
Table of Contents
ভূমিকাঃ আরশের ভূগোল ও ভৌত সীমাবদ্ধতার প্রশ্ন
ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনায় স্রষ্টাকে সাধারণত অসীম, নিরাকার এবং জাগতিক সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু ইসলামের ধ্রুপদী উৎসগুলো—বিশেষ করে হাদিস এবং তাফসির শাস্ত্র—পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সেখানে স্রষ্টা এবং তাঁর সিংহাসন বা আরশকে অত্যন্ত স্থূল এবং ভৌত (Physical) অবয়বে চিত্রিত করা হয়েছে। আরশের বিশালতা, এর ওপর স্রষ্টার উপবেশন, এবং আরোহীর ভারে আরশের ‘মচমচ’ শব্দ করার বিবরণগুলো স্রষ্টাকে মহাজাগতিক ভৌত নিয়মের অধীন করে ফেলে।
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান এবং সাধারণ যুক্তিবিদ্যার আলোকে যখন আমরা এই বর্ণনাগুলো বিশ্লেষণ করি, তখন কয়েকটি মৌলিক বৈজ্ঞানিক অসংগতি সামনে আসে। যদি স্রষ্টা কোনো সিংহাসনে বসেন এবং সেই সিংহাসন আরোহীর ভারে শব্দ করে, তবে সেখানে স্পষ্টতই ভর (Mass), ওজন (Weight) এবং মহাকর্ষীয় বলের (Gravity) উপস্থিতি স্বীকার করে নিতে হয়। এই প্রবন্ধে আমরা ইবনে কাসীরের বর্ণনা এবং সহিহ হাদিসের তথ্যের ভিত্তিতে এটি খতিয়ে দেখব যে, কীভাবে এই প্রাচীন কসমোলজি স্রষ্টাকে একটি নির্দিষ্ট আয়তন এবং ওজনের ফ্রেমে বন্দি করে ফেলেছে, যা তাঁর ‘অসীম’ হওয়ার দাবির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
আরোহীর ভারে আরশের ‘মচমচানি’: মধ্যাকর্ষণ ও ভৌত ওজনের অস্তিত্ব
আল্লামা ইবনে কাসীরের ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থে বর্ণিত হাদিসটি স্রষ্টার ভৌত অস্তিত্বের এক বিস্ময়কর দাবি উত্থাপন করে। সেখানে বলা হয়েছে, আরশ তার আরোহীর ভারে সেভাবে ‘মচমচ’ (Ateet) শব্দ করে, যেভাবে নতুন জিনের ওপর আরোহী বসলে উটের পিঠ থেকে শব্দ নির্গত হয়। অথবা গ্রামে আমাদের বাড়ির টিনের চাল যেভাবে মচমচ করতো [1]। এই বর্ণনাটি স্রষ্টাকে একটি সুনির্দিষ্ট ভৌত সত্তা হিসেবে হাজির করে।
অর্থাৎ- “আকাশ ও পৃথিবীর মাঝের দূরত্ব কতটুকু তা কি তোমরা জান? তাঁরা বলল, আমরা তো জানি না। তিনি বললেন, উভয়ের মাঝে একাত্তর কিংবা বাহাত্তর কিংবা তিহাত্তর বছরের দূরত্ব।১ অবশিষ্টগুলোর দূরত্ব অনুরূপ।”
ইমাম আবূ দাউদ (র) সাহাবী জুবায়র ইবন মুতইম (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি
বলেছেন: জনৈক বেদুঈন একদা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দরবারে এসে বলল:
يارسول الله جهدت الأنفس وجاعت العيال ونهكت الأموال وهلكت الأنعام. فاستسق الله لنا فانا نستشفع بك على الله و نستشفع بالله عليك .
অর্থাৎ-হে আল্লাহর রাসূল! মানুষগুলো সংকটে পড়ে গেছে, পরিবার-পরিজন অনাহারে দিনপাত করছে এবং ধন-সম্পদ ও গবাদি পশুগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। অতএব, আপনি আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য বৃষ্টির দু’আ করুন। আমরা আপনার উসিলা দিয়ে আল্লাহর নিকট এবং আল্লাহর উসিলা দিয়ে আপনার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : ويحك أتدرى ما تقول ধিক তোমাকে, তুমি কি বুঝতে পারছো, কী বলছ! এই বলে রাসূলুল্লাহ (সা) অনবরত আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করতে থাকেন। এমনকি সাহাবীগণের মুখমণ্ডলে তার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তারপর তিনি বললেন:
ويحك انه لا يستشفع بالله علي احد من خلفه شان الله اعظم من ذالك ويحك اتدرى ما الله ان عرشه على سموته هكذا .
অর্থাৎ-ধিক তোমাকে! আল্লাহর উসিলা দিয়ে তাঁর সৃষ্টির কারো সাহায্য প্রার্থনা করা চলে না। আল্লাহর শান তার অনেক ঊর্ধ্বে। ধিক তোমাকে! তোমার কি জানা আছে যে, আল্লাহর আরশ তার আকাশসমূহের উপরে এভাবে আছে। এ বলে তিনি তাঁর অঙ্গুলিসমূহের দ্বারা ইশারা করে গম্বুজের মত করে দেখান। তারপর বললেন:
وانه لينط به أطيط الرحل بالراكب.
অর্থাৎ-বাহন তার আরোহীর ভারে যেমন মচমচ করে উঠে আরশও তেমনি মচমচ করে উঠে। ইবন বাশার (র)-এর বর্ণনায় রয়েছে: ان الله فوق عرشه والعرش فوق سموته.
অর্থাৎ-আল্লাহ আছেন তাঁর আরশের উপর আর আরশ আছে তাঁর আকাশসমূহের উপর।
হাফিজ আবুল কাসিম ইব্ন আসাকির দামেশকী (র) এ হাদীসের বিরুদ্ধে “বায়ানুল ওহমি ওয়াত তাখলীতিল ওয়াকিয়ি ফী হাদীসিল আতীত” নামক একটি স্বতন্ত্র পুস্তিকা রচনা করেছেন

নিচে এই বর্ণনার বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক অসংগতিগুলো একটি ‘ফিজিক্স অ্যানালাইসিস’ কার্ডে তুলে ধরা হলো:
পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী, কোনো বস্তু তখনই মচমচ শব্দ বা যান্ত্রিক চাপ তৈরি করে যখন তার ওপর ওজন (W) কাজ করে। আমরা জানি W = m × g, যেখানে m হলো ভর এবং g হলো অভিকর্ষজ ত্বরণ। যদি আরশ আল্লাহর ভারে শব্দ করে, তবে প্রমাণিত হয় যে আরশের ওপর আল্লাহর একটি নির্দিষ্ট ‘ওজন’ রয়েছে এবং সেখানে মহাকর্ষীয় বল কার্যকর হচ্ছে।
Classical Mechanics‘মচমচ’ শব্দ হওয়া তখনই সম্ভব যখন দুটি কঠিন পদার্থের মধ্যে ঘর্ষণ বা যান্ত্রিক বিকৃতি (Deformation) ঘটে। যদি আরশ শব্দ করে, তবে আরশ এমন কোনো পদার্থ দিয়ে তৈরি যার নির্দিষ্ট স্থিতিস্থাপকতা বা ‘Elasticity’ আছে। এটি স্রষ্টাকে একটি ভৌত কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করে, যা বস্তুর সাধারণ ভৌত ধর্মের অনুসারী।
Materials Scienceযিনি অসীম এবং মহাবিশ্বের স্রষ্টা, তাঁর একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বসে ওজন তৈরি করা এবং নিচের বস্তুকে সংকুচিত করা যুক্তিবিরোধী। এটি স্রষ্টাকে মহাবিশ্বের বাইরের কোনো সত্তা নয়, বরং মহাবিশ্বের ভৌত নিয়মের (ওজন, চাপ, শব্দ) অধীন একটি সসীম বা সীমিত সত্তায় রূপান্তর করে।
Logical Contradictionবিশালাকার ফেরেশতা ও বহনের আবশ্যকতাঃ মহাশূন্যে ওজনের জটিলতা
ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহর আরশ বর্তমানে আটজন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিশালাকার ফেরেশতা বহন করছেন। আবু দাউদে বর্ণিত সহিহ হাদিস থেকে জানা যায়, এই ফেরেশতাদের একজনের কানের লতি থেকে কাঁধের দূরত্বই হলো সাতশ বছরের পথ। এই অতিপ্রাকৃত বিশালত্ব প্রমাণ করে যে, তারা যে সত্তা বা সিংহাসনটি বহন করছেন, তার ভর (Mass) এবং ওজন (Weight) সাধারণ কোনো গাণিতিক হিসাবের ঊর্ধ্বে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক মানদণ্ডে এই ‘বহন করা’র ধারণাটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে। [2] [3]-
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৯. জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায় সম্পর্কে
৪৭২৭। জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে সকল ফিরিশতা আল্লাহর আরশ বহন করেন,তাদের একজনের সঙ্গে আলাপ করার জন্য আমাকে অনুমতি দেয়া হয়েছিল। তার কানের লতি থেকে কাঁধ পর্যন্ত স্থানের দূরত্ব হলো সাতশ বছরের দূরত্বের সমান।[1]
সহীহ।
[1]. তাবারানী।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

নিচে এই বিষয় সম্পর্কিত যৌক্তিক পয়েন্টগুলো একটি ‘কসমিক মেকানিক্স’ কার্ডে দেওয়া হলো:
‘বহন করা’ বা ‘লটকে থাকা’র ধারণাটি কেবল তখনই প্রাসঙ্গিক যখন কোনো মহাকর্ষীয় ফিল্ড বা গ্র্যাভিটি কাজ করে। মহাশূন্যের যেখানে কোনো গ্রহ বা নক্ষত্রের টান নেই, সেখানে সব বস্তু ওজনহীনভাবে ভাসতে থাকে। যদি আরশকে বহন করার জন্য আটজন বিশালাকার ফেরেশতার প্রয়োজন হয়, তবে প্রমাণিত হয় যে আরশ কোনো শক্তিশালী মহাকর্ষীয় কেন্দ্রের দিকে পড়ে যাচ্ছে এবং ফেরেশতারা তাকে টেনে ধরে রেখেছেন। এই চিত্রটি স্রষ্টাকে মহাবিশ্বের ভৌত ডাইনামিকসের একটি অংশ বানিয়ে ফেলে।
Gravitational Physicsসাতশ বছরের দূরত্বের সমান শক্তিশালী কাঁধ কেবল তখনই প্রয়োজন, যখন আরোহীর ওজন অত্যন্ত বিপুল হয়। যদি স্রষ্টা নিরাকার বা ওজনহীন হতেন, তবে এই বিশালাকার শারীরিক শক্তির প্রদর্শন অবান্তর। ফেরেশতাদের এই শারীরিক সক্ষমতার বর্ণনা প্রকারান্তরে স্রষ্টার একটি ‘প্রকাণ্ড ভৌত ওজন’ থাকার বিষয়টিকে নিশ্চিত করে, যা আধুনিক আধ্যাত্মিক দর্শনের (যখানে স্রষ্টা স্থান-কালের ঊর্ধ্বে) সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
Mechanical Stress & Massযিনি মহাবিশ্বের প্রতিটি কণিকাকে তাঁর হুকুমের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁর নিজের ওজন ধরে রাখার জন্য কেন ফেরেশতাদের শারীরিক শ্রমের ওপর নির্ভর করতে হবে? এই কসমোলজি স্রষ্টাকে একজন ‘সার্বভৌম অধিপতি’র চেয়ে একজন ‘ভৌত আরোহী’ হিসেবে বেশি চিত্রিত করে, যিনি তাঁর সিংহাসন ধরে রাখার জন্য অন্যের শক্তির ওপর নির্ভরশীল।
Logical Consistencyআবেগ ও কম্পনঃ আরশ কি কোনো সচেতন সত্তা?
ইসলামি পুরাণকথার অন্যতম বিস্ময়কর দাবি হলো—নির্জীব বস্তুও মাঝে মাঝে মানবিক আবেগ প্রদর্শন করে। সহিহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী, নবী মুহাম্মদের বিশিষ্ট সাহাবী সা’দ ইবনু মু’আযের মৃত্যুতে স্বয়ং আল্লাহর আরশ ‘কেঁপে’ উঠেছিল [4]
সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছদঃ ২১২২. স্বাদ ইবন মু’আয (রাঃ) এর মর্যাদা
৩৫৩১। মুহাম্মদ ইবনু মূসান্না (রহঃ) … জাবির (রাঃ) বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি সা’দ ইবনু মু’আয (রাঃ) এর মৃত্যুতে আল্লাহ্ ত’আলার আরশ কেঁপে উঠে ছিল। আমাশ (রহঃ) … নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যাক্তি জাবির (রাঃ) কে বলল, বারা ইবনু আযিব (রাঃ) তো বলেন, জানাযার খাট নড়েছিল। তদুত্তরে জাবির (রাঃ) বললেন, সা’দ ও বারা (রাঃ) এর গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কিছুটা বিরোধ ছিল, (কিন্তু এটা ঠিক নয়) কেননা, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে عَرْشُ الرَّحْمَنِ অর্থাৎ আল্লাহর আরশ সা’দ ইবনু মু’আযের (মৃত্যুতে) কেঁপে উঠল বলতে শুনেছি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই কম্পন কেবল কোনো ভৌত নড়াচড়া নয়, বরং এটি ছিল শোক বা আনন্দের এক অতিপ্রাকৃত বহিঃপ্রকাশ। এই বর্ণনাটি আরশকে কেবল একটি জড় সিংহাসন হিসেবে নয়, বরং একটি ‘সচেতন যন্ত্র’ বা ‘সত্তা’ হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে এই অলৌকিক দাবির পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর কিছু যৌক্তিক সংকট। আর যদি আরশ না হয়ে খোদ আল্লাহই কেঁপে উঠে থাকেন, তাহলে সমস্যাগুলো আরও জটিল রূপ ধারণ করে। নিচে এই বিষয় সম্পর্কিত যৌক্তিক পয়েন্টগুলো একটি ‘থিওলজিক্যাল ও লজিক্যাল অ্যানালাইসিস’ কার্ডে দেওয়া হলো:
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনা এবং কার মৃত্যু কখন হবে—তা সৃষ্টির শুরুতেই ‘লাওহে মাহফুজে’ লিখে রাখা হয়েছে। সা’দ ইবনু মু’আযের মৃত্যু আল্লাহর কাছে কোনো আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছিল না। তাহলে কেন তাঁর মৃত্যুতে আরশকে কেঁপে উঠতে হবে? কম্পন সাধারণত শোক বা উত্তেজনার মতো আকস্মিক প্রতিক্রিয়ার ফল। এটি স্রষ্টার ‘পূর্বজ্ঞান’ (Omniscience) এবং ‘নিস্পৃহতা’র ধারণার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
Determinism Paradoxএকটি সিংহাসন বা চেয়ারের আবেগ থাকা—এটি মূলত আদিম মানুষের ‘অ্যানিমিজম’ বা ‘সর্বপ্রাণবাদ’ বিশ্বাসের একটি ধ্বংসাবশেষ। প্রাচীনকালে মানুষ মনে করত পাহাড়, নদী বা আসবাবপত্রেরও প্রাণ আছে এবং তারা মানুষের সুখে-দুখে সাড়া দেয়। আরশ কেঁপে ওঠার এই দাবিটি সেই আদিম কুসংস্কারেরই একটি পরিশীলিত ধর্মীয় সংস্করণ, যা আধুনিক বিজ্ঞানের জড় পদার্থের ধর্মের (Laws of Inertia) পরিপন্থী।
Animistic Residueযেকোনো কম্পনের জন্য শক্তির (Energy) প্রয়োজন এবং কম্পন মানেই হলো বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তন। যদি আরশ কাঁপে, তবে সেই কম্পন আরোহী বা আল্লাহর ওপরেও প্রভাব ফেলার কথা। আরোহী নড়ে উঠলে সিংহাসন যেমন শব্দ করে, তেমনি আরশ কেঁপে উঠলে তা আল্লাহর অবস্থানকেও অস্থিতিশীল করার কথা। এই বর্ণনাটি প্রকারান্তরে স্রষ্টাকে একটি ভৌত শরীরের ফ্রেমে বন্দি করে, যার অবস্থান নড়বড়ে হতে পারে।
Mechanical Inconsistencyউপসংহার: প্রাক-আধুনিক কসমোলজি বনাম পরম সত্তার অসীমত্ব
আল্লামা ইবনে কাসীরের বর্ণনা এবং সহিহ হাদিসগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে এটি স্পষ্ট যে, আরশের ‘মচমচানি’, ‘কম্পন’ কিংবা বিশালাকার ফেরেশতাদের মাধ্যমে ‘বহন করার’ এই ধারণাগুলো একটি সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক জ্ঞান-কাঠামোর ফসল। প্রাচীন মানুষ যখন ক্ষমতার কথা ভাবত, তখন তাদের সামনে রাজকীয় সিংহাসন, তার আরোহী এবং দেহরক্ষী বা বাহকদের ছবি ভেসে উঠত। এই জাগতিক রাজকীয় আড়ম্বরকেই যখন স্রষ্টার ওপর আরোপ করা হয়েছে, তখন স্রষ্টা তাঁর ‘অসীম’ এবং ‘নিরাকার’ বৈশিষ্ট্য হারিয়ে একটি ভৌত ও সসীম সত্তায় পরিণত হয়েছেন।
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মানদণ্ডে ওজনের অস্তিত্ব মানেই হলো সেখানে মহাকর্ষীয় বলের উপস্থিতি। যদি আরশ মচমচ করে তবে সেখানে ঘর্ষণ আছে; যদি আরশ কাঁপে তবে সেখানে যান্ত্রিক শক্তি ও জড়তার (Inertia) নিয়ম কাজ করছে। এই ভৌত ধর্মগুলো কোনো অসীম ও চিরন্তন সত্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রকৃতপক্ষে, এই বর্ণনাগুলো স্রষ্টাকে মহাবিশ্বের বাইরের কোনো পরম শক্তি হিসেবে নয়, বরং মহাবিশ্বেরই কিছু ভৌত উপাদানের ওপর নির্ভরশীল এক আরোহী হিসেবে চিত্রিত করে। বিজ্ঞানের জয়যাত্রা এবং যৌক্তিক চিন্তার উন্মেষের এই যুগে, এই ধরণের বর্ণনাগুলোকে আক্ষরিক ভূগোল বা ভৌত বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করা কেবল অবৈজ্ঞানিকই নয়, বরং তা পরম সত্তার মহিমাকেই সীমাবদ্ধ করে ফেলে। সত্য অনুসন্ধানের যাত্রায় তাই এই প্রাচীন রূপকগুলোকে বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে যাচাই করা এবং সেগুলোর সীমাবদ্ধতা চিনে নেওয়াই প্রগতিশীল বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মূল দাবি।
মচমচ শব্দ (Ateet) এবং ওজনের ধারণা প্রমাণ করে যে, এই কসমোলজিতে স্রষ্টাকে ভর (Mass) এবং অভিকর্ষের অধীন একটি বস্তুগত সত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যা তাঁর অসীমত্বের দাবির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
বিশালাকার ফেরেশতাদের দ্বারা আরশ বহন করার দৃশ্যকল্পটি মূলত প্রাচীন রাজতন্ত্রের সিংহাসন ও পালকির একটি স্বর্গীয় সংস্করণ মাত্র। এটি কোনো বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা নয়, বরং মানুষের পরিচিত সামাজিক কাঠামোর এক পৌরাণিক অভিক্ষেপ।
সা’দ ইবনু মু’আযের মৃত্যুতে আরশ কেঁপে ওঠার মাধ্যমে যে আবেগীয় প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে, তা স্রষ্টার পূর্বজ্ঞান এবং নিস্পৃহতার থিওলজিক্যাল সংজ্ঞাকে দুর্বল করে ফেলে। জড় বস্তুর এই মানবিক রূপদান মূলত প্রাচীন ‘সর্বপ্রাণবাদ’-এর একটি চিহ্ন।
