ইসলামইসলামে নারী

ইসলামে মুতা বিবাহ: হালাল যৌনচুক্তির ইতিহাস ও নৈতিক সংকট

সারসংক্ষেপ

মুতা বা সাময়িক বিবাহ ছিল নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট বিনিময়ের ভিত্তিতে নারী-পুরুষের মধ্যে যৌনসম্পর্কের একটি চুক্তি, যার মেয়াদ শেষ হলে আলাদা তালাক ছাড়াই সম্পর্ক শেষ হয়ে যেত। বর্তমান সুন্নি ইসলামে এই প্রথা সাধারণভাবে হারাম বলে গণ্য হলেও ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুতা বৈধ ছিল—এটি সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিমসহ বহু হাদিসেই স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত। বিভিন্ন বর্ণনায় মুহাম্মদের সাহাবীদের মুতা করার অনুমতি দেওয়া, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নারীদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া এবং বিনিময় হিসেবে কাপড়, খেজুর বা ময়দার মতো সামান্য সম্পদ দেওয়ার বিবরণ পাওয়া যায়। কোনো কোনো বর্ণনায় তিন রাতের নির্দিষ্ট মেয়াদের কথাও সরাসরি এসেছে।

মুতা বৈধ করার পেছনে যে বাস্তব পরিস্থিতি ছিল, হাদিসগুলো সেটিও গোপন করেনি। যুদ্ধ ও দীর্ঘ অভিযানের সময় সাহাবীদের সঙ্গে তাঁদের স্ত্রীরা থাকতেন না; নারীসঙ্গের অভাবে তারা তাদের যৌন চাহিদা ও কষ্টের কথা জানালে মুহাম্মদ প্রথমে খোজা হয়ে যাওয়ার প্রস্তাব নিষিদ্ধ করেন এবং পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নারীদের সঙ্গে বিবাহ বা মুতা করার অনুমতি দেন। ইবনে আব্বাসের বর্ণনাতেও নারীর স্বল্পতা ও প্রয়োজনকে এই অনুমতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ মুতা কোনো পরবর্তী শিয়া উদ্ভাবন নয়; মুহাম্মদের যুগের সামরিক ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেই এর অনুমোদিত চর্চার শক্তিশালী বর্ণনা রয়েছে।

আরও বড় সমস্যা দেখা দেয় মুতা কখন এবং কার মাধ্যমে হারাম হলো, এই প্রশ্নে। একটি বর্ণনায় খায়বারের সময় নিষিদ্ধ হওয়ার কথা বলা হয়েছে, অথচ তার পরবর্তী মক্কা বিজয় এবং আওতাসের সময় আবার মুতা করার অনুমতির বর্ণনা পাওয়া যায়। আবার সহিহ মুসলিমে জাবির ইবন আবদুল্লাহর নামে স্পষ্টভাবে এসেছে যে মুহাম্মদের যুগে, আবু বকরের খেলাফতে এবং উমরের যুগের একটি অংশ পর্যন্ত সাহাবীরা মুতা করতেন; শেষ পর্যন্ত উমর তা নিষিদ্ধ করেন। ফলে “মুহাম্মদ একবার নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং বিষয়টি সেখানেই চিরতরে শেষ হয়ে যায়”—এই সরল বিবরণ হাদিসগুলোর সামগ্রিক চিত্রের সঙ্গে মেলে না। বিভিন্ন বর্ণনায় অনুমতি, নিষেধ, পুনরায় অনুমতি এবং আবার নিষেধ—একাধিক পর্যায় দেখা যায়।

মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার প্রশ্নে সাহাবীদের মধ্যেও একরূপ অবস্থান ছিল না। ইবনে আব্বাস দীর্ঘ সময় এর বৈধতার পক্ষে ফতোয়া দিয়েছেন এবং তাঁর এই অবস্থানের কারণে ইবনে যুবায়ের তাঁকে প্রকাশ্যে আক্রমণ ও রজমের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন। অন্যদিকে উমর তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন এবং মুতা করলে রজমের হুমকি দেন। মুয়াত্তা মালিকের একটি বর্ণনায় উমরের নিজের বক্তব্য থেকেই দেখা যায়, তিনি বলেন—আগে থেকে ঘোষণা করা থাকলে মুতা করা ব্যক্তিকে রজম করতেন। এইসব বর্ণনা নিষেধাজ্ঞাটি মুহাম্মদের জীবদ্দশাতেই সর্বজনবিদিত ও নির্বিবাদ চূড়ান্ত বিধান হয়ে গিয়েছিল কি না—সে প্রশ্নকে আরও জটিল করে তোলে।

কোরআনের সূরা নিসা ৪:২৪-ও এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। আয়াতের “فَمَا اسْتَمْتَعْتُمْ بِهِ مِنْهُنَّ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ” অংশকে প্রাথমিক যুগের একাধিক মুফাসসির মুতা বিবাহের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ইবনে কাসীরসহ সুন্নি তাফসিরেও স্বীকার করা হয়েছে যে ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুতা বৈধ ছিল। মওদুদিও সরাসরি বলেছেন, মুতা কোরআনের কোনো সুস্পষ্ট ঘোষণার মাধ্যমে হারাম হয়নি; বরং তাঁর মতে সুন্নাহর মাধ্যমে নিষিদ্ধ হয়েছে। এর ফলে আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়ায়—কোরআনের একটি আয়াতের সঙ্গে যে প্রথার বৈধতার সম্পর্ক প্রাথমিক তাফসিরে পাওয়া যায়, সেটির নিষেধাজ্ঞা পরে কোন কর্তৃত্বে এবং কোন পর্যায়ে চূড়ান্ত হলো?

এই প্রবন্ধে আরও দেখানো হয়েছে, “মুতা” শব্দটি কখনো হজের তামাত্তু এবং কখনো সাময়িক বিবাহ—দুই অর্থেই ব্যবহৃত হওয়ায় কিছু বাংলা অনুবাদে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট হাদিসগুলোর পূর্ণ প্রসঙ্গ পড়লে বহু ক্ষেত্রে নারী, বিবাহ, নির্দিষ্ট সময়, বিনিময় এবং রজমের হুমকি সরাসরি উপস্থিত; ফলে সেগুলোকে শুধু তামাত্তু হজ হিসেবে অনুবাদ করলে বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশই বিকৃত হয়ে যায়।

সবশেষে প্রবন্ধটির নৈতিক প্রশ্নটি আরও মৌলিক। যে কাজটি বর্তমান সুন্নি সমাজের অধিকাংশই হারাম, অশোভন বা অনৈতিক বলে মনে করে, সেই একই কাজ ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুহাম্মদের অনুমোদনে তাঁর সাহাবীরা করেছেন—এবং তা সহিহ হাদিসেই সংরক্ষিত। যদি কোনো কাজ এক সময়ে আল্লাহ ও মুহাম্মদের অনুমোদনে বৈধ এবং পরে একই কাজ হারাম হয়ে যায়, তাহলে ধর্মীয় নৈতিকতার তথাকথিত অপরিবর্তনীয় বা অবজেক্টিভ চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। আর যদি আজ মুতা বিবাহকে অনৈতিক বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়, তাহলে একই নৈতিক মানদণ্ড মুহাম্মদের অনুমোদিত ও সাহাবীদের চর্চিত মুতার ওপর প্রয়োগ করা হবে কি না—প্রবন্ধটির শেষ প্রশ্ন মূলত সেটিই।


ভূমিকা

মুতা বিবাহকে ইসলামি পরিভাষায় “বিবাহ” বলা হলেও এর বাস্তব কাঠামো সাধারণ বিবাহের চেয়ে একটি অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের যৌনচুক্তির সঙ্গেই বেশি মেলে। একজন পুরুষ ও একজন নারী আগে থেকেই ঠিক করে নেয় কত সময় সম্পর্কটি থাকবে এবং এর বিনিময়ে নারী কী পাবে; নির্ধারিত সময় শেষ হলেই সম্পর্ক শেষ, আলাদা তালাকের প্রয়োজন নেই। স্বাভাবিক দাম্পত্যের মতো আজীবন সংসার, পারস্পরিক উত্তরাধিকার কিংবা স্থায়ী পারিবারিক দায়বদ্ধতা এখানে মূল বিষয় নয়। চুক্তির কেন্দ্রবিন্দু হলো নির্দিষ্ট সময়ের যৌনসম্পর্ক এবং তার বিনিময়। এই কারণেই মুতা বিবাহকে পতিতাবৃত্তির একটি ইসলামি বৈধ রূপ হিসেবে বর্ণনা করা অযৌক্তিক নয়—পার্থক্য হলো, এখানে একই ধরনের অর্থ-সময়-যৌনতার বিনিময়কে একটি ধর্মীয় চুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে।

হাদিসের বিবরণগুলো পড়লে এই চরিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। কোথাও কয়েক রাতের জন্য সম্পর্ক, কোথাও একটি চাদরের বিনিময়, কোথাও এক মুঠো খেজুর বা ময়দার বিনিময়ে মুতা করার কথা এসেছে। নারী ও পুরুষের মধ্যে দরকষাকষি হচ্ছে, বিনিময় নির্ধারিত হচ্ছে, সময়সীমা ঠিক হচ্ছে, তারপর সেই মেয়াদ শেষ হলে সম্পর্কও শেষ হচ্ছে। “বিবাহ” শব্দটি ব্যবহার করলেই এই লেনদেনের প্রকৃতি বদলে যায় না। একজন যৌনকর্মীকে অর্থ দিয়ে এক রাতের জন্য যৌনসম্পর্ক করা এবং ধর্মীয় অনুমোদনের অধীনে একটি চাদর বা খাদ্যের বিনিময়ে তিন রাতের জন্য যৌনসম্পর্ক করা—নৈতিক কাঠামোর দিক থেকে এদের পার্থক্য কোথায়, সেটি প্রশ্ন করার যথেষ্ট কারণ আছে।

বর্তমান সুন্নি ইসলামের মূলধারায় মুতা হারাম বলে গণ্য হলেও এই বিষয়ে ইসলামী ঐতিহ্য কখনোই পুরোপুরি একরৈখিক ছিল না। ইসনা আশারিয়া শিয়ারা আজও মুতাকে বৈধ বিবাহ হিসেবে গ্রহণ করে। আবার সুন্নি ঐতিহ্যের ভেতরেও ইবনে আব্বাসসহ প্রাথমিক যুগের কয়েকজন সাহাবির নামে এর বৈধতা অব্যাহত থাকার মত সংরক্ষিত হয়েছে; ফখরুদ্দীন আল-রাযীও সূরা নিসা ৪:২৪-এর আলোচনায় লিখেছেন যে বৃহৎ অংশ একে রহিত মনে করলেও অন্য একদল এর বৈধতা অব্যাহত ছিল বলে মত দিয়েছে। ফলে মুতা নিয়ে আসল প্রশ্ন শুধু “আজ সুন্নিরা কী বলে” নয়; বরং ইসলামের প্রাথমিক উৎসগুলো আসলে কী চিত্র সংরক্ষণ করেছে।

এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মুতা নিয়ে পরবর্তী ধর্মীয় অবস্থান যতই কঠোর হোক, সহিহ হাদিসের ভেতরেই এমন একটি সময়ের বিবরণ রয়েছে যখন মুহাম্মদ নিজেই সাহাবীদের এই সাময়িক যৌনচুক্তির অনুমতি দিয়েছেন এবং সাহাবীরা তা বাস্তবে করেছেন। তাই পরবর্তী নিষেধাজ্ঞা দেখিয়ে প্রাথমিক বৈধতাকে মুছে ফেলা যায় না। বরং এখানেই নৈতিক প্রশ্নটি শুরু হয়: যে ব্যবস্থাকে আজ অশোভন, অনৈতিক বা পতিতাবৃত্তিসদৃশ বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়, সেই ব্যবস্থাই যখন মুহাম্মদের অনুমোদনে ধর্মীয়ভাবে বৈধ ছিল, তখন ইসলামের তথাকথিত চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় নৈতিকতার দাবিটি কতটা টেকে?


ইসলামে মুতা বিবাহের বর্তমান অবস্থান

মুতা বিবাহকে নিয়ে মুসলিমদের মধ্যেই একক অবস্থান নেই। বর্তমান সুন্নি ইসলামের মূলধারায় মুতা বিবাহ হারাম বলে গণ্য হয়। সাধারণ সুন্নি অবস্থান হলো—ইসলামের প্রাথমিক যুগে এটি বৈধ ছিল, পরে মুহাম্মদ তা নিষিদ্ধ করেন এবং সেই নিষেধাজ্ঞাই চূড়ান্ত। কিন্তু শিয়া ইসলামের বৃহৎ অংশ, বিশেষ করে ইসনা আশারিয়া বা বারো ইমামের অনুসারীরা, এই নিষেধাজ্ঞাকে চূড়ান্ত বলে মানেন না এবং মুতা বিবাহকে এখনো বৈধ মনে করেন। তাঁদের যুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—মুতা মুহাম্মদের যুগে বৈধ ছিল এবং পরবর্তীতে উমর এটিকে নিষিদ্ধ করেন।

অন্যদিকে শিয়া ইসলামের সব শাখাও মুতা বৈধ বলে না। জায়েদি শিয়ারা সাধারণত সুন্নিদের মতোই মুতা বিবাহকে অবৈধ মনে করেন। ফলে “সুন্নিরা হারাম, শিয়ারা হালাল”—এমন সরল বিভাজনও পুরোপুরি সঠিক নয়। বাস্তব চিত্র হলো, সুন্নি ইসলামের বৃহৎ অংশ এটিকে হারাম মনে করে; শিয়া ইসলামের বৃহৎ অংশ, বিশেষ করে ইসনা আশারিয়ারা, বৈধ মনে করে; আবার শিয়াদের মধ্যেও এমন শাখা রয়েছে যারা একে নিষিদ্ধ বলে।

মুতা নিয়ে মতভেদের আরেকটি দিক হলো, সাময়িক বা সীমিত দায়বদ্ধতার যৌনচুক্তি কেবল শিয়া ফিকহেই পাওয়া যায় না। সুন্নি সমাজেও মিসইয়ার নিকাহ এবং উর্ফি নিকাহ-এর মতো বিবাহরীতিকে বিভিন্ন আলেম বৈধতা দিয়েছেন। এগুলো মুতা নয়, কিন্তু স্থায়ী দাম্পত্যের প্রচলিত কাঠামো থেকে অনেকটাই আলাদা; বিশেষ করে মিসইয়ারে স্ত্রী অনেক ক্ষেত্রে বাসস্থান, নিয়মিত সহবাস, ভরণপোষণ বা স্বামীর সঙ্গে একত্রে বসবাসের কিছু অধিকার ছেড়ে দেন। ফলে ইসলামি বিবাহের বাস্তব কাঠামো একমাত্র “স্থায়ী স্বামী-স্ত্রীর সংসার” মডেলে সীমাবদ্ধ নয়। [1] [2]

এই মতভেদটিই পরবর্তী আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মুতা আজ কোন মাজহাবে বৈধ বা অবৈধ—এটি প্রবন্ধের শেষ প্রশ্ন নয়। আসল প্রশ্ন হলো, ইসলামের প্রাথমিক যুগে এটি কী ছিল, মুহাম্মদ কী অনুমতি দিয়েছিলেন, সাহাবীরা কী করতেন, এবং পরে নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস কীভাবে তৈরি হলো। বর্তমান ফিকহি অবস্থানগুলো সেই পুরোনো বিতর্কের পরবর্তী ফল; প্রবন্ধের মূল আলোচ্য হলো তার উৎস।


মুতা বৈধ থাকার পক্ষে শিয়াদের যুক্তি

ইসনা আশারিয়া শিয়াদের কাছে মুতা কোনো পরবর্তী যুগের নতুন প্রথা নয়; তাদের দাবি হলো, এটি কোরআন ও মুহাম্মদের যুগে বৈধ হওয়া একটি বিধান, যেটিকে পরবর্তীতে উমর নিষিদ্ধ করেন। তাদের যুক্তির প্রথম ভিত্তি সূরা নিসার ২৪ নম্বর আয়াত। “فَمَا اسْتَمْتَعْتُمْ بِهِ مِنْهُنَّ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ” অংশটিকে তারা মুতা বিবাহের বিধান হিসেবে গ্রহণ করে। এই ব্যাখ্যা শুধু শিয়া তাফসিরেই নেই; ইবনে আব্বাস, উবাই ইবন কা’ব, সাঈদ ইবন জুবাইর, সুদ্দী ও মুজাহিদের নামেও এই আয়াতকে মুতার সঙ্গে যুক্ত করার বর্ণনা সুন্নি তাফসিরে সংরক্ষিত হয়েছে। প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে ইবনে কাসীরসহ সেই সূত্রগুলো সরাসরি দেখা যাবে।

শিয়াদের দ্বিতীয় প্রশ্ন আরও সরাসরি: কোরআনে মুতা বৈধ হয়ে থাকলে সেটি রহিত করল কোন আয়াত? সুন্নি ব্যাখ্যায় সাধারণত বলা হয়, মুহাম্মদের পরবর্তী নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে মুতার বৈধতা রহিত হয়েছে। কিন্তু শিয়ারা এই হাদিসগুলোর মধ্যকার সময়গত বিরোধকেই আপত্তির জায়গা হিসেবে তুলে ধরে। কোথাও খায়বারে নিষেধের কথা, আবার তার পরে মক্কা বিজয়ে অনুমতি, আওতাসে আবার অনুমতি ও নিষেধ—অর্থাৎ “একবার নিষিদ্ধ হয়ে চিরতরে শেষ” হওয়ার সরল ইতিহাস হাদিসগুলোর মধ্যেই পাওয়া যায় না।

তৃতীয় এবং সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি আসে জাবির ইবন আবদুল্লাহর বর্ণনা থেকে। সহিহ মুসলিমে তাঁর নামে এসেছে, “আমরা রাসুলুল্লাহর যুগে এবং আবু বকরের যুগে এক মুঠো খেজুর বা ময়দার বিনিময়ে মুতা করতাম; শেষ পর্যন্ত উমর আমর ইবন হুরায়সের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তা নিষিদ্ধ করেন।” অন্য বর্ণনায় জাবির বলেন, তাঁরা মুহাম্মদ, আবু বকর এবং উমরের যুগেও মুতা করেছেন। শিয়াদের প্রশ্ন তাই খুব সাধারণ: যদি মুহাম্মদ জীবদ্দশাতেই কিয়ামত পর্যন্ত মুতা হারাম করে দিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর মৃত্যুর পর আবু বকরের খেলাফতে সাহাবীরা কীভাবে তা করলেন, এবং উমরের কেন আবার নতুন করে তা নিষিদ্ধ করতে হলো?

চতুর্থ যুক্তিটি উমরের নিজের অবস্থানকে কেন্দ্র করে। মুয়াত্তা মালিকে সংরক্ষিত বর্ণনায় উমর বলেন, তিনি যদি আগে বিষয়টি ঘোষণা করে রাখতেন তাহলে মুতা করা ব্যক্তিকে রজম করতেন। আবার অন্যান্য বর্ণনায় তাঁর আমলেই নারী-মুতা ও হজের তামাত্তু নিষিদ্ধ করার বক্তব্য পাওয়া যায়। শিয়া যুক্তিতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: নিষেধটি যদি মুহাম্মদের সুপরিচিত ও চূড়ান্ত বিধানই হতো, তাহলে উমরের নিজের ঘোষণা, নিজের নিষেধ এবং “আগে ঘোষণা করলে শাস্তি দিতাম”—এই ভাষার প্রয়োজন কেন হলো?

এই কারণেই শিয়াদের সিদ্ধান্ত হলো—মুতা মুহাম্মদের যুগে বৈধ ছিল এবং বৈধ অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু ঘটে; পরবর্তী রাজনৈতিক-আইনগত নিষেধাজ্ঞাটি আসে উমরের কাছ থেকে। সুন্নিরা এই সিদ্ধান্ত অস্বীকার করে এবং মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত নিষেধের হাদিসগুলোকে চূড়ান্ত বলে গ্রহণ করে। কিন্তু বিতর্কটির আসল জায়গা এখানেই: একদিকে মুহাম্মদের নামে একাধিক নিষেধের বর্ণনা, অন্যদিকে তাঁর পরেও সাহাবীদের বাস্তব মুতা-চর্চা এবং শেষে উমরের প্রকাশ্য নিষেধ। এই দুই ধারার সংঘর্ষই মুতা বিতর্কের কেন্দ্র।


ইসলাম: নৈতিকতা নাকি নির্দেশনা

ধর্মগুলোর একটি প্রধান দাবি হচ্ছে, ধর্ম মানুষকে নৈতিকতার শিক্ষা দেয় এবং ধর্মীয় নৈতিকতা মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভরশীল নয়। অনেক ধর্মবিশ্বাসী এই নৈতিকতাকে অবজেকটিভ বা বস্তুনিষ্ঠ নৈতিকতা হিসেবে উপস্থাপন করেন—অর্থাৎ কোন কাজ ভাল বা মন্দ, তার সত্যতা মানুষের মতামত দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং একটি উচ্চতর নৈতিক সত্য বা ঐশ্বরিক কর্তৃত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয়। একই ধরনের কাজ যদি এক সময়ে আল্লাহর নির্দেশে বৈধ হয় এবং অন্য সময়ে আবার আল্লাহর নির্দেশেই অবৈধ হয়ে যায়, তাহলে সেই কাজটির নৈতিক মূল্য আসলে কোথায় নিহিত? কাজটির নিজস্ব ভাল-মন্দ চরিত্রে, নাকি কেবল তখনকার ঐশ্বরিক নির্দেশে? ইসলামী বর্ণনায় কখনো ভাই-বোনের বিবাহকে বৈধ ধরে নেওয়া হয়েছে[3], কখনো মুতা বিবাহকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, আবার পরবর্তী সময়ে একই মুতা বিবাহকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে; নবীর ক্ষেত্রেও সাধারণ মুসলিমদের তুলনায় ভিন্ন বিবাহবিধান রাখা হয়েছে। ফলে এখানে আসল প্রশ্ন স্থান-কাল বদলেছে কি না, সেটি নয়; বরং একই কাজের নৈতিক অবস্থান কি কেবল নির্দেশের পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে?

মুতা বিবাহের ক্ষেত্রেই সমস্যাটি খুব পরিষ্কার। মুহাম্মদ এক সময়ে এটিকে বৈধ করেছেন, সাহাবীরা তাঁর অনুমতিতে তা করেছেন, আবার অন্য সময়ে এর নিষেধের বর্ণনাও পাওয়া যায়। যদি বলা হয়, অনুমতির সময়ে মুতা নৈতিক ছিল কারণ আল্লাহ তা হালাল করেছিলেন, আর নিষেধের পরে একই কাজ অনৈতিক হলো কারণ আল্লাহ তা হারাম করেছেন, তাহলে এখানে নৈতিকতার মানদণ্ড কাজটির প্রকৃতি নয়; মানদণ্ড হচ্ছে নির্দেশ। অর্থাৎ প্রশ্নটি তখন আর “কাজটি নিজে ভাল না মন্দ?” থাকে না, বরং হয়ে যায় “এ মুহূর্তে আল্লাহ এটিকে হালাল বলেছেন না হারাম বলেছেন?” এই অবস্থানকে বস্তুনিষ্ঠ নৈতিকতার প্রমাণ বলা কঠিন; বরং এটি ঐশ্বরিক নির্দেশনির্ভর নৈতিকতা—যেখানে একই কাজের নৈতিক মর্যাদা নির্দেশদাতার আদেশ বদলানোর সঙ্গে বদলে যেতে পারে।

নৈতিকতা হলো একটি মানদণ্ড যা দ্বারা আমার এবং অন্যের জন্য কোনটি ভাল আর কোনটি মন্দ, তার পার্থক্য নির্ধারণ করা যায়। একে “সঠিকতা” বা “ন্যায্যতা”-ও বলা যায়।ইসলামে নৈতিকতা বা মোরালিটি বলতে তাহলে আসলে কী বোঝায়? কোনটি ভাল কোনটি মন্দ, সেটি; নাকি আল্লাহর নির্দেশে কোনটি হালাল আর কোনটি হারাম সেটি? ইসলামে যদি নৈতিকতা বা মোরালিটি অর্থ এটি হয় যে, কোনটি ভাল আর কোনটি খারাপ, এবং সেটি যদি অবজেক্টিভলি ভাল বা খারাপ হয়, তাহলে মুহাম্মদ মুতা বিবাহকে বৈধ করে একটি খারাপ কাজের অনুমতি দিয়েছিলেন এবং তাঁর সাহাবীগণ সেই অনুমতিতেই কাজটি করেছিলেন। আর ইসলামে নৈতিকতা বা মোরালিটি অর্থ যদি এটি হয় যে, আল্লাহ যা নির্দেশ দিয়েছেন সেটি; আল্লাহ যা বলেছে সেটি ভাল কি মন্দ না দেখে সেটিই মানতে হবে; তাহলে তো সেটি আর নৈতিকতা বা মোরালিটি থাকে না। সেটি হয়ে যায় নির্দেশ পালন। নৈতিকতা বা মোরালিটি এবং নির্দেশ পালন তো ভিন্ন বিষয়।

অর্থাৎ ধর্ম আমাদের নৈতিকতা শেখায়, এটি একেবারেই ভুল কথা [4]। ধর্ম আমাদের শেখায় কিতাব অনুসারে নির্দেশের অনুসরণ করাকে। যুক্তি তথ্য প্রমাণ বিচার বিবেচনা ছাড়াই দ্বিধাহীনভাবে ধর্মের দাবীগুলো মেনে নেয়া এবং সেই অনুসারে জীবন যাপনই ধর্ম পালন। অন্যদিকে নৈতিকতা বা মোরালিটি অর্থই হচ্ছে, প্রতিটি ঘটনা বা কাজকে যুক্তি তথ্য প্রমাণ দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে দেখা যে, কাজটি বা ঘটনাটি আমার জন্য এবং অন্য মানুষের জন্য ভাল নাকি মন্দ। এটিই আসলে নৈতিকতার মানদণ্ড। ধর্ম তাই আমাদের নির্দেশনা পালন শেখায়, আর নৈতিকতার ধারণা আমরা লাভ করি আমাদের যুক্তিবোধ এবং জ্ঞান থেকে।


কোরআনে মুতা বিবাহের বৈধতা

সূরা নিসার ২৪ নম্বর আয়াতের তাফসীর যারা করেছেন, মুহাম্মদের সাহাবী- তাবে তাবেইনদের মধ্যে যারা এই আয়াতের অর্থ বুঝেছেন, তারা অনেকেই এই আয়াতের সাথে মুতা বা মুত’আ বিবাহের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন। শুরুতেই আমরা সেই আয়াতটি পড়ে নিই। সূরা নিসার ২৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে [5] –

নারীদের মধ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ নারীগণও তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, কিন্তু তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীদের বাদে, আল্লাহ এসব ব্যবস্থা তোমাদের উপর ফরয করে দিয়েছেন। তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ নারীদের ছাড়া অন্যান্য সকল নারীদেরকে মোহরের অর্থের বদলে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে চাওয়া তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে, অবৈধ যৌন সম্পর্কের জন্য নয়। অতঃপর তাদের মধ্যে যাদের তোমরা সম্ভোগ করেছ, তাদেরকে তাদের ধার্যকৃত মোহর প্রদান কর। তোমাদের প্রতি কোনও গুনাহ নেই মোহর ধার্যের পরও তোমরা উভয়ের সম্মতির ভিত্তিতে মোহরের পরিমাণে হেরফের করলে, নিশ্চয় আল্লাহ সবিশেষ পরিজ্ঞাত ও পরম কুশলী।
Taisirul Quran
এবং নারীদের মধ্যে বিবাহিতগণ তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে; কিন্তু তোমাদের ডান হাত যাদের অধিকারী – আল্লাহ তোমাদের জন্য তাদেরকে বিধিবদ্ধ করেছেন, এতদ্ব্যতীত তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে অন্যান্য নারীদের; তোমরা স্বীয় ধনের দ্বারা ব্যভিচারের উদ্দেশ্য ব্যতীত বিবাহ করার জন্য তাদের অনুসন্ধান কর; অনন্তর তাদের দ্বারা যে ফল ভোগ করবে তজ্জন্য তাদেরকে তাদের নির্ধারিত দেয় প্রদান কর এবং কোন অপরাধ হবেনা যদি নির্ধারণের পর তোমরা পরস্পর সম্মত হও, নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাজ্ঞানী, বিজ্ঞানময়।
Sheikh Mujibur Rahman
আর (হারাম করা হয়েছে) নারীদের মধ্য থেকে সধবাদেরকে। তবে তোমাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে (দাসীগণ) তারা ছাড়া। এটি তোমাদের উপর আল্লাহর বিধান এবং এরা ছাড়া সকল নারীকে তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে যে, তোমরা তোমাদের অর্থের বিনিময়ে তাদেরকে চাইবে বিবাহ করে, অবৈধ যৌনাচারে লিপ্ত হয়ে নয়। সুতরাং তাদের মধ্যে তোমরা যাদেরকে ভোগ করেছ তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও। আর নির্ধারণের পর যে ব্যাপারে তোমরা পরস্পর সম্মত হবে তাতে তোমাদের উপর কোন অপরাধ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।
Rawai Al-bayan
আর নারীদের মধ্যে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী (১) ছাড়া সব সধবা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, তোমাদের জন্য এগুলো আল্লাহর বিধান। উল্লেখিত নারীগণ ছাড়া অন্য নারীকে অর্থব্যয়ে বিয়ে করতে চাওয়া তোমাদের জন্য বৈধ করা হল, অবৈধ যৌন সম্পর্কের জন্য নয়। তাদের মধ্যে যাদেরকে তোমরা সম্ভোগ করেছ তাদের নির্ধারিত মাহ্‌র অর্পণ করবে (২)। মাহ্‌র নির্ধারণের পর কোনো বিষয়ে পরস্পর রাযী হলে তাতে তোমাদের কোনো দোষ নেই (৩)। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এই আয়াতটির আরবিও একইসাথে দেখে নিই,

وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۖ كِتَابَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ ۚ وَأُحِلَّ لَكُمْ مَا وَرَاءَ ذَٰلِكُمْ أَنْ تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُمْ مُحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ ۚ فَمَا اسْتَمْتَعْتُمْ بِهِ مِنْهُنَّ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَةً ۚ وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا تَرَاضَيْتُمْ بِهِ مِنْ بَعْدِ الْفَرِيضَةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا

উপরের আয়াতে যেই ইস্তামতাতুম (اسْتَمْتَعْتُمْ) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, প্রখ্যাত তাবেঈ মুজাহিদ ইবন জাবরের মতে, এই শব্দটি দ্বারা মুতা বোঝানো হয়েছে, এবং এই আয়াতটি মুতার আয়াত। যা শিয়া মুসলমানদের একাংশও বলেন।। কারণ, এই শব্দটি মুত’আ (متعة) এর ভার্বাল ফর্ম। ভাল করে আয়াতটা পড়লে বোঝা যায়, এখানে কিছু একটি বিষয়ের কথা বলা হচ্ছে। খেয়াল করে পড়ুন, বলা হচ্ছে-

সুতরাং তাদের মধ্যে তোমরা যাদেরকে ভোগ করেছ তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও। আর নির্ধারণের পর যে ব্যাপারে তোমরা পরস্পর সম্মত হবে তাতে তোমাদের উপর কোন অপরাধ নেই

নির্ধারণের পরে কোন বিষয়ে তারা সম্মত হচ্ছে? এই বিষয়টি ধীরে ধীরে এই লেখাটি যত এগুলোবে, আশা করি পাঠকের কাছে পরিষ্কার হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর

আসুন এবারে তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে খানিকটা পড়ে নিই, যেখানে বলা হচ্ছে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুতা বিবাহ বৈধ ছিল। পরবর্তীতে তা নিষিদ্ধ করা হয় [6] –

‘তোমরা তাহাদিগকে স্বীয় অর্থের বিনিময়ে তলব করিবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্যে, ব্যভিচারের জন্যে নহে।’ অর্থাৎ তোমরা তাহাদিগকে অর্থের বিনিময়ে বধু হিসাবে চারটি পর্যন্ত লাভ করিতে পার। তবে দাসী গ্রহণের বেলায় নির্ধারিত কোন সংখ্যা নাই। অবশ্য তাহাও শরীআতের বিধানসম্মত হইতে হইবে। তাই আল্লাহ তা’আলা বলিয়াছেন, ‘বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে, ব্যভিচারের জন্যে নয়।’
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
فَمَا اسْتَمْتَعْتُمْ بِهِ مِنْهُنَّ فَأْتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَةً.
‘তাহাদের মধ্যে যাহাকে তোমরা ভোগ করিবে, তাহাকে তাহার নির্ধারিত হক দান করিবে।’ অর্থাৎ যাহাদিগকে ভোগ করিবে, তাহাদিগকে ভোগের বিনিময়ে মাহর দান করিবে।
যথা আল্লাহ তা’আলা অন্যস্থানে বলিয়াছেন:
وَكَيْفَ تَأْخُذُونَهُ وَقَدْ أَفْضَى بَعْضُكُمْ إِلَى بَعْضٍ.
অর্থাৎ ‘কিরূপে তোমরা তাহা গ্রহণ করিবে? অথচ তোমরা পরস্পরে একে অন্যের সান্নিধ্য গ্রহণ করিয়াছ।’
তিনি আরও বলিয়াছেন:
وَأْتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً.
অর্থাৎ ‘তোমরা খুশিমনে স্ত্রীদিগকে তাহাদের মাহর প্রদান কর।’
অন্যত্র তিনি বলিয়াছেন:
وَلَا يَحِلُّ لَكُمْ أَنْ تَأْخُذُوا مِمَّا آتَيْتُمُوهُنَّ شَيْئًا.
অর্থাৎ ‘তোমরা স্ত্রীদিগকে যাহা কিছু প্রদান করিয়াছ, তাহা হইতে কিছু ফিরাইয়া নেওয়া তোমাদের জন্যে বৈধ নয়।’
এই আয়াতের সাধারণ অর্থ দ্বারা মুত’আ বিবাহের সমর্থনে দলীল গ্রহণ করা হইয়া থাকে। তবে এই কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ইসলামের প্রথম যুগে ইহা জায়েয ছিল ও পরে ইহা রহিত করা হয়।
ইমাম শাফিঈ (র) সহ আলিমদের একটি দল বলেন: মুত’আ একবার বৈধ করা হয়, কিন্তু তাহাও রহিত করা হয়। মোট কথা দুইবার বৈধ করা হইয়াছে এবং দুইবার রহিত করা হইয়াছে।
অপর একদল বলেন: ইহা কয়েকবার বৈধ করা হয় এবং কয়েকবার রহিত করা হয়।
আলিমদের অন্য একটি দল বলেন: ইহা একবার বৈধ করা হইয়াছিল এবং পরে ইহার বৈধতা রহিত করা হয়। অতঃপর ইহাকে বৈধ করা হয় নাই।
হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) সহ সাহাবাদের একটি দল হইতে বর্ণিত হইয়াছে যে, প্রয়োজন ও পরিস্থিতি সাপেক্ষে উহা জায়েয রহিয়াছে। ইমাম আহমদ (র) হইতেও উহা বর্ণিত হইয়াছে।
হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) উবাই ইব্‌ন কা’ব (রা), সাঈদ ইব্‌ন্ন জুবায়র (রা) এবং সুদ্দী প্রমুখের কিরাআতে রহিয়াছে:

فَمَا اسْتَمْتَعْتُم بِهِ مِنْهُنَّ إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى فَأْتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَةِ অর্থাৎ এই কিরাআতে إلى أجل مسمى বাক্যটি বেশি রহিয়াছে।
মুজাহিদ (র) বলেন: ইহা মুত’আ বিবাহ সম্পর্কে অবতীর্ণ হইয়াছে। কিন্তু জমহুর এই মতের বিরোধী। তবে আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইব্‌ন আবু তালিব (রা) হইতে সহীহদ্বয়ে বর্ণিত হাদীসটিই সর্বাপেক্ষা উত্তম। সেই হাদীসে আমীরুল মুমিনীন আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) বলিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) খায়বার যুদ্ধের সময় মুত’আ বিবাহ করিতে এবং পালিত গাধার গোশত খাইতে নিষেধ করিয়াছেন।
রবী…… সাবুরা ইব্‌ন মা’বাদ জুহানী (রা) হইতে সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হইয়াছে যে, সাবুরা ইব্‌ন মা’বাদ জুহানী (রা) বলিয়াছেন: তিনি মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে যুদ্ধ করিয়াছেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) সকল জনতাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেনঃ হে লোক সকল! আমি তোমাদিগকে নারীদের সঙ্গে মুত’আ করার অনুমতি দিয়াছিলাম। এখন আল্লাহ তা’আলা কিয়ামত পর্যন্ত উহা হারাম বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। তোমাদের যাহাদের নিকট এই ধরনের স্ত্রী রহিয়াছে, তাহাদিগকে পরিত্যাগ কর। তবে এই ব্যাপারে তাহাদিগকে যাহা দিয়াছ, উহা হইতে কিছুই গ্রহণ করিবে না।
মুসলিমের অন্য রিওয়ায়াতে রহিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ইহা বিদায় হজ্জের দিন বলিয়াছিলেন। ফিকহ এবং আহকামের কিতাবসমূহে এই বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা হইয়াছে।
অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলেন:
ولَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا تَرَاضِيْتُمْ بِهِ مِنْ بَعْدِ الْفَرِيضَةِ
‘তোমাদের কোন পাপ হইবে না যদি মাহর নির্ধারণের পর তোমরা পরস্পরে সম্মত হও।’
এই আয়াত দ্বারা যাহারা মুত’আ বিবাহ উদ্দেশ্য নেন তাহারা অর্থ করেন যে, যখন নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হইবে, তখন পুনরায় বিনিময় বৃদ্ধি করিয়া মেয়াদ বৃদ্ধি করিয়া লওয়ায় কোন পাপ নাই।
সুদ্দী (র) বলেনঃ ইচ্ছা করিলে পূর্ব নির্ধারিত মাহরের পর মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে সে বলিবে-আমি এত সময়ের জন্যে পুনরায় মুত’আ করিতেছি। আর গর্ভাশয়ের পবিত্রতার পূর্বে যদি বিনিময়ের সেই বেশি অংশটা নির্ধারিত করে নেয়, তবে সে মেয়াদও বৃদ্ধি করিয়া নিতে পারিবে।
আলোচ্য আয়াতাংশের ভাবার্থে সুদ্দী (র) আরও বলেন: যদি মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে বিনিময় বৃদ্ধি না করে, তবে মেয়াদ বৃদ্ধি করার সুযোগ বিনষ্ট হইয়া যায়। এই পরিস্থিতিতে সে পৃথক হইয়া যাইবে এবং এক ঋতুকাল অপেক্ষা করিয়া স্বীয় গর্ভাশয়কে পবিত্র করিয়া নিবে। পবিত্রতার পর আবার চুক্তির সুযোগ সৃষ্টি হইবে। উল্লেখ্য যে, ইহারা একে অপরের উত্তরাধিকারী হয় না।
পক্ষান্তরে যাহারা বলেন, ইহা দ্বারা মাহর নির্ধারণের কথা বলা হইয়াছে, তাহারা ইহার সপক্ষে এই দলীল পেশ করেন : وَأَتُو النِّسَاءَ صَدَقَاتِهِنَّ نِحْلَةً -অর্থাৎ ‘তোমরা স্ত্রীদিগকে

মুতা
মুতা 1

এবারে আসুন নবীর প্রখ্যাত সাহাবী ইবনে আব্বাসের তাফসীর হিসেবে প্রচলিত তাফসীর গ্রন্থ থেকে এই আয়াতটির ব্যাখ্যা দেখে নিই [7] –

২৪. এবং সধবা নারীও তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, তবে তোমাদের হাত যার মালিক হয়ে গেছে তার কথা ভিন্ন। এটা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ। এছাড়া আর সব নারী তোমাদের জন্য বৈধ যদি অর্থের বিনিময়ে তাদেরকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে চাও-কেবল মৌজ করার জন্য নয়। তারপর সে নারীদের মধ্যে যাকে তোমরা সম্ভোগ করেছ, তাকে তার স্থিরীকৃত মোহরানা দিয়ে দাও। আর স্থিরীকরণের পর তোমরা উভয়ে পারস্পরিক সন্তুষ্টিক্রমে যদি কিছু ঠিক করে নাও, তাতে কোন পাপ নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
)وَالْمُحْصَنَتْ مِنَ النِّسَاء( এবং সধবা যাদের স্বামী আছে, নারী তোমাদের উপর হারাম ‘১।( )مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ কিন্তু যাদের তোমরা মালিক হয়েছ বন্দিনীদের মধ্য থেকে। তারা তোমাদের জন্য হালাল। যদিও দারুল হারবে তাদের স্বামী রয়েছে। এক হায়েযের দ্বারা তাদের গর্ভাশয় পবিত্র করে নেয়ার পর তারা হালাল হয়ে যাবে )كتب الله عَلَيْكُ( এটা তোমাদের জন্য আল্লাহর বিধান অর্থাৎ আল্লাহর কিতাবে তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে সে সব নারী যাদের কথা তোমাদেরকে আমি উল্লেখ করেছি )وأحل لكم( আর তোমাদের জন্য বৈধ করা হল উল্লেখিত নারীগণ ছাড়া যাদের হারাম হওয়ার কথা তোমাদের উল্লেখ করেছি )أَنْ تَبْتَغُوا( তোমরা চাইবে বিয়ে করতে চাইবে )بأموالكُمْ( তোমাদের অর্থ ব্যয়ে চারজন পর্যন্ত।
আরো বলা হয়, তোমরা ক্রয় করবে তোমাদের অর্থ ব্যয়ে যেসব বাদী। আরো বলা হয়, তোমরা চাইবে তোমাদের অর্থ ব্যয়ে তাদের লজ্জাস্থান। অর্থাৎ মুতআ-এর মাধ্যমে পরবর্তীতে তা রহিত হয়ে গিয়েছে।
)محصنين( বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া আল্লাহ্ বলছেন, তোমরা তাদের সঙ্গে থাক বিবাহিত অবস্থায় غیر( )صفحين অবৈধ যৌন সম্পর্ক নয় বিয়ে না করে যিনাকারী অবস্থায় নয়। )فما استمتعتم (به( অতঃপর যা তোমরা সম্ভোগ কর উপকার লাভ কর (4) তাদের মধ্য থেকে বিয়ের পরে )فأتوهن( তাদেরকে দিয়ে দাও প্রদান করো তাদেরকে )أجُورَهُ( তাদের বিনিময় তাদের মোহর পূর্ণভাবে )فريضة( নির্ধারিত হক আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর এই যে, তোমরা মোহর দাও পূর্ণভাবে। )وَلَأَجْنَاحَ عَلَيْكُمْ( আর কোন দোষ নেই তোমাদের ওপর এবং কোন দোষ নেই তোমাদের ওপর )فَيمَا تَرَاضَيْتُمْ بِهِ( এই ব্যাপারে তোমরা পরস্পর রাযী হলে অর্থাৎ মোহরের ব্যাপারে পারস্পরিক সম্মতিতে কমবেশী করলে মোহর من بعد(

মুতা 3

মুতা বিবাহ হালাল হওয়া

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মুতা বিবাহ কি ইসলামে কখনো হালাল ছিল? এই বিষয়ে সহিহ হাদিস থেকে জানা যায়, মুতা বিবাহকে নবী মুহাম্মদ হালাল করেছিলেন। পরবর্তীতে একাধিকবার হারাম করেছিলেন, আবারো হালাল করেছিলেন। কিন্তু এটিও সত্য যে, এটি ইসলামে একসময়ে হালাল ছিল [8] [9] [10] [11] –

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৮৩। মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার (রহঃ) … জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) ও সালামা ইবনুল আকওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তারা উভয়ে বলেন, আমাদের সামনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘোষক বেরিয়ে এসে বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের মুত’আ বিবাহ করার অনুমতি দিয়েছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৮৪। উমায়্যা ইবনু বিসতাম আল আয়শী (রহঃ) … সালামা ইবনুল আকওয়া (রাঃ) ও জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট এলেন এবং আমাদের মুত’আর (সাময়িক বিবাহের) অনুমতি দিলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সালামাহ ইবনু আক্ওয়া‘ (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৮৮। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … আয়্যাশ ইবনু সালামা (রহঃ) থেকে তার পিতার সুত্রে বর্ণিত। তিনি (পিতা) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আওতাস যুদ্ধের বছর
তিন দিনের জন্য মুতআ বিবাহের অনুমতি দিয়েছিলেন। তারপর তিনি তা নিষিদ্ধ করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৭/ বিয়ে
পরিচ্ছেদঃ ৬৭/৩২. অবশেষে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুত‘আহ বিয়ে নিষেধ করেছেন।
৫১১৭-৫১১৮. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ্ এবং সালাম আকওয়া’ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, আমরা কোন এক সেনাবাহিনীতে ছিলাম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট এসে বললেন, তোমাদেরকে মুত‘আহ বিয়ের অনুমতি দেয়া হয়েছে। সুতরাং তোমরা মুত‘আহ করতে পার। (আধুনিক প্রকাশনী- ৪৭৪২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৭৪৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

এমনকি, মক্কা বিজয়ের বছর মক্কায় প্রবেশকালেও মুতা বিবাহ বৈধ ছিল বলেই হাদিস থেকে জানা যায় [12] [13] –

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৯৪। ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) … আবদুল মালিক ইবনু রাবী ইবনু সাবরা জুহানী (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তাঁর পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি (দাদা) বলেন, মক্কা বিজয়ের বছর আমাদের মক্কায় প্রবেশকালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মুত’আ বিবাহের অনুমতি দান করেন। তিনি আমাদের তা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত (নারী সঙ্গ ত্যাগ করে) বের হয়ে আসি নি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ রবী’ ইবন সাবরা জুহানী (রহঃ)

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৭/ বিয়ে
পরিচ্ছেদঃ ৬৭/৩২. অবশেষে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুত‘আহ বিয়ে নিষেধ করেছেন।
৫১১৯. ইবনু আবূ যিব বলেন, আয়াস ইবনু সালামাহ ইবনু আকওয়া‘ তার পিতা সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, যে কোন পুরুষ এবং মহিলা উভয়ে (মুত‘আহ করতে) একমত হলে তাদের পরস্পরের এ সম্পর্ক তিন রাতের জন্য গণ্য হবে। এরপর তারা ইচ্ছে করলে এর চেয়ে অধিক সময় স্থায়ী করতে পারে অথবা বিচ্ছিন্ন হতে চাইলে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। (বর্ণনাকারী বলেন) আমরা জানি না এ ব্যবস্থা শুধু আমাদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল, না সকল মানুষের জন্য ছিল।
আবূ ‘আবদুল্লাহ্ (ইমাম বুখারী) বলেন, ‘আলী (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এটা পরিষ্কার করে ব’লে দিয়েছেন, মুতা‘আ বিবাহ প্রথা রহিত হয়ে গেছে। (মুসলিম ১৬/২, হাঃ ১৪০৫) (আধুনিক প্রকাশনী- ৪৭৪২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৭৪৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


মুতা বিবাহে নাবালিকা, কুমারী নারী এবং অভিভাবকের অনুমতি

মুতা বিবাহের ক্ষেত্রে নারীর বয়স, কুমারীত্ব এবং অভিভাবকের অনুমতি নিয়ে শিয়া হাদিস ও আইনগ্রন্থে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। এসব বর্ণনায় এমন প্রশ্নও পাওয়া যায়, যেখানে দশ বছর বয়সী মেয়ের সাময়িক বিবাহ, পিতা-মাতার অজ্ঞাতে কুমারী মেয়ের মুতা এবং অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই বিবাহের বৈধতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু কত বছর বয়সে বিবাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে তা নয়; বরং একটি অল্পবয়সী মেয়ে বিবাহের প্রকৃতি, নির্ধারিত মেয়াদের যৌনচুক্তি এবং তার সম্ভাব্য পরিণতি বুঝে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম কি না, সেই প্রশ্নও। প্রাচীন শিয়া হাদিসে বয়স, প্রতারণার আশঙ্কা, কুমারীত্ব এবং পরিবারের সামাজিক মর্যাদাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী আইনজ্ঞরাও এই বিধানগুলোর ব্যাখ্যায় ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেছেন।

শিয়া হাদিসসংকলক শায়খ সদুক (মৃত্যু ৩৮১ হিজরি) তাঁর মান লা ইয়াহদুরুহুল ফাকিহ গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে মুতা বিবাহের অধ্যায়ে পরপর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা সংরক্ষণ করেছেন। প্রথমটিতে অল্পবয়সী মেয়ের সঙ্গে মুতা বিবাহের ক্ষেত্রে দশ বছর বয়সের কথা এসেছে। দ্বিতীয়টিতে কুমারী মেয়েকে মুতা বিবাহ করা পরিবারের জন্য অসম্মানের কারণ হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তৃতীয়টিতে পিতা জীবিত থাকলে তাঁর অনুমতি ছাড়া কুমারী মেয়ের মুতা বিবাহ নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। এই তিনটি বক্তব্য একত্রে দেখলে বোঝা যায়, মুতা বিবাহের বৈধতা নির্ধারণে মেয়েটির ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পাশাপাশি তাঁর বয়স এবং পিতার কর্তৃত্বকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়েছিল। [14]

দশ বছর বয়সী মেয়ে এবং প্রতারণার প্রশ্ন

শায়খ সদুকের ৪৫৯১ নম্বর বর্ণনাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে মুহাম্মদ ইবন মুসলিম অল্পবয়সী মেয়ের সঙ্গে মুতা বিবাহ করা সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। উত্তরে বলা হয়, তা করা যেতে পারে, তবে এমন মেয়ে হলে নয় যাকে প্রতারিত করা সম্ভব। এরপর প্রশ্নকারী জানতে চান, কত বছর বয়স হলে মেয়েটিকে আর প্রতারিত হওয়ার মতো ছোট হিসেবে গণ্য করা হবে না। উত্তরে দশ বছর বয়সের কথা বলা হয়। বর্ণনাটিতে মেয়েটির ব্যক্তিগত সম্মতির অর্থ কী, সে বিবাহের অর্থনৈতিক ও যৌন পরিণতি কতটা বুঝতে পারে, কিংবা তার নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কতটা রয়েছে—এসব বিষয়ে আলাদা কোনো পরীক্ষা বা শর্ত উল্লেখ করা হয়নি। নির্দিষ্ট বয়সকে প্রতারণার আশঙ্কা থেকে বেরিয়ে আসার একটি সীমা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। [15]

মূল আরবির প্রশ্নোত্তর:

وَرَوَى مُحَمَّدُ بْنُ يَحْيَى الْخَثْعَمِيُّ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ مُسْلِمٍ قَالَ: سَأَلْتُهُ عَنِ الْجَارِيَةِ يَتَمَتَّعُ مِنْهَا الرَّجُلُ؟ قَالَ: نَعَمْ، إِلَّا أَنْ تَكُونَ صَبِيَّةً تُخْدَعُ. قُلْتُ: أَصْلَحَكَ اللَّهُ، وَكَمِ الْحَدُّ الَّذِي إِذَا بَلَغَتْهُ لَمْ تُخْدَعْ؟ قَالَ: ابْنَةُ عَشْرِ سِنِينَ.

বাংলা অনুবাদ:

মুহাম্মদ ইবন ইয়াহইয়া আল-খাসআমি, মুহাম্মদ ইবন মুসলিমের সূত্রে বর্ণনা করেন। মুহাম্মদ ইবন মুসলিম বলেন, “আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, একজন পুরুষ কি অল্পবয়সী মেয়ের সঙ্গে মুতা বিবাহ করতে পারে?” তিনি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, তবে এমন ছোট মেয়ে হলে নয়, যাকে প্রতারিত করা যায়।” আমি বললাম, “আপনার মঙ্গল হোক, কত বছর বয়স হলে তাকে আর প্রতারিত হওয়ার মতো ছোট বলে গণ্য করা হবে না?” তিনি উত্তর দিলেন, “দশ বছর বয়সী মেয়ে।”

এখানে ব্যবহৃত الجارية শব্দটি প্রসঙ্গভেদে অল্পবয়সী মেয়ে, যুবতী কিংবা দাসী অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু বর্ণনার পরবর্তী অংশে صبية অর্থাৎ ছোট মেয়ের উল্লেখ এবং দশ বছর বয়সের নির্দিষ্ট সীমা দেওয়ায় আলোচনাটি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে সাময়িক বিবাহের প্রশ্নেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এই বর্ণনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, বয়সের সঙ্গে প্রতারিত হওয়ার সক্ষমতাকে যুক্ত করা হয়েছে। দশ বছর বয়সী কোনো মেয়ে আর সহজে প্রতারিত হবে না—এমন সাধারণীকরণের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এখানে দেওয়া হয়নি। আধুনিক শিশু-মনোবিজ্ঞানের আলোকে দশ বছর বয়সের একটি শিশু যৌনসম্পর্ক, গর্ভধারণ কিংবা নির্দিষ্ট মেয়াদের বিবাহের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিণতি সম্পর্কে প্রাপ্তবয়স্কের সমতুল্য সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নয়।

এই বর্ণনাটি শুধু শায়খ সদুকের গ্রন্থেই নেই। শায়খ তুসি তাঁর আল-ইস্তিবসার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৪৫–১৪৬-এর ‘কুমারী মেয়েদের সঙ্গে মুতা বিবাহ’ অধ্যায়ের ৫২৮ নম্বর বর্ণনায় একই প্রশ্নোত্তর সংরক্ষণ করেছেন। তুসি এটি ব্যবহার করেছেন কুমারী মেয়ের মুতা বিবাহের ক্ষেত্রে অভিভাবকের অনুমতি নিয়ে পাওয়া পরস্পরবিরোধী বর্ণনাগুলোর ব্যাখ্যায়। ফলে দশ বছরের বয়সসীমার বর্ণনাটি তাঁর আলোচনায় একটি কার্যকর আইনগত যুক্তি হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। [16]

কুমারী মেয়ের মুতা বিবাহ: পরিবারের অসম্মান ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ

শায়খ সদুকের পরবর্তী ৪৫৯২ নম্বর বর্ণনায় হাফস ইবন আল-বাখতারি জাফর আল-সাদিককে কুমারী মেয়ের সঙ্গে মুতা বিবাহ করা সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। উত্তরে তিনি এটিকে অপছন্দনীয় বলেছেন, কারণ এতে মেয়েটির পরিবারের অসম্মান হতে পারে। এখানে আপত্তির কারণ হিসেবে মেয়েটির বয়স, স্বাধীন সম্মতি কিংবা সাময়িক যৌনসম্পর্কের সম্ভাব্য শারীরিক বা মানসিক পরিণতি উল্লেখ করা হয়নি। বরং বিষয়টিকে পরিবারের সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তী ৪৫৯৩ নম্বর বর্ণনায় আবান, আবু মারইয়ামের সূত্রে জাফর আল-সাদিকের আরও একটি বক্তব্য সংরক্ষণ করেন, যেখানে পিতা জীবিত থাকা কুমারী মেয়ের মুতা বিবাহের জন্য পিতার অনুমতি প্রয়োজন বলা হয়েছে। [17]

মূল আরবি, বর্ণনা ৪৫৯২:

في الرجل يتزوج البكر متعة؟ قال: يكره للعيب على أهلها

বাংলা অনুবাদ:

হাফস ইবন আল-বাখতারি জাফর আল-সাদিকের সূত্রে বর্ণনা করেন। তাঁকে একজন পুরুষের কুমারী মেয়েকে মুতা বিবাহ করা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দেন, “এটি অপছন্দনীয়, কারণ এতে মেয়েটির পরিবারের অসম্মান হতে পারে।”

মূল আরবি, বর্ণনা ৪৫৯৩:

العذراء التي لها أب لا تتزوج متعة إلا بأذن أبيها

বাংলা অনুবাদ:

আবান, আবু মারইয়ামের সূত্রে জাফর আল-সাদিক থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “যে কুমারী মেয়ের পিতা রয়েছে, সে পিতার অনুমতি ছাড়া মুতা বিবাহ করবে না।”

এই দুটি বর্ণনায় একই বিষয়ের দুটি আলাদা দিক রয়েছে। প্রথমটিতে মুতা বিবাহকে পরিবারের জন্য সামাজিক অসম্মানের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে। দ্বিতীয়টিতে পিতার অনুমতিকে বিবাহের শর্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কুমারীত্ব এখানে একটি ব্যক্তিগত শারীরিক বা সামাজিক অবস্থা হওয়ার পাশাপাশি পারিবারিক কর্তৃত্বের ভিত্তি হিসেবেও কাজ করছে। একজন নারী কুমারী হওয়ার কারণে তাঁর বিবাহের সিদ্ধান্তে পিতার অনুমতি প্রয়োজন হতে পারে, অথচ স্থায়ী বিবাহের ক্ষেত্রে পূর্বে যৌনসম্পর্ক হয়ে থাকলে তাঁর অবস্থান ভিন্ন হতে পারে। ফলে নারীটির বিবাহ-সংক্রান্ত স্বাধীনতা তাঁর নিজের বিচারক্ষমতার পাশাপাশি পূর্ববর্তী যৌন-অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেও নির্ধারিত হচ্ছে।

পিতা-মাতার অজ্ঞাতে কুমারীর মুতা বিবাহ: শায়খ তুসির সংরক্ষিত মতভেদ

কুমারী মেয়ের মুতা বিবাহ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা পাওয়া যায় শায়খ তুসির আল-ইস্তিবসার গ্রন্থের ৯৪ নম্বর অধ্যায়ে, যার নাম باب التمتع بالأبكار—অর্থাৎ কুমারী মেয়েদের সঙ্গে মুতা বিবাহ। এই অধ্যায়ে তুসি এমন কয়েকটি বর্ণনা পাশাপাশি রেখেছেন, যেগুলোর বক্তব্য এক নয়। একটি বর্ণনায় পিতা-মাতার তত্ত্বাবধানে থাকা কুমারী মেয়ের সঙ্গে মুতা বিবাহে সমস্যা নেই বলা হয়েছে। অন্য বর্ণনায় পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়াই মুতা করার প্রশ্নে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তবে একটি সীমাবদ্ধতার কথা এসেছে। আবার তৃতীয় বর্ণনায় পিতার অনুমতি ছাড়া কুমারীর মুতা বিবাহ নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। তুসি এই বিরোধ নিরসনের জন্য বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। [18]

৫২৫ নম্বর বর্ণনায় আবু সাঈদ আল-কাম্মাতের সূত্রে জাফর আল-সাদিককে পিতা-মাতার তত্ত্বাবধানে থাকা কুমারী মেয়েদের সঙ্গে মুতা বিবাহ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। তিনি উত্তর দেন, এতে কোনো সমস্যা নেই। ৫২৬ নম্বর বর্ণনায় হালাবির সূত্রে পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া কুমারীর মুতা বিবাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে একই ধরনের অনুমোদন পাওয়া যায়, তবে মেয়ের কুমারীত্ব অক্ষত রাখার শর্ত উল্লেখ করা হয়। এর বিপরীতে ৫২৭ নম্বর বর্ণনায় পিতার অনুমতি ছাড়া কুমারীর মুতা বিবাহ করা যাবে না বলা হয়েছে।

মূল আরবি, আল-ইস্তিবসার, বর্ণনা ৫২৬:

سألته عن التمتع من البكر إذا كانت بين أبويها بلا إذن أبويها قال لا بأس ما لم يفتض ما هناك لتعف بذلك

বাংলা অনুবাদ:

হালাবি বলেন, “আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, কোনো কুমারী মেয়ে পিতা-মাতার তত্ত্বাবধানে থাকলে তাঁদের অনুমতি ছাড়া তার সঙ্গে মুতা বিবাহ করা যাবে কি?” তিনি উত্তর দিলেন, “এতে সমস্যা নেই, যদি তার কুমারীত্ব অক্ষত রাখা হয়, যাতে এর মাধ্যমে সে সতীত্ব বজায় রাখতে পারে।”

এই বর্ণনায় পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়াই কুমারী মেয়ের সাময়িক বিবাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শর্তটি মেয়েটির স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা সম্পর্কে নয়; বরং কুমারীত্ব অক্ষত রাখার বিষয়ে। অর্থাৎ কুমারীত্ব বজায় থাকলে সাময়িক বিবাহের একটি ব্যবস্থা পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়াও গ্রহণযোগ্য বলে বর্ণিত হয়েছে। এখানে মেয়েটির নিজের বয়স বা পরিপক্বতা নির্ধারণের বিস্তারিত কোনো মানদণ্ড নেই। বর্ণনার কেন্দ্রীয় বিবেচনা কুমারীত্বের সামাজিক ও শারীরিক অবস্থান।

তবে তুসি একই অধ্যায়ে পিতার অনুমতি আবশ্যক বলে বর্ণিত বক্তব্যটিও সংরক্ষণ করেছেন। এরপর তিনি এই পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, পিতার অনুমতির বিধানটি এমন অপ্রাপ্তবয়স্ক কুমারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে, যে এখনও বয়ঃপ্রাপ্ত হয়নি। তাঁর এই ব্যাখ্যার সমর্থনে তিনি দশ বছর বয়সের বর্ণনাটি উল্লেখ করেন। আরও দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন: কোনো বর্ণনা বিশেষ পরিস্থিতিতে বলা হয়ে থাকতে পারে, অথবা নিষেধটি কঠোর অবৈধতা নয়, বরং অপছন্দনীয় হওয়ার অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। শেষোক্ত ব্যাখ্যার পক্ষে তিনি পরিবারের অসম্মানের আশঙ্কাসংক্রান্ত বর্ণনাটি উল্লেখ করেন। [19]

এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তুসির ব্যাখ্যায় পিতার অনুমতির প্রয়োজনকে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে যুক্ত করার একটি প্রচেষ্টা রয়েছে। অন্যদিকে কিছু বর্ণনায় অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই কুমারীর মুতা বিবাহের অনুমোদন এসেছে। ফলে প্রাচীন শিয়া হাদিস ও ফিকহে এই প্রশ্নের একক ও অপরিবর্তিত উত্তর পাওয়া যায় না। কুমারীর বয়স, বয়ঃপ্রাপ্তি, পিতার অনুমতি এবং সামাজিক অসম্মানের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে একাধিক অবস্থান সংরক্ষিত হয়েছে।

নাবালিকার বিবাহে পিতা ও পিতামহের কর্তৃত্ব

সমসাময়িক ইসনা আশারিয়া শিয়া ফিকহে অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের বিবাহের বিধানও স্বতন্ত্রভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। আলী আল-সিস্তানির মিনহাজুস সালিহিন গ্রন্থের বিবাহ অধ্যায়ের ৫৭ নম্বর বিধানে পিতা এবং পিতার পিতাকে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে ও মেয়ের বিবাহের অভিভাবক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মা, মাতামহ, ভাই, চাচা অথবা মামার জন্য একই ধরনের স্বয়ংক্রিয় কর্তৃত্ব নেই। ৫৮ নম্বর বিধানে বলা হয়েছে, পিতা ও পিতামহ উভয়ে জীবিত থাকলে তাঁদের প্রত্যেকে পৃথকভাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের বিবাহ সম্পন্ন করতে পারেন। যদি দুজন পৃথক ব্যক্তির সঙ্গে বিবাহের ব্যবস্থা করেন, তাহলে আগে সম্পন্ন হওয়া চুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে; একসঙ্গে সম্পন্ন হলে পিতামহের চুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। [20]

৫৯ নম্বর বিধানে অভিভাবকের সম্পাদিত বিবাহের ক্ষেত্রে সন্তানের ক্ষতি না হওয়ার শর্ত রয়েছে। অভিভাবক এমন বিবাহ সম্পন্ন করলে যা যুক্তিসঙ্গত বিচারে সন্তানের ক্ষতিকর, সেই চুক্তি অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না; পরবর্তী সময়ে সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে অনুমোদন দিলে তা কার্যকর হতে পারে। ৬০ নম্বর বিধানে ক্ষতিকর নয় এমন বিবাহের ক্ষেত্রেও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সন্তান চুক্তি বাতিল করার অধিকার পেতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও সে ক্ষেত্রে পুনরায় বিবাহ বা তালাকের বিষয়ে সতর্কতার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ অভিভাবকের কর্তৃত্বকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তার ওপর কিছু আইনগত শর্তও আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু মূল কাঠামোতে অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের বিবাহের চুক্তি অভিভাবকের মাধ্যমে সম্পাদনের সুযোগ বজায় রয়েছে। [21]

মূল আরবি, বিধান ৫৭-এর প্রাসঙ্গিক অংশ:

الأب والجدّ من طرف الأب لهما الولاية على الطفل الصغير والصغيرة

বাংলা অনুবাদ:

পিতা এবং পিতার দিকের পিতামহ অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে ও মেয়ের বিবাহ-সংক্রান্ত অভিভাবকত্বের অধিকারী।

এই বিধানের সঙ্গে মুতা বিবাহের সম্পর্কও সরাসরি রয়েছে। সিস্তানির মিনহাজুস সালিহিন-এর ২৪৪ নম্বর বিধানে সাময়িক বিবাহের মেয়াদের সর্বনিম্ন কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই বলা হয়েছে। একই আলোচনায় অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে বা মেয়ের জন্য সাময়িক বিবাহের চুক্তি করার প্রশ্নও এসেছে। বিশেষ করে আত্মীয়তার নিষেধাজ্ঞা প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে এমন চুক্তির উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। সেখানে নির্ধারিত মেয়াদ সাময়িক বিবাহের প্রাসঙ্গিক উদ্দেশ্য পূরণের উপযোগী না হলে চুক্তিটির বৈধতা নিয়ে সমস্যা রয়েছে বলা হয়েছে। অর্থাৎ অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সাময়িক বিবাহ আধুনিক শিয়া ফিকহের আলোচনাতেও একটি স্বীকৃত আইনগত বিষয়। [22]

এখানে বিবাহের চুক্তি এবং বিবাহ-পরবর্তী যৌনসম্পর্কের বিধান পৃথকভাবে নির্ধারিত হয়েছে। সিস্তানির আল-মাসায়িলুল মুনতাখাবা গ্রন্থের ১০১১ নম্বর বিধানে নয় বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে স্ত্রীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার বয়সসীমা নিজেই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিবাহের চুক্তি সম্পন্ন করার অনুমতি এবং তার সঙ্গে যৌনসম্পর্কের বয়সসীমা—দুটি পৃথক বিধান হিসেবে এখানে উপস্থিত। প্রাপ্তবয়স্কের সমতুল্য মানসিক পরিপক্বতা অথবা স্বাধীন ও অবহিত সম্মতির কোনো সর্বজনীন মানদণ্ড এই বয়সসীমায় নির্ধারিত হয়নি। [23]

প্রাপ্তবয়স্ক কুমারী নারীর সম্মতি এবং পিতার অনুমতি

অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিবাহের বিধান থেকে প্রাপ্তবয়স্ক কুমারী নারীর বিধান আলাদা। সিস্তানির মিনহাজুস সালিহিন-এর ৬৭ নম্বর বিধানে বলা হয়েছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ও বিচারক্ষমতাসম্পন্ন নারী আগে বিবাহিত হয়ে থাকলে তাঁর ওপর পিতা বা পিতামহের বিবাহসংক্রান্ত কর্তৃত্ব নেই। কিন্তু তিনি কুমারী হলে পিতার অনুমতির প্রশ্ন আবার সামনে আসে। নারীটি নিজের জীবন পরিচালনায় স্বাধীন হলে পিতা বা পিতামহ তাঁর সম্মতি ছাড়া বিবাহ দিতে পারেন না। তবে সেই নারী নিজে পিতার অনুমতি ছাড়া বিবাহ করতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে বাধ্যতামূলক সতর্কতার বিধান রয়েছে। নারীটি স্বাধীনভাবে জীবন পরিচালনা না করলে পিতা বা পিতামহের অনুমতি ছাড়া তাঁর বিবাহ করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে তাঁর সম্মতি ছাড়া অভিভাবক তাঁকে বিবাহ দিতে পারবেন কি না, সে বিষয়েও পৃথক বিধান রয়েছে। [24]

পরবর্তী ৬৮ নম্বর বিধানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক ও বিচারক্ষমতাসম্পন্ন কুমারী নারীর বিবাহে অভিভাবকের অনুমতির প্রশ্নে স্থায়ী ও সাময়িক বিবাহের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এমনকি সাময়িক বিবাহের চুক্তিতে যৌনসম্পর্ক না করার শর্ত থাকলেও একই বিধান প্রযোজ্য। ৬৯ নম্বর বিধানে পিতা বা পিতামহ উপযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে বিবাহে বাধা দিলে, বিবাহসংক্রান্ত দায়িত্ব থেকে সরে গেলে অথবা অনুমতি নেওয়া বাস্তবে অসম্ভব হলে কিছু ক্ষেত্রে অনুমতির প্রয়োজন না থাকার বিধান রয়েছে। তবে সেই ব্যতিক্রমগুলো সাময়িক বিবাহের ক্ষেত্রে একইভাবে কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে পৃথক সতর্কতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। [25]

এই বিধানগুলোতে নারীর স্বাধীন সম্মতি এবং অভিভাবকের অনুমতি দুটি ভিন্ন বিষয়। একজন নারী বিবাহে সম্মত হলেও কুমারী হওয়ার কারণে তাঁর পিতার অনুমতি প্রয়োজন হতে পারে। আবার পিতা সম্মত হলেই মেয়েটির নিজের সম্মতির প্রশ্ন সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় না। কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের ক্ষেত্রে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা অভিভাবকের হাতে থাকায় ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্নের কাঠামোই আলাদা। ফলে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক কুমারী নারীর বিধান এক করে দেখলে তাঁদের প্রকৃত আইনগত অবস্থান বোঝা যায় না।

কুমারীত্ব, বয়স এবং স্বাধীন সম্মতির সমস্যা

প্রাচীন ও সমসাময়িক শিয়া বিধানগুলো একত্র করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। প্রথমত, শায়খ সদুকের সংরক্ষিত বর্ণনায় দশ বছর বয়সী মেয়েকে প্রতারণার আশঙ্কা থেকে মুক্ত বলে বিবেচনা করার বক্তব্য পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, শায়খ তুসির সংরক্ষিত বর্ণনায় পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়াই কুমারীর সঙ্গে মুতা বিবাহের অনুমোদন রয়েছে, যদিও অন্য বর্ণনায় সেই অনুমতি প্রয়োজন বলা হয়েছে। তৃতীয়ত, সমসাময়িক ফিকহে অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের বিবাহের চুক্তি অভিভাবকের মাধ্যমে সম্পাদনের সুযোগ রয়েছে। চতুর্থত, প্রাপ্তবয়স্ক কুমারী নারী বিচারক্ষমতাসম্পন্ন হলেও তাঁর বিবাহে পিতার অনুমতির প্রশ্ন থেকে যায়। এই বিভিন্ন বিধানের মধ্যে মূল বিষয় হলো বয়স, কুমারীত্ব এবং পরিবারের কর্তৃত্বের ভিত্তিতে নারীটির বিবাহসংক্রান্ত অধিকার নির্ধারণ করা।

অল্পবয়সী শিশুর বিবাহের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্বাধীন ও অবহিত সম্মতি। একজন দশ বছর বয়সী শিশু কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে নির্দিষ্ট মেয়াদের বিবাহের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শারীরিক পরিণতি সম্পূর্ণভাবে বুঝতে সক্ষম—এমন ধারণার পক্ষে বয়সের সংখ্যা ছাড়া অন্য কোনো প্রমাণ ওই হাদিসে নেই। শিশুটি কোনো প্রাপ্তবয়স্কের প্ররোচনা, চাপ কিংবা প্রতারণার শিকার হচ্ছে কি না, তা নির্ধারণের জন্যও কেবল বয়স যথেষ্ট নয়। যে বয়সে একটি শিশু শিক্ষা, পরিবার ও অভিভাবকের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল, সেই বয়সে তার সাময়িক বিবাহের সম্ভাবনা নিয়ে ধর্মীয় অনুমতির আলোচনা নিজেই একটি গুরুতর নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করে।

কুমারী নারীর ক্ষেত্রে পরিবারের সম্মানকে বিবেচনায় নেওয়ার বিধানও একই ধরনের সামাজিক সমস্যার প্রকাশ। শায়খ সদুকের বর্ণনায় মুতা বিবাহকে পরিবারের জন্য অসম্মানজনক হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু নারীটির নিজের সামাজিক অবস্থান, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং সম্পর্কের পরিণতি পৃথকভাবে মূল্যায়িত হয়নি। আবার অভিভাবকের অনুমতির বিধানে পিতার কর্তৃত্বকে গুরুত্বপূর্ণ করা হয়েছে। এই কাঠামোয় নারীটির ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং পারিবারিক মর্যাদার মধ্যে সংঘাতের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সাময়িক বিবাহে সম্পর্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নারীর ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার এবং অন্যান্য পারিবারিক অধিকার সীমিত হওয়ায় সেই সংঘাতের বাস্তব প্রভাব আরও বড় হতে পারে।

শিশুর বিবাহের চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা অভিভাবকের হাতে থাকা এবং নির্দিষ্ট বয়সে যৌনসম্পর্কের অনুমতির বিধান থাকা—এই দুটি বিষয় আধুনিক শিশু-অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বায়ত্তশাসনের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অভিভাবক কোনো শিশুর চিকিৎসা, শিক্ষা বা দৈনন্দিন প্রয়োজনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তিনি শিশুর হয়ে প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে যৌনসম্পর্কের জন্য স্বাধীন ও অবহিত সম্মতি প্রদান করতে সক্ষম। যৌনসম্পর্কে সম্মতির কেন্দ্রীয় বিষয় হলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজের বয়সোপযোগী পরিপক্বতা, স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং চাপমুক্ত সম্মতি। একটি ধর্মীয় বিবাহচুক্তি সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে এসব শর্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূরণ হয়ে যায় না।

মুতা বিবাহের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি আরও স্পষ্ট, কারণ এখানে সম্পর্কের মেয়াদ এবং বিনিময় আগে থেকে নির্ধারিত হয়। চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে স্থায়ী দাম্পত্যের সম্পর্ক বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা থাকে না। অথচ অল্পবয়সী মেয়ের সামাজিক অবস্থান, শারীরিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ জীবন সেই চুক্তির পরিণতিতে প্রভাবিত হতে পারে। সাময়িক বিবাহের আইনগত বৈধতা এবং সেই সম্পর্কে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির প্রকৃত সম্মতি—এ দুটি পৃথক প্রশ্ন। শায়খ সদুক ও তুসির সংরক্ষিত বর্ণনাগুলো এই পার্থক্যের ঐতিহাসিক গুরুত্ব প্রকাশ করে।

সুতরাং শিয়া হাদিস ও ফিকহগ্রন্থে মুতা বিবাহকে শুধু দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের স্বাধীন সম্মতিতে সম্পাদিত সাময়িক চুক্তি হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। সেখানে অল্পবয়সী মেয়ে, কুমারী নারী, পিতা-মাতার অনুমতি, পরিবারের সম্মান এবং অভিভাবকের মাধ্যমে বিবাহের চুক্তি সম্পাদনের বিধান রয়েছে। দশ বছর বয়সকে প্রতারণার প্রশ্নে একটি সীমা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; পিতার অনুমতি ছাড়া কুমারীর মুতা বিবাহের পক্ষে ও বিপক্ষে বর্ণনা সংরক্ষিত হয়েছে; এবং পরবর্তী ফিকহেও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের বিবাহের আইনগত কাঠামো বজায় রয়েছে। এসব বিধানের কেন্দ্রে শুধু বিবাহের ধর্মীয় বৈধতা নয়, শিশু ও নারীর স্বাধীন সম্মতি এবং তাঁদের ওপর পারিবারিক ও সামাজিক কর্তৃত্বের প্রশ্নও রয়েছে।


মুতা বিবাহ হালাল হওয়ার কারণ

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পতিতাবৃত্তির মত এরকম একটি প্রথা ইসলামে হালাল কেন করা হয়েছিল? কী এমন ঘটনা ঘটেছিল, যার কারণে এরকম একটি বিষয়কে নবী হালাল করেছিলেন? আসুন পড়ে দেখি [26] –

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৭/ বিয়ে
পরিচ্ছেদঃ ৬৭/৩২. অবশেষে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুত‘আহ বিয়ে নিষেধ করেছেন।
৫১১৬. আবূ জামরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, আমি মহিলাদের মুত‘আহ বিয়ে সম্পর্কে ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-কে প্রশ্ন করতে শুনেছি, তখন তিনি তার অনুমতি দেন। তাঁর আযাদকৃত গোলাম তাঁকে বললেন যে, এরূপ হুকুম নিতান্ত প্রয়োজন ও মহিলাদের স্বল্পতা ইত্যাদির কারণেই ছিল? ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বললেন, হাঁ। (আধুনিক প্রকাশনী- ৪৭৪১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৭৪৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ জামরা (রহঃ)

উপরের হাদিসটি থেকে জানা যায়, নবী মুহাম্মদ মুতা বিবাহ হালাল করেছিলেন নারী স্বল্পতার কারণে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে যখন গনিমতের মাল হিসেবে যুদ্ধবন্দী নারীরা মুহাম্মদের সৈন্যদের হস্তগত হয় নি, তাদের সাথে সহবত করা যায় নি, সেই সময়ে নবী মুতা বিবাহ হালাল করে দিয়েছিলেন। ইবনে হাজারের ব্যাখ্যায়, খায়বারের পর মুসলিমদের হাতে সম্পদ ও যুদ্ধবন্দী নারী বৃদ্ধি পাওয়ায় মুতার আগের প্রয়োজন কমে যায়; এই প্রেক্ষাপটেই তিনি নিষেধাজ্ঞাটিকে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ নারীসঙ্গের প্রয়োজন অন্যভাবে পূরণ হওয়ার সুযোগ তৈরি হলে মুতার প্রয়োজনও কমে যায়। বিনা পয়সায় যুদ্ধবন্দী নারীদের ধর্ষণ করা গেলে পয়সা দিয়ে আর মুতা বিবাহের প্রয়োজনই বা কী [27] [28]!

মূল আরবি
وَسَيَأْتِي النَّقْلُ عَنْهُ فِي الرُّخْصَةِ فِي الْحُمُرِ الْأَهْلِيَّةِ فِي أَوَائِلِ كِتَابِ الْأَطْعِمَةِ، فَرَدَّ عَلَيْهِ عَلِيٌّ فِي الْأَمْرَيْنِ مَعًا وَأَنَّ ذَلِكَ يَوْمُ خَيْبَرَ، فَإِمَّا أَنْ يَكُونَ عَلَى ظَاهِرِهِ، وَأَنَّ النَّهْيَ عَنْهُمَا وَقَعَ فِي زَمَنٍ وَاحِدٍ. وَإِمَّا أَنْ يَكُونَ الْإِذْنُ الَّذِي وَقَعَ عَامَ الْفَتْحِ لَمْ يَبْلُغْ عَلِيًّا لِقِصَرِ مُدَّةِ الْإِذْنِ وَهُوَ ثَلَاثَةُ أَيَّامٍ كَمَا تَقَدَّمَ.
وَالْحَدِيثُ فِي قِصَّةِ تَبُوكَ عَلَى نَسْخِ الْجَوَازِ فِي السَّفَرِ؛ لِأَنَّهُ نَهَى عَنْهَا فِي أَوَائِلِ إِنْشَاءِ السَّفَرِ مَعَ أَنَّهُ كَانَ سَفَرًا بَعِيدًا، وَالْمَشَقَّةُ فِيهِ شَدِيدَةٌ كَمَا صَرَّحَ بِهِ فِي الْحَدِيثِ فِي تَوْبَةِ كَعْبٍ، وَكَانَتْ عِلَّةُ الْإِبَاحَةِ وَهِيَ الْحَاجَةُ الشَّدِيدَةُ انْتَهَتْ مِنْ بَعْدِ فَتْحِ خَيْبَرَ وَمَا بَعْدَهَا وَاللَّهُ أَعْلَمُ.
وَالْجَوَابُ عَنْ قَوْلِ السُّهَيْلِيِّ أَنَّهُ لَمْ يَكُنْ فِي خَيْبَرَ نِسَاءٌ يُسْتَمْتَعُ بِهِنَّ ظَاهِرٌ مِمَّا بَيَّنْتُهُ مِنَ الْجَوَابِ عَنْ قَوْلِ ابْنِ الْقَيِّمِ: لَمْ تَكُنِ الصَّحَابَةُ يَتَمَتَّعُونَ بِالْيَهُودِيَّاتِ، وَأَيْضًا فَيُقَالُ كَمَا تَقَدَّمَ لَمْ يَقَعْ فِي الْحَدِيثِ التَّصْرِيحُ بِأَنَّهُمُ اسْتَمْتَعُوا فِي خَيْبَرَ، وَإِنَّمَا فِيهِ مُجَرَّدُ النَّهْيِ، فَيُؤْخَذُ مِنْهُ أَنَّ التَّمَتُّعَ مِنَ النِّسَاءِ كَانَ حَلَالًا، وَسَبَبُ تَحْلِيلِهِ مَا تَقَدَّمَ فِي حَدِيثِ ابْنِ مَسْعُودٍ حَيْثُ قَالَ: كُنَّا نَغْزُو وَلَيْسَ لَنَا شَيْءٌ – ثُمَّ قَالَ – فَرَخَّصَ لَنَا أَنْ نَنْكِحَ الْمَرْأَةَ بِالثَّوْبِ، فَأَشَارَ إِلَى سَبَبِ ذَلِكَ وَهُوَ الْحَاجَةُ مَعَ قِلَّةِ الشَّيْءِ، وَكَذَا فِي حَدِيثِ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ الَّذِي أَخْرَجَهُ ابْنُ عَبْدِ الْبَرِّ بِلَفْظِ: إِنَّمَا رَخَّصَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فِي الْمُتْعَةِ لِعُزْبَةٍ كَانَتْ بِالنَّاسِ شَدِيدَةٍ، ثُمَّ نَهَى عَنْهَا، فَلَمَّا فُتِحَتْ خَيْبَرَ وَسَّعَ عَلَيْهِمْ مِنَ الْمَالِ وَمِنَ السَّبْيِ فَنَاسَبَ النَّهْيُ عَنِ الْمُتْعَةِ؛ لِارْتِفَاعِ سَبَبِ الْإِبَاحَةِ، وَكَانَ ذَلِكَ مِنْ تَمَامِ شُكْرِ نِعْمَةِ اللَّهِ عَلَى التَّوْسِعَةِ بَعْدَ الضِّيقِ، أَوْ كَانَتِ الْإِبَاحَةُ إِنَّمَا تَقَعُ فِي الْمَغَازِي الَّتِي يَكُونُ فِي الْمَسَافَةِ إِلَيْهَا بُعْدٌ وَمَشَقَّةٌ، وَخَيْبَرُ بِخِلَافِ ذَلِكَ؛ لِأَنَّهَا بِقُرْبِ الْمَدِينَةِ فَوَقَعَ النَّهْيُ عَنِ الْمُتْعَةِ فِيهَا إِشَارَةٌ إِلَى ذَلِكَ مِنْ غَيْرِ تَقَدُّمِ إِذْنٍ فِيهَا، ثُمَّ لَمَّا عَادُوا إِلَى سَفْرَةٍ بَعِيدَةِ الْمُدَّةِ، وَهِيَ غَزَاةُ الْفَتْحِ، وَشَقَّتْ عَلَيْهِمُ الْعُزُوبَةُ أَذِنَ لَهُمْ فِي الْمُتْعَةِ لَكِنْ مُقَيَّدًا بِثَلَاثَةِ أَيَّامٍ فَقَطْ؛ دَفْعًا لِلْحَاجَةِ، ثُمَّ نَهَاهُمْ بَعْدَ انْقِضَائِهَا عَنْهَا كَمَا سَيَأْتِي مِنْ رِوَايَةِ سَلَمَةَ.
وَهَكَذَا يُجَابُ عَنْ كُلِّ سَفْرَةٍ ثَبَتَ فِيهَا النَّهْيُ بَعْدَ الْإِذْنِ.
وَأَمَّا حَجَّةُ الْوَدَاعِ فَالَّذِي يَظْهَرُ أَنَّهُ وَقَعَ فِيهَا النَّهْيُ مُجَرَّدًا إِنْ ثَبَتَ الْخَبَرُ فِي ذَلِكَ؛ لِأَنَّ الصَّحَابَةَ حَجُّوا فِيهَا بِنِسَائِهِمْ بَعْدَ أَنْ وُسِّعَ عَلَيْهِمْ فَلَمْ يَكُونُوا فِي شِدَّةٍ وَلَا طُولِ عُزْبَةٍ، وَإِلَّا فَمَخْرَجُ حَدِيثِ سَبْرَةَ رَاوية هُوَ مِنْ طَرِيقِ ابْنِهِ الرَّبِيعِ عَنْهُ، وَقَدِ اخْتُلِفَ عَلَيْهِ فِي تَعْيِينِهَا؛ وَالْحَدِيثُ وَاحِدٌ فِي قِصَّةٍ وَاحِدَةٍ فَتَعَيَّنَ التَّرْجِيحُ، وَالطَّرِيقُ الَّتِي أَخْرَجَهَا مُسْلِمٌ مُصَرِّحَةٌ بِأَنَّهَا فِي زَمَنِ الْفَتْحِ أَرْجَحُ فَتَعَيَّنَ الْمَصِيرُ إِلَيْهَا وَاللَّهُ أَعْلَمُ.
الْحَدِيثُ الثَّانِي.
قَوْلُهُ: (عَنْ أَبِي جَمْرَةَ) هُوَ الضُّبَعِيُّ بِالْجِيمِ وَالرَّاءِ، وَرَأَيْتُهُ بِخَطِّ بَعْضِ مَنْ شَرَحَ هَذَا الْكِتَابِ بِالْمُهْمَلَةِ وَالزَّايِ وَهُوَ تَصْحِيفٌ.
قَوْلُهُ: (سَمِعْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ يُسْأَلُ) بِضَمِّ أَوَّلِهِ.
قَوْلُهُ: (فَرَخَّصَ) أَيْ فِيهَا، وَثَبَتَتْ فِي رِوَايَةِ الْإِسْمَاعِيلِيِّ.
قَوْلُهُ: (فَقَالَ لَهُ مَوْلًى لَهُ) لَمْ أَقِفْ عَلَى اسْمِهِ صَرِيحًا، وَأَظُنُّهُ عِكْرِمَةَ.
قَوْلُهُ: (إِنَّمَا ذَلِكَ فِي الْحَالِ الشَّدِيدِ، وَفِي النِّسَاءِ قِلَّةٌ أَوْ نَحْوِهِ) فِي رِوَايَةِ الْإِسْمَاعِيلِيِّ: إِنَّمَا كَانَ ذَلِكَ فِي الْجِهَادِ وَالنِّسَاءُ قَلِيلٌ.
قَوْلُهُ: (فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: نَعَمْ) فِي رِوَايَةِ الْإِسْمَاعِيلِيِّ صَدَقَ. وَعِنْدِ مُسْلِمٍ مِنْ طَرِيقِ الزُّهْرِيِّ، عَنْ خَالِدِ بْنِ الْمُهَاجِرِ، أَوِ ابْنِ أَبِي عُمْرَةَ الْأَنْصَارِيِّ: قَالَ رَجُلٌ – يَعْنِي لِابْنِ عَبَّاسٍ، وَصَرَّحَ بِهِ الْبَيْهَقِيُّ فِي رِوَايَتِهِ – إِنَّمَا كَانَتْ – يَعْنِي الْمُتْعَةَ – رُخْصَةً فِي أَوَّلِ الْإِسْلَامِ لِمَنِ اضْطُرَّ إِلَيْهَا؛ كَالْمَيْتَةِ وَالدَّمِ وَلَحْمِ الْخِنْزِيرِ، وَيُؤَيِّدُهُ مَا أَخْرَجَهُ الْخَطَّابِيُّ، وَالْفَاكِهِيُّ مِنْ طَرِيقِ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ قَالَ: قُلْتُ لِابْنِ عَبَّاسٍ لَقَدْ سَارَتْ بِفُتْيَاكَ الرُّكْبَانُ، وَقَالَ فِيهَا الشُّعَرَاءُ، يَعْنِي فِي الْمُتْعَةِ. فَقَالَ: وَاللَّهِ مَا بِهَذَا أَفْتَيْتُ، وَمَا هِيَ إِلَّا كَالْمَيْتَةِ لَا تَحِلُّ إِلَّا لِلْمُضْطَرِّ.
وَأَخْرَجَهُ الْبَيْهَقِيُّ مِنْ وَجْهٍ آخَرَ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، وَزَادَ فِي آخِرِهِ: أَلَا إِنَّمَا هِيَ كَالْمَيْتَةِ وَالدَّمِ وَلَحْمِ الْخِنْزِيرِ. وَأَخْرَجَهُ مُحَمَّدُ بْنُ خَلَفٍ الْمَعْرُوفُ بِوَكِيعٍ فِي كِتَابِ الْغُرَرِ مِنَ الْأَخْبَارِ بِإِسْنَادٍ أَحْسَنَ مِنْهُ عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ بِالْقِصَّةِ، لَكِنْ لَيْسَ فِي آخِرِهِ قَوْلُ ابْنِ عَبَّاسٍ الْمَذْكُورُ.
وَفِي حَدِيثِ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ الَّذِي أَشَرْتُ
বাংলা অনুবাদ
ফাতহুল বারী
খন্ডঃ 9 | পৃষ্ঠাঃ 171
গৃহপালিত গাধার গোশত ভক্ষণের অনুমতির বিষয়ে তাঁর থেকে উদ্ধৃতি আহার অধ্যায়ের (কিতাবুল আতইমাহ) প্রারম্ভে আসবে। আলী (রা.) উভয় বিষয়েই (গাধা ও মুতআ) তাঁকে উত্তর দিয়েছিলেন এবং জানিয়েছিলেন যে, তা খায়বরের যুদ্ধের দিন নিষিদ্ধ হয়েছিল। হয় এটি তার প্রকাশ্য অর্থের ওপর ভিত্তি করে হবে যে, উভয় বিষয়ের নিষেধাজ্ঞা একই সময়ে কার্যকর হয়েছিল; অথবা এমনও হতে পারে যে, মক্কা বিজয়ের বছর মুতআর যে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তা আলীর (রা.) কাছে পৌঁছেনি। কারণ সেই অনুমতির মেয়াদ ছিল অত্যন্ত স্বল্প—মাত্র তিন দিন, যেমনটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
আর তাবুকের যুদ্ধের ঘটনার হাদীসটি সফর অবস্থায় মুতআ বৈধ হওয়ার বিধান রহিত হওয়ার প্রমাণ বহন করে। কারণ তিনি (সা.) সফরের শুরুতেই তা নিষেধ করেছিলেন, যদিও সেটি ছিল একটি সুদূরপ্রসারী সফর এবং তাতে কষ্ট ছিল অত্যন্ত তীব্র, যেমনটি কা’ব ইবনে মালিকের তাওবার হাদীসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। আর মুতআ বৈধ হওয়ার যে কারণ ছিল—অর্থাৎ তীব্র অভাব ও প্রয়োজন—তা খায়বর বিজয় ও পরবর্তী সময়ে শেষ হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহই ভালো জানেন।
সুহাইলীর এই উক্তির জবাব—যে খায়বরে উপভোগ করার মতো কোনো নারী ছিল না—ইবনে কাইয়্যিমের উক্তির জবাবে আমি যা স্পষ্ট করেছি তা থেকেই প্রতীয়মান হয়। ইবনে কাইয়্যিম বলেছিলেন: সাহাবীগণ ইহুদী নারীদের সাথে মুতআ করতেন না। এছাড়া আরও বলা যেতে পারে যে, পূর্বে যেমন অতিক্রান্ত হয়েছে, হাদীসে স্পষ্টভাবে এটি আসেনি যে তাঁরা খায়বরে মুতআ করেছিলেন; বরং সেখানে কেবল নিষেধাজ্ঞার কথা এসেছে। এ থেকে বোঝা যায় যে, নারীদের সাথে মুতআ করা (পূর্বে) হালাল ছিল। এর হালাল হওয়ার কারণ ইবনে মাসউদের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছিলেন: “আমরা যুদ্ধ করতাম অথচ আমাদের সাথে কিছুই ছিল না।” তারপর তিনি বললেন, “অতঃপর তিনি আমাদের একটি কাপড়ের বিনিময়ে নারীকে বিবাহ (মুতআ) করার অনুমতি দিয়েছিলেন।” তিনি এর কারণ হিসেবে অভাব ও প্রয়োজনীয় আসবাবের স্বল্পতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
তদ্রূপ সহল ইবনে সা’দ-এর হাদীসেও রয়েছে, যা ইবনে আব্দুল বার বর্ণনা করেছেন: “নবী (সা.) মানুষের তীব্র একাকীত্বের (অবিবাহিত অবস্থা) কারণে মুতআর অনুমতি দিয়েছিলেন, অতঃপর তা নিষেধ করেন।” যখন খায়বর বিজিত হলো, তখন আল্লাহ তাঁদের জন্য সম্পদ ও যুদ্ধবন্দিনীর প্রাচুর্য দান করলেন। ফলে মুতআ নিষিদ্ধ হওয়াটাই যুক্তিযুক্ত ছিল, কারণ বৈধতার কারণটি দূরীভূত হয়েছিল। এটি ছিল সংকীর্ণতার পর সচ্ছলতা দানের জন্য আল্লাহর নেয়ামতের পূর্ণাঙ্গ শুকরিয়া স্বরূপ। অথবা মুতআর বৈধতা কেবল সেই সকল যুদ্ধাভিযানে দেওয়া হতো যেখানে দূরত্ব ছিল অনেক এবং কষ্ট ছিল তীব্র।
খায়বরের বিষয়টি এর বিপরীত ছিল, কারণ এটি মদীনার নিকটবর্তী ছিল। তাই সেখানে কোনো পূর্ববর্তী অনুমতি ছাড়াই মুতআ নিষিদ্ধ হওয়া এই বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে। পরবর্তীতে যখন তাঁরা সুদীর্ঘ সময়ের সফরে বের হলেন—অর্থাৎ মক্কা বিজয়ের যুদ্ধ—এবং তাঁদের ওপর একাকীত্ব কষ্টদায়ক হয়ে উঠল, তখন তিনি তাঁদেরকে মুতআর অনুমতি দিলেন; তবে তা কেবল তিন দিনের জন্য সীমিত ছিল অভাব পূরণের লক্ষে। অতঃপর সেই সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর তিনি পুনরায় তা নিষেধ করেন, যেমনটি সামনে সালামাহ-এর বর্ণনায় আসবে।
এভাবেই সেই প্রতিটি সফরের জবাব দেওয়া হবে যেগুলোতে অনুমতির পর নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
আর বিদায় হজ্জের বিষয়ে যা প্রতীয়মান হয় তা হলো, যদি সেখানে নিষেধাজ্ঞার বর্ণনাটি প্রমাণিত হয়, তবে তা ছিল কেবল পূর্ববর্তী নিষেধাজ্ঞার স্মারকস্বরূপ। কারণ সাহাবীগণ তখন সচ্ছল অবস্থায় তাঁদের স্ত্রীদের নিয়ে হজ্জ করেছিলেন, ফলে কোনো অভাব বা দীর্ঘ একাকীত্ব সেখানে ছিল না। অন্যথায়, সাবরা-এর হাদীসের সূত্র তাঁর পুত্র রবী’র মাধ্যমে বর্ণিত। কিন্তু সেটি কোন সময়ের ঘটনা ছিল তা নির্ধারণে মতভেদ রয়েছে। ঘটনাটি যেহেতু একটিই, তাই এখানে প্রাধান্য (তারজীহ) দেওয়া আবশ্যক। আর মুসলিম যে বর্ণনাটি মক্কা বিজয়ের সময় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে উদ্ধৃত করেছেন, সেটিই অধিক বিশুদ্ধ; ফলে সেটির দিকেই প্রত্যাবর্তন করা আবশ্যক। আল্লাহই ভালো জানেন।
দ্বিতীয় হাদীস।
তাঁর উক্তি: (আবু জামরা থেকে) তিনি হলেন আদ-দুবাইয়ী—জীম ও রা বর্ণযোগে। আমি এই গ্রন্থের কোনো কোনো ব্যাখ্যাকারকের হস্তলিপিতে এটি সিন (মুহমালাহ) ও যা বর্ণযোগে দেখেছি, যা মূলত লেখনীগত ভুল (তাসহিফ)।
তাঁর উক্তি: (আমি ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞাসিত হতে শুনেছি) এখানে ক্রিয়াটি কর্মবাচ্যে (পড়তে হবে)।
তাঁর উক্তি: (অতঃপর তিনি অনুমতি দিলেন) অর্থাৎ মুতআ করার বিষয়ে। ইসমাঈলীর বর্ণনায় এটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
তাঁর উক্তি: (তাঁর এক গোলাম তাঁকে বলল) আমি তাঁর নাম স্পষ্টভাবে জানতে পারিনি, তবে আমার ধারণা তিনি ইকরিমা।
তাঁর উক্তি: (এটি কেবল তীব্র অভাবের অবস্থায় এবং যখন নারীর স্বল্পতা থাকে অথবা তদ্রূপ কিছু) ইসমাঈলীর বর্ণনায় রয়েছে: “এটি কেবল জিহাদের সময় ছিল যখন নারীর সংখ্যা ছিল কম।”
তাঁর উক্তি: (ইবনে আব্বাস বললেন: হ্যাঁ) ইসমাঈলীর বর্ণনায় রয়েছে: “সে সত্য বলেছে।” আর মুসলিমের বর্ণনায় যুহরীর সূত্রে খালিদ ইবনে মুহাজির অথবা ইবনে আবী আমরাহ আনসারী থেকে বর্ণিত হয়েছে: এক ব্যক্তি ইবনে আব্বাসকে বললেন—বায়হাকী তাঁর বর্ণনায় স্পষ্ট করেছেন—”মুতআ কেবল ইসলামের শুরুতে নিরুপায় ব্যক্তির জন্য অনুমতি (রুখসা) ছিল, যেমনটি মৃত প্রাণী, রক্ত এবং শুকরের গোশত (নিরুপায় অবস্থায় বৈধ)।” খাত্তাবী ও ফাকীহী সাঈদ ইবনে জুবায়েরের সূত্রে যা বর্ণনা করেছেন তা একে সমর্থন করে। সাঈদ ইবনে জুবায়ের বলেন: আমি ইবনে আব্বাসকে বললাম, আপনার ফতোয়া তো দেশময় ছড়িয়ে পড়েছে এবং কবিরা এ নিয়ে (মুতআ বিষয়ে) কবিতাও রচনা করেছে। তখন তিনি বললেন, “আল্লাহর কসম, আমি এমন ফতোয়া দেইনি। এটি তো মৃত প্রাণীর মতো, যা নিরুপায় ব্যক্তি ছাড়া আর কারো জন্য হালাল নয়।”
বায়হাকী অন্য সূত্রে সাঈদ ইবনে জুবায়ের থেকে এটি বর্ণনা করেছেন এবং শেষে যোগ করেছেন: “জেনে রেখো, এটি মৃত প্রাণী, রক্ত ও শুকরের গোশতের মতোই।” মুহাম্মদ ইবনে খালাফ (যিনি ওয়াকী’ নামে পরিচিত) তাঁর ‘আল-গুরার মিনাল আখবার’ গ্রন্থে সাঈদ ইবনে জুবায়ের থেকে আরও উত্তম সনদে এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন, তবে সেখানে শেষে ইবনে আব্বাসের এই উক্তিটি নেই।
আর সহল ইবনে সা’দ-এর যে হাদীসের দিকে আমি ইঙ্গিত করেছি…

অর্থাৎ নারীসঙ্গের প্রয়োজন তৈরি হলে মুতা হালাল, সেই প্রয়োজন অন্যভাবে মিটে গেলে হারাম, আবার প্রয়োজন তৈরি হলে পুনরায় হালাল, সুন্নি ব্যাখ্যার ভেতরেই এমন একটি চিত্র পাওয়া যাচ্ছে [29]। আসুন আরো কিছু হাদিস পড়ি [30] [31] –

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৮০। মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু নুমায়র আল হামদানী (রহঃ) … কায়স (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে জিহাদে অংশ গ্রহণ করতাম এবং আমাদের সঙ্গে আমাদের স্ত্রীগণ থাকত না। আমরা বললাম, আমরা কি খাসী হব না? তিনি আমাদের তা থেকে নিষেধ করলেন। তারপর তিনি পরিধেয় বস্ত্র দানের বিনিময়ে আমাদের নির্দিষ্ট কালের জন্য নারীদের বিবাহ করার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর আবদুল্লাহ (রাঃ) পাঠ করলেনঃ “হে মুমিনগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য উৎকৃষ্ট যেসব বস্তু হালাল করেছেন, সেই সমুদয়কে তোমরা হারাম করো না এবং সীমালংঘন করো না আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা মায়িদাঃ ৮৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ক্বায়স বিন আবু হাযিম (রহ.)

সুনান ইবনু মাজাহ
৯/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৯/৪৪. মুত‘আ বিবাহ নিষিদ্ধ।
২/১৯৬২। সাবরাহ্ (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে বিদায় হাজ্জে রওয়ানা হলাম। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! স্ত্রীহীন অবস্থায় থাকা আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন : তাহলে তোমরা এসব মহিলার সাথে মুত‘আ করো (সাময়িকভাবে উপকৃত হও)। অতএব আমরা তাদের সান্নিধ্যে পৌঁছলাম, কিন্তু তারা আমাদের এবং তাদের মাঝে নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণ ব্যতীত আমাদের সঙ্গে বিবাহ বসতে অস্বীকার করলো। সাহাবীগণ বিষয়টি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উল্লেখ করলে তিনি বলেন, তাহলে তোমাদের ও তাদের মাঝে মেয়াদ নির্দিষ্ট করে নাও।
অতএব আমি ও আমার এক চাচাত ভাই (এই উদ্দেশে) বের হলাম। তার সাথে ছিল একটি চাদর এবং আমার সাথেও ছিল একটি চাদর। তার চাদরটি ছিল আমার চাদর থেকে বেশি সুন্দর। আর আমি ছিলাম তার চাইতে অধিক যুবক। আমরা দু’জন এক নারীর নিকট আসলাম। সে বললো, চাদর দু’টি তো একই মানের। অতঃপর আমি তাকে বিবাহ করলাম এবং তার কাছেই ঐ রাত কাটালাম। ভোরে আমি ফিরে এলাম, তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা‘বা ঘরের দরজা ও রুকনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলছিলেন : হে লোকসকল! আমি তোমাদের মুত‘আ বিবাহের অনুমতি দিয়েছিলাম। এখন তোমরা শুনে নাও যে, আল্লাহ্ ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) পর্যন্ত এই প্রকার বিবাহ হারাম করেছেন। অতএব তোমাদের কারো কাছে এ ধরণের কোন নারী থাকলে সে যেন তাকে ছেড়ে দেয় এবং তোমরা তাদেরকে যা কিছু দিয়েছো তা থেকে কিছুই ফেরত নিও না।
মুসলিম ১৪০৬, নাসায়ী ৩৩৬৮, আবূ দাউদ ২০৭২, ২০৭৩, আহমাদ ১৪৯১৩, ১৪৯২১, দারেমী ২১৯৫, ২১৯৬, ইরওয়াহ ১৯০১, ১৯০২, সহীহাহ ৩৮১, সহীহ আবী দাউদ ১৮০৮।
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ, কিন্তু বিদায় হাজ্জের কথাটি শায, মাক্কাহ বিজয়ে কথাটি সংরক্ষিত। উক্ত হাদিসের রাবী আবদুল আযিয বিন উমার সম্পর্কে আবু হাতিম আর-রাযী বলেন, তার থেকে হাদিস গ্রহন করা যায়। আবু হাতিম বিন হিব্বান বলেন, তিনি হাদিস বর্ণনায় দুর্বল। আবু হাফস উমার বিন শাহীন ও আবু দাউদ আস-সাজিসতানী বলেন, তিনি সিকাহ। আবু মুসহির আল গাসসানী বলেন, তিনি হাদিস বর্ণনায় দুর্বল। ইবনু হাজার আল-আসকালানী বলেন, তিনি সত্যবাদী তবে হাদিস ভুল সন্দেহ করেন। ইমাম যাহাবী তাকে সিকাহ বলেছেন। আবুল আলা বিন মুসহির বলেন, তিনি দুর্বল। (তাহযীবুল কামালঃ রাবী নং ৩৪৬৪, ১৮/১৭৩ নং পৃষ্ঠা)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ রবী ইবনু সাবীহ (রহঃ)


নবীর সাহাবীগণের অনেকেই মুতা বিবাহ করেছেন

অসংখ্য হাদিস এবং অসংখ্য তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, নবী মুহাম্মদের অনেক সাহাবীই মুতা বিবাহ চর্চা করতেন, এমনকি নবীর নির্দেশেই তারা মুতা বিবাহ করতেন। এই চর্চা উমরের খিলাফত পর্যন্ত আসুন কয়েকটি হাদিস দেখে নিই [32] [33] [34] –

সূনান নাসাঈ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৬/ নিকাহ (বিবাহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭১. মুত’আ হারাম হওয়া সম্পর্কে
৩৩৭১. কুতায়বা (রহঃ) … রবী’ ইবন সাবরা জুহানী (রহঃ) তার পিতার মাধ্যমে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুত’আর অনুমতি দিলে আমি আর এক ব্যক্তি বনূ আমরের এক মহিলার নিকট গেলাম এবং তার নিকট আমাদের নিজেদের উপস্থাপন করলাম। সে বললোঃ আমাকে কি দেবে? আমি বললামঃ আমার চাদর। আমার সাথীও বললেন, আমার চাদর দিব। আর আমার সাথীর চাদরখানা ছিল আমার চাদর হতে উত্তম। আর আমি ছিলাম আমার সাথী হতে অধিক যুবক। যখন সে আমার সাথীর চাদরের প্রতি লক্ষ্য করলো, তখন ঐ চাদর তার নিকট ভাল লাগল। আর যখন আমার দিকে লক্ষ্য করলো, তখন আমি তার চোখে ভালবোধ হলাম। এরপর সে বললঃ তুমি এবং তোমার চাদরই আমার জন্য যথেষ্ট। আমি তার সঙ্গে তিন রাত অবস্থান করলাম, পরবর্তী সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যার নিকট এ মুত’আর নারী আছে, সে যেন তার পথ ছেড়ে দেয় (মুক্ত করে দেয়)।
তাহক্বীকঃ সহীহ। ইবন মাজাহ ১৯৬২, ইরওয়া ১৯০১, ১৯০২, সহীহাহ ৩৮১।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ রবী’ ইবন সাবরা জুহানী (রহঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৯৫। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) … সাবরা ইবনু মা’বাদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের বছর তাঁর সাহাবীগণকে স্ত্রীলোকদের সাথে মুতআর অনুমতি দেন। সাবরা (রাঃ) বলেন, তখন আমি এবং সুলায়ম গোত্রের আমার এক সাথী বের হয়ে পড়লাম এবং শেষ পর্যন্ত আমির গোত্রের এক যুবতীকে পেয়ে গেলাম। সে জোয়ান উষ্ট্রীর ন্যায়। আমরা তার নিকট মুত’আ বিবাহের প্রস্তাব দিলাম এবং আমাদের চাঁদর তার সামনে পেশ করলাম। তখন সে তাকিয়ে দেখল এবং আমাকে আমার সঙ্গীর তুলনায় সুন্দর দেখতে পেল, অপরদিকে আমার চাঁদরের তুলনায় আমার সঙ্গীর চাঁদর উৎকৃষ্টতর দেখল। সে মনে মনে কিছুক্ষণ চিন্তা করল তারপর আমার সঙ্গীর চাইতে আমাকে অগ্রাধিকার দিল। তারা আমাদের সাথে তিন থাকল। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের পরিত্যাগ করতে আমাদের নির্দেশ দিলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সাবরাহ বিন মা’বাদ আল জুহনী (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৭। বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত্’আহ বিবাহ বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, অতঃপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং তা কিয়ামাত পর্যন্ত স্থির থাকবে
৩৩১১-(২০/…) আবূ কামিল ফুযায়ল ইবনু হুসায়ন (রহঃ) ….. রাবী’ ইবনু সাবরাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তার পিতা মাক্কাহ্ (মক্কা) বিজয়াভিযানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বলেন, আমরা তথায় ১৫ দিন অর্থাৎ পূর্ণ ১৩ দিন এবং এক দিন ও এক রাত অবস্থান করি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মুত্’আর অনুমতি দিলেন। তখন আমি ও আমার গোত্রের এক ব্যক্তি বেরিয়ে পড়লাম। আমি তার তুলনায় আকর্ষণীয় চেহারার অধিকারী ছিলাম এবং সে ছিল প্রায় কুৎসিত। আমাদের উভয়ের সাথে একটি করে চাঁদর ছিল। আমার চাঁদরটি ছিল পুরাতন এবং আমার চাচাতো ভাইয়ের চাঁদরটি ছিল সম্পূর্ণ নতুন। অবশেষে আমরা মাক্কার (মক্কার) নিম্নভূমিতে অথবা উচ্চভূমিতে পৌছে একটি যুবতী মেয়ের সাক্ষাৎ পেলাম, যাকে দেখতে অনেকটা উঠতি বয়সের চালাক এবং লম্বাঘাড় বিশিষ্ট উষ্ট্রীর মত।
আমরা প্রস্তাব দিলাম, আমাদের দু’জনের কারো সাথে তোমার মুত্র’আহ বিবাহ কি সম্ভব? সে বলল, তোমরা কী বিনিময় দিবে? তাদের প্রত্যেকে নিজ নিজ চাঁদর মেলে ধরল। সে তাদের উভয়ের দিকে তাকাতে লাগল। আমার সঙ্গীও তার দিকে তাকাল। যখন স্ত্রীলোকটির দিকে তাকিয়ে বলল, তার এ চাঁদর পুরাতন এবং আমার চাঁদর একেবারে নতুন। স্ত্রীলোকটি তিনবার কি দু’বার বলল, তার চাঁদরটি গ্রহণে কোন ক্ষতি নেই।
অতঃপর আমি তাকে মুত’আহ বিবাহ করলাম এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা হারাম ঘোষণা না করা পর্যন্ত ফিরে আসিনি।। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩২৮৬, ইসলামীক সেন্টার ৩২৮৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ রবী’ ইবন সাবরা জুহানী (রহঃ)


ইবনে হাযমের তালিকা: মুতা বৈধ মনে করতেন যেসব সাহাবি

মুতা বিবাহের বৈধতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া সাহাবীদের সংখ্যা শুধু ইবনে আব্বাস বা জাবির ইবন আবদুল্লাহর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রখ্যাত সুন্নি আইনজ্ঞ ইবনে হাযম আল-আন্দালুসি (মৃত্যু ৪৫৬ হিজরি) তাঁর আল-মুহাল্লা বিল আছার গ্রন্থে মুহাম্মদের মৃত্যুর পরেও মুতা বিবাহ বৈধ মনে করতেন, এমন নয়জন সাহাবির নাম সরাসরি উল্লেখ করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইবনে হাযম নিজে মুতা বিবাহ নিষিদ্ধ বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। কিন্তু নিজের সেই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি তিনি প্রাথমিক মুসলিম সমাজে মুতা বৈধ থাকার পক্ষে সাহাবীদের অবস্থানও সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মুহাম্মদের মৃত্যুর পরেও একদল সাহাবি এই প্রথাকে বৈধ মনে করতেন। তিনি শুধু সাহাবীদের নামই দেননি, বরং জাবির ইবন আবদুল্লাহর বর্ণনা অনুসারে মুহাম্মদ, আবু বকর এবং উমরের খেলাফতের শেষ পর্যায়ের কাছাকাছি সময় পর্যন্ত মুতার চর্চার কথাও উল্লেখ করেছেন। [35] [36]

وَقَدْ ثَبَتَ عَلَى تَحْلِيلِهَا بَعْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَمَاعَةٌ مِنْ السَّلَفِ – رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ – مِنْهُمْ مِنَ الصَّحَابَةِ

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদের মৃত্যুর পরেও পূর্ববর্তী মুসলিমদের একটি দল মুতা বিবাহ বৈধ থাকার অবস্থানে অটল ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সাহাবিরাও ছিলেন।

ইবনে হাযমের উল্লেখ করা নয়জন সাহাবি হলেন: ১. আসমা বিনত আবু বকর, ২. জাবির ইবন আবদুল্লাহ, ৩. আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ, ৪. আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস, ৫. মুয়াবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান, ৬. আমর ইবন হুরায়স, ৭. আবু সাঈদ আল-খুদরি, ৮. সালামাহ ইবন উমাইয়া ইবন খালাফ এবং ৯. মাবাদ ইবন উমাইয়া ইবন খালাফ। এই তালিকায় আবু বকরের কন্যা আসমা, প্রখ্যাত কোরআন-ব্যাখ্যাকার ইবনে আব্বাস, ইবনে মাসউদ, জাবির, আবু সাঈদ এবং পরবর্তী উমাইয়া শাসক মুয়াবিয়ার মতো ব্যক্তিদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। অর্থাৎ মুতা বৈধ থাকার অবস্থানটি প্রাথমিক মুসলিম সমাজে কয়েকজন অপরিচিত ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন মত ছিল না।

ইবনে হাযম একই আলোচনায় জাবির ইবন আবদুল্লাহর সূত্রে মুহাম্মদের যুগ থেকে আবু বকর এবং উমরের খেলাফতের শেষ পর্যায়ের কাছাকাছি সময় পর্যন্ত সাহাবীদের মুতা করার বিবরণও উল্লেখ করেছেন। এর ফলে তাঁর তালিকায় দুটি তথ্য একসঙ্গে পাওয়া যায়। প্রথমত, মুহাম্মদের মৃত্যুর পরেও একাধিক সাহাবির নামে মুতা বৈধ থাকার মত সংরক্ষিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মুহাম্মদের মৃত্যুর পরবর্তী দুই খলিফার শাসনকালেও মুতা বিবাহের বাস্তব চর্চার বিবরণ রয়েছে। সহিহ মুসলিমে সংরক্ষিত জাবিরের বক্তব্যের সঙ্গেও এই দ্বিতীয় তথ্য মিলে যায়।

ইবনে হাযম শুধু সাহাবীদের অবস্থানেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি তাবেঈদের মধ্যে তাউস ইবন কায়সান, আতা ইবন আবি রাবাহ ও সাঈদ ইবন জুবাইর-এর নাম উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে মক্কার অন্যান্য আইনজ্ঞদেরও মুতা বৈধ থাকার পক্ষের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অর্থাৎ মুতার বৈধতার পক্ষে অবস্থান সাহাবীদের যুগেই শেষ হয়ে যায়নি; পরবর্তী প্রজন্মের ধর্মীয় আইনজ্ঞদের মধ্যেও তার ধারাবাহিকতা ছিল। ইবনে হাযম আরও উল্লেখ করেছেন, উমরের নামে এমন বিবরণ পাওয়া যায়, যেখানে দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী উপস্থিত থাকলে মুতা অনুমোদিত এবং সাক্ষী না থাকলে তা আপত্তিকর বলে গণ্য হয়েছে। এই তথ্যগুলো মুতা নিষেধাজ্ঞার ঐতিহাসিক বিকাশ এবং পরবর্তী আইনগত মতভেদের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

ইবনে হাযমের এই তালিকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। তিনি নয়জন সাহাবির নামে মুতা বৈধ মনে করার অবস্থান উল্লেখ করেছেন; তাঁদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত মুতা বিবাহের পৃথক ঘটনা এখানে বর্ণনা করেননি। তবে তালিকাভুক্ত কয়েকজনের ব্যক্তিগত মুতা করার বিবরণ অন্য হাদিস ও ইতিহাসগ্রন্থে সরাসরি সংরক্ষিত হয়েছে। বিশেষ করে জাবির ইবন আবদুল্লাহ, মুয়াবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান, আমর ইবন হুরায়স এবং সালামাহ ইবন উমাইয়ার ঘটনা পৃথক বর্ণনায় পাওয়া যায়। ফলে ইবনে হাযমের তালিকা ও ব্যক্তিগত মুতা-বিবাহের ঘটনাগুলো একত্র করলে সাহাবীদের মধ্যে এই প্রথার বিস্তৃত উপস্থিতির আরও সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক চিত্র পাওয়া যায়।

ইবনে হাযমের নিজের সিদ্ধান্ত এবং তাঁর সংরক্ষিত ঐতিহাসিক তথ্যের মধ্যকার পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মুহাম্মদের নামে বর্ণিত চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞাকে গ্রহণ করে মুতা বিবাহকে অবৈধ বলেছেন। কিন্তু একই আলোচনায় মুহাম্মদের মৃত্যুর পরেও সাহাবি ও তাবেঈদের মধ্যে মুতা বৈধ থাকার মত এবং বাস্তব চর্চার ইতিহাস অস্বীকার করেননি। পরবর্তী যুগের আইনগত সিদ্ধান্ত দিয়ে সেই পূর্ববর্তী ইতিহাস মুছে যায় না। বরং তাঁর নিজের গ্রন্থই দেখায়, মুতা বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়ার প্রচলিত সুন্নি সিদ্ধান্তের সঙ্গে প্রাথমিক মুসলিম সমাজের বাস্তব মতভেদ ও চর্চার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।


ব্যক্তিগতভাবে মুতা করেছিলেন যেসব সাহাবি: নাম, ঘটনা ও তথ্যসূত্র

ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুতা বিবাহের চর্চা কেবল একটি ধর্মীয় অনুমতি বা আইনগত মতামতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মুহাম্মদের সাহাবীদের মধ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তির মুতা বিবাহ করা, নারীদের সঙ্গে বিনিময় নির্ধারণ, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যৌনসম্পর্ক স্থাপন এবং সেই সম্পর্কের ফলে সন্তান ধারণের একাধিক ঘটনা হাদিস ও ইতিহাসগ্রন্থে সংরক্ষিত হয়েছে। বিশেষ করে জাবির ইবন আবদুল্লাহ, সাবরা ইবন মাবাদ, মুয়াবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান, আমর ইবন হুরায়স, সালামাহ ইবন উমাইয়া এবং রাবিআ ইবন উমাইয়ার নামের সঙ্গে মুতা-বিবাহের নির্দিষ্ট ঘটনা যুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে ইবন মাসউদ, আবু সাঈদ আল-খুদরি এবং আরও কয়েকজন সাহাবির বর্ণনায় প্রথম পুরুষে সম্মিলিত মুতা-চর্চার বক্তব্য পাওয়া যায়। এসব বর্ণনায় মুতা করার জন্য নির্দিষ্ট বিনিময়, নারীর পরিচয়, গর্ভধারণ এবং উমরের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনাও পাওয়া যায়।


জাবির ইবন আবদুল্লাহ: মুহাম্মদ থেকে উমরের যুগ পর্যন্ত মুতা

জাবির ইবন আবদুল্লাহর বক্তব্য মুতা বিবাহের বাস্তব চর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তিনি শুধু মুহাম্মদের অনুমতির কথা বলেননি, বরং নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করে সরাসরি বলেছেন যে তাঁরা মুহাম্মদের জীবদ্দশায়, আবু বকরের খেলাফতে এবং উমরের যুগেও মুতা বিবাহ করেছেন। সহিহ মুসলিমের একাধিক বর্ণনায় তাঁর এই বক্তব্য রয়েছে। একটি বর্ণনায় তিনি খেজুর বা ময়দার বিনিময়ে মুতা করার কথা বলেছেন এবং আমর ইবন হুরায়সের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উমরের নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করেছেন। অন্য বর্ণনায় উমরের খেলাফতের সময় পর্যন্ত এই চর্চা অব্যাহত থাকার বিবরণ রয়েছে। [37] [38]

قَالَ عَطَاءٌ قَدِمَ جَابِرُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ مُعْتَمِرًا فَجِئْنَاهُ فِي مَنْزِلِهِ فَسَأَلَهُ الْقَوْمُ عَنْ أَشْيَاءَ ثُمَّ ذَكَرُوا الْمُتْعَةَ فَقَالَ نَعَمِ اسْتَمْتَعْنَا عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ

বাংলা অনুবাদ: আতা বলেন, জাবির ইবন আবদুল্লাহ উমরা পালন করতে এলে আমরা তাঁর বাসস্থানে যাই। লোকেরা তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে। এরপর মুতা বিবাহের প্রসঙ্গ উঠলে জাবির বলেন, “হ্যাঁ, আমরা মুহাম্মদের যুগে, আবু বকরের যুগে এবং উমরের যুগেও মুতা করেছি।”

জাবিরের এই বক্তব্য কোনো পরবর্তী আলেমের অনুমান নয়। এখানে সরাসরি اسْتَمْتَعْنَا বা “আমরা মুতা করেছি” বলা হয়েছে। মুহাম্মদের মৃত্যুর পরে দুই খলিফার শাসনকালেও এই চর্চা অব্যাহত ছিল বলে তিনি জানিয়েছেন। আবদুর রাজ্জাকের বর্ণনায় সময়টি আরও নির্দিষ্ট হয়েছে। সেখানে উমরের খেলাফতের শেষ পর্যায়ের কাছাকাছি সময় পর্যন্ত মুতা চলার কথা এসেছে এবং একটি গর্ভধারণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিষেধাজ্ঞার বিবরণ দেওয়া হয়েছে।


সাবরা ইবন মাবাদ: চাদরের বিনিময়ে তিন রাতের মুতা বিবাহ

সাবরা ইবন মাবাদ আল-জুহানির ঘটনা মুতা বিবাহের চুক্তিগত প্রকৃতিকে সরাসরি প্রকাশ করে। সহিহ মুসলিমে তাঁর নিজের বর্ণনায় এসেছে, মক্কা বিজয়ের সময় মুহাম্মদ সাহাবীদের নারীদের সঙ্গে মুতা করার অনুমতি দেন। সাবরা এবং তাঁর এক সঙ্গী একজন নারীর কাছে গিয়ে সাময়িক বিবাহের প্রস্তাব দেন। উভয়ের কাছে একটি করে চাদর ছিল। সঙ্গীর চাদরটি অপেক্ষাকৃত ভালো হলেও সাবরা বয়সে কম ও দেখতে আকর্ষণীয় ছিলেন। নারীটি চাদর এবং পুরুষ দুজনকে বিবেচনা করে সাবরাকে বেছে নেন। সাবরা তাঁর সঙ্গে তিন রাত অবস্থান করেন। পরবর্তীতে মুহাম্মদ মুতা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার নির্দেশ দেন। [39] [40]

أَذِنَ لَنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِالْمُتْعَةِ فَانْطَلَقْتُ أَنَا وَرَجُلٌ إِلَى امْرَأَةٍ مِنْ بَنِي عَامِرٍ كَأَنَّهَا بَكْرَةٌ عَيْطَاءُ فَعَرَضْنَا عَلَيْهَا أَنْفُسَنَا فَقَالَتْ مَا تُعْطِي فَقُلْتُ رِدَائِي وَقَالَ صَاحِبِي رِدَائِي وَكَانَ رِدَاءُ صَاحِبِي أَجْوَدَ مِنْ رِدَائِي وَكُنْتُ أَشَبَّ مِنْهُ فَإِذَا نَظَرَتْ إِلَى رِدَاءِ صَاحِبِي أَعْجَبَهَا وَإِذَا نَظَرَتْ إِلَيَّ أَعْجَبْتُهَا ثُمَّ قَالَتْ أَنْتَ وَرِدَاؤُكَ يَكْفِينِي فَمَكَثْتُ مَعَهَا ثَلَاثًا ثُمَّ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَنْ كَانَ عِنْدَهُ شَيْءٌ مِنْ هَذِهِ النِّسَاءِ الَّتِي يَتَمَتَّعُ فَلْيُخَلِّ سَبِيلَهَا

বাংলা অনুবাদ: সাবরা বলেন, মুহাম্মদ আমাদের মুতা করার অনুমতি দিলে আমি এবং আরেক ব্যক্তি বনু আমির গোত্রের একজন নারীর কাছে গেলাম। তিনি দেখতে তরুণী উটনির মতো ছিলেন। আমরা তাঁর কাছে নিজেদের মুতা বিবাহের জন্য উপস্থাপন করলাম। নারীটি জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি আমাকে কী দেবে?” আমি বললাম, “আমার চাদর।” আমার সঙ্গীও তাঁর চাদর দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। সঙ্গীর চাদরটি আমার চাদরের তুলনায় ভালো ছিল, কিন্তু আমি তাঁর তুলনায় বয়সে তরুণ ছিলাম। নারীটি আমার সঙ্গীর চাদর দেখে সেটি পছন্দ করলেন, আবার আমাকে দেখে আমার প্রতিও আকৃষ্ট হলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি বললেন, “তুমি এবং তোমার চাদরই আমার জন্য যথেষ্ট।” আমি তাঁর সঙ্গে তিন রাত অবস্থান করলাম। এরপর মুহাম্মদ ঘোষণা করলেন, যাদের কাছে এ ধরনের মুতা-বিবাহিত নারী রয়েছে, তারা যেন তাঁদের ছেড়ে দেয়।

এই ঘটনা মুতা বিবাহের অর্থনৈতিক এবং যৌন কাঠামোকে স্পষ্ট করে। চুক্তির বিনিময় একটি চাদর, মেয়াদ তিন রাত এবং মেয়াদ শেষে সম্পর্কের সমাপ্তি। নারীটি দুই পুরুষের প্রস্তাবের মধ্যে একজনকে বেছে নিয়েছিলেন। এখানে সাধারণ স্থায়ী দাম্পত্যের কোনো বিবরণ নেই; নির্দিষ্ট সম্পদের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের যৌনসম্পর্কের ব্যবস্থাই বর্ণিত হয়েছে। একই সঙ্গে এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, মুহাম্মদের অনুমতি কেবল তাত্ত্বিক ছিল না; তাঁর উপস্থিতিতেই সাহাবীরা সাময়িক বিবাহ সম্পন্ন করেছিলেন।


মুয়াবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান: তায়েফে মুতা বিবাহ

মুয়াবিয়া ইবন আবু সুফিয়ানের মুতা করার ঘটনা আবদুর রাজ্জাকের মুসান্নাফে সংরক্ষিত হয়েছে। এই ঘটনার উল্লেখ ইবনে আবদুল বারের আত-তামহিদ এবং ইবনে হাজার আসকালানীর ফাতহুল বারী-তেও রয়েছে। ইয়া’লা ইবন উমাইয়ার সূত্রে মুয়াবিয়ার তায়েফে একজন নারীর সঙ্গে মুতা করার কথা পাওয়া যায়। ঘটনা নিয়ে আপত্তি উঠলে ইবনে আব্বাসের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে জাবির ইবন আবদুল্লাহও মুতা চর্চার ইতিহাস নিশ্চিত করেন। আরেকটি বর্ণনায় মুয়াবিয়ার মুতা-সঙ্গিনীর নাম পর্যন্ত সংরক্ষিত হয়েছে—মুআনা, যিনি ইবনুল হাদরামির একজন মুক্তদাসী ছিলেন। [41] [42]

اسْتَمْتَعَ مُعَاوِيَةُ بْنُ أَبِي سُفْيَانَ مَقْدِمَهُ مِنَ الطَّائِفِ عَلَى ثَقِيفٍ بِمَوْلَاةِ ابْنِ الْحَضْرَمِيِّ يُقَالُ لَهَا مُعَانَةُ

বাংলা অনুবাদ: জাবির ইবন আবদুল্লাহ বর্ণনা করেন, মুয়াবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান তায়েফে আসার সময় ইবনুল হাদরামির একজন মুক্তদাসীর সঙ্গে মুতা বিবাহ করেছিলেন। ওই নারীর নাম ছিল মুআনা। জাবির আরও জানিয়েছেন, মুয়াবিয়ার খেলাফতকাল পর্যন্ত মুআনা জীবিত ছিলেন। মুয়াবিয়া তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিবছর তাঁকে উপহার পাঠাতেন।

মুয়াবিয়ার ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি ছিলেন মুহাম্মদের সাহাবি এবং পরবর্তীকালে উমাইয়া শাসনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর মুতা করার ঘটনা কোনো আধুনিক শিয়া প্রচারের ওপর নির্ভরশীল নয়; সুন্নি হাদিসসংকলক আবদুর রাজ্জাক নিজ গ্রন্থে সেটি সংরক্ষণ করেছেন। ইবনে হাজারও মুয়াবিয়ার তায়েফে মুতা করার বর্ণনাটির সনদকে সহিহ বলেছেন। আর মুআনার নামসহ বর্ণনায় দেখা যায়, মুতা বিবাহের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও মুয়াবিয়া তাঁর সঙ্গে আর্থিক যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন।


আমর ইবন হুরায়স: মুতা বিবাহ, গর্ভধারণ এবং উমরের নিষেধাজ্ঞা

আমর ইবন হুরায়স ছিলেন মুহাম্মদের একজন সাহাবি, যাঁর জীবনী যাহাবির সিয়ারু আলামিন নুবালা-তেও সংরক্ষিত হয়েছে। তাঁর মুতা বিবাহের ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সহিহ মুসলিমে জাবির ইবন আবদুল্লাহ সরাসরি আমর ইবন হুরায়সের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উমরের মুতা নিষিদ্ধ করার কথা বলেছেন। আবদুর রাজ্জাক এবং ইবনে হাজারের সংরক্ষিত বিবরণে ঘটনাটির বিস্তারিত পাওয়া যায়। আমর একজন মুক্তদাসীর সঙ্গে মুতা বিবাহ করেন। নারীটি গর্ভবতী হন। বিষয়টি উমরের কাছে পৌঁছালে তিনি তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এই ঘটনার পর উমরের নিষেধাজ্ঞার কথা বর্ণিত হয়েছে। [43] [44]

اسْتَمْتَعَ عَمْرُو بْنُ حُرَيْثٍ بِامْرَأَةٍ سَمَّاهَا جَابِرٌ فَنَسِيتُهَا فَحَمَلَتِ الْمَرْأَةُ فَبَلَغَ ذَلِكَ عُمَرَ فَدَعَاهَا فَسَأَلَهَا فَقَالَتْ نَعَمْ

বাংলা অনুবাদ: উমরের খেলাফতের শেষ পর্যায়ের কাছাকাছি সময়ে আমর ইবন হুরায়স একজন নারীর সঙ্গে মুতা বিবাহ করেন। জাবির নারীটির নাম উল্লেখ করেছিলেন, কিন্তু বর্ণনাকারী তা ভুলে গেছেন। নারীটি গর্ভবতী হলে ঘটনাটি উমরের কাছে পৌঁছে যায়। উমর তাঁকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। নারীটি মুতা বিবাহের ঘটনা স্বীকার করেন। উমর এরপর সাক্ষীদের বিষয়ে জানতে চান এবং কেন অন্য সাক্ষী রাখা হয়নি, সে প্রশ্নও তোলেন। এই ঘটনার সঙ্গে উমরের মুতা নিষিদ্ধ করার বিবরণ যুক্ত রয়েছে।

আমর ইবন হুরায়সের ঘটনাটি মুহাম্মদের মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় মুতা বিবাহের চর্চা অব্যাহত থাকার একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ। এখানে কোনো অজ্ঞাত ব্যক্তির গোপন যৌনসম্পর্কের অভিযোগ নয়; একজন সাহাবির নাম, মুতা-বিবাহের ঘটনা, নারীর গর্ভধারণ, খলিফার জিজ্ঞাসাবাদ এবং নিষেধাজ্ঞার ঘটনাপ্রবাহ সংরক্ষিত হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জাবিরের বর্ণনায় উমরের খেলাফতের শেষ পর্যায়ের কাছাকাছি সময় পর্যন্ত মুতা চলার কথা এসেছে।


সালামাহ ইবন উমাইয়া: উম্মু আরাকার গর্ভধারণ

সালামাহ ইবন উমাইয়া ইবন খালাফের মুতা-বিবাহের ঘটনা মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক, হাদিস ১৪০২৪-এ সংরক্ষিত হয়েছে। ইবন আব্বাসের বর্ণনায় রয়েছে, উমর একদিন উম্মু আরাকাকে গর্ভবতী অবস্থায় দেখতে পান এবং তাঁর গর্ভধারণ সম্পর্কে জানতে চান। উম্মু আরাকা সরাসরি সালামাহ ইবন উমাইয়ার নাম উল্লেখ করে বলেন, তিনি তাঁর সঙ্গে মুতা করেছেন। পরে ইবনে আব্বাসের মুতা-সংক্রান্ত বক্তব্যের বিরোধিতা করা হলে ইবনে আব্বাস এই ঘটনাটিকেই পাল্টা যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেন। [45]

فَسَأَلَهَا عُمَرُ عَنْ حَمْلِهَا فَقَالَتِ اسْتَمْتَعَ بِي سَلَمَةُ بْنُ أُمَيَّةَ بْنِ خَلَفٍ فَلَمَّا أَنْكَرَ صَفْوَانُ عَلَى ابْنِ عَبَّاسٍ بَعْضَ مَا يَقُولُ فِي ذَلِكَ

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন, উমর উম্মু আরাকাকে গর্ভবতী অবস্থায় দেখে তাঁর গর্ভধারণের কারণ জানতে চান। তিনি উত্তর দেন, “সালামাহ ইবন উমাইয়া ইবন খালাফ আমার সঙ্গে মুতা করেছেন।” পরবর্তীতে সাফওয়ান ইবনে আব্বাসের মুতা-সংক্রান্ত বক্তব্যের বিরোধিতা করলে ইবনে আব্বাস তাঁকে বলেন, “তোমার চাচাকে জিজ্ঞেস করো, তিনি মুতা করেছিলেন কি না।”

এই ঘটনাটি ইবনে আব্বাসের মুতা বৈধতার পক্ষে অবস্থানের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। ইবনে আব্বাস একটি বাস্তব ঘটনার উল্লেখ করে তাঁর বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছিলেন। ইবনে হাজার ফাতহুল বারী-তে এই ঘটনার আলোচনা করেছেন এবং উল্লেখ করেছেন, আবদুর রাজ্জাকের অন্য একটি বর্ণনায় সালামাহর পরিবর্তে তাঁর ভাই মাবাদ ইবন উমাইয়ার নাম পাওয়া যায়। একই উম্মু আরাকার ঘটনাটিতে নামের এই পাঠভেদ রয়েছে। ফলে সালামাহ ও মাবাদকে একই ঘটনার ভিত্তিতে দুইজন পৃথক মুতা-বিবাহকারী হিসেবে গণনা করা যায় না। তবে ঘটনাটিতে উম্মু আরাকার মুতা বিবাহ এবং গর্ভধারণের বিবরণ স্পষ্টভাবেই সংরক্ষিত হয়েছে।


রাবিআ ইবন উমাইয়া: মুতা-বিবাহিত নারীর গর্ভধারণ

রাবিআ ইবন উমাইয়া ইবন খালাফের ঘটনা মুতা-বিবাহের আরেকটি নির্দিষ্ট উদাহরণ। ইমাম মালিক তাঁর মুয়াত্তা-তে খাওলা বিনত হাকিমের সূত্রে এই ঘটনার বিবরণ সংরক্ষণ করেছেন। খাওলা উমরের কাছে এসে জানান, রাবিআ একজন নারীর সঙ্গে মুতা বিবাহ করেছেন এবং নারীটি তাঁর সন্তান গর্ভে ধারণ করেছেন। এই সংবাদ শুনে উমর আতঙ্কিত হয়ে চাদর টানতে টানতে বেরিয়ে আসেন এবং বলেন, তিনি আগে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে রজম করতেন। একই ঘটনা ইমাম শাফিঈর মুসনাদ-এও সংরক্ষিত হয়েছে। [46] [47]

إِنَّ رَبِيعَةَ بْنَ أُمَيَّةَ اسْتَمْتَعَ بِامْرَأَةٍ فَحَمَلَتْ مِنْهُ فَخَرَجَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ فَزِعًا يَجُرُّ رِدَاءَهُ

বাংলা অনুবাদ: খাওলা বিনত হাকিম উমর ইবন খাত্তাবের কাছে গিয়ে বললেন, “রাবিআ ইবন উমাইয়া একজন নারীর সঙ্গে মুতা বিবাহ করেছেন এবং নারীটি তাঁর সন্তান গর্ভে ধারণ করেছেন।” এই সংবাদ শুনে উমর বিচলিত হয়ে চাদর টানতে টানতে বেরিয়ে এলেন। তিনি বললেন, “এই হলো মুতা। আমি যদি আগে এ বিষয়ে ঘোষণা দিয়ে থাকতাম, তাহলে তাঁকে রজম করতাম।”

রাবিআর ঘটনাটি সালামাহ বা আমর ইবন হুরায়সের ঘটনার সঙ্গে এক নয়। এখানে আলাদা একজন পুরুষের নাম, গর্ভবতী নারীর বিবরণ এবং খাওলা বিনত হাকিমের মাধ্যমে সংবাদ পৌঁছানোর ঘটনা রয়েছে। রাবিআ ইবন উমাইয়াকে ইবনে হাজার সাহাবিদের জীবনীগ্রন্থ আল-ইসাবা-তে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এই বিবরণে উমরের নিজের পূর্বঘোষণার বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মুতা করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি কঠোর শাস্তির কথা বলছেন, কিন্তু পূর্বে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা না করার কথাও নিজেই উল্লেখ করছেন।


ইবন মাসউদ ও আবু সাঈদ আল-খুদরি: সম্মিলিত মুতা-চর্চার বর্ণনা

আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের বর্ণনাতেও সাহাবীদের মুতা করার অনুমতি ও চর্চার কথা এসেছে। তিনি বলেন, মুহাম্মদের সঙ্গে সামরিক অভিযানের সময় তাঁদের সঙ্গে স্ত্রীলোক থাকতেন না। যৌন চাহিদার কারণে তাঁরা খোজা হয়ে যাওয়ার অনুমতি চাইলে মুহাম্মদ তা নিষিদ্ধ করেন। পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি কাপড়ের বিনিময়ে নারীদের বিবাহ করার অনুমতি দেন। ইবনে হাজার ফাতহুল বারী-তে ইবন মাসউদের এই বর্ণনার আরেকটি পাঠ উল্লেখ করেছেন, যেখানে তাঁরা বাস্তবে তা করেছিলেন বলে বক্তব্য রয়েছে। [48] [49]

فَفَعَلْنَا ثُمَّ تُرِكَ ذَلِكَ

বাংলা অনুবাদ: “অতঃপর আমরা তা করেছিলাম; পরে সেই ব্যবস্থা পরিত্যক্ত হয়।” এই পাঠটি ইবনে হাজার ইবন মাসউদের মুতা-সংক্রান্ত হাদিসের আলোচনায় আবু আওয়ানার সংকলন থেকে উদ্ধৃত করেছেন। ইবন মাসউদের মূল বর্ণনায় সামরিক অভিযানে স্ত্রীহীন অবস্থায় থাকার কষ্ট, খোজা হওয়ার প্রস্তাব এবং কাপড়ের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের বিবাহের অনুমতির পূর্ণ প্রসঙ্গ রয়েছে।

আবু সাঈদ আল-খুদরির নামেও মুতা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য পাওয়া যায়। আবদুর রাজ্জাকের মুসান্নাফ, হাদিস ১৪০২২-এ আতার সূত্রে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে। সেখানে তিনি এক পেয়ালা ছাতুর বিনিময়ে মুতা করার কথা বলেছেন। একই বর্ণনায় ইবনে আব্বাসের মুতা বৈধ মনে করার অবস্থান, কোরআনের সূরা নিসার ২৪ নম্বর আয়াতের পাঠ এবং সাফওয়ানের সঙ্গে ইবনে আব্বাসের বিতর্কও রয়েছে। [50]

وَأَخْبَرَنِي مَنْ شِئْتَ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ لَقَدْ كَانَ أَحَدُنَا يَسْتَمْتِعُ بِمِلْءِ الْقَدَحِ سَوِيقًا

বাংলা অনুবাদ: আতা বলেন, আবু সাঈদ আল-খুদরির সূত্রে তাঁকে জানানো হয়েছে যে, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এক পেয়ালা ছাতুর বিনিময়ে মুতা বিবাহ করতেন। ছাতুর মতো সামান্য খাদ্যদ্রব্যও এই সাময়িক বিবাহের বিনিময় হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

আবু সাঈদের বক্তব্যে أَحَدُنَا বা “আমাদের কেউ কেউ” বলা হয়েছে। এটি সাহাবীদের সম্মিলিত মুতা-চর্চার বিবরণ। ইবন মাসউদের বর্ণনাতেও একাধিক সাহাবির অংশগ্রহণের ভাষা রয়েছে। জাবিরের বক্তব্যের সঙ্গে এই বিবরণগুলো মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, সামরিক অভিযানের সময় এবং পরবর্তী মুসলিম সমাজে মুতা কেবল কয়েকজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন কাজ ছিল না; এর একটি বিস্তৃত চর্চা সংরক্ষিত হয়েছে।


আলী ইবন আবু তালিব নিজেও মুতা করেছিলেন: শিয়া গ্রন্থের বিবরণ

মুতা বিবাহের ইতিহাসে আলী ইবন আবু তালিবের অবস্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সুন্নি ইসলামের অন্যতম প্রধান দলিল হিসেবে আলীর সূত্রে একটি হাদিস প্রচলিত রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ খায়বারের যুদ্ধে মুতা বিবাহ এবং গৃহপালিত গাধার মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করেছিলেন। অথচ শিয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ হাদিসগ্রন্থগুলোতে সেই আলী নিজেই মুতা বিবাহ করেছিলেন বলে সরাসরি বর্ণনা সংরক্ষিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, আলীর নামে এমন বক্তব্যও পাওয়া যায়, যেখানে মুতা নিষিদ্ধ করার জন্য উমর ইবন খাত্তাবকে দায়ী করা হয়েছে। ফলে আলীর অবস্থান নিয়ে ইসলামের প্রাথমিক ও পরবর্তী উৎসগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ বিরোধপূর্ণ বিবরণ রয়েছে।

শিয়া হাদিসসংকলক হুর আল-আমিলি তাঁর ওয়াসাইলুশ শিয়া গ্রন্থের ২১তম খণ্ডে, মুতা বিবাহের বৈধতাসংক্রান্ত অধ্যায়ের ২৬৩৭৮ নম্বর বর্ণনায় জানিয়েছেন, আলী ইবন আবু তালিব কুফায় বনু নাহশাল গোত্রের একজন নারীকে মুতা বিবাহ করেছিলেন। বর্ণনাটি শায়খ মুফিদের রিসালাতুল মুতা গ্রন্থ থেকে সংকলিত। সেখানে ইবনে বাবাওয়াইহ বা শায়খ সদুকের সূত্রে আলীর ব্যক্তিগত মুতা বিবাহের ঘটনাটি উদ্ধৃত হয়েছে। একই অধ্যায়ে মুহাম্মদের নিজের মুতা বিবাহ এবং আলীর মুতা বৈধ মনে করার বক্তব্যও রয়েছে। [51]

মূল আরবি:

وروى ابن بابويه بإسناده أن عليا ( عليه السلام ) نكح امرأة بالكوفة من بني نهشل متعة .

বাংলা অনুবাদ:

ইবনে বাবাওয়াইহ তাঁর বর্ণনাসূত্রে উল্লেখ করেছেন যে, আলী ইবন আবু তালিব কুফায় বনু নাহশাল গোত্রের একজন নারীর সঙ্গে মুতা বিবাহ করেছিলেন।

মুহাক্কিক কারাকি (মৃত্যু ৯৪০ হিজরি) তাঁর খুলাসাতুল ইজাজ ফিল মুতা গ্রন্থের ২৩ পৃষ্ঠাতেও এই বর্ণনা সংরক্ষণ করেছেন। তিনি প্রথমে আলীর কুফায় একজন নারীকে মুতা বিবাহ করার ঘটনা উল্লেখ করেন। এরপর আবদুর রহমান ইবন আবি লায়লার সূত্রে আলীর আরেকটি বক্তব্য তুলে ধরেন। সেই বর্ণনায় মুতার আয়াত রহিত হয়েছে কি না জানতে চাওয়া হলে আলীর উত্তর হিসেবে এসেছে, উমর নিষিদ্ধ না করলে হতভাগা ব্যক্তি ছাড়া কেউ ব্যভিচারে লিপ্ত হতো না। একই আলোচনায় হুসাইন ইবন আলীর সূত্রেও আলীর অনুরূপ বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে। [52]

একই তথ্য পরবর্তী শিয়া ইতিহাসবিদ সাইয়েদ জাফর মুরতাদা আল-আমিলির জাওয়াজুল মুতা গ্রন্থেও পাওয়া যায়। তিনি আলীর ব্যক্তিগত মুতা-বিবাহের ঘটনা উদ্ধৃত করে শায়খ মুফিদ, ওয়াসাইলুশ শিয়া, বিহারুল আনওয়ার এবং মুস্তাদরাকুল ওয়াসাইল-এর সূত্র নির্দেশ করেছেন। এই গ্রন্থগুলোর মধ্যে পূর্ববর্তী বর্ণনার পুনঃসংকলনের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে আলীর মুতা করার ঘটনাটি শিয়া ধর্মীয় সাহিত্যে একাধিক গ্রন্থে সংরক্ষিত হয়েছে এবং পরবর্তী লেখকরাও ঘটনাটিকে তাঁদের আলোচনায় ব্যবহার করেছেন। [53]

আলীর নামে মুতা বৈধ থাকার আরও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রয়েছে শিয়া ইসলামের অন্যতম প্রধান হাদিসগ্রন্থ আল-কাফি-তে। মুহাম্মদ ইবন ইয়াকুব আল-কুলাইনি তাঁর গ্রন্থের পঞ্চম খণ্ডের ৪৪৮ পৃষ্ঠায় আবদুল্লাহ ইবন সুলাইমানের সূত্রে মুহাম্মদ আল-বাকিরের একটি বক্তব্য সংরক্ষণ করেছেন। সেখানে আলী সম্পর্কে বলা হয়েছে, উমর মুতা নিষিদ্ধ না করলে হতভাগা ব্যক্তি ছাড়া কেউ ব্যভিচার করত না। একই বক্তব্য তাহযিবুল আহকাম, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ২৫০ এবং ওয়াসাইলুশ শিয়া, খণ্ড ২১, হাদিস ২৬৩৫৭-এও সংরক্ষিত হয়েছে। [54] [55]

মূল আরবি:

عن عبد الله بن سليمان قال: سمعت أبا جعفر يقول: كان علي يقول: لولا ما سبقني به بني الخطاب ما زنى إلا شقي.

বাংলা অনুবাদ:

আবদুল্লাহ ইবন সুলাইমান বলেন, “আমি মুহাম্মদ আল-বাকিরকে বলতে শুনেছি, আলী বলতেন, ‘ইবন খাত্তাব আমার আগে মুতা নিষিদ্ধ না করলে হতভাগা ব্যক্তি ছাড়া কেউ ব্যভিচার করত না।’”

এই বক্তব্যে মুতা নিষিদ্ধ করার কাজটি উমরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। আলীর নামে সংরক্ষিত অবস্থান অনুসারে মুতা এমন একটি ব্যবস্থা ছিল, যা চালু থাকলে ব্যভিচারের প্রয়োজন অনেক কমে যেত। এখানে شقي শব্দের পাশাপাশি বিভিন্ন পাঠে شفى বা অনুরূপ শব্দ পাওয়া যায়, যার অর্থ অল্পসংখ্যক মানুষ। তবে পাঠভেদের মধ্যেও বক্তব্যের কেন্দ্রীয় বিষয় অপরিবর্তিত রয়েছে: উমরের নিষেধাজ্ঞার আগে মুতা বৈধ ছিল এবং সেটিকে যৌনসম্পর্কের একটি অনুমোদিত উপায় হিসেবে দেখা হতো।

এবারে এই বর্ণনাগুলোর বিপরীতে সুন্নি হাদিসগ্রন্থে আলীর নামে সংরক্ষিত নিষেধাজ্ঞার বিবরণটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সহিহ বুখারির ৫১১৫ এবং সহিহ মুসলিমের ১৪০৭ নম্বর হাদিসে আলী ইবনে আব্বাসকে বলেন, মুহাম্মদ খায়বারের সময় মুতা বিবাহ এবং গৃহপালিত গাধার মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করেছিলেন। এই হাদিসটির ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী সুন্নি ফিকহে মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার ইতিহাস নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু খায়বারে নিষিদ্ধ হওয়ার সময়নির্ধারণ নিয়ে বহু প্রখ্যাত সুন্নি আলেমও সরাসরি আপত্তি করেছেন। [56] [57]

মূল আরবি:

أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَنِ الْمُتْعَةِ وَعَنْ لُحُومِ الْحُمُرِ الأَهْلِيَّةِ زَمَنَ خَيْبَرَ.

বাংলা অনুবাদ:

আলীর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি ইবনে আব্বাসকে বলেন, মুহাম্মদ খায়বারের সময় মুতা বিবাহ এবং গৃহপালিত গাধার মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করেছিলেন।

এই হাদিসটির প্রধান সমস্যা হলো খায়বারের সময়নির্ধারণ। খায়বারের যুদ্ধ হয়েছিল সপ্তম হিজরিতে। অথচ তার পরবর্তী অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের সময় মুহাম্মদ সাহাবীদের মুতা করার অনুমতি দিয়েছিলেন বলে সহিহ মুসলিমে সরাসরি বর্ণনা রয়েছে। আওতাসের সময়েও তিন দিনের জন্য অনুমতি এবং পরবর্তী নিষেধের কথা পাওয়া যায়। ফলে খায়বারের নিষেধ যদি চূড়ান্ত হয়, তাহলে পরবর্তী অনুমতিগুলো সেই চূড়ান্ত নিষেধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আলীর নামে বর্ণিত হাদিসটির এই সময়গত সমস্যা প্রাচীন সুন্নি আলেমদের নজরও এড়ায়নি।

ইবনে হাজার আসকালানী ফাতহুল বারী-তে এই হাদিসের আলোচনা করতে গিয়ে সুফিয়ান ইবন উয়াইনা, সুহাইলি, ইবন আবদুল বার, বায়হাকি এবং আবু আওয়ানার বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। এসব বক্তব্যে খায়বারে মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার দাবির বিরুদ্ধে বিভিন্ন আপত্তি পাওয়া যায়। কেউ বলেছেন, খায়বারের সময়নির্দেশটি কেবল গৃহপালিত গাধার মাংসের নিষেধের সঙ্গে সম্পর্কিত; কেউ বলেছেন, যুহরির বর্ণনার শব্দবিন্যাসে আগে-পরে হওয়ার সমস্যা রয়েছে; আবার কেউ খায়বারের পরে মুতা বৈধ হওয়ার বর্ণনাগুলোকে এই সময়নির্ধারণের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। [58]


আলীর নামে খায়বারে মুতা নিষিদ্ধ করার হাদিস নিয়ে সুন্নি আলেমদের আপত্তি
আলেমহাদিস সম্পর্কে বক্তব্য বা আপত্তিআপত্তির প্রকৃতিতথ্যসূত্র
সুফিয়ান ইবন উয়াইনাআলীর বর্ণনায় ‘খায়বারের দিন’ কথাটি গৃহপালিত গাধার মাংস নিষিদ্ধ হওয়ার সময় নির্দেশ করে, মুতা বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়ার সময় নয়।সময় ও বাক্যবিন্যাসের আপত্তিফাতহুল বারী, খণ্ড ৯
আবদুর রহমান আস-সুহাইলিখায়বারের দিনে মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা সীরাত ও ঐতিহাসিক বর্ণনার লেখকদের কাছে পরিচিত নয়। তাঁর মতে যুহরির বর্ণনায় শব্দের আগে-পরে হওয়ার সমস্যা রয়েছে।ঐতিহাসিক ও বর্ণনাগত আপত্তিফাতহুল বারীতে সুহাইলির বক্তব্য
ইবন আবদুল বারইবন উয়াইনার ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করে বলেছেন, অধিকাংশের অবস্থান হলো খায়বারের সময়টি গাধার মাংসের নিষেধের সঙ্গে সম্পর্কিত; মুতা নিষেধ অন্য সময়ে।খায়বারের সময়নির্ধারণের আপত্তিফাতহুল বারী; ইবন আবদুল বারের বক্তব্য
ইমাম বায়হাকিইবন উয়াইনার ব্যাখ্যাকে গ্রহণযোগ্য বলেছেন। খায়বারের পরে আবার মুতা করার অনুমতির বর্ণনা রয়েছে; ফলে আলী ইবনে আব্বাসের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত নিষেধের দলিল দিতে চাইলে শেষ নিষেধের ঘটনাই প্রাসঙ্গিক।পরবর্তী অনুমতির সঙ্গে সময়গত অসঙ্গতিফাতহুল বারী; বায়হাকির বক্তব্য
আবু আওয়ানাতাঁর সহিহ গ্রন্থে আলেমদের ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করেছেন যে, খায়বারে গাধার মাংস নিষিদ্ধ হয়েছিল; মুতা বিবাহ নিষিদ্ধ হয়েছিল মক্কা বিজয়ের সময়।নিষেধাজ্ঞার সময় ও বর্ণনার ব্যাখ্যা নিয়ে আপত্তিফাতহুল বারী; আবু আওয়ানার সংকলিত বক্তব্য
ইবনুল কাইয়্যিমসরাসরি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, খায়বারে মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার দাবি ভুল। তাঁর মতে বর্ণনাকারীরা খায়বারের সময়নির্দেশকে দুটি নিষেধের সঙ্গে যুক্ত করে ভুল করেছিলেন।বর্ণনার সময়নির্ধারণে ভুলের অভিযোগযাদুল মাআদ, খণ্ড ৩; খণ্ড ৫
ইবনে কাসীরখায়বারে মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার বক্তব্যকে দুটি কারণে সমস্যাপূর্ণ বলেছেন: খায়বারের পরিস্থিতি এবং তার পরে মক্কা বিজয়ে মুতা বৈধ হওয়ার বর্ণনা। একাধিকবার বৈধ ও অবৈধ করার ব্যাখ্যাকেও দূরবর্তী সম্ভাবনা হিসেবে দেখেছেন।ঐতিহাসিক ও কালানুক্রমিক আপত্তিআল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৪
ইমাম শাওকানিসুহাইলি, ইবন উয়াইনা, ইবন আবদুল বার ও আবু আওয়ানার আপত্তিগুলো সংরক্ষণ করেছেন। খায়বার, মক্কা বিজয় ও আওতাসের বর্ণনাগুলোর সময়গত সম্পর্ক আলোচনা করেছেন।পূর্ববর্তী আপত্তিগুলোর পর্যালোচনানাইলুল আওতার, কিতাবুন নিকাহ

এই তালিকার আলেমরা একই ধরনের আপত্তি করেননি। তাঁদের আলোচনার প্রধান বিষয় হলো হাদিসের বর্ণিত সময়, শব্দবিন্যাস এবং অন্য হাদিসের সঙ্গে সামঞ্জস্য। তাঁদের প্রত্যেককে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে সংরক্ষিত আলীর সম্পূর্ণ বর্ণনাটির সনদ দুর্বল বলেছেন বলে দাবি করার ভিত্তি নেই। কিন্তু খায়বারেই মুতা নিষিদ্ধ হয়েছিল—এই নির্দিষ্ট দাবির বিরুদ্ধে তাঁদের বক্তব্য ও আপত্তি সরাসরি সংরক্ষিত হয়েছে। হাদিসটি সংকলনে স্থান পাওয়া এবং হাদিসের সময়নির্ধারণ সঠিক হওয়া দুটি পৃথক প্রশ্ন।

সুহাইলির আপত্তিটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, খায়বারের দিনে মুতা বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়ার কথা সীরাত ও আছারের বর্ণনাকারীদের কাছে পরিচিত ছিল না। তিনি যুহরির বর্ণনায় শব্দের আগে-পরে হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখ করেন। ইবনে হাজার একই আলোচনায় ইবন উয়াইনার বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন যে, খায়বারের সময়নির্দেশটি গাধার মাংসের সঙ্গে সম্পর্কিত, মুতা বিবাহের সঙ্গে নয়। ইবন আবদুল বার জানান, অধিকাংশের অবস্থানও এই ব্যাখ্যার অনুকূলে।

মূল আরবি, সুহাইলির বক্তব্য:
وَالنَّهْيُ عَنْ نِكَاحِ الْمُتْعَةِ يَوْمَ خَيْبَرَ وَهَذَا شَيْءٌ لَا يَعْرِفُهُ أَحَدٌ مِنْ أَهْلِ السِّيَرِ وَرُوَاةِ الْأَثَرِ

বাংলা অনুবাদ:
“খায়বারের দিনে মুতা বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি সীরাত ও ঐতিহাসিক বিবরণের কোনো লেখকের কাছেই পরিচিত নয়।”

বায়হাকির বক্তব্যেও একই সময়গত সমস্যা রয়েছে। তাঁর যুক্তি হলো, খায়বারের পরে মুহাম্মদ পুনরায় মুতা বিবাহের অনুমতি দিয়েছিলেন বলে হাদিসে এসেছে। ফলে আলী যদি ইবনে আব্বাসের সামনে মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার দলিল দিতে চান, তাহলে পরবর্তী চূড়ান্ত নিষেধের ঘটনাটিই তাঁর যুক্তির ভিত্তি হওয়ার কথা। অন্যদিকে আবু আওয়ানা আলেমদের যে বক্তব্য সংরক্ষণ করেছেন, সেখানে খায়বারের নিষেধকে গাধার মাংসের সঙ্গে এবং মুতা নিষেধকে মক্কা বিজয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এই আপত্তিগুলো আলীর নামে প্রচলিত নিষেধাজ্ঞার সময়নির্ধারণকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। [59]

ইবনুল কাইয়্যিম আরও স্পষ্ট ভাষায় এই সমস্যাটি আলোচনা করেছেন। তাঁর যাদুল মাআদ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, মুতা বিবাহ খায়বারে নিষিদ্ধ হয়নি; তা নিষিদ্ধ হয়েছিল মক্কা বিজয়ের সময়। তাঁর মতে আলী ইবনে আব্বাসকে দুটি পৃথক নিষেধের কথা জানিয়েছিলেন: একটি মুতা বিবাহের নিষেধ, অন্যটি খায়বারে গৃহপালিত গাধার মাংসের নিষেধ। কিন্তু পরবর্তী বর্ণনাকারীদের কেউ কেউ খায়বারের সময়নির্দেশটি উভয় বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই কারণেই বর্ণনাটির প্রচলিত পাঠে খায়বারের সঙ্গে মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। [60] [61]

মূল আরবি, ইবনুল কাইয়্যিমের বক্তব্য:
وَلَمْ تُحَرَّمِ الْمُتْعَةُ يَوْمَ خَيْبَرَ وَإِنَّمَا كَانَ تَحْرِيمُهَا عَامَ الْفَتْحِ هَذَا هُوَ الصَّوَابُ

বাংলা অনুবাদ:
“খায়বারের দিনে মুতা নিষিদ্ধ করা হয়নি। বরং মক্কা বিজয়ের বছর তা নিষিদ্ধ হয়েছিল। এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত।”

ইবনুল কাইয়্যিম একই আলোচনায় বলেছেন, কিছু বর্ণনাকারী খায়বারের সময়নির্দেশটিকে উভয় নিষেধের সঙ্গে সম্পর্কিত মনে করেছিলেন এবং সেই অনুযায়ী হাদিসটি অর্থানুসারে বর্ণনা করেছিলেন। তাঁর মতে এই ভুল বোঝাবুঝি থেকেই খায়বারে মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার ধারণাটি তৈরি হয়েছে। তিনি মক্কা বিজয়ের সময় মুতা বৈধ করা ও নিষিদ্ধ করার ঘটনাগুলোকে খায়বারের ঘটনার তুলনায় অধিক সুস্পষ্ট মনে করেছেন। ফলে আলীর নামে বর্ণিত নিষেধের ঘটনাটি গ্রহণ করেও তিনি খায়বারের সময়নির্ধারণ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ইবনে কাসীরও তাঁর আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে আলীর হাদিসের খায়বার-সংক্রান্ত বক্তব্যকে সমস্যাপূর্ণ বলেছেন। তিনি প্রথমত খায়বারের পরিস্থিতির উল্লেখ করেছেন এবং দ্বিতীয়ত খায়বারের পরে মক্কা বিজয়ের সময় মুতা বিবাহের অনুমতি পাওয়ার বর্ণনা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে খায়বারে নিষেধ, পরে পুনরায় অনুমতি এবং তারপর আবার চূড়ান্ত নিষেধ গ্রহণ করলে একই বিধান বারবার রহিত ও পুনঃপ্রবর্তনের ইতিহাস দাঁড়ায়। তিনি এটিকে অস্বাভাবিক বলে উল্লেখ করেছেন। একই আলোচনায় মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার বিভিন্ন সময়ের বর্ণনা এবং সেগুলোর পরস্পরবিরোধী অবস্থাও সংরক্ষণ করেছেন। [62]

সুন্নি আলেমদের এই আলোচনাগুলো থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয়: আলীর নামে প্রচলিত খায়বারের নিষেধাজ্ঞাকে পরবর্তী আলেমরা সবাই একইভাবে ব্যাখ্যা করেননি। বর্ণনাটির সময়নির্ধারণ, শব্দবিন্যাস এবং পরবর্তী অনুমতির সঙ্গে সামঞ্জস্য নিয়ে তাঁদের মধ্যে সুস্পষ্ট মতভেদ ছিল। অন্যদিকে শিয়া গ্রন্থে আলীর নিজের মুতা বিবাহ এবং উমরকে মুতা নিষিদ্ধ করার জন্য দায়ী করার বর্ণনা রয়েছে। ফলে আলীকে মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার প্রশ্নে একরৈখিক ও বিতর্কহীন ঐতিহাসিক সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করা ইসলামি উৎসগুলোর সামগ্রিক বিবরণের সঙ্গে মেলে না।

আলীর ব্যক্তিগত মুতা বিবাহের ঘটনাটি আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল মুতা বৈধ থাকার পক্ষে কোনো আইনগত মত নয়; নির্দিষ্ট ব্যক্তি, নির্দিষ্ট শহর এবং নির্দিষ্ট গোত্রের নারীর উল্লেখসহ একটি ব্যক্তিগত ঘটনার বর্ণনা। আলী কুফায় বনু নাহশাল গোত্রের একজন নারীকে মুতা করেছিলেন—এই বক্তব্য শিয়া ইসলামি গ্রন্থে সরাসরি সংরক্ষিত। একই সঙ্গে আলীর নামে উমরের নিষেধাজ্ঞার সমালোচনামূলক বক্তব্যও পাওয়া যায়। এই দুই ধরনের বিবরণ প্রমাণ করে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুতা বিবাহের অনুমোদন ও চর্চার ইতিহাস শুধু জাবির, ইবনে আব্বাস, মুয়াবিয়া কিংবা অন্য সাহাবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আলীর ব্যক্তিগত জীবন ও তাঁর নামে সংরক্ষিত আইনগত অবস্থানও সেই বিতর্কের অংশ।


মুতা বিবাহে জড়িত সাহাবিদের নামভিত্তিক তালিকা

হাদিস ও ইতিহাসগ্রন্থে পাওয়া নামভিত্তিক তথ্যগুলো একত্র করলে নিম্নোক্ত তালিকা পাওয়া যায়। এখানে নির্দিষ্ট ব্যক্তির মুতা বিবাহের ঘটনা এবং প্রথম পুরুষে সম্মিলিত অংশগ্রহণের বক্তব্য পৃথকভাবে দেখানো হয়েছে। সালামাহ ইবন উমাইয়া ও মাবাদ ইবন উমাইয়ার নামের পাঠভেদকে একই ঘটনার দুটি পৃথক ঘটনা হিসেবে গণনা করা হয়নি।

সাহাবির নামমুতা-সংক্রান্ত ঘটনাবর্ণনার প্রকৃতিপ্রধান উৎস
জাবির ইবন আবদুল্লাহমুহাম্মদ, আবু বকর ও উমরের যুগে মুতা করার বক্তব্য; খেজুর ও ময়দার বিনিময়ের উল্লেখনিজেকে অন্তর্ভুক্ত করে সরাসরি চর্চার স্বীকারোক্তিসহিহ মুসলিম ১৪০৫c–d; মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক ১৪০২১
সাবরা ইবন মাবাদমক্কা বিজয়ের সময় চাদরের বিনিময়ে একজন নারীর সঙ্গে তিন রাত অবস্থাননিজের নির্দিষ্ট মুতা-বিবাহের ঘটনাসহিহ মুসলিম ১৪০৬a–b
আলী ইবন আবু তালিবকুফায় বনু নাহশাল গোত্রের একজন নারীর সঙ্গে মুতা বিবাহ; উমরের মুতা নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আলীর বক্তব্যশিয়া গ্রন্থে ব্যক্তিগত মুতা বিবাহের বিবরণ এবং মুতা নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে বক্তব্যওয়াসাইলুশ শিয়া ২৬৩৭৮; খুলাসাতুল ইজাজ ফিল মুতা, পৃষ্ঠা ২৩; আল-কাফি, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪৪৮
মুয়াবিয়া ইবন আবু সুফিয়ানতায়েফে মুআনা নামের মুক্তদাসীর সঙ্গে মুতা বিবাহনির্দিষ্ট ব্যক্তির ঘটনা এবং নারীর পরিচয়মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক ১৪০২৬; ফাতহুল বারী
আমর ইবন হুরায়সমুক্তদাসীর সঙ্গে মুতা; গর্ভধারণ ও উমরের জিজ্ঞাসাবাদনির্দিষ্ট ব্যক্তির ঘটনামুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক ১৪০২১; সহিহ মুসলিম ১৪০৫d
সালামাহ ইবন উমাইয়াউম্মু আরাকার সঙ্গে মুতা; গর্ভধারণনির্দিষ্ট ব্যক্তির ঘটনা; অন্য পাঠে মাবাদ ইবন উমাইয়ামুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক ১৪০২৪; ফাতহুল বারী
রাবিআ ইবন উমাইয়াএক নারীর সঙ্গে মুতা; নারী গর্ভবতী হন; উমরের রজমের হুমকিনির্দিষ্ট ব্যক্তির ঘটনামুয়াত্তা মালিক ১১৩৭; মুসনাদুশ শাফিঈ ১১৫৮
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদসামরিক অভিযানে কাপড়ের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের বিবাহসম্মিলিত অনুমতি ও চর্চার বক্তব্যসহিহ মুসলিম ১৪০৪a; ফাতহুল বারী
আবু সাঈদ আল-খুদরিএক পেয়ালা ছাতুর বিনিময়ে মুতা করার প্রচলনের বিবরণসম্মিলিত চর্চার বক্তব্যমুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক ১৪০২২
সালামাহ ইবনুল আকওয়াসামরিক অভিযানে মুতা করার অনুমতি পাওয়া এবং আওতাসে তিন দিনের অনুমতির বর্ণনাসরাসরি অনুমতি ও সামরিক অভিযানের অংশগ্রহণের সাক্ষ্যসহিহ বুখারি ৫১১৭–৫১১৮; সহিহ মুসলিম ১৪০৫a–b

এই নামগুলোর বাইরেও আসমা বিনত আবু বকরের নামে নারীদের মুতা সম্পর্কে প্রথম পুরুষে একটি বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে। মুসনাদুত তায়ালিসির বর্ণনায় তাঁকে নারীদের মুতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “আমরা মুহাম্মদের যুগে এটি করেছি।” তাঁর এই বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট অন্য বর্ণনাগুলো পৃথক আলোচনার বিষয়। ইবনে হাযমের তালিকায়ও আসমাকে মুতা বৈধ থাকার অবস্থানে ছিলেন এমন সাহাবিদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

জাবির, সাবরা, মুয়াবিয়া, আমর ইবন হুরায়স, সালামাহ ইবন উমাইয়া এবং রাবিআ ইবন উমাইয়ার ঘটনায় নির্দিষ্ট ব্যক্তির মুতা বিবাহের বিবরণ পাওয়া যায়। এসব ঘটনার মধ্যে কিছু মুহাম্মদের জীবদ্দশায় সংঘটিত, আবার কিছু উমরের খেলাফতের সময়ের। অন্যদিকে ইবন মাসউদ ও আবু সাঈদের বক্তব্যে সম্মিলিত মুতা-চর্চার বিবরণ রয়েছে। এই নামভিত্তিক তথ্যগুলো মুহাম্মদের যুগে মুতা বিবাহ বৈধ থাকার পাশাপাশি তাঁর মৃত্যুর পরেও মুসলিম সমাজে এই প্রথার বাস্তব উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করে।


মুয়াবিয়া ও মুআনার মুতা বিবাহ

মুতা বিবাহ করেছিলেন এমন সাহাবীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মুয়াবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান, যিনি পরবর্তীকালে উমাইয়া খেলাফতের প্রতিষ্ঠাতা হন। প্রখ্যাত হাদিসসংকলক আবদুর রাজ্জাক আস-সানআনি তাঁর মুসান্নাফ গ্রন্থে মুয়াবিয়ার মুতা বিবাহের ঘটনা সংরক্ষণ করেছেন। সেখানে শুধু মুয়াবিয়ার সাময়িক বিবাহ করার কথাই নেই; সংশ্লিষ্ট নারীর নাম, তাঁর সামাজিক পরিচয় এবং বহু বছর পরে মুয়াবিয়ার শাসনকালেও তাঁদের মধ্যে আর্থিক যোগাযোগ বজায় থাকার বিবরণ রয়েছে। নারীর নাম ছিল মুআনা (معانة), যিনি ইবনুল হাদরামির একজন মুক্তদাসী ছিলেন। ঘটনাটি জাবির ইবন আবদুল্লাহর বক্তব্যের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে।

মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকের ১৪০২১ নম্বর বর্ণনায় আতা ইবন আবি রাবাহ জানান, তিনি প্রথম মুতা বিবাহের বিষয়টি সাফওয়ান ইবন ইয়ালার কাছে শুনেছিলেন। সাফওয়ান তাঁর পিতা ইয়ালার সূত্রে জানান, মুয়াবিয়া তায়েফে একজন নারীর সঙ্গে মুতা বিবাহ করেছিলেন। এই ঘটনা নিয়ে আপত্তি ওঠায় তাঁরা ইবনে আব্বাসের কাছে যান। ইবনে আব্বাস মুতা বিবাহের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পরবর্তীতে জাবির ইবন আবদুল্লাহর কাছেও বিষয়টি উত্থাপিত হয়। জাবির তখন মুহাম্মদ, আবু বকর এবং উমরের যুগে নিজেদের মুতা করার কথা জানান। এই বর্ণনায় মুয়াবিয়ার ব্যক্তিগত ঘটনার সঙ্গে ইসলামের প্রথম তিন শাসনপর্বে মুতা বিবাহের বাস্তব চর্চার সম্পর্ক সরাসরি উঠে এসেছে। [63]

মূল আরবি:
عَبْدُ الرَّزَّاقِ ، عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ ، عَنْ عَطَاءٍ قَالَ : لَأَوَّلُ مَنْ سَمِعْتُ مِنْهُ الْمُتْعَةَ صَفْوَانُ بْنُ يَعْلَى قَالَ : أَخْبَرَنِي ، عَنْ يَعْلَى ، أَنَّ مُعَاوِيَةَ اسْتَمْتَعَ بِامْرَأَةٍ بِالطَّائِفِ فَأَنْكَرَتْ ذَلِكَ عَلَيْهِ ، فَدَخَلْنَا عَلَى ابْنِ عَبَّاسٍ فَذَكَرَ لَهُ بَعْضُنَا ، فَقَالَ لَهُ : نَعَمْ . فَلَمْ يَقِرَّ فِي نَفْسِي حَتَّى قَدِمَ جَابِرُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ ، فَجِئْنَاهُ فِي مَنْزِلِهِ فَسَأَلَهُ الْقَوْمُ عَنْ أَشْيَاءَ ، ثُمَّ ذَكَرُوا لَهُ الْمُتْعَةَ ، فَقَالَ : نَعَمْ ، اسْتَمْتَعْنَا عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، وَأَبِي بَكْرٍ ، وَعُمَرَ ، حَتَّى إِذَا كَانَ فِي آخِرِ خِلَافَةِ عُمَرَ ، اسْتَمْتَعَ عَمْرُو بْنُ حُرَيْثٍ بِامْرَأَةٍ سَمَّاهَا جَابِرٌ فَنَسِيتُهَا ، فَحَمَلَتِ الْمَرْأَةُ فَبَلَغَ ذَلِكَ عُمَرَ فَدَعَاهَا فَسَأَلَهَا ، فَقَالَتْ : نَعَمْ قَالَ : مَنْ أَشْهَدَ ؟ قَالَ : عَطَاءٌ لَا أَدْرِي قَالَتْ : أُمِّي أَمْ وَلِيَّهَا قَالَ : فَهَلَّا غَيْرَهُمَا قَالَ : خَشِيَ أَنْ يَكُونَ دَغْلًا الْآخَرُ ، قَالَ عَطَاءٌ ، وَسَمِعْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ يَقُولُ : يَرْحَمُ اللَّهُ عُمَرَ مَا كَانَتِ الْمُتْعَةُ إِلَّا رُخْصَةً مِنَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ رَحِمَ بِهَا أُمَّةَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَلَوْلَا نَهْيُهُ عَنْهَا مَا احْتَاجَ إِلَى الزِّنَا إِلَّا شَقِيٌّ قَالَ : كَأَنِّي وَاللَّهِ أَسْمَعُ قَوْلَهُ : إِلَّا شَقِيٌّ – عَطَاءٌ الْقَائِلُ – قَالَ عَطَاءٌ : فَهِيَ الَّتِي فِي سُورَةِ النِّسَاءِ : فَمَا اسْتَمْتَعْتُمْ بِهِ مِنْهُنَّ [النساء: 24] إِلَى كَذَا وَكَذَا مِنَ الْأَجَلِ عَلَى كَذَا وَكَذَا لَيْسَ يُتَشَاوَرُ قَالَ : بَدَا لَهُمَا أَنْ يَتَرَاضِيَا بَعْدَ الْأَجَلِ ، وَأَنْ يَتَفَرَّقَا فَنَعَمْ ، وَلَيْسَ بِنِكَاحٍ

বাংলা অনুবাদ:
আবদুর রাজ্জাক ইবন জুরাইজের সূত্রে আতা থেকে বর্ণনা করেন। আতা বলেন, মুতা বিবাহ সম্পর্কে সর্বপ্রথম আমি সাফওয়ান ইবন ইয়ালার কাছে শুনেছিলাম। তিনি তাঁর পিতা ইয়ালার সূত্রে আমাকে জানান, মুয়াবিয়া তায়েফে একজন নারীর সঙ্গে মুতা বিবাহ করেছিলেন। এ ঘটনায় আপত্তি ওঠায় আমরা ইবনে আব্বাসের কাছে গেলাম। আমাদের একজন তাঁকে বিষয়টি জানালে তিনি বললেন, “হ্যাঁ।”
কিন্তু আমার মনে তখনও সন্তুষ্টি আসেনি। পরে জাবির ইবন আবদুল্লাহ এলে আমরা তাঁর বাসস্থানে গেলাম। লোকেরা তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করলেন। এরপর মুতা বিবাহের কথা উত্থাপন করলে তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আমরা মুহাম্মদের যুগে, আবু বকরের যুগে এবং উমরের যুগেও মুতা করেছি। শেষ পর্যন্ত উমরের খেলাফতের শেষ পর্যায়ে আমর ইবন হুরায়স একজন নারীর সঙ্গে মুতা করেন। জাবির নারীটির নাম বলেছিলেন, কিন্তু আমি তা ভুলে গেছি। নারীটি গর্ভবতী হন। বিষয়টি উমরের কাছে পৌঁছালে তিনি নারীটিকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। নারীটি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন।”
উমর জিজ্ঞেস করেন, “সাক্ষী কারা ছিল?” আতা বলেন, নারীটি তাঁর মা অথবা অভিভাবকের কথা বলেছিলেন কি না, তা আমার মনে নেই। উমর প্রশ্ন করেন, “তাঁদের ছাড়া অন্য কাউকে সাক্ষী রাখা হয়নি কেন?” তিনি অন্য কোনো প্রতারণার আশঙ্কা করেছিলেন।
আতা আরও বলেন, আমি ইবনে আব্বাসকে বলতে শুনেছি, “আল্লাহ উমরের প্রতি দয়া করুন। মুতা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি বিশেষ অনুমতি, যার মাধ্যমে তিনি মুহাম্মদের উম্মতের প্রতি দয়া করেছিলেন। উমর যদি এটি নিষিদ্ধ না করতেন, তাহলে হতভাগা ব্যক্তি ছাড়া আর কারও ব্যভিচারের প্রয়োজন হতো না।” আতা বলেন, আল্লাহর কসম, এখনও যেন আমি ইবনে আব্বাসের মুখে “হতভাগা ব্যক্তি ছাড়া” কথাটি শুনতে পাচ্ছি।
আতা বলেন, এটি সূরা নিসার ২৪ নম্বর আয়াতের বিধান—“তাদের মধ্যে যাদের তোমরা ভোগ করেছ”—অর্থাৎ নির্দিষ্ট মেয়াদ এবং নির্দিষ্ট বিনিময়ের ভিত্তিতে চুক্তি। মেয়াদ শেষ হলে উভয়ে সম্মত হয়ে সম্পর্কের মেয়াদ বাড়াতে পারে অথবা বিচ্ছিন্ন হতে পারে। এটি প্রচলিত স্থায়ী বিবাহ নয়।

এই বিবরণে মুয়াবিয়ার মুতা বিবাহের ঘটনা জানতে পেরে ইবনে আব্বাস ও জাবিরের কাছে যাওয়ার কথা রয়েছে। ইবনে আব্বাস বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং জাবির আরও বিস্তৃতভাবে সাহাবীদের মুতা-চর্চার ইতিহাস তুলে ধরেন। জাবিরের বক্তব্যে মুহাম্মদের মৃত্যুর পরে আবু বকর ও উমরের খেলাফতকালেও মুতা করার কথা এসেছে। ইবনে আব্বাসের বক্তব্যে আবার উমরের নিষেধাজ্ঞার কথা সরাসরি উপস্থিত। ফলে মুয়াবিয়ার ব্যক্তিগত মুতা বিবাহের ঘটনা এমন একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ, যেখানে সাময়িক বিবাহের অনুমতি, বাস্তব চর্চা এবং পরবর্তী নিষেধাজ্ঞা একই সূত্রে আলোচিত হয়েছে।

আবদুর রাজ্জাকের পরবর্তী ১৪০২৬ নম্বর বর্ণনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আবু যুবাইর সরাসরি জাবির ইবন আবদুল্লাহর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। জাবির মুয়াবিয়ার মুতা-সঙ্গিনীর নাম উল্লেখ করেছেন। তিনি ছিলেন মুআনা, ইবনুল হাদরামির মুক্তদাসী। জাবির আরও জানিয়েছেন, মুআনা মুয়াবিয়ার খেলাফতকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন এবং মুয়াবিয়া তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিবছর তাঁকে উপহার পাঠাতেন। [64]

মূল আরবি:
اسْتَمْتَعَ مُعَاوِيَةُ بْنُ أَبِي سُفْيَانَ مَقْدِمَهُ مِنَ الطَّائِفِ عَلَى ثَقِيفٍ بِمَوْلَاةِ ابْنِ الْحَضْرَمِيِّ يُقَالُ لَهَا مُعَانَةُ

বাংলা অনুবাদ:
আবু যুবাইর বলেন, আমি জাবির ইবন আবদুল্লাহকে বলতে শুনেছি, মুয়াবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান তায়েফে সাকিফ গোত্রের এলাকায় আগমনের সময় ইবনুল হাদরামির এক মুক্তদাসীর সঙ্গে মুতা বিবাহ করেছিলেন। ওই নারীর নাম ছিল মুআনা। জাবির আরও জানান, মুআনা মুয়াবিয়ার খেলাফতকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। মুয়াবিয়া তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিবছর তাঁকে উপহার পাঠাতেন।

মুআনার ঘটনাটি মুতা বিবাহের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত হাদিসে মুতা-বিবাহিত নারীদের নাম উল্লেখ করা হয় না; তাঁদের পরিচয় শুধু একজন নারী, কোনো গোত্রের নারী অথবা মুক্তদাসী হিসেবে দেওয়া হয়। কিন্তু মুআনার ক্ষেত্রে নাম ও পূর্ববর্তী সামাজিক পরিচয় দুটিই পাওয়া যায়। একই সঙ্গে মুতা বিবাহের ঘটনার বহু বছর পরে মুয়াবিয়ার শাসনকাল পর্যন্ত তাঁর জীবিত থাকার এবং নিয়মিত উপহার পাওয়ার কথাও সংরক্ষিত হয়েছে। অর্থাৎ মুতা-বিবাহের চুক্তি শেষ হয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট নারী ও পুরুষের মধ্যে পরবর্তী আর্থিক যোগাযোগ বজায় থাকতে পারত—মুয়াবিয়া ও মুআনার ঘটনাটি তার একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক উদাহরণ।

ইবনে হাজার আসকালানী তাঁর ফাতহুল বারী গ্রন্থে ইবনে হাযমের উল্লেখ করা মুতা-বিবাহের পক্ষের সাহাবীদের নাম পর্যালোচনা করতে গিয়ে মুয়াবিয়ার ঘটনাটিও আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি আবদুর রাজ্জাকের সংরক্ষিত ইয়ালা ইবন উমাইয়ার বর্ণনা উদ্ধৃত করেন এবং স্পষ্টভাবে লেখেন, وَإِسْنَادُهُ صَحِيحٌ—অর্থাৎ, “এর সনদ সহিহ।” এরপর তিনি আবু যুবাইরের সূত্রে জাবিরের বর্ণনাটিও উল্লেখ করেন, যেখানে মুআনার নাম এবং মুয়াবিয়ার খেলাফতকাল পর্যন্ত তাঁকে প্রতিবছর উপহার পাঠানোর কথা রয়েছে। [65]

ইবনে হাজার মুয়াবিয়ার ঘটনার সময় সম্পর্কে আবু যুবাইর ও জাবিরের বর্ণনার ভিত্তিতে উল্লেখ করেছেন যে ঘটনাটি আগের যুগের। পরে তিনি মুয়াবিয়ার উমরের অনুসারী হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে নিষেধাজ্ঞার পর মুয়াবিয়া উমরের অবস্থান অনুসরণ করেছিলেন বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। কিন্তু এই আলোচনা মুয়াবিয়ার ব্যক্তিগত মুতা করার ঘটনাকে অস্বীকার করে না। বরং ইবনে হাজার নিজেই সেই ঘটনার বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, সনদকে সহিহ বলেছেন এবং সংশ্লিষ্ট নারীর পরিচয়ও সংরক্ষণ করেছেন। মুয়াবিয়ার মুতা করার ঘটনা এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর আইনগত অবস্থান পৃথক বিষয়। প্রথমটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা; দ্বিতীয়টি সেই ঘটনার পরবর্তী ধর্মীয় অবস্থান।

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। মুয়াবিয়া ছিলেন মুহাম্মদের সাহাবি, পরবর্তীকালে সিরিয়ার শাসক এবং শেষ পর্যন্ত উমাইয়া খেলাফতের প্রতিষ্ঠাতা। পরবর্তী সুন্নি ঐতিহ্যে তিনি একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। অথচ সেই একই ঐতিহ্যের হাদিস ও ব্যাখ্যাগ্রন্থে তাঁর ব্যক্তিগত মুতা বিবাহের ঘটনা সংরক্ষিত রয়েছে। ইবনে হাযম তাঁকে মুতা বৈধ মনে করতেন এমন সাহাবীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আবদুর রাজ্জাক তাঁর মুতা-বিবাহের ঘটনা সংরক্ষণ করেছেন। ইবনে হাজার সেই ঘটনাটির সনদকে সহিহ বলেছেন। জাবির ইবন আবদুল্লাহ আবার সংশ্লিষ্ট নারীর নাম ও পরবর্তী জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন।

এই তথ্যগুলো একত্র করলে মুয়াবিয়ার মুতা বিবাহের একটি সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। তিনি তায়েফে মুআনা নামের একজন মুক্তদাসীর সঙ্গে সাময়িক বিবাহ করেছিলেন। ঘটনাটি সাহাবীদের মধ্যে পরিচিত ছিল এবং এ নিয়ে প্রশ্নও উঠেছিল। ইবনে আব্বাস ও জাবিরের কাছে বিষয়টি আলোচিত হয়। জাবিরের সংরক্ষিত বর্ণনায় মুআনার নাম পাওয়া যায় এবং জানা যায়, তিনি মুয়াবিয়ার খেলাফতকাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। মুয়াবিয়া তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিবছর তাঁকে উপহার পাঠাতেন। সুতরাং ইসলামের প্রথম যুগে মুতা বিবাহ কেবল মুহাম্মদের সাময়িক অনুমতিপ্রাপ্ত একটি প্রথা ছিল না; পরবর্তীকালে মুসলিম সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ শাসক হয়েছিলেন এমন ব্যক্তিও এই প্রথায় অংশ নিয়েছিলেন।


মুতা বিবাহের সন্তান, পিতৃত্ব, উত্তরাধিকার ও পারিবারিক দায়বদ্ধতা

মুতা বিবাহের আলোচনা শুধু নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নারীসঙ্গ লাভ এবং বিনিময়ে কিছু অর্থ বা সম্পদ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এই সাময়িক যৌনসম্পর্ক থেকে সন্তান জন্মগ্রহণ করলে তার পিতা কে, সেই সন্তানকে স্বীকার করা পুরুষটির জন্য কতটা বাধ্যতামূলক, সন্তান ও মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব কার, আর সম্পর্কের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে নারীটির কী অধিকার থাকে—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের প্রাথমিক যুগের একাধিক বর্ণনায় মুতা-বিবাহিত নারীদের গর্ভধারণের কথা রয়েছে। আমর ইবন হুরায়স, সালামাহ ইবন উমাইয়া এবং রাবিআ ইবন উমাইয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোতে গর্ভধারণের বিবরণ পাওয়া যায়। ইবনে আব্বাসের নামে আরও সংরক্ষিত হয়েছে যে তিনি কুরাইশের এমন পুরুষদের নাম বলতে পারতেন, যাঁদের জন্ম মুতা বিবাহের মাধ্যমে হয়েছিল। অর্থাৎ মুতা বিবাহের ফলে সন্তান জন্মানোর বিষয়টি পরবর্তী ইসলামি আইনজ্ঞদের কল্পিত সমস্যা ছিল না; প্রাথমিক মুসলিম সমাজের ঘটনাবিবরণেই এর উপস্থিতি রয়েছে।

ইসনা আশারিয়া শিয়া ফিকহে মুতা বিবাহকে বৈধ বিবাহের একটি স্বতন্ত্র শ্রেণি হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ব্যবস্থায় জন্ম নেওয়া সন্তানের পিতৃত্ব স্বীকৃত হওয়ার বিধান রয়েছে। সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্বও পিতার ওপর আসতে পারে। কিন্তু সাময়িক বিবাহে নারীটির জন্য স্থায়ী স্ত্রীর মতো ভরণপোষণ, স্বামীর সঙ্গে নিয়মিত রাত্রিযাপন অথবা স্বয়ংক্রিয় উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা হয়নি। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করার ক্ষেত্রে সাময়িক ও স্থায়ী বিবাহের বিচারিক বিধান এক নয়। ফলে একই সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানের অধিকার এবং সেই সন্তানের মায়ের দাম্পত্য অধিকার আইনগতভাবে ভিন্ন কাঠামোর মধ্যে পড়ে।


মুতা বিবাহের সন্তান ও পিতৃত্বের স্বীকৃতি

শিয়া হাদিসগ্রন্থে মুতা-বিবাহজাত সন্তানের পিতৃত্ব সম্পর্কে সরাসরি বক্তব্য রয়েছে। শায়খ তুসি (মৃত্যু ৪৬০ হিজরি) তাঁর আল-ইস্তিবসার গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে باب أن ولد المتعة لاحق بأبيه অর্থাৎ ‘মুতা বিবাহের সন্তান তার পিতার সঙ্গে সম্পর্কিত’ শিরোনামে একটি পৃথক অধ্যায় সংকলন করেছেন। সেখানে মুহাম্মদ ইবন মুসলিমের সূত্রে জাফর আল-সাদিককে প্রশ্ন করা হয়, মুতা-বিবাহিত নারী গর্ভবতী হলে সন্তানের অবস্থা কী হবে। জাফর আল-সাদিক উত্তর দেন, সন্তানটি পুরুষটির সন্তান। একই অধ্যায়ে আরও বলা হয়েছে, সন্তান জন্মানোর সম্ভাবনা থাকলে পুরুষটি কেবল বীর্যপাত বাইরে করেছিলেন বলে সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করতে পারেন না। [66]

باب أن ولد المتعة لاحق بأبيه
(٥٥٧) ١ أحمد بن محمد بن أبي نصر عن عاصم بن حميد عن محمد بن مسلم عن أبي عبدالله (ع) قال قلت له: أرأيت إن حبلت؟ قال: هو ولده.
(٥٥٨) ٢ محمد بن يعقوب عن علي بن إبراهيم عن ابن أبي عمير وغيره قال: الماء ماء الرجل يضعه حيث شاء إلا أنه إن جاء بولد لم ينكره وشدد في إنكار الولد.
(٥٥٩) ٣ عنه عن علي بن إبراهيم عن المختار بن محمد ومحمد بن الحسين عن عبدالله ابن الحسين جميعا عن الفتح بن يزيد قال: سألت أبا الحسن الرضا (ع) عن الشروط في المتعة فقال: الشروط فيها كذا وكذا فإن قالت: نعم فذاك جائز ولا أقول كما أنهى إلي أن أهل العراق يقولون أن الماء مائي والارض لك ولست أسقي أرضك الماء وإن نبت هناك نبت فهو لصاحب الارض فإن شرطين في شرط فاسد وإن رزقت ولدا قبلته والامر واضح فمن شاء التلبيس على نفسه لبس.

বাংলা অনুবাদ:
অধ্যায়: মুতা বিবাহের সন্তান তার পিতার সন্তান হিসেবে গণ্য হবে।
৫৫৭। আহমদ ইবন মুহাম্মদ ইবন আবি নাসর, আসিম ইবন হুমাইদ এবং মুহাম্মদ ইবন মুসলিমের সূত্রে বর্ণিত। মুহাম্মদ ইবন মুসলিম বলেন, আমি জাফর আল-সাদিককে জিজ্ঞেস করলাম, “মুতা-বিবাহিত নারী যদি গর্ভবতী হয়, তাহলে কী হবে?” তিনি উত্তর দিলেন, “সন্তানটি তারই সন্তান।”
৫৫৮। মুহাম্মদ ইবন ইয়াকুব, আলী ইবন ইবরাহিম এবং ইবন আবি উমাইরের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, “বীর্য পুরুষের; সে যেখানে ইচ্ছা তা নিক্ষেপ করতে পারে। কিন্তু যদি সন্তান জন্মগ্রহণ করে, তাহলে সে সন্তানটিকে অস্বীকার করবে না।” সন্তান অস্বীকার করার বিষয়ে কঠোর আপত্তি জানানো হয়েছে।
৫৫৯। ফাতহ ইবন ইয়াজিদ বলেন, আমি আলী আল-রিদাকে মুতা বিবাহের শর্ত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বললেন, “নির্ধারিত শর্তে মুতা বিবাহ সম্পন্ন হবে। নারী সম্মতি জানালে চুক্তিটি বৈধ।” এরপর তিনি বললেন, “ইরাকের লোকদের সম্পর্কে আমার কাছে যে কথা পৌঁছেছে, সেভাবে বলবে না—‘বীর্য আমার, জমি তোমার; আমি তোমার জমিতে বীজ বপন করছি না, আর সেখানে কোনো ফসল জন্মালে তা জমির মালিকের।’ এ ধরনের শর্তের সমন্বয় অবৈধ। যদি সন্তান জন্মগ্রহণ করে, তাহলে তাকে গ্রহণ করবে। বিষয়টি স্পষ্ট। যে নিজের কাছে বিষয়টি অস্পষ্ট করতে চায়, সে-ই তা অস্পষ্ট করে।”

তুসির সংরক্ষিত বর্ণনাগুলোতে মুতা-বিবাহজাত সন্তানের পিতৃত্ব স্বীকার করার নির্দেশ সরাসরি উপস্থিত। বিশেষ করে ৫৫৯ নম্বর বর্ণনাটি গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে পুরুষের বীর্যপাতকে জমিতে বীজ বপনের সঙ্গে তুলনা করে সন্তান জন্মানোর দায় নারীর ওপর চাপানোর একটি বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। আলী আল-রিদা এই ধরনের শর্তকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং সন্তান জন্মালে তাকে গ্রহণ করতে বলেছেন। এর ফলে বোঝা যায়, মুতা বিবাহের শর্ত নির্ধারণের সময় সন্তান জন্মানোর দায় অস্বীকার করার চেষ্টাও আলোচ্য ছিল। পুরুষটি যৌনসম্পর্ক করতে চায়, কিন্তু সেই সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানের দায়িত্ব নিতে চায় না—এই সমস্যার উপস্থিতি ইসলামি হাদিসসংকলনেই সংরক্ষিত রয়েছে।


সন্তান অস্বীকারের শর্ত ও আলী আল-রিদার আপত্তি

শায়খ সদুক তাঁর মান লা ইয়াহদুরুহুল ফাকিহ গ্রন্থের মুতা বিবাহ অধ্যায়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর সংরক্ষণ করেছেন। একজন ব্যক্তি আলী আল-রিদাকে জিজ্ঞেস করেন, কোনো পুরুষ যদি একজন নারীকে মুতা বিবাহ করার সময় শর্ত দেয় যে সে তাঁর সন্তান দাবি করবে না, কিন্তু পরে নারীটি সন্তান জন্ম দিলে পুরুষটি সেই সন্তান অস্বীকার করতে পারবে কি না। আলী আল-রিদা এতে কঠোর আপত্তি জানান। প্রশ্নকারী নারীটির চরিত্র সম্পর্কে সন্দেহের কথা তুললে তিনি বলেন, এমন নারীকে বিবাহ করা উচিত যাকে বিশ্বাস করা যায়। এই বর্ণনার গুরুত্ব হলো, নির্দিষ্ট মেয়াদের বিবাহের সময় ভবিষ্যৎ সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকারের শর্ত দেওয়ার ঘটনাটি সরাসরি আলোচনায় এসেছে। [67]

وَ رُوِيَ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِسْمَاعِيلَ بْنِ بَزِيعٍ قَالَ سَأَلَ رَجُلٌ اَلرِّضَا عَلَيْهِ اَلسَّلاَمُ: عَنِ اَلرَّجُلِ يَتَزَوَّجُ اِمْرَأَةً مُتْعَةً وَ يَشْتَرِطُ عَلَيْهَا أَنْ لاَ يَطْلُبَ وَلَدَهَا فَتَأْتِي بَعْدَ ذَلِكَ بِوَلَدٍ فَيُنْكِرُ اَلْوَلَدَ فَشَدَّدَ فِي ذَلِكَ وَ قَالَ “يَجْحَدُ وَ كَيْفَ يَجْحَدُ” إِعْظَاماً لِذَلِكَ قَالَ اَلرَّجُلُ فَإِنِ اِتَّهَمَهَا، قَالَ “لاَ يَنْبَغِي لَكَ أَنْ تَتَزَوَّجَ إِلاَّ بِمَأْمُونَةٍ إِنَّ اَللَّهَ عَزَّ وَ جَلَّ قَالَ: اَلزّٰانِي لاٰ يَنْكِحُ إِلاّٰ زٰانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً وَ اَلزّٰانِيَةُ لاٰ يَنْكِحُهٰا إِلاّٰ زٰانٍ أَوْ مُشْرِكٌ وَ حُرِّمَ ذٰلِكَ عَلَى اَلْمُؤْمِنِينَ

বাংলা অনুবাদ:
মুহাম্মদ ইবন ইসমাইল ইবন বাযি বর্ণনা করেন, একজন ব্যক্তি আলী আল-রিদাকে জিজ্ঞেস করলেন, “এক ব্যক্তি একজন নারীকে মুতা বিবাহ করল এবং তাঁর সঙ্গে শর্ত করল যে সে ওই নারীর সন্তান দাবি করবে না। এরপর নারীটি একটি সন্তান জন্ম দিল এবং পুরুষটি সন্তানটিকে অস্বীকার করল। এ অবস্থায় কী হবে?”
আলী আল-রিদা বিষয়টিতে কঠোর আপত্তি জানিয়ে বললেন, “সে সন্তানটিকে অস্বীকার করবে? কীভাবে সে অস্বীকার করবে?” তিনি বিষয়টিকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করলেন।
প্রশ্নকারী বললেন, “কিন্তু যদি সে নারীটির ব্যাপারে সন্দেহ করে?”
আলী আল-রিদা উত্তর দিলেন, “তোমার এমন নারী ছাড়া কাউকে বিবাহ করা উচিত নয়, যাকে বিশ্বাস করা যায়। আল্লাহ বলেছেন, ‘ব্যভিচারী পুরুষ ব্যভিচারিণী অথবা মুশরিক নারী ছাড়া কাউকে বিবাহ করে না; আর ব্যভিচারিণীকে ব্যভিচারী অথবা মুশরিক পুরুষ ছাড়া কেউ বিবাহ করে না। মুমিনদের জন্য এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’”

এই বর্ণনাটি প্রমাণ করে, মুতা বিবাহে সন্তান জন্মানোর প্রশ্নটি কেবল পরবর্তী পারিবারিক সমস্যা ছিল না; চুক্তি করার সময়ই পুরুষ সন্তানের দায়িত্ব না নেওয়ার শর্ত আরোপ করতে চাইত। আলী আল-রিদা এমন শর্তের ভিত্তিতে সন্তান অস্বীকার করাকে গ্রহণ করেননি। তাঁর বক্তব্যে পুরুষটির ওপর পিতৃত্ব স্বীকার করার নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু পিতৃত্ব অস্বীকারের ধর্মীয় নিষেধ এবং আদালতে সেই অস্বীকৃতির কার্যকারিতা একই নিয়মে পরিচালিত হয়নি। পরবর্তী শিয়া আইনগ্রন্থে এই দুটি বিষয়কে আলাদা করা হয়েছে।

আলী আল-সিস্তানি তাঁর মিনহাজুস সালিহিন গ্রন্থের মুতা বিবাহ অধ্যায়ে ২৫১ নম্বর বিধানে বলেছেন, সাময়িক বিবাহে পুরুষ স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই বীর্যপাত বাইরে করতে পারে। তবুও সন্তান জন্মালে এবং সন্তানটি তাঁর হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে পিতৃত্ব অস্বীকার করা তাঁর জন্য বৈধ নয়। কিন্তু পুরুষটি নিশ্চিতভাবে পিতৃত্ব অস্বীকার করলে এবং তাঁর বক্তব্য সত্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বিশেষ শপথপদ্ধতি ছাড়াই আদালতের বিচারে সন্তানটির পিতৃত্ব অস্বীকৃত হতে পারে—যদি তিনি আগে সন্তানটিকে নিজের বলে স্বীকার না করে থাকেন। একই বিধানে স্থায়ী বিবাহের তুলনায় মুতা বিবাহের পিতৃত্ব-অস্বীকৃতির আইনি পদ্ধতি আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। [68]

مسألة 251: يجوز العزل للمتمتّع من دون إذن المتمتّع بها، ولكن يلحق به الولد لو حملت وإن عزل لاحتمال سبق المنيّ من غير تنبّه، ويلحق بالوطء الإنزال في فم الفرج، ولا يجوز للزوج نفي الولد مع احتمال تولّده منه، ولو نفاه جزماً انتفى ظاهراً – بلا لعان – مع احتمال صدقه إلّا إذا كان قد أقرّ به سابقاً.
مسألة 252: لا طلاق في المتعة وإنّما تبين المرأة بانقضاء المدّة أو إبرائها، ولا رجعة للزوج في عدّتها.

বাংলা অনুবাদ:
মাসআলা ২৫১: মুতা বিবাহকারী পুরুষ সাময়িক স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই বীর্যপাত বাইরে করতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও নারীটি গর্ভবতী হলে সন্তানটি পুরুষটির সন্তান হিসেবে গণ্য হবে, কারণ তাঁর অজান্তেও কিছু বীর্য আগে প্রবেশ করার সম্ভাবনা থাকে। যোনিপথের মুখে বীর্যপাতও এই বিধানের অন্তর্ভুক্ত। সন্তানের জন্ম তাঁর কারণে হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে স্বামী সেই সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করতে পারবেন না। তবে তিনি নিশ্চিতভাবে পিতৃত্ব অস্বীকার করলে এবং তাঁর বক্তব্য সত্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে, বিশেষ শপথপদ্ধতি ছাড়াই বাহ্যিক আইনি বিচারে সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকৃত হবে। কিন্তু তিনি আগে সন্তানটিকে নিজের বলে স্বীকার করে থাকলে এভাবে অস্বীকার করতে পারবেন না।
মাসআলা ২৫২: মুতা বিবাহে তালাক নেই। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলে অথবা স্বামী অবশিষ্ট মেয়াদ ছেড়ে দিলে নারীটি তাঁর বিবাহবন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। ইদ্দত চলাকালে স্বামীর তাঁকে ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার নেই।

এই বিধানের তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুতর। একদিকে পুরুষের জন্য সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা থাকা অবস্থায় পিতৃত্ব অস্বীকার নিষিদ্ধ বলা হচ্ছে; অন্যদিকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাঁর অস্বীকার বিশেষ শপথ ছাড়াই বিচারিকভাবে কার্যকর হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। স্থায়ী বিবাহে পিতৃত্ব অস্বীকারের জন্য যে বিশেষ শপথপদ্ধতি বা লিআনের বিধান রয়েছে, সাময়িক বিবাহে সেই পদ্ধতি অপরিহার্য নয়। ফলে ধর্মীয়ভাবে পিতৃত্ব অস্বীকার নিষিদ্ধ হওয়া এবং আদালতে সেই অস্বীকৃতি কার্যকর হওয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি হয়েছে। পুরুষটি পূর্বে সন্তানকে নিজের বলে স্বীকার না করে থাকলে এবং তাঁর দাবি সত্য হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা থাকলে এই পার্থক্য সন্তানের আইনগত পরিচয় ও অধিকারকে প্রভাবিত করতে পারে। অথচ সন্তান জন্মানোর পেছনে নারীর পাশাপাশি পুরুষটিরও প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। একটি সাময়িক যৌনচুক্তি শেষ হয়ে গেলেও সেই সম্পর্কের ফলে জন্ম নেওয়া সন্তানের জীবন ও প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না।


মুতা বিবাহে উত্তরাধিকার: স্ত্রী ও সন্তানের অধিকারের পার্থক্য

মুতা বিবাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো উত্তরাধিকারসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা। স্থায়ী বিবাহে স্বামী বা স্ত্রী মৃত্যুবরণ করলে অপরজন নির্ধারিত উত্তরাধিকার পাওয়ার অধিকারী হন। কিন্তু শিয়া ফিকহে সাময়িক বিবাহের ক্ষেত্রে এই অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। নারীটি যত দিনই মুতা-বিবাহের সম্পর্কে থাকুন, কিংবা সেই সম্পর্কের ফলে গর্ভবতী হোন, কেবল সাময়িক স্ত্রী হওয়ার কারণে তিনি স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন না। একইভাবে স্বামীও তাঁর সাময়িক স্ত্রীর সম্পত্তির স্বয়ংক্রিয় উত্তরাধিকারী হন না। এই বিধানটি স্থায়ী ও সাময়িক বিবাহের মধ্যে একটি মৌলিক অর্থনৈতিক পার্থক্য তৈরি করে। [69]

উত্তরাধিকার নিয়ে প্রাচীন শিয়া হাদিসগ্রন্থেও একাধিক বক্তব্য পাওয়া যায়। হুর আল-আমিলির ওয়াসাইলুশ শিয়া গ্রন্থের ২১তম খণ্ডে এ বিষয়ে পৃথক অধ্যায় রয়েছে। অধ্যায়টির নাম باب عدم ثبوت الميراث في المتعة للزوج ولا للمرأة وحكم ما لو شرط الميراث, অর্থাৎ মুতা বিবাহে স্বামী ও স্ত্রীর উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া এবং উত্তরাধিকারের শর্ত আরোপ করলে তার বিধান। এই অধ্যায়ের ২৬৫৪৬ নম্বর বর্ণনায় আলী আল-রিদার নামে বলা হয়েছে, মুতা বিবাহ উত্তরাধিকারসহ কিংবা উত্তরাধিকার ছাড়া—উভয়ভাবেই সম্পন্ন হতে পারে; চুক্তিতে উত্তরাধিকারের শর্ত থাকলে সেটি কার্যকর হবে। কিন্তু একই অধ্যায়ের ২৬৫৪৯ নম্বর বর্ণনায় বলা হয়েছে, শর্ত থাকুক বা না থাকুক, সাময়িক স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে উত্তরাধিকার নেই। অর্থাৎ প্রাচীন শিয়া বর্ণনাগুলোর মধ্যেও উত্তরাধিকার-শর্তের কার্যকারিতা নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে। [70] [71]

মূল আরবি, হাদিস ২৬৫৪৬:
تزويج المتعة نكاح بميراث ، ونكاح بغير ميراث إن اشترطت كان وإن لم تشترط لم يكن .

বাংলা অনুবাদ: মুতা বিবাহ উত্তরাধিকারসহ হতে পারে, আবার উত্তরাধিকার ছাড়া হতে পারে। উত্তরাধিকারের শর্ত রাখা হলে উত্তরাধিকার থাকবে; শর্ত না রাখা হলে থাকবে না।

মূল আরবি, হাদিস ২৬৫৪৯:
وروي أنه ليس بينهما ميراث اشترط أو لم يشترط .

বাংলা অনুবাদ: আরও বর্ণিত হয়েছে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো উত্তরাধিকার নেই, তাঁরা উত্তরাধিকারের শর্ত রাখুন কিংবা না রাখুন।

আলী আল-সিস্তানির মিনহাজুস সালিহিন-এর ২৫৫ নম্বর বিধানে সাময়িক বিবাহে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক উত্তরাধিকার স্বীকৃত নয়। এমনকি চুক্তিতে উত্তরাধিকারের শর্ত রাখা হলেও সেই শর্তের কার্যকারিতা নিয়ে আইনগত সমস্যা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন এবং সতর্কতার বিধান দিয়েছেন। অর্থাৎ স্থায়ী বিবাহের ক্ষেত্রে যে উত্তরাধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, সাময়িক বিবাহে তা অনুপস্থিত। এই অর্থনৈতিক পার্থক্যটি নিছক আনুষ্ঠানিক নয়। একজন নারী দীর্ঘদিন ধরে সাময়িক বিবাহের সম্পর্কে থাকলেও এবং সেই সম্পর্কের ফলে সন্তানের জন্ম দিলেও স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর নিজের উত্তরাধিকার স্থায়ী স্ত্রীর মতো নিশ্চিত নয়।

কিন্তু সাময়িক স্ত্রীর উত্তরাধিকার না থাকা এবং তাঁর সন্তানের উত্তরাধিকার না থাকা এক বিষয় নয়। সন্তানের পিতৃত্ব আইনগতভাবে স্বীকৃত হলে সেই সন্তান পিতার উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য হয়। শিয়া উত্তরাধিকারবিধানে পিতা-মাতা এবং সন্তান প্রথম শ্রেণির উত্তরাধিকারী। সন্তানটি স্থায়ী বিবাহে জন্মেছে, নাকি সাময়িক বিবাহে জন্মেছে—কেবল এই কারণে স্বীকৃত সন্তানের উত্তরাধিকার বাতিল হয় না। সিস্তানির মিনহাজুস সালিহিন-এর উত্তরাধিকার অধ্যায়ের ৯৫৩ নম্বর বিধানে পিতা-মাতা এবং সন্তানকে প্রথম শ্রেণির উত্তরাধিকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। [72]

এই পার্থক্যের ফলে একই পরিবারের দুজন মানুষের অধিকার ভিন্নভাবে নির্ধারিত হয়। একজন সাময়িক স্ত্রী তাঁর স্বামীর সম্পত্তির স্বয়ংক্রিয় উত্তরাধিকারী নন, অথচ তাঁদের স্বীকৃত সন্তান সেই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। সন্তানটির সম্পত্তিতে মা-বাবার উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও স্বীকৃত আত্মীয়তার বিধান কার্যকর হয়। কিন্তু পুরুষটি যদি সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করেন এবং সেই অস্বীকৃতি বিচারিকভাবে কার্যকর হয়, তাহলে পিতার সঙ্গে সন্তানের আইনগত সম্পর্ক ও উত্তরাধিকার নির্ধারণের প্রশ্নও জটিল হয়ে পড়ে। এ কারণেই মুতা বিবাহে পিতৃত্ব অস্বীকারের বিশেষ বিধানটি উত্তরাধিকার-আলোচনা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।


সাময়িক স্ত্রীর ভরণপোষণ: গর্ভবতী হলেও স্বামীর দায়িত্ব নয়

মুতা বিবাহের অর্থনৈতিক কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো সাময়িক স্ত্রীর ভরণপোষণ। স্থায়ী বিবাহে নির্দিষ্ট শর্তে স্বামীর ওপর স্ত্রীর খাদ্য, বাসস্থান ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় বহনের দায়িত্ব থাকে। কিন্তু সাময়িক বিবাহে স্ত্রী স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই অধিকার পান না। সিস্তানির মিনহাজুস সালিহিন-এর ২৫৬ নম্বর বিধানে সরাসরি বলা হয়েছে, সাময়িক স্ত্রীর ভরণপোষণ স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক নয়, এমনকি নারীটি তাঁর সন্তান গর্ভে ধারণ করলেও নয়। একই বিধানে বলা হয়েছে, সাময়িক স্ত্রীর কাছে রাত্রিযাপনের অধিকারও স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না; চুক্তিতে অথবা অন্য বাধ্যতামূলক চুক্তিতে শর্ত রাখা হলে তা কার্যকর হতে পারে। [73]

মূল আরবি, মাসআলা ২৫৬-এর প্রাসঙ্গিক অংশ:
لا تجب نفقة الزوجة المتمتّع بها على زوجها وإن حملت منه، ولا تستحقّ من زوجها المبيت عندها إلّا إذا اشترطت ذلك

বাংলা অনুবাদ:
সাময়িক স্ত্রীর ভরণপোষণ তাঁর স্বামীর ওপর বাধ্যতামূলক নয়, এমনকি তিনি স্বামীর সন্তান গর্ভে ধারণ করলেও। একইভাবে স্বামী তাঁর কাছে রাত্রিযাপন করবেন—এমন অধিকারও তাঁর নেই, যদি না চুক্তিতে সেই শর্ত রাখা হয়।

এই বিধানের বাস্তব অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট। একজন পুরুষ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একজন নারীর সঙ্গে মুতা বিবাহ করতে পারেন। সেই সম্পর্কের ফলে নারীটি গর্ভবতী হতে পারেন। কিন্তু কেবল এই গর্ভধারণের কারণে পুরুষটির ওপর নারীটির নিজের ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। গর্ভধারণের শারীরিক কষ্ট, চিকিৎসা, কাজের সক্ষমতা কমে যাওয়া কিংবা দৈনন্দিন জীবনের বাড়তি প্রয়োজন নারীটির জীবনে বাস্তব প্রভাব ফেলতে পারে। অথচ সাময়িক বিবাহের আইনগত কাঠামোতে নারীটির জন্য স্থায়ী স্ত্রীর সমতুল্য অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা রাখা হয়নি। যৌনসম্পর্কে অংশগ্রহণের সুযোগ এবং সেই সম্পর্কের সম্ভাব্য পরিণতি বহনের দায়িত্ব এখানে সমানভাবে বণ্টিত নয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সিস্তানির পরবর্তী ২৫৭ নম্বর বিধান অনুযায়ী, নারীটি সাময়িক বিবাহের সময় জানতেন না যে তিনি ভরণপোষণ ও রাত্রিযাপনের অধিকার পাবেন না—তবুও সেই অজ্ঞতার কারণে তাঁর জন্য নতুন কোনো অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। অর্থাৎ একজন নারী স্থায়ী বিবাহের প্রচলিত অধিকার সম্পর্কে ধারণা নিয়ে সাময়িক বিবাহে প্রবেশ করলেও শুধু সেই ভুল ধারণার কারণে স্বামীর ওপর ভরণপোষণের দায়িত্ব আসে না। চুক্তির আইনগত শ্রেণিই এখানে তাঁর অর্থনৈতিক অধিকারের সীমা নির্ধারণ করে। [74]


সন্তানের ভরণপোষণ: মায়ের অধিকার থেকে পৃথক পিতার দায়িত্ব

সাময়িক স্ত্রীর জন্য ভরণপোষণ বাধ্যতামূলক না হলেও মুতা বিবাহে জন্ম নেওয়া স্বীকৃত সন্তানের অবস্থান ভিন্ন। পিতা-মাতা ও সন্তানের মধ্যে আত্মীয়তার ভিত্তিতে ভরণপোষণের যে বিধান রয়েছে, সেটি সাময়িক বিবাহে জন্ম নেওয়া স্বীকৃত সন্তানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সিস্তানির মিনহাজুস সালিহিন-এর ৪৪০ নম্বর বিধানে ছেলে ও মেয়ে উভয় সন্তানের জন্য পিতার কাছে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী বিধানগুলোতে আর্থিক প্রয়োজন, পিতার সক্ষমতা এবং খাদ্য, পোশাক ও বাসস্থানের মতো প্রয়োজনীয় ব্যয়ের বিষয়ও আলোচনা করা হয়েছে। [75]

মূল আরবি, মাসআলা ৪৪০-এর প্রাসঙ্গিক অংশ:
كما يثبت للولد – ذكراً كان أو أُنثى – حقّ الإنفاق على أبيه

বাংলা অনুবাদ:
একইভাবে সন্তান ছেলে হোক কিংবা মেয়ে, তার পিতার কাছ থেকে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

এখানে মা ও সন্তানের অর্থনৈতিক অবস্থানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য দেখা যায়। পুরুষটি সাময়িক স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে বাধ্য নন, এমনকি তিনি গর্ভবতী হলেও নয়। কিন্তু সন্তান জন্মানোর পরে পিতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে সন্তানের প্রয়োজনের ভিত্তিতে পিতার ভরণপোষণের দায়িত্ব তৈরি হয়। অর্থাৎ যে গর্ভধারণের সময় নারীটির নিজের ভরণপোষণ নিশ্চিত নয়, সেই গর্ভধারণের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুর জন্য পৃথক আইনগত অধিকার রয়েছে। শিশুর অধিকার থাকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি গর্ভবতী নারীর নিজের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ঘাটতি পূরণ করে না।

এখানে পিতৃত্ব অস্বীকারের আগের আলোচনাটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সন্তানটি পুরুষটির বলে স্বীকৃত হলে আত্মীয়তার ভিত্তিতে ভরণপোষণ ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত বিধান কার্যকর হয়। কিন্তু পিতৃত্ব নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে নারীকে শুধু সন্তানের দৈনন্দিন প্রয়োজন বহনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় না; তাঁকে সন্তানের আইনগত পরিচয়ের প্রশ্নও মোকাবিলা করতে হতে পারে। সিস্তানির বিধানে পিতৃত্ব অস্বীকারের জন্য স্থায়ী বিবাহের বিশেষ শপথপদ্ধতি অপরিহার্য না হওয়ায় সাময়িক বিবাহের ক্ষেত্রে এই বিরোধের একটি পৃথক আইনগত কাঠামো তৈরি হয়েছে।


মোহর, যৌনসম্পর্ক ও নির্ধারিত মেয়াদের অর্থনৈতিক হিসাব

মুতা বিবাহের ক্ষেত্রে মোহর বা নির্ধারিত বিনিময় অপরিহার্য। স্থায়ী বিবাহে মোহরের উল্লেখ না থাকলেও বিবাহ বৈধ হওয়ার বিধান রয়েছে; কিন্তু সাময়িক বিবাহের চুক্তিতে মোহর নির্ধারণ না করা হলে চুক্তিটি বৈধ হয় না। সিস্তানির মিনহাজুস সালিহিন-এর ২৩৩ থেকে ২৩৬ নম্বর বিধানে মোহর নির্ধারণের বাধ্যবাধকতা এবং তার পরিমাণের আলোচনা রয়েছে। নির্দিষ্ট বিনিময় হিসেবে অর্থ, সম্পদ, বৈধ সেবা বা আর্থিক অধিকার নির্ধারণ করা যায়। মোহরের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সর্বনিম্ন পরিমাণ রাখা হয়নি; উভয়ের সম্মতি থাকলে এক মুঠো খাদ্যও মোহর হতে পারে। [76]

এই বিধানের সঙ্গে ইসলামের প্রাথমিক যুগের হাদিসগুলোর সরাসরি মিল রয়েছে। সাবরা ইবন মাবাদের বর্ণনায় একটি চাদরের বিনিময়ে তিন রাতের মুতা বিবাহের ঘটনা এসেছে। জাবির ইবন আবদুল্লাহর বর্ণনায় এক মুঠো খেজুর বা ময়দার বিনিময়ে সাময়িক বিবাহ করার কথা রয়েছে। অর্থাৎ বিনিময়ের পরিমাণ খুব সামান্য হলেও চুক্তিটি বৈধ হতে পারত। চুক্তির মেয়াদ এবং বিনিময় আগে থেকে নির্ধারণ করাই ছিল এই ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

মোহরের অর্থনৈতিক কাঠামো আরও স্পষ্ট হয় সিস্তানির ২৩৭ থেকে ২৪১ নম্বর বিধানগুলোতে। সেখানে বলা হয়েছে, সাময়িক স্ত্রী চুক্তির মাধ্যমে সম্পূর্ণ মোহরের মালিক হন। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী যৌনসম্পর্কের সুযোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তিনি মেয়াদের কোনো অংশে পালন না করলে পুরুষটি সেই অনুপাতে মোহর কমাতে পারেন। নারীটি অর্ধেক মেয়াদে যৌনসম্পর্কের সুযোগ না দিলে অর্ধেক, এক-তৃতীয়াংশ মেয়াদে না দিলে এক-তৃতীয়াংশ মোহর কমানোর বিধান রয়েছে। অবশ্য ঋতুস্রাবের মতো যৌনসম্পর্ক নিষিদ্ধ থাকা সময় অথবা স্বীকৃত অসুস্থতা ও প্রয়োজনীয় সফরের কারণে অক্ষমতার ক্ষেত্রে এই কর্তন প্রযোজ্য নয়। আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়জুড়ে নারীটি যৌনসম্পর্কের সুযোগ দেবেন না বলে আশঙ্কা থাকলে পুরুষটি কিস্তিতে মোহর দিতে পারেন। [77]

অন্যদিকে পুরুষটি নিজে অসুস্থ হয়ে পড়লে, সফরে গেলে, বন্দী হলে কিংবা নিজের ইচ্ছায় নারীর কাছে না গেলেও নির্ধারিত মেয়াদ পার হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁর দেওয়া মোহর ফেরত পাওয়ার অধিকার তৈরি হয় না। চুক্তি সম্পাদনের পরে পুরুষটি অবশিষ্ট মেয়াদ ছেড়ে দিলে যৌনসম্পর্ক হওয়ার আগে তাঁকে অর্ধেক মোহর দিতে হয়। কিন্তু যৌনসম্পর্ক হয়ে যাওয়ার পরে তিনি মেয়াদের বাকি অংশ ছেড়ে দিলে সম্পূর্ণ মোহর দিতে হয়, এমনকি চুক্তির অনেকটা সময় তখনও বাকি থাকলেও। এখানে মোহরের পরিমাণ, যৌনসম্পর্কের সুযোগ দেওয়া এবং পুরুষটির মেয়াদ শেষ করার ক্ষমতার মধ্যে সরাসরি আইনগত সম্পর্ক রয়েছে। [78]

এই বিধানগুলো মুতা বিবাহের অর্থনৈতিক প্রকৃতি স্পষ্ট করে। সাধারণ স্থায়ী দাম্পত্যের মতো পারস্পরিক ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি সংসার পরিচালনার দায়িত্ব এখানে চুক্তির অপরিহার্য অংশ নয়। অন্যদিকে নারী যৌনসম্পর্কের সুযোগ না দিলে তাঁর প্রাপ্য বিনিময় কমানোর বিধান রয়েছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট মেয়াদের যৌনসম্পর্কের সুযোগ এবং সেই সুযোগের বিনিময়ে দেওয়া সম্পদের মধ্যে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিবাহের ধর্মীয় নাম ব্যবহার করা হলেও এই লেনদেনের কাঠামো অর্থ ও যৌনসেবার বিনিময়সম্পর্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলে যায়।


মেয়াদ শেষ হওয়া, তালাকের অনুপস্থিতি এবং নারীর ইদ্দত

মুতা বিবাহের আরও একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, সম্পর্কটি শেষ করার জন্য প্রচলিত তালাকের প্রয়োজন হয় না। চুক্তিতে নির্ধারিত সময় শেষ হলেই বিবাহের সম্পর্ক সমাপ্ত হয়। পুরুষটি চাইলে নির্ধারিত সময়ের আগেই অবশিষ্ট মেয়াদ নারীকে ছেড়ে দিতে পারেন। সিস্তানির ২৫২ নম্বর বিধানে এই নিয়ম উল্লেখ রয়েছে। স্থায়ী বিবাহের তালাকের ক্ষেত্রে যে আনুষ্ঠানিকতা ও সাক্ষ্যসংক্রান্ত শর্ত রয়েছে, সাময়িক বিবাহের অবশিষ্ট মেয়াদ ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সেগুলো প্রযোজ্য নয়। ফলে সাময়িক বিবাহের সম্পর্কের সমাপ্তি স্থায়ী বিবাহের তুলনায় অনেক সরল এবং দ্রুত সম্পন্ন হতে পারে। [79] [80]

কিন্তু সাময়িক বিবাহ শেষ হয়ে গেলেই নারীর ওপর সব বিধিনিষেধ শেষ হয়ে যায় না। যৌনসম্পর্ক হয়ে থাকলে নির্দিষ্ট শর্তে তাঁকে ইদ্দত পালন করতে হয়। সিস্তানির মিনহাজুস সালিহিন-এর ২৫৯ এবং ৫৭৪ নম্বর বিধানে বলা হয়েছে, গর্ভবতী নারীর ইদ্দত সন্তান প্রসব পর্যন্ত চলবে। আর ঋতুস্রাব হয় এমন নারীর ক্ষেত্রে দুটি পূর্ণ ঋতুচক্রের ইদ্দত রয়েছে। ঋতুস্রাবের বয়সে থাকা সত্ত্বেও অসুস্থতা বা অন্য কারণে ঋতুস্রাব না হলে ইদ্দতের মেয়াদ পঁয়তাল্লিশ দিন। যৌনসম্পর্ক না হয়ে থাকলে নির্ধারিত অবস্থায় ইদ্দতের প্রয়োজন নেই। [81] [82]

মূল আরবি, মাসআলা ৫৭৪-এর প্রাসঙ্গিক অংশ:
عدّة المتمتّع بها في الحامل مدّة حملها، وفي الحائل المدخول بها – غير الصغيرة واليائسة – حيضتان كاملتان

বাংলা অনুবাদ:
সাময়িক বিবাহে গর্ভবতী নারীর ইদ্দত তাঁর গর্ভধারণের সময়কাল পর্যন্ত। আর গর্ভবতী নন, যৌনসম্পর্ক হয়েছে এবং নাবালিকা বা ঋতুবন্ধপ্রাপ্ত নন—এমন নারীর ইদ্দত দুটি পূর্ণ ঋতুচক্র।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অসমতা রয়েছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষটির সাময়িক দাম্পত্যসম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। কিন্তু নারীটির ওপর পরবর্তী বিবাহের আগে ইদ্দত পালনের বিধান কার্যকর থাকতে পারে। নারীটি গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত সেই অপেক্ষা দীর্ঘ হতে পারে। অথচ সাময়িক বিবাহের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নারীটির ব্যক্তিগত ভরণপোষণের স্বয়ংক্রিয় অধিকার নেই। ফলে যৌনসম্পর্কের পরিণতি হিসেবে গর্ভধারণ এবং অপেক্ষার দায়িত্ব নারীর জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেললেও সেই প্রভাবের সঙ্গে সমান মেয়াদের আর্থিক নিশ্চয়তা স্বামীর ওপর আরোপ করা হয়নি।

স্বামী সাময়িক বিবাহ চলাকালে মারা গেলে নারীটির জন্য স্থায়ী স্ত্রীর মতো মৃত্যুর ইদ্দত পালন করতে হয়। সিস্তানির বিধানে গর্ভবতী নন এমন নারীর ক্ষেত্রে চার মাস দশ দিন এবং গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে চার মাস দশ দিন ও সন্তান প্রসবের মধ্যে যেটি দীর্ঘতর, সেই সময় পর্যন্ত ইদ্দত নির্ধারিত হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর ইদ্দতের বিধান থাকা মানেই সাময়িক স্ত্রী মৃত স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়ে যান না। ইদ্দত ও উত্তরাধিকার পৃথক বিধান। [83]


স্থায়ী না সাময়িক বিবাহ: চুক্তির প্রকৃতি নিয়ে বিরোধের পরিণতি

সাময়িক ও স্থায়ী বিবাহের মধ্যে এতগুলো অর্থনৈতিক ও পারিবারিক পার্থক্য থাকার কারণে সম্পর্কটির প্রকৃতি নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে তার সরাসরি আর্থিক পরিণতি ঘটে। একজন নারী যদি দাবি করেন যে তিনি স্থায়ী বিবাহে আবদ্ধ হয়েছেন এবং সেই কারণে ভরণপোষণের অধিকারী, কিন্তু পুরুষটি দাবি করেন যে বিবাহটি সাময়িক ছিল, তাহলে কেবল বিবাহের শ্রেণি নির্ধারণের ওপরই নারীটির অর্থনৈতিক অধিকার নির্ভর করবে। এই ধরনের বিরোধ কোনো কল্পিত সমস্যা নয়। সিস্তানির মিনহাজুস সালিহিন-এর ২৫৮ নম্বর বিধানে সরাসরি এমন পরিস্থিতির উদাহরণ রয়েছে। সেখানে নারীটির স্থায়ী বিবাহের দাবি ও ভরণপোষণের দাবি এবং পুরুষটির সাময়িক বিবাহের দাবি ও ভরণপোষণ অস্বীকারের পরিস্থিতি আলোচনা করা হয়েছে। [84]

একই বিধানে বিপরীত ধরনের বিরোধের কথাও রয়েছে। পুরুষটি যদি দাবি করেন যে বিবাহটি সাময়িক ছিল এবং নারী নির্ধারিত সময়ের কিছু অংশে যৌনসম্পর্কের সুযোগ না দেওয়ায় মোহরের অংশবিশেষ ফেরত দিতে হবে, কিন্তু নারীটি বিবাহ স্থায়ী ছিল বলে দাবি করেন, তাহলে আবারও বিবাহের শ্রেণি নির্ধারণের প্রশ্ন সামনে আসে। অর্থাৎ একই সম্পর্ককে নারী স্থায়ী বিবাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে তাঁর ভরণপোষণের অধিকার তৈরি হতে পারে, আর পুরুষ সেটিকে সাময়িক বিবাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে সেই ভরণপোষণ অস্বীকার এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মোহরের অংশ ফেরত দাবি করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এই আইনগত পার্থক্য মুতা বিবাহে চুক্তির শর্তগুলোর গুরুত্ব প্রকাশ করে। সম্পর্কের সময়সীমা, বিনিময় এবং অন্য শর্তগুলো নির্ধারণ করা না হলে কিংবা পরে সেগুলো নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে স্বামী-স্ত্রীর অর্থনৈতিক অধিকার নিয়ে সরাসরি সংঘাত তৈরি হতে পারে। একজন নারী বিবাহের সম্পর্কের মধ্যে রয়েছেন বলেই স্থায়ী বিবাহের অধিকারগুলো পাবেন—এমন নিশ্চয়তা এই ব্যবস্থায় নেই। বরং তাঁর অধিকার অনেকাংশে নির্ভর করে সম্পর্কটি কোন শ্রেণির বিবাহ এবং নির্দিষ্ট চুক্তিতে কী শর্ত রাখা হয়েছে, তার ওপর।


সন্তান জন্ম এবং সাময়িক বিবাহের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিণতি

মুতা বিবাহের মেয়াদ কয়েক ঘণ্টা, কয়েক দিন, কয়েক মাস কিংবা আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য নির্ধারণ করা সম্ভব। চুক্তি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাময়িক দাম্পত্যসম্পর্কের সমাপ্তি ঘটতে পারে। কিন্তু সেই সম্পর্কের ফলে গর্ভধারণ হলে তার শারীরিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিণতি নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে শেষ হয় না। গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব, সন্তানের পরিচয়, ভরণপোষণ এবং উত্তরাধিকার—এসব বিষয় বহু বছর ধরে সংশ্লিষ্ট নারী ও সন্তানের জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে যে সম্পর্ককে আইনগতভাবে একটি সীমিত মেয়াদের চুক্তি হিসেবে গঠন করা হয়েছে, তার বাস্তব পরিণতি সেই সীমিত মেয়াদকে অনেক দূর অতিক্রম করতে পারে।

ইসলামের প্রাথমিক যুগের ঐতিহাসিক বিবরণগুলোতেও এই সমস্যার উপস্থিতি রয়েছে। আমর ইবন হুরায়সের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুতা বিবাহে একজন নারী গর্ভবতী হওয়ার পর বিষয়টি উমরের কাছে পৌঁছায়। সালামাহ ইবন উমাইয়ার সঙ্গে উম্মু আরাকার মুতা বিবাহের বিবরণেও গর্ভধারণের কথা রয়েছে। রাবিআ ইবন উমাইয়ার ঘটনাতেও একজন নারী গর্ভবতী হন এবং বিষয়টি উমরের কাছে অভিযোগ হিসেবে পৌঁছায়। আবার ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত বর্ণনায় কুরাইশের এমন পুরুষদের উল্লেখ রয়েছে, যাঁদের জন্ম মুতা বিবাহের মাধ্যমে হয়েছিল। অর্থাৎ সাময়িক বিবাহ থেকে সন্তান জন্মানোর ঘটনা ইসলামি উৎসে শুধু একটি আইনগত সম্ভাবনা হিসেবে নয়, বাস্তব ঘটনার বিবরণ হিসেবেও সংরক্ষিত রয়েছে।

প্রাচীন শিয়া হাদিসে মুতা-বিবাহজাত সন্তানের পিতৃত্ব স্বীকার করার নির্দেশ এবং পিতৃত্ব অস্বীকারের চেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য পাওয়া যায়। পরবর্তী শিয়া ফিকহেও স্বীকৃত সন্তানের উত্তরাধিকার ও ভরণপোষণের বিধান রয়েছে। কিন্তু একই আইনব্যবস্থায় সাময়িক স্ত্রীর ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার, স্বামীর সঙ্গে বসবাস এবং সম্পর্ক অব্যাহত রাখার অধিকার স্থায়ী স্ত্রীর মতো নয়। আবার সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকারের বিচারিক পদ্ধতিও পৃথক। এর ফলে নারী ও সন্তানের স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও তাঁদের আইনগত নিরাপত্তা একইভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

মুতা বিবাহের এই কাঠামো থেকে একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্ন তৈরি হয়। একজন পুরুষ নির্দিষ্ট বিনিময়ের ভিত্তিতে একজন নারীর সঙ্গে যৌনসম্পর্কের চুক্তি করতে পারেন এবং মেয়াদ শেষ হলে সেই সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারেন। কিন্তু নারীটি গর্ভবতী হলে তাঁকেই গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসবের শারীরিক পরিণতি বহন করতে হয়। সন্তানের পিতৃত্ব স্বীকৃত হওয়ার বিধান থাকলেও পিতৃত্ব নিয়ে বিরোধের সম্ভাবনা সম্পূর্ণ দূর হয় না। তাছাড়া গর্ভধারণের সময় সাময়িক স্ত্রীর নিজের ভরণপোষণ বাধ্যতামূলক না থাকার বিধান নারীটির অর্থনৈতিক ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। এই ব্যবস্থায় সাময়িক যৌনসম্পর্কের সুযোগের তুলনায় নারী ও সন্তানের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

মুতা বিবাহকে শুধু ধর্মীয়ভাবে বৈধ একটি বিবাহের শ্রেণি হিসেবে বর্ণনা করলে এই পারিবারিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা আড়ালে থেকে যায়। এর আইনগত কাঠামোতে মোহর অপরিহার্য, যৌনসম্পর্কের সুযোগের সঙ্গে সেই মোহরের হিসাব সম্পর্কিত, স্বামীর ওপর সাময়িক স্ত্রীর ভরণপোষণ বাধ্যতামূলক নয়, স্ত্রী স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বামীর উত্তরাধিকারী নন এবং নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলে তালাক ছাড়াই সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। অন্যদিকে সন্তান জন্মালে তার পিতৃত্ব, ভরণপোষণ ও উত্তরাধিকারের পৃথক বিধান কার্যকর হয়। ফলে মুতা বিবাহের মূল বৈশিষ্ট্য হলো স্বল্পমেয়াদি যৌনচুক্তির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রজনন ও পারিবারিক পরিণতির একটি অসম সম্পর্ক। এই অসমতা শুধু আধুনিক নৈতিক মূল্যায়নের বিষয় নয়; ইসলামি হাদিস ও ফিকহগ্রন্থে সংরক্ষিত বিধানগুলোর মধ্যেই এর ভিত্তি রয়েছে।


মুহাম্মদ নিজে মুতা বিবাহ করেছিলেন: শিয়া গ্রন্থে সংরক্ষিত বিবরণ

ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুতা বিবাহের আলোচনা সাধারণত মুহাম্মদের সাহাবীদের এই প্রথা পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ শিয়া হাদিস ও ধর্মীয় আইনসংক্রান্ত গ্রন্থগুলোতে মুহাম্মদ নিজেও মুতা বিবাহ করেছিলেন বলে সরাসরি বিবরণ সংরক্ষিত রয়েছে। এসব বর্ণনায় কেবল সাহাবীদের সাময়িক বিবাহের অনুমতি দেওয়ার কথা নয়, বরং মুহাম্মদের ব্যক্তিগতভাবে একজন নারীর সঙ্গে নির্দিষ্ট মেয়াদের বিবাহে আবদ্ধ হওয়ার কথাও এসেছে। শিয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ হাদিসসংকলক শায়খ সদুক তাঁর মান লা ইয়াহদুরুহুল ফাকিহ গ্রন্থে জাফর আল-সাদিকের একটি বক্তব্য সংরক্ষণ করেছেন, যেখানে তাঁকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা হয়, মুহাম্মদ নিজে মুতা করেছিলেন কি না। জাফর আল-সাদিক এর উত্তরে সম্মতি জানান এবং কোরআনের সূরা তাহরিমের ৩ থেকে ৫ নম্বর আয়াতের উল্লেখ করেন। অর্থাৎ এই বর্ণনায় মুহাম্মদের ব্যক্তিগত মুতা বিবাহকে তাঁর নিজের অনুসৃত একটি প্রথা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। [85]

অন্য একটি বর্ণনায় ঘটনাটির আরও বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। শায়খ মুফিদের মুতা-সংক্রান্ত রচনার সূত্রে মুহাক্কিক কারাকি তাঁর খুলাসাতুল ইজাজ ফিল মুতা গ্রন্থে মুহাম্মদ আল-বাকিরের একটি বক্তব্য সংরক্ষণ করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ একজন স্বাধীন নারীর সঙ্গে মুতা বিবাহ করেছিলেন। তাঁর একজন স্ত্রী বিষয়টি জানতে পেরে এই সম্পর্ককে অবৈধ যৌনসম্পর্ক হিসেবে অভিযুক্ত করেন। মুহাম্মদ তখন জানান, নারীটি তাঁর জন্য বৈধ, কারণ এটি নির্দিষ্ট মেয়াদের বিবাহ। তিনি স্ত্রীকে বিষয়টি গোপন রাখতে বলেন, কিন্তু স্ত্রী অন্য একজন স্ত্রীকে ঘটনাটি জানিয়ে দেন। এই বিবরণেও সূরা তাহরিমের ৩ নম্বর আয়াতের সঙ্গে ঘটনাটির সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। হুর আল-আমিলি তাঁর ওয়াসাইলুশ শিয়া গ্রন্থেও এই বক্তব্য সংকলন করেছেন। [86]

এই দুই বর্ণনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই মুহাম্মদের নিজের মুতা বিবাহের সঙ্গে সূরা তাহরিমের সেই ঘটনার সম্পর্ক দেখানো হয়েছে, যেখানে তিনি তাঁর একজন স্ত্রীর কাছে গোপন কথা বলেছিলেন এবং সেই স্ত্রী তা অন্যের কাছে প্রকাশ করেছিলেন। দ্বিতীয় বর্ণনায় সাময়িক বিবাহের পরিচয় আরও স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়—সেখানে সরাসরি نِكَاحٌ بِأَجَلٍ مُسَمًّى অর্থাৎ নির্দিষ্ট মেয়াদের বিবাহ বলা হয়েছে। ফলে এখানে হজের তামাত্তু এবং নারীদের সঙ্গে মুতা বিবাহের মধ্যে শব্দগত বিভ্রান্তির কোনো অবকাশ নেই। যে মুহাম্মদের নামে পরবর্তীকালে মুতা বিবাহ কিয়ামত পর্যন্ত নিষিদ্ধ করার বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে, সেই মুহাম্মদের নিজের মুতা বিবাহের ঘটনাও শিয়া ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে সংরক্ষিত রয়েছে। এর ফলে মুতা বিবাহের ইতিহাস কেবল মুহাম্মদের দেওয়া অনুমতি ও সাহাবীদের যৌনচুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; মুহাম্মদের নিজের ব্যক্তিগত জীবনও এই আলোচনার অন্তর্ভুক্ত হয়।


জাফর আল-সাদিকের সরাসরি বক্তব্য

মুহাম্মদ নিজে মুতা বিবাহ করেছিলেন কি না, সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর পাওয়া যায় শিয়া ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাদিসগ্রন্থ মান লা ইয়াহদুরুহুল ফাকিহ-এ। গ্রন্থটির সংকলক শায়খ সদুক (মৃত্যু ৩৮১ হিজরি) তাঁর তৃতীয় খণ্ডের باب المتعة বা মুতা বিবাহ অধ্যায়ে জাফর আল-সাদিকের একটি বক্তব্য সংরক্ষণ করেছেন। জাফর আল-সাদিক ছিলেন মুহাম্মদের বংশধর এবং শিয়া ইসলামের ষষ্ঠ ইমাম, একইসাথে ছিলেন ৮ম শতাব্দীর একজন অন্যতম মুসলিম পণ্ডিত ও মনীষী। সুন্নি মুসলমানদের মতে তিনি ইসলামি ধর্মতত্ত্ব, ফিকহশাস্ত্র, হাদিসশাস্ত্র, কালামশাস্ত্র ও তাসাউফের একজন গুরুত্বপূর্ণ আলেম এবং হানাফি ও মালিকি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা আবু হানিফা ও মালিক ইবনে আনাসের শিক্ষক ছিলেন। এই বর্ণনায় তিনি মুতা বিবাহকে মুহাম্মদের নিজের পালন করা একটি প্রথা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মুহাম্মদ নিজে মুতা করেছিলেন কি না। তাঁর উত্তর ছিল, نَعَمْ—অর্থাৎ, হ্যাঁ। এরপর তিনি কোরআনের সূরা তাহরিমের ৩ থেকে ৫ নম্বর আয়াত পাঠ করেন। [85]

মূল আরবি (সরাসরি প্রশ্নোত্তর):
قَالَ الصَّادِقُ (عليه السلام): إِنِّي لَأَكْرَهُ لِلرَّجُلِ أَنْ يَمُوتَ وَقَدْ بَقِيَتْ عَلَيْهِ خَلَّةٌ مِنْ خِلَالِ رَسُولِ اللَّهِ (صلى الله عليه وآله) لَمْ يَأْتِهَا، فَقُلْتُ: فَهَلْ تَمَتَّعَ رَسُولُ اللَّهِ (صلى الله عليه وآله)؟ قَالَ: نَعَمْ، وَقَرَأَ هَذِهِ الْآيَةَ: (وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَى بَعْضِ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا) إِلَى قَوْلِهِ: (ثَيِّبَاتٍ وَأَبْكَارًا).

বাংলা অনুবাদ — সম্পূর্ণ বর্ণনা:
জাফর আল-সাদিক বলেন, “আমি অপছন্দ করি যে কোনো ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, যখন মুহাম্মদের পালন করা কোনো একটি কাজ তার নিজের জীবনে এখনও অপালিত রয়ে গেছে।”
তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, “মুহাম্মদ কি নিজে মুতা করেছিলেন?”
তিনি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ।”

এরপর তিনি কোরআনের এই আয়াত পাঠ করলেন: “যখন নবী তাঁর কোনো স্ত্রীর কাছে গোপনে একটি কথা বলেছিলেন”—এখান থেকে আয়াতের “পূর্বে বিবাহিত ও কুমারী” অংশ পর্যন্ত। অর্থাৎ তিনি সূরা তাহরিমের ৩ থেকে ৫ নম্বর আয়াত উল্লেখ করেন।

এই বক্তব্যের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। জাফর আল-সাদিক শুধু মুতা বিবাহ বৈধ হওয়ার কথা বলেননি। তিনি বলেছেন, মুহাম্মদের অনুসৃত কাজগুলোর কোনো একটি সম্পাদন না করে মৃত্যুবরণ করা তাঁর কাছে অপছন্দনীয়। এরপর সেই কাজটি মুতা বিবাহ কি না জানতে চাইলে তিনি মুহাম্মদের নিজের মুতা করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অর্থাৎ এই বর্ণনায় মুতা বিবাহকে মুহাম্মদের ব্যক্তিগত আচরণের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখানে সাহাবীদের অনুমতি দেওয়া এবং মুহাম্মদের নিজের মুতা করা দুটি পৃথক ঘটনা; দ্বিতীয়টির কথাই সরাসরি বলা হয়েছে।

এই বর্ণনাটির পূর্ববর্তী অংশও গুরুত্বপূর্ণ। একই গ্রন্থের ৪৬১৩ নম্বর বর্ণনায় বলা হয়েছে, মুতা না করা পর্যন্ত একজন মুমিনের পূর্ণতা আসে না। এর পরবর্তী ৪৬১৪ নম্বর বর্ণনায় জাবির ইবন আবদুল্লাহর সূত্রে মুহাম্মদের একটি বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে যৌনসম্পর্কের তিনটি বৈধ ব্যবস্থার কথা এসেছে। প্রথমটি উত্তরাধিকার-সম্পর্কযুক্ত স্থায়ী বিবাহ, দ্বিতীয়টি উত্তরাধিকার-সম্পর্কহীন মুতা বিবাহ এবং তৃতীয়টি মালিকানাধীন দাসীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক। এর ঠিক পরের ৪৬১৫ নম্বর বর্ণনাতেই জাফর আল-সাদিকের কাছে মুহাম্মদের নিজের মুতা বিবাহ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছে। ফলে সম্পূর্ণ অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয় নারীদের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক ও সাময়িক বিবাহ। এখানে হজের তামাত্তুর কোনো প্রসঙ্গ নেই। [87]

পরবর্তী শিয়া হাদিসসংকলক হুর আল-আমিলি (মৃত্যু ১১০৪ হিজরি) তাঁর ওয়াসাইলুশ শিয়া গ্রন্থের ২১তম খণ্ডে এই বক্তব্য পুনরায় সংকলন করেছেন। সেখানে অধ্যায়ের শিরোনাম باب استحباب المتعة وما ينبغي قصده بها—অর্থাৎ মুতা বিবাহ করা কাম্য হওয়া এবং তা করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোচনা। এই অধ্যায়ের ২৬৩৮৮ নম্বর বর্ণনায় বকর ইবন মুহাম্মদের সূত্রে জাফর আল-সাদিকের বক্তব্য এসেছে যে, কোনো মুসলিম ব্যক্তি মুহাম্মদের একটি অনুসৃত কাজ সম্পাদন না করে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে—এটি তিনি অপছন্দ করেন। ঠিক পরের ২৬৩৮৯ নম্বর বর্ণনায় শায়খ সদুকের সংরক্ষিত সেই সরাসরি প্রশ্নোত্তরটি উদ্ধৃত হয়েছে, যেখানে মুহাম্মদের নিজের মুতা বিবাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে জাফর আল-সাদিক সম্মতিসূচক উত্তর দেন। [88] [89]

এখানে মান লা ইয়াহদুরুহুল ফাকিহ এবং ওয়াসাইলুশ শিয়া গ্রন্থের সম্পর্কও স্পষ্ট। হুর আল-আমিলি শায়খ সদুকের পূর্ববর্তী বর্ণনাটি নিজের সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ফলে দুটি গ্রন্থে একই বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে, যদিও দ্বিতীয়টি প্রথমটির বক্তব্য পুনরায় সংরক্ষণ করেছে। এই বক্তব্য পরবর্তীকালে মুহাম্মদ তাকী মাজলিসির ব্যাখ্যাগ্রন্থ রাওদাতুল মুত্তাকীন এবং মুহসিন ফায়য কাশানির আল-ওয়াফি-তেও আলোচিত হয়েছে। আল-ওয়াফি, খণ্ড ২১, পৃষ্ঠা ২০৪-এ বর্ণনা ২১৩৪৩-এর আলোচনায় মুহাম্মদের নিজের মুতা করা এবং সূরা তাহরিমের আয়াত উল্লেখ করার বিবরণ সংরক্ষিত হয়েছে। [90]

মুসনাদে আহমদের ৩৪২ ও ৩৫১ নম্বর হাদিসের বাংলা অনুবাদে মুতা বিবাহ এবং হজের তামাত্তুর মধ্যে যে অর্থগত বিভ্রান্তি রয়েছে, সেটি জাফর আল-সাদিকের এই বক্তব্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। মুসনাদে আহমদের সংশ্লিষ্ট বর্ণনাগুলোতে হজের আনুষ্ঠানিকতা, ইহরামমুক্ত হওয়া এবং হজের আগে স্ত্রীসঙ্গের প্রসঙ্গ রয়েছে। কিন্তু জাফর আল-সাদিকের বর্ণনাটি সরাসরি মুতা বিবাহের অধ্যায়ে সংরক্ষিত; এর পূর্ববর্তী বর্ণনায় স্থায়ী বিবাহ, সাময়িক বিবাহ এবং দাসীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক পৃথকভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের পরবর্তী অংশেও হজের কোনো বিধান নয়, বরং মুহাম্মদের স্ত্রীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূরা তাহরিমের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। কাজেই মুসনাদে আহমদের বাংলা অনুবাদ ভুল হওয়ার বিষয়টি দিয়ে মুহাম্মদের নিজের মুতা বিবাহ সম্পর্কে এই পৃথক শিয়া বর্ণনাটিকে বাতিল করা যায় না।

জাফর আল-সাদিকের বক্তব্যে সূরা তাহরিমের ৩ থেকে ৫ নম্বর আয়াত উল্লেখ করার বিষয়টিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সূরা তাহরিমের ওই অংশে মুহাম্মদের একজন স্ত্রীর কাছে গোপন কথা বলা, সেই কথা অন্যের কাছে প্রকাশ পাওয়া এবং তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে সংঘাতের বিবরণ রয়েছে। জাফর আল-সাদিক এই ঘটনার সঙ্গে মুহাম্মদের মুতা বিবাহের সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। পরবর্তী শিয়া বর্ণনায় ঘটনাটির আরও বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়, যেখানে মুহাম্মদের একজন স্বাধীন নারীর সঙ্গে নির্দিষ্ট মেয়াদের বিবাহ এবং তাঁর এক স্ত্রীর কাছে বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার কথা এসেছে। ফলে জাফর আল-সাদিকের বক্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন শব্দপ্রয়োগ নয়; শিয়া হাদিস ও তাফসিরের একটি নির্দিষ্ট ঘটনাবিবরণের অংশ।

অতএব শিয়া ইসলামের প্রাথমিক হাদিসসংকলনেই মুহাম্মদের ব্যক্তিগত মুতা বিবাহের সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। শায়খ সদুক জাফর আল-সাদিকের সরাসরি সম্মতিসূচক উত্তর সংরক্ষণ করেছেন; হুর আল-আমিলি সেটি পুনরায় সংকলন করেছেন এবং পরবর্তী শিয়া হাদিসব্যাখ্যায়ও এই বক্তব্য আলোচিত হয়েছে। মুহাম্মদের নিজের মুতা বিবাহের ঘটনা শিয়া ইসলামি সাহিত্যে সংরক্ষিত একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক দাবি। সাময়িক বিবাহের অনুমতি শুধু তাঁর সাহাবীদের জন্য ছিল—এমন ধারণার সঙ্গে জাফর আল-সাদিকের এই বক্তব্য সরাসরি সাংঘর্ষিক।


নির্দিষ্ট মেয়াদের বিবাহ, গোপনীয়তা ও সূরা তাহরিমের ঘটনা

মুহাম্মদের নিজের মুতা বিবাহ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত একটি বিবরণ পাওয়া যায় শিয়া ইসলামের প্রখ্যাত আলেম মুহাম্মদ আল-বাকিরের সূত্রে। আবদুল্লাহ ইবন আতা আল-মাক্কি তাঁকে কোরআনের সূরা তাহরিমের ৩ নম্বর আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। এই আয়াতে মুহাম্মদের একজন স্ত্রীর কাছে গোপন কথা বলা এবং সেই স্ত্রী তা অন্যের কাছে প্রকাশ করার ঘটনা উল্লেখ রয়েছে। আল-বাকির এর ব্যাখ্যায় জানান, মুহাম্মদ একজন স্বাধীন নারীর সঙ্গে মুতা বিবাহ করেছিলেন। তাঁর একজন স্ত্রী এই সম্পর্কের কথা জানতে পেরে তাঁকে অবৈধ যৌনসম্পর্কের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। মুহাম্মদ তখন স্ত্রীকে জানান, ওই নারী তাঁর জন্য বৈধ, কারণ এটি নির্দিষ্ট মেয়াদের বিবাহ। এরপর তিনি স্ত্রীকে বিষয়টি গোপন রাখতে বলেন। কিন্তু স্ত্রী ঘটনাটি তাঁর অন্য একজন স্ত্রীর কাছে প্রকাশ করে দেন। এই বিবরণটি শায়খ মুফিদের রিসালাতুল মুতা থেকে মুহাক্কিক কারাকি তাঁর খুলাসাতুল ইজাজ ফিল মুতা গ্রন্থে সংরক্ষণ করেছেন। [91]

পরবর্তী শিয়া হাদিসসংকলক হুর আল-আমিলি তাঁর ওয়াসাইলুশ শিয়া গ্রন্থের ২১তম খণ্ডে একই বর্ণনা সংরক্ষণ করেছেন। সেখানে হাদিসটির নম্বর ২৬৩৭৭। বর্ণনাটি মুতা বিবাহের বৈধতাসংক্রান্ত অধ্যায়ে স্থান পেয়েছে। এতে ফজল আশ-শায়বানির সূত্রে আবদুল্লাহ ইবন আতা আল-মাক্কির প্রশ্ন এবং মুহাম্মদ আল-বাকিরের উত্তর উল্লেখ করা হয়েছে। বর্ণনার বক্তব্যে সাধারণ বিবাহ ও মুতা বিবাহের পার্থক্য স্পষ্ট, কারণ মুহাম্মদের নিজের মুখে সম্পর্কটিকে নির্দিষ্ট মেয়াদের বিবাহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। [92]

মূল আরবি:
وَرَوَى الْفَضْلُ الشَّيْبَانِيُّ بِإِسْنَادِهِ إِلَى الْبَاقِرِ (عليه السلام) أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَطَاءٍ الْمَكِّيَّ سَأَلَهُ عَنْ قَوْلِهِ تَعَالَى: (وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ) الْآيَةَ؟ فَقَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ (صلى الله عليه وآله) تَزَوَّجَ بِالْحُرَّةِ مُتْعَةً، فَاطَّلَعَ عَلَيْهِ بَعْضُ نِسَائِهِ فَاتَّهَمَتْهُ بِالْفَاحِشَةِ، فَقَالَ: إِنَّهُ لِي حَلَالٌ، إِنَّهُ نِكَاحٌ بِأَجَلٍ، فَاكْتُمِيهِ، فَأَطْلَعَتْ عَلَيْهِ بَعْضَ نِسَائِهِ.

বাংলা অনুবাদ:
ফজল আশ-শায়বানি তাঁর বর্ণনাসূত্রে মুহাম্মদ আল-বাকির থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আবদুল্লাহ ইবন আতা আল-মাক্কি তাঁকে কোরআনের সেই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, যেখানে বলা হয়েছে, “যখন নবী তাঁর একজন স্ত্রীর কাছে একটি গোপন কথা বলেছিলেন।”
মুহাম্মদ আল-বাকির উত্তরে বলেন, “মুহাম্মদ একজন স্বাধীন নারীর সঙ্গে মুতা বিবাহ করেছিলেন। তাঁর একজন স্ত্রী বিষয়টি জানতে পেরে তাঁকে ব্যভিচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। তখন মুহাম্মদ তাঁকে বলেন, ‘এই নারী আমার জন্য বৈধ। এটি নির্দিষ্ট মেয়াদের বিবাহ। তুমি বিষয়টি গোপন রেখো।’ কিন্তু সেই স্ত্রী ঘটনাটি তাঁর অন্য একজন স্ত্রীর কাছে প্রকাশ করে দেন।”

এই বর্ণনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। প্রথমত, মুহাম্মদ যে নারীর সঙ্গে মুতা করেছিলেন, তাঁকে الْحُرَّة অর্থাৎ স্বাধীন নারী বলা হয়েছে। তিনি কোনো মালিকানাধীন দাসী ছিলেন না। দ্বিতীয়ত, মুহাম্মদের স্ত্রী সম্পর্কটির প্রকৃতি নিয়ে আপত্তি জানান এবং সরাসরি অবৈধ যৌনসম্পর্কের অভিযোগ করেন। তৃতীয়ত, মুহাম্মদ সেই অভিযোগের উত্তরে সম্পর্কটির বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে একে نِكَاحٌ بِأَجَلٍ বা নির্দিষ্ট মেয়াদের বিবাহ হিসেবে চিহ্নিত করেন। চতুর্থত, তিনি বিষয়টি গোপন রাখার নির্দেশ দেন। অর্থাৎ বর্ণনাটিতে একজন স্বাধীন নারীর সঙ্গে সাময়িক বিবাহ, স্ত্রীর আপত্তি, সম্পর্কের ধর্মীয় বৈধতার দাবি এবং সেই সম্পর্কের গোপনীয়তা—সবকিছুই উপস্থিত রয়েছে।

এই ঘটনাটিকে সূরা তাহরিমের সঙ্গে যুক্ত করার কারণও আল-বাকিরের বক্তব্যে সরাসরি পাওয়া যায়। কোরআনের সূরা তাহরিমের প্রথম আয়াতে আল্লাহ মুহাম্মদকে প্রশ্ন করেছেন, তিনি কেন স্ত্রীদের সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহর বৈধ করা কোনো বিষয় নিজের জন্য নিষিদ্ধ করছেন। তৃতীয় আয়াতে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ একজন স্ত্রীর কাছে একটি গোপন কথা বলেছিলেন। সেই স্ত্রী কথাটি অন্যের কাছে প্রকাশ করলে আল্লাহ মুহাম্মদকে বিষয়টি জানিয়ে দেন। এরপর মুহাম্মদ স্ত্রীকে ঘটনাটির কিছু অংশ সম্পর্কে অবহিত করেন এবং কিছু অংশ এড়িয়ে যান। তাঁর স্ত্রী জানতে চান, কে তাঁকে গোপন কথা প্রকাশের বিষয়টি জানিয়েছে। মুহাম্মদ উত্তর দেন, সর্বজ্ঞ আল্লাহ তাঁকে জানিয়েছেন। [93]

মূল আরবি, সূরা তাহরিম ৬৬:৩-এর প্রাসঙ্গিক অংশ:
وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَىٰ بَعْضِ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا فَلَمَّا نَبَّأَتْ بِهِ وَأَظْهَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ

বাংলা অনুবাদ:
“আর স্মরণ করো, যখন নবী তাঁর একজন স্ত্রীর কাছে গোপনে একটি কথা বলেছিলেন। পরে সেই স্ত্রী কথাটি অন্যের কাছে প্রকাশ করে দেন এবং আল্লাহ বিষয়টি নবীকে জানিয়ে দেন। তখন নবী তার কিছু অংশ প্রকাশ করেন এবং কিছু অংশ এড়িয়ে যান। এরপর নবী যখন তাঁকে বিষয়টি জানালেন, তখন সেই স্ত্রী বললেন, ‘আপনাকে কে এ কথা জানিয়েছে?’ নবী বললেন, ‘আমাকে সর্বজ্ঞ, সবকিছু সম্পর্কে অবহিত সত্তা জানিয়েছেন।’”

সূরা তাহরিমের পরবর্তী আয়াতগুলোতেও মুহাম্মদের স্ত্রীদের সঙ্গে এই বিরোধের ধারাবাহিকতা রয়েছে। চতুর্থ আয়াতে দুই স্ত্রীকে তওবা করার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং মুহাম্মদের বিরুদ্ধে পরস্পরকে সহযোগিতা করলে আল্লাহ, জিবরাইল ও সৎ মুমিনদের তাঁর সহায়তাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পঞ্চম আয়াতে স্ত্রীদের তালাক দেওয়া হলে তাঁদের পরিবর্তে আরও উত্তম স্ত্রী দেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে পূর্বে বিবাহিত নারী ও কুমারী উভয় শ্রেণির নারী থাকার কথাও উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ আয়াতগুলোর মূল ঘটনাপ্রবাহ মুহাম্মদের দাম্পত্যজীবন, স্ত্রীদের অসন্তোষ, গোপন তথ্য প্রকাশ এবং সেই বিরোধে আল্লাহর হস্তক্ষেপকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। মুহাম্মদ আল-বাকির এই ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে মুহাম্মদের একজন স্বাধীন নারীর সঙ্গে মুতা বিবাহ করার ঘটনাকে যুক্ত করেছেন। [94]

আল-বাকিরের বর্ণনায় স্ত্রীর অভিযোগের উত্তরে মুহাম্মদের ব্যবহৃত ভাষাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেননি যে নারীটি তাঁর স্থায়ী স্ত্রী ছিলেন। বরং স্পষ্টভাবে সম্পর্কটিকে নির্দিষ্ট মেয়াদের বিবাহ বলেছেন। মুতা বিবাহের মৌলিক বৈশিষ্ট্যও এটাই—আগে থেকে নির্ধারিত মেয়াদের জন্য যৌনসম্পর্কের চুক্তি। মুহাক্কিক কারাকি তাঁর গ্রন্থে মুতা বিবাহের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লিখেছেন, نِكَاحُ الْمُتْعَةِ هُوَ نِكَاحٌ إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى بِعِوَضٍ مَعْلُومٍ—অর্থাৎ মুতা হলো নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্ধারিত বিনিময়ের ভিত্তিতে সম্পাদিত বিবাহ। মুহাম্মদের নিজের মুতা বিবাহ সম্পর্কে সংরক্ষিত বর্ণনার সঙ্গে এই সংজ্ঞার সরাসরি মিল রয়েছে। [95]

এই ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দিক হলো গোপনীয়তা। বর্ণনাটিতে মুহাম্মদের স্ত্রী সাময়িক বিবাহের বিষয়টি জানতে পেরে ক্ষুব্ধ হন এবং সম্পর্কটিকে ব্যভিচার বলে অভিযুক্ত করেন। মুহাম্মদ নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার পরও তাঁকে ঘটনাটি গোপন রাখতে বলেন। কিন্তু বিষয়টি অন্য স্ত্রীর কাছে প্রকাশিত হয়। ফলে এখানে শুধু সাময়িক বিবাহের একটি ঘটনা নয়, মুহাম্মদের নিজের পরিবারের ভেতরেও সেই সম্পর্ক নিয়ে বিরোধের বিবরণ রয়েছে। ধর্মীয়ভাবে বৈধ বলে ঘোষণা করা একটি যৌনসম্পর্ক তাঁর স্ত্রীর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। সেই অসন্তোষের উত্তরে মুহাম্মদ সম্পর্কটির নির্দিষ্ট মেয়াদের বৈধ বিবাহ হওয়ার কথা বলেছেন এবং গোপনীয়তার নির্দেশ দিয়েছেন।

মুহাম্মদের এই মুতা বিবাহের বিবরণ পরবর্তী শিয়া আলেম সাইয়েদ জাফর মুরতাদা আল-আমিলির জাওয়াজুল মুতা গ্রন্থেও সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানে মুতা বিবাহের ঐতিহাসিক প্রচলনসংক্রান্ত আলোচনায় শায়খ মুফিদের সূত্রে মুহাম্মদ আল-বাকিরের বর্ণনাটি উদ্ধৃত করা হয়েছে। এর পরপরই শায়খ সদুকের সংরক্ষিত জাফর আল-সাদিকের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে মুহাম্মদ নিজে মুতা করেছিলেন কি না জানতে চাইলে তিনি সরাসরি হ্যাঁ বলেন এবং সূরা তাহরিমের আয়াত পাঠ করেন। ফলে দুটি বর্ণনা একই ঘটনাগত ব্যাখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত: জাফর আল-সাদিক মুহাম্মদের ব্যক্তিগত মুতা করার কথা নিশ্চিত করেছেন, আর মুহাম্মদ আল-বাকিরের বর্ণনায় স্বাধীন নারীর সঙ্গে সেই নির্দিষ্ট মেয়াদের বিবাহ ও স্ত্রীর কাছে বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার বিবরণ রয়েছে। [96]

মুহাম্মদের নিজের মুতা বিবাহের বিষয়ে শিয়া ইসলামি গ্রন্থগুলোতে সংরক্ষিত এই বিবরণগুলো ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। মুহাম্মদ কেবল সাহাবীদের নির্দিষ্ট মেয়াদের যৌনচুক্তির অনুমতি দিয়েছিলেন—এমন নয়; তাঁর নিজের ব্যক্তিগত জীবনেও সেই প্রথার চর্চার বর্ণনা রয়েছে। মুহাম্মদ আল-বাকিরের বিবরণে একজন স্বাধীন নারীর সঙ্গে মুতা বিবাহ, স্ত্রীর ব্যভিচারের অভিযোগ এবং মুহাম্মদের নিজের মুখে সম্পর্কটিকে নির্দিষ্ট মেয়াদের বৈধ বিবাহ বলার কথা এসেছে। জাফর আল-সাদিকও মুহাম্মদের ব্যক্তিগত মুতা করার কথা সরাসরি স্বীকার করেছেন। উভয় বর্ণনাতেই সূরা তাহরিমের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। ফলে মুহাম্মদের নিজের মুতা বিবাহের বিষয়টি ইসলামি সাহিত্যে সংরক্ষিত একটি সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বিবরণ, যার মূল বক্তব্য হলো—মুতা বিবাহ কেবল সাহাবীদের পালন করা প্রথা ছিল না; মুহাম্মদের নিজের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কেও এমন বর্ণনা সংরক্ষিত হয়েছে।


“মুতা” না “তামাত্তু”: একই শব্দ, দুই ভিন্ন বিষয়

হাদিস পড়ার সময় একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ, আরবি متعة শব্দটি সব জায়গায় নারী-মুতা বা সাময়িক বিবাহ বোঝায় না। হজের একটি পদ্ধতিকেও “মুতআতুল হাজ্জ” বা তামাত্তু বলা হয়। ফলে কোনো হাদিসে শুধু “মুতা” শব্দ পাওয়া গেলেই সেটিকে মুতা বিবাহ ধরে নেয়া যেমন সঠিক নয়, তেমনি নারী, সময়সীমা, বিনিময় ও যৌনসম্পর্কের স্পষ্ট প্রসঙ্গ থাকা সত্ত্বেও সেটিকে হজের তামাত্তু বানিয়ে ফেলাও ভুল। প্রতিটি বর্ণনা তার পূর্ণ প্রসঙ্গ দিয়েই পড়তে হবে। এই বিষয়ে আরও গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে, আপাতত দুইটি হাদিস দেখে নাইয়া দরকার।

মুসনাদে আহমাদের উমর ও আবু মূসা-সংক্রান্ত যে বর্ণনাগুলোতে “মুতা”কে নবীর সুন্নত বলা হয়েছে, সেখানে হজ, ইহরামমুক্ত হওয়া, স্ত্রীসঙ্গ এবং পরে মাথা থেকে গোসলের পানি ঝরতে ঝরতে হজে যাওয়ার প্রসঙ্গ রয়েছে। ফলে এই নির্দিষ্ট বর্ণনাগুলো হজের তামাত্তু নিয়ে; নাকি মুহাম্মদ ব্যক্তিগতভাবে কোনো নারীকে মুতা বিবাহ করেছিলেন, সেটি শতভাগ নিশ্চয়তার সাথে বলা যায় না। কিছু অনুবাদে দেখা যাচ্ছে, অনুবাদকগণ একে নবী নিজেই মুতা বিবাহ করেছিলেন বলে উল্লেখ করছেন [97] [98] –

মুসনাদে আহমাদ
মুসনাদে উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) (উমারের বর্ণিত হাদীস)
পরিচ্ছেদঃ
৩৫১। আবু মূসার ছেলে ইবরাহীম বর্ণনা করেন, আবু মূসা (রাঃ) মুত’আ (অস্থায়ী) বিয়ের পক্ষে ফতোয়া দিতেন। এক ব্যক্তি আবু মূসাকে বললেন, আপনার কিছু কিছু ফতোয়া নিয়ে একটু ধীরে চলুন। কারণ আপনার পরে আমীরুল মু’মিনীন হজ্জের ব্যাপারে কী নতুন ধারা প্রবর্তন করেছেন তা আপনি জানেন না। অবশেষে আবু মূসা উমার (রাঃ) এর সাথে দেখা করে জিজ্ঞাসা করলেন। উমার (রাঃ) তাকে বললেনঃ আমি অবহিত হয়েছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীগণ এটা করেছেন। তবে আমার কাছে এটা অপছন্দনীয় যে, লোকেরা তাদের (মুত’আ বিয়ের) স্ত্রীদের সাথে বাসর করতে থাকবে, আর হজ্জে যাবে এমন অবস্থায় যে, তখনো তাদের মাথার চুল গড়িয়ে ফোটা ফোটা পানি টপকাচ্ছে।
(মুসলিম-১২২২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

মুসনাদে আহমাদ
মুসনাদে উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) (উমারের বর্ণিত হাদীস)
পরিচ্ছেদঃ
৩৪২। আবু মূসা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, উমার (রাঃ) বলেছেনঃ ওটা অর্থাৎ মুত’আ (অস্থায়ী বিয়ে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত। তবে আমার আশঙ্কা হয় যে, লোকেরা এই সব স্ত্রীকে নিয়ে বাবলা গাছের নিছে বাসর করবে, তারপর তাদেরকে নিয়ে হজ্জে যাবে।
(হাদীস নং ৩৫১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

আসুন সরাসরি মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থ থেকেও সরাসরি হাদিস দুইটি দেখে নিই। ইদানীং অনালিন ভার্শনে এই অনুবাদগুলো পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে, পরিবর্তন করে দাবি করা হচ্ছে সংশয় ডট কমের আর্টিকেলে নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যাচার করা হয়েছে। সেটি সংশয় ডট কমের মিথ্যাচার কিনা, তা আর্কাইভ ডট অর্গের সেই লিঙ্কে গেলেই দেখা যাবে, একই সাথে মূল বই থেকে দেখে নেয়াও জরুরি [99]

মুতা
মুতা বিবাহ
মুতা 7

কিন্তু এখানেই উল্টো একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা তৈরি হয়। একই “মুতা” শব্দ হজ ও নারী—দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হওয়ায় অনুবাদক যদি প্রসঙ্গকে ঠিকভাবে আলাদা করতে না পারেন, এখানে কোনো সমস্যা রয়েছে তা পরিষ্কার বোঝা যায়।


তামাত্তু হজের আড়ালে মুতা বিবাহ?

একই “মুতা” শব্দ হজের তামাত্তু এবং নারীদের সাময়িক বিবাহ, দুই অর্থে ব্যবহৃত হওয়ায় কিছু জটিলতা তৈরি হয়, একইসাথে কিছু লুকোছাপার ব্যাপারও চলে আসে। কোনো কোনো জায়গায় “মুতা”কে তামাত্তু হজ হিসেবে অনুবাদ করা একেবারেই সঠিক, কারণ প্রসঙ্গটিই হজ। কিন্তু সমস্যা হয় যখন একই বর্ণনার পরের অংশে সরাসরি নারীদের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের মুতা বিবাহের কথা থাকা সত্ত্বেও পাঠকের সামনে প্রথম “তামাত্তু” অর্থটিই এত জোর দিয়ে হাজির করা হয় যে দুই ভিন্ন মুতার পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে যায়।

সহিহ মুসলিমের নিচের বর্ণনাটি এর একটি অসাধারণ উদাহরণ। শুরুতে ইবনে আব্বাস ও ইবনে যুবায়েরের মতবিরোধের বিষয় হলো তামাত্তু হজ; জাবিরও বলেন, তাঁরা মুহাম্মদের সঙ্গে তামাত্তু হজ করেছেন। কিন্তু উমরের বক্তব্য এগোতেই বিষয়টি বদলে যায়। তিনি আলাদাভাবে বলেন, যে পুরুষকে নির্দিষ্ট সময়ের শর্তে কোনো নারীকে মুতা বিবাহ করতে পাওয়া যাবে, তাকে তিনি রজম করবেন। অর্থাৎ একই বর্ণনার মধ্যে প্রথম “মুতা” হজের, দ্বিতীয় “মুতা” নারীর। এই পার্থক্যটি বাদ দিলে বা দুইটিকেই একই অর্থে অনুবাদ করলে হাদিসের বক্তব্যই বিকৃত হয়ে যায়। [100] [101]

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৬। হজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ১৮. হজ্জ উমরাতে উপভোগ করা প্রসঙ্গে
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ২৮৩৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১২১৭
২৮৩৭-(১৪৫/১২১৭) মুহাম্মাদ ইবনুল মুসান্না ও ইবনু বাশশার (রহঃ) ….. আবূ নাযরাহ্ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) তামাত্তু হাজ্জ করার নির্দেশ দিতেন এবং ইবনু যুবায়র (রাযিঃ) তামাত্তু হাজ্জ (হজ্জ/হজ) করতে নিষেধ করতেন। আমি বিষয়টি জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) এর সামনে পেশ করলাম। তিনি বললেন, এ ঘটনাটি আমার সামনেই ঘটেছে। আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে তামাত্তু হাজ্জ (হজ্জ/হজ) করেছি। উমার (রাযিঃ) খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পর বললেন, আল্লাহ তা’আলা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য যে জিনিস ইচ্ছা এবং যে কারণে ইচ্ছা হালাল করেন এবং কুরআন নাযিল হওয়া সমাপ্ত হয়েছে। অতএব তোমরা আল্লাহ তা’আলার উদ্দেশে হাজ্জ ও উমরাহ সম্পাদন কর- যেভাবে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন এবং যেসব নারীকে তোমরা মুত্’আর (উপভোগ করার) মাধ্যমে বিবাহ করেছে- তাদের সঠিক বিবাহ বন্ধনে নিয়ে নাও। আমার নিকট মুত’আর শর্তে বিবাহকারী কোন পুরুষ লোক এলে আমি অবশ্যই তাকে রজম (প্রস্তরাঘাতে হত্যা) করব। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২৮১৪, ইসলামীক সেন্টার ২৮১২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

মুতা 9

আসমা বিনত আবু বকরের মুতা-সংক্রান্ত বক্তব্য

ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকরের কন্যা, আয়িশার বড় বোন এবং আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের মা আসমা বিনত আবু বকরের নামে মুতা বিবাহের চর্চা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য সংরক্ষিত রয়েছে। প্রখ্যাত সুন্নি হাদিসসংকলক আবু দাউদ আত-তায়ালিসি তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে আসমার কাছে সরাসরি নারীদের মুতা বিবাহ সম্পর্কে প্রশ্ন করার ঘটনা বর্ণনা করেছেন। আসমা উত্তরে বলেছেন, فَعَلْنَاهَا عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ—অর্থাৎ, “আমরা মুহাম্মদের যুগে এটি করেছি।” একই বক্তব্য নাসাঈর আস-সুনানুল কুবরা এবং আবু নুআইম আল-ইসফাহানির আল-মুসনাদুল মুস্তাখরাজ আলা সহিহ মুসলিম গ্রন্থেও সংরক্ষিত হয়েছে। এসব বর্ণনায় আসমার বক্তব্য কোনো পরবর্তী আলেমের অনুমান হিসেবে নয়, বরং তাঁর নিজের মুখের সরাসরি উত্তর হিসেবে এসেছে।

আসমার এই বক্তব্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের এবং ইবনে আব্বাসের বিতর্কের কারণে। আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের মুতা বিবাহের বৈধতার পক্ষে ইবনে আব্বাসের অবস্থানের প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছিলেন। ইবনে আব্বাস পাল্টা তাঁকে নিজের মা আসমার কাছে বিষয়টি জানতে বলেন। আসমাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি ইবনে আব্বাসের বক্তব্য সত্য বলে নিশ্চিত করেন। এরপর ইবনে আব্বাস বলেন, তিনি চাইলে কুরাইশের এমন বহু পুরুষের নাম বলতে পারেন, যাঁরা মুতা বিবাহের মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করেছেন। এই ঘটনাটি সুন্নি আইনজ্ঞ আবু জাফর আত-তাহাবির শরহু মাআনিল আছার গ্রন্থের নিকাহুল মুতা অধ্যায়ে সংরক্ষিত হয়েছে।


আসমার সাক্ষ্য, ইবনে আব্বাস ও ইবনে যুবায়েরের বিতর্ক এবং মুতা-বিবাহজাত সন্তান

আসমা বিনত আবু বকরের বক্তব্যের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ উৎস মুসনাদ আবি দাউদ আত-তায়ালিসি। গ্রন্থটির তৃতীয় খণ্ডের ২০৮ পৃষ্ঠায়, ১৭৪২ নম্বর বর্ণনায় মুসলিম আল-কুর্রির সূত্রে আসমাকে নারীদের মুতা সম্পর্কে প্রশ্ন করার ঘটনা এসেছে। এখানে প্রশ্নের ভাষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বর্ণনাকারী কেবল متعة বা মুতা বলেননি, সরাসরি مُتْعَةِ النِّسَاءِ—অর্থাৎ নারীদের মুতা বিবাহ বলেছেন। আসমার উত্তরেও প্রথম পুরুষে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। এটি কেবল মুহাম্মদ মুতা বিবাহের অনুমতি দিয়েছিলেন—এমন বক্তব্য নয়; বরং তাঁর যুগে বাস্তবে মুতা করা হয়েছিল বলে আসমার নিজের সাক্ষ্য। [102]

মূল আরবি:
١٧٤٢ – حَدَّثَنَا يُونُسُ، قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو دَاوُدَ، قَالَ: حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ مُسْلِمٍ الْقُرِّيِّ، قَالَ: دَخَلْنَا عَلَى أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ، فَسَأَلْنَاهَا عَنْ مُتْعَةِ النِّسَاءِ، فَقَالَتْ: «فَعَلْنَاهَا عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ».

বাংলা অনুবাদ:
১৭৪২। ইউনুস আবু দাউদের সূত্রে, তিনি শুবার সূত্রে এবং শুবা মুসলিম আল-কুর্রির সূত্রে বর্ণনা করেন। মুসলিম আল-কুর্রি বলেন, “আমরা আসমা বিনত আবু বকরের কাছে গেলাম এবং তাঁকে নারীদের মুতা বিবাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ‘আমরা মুহাম্মদের যুগে এটি করেছি।’”

একই বক্তব্য নাসাঈ তাঁর আস-সুনানুল কুবরা গ্রন্থের বিবাহ অধ্যায়ে সংরক্ষণ করেছেন। বিভিন্ন সংস্করণের নম্বর অনুযায়ী এটি ৫৫১৫ অথবা ৫৭২৫ নম্বর বর্ণনা। নাসাঈর মুতা-সংক্রান্ত অধ্যায়ে আসমার বক্তব্যের ঠিক আগেই জাবির ইবন আবদুল্লাহ এবং সালামাহ ইবনুল আকওয়ার বর্ণনা রয়েছে। জাবির জানান, মুহাম্মদের যুগে, আবু বকরের সময়ে এবং উমরের খেলাফতের প্রথম পর্যায়ে তাঁরা নারীদের মুতা করতেন। এরপর মুহাম্মদের ঘোষকের মাধ্যমে সাহাবীদের মুতা বিবাহের অনুমতি জানানোর বিবরণ রয়েছে। এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই নাসাঈ আসমাকে নারীদের মুতা সম্পর্কে প্রশ্ন করার ঘটনা সংকলন করেছেন। অর্থাৎ একই অধ্যায়ে প্রথমে সাহাবীদের বাস্তব মুতা-চর্চা, তারপর মুহাম্মদের অনুমতি এবং এরপর আসমার বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে। [103] [104]

মূল আরবি:
٥٥١٣ – أَخْبَرَنَا عَمْرُو بْنُ عَلِيٍّ، قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو عَاصِمٍ يَعْنِي النَّبِيلَ، قَالَ: حَدَّثَنَا زَكَرِيَّا بْنُ إِسْحَاقَ، قَالَ: أَخْبَرَنَا عَمْرُو بْنُ دِينَارٍ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ، قَالَ: «كُنَّا نَعْمَلُ بِهَا – يَعْنِي مُتْعَةَ النِّسَاءِ – عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَفِي زَمَانِ أَبِي بَكْرٍ، وَصَدْرًا مِنْ خِلَافَةِ عُمَرَ حَتَّى نَهَانَا عَنْهَا».
٥٥١٤ – أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا مُحَمَّدٌ يَعْنِي غُنْدَرًا، قَالَ: حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ عَمْرِو بْنِ دِينَارٍ، قَالَ: سَمِعْتُ الْحَسَنَ بْنَ مُحَمَّدٍ، يُحَدِّثُ عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ، وَسَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ، قَالَا: خَرَجَ مُنَادِي رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: «إِنَّ اللهَ قَدْ أَذِنَ لَكُمْ فَاسْتَمْتِعُوا، يَعْنِي مُتْعَةَ النِّسَاءِ».
٥٥١٥ – أَخْبَرَنَا مَحْمُودُ بْنُ غَيْلَانَ الْمَرْوَزِيُّ، قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو دَاوُدَ، قَالَ: حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ مُسْلِمٍ الْقُرِّيِّ، قَالَ: دَخَلْنَا عَلَى أَسْمَاءَ ابْنَةِ أَبِي بَكْرٍ، فَسَأَلْنَاهَا عَنْ مُتْعَةِ النِّسَاءِ، فَقَالَتْ: «فَعَلْنَاهَا عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ».

বাংলা অনুবাদ:
হাদিস ৫৫১৩: আমর ইবন দীনারের সূত্রে জাবির ইবন আবদুল্লাহ বলেন, “আমরা মুহাম্মদের যুগে, আবু বকরের সময়ে এবং উমরের খেলাফতের প্রথম পর্যায় পর্যন্ত এই প্রথা পালন করতাম—অর্থাৎ নারীদের মুতা বিবাহ। শেষ পর্যন্ত উমর আমাদের তা থেকে নিষেধ করেন।”
হাদিস ৫৫১৪: হাসান ইবন মুহাম্মদ জাবির ইবন আবদুল্লাহ এবং সালামাহ ইবনুল আকওয়ার সূত্রে বর্ণনা করেন। তাঁরা বলেন, “মুহাম্মদের ঘোষক বেরিয়ে এসে ঘোষণা করলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের অনুমতি দিয়েছেন, সুতরাং তোমরা মুতা করো।’” এখানে নারীদের মুতা বিবাহের কথাই বলা হয়েছে।
হাদিস ৫৫১৫: মাহমুদ ইবন গাইলান আবু দাউদের সূত্রে, তিনি শুবার সূত্রে এবং শুবা মুসলিম আল-কুর্রির সূত্রে বর্ণনা করেন। মুসলিম আল-কুর্রি বলেন, “আমরা আসমা বিনত আবু বকরের কাছে গেলাম এবং তাঁকে নারীদের মুতা বিবাহ সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। তিনি বললেন, ‘আমরা মুহাম্মদের যুগে এটি করেছি।’”

নাসাঈর এই তিনটি ধারাবাহিক বর্ণনা ইসলামের প্রথম যুগের মুতা বিবাহ সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। জাবির সরাসরি নিজের অংশগ্রহণের কথা বলছেন; মুহাম্মদের ঘোষক সাময়িক বিবাহের অনুমতি জানাচ্ছেন; আসমাও প্রথম পুরুষে সেই প্রথা পালনের কথা নিশ্চিত করছেন। তিনটি বর্ণনাতেই নারীদের মুতা বিবাহের প্রসঙ্গ স্পষ্ট। এগুলো হজের তামাত্তু নিয়ে আলোচনা নয়। আসমার বক্তব্যে مُتْعَةِ النِّسَاءِ এবং জাবিরের বক্তব্যেও একই পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।

আসমার বক্তব্য তাবারানির আল-মুজামুল কাবীর গ্রন্থেও সংরক্ষিত হয়েছে। চব্বিশতম খণ্ডের ১০৩ পৃষ্ঠায় ২৭৭ নম্বর বর্ণনায় মুসলিম আল-কুর্রি আসমাকে মুতা সম্পর্কে প্রশ্ন করার কথা বলেছেন। আসমার উত্তর সেখানেও একই—মুহাম্মদের যুগে তাঁরা মুতা করতেন। এই সংকলনে প্রশ্নের স্থানে শুধু الْمُتْعَةِ শব্দটি রয়েছে; নাসাঈ ও তায়ালিসির পাঠে مُتْعَةِ النِّسَاءِ বলা হয়েছে। এই গ্রন্থগুলোতে একই বর্ণনাধারার বিভিন্ন পাঠ সংরক্ষিত হয়েছে। [105]

আবু নুআইম আল-ইসফাহানির আল-মুসনাদুল মুস্তাখরাজ আলা সহিহ মুসলিম গ্রন্থে আসমার বক্তব্যের বিভিন্ন পাঠের তুলনা আরও স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। তিনি পাশাপাশি দুটি বর্ণনা সংরক্ষণ করেছেন। প্রথমটিতে হজের তামাত্তুর প্রসঙ্গ রয়েছে; দ্বিতীয়টিতে নারীদের মুতা বিবাহের কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় বর্ণনার পর তিনি অন্য বর্ণনাকারীদের পাঠে কোথায় শুধু ‘মুতা’ বলা হয়েছে এবং কোথায় হজের মুতা নাকি নারীদের মুতা—এই প্রশ্নে শব্দগত পার্থক্য রয়েছে, তা উল্লেখ করেছেন। ফলে একই বর্ণনাধারার পাঠভেদ প্রাচীন হাদিসসংকলনেই স্পষ্টভাবে নথিবদ্ধ রয়েছে। [106]

মূল আরবি:
٢٨٧٢ – حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ خَلَّادٍ ثَنَا الْحَارِثُ بْنُ أَبِي أُسَامَةَ ثَنَا رَوْحُ بْنُ عُبَادَةَ ثَنَا شُعْبَةُ عَنْ مُسْلِمٍ الْقُرِّيِّ قَالَ سَأَلْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ عَنْ مُتْعَةِ الْحَجِّ فَرَخَّصَ فِيهَا وَكَانَ ابْنُ الزُّبَيْرِ يَنْهَى عَنْهُ فَقَالَ هَذِهِ أُمُّ ابْنِ الزُّبَيْرِ تُحَدِّثُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَخَّصَ فِيهَا فَادْخُلُوا عَلَيْهَا فَسْأَلُوهَا قَالَ فَدَخَلْنَا عَلَيْهَا فَإِذَا امْرَأَةٌ ضَخْمَةٌ عَمْيَاءُ قَالَتْ رَخَّصَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيهَا.
٢٨٧٣ – ثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ جَعْفَرٍ ثَنَا يُوسُفُ بْنُ حَبِيبٍ ثَنَا أَبُو دَاوُدَ ثَنَا شُعْبَةُ عَنْ مُسْلِمٍ الْقُرِّيِّ قَالَ دَخَلْنَا عَلَى أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ فَسَأَلْنَاهَا عَنْ مُتْعَةِ النِّسَاءِ فَقَالَتْ فَعَلْنَاهَا عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثَنَاهُ أَبُو مُحَمَّدِ بْنُ حَيَّانَ ثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يَحْيَى ثَنَا عَبْدَةَ ثَنَا أَبُو دَاوُدَ ثَنَا شُعْبَةُ وَقَالَ الْمُتْعَةَ وَلَمْ يَذْكُرِ النِّسَاءَ.
رَوَاهُ مُسْلِمٌ عَنْ أَبِي مُوسَى عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ عَنْ شُعْبَةَ فَقَالَ الْمُتْعَةَ وَلَمْ يَذْكُرِ الْحَجَّ وَعَنْ بُنْدَارٍ عَنْ غُنْدَرٍ فَقَالَ قَالَ مُسْلِمٌ لَا أَدْرِي مُتْعَةَ الْحَجِّ أَوْ مُتْعَةَ النِّسَاءِ.

বাংলা অনুবাদ:
বর্ণনা ২৮৭২: আবু বকর ইবন খাল্লাদ, হারিস ইবন আবি উসামা, রাওহ ইবন উবাদা ও শুবার সূত্রে মুসলিম আল-কুর্রি বলেন, “আমি ইবনে আব্বাসকে হজের তামাত্তু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি এর অনুমতি দিলেন, অথচ ইবনে যুবায়ের তা নিষিদ্ধ করতেন। ইবনে আব্বাস বললেন, ‘ইবনে যুবায়েরের মা আছেন, যিনি বর্ণনা করেন যে মুহাম্মদ এর অনুমতি দিয়েছিলেন। তোমরা তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করো।’ আমরা তাঁর কাছে গেলাম। তিনি ছিলেন স্থূলকায় ও দৃষ্টিহীন এক নারী। তিনি বললেন, ‘মুহাম্মদ এর অনুমতি দিয়েছিলেন।’”
বর্ণনা ২৮৭৩: আবদুল্লাহ ইবন জাফর, ইউসুফ ইবন হাবিব, আবু দাউদ ও শুবার সূত্রে মুসলিম আল-কুর্রি বলেন, “আমরা আসমা বিনত আবু বকরের কাছে গিয়ে তাঁকে নারীদের মুতা বিবাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ‘আমরা মুহাম্মদের যুগে এটি করেছি।’”
আবু নুআইম এরপর আরেকটি সূত্র উল্লেখ করেছেন। সেখানে একই বর্ণনায় শুধু ‘মুতা’ শব্দটি এসেছে; ‘নারীদের’ শব্দটি উল্লেখ করা হয়নি। তিনি আরও জানান, সহিহ মুসলিমের একটি বর্ণনাপাঠে শুধু ‘মুতা’ রয়েছে, হজের কথা নেই। অপর একটি পাঠে মুসলিম আল-কুর্রি বলেছেন, তিনি জানেন না প্রশ্নটি হজের মুতা সম্পর্কে ছিল, নাকি নারীদের মুতা সম্পর্কে।

সহিহ মুসলিমের ১২৩৮ নম্বর হাদিসেও এই পাঠভেদের বিবরণ রয়েছে। একটি পাঠে হজের তামাত্তুর কথা সরাসরি বলা হয়েছে। অন্য পাঠে শুধু মুতা শব্দটি এসেছে। আবার আরেক পাঠে মুসলিম আল-কুর্রি নিজেই হজের মুতা ও নারীদের মুতার মধ্যে কোনটি উদ্দেশ্য ছিল, তা নির্দিষ্ট করতে পারেননি। কিন্তু নাসাঈ, তায়ালিসি এবং আবু নুআইমের সংরক্ষিত পাঠে নারীদের মুতা বিবাহের শব্দগুলো সরাসরি উপস্থিত। ফলে সমস্ত বর্ণনাকে নির্বিচারে হজের তামাত্তু হিসেবে উপস্থাপন করলে মূল গ্রন্থগুলোতে সংরক্ষিত পাঠগত পার্থক্য হারিয়ে যায়। [107] [108]

মূল আরবি, সহিহ মুসলিম ১২৩৮b:
وَحَدَّثَنَاهُ ابْنُ الْمُثَنَّى، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ، ح وَحَدَّثَنَاهُ ابْنُ بَشَّارٍ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدٌ، – يَعْنِي ابْنَ جَعْفَرٍ – جَمِيعًا عَنْ شُعْبَةَ، بِهَذَا الإِسْنَادِ فَأَمَّا عَبْدُ الرَّحْمَنِ فَفِي حَدِيثِهِ الْمُتْعَةُ وَلَمْ يَقُلْ مُتْعَةُ الْحَجِّ. وَأَمَّا ابْنُ جَعْفَرٍ فَقَالَ قَالَ شُعْبَةُ قَالَ مُسْلِمٌ لاَ أَدْرِي مُتْعَةُ الْحَجِّ أَوْ مُتْعَةُ النِّسَاءِ.

বাংলা অনুবাদ:
ইবনুল মুসান্না আবদুর রহমানের সূত্রে এবং ইবন বাশশার মুহাম্মদ ইবন জাফরের সূত্রে শুবার কাছ থেকে একই বর্ণনা সংরক্ষণ করেছেন। আবদুর রহমানের বর্ণনায় শুধু ‘মুতা’ শব্দটি রয়েছে; তিনি ‘হজের মুতা’ বলেননি। আর ইবন জাফরের বর্ণনায় শুবা জানান, মুসলিম আল-কুর্রি বলেছেন, “আমি জানি না, এটি হজের মুতা ছিল নাকি নারীদের মুতা।”

আসমার বক্তব্যের গুরুত্ব শুধু তাঁর নিজের সাক্ষ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের পরবর্তী সময়ে মুতা বিবাহের বৈধতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন। ইবনে আব্বাস ছিলেন মুতা বিবাহ বৈধ থাকার পক্ষে ফতোয়া দিতেন এমন একজন প্রধান সাহাবি। এই মতপার্থক্য একপর্যায়ে প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিতর্কে রূপ নেয়। সুন্নি আইনজ্ঞ আবু জাফর আত-তাহাবি তাঁর শরহু মাআনিল আছার গ্রন্থে সাঈদ ইবন জুবাইরের সূত্রে ঘটনাটি সংরক্ষণ করেছেন। সেখানে ইবনে যুবায়ের জনসমক্ষে ইবনে আব্বাসের মুতা-সংক্রান্ত অবস্থানের সমালোচনা করেন। ইবনে আব্বাস পাল্টা তাঁকে নিজের মা আসমার কাছে বিষয়টি যাচাই করতে বলেন। আসমা ইবনে আব্বাসের বক্তব্য সত্য বলে স্বীকার করেন। এরপর ইবনে আব্বাস কুরাইশের মুতা-বিবাহজাত সন্তানদের প্রসঙ্গ তোলেন। [109]

মূল আরবি:

٤٣٠٦ – حَدَّثَنَا صَالِحُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، قَالَ: ثَنَا سَعِيدُ بْنُ مَنْصُورٍ، قَالَ: ثَنَا هُشَيْمٌ، قَالَ: أَخْبَرَنَا أَبُو بِشْرٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، قَالَ: سَمِعْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ الزُّبَيْرِ يَخْطُبُ وَهُوَ يُعَرِّضُ بِابْنِ عَبَّاسٍ، يَعِيبُ عَلَيْهِ قَوْلَهُ فِي الْمُتْعَةِ.
فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: يَسْأَلُ أُمَّهُ إِنْ كَانَ صَادِقًا، فَسَأَلَهَا، فَقَالَتْ: صَدَقَ ابْنُ عَبَّاسٍ، قَدْ كَانَ ذَلِكَ.
فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُمَا: لَوْ شِئْتُ لَسَمَّيْتُ رِجَالًا مِنْ قُرَيْشٍ وُلِدُوا فِيهَا.

বাংলা অনুবাদ:
৪৩০৬। সালিহ ইবন আবদুর রহমান, সাঈদ ইবন মানসুর, হুশাইম ও আবু বিশরের সূত্রে সাঈদ ইবন জুবাইর বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “আমি আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়েরকে ভাষণ দিতে শুনেছি। তিনি তাঁর ভাষণে ইবনে আব্বাসের প্রতি ইঙ্গিত করে মুতা বিবাহ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করছিলেন।
তখন ইবনে আব্বাস বললেন, ‘তিনি যদি সত্যবাদী হন, তাহলে তাঁর মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করুন।’ এরপর আসমাকে প্রশ্ন করা হলো। তিনি বললেন, ‘ইবনে আব্বাস সত্য বলেছেন। এমনটি ঘটেছিল।’
তখন ইবনে আব্বাস বললেন, ‘আমি চাইলে কুরাইশের এমন পুরুষদের নাম বলতে পারি, যারা মুতা বিবাহের মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করেছে।’”

এই বর্ণনায় ইবনে আব্বাসের বক্তব্যের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ইবনে যুবায়ের তাঁর মুতা-সংক্রান্ত ফতোয়ার বিরোধিতা করলে তিনি কেবল নিজের ধর্মীয় ব্যাখ্যা পুনরাবৃত্তি করেননি; সরাসরি ইবনে যুবায়েরের মা আসমাকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত করেছেন। আসমাও তাঁর বক্তব্য সত্য বলে নিশ্চিত করেছেন। অর্থাৎ আবু বকরের কন্যা ও ইবনে যুবায়েরের মা নিজেই এমন এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষ্য দিচ্ছেন, যেটিকে তাঁর পুত্র প্রকাশ্যে অস্বীকার বা সমালোচনা করছিলেন।

এরপর ইবনে আব্বাসের বক্তব্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, لَوْ شِئْتُ لَسَمَّيْتُ رِجَالًا مِنْ قُرَيْشٍ وُلِدُوا فِيهَا—অর্থাৎ চাইলে তিনি কুরাইশের এমন পুরুষদের নাম বলতে পারতেন, যাঁদের জন্ম মুতা বিবাহের মাধ্যমে হয়েছিল। এখানে মুতা কেবল সাময়িক যৌনসম্পর্কের চুক্তি হিসেবে নয়, সন্তান জন্মের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত একটি প্রথা হিসেবে উপস্থিত। কুরাইশ ছিল মুহাম্মদের নিজের গোত্র এবং মক্কার প্রধান সামাজিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী। সেই কুরাইশের মধ্যেই মুতা-বিবাহজাত পুরুষদের উপস্থিতির কথা ইবনে আব্বাস বলেছেন। তিনি ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ করেননি, কিন্তু প্রয়োজন হলে নাম বলতে পারবেন বলে দাবি করেছেন।

তাহাবির এই বর্ণনাটি পরবর্তী সুন্নি হাদিসব্যাখ্যাকার বদরুদ্দীন আল-আইনী তাঁর নুখাবুল আফকার গ্রন্থেও আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি বর্ণনাটির সনদকে সহিহ বলেছেন। একই ঘটনার বিবরণ বায়হাকির আস-সুনানুল কুবরা-তেও উল্লেখিত হয়েছে। ফলে ইবনে আব্বাসের সঙ্গে ইবনে যুবায়েরের বিতর্ক এবং আসমার বক্তব্য ইসলামের প্রাথমিক মুতা-সংক্রান্ত ঐতিহ্যে সংরক্ষিত একটি নির্দিষ্ট ঘটনা। [110]

ইবনে আব্বাস ও ইবনে যুবায়েরের এই সংঘাতের আরও একটি বিবরণ সহিহ মুসলিমে রয়েছে। সেখানে ইবনে যুবায়ের জনসমক্ষে মুতা বিবাহের পক্ষে ফতোয়া দেওয়া ব্যক্তিদের সমালোচনা করেন এবং ইবনে আব্বাসের প্রতি ইঙ্গিত করেন। ইবনে আব্বাস পাল্টা তাঁকে অসভ্য ও রূঢ় ব্যক্তি বলে সম্বোধন করেন এবং মুহাম্মদের যুগে মুতা চালু থাকার কথা উল্লেখ করেন। ইবনে যুবায়ের তখন বলেন, ইবনে আব্বাস নিজে মুতা করে দেখলে তিনি তাঁকে পাথর মেরে হত্যা করবেন। অর্থাৎ মুতা বিবাহের বৈধতা নিয়ে সাহাবীদের মতভেদ শুধু ব্যক্তিগত ধর্মীয় আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তা প্রকাশ্য বিতর্ক এবং মৃত্যুদণ্ডের হুমকি পর্যন্ত পৌঁছেছিল। [111]

আসমার সাক্ষ্য এবং ইবনে আব্বাসের বক্তব্য একত্র করলে প্রাথমিক মুসলিম সমাজের মুতা বিবাহ সম্পর্কে তিনটি নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। প্রথমত, মুহাম্মদের যুগে নারীদের মুতা বিবাহ করা হয়েছিল বলে আসমার সরাসরি বক্তব্য একাধিক সুন্নি হাদিসগ্রন্থে সংরক্ষিত। দ্বিতীয়ত, আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের এই প্রথার বিরোধিতা করলেও তাঁর মা আসমা ইবনে আব্বাসের বক্তব্য সত্য বলে নিশ্চিত করেছিলেন। তৃতীয়ত, ইবনে আব্বাসের বক্তব্য অনুযায়ী কুরাইশের মধ্যেও মুতা বিবাহের ফলে সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল। অর্থাৎ মুতা বিবাহ প্রাথমিক মুসলিম সমাজের কেবল যুদ্ধকালীন সাময়িক অনুমতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এই প্রথার সঙ্গে পরিবার, সন্তান জন্ম এবং কুরাইশের সামাজিক ইতিহাসও জড়িত ছিল।

এখানে পরবর্তী সুন্নি নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে প্রাথমিক সাহাবীদের অবস্থানের পার্থক্যও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে মুহাম্মদের যুগে মুতা বিবাহের অনুমতি ও বাস্তব চর্চার বর্ণনা রয়েছে; অন্যদিকে পরবর্তী সময়ে একই প্রথাকে রজমযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করার হুমকি এসেছে। আসমার মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ নারী সাহাবি এবং ইবনে আব্বাসের মতো প্রখ্যাত কোরআন-ব্যাখ্যাকার এই প্রথার পূর্ববর্তী প্রচলনকে প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন। তাঁদের বক্তব্যের সঙ্গে ইবনে যুবায়েরের কঠোর বিরোধিতা প্রমাণ করে, মুতা বিবাহ নিয়ে মুসলিম সমাজের অবস্থান কখনোই একরূপ ছিল না। মুহাম্মদের যুগে বৈধ ও প্রচলিত একটি যৌনচুক্তি পরবর্তী সময়ে নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য হয়ে ওঠার ইতিহাস সাহাবীদের নিজেদের বক্তব্য এবং পারস্পরিক বিরোধের মধ্যেই সংরক্ষিত রয়েছে।


মুহাম্মদ ও আবু বকরের যুগে মুতা

আরো জরুরি প্রশ্ন হচ্ছে, মুহাম্মদের পরে ইসলামি সাম্রাজ্যের খলিফা ছিলেন হযরত আবু বকর। মুহাম্মদ যদি মুতা বিবাহ নিষিদ্ধ করে গিয়ে থাকেন, আবু বকরের আমলে মুতা বিবাহ কীভাবে চালু থাকে? মদ নিষিদ্ধের আয়াত নাজিল হওয়া এবং মদিনার ঘরে ঘরে বড় বড় পাত্রে জমিয়ে রাখা মদ ঢেলে ফেলে দেয়ার কথা আমরা জানি। মুতা বিবাহ মুহাম্মদ নিষিদ্ধ করে থাকলে, আবু বকরের আমলে কেউ কীভাবে মুতা বিবাহ করতো? হযরত উমরের কেন মুতা বিবাহ নিষিদ্ধ করতে হলো? [112] [113] [114] [115] [116] –

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৮৫। হাসান হুলওয়ানী (রহঃ) … আতা (রহঃ) বলেন, জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) উমরা পালন করতে এলেন। তখন আমরা তাঁর আবাসে তাঁর নিকট গেলাম। লোকেরা তাঁর নিকট বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞেসা করল। অতঃপর তারা মুত’আর উল্লেখ করলে তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে এবং আবূ বকর (রাঃ) ও উমর (রাঃ) এর যুগে মুতআ (বিবাহ) করেছি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আতা ইবনু আবী রাবাহ (রহঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৮৬। মুহাম্মাদ ইবনু রাফি (রহঃ) ... আবূ যুবায়র (রহঃ) বলেন, আমি জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) কে বলতে শুনেছিঃ আমরা এক মুঠো খেজুর অথবা ময়দার বিনিময়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে এবং আবূ বকর (রাঃ) এর যুগে মুতআ বিবাহ করতাম। শেষ পর্যন্ত উমর (রাঃ) আমর ইবন্‌ হুরায়সের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে তা নিষিদ্ধ করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবুয্ যুবায়র (রহঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৮৭। হামিদ ইবনু উমর বাকরাবী (রহঃ) … আবূ নাদরাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এক ব্যক্তি তার নিকট এসে বলল, ইবনু আব্বাস (রাঃ) ও ইবনু যুবায়র (রাঃ) দুই প্রকারের মুতআ (তামাত্তু হজ্জ ও মুতআ বিবাহ) নিয়ে পরস্পর মতবিরোধ করেছেন। তখন জাবির (রাঃ) বললেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপস্থিতে দুই প্রকারের মুত’আই করেছি। অতঃপর উমর (রাঃ) আমাদের এই উভয়টই করতে নিষেধ করলেন। অতএব আমরা তা আর করি নি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৭। বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত্’আহ বিবাহ বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, অতঃপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং তা কিয়ামাত পর্যন্ত স্থির থাকবে
৩৩০৭-(১৬/…) মুহাম্মাদ ইবনু রাফি’ (রহঃ) ….. আবূ যুবায়র (রহঃ) বলেন, আমি জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাযিঃ) কে বলতে শুনেছি, আমরা এক মুঠো খেজুর অথবা ময়দার বিনিময়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে এবং আবূ বাকর (রাযিঃ) এর যুগে মুত’আহ বিবাহ করতাম। শেষ পর্যন্ত উমর (রাযিঃ) আমর ইবনু হুরায়স এর বিষয়টিকে কেন্দ্র করে তা নিষিদ্ধ করেন।*। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩২৮২, ইসলামীক সেন্টার ৩২৮০)
* ‘আমর ইবন হুরায়স কুফায় তার মুক্তদাসীকে মুত’আহ বিবাহ করেন। এর ফলে সে গর্ভবতী হলে তাকে নিয়ে আমর ইবন হুরায়স উমার ফারুক (রাযিঃ) এর কাছে উপস্থিত হন, এ সময় তিনি মুত’আহ বিবাহকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবুয্ যুবায়র (রহঃ)

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৭। বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত্’আহ বিবাহ বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, অতঃপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং তা কিয়ামাত পর্যন্ত স্থির থাকবে
৩৩০৬-(১৫/…) হাসান আল হুলওয়ানী (রহঃ) ….. আত্বা (রহঃ) বলেন, জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) উমরাহ পালন করতে এলেন। তখন আমরা তার আবাসে তার নিকট গেলাম। লোকেরা তার নিকট বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞেস করল। অতঃপর তারা মুত‘আহ সম্পর্কে উল্লেখ করলে তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে এবং আবূ বাকর (রাযিঃ) ও উমার (রাযিঃ) এর যুগে মুত’আহ (বিবাহ) করেছি।*। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩২৮১, ইসলামীক সেন্টার ৩২৭৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আতা ইবনু আবী রাবাহ (রহঃ)


উমরের যুগেও মুতা: নিষেধের সংবাদ কি সাহাবীদের কাছেই পৌঁছায়নি?

মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাকের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা থেকে জানা যায়, উমরের খেলাফতের সময়েও সাহাবীদের মধ্যে মুতা বিবাহের বাস্তব চর্চা ছিল। ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন, উমর একদিন উম্মু আরাকাকে গর্ভবতী অবস্থায় দেখে তাঁর গর্ভধারণের কারণ জিজ্ঞেস করেন। উম্মু আরাকা সরাসরি বলেন, “সালামাহ ইবন উমাইয়া ইবন খালাফ আমার সঙ্গে মুতা করেছেন।” পরবর্তীতে ইবনে আব্বাসের মুতা-সংক্রান্ত অবস্থান নিয়ে আপত্তি উঠলে তিনি সেই ঘটনাকেই পাল্টা প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেন এবং ইবন সাফওয়ানকে বলেন, তার চাচাকে জিজ্ঞেস করতে—তিনি মুতা করেছিলেন কি না। বর্ণনাটির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় এই কারণে যে ইবনে হাজার আসকালানী ফাতহুল বারী-তে আব্দুর রাযযাকের এই সনদকে সরাসরি “সহিহ সনদ” বলেছেন। [117] [118]

ইবনে আব্বাস বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব উম্মু আরাকাকে গর্ভবতী অবস্থায় দেখে তাঁর গর্ভের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, “সালামাহ ইবন উমাইয়া ইবন খালাফ আমার সঙ্গে মুতা করেছেন।” পরবর্তীতে ইবন সাফওয়ান ইবনে আব্বাসের এই বিষয়ে কিছু বক্তব্যের বিরোধিতা করলে ইবনে আব্বাস বলেন, “তোমার চাচাকে জিজ্ঞেস করো, তিনি কি মুতা করেননি?”

প্রখ্যাত আধুনিক স্কলার বিন বাযের ফতোয়া-সংগ্রহেও ঠিক এই উদ্ধৃতিটি আছে—ইবনু বায সেখানে ইবনে হাজারের বক্তব্য উদৃত করে বলেছেন,

ইবনু বাযের ফতোয়া: খণ্ড ২০ পৃষ্ঠা ৩৭৬-৩৮০
وسعيد بن جبير وعطاء وسائر فقهاء مكة، فقد تعقبه الحافظ ابن حجر العسقلاني في ج 9 من فتح الباري ص 174 بقوله: قلت: وفي جميع ما أطلقه نظر. أما ابن مسعود فمستنده فيه الحديث الماضي في أوائل النكاح.
وقد بينت فيه ما نقله الإسماعيلي من الزيادة فيه المصرحة عنه بالتحريم، وقد أخرجه أبو عوانة من طريق أبي معاوية عن إسماعيل ابن أبي خالد، وفي آخره ففعلنا ثم ترك ذلك، وأما معاوية فأخرجه عبد الرزاق من طريق صفوان بن يعلى بن أمية، أخبرني يعلى أن معاوية استمتع بامرأة بالطائف، وإسناده صحيح، لكن في رواية أبي الزبير عن جابر عند عبد الرزاق أيضا أن ذلك كان قديما ولفظه: استمتع معاوية
পৃষ্ঠা ৩৭৮
বাংলা অনুবাদ
এবং সাঈদ ইবনে জুবাইর, আতা এবং মক্কার অন্যান্য ফুকাহাগণ (আইনজ্ঞগণ)— তাঁদের এই বক্তব্যের উপর হাফিয ইবন হাজার আল-আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থের ৯ম খণ্ডের ১৭৪ পৃষ্ঠায় এই বলে সমালোচনা করেছেন (বা, মন্তব্য করেছেন):
তিনি (ইবন হাজার) বলেন: “আমি বলি: তিনি যা কিছু সাধারণভাবে উল্লেখ করেছেন, তার সবগুলোর ক্ষেত্রেই পর্যালোচনার অবকাশ রয়েছে।
আর ইবন মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ক্ষেত্রে, তাঁর প্রমাণ হলো নিকাহ (বিবাহ) অধ্যায়ের প্রথম দিকে বর্ণিত পূর্বের হাদীসটি। আর আমি তাতে (ঐ স্থানে) ইসমাঈলী কর্তৃক বর্ণিত অতিরিক্ত অংশটি স্পষ্ট করে দিয়েছি, যা তাঁর (ইবন মাসউদ) পক্ষ থেকে হারাম হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। আবূ আওয়ানাহ (রহিমাহুল্লাহ) এটি আবূ মুআবিয়া হতে, তিনি ইসমাঈল ইবন আবী খালিদ হতে বর্ণনা করেছেন, যার শেষে রয়েছে: ‘অতঃপর আমরা তা করলাম, কিন্তু পরে তা পরিত্যাগ করলাম।’
আর মুআবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ক্ষেত্রে, আব্দুর রাযযাক (রহিমাহুল্লাহ) এটি সাফওয়ান ইবন ইয়া’লা ইবন উমাইয়্যার সূত্রে বর্ণনা করেছেন। ইয়া’লা আমাকে জানিয়েছেন যে, মুআবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তায়েফে একজন মহিলার সাথে ইস্তিমতা’ (মুতা’আ) করেছিলেন। আর এর সনদ সহীহ। কিন্তু আব্দুর রাযযাক (রহিমাহুল্লাহ)-এর নিকট আবূয যুবাইর কর্তৃক জাবির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, এটি প্রাচীনকালে (ইসলামের প্রথম দিকে) ঘটেছিল। আর এর শব্দগুলো হলো: ‘মুআবিয়া ইস্তিমতা’ করেছিলেন’।”

এখানেই সুন্নি ব্যাখ্যার একটি বড় সমস্যা সামনে আসে। পরবর্তী সুন্নি ব্যাখ্যাকারদের প্রচলিত উত্তর হলো, মুহাম্মদ মুতা চিরতরে নিষিদ্ধ করেছিলেন, কিন্তু কিছু সাহাবীর কাছে সেই নিষেধের সংবাদ পৌঁছায়নি; তাই তারা আবু বকর বা উমরের যুগেও মুতা করতে থাকেন। অর্থাৎ ঘটনাগুলো অস্বীকার করা হয় না, বরং বলা হয় নিষেধের খবর সংশ্লিষ্ট সাহাবীরা জানতেন না। কিন্তু এই উত্তর সমস্যার সমাধান না করে সমস্যাটিকেই আরও বড় করে তোলে।

কারণ সহিহ মুসলিমের সাবরা আল-জুহানীর বর্ণনাকে যদি গ্রহণ করা হয়, তাহলে মুহাম্মদ মক্কা বিজয়ের সময় কোনো ব্যক্তিগত কথোপকথনে নয়, প্রকাশ্যে মানুষকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, “হে লোকসকল! আমি তোমাদের নারীদের সঙ্গে মুতা করার অনুমতি দিয়েছিলাম; আল্লাহ এখন কিয়ামত পর্যন্ত তা হারাম করেছেন।” অর্থাৎ বর্ণনাটি নিজেই এটিকে একটি প্রকাশ্য, সাধারণ এবং স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা হিসেবে উপস্থাপন করছে। ইবনে হাজারের আল-ইসাবাহ-তে খলিফা ইবন খাইয়াতের সূত্রে সালামাহ ইবন উমাইয়াকে মক্কায় বসবাসকারী সাহাবীদের মধ্যে গণ্য করা হয়েছে। অন্যদিকে ফাতহুল বারী-তে ইবনে হাজার আব্দুর রাযযাকের সহিহ সনদে সালামাহর মুতা করার ঘটনাটিও উদ্ধৃত করেছেন। [119] [120]। যে শহরে “কিয়ামত পর্যন্ত” নিষেধের এমন প্রকাশ্য ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল বলে বর্ণনা করা হচ্ছে, সেই মক্কায় বসবাসকারী একজন সাহাবীর কাছেও যদি উমরের খেলাফত পর্যন্ত সেই নিষেধাজ্ঞার সংবাদ কার্যকরভাবে না পৌঁছে থাকে, তাহলে “কিছু সাহাবীর কাছে নিষেধের খবর পৌঁছায়নি”—এই ব্যাখ্যাটি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে।

সময়টিও লক্ষ্য করার মতো। মক্কা বিজয় হয়েছিল অষ্টম হিজরিতে; উমরের খেলাফত শুরু হয় ত্রয়োদশ হিজরিতে। অর্থাৎ কথিত চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা এবং উমরের শাসনামলে সালামাহর মুতা করার ঘটনার মধ্যে ন্যূনতম প্রায় পাঁচ বছরের ব্যবধান। আর ঘটনাটি উমরের খেলাফতের আরও পরে ঘটে থাকলে ব্যবধান আরও বেশি। একজন সাধারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ নয়, মক্কায় বসবাসকারী একজন সাহাবী, যে শহরে নিষেধটি প্রকাশ্যে ঘোষিত হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে, তিনি পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে এই “কিয়ামত পর্যন্ত” বিধানের কিছুই জানলেন না, এমন দাবি স্বাভাবিক ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার চেয়ে একটি পরবর্তী সমন্বয়মূলক ব্যাখ্যার মতোই বেশি শোনায়।

আর সমস্যাটি শুধু সালামাহকে নিয়ে নয়। সহিহ মুসলিমে জাবির ইবন আবদুল্লাহ বলেন, তাঁরা মুহাম্মদের যুগে এবং আবু বকরের যুগেও মুতা করতেন, শেষ পর্যন্ত উমর আমর ইবন হুরায়সের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তা নিষিদ্ধ করেন। অন্য বর্ণনায় জাবির মুহাম্মদ, আবু বকর ও উমর, তিন যুগেই মুতা করার কথা বলেন। ইবনে আব্বাস আলীর মৃত্যুর পরেও মুতা বৈধতার পক্ষে ফতোয়া দিচ্ছিলেন। আব্দুর রাযযাকের আরেকটি বর্ণনায় মুয়াবিয়ার তায়েফে মুতা করার ঘটনাও সংরক্ষিত হয়েছে; ইবনে হাজার এর সনদকে সহিহ বলেছেন। তবে এই নির্দিষ্ট ঘটনাটি ঠিক কোন সময়ে ঘটেছিল, তা বর্ণনাটিতে স্পষ্ট নয়। ফলে প্রতিবার একই উত্তর—“তাঁর কাছে নিষেধের সংবাদ পৌঁছায়নি”—দিলে একটি ব্যতিক্রম ব্যাখ্যা করা হয় না; বরং একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সাহাবীর অজ্ঞতাকে ধরে পুরো নিষেধাজ্ঞাটিকেই রক্ষা করতে হয় [121]। উল্লেখ্য, নিচে প্রদত্ত এই অনুবাদে একটি অংশে ভুল অনুবাদ করা হয়েছে। আরবিতে বলা আছে حَتَّى إِذَا كَانَ فِي آخِرِ خِلَافَةِ عُمَرَ—অর্থাৎ উমরের খেলাফতের শেষ পর্যায় পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ চলেছে; “প্রথম দিক পর্যন্ত” নয়।

হাদিস ১৪,০২১
মূল আরবি
عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ، عَنْ عَطَاءٍ قَالَ: لَأَوَّلُ مَنْ سَمِعْتُ مِنْهُ الْمُتْعَةَ صَفْوَانُ بْنُ يَعْلَى قَالَ: أَخْبَرَنِي، عَنْ يَعْلَى، أَنَّ مُعَاوِيَةَ -[497]-، اسْتَمْتَعَ بِامْرَأَةٍ بِالطَّائِفِ فَأَنْكَرَتْ ذَلِكَ عَلَيْهِ، فَدَخَلْنَا عَلَى ابْنِ عَبَّاسٍ فَذَكَرَ لَهُ بَعْضُنَا، فَقَالَ لَهُ: «نَعَمْ». فَلَمْ يَقِرَّ فِي نَفْسِي حَتَّى قَدِمَ جَابِرُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، فَجِئْنَاهُ فِي مَنْزِلِهِ فَسَأَلَهُ الْقَوْمُ عَنْ أَشْيَاءَ، ثُمَّ ذَكَرُوا لَهُ الْمُتْعَةَ، فَقَالَ: ” نَعَمْ، اسْتَمْتَعْنَا عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَأَبِي بَكْرٍ، وَعُمَرَ، حَتَّى إِذَا كَانَ فِي آخِرِ خِلَافَةِ عُمَرَ، اسْتَمْتَعَ عَمْرُو بْنُ حُرَيْثٍ بِامْرَأَةٍ سَمَّاهَا جَابِرٌ فَنَسِيتُهَا، فَحَمَلَتِ الْمَرْأَةُ فَبَلَغَ ذَلِكَ عُمَرَ فَدَعَاهَا فَسَأَلَهَا، فَقَالَتْ: نَعَمْ قَالَ: مَنْ أَشْهَدَ؟
قَالَ: عَطَاءٌ لَا أَدْرِي قَالَتْ: أُمِّي أُمَّ وَلِيَّهَا قَالَ: فَهَلَّا غَيْرَهُمَا قَالَ: خَشِيَ أَنْ يَكُونَ دَغْلًا الْآخَرُ، قَالَ عَطَاءٌ، وَسَمِعْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ يَقُولُ: «يَرْحَمُ اللَّهُ عُمَرَ مَا كَانَتِ الْمُتْعَةُ إِلَّا رُخْصَةً مِنَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ رَحِمَ بِهَا أُمَّةَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَلَوْلَا نَهْيُهُ عَنْهَا مَا احْتَاجَ إِلَى الزِّنَا إِلَّا شَقِيٌّ» قَالَ: كَأَنِّي وَاللَّهِ أَسْمَعُ قَوْلَهُ: إِلَّا شَقِيٌّ – عَطَاءٌ الْقَائِلُ – قَالَ عَطَاءٌ: ” فَهِيَ الَّتِي فِي سُورَةِ النِّسَاءِ: فَمَا اسْتَمْتَعْتُمْ بِهِ مِنْهُنَّ [النساء: 24] إِلَى كَذَا وَكَذَا مِنَ الْأَجَلِ عَلَى كَذَا وَكَذَا لَيْسَ يُتَشَاوَرُ ” قَالَ: «بَدَا لَهُمَا أَنْ يَتَرَاضِيَا بَعْدَ الْأَجَلِ، وَأَنْ يَتَفَرَّقَا فَنَعَمْ، وَلَيْسَ بِنِكَاحٍ»
বাংলা অনুবাদ
আতা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: মুত’আ (সাময়িক বিবাহ) সম্পর্কে সর্বপ্রথম আমি যার কাছ থেকে শুনেছি তিনি হলেন সাফওয়ান ইবনু ইয়া’লা। তিনি আমাকে ইয়া’লা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে জানিয়েছেন যে, মু’আবিয়া (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা) তায়েফে এক মহিলার সাথে মুত’আ করলেন। তখন মহিলাটি এর বিরোধিতা করে আপত্তি জানালেন। অতঃপর আমরা ইবনু আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর কাছে গেলাম। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ তাঁকে বিষয়টি বললেন। তিনি বললেন: “হ্যাঁ (এটা বৈধ ছিল)।”
কিন্তু আমার মনে শান্তি এলো না, যতক্ষণ না জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা) আগমন করলেন। আমরা তাঁর বাসস্থানে এসে তাঁর সাথে দেখা করলাম। লোকেরা তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলো, এরপর তারা তাঁর কাছে মুত’আর বিষয়টি উত্থাপন করলো। তিনি বললেন: “হ্যাঁ, আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে, আবূ বাকর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর যুগে এবং উমর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর (শাসনের) প্রথম দিক পর্যন্ত মুত’আ করেছি। অবশেষে যখন উমর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর খিলাফতের শেষ সময় এলো, তখন আমর ইবনু হুরাইস এক মহিলার সাথে মুত’আ করলেন, যার নাম জাবির (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা) উল্লেখ করেছিলেন কিন্তু আমি তা ভুলে গেছি। অতঃপর মহিলাটি গর্ভবতী হয়ে পড়ল। এ কথা উমর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি মহিলাটিকে ডেকে পাঠালেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন। মহিলাটি বলল: হ্যাঁ (আমি মুত’আ করেছিলাম)।”
(উমর) জিজ্ঞেস করলেন: “সাক্ষী কে ছিল?” আতা বলেন: আমি জানি না, মহিলাটি কি বলেছিল: “আমার মা এবং তার অভিভাবক।” (উমর) বললেন: “অন্য কাউকে সাক্ষী রাখলে না কেন?” (আতা) বলেন: “তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে অন্য কেউ হয়তো প্রতারণা করতে পারে।” আতা বলেন: আমি ইবনু আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে বলতে শুনেছি: “আল্লাহ তাআলা উমর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর উপর রহম করুন! মুত’আ ছিল কেবল আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার পক্ষ থেকে একটি বিশেষ সুবিধা (রুখসা), যার মাধ্যমে তিনি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উম্মতকে দয়া করেছিলেন। উমর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা) যদি এটি নিষিদ্ধ না করতেন, তবে দুর্ভাগা ব্যক্তি ছাড়া আর কারো ব্যভিচারের প্রয়োজন হতো না।” আতা বলেন: আল্লাহর কসম! আমি যেন তাঁর (ইবনু আব্বাস-এর) সেই কথাটি শুনছি: “দুর্ভাগা ব্যক্তি ছাড়া।”
আতা বলেন: আর এটিই হলো সূরা নিসার [২৪] আয়াতের কথা: ফামা-সতামতা’তুম বিহী মিনহুন্না [অর্থাৎ: তাদের মধ্যে যাদেরকে তোমরা ভোগ করেছ…] এত এত দিনের জন্য এত এত (মুদ্রার বিনিময়ে), এর জন্য পরামর্শ করার দরকার নেই। আতা বলেন: “যদি তাদের দুজনের মধ্যে নির্ধারিত সময়সীমার পরে পারস্পরিক সমঝোতা হয় (যে তারা একসাথে থাকবে), অথবা তারা আলাদা হয়ে যাবে, তবে (তা বৈধ)। তবে এটি স্বাভাবিক বিবাহ ছিল না।”

এখানে একটি সাধারণ প্রশ্নই যথেষ্ট: মুহাম্মদের পক্ষ থেকে যদি সত্যিই এমন একটি প্রকাশ্য ঘোষণা হয়ে থাকে যে মুতা “কিয়ামত পর্যন্ত হারাম”, তাহলে এই ঘোষণা এত গুরুত্বপূর্ণ সাহাবীর কাছেই পৌঁছাল না কেন? মক্কার লোক মক্কায় শুনলেন না, আবু বকরের পুরো শাসনামলেও মুতা চলল, উমরের আমলেও মানুষ মুতা করল, ইবনে আব্বাস বহু পরে পর্যন্ত এর বৈধতার পক্ষে ফতোয়া দিলেন—এরপর বলা হলো, সবাই কেবল নিষেধের খবর জানতেন না। এটি ব্যাখ্যার বদলে একটি নতুন সমস্যা তৈরি করে: তাহলে মুহাম্মদের তথাকথিত চূড়ান্ত শরয়ী নিষেধাজ্ঞার প্রচার ও কার্যকারিতা এতটাই দুর্বল ছিল যে তাঁর নিজের সাহাবীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও বহু বছর ধরে সেটি জানতেন না।

বরং সংরক্ষিত বর্ণনাগুলোর সরল পাঠে যে চিত্রটি পাওয়া যায় তা অনেক বেশি সরাসরি: মুহাম্মদের যুগে মুতা বৈধ ছিল এবং বহু সাহাবী তা করেছেন; তাঁর মৃত্যুর পর আবু বকরের যুগেও এর চর্চা চলেছে; উমরের যুগেও তার বাস্তব উদাহরণ পাওয়া যায়; এরপর উমর ইসলামে খুবই অস্বস্তিকর এই বিধান সম্পর্কে প্রকাশ্যে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। পরবর্তী সুন্নি ব্যাখ্যাকে এই বাস্তব ধারাবাহিকতার সঙ্গে মুহাম্মদের নামে বর্ণিত “কিয়ামত পর্যন্ত হারাম” ঘোষণাকে মিলিয়ে নিতে গিয়ে বারবার বলতে হয়েছে, একজন জানতেন না, আরেকজনের কাছে নিষেধ পৌঁছায়নি, অন্যজন পরে মত প্রত্যাহার করেছেন। যত বেশি এমন ব্যাখ্যা প্রয়োজন হয়, ততই প্রশ্নটি তীব্র হয়: চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞাটি সত্যিই মুহাম্মদের যুগে সর্বজনবিদিত বিধান ছিল, নাকি উমরের যুগের নিষেধাজ্ঞাকে পরে মুহাম্মদের নামে একটি পূর্ববর্তী চূড়ান্ত নিষেধের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে? প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয়, সহিহ হাদিসে মুহাম্মদের প্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পরবর্তী যুগের আলেমগণ সহিহ হাদিস টপকে কুরআন শিক্ষা দিয়ে অর্থ গ্রহণকে হালাল করেছেন [122]। এমনকি, উমরের আমলে এমন বেশ কয়েকটি ঘটনার কথা জানা যায়, যেখানে উমর মুহাম্মদের নির্দেশ তো বটেই [123], খোদ কোরআনের আয়াতের সংস্কার করে বিধান প্রণয়ন করেছেন [124]। এগুলো এই প্রবন্ধের সাথে খুবই প্রাসঙ্গিক আলোচনা।


মুতা বিবাহের চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা: মুহাম্মদ, না উমর?

মুয়াত্তা মালিকের হাদিস অসংখ্য প্রখ্যাত আলেমের মতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাদিস। সেই হাদিস থেকে জানা যায়, হযরত উমর মুতা বিবাহকারীকে ব্যাভিচারের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেন নি। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, যেহেতু তিনি এই বিষয়ে পুর্ব ঘোষণা দেন নি, সেই কারণে সেই মুতা বিবাহকারীকে তিনি হত্যা করেন নি। কিন্তু মুতা বিবাহ নিষিদ্ধের নির্দেশ আল্লাহর নবী মুহাম্মদই যদি দিয়ে গিয়ে থাকেন, সেইখানে তো তার ঘোষণা দেয়া না দেয়া কোন গুরুত্ব বহন করে না। মুহাম্মদ সেটি নিষিদ্ধ করে থাকলে, তার কেন আবারো ঘোষণার প্রয়োজন? [125] –

মুয়াত্তা মালিক
২৮. বিবাহ সম্পর্কিত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ১৮. মুত‘আ বিবাহ প্রসঙ্গ
রেওয়ায়ত ৪২. খাওলা বিনত হাকিম (রাঃ) উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া বলিলেনঃ রবি’আ ইবন উমাইয়া (রাঃ) এক মুওয়াল্লাদা(1) নারীকে মুত’আ বিবাহ করেন এবং সে নারী গর্ভবতী হয়। উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) ইহা শুনিয়া ঘাবড়াইয়া গেলেন এবং আপন চাদর টানিতে টানিতে বাহির হইলেন। অতঃপর তিনি বলিলেনঃ মুত’আ নিষিদ্ধ। লোকদের মধ্যে যদি এ বিষয়ে আমি পূর্বে ঘোষণা করিতাম তবে এই (মুত’আর কারণে) ব্যভিচারীর প্রতি রজম (প্রস্তর নিক্ষেপ) করিতাম।
(1) মুওয়াল্লাদা : যে মহিলা আরব নহে কিন্তু তাহার জন্ম হইয়াছে আরবে এবং আরবীয় রীতিনীতি আদব-কায়দা মুতাবিক তাহাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হইয়াছে।
হাদিসের মানঃ তাহকীক অপেক্ষমাণ

এবারে আসুন আল্লামা সাইয়েদ আবু আলা মওদুদির তাফহীমুল কুরআন থেকে মুতা বিবাহ সম্পর্কিত একটি আলোচনা পড়ে নিই, [126] যেখানে বলা হচ্ছে, মুতাহ বিবাহ কোরআনের আয়াতের মাধ্যমে নয়, হাদিসের মাধ্যমে নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর প্রদত্ত মুতাহের বিধান নবী নিষিদ্ধ করেন কীভাবে? সূরা নিসার ২৪ নম্বর আয়াতটি রহিত হওয়ার আয়াত কোথায়?

চার : কোন কোন মুফাসির মুতা বিবাহ হারাম হবার বিষয়টিও এ আয়াত থেকে প্রমাণ করেছেন। তাঁদের যুক্তি হচ্ছে, যে মেয়েকে মুতা বিয়ে করা হয় সে না স্ত্রীর পর্যায়ভুক্ত, না বাঁদীর। বাঁদী তো সে নয় একথা সুস্পষ্ট, আবার স্ত্রীও নয়। কারণ স্ত্রীর মর্যাদা লাভ করার জন্য যতগুলো আইনগত বিধান আছে তার কোনটাই তার ওপর আরোপিত হয় না। সে পুরুষের উত্তরাধিকারী হয় না, পুরুষও তার উত্তরাধিকারী হয় না। তার জন্য ইদ্দত নেই, তালাকও নেই, খোরপোশ নেই এবং ঈলা, যিহার ও লি’আন ইত্যাদি কোনটিই নেই। বরং সে চার স্ত্রীর নির্ধারিত সীমানার বাইরে অবস্থান করছে।
কাজেই সে যখন “স্ত্রী” ও “বাঁদী” কোনটার সংজ্ঞায় পড়ে না তখন নিশ্চয়ই সে ‘এর বাইরে আরো কিছু’র মধ্যে গণ্য হবে। আর এ আরো কিছু যারা চায় তাদেরকে কুরআন সীমালংঘনকারী গণ্য করেছে। এ যুক্তিটি অনেক শক্তিশালী। তবে এর মধ্যে একটি দুর্বলতার দিকও আছে। আর এ দুর্বলতার কারণে এ আয়াতটির বলেই -যে, মুতা’ হারাম হয়েছে সে কথা বলা কঠিন। এ দুর্বলতাটি হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুতা’ হারাম হবার শেষ ও চূড়ান্ত ঘোষণা দেন মক্কা বিজয়ের বছরে। এর পূর্বে অনুমতির প্রমাণ সহী হাদীসগুলোতে পাওয়া যায়।
যদি একথা মেনে নেয়া হয় যে, মুতা হারাম হবার হুকুম কুরআনের এ আয়াতের মধ্যেই এসে গিয়েছিল আর এ আয়াতটির মক্কী হবার ব্যাপারে সবাই একমত এবং এটি হিজরতের কয়েক বছর আগে নাযিল হয়েছিল, তাহলে কেমন করে ধারণা করা যেতে পারে যে, নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা বিজয় পর্যন্ত একে জায়েয রেখেছিলেন? কাজেই একথা বলাই বেশী নির্ভুল যে, মুতা’ বিয়ে কুরআন মজীদের কোন সুস্পষ্ট ঘোষণার মাধ্যমে নয় বরং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের মাধ্যমেই হারাম হয়েছে। সুন্নাতের মধ্যে যদি এ বিষয়টির সুস্পষ্ট ফায়সালা না থাকতো তাহলে নিছক এ আয়াতের ভিত্তিতে এর হারাম হওয়ার ফায়সালা দেয়া কঠিন ছিল। মুতা’র আলোচনা যখন এসে গেছে তখন আরো দু’টি কথা স্পষ্ট করে দেয়া সংগত বলে মনে হয়। এক, এর হারাম হওয়ার বিষয়টি স্বয়ং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকেই প্রমাণিত। কাজেই হযরত উমর (রা) একে হারাম করেছেন, একথা বলা ঠিক নয়। হযরত উমর (রা) এ বিধিটির প্রবর্তক বা রচয়িতা ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন কেবলমাত্র এর প্রচারক ও প্রয়োগকারী। যেহেতু এ হুকুমটি রসূলুল্লাহ (সা) তাঁর আমলের শেষের দিকে দিয়েছিলেন এবং সাধারণ লোকদের কাছে এটি পৌছেনি তাই হযরত উমর (রা) এটিকে সাধারণ্যে প্রচার ও আইনের সাহায্যে কার্যকরী করেছিলেন। দুই, শীয়াগণ মুতা’কে সর্বতোভাবে ও শর্তহীনভাবে মুবাহ সাব্যস্ত করার যে নীতি অবলম্বন করেছেন কুরআন ও সুন্নাতের কোথাও তার কোন অবকাশই নেই। প্রথম যুগের সাহাবা, তাবেঈ ও ফকীহদের মধ্যে কয়েকজন যাঁরা এর বৈধতার সমর্থক ছিলেন তাঁরা শুধুমাত্র অনন্যোপায় অবস্থায় অনিবার্য পরিস্থিতিতে এবং চরম প্রয়োজনের সময় একে বৈধ গণ্য করেছিলেন। তাদের একজনও একে বিবাহের মতো শর্তহীন মুবাহ এবং সাধারণ অবস্থায় অবলম্বনযোগ্য বলেননি। বৈধতার প্রথক্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী উল্লেখযোগ্য হিসেবে পেশ করা হয় হযরত ইবনে আব্বাসের (রা) নাম। তিনি নিজের মত এভাবে ব্যক্ত করেছেন : (এ হচ্ছে মৃতের মতো, যে ব্যক্তি অনিবার্য ও অনন্যোপায় অবস্থার শিকার হয়েছে তার ছাড়া আর কারোর জন্য বৈধ নয়।) আবার তিনি যখন দেখলেন তাঁর এ বৈধতার অবকাশ- দানমূলক ফতোয়া থেকে লোকেরা অবৈধ স্বার্থ উদ্ধার করে যথেচ্ছভাবে মুতা’ করতে শুরু করেছে এবং তাকে প্রয়োজনের সময় পর্যন্ত মুলতবী করছে না তখন তিনি নিজের ফতওয়া প্রত্যাহার করে নিলেন। ইবনে আব্বাস ও তাঁর সমমনা মুষ্টিমেয় কয়েকজন তাঁদের এ মত প্রত্যাহার করেছিলেন কিনা এ প্রশ্নটি যদি বাদ দেয়াও যায় তাহলে তাদের মত গ্রহণকারীরা বড় জোর “ইতিরার” তথা অনিবার্য ও অনন্যোপায় অবস্থায় একে বৈধ বলতে পারেন। অবাধ ও শর্তহীন মুবাহ এবং প্রয়োজন ছাড়াই মুতা বিবাহ করা এমন কি বিবাহিত স্ত্রীদের উপস্থিতিতেও মুতা-বিবাহিত স্ত্রীদের সাথে যৌন সম্ভোগ করা এমন একটি সেচ্ছাচার যাকে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ রুচিবোধও কোনদিন বরদাশত করে না। ইসলামী শরীয়াত ও রসূল বংশোদ্ভূত ইমামদেরকে এর সাথে জড়িত মনে করার তো কোন প্রশ্নই ওঠে না। আমি মনে করি, শীয়াদের মধ্য থেকে কোন ভদ্র ও রুচিবান ব্যক্তিও তার মেয়ের জন্য কেউ বিবাহের পরিবর্তে মুতা’র প্রস্তাব দেবে এটা বরদাশত করতে পারেন না। এর অর্থ এ দাঁড়ায় যে, মুতা’র বৈধতার জন্য সমাজে বারবনিতাদের মতো মেয়েদের এমন একটি নিকৃষ্ট শ্রেণী থাকতে হবে যাদের সাথে মুতা’ করার অবাধ সুযোগ থাকে। অথবা মুতা’ হবে শুধুমাত্র গরীবদের কন্যা ও ভগিনীদের জন্য এবং তা থেকে ফায়দা হাসিল করার অধিকারী হবে সমাজের ধনিক ও সমৃদ্ধিশালী শ্রেণীর পুরুষেরা। আল্লাহ ও রসূলের শরীয়াত থেকে কি এ ধরনের বৈষম্যপূর্ণ ও ইনসাফবিহীন আইনের আশা করা যেতে পারে? আবার আল্লাহ ও তাঁর রসূল থেকে কি এটাও আশা করা যেতে পারে যে, তিনি এমন কোন কাজকে মুবাহ করে দেবেন যাকে যে কোন সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে নিজের জন্য অমর্যাদাকর এবং বেহায়াপনা মনে করে?

মুতা 11
মুতা 13

এবারে তাফসীরে জালালাইন থেকে এই বিষয়ের কিছু বক্তব্য পড়ি, [127]

সাময়িক বিয়ে বা মুতা দ্বারা লব্ধ মহিলা যে শরয়ী বাদী নয় তাতো স্পষ্টই। কারণ তাকে কেনা-বেচা করা যায় না, দান করা যায় না, এবং আজাদ করার বিধানও তার উপর জারি করা যায় না।
আর স্ত্রী যে নয় তাও সুস্পষ্ট। কারণ তাদেরকে খোদ শিয়াগণসহ কেহই স্ত্রী বলেন না। কেননা ঐ মহিলা ও মুতা কারী পুরুষের মধ্যে উত্তরাধিকার চলে না। অথচ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে থেকে একে অন্যের উত্তরাধিকারী হয়ে থাকে। যেমন-আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন- وَلَكُمْ نِصْفُ مَا تَرَكَ أَزْوَاجُكُم তমনিভাবে মুতা দ্বারা অর্জিত মহিলার জন্য পুরুষের উপর ভরণ-পোষণ, খানা-খোরাক ওয়াজিব হয় না এবং বাসস্থান দেওয়াও ওয়াজিব হয় না। তার সাথে ঐ মহিলার সন্তানের জন্য বংশীয় সম্পর্কও প্রমাণিত হয় না। এবং তালাক হদ ও মহরের কিছুই মুতার মধ্যে আসেনা। এতে বুঝা গেল, মুতার মহিলা স্ত্রী ও নয় এবং শরয়ী দাসীও নয়। তাই এদেরকে মুতার নামে ব্যবহার করা সম্পূর্ণরূপে হারাম।
عَنْ عَلِيِّ (رض) أَنَّ الرَّسُولَ اللَّهِ اللهُ نَهَى عَنْ مُتَعَةِ النِّسَاءِ وَعَنْ أَكْلِ لُحُومِ – 2009 (1) 1 2 2 الْعُمر الأنسية অর্থাৎ, হযরত আলী (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ মুতা [সাময়িক বিবাহ এবং পোষ্য গাধার মাংস খেতে নিষেধ করেছেন।
৩. হযরত রবী হতে বর্ণিত হাদীস-
روى عَنِ الرَّبِيعِ بْنِ سَيِّرَةَ الْجُهَنِي عَنْ أَبِيهِ قَالَ غَدَوْتُ عَلَى رَسُولِ اللهِ اللهُ فَإِذَا هُوَ قَائِمٌ بَيْنَ الرُّكْنِ وَالْمَقَامِ مسَّنِنَا ظَهْرَهُ إِلَى الْكَعْبَةِ يَقُولُ بَابَهَا النَّاسُ إِنِّي أَمَرْتُكُمْ بِالاسْتِمْتَاعِ مِنْ هَذِهِ النِّسَاءِ أَلَا وَإِنَّ اللَّهَ قَدْ حرَّمَهَا عَلَيْكُمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ فَمَنْ كَانَ عِنْدَهُ مِنْهُنَّ نِسَى فَلْبُخَلَ سَبِيلَهَا وَلَا تَأْخُذُوا مِمَّا أَتَيْتُمُوهُنَّ شَيْئًا – وَرُوِيَ عَنْهُ اللهُ أَنَّهُ قَالَ مُنْعَةُ النِّسَاءِ حَرَامٌ .
অর্থাৎ, হযরত রবী বিন সাবুরা জুহানী তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি এক সকালে রাসূলে কারীম -এর নিকট গিয়ে দেখতে পেলাম, তিনি রুকন ও মাকামে ইবরাহীমের মধ্যখানে কাবার দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে
আছেন, তখন তিনি বলতে ছিলেন, লোক সকল! আমি তোমাদেরকে এসব মহিলাদের সাথে মুতা করতে অনুমতি দিয়েছিলাম বটে, তবে জেনে রাখো। আল্লাহ পাক অবশ্যই কিয়ামত পর্যন্তের জন্য একে তোমাদের উপর হারাম করে দিয়েছেন। সুতরাং মুতার কোনো মহিলা যার কাছে রয়েছে সে যেন তাকে অবশ্যই বিদায় দিয়ে দেয়। আর তাদেরকে যা কিছু তোমরা দিয়েছ তার কিছু ফেরত আনতে পারবে না।
তিনি আরো বলেছেন- মুতা বা নারীদেরকে সাময়িকভাবে বিবাহ করা হারাম। উপরোক্ত হাদীস তিনটি ওয়াহিদী তার আল
বসীত গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।
৪. হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) সাহাবায়ে কেরামের সামনে তাঁর খোতবার মধ্যে মুতাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তাঁর এ নিষেধের উপর একজন সাহাবীও প্রতিবাদ করেন নি। এতে বুঝা গেল, সাহাবাদের মুতা হারাম হওয়ার ব্যাপারটা জানা ছিল। নতুবা অবশ্যই কেউ না কেউ প্রতিবাদ করতেন। এতে করে ইজমায়ে সাহাবা দ্বারাও মুতা হারাম প্রমাণিত হয়েছে।
চারো মাজহাবের ইমামসহ সকল আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের ওলামাদের ঐকমত্যে মুতা হারাম। ইমাম সারখসী ও হেদায়া প্রণেতা মালেক (র.)-এর প্রতি যে মুতার বৈধতার সম্পর্ক করেছেন, ইবনে হুমাম প্রমুখ ওলামাদের মতে তাদের এ সম্পর্ক করাটা ঠিক নয়। বরং ইমাম মালেক (র.)-এর মতেও মৃতা হারাম। তার মাজহাবই এর প্রকৃষ্ঠ প্রমাণ।
কেবলমাত্র শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরাই বলে মুতা জায়েজ।
আর হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) প্রথমে জায়েজ ফতোয়া দিয়ে থাকলে পরবর্তীতে তিনি তার সেই মত প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর এ মত থেকে তওবা করেছেন। বিস্তারিত জানতে হলে তাফসীরে কাবীর দেখুন।
খ. ৫, পৃ. ৫১-৫৩)

–

মুতা 15

এবারে আসুন তাহাবী শরীফ থেকে কয়েকটি হাদিস দেখে নেয়া যাক, [128] –

৪০০৩. রাবী’ আল-জীযী (র) আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, সাময়িক বিয়ে এ উম্মতের জন্যে আল্লাহ্ তা’আলার একটি করুণা হিসেবে গণ্য ছিল। যদি উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) সাময়িক বিয়ে হতে নিষেধ না করতেন তাহলে হতভাগা ব্যতীত অন্য কেউ ব্যভিচারের শিকার হতনা। বর্ণনাকারী আরো বলেন, এখনও যেন আমি আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা) হতে لا شقى। কথাটির উচ্চারণ শুনছি।

মুতা 17

মুতা বিবাহ হারাম করা হয়েছে

অসংখ্য সহিহ হিসেবে গৃহীত হাদিসে মুহাম্মদের নামে মুতা বিবাহ নিষিদ্ধ করার বর্ণনাও রয়েছে, সেটি অস্বীকার করা সম্ভব নয়। সমস্যাটি অন্য জায়গায়: নিষেধটি কখন হয়েছিল, সেটি বিভিন্ন বর্ণনায় বিভিন্ন সময়ে চলে যাচ্ছে; আবার মুহাম্মদের মৃত্যুর পরেও সাহাবীদের মুতা করার বর্ণনা রয়েছে। ফলে প্রশ্ন হচ্ছে, এই নিষেধের বর্ণনাগুলোকে ইতিহাসের সঙ্গে কীভাবে মেলানো হবে এবং উমরের প্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞার ভূমিকা আসলে কী ছিল। আসুন আগে হাদিসগুলো দেখি [129] –

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৪/ বিয়ে-শাদী
পরিচ্ছেদঃ ২৪৫৭. অবশেষে রাসূল (সা) মুতা’আ বিবাহ নিষেধ করেছেন
৪৭৪৪। আলী (রহঃ) … জাবির ইবনু আবদুল্লাহ এবং সালামা আকওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, আমরা কোন এক সেনাবাহিনীতে ছিলাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রেরিত এক ব্যাক্তি আমাদের নিকট এসে বললেন, তোমাদেরকে মুতা’আ বিবাহের অনুমতি দেয়া হয়েছে। সুতরাং তোমরা মুতা’আ করতে পার। ইবনু আবূ যিব বলেন, আয়াস ইবনু সালামা ইবনু আকওয়া তার পিতা সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, যে কোন পুরুষ এবং মহিলা উভয়ে (মুতা’আ করতে) একমত হলে তাদের পরস্পরের এই সম্পর্ক তিন রাতের জন্য গণ্য হবে। এরপর তারা ইচ্ছা করলে এর চেয়ে বেশি সময় স্থায়ী করতে পারে অথবা বিচ্ছিন্ন হতে চাইলে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। (বর্ণনাকারী বলেন) আমরা জানিনা এ ব্যবস্থা শুধু আমাদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল, না সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল। আবূ আবদুল্লাহ (ইমাম বুখারী) বলেন, আলী (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এটা পরিস্কার করে বলে দিয়েছেন, মুতা’আ বিবাহ প্রথা রহিত হয়ে গেছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

এবারে আসুন আলীর সূত্র থেকে পাওয়া হাদিসগুলো দেখি [129] [130] [131] [132] –

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৪/ বিয়ে-শাদী
পরিচ্ছেদঃ ২৪৫৭. অবশেষে রাসূল (সা) মুতা’আ বিবাহ নিষেধ করেছেন
৪৭৪২। মালিক ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) … হাসান ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আলী ও তাঁর ভাই আবদুল্লাহ তাঁদের পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, আলী (রাঃ) ইবনু আব্বাস বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বর যুদ্ধে মুতা’আ বিবাহ এবং গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়া নিষেধ করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সূনান নাসাঈ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৬/ নিকাহ (বিবাহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭১. মুত’আ হারাম হওয়া সম্পর্কে
৩৩৭০. আমর ইবন আলী, মুহাম্মাদ ইবন বাশশার এবং মুহাম্মাদ ইবন মুসান্না (রহঃ) … মালিক ইবন আনাস অবহিত করেছেন যে, ইবন শিহাব (রহঃ) তাকে অবহিত করেছেন, মুহাম্মাদ ইবনু আলীর দুই ছেলে আবদুল্লাহ এবং হাসান তাকে অবহিত করেছেন যে, তাদের পিতা মুহাম্মাদ ইবন আলী তাদের অবহিত করেছেন। আলী ইবন আবূ তালিব (রাঃ) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারের দিন মেয়েদের সাথে মুত’আ করা হতে নিষেধ করেছেন। ইবন মুসান্না (রহঃ) বলেছেনঃ হুনায়নের দিন। তিনি বলেন, আবদুল ওয়াহহাব তার কিতাব থেকে আমাদের নিকট এমনই বর্ণনা করেছেন।
তাহক্বীকঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু আনাস (রহঃ)

সূনান নাসাঈ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৩/ শিকার ও যবেহকৃত জন্তু
পরিচ্ছেদঃ ৩১. পালিত গাধার গোশত খাওয়া হারাম
৪৩৩৫. মুহাম্মাদ ইবন মানসূর ও হারিস ইবন মিসকীন (রহঃ) … মুহাম্মাদ (রহঃ) বলেন, আলী (রাঃ) ইবন আব্বাস (রাঃ)-কে বললেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বরের দিন মুত’আ বিবাহ এবং গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেন।
তাহক্বীকঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সূনান তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৮/ খাদ্য সম্পর্কিত
পরিচ্ছেদঃ গৃহপালিত গাধার গোশত।
১৮০১। মুহাম্মদ ইবনু বাশশার ও ইবনু আবূ উমার (রহঃ) … আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, খায়বার যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে মুত’আ বিবাহ এবং গৃহপালিত গাধার গোশত আহার থেকে নিষেধ করেছেন। সহীহ, ইবনু মাজাহ ১৯৬১, নাসাঈ, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ১৭৯৪ (আল মাদানী প্রকাশনী)
সাঈদ ইবনু আবদুর রহমান মাখযূমী (রহঃ) … মুহাম্মদ ইবনু আলীর দুই পুত্র আবদুল্লাহ ও হাসান (রহঃ) থেকে বর্ণিত যুহরী (রহঃ) বলেন, এই দুই জনের মধ্যে হাসান ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ)-ই হলেন, অধিক সন্তোষজনক। সাঈদ ইবনু আবদুর রহমান ব্যতীত অন্যরা ইবনু উয়ায়না (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, এদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) হলেন অধিক সন্তোষজনক। ইমাম আবূ ঈসা (রহঃ) বলেন, এই হাদীসটি হাসান-সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আলী ইবনু আবী তালিব (রাঃ)


খায়বারে মুতা নিষিদ্ধ হয়েছিল: সুন্নি আলেমদের আপত্তি

খায়বারের দিনে মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার এই বর্ণনাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরবর্তী সময়ের সহিহ হাদিসেই আবার মুতা বৈধ করার কথা পাওয়া যায়। এই অসঙ্গতি শুধু শিয়াদের উত্থাপিত আপত্তি নয়; সুন্নি হাদিসব্যাখ্যার ভেতরেও খায়বারের তারিখটি নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ইবনে হাজার আসকালানী ফাতহুল বারী-তে সুহাইলীর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন যে, খায়বারের দিনে মুতা বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি সীরাত ও আছারের বর্ণনাকারীদের কাছে পরিচিত নয়। তাঁর মতে, যুহরীর বর্ণনায় শব্দের আগে-পরে হওয়ার সমস্যা ঘটে থাকতে পারে—খায়বারের সঙ্গে নিষেধটি ছিল গৃহপালিত গাধার মাংসের, মুতা বিবাহের নয়। [133]

একই আলোচনায় ইবনে উয়াইনার ব্যাখ্যাও উদ্ধৃত হয়েছে—খায়বারে নিষেধ ছিল গৃহপালিত গাধার মাংসের ব্যাপারে, মুতা বিবাহের ব্যাপারে নয়। ইবনে আবদুল বার বলেন, অধিকাংশের অবস্থানও এটিই। আবু আওয়ানা তাঁর সহিহ-তে আলেমদের কাছ থেকে যে ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করেছেন সেটিও আরও পরিষ্কার: আলীর হাদিসে খায়বারের দিনে গাধার মাংস নিষিদ্ধ হওয়ার কথা বলা হয়েছে; মুতা সম্পর্কে সেখানে নীরব থাকা হয়েছে, আর মুতা নিষিদ্ধ হয়েছিল মক্কা বিজয়ের সময়। শাওকানীর নাইলুল আওতার-এও এই মতগুলো সংরক্ষিত হয়েছে। [134]

এই আপত্তির কারণটিও খুব স্বাভাবিক: খায়বারের পরে আবার মুতা করার অনুমতির সহিহ বর্ণনা রয়েছে। ফলে খায়বারেই যদি মুতা চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী অনুমতিগুলোকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে সুন্নি ব্যাখ্যাকারদের কেউ বলেছেন নিষেধটি কয়েকবার হয়েছে, কেউ বলেছেন খায়বারের তারিখটি শুধু গাধার মাংসের জন্য, আবার কেউ পরবর্তী অনুমতিকে অল্প সময়ের বিশেষ ছাড় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার ইতিহাসটি হাদিসের ভেতরেই একেবারে সরল ও একরৈখিক নয়।

এখন বর্ণনাগুলোর সময়ক্রম পাশাপাশি রাখলে সমস্যাটি আরও পরিষ্কার হয়। আলীর সূত্রের একাধিক হাদিসে খায়বারের দিনে মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার কথা এসেছে। কিন্তু তার পরবর্তী সময়েই আবার মক্কা বিজয়ের সময় মুহাম্মদ সাহাবীদের মুতা করার অনুমতি দিয়েছেন—সহিহ মুসলিমে সাবরা জুহানীর সূত্রে সেই বর্ণনা রয়েছে। এরপর আওতাসের বছরও তিন দিনের জন্য মুতা করার অনুমতি এবং তারপর নিষেধের কথা পাওয়া যায়। অর্থাৎ একটি নিষেধাজ্ঞার পরেই আবার অনুমতি, তারপর আবার নিষেধ—এই চিত্রটি হাদিসের নিজেদের মধ্যেই রয়েছে।

আর মতভেদ শুধু খায়বার, মক্কা বিজয় ও আওতাসেই সীমাবদ্ধ নয়। ইবনে হাজার ফাতহুল বারী-তে মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার বর্ণিত সময়গুলো একত্র করতে গিয়ে খায়বার, উমরাতুল ক্বাযা, মক্কা বিজয়, আওতাস, তাবুক এবং বিদায় হজ—এমন ছয়টি স্থান/সময় উল্লেখ করেছেন; হুনাইনের একটি বর্ণনাও রয়েছে। অর্থাৎ পরবর্তী সুন্নি হাদিসব্যাখ্যাকারদের সামনেও প্রশ্নটি ছিল—মুতা আসলে কখন চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ হয়েছিল? বিভিন্ন বর্ণনায় একাধিক ভিন্ন সময় পাওয়া যাওয়ায় তাদের এগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করতে হয়েছে। [135]

[136]। তখন আবারো মুতাহ বিবাহের অনুমতি দেয়া হয়েছিল।

ইমাম বুখারী মুহাম্মাদ ইবন আলা আবু মুসা (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, হুনায়ন যুদ্ধ শেষ করার পর রাসুলুল্লাহ্ (সা) আবু আমির (রা)-এর নেতৃত্বে একটি সৈন্যদল আওতাস গোত্রের দিকে পাঠান ৷

আরো একটি হাদিস পড়ি [137] –

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৮৮। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … আয়্যাশ ইবনু সালামা (রহঃ) থেকে তার পিতার সুত্রে বর্ণিত। তিনি (পিতা) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আওতাস যুদ্ধের বছর তিন দিনের জন্য মুতআ বিবাহের অনুমতি দিয়েছিলেন। তারপর তিনি তা নিষিদ্ধ করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


ইবনে আব্বাসের বিরুদ্ধ মত

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ছিলেন নবী মুহাম্মাদের একজন বিখ্যাত সাহাবী এবং মুহাম্মাদের চাচা আব্বাসের ছেলে। ইবনে আব্বাস ছিলেন একজন বিশিষ্ট সুবিজ্ঞ ফকিহ ও আল-কুরআনের তাফসীরের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় মুফাস্‌সির। মুসলিম বিশ্বে তাকে রইসুল মুফাস্‌সিরিন বা সাইয়্যিদুল মুফাস্‌সিরিন বলা হয়। ইবনে আব্বাস মুহাম্মদের বিখ্যাত সাহাবী, যার জ্ঞানের প্রশংসা খোদ মুহাম্মদ করতেন। আল্লাহর কাছে তিনি ইবনে আব্বাসের জ্ঞান বৃদ্ধি করার প্রার্থনাও করতেন। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব হযরত ইবনে আব্বাস সম্পর্কে বলেন, “ইবনে আব্বাস তোমাদের সকলের অপেক্ষা বড় বিদ্বান।” উমর তার সম্পর্কে আরও বলতেন যে, “সে বয়সে তরুণ, জ্ঞানে প্রবীণ !” ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী তার সম্পর্কে বলেন, “কুরআন কারিমের তাফসীর বর্ণনার সময় মনে হয় যেন তিনি (ইবনে আব্বাস) একটি স্বচ্ছ পর্দার অন্তরাল হতে অদৃশ্য বস্তুসমূহ প্রত্যক্ষ করছেন ” প্রখ্যাত সাহাবী ইবনে মাসউদ বলতেন, “ইনি কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার।” ইবনে উমর বলতেন, “মুহাম্মাদের উপর যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে তৎসম্পর্কে ইবনে আব্বাস এই উম্মাতের মধ্যে সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী।”

সেই ইবনে আব্বাস কিন্তু মুতা বিবাহের পক্ষে বলেছিলেন এবং উমরের ফতোয়াকে মেনে নেন নি। ইবনে আব্বাসকে সেই কারণে হত্যা করার হুমকিও দেয়া হয়েছিল। অনেকগুলো তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, ইবনে আব্বাস নাকি শেষ জীবনে মুতা বিবাহকে হারাম করার উমরের ফতোয়া মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু এই তথ্যটি সঠিক কিনা তা নিয়ে প্রচুর সন্দেহ আছে। কারণ ইবনে আব্বাস খুব দৃঢ়ভাবেই মুতা বিবাহের পক্ষে কথা বলতেন। উনার পক্ষে এরকম করাটি খুবই অস্বাভাবিক বিষয়।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়গত সমস্যা রয়েছে। প্রচলিত সুন্নি ব্যাখ্যায় প্রায়ই বলা হয়, আলী ইবনে আব্বাসকে খায়বারে মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পর ইবনে আব্বাস নিজের মত প্রত্যাহার করেছিলেন। কিন্তু সুন্নি তাফসীরকার আলুসী রূহুল মাআনী-তে স্পষ্টভাবে লিখেছেন, সহিহ মুসলিমের ইবনে যুবায়ের ও ইবনে আব্বাসের বিতর্কটি ঘটেছিল আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের খেলাফতের সময়—অর্থাৎ আলীর মৃত্যুর পরে। সেই সময়েও ইবনে আব্বাস প্রকাশ্যে বলছিলেন যে, “ইমামুল মুত্তাকীন” মুহাম্মদের যুগে মুতা করা হতো এবং তিনি তখনও এর পক্ষে ফতোয়া দিচ্ছিলেন। আলুসী নিজেই এর ভিত্তিতে বলেন, আলী তাঁকে বলার পরপরই ইবনে আব্বাস মত পরিবর্তন করেছিলেন—এ কথা সহিহ মুসলিমের এই বর্ণনার সঙ্গে মেলে না। [138]

অবশ্য পরবর্তী সময়ে ইবনে আব্বাস মত প্রত্যাহার করেছিলেন—এমন আলাদা বর্ণনাও সুন্নি গ্রন্থে রয়েছে। কিন্তু তাতে অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার: “আলী ভুল ধরিয়ে দিলেন এবং ইবনে আব্বাস তখনই মুতার বৈধতার মত ছেড়ে দিলেন”—এই সরল গল্পটি ঠিক নয়। আলীর মৃত্যুর পরেও ইবনে আব্বাসের নামে মুতা বৈধতার প্রকাশ্য ফতোয়া সংরক্ষিত হয়েছে, এবং সেই ফতোয়ার কারণেই ইবনে যুবায়ের তাঁকে রজমের হুমকি দেন। নিচের হাদিসটি দেখুন [139] –

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৯৯। হারামালা ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) … উরওয়া ইবনু যুবায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র (রাঃ) মক্কায় (ভাষণ দিতে) দাঁড়িয়ে বললেন, কিছু লোক এমন আছে আল্লাহ যেমন তাদের চোখ অন্ধ করে দিয়েছেন তেমনি অন্তরকেও অন্ধ করে দিয়েছেন। তারা মুতআর পক্ষে ফাতওয়া দেয়। একথা বলে তিনি এক ব্যক্তির প্রতি ইঙ্গিত করলেন। সে ব্যক্তি ইবনু আব্বাস (রাঃ)। তিনি তাঁকে ডাক দিয়ে বললেন, তুমি একটি অসভ্য ও রুঢ় ব্যক্তি। আমার জীবনের শপথ! ইমামুল মুত্তাকীন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে মুত’আ প্রচলিত ছিল। ইবনু যুবায়র (রাঃ) তাকে বললেন, আপনি নিজে একবার করে দেখুন। আল্লাহর শপথ! আপনি যদি তা (মুতআ) করেন তাহলে আপনার জন্য নির্ধারিত পাথর দিয়েই আপনাকে রজম (পাথর নিক্ষেপে হত্যা) করব।
ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন, খালিদ ইবনুল মুহাজির ইবনু সায়ফুল্লাহ (রহঃ) আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি এক ব্যক্তির নিকট বসাছিলেন। এই সময় এক ব্যক্তি এসে তাকে মুত’আ সম্পর্কে ফাতওয়া জিজ্ঞেস করে। তিনি তাকে মুতআর অনুমতি দিলেন। ইবনু আবূ উমরা আনসারী (রাঃ) তাকে বললেন, থামুন। সে বলল, কেন? আল্লাহর শপথ! ইমামুল মুত্তাকীন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে তা করা হত। ইবনু আবূ উমরা (রাঃ) বললেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগে নিরুপায় অবস্থায় তার অনুমতি ছিল (যেমন নিরুপায় অবস্থায়) মৃত জীব, রক্ত ও শুকরের (গোশত ভক্ষণের) ন্যায়। অতঃপর আল্লাহ তার দ্বীনকে শক্তিশালী এবং সুদৃড় করলেন এবং তা নিষিদ্ধ করলেন।
ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন, রাবী ইবনু সাবরা জুহানী আমাকে জানিয়েছেন যে, তাঁর পিতা বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে আমি দুটি লাল চাঁদরের বিনিময়ে আমির গোত্রের একটি স্ত্রীলোকের সাথে মুত’আ করেছিলাম। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মুত’আ করতে নিষেধ করেন। ইবনু শিহাব (রহঃ) আরও বলেন, আমি রাবী ইবনু সাবরাকে উমর ইবনু আবদুল আযীয (রহঃ) এর নিকট তা বর্ণনা করতে শুনেছি, আমি তখন (সেখানে) বসা ছিলাম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উরওয়াহ বিন যুবাইর (রা.)


ইমাম মালিক এবং আহমদ বিন হাম্বল

এবারে আশরাফুল হিদায়া থেকেও মুতাহ বিবাহ সম্পর্কে পড়ি, [140] যেখানে হিদায়া গ্রন্থকারের সূত্রে ইমাম মালিকের নামে মুতা বৈধ হওয়ার মত উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একই উদ্ধৃতির শেষাংশে ব্যাখ্যাকার এই মত মালিকের নামে আরোপ করাকে ভুল বলেছেন। সেই সাথে এটিও বলা হয়েছে, মুতা বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে সম্মিলিত ইজমার মাধ্যমে। সেটি নবীর নির্দেশ হয়ে থাকলে ইজমার প্রয়োজন কেন হলো, সেটিও একটি প্রশ্ন!

وَنِكَاحُ الْمُتْعَةِ بَاطِلٌ وَهُوَ أَنْ يَقُولَ لِاِمْرَأَةِ أَتَمَتَّعُ بِكِ كَذَا مُدَّةٌ بِكَذَا مِنَ الْمَالِ وَقَالَ مَالِكَ (رح) هُوَ جَائِزٌ لِأَنَّهُ كَانَ مُبَاحًا فَيَبْقَى إِلَى أَنْ يَظْهَرَ نَاسِخَةُ قُلْنَا ثَبَتَ النَّسْعُ بِإِجْمَاعِ الصَّحَابَةِ وَابْنِ عَبَّاسٍ (رض) صَحَ رُجُوعُهُ إِلَى قَوْلِهِمْ فَتَقَرَّرَ الْإِجْمَاعُ.
অনুবাদ: মুতা বিবাহ বাতিল। মুতা বিবাহের অর্থ- পুরুষ কোনো স্ত্রীলোককে বলল, আমি এ পরিমাণ মালের
বিনিময়ে এতদিনের জন্য তোমাকে ভোগ করব। ইমাম মালেক (র.) বলেন, এটা জায়েজ আছে। কেননা, মূলত এটা জায়েজ ছিল, সুতরাং রহিতকারী সাব্যস্ত হওয়া পর্যন্ত বৈধতা অব্যাহত থাকবে। আমাদের দলিল হলো, সাহাবায়ে কেরামের ইজমা-এর মাধ্যমে [মুতার বৈধতা) রহিত হওয়া সাব্যস্ত হয়েছে। আর এ কথা বিশুদ্ধরূপে প্রমাণিত হয়েছে যে. হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) সাহাবায়ে কেরামের মতের অনুকূলে স্বীয় মত প্রত্যাহার করেছেন। সুতরাং ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
প্রাসঙ্গিক আলোচনা
قَوْلُهُ وَنِكَاحُ الْمُنْعَةِ بَاطِلُ الحَ : মুভা বলা হয়, কোনো নারীকে এ কথা বলা যে-
اتمتع بك كَذَا مُدَّةٌ بِكَنَا مِنَ الْمَالِ : অর্থাৎ, ‘নির্দিষ্ট পরিমাণ মালের বিনিময়ে নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত আমি মোতাকে ভোগ করব।’ সকল ইমাম মুতা হারাম হওয়ার প্রবক্তা। অবশ্য ইমাম মালেক (র.) ভিন্নমত পোষণ করেন। হিদায়া গ্রন্থকারের বর্ণনা মতে, ইমাম মালেক (র.) বলেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুতা জায়েজ ছিল। সুতরাং তার বৈধতা ততক্ষণ পর্যন্ত বাকি থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো রহিতকারী না পাওয়া যাবে। আর যেহেতু রহিতকারী এখনো আসেনি তাই মুতা বৈধ-ই থাকবে। কিন্তু হিদায়া গ্রন্থকার (র.) এর জবাবে বলেন যে, মুতা হারাম হওয়ার উপর সাহাবায়ে কেরামের ইজমা রয়েছে। সুতরাং এটাই রহিতকারী। কিন্তু এ জবাবের উপর এ প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, মুতা হারাম হওয়ার উপর সাহাবায়ে কেরামের ইজমা বলা ঠিক নয়। কেননা, ইজমা -এর জমানায় হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) মুতা জায়েজ হওয়ার অভিমত পেশ করেছিলেন। এর জবাব হলো, একবার হযরত আলী (রা.) হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-কে বলেছিলেন, আপনার কি জানা নেই যে, রাসূলুল্লাহ হারে খায়বারের দিনে মুতাকে হারাম করে দিয়েছেন? একথা শ্রবণে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) তাঁর পূর্বোক্ত অভিমত প্রত্যাহার করেছেন এবং মুতা জায়েজ হওয়ার পক্ষে নিজের মতামত হতে তওবা করেছেন। সুতরাং হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-ও যখন স্বীয় মত পরিত্যাগ করলেন, তখন তো মুতা হারাম হওয়ার উপর ইজমা সংঘটিত হয়ে গেল।
মুতা খায়বারের পূর্বে হালাল ছিল, কিন্তু খায়বারের দিন রাসূলুল্লাহ
গৃহপালিত গাধার গোশ্ত ও নারীদের সাথে মুতাকে হারাম করে দিয়েছেন। তারপর মক্কা বিজয়ের বছর আওতাসের দিনে তিনদিনের জন্য মুতা হালাল করা হয়েছিল। পরে চতুর্থবার কিয়ামত পর্যন্ত হারাম করে দিয়েছেন। এখানে এ কথাও জানা থাকা আবশ্যক যে, হিদায়া গ্রন্থকার ইমাম মালেক (র.)-এর মাযহাব বর্ণনা করতে গিয়ে ভ্রমতার পরিচয় দিয়েছেন। কারণ, মালেকীগণের কোনো কিতাবে মুতা বৈধ হওয়ার কথা বর্ণিত হয়নি। স্বয়ং ইমাম মালেক (র.) তাঁর মুয়াত্তার মধ্যে হযরত আলী (রা.)-এর হাদীস বর্ণনা করেছেন- إِنَّ رَسُولَ اللهُ تَهَى عَنْ مُنْعَةِ النِّسَاءِ وَعَنْ لُحُوْمِ الْعُسْرِ الْأَهْلِيَّةِ مِنْ خَبْبَرٌ অর্থাৎ, নবী করীম খায়বার দিবসে মুতা বিবাহ এবং গৃহপালিত গাধার গোশত থেকে নিষেধ করেছেন।’ আইনী শরহে হিদায়া।
ইমাম মালেক (র.)-এর আদত বা বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি তাঁর মুয়াত্তায় সে হাদীসটিই আনয়ন করেন যা তাঁর মাযহাব। সুতরাং উক্ত হাদীসটিও মুয়াত্তায় স্থান পাওয়া এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, ইমাম মালেক (র.)-ও মুতা হারাম হওয়ার প্রবক্তা।

মুতা 19

ইবনে কাসীরের সংরক্ষিত আলোচনায় ইবনে আব্বাসসহ একদল সাহাবীর নামে প্রয়োজন ও পরিস্থিতি সাপেক্ষে মুতার বৈধতা অব্যাহত থাকার মত বর্ণিত হয়েছে এবং আহমদ ইবনে হাম্বলের নামেও এমন একটি বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ পরবর্তী সুন্নি ঐকমত্যের চিত্র যতটা একরৈখিকভাবে উপস্থাপন করা হয়, প্রাচীন মতবিবরণের ভেতরে বিষয়টি ততটা সরল ছিল না। [141] –

তিনি আরও বলিয়াছেন:
وَأْتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً.
অর্থাৎ ‘তোমরা খুশিমনে স্ত্রীদিগকে তাহাদের মাহর প্রদান কর।’
অন্যত্র তিনি বলিয়াছেন:
وَلَا يَحِلُّ لَكُمْ أَنْ تَأْخُذُوا مِمَّا أَتَيْتُمُوهُنَّ شَيْئًا.
অর্থাৎ ‘তোমরা স্ত্রীদিগকে যাহা কিছু প্রদান করিয়াছ, তাহা হইতে কিছু ফিরাইয়া নেওয়া তোমাদের জন্যে বৈধ নয়।’
এই আয়াতের সাধারণ অর্থ দ্বারা মুত’আ বিবাহের সমর্থনে দলীল গ্রহণ করা হইয়া থাকে।
তবে এই কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ইসলামের প্রথম যুগে ইহা জায়েয ছিল ও পরে ইহা রহিত করা হয়।
ইমাম শাফিঈ (র) সহ আলিমদের একটি দল বলেন: মুত’আ একবার বৈধ করা হয়, কিন্তু তাহাও রহিত করা হয়। মোট কথা দুইবার বৈধ করা হইয়াছে এবং দুইবার রহিত করা হইয়াছে।
অপর একদল বলেন: ইহা কয়েকবার বৈধ করা হয় এবং কয়েকবার রহিত করা হয়।
আলিমদের অন্য একটি দল বলেন: ইহা একবার বৈধ করা হইয়াছিল এবং পরে ইহার বৈধতা রহিত করা হয়। অতঃপর ইহাকে বৈধ করা হয় নাই।
হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) সহ সাহাবাদের একটি দল হইতে বর্ণিত হইয়াছে যে, প্রয়োজন ও পরিস্থিতি সাপেক্ষে উহা জায়েয রহিয়াছে। ইমাম আহমদ (র) হইতেও উহা বর্ণিত হইয়াছে।
হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) উবাই ইব্‌ন কা’ব (রা), সাঈদ ইব্‌ন জুবায়র (রা) এবং সুদ্দী প্রমুখের কিরাআতে রহিয়াছে:

মুতা 21

উপসংহার

ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুতা বিবাহ যে বৈধ ছিল, সেটি কোনো বিতর্কিত আধুনিক ব্যাখ্যা কিংবা পরবর্তী শিয়া ধর্মতত্ত্বের উদ্ভাবন নয়। সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম এবং অন্যান্য সুন্নি হাদিসগ্রন্থেই মুহাম্মদের সরাসরি অনুমতিতে সাহাবীদের মুতা বিবাহ করার বিবরণ সংরক্ষিত রয়েছে। এসব বর্ণনায় নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নারীদের সঙ্গে যৌনসম্পর্কের চুক্তি, বিনিময় হিসেবে কাপড়, খেজুর বা ময়দা দেওয়া এবং মেয়াদ শেষ হলে সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা পাওয়া যায়। সাবরা ইবন মাবাদের বর্ণনায় একটি চাদরের বিনিময়ে তিন রাতের মুতা বিবাহের বিস্তারিত ঘটনা রয়েছে। জাবির ইবন আবদুল্লাহ জানিয়েছেন, তাঁরা মুহাম্মদের যুগে, আবু বকরের খেলাফতে এবং উমরের সময়েও মুতা করেছেন। ফলে মুতা বিবাহ ইসলামের প্রথম যুগে শুধু আইনগতভাবে অনুমোদিত ছিল না; এটি বাস্তবে প্রচলিত একটি যৌনসম্পর্কের ব্যবস্থা ছিল, যার অনুমোদন ও চর্চার বিবরণ ইসলামি উৎসগুলোতেই সংরক্ষিত হয়েছে।

সাহাবীদের ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনাগুলো এই ইতিহাসকে আরও নির্দিষ্ট করে তোলে। মুয়াবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান তায়েফে মুআনা নামের একজন মুক্তদাসীর সঙ্গে মুতা বিবাহ করেছিলেন বলে আবদুর রাজ্জাকের মুসান্নাফে বর্ণিত হয়েছে। পরবর্তীকালে মুয়াবিয়ার খেলাফতকাল পর্যন্ত ওই নারী জীবিত ছিলেন এবং মুয়াবিয়া তাঁকে নিয়মিত উপহার পাঠাতেন। আমর ইবন হুরায়সের মুতা-বিবাহিত নারী গর্ভবতী হওয়ার ঘটনা উমরের কাছে পৌঁছেছিল। সালামাহ ইবন উমাইয়া ও রাবিআ ইবন উমাইয়ার নামেও মুতা বিবাহ ও গর্ভধারণের বিবরণ রয়েছে। ইবনে হাযম তাঁর আল-মুহাল্লা গ্রন্থে মুহাম্মদের মৃত্যুর পরেও মুতা বৈধ মনে করতেন এমন একাধিক সাহাবির নাম সংরক্ষণ করেছেন। অন্যদিকে শিয়া হাদিসগ্রন্থে আলী ইবন আবু তালিবের কুফায় বনু নাহশাল গোত্রের একজন নারীকে মুতা বিবাহ করার বর্ণনা রয়েছে। অর্থাৎ ইসলামের প্রথম যুগের মুতা বিবাহের ইতিহাস কেবল কয়েকজন অজ্ঞাত সৈনিকের সাময়িক যৌনসম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; ইসলামের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামও এই প্রথার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, শিয়া হাদিস ও ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে মুহাম্মদের নিজের মুতা বিবাহের বিবরণও সংরক্ষিত রয়েছে। শায়খ সদুকের মান লা ইয়াহদুরুহুল ফাকিহ গ্রন্থে জাফর আল-সাদিককে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল, মুহাম্মদ নিজে মুতা করেছিলেন কি না। তিনি সম্মতিসূচক উত্তর দিয়ে সূরা তাহরিমের আয়াত উল্লেখ করেন। মুহাম্মদ আল-বাকিরের নামে সংরক্ষিত অন্য একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, মুহাম্মদ একজন স্বাধীন নারীর সঙ্গে নির্দিষ্ট মেয়াদের বিবাহ করেছিলেন। তাঁর একজন স্ত্রী বিষয়টি জানতে পেরে তাঁকে অবৈধ যৌনসম্পর্কের অভিযোগে অভিযুক্ত করলে মুহাম্মদ সম্পর্কটিকে বৈধ এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের বিবাহ বলে উল্লেখ করেন। এরপর তিনি স্ত্রীকে বিষয়টি গোপন রাখতে বলেন, কিন্তু সেই কথা তাঁর অন্য একজন স্ত্রীর কাছে প্রকাশিত হয়। এই বিবরণগুলো শিয়া ইসলামি সাহিত্যে মুহাম্মদের ব্যক্তিগত মুতা-বিবাহের নির্দিষ্ট দাবি হিসেবে সংরক্ষিত। ফলে মুতা বিবাহ নিয়ে ইসলামি উৎসগুলোর আলোচনা শুধু মুহাম্মদের দেওয়া অনুমতিতে শেষ হয় না; তাঁর নিজের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কেও এমন বিবরণ পাওয়া যায়।

মুতা বিবাহের নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস আরও বেশি অসঙ্গতিপূর্ণ। আলীর সূত্রে মুহাম্মদের খায়বারের সময় মুতা বিবাহ ও গৃহপালিত গাধার মাংস নিষিদ্ধ করার বর্ণনা রয়েছে। অথচ খায়বারের পরে মক্কা বিজয়ের সময় আবার মুতা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল বলে সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। আওতাসের সময় তিন দিনের অনুমতি ও পরবর্তী নিষেধের কথাও পাওয়া যায়। খায়বারেই মুতা নিষিদ্ধ হয়েছিল—এই নির্দিষ্ট সময়নির্ধারণের বিরুদ্ধে সুফিয়ান ইবন উয়াইনা, সুহাইলি, ইবন আবদুল বার, বায়হাকি ও ইবনুল কাইয়্যিমের মতো সুন্নি আলেমদের আপত্তি সংরক্ষিত হয়েছে। বিশেষ করে ইবনুল কাইয়্যিম খায়বারে মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার সময়নির্ধারণকে ভুল বলেছেন। অন্যদিকে ইবনে হাজার অনুমতি ও নিষেধাজ্ঞার বিভিন্ন সময়ের বর্ণনা সমন্বয় করতে গিয়ে একাধিক পর্যায়ে বৈধতা ও নিষেধের আলোচনা করেছেন। ফলে মুহাম্মদ একবার মুতা নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং সেই নিষেধাজ্ঞা তাঁর জীবদ্দশা থেকেই সর্বজনবিদিত ও নির্বিবাদ ছিল—এমন সরল ঐতিহাসিক বিবরণ প্রাথমিক উৎসগুলোর সামগ্রিক চিত্রের সঙ্গে মেলে না।

মুহাম্মদের মৃত্যুর পরের ঘটনাগুলো এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে। সহিহ মুসলিমে জাবিরের বক্তব্য অনুযায়ী আবু বকরের খেলাফতেও মুতা চলেছে এবং উমরের সময় আমর ইবন হুরায়সের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইবনে আব্বাস মুতা বৈধ থাকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর এই অবস্থানের কারণে আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের প্রকাশ্যে তাঁর সমালোচনা করেন এবং মুতা করলে রজমের হুমকি দেন। ইবনে আব্বাস পাল্টা ইবনে যুবায়েরকে নিজের মা আসমা বিনত আবু বকরের কাছে বিষয়টি জানতে বলেন। আসমাও ইবনে আব্বাসের বক্তব্য সত্য বলে নিশ্চিত করেন। নাসাঈ ও তায়ালিসির সংরক্ষিত বর্ণনায় আসমাকে সরাসরি নারীদের মুতা বিবাহ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তাঁরা মুহাম্মদের যুগে এটি করেছেন। ইবনে আব্বাস আরও জানান, তিনি চাইলে কুরাইশের এমন পুরুষদের নাম বলতে পারবেন, যাঁদের জন্ম মুতা বিবাহের মাধ্যমে হয়েছিল। এই ঘটনাগুলো দেখায়, মুতা বিবাহের বাস্তব প্রচলন, তার বৈধতা এবং পরবর্তী নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সাহাবীদের মধ্যেই প্রকাশ্য বিরোধ ছিল।

মুতা বিবাহের বৈধতা ও নিষেধাজ্ঞার বিতর্কের বাইরেও এই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, যা হলো সন্তান জন্ম এবং পারিবারিক দায়বদ্ধতা। সাময়িক যৌনচুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও সেই সম্পর্কের ফলে জন্ম নেওয়া সন্তানের পিতৃত্ব, ভরণপোষণ ও উত্তরাধিকারের প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না। প্রাচীন শিয়া হাদিসে মুতা-বিবাহজাত সন্তানকে পিতার সন্তান হিসেবে স্বীকার করার নির্দেশ রয়েছে। আলী আল-রিদার নামে সংরক্ষিত বর্ণনায় সন্তান জন্মানোর পর পিতৃত্ব অস্বীকার করার চেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য পাওয়া যায়। কিন্তু পরবর্তী শিয়া ফিকহে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সাময়িক বিবাহে সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করার বিচারিক পদ্ধতি স্থায়ী বিবাহের চেয়ে আলাদা রাখা হয়েছে। অন্যদিকে পিতৃত্ব স্বীকৃত হলে সন্তান পিতার উত্তরাধিকার ও ভরণপোষণের অধিকারী হয়। অর্থাৎ সাময়িক বিবাহের চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও সন্তানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আইনগত সম্পর্কের প্রয়োজন স্বীকার করা হয়েছে।

কিন্তু সন্তানের অধিকার স্বীকার করা হলেও সাময়িক স্ত্রীর জন্য একই ধরনের অর্থনৈতিক ও পারিবারিক নিরাপত্তা রাখা হয়নি। শিয়া ফিকহে মুতা-বিবাহিত নারী স্বামীর স্বয়ংক্রিয় উত্তরাধিকারী নন। স্বামী তাঁর ভরণপোষণ দিতেও বাধ্য নন, এমনকি নারীটি তাঁর সন্তান গর্ভে ধারণ করলেও। চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তালাক ছাড়াই সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটে। অথচ যৌনসম্পর্কের পর নারীটির জন্য ইদ্দতের বিধান রয়েছে এবং গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত তার অপেক্ষা দীর্ঘ হতে পারে। মুতা বিবাহে নির্দিষ্ট মোহর অপরিহার্য; চুক্তির মেয়াদের যে অংশে নারী যৌনসম্পর্কের সুযোগ না দেন, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেই অনুপাতে মোহর কমানোর বিধানও রয়েছে। ফলে এই ব্যবস্থায় যৌনসম্পর্কের সুযোগ এবং তার বিনিময়ে নির্ধারিত সম্পদের মধ্যে প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু সেই যৌনসম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতির জন্য নারীটির নিজের ভরণপোষণ ও উত্তরাধিকার স্থায়ী স্ত্রীর মতো নিশ্চিত করা হয়নি।

মুতা বিবাহের আরও উদ্বেগজনক দিক হলো অল্পবয়সী ও কুমারী মেয়েদের সাময়িক বিবাহের বিধান। শায়খ সদুকের মান লা ইয়াহদুরুহুল ফাকিহ গ্রন্থে অল্পবয়সী মেয়ের মুতা বিবাহের প্রশ্নে দশ বছর বয়সের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে কত বছর বয়সে একটি মেয়ে আর সহজে প্রতারিত হওয়ার মতো ছোট থাকবে না—এই প্রশ্নের উত্তরে দশ বছর বলা হয়েছে। শায়খ তুসির আল-ইস্তিবসার গ্রন্থে পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়াই কুমারী মেয়ের মুতা বিবাহের অনুমোদনসংক্রান্ত বর্ণনা রয়েছে; অন্য বর্ণনায় পিতার অনুমতিকে আবশ্যক বলা হয়েছে। পরবর্তী শিয়া ফিকহেও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের বিবাহের চুক্তি পিতা বা পিতামহের মাধ্যমে সম্পাদনের বিধান সংরক্ষিত রয়েছে। বিবাহের চুক্তি এবং যৌনসম্পর্কের জন্য পৃথক বিধান রাখা হলেও অল্পবয়সী শিশুর স্বাধীন ও অবহিত সম্মতির সমস্যা তাতে দূর হয় না। দশ বছর বয়সের একটি শিশু প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে নির্দিষ্ট মেয়াদের যৌনচুক্তির প্রকৃতি, সম্ভাব্য শারীরিক পরিণতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ঝুঁকি পূর্ণাঙ্গভাবে মূল্যায়ন করতে সক্ষম নয়। অভিভাবকের সম্মতি শিশুর নিজের স্বাধীন সম্মতির বিকল্প হতে পারে না। ফলে মুতা বিবাহকে কেবল দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক সম্মতির চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করলে ইসলামি উৎসে সংরক্ষিত অল্পবয়সী মেয়েদের বিবাহসংক্রান্ত বিধানগুলো আড়ালে থেকে যায়।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুতা বিবাহ অনুমোদনের কারণও এই ব্যবস্থার প্রকৃতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সহিহ হাদিসে সামরিক অভিযানে স্ত্রীহীন অবস্থায় সাহাবীদের যৌন চাহিদা ও কষ্টের কথা এসেছে। মুহাম্মদ তাঁদের খোজা হয়ে যাওয়ার প্রস্তাব নিষিদ্ধ করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নারীদের সঙ্গে বিবাহ করার অনুমতি দেন। ইবনে হাজার খায়বারের পরে মুসলিমদের সম্পদ ও যুদ্ধবন্দী নারী বৃদ্ধির সঙ্গে মুতার প্রয়োজন কমে যাওয়ার সম্পর্ক আলোচনা করেছেন। যুদ্ধবন্দী নারীদের যৌন ব্যবহারের সুযোগ বৃদ্ধি পেলে অর্থের বিনিময়ে সাময়িক বিবাহের প্রয়োজনও কমে যেতে পারে—এটি সেই সামাজিক ও সামরিক বাস্তবতা থেকে অনুসৃত একটি যৌক্তিক ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা। একই সমাজে দাসী মালিকানার ভিত্তিতে যৌনসম্পর্ক এবং নির্দিষ্ট বিনিময়ের ভিত্তিতে মুতা বিবাহ—উভয় ব্যবস্থার অনুমোদন ছিল। নারীর যৌনতা ও প্রজননের ওপর পুরুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দুটি পৃথক আইনগত কাঠামো এখানে পাশাপাশি কাজ করেছে।

এই সমস্ত তথ্যের ভিত্তিতে মুতা বিবাহের নৈতিক চরিত্রের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একজন নারীকে নির্দিষ্ট অর্থ বা সম্পদের বিনিময়ে কয়েক রাতের জন্য যৌনসম্পর্কের চুক্তিতে আবদ্ধ করা, সেই সম্পর্কের মেয়াদ শেষে স্থায়ী পারিবারিক দায়বদ্ধতা ছাড়াই বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং গর্ভধারণের পরেও নারীটির নিজের ভরণপোষণ বাধ্যতামূলক না রাখা—এসব বৈশিষ্ট্য অর্থের বিনিময়ে যৌনসেবার একটি ব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলে যায়। এই কারণেই মুতা বিবাহকে পতিতাবৃত্তিসদৃশ যৌনচুক্তি হিসেবে চিহ্নিত করার শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি রয়েছে। সেই ব্যবস্থাকে ধর্মীয়ভাবে বিবাহ বলা হয়েছে কি না, সেটি তার অর্থনৈতিক ও যৌন কাঠামোর মূল্যায়নকে বদলে দেয় না। একইভাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিবাহের চুক্তি ধর্মীয়ভাবে বৈধ বলে বিবেচিত হলেই তার স্বাধীন সম্মতি প্রতিষ্ঠিত হয় না।

এখানেই ইসলামের অপরিবর্তনীয় নৈতিকতার দাবির সঙ্গে একটি মৌলিক সংঘাত তৈরি হয়। যে মুতা বিবাহকে বর্তমান সুন্নি ইসলাম হারাম মনে করে, সেই একই প্রথা মুহাম্মদের অনুমোদনে একসময় বৈধ ছিল এবং সাহাবীরা বাস্তবে তা করেছেন। কোনো কাজের ধর্মীয় বৈধতা এক সময়ে প্রতিষ্ঠিত এবং অন্য সময়ে প্রত্যাহৃত হতে পারে—কিন্তু শুধু বৈধতা বা নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তন দিয়ে কাজটির নিজস্ব নৈতিক চরিত্র কেন বদলে গেল, তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। যদি নির্দিষ্ট বিনিময়ে সাময়িক যৌনসম্পর্ক, নারীটির সীমিত অর্থনৈতিক অধিকার কিংবা অল্পবয়সী মেয়ের সাময়িক বিবাহের বিধানকে কেবল ধর্মীয় অনুমোদনের কারণে নৈতিক ঘোষণা করা হয়, তাহলে নৈতিকতার স্বাধীন মানদণ্ডের পরিবর্তে ঐশ্বরিক নির্দেশই বিচারকের আসনে বসে। কোন কাজ মানুষের জন্য কতটা ক্ষতিকর, কতটা শোষণমূলক কিংবা কতটা ন্যায়সংগত—সেসব প্রশ্ন তখন ধর্মীয় বৈধতার অধীনস্থ হয়ে পড়ে।

মুতা বিবাহের ইতিহাস তাই শুধু একটি প্রাচীন বিবাহপ্রথার ইতিহাস নয়। এটি এমন একটি ধর্মীয় আইনব্যবস্থার ইতিহাস, যেখানে যৌন চাহিদা পূরণের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তি অনুমোদিত হয়েছিল; পরবর্তী সময়ে সেই চুক্তির নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সাহাবীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল; একই প্রথার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের নাম যুক্ত হয়েছিল; এবং সাময়িক সম্পর্কের ফলে জন্ম নেওয়া সন্তান, নারীর ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার ও অভিভাবকত্বের জন্য পৃথক আইনগত বিধান তৈরি হয়েছিল। এসব বিধানে পুরুষের যৌনসম্পর্কে প্রবেশ ও সম্পর্ক শেষ করার সুযোগের তুলনায় নারী ও সন্তানের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার প্রশ্ন অনেক বেশি জটিল। একটি ব্যবস্থার ধর্মীয় অনুমোদন তার নৈতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ নয়। যৌনসম্পর্কে স্বাধীন সম্মতি, অপ্রাপ্তবয়স্কের সুরক্ষা, অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং নারী ও সন্তানের অধিকার—এই মানদণ্ডে বিচার করলে মুতা বিবাহের ঐতিহাসিক ও আইনগত কাঠামোয় গুরুতর নৈতিক সমস্যা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


তথ্যসূত্রঃ
  1. Misyar Marriage — a Marvel or Misery? ↩︎
  2. Misyar now ‘a widespread reality’ ↩︎
  3. ধর্মীয় নৈতিকতায় অজাচারের রূপরেখাঃ নাস্তিকরা অজাচার করে? ↩︎
  4. ধর্ম ছাড়া নৈতিকতা আমরা শিখবো কীভাবে? ↩︎
  5. সূরা নিসা, আয়াত ২৪ ↩︎
  6. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫, ২৬ ↩︎
  7. তাফসীরে ইবনে আব্বাস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ২২৮ ↩︎
  8. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৩২৮৩ ↩︎
  9. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৩২৮৪ ↩︎
  10. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৩২৮৮ ↩︎
  11. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস নম্বরঃ ৫১১৭ ↩︎
  12. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩২৯৪ ↩︎
  13. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৫১১৯ ↩︎
  14. শায়খ সদুক, মান লা ইয়াহদুরুহুল ফাকিহ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৬১, বর্ণনা ৪৫৯১–৪৫৯৩ ↩︎
  15. মান লা ইয়াহদুরুহুল ফাকিহ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৬১, হাদিস ৪৫৯১ ↩︎
  16. শায়খ তুসি, আল-ইস্তিবসার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৪৫–১৪৬, বাবুত তামাত্তু বিল আবকার, বর্ণনা ৫২৮ ↩︎
  17. মান লা ইয়াহদুরুহুল ফাকিহ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৬১, হাদিস ৪৫৯২–৪৫৯৩ ↩︎
  18. শায়খ তুসি, আল-ইস্তিবসার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৪৫–১৪৬, অধ্যায় ৯৪, বর্ণনা ৫২৫–৫৩০ ↩︎
  19. আল-ইস্তিবসার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৪৬, বর্ণনা ৫২৭–৫৩০ এবং শায়খ তুসির ব্যাখ্যা ↩︎
  20. আলী আল-সিস্তানি, মিনহাজুস সালিহিন, খণ্ড ৩, কিতাবুন নিকাহ, অভিভাবকসংক্রান্ত বিধান ৫৭–৫৮ ↩︎
  21. মিনহাজুস সালিহিন, বিধান ৫৯–৬০ ↩︎
  22. মিনহাজুস সালিহিন, নিকাহুল মুনকাতি, বিধান ২৪৪ ↩︎
  23. আলী আল-সিস্তানি, আল-মাসায়িলুল মুনতাখাবা, কিতাবুন নিকাহ, বিধান ১০১১ ↩︎
  24. মিনহাজুস সালিহিন, বিবাহের অভিভাবকসংক্রান্ত বিধান ৬৭ ↩︎
  25. মিনহাজুস সালিহিন, বিধান ৬৮–৬৯ ↩︎
  26. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস নম্বরঃ ৫১১৬ ↩︎
  27. ইসলামে দাসী-ধর্ষণ: দাসী সহবাসে কি সম্মতি জরুরি? ↩︎
  28. ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার আসকালানী, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১৭১ ↩︎
  29. ফাতহুল বারী—নিকাহুল মুতা ↩︎
  30. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩২৮০ ↩︎
  31. সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিসঃ ১৯৬২ ↩︎
  32. সূনান নাসাঈ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৩৭১ ↩︎
  33. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩২৯৫ ↩︎
  34. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৩১১ ↩︎
  35. ইবনে হাযম, আল-মুহাল্লা বিল আছার, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১২৮–১৩০, মাসআলা ১৮৫৮: নিকাহুল মুতা ↩︎
  36. محلى ابن حزم – المجلد الخامس/الصفحة العاشرة ↩︎
  37. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪০৫c ↩︎
  38. মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক, খণ্ড ৭, হাদিস ১৪০২১ ↩︎
  39. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪০৬a ↩︎
  40. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪০৬b ↩︎
  41. মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক, হাদিস ১৪০২৬, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৪৯৯ ↩︎
  42. ইবনে হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী, কিতাবুন নিকাহ ↩︎
  43. মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক, হাদিস ১৪০২১ ↩︎
  44. ফাতহুল বারী, খণ্ড ৯, আমর ইবন হুরায়সের ঘটনা ↩︎
  45. মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক, হাদিস ১৪০২৪, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৪৯৮–৪৯৯ ↩︎
  46. মুয়াত্তা মালিক, কিতাবুন নিকাহ, হাদিস ১১৩৭ ↩︎
  47. মুসনাদুশ শাফিঈ, হাদিস ১১৫৮ ↩︎
  48. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪০৪a ↩︎
  49. ফাতহুল বারী, খণ্ড ৯, নিকাহুল মুতা প্রসঙ্গ ↩︎
  50. মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক, হাদিস ১৪০২২, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৪৯৮ ↩︎
  51. হুর আল-আমিলি, ওয়াসাইলুশ শিয়া, খণ্ড ২১, পৃষ্ঠা ১০, আবওয়াবুল মুতা, হাদিস ২৬৩৭৬–২৬৩৭৮ ↩︎
  52. মুহাক্কিক কারাকি, খুলাসাতুল ইজাজ ফিল মুতা, পৃষ্ঠা ২৩–২৪ ↩︎
  53. সাইয়েদ জাফর মুরতাদা আল-আমিলি, জাওয়াজুল মুতা, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৮৮ ↩︎
  54. আল-কুলাইনি, আল-কাফি, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪৪৮, হাদিস ২ ↩︎
  55. শায়খ তুসি, তাহযিবুল আহকাম, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ২৫০, বর্ণনা ১০৮০ ↩︎
  56. সহিহ বুখারি, হাদিস ৫১১৫ ↩︎
  57. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪০৭a ↩︎
  58. ইবনে হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী, খণ্ড ৯, কিতাবুন নিকাহ, মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার সময়ের আলোচনা ↩︎
  59. ফাতহুল বারী, খণ্ড ৯, বায়হাকি ও আবু আওয়ানার বক্তব্য ↩︎
  60. ইবনুল কাইয়্যিম, যাদুল মাআদ, খণ্ড ৩, খায়বারের যুদ্ধের বিধানসংক্রান্ত আলোচনা ↩︎
  61. যাদুল মাআদ, খণ্ড ৫, মুতা বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়ার আলোচনা ↩︎
  62. ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৪, খায়বার বিজয়সংক্রান্ত আলোচনা ↩︎
  63. মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক, কিতাবুত তালাক, বাবুল মুতা, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৪৯৬–৪৯৭, হাদিস ১৪০২১ ↩︎
  64. মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৪৯৯, হাদিস ১৪০২৬ ↩︎
  65. ইবনে হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী, কিতাবুন নিকাহ, নিকাহুল মুতা, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ৭৯ ↩︎
  66. শায়খ তুসি, আল-ইস্তিবসার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৫২–১৫৩, বাবু আন্না ওয়ালাদাল মুতা লাহিকুন বি-আবিহি, হাদিস ৫৫৭–৫৬০ ↩︎
  67. শায়খ সদুক, মান লা ইয়াহদুরুহুল ফাকিহ, খণ্ড ৩, বাবুল মুতা, হাদিস ৫, মুহাম্মদ ইবন ইসমাইল ইবন বাযির বর্ণনা ↩︎
  68. আলী আল-সিস্তানি, মিনহাজুস সালিহিন, খণ্ড ৩, কিতাবুন নিকাহ, ফাসলুস সাবি ফিন নিকাহিল মুনকাতি, মাসআলা ২৫১–২৫২ ↩︎
  69. আলী আল-সিস্তানি, মিনহাজুস সালিহিন, খণ্ড ৩, কিতাবুন নিকাহ, নিকাহুল মুনকাতি, মাসআলা ২৫৫ ↩︎
  70. ওয়াসাইলুশ শিয়া, খণ্ড ২১, পৃষ্ঠা ৬৬, হাদিস ২৬৫৪৬–২৬৫৪৭ ↩︎
  71. ওয়াসাইলুশ শিয়া, খণ্ড ২১, পৃষ্ঠা ৬৭, হাদিস ২৬৫৪৮–২৬৫৫২ ↩︎
  72. আলী আল-সিস্তানি, মিনহাজুস সালিহিন, কিতাবুল মিরাস, মাসআলা ৯৫৩ ↩︎
  73. আলী আল-সিস্তানি, মিনহাজুস সালিহিন, খণ্ড ৩, নিকাহুল মুনকাতি, মাসআলা ২৫৬ ↩︎
  74. মিনহাজুস সালিহিন, মাসআলা ২৫৭ ↩︎
  75. আলী আল-সিস্তানি, মিনহাজুস সালিহিন, খণ্ড ৩, কিতাবুন নিকাহ, আত্মীয়তার কারণে ভরণপোষণ, মাসআলা ৪৪০–৪৪৯ ↩︎
  76. আলী আল-সিস্তানি, মিনহাজুস সালিহিন, মাসআলা ২৩৩–২৩৬ ↩︎
  77. মিনহাজুস সালিহিন, মাসআলা ২৩৭–২৩৯ ↩︎
  78. মিনহাজুস সালিহিন, মাসআলা ২৪০–২৪১ ↩︎
  79. মিনহাজুস সালিহিন, মাসআলা ২৫২ ↩︎
  80. মিনহাজুস সালিহিন, কিতাবুত তালাক, মাসআলা ৪৮৫ ↩︎
  81. মিনহাজুস সালিহিন, মাসআলা ২৫৯ ↩︎
  82. মিনহাজুস সালিহিন, কিতাবুত তালাক, মুতা-বিবাহিত নারীর ইদ্দত, মাসআলা ৫৭৪–৫৭৭ ↩︎
  83. মিনহাজুস সালিহিন, কিতাবুত তালাক, মৃত্যুর ইদ্দত, মাসআলা ৫৭৮ ↩︎
  84. মিনহাজুস সালিহিন, মাসআলা ২৫৮ ↩︎
  85. শায়খ সদুক, মান লা ইয়াহদুরুহুল ফাকিহ, খণ্ড ৩, কিতাবুন নিকাহ, বাবুল মুতা, বর্ণনা ৪৬১৫ 1 2
  86. মুহাক্কিক কারাকি, খুলাসাতুল ইজাজ ফিল মুতা, পৃষ্ঠা ২২; ওয়াসাইলুশ শিয়া, খণ্ড ২১, পৃষ্ঠা ১০, বর্ণনা ২৬৩৭৭ ↩︎
  87. মান লা ইয়াহদুরুহুল ফাকিহ, বাবুল মুতা, ধারাবাহিক বর্ণনা ৪৬১৩–৪৬১৫ ↩︎
  88. ওয়াসাইলুশ শিয়া, খণ্ড ২১, পৃষ্ঠা ১২, মুতা বিবাহের অধ্যায় ↩︎
  89. ওয়াসাইলুশ শিয়া, খণ্ড ২১, পৃষ্ঠা ১৩, বর্ণনা ২৬৩৮৮–২৬৩৮৯ ↩︎
  90. মুহসিন ফায়য কাশানি, আল-ওয়াফি, খণ্ড ২১, পৃষ্ঠা ২০৪, বর্ণনা ২১৩৪৩ ↩︎
  91. মুহাক্কিক কারাকি, খুলাসাতুল ইজাজ ফিল মুতা, পৃষ্ঠা ২২, বাবু মাশরুইয়্যাতিল মুতা ↩︎
  92. হুর আল-আমিলি, ওয়াসাইলুশ শিয়া, খণ্ড ২১, পৃষ্ঠা ১০, হাদিস ২৬৩৭৭, আবওয়াবুল মুতা ↩︎
  93. কোরআন, সূরা তাহরিম, আয়াত ১–৫ ↩︎
  94. কোরআন, সূরা তাহরিম, আয়াত ৩–৫ ↩︎
  95. খুলাসাতুল ইজাজ ফিল মুতা, পৃষ্ঠা ১৭, মুতা বিবাহের সংজ্ঞা ↩︎
  96. সাইয়েদ জাফর মুরতাদা আল-আমিলি, জাওয়াজুল মুতা, পৃষ্ঠা ৯২, বর্ণনা ১৩–১৪ ↩︎
  97. মুসনাদে আহমাদ, মুসনাদে উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) (উমারের বর্ণিত হাদীস), হাদিসঃ ৩৫১ ↩︎
  98. মুসনাদে আহমাদ, মুসনাদে উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) (উমারের বর্ণিত হাদীস), হাদিসঃ ৩৪২ ↩︎
  99. মুসনাদে আহমদ, ইসলামিক সেন্টার, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩২, ২৩৫, ২৩৬ ↩︎
  100. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ২৮৩৭ ↩︎
  101. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৩, ১৬৭, ১৬৮ ↩︎
  102. মুসনাদ আবি দাউদ আত-তায়ালিসি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২০৮, হাদিস ১৭৪২, আসমা বিনত আবু বকরের বর্ণনা ↩︎
  103. নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা, কিতাবুন নিকাহ, বাবুল মুতা, হাদিস ৫৫১৩–৫৫১৫ ↩︎
  104. আস-সুনানুল কুবরা, ইসলামওয়েব সংস্করণ, হাদিস ৫৭২৫, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৫৩–২৫৪ ↩︎
  105. তাবারানি, আল-মুজামুল কাবীর, খণ্ড ২৪, পৃষ্ঠা ১০৩, হাদিস ২৭৭ ↩︎
  106. আবু নুআইম আল-ইসফাহানি, আল-মুসনাদুল মুস্তাখরাজ আলা সহিহ মুসলিম, বর্ণনা ২৮৭২–২৮৭৩ ↩︎
  107. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১২৩৮a ↩︎
  108. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১২৩৮b ↩︎
  109. আবু জাফর আত-তাহাবি, শরহু মাআনিল আছার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৪, কিতাবুন নিকাহ, বাবু নিকাহিল মুতা, হাদিস ৪৩০৬ ↩︎
  110. বদরুদ্দীন আল-আইনী, নুখাবুল আফকার, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ৩৪০; তাহাবি, হাদিস ৪৩০৬ ↩︎
  111. সহিহ মুসলিম, কিতাবুন নিকাহ, মুতা বিবাহের বৈধতা ও নিষেধের আলোচনা ↩︎
  112. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩২৮৫ ↩︎
  113. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩২৮৬ ↩︎
  114. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩২৮৭ ↩︎
  115. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৩০৭ ↩︎
  116. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৩০৬ ↩︎
  117. মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হাদিস ১৪০২৪ ↩︎
  118. ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার আসকালানী, কিতাবুন নিকাহ, নিকাহুল মুতা প্রসঙ্গ ↩︎
  119. আল-ইসাবাহ ফি তামইযিস সাহাবাহ, সালামাহ ইবন উমাইয়ার জীবনী ↩︎
  120. ফাতহুল বারী, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১৭৪ ↩︎
  121. মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হাদিস ১৪০২১, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৪৯৬–৪৯৭ ↩︎
  122. কোরআন শিক্ষা দিয়ে অর্থ নেয়া হারাম ↩︎
  123. হযরত উমরের সরাসরি কুফরি কর্মসমূহের তালিকা ↩︎
  124. আউল পদ্ধতিঃ কোরআনে উত্তরাধিকার আইনে ভুল ↩︎
  125. মুয়াত্তা মালিক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১১৪১ ↩︎
  126. তাফহীমুল কুরআন, সাইয়েদ আবু আলা মওদুদি, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১, ১২ ↩︎
  127. তাফসীরে জালালাইন, ইসলামিয়া কুতুবখানা, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮০০ ↩︎
  128. তাহাবী শরীফ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮ ↩︎
  129. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৭৪৪ 1 2
  130. সূনান নাসাঈ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৩৭০ ↩︎
  131. সূনান নাসাঈ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৩৩৫ ↩︎
  132. সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১৮০১ ↩︎
  133. ফাতহুল বারী, কিতাবুন নিকাহ—মুতা নিষেধের আলোচনা ↩︎
  134. নাইলুল আওতার—নিকাহুল মুতা ও তার রহিতকরণ ↩︎
  135. ফাতহুল বারী—মুতা নিষিদ্ধ হওয়ার বিভিন্ন সময় ↩︎
  136. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসীর, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৮৪ ↩︎
  137. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩২৮৮ ↩︎
  138. রূহুল মাআনী, সূরা নিসা ৪:২৪-এর তাফসীর ↩︎
  139. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩২৯৯ ↩︎
  140. আশরাফুল হিদায়া, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৭ ↩︎
  141. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫ ↩︎

About This Article

Genre: Islamic Marriage Law Critique, Mut‘ah Marriage Analysis, Hadith-Based Legal History, Sunni-Shia Dispute Review, and Religious-Morality Critique

Epistemic Position: Secular Humanism, Historical Criticism, Source Criticism, Sexual-Ethics Analysis, Anti-Apologetic Reasoning, and Moral-Consistency Review

This article examines mut‘ah, or temporary marriage, as a time-limited sexual contract that was practiced and permitted in the early Islamic period according to major hadith and tafsir sources.

The central argument is that mut‘ah was not a later Shia invention; Islamic sources themselves preserve reports of Muhammad permitting his companions to contract temporary sexual relationships for a fixed period and fixed compensation.

The article also discusses Quran 4:24, the term istamta‘tum, Ibn Kathir's tafsir, Ibn Abbas's view, Sahih Bukhari and Sahih Muslim reports, wartime sexual need, three-night temporary marriage reports, the Khaybar, Mecca, and Awtas timelines, Jabir's report that mut‘ah continued during Muhammad's, Abu Bakr's, and part of Umar's time, Umar's prohibition, and the Sunni-Shia disagreement over whether the ban was prophetic or later political-legal enforcement.

This article should be evaluated through hadith evidence, tafsir history, legal chronology, Quranic interpretation, early Muslim practice, moral consistency, and sexual ethics—not through sectarian dismissal, post-hoc Sunni harmonization, euphemistic marriage language, selective quotation, or the demand that a temporary paid sexual contract be protected from ordinary ethical scrutiny.

আসিফ মহিউদ্দীন

আসিফ মহিউদ্দীন সম্পাদক সংশয় - চিন্তার মুক্তির আন্দোলন [email protected]

21 thoughts on

  1. আপনি ভুল ভাল হাদিস ব্যাখ্যা করেছেন। আমি হাদিসে খুঁজে সংখ্যা মিলিয়েছি। পাইনি আপনার হাদীস। এগুলো করে কোনো লাভ নেই।

    1. কোন হাদিসটি ভুল? এখানে হাদিসের কোন ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। হাদিস নম্বর এবং বই সহ উল্লেখ করা হয়েছে। আপনি প্রকাশনী এবং হাদিস নম্বর দিয়ে খুঁজে না পেলে সেটি হবে খুবই অদ্ভুত ব্যাপার। কারণ আমি সরাসরি বইয়ের ছবিও তুলে দিয়েছি। মিথ্যা বলে কী লাভ? এতে ধর্ম রক্ষা পাবে?

  2. আসিফ মহিউদ্দীন সাহেব। নবীজি যে মুতাহ বিবাহ করেছিলেন – এ সংক্রান্ত আপনি যে দলিল দিলেন সেটি যাচাই করেছেন তো? যদি আমি প্রমাণ করতে পারি নবী (সা:) মুতাহ বিবাহ করেন নাই – আপনার দেওয়া দলিল থেকেই?

  3. খুব সুন্দর করে উপস্থাপন করেছেণ। ধন্যবাদ। আসলে কোরআন অনুযায়ী মুতা বিবাহ, পতিতা এগুলো জায়েজ। কিন্তু কাঠ মোল্লারা তা বুঝতে চাইনা।

  4. eisob hypocrisy bondho koren, mutah bibaho islam onek agei ban kore dise
    Lemme show ya some reference such as cunt akin ya Won’t show this ( Don’t remove my comment if ya ain’t wuss)

    সাবরাহ আল জুহানী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে ছিলেন। তিনি বললেন, হে লোক সকল! আমি তোমাদের স্ত্রীলোকদের সাথে মুতা বিয়ের অনুমতি দিয়েছিলাম। কিন্তু অচিরেই আল্লাহ তায়ালা তা হারাম করেছেন কিয়ামাতের দিন পর্যন্ত। অতএব যার নিকট এ ধরনের বিয়ের সূত্রে কোন স্ত্রীলোক আছে, সে যেন তার পথ ছেড়ে দেয়। আর তোমরা তাদের যা কিছু দিয়েছ তা কেড়ে নিও না । (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৩৩১৩)

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আওত্বাস যুদ্ধের বছর তিন দিনের জন্য মুতা বিয়ের অনুমতি দিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি তা নিষিদ্ধ করেন । (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৩৩০৯)

    নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুতা‌ (বিবাহ) করতে নিষেধ করেছেন । (সহিহ মুসলিম,হাদিস নং ৩৩১৭)

  5. ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুতাআ ও সাময়িক বিয়ের অনুমতি ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে অসংখ্য সহীহ হাদীসে এটাকে হারাম ঘোষণা করা হয়। যেমন এক হাদীসে এসেছে, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বার যুদ্ধের কালে মুত’আ বিয়ে ও গৃহপালিত গাধার গোস্ত হারাম করেছেন। [বুখারী ৫১১৫, ৫৫২৩; আরও দেখুন বুখারীঃ ৪২১৬, মুসলিমঃ ১৪০৬, ১৪০৭]

    সূত্র: https://www.hadithbd.com

  6. এর থেকে এটা স্পষ্ট যে যখন তাদের মনে চায় হালাল হয়েছে এবং যখন মনে চায় না হারাম হয়েছে।নিজে করেছে এবং অন্যদের করতে বলেছে।আর যখন বুঝতে পারলো বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে তখন সেটাকে নিষিদ্ধ দাবি করেছে যে আল্লাহ এটাকে হারাম বলেছেন।আর যদি আল্লাহ এটাকে হারাম বলে যখন তারা করছিলো তখন কেন তাদের বাধা দেন নি। তাহলে আল্লাহ কি বিষয়টি পরে বুঝতে পেরেছে?

  7. নবী (সা.) মুত’আ করেছেন কিনা – হাদীসভিত্তিক বিশ্লেষণ

    🔎 হাদীস ১: সহীহ মুসলিম – হাদীস ১২২২

    🗣 উমার (রাঃ) বলেন:

    “إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَلَهُ وَفَعَلَهُ أَصْحَابُهُ”
    অর্থ: “নবী (সা.) এটি করেছেন, এবং সাহাবীরাও করেছেন।”

    📌 এই “فَعَلَهُ” (ফা‘আলাহু) শব্দটি আরবি ব্যাকরণ অনুসারে,

    🔍 ইসলামী ব্যাখ্যাকারীরা (যেমনঃ ইমাম নববী, ইবনে হাজার আসকালানী) বলেছেন:

    ➡ এখানে “فَعَلَهُ” মানে তিনি অনুমতি দিয়েছেন,
    ➡ তাঁর অনুমতিতে সাহাবীরা করেছেন।

    ✅ কোনো সহীহ হাদীসে নেই: নবী (সা.) নিজে মুত’আ করেছেন বা কোনো নির্দিষ্ট নারীর সঙ্গে করেছেন।

    শব্দ বিশ্লেষণ: فَعَلَهُ (ফা‘আলাহু)

    এর সাধারণ অর্থ:

    “সে এটা করেছে”
    ➡ এখানে “সে” বলতে বোঝায় কোন ব্যক্তি নিজের হাতে/নিজ উদ্যোগে কাজটি করেছে।

    🔎 কিন্তু হাদীসে কখন কখন এই ক্রিয়াপদ “ফা‘আলাহু” দিয়ে বোঝানো হয়:

    সে নিজে করেছে
    না হয়ে, বোঝায়:

    সে অন্যদের করতে দিয়েছে/অনুমতি দিয়েছে

    বা তার শাসনকালে, নেতৃত্বে কাজটি হয়েছে

    উদাহরণ ১:

    হাদীস:

    صلى النبيُّ على امرأةٍ ماتتْ في نِفاسِها
    “নবী (সা.) এক মহিলা যিনি সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছেন, তাঁর জানাযা পড়েছেন।”

    এখানে বলা হয়েছে “নবী জানাযা পড়েছেন”, কিন্তু বুখারী/মুসলিমের ব্যাখ্যায় বলা হয় —
    ➡ নবী (সা.) নিজে জানাযার ইমামতি করেননি,
    ➡ বরং তাঁর নির্দেশে সাহাবীরা পড়েন, আর তিনি সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

    📘 তথ্যসূত্র:

    সহীহ বুখারী

    ইবনে হাজার আসকালানীর فتح الباري (Fath al-Bari) ব্যাখ্যা

    উদাহরণ ২: (এই প্রসঙ্গেই খুব গুরুত্বপূর্ণ)

    📘 সহীহ মুসলিম ১২২২ হাদীস:

    “فَعَلَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَفَعَلَهُ أَصْحَابُهُ”

    ➡ এটা আবু মূসা আশ’আরীর কাহিনী যেখানে উমর (রাঃ) বলছেন:
    “নবী (সা.) ও সাহাবীরা মুত’আ করেছেন”

    এখানে ইমাম নববী (রহ.) তাঁর “شرح النووي على مسلم” ব্যাখ্যায় বলেন:

    “المعنى فعل بإذنه، أو في عهده”
    অর্থ:
    ➤ “এখানে ‘করেছেন’ মানে তাঁর অনুমতিক্রমে করা হয়েছে, বা তাঁর সময়ে করা হয়েছে”

    অর্থাৎ, “নবী করেছেন” মানেই তিনি নিজে কোন নারীর সাথে মুত’আ করেছেন — এটা সরাসরি বোঝায় না।
    ➡ বরং বোঝায় যে তাঁর যুগে, তাঁর অনুমতিতে সাহাবীরা করেছেন।

    উদাহরণ ৩: (আরও বেশি পরিষ্কার)

    রাসূল (সা.)-এর যুগে মসজিদে নববীর মিম্বর তৈরি করা হয়।

    হাদীসের ভাষায় বলা হয়:

    “نصب النبيُّ المنبرَ”
    ➡ অর্থ: “নবী (সা.) মিম্বর স্থাপন করেছেন”

    কিন্তু বাস্তবে কে মিম্বর বানিয়েছে?
    ➡ সাহাবারা – নবীর নির্দেশে।

    📘 তাফসিরকারীরা বলেন:

    এটি ফে’আলাহু = কাজটি তাঁর অনুমতিতে হয়েছে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে,
    যদিও তিনি নিজ হাতে কাঠ কাটেননি বা বানাননি।

    ঘটনা:
    সাল,খ্রিস্টাব্দ এবং নবীজির বয়স:

    1/মুত’আর অনুমতি : ৭ হিজরি, ৬২৮ খ্রিস্টাব্দ,নবীর বয়স:✅ ৫৮ বছর
    2/মুত’আর অনুমতি আবার করা হয়:৮ হিজরি, ৬৩০ খ্রিস্টাব্দ, নবীর বয়স :✅ ৬০ বছর
    3/মুত’আ নিষিদ্ধ: ১০ হিজরি,৬৩২ খ্রিস্টাব্দ, নবীর বয়স :✅ ৬২ বছর

    ১. খায়বার যুদ্ধ (৭ হিজরি)
    ২.মক্কা বিজয় ও হুনায়েন যুদ্ধ (৮ হিজরি)
    ৩. তাবুক যুদ্ধের পর (১০ হিজরি) নিষিদ্ধ হয়।

    যখন ইসলামী সমাজ সুসংগঠিত হয়ে ওঠে এবং নৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনই নবীজি (সা.) চূড়ান্তভাবে মুত’আ নিষিদ্ধ করেন।

  8. ইসলাম হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য ও সর্ব নিকৃষ্ট ধর্ম।
    ১. ধর্মত্যাগ = মৃত্যুদণ্ড
    ১৩টা দেশে আইনি। বাংলাদেশে মাদ্রাসা ছাত্ররা “মুরতাদ মারো” বলে রাস্তায় নামে।
    ২. ৯ বছরের বাচ্চাকে ধর্ষণ হালাল
    সহীহ বুখারী ৫১৩৪: মুহাম্মদ আয়েশাকে ৬ বছরে বিয়ে, ৯ বছরে ধর্ষণ। ইরানে আজও ৯ বছরে বিয়ে আইনি।
    ৩. যুদ্ধে ধর্ষণ = হালাল
    কুরআন ৪:২৪: “যাদের তোমার ডান হাত দখল করে” = যুদ্ধবন্দী মহিলা। হামাস ৭ অক্টোবর একই আয়াত পড়ে ধর্ষণ করেছে।
    ৪. মাথা কাটা = সুন্নত
    কুরআন ৪৭:৪: “যখন কাফেরদের সাথে যুদ্ধ কর, তাদের গলা কাটো”। তালেবান ২০২৫-এ লাইভ স্ট্রিম করে।
    ৫. নারী = অর্ধেক মানুষ
    কুরআন ২:২৮২: সাক্ষ্য অর্ধেক। ৪:৩৪: স্বামী পিটাতে পারে।
    ৬. সমকামী = ছাদ থেকে ফেলে মারা
    হাদিস: “যে পুরুষ পুরুষের সাথে করে, দুজনকে ছাদ থেকে ফেলো”। ইরান ২০২৫-এ ২৩ জনকে ফাঁসি।
    ৭. কার্টুন আঁকলে মৃত্যু
    চার্লি হেবদো, স্যামুয়েল প্যাটি—বাংলাদেশে ৭৮% মুসলিম বলে “ব্লাসফেমির শাস্তি মৃত্যু” (Pew ২০২৩)।
    ৮. দাসপ্রথা = হালাল
    কুরআন ২৩:৫-৬: দাসীদের সাথে যৌনতা। আরবরা ১৪০০ বছরে ১৪ মিলিয়ন আফ্রিকান ক্রীতদাস করেছে।
    ৯. মুহাম্মদ = পেডোফাইল + রেপিস্ট
    সাফিয়্যা: বাবা-স্বামী খুন → সেই রাতেই ধর্ষণ (ইবনে ইশাক ৭৫৮)।
    ১০. কোনো রিফর্ম নেই
    ১৪০০ বছর। শূন্য আপডেট। খ্রিস্টানরা সংস্কার করেছে, হিন্দুরা করেছে—ইসলাম আজও ৭ম শতাব্দীর সফটওয়্যার চালায়।

Leave a comment

Your email will not be published.