নাস্তিকের লাশের সৎকার কীভাবে হবে?

Print Friendly, PDF & Email

ভূমিকা

নাস্তিকের মৃত্যুর পরে নাস্তিকের লাশ নিয়ে কি করা হবে তা নিয়ে মুমিনগনের চিন্তার শেষ নেই। একজন প্রশ্ন করলো, “ভাই, ধর্ম মানেন না ঠিক আছে, মৃত্যু তো মানেন। মানে মরবেন তো, নাকি? কোরআনে তো মৃত্যুর কথা বলা আছে, তাইলে নাস্তিকরা মরে ক্যান?”

-হ্যা ভাই, ‘নাস্তিকরা’ও মারা যায়। কথা শুনে মনে হচ্ছে, অন্যান্য সকল বিষয়ের মত মৃত্যুও মুমিন ধার্মিকগনের বাপদাদার আবিষ্কৃত বিষয়।

এই প্রশ্নের জবাবে আপনাদের সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, ইসলাম বা কোরান নাজিল হবার বহু পুর্বেও মানুষ মারা যেত, এবং দুনিয়াতে কোরান বা ইসলামের নামগন্ধ না থাকলেও মানুষ মারা যাবে। এমন নয় যে কোরানে ব্যাপারটা আল্লাপাক বলার পরেই মানুষ টপাটপ মরতে শুরু করলো, এর আগে সব মানুষ বেশ বেঁচে বর্তে খেয়ে দেয়ে আমোদফুর্তি করে যাচ্ছিল।

এমনকি মানুষ আসার আগেও প্রানীকুল মারা যেত, আবার নতুন প্রানের জন্ম হতো। মৃত্যু কোরআন বা ইসলামের আবিষ্কার নয়, অন্য কোন ধর্মেরও আবিষ্কার নয়। এটা অন্যান্য প্রাকৃতিক সুত্রের মতই বৈজ্ঞানিক সত্য। মানুষ মারা যাবে, প্রকৃতির ছেলে প্রকৃতির কাছে ফিরে যাবে। তাই মৃত্যু ঘটা মানে কোরআনের বানী সত্য হওয়া বলে ধরে নেয়া যাবে না। বরঞ্চ কোরআনই প্রকৃতির সুত্রকে মেনে নিয়েছে। বহুযুগ ধরে মানুষ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জেনেছে, জীবের মৃত্যু ঘটে। সেই কথাটিই কোরআনে এসেছে। কোরআন নতুন কিছু বলে নি, যা আগে মানুষ জানতো না। এপর্যন্ত কোন নবী রাসুল পয়গম্বর আল্লার বান্দা আল্লার তেলেসমাতি কুদরতে প্রকৃতির এই সুত্রকে কলা দেখিয়ে বেঁচে নেই। আল্লাহ যদি এরকম ঘটিয়ে দেখাতো, তাহলে বোঝা যেতো, আল্লাহ প্রাকৃতিক সূত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। উলতে দিতে পারে। মানে, আল্লাহ প্রকৃতির চাইতেও ক্ষমতাবান। কিন্তু তা তো দেখানো হয় নি। আগেই মানুষ যা জানতো, সেই কথাটিই বলে ক্রেডিট নেয়ার চেষ্টা করেছে।

ধরুন, আমি যদি বলি, তুমি ঘুমালে চোখে দেখবে না। এই কথাটি এমন কোন নতুন কথা নয় যে, আগে মানুষ জানতো না, আমি বলার পরেই সবাই জানলো! যদি আমি এমন কাউকে দেখাতে পারতাম, যিনি ঘুমিয়েও চোখে দেখেন, সেটি হতো অস্বাভাবিক দাবী।

লাশ কবর দেয়া কি ইসলামের আবিষ্কার?

লাশ কবর দেয়া ইসলামের আবিষ্কার নয়। কারণ মুহাম্মদের কাছে ইসলাম আসার বহু আগে থেকেই লাশ কবরে দেয়ার প্রথা প্রচলিত ছিল। সেই প্রাচীনকাল থেকেই লাশ কবরে দেয়া, পানিতে ভাসিয়ে দেয়া কিংবা আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার প্রথাগুলো সমাজে মানুষ করে এসেছে। সেই সাথে, প্রিয়জনের লাশের কাছে মৃত ব্যক্তির প্রিয় কোন পোশাক, প্রিয় কোন খাবার, বা গয়না, বা অস্ত্র, এগুলো প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ রেখে আসতো। Taforalt হচ্ছে সবচাইতে প্রাচীনতম কবরস্থান। সেই গুহাযুগের মানুষও মৃতদেহ দূরে কোথাও রেখে আসতো। এছাড়াও অনেক প্রানীর মধ্যেও এই ধরণের প্রথা লক্ষ্য করা যায়। তারা তাদের বন্ধু, আত্মীয় স্বজন বা প্রিয়জনের মৃত্যুতে শোক পালন করে, এবং লাশটিকে বিদায় জানায়। আফ্রিকান হাতিদের মধ্যে এটি স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। [1]

রোনাল্ড কে. সিগল লিখেছেন: “যখন মৃত হাতিদের সৎকারের বিষয়টি আসে, হাতিরা প্রায়ই তাদেরকে কাঁদা, মাটি ও পাতা দিয়ে সমাধিস্থ করে। হাতিরা হাতি ছাড়াও গণ্ডার, মহিষ, গরু, বাছুর এবং এমনকি মানুষকেও এভাবে সমাধিস্থ করে। হাতিদেরকে প্রচুর পরিমাণে ফল, ফুল এবং রঙ্গিন পাতা দিয়েও মৃতদেহকে সৎকার করতে দেখা গেছে।”[2]

শিম্পাঞ্জীদের মধ্যেও নিজেদের দলের কোন সদস্যের মৃত্যুতে প্রথাগত আচরণ করতে দেখা যায়। এই আচরণগুলো শুরু হয় দলের বা কোন সদস্যের নীরবতার মধ্য দিয়ে। তারা চুপ করে থেকে মৃতকে শ্রদ্ধা জানায়। আবার কিছু হাতি নির্দিষ্ট কিছু শব্দ উচ্চারণ করে। এরপর এরা মৃতদেহকে সজ্জিত করে, এরপর একে একে পবিত্রতার সহিত মৃতদেহকে দেখতে আসে, এবং মৃতদেহের দিকে তাকায়। এরা মৃতের প্রতি শোক প্রদর্শন করে, এবং এদের মধ্যে দুঃখের গোঙ্গানির স্বর শোনা যায়। [3]

হাতি ও শিম্পাঞ্জি ছাড়াও ডলফিনদেরকেও মৃতের প্রতি আলাদাভাবে মনোযোগী হতে দেখা গিয়েছে। ডলফিনকে কয়েকদিন যাবৎ মৃত সদস্যের সাথে থাকতে দেখা যায়, আর ডুবুরীদের কাছাকাছি আসতে তারা বাধা দেয়। [4]

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলাম আবির্ভাবের পূর্বে মুহাম্মদের পিতামাতার লাশ দিয়ে কী করা হয়েছিল? মুহাম্মদের নিজেরই হাদিস রয়েছে যে, তার পিতামাতা হচ্ছে জাহান্নামী। হাদিস থেকে জানা যায়ঃ

গ্রন্থের নামঃ সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
হাদিস নম্বরঃ (394)
অধ্যায়ঃ ১/ কিতাবুল ঈমান
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ৮২. কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী জাহান্নামী; সে কোন শাফায়াত পাবে না এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী বান্দার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্কও তার উপকারে আসবে না
৩৯৪। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্নিত। জনৈক ব্যাক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমার পিতা কোথায় আছেন (জান্নাতে না জাহান্নামে)? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ জাহান্নামে। বর্ণনাকারী বলেন, লোকটি যখন পিছনে ফিরে যাচ্ছিল, তখন তিনি ডাকলেন এবং বললেনঃ আমার পিতা এবং তোমার পিতা জাহান্নামে।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

গ্রন্থের নামঃ সুনানে ইবনে মাজাহ
হাদিস নম্বরঃ (1572)
অধ্যায়ঃ ৬/ জানাযা
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
পরিচ্ছদঃ ৬/৪৮. মুশরিকদের কবর যিয়ারত।
১/১৫৭২। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করেন। তিনি কান্নাকাটি করেন এবং তাঁর সাথের লোকেদেরও কাঁদান। অতঃপর তিনি বলেন : আমি আমার রবের নিকট তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দেননি। আমি আমার রবের নিকট তার কবর যিয়ারতের অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দেন। অতএব তোমরা কবর যিয়ারত করো। কেননা তা তোমাদের মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয়।
মুসলিম ৯৭৬ ;নাসায়ী ২০৩৪; আবূ দাউদ ৩২৩৪; আহমাদ ৯৩৯৫ ইরওয়াহ ৭৭২। তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

গ্রন্থঃ সূনান নাসাঈ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২১/ জানাজা
হাদিস নম্বরঃ (2038)
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ১০১/ মুশরিকের কবর যিয়ারত করা
২০৩৮। কুতায়বা (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মাতার কবর যিয়ারত করার সময় ক্রন্দন করলেন, তার আশ পাশের সবাইও ক্রন্দন করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি আম্মার মাগাফিরাতের অনুমতি চাইলাম কিন্তু আমাকে তার অনুমতি প্রদান করা হল না। অতঃপর তার কবর যিয়ারতের অনুমতি চাইলে তার অনুমতি দেওয়া হয়। তাই তোমরা কবর যিয়ারত কর, কেননা তা তোমাদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
(সহীহ। ইবন মাজাহ ১৫৭২, ইরউয়াউল গালীল ৭৭২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বেও পৌত্তলিকদের লাশ কবর দেয়া হতো। মুহাম্মদের মায়ের কবরও ছিল। তার মানে, কবর দেয়া কোন ইসলামের আবিষ্কৃত প্রথা নয়। সেই সময়ের আরবে যা প্রচলিত ছিল, মুহাম্মদ সেই প্রথাকেই নিজ ধর্মে গ্রহণ করেছেন।

ইসলামে অঙ্গদান এবং লাশের ব্যবহার

ইসলামে অঙ্গদান বিষয়ে নিষেধাজ্ঞামূলক ফতোয়া রয়েছে। ফতোয়াটি এখানে উল্লেখ করা হলো।

অঙ্গ দান করা কি জায়েজ?
প্রশ্নঃ
কেউ যদি মৃত্যু পরবর্তী সময়ে নিজের অঙ্গ যেমন- চোখ কিডনি ইত্যাদি দান করে যেতে চায় সেটা কি জায়েজ হবে? আর জীবদ্দশায় যদি কারো জীবন রক্ষার তাগিদে কোন মূল্য গ্রহণ ব্যাতিত অঙ্গ দান করতে চায় সেটা কি জায়েজ হবে?
Answered Nov 13, 2020 by মুফতী ওলি উল্লাহ
জবাব
بسم الله الرحمن الرحيم
পৃথিবীতে মানুষই সবচেয়ে মর্যাদাবান। তারাভরা আকাশ, জোছনা ভরা রাত বিছিয়ে রাখা বিস্তৃত সবুজ ভূমি সব আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি। আল্লাহতায়ালার সব সৃষ্টিই মানুষের কল্যাণে। মানুষের প্রয়োজনে।
মানবজাতিকে মর্যাদাবান করার জন্য মহান প্রভু মানুষের অবয়ব ও কাঠামোগত সৌন্দর্য, বিবেক-বুদ্ধি ও জ্ঞান-গরিমায় উন্নতি দিয়েছেন। দিয়েছেন ভাব-ভাষা ও শৈলীর শক্তি। আল্লাহতায়ালা বলেন,
لقد خلقنا الإنسان في احسن تقويم
আমি মানুষকে সুন্দরতম গঠনে সৃষ্টি করেছি। (সূরা তিন ৪)।
মানুষের মন-মনন, চিন্তা-চেতনা ও জ্ঞানের মর্যাদা প্রদানে কোরআন বলেছে,
علم الانسان ما لم يعلم
আল্লাহতায়ালা মানুষকে এমন জ্ঞান দান করেছেন যা সে জানত না। (সূরা আলাক ৫)।
আল্লাহ আরও বলেছেন,
وعلم الأمم أسماء كلها
আমি আদমকে বস্তুজগতের সব জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছি। (সূরা বাকারা ৩৩)।
সমগ্র সৃষ্টির তুলনায় মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কথা কোরআন এভাবে উচ্চারণ করছে, আমি তো মানুষকে মর্যাদা দান করেছি, জলে ও স্থলে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি, তাদের উত্তম রিজিক দিয়েছি। সৃষ্টির অনেকের ওপর আমি মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। (সূরা বনি ইসরাইল ৭০)।
পৃথিবীর ফুল ফল, বৃক্ষ-তরু-লতা, পাখ-পাখালি সব আয়োজনই মানুষের জন্য। মানুষের প্রয়োজনে সমগ্র সৃষ্টি নিবেদিত। সেই মানুষের হাড়, মাংস বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের যথেচ্ছ ব্যবহার, মানব অঙ্গ বেচাকেনা, আদান-প্রদান, কাটাছেঁড়া করা আদৌ কি মানুষের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ? নাকি চিরায়ত ধারায় মর্যাদাবান জাতি মানব সভ্যতার প্রতি অভিশাপ?
আল্লাহ তায়ালার দেওয়া অংগ প্রতঙ্গের মালিক মানুষ নয়,এগুলো সবই আল্লাহ তায়ালার প্রদত্ত আমানত।
এই জন্য চোখ বা শরীরের যেকোনো অঙ্গ জীবিত অবস্থায় বা মৃত বরনের পর দান করা শরীয়তে জায়েজ নেই।
(ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়্যা ১৮/৩৩৭ ঢাবিল,কিতাবুন নাওয়াজেল ১৬/১৯৬)
الاٰدمي مکرمٌ شرعًا وإن کان کافرًا، فإیراد العقد علیہ وإبتذالہ بہ، وإلحاقہ بالجمادات إذلالٌ لہ أي وہو غیر جائز، … وصرح في فتح القدیر ببطلانہ۔ (رد المحتار، کتاب البیوع / باب البیع الفاسد، مطلب: الآدمي مکرم شرعًا ولو کافرًا ۵؍۵۸ دار الفکر بیروت، ۷؍۲۴۵ زکریا، فتح القدیر، کتاب البیوع / باب البیع الفاسد ۶؍۳۹۰ زکریا، ۶؍۴۲۵ مصطفیٰ البابي الحلبي مصر، البحر الرائق ۶؍۸۱، الفتاویٰ الہندیۃ، کتاب الکراہیۃ / الباب الثامن عشر في التداوي والمعالجات ۵؍۳۵۴ زکریا)
মানব দেহ শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্মানিত যদিও সে কাফের হোক,সুতরাং সেগুলো ক্রয় বিক্রয়,স্থাপন ইত্যাদি তার প্রতি অসম্মান প্রদর্শন, তাই এটি নাজায়েজ,
الانتفاع بأجزاء الآدمي لم یجز۔ (الفتاوی الہندیۃ، کتاب الکراہیۃ / الباب الثامن عشر في التداوي والمعالجات ۵؍۳۵۴)
মানুষের শরীর দ্বারা ফায়দা অর্জন করা জায়েজ নেই।
مضطر لم یجد میتۃ وخاف الہلاک، فقال لہ رجل: إقطع یدي وکلہا، أو قال: اقطع مني قطعۃ وکلہا لا یسعہ أن یفعل ذٰلک، ولا یصح أمرہ بہ کما لا یسع للمضطر أن یقطع قطعۃ من نفسہ فیأکل۔ (الفتاوی الہندیۃ، کتاب الکراہیۃ / الباب الحادي عشر في الکراہۃ في الأکل الخ ۵؍۳۳۸، الفتاویٰ البزازیۃ مع الہندیۃ ۳؍۴۰۴)
যার সারমর্ম হলো কঠিন অবস্থাতেও মানুষের শরীরের অঙ্গ কেটে অন্যের শরীরে স্থাপন নাজায়েজ।
সুতরাং প্রশ্নে উল্লেখিত ছুরত “”জীবদ্দশায় যদি কারো জীবন রক্ষার তাগিদে কোন মূল্য গ্রহণ ব্যাতিত অঙ্গ দান করতে চায় সেটা জায়েজ হবেনা।
★★কেউ যদি মৃত্যু পরবর্তী সময়ে নিজের অঙ্গ যেমন- চোখ কিডনি ইত্যাদি দান করার অছিয়ত করতে চায়,তার বিধানঃ
কোন কিছু দান করার জন্য কয়েকটি বিষয় শর্ত। যথা-
১-যে বস্তুটি দান করছে সেটি মাল হতে হবে।
২-যে ব্যক্তি দান করছে সে উক্ত বস্তুর পূর্ণ মালিক হতে হবে।
اما الواهب فانهم اتفقوا على انه تجوز هبته اذا كان مالكا للموهوب صحيح الملك الخ (بداية المجتهد ونهاية المقصد للشيخ الامام ابن رشد القرطبى، كتاب الهبات-2/22)
দান করার জন্য ফুক্বাহায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হল উক্ত বস্তুটির সঠিক অর্থেই মালিক হবে। এছাড়া উক্ত বস্তু দান করা তার জন্য কিছুতেই জায়েজ নয়।
আল্লামা কাসানী রহঃ লিখেছেন-
ومن شرائط الهبة ان يكون مالا متقوما لا تجوز هبة ما ليس بمال اصلا كالحر والميتة والدم وصيد الحرم والخنزير وغير ذلك الخ (بدائع الصنائع- كتاب الهبة، واما ما يرجع الى الموهوب-5/169)
উপরোক্ত ইবারত দ্বারা একথাও পরিস্কার যে, দান করার জন্য বস্তুটির মূল্য থাকতে হবে। অমূল্য বস্তু না হতে হবে।
সুতরাং যে বস্তু মূলত মালই নয়। সেটি দান করা জায়েজ নয়। যেমন আযাদ ব্যক্তি, মৃত, হারাম শরীফের শিকারকৃত বস্তু, শুকর ইত্যাদি।
কারো জন্য কোন কিছু দান করার অসিয়ত করার জন্য উক্ত বস্তু মাল হবার সাথে সাথে এটিও শর্ত যে, উক্ত বস্তুটি অসিয়তকারীর মালিকানায় থাকতে হবে।
ফাতাওয়া আলমগীরীতে উল্লেখিত হয়েছে-
وشرطها كون الموصى اهلا للتمليك والموصى له اهلا للتمليك والموصى به يعد الموصى مالا قابلا للتمليك… الخ (الفتاوى الهندية- كتاب الوصايا، الباب الأول فى تفسير.. الخ-6/90, وايضا فى البحر الرائق، كتاب الوصايا-8/403، وكذا فى رد المحتار، كتاب الوصايا-6/649)
وفى البدائع الصنائع: واما الذى يرجع الى الموصى به فانواع منها ان يكون مالا او متعلقا بالمال لان الوصية ايجاب الملك او ايجاب ما يتعلق بالملك من البيع والهبة والصدقة والاعتاق، ومحل الملك هو المال فلا تصح الوصية بالميتة والدم من احد ولأحد لانها ليسا بمال ف ى حق احد ولا بجلد الميتة قبل الدباغ وكل ما ليس بمال.. الخ
وفيه ايضا- ومنها ان يكون المال متقوما فلا تصح الوصية بمال غير متقوم كالخمر الخ (بدائع الصنائع فى ترتيب الشرائع، كتاب الوصية-6/457)
অসিয়ত শুদ্ধ হবার শর্ত হল, অসিয়তকারী যে বস্তুর অসিয়ত করছে, সে উক্ত বস্তুর মালিক হতে হবে। সেই সাথে যে বস্তুর অসিয়ত করছে, সে বস্তুটি মালিকানা হবার যোগ্য হতে হবে।
আর যেহেতু মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ মাল নয়। না মানুষ তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মালিক। বরং সে কেবলি ভোগদখলকারী। তাই তা সে তার কোন অঙ্গকে না দান করতে পারে, না দান করার জন্য অসিয়ত করে যেতে পারে। না কারো কাছে তা বিক্রি করতে পারে।
অন্য কারো শরীরে ক্ষতি করা যেমন গোনাহ ও পাপ। তেমনি নিজের শরীরের ক্ষতি করাও গোনাহ ও পাপ। কারণ এ শরীর মানুষের নিজের মালিকনা নয়। বরং আল্লাহর মালিকনায়।
ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ ফাতহুল বারীতে লিখেছেন-
ويوخذ منه ان جناية الانسان على نفسه كجناية على غيره فى الاثم لان نفسه ليست ملكا له مطلقا، بل هى لله تعالى فلا يتصرف فيها الا بما اذن فيه (فتح البارى شرح صحيح البخارى، كتاب الأيمان والنذور، باب من حلف بملة سوى ملة الاسلام-11/539، رقم الحديث-652)
অর্থাৎ আত্মহত্যা নিষিদ্ধতার হাদীস দ্বারা এ হুকুম বের হয় যে, যে ব্যক্তি নিজে নিজেকে ধ্বংস করে বা ক্ষতিগ্রস্ত করে সে ব্যক্তি গোনাহগার। যেমন অন্য ব্যক্তিকে ধ্বংস করা বা ক্ষতিগ্রস্ত করা গোনাহ। কেননা, মানুষের শরীর ও প্রাণ তার নিজের মালিকনায় নয়। বরং এটি কেবলি আল্লাহর মালিকানাধীন। মানুষকে শুধু ভোগ দখলের অধিকার দেয়া হয়েছে। তাই সে তার শরীরকে ততটুকু ব্যবহার করতে পারবে, যতটুকু করতে সে অনুমতিপ্রাপ্ত। {ফাতহুল বারী-১১/৫৩৯}
উপরোক্ত ফিক্বহী কিতাবের পরিস্কার ইবারতের দ্বারা আশা করি এ বিষয়টি প্রতিভাত হয়ে গেছে যে, কোন ব্যক্তির জন্য তার কোন অঙ্গ প্রত্যাঙ্গ দান করার অয়িসত করার অধিকার রাখে না। কাউকে দান করারও অধিকার রাখে না। আর এভাবে মৃত ব্যক্তির অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কর্তন করার দ্বারা মৃত ব্যক্তির অসম্মান হয়ে থাকে। এ কারণেও এটি নাজায়েজ।
(আল্লাহ-ই ভালো জানেন)
————————
মুফতী ওলি উল্লাহ
ইফতা বিভাগ
Islamic Online Madrasah(IOM)

এবারে আসুন ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত থেকে একটি ফতোয়া দেখে নিই,

নাস্তিকের লাশ
নাস্তিকের লাশ

কিন্তু নাস্তিকের লাশ নিয়ে কি করা যেতে পারে?

মহাজ্ঞানী ডায়োজিনিসের কাছে একবার কিছু লোক গেল, গিয়ে বললো, “বেটা অপদার্থ, মূর্খ, তুই তো দেব দেবী মানিস না। তো মৃত্যুর পরে তোর লাশ তো শিয়াল শকুনে ছিড়ে খাবে।কেউ তো তোর লাশ পোড়াবেও না, মাটিও দেবে না।”

ডায়োজিনিস বললেন, “তো এক কাজ করো। মারা যাবার সময় আমার লাশের পাশে একটা লাঠি রেখে যেও। লাঠি দিয়ে শিয়াল শকুন তাড়ানো যাবে।”

লোকজন বললো, “আরে বেটা নাস্তিক আহাম্মক, অবিশ্বাসী উল্লুক, মারা যাবার পরে কি তোর হুশ থাকবে? তুই শিয়াল শকুন তাড়াবি ক্যামনে?”

ডায়োজিনিস বললেন, “যদি হুশই না থাকে, চেতনাই না থাকে, তাহলে শিয়ালে খাইলে কি আর শকুনে খাইলেই কিরে বেটা? পোড়াইলেই কি আর মাটি চাপা দিলেই কি? যেহেতু টেরই পামু না, এসবে কি আসে যায়?”

হ্যা, নাস্তিকের লাশ নিয়ে মুমিনগন যতটা চিন্তিত, স্বয়ং নাস্তিকগনও এতটা চিন্তিত নয়।

কি আসে যায়?

এই মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবার সাথে সাথেই আর কিছু নাই। সমস্ত স্মৃতি, এই জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা সেখানেই শেষ। আর মস্তিষ্কে পচন ধরার সাথে সাথেই পুনরায় বেঁচে ওঠার সমস্ত আকাংখারও সমাপ্তি। কষ্টকর হলেও সত্য মেনে নেয়াটাই সাহসী মানুষের কাজ।

তবে হ্যা, ব্যাক্তিগতভাবে ইচ্ছাপোষন করি, মৃত্যুর পরে এই শরীরটা কাজে লাগুক। লাশটা আমি দান করে যাবো মেডিকেল কলেজে। সেখানে ছাত্রছাত্রীরা আমার লাশ কেটে অভিজ্ঞ হবে, নিখুঁতভাবে অস্ত্রপাচারের কৌশল শিখবে।

শুধু লাশই না, এই চোখ, এবং শরীরের যাবতীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, যাই কাজে লাগে, অন্য মানুষের উপকার হয়, আমি দান করে দিয়েছি। শরীরটা নিয়ে কবরে গিয়ে হুর ছোহবতের অশ্লীল স্বপ্নের চাইতে এটা অবশ্যই ভাল মনে করি। হয়তো চোখ ছাড়া কবরে বা স্বর্গে হুরগনের অপরুপ সৌন্দর্য্য, উন্নতবক্ষ আর নিখুঁত নিতম্ব দেখতে পাবো না, বেহেশতেও ঢুকতে পারবো না, কিন্তু সেই চোখ দিয়ে কেউ না কেউ এই পৃথিবী দেখবে, এর চাইতে আনন্দের মৃত্যু আর কি হতে পারে?

আপনিও যদি আপনার শরীরকে দান করতে চান, আপনার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কাউকে দিয়ে যেতে চান, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অমরত্ব পেতে চান, এই লেখাটি পড়ুন

তথ্যসূত্রঃ

  1. Bekoff M (2009). “Grief in Animals” Psychology Today, October []
  2. Siegel RK (1980). “The Psychology of Life After Death” American Psychologist, Vol. 35(10), October pp.911-931 []
  3. Harrod, James B. (২০১৪)। “The Case for Chimpanzee Religion”। Journal for the Study of Religion, Natural and Culture8 (1): 16–25। []
  4. Ritter F (2007). “Behaviour Responses of Rough-toothed Dolphins to a Dead Newborn Calf” Marine Mammal Science April pp.429-433 []
আসিফ মহিউদ্দীন

আসিফ মহিউদ্দীন

আসিফ মহিউদ্দীন সম্পাদক সংশয় - চিন্তার মুক্তির আন্দোলন [email protected]

One thought on “নাস্তিকের লাশের সৎকার কীভাবে হবে?

  • জুন 11, 2020 at 12:47 পূর্বাহ্ন
    Permalink

    আপনার বেশ কয়েকটা লেখা পড়লাম। আপনার লেখাগুলো পড়ে একটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করতেছে। ইসলাম কি মুহাম্মদ(সঃ) এর আবির্ভাব থেকে শুরু হয়েছে নাকি রাসুল (সঃ) এর আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই ইসলামের এক্সাত্রা শুরু?
    মানুষকে বোকা বানানোর জন্য আর কত মিস-ইনফরনেশন দেবেন, বলতে পারেন?
    পৃথিবীতে আসছেন। পারলে ভালো কিছু করেন, আর না পারলে খারাপ করেন কেন??

    Reply

Leave a Reply

%d bloggers like this: