ইসলাম অনুসারে পৃথিবী স্থির এবং নড়াচড়া করে না

Table of Contents

ভূমিকা

মানুষের জ্ঞানতাত্ত্বিক ইতিহাসে মহাবিশ্বের গঠন এবং পৃথিবীর অবস্থান নিয়ে কৌতূহলের কোনো শেষ নেই। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ যখন আকাশের দিকে তাকিয়েছে, তখন তার সাধারণ ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতা (Empirical Experience) তাকে বলেছে যে—আকাশের সূর্য, চন্দ্র এবং নক্ষত্ররাজি গতিশীল, আর আমরা যে পৃথিবীর ওপর দাঁড়িয়ে আছি, তা স্থির ও অচল। মানব সভ্যতার শৈশবে এই ধারণাটিই ছিল সবচেয়ে যৌক্তিক ও স্বাভাবিক। সপ্তম শতাব্দীতে আরবের মরুভূমিতে যখন ইসলাম ধর্মের উদ্ভব ঘটে, তখন সেখানকার মানুষের মহাজাগতিক ধারণা এই ভূ-কেন্দ্রিক (Geocentric) এবং স্থির পৃথিবীর বিশ্বাসের বাইরে ছিল না।

ইসলামী ধর্মগ্রন্থ কোরআন এবং হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনাকে যখন আমরা নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করি, তখন দেখা যায়—এতে পৃথিবীকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যা প্রাচীন মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সাথে হুবহু মিলে যায়। অর্থাৎ, পৃথিবীকে একটি অচল ক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যাকে পাহাড় দিয়ে স্থিতিশীল রাখা হয়েছে যাতে তা নড়াচড়া না করে। সমস্যাটি তৈরি হয় তখন, যখন মধ্যযুগের এই ধারণাপ্রসূত বর্ণনাগুলোকে আধুনিক বিজ্ঞানের ‘চমক’ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং পদার্থবিজ্ঞান দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করেছে যে, পৃথিবী স্থির নয়; বরং এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নিজ অক্ষের ওপর এবং সূর্যের চারদিকে ঘুরছে।

এই প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করব, কীভাবে কোরআনের আয়াত, হাদিসের বর্ণনা এবং প্রখ্যাত মুসলিম আলেমদের ব্যাখ্যা প্রমাণ করে যে—ইসলামের আদি দৃষ্টিভঙ্গিতে পৃথিবীকে স্থির এবং সূর্যকে তার চারদিকে ঘূর্ণায়মান একটি বস্তু হিসেবেই দেখা হতো। আমরা কেবল ধর্মীয় ভাবাবেগ নয়, বরং ঐতিহাসিক দলিল, যুক্তি এবং বিজ্ঞানের নিরিখে এই বিষয়টিকে ব্যবচ্ছেদ করব।


কোরআনের ভাষ্যঃ স্থির এবং অচল পৃথিবী

কোরআনের মহাজাগতিক বর্ণনাগুলো পাঠ করলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পৃথিবীকে এখানে একটি অটল এবং স্থির ভিত্তি হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান যেখানে বলছে পৃথিবী প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩০ কিলোমিটার বেগে সূর্যের চারদিকে দৌড়াচ্ছে, কোরআন সেখানে দাবি করছে যে পৃথিবী যাতে ‘স্থানচ্যুত’ না হয় বা ‘নড়াচড়া’ না করে, সেজন্য স্বয়ং ঈশ্বর একে ধরে রেখেছেন। অথচ আমরা জানি, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘূর্ণায়মান এবং নিজ অক্ষের ওপরও সে ঘুরছে, অনেকটা নিচের ছবির মত।

পৃথিবী স্থির

আসমান ও জমিনের স্থিতি

সূরা ফাতিরের ৪১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: [1]

আল্লাহই আসমান ও যমীনকে স্থির রাখেন যাতে ও দু’টো টলে না যায়। ও দু’টো যদি টলে যায় তাহলে তিনি ছাড়া কে ও দু’টোকে স্থির রাখবে? তিনি পরম সহিষ্ণু, পরম ক্ষমাশীল।
— Taisirul Quran
আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে সংরক্ষণ করেন যাতে ওরা স্থানচ্যূত না হয়, ওরা স্থানচ্যূত হলে তিনি ব্যতীত কে ওদেরকে সংরক্ষণ করবে? তিনি অতি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনকে ধরে রাখেন যাতে এগুলো স্থানচ্যুত না হয়। আর যদি এগুলো স্থানচ্যুত হয়, তাহলে তিনি ছাড়া আর কে আছে, যে এগুলোকে ধরে রাখবে? নিশ্চয় তিনি পরম সহনশীল, অতিশয় ক্ষমাপরায়ণ।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় আল্লাহ্‌ আসমানসমূহ ও যমীনকে ধারণ করেন, যাতে তারা স্থানচ্যুত না হয়, আর যদি তারা স্থানচ্যুত হয়, তবে তিনি ছাড়া কেউ নেই যে, তাদেরকে ধরে রাখতে পারে [১]। নিশ্চয় তিনি অতি সহনশীল, অসীম ক্ষমাপরায়ণ।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এখানে ‘তাজুলা’ শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হলো নিজের জায়গা থেকে সরে যাওয়া বা বিচ্যুত হওয়া। যদি পৃথিবী প্রাকৃতিকভাবেই ঘূর্ণায়মান হতো, তবে তাকে “ধরে রাখা যাতে সরে না যায়”—এমন বক্তব্যের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি থাকে না। এই আয়াতটি মূলত একটি স্থির পৃথিবীর প্রাচীন ধারণাকেই সমর্থন করে, যেখানে আসমান এবং জমিনকে দুটি বিশাল কিন্তু অচল কাঠামো হিসেবে দেখা হতো।


পাহাড়: পৃথিবীর গতিরোধক পেরেক

কোরআনের একাধিক আয়াতে পৃথিবীর স্থিতিশীলতা রক্ষায় পাহাড়ের ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। প্রাচীন আরবে ধারণা ছিল যে, পৃথিবী একটি বিশাল সমতল পৃষ্ঠের মতো যা পানির ওপর ভাসমান বা কোনো কিছুর ওপর ভারসাম্যহীনভাবে আছে, ফলে এটি যেকোনো সময় উল্টে যেতে পারে বা দুলতে পারে। এই ‘দুলুনি’ থামানোর জন্য পাহাড়কে ‘পেরেক’ বা ‘নোঙর’ হিসেবে ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। সূরা লোকমানে বলা হয়েছে: [2]

তিনি আকাশমন্ডলী নির্মাণ করেছেন স্তম্ভ ছাড়া যা তোমরা দেখছ। তিনি পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন দৃঢ়ভাবে দন্ডায়মান পর্বতমালা যাতে পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে নড়াচড়া না করে আর তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সকল প্রকার জীবজন্তু, আর আমিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি, অতঃপর তাতে উদ্গত করি যাবতীয় কল্যাণকর উদ্ভিদ।
— Taisirul Quran
তিনি আকাশমন্ডলী নির্মাণ করেছেন স্তম্ভ ব্যতীত, তোমরা এটা দেখছ। তিনিই পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন পবর্তমালা যাতে এটা তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্ব প্রকার জীব-জন্তু এবং আমিই আকাশ হতে বারি বর্ষণ করে এতে উদ্ভব করি সর্বপ্রকার কল্যাণকর উদ্ভিদ।
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনি খুঁটি ছাড়া আসমানসমূহ সৃষ্টি করেছেন, যা তোমরা দেখছ, আর যমীনে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পাহাড়, যাতে তা তোমাদেরকে নিয়ে হেলে না পড়ে, আর তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রত্যেক প্রকারের প্রাণী; আর আসমান থেকে আমি পানি পাঠাই। অতঃপর তাতে আমি জোড়ায় জোড়ায় কল্যাণকর উদ্ভিদ জন্মাই।
— Rawai Al-bayan
তিনি আসমানসমূহ নির্মাণ করেছেন খুঁটি ছাড়া—তোমরা এটা দেখতে পাচ্ছ; তিনিই যমীনে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বতমালা যাতে এটা তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সব ধরণের জীব-জন্তু। আর আমরা আকাশ হতে বারি বর্ষণ করি তারপর এতে উদ্গত করি সব ধরণের কল্যাণকর উদ্ভিদ।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এখানে ‘তামিদা’ শব্দের অর্থ হলো দুলতে থাকা, হেলে পড়া বা ভারসাম্য হারানো। আধুনিক ভূতত্ত্ব বা জিওলজি অনুযায়ী পাহাড় কখনোই পৃথিবীর ঘূর্ণন বা দুলুনি থামানোর কাজ করে না; বরং পাহাড় নিজেই টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার ফলে সৃষ্টি হয়। কিন্তু কোরআনিক বর্ণনায় পাহাড়কে দেখা হয়েছে পৃথিবীর ‘স্থিতি’ রক্ষার গ্যারান্টি হিসেবে। অর্থাৎ, পাহাড় না থাকলে পৃথিবী নড়াচড়া করত বা অস্থির থাকতো। এই ধারণাটি কেবল তখনই সম্ভব, যখন আপনি বিশ্বাস করবেন যে পৃথিবী মূলত একটি স্থির বস্তু যা মাঝে মাঝে ভূমিকম্প বা ভারসাম্যহীনতার কারণে কেঁপে উঠতে পারে।


স্থির আবাসস্থল হিসেবে পৃথিবী

সূরা নামল-এ পৃথিবীকে একটি ‘কারার’ বা স্থির আবাসস্থল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে:

নাকি তিনিই (শ্রেষ্ঠ) যিনি এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করেছেন আর তার ফাঁকে ফাঁকে নদীনালা প্রবাহিত করেছেন, তাতে সুদৃঢ় পর্বত সংস্থাপিত করেছেন এবং দু’ দরিয়ার মাঝে পার্থক্যকারী আড়াল সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর সাথে অন্য কোন ইলাহ আছে কি? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।
— Taisirul Quran
বলত, কে পৃথিবীকে করেছেন বাসোপযোগী এবং ওর মাঝে মাঝে প্রবাহিত করেছেন নদ-নদী এবং তাকে স্থির রাখার জন্য স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বত ও দুই সমুদ্রের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন অন্তরায়; আল্লাহর সাথে অন্য কোন মা‘বূদ আছে কি? তবুও তাদের অনেকেই জানেনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
বরং তিনি, যিনি যমীনকে আবাসযোগ্য করেছেন এবং তার মধ্যে প্রবাহিত করেছেন নদী-নালা। আর তাতে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বতমালা এবং দুই সমুদ্রের মধ্যখানে অন্তরায় সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সাথে কি অন্য কোন ইলাহ আছে? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।
— Rawai Al-bayan
নাকি তিনি, যিনি যমীনকে করেছেন বসবাসের উপযোগী এবং তার মাঝে মাঝে প্রবাহিত করেছেন নদীনালা এবং তাতে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বত ও দুই সাগরের মাঝে সৃষ্টি করেছেন অন্তরায় [১]; আল্লাহ্‌র সাথে অন্য কোনো ইলাহ আছে কি? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এই ‘কারার’ শব্দটির মূল অর্থই হলো স্থিতি বা স্থিরতা। মহাকাশে ঘূর্ণায়মান কোনো গ্রহের ক্ষেত্রে “স্থির আবাসস্থল” বিশেষণটি ব্যবহার করা বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এটি মূলত সপ্তম শতাব্দীর মানুষের সেই চিরচেনা অনুভূতির প্রতিফলন, যেখানে মানুষ মনে করত পায়ের নিচের মাটি সবসময়ই স্থির।


ধ্রুপদী তাফসীরঃ পূর্বযুগের আলেমদের দৃষ্টিতে পৃথিবীর স্থিতি

কোরআনের আয়াতগুলোকে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে মেলাতে গিয়ে বর্তমানের অনেক অপোলজিস্ট (ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাকারী) দাবি করেন যে, পাহাড়ের মাধ্যমে পৃথিবীকে স্থিতিশীল রাখার কথাটি কেবল একটি রূপক। কিন্তু আপনি যদি ইসলামের ইতিহাসের মহান আলেমদের তাফসীর পড়েন, তবে দেখবেন তারা বিষয়টিকে অত্যন্ত আক্ষরিক এবং ভৌগোলিক বাস্তব হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন।


ইবনে কাসীরের ব্যাখ্যা ও পাহাড়ের ভূমিকা

বিখ্যাত তাফসীরকারক ইবনে কাসীর তাঁর তাফসীরে বিভিন্ন সাহাবীর বর্ণনা উদ্ধৃত করে পৃথিবীর সৃষ্টিতত্ত্ব আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, পৃথিবী যখন সৃষ্টি করা হলো, তখন এটি পানির ওপর দুলছিল বা কাঁপছিল। এরপর পাহাড় সৃষ্টি করে একে স্থির করা হয়। তিনি সূরা আম্বিয়ার ৩১ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: “অর্থাৎ: আমি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করিয়াছি যাহাতে উহা তাহাদের (মানুষদের) লইয়া আন্দোলিত না হয়।” [3]। এখানে ‘আন্দোলিত হওয়া’ বা ‘নড়াচড়া করা’ বলতে পৃথিবীর বর্তমান বৈজ্ঞানিক গতিকে (Rotation/Revolution) বোঝানো হয়নি। বরং বোঝানো হয়েছে একটি স্থির বস্তু যেভাবে পানির ওপর বা কোনো তলের ওপর ভারসাম্য হারিয়ে কেঁপে ওঠে, সেই অস্থিরতাকে।


সৃষ্টির আদি ইতিহাসঃ মাছ ও শিলা

ইবনে কাসীর এবং আস-সুদ্দী প্রমুখ আলেমগণ ইবনে মাসউদ এবং ইবনে আব্বাসের মতো বড় বড় সাহাবীদের বর্ণনা থেকে পৃথিবীর যে ভিত্তি বর্ণনা করেছেন, তা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ বিপরীত। সেই বর্ণনা অনুযায়ী:

“সৃজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সর্বপ্রথম তিনি (আল্লাহ) পানি হইতে বাষ্প সৃষ্টি করিলেন। উহা ঊর্ধ্বলোকে উত্থিত হইয়া আকাশে পরিণত হইল। অতঃপর পানি শুকাইয়া একটি ভূখণ্ড দেখা দিল… অতঃপর পৃথিবীকে সেই মৎসের (নূন) ওপর স্থাপন করা হইল… মৎসটি নড়াচড়া করা মাত্র পৃথিবী কম্পিত হয় এবং ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। তাই পৃথিবীকে পাহাড় চাপা দেওয়া হইল। ফলে পৃথিবী সুস্থির হইল।” [3]

এই বর্ণনাটি ঐতিহাসিক ‘ভূ-কেন্দ্রিক’ এবং ‘স্থির পৃথিবী’ ধারণার একটি চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এখানে পাহাড়কে দেখা হয়েছে পৃথিবীর ওপর একটি ‘চাপ’ বা ওজন হিসেবে, যা মৎস্যের (Whale/Fish) নড়াচড়ার ফলে সৃষ্ট কম্পন থামিয়ে পৃথিবীকে স্থির রাখে। যদিও আধুনিক যুগের মুসলিমরা এই মৎস্য বা শিলার কাহিনীগুলোকে ‘ইসরাঈলী বর্ণনা’ বলে এড়িয়ে যেতে চান, কিন্তু এই বর্ণনাগুলোই প্রমাণ করে যে সেই সময়ের মানুষদের কাছে পৃথিবী কোনো শূন্যস্থানে ঘূর্ণায়মান গোলক ছিল না।


সুম্মার ভাষাগত মারপ্যাঁচ

পৃথিবী আগে নাকি আকাশ আগে সৃষ্টি হয়েছে—এই বিতর্কের সমাধানে ইবনে কাসীর আরবি ব্যাকরণের ‘সুম্মা’ (ثم) শব্দের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, পৃথিবী সৃষ্টি করে একে স্থির করার পর আকাশের দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রাচীন কবিদের কবিতা উদ্ধৃত করে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, পৃথিবীর যে স্থিতি বা সংস্থাপন কার্যের কথা কোরআনে বলা হয়েছে, তা আকাশমন্ডলী সৃষ্টির সাথেই সংশ্লিষ্ট এবং এটি একটি অচল কাঠামো হিসেবেই সুসংবদ্ধ।

এর থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়—প্রাচীন আলেমদের কাছে পৃথিবীর ‘গতি’ বা ‘ঘূর্ণন’ সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। তাদের কাছে পাহাড় ছিল পৃথিবীর স্থিতির নোঙর, আর পৃথিবী ছিল মহাবিশ্বের কেন্দ্রে থাকা এক বিশাল স্থির মঞ্চ। আসুন ইবনে কাসীরের সম্পূর্ণ বর্ণনাটি পড়ে দেখা যাক,

এটি খবর (সংবাদমূলক বক্তব্য)-এর সহিত সংশ্লিষ্ট, ফেল (ক্রিয়া)-এর সহিত নহে। অর্থাৎ আত্বফ (সংযোজন) হইয়াছে খবরের সহিত, ফেলের সহিত নহে। সুতরাং এখানে খবর পরিবেশনের সংযোগ রক্ষা করিতেছে, পূর্বাপর নির্ধারক (সময়ক্রম) হিসেবে কাজ করে নাই। আরবিতে ‘সুম্মা’ (ثم) শব্দের নিছক সংযোগ কাজে ব্যবহৃত হওয়ার প্রচলন রহিয়াছে। যেমন জনৈক কবি বলেন:
قُلْ لِمَنْ سَادَ ثُمَّ سَادَ أَبُوهُ ۞ ثُمَّ قَدْ سَادَ قَبْلَ ذَلِكَ جَدُّهُ
(অর্থাৎ: বল সেই ব্যক্তিকে যে নেতা হইয়াছে, অতঃপর নেতা হইয়াছিল তাহার পিতা, আর ইহার পূর্বে নেতা হইয়াছিল তাহার পিতামহ।)
উক্ত চরণে ‘সুম্মা’ শব্দটি সময়ক্রম না বুঝাইয়া নিছক সংবাদ বা তথ্যের সংযোগ রক্ষা করিয়াছে এবং পুরুষানুক্রমিক নেতৃত্বের খবর পরিবেশনের কাজ দিয়াছে।
একদল ব্যাখ্যাকার আয়াতদ্বয়ের আপাত বৈসাদৃশ্য (আকাশ আগে না পৃথিবী আগে সৃষ্টি) দূরীকরণার্থে বলেন, এই আয়াতে পৃথিবীর সম্প্রসারণ ও বিন্যাস কার্যের (দাহাহা) বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। উহা সৃষ্টির (খলক) কথা বলা হয় নাই। সুতরাং আমাদের আলোচ্য আয়াতে প্রথমে পৃথিবী সৃষ্টি করিয়া পরে আকাশ সৃষ্টি এবং অন্য আয়াতে (সূরা নাযিয়াত) উহার পর পৃথিবীকে পরিপূর্ণরূপে বিন্যস্ত করা বুঝানো হইতেছে। ফলে কোনো বৈপরীত্য ঘটিতেছে না।
কেহ কেহ বলেন, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করার পরপরই উহার সংস্থাপন কার্য করা হয়। এই অভিমতটি হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হইতে আলী ইবনে আবু তালহা বর্ণনা করেন।
আস্-সুদ্দী স্বীয় তাফসীরে ইবনে মাসউদ ও অন্যান্য সাহাবা (রা.) হইতে পর্যায়ক্রমে মুররা (গুগল লেন্সে ভুল এসেছিল ‘মুল্লাহ’), ইবনে আব্বাস, আবু সালেহ ও আবূ মালিক হইতে বর্ণনা করেন— সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ তাআলার আরশ পানির উপর সংস্থাপিত ছিল। পানির পূর্বে আল্লাহ পাক কোনো বস্তুই সৃষ্টি করেন নাই। সুতরাং সৃজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সর্বপ্রথম তিনি পানি হইতে বাষ্প সৃষ্টি করিলেন। উহা ক্রমান্বয়ে ঊর্ধ্বলোকে উত্থিত হইল এবং উত্থিত বাষ্প ছাদরূপ পরিগ্রহ করিয়া আকাশে পরিণত হইল। এইজন্য উহার নাম হইল সামাউ (سماء) বা ঊর্ধ্বলোক (লেন্সে ভুল ছিল ءL)।
অতঃপর পানি শুকাইয়া একটি ভূখণ্ড দেখা দিল। তখন উহাকে সপ্তখণ্ডে বিভক্ত করা হইল। রবি ও সোম—এই দুই দিনে এই সপ্তখণ্ড (পৃথিবী) সৃষ্টি হইল। অতঃপর পৃথিবীকে সেই মৎসের (নূন) উপর স্থাপন করা হইল যাহার বর্ণনা সূরা ‘নূন ওয়াল কলম’-এ আসিয়াছে। মৎসটি পানির উপর এবং পানির নিচে সাখরা (সাখরা বা শিলা; লেন্সে ভুল ছিল ‘সকাত’) জাতীয় পদার্থ বা পরিচ্ছন্ন মৃত্তিকা শিলা বিদ্যমান। শিলার ধারক হইলেন ফেরেশতা। ফেরেশতা দণ্ডায়মান প্রস্তরের আস্তরের উপর এবং প্রস্তরের আস্তরটি বায়ুমণ্ডলের উপর ভাসমান রহিয়াছে। লুকমান হাকীম এই প্রস্তর আস্তরের কথাই বলিয়াছেন। উহা আকাশ কিংবা পৃথিবীর কোথাও স্থাপিত নহে। মৎসটি নড়াচড়া করা মাত্র পৃথিবী কম্পিত হয় এবং ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। তাই পৃথিবীকে পাহাড় চাপা দেওয়া হইল। ফলে পৃথিবী সুস্থির হইল। পর্বত তাই পৃথিবীর কাছে নিজের বড়াই করিয়া থাকে।
আল্লাহ পাক বলেন:
وَجَعَلْنَا فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيدَ بِهِمْ
(অর্থাৎ: আমি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করিয়াছি যাহাতে উহা তাহাদের লইয়া আন্দোলিত না হয়।)

পৃথিবী স্থির 1

ঐতিহাসিক দলিলঃ কাজউইনি ও মধ্যযুগীয় ইসলামিক বিশ্বতত্ত্ব

ইসলামিক স্বর্ণযুগের চিন্তাধারায় পৃথিবীর স্থিতি কেবল সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ছিল না, বরং তা তৎকালীন উচ্চশিক্ষিত জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাজের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছিল। এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলেন ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ফারসী জ্যোতির্বিজ্ঞানী জাকারিয়া আল-কাজউইনি (১২০৩–১২৮৩ খ্রি.)। ইরানের কাজউইন শহরে জন্মগ্রহণকারী এই পন্ডিত ছিলেন নবী মুহাম্মাদের বিশিষ্ট সাহাবী আনাস ইবনে মালিকের বংশধর।

তার বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘আজাইব আল-মাখলুকাত ওয়া গরায়েব আল-মওজুদাত’ (সৃষ্টির বিস্ময়রাজি) মধ্যযুগীয় ইসলামিক বিশ্বতত্ত্বের এক অমূল্য দলিল। এই গ্রন্থে তিনি পৃথিবী ও মহাবিশ্বের যে মানচিত্র বা চিত্র তুলে ধরেছেন, তা কোরআনিক বর্ণনার আক্ষরিক প্রতিফলন। তার বর্ণনা ও ডায়াগ্রাম থেকে আমরা তৎকালীন ইসলামিক বিশ্বের মহাজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাই:

  • মহাজাগতিক ভিত্তি: কাজউইনির বর্ণনায় দেখা যায়, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রে এক অবিচল অবস্থানে রয়েছে। কোরআনের সূরা নূনের তাফসীরের ওপর ভিত্তি করে তিনি পৃথিবীকে একটি বিশাল মৎস্য (Bahamut), একটি মহাজাগতিক ষাঁড় (Kuyutha) এবং একটি বিশাল শিলাখণ্ডের (Ruby/Rock) ওপর বিন্যস্ত দেখিয়েছেন।
  • স্থিরতার যুক্তি: তার গ্রন্থে পৃথিবী ও আকাশকে এমনভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে যেখানে পাহাড়গুলো ‘পেরেকের’ মতো পৃথিবীকে আটকে রেখেছে। এই স্থির কাঠামোটি তৎকালীন জ্যোতির্বিজ্ঞানে এতটাই সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল যে, কাজউইনি একে ‘সৃষ্টির বিস্ময়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। [4]

কাজউইনির এই কাজগুলো প্রমাণ করে যে, এমনকি ইসলামি স্বর্ণযুগের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের কাছেও পৃথিবী ছিল একটি স্থির ও অচল মঞ্চ। তাদের কাছে সূর্য এবং চন্দ্র ছিল পৃথিবীর চারদিকে ঘূর্ণায়মান বস্তু, আর পৃথিবী ছিল সেই স্থির কেন্দ্র যার ওপর আসমানগুলো ছাদের মতো স্তরে স্তরে সজ্জিত। এটি নির্দেশ করে যে, তৎকালীন আলেম ও বিজ্ঞানীরা কোরআনের বর্ণনাগুলোকে একটি স্থির ভূ-কেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্ব হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। উনার গ্রন্থ The Wonders of Creation, Translated into Turkish from Arabic. Istanbul: ca. 1553 থেকে আমরা পৃথিবী ও মহাবিশ্বের ইসলামিক ধারণা পাই নিচের ছবিটির মত,

পৃথিবী স্থির 3

সূর্য ঘোরে না পৃথিবী ঘোরে? আধুনিক আলেমদের ফতোয়া

অনেকে মনে করেন, পৃথিবীকে স্থির মনে করা কেবল তেরো বা চোদ্দো শতকের আলেমদের ধারণা ছিল। কিন্তু আধুনিক যুগের প্রভাবশালী সৌদি আলেম শায়খ ইবনে উসাইমীন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম’-এ দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন যে—সূর্যই পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে এবং পৃথিবী স্থির। ১৬ নম্বর প্রশ্নের জবাবে তিনি মোট ১০টি দলীল উপস্থাপন করেছেন, যা মুহাম্মদের মহাজাগতিক ধারণার আক্ষরিক প্রতিফলন। [5] [6]। উনার ফতোয়া থেকে যে বিষয়গুলো জানা যায়,

সূর্যের উদয় ও অস্ত যাওয়া
শায়খ উসাইমীনের মতে, কোরআনের বর্ণনা (সূরা বাকারা: ২৫৮) অনুযায়ী আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন এবং পশ্চিম দিকে অস্তমিত করেন। তাঁর যুক্তি হলো, যদি পৃথিবী ঘুরত তবে আল্লাহ বলতেন না যে সূর্য উদিত হয় বা অস্ত যায়, বরং বলতেন পৃথিবী এমনভাবে সরে যায় যাতে সূর্যকে উদিত মনে হয়।
গুহার সেই বিশেষ বর্ণনা
সূরা কাহাফের ১৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে সূর্য গুহার ডান দিক থেকে উদিত হয় এবং বাম দিক থেকে পাশ কাটিয়ে যায়। উসাইমীনের দাবি:
“পাশ কেটে ডান দিকে বা বাম দিকে চলে যাওয়া প্রমাণ করে যে, নড়াচড়া সূর্য থেকেই হয়ে থাকে। পৃথিবী যদি নড়াচড়া করত তবে অবশ্যই বলা হতো সূর্য থেকে গুহা পাশ কেটে যায়।”
রাতের পেছনে দিনের দৌড়ানি
সূরা আরাফের ৫৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “দিন দৌড়ে দৌড়ে রাতের পেছনে আসে।” এই বর্ণনাটিকে শায়খ উসাইমীন একজন অনুসন্ধানকারীর সাথে তুলনা করেছেন যে তার শিকারের পেছনে ছুটছে। এটি কেবল তখনই সম্ভব যদি দিন-রাত বা আলোর উৎস সূর্য পৃথিবীর ওপর দিয়ে ক্রমাগত ছুটে চলে।
আরশের নিচে সূর্যের সেজদা
উসাইমীন তাঁর ফতোয়ায় সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে সহিহ বুখারীর সেই হাদিসটি এনেছেন যেখানে মুহাম্মদ আবু যর (রা.)-কে বলছেন:
“সূর্য যখন অস্ত যায়, তখন সে আরশের নিচে গিয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং পুনরায় উদিত হওয়ার অনুমতি চায়। কিয়ামতের আগে তাকে বলা হবে—যেখান থেকে এসেছ সেখানে ফিরে যাও, অর্থাৎ সূর্য তখন পশ্চিম দিক থেকেই উদিত হবে।”
সূর্য যদি আরশের নিচে যাওয়ার জন্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ‘ভ্রমণ’ করে এবং পুনরায় উদিত হতে ‘অনুমতি’ চায়, তবে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ‘নিজ অক্ষের ওপর পৃথিবীর ঘূর্ণন’ তত্ত্বটি এই বর্ণনার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। [7]
স্থির বনাম গতিশীল বস্তুর বশীভূতকরণ
শায়খ উসাইমীন আরও যুক্তি দেন যে, কোরআনে সূর্য ও চন্দ্রকে ‘বশীভূত’ করা এবং তাদের ‘চলাচল’ করার কথা বলা হয়েছে (সূরা যুমার: ৫)। তিনি মনে করেন, কোনো স্থির বস্তুকে বশীভূত করার চেয়ে চলমান বস্তুকে নিয়ন্ত্রণে রাখা বা নির্দিষ্ট পথে পরিচালনা করা অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত এবং ভাষাগতভাবে সঙ্গতিপূর্ণ।

এবারে আসুন তার বিখ্যাত ফতোয়াটি পড়ে নিই,

প্রশ্ন: (১৬) সূর্য কি পৃথিবীর চার দিকে ঘুরে?
উত্তর: মান্যবর শাইখ উত্তরে বলেন যে, শরী‘আতের প্রকাশ্য দলীলগুলো প্রমাণ করে যে, সূর্যই পৃথিবীর চতুর্দিকে ঘুরে। এ ঘুরার কারণেই পৃথিবীতে দিবা-রাত্রির আগমণ ঘটে। আমাদের হাতে এ দলীলগুলোর চেয়ে বেশি শক্তিশালী এমন কোনো দলীল নেই, যার মাধ্যমে আমরা সূর্য ঘূরার দলীলগুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারি। সূর্য ঘুরার দলীলগুলো হলো আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿فَإِنَّ ٱللَّهَ يَأۡتِي بِٱلشَّمۡسِ مِنَ ٱلۡمَشۡرِقِ فَأۡتِ بِهَا مِنَ ٱلۡمَغۡرِبِ﴾ [البقرة: ٢٥٨]
“আল্লাহ তা‘আলা সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন। তুমি পারলে পশ্চিম দিক থেকে উদিত কর।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৮] সূর্য পূর্ব দিক থেকে উঠার মাধ্যমে প্রকাশ্য দলীল পাওয়া যায় যে, সূর্য পৃথিবীর উপর পরিভ্রমণ করে।
২) আল্লাহ বলেন,
﴿فَلَمَّا رَءَا ٱلشَّمۡسَ بَازِغَةٗ قَالَ هَٰذَا رَبِّي هَٰذَآ أَكۡبَرُۖ فَلَمَّآ أَفَلَتۡ قَالَ يَٰقَوۡمِ إِنِّي بَرِيٓءٞ مِّمَّا تُشۡرِكُونَ ٧٨﴾ [الانعام: ٧٨]
“অতঃপর যখন সূর্যকে চকচকে অবস্থায় উঠতে দেখলেন তখন বললেন, এটি আমার রব, এটি বৃহত্তর। অতপর যখন তা ডুবে গেল, তখন বলল হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যেসব বিষয়ে শরীক কর আমি ওসব থেকে মুক্ত।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৭৮]
এখানে নির্ধারণ হয়ে গেল যে, সূর্য অদৃশ্য হয়ে যায়। একথা বলা হয় নি যে, সূর্য থেকে পৃথিবী ডুবে গেল। পৃথিবী যদি ঘূরত তাহলে অবশ্যই তা বলা হত।
৩) আল্লাহ বলেন,
﴿وَتَرَى ٱلشَّمۡسَ إِذَا طَلَعَت تَّزَٰوَرُ عَن كَهۡفِهِمۡ ذَاتَ ٱلۡيَمِينِ وَإِذَا غَرَبَت تَّقۡرِضُهُمۡ ذَاتَ ٱلشِّمَالِ﴾ [الكهف: ١٧]
“তুমি সূর্যকে দেখবে, যখন উদিত হয়, তাদের গুহা থেকে পাশ কেটে ডান দিকে চলে যায় এবং যখন অস্ত যায়, তাদের থেকে পাশ কেটে বাম দিকে চলে যায়।” [সূরা কাহাফ, আয়াত: ১৭] পাশ কেটে ডান দিকে বা বাম দিকে চলে যাওয়া প্রমাণ করে যে, নড়াচড়া সূর্য থেকেই হয়ে থাকে। পৃথিবী যদিনড়াচড়া করত তাহলে অবশ্যই বলতেন সূর্য থেকে গুহা পাশ কেটে যায়। উদয় হওয়া এবং অস্ত যাওয়াকে সূর্যের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এটা থেকে বুঝা যায় যে, সূর্যই ঘুরে। পৃথিবী নয়।
৪) আল্লাহ বলেন,
﴿وَهُوَ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلَّيۡلَ وَٱلنَّهَارَ وَٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَۖ كُلّٞ فِي فَلَكٖ يَسۡبَحُونَ ٣٣﴾ [الانبياء: ٣٣]
“এবং তিনিই দিবা-নিশি এবং চন্দ্র-সূর্য সৃষ্টি করেছেন। সবাই আপন আপন কক্ষ পথে বিচরণ করে।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৩৩]
ইবন আব্বাস বলেন, লাটিম যেমন তার কেন্দ্র বিন্দুর চার দিকে ঘুরতে থাকে, সূর্যও তেমনিভাবে ঘুরে।
৫) আল্লাহ বলেন,
﴿يُغۡشِي ٱلَّيۡلَ ٱلنَّهَارَ يَطۡلُبُهُۥ حَثِيثٗا﴾ [الاعراف: ٥٤]
“তিনি রাতকে আচ্ছাদিত করেন দিনের মাধ্যমে, দিন দৌড়ে দৌড়ে রাতের পিছনে আসে।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৫৪]
আয়াতে রাতকে দিনের অনুসন্ধানকারী বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অনুসন্ধানকারী পিছনে পিছনে দ্রুত অনুসন্ধান করে থাকে। এটা জানা কথা যে, দিবা-রাত্রি সূর্যের অনুসারী।
৬) আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ بِٱلۡحَقِّۖ يُكَوِّرُ ٱلَّيۡلَ عَلَى ٱلنَّهَارِ وَيُكَوِّرُ ٱلنَّهَارَ عَلَى ٱلَّيۡلِۖ وَسَخَّرَ ٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَۖ كُلّٞ يَجۡرِي لِأَجَلٖ مُّسَمًّىۗ أَلَا هُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡغَفَّٰرُ ٥﴾ [الزمر: ٥]
“তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে। তিনি রাত্রিকে দিবস দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে কাজে নিযুক্ত করেছেন। প্রত্যেকেই বিচরণ করে নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত। জেনে রাখুন, তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৫]
আয়াতের মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম যে, পৃথিবীর উপরে দিবা-রাত্রি চলমান রয়েছে। পৃথিবী যদি ঘুরতো তাহলে তিনি বলতেন, দিবা-রাত্রির উপর পৃথিবীকে ঘূরান। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “সূর্য এবং চন্দ্রের প্রত্যেকেই চলমান”। এ সমস্ত দলীলের মাধ্যমে জানা গেল যে, সুস্পষ্টভাবেই সূর্য ও চন্দ্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করছে। এ কথা সুস্পষ্ট যে, চলমান বস্তুকে বশীভুত করা এবং কাজে লাগানো একস্থানে অবস্থানকারী বস্তুকে কাজে লাগানোর চেয়ে অধিক যুক্তিসঙ্গত।
৭) আল্লাহ বলেন,
﴿وَٱلشَّمۡسِ وَضُحَىٰهَا ١ وَٱلۡقَمَرِ إِذَا تَلَىٰهَا ٢﴾ [الشمس: ١، ٢]
“শপথ সূর্যের ও তার কিরণের, শপথ চন্দ্রের যখন তা সূর্যের পশ্চাতে আসে।” [সূরা আশ-শামস, আয়াত: ১-২]
এখানে বলা হয়েছে যে, চন্দ্র সূর্যের পরে আসে। এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, সূর্য এবং চন্দ্র চলাচল করে এবং পৃথিবীর উপর ঘুরে। পৃথিবী যদি চন্দ্র বা সূর্যের চার দিকে ঘুরত, তাহলে চন্দ্র সূর্যকে অনুসরণ করতনা। বরং চন্দ্র একবার সূর্যকে, আর একবার সূর্য চন্দ্রকে অনুসরণ করত। কেননা সূর্য চন্দ্রের অনেক উপরে। এ আয়াত দিয়ে পৃথিবী স্থীর থাকার ব্যাপারে দলীল গ্রহণ করার ভিতরে চিন্তা-ভাবনার বিষয় রয়েছে।
৮) মহান আল্লাহ বলেন,
﴿وَٱلشَّمۡسُ تَجۡرِي لِمُسۡتَقَرّٖ لَّهَاۚ ذَٰلِكَ تَقۡدِيرُ ٱلۡعَزِيزِ ٱلۡعَلِيمِ ٣٨ وَٱلۡقَمَرَ قَدَّرۡنَٰهُ مَنَازِلَ حَتَّىٰ عَادَ كَٱلۡعُرۡجُونِ ٱلۡقَدِيمِ ٣٩ لَا ٱلشَّمۡسُ يَنۢبَغِي لَهَآ أَن تُدۡرِكَ ٱلۡقَمَرَ وَلَا ٱلَّيۡلُ سَابِقُ ٱلنَّهَارِۚ وَكُلّٞ فِي فَلَكٖ يَسۡبَحُونَ ٤٠﴾ [يس: ٣٨، ٤٠]
“সূর্য তার নির্দিষ্ট অবস্থানে আবর্তন করে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারণ। চন্দ্রের জন্যে আমি বিভিন্ন মঞ্জিল নির্ধারিত করেছি। অবশেষে সে পুরাতন খর্জুর শাখার অনুরূপ হয়ে যায়। সূর্যের পক্ষে চন্দ্রকে নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। রাতের পক্ষেও দিনের অগ্রবতী হওয়া সম্ভব নয়। প্রত্যেকেই আপন আপন কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে।” [সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৩৮-৪০]
সূর্যের চলা এবং এ চলাকে মহা পরাক্রমশালী আল্লাহর নির্ধারণ বলে ব্যাখ্যা করা এটাই প্রমাণ করে যে, সূর্য প্রকৃতভাবেই চলমান। আর এ চলাচলের কারণেই দিবা-রাত্রি এবং ঋতুর পরিবর্তন হয়। চন্দ্রের জন্য মঞ্জিল নির্ধারণ করার অর্থ এ যে, সে তার মঞ্জিলসমূহে স্থানান্তরিত হয়। যদি পৃথিবী ঘুরত, তাহলে পৃথিবীর জন্য মঞ্জিল নির্ধারণ করা হত। চন্দ্রের জন্য নয়। সূর্য কর্তৃক চন্দ্রকে ধরতে না পারা এবং দিনের অগ্রে রাত থাকা সূর্য, চন্দ্র, দিন এবং রাতের চলাচলের প্রমাণ বহন করে।
৯) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় আবু যরকে বলেছেন,
«أَتَدْرِي أَيْنَ تَذْهَبُ قُلْتُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ قَالَ فَإِنَّهَا تَذْهَبُ حَتَّى تَسْجُدَ تَحْتَ الْعَرْشِ فَتَسْتَأْذِنَ فَيُؤْذَنُ لَهَا وَيُوشِكُ أَنْ تَسْجُدَ فَلَا يُقْبَلَ مِنْهَا وَتَسْتَأْذِنَ فَلَا يُؤْذَنَ لَهَا يُقَالُ لَهَا ارْجِعِي مِنْ حَيْثُ جِئْتِ فَتَطْلُعُ مِنْ مَغْرِبِهَا»
“হে আবু যর! তুমি কি জান সূর্য যখন অস্ত যায় তখন কোথায় যায়? আবু যার বললেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় ‘আরশের নিচে গিয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং পুনরায় উদিত হওয়ার অনুমতি চায়। অতঃপর তাকে অনুমতি দেওয়া হয়। সে দিন বেশি দূরে নয়, যে দিন অনুমতি চাবে কিন্তু তাকে অনুমতি দেওয়া হবে না। তাকে বলা হবে যেখান থেকে এসেছ, সেখানে ফেরত যাও। অতঃপর সূর্য পশ্চিম দিক থেকেই উদিত হবে।”[1]
এটি হবে কিয়ামতের পূর্ব মুহূর্তে। আল্লাহ সূর্যকে বলবেন, যেখান থেকে এসেছ সেখানে ফেরত যাও, অতঃপর সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সূর্য পৃথিবীর উপরে ঘুরছে এবং তার এ ঘুরার মাধ্যমেই উদয়-অস্ত সংঘটিত হচ্ছে।
১০) অসংখ্য হাদীসের মাধ্যমে জানা যায় যে, উদয় হওয়া, অস্ত যাওয়া এবং ঢলে যাওয়া এ কাজগুলো সূর্যের সাথে সম্পৃক্ত। এগুলো সূর্য থেকে প্রকাশিত হওয়া খুবই সুস্পষ্ট। পৃথিবী হতে নয়। হয়তো এ ব্যাপারে আরো দলীল-প্রমাণ রয়েছে। সেগুলো আমার এ মুহূর্তে মনে আসছেনা। তবে আমি যা উল্লেখ করলাম, এ বিষয়টির দ্বার উম্মুক্ত করবে এবং আমি যা উদ্দেশ্য করেছি, তা পূরণে যথেষ্ট হবে। আল্লাহর তাওফীক চাচ্ছি!
[1] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: বাদউল খালক; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান

পৃথিবী স্থির 5
পৃথিবী স্থির 7
পৃথিবী স্থির 9

আধুনিক আলেম ওলামাদের বক্তব্য

এবারে আসুন শায়খ মতিউর রহমান মাদানী এই বিষয়ে কী বলে জেনে নেয়া যাক,


মহাবিশ্বের ইসলামিক স্থাপত্যঃ সাত আসমান, বাইতুল মামুর এবং আল্লাহর অবতরণ

সপ্তম শতাব্দীর ইসলামি ধারণায় মহাবিশ্ব কেবল এক বিশাল শূন্যস্থান নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট স্থাপত্য বা অট্টালিকার মতো (Building/Construction)। এই স্থাপত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পৃথিবী, আর তার ওপরে ছাদের মতো স্তরে স্তরে সাজানো সাত আসমান। এই সুনির্দিষ্ট ভূ-কেন্দ্রিক কাঠামোর প্রমাণ পাওয়া যায় কাবার অবস্থান এবং আল্লাহর আরশের সাথে সম্পর্কিত বর্ণনাগুলো থেকে।

১. বাইতুল মামুর: কাবার মহাজাগতিক সংযোগ
মি’রাজের বর্ণনায় ‘বাইতুল মামুর’-এর কথা এসেছে, যা সপ্তম আসমানে অবস্থিত। ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী, এটি সরাসরি মক্কার কাবার ঠিক সমান্তরালে (Perpendicularly) উপরে অবস্থিত। বলা হয়, বাইতুল মামুর থেকে কিছু পড়লে তা সরাসরি কাবার ওপরই পড়বে।
যৌক্তিক বিশ্লেষণ: পৃথিবী যদি সেকেন্ডে ৩০ কিমি বেগে ঘোরে এবং ঘণ্টায় ১,৬৭০ কিমি বেগে পাক খায়, তবে কাবার অবস্থান প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হওয়ার কথা। আসমানের একটি নির্দিষ্ট ঘরের নিচে কাবার স্থির অবস্থান কেবল তখনই সম্ভব, যখন পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রে **অচল** থাকে।
বিস্তারিতঃ বায়তুল মামুরঃ কাবার ঠিক ওপরে আসমানি মসজিদ →
২. সাত আসমান: একটি নিরেট ছাদ
কোরআনে আসমানকে একটি ‘সুরক্ষিত ছাদ’ (২১:৩২) এবং একটি ‘নির্মাণ’ (২:২২) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান মহাকাশকে অসীম শূন্যস্থান হিসেবে দেখলেও, ইসলামি বর্ণনায় আসমানগুলো **নিরেট** এবং এর সুনির্দিষ্ট দরজা রয়েছে যা অনুমতি সাপেক্ষে খোলে।
এই ছাদ সদৃশ আসমানের কল্পনাটি মূলত একটি অচল এবং স্থির ভূমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গম্বুজাকৃতির প্রাচীন বিশ্বতত্ত্বের (Domed World) ধারণাকেই পূর্ণতা দেয়।
বিস্তারিতঃ ইসলাম অনুসারে আসমানসমূহ কিসের তৈরি? →
৩. আল্লাহর অবতরণ (নযুল) ও সময়ের সংকট
সহিহ হাদিস অনুযায়ী, আল্লাহ প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন। কিন্তু গোল পৃথিবীর ক্ষেত্রে এটি একটি গাণিতিক ধাঁধা তৈরি করে।
গোল বনাম স্থির পৃথিবীর সংকট: গোল পৃথিবীতে প্রতি মুহূর্তেই কোথাও না কোথাও ‘রাতের শেষ তৃতীয়াংশ’ থাকে। পৃথিবী স্থির ও সমতল না হলে আল্লাহর এই ‘নামা ও ওঠা’ যুক্তিহীন হয়ে পড়ে। এই বর্ণনাটি মূলত সপ্তম শতাব্দীর সেই স্থির পৃথিবীর ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে দিন ও রাত কেবল আলোর আসা-যাওয়ার খেলা মাত্র।
বিস্তারিতঃ আল্লাহর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ বিষয়ক জটিলতা →

বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা বনাম শাস্ত্রীয় বর্ণনাঃ আধুনিক অপোলজিস্টদের কৌশল

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষিত তথ্য অনুযায়ী পৃথিবী কোনোভাবেই স্থির নয়। অথচ কোরআন ও হাদিসের বর্ণনা অনুসারে পৃথিবীর কোনো গতির উল্লেখ পাওয়া যায় না। এই দুই চরম বিপরীতমুখী অবস্থানের মাঝে সমন্বয় করতে গিয়ে বর্তমানের ইসলামি স্কলাররা বিজ্ঞানের নাম ব্যবহার করে কিছু অপব্যাখ্যার আশ্রয় নেন।


পৃথিবীর প্রকৃত গতি বনাম ‘ধরে রাখা’র দাবি

বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, পৃথিবী স্থির থাকা তো দূরের কথা, এটি মূলত বহুমাত্রিক গতির অধিকারী।

  • নিজ অক্ষের ওপর ঘূর্ণন: পৃথিবী ঘণ্টায় প্রায় ১,৬৭০ কিলোমিটার বেগে পাক খাচ্ছে।
  • কক্ষপথের পরিক্রমা: সূর্যের চারদিকে পৃথিবী সেকেন্ডে প্রায় ৩০ কিলোমিটার বেগে দৌড়াচ্ছে।

অপোলজিস্টদের কৌশল: তারা দাবি করেন যে, কোরআনে “ধরে রাখা” বা “টলে না যাওয়া” বলতে এই মহাজাগতিক ভারসাম্যকেই বোঝানো হয়েছে। কিন্তু ব্যাকরণগতভাবে ‘তাজুলা’ (স্থানচ্যুত হওয়া) বলতে কোনো কক্ষপথে ঘোরা বোঝায় না, বরং নিজের অবস্থান থেকে বিচ্যুত হওয়া বোঝায়। এছাড়া, পৃথিবী যদি সেকেন্ডে ৩০ কিমি বেগে দৌড়ায়, তবে তাকে “অচল” বা “স্থির আবাস” বলা কেবল ভাষাগত বিপর্যয়ই নয়, বরং বাস্তব সত্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।


পাহাড়ের কাজ: বৈজ্ঞানিক অসঙ্গতি

কোরআনের ৩১:১০ আয়াতে বলা হয়েছে পাহাড় দেওয়া হয়েছে যাতে পৃথিবী “তোমাদের নিয়ে ঢলে না পড়ে”। আধুনিক অপোলজিস্টরা ‘আইসোস্টাসি’ (Isostasy) বা পাহাড়ের শিকড় থাকার তত্ত্ব এনে একে বৈজ্ঞানিক মিরাকল প্রমাণের চেষ্টা করেন। তারা দাবি করেন পাহাড় পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করে।

বাস্তবতা: ভূতত্ত্ব বা জিওলজি অনুযায়ী, পাহাড় পৃথিবীর ঘূর্ণন বা গ্রহ হিসেবে এর ভারসাম্য রক্ষার সাথে মোটেও জড়িত নয়। পাহাড় বরং টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের ফলাফল। পাহাড় পৃথিবীর প্লেটগুলোর নড়াচড়া থামাতে পারে না (যার ফলে ভূমিকম্প হয়), বরং অনেক পাহাড়ই ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। সুতরাং, পাহাড়কে পৃথিবীর “পেরেক” বা পৃথিবীকে স্থির রাখার খুঁটি হিসেবে কল্পনা করা একটি প্রাচীন ভ্রান্ত ধারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। [8]


‘দাহাহা’ এবং উটপাখির ডিমের বিতর্ক

আধুনিক অপোলজিস্টদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি অপব্যাখ্যা হলো সূরা নাজিয়াতের ৩০ নম্বর আয়াতের ‘দাহাহা’ (دَحَاهَا) শব্দটিকে নিয়ে। ড. জাকির নায়েকের মতো প্রচারকরা দাবি করেন যে, এর অর্থ হলো পৃথিবীকে উটপাখির ডিমের মতো করা। এর মাধ্যমে তারা প্রমাণ করতে চান যে কোরআন পৃথিবীকে গোল বলেছে।

বাস্তবতা: আরবি ভাষার ধ্রুপদী অভিধান (যেমন- লিসানুল আরব) এবং সকল প্রাচীন তাফসীর অনুযায়ী ‘দাহা’ শব্দের অর্থ হলো বিছিয়ে দেওয়া, সমতল করা বা বিস্তার করা। মরুভূমির বালু যেভাবে উটপাখি পা দিয়ে সমান করে বা সমতল করে বিছিয়ে দেয়, তাকেই দাহা বলা হয়। মজার বিষয় হলো, উটপাখির ডিমের মতো গোল করা তো দূরের কথা, প্রাচীন আরবদের কাছে এই শব্দটি ‘সমতল পৃথিবী’র সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে গণ্য হতো। [9]


সূর্য ও চন্দ্রের কক্ষপথ: পৃথিবীর অনুপস্থিতি

কোরআনে যখনই মহাকাশীয় বস্তুর বিচরণ বা কক্ষপথের (ফালাক) কথা এসেছে (যেমন: সূরা আম্বিয়া: ৩৩ বা সূরা ইয়াসিন: ৪০), সেখানে কেবল সূর্য এবং চন্দ্রের নাম নেওয়া হয়েছে।

“সূর্য ও চন্দ্র… প্রত্যেকেই আপন কক্ষপথে বিচরণ করে।”

অপোলজিস্টদের যুক্তি: তারা বলেন, পৃথিবীও যে ঘোরে তা এখানে উহ্য রাখা হয়েছে।

পাল্টা যুক্তি: যদি এটি সর্বজ্ঞ সৃষ্টিকর্তার বাণী হতো, তবে চন্দ্র-সূর্যের সাথে পৃথিবীর ঘূর্ণনের কথা বলাটিই ছিল সবচেয়ে জরুরি। কারণ মানুষের কাছে সূর্য-চন্দ্রের গতি দৃশ্যমান হলেও পৃথিবীর গতি অদৃশ্য। সেই অদৃশ্য ধ্রুব সত্যটি (পৃথিবীর গতি) এড়িয়ে গিয়ে কেবল দৃশ্যমান বস্তুর (সূর্য-চন্দ্র) গতির কথা বলা এটাই প্রমাণ করে যে, কোরআন রচয়িতার জ্ঞান কেবল তৎকালীন সাধারণ মানুষের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।


এই বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ধর্মীয় শাস্ত্রের বর্ণনাগুলো মূলত একটি স্থির ও সমতল পৃথিবীর আদিম কসমোলজির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আধুনিক বিজ্ঞানের প্রলেপ দিয়ে একে উজ্জ্বল করার চেষ্টা মূলত একটি ঐতিহাসিক সত্যকে আড়াল করার ব্যর্থ প্রয়াস মাত্র।


উপসংহার: ধর্মীয় বয়ান বনাম মহাজাগতিক বাস্তবতা

পুরো প্রবন্ধের আলোচনাকে যদি আমরা সংক্ষেপে সারসংক্ষেপ করি, তবে কয়েকটি মৌলিক সত্য আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়:

📜
ঐতিহাসিক বাস্তবতা সপ্তম শতাব্দীতে যখন এই বাণীগুলো সংকলিত হচ্ছিল, তখন মানুষের কাছে পৃথিবীকে স্থির মনে হওয়াই ছিল একমাত্র ‘যৌক্তিক’ ও ‘বিজ্ঞানসম্মত’ ধারণা। কোরআনের “পাহাড় দিয়ে পৃথিবীকে গেঁথে রাখা” কিংবা “আরশের নিচে সূর্যের সিজদা” সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো সেই সময়ের আরব্য কসমোলজিরই অংশ। একে আজকের বিজ্ঞানের চোখে ভুল মনে হলেও, সেই সময়কার মানুষের জন্য এটি ছিল এক ধ্রুব সত্য।
📖
আক্ষরিকতা বনাম রূপক আধুনিক মুসলিম চিন্তাবিদ বা অপোলজিস্টরা যখন এই আয়াতগুলোকে বৈজ্ঞানিক মিরাকল হিসেবে চালানোর চেষ্টা করেন, তখন তারা মূলত মুহাম্মদের নিজস্ব ভৌগোলিক বিশ্বাস এবং ধ্রুপদী আলেমদের (ইবনে কাসীর বা ইবনে আব্বাস) ব্যাখ্যাকে অবজ্ঞা করেন। শায়খ উসাইমীনের মতো কট্টরপন্থী আলেমদের ফতোয়া আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, এই টেক্সটগুলোর আক্ষরিক পাঠ কেবল স্থির ও অচল পৃথিবীর দিকেই নিয়ে যায়।
⚖️
যৌক্তিক সংঘাত কাবার সরাসরি ওপরে বাইতুল মামুরের অবস্থান কিংবা রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহর আসমানে নেমে আসার বর্ণনাগুলো কেবল একটি **স্থির ও সমতল (Flat/Static)** ভূ-কাঠামোর ক্ষেত্রেই অর্থবহ হয়। পৃথিবী গোলক হওয়ার কারণে এবং এটি প্রচণ্ড গতিতে ঘূর্ণায়মান হওয়ার ফলে এই ধর্মীয় চিত্রকল্পগুলো গাণিতিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সংকটের মুখে পড়ে।

মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত হচ্ছে। ধর্মীয় শাস্ত্রের ভাষা ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য এক নয়। বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের আলোকে পৃথিবীর প্রকৃতি ও গতি ব্যাখ্যা করতে হলে ধর্মীয় পাঠের আক্ষরিক অর্থের বাইরে এসে সেটিকে ঐতিহাসিক ও মানবিক প্রেক্ষাপটে দেখা অপরিহার্য। প্রাচীন আরবের সীমিত অভিজ্ঞতার প্রতিফলনকে যখন আমরা ‘অলৌকিক বিজ্ঞান’ হিসেবে দাবি করি, তখন সেটি কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক সততাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং ধর্মের নিজস্ব ঐতিহাসিকতাকেও অস্বীকার করে।

পরিশেষে বলা যায়, পৃথিবীকে স্থির মনে করা মুহাম্মদের কোনো ব্যক্তিগত ভুল ছিল না, বরং তা ছিল তৎকালীন সমগ্র মানব সভ্যতার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। এই সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেওয়াই হলো যুক্তিবাদী চিন্তার প্রথম ধাপ। মহাবিশ্ব কোনো স্থির মঞ্চ নয়; এটি এক অসীম ও গতিশীল রহস্য, যা কোনো প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের আক্ষরিক সীমানায় আটকে থাকতে বাধ্য নয়।

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.

The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.

This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.


তথ্যসূত্রঃ
  1. কোরআন ৩৫ঃ৪১ ↩︎
  2. কোরআন ৩১ঃ১০ ↩︎
  3. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬৯ 1 2
  4. Zakariya al-Qazwini, The Wonders of Creation ↩︎
  5. ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম, ঈমান, শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহঃ) ↩︎
  6. ফতোয়ায়ে আরকানুল ইসলাম, শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেদ আল উসাইমীন, পৃষ্ঠা ৩৭, ৩৮, ৩৯ ↩︎
  7. সহীহ বুখারী, অধ্যায়: বাদউল খালক ↩︎
  8. ইসলাম অনুসারে পাহাড়-পর্বত হচ্ছে উপর থেকে আসা পৃথিবীর পেরেক ↩︎
  9. জাকির নায়েকঃ দাহাহা বা উটপাখির ডিম ↩︎