বিজ্ঞানপ্রতিক্রিয়াস্টিকি

আসলেই কি রোজার উপকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত ও প্রমাণিত?

লিখেছেন: মাহনাজ হোসেইন ফারিবা

(এই লেখার লেখিকা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী, নাস্তিক নন, ইসলামের রীতিনীতি তিনি শ্রদ্ধার সাথেই মেনে চলার চেষ্টা করেন। অবশ্যই নাস্তিকতা প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি লেখাটি লিখেননি। লেখাটি তার অনুমতি সাপেক্ষে তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। একজন মুসলিম হয়েও অন্যান্য মুসলিমদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেছেন, তার এই সততায় মুগ্ধ হয়ে আমরা তাকে শ্রদ্ধা জানাই।)

ফেসবুকে তর্ক বিতর্ক করতে গেলে আমার নিজেরও অনেক কিছু শেখা হয়। এই যেমন গতকাল রোযা আর অটোফ্যাগি যে এক জিনিস নয় এ বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে দেশ বিদেশের বিভিন্ন জার্নাল পড়ে লেটেস্ট বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো জানা ও লেখা হয়েছে। গতকাল অটোফ্যাগি আর রোযা যে এক জিনিস নয় এ বিষয়ে দুইটি পোস্ট দেবার পরে অনেকে আমাকে মেসেজ দিয়েছেন আমি যেন রোযার উপকারিতা আছে কিনা তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নিয়ে লিখি।

এখানে কিছু বিষয় প্রথমে বলে নেয়া ভাল। বর্তমানে যেকোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা ভ্যালিড কিনা তা বলা যায় সেই গবেষণা যে জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে তার ইম্প্যাক্ট ফ্যাক্টর কত (অর্থাৎ সহজ ভাষায় এক ধরনের র‍্যাঙ্কিংই ধরে নেন) এবং পিয়ার রিভিউড কিনা (অর্থাৎ একটি গবেষণা একটি জার্নালে প্রকাশিত হবার আগে একই ধরনের গবেষণারত অন্য গবেষকদের কাছে আর্টিকেলটি পুনরায় পড়বার জন্য পাঠানো হয়। একে বলে পিয়ার রিভিউ প্রসেস। এই রিভিউ পার করতে পারলেই জার্নালটি প্রকাশিত হয়)

তো রোযার উপকারিতা বিষয়ে সারা পৃথিবীতে গবেষণা হয়েছে খুবই কম। যেকোনো গবেষণাই গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ সায়েন্টিফিক্যালি ভ্যালিড হতে গেলে তার স্যাম্পল সাইজ বড় থাকতে হবে। স্টাডি ডিজাইন এমনভাবে হতে হবে যেন বায়াস না থাকে। স্ট্যাটিস্টিক্যাল প্যারামিটারগুলো সঠিক থাকতে হবে। সাধারণত এধরনের কোয়ান্টিটেটিভ গবেষণা (যা স্ট্যাটিস্টিক্স/পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা হবে) সেগুলোকে রিভিউ করবার একটি বিশেষ পদ্ধতি আছে। তার নাম হল সিস্টেমেটিক রিভিউ এবং মেটা এনালাইসিস। আমি অক্সফোর্ডে এসে পৌঁছাবার পর থেকে প্রথম ক্লাস থেকেই আমাদের এই সিস্টেমেটিক রিভিউ এবং মেটা এনালাইসিস এর উপরে ক্লাস নেয়া হয় যেন আমরা যেকোনো বিষয়ে সর্বশেষ গবেষণা রিসার্চে যোগ করে, সব গবেষণার কিউমুলেটিভ ইফেক্ট নিয়ে এরপরে একটি সিদ্ধান্তে আসতে পারি। সবচেয়ে বেশী স্বীকৃত হল ককরেন রিভিউ। মেটা এনালাইসিস হল সিস্টেমেটিক রিভিউ এর একটি অংশ। এই মেটা এনালাইসিস সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য কারণ যেসব গবেষণাপত্রে সব কিছু ঠিক আছে, এই যেমন স্টাডি ডিজাইন, পপুলেশন সাইজ, রেলিভেন্স, অন্য আর সব প্যারামিটার, সেগুলোকে এক করে নির্দিষ্ট weightage দিয়ে এরপর কিউমুলেটিভ ইফেক্ট দিয়ে হিসাব করা হয়। আমরা এখন চারিদিকে evidence based medicine অথবা evidence based healthcare নিয়ে কথা বলি, এর মূলভিত্তি হল Systematic Review এবং Meta Analysis.

যাই হোক, রোযার মানুষের উপরে গবেষণা নিয়ে একটিই সিস্টেমেটিক রিভিউ পাওয়া গেছে, কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন জার্নালে। অতীতে বিভিন্ন গবেষণায় রোযার ভালো প্রভাব এবং মন্দ প্রভাব দুটোই দেখা গেলেও, এই মেটা এনালাইসিস এর মাধ্যমে প্রমাণ করা হয়েছে অতীতের আরও ৩০টি স্টাডির কিউমুলেটিভ ইফেক্ট তেমন নয়, অর্থাৎ শরীরের উপর রোযার ভালো ও মন্দ কোনো প্রভাবই নেই, সম্পূর্ণ নিউট্রাল। রোযার সময় ওজন কিছুটা কমলেও রোযা শেষে আবার সব আগের মত হয়ে যায়। শুধুমাত্র পূর্ব এশিয়ানদের প্রচুর ওয়েট লস হয় এবং পশ্চিম এশিয়ান ও আফ্রিকানদের সামান্য ওয়েট লস হয়। ইউরোপিয়ানদের তেমন হয়ইনা রোযার সময়। এই ওয়েট লস রোযার মাসে কেন হয়ে থাকে সেই কারণগুলোকে কয়েকভাবে বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছেন।

১। রোযা কত ঘন্টা করা হচ্ছে এবং তাপমাত্রা
২। কয়বার খাওয়া হচ্ছে
৩। খাদ্যাভ্যাস, খাবারের মান ও পরিমাণ
৪। পানি কতটুকু খাওয়া হচ্ছে
৫। ঘুমানোর সময় এবং ধরন
৬। শারীরিক পরিশ্রম
৭। বয়স

রোযার মাস শেষে মানুষের ঘুমের প্যাটার্ন পরিবর্তিত হয়ে যায়, যার ফলে শরীরে সিরাম লেপটিন, ইনসুলিন, কর্টিসল ইত্যাদির মাত্রা পরিবর্তিত হয়, তাই খাদ্যাভাস আবার পরিবর্তিত হয়ে যায়, এমনটাই বলেছেন বিজ্ঞানীরা।

কাজেই রোযার মাধ্যমে শারীরিক বেনিফিট পাবার চেয়ে কনসিস্টেন্ট লাইফস্টাইল মেইন্টেইন করাটা বেশী জরুরী। রোযা রাখতে কেউ নিষেধ করছেনা, তবে রোযার সময় যে রুটিন নিয়ম তা যদি সারা বছর মেইন্টেন করা যায়, তাহলেও ওজন কম রাখা সম্ভব এবং বেশী ওজনের ফলে শরীরের যত খারাপ অসুখ আছে যেমন কোলেস্টেরল, ডায়বেটিস, ব্লাড প্রেসার, হার্টের অসুখ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। শুধু এক মাস রোযা করে শরীরের তেমন সিগনিফক্যান্ট বেনিফিট নেই।

তবে আমি এও স্বীকার করছি, এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। শরীরে রোযার উপকারিতা নিয়ে তেমন গবেষণা হয়নি।

ধন্যবাদ।


(এই লেখার লেখিকা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী, নাস্তিক নন, ইসলামের রীতিনীতি তিনি শ্রদ্ধার সাথেই মেনে চলার চেষ্টা করেন। অবশ্যই নাস্তিকতা প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি লেখাটি লিখেননি। লেখাটি তার অনুমতি সাপেক্ষে তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। একজন মুসলিম হয়েও অন্যান্য মুসলিমদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেছেন, তার এই সততায় মুগ্ধ হয়ে আমরা তাকে শ্রদ্ধা জানাই।)

সূত্রসমূহঃ

১। https://www.cambridge.org/…/3791BAE2A6C52218994B3BEF291BF6EE (সম্পূর্ণ পেপারটি যারা দেখতে চান তারা লেখিকাকে ইমেইল করতে পারেন)

২। Effect of Ramadan Fasting on Weight and Body Composition in Healthy Non-Athlete Adults: A Systematic Review and Meta-Analysis (এটি ২০১৯ সালের সিস্টেমেটিক রিভিউ। এখানেও একই কথা বলা আছে। রমযানে ওজন কিছু কমলেও ২-৫ সপ্তাহের মধ্যে শরীর আবার আগের মত হয়ে যায়। এই গবেষণাপত্রে কনফাউন্ডিং ফ্যাক্টর এডজাস্ট করা হয়নি যেকারণে জাতিভেদে কতটুকু সুফল-কুফল তাও বোঝা কঠিন)

লেখিকা পরিচিতি

রোজা 1

Mahnaz Hossain Fariba 

Graduate and MSc Alumni, IHTM, University of Oxford

Assistant Commissioner and Executive Magistrate, Government of the People’s Republic of Bangladesh

Administration Cadre (35th BCS), Bangladesh Civil Service

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.

The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.

This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.

3 thoughts on

  1. ঝরে বক মরে আর ফকিরের কেরামতি বাড়ে

    যেই মাত্র বিজ্ঞান কিছু প্রমাণ দিয়েছে যে অতিরিক্ত আহার স্বাস্থ্যের পক্ষে বিপদজনক এবং নিয়ন্ত্রিত ও পরিমিত আহার স্বাস্থকর, অমনি ধর্মান্ধরা রোযা, উপাস ইত্যাদির বিজ্ঞানসম্মতটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে | সবাই উৎসাহে অস্থির যে তাদের হাজার বছরের পুরানো ধর্ম গ্রন্থ কত আধুনিক ও প্রাসঙ্গিক | ঈশ্বর তার ভক্তদের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে কি সুন্দর বিধান দিয়েছেন সেই কোন যুগে | গোড়ায় গলদটা সবাই সুন্দর এড়িয়ে যাচ্ছে |

    বিজ্ঞান ও ধর্মের ধারণার তফাৎটা দেখা যাক

    ১) বিজ্ঞান বলছে একটা নিয়মিত অভ্যাস পালন করতে, না হলে স্বাস্থ ভালো না হয়ে আরো খারাপ হবার সম্ভাবনা | অর্থাৎ হটাৎ করে বছরে এক মাস অথবা মাসে দুদিন অন্য রকম বা কম খেলে ক্ষতি

    ২) বিজ্ঞান বলছে, তরল খাওয়া বন্ধ করলে লাভের থেকে ক্ষতি বেশি | ধর্ম বলছে কিচ্ছু খাওয়া চলবে না

    ৩) বিজ্ঞান বলছে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে | ধর্ম বলছে যত খুশি খাও এমনকি আরো বেশি করে খাও কিন্তু এই সময় থেকে সেই সময় পর্যন্ত কিছু খেও না – ব্যাস তবেই হবে

    এর পরও কিছু মানুষ চিৎকার করবে যে মানুষের মঙ্গলের কথা ভেবে ধর্ম কত ব্যবস্থা করেছে | ব্যবস্থা যে বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ বিপরীত সেটা আর মাথায় ঢুকলো না !

Leave a comment

Your email will not be published.