মুক্তির অনুভূতি
আমার বাবা খুব ধার্মিক ছিলেন। আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়তাম আর আরবিতে কোরান তেলোয়াত করতাম। আমার মাকে তেমন ধার্মিক বলা যাবে না। মার কাছে দুপুরে শুয়ে শুয়ে কবিতা আবৃতি শুনে কবিতা মুখস্থ করেছি আর ভোরে বাবার কোরান তেলোয়াত শুনে আবেগে আপ্লুত হয়েছি। বাবা বলতেন,মেয়েদের ধর্ম খুব সহজ। শুধু ঠিক মত নামাজ পড়া আর স্বামীর আদেশ পালন করলেই হবে। পর্দার জন্য কখনো জোর করেননি। সাধারণ সালোয়ার কামিজ আর ওড়নাই পড়তাম। ধর্মীয় বই বলতে আরবী কোরান,অজিফা,মোকছদুল মোমেনিন আর নেয়ামুল কোরান পড়েছি। বাবাকে বলেছিলাম, আরবি তো বুঝি না। একটা বাংলা অর্থসহ কোরান শরিফ কিনে দাও। বাবা বলেছিলেন,বাংলা কোরান পড়লে ঈমান থাকেনা। বাংলা কোরান পড়ার দরকার নাই। আর আমার স্কুলে ছিল বিশাল লাইব্রেরি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল,সুকান্ত,শরৎচন্দ্র, সমরেশ,ফাল্গুনি আরো অনেক বই পড়েছি। রোমেনা আফাজের দস্যু বনহুরও পড়েছি। আবৃতি, বিতর্ক করতে স্যারদের সাথে অনেক জায়গায় গিয়েছি। সপ্তাহে একটা সিনেমা দেখতাম। বাবামা তেমন কোন আপত্তি করতেন না। কিন্তু অষ্টম শ্রেণি কিংবা তার কিছুটা পূর্বেই বাবা আমার বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লাগলেন। কারণ হিসেবে বাবা মাকে বলেছিলেন আমার প্রতি মাসিকের জন্য বাবাকে কাফফারা দিতে হবে (ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী)। অনেক কান্নাকাটি, ঝামেলা করে শেষ পর্যন্ত নবম শ্রেণি তে পড়া অবস্থায় বিয়ে দেয়া হল। বাবা বললেন জামাই চাইলে পড়বে না চাইলে পড়বে না। স্বামীর সাথে বহু দূরে তার কর্ম স্থলে চলে এলাম। তিনি ও ধর্মের ব্যাপারে তেমন বাড়াবাড়ি করেননি।
ধর্মীয় কারণেই আমাকে ছোট বেলায় বিয়ে দেয়া হয়েছে। যার ফলে স্বাভাবিক ভাবে পড়াশুনা হয়নি। নানা ধরণের মানসিক, সামাজিক আর শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
আমি ক্লাসে খুব ভালো ছাত্রী ছিলাম। তাছাড়া নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাইতাম। আমার মা বলতেন অর্থ উপার্জন ছাড়া মেয়েদের কোন স্বাধীনতা থাকতে পারে না। আমার মা ভাবতেন ভাইবোনদের মধ্যে আমি সবচেয়ে ব্রিলিয়েন্ট। তাই লেখা পড়া করার আগ্রহটা থেকে যায়। আমার হাজবেন্ডকে বলি। নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন হয়ে গিয়েছিল। এস এস সি পরীক্ষার নয় দিন আগে ডিসিশন নেই পরীক্ষা দিব। মানবিক বিভাগেই আমি পড়তে শুরু করে ছিলাম তাও বাবার আদেশে। বাবা বলতেন মেয়েদের সাইন্স পড়া লাগবে না। নয়দিন আগে বাবার এখানে গিয়ে পড়া শুরু করি আর পরীক্ষা দেই। অবশ্য কোন রকমে টেস্ট পরীক্ষাও দিয়ে ছিলাম। যা হউক ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করি। তিনটি লেটারও ছিল। স্কলারশিপ ও পাই। আবার হাজবেন্ডের কর্মস্থলে চলে আসি। মহিলা কলেজে ভর্তি হই। কিন্তু ক্লাস করতে পারতাম না। ফার্স্ট ইয়ার পরীক্ষা দেই। ভালই রেজাল্ট হয়। এর মধ্যে আমি কন্সিভ করি। টেস্ট পরীক্ষা দিতে পারলাম না। বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা ও মানসিক সমস্যাও ছিল। ভেবেছিলাম আর পড়ালেখা হবে না। আগেতো বাচতে হবে। পরীক্ষার দশ বার দিন আগে আমার মেয়ে জন্ম নেয়। আমার হাজবেন্ড নিজেই কলেজে গিয়ে এপ্লিকেশন করে আমার পরীক্ষা দেয়ার অনুমতি নিয়ে আসে। কিন্তু আমার শরীর সাপোর্ট করছিল না। পড়ালেখা কিছুই করি নাই। আমার মা আসলেন বুঝালেন,আমার হাজবেন্ডও বুঝালেন। মনের বিরুদ্ধে শরীরের বিরুদ্ধে গিয়ে পরীক্ষা দিলাম। তখন একদিনে দুটো পরীক্ষা হত। এখন বলতে লজ্জা নেই এত খানি সময় বাচ্চাকে ফিডিং না করায় ব্রেস্টের ব্যাথায় জ্বর আসতো জামা ভিজে যেতো। কোনো রকম থার্ড ডিভিশনে পাস করি।
রেজাল্ট খারাপ হওয়ায় পড়ালেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। আবারো ওর আগ্রহে ডিগ্রিতে ভর্তি হই। ক্লাস করতে পারতাম না। পরীক্ষার রুটিন দিলে পড়ালেখা শুরু করি। সে বার ১৬% ডিগ্রিতে পাস করে। অল্প কিছু নাম্বারের জন্য ফার্স্ট ডিভিশন পেলাম না। এই পর্যায় এসে আমি মেন্টালি শক্ত হতে থাকি। নিজের মত চলার শক্তি সঞ্চয় করতে থাকি। এরপর আমার দুই ছেলে মেয়ে জন্ম গ্রহণ করে। শ্বশুর অসুস্থ হয়ে পড়লে চার বছর কোন কিছু করা হয় নাই। এরপর বি এড করি। এখানে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হই। এবছরই চাকরি হয়। চাকরি করা অবস্থায় মাস্টার্স করি। এই হলো পড়ালেখা। আমি আর আমার ছেলেমেয়ে এক টেবিলে এক সঙ্গে পড়তাম। সংসার, চাকরি, ছেলে মেয়ে পড়ালেখার সময় পেতাম না। রাত দুইটা তিনটায় হয়ত পড়তে বসতাম। আমার শ্বশুর শাশুড়ি দেখতেন। ওনারা বলতেন ওর সাথে কিছু আছে। অর্থাৎ জ্বীনভূত আরকি।
বলে রাখি, চাকরির ব্যাপারে কেউ বাধা দেননি। বরং ও আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছে। উনি ভালো একটা প্রতিষ্ঠানের ভালো পদে ছিলেন। উনি আজ পর্যন্ত আমার বেতনের কোন টাকা নেন নাই। আমরাও কাজ ভাগ করে নেই এখনো। ছেলেমেয়েদেরো কাজ ভাগ করে দিতাম। আমার হাজবেন্ড খুবই ভালো। তবে আমাকে এখনো বালিকা ভাবে। হটাৎ হটাৎ ধমকে উঠে আগের মত। তবে ওনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এখনও আমাকে অনেক সহযোগিতা করে।
আমি বিশ্বাসী ছিলাম কিন্তু তেমন ধার্মিক ছিলাম না। আমি নিজে নিজেই এক সময় কঠিন ধার্মিক হয়ে যাই। আমার খুবই ঘনিষ্ঠ একজন ছাত্র ইউনিয়ন করত। ওর কাছে কিছু কিছু কথা শুনতাম কিন্তু মনে দাগ কাটতো না। বলতো নামাজে গিয়ে কি করবি? গালাগালি? ধ্বংস হউক আবু লাহাবের হাত দুটি। এগুলো বহু আগের ঘটনা, আজ থেকে প্রায় ত্রিশ চল্লিশ বছর। এর পরে ২০বছর কেটেছে। সাধারণভাবেই কেটেছে। তার মাঝেই চাকরি তে যোগ দেই। এখানে আমার সহকর্মীরা ছিল বিভিন্ন ধর্মের। এখানে হিন্দু,বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের সম্পর্কে মোটামুটি জানতে পারি। তার আগে ভাসা ভাসা একটু জানতাম। এখানেও একটা বিশাল লাইব্রেরি পেলাম। অনেক ধরণের বই পড়লাম।
সকল নতুন কিছুই আমার ভাল লাগতো। হিন্দু কলিগদের লুচি নিরামিষ, নাড়ু, অম্বল, উপবাসে ওনারা একটা বিশেষ খাবার খেত সেগুলোও খেতাম। বিয়ে,শ্রাদ্ধ, পুজোতেও ওনাদের বাসায় যেতাম খেতাম। তিনচার বছর পর কর্মস্থান পরিবর্তন করি ভাল কিছুর আশায়। এখানে ঠিক উল্টো। ৯০% সহকর্মী ভালো মুমিন এবং মুমিনা। এখানে আমার পোশাক নিয়ে অনেক কানা ঘুষা চলতো। বেশ কয়েকজন মুরুব্বী গোছের সহকর্মী দিয়ে আমাকে পিঠে আচল টেনে দিতে বলাতো, সাজগোজ নিয়ে সমালোচনা করতো। এই কর্মস্থলে এসে দেখি নারী শিক্ষকদের ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত ক্লাস দেয়।উপরের ক্লাসে দেয়া হয়না। আমি প্রতিবাদ করলাম। আমাকে বলা হল ব্লাকবোর্ড এ লিখতে গেলে শিক্ষিকা দের শরীর দেখা যায়। তাই উপরে ক্লাসে ক্লাস দেয় না। আমি বললাম আমার অসুবিধা নেই। আমিই প্রথম ওখানে এইট নাইন টেন এ ক্লাস নেই। এখন অনেক মেয়েই নেয়। বাহিরের কোন কাজে মহিলা দের পাঠানো হতনা। আমি সে নিয়মও বদলানোর চেষ্টা করি। আমি খুব দ্রুত হাটতাম। প্রায়ই একজন হুজুর আমাকে দেখলে কি একটা দোয়া পড়ত। প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি কিন্তু পরে জানলাম মেয়েদের দেখলে পুরুষদের নাকি একটা দোয়া পড়তে হয়। আমি অবশ্য আমার মতই চলেছি। যা হোক পরিবারে যুদ্ধ,কর্মক্ষেত্রে যুদ্ধ, রাস্তায় ও যুদ্ধ। অনেক বাচ্চা মেয়েদের স্কুলে এসে মাসিক হয়। এতে সবাই যেনো কেমন করতো। আমি প্রতিষ্ঠান প্রধানকে বলে প্যাড এর ব্যবস্থা করি। এভাবে ঘরে বাইরে সমানতালে চলার চেষ্টা করি। এই শতকের শুরুর দিকে আমার বাবা,শাশুড়ি আর মামা মারা যায়। এতে আমি মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়ি। কিছুতেই বেচে থাকার মানে বুঝতে পারলাম না। মৃত্যু ভয়ে আমার ভিতরে ধর্মীয় চিন্তা আসতে শুরু করলো। নামাজ নিয়মিত করলাম, এরপর ভাঙ্গতি রোজা রাখা, তাহজুদ পড়া। তাতেও শান্তি পাচ্ছিলাম না। কয়েকজন মুমিনমুমিনার সাথে আলাপ করলাম। অনেক ধর্মীয় বই কিনলাম। পর্দা করা শুরু করলাম। বোরকা,স্কার্ফ, হিজাব। তবুও শান্তি পাচ্ছিলাম না। অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলাম। সারাক্ষণ বাবা শাশুড়ি আর মামার কথা মনে পড়তো। নামাজে কান্নাকাটি করতাম। রাতে মৃত্যুভয়ে ঘুম আসতে পারতাম না। এভাবে কয়েক মাস যাওয়ার পরে ডাক্তার বাইরে কোথাও ঘুরতে যেতে বললেন। আমি আমার হাজবেন্ডকে বললাম হজ্বে যাব।
নামাজ সঠিক ভাবে শিখার জন্য বই কিনলাম, ওজুর সঠিক করতে কতকিছু করলাম,হজ্বের বই কিনলাম। টাকা পয়সা অন্যান্য ব্যাংক থেকে তুলে ইসলামি ব্যাংকে রাখলাম। আর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে লাগলাম। অবশেষে হজ্বে গেলাম। যাওয়ার আগে একবার চাকরি ছেড়ে দিতে চাইলাম। কিন্তু কি মনে করে ছাড়লাম না। নিজেকে খুব অসহায় মনে হতে লাগল। শান্তি পাচ্ছিলাম না।
হজ্বে গিয়ে কিছু এলোমেলো লাগলো। ইমাম ও হুজুর দের কিছু কিছু ব্যাবহার প্রশ্নের সৃষ্টি করলো। কাবায় গিয়েও কিছুটা দ্বিধান্বিত হলাম। নারী পুরুষ একসাথে ধাক্কাধাক্কি করে তাওয়াফ করছে, নামাজ পরছে। তাওয়াফ করার সময় একলোক আমাকে পিছন থেকে জাপটে ধরে,আমি পিছনে ঘুরে দেখলাম কিন্তু আইডেন্টিফাই করতে পারি নাই। এত কষ্ট করে নামাজ পড়া শিখলাম এখানে দেখলাম একেকজন একেক ভাবে নামাজ পড়ছে। মূল হজ্বেও মেয়েদের অনেক কাজ যেমন পাথর মারা, মিনায় অবস্থান কালে তাওয়াফ করা আরো ছোট খাট কাজ করতে দিল না। বললো মেয়েদের এগুলো না করলেও চলবে। আবার মক্কায় যাওয়ার পরপর হুজুর আমার হাজবেন্ড থেকে একটা কুরবাণির টাকা নিল বলল কাউকে বলবেন না। এটা যদি কোন ভুলত্রুটি হয় তাই কাফফারা কুরবানি বা এমন একটা কিছু এখন সঠিক মনে নেই।
হজ্ব করে আসার পরও মনে হচ্ছিল আমার আমলে কোথাও কোন গণ্ডগোল আছে। কিছু একটা মিসিং। সারাদিন রাত নামাজ,কোরান পড়া, তজবি পরা,আমলে নাজাত দেখে দোয়া দরুদ পড়া। একটা বছর কিছুতেই শান্তি পাচ্ছি না। এরপর ভাবলাম কোরাণ শরীফ বাংলা অর্থ সহ পড়ি। যদি আল্লাহ কে পাই। বাবার নিষেধটাও মনে পড়ছিল। বাবাকে মনে মনে বললাম আল্লাহর কাছে যেতেই আমি বাংলা পড়ছি। নিজে দোকানে গিয়ে কিনে আনলাম। পড়া শুরু করলাম। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারছিলামনা। এর পর আবার পড়া শুরু করলাম। বৈজ্ঞানিক ভুল গুলো চোখে পড়ল-সমতল পৃথিবী আর পাহাড় তাকে কিলকের ন্যায় আটকে রাখে। আকাশ ছাদ, সূর্য ঘুরে ইত্যাদি,ইত্যাদি। আরব ছাড়া সেখানে আর কোন কিছুর বর্ণনা নেই। আমার প্রিয় ফল আম কাঁঠালের কথা নেই কিন্তু ত্বীন আর জয়তুন এর কথা আছে। আরো মনে হল কোরান শুধু পুরুষদের উদ্দেশ্যইই লেখা হয়েছে। মেয়েদের অত্যন্ত ছোট করা হয়েছে। সম্পত্তিতে অর্ধেক, সাক্ষীতে অর্ধেক আর স্বামীকে তৃপ্তি দিতেই নারীর সৃষ্টি। যখন দেখলাম দাসীদের সাথে থাকা কোরানে লেখা আছে আমার সারা শরীর কেঁপে উঠে। পালিত পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে, তারপর বলা হয়েছে মুহম্মদ মুসলমানদের ভাই আর উনার বিবিগণ সকল মুসলমানের আম্মাজান কি হাস্য কর। একটা খটকা লাগলো তিনি এত নবিদের ঘটনা জানলেন কি ভাবে? নবিদের তালিকা সংগ্রহ করলাম, পৃথিবীর মানচিত্র খুললাম। দেখলাম প্রায় সব নবি কাছাকাছি অঞ্চলের। ফলে জানা সম্ভব। আল্লাহ কি শুধু ঐ এলাকা নিয়ে চিন্তা করেন? ইউরোপ, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া নিয়ে কি চিন্তা করেন না? সেই সময় তথ্য সংগ্রহ এত সহজ ছিল না। কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারছিলাম না। আবার আরেকটা বাংলা কোরান কিনলাম। সেটা পড়ে আরও আহত হলাম। সেখানে আল্লাহর কথায় আমি না লিখে আমরা মানে বহুবচন লেখা হয়েছে। এবার কোরান নাযিল কিভাবে হয়েছে তা জানতে দোকানে দোকানে বই খুজতে লাগলাম। একটা বই পেলাম। সেখানে দেখলাম পাঁচ ভাবে কোরান নাজিল হত। কখনো তার বন্ধুরূপে জিবরীল আসতেন এখন নামটা মনে নেই কখনো বিশাল ঘণ্টা ধ্বনি দিয়ে যা অন্যকেউ শুনতেন না ইত্যাদি যা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
গ্রামে প্রায়ই শুনতাম কাজের মেয়েরা গর্ভবতী হয়ে পড়ে বাড়ির কর্তা ও তাদের ছেলেদের দ্বারা। দাসী সহবৎ পড়ার পর মনে হল এইটাইতো আসল কারণ। আবার আমার পরিচিত একজন নার্স ছিলেন তিনি বলতেন, ভাবী সাবধানে কাজের মানুষ রাখবেন। কাজের মেয়েদের যে পরিমান এবরশন করাই আমরা। বাড়ির গৃহিণীরাই নিয়ে আসে। আচ্ছা যে দুইতিন বছর আমি কঠিন ধার্মিক ছিলাম তখন মাঝে মাঝে মনে হত এটা কি জীবন! কারো সাথে কথা নাই,দেখা নাই, গল্পের বই পড়া নাই, ঘুরা নাই ফেরা নাই,কবিতা নাই গান নাই। টিভি নাই সিনেমা নাই। এক কাজ নামাজ আর তসবিহ পাঠ। বন্দী জীবন, খোঁয়াড় বন্দী। খাঁচা হলেও আলো বাতাস আসতো। এটাকে কি বেচে থাকা বলা যায়?
মনে হল আর যাই হোক এটা আমি যে আল্লাহর চিন্তা করি তার কথা নয়। নিজেকে আরো বেশি অসহায় মনে হতে লাগলো। অনেক আগে আরজ আলি মাতুব্বর, হুমায়ুন আজাদ, আহমদ ছফার লেখার কথা জানতাম। কিন্তু পড়িনি। তাদের সব বই কিনে নিয়ে আসি। পড়তে থাকি। বুঝতে পারি ধর্ম কি। ওমর খৈয়াম পড়ি। লালনের গান নিয়ে ভাবি,আমার ফুপু মাঝে মাঝে কিছু ছড়া বলতেন সে গুলো (নাপাক থেকে জন্ম যার, পাক হবার উপায় কি তার?) ভাবি। বুখারি,মুসলিম শরিফ পড়ি। বিশ্বাস আস্তে আস্তে চলে যায়।
আমি প্রথম এই কথা জানাই আমার ছেলেকে। বাসায় কেউ ছিল না। ও আর আমি। কথায় কথায় বললাম মনে হয় আল্লাহ বলে কেউ নেই। ও খুব স্বাভাবিক ভাবে বলে, আমারও তাই ধারনা। ওর কথা শুনে আমিই অবাক। বললাম তুই কীভাবে জানলি? উত্তর দিল আদম হাওয়া সত্য নাকি বিবর্তন? বাস। আমরা আর তেমন কথা বলিনি। তবে আমরা এখনো মজা করি। ও বিয়ে করেছে। একদিন এয়ারপোর্ট এ গেলাম। দুবাই এয়ার হোস্টেজদের দিকে তাকিয়ে আছি দেখে আমার কানে কানে বলে এমন বউ লাগতো? আমি বললাম হিম। বলল, এখনো তিন চান্স আছে। তুমি চাইলেই করে ফেলবো। আবার রোজাতেও বাসায় কেউ ছিল না,আমি আর ও। বলে, কোক খাবা নাকি ফান্টা। এরকম হাসি ঠাট্টা করি মা ছেলেতে। বড় মেয়েও বোঝে। কিন্তু কিছু বলেনা। আমার হাজবেন্ড ধার্মিক।
আমার ছেলেমেয়েরা এতো বই পড়ে না। সবাই চাকরি করছে। মাঝে মাঝে আমি ওদের কাছে যাই, মাঝে মাঝে ওরা আসে। আমি কখনই ওদের পালন করতে বাঁধাও দেইনি জোরও করিনি। শুধু সততার কথা বলেছি।
আমার হাজবেন্ডও বোঝে। যেমন এখন ও ওয়াজ দেখে আমি ফেসবুকে লাইভ দেখি। দু একজন কলিগকে বলেছি। ওরা বলে থাক আপা এগুলি কাউকে বলাবলি করবেন না। তবুও মাঝে মাঝে কিছু কথা বলে ফেলি। যেমন একদিন এক পুরুষ বয়স্ক সিনিয়র কলিগ বলল, নবিজি মেয়েদের অনেক ভালো বাসতেন। আমি হেসে ফেলি। বলি জি স্যার নারী, বাড়ি আর পশু কুলক্ষণ বলেছিলেন।
এখন আর পর্দা করি না। ধর্মীয় কোন ভার,যন্ত্রনা,মৃত্যুভয় নেই। বাবার কথাই সত্য হল- বাংলা কোরান পড়লে ইমান থাকেনা।
এই শতকের শুরুর দিক থেকে আমার এ অবস্থা। কিন্তু কাউকে বলতে পারিনি। ভালো করে আলোচনা করে কারো সাথে শেয়ার করতে পারিনি। নিজেকে নিজে যুক্তি দিলাম, আমার ধর্ম অন্য ধর্মগলোকে মিথ্যা বলেছে, তা ছাড়া আমি হালকা পাতলা যা জানতাম তাতে খুব এলোমেলোই মনে হত। আর আমাদের প্রধান ধর্ম গ্রন্থে অনেক ভুল। একটা বিশাল অংককে শূন্য দিয়ে গুণ করলে শূন্য ই হবে। আরো মনে হয় যার একটা তথ্য মিথ্যা সেটা আসমানি কিতাব হতে পারে না। আর যে কিতাবে মেয়েদের এতো ছোট করা হয়েছে সে কিতাব বা তার আল্লাহর আমার কি প্রয়োজন! দোযখে গেলে যাবো। সব বিজ্ঞানী, লেখক,কবি,মানবতাবাদীরাতো দোযখেই যাবে। খারাপ সময় যাবে না। সবাই মিলে কিছু একটাতো করবেই। হাহা। এরপর পরে বইই ছিল সব। এক সময় উপন্যাসই বেশি পড়তাম। এই অবস্থার পর উপন্যাস আর ভালো লাগে না। কবিতা আর প্রবন্ধই ভালো লাগে। প্রতি মাসে একবার লাইব্রেরী গিয়ে একগাদা বই আনতাম। ব্রাটেন্ড রাসেল,বন্যা আহমেদের বিবর্তনের পথ ধরে,সোফিয়া, ঈশ্ব্ররের সন্ধানে, অমল বোসের বই এরকম অনেক বই। ছোট বেলায় কিছুটা লেখা লেখি করেছি,তাতে আবার মনোযোগ দেই। এমনি কাটছিল। এমবি দিয়ে ফেইস বুক চালাতাম। এরপর বাসায় ওয়াই ফাই নেই। ইউটিউব থেকে ইতিহাস জানি। বিবর্তন দেখি। এমনি করে একদিন একজনের একটা ভিডিও আসে ওটাতে ক্লিক করতে আরও অনেককে পেলাম যারা যুক্তি, মানবতা, বিজ্ঞান, দর্শন নিয়ে কথা বলেন ও লেখালেখি করেন। আমার খুব ভালো লাগলো। এর পরে কিছু ওয়েবসাইটে গিয়েছি। কিছু লেখা পড়েছি। এখনো পড়ি। নতুন কিছু আসে কিনা দেখি। অবিশ্বাসের দর্শন, বিশ্বাসের ভাইরাসও পরেছি। এই সকল বই আমাকে বুকসেল্ফের পিছনের দিকে লুকিয়ে রাখতে হয়। আগে তথ্য সংগ্রহ অনেক কঠিন ছিল। এখন অনেক সহজ। গুগুলে সার্চ দিলেই চলে আসে। তবে ভয় হয়। এখন আগের চেয়ে বোরকারধারিনী সংখ্যা, হিজাব ওয়ালির সংখ্যা বাড়ছে। তবে মেয়েরা বাহিরে আসছে পড়ালেখা চাকরি করছে। অনেকেই সত্যিটা জানে না। সবাই ভাবে বিশেষ করে মেয়েরা পর্দা করে সব কাজই মেয়েদের করা জায়েজ আছে। আমি ক্লাসে মেয়েদের বলি মানুষ হওয়ার আগে মেয়ে বা নারী হয়ে যেয়ো না।
আসলে সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই। সবকিছু মানুষের জন্য। মানুষের মঙ্গল টাই আসল। প্রাণীদের জন্যও আমার মায়া হয়। আমি এখন পর্যন্ত গরু কুরবানি দেখি নাই। হ্যা মাংস খাই। যেমন আমার সাহায্যকারী একজন হিন্দু মহিলা।তার স্বামী মারা গেলে আমি দেখতে গিয়েছি। সাহায্য করেছি। শ্রাদ্ধেও গিয়েছি। খেয়েছি। ওর মেয়েদের জড়িয়ে ধরে আদর করেছি। আমি কখনই অসৎ ছিলাম না। মিথ্যা ও বলি নাই। আমার কথা বা কাজে অজান্তেও কাউকে কষ্ট দিলে জানতে পারলে খারাপ লাগে। কারো ক্ষতি না করে যার যার ধর্ম পালন করুন। ধর্মের মিথ্যা প্রচার সহ্য করতে কষ্ট হয়। যেমন নবিজি মেয়েদের ভালোবাসতেন।
ধার্মিকদের কি বলবো! অনেকেই সব না জেনেই বিশ্বাসী আমার মত। অনেকেই জেনে শুনেই বিশ্বাসী। আমার মনে হয় সক্রেটিস থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অনেক জ্ঞানী লোকই অবিশ্বাসী। আমিতো দেখি বায়োলোজিতে বিবর্তন পড়াচ্ছেন আবার জোরেশোরে ধর্মও পালন করছেন। ভূগোলে পৃথিবী গোল, সৌর জগত পড়াচ্ছেন আবার মোবাইলে ছবি তোলাও নাজায়েজ বলছেন। ধর্ম ছাড়া খুব কঠিন। আবার এক হুজুরকে বলতে শুনেছি জিন টিন এখন আর নেই। আরেক তাকে বলছে জিনের কথা কোরাণে আছে অবিশ্বাস করলে ঈমান থাকবে না।
সংশয়ে যারা আছে তারা কোরাণ ভালো করে বুঝে পড়তে পারেন। ছোয়াব হবে অথবা সংশয় থেকে মুক্তি পাবে। আমি এমনও দেখেছি আরজ আলীর সত্যের সন্ধানে পড়েও বলছে উনি যে সত্য বলেছেন তারই বা প্রমাণ কি?
আমার কখনই অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি ঘৃণা ছিল না। তবে মায়া বা করুণা হত। ভাবতাম আহারে তারা সত্য ধর্ম ইসলাম ছেড়ে কেন এসকল মিথ্যা ধর্ম পালন করে? যখন পর্দা করতাম কারো কারো ড্রেসের সমালোচনা করতাম। এখনো মাঝেমধ্যে করে ফেলি। এটা উচিৎ না। যে যেভাবে কম্ফর্টেবল। আমি আমার বিবেককেই বেশি প্রাধান্য দেই। মাঝেমধ্যে কিছুটা দ্বিধান্বিত হই। সময় নেই। কিছু কিছু ভুলও হয়। সে ভাবে আদর্শিক কিছু ঠিক করতে পারিনি। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তেমনভাবে ঠিক করিনি। তবে মেয়েদের জন্য কিছু করতে পারলে ভালো লাগতো।
লিখেছেনঃ মিষ্টি কুল
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.
The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.
This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.


ধর্মীয় কূপমণ্ডূকতা থেকে নাস্তিকতায় তিনি উঠেছেন বইয়ের সিঁড়ি ভেঙ্গে। শিক্ষার প্রসার যত হবে সমাজে ততই বেশি নাস্তিক দেখবো আমরা। শিক্ষার প্রসারে এই সরকারের উদ্যোগগুলোর দিকে তাই তৃষিত চোখে তাকিয়ে থাকি।
অসাধারণ একটি লেখা। সকলের পড়া উচি, বিশেষত নারীদের।
সংশয়বাদী হতে বাধ্য হয়েছি। জ্ঞান আমাকে সংশয়বাদী করে দিচ্ছে দিনে দিনে ,,যতই অর্জন করছি ততই ফাঁদে পরছি ।যাইহোক আসিফ ভাই “আপনার ফেসবুক পেজ থেকে আমাকে ব্লক দিলেন কেন বুঝলাম না ।
হজ সম্পর্কে কথা গুলা চরম মি।