চুক্তিহীন কাফেরের জানমাল রক্ষা করা ইসলামে হারাম

ভূমিকা

মানবিকতার চিরন্তন সংজ্ঞায় বিপন্ন মানুষের প্রাণ রক্ষা করা প্রতিটি মানুষের সর্বোচ্চ নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হয়। জাতি, ধর্ম বা বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোকেই আধুনিক সমাজব্যবস্থায় ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ বলে অভিহিত করা হয়। বিশেষ করে দাঙ্গা বা যুদ্ধের মতো অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে যখন নারী বা শিশুদের মতো অরক্ষিত গোষ্ঠী প্রাণভয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তখন তাদের ঘরের দরজা খুলে দেওয়াকে একটি পরম মানবিক কর্তব্য হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু যখন এই মানবিক কর্মকাণ্ডকে কোনো সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় কাঠামোর মাপকাঠিতে বিচার করা হয়, তখন অনেক ক্ষেত্রেই এক গভীর নৈতিক সংকটের সৃষ্টি হয়।

ইসলামি আইনশাস্ত্রের কিছু ধ্রুপদী ব্যাখ্যা এবং তাফসির গ্রন্থ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে সাহায্য ও বন্ধুত্বের পরিধিকে কেবল নিজ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার একটি শক্তিশালী প্রবণতা বিদ্যমান। বিশেষ করে অমুসলিমদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে একজন মুসলমানের অবস্থান কী হবে এবং প্রাণভয়ে ভীত অমুসলিমদের আশ্রয় প্রদান করা বৈধ কি না—এই প্রশ্নটি যখন উত্থাপিত হয়, তখন ইসলামের অনেক আইনি দলিল ‘সর্বজনীন মানবিকতার’ বদলে ‘ধর্মীয় আনুগত্য’ বা ‘আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা’ (বন্ধুত্ব ও বিচ্ছেদ) তত্ত্বকে প্রাধান্য দেয়। এটি কেবল একটি তাত্ত্বিক বিতর্ক নয়, বরং বাস্তব সংকটকালীন মুহূর্তে একজন মুমিনের আচরণগত সিদ্ধান্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।


তাফসীরে মাযহারী ও মাবসুত-এর নিষেধাজ্ঞাঃ আইনি ও আদর্শিক ব্যবচ্ছেদ

ইসলামি আইনশাস্ত্রের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, সাহায্য এবং সহযোগিতার বিষয়টি কেবল মানবিক আবেগের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। ‘তাফসীরে মাযহারী’-র মতো প্রামাণ্য তাফসীর গ্রন্থে সুরা আনফালের আয়াতের ব্যাখ্যায় যে মাসআলা বা আইনি সমাধান দেওয়া হয়েছে, তা বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করেছে বা কাফের, তারা কেবল একে অপরের বন্ধু হতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, মুসলমানদের সঙ্গে অমুসলিমদের এমন কোনো গভীর বন্ধুত্ব বা সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা বৈধ নয়, যা ধর্মীয় সীমান্তের ঊর্ধ্বে গিয়ে কেবল মানবিকতাকে প্রাধান্য দেয় [1]

যাহারা সত্য প্রত্যাখ্যান করিয়াছে তাহারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু, যদি তোমরা উহা না কর তবে দেশে ফিত্না ও মহা বিপর্যয় দেখা দিবে।
যাহারা বিশ্বাস করিয়াছে, দ্বীনের জন্য গৃহত্যাগ করিয়াছে ও আল্লাহের পথে সংগ্রাম করিয়াছে এবং যাহারা আশ্রয় দান করিয়াছে তাহারাই প্রকৃত বিশ্বাসী; তাহাদিগের জন্য ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা রহিয়াছে।
প্রথমোক্ত আয়াতটির মর্মার্থ হচ্ছে- অবিশ্বাসীরা অবিশ্বাসীদেরই বন্ধু।
বিশ্বাসীদের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব হতে পারে না। তাই তাদেরকে সাহায্য করা বিশ্বাসীদের জন্য বৈধ নয়। বিশ্বাসীরা সাহায্য করবে কেবল বিশ্বাসীদেরকে। এ রকম না করলে দেখা দিবে বিপর্যয়।
হজরত উসামা ইবনে জায়েদ থেকে বোখারী, মুসলিম ও সুনান রচয়িতাগণ তাঁদের আপনাপন পুস্তকে লিখেছেন, রসুল স. বলেছেন মুসলমানেরা কাফেরদের উত্তরাধিকারী নয়। কাফেরেরাও নয় মুসলমানদের উত্তরাধিকারী। সুরা নিসার উত্তরাধিকার বিষয়ক আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রসঙ্গটির বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। যথাস্থানে তা দেখে নেয়া যেতে পারে।
মাসআলাঃ মাবসুত গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি কাফের সাম্রাজ্যে কিছু
সংখ্যক কাফের অপর কোনো কাফের জনপদের উপর আক্রমন করে বসে, তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করে, ওই জনপদে বাস করে কিছু সংখ্যক আশ্রিত মুসলমান, তবে হামলাকারীদের প্রতিহত করা মুলমানদের জন্য জায়েয নয়। কিন্তু যদি মুসলমানদের জান-মালের ক্ষতির আশংকা দেখা যায় তবে তাদেরকে প্রতিহত করতে হবে। কারণ শত্রুর মোকাবিলা করার অর্থ- জীবনের ঝুঁকি গ্রহণ করা। আর আল্লাহতায়ালার বাণীকে সমুন্নত করা, ধর্মের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা ও আত্মরক্ষা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে জীবনের ঝুঁকি নেয়া বৈধ নয়। তাই কাফেরদের জান মাল রক্ষার জন্য জীবনের ঝুঁকি নেয়া মুসলমানদের জন্য অবৈধ।

কাফের

এই তাত্ত্বিক অবস্থানের সবচেয়ে চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে যখন যুদ্ধ বা দাঙ্গার মতো পরিস্থিতিতে অমুসলিমদের জীবন রক্ষার প্রশ্নটি সামনে আসে। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান আশ-শায়বানি রচিত ‘আল-মাবসুত’ গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে তাফসীরে মাযহারীতে একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যদি কোনো অমুসলিম শাসিত অঞ্চলে একদল অমুসলিম অন্য কোনো অমুসলিম জনপদের ওপর আক্রমণ করে এবং সেখানে মুসলমানরা সংখ্যালঘু বা আশ্রিত হিসেবে বসবাস করে, তবে সেই আক্রমণকারীদের প্রতিহত করা বা আক্রান্তদের প্রাণ রক্ষা করা মুসলমানদের জন্য জায়েজ নয়। অর্থাৎ, দাঙ্গারত দুই পক্ষই যদি অমুসলিম হয়, তবে একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো নিষ্ক্রিয় থাকা, যতক্ষণ না তার নিজের জান বা মাল হুমকির মুখে পড়ছে

এই বিধানের পেছনে যে যুক্তিটি কাজ করে তা অত্যন্ত কঠোর। ইসলামি শরিয়াহর মতে, জীবনের ঝুঁকি নেওয়া কেবল তিনটি ক্ষেত্রেই বৈধ: এক, আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করা; দুই, ইসলামের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা; এবং তিন, আত্মরক্ষা। এই তিনটি উদ্দেশ্যের বাইরে কেবল একজন অমুসলিমের জীবন বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলাকে ‘অবৈধ’ বা হারাম বলে গণ্য করা হয়েছে। এখানে ‘মানবিকতা’ বা ‘বিপন্ন মানুষের আশ্রয়’ দেওয়ার মতো সর্বজনীন নৈতিক গুণগুলো ধর্মীয় সংজ্ঞার কাছে পরাজিত হয়। ফলে, দাঙ্গার সময় কোনো হিন্দু বা শিখ নারী যদি একজন মুসলমানের কাছে আশ্রয় চায়, তবে সেই মুসলমানের জন্য সেই নারীকে আশ্রয় দিয়ে নিজের জীবনের ঝুঁকি নেওয়া ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে, কারণ এতে কোনো ধর্মীয় স্বার্থ বা ‘কালিমা’ সমুন্নত হওয়ার অবকাশ নেই। এই আইনি কাঠামোটি এটিই প্রমাণ করে যে, ইসলামি ভ্রাতৃত্ব কেবল বিশ্বাসীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং অমুসলিমদের জীবন রক্ষার চেয়ে ধর্মীয় পরিচয় ও আনুগত্যই এখানে মুখ্য।


সম্প্রীতির বুলি বনাম বাস্তবতাঃ সমকালীন ওয়াজ ও আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি

সমসাময়িক বিশ্বব্যবস্থায় যখন বহুত্ববাদ (Pluralism) এবং অসাম্প্রদায়িক সহাবস্থানকে শ্রেষ্ঠ সামাজিক আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তখন অনেক আধুনিক ইসলামি চিন্তাবিদ ও প্রচারক ইউরোপ কিংবা আমেরিকা সফরের সময় দাবি করেন যে, ইসলাম নাকি সব ধর্মের মানুষের মধ্যে গভীর ভ্রাতৃত্ব এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ওপর জোর দেয়। তারা কোরআনের কিছু খণ্ডিত আয়াত উদ্ধৃত করে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, ইসলাম একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু যখন আমরা রক্ষণশীল আলেমদের বক্তব্য এবং ধ্রুপদী শাস্ত্রীয় বিধানগুলো বিশ্লেষণ করি, তখন এই ‘অসাম্প্রদায়িকতার’ দাবিটি কেবল একটি পলিশ করা বয়ান বা ‘অ্যাপোলজেটিক্স’ (Apologetics) হিসেবেই ধরা পড়ে। ইসলামি শরিয়াহর মূলে অমুসলিমদের প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, তা মূলত সহাবস্থানের চেয়ে ‘আদর্শিক দূরত্ব’ বজায় রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।

বাংলাদেশের প্রখ্যাত এবং প্রভাবশালী আলেমদের ওয়াজ ও ফতোয়াগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তারা অমুসলিমদের সাথে ‘আন্তরিক বন্ধুত্ব’ (Internal Friendship) স্থাপনের ঘোর বিরোধী। তাদের মতে, একজন মুসলমান এবং একজন অমুসলিমের মধ্যে সামাজিক লেনদেন বা মানবিক আচরণ হয়তো জায়েজ হতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের গহীন থেকে কোনো অমুসলিমকে বন্ধু বা আপন হিসেবে গ্রহণ করা ইসলামি আকিদার পরিপন্থী। ‘আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা’ (Al-Wala’ wal-Bara’) নামক আকিদাগত তত্ত্বে এটি স্পষ্টভাবে শেখানো হয় যে, একজন মুমিনের ভালোবাসা ও আনুগত্য কেবল আল্লাহর অনুসারীদের জন্যই নিবেদিত থাকবে এবং যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে (কাফের), তাদের প্রতি থাকবে ঘৃণা বা দূরত্ব। এমনকি অনেক জননন্দিত বক্তা তাদের ওয়াজে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন যে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চরিত্রবান অমুসলিম বা কাফেরের চেয়ে একজন পাপী বা ‘চরিত্রহীন’ মুসলিমও অনেক বেশি মর্যাদাবান ও শ্রেষ্ঠ।

এই মানসিকতার শেকড় মূলত ‘তাফসীরে মাযহারী’-র মতো গ্রন্থগুলোর সেই মাসআলায় প্রোথিত, যেখানে অমুসলিমদের একে অপরের বন্ধু হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং মুসলমানদের তাদের থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে [2]। এই শিক্ষাগুলোর প্রভাবে জনমানসে একটি সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি হয়, যেখানে ‘আমরা’ এবং ‘তারা’—এই দুই মেরুতে সমাজকে ভাগ করে দেওয়া হয়। আধুনিক মুমিনরা যখন অসাম্প্রদায়িকতার দাবি করেন, তখন তারা আসলে শাস্ত্রীয় বিধানের এই রূঢ় অংশগুলোকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যখনই কোনো সংকটের সময় অমুসলিমদের পাশে দাঁড়ানোর বা তাদের জীবন রক্ষার প্রশ্ন আসে, তখন এই ‘ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদ’ এবং ‘বন্ধুত্বের নিষেধাজ্ঞা’ মানবিক দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ফলে, একজন অমুসলিমকে কেবল তার মানবিক পরিচয়ে দেখা বা তাকে বিপদে আশ্রয় দেওয়ার মতো সাধারণ নৈতিকতাও তখন ধর্মীয় আইনি বিতর্কের গোলকধাঁধায় আটকে যায়। এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে যে, ইসলামের তাত্ত্বিক কাঠামোতে অমুসলিমদের সাথে পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও মানবিক সংহতির কোনো বাস্তবিক স্থান নেই বললেই চলে। আসুন বাংলাদেশের সবচাইতে প্রখ্যাত কয়েকজন আলেমের বক্তব্য শুনি,

এবারে আসুন আরও দুইটি ওয়াজ শুনে নিই,


বিশ্বাসের মানদণ্ডে মানুষের মর্যাদা ও সম্মানের বিচার

ইসলামি আইনশাস্ত্র ও সমকালীন রক্ষণশীল ওয়াজগুলোর একটি প্রধান স্তম্ভ হলো ‘বিশ্বাসগত শ্রেষ্ঠত্ববাদ’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একজন মানুষের পরম মর্যাদা তার কর্ম, চরিত্র বা মানবিক গুণের ওপর নির্ভর করে না, বরং তার ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে। এই শ্রেষ্ঠত্ববাদের সবচাইতে বিতর্কিত এবং প্রকট প্রকাশ ঘটে যখন দাবি করা হয় যে, “পৃথিবীর সবচাইতে নিকৃষ্ট চরিত্রবান মুসলমানও সবচাইতে ভালো চরিত্রবান কাফের বা অমুসলিমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।” এই ধারণাটি কেবল একটি বিমূর্ত ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থান নয়, বরং এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে অমুসলিমদের প্রতি মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। যখন একজন অমুসলিমকে জন্মগতভাবে বা বিশ্বাসগতভাবে ‘নিকৃষ্ট’ বা ‘অভিশপ্ত’ হিসেবে দেখা হয়, তখন তার জীবন রক্ষার গুরুত্বও ধর্মীয় বিধানের কাছে গৌণ হয়ে পড়ে।

এই মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোটিই মূলত সেই নির্মম বিধানের জন্ম দেয়, যেখানে দাঙ্গা বা যুদ্ধের সময় কোনো অমুসলিমকে আশ্রয় দেওয়া বা তার জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নেওয়াকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করা হয়। ‘তাফসীরে মাযহারী’-তে বর্ণিত যুক্তি অনুযায়ী, একজন মুসলমানের জীবন অত্যন্ত মূল্যবান কারণ সে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী, অন্যদিকে একজন কাফেরের জীবন বা মাল রক্ষা করার কোনো বিশেষ ধর্মীয় উপযোগিতা নেই [1]। ফলে, দাঙ্গার সময় দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা কোনো অমুসলিম জনপদ থেকে যদি কোনো নিরপরাধ নারী বা শিশু প্রাণভিক্ষা চায়, তবে একজন গোঁড়া মুমিন তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার ধর্মীয় বৈধতা খুঁজে পায়। এখানে ‘মানবিক সমবেদনা’ বা ‘বিপন্ন মানুষের আর্তি’ বিশ্বাসের সেই কঠোর দেয়াল ভেদ করতে পারে না।

এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক মানবাধিকারের ধারণাকে পুরোপুরি নাকচ করে দেয়। আধুনিক পৃথিবীতে ‘মানবিক মর্যাদা’ (Human Dignity) হলো একটি ধ্রুব সত্য, যা ধর্ম বা বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে। কিন্তু ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদের চশমায় যখন মানুষকে ‘মুমিন’ এবং ‘কাফের’—এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়, তখন অমুসলিমরা কার্যত ‘দ্বিতীয় শ্রেণির’ জীবে পরিণত হয়। তাদের জান-মালের সুরক্ষা কেবল তখনই মুসলমানদের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়, যখন তারা আনুগত্যের বিনিময়ে কর (জিজিয়া) প্রদান করে বা কোনো চুক্তির অধীন থাকে। কিন্তু সাধারণ পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে যখন দুই পক্ষই অমুসলিম (কাফের), তখন তাদের পারস্পরিক ধ্বংস বা বিপর্যয়কে মুসলমানদের জন্য কোনো উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা হয় না। এই ধরণের শিক্ষা কেবল সমাজকে সাম্প্রদায়িক করে না, বরং মানুষের ভেতরে থাকা সহজাত পরোপকার ও সহমর্মিতার প্রবৃত্তিকেও ধর্মের নামে অবদমিত করে ফেলে।


উপসংহারঃ ধর্মীয় কাঠামোর ঊর্ধ্বে সর্বজনীন মানবিকতার আবশ্যকতা

সারসংক্ষেপে বলা যায়, ইসলামের ধ্রুপদী আইনশাস্ত্র এবং তাফসির গ্রন্থগুলোতে অমুসলিমদের সুরক্ষা ও সহযোগিতার বিষয়ে যে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে, তা আধুনিক মানবিক মূল্যবোধের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। যখন কোনো ধর্মীয় বিধান কেবল বিশ্বাসের পার্থক্যের কারণে বিপন্ন মানুষের জীবন রক্ষা করাকে ‘অবৈধ’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে ঘোষণা করে, তখন সেই আদর্শের সর্বজনীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ‘তাফসীরে মাযহারী’ এবং ‘মাবসুত’-এর মতো গ্রন্থে বর্ণিত মাসআলাগুলো এটিই প্রমাণ করে যে, সেখানে ‘বিপন্ন মানবতা’র চেয়ে ‘ধর্মীয় আনুগত্য’ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দাঙ্গার সময় আশ্রয়প্রার্থী নারীদের রক্ষা না করার বা অমুসলিমদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নিষ্ক্রিয় থাকার এই বিধানগুলো কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং এগুলো একটি সাম্প্রদায়িক ও সংকীর্ণ সমাজব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করে। সমকালীন অনেক আলেম যখন অসাম্প্রদায়িকতার দোহাই দেন, তখন তারা আসলে শাস্ত্রীয় এই রূঢ় বাস্তবতাগুলোকে এড়িয়ে যান। কিন্তু বাস্তব সংকটকালে যখন একজন মুমিন তার ধর্মীয় শিক্ষার মুখোমুখি হয়, তখন এই ‘বৈষম্যমূলক শ্রেষ্ঠত্ববাদ’ তাকে অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি সহমর্মী হতে বাধা দেয়। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মের সমস্যা নয়, বরং যেকোনো আদর্শ যখন মানুষকে ‘আমরা’ এবং ‘তারা’—এই দুই ভাগে ভাগ করে এবং ‘তাদের’ প্রাণ রক্ষার চেয়ে নিজের ‘ঈমানি সুরক্ষা’কে বড় করে দেখে, তখন তা মানবতার জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনে।

একটি শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব গড়ে তুলতে হলে মানুষকে কেবল তার ধর্মীয় পরিচয়ে নয়, বরং তার মানবিক পরিচয়ে মূল্যায়ন করা শিখতে হবে। জীবন রক্ষার মতো মৌলিক নৈতিক দায়িত্বকে যখন কোনো ধর্মীয় শৃঙ্খলে বন্দি করা হয়, তখন তা আর ‘ধর্ম’ থাকে না, বরং তা এক প্রকার ‘বৌদ্ধিক ও নৈতিক জড়তা’য় পরিণত হয়। প্রকৃত সভ্যতার মানদণ্ড হওয়া উচিত বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সেখানে তার কপালে তিলক আছে নাকি মাথায় টুপি—তা হওয়া উচিত একেবারেই গৌণ। ধর্মের নামে অমানবিকতাকে বৈধতা দেওয়ার এই প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে এসে একটি যুক্তিবাদী ও সহমর্মী সমাজ গঠন করাই হোক বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


তথ্যসূত্রঃ
  1. তাফসীরে মাযহারী, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৫ 1 2
  2. তাফসীরে মাযহারী, ৫ ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৫ ↩︎