বর্তমান সময়ের অধিকাংশ ইসলামি চিন্তাবিদ ও অ্যাপোলোজিস্টরা দাবি করে থাকেন যে, নবী মুহাম্মদ তার জীবদ্দশায় যতগুলো যুদ্ধ করেছেন, তার প্রতিটিই ছিল নিছক ‘রক্ষণাত্মক’ (Defensive)। তাদের মতে, তিনি কেবল আক্রান্ত হলেই অস্ত্রধারণ করতেন। তবে এই দাবিটি ঐতিহাসিক তথ্যের চেয়ে বরং আধুনিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইসলামকে একটি ‘শান্তিবাদী’ ধর্ম হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টার ফল। বিশেষ করে সারা পৃথিবীতে যখন মানুষ ইসলামিক জঙ্গিবাদের কারণে ভীত এবং শঙ্কিত, তখন তাদের সামনে শান্তির দূত হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করার জন্য অনেক ইসলামিস্টই এই ধরনের মিথ্যা এবং অপপ্রচার করে থাকেন।
প্রকৃতপক্ষে, ধ্রুপদী সীরাত (জীবনী) এবং মাগাজি (যুদ্ধবিগ্রহ) গ্রন্থগুলো বিশ্লেষণ করলে এক ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণ করে যে, মুহাম্মদের পরিচালিত বা নির্দেশিত সামরিক অভিযানগুলোর একটি বড় অংশই ছিল ‘আক্রমণাত্মক’ (Offensive)। মদিনায় হিজরতের পর কুরাইশদের বেসামরিক বাণিজ্য কাফেলায় আক্রমণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন গোত্রের ওপর অতর্কিত হামলা—এসবই ছিল ইসলামি রাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তার এবং শত্রুকে দুর্বল করার সুপরিকল্পিত কৌশল। আসুন একটি ওয়াজ শুনি, যেখানে আবদুল্লাহ বিন আব্দুর রাজ্জাক বলছেন, মদিনায় আসার এক সপ্তাহের আগেই মুহাম্মদই আগ বাড়িয়ে আক্রমণ শুরু করে,
ইসলামী শাস্ত্রীয় গবেষণায় একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, শরীয়তের বিধান বা আকীদাগত বিষয়ে ‘সহীহ’ (বিশুদ্ধ) হাদিসের কঠোর আবশ্যকতা থাকলেও, ঐতিহাসিক ঘটনা বা সীরাত বর্ণনার ক্ষেত্রে মানদণ্ড শিথিল। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলসহ বহু প্রথিতযশা ফকীহ ও মুহাদ্দিসের মতে, ইতিহাস ও যুদ্ধের বর্ণনায় ‘জয়িফ’ (দুর্বল) সূত্রও গ্রহণযোগ্য তথ্য হিসেবে বিবেচিত হয় [1]। সীরাত রচনার পথিকৃৎ ইবনে ইশাক, ইবনে সা’দ এবং আল-ওয়াকিদির মাগাজি গ্রন্থগুলো এই ঐতিহাসিক ধারারই ধারক, যেখানে যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ সংরক্ষিত হয়েছে [2]।
অ্যাপোলোজিস্টরা প্রায়ই এই ধ্রুপদী ঐতিহাসিক তথ্যগুলোকে আধুনিক ‘সহীহ-জয়িফ’ বিতর্কের আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য হচ্ছে, এই সীরাত গ্রন্থগুলোই মুহাম্মদের জীবনের প্রধানতম উৎস। কোরআন, তাফসীর, হাদিস, সীরাত ও মাগাজি গ্রন্থের সেই আদি ও অকৃত্রিম তথ্যের ভিত্তিতেই এই তালিকাটি সংকলন করা হয়েছে। এখানে তথ্যের বিশুদ্ধতা রক্ষায় এবং তথাকথিত ‘রক্ষণাত্মক যুদ্ধের’ মিথ্যাচার ও ঐতিহাসিক বিকৃতি রোধে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের উল্লেখ করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে মুহাম্মদের জিহাদ কেবল আত্মরক্ষার জন্য ছিল না, বরং তা ছিল একটি নতুন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শক্তির অগ্রাসন।
হিজরতের পর ১–১১ হিজরি: গাজওয়া, সারিয়া, সামরিক ধাওয়া, অবরোধ, গুপ্তহত্যা, শাস্তিমূলক অভিযান, ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস এবং কর/আনুগত্য-চুক্তির উৎসভিত্তিক সারণি
পরিভাষা: মুহাম্মদ স্বয়ং অংশ নিলে প্রচলিত সীরাত-পরিভাষায় গাজওয়া; তাঁর নিযুক্ত অধিনায়কের নেতৃত্বে বাহিনী গেলে সারিয়া বা বা’স। সব গাজওয়ায় যুদ্ধ হয়নি এবং সব সারিয়াও যুদ্ধের উদ্দেশ্যে ছিল না। প্রাচীন লেখকদের গণনা এক নয়: ইবন ইসহাক ২৬টি গাজওয়ার কথা বলেন; সহিহ বুখারির যায়েদ ইবন আরকামের বর্ণনায় ১৯টি; সারিয়া প্রায় ৭০—এই পার্থক্য ঘটনাকে একত্র বা পৃথক গণনা এবং “অভিযান” সংজ্ঞার ফল।
তারিখ: হিজরি মাসই প্রধান। খ্রিস্টীয় সাল আনুমানিক; প্রাচীন উৎসে মাস/সাল নিয়ে মতভেদ থাকলে তা মন্তব্যে লেখা হয়েছে। আধুনিক ক্যালেন্ডার রূপান্তরকে প্রাচীন বর্ণনার চেয়ে বেশি নিশ্চিত ধরা হয়নি।
প্রকৃতি: “উদ্যোগী আক্রমণ” মানে বাহিনী মদিনা থেকে প্রতিপক্ষের এলাকা, কাফেলা বা লক্ষ্যবস্তুর দিকে আগে অগ্রসর হয়েছে; এটি নৈতিক রায় নয়। “পাল্টা প্রতিরক্ষা” সরাসরি আক্রমণ প্রতিহত বা হামলাকারীকে ধাওয়া; “প্রতিশোধ/শাস্তি” পূর্বঘটনার জবাব; “সামরিক চাপ/চুক্তি” লড়াই ছাড়াই বাহিনী, অবরোধ বা কর-চুক্তি; “বিতর্কিত” মানে ঘটনার মূল বিবরণ দুর্বল বা বিচ্ছিন্ন সনদের ওপর দাঁড়ানো।
প্রমাণমাত্রা: উচ্চ = কোরআন বা সহিহ হাদিসে মূল ঘটনা; মধ্যম = প্রাচীন সীরাত/মাগাজির সুপরিচিত বর্ণনা, কিন্তু পূর্ণ সহিহ সনদ নয়; দুর্বল/বিতর্কিত = আল-ওয়াকিদি, বিচ্ছিন্ন সনদ, বা পরবর্তী ইতিহাসে সংরক্ষিত এমন খুঁটিনাটি যার সত্যতা নিয়ে হাদিসবিশারদদের আপত্তি আছে।
| № | তারিখ | ঘটনা | লক্ষ্য/স্থান | প্রকৃতি | ঘটনা, ফল, প্রমাণ ও উৎসসমালোচনা |
|---|---|---|---|---|---|
| ১ | রমজান ১ হি. মার্চ ৬২৩ খ্রি. আনু. |
হামজা ইবন আবদুল মুত্তালিবের সিফুল-বাহর সারিয়া | আল-ঈস উপকূল; আবু জাহলের মক্কি দল/কাফেলা | উদ্যোগী | ত্রিশজন মুহাজির অশ্বারোহী আবু জাহলের প্রায় তিনশজনের দলের মুখোমুখি হয়। উভয় পক্ষ যুদ্ধের জন্য সারিবদ্ধ হলেও দুই পক্ষের মিত্র মাজদি ইবন আমর আল-জুহানি মাঝখানে পড়ে সংঘর্ষ থামান। তাই “কাফেলা লুট” নয়, কাফেলা-রুটে প্রথম সশস্ত্র বাধাদানের চেষ্টা বলা নির্ভুল। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, ১/৫৯৫–৫৯৬ (শামেলা); ইসলামওয়েব: বদরের আগের গাজওয়া-সারিয়া। |
| ২ | শাওয়াল ১ হি. এপ্রিল ৬২৩ আনু. |
উবাইদা ইবন আল-হারিসের রাবিগ সারিয়া | সানিয়াতুল-মুররা/রাবিগ; কুরাইশের দল | উদ্যোগী | ৬০ বা ৮০ জন মুহাজিরের দল একটি বৃহৎ কুরাইশি দলের মুখোমুখি হয়। পূর্ণ যুদ্ধ হয়নি; সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাসের নিক্ষিপ্ত তীরকে সীরাত “ইসলামে প্রথম তীর” বলে। মিকদাদ ও উতবা ইবন গাজওয়ান কুরাইশি দল ছেড়ে মুসলিমদের সঙ্গে যোগ দেন। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, ১/৫৯১; একই গ্রন্থ, ১/৫৯৫। |
| ৩ | জিলকদ ১ হি. মে ৬২৩ আনু. |
সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাসের খাররার সারিয়া | আল-খাররার; কুরাইশি কাফেলা | উদ্যোগী | প্রায় বিশজন মুহাজিরকে কাফেলার অপেক্ষায় পাঠানো হয়; তারা পায়ে হেঁটে রাতে চলত ও দিনে লুকাত। কাফেলা এক দিন আগে চলে যাওয়ায় সংঘর্ষ হয়নি। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, বুয়াত–উশাইরা–খাররার অনুচ্ছেদ; ইসলামওয়েব: বদরের আগের অভিযান। |
| ৪ | সফর ২ হি. আগস্ট ৬২৩ আনু. |
ওয়াদ্দান/আবওয়া গাজওয়া | কুরাইশি পথ ও বনু দামরা | উদ্যোগী | মুহাম্মদের প্রথম গাজওয়া। ইবন ইসহাকের ভাষায় লক্ষ্য ছিল কুরাইশ ও বনু দামরা; যুদ্ধ হয়নি। বনু দামরার নেতা মাখশি ইবন আমরের সঙ্গে অনাক্রমণ/মৈত্রীচুক্তি করে বাহিনী ফিরে আসে। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, ১/৫৯১; ইসলামওয়েব: প্রথম গাজওয়া। |
| ৫ | রবিউল আউয়াল ২ হি. সেপ্টেম্বর/অক্টোবর ৬২৩ আনু. |
বুয়াত গাজওয়া | উমাইয়া ইবন খালাফের কাফেলা; রাদওয়া অঞ্চল | উদ্যোগী | প্রায় ২০০ জন নিয়ে কুরাইশের ১০০ রক্ষী ও প্রায় ২,৫০০ উটের কাফেলাকে আটকাতে যাওয়া হয়। কাফেলা পাওয়া যায়নি; যুদ্ধও হয়নি। এটি মক্কার সিরিয়া-বাণিজ্য রুটে ধারাবাহিক অর্থনৈতিক চাপের অংশ। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, ১/৫৯৮; আল-কামিল, ইসলামওয়েব। |
| ৬ | রবিউল আউয়াল ২ হি. ৬২৩ আনু. |
সাফওয়ান/বদরুল-উলা | কুরজ ইবন জাবিরের হামলাকারী দল | পাল্টা ধাওয়া | এটি “সাফওয়ানের কাফেলা” আক্রমণ ছিল না। কুরজ ইবন জাবির মদিনার চারণভূমিতে হানা দিয়ে পশু নিয়ে গেলে মুহাম্মদ তাকে ধাওয়া করে সাফওয়ান উপত্যকা পর্যন্ত যান; ধরতে পারেননি। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, ১/৬০১; ইসলামওয়েব। |
| ৭ | জুমাদাল উলা/আখিরা ২ হি. নভেম্বর–ডিসেম্বর ৬২৩ আনু. |
জুল-উশাইরা গাজওয়া | ইয়ানবু অঞ্চল; সিরিয়াগামী কুরাইশি কাফেলা | উদ্যোগী | কুরাইশের সিরিয়াগামী কাফেলাকে আটকাতে বাহিনী বের হয়; কাফেলা আগেই চলে যায়। বনু মুদলিজ ও তাদের বনু দামরা মিত্রদের সঙ্গে চুক্তি হয়। ফেরার পথে এই একই কাফেলাই পরে বদরের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হয়। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, ১/৫৯৮–৬০০; ইসলামওয়েব। |
| ৮ | রজব ২ হি. জানুয়ারি ৬২৪ আনু. |
নাখলা সারিয়া | আমর ইবন আল-হাদরামির কুরাইশি কাফেলা | উদ্যোগী | আবদুল্লাহ ইবন জাহশের দলকে নাখলায় গিয়ে কুরাইশের খবর নিতে লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। দলটি পবিত্র মাস শেষ হয়েছে কি না—এ নিয়ে সন্দেহের মধ্যেই হামলা করে আমরকে হত্যা, দুজনকে বন্দী ও কাফেলা দখল করে। ফিরে এলে মুহাম্মদ প্রথমে বলেন, তিনি পবিত্র মাসে যুদ্ধের নির্দেশ দেননি এবং মাল/বন্দী গ্রহণ স্থগিত রাখেন; পরে কোরআন ২:২১৭ নাজিল হয়। তাই “আয়াতটি সরাসরি হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল” বলা ভুল; আয়াত পবিত্র মাসে যুদ্ধকে “বড় অপরাধ” বলেও প্রতিপক্ষের নিপীড়নকে আরও বড় বলে তুলনা করে। প্রমাণ: উচ্চ/মধ্যমউৎস: ইসলামওয়েবের সীরাত-বিবরণ; আল-মুনতাজাম, ৩/৯২–৯৩; কোরআন ২:২১৭। |
| ৯ | ১৭ রমজান ২ হি. ১৩ মার্চ ৬২৪ আনু. |
বদর যুদ্ধ | আবু সুফিয়ানের কাফেলা ও মক্কার উদ্ধারকারী বাহিনী | উদ্যোগী → যুদ্ধ | প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল সিরিয়া-ফেরত বৃহৎ কাফেলা। আবু সুফিয়ান পথ বদলে রক্ষা পেলেও আবু জহলের নেতৃত্বে প্রায় এক হাজারের বাহিনী এগোয়; মুসলিম প্রায় ৩১৩। যুদ্ধে মুসলিম ১৪ জন, কুরাইশ প্রায় ৭০ জন নিহত এবং প্রায় ৭০ জন বন্দী—প্রচলিত সীরাত-সংখ্যা। বন্দীদের মুক্তিপণ/মুক্তি এবং গনিমত বণ্টনের বিধান পরে নির্ধারিত হয়; সূরা আনফাল ঘটনাটির প্রধান কোরআনিক দলিল। প্রমাণ: উচ্চউৎস: ইবন হিশাম: বদর অধ্যায়ের শুরু; সূরা আনফাল। |
| ১০ | শাওয়াল ২ হি. এপ্রিল/মে ৬২৪ আনু. |
বনু সুলাইম: আল-কুদর গাজওয়া | বনু সুলাইম/গাতাফান; আল-কুদর | আগাম আক্রমণ | বদরের পর বনু সুলাইমের সমাবেশের খবর পেয়ে প্রায় ২০০ জন নিয়ে অভিযান চালানো হয়। প্রতিপক্ষ সরে যায়; সীরাত-সূত্রে প্রায় ৫০০ উট দখলের কথা আছে, যেখান থেকে এক-পঞ্চমাংশ পৃথক করে বাকিটা যোদ্ধাদের মধ্যে ভাগ হয়। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশামের অধ্যায়-সূচিতে “বনু সুলাইম বিল-কুদর”; ইসলামকিউএ-তে ইবন ইসহাকের গাজওয়া-তালিকা। |
| ১১ | শাওয়াল ২ হি. এপ্রিল/মে ৬২৪ আনু. |
বনু কায়নুকা অবরোধ ও নির্বাসন | মদিনার বনু কায়নুকা | অবরোধ/উচ্ছেদ | বদরের পর চুক্তিভঙ্গের অভিযোগে গোত্রটির দুর্গ প্রায় ১৫ দিন অবরোধ করা হয়। তারা আত্মসমর্পণ করলে আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের হস্তক্ষেপে পুরুষদের হত্যা না করে মদিনা থেকে বহিষ্কার করা হয়; অস্ত্র ও উল্লেখযোগ্য সম্পদ মুসলিম নিয়ন্ত্রণে আসে। বাজারে এক মুসলিম নারীর পোশাক টেনে উন্মুক্ত করা এবং পাল্টা হত্যার কাহিনি সীরাতে আছে, কিন্তু ঘটনাটির পূর্ণ সনদ সহিহ হাদিসের মানে নয়। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, ২/৪৭। |
| ১২ | ২ হি., বদরের পরে ৬২৪ আনু. |
আবু আফাক হত্যার বর্ণনা | বনু আমর ইবন আওফের প্রবীণ কবি | বিতর্কিত | আল-ওয়াকিদি ও ইবন সাদের মাগাজি-ধারায় বলা হয়: বদরের পর বিরোধী কবিতা/উসকানির কারণে সালিম ইবন উমাইর রাতে ঘুমন্ত আবু আফাককে হত্যা করেন। বয়স “১২০ বছর” বলেও বর্ণনা আছে। কিন্তু ঘটনাটির কোনো প্রতিষ্ঠিত সহিহ সনদ নেই; ইসলামকিউএও স্পষ্ট বলেছে “নির্ভরযোগ্য সনদ জানা যায় না।” অতএব ঘটনাটি সীরাত-রিপোর্ট হিসেবে রাখা যায়, নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে নয়। প্রমাণ: দুর্বলউৎস: ইবন হিশামের সংযোজিত সারিয়া-অধ্যায়; ইসলামকিউএ: আবু আফাকের খবরের সনদ। |
| ১৩ | রমজান ২ হি., বদরের পরে ৬২৪ আনু. |
আসমা বিনতে মারওয়ান হত্যার বর্ণনা | বনু খাতমার নারী কবি | বিতর্কিত | বর্ণনায় উমাইর ইবন আদি রাতে তাঁর ঘরে ঢুকে, স্তন্যপানরত শিশুকে সরিয়ে, তরবারি দিয়ে হত্যা করেন; পরে মুহাম্মদ ঘটনাটি অনুমোদন করেন। কিন্তু মূল সনদ আল-ওয়াকিদির মাধ্যমে, যাকে প্রধান হাদিসসমালোচকেরা পরিত্যক্ত/অবিশ্বস্ত বলেছেন; ইসলামকিউএ সনদকে “ধ্বংসপ্রাপ্ত” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই বহুল উদ্ধৃত নাটকীয় খুঁটিনাটি নিশ্চিত নয়। প্রমাণ: অত্যন্ত দুর্বলউৎস: ইসলামওয়েবে প্রচলিত বর্ণনা; ইসলামকিউএ: সনদসমালোচনা; শামেলা। |
| ১৪ | জিলহজ ২ হি. মে/জুন ৬২৪ আনু. |
সাওয়িক গাজওয়া | আবু সুফিয়ানের হামলাকারী দল | পাল্টা ধাওয়া | আবু সুফিয়ান বদরের প্রতিশোধের শপথে মদিনার উপকণ্ঠে হানা দিয়ে খেজুরগাছ পোড়ান এবং দুই আনসারকে হত্যা করেন। মুহাম্মদ ধাওয়া করলে দলটি পালাতে গিয়ে বোঝা হালকা করতে সাওয়িকের বস্তা ফেলে দেয়; সেখান থেকেই নাম। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশামের অধ্যায়-সূচি; গাজওয়া-তালিকা। |
| ১৫ | মুহাররম ৩ হি. জুলাই/আগস্ট ৬২৪ আনু. |
জু আমর/গাতাফান গাজওয়া | বনু সালাবা ও বনু মুহারিব; নাজদ | আগাম অভিযান | মদিনার দিকে হামলার জন্য গোত্রগুলো জড়ো হচ্ছে—এ খবরের ভিত্তিতে প্রায় ৪৫০ জন নিয়ে অভিযান। প্রতিপক্ষ পাহাড়ে সরে যায়; বড় যুদ্ধ হয়নি। কিছু বর্ণনায় দাসুর/গাওরাস মুহাম্মদের তরবারি নিয়ে তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছিল—এই অংশের রূপভেদ আছে। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম: জু আমর অধ্যায়। |
| ১৬ | রবিউল আখির ৩ হি. ৬২৪ আনু. |
বুহরান গাজওয়া | বনু সুলাইম; হিজাজের খনি অঞ্চল | অভিযান | বুহরান/বাহরান অঞ্চলে বনু সুলাইমের বিরুদ্ধে বাহিনী যায়; প্রায় দুই মাস বাইরে থেকে কোনো বড় সংঘর্ষ ছাড়াই ফিরে আসে। মূল তালিকায় অনুপস্থিত এই অভিযানকে ইবন ইসহাক স্বতন্ত্র গাজওয়া হিসেবে গণনা করেছেন। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইসলামকিউএ-তে উদ্ধৃত ইবন ইসহাকের তালিকা; ইবন হিশামের সূচি। |
| ১৭ | জুমাদাল আখিরা ৩ হি. নভেম্বর ৬২৪ আনু. |
আল-কারাদা সারিয়া | ইরাকমুখী কুরাইশি কাফেলা | কাফেলা-আক্রমণ | সাফওয়ান ইবন উমাইয়ার নেতৃত্বাধীন কাফেলা সিরিয়া-পথ এড়িয়ে ইরাকের পথে যায়। যায়েদ ইবন হারিসার দল কারাদায় আক্রমণ করে পণ্য দখল করে; নেতারা পালায়। সীরাত-গণনায় সম্পদের মূল্য এক লক্ষ দিরহাম বলা হয়েছে—সংখ্যাটি মাগাজি-উৎসনির্ভর। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, ২/৫০। |
| ১৮ | রবিউল আউয়াল ৩ হি. আনু. আগস্ট/সেপ্টেম্বর ৬২৪ |
কাব ইবন আল-আশরাফ হত্যা | মদিনার ইহুদি কবি ও বনু নাদির-সম্পর্কিত নেতা | লক্ষ্যভিত্তিক হত্যা | সহিহ বুখারিতে মুহাম্মদ বলেন, কাবকে কে হত্যা করবে—সে “আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে কষ্ট দিয়েছে।” মুহাম্মদ ইবন মাসলামা প্রতারণামূলক কথা বলার অনুমতি নিয়ে কাবকে রাতে দুর্গ থেকে বের করেন; দলটি তাকে হত্যা করে। সীরাতে বদরের নিহতদের জন্য কাবের শোককাব্য, মক্কায় কুরাইশকে উত্তেজিত করা এবং মুসলিম নারীদের নিয়ে যৌনধর্মী কবিতার অভিযোগ আছে; সহিহ হাদিসে হত্যার কৌশল সরাসরি বর্ণিত। প্রমাণ: উচ্চউৎস: সহিহ বুখারি ৪০৩৭; ইবন হিশাম, ২/৫১; ইসলামওয়েব। |
| ১৯ | ৭ শাওয়াল ৩ হি. মার্চ ৬২৫ আনু. |
উহুদ যুদ্ধ | আবু সুফিয়ানের মক্কি বাহিনী; উহুদ | প্রতিরক্ষা | বদরের প্রতিশোধে প্রায় ৩,০০০ মক্কি মদিনার কাছে আসে। মুহাম্মদ প্রায় ১,০০০ জন নিয়ে বের হলেও আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের প্রায় ৩০০ অনুসারী ফিরে যায়। তীরন্দাজদের অবস্থানত্যাগের পর মুসলিম বাহিনী বিপর্যস্ত হয়; মুহাম্মদ আহত হন, হামজাসহ প্রায় ৭০ মুসলিম নিহত। কোরআন ৩:১২১–১৮০ ঘটনায় মন্তব্য করে। প্রমাণ: উচ্চউৎস: ইবন হিশাম, ২/৬০ থেকে; কোরআন ৩:১২১–১৮০। |
| ২০ | ৮ শাওয়াল ৩ হি. উহুদের পরদিন |
হামরাউল-আসাদ গাজওয়া | ফিরে যাওয়া মক্কি বাহিনী | ধাওয়া/শক্তি প্রদর্শন | উহুদের পর মক্কিরা ফিরে এসে মদিনায় আবার হামলা করতে পারে—এই আশঙ্কায় আহত যোদ্ধাদের নিয়েই বাহিনী হামরাউল-আসাদ পর্যন্ত ধাওয়া করে। পুনরায় যুদ্ধ হয়নি। এটি পরাজয়ের পর অবিলম্বে প্রতিরোধক্ষমতা প্রদর্শনের অভিযান। প্রমাণ: উচ্চ/মধ্যমউৎস: কোরআন ৩:১৭২–১৭৪; ইবন হিশাম, উহুদ-পরবর্তী অধ্যায়। |
| ২১ | মুহাররম ৪ হি. জুন/জুলাই ৬২৫ আনু. |
আবু সালামার কাতান সারিয়া | বনু আসাদ; কাতান | আগাম দমন | তুলাইহা ও সালামা ইবন খুয়াইলিদের নেতৃত্বে বনু আসাদ মদিনায় হামলার লোক জড়ো করছে—এ সংবাদে প্রায় ১৫০ জন পাঠানো হয়। আকস্মিক অভিযানে প্রতিপক্ষ ছত্রভঙ্গ হয়; উট-ছাগল দখল করে বাহিনী ফিরে আসে। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন সাদ, আত-তাবাকাত আল-কুবরা, সারিয়া-অধ্যায়; শামেলার গ্রন্থপঞ্জি। |
| ২২ | মুহাররম ৪ হি. জুন/জুলাই ৬২৫ আনু. |
আবদুল্লাহ ইবন উনাইসের অভিযান | খালিদ ইবন সুফিয়ান আল-হুযালি; উরানা | লক্ষ্যভিত্তিক হত্যা | খালিদ মদিনা আক্রমণের জন্য লোক জড়ো করছেন—এই খবরের ভিত্তিতে একক অভিযাত্রী পাঠানো হয়। আবদুল্লাহ পরিচয় গোপন করে কাছে গিয়ে তাঁকে হত্যা করেন। মাথা কেটে আনার খুঁটিনাটি কিছু মাগাজি/মুসনাদ বর্ণনায় আছে; সব রূপ সমান শক্তিশালী নয়। মুহাম্মদের দেওয়া লাঠির ঘটনাও মুসনাদ আহমদে বর্ণিত। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশামের অধ্যায়-সূচিতে ঘটনাটি; মুসনাদ আহমদ, আবদুল্লাহ ইবন উনাইসের বর্ণনা। |
| ২৩ | সফর ৪ হি. জুলাই/আগস্ট ৬২৫ আনু. |
আর-রাজি হত্যাকাণ্ড | হুযাইল-সম্পর্কিত দল; আর-রাজি | মুসলিম দল আক্রান্ত | ধর্মশিক্ষক চাওয়ার অজুহাতে কয়েকজন মুসলিমকে নিয়ে গিয়ে বনু লিহইয়ানের কাছে ধরিয়ে দেওয়ার ফাঁদ পাতা হয়। অধিকাংশ নিহত; খুবাইব ইবন আদি ও যায়েদ ইবন আদ-দাসিন্না বন্দী হয়ে মক্কায় বিক্রি এবং পরে নিহত হন। এটি মুসলিম-প্রেরিত দলের ওপর আক্রমণ; পরবর্তী বনু লিহইয়ান অভিযান এর প্রতিশোধমূলক পটভূমি। প্রমাণ: উচ্চউৎস: সহিহ বুখারি, কিতাবুল মাগাজি; ইবন হিশামের অধ্যায়-সূচি: ইয়াওম আর-রাজি। |
| ২৪ | সফর ৪ হি. ৬২৫ আনু. |
বিরে মাউনা হত্যাকাণ্ড | বনু আমির/রিল, জাকওয়ান ও উসাইয়া | মুসলিম দল আক্রান্ত | কোরআন-শিক্ষক/দাওয়াতি দল হিসেবে পাঠানো প্রায় ৭০ জনকে বিরে মাউনাতে আক্রমণ করে প্রায় সবাইকে হত্যা করা হয়। আমির ইবন ফুহাইরা নিহত; কাব ইবন যায়েদ আহত অবস্থায় বেঁচে যান। মুহাম্মদ এক মাস কুনুতে আক্রমণকারী গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে বদদোয়া করেন—সহিহ বুখারিতে আছে। প্রমাণ: উচ্চউৎস: সহিহ বুখারি ৪০৯০–৪০৯৬; ইবন হিশামের সূচি। |
| ২৫ | রবিউল আউয়াল ৪ হি. আগস্ট ৬২৫ আনু. |
বনু নাদির অবরোধ ও নির্বাসন | মদিনার বনু নাদির | অবরোধ/উচ্ছেদ | রক্তপণ-সহায়তা চাইতে গেলে ছাদ থেকে পাথর ফেলে মুহাম্মদকে হত্যার পরিকল্পনা হয়েছিল—এটি প্রাচীন সীরাতের মূল বর্ণনা; “৩০ জন নিয়ে বিতর্কে ডেকে জিবরাইলের সতর্কতায় পালিয়ে আসা” আলাদা/দুর্বল ধারার সঙ্গে মিশে যায়। অবরোধে খেজুরগাছ কাটা-পোড়ানো হয়; কোরআন ৫৯:৫ তা উল্লেখ করে। গোত্রটি অস্ত্র ছাড়া উটবহনযোগ্য সম্পদ নিয়ে বের হয়; জমি-বাগান ফাই হিসেবে মুহাম্মদের নিয়ন্ত্রণে আসে। প্রমাণ: উচ্চ/মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, ২/১৯০; কোরআন ৫৯:২–৭। |
| ২৬ | ৪ হি. আনু. | আবু সুফিয়ান হত্যার ব্যর্থ মিশন | মক্কা; আমর ইবন উমাইয়া আদ-দামরি | গোপন অভিযান | সীরাতে বলা হয়, মদিনায় মুহাম্মদকে হত্যার জন্য আবু সুফিয়ানের পাঠানো বেদুইন ধরা পড়ার পর পাল্টা হিসেবে আমর ইবন উমাইয়া ও সালামা ইবন আসলামকে পাঠানো হয়। পরিকল্পনা ব্যর্থ; ফেরার পথে আমর কয়েকটি সহিংস ঘটনায় জড়ান এবং একজনকে বন্দী করেন। সুনির্দিষ্ট সাল ও খুঁটিনাটি নিয়ে মতভেদ আছে। প্রমাণ: মধ্যম/বিতর্কিত খুঁটিনাটিউৎস: ইবন হিশাম, সীরাহ, “আমর ইবন উমাইয়াকে আবু সুফিয়ানের বিরুদ্ধে পাঠানো” অধ্যায়; শামেলা সূচি। |
| ২৭ | ৪/৫/৭ হি.—তারিখ বিতর্কিত | জাতুর-রিকা গাজওয়া | গাতাফানের বনু মুহারিব ও বনু সালাবা; নাজদ | আগাম অভিযান | শত্রুসমাবেশের খবর পেয়ে নাজদে অভিযান; বড় যুদ্ধ হয়নি, উভয় পক্ষ মুখোমুখি থেকেও পিছিয়ে যায়। ভয়কালীন নামাজের একাধিক বর্ণনা এই অভিযানের সঙ্গে যুক্ত। ইবন ইসহাক ৪ হিজরিতে রাখলেও বুখারি-সম্পর্কিত প্রমাণে আবু মুসা আল-আশআরির অংশগ্রহণের কারণে খায়বারের পর ৭ হিজরি হওয়ার শক্ত যুক্তি আছে। ঘটনা উচ্চ; তারিখ অনিশ্চিতউৎস: ইসলামকিউএ: তারিখ-বিতর্ক; ইবন হিশাম, জাতুর-রিকা অধ্যায়। |
| ২৮ | শাবান ৪ হি. জানুয়ারি ৬২৬ আনু. |
বদরুল-মাওইদ/দ্বিতীয় বদর | আবু সুফিয়ানের সঙ্গে ঘোষিত মোকাবিলা | শক্তি প্রদর্শন | উহুদের শেষে পরের বছর বদরে সাক্ষাতের ঘোষণা অনুযায়ী মুসলিম বাহিনী বদরে আট দিন অপেক্ষা করে ও বাণিজ্য করে। আবু সুফিয়ান বাহিনী নিয়ে বের হলেও খরা দেখিয়ে ফিরে যান। কোনো যুদ্ধ হয়নি; উভয় পক্ষের রাজনৈতিক প্রচারে ঘটনাটি ব্যবহৃত হয়। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, বদর আল-আখিরা অধ্যায়; শামেলা সূচি। |
| ২৯ | রবিউল আউয়াল ৫ হি. আগস্ট/সেপ্টেম্বর ৬২৬ আনু. |
দুমাতুল-জান্দাল গাজওয়া | উত্তর আরবের বাণিজ্যপথ | দূরপাল্লার অভিযান | সীরাতের দাবি—দুমার আশপাশের দল পথিক/কাফেলা লুটছিল এবং মদিনা আক্রমণের জন্য সমবেত হচ্ছিল। প্রায় এক হাজার সৈন্য রাতে চলা ও দিনে লুকানোর কৌশলে যায়; বাসিন্দারা ছত্রভঙ্গ হলে কিছু পশু দখল হয়, বড় যুদ্ধ ছাড়াই বাহিনী ফেরে। এটি মদিনার উত্তরমুখী প্রথম বড় শক্তি-প্রক্ষেপণ। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, দুমাতুল-জান্দাল অধ্যায়; গাজওয়া-তালিকা। |
| ৩০ | শাওয়াল–জিলকদ ৫ হি. মার্চ/এপ্রিল ৬২৭ আনু. |
খন্দক/আহজাব যুদ্ধ | কুরাইশ, গাতাফান ও মিত্র জোট; মদিনা | প্রতিরক্ষা | প্রায় দশ হাজারের সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে মদিনার উন্মুক্ত উত্তরে পরিখা খনন করা হয়; মুসলিম বাহিনী প্রায় তিন হাজার। অবরোধ কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়; সীমিত দ্বন্দ্ব ও তীরবিনিময় ছাড়া পূর্ণ আক্রমণ সম্ভব হয়নি। নুয়াইম ইবন মাসউদের বিভ্রান্তিমূলক কূটকৌশল, পারস্পরিক অবিশ্বাস, শীতল ঝড় ও সরবরাহসংকটে জোট সরে যায়। প্রমাণ: উচ্চউৎস: কোরআন ৩৩:৯–২৭; ইবন হিশাম, খন্দক অধ্যায়। |
| ৩১ | জিলকদ ৫ হি. এপ্রিল/মে ৬২৭ আনু. |
বনু কুরাইযা অবরোধ ও পুরুষদের হত্যা | মদিনার বনু কুরাইযা | অবরোধ/সমষ্টিগত দণ্ড | খন্দকের অবরোধকালে চুক্তিভঙ্গ ও জোটকে সহায়তার অভিযোগে গোত্রের দুর্গ প্রায় ২৫ রাত অবরোধ করা হয়। আত্মসমর্পণের পর তাদের পুরনো আওস-মিত্র সাদ ইবন মুয়াজ রায় দেন: যুদ্ধক্ষম পুরুষদের হত্যা, নারী-শিশুদের বন্দী, সম্পদ বণ্টন। সহিহ বুখারি রায়ের ভাষা নিশ্চিত করে; আবু দাউদে বয়ঃসন্ধির চিহ্ন পরীক্ষা করে হত্যা/বন্দিত্ব নির্ধারণের প্রত্যক্ষ বর্ণনা আছে। ৬০০–৭০০, ৮০০–৯০০ ইত্যাদি মোট সংখ্যা ইবন ইসহাক ও পরবর্তী সীরাতে; সহিহ হাদিস কোনো নির্দিষ্ট মোট সংখ্যা দেয় না। মূল ঘটনা উচ্চ; সংখ্যা মধ্যমউৎস: সহিহ বুখারি ৪১২১; সুনান আবু দাউদ ৪৪০৪; ইসলামকিউএ; ইসলামওয়েব। |
| ৩২ | জিলহজ ৫/৬ হি. আনু. ৬২৭ আনু. |
আবু রাফে/সালাম ইবন আবিল-হুকাইক হত্যা | খায়বারের ইহুদি নেতা | লক্ষ্যভিত্তিক হত্যা | খন্দকের পরে খাজরাজের একটি দল আবদুল্লাহ ইবন আতিকের নেতৃত্বে দুর্গে ঢুকে আবু রাফেকে তাঁর ঘরে হত্যা করে। সহিহ বুখারিতে তালা খুলে, অন্ধকার ঘরে কণ্ঠস্বর শনাক্ত করে বারবার আঘাত এবং শেষে তরবারির ফল পেটে ঢোকানোর প্রত্যক্ষ বর্ণনা আছে। ঘটনাটি ৩ হিজরি/উহুদের আগে নয়; ইবন হিশামের ক্রমে বনু কুরাইযার পরে। প্রমাণ: উচ্চউৎস: সহিহ বুখারি ৪০৩৯; ইবন হিশাম, “মাকতাল সালাম ইবন আবিল-হুকাইক”। |
| ৩৩ | জুমাদাল উলা ৬ হি. আগস্ট/সেপ্টেম্বর ৬২৭ আনু. |
বনু লিহইয়ান গাজওয়া | হুযাইলের বনু লিহইয়ান | প্রতিশোধমূলক | আর-রাজিতে মুসলিম দল হত্যার প্রায় দুই বছর পর ২০০ জন নিয়ে গোপনে অভিযান করা হয়। বনু লিহইয়ান পাহাড়ে পালিয়ে যায়; সরাসরি যুদ্ধ হয়নি। মক্কার কাছে উসফান পর্যন্ত গিয়ে বাহিনী উপস্থিতি জানান দেয়। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, বনু লিহইয়ান অধ্যায়; ইসলামকিউএ গাজওয়া-তালিকা। |
| ৩৪ | ৬ হি. (খায়বারের অল্প আগে) ৬২৭/৬২৮ আনু. |
জু কারাদ/আল-গাবা অভিযান | উয়াইনা ইবন হিসন ও গাতাফানি হানাদার | ধাওয়া | মদিনার দুগ্ধবতী উট লুট, রাখাল হত্যা ও এক নারীকে অপহরণের পর সালামা ইবন আল-আকওয়া একাই তীর ছুড়ে ধাওয়া শুরু করেন; পরে অশ্বারোহী বাহিনী ও মুহাম্মদ যোগ দেন। কয়েকজন নিহত, কিছু উট উদ্ধার; অপহৃত নারী নিজেই পালিয়ে ফেরেন। তাই এটিকে আক্রমণাত্মক অভিযান বলা সঠিক নয়। প্রমাণ: উচ্চউৎস: সহিহ মুসলিম ১৮০৭; সহিহ বুখারি, মাগাজি; ইবন হিশাম, জু কারাদ অধ্যায়। |
| ৩৫ | শাবান ৫ বা ৬ হি.—মতভেদ ৬২৭/৬২৮ আনু. |
বনু মুস্তালিক/মুরাইসি অভিযান | বনু মুস্তালিক; মুরাইসি কূপ | অতর্কিত আক্রমণ | সহিহ বুখারি ও মুসলিমের ভাষায়, তারা অসতর্ক অবস্থায় পশুকে পানি খাওয়াচ্ছিল—তখন আক্রমণ হয়; যোদ্ধাদের একাংশ নিহত এবং নারী-শিশু বন্দী। জুয়াইরিয়া বিনতে আল-হারিস বন্দীদের মধ্যে ছিলেন; পরে মুহাম্মদ তাঁকে বিবাহ করেন। সীরাত বলে গোত্রটি যুদ্ধের জন্য সমবেত হচ্ছিল; সহিহ বর্ণনা আকস্মিক হামলার প্রকৃতি নিশ্চিত করে। তারিখে ইবন ইসহাক ৬ হি., অন্যরা ৫ হি. বলেন। প্রমাণ: উচ্চউৎস: সহিহ বুখারি ২৫৪১; সহিহ মুসলিম ১৭৩০ক। |
| ৩৬ | মুহাররম ৬ হি. আনু. | মুহাম্মদ ইবন মাসলামার আল-কুরাতা সারিয়া | বনু বকর/বনু কিলাবের আল-কুরাতা শাখা | রাত্রিকালীন হানা | প্রায় ত্রিশ অশ্বারোহীকে নাজদের আল-কুরাতা এলাকায় পাঠানো হয়। মাগাজি-সূত্রে রাতের হানায় কয়েকজন নিহত, উট-ছাগল দখল এবং সুমামা ইবন উসালকে ফেরার পথে বন্দী করার কথা আছে; সহিহ বুখারিতে সুমামাকে মসজিদের স্তম্ভে বেঁধে রাখা ও পরে মুক্তির ঘটনা প্রতিষ্ঠিত। বন্দিত্ব উচ্চ; অভিযানের সংখ্যা মধ্যমউৎস: সহিহ বুখারি ৪৩৭২; ইবন সাদ, সারিয়া-অধ্যায়। |
| ৩৭ | রবিউল আখির ৬ হি. আনু. | মুহাম্মদ ইবন মাসলামার জুল-কাসসা দল | বনু সালাবা; জুল-কাসসা | দল আক্রান্ত | দশজনের অনুসন্ধানী দল রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় প্রায় একশজনের আক্রমণে পড়ে; নয়জন নিহত, মুহাম্মদ ইবন মাসলামা আহত অবস্থায় মৃতের ভান করে বেঁচে যান। মূল লেখায় এটিকে প্রথমে মুসলিম আক্রমণ বলা হয়েছিল; সংরক্ষিত কাহিনির কেন্দ্র হলো পাঠানো ছোট দলের ওপর অতর্কিত হামলা। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন সাদ, তাবাকাত, ২য় খণ্ডের সারিয়া-তালিকা; শামেলা। |
| ৩৮ | রবিউল আখির ৬ হি. আনু. | আবু উবাইদার জুল-কাসসা পাল্টা অভিযান | বনু সালাবা | পাল্টা অভিযান | আগের দলের নয়জন নিহত হওয়ার পর আবু উবাইদা ইবন আল-জাররাহর নেতৃত্বে প্রায় ৪০ জন পাঠানো হয়। প্রতিপক্ষ পাহাড়ে সরে যায়; একজন বন্দী/ইসলাম গ্রহণ এবং কিছু পশু দখলের কথা মাগাজি-সূত্রে আছে। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন সাদ, তাবাকাত, সারিয়া-অধ্যায়। |
| ৩৯ | রবিউল আউয়াল ৬ হি. আনু. | উকাশা ইবন আল-মিহসানের আল-গামর সারিয়া | বনু আসাদ; আল-গামর | হানা/সম্পদ দখল | প্রায় ৪০ জনের দল গেলে লক্ষ্যগোষ্ঠী পালায়। সীরাত-তালিকায় ২০০ উট মদিনায় আনার কথা আছে; সরাসরি যুদ্ধের খবর নেই। “গোত্রটিকে নিঃস্ব করা” উদ্দেশ্য ছিল—এ কথা উৎসে সরাসরি নেই; প্রমাণিত তথ্য হলো লক্ষ্যস্থলে অভিযান ও পশু দখল। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন সাদ, তাবাকাত; আল-তাবারি, তারিখ; শামেলা: তারিখ আল-তাবারি। |
| ৪০ | রবিউল আখির ৬ হি. আনু. | যায়েদ ইবন হারিসার আল-জুমুম সারিয়া | বনু সুলাইম; মাররুজ-জাহরানের আল-জুমুম | হানা | স্থানীয় এক নারীর দেওয়া তথ্য অনুসরণ করে বনু সুলাইমের শিবিরে পৌঁছে কয়েকজন বন্দী ও পশু দখলের বর্ণনা পাওয়া যায়। ওই নারী ও তাঁর স্বামীকে মুক্ত করে দেওয়া হয়—এ খুঁটিনাটি ইবন সাদের মাগাজি-ধারার, সহিহ হাদিস নয়। প্রমাণ: মধ্যম/নিম্নউৎস: ইবন সাদ, তাবাকাত, যায়েদের সারিয়াসমূহ। |
| ৪১ | জুমাদাল উলা ৬ হি. সেপ্টেম্বর/অক্টোবর ৬২৭ আনু. |
যায়েদ ইবন হারিসার আল-ঈস সারিয়া | আবুল-আস ইবন আর-রাবির কুরাইশি কাফেলা | কাফেলা-আক্রমণ | প্রায় ১৭০ অশ্বারোহী সিরিয়া-ফেরত কাফেলা আটক করে পণ্য ও কয়েকজনকে ধরে। মুহাম্মদের কন্যা যায়নাব তাঁর স্বামী আবুল-আসকে আশ্রয় দিলে মুহাম্মদ সাহাবিদের সম্পদ ফেরত দিতে বলেন; তারা সব ফিরিয়ে দেয়। আবুল-আস মক্কায় মালিকদের হিসাব মিটিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে মদিনায় আসেন। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইসলামওয়েব: যায়েদের সারিয়া ও আবুল-আস; ইবন হিশাম। |
| ৪২ | জুমাদাল আখিরা ৬ হি. আনু. | যায়েদ ইবন হারিসার আত-তারাফ সারিয়া | বনু সালাবা; নাখল/আত-তারাফ | হানা | প্রায় ১৫ জন নিয়ে বনু সালাবার এলাকায় যাওয়া হয়। লক্ষ্যগোষ্ঠী বড় বাহিনী এসেছে ভেবে পালায়; প্রায় বিশটি উট দখল এবং চার দিন অবস্থানের কথা ইবন সাদের বর্ণনায় আছে। মূল তালিকার “বনু সালাবা হামলা ১” এই নির্দিষ্ট অভিযানের সঙ্গে মেলানো হয়েছে। প্রমাণ: মধ্যম/নিম্নউৎস: ইবন সাদ, তাবাকাত, ২য় খণ্ড। |
| ৪৩ | জুমাদাল আখিরা ৬ হি. আনু. | যায়েদ ইবন হারিসার হিসমা অভিযান | জুযাম গোত্র; হিসমা | পাল্টা হানা | দিহইয়া আল-কালবির বাণিজ্যদল লুটের জবাবে যায়েদের প্রায় ৫০০ জনের দল জুযামের ওপর হানা দিয়ে মানুষ ও পশু ধরে। জুযামের কিছু নেতা মুহাম্মদের দেওয়া নিরাপত্তাপত্র দেখালে বন্দী ও সম্পদ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ হয়। এর ফলে অভিযানটি একই সঙ্গে সহিংস পাল্টা আঘাত ও পরবর্তী ক্ষতিপূরণ/প্রত্যর্পণের উদাহরণ। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন সাদ; আল-ওয়াকিদি, মাগাজি। |
| ৪৪ | রজব ৬ হি. আনু. | যায়েদ ইবন হারিসার ওয়াদি আল-কুরা অভিযান | বনু ফাজারা-সম্পর্কিত দল | অভিযান; মুসলিম দল বিপর্যস্ত | বাণিজ্যযাত্রা বা সামরিক অভিযানের পথে যায়েদের দল আক্রমণের শিকার হয়; কয়েকজন মুসলিম নিহত এবং যায়েদ গুরুতর আহত অবস্থায় বেঁচে ফেরেন। পরে তিনি বনু ফাজারার বিরুদ্ধে প্রতিশোধের শপথ নেন। এটি খায়বার-পরবর্তী ওয়াদি আল-কুরা অবরোধ নয়—দুটি আলাদা ঘটনা। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম: বনু ফাজারা ও উম্মে কিরফা অধ্যায়। |
| ৪৫ | শাবান ৬ হি. আনু. | আবদুর রহমান ইবন আওফের দুমাতুল-জান্দাল সারিয়া | কালব গোত্রের খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী | ধর্মীয়-রাজনৈতিক চাপ | প্রায় ৭০০ জন নিয়ে যাত্রার আগে তিন দিন ইসলাম গ্রহণের আহ্বান, অস্বীকার করলে যুদ্ধ—এ নির্দেশের বর্ণনা আছে। স্থানীয় নেতা আল-আসবাগ ইবন আমর ইসলাম গ্রহণ করেন; তাঁর কন্যা তুমাদিরকে আবদুর রহমান বিয়ে করেন। বড় যুদ্ধের খবর নেই। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, “আবদুর রহমান ইবন আওফ ইলা দুমাতুল-জান্দাল”; শামেলা সূচি। |
| ৪৬ | শাবান ৬ হি. আনু. | আলি ইবন আবি তালিবের ফাদাক/বনু সাদ অভিযান | বনু সাদ ইবন বকর; ফাদাক-সংলগ্ন এলাকা | আগাম হানা | বনু সাদ খায়বারের ইহুদিদের সহায়তা করতে লোক জড়ো করছে—এই গোয়েন্দা খবরের ভিত্তিতে প্রায় ১০০ জনের দল পাঠানো হয়। শিবির খালি পাওয়া গেলে প্রচলিত বর্ণনায় ৫০০ উট ও ২,০০০ ছাগল দখল করে আনার কথা আছে। সংখ্যাগুলো ইবন সাদ/ওয়াকিদি-ধারার; সহিহ হাদিসে নেই। প্রমাণ: মধ্যম/নিম্নউৎস: ইবন সাদ, তাবাকাত, ২য় খণ্ড। |
| ৪৭ | রমজান ৬ হি. আনু. | বনু ফাজারা ও উম্মে কিরফার ঘটনা | ওয়াদি আল-কুরা; বনু ফাজারা | প্রতিশোধমূলক | বনু ফাজারার লোকেরা যায়েদের বাণিজ্যদল আক্রমণ করে মালপত্র লুট এবং তাঁকে গুরুতর আহত করার পর তিনি সুস্থ হয়ে প্রতিশোধমূলক বাহিনী নিয়ে ফেরেন। ইবন ইসহাক–ইবন হিশামের বর্ণনায় সংঘর্ষে বনু ফাজারার লোক নিহত হয়; গোত্রনেত্রী উম্মে কিরফা—ফাতিমা বিনতে রবিআ ইবন বদর—তাঁর কন্যাসহ বন্দী হন। যায়েদ কায়েস ইবন আল-মুসাহহারকে তাঁকে হত্যার আদেশ দেন এবং তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। আল-তাবারি, ইবন সাদ ও পরবর্তী সীরাত-শরহে পদ্ধতিটি স্পষ্ট: তাঁর দুই পা দুই ঘোড়া বা উটের সঙ্গে বেঁধে বিপরীত দিকে চালিয়ে দেহ দ্বিখণ্ডিত করা হয়। ইবন হাজার আল-আসকালানি ফাতহুল বারী-তে যায়েদের সাতটি সারিয়া গণনা করতে গিয়ে বনু ফাজারার এই অভিযান, উম্মে কিরফার হত্যা, দুই ঘোড়ার লেজে বেঁধে ছিন্ন করা এবং সুন্দরী কন্যাকে বন্দী করার বিবরণ একত্রে উল্লেখ করেছেন; এরপর তিনি বলেন, সহিহ মুসলিমে সালামা ইবন আল-আকওয়ার হাদিসে “এর একটি অংশ” বর্ণিত হয়েছে। সহিহ মুসলিমের সেই বর্ণনায় বনু ফাজারায় ভোরের অতর্কিত হামলা, হত্যা ও বন্দিত্ব, চামড়ার পোশাকধারী এক ফাজারি নারী ও তাঁর সুন্দরী কন্যাকে ধরে আনা, কন্যাটিকে সালামাকে গনিমত হিসেবে দেওয়া, এবং পরে মুহাম্মদের অনুরোধে কন্যাটিকে মক্কায় পাঠিয়ে মুসলিম বন্দীদের বিনিময় করার ঘটনা আছে। মুসলিমের মূল হাদিসে মায়ের নাম বা হত্যাপদ্ধতি লেখা নেই এবং সেখানে অভিযানের ময়দানি আমির হিসেবে আবু বকরের নাম এসেছে; কিন্তু শরহকারেরা নারীটিকে উম্মে কিরফা হিসেবে শনাক্ত করেছেন এবং ইবন হাজার সহিহ মুসলিমের ঘটনাংশকে যায়েদের উম্মে কিরফা অভিযানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। অতএব, দ্বিখণ্ডনের বিবরণকে আধুনিক ফতোয়া-সাইটের দাবির ভিত্তিতে “জাল” বা “অপ্রমাণিত কাহিনি” বলে বাতিল করা ইতিহাসগ্রন্থ, হাদিস-শরহ ও পারস্পরিক সমর্থনকারী বর্ণনাগুলো গোপন করে। অভিযান, বন্দিত্ব ও কন্যাকে গনিমত করা: সহিহ; উম্মে কিরফার হত্যা ও দ্বিখণ্ডন: প্রাচীন সীরাত-ইতিহাসে সুসংরক্ষিতউৎস: সংশয়: উৎসসমন্বিত বিশ্লেষণ; ইবন হিশাম: উম্মে কিরফার বন্দিত্ব ও হত্যা; ফাতহুল বারী, ৭/৫৭০; সহিহ মুসলিম ১৭৫৫; ইবন হিশাম, শামেলা। |
| ৪৮ | শাওয়াল ৬ হি. আনু. | আল-ইউসাইর/উসাইর ইবন রিজাম অভিযান | খায়বারি নেতা ও তাঁর সঙ্গীরা | আলোচনায় ডেকে হত্যা | আবু রাফের পর উসাইর গাতাফানকে মদিনার বিরুদ্ধে জড়ো করছেন—এই অভিযোগে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার প্রায় ৩০ জনের দল তাঁকে খায়বারের শাসক করার প্রস্তাব দিয়ে মদিনায় আনতে চায়। পথে তাঁর অস্ত্র ধরার চেষ্টা/বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কার বর্ণনায় সংঘর্ষ বাধে এবং উসাইরসহ প্রায় ৩০ ইহুদি নিহত; একজন মুসলিম আহত। নিরাপদ আলোচনার প্রলোভন ও পথে হত্যার মূল কাঠামো সীরাতনির্ভর। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, “গাজওয়াত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা লি-কতল আল-ইউসাইর”; শামেলা সূচি। |
| ৪৯ | শাওয়াল ৬ হি. আনু. | উকল–উরাইনা দণ্ড | আটজন ধর্মত্যাগী/হত্যা ও উট-লুটে অভিযুক্ত ব্যক্তি | বিচারিক প্রতিশোধ | এটি গোত্রের বিরুদ্ধে সামরিক আক্রমণ নয়। অসুস্থ আটজনকে সরকারি উটের দুধ/মূত্রপানের জন্য চারণভূমিতে পাঠানো হয়েছিল; তারা রাখালকে হত্যা, চোখ উপড়ে/অঙ্গচ্ছেদ করে, উট নিয়ে পালায় এবং ইসলাম ত্যাগ করে—সহিহ বর্ণনার অভিযোগ। কুরজ ইবন জাবিরের দল তাদের ধরে আনে; তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কাটা, চোখে গরম শলাকা এবং পানি না দিয়ে মৃত্যুর দণ্ড দেওয়া হয়। প্রমাণ: উচ্চউৎস: সহিহ বুখারি ৬৮০২; সহিহ মুসলিম ১৬৭১ক। |
| ৫০ | জিলকদ ৬ হি. মার্চ ৬২৮ আনু. |
হুদায়বিয়ার অভিযান ও সন্ধি | মক্কা; কুরাইশ | সশস্ত্র তীর্থযাত্রা/সন্ধি | প্রায় ১,৪০০ অনুসারী কোরবানির পশুসহ উমরার উদ্দেশ্যে যায়; যুদ্ধের উদ্দেশ্য ঘোষণা করা হয়নি, তবে অস্ত্র ছিল সফরকারীর প্রচলিত তরবারি। কুরাইশ প্রবেশ ঠেকায়; উসমান নিহত হয়েছেন—এ গুজবে রিদওয়ান বাইআত হয়। দশ বছরের সন্ধি, সে বছর প্রত্যাবর্তন, পরের বছর উমরা এবং পালিয়ে আসা মক্কাবাসী ফেরত দেওয়ার শর্ত গৃহীত হয়। সূরা ফাতহ একে “সুস্পষ্ট বিজয়” বলে। প্রমাণ: উচ্চউৎস: সহিহ বুখারি ২৭৩১–২৭৩২; সূরা ফাতহ; ইবন হিশাম, হুদায়বিয়া অধ্যায়। |
| ৫১ | মুহাররম ৭ হি. মে/জুন ৬২৮ আনু. |
খায়বার অভিযান | খায়বারের ইহুদি দুর্গসমূহ | অবরোধ ও দখল | হুদায়বিয়ার পরে দুর্গনগরীতে রাত্রে পৌঁছে ভোরে সামরিক অভিযান শুরু হয়; সহিহ বুখারিতে কৃষকেরা কোদাল-ঝুড়ি নিয়ে বের হয়ে বাহিনী দেখে আতঙ্কিত হওয়ার বর্ণনা আছে। ধারাবাহিক অবরোধে দুর্গগুলো দখল, যোদ্ধা নিহত এবং নারী-শিশু বন্দী হয়; সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই বন্দীদের মধ্যে ছিলেন, পরে মুহাম্মদ তাঁকে মুক্ত করে বিবাহ করেন। “সব পুরুষ হত্যা” সঠিক নয়: ইহুদি কৃষকদের জমিতে থাকতে দিয়ে উৎপাদনের অর্ধেক দেওয়ার চুক্তি হয়, যদিও বহিষ্কারের অধিকার মুসলিম কর্তৃপক্ষ রাখে। প্রমাণ: উচ্চউৎস: সহিহ বুখারি ৪১৯৭; বুখারি ২৭২০; ইবন হিশাম, ২/৩২৮। |
| ৫২ | মুহাররম ৭ হি. | ফাদাক চুক্তি | ফাদাকের ইহুদি বসতি | সামরিক চাপে চুক্তি | খায়বার পতনের খবরের পর ফাদাকবাসী যুদ্ধ ছাড়াই অর্ধেক জমি/উৎপাদনের বিনিময়ে শান্তিচুক্তি করে। যুদ্ধে অশ্বারোহী অংশ নেয়নি বলে ফাদাকের অংশ ফাই হিসেবে মুহাম্মদের ব্যক্তিগত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে ছিল—পরবর্তী উত্তরাধিকার-বিতর্কে যা গুরুত্বপূর্ণ। প্রমাণ: উচ্চ/মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম: খায়বার ও ফাদাক অধ্যায়; কোরআন ৫৯:৬–৭। |
| ৫৩ | সফর ৭ হি. আনু. | ওয়াদি আল-কুরা অবরোধ | ওয়াদি আল-কুরার ইহুদি/আরব বসতি | অবরোধ | খায়বার থেকে ফেরার পথে বসতি অবরোধ করা হয়; কয়েকদিন তীরবিনিময় ও দ্বন্দ্বের পর আত্মসমর্পণ। জমি-খেজুরবাগান দখলে যায়, তবে চাষিদের উৎপাদনের অংশের বিনিময়ে জমিতে রাখা হয়। এটি ৬ হিজরির যায়েদ-বাহিনীর বিপর্যয় থেকে পৃথক। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন সাদ ও আল-তাবারি; তারিখ আল-তাবারি, শামেলা। |
| ৫৪ | ৭ হি. | তাইমা চুক্তি | তাইমার ইহুদি বসতি | কর-চুক্তি | খায়বার, ফাদাক ও ওয়াদি আল-কুরার পর তাইমাবাসী সামরিক সংঘর্ষ ছাড়াই জিজিয়া/নিরাপত্তা-চুক্তি মেনে নেয়। ফলে উত্তর হিজাজের ধারাবাহিক বসতিগুলো মদিনার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্তৃত্বে আসে। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: আবু উবাইদ, কিতাব আল-আমওয়াল; বালাধুরি, ফুতুহ আল-বুলদান। |
| ৫৫ | ৭ হি. আনু. | ইবন আবিল-আওজার বনু সুলাইম সারিয়া | বনু সুলাইম | বশ্যতা/ইসলামের আহ্বান | প্রায় ৫০ জনকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বানে পাঠানো হয়। গোত্রের লোকেরা “প্রয়োজন নেই” বলে আক্রমণ করলে অধিকাংশ মুসলিম নিহত; নেতা আহত অবস্থায় ফিরে আসেন। এটি সফল লুট নয়, মদিনার আনুগত্য বিস্তারের ব্যর্থ সশস্ত্র মিশন। প্রমাণ: মধ্যম/নিম্নউৎস: ইবন সাদ, তাবাকাত, সারিয়া-অধ্যায়। |
| ৫৬ | জুমাদাল উলা ৮ হি. সেপ্টেম্বর ৬২৯ আনু. |
মুতা যুদ্ধ | বাইজেন্টাইন-ঘাসসানি সীমান্ত; মুতা | শাস্তিমূলক সীমান্ত অভিযান | সীরাত অনুযায়ী বসরার শাসকের কাছে পাঠানো দূত আল-হারিস ইবন উমাইরকে ঘাসসানি কর্মকর্তা শুরাহবিল হত্যা করায় প্রায় ৩,০০০ সৈন্য পাঠানো হয়। যায়েদ, জাফর ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ধারাবাহিকভাবে নিহত; খালিদ ইবন ওয়ালিদ নেতৃত্ব নিয়ে বাহিনীকে সরিয়ে আনেন। শত্রুবাহিনী ১–২ লক্ষ—এ প্রচলিত সংখ্যা পরবর্তী সীরাতের অতিরঞ্জন হতে পারে; সমসাময়িক নির্ভরযোগ্য গণনা নেই। মূল যুদ্ধ উচ্চ; সংখ্যা নিম্নউৎস: সহিহ বুখারি ৪২৬২; ইবন হিশাম, মুতা অধ্যায়; গাজওয়া-তালিকা। |
| ৫৭ | জুমাদাল আখিরা ৮ হি. অক্টোবর ৬২৯ আনু. |
জাতুস-সালাসিল সারিয়া | কুদাআর বালি, উযরা ও বালকাইন শাখা | আগাম সীমান্ত অভিযান | উত্তরাঞ্চলের গোত্রগুলো মদিনার বিরুদ্ধে জড়ো হচ্ছে—এ সংবাদে আমর ইবন আল-আসের প্রায় ৩০০ জন পাঠানো হয়; পরে আবু উবাইদার ২০০ জন সহায়তা যোগ করে। শত্রুদল ছত্রভঙ্গ হয়; বড় যুদ্ধ বা ব্যাপক লুটের নির্ভরযোগ্য বিবরণ নেই। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, জাতুস-সালাসিল অধ্যায়; আবু দাউদ ৩৩৪। |
| ৫৮ | রজব ৮ হি. আনু. | আল-খাবত/সিফুল-বাহর অভিযান | লোহিত সাগর উপকূল; কুরাইশি কাফেলার দিক | কাফেলা-অভিমুখী অভিযান | আবু উবাইদার অধীনে প্রায় ৩০০ জনকে উপকূলে পাঠানো হয়। খাদ্য ফুরিয়ে পাতাঝরা খাওয়ায় নাম “খাবত”; পরে সমুদ্রতীরে বিশাল মৃত আম্বর মাছ খেয়ে প্রায় এক মাস বেঁচে থাকে। কাফেলায় বাস্তব হামলা বা যুদ্ধের বর্ণনা নেই—অতএব “নিরবচ্ছিন্ন লুট” নয়, কাফেলা-অভিমুখী কিন্তু সংঘর্ষহীন অভিযান। প্রমাণ: উচ্চউৎস: সহিহ বুখারি ৪৩৬১; সহিহ মুসলিম ১৯৩৫। |
| ৫৯ | রমজান ৮ হি. ডিসেম্বর ৬২৯/জানুয়ারি ৬৩০ আনু. |
বাতন ইদাম বিভ্রান্তিমূলক সারিয়া | ইদাম উপত্যকা; আমির ইবন আল-আদবাত | গোপন গতিবিধি | মক্কা অভিযানের প্রকৃত দিক গোপন করতে আবু কাতাদার ছোট দল ইদামের দিকে পাঠানো হয়। পথে আমির ইবন আল-আদবাত সালাম জানালেও মুহাল্লিম ইবন জাসসাম পুরোনো শত্রুতায় তাকে হত্যা ও সম্পদ নেয়। কোরআন ৪:৯৪—সালামদানকারীকে “তুমি মুমিন নও” না বলার আয়াত—এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। প্রমাণ: উচ্চ/মধ্যমউৎস: কোরআন ৪:৯৪; ইবন হিশাম, বাতন ইদাম অধ্যায়। |
| ৬০ | রমজান ৮ হি. জানুয়ারি ৬৩০ আনু. |
মক্কা বিজয় | মক্কা ও কুরাইশ | নগর দখল | কুরাইশ-মিত্র বনু বকর হুদায়বিয়ার চুক্তিভুক্ত খুযাআকে আক্রমণ করলে প্রায় দশ হাজারের বাহিনী গোপনে মক্কার দিকে যায়। আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করতে আবু সুফিয়ানকে নিরাপত্তার ঘোষণা প্রচার করানো হয়। সাধারণ নির্দেশ ছিল প্রতিরোধ না করলে যুদ্ধ নয়; খালিদের পথে সীমিত সংঘর্ষে কয়েকজন নিহত। কাবার প্রায় ৩৬০ প্রতিমা অপসারণ/ধ্বংস, কুরাইশি রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অবসান এবং ইসলামী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রমাণ: উচ্চউৎস: ইসলামকিউএ: মক্কা বিজয়; ইবন হিশাম, ফাতহ অধ্যায়; সহিহ বুখারি ৪২৮৭। |
| ৬১ | রমজান ৮ হি. | আল-উজ্জা, মানাত ও সুওয়া মন্দির ধ্বংস | নাখলা, আল-মুশাল্লাল ও রুহাত | ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস | মক্কা বিজয়ের পর খালিদ ইবন ওয়ালিদকে আল-উজ্জা, সাদ ইবন যায়েদকে মানাত এবং আমর ইবন আল-আসকে সুওয়া ধ্বংসে পাঠানোর বর্ণনা আছে। এগুলো আরবের প্রধান দেবী/দেবতার আঞ্চলিক পূজাকেন্দ্র ছিল। কাবার প্রতিমা ধ্বংসের পাশাপাশি এ পদক্ষেপ ধর্মীয় বহুত্বের দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদের কেন্দ্রীয় নীতি নির্দেশ করে। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, “খালিদকে আল-উজ্জা ধ্বংসে পাঠানো”; শামেলা সূচি। |
| ৬২ | শাওয়াল ৮ হি. আনু. | বনু জাধিমা হত্যাকাণ্ড | বনু জাধিমা; ইয়ালামলাম-সংলগ্ন এলাকা | অধিনায়কের বেআইনি হত্যা | খালিদকে দাওয়াতের জন্য পাঠানো হয়েছিল; গোত্রটি “আসলামনা” না বলে “সাবানা” বলায় খালিদ কিছু লোক হত্যা ও কিছু বন্দী করেন, পরে প্রত্যেক সৈন্যকে নিজ বন্দী হত্যার আদেশ দেন। ইবন উমরসহ কয়েকজন অমান্য করেন। সংবাদ পেয়ে মুহাম্মদ দুবার বলেন, “খালিদ যা করেছে, আমি তা থেকে দায়মুক্ত”; আলিকে পাঠিয়ে নিহতদের রক্তপণ ও ক্ষতিপূরণ দেন। তাই এটিকে মুহাম্মদের নির্দেশিত গণহত্যা বলা যায় না; তাঁর নিযুক্ত বাহিনীর সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, যা তিনি প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেন। প্রমাণ: উচ্চউৎস: সহিহ বুখারি ৭১৮৯; ইবন হিশাম, বনু জাধিমা অধ্যায়। |
| ৬৩ | ১০ শাওয়াল ৮ হি. ফেব্রুয়ারি ৬৩০ আনু. |
হুনাইন যুদ্ধ | হাওয়াজিন, সাকিফ ও মিত্ররা | আগাম মোকাবিলা/প্রতিরোধ | মক্কা পতনের পর মালিক ইবন আওফের নেতৃত্বে হাওয়াজিন-সাকিফ মুসলিমদের বিরুদ্ধে আগে সমবেত হয় এবং পরিবার-পশু সঙ্গে আনে। প্রায় ১২ হাজার মুসলিম হুনাইনে গেলে লুকানো তীরন্দাজের অতর্কিত আক্রমণে প্রথমে ছত্রভঙ্গ হয়; পরে পুনর্গঠিত হয়ে জয়ী হয়। প্রচলিত হিসাব: প্রায় ৬,০০০ নারী-শিশু বন্দী, ২৪,০০০ উট, ৪০,০০০ ভেড়া ও বিপুল রুপা। পরে হাওয়াজিন প্রতিনিধি ইসলাম গ্রহণ করে বন্দী ফেরত চাইলে অধিকাংশ বন্দী ফেরত দেওয়া হয়; সম্পদ নয়। প্রমাণ: উচ্চ; সংখ্যার উৎস সীরাতউৎস: কোরআন ৯:২৫–২৭; ইসলামওয়েব; সহিহ বুখারি ৪৩১৮। |
| ৬৪ | শাওয়াল ৮ হি. | আওতাস অভিযান | হাওয়াজিনের পশ্চাদপসরণকারী অংশ | ধাওয়া | হুনাইনের পর আবু আমির আল-আশআরির নেতৃত্বে একটি বাহিনী আওতাসে পালানো শত্রুদলকে ধাওয়া করে; আবু আমির নিহত হলে আবু মুসা নেতৃত্ব নেন। যুদ্ধবন্দী নারীদের সঙ্গে সহবাস, বন্দিত্ব ও আজল বিষয়ে সহিহ মুসলিমের বর্ণনা এই অভিযানের সঙ্গে যুক্ত—যুদ্ধের মানবিক পরিণতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রমাণ: উচ্চউৎস: সহিহ বুখারি ৪৩২৩; সহিহ মুসলিম ১৪৫৬। |
| ৬৫ | শাওয়াল–জিলকদ ৮ হি. | তায়েফ অবরোধ | সাকিফ; তায়েফ নগরী | অবরোধ | হুনাইনের পর সাকিফ তায়েফ দুর্গে আশ্রয় নিলে প্রায় ১৫–২০ দিন অবরোধ চলে। মঞ্জনীক ও ঢাল-আবৃত চলমান যন্ত্র ব্যবহারের বর্ণনা আছে; আঙুরলতা কাটার নির্দেশ পরে অনুরোধে থামানো হয়। দুর্গ তখন দখল হয়নি; অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। সাকিফ পরের বছর প্রতিনিধি পাঠিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে—অতএব “অবরোধেই নতি স্বীকার” ভুল। মূল অবরোধ উচ্চ; প্রযুক্তির খুঁটিনাটি মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, তায়েফ অধ্যায়; ইসলামকিউএ: মঞ্জনীক। |
| ৬৬ | সফর ৯ হি. আনু. | কুতবা ইবন আমিরের খাসআম/তাবালা সারিয়া | খাসআম; তাবালা | রাত্রিকালীন হানা | প্রায় ২০ জনকে দশটি উটে পালাক্রমে চড়িয়ে পাঠানো হয়। ভোর/রাতে আক্রমণে উভয় পক্ষের হতাহত এবং উট-ছাগল দখলের বর্ণনা ইবন সাদের তালিকায় আছে। মূল লেখার “সেপ্টেম্বর ৬৩০” তারিখটি নির্ভরযোগ্য নয়; হিজরি ক্রমে এটি তাবুকের আগের ঘটনা। প্রমাণ: মধ্যম/নিম্নউৎস: ইবন সাদ, তাবাকাত, সারিয়া কুতবা ইবন আমির। |
| ৬৭ | মুহাররম ৯ হি. আনু. | উয়াইনা ইবন হিসনের বনু তামিম সারিয়া | বনু তামিমের আল-আনবার শাখা | কর-সংগ্রহ ঘিরে অভিযান | বনু তামিমের একটি দল বনু খুযাআর সদকা-সংগ্রাহকদের বাধা দিলে প্রায় ৫০ অশ্বারোহী পাঠানো হয়। রাতে হানায় পুরুষ, নারী ও শিশু বন্দী করে মদিনায় আনা হয়; পরে বনু তামিমের প্রতিনিধি এসে কবিতা-বাগ্মিতার প্রতিযোগিতা ও আলোচনার পর বন্দীরা মুক্ত হয়। প্রচলিত গণনা ১১ পুরুষ, ২১ নারী ও ৩০ শিশু—মাগাজি-উৎসনির্ভর। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, বনু তামিম প্রতিনিধি ও উয়াইনার অভিযান; শামেলা সূচি। |
| ৬৮ | রবিউল আউয়াল ৯ হি. আনু. | আদ-দাহহাক ইবন সুফিয়ানের বনু কিলাব সারিয়া | বনু কিলাব | ইসলামের আহ্বান/সংঘর্ষ | দলটি বনু কিলাবকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানায়; অস্বীকৃতি ও যুদ্ধ হলে তারা পরাজিত হয়। “গবাদি পশু লুটই একমাত্র উদ্দেশ্য”—এমন সরাসরি উৎস নেই; রাজনৈতিক-ধর্মীয় বশ্যতা প্রতিষ্ঠা ছিল অভিযানের ঘোষিত কাঠামো। প্রমাণ: মধ্যম/নিম্নউৎস: ইবন সাদ, তাবাকাত, ২য় খণ্ড। |
| ৬৯ | রবিউল আখির ৯ হি. আনু. | আলির বনু তায়্য অভিযান ও আল-ফুলস ধ্বংস | বনু তায়্য; হাতিম আত-তাইয়ের এলাকা | হানা/মন্দির ধ্বংস | প্রায় ১৫০ জন নিয়ে ভোরে হামলা, আল-ফুলস দেবমন্দির ধ্বংস এবং নারী-শিশু ও পশু বন্দী/দখলের বর্ণনা আছে। হাতিমের কন্যা সাফফানা বন্দীদের মধ্যে ছিলেন; নিজের পরিচয় ও পিতার গুণ উল্লেখ করলে মুহাম্মদ তাঁকে মুক্তি ও যাত্রাসাহায্য দেন। তাঁর ভাই আদি পরে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, আদি ইবন হাতিম অধ্যায়; ইবন সাদ, ২য় খণ্ড। |
| ৭০ | রজব ৯ হি. অক্টোবর ৬৩০ আনু. |
তাবুক গাজওয়া | বাইজেন্টাইন সীমান্ত ও উত্তর আরব | বিশাল শক্তি-প্রক্ষেপণ | বাইজেন্টাইন/আরব মিত্রবাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণের সংবাদে প্রায় ৩০,০০০ জনের বাহিনী কঠিন গরম ও খাদ্যাভাবের মধ্যে তাবুকে যায়। কোনো বাইজেন্টাইন বাহিনী মুখোমুখি হয়নি, যুদ্ধও হয়নি। প্রায় ২০ দিন অবস্থান করে উত্তর সীমান্তে মদিনার উপস্থিতি দেখানো এবং স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে কর/নিরাপত্তা চুক্তি করে প্রত্যাবর্তন। সূরা তওবার বহু আয়াত অভিযানে অংশগ্রহণ, অনুদান, অনুপস্থিতি ও মুনাফিকদের প্রসঙ্গ তোলে। প্রমাণ: উচ্চউৎস: কোরআন ৯:৩৮–১০৬; ইবন হিশাম, তাবুক অধ্যায়; ইসলামকিউএ সারসংক্ষেপ। |
| ৭১ | রজব ৯ হি. | খালিদের দুমাতুল-জান্দাল অভিযান | খ্রিস্টান শাসক উকাইদির ইবন আবদুল মালিক | বন্দিত্ব/জিজিয়া চুক্তি | তাবুক থেকে প্রায় ৪২০ অশ্বারোহীসহ খালিদকে পাঠানো হয়। রাতের শিকারে দুর্গের বাইরে উকাইদিরকে ধরে এবং তাঁর ভাই প্রতিরোধে নিহত হয়—এ সীরাত-বিবরণ। উকাইদিরকে মুহাম্মদের কাছে আনা হলে জিজিয়া/আনুগত্যের চুক্তিতে মুক্তি দেওয়া হয়। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম ও আল-তাবারি, তাবুক-পর্ব; শামেলা। |
| ৭২ | রজব ৯ হি. | আইলা, জারবা ও আজরুহের কর-চুক্তি | উত্তর-পশ্চিম আরবের খ্রিস্টান/ইহুদি বসতি | জিজিয়া/নিরাপত্তা চুক্তি | তাবুক অবস্থানের সময় আইলার ইউহান্না ইবন রুবা এবং জারবা-আজরুহের প্রতিনিধিরা নিরাপত্তা ও চলাচলের অধিকারের বিনিময়ে নির্দিষ্ট কর/জিজিয়া মেনে নেয়। বড় যুদ্ধ ছাড়াই সামরিক উপস্থিতি আঞ্চলিক কর-নির্ভরতার কাঠামো তৈরি করে। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, তাবুকের চুক্তিপত্র; আবু উবাইদ, আল-আমওয়াল। |
| ৭৩ | রজব ৯ হি., তাবুক ফেরার পথে | মসজিদে দিরার ভাঙা ও পোড়ানো | কুবা-সংলগ্ন বিরোধী মসজিদ | ধর্মীয়-রাজনৈতিক দমন | কোরআন ৯:১০৭–১১০-এ এমন মসজিদের কথা বলা হয় যা ক্ষতি, অবিশ্বাস, বিভাজন ও পূর্বশত্রুর ঘাঁটি হিসেবে নির্মিত। তাবুক থেকে ফেরার পথে মুহাম্মদ মালিক ইবন দুখশুম ও মান ইবন আদিকে পাঠিয়ে স্থাপনাটি ভেঙে/পুড়িয়ে দিতে বলেন—সীরাতের বর্ণনা। এটি যুদ্ধ নয়, কিন্তু সামরিক-রাজনৈতিক কর্তৃত্বে ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনা। কোরআনিক অভিযোগ উচ্চ; ধ্বংসের খুঁটিনাটি মধ্যমউৎস: কোরআন ৯:১০৭–১১০; ইবন হিশাম, মসজিদে দিরার অধ্যায়। |
| ৭৪ | রমজান ৯ হি. | আল-লাত মন্দির ধ্বংস | তায়েফ; সাকিফ | আত্মসমর্পণ-পরবর্তী ধ্বংস | তায়েফ অবরোধের কয়েক মাস পরে সাকিফের প্রতিনিধি ইসলাম গ্রহণে আসে। তারা আল-লাত তিন বছর অক্ষত রাখা, নামাজ থেকে অব্যাহতি ইত্যাদি শর্ত চাইলে প্রত্যাখ্যাত হয়। আবু সুফিয়ান ও মুগিরা ইবন শুবাকে পাঠিয়ে আল-লাতের মন্দির ভাঙা হয়; সাকিফের নারীরা শোক প্রকাশ করে। এটি অবরোধের তাৎক্ষণিক ফল নয়, পরবর্তী রাজনৈতিক আত্মসমর্পণের শর্ত। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, সাকিফ প্রতিনিধি অধ্যায়; আবু দাউদ ৩০২৬। |
| ৭৫ | ৯/১০ হি. | নাজরানের খ্রিস্টানদের সঙ্গে বিতর্ক ও চুক্তি | নাজরান | ধর্মতাত্ত্বিক চাপ/জিজিয়া | এটি সরাসরি “নাজরান সামরিক অভিযান” নয়। খ্রিস্টান প্রতিনিধি মদিনায় এসে যিশুর প্রকৃতি নিয়ে বিতর্ক করে; কোরআন ৩:৬১-এর পারস্পরিক অভিশাপের আহ্বান তারা গ্রহণ করেনি। পরে তারা ধর্ম পালনের নিরাপত্তার বিনিময়ে বস্ত্র/রৌপ্যসমমূল্যের নির্ধারিত কর ও অন্যান্য দায় মেনে চুক্তি করে। আলাদা ঘটনায় খালিদকে বনু আল-হারিস ইবন কাবের কাছে পাঠানো হয়। মূল সাক্ষাৎ উচ্চ/মধ্যমউৎস: কোরআন ৩:৫৯–৬৪; ইবন হিশাম: নাজরান প্রতিনিধি। |
| ৭৬ | রবিউল আখির/জুমাদাল উলা ১০ হি. আনু. | খালিদের বনু আল-হারিস ইবন কাব মিশন | নাজরান অঞ্চলের বনু আল-হারিস | আলটিমেটাম/আনুগত্য | মুহাম্মদ খালিদকে নির্দেশ দেন: তিন দিন ইসলাম গ্রহণের আহ্বান; গ্রহণ করলে মেনে নেওয়া, না করলে যুদ্ধ। তারা যুদ্ধ ছাড়াই ইসলাম গ্রহণ করে; খালিদ ধর্মশিক্ষা দিয়ে প্রতিনিধি নিয়ে মদিনায় ফেরেন। “ইসলাম নতুবা যুদ্ধ” বাক্যটি নাজরানের সব খ্রিস্টানের সাধারণ চুক্তির বদলে এই নির্দিষ্ট গোত্রীয় মিশনের সঙ্গে অধিক নির্ভুলভাবে যুক্ত। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, “বনু আল-হারিস ইবন কাবের ইসলাম”; শামেলা সূচি। |
| ৭৭ | রমজান ১০ হি. আনু. | আলির ইয়েমেন/মাযহিজ অভিযান | মাযহিজ ও ইয়েমেনি গোত্র | দাওয়াতের পর যুদ্ধ | খালিদের আগের প্রচেষ্টা কাঙ্ক্ষিত ফল না দেওয়ায় আলিকে প্রায় ৩০০ অশ্বারোহীসহ পাঠানো হয়। আলি লিখিত আহ্বান পাঠান; একটি অংশ আক্রমণ করলে সংঘর্ষে প্রায় ২০ জন নিহত—প্রচলিত সীরাত-সংখ্যা। পরে তারা আত্মসমর্পণ/ইসলাম গ্রহণ করে; গনিমত ভাগ ও এক-পঞ্চমাংশ পৃথক করা হয়। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন সাদ, তাবাকাত; ইবন হিশাম, আলির ইয়েমেন অভিযান। |
| ৭৮ | ১০ হি. আনু. | হামদান গোত্রের ইসলাম গ্রহণ | ইয়েমেনের হামদান | দাওয়াত/আনুগত্য | আলি মুহাম্মদের চিঠি পড়ে শোনালে হামদান একই দিনে ইসলাম গ্রহণ করে—ইবন ইসহাকের বর্ণনা। এখানে যুদ্ধ, হত্যা বা জোরপূর্বক কর আরোপের নির্দিষ্ট খবর নেই। তাই মূল লেখার “সামরিক ও আদর্শিক চাপে বাধ্য” সিদ্ধান্তের বদলে প্রমাণযোগ্য তথ্য হলো সশস্ত্র প্রতিনিধির উপস্থিতিতে সমষ্টিগত ধর্মান্তর ও রাজনৈতিক আনুগত্য। প্রমাণ: মধ্যমউৎস: ইবন হিশাম, হামদানের প্রতিনিধি/ইসলাম অধ্যায়; শামেলা সূচি। |
| ৭৯ | ১০ হি. বা ১১ হি.—তারিখ অনিশ্চিত | যুল-খালাসা মন্দির ধ্বংস | বাজিলা, খাসআম ও বনু কাহাফা; তাবালা-সংলগ্ন | মন্দির ধ্বংস/সংঘর্ষ | মুহাম্মদ জারির ইবন আবদুল্লাহকে আহমাসের ১৫০ অশ্বারোহীসহ “ইয়েমেনি কাবা” নামে পরিচিত যুল-খালাসা ধ্বংসে পাঠান। সহিহ বুখারিতে জারির জানান, তারা মন্দির ভেঙে/পুড়িয়ে দেয় এবং প্রতিরোধকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে; মুহাম্মদ আহমাসের অশ্বারোহীদের জন্য পাঁচবার আশীর্বাদ করেন। নিহতের নির্দিষ্ট সংখ্যা পরবর্তী ইতিহাসে, সহিহ হাদিসে নয়। প্রমাণ: উচ্চউৎস: সহিহ বুখারি ৪৩৫৫; বুখারি ৪৩৫৬–৪৩৫৭। |
| ৮০ | সফর ১১ হি. মে ৬৩২ আনু. |
উসামা ইবন যায়েদের বাহিনী | উবনা/আল-বালকা; বাইজেন্টাইন-ঘাসসানি সীমান্ত | প্রতিশোধ/সীমান্ত অভিযান | মুতায় যায়েদ ও অন্যদের মৃত্যুর প্রতিশোধ এবং সীমান্তে শক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য তরুণ উসামাকে বৃহৎ বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া হয়। মুহাম্মদের অসুস্থতায় বাহিনী জুরফে থেমে থাকে; তাঁর মৃত্যুর পর আবু বকর অভিযান পাঠান। ফলে এটি মুহাম্মদের আদেশিত শেষ বাহিনী, কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় লক্ষ্যস্থলে পৌঁছায়নি। প্রমাণ: উচ্চ/মধ্যমউৎস: সহিহ বুখারি ৪২৫০; ইবন হিশাম, উসামার বাহিনী অধ্যায়; শামেলা সূচি। |
- প্রথম দুই বছরের প্রধান কৌশল ছিল কুরাইশের বাণিজ্যপথে সশস্ত্র চাপ। হামজা, উবাইদা, খাররার, ওয়াদ্দান, বুয়াত, উশাইরা, নাখলা ও বদর—এই ধারাটি আলাদা ঘটনা নয়; একই অর্থনৈতিক-সামরিক সংঘাতের ক্রমবিকাশ। তবে সাফওয়ান/বদরুল-উলা ছিল মদিনার পশু লুটের পাল্টা ধাওয়া।
- “সব যুদ্ধ আত্মরক্ষামূলক” এবং “সব যুদ্ধ আগ্রাসী”—দুই দাবিই উৎসের সঙ্গে মেলে না। উহুদ, খন্দক, জু কারাদ সরাসরি প্রতিরক্ষা বা ধাওয়া; নাখলা, বদরের সূচনা, কারাদা, খায়বার, আল-ঈস, কয়েকটি গোত্রীয় হানা ও মন্দির-ধ্বংস উদ্যোগী অভিযান। কিছু অভিযান গোয়েন্দা-খবরভিত্তিক আগাম আঘাত, কিছু প্রতিশোধমূলক, কিছু যুদ্ধহীন শক্তি প্রদর্শন।
- কাফেলা ছিল সামরিক অর্থনীতির বৈধ লক্ষ্য—সীরাতের নিজস্ব বর্ণনায়। “বেসামরিক” আধুনিক শ্রেণি; সপ্তম শতকের মক্কি কাফেলা একই সঙ্গে গোত্রীয় সম্পদ, যুদ্ধ-অর্থায়ন, সশস্ত্র রক্ষী ও রাজনৈতিক ক্ষমতার বাহক। তবু নাখলা ও বদরের শুরুতে সম্পদ-দখল লক্ষ্য ছিল—এ তথ্য আড়াল করা যায় না।
- লক্ষ্যভিত্তিক হত্যার প্রতিষ্ঠিত উদাহরণ আছে। কাব ইবন আল-আশরাফ ও আবু রাফের হত্যা সহিহ বুখারিতে; উসাইরের ঘটনা প্রাচীন সীরাতে। কিন্তু আসমা বিনতে মারওয়ান ও আবু আফাকের কাহিনি সহিহ নয়—দুর্বল মাগাজি-রিপোর্ট। দুর্বল কাহিনি দিয়ে শক্ত প্রমাণকে সাজানো যেমন ভুল, তেমনি দুর্বলতা দেখিয়ে সহিহ কাহিনিও অস্বীকার করা ভুল।
- বন্দিত্ব, দাসত্ব ও সম্পদ-বণ্টন ছিল বহু বিজয়ের কাঠামোগত ফল। বনু মুস্তালিক, বনু কুরাইযা, খায়বার, হুনাইন/আওতাস ও একাধিক সারিয়ায় নারী-শিশু বন্দী ও সম্পদ গনিমত হওয়ার সরাসরি দলিল আছে। কোনো কোনো ঘটনায় পরে মুক্তি/ফেরত দেওয়া হয়েছে; তা প্রাথমিক বন্দিত্বকে বাতিল করে না।
- বনু কুরাইযার গণহত্যার মূল ঘটনা শক্ত প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু মোট সংখ্যা নয়। যুদ্ধক্ষম পুরুষদের হত্যা ও নারী-শিশু বন্দিত্ব সহিহ বুখারিতে; বয়ঃসন্ধি পরীক্ষার বর্ণনা আবু দাউদে। ৬০০–৯০০ সংখ্যার পরিসর সীরাত-ইতিহাসে, সহিহ হাদিসে নির্দিষ্ট মোট নেই।
- উম্মে কিরফার হত্যাকে আধুনিক সনদ-অজুহাতে বাতিল করা উৎসসমষ্টির বিকৃতি। ইবন ইসহাক–ইবন হিশামে যায়েদের প্রতিশোধমূলক অভিযানে উম্মে কিরফার বন্দিত্ব, যায়েদের আদেশ এবং নিষ্ঠুর হত্যার কথা আছে; আল-তাবারি, ইবন সাদ ও সীরাত-শরহে দুই ঘোড়া/উটের সঙ্গে বেঁধে দ্বিখণ্ডনের পদ্ধতি সংরক্ষিত। ইবন হাজার ফাতহুল বারী-তে একই বিবরণ দিয়ে সহিহ মুসলিমে সালামা ইবন আল-আকওয়ার হাদিসকে ঘটনার আংশিক বর্ণনা বলেছেন। মুসলিমের হাদিসটি ফাজারায় অতর্কিত হামলা, হত্যা-বন্দিত্ব, মা ও সুন্দরী কন্যাকে ধরা, কন্যাকে যৌন-অধিকারসহ গনিমত করা এবং পরে বন্দী-বিনিময়ে ব্যবহার নিশ্চিত করে। হাদিসে হত্যাপদ্ধতি অনুল্লিখিত থাকা সীরাত-ইতিহাসে সংরক্ষিত পদ্ধতির বিপরীত প্রমাণ নয়।
- মক্কা বিজয়ের পরে ধর্মীয় একীকরণ ছিল প্রকাশ্য রাষ্ট্রনীতি। কাবার প্রতিমা, আল-উজ্জা, মানাত, সুওয়া, আল-ফুলস, আল-লাত ও যুল-খালাসা ধ্বংসের ধারাবাহিকতা স্থানীয় বহুদেববাদী উপাসনাকেন্দ্র বিলোপ করে। কিছু ধ্বংস আত্মসমর্পণ-পরবর্তী, কিছুতে সশস্ত্র প্রতিরোধ ও হত্যা ঘটে।
- জিজিয়া ও উৎপাদন-অংশ ছিল সাম্রাজ্যবিস্তারের অর্থনৈতিক রূপ। খায়বারে অর্ধেক ফসল, ফাদাকের চুক্তি, তাইমা, আইলা, জারবা, আজরুহ ও দুমাতুল-জান্দালে কর/নিরাপত্তা-চুক্তি—লড়াই ছাড়াই বা সামরিক চাপের পরে মদিনার নিয়মিত রাজস্বভিত্তি তৈরি করে।
- অধিনায়কের কাজ ও মুহাম্মদের নির্দেশ সবসময় এক নয়। নাখলায় পবিত্র মাসে যুদ্ধের প্রাথমিক অস্বীকৃতি, বনু জাধিমায় খালিদের হত্যাকাণ্ড থেকে দায়মুক্তি ঘোষণা ও ক্ষতিপূরণ, হিসমায় সম্পদ ফেরত—এই ঘটনাগুলো পৃথক দায় নির্ধারণে জরুরি।
- আল-মাকতাবা আশ-শামেলা: ইবন হিশাম, আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ — পূর্ণ আরবি পাঠ ও অধ্যায়ভিত্তিক স্থায়ী লিংক।
- ইসলামওয়েব: ইবন হিশামের সীরাহ — একই মূলগ্রন্থের অনুসন্ধানযোগ্য আরবি সংস্করণ।
- ইসলামওয়েব: বদরের আগের গাজওয়া ও সারিয়া — প্রথম দিকের কাফেলা-অভিযানের সংক্ষিপ্ত বিন্যাস।
- ইসলামকিউএ: গাজওয়ার সংখ্যা — ১৯/২১/২৬/২৭ প্রভৃতি গণনাভেদ এবং ইবন ইসহাকের তালিকা।
- সহিহ বুখারি: কিতাবুল মাগাজি — কাব, আবু রাফে, কুরাইযা, খায়বার, হুনাইনসহ শক্তিশালী বর্ণনা।
- ইসলামকিউএ: বনু কুরাইযা — ধর্মীয় পক্ষের ব্যাখ্যাসহ হত্যা, বন্দিত্ব ও বয়ঃসন্ধি পরীক্ষার দলিল।
- ইসলামওয়েব: বনু কুরাইযার বিস্তৃত সীরাত।
- ইসলামকিউএ: আসমা বিনতে মারওয়ান কাহিনির সনদসমালোচনা।
- সংশয়: যায়েদের উম্মে কিরফা হত্যাকাণ্ড — সহিহ মুসলিম, শরহে মুসলিম, ফাতহুল বারী, আর-রাহিকুল মাখতুম ও ইবন ইসহাকের বিবরণসমন্বিত আলোচনা।
- ইসলামওয়েব: ফাতহুল বারী, যায়েদ ইবন হারিসার অভিযান — ইবন হাজারের ভাষায় উম্মে কিরফাকে দুই ঘোড়ার লেজে বেঁধে চালিয়ে ছিন্ন করা, তাঁর সুন্দরী কন্যার বন্দিত্ব এবং সহিহ মুসলিমে ঘটনার অংশবিশেষ থাকার স্বীকৃতি।
- সহিহ মুসলিম ১৭৫৫ — বনু ফাজারায় আকস্মিক হামলা, হত্যা ও বন্দিত্ব; ফাজারি নারী ও তাঁর সুন্দরী কন্যাকে বন্দী করা; কন্যাকে সালামাকে দেওয়া এবং পরে মুসলিম বন্দীদের বিনিময়ে পাঠানো।
- ইসলামওয়েব: আসমা হত্যার প্রচলিত ওয়াকিদি-বর্ণনা — কাহিনিটি কী বলে তা দেখার জন্য; সহিহতার প্রমাণ নয়।
- শামেলা: তারিখ আল-তাবারি — পরবর্তী ইতিহাসের পূর্ণ আরবি পাঠ; আল-তাবারির উদ্ধৃতি মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সহিহ নয়, তাঁর সনদও পরীক্ষা করতে হয়।
- শামেলা: ইবন সাদ, আত-তাবাকাত আল-কুবরা — ক্ষুদ্র সারিয়া, সৈন্যসংখ্যা, বন্দী ও গনিমতের বহু বিবরণের প্রধান উৎস।
- কোরআন ২:২১৭, সূরা ৮, ৩৩:৯–২৭, সূরা ৪৮, ৫৯:২–৭, ৯:২৫–২৯, ৯:৩৮–১১০ — সংশ্লিষ্ট কোরআনিক পাঠ।
