ধর্মদর্শনযুক্তিবাদ

তিনি আরজ আলি মাতুব্বর

প্রায় ৫০-৬০ হাজার বছর আগের নিয়ান্ডারথাল মানুষেরাই প্রথম প্রশ্ন তোলে জীবন-মৃত্যু নিয়ে? মানুষ কোত্থেকে আসে? বেঁচে থাকে কেন? মারা যায় কেন? শুধু মানুষ নয়। প্রকৃতিকে নিয়েও তারা প্রশ্ন করা শুরু করেছিল। নদী প্রবহমান কেন? বাতাস কি? পাহাড় এলো কোত্থেকে? সূর্য আলোকিত কেন? সহস্র বছর আগের অবিকশিত ও আদিম বুদ্ধি দিয়ে আদিম মানুষেরা ভেবে নিয়েছিল তাদের প্রতিটি সমস্যার সমাধান। প্রাণীজগতের সব প্রাণীই নিজেদের যেকোন সমস্যায় নিজ নিজ বুদ্ধি, পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই আধুনিক যুগেও প্রাণীদের চোখে মটরগাড়ীগুলো শব্দকারক ও দূর্গন্ধযুক্ত একটি বিদঘুটে প্রাণী ছাড়া কিছুই নয়। একটি যন্ত্র সম্পর্কে এমন ধারণা পোষণের জন্য আমরা প্রাণীদেরকে দোষ দিতে পারি না। কারণ যন্ত্রকে যন্ত্র মনে করার জন্য যে জ্ঞান, মেধা, মণীষা, অভিজ্ঞতা থাকা দরকার তা তাদের নেই। জীব জগতের কোটি বছরের ইতিহাসে মনুষ্যেতর প্রাণীগুলো কখনো যন্ত্র নিয়ে গবেষণা করেনি, বা করতে চায়নি। বানর, কয়েক প্রজাতির পাখি এবং অন্যান্য কয়েকটি মাত্র প্রাণী অবশ্য যন্ত্রের ব্যবহার করে। উঁচু ডাল থেকে ফল পাড়তে লাঠি, শত্রু তাড়াতে ঢিল, খাদ্য ভাঙতে পাথর ইত্যাদির ব্যবহার তারা করে থাকে। কিন্তু তাদের যন্ত্র সম্পর্কে এই অভিজ্ঞতা অতটুকু প্রাথমিক অবস্থাতেই থেকে গেছে। আর কোন অগ্রগতি হয়নি এবং তা সহজাত প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। কারণ যন্ত্রের ঐ সীমিত ব্যবহারটুকুর বেশি তাদের প্রয়োজন হয়নি। তাই যন্ত্রের আবিষ্কার বা উৎকর্ষের জন্যও কোন রকম অভ্যন্তরস্থ আগ্রহ তারা বোধ করেনি। কিন্তু মানুষ মানবেতর নয়। ক্রমাগত নিজেকে পেরিয়ে যাওয়ার এক অদম্য আগ্রহ মানুষকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়ায়। ফলে মানুষ নিরন্তর তার পূর্বতন অনভিজ্ঞতা, অনগ্রসরতা, পশ্চাৎপদতা, সীমিত যান্ত্রিক শক্তি প্রভৃতিকে পরিত্যাগ করেছে এবং সাগ্রহে বরণ করেছে ভবিষ্যতের নতুনত্ব, জ্ঞান, আবিষ্কার, মনন। তাই অন্যান্য পশুদের জীবন যাত্রা এখনও আদিম যুগের ন্যায় থাকলেও মানুষের ক্ষেত্রে তা পাল্টে গেছে। মানুষ এগিয়ে এসেছে বর্তমানের কুসংস্কারহীন প্রযুক্তিময় পৃথিবীতে।

উপর্যুক্ত আলোচনাটি তত্ত্ব হিসাবে অসাধারণ এবং বাস্তব মনে হলেও এতে একটি ত্রুটি আছে। কারণ মানুষ বিভক্ত বহু ভাগে। প্রাকৃতিক পরিবেশ অর্থাৎ ভূ-প্রকৃতির কাঠামো ও নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যভেদে মানুষ বিভিন্ন রকম। কেউ পাহাড়বাসী, কেউ সমতলবাসী, কেউ দ্বীপবাসী, কেউবা বনবাসী। কেউ রুক্ষ অঞ্চলে, কেউবা উর্বর ভূমিতে বাস করে। প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে দেয় মানুষের সার্বিক অগ্রগতির আয়তন। মাটির গঠন, বাতাসের আর্দ্রতা, সূর্যালোকের প্রখরতা, গাছপালার পরিমাণ মানুষের আত্মিক বিকাশ ও নৈতিক মানদণ্ড গঠনে অন্যতম সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যে ব্যক্তি বাস করে রুক্ষ্ম ভূমিতে তার তুলনায় বাংলাদেশের ন্যায় উর্বর জলাভূমিতে বসবাসকারী ব্যক্তির মন অনেকাংশে নরম হবেই। অর্থাৎ মানুষের মানসিক পরিবর্তন সারা পৃথিবীতে সমান্তরাল গতিতে অগ্রসর হয়নি। যে ব্যক্তি মরুভূমিতে বাস করে সে পৃথিবী সম্পর্কে যেরকম ধারণা পোষণ করে তার সম্পূর্ণ বিপরীত ধারণা লালন করে উর্বর ভূমিতে বাসকারী মানুষ। যে জনগোষ্ঠী পাহাড়ে বাস করে তাদের ধারণার সাথে দ্বীপবাসীর ধারণার কোন অংশেই মিল নেই। প্রত্যেকে পৃথিবী, প্রাণীজগত এবং মনুষ্যত্বকে বিচার করে ভিন্ন ভিন্ন দার্শনিক অবস্থান থেকে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে জগৎকে বিচার করার ফলেই মানুষে মানুষে এত পার্থক্য। নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ীও মানুষ বিভিন্ন রকম। এক কালে ধারণা করা হতো মানুষের বুদ্ধিতাত্ত্বিক অগ্রগতি নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে। বর্তমানে সে ধারণা পরিত্যাজ্য হয়েছে।

আমরা বাঙালিরা পৃথিবীর যে অঞ্চলে বাস করি সে অঞ্চলের মাটি খুবই উর্বর। উত্তরের হিমালয়ের পাদদেশ ধুয়ে পলি নিয়ে এসে এই অঞ্চলের নদীগুলো বঙ্গভূমির শরীর তৈরী করেছে। ফলে এখানকার মানুষের খাদ্যের অভাব কখনও হয়নি। প্রকৃতির ভালোবাসায় সিক্ত মানুষেরা ব্যক্তিগত জীবনেও ভালোবাসাপ্রবণ হবার কথা। কিন্তু বর্তমানকালের সামাজিকতা তুলে ধরে বাঙালির আবহমানকালের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। তাই বলে বাঙালির বর্তমানের হীন চরিত্রের চিত্র চিরকালের নয়। আজ থেকে হাজার বছর আগেও বাঙালি চরিত্রের সাথে প্রকৃতির চরিত্রের তত অমিল ছিল না। ক্রমাগত পাহাড়বাসী ও মরুভূমিবাসীদের নৈতিক আগ্রাসনের জালে বাঙালি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়েছে গত হাজার বছরে। নিজ প্রকৃতি সম্ভূত নীতিবোধ একাধিক কারণে বিসর্জন দিয়ে তারা গ্রহণ করেছে পাহাড় ও মরুভূমির উগ্র সাম্রাজ্যবাদী নীতিবোধ। ফলে তাদের মানবিক অবস্থানের পতন ঘটতে দেরী হয়নি। যার হলাহল আমরা একালে মর্মে মর্মে গলাধকরণ করছি।

নিকট পশ্চিম ও দূর পশ্চিম প্রভাবিত মানসিকতায় যা কিছু জ্ঞান ও সুন্দর তার উদ্ভব হয়েছে পাশ্চাত্যেই। আজকের আত্মবিমুখ জাতি হিসেবে আমরা তাইই সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করছি। এ ধারণা সমর্থন করলে আমাদের নিজেদের যে দার্শনিক ঐতিহ্য আছে তাকে অস্বীকার করা হয়। কারণ নির্মোহ ইতিহাস চেতনা আমাদেরকে ভিন্নভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। দার্শনিক পরাধীনতাই যে পাশ্চাত্যমুখী অবস্থান তৈরী করেছে আজ তা অনেকাংশে স্পষ্ট। তাই এটা অনেকের অজানা যে, পাশ্চাত্যে দর্শন যখন হাটি হাটি পা পা করে শৈশব অতিক্রান্ত করছিল তখন এই ভারতীয় উপমহাদেশে দর্শন চর্চা হয়েছিল যৌবনপ্রাপ্ত। মাওলানা আজাদ বলেছেন- “ভারতীয় দর্শন মানব সভ্যতার অন্যতম গর্বের সম্পদ।”

প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা চেতনার বিরুদ্ধে যে সাহসী ব্যক্তিরা প্রথম প্রতিবাদ করেন সেই মহান দর্শন যোদ্ধাদের একজন হলেন ঋষি বৃহস্পতি। তিনি ছিলেন সেকালের একজন দুঃসাহসী চিন্তানায়ক। প্রকৃত জ্ঞান ও প্রগতির পক্ষে তার অবস্থান ছিল অটল ও দৃঢ়। সাম্রাজ্যবাদী দর্শন ও নীতিবোধের বিরুদ্ধে তিনিই সর্বপ্রথম জোর গলায় প্রতিবাদ জানান। এ অঞ্চলের যুক্তিবাদী ও মুক্তবুদ্ধি আন্দোলনের চিন্তানায়কদের আদিগুরু হচ্ছেন ঋষি বৃহস্পতি। ঋগ্বেদে বৃহস্পতি বলেছেন, ‘বস্তুই চরম সত্তা’। মাধবাচার্য এর ‘সর্বদর্শন সংগ্রহ’ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে বার্হস্পত্য দর্শনের এই উদ্ধৃতি আছে- “স্বর্গ নেই, মোক্ষ নেই, আত্মা নেই, পরলোক নেই, জাতিধর্ম নেই, কর্মফল নেই। ত্রিবেদ, ত্রিদণ্ড এবং ভস্মলেপন এসব বুদ্ধি ও পৌরুষহীন কিছু মানুষের জীবিকা নির্বাহের উপায় মাত্র (বুদ্ধি পৌরুষহীনানাং জীবিকা, ধাতৃনির্মাতা)।” এই বার্হস্পত্য দর্শনের প্রধান ভাষ্যকার হিসাবে চার্বাক ঋষি ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ খ্যাত ছিলেন। উপমহাদেশের দর্শন পরিমণ্ডলে চার্বাকের দার্শনিক অবস্থানের পরিচিতি ও প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছিল। সাধারণ মানুষের সুখ দুঃখের যথার্থ কারণ চার্বাকের মত করে আর কেউ বলতে পারেনি। তাই জনজীবনের আত্মিক গঠনে তার দর্শনের ভূমিকা ছিল প্রবল। একারণেই চার্বাকের দর্শনকে বলা হয় ‘লোকায়ত দর্শন’। এই দর্শনে বলা হয়েছে, “প্রত্যক্ষ ছাড়া পরোক্ষ কোন প্রমাণ নেই। শরীর থেকে পৃথক কেন চৈতন্য নেই।” তিনি মনে করেন বস্তুই সব কিছু সৃষ্টির মূলে। তিনি বলেন, “মৃত্তিকা, বায়ু, অগ্নি ও জল, এই চারিতত্ত্বের সমাহারে শরীর সৃষ্টি হয়। দেহাতীত কোন আত্মা নেই। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কোন বহিঃশক্তির সহায়তা ছাড়া, এমন কি অদৃষ্টেরও সহায়তা ছাড়া নিজে নিজেই সৃষ্ট হয়।” Ethnic Epic রামায়ণেও আমরা এই বস্তুবাদী দর্শনের চিত্র পাই। বনবাসে যাওয়া রাম ছোটভাই ভরতের অনুরোধেও যখন অযোধ্যায় ফিরে যেতে অস্বীকার করেন তখন তাদের সামনে এসে উপস্থিত হন বস্তুবাদী ঋষি জাবালি। তিনি রামকে উপদেশ দিয়েছিলেন- “চতুর লোকের রচিত শাস্ত্রগ্রন্থে আছে যজ্ঞ কর, দান কর, ত্যাগ কর, তপস্যা কর ইত্যাদি। এর উদ্দেশ্য কেবল জনসাধারণকে বশীভূত করা। অতএব হে রাম, তোমার এই বুদ্ধি হোক যে পরলোক নেই। যা প্রত্যক্ষ তার জন্যই উদ্যেগী হও যা পরোক্ষ তা পরিহার কর।”

বৃহস্পতি, চার্বাক এর পরে আমরা ভারতীয় বস্তুবাদীদের মধ্যে দেখা পাই সাংখ্য মতাবলম্বীদের। তারা মনে করতেন কাজ একান্তভাবেই কারণের পরিণাম। কাজের মধ্যে এমন কিছু থাকতে পারেনা যা কারণের মধ্যে অবশ্যই অস্ফুট বা বীজাকারে বর্তমান নয়। তাই তাদের বিশ্বাস যেহেতু ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় না অতএব ঈশ্বর নেই। তারা মনে করেন পৃথিবী সৃষ্টি করার জন্য ঈশ্বর ধারণার প্রয়োজন নেই। কোনো কারণ নিজের পরিবর্তন ছাড়া কোনো কাজের সৃষ্টি করতে পারে না। তাই অপরিবর্তনীয় ঈশ্বর জগতরূপ কাজের কোনো কারণ হতে পারে না। তবে তাদের ধারণার মধ্যে বহু আত্মা সস্পর্কিত ভাবনারও মিশ্রণ রয়েছে। এই নিরাসক্ত উপলব্ধির ধারাবাহিকতায় জন্ম নেয় বৌদ্ধ মতের। গৌতম বুদ্ধের এই মতের নাম বৌদ্ধধর্ম হলেও এটি প্রচলিত অর্থে কোনো ধর্ম নয়। এটি একটি মতবাদ যা মানুষের জীবনযাত্রাকে অর্থবহ করতে চায়। মহান গৌতম বুদ্ধও মনে করতেন আত্মা বা ঈশ্বর বা এধরণের কোন অপরিবর্তনীয় সত্ত্বা বাস্তবে নেই। এমন ভাবনার প্রভাব জৈন ধর্মের মধ্যেও কিঞ্চিত রয়েছে। কবীর, দাদু প্রমুখ সংস্কারকদের মতবাদের মধ্যেও অলৌকিকতার তুলনায় মানবীয়তার স্পর্শ খুবই স্পষ্ট। আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় গণ্ডীর বাইরে থেকে লোকায়ত মরমীবাদকে আশ্রয় করে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন লালন ফকির সহ বাউল সম্প্রদায়। ভারতীয় উপমহাদেশীয় বস্তুবাদী দর্শনসঞ্চারী মনোভঙ্গিকে আধুনিক কাল পর্যন্ত বহন করে এনেছেন ডক্টর রাধাকৃষ্ণন, মানবেন্দ্র নাথ রায়, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ প্রাজ্ঞ দার্শনিকেরা।

প্রথাবিরোধী ধর্মদর্শনের প্রাচীন ধারাবাহিকতার বাংলাদেশী রূপকার হলেন আরজ আলি মাতুব্বর। তিনি মনে করতেন পশু যেমন সামান্য জ্ঞান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে ধর্মবাদী ব্যক্তিগণও তেমনি সামান্য জ্ঞান নিয়েই জীবন কাটিয়ে দেয়। মেধার বিকাশ, মুক্তচিন্তা, মুক্তজ্ঞান, বিজ্ঞান চেতনা ইত্যাদি মুক্তবৌদ্ধিক মনোভঙ্গির বিপক্ষে ধর্মপ্রবণ ব্যক্তিগণ দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে। তাই ধর্ম অনেকাংশেই মানুষের মানবিক বিকাশকে সমর্থন করে না; মুক্তবুদ্ধি, জ্ঞানচর্চা, উদারতা, সহানুভূতিশীলতা, মানবিকতা প্রভৃতির প্রসার-প্রচারকে অনেকাংশেই সীমিত করে তোলে। তিনি জানেন সমাজের যথার্থ মুক্তি ঘটে একমাত্র বস্তুবাদী দর্শনের চর্চাতেই। নিজের প্রান্তিক জীবনের সাধারণ কয়েকটি ঘটনাতেই তিনি বুঝে নিয়েছেন তার ও তার সমাজের আচরিত ধর্মের স্বরূপ। ক্রমাগত গ্রন্থ পাঠে বুঝে নিয়েছেন এর কারণাবলী। এই অন্ধকারাচ্ছন্নতার বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট। তাই তিনি অনবরত প্রশ্নবাণে দগ্ধ করেছেন তথাকথিত সমাজপিতা ও তাদের আচরিত-প্রচারিত ধর্ম ও দর্শনকে।

ফিলোসফি শব্দটি এসেছে ‘ফিলোসফিয়া’ শব্দটি থেকে। ফিলোসফি শব্দটির ইংরেজি ভাবার্থ ‘জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ’। সংস্কৃত ‘দর্শন’ শব্দটির আপাত অর্থ ইন্দ্রিয়জ ‘দেখা’। কিন্তু যখন ‘বিদ্যা’ অর্থে প্রযুক্ত হয় তখন আর তা চাক্ষুষ দেখায় সীমাবদ্ধ থাকে না। চোখ দিয়ে দেখার সীমাবদ্ধতা পেড়িয়ে দার্শনিকরা যখন শুধু মন নয় বুদ্ধি ও চিন্তা দিয়েও দেখা শুরু করলেন তখন থেকেই ‘দর্শন’ শব্দটি লাভ করলো নতুন অভীধা। দর্শন ও জিজ্ঞাসা মোটেই পরস্পরবিরোধী নয়। বরং শব্দ ও চেতনাদ্বয় সবসময়ই পরস্পরের সম্পূরক হিসেবে কাজ করেছে। প্রাজ্ঞ পণ্ডিত আরজ আলি মাতুব্বরও অজস্র জিজ্ঞাসায় প্রতিনিয়ত বিক্ষত হয়েছেন। এলোমেলোভাবে উদয় হওয়া প্রশ্নধারা তাকে অকুল চিন্তা সাগরে ভাসিয়ে নিয়েছিল। তিনি দেখেছেন তাঁর জীবনে বিরক্তির উদ্রেগ করা একাধিক সমস্যার মূলে ছিল তার সমাজে আচরিত ও প্রতিষ্ঠিত ধর্ম। স্বধর্মের কারণেই তাকে একাধিকবার বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। ১৩৫৮ সালের ১২ জ্যৈষ্ঠ তারিখে বরিশালের ল ইয়ার ম্যাজিস্ট্রেট ও তবলিগ জামাতের আমির এফ রহমান আরজ আলিকে জামাতভুক্ত হবার প্রস্তাব দেন। তিনি সরলমনে জিজ্ঞাসা করেছিলেন-“ধর্মজগতে এরূপ কতগুলি নীতি, প্রথা, সংস্কার ইত্যাদি এবং ঘটনার বিবরণ প্রচলিত আছে, যাহা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নহে এবং এগুলি দর্শন ও বিজ্ঞানের সাহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ নহে, এমনকি অনেকক্ষেত্রে বিপরীতও বটে। ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞান এই তিনটি মতবাদের সমন্বয় সাধনের উদ্দেশ্যে চিন্তা করিতে যাইয়া আমার মনে কতগুলি প্রশ্নের উদয় হইয়াছে এবং হইতেছে। আমি ঐগুলি সমাধানে অক্ষম হইয়া এক বিভ্রান্তিকর আঁধার কূপে নিমজ্জিত হইয়া আছি। আপনি আমার প্রশ্নগুলির সুষ্ঠু সমাধানপূর্বক আমাকে সেই বিভ্রান্তিকর আঁধার কূপ হইতে উদ্ধার করিতে পারিলে আমি আপনার জামাতভুক্ত হইতে পারি।” কিন্তু পশ্চাৎপ্রবণ করিম সাহেব এর উত্তর দিয়েছিলেন আরজ আলিকে গ্রেফতার করে। আরজ আলির প্রশ্নের বিপরীতে ঈশ্বরের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা করেননি। আদালত তাঁর প্রশ্নগুলোকে অপরাধ মনে করেনি কিন্তু প্রশ্নগুলির ব্যাখ্যা তৈরী করতে গিয়েই রচিত হয়ে যায় ‘সত্যের সন্ধান’ গ্রন্থটি। গ্রন্থটি যখন ছাপাখানায় ছিল তখন জনৈক পীরের আদেশ এসেছিল এর ছাপানো বন্ধ করতে এবং যা ছাপা হয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে ফেলতে। চুয়াত্তরের কোনো এক সময় মাদ্রাসার ছাত্ররা হত্যার উদ্দেশ্যে আরজ আলিকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল। ধর্মবাদী ব্যক্তিগণের এইসব অপচেষ্টা প্রত্যেকবারই মুক্তবুদ্ধির মানুষদের সক্রিয় অংশগ্রহণে বিফল হয়ে গিয়েছিল। ’৭১ এ স্বাধীনতার পর তিনি এবং তার সুহৃদরা পরম বিস্ময় ও আতংকের সাথে দেখছিলেন গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের পতাকাবাহী দেশটিতে ক্রমাগত সিরাত ও কিরাত মাহফিলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়, সরকারী উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামিক ফাউন্ডেশন, মুক্তিযুদ্ধের মহান নেতা সগৌরবে উপস্থিত হয় ইসলামী সম্মেলন সংস্থায়। আরজ আলি বিশ্লেষক মুহম্মদ শামসুল হক এর ভাষায়- “ইসলামী সম্মেলন সংস্থায় জাতীয় নেতার সগৌরব উপস্থিতি আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতায় নতুন মাত্রা যোগ করে বুকের ভেতরটায় কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়।”

আরজ আলি দেখেছেন দাবীকৃত শান্তিবাদীরাই তার জীবনে যতো অশান্তির মূল। তাই অমানবিকতা, আক্রমণপ্রবণতা, অজ্ঞতা, কুসংস্কারপ্রবণতা, ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদ এসবের বিরুদ্ধে তার নৈতিক অবস্থান অনেকের তুলনায় অনেক দৃঢ় ছিল। ধর্মপ্রাণ মার মৃত্যুর পর আরজ আলি তার স্মৃতি সংরক্ষণ করতে চেয়েছিলেন। এজন্য পেশাদার ফটোগ্রাফার দ্বারা মৃত মায়ের ছবি তুলিয়েছিলেন। ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী প্রাণীর ছবি তোলা মহা অপরাধ। বর্তমান কালের ধর্মবাদী ব্যক্তিরা একথা স্বীকার করতে না চাইলেও আরজ আলির মুরুব্বীরা ভণ্ড হতে চাননি। তাই ছবি তোলার অপরাধে মৃত মায়ের সৎকারে তাকে সহায়তা করেননি। ধর্মীয় নীতিবোধের দিক থেকে সমাজনেতারা কোনো ভুল করেননি। কিন্তু অবুঝ আরজ আলি ধর্মীয় বিধানের কঠোর অর্গল মেনে নিতে পারেননি। ক্রমাগত গ্রন্থপাঠে বুঝে নিতে চেয়েছেন মানবতাকে অপমান করার উৎস ও অনুষঙ্গসমূহকে। চেতনার বন্ধ দরজায় অনবরত আঘাত করে তিনি পরিস্কার করতে চেয়েছেন হাজার বছরে জমে ওঠা প্রতিটি শ্যাওলাকে। তার শ্রম বিফলে যায়নি।

সমকালে নিজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার ইচ্ছা আর নিজস্ব নেই। স্বাধীনতা শব্দটি তার অন্তর্নিহিত অর্থ হারিয়ে ফেলেছে। মানুষ এখন ইচ্ছাকৃত পরাধীন থাকতে চায়। মানুষ মনে করে মানুষ নিজে নিজে স্বাধীন থাকতে পারে না। খারাপ কিছু করে ফেলতে পারে। তাই তারা তাদের সমস্ত স্বাধীনতা বিসর্জন দেয় প্রথা, আইন, রাষ্ট্র, নিয়ম, ধর্ম, নীতি, আদর্শ ইত্যাদির কাছে। তারা মনে করে একমাত্র কঠোর আচরণ বা শাসনই মানুষকে সৎ হিসাবে তৈরী করে। ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায়’ কবির এই কথাটি সমকালে অপমানিত হয়। বাস্তবে প্রত্যেকেই আজ স্বাধীনতাহীনতায় বাঁচতে চায়।

প্রতিটি দর্শন ভবিষ্যত সম্পর্কে যা বলে তা মূলত স্বপ্ন। প্রতিটি মতবাদ ভবিষ্যত সম্পর্কে যা ভাবে তা কল্পনা। আমাদের কল্পনাগুলি যে সমাজের স্বপ্ন দেখায় তা যেন কত সুদূর। এই সামাজিক উপলব্ধি আমাদের মতো আরজ আলিকেও প্রতিনিয়ত তাড়িত করতো। তিনি বুঝতে পেরেছেন বর্তমান সামাজিক কাঠামোয় সন্তুষ্ট থাকা চলে না। কারণ সমকালীন সমাজে মানুষ আর মানুষী রূপ ধরে বেঁচে নেই। তারা নির্ধারিত জীবন কাঠামোয় অনবরত অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। এই আরোপিত যান্ত্রিকতা ভাঙতে হবে। মানুষকে বুঝিয়ে দেয়া দরকার সত্যিকার জীবনচেতনার সরল অংকটি। তাই তিনি সরাসরি প্রশ্ন করেছেন। সমাজনেতা, ধর্মনেতাদের কাছে জানতে চেয়েছেন অসংখ্য সমস্যার যৌক্তিক সমাধান। ‘আমি কে?’, ‘আমি কি স্বাধীন?’ ‘অশরীরী আত্মার কি জ্ঞান থাকিবে?’, ‘আল্লাহর রূপ কি?’, ‘ঈশ্বর কি স্বেচ্ছাচারী না নিয়মতান্ত্রিক?’, আল্লাহ ন্যায়বান না দয়ালু?’, ‘আল্লাহর অনিচ্ছায় কোন ঘটনা ঘটে কি?’, ‘সৃষ্টি যুগের পূর্বে কোন যুগ?’, ‘ঈশ্বর কি দয়াময়?’, ‘জীবসৃষ্টির উদ্দেশ্য কি?’ ‘পাপ-পূণ্যের ডায়রী কেন?’, ‘পরলোকের সুখ-দুঃখ শারীরিক না আধ্যাত্মিক?’, ‘গোর আজাব কি ন্যায়সঙ্গত?’, ‘ইহকাল ও পরকালে সাদৃশ্য কেন?’, ‘আল্লাহ মানুষের পরিবর্তন না করিয়া হেদায়েতের ঝঞ্ঝাট পোহান কেন?’, ‘উপাসনার সময় নির্দিষ্ট কেন?’, ‘নাপাক বস্তু কি আল্লাহর কাছেও নাপাক?’, ‘উপাসনায় দিগনির্ণয় কেন?’, ‘মেয়ারাজ কি সত্য না স্বপ্ন?’, ‘ইসলামের সহিত পৌত্তলিকতার সাদৃশ্য কেন?’, ‘জীবহত্যায় পূণ্য কি?’, ‘মানুষ ও পশুতে সাদৃশ্য কেন?’, ‘আকাশ কি?’, ‘দিবা-রাত্রির কারণ কি?’, ‘বজ্রপাত হয় কেন?’, ‘রাত্রে সূর্য কোথায় থাকে?’, ‘আদম কি আদি মানব?’, ‘হজরত মুসা সীনয় পর্বতে কি দেখিয়াছিলেন?’, ‘হজরত সোলায়মানের হেকমত না কেরামত?’, ‘যীশু খ্রীস্টের পিতা কে?’, ‘জ্বীন জাতি কোথায়?’, ‘স্ত্রী ত্যাগ ও হিলা প্রথার তাৎপর্য কি?’ ধর্ম ও ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষঙ্গ প্রসঙ্গে এসব প্রশ্ন সহজাত। একজন প্রশ্নপ্রবণ, যুক্তিবাদী, শিক্ষিত, মানবিক ও উদার ব্যক্তির মনে এসব প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক। কিন্তু সময়, সমাজ, রাষ্ট্র অর্থাৎ আইন মানুষের এইসব সাধারণ কৌতুহলকে কঠোরভাবে দমন করতে চায়। রাষ্ট্র যেন মানুষের মানবিক রূপের চাইতে স্বাধীনতাহীন যান্ত্রিক রূপটিকেই অধিকতর সমর্থন করে। তাই আমাদের আজ সিদ্ধান্ত নেবার সময় এসেছে। আমাদের দৃঢ় স্বরে উচ্চারণ করা উচিত কোন দর্শন সামাজিক পরিবর্তন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে সক্রিয় হয়েছে আর কোন দর্শন সচেষ্ট থেকেছে সামাজিক পরিবর্তনকে বিঘ্নিত করতে।

তিনি জানেন সমস্যাটা কোথায়? তাই কিছু সচেতন উপলব্ধিও তাঁর ছিল। যে পশ্চাৎপদ সামাজিক সিদ্ধান্ত তাঁকে বিরক্ত করতো তার প্রতিও তিনি সচেতন ছিলেন। তিনি বলেছেন- “মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা মিটাইতেছে বিজ্ঞান। আপনি যদি বিজ্ঞানের দান গ্রহণে অমত করেন, তাহা হইলে আকাশের দিকে তাকান, ঘড়ির দিকে নয়। আপনি যদি বিজ্ঞানের দান গ্রহণ করিতে না চাহেন, তাহা হইলে যানবাহনে বিদেশ সফর ও জামা-কাপড় ত্যাগ করুন এবং কাগজ-কলমের ব্যবহার ও পুস্তক পড়া ত্যাগ করিয়া মুখস্থ শিক্ষা শুরু করুন। ইহার কোনটি করা আপনার পক্ষে সম্ভব? বোধহয় একটিও না। কেননা মানব জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বিজ্ঞানের দান অনস্বীকার্য। টেলিগ্রাফ, টেলিফোন হইতে শুরু করিয়া দেশলাই ও সুচ সুতা পর্যন্ত সবই বিজ্ঞানের দান। বিজ্ঞানের কোন দান গ্রহণ না করিয়া মানুষের এক মুহূর্তও চলে না। মানুষ বিজ্ঞানের কাছে ঋণী। কিন্তু সমাজে এমন একশ্রেণীর লোক দেখিতে পাওয়া যায়, যাঁহারা হাতে ঘড়ি ও চক্ষে চশমা আঁটিয়া মাইকে বক্তৃতা করেন আর ‘বস্তুবাদ’ বলিয়া বিজ্ঞানকে ঘৃণা ও ‘বস্তুবাদী’ বলিয়া বিজ্ঞানীদের অবজ্ঞা করেন। অথচ তাঁহারা ভাবিয়া দেখেন না যে, ভাববাদীরা বস্তুবাদীদের পোষ্য। বিজ্ঞান মানুষকে পালন করে। কিন্তু ধর্ম মানুষকে পালন করে না, বরং মানুষ ধর্মকে পালন করে এবং প্রতিপালনও।” তিনি তাঁর ‘অনুমান’ গ্রন্থের ‘রাবণের প্রতিভা’, ‘ফেরাউনের কীর্তি’, ‘ভগবানের মৃত্যু’, ‘আধুনিক দেবতত্ত্ব’, ‘মেরাজ’, ‘শয়তানের জবানবন্দী’ প্রভৃতি প্রবন্ধে অনুসন্ধিৎসু ও বিজ্ঞানপ্রবণ মন নিয়ে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন আমাদের বিশ্বাসের স্বরূপ। তিনি দেখিয়েছেন আমাদের চিন্তার যৌক্তিক অসারতা। ‘সৃষ্টি রহস্য’ গ্রন্থে মানুষ ও প্রকৃতি সম্পর্কে সারা পৃথিবীতে প্রচলিত একাধিক সৃষ্টিতত্ত্ব আলোচনা করেছেন। তিনি বুঝেছেন সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে চৈনিক মত, মিশরীয় মত, ফিনিসীয় মত, ব্যাবিলনীয় মত, অস্ট্রেলিয়া-আফ্রিকা-আমেরিকার আদিম অধিবাসীদের মত, পলিনেশীয় মত, বৈদিক ধর্ম, পার্সি ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টিয় ধর্ম, ইসলাম ধর্ম প্রভৃতির মত পরস্পরের চাইতে আলাদা। সেমেটিক ধর্মগুলোর (ইহুদি, খ্রিস্টিয়, ইসলাম) সৃষ্টিতত্ত্ব প্রায় একই হলেও পরবর্তী ধর্মটি পূর্ববর্তীর তুলনায় নিজেরটাই সঠিক বলে ভেবেছে এবং পূববর্তী ধর্ম সম্পর্কে নিন্দামুখী ও আক্রমণাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করেছে। দার্শনিক মতের সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কেও তাঁর কৌতুহল ছিল। থেলিস, অ্যানাক্সিমান্ডার, পিথাগোরাস, জেনোফেনস, হিরাক্লিটাস, এরিস্টটল, এম্পিডোকলস, অ্যানাক্সাগোরাস, ডেমক্রিটাস, লিউকিপ্পাস, সক্রেটিস, প্লে¬টো, অ্যারিস্টটল প্রমূখ প্রদত্ত সৃষ্টিতত্ত্ব সম্বন্ধেও তাঁর সচেতন জ্ঞানপিপাসা ছিল।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন তিনি। তারপরও দাবিকৃত শিক্ষিতজনদের চাইতে তিনি অনেক বেশি শিক্ষিত ছিলেন। মননশীলতার অসাধারণ সৌকর্যছটায় আমাদের সামনে দাঁড় করিয়েছেন যে প্রশ্নধারা তা আজ মহাসত্যে পরিণত হয়েছে। সামাজিক দৃষ্টিতে অশিক্ষিত কিন্তু স্বশিক্ষায়, প্রজ্ঞায়, মননে, বুদ্ধিবৃত্তিতে বাঙালি জাতির উজ্জ্বল এই নক্ষত্রটির নাম আরজ আলি মাতুব্বর। বাংলা ১৩৯২ সালের ৩ পৌষ জন্ম নেয়া এই ব্যক্তিটি অর্থকষ্টে ভুগেছেন সারাজীবন। তারপরও গ্রন্থের সংস্পর্শ থেকে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত দূরে থাকেননি। তিনি জন্ম নিয়েছেন বরিশাল শহর থেকে ছয় মাইল উত্তর-পূর্ব দিকে কীর্তনখোলা নদীর পশ্চিম তীরে লামচরি নামক এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানে কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালয় ছিলনা। তাই মুন্সি তাহের আলীর মক্তবে আরজ আলির শিক্ষাজীবন শুরু হয়। মুন্সি আব্দুল করিম, মুন্সি আফছার উদ্দিন প্রমূখের কাছে কোরানীয় শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তাতে আরজ আলির জ্ঞানতৃষ্ণা মেটেনি। অর্থাভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগও আর তাঁর জীবনে ঘটেনি। নিজের ভাষায় তিনি ছিলেন ‘আজীবন পল্লীবাসী’, পেশায় ‘খাঁটি কৃষক’, জীবনের অধিকাংশ সময়ই তাঁর ‘সহচর ছিল গরু’। তিনি ছিলেন ‘ইংরেজী ভাষায় অদ্বিতীয় মূর্খ’, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল ‘সেকালের পাঠশালার দ্বিতীয় শ্রেণী’ পর্যন্ত। সেই তিনিই নিজের ভিতরে লালন করেছেন একটি চিরপ্রজ্জ্বল দীপশিখা যার নাম ‘মুক্তবুদ্ধি’।

একা একাই তিনি অন্যদের ফেলে দেয়া বই, ছেঁড়া কাগজ, বাজারের ঠোঙা পড়ে পড়ে বাংলা পড়তে ও লিখতে শিখেছেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে বই সংগ্রহ করে শিখেছেন ভূগোল, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, দর্শন, ব্যাকরণ। ইসলামের গন্ডী পেরিয়ে রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, মনসামঙ্গল, মনুসংহিতা পড়েছেন, লাভ করেছেন সনাতন ধর্ম সম্পর্কে প্রভূত জ্ঞান। ক্রমাগত মানসিক দিগন্ত প্রসারিত করার এক অদম্য নেশায় পেয়ে বসেছিল তাঁকে। তাঁর কৌতুহলী মনের সামনে সব সময়ই একটি প্রশ্ন ‘কেন’ তাকে দাঁড় করিয়েছে এক মহাকালিক সমাধানের সামনে।

মৃত মায়ের ছবি তোলার কারণে যে সময়ে ধর্ম ও সমাজনেতাদের কাছে তিনি অপরাধী সাব্যাস্ত হন সেসময় তিনি স্বপাঠ প্রক্রিয়ায় দশম শ্রেণীর পাঠ্যবই পড়ছিলেন। সমসাময়িক সময়েই তিনি দিন-রাত, জোয়ার-ভাটা, শীত-গ্রীষ্ম, বজ্র-বৃষ্টি, ভূমিকম্প প্রভৃতি প্রকৃতি বিজ্ঞান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে করতেই যুক্তিবাদী হয়ে উঠছিলেন। প্রায় প্রতিটি বিষয়েই প্রশ্ন করা এবং তার বিজ্ঞান সম্মত উত্তর খোঁজা তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। মৃত মায়ের ফটো তোলা কেন্দ্রিক ঘটনায় তাঁর অনুসন্ধিৎসু মন দৃষ্টি ফেরালো ধর্মের দিকে। এবার তিনি সচেতনভাবে শুরু করলেন বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের গ্রন্থপাঠ। অসংখ্য দার্শনিক প্রশ্ন তাঁকে এক নতুন পৃথিবীর সন্ধান দিল।

প্রচলিত অর্থে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন। কিন্তু অনেক শিক্ষিতজনের চাইতেও তাঁর দৃষ্টি স্বচ্ছ ও গভীর ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানগর্বী আমাদের মননে আঘাত করে অশিক্ষিত(?) আরজ আলি মাতুব্বর দেখিয়ে দিয়েছেন মুক্তবুদ্ধি কিংবা যুক্তিবাদী হওয়ার জন্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রীধারী হওয়ার প্রয়োজন পড়েনা। তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। তাই তিনি বুঝেছেন, “শাহ ছাহেবদের ‘কালাম’এর তাবিজে কৃমি পড়ে না, কৃমি পড়ে স্যান্টোনাইন সেবনে। মানত-সিন্নিতে জ্বর ফেরে না, জ্বর ফেরাইতে সেবন করিতে হয় কুইনাইন। লোকে বিশ্বাস করিবে কোনটি? নানাবিধ রোগারোগ্যের জন্য পীরের দরগাহ হইতে হাসপাতালকেই লোকে বিশ্বাস করে বেশি। গর্ভিনীর সন্তান প্রসব যখন অস্বাভাবিক হইয়া পড়ে, তখন পানিপড়ার চেয়ে লোকে বেবী ক্লিনিকের (Baby Clinic) উপর ভরসা রাখে বেশী।” এই সচেতন অনুভূতির জন্য তাঁকে ভুগতেও হয়েছিল। ধর্মবাদী ব্যক্তিগণ তাঁকে তাড়া করেছে জীবনভর। তবুও তিনি নিজ অবস্থান থেকে সরে আসেননি। বিজ্ঞান অনুসন্ধিৎসু মন দিয়ে যা বুঝেছেন তার পক্ষে নিজ অবস্থান অনড় রেখেছেন।

প্রচলিত ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা তিনি পাননি। তারপরও তিনি তাঁত, ডায়নামো, জলঘড়ি, জলকল প্রভৃতি যন্ত্র তৈরী করতে পেরেছিলেন। ‘সীজের ফুল’ নামক একটি কাব্যগ্রন্থও রচনা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর মনীষা ও প্রজ্ঞার চরম প্রকাশ ঘটেছে ‘সত্যের সন্ধান’, ‘সৃষ্টি রহস্য’, ‘অনুমান’, ‘আমার জীবন দর্শন’ প্রভৃতি গ্রন্থগুলিতে। এই গ্রন্থগুলিতেই তিনি কুসংস্কার ও পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে এক মৌনবিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। অন্যদের মত চীৎকার করে নয়; তাঁর স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্যে, বিনম্র, ধীর, শান্ত ও যুক্তিবাদী ভঙ্গীতে।

তিনি দেখেছেন আমাদের সমাজের মানুষেরা চিন্তায় স্থবির, জিজ্ঞাসাবিমুখ। তাঁরা হাজার বছর অতীতের বৈদেশিক নিয়মনীতিকেই সঠিক মনে করে। স্বদেশী চেতনা, মর্মবোধ, নীতি, সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁরা পোষণ করে এক অজ্ঞ বিমুখতা। এটা যে কুসংস্কার প্রবণতার ফল সে সম্বন্ধে আরজ আলি মাতুব্বরের কোন সন্দেহ ছিল না। ক্রমাগত গ্রন্থপাঠে তিনি বুঝে নিয়েছেন এই সামগ্রিক স্ববিরোধীতার উৎসসমূহ।

প্রচলিত অর্থে তিনি নতুন কোন দার্শনিক তত্ত্বের সৃষ্টি করেননি। কোন মৌলিক তত্ত্ব উদ্ভাবনের চেষ্টাও তিনি করেননি। কিন্তু আমাদের চোখে আঙ্গুল দিযে দেখিয়ে দিয়েছেন কোন দার্শনিক মতকে কিভাবে গ্রহণ করতে হয়, কোনটি অধিকতর যুক্তিযুক্ত, কোনটি তুলনামূলকভাবে মানবীয়, কোনটি সর্বাপেক্ষা বিজ্ঞানচেতনাসম্পন্ন। তিনি এ সমাজের অজ্ঞান মানুষদের বৌদ্ধিক পুষ্টির অভাব দূর করতে চেয়েছিলেন। তাই শুধু প্রশ্নই করেননি। প্রশ্নের পাশাপাশি তাঁর প্রশ্ন করার কারণ, পদ্ধতি, বিশ্লেষন ও সমাধানের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। তিনি তাঁর সচেতন অর্থাৎ যুক্তিপ্রবণ মন দিয়ে যা দেখেছেন, মনে করেছেন, বুঝেছেন তা দ্বিধাহীনভাবে প্রকাশ করেছেন। কখনো কখনো পরস্পরবিরোধী মতগুলোর তুলনাও করেছেন কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত দেননি। সমস্ত তথ্য ও তত্ত্ব তুলে ধরে প্রত্যাশা করেছেন পাঠকের বুদ্ধিপ্রভাবিত আলোকিত চিন্তার। কামনা করেছেন সুশিক্ষিত ব্যক্তিগণের মর্মদীপ্ত উপলব্ধির।

আরজ আলি মাতুব্বর এমন এক সমাজে জন্মগ্রহণ করেছেন যে সমাজ অন্ধকারাচ্ছন্ন, পশ্চাৎপ্রবণ, কুসংস্কারমুখী ও বৈদেশিক নীতির আফিমে আচ্ছন্ন। প্রতিভাবিমুখ এ সমাজে তাই আরজ আলিকে আমরা চিনিনা বা চিনলেও তাঁর সম্পর্কে পোষণ করি এক কুসংস্কার প্রভাবিত সংস্কার। মধ্যযুগে ফ্রান্সিস বেকন ইউরোপে জন্ম নিয়ে জন্ম দিয়েছেন আধুনিক যুগের। ইউরোপ তাঁকে রেনেসাঁসের অগ্রদূত বলে সম্মানীত করেছে। পণ্ডিতম্মন্য আমরা আরজ আলিকে না চিনলেও পাশ্চাত্যের আলোকিত সমাজ তাঁকে চিনতে ভুল করেনি। তাই যে সময়ে আরজ আলি তাঁর স্বদেশে প্রায় অজ্ঞাত বা নিষিদ্ধ সেই সময়ে ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কের ‘Iconoclast’ পত্রিকা লিখেছে Aroj ali, ‘The insurrectionist’, দিয়েছে সক্রেটিসের মর্যাদা।

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.

The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.

This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.

4 thoughts on

  1. এত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে জানার জন্য আমাকে টর ব্রাউজার ব্যবহার করতে হচ্ছে। বাংলাদেশের সমাজ রাষ্ট্র এরকম জ্ঞানীকে সম্মান দেয় না., মূল্যায়ন করে না। সব অর্ধশিক্ষিত, হিংসুটে, বিদ্বেশ প্রচারকারী আরবীয় অপমতবাদের এদেশীয় দালালরাই সমাজে সম্মানিত। ছি! বাংলাদেশ।

Leave a comment

Your email will not be published.