ইহুদীকন্যা সাফিয়ার না-বলা গল্প
সারসংক্ষেপ
ইহুদি কন্যা সাফিয়া বিনতে হুয়াইয়ের জীবনের ট্র্যাজেডি ইসলামের ইতিহাসের এক বিতর্কিত ও সংবেদনশীল অধ্যায়। খায়বার যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তাঁর সম্ভ্রান্ত জীবন মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়, যখন মুহাম্মদের বাহিনী তাঁর পিতা, চাচা এবং স্বামীকে হত্যা করে। যুদ্ধের ময়দানে স্বজনদের ক্ষতবিক্ষত লাশের পাশ দিয়ে তাঁকে বন্দী হিসেবে নিয়ে আসা, গনিমতের মাল হিসেবে ভাগ বাটোয়ারা করা এবং তাঁর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই দ্রুত তার সাথে সহবাস করার ঘটনাটি নৈতিক ও মানবিক অধিকারের জায়গা থেকে গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়। সাফিয়ার এই গল্পটি মূলত যুদ্ধজয়ের আড়ালে নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ এবং তাঁদের গনিমতের মাল হিসেবে গণ্য করার এক করুণ দলিল। নিম্নে এই ঘটনাবলীর একটি সংক্ষিপ্ত ও ধারাবাহিক টাইমলাইন দেওয়া হলো:
ভূমিকা
ইতিহাসে ধর্মযুদ্ধ, ধর্মের নামে মানুষ হত্যা, অন্য ধর্মের ওপর আরেক ধর্মের বিজয়ের নামে বহু অনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘটেছে, বহু মানুষের জীবন চলে গেছে। সেইসব ঘটনাবলীর মধ্যে খায়বার আক্রমণের পর নবী মুহাম্মদের হাতে সাফিয়া বিনতে হুয়াইয়ের বন্দিত্ব এবং বন্দীদশা থেকে মুক্তির জন্য পরবর্তী বিবাহ অন্যতম। এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কীভাবে যুদ্ধ শুধু ভূমি বা সম্পদের জন্যই নয়, নারীর ওপরও এক অমানবিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। নারীর দেহ ভোগ যে যুদ্ধের একটি অন্যতম চালিকা শক্তি, তা এই ঘটনা থেকে খুব স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়।
খায়বার ছিল একটি সমৃদ্ধ ইহুদি বসতি, যেখানে মুহাম্মদ এবং তার অনুসারীরা ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে আক্রমণাত্মক জিহাদ চালান। যুদ্ধের নামে হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়, এবং বিজিতদের মধ্যে নারীদের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে বন্দী করা হয়। সাফিয়া বিনতে হুয়াই ছিলেন বনী নাদির গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত নারী, যাঁর স্বামী ও পরিবারের অধিকাংশ সদস্য এই যুদ্ধে নিহত হন। এক মুহূর্তের মধ্যে তিনি সম্ভ্রান্ত নারী থেকে পরাজিত জাতির যুদ্ধবন্দীতে পরিণত হন। এই পরিস্থিতিতে মুহাম্মদের এক অনুসারী সাফিয়াকে ভাগে পান, কিন্তু শেষপর্যন্ত মুহাম্মদ তার রূপের খ্যাতি শুনে নিজেই তাঁকে গ্রহণ করেন এবং বিবাহ করেন। একজন যুদ্ধবন্দী, স্বজনহারা, বিধ্বস্ত, সদ্য স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের হারানো নারী কতটা স্বেচ্ছায় এই বিবাহে সম্মত হতে পারেন, সেটি সহজেই অনুমেয়। বাস্তবতা হচ্ছে, এটি ছিল এক ধরনের ধর্মীয় বৈধতার মোড়কে মোড়া দাসত্ব, যেখানে বিজিত নারীদের কোনো স্বাধীন ইচ্ছা বা পছন্দের অধিকার ছিল না।
মুহাম্মদের আচরণ শুধুমাত্র নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতাকে লঙ্ঘন করেনি, বরং এটিকে ধর্মীয় অনুমোদন দিয়েছিল। যুদ্ধের পর নারী বন্দীদের গ্রহণের এই সংস্কৃতি পরবর্তী সময়েও ইসলামী সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে। নারীদের স্বাধীন সত্তা ও সম্মানের কথা বললেও, এই ঘটনার মাধ্যমে ইসলামে নারীর অবস্থান প্রকৃতপক্ষে কী ছিল, তা পরিষ্কার হয়ে যায়। খায়বারের এই ঘটনা ধর্মীয় বিজয়ের নামে সহিংসতা, দাসত্ব এবং নারীর প্রতি নির্মম আচরণের এক নির্মম উদাহরণ। এটি শুধুমাত্র ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়, বরং একটি স্পষ্ট প্রমাণ যে, যুদ্ধ ও ধর্মীয় আদর্শের নামে কীভাবে নারীর মৌলিক অধিকারের ওপর আঘাত হানা হয়েছে।
এই প্রবন্ধে আমরা সেই বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করবো, ইসলামের ইতিহাস থেকে সাফিয়ার গল্প তুলে আনবো। এখানে দেয়া তথ্যগুলো পড়ার সময় মনে রাখতে হবে, এগুলো সবই ইসলামপন্থী বিজয়ী বাহিনীর লিখিত তথ্য, সাফিয়ার কথা কোন নিরপেক্ষ তথ্যসূত্র থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ প্রধান surviving sources মুসলিম বিজয়ী পক্ষ থেকেই এসেছে। তাই পড়ার সময় আমাদের এটি স্মরণ রাখতে হবে এবং এটিও মনে রাখতে হবে, নবী মুহাম্মদকে সর্বোচ্চ আদর্শ পুরুষ হিসেবে উপস্থাপন মুসলিমদের ধর্মবিশ্বাসের প্রচারের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তাই তারা নিশ্চিতভাবেই এমন কিছু তাদের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করবেন না, যার কারণে নবীকে একজন বর্বর যুদ্ধবাজ ও নারীলোভী হিসেবে মনে হতে পারে। এইসব বর্ণনা বরঞ্চ নবীর শৌর্যবীর্য প্রকাশের জন্যই লিখিত হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো থেকেই নবীর কৃতকর্ম সম্পর্কে ধারণা মেলে। ইতিহাসে নারীদের ভূমিকা সাধারণত পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়। ইসলামের প্রাথমিক যুগের নারী চরিত্রগুলোর মধ্যে নবী-পত্নী সাফিয়ার নামটি যতটা উচ্চারিত হয়েছে, তার ব্যক্তি জীবনের জটিলতা ততটাই আড়ালে থেকে গেছে। এই লেখায় আমরা কেবল একজন নবী-পত্নীর জীবন নয়, বরং একটি পরাজিত জনগোষ্ঠীর একজন নারীর জীবনকাহিনী জানার চেষ্টা করব, যাকে জোর করে এক বিজয়ীর ঘরে আনা হয়েছিল।
“সেই সময়ে প্রচলিত ছিল” কোনো নৈতিক প্রতিরক্ষা নয়। এখানে “অপরাধ” এবং “অন্যায়”কে আলাদা করতে হবে: অপরাধ নির্ধারিত হয় প্রচলিত আইন, বিধি বা বিচারব্যবস্থা দিয়ে; অন্যায় নির্ধারিত হয় কারও ওপর আরোপিত ক্ষতি, জবরদস্তি, শোষণ, অধিকারহানি ও যন্ত্রণার ভিত্তিতে। কোনো কাজ তখনকার আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য না হলেও, সেটি নৈতিকভাবে অন্যায় হতে পারে—এবং দাসত্ব, যৌন অধিকারহানি, জোরপূর্বক অধীনতা বা নিষ্ঠুরতার ক্ষেত্রে তা স্পষ্টভাবেই বলা যায়। “তখন বৈধ ছিল” কেবল আইনি অবস্থান ব্যাখ্যা করে; এটি নৈতিক বৈধতা প্রমাণ করে না এবং ভুক্তভোগীর কষ্ট এক বিন্দুও কমায় না। বরং “তখন সবাই করত” ধরনের যুক্তি প্রায়ই সেই অন্যায়ের সমর্থকদের নিজেদের নৈতিক অস্বস্তি, অপরাধবোধ বা cognitive dissonance কমাতে সাহায্য করে। অর্থাৎ এই যুক্তির মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা ভুক্তভোগীর নয়; সুবিধাটি পায় সেই ব্যক্তি, যে অন্যায়টিকে ন্যায্য বা সহনীয় হিসেবে মেনে নিতে চায়।
সাফিয়ার পারিবারিক পরিচয়
সাফিয়ার পিতা ছিলেন খায়বারের বিখ্যাত ইহুদি নেতা হুয়াই ইবনে আখতাব। তিনি ছিলেন বনী নাযির গোত্রের প্রভাবশালী ব্যক্তি। সাফিয়ার মা ছিলেন বনু কুরাইজা গোত্রের। অর্থাৎ, তিনি আরবের ইহুদি সমাজে সম্মানিত ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক পরিবারের সন্তান। তাঁর স্বামী কিনানা ইবনে রাবি’ ছিলেন একজন ইহুদি নেতা যিনি খায়বার আক্রমণের ফলে নির্মমভাবে নিহত হন। এই সকল পরিচয় থেকেই বোঝা যায়, সাফিয়ার জীবন শুরু হয়েছিল স্বাধীন, মর্যাদাবান ও জাতিগতভাবে গর্বিত এক ইহুদি পরিবারের নারী হিসেবে। শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন একজন স্বাধীন-চেতা তরুণী যিনি তার গোত্রকে ভালবাসতেন। এই বিষয়গুলো ধীরে ধীরে আমরা এই প্রবন্ধে প্রমাণ করবো। পাঠকদের অনুরোধ থাকবে, পুরো প্রবন্ধটি মন দিয়ে পড়ার।
বাবা-চাচার অতি আদরের সাফিয়া
খায়বার যুদ্ধের সময় সাফিয়া ছিলেন অল্পবয়সের এক কিশোরী বা তরুনী। যতদূর জানা যায়, সেই সময়ে নবী মুহাম্মদ ছিলেন ৫৭ এর কাছাকাছি একজন বৃদ্ধ মানুষ, আর তিনি ছিলেন ১৬ পেরুনো এক তরুণী। আগেই বলা হয়েছে, তার পিতার নাম হুয়াই ইবনে আখতাব, চাচার নাম আবু ইয়াসির ইবনে আখতাব। অল্পবয়সেই সাফিয়ার বিয়ে হয়েছিল কিনানা ইবন রাবির সাথে। উল্লেখ্য, খায়বার যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন সদ্য বিবাহিতা। আসুন শুরুতেই জেনে নেয়া যাক, বাবা ও চাচার অতি আদরের শিশু ছিলেন সাফিয়া [3]
সাফিয়ার সাক্ষ্য
… আমাকে বলেছেন, সাফিয়া বিনতে হুইয়াই ইবনে আখতার বলেছেন, ‘আমি বাবা ও চাচার প্রিয়পাত্র ছিলাম। আমি কাছে থাকলে তাঁরা অন্য কোনো বাচ্চাকাচ্চার দিকে চোখ তুলেও তাকাতেন না। রাসুল (সা.) তখন কুবায় বনি আমর ইবনে আউফদের সঙ্গে থাকছেন। সূর্য ওঠার আগে দুজন গেলেন তাকে দেখতে। ফিরে এলেন অনেক রাতে, শ্রান্ত, ক্লান্ত, অবসন্ন, দুর্বল। অভ্যাসমতো শিশুসুলভ চপলতায় আমি তাঁদের কাছে ছুটে গেলাম। ‘শুনলাম, চাচা বাবাকে বলছেন, “ইনিই কি তিনি? চিনতে পেরেছেন তো, ঠিক নাকি? আপনি নিশ্চিত?” “হ্যাঁ!” “তাহলে এখন করবেন, ভাবছেন?” “ঈশ্বরের শপথ, যত দিন দেহে প্রাণ আছে তত দিন আমি হব তার জানের দুশমন।

একই কথা বর্ণিত আছে ইবনে হিশামের সিরাত গ্রন্থেও [4]
সীরাতুন নবী (সা) পৃষ্ঠা ১৯৬
হযরত সফিয়্যা (রা)-এর বর্ণনা
ইবন ইসহাক বলেন : আমার কাছে বর্ণনা করেছেন আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ বকর ইব্ন মুহাম্মদ ইব্ন আমর ইবন হাযম (র)। তিনি বলেন : আমার কাছে সফিয়্যা বিন্ত হুয়াই ইবন আখতাবের নিকট থেকে রিওয়ায়ত পৌঁছেছে, তিনি বলেছেন : আমি আমার পিতা ও চাচা আবূ ইয়াসিরের সন্তানদের মধ্যে প্রিয়তম সন্তান ছিলাম। যখনই আমি তাঁদের সাথে দেখা করতাম, তখনই তাঁরা তাঁদের অন্য সন্তানদের ছেড়ে আমাকেই কোলে তুলে নিতেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মদীনায় পদার্পণ করলেন এবং কুবায় বনূ আমর ইব্ন আওফের পল্লীতে অবস্থান করেন, তখন আমার পিতা হুয়াই ইব্ন আখতাব এবং আমার চাচা আবূ ইয়াসির ইব্ন আখতাব তাঁর নিকট গেলেন ভোর সকালে। তিনি বলেন : কিন্তু সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত তাঁরা আর ফিরে এলেন না ।
তিনি বলেন : তারপর তাঁরা যখন এলেন, তখন তাঁরা এতই ক্লান্ত যে, চলতে গিয়ে যেন পড়ে যাচ্ছিলেন। আমি চিরাচরিত নিয়মে খুশি মুখে তাঁদের দিকে এগিয়ে গেলাম কিন্তু আল্লাহর কসম, দুজনের একজনও আমার দিকে একটু ফিরেও তাকালেন না। কারণ তারা ছিলেন বিষণ্ণ ও চিন্তিত। তিনি বলেন, আমি আমার চাচা আবূ ইয়াসিরকে আমার পিতা হুয়াই ইন আখতাবকে লক্ষ্য করে বলতে শুনলাম : এ কি সেই ব্যক্তি? জবাবে তিনি বললেন : হ্যাঁ, আল্লাহর কসম, তিনিই সেই ব্যক্তি। তখন চাচা বললেন : আপনি কি তাঁকে সত্যিই চিনতে পেরেছেন এবং এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন ? পিতা বললেন : হ্যাঁ। তখন চাচা বললেন : এখন আপনি তাঁর সম্পর্কে কি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ? পিতা বললেন : আজীবন তাঁর সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করে যাব ।

হুয়াই ইবনে আখতাবের সাথে শত্রুতার কারণ
মৌলিকভাবে ইসলাম ধর্ম যেহেতু একটি যুক্তি প্রমাণহীন অন্ধবিশ্বাস, তাই এই ধর্মের প্রবর্তক যে প্রশ্ন এবং যুক্তি বিরোধী হবেন তা সহজেই অনুমেয়। আসুন একটি ওয়াজ শুনি, ওয়াজে বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম আহমদুল্লাহ ও আব্বাসী ইহুদিদের সম্পর্কে কী ঘৃনাত্মক বক্তব্য দিচ্ছে তা পর্যালোচনা করি। সেই সাথে, ইহুদীদের প্রতি এই ঘৃণার কারণ যে তাদের প্রশ্ন এবং জিজ্ঞাসা, অর্থাৎ ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং, সেটিও আহমদুল্লাহরা স্বীকার করবেন।
নবী মুহাম্মদের সাথে হুয়াই ইবনে আখতাবের প্রধান শত্রুতা ছিল ধর্ম বিষয়ে। ধর্ম নিয়ে হুয়াই ইবনে আখতাব নানা ধরণের প্রশ্ন করতো, যার বেশিরভাগই মুহাম্মদ উত্তর দিতে পারতো না। নিশ্চিতভাবেই বোঝা যায়, হুয়াই ইবনে আখতাবের নানা ধরণের যুক্তি এবং প্রশ্ন শুনে নবী বেচারার ছিল খুব কাহিল অবস্থা! সেই কারণেই অনেক সময় রেগেমেগে যেতো নবী [5]
ইয়াহুদীদের বৈরিতা
ইবন ইসহাক বলেন : আল্লাহ্ তা’আলা যেহেতু আরবদের মধ্য থেকে নবী প্রেরণ করে, তাদেরকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন, এজন্যে ইয়াহূদী পণ্ডিতগণ হিংসা-বিদ্বেষবশত রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে শত্রুতাকে তাদের ব্রতরূপে গ্রহণ করে। তাদের সাথে ছিল আওস ও খাযরাজ গোত্রের কিছু লোক—যারা জাহিলিয়াতের উপর বহাল রয়েছিল। তারা ছিল মুনাফিক, তাদের পিতৃপুরুষের ধর্ম শিরকের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং পুনরুত্থানে অবিশ্বাসী। কিন্তু ইসলামের প্রভাব এবং তাদের স্বজাতির লোকদের ইসলাম গ্রহণের ফলে তারাও বাহ্যত ইসলাম গ্রহণে বাধ্য হয় এবং একে তারা ঢালরূপে গ্রহণ করে প্রাণ রক্ষায় সচেষ্ট হয়। কিন্তু গোপনে গোপনে তারা কপটতায় লিপ্ত ছিল। ইয়াহূদীদের চাওয়া-পাওয়া ও কামনা-বাসনার সাথে তাদের মিল ছিল । কেননা তারাও নবী করীম (সা)-কে অস্বীকার এবং ইসলামের বিরোধিতা করত। ইয়াহূদী পণ্ডিতদের অবস্থা ছিল এই যে, নানারূপ বিব্রতকর প্রশ্ন করে তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বিরক্ত ও অতিষ্ঠ করত এবং নানারূপ সন্দেহ জাল বিস্তার করে সত্যকে অসত্য দিয়ে ঢাকবার প্রয়াস পেত । তাদের প্রশ্নের জবাবে কুরআন শরীফের আয়াত নাযিল হত। হালাল ও হারাম সংক্রান্ত মুসলিমগণের অল্প কিছু প্রশ্ন বাদে সকল প্রশ্ন তাদেরই থাকত ।
গোত্রওয়ারীভাবে ইয়াহূদী পণ্ডিতদের নামধাম এরূপ :
বনূ নযীরের হুয়াই ইবন আখতাব এবং আবূ ইয়াসির ইবন আখতাব ও হুয়াই ইব্ন অখিতাব নামে তার দু’ভাই, সালাম ইব্ন মুশকাম, কিনানা ইব্ন রবী‘ ইব্ন আবুল হুকায়ক, সালাম ইব্ন আবুল হুকায়ক, আবূ রাফি’ আল আওয়ার—একেই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাহাবীগণ খায়বরের যুদ্ধে হত্যা করেছিলেন। রবী’ ইবন আবুল হুকায়ক, আমর ইবন জাহাশ, কা’ব ইবন আশরাফ-এ ব্যক্তি তাঈ গোত্রের শাখাগোত্র বনূ নাবহানের লোক ছিল। তার মা ছিল বনূ নযীর গোত্রীয়। হাজ্জাজ ই আমর-এ ব্যক্তি কা’ব ইব্ন আশরাফের মিত্র ছিল। কুরদাম ইবন কায়স-এ ব্যক্তিও কা’ব ইব্ন আশরাফের মিত্র ছিল। এরা সবাই ছিল বনূ নযীরের লোক ।




নবীর কঠোর সমালোচক ছিলেন হুয়াই
নবী মুহাম্মদের কাজকর্ম, নারীলোভ সম্পর্কে সেই সময়ে অনেকেই মুখ খুলেছিলেন, অনেকেই সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু তাদের নবী গুপ্ত ঘাতক পাঠিয়ে নিয়মিতই খুন করাতেন। এই সমালোচকদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন সাফিয়ার পিতা হুয়াই ইবনে আখতাব। আসুন দেখি, তিনি নবী মুহাম্মদের কী সমালোচনা করতেন, এবং সমালোচনাগুলো আসলেই যৌক্তিক ছিল কিনা [6]

এবারে আসুন দেখি, হুয়াই ইবনে আখতাবের সমালোচনাগুলো আসলেই সত্য ছিল, নাকি সেগুলো বিদ্বেষবশত অপপ্রচার ছিল? আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, নবীর একইসাথে ছিল ১১ যৌন সঙ্গী। একই রাতে তিনি লাগাতার ১১ জনার সাথে যৌন সঙ্গম করতেন। এই বিষয়ে অন্যত্র বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে, আসুন আপাতত একজন আলেমের মুখ থেকে শুনে নিই,
এবারে আসুন দ্বিতীয় পয়েন্টে যাই। অনেক মুসলিমকেই আজকাল বলতে শোনা যায় যে, নবী নাকি খুবই অল্প খেতেন, এবং অল্প খেতে পরামর্শ দিতেন। এমনকি, অল্প আহার করা নাকি নবীর সুন্নতও। অথচ সহিহ হাদিস বলে ভিন্ন কথা। নবী খাবারের ব্যাপারে ভয়াবহ লোভীই ছিলেন বলে হাদিস থেকে বোঝা যায়। আসুন হাদিসগুলো পড়ি, যেখানে দেখা যায়, একটি বকরী বা ছাগলের দুই দুইটি সামনের রান খাবার পরেও নবী আরও রান চাইতেন। আপনি ভাবুন তো, মাঝারি সাইজের একটি বকরী বা ছাগলের সামনের রানে কয় কেজি মাংস হয়? দুই দুইটি রান খাবার পরেও একজন কীভাবে আরও রান চাইতে পারে? [7] [8] –
সহীহ শামায়েলে তিরমিযী
২৬. রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর তরকারীর বর্ণনা
১২৬. আবু উবায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য এক ডেগ গোশত রান্না করলাম। তিনি বকরীর সামনের উরুর গোশত অধিক পছন্দ করতেন। তাই আমি তাকে সামনের একটি পা দিলাম। তারপর তিনি বললেন, আমাকে সামনের আরেকটি পা দাও। তখন আমি তাকে সামনের আরেকটি পা দিলাম। তারপর তিনি পুনরায় বললেন, আমাকে সামনের আরেকটি পা দাও। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! বকরীর সামনের পা কয়টি থাকে? তিনি বললেন, সে মহান সত্তার কসম, যার হাতে আমার জীবন! যদি তুমি চুপ থাকতে তাহলে আমি যতক্ষণ সামনের পা চাইতাম, ততক্ষণ তুমি দিতে পারতে।[1]
[1] মুজামুল কাবীর, হা/১৮২৮৬; মুসনাদে বাযযার, হা/৮৩৪৫।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি)
ভূমিকা
পরিচ্ছেদঃ ৭. খাদ্যে বরকত প্রদানের মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে
৪৫. শাহর ইবনু হাওশাব, আবু উবাইদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য এক হাঁড়ি (গোশত) রান্না করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন: ’আমাকে সামনের একটি রান দাও।’ তিনি সামনের রানের গোশত পছন্দ করতেন। সে তাঁকে সামনের রান দিল। তিনি আবার বললেন: ’আমাকে সামনের রান দাও।’ তখন সে তাঁকে সামনের রান দিল। তিনি আবারও বললেন: ’আমাকে সামনের রান দাও।’ তখন আমি তাকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! একটি ছাগলের সামনের রান কয়টি হয়? তিনি উত্তরে বললেন: ’যার হাতে আমার প্রাণ সেই মহান সত্তার কসম! তুমি যদি চুপ থাকতে তাহলে যতক্ষণ আমি চাইতাম ততক্ষণ তুমি আমাকে সামনের রান দিতেই থাকতে।’[1]
[1] তাহক্বীক্ব: সনদ হাসান, শাহর ইবনু হাওশাবের কারণে।
তাখরীজ: তাবারানী, কাবীর ২২/৩৩৫ নং ৮৪২; তিরমিযী, শামাইল ১৭০।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
আবু বকরের সাথে দ্বন্দ্ব
নবীর সাথে সাথে আবু বকরের সাথে ইহুদীদের নানা ধরনের ধর্মতাত্ত্বিক তর্ক হতো। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সে সব তর্কে বেশিরভাগ সময়ই মুসলিমরাই ইহুদিদের আক্রমণ করে বসতো। যুক্তির বিরুদ্ধে যুক্তি, তর্কের বিরুদ্ধে তর্ক, কথার বিরুদ্ধে কথার জবাব সংস্কৃতিটি মুসলিমদের মধ্যে একদম শুরু থেকেই অনুপস্থিত। সেই কারণেই আমরা দেখতে পাই, প্রশ্ন করায় আবু বকর ঘুষি মেরে বসতো[9]
আবু বকরের ইহুদি শিক্ষালয়ে প্রবেশ
একদিন আবু বকর সিদ্দীক (রা.) ইহুদিদের শিক্ষালয়ে প্রবেশ করলেন। তিনি সেখানে বিপুলসংখ্যক লোককে এক ব্যক্তির চারপাশে সমবেত দেখতে পেলেন। ঐ ব্যক্তিটি ফানহাস নামে পরিচিত ছিল। সে ছিল তাদের একজন পণ্ডিত ও ধর্মনেতা। তার কাছে তখন আশইয়া নামে তাদের আরেকজন ধর্মীয় পণ্ডিতও উপস্থিত ছিলেন।
আবু বকর (রা.) ফানহাসকে উদ্দেশ করে বললেন,
তোমার জন্য আফসোস, হে ফানহাস! আল্লাহকে ভয় কর এবং ইসলাম গ্রহণ কর।
আল্লাহর কসম! তুমি নিশ্চিতভাবেই জানো যে মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল। তিনি তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তোমাদের কাছে সংরক্ষিত তাওরাত ও ইনজিলে তোমরা তাঁর বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য পেয়েছ।”
তখন ফানহাস জবাবে আবু বকর (রা.)-কে উদ্দেশ করে বলল,
“আল্লাহর কসম, হে আবু বকর! আমাদের আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। বরং তাঁরই আমাদের প্রয়োজন। আমরা তাঁর কাছে কাকুতি-মিনতি করি না, বরং তিনিই আমাদের কাছে তা করেন। আমরা তাঁর কাছে দীনহীন নই, বরং তিনিই আমাদের প্রতি নির্ভরশীল। যদি তিনি আমাদের প্রতি নির্ভরশীল না হতেন, তবে আমাদের সম্পদ থেকে ঋণ চাইতেন না—যেমনটি তোমাদের নবী ধারণা করেন। তিনি আমাদেরকে সুদ থেকে বিরত থাকতে বলেন, অথচ নিজেই তা আমাদের থেকে গ্রহণ করেন।”
আবু বকরের ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া
এই কথা শুনে আবু বকর (রা.) রাগান্বিত হলেন এবং ফানহাসের গালে জোরে চড় মারলেন। তিনি বললেন,
“যাঁর হাতে আমার প্রাণ, সেই মহান সত্তার কসম! যদি তোমাদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি না থাকত, তবে আমি তোমার মাথা চূর্ণ করতাম, হে আল্লাহর শত্রু!”
রাবি বলেন, এরপর ফানহাস রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গিয়ে অভিযোগ করল,
“হে মুহাম্মদ! আপনার সঙ্গী আমার সাথে দুর্ব্যবহার করেছেন। দয়া করে আপনি তা লক্ষ্য করুন।”
তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু বকর (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন,
“তুমি তার সঙ্গে এমন আচরণ করলে কেন?”
আবু বকর (রা.) বললেন,
“ইয়া রাসূলাল্লাহ! নিশ্চয়ই এই আল্লাহর শত্রু আল্লাহ সম্পর্কে জঘন্য মন্তব্য করেছে। সে বলেছে যে, আল্লাহ দরিদ্র, অথচ তারা ধনী। তার এই কথায় আমি অসন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার গালে আঘাত করেছি।”
কিন্তু ফানহাস সাথে সাথেই তার মন্তব্য অস্বীকার করে বসে।


আসুন ইহুদীরা এই বিষয়টি কেন উত্থাপন করেছিল সে সম্পর্কেও জেনে নেয়া যাক। ইহুদীদের এই প্রশ্নটি খুবই যৌক্তিক ছিল বলেই বোঝা যায়। ইসলাম ধর্মে আল্লাহকে সর্বশক্তিমান, অমুখাপেক্ষী এবং স্রষ্টা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যিনি সমস্ত সৃষ্টির উপরে ক্ষমতাবান এবং যিনি কারো ওপর নির্ভরশীল নন। আল্লাহর এই অবস্থান এমন একটি ধারণা সৃষ্টি করে, যেখানে তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিখুঁত এবং সব ধরনের প্রয়োজন থেকে মুক্ত। তবে, কোরআনের কিছু আয়াতে এমন কিছু বক্তব্য দেখা যায়, যা এই অবস্থান এবং ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। যেমন, কোরআনের সূরা মুহাম্মদ-আয়াত ৭, সূরা বাকারা-আয়াত ২৪৫, সূরা হাদিদ-আয়াত ১১ এবং ১৮) এবং সূরা আত-তাগাবুন-আয়াত ১৭-এ আল্লাহ মানুষের কাছে ঋণ চেয়েছেন বলে দেখা যায়। যদি আল্লাহ সত্যিই সবকিছুর স্রষ্টা এবং মালিক হন, তবে কেন তাকে কোনো কিছুর জন্য সামান্য মানুষের কাছে “ঋণ” চাইতে হবে? যিনি হও বললেই সবকিছু হয়ে যায়, তিনি কাতর সুরে মানুষের কাছ থেকে ধারকর্য করছেন, বিষয়টি অত্যন্ত হাস্যকর। এ ধরনের বক্তব্য একটি অমুখাপেক্ষী সত্তার দাবীর সাথে যৌক্তিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে এবং একটি গুরুতর দার্শনিক প্রশ্নের জন্ম দেয়: একটি সর্বশক্তিমান সত্তার পক্ষ থেকে মানুষের কাছে ঋণ চাওয়া কি তার প্রকৃতির সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে না? আসুন আয়াতগুলো পড়ি, যেই আয়াতগুলো পড়লে যেকোন যুক্তিবাদী মানুষের মনেই প্রশ্নগুলো জাগতে পারে,
সূরা মুহাম্মদ, আয়াত ৭
O you who have believed, if you support Allāh, He will support you and plant firmly your feet.
— Saheeh International
O ye who believe! If ye help Allah, He will help you and will make your foothold firm.
— M. Pickthall
হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য কর, তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন আর তোমাদের পাগুলোকে দৃঢ়প্রতিষ্ঠ করবেন।
— Taisirul Quran
হে মু’মিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের অবস্থান দৃঢ় করবেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
হে মুমিনগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর তবে আল্লাহও তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা সুদৃঢ় করে দেবেন।
— Rawai Al-bayan
হে মুমিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, তবে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা সমূহ সুদৃঢ় করবেন।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
সূরা বাকারা, আয়াত ২৪৫
Who is it that would loan Allāh a goodly loan so He may multiply it for him many times over? And it is Allāh who withholds and grants abundance, and to Him you will be returned.
— Saheeh International
Who is it that will lend unto Allah a goodly loan, so that He may give it increase manifold? Allah straiteneth and enlargeth. Unto Him ye will return.
— M. Pickthall
এমন ব্যক্তি কে আছে যে আল্লাহকে উত্তম কর্জ প্রদান করবে? তাহলে তার সেই কর্জকে তার জন্য আল্লাহ বহু গুণ বর্ধিত করে দেবেন এবং আল্লাহই সীমিত ও প্রসারিত ক’রে থাকেন এবং তাঁর দিকেই তোমরা ফিরে যাবে।
— Taisirul Quran
কে সে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণদান করে? অনন্তর তিনি তাকে দ্বিগুণ, বহুগুণ বর্ধিত করেন এবং আল্লাহই (মানুষের আর্থিক অবস্থাকে) কৃচ্ছ বা স্বচ্ছল করে থাকেন এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।
— Sheikh Mujibur Rahman
কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে, ফলে তিনি তার জন্য বহু গুণে বাড়িয়ে দেবেন? আর আল্লাহ সংকীর্ণ করেন ও প্রসারিত করেন এবং তাঁরই নিকট তোমাদেরকে ফিরানো হবে।
— Rawai Al-bayan
কে সে, যে আল্লাহ্কে কর্যে হাসানা প্রদান করবে ? তিনি তার জন্য তা বহুগুনে বৃদ্ধি করবেন [১।] আর আল্লাহ্ সংকুচিত ও সম্প্রসারিত করেন এবং তাঁর দিকেই তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তিত করা হবে।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
সূরা হাদিদ, আয়াত ১১
Who is it that would loan Allāh a goodly loan so He will multiply it for him and he will have a noble reward?
— Saheeh International
Who is he that will lend unto Allah a goodly loan, that He may double it for him and his may be a rich reward?
— M. Pickthall
এমন কে আছে যে, আল্লাহকে উত্তম ঋণ দিবে? তাহলে তিনি তা তার জন্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিবেন আর তার জন্য আছে সম্মানজনক প্রতিফল।
— Taisirul Quran
কে আছে যে আল্লাহকে দিবে উত্তম ঋণ? তাহলে তিনি বহু গুণে একে বৃদ্ধি করবেন এবং তার জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার।
— Sheikh Mujibur Rahman
এমন কে আছে যে, আল্লাহকে উত্তম করয দিবে ? তাহলে তিনি তার জন্য তা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দিবেন এবং তার জন্য রয়েছে সম্মানজনক প্রতিদান।
— Rawai Al-bayan
এমন কে আছে যে আল্লাহকে দেবে উত্তম ঋণ? তাহলে তিনি বহু গুণ এটাকে বৃদ্ধি করবেন তার জন্য। আর তার জন্য রয়েছে সম্মানজনক পুরুস্কার [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
সূরা হাদিদ, আয়াত ১৮
Indeed, the men who practice charity and the women who practice charity and [they who] have loaned Allāh a goodly loan – it will be multiplied for them, and they will have a noble reward.
— Saheeh International
Lo! those who give alms, both men and women, and lend unto Allah a goodly loan, it will be doubled for them, and theirs will be a rich reward.
— M. Pickthall
দানশীল পুরুষরা আর দানশীলা নারীরা আর যারা আল্লাহকে ঋণ দেয়- উত্তম ঋণ, তাদের জন্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়া হবে, আর তাদের জন্য আছে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিদান।
— Taisirul Quran
দানশীল পুরুষ ও দানশীলা নারী এবং যারা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান করে তাদেরকে দেয়া হবে বহুগুণ বেশি এবং তাদের জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী এবং যারা আল্লাহকে উত্তম করয দেয়, তাদের জন্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়া হবে এবং তাদের জন্য রয়েছে সম্মানজনক প্রতিদান।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় দানশীল পুরুষগণ ও দানশীল নারীগণ এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান করে তাদেরকে দেয়া হবে বহুগুণ বেশী এবং তাদের জন্য রয়েছে সম্মানজনক পুরস্কার।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
সূরা আত-তাগাবুন, আয়াত ১৭
If you loan Allāh a goodly loan, He will multiply it for you and forgive you. And Allāh is [most] Appreciative1 and Forbearing,2
— Saheeh International
If ye lend unto Allah a goodly loan, He will double it for you and will forgive you, for Allah is Responsive, Clement,
— M. Pickthall
তোমরা যদি আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, তবে তিনি তা তোমাদের জন্য দ্বিগুণ করে দেবেন, আর তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন, আল্লাহ (কারো কাজের) অতি মর্যাদাদানকারী, সহনশীল।
— Taisirul Quran
যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান কর তাহলে তিনি তোমাদের জন্য ওটা দ্বিগুণ বৃদ্ধি করবেন এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ গুণগ্রাহী ও সহনশীল।
— Sheikh Mujibur Rahman
যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, তিনি তা তোমাদের জন্য দ্বিগুন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন। আল্লাহ গুণগ্রাহী, পরম ধৈর্যশীল।
— Rawai Al-bayan
যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান কর তিনি তোমাদের জন্য তা বহু গুণ বৃদ্ধি করবেন এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ গুণগ্ৰাহী, পরম সহিষ্ণু।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আল্লাহর স্রষ্টা কে প্রশ্ন করায় নবীর রাগ
একটি খুবই জরুরি প্রশ্ন, যেই প্রশ্নটি সকলের মাথাতেই আসে যে, আল্লাহ থেকে থাকলে আল্লাহকে কে বানিয়েছে! কিন্তু নবীকে এই প্রশ্ন করলে নবী তেলেবেগুনে জ্বলে উঠত বলে জানা যায় [10]
আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে ইহুদিদের ধৃষ্টতাপূর্ণ জিজ্ঞাসাবাদ
ইবন ইসহাক বলেন: আমাকে সাঈদ ইবন জুবায়র জানিয়েছেন যে, একবার কতিপয় ইহুদি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, “হে মুহাম্মদ, আল্লাহ তো সমগ্র সৃষ্টি জগতকে সৃষ্টি করেছেন, তবে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে?”
এ প্রশ্ন শুনে রাসূল (সা.) এত রেগে যান যে, তাঁর মুখমণ্ডল বিবর্ণ হয়ে যায় এবং তিনি তাদেরকে আল্লাহর গযবের ব্যাপারে সাবধান করে দেন। এ সময়ে তাঁর কাছে জিবরীল (আ.) আসেন এবং তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, “হে মুহাম্মদ! আপনি শান্ত হোন।” এরপর তিনি ইহুদিদের প্রশ্নের যে জবাব আল্লাহর কাছ থেকে নিয়ে এসেছিলেন, তা তাঁকে শোনালেন:
“আপনি বলুন, তিনি আল্লাহ একক ও অদ্বিতীয়, আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন; তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি, তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।” (১১২:১-৪)
রাসূলুল্লাহ (সা.) সমবেত ইহুদিদের সামনে উপরোক্ত সূরা পড়ে শোনানোর পর তারা বলল, “হে মুহাম্মদ! আপনার এ বক্তব্য না হয় বুঝলাম। এখন বলুন, তাঁর আকার-আকৃতি কেমন? তাঁর হাত কেমন? তাঁর বাহু কেমন?”
এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) আগের চাইতেও বেশি রাগান্বিত হলেন এবং তাদের পুনরায় সতর্ক করলেন। এ সময় জিবরীল (আ.) তাঁর কাছে আসলেন এবং প্রথমবার যা বলেছিলেন, তার পুনরাবৃত্তি করলেন। আর এ প্রশ্নের যে জবাব আল্লাহর কাছ থেকে নিয়ে এসেছিলেন, তা তাঁকে শোনালেন। আল্লাহর সেই জবাব হল:
“তারা আল্লাহকে যথোচিত সম্মান করে না। কিয়ামতের দিন সমস্ত পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুঠোয় এবং আকাশমণ্ডলী থাকবে ভাঁজ করা অবস্থায় তাঁর ডান হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি, তারা যাকে শরীক করে তিনি তার ঊর্ধ্বে।”(৩৯:৬৭)

বনু নাদীরের নিমন্ত্রণ এবং মুহাম্মদের পলায়ন
বনু নাদির গোত্রের প্রধানগণ নবী মুহাম্মদ ও তার সাহাবীদের নিমন্ত্রণ করেছিল আলোচনার উদ্দেশ্যে, চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল নবী মুহাম্মদের নবী হওয়ার প্রমাণ দেখাতে। ইহুদিদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মুহাম্মদ যদি ইহুদি আলেমদের সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেন, তাহলে বনু নাদীর গোত্রের সবাই ইসলামের সত্যতা বুঝতে পারবে এবং ইসলামকে কবুল করে নিবে। একটি নির্দিষ্ট স্থানে মুহাম্মদ ৩০ জন সঙ্গী নিয়ে আসবে, অপরদিকে ইহুদিরাও ৩০ জনকে নিয়ে আসবে। নবী সেখানে গেলেন তার সাহাবীগণ সহ। কিন্তু বিতর্ক শুরুর আগেই হঠাৎ তিনি সেখান থেকে উঠে চলে আসলেন, অন্য সবাইকে ফেলে চুপিচুপি। অন্য সাহাবীগণ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলেন, কিন্তু নবীর আর কোন খোঁজ খবর নেই! তাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এরপরে আরেকজনার কাছ থেকে শুনলেন নবী মদিনা চলে গেছেন। তারা মদিনা ফিরে আসলেন। ফিরে আসার পরে জানতে পারলেন, নবীকে নাকি জিব্রাইল এসে চুপিচুপি বলেছে, তারা যেখানে বসে ছিল সেই ঘরের ছাদে কিছু লোক নবীকে হত্যা করার জন্য বসে ছিল। কিন্তু সেই লোকগুলো কেন নবীর সাহাবীদের হত্যা করলো না, কেন সাহাবীদের কেউই এরকম কাউকে দেখতে পেলেন না, নবীও বা কাউকে কিছু না বলে একা একা চলে আসলেন কেন, তার সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। অর্থাৎ এই ইহুদিদের এই গোপন ষড়যন্ত্রের কথা শুধুমাত্র নবী একাই জানেন, যার কোন বাস্তব প্রমাণ নেই। সেইদিন বন্ধু সঙ্গি সাথীদের বিপদের মুখে ফেলে নবীর চম্পট দেয়ার এই ঘটনাটি কতটা হাস্যকর এবং ইহুদিদের সাথে বিতর্ক এড়াবার কৌশল, তা বুদ্ধিমান মানুষ মাত্রই বুঝবেন। এর পরদিনই মুহাম্মদের নেতৃত্বে বনু নাদিরের ওপর আক্রমণ চালানো হয় [11] [12] –

রাসূলুল্লাহ (সা) তখন তাদের একটি ঘরের দেয়ালের পাশে বসা ছিলেন। তারা বলল, কে আছে যে, ছাদে উঠে ওখান থেকে একটি পাথর ফেলে দিয়ে মুহাম্মাদকে হত্যা করে আমাদেরকে তাঁর হাত থেকে নিষ্কৃতি দেবে? আমর ইবন জাহহাশ এগিয়ে এসে বলল, আমি এ জন্যে প্রস্তুত আছ। সে মতে পাথর নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে সে স্থানে উঠে । রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখনও সেখানে একদল সাহাবীসহ বসা ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন হযরত আবু বকর (রা) উমর (রা) এবং আলী (রা)। ওদের দুরভিসন্ধি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট আসমানী সংবাদ এসে যায়। তিনি কাউকে কিছু না বলে উঠে পড়েন এবং মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। দীর্ঘক্ষণ ঘটনাস্থলে ফিরে না আসায় সাহাবীগণ তাঁর খোঁজে বের হন, মদীনার দিক থেকে আগত এক লোককে দেখে তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কথা তাকে জিজ্ঞেস করে। সে ব্যক্তি বলেছিল যে, আমি তো তাঁকে মদীনায় প্রবেশ করতে দেখেছি। এ সংবাদ পেয়ে সাহাবীগণ সকলে মদীনায় ফিরে এলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট সমবেত হলেন। তিনি ইয়াহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতার কথা তাঁদেরকে অবহিত করলেন।

উপরের দলিলে দেখতে পারলেন যে, মুহাম্মদ হুট করে তার নবুয়্যতের প্রমাণ না দিয়ে সেখান থেকে চলে আসেন। এবারে আসুন দেখা যাক, এর আগে পরে কী ঘটেছিল [13]
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৪/ কর, খাজনা, অনুদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পর্কে
পরিচ্ছেদঃ ১৬১. বনূ নযীরের ঘটনা সম্পর্কে।
২৯৯৪. মুহাম্মদ ইবন দাঊদ ইবন সুফইয়ান (রহঃ) ……. আবদুর রহমান ইবন কা’ব ইবন মালিক (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জনৈক সাহাবী হতে বর্ণনা করেছেন যে, কুরায়শ কাফিররা আবদুল্লাহ ইবন উবাই এবং তার মূর্তি-পূজক সাথীদের, যারা আওস ও খাযরাজ গোত্রের লোক, এ মর্মে পত্র লেখে, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধের আগে মদীনায় অবস্থান করছিলেনঃ তোমরা আমাদের সাথী (মুহাম্মদ) কে জায়গা দিয়েছ। এ জন্য আমরা আল্লাহ্র নামে শপথ করে বলছি, হয়তো তাঁর সাথে যুদ্ধ কর, নয়তো তাঁকে বের করে দাও। অন্যথায় আমরা সম্মিলিতভাবে আক্রমণ করে তোমাদের যোদ্ধাদের হত্যা করব এবং তোমাদের স্ত্রীদের আমাদের দখলে আনব।
আবদুল্লাহ ইবন উবাই এবং তার মূর্তিপূজারী সাথীরা এ খবর পাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। এ খবর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌছবার পর তিনি তাদের সাথে সাক্ষাত করেন এবং বলেনঃ তোমরা কুরায়শদের নিকট হতে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী চিঠি পেয়েছ, কিন্তু তা তোমাদের জন্য এত মারাত্মক নয়, যত না ক্ষতি তোমরা নিজেরা নিজেদের করবে। কেননা, তোমরা তো তোমাদের সন্তান-সন্ততি ও ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সংকল্প করছ।
তারা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এরূপ কথা শুনলো, তখন তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। এ খবর কুরায়শ কাফিরদের কাছে পৌছলে তারা বদর যুদ্ধের পর ইয়াহুদীদের নিকট লিখলোঃ তোমরা ঘরবাড়ী ও দুর্গের অধিকারী। কাজেই তোমাদের উচিত আমাদের সাথী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে যুদ্ধ করা। অন্যথায় আমরা তোমাদের সাথে এরূপ করব, সেরূপ করব। আর আমাদের ও তোমাদের স্ত্রীদের মাঝে কোন পার্থক্য থাকবে না।
যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তারা এরূপ চিঠি পেল, তখন বনূ নযীরের ইয়াহুদীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করলো এবং তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ মর্মে অবহিত করে যে, আপনি আপনার সাথীদের থেকে ত্রিশজন নিয়ে আমাদের কাছে আসুন এবং আমাদের ত্রিশজন আলিম আপনার সংগে এক আলাদা স্থানে দেখা করবে। তারা আপনার কথা শুনবে, যদি তারা আপনার উপর ঈমান আনে এবং বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে আমরা আপনার উপর ঈমান আনব।
পরদিন সকাল বেলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল সেনাবাহিনী নিয়ে তাদের উপর হামলা করেন এবং তাদের অবরোধ করে বলেনঃ আল্লাহ্র শপথ! তোমরা যতক্ষণ অঙ্গীকার না করবে, ততক্ষণ আমি তোমাদের ব্যাপারে নিশ্চিত নই। তখন তারা (ইয়াহুদীরা) অঙ্গীকার করতে অস্বীকার করে। ফলে তিনি সেদিন তাদের সাথে দিনভর যুদ্ধে রত থাকেন। পরদিন তিনি বনূ নযীরকে বাদ দিয়ে বনূ কুরাইযার উপর আক্রমণ করেন এবং তাদের অঙ্গীকারবদ্ধ হতে বলেন। ফলে তারা তাঁর সংগে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। তখন তিনি তাদের নিকট হতে প্রত্যাবর্তন করে পুনরায় বনূ নযীরকে অবরোধ করেন এবং তাদের সাথে ততক্ষণ যুদ্ধ করেন, যতক্ষণ না তারা দেশত্যাগে বাধ্য হয়।
বনূ নযীরের লোকেরা তাদের উটের পিঠে ঘরের দরজা, চৌকাঠ ইত্যাদি যে পরিমাণ মালামাল নেওয়া সম্ভব ছিল, তা নিয়ে যায়। এবার বনূ নযীরের খেজুরের বাগান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অধিকারে আসে, যা আল্লাহ্ তা’আলা বিশেষভাবে প্রদান করেন। যেমন আল্লাহ্ বলেনঃ
وَمَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلاَ رِكَابٍ
অর্থাৎ আল্লাহ্ কাফিরদের মাল হতে যে সস্পদ তাঁর রাসূলকে প্রদান করেন, তা হাসিলের জন্য তোমরা তোমাদের ঘোড়া অথবা উট হাঁকাও নি, অর্থাৎ ঐ সম্পদ বিনা যুদ্ধে হাসিল হয়।
অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ মালের অধিকাংশই মুহাজিরদের মাঝে বণ্টন করে দেন এবং অভাবগ্রস্ত দু’জন আনসারকে তা হতে অংশ প্রদান করেন। এ দু’জন ছাড়া অন্য আনসার সাহাবীদের মাঝে এ মাল বিতরণ করা হয়নি। অবশিষ্ট মাল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য সাদকা স্বরূপ ছিল, যা বনূ ফাতিমার নিয়ন্ত্রণে ছিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পিতা হুয়াই ইবনে আখতাবকে জবাই
এরপরে বনু কুরাইজা গোত্রকে নবী ২৫ দিন ধরে অবরোধ করে রেখে শেষে তাদের আত্মসমর্পনে বাধ্য করে, এবং সেখানে বন্দীদের মধ্যে হুয়াই ইবনে আখতাবকেও অন্য পুরুষদের সাথে হত্যা করে [14]

আসুন এই রেফারেন্সটি আরও একটি সূত্র থেকে দেখে নেয়া যাক, [15]
এভাবে বন্দীদের সকলের (যাদের সংখ্যা ছয় এবং সাত শতের মধ্যবর্তী ছিল) শিরচ্ছেদ করা হয়।
উল্লেখিত ব্যবস্থাপনার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিপক্ক অঙ্গীকার ভঙ্গকারী বনু কুরাইযার বিশ্বাসঘাতকতা ও বিদ্রোহের সম্পূর্ণরূপে মূলোৎপাটন করে ফেলা হয়। মুসলিমগণকে নিংশেষ করে ফেলার উদ্দেশ্যে তাঁদের দুঃখ দুর্দশা ও দারুন দুঃসময়ে শত্রুদের সাহায্য দান করে তারা যে জঘন্য যুদ্ধ অপরাধ করেছিল তাতে তারা যথার্থই প্রাণদণ্ড পাওয়ার যোগ্য হয়ে গিয়েছিল। বনু কুরাইযার ন্যায় বনু নাযীর গোত্রের নিকৃষ্ট শয়তান ও আহযাব যুদ্ধের বড় অপরাধী হুয়াই বিন আখতাব ও তার নানা অন্যায় অত্যাচারের কারণে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হয়ে পড়েছিল।
এ ব্যক্তি উম্মুল মু’মিনীন কারণে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হয়ে পড়েছিল। [এ ব্যক্তি উম্মুল মু’মিনীন সাফিয়ার (স)-এর পিতা ছিল। কুরাইশ এবং গাতফানদের সঙ্গে যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর যখন বনু কুরাইযাকে অবরোধ করা হয় এবং তারা দূর্গ মধ্যে অবরুদ্ধ জীবন যাপন করতে থাকে তখন বনু কুরাইযার সঙ্গে হুয়াই বিন আখতাবও দূর্গের মধ্যে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকে। কারণ, আহযাব যুদ্ধের সময় এ ব্যক্তি যখন কা’ব বিন আসাদকে বিশ্বাসঘাতকতা ও গাদ্দারী করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে এসেছিল তখন সে অঙ্গীকার করেছিল তখন চলছিল সে অঙ্গীকারেরই বাস্তবায়ন।
তাকে যখন খিদমতে নববীতে নিয়ে আসা হল তখন সে এক জোড়া পরিধেয় বস্ত্র দ্বারা নিজেকে আবৃত করে রেখেছিল। এ পোষাককে সে নিজেই প্রত্যেক দিক থেকে এক এক আঙ্গুল করে চিরে রেখেছিল যাতে তাকে মোহরাঙ্কিত জান্নাতী সুধা 357 লুণ্ঠিত মালামালের মধ্যে গণ্য করা না হয়। তার হাত দুটি গ্রীবার পেছন দিকে দড়ি দ্বারা একত্রে বাঁধা অবস্থায় ছিল। সে রাসূলে করীম -কে লক্ষ্য করে বলল, ‘আমি আপনার শত্রুতার জন্য নিজে নিজেকে নিন্দা করি নি। কিন্তু যে আল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ করে সে পরাজিত হয়।’
অতঃপর লোকজনকে সম্বোধন করে বলল, ‘ওহে লোকেরা আল্লাহর ফায়সালায় কোন অসুবিধা নেই। এটাতো ভাগ্যের লিখিত ব্যাপার। এটি হচ্ছে এক বড় হত্যাকণ্ড যা বনু ইসরাইলের উপর আল্লাহ তা’আলা লিপিবদ্ধ করে দিয়েছেন। এরপর সে বসে পড়ল এবং তার গলা কেটে দেয়া হল।
এ ঘটনায় বনু কুরাইযার এক মহিলাকেও হত্যা করা হয়। সে খাল্লাদ বিন সোওয়ায়েদ -এর উপর যাঁতার একটি পাট নিক্ষেপ করে তাঁকে শহীদ করেছিল। তাই এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিদান হিসেবেই তাকে হত্যা করা হয়।
এ ঘটনা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহর নির্দেশ প্রদান করেন যে, যাদের নাভির নিম্নদেশের লোম গজিয়েছে তাদের হত্যা করা হোক । আতিয়া কোরাযীর তখনো সে লোম গজায়নি যার ফলে তাকে জীবিত ছেড়ে দেয়া হয়। পরবর্তী কালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করে অন্যতম সাহাবী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন।

নবী নিজে কী জবাইযজ্ঞে অংশ নিয়েছিলেন?
প্রশ্ন জাগতে পারে, এই জবাই কী নবী নিজে করেছিল, নাকি তার অনুপস্থিতিতে তার সাহাবীরা করেছিল? সহিহ হাদিস থেকেই জানা যায়, মুহাম্মদ বানু কুরাইজার বাজারে শত শত মানুষকে লাইন ধরে দাড় করিয়ে নিজে উপস্থিত থেকে জবাই করছিলেন। একজন মানুষ বসে নির্দেশ দিচ্ছে, তার সামনে শত শত মানুষকে লাইন ধরে ধরে আনা হচ্ছে, আর জবাই করে লাশ গর্তে ফেলা হচ্ছে। দৃশ্যটি কল্পনা করুন। সেই সময়ে একজন নারী, যিনি সম্ভবত স্বজন হারাবার বেদনাতেই পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিলেন আর নবীকে গালি দিচ্ছিল। সে জানতো, এই কারণে তাকেও হত্যা করা হবে, কিন্তু হাসতে হাসতেই তিনি মৃত্যুকে বেছে নিয়েছিলেন। যা দেখে আয়িশা নিতান্তই অবাক হয়ে যায় [16] [17]
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৯/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ১২১. নারী হত্যা সম্পর্কে
২৬৭১। ‘আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, বনী কুরাইযার কোনো মহিলাকে হত্যা করা হয়নি। তবে এক মহিলাকে হত্যা করা হয়। সে আমার পাশে বসে কথা বলছিল এবং অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিলো। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে তাদের পুরুষদেরকে হত্যা করছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি তার নাম ধরে ডেকে বললো, অমুক মহিলাটি কোথায়? সে বললো, আমি। আমি (‘আয়িশাহ) বললাম, তোমরা কি হলো, (ডাকছো কেন)? সে বললো, আমি যা ঘটিয়েছি সেজন্য (সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অশ্লীল ভাষায় গালি দিয়েছিলো)। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, তাকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হলো। আমি ঘটনাটি আজও ভুলতে পারিনি। আমি তার আচরণে অবাক হয়েছিলাম যে, তাকে হত্যা করা হবে একথা জেনেও সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিলো।(1)
(1). হাসান।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৯/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ১৫. মহিলাদের হত্যা সম্পর্কে।
২৬৬২. ‘আবদুল্লাহ্ ইবন মুহাম্মদ নুফায়লী (রহঃ) ….. আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বনূ কুরাইযার মহিলাদের থেকে কোন মহিলাকে হত্যা করা হয়নি, কিন্তু একজন মহিলাকে (হত্যা করা হয়), যে আমার পাশে বসে কথা বলছিল এবং অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিল। এ সময় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের পুরুষদের এক বাজারে হত্যা করেছিলেন। তখন জনৈক আহবানকারী সে মহিলার নাম ধরে ডাকে যে, অমুক মহিলা কোথায়? তখন সে বলে, এই তো আমি। আমি (আয়িশা) তাকে জিজ্ঞাসা করিঃ তোমার ব্যাপার কি? তখন সে বলেঃ আমি একটা ঘটনা ঘটিয়েছি, (অর্থাৎ সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দেয়)। আয়িশাহ (রাঃ) বলেনঃ তখন সে (আহবানকারী) তাকে নিয়ে যায় এবং তার শিরচ্ছেদ করে। তিনি বলেনঃ আমি সেই ঘটনাটি এখনো ভুলতে পারিনি। কেননা তার আচরণে তাজ্জবের ব্যাপার এই ছিল যে, সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিল, অথচ সে জানত যে, তাকে হত্যা করা হবে।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
এই ঘটনাটির আরেকটি বর্ণনা উল্লেখ করছি। এই বর্ণনাটি অত্যন্ত হৃদয় বিদারক [18]
সেদিন বনী কুরায়জার রমণীদের মধ্যে হত্যা করা হয়েছিলো কেবল বানানা নাম্নী এক রমণীকে। সে ছিলো বনী নাজির সম্প্রদায়ের মেয়ে। কিন্তু তার বিয়ে হয়েছিলো বনী কুরায়জার এক যুবকের সাথে। তাদের দাম্পত্যপ্রণয় ছিলো অত্যন্ত গভীর। তখন অবরোধের শেষ পর্যায়। তাদের সকলেই বুঝলো, এবার আর তাদের নিস্তার নেই। বানানা তার স্বামীকে বললো, তোমাকে তো এবার আমার কাছ থেকে পৃথক করে ফেলা হবে। তাই যদি হয় তবে আমার আর বেঁচে থেকে কাজ কী? যুবক বললো, মোহাম্মদ জয়ী হলে তোমাকে হত্যা করবে না। করবে চিরদাসী। কারণ তার ধর্মে নারী হত্যার বিধান নেই। কিন্তু তুমি কারো দাসী হয়ে থাকবে, সে কল্পনাও আমার জন্য অসহনীয়। তার চেয়ে তুমি এক কাজ করো। ওই আটা পেশার যাঁতার চাকতিটি এখান থেকে নিচে গড়িয়ে দাও। যদি ওই চাকতির আঘাতে কোনো মুসলমান সৈনিক নিহত হয়, তবে সেই অপরাধে তোমাকে দেওয়া হবে মৃত্যুদণ্ড। আমি চাই তোমাকে মৃত্যুদণ্ডই দেওয়া হোক। বানানা তার স্বামীর কথামতো যাঁতার চাকতিটি দুর্গের একটি ফোকর দিয়ে নিচে গড়িয়ে দিলো। বাইরে তখন মধ্যাহ্নের প্রখর উত্তাপ। ওই সময় মুসলিম সৈন্যদের অনেকে দুর্গের দেয়ালের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলো। চাকতি সোজা গড়িয়ে পড়লো সেরকম বিশ্রামরত এক সৈনিকের মাথায়। ফলে অল্পক্ষণের মধ্যে শাহাদত বরণ করলেন তিনি।
ওরওয়ার বর্ণনায় এসেছে, জননী আয়েশা বলেছেন, যখন বনী কুরায়জার পুরুষদেরকে হত্যা করা হয়, তখন বানানা ছিলো আমার কাছে। প্রায় সারাক্ষণ হাস্য-কৌতুকে মেতে থাকা ছিলো তার স্বভাব। ওদিকে তাদের পুরুষদেরকে হত্যা করা হচ্ছিলো, আর সে মাঝে মাঝেই কৌতুক করে বলছিলো, কী মজা! আজ বনী কুরায়জার পুরুষদেরকে বধ করা হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর বাইরে থেকে আওয়াজ এলো, বানানা কোথায়? সে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলো, এই যে আমি এখানে । আমি বললাম, হতভাগিনী! লোকটি তোমার কে? সে বললো, আমাকে ডাকা হচ্ছে হত্যা করার জন্য। আমি বললাম, কী কারণে? সে বললো, নিশ্চয় কোনো অপরাধ করেছি। জননী আয়েশা আরো বলেছেন, যার উপরে মৃত্যুর পরওয়ানা ঝুলছে, তার এরকম আনন্দ-উচ্ছলতা করার কথা আমি জীবনে শুনিনি। তার কথা আমার আজও মনে পড়ে যায় ।

এবারে আসুন একটি ওয়াজ শুনি,
নবী মুহাম্মদের খায়বার আক্রমণ
অন্যান্য ইহুদী গোত্রের মতই, নবী মুহাম্মদ অত্যন্ত ধনী ইহুদী গোত্রের অঞ্চল খায়বার আক্রমণ করেন। ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে (৭ হিজরি) এই যুদ্ধ সংঘটিত হয় মদিনা নগরী থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত খায়বার নামক এলাকায়। খায়বার ছিল একসময়ের ইহুদি অধ্যুষিত একটি সমৃদ্ধ উপনিবেশ, যেখানে শক্তিশালী দুর্গ, চাষযোগ্য জমি ও খনিজসম্পদ ছিল। এখানকার ইহুদিরা শুধু ধর্মীয়ভাবেই নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও তৎকালীন আরব সমাজে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখে চলেছিল। মুসলিমদের ইতিহাসে বলা হয়, খায়বারের ইহুদি নেতারা বনু কুরাইজা ও বনু নাযির গোত্রকে মদিনার মুসলিমদের বিরুদ্ধে উসকে দিয়েছিল এবং পরবর্তীতে তারা গাতাফান গোত্র ও মরু বেদুঈনদের সঙ্গে মিলিত হয়ে মদিনা আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিল, তবে মুসলিমদের এসব তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে কারণ এইসকল তথ্যই একপাক্ষিক। এইসব প্রেক্ষাপটে নবী মুহাম্মদের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী খায়বার আক্রমণ করে এবং একের পর এক দুর্গ দখল করে নেয়।
যুদ্ধটি ছিল সংঘর্ষপূর্ণ এবং এর ফলে বহু ইহুদি নিহত ও বন্দি হয়। যুদ্ধে মুসলমানরা জয়লাভ করলেও খায়বারের ইহুদিদের সম্পূর্ণভাবে বিতাড়িত করা হয়নি। বরং একটি চুক্তির মাধ্যমে তাদের খায়বারে বসবাস করতে দেওয়া হয়—এই শর্তে যে, মুহাম্মদ যতদিন খুশী ততদিন তাদের থাকতে দিবে এবং তারা প্রতি বছর উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক মুসলমানদেরকে প্রদান করবে। এই যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েই একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে যায়, যা ইসলামী ঐতিহাসিকদের মধ্যেও বহু বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। আত্মীয় স্বজন হারানো শোকার্ত একজন ইহুদি নারী নবী মুহাম্মদকে একটি ভোজের আমন্ত্রণ জানান এবং সেখানে বিষ মেশানো ছাগলের মাংস পরিবেশন করেন। নবী তা খাওয়ার পর বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন এবং এই বিষের প্রভাব দীর্ঘ সময় তার স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল এবং এক সময়ে নবীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল [19]।
স্বজনদের লাশের ওপর দিয়ে আনা হলো সাফিয়াকে
নবী মুহাম্মদের বাহিনীর হাতে একে একে সাফিয়্যার পিতা, চাচা, স্বামী সহ আত্মীয়স্বজনদের অধিকাংশ নিহত হন। মানসিকভাবে সুস্থ একজন নারী নিজের পুরো পরিবার পরিজন হারানোর ভয়াবহ শোক রাতারাতি ভুলে স্বেচ্ছায় নবীর বিছানায় উঠে রঙ্গলীলা আর প্রেমকেলী করতে শুরু করবে, এটি নিতান্তই অবাস্তব একটি ইসলামিক দাবী! কামূস দুর্গের পতনের পরে সাফিয়্যা সহ অনেক নারী মুসলিমদের হাতে গনিমতের মাল হিসেবে বন্দী হয়। এদের মধ্যে সাফিয়্যাকে হযরত বিলাল নিয়ে আসার সময় সাফিয়্যার আত্মীয়স্বজনদের ক্ষতবিক্ষত লাশের ওপর দিয়েই নিয়ে আসেন। খুবই ভয়াবহ একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তখন। এই বর্ণনাটি পাওয়া যায় আসহাবে রাসুলের জীবনকথা বই সহ অনেক সীরাত গ্রন্থেই [20] –

সাফিয়ার স্বামী কিনানাকে হত্যা
নববিবাহিতা সাফিয়ার স্বামীর নাম ছিল কিনানা, যিনি ছিলেন খায়বারের ইহুদিদের কোষাধ্যক্ষ বা খাজাঞ্চী, বা ধনভান্ডারের রক্ষক। খায়বারের লুকানো সম্পদ কোথায় আছে সেটি জানার জন্য কিনানাকে প্রচণ্ড রকম নির্যাতন করেন বলে জানা যায়। শুধু তাই নয়, এরপরে সাফিয়ার স্বামী কিনানাকে খুবই নির্মমভাবে হত্যা করেছিল বলে জানা যায় [21]
সীরাতুন নবী (সা) পৃষ্ঠা ৩৫৪
উম্মুল মু’মিনীন সুফিয়্যার ঘটনা
ইবন ইসহাক বলেন: আল্লাহ যখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বনু আবুল হুকায়কের কামূস দুর্গের বিজয় দান করলেন, তখন অন্য এক রমণীসহ সুফিয়্যা বিনত হুয়াই ইবন আখতাব তাঁর কাছে আনা হলেন। এদেরকে নিহত ইহুদিদের মৃতদেহের পাশ দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল। সুফিয়্যার সঙ্গী রমণীটি যখন তাদের মৃতদেহ দেখতে পেল, তখন সে ভীষণ চিৎকার জুড়ে দিল, নিজের মুখমণ্ডলে করাঘাত করতে লাগল এবং মাথায় ধুলো মাখাতে লাগল।
রাসূলুল্লাহ (সা.) তা দেখে বললেন, “ঐ শয়তান মহিলাটিকে আমার নিকট থেকে দূরে সরিয়ে নাও!” এরপর তিনি সুফিয়্যাকে নিজের কাছে নিয়ে আসতে বললেন। সুফিয়্যা নিজেকে অত্যন্ত গুটিয়ে নিয়ে তাঁর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন, আর রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর ওপর নিজের চাদরখানা বিছিয়ে দিলেন। তখন উপস্থিত মুসলমানরা বুঝে নিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে নিজের জন্যে বেছে নিয়েছেন।
এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) বিলালকে লক্ষ্য করে বললেন, “যখন তুমি ঐ ইহুদি মহিলাকে ঐভাবে করতে দেখলে, তোমার হৃদয় থেকে কি দয়া-মায়া উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল, হে বিলাল! তুমি যে দুটি মহিলাকে তাদের আত্মীয়-স্বজনের মৃতদেহ সরিয়ে নিয়ে এলে?”
সুফিয়্যা কিনানা ইবন রবী’ ইবন আবুল হুকায়কের স্ত্রী থাকা অবস্থায় একদিন স্বপ্ন দেখেন যে, চন্দ্র তাঁর কোলে এসে পড়েছে। তিনি তাঁর স্বামীর কাছে স্বপ্নটি বিবৃত করলে সে বলেছিল, “তুমি হিজাজ অধিপতি মুহাম্মদের পাণিপ্রার্থনা করছো বৈ অন্য কিছু নয়।” কথাটি বলে সে এত জোরে তাঁর গালে একটি চপেটাঘাত করল যে, এর ফলে তাঁর চোখ নীল হয়ে যায়। সুফিয়্যা যখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট আনা হলেন, তখনও তাঁর চেহারায় সেই চপেটাঘাতের চিহ্নটি স্পষ্ট ছিল।
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এটা কী?” তখন তিনি তাঁকে সে সম্পর্কে অবহিত করলেন।
কিনানা ইবন রবী’র শাস্তি
কিনানা ইবন রবী’কে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট আনা হলো। বনু নযীরের গুপ্তধনরাশি তার কাছেই রক্ষিত ছিল। তিনি তাকে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন, কিন্তু সে তা কোথায় আছে জানাতে অস্বীকার করল।
এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট এক ইহুদিকে আনা হলো। সে জানাল যে, কিনানা ইবন রবী’কে প্রতিদিন ভোরে একটি বাড়ির ভগ্নাবশেষের চারদিকে ঘুরাফেরা করতে দেখা গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) কিনানাকে বললেন, “তুমি কি জ্ঞাত আছো যে, এরপর যদি তোমার কাছে গুপ্তধন পাওয়া যায়, তবে তোমাকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হবে?”
সে বলল, “হ্যাঁ।”
তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) সেই বিরান বাড়িটি খননের নির্দেশ দিলেন। যথারীতি সেখান থেকে কিছু গুপ্তধন উদ্ধারও করা হলো। তারপর রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে অবশিষ্ট গুপ্তধন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন, কিন্তু সে তা প্রদানে অস্বীকৃতি জানাল।
তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) যুবায়র ইবন আওয়ামকে নির্দেশ দিলেন, “তার কাছ থেকে গুপ্তধন উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত তাকে শাস্তি দিয়ে যেতে থাকো।”
যুবায়র তার বুকে চকমকি পাথর ঘষে আগুন জ্বালিয়ে শাস্তি দিতে থাকলেন, যতক্ষণ না সে আধমরা হয়ে পড়ল। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে…

মানুষ যেভাবে মালে পরিণত হয়
লাজলজ্জার বালাই না করেই ইসলাম একজন মানুষকে মাল হিসেবে পরিগণিত করে, বিশেষ করে নারীকে। একজন মানুষ, যিনি কিছুক্ষণ আগেও স্বাধীন ছিলেন, ইসলামের ছোবলে তিনি পরিণত হলেন একটি মালে! আসুন একটি হাদিস পড়ি, [22]
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৪/ কর, খাজনা, অনুদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পর্কে
পরিচ্ছেদঃ ১৫৯. গনীমতের মালে নবী (ﷺ) -এর পছন্দনীয় অংশ
২৯৮৪. নাসর ইবন আলী (রহঃ) ….. আইশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ সাফিয়্যা ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পসন্দ করা মালের অংশ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)
গনিমতের মালের ভাগাভাগি
নবী মুহাম্মদ এবং তার জিহাদী সেনাবাহিনী খায়বার আক্রমণের পরে খায়বার জয় করেন এবং নারী ও শিশুদের গনিমতের মাল হিসেবে বন্দী করেন। এরপরে বন্দী নারীদের দলবেঁধে একসাথে করা হয় ভাগাভাগির জন্য। যেন গরু ছাগলের মত, যার যাকে ইচ্ছা বেছে নিবে। তখন নবীর সাহাবী দাহিয়া কালবী নবীর কাছে একটি দাসী চাইতেই নবী তাকে বললেন, এদের মধ্য থেকে যাকে পছন্দ নিয়ে যাও। তিনি বেছে বেছে সবচাইতে সুন্দরী সাফিয়্যা বিনত হুয়াইকে নিলেন নিজের যৌনদাসী হিসেবে। এমন সময় এক ব্যক্তি নবী মুহাম্মদকে সাফিয়্যার রূপের কথা বলতেই, নবী দিহয়া সহ সাফিয়্যাকে ডেকে পাঠালেন। তারপর দিহয়া সাফিয়্যাসহ উপস্থিত হলে নবী সাফিয়্যাকে নিজের জন্য রেখে দিলেন, এবং দিহয়াও নবীর মনের খায়েস বুঝতে পেরে সাফিয়্যার বদলে সাতজন দাসীকে চেয়ে বসলেন। নবী সাতজন দাসীর বিনিময়ে সাফিয়্যাকে নিজের ভাগে নিলেন। তারপর ফেরার পথেই তিনি সাফিয়্যার সঙ্গে বাসর উদযাপন করেন [23] [24] –
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৪/ কর, খাজনা, অনুদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পর্কে
পরিচ্ছেদঃ ১৬২. খায়বরের যমীনের হুকুম সম্পর্কে।
২৯৯৯. দাঊদ ইবন মু’আয (রহঃ) …… আনাস ইবন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বরের উপর যুদ্ধ পরিচালনা করেন। আমরা যুদ্ধ করে তা জয় করি। অবশেষে বন্দীদের একত্রিত করা হয় (যাতে মুসলিমদের মাঝে তা সহজে বন্টন করা যায়)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দাসী আযাদ করে তাকে বিবাহ করা ফযীলত
৩৩৬৬। যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারের যুদ্ধে যান। বর্ণনাকারী বলেন আমরা খায়বারের কাছে অন্ধকার থাকতেই ফজরের সালাত আদায় করলাম। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আবূ তালহা (রাঃ) সাওয়ার হলেন। আমি ছিলাম আবূ তালহা (রাঃ) এর রাদীফ (তাঁর বাহনে তার পশ্চাতে উপবিষ্ট) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারের গলি দিয়ে রওনা দিলেন। এ সময় আমার হাটু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর উরুদেশ স্পর্শ করছিল এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উরু থেকে লুঙ্গী সরে যাচ্ছিল। আর আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উকর শুভ্রতা দেখছিলাম। যখন তিনি বসতীতে প্রবেশ করলেন তখন বললেন, আল্লাহু আকবার, খায়বার ধ্বংস হোক। বস্তুত আমরা যখন কোন সম্প্রদায়ের অঙ্গিনায় অবতরণ করি তখন সতর্ককৃতদের প্রভাত হয় কত মন্দা’ একথা তিনি তিনবার বলেন।
বর্ণনাকারী বলেন ঐ সময় লোকজন তাদের কাজে বের হচ্ছিল। তারা বলতে লাগলো, আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ। বর্ণনাকারী আবদুল আযীয বলেন, আমাদের কোন কোন উস্তাদ বলেছেন, পুরা বাহিনী। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা খায়বার জয় করলাম, এবং বন্দীদের একত্রিত করা হল। তখন দিহয়া (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কায়েদীদের মধ্যে থেকে আমাকে একজন দাসী প্রদান করুন। তিনি বললেনঃ যাও একজন দাসী নিয়ে নাও। তিনি সাফিয়্যা বিনত হুয়াই কে নিয়ে নিলেন। তখন এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, ইয়া নবী আল্লাহ! আপনি বনু কুরায়যা ও বনু নযীরের সর্দার হুযাইনের কন্যা সাফিয়্যাকে দিহয়াকে দিয়ে দিয়েছেন? ইনি একমাত্র আপনারই উপযুক্ত হতে পারে। তিনি বললেন, তাকে সাফিয়্যাসহ ডাক।
তারপর দিহয়া (রাঃ) সাফিয়্যাসহ উপস্থিত হলেন। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন, তখন তিনি দিহয়া (রাঃ) কে বললেন, তুমি সাফিয়্যা ব্যতীত কয়েদীদের মধ্য থেকে অন্য কোন দাসী নিয়ে নাও। বর্ণনাকারী বলেন তিনি সাফিয়্যাকে আযাদ করলেন এবং তাঁকে বিবাহ করলেন।
আনাসকে লক্ষ্য করে সাবিত (রাঃ) বললেন, হে আবূ হামযা! তিনি তাঁকে কী মাহর দিলেন? তিনি বললেন, তিনি তাঁর সত্তাকে মুক্তি দান করেন এবং এর বিনিময়ে তাঁকে বিবাহ করেন। তারপর তিনি যখন (ফেরার) পথে ছিলেন তখন উম্মু সুলায়ম (রাঃ) সাফিয়্যা (রাঃ) কে তাঁর জন্য প্রস্তুত করেন এবং রাতে তার কাছে পাঠিয়ে দেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গে বাসর উদযাপনের পর ভোর হলে তিনি ঘোষণা করলেন, যার নিকট যা কিছু আছে তা নিয়ে যেন উপস্থিত হয়। আর তিনি চামড়ার বড় দস্তরখান বিছালেন। বর্ণনাকারী বলেন, একথা শুনে কেউ পানীয়, কেউ খেজুর ও কেউ ঘি নিয়ে হাযির হল। তারপর এসব মিলিয়ে তারা হায়স তৈরী করেন। আর তাই ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওলীমা।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
দিহয়াতুল কালবীর ঝোপ বুঝে কোপ
গনিমতের মাল ভাগাভাগির শুরুতেই, নবী মুহাম্মদের সাহাবী দাহিয়া কালবী খায়বারের সেরা সুন্দরী সাফিয়াকে নিজের যৌন দাসী করার আবদার করেন। নবী মুহাম্মদ সাফিয়াকে না দেখেই সেই আবদার মঞ্জুর করে ফেলেন। কিন্তু একটু পরেই একজন সাফিয়ার রূপ সৌন্দর্য্যের কথা নবীকে বলায়, নবী দাহিয়াকে ডেকে পাঠান এবং সাফিয়াকে ফেরত নেয়ার চেষ্টা করেন। নবীর সাহাবী দাহিয়া নিশ্চয়ই নবীর চরিত্র কেমন তা সম্পর্কে অবগত ছিলেন, তাই তিনিও এর বিনিময়ে গুনে গুনে সাতটি দাসী নিয়ে তারপরে সাফিয়াকে দিতে রাজি হয়। একে বলা হয় ঝোপ বুঝে কোপ মারা। দাহিয়া নবীর নারীলোভ সম্পর্কে জানতেন বলেই, এরকম কোপটি মারতে পেরেছিলেন [25]
সুনান ইবনু মাজাহ
১২/ ব্যবসা-বাণিজ্য
পরিচ্ছেদঃ ১২/৫৭. পশুর পরিবর্তে পশু অধিক দরে নগদ ক্রয়-বিক্রয়।
২/২২৭২। আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফিয়্যা (রাঃ) কে সাতটি দাসীর বিনিময়ে খরিদ করেন। রাবী আবদুর রহমান (রাঃ) বলেন, দিহয়াতুল কালবী (রাঃ) এর নিকট থেকে (তাকে খরিদ করেন)।
মুসলিম ১৩৬৫, আবূ দাউদ ২৯৯৭ আহমাদ ১৩১৬৩।
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ। উক্ত হাদিসের রাবী হুসায়ন বিন উরওয়াহ সম্পর্কে আবুল ফাতহ আল-আযদী বলেন, তিনি দুর্বল। ইবনু হাজার আল-আসকালানী বলেন, তিনি সত্যবাদী তবে হাদিস বর্ণনায় সন্দেহ করেন। ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি সত্যবাদী। যাকারিয়্যা বিন ইয়াহইয়া আস-সাজী বলেন, তার মাঝে দুর্বলতা রয়েছে। (তাহযীবুল কামালঃ রাবী নং ১৩১৯, ৬/৩৯০ নং পৃষ্ঠা)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
ষোড়শী তরুণীর সাথে ৫৭ বছরের নবী
সাফিয়া বিনতে হুয়াই যখন নবী মুহাম্মদের কাছে বন্দী হন, তখন তাঁর বয়স আনুমানিক ১৬ বছর, অন্যদিকে মুহাম্মদের বয়স ছিল প্রায় ৫৭ বছর। এই বয়সের পার্থক্য যে কোনো সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকেই বিস্ময়কর এবং প্রশ্ন উত্থাপনকারী। বিশেষ করে যখন বিবাহটি হয় যুদ্ধবন্দিত্ব ও পরিবার ধ্বংসের প্রেক্ষাপটে। একজন ষোড়শী তরুণী, যার সামনে হঠাৎ করেই তাঁর স্বামী ও পিতার রক্তাক্ত মৃতদেহ, স্বজনদের লাশ চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তাঁকে এক বিজয়ীর বিছানায় নেয়ার জন্য সাজানো হচ্ছে, জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে, যে বয়সে তার দাদার সমান, এটি নিছক একটি বিবাহ নয়, বরং ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রকাশ। তাঁর সম্মতি এখানে কতটা স্বতঃস্ফূর্ত ছিল, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন থেকেই যায়।
আধুনিক মানবাধিকার, নারীর সম্মান এবং স্বাধীন সিদ্ধান্তের আলোকে এই ধরনের ঘটনা গভীর প্রশ্ন তোলে। এমন একটি সম্পর্ক, যেখানে বয়সের ব্যবধান অত্যন্ত বেশি, আর পরিস্থিতিগতভাবে মেয়েটি মানসিকভাবে ভঙ্গুর অবস্থায়, সেটিকে ভালোবাসার সম্পর্ক না বলে অধিকতর বাস্তব ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ইতিহাসে এমন বিবাহকে ‘আল্লাহর ইচ্ছা’ বা ‘ধর্মীয় নির্দেশ’ হিসেবে দেখানো হলেও, আসলে তা ছিল রাজনীতি, ক্ষমতা ও বিজয় প্রতিষ্ঠার কৌশল। সাফিয়ার ঘটনাও এর ব্যতিক্রম নয়। এই সম্পর্কের পেছনে ছিল নারীর ইচ্ছার অনুপস্থিতি, যুদ্ধজয়ের প্রতীক হিসেবে নারীদেহ ভোগ ও দখল এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর স্থান নির্ধারণের এক নির্মম বাস্তবতা। আসুন সাফিয়ার কাছ থেকেই জেনে নিই, বন্দী হওয়ার সময় নবীকে কী পরিমাণ ঘৃণা করতো সাফিয়া [26]
hakim:6789 – Abū ʿAbdullāh al-Aṣbahānī > al-Ḥasan b. al-Jahm b. Maṣqalah > al-Ḥusayn b. al-Faraj > Muḥammad b. ʿUmar > Muḥammad b. Mūsá > ʿUmārah b. al-Muhājir > Āminah b. Abū Qays al-Ghifāriyyah
[Machine] “I am one of the women who accompanied Safiyyah to the Messenger of Allah ﷺ . I heard her say, ‘I did not reach the age of seventeen when I entered upon the Messenger of Allah ﷺ .’ He said, ‘And Safiyyah passed away at the age of fifty-two during the time of Mu’awiyah and she was buried in the Baqi’ cemetery.’ Al-Dhahabi remained silent about it in his summary.”
– Remains Silent (Dhahabī)
§ Safiyyah b. Huyayy in Book of the Companions

আদৌ কী তাদের বিয়ে হয়েছিল?
আনাস ইবন মালিক নবী মুহাম্মদের ঘরের সেবক হিসেবে বেশ কিছুদিন কাজ করেছেন, যার কারণে নবীর ঘরের ভেতরের কাহিনী সম্পর্কে তার জানাশোনা অন্যদের থেকে বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। আনাস থেকে যেই বিবরণ জানা যায়, খায়বার থেকে ফেরার পথে নবী সাফিয়ার সাথে সঙ্গম করেন, কিন্তু সেই সময়ে মুসলিমরা আসলে কেউই নিশ্চিত ছিলেন না, সাফিয়াকে নবী স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছেন নাকি যৌনদাসী হিসেবে। পরবর্তীতে তারা পর্দা দেখে ধারণা করেন, সাফিয়াকে স্ত্রী হিসেবেই নবী গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এই কথাটি তো নবী নিজে তাদেরকে বলেননি। একইসাথে, তাদের তো বিবাহ হতে হবে, সেখানে সাক্ষীও লাগবে। ইসলামের বিধান তো সেটিই। সাক্ষীসাবুদ ছাড়া নিজে নিজে নবী কীভাবে বিবাহ করলেন? আর বিবাহ করে থাকলে, অন্যরা জানলো না কেন? আসলেই কী কোন বিয়ে হয়েছিল? নাকি নবী স্রেফ অল্পবয়সী সাফিয়াকে নিয়ে বিছানায় চলে গেছেন? [27]
সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৬/ নিকাহ (বিবাহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭৯. সফরে সহবাস
৩৩৮৫. আলী ইবন হুজুর (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বৰ্ণিত। তিনি আনাস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার এবং মদীনার মধ্যস্থলে তিনদিন সফিয়্যা বিনত হুয়াই (রাঃ)-এর সংগে কাটান। আমি তার ওয়ালীমার জন্য মুসলিমদের দাওয়াত দিলাম, আর তাতে মাংস ও রুটি কিছুই ছিল না। তিনি চামড়ার দস্তরখান বিছাতে আদেশ করলেন, লোকেরা তার উপর খেজুর, পনির, ঘি রাখতে লাগলো, এটাই ছিল তাঁর ওয়ালীমা। মুসলিমগণ বলতে লাগলো, তিনি উম্মাহাতুল মুমিনীনের একজন না তাঁর দাসীদের একজন? তারা বললোঃ যদি তার সামনে পর্দা লটকান হয়, তবে তিনি উম্মাহাতুল মু’মিনীনদের অন্তর্ভুক্ত। আর যদি পর্দা না করা হয়, তবে তিনি বাঁদীদের একজন। যখন প্রত্যাবর্তনের সময় হলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সওয়ারীর হাওদার পেছনে তাঁর বসার ব্যবস্থা করা হলো এবং অন্যান্য লোক ও তার মধ্যে পর্দা ঝুলানো হলো।
তাহক্বীকঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
এবারে আসুন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে নিই। হযরত উমরের খিলাফত আমলে নবীর বিধবা স্ত্রীদেরকে বারো হাজার মুদ্রা ভাতা প্রদান করা হতো, কিন্তু সাফিয়াকে প্রদান করা হতো ছয় হাজার মুদ্রা। নবী যদি সাফিয়াকে আসলেই বিবাহ করে থাকতেন, তাহলে তাকে কেন ছয় হাজার মুদ্রা ভাতা প্রদান করা হতো? [28]

নবীকে ঘৃণা করতো সাফিয়া
এবারে আসুন সবচাইতে জরুরি তথ্যটি জেনে নিই। নবীকে কী সাফিয়া বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল? নবীর প্রতি সাফিয়া কী প্রেম অনুভব করেছিল? নবীর বিছানায় যাওয়ার জন্য সাফিয়া কী আগে থেকেই মরিয়া হয়ে ছিল? অন্যের স্ত্রী থাকা অবস্থাতেই কী বেগানা পুরুষ নবীকে স্বপ্নে দেখে সাফিয়ার স্বপ্নদোষ হতো? অনেক মুসলিমই একটি বর্ণনা নেনে দাবী করেন, নবীর খায়বার আক্রমণের আগেই সাফিয়া নবীকে নিয়ে একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন। বর্ণনাটি সত্য হলেও, বর্ণনাটি সাফিয়া কী উদ্দেশ্যে করেছিল তা ধারণা করা যায়। নইলে মুসলিমরা সত্যিই কী এটি বিশ্বাস করে যে, তাদের বিশ্বাসের মাতা সাফিয়া কিনানার স্ত্রী থাকা অবস্থাতেই পরপুরুষ বৃদ্ধ মুহাম্মদকে স্বপ্নে দেখে স্বপ্নদোষ ঘটিয়ে ফেলতেন? অথচ সাফিয়ার হাদিস থেকে জানা যায়, নবীর প্রতি সেই সময় পর্যন্ত প্রচণ্ড ঘৃণা ছিল সাফিয়ার [29]
Sahih Ibn Habban (11/607)
عن عبد الله بن عمر رضي الله عنه قال : … قالت صفية :وكان رسول الله صلى الله عليه وسلم من أبغض الناس إليَّ قَتل زوجي وأبي وأخي فما زال يعتذر إليَّ ويقول : ( إن أباك ألَّب علي العرب وفعل وفعل ) حتى ذهب ذلك من نفسي .۔۔ رواه ابن حبان في ” صحيحه ” ( 11 / 607 ) ، .
Abdullah Ibn Umar narrates that Safiya said:”Rasool Allah was among the most hated person for me, while he killed my husband, father and brother. Then he used to make excuses that my father used to incite the Arabs against him. He kept on apologizing for so long till I was no more angry.
Grading: Sahih (authentic)
সাফিয়াকে বিছানায় তোলা হয় অল্প পরেই
নিচের হাদিসগুলো লক্ষ্য করুন। খায়বার থেকে মদিনা ফেরার পথে খায়বার থেকে মাত্র কয়েক মাইল দুরে সাদ্দুস্ সাহ্বা নামক স্থানেই সাফিয়ার সাথে সঙ্গম করে নবী। সম্পূর্ণ নিশ্চিতভাবে এই জায়গাটির অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি, কিন্তু এই জায়গাটি খায়বার থেকে ৬-৩০ কিলোমিটারের মধ্যে ছিল, অর্থাৎ খুবই কাছাকাছি একটি জায়গা ছিল। উটের পিঠে চড়ে এখানে মাত্র কয়েক ঘণ্টাতেই পৌঁছানো সম্ভব। অর্থাৎ, মদিনা ফেরার পথে মাত্র সদ্য পিতা, স্বামী, স্বজন হারানো সাফিয়াকে বিছানায় তুলেছিল নবী মুহাম্মদ [30] [31]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫৬/ জিহাদ ও যুদ্ধকালীন আচার ব্যবহার
পরিচ্ছেদঃ ৫৬/৭৪. যে ব্যক্তি খিদমত গ্রহণের উদ্দেশে যুদ্ধে বালকদের নিয়ে যায়।
২৮৯৩. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আবূ ত্বলহাকে বলেন, তোমাদের ছেলেদের মধ্য থেকে একটি ছেলে খুঁজে আন, যে আমার খেদমত করতে পারে। এমনকি তাকে আমি খায়বারেও নিয়ে যেতে পারি। অতঃপর আবূ ত্বলহা (রাঃ) আমাকে তার সাওয়ারীর পেছনে বসিয়ে নিয়ে চললেন। আমি তখন প্রায় সাবালক। আমি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমত করতে লাগলাম। তিনি যখন অবতরণ করতেন, তখন প্রায়ই তাকে এই দু‘আ পড়তে শুনতামঃ ‘হে আল্লাহ! আমি দুশ্চিন্তা ও পেরেশানী থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণভার ও লোকজনের প্রাধান্য থেকে আপনার নিকট পানাহ চাচ্ছি।’ পরে আমরা খায়বারে গিয়ে হাজির হলাম। অতঃপর যখন আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে দুর্গের উপর বিজয়ী করলেন, তখন তাঁর নিকট সাফিয়্যা বিনতু হুয়াই ইবনু আখতাবের সৌন্দর্যের কথা উল্লেখ করা হলো, তিনি ছিলেন সদ্য বিবাহিতা; তাঁর স্বামীকে হত্যা করা হয়েছিল এবং আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে নিজের জন্য মনোনীত করলেন। অতঃপর তাঁকে নিয়ে রওয়ানা দিলেন। আমরা যখন সাদ্দুস্ সাহ্বা নামক স্থানে পৌঁছলাম তখন সফিয়্যাহ (রাঃ) হায়েয থেকে পবিত্র হন। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেখানে তাঁর সঙ্গে বাসর যাপন করেন। অতঃপর তিনি চামড়ার ছোট দস্তরখানে ‘হায়সা’ প্রস্তুত করে আমাকে আশেপাশের লোকজনকে ডাকার নির্দেশ দিলেন। এই ছিল আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সঙ্গে সাফিয়্যার বিয়ের ওয়ালিমা। অতঃপর আমরা মদিনার দিকে রওয়ানা দিলাম। আনাস (রাঃ) বলেন, আমি দেখতে পেলাম যে, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর পেছনে চাদর দিয়ে সফিয়্যাহ্কে পর্দা করছেন। উঠানামার প্রয়োজন হলে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর উটের কাছে হাঁটু বাড়িয়ে বসতেন, আর সাফিয়্যা (রাঃ) তাঁর উপর পা রেখে উটে আরোহণ করতেন। এভাবে আমরা মদিনার নিকটবর্তী হলাম। তখন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উহুদের দিকে তাকিয়ে বললেন, এটি এমন এক পর্বত যা আমাদের ভালবাসে এবং আমরাও তাকে ভালবাসি। অতঃপর মদিনার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ হে আল্লাহ, এই কঙ্করময় দু’টি ময়দানের মধ্যবর্তী স্থানকে আমি ‘হারাম’ বলে ঘোষণা করছি, যেমন ইব্রাহীম (আঃ) মক্কাকে ‘হারাম’ ঘোষণা করেছিলেন। হে আল্লাহ্! আপনি তাদের মুদ এবং সা‘তে বরকত দান করুন।’ (৩৭১) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৬৮০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৬৯১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
১৪/ কর, ফাই ও প্রশাসক
পরিচ্ছেদঃ ২১. গানীমাতের মালে সেনাপতির অংশ
২৯৯৫। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’আমরা খায়বারে আক্রমণ করি। মহান আল্লাহ যখন এ দুর্গ জয় করালেন তখন হুয়াইয়ের কন্যা সফিয়্যাহর সৌন্দর্যের কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বর্ণনা করা হয়। তিনি সদ্য বিবাহিতা ছিলেন এবং তার স্বামী এ যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজের জন্য পছন্দ করলেন। অতঃপর তাকে নিয়ে সেখান থেকে রওয়ানা হলেন। ’আমরা সাদ্দুস-সাহবা নামক জায়গাতে পৌঁছলে তিনি মাসিক ঋতু থেকে পবিত্র হন। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে নির্জনবাস করেন।[1]
[1]. সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
অনিশ্চিত সূত্র থেকে এই জায়গাটির অবস্থান নির্ণয়ের চেষ্টা করেছি, এই তথ্যটি সম্পর্কে আমি একদম নিশ্চিত নই। এই জায়গাটি হওয়ার কথা, A location within approximately 6 miles (9.6 kilometers) to 30 kilometers south of Khaybar. খায়বার থেকে যেখানে হেঁটে পৌঁছাতে ৭ ঘণ্টার মত লাগার কথা। উটের পিঠে চড়ে গেলে আরও কম সময় লাগাড় কথা।

একটানা তিনরাত তাঁবুর ভেতর
নবী মুহাম্মদ সাফিয়াকে পেয়ে নিশ্চয়ই খুবই আনন্দিত ছিলেন, কারণ সাফিয়াকে পাওয়ার পরেই সেখানেই নবী ও তার বাহিনী টানা তিনরাত অবস্থান করে। এই তাঁবুর অভ্যন্তরের ঘটনা হয়তো কখনোই পুরোপুরি জানা যাবে না। কিন্তু ইতিহাসের নীরবতা ও তীব্র বৈসাদৃশ্য আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—কোনো নারীর পক্ষে কি আদৌ সম্ভব, তাঁর এতসব হারানোর পর, এত দ্রুত এক নতুন সম্পর্ক ও পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া? তার স্বজনদের খুনীকে বিছানায় যৌনসুখ দেয়া? আসুন হাদিসটি পড়ি, [32]
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৬/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১২৯. কুমারী মহিলা বিবাহ করলে, তার সাথে কতদিন অবস্থান করতে হবে।
২১২০. ওয়াহব ইবন বাকীয়্যা, উসমান আবূ শায়রা …. আনাস ইবন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সাফিয়্যা (রাঃ)-কে বিবাহ করেন, তখন তিনি তাঁর সাথে তিন রাত অতিবাহিত করেন। রাবী উসমান অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, এই সময় তিনি (সাফিয়্যা) সাইয়্যেবা ছিলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
তাঁবুর বাইরে সারারাত পাহারা
খায়বার আক্রমণের সময় সাফিয়ার স্বামীকে বন্দী করা হয় এবং পরবর্তীতে মুসলমানরা তার কাছ থেকে খায়বারের কোষাগারের সন্ধান জানতে চায়। কিনানা তথ্য দিতে অস্বীকার করলে তাকে খুব নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয় এবং অবশেষে হত্যা করা হয়। তার পরই রাসূলুল্লাহ (সা) সাফিয়াকে নিজের জন্য নির্বাচিত করেন এবং তাকে বন্দিনী থেকে মুক্ত করে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। যখন সাফিয়াকে নবীর তাঁবুতে আনা হয়, তখন সাহাবী আবু আইয়ুব আল-আনসারি গভীর রাতে নবীর তাঁবুর সামনে পাহারায় দাঁড়িয়ে থাকেন। সকালে নবী তাকে দেখে জিজ্ঞাসা করেন, “তুমি এখানে কেন দাঁড়িয়ে ছিলে?” আবু আইয়ুব (রা) উত্তর দেন, “হে আল্লাহর রাসূল! এই নারী সদ্য বিধবা হয়েছে। তার স্বামী ও স্বজনদের হত্যা করা হয়েছে। আমি ভয় করছিলাম, যদি সে আপনার কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তাই সারারাত পাহারা দিয়েছি।” নবী তার এই সতর্কতার জন্য তাকে দোয়া দেন এবং ধন্যবাদ জানান।[33]

এই বিষয়টি আরও পাওয়া যায় মুস্তাদরাক আল হাকিম গ্রন্থেও [34]
hakim:6787 – ʿAbdullāh b. Isḥāq al-Khurāsānī al-ʿAdl > Yaḥyá b. Jaʿfar b. al-Zibriqān > ʿAbd al-Wahhāb b. ʿAṭāʾ > Khālid al-Ḥadhhāʾ > Kathīr b. Zayd > al-Walīd b. Rabāḥ > Abū Hurayrah > Lammā
[Machine] When the Messenger of Allah ﷺ entered Safiyyah’s tent, Abu Ayub slept at the door of the Prophet ﷺ . When morning came and the Messenger of Allah ﷺ saw him, he raised his voice in takbeer (saying “Allahu Akbar”) and Abu Ayub had a sword with him. He said, “O Messenger of Allah, she was a newlywed woman who had just gotten married, and I had killed her father, brother, and husband. So I did not trust her with you.” The Messenger of Allah ﷺ laughed and said to him, “Well done.”
– Sound (Dhahabī)
§ Safiyyah b. Huyayy in Book of the Companions
এবারে আসুন তাবারীর ইতিহাস থেকে কী জানা যায় সেটি দেখে নিই, [35]

নবীকে বিবাহ না করলে যা হতো
যুদ্ধে পরাজিত বাহিনীর নারীদের সাথে আসলে কী হয়, কী পরিমাণ মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে তারা থাকেন, সেটি খুব সহজেই অনুমেয়। যখন তারা বিপক্ষের সেনাবাহিনীর সৈন্যদের হাতে বন্দী হয়, তাদের সাতেহ যে খুব নির্মম কিছুই হবে, এটি তারা বুঝেই যান। বিশেষ করে বিপক্ষে যদি থাকে মুহাম্মদের মত মানুষ। এরকম পরিস্থিতিতে গণধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার একটিই উপায় থাকে, সেটি হচ্ছে বিপক্ষের নেতৃস্থানীয় কারো বিছানায় যাওয়া। নেতাগোছের কারো বিছানায় গেলে অন্তত গণধর্ষণের শিকার হতে হবে না। নবী মুহাম্মদের দাসী বা স্ত্রীর ওপর অন্য কেউ নজর দিতে পারে না, এটি নিশ্চয়ই সাফিয়ার জানা ছিল। তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই, গণধর্ষণের চাইতে তার জন্য শুধুমাত্র নবী দ্বারা ধর্ষিত হওয়া বেছে নেয়াটিই ছিল বুদ্ধিমানের কাজ। সাফিয়া আসলে সেটিই করেছে।
কারণ সাফিয়া ভাগে পরেছিল দাহিয়া কালবির। আর ইসলামের একটি বিধান হচ্ছে, মুসলিমরা তাদের দাসদাসীদেরকে অদল বদল করে ভোগ করতে পারে। ইসলাম ধর্মে যেহেতু দাসী বিক্রি কিংবা উপহার হিসেবে দান করে দেয়া সম্পূর্ণ বৈধ, কেনা বা উপহার সূত্রে প্রাপ্ত দাসীকে ভোগ করাও যেহেতু বৈধ, সেহেতু এটি হওয়া খুবই স্বাভাবিক যে, নবী মুহাম্মদের সাহাবীগণ দাসী অদল বদল করতেন। ধরুন একজন সাহাবী যুদ্ধবন্দী হিসেবে একজন ক্রীতদাসীকে পেলেন। কিছুদিন ধরে সেই ক্রীতদাসীকে তিনি ইচ্ছেমত ভোগ করলেন। সেই একই সাহাবীর বন্ধুও একজন নারীকে গনিমতের মাল হিসেবে পেলেন। তিনিও তার দাসীকে ভোগ করলেন।
এখন ইসলামের বিধান মোতাবেক, তারা দুইজন দুইজনার দাসীকে পরস্পর উপহার দিলেন, বা সমমূল্যে বিক্রয় করলেন। এরপরে নতুন দাসীকে তারা ইচ্ছেমত ভোগ করলেন। অর্থাৎ, এই যে দাসী বিক্রি বা উপহার হিসেবে দান করার বিধানটি খালি চোখে খুব সাধারণ মনে হলেও, আসলে এর মধ্যে লুকিয়ে আছে আরো কুৎসিত চিত্র। এই বিধানটি কাজে লাগিয়ে গনিমতের মাল হিসেবে প্রাপ্ত একটি মেয়েকে সাহাবীগণ সবাই মিলে মিশে ভোগ করতে পারবে, অদল বদল করে। এর অর্থ হচ্ছে, একটি মেয়ে মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হলে তাকে সবাই মিলে ভোগ না করা পর্যন্ত তার কোন নিস্তার নেই। খালি চোখে একদম সহজ একটি বিধানের মধ্যে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ কুৎসিত একটি ব্যাপার। আসুন এই সম্পর্কিত একটি হাদিস পড়ে নিই [36] –
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫১/ হিবা ও এর ফযীলত
পরিচ্ছেদঃ ৫১/৩৬. প্রচলিত অর্থে যদি কেউ বলে এই দাসীটি তোমার খিদমাতের জন্য দিলাম, এটি বৈধ।
وَقَالَ بَعْضُ النَّاسِ هَذِهِ عَارِيَّةٌ وَإِنْ قَالَ كَسَوْتُكَ هَذَا الثَّوْبَ فَهُوَ هِبَةٌ
কোন কোন ফিকাহ্ বিশারদ বলেন, এটি আরিয়ত হবে। তবে কেউ যদি বলে, এ কাপড়টি তোমাকে পরিধান করতে দিলাম, তবে তা হিবা হবে।
২৬৩৫. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বর্ণিত গ্রন্থ হতে বলেছেন, ইবরাহীম (আঃ) সারাকে সঙ্গে নিয়ে হিজরত করলেন। লোকেরা সারার উদ্দেশে হাজিরাকে হাদিয়া দিলেন। তিনি ফিরে এসে (ইবরাহীমকে) বললেন, আপনি কি জেনেছেন, কাফিরকে আল্লাহ পরাস্ত করেছেন এবং সেবার জন্য একটি বালিকা দান করেছেন।
ইবনু সীরীন (রহ.) বলেন, আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ)-এর সূত্রে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন, অতঃপর (সেই কাফির) সারার উদ্দেশে হাজিরাকে দান করল। (২২১৭) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৪৪৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৪৫৯)
بَابُ إِذَا قَالَ أَخْدَمْتُكَ هَذِهِ الْجَارِيَةَ عَلَى مَا يَتَعَارَفُ النَّاسُ فَهُوَ جَائِزٌ
حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ حَدَّثَنَا أَبُو الزِّنَادِ عَنْ الأَعْرَجِ عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ هَاجَرَ إِبْرَاهِيْمُ بِسَارَةَ فَأَعْطَوْهَا آجَرَ فَرَجَعَتْ فَقَالَتْ أَشَعَرْتَ أَنَّ اللهَ كَبَتَ الْكَافِرَ وَأَخْدَمَ وَلِيْدَةً وَقَالَ ابْنُ سِيْرِيْنَ عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَأَخْدَمَهَا هَاجَرَ.
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
এবারে আসুন তাফসীরে মাযহারী থেকে এই সম্পর্কে একটি দলিল দেখে নিই, [37] –

সাফিয়াকে আয়িশার গালাগালি
নবীর শিশু স্ত্রী আয়িশাও সাফিয়্যাকে গালাগালি করতেন বলে জানা যায়। এর অর্থ হচ্ছে, সাফিয়্যাকে ইহুদির কন্যা হওয়ার বিভিন্ন জনার কাছ থেকেই নানান কটূবাক্য শুনতে হতো। কারণ মুসলিমদের কাছে আদর্শ রমণী নবীর স্ত্রী আয়িশা যেখানে এসব বলতেন, অন্যরাও নিশ্চয়ই ছেড়ে কথা বলতেন না। অন্যরা নিশ্চয়ই আয়িশার মত আদর্শ নারী ছিলেন না, তাই না? [38] –
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩৫/ কিয়ামত ও মর্মস্পর্শী বিষয়
পরিচ্ছেদঃ ৫১. (ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা বা নকল সাজা নিষেধ)
২৫০২। আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোন এক সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি জনৈক ব্যক্তির চালচলন নকল করে দেখালাম। তিনি বললেন, আমাকে এই পরিমাণ সম্পদ প্রদান করা হলেও কারো চালচলন নকল করা আমাকে আনন্দ দেয় না। আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! সাফিয়্যা তো বামন মহিলা লোক, এই বলে তিনি তা হাতের ইশারায় দেখালেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি এমন একটি কথার দ্বারা বিদ্রুপ করেছো, তা সাগরের পানির সাথে মিশালেও তা উক্ত পানিকে দূষিত করে ফেলতো।
সহীহঃ মিশকাত তাহকীক সানী (৪৮৫৩, ৪৮৫৭), গাইয়াতুল মারাম (৪২৭)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)
সাফিয়াকে নবীর অশ্রাব্য গালাগালি
এরপরেই নবী মুহাম্মদ সাফিয়্যার তাঁবুতে যান এবং সাফিয়্যাকে চিন্তিতা ও অবসাদগ্রস্তা দেখতে পান। নবী মুহাম্মদ এই সময়ে অত্যন্ত রাগান্বিত অবস্থায় সাফিয়্যাকে বন্ধ্যা ও নেড়ি বলে গালাগালি করেন। কেন গালাগালি করেন, তার বর্ণনা পরে দিচ্ছি। আগে সেই অত্যন্ত অমর্যাদাকর এবং নোংরা গালিগুলো দেখে নিই [39] [40]-
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৬/ হাজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ৬৪. বিদায়ী তাওয়াফ বাধ্যতামুলক কিন্তু ঋতুমতী মহিলার ক্ষেত্রে তা পরিত্যাজ্য
৩০৯৮। মুহাম্মাদ ইবনুল মুসান্না, ইবনু বাশশার ও উবায়দুল্লাহ ইবনু মু’আয (রহঃ) … হাকাম ইবরাহীম থেকে, তিনি আসওয়াদ থেকে এবং তিনি আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন রওনা হওয়ার ইচ্ছা করলেন, তখন সাফিয়্যাকে তাঁর তাঁবুর দরজায় চিন্তিতা ও অবসাদগ্রস্তা দেখতে পেলেন। তিনি বললেনঃ বন্ধ্যা, নেড়ি! তুমি আমাদের (এখানে) আটকে রাখবে? তিনি পুনরায় তাকে বললেনঃ তুমি কি কুরবানীর দিন (বায়তুল্লাহ) যিয়ারত করেছ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাহলে রওনা হও।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)
15th The Book of Pilgrimage
(67)Chapter: The farewell Tawaf is obligatory, but it is waived in the case of menstruating women
‘A’isha (Allah be pleased with her) reported:
When Allah’s Apostle (ﷺ) decided to march (for return journey), he found Safiyyah at the door of her tent, sad and downcast. He remarked. Barren, shaven-head, you are going to detain us, and then said: Did you perform Tawaf Ifada on the Day of Nahr? She replied in the affirmative, whereupon he said: Then march on.
Reference : Sahih Muslim 1211ag
In-book reference: Book 15, Hadith 432
USC-MSA web (English) reference: Book 7, Hadith 3066

সাফিয়াকে বন্ধ্যা নেড়ি বলে গালির কারণ
একটি প্রশ্ন মনে জাগতে পারে যে, সেইদিন নবী যে সাফিয়াকে এরকম অশ্রাব্যভাষায় গালাগালি করলো, তার কারণ কী ছিল? নিচে বর্ণিত হাদিসগুলো থেকে খুব পরিষ্কারভাবেই বোঝা যায়, সেইদিন নবী মুহাম্মদ সাফিয়ার সাথে যৌনসঙ্গমের ইচ্ছে করেছিল, কিন্তু সাফিয়ার পিরিয়ড বা হায়েজ হওয়ায় নবী তা করতে পারেন নি। ভাবুন তো, সাফিয়াকে নবী শুধু একটি ভোগ্যপণ্যই ভাবতো, যার সাথে যখন খুশি সেক্স করা যাবে। নইলে সাফিয়ার পিরিয়ড হওয়ায় যৌন সঙ্গম করতে না পেরে নবী এরকম গালাগালি করবেন কেন [41] ?
পাঠক লক্ষ্য করে পড়ুন, এই হাদিসে নবী বলছেন বলে বর্ণিত আছে যে, সাফিয়া তাদের সেখানে আটকে রাখবে কিনা। ঠিক একই বক্তব্য পাবেন অন্য হাদিসে। এর অর্থ হচ্ছে, এই হাদিসগুলোর সময়কাল এক, ঘটনাও একই। শুধু বিভিন্ন জন বিভিন্ন অংশ শুনে বর্ণনা করেছে [42] [43] [44] [45] –
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৬/ হাজ্জ (হজ্জ/হজ)
পরিচ্ছেদঃ ৬৪. বিদায়ী তাওয়াফ বাধ্যতামুলক কিন্তু ঋতুমতী মহিলার ক্ষেত্রে তা পরিত্যাজ্য
৩০৯৭। হাকাম ইবনু মূসা (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, কোন পুরুষ স্ত্রীর সাথে সাধারণত যা করার ইচ্ছা করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাফিয়্যা (রাঃ) এর সাথে তাই করার ইচ্ছা করলেন। তারা বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! তিনি হায়যগ্রস্তা। তিনি বললেনঃ তাহাল সে তো আমাদের এখানে আটকে রাখবে। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসুল! তিনি কুরবানীর দিন (বায়তুল্লাহ এর) যিয়ারত করেছেন। তিনি বললেনঃ তাহলে সে তোমাদের সঙ্গে যাত্রা করুক।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৬/ হাজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ৬৪. বিদায়ী তাওয়াফ বাধ্যতামুলক কিন্তু ঋতুমতী মহিলার ক্ষেত্রে তা পরিত্যাজ্য
৩০৯৫। আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা ইবনু কা’নাব (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আশংকা করছিলাম যে, সাফিয়্যা (রাঃ) তাওয়াফে ইফাযা করার পূর্বে হায়যগ্রস্ত হয়ে পড়বেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট এলেন এবং বললেনঃ সাফিয়্যা কি আমাদের আটকে রাখবে? আমরা বললাম, তিনি তাওয়াফে ইফাযা করেছেন। তিনি বললেনঃ তাহলে নয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৬/ হাজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ৬৪. বিদায়ী তাওয়াফ বাধ্যতামুলক কিন্তু ঋতুমতী মহিলার ক্ষেত্রে তা পরিত্যাজ্য
৩০৯৪। কুতায়বা ইবনু সাঈদ, যুহায়র ইবনু হারব ও মুহাম্মাদ ইবনু মূসান্না (রহঃ) … আবদুর রহমান ইবন কাসিম তার পিতা থেকে এবং তিনি আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উল্লেখ করলেন, সাফিয়্যা (রাঃ) এর হায়য হয়েছে। অবশিষ্ট যুহরীর হাদীসের অনুরূপ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আব্দুর রহমান ইবনু কাসিম (রহঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৬/ হাজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ৬৪. বিদায়ী তাওয়াফ বাধ্যতামুলক কিন্তু ঋতুমতী মহিলার ক্ষেত্রে তা পরিত্যাজ্য
৩০৯৬। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সাফিয়্যা বিনত হুওয়াই হায়যগ্রস্তা হয়ে পড়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হয়ত সে আমাদের আটকে রাখবে। সে কি তোমাদের সঙ্গে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেনি? তারা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ তবে তোমরা চল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)
এবারে আসুন সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যা গ্রন্থ থেকে এই বিষয় সম্পর্কে আরেকটু জেনে নিই [46] –
আল্লামা কুরতুবী ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞজ্ঞাণ বলেন, হজ্জের সফরে হযরত আয়িশা ও সুফিয়্যা (রাযিঃ) দুইজনই ঋতুমতী হইয়াছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি তাহাদের দুইজনের ক্ষেত্রে বিরাট পার্থক্য পরিলক্ষিত হইতেছে। কেননা, তিনি হযরত সুফিয়া (রাযিঃ)কে বলিয়াছেন দুর দুর্ভাগী, তোমার কল্যাণ না হউক। আর হযরত আয়িশা (রাযিঃ) কে বলিয়াছেন ইহা এমন একটি বস্তু যাহা আল্লাহ তা’আলা আদম (আঃ)-এর কন্যাদের জন্য নির্ধারণ করিয়া দিয়াছেন)।
ইহা দ্বারা কাহাকেও কাহারও উপর প্রাধান্য দেওয়া উদ্দেশ্য নহে, বরং স্থান-কাল-পাত্র ও অবস্থার প্রেক্ষিতে কথা বিভিন্ন হয়। ফলে নবী সান্তাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হযরত আয়িশা (রাযিঃ)-এর কাছে তাশরীফ নিলেন, তখন তিনি হজ্জ ছুটিয়া যাওয়ার আশংকায় মনক্ষুণ্ণ হইয়া কাঁদিতেছিলেন। ফলে তাহাকে সান্ত্বনা দেয়া প্রয়োজন ছিল সেই মতে তাঁহাকে সান্ত্বনামূলক বাক্য দ্বারা সান্ত্বনা দিয়াছেন। পক্ষান্তরে হযরত সাফিয়্যা (রাযিঃ)। তিনি হজব্রত পালন শেষ করায় “নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহার সঙ্গে এমন ইচ্ছা করিয়াছিলেন যাহা একজন পুরুষ নিজের স্ত্রীর সঙ্গে ইচ্ছা করিয়া থাকে।” এতদুভয়ের অবস্থার বিভিন্নতার কারণে সম্বোধনে বিভিন্নতা যথাযোগ্য হইয়াছে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ (ফতহুল মুলহিম ৩২৭)।

(৩১১৭) হাদীছ (ইমাম মুসলিম (রহ.) বলেন) আমার নিকট হাদীছ বর্ণনা করেন হাকাম বিন মুসা (রহ.) তিনি …. আয়িশা (রাযিঃ) হইতে বর্ণনা করেন যে, কোন পুরুষ নিজ স্ত্রীর সহিত সাধারণত যাহা করার ইচ্ছা করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও (তাঁহার স্ত্রী) সাফিয়্যা (রাযিঃ)-এর সহিত উহা করার ইচ্ছা করিলেন। তখন তাহারা বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, তিনি ঋতুমতী। তিনি ইরশাদ করিলেন, তাহা হইলে তো সে আমাদেরকে আটকাইয়া রাখিবে। তাহারা আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ। তিনি কুরবানীর দিন তাওয়াফে যিয়ারত করিয়া ফেলিয়াছেন। তিনি ইরশাদ করিলেন, তাহা হইলে সে তোমাদের সহিত রওয়ানা করুক।


অ্যাপোলোজেটিক ব্যাখ্যা: সম্মতি, দাসত্ব ও ক্ষমতার রাজনীতি
সাফিয়া বিনতে হুয়াইয়ের জীবনের এই ট্র্যাজিক অধ্যায়টি নিয়ে আধুনিক যুগের তথাকথিত ‘সুগারকোটেড’ বা অ্যাপোলোজেটিক ব্যাখ্যাকারীদের তৎপরতা বিশেষভাবে লক্ষণীয় । তারা এই ঘটনাটিকে নানাভাবে ‘মানবিক’ বা ‘রোমান্টিক’ করার চেষ্টা করেন যাতে আধুনিক মানবাধিকারের মানদণ্ডে নবী মুহাম্মদের ভাবমূর্তি রক্ষা করা যায়। ইসলাম প্রচারকদের মুখে ঘটনাটি শুনলে মনে হতে পারে, সাফিয়া শুরু থেকেই নবী মুহাম্মদের শুধুমাত্র নাম শুনেই প্রেমে এতটাই পাগল হয়ে গিয়েছিলেন যে, তার সাথে বিবাহের জন্য ব্যাকুল হয়ে নিজের স্বামীর মারধরেরও শিকার হন! বিশেষ করে দাওয়াহ কালচারের উত্থানের পর থেকে এই ঘটনাকে এমনভাবে প্রচার করা হয় যেন এটি একটি স্বেচ্ছাসম্মত এবং সম্মানজনক বিবাহ ছিল । কিন্তু এই ব্যাখ্যাগুলো অনেকাংশেই মূলত ইসলামের ধ্রুপদী উৎস, নৈতিকতা ও মানবিক বোধ এবং যুদ্ধের কঠিন বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে তৈরি করা হয়েছে । মুহাম্মদকে যেহেতু ‘সর্বোত্তম আদর্শ মানুষ’ হিসেবে বিশ্বাস করা হয়, তাই তাঁর কোনো কাজকে নৈতিকভাবে বিতর্কিত হিসেবে স্বীকার করা এই ব্যাখ্যাকারীদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ; ফলে তাঁরা ইতিহাসকে নিজেদের প্রয়োজনমতো নরম ও সম্পাদিত রূপ দিয়ে থাকেন । নানা ধরণের মানসিক কসরত বা মেন্টাল জিমন্যাস্টিকসের মাধ্যমে তৈরি করা এসব এড হক ব্যাখ্যা পড়লে অনেক সময় মনে হয়, সাফিয়া ইহুদি গোত্রে থাকাকালীনই মুহাম্মদকে শারীরিকভাবে কামনা করছিলেন, তিনি মনে মনে চাচ্ছিলেন কবে মুহাম্মদ এসে তাঁর স্বামীসহ পুরো গোত্রকে হত্যা করে তাঁকে নিজের বিছানায় তুলবেন!
সাফিয়ার ঘটনাকে একটি স্বাভাবিক প্রেম, স্বাধীন ধর্মান্তর কিংবা চাপমুক্ত বিবাহের গল্প হিসেবে উপস্থাপন করতে হলে প্রথমেই খায়বারের যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতাকে মুছে ফেলতে হয়। সাফিয়া তখন কোনো স্বাধীন নারী হিসেবে নিজের সামাজিক পরিবেশে বসে বিবাহের প্রস্তাব বিবেচনা করছিলেন না। তাঁর গোত্র সামরিকভাবে পরাজিত ও পর্যুদস্ত, তিনি নিজে যুদ্ধবন্দিনী, বন্দীদের সঙ্গে তাঁকেও গনিমতের অংশ হিসেবে একত্র করা হয়েছে, প্রথমে দিহয়া আল-কালবীর ভাগে দেওয়া হয়েছে, পরে তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে বিজয়ী বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতা মুহাম্মদ নিজের জন্য গ্রহণ করেছেন। সহিহ ইসলামি বর্ণনাগুলোর সবচেয়ে শক্ত ও বহুল-সংরক্ষিত অংশে এই মালিকানা, বণ্টন এবং হস্তান্তরের কাঠামোটি স্পষ্ট। এই বাস্তবতার পর কোনো বর্ণনায় যদি বলা হয়, বন্দিনী নারীটি শেষ পর্যন্ত স্বাধীন সম্মতির মাধ্যমে বিজয়ী শাসককেই “বেছে নিয়েছিলেন”, তাহলে সেই বাক্যকে তার রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে সেই কথিত স্বাধীন সম্মতির প্রমাণ বানানো ইতিহাসের বিকৃতি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো উৎসের প্রকৃতি। সাফিয়ার নিজের কোনো সমসাময়িক লিখিত সাক্ষ্য আমাদের হাতে নেই। আমরা তাঁর নিজের কণ্ঠে লেখা কোনো স্মৃতিকথা পড়ছি না, কোনো নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের যুদ্ধবিবরণও পড়ছি না। ঘটনাটি আমাদের কাছে এসেছে মূলত সেই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পুরুষ বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে, যারা যুদ্ধের বিজয়ী পক্ষ এবং যাদের কাছে মুহাম্মদের কর্মকাণ্ড বিতর্ক বা সমালোচনার উর্ধ্বে, ধর্মীয়ভাবে আদর্শ ও ন্যায্য। বিজয়ীর লিখিত ইতিহাসে বিজয়ী নেতার কর্মকাণ্ডকে নৈতিক, সম্মানজনক ও স্বেচ্ছামূলক হিসেবে উপস্থাপনকারী বিবরণকে বন্দিনীর স্বাধীন পরিস্থিতি হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। বিশেষত যখন একই সংস্কৃতির অস্বস্তিকর ও কম-বিতর্কিত অংশই জানাচ্ছে যে নারীটিকে প্রথমে গনিমত হিসেবে বণ্টন করা হয়েছিল। বিজয়ীর পক্ষ থেকে কয়েক প্রজন্ম পরে সংরক্ষিত “তিনি স্বেচ্ছায় আমাদের নেতাকেই বেছে নিয়েছিলেন” ধরনের বর্ণনা তাই নিজের সত্যতার সার্টিফিকেট নিজে হতে পারে না; সেটিকে ক্ষমতার সম্পর্ক, বর্ণনার উদ্দেশ্য এবং অন্য শক্তিশালী উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে পড়তেই হবে।
সাফিয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু নবীকেই বেছে নিলেন?
ইসলামের দাওয়াহ প্রচারকারীগণ যখন সাফিয়া সম্পর্কিত এই অত্যন্ত বিব্রতকর প্রশ্নের সম্মুখীন হন, তখন প্রধানত কয়েকটি হাদিস ও সিরাত-বর্ণনা উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয় সাফিয়ার কথিত স্বপ্নের কাহিনি এবং মুহাম্মদের পক্ষ থেকে তাঁকে ইসলাম গ্রহণ অথবা নিজের লোকদের কাছে ফিরে যাওয়ার তথাকথিত সুযোগ দেওয়ার বর্ণনা। এই দুই বর্ণনাই খায়বারের বন্দিত্বকে পরবর্তী সময়ে স্বেচ্ছাসম্মত প্রেম, পূর্বনির্ধারিত মিলন এবং স্বাধীন ধর্মীয় নির্বাচনের গল্পে রূপান্তর করার কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বর্ণনাগুলোর উৎস, সনদ এবং নিজেদের ভাষা পরীক্ষা করলেই এই এপোলোজেটিক নির্মাণের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রথমে সাফিয়ার কথিত স্বপ্নের বর্ণনাটি দেখা যাক। ইবন সা‘দের আত-তাবাকাতুল কুবরা-তে একটি দীর্ঘ বর্ণনায় বলা হয়েছে, মুহাম্মদ সাফিয়ার মুখে আঘাতের চিহ্ন দেখে কারণ জানতে চাইলে তিনি তাঁর একটি স্বপ্নের কথা বলেন। উল্লেখ্য, কিছু বাংলা এপোলোজেটিক লেখায় এটিকে “উজ্জ্বল নক্ষত্র” বলা হলেও মূল আরবিতে قَمَرًا—অর্থাৎ চাঁদ বলা হয়েছে। [47]
“আমি স্বপ্নে দেখলাম, ইয়াসরিবের দিক থেকে একটি চাঁদ এগিয়ে এসে আমার কোলে পড়ল। আমি বিষয়টি আমার স্বামী কিনানাকে বললে সে বলল, ‘তুমি কি সেই বাদশাহর স্ত্রী হতে চাও, যে মদিনা থেকে আসছে?’ এরপর সে আমার মুখে আঘাত করল।”
কোলে চাঁদ একে পড়ার স্বপ্ন সাধারণত সন্তান হওয়ার সাথে সম্পর্কিত বলে প্রচলিত। এই কোলে চাঁদ এসে পড়ার স্বপ্নে মুহাম্মদ কীভাবে প্রবেশ করলেন, তা বোঝা একটু মুশকিল। দ্বিতীয় বর্ণনাটি আরও বেশি ব্যবহৃত হয়। একই তাবাকাত-এ বলা হয়েছে, সাফিয়াকে মুহাম্মদের সামনে আনার পর তিনি সাফিয়ার পিতার শত্রুতার কথা উল্লেখ করেন এবং পরে তাঁকে ইসলাম অথবা ইহুদি ধর্মের মধ্যে একটি নির্বাচন করতে বলেন। [48]
“যখন সাফিয়া রাসূলের সামনে এলেন, তিনি তাঁকে বললেন, ‘তোমার পিতা ইহুদিদের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে শত্রুতা বন্ধ করেনি, যতক্ষণ না আল্লাহ তাকে হত্যা করেছেন।’ সাফিয়া বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তাঁর কিতাবে বলেছেন: কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।’ তখন রাসূল তাঁকে বললেন, ‘তুমি নির্বাচন করো। যদি ইসলাম গ্রহণ করো, তাহলে আমি তোমাকে নিজের জন্য রেখে দেব; আর যদি ইহুদি ধর্ম বেছে নাও, তাহলে হয়তো আমি তোমাকে মুক্ত করে তোমার লোকদের কাছে পাঠিয়ে দেব।’
সাফিয়া বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কাছে আসার পর, আপনি আমাকে আহ্বান করার আগেই আমি ইসলামকে পছন্দ করেছি এবং আপনাকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছি। ইহুদি ধর্মে আমার আর কোনো প্রয়োজন নেই; সেখানে আমার পিতা নেই, ভাইও নেই। আপনি আমাকে কুফর ও ইসলামের মধ্যে নির্বাচন করতে দিয়েছেন; মুক্ত হয়ে আমার লোকদের কাছে ফিরে যাওয়ার চেয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমার কাছে অধিক প্রিয়।’”
আর যদি এই বর্ণনার দাবিটিই মেনে নেওয়া হয় যে, সাফিয়া মুহাম্মদের আহ্বানের আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁকে সত্য নবী বলে বিশ্বাস করেছিলেন, তাহলে গল্পটি আরও ভয়াবহ ও অস্বাভাবিক রূপ নেয়। প্রশ্ন হলো—কিসের ভিত্তিতে? মুহাম্মদ সম্পর্কে তিনি এমন কী প্রমাণ পেয়েছিলেন যে, নিজের পিতা, স্বামী, স্বজন এবং গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনাকারী বিজয়ী বাহিনীর নেতাকেই তিনি আগে থেকেই আল্লাহর সত্য রাসূল বলে মেনে নিলেন? আরও বড় প্রশ্ন, তিনি যদি আগেই মুহাম্মদের ধর্ম ও দাবিকে সত্য বলে বিশ্বাস করে থাকেন, তাহলে তাঁর নিজ গোত্রের বিরুদ্ধে মুহাম্মদের যুদ্ধ, গোত্রের বহু পুরুষের হত্যা, তাঁর পিতার হত্যা এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের বন্দিত্ব—এসবের প্রতিও কি তিনি নৈতিক সমর্থন জানাচ্ছিলেন? একজন সদ্য পরাজিত ও স্বজনহারা নারীকে তাঁর আত্মীয়দের মৃতদেহের পাশ দিয়ে বন্দী করে নিয়ে আসা হচ্ছে, অথচ সেই নারী নাকি এর আগেই সেই বিজয়ী বাহিনীর নেতাকে মনে মনে সত্য নবী হিসেবে গ্রহণ করে বসে আছেন—এটি কোনো স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া নয়। এত অস্বাভাবিক ও ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে এত গভীরভাবে সাংঘর্ষিক একটি দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হলে অসাধারণ শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রমাণ প্রয়োজন। অথচ এই নাটকীয় দাবিটি যে বর্ণনায় বিস্তারিতভাবে পাওয়া যায়, সেটিই দুর্বল সনদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলে এই কাহিনি সাফিয়ার স্বাধীন ধর্মীয় সিদ্ধান্তের প্রমাণ হওয়ার বদলে বরং পরবর্তী যুগে তাঁর বন্দিত্ব ও বিবাহকে নৈতিক ও ধর্মীয় বৈধতার আবরণে ঢাকার একটি আদর্শিক বয়ান হিসেবেই বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে।
সাফিয়াকে মুক্ত হয়ে মুহাম্মদের স্ত্রী হওয়া অথবা নিজের লোকদের কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল—এই দাবির প্রধান বর্ণনাটি মুসনাদ আহমাদ ১২৪০৯-এ পাওয়া যায়। এর সনদ আবদুর রাজ্জাক → মা‘মার → সাবিত আল-বুনানি → আনাস ইবন মালিক। শু‘আইব আল-আরনাউত এটিকে “ইসনাদুহু সহিহুন ‘আলা শারতিশ শাইখাইন”, অর্থাৎ বুখারি-মুসলিমের শর্তে সহিহ বলেছেন; হাইসামিও এর রাবিদের সহিহের রাবি বলেছেন। সুতরাং হাদিসশাস্ত্রের প্রচলিত সনদ-মাপকাঠিতে এই বর্ণনাটিকে দুর্বল বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু এখানেই এপোলোজেটিক উপস্থাপনার একটি বড় বিভ্রান্তি ধরা পড়ে। সুনানুল কুবরা নাসাঈ ৮৬৪৬-কে এর পাশে দ্বিতীয় স্বাধীন সহিহ সাক্ষ্য হিসেবে হাজির করা হলেও সেটি একই মূল সনদ-ধারার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা; বরং নাসাঈর সংক্ষিপ্ত পাঠে সাফিয়াকে সেই তথাকথিত বিকল্প দেওয়ার বাক্যটিই নেই। অর্থাৎ “আহমাদ ও নাসাঈ—দুটি স্বতন্ত্র সহিহ হাদিস একই choice প্রমাণ করছে”—এমন ধারণা সঠিক নয়। choice-বাক্যটির মূল প্রমাণমূল্য একটি নির্দিষ্ট transmission line-এর ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
প্রথমে মুসনাদ আহমাদ-এর বর্ণনাটি পড়ুন। এটি একটি দীর্ঘ হাদিস; নিচে সাফিয়া সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক অংশটি দেয়া হলো। এখানে লক্ষণীয়, সাফিয়াকে মুক্ত করে স্ত্রী হওয়া অথবা নিজের পরিবারের কাছে চলে যাওয়ার তথাকথিত বিকল্প দেওয়ার কথাটি সাফিয়ার নিজের মুখে বর্ণিত নয়; হজ্জাজ ইবন ইলাত খায়বারের বিজয়ের সংবাদ আব্বাসকে জানাতে গিয়ে এই কথাটি বলছেন। [49]
আরবি:
فَأَخْبَرَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدِ افْتَتَحَ خَيْبَرَ، وَغَنِمَ أَمْوَالَهُمْ، وَجَرَتْ سِهَامُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فِي أَمْوَالِهِمْ، وَاصْطَفَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَفِيَّةَ بِنْتَ حُيَيٍّ فَاتَّخَذَهَا لِنَفْسِهِ، وَخَيَّرَهَا أَنْ يُعْتِقَهَا وَتَكُونَ زَوْجَتَهُ، أَوْ تَلْحَقَ بِأَهْلِهَا، فَاخْتَارَتْ أَنْ يُعْتِقَهَا وَتَكُونَ زَوْجَتَهُ.
বাংলা অনুবাদ:
হজ্জাজ তাঁকে জানালেন যে, রাসূলুল্লাহ খায়বার জয় করেছেন, তাদের সম্পদ গনিমত হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং তাদের সম্পদের মধ্যে ভাগ-বণ্টন হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাফিয়া বিনতে হুয়াইকে নিজের জন্য নির্বাচন করেন এবং তাঁকে নিজের জন্য গ্রহণ করেন। এরপর তিনি সাফিয়াকে এই বিকল্প দেন—তাঁকে মুক্ত করে দিলে তিনি তাঁর স্ত্রী হবেন, অথবা তিনি নিজের পরিবারের কাছে চলে যাবেন। তখন সাফিয়া মুক্ত হয়ে তাঁর স্ত্রী হওয়াকেই বেছে নেন।
এবারে সুনানুল কুবরা নাসাঈ-এর একই বর্ণনাটি পড়ুন। এর সনদও একই জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়—আবদুর রাজ্জাক → মা‘মার → সাবিত আল-বুনানি → আনাস। কিন্তু নাসাঈ এই বর্ণনাটি সংক্ষিপ্ত করেছেন, এবং তাঁর সংরক্ষিত পাঠে সাফিয়াকে কোনো বিকল্প দেওয়া, তাঁকে মুক্ত করা কিংবা সাফিয়ার মুহাম্মদকে বেছে নেওয়ার কথাই নেই। [50]
আরবি:
أَنْبَأَ إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ قَالَ أَنْبَأَ عَبْدُ الرَّزَّاقِ قَالَ حَدَّثَنَا مَعْمَرٌ قَالَ سَمِعْتُ ثَابِتًا الْبُنَانِيَّ يُحَدِّثُ عَنْ أَنَسٍ قَالَ لَمَّا افْتَتَحَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَيْبَرَ قَالَ الْحَجَّاجُ بْنُ عِلَاطٍ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ لِي بِمَكَّةَ مَالًا وَإِنَّ لِي بِهَا أَهْلًا وَأَنَا أُرِيدُ أَنْ آتِيَهُمْ فَأَنَا فِي حِلٍّ إِنْ أَنَا نِلْتُ مِنْكَ وَقُلْتُ شَيْئًا فَأَذِنَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَلَمَّا قَدِمَ عَلَى امْرَأَتِهِ بِمَكَّةَ قَالَ لِأَهْلِهِ اجْمَعِي مَا كَانَ لَكِ مِنْ مَالٍ وَشَيْءٍ فَإِنِّي أُرِيدُ أَنْ أَشْتَرِيَ مِنْ مَغَانِمِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَصْحَابِهِ فَإِنَّهُمْ قَدْ أُبِيحُوا وَذَهَبَتْ أَمْوَالُهُمْ، فَانْقَمَعَ الْمُسْلِمُونَ وَظَهَرَ الْمُشْرِكُونَ فَرَحًا وَسُرُورًا.
বাংলা অনুবাদ:
ইসহাক ইবন ইবরাহিম আমাদের জানিয়েছেন, আবদুর রাজ্জাক তাঁকে জানিয়েছেন, মা‘মার বলেছেন: আমি সাবিত আল-বুনানিকে আনাস থেকে বর্ণনা করতে শুনেছি—রাসূলুল্লাহ যখন খায়বার জয় করলেন, তখন হজ্জাজ ইবন ইলাত বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! মক্কায় আমার সম্পদ ও পরিবার রয়েছে। আমি তাদের কাছে যেতে চাই। সেখানে আপনার সম্পর্কে কোনো কথা বললে বা আপনার বিরুদ্ধে কিছু বললে কি আমার অনুমতি আছে?” রাসূলুল্লাহ তাঁকে অনুমতি দিলেন। তিনি মক্কায় নিজের স্ত্রীর কাছে পৌঁছে বললেন, “তোমার কাছে যে সম্পদ আছে তা একত্র করো। আমি রাসূলুল্লাহ ও তাঁর সাহাবিদের গনিমতের মাল কিনতে চাই; কারণ তারা পরাজিত হয়েছে এবং তাদের সম্পদ চলে গেছে।” এই সংবাদে মুসলিমরা দমে গেল এবং মুশরিকরা আনন্দ ও উল্লাস প্রকাশ করল।
দুটি বর্ণনা পাশাপাশি রাখলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। এগুলো দুইজন স্বাধীন সাক্ষীর দুইটি পৃথক হাদিস নয়। নাসাঈ নিজেও সেই একই আবদুর রাজ্জাক → মা‘মার → সাবিত → আনাস সনদে ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তাঁর সংক্ষিপ্ত পাঠ শেষ হয়ে গেছে সাফিয়া সম্পর্কিত তথাকথিত নির্বাচনের অংশে পৌঁছানোর আগেই। ফলে নাসাঈ ৮৬৪৬-কে আহমাদ ১২৪০৯-এর “সাফিয়া স্বাধীনভাবে মুহাম্মদকে বেছে নিয়েছিলেন” বক্তব্যের দ্বিতীয় স্বাধীন সাক্ষ্য হিসেবে দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। বরং হাদিস-সমালোচকরা নিজেরাই নাসাঈর বর্ণনাকে আহমাদের বর্ণনার “مختصراً”—সংক্ষিপ্ত রূপ—হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এই বর্ণনাটিও সাফিয়ার নিজের বক্তব্য নয়। এখানে হজ্জাজ ইবন ইলাত খায়বারের বিজয়ের সংবাদ আব্বাসকে জানাচ্ছেন। সেই বিজয়-সংবাদের মধ্যেই বলা হচ্ছে যে খায়বার জয় হয়েছে, তাদের সম্পদে গনিমতের ভাগ বণ্টিত হয়েছে, মুহাম্মদ সাফিয়াকে নিজের জন্য নির্বাচন করেছেন, এবং পরে তাঁকে মুক্ত হয়ে স্ত্রী হওয়া অথবা নিজের লোকদের কাছে যাওয়ার বিকল্প দিয়েছেন। অর্থাৎ বর্ণনাটির নিজের কাঠামোতেই প্রথমে সামরিক বিজয়, সম্পত্তি দখল এবং নারী নির্বাচন; তার পরে তথাকথিত choice। এই ক্রম উল্টে দিয়ে শুধু শেষ অংশটিকে সামনে এনে “সাফিয়া স্বাধীনভাবে মুহাম্মদকে বেছে নিয়েছিলেন” বলা পুরো বর্ণনাটিকেই বিকৃত করে।
দুই বর্ণনার মান এবং ভেতরের সমস্যাগুলো
এখন বর্ণনাগুলোর মান দেখা যাক। উপরের স্বপ্নের দীর্ঘ বর্ণনাটি ইবন সা‘দের আত-তাবাকাতুল কুবরা-তে এসেছে মুহাম্মদ ইবন উমর আল-ওয়াকিদি-র মাধ্যমে। ইবন সা‘দের পাঠের শুরুতেই রয়েছে أخبرنا محمد بن عمر—অর্থাৎ তাঁর শিক্ষক আল-ওয়াকিদি এই কাহিনি বর্ণনা করছেন। একই দীর্ঘ বর্ণনায় একাধিক সূত্রের বক্তব্য একত্রিত করে সরাসরি বলা হয়েছে دخل حديث بعضهم في حديث بعض—একজনের বর্ণনা অন্যজনের বর্ণনার সঙ্গে মিশে গেছে। ফলে সাফিয়ার স্বপ্ন, কিনানার মন্তব্য, মুখে আঘাত, পরবর্তী আচরণ, সবকিছুকে হাদিসশাস্ত্রের নিজস্ব মানদণ্ডেই একটি বিশুদ্ধ, স্বতন্ত্র সহিহ হাদিস হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না-নৈতিক ও মানবিক মানদণ্ডের কথা তো বাদই রাখলাম। এপোলোজিস্টরা যে স্বপ্নকে মুহাম্মদের সঙ্গে সাফিয়ার পূর্বনির্ধারিত প্রেমের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেন, সেই রোমান্টিক গল্পটিই দাঁড়িয়ে আছে ওয়াকিদির মাধ্যমে সংরক্ষিত একটি composite সিরাত-বর্ণনার ওপর।
ইসলাম গ্রহণ ও নিজের লোকদের কাছে ফিরে যাওয়ার দীর্ঘ সংলাপটির অবস্থা আরও পরিষ্কার। এর সনদ মুহাম্মদ ইবন উমর আল-ওয়াকিদি → ইবরাহিম ইবন জাফর → তাঁর পিতা। অর্থাৎ এই বর্ণনাটির প্রবেশদ্বারও সেই আল-ওয়াকিদি। ফলে এটিকে সহিহ হাদিসের মর্যাদা দিয়ে সাফিয়ার স্বাধীন সম্মতির প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ নেই। মুসনাদ আহমাদের সহিহ-গ্রেডেড বর্ণনায় একটি সংক্ষিপ্ত পছন্দ করার কথা পাওয়া গেলেও, ইসলাম বনাম ইহুদি ধর্ম, পিতার মৃত্যু, “আমার পিতা নেই, ভাই নেই”, এবং আল্লাহ ও রাসূলকে মুক্তির চেয়ে বেশি ভালোবাসার এই বিস্তারিত নাটকীয় সংলাপ সেই শক্ত সনদে পাওয়া যায় না। দুর্বল বর্ণনার বিস্তারিত ভাষা দিয়ে শক্তিশালী সংক্ষিপ্ত বর্ণনার ফাঁকা জায়গা পূরণ করে তারপর সেটিকে ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা এই ঘটনা পরম্পরায় সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
আর বর্ণনাটিকে তর্কের খাতিরে সত্য ধরে নিলেও এটি এপোলোজেটিক দাবিকে সাহায্য করার বদলে আরও বড় সমস্যা তৈরি করে। মুহাম্মদের বক্তব্য “فعسى أن أعتقك فتلحقي بقومك”—“হয়তো আমি তোমাকে মুক্ত করব, যাতে তুমি তোমার লোকদের কাছে যেতে পারো।” এখানে মুক্তি কোনো স্বীকৃত অধিকার নয়; বিজয়ী মালিকের সম্ভাব্য অনুগ্রহ, তার খেয়াল খুশিই এখানে মুখ্য। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো সাফিয়ার মুখে বসানো বক্তব্য: “আমার সেখানে পিতা নেই, ভাইও নেই।” অর্থাৎ যে বর্ণনাকে স্বাধীন নির্বাচনের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেই বর্ণনাই তাঁর বিকল্পের ভয়াবহ সংকোচন স্বীকার করছে—পিতা নিহত, ভাই নেই, স্বামী নিহত, গোত্র পরাজিত, আর নিজের স্বাধীনতা বিজয়ীর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। এমন পরিস্থিতির “choice” সমমর্যাদার দুইটি স্বাধীন জীবনের মধ্যে নির্বাচন নয়।
স্বপ্নের গল্পটিও সত্য ধরে নিলে প্রেমের কোনো প্রমাণ হয় না। একটি স্বপ্ন দেখা মানেই স্বপ্নের ব্যক্তিকে বিয়ে করার সচেতন আকাঙ্ক্ষা নয়। বরং কিনানার কথিত মন্তব্য—“তুমি কি মদিনা থেকে আসা এই বাদশাহর স্ত্রী হতে চাও?”—স্বামীর নিজের ব্যাখ্যা; সাফিয়া নিজে সেখানে মুহাম্মদের প্রতি কোনো প্রেম, কামনা বা বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশ করেননি। একটি স্বপ্নকে পরে সংঘটিত বিজয় ও বিবাহের আলোকে “দৈব পূর্বাভাস” বানানো একটি textbook teleological reconstruction: শেষ ফলাফল আগে থেকে জানা আছে বলে পুরনো অস্পষ্ট ঘটনাকে সেই ফলাফলের দিকে নির্দেশকারী সংকেত হিসেবে পুনর্ব্যাখ্যা করা। আর যে কাহিনির সনদ নিজেই দুর্বল, সেটিকে ব্যবহার করে যুদ্ধবন্দিত্বকে পূর্বনির্ধারিত প্রেমে রূপান্তর করা আরও অসার।
“নিজের লোকদের কাছে ফিরে যাও”—কোন বাস্তবতায়?
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায় সবসময় চাপা পড়ে যায়: খায়বার জয় করার পর “নিজের লোকদের কাছে ফিরে যাওয়া” বলতে বাস্তবে কী বোঝাত? খায়বারের সব ইহুদি নিহত হয়নি; একটি অংশ জীবিত ছিল। কিন্তু তারা আর আগের স্বাধীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থায় ছিল না। সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় খায়বারের ইহুদিরাই মুহাম্মদের কাছে অনুরোধ করেছিল যেন তাদের সেখানে থাকতে দেওয়া হয় এবং জমি চাষ করতে দেওয়া হয়। তাদের থাকতে দেওয়া হয়েছিল উৎপাদনের অর্ধেক দেওয়ার শর্তে এবং মুহাম্মদের ভাষায় “যতদিন আমরা চাই”। অর্থাৎ তাদের অবস্থান ছিল বিজয়ীর অনুমতিনির্ভর। সহিহ বুখারিতেও খায়বারের জমিতে ইহুদিদের কাজ করা এবং উৎপাদনের অর্ধেক পাওয়ার একই ব্যবস্থা সংরক্ষিত হয়েছে। মুহাম্মদের বর্ণিত এই “যতদিন আমরা চাই” – নির্দেশনার মধ্যে মুহাম্মদকে সন্তুষ্ট রাখা, খুশী রাখা নিশ্চয়ই অন্তর্ভূক্তি ছিল। এরকম শর্তের অধীনে একজন ইহুদি নারী যদি নিজেকে তার গোত্রের ভবিষ্যতের কথা ভেবে উৎসর্গ করতে চান, সেটি ঘটে থাকলে অবাক হওয়ার মত কিছু থাকবে না।
তাই “সাফিয়া চাইলে নিজের পরিবারের কাছে ফিরে গিয়ে আগের স্বাধীন জীবনযাপন করতে পারতেন”—এমন ছবি একজন পরাজিত পরিবার হারা নারীর ক্ষেত্রে খাটে না। তাঁর সামনে যে “নিজের লোকেরা” বেঁচে ছিল, তারা সদ্য সামরিকভাবে পরাজিত, ভিটেমাটি জায়গা-জমির রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হারানো এবং বিজয়ী মুসলিম শাসকের ইচ্ছায় সেখানে অবস্থানরত একটি জনগোষ্ঠী। একদিকে বিজয়ী শাসকের স্ত্রী হয়ে স্বাধীনতা, সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যপদ এবং নিরাপত্তা; অন্যদিকে সেই একই বিজয়ী শক্তির অধীনে টিকে থাকা একটি পরাজিত সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে যাওয়া, এই দুই অবস্থাকে সমান ক্ষমতার দুটি নিরপেক্ষ বিকল্প বলা যায় না।
পরিণতি: “যতদিন আমরা চাই” থেকে শেষ পর্যন্ত উচ্ছেদ
সাফিয়াকে কথিতভাবে “নিজের লোকদের কাছে ফিরে যাওয়ার” যে বিকল্প দেওয়া হয়েছিল, তার বাস্তব চরিত্র আরও পরিষ্কার হয়ে যায় পরবর্তী ঘটনাগুলো দেখলে। খায়বার বিজয়ের পর মুহাম্মদ প্রথমেই সেখানকার ইহুদিদের বের করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খায়বারের কৃষিকাজ পরিচালনার প্রয়োজনেই ইহুদিরা তাঁকে অনুরোধ করে সেখানে থাকার অনুমতি নেয় এবং উৎপাদনের অর্ধেক মুসলিমদের দেওয়ার শর্তে তাদের থাকতে দেওয়া হয়। সহিহ বুখারির ভাষায় মুহাম্মদ তাদের স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা যতদিন চাই, ততদিন তোমাদের এই অবস্থায় থাকতে দেব।” অর্থাৎ যে সমাজে ফিরে যাওয়াকে সাফিয়ার জন্য একটি স্বাধীন বিকল্প হিসেবে দেখানো হয়, সেই সমাজের নিজের বসবাসের অধিকারই ছিল বিজয়ী মুসলিম শাসকের ইচ্ছাধীন। [51]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ১৯৫৯. নবী (ﷺ) ইসলামের প্রতি যাদের মন আকৃষ্ট করার প্রয়োজন তাদেরকে ও অন্যদেরকে খুমুস ইত্যাদি থেকে দান করতেন। এ বিষয়ে আবদুল্লাহ ইবন যায়দ (রাঃ) নবী (সাঃ) থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ২৯৩১ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩১৫২
২৯৩১। আহমদ ইবনু মিকদাম (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদেরকে হিজায ভূখন্ড থেকে নির্বাসিত করেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খায়বার জয় করেন, তখন তিনিও ইয়াহুদীদের সেখান থেকে বের করে দিতে চেয়েছিলেন। আর সে জমীন বিজিত হওয়ার পর আল্লাহ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমগণের অধিকারে এসে গিয়েছিল। তখন ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আবেদন করল, যেন তিনি তাদের এ শর্তে থাকার অনুমতি দেন যে, তারা কৃষি কাজ করবে এবং তাদের জন্য অর্ধেক ফসল থাকবে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, যতদিন আমরা চাই তোমাদের এ শর্তে থাকার অনুমতি দিচ্ছি। তারা এভাবে রয়ে গেল। অবশেষে উমর (রাঃ) তাঁর শাসনামলে তাদের তায়মা আরীহা নামক স্থানের দিকে নির্বাসিত করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)
এটি কোনো স্থায়ী সন্ধি, সমান রাজনৈতিক অধিকার কিংবা নিজেদের ভূমিতে স্বাধীনভাবে বসবাসের নিশ্চয়তা ছিল না। বুখারির একই বর্ণনায় আরও বলা হয়েছে, খায়বারের জমি বিজয়ের পর আল্লাহ, রাসূল ও মুসলিমদের অধিকারে চলে যায় এবং ইহুদিদের অবস্থান ছিল শর্তসাপেক্ষ। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, সেই একই হাদিস পরবর্তী পরিণতিও জানিয়ে দেয়—উমর খলিফা হওয়ার পর খায়বারের ইহুদিদের সেখান থেকে উচ্ছেদ করে তাইমা ও আরিহা-র দিকে পাঠিয়ে দেন। অর্থাৎ মুহাম্মদের “যতদিন আমরা চাই” কোনো অলঙ্কারিক বাক্য ছিল না; পরবর্তী মুসলিম রাষ্ট্র সেটির বাস্তব প্রয়োগ করেছে।
এর সঙ্গে মুহাম্মদের আরেকটি সহিহ নির্দেশ মিলিয়ে পড়লে নীতিটির চরিত্র আরও স্পষ্ট হয়। সহিহ মুসলিমে উমর ইবন খাত্তাবের সূত্রে মুহাম্মদের বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে যে, তিনি ইহুদি ও খ্রিস্টানদের আরব উপদ্বীপ থেকে বের করে দেবেন এবং সেখানে মুসলিম ছাড়া কাউকে রাখবেন না। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; ইসলামি হাদিস-ঐতিহ্য নিজেই এটিকে মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে সংরক্ষণ করেছে।
আর মুহাম্মদের জীবনের একেবারে শেষ পর্যায়ের অসুস্থতার বর্ণনাতেও একই নীতির আরেকটি রূপ পাওয়া যায়। সহিহ বুখারিতে ইবন আব্বাসের বর্ণনা অনুযায়ী, মৃত্যুর পূর্ববর্তী অসুস্থতার সময় মুহাম্মদ তাঁর শেষ নির্দেশগুলোর একটি হিসেবে বলেন, “আরব উপদ্বীপ থেকে মুশরিকদের বের করে দাও।” অর্থাৎ ধর্মীয়ভাবে ভিন্ন জনগোষ্ঠীকে আরব উপদ্বীপ থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ তাঁর মৃত্যুর আগের নির্দেশনাগুলোর মধ্যেও উপস্থিত ছিল। এবারে আসুন প্রাসঙ্গিক হাদিসগুলো পড়া যাক, [52] [53] [54]।
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ জিহাদ ও এর নীতিমালা
পরিচ্ছদঃ ২১. ইয়াহুদী ও নাসারাদের আরব উপ-দ্বীপ থেকে বহিস্কার
৪৪৪২। যুহায়র ইবনু হারব ও মুহাম্মাদ ইবনু রাফি (রহঃ) … জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, আমার কাছে উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন যে, নিশ্চয়ই আমি ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান সম্প্রদায়কে আরব উপ-দ্বীপ থেকে বহিস্কার করবো। পরিশেষে মুসলমান ব্যতীত অন্য কাউকে এখানে থাকতে দেবো না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৩৩। জিহাদ ও সফর
পরিচ্ছদঃ ২১. ইয়াহুদী ও নাসারাদের আরব উপ-দ্বীপ থেকে বের করে দেয়া
৪৪৮৬-(৬৩/১৭৬৭) যুহায়র ইবনু হারব ও মুহাম্মাদ ইবনু রাফি’ (রহঃ) ….. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, আমার কাছে উমর ইবনু খাত্তাব (রাযিঃ) বর্ণনা করেন যে, তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন যে, নিশ্চয়ই আমি ইয়াহুদী ও খ্ৰীষ্টান সম্প্রদায়কে আরব উপ-দ্বীপ থেকে বের করে দেবো। তারপর মুসলিম ব্যতীত অন্য কাউকে এখানে থাকতে দেবো না। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৪৪২, ইসলামিক সেন্টার ৪৪৪৪)
যুহায়র ইবনু হারব ও সালামাহ্ ইবনু শাবীব (রহঃ) ….. উভয়েই আবূ যুবায়র (রহঃ) থেকে এ সানাদে অনুরূপ বর্ণনা করেন। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৪৪২, ইসলামিক সেন্টার ৪৪৪৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
অধ্যায়ঃ ১৯/ যুদ্ধাভিযান
পাবলিশারঃ হুসাইন আল-মাদানী
পরিচ্ছদঃ ৪৩. আরব উপদ্বীপ হতে ইয়াহুদী-নাসারাদের বের করে দেওয়া প্রসঙ্গে
১৬০৭। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেনঃ আমি ইহুদী ও নাসারাদের আরব উপদ্বীপ হতে অবশ্যই বহিষ্কার করব। মুসলমান ব্যতীত অন্য কাউকে সেখানে বসবাস করতে দিব না।
সহীহ, সহীহা (১১৩৪), সহীহ আবূ দাউদ, মুসলিম
এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই ধারাবাহিকতার আলোকে সাফিয়ার তথাকথিত “নিজের লোকদের কাছে ফিরে যাওয়ার” সুযোগকে একটি নিরাপদ ও স্বাধীন বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা আরও হাস্যকর হয়ে পড়ে। তাঁর সামনে ফিরে যাওয়ার মতো যে ইহুদি সমাজটি তখনও অবশিষ্ট ছিল, সেই সমাজ প্রথম থেকেই বিজয়ীর অনুমতিতে সেখানে অবস্থান করছিল, তাদের জমির ওপর স্বাধীন কর্তৃত্ব ছিল না, তাদের অবস্থান ছিল “যতদিন আমরা চাই” শর্তাধীন, এবং শেষ পর্যন্ত সেই মুসলিম রাষ্ট্রই মুহাম্মদের মৃত্যুর কিছু সময় পরে তাদের উচ্ছেদ করেছে। উপরন্তু মুহাম্মদের নিজের নামে সংরক্ষিত সহিহ বর্ণনাই আরব উপদ্বীপ থেকে ইহুদি-খ্রিস্টানদের সরিয়ে দেওয়ার নীতি ঘোষণা করছে। ফলে বিজয়ী শাসকের স্ত্রী হওয়া এবং সেই শাসককে খুশি রাখা সাফিয়ার কী অত্যন্ত রূঢ় বাস্তব সিদ্ধান্ত ছিল না? সেই বিজয়ীর অধীন, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, পরাজিত ও শেষ পর্যন্ত উচ্ছেদযোগ্য জনগোষ্ঠীর কাছে ফিরে যাওয়াকে সমান ক্ষমতার দুটি স্বাধীন বিকল্প বলে দেখানো ইতিহাসের বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ উল্টে দেওয়া।
এই পরবর্তী ঘটনাগুলো সাফিয়ার সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক মাত্রাকেও আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। তিনি যদি বিজয়ী শাসকের পরিবারে প্রবেশের মাধ্যমে নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি অবশিষ্ট আত্মীয়স্বজন ও গোত্রীয় মানুষের জন্য কোনো ধরনের সুরক্ষা, প্রভাব বা মধ্যস্থতার সুযোগ অর্জনের কথা বিবেচনা করে থাকেন, সেটি সেই সময়কার ক্ষমতার বাস্তবতায় অত্যন্ত যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। কারণ তিনি এমন এক জনগোষ্ঠীতে ফিরে যাওয়ার বিকল্প পাচ্ছিলেন, যাদের নিজেদের ভবিষ্যৎই তাঁর প্রস্তাবদাতা পুরুষটির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সিদ্ধান্তের ওপর ঝুলছিল। এমন পরিস্থিতিকে “স্বাধীন প্রেমের নির্বাচন” হিসেবে সাজানো সাফিয়ার অবস্থাকে ব্যাখ্যা করে না; বরং বিজয়ীর ক্ষমতাকে আড়াল করে।
সাফিয়ার নিজের সিদ্ধান্ত: প্রেম, নাকি বেঁচে থাকার রাজনৈতিক হিসাব?
সাফিয়ার অবস্থানকে বুঝতে হলে তাঁর ব্যক্তিগত ও গোত্রীয় বাস্তবতা একসঙ্গে দেখতে হবে। তিনি ছিলেন সাধারণ বন্দিনী নন; তিনি বনু নাদিরের নেতা হুয়াই ইবন আখতাবের কন্যা এবং খায়বারের ইহুদি অভিজাত পরিবারের নারী। তাঁর পিতা ইতিমধ্যে মুসলিমদের হাতে নিহত, তাঁর স্বামী কিনানাও খায়বারের পর নিহত, তাঁর নিজ সম্প্রদায় সামরিকভাবে পরাজিত এবং তাদের ভবিষ্যৎ বিজয়ী শক্তির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। এর আগেই তিনি এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ দেখেছেন যেখানে পরাজিত ইহুদি গোষ্ঠীর পুরুষদের হত্যা এবং নারী-শিশুদের বন্দী করার নজির রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিজয়ী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতার স্ত্রী হওয়াকে নিছক প্রেমঘটিত ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে পড়া ইতিহাসের বাস্তব ক্ষমতার সম্পর্ককে ইচ্ছাকৃতভাবে অদৃশ্য করে দেওয়া।
বরং এই সিদ্ধান্তের একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ও survival logic রয়েছে। মুহাম্মদের বন্দিনী হয়ে থাকা অবস্থায় সাফিয়ার নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ তাঁর হাতে; একই সময়ে তাঁর বেঁচে থাকা আত্মীয় ও গোত্রীয় মানুষের জীবন, জমি ও নিরাপত্তাও বিজয়ী মুসলিম কর্তৃত্বের অধীন। বিজয়ী শাসকের স্ত্রী হওয়া তাঁকে গনিমতের একজন নারী থেকে সরাসরি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাকেন্দ্রের সদস্যে পরিণত করে। এতে নিজের জীবন ও মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি বেঁচে থাকা আত্মীয়স্বজন ও গোত্রের ওপর সম্ভাব্য প্রতিশোধ, উচ্ছেদ বা নিপীড়ন কমানোর রাজনৈতিক সুযোগও তৈরি হয়। তাই তাঁর সিদ্ধান্তকে গোত্রীয় ও ব্যক্তিগত survival strategy হিসেবে পড়ার যথেষ্ট ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে। এটি কোনো স্বাভাবিক সামাজিক পরিবেশে প্রেমিক বা যৌন সঙ্গী নির্বাচন নয়; এটি এক পরাজিত অভিজাত নারীর সামনে বিজয়ীর তৈরি করা বাস্তবতার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী নিরাপত্তার পথ নির্বাচন।
এই দিকটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এই বিবাহকে রাজনৈতিক পুনর্মিলন ও alliance তৈরির ঘটনা হিসেবে পড়ার ঐতিহাসিক ভিত্তিও রয়েছে। বিজয়ী শাসকের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি পরাজিত ইহুদি অভিজাত পরিবারের নারীকে বিবাহ করা রাজনৈতিক শত্রুতা কমানোর কার্যকর উপায় হয়ে থাকে, তাহলে একই সম্পর্ক পরাজিত পক্ষের সেই নারীর কাছেও নিজের ও নিজের সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার রাজনৈতিক উপায় হওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। ক্ষমতার এই দ্বিমুখী বাস্তবতাকে বাদ দিয়ে শুধু “তিনি তাঁকেই বেছে নিয়েছিলেন” বলা ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটিই মুছে ফেলে।
| এপোলোজেটিক উপস্থাপনা | ঐতিহাসিক বাস্তবতা |
|---|---|
| সাফিয়া স্বাধীনভাবে মুহাম্মদকে বেছে নেন | তিনি ইতিমধ্যে যুদ্ধবন্দিনী এবং গনিমতের অংশ হিসেবে বণ্টিত নারী |
| আহমাদ ও নাসাঈ দুইটি স্বাধীন সহিহ সাক্ষ্য | দুটি একই মূল transmission line-এর; নাসাঈর সংক্ষিপ্ত পাঠে choice-বাক্যটিও নেই |
| তিনি চাইলে নিজের লোকদের কাছে ফিরে যেতে পারতেন | তাঁর জীবিত লোকেরা ছিল সদ্য পরাজিত এবং বিজয়ীর অনুমতিতে খায়বারে অবস্থানরত জনগোষ্ঠী। মুহাম্মদ যতদিন খুশি তাদের রাখতে পারেন, অর্থাৎ মুহাম্মদের খুশি থাকা ছিল এখানে শর্ত |
| ইসলাম ও বিবাহ তাঁর স্বাধীন নির্বাচন | তাঁর স্বাধীনতা, জীবন ও ভবিষ্যৎ তখন বিজয়ী শাসকের হাতে |
| পরে ভালো সম্পর্ক ছিল, তাই প্রথম সিদ্ধান্তও স্বাধীন | পরবর্তী অভিযোজন বা সম্পর্ক পূর্ববর্তী বন্দিত্ব ও ক্ষমতার অসমতা মুছে দেয় না |
| বিবাহটি ব্যক্তিগত প্রেমের ফল | এটি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, গোত্রীয় survival ও রাজনৈতিক পুনর্মিলনের শক্তিশালী পথও ছিল |
হাদিসগুলো সম্পূর্ণ সত্য ধরে নিলেও সমস্যাটি দূর হয় না
সবশেষে তর্কের খাতিরে মুসনাদ আহমাদের বর্ণনাটিকে শব্দে শব্দে সম্পূর্ণ সত্য ধরে নেওয়া যাক। ধরে নেওয়া যাক মুহাম্মদ সত্যিই সাফিয়াকে বলেছেন—তোমাকে মুক্ত করে স্ত্রী করব অথবা নিজের লোকদের কাছে যেতে দেব। তাতেও এটি স্বাধীন সম্মতির প্রমাণ হয় না। কারণ বিকল্প দেওয়ার ক্ষমতাটিই বিজয়ী মালিকের হাতে। সাফিয়ার স্বাধীনতা তাঁর নিজের স্বাভাবিক অধিকার হিসেবে বিদ্যমান ছিল না; মুহাম্মদ সেটি দেবেন কি না, সেই সিদ্ধান্তও মুহাম্মদের। যে ব্যক্তি প্রথমে একজন নারীকে যুদ্ধবন্দিনী হিসেবে নিজের ক্ষমতার অধীনে রাখে, পরে সেই নারীকে মুক্তির শর্তসাপেক্ষ একটি বিকল্প দেয়, সে এর মাধ্যমে আগের coercive relationship মুছে ফেলতে পারে না।
আরও বড় কথা, সাফিয়ার তথাকথিত choice তাঁর বন্দিত্বের আগের ঘটনাগুলোকে একবিন্দুও পরিবর্তন করে না। তাঁর নিজের সম্মতি ছাড়াই তাঁকে বন্দী করা হয়েছে; সম্মতি ছাড়াই গনিমতের অংশ বানানো হয়েছে; সম্মতি ছাড়াই দিহয়ার ভাগে দেওয়া হয়েছে; সম্মতি ছাড়াই দিহয়ার কাছ থেকে সরিয়ে মুহাম্মদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরে বিজয়ী মালিক তাঁকে একটি বিকল্প দিয়ে থাকলেও তা প্রমাণ করে না যে আগের ব্যবস্থা সম্মতিমূলক ছিল। বরং সেটি প্রমাণ করে স্বাধীনতা দেওয়ার বা না দেওয়ার ক্ষমতাও বিজয়ীর হাতে ছিল।
তাই সাফিয়ার কাহিনিকে “তিনি নিজের ইচ্ছায় মুহাম্মদকে বেছে নিয়েছিলেন” এক বাক্যে শেষ করা ইতিহাস নয়। সবচেয়ে শক্ত ইসলামি উৎসগুলোই প্রথমে তাঁকে বন্দিনী, গনিমত এবং বণ্টনযোগ্য নারী হিসেবে দেখাচ্ছে। তথাকথিত choice-এর প্রধান বর্ণনা একটি নির্দিষ্ট সনদ-ধারায় সংরক্ষিত বিজয়ী পক্ষের testimony; নাসাঈ কোনো স্বাধীন দ্বিতীয় corroboration নয়; বিস্তারিত প্রেমময় ধর্মান্তর-সংলাপ দুর্বল বর্ণনার ওপর দাঁড়ানো; আর খায়বারের বাস্তবতায় “নিজের লোকদের কাছে ফিরে যাওয়া” মানে আগের স্বাধীন জীবনে ফেরা নয়, বরং বিজয়ী মুসলিম শক্তির অধীন সদ্য পরাজিত সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে যাওয়া। এই বাস্তবতার মধ্যে সাফিয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাধীন প্রেমের প্রমাণ বলা নয়, বরং নিজের জীবন, মর্যাদা এবং সম্ভবত বেঁচে থাকা গোত্রের নিরাপত্তার জন্য একজন পরাজিত অভিজাত নারীর রাজনৈতিক survival decision হিসেবে পড়াই ঘটনাটির ক্ষমতার বাস্তবতার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সম্মতির নৈতিক দর্শন ও ক্ষমতার অসম সমীকরণ
অ্যাপোলোজিস্টদের পক্ষ থেকে যে দাবিটি করা হয় তা হলো, মুহাম্মদ সাফিয়াকে দাসী না বানিয়ে বিয়ে করেছিলেন, তাই এটি ছিল একটি অত্যন্ত সম্মানজনক আচরণ। এই যুক্তিটি বাহ্যিকভাবে মানবিক শোনালেও এর ভেতরে একটি গভীর সমস্যাজনক এবং সংকীর্ণ অনুমান লুকিয়ে আছে। এই যুক্তিটি আসলে অজান্তেই এই ধারণাকে মেনে নিচ্ছে যে, মুহাম্মদের সামনে মূলত দুটি বিকল্প খোলা ছিল—এক, তাঁকে কেবল একজন যৌনদাসী হিসেবে রাখা, অথবা দুই, তাঁকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা । এখানে সাফিয়ার নিজের স্বাধীন ইচ্ছা, নিজের পূর্বের একই মানের ধর্মীয় বা সামাজিক অবস্থানে ফিরে যাওয়ার মৌলিক অধিকার ছেঁটে ফেলা হয়। তথাকথিত এই ‘সম্মান’ মূলত একজন যুদ্ধবন্দী নারীকে লুণ্ঠিত মালামালের বা যৌনদাসীর স্তর থেকে সামান্য উপরের একটি সামাজিক অবস্থানে উন্নীত করার নামান্তর মাত্র। কিন্তু কোনো মানুষকে তাঁর পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে, তাঁর স্বজনদের হত্যার মাধ্যমে বন্দিত্ব ও চরম মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দিয়ে তাঁকে স্রেফ ‘কম খারাপ’ একটি অবস্থানে রাখা কখনোই নৈতিকতার প্রমাণ হতে পারে না। বিশেষভাবে যেখানে তাঁর নিজ গোত্রকে আক্রমণ করে প্রায় ধ্বংস করা, পিতা ভাই স্বামীর হত্যাকারীদের সর্দারকে যৌনসুখ দিতে হচ্ছে।
দ্বিমুখী সংকটের জাল: সম্মান বনাম মুক্তি
এই আলোচনার গভীরে প্রবেশ করলে একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে চলে আসেঃ একজন নারীর সামনে যদি বাস্তবে কোনো স্বাধীন বিকল্পই না থাকে, তবে তাঁর তথাকথিত ‘সম্মতি’ ঠিক কতটুকু যৌক্তিক ও অর্থবহ হতে পারে? আধুনিক নৈতিক দর্শন, মনোবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে সম্মতির একটি অপরিহার্য ও অলঙ্ঘনীয় শর্ত হলো—যেকোনো ধরণের ভয়, জবরদস্তি ও চরম ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা। একজন বন্দী, সদ্য স্বামীহারা, পিতৃহারা এবং নিজ গোত্রহারা ১৬-১৭ বছরের এক কিশোরী, যাঁর চারপাশে ঘিরে রয়েছে তাঁর জাতিগত ও পারিবারিক শত্রুদের বিশাল এক সশস্ত্র বাহিনী, সে সেই মুহূর্তে কতটা স্বাধীন ও স্বাভাবিক চিত্তে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম, সেটি সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের একটি সাধারণ জিজ্ঞাসা। অথচ অ্যাপোলোজিস্টরা সচরাচর এই করুণ ঘটনাটিকে এমনভাবে সুচারুভাবে উপস্থাপন করেন যেন এটি ছিল সমমর্যাদার দুটি স্বাধীন মানুষের পারস্পরিক প্রেম বা শ্রদ্ধার একটি চুক্তি। বাস্তব সত্য হলো, ক্ষমতার একপাশে ছিলেন সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী এক বিজয়ী সামরিক নেতা এবং অন্যপাশে ছিলেন চরমভাবে বিধ্বস্ত ও সদ্য দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ এক কিশোরী যুদ্ধবন্দী; ফলে এই অমানবিক ভারসাম্যহীন সম্পর্কের ভেতরে প্রকৃত সম্মতির বিন্দুমাত্র সম্ভাবনাও কার্যত ছিল না। এখানে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সাফিয়ার কি বাস্তবিক অর্থে ‘না’ বলার কোনো সুযোগ আদৌ ছিল? যদি তিনি প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করতেন, তবে কি তিনি স্বাধীনভাবে নিজের জনগোষ্ঠীর কাছে ফিরে গিয়ে নিজ ভিটামাটিতে বসবাসের সুযোগ পেতেন, নাকি একজন যৌনদাসী হিসেবেই বিজয়ী সৈন্যদের হাতে হাতে ঘুরতেন? ইসলামের ধ্রুপদী ফিকহ ও যুদ্ধবন্দিত্বের প্রচলিত নীতিমালা পড়লে এ বিষয়ে আর কোনো অস্পষ্টতা থাকে না যে, একজন বিজিত নারীর শরীর ও ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণভাবে বিজয়ীর নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল [55]। তাই এই তথাকথিত ‘বিবাহ’ সমান ক্ষমতাসম্পন্ন দুই ব্যক্তির পারস্পরিক চুক্তি ছিল না, বরং এটি ছিল এক ভয়াবহ ক্ষমতার অসম বাস্তবতায় টিকে থাকার একটি মরিয়া কৌশল মাত্র [56]।
ট্রমা বন্ডিং এবং সারভাইভাল অ্যাডাপ্টেশন
আধুনিক অ্যাপোলোজিস্টরা একটি বহুল আলোচিত দাবি সামনে নিয়ে আসেন যে, সাফিয়া নাকি পরবর্তীতে মুহাম্মদের প্রতি গভীর অনুরাগ পোষণ করেছিলেন অথবা তিনি ইসলাম গ্রহণ করে অত্যন্ত সুখী জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। কিন্তু এই ধরণের দাবি গভীরতর মনস্তাত্ত্বিক এবং সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতাকে চরমভাবে উপেক্ষা করে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ট্রমা বন্ডিং’ (Trauma Bonding) বা ‘সারভাইভাল অ্যাডাপ্টেশন’ (Survival Adaptation) নামক ধারণাগুলো আমাদের স্পষ্ট করে জানায় যে, যখন কোনো মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতা, বন্দিত্ব এবং প্রাণের হুমকির সম্মুখীন হয়, তখন সে নিজের জীবন বাঁচাতে এবং মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করতে অবচেতনভাবেই তার শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণকর্তার সাথে মানসিকভাবে অভিযোজিত হতে বাধ্য হয়। ইতিহাসের পাতায় বন্দিত্ব, নির্যাতন এবং ক্ষমতার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বারবার দেখিয়েছেন যে, একজন ভুক্তভোগী যখন তাঁর সমস্ত সামাজিক ও পারিবারিক আশ্রয় হারিয়ে ফেলেন, তখন তিনি তাঁর নিপীড়কের করুণার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েন এবং নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেই নিপীড়কের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে আপন করে নেন। ১৬ বছরের এক কিশোরী, যাঁর চোখের সামনে তাঁর আপনজনদের রক্তাক্ত লাশ পড়ে ছিল, তাঁর পক্ষে এই ধরণের মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতির শিকার হওয়া খুবই স্বাভাবিক। সুতরাং সাফিয়া যদি পরবর্তীতে কোনো ধরণের আনুগত্য প্রদর্শন করে থাকেন, তবে তা কোনো স্বাভাবিক বা স্বতঃস্ফূর্ত প্রেমের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; বরং তা হয়তো ছিল এক ভয়াবহ ট্রমা এবং চরম বৈরী পরিবেশে টিকে থাকার এক অপরিহার্য মানসিক প্রবৃত্তি। ইতিহাসে এমন অসংখ্য দাস, বন্দী এবং নির্যাতিত মানুষের নজির রয়েছে যারা পরবর্তীকালে নিজেদের ভাগ্যের সাথে মানিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে, কিন্তু সেটিকে কখনোই তাঁদের ‘স্বাধীন এবং সজ্ঞান পছন্দ’ হিসেবে বিবেচনা করার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।
দৈব রোমান্টিসিজম ও নৈতিক স্ববিরোধিতা
সাফিয়াকে নিয়ে প্রচলিত রোমান্টিক আখ্যানগুলোর একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে তাঁর কথিত ‘স্বপ্ন’ দেখার কাহিনী, যেখানে দাবি করা হয় যে তিনি মদিনা আক্রমণের আগে থেকেই মুহাম্মদকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন, উপরে যা রেফারেন্স সহকারে বর্ণিত হয়েছে। এই বয়ানটি গভীর বিশ্লেষণ করলে এক চরম নৈতিক স্ববিরোধিতা ও দ্বিচারিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যদি আমরা এই দাবিটি সত্য বলে মেনে নিই যে, সাফিয়া তাঁর প্রথম স্বামী কিনানা ইবনে রাবি’র বিবাহিত স্ত্রী থাকা অবস্থাতেই পরপুরুষ মুহাম্মদের প্রতি রোমান্টিক আকর্ষণ বা গোপন অনুরাগ অনুভব করতেন, তবে তা স্বয়ং ইসলামী নৈতিকতার মাপকাঠিতেই একজন নারীর জন্য এক ধরণের ‘মানসিক অবিশ্বস্ততা’ বা বড় ধরণের চরিত্রগত বিচ্যুতি হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা। ইসলাম প্রচারকরা সাধারণত মুসলিম নারীদের জন্য যে ‘পবিত্রতা’, ‘চোখের হেফাজত’ ও ‘স্বামীর প্রতি একনিষ্ঠতার’ কঠোর আদর্শ নির্মাণ করেন, সাফিয়ার ক্ষেত্রে এসে মুহাম্মদের ভাবমূর্তি রক্ষার প্রয়োজনে তাঁরা সেই মানদণ্ডটিই অবলীলায় বিসর্জন দেন । মূলত এই ধরণের টেলিলজিক্যাল ন্যারেটিভ (Teleological narrative) বা উদ্দেশ্যমূলক কাহিনীগুলো পরবর্তী যুগের সেই প্রচেষ্টারই ফসল, যার মাধ্যমে যুদ্ধবন্দিত্ব ও ক্ষমতার অসম সম্পর্কের একটি নির্মম বাস্তবতাকে ‘পারস্পরিক স্বর্গীয় প্রেম’ বা ‘পূর্বনির্ধারিত মিলন’ হিসেবে পুনরায় কল্পনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে সাফিয়ার মানবিক ট্র্যাজেডিকে সংকুচিত করে এমন একটি খেলো গল্পে নামিয়ে আনা হয়, যেখানে তিনি নাকি অবচেতনভাবেই নিজের সম্ভাব্য বিজয়ীর প্রেমে পড়েছিলেন—যা শেষ পর্যন্ত সাফিয়ার নিজের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার বদলে তাঁকে আরও বেশি ‘অবজেক্টিফাইড’ (Objectified) করে তোলে।
‘উসওয়াতুন হাসানাহ’ বনাম ঐতিহাসিক আপেক্ষিকতাবাদ
আরেকটি বহুল ব্যবহৃত অ্যাপোলোজেটিক যুক্তি হলো— “সেই যুগে দাসপ্রথা ও যুদ্ধবন্দী নারীদের সাথে এমন আচরণ করা স্বাভাবিক ছিল”। এই যুক্তিটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি একটি অত্যন্ত ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে । পৃথিবীর প্রায় সব অন্ধকার যুগেই কোনো না কোনো সময়ে গণহত্যা, নারী-নিপীড়ন বা দাসত্ব ‘স্বাভাবিক’ হিসেবেই প্রচলিত ছিল। কিন্তু কোনো কিছুর ঐতিহাসিক ‘স্বাভাবিকতা’ কখনোই তার নৈতিক সঠিকতার চূড়ান্ত প্রমাণ হতে পারে না। বিশেষ করে যেখানে মুহাম্মদকে কেবল সপ্তম শতাব্দীর একজন আরব নেতা হিসেবে না দেখে বরং তাঁকে ‘উসওয়াতুন হাসানাহ’ বা কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত যুগের ও সমস্ত মানুষের জন্য এক শাশ্বত ও সর্বোত্তম আদর্শ হিসেবে দাবি করা হয়। যদি তাঁর কোনো কাজকে নৈতিকভাবে জায়েজ করতে গিয়ে স্রেফ ‘সময়ের দোহাই’ বা ‘সে সময় এটা চলত’—এমন যুক্তির আশ্রয় নিতে হয়, তবে সেটি পরোক্ষভাবে এই সত্যকেই স্বীকার করে নেওয়া যে মুহাম্মদের নৈতিকতা আসলে তাঁর সমসাময়িক গড় আরব সমাজের সীমাবদ্ধ নৈতিকতার গণ্ডি অতিক্রম করতে পারেনি। ফলে যা এককালে ‘স্বাভাবিক’ ছিল তা যদি আধুনিক যুগের উন্নত মানবাধিকার ও নৈতিকতার আলোতে নিষ্ঠুর ও অমানবিক মনে হয়, তবে সেটিকে স্রেফ ‘সময়ের দোহাই’ দিয়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়া ইসলামের সার্বজনীন নৈতিকতার দাবিটিকেই চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ও দুর্বল করে দেয়।
সবশেষে, এই ধরণের অ্যাপোলোজেটিক ব্যাখ্যাগুলোর সবচাইতে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, তারা এই ভয়াবহ ঘটনাটিকে কোনোভাবেই মানবিকভাবে কল্পনা করতে সক্ষম হয় না। তারা পুরো বিষয়টিকেই একটি বিমূর্ত ধর্মীয় তাত্ত্বিক কাঠামোর ভেতরে ফেলে বিশ্লেষণ করে, যা শেষ পর্যন্ত একে রক্ত-মাংসের বাস্তব মানবিক অভিজ্ঞতা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। একটু সংবেদনশীল হয়ে কল্পনা করলেই দেখা যায়, একজন কিশোরী, যাঁর বাবা, স্বামী ও বহু স্বজন নিহত, আর গোত্র সামরিকভাবে পরাজিত ও ছিন্নভিন্ন; যাঁর চারপাশে কেবল সশস্ত্র অপরিচিত শত্রু সৈন্য; এবং যিনি জানেন যে তাঁর জীবন এখন সম্পূর্ণভাবে তাঁর পরম শত্রুর দয়ার ওপর নির্ভরশীল—সেই চরমতম বিপর্যয়ের মধ্যে কারো শয্যাসঙ্গিনী হওয়াকে ‘প্রেম’ বলা কতটা অসার ও নিষ্ঠুর। আসলে এই ধরণের ব্যাখ্যাগুলো ইতিহাসের বাস্তব রক্ত-মাংসের মানুষগুলোকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে স্রেফ কিছু ধর্মীয় প্রতীক বা ‘আইকন’ স্থাপন করতে চায়। এর ফলে সাফিয়া আর একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে টিকে থাকেন না, তিনি কেবল ‘নবী-পত্নী’ নামক একটি অতিপ্রাকৃত ও বিমূর্ত পরিচয়ে সংকুচিত হয়ে যান। তাঁর ব্যক্তিগত ট্রমা, অসহনীয় শোক, নিজস্ব জাতিগত পরিচয়, ভয় এবং মানসিক যন্ত্রণার কথাগুলো তখন ইতিহাসের পাতা থেকে বেমালুম গায়েব হয়ে যায়। অথচ ইতিহাসের সবচাইতে জরুরি ও অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর একটি হলোঃ বিজয়ীদের আকাশচুম্বী গৌরবের আড়ালে পরাজিতদের এই যে অন্তহীন কান্না, তা ঠিক কোথায় হারিয়ে যায়?
শেষ জীবনেও সাফিয়ার স্বজনদের প্রতি ভালবাসা
সাফিয়া ইসলাম গ্রহণ করে নবী-পত্নীর মর্যাদায় আসীন হলেও, তিনি কখনও নিজের ইহুদি পরিচয়কে পুরোপুরি বিসর্জন দেননি। অনেক ঐতিহাসিক সূত্রে দেখা যায়, তিনি তাঁর গোত্র, তাঁর জাতি এবং তাঁদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিকে আজীবন হৃদয়ে ধারণ করে রেখেছিলেন। এমনকি নবী মুহাম্মদের সঙ্গে জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত থেকেও, তিনি তাঁর ইহুদি পরিচয় গোপন করেননি—বরং এক পর্যায়ে বলেছিলেন, “আমি হারুন (আ.) এর বংশধর, আমার চাচা মুসা (আ.), এবং আমি ইহুদি জাতির সন্তান।”
একাধিক বর্ণনায় জানা যায়, সাফিয়া তাঁর ইহুদি ভাইকে সাহায্য করেছেন—তাঁর জন্য সম্পত্তি বরাদ্দ করে দিয়েছেন, এমনকি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। অনেক মুসলিম সাহাবি ও নবীপত্নী এই আচরণে অস্বস্তি প্রকাশ করলেও, সাফিয়া কখনো নিজ স্বজনদের প্রতি সহানুভূতি হারাননি। এই অবস্থান হয়তো ছিল তাঁর একধরনের নীরব প্রতিবাদ। তিনি হয়তো প্রকাশ্যে কিছু বলেননি, প্রকাশ্যে কিছু বলা সম্ভবও ছিল না। কিন্তু তাঁর আচরণে বোঝা যায়—তিনি হয়তোবা মেনে নিয়েছিলেন নিজের বর্তমান, কিন্তু ভুলে যাননি অতীত। [57]
সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি)
২২. ওয়াসিয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ৪২. যিম্মিগণের প্রতি ওয়াসীয়াত করা
৩৩৩৭. ইবনু উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, সাফিয়্যাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তার এক ইয়াহুদী আত্মীয়ের (অথবা ভগ্নিপতির) জন্য ওয়াসীয়াত করেছিলেন।[1]
[1] তাহক্বীক্ব: এর সনদ ইবনু উমার পর্যন্ত সহীহ।
তাখরীজ: আব্দুর রাযযাক ১৯৩৪২, ১৯৩৪৪; বাইহাকী, ওয়াসাইয়া ৬/২৮১ তা’লিক হিসেবে; ইবনু আবী শাইবা ১১/১৬১ নং ১০৮১২।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)
একজন যুদ্ধবন্দি নারী, যাঁর স্বামী ও পিতা নবীর আদেশে নিহত, সেই নারী যখন নবীপত্নী হিসেবে “উম্মাহাতুল মুমিনীন”-এর আসনে অধিষ্ঠিত হন, তখন তাঁর ভেতরের দ্বন্দ্ব, তাঁর গভীর অভিমান—তা প্রকাশ না করেও ভাষা খুঁজে পেয়েছিল স্বজনদের প্রতি তাঁর নিরব ভালোবাসায়। এই ভালোবাসা ছিল গভীর, নীরব এবং অতল। শেষ জীবনেও তিনি নিজ জাতির প্রতি শ্রদ্ধা, স্মৃতি এবং আত্মিক টান ধরে রেখেছিলেন—যা তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি অনন্য দিক হয়ে ইতিহাসে রয়ে গেছে।
রায়হানা বিনত যায়েদঃ সাফিয়াই একমাত্র নন
নবী মুহাম্মদ যে ইহুদী গোত্রগুলোর সমস্ত পুরুষ হত্যা করে তাদের স্ত্রীদের মধ্যে থেকে সবচাইতে সুন্দরী মেয়েটিকে নিজের জন্য রাখতেন, এটি কিন্তু শুধুমাত্র সাফিয়ার বেলাতে ঘটেনি। রায়হানার বেলাতেও একই ঘটনা ঘটেছিল। বনু কুরাইজার রক্তস্নাত অধ্যায়ের অন্যতম করুণ সাক্ষী ছিলেন রায়হানা বিনতে যায়েদ। তিনি মূলত বনু নাদির গোত্রের কন্যা ছিলেন, কিন্তু বৈবাহিক সূত্রে বনু কুরাইজার সাথে যুক্ত হন। তার স্বামী আব্দুল হাকামকেও এই গণহত্যায় শিরশ্ছেদ করে হত্যা করা হয়েছিল। গোত্রের সমস্ত পুরুষকে হত্যার পর যে বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশুকে গনিমতের মাল বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে বন্দি করা হয়, রায়হানা ছিলেন তাদেরই একজন।
বন্দিদের মধ্য থেকে নবী মুহাম্মদ রায়হানাকে নিজের জন্য বিশেষ অংশ বা ‘সাফি’ হিসেবে বেছে নেন। স্বামীর রক্ত শুকানোর আগেই রায়হানাকে তার গোত্রের হত্যাকারীর হাতে সমর্পিত হতে হয়। ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাকের বর্ণনামতে, নবী মুহাম্মদ তাকে বিবাহ করার প্রস্তাব দিলে রায়হানা প্রথমে তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজের ইহুদি ধর্মের ওপর অটল থাকার সিদ্ধান্ত জানান। তিনি বরং দাসী হয়ে থাকাকেই শ্রেয় মনে করেছিলেন, সম্ভবত স্বামী ও স্বজনদের হত্যাকারীর স্ত্রী হওয়ার মানসিক বৈপরীত্য মেনে নিতে পারেননি বলে। পরবর্তীতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায়, তবে আমৃত্যু তার মনে সেই দগদগে ক্ষতের প্রভাব কতটা ছিল, তা বিজয়ী ইতিহাসের পাতায় খুব একটা উঠে আসেনি। ৬৩১ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি মদিনাতেই ছিলেন, এককালের সম্ভ্রান্ত নারী থেকে ‘গনিমতের মাল’ হয়ে ওঠার এক দীর্ঘশ্বাসের নাম রায়হানা। আসুন তার সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই, [58]
অন্যতমা হচ্ছেন, রায়হানা বিনত যায়দ -বনূ নাযীর গোত্রীয়া এবং মতান্তরে রক্ত ईর ভয় কিনী (র) বলেন, রায়হানা বিনত যায়দ ছিলেন বনূ নাযীর গোত্রের। তবে কেউ কেউ বলেছেন বনূ কুরায়জার। ওয়াকিদী (র) আরো বলেন, রায়হানা বিনত যায়দ ছিলেন বহু নাযীর গোত্রের এবং তিনি এ গোত্রেই বিবাহিতা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে নিজের জন্য বাছাই করে নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সুন্দরী মহিলা। রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে ইসলাম গ্রহণের প্রস্তাব দিলে তিনি ইয়াহুদী ধর্ম পরিত্যাগে অস্বীকৃত হন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে পরিত্যাগ করে রাখলেন এবং মনে মনে তাঁর আচরণে ব্যথা পেলেন পরে ইন শু’বা (ছা’লাব)-কে ডেকে পাঠিয়ে তার সংগে নবী করীম (সা) বিষয়টি আলোচনা করলেন। ইবন শু’বা বললেন, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গিত! সে ইসলাম গ্রহণ করবেই। তিনি তখন বের হয়ে গিয়ে রায়হানার কাছে পৌঁছলেন এবং তাকে বলতে লাগলেন, তুমি তোমার স্বগোত্রের অনুগামী হয়ে থেক না। তুমি তো দেখছই, (সর্দার) হুয়ায় ইব্ন আখতাব তাদের কি পরিণতিই না ঘটিয়েছে। তাই, (আমার পরামর্শ হচ্ছে) তুমি মুসলমান হয়ে যাও। রাসূলুল্লাহ (সা) তোমাকে তাঁর ‘একান্ত ব্যক্তিগত’ করে নেবেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর সাহাবীদের মাঝে ছিলেন। ইতোমধ্যে তিনি এক জোড়া চপ্পলের আওয়াজ শুনতে পেয়ে বললেন, – – – ‘এ অবশ্যই ইব্ন শু’বার চপ্পলদ্বয়। সে আমাকে রায়হানার ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ দিতে আসছে।’ তখনই ইবন শু’বা এসে বলতে লাগলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! রায়হানা ইসলাম গ্রহণ করেছে। ফলে নবী করীম (সা) আনন্দিত হলেন। ইবন ইসহাক (র) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বনূ কুরায়জাকে পরাজিত করার পরে রায়হানা বিনত আমর ইব্ন খিনাফাকে নিজের জন্য একান্ত করে নিলেন। নবী করীম (সা)-এ ওফাত পর্যন্ত তিনি তার নিকটে তাঁরই মালিকানাধীন ছিলেন। তিনি তাঁকে ইসলাম গ্রহণ কর এবং পরে তাকে বিবাহ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
কিন্তু তিনি ইয়াহুদী ধর্ম ব্যতীত অন্য কিছু গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন। এরপরে ইন ইসহাক তাঁর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কিত পূর্বোক্ত বিবরণ উল্লেখ করেছেন। ওয়াকিদী (র) বলেন, পরে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে উম্মুল মুনযির সালমা বিনত কায়স (রা)-এর বাড়ীতে পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে অবস্থান কালে তার ঋতুস্রাব দেখা দেয় এবং এক বারের স্রাবের পরে তিনি পবিত্রা হলে উম্মুল মুনযির (রা) এসে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে তা অবহিত করলেন। নবী করীম (সা) উম্মুল মুনযিরের বাড়িতে তাঁর কাছে গিয়ে বললেন,
ان احببت ان اعتقك و انزوجك فعلت – وان احببت ان تكونى في ملكي اطأك بالملك
“তোমার যদি পসন্দ হয় তবে তোমাকে মুক্ত করে দিয়ে আমি তোমাকে বিয়ে করি। তবে আমি তাই করব। আর যদি আমার মালিকানায় থাকা তোমার কাছে ভাল লাগে তবে মালিকানা সূত্রে আমি তোমাকে ব্যবহার করব।” সে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার দৃষ্টিতে আপনার জন্য এবং আমারও জন্য আপনার মালিকানাধীন থাকা অধিক নির্ঝঞ্চাট ও সহজ। ফলে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মালিকানাধীন ছিলেন এবং তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত এ অবস্থা অব্যাহত ছিল। ওয়াকিদী (র) আরো বলেন, ইব্ন আবূ থি’ব (র) আমাকে বর্ণনা দিয়েছেন যে, আমি যুহরী (র)-কে রায়হানা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বাঁদী। পরে তিনি তাঁকে আযাদ করে দিয়ে দাম্পত্য বন্ধনে আবদ্ধ করলেন। ফলে তিনি তার পরিবারের মাঝেও পর্দা করে থাকতেন এবং বলতেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পরে আর কেউ আমাকে দেখতে পাবে না। ওয়াকিদী (র) বলেন, হাদীসদ্বয়ের মাঝে এটিই আমাদের বিচারে | অধিক প্রামাণ্য। নবী করীম (সা)-এর পূর্বে তাঁর স্বামী ছিল হাকাম।
ওয়াকিদী (র) বলেন, আসিম ইব্ন আবদুল্লাহ ইবনুল হাকাম উমর ইবনুল হাকাম (র) | থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) রায়হানা বিনত যায়দ ইব্ন আমর ইব্ন খিনাফ কে আযাদ করে দিলেন। তিনি তার স্বামীর কাছে ছিলেন এবং স্বামী তাঁকে ভালবাসত এবং তাঁর যথাযোগ্য কদর করত। তাই তিনি বলেছিলেন, তার পরে কোন দিন আর কাউকে | আমি তার স্থানে গ্রহণ করব না। তিনি ছিলেন সৌন্দর্যের অধিকারিণী। পরে বনূ কুরায়জার | নারীদের বন্দী করা হলে বন্দিনীদের রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সামনে উপস্থিত করা হল। রায়হানা | বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সামনে যাদেরকে উপস্থিত করা হয় তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। তার আদেশে আমাকে পৃথক করে রাখা হল।
আর যে কোন গণীমতে তাঁর একান্ত কিছু অধিকার (ii) থাকত, আমাকে পৃথক করে রাখা হলে তিনি আমার ব্যাপারে আল্লাহর নিকট ‘ইসতিখারা’ (কল্যাণবহ সিদ্ধান্ত কামনা) করলেন।
পরে কিছু দিনের জন্য আমাকে উম্মুল মুনযির বিনত কায়স (রা)-এর বাড়িতে পাঠিয়ে | দিলেন। ইত্যবসরে তিনি পুরুষ বন্দীদের মৃত্যুদণ্ড দিলেন এবং নারী বন্দীদের বাটোয়ারা করে দিলেন। পরে রাসূলুল্লাহ (সা) আমার কাছে আগমন করলে আমি লজ্জায় পাশে সরে রইলাম। | তিনি আমাকে ডেকে তাঁর সামনে বসালেন। এবং বললেন, এ … “তুমি আল্লাহ এবয় রাসূলকে গ্রহণ করলে আল্লাহর রাসূল তাঁর নিজের জন্য তোমাকে গ্রহণ করবেন।” আমি ইসলাম গ্রহণ করলে রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে মুক্ত করে দিলেন এবং আমাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করলেন। তিনি আমাকে বারো উকিয়ার কিছু অধিক (সাড়ে বারো উকিয়া =৫০০ দিরহাম) মহর দিলেন। যেমন তাঁর অন্যান্য স্ত্রীদের দিতেন। | তিনি উম্মুল মুনযির (রা)-এর বাড়িতে আমাকে নিয়ে বাসর উদযাপন করলেন। তিনি নিজের স্ত্রীদের জন্য রাত্রি যাপনের ‘পালা’ নির্ধারণ করতেন। আমার জন্য পর্দার বিধান সাব্যস্ত করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর প্রতি বিমুগ্ধ ছিলেন এবং তিনি কোন কিছুর জন্য আবদার করলে নবী করীম (সা) তা তাঁকে দিয়ে দিতেন। তাই তাঁকে বলা হয়, তুমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট বনূ কুরায়জার ব্যাপারে আবদার করলে তিনি অবশ্যই তাদের মুক্ত করে দিতেন। এর জবাবে তিনি বলতেন, বন্দিনীদের বন্টন (এবং পুরুষ বন্দীদের হত্যা) করার পরই তিনি আমার সংগে নিভৃতে মিলিত হয়েছিলেন। নবী করীম (সা) তাঁর সংগে নিভৃত বাস করতেন এবং প্রায়শ তা করতেন। এভাবে তিনি নবী করীম (সা)-এর নিকটেই ছিলেন | এবং অবশেষে বিদায় হজ্জ থেকে নবী করীম (সা)-এর প্রত্যাগমন কালে তাঁর মৃত্যু হল। নবী করিম (সা) তাঁকে বাকী গোরস্তানে দাফন করলেন। নবী করীম (সা) তাঁকে বিবাহ করেছিলেন হিজরতের ষষ্ঠ বর্ষে মুহাররম মাসে।
ইবন ওয়াহব (র) বলেছেন, ইউনুস ইব্ন ইয়াযীদ (র) সূত্রে যুহরী (র) থেকে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বনূ কুরায়জার রায়হানাকে বাঁদী-পত্নীরূপে গ্রহণ করলেন। পরে তাঁকে মুক্তি দিয়ে দিলে তিনি তার পরিবার-পরিজনের সংগে মিলিত হলেন। আবূ উবায়দা মা’মার | ইবনুল মুদান্না (র) বলেছেন, রায়হানা বিনত যায়দ ইব্ন শাম’উন ছিলেন বনু নাযীর গোত্রের! আবার কারো মতে বনূ কুরায়জা গোত্রের। সাদাকার বাগানসমূহের এক খেজুর বাগানে তিনি | অবস্থান করতেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা) মাঝে মধ্যে সেখানে মধ্যাহ্ন বিশ্রাম নিতেন। শাওয়াল, চার হিজরীতে তিনি তাঁকে বন্দিনী রূপে পান।
আবূ বকর ইব্ন আবূ খায়ছামা (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দু’জন বাঁদী-পত্নী ছিলেন; মারিয়া কিবতীয়া ও রায়হানা বিনত শামউন ইব্ন যায়দ ইব্ন খিনাদা- কুরায়জার বনূ আমর- | এর লোক। প্রথমে তিনি যতদূর জানা যায়, তাঁর চাচাত ভাই হাকাম-এর স্ত্রী ছিলেন। নবী করীম (সা)-এর ওফাতের আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। আবূ উবায়দা মা’মার ইবনুল মুছান্না (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চার জন বাঁদী ছিলেন মারিয়া, কিবতিয়া, রায়হানা কুরাজী, | আর একজন বাঁদী ছিলেন জমীলা সুন্দরী। নবী সহধর্মিণীগণ তার বিরুদ্ধে কৌশল অবলম্বন করলেন। তাঁদের আশংকা ছিল যে, নবী করীম (সা)-এর উপর তিনি তাদের তুলনায় প্রাধান্য বিস্তার করে ফেলবেন এবং অন্য জন বাঁদী নফীসা – যাঁকে যায়নাব (রা) তাঁকে হিবা করেছিলেন। (ঘটনার বিবরণে বলা হয়েছে) নবী করীম (সা) সফিয়্যা বিনত হুয়ায় (রা)-এর কারণে যায়নাব (রা)-কে পরিত্যাগ করে রেখেছিলেন- যিলহজ্জ, মুহাররম ও সফর মাস। তার ওফাতের মাস রাবীউল আউয়াল শুরু হলে তিনি যায়নাব (রা) বললেন, আমি ভেবে স্থির করতে পারছি না যে আপনাকে কি প্রতিদান দেব ? পরে এ বাঁদীটিকে নবী করীম (সা)-কে হিবা করলেন।



উপসংহার
সাফিয়া বিনতে হুয়াই-এর জীবন ইতিহাসের এমন এক অধ্যায়, যা ধর্ম, রাজনীতি এবং মানবতার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি একজন নবীপত্নী, এক পরাজিত জনগোষ্ঠীর কন্যা, যুদ্ধবিধ্বস্ত এক নারীর প্রতীক, যাঁর জীবন বারবার শোক, সংশয় এবং সংঘাতের মধ্যে দোদুল্যমান থেকেছে। তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে শুধু ধর্মীয় আখ্যান হিসেবে দেখলে আমরা ইতিহাসের মানবিক দিকটি হারিয়ে ফেলি। এই গল্প আমাদের শেখায়, বিজয়ের কাহিনি যেমন গর্বের হতে পারে, তেমনি পরাজয়ের গল্পও থাকে, লুকানো কান্না হিসেবে।
আজকের যুগে দাঁড়িয়ে, সাফিয়ার মতো নারীদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাস কেবল বিজয়ীদের লেখা দলিল নয়, পরাজিতদের নীরবতাও সেখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাফিয়া বিনতে হুয়াই একজন নবী-পত্নী হয়েও ছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত এক নারীর প্রতীক। তাঁর গল্পে আছে পরাজয়ের বেদনা, পরিচয়ের দ্বন্দ্ব, আর মানুষের মর্মান্তিক সত্যের মুখোমুখি হওয়া। এই না-বলা গল্পগুলো আলোচনার টেবিলে আনলেই আমরা সত্যিকার অর্থে মানবিক ইতিহাস নির্মাণ করতে পারি—যেখানে সাহস আছে, প্রশ্ন আছে, আর আছে নিঃশব্দ প্রতিরোধের স্বর।
তথ্যসূত্রঃ
- সহীহ বুখারী, হাদিসঃ ২৬৫২ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিসঃ ২৫৩৩ ↩︎
- সিরাতে রাসুলুল্লাহ, ইবনে ইসহাক, প্রথমা প্রকাশনী, অনুবাদঃ শহীদ আখন্দ, পৃষ্ঠা ২৮১ ↩︎
- সীরাতুন নবী, ইবনে হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯৬ ↩︎
- সীরাতুন নবী, ইবনে হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯১, ১৯৩, ২৩৫ ↩︎
- আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৩৯, ৪০ ↩︎
- সহীহ শামায়েলে তিরমিযী, হাদিসঃ ১২৬ ↩︎
- সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি), হাদিসঃ ৪৫ ↩︎
- সীরাতুন নবী, ইবনে হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫২-২৫৩ ↩︎
- সীরাতুন নবী, ইবনে হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৯ ↩︎
- সীরাতুন নবী, ইবনে হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৯ ↩︎
- আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮৮ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৯৯৪ ↩︎
- সীরাতুন নবী, ইবনে হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৭-২৩৮ ↩︎
- আর-রাহীকুল মাখতুম, আল্লামা শফীউর রহমান মোবারকপুরি, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা ৩৫৬-৩৫৭ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ২৬৭১ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৬৬২ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬৪ ↩︎
- নবী মুহাম্মদের করুণ মৃত্যু ↩︎
- আসহাবে রাসুলের জীবনকথা, খণ্ড ৫, মুহাম্মদ আবদুল মা’বুদ, পৃষ্ঠা ২৭৫-২৭৬ ↩︎
- সীরাতুন নবী, ইবনে হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৪ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৯৮৪ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৯৯৯ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৩৬৬ ↩︎
- সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিসঃ ২২৭২ ↩︎
- মুস্তাদরাক আল হাকিম, হাদিসঃ ৬৭৮৯ ↩︎
- সুনান আন-নাসায়ী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৩৮৫ ↩︎
- আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮৫ ↩︎
- Sahih Ibn Habban (11/607) ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ২৮৯৩ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ২৯৯৫ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২১২০ ↩︎
- সীরাতুন নবী, ইবনে হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৮ ↩︎
- মুস্তাদরাক আল হাকিম, হাদিসঃ ৬৭৮৭ ↩︎
- History of Tabari – Volume 39, Page 185 ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ২৬৩৫ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, কাজী ছানাউল্লাহ পানিপথী, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৪১ ↩︎
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ২৫০২ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩০৯৮ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৯, হাদিসঃ ৩০৯৮ ↩︎
- সাফিয়্যাকে নবীর গালাগালির কারণ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩০৯৭ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩০৯৫ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩০৯৪ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩০৯৬ ↩︎
- সহিহ মুসলিম শরীফ (প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাসহ বঙ্গানুবাদ), আল-হাদীছ প্রকাশনী, ১২ তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮, ২১৮-২১৯ ↩︎
- ইবন সা‘দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা — সাফিয়া বিনতে হুয়াই ↩︎
- ইবন সা‘দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, বর্ণনা ১১৮৩০ ↩︎
- মুসনাদ আহমাদ, হাদিস ১২৪০৯ — শু‘আইব আল-আরনাউত: ইসনাদ সহিহ, বুখারি-মুসলিমের শর্তে ↩︎
- সুনানুল কুবরা নাসাঈ, হাদিস ৮৬৪৬ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস: ২৯৩১ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৪৪২ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, (হাদিস একাডেমী, হাদিসঃ ৪৪৮৬ ↩︎
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হুসাইন আল-মাদানী পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ১৬০৭ ↩︎
- ইসলামে যুদ্ধবন্দি নারী বা দাসী ধর্ষণের বৈধতা প্রসঙ্গে: দাসীর সম্মতি কি জরুরি? ↩︎
- মানবিকতার কফিনে শেষ পেরেকঃ ইসলামের দাসীবাজার ও নারীর শরীরের উন্মুক্ত নিলাম ↩︎
- সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি), হাদিসঃ ৩৩৩৭ ↩︎
- আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পঞ্চম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৫০০- ৫০২ ↩︎
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.




Chaos! Asif bhai.
সাফিয়া র ঘটনা পড়লে কান্না এসে যায় আসিফ ভাই। এই নর পশু গুলো কবে বুজবে। কত আরব দের গুলামি করবে এরা????
নারীরা যেন ভোগের বস্তু কেবল।
ইসলাম নিয়ে উচ্চ ধারণা ছিল।
সত্য জানানোর জন্য আসিফ ভাইকে ধন্যবাদ।
We are Asif
#weareasif
আমাদের, নারীদের, প্রতি এদের দৃষ্টিভঙ্গী কেমন তা এক সাফিয়্যার ঘটনা থেকেই বোঝা যায়।
আমাদের (নারীদের) প্রতি এদের দৃষ্টিভঙ্গী কেমন তা সাফিয়্যার ঘটনা পড়লেই বোঝা যায়।
এরকম চরিত্রহীনকে যারা সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী বলে তাদের নিজেদেরই চরিত্র নাই।
মুহাম্মদকে ছোটবেলায় ভিকটিম হিসেবে দেখানো হয়েছিল যা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা। কুরায়শরা ১৩ বছরে নবী বা সাহাবাদের হত্যা করেনি, কিন্তু নবী মদিনাতে তার বিপক্ষদের এটা করেছে। কুরায়শদের জ্ঞান, মানবিকতা, সহিষ্ণুতা সবকিছুই মুহাম্মদ থেকে অনেক উন্নত ছিল। এগুলো আজ বুঝতে পারি। এটা নিয়ে লিখতে পারেন আসিফ ভাই।
ভাই লিংক কপি করব কিভাবে?
সাফিয়ার গটনাটি পরে সত্যই কান্না চলে আসে, এত নিষ্ঠুরতম বরর্বরতা কোন মানুষের পক্ষে করা সম্ভম। যাই হক লেখতে চেয়েছিলাম অনেক কিছু শোখে আমি আবেক কান্ত ঠিক কি লিখবো সেটা আমার মাথাই ধরছে না।
প্রিয় আসিফ মহিউদ্দিন ভাই, আপনাকে এই লেখাটিতে নিচের কথাগুলো সংযোজন করতে অনুরোধ করছি।
মিথ্যাচারঃ কিনানা ইবনে রবীকে হত্যা করা হয়েছিল মাহমুদ ইবনে মাসমালাকে খুনের দায়ে।
জবাবঃ আসুন, দেখে আসি মাহমুদ ইবনে মাসমালাকে কেন ও কিভাবে খুন হতে হয়েছিল। সীরাতুন নবী (সা.) ইবনে হিশাম খন্ড ৩ পৃষ্ঠা ৩৪৭-৩৪৮,

যখন খায়বারে নবী একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে দুর্গ দখল করতে থাকেন, তখন আত্মরক্ষার জন্য উপর থেকে যাঁতার চাক্কির পাট নিক্ষেপ করে মাহমুদ ইবনে মাসমালাকে হত্যা করা হয়। রণক্ষেত্রের মতো পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষকে হত্যা করার শাস্তি যে কখনো মৃত্যুদন্ড হতে পারে না তা যেকোনো বিবেকবান মানুষের বুঝার কথা। এমনকি তাদের নিজেদের গ্রন্থ আল হিদায়া ২য় খন্ড ৪৩২ নং পৃষ্ঠায় লেখা আছে, যুদ্ধক্ষেত্রে কাফের মারার উদ্দেশ্যে মুসলিম নিধন করাও জায়েজ।

সুতরাং যারা কিসাস বা হত্যার বদলে হত্যা দিয়ে কিনানা ইবনে রবীর মৃত্যুদন্ডকে বৈধতা দিতে চায়, তারা উন্মাদ ছাড়া কিছুই না।
মিথ্যাচারঃ সম্পদ লুকানোর অভিযোগে কিনানা ইবনে রবীকে নবী মুহাম্মদ কর্তৃক হত্যার বিবরণটি ভুল। কারণ এই বিবরণটি যারা বর্ণনা করেছেন তারা সবাই ইবনে ইসহাকের রেওয়ায়েত দিয়ে বর্ণনা করলেও ইবনে ইসহাক ঘটনাটির স্বপক্ষে কোনো দলিল দেন নি।
জবাবঃ ঘটনাটি হলো এমন, খায়বার আক্রমণের পর যখন মুসলিমরা গণীমতের মাল হিসেবে বনু নাযীর গোত্রের ধনসম্পদ লুন্ঠন শুরু করে, সেই সময় কিনানা ইবন রবী বনু নাযীরের ধনরাশি আক্রমণকারী মুসলিমদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে। আক্রমণকারী মুসলিম বাহিনীর কাছ থেকে নিজেদের ধনসম্পদ সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করার অপরাধে নবী মুহাম্মদ তার একজন সাহাবা যুবায়র ইবন আওয়ামের মাধ্যমে কিনানার বুকে চকমকি পাথর ঘষে আগুন জ্বালিয়ে শাস্তি দিতে দিতে আধমরা করে ফেলেন এবং অতঃপর মুহাম্মদ ইবনে মাসলামার মাধ্যমে হত্যা করেন। রেফারেন্সঃ সীরাতুন নবী (সা.) ইবনে হিশাম তৃতীয় খন্ড পৃষ্ঠা ৩৫৪-৫৫
ঘটনাটি যে শুধু ইবনে ইসহাকই বর্ণনা করেছেন এমনটি নয়, একই ঘটনার উল্লেখ সুনানে আবু দাউদের হাদিসেও পাওয়া যায়।
http://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=60374 এই হাদিসে যেই ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে অর্থাৎ ইবনু আবুল হাকীক, তিনিই কিনানা ইবনে রবী। তার পূর্ণ নাম কিনানা ইবনে রবী ইবনে আবুল হাকীক। হাদিসটিতে সম্পদ লুকানোর অপরাধকেই কিনানা ইবনে রবীকে হত্যার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, কিসাস বা অন্য কোনো কারণের নাম গন্ধ পর্যন্ত নেই।
পুরো বিষয়টি কিছু ইসলামিস্ট এই বলে অস্বীকার করতে চায়, নবী মুহাম্মদ কাউকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। ইসলামিক ফাউণ্ডেশন থেকে হাদিসটির লিংকঃ http://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=34772
তাদের যুক্তিটি খুব সহজেই খন্ডন করা যায়। রাসূলের জীবনে এমন বহু কাজ আছে যা তিনি উম্মতকে করতে নিষেধ করেছেন অথচ নিজে সেই কাজ করেছেন। যেমন তিনি তার উম্মতের জন্য চারের অধিক বিবাহ নিষিদ্ধ করেছেন কিন্তু নিজে বিবাহ করেছেন এগারো টি। আবার তিনি তার উম্মতকে কুমারী নারী বিবাহ করতে বলেছেন http://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=66306 অথচ নবীর নিজে যাদের বিয়ে করেছেন তাদের অধিকাংশই কুমারী ছিলেন না। ইসলামে এমন বহু বিষয় আছে। যেমন আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে সিজদা করা শিরক, যা ইসলামে সবচেয়ে বড় পাপ। অথচ আল্লাহই ইবলিশকে আদেশ করেছিলেন আদমকে সিজদা করার জন্য।
তাদের আরেকটি দাবী হচ্ছে, কোনো দলিল বা সনদ ছাড়াই ইবনে ইসহাক নবী মুহাম্মদ কর্তৃক কিনানাকে নির্যাতন করে হত্যা করার ঘটনা বর্ণনা করেছেন। এই অভিযোগটিও ভিত্তিহীন। কারণ, ইবনে ইসহাকের জন্ম ৮৫ হিজরী/৭০৪ খ্রিস্টাব্দ, মৃত্যু ১৫০-১৫৯ হিজরী/৭৬১-৭৭০ খ্রিস্টাব্দ অর্থাৎ তিনি যখন কিনানাকে হত্যার ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন সেই সময়টা নবীর সময়কালের এতো কাছাকাছি ছিল যে, সেই ঘটনাটি বর্ণনা করার জন্য কোনো রেফারেন্সের প্রয়োজন হয় নি। সেই সময়ে হয়তো এমনিতেই সবাই ঘটনাটি সম্পর্কে জানতো। তাই ইবনে ইসহাক কোনো রেফারেন্স দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন নি। মুমিনরা দলিল হিসেবে যে সিহাহ সিত্তাহ বা ছয়টি হাদিস গ্রন্থকে গ্রহণযোগ্য মনে করে, এই ছয়টি হাদিস গ্রন্থের গ্রন্থকারই ইবনে ইসহাকেরও পরবর্তী সময়কার মানুষ। যেমনঃ
ইমাম বুখারী-
জন্মঃ ২১ জুলাই ৮১০; ১৩ শাওয়াল ১৯৪ হিজরী
মৃত্যুঃ ১ সেপ্টেম্বর ৮৭০; ১ শাওয়াল ২৫৬ হিজরী
ইমাম মুসলিম-
জন্মঃ ৮১৫
মৃত্যুঃ মে, ৮৭৫
ইমাম নাসায়ী-
জন্মঃ ২১৫ হিজরী (৮৩০ খ্রিষ্টাব্দ)
মৃত্যুঃ ৩০৩ হিজরী (৯১৮ খ্রিস্টাব্দ)
ইমাম আবু দাউদ-
জন্মঃ ৮১৭–১৮ খ্রিষ্টাব্দ
মৃত্যুঃ ৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দ
ইমাম তিরমিজি-
জন্মঃ ২০৯/২১০ হিজরি (৮২৪/৮২৫ খ্রিষ্টাব্দ)
মৃত্যুঃ ১৩ রজব ২৭৯ হিজরি (৮ অক্টোবর ৮৯২)
ইবনে মাজাহ-
জন্মঃ ৮২৪
মৃত্যুঃ ৮৮৭ বা ৮৮৯
এছাড়াও বলা যেতে পারে, ইবনে ইসহাক রচিত সিরাতে রাসুলুল্লাহ এর অনেক ঘটনাই ইবনে হিশাম তার সীরাতে বাদ দিয়েছেন। The Life of Muhammad, A Translation of Ibn Ishaq’s Sirat Rasul Allah, with introduction and notes by Alfred Guillaume [Karachi Oxford University Press, Karachi, Tenth Impression 1995] এর ৬৯১ নং পৃষ্ঠায় ইবনে হিশামের নিজের উক্তি-
things which it is disgraceful to discuss; matters which would distress certain people; and such reports as al-Bakka’i told me he could not accept as trustworthy — all these things I have omitted
তবুও কিনানা ইবনে রবীকে হত্যার ঘটনাটি ইবনে হিশামে সীরাত গ্রন্থে থেকে গেছে।
মিথ্যাচারঃ ইসলাম যেখানে যুদ্ধবন্দীদের সাথে উত্তম আচরণ এবং তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শনের শিক্ষা দিয়েছে, সেখানে সম্পদ লুকানোর অভিযোগে কিনানা ইবনে রবীকে হত্যার বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
জবাবঃ ইসলাম নাকি যুদ্ধবন্দীদের সাথে ভালো আচরণ করতে শিখিয়েছে। আসুন ইসলামিক জিহাদের পরে অমুসলিম যুদ্ধবন্দীদের সাথে মুসলিমদের আচরণ কীরকম হবে, সে সম্পর্কে আসুন পড়ি ইবনে কাসীর খন্ড ৪ পৃষ্ঠা ৪৮১ থেকে
“তাফসীরঃ উল্লেখিত আয়াতসমূহে আল্লাহ পাক কাফিরদের প্রতি তাঁহার ঘৃণা এবং তাহাদের অপকর্মের বর্ণনা দিয়া বলিতেছেন যে, ভূপৃষ্ঠে জীবকুলের মধ্যে বেঈমান কাফিরগণই হইল আল্লাহর নিকট অতি নিকৃষ্ট জীব। উহাদের মধ্যকার যাহাদের সাথে তুমি যখনই কোন চুক্তিতে আবদ্ধ হও, তখনই উহারা সেই চুক্তি লঙ্ঘন করে। যখন উহাদিগকে বিশ্বাস করিয়া আস্থা স্থাপন কর, তখন বিশ্বাস ভঙ্গ করিয়া তোমার আস্থা নষ্ট করিয়া ফেলে। উহারা আল্লাহকে আদৌ কোনরূপ ভয়ই করে না। নির্ভয় দাম্ভিকতার সহিত পাপাচারে লিপ্ত হয়। আলোচ্য আয়াতাংশের মর্ম হইলঃ তুমি যদি উহাদের যুদ্ধে পরাস্ত করিয়া বিজয় লাভ করিতে পার, তবে কঠোরভাবে বন্দী করিয়া জ্বালা-যন্ত্রণা দিবে। এই ব্যাখ্যা প্রদান করেন ইবন আব্বাস (রা)।
হাসান বসরী, যাহহাক, সুদ্দী, আতা খুরাসানী ও ইবন উআয়না (র) ইহার ব্যাখ্যায় বলেনঃ যুদ্ধে উহাদিগকে পরাস্ত করিতে পারিলে অতি কঠোরভাবে শাস্তি দিবে এবং নির্দয়ভাবে উহাদিগকে হত্যা করিবে যেন ইহাদের ছাড়া আরবের অন্যান্য শত্রুগণ এই শাস্তির কথা শুনিয়া ভীত হয় এবং নসীহত ও শিক্ষা গ্রহণ করে। তাহাদের মধ্যে লজ্জা ও অনুশোচনার সৃষ্টি হয়।”
পাশাপাশি এই কথাগুলোও আপনার লেখায় সংযুক্ত করতে অনুরোধ করছি
মিথ্যাচারঃ এছাড়া আরবে একটি রীতি ছিল শত্রু যদি গোত্রের কোন মেয়েকে বিয়ে করত তবে তার সাথে তারা শত্রুতা শেষ করে ফেলত। এ কারণেই আবু সুফিয়ানের মেয়ে উম্মে হাবীবাহ(রাঃ) কে রাসূল ﷺ বিয়ে করার কারণে তাঁর সাথে আবু সুফিয়ানের শত্রুতা শেষ হয়ে যায়। রাসূল ﷺ এই বিয়ের মাধ্যমে ইহুদীদের সাথে শত্রুতা শেষ করার জন্য একটি হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
জবাবঃ এটি ডাহা মিথ্যা কথা। আবু সুফিয়ানের মেয়ে উম্মে হাবীবাহ(রাঃ) রাসূলের স্ত্রী থাকা অবস্থায়ও আবু সুফিয়ান রাসূলের চরম শত্রু ছিলেন এবং এই বিয়ের কারণে কস্মিনকালেও আবু সুফিয়ানের সাথে রাসূলের শত্রুতা শেষ হয়ে যায় নি।
উম্মে হাবিবা তার আগের স্বামী উবায়দুল্লাহ এর সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং হিজরত করে হাবশা (আবিসিনিয়া) চলে গিয়েছিলেন। উবায়দুল্লাহ পরবর্তীতে খ্রিস্টান হয়ে যান ও খ্রিস্টধর্মের ওপরই তার মৃত্যু হয়। উম্মে হাবিবা (রা.) ইসলামের ওপর দৃঢ়ভাবে কায়েম থাকেন এবং তার সঙ্গে তার একমাত্র কন্যা হাবিবা বিনতে জাহাশ থেকে যান, যার জন্মও হয়েছিল হাবশায়। হুজুর (সা.) যখন উম্মে হাবিবার অসহায়ত্বের অবস্থা অবগত হন, তখন আমর ইবনে ওমাইয়া যামরী (রা.)-কে হাবশা-রাজ নাজ্জাশীর নিকট প্রেরণ করেন এবং পত্রে প্রস্তাব পেশ করেন উম্মে হাবিবাকে তার সাথে বিয়ে দিতে। নাজ্জাশীর নিকট এ পয়গাম পৌঁছার পর তিনি তার বিশেষ বাদি (দাসী) আবরাহাকে উম্মে হাবিবার নিকট প্রেরণ করেন এবং রসূলুল্লাহ (সা.)-এর পয়গামের খবর জানান। তিনি এ সুসংবাদ শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং এ পুরস্কার হিসেবে তিনি আবরাহাকে তার অলংকার দান করেন এবং তার মামাতো ভাই খালেদ ইবনে সাঈদ ইবনে আবিল আসকে উকিল হিসেবে নাজ্জাশীর নিকট প্রেরণ করেন। হাবশায় অবস্থানকারী হজরত জাফর (রা.) ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামকে নাজ্জাশী তলব করেন এবং সকলের উপস্থিতিতে হজরত উম্মে হাবিবা (রা.)-এর বিয়ে পড়ান।
এছাড়াও সীরাতুন নবী (সা.) ইবনে হিশাম চতুর্থ খন্ড পৃষ্ঠা ৪৯-৫০ থেকে আমরা জানতে পারি, মক্কা বিজয়ের আগে যখন আবু সুফিয়ান মদীনায় নবী মুহাম্মদের কাছে গিয়েছিলেন বিরোধ মীমাংসা করার জন্য, উম্মে হাবিবা (রা.) তার পিতা আবু সুফিয়ানকে হুজুর (সা.)-এর বিছানায় বসতে দেননি আবু সুফিয়ান পৌত্তলিক হবার কারণে। অর্থাৎ সেই সময়ও উম্মে হাবীবা রাসূলের স্ত্রী ছিলেন। শুধু তাই নয়, নবী মুহাম্মদের সাথে বিবাদ মীমাংসা ও হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি নবায়নের চেষ্টা করতে গিয়ে আবু সুফিয়ান ব্যর্থ হয়ে মক্কায় ফেরত আসেন। পৃষ্ঠা ৫০ এ স্পষ্টভাবে লেখা আছে, আবু সুফিয়ান নবী মুহাম্মদের কাছে সন্ধি চুক্তি নবায়ন করতে গিয়েছিলেন কিন্তু নবী মুহাম্মদ আবু সুফিয়ানের কথার কোনো উত্তরই দেন নি। তার পরই নবী মুহাম্মদ তার বাহিনী নিয়ে মক্কা আক্রমণ করেন।
মিথ্যাচারঃ নবী মুহাম্মদ সাফিয়ার রূপে আসক্ত হয়ে নয়, বরং তিনি একজন গোত্রপ্রধানের কন্যা ছিলেন বলেই নবী তাকে বিয়ে করেছে। রেফারেন্স হিসেবে তারা এমন কিছু সহীহ হাদিস দেখায় যেখানে বলা হয়েছে
“হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি সাফিয়্যাহ বিনতু হুয়াইকে দিহ্য়াকে দিলেন। অথচ তিনি কেবল আপনারই উপযুক্ত। কেননা হুয়াই কন্যা বনু কুরাইযাহ ও বনু নাযীর গোত্রের নেতার কন্যা।”
জবাবঃ এবার আমরা কিছু সহিহ হাদিস দেখে নিই।
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খায়বার গমন করেন। যখন আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দুর্গের বিজয় দান করেন, তখন তাঁর সামনে সাফিয়্যাহ (রাঃ) বিনতে হুয়ায়্যি ইবনু আখতাব এর সৌন্দর্যের আলোচনা করা হয়। তাঁর স্বামী নিহত হয় এবং তিনি তখন ছিলেন নব-বিবাহিতা। অবশেষে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে নিজের জন্য গ্রহণ করে নেন। তিনি তাঁকে নিয়ে রওনা হন। যখন আমরা সাদ্দা রাওহা নামক স্থানে উপনীত হলাম, তখন সাফিয়্যাহ (রাঃ) পবিত্র হলেন! তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সঙ্গে মিলিত হন। তারপর চামড়ার ছোট দস্তরখানে হায়েস (খেজুরের ছাতু ও ঘি মিশ্রিত খাদ্য) তৈরী করে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তোমরা আশেপাশের লোকদের উপস্থিত হওয়ার খবর দিয়ে দাও। এই ছিল সাফিয়্যাহ (রাঃ)-এর বিবাহে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কর্তৃক ওয়ালিমাহ। এরপর আমরা মদীনার উদ্দেশে রওয়ানা হই। আনাস (রাঃ) বলেন, আমি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে দেখতে পেলাম যে, তাঁকে নিজের আবা’ দিয়ে ঘেরাও করে দিচ্ছেন। তারপর তিনি তাঁর উটের পাশে বসে হাঁটু সোজা করে রাখলেন, পরে সাফিয়্যাহ (রাঃ) তাঁর হাঁটুর উপর পা দিয়ে ভর করে আরোহণ করলেন।
সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২২৩৫
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস
Source: আল হাদিস অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ, IRD
ইসলামিক ফাউণ্ডেশন থেকে হাদিসটি দেখে নেওয়া যাক।
http://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=2100
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, আমরা খায়বারে আক্রমন করি। মহান আল্লাহ যখন এ দুর্গ জয় করালেন তখন হুয়াইয়ের কন্যা সাফিয়্যাহর (রাঃ) সৌন্দর্যের কথা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে বর্ণনা করা হয়। তিনি সদ্য বিবাহিতা ছিলেন এবং তার স্বামী এ যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে নিজের জন্য পছন্দ করলেন। অতঃপর তাকে নিয়ে সেখান থেকে ‘রওয়ানা হলেন। আমরা সাদ্দুস-সাহবা নামক জায়গাতে পৌঁছলে তিনি মাসিক ঋতু থেকে পবিত্র হন। অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার সাথে নির্জনবাস করেন।
সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২৯৯৫
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস
Source: আল হাদিস অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ, IRD
ইসলামিক ফাউণ্ডেশন থেকে হাদিসটি দেখে নেওয়া যাক।
http://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=35092
এছাড়াও সূরা আহযাব আয়াত ৫২ পড়লে এই বিষয়টা একদম পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে, নবী যাদেরকে বিবাহ করতেন, নিশ্চয়ই তাদের রূপ লাবণ্যে মুগ্ধ হয়েই বিবাহ করতেন। আসুন দেখি উক্ত আয়াতে কি বলা হয়েছে-
“এরপর আপনার জন্যে কোন নারী হালাল নয় এবং তাদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করাও হালাল নয় যদিও তাদের রূপলাবণ্য আপনাকে মুগ্ধ করে, তবে দাসীর ব্যাপার ভিন্ন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ের উপর সজাগ নজর রাখেন।”
1. “সাফিয়া ছিলেন ‘মালে গণিমাত’ এবং তাকে লাশের পাশ দিয়ে হাঁটিয়ে আনা হয়” — অতিরঞ্জন ও অতিরক্ত আবেগপ্রবণতা
ইসলামী পরিভাষায় মানুষকে সম্পদের মতো বর্ণনা করা বা “লাশের পাশে হাঁটিয়ে আনা হয়” — এসব অপ্রমাণিত ও অতিরঞ্জিত বর্ণনা যা সহিহ হাদীসে নেই।
সহিহ হাদীস অনুযায়ী:
রাসূল (সা.) যুদ্ধের পর সাফিয়াকে সম্মানিত করেন এবং তাকে দাসী হিসেবে নয়, স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন।
সহিহ মুসলিম 1365: রাসূল (সা.) তাঁকে মুক্ত করে বিয়ে করেন এবং সেখানেই তাঁর বাসর হয়।
আবু আইউব আনসারী পাহারা দিয়েছিলেন, এটা সহিহ হাদীসে আছে (সহিহ মুসলিম), তবে সেই কারণ তার মনোভাব সম্পর্কে ভয় নয়, বরং সাবধানতার জন্য।
2. “নবী সাফিয়ার প্রতি ঘৃণা বা বিদ্বেষের মুখোমুখি হন” — অপ্রমাণিত দাবি
সহিহ হাদীস অনুযায়ী:
সহিহ মুসলিম ও তিরমিজির একাধিক হাদীসে এসেছে — রাসূল (সা.) সাফিয়ার সাথে স্নেহময় আচরণ করেন এবং সাহাবীদের মধ্যে তাঁর সম্মান ছিল।
সাফিয়া (রা.) বলেন, নবী (সা.) তাঁকে সবচেয়ে সম্মান ও শ্রদ্ধা করেছেন (তিরমিজি: 3894)।
3. “সাফিয়া অর্ধেক ভাতার অধিকারী ছিলেন” — ভিত্তিহীন ও ভুল তথ্য
সহিহ হাদীস অনুযায়ী:
সব স্ত্রীদের জন্য নাবী (সা.) এর পক্ষ থেকে সমান ভরণপোষণ ও ন্যায্যতা বজায় রাখার নির্দেশ ছিল (সূরা নিসা 4:3, সহিহ বুখারী 2581)।
4. “নবী তাকে ‘বন্ধা’ বলে গালি দেন” — শুদ্ধ নয়
রাসূল (সা.) এর ভাষা ও ব্যবহার:
রাসূল (সা.) কখনো কারো সম্পর্কে কটু কথা বলতেন না (সহিহ বুখারী 6100)।
সাফিয়া সম্পর্কে আয়েশা (রা.) একবার ইহুদি বললে, রাসূল (সা.) তাঁকে নিষেধ করেন (তিরমিজি 3894)।
5. বলা হয়েছে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেও ইহুদি পরিচয় ভুলে যাননি।
তথ্যগতভাবে বিভ্রান্তিকর, কারণ:
সহিহ হাদীস অনুযায়ী:
সাফিয়া (রা.) স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন, আর রাসূল (সা.) তাঁর ইসলাম গ্রহণের পরেই বিয়ে করেন (সহিহ মুসলিম 1365)।
তিনি তাঁর আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখতেন — এটা ইসলামে উৎসাহিত, এর মানে এই না যে তিনি ইহুদি রয়ে গিয়েছিলেন।
6. “আয়েশা সাফিয়াকে কটুক্তি করতেন” — অতিরিক্ত নেতিবাচক sentence
আয়েশা (রা.) একবার বলেছেন “তুমি ইহুদি কন্যা”, তবে পরে রাসূল (সা.) তাঁকে বলেছেন, একে অতি-নাটকীয় বা বিদ্বেষমূলকভাবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
সহিহ হাদীস অনুযায়ী:
সাফিয়া (রা.) খুবই গুণবতী ও প্রিয় স্ত্রীদের একজন ছিলেন। (তিরমিজি 3894)
7. “আত্মীয়দের পাশে হাঁটিয়ে আনা” — সহিহ হাদীসে নেই
+ More information is added for my previous comment…
1. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফিয়াকে মুক্ত করে বিয়ে করলেন…(আলোকিত প্রকাশনী নাম্বারঃ ২৩৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩৭১, মুখতাসার সহীহ আল-বুখারী, from hadithbd. com)
আবু আইউব আনসারী পাহারা দিয়েছিলেন- সঠিক ও গ্রহণযোগ্য হাদিসের গ্রন্থে (যেমন: সহিহ বুখারী, সহিহ মুসলিম, অথবা যেসব হাদিস কবুলযোগ্য) এই ঘটনার বর্ণনা সাধারণভাবে স্বীকৃত সহিহ গ্রন্থে নেই।
2. “It reached Safiyyah that Hafsah said: ‘The daughter of a Jew’ so she wept. Then the Prophet (ﷺ) entered upon her while she was crying, so he said: ‘What makes you cry?’ She said: ‘Hafsah said to me that I am the daughter of a Jew.’ So the Prophet (ﷺ) said: ‘And you are the daughter of a Prophet, and your uncle is a Prophet, and you are married to a Prophet, so what is she boasting to you about?’ Then he said: ‘Fear Allah, O Hafsah.'” – (Jami` at-Tirmidhi 3894, from sunnah. com)
3. আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোকের নিকট দু’জন স্ত্রী আছে সে লোক যদি তাদের মধ্যে সমতা না রাখে তবে কিয়ামতের দিন সে লোক তার দেহের এক পার্শ্ব ভাঙ্গা অবস্থায় উপস্থিত হবে। — (1141, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), from hadithbd .com)
4. আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (সা.) এর স্ত্রী সফিয়্যাহ্-এর কাছে এ কথাটি পৌছেছে যে, হাফসাহ (রাঃ) তাঁকে ইয়াহুদী কন্যা বলেছেন। এ কথা শুনে সফিয়্যাহ কাঁদতে লাগলেন। এমন সময় নবী (সা.) তাঁর কাছে গিয়ে দেখলেন, তিনি কাঁদছেন। প্রশ্ন করলেন কি কারণে তুমি কাঁদছ? সফিয়্যাহ্ (রাঃ) বললেন, হাফসাহ আমাকে ইয়াহুদী কন্যা বলেছে। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তুমি তো এক নবীর কন্যা, আরেক নবী তোমার চাচা এবং তুমি আরেক নবীর স্ত্রী। অতএব হাফসা কোন কথায় তোমার ওপর গর্ব করতে পারে? অতঃপর তিনি (সা.) বললেন, হে হাফসা! আল্লাহকে ভয় কর। – (৬১৯২, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) from hadithbd. com)
5.
…রাসূলুল্লাহ ﷺ সাফিয়াহ বিনতে হুয়াইকে নিজের জন্য বাছাই করে নিয়েছেন এবং তাকে মুক্তি দিয়ে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার অথবা তার পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার অধিকার দিয়েছেন। তিনি মুক্তি পেয়ে তাঁর স্ত্রী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।…
(মুসনাদ আহমদ, হাদীস ১২৪০৯) from al-hadees. com
+ more about ইসলামে দাস দাসী নিয়ে ধারণা: https://antinastik.blogspot.com/
6.
The below reference that has no relation between the hadith number and the written hadith language (given in previous comment).
Reference:
[সাফিয়া (রা.) খুবই গুণবতী ও প্রিয় স্ত্রীদের একজন ছিলেন। (তিরমিজি 3894)]
Sorry for that.
লুচ্ছার বাইরে কিছুই ছিলনা। ইহুদীরা আগে থেকেই বহু জ্ঞানী ছিল, তাতের প্ৰতি শ্ৰদ্ধা বের গেল। অৰ্থলোভী, নাৰী লোভী মহম্মদ।
হৃদয়বিদারক
হৃদয়বিদারক💔
১. Genre এবং Epistemic Position
লেখাটি নিজেকে “Semi-Academic Skeptical Analysis” বলেছে। কিন্তু একাডেমিক লেখার মৌলিক শর্ত হলো methodological neutrality — অর্থাৎ প্রমাণ যেদিকে যায় সেদিকে যাওয়া। এই লেখায় শুরু থেকেই উপসংহার নির্ধারিত। তাই এটি একাডেমিক লেখা নয়, advocacy journalism এর কাছাকাছি।
২. Source Criticism এর মান
একাডেমিক ইতিহাস চর্চায় উৎস সমালোচনার তিনটি স্তর থাকে।
External criticism: উৎসটি কি আসল?
Internal criticism: উৎসটি কি নির্ভরযোগ্য?
Contextual criticism: উৎসটি কি প্রাসঙ্গিক?
এই লেখায় তিনটি স্তরেই সমস্যা আছে।
ওয়াকিদির বর্ণনা সহিহ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে অথচ মুহাদ্দিসিনের ঐকমত্যে তিনি মাতরুক। কিনানার নির্যাতনের বর্ণনা “highly disputed” হওয়া সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপিত। মুসনাদ আহমাদের সহিহ বর্ণনা সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে।
মূল্যায়ন: Source criticism এর মান অগ্রহণযোগ্য।
৩. Historiographical Method
আধুনিক ইতিহাসশাস্ত্রে Leopold von Ranke এর পর থেকে মূলনীতি হলো “wie es eigentlich gewesen” — যা আসলে ঘটেছিল তা বের করা। এর জন্য দরকার:
Counter-evidence examination: প্রতিপক্ষের দলিল পরীক্ষা করা।
Corroboration: একাধিক স্বাধীন উৎস থেকে নিশ্চিত করা।
Contextualization: ঘটনাকে তার কালিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে রাখা।
এই লেখায় counter-evidence সম্পূর্ণ অনুপস্থিত, corroboration শুধু একমুখী এবং contextualization এ anachronism আছে।
মূল্যায়ন: Historiographical method দুর্বল।
৪. Logical Structure
একাডেমিক যুক্তিকাঠামোয় থাকে:
Premise → Evidence → Conclusion
এই লেখায় কাঠামো উল্টো:
Conclusion → Selected Evidence → Reinforced Conclusion
এটি confirmation bias এর পাঠ্যপুস্তক উদাহরণ। ১৫টি কুযুক্তি আগেই চিহ্নিত হয়েছে যেগুলো এই উল্টো কাঠামো থেকেই জন্ম নিয়েছে।
মূল্যায়ন: Logical structure অগ্রহণযোগ্য।
৫. Interdisciplinary Misuse
লেখায় আধুনিক মনোবিজ্ঞানের “Trauma Bonding” এবং “Survival Adaptation” ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এই ধারণাগুলো:
প্রথমত, clinical context এ প্রযোজ্য, ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে নয়।
দ্বিতীয়ত, এগুলো unfalsifiable — যেকোনো আচরণকেই এই তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।
তৃতীয়ত, সপ্তম শতাব্দীর ব্যক্তির উপর একবিংশ শতাব্দীর clinical framework আরোপ করা anachronistic psychology।
মূল্যায়ন: Interdisciplinary methodology ত্রুটিপূর্ণ।
৬. Rhetoric বনাম Evidence
একাডেমিক লেখায় rhetoric এবং evidence আলাদা থাকে। এই লেখায় দুটি মিশিয়ে ফেলা হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে “লাশের পাহাড়ের ওপর বাসর” শিরোনাম একটি rhetorical device যা পাঠকের আবেগকে প্রভাবিত করে। একাডেমিক লেখায় এই ধরনের loaded language গ্রহণযোগ্য নয়।
একইভাবে “পৈশাচিক নির্যাতন,” “নারীলোভী,” “ভণ্ড মানুষ” এই শব্দগুলো rhetorical এবং evidential নয়।
মূল্যায়ন: Rhetoric এবং evidence এর মধ্যে সীমারেখা অনুপস্থিত।
৭. Self-Contradiction
লেখাটি নিজেই বলেছে মুসলিম উৎসগুলো পক্ষপাতদুষ্ট কারণ লেখকরা নবীকে ইতিবাচকভাবে দেখাতে চাইতেন। কিন্তু তারপরেই সেই একই উৎস থেকে নেতিবাচক তথ্য নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
এটি internal inconsistency — একাডেমিক লেখার মৌলিক ত্রুটি।
মূল্যায়ন: Internal consistency নেই।
৮. Comparative Academic Standards
পশ্চিমা একাডেমিয়ায় সাফিয়্যা বিষয়ে যারা লিখেছেন তাদের মধ্যে Kecia Ali (Boston University), W. Montgomery Watt, Martin Lings প্রমুখ সকলেই স্বীকার করেছেন যে:
প্রথমত, সম্মতির প্রশ্ন জটিল।
দ্বিতীয়ত, আধুনিক consent framework সরাসরি প্রয়োগযোগ্য নয়।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কারণও ছিল।
এই লেখায় কোনো পশ্চিমা বা প্রাচ্যবিদ একাডেমিক উৎস ব্যবহার করা হয়নি — শুধু ইসলামি প্রাথমিক উৎস নির্বাচিতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
মূল্যায়ন: Secondary literature সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
৯. Peer Review Standard
একাডেমিক লেখার মান যাচাইয়ের জন্য peer review এর প্রশ্ন করা যায়। এই লেখাটি কোনো পিয়ার রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত হয়নি এবং হওয়ার যোগ্যতাও রাখে না কারণ:
উৎস সমালোচনা অনুপস্থিত, counter-evidence উপেক্ষিত, logical fallacies বিদ্যমান এবং loaded language ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত।
এসব পড়ে অসুস্থ হয়ে গেছি, হায় হায়, মুহাম্মদ কি ছিল, আর জীবনের একটা বড় অংশ তাকে কত শ্রেষ্ট মনে করেছি। নর-পিশাচকেও হার মানায়। ধিক্কার নিজেকে
সারসংক্ষেপ এ নারীদের যৌন দাসী হিসেবে নেওয়ার অংশে বানানে ভুল আছে, দাবি এর জায়গায় নারী বা দাসী হবে
Dear, Asif Bhai!
This Is Dr. Mistaf Laskar (PhD)
I am a Professor at a Government College by profession. I am a freethinker, rationalist, and humanist. I work for human rights.. I identify as a freethinker, rationalist and humanist.
I visit your Sangshay website whenever I get free time. I’ve already read almost half of the content there. It’s one of the best Bengali platforms that promotes humanism and rational thinking.
It helps them accept the truth of cosmology and humanity.
people of all religions ✝️☪️🕉️☦️✡️🔯☸️
they own
Afraid to know details about religion and they are afraid to talk about their own religion, their religion is dirty
and will reveal the fervor
Dear, Asif Bhai!
This Is Dr. Mistaf Laskar (PhD)
I am a Professor at a Government College by profession. I am a freethinker, rationalist, and humanist. I work for human rights.. I identify as a freethinker, rationalist and humanist.
I visit your https://www.shongshoy.com/ website whenever I get free time. I’ve already read almost half of the content there. It’s one of the best Bengali platforms that promotes humanism and rational thinking.
It helps them accept the truth of cosmology
🌍🕊️🥀মুক্ত পৃথিবী 🥀🕊️🌍
ড. মিছতাফ লস্কর (পিএইচডি)✍️
উদিয়মান সূর্যালোকের আলোয় আলোকিত হউক এ ধরা,
মুছে যাক যতো গ্লানি যতো পাপ দূর হউক সবই জ্বরা।।
হিংসা দ্বেষ মুছে যাক এ পৃথিবীতে
জয় হউক মানবতার,
মানবতার গানে গানে হউক মুখরিত অবসান হউক অসুরতার।।
মুক্ত মন হউক মানবতা, মুক্ত হউক ধরিত্রীর গ্লানিকর কুল,
চাই মুক্ত পৃথিবী চাই সরল মানবতা
ঘুচে যাক মোদের সহস্র ভুল।।
সুন্দর পৃথিবীর মাঝে বসত করতে চাই স্বর্গীয় মহিমায়,
প্রস্ফুটিত ফুলের কাননে পাখির গানে সবই মিলে যেন মুগ্ধতা জাগায়।। ©