ভূমিকাঃ মহাজাগতিক বাস্তবতা বনাম শাস্ত্রীয় কসমোলজির সংঘাত
আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের এই উৎকর্ষের যুগে যখন আমরা টেলিস্কোপ আর স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মহাবিশ্বের অতি-সূক্ষ্ম গাণিতিক নিয়মগুলো পর্যবেক্ষণ করি, তখন ধর্মীয় কিতাব বা হাদিসে বর্ণিত কিছু দৃশ্যকল্প আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক হোঁচট খেতে বাধ্য করে। ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কসমোলজিক্যাল বর্ণনা হলো—সূর্য প্রতিদিন অস্ত যাওয়ার পর আল্লাহর আরশের নিচে গিয়ে সিজদা করে এবং পুনরায় উদিত হওয়ার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করে। শুধু তাই নয়, কোরআনের সূরা কাহফে জুলকারনাইনের সফরের বর্ণনায় সূর্যকে আক্ষরিক অর্থেই একটি “কর্দমাক্ত জলাশয়ে” বা পঙ্কিল পানিতে অস্ত যেতে দেখার দাবি করা হয়েছে।
একনিষ্ঠ ধর্মবিশ্বাসীদের কাছে এই বর্ণনাগুলো অলৌকিক সত্য মনে হলেও, পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং মহাকাশবিজ্ঞানের মৌলিক নিয়মের সামনে এগুলো স্রেফ প্রাচীনকালের খেয়ালি কল্পনাবিলাস ছাড়া আর কিছুই নয়। হেলিয়োসেন্ট্রিক মডেল এবং পৃথিবীর আহ্নিক গতির বাস্তবতা অনুযায়ী, দৈনিক উদয়-অস্তের জন্য সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে না; পৃথিবীর নিজ অক্ষের ঘূর্ণনের কারণেই আমাদের চোখে সূর্যের উদয় ও অস্তের আপাত দৃশ্য তৈরি হয়। এই প্রবন্ধে আমরা কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত সূর্য সংক্রান্ত এই আদিম বর্ণনাগুলোর বৈজ্ঞানিক অসারতা বিশ্লেষণ করব এবং দেখব কীভাবে প্রাচীন আরব্য কসমোলজিকে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে মেলাতে গিয়ে ধর্মতাত্ত্বিকরা নানা ধরনের যুক্তিনির্ভর ফ্যালাসি বা ভ্রান্তির আশ্রয় নেন।
কেন প্রাচীনকালের মানুষ নানা উপকথা তৈরি করতো?
সেই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ দেখে আসছে, সূর্য দিনের বেলা উঠছে আর রাতের বেলা কোথায় যেন চলে যাচ্ছে। পৃথিবীর মানুষের এই সাধারণ পর্যবেক্ষণের কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সেই সময়ের মানুষের কাছে ছিল না। মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি হলো অজানা বিষয়ের একটি কারণ খুঁজে বের করা, আর তা বোঝা সম্ভব না হলে কল্পনা দিয়ে সেই শূন্যতা পূরণ করা। যখন প্রাচীনকালের মানুষের কাছে আধুনিক বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান বা পর্যবেক্ষণযন্ত্র ছিল না, তখন তারা প্রাকৃতিক ও মহাজাগতিক ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করার জন্য মানুষের আবেগ, উদ্দেশ্য, রাগ, অভিশাপ বা অতিপ্রাকৃত শক্তিকে ব্যবহার করত। মনোবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের ভাষায় একে Anthropomorphism বলা হয়—অর্থাৎ প্রকৃতি, প্রাণী, বস্তু বা মহাজাগতিক ঘটনাকে মানুষের উদ্দেশ্য, আবেগ বা আচরণের মতো করে কল্পনা করা।
মানুষের মস্তিষ্ক স্বভাবতই প্যাটার্ন ও উদ্দেশ্য খুঁজতে চায়। যখন তারা দেখত হঠাৎ মেঘ ডাকছে বা সূর্য অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে, তখন তারা এর পেছনে কোনো ‘উদ্দেশ্য’ বা ‘শাস্তি’ খুঁজত। এই ধরনের উপকথাগুলো আসলে মানুষের আদিম কৌতূহল এবং ভয়ের এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। নিচে দেখা যাবে, প্রাকৃতিক ঘটনাকে দেবতা, অভিশাপ বা অতিপ্রাকৃত উদ্দেশ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করার এই প্রবণতা বহু সংস্কৃতিতেই ছিল।
প্রাচীন কসমোলজি: সমতল পৃথিবী, স্তরভিত্তিক আকাশ ও সূর্যের রাতের যাত্রা
সূর্য অস্ত যাওয়ার পর “কোথায় যায়”—এই প্রশ্নটি আধুনিক মানুষের কাছে অদ্ভুত মনে হলেও প্রাচীন মানুষের কাছে এটি ছিল একেবারে বাস্তব প্রশ্ন। কারণ তাদের কাছে পৃথিবী ছিল না মহাশূন্যে ঘূর্ণায়মান একটি গ্রহ; বরং অধিকাংশ প্রাচীন সভ্যতার কল্পনায় পৃথিবী ছিল মানুষের বসবাসযোগ্য বিস্তৃত ভূমি, তার ওপরে ছিল আকাশের স্তর বা গম্বুজ, আর নিচে ছিল পাতাল/নিম্নজগত। প্রাচীন Near Eastern বা পশ্চিম এশীয় কসমোলজিতে আকাশকে অনেক সময় দৃঢ় ছাদ, গম্বুজ বা স্তরভিত্তিক কাঠামো হিসেবে কল্পনা করা হতো; পৃথিবীর প্রান্ত, আকাশের দরজা, সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের স্থান, দেবতাদের আবাস, এবং মৃতদের নিম্নজগত—এসব ধারণা একই মহাবিশ্ব-চিত্রের অংশ ছিল। মেসোপটেমীয় কসমোলজিতেও “flat-earth” বা স্তরভিত্তিক “layer-cake” ধরনের বিশ্ব-চিত্র দেখা যায়, যেখানে আকাশ, পৃথিবী ও নিম্নজগত আলাদা স্তরে সাজানো; দেবতা, মানুষ, মৃত ও মহাজাগতিক বস্তু প্রত্যেকে নিজ নিজ স্তরে অবস্থান করে [1]। এই ধরনের বিশ্ব-চিত্রে সূর্যাস্ত মানে ছিল না পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফলে কোনো অঞ্চলের দৃষ্টিসীমা থেকে সূর্যের অদৃশ্য হওয়া; বরং সূর্য যেন বাস্তবেই পশ্চিম প্রান্তে গিয়ে অস্ত যায় এবং রাতের বেলায় অন্য কোনো পথ, স্তর বা নিম্নজগতে প্রবেশ করে।
মেসোপটেমীয় সূর্যদেব Utu/Shamash-এর ধারণা এই প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সুমেরীয় ও আক্কাদীয় ঐতিহ্যে সূর্য কেবল আলো দেওয়া জ্যোতিষ্ক নয়; সে ছিল দেবতা, বিচারক এবং পথিকদের রক্ষক। দিনের বেলায় সে পূর্ব থেকে পশ্চিমে আকাশপথে যাত্রা করে, আর রাতের বেলায় সে নিম্ন আকাশ বা পাতালসংলগ্ন পথে ফিরে যায়—এমন ধারণা মেসোপটেমীয় ও ব্যাবিলনীয় কল্পনায় পাওয়া যায়। Utu/Shamash-কে সূর্য ও ন্যায়ের দেবতা হিসেবে কল্পনা করা হতো, এবং রাতের সঙ্গে তার নিম্নজগত/underworld-সংযোগও প্রাচীন ঐতিহ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল [2]। কিছু ঐতিহ্যে সূর্য রাতে বিশ্রাম নেয়, আবার কিছু ঐতিহ্যে সে নিম্নজগত বা “nether sky”-এর পথ ধরে পূর্বদিকে ফিরে আসে, যাতে পরের সকালে আবার উদিত হতে পারে। এই ধারাটি শুধু মেসোপটেমিয়ায় সীমাবদ্ধ ছিল না; প্রাচীন মিশরীয় কসমোলজিতেও সূর্যদেব রা দিনের বেলায় আকাশে নৌকায় যাত্রা করেন এবং রাতে Duat বা পাতাল-জগতের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে আবার পূর্বদিকে উদিত হন [3]। মিশরীয় Book of Amduat-এও রাতকে বারো ভাগে ভাগ করে রা-এর পাতাল-যাত্রার কাহিনী পাওয়া যায়, যেখানে সূর্যদেব রাতের অন্ধকারে underworld অতিক্রম করে পুনর্জন্মের মাধ্যমে পরের দিনে আবার উদিত হন [4]। অর্থাৎ “সূর্য অস্ত যাওয়ার পর কোথায় যায়” প্রশ্নের পৌরাণিক উত্তর বহু প্রাচীন সভ্যতাতেই ছিল: সূর্য কোনো অদৃশ্য মহাজাগতিক পথে, পাতালে, আকাশের গোপন দরজায় বা দেবতাদের অঞ্চলে যায়।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বুঝলে কোরআন-হাদিসের সূর্য-সংক্রান্ত ভাষা আর বিচ্ছিন্ন বা রহস্যময় থাকে না। “সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছানো”, “সূর্যকে পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যেতে পাওয়া”, “সূর্য কোথায় যায়”, “আরশের নিচে গন্তব্য”, “সিজদা করে অনুমতি নেওয়া”—এসব ভাষা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান নয়; এগুলো প্রাচীন পর্যবেক্ষণভিত্তিক ও পৌরাণিক কসমোলজির ভাষা। তবে পরবর্তী তাফসির-সাহিত্যে, বিশেষ করে ইবনে কাসীরের মতো মধ্যযুগীয় ব্যাখ্যাকারদের কাছে, আরেকটি স্তর যুক্ত হয়: গ্রিক-পটলেমীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রভাব। পটলেমির ভূকেন্দ্রিক মডেলে পৃথিবী কেন্দ্রস্থলে থাকে, আর সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ ও নক্ষত্র পৃথিবীকে ঘিরে কক্ষ/গোলক ধরে চলে—এটি হেলিওসেন্ট্রিক আধুনিক বিজ্ঞান নয়, বরং গ্রিক ভূকেন্দ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞান [5]। আব্বাসীয় অনুবাদ-আন্দোলনের মাধ্যমে পটলেমির Almagest আরবি জ্ঞানজগতে প্রবেশ করে এবং মুসলিম জ্যোতির্বিদরা এই ভূকেন্দ্রিক মডেল গ্রহণ ও সংশোধন করেন [6]। তাই ইবনে কাসীর যখন বলেন, জুলকারনাইন সূর্যকে নিজের দৃষ্টিতে সমুদ্রে অস্ত যেতে দেখেছিল, কিন্তু সূর্য তার কক্ষপথ ছাড়ে না—এটি আধুনিক বিজ্ঞানের পূর্বাভাস নয়; এটি প্রাচীন মিথিক ভাষার ওপর মধ্যযুগীয় পটলেমীয়-ইসলামি জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্যাচ। এপোলোজিস্টদের প্রতারণা এখানেই: তারা মধ্যযুগীয় ভূকেন্দ্রিক “কক্ষপথ” ধারণাকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে গুলিয়ে দিয়ে আয়াতের প্রান্তিক ভূগোল ও সূর্যাস্ত-সূর্যোদয়ের স্থানগত সমস্যাকে ঢাকতে চায়।
কোরআনের সূর্য পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যায়
আসুন জেনে নেয়া যাক, কোরআনে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত সম্পর্কে আসলে কী বলা আছে। অর্থাৎ সূর্য কোথায় অস্ত যায় আর কোথা থেকে ওঠে [7]
আমি তাকে পৃথিবীতে আধিপত্য দান করেছিলাম আরতাকে সব রকমের উপায় উপাদান দিয়েছিলাম।
— Taisirul Quran
আমি তাকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম এবংপ্রত্যেক বিষয়ের উপায় ও পন্থা নির্দেশ করেছিলাম।
— Sheikh Mujibur Rahman
আমি তাকে যমীনে কর্তৃত্ব দান করেছিলাম এবং সববিষয়ের উপায়- উপকরণ দান করেছিলাম।
— Rawai Al-bayan
আমরা তো তাকে যমীনে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের উপায়-উপকরণ দান করেছিলাম [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
একবার সে এক রাস্তা ধরল (অর্থাৎ একদিকে একটা অভিযান চালাল)।
— Taisirul Quran
সে এক পথ অবলম্বন করল।
— Sheikh Mujibur Rahman
অতঃপর সে একটি পথ অবলম্বন করল।
— Rawai Al-bayan
অতঃপর সে এক পথ অবলম্বন করল।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
চলতে চলতে যখন সে সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছল, তখন সে সূর্যকে অস্বচ্ছ জলাশয়ে ডুবতে দেখল আর সেখানে একটি জাতির লোকেদের সাক্ষাৎ পেল। আমি বললাম, ‘হে যুলকারনাইন! তুমি তাদেরকে শাস্তি দিতে পার কিংবা তাদের সঙ্গে (সদয়) ব্যবহারও করতে পার।’
— Taisirul Quran
চলতে চলতে যখন সে সূর্যের অস্তগমন স্থানে পৌঁছল তখন সে সূর্যকে এক পংকিল পানিতে অস্ত যেতে দেখলএবং সে সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেল; আমি বললামঃ হে যুলকারনাইন! তুমি তাদেরকে শাস্তি দিতে পার অথবা তাদেরকে সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পার।
— Sheikh Mujibur Rahman
অবশেষে যখন সে সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছল, তখন সে সূর্যকে একটি কর্দমাক্ত পানির ঝর্ণায় ডুবতে দেখতে পেল এবং সে এর কাছে একটি জাতির দেখা পেল। আমি বললাম, ‘হে যুলকারনাইন, তুমি তাদেরকে আযাবও দিতে পার অথবা তাদের ব্যাপারে সদাচরণও করতে পার’।
— Rawai Al-bayan
চলতে চলতে সে যখন সূর্যের অস্ত গমন স্থানে পৌছল [১] তখন সে সূর্যকে এক পংকিল জলাশয়ে অস্তগমন করতে দেখল [২] এবং সে সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেল। আমরা বললাম, ‘হে যুল-কারনাইন! তুমি এদেরকে শাস্তি দিতে পার অথবা এদের ব্যাপার সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পার।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তারপর সে আরেক পথ ধরল।
— Taisirul Quran
আবার সে এক পথ ধরল।
— Sheikh Mujibur Rahman
তারপর সে আরেক পথ অবলম্বন করল।
— Rawai Al-bayan
তারপর সে এক উপায় অবলম্বন করল,
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
চলতে চলতে সে সূর্যোদয়ের স্থানে পৌঁছল। সে সূর্যকে এমন এক জাতির উপর উদয় হতে দেখতে পেল, আমি যাদের জন্য সূর্য থেকে বাঁচার কোন আড়ালের ব্যবস্থা করিনি।
— Taisirul Quran
চলতে চলতে যখন সে সূর্যোদয় স্থলে পৌঁছল তখন সে দেখলো – ওটা এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদিত হচ্ছে যাদের জন্য সূর্য তাপ হতে আত্মরক্ষার কোন অন্তরাল আমি সৃষ্টি করিনি।
— Sheikh Mujibur Rahman
অবশেষে সে যখন সূর্যোদয়ের স্থানে এসে পৌঁছল তখন সে দেখতে পেল, তা এমন এক জাতির উপর উদিত হচ্ছে যাদের জন্য আমি সূর্যের বিপরীতে কোন আড়ালের ব্যবস্থা করিনি।
— Rawai Al-bayan
চলতে চলতে যখন সে সূর্যোদয়ের স্থলে পৌছল তখন সে দেখল সেটা এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদয় হচ্ছে যাদের জন্য সূর্যতাপ হতে কোনো অন্তরাল আমরা সৃষ্টি করিনি;
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

হাদিস সম্পর্কে ইসলামিক আকীদা
রক্ষণশীল সুন্নি হাদিস-আকীদায় নবীর ধর্মীয় বক্তব্য, ব্যাখ্যা ও শরিয়ত-সংক্রান্ত নির্দেশনাকে ঐশী তত্ত্বাবধানে সত্য হিসেবে ধরা হয়। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে নবীর মুখ থেকে ধর্মীয় শিক্ষা, ওহির ব্যাখ্যা বা বাস্তব-বিশ্ব সম্পর্কিত দাবি এলে তা সাধারণ মানবিক অনুমান হিসেবে নয়, নববী সত্য-বক্তব্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ফলে, কোনো সহিহ হাদিসে যদি মহাজাগতিক বা বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা সম্পর্কে দাবি করা হয়, একজন একনিষ্ঠ বিশ্বাসীর কাছে সেটি পর্যবেক্ষণযোগ্য বিজ্ঞানের বিরুদ্ধেও সত্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই অবস্থানটি বোঝার জন্য আবদুল্লাহ ইবন আমর-এর হাদিসটি গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে নবীর মুখ থেকে বের হওয়া কথাকে সত্য বলে লিপিবদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে [8]।
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৯/ শিক্ষা-বিদ্যা, (জ্ঞান-বিজ্ঞান)
পরিচ্ছেদঃ ৪১৭. ইলম লিপিবদ্ধ করা সম্পর্কে।
৩৬০৭. মুসাদ্দাদ (রহঃ) ….. আবদুল্লাহ ইবন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি যা কিছু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হতে শ্রবণ করতাম, তা লিখে রাখতাম। আমি ইচ্ছা করতাম যে, আমি এর সবই সংরক্ষণ করি। কিন্তু কুরাইশরা আমাকে এরূপ করতে নিষেধ করে এবং বলেঃ তুমি যা কিছু শোন তার সবই লিখে রাখ, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন মানুষ, তিনি তো কোন সময় রাগান্বিত অবস্থায় কথাবার্তা বলেন এবং খুশীর অবস্থায়ও বলেন। একথা শুনে আমি লেখা বন্ধ করি এবং বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবহিত করি। তখন তিনি তার আংগুল দিয়ে নিজের মুখের প্রতি ইাশারা করে বলেনঃ তুমি লিখতে থাক, ঐ যাতের কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন, যা কিছু এ মুখ হতে বের হয়, তা সবই সত্য।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ)
হাদিসে বর্ণিত সূর্য সম্পর্কিত কাহিনী
ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে, সূর্য রাতের বেলা আল্লাহর আরশের নিচে গিয়ে ইবাদত বন্দেগী করে, এবং সকাল বেলা আল্লাহ অনুমতি দিলে সে আবারো উদিত হয়। আমরা যারা পাঠ্যপুস্তকে পড়েছি, পৃথিবী গোলাকৃতি, এবং কোনো না কোনো অঞ্চলে কখনো না কখনো সূর্য আলো দিচ্ছে, একপাশে দিন হলে আরেকপাশে রাত হচ্ছে, এই কথাগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীতে চলে যাচ্ছে হাদিসের এই কথাগুলো [9] [10] [11] [12] [13] [14] [15] [16] [17] [18] [19] [20] [21]
সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২৫/ কুরআনের হরুফ এবং কিরাত
পরিচ্ছদঃ পরিচ্ছেদ নাই।
৩৯৬১. উবায়দুল্লাহ্ ইবন উমার (রহঃ) …… আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে একটি গাধার পেছনে সওয়ার ছিলাম। এ সময় সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেনঃ তুমি কি জান, সূর্য কোথায় অস্তমিত হয়? আমি বলি, আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল এ ব্যাপারে অধিক অবহিত। তিনি বলেন عَيْنِ حَامِيَةٍ এটি অর্থাৎ গরম প্রস্রবণের মধ্যে যায়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
২৯৭২। মুহাম্মদ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় আবূ যার (রাঃ)-কে বললেন, তুমি কি জানো, সূর্য কোথায় যায়? আমি বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ই ভাল জানেন। তিনি বললেন, তা যেতে যেতে আরশের নীচে গিয়ে সিজদায় পড়ে যায়। এরপর সে পুনঃ উদিত হওয়ার অনুমতি চায় এবং তাকে অনুমতি দেওয়া হয়। আর অচিরেই এমন সময় আসবে যে, সিজদা করবে তা কবূল করা হবে না এবং সে অনুমতি চাইবে কিন্তু অনুমতি দেওয়া হবে না। তাকে বলা হবে যে পথে এসেছ, সে পথে ফিরে যাও। তখন সে পশ্চিম দিক হতে উদিত হবে–এটাই মর্ম হল আল্লাহ তাআলার বাণীঃ আর সূর্য গমন করে তার নির্দিষ্ট গন্ত্যব্যের দিকে, এটাই পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।
[কোরআন ৩৬:৩৮]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ আল্লাহর বাণীঃ والشمس تجري لمستقر لها ذلك تقدير العزيز العليم “এবং সূর্য ভ্রমন করে তার নির্দৃিষ্ট গন্তব্যের দিকে, এ পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রন।”
৪৪৩৯ আবূ নু’আয়ম (রহঃ) … আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা সূর্যাস্তের সময় আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মসজিদে ছিলাম। তিনি বললেন, হে আবূ যার! তুমি কি জানো সূর্য কোথায় ডুবে? আমি বললাম, আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল সবচেয়ে ভাল জানেন।তিনি বললেন, সূর্য চলে, অবশেষে আরশের নিচে গিয়ে সিজদা করে। নিম্নবর্ণিত আয়াতوَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍّ لَهَا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ এ এ কথাই বর্ণনা করা হয়েছে, অর্থাৎ সূর্য ভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে, এ পরাক্রমশলী সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ আল্লাহর বাণীঃ والشمس تجري لمستقر لها ذلك تقدير العزيز العليم “এবং সূর্য ভ্রমন করে তার নির্দৃিষ্ট গন্তব্যের দিকে, এ পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রন।”
৪৪৪০। হুমায়দী (রহঃ) … আবূ যার গিফারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আল্লাহর বাণীঃمُسْتَقَرُّ এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বলেছেন, সূর্যের গন্তব্যস্থল আরশের নিচে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৭১. যে সময়ে ঈমান কবুল হবে না
২৯৬। ইয়াহইয়া ইবনু আইউব ও ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) … আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা কি জানো, এ সূর্য কোথায় যায়? সাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভাল জানেন।তিনি বললেনঃ এ সূর্য চলতে থাকে এবং (আল্লাহ তা’আলার) আরশের নিচে অবস্থিত তার অবস্থানস্থলে যায়। সেখানে সে সিজদাবনত হয়ে পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, ওঠ এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও! অনন্তর সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়স্থল দিয়েই উদিত হয়। তা আবার চলতে থাকে এবং আরশের নিচে অবস্থিত তার অবস্থানস্থলে যায়। সেখানে সে সিজদাবনত অবস্থায় পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, ওঠ এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও। তখন সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়লে হয়েই উদিত হয়।
সে আবার চলতে থাকে এবং আরশের নিচে অবস্থিত তার অবস্থান স্থলে যায়। সেখানে সে সিজদাবনত অবস্থায় পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, ওঠ এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও। তখন সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়স্থল হয়েই সে উদিত হয়। এমনিভাবে চলতে থাকবে; মানুষ তার থেকে অস্বাভাবিক কিছু হতে দেখবে না। শেষে একদিন সূর্য যথার্রীতি আরশের নিচে তার নিদৃষ্টস্থলে যাবে। তাকে বলা হবে, ওঠ এবং অস্তাচল থেকে উদিত হও। অনন্তর সেদিন সূর্য পশ্চিম গগনে উদিত হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কোন দিন সে অবস্থা হবে তোমরা জানো? সে দিন ঐ ব্যাক্তির ঈমান কোন কাজে আসবে না, যে ব্যাক্তি পুর্বে ঈমান আনে নাই কিংবা যে ব্যাক্তি ঈমানের মাধ্যমে কল্যাণ অর্জন করে নাই।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৭১. যে সময়ে ঈমান কবুল হবে না
২৯৮। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা ও আবূ কুরায়ব (রহঃ) … আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তথায় উপবিষ্ট ছিলেন। সূর্য অন্তমিত হলে তিনি বললেনঃ হে আবূ যার! জানো, এ সূর্য কোথায় যায়? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভাল জানেন।রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সে তার গন্তব্য স্থলে যায় এবং আল্লাহর কাছে সিজদার অনুমতি চায়। তখন তাকে অনুমতি দেয়া হয়। পরে একদিন যখন তাকে বলা হবে যেদিক থেকে এসেছো সেদিকে ফিরে যাও। অনন্তর তা অস্থাচল থেকে উদিত হবে। এরপর তিনি আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদের কিরাআত অনুসারে তিলাওয়াত করেনঃذَلِكَ مُسْتَقَرٌّ لَهَا এ তার গন্তব্যস্থল
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৭১. যে সময়ে ঈমান কবুল হবে না
২৯৯। আবূ সাঈদ আল আশাজ্জ ও ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) … আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আামরা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেوَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍّ لَهَا “এবং সূর্য ভ্রমণ করে উহার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিবে” (৩৬ঃ ৩৮) এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেনঃ আরশের নিচে তার গন্তব্য স্থল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
সহীহ হাদিসে কুদসি
১/ বিবিধ হাদিসসমূহ
পরিচ্ছেদঃ আল্লাহর প্রশংসামূলক কতক বাক্যের ফযিলত
১৬১. আবূ যর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি একটি গাধার ওপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। তখন তার উপর একটি পাড়যুক্ত চাদর ছিল। তিনি বলেন: এটা ছিল সূর্যাস্তের সময়, তিনি আমাকে বলেন: “হে আবূ যর তুমি জান এটা কোথায় অস্ত যায়?” তিনি বলেন: আমি বললাম: আল্লাহ এবং তার রাসূল ভাল জানেন। তিনি বলেন: সূর্যাস্ত যায় একটি কর্দমাক্ত ঝর্ণায়, সে চলতে থাকে অবশেষে আরশের নিচে তার রবের জন্য সেজদায় লুটিয়ে পড়ে, যখন বের হওয়ার সময় আল্লাহ তাকে অনুমতি দেন, ফলে সে বের হয় ও উদিত হয়। তিনি যখন তাকে যেখানে অস্ত গিয়েছে সেখান থেকে উদিত করার ইচ্ছা করবেন আটকে দিবেন, সে বলবে: হে আমার রব আমার পথ তো দীর্ঘ, আল্লাহ বলবেন: যেখান থেকে ডুবেছে সেখান থেকেই উদিত হও, এটাই সে সময় যখন ব্যক্তিকে তার ঈমান উপকার করবে না”। [আহমদ] হাদিসটি সহিহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৫/ কুরআন মাজীদের তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ ৬৫/৩৬/১. আল্লাহর বাণীঃ আর সূর্য নিজ গন্তব্য স্থানের দিকে চলতে থাকে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। (সূরাহ ইয়াসীন ৩৬/৩৮)
৪৮০২. আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে মসজিদে ছিলাম। তিনি বললেন, হে আবূ যার! তুমি কি জান সূর্য কোথায় ডুবে? আমি বললাম, আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল সবচেয়ে ভাল জানেন।তিনি বললেন, সূর্য চলে, অবশেষে আরশের নিচে গিয়ে সিজদা করে। নিম্নবর্ণিত وَالشَّمْسُ تَجْرِيْ لِمُسْتَقَرٍّ لَّهَا ذٰلِكَ تَقْدِيْرُ الْعَزِيْزِ الْعَلِيْمِ এ আয়াতের কথাই বর্ণনা করা হয়েছে, অর্থাৎ সূর্য ভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের পানে, এ হল পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। [৩১৯৯] (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৪৩৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৪৩৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৫/ কুরআন মাজীদের তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ ৬৫/৩৬/১. আল্লাহর বাণীঃ আর সূর্য নিজ গন্তব্য স্থানের দিকে চলতে থাকে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। (সূরাহ ইয়াসীন ৩৬/৩৮)
৪৮০৩. আবূ যার গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আল্লাহর বাণীঃ وَالشَّمْسُ تَجْرِيْ لِمُسْتَقَرٍّ لَّهَا সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম।তিনি বলেছেন, সূর্যের গন্তব্যস্থল আরশের নিচে। [৩১৯৯] (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৪৩৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৪৪০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৯৭/ তাওহীদ
পরিচ্ছেদঃ ৯৭/২৩. আল্লাহর বাণীঃ ফেরেশতা এবং রূহ্ আল্লাহর দিকে ঊর্ধ্বগামী হয়- (সূরা আল মা‘আরিজ ৭০/৪)। এবং আল্লাহর বাণীঃ তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ আরোহণ করে- (সূরাহ ফাত্বির ৩৫/১০)।
৭৪৩৩. আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেছি, ‘‘আর সূর্য ভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে’’ আল্লাহর এ কথা সম্পর্কে। তিনি বলেছেনঃ সূর্যের নির্দিষ্ট গন্তব্য হল আরশের নিচে। [৩১৯৯] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৯১৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৯২৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১। ঈমান [বিশ্বাস]
পরিচ্ছেদঃ ৭২. যে সময়ে ঈমান কবুল হবে না।
২৮৯-(২৫০/১৫৯) ইয়াহইয়া ইবনু আইয়ুব ও ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (আঃ) ….. আবূ যার (রাযিঃ) বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা কি জান, এ সূর্য কোথায় যায়? সাহাবাগণ বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেন, এ সূর্য চলতে থাকে এবং (আল্লাহ তা’আলার) আরশের নীচে অবস্থিত তার অবস্থান স্থলে যায়। সেখানে সে সাজদাবনত হয়ে পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, উঠ এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও! অনন্তর সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়স্থল দিয়েই উদিত হয়। তা আবার চলতে থাকে এবং আরশের নীচে অবস্থিত তার অবস্থান স্থলে যায়। সেখানে সে সাজদাবনত অবস্থায় পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয় উঠ এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও। তখন সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়স্থল হয়েই সে উদিত হয়। এমনিভাবে চলতে থাকবে; মানুষ তার থেকে অস্বাভাবিক কিছু হতে দেখবে না। শেষে একদিন সূর্য যথারীতি আরশের নীচে তার অবস্থানে যাবে। তাকে বলা হবে, উঠ এবং অস্তাচল থেকে উদিত হও। অনন্তর সেদিন সূর্য পশ্চিমাকাশে উদিত হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, (কুরআনের বাণী) “কোন দিন সে অবস্থা হবে তোমরা জান? সেদিন ঐ ব্যক্তির ঈমান কোন কাজে আসবে না, যে ব্যক্তি পূর্বে ঈমান আনেনি কিংবা যে ব্যক্তি ঈমানের মাধ্যমে কল্যাণ অর্জন করেনি”- [ সূরাহ আল আনআম ৬ঃ ১৫৮]*। [ ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৯৬, ইসলামিক সেন্টারঃ ৩০৭ ]
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)

হাদিস-তাফসিরে গোঁজামিল: আক্ষরিক পাঠ থেকে আধুনিক এপোলোজেটিক ব্যাখ্যা
সূর্যের আরশের নিচে গিয়ে সিজদা করার হাদিসটি শুধু কোনো বিচ্ছিন্ন বর্ণনা নয়; এটি সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে এসেছে এবং সূরা ইয়াসীনের ৩৬:৩৮ আয়াতের সরাসরি ব্যাখ্যা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। সংশয়ের ইসলাম আর্কাইভে সংরক্ষিত তাফসীর আবু বকর যাকারিয়ায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সূর্য চলতে চলতে আরশের নিচে পৌঁছে সিজদা করে এবং আয়াতের «مُسْتَقَرٍّ لَّهَا» দ্বারা এই অবস্থানকেই বোঝানো হয়েছে। কুরতুবীও আবু যরের একই হাদিস উদ্ধৃত করে সূর্যের আরশের নিচে যাওয়া, সিজদা করা, অনুমতি চাওয়া এবং শেষে পশ্চিম থেকে উদিত হওয়ার পুরো বর্ণনা দিয়েছেন। আদ-দুররুল মানসূরেও বুখারী, তিরমিযী, ইবন আবি হাতিম, বায়হাকীসহ একাধিক সূত্রে একই বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে। অর্থাৎ “আরশের নিচে গন্তব্য” কোনো আধুনিক অনুবাদগত ভুল নয়; এটি তাফসীর-ঐতিহ্যের ভেতরেই প্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যা [22] [23] [24] [25] [26]। ফলে সমস্যাটি সাধারণ “ভুল অনুবাদ” বা “প্রান্তিক ব্যাখ্যা” নয়। হাদিসের ভাষা স্পষ্টভাবে ঘটনামূলক: সূর্য যায়, আরশের নিচে পৌঁছায়, সিজদা করে, অনুমতি চায়, অনুমতি পায়, ফিরে আসে, এবং একদিন তাকে পশ্চিম দিক থেকে উঠতে বলা হবে। এই কাঠামোকে সরাসরি পড়লে এটি প্রাচীন ভূকেন্দ্রিক ও স্তরভিত্তিক কসমোলজির সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই সরল পাঠ অস্বস্তিকর হয়ে পড়ে। তখন থেকেই বিভিন্ন স্তরে ব্যাখ্যার কসরত দেখা যায়: কেউ “মুস্তাক্বার” শব্দকে স্থান না বলে সময়সীমা বানায়, কেউ সূর্যের সিজদাকে রূপক আনুগত্য বলে, কেউ আরশকে এমন সর্ববেষ্টনকারী বাস্তবতা বানায় যাতে সূর্য সবসময়ই তার নিচে থাকে, আর কেউ পুরো ঘটনাকে গায়েবি বলে বিজ্ঞান-পরীক্ষার বাইরে সরিয়ে দেয়।
মূল আরবি
قَوْلُهُ تَعَالَى: (وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍّ لَها) يَجُوزُ أَنْ يَكُونَ تَقْدِيرُهُ وَآيَةٌ لَهُمُ الشَّمْسُ. وَيَجُوزُ أَنْ يَكُونَ الشَّمْسُ مَرْفُوعًا بِإِضْمَارِ فِعْلٍ يُفَسِّرُهُ الثَّانِي. وَيَجُوزُ أَنْ يَكُونَ مَرْفُوعًا بِالِابْتِدَاءِ” تَجْرِي” فِي مَوْضِعِ الْخَبَرِ أَيْ جَارِيَةٌ. وَفِي صَحِيحِ مُسْلِمٍ عَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ قَوْلِهِ عز وجل:” وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍّ لَها” قَالَ:” مُسْتَقَرُّهَا تَحْتَ الْعَرْشِ”. وَفِيهِ عَنْ أَبِي ذَرٍّ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ يَوْمًا: (أَتَدْرُونَ أَيْنَ تَذْهَبُ هَذِهِ الشَّمْسُ) قَالُوا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ:” إِنَّ هَذِهِ تَجْرِي حَتَّى تَنْتَهِيَ إِلَى مُسْتَقَرِّهَا تَحْتَ الْعَرْشِ فَتَخِرُّ سَاجِدَةً فَلَا تَزَالُ كَذَلِكَ حَتَّى يُقَالَ لَهَا ارْتَفِعِي ارْجِعِي مِنْ حَيْثُ جِئْتِ فَتَرْجِعُ فَتُصْبِحُ طَالِعَةً مِنْ مَطْلِعِهَا ثُمَّ تَجْرِي حَتَّى تَنْتَهِيَ إِلَى مُسْتَقَرِّهَا تَحْتَ الْعَرْشِ فَتَخِرُّ سَاجِدَةً وَلَا تَزَالُ كَذَلِكَ حَتَّى يُقَالَ لَهَا ارْتَفِعِي ارْجِعِي مِنْ حَيْثُ جِئْتِ فَتَرْجِعُ فَتُصْبِحُ طَالِعَةً مِنْ مَطْلِعِهَا ثُمَّ تَجْرِي لَا يَسْتَنْكِرُ النَّاسُ مِنْهَا شَيْئًا حَتَّى تَنْتَهِيَ إِلَى مُسْتَقَرِّهَا ذَاكَ تَحْتَ الْعَرْشِ فَيُقَالُ لَهَا ارْتَفِعِي أَصْبِحِي طَالِعَةً مِنْ مَغْرِبِكِ فَتُصْبِحُ طَالِعَةً مِنْ مَغْرِبِهَا) فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم:” أَتَدْرُونَ مَتَى ذَلِكُمْ ذَاكَ حِينَ” لَا يَنْفَعُ نَفْساً إِيمانُها لَمْ تَكُنْ آمَنَتْ مِنْ قَبْلُ أَوْ كَسَبَتْ فِي إِيمانِها خَيْراً” [الأنعام: 158] (.
وَلَفْظُ الْبُخَارِيِّ عَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم لِأَبِي ذَرٍّ حِينَ غَرَبَتِ الشَّمْسُ:” تَدْرِي أَيْنَ تَذْهَبُ” قُلْتُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ:” فَإِنَّهَا تَذْهَبُ حَتَّى تَسْجُدَ تَحْتَ الْعَرْشِ فَتَسْتَأْذِنُ فَيُؤْذَنُ لَهَا وَيُوشِكُ أَنْ تَسْجُدَ فَلَا يُقْبَلُ مِنْهَا وَتَسْتَأْذِنَ فَلَا يُؤْذَنُ لَهَا يُقَالُ لَهَا ارْجِعِي مِنْ حَيْثُ جِئْتِ فَتَطْلُعُ مِنْ مَغْرِبِهَا فَذَلِكَ قَوْلُهُ تَعَالَى:” وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍّ لَها ذلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ”.
وَلَفْظُ التِّرْمِذِيِّ عَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: دَخَلْتُ الْمَسْجِدَ حِينَ غَابَتِ الشَّمْسُ وَالنَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم جَالِسٌ. فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم:” يَا أَبَا ذَرٍّ أَتَدْرِي أَيْنَ تَذْهَبُ هَذِهِ” قَالَ قُلْتُ: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ:” فَإِنَّهَا تَذْهَبُ فَتَسْتَأْذِنُ فِي السُّجُودِ فَيُؤْذَنُ لَهَا وَكَأَنَّهَا قَدْ قِيلَ لَهَا اطْلُعِي مِنْ حَيْثُ جِئْتِ فَتَطْلُعُ مِنْ مَغْرِبِهَا” قَالَ: ثُمَّ قَرَأَ” ذَلِكَ «1» مُسْتَقَرٌّ لَهَا” قَالَ وَذَلِكَ قِرَاءَةُ عَبْدِ اللَّهِ.
قَالَ أَبُو عِيسَى: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ.(1). كذا في الأصول وفى صحيح الترمذي والعلة تحريف، إذ لا تعرف قراءة بهذا النص، وقراءة عبد الله بن مسعود” والشمس تجرى لا مستقر لها” كما سيأتي.
বাংলা তাফসীর
মহান আল্লাহর বাণী: (আর সূর্য তার নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে চলতে থাকে)। এর অর্থ এরূপ হওয়া সম্ভব যে, “তাদের জন্য একটি নিদর্শন হলো সূর্য।” আবার “সূর্য” শব্দটি একটি উহ্য ক্রিয়া দ্বারা রফ’ (পেশ) প্রাপ্ত হওয়াও সম্ভব, যা পরবর্তী অংশ দ্বারা ব্যাখ্যায়িত হয়। অথবা এটি মুক্তাদা হিসেবে রফ’ প্রাপ্ত হতে পারে এবং “চলতে থাকে” (তাজরী) শব্দটি খবরের স্থলে হবে, অর্থাৎ “পরিভ্রমণরত।” সহীহ মুসলিমে আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে মহান আল্লাহর বাণী—”আর সূর্য তার নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে চলতে থাকে”—সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম।
তিনি বললেন: “তার গন্তব্যস্থল হলো আরশের নিচে।” এবং তাতে আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী (সা.) একদিন বললেন: (তোমরা কি জানো এই সূর্য কোথায় যায়?) তারা বললেন: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন: “এটি চলতে থাকে যতক্ষণ না আরশের নিচে তার গন্তব্যস্থলে পৌঁছে। সেখানে সে সিজদাবনত হয়ে লুটিয়ে পড়ে এবং সেভাবেই থাকে যতক্ষণ না তাকে বলা হয়: ওঠো এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানেই ফিরে যাও। ফলে সে ফিরে আসে এবং নিজের উদয়স্থল থেকেই উদিত হয়। এরপর সে চলতে থাকে যতক্ষণ না আরশের নিচে তার গন্তব্যে পৌঁছায় এবং সিজদাবনত হয়ে লুটিয়ে পড়ে।
সে এভাবেই থাকে যতক্ষণ না তাকে বলা হয়: ওঠো এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানেই ফিরে যাও। ফলে সে ফিরে আসে এবং নিজের উদয়স্থল থেকেই উদিত হয়। এরপর সে চলতে থাকে এবং মানুষ তার মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু দেখে না, যতক্ষণ না সে আরশের নিচে সেই গন্তব্যে পৌঁছায়। তখন তাকে বলা হবে: ওঠো এবং আজ তোমার অস্তাচল (পশ্চিম দিক) থেকে উদিত হও। ফলে সে পশ্চিম দিক থেকেই উদিত হবে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “তোমরা কি জানো তা কখন হবে? তা হবে সেই সময় যখন ‘কোনো ব্যক্তির ঈমান তার উপকারে আসবে না যদি সে পূর্বে ঈমান না এনে থাকে অথবা ঈমান দ্বারা কোনো কল্যাণ অর্জন না করে থাকে’” [সূরা আল-আন’আম: ১৫৮]।
বুখারীর শব্দে আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় নবী (সা.) আবু যরকে বললেন: “তুমি কি জানো এটি কোথায় যায়?” আমি বললাম: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন: “এটি যায় এবং আরশের নিচে সিজদা করে। এরপর সে অনুমতি চায় এবং তাকে অনুমতি দেওয়া হয়। আর অচিরেই এমন সময় আসবে যখন সে সিজদা করবে কিন্তু তা কবুল করা হবে না, এবং সে অনুমতি চাইবে কিন্তু তাকে অনুমতি দেওয়া হবে না। তাকে বলা হবে: যেখান থেকে এসেছিলে সেখানেই ফিরে যাও। ফলে সে পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে। আর সেটিই মহান আল্লাহর বাণী: ‘আর সূর্য তার নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে চলতে থাকে; এটি মহাপরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের সুনিয়ন্ত্রিত নির্ধারণ’।” তিরমিযীর শব্দে আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: সূর্য ডুবে যাওয়ার সময় আমি মসজিদে প্রবেশ করলাম তখন নবী (সা.) বসে ছিলেন।
নবী (সা.) বললেন: “হে আবু যর! তুমি কি জানো এটি কোথায় যায়?” তিনি (আবু যর) বলেন, আমি বললাম: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন: “এটি যায় এবং সিজদা করার অনুমতি চায়, ফলে তাকে অনুমতি দেওয়া হয়। আর অচিরেই তাকে বলা হবে: যেখান থেকে এসেছিলে সেখান থেকেই উদিত হও। ফলে সে তার পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে।” বর্ণনাকারী বলেন: এরপর তিনি পাঠ করলেন “এটিই (১) তার জন্য নির্ধারিত গন্তব্য।” তিনি বললেন: এটি আবদুল্লাহর ক্বিরাত (পাঠরীতি)। আবু ঈসা বলেন: এই হাদীসটি হাসান সহীহ।(১) মূল পাণ্ডুলিপিসমূহে এবং সহীহ তিরমিযীতে এভাবেই রয়েছে এবং বিষয়টি পাঠগত ত্রুটি (তাহরীফ); কেননা এই পাঠে (ক্বিরাত) কোনো বর্ণনা জানা নেই।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের ক্বিরাত হলো—”আর সূর্য পরিভ্রমণ করে, তার কোনো স্থিরতা নেই”—যেমনটি সামনে আসবে।
এই ব্যাখ্যাগুলোর মূল সমস্যা হলো, এগুলো টেক্সটের স্বাভাবিক অর্থ থেকে তৈরি হয় না; বরং বৈজ্ঞানিক চাপ তৈরি হওয়ার পরে টেক্সটকে বাঁচানোর প্রয়োজন থেকে জন্মায়। প্রাচীন ব্যাখ্যায় সূর্যের “গন্তব্য”, “আরশের নিচে অবস্থান” এবং “সিজদা”কে সরাসরি ধর্মীয় বাস্তবতা হিসেবে নেওয়া হয়েছে। পরে যখন বুঝতে হলো পৃথিবী ঘোরে, সূর্য দৈনিক পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে না, এবং পৃথিবীর এক অঞ্চলে রাত হলেও অন্য অঞ্চলে সূর্য দৃশ্যমান থাকে—তখন ব্যাখ্যা পাল্টে যায়। তখন বলা হয়, “সিজদা” মানে প্রাকৃতিক নিয়ম মানা; “যাওয়া” মানে প্রকৃত যাত্রা নয়; “আরশের নিচে” মানে স্থানগত অবস্থান নয়; “মুস্তাক্বার” মানে নির্দিষ্ট স্থানও হতে পারে, সময়ও হতে পারে; আর এগুলো বোঝা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এই পদ্ধতি জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে দুর্বল, কারণ এতে কোনো স্থির ব্যাখ্যার মানদণ্ড নেই। টেক্সট যখন আক্ষরিকভাবে সুবিধাজনক, তখন আক্ষরিক; যখন বিজ্ঞান বিরোধী, তখন রূপক; যখন রূপকও যথেষ্ট নয়, তখন গায়েব। এটি ব্যাখ্যা নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক পশ্চাদপসরণ।
| ব্যাখ্যার ধরন | মূল দাবি | সমস্যা | যুক্তিগত রায় |
|---|---|---|---|
| আক্ষরিক হাদিস-পাঠ | সূর্য অস্ত যাওয়ার পর আরশের নিচে যায়, সিজদা করে, অনুমতি নিয়ে আবার উদিত হয়। | পৃথিবীর ঘূর্ণন, গোলাকার পৃথিবীর দিন-রাত্রি এবং সূর্যের বাস্তব অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। | এটি প্রাচীন কসমোলজির সঙ্গে মেলে, আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে নয়। |
| “মুস্তাক্বার” শব্দের অর্থ বদলানো | “মুস্তাক্বার” স্থান নয়, সময়সীমা বা কিয়ামত পর্যন্ত চলার নির্ধারিত মেয়াদও হতে পারে। | হাদিস নিজেই আয়াতটির ব্যাখ্যায় আরশের নিচে গন্তব্য, সিজদা ও অনুমতির ঘটনা দিয়েছে। তাই শুধু শব্দার্থ পাল্টালে ঘটনামূলক হাদিস মুছে যায় না। | এটি আংশিক ভাষাতাত্ত্বিক সম্ভাবনা, কিন্তু হাদিসের মূল সমস্যাকে সমাধান করে না। |
| রূপক সিজদা | সূর্যের সিজদা মানে আল্লাহর নিয়ম মেনে চলা, আক্ষরিকভাবে নত হওয়া নয়। | তাহলে “অনুমতি চাওয়া”, “অনুমতি দেওয়া”, “ফিরে যাওয়ার নির্দেশ”—এসব ঘটনামূলক ভাষার অর্থ কী? শুধু আনুগত্য বোঝাতে এই নাটকীয় সংলাপ অপ্রয়োজনীয়। | রূপক ব্যাখ্যাটি টেক্সটের সব উপাদান ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ। |
| আরশ সর্ববেষ্টনকারী, তাই সমস্যা নেই | আরশ সব সৃষ্টির ঊর্ধ্বে/পরিবেষ্টনকারী; তাই সূর্য সবসময়ই কোনো অর্থে আরশের নিচে। | যদি সূর্য সবসময়ই আরশের নিচে থাকে, তাহলে “সূর্য কোথায় যায়?”, “সেখানে সিজদা করে”, “যেখান থেকে এসেছ ফিরে যাও”—এই যাত্রামূলক ভাষা অর্থহীন হয়ে যায়। | এই ব্যাখ্যা হাদিসকে বাঁচায় না; বরং হাদিসের ঘটনাকাঠামো ভেঙে দেয়। |
| গায়েবি বাস্তবতা | ঘটনাটি অদৃশ্য জগতের, বিজ্ঞান দিয়ে বোঝা যাবে না। | হাদিসটি সূর্যাস্ত, উদয়, পশ্চিম থেকে উদয়—অর্থাৎ পর্যবেক্ষণযোগ্য জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাকেই ব্যাখ্যা করছে। পর্যবেক্ষণযোগ্য ঘটনার ব্যাখ্যা ভুল হলে সেটিকে গায়েবি বলে সরিয়ে দেওয়া ad hoc পলায়ন। | এটি unfalsifiable claim; জ্ঞান নয়, বিশ্বাস রক্ষা। |
| আধুনিক reference-frame ব্যাখ্যা | মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে সূর্যই ওঠে-ডোবে; তাই সমস্যার কিছু নেই। | দৈনন্দিন ভাষায় “সূর্য উঠেছে” বলা এক জিনিস; সূর্য আরশের নিচে গিয়ে সিজদা করে অনুমতি নেয় বলা আরেক জিনিস। reference frame দিয়ে পৌরাণিক ঘটনাকে বিজ্ঞান বানানো যায় না। | এটি apparent motion ও physical reality গুলিয়ে ফেলা। |
প্রাচীন ও আধুনিক ব্যাখ্যার এই ধারাবাহিকতা দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার: হাদিসটি সহিহ হিসেবে গ্রহণ করেই তাকে বাস্তবতার সঙ্গে মিলাতে গিয়ে ব্যাখ্যার স্তর বাড়াতে হয়। Tafsir literature-এ ৩৬:৩৮ আয়াতকে কখনো সূর্যের স্থির হওয়ার স্থান, কখনো সময়সীমা, কখনো কিয়ামত পর্যন্ত চলার মেয়াদ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে; আধুনিক তাফসিরেও “মুস্তাক্বার” শব্দকে place এবং time—দুইভাবে নেওয়ার সুযোগ দেখানো হয় [27]। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, আধুনিক সালাফি ফতোয়াগুলোতেও গুরুত্বপূর্ণ অংশও “সিজদা”কে নিছক রূপক আনুগত্য বলে উড়িয়ে দেয় না। IslamQA সরাসরি লিখেছে, হাদিসের প্রকাশ্য অর্থে সিজদা বলতে শুধু আল্লাহর আদেশের অধীন থাকা বোঝানো হয়নি; সূর্য বাস্তব অর্থেই সিজদা করে, যদিও কীভাবে করে তা মানুষের অজানা। IslamWeb-ও একইভাবে বলেছে, সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাখ্যা হলো এটি real prostration, কেবল metaphorical submission নয়। ইবন বাযের ফতোয়াতেও সূর্যের «مستقرها» ব্যাখ্যা করা হয়েছে আরশের নিচে তার সিজদার স্থান হিসেবে এবং বলা হয়েছে সূর্য আল্লাহর আদেশে “যায় ও ফিরে আসে”—«ذاهبة وآيبة». ফলে “সিজদা মানে শুধু প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলা” ধরনের আধুনিক ব্যাখ্যা এমনকি এসব রক্ষণশীল ইসলামি উৎসের সঙ্গেও মেলে না [28] [29] [30]। অর্থাৎ সরল ভাষা যত বেশি বিজ্ঞানের সঙ্গে সংঘাতে পড়ে, ব্যাখ্যা তত বেশি বিমূর্ত, গায়েবি ও অপ্রমাণযোগ্য হয়ে যায়।
মূল আরবি
مستقرها: أنها تسجد تحت عرش ربها عز وجل ذاهبة وآيبة بأمره سبحانه وتعالى (¬1) » . سجودا الله أعلم بكيفيته سبحانه وتعالى.
وهذه المخلوقات كلها تسجد لله وتسبح له جل وعلا، تسبيحا وسجودا يعلمه سبحانه، وإن كنا لا نعلمه ولا نفقهه، كما قال عز وجل: تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا (¬2) وقال تعالى: أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَابُّ وَكَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ وَكَثِيرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ وَمَنْ يُهِنِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ مُكْرِمٍ إِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يَشَاءُ (¬3) الآية، هذا السجود يليق به، لا يعلم كيفيته إلا الله سبحانه، ومن هذا قوله تعالى في سورة الرعد: وَلِلَّهِ يَسْجُدُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَظِلَالُهُمْ بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ (¬4) فالشمس تجري كما أمرها الله تطلع من المشرق وتغيب من المغرب إلى آخر الزمان، فإذا قرب قيام
(¬1) أخرجه البخاري في صحيحه كتاب (بدء الخلق) باب: صفة الشمس والقمر برقم (2960) .
(¬2) سورة الإسراء الآية 44
(¬3) سورة الحج الآية 18
(¬4) سورة الرعد الآية 15
বাংলা অনুবাদ
এর অবস্থানস্থল হলো: এটি তার পরাক্রমশালী ও মহিমান্বিত রবের আরশের নিচে তাঁরই আদেশে আসা-যাওয়ার মাধ্যমে সাজদাহ করে (১)। এমন সাজদাহ, যার পদ্ধতি (কাইফিয়াত) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাই ভালো জানেন।
এই সকল সৃষ্টিই মহিমান্বিত ও সুউচ্চ আল্লাহর জন্য সাজদাহ করে এবং তাঁর তাসবীহ করে। এমন তাসবীহ ও সাজদাহ যা তিনি (আল্লাহ) জানেন, যদিও আমরা তা জানি না বা বুঝি না। যেমন পরাক্রমশালী ও মহিমান্বিত আল্লাহ বলেছেন:
تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا
অর্থ: তাঁরই তাসবীহ করে সপ্ত আকাশ, পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে। এমন কোনো কিছুই নেই যা তাঁর প্রশংসাসহ তাসবীহ করে না। কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ বুঝতে পারো না। নিশ্চয় তিনি সহনশীল, ক্ষমাশীল। (২)
তিনি আরও বলেন:
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَابُّ وَكَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ وَكَثِيرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ وَمَنْ يُهِنِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ مُكْرِمٍ إِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يَشَاءُ
অর্থ: তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহকে সাজদাহ করে যারা আকাশসমূহে আছে এবং যারা পৃথিবীতে আছে, আর সূর্য, চাঁদ, তারকারাজি, পর্বতমালা, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং বহু মানুষ? আর অনেকের উপর শাস্তি অনিবার্য হয়ে গেছে। আল্লাহ যাকে অপমানিত করেন, তাকে সম্মানদাতা কেউ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন। (৩)
এই আয়াতটি (শেষ হলো)। এই সাজদাহ তাঁর (আল্লাহর) জন্য উপযুক্ত। এর পদ্ধতি আল্লাহ সুবহানাহু ছাড়া কেউ জানে না। এ প্রসঙ্গে সূরা আর-রা’দে আল্লাহ তা’আলার বাণীও রয়েছে:
وَلِلَّهِ يَسْجُدُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَظِلَالُهُمْ بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ
অর্থ: আর আল্লাহকেই সাজদাহ করে আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সবাই স্বেচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় এবং তাদের ছায়াসমূহও সকাল-সন্ধ্যায়। (৪)
সুতরাং সূর্য আল্লাহর আদেশে চলমান থাকে। এটি পূর্ব দিক থেকে উদিত হয় এবং পশ্চিম দিকে অস্ত যায়, যা শেষ সময় পর্যন্ত চলতে থাকবে। যখন কিয়ামত নিকটবর্তী হবে…
(১) এটি ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে ‘সৃষ্টির সূচনা’ অধ্যায়ে, ‘সূর্য ও চাঁদের বর্ণনা’ পরিচ্ছেদে (হাদীস নং ২৯৬০) বর্ণনা করেছেন।
(২) সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৪৪
(৩) সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ১৮
(৪) সূরা আর-রা’দ, আয়াত: ১৫
মূল আরবি
الساعة طلعت من مغربها، وذلك من أشراط الساعة العظمى، كما تواترت بذلك الأحاديث الصحيحة عن رسول الله – صلى الله عليه وسلم – فإذا انتهى هذا العالم وقامت القيامة كورت، كما قال تعالى: إِذَا الشَّمْسُ كُوِّرَتْ (¬1) فتكور ويذهب نورها وتطرح هي والقمر في جهنم؛ لأنهما قد ذهبت الحاجة إليهما بزوال هذه الدنيا.
والمقصود: أنها تجري لمستقر لها ذاهبة وآيبة، ومستقرها سجودها تحت العرش في سيرها طالعة وغاربة، كما تقدم ذكر ذلك في الحديث الصحيح، ذلك بتقدير العزيز العليم، وهو الذي قدر سبحانه وتعالى لها ذلك.
العزيز، ومعناه: المنيع الجناب الغالب لكل شيء، العليم بأحوال خلقه سبحانه وتعالى. والله ولى التوفيق.
(¬1) سورة التكوير الآية 1
বাংলা অনুবাদ
সূর্য তার পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে, আর এটি হলো কিয়ামতের অন্যতম বড় নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহীহ হাদীসসমূহের মাধ্যমে মুতাওয়াতির সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে।
যখন এই জগৎ শেষ হয়ে যাবে এবং কিয়ামত সংঘটিত হবে, তখন সূর্যকে গুটিয়ে ফেলা হবে (কূওবিরত)। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন: যখন সূর্যকে গুটিয়ে ফেলা হবে। (সূরা আত-তাকভীর, আয়াত ১)। অতঃপর তাকে গুটিয়ে ফেলা হবে এবং তার আলো চলে যাবে। আর তাকে ও চাঁদকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে; কারণ এই দুনিয়া বিলুপ্ত হওয়ার সাথে সাথে তাদের প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে যাবে।
মূল উদ্দেশ্য হলো: সূর্য তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে চলমান থাকে—যাওয়া-আসার মাধ্যমে। আর তার গন্তব্য হলো আরশের নিচে তার সিজদা করা, যখন সে উদিত হয় এবং যখন সে অস্ত যায়। যেমনটি সহীহ হাদীসে পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি পরাক্রমশালী, মহাজ্ঞানী (আল-আযীয, আল-আলীম) আল্লাহরই নির্ধারণ। আর তিনিই সুবহানাহু ওয়া তাআলা এর জন্য তা নির্ধারণ করেছেন।
‘আল-আযীয’ (পরাক্রমশালী) এর অর্থ হলো: যিনি অপ্রতিরোধ্য, যার সান্নিধ্য সুরক্ষিত এবং যিনি সবকিছুর উপর বিজয়ী। আর ‘আল-আলীম’ (মহাজ্ঞানী) হলেন: যিনি তাঁর সৃষ্টির সকল অবস্থা সম্পর্কে অবগত, সুবহানাহু ওয়া তাআলা।
আর আল্লাহই তাওফীক দাতা।
এখানে যুক্তিগত সিদ্ধান্ত সরল। আক্ষরিক পাঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে; রূপক পাঠ হাদিসের যাত্রা, অনুমতি ও প্রত্যাবর্তনের ভাষা ব্যাখ্যা করতে পারে না; গায়েবি পাঠ দাবিটিকে পরীক্ষার বাইরে সরিয়ে দেয়; আর reference-frame ব্যাখ্যা সূর্যের আপাত গতি ও আরশের নিচে সিজদার ঘটনাকে গুলিয়ে ফেলে। তাই সূর্য-সিজদা হাদিসকে আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেখানোর চেষ্টা ব্যাখ্যা নয়; এটি সহিহ টেক্সটের ওপর পরবর্তী যুগের মেরামতকাজ।
শায়েখ উসাইমিনের ফতোয়াঃ পৃথিবী নয়, সূর্যই ঘুরে!
এবারে আসুন শায়খ মুহাম্মদ বিন সালিহ আল উসাইমীন রচিত ফতোয়ায়ে আরকানুল ইসলাম থেকে একটি বিখ্যাত ফতোয়া দেখে নিই [31] [32] –
প্রশ্ন: (১৬) সূর্য কি পৃথিবীর চার দিকে ঘুরে?
উত্তর: মান্যবর শাইখ উত্তরে বলেন যে, শরী‘আতের প্রকাশ্য দলীলগুলো প্রমাণ করে যে, সূর্যই পৃথিবীর চতুর্দিকে ঘুরে। এ ঘুরার কারণেই পৃথিবীতে দিবা-রাত্রির আগমণ ঘটে। আমাদের হাতে এ দলীলগুলোর চেয়ে বেশি শক্তিশালী এমন কোনো দলীল নেই, যার মাধ্যমে আমরা সূর্য ঘূরার দলীলগুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারি। সূর্য ঘুরার দলীলগুলো হলো আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿فَإِنَّ ٱللَّهَ يَأۡتِي بِٱلشَّمۡسِ مِنَ ٱلۡمَشۡرِقِ فَأۡتِ بِهَا مِنَ ٱلۡمَغۡرِبِ﴾ [البقرة: ٢٥٨]
“আল্লাহ তা‘আলা সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন। তুমি পারলে পশ্চিম দিক থেকে উদিত কর।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৮] সূর্য পূর্ব দিক থেকে উঠার মাধ্যমে প্রকাশ্য দলীল পাওয়া যায় যে, সূর্য পৃথিবীর উপর পরিভ্রমণ করে।
২) আল্লাহ বলেন,
﴿فَلَمَّا رَءَا ٱلشَّمۡسَ بَازِغَةٗ قَالَ هَٰذَا رَبِّي هَٰذَآ أَكۡبَرُۖ فَلَمَّآ أَفَلَتۡ قَالَ يَٰقَوۡمِ إِنِّي بَرِيٓءٞ مِّمَّا تُشۡرِكُونَ ٧٨﴾ [الانعام: ٧٨]
“অতঃপর যখন সূর্যকে চকচকে অবস্থায় উঠতে দেখলেন তখন বললেন, এটি আমার রব, এটি বৃহত্তর। অতপর যখন তা ডুবে গেল, তখন বলল হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যেসব বিষয়ে শরীক কর আমি ওসব থেকে মুক্ত।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৭৮]
এখানে নির্ধারণ হয়ে গেল যে, সূর্য অদৃশ্য হয়ে যায়। একথা বলা হয় নি যে, সূর্য থেকে পৃথিবী ডুবে গেল। পৃথিবী যদি ঘূরত তাহলে অবশ্যই তা বলা হত।
৩) আল্লাহ বলেন,
﴿وَتَرَى ٱلشَّمۡسَ إِذَا طَلَعَت تَّزَٰوَرُ عَن كَهۡفِهِمۡ ذَاتَ ٱلۡيَمِينِ وَإِذَا غَرَبَت تَّقۡرِضُهُمۡ ذَاتَ ٱلشِّمَالِ﴾ [الكهف: ١٧]
“তুমি সূর্যকে দেখবে, যখন উদিত হয়, তাদের গুহা থেকে পাশ কেটে ডান দিকে চলে যায় এবং যখন অস্ত যায়, তাদের থেকে পাশ কেটে বাম দিকে চলে যায়।” [সূরা কাহাফ, আয়াত: ১৭] পাশ কেটে ডান দিকে বা বাম দিকে চলে যাওয়া প্রমাণ করে যে, নড়াচড়া সূর্য থেকেই হয়ে থাকে। পৃথিবী যদিনড়াচড়া করত তাহলে অবশ্যই বলতেন সূর্য থেকে গুহা পাশ কেটে যায়। উদয় হওয়া এবং অস্ত যাওয়াকে সূর্যের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এটা থেকে বুঝা যায় যে, সূর্যই ঘুরে। পৃথিবী নয়।
৪) আল্লাহ বলেন,
﴿وَهُوَ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلَّيۡلَ وَٱلنَّهَارَ وَٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَۖ كُلّٞ فِي فَلَكٖ يَسۡبَحُونَ ٣٣﴾ [الانبياء: ٣٣]
“এবং তিনিই দিবা-নিশি এবং চন্দ্র-সূর্য সৃষ্টি করেছেন। সবাই আপন আপন কক্ষ পথে বিচরণ করে।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৩৩]
ইবন আব্বাস বলেন, লাটিম যেমন তার কেন্দ্র বিন্দুর চার দিকে ঘুরতে থাকে, সূর্যও তেমনিভাবে ঘুরে।
৫) আল্লাহ বলেন,
﴿يُغۡشِي ٱلَّيۡلَ ٱلنَّهَارَ يَطۡلُبُهُۥ حَثِيثٗا﴾ [الاعراف: ٥٤]
“তিনি রাতকে আচ্ছাদিত করেন দিনের মাধ্যমে, দিন দৌড়ে দৌড়ে রাতের পিছনে আসে।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৫৪]
আয়াতে রাতকে দিনের অনুসন্ধানকারী বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অনুসন্ধানকারী পিছনে পিছনে দ্রুত অনুসন্ধান করে থাকে। এটা জানা কথা যে, দিবা-রাত্রি সূর্যের অনুসারী।
৬) আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ بِٱلۡحَقِّۖ يُكَوِّرُ ٱلَّيۡلَ عَلَى ٱلنَّهَارِ وَيُكَوِّرُ ٱلنَّهَارَ عَلَى ٱلَّيۡلِۖ وَسَخَّرَ ٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَۖ كُلّٞ يَجۡرِي لِأَجَلٖ مُّسَمًّىۗ أَلَا هُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡغَفَّٰرُ ٥﴾ [الزمر: ٥]
“তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে। তিনি রাত্রিকে দিবস দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে কাজে নিযুক্ত করেছেন। প্রত্যেকেই বিচরণ করে নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত। জেনে রাখুন, তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৫]
আয়াতের মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম যে, পৃথিবীর উপরে দিবা-রাত্রি চলমান রয়েছে। পৃথিবী যদি ঘুরতো তাহলে তিনি বলতেন, দিবা-রাত্রির উপর পৃথিবীকে ঘূরান। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “সূর্য এবং চন্দ্রের প্রত্যেকেই চলমান”। এ সমস্ত দলীলের মাধ্যমে জানা গেল যে, সুস্পষ্টভাবেই সূর্য ও চন্দ্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করছে। এ কথা সুস্পষ্ট যে, চলমান বস্তুকে বশীভুত করা এবং কাজে লাগানো একস্থানে অবস্থানকারী বস্তুকে কাজে লাগানোর চেয়ে অধিক যুক্তিসঙ্গত।
৭) আল্লাহ বলেন,
﴿وَٱلشَّمۡسِ وَضُحَىٰهَا ١ وَٱلۡقَمَرِ إِذَا تَلَىٰهَا ٢﴾ [الشمس: ١، ٢]
“শপথ সূর্যের ও তার কিরণের, শপথ চন্দ্রের যখন তা সূর্যের পশ্চাতে আসে।” [সূরা আশ-শামস, আয়াত: ১-২]
এখানে বলা হয়েছে যে, চন্দ্র সূর্যের পরে আসে। এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, সূর্য এবং চন্দ্র চলাচল করে এবং পৃথিবীর উপর ঘুরে। পৃথিবী যদি চন্দ্র বা সূর্যের চার দিকে ঘুরত, তাহলে চন্দ্র সূর্যকে অনুসরণ করতনা। বরং চন্দ্র একবার সূর্যকে, আর একবার সূর্য চন্দ্রকে অনুসরণ করত। কেননা সূর্য চন্দ্রের অনেক উপরে। এ আয়াত দিয়ে পৃথিবী স্থীর থাকার ব্যাপারে দলীল গ্রহণ করার ভিতরে চিন্তা-ভাবনার বিষয় রয়েছে।
৮) মহান আল্লাহ বলেন,
﴿وَٱلشَّمۡسُ تَجۡرِي لِمُسۡتَقَرّٖ لَّهَاۚ ذَٰلِكَ تَقۡدِيرُ ٱلۡعَزِيزِ ٱلۡعَلِيمِ ٣٨ وَٱلۡقَمَرَ قَدَّرۡنَٰهُ مَنَازِلَ حَتَّىٰ عَادَ كَٱلۡعُرۡجُونِ ٱلۡقَدِيمِ ٣٩ لَا ٱلشَّمۡسُ يَنۢبَغِي لَهَآ أَن تُدۡرِكَ ٱلۡقَمَرَ وَلَا ٱلَّيۡلُ سَابِقُ ٱلنَّهَارِۚ وَكُلّٞ فِي فَلَكٖ يَسۡبَحُونَ ٤٠﴾ [يس: ٣٨، ٤٠]
“সূর্য তার নির্দিষ্ট অবস্থানে আবর্তন করে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারণ। চন্দ্রের জন্যে আমি বিভিন্ন মঞ্জিল নির্ধারিত করেছি। অবশেষে সে পুরাতন খর্জুর শাখার অনুরূপ হয়ে যায়। সূর্যের পক্ষে চন্দ্রকে নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। রাতের পক্ষেও দিনের অগ্রবতী হওয়া সম্ভব নয়। প্রত্যেকেই আপন আপন কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে।” [সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৩৮-৪০]
সূর্যের চলা এবং এ চলাকে মহা পরাক্রমশালী আল্লাহর নির্ধারণ বলে ব্যাখ্যা করা এটাই প্রমাণ করে যে, সূর্য প্রকৃতভাবেই চলমান। আর এ চলাচলের কারণেই দিবা-রাত্রি এবং ঋতুর পরিবর্তন হয়। চন্দ্রের জন্য মঞ্জিল নির্ধারণ করার অর্থ এ যে, সে তার মঞ্জিলসমূহে স্থানান্তরিত হয়। যদি পৃথিবী ঘুরত, তাহলে পৃথিবীর জন্য মঞ্জিল নির্ধারণ করা হত। চন্দ্রের জন্য নয়। সূর্য কর্তৃক চন্দ্রকে ধরতে না পারা এবং দিনের অগ্রে রাত থাকা সূর্য, চন্দ্র, দিন এবং রাতের চলাচলের প্রমাণ বহন করে।
৯) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় আবু যরকে বলেছেন,
«أَتَدْرِي أَيْنَ تَذْهَبُ قُلْتُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ قَالَ فَإِنَّهَا تَذْهَبُ حَتَّى تَسْجُدَ تَحْتَ الْعَرْشِ فَتَسْتَأْذِنَ فَيُؤْذَنُ لَهَا وَيُوشِكُ أَنْ تَسْجُدَ فَلَا يُقْبَلَ مِنْهَا وَتَسْتَأْذِنَ فَلَا يُؤْذَنَ لَهَا يُقَالُ لَهَا ارْجِعِي مِنْ حَيْثُ جِئْتِ فَتَطْلُعُ مِنْ مَغْرِبِهَا»
“হে আবু যর! তুমি কি জান সূর্য যখন অস্ত যায় তখন কোথায় যায়? আবু যার বললেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় ‘আরশের নিচে গিয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং পুনরায় উদিত হওয়ার অনুমতি চায়। অতঃপর তাকে অনুমতি দেওয়া হয়। সে দিন বেশি দূরে নয়, যে দিন অনুমতি চাবে কিন্তু তাকে অনুমতি দেওয়া হবে না। তাকে বলা হবে যেখান থেকে এসেছ, সেখানে ফেরত যাও। অতঃপর সূর্য পশ্চিম দিক থেকেই উদিত হবে।”[1]
এটি হবে কিয়ামতের পূর্ব মুহূর্তে। আল্লাহ সূর্যকে বলবেন, যেখান থেকে এসেছ সেখানে ফেরত যাও, অতঃপর সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সূর্য পৃথিবীর উপরে ঘুরছে এবং তার এ ঘুরার মাধ্যমেই উদয়-অস্ত সংঘটিত হচ্ছে।
১০) অসংখ্য হাদীসের মাধ্যমে জানা যায় যে, উদয় হওয়া, অস্ত যাওয়া এবং ঢলে যাওয়া এ কাজগুলো সূর্যের সাথে সম্পৃক্ত। এগুলো সূর্য থেকে প্রকাশিত হওয়া খুবই সুস্পষ্ট। পৃথিবী হতে নয়। হয়তো এ ব্যাপারে আরো দলীল-প্রমাণ রয়েছে। সেগুলো আমার এ মুহূর্তে মনে আসছেনা। তবে আমি যা উল্লেখ করলাম, এ বিষয়টির দ্বার উম্মুক্ত করবে এবং আমি যা উদ্দেশ্য করেছি, তা পূরণে যথেষ্ট হবে। আল্লাহর তাওফীক চাচ্ছি!
[1] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: বাদউল খালক; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান



আলেমদের বক্তব্যঃ আল্লাহই ভাল জানেন
আসুন বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় আলেমগণ কীভাবে এই বিষয়ক প্রশ্নের সম্মুখে হলে কত ধরনের মানসিক কসরত এবং গোঁজামিল দিতে চেষ্টা করেন, মূল প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রশ্নটিকে অন্যভাবে উপস্থাপন করে সেটার উত্তর দিতে থাকেন, সেটি দেখে নিই,
এবারে আসুন শায়খ মতিউর রহমান মাদানী এই বিষয়ে কী বলে জেনে নেয়া যাক,
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে হাদিসের অসংগতি
এই হাদিসে যে ধরনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। বর্তমান জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসারে, দৈনিক সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত সূর্যের পৃথিবী-প্রদক্ষিণের ফল নয়; এটি পৃথিবীর নিজ অক্ষের ঘূর্ণনের কারণে সৃষ্টি হওয়া আপাত দৃশ্য। সূর্য একটি বিশাল প্লাজমার গোলক, যার ভর প্রায় ১.৯৮ × ১০^৩০ কিলোগ্রাম, এবং তার মহাকর্ষীয় প্রভাবেই সৌরজগতের গ্রহগুলো কক্ষপথে থাকে। সূর্য কঠিন বস্তু নয়; প্লাজমা হওয়ায় এর বিভিন্ন অংশ ভিন্ন গতিতে ঘোরে—বিষুবরেখার কাছে প্রায় ২৫ দিনে এবং মেরু অঞ্চলে প্রায় ৩৬ দিনে একবার। সূর্যের কেন্দ্রে প্রতি সেকেন্ডে বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেন হেলিয়ামে রূপান্তরিত হয়ে শক্তি উৎপন্ন করে, যা পৃথিবীতে আলো ও তাপ হিসেবে পৌঁছায়। এই বাস্তবতার সামনে সূর্যের প্রতিদিন কোনো নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে সিজদা করা, অনুমতি চাওয়া এবং অনুমতি পেয়ে আবার ফিরে আসার বর্ণনা প্রাচীন কসমোলজির ভাষা ছাড়া আর কিছু নয়। পৃথিবী গোলাকার এবং ঘূর্ণনশীল হওয়ায় পৃথিবীর কোনো না কোনো অঞ্চলে সবসময় সূর্যের আলো পড়ছে; এক অঞ্চলে রাত হলে অন্য অঞ্চলে দিন। তাই “রাতের বেলা সূর্য কোথাও চলে যায়”—এই ধারণা বাস্তব জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে মেলে না।
তাছাড়া, কোরআনের প্রচলিত পাঠে সূর্যকে পঙ্কিল বা কর্দমাক্ত জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখার বর্ণনা এসেছে; কিছু পাঠভেদ ও হাদিসি বর্ণনায় “গরম প্রস্রবণ” অর্থও পাওয়া যায়। যে পাঠই ধরা হোক, মূল সমস্যা একই: পৃথিবীর এমন কোনো ভৌত স্থান নেই, যেখানে সূর্য বাস্তবে কোনো জলাশয়, ঝর্ণা বা প্রস্রবণের মধ্যে ডুবে যায়। সূর্য কোনো নির্দিষ্ট স্থানে ধীরে ধীরে প্রবেশ করে না; পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল থেকে সূর্যকে অস্ত যেতে দেখা যায়। তাই এই ধরনের বর্ণনা বাস্তব জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রমাণের পরিপন্থী।

ধর্মীয় বিশ্বাসের অবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব
ধর্মীয় বিশ্বাসের এই ধরনের অবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের জ্ঞানচর্চা এবং যুক্তিবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যদি কোনো ধর্মগ্রন্থ বা হাদিস মানুষকে এমন কোনো ধারণা শেখায়, যা বিজ্ঞানের প্রমাণিত সত্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তবে তা মানুষের জ্ঞানচর্চাকে বাধাগ্রস্ত করে এবং তাদের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে। মানুষ তখন সত্য জানার পরিবর্তে কল্পনা এবং অন্ধবিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা তাদের উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করে।
এই হাদিসের মতো বর্ণনাগুলো প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় বিশ্বাস অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে কল্পনাকে বেশি প্রাধান্য দেয় এবং মানুষকে প্রকৃত জ্ঞান থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। মানুষ যদি এই ধরনের ভুল তথ্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করে, তবে তারা নিজেদের জ্ঞান ও বিজ্ঞানচর্চা থেকে পিছিয়ে পড়বে এবং প্রগতির পথে বাধাগ্রস্ত হবে।
এপোলোজিস্টদের আধুনিক কারচুপি: ব্যাখ্যা নয়, টেক্সট বাঁচানোর জালিয়াতি
কোরআন ও সহিহ হাদিসে সূর্য সম্পর্কিত বর্ণনাগুলো আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সামনে সরাসরি সমস্যায় পড়ার পর একদল এপোলোজিস্ট এই টেক্সটগুলোকে বাঁচাতে নানা ধরনের ভাষাতাত্ত্বিক, পদার্থবৈজ্ঞানিক এবং ধর্মতাত্ত্বিক কসরত শুরু করেছেন। তাদের যুক্তির সাধারণ কাঠামো হলো—টেক্সট যখন আক্ষরিকভাবে ধর্মীয় বিশ্বাসকে শক্তিশালী করে, তখন সেটি আক্ষরিক; কিন্তু একই টেক্সট যখন বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল প্রমাণিত হয়, তখন সেটি হঠাৎ রূপক, আপেক্ষিক, গায়েবি, কিয়ামত-সংক্রান্ত, অথবা “মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা” হয়ে যায়। এই পদ্ধতি কোনো সৎ ব্যাখ্যাপদ্ধতি নয়; এটি বাছাই করা আক্ষরিকতা এবং সুবিধাবাদী রূপকায়নের মিশ্রণ। সহজ ভাষায়, যেখানে প্রমাণ নেই সেখানে “গায়েব”, যেখানে বিজ্ঞান আছে সেখানে “রূপক”, যেখানে টেক্সট ধরা পড়ে সেখানে “ভিন্ন অর্থ”—এই কৌশলই আধুনিক এপোলোজেটিক জালিয়াতির মূল রূপ।
এই কৌশলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটি টেক্সটকে কখনোই ভুল হতে দেয় না। সূর্য যদি সত্যিই আরশের নিচে যায়—তাহলে অলৌকিক সত্য। যদি সূর্য কোথাও না যায়—তাহলে সেটা রূপক। যদি সূর্য থামে না—তাহলে ন্যানোসেকেন্ডে থেমেছিল। যদি ন্যানোসেকেন্ডে থামার প্রমাণ না থাকে—তাহলে quantum uncertainty. যদি আরশের নিচে যাওয়ার ভৌগোলিক সমস্যা ওঠে—তাহলে আরশ সবকিছুকে ঘিরে আছে। যদি সূর্য পঙ্কিল জলাশয়ে ডোবে না—তাহলে জুলকারনাইনের দৃষ্টিভ্রম। অর্থাৎ ব্যাখ্যার লক্ষ্য সত্য নির্ণয় নয়; লক্ষ্য হলো যেভাবেই হোক পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখা। এটি যুক্তিবিদ্যার ভাষায় ad hoc rescue, moving the goalpost এবং unfalsifiable claim—তিনটিরই মিশ্রণ।
“মুস্তাক্বার” শব্দ নিয়ে অর্থ-কারচুপি
সূরা ইয়াসীনের ৩৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “সূর্য তার মুস্তাক্বারের দিকে চলে।” “মুস্তাক্বার” শব্দের আক্ষরিক অর্থ স্থির হওয়ার স্থান, অবস্থানস্থল বা গন্তব্য। প্রাচীন পাঠে এই আয়াতকে সূর্যের একটি নির্দিষ্ট গন্তব্য বা স্থিতিস্থানের ধারণার সঙ্গে পড়া খুবই স্বাভাবিক, বিশেষত যখন সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমের হাদিসগুলো এই আয়াতের ব্যাখ্যা হিসেবে সরাসরি বলে—সূর্যের গন্তব্য আরশের নিচে, সেখানে সে সিজদা করে, অনুমতি চায়, এবং অনুমতি পেলে ফিরে আসে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান জানার পরে এপোলোজিস্টরা “মুস্তাক্বার” শব্দকে স্থান থেকে সময়, আক্ষরিক গন্তব্য থেকে বিমূর্ত পরিণতি, এবং বাস্তব গতিপথ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত চলমান থাকার ধারণায় সরিয়ে দেন। এই অর্থ-বদল নিজেই সমস্যার স্বীকারোক্তি। কারণ টেক্সট যদি নিজেই পরিষ্কার ও বিজ্ঞানসম্মত হতো, তাহলে শব্দের অর্থকে বারবার সরিয়ে নেওয়ার দরকার পড়ত না।
আরও বড় কথা, “মুস্তাক্বার” শব্দকে সময়সীমা হিসেবে ধরলেও হাদিসের সমস্যা মুছে যায় না। কারণ সমস্যা শুধু একটি শব্দের অভিধানগত অর্থে সীমাবদ্ধ নয়; সমস্যা হলো নবী নিজেই এই আয়াতের ব্যাখ্যা হিসেবে সূর্যের আরশের নিচে গিয়ে সিজদা করা এবং অনুমতি চাওয়ার কাহিনী বলেছেন বলে সহিহ হাদিসে এসেছে। যদি আয়াতটি কেবল সূর্যের মহাজাগতিক গতির সাধারণ বর্ণনা হতো, তাহলে “সে কোথায় যায়?”, “আরশের নিচে যায়”, “সিজদা করে”, “অনুমতি চায়”, “ফিরে যাও”—এই ঘটনামূলক ভাষা কেন? এখানে এপোলোজিস্টদের অর্থ-কারচুপি ধরা পড়ে: তারা আয়াতকে আধুনিক করে পড়তে চায়, কিন্তু হাদিসকে পুরোপুরি বাতিল করতেও পারে না। ফলে তারা এমন এক অসংগত অবস্থান নেয় যেখানে আয়াত রূপক, হাদিস গায়েবি, সূর্যের গতি আপেক্ষিক, আর আরশ সর্বব্যাপী। এইসব ব্যাখ্যা একসঙ্গে দাঁড়ায় না; এগুলো শুধু ভাঙা টেক্সটের ওপর মেকআপ।
ন্যানোসেকেন্ডে সূর্যের সিজদা: কল্পবিজ্ঞানকে পদার্থবিজ্ঞান বানানোর চেষ্টা
আরেকটি হাস্যকর ব্যাখ্যা হলো—সূর্য হয়তো ন্যানোসেকেন্ড, পিকোসেকেন্ড বা ফেমটোসেকেন্ডের মতো অতি ক্ষুদ্র সময়ে থেমে যায়, আরশের নিচে সিজদা করে, অনুমতি চায়, অনুমতি পায়, তারপর আবার চলতে শুরু করে; আমরা সেটা মাপতে পারি না বলেই ধরতে পারি না। এই যুক্তি সরাসরি কল্পবিজ্ঞান। সূর্য কোনো ছোট বল নয়, যে চুপিচুপি এক মুহূর্তের জন্য থেমে আবার চলতে শুরু করবে। সূর্য একটি বিশাল ভরযুক্ত নক্ষত্র; তার গতি, ভর, মহাকর্ষীয় সম্পর্ক, সৌরজগতের barycentric dynamics, angular momentum—এসব কোনো শিশুসুলভ “মুহূর্তের জন্য থেমেছিল” গল্প দিয়ে বাতিল করা যায় না। “তুমি প্রমাণ করতে পারবে না যে এক ফেমটোসেকেন্ডের জন্য সূর্য থামেনি”—এটি বিজ্ঞান নয়; এটি burden of proof উল্টে দেওয়া। দাবিকারী বলছে সূর্য থামে, সিজদা করে, অনুমতি নেয়; প্রমাণের দায় তার। সন্দেহকারীকে মহাবিশ্বের প্রতিটি ফেমটোসেকেন্ড পাহারা দিতে বলা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতারণা।
এই যুক্তির আসল অসততা হলো, একই পদ্ধতিতে যেকোনো অবাস্তব দাবিকেই বাঁচানো যায়। কেউ বলতে পারে—চাঁদ প্রতিদিন এক পিকোসেকেন্ডের জন্য অদৃশ্য ড্রাগনে পরিণত হয়, তুমি প্রমাণ করতে পারবে না যে হয় না। কেউ বলতে পারে—মঙ্গলগ্রহ প্রতি রাতে এক ফেমটোসেকেন্ডের জন্য জান্নাতে গিয়ে ফিরে আসে, তুমি মাপোনি বলে অস্বীকার করতে পারো না। এই যুক্তি গ্রহণ করলে বিজ্ঞান, ইতিহাস, পর্যবেক্ষণ—সবকিছু অর্থহীন হয়ে যায়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বলে, অসাধারণ দাবির জন্য অসাধারণ প্রমাণ দরকার। “অতি ক্ষুদ্র সময়ে ঘটেছে, তাই ধরা যায়নি”—এটি প্রমাণ নয়; এটি অদৃশ্যতার আড়ালে পালানো। সূর্যের সিজদা যদি বাস্তব মহাজাগতিক ঘটনা হয়, তার পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রভাব, মডেল, প্রক্রিয়া, শক্তি-বিনিময়, অবস্থানগত পরিবর্তন—কোনো না কোনোভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। শুধু “হয়তো খুব দ্রুত হয়েছে” বললে তা হাদিসকে বিজ্ঞানসম্মত করে না; বরং হাদিসকে পরীক্ষার বাইরে সরিয়ে দেয়। আর পরীক্ষার বাইরে সরিয়ে দেওয়া মানেই বৈজ্ঞানিক দাবি থেকে পলায়ন।
Quantum uncertainty-এর অপব্যবহার: বিজ্ঞানের নামে ছদ্মবিজ্ঞান
এপোলোজিস্টদের সবচেয়ে দুর্বল অথচ সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসী কৌশল হলো হাইজেনবার্গের uncertainty principle টেনে আনা। তাদের দাবি—কোনো বস্তুর গতি ধারাবাহিকভাবে মাপা যায় না, পর্যবেক্ষণের মধ্যে সময়ের ফাঁক থাকে; তাই বিজ্ঞান দিয়ে প্রমাণ করা যাবে না যে সূর্য কখনো অতি ক্ষুদ্র সময়ের জন্য থামেনি। এই বক্তব্য quantum mechanics-এর সরাসরি অপব্যবহার। Uncertainty principle কোনো জাদুর লাইসেন্স নয় [33]। এটি position-momentum বা energy-time সম্পর্কিত পরিমাপগত সীমা নিয়ে কথা বলে; এটি বলে না যে ১.৯৮ × ১০^৩০ কিলোগ্রাম ভরের সূর্যের মতো একটি macroscopic celestial body ইচ্ছামতো থেমে গিয়ে আরশের নিচে সিজদা করে আবার পূর্বের গতিতে ফিরে আসতে পারে। বরং macroscopic পর্যায়ে পরিবেশের সঙ্গে বিপুল interaction-এর কারণে quantum decoherence অত্যন্ত দ্রুত classical behaviour তৈরি করে; তাই quantum uncertainty-কে ব্যবহার করে সূর্যের গোপন অলৌকিক থেমে যাওয়া বা সিজদা ঢোকানো ছদ্মবিজ্ঞান [34]। Quantum mechanics-কে ব্যবহার করে macroscopic celestial mechanics বাতিল করার চেষ্টা বিজ্ঞানের ভাষায় কুসংস্কার ঢোকানো।
এখানে আরও একটি মৌলিক ভুল আছে। অনিশ্চয়তা মানে “যেকোনো কিছু ঘটতে পারে” নয়। বিজ্ঞান কোনো ঘটনা না দেখতে পাওয়ার অক্ষমতাকে ঘটনার প্রমাণ হিসেবে নেয় না। “মাপা যায়নি, তাই ঘটেছে”—এটি যুক্তিগতভাবে মিথ্যা। সঠিক যুক্তি হলো—“মাপা যায়নি, তাই ঘটেছে বলা যায় না।” Heisenberg uncertainty principle পরিমাপের সীমা নিয়ে কথা বলে; এটি কোনো অলৌকিক ঘটনার প্রমাণ সরবরাহ করে না। আর decoherence দেখায় কেন বৃহৎ বস্তু, বিশেষত পরিবেশের সঙ্গে ক্রমাগত interaction-এ থাকা macroscopic system, আমাদের পর্যবেক্ষণে classical নিয়ম মেনে চলে [35]। এপোলোজিস্টরা এই মৌলিক নিয়ম উল্টে দিয়ে প্রমাণের অভাবকে দাবির আশ্রয় বানায়। এটি জ্ঞানের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলা। কারণ এই যুক্তি গ্রহণ করলে কোনো মিথ, কুসংস্কার বা অলৌকিক দাবিকেই আর খণ্ডন করা যাবে না। সবকিছুই বলা যাবে—“অতি ক্ষুদ্র সময়ে হয়েছে”, “গায়েবি স্তরে হয়েছে”, “মানুষের যন্ত্রে ধরা পড়ে না।” এভাবে বিজ্ঞান নয়, অজ্ঞতাকেই পদ্ধতি বানানো হয়।
“আরশ সবকিছুকে ঘিরে আছে” ব্যাখ্যার ফাঁপা ধর্মতত্ত্ব
সূর্য আরশের নিচে যায়—এই হাদিসের ভৌত অসংগতিকে ঢাকতে বলা হয়, আরশ যেহেতু সমস্ত সৃষ্টিকে ঘিরে আছে, তাই সূর্য সর্বদাই আরশের নিচে; অতএব সমস্যা নেই। এই ব্যাখ্যাটি কোনো কাল্পনিক আপত্তি নয়; তাফসীরে ইবনে কাসীরের সূরা ইয়াসীন ৩৬:৩৮-এর ব্যাখ্যাতেই বলা হয়েছে, শুধু সূর্য নয়, সমস্ত মাখলুকই আরশের নিচে এবং আরশ সব সৃষ্টির ঊর্ধ্বে থেকে তাদের পরিবেষ্টন করে আছে। [36] কিন্তু এই ব্যাখ্যা নিজের মধ্যেই আত্মঘাতী। যদি সবকিছুই সবসময় আরশের নিচে থাকে, তাহলে হাদিসে “সূর্য কোথায় যায়?” প্রশ্নের অর্থ কী? “যায়” শব্দের অর্থ কী? “সেখানে সিজদা করে পড়ে থাকে” কথার অর্থ কী? “অনুমতি চায়” এবং “যেখান থেকে এসেছ সেখানে ফিরে যাও”—এই নির্দেশের অর্থ কী? যদি সূর্য সবসময়ই আরশের নিচে থাকে, তাহলে প্রতিদিন অস্ত যাওয়ার পর বিশেষভাবে আরশের নিচে যাওয়ার কোনো আলাদা ঘটনা থাকে না। তখন হাদিসের পুরো দৃশ্যকল্প ভেঙে পড়ে।
এখানে এপোলোজিস্টরা একই সঙ্গে দুই বিপরীত কথা বলছে। একদিকে হাদিসে সূর্যের একটি নির্দিষ্ট যাত্রা, গন্তব্য, সিজদা, অনুমতি ও প্রত্যাবর্তনের কথা আছে। অন্যদিকে তারা বলে, সূর্য তো সবসময়ই আরশের নিচে, তাই যাওয়ার কোনো সমস্যা নেই। তাহলে প্রশ্ন হলো: সূর্য “যায়” কোথায়? যদি যায় না, হাদিসের ভাষা ভুল। যদি যায়, আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে সংঘাত। এই দ্বিমুখী ব্যাখ্যা হলো অর্থের জালিয়াতি—টেক্সটের গতিশীল ভাষাকে ধর্মতাত্ত্বিক স্থিরতায় গলিয়ে দেওয়া। আসলে “আরশ সবকিছুকে ঘিরে আছে” ব্যাখ্যাটি হাদিসকে বাঁচায় না; বরং হাদিসের বর্ণিত ঘটনাকেই অর্থহীন করে দেয়।
রেফারেন্স ফ্রেম-এর নামে ভূকেন্দ্রিক প্রতারণা
এপোলোজিস্টরা আরেকটি চালাকি করে—তারা বলে, পৃথিবীতে বসে আমরা সূর্যকে উঠতে ও ডুবতে দেখি; আমাদের frame of reference থেকে সূর্যই ঘোরে, পৃথিবী স্থির। তাই “সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে” বললে ভুল কোথায়? এই যুক্তি পদার্থবিদ্যার ভাষা ব্যবহার করে পদার্থবিদ্যাকেই বিকৃত করে। হ্যাঁ, কোনো rotating Earth frame থেকে আকাশের বস্তুর আপাত দৈনিক গতি বর্ণনা করা যায়। কিন্তু সেটি একটি rotating, non-inertial frame. এই ফ্রেমে সূর্যের দৈনিক পূর্ব-পশ্চিম গতি বাস্তব orbital dynamics নয়; সেটি পৃথিবীর নিজ অক্ষের ঘূর্ণনের কারণে সৃষ্ট apparent motion. আপাত বর্ণনা আর ভৌত ব্যাখ্যা এক জিনিস নয়।
“সূর্য উঠেছে” বলা ভাষাগতভাবে গ্রহণযোগ্য; কিন্তু “সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে দিন-রাত তৈরি করে” বলা বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল। ট্রেনে বসে বাইরের গাছকে পিছিয়ে যেতে দেখা যায়—এটি আপেক্ষিক পর্যবেক্ষণ। কিন্তু সেখান থেকে “গাছগুলোই বাস্তবে ট্রেনের চারদিকে দৌড়াচ্ছে” বলা মূর্খতা। একইভাবে পৃথিবী থেকে সূর্যের আপাত গতি দেখা যায় বলে সূর্য পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে—এই সিদ্ধান্ত ভুল। পদার্থবিদ্যায় frame of reference মানে এই নয় যে সব ব্যাখ্যা সমান বৈজ্ঞানিক। কিছু frame শুধু বর্ণনার সুবিধা দেয়, কিন্তু প্রকৃত dynamical explanation দেয় না। সৌরজগতের বাস্তব গঠন, গ্রহের কক্ষপথ, মহাকর্ষীয় হিসাব, গ্রহের অবস্থান পূর্বাভাস, spacecraft navigation—এসব সূর্যকেন্দ্রিক বা barycentric মডেলে সহজ, শক্তিশালী ও পরীক্ষিতভাবে ব্যাখ্যাত হয়। পৃথিবী-কেন্দ্রিক ঘূর্ণায়মান ফ্রেম ব্যবহার করলে বিশাল কৃত্রিম বল, জটিল সংশোধন, এবং অপ্রয়োজনীয় গাণিতিক বিকৃতি ঢোকাতে হয়। তাই “আমার ফ্রেমে সূর্য ঘোরে”—এই বক্তব্য একটি শিক্ষানবিশ-স্তরের অর্ধসত্য; এটিকে ধর্মীয় কসমোলজি বাঁচানোর ঢাল বানানো বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আলোচ্য হাদিস শুধু সূর্যের আপাত উদয়-অস্তের ভাষা ব্যবহার করছে না। সেখানে সূর্যকে সচেতন সত্তার মতো আচরণ করানো হয়েছে—সে যায়, সিজদা করে, অনুমতি চায়, অনুমতি পায়, আবার ফিরে আসে, এবং একদিন তাকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত হতে বলা হবে। reference frame দিয়ে “সূর্য পশ্চিমে অস্ত যায়” ধরনের দৈনন্দিন ভাষা ব্যাখ্যা করা যায়; কিন্তু reference frame দিয়ে “সূর্য আরশের নিচে সিজদা করে এবং আল্লাহর কাছ থেকে অনুমতি নেয়” ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি observational astronomy নয়; এটি পৌরাণিক কসমোলজি। এপোলোজিস্টরা ইচ্ছাকৃতভাবে এই দুই স্তরকে গুলিয়ে দেয়।
এটি পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞান (Observational Astronomy) নয়, বরং সপ্তম শতাব্দীর আরব্য জনপদের আদিম ও ভুল পৌরাণিক কসমোলজি (Mythological Cosmology)।
জুলকারনাইনের “দৃষ্টিভঙ্গি” ব্যাখ্যা: খণ্ডিত ধ্রুপদী পাঠের উদ্ধারকবচ
সূরা কাহফে জুলকারনাইন “সূর্যাস্তের স্থানে” পৌঁছে সূর্যকে পঙ্কিল বা কর্দমাক্ত জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখেন—এই বর্ণনাকে বাঁচাতে এপোলোজিস্টরা বলেন, এটি নাকি তার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি; সমুদ্রতীরে দাঁড়ালে যেমন সূর্যকে পানিতে ডুবতে দেখা যায়, তেমনই তিনি দেখেছিলেন। এই perceptual ব্যাখ্যা ধ্রুপদী তাফসিরেও পাওয়া যায়; ইবনে কাসীরও বলেন, জুলকারনাইন সূর্যকে নিজের দৃষ্টিতে সমুদ্রে অস্ত যেতে দেখেছিলেন, যেমন উপকূলে দাঁড়ানো মানুষ দেখে, অথচ সূর্য তার কক্ষপথ ছাড়ে না। আধুনিক IslamQA-ও ঠিক এই প্রতিরক্ষাই ব্যবহার করেছে—আয়াতটি নাকি বাস্তব অবস্থান নয়, জুলকারনাইনের চোখে দিগন্তে দেখা দৃশ্যের বর্ণনা। কিন্তু সংশয়ের ইসলাম আর্কাইভে সংরক্ষিত কুরতুবীর তাফসীরে একই কাহিনির প্রাচীন ভৌগোলিক কাঠামো আরও স্পষ্ট: ইবন ইসহাকের বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, জুলকারনাইন পূর্ব ও পশ্চিমের এমন চূড়ান্ত প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন, যার পরে আর কোনো সৃষ্টির বসতি ছিল না [37]। অর্থাৎ ধ্রুপদী ঐতিহ্যের ভেতরেই কাহিনিটি শুধু একটি সাধারণ seaside sunset নয়; পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিম প্রান্তে পৌঁছানোর একটি বাস্তব ভৌগোলিক narrative হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে। [38]। কিন্তু এটি আসলে এপোলোজিস্টদের কারচুপি: তারা একটি প্রসঙ্গহীন দৃষ্টিগত ব্যাখ্যাকে পুরো আয়াতের ভৌগোলিক-কসমোলজিক্যাল সমস্যার পূর্ণ উদ্ধারকবচ বানাতে চায়। আয়াতের কাঠামো কেবল “সে সূর্যাস্ত দেখল” নয়। প্রথমে বলা হচ্ছে, তাকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব ও উপায়-উপকরণ দেওয়া হয়েছে; তারপর সে একটি পথ ধরে; তারপর সে সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছে; সেখানে সূর্যকে পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখে; এবং একই জায়গায় একটি জাতির দেখা পায়। এরপর আবার সে আরেক পথ ধরে সূর্যোদয়ের স্থানে পৌঁছে এমন এক জাতির দেখা পায়, যাদের জন্য সূর্যের তাপ থেকে কোনো আড়াল নেই। এটি নিছক সমুদ্রসৈকতের sunset description নয়; এটি প্রাচীন ভূগোল ও কসমোলজির গল্পকাঠামোই।
“সে দেখল” বললেই বর্ণনাটি optical illusion হয়ে যায় না। এখানে আরবি শব্দটি হলো وَجَدَهَا—অর্থাৎ “সে তা পেল/দেখল/আবিষ্কার করল”; কিন্তু শব্দটির একক অভিধানগত অর্থের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো পুরো বাক্যগঠন। আয়াতটি শুধু বলেনি, “তার মনে হলো সূর্য ডুবছে”; বরং বলেছে, সে সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছল, সেখানে সূর্যকে পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যেতে পেল, এবং সেই স্থানেই একটি জাতির দেখা পেল। তারপর পরবর্তী অংশে সে আবার সূর্যোদয়ের স্থানে পৌঁছে আরেক জাতির বর্ণনা পায়। অর্থাৎ সূর্যাস্ত, সূর্যোদয়, স্থান, সফরপথ এবং জাতি—সব একসঙ্গে একটি ভৌগোলিক narrative frame-এর ভেতরে এসেছে। ধ্রুপদী perceptual reading “দেখার ধরন” নিয়ে কথা বলে; কিন্তু এই ভৌগোলিক কাঠামোকে ধ্বংস করে না। এপোলোজিস্টরা টেক্সটের এই কাঠামো কেটে ফেলে শুধু “দেখল” শব্দে ঝুলে থাকে। এটি সৎ পাঠ নয়; এটি বিচ্ছিন্ন শব্দ ধরে পুরো বর্ণনাকে পাল্টে দেওয়ার কারচুপি।
আরও বড় সমস্যা হলো, বর্ণনাকারী এখানে কোনো অজ্ঞ মরুভূমিবাসী পর্যটক নন; ধর্মীয় দাবিতে এটি সর্বজ্ঞ আল্লাহর বর্ণিত ঘটনা। যদি উদ্দেশ্য কেবল “দিগন্তে সূর্যকে পানিতে ডুবতে দেখা”—এই সাধারণ দৃশ্য বোঝানো হতো, তাহলে আয়াতের “সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছানো”, “সেখানে জাতি পাওয়া”, পরে “সূর্যোদয়ের স্থানে পৌঁছানো”—এই পুরো ভৌগোলিক বিন্যাস অপ্রয়োজনীয় হয়ে যেত। তাই ইবনে কাসীরের দৃষ্টিগত ব্যাখ্যাকে সামনে এনে আয়াতের পূর্ণ কসমোলজিক্যাল সমস্যা ঢেকে দেওয়া স্রেফ প্রসঙ্গ-চুরি। এপোলোজিস্টরা একটি সীমিত তাফসিরকে ব্যবহার করে আয়াতের ভেতরের প্রাচীন প্রান্তিক-ভূগোল ও সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের স্থানগত কাঠামো মুছে ফেলতে চায়। এটাই তাদের কারচুপি: ধ্রুপদী তাফসীরকারকদের ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টাকে পূর্ণ সমাধান বানানো।
এই দাবিটি কেবল একটি কুযুক্তিই নয়, বরং কোরআনের টেক্সটকে সরাসরি বিকৃত করার সামিল। এর খণ্ডন নিচে দেওয়া হলো:
সুতরাং, একে জুলকারনাইনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টাটি হলো একটি পোস্ট-হক জাস্টিফিকেশন। আসলে, এই এড হক ব্যাখ্যাগুলো কেবল তখনই তৈরি করা হয়েছে, যখন মানুষ জানতে পেরেছে যে পৃথিবী গোল এবং সূর্য কোনো জলাশয়ে ডুবে যায় না।
“জুলকারনাইন কেবল নিজের চোখে সূর্যকে ডুবতে দেখেছিলেন (দৃষ্টিভ্রম), আল্লাহ এখানে বৈজ্ঞানিক সত্য বলছেন না।”
আগের আয়াতে (১৮:৮৪-৮৫) আল্লাহ বলছেন—”আমিই তাকে সামর্থ্য দিয়েছি”। পুরো বর্ণনাটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বস্তুনিষ্ঠ (Objective) বর্ণনা হিসেবে উপস্থাপিত, কোনো ব্যক্তির দৃষ্টিভ্রম হিসেবে নয়।
“বিজ্ঞান না জানা নিন্দনীয় নয়” – আসল প্রশ্ন থেকে পালানো
যখন পুরনো আলেমরা কোরআন-হাদিসের প্রকাশ্য অর্থ ধরে পৃথিবী স্থির এবং সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে বলেছেন, তখন আধুনিক এপোলোজিস্টরা আরেকটি আবেগী রক্ষাকবচ ব্যবহার করে: বিজ্ঞান না জানা নিন্দনীয় নয়। এই কথা সত্য হলেও আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক। প্রশ্নটি কোনো আলেম নৈতিকভাবে দোষী কি না—তা নয়। প্রশ্নটি হলো, তার দাবিটি সত্য না মিথ্যা। কেউ অজ্ঞতার কারণে ভুল বললে তার অজ্ঞতা ব্যাখ্যা হতে পারে, কিন্তু ভুল বক্তব্যকে সত্য বানায় না। পৃথিবী স্থির এবং সূর্য তার চারদিকে ঘুরে দিন-রাত তৈরি করে—এই দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে মিথ্যা। যিনি বলুন, যে উদ্দেশ্যে বলুন, যে যুগে বলুন—দাবিটি মিথ্যা। এবং ধর্মীয় আলেমগণ যখন এরকম কথা বলেন, সাধারণ মানুষের ওপর এগুলো প্রভাব ফেলে, তা সহজেই বোঝা যায়।
এই আবেগী যুক্তির আসল কাজ হলো truth claim থেকে sympathy claim-এ আলোচনা সরিয়ে দেওয়া। যখন বলা হয় “আলেমরা বিজ্ঞান জানতেন না”—তখন আসলে স্বীকার করা হয় যে তাদের ব্যাখ্যা বিজ্ঞানসম্মত ছিল না। কিন্তু এরপরও তাদের ব্যাখ্যাকে টেক্সটের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে রেখে দেওয়া হয়। এটি দ্বিমুখী খেলা। একদিকে বলা হয়, বিজ্ঞান জানলে তারা অন্য ব্যাখ্যা নিতেন; অন্যদিকে বলা হয়, তাদের আক্ষরিক ব্যাখ্যাও ভাষাগতভাবে সম্ভব। তাহলে স্পষ্ট প্রশ্ন দাঁড়ায়: যদি ধর্মগ্রন্থ সত্যিই সর্বজ্ঞ উৎস থেকে আসত, তবে তার স্বাভাবিক পাঠ কেন বারবার অজ্ঞ যুগের ভুল কসমোলজির সঙ্গে মিলে যায়, আর বিজ্ঞান আবিষ্কারের পরে কেন নতুন ব্যাখ্যার দরকার পড়ে? এই প্রশ্নের উত্তর এপোলোজিস্টদের কাছে নেই।
চূড়ান্ত সমস্যা: একই টেক্সটকে একই সঙ্গে আক্ষরিক ও রূপক বানানো যায় না
এপোলোজিস্টদের পুরো প্রতিরক্ষার সবচেয়ে বড় ভাঙন হলো, তারা একই টেক্সটকে সুবিধামতো আক্ষরিক ও রূপক বানায়। সূর্য চলমান—আক্ষরিক। সূর্য আরশের নিচে যায়—গায়েবি। সূর্য সিজদা করে—রূপক। সূর্য অনুমতি চায়—প্রাকৃতিক নিয়ম। সূর্য ফিরে আসে—মহাজাগতিক শৃঙ্খলা। সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠবে—কিয়ামতের অলৌকিক ঘটনা। জুলকারনাইন সূর্যকে জলাশয়ে ডুবতে দেখল—দৃষ্টিভ্রম। “সূর্যাস্তের স্থান” ও “সূর্যোদয়ের স্থান”—মানুষের ভাষা। এভাবে একেক বাক্যে একেক নিয়ম বসালে কোনো টেক্সটই আর ভুল হতে পারে না। কিন্তু যে দাবিকে ভুল প্রমাণ করার কোনো পথ নেই, সে দাবি জ্ঞান নয়—বিশ্বাসের দুর্গে লুকানো অনুমান।
সৎ ব্যাখ্যার নিয়ম হলো, টেক্সটের ভাষা, প্রসঙ্গ, প্রাচীন ব্যাখ্যা, সংযুক্ত হাদিস, এবং বাস্তবতার সঙ্গে তার সম্পর্ক একসঙ্গে বিচার করা। এই মানদণ্ডে সূর্য-সংক্রান্ত কোরআন-হাদিসি বর্ণনাগুলো পরিষ্কারভাবে প্রাচীন পৃথিবীকেন্দ্রিক ও আকাশস্তরভিত্তিক কসমোলজির ভাষা বহন করে। আধুনিক বিজ্ঞান জানার পরে এগুলোকে reference frame, quantum mechanics, optical illusion, আরশের সর্ববেষ্টন, কিংবা ভাষাতাত্ত্বিক সম্ভাবনার আড়ালে ঢেকে রাখা সত্য অনুসন্ধান নয়; এটি ধর্মীয় টেক্সটকে ভুল প্রমাণিত হওয়া থেকে বাঁচানোর কৃত্রিম ব্যবস্থা। এমন ব্যাখ্যা যত বেশি লাগে, টেক্সটের স্বচ্ছতা তত কমে। আর যে টেক্সটকে বাঁচাতে প্রতিটি বাক্যে নতুন অজুহা লাগাতে হয়, সেটি অলৌকিক জ্ঞান নয়; সেটি প্রাচীন ভুল ধারণাকে আধুনিক বিজ্ঞানের রঙে রাঙানোর ব্যর্থ চেষ্টা।
উপসংহার: প্রাচীন কসমোলজি বনাম মহাজাগতিক বাস্তবতা
মহাকাশবিজ্ঞান ও আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের অকাট্য প্রমাণের সামনে দাঁড়িয়ে কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত সূর্যের ‘সেজদা করা’ কিংবা ‘পঙ্কিল জলাশয়ে ডুবে যাওয়া’র আখ্যানগুলো স্রেফ এক সুদূর অতীতের ভ্রান্ত বিশ্ব-চেতনার স্বাক্ষর হিসেবেই প্রতীয়মান হয়। পৃথিবী গোলাকার এবং সূর্যকে কেন্দ্র করে এর আবর্তনের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর, প্রাচীন এই কসমোলজিকে আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করা আজ যে কোনো যুক্তিমনস্ক মানুষের জন্য অসম্ভব। যখনই এই অস্পষ্ট এবং অবৈজ্ঞানিক বর্ণনাগুলোকে বাঁচাতে ধর্মতাত্ত্বিকরা ‘রূপক’ বা ‘ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা’র দোহাই দিয়ে ‘এড হক’ ব্যাখ্যার আশ্রয় নেন, তখন তারা মূলত বিজ্ঞানের কাছে ধর্মের পরাজয়কেই পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেন।
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামিক টেক্সটে সূর্যের যে গতিপথ ও আচরণের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা কোনো সর্বজনীন ঐশী সত্য নয়; বরং সপ্তম শতাব্দীর আরব্য জনপদে প্রচলিত ‘সমতল পৃথিবী’ এবং ‘স্তরভিত্তিক আসমান’ সংক্রান্ত ভুল ধারণারই একটি সংকলন। সূর্যকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে উদয় হতে দেখা কিংবা কর্দমাক্ত জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখা—এই বর্ণনাগুলো সেই যুগের সীমিত ভৌগোলিক জ্ঞানের অনিবার্য ফসল। আজকের দিনে এই বর্ণনার অসারতা ঢাকতে ‘মুভিং দ্য গোলপোস্ট’ বা শব্দের অর্থ নিয়ে কারচুপি করা কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক অসততাই নয়, বরং মানুষের প্রগতিশীল চিন্তাকে কুসংস্কারের শেকলে বেঁধে ফেলার একটি অপপ্রয়াস মাত্র। বিজ্ঞান আমাদের শিখিয়েছে যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কোনো অতিপ্রাকৃত আরশের নিচে সিজদা করে চলে না, বরং তা চলে পদার্থবিজ্ঞানের নিখুঁত ও অমোঘ গাণিতিক নিয়মে। সত্য অনুসন্ধানের যাত্রায় তাই প্রাচীন উপকথার চেয়ে যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানকেই অগ্রাধিকার দেওয়া আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক দাবি।
তথ্যসূত্রঃ
- M. J. Geller, “Sumerian Paradise Lost,” UCL Discovery ↩︎
- World History Encyclopedia, “Utu-Shamash: Sumerian God of the Sun and Justice” ↩︎
- American Research Center in Egypt, “Ra, The Creator God of Ancient Egypt” ↩︎
- Eton College Collections, “Gods, snakes and the underworld: Fragment of a scene from the Book of Amduat” ↩︎
- Library of Congress, “Ancient Greek Astronomy and Cosmology” ↩︎
- Astronomy in the Medieval Islamic World: Ptolemy’s Almagest in Arabic tradition ↩︎
- সূরা কাহফ, আয়াত ৮৪-৯০ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৬০৭ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৯৬১ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৯৭২ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৪৩৯ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৪৪০ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৯৬ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৯৮ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৯৯ ↩︎
- সহীহ হাদিসে কুদসি, হাদিসঃ ১৬১ ↩︎
- সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন), হাদিসঃ ৪৮০২ ↩︎
- সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন), হাদিসঃ ৪৮০৩ ↩︎
- সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন), হাদিসঃ ৭৪৩৩ ↩︎
- সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী), হাদিসঃ ২৮৯ ↩︎
- নিকটবর্তী আসমানে আল্লাহ পাক ↩︎
- তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া, সূরা ইয়াসীন ৩৬:৩৮ ↩︎
- তাফসীর আল-কুরতুবী: খণ্ড ১৫ পৃষ্ঠা ২৬-৩০ ↩︎
- তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৫৫–৫৬; সূরা ইয়াসীন ৩৬:৩৮ ↩︎
- Sahih al-Bukhari 3199, Sunnah.com ↩︎
- Sahih Muslim 159a, Sunnah.com ↩︎
- Ma‘arif al-Qur’an, Tafsir of Quran 36:38, Quran.com ↩︎
- ইবনু বাযের ফতোয়া: খণ্ড ২৪, পৃষ্ঠা ২৭১–২৭৫ ↩︎
- IslamQA, “The correct way to describe the sun is that it prostrates beneath the Throne…” ↩︎
- IslamWeb Fatwa 81453, “Sun prostrates under Allah’s throne” ↩︎
- ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম, ঈমান, শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহঃ) ↩︎
- ফতোয়ায়ে আরকানুল ইসলাম, শায়খ মুহাম্মদ বিন সালিহ আল উসাইমীন, পৃষ্ঠা ৩৭, ৩৮, ৩৯ ↩︎
- Busch, Heinonen & Lahti, “Heisenberg’s Uncertainty Principle,” arXiv review. ↩︎
- W. H. Zurek, “Decoherence and the Transition from Quantum to Classical,” review article. ↩︎
- Stanford Encyclopedia of Philosophy, “The Role of Decoherence in Quantum Mechanics.” ↩︎
- তাফসীর ইবনে কাসীর, সূরা ইয়াসীন ৩৬:৩৮ ↩︎
- তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৪৬–৫০ ↩︎
- Tafsir Ibn Kathir on Qur’an 18:86, Quran.com ↩︎
- সূরা কাহফ ১৮:৮৪–৮৫ ↩︎
- সূরা কাহফ ১৮:৮৬ ↩︎
- আয়াত ৯০ ↩︎
- সূরা কাহফ ১৮:৯০ ↩︎


অনেক কিছু জানলাম 💝