ইসলামের আকীদা অনুসারে বিতর্ক ও বেশি প্রশ্ন করা হারাম

ভূমিকাঃ বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য ও প্রশ্ন দমনের রাজনীতি

ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে প্রশ্ন, মুক্তচিন্তা এবং সমালোচনার প্রতি যে বিরাগ লক্ষ্য করা যায়, তা কেবল আকস্মিক কোনো ধর্মীয় বিধান নয়; বরং এটি একটি সুসংগঠিত সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ কৌশল। যেকোনো আদর্শিক কর্তৃত্ব যখন নিজেকে পরম বা অভ্রান্ত হিসেবে দাবি করে, তখন তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রাথমিক শর্তই হয়ে দাঁড়ায় সংশয়কে দমন করা। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই প্রশ্ন করার ওপর যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, তা অনুসারীদের মধ্যে এক ধরণের ‘বৌদ্ধিক পক্ষাঘাত’ তৈরি করে, যা মূলত ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার একটি ধ্রুপদী হাতিয়ার। সত্য যদি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং যুক্তিনির্ভর হতো, তবে তা সংশয়ের তোপে ভেঙে পড়ার ভয় পাওয়ার কথা ছিল না; অথচ এখানে প্রশ্নহীন আনুগত্যকে ‘ঈমান’ বা বিশ্বাসের মাপকাঠি হিসেবে উপস্থাপন করে চিন্তার স্বাধীনতাকে সুকৌশলে একটি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। মূলত প্রশ্ন দমনের এই সংস্কৃতি একটি সমাজকে বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রথম ধাপ।


দার্শনিক প্রেক্ষিতঃ প্রশ্নহীনতা বনাম জানার সাহস

দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, প্রশ্ন করার ক্ষমতা কেবল তথ্যের আদান-প্রদান নয়, বরং এটি মানুষের অস্তিত্বের শ্রেষ্ঠত্ব এবং তার বৌদ্ধিক সার্বভৌমত্বের (Intellectual Sovereignty) চূড়ান্ত প্রমাণ। মানুষ যখন প্রশ্ন করে, তখন সে আসলে বিদ্যমান ব্যবস্থার ওপর নিজের বিচারবুদ্ধির শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে। গ্রিক দর্শনের প্রবাদপুরুষ সক্রেটিস এই সত্যটিকেই তার জীবনের মূলমন্ত্র করেছিলেন। তার সেই কালজয়ী উক্তি—“যাচাইহীন জীবন বেঁচে থাকার যোগ্য নয়” [1]—প্রমাণ করে যে, অন্ধভাবে জীবন অতিবাহিত করা পশুর সমান, মানুষের প্রকৃত সার্থকতা তার অনুসন্ধিৎসায়। তার প্রবর্তিত ‘সক্রেটিক মেথড’ (Socratic Method) বা প্রশ্নোত্তর পদ্ধতি মূলত একটি ‘ইলেঙ্কাস’ (Elenchus) বা জেরা করার প্রক্রিয়া, যা ব্যক্তির মনের গভীর স্তরে লুকিয়ে থাকা ভ্রান্ত ধারণা ও অসার বিশ্বাসগুলোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। এই পদ্ধতি শেখায় যে, কোনো দাবিই ‘পবিত্র’ বা ‘অলঙ্ঘনীয়’ নয়; যদি তা যুক্তির কষ্টিপাথরে উত্তীর্ণ হতে না পারে, তবে তা বর্জনীয়।

ইউরোপীয় আলোকায়ন বা এনলাইটেনমেন্টের (Enlightenment) মূল সুর ধ্বনিত হয়েছিল ইমানুয়েল কান্টের দর্শনে। কান্ট আলোকায়নের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে মানুষের ‘স্ব-আরোপিত নাবালকত্ব’ (Self-incurred Minority) থেকে মুক্তি পাওয়ার কথা বলেছিলেন। এখানে নাবালকত্ব বলতে তিনি বয়সের কমতি নয়, বরং অন্যের বুদ্ধি বা নির্দেশনার ওপর নির্ভরশীল থাকাকে বুঝিয়েছেন। কান্টের মতে, যারা ধর্মগ্রন্থ, ধর্মগুরু বা রাজনৈতিক নেতার ওপর নিজেদের চিন্তার দায়ভার ছেড়ে দেয়, তারা মূলত স্বেচ্ছায় বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব বরণ করে নেয় [2]। তার অমর আহ্বান ছিল—“Sapere Aude” বা ‘জানার সাহস করো’। এটি কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং এটি মানুষের প্রতি নিজের বিচারবুদ্ধিকে ব্যবহার করার একটি নৈতিক ও দার্শনিক নির্দেশ।

সমাজতাত্ত্বিক ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যখনই কোনো ধর্ম বা আদর্শিক কাঠামো প্রশ্ন করাকে ‘বিপর্যয়’ বা ‘নিন্দনীয়’ হিসেবে প্রচার করে, তখন তারা মূলত মানুষকে সেই ‘নাবালকত্ব’ বা বৌদ্ধিক শৈশবে আজীবন বন্দি রাখতে চায়। একটি প্রশ্নহীন সমাজ আসলে একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক জেলখানা’, যেখানে ধর্মীয় অভিভাবকত্ব ত্যাগ করে স্বাধীনভাবে চিন্তা করাকে ‘পাপ’ বা ‘ফিতনা’ হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু ইতিহাসের সত্য এই যে, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সত্যই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। মানুষ যখনই তার ‘জানার সাহস’ সঞ্চয় করেছে, তখনই সে বিশ্বাসের শেকল ছিঁড়ে জ্ঞানের আলোয় প্রবেশ করেছে। কান্ট এবং সক্রেটিসের দর্শন আমাদের এটাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের প্রকৃত সম্মান তার ‘অন্ধ আনুগত্যে’ নয়, বরং তার আপসহীন সত্য অনুসন্ধানের স্পর্ধায়।


ইসলামের বিবরণঃ বেশি প্রশ্ন করা যাবে না

আসুন একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস পড়ি, [3]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৯৬/ কুরআন ও সুন্নাহকে শক্তভাবে ধরে থাকা
হাদিস নম্বরঃ ৭২৯২
৯৬/৩. বেশি বেশি প্রশ্ন করা এবং অকারণে কষ্ট করা নিন্দনীয়।
৭২৯২. মুগীরাহ ইবনু শু‘বাহ (রাঃ)-এর লেখক ওয়াররাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মু‘আবিয়াহ (রাঃ) মুগীরাহ (রাঃ)-এর কাছে লিখে পাঠালেন যে, তুমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা কিছু শুনেছ তা আমার কাছে লিখে পাঠাও। তিনি বলেন, তিনি তাকে লিখলেন যে, আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি সালাতের পর বলতেনঃ আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ্ নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শারীক নেই, সাম্রাজ্য তাঁরই, আর সকল প্রশংসা তাঁরই জন্য, তিনি সকল বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান। হে আল্লাহ্! তুমি যা দান করবে তাকে আটকানোর কেউ নেই, আর তুমি আটকাবে তা দেয়ার মত কেউ নেই। ধন সম্পদ তোমার নিকটে সম্পদশালীদের কোন উপকার করবে না।
তিনি আরো লিখেছিলেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তর্কে লিপ্ত হওয়া, বেশি বেশি প্রশ্ন করা ও সম্পদ বিনষ্ট করা থেকে নিষেধ করতেন। আর তিনি মায়েদের অবাধ্য হতে, কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দিতে ও প্রাপকের পাওনা দেয়া থেকে হাত গুটাতে আর নেয়ার ব্যাপারে হাত বাড়িয়ে দিতে নিষেধ করতেন। আবূ ‘আবদুল্লাহ্ (বুখারী (রহ.)) বলেন, তারা (কাফির) জাহিলীয়্যাতের যুগে স্বীয় কন্যাদেরকে হত্যা করতেন। অতঃপর আল্লাহ তা হারাম করে দেন। (৮৪৪) (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৭৮২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৭৯৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এবারে আসুন সহিহ মুসলিম এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ থেকে [4]

হাদীছ-২৪৯ঃ (ইমাম মুসলিম (রহঃ) বলেন) আমাদের নিকট হাদীছ বর্ণনা করেন হারুন বিন মারুফ এবং মুহাম্মদ বিন আব্বাদ (রহঃ)। তাঁহারা হযরত আবূ হুরায়রা (রাযিঃ) হইতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ মানুষ পরস্পর এই প্রশ্ন করিতে থাকে, এমনকি এক পর্যায়ে কেহ এই প্রশ্ন করিয়া বসে যে, এই সৃষ্টি জগতের যাবতীয় বস্তু তো আল্লাহ তা’আলা সৃষ্টি করিয়াছেন। তাহা হইলে আল্লাহ তা’আলাকে সৃষ্টি করিয়াছে কে? (রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন) যে ব্যক্তি এই ধরণের ওয়াসওয়াসা তথা সন্দেহ নিজ অন্তরে অনুভব করিবে সে যেন বলে, “আল্লাহ তা’আলার উপর ঈমান আনিয়াছি।”
ব্যাখ্যা বিশ্লেষণঃ
শয়তান মানব জাতির চরম শত্রু। তাহার কাজই কেবল মানুষকে সৎ পথ হইতে সরাইয়া ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করা। মানুষকে ভ্রষ্টতায় নিপতিত করিবার জন্য যে সকল কলাকৌশল ও ক্ষমতা প্রয়োজন উহার সকল কিছুই আল্লাহ তা’আলা তাহাকে দিয়াছেন। তবে কোন অবস্থাতেই আল্লাহ তা’আলার খাঁটি মুমিন বান্দাদেরকে বিপথগামী করিতে পারিবে না। আল্লাহ তা’আলার খাস বান্দাগণ সর্বদা অকাট্যভাবে আল্লাহ তা’আলা ও তাঁহার মনোনীত রসূল যাহা বলিয়াছেন উহার উপর অটল থাকেন। আর নিজ আকলী (যৌক্তিক) দলীল প্রমাণাদির পশ্চাতে লাগিয়া মূল্যবান সময় ব্যয় করেন না। অকাট্য প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত বস্তুর প্রমাণের জন্য মানবীয় আকলী দলীলের প্রয়োজন নাই। কারণ যে স্থানে স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা ও তাঁহার প্রেরিত রসূল, আল্লাহ তা’আলা একক ও চিরন্তন হইবার কথা বলিয়াছেন উহাই শ্রেষ্ঠ ও অকাট্য দলীল। ইহার উপর মানুষের আকলী দলীলের স্থান কোথায়?
শয়তান তার প্রতি প্রদত্ত ক্ষমতাবলে মানুষের অন্তরে নানা প্রকার ওয়াসওয়াসা তথা কুমন্ত্রণা ও প্রশ্নাদি সৃষ্টি করিতে থাকে। সেই সকল প্রশ্নাদির মধ্যে সর্বাপেক্ষা মারাত্মক ও জঘন্য প্রশ্ন হইতেছে যে, আল্লাহ তা’আলা যাবতীয় সৃষ্ট-বস্তু সৃষ্টি করিয়াছেন; তবে (নাউযুবিল্লাহ) আল্লাহ তা’আলাকে কে সৃষ্টি করিয়াছে? এই প্রকার মনের ওয়াসওয়াসার উপর চিন্তা করিতে থাকিলে ভ্রষ্টতা ও কুফরীতে নিক্ষিপ্ত হইবার আশংকা অধিক। কাজেই হাদীছ শরীফ বলিয়া দিয়াছে যে, মানুষ যখনই এই প্রকার শয়তানী ওয়াসওয়াসার অনুভব করিবে তৎক্ষণাৎ বলিবে, “আমি আল্লাহ তা’আলার উপর ঈমান আনিয়াছি।”
আর অন্য হাদীছ শরীফে বর্ণিত হইয়াছে যে, অন্তরে এই প্রকার শয়তানী ওয়াসওয়াসা অনুভব করিলে আল্লাহ তা’আলার আশ্রয় চাহিবে এবং এই চিন্তা ত্যাগ করিবে। অর্থাৎ অন্তর হইতে অকাট্যভাবে উক্ত ওয়াসওয়াসা ও সন্দেহ দূরীভূত করিয়া আপাদমস্তক চিরন্তন একক আল্লাহ তা’আলার দিকে মনোযোগী হইয়া উহা দূরীভূত হওয়ার জন্য আল্লাহ তা’আলার সমীপে দু’আ করিবে।
ইমাম মাযরী (রহঃ) বলেনঃ হাদীছ শরীফের বাহ্যিক অর্থ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সাহাবায়ে কিরাম (রাযিঃ) কে নির্দেশ দিয়াছেন যে, এই সকল শয়তানী ওয়াসওয়াসা খণ্ডন করিবার জন্য চিন্তা, ফিকির ও আকলী প্রমাণাদির পশ্চাতে পড়িবার কোন প্রয়োজন নাই। বরং আকলী দলীল ছাড়াই অন্তর হইতে এই সকল ওয়াসওয়াসা বহিস্কার ও দূরীভূত করিয়া দিবে। ইমাম মাযরী (রহঃ) আরও বলেনঃ বস্তুতঃ ধারণাসমূহ দুই প্রকার। (এক) ঐ সকল আন্তরিক ধারণাসমূহ যাহা অন্তরে জমিয়া যায় না বরং ঘটনাক্রমে আসে, আবার চলিয়া যায়, ইহাকেই ওয়াসওয়াসা বলে। এই প্রকার ধারণার চিকিৎসা অত্র হাদীছ শরীফে বর্ণনা করা হইয়াছে। (দুই) ঐ সকল আন্তরিক ধারণাসমূহ যাহা অন্তরে জমিয়া যায়। এই প্রকার ওয়াসওয়াসাকে গভীর চিন্তা-ফিকির ও প্রমাণাদি ব্যতীত দূরীভূত করা সম্ভব হয় না। [ নবভী]
বলাবাহুল্য অন্তরের ওয়াসওয়াসা তথা কুমন্ত্রণা হইতে বাঁচিবার জন্য হাদীছ শরীফে যে চিকিৎসা বাতলাইয়া দেওয়া হইয়াছে উহা উপরোল্লেখিত উভয় প্রকার ওয়াসওয়াসারই চিকিৎসা। আর যদি কেহ আকলী দলীল প্রমাণাদির পশ্চাতে পড়ে তবে তাহার মধ্যে আরও অধিক ওয়াসওয়াসার সৃষ্টি হইবে। কেননা মানুষের আকলী দলীল সীমিত। পক্ষান্তরে শয়তানের কুমন্ত্রণা অসংখ্য। কাজেই মানুষ যেকোন দলীল পেশ করিবে শয়তান উহা রদ করিয়া অন্য ওয়াসওয়াসার সৃষ্টি করিবে। শেষ পর্যন্ত শয়তানী ওয়াসওয়াসা দূরীভূত করা মুশকিল হইবে এবং শয়তানী জালে আবদ্ধ হইয়া ভ্রষ্টতায় নিপতিত হইবার প্রবল আশংকা রহিয়াছে। হে করুণাময় আল্লাহ তা’আলা! আপনি আমাদিগকে শয়তানী ওয়াসওয়াসা হইতে হিফাযত করুন।
হাদীছ-২৫০ঃ (ইমাম মুসলিম (রহঃ) বলেন) আর আমাদের নিকট হাদীছ বর্ণনা করেন মাহমুদ বিন গাযলান (রহঃ)। তিনি হিশাম বিন ওরওয়া (রহঃ)-এর সূত্রে একই সনদে বর্ণনা করেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেনঃ শয়তান তোমাদের কাহারও নিকট আসিয়া (তোমাদিগকে পথভ্রষ্ট ও কুফরীতে নিপতিত করিবার উদ্দেশ্যে) বলেঃ আকাশ কে সৃষ্টি করিয়াছেন? ভূ-মন্ডল কে সৃষ্টি করিয়াছেন? তখন জবাবে সে (তোমাদের কেহ) বলেঃ আল্লাহ তা’আলা। অতঃপর রাবী উপরোল্লিখিত হাদীছ শরীফের অনুরূপ হাদীছ রিওয়ায়ত করেন। তবে তিনি “আর তাঁহার মনোনীত রসূলগণ যাহা বলিয়াছেন উহার উপর আমি ঈমান আনিয়াছি” বাক্য সংযোগ করিয়া রিওয়ায়ত করিয়াছেন। (فليقل امنت بالله ورسله)।
(অর্থাৎ তখন শয়তান তোমাদের কাহারও অন্তরে ওয়াসওয়াসা ও সন্দেহ সৃষ্টি করিয়া দেয় যে, আল্লাহ তা’আলা তো আকাশ ও ভূ-মণ্ডল সৃষ্টি করিয়াছেন তবে (নাউযুবিল্লাহ) আল্লাহকে কে সৃষ্টি করিয়াছে? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই প্রকার ওয়াসওয়াসার চিকিৎসায় বলেন যে, যখন তোমাদের মধ্যে কাহারও অন্তরে এই প্রকার জঘন্য ওয়াসওয়াসার উদ্রেক হয় তখন যেন সে বলেঃ আমি একক আল্লাহ তা’আলার উপর ও তাঁহার মনোনীত রসূলগণের কথার উপর বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছি।)
ব্যাখ্যা বিশ্লেষণঃ
আলোচ্য হাদীছ শরীফের রাবী হাদীছের শেষ অংশে উপরোল্লিখিত হাদীছ শরীফের অনুরূপ হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। তবে ‘ফাল ইয়াকুল আমানতু বিল্লাহি’ এর সহিত ‘ওয়া রুসুলিহী’ শব্দ সংযোগসহ রিওয়ায়ত করিয়াছেন। অর্থাৎ শয়তান তোমাদের কাহারও নিকট আসিয়া অন্তরে কুমন্ত্রণা ঢালিয়া বলে যে, আকাশ ও ভূ-মণ্ডল কে সৃষ্টি করিয়াছেন? জবাবে তোমাদের কেহ বলে, মহিমান্বিত আল্লাহ। তখন শয়তান বলে যে, তবে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করিয়াছে? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যখন তোমাদের মধ্যে যে কেহ এই ধরণের শয়তানী কুমন্ত্রণা অনুভব করিবে তখন যেন সে বলে ‘আমানতু বিল্লাযি কালাল্লাহু ওয়া রুসুলুহু মিন ওয়াসফিহী তাআলা বিত-তাওহীদি ওয়াল কাদীম’ (امنت بالذي قال الله ورসله من وصفه تعالى بالتوহীদ والقديم)। অর্থ: “মহিমান্বিত আল্লাহর তাওহীদ তথা একত্ব ও চিরন্তন গুণ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা ও তাঁহার প্রেরিত রসূলগণ যাহা বলিয়াছেন উহার উপর দৃঢ়ভাবে ঈমান আনিয়াছি।” বস্তুতঃ আল্লাহ তা’আলা ও তাঁহার মনোনীত রসূলগণের বর্ণিত কথাই যথার্থ সত্য ও হক। আর এই যথার্থ সত্য ও হকের বিপরীত যাহা আসে তাহা ভ্রষ্টতা ও কুফরী ছাড়া আর কিছুই নহে। (এই কথা বলিলে শয়তান নিরাশ হইয়া চলিয়া যাইবে)।
‘সুনানে আবী দাউদ’ ও ‘নাসায়ী শরীফ’-এ আরও সংযোগসহ বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, এই প্রকার জঘন্য শয়তানী ওয়াসওয়াসা অন্তরে পতিত হইলে তোমরা বলোঃ (قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ، اللَّهُ الصَّمَدُ، لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ، وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ) অর্থাৎ “বলুন, আল্লাহ একক অদ্বিতীয়। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তাঁহার কোন সন্তান-সন্ততি নাই। আর তিনি কাহারও সন্তান নহেন। আর তাঁহার সমতুল্যও কেহই নাই।” অতঃপর বাম পার্শ্বে থুক ফেলিবে এবং পরে আল্লাহ তা’আলার আশ্রয় প্রার্থনা করিবে। [ ফতহুল মুলহিম]
হাদীছ-২৫১ঃ (ইমাম মুসলিম (রহঃ) বলেন) আমার নিকট হাদীছ বর্ণনা করেন যুহায়র বিন হারব ও আবদ বিন হুমায়দ (রহঃ)। তিনি হযরত আবূ হুরায়রা (রাযিঃ) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ তোমাদের মধ্যে কাহারও কাছে শয়তান আসিয়া (কুমন্ত্রণার মাধ্যমে বিপথগামী করার জন্য) বলেঃ ইহা কে সৃষ্টি করিয়াছেন, উহা কে সৃষ্টি করিয়াছেন? এমনকি সে এই (জঘন্য) প্রশ্ন করিয়া তাহাকে বলে যে, তোমার প্রতিপালককে সৃষ্টি করিয়াছে কে? যখন সে এতদূর পর্যন্ত পৌঁছে তখন (তোমাদের মধ্যে যাহারই অন্তরে এইরূপ কুমন্ত্রণা অনুভব কর) তাহার উচিত যে, আল্লাহ তা’আলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং এই প্রকার ধারণা হইতে বিরত থাকা (আর এই ওয়াসওয়াসাকে মস্তিষ্ক হইতে বহিষ্কার করিয়া দেওয়া)।
ব্যাখ্যা বিশ্লেষণঃ
কাহারও অন্তরে শয়তানী ওয়াসওয়াসার অনুভব হইলে তাহাকে উক্ত ওয়াসওয়াসা হইতে বাঁচিবার উপায় ‘ফালইয়াছতাঈয বিল্লাহি ওয়াল ইয়ানতাহি’ (فليستعذ بالله ولينته) হিসাবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়াছেন। অর্থাৎ “তাহার উচিত যে, সে যেন আল্লাহ তা’আলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং এই প্রকার খেয়াল হইতে বিরত হয়।” রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র নির্দেশের মর্মার্থ হইতেছে যে, যখন তোমাদের মধ্যে কেহ উক্ত শয়তানী ওয়াসওয়াসাসমূহের মধ্যে পতিত হয় তবে উহার চিকিৎসা ইহা যে, আল্লাহ তা’আলার নিকট উক্ত শয়তানী কুমন্ত্রণা দূর হওয়ার জন্য দু’আ করা এবং এই বিষয়ে চিন্তা-ফিকির বর্জন করা এবং অন্তরে খাঁটিভাবে গাঁথিয়া লইবে যে, এই ধরণের ওয়াসওয়াসা হইতেছে শয়তানী কুমন্ত্রণা। আর তাহার উদ্দেশ্য কেবল মুমিনদেরকে সঠিক রাস্তা হইতে প্রতারিত করিয়া পথভ্রষ্টতার গভীর গুহায় নিপতিত করা। কাজেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উক্ত শয়তানী ওয়াসওয়াসাগুলিকে মস্তিষ্ক হইতে দূরে নিক্ষেপ করিয়া নিজ অন্তরের ভাবনাসমূহ অন্য দিকে ফিরাইয়া শয়তানের জাল হইতে বাহির হইয়া আসিবে। [ নবভী]
হাফিয ইবন হাজার (রহঃ) বলেনঃ এই ধরণের প্রশ্ন নির্বুদ্ধিতা, হাস্যাস্পদ এবং জবাব দেওয়ার অনুপযুক্ত। তাহাছাড়া আল্লাহ তা’আলার সিফাত ও সত্তায় চিন্তা-ফিকির করা হইতে বিরত থাকিবার হুকুম বর্ণিত হইয়াছে।
আল্লামা তীবী (রহঃ) বলেনঃ হাদীছ শরীফে এই ধরণের শয়তানী ওয়াসওয়াসার চিকিৎসায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা’আলার নিকট আশ্রয় ও সাহায্য চাহিবার এবং অন্য কোন কাজে নিজ মস্তিষ্ককে ব্যস্ত করিবার জন্য নির্দেশ দিয়াছেন। কিন্তু তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ওয়াসওয়াসা দূর করিবার জন্য চিন্তা-ফিকির ও দলীল-প্রমাণাদির উপস্থাপন করিতে নির্দেশ দেন নাই। কেননা অন্য কোন স্রষ্টা হইতে মহিমান্বিত আল্লাহ অমুখাপেক্ষী হইবার ইলম হইতেছে জরুরী তথা স্পষ্ট বিষয়ক যাহা দিবালোকের ন্যায় উজ্জ্বল। কাজেই এই বিষয়টি মুনাযারা তথা তর্ক-বিতর্কের অবকাশ রাখে না। আর ওয়াসওয়াসার ব্যাপারে মনের মধ্যে প্রশ্ন ও জবাব মানুষকে কেবল হতবুদ্ধিতার মধ্যে নিক্ষেপ করে। সুতরাং যাহার অন্তরে শয়তানী কুমন্ত্রণা পতিত হয় তাহার উক্ত শয়তানী কুমন্ত্রণা হইতে রেহাই পাইবার জন্য একমাত্র আল্লাহ তা’আলার আশ্রয় এবং তাঁহার সাহায্য প্রার্থনা ব্যতীত অন্য কোন চিকিৎসা নাই।
এই সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ
وَإِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَنِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ
অর্থাৎ “আর যদি শয়তানের পক্ষ হইতে কোন প্ররোচনা আপনাকে প্ররোচিত করিতে চায়, তবে আল্লাহ তা’আলার আশ্রয় প্রার্থনা করিতে থাকুন।” [ সূরা আ’রাফ-২০০]
আর শয়তান দূর করার জন্য আল্লাহ তা’আলার সাহায্য প্রার্থনা করাকে استعاذة (ইস্তিআযাহ) বলা হয়।
আল্লামা মুখাল্লাব (রহঃ) বলেনঃ বস্তুজগতসমূহের স্রষ্টা অত্যাবশ্যকভাবে স্বীকার করিবার পর ইহাও বিশ্বাস করা জরুরী যে, তাঁহার কোন স্রষ্টা নাই। তিনিই চিরন্তন সত্তা। কেননা চিন্তাশীল বুদ্ধিমান ব্যক্তি সৃষ্টিজগতের কারিগরী নিদর্শনাদি ও পরিবর্তন-পরিবর্ধন প্রত্যক্ষ করিয়া একজন স্রষ্টার সন্ধান পায়। আর ইহাও সত্য যে, স্রষ্টা এবং সৃষ্ট বস্তুর গুণ পৃথক জিনিস। কাজেই দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হয় যে, প্রত্যেক সৃষ্ট বস্তুর একজন একক স্রষ্টা রহিয়াছেন যাহার কোন সৃষ্টিকারী নাই। তিনি একক চিরন্তন সত্তা। আর ইহাই প্রকৃত ঈমান। কাজেই শয়তানী প্ররোচনার মধ্যে তর্ক-বিতর্ক করা যাহা মানুষকে হতবুদ্ধিতা, ব্যাকুলতা ও পেরেশানীতে নিক্ষেপ করে উহাতে লিপ্ত হওয়া উচিত নয়।
আল্লামা ইবন আত-তীন (রহঃ) বলেনঃ বস্তুজগতসমূহের সৃষ্টিকারী স্রষ্টার যদি (নাউযুবিল্লাহ) অপর কোন সৃষ্টিকারী আছে বলিয়া জায়েয ধরিয়া নেওয়া হয়, তবে তাসালসুল তথা শিকলের ন্যায় সংযোগ পরম্পরা চলিতে থাকিবে যাহার কোন শেষ নাই। ইহা মহাল তথা অসম্ভব! সুতরাং ইহা অত্যাবশ্যক যে, একজন প্রাচীন সৃষ্টিকারী (موجد قديم) পর্যন্ত যাইয়া চূড়ান্তভাবে সমাপ্ত হওয়া। আর কদীম অর্থাৎ প্রাচীনতম তিনিই যাহার পূর্বে তিনি ব্যতীত অন্য কোন বস্তু না থাকে। তিনিই চিরন্তন কর্তা, কর্ম নহে। তিনিই মহিমান্বিত চিরন্তন সত্তা একক আল্লাহ তা’আলা! [ ফতহুল মুলহিম]
বলাবাহুল্য শয়তানী জিজ্ঞাস্য যে, তোমার প্রতিপালকের স্রষ্টা কে? (নাউযুবিল্লাহ) এই ধরণের প্রশ্ন অহেতুক ও জঘন্য মূর্খতার পরিচায়ক। ফলে উক্ত প্রশ্ন জবাবযোগ্য নহে বলিয়া কুমন্ত্রণার সহিত প্রশ্ন ও জবাবের মাধ্যমে বিতর্কে লিপ্ত হইবে না। বরং আল্লাহ তা’আলার আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থনা করিয়া নিজ অন্তরকে অন্য কাজে ব্যস্ত করিবে। তাহাতে শয়তান নিরাশ হইয়া চলিয়া যাইবে। আর তুমি শয়তানী কুমন্ত্রণার সহিত মুজাহাদা করিয়া উত্তীর্ণ হইয়া খাঁটি ঈমানের অধিকারী হইবে। ইহাই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিক্ষা। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।
হাদীছ-২৫২ঃ (ইমাম মুসলিম (রহঃ) বলেন) আর আমার নিকট হাদীছ বর্ণনা করেন আবদুল মালিক বিন শুআয়ব বিন লায়ছ (রহঃ)। তিনি হযরত আবূ হুরায়রা (রাযিঃ) হইতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ আল্লাহ তা’আলার বান্দার কাছে শয়তান আসিয়া (কুমন্ত্রণার মাধ্যমে বিপথগামী করার জন্য) বলেঃ ইহা কে সৃষ্টি করিয়াছেন, উহা কে সৃষ্টি করিয়াছেন? এমনকি এক পর্যায়ে সে (এমন জঘন্য প্রশ্ন করিয়া) তাহাকে বলে যে, কে তোমার প্রতিপালককে সৃষ্টি করিয়াছে? যখন শয়তান এতদূর পর্যন্ত পৌঁছে তখন (তোমাদের মধ্যে যাহারই অন্তরে এইরূপ শয়তানী কুমন্ত্রণা অনুভব কর তাহার উচিত) সে যেন আল্লাহ তা’আলার সমীপে আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং এই প্রকার ভাবনা হইতে বিরত হইয়া যায়। এই হাদীছ আমার ভ্রাতুষ্পুত্র ইবন শিহাবের অনুরূপ হাদীছ রিওয়ায়ত করিয়াছেন।
ব্যাখ্যা বিশ্লেষণঃ
[ বিস্তারিত ব্যাখ্যা ২৫১ নং হাদীছ শরীফের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য]
হাদীছ-২৫৩ঃ (ইমাম মুসলিম (রহঃ) বলেন) আমাদের নিকট হাদীছ বর্ণনা করেন আবদুল ওয়ারিছ বিন আবদিস সামাদ (রহঃ)। তিনি হযরত আবূ হুরায়রা (রাযিঃ) হইতে বর্ণনা করেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেনঃ মানুষ তোমাদের নিকট ইলম সম্পর্কিত বিষয়ে প্রশ্ন করিতে থাকিবে, এমনকি তাহারা এই কথাও জিজ্ঞাসা করিয়া বসিবে; আল্লাহ তা’আলা তো আমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন, কিন্তু কে আল্লাহ তা’আলাকে সৃষ্টি করিয়াছেন? বর্ণনাকারী বলেন, হযরত আবূ হুরায়রা (রাযিঃ) এই হাদীছ বর্ণনা করিবার সময় এক ব্যক্তির হাত ধরা অবস্থায় ছিলেন। অতঃপর হযরত আবূ হুরায়রা (রাযিঃ) বলিলেনঃ আল্লাহ তা’আলা ও তাঁহার প্রেরিত রসূলই সত্য বলিয়াছেন। ইতিপূর্বে এই বিষয়ে আমার কাছে দুই ব্যক্তি প্রশ্ন করিয়াছিল এবং এই প্রশ্নকারী হইতেছে তৃতীয় ব্যক্তি। (বর্ণনাকারী বলেন) অথবা হযরত আবূ হুরায়রা (রাযিঃ) এইরূপ বলিয়াছেন যে, আমার নিকট এই সম্পর্কে পূর্বে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করিয়াছিল এবং এই প্রশ্নকারী হইতেছে দ্বিতীয় ব্যক্তি।
ব্যাখ্যা বিশ্লেষণঃ
“তোমাদের কাছে জ্ঞানের বিষয়ে কথা জিজ্ঞাসা করিতে থাকিবে।” অত্র বাক্যে অধিক প্রশ্ন করার মন্দের দিকে ইঙ্গিত করা হইয়াছে। কেননা হাদীছ শরীফে উল্লিখিত প্রশ্ন সম্পর্কে অধিক গবেষণা, অনুসন্ধান ও জিজ্ঞাসার মধ্যে জড়িত হওয়া রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপছন্দ করিতেন। এই বিষয়ে অধিক জিজ্ঞাসা মানুষকে ঐ বস্তুর দিকে লইয়া যায় যাহা হইতে বিরত থাকা অপরিহার্য। আর এই ধরণের প্রশ্নাদি অত্যধিক মূর্খতার আলামত। [ ফতহুল মুলহিম]
বলাবাহুল্য মানুষ যেমন সসীম ও ধ্বংসশীল, অনুরূপ তাহার ইলম-জ্ঞানও সসীম ও ধ্বংসশীল। আর ইহা অকাট্য সত্য যে, সসীম জ্ঞান অসীমকে আয়ত্ব করিতে পারে না। অসীমকে আয়ত্ব করা তো দূরের কথা, সসীমের যাবতীয় জ্ঞানকে কি কেহ আয়ত্ব করিতে সক্ষম হইয়াছে? উদাহরণতঃ অভিজ্ঞ ডাক্তার প্রকৌশল বিষয় অনুধাবন করিতে পারে না। আর অভিজ্ঞ প্রকৌশলী রোগ নির্ণয়ে অনভিজ্ঞ। এমনিভাবে যাবতীয় বস্তুর ব্যাপারেই ইহা প্রযোজ্য। আর প্রত্যেক ব্যক্তি নিজস্ব জ্ঞাত বিষয় ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে অপারগতা প্রকাশ করিতে বাধ্য। কাজেই বস্তুজগতের যাবতীয় বস্তুর সূক্ষ্মতা অনুধাবন করিতে যেখানে মানুষের ইলম-জ্ঞান অপারগ, সেই স্থানে চিরন্তন সত্তার বিষয়ে অনুধাবন করিতে যাওয়া যে কতবড় মূর্খতা ও নির্বুদ্ধিতা তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না! অর্থাৎ “যাহা অনুধাবন করা যায় তাহা অসীম কিভাবে হইবে?”
আল্লাহ তা’আলার সত্তা সম্পর্কে না বুঝাই তাঁহার অস্তিত্বের প্রমাণ। কাজেই আল্লাহ তা’আলা সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা আসমানী কিতাবে এবং তাঁহার মনোনীত রসূলের মাধ্যমে যাহা বর্ণনা করিয়াছেন উহাই অকাট্য প্রমাণে প্রমাণিত হক ও সত্য। সীমিত জ্ঞানের অধিকারী মানুষের এই বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক করা নিতান্তই বেমানান এবং বিপদসঙ্কুলও বটে। তদুপরি যাহারা এই বিষয়ে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হইবে তাহারা ভ্রষ্টতায় নিক্ষিপ্ত হইতে বাধ্য। এই কারণে হযরত আবূ হুরায়রা (রাযিঃ) আল্লাহ তা’আলার সত্তা সম্পর্কিত প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়া বলিয়া দিয়াছেন, আল্লাহ তা’আলা সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় বিষয়াদি যাহা আল্লাহ তা’আলা ও তাঁহার মনোনীত রসূল বর্ণনা করিয়াছেন উহাই অকাট্য সত্য, হক ও যথার্থ। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।
হাকীমুল উম্মত হযরত আশরাফ আলী থানুবী (রহঃ) স্বীয় ‘আনফাসে ঈসা’ কিতাবে লিখিয়াছেনঃ
خدا وہ ہے جو سمجھ میں نہ آوے اور سمجھ وہ ہے جو خدا کو پاوے یعنی طلب میں رہے ۔
অর্থাৎ “আল্লাহ তা’আলা তিনিই যিনি বোধ-জ্ঞানের আওতাধীন নহেন এবং জ্ঞান-বোধ উহাই যাহা দ্বারা আল্লাহ তা’আলাকে পাইবে অর্থাৎ অনুসন্ধানের মধ্যে রাখিবে।” [ আনফাসে ঈসা]
হাদীছ-২৫৪ঃ (ইমাম মুসলিম (রহঃ) বলেন) আর উপরোক্ত হাদীছ আমার নিকট বর্ণনা করেন যুহায়র বিন হারব ও ইয়াকূব আদ-দাওরাকী (রহঃ)। তাহারা মুহাম্মদ হইতে (বর্ণনা করেন)। তিনি বলেনঃ হযরত আবূ হুরায়রা (রাযিঃ) বলেন, মানুষ সর্বদা তোমাদের কাছে জ্ঞানের বিষয়ে কথা জিজ্ঞাসা করিতে থাকিবে। অতঃপর অত্র হাদীছের রাবী (উপরোল্লিখিত) আবদুল ওয়ারিছ সূত্রে বর্ণিত হাদীছের ন্যায় রিওয়ায়ত করিয়াছেন। কিন্তু তিনি এই সনদে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উল্লেখ করেন নাই। তবে তিনি হাদীছ শরীফের শেষাংশে বলিয়াছেন, “আল্লাহ তা’আলা ও তাঁহার মনোনীত রসূল (সম্পূর্ণ) সত্য বলিয়াছেন!”
হাদীছ-২৫৫ঃ (ইমাম মুসলিম (রহঃ) বলেন) আর আমার নিকট হাদীছ বর্ণনা করেন আবদুল্লাহ বিন আর-রূমী (রহঃ)। তিনি হযরত আবূ হুরায়রা (রাযিঃ) হইতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, (একদা) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেনঃ হে আবু হুরায়রা! মানুষ তোমাকে প্রশ্ন করিতে থাকিবে। এমনকি তাহারা এই প্রশ্নও করিবে, এই (সকল যাবতীয় বস্তু) তো আল্লাহ তা’আলা সৃষ্টি করিয়াছেন; তাহা হইলে কে আল্লাহকে সৃষ্টি করিয়াছে? হযরত আবূ হুরায়রা (রাযিঃ) বলেন, পরবর্তী সময়ে একদিন আমি মসজিদে নববীতে উপস্থিত ছিলাম। তখন কতিপয় মরুচারী-বেদুইন লোক আসিয়া আমাকে প্রশ্ন করিলঃ হে আবূ হুরায়রা! এই (সকল যাবতীয় বস্তু) তো আল্লাহ তা’আলা সৃষ্টি করিয়াছেন, তাহা হইলে কে আল্লাহ্ তা’আলাকে সৃষ্টি করিয়াছেন? রাবী বলেন, (এই কথা শ্রবণ করিবার পর) হযরত আবূ হুরায়রা (রাযিঃ) এক মুষ্টি পাথর কণা লইয়া তাহাদের প্রতি নিক্ষেপ করিলেন। অতঃপর (ক্রুদ্ধ স্বরে) বলিলেনঃ তোমরা এই স্থান হইতে উঠিয়া যাও, তোমরা এই স্থান হইতে বাহির হইয়া যাও। আমার খাঁটি দোস্ত (রসূল) সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পূর্ণ সত্য কথাই ইরশাদ করিয়া গিয়াছেন।
হাদীছ-২৫৬ঃ (ইমাম মুসলিম (রহঃ) বলেন) আমার নিকট হাদীছ বর্ণনা করেন মুহাম্মদ বিন হাতিম (রহঃ)। তিনি ইয়াযীদ বিন আল-আসাম (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হযরত আবূ হুরায়রা (রাযিঃ) কে বলিতে শুনিয়াছি যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করিয়াছেনঃ অবশ্যই লোকেরা তোমাদের কাছে প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিবে। এমনকি তাহারা বলিবে, আল্লাহ তা’আলা তো প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করিয়াছেন, কিন্তু তাঁহাকে সৃষ্টি করিয়াছেন কে?
ব্যাখ্যা বিশ্লেষণঃ
[ আলোচ্য অনুচ্ছেদের পূর্ববর্তী হাদীছ শরীফসমূহের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য]
হাদীছ-২৫৭ঃ (ইমাম মুসলিম (রহঃ) বলেন) আমাদের নিকট হাদীছ বর্ণনা করেন আবদুল্লাহ বিন আমির বিন যুরারা আল-হাযরামী (রহঃ)। তিনি হযরত আনাস বিন মালিক (রাযিঃ)-এর সূত্রে (হাদীছে কুদসী) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হইতে রিওয়ায়ত করেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন যে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করিয়াছেনঃ নিশ্চয় আপনার উম্মত সর্বদা (প্রশ্নাকারে) বলিতে থাকিবে যে, ইহা কে সৃষ্টি করিল, উহা কে সৃষ্টি করিল। এমনকি (এক পর্যায়ে) তাহারা এই প্রশ্ন করিয়া বলিবে যে, আল্লাহ তা’আলা তো মাখলুকাত (সকল সৃষ্ট বস্তু) সৃষ্টি করিয়াছেন, তবে আল্লাহ তা’আলাকে সৃষ্টি করিয়াছেন কে?

বিতর্ক
বিতর্ক 1
বিতর্ক 3
বিতর্ক 5
বিতর্ক 7
বিতর্ক 9
বিতর্ক 11
বিতর্ক 13

মনস্তাত্ত্বিক স্থবিরতা ও জ্ঞানীয় বিকাশ

মনস্তাত্ত্বিক এরিখ ফ্রোম তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মানুষ যখন স্বাধীনতার ভয় (Fear of Freedom) থেকে কোনো একনায়কতান্ত্রিক বা ধর্মীয় শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে, তখন তার সৃজনশীলতা ও নৈতিক বিচারবুদ্ধি লোপ পায়। ফ্রোম মনে করেন, প্রশ্নহীন আনুগত্য মানুষের ব্যক্তিত্বকে খণ্ডিত করে ফেলে [5]। আধুনিক শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ জিন পিয়াজে-র মতে, জ্ঞান কোনো স্থির বস্তু নয় যা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হবে; বরং এটি প্রশ্ন ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে ব্যক্তি নিজেই নির্মাণ করে। পিয়াজের ‘কগনিটিভ ডেভেলপমেন্ট’ তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রশ্ন করার সুযোগ বন্ধ করে দিলে মানুষের বৌদ্ধিক বিকাশ স্থবির হয়ে পড়ে। ফলে একটি সমাজ মানসিকভাবে অপরিণত থেকে যায়, যারা কেবল আদেশ পালন করতে জানে কিন্তু সৃজনশীল সমাধান বের করতে পারে না।


আনুগত্যের মনস্তত্ত্ব: কৌতূহলকে ‘ধ্বংস’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা

ইসলামী ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোতে কৌতূহল বা প্রশ্ন করার প্রবৃত্তিকে নিছক ‘অনাগ্রহ’ হিসেবে দেখা হয় না; বরং একে একটি মনস্তাত্ত্বিক অপরাধ বা ‘বিপর্যয়মূলক আচরণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যখন কোনো মতাদর্শ দাবি করে যে, “তোমাদের পূর্ববর্তীরা অতিরিক্ত প্রশ্নের কারণে ধ্বংস হয়েছে” [3], তখন সেখানে সুকৌশলে ‘কন্ডিশনিং’ (Conditioning) বা মনস্তাত্ত্বিক অভিযোজন প্রক্রিয়া চালানো হয়। একজন মনস্তাত্ত্বিকের দৃষ্টিতে এটি একটি তীব্র ভয়ের রাজনীতি (Politics of Fear), যেখানে মানুষের সহজাত অনুসন্ধিৎসাকে ‘ধ্বংস’ বা ‘সর্বনাশ’-এর সাথে সম্পৃক্ত করে অবচেতন মনে একটি স্থায়ী ভীতির দেয়াল তুলে দেওয়া হয়। এর ফলে ব্যক্তি কোনো যৌক্তিক সংশয় বোধ করলেও তা প্রকাশ করতে ভয় পায়, যাকে মনস্তত্ত্বের ভাষায় ‘ইন্টেলেকচুয়াল ইনহিবিশন’ (Intellectual Inhibition) বা বৌদ্ধিক দমন বলা যেতে পারে।

সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে, এটি একটি সুনিপুণ কর্তৃত্ববাদী নিয়ন্ত্রণ কৌশল (Authoritarian Control Strategy)। যেকোনো ক্ষমতার কাঠামো তখনই নিরঙ্কুশ থাকে যখন তার অধীনস্থরা ‘কেন’ (Why) প্রশ্নটি করা ভুলে যায়। ইসলামে প্রশ্ন করার এই সীমাবদ্ধতা আসলে অনুসারীদের এক ধরণের ‘ইনফ্যান্টিলাইজেশন’ (Infantilization) বা শিশুকে পরিণত করার প্রক্রিয়া, যেখানে বিশ্বাসীকে বলা হয় সে যেন তার বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ না করে কেবল আদেশ পালন করে।

একজন যুক্তিবাদীর চোখে, সত্যের ভিত্তি যদি মজবুত হতো তবে তা হাজারো প্রশ্নের মুখেও অটল থাকত; কিন্তু যে ব্যবস্থার ভিত্তি নড়বড়ে, সেখানেই পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা স্ক্রুটিনি (Scrutiny)-কে সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করা হয়। এই দমননীতি মূলত অনুসারীদের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বন্দি রাখে, যেখানে ‘প্রশ্নহীন দাসত্ব’ বা অন্ধ আনুগত্যকে ‘আদর্শ ঈমান’ ও ‘পরহেজগারি’র মোড়কে মহিমান্বিত করা হয়। এটি অনেকটা সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ চলচ্চিত্রের সেই দর্শনেরই প্রতিফলন—যেখানে প্রজাদের জ্ঞানলাভকে রাজদণ্ড রক্ষার অন্তরায় মনে করা হতো। সংক্ষেপে, ইসলামের এই নীতি মানুষকে সত্যের সন্ধান দিতে নয়, বরং সত্যের নামে একটি নির্দিষ্ট ডগমার কারাগারে আজীবন আটকে রাখার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল মাত্র।


‘পরিচালিত চিন্তা’ বনাম প্রকৃত মুক্তচিন্তা: সভ্যতার বিকাশে বাধা

কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে জগত ও প্রকৃতি সম্পর্কে ‘তফাক্কুর’ বা চিন্তা করার যে আহ্বান জানানো হয়, একজন ক্রিটিক বা সমালোচকের দৃষ্টিতে তা আদতে একটি মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি বা ‘ডাবল বাইন্ড’ (Double Bind) পরিস্থিতি। একদিকে ‘চিন্তা করো’ বা ‘গবেষণা করো’ বলে বুদ্ধিবৃত্তিক উদারতার যে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, অন্যদিকে ‘আল্লাহর কর্তৃত্ব বা ধর্মের মূল ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলো না’ বলে যে চরম ভীতি প্রদর্শন করা হয়—এই দুইয়ের মধ্যবর্তী দ্বন্দ্ব একজন বিশ্বাসীর মনে তীব্র ‘কগনিটিভ ডিসোনেন্স’ (Cognitive Dissonance) বা মানসিক যাতনা তৈরি করে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে একে এক প্রকার ‘বৌদ্ধিক জিম্মি দশা’ বলা যায়, যেখানে চিন্তার ইঞ্জিন চালু করার অনুমতি দেওয়া হলেও তার গন্তব্য বা স্টপেজ আগে থেকেই ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত থাকে।

একজন যুক্তিবাদীর দৃষ্টিকোণ থেকে, ইসলামের এই দ্বিচারিতা মূলত একটি ‘ইন্টেলেকচুয়াল বেইট-অ্যান্ড-সুইচ’ (Intellectual Bait-and-Switch) কৌশল। এটি ইসলামকে যেকোনো ধরণের কঠোর যৌক্তিক পরীক্ষা বা স্ক্রুটিনি (Scrutiny) থেকে আড়াল করার একটি প্রতিরক্ষামূলক বর্ম হিসেবে কাজ করে। সমাজতাত্ত্বিক বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোনো সমাজ তখনই প্রকৃত অগ্রগতি লাভ করেছে যখন সে তার জ্ঞানতাত্ত্বিক জগতের ওপর থেকে ধর্মের এই ‘সেন্সরশিপ’ বা নিয়ন্ত্রিত চিন্তার গণ্ডি ভাঙতে পেরেছে। ইসলামের ইতিহাসে ‘মুতাযিলা’ (যুক্তিবাদী) সম্প্রদায়ের উত্থান ও পতন এবং পরবর্তীতে আশআরী মতবাদের আধিপত্য এই বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াপনারই সাক্ষ্য দেয়।

প্রকৃতপক্ষে, ইসলামের এই ‘গাইডড থিংকিং’ (Guided Thinking) বা পরিচালিত চিন্তা পদ্ধতি মুক্তচিন্তার মূল সংজ্ঞারই পরিপন্থী। কারণ যেখানে অনুসন্ধানের ফলাফল (Conclusion) আগেই ‘পরম সত্য’ হিসেবে স্থির করে রাখা হয়, সেখানে তথাকথিত ‘গবেষণা’ নিছক একটি ‘কনফার্মেশন বায়াস’ (Confirmation Bias) বা পূর্বনির্ধারিত সত্যকে প্রমাণ করার কসরত ছাড়া আর কিছুই নয়। যেখানে প্রশ্ন করার অধিকার সীমিত এবং সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা অনুপস্থিত, সেখানে চিন্তার কোনো স্বাধীন পরিসর থাকে না; বরং তা পরিণত হয় একটি প্রাতিষ্ঠানিক আনুগত্যের যান্ত্রিক মহড়ায়। আর এই মানসিক স্থবিরতাই দীর্ঘমেয়াদে একটি সভ্যতার উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও দার্শনিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দেয়।


আধুনিক বিশ্ব ও শিক্ষা দর্শনে প্রশ্নের ভূমিকা

আধুনিক ইউরোপীয় তথা উন্নত বিশ্বের শিক্ষা দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ (Critical Thinking) বা বিশ্লেষণাত্মক চিন্তা পদ্ধতি, যা প্রচলিত ডগম্যাটিক বা আপ্তবাক্য-নির্ভর শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। এই শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো—শিক্ষার্থীকে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য বা মতাদর্শ গেলানো নয়, বরং তথ্যের যথার্থতা যাচাই করার সক্ষমতা তৈরি করা। সমকালীন শিক্ষাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘কী ভাবতে হবে’ (What to think) তার পরিবর্তে ‘কীভাবে ভাবতে হবে’ (How to think) তার প্রশিক্ষণ দেওয়া। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন; কারণ যখন একজন শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করা হয়, তখন তার মস্তিষ্কে ‘মেটাকগনিটিভ অ্যাবিলিটি’ (Metacognitive Ability) বা নিজের চিন্তার প্রক্রিয়াকে নিজেই পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা তৈরি হয়। এটি তাকে নিছক একজন তথ্য সংগ্রাহক থেকে একজন সচেতন বিচারকে পরিণত করে।

বিখ্যাত মার্কিন শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক জন ডিউই মনে করতেন, গণতন্ত্র এবং সামাজিক প্রগতি কেবল তখনই সম্ভব যখন নাগরিকরা প্রশ্ন করার অদম্য মানসিকতা ধারণ করে। ডিউই-র মতে, শিক্ষা হলো অভিজ্ঞতার নিরন্তর পুনর্গঠন; এবং এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়াটি সচল থাকে কেবল প্রশ্নের মাধ্যমে [6]। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো বুঝেছে যে, একটি সমাজ যদি প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, তবে তা দ্রুত স্বৈরাচারী শাসকের চারণভূমিতে পরিণত হয়। তাই স্কুল-কলেজ পর্যায়েই বিতর্ক ও ভিন্নমতকে উৎসাহিত করা হয়, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেকোনো ক্ষমতার কাঠামোকে যুক্তি দিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

সমাজতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আধুনিক ইউরোপ আজ বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার ও বিজ্ঞানের যে শিখরে অবস্থান করছে, তার মূলে ছিল চার্চের দীর্ঘকালীন ডগমা বা অলঙ্ঘনীয় বিশ্বাসকে প্রশ্ন করার সাহস। রেনেসাঁ ও এনলাইটেনমেন্ট বা জ্ঞানদীপ্তির যুগে যখন গ্যালিলিও বা কোপারনিকাসের মতো বিজ্ঞানীরা প্রচলিত ধর্মীয় বয়ানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন, তখনই আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। দার্শনিক কার্ল পপার-এর ‘ফলসিফিকেশন’ (Falsification) তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো দাবি তখনই বৈজ্ঞানিক হিসেবে গণ্য হবে যখন তাকে ভুল প্রমাণ করার বা প্রশ্ন করার সুযোগ থাকবে [7]। এই দৃষ্টিভঙ্গিই ইউরোপকে অন্ধকার যুগ (Dark Ages) থেকে বের করে এনেছে। যদি সে সময় প্রশ্ন করাকে ‘বিপর্যয়’ বা ‘ধ্বংসের কারণ’ হিসেবে দেখা হতো, তবে আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যা, প্রযুক্তি এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ কখনোই সম্ভব হতো না।

উদ্ভাবনের (Innovation) মূল চালিকাশক্তিই হলো কৌতূহল। যখন একজন মানুষ বিদ্যমান ব্যবস্থাকে ‘কেন’ বা ‘কীভাবে’ দিয়ে প্রশ্ন করে, তখনই নতুন কোনো আবিষ্কারের পথ উন্মোচিত হয়। আধুনিক বিশ্বের শিক্ষা দর্শনে প্রশ্নকে কেবল তথ্য জানার মাধ্যম হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটি মানুষের ‘বৌদ্ধিক সার্বভৌমত্ব’ (Intellectual Sovereignty) রক্ষার হাতিয়ার। যেখানে প্রশ্নহীন আনুগত্য মানুষকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয় এবং চিন্তার দাসত্ব নিশ্চিত করে, সেখানে প্রতিটি যৌক্তিক প্রশ্নই হলো মুক্তির একেকটি আলোকবর্তিকা। উন্নত বিশ্ব আজ এ সত্যটি অনুধাবন করেছে বলেই তাদের শ্রেণিকক্ষগুলো আজ তথাকথিত ‘পবিত্র’ ডগমার পরিবর্তে সংশয় ও যুক্তির মুখরতায় স্পন্দিত।


উপসংহারঃ সত্য বনাম অন্ধবিশ্বাস

এই প্রশ্নবিমুখ প্রবণতা কেবল মধ্যযুগীয় ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং আধুনিক বিশ্বেও বহু সমাজ ও রাষ্ট্রে এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কারাগার হিসেবে টিকে আছে। সমাজতাত্ত্বিক বিচারে, যখন কোনো মতাদর্শ নিজেকে সকল প্রশ্নের ঊর্ধ্বে স্থাপন করে, তখন সেই সমাজ অনিবার্যভাবে অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে। সেখানে ভিন্নমত বা যৌক্তিক সংশয়কে দমন করতে ‘কাফের’ ঘোষণা বা শারীরিক নির্মূলের মতো নৃশংস পথ বেছে নেওয়া হয়। মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি স্পষ্ট যে, কোনো সত্য যদি অকাট্য হয়, তবে তা প্রশ্নের আঘাতে ভেঙে পড়ে না; বরং মিথ্যাই নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় দমনের আশ্রয় নেয়। সভ্যতার প্রকৃত বিকাশ ও মানবিক অগ্রগতির জন্য সকল প্রকার ধর্মীয় দমননীতি প্রত্যাখ্যান করা অপরিহার্য। অন্ধবিশ্বাসের শৃঙ্খল ভেঙে সত্যের সন্ধান করতে হলে মুক্তচিন্তার চর্চাই একমাত্র পথ। কারণ, যে জ্ঞান প্রশ্ন করতে শেখায় না, তা জ্ঞান নয়; বরং তা এক প্রকার মানসিক দাসত্ব।

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.

The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.

This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.


তথ্যসূত্রঃ
  1. Plato, Apology 38a ↩︎
  2. Immanuel Kant, Answering the Question: What is Enlightenment?, 1784 ↩︎
  3. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৭২৯২ 1 2
  4. সহিহ মুসলিম শরীফ (প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাসহ বঙ্গানুবাদ), মাকতাবাতুল হাদীছ প্রকাশনী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭৫-১৮২ ↩︎
  5. Erich Fromm, Escape from Freedom, 1941 ↩︎
  6. John Dewey, Democracy and Education, 1916 ↩︎
  7. Karl Popper, The Logic of Scientific Discovery, 1934 ↩︎