সম্পাদকীয়সংশয়বাদস্টিকি

পরমকরুণাময় এবং অসীম দয়ালু গাছাল্লাহ এবং আমার অবিশ্বাসী পাপী মন

আমাদের গলির যে রাস্তা দিয়ে বাসায় ঢুকি, একদিন দেখলাম সে রাস্তায় বিশাল এক মরা গাছ ফেলে রেখেছে কে বা কাহারা। রোজ গাছের উপর দিয়ে যাতায়াত শুরু করতে হলো, রিকশা নিয়ে আর বাসা পর্যন্ত যাবার উপায় রইলো না। এলাকার মানুষগুলোকেও দেখলাম ব্যাপারটা সম্পর্কে কেমন উদাসীন। রাস্তার মাঝে এতবড় একটা গাছ ফেলে রেখেছে, তা নিয়ে কারো কোন মাথাব্যথা নেই। এই গাছটি থাকার কারণে আসা যাওয়াতে সমস্যা হচ্ছিল, কোন মুমূর্ষ রোগীর জন্য এম্বুলেন্স ঢোকা বা আগুন লাগলে ফায়ার বিগ্রেডের ঢোকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পরেছিল। কিন্তু একটা সময়ে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, মানুষজন বেশ অভ্যস্ত হয়ে পরেছে। তারা তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে রাস্তার গাছটাকে গ্রহণ করে নিয়েছে। আরো আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, গাছটাকে নিয়ে এলাকার বাচ্চারা খেলাধুলা করতে শুরু করেছে, এবং এভাবেই গাছটা আমার এলাকায় ক্রমশ একটা চরিত্রে পরিণত হলো।

ঠিক করলাম গাছটাকে সড়াতে হবে, এভাবে চলতে দেয়া যায় না। তো এসব ভেবে চিন্তে স্ব-প্রনোদিত হয়েই শুরু করলাম আলোচনা। এলাকার মুরুব্বি, যারা এই গাছটাকে এই রাস্তায় ফেলার জন্য দায়ী এবং লাভবান, তারা স্বাভাবিক ভাবেই এই গাছের গুণকীর্তনে লিপ্ত হল। আরো আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, একটা দল দাড়িয়ে গেল গাছ রক্ষায়। গাছের নানাবিধ উপকারিতা বর্ণনা করে তারা গাছটাকে এখানেই রাখার পক্ষে রায় দিল। তারা বলল, “গাছটার জন্য যাতায়াতে অসুবিধা হচ্ছে এটা তো গাছের দোষ নয়, এটা রাস্তার দোষ এবং মানুষের দোষ! তারা গাছটাকে জনস্বার্থে ব্যবহার করতে পারছে না, এটাকে কিভাবে জনস্বার্থে ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে”।

তাদের যুক্তি দেখে মুগ্ধ হলাম, সেই অসাধারণ যুক্তিটি হচ্ছে, “মাথাব্যথার জন্যে তো মাথা কাটা যাবে না! গাছের কারণে সমস্যা হওয়াতেও গাছটি সড়ানো যাবে না! প্রয়োজনে মানুষকেই সরানো হবে।”

এই অসাধারণ যুক্তিবোধাক্রান্ত মানুষগুলোর বেশ কিছু সমর্থকও তৈরি হল, তারা জানপ্রাণ দিয়ে গাছ রক্ষায় নেমে পরলেন। বিভিন্ন দল উপদল তৈরি হতে লাগলো, কেউ গাছটাকে খেলাধুলার কাজে লাগাতে চায়, কেউ চায় ব্যায়ামের জন্য ব্যবহার করতে। তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল তৈরি শুরু করলো এবং একে অপরের সাথে তর্ক করা শুরু করলো, যে গাছটিকে আসলে কোন কাজে লাগালে বেশি ভাল হবে। তাদের ভেতরে আবার প্রায় দাঙ্গাও শুরু হবার যোগার, একে অপরকে হুমকি ধামকি দিয়ে চুপ করাতে চেষ্টা করছে, আবার আমার পক্ষে যারা আছে, গাছটি সরানোর প্রসঙ্গ আনলেই আমাদের বিরুদ্ধে এক হয়ে যাচ্ছে। কি বিশ্রী অবস্থা, এই গনহিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত লোকগুলোকে বোঝাবার সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো। তাদের বিশ্বাস গাছটি এলাকার জন্য ঈশ্বরের আশীর্বাদ স্বরূপ, কারণ এই গাছটি আসার পরে কয়েকজনার ব্যবসায় লাভ হয়েছে, কয়েকজনার আবার বহু পুরাতন বাতের ব্যথা সেরে গেছে, কয়েকজনার পাশের বাড়ির মর্জিনার সাথে প্রেম হয়েছে। অনেকে তো এক কাঠি বেশি রসিক, গাছটার বাকল তাবিজ বানিয়ে পরা এবং গাছের বাকল ধুয়ে পানি খাওয়া এলাকায় জনপ্রিয় হওয়া শুরু করলো। এরমধ্যে অনেকেই বাকলের ভেতরে বিভিন্ন ভাষায় “আল্লাহ” বা “মুহাম্মদ রাসুল” বা “হরেকৃষ্ণ” লেখা দেখাও শুরু করে দিলো।

খুবই হতাশ হয়ে জনগণের কর্মকাণ্ড দেখতে লাগলাম। গাছটা হয়ে উঠলো আমার এলাকার এক নতুন পয়গম্বর, যার সম্পর্কে কোন কথাই কেউ শুনতে চাইছে না। তাদের প্রবল গাছানুভূতি অত্যন্ত মোলায়েম এবং সদা সর্বদা জাগ্রত বৃক্ষের মতই খাড়া, একটু এদিক সেদিক বললেই তারা আহত হচ্ছে। কেউ কেউ একটু বেশি হিংস্র হয়ে আমাকে গালাগালও করছে। যারা অপেক্ষাকৃত আধুনিক, তারা আবার হিংস্রভাবে গালাগালি করা লোকগুলোকে কৌশলে রক্ষা করে যাচ্ছে, তারা বলছে “হিংস্রদের গালাগালির জন্যে তো ঐ গাছটা দায়ী না। ওরা প্রকৃত বৃক্ষপ্রেমিক নয়! একজন সহিহ গাছ প্রেমিক কখনো অন্যকে গালি দেয় না।” অথচ তারা নিজেরাও জানে, ঐ হিংস্রতার পিছনে দায়ী ঐ গাছটিই। গাছটি না থাকলে এই সব হিংস্রতাও আর থাকবে না।

ধীরে ধীরে গাছটি হয়ে উঠলো এলাকার একমে বা দ্বিতীয়াম সর্বশক্তিমান পরমকরুণাময় আল্লাহ তালাহ। আসমানের আল্লাহ যেভাবে লাফ দিয়ে ভাল কিছুর কৃতিত্ব দাবী করে, এবং খারাপ হলে সব দায় মানুষ বা শয়তানের কাঁধে চাপিয়ে সটকে পরে, এই গাছটিও সেই চরিত্র অর্জন করলো। আসলে আসমানের আল্লাহ আর এই মরা গাছটার ভেতরে কোন গুনগত পার্থক্যই নেই, উভয়ই কর্মক্ষমতাহীন, ভালমন্দ কিছু করার যোগ্যতা কারো নেই। প্রার্থনা শোনা বা প্রার্থনা শুনে সেই মত কাজ করার কোন ক্ষমতাই গাছটির নেই, আসমানের খোদাতালাহর মতই। প্রার্থনা করলেও যেই ৫০% সম্ভাবনা থাকে সফল বা বিফল হবার, না করলেও ঠিক একই পরিমাণ সম্ভাবনা থাকে। অথচ কারো রোগমুক্তি ঘটলে বা এক্সিডেন্টে বেঁচে গেলে লোকজন নিজে থেকেই গাছাল্লাহ বা আসমানের ঈশ্বরকে কৃতিত্ব দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। এটা তারা করে মূলত নিজেকে ঐ গাছাল্লাহর প্রিয় প্রমাণ করার জন্য, অন্যের চোখে ঐ গাছাল্লাহর ঘনিষ্ঠ প্রমাণ করে সম্মান আদায়ের জন্য।

তো একরাতে কেবা কাহারা গাছটার একপাশে মলত্যাগ করে রেখে গেল। সে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়, মহাবিশ্বে বোধকরি এমন ঘৃণিত কর্ম কেউ কখনও করে নি। এলাকার মানুষের কোমল গাছানুভূতি নিয়ে এই অমানবিক আচরণ, এই ঘৃণাবাদী প্রয়াস রীতিমত উন্মাদনা সৃষ্টি করলো। “নাড়ায়ে তকবীর গাছাল্লাহো আকবর” ধ্বনিতে গ্রুপ উপগ্রুপের সদস্যরা একে অপরের উপরে ঝাঁপিয়ে পরতে লাগলো। একদল আরেকদলকে এই কাজের জন্য দায়ী করলো এবং এরপর থেকে একদল আরেকদলকে দুচোখে দেখতে পারছিল না, তারা একে অপরকে গাছশত্রু উপাধি দেয়াও শুরু করলো। এসব দেখে শুনে হতভম্ব আমিও ভাবতে শুরু করলাম, গাছের কলেমা পড়ে এদের একটি দলে ভিড়ে যাব কিনা। কারণ ইতিমধ্যে এই গনহিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত লোকগুলো আমাকে “অসামাজিক”, “বাস্তববুদ্ধিশূন্য”, “ঘৃণাবাদী”, “নাস্তিক মৌলবাদী” আখ্যা দিয়ে ফেলেছে। আমাকে বলেছে, আমার এই গাছ সড়াবার প্রচেষ্টা নাকি “Gross and Racist”। আমি বুঝলাম না, গাছ কীভাবে একটা জাতি হয়ে গেল, যে গাছের সমালোচনাকে রেসিজমের অন্তর্ভূক্ত করা হচ্ছে! আমি রীতিমত আতংকিত, কবে তারা আমার কল্লা নামিয়ে দেয়। এবং গাছের পাশে মলত্যাগ করে ওনাদের গাছানুভূতিতে আঘাত করা লোকটা আমিই কিনা, তা নিয়েও আমাকে সন্দেহ করা শুরু হলো।

এলাকার বেশ কিছু তরুণকে অবশ্য সব বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করছিলাম জনগণকে বোঝাতে যে এই গাছের কোন অলৌকিক ক্ষমতা নেই। তবে সকলেই যে আমার পক্ষে ছিল তা নয়; আমার অনেক অনুজই বলতো, আমাকে তারা সম্মান করে বটে, তবে গাছাল্লাহ বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্যে আমাকে সমানভাবে ঘৃণাও করে। আমাদের, মানে আমার এবং আমার পক্ষের ছেলেমেয়েদের মুরুব্বি মহলে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা শুরু হয়ে গেল। এলাকার ছেলেমেয়েদের বলা হলো আমার সাথে আর না মিশতে। আমাদের বলা হল, আমরা নাকি দু’পাতা বিজ্ঞান পড়ে পণ্ডিতি করতে চেষ্টা করছি। বা আমরা নাকি ফ্যাশনের কারণে তাদের প্রিয় গাছাল্লাহর বিরোধীতা করছি। আমি নাকি সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমাদের থেকে মোটা টাকা নিয়েছি এই গাছ সড়াবার ষড়যন্ত্র করবার জন্য।
তাদের যুক্তিজ্ঞান দেখে বিমোহিত হলাম, কেউ কেউ বলতে লাগলোঃ “বিজ্ঞান কি প্রমাণ করতে পেরেছে যে এই গাছটির কোন অলৌকিক ক্ষমতা নেই?” যেন বিজ্ঞানের খেয়ে পরে কোন কাজ নাই যে কোথাকার কোন মরা গাছের অলৌকিক ক্ষমতা আছে কি নেই তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করে গবেষণায় বসবে! কি হাস্যকর কথাবার্তা!

এভাবে চলে যাচ্ছিল, মানুষজন এই গাছাল্লাহ প্রতি ক্রমশ আরো বেশি অনুরক্ত হয়ে উঠছিল। এরমধ্যে গজালো গাছের অলৌকিকত্বের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়া আরেকটা শ্রেণী, তারা বিভিন্নভাবে গাছটার শিকড় বাকড় রিং গবেষণা করে বের করে দিল, সমস্ত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারই গাছটার শিকড় বাকড়ের মধ্যে সাংকেতিকভাবে লেখা আছে, শুধুমাত্র ঈমান সহকারে বোঝার মত মানুষের অপেক্ষা।
তারা এটিও দাবী করলো, এই মরাগাছের শিকড় বাকড়ে কোন অবৈজ্ঞানিক তত্ত্বই নেই, থাকলে তা ব্যাখ্যার ভুল বা বোঝার ভুল। আমার সাথের কিছু তরুণ চেষ্টা চালিয়ে গেল ঐ বিজ্ঞানবাদী মোল্লাদের বিরুদ্ধে, তারা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তত্ব ঘেঁটে বিজ্ঞানবাদী মোল্লাদের কথা ভুল প্রমাণের চেষ্টা চালিয়ে গেল এবং মুরুব্বি মহলে যথারীতি “রক্তগরম তাই বিশ্বাস নেই” বা “ফ্যাশনের নাস্তিক” বা “সস্তাজনপ্রিয়তার লোভে হঠকারী মাথাগরম তরুণ” “পশ্চিমাদের নোবেল পাওয়ার জন্য দেশের সাথে বেইমানি” খেতাবে ভূষিত হলো।

এর উপরে মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে আবির্ভূত হলেন কিছু পোস্ট মর্ডানিস্ট এবং পোস্ট কলোনিয়ালিস্ট। পোস্ট মডার্নিস্টদের দাবী মতে, গাছাল্লার এই অলৌকিকত্বের দাবীও তারা গুরুত্ব সহকারে বিচার বিশ্লেষণ করার পক্ষপাতী এবং কোন ধরণের দাবীকেই তারা উড়িয়ে দিতে চান না। তারা এই গাছটিকে অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন বা অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন নয়, এগুলোর কোনটা বলতেই রাজি নয় এবং যেহেতু জনগণ গাছের এই অলৌকিকত্বে বিশ্বাস করছে, তারা সেটাকে সেভাবেই দেখার পক্ষপাতী। আমি তাদের বুঝালাম এই আহাম্মকির কোন মানেই নেই, এ মিথ্যা, এ এক প্রতারণা। কিন্তু তাদের কাছে সত্য মিথ্যা বলেই কিছু নেই, তারা সত্য বা মিথ্যার মানদণ্ডে কিছুকে বিচার করতে রাজি নয়। তারা সত্য মিথ্যার বাইরে থেকে ঘটনাটাকে দেখতে ইচ্ছুক এবং জনস্বার্থ ব্যাপারটাই তাদের কাছে আপেক্ষিক। অন্যদিকে পোস্ট কলোনিয়ালিস্টরা তো রীতিমত যুদ্ধংদেহী হয়ে আমাকে সাম্রাজ্যবাদের দালাল, আধিপত্যবাদী ইউরোপ আমেরিকা ইহুদী নাসারাদের চর বলেই গণ্য করলো। তাদের দাবী হচ্ছে, এই গাছটি আমাদের এলাকারই অংশ, এবং এটাকে এখান থেকে সড়াতে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা, সিআইএ, ইজরাইল এবং ভারত ক্রিয়াশীল। তারা এই কাজের জন্য আমাকে নিয়োগ করেছে এবং আমাকে রীতিমত টাকা দিচ্ছে এই গাছের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা তৈরির জন্য। তারা কিছু ঐতিহাসিক কন্টেক্সট, মেটাফোর, নানান ইন্টারপ্রেটেশন, হেজিমনি, ইত্যাদি নানান কথাবার্তা বলে বোঝাবার চেষ্টা করলেন, গাছটি যথাস্থানে থাকাই সকলের জন্য মঙলজনক। তারা শুধু কিছু ভারী ভারী শব্দ ব্যবহার করে মোল্লাদের মত একই কথা বলে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সেই কথাগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পেয়ে গেল। নির্বোধ লোকজন কথাগুলোর মাথামূণ্ডু কিছুই বুঝলো না, তবে এটা বুঝলো কথাগুলো তাদের পক্ষের। তাই মাথা ঝাকিয়ে সমর্থন জানালো। তারা হয়ে উঠলেন জ্ঞানী মানুষ, আর আমি হয়ে গেলাম অজ্ঞান, মূর্খ, মুক, বধির!

তাদেরকে বোঝালাম, আমাদের অশিক্ষা, বিদ্যুৎ সমস্যা, আমাদের স্বাস্থ্য সমস্যা, এইগুলোও তো আমাদের নিজস্ব। কিন্তু নিজস্ব বলে সেগুলোকে লালন পালনের কি অর্থ হতে পারে? এগুলো তো লালন পালন করে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ইউরোপ আমেরিকাতেও এক সময়ে এই সমস্যাগুলো ছিল এবং তারা নিজেদের বুদ্ধি ব্যবহার করে ক্রমশ এর থেকে উত্তরণের পথ বের করেছে। আমরাও কেন এই সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণের পথ না খুঁজে এই সমস্যাগুলোকে আমাদের বৈশিষ্ট্য বলে গণ্য করছি? নিজেদের ঐতিহ্য সংস্কৃতি বলে মনে করছি? এবং এই সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলা লোকদের আমেরিকার দালাল বলে উড়িয়ে দিচ্ছি! কিন্তু বৃথা চেষ্টা।

এই দুই শ্রেণীর সাথে তর্ক বিতর্কে রীতিমত বিরক্ত হওয়া শুরু করলাম, এবং বিজ্ঞানবাদী মোল্লাদের ক্রমাগত যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠলাম। এর মধ্যে কিছু “তুলনামূলকভাবে আধুনিক” আমাকে সেই গাছের অলৌকিকত্ব বোঝাবার আপ্রাণ চেষ্টা করলো, আবার কোন কোন আধুনিক এই গাছটির আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বোঝালো, কিছু বামপন্থী এসে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অশুভ চক্রান্ত, পুঁজিবাদী ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থায় মার্ক্সীয় সমাজতত্ত্বে এই গাছটির দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী গুরুত্ব আমাকে বোঝাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। তারা মার্ক্স এঙ্গেলস লেনিন স্ট্যালিন মাও সে তুঙ এর লেখা থেকে কোরানে হাফেজের মত মুখস্ত বাণী আউরাতে লাগলো, আমার অবিশ্বাসী মন এবং সোজাসাপ্টা কথাবার্তাকে তারা স্বল্পজ্ঞান সম্পন্ন বালখিল্যতা বলে প্রচার করলো, এবং আমাকে রীতিমত নাস্তিক মৌলবাদী আখ্যা দেয়া শুরু হতে লাগলো। তারা বলতে লাগলো, ঐ গাছটির সম্মান রক্ষার্থে যারা গলা কাটে, আর যারা গাছটি যারা সড়াবার কথা বলে, উভয়ই দুষ্টু। তারা বেশ নিরপেক্ষ খেতাব পেতে লাগলেন। বেশ কিছু লোক বাহাবা দিতে লাগলো। আমি বুঝলাম না, গলা কাটা আর মৌখিকভাবে কোন কিছুর বিরোধিতা করা কীভাবে সমান বলে বিবেচিত হলো!

এসব যন্ত্রণায় শেষমেষ অতিষ্ঠ হয়ে এক রাতে কয়েকজন তরুণকে নিয়ে গাছটা কেটে ছুড়ে ফেলে দিলাম আবর্জনার স্তুপে। আমার কল্লা কাটার ফতোয়া দেয়া হলো, আমাকে মুরতাদ ঘোষণা করা হলো। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কেউ ভেবেও দেখলো না, যে অলৌকিক ক্ষমতাবান ঐ গাছটির এতটুকু ক্ষমতা ছিল না যে সে আমাকে বাধা দেয়, সেটাকে কেটে টুকরা টুকরা করার সময় একবারও প্রতিবাদ করলো না সর্বশক্তিমান গাছাল্লাহ।
এই প্রশ্নটি তাদের কাছে যখন করলাম, তারা আমাকে বলতে লাগলো, ঐ গাছটি আমি মারা যাবার পরে প্রতিশোধ নেবে, মৃত্যুর পরের দুনিয়ায় সে আমার কল্লা কাটবে, আমার হাত পা কাটবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাকে গাছটি নরকের আগুনে পোড়াবে, অনন্তকাল সেখানে আমাকে মারপিট করা হবে। যাইহোক, এরপর থেকে আর রাস্তায় কোন সমস্যা থাকলো না। আমার গলিতে এখন গাড়ি ঢুকতে পারে, এম্বুলেন্স ঢুকতে পারে, ফায়ার বিগ্রেড ঢুকতে পারে। কেউ গাছটি সরাবার কাজটি করার জন্য আমাকে একবার ধন্যবাদও দিলো না, উল্টো আমি হয়ে উঠলাম জনশত্রু। কিন্তু গাছটি সরাবার সুফল সকলেই ভোগ করতে লাগলো। তাই কোন কৃতিত্ত্ব পাইনি দেখে কোন আফসোস নেই। মানুষ একটু গালমন্দ করছে করুক, কিন্তু এর সুফল তো সকলেই পাচ্ছে এবং পেতেই থাকবে।

এরপরে একদিন দেখলাম, রাস্তা বন্ধ করে গাছটি যেখানে ছিল, সেখানে একটি মাজার বানানো হচ্ছে!

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.

The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.

This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.

আসিফ মহিউদ্দীন

আসিফ মহিউদ্দীন সম্পাদক সংশয় - চিন্তার মুক্তির আন্দোলন [email protected]

Leave a comment

Your email will not be published.