ইসলামইসলামে নারীধর্ম ও রাজনীতিনারীবাদমানবাধিকার

শরিয়ার অভ্যন্তরের বিভিন্ন তাত্ত্বিক অবস্থান ও দ্বন্দ্ব: কাঠামোগত ও দার্শনিক টানাপোড়েনের বিশ্লেষণ

Table of Contents

ভূমিকা

আমরা যখন শরিয়া (Sharia) শব্দটা উচ্চারণ করি, তখন সাধারণ মানুষের মনোজগতে ঠিক কোন চিত্রটা ভেসে ওঠে? অধিকাংশের মানসপটে ভেসে ওঠে এক বিশাল, অচলায়তন পাথরখণ্ডের ছবি। যেন মহাকাশ থেকে ধপ করে পড়ে যাওয়া এক অখণ্ড সংবিধান, যার গায়ে কোনো আঁচড় নেই, কোনো ফাটল নেই, যার কোনো পরিবর্তন নেই। আমরা ধরে নিই, এই আইনের ধারাগুলো বুঝি গণিতের নামতার মতো সুনির্দিস্ট – দুই দুগুনে চার; এর কোনো নড়চড় হওয়া অসম্ভব। কিন্তু ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে, আবেগের চশমাটা খুলে যদি আমরা এই আইনি কাঠামোর গভীরতম স্তরে তাকাই, তবে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে কোনো স্থবির প্রশান্তি নেই, বরং আছে এক উত্তাল সমুদ্র, যেখানে প্রতিনিয়ত বিপরীতমুখী স্রোতের সংঘর্ষ হচ্ছে। শরিয়া কোনো শান্ত পুকুর নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের এক বিশাল কুরুক্ষেত্র।

এই সংঘর্ষ বা দ্বন্দ্ব কোনো বাইরের শত্রুর আক্রমণ নয়, কিংবা পশ্চিমা সমালোচনার জবাবও নয়। এটা একেবারে ঘরের ভেতরের বিবাদ। শরিয়ার চৌদ্দশ বছরের ইতিহাস আসলে এক দীর্ঘ, অবিরাম বিতর্কের ইতিহাস। এই বিতর্কে কোনো একটি পক্ষ পুরোপুরি ভুল নয়, আবার কোনো পক্ষই এককভাবে চূড়ান্ত সত্যের দাবিদার হতে পারছে না। এখানেই শরিয়ার সবচেয়ে বড় প্যারাডক্স বা কূটাভাস লুকিয়ে আছে। শরিয়া নিজেকে দাবি করে ‘ঐশ্বরিক’ বা ডিভাইন (Divine), অথচ এর প্রয়োগ এবং ব্যাখ্যা হয় পুরোপুরি ‘মানবিক’ বা হিউম্যান (Human) বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে। আর যেখানেই মানুষ আছে, সেখানেই সীমাবদ্ধতা আছে, ভিন্নমত আছে, যুক্তি আছে এবং পাল্টা যুক্তি আছে। ধারণাগতভাবে অসীম স্রষ্টার অভিপ্রায়কে সসীম মানুষের বুদ্ধি দিয়ে ধরার এই যে প্রাণান্তকর চেষ্টা – এটাই শরিয়ার মূল সংকট এবং একই সাথে মূল শক্তি।

আমরা আজ সেই ভেতরের টানাপোড়েনগুলো দেখব। কোনো বহিরাগত তাত্ত্বিকের চোখ দিয়ে নয়, বরং শরিয়ার নিজস্ব লজিক বা যুক্তিকাঠামোর ভেতরে যে বিশাল ফাটলগুলো (Fractures) এবং দার্শনিক দোলাচল রয়েছে, সেগুলোকে আতশ কাঁচের নিচে ফেলব। এই আলোচনার ভিত্তি হলো ‘দ্বান্দ্বিকতা’। শরিয়ার ভেতরে প্রতিনিয়ত দুটো আলাদা দর্শন বা চিন্তাধারা একে অপরের সঙ্গে কুস্তি লড়ছে। একদল বলছে অক্ষরকে আঁকড়ে ধরতে, অন্যদল বলছে মর্মার্থকে বুঝতে; একদল বলছে যুক্তির কথা, অন্যদল বলছে অন্ধ আনুগত্যের কথা। এই যে ভেতরে ভেতরে পরস্পরবিরোধী আদর্শের সংঘাত, এটাই শরিয়াকে কখনো সচল রেখেছে, আবার কখনো বা স্থবির করে দিয়েছে। মনে রাখবেন, এই দ্বন্দ্বগুলো কোনো বিচ্যুতি বা দুর্ঘটনা নয়, বরং শরিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি এমন এক ব্যবস্থা যেখানে স্থিরতা এবং গতির লড়াই চলছে জন্মলগ্ন থেকে। চলুন, এই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের মানচিত্রটি খুলে দেখা যাক।

টেক্সচুয়ালিজম বনাম কনটেক্সচুয়ালিজম: অক্ষরের বাঁধন নাকি অর্থের মুক্তি?

শরিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের দিকে তাকালে যে দ্বন্দ্বটি সবচেয়ে প্রকট এবং মৌলিক হয়ে ধরা দেয়, তা হলো টেক্সট বা পাঠ এবং কনটেক্সট বা প্রেক্ষাপটের মধ্যকার চিরন্তন সংঘাত। এই লড়াইটা কেবল আইনের ধারা-উপধারা নিয়ে নয়; এটি শরিয়ার অস্তিত্বের ধরণ বা অনটোলজি (Ontology) নিয়ে। প্রশ্নটি খুব গভীর – শরিয়া কি কোনো স্থির আলোকচিত্র যা সপ্তম শতাব্দীতে ফ্রেমবন্দী করা হয়েছে, নাকি এটি একটি প্রবহমান নদী যা যুগের বাঁকে বাঁকে তার গতিপথ এবং রূপ বদলায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই শরিয়ার তাত্ত্বিকরা মূলত দুটি বড় শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন: টেক্সচুয়ালিজম (Textualism) বা পাঠবাদ এবং কনটেক্সচুয়ালিজম (Contextualism) বা প্রেক্ষাপটবাদ। এই দুই শিবিরের যুক্তিগুলো এতটাই শক্তিশালী যে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিতর্কটি অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

অক্ষরের সার্বভৌমত্ব: টেক্সচুয়ালিজমের দর্শন

টেক্সচুয়ালিজম (Textualism) বা পাঠবাদের মূল মন্ত্র হলো – “যা লেখা আছে, তাই চূড়ান্ত।” এই দর্শনের অনুসারীরা মনে করেন, ওহি বা রিভিলেশন হলো আল্লাহর প্রত্যক্ষ বাণী, এবং আল্লাহ যা বলেছেন তা তিনি জেনেশুনেই বলেছেন। শব্দের চয়ন, বাক্যের গঠন এবং আদেশের প্রকৃতি – সবই ঐশ্বরিক পরিকল্পনার অংশ। এখানে মানুষের নিজস্ব বুদ্ধি বা র‍্যাশনালিটি (Rationality) খাটিয়ে কোনো শব্দের অর্থ পরিবর্তন করার এখতিয়ার নেই। তাদের যুক্তি হলো, মানুষ যদি নিজের যুগের প্রয়োজন বা প্রেক্ষাপটের দোহাই দিয়ে টেক্সটের অর্থ পাল্টাতে শুরু করে, তবে আল্লাহর আইনের পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যাবে। আজ কেউ বলবে চুরির শাস্তি হাত কাটা অমানবিক, কাল কেউ বলবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ বেশি হয়ে যায় – এই ঢালু পথ বা স্লিপারি স্লোপ (Slippery Slope) থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো টেক্সটকে আক্ষরিক অর্থে আঁকড়ে ধরা।

ইতিহাসে এই মতবাদের সবচেয়ে কট্টর এবং তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী রূপটি দেখা যায় জাহিরি মাযহাব (Zahiri School)-এর মধ্যে। একাদশ শতাব্দীর আন্দালুসিয়ান তাত্ত্বিক ইবন হাজম (Ibn Hazm) ছিলেন এই ধারার প্রধান প্রবক্তা। ইবন হাজম (Ibn Hazm)-এর যুক্তি ছিল অত্যন্ত ধারালো। তিনি বলতেন, আল্লাহ যদি কোনো আদেশের পেছনে কোনো কারণ বা ‘ইল্লাত’ (Cause) রাখতে চাইতেন, তবে তিনি তা পরিষ্কার বলে দিতেন। যেহেতু আল্লাহ বলেননি, তাই আমাদের কাজ হলো কোনো কারণ না খুঁজে অন্ধভাবে আদেশ মানা। একে বলা হয় তা’আববুদি (Ta’abbudi) বা নিছক আনুগত্যমূলক আদেশ। উদাহরণস্বরূপ, শূকরের মাংস হারাম। কেন হারাম? এতে জীবাণু আছে বলে? নাকি স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে বলে? টেক্সচুয়ালিজম বলে – এসব কারণ খোঁজা অনর্থক। আল্লাহ বারণ করেছেন, ব্যস, এটাই একমাত্র কারণ। যদি কাল বিজ্ঞান প্রমাণ করে যে শূকরের মাংস স্বাস্থ্যকর, তবুও তা হারাম থাকবে। কারণ নিষেধাজ্ঞাটি বিজ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল নয়, টেক্সটের ওপর নির্ভরশীল।

আধুনিক যুগে এই টেক্সচুয়ালিজমের পুনর্জাগরণ ঘটেছে সালাফিজম (Salafism) বা নিও-ট্র্যাডিশনালিস্ট মুভমেন্টের মাধ্যমে। তারা মনে করেন, ইতিহাসের জঞ্জাল এবং পরবর্তী যুগের আলেমদের ব্যাখ্যা বা ইজতিহাদ (Ijtihad) সরিয়ে সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহর টেক্সটে ফিরে যেতে হবে। তাদের মতে, টেক্সট নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং স্বব্যাখ্যাত। এর জন্য বাইরের কোনো ফিলোসফি বা সমাজবিজ্ঞানের সাহায্যের প্রয়োজন নেই। টেক্সচুয়ালিজমের বড় শক্তি হলো এর নিশ্চয়তা বা সার্টেনিটি। এখানে কোনো ধূসর এলাকা নেই। আইন খুব স্পষ্ট – কালো এবং সাদা। এটি বিশ্বাসীদের এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি দেয়, কারণ তাদের নিজেদের কোনো কঠিন নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হয় না; টেক্সট তাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখে। কিন্তু এই নিশ্চয়তাই আধুনিক জটিল রাষ্ট্রব্যবস্থায় তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়।

প্রেক্ষাপটের অপরিহার্যতা: কনটেক্সচুয়ালিজমের যুক্তি

অন্যদিকে, কনটেক্সচুয়ালিজম (Contextualism) বা প্রেক্ষাপটবাদীরা শরিয়াকে দেখেন একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে। তারা বলেন, “টেক্সট অন্ধ, যদি না আপনি তার পেছনের কারণটা দেখেন।” তাদের প্রধান যুক্তি হলো, কুরআন শূন্যে নাজিল হয়নি; এটি নাজিল হয়েছে একটি নির্দিষ্ট সময়ে, একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে এবং একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর (সপ্তম শতাব্দীর আরব সমাজ) উদ্দেশ্যে। প্রতিটি আয়াতের পেছনে একটি শানে নুজুল বা আসবাব আল-নুজুল (Asbab al-Nuzul) আছে। এই প্রেক্ষাপট বা কারণ না জানলে টেক্সটের আক্ষরিক প্রয়োগ জুলুম বা অবিচারে পরিণত হতে পারে। তারা প্রশ্ন তোলেন – আল্লাহর উদ্দেশ্য কী? হাত কাটা কি উদ্দেশ্য, নাকি চুরি বন্ধ করা উদ্দেশ্য? যদি চুরি বন্ধ করাই উদ্দেশ্য হয়, তবে সমাজভেদে শাস্তির ধরণ বদলালে অসুবিধা কোথায়?

এই দর্শনের ঐতিহাসিক ভিত্তি হিসেবে তারা প্রায়ই ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবন আল-খাত্তাব (Umar ibn al-Khattab)-এর উদাহরণ টানেন। দুর্ভিক্ষের সময় যখন তিনি চুরির শাস্তি (হাত কাটা) স্থগিত করেছিলেন, তখন তিনি কুরআনের টেক্সটকে অস্বীকার করেননি। বরং তিনি টেক্সটের পেছনের ‘স্পিরিট’ বা আত্মাকে বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, পেটে ভাত না থাকলে টেক্সটের কঠোরতা প্রয়োগ করা আল্লাহর ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এটিই কনটেক্সচুয়ালিজমের মূল কথা – পরিস্থিতি বদলালে হুকুম বদলায়। এই ধারাটিকে তাত্ত্বিক রূপ দিয়েছিলেন আন্দালুসিয়ান মালিকি ফকিহ আল-শাতিবি (Al-Shatibi)। তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ আল-মুওয়াফাকাত (Al-Muwafaqat)-এ মাকাসিদ আল-শরিয়া (Maqasid al-Shari’ah) বা শরিয়ার উদ্দেশ্যের তত্ত্ব দাঁড় করান। আল-শাতিবি (Al-Shatibi) বলেন, শরিয়ার মূল লক্ষ্য হলো জনকল্যাণ বা মাসলাহা (Maslaha) নিশ্চিত করা। যেখানে টেক্সটের আক্ষরিক প্রয়োগ জনকল্যাণ ব্যাহত করে, সেখানে টেক্সটের মর্মার্থ বা উদ্দেশ্যকে প্রাধান্য দিতে হবে (Ramadan, 2004)।

আধুনিক যুগে এই চিন্তাধারাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছেন ফজলুর রহমান (Fazlur Rahman)। তার বিখ্যাত ডাবল মুভমেন্ট থিওরি (Double Movement Theory) কনটেক্সচুয়ালিজমের এক চমৎকার মেথডলজি। ফজলুর রহমান (Fazlur Rahman) বলেন, শরিয়া বুঝতে হলে আমাদের দুটো মুভমেন্ট বা নড়াচড়া করতে হবে। প্রথম মুভমেন্ট: বর্তমান থেকে পিছিয়ে সপ্তম শতাব্দীতে যেতে হবে এবং দেখতে হবে ওই সময় কেন এবং কোন প্রেক্ষাপটে একটি আইন নাজিল হয়েছিল। সেখান থেকে মূল নীতি বা এথিক্যাল প্রিন্সিপালটি বের করে আনতে হবে। দ্বিতীয় মুভমেন্ট: সেই নীতিটি নিয়ে আবার বর্তমানে ফিরে আসতে হবে এবং আজকের প্রেক্ষাপটে তা প্রয়োগ করতে হবে। যেমন – কুরআনে সুদ বা রিবা হারাম করা হয়েছে। ফজলুর রহমান (Fazlur Rahman)-এর মতে, সপ্তম শতাব্দীতে রিবা ছিল গরিবকে শোষণ করার হাতিয়ার। তাই মূল নীতি হলো “শোষণ বন্ধ করা”। এখন আজকের যুগে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যদি ‘শোষণ’ না থাকে, তবে সেই বাণিজ্যিক সুদ আর কুরআনিক রিবা এক জিনিস নাও হতে পারে। এই ধরনের ব্যাখ্যা কেবল কনটেক্সচুয়ালিজমেই সম্ভব (Rahman, 1982)।

শরিয়ার অভ্যন্তরীণ ফাটল: যেখানে দুই দর্শন মুখোমুখি

এই দুই ইজমের সংঘর্ষে শরিয়ার ভেতরে যে টেনশন বা টানাপোড়েন তৈরি হয়, তা অত্যন্ত জটিল। এটি কেবল তাত্ত্বিক বিলাসিতা নয়, এর সাথে মুসলিম সমাজের আইন, রাষ্ট্র এবং ব্যক্তিজীবন সরাসরি জড়িত।

প্রথম বড় দ্বন্দ্বটি হলো – ইউনিভার্সালিজম (Universalism) বনাম হিস্টোরিসিটি (Historicity)। শরিয়া দাবি করে এটি সর্বকালীন এবং সর্বজনীন। কিন্তু কনটেক্সচুয়ালিজম (Contextualism) যখন বলে যে কুরআনের আইনগুলো সপ্তম শতাব্দীর আরবের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়েছে, তখন তারা পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেয় যে এই আইনগুলো ঐতিহাসিকভাবে সীমাবদ্ধ বা ‘হিস্টোরিক্যালি বাউন্ড’। যদি উত্তরাধিকার আইনে নারীদের অর্ধেক সম্পত্তি দেওয়া হয় কারণ তৎকালীন আরবে নারীরা উপার্জন করত না এবং তাদের আর্থিক দায়িত্ব ছিল না, তবে আজকের যুগে যখন নারীরা উপার্জন করছে, তখন কি আইন পাল্টাবে? কনটেক্সচুয়ালিজম বলে, “হ্যাঁ, পাল্টানো উচিত, কারণ প্রেক্ষাপট পাল্টেছে এবং ন্যায়বিচারের দাবি সেটাই।” কিন্তু টেক্সচুয়ালিজম (Textualism) এখানে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারা বলে, আপনি যদি প্রেক্ষাপটের দোহাই দিয়ে কুরআনের আয়াতকে ‘তৎকালীন সমাজের জন্য প্রযোজ্য’ বলে রায় দেন, তবে কুরআনের চিরন্তনতা বা ইটারনালিটি (Eternality) কোথায় থাকে? কুরআন কি তবে নিছক একটি ইতিহাস বই? এভাবে ব্যাখ্যা করতে থাকলে তো একদিন পুরো শরিয়াই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে।

দ্বিতীয় দ্বন্দ্বটি হলো – সাবজেক্টিভিটি (Subjectivity) বা ব্যক্তিগত খেয়ালখুশি বনাম ডিভাইন অথরিটি (Divine Authority)টেক্সচুয়ালিজম (Textualism) দাবি করে যে তারা আল্লাহর কথার বাইরে এক চুলও নড়ছে না, তাই তাদের অবস্থানে কোনো ভেজাল নেই। কিন্তু কনটেক্সচুয়ালিজম (Contextualism)-এর বিপদ হলো, কে নির্ধারণ করবে কোনটা ‘প্রেক্ষাপট’ আর কোনটা ‘মূলনীতি’? একজন লিবারেল স্কলার হয়তো বলবেন, হিজাব হলো তৎকালীন আরবের সংস্কৃতি, তাই আজ এটি বাধ্যতামূলক নয়। আবার একজন কনজারভেটিভ স্কলার বলবেন, না, হিজাব চিরস্থায়ী বিধান। যখন টেক্সট ছেড়ে যুক্তির ওপর নির্ভর করা হয়, তখন শরিয়া কি মানুষের খেয়ালখুশির শিকার হয়ে পড়ে না? ওয়ায়েল হাল্লাক (Wael Hallaq) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, প্রাক-আধুনিক যুগে মুসলিম ফকিহরা এই দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতেন, কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বা মডার্ন স্টেট সেই ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে। রাষ্ট্র চায় ফিক্সড আইন (যা টেক্সচুয়ালিজম দেয়), কিন্তু সমাজ চায় নমনীয়তা (যা কনটেক্সচুয়ালিজম দেয়)। এই দুইয়ের টানাটানিতে শরিয়া আজ এক গভীর অস্তিত্ব-সংকটে নিপতিত (Hallaq, 2009)।

একটি অমীমাংসিত উপসংহারের দিকে

আজকের দিনে নারী নেতৃত্ব, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বায়োএথিক্সের মতো বিষয়গুলোতে শরিয়া কী রায় দেবে – তা পুরোপুরি নির্ভর করে আপনি কোন লেন্স দিয়ে দেখছেন তার ওপর। যদি টেক্সচুয়ালিজম (Textualism)-এর লেন্স লাগান, তবে নারী রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারবে না, কারণ একটি নির্দিষ্ট হাদিসে এ বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য আছে। কিন্তু যদি কনটেক্সচুয়ালিজম (Contextualism)-এর লেন্স লাগান, তবে দেখা যাবে ওই হাদিসটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে (পারস্যের রানীর প্রসঙ্গে) বলা হয়েছিল এবং কুরআনের মূল স্পিরিট হলো যোগ্যতা ও ন্যায়বিচার; তাই নারী নেতৃত্বে বাধা নেই।

সমস্যা হলো, শরিয়া যদি পুরোপুরি কনটেক্সট বা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে তার “আইন” বা “ল” হিসেবে যে কঠোরতা থাকার কথা, তা থাকে না। জল যেমন পাত্রের আকার ধারণ করে, শরিয়াও তখন সময়ের আকার ধারণ করে। প্রশ্ন ওঠে, যা সময়ের সাথে সাথে নিজের রূপ বদলায়, তা কি আসলেই ঐশ্বরিক নির্দেশ হতে পারে? নাকি ঐশ্বরিক নির্দেশের উদ্দেশ্যই হলো সময়ের সাথে সাথে নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখা? আবদুল্লাহ সাঈদ (Abdullah Saeed) তার ইন্টারপ্রেটিং দ্য কুরআন (Interpreting the Qur’an) বইতে যুক্তি দেখান যে, কুরআনের এথিকো-লিগাল বা নৈতিক-আইনি বিষয়বস্তুর মধ্যে একটি হায়ারার্কি বা ক্রমউচ্চতা আছে। কিছু নির্দেশ সুনির্দিষ্ট এবং সাময়িক, আর কিছু নির্দেশ মূলনীতিমূলক এবং শাশ্বত। এই দুটোর পার্থক্য বুঝতে না পারার কারণেই টেক্সচুয়ালিজম এবং কনটেক্সচুয়ালিজমের এই অনন্ত যুদ্ধ চলছে (Saeed, 2006)।

দিনশেষে, এই “ইজম বনাম ইজম” শরিয়াকে অকার্যকর করে না, বরং একে ডাইনামিক রাখে। টেক্সচুয়ালিজম শরিয়াকে শেকড়হীন হওয়া থেকে বাঁচায়, তাকে একটি শক্ত কাঠামো দেয়। আর কনটেক্সচুয়ালিজম শরিয়াকে ফসিল হওয়া থেকে বাঁচায়, তাকে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। কিন্তু এই দুইয়ের মাঝখানের ঠিক কোন বিন্দুতে দাঁড়ালে আল্লাহর আসল অভিপ্রায় বা ‘ডিভাইন ইনটেন্ট’ খুঁজে পাওয়া যাবে, তা হয়তো কোনোদিনই নিশ্চিতভাবে জানা যাবে না। আর এই না-জানা, এই ক্রমাগত অনুসন্ধানই শরিয়ার আসল সৌন্দর্য এবং একই সাথে তার সবচেয়ে বড় বেদনা।

লিগালিজম বনাম মোরালিজম: কাঠখোট্টা নিয়ম বনাম বিবেকের আর্তনাদ

আইন এবং নৈতিকতা – এই দুটি শব্দ শুনলে আমাদের মনে হয় তারা যেন যমজ ভাই। আমরা ধরে নিই, যা কিছু আইনি (Legal), তা অবশ্যই নৈতিক (Moral); আর যা কিছু নৈতিক, আইন তাকে অবশ্যই সমর্থন করবে। কিন্তু শরিয়ার গভীর এবং জটিল অন্দরমহলে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এই দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্কটা সবসময় মধুর নয়, বরং প্রায়শই সাপে-নেউলে। এই দ্বন্দ্বটি শরিয়ার ইতিহাসে লিগালিজম (Legalism) বা ফিকহবাদ এবং মোরালিজম (Moralism) বা আখলাকবাদের মধ্যকার এক দীর্ঘস্থায়ী বুদ্ধিবৃত্তিক গৃহযুদ্ধ। এই লড়াইয়ের একদিকে আছে আইনের নিরেট কাঠামো, নিয়মকানুন এবং যান্ত্রিকতা; অন্যদিকে আছে মানুষের বিবেক, ন্যায়বোধ এবং আত্মশুদ্ধি। শরিয়া কি কেবল একগাদা ‘ডু’জ অ্যান্ড ডোন্ট’স’ (Do’s and Don’ts)-এর তালিকা, নাকি এটি একটি উচ্চতর নৈতিক সত্তা গড়ার প্রক্রিয়া? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই মুসলিম মানস শতাব্দীকাল ধরে দোদুল্যমান।

যান্ত্রিকতার জয়গান: লিগালিজম বা ফিকহবাদের রাজত্ব

লিগালিজম (Legalism) বা আইনসর্বস্বতার দৃষ্টিতে শরিয়া হলো একটি সুশৃঙ্খল, যান্ত্রিক সিস্টেম। এখানে আবেগের কোনো স্থান নেই, বিবেকের কোনো ভেটো পাওয়ার নেই। এর পুরো ফোকাস থাকে ‘ফর্ম’ (Form) বা বাহ্যিক কাঠামোর ওপর। একজন ফিকহবিদ বা জুরিস্টের কাছে প্রশ্ন হলো – কাজটি কি সঠিক নিয়মে হয়েছে? আপনার নিয়ত বা উদ্দেশ্য কী ছিল, তা আইনের দেখার বিষয় নয়। ধরুন, নামাজের কথাই ধরা যাক। লিগালিজম (Legalism) অনুযায়ী, আপনি যদি সঠিক সময়ে ওজু করেন, কেবলামুখী দাঁড়ান, নির্দিষ্ট সূরা পাঠ করেন এবং রুকু-সিজদার নিয়মগুলো হুবহু পালন করেন, তবে আপনার নামাজ ‘সহিহ’ বা বৈধ হয়ে গেল। আপনার মন যদি নামাজের সময় ব্যবসার হিসাবে ব্যস্ত থাকে, কিংবা আপনার হৃদয়ে যদি বিন্দুমাত্র বিনয় বা খুশুখুজু না থাকে, তবুও আইন বলবে – “আপনার দায়িত্ব শেষ, খাতায় টিক চিহ্ন পড়ে গেছে।” আইন এখানে একটা চেকলিস্টের মতো কাজ করে। ভেতরের শূন্যতা বা হাহাকার এখানে অপ্রাসঙ্গিক; বাইরের খোলসটাই এখানে মুখ্য।

এই লিগালিজমের সবচেয়ে কদর্য এবং বুদ্ধিদীপ্ত রূপটি দেখা যায় হিলা (Legal Stratagems) বা আইনি কৌশলের মধ্যে। হিলা (Hila) হলো এমন এক পদ্ধতি যেখানে মানুষ শরিয়ার অক্ষর বা লেটার (Letter of the Law) ঠিক রাখে, কিন্তু শরিয়ার স্পিরিট বা আত্মাকে হত্যা করে। যেমন, ইসলামে সুদ বা রিবা হারাম। এখন কোনো মহাজন যদি সুদ খেতে চায় কিন্তু আইনের চোখে সাধু থাকতে চায়, সে কী করবে? সে বাই আল-ইনা (Bay’ al-‘Inah) নামের এক কৌশল অবলম্বন করতে পারে। সে ঋণগ্রহীতার কাছে একটি কলম ১০০ টাকায় বাকিতে বিক্রি করবে (যা পরে শোধ করতে হবে), এবং সাথে সাথেই সেই কলমটি ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে নগদ ৯০ টাকায় কিনে নেবে। ফলস্বরূপ, ঋণগ্রহীতা নগদ ৯০ টাকা পেল, কিন্তু তাকে শোধ করতে হবে ১০০ টাকা। মাঝখানের ১০ টাকা সুদ, কিন্তু কাগজে-কলমে এটি দুটি বৈধ কেনাবেচা। লিগালিজম (Legalism) বা ফিকহের আদালতে এই লেনদেন ১০০% বৈধ, কারণ কেনাবেচার সব শর্ত (অফার, এক্সেপটেন্স, পজেশন) মানা হয়েছে। কিন্তু নৈতিকতার বিচারে এটি একটি জঘন্য প্রতারণা। ফিকহ যখন নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তা মানুষকে এমন চতুর হতে শেখায় যে, তারা আল্লাহর আইন ব্যবহার করেই আল্লাহকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে।

শরিয়ার ইতিহাসে রাষ্ট্র এবং বিচার ব্যবস্থা সবসময় এই লিগালিজমকে প্রাধান্য দিয়েছে। কারণ রাষ্ট্র চালাতে গেলে এমন আইন দরকার যা মাপা যায়, দেখা যায় এবং প্রয়োগ করা যায়। মানুষের মনের ভেতর কী চলছে, তার ওপর ভিত্তি করে তো আর আদালত রায় দিতে পারে না। তাই ধীরে ধীরে ফিকহ বা আইনশাস্ত্র হয়ে ওঠে শরিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী অংশ। মাদ্রাসার সিলেবাস থেকে শুরু করে রাজদরবার – সবখানেই ফিকহবিদদের দাপট। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় শরিয়া তার কোমলতা হারিয়ে ফেলে। এটি হয়ে ওঠে এক কঠিন প্রস্তরখণ্ড, যেখানে নিয়ম মানাই একমাত্র ধর্ম, আর নিয়ম ভাঙাই একমাত্র পাপ। ন্যায়বিচার বা জাস্টিস শব্দটা তখন টেকনিক্যাল টার্মে পরিণত হয়; এর মানবিক আবেদন হারিয়ে যায়।

বিবেকের আর্তনাদ: মোরালিজম বা আখলাকবাদের দর্শন

এর ঠিক বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে আছে মোরালিজম (Moralism) বা আখলাকবাদ। সুফি সাধক, দার্শনিক এবং এথিসিস্টরা বলেন, শরিয়ার শরীর হলো ফিকহ, কিন্তু শরিয়ার আত্মা হলো আখলাক বা নৈতিকতা। তাদের মতে, শরিয়ার মূল উদ্দেশ্য মানুষকে দিয়ে কেবল রোবটের মতো কিছু নিয়ম পালন করানো নয়; বরং তার ভেতরে দয়া, ন্যায়বিচার এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলা। একাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত তাত্ত্বিক ও দার্শনিক ইমাম গাজালি (Al-Ghazali) এই সংকটের গভীরতা সবচেয়ে ভালো অনুধাবন করেছিলেন। তার কালজয়ী গ্রন্থ ইহইয়া উলুম আল-দীন (Ihya’ ‘Ulum al-Din)-এ তিনি তৎকালীন ফিকহবিদদের তীব্র সমালোচনা করেন। গাজালি (Al-Ghazali) বলেন, ফিকহ হলো একটি ‘দুনিয়াবি বিজ্ঞান’ (Worldly Science), যা কেবল মানুষের বাহ্যিক বিবাদ মেটাতে এবং সমাজকে বিশৃঙ্খলা থেকে বাঁচাতে কাজ করে। কিন্তু এটি পরকালের মুক্তির জন্য যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি ফিকহের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ হতে পারে, কিন্তু তার অন্তরে অহংকার, হিংসা বা প্রতারণা থাকার কারণে আল্লাহর কাছে সে ধিকৃত হতে পারে।

মোরালিজম (Moralism) দাবি করে যে, প্রতিটি আইনি আদেশের পেছনে একটি নৈতিক উদ্দেশ্য বা মাকাসিদ (Maqasid) থাকে। একে বলা হয় ইহসান (Ihsan) বা উৎকর্ষ। কুরআনে বারবার ‘আদল’ (ন্যায়বিচার) এবং ‘ইহসান’-এর কথা বলা হয়েছে। ইহসান (Ihsan) মানে হলো আইনের দাবির চেয়েও বেশি কিছু করা; নিজের অধিকার ছেড়ে দিয়ে অন্যের কল্যাণ করা। আইন হয়তো আপনাকে প্রতিশোধ নেওয়ার অধিকার দেয় (কিসাস), কিন্তু নৈতিকতা আপনাকে ক্ষমা করতে উৎসাহিত করে। মোরালিস্টরা প্রশ্ন তোলেন – যে আইন মানুষের চোখে পানি আনে না, যে আইন পাষাণ হৃদয়ে কম্পন তোলে না, তা কি নবীর আনীত শরিয়া হতে পারে? তাদের কাছে, বিবেক বা ক্বলব হলো আল্লাহর সবচেয়ে বড় আদালত। তারা বলেন, ফতোয়ার বইতে যা-ই লেখা থাক, “তোমার নিজের হৃদয়ের কাছে ফতোয়া চাও” (ইস্তাখতি কালবাক) – এটিই হলো নবীর শিক্ষা।

এই দর্শনে, আইন হলো কেবল যাত্রার শুরু, গন্তব্য নয়। আপনি নামাজ পড়েছেন – এটা আইনের শুরু। নামাজ আপনাকে অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রেখেছে কি না – সেটা হলো নৈতিক গন্তব্য। যদি নামাজ পড়ার পরেও আপনি মিথ্যা বলেন বা ওজনে কম দেন, তবে মোরালিজমের দৃষ্টিতে আপনার সেই নামাজ অর্থহীন ব্যায়াম মাত্র। অথচ লিগালিজমের দৃষ্টিতে আপনার নামাজ ‘সহিহ’। এই যে দুই ভিন্ন মানদণ্ড – একটি কাজের বাহ্যিক বৈধতা বিচার করে, অন্যটি কাজের অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা বিচার করে – এটাই শরিয়ার ভেতরের সবচেয়ে বড় দার্শনিক ফাটল।

বৈধ কিন্তু অনৈতিক: শরিয়ার ব্ল্যাকহোল এবং দ্বান্দ্বিক সংকট

এই দুই ইজমের সংঘর্ষ সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে যখন আমরা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হই যা “বৈধ কিন্তু অনৈতিক” (Lawful but Immoral)। একে শরিয়ার ‘ব্ল্যাকহোল’ বলা যেতে পারে। এমন অনেক কাজ আছে যা ফিকহের কিতাব অনুযায়ী সম্পূর্ণ জায়েজ বা বৈধ, কিন্তু সুস্থ বিবেক এবং মানবিক দৃষ্টিতে তা চরম অন্যায় বা জুলুম।

উদাহরণস্বরূপ, তালাকের বিষয়টি দেখা যাক। ক্লাসিক্যাল ফিকহ এবং অনেক দেশের প্রচলিত মুসলিম আইন অনুযায়ী, একজন স্বামী যদি রাগের মাথায় স্ত্রীকে পরপর তিনবার ‘তালাক’ শব্দ বলেন, তবে বিবাহ বিচ্ছেদ কার্যকর হয়ে যায়। লিগালিজম (Legalism) এখানে খুব কঠিন। সে বলে, “শব্দ উচ্চারিত হয়েছে, শর্ত পূরণ হয়েছে, সুতরাং বিবাহ শেষ।” এই সিদ্ধান্তে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা, দীর্ঘদিনের সংসার, কিংবা বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ – কোনোকিছই ধর্তব্য নয়। আইন এখানে অন্ধ। কিন্তু মোরালিজম (Moralism) বা নৈতিকতা এখানে চিৎকার করে ওঠে। সে বলে, এটা অন্যায়। এটা জুলুম। আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে তালাকের কথায়। যে বিধান দেওয়া হয়েছিল চরম পরিস্থিতির সমাধানের জন্য, তা যখন খেলার পুতুলে পরিণত হয়, তখন তা আর ‘শরিয়া’ থাকে না, হয়ে যায় শয়তানের হাতিয়ার। এখন প্রশ্ন হলো, একজন বিচারক কী করবেন? তিনি কি ফিকহের নিয়ম মেনে তালাক কার্যকর করবেন (লিগালিজম), নাকি নৈতিকতার খাতিরে তা আটকে দেবেন (মোরালিজম)?

এই সংকটকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আধুনিক যুগের বিশিষ্ট স্কলার এবং জুরিস্ট খালেদ আবু এল ফাদল (Khaled Abou El Fadl) একটি চমৎকার তত্ত্ব সামনে এনেছেন। তিনি বলেন, যখন শরিয়াকে নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, তখন তা অথরিটারিয়ানিজম (Authoritarianism) বা কর্তৃত্বপরায়ণতায় রূপ নেয়। তার মতে, শরিয়ার বিধানগুলো ব্যাখ্যার সময় যদি আমরা দয়া, সৌন্দর্য এবং ন্যায়বিচারের বা বিউটি এন্ড জাস্টিস (Beauty and Justice)-এর মূলনীতিগুলো ভুলে যাই, তবে আমরা আল্লাহর নামে মূলত নিজেদের কুৎসিত ইচ্ছাগুলোকেই চাপিয়ে দিই। আবু এল ফাদল (Abou El Fadl) যুক্তি দেন যে, কোনো আইন যদি বিবেককে দংশন করে, তবে বুঝতে হবে সেখানে ব্যাখ্যার কোথাও ভুল হচ্ছে। কারণ আল্লাহ কখনোই এমন কিছু আদেশ করতে পারেন না যা স্বভাবজাত মানবিক বিবেকের বিরোধী। তিনি একে কনশেনসিয়াস পজ (Conscientious Pause) বা বিবেকের বিরতি দেওয়ার আহ্বান জানান – যেকোনো ফতোয়া মানার আগে একবার থমকে দাঁড়ানো এবং ভাবা, এটা কি সত্যিই ন্যায়সংগত? (Abou El Fadl, 2001)।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো কাজা (Qada) এবং দিয়ানাহ (Diyanah)-এর পার্থক্য। কাজা (Qada) হলো আদালতের বিচার, যা বাহ্যিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়। আর দিয়ানাহ (Diyanah) হলো আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার গোপন বিষয় বা বিবেকের বিচার। ফিকহবিদরা বলেন, একজন বিচারক ভুল সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে কাউকে নির্দোষ ঘোষণা করতে পারেন (কাজা অনুযায়ী সে মুক্ত), কিন্তু সেই ব্যক্তি যদি সত্যিই অপরাধী হয়, তবে আল্লাহর কাছে সে দোষী থাকবে (দিয়ানাহ অনুযায়ী)। সমস্যা হলো, আধুনিক যুগে মানুষ এই পার্থক্য ভুলে গেছে। মানুষ মনে করে, আদালতের রায়ে জিততে পারলেই বুঝি সব মাফ। তারা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাওয়াকে ‘স্মার্টনেস’ ভাবে। কিন্তু মোরালিজম (Moralism) মনে করিয়ে দেয়, আইনের চোখে ধুলো দেওয়া গেলেও বিবেকের চোখ ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব।

উপসংহার: এক বিভক্ত সত্তার আর্তনাদ

আজকের মুসলিম সমাজ এই লিগালিজম এবং মোরালিজমের দ্বন্দ্বে এক ধরনের দ্বৈতসত্তায় ভুগছে। একদিকে আমরা দেখি ধর্মপ্রাণ মানুষ, যারা দাড়ি, হিজাব, এবং নামাজের ওয়াক্ত নিয়ে অত্যন্ত সচেতন (লিগালিজম); অন্যদিকে তারাই হয়তো প্রতিবেশীর হক মারছেন, ঘুষ খাচ্ছেন, কিংবা গৃহকর্মীর সাথে অমানবিক আচরণ করছেন (মোরালিজমের অভাব)। তাদের কাছে ধর্ম মানে হলো কিছু যান্ত্রিক নিয়ম পালন, কিন্তু সেই নিয়মগুলো তাদের চরিত্রকে স্পর্শ করছে না।

ইব্রাহিম মুসা (Ebrahim Moosa) তার গবেষণায় দেখান যে, আধুনিক যুগে শরিয়ার সংকট আসলে এই এথিক্যাল বা নৈতিক ভিত্তির ধসে পড়ার সংকট। যতক্ষণ না আমরা ফিকহ এবং আখলাককে আবার এক করতে পারছি, যতক্ষণ না আমরা বুঝতে পারছি যে ‘আইনগতভাবে সঠিক’ মানেই ‘আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য’ নয়, ততক্ষণ শরিয়া তার পূর্ণতা পাবে না। শরিয়া কোনো শুষ্ক আইনি কোড নয়; এটি একটি নৈতিক পথচলা। আইন শরীর হলে নৈতিকতা তার প্রাণ। প্রাণ ছাড়া শরীর যেমন লাশ, নৈতিকতা ছাড়া আইনও তেমনি এক মৃত ও ভয়ঙ্কর কাঠামো। এই দুইয়ের মিলন ঘটানোই আজকের দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ডিভাইন কমান্ড থিওরি বনাম র‍্যাশনাল এথিক্স: ভালো কি আদেশের কারণে, নাকি ভালো বলেই আদেশ?

শরিয়ার দর্শনের গভীরে এমন একটি প্রশ্ন লুকিয়ে আছে যা গত হাজার বছর ধরে মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদ এবং দার্শনিকদের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু এর উত্তর খোঁজার ওপর নির্ভর করে আমরা ঈশ্বর, মানুষ এবং নৈতিকতাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করব। প্রশ্নটি হলো: কোনো কাজ কি ভালো কারণ আল্লাহ তা করতে বলেছেন? নাকি কাজটা নিজেই ভালো, তাই আল্লাহ তা করতে বলেছেন? শুনতে মনে হতে পারে এটা কথার মারপ্যাঁচ, কিন্তু এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে শরিয়ার নৈতিক কাঠামোর সবচেয়ে বড় ফাটল। এই বিতর্কটি মূলত দুটি বিশাল দার্শনিক শিবিরের যুদ্ধ: একদিকে ডিভাইন কমান্ড থিওরি (Divine Command Theory) বা ঐশ্বরিক আদেশবাদ, এবং অন্যদিকে র‍্যাশনাল এথিক্স (Rational Ethics) বা যুক্তিবাদী নীতিবিদ্যা। এই দুই শিবিরের টানাটানিতে শরিয়ার আইন এবং নৈতিকতার ভিত্তি বারবার কেঁপে উঠেছে।

আদেশের সার্বভৌমত্ব: ডিভাইন কমান্ড থিওরি বা আশারিয়া মতবাদ

ডিভাইন কমান্ড থিওরি (Divine Command Theory)-র মূল কথা হলো নৈতিকতার কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব নেই। ভালো (Good) এবং মন্দ (Evil) – এই ধারণাগুলো শূন্যে ভেসে বেড়ানো কোনো সত্য নয়। এগুলো একমাত্র ঈশ্বরের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। এই মতবাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রবক্তা ছিল সুন্নি ইসলামের প্রধান ধর্মতাত্ত্বিক গোষ্ঠী আশারিয়া (Ash’arite) সম্প্রদায়। দশম শতাব্দীর প্রখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ আবুল হাসান আল-আশারি (Abu al-Hasan al-Ash’ari) এবং পরবর্তীকালে ইমাম আল-গাজালি (Al-Ghazali) এই দর্শনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। তাদের যুক্তি ছিল ঈশ্বরের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা বা কুদরত (Qudra) নিয়ে। তারা বললেন, যদি আমরা বলি যে “মিথ্যা বলা খারাপ” এবং “সত্য বলা ভালো” এবং এই ভালো-মন্দ ঈশ্বরের আদেশের আগে থেকেই ঠিক করা আছে, তবে আমরা আসলে ঈশ্বরের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলছি। এর মানে দাঁড়ায়, ঈশ্বর চাইলেও মিথ্যাকে ‘ভালো’ বানাতে পারবেন না। অর্থাৎ, ঈশ্বর নৈতিকতার নিয়মের অধীন। আশারিয়া (Ash’arite) তাত্ত্বিকদের কাছে এটি ছিল অগ্রহণযোগ্য এবং এক ধরণের শিরক বা অংশীদারিত্ব। তাদের কাছে ঈশ্বর হলেন পরম সার্বভৌম সত্তা, যিনি কোনো নিয়ম বা যুক্তির কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন।

এই দর্শনের সারমর্ম হলো – ঈশ্বর যা আদেশ করেন, সেটাই ন্যায়বিচার; তিনি যা নিষেধ করেন, সেটাই অবিচার। এখানে কাজের নিজস্ব কোনো গুণাগুণ বা ইনট্রিনসিক ভ্যালু (Intrinsic Value) নেই। উদাহরণস্বরূপ, আমরা মনে করি হত্যা করা খারাপ। ডিভাইন কমান্ড থিওরি (Divine Command Theory) বলবে, হত্যা করা খারাপ হওয়ার একমাত্র কারণ হলো আল্লাহ এটি নিষেধ করেছেন। তাত্ত্বিকভাবে, আল্লাহ যদি আগামীকাল ওহির মাধ্যমে আদেশ দেন যে “নিরীহ মানুষকে হত্যা করা পুণ্যের কাজ”, তবে আশারিয়া লজিক অনুযায়ী সেটাই তখন নৈতিকভাবে ‘ভালো’ হয়ে যাবে এবং মানুষকে তা মানতে হবে। এখানে মানুষের বুদ্ধি বা বিবেক দিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। ইমাম আল-গাজালি (Al-Ghazali) তার আল-মুস্তাসফা (Al-Mustasfa) গ্রন্থে যুক্তি দেখান যে, আকল বা বুদ্ধির কাজ হলো কেবল ওহির সত্যতা যাচাই করা এবং নবীর বার্তা বোঝা; কিন্তু ভালো-মন্দ নির্ধারণ করার কোনো ক্ষমতা বুদ্ধির নেই। বুদ্ধি হলো দাসের মতো, আর ওহি হলো মনিবের মতো।

এই মতবাদের একটি বড় সুবিধা হলো এটি শরিয়াকে এক অটুট ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দেয়। যেহেতু ভালো-মন্দের চাবিকাঠি একমাত্র আল্লাহর হাতে, তাই মানুষ নিজের খেয়ালখুশি মতো নৈতিকতার সংজ্ঞা পাল্টাতে পারে না। এটি আইনকে এক ধরণের পবিত্র নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু এর সমস্যাটিও ভয়াবহ। এই দর্শন মেনে নিলে বলতে হয়, নৈতিকতা আসলে একটি ‘আরবিট্রেডারি’ বা খামখেয়ালি বিষয়। আজ যা ভালো, কাল তা খারাপ হতে পারে যদি আদেশ বদলে যায়। মানুষের বিবেক বলে, কিছু কাজ (যেমন শিশুদের নির্যাতন করা) সব সময়ই খারাপ, আল্লাহ নিষেধ করুন বা না করুন। কিন্তু ডিভাইন কমান্ড থিওরি (Divine Command Theory) এই স্বভাবজাত বিবেককে স্বীকার করতে চায় না। তাদের মতে, ওহি ছাড়া মানুষ এক অন্ধ নাবিক, যে জানে না কোন দিকে তার জাহাজ চালাতে হবে।

যুক্তির আলোকবর্তিকা: র‍্যাশনাল এথিক্স বা মুতাজিলা দর্শন

এর ঠিক বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে র‍্যাশনাল এথিক্স (Rational Ethics) বা যুক্তিবাদী নীতিবিদ্যা। ইসলামের ইতিহাসে এই ধারার প্রধান বাহক ছিল মুতাজিলা (Mu’tazilite) সম্প্রদায় এবং পরবর্তীতে হানাফি মাযহাবের তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদানকারী মাতুরিদি (Maturidi) সম্প্রদায়। তাদের দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল আল্লাহর ন্যায়বিচার বা আদল (Adl)। বিখ্যাত মুতাজিলা তাত্ত্বিক আব্দ আল-জাব্বার (Abd al-Jabbar) যুক্তি দেন যে, আল্লাহ হলেন পরম প্রজ্ঞাময় এবং ন্যায়পরায়ণ। তিনি কখনোই এমন কিছু আদেশ করতে পারেন না যা অযৌক্তিক বা অন্যায্য। মুতাজিলাদের মতে, ভালো এবং মন্দের নিজস্ব একটি সত্তা বা অবজেক্টিভিটি আছে। তারা একে বলেন হুসন (Husn) বা সৌন্দর্য (ভালো) এবং কুবহ (Qubh) বা কদর্যতা (মন্দ)। সত্য কথা বলা তার নিজের গুণেই সুন্দর, আর মিথ্যা বলা তার নিজের দোষেই কদর্য। আল্লাহ সত্য বলতে আদেশ দিয়েছেন কারণ সত্য বলাটা ‘ভালো’, এমন নয় যে আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন বলেই তা ভালো হয়েছে।

র‍্যাশনাল এথিক্স (Rational Ethics) দাবি করে যে, মানুষকে আল্লাহ আকল (Intellect) বা বুদ্ধি দিয়েছেন যেন সে সত্য এবং মিথ্যার এই পার্থক্যটা নিজেই বুঝতে পারে। ওহি বা ধর্মগ্রন্থ না থাকলেও একজন সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ বুঝতে পারবে যে চুরি করা খারাপ বা এতিমের মাল ভক্ষণ করা অন্যায়। ওহির কাজ হলো মানুষকে এই সত্যগুলো মনে করিয়ে দেওয়া এবং বিস্তারিত গাইডলাইন দেওয়া, কিন্তু নৈতিকতার উৎস ওহির বাইরেও অস্তিত্বশীল। এই দর্শন অনুযায়ী, আল্লাহ নিজেও যুক্তির বা রিজন-এর বাইরে কাজ করেন না। আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন না (যেমন তিনি নিজেকে ধ্বংস করতে পারেন না বা মিথ্যা বলতে পারেন না), কারণ এটি তার ডিভাইন নেচার বা ঐশ্বরিক সত্তার বিরোধী।

এই দর্শনের প্র্যাকটিক্যাল ইমপ্যাক্ট বা ব্যবহারিক প্রভাব বিশাল। যদি আমরা মেনে নিই যে নৈতিকতা যুক্তিনির্ভর, তবে শরিয়ার যেকোনো আইনকে আমরা যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করতে পারি। আমরা প্রশ্ন করতে পারি, “এই আইনটি কি ন্যায়সংগত?” বা “এই শাস্তির উদ্দেশ্য কি সফল হচ্ছে?” মুতাজিলা (Mu’tazilite) এবং মাতুরিদি (Maturidi) দৃষ্টিভঙ্গিতে, শরিয়া কোনো অন্ধ আনুগত্যের নাম নয়। এটি একটি যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থা যা মানুষের কল্যাণের জন্য তৈরি। যদি কোনো আইন বা ফতোয়া যুক্তির বিচারে অমানবিক বা ক্ষতিকর মনে হয়, তবে বুঝতে হবে হয় আমাদের ব্যাখ্যায় ভুল আছে, অথবা সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। এই দর্শন মানুষকে প্রশ্ন করার, চিন্তা করার এবং শরিয়াকে প্রতিনিয়ত নবায়ন করার সাহস যোগায়। কিন্তু একই সাথে এটি এক বড় ঝুঁকির জন্ম দেয় – মানুষের বুদ্ধি কি সবসময় নির্ভুল? মানুষ যদি নিজের সীমিত বুদ্ধি দিয়ে আল্লাহর অসীম জ্ঞানকে বিচার করতে যায়, তবে সে কি শেষ পর্যন্ত ধর্মকেই অস্বীকার করে বসবে না?

দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু: শরিয়া কি অন্ধ আনুগত্য নাকি সচেতন যুক্তি?

এই দুই বিপরীতধর্মী দর্শনের সংঘর্ষ শরিয়ার ভেতরে এক গভীর ক্ষত বা ফাটল তৈরি করেছে। এই দ্বন্দ্বটি কেবল তাত্ত্বিক আকাশকুসুম কল্পনা নয়, এটি সরাসরি আইন প্রণয়ন এবং বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে।

প্রথম বড় কন্ট্রাডিকশন বা স্ববিরোধিতা হলো – অমনিপোটেন্স (Omnipotence) বনাম অমনিবেনেভোলেন্স (Omnibenevolence)। আশারিয়া বা ডিভাইন কমান্ড থিওরি (Divine Command Theory) আল্লাহর সর্বশক্তিমান ক্ষমতাকে (Omnipotence) রক্ষা করতে গিয়ে তাকে এমন এক শাসকে পরিণত করে যার আদেশের কোনো কার্যকারণ বা ‘লজিক’ খোঁজা নিষেধ। এখানে আল্লাহ হলেন এক মহাজাগতিক সুলতান, যার হুকুমই শেষ কথা। অন্যদিকে, মুতাজিলা বা র‍্যাশনাল এথিক্স (Rational Ethics) আল্লাহর পরম দয়ালু সত্তা ও ন্যায়পরায়ণতাকে (Omnibenevolence) রক্ষা করতে গিয়ে তার ক্ষমতাকে যুক্তির ফ্রেমে বন্দী করে ফেলে। কন্ট্রাডিকশনটা হলো – আমরা কি এমন এক আল্লাহকে চাই যিনি যা খুশি তাই করতে পারেন (এমনকি অবিচারও, তাত্ত্বিকভাবে), নাকি এমন এক আল্লাহকে চাই যিনি অবশ্যই ন্যায়বিচার করবেন কিন্তু যুক্তির নিয়মে বাঁধা? শরিয়া একই সাথে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা এবং তার পরম ন্যায়ের কথা বলে, যা এই দুই থিওরির মাঝখানে পড়ে বিপর্যস্ত হয়।

দ্বিতীয়ত, আইনের ব্যাখ্যায় এই দ্বন্দ্ব মারাত্মক রূপ নেয়। ধরুন, শরিয়ায় এমন একটি বিধান পাওয়া গেল যা আধুনিক মানবাধিকার বা হিউম্যান রাইটস-এর সাথে সাংঘর্ষিক। ডিভাইন কমান্ড থিওরি (Divine Command Theory) বলবে, “চুপ করে মেনে নাও। তোমার বুদ্ধি দিয়ে আল্লাহর বিচার বোঝা সম্ভব নয়। আল্লাহ বলেছেন, এটাই চূড়ান্ত ন্যায়।” এখানে প্রশ্ন করা পাপ, যুক্তি দেখানো ঔদ্ধত্য। এটি শরিয়াকে করে তোলে অনড় এবং পরিবর্তনবিমুখ। কিন্তু র‍্যাশনাল এথিক্স (Rational Ethics) বলবে, “না, আল্লাহ কখনোই অবিচার করতে পারেন না। যদি এই আইনটি অবিচার মনে হয়, তবে নিশ্চয়ই আমরা টেক্সটের ভুল অর্থ করছি, অথবা এই হুকুমটি একটি বিশেষ সময়ের জন্য ছিল।” এই দৃষ্টিভঙ্গি শরিয়াকে নমনীয় করে ঠিকই, কিন্তু এর বিপদ হলো – মানুষ তখন নিজের সুবিধামতো ‘ন্যায়বিচার’-এর সংজ্ঞা তৈরি করে শরিয়াকে পাশ কাটাতে শুরু করে। তখন ওহির চেয়ে মানুষের যুক্তি বড় হয়ে দাঁড়ায়। যদি যুক্তি দিয়েই সব বোঝা যায়, তবে আর ওহির দরকার কী? জর্জ হুরানি (George Hourani) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ইসলামি দর্শন এক গোলকধাঁধায় আটকে গেছে, যেখানে এক পথ বেছে নিলে অন্য পথ বন্ধ হয়ে যায় (Hourani, 1985)।

তৃতীয়ত, সাবজেক্টিভিটি অব রিজন (Subjectivity of Reason) বা যুক্তির আপেক্ষিকতা। র‍্যাশনাল এথিক্স দাবি করে যে বুদ্ধি দিয়ে ভালো-মন্দ বোঝা যায়। কিন্তু কার বুদ্ধি? একজন চোরের বুদ্ধি আর একজন সাধুর বুদ্ধি এক নয়। একজন পশ্চিমা দার্শনিকের ‘ন্যায়বিচার’ আর একজন মধ্যপ্রাচ্যের আলেম-এর ‘ন্যায়বিচার’ এক নয়। যদি আমরা নৈতিকতাকে বুদ্ধির ওপর ছেড়ে দিই, তবে শরিয়া হাজার টুকরো হয়ে যাবে। একেক জন একেক রকম ব্যাখ্যা দেবে। এই ভয় থেকেই ঐতিহাসিকভাবে সুন্নি ইসলাম আশারিয়া (Ash’arite) মতবাদকে গ্রহণ করেছে এবং মুতাজিলাদের যুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা মনে করেছে, বিশৃঙ্খল যুক্তির চেয়ে অন্ধ আনুগত্য অনেক বেশি নিরাপদ। কিন্তু এই নিরাপত্তার মূল্য দিতে হয়েছে শরিয়ার প্রাণশক্তি বা ডাইনামিজমকে বলি দিয়ে। বুদ্ধি চর্চা কমে যাওয়ার ফলে শরিয়া হয়ে পড়েছে স্থবির।

একটি অসমাপ্ত বিতর্কের রেশ

আজকের যুগে আমরা যখন শরিয়া নিয়ে কথা বলি, তখন আমরা আসলে অবচেতনে এই হাজার বছরের পুরনো ডিবেটটাই চালিয়ে যাই। যখন কেউ বলে, “কুরআনে আছে, তাই মানতে হবে” – সে আসলে ডিভাইন কমান্ড থিওরি (Divine Command Theory)-র প্রতিধ্বনি করছে। আর যখন কেউ বলে, “ইসলাম শান্তির ধর্ম, তাই ইসলামে সন্ত্রাসের কোনো স্থান নেই (যদিও কিছু টেক্সট ভায়োলেন্স সাপোর্ট করে বলে মনে হয়)” – সে তখন র‍্যাশনাল এথিক্স (Rational Ethics) ব্যবহার করছে। সে ধরে নিচ্ছে যে সন্ত্রাস ‘খারাপ’ (বুদ্ধি দ্বারা নির্ধারিত), তাই আল্লাহ এটা সমর্থন করতে পারেন না।

শরিয়ার ট্র্যাজেডি (অনেকের মতে সৌন্দর্য) হলো, সে এই দুই নৌকায় পা দিয়ে চলছে। সে একদিকে দাবি করে আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং তার আদেশ প্রশ্নাতীত; অন্যদিকে সে দাবি করে আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ এবং তার আইন মানুষের কল্যাণের জন্য। কিন্তু যখন ‘আদেশ’ এবং ‘কল্যাণ’ মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন শরিয়া কার পক্ষ নেবে? এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই। কেভিন রেইনহার্ট (Kevin Reinhart) তার বিফোর রিভিলেশন (Before Revelation) বইতে দেখিয়েছেন যে, ইসলামি আইনতত্ত্ব বা উসুল আল-ফিকহ আসলে এই দুই দর্শনের একটি হাইব্রিড তৈরি করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সেই জোড়াতালি সবসময় টেকেনি। কখনো আশারিয়া মতবাদ জিতে গেছে, কখনো মাতুরিদি যুক্তি উঁকি দিয়েছে। এই টানাপোড়েন না থাকলে শরিয়া হয়তো অনেক সহজ হতো, কিন্তু তা আর মানুষের জন্য কোনো চ্যালেঞ্জ বা পরীক্ষা হয়ে থাকত না (Reinhart, 1995)।

দিনশেষে, ডিভাইন কমান্ড থিওরি (Divine Command Theory) এবং র‍্যাশনাল এথিক্স (Rational Ethics)-এর এই দ্বন্দ্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষ হিসেবে আমাদের অবস্থান কোথায়। আমরা কি কেবল আদেশের দাস, নাকি আমরা চিন্তাশীল প্রতিনিধি? শরিয়া হয়তো চায় আমরা একই সাথে দুটোই হই – যুক্তি দিয়ে বুঝি, আবার ভক্তি দিয়ে মানি। কিন্তু এই দুটোর পারফেক্ট ব্যালেন্স বা ভারসাম্য রক্ষা করা যে কত কঠিন, তা শরিয়ার ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় লেখা আছে।

অকেশনালিজম বনাম ন্যাচারাল ল: আগুনের কি পোড়ানোর ক্ষমতা আছে?

আমরা যখন আমাদের চারপাশের জগতটাকে দেখি, তখন সবকিছু খুব সুশৃঙ্খল মনে হয়। হাতে গরম চায়ের কাপ (দুঃখিত, গরম কফির মগ) নিলে হাতে ছ্যাঁকা লাগে। তুলা আগুনের কাছে নিলে দপ করে জ্বলে ওঠে। আমরা ধরে নিই, এটাই স্বাভাবিক। আগুনের ধর্মই হলো পোড়ানো। এটা তার নিজস্ব স্বভাব বা নেচার। বিজ্ঞান বলে, এখানে একটা কার্যকারণ বা কজালিটি (Causality) সম্পর্ক আছে। আগুন হলো কারণ, আর পুড়ে যাওয়াটা হলো কার্য। এই যে প্রকৃতির একটা নিজস্ব নিয়ম আছে, যা অমোঘ এবং অপরিবর্তনীয় – একে দর্শনের ভাষায় বলা হয় ন্যাচারাল ল (Natural Law) বা প্রাকৃতিক আইন। কিন্তু শরিয়ার অন্দরমহলে উঁকি দিলে দেখবেন, এই আপাত-সহজ সত্যটা নিয়ে এক ভয়াবহ দার্শনিক তোলপাড় চলছে। এই তোলপাড়ের একদিকে আছে প্রকৃতির নিয়ম বা ন্যাচারাল ল, আর অন্যদিকে আছে এক অদ্ভুত ও চমকপ্রদ মতবাদ – যার নাম অকেশনালিজম (Occasionalism)

শরিয়ার ইতিহাসে এই দ্বন্দ্বটি শুধু তাত্ত্বিক বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন। অকেশনালিজম (Occasionalism) বা উপলক্ষবাদ দাবি করে, এই মহাবিশ্বে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ‘কারণ’ বা এজেন্ট নেই। আগুনের নিজস্ব কোনো পোড়ানোর ক্ষমতা নেই, বিষের নিজস্ব কোনো মারার ক্ষমতা নেই, এমনকি মানুষের নিজের হাত নাড়ানোরও কোনো স্বাধীন ক্ষমতা নেই। তাহলে আগুন তুলাকে পোড়ায় কেন? এই মতবাদ বলে, আগুন যখন তুলার সংস্পর্শে আসে, ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহ সেখানে ‘পোড়া’ নামক ঘটনাটি সৃষ্টি করেন। আগুনটা এখানে একটা উপলক্ষ বা অকেশন মাত্র। আল্লাহ চাইলে আগুনের সংস্পর্শে তুলা ঠাণ্ডাও হয়ে যেতে পারত (যেমনটা নবী ইব্রাহিমের ক্ষেত্রে হয়েছিল)। অর্থাৎ, প্রকৃতির কোনো নিজস্ব নিয়ম বা আইন নেই; যা আছে তা হলো আল্লাহর মুহূর্তের ইচ্ছা। এই দর্শনটি শুনতে খুব ভক্তিপূর্ণ মনে হতে পারে, কিন্তু এর ফলাফল সুদূরপ্রসারী। যদি প্রকৃতির কোনো নিয়ম না থাকে, তবে শরিয়া কি মানুষের ‘স্বভাব’ বা প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হতে পারে? নাকি শরিয়া হবে প্রকৃতির নিয়মের তোয়াক্কা না করা এক ঐশ্বরিক হুকুম?

মহাজাগতিক অনিশ্চয়তা: আশআরী ধর্মতত্ত্বের জগৎ

এই অকেশনালিজমের ধারণাটি মুসলিম মানসজগতে গেঁথে দেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন ইমাম আল-গাজালি (Al-Ghazali) এবং তার অনুসারী আশআরী (Ash’arite) ধর্মতত্ত্ববিদরা। গাজালি তার বিখ্যাত বই দ্য ইনকোহেরেন্স অফ দ্য ফিলোসফারস (The Incoherence of the Philosophers)-এ গ্রিক দর্শন এবং কার্যকারণ সম্পর্কের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আমরা যে দেখি আগুনের পর ধোঁয়া হচ্ছে, এটা আমাদের চোখের অভ্যাস, বা আদত (Adat)। আল্লাহ সাধারণত আগুনের পরে পোড়া সৃষ্টি করেন, এটা তার অভ্যাস বা ‘হ্যাবিট অব গড’। কিন্তু অভ্যাস মানে নিয়ম নয়। অভ্যাস যেকোনো সময় বদলানো যায়। গাজালি যুক্তি দেখান, যদি আমরা মেনে নিই যে আগুনের নিজস্ব পোড়ানোর ক্ষমতা আছে, তবে আমরা আল্লাহর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা বা অমনিপোটেন্স (Omnipotence)-কে খাটো করে ফেলি। তখন মনে হবে, আল্লাহ বুঝি আগুনের কাছে জিম্মি!

এই দর্শনের প্রভাব শরিয়ার ওপর কীভাবে পড়ল? শরিয়া হয়ে উঠল এমন এক আইনি ব্যবস্থা, যা প্রকৃতির যুক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। যেহেতু মানুষের বা প্রকৃতির কোনো স্থায়ী স্বভাব নেই (কারণ আল্লাহ যেকোনো মুহূর্তে তা বদলে দিতে পারেন), তাই ‘প্রাকৃতিক আইন’ বা ন্যাচারাল ল-এর ভিত্তিতে কোনো অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। মানুষ স্বাধীন, মানুষ সমান, বা মানুষের বাঁচার অধিকার আছে – এগুলো আধুনিক যুগে আমরা ‘প্রাকৃতিক অধিকার’ বা ন্যাচারাল রাইটস (Natural Rights) বলি। আমরা মনে করি মানুষ হিসেবে জন্মালেই এই অধিকারগুলো প্রকৃতির নিয়মেই পাওয়া যায়। কিন্তু অকেশনালিজম (Occasionalism) এই ধারণাটিকে গোড়াতেই নাকচ করে দেয়। এই দর্শন বলে, মানুষের নিজস্ব কোনো অধিকার নেই; আছে কেবল আল্লাহর দেওয়া হুকুম। আল্লাহ যদি বলেন হত্যা করা ভালো, তবে তাত্ত্বিকভাবে সেটাই ভালো (কারণ ভালো-মন্দের নিজস্ব কোনো সত্তা নেই)। ফলে শরিয়া এমন এক আইনি কাঠামোতে পরিণত হলো, যেখানে যুক্তির চেয়ে ওহির টেক্সট বা পাঠ অনেক বেশি শক্তিশালী। কারণ যুক্তি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল, আর প্রকৃতি নিজেই অনিশ্চিত।

এর বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিল মুতাজিলা (Mu’tazilite) সম্প্রদায় এবং ইবনে রুশদ বা অ্যাভেরোজ (Averroes)-এর মতো দার্শনিকরা। তারা বলতেন, আল্লাহ এই জগতকে একটি প্রজ্ঞাময় বা র‍্যাশনাল নিয়ম দিয়েই বানিয়েছেন। তিনি খামখেয়ালি নন। তিনি আগুনকে পোড়ানোর ক্ষমতা দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। এই নিয়মগুলো তিনি সচরাচর ভাঙেন না। ইবনে রুশদ বলেছিলেন, যদি জগতে কার্যকারণ না থাকে, তবে তো কোনো জ্ঞানই সম্ভব নয়। আজ আমি জানলাম আগুন পোড়ায়, কাল যদি দেখি আগুন ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, তবে বিজ্ঞান চর্চা করব কীভাবে? এই দার্শনিকরা বিশ্বাস করতেন, শরিয়া মানুষের ফিতরাত (Fitrah) বা স্বভাবজাত প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ, মানুষের বিবেক বা প্রকৃতি যা চায় (যেমন ন্যায়বিচার), শরিয়াও তাই চায়। এখানে প্রকৃতি এবং শরিয়া একে অপরের শত্রু নয়, বরং বন্ধু। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাসে, সুন্নি মুসলিম বিশ্বে আশআরী মতবাদ বা অকেশনালিজম জয়ী হলো, আর ন্যাচারাল ল-এর ধারণা কোণঠাসা হয়ে পড়ল।

আধুনিকতার সংকট: বিজ্ঞান ও আইনের মুখোমুখি শরিয়া

আজকের একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই হাজার বছরের পুরনো দ্বন্দ্বটি নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান এবং আধুনিক রাষ্ট্র – দুটোই দাঁড়িয়ে আছে ন্যাচারাল ল (Natural Law) বা প্রকৃতির নিয়মের ওপর। একজন বিজ্ঞানী যখন ল্যাবে কাজ করেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে প্রকৃতির নিয়মগুলো স্থির। তিনি জানেন, হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন মিললে জল হবেই; এটা আল্লাহর মুহূর্তের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল নয় (অন্তত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সময়)। একইভাবে, আধুনিক রাষ্ট্র চলে সংবিধান এবং মানবাধিকারের ওপর ভিত্তি করে, যা ধরে নেয় মানুষের কিছু জন্মগত বা প্রাকৃতিক অধিকার আছে। এখন শরিয়া যখন এই আধুনিক বিশ্বের মুখোমুখি হয়, তখন এক বিশাল দার্শনিক সংঘর্ষ বা ক্ল্যাশ তৈরি হয়।

সমস্যাটা কোথায়, একটু গভীরে দেখা যাক। আধুনিক আইন বলে, “মানুষ যুক্তিসম্পন্ন জীব, তাই তার বাকস্বাধীনতা থাকাটা প্রাকৃতিক অধিকার।” শরিয়ার আশআরী ব্যাখ্যা বলবে, “না। মানুষের কোনো প্রাকৃতিক অধিকার নেই। আল্লাহ যতটুকু কথা বলার অনুমতি দিয়েছেন, ততটুকুই সে বলবে। এর বেশি তার কোনো অধিকার নেই।” এই যে অধিকারের উৎসের ভিন্নতা, এটা শরিয়া এবং আধুনিক মানবাধিকার সনদের মধ্যে এক বিশাল দেয়াল তুলে দেয়। টোবি হাফ (Toby Huff) তার দ্য রাইজ অফ আর্লি মডার্ন সায়েন্স (The Rise of Early Modern Science) বইতে দেখিয়েছেন যে, মুসলিম বিশ্বে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠার পেছনে এই অকেশনালিজম একটি বড় কারণ ছিল। যখন আপনি বিশ্বাস করেন যে জগতের কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়, সব আল্লাহর ইচ্ছা, তখন আপনি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না। কারণ আইনের শাসন বা রুল অফ ল (Rule of Law) দাবি করে যে আইন সবার জন্য এবং সব সময়ের জন্য সমান হবে – ঠিক প্রকৃতির নিয়মের মতো।

অন্যদিকে, শরিয়া যদি আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে ন্যাচারাল ল (Natural Law)-কে স্বীকার করে নেয়, তবে তাকে তার নিজস্ব ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি বা থিওলজিক্যাল ফাউন্ডেশন ভাঙতে হয়। তাকে মেনে নিতে হয় যে, আল্লাহর ক্ষমতা প্রকৃতির নিয়মের দ্বারা সীমাবদ্ধ। এটা একজন বিশ্বাসীর জন্য খুব অস্বস্তিকর অবস্থান। এই দ্বন্দ্বটি শরিয়ার ভেতরে এক ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক স্কিজোফ্রেনিয়া তৈরি করেছে। একদিকে মুসলিমরা আধুনিক বিজ্ঞান ব্যবহার করছে (যা ন্যাচারাল ল-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত), অন্যদিকে তারা এমন এক শরিয়া বা ধর্মতত্ত্ব বিশ্বাস করছে যা সেই ন্যাচারাল ল-কে অস্বীকার করে। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক বা এপিস্টেমোলজিক্যাল (Epistemological) স্ববিরোধিতা শরিয়ার আধুনিকায়নের পথে সম্ভবত সবচেয়ে বড় ও অদৃশ্য বাধা।

ফিতরাত বনাম আদত: স্বভাব নাকি অভ্যাস?

শরিয়ার ভেতরে এই দ্বন্দ্বের আরেকটি চমৎকার দিক হলো মানুষের স্বভাব বা ফিতরাত (Fitrah) বনাম আল্লাহর অভ্যাস বা আদত (Adat)-এর লড়াই। ন্যাচারাল ল-পন্থীরা বলেন, শরিয়া এসেছে মানুষের ফিতরাত রক্ষা করার জন্য। আল্লাহ মানুষকে স্বাধীনচেতা এবং সম্মানজনক সত্তা হিসেবে বানিয়েছেন। তাই শরিয়ার কোনো আইন যদি মানুষের এই সম্মানের হানি করে (যেমন দাসপ্রথা), তবে বুঝতে হবে সেই আইনটি ফিতরাতের বিরোধী এবং তা বাতিলযোগ্য। তাদের কাছে, মানুষের বিবেক এবং প্রকৃতির ডাক হলো আল্লাহরই আরেকটি ওহি বা প্রত্যাদেশ। তারা মনে করেন, মহাবিশ্বের কিতাব (প্রকৃতি) আর ওহির কিতাব (কুরআন) – এই দুইয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ থাকতে পারে না।

কিন্তু অকেশনালিজম বা আশআরী পন্থীরা বলেন, মানুষের কোনো ফিক্সড ফিতরাত নেই যা অপরিবর্তনীয়। আল্লাহ চাইলে মানুষের স্বভাব বদলে দিতে পারেন। তাদের কাছে আদত (Adat) বা আল্লাহর অভ্যাসই আসল। আমরা যা দেখি, তা আল্লাহর অভ্যাস মাত্র। দাসপ্রথা যদি আল্লাহর হুকুম হয়, তবে সেটাই ন্যায়বিচার, তা আমাদের বিবেকে যতটাই খারাপ লাগুক না কেন। এই দর্শনে বিবেক বা প্রকৃতি গৌণ, টেক্সট বা ওহি মুখ্য। এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে শরিয়া অনেক সময় আধুনিক এথিক্স বা নীতিবিদ্যার সাথে সংঘাতে জড়ায়। যেমন, বাল্যবিবাহ। আধুনিক বিবেক (যা ন্যাচারাল ল দ্বারা প্রভাবিত) বলে এটি শিশুর প্রকৃতির বিরোধী। কিন্তু আশআরী ব্যাখ্যাকৃত শরিয়া বলতে পারে, টেক্সটে অনুমতি আছে, তাই এটি বৈধ; প্রকৃতির দোহাই দিয়ে লাভ নেই।

এই দার্শনিক টানাপোড়েন শরিয়াকে একটি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। শরিয়া কি প্রকৃতির অমোঘ সত্যের ওপর দাঁড়াবে, নাকি অলৌকিক ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে? যদি অলৌকিকতার ওপর নির্ভর করে, তবে আধুনিক যুক্তিবাদী সমাজে এটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। আর যদি প্রকৃতির ওপর দাঁড়ায়, তবে এটি তার ‘ঐশ্বরিক’ রহস্যময়তা হারিয়ে ফেলতে পারে। এই অকেশনালিজম (Occasionalism) বনাম ন্যাচারাল ল (Natural Law)-এর দ্বন্দ্বটি শরিয়ার শুধু আইনি লড়াই নয়, এটি মহাজাগতিক অস্তিত্বের লড়াই। আগুনের কি পোড়ানোর ক্ষমতা আছে? – এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর নির্ভর করছে শরিয়া আগামী দিনে কেমন সমাজ গড়বে।

অকেশনালিজমের প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব: অনিশ্চয়তার সমাজতত্ত্ব

এই তাত্ত্বিক বিতর্কের প্রভাব শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি মুসলিম সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশেও গভীর ছাপ ফেলেছে। যখন একটি সমাজ বিশ্বাস করে যে, আগামীকালের সূর্য ওঠা বা না ওঠা কোনো প্রাকৃতিক নিয়মের ওপর নয় বরং সরাসরি আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল, তখন সেই সমাজের মানুষের মনস্তত্ত্বে এক ধরনের ‘ক্ষণস্থায়ীত্ব’ বা টেম্পোরালিটি (Temporality) তৈরি হয়। তারা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার চেয়ে তাৎক্ষণিক বর্তমানকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কারণ, ভবিষ্যৎ তো নিশ্চিত নয়। এই মানসিকতা অর্থনৈতিক ও আইনি প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রে একটি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক পুঁজিবাদ বা ক্যাপিটালিজম দাঁড়িয়ে আছে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার ওপর। ব্যাংক ঋণ দেয় এই বিশ্বাসে যে, আগামী বিশ বছর ধরে ঋণগ্রহীতা কিস্তি শোধ করবে। বীমা কোম্পানি পলিসি বিক্রি করে এই বিশ্বাসে যে, গড় আয়ু বা দুর্ঘটনার হার পরিসংখ্যানের নিয়মে চলবে। কিন্তু অকেশনালিজম বা আশআরী বিশ্বদৃষ্টিতে এই ধরনের গাণিতিক ভবিষ্যদ্বাণী করা এক ধরনের ঔদ্ধত্য। কারণ, আল্লাহ যেকোনো মুহূর্তে পরিসংখ্যানের নিয়ম ভেঙে দিতে পারেন।

ঐতিহাসিকভাবে, এই অনিশ্চয়তার দর্শন মুসলিম বণিকদের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। তারা দীর্ঘস্থায়ী কোম্পানি বা কর্পোরেশন গড়ার চেয়ে স্বল্পমেয়াদী অংশীদারিত্ব বা পার্টনারশিপ ব্যবসায় বেশি আগ্রহী ছিল। কারণ, ভবিষ্যতের ওপর আস্থা রাখা কঠিন ছিল। অন্যদিকে, ইউরোপে যখন ন্যাচারাল ল-এর ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন তারা বিশ্বাস করতে শুরু করল যে, প্রকৃতির মতো সমাজ ও অর্থনীতিরও কিছু অমোঘ নিয়ম আছে যা হঠাৎ করে বদলাবে না। এই আস্থার ওপর ভিত্তি করেই তারা ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড বা ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পেরেছিল। শরিয়ার অকেশনালিজম মানুষের মনে আল্লাহর ভয় জাগিয়ে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু একই সাথে তা আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্ব বা ইনস্টিটিউশনাল স্ট্যাবিলিটি তৈরির পথকে কিছুটা হলেও পিচ্ছিল করে দিয়েছে।

তাকলিদিজম বনাম ইজতিহাদিজম: সিলগালা অতীত নাকি উন্মুক্ত ভবিষ্যৎ?

শরিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় এবং সম্ভবত সবচেয়ে বিধ্বংসী বিতর্কটি আবর্তিত হয়েছে এর গতিশীলতাকে কেন্দ্র করে। শরিয়া কি একটি সমাপ্ত প্রকল্প, নাকি একটি চলমান প্রক্রিয়া? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মুসলিম বিশ্ব দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে দুটি বিশাল মনস্তাত্ত্বিক শিবিরে: তাকলিদিজম (Taqlidism) বা অন্ধ অনুকরণবাদ এবং ইজতিহাদিজম (Ijtihadism) বা স্বাধীন গবেষণা-বাদ। এই দ্বন্দ্বটি কেবল তাত্ত্বিক নয়, এটি মুসলিম সমাজের স্থবিরতা বনাম প্রগতি, এবং ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতার লড়াই। একদিকে আছে অতীতের মহান ইমামদের প্রতি শর্তহীন আনুগত্যের দাবি, যারা মনে করেন সত্য উদঘাটনের কাজ বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে; অন্যদিকে আছে সমসাময়িক বুদ্ধিজীবীদের আর্তনাদ, যারা মনে করেন সময়ের সাথে তাল মেলাতে না পারলে শরিয়া ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। এই লড়াইয়ে শরিয়া আজ এক গভীর অস্তিত্ব-সংকটের মুখোমুখি, যেখানে দরজা খোলা রাখলেও বিপদ, আবার বন্ধ করলেও বিপদ।

পূর্বসূরীদের ছায়াতলে: তাকলিদিজম বা অনুকরণবাদের দুর্গ

তাকলিদ (Taqlid) শব্দটি এসেছে আরবি ‘কিলাদা’ থেকে, যার অর্থ গলায় রশি বা হার পরানো। পারিভাষিক অর্থে, এর মানে হলো কোনো প্রমাণ বা দলিল জিজ্ঞাসা না করেই একজন বিশেষজ্ঞ বা ইমামের মতামত মেনে নেওয়া। তাকলিদিজম (Taqlidism)-এর মূল দর্শন হলো – শরিয়ার বিধানগুলো বোঝার জন্য যে মেধা, পাণ্ডিত্য এবং আধ্যাত্মিক গভীরতা প্রয়োজন, তা পরবর্তী যুগের মানুষের নেই। হিজরি দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীতে (অষ্টম ও নবম খ্রিস্টাব্দ) ইমাম আবু হানিফা (Abu Hanifa), ইমাম মালিক (Malik ibn Anas), ইমাম শাফেয়ী (Al-Shafi’i) এবং ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (Ahmad ibn Hanbal)-এর মতো যে বিশাল প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বরা এসেছিলেন, তারা কুরআন ও সুন্নাহ মন্থন করে সব সমস্যার সমাধান দিয়ে গেছেন। তাদের পর আর এমন কোনো ‘সুপারম্যান’ আসা সম্ভব নয় যিনি তাদের রায়কে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। তাই নিরাপদ এবং একমাত্র পথ হলো এই চার মাযহাবের যেকোনো একটিকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা।

এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নিয়েছে ইসলামের আইনি ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ধারণা – “ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া” বা ইনসিদাদ বাব আল-ইজতিহাদ (Closing the Gate of Ijtihad)। দশম শতাব্দীর পর থেকে সুন্নি আলেমদের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, আইনের সব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়ে গেছে। এখন নতুন করে ইজতিহাদ (Ijtihad) বা গবেষণা করার দরকার নেই, বরং পুরনো কিতাবের রায়গুলো মুখস্থ করা এবং প্রয়োগ করাই যথেষ্ট। একে বলা হয় তাকলিদ আল-শাখসি (Taqlid al-Shakhsi) বা নির্দিষ্ট ব্যক্তির অন্ধ অনুকরণ। তাকলিদপন্থীদের যুক্তি ছিল অত্যন্ত প্র্যাকটিক্যাল বা ব্যবহারিক। তারা ভয় পেয়েছিলেন যে, যদি প্রত্যেককে কুরআন-হাদিস ব্যাখ্যা করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়, তবে সমাজে আইনি নৈরাজ্য বা লিগ্যাল অ্যানার্কি তৈরি হবে। মূর্খ এবং অযোগ্য লোকেরা নিজেদের খেয়ালখুশি মতো ফতোয়া দেবে। শরিয়াকে এই সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা থেকে বাঁচানোর জন্য তারা ‘তাকলিদ’-এর দেয়াল তুলে দিলেন। বিখ্যাত ওরিয়েন্টালিস্ট জোসেফ শ্যাখট (Joseph Schacht) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, এই “দরজা বন্ধ হওয়ার” ধারণাটি শরিয়াকে স্থিতিশীলতা দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু একই সাথে একে এক অনড় পাথরে পরিণত করেছিল (Schacht, 1964)।

তাকলিদিজম (Taqlidism) শরিয়াকে দেখে একটি ‘কমপ্লিট প্যাকেজ’ হিসেবে। তাদের কাছে শরিয়া কোনো গবেষণাাগার নয়, বরং একটি জাদুঘর। এখানে নতুন কিছু তৈরি করা নিষেধ, শুধু পুরনো সম্পদ সংরক্ষণ করাই দায়িত্ব। এই দর্শনের ফলে মুসলিম সমাজে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক আলস্য বা ইন্টেলেকচুয়াল লেথার্জি তৈরি হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাদ্রাসায় এবং আদালতে একই কিতাব, একই উদাহরণ এবং একই যুক্তি চর্বিতচর্বণ করা হতে থাকে। নতুন সমস্যা এলে তারা নতুন সমাধান না খুঁজে পুরনো কিতাবের কোনো এক কোণায় সাদৃশ্য খোঁজার চেষ্টা করেন। যদি সমাধান না মেলে, তবে তারা নীরব থাকেন অথবা জোর করে পুরনো সমাধান চাপিয়ে দেন। তাকলিদপন্থীদের কাছে, পূর্বসূরীদের ভুলের চেয়ে নিজের নতুন উদ্ভাবন অনেক বেশি বিপজ্জনক। তাদের মটো হলো: “পূর্ববর্তীরা পরবর্তীদের জন্য কিছু বাকি রাখেননি।”

বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহ: ইজতিহাদিজম বা গবেষণাবাদের দাবি

এর ঠিক উল্টো পিঠে দাঁড়িয়ে আছে ইজতিহাদিজম (Ijtihadism)ইজতিহাদ (Ijtihad) শব্দের অর্থ হলো কোনো আইনি বিধান বের করার জন্য সর্বোচ্চ মানসিক প্রচেষ্টা চালানো। এই দর্শনের অনুসারীরা বলেন, আল্লাহ মানুষকে বিবেক দিয়েছেন এবং কুরআন-সুন্নাহ দিয়েছেন; তিনি কোথাও বলেননি যে চিন্তা করার ক্ষমতা শুধু চারজন ইমামের ছিল। পৃথিবী প্রতি মুহূর্তে পাল্টাচ্ছে। সপ্তম শতাব্দীর আরবের সমস্যা আর একবিংশ শতাব্দীর সিলিকন ভ্যালির সমস্যা এক নয়। ক্রিপ্টোকারেন্সি, টেস্ট টিউব বেবি, ক্লোনিং, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, মহাকাশ ভ্রমণ, বা আন্তর্জাতিক শেয়ার বাজার – এসব বিষয়ে ইমাম আবু হানিফা বা শাফেয়ীর কিতাবে কোনো সরাসরি সমাধান নেই। থাকার কথাও নয়। তাই এসব নতুন সমস্যার সমাধানের জন্য পুরনো কিতাব বন্ধ করে সরাসরি ওহির উৎসে ফিরে যেতে হবে এবং নতুন করে গবেষণা করতে হবে।

উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে মুসলিম বিশ্বের পতনের যুগে এই ইজতিহাদিজম নতুন করে জেগে ওঠে। এর প্রধান প্রবক্তা ছিলেন দার্শনিক ও কবি মুহাম্মদ ইকবাল (Muhammad Iqbal)। তিনি তার বিখ্যাত বই দ্য রিকনস্ট্রাকশন অফ রিলিজিয়াস থট ইন ইসলাম (The Reconstruction of Religious Thought in Islam)-এ ইজতিহাদকে ইসলামের “প্রিন্সিপাল অফ মুভমেন্ট” বা গতির মূলনীতি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ইকবাল (Muhammad Iqbal) বলেন, যে সমাজ ইজতিহাদ ছেড়ে দেয়, সে সমাজ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। তার মতে, ইজতিহাদের দরজা বন্ধ করা ছিল ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুল। এটি ইসলামকে এক জীবন্ত শক্তি থেকে এক মৃত ঐতিহ্যে পরিণত করেছে। ইকবাল এবং তার সমসাময়িক সংস্কারকরা (যেমন জামালুদ্দিন আফগানিমুহাম্মদ আবদুহ) দাবি করেন, ইসলাম কোনো স্থবির পুকুর নয়, এটি একটি প্রবহমান নদী। নদী যেমন তার গতিপথ বদলায় জল পানি একই থাকে, শরিয়াকেও তেমনি যুগের প্রয়োজনে তার আইনি কাঠামো বদলাতে হবে, কিন্তু মূলনীতি ঠিক রাখতে হবে (Iqbal, 1930)।

আধুনিক ইজতিহাদিজম (Ijtihadism) কেবল নতুন সমস্যার সমাধান চায় না, তারা পুরনো অনেক মীমাংসিত বিষয়কেও নতুন করে দেখতে চায়। তারা প্রশ্ন তোলে – নারীর সাক্ষ্য, দাসপ্রথা, বা অমুসলিমদের অধিকার নিয়ে মধ্যযুগের ফিকহবিদরা যে রায় দিয়েছেন, তা কি কুরআনের চিরন্তন নির্দেশ, নাকি তৎকালীন সমাজের প্রতিফলন? ইজতিহাদপন্থীরা বলেন, আমরা যদি আজ সেই পুরনো রায়গুলো আঁকড়ে থাকি, তবে আমরা ইসলামকে রক্ষা করছি না, বরং ইসলামকে আধুনিক যুগের সামনে লজ্জিত করছি। তাদের স্লোগান হলো: “উৎস এক, কিন্তু ব্যাখ্যা অনেক হতে পারে।” তারা মনে করেন, মুজতাহিদ বা গবেষক ভুল করতে পারেন, কিন্তু সেই ভুলের মধ্যেও সওয়াব আছে কারণ তিনি চেষ্টা করেছেন। স্তব্ধ হয়ে বসে থাকার চেয়ে ভুল পথে হাঁটাও শ্রেয় – এটিই ইজতিহাদের স্পিরিট।

শরিয়ার অভ্যন্তরীণ প্যারাডক্স: স্বাধীনতা নাকি নৈরাজ্য?

এই “তাকলিদ বনাম ইজতিহাদ” বিতর্কটি শরিয়ার ভেতরে এক ভয়াবহ কন্ট্রাডিকশন বা স্ববিরোধিতা তৈরি করেছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ইজতিহাদই সঠিক পথ, কিন্তু এর ব্যবহারিক প্রয়োগে বিশাল ঝুঁকি রয়েছে।

প্রথম দ্বন্দ্বটি হলো অথরিটিভ আনসার্টেনিটি (Authoritative Uncertainty) বা কর্তৃপক্ষের অনিশ্চয়তা। যদি ইজতিহাদের দরজা সবার জন্য খুলে দেওয়া হয়, তবে শরিয়ার “একক সত্য” বা অথরিটি বলে কিছু থাকে না। তখন শরিয়া হয়ে যায় একটি ‘সুপারমার্কেট’, যেখানে হাজার হাজার ভিন্ন ভিন্ন মত বা অপিনিয়ন তাকে সাজানো আছে। একজন স্কলার বলবেন ব্যাংকের সুদ জায়েজ, আরেকজন বলবেন হারাম। একজন বলবেন হিজাব ঐচ্ছিক, আরেকজন বলবেন বাধ্যতামূলক। সাধারণ মানুষ তখন বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে। একে বলা হয় ফতোয়া শপিং (Fatwa Shopping) – মানুষ তখন সেই ফতোয়াই বেছে নেবে যা তার সুবিধামতো হয়। শরিয়া তখন আর ‘ল’ বা আইন থাকে না, এটি হয়ে যায় ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয়। আধুনিক যুগে ইন্টারনেটের কারণে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। এখন যে কেউ নিজেকে ‘মুজতাহিদ’ দাবি করে ইউটিউবে ফতোয়া দিচ্ছে। তাকলিদপন্থীরা এই বিশৃঙ্খলার কথাই ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন। তারা বলেন, “দেখলে তো? দরজা খোলার ফল হলো শরিয়া এখন তামাশায় পরিণত হয়েছে।”

দ্বিতীয় দ্বন্দ্বটি হলো লিগ্যাল স্ট্যাবিলিটি (Legal Stability) বনাম সোশ্যাল রেলেভেন্স (Social Relevance)। রাষ্ট্র এবং বিচার ব্যবস্থার জন্য আইনের স্থিতিশীলতা খুব জরুরি। একজন বিচারক যদি প্রতিদিন নতুন নতুন ইজতিহাদ করে রায় দেন, তবে কোনো নাগরিকই জানবে না আইনটা আসলে কী। তাকলিদ বা ফিক্সড আইন রাষ্ট্রকে সেই স্থিতিশীলতা দেয়। কিন্তু এই স্থিতিশীলতার মূল্য দিতে হয় প্রাসঙ্গিকতা বা রেলেভেন্স হারিয়ে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর আইন দিয়ে যখন একবিংশ শতাব্দীর বিচার করা হয়, তখন তা সমাজের কাছে হাস্যকর বা নিষ্ঠুর মনে হতে পারে। ফজলুর রহমান (Fazlur Rahman) তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, তাকলিদের কারণে শরিয়া বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল মাদ্রাসার চার দেয়ালে বন্দী হয়ে পড়েছে। সমাজ এগিয়ে গেছে, কিন্তু আইন দাঁড়িয়ে আছে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। ফলে আধুনিক রাষ্ট্রগুলো বাধ্য হয়ে শরিয়াকে পাশ কাটিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ আইন বা সেক্যুলার ল তৈরি করেছে। অর্থাৎ, শরিয়াকে রক্ষা করতে গিয়ে (তাকলিদ), তারা আসলে শরিয়াকে সমাজ থেকে বিতাড়িত করে ফেলেছে (Rahman, 1982)।

তৃতীয়ত, সালাফিজম (Salafism)-এর উত্থান এই দ্বন্দ্বে এক অদ্ভুত মাত্রা যোগ করেছে। সালাফিরা দাবি করে তারা তাকলিদ মানে না, তারা মাযহাব মানে না, তারা সরাসরি হাদিস থেকে ইজতিহাদ করে। কিন্তু বাস্তবে তাদের ইজতিহাদ হলো চরমমাত্রার লিটারালিজম (Literalism) বা আক্ষরিকতাবাদ। তারা ইজতিহাদের নামে বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা করে না, বরং সপ্তম শতাব্দীর টেক্সটকে হুবহু কপি-পেস্ট করার চেষ্টা করে। আধুনিক মডার্নিস্ট ইজতিহাদপন্থীরা যেখানে ইজতিহাদ ব্যবহার করে শরিয়াকে উদার করতে চান, সালাফিরা সেখানে ইজতিহাদ ব্যবহার করে শরিয়াকে আরও কঠোর করতে চান। অর্থাৎ, ‘ইজতিহাদ’ শব্দটি নিজেই এখন এক যুদ্ধের ময়দান। কেউ ইজতিহাদ দিয়ে এগিয়ে যেতে চায়, কেউ ইজতিহাদ দিয়ে পেছাতে চায়।

একটি দোলাচল এবং অসমাপ্ত গন্তব্য

শরিয়া আজ তাকলিদ এবং ইজতিহাদের এই দ্বান্দ্বিক টানাপোড়েনে এক অদ্ভুত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে তাকলিদিজম একে বলছে, “থেমে যাও, নড়াচড়া করলেই বিপদ।” অন্যদিকে ইজতিহাদিজম বলছে, “দৌড়াও, না হলে মরে যাবে।” এই দুই আদেশের মাঝখানে শরিয়া দুলছে।

সমসাময়িক তাত্ত্বিক তাহা জাবির আল-আলওয়ানি (Taha Jabir Al-Alwani) তার উসুল আল-ফিকহ আল-ইসলামি (Usul al-Fiqh al-Islami)-তে মন্তব্য করেছেন যে, তাকলিদ ছিল একটি ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা বা প্রয়োজনীয়তা, কিন্তু একে চিরস্থায়ী নীতি বানানো ছিল একটি বিপর্যয়। তিনি বলেন, আমাদের সমস্যা হলো আমরা ইজতিহাদ চাই, কিন্তু ইজতিহাদের ঝুঁকি নিতে চাই না। আমরা চাই নতুন সমাধান, কিন্তু পুরনো নিশ্চয়তা বা সার্টেনিটি ছাড়তে ভয় পাই। এই ভয়ই মুসলিম মানসকে পঙ্গু করে রেখেছে (Al-Alwani, 1990)।

আজকের বাস্তবতা হলো, শরিয়া আর একক কোনো সত্তা নেই। এটি এখন বহুমুখী। একদল মানুষ তাকলিদ করে শান্তিতে আছে, তারা মনে করে তাদের দায়িত্ব শেষ। আরেকদল মানুষ ইজতিহাদ করে ক্লান্ত, তারা প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। কিন্তু আসল সংকট হলো – যিনি ইজতিহাদ করছেন, তার কি সেই যোগ্যতা আছে? আর যিনি তাকলিদ করছেন, তার কি সেই অন্ধত্ব মানার অধিকার আছে? শরিয়া কি কেবল বিশেষজ্ঞদের জন্য, নাকি সাধারণ মানুষের বিবেকের জন্যও? যতক্ষণ না এই প্রশ্নের উত্তর মিলছে, ততক্ষণ শরিয়া এই দ্বন্দ্বের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকবে। 

ইউনিভার্সালিজম বনাম পার্টিকুলারিজম: বিশ্বজনীন সত্য নাকি সাম্প্রদায়িক পরিচয়?

শরিয়া নিয়ে যে বিতর্কগুলো আধুনিক রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক আইনের অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি তোলপাড় তোলে, তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক অস্তিত্ববাদী প্রশ্ন: শরিয়া আসলে কার জন্য? এটি কি সমগ্র মানবজাতির জন্য এক অলঙ্ঘনীয় ঐশ্বরিক প্রেসক্রিপশন, নাকি এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের বা কমিউনিটির অভ্যন্তরীণ জীবনবিধান? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে শরিয়ার দর্শন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে: ইউনিভার্সালিজম (Universalism) বা সার্বজনীনতাবাদ এবং পার্টিকুলারিজম (Particularism) বা স্বাতন্ত্র্যবাদ। এই দুই ইজমের সংঘাত কেবল ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের গঠন, নাগরিকত্ব এবং মানবাধিকারের ধারণার ওপর সরাসরি আঘাত করেছে। শরিয়া দাবি করে সে বিশ্বজগতের জন্য রহমত, কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে সে প্রায়শই একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সীমানার মধ্যে আটকে যায়। এই “বিশ্বজনীন দাবি” এবং “সীমিত প্রয়োগ”-এর মধ্যকার ফাঁকটি শরিয়ার ইতিহাসের এক অমীমাংসিত প্যারাডক্স।

বিশ্বজগতের জন্য রহমত: ইউনিভার্সালিজমের মহাকাব্যিক দাবি

ইউনিভার্সালিজম (Universalism) বা সার্বজনীনতাবাদের মূল ভিত্তি হলো কুরআনের সেই ঘোষণা যেখানে নবী মুহাম্মদের “রাহমাতুল্লিল আলামিন” বা বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এই দর্শনের অনুসারীরা বিশ্বাস করেন, শরিয়া কোনো জাতি, বর্ণ বা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জন্য আসেনি; এটি এসেছে সমগ্র মানবজাতির নৈতিক এবং আইনি মুক্তির জন্য। তাদের যুক্তি হলো, শরিয়ার মূলনীতিগুলো – যেমন ন্যায়বিচার (আদল), দয়া (রহমত), মানুষের মর্যাদা (কারামাহ), এবং সম্পদের সুষম বণ্টন – এগুলো কোনো বিশেষ ধর্মের সম্পত্তি নয়, বরং এগুলো শাশ্বত মানবিক মূল্যবোধ বা ইউনিভার্সাল হিউম্যান ভ্যালুজ (Universal Human Values)। তাই শরিয়ার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা (যেমন সুদবিহীন লেনদেন) বা এর সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা (যেমন যাকাত) কেবল মুসলিমদের জন্য উপকারী নয়, বরং অমুসলিম, এমনকি নাস্তিকদের জন্যও কল্যাণকর।

এই দর্শনের তাত্ত্বিক ভিত্তি অনেক মজবুত। সাইয়্যিদ কুতুব (Sayyid Qutb) তার বিখ্যাত গ্রন্থ মাইলস্টোনস (Milestones)-এ যুক্তি দিয়েছেন যে, ইসলাম কোনো “ধর্ম” বা রিলিজিয়ন নয় প্রচলিত অর্থে; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা বা নিজাম (Nizam), যা মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বে নিয়ে আসে। কুতুবের মতে, শরিয়া হলো প্রকৃতির আইনের মতোই সত্য। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি যেমন সবার জন্য কাজ করে, শরিয়ার আইনও তেমনি সবার মঙ্গলের জন্য কাজ করে। তাই শরিয়া বাস্তবায়ন করা মানে হলো পৃথিবীকে তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনা। এখানে অমুসলিমদের ওপর আইন চাপিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন আসে না, বরং তাদের ‘অজ্ঞতা’ বা জাহিলিয়াহ (Jahiliyyah) থেকে মুক্ত করে ‘সত্যের আলো’র নিচে নিয়ে আসার কথা বলা হয়। ইউনিভার্সালিস্টরা মনে করেন, শরিয়া যদি সত্যিই আল্লাহর আইন হয়, তবে তা অবশ্যই সবার জন্য সেরা আইন হতে বাধ্য। সুতরাং, একটি রাষ্ট্রে শরিয়া চালু হলে তা হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ – সবার জন্যই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে।

আধুনিক যুগে অনেক ইসলামি অর্থনীতিবিদ এবং পরিবেশবাদীও এই ইউনিভার্সালিজম (Universalism)-এর ঝাণ্ডা উড়াচ্ছেন। তারা বলেন, পুঁজিবাদ বা ক্যাপিটালিজম বিশ্বকে ধ্বংস করছে, পরিবেশ নষ্ট করছে। এর একমাত্র বিকল্প হলো শরিয়া-ভিত্তিক অর্থনীতি এবং পরিবেশনীতি। এখানে শরিয়াকে উপস্থাপন করা হয় একটি ‘গ্লোবাল সলিউশন’ বা বৈশ্বিক সমাধান হিসেবে। তাদের মতে, শরিয়ার নিষেধাজ্ঞাগুলো (যেমন মদ বা জুয়া নিষিদ্ধকরণ) কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং সামাজিক ব্যাধি দূর করার বৈজ্ঞানিক উপায়। তাই এই আইনগুলো সবার ওপর প্রয়োগ করা কোনো জুলুম নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেন সে তার নাগরিকদের ক্ষতিকর কাজ থেকে বিরত রাখে। ইউনিভার্সালিজমের এই দৃষ্টিতে, শরিয়া হলো এক মহৌষধ যা সমগ্র মানবদেহের (বিশ্বের) রোগ সারানোর জন্য তৈরি, রোগী যেই হোক না কেন।

বিশ্বাসীদের একান্ত ভুবন: পার্টিকুলারিজমের বাস্তবতা

মুদ্রার উল্টো পিঠে আছে পার্টিকুলারিজম (Particularism) বা স্বাতন্ত্র্যবাদ। এই দর্শনটি শরিয়াকে দেখে মূলত ‘উম্মাহ’ বা মুসলিম কমিউনিটির নিজস্ব আইন হিসেবে। তাদের যুক্তি হলো, শরিয়া একটি চুক্তির বা কোভেন্যান্ট (Covenant)-এর ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে – যা আল্লাহ এবং বিশ্বাসীদের মধ্যে স্বাক্ষরিত। যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না, তারা এই চুক্তির অংশ নয়। তাই তাদের ওপর শরিয়ার বিধিবিধান চাপিয়ে দেওয়া অযৌক্তিক এবং অনৈতিক। ঐতিহাসিকভাবে, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা এই পার্টিকুলারিস্ট মডেলই অনুসরণ করেছে। মদিনার সনদে আমরা দেখি, ইহুদি এবং অন্যান্য গোত্রের জন্য তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী বিচার পাওয়ার অধিকার ছিল। অটোমান সাম্রাজ্যেও মিল্লাত সিস্টেম (Millet System) চালু ছিল, যেখানে খ্রিস্টান বা ইহুদিরা তাদের ধর্মীয় আইন অনুযায়ী আদালত চালাত। শরিয়া কেবল মুসলিমদের জন্য প্রযোজ্য ছিল।

পার্টিকুলারিজম (Particularism)-এর তাত্ত্বিকরা, যেমন সমসাময়িক চিন্তাবিদ আব্দুল্লাহি আহমেদ আন-নাইম (Abdullahi Ahmed An-Na’im), বলেন যে শরিয়াকে রাষ্ট্রীয় আইন হিসেবে গ্রহণ করাই ভুল। তার মতে, শরিয়া হলো ব্যক্তিগত বা সাম্প্রদায়িক নৈতিকতার বিষয়। রাষ্ট্র যদি শরিয়াকে সবার ওপর চাপিয়ে দেয়, তবে তা ধর্মের স্পিরিট নষ্ট করে এবং নাগরিকদের সমান অধিকারে হস্তক্ষেপ করে। আন-নাইম (Abdullahi Ahmed An-Na’im) তার ইসলাম অ্যান্ড দ্য সেকুলার স্টেট (Islam and the Secular State) বইতে যুক্তি দেখান যে, শরিয়া পালনের জন্য রাষ্ট্রীয় দণ্ড নয়, বরং ব্যক্তিগত ঈমান জরুরি। যখন রাষ্ট্র পুলিশ দিয়ে নামাজ পড়াতে যায় বা রোজা রাখাতে যায়, তখন তা আর ইবাদত থাকে না, ভণ্ডামি বা হিপোক্রিসিতে পরিণত হয়। তার মতে, শরিয়া ইউনিভার্সাল হতে পারে নৈতিক আবেদনের দিক থেকে, কিন্তু আইনি প্রয়োগের দিক থেকে এটি অবশ্যই পার্টিকুলার বা নির্দিষ্ট হতে হবে (An-Na’im, 2008)।

এই দর্শনের মূল কথা হলো – “লা ইকরাহা ফিদ দ্বীন” বা দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। পার্টিকুলারিস্টরা বলেন, যদি শরিয়া দাবি করে যে মদ খাওয়া হারাম, তবে সেটা মুসলিমদের জন্য হারাম। একজন খ্রিস্টান বা নাস্তিকের জন্য মদ খাওয়া তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ হতে পারে। রাষ্ট্র যদি শরিয়ার দোহাই দিয়ে তার গ্লাস কেড়ে নেয়, তবে রাষ্ট্র তার ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ করছে। শরিয়াকে যদি একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের কালচারাল আইডেন্টিটি বা সাংস্কৃতিক পরিচয় হিসেবে দেখা হয়, তবে সংঘাত কমে আসে। কিন্তু যখনই একে ‘সবার জন্য আইন’ হিসেবে দাবি করা হয়, তখনই এটি আধুনিক বহুত্ববাদী সমাজ বা প্লুরালিস্টিক সোসাইটির সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। পার্টিকুলারিজম চায় শরিয়া থাকুক মুসলিমদের ঘরে, মসজিদে এবং ব্যক্তিগত জীবনে; কিন্তু পার্লামেন্টে বা সুপ্রিম কোর্টে নয়।

রাষ্ট্র এবং আইনের সংঘাত: যেখানে ইউনিভার্সালিজম ও পার্টিকুলারিজম মুখোমুখি

এই দ্বন্দ্ব সবচেয়ে প্রকট আকার ধারণ করে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র বা নেশন-স্টেট-এর কাঠামোর ভেতরে। আধুনিক রাষ্ট্রের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আইনের সমতা বা লিগ্যাল ইক্যুয়ালিটি (Legal Equality) – অর্থাৎ এক দেশে এক আইন, যা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য সমান। এখানে শরিয়া এক বিশাল সংকটে পড়ে।

প্রথম সংকটটি হলো নাগরিকত্ব (Citizenship) বনাম জিম্মি (Dhimmi) স্ট্যাটাস। ক্লাসিক্যাল শরিয়া আইন অনুযায়ী (যা ইউনিভার্সালিস্টরা সমর্থন করেন), একটি ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিমরা ‘জিম্মি’ বা সংরক্ষিত প্রজা হিসেবে থাকে। তারা জিজিয়া কর দেয় এবং বিনিময়ে নিরাপত্তা পায়, কিন্তু তারা রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারে না বা সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পারে না। এটি ইউনিভার্সালিজম (Universalism)-এর এক অদ্ভুত রূপ – রাষ্ট্র সবার, কিন্তু অধিকার সবার সমান নয়। আধুনিক মানবাধিকার বা হিউম্যান রাইটস-এর দৃষ্টিতে এটি চরম বৈষম্যমূলক। আবার পার্টিকুলারিজম (Particularism) যদি মেনে নেওয়া হয় এবং বলা হয় “মুসলিমদের জন্য শরিয়া আইন, অমুসলিমদের জন্য সিভিল আইন”, তবে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা বা ইউনিটি নষ্ট হয়। একই অপরাধে (যেমন ব্যভিচার) মুসলিমের শাস্তি হবে পাথর মারা বা বেত্রাঘাত, আর অমুসলিম পাবে জেল-জরিমানা – একই দেশের নাগরিকদের জন্য দুই রকম শাস্তি কি ন্যায়বিচার? এই প্রশ্নের উত্তরে শরিয়ার তাত্ত্বিকরা আজও দ্বিধাবিভক্ত।

দ্বিতীয় সংকটটি হলো পাবলিক মোরালিটি (Public Morality) বা জননৈতিকতা। ইউনিভার্সালিজম (Universalism) দাবি করে যে শরিয়ার নৈতিকতাগুলো (যেমন শালীনতা, মাদক বর্জন) সমাজের মঙ্গলের জন্য জরুরি, তাই এগুলো পাবলিক ল বা জন-আইন হওয়া উচিত। যেমন আফগানিস্তান বা সৌদি আরবে হিজাব বা বোরকা পরা বাধ্যতামূলক করা হয় সবার জন্য, এমনকি অমুসলিম নারীদের জন্যও (জনসম্মুখে)। তাদের যুক্তি: “আমাদের দেশে আমাদের নিয়ম চলবে।” কিন্তু এটি কি ইউনিভার্সাল জাস্টিস? নাকি এটি মেজরিটারিয়ান ডমিনেশন বা সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য? উল্টো দিকে, পশ্চিমা সেক্যুলার রাষ্ট্রে যখন হিজাব নিষিদ্ধ করা হয় (যেমন ফ্রান্সে), তখন মুসলিমরা দাবি করে এটি তাদের ধর্মীয় অধিকার (পার্টিকুলারিজম)। অর্থাৎ, মুসলিমরা যখন সংখ্যালঘু, তখন তারা পার্টিকুলারিজম বা বিশেষ অধিকারের কথা বলে; আর যখন তারা সংখ্যাগুরু, তখন তারা ইউনিভার্সালিজম বা সার্বজনীন আইন চাপিয়ে দেওয়ার কথা বলে। এই দ্বিমুখী নীতি বা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড শরিয়ার নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক আইন বা ইন্টারন্যাশনাল ল (International Law)-এর সাথে শরিয়ার সম্পর্ক। ইউনিভার্সালিস্টরা মনে করেন শরিয়া নিজেই একটি আন্তর্জাতিক আইন এবং এটি জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। তারা কায়রো ডিক্লারেশন অন হিউম্যান রাইটস ইন ইসলাম (Cairo Declaration on Human Rights in Islam) তৈরি করেছেন যা শরিয়াকে মানবাধিকারের একমাত্র উৎস হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু পার্টিকুলারিস্টরা বলেন, শরিয়াকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপানো যাবে না। প্রতিটি জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি ও আইন তৈরির অধিকার আছে। শরিয়া যদি নিজেকে ‘একমাত্র সত্য’ হিসেবে দাবি করে, তবে তা বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি হতে পারে। এই দ্বন্দ্বের ফলেই আমরা দেখি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুসলিম দেশগুলো প্রায়ই মানবাধিকার ইস্যুতে ভিন্নমত পোষণ করে।

এক অমীমাংসিত প্যারাডক্সের ভবিষ্যৎ

শরিয়ার এই “ইউনিভার্সাল বনাম পার্টিকুলার” দ্বন্দ্বটি আসলে আধুনিক যুগের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস বা পরিচয় সংকটের প্রতিফলন। শরিয়া কি একটি বিশ্বাস? নাকি একটি পলিটিক্যাল আইডিওলজি বা রাজনৈতিক মতবাদ?

যদি শরিয়া ইউনিভার্সাল হয়, তবে তাকে প্রমাণ করতে হবে যে তার আইনগুলো ধর্ম-নিরপেক্ষভাবেও যুক্তিসঙ্গত এবং কল্যাণকর। তাকে ‘আল্লাহ বলেছেন’ – এই যুক্তির বাইরে এসে ‘এটি মানুষের জন্য ভালো’ – এই যুক্তিতে কথা বলতে হবে। যেমন, সুদ নিষিদ্ধ করাকে শুধু ‘হারাম’ না বলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি হিসেবে প্রমাণ করতে হবে। তবেই অমুসলিমরা বা আধুনিক রাষ্ট্র একে গ্রহণ করবে। কিন্তু তখন ভয় থাকে – শরিয়া কি তার পবিত্রতা বা স্যাক্রেডনেস হারিয়ে ফেলবে না? এটি কি তখন নিছক একটি সোশ্যাল পলিসি বা সামাজিক নীতিতে পরিণত হবে না?

আর যদি শরিয়া পার্টিকুলার হয়, তবে তাকে মেনে নিতে হবে যে তার ‘বিশ্বজনীন সত্য’ দাবিটি কেবল আধ্যাত্মিক স্তরে সত্য, রাজনৈতিক স্তরে নয়। তাকে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে সমাজের কোণে আশ্রয় নিতে হবে। কিন্তু শরিয়ার ইতিহাস এবং টেক্সট কি এই পশ্চাদপসরণ বা রিট্রিট মেনে নিতে প্রস্তুত? শরিয়া তো নিজেকে জীবনের সব ক্ষেত্রের শাসক হিসেবে দাবি করে।

ইসমাইল রাজি আল-ফারুকি (Ismail Raji al-Faruqi) তার তাওহিদ তত্ত্বে এই দুইয়ের মিলনের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইসলামের নীতিগুলো ইউনিভার্সাল, কিন্তু তার প্রয়োগ হতে পারে নির্দিষ্ট কালচারাল বা পার্টিকুলার ফর্মে। কিন্তু বাস্তবে এই তাত্ত্বিক মিলন ঘটানো অত্যন্ত কঠিন। আজকের মুসলিম বিশ্বে আমরা দেখি এক অদ্ভুত জগাখিচুড়ি – কোথাও শরিয়াকে ইউনিভার্সাল বলে চাপানো হচ্ছে (ইরান, আফগানিস্তান), আবার কোথাও একে পার্টিকুলার ফ্যামিলি ল বা পারিবারিক আইনের মধ্যে বন্দী রাখা হচ্ছে (ভারত, বাংলাদেশ)।

শরিয়া আসলে এই দুই ইজমের মাঝখানে ঝুলে আছে। সে বিশ্বকে জয় করতে চায় (ইউনিভার্সালিজম), আবার নিজের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে চায় (পার্টিকুলারিজম)। কিন্তু একই সাথে গ্লোবাল এবং লোকাল হওয়া, একই সাথে সবার এবং শুধু নিজেদের হওয়া – এই অসম্ভব কাজটি করতে গিয়েই শরিয়া আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।

প্যাট্রিয়ার্কাল লিগালিজম বনাম স্পিরিচুয়াল ইক্যুয়ালিজম: আত্মিক সাম্য বনাম আইনি প্রভুত্ব

শরিয়ার দর্শনে নারী ও পুরুষের অবস্থান নিয়ে যে বিতর্কটি গত এক শতাব্দী ধরে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন এবং রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে, তা হলো লিঙ্গ বা জেন্ডারের প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি শরিয়ার অন্দরমহলে একটি গভীর এবং দৃশ্যমান ফাটল তৈরি করেছে, যা সহজে জোড়া লাগার নয়। একদিকে শরিয়া ঘোষণা করে যে আল্লাহর দৃষ্টিতে সকল মানুষ সমান; অন্যদিকে শরিয়ার আইনের বইগুলোতে নারী ও পুরুষের অধিকারের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান রচনা করা হয়েছে। এই যে তত্ত্ব এবং প্রয়োগের মধ্যকার বিশাল অসামঞ্জস্য, একে আমরা বলতে পারি স্পিরিচুয়াল ইক্যুয়ালিজম (Spiritual Equalism) বা আধ্যাত্মিক সাম্যবাদ এবং প্যাট্রিয়ার্কাল লিগালিজম (Patriarchal Legalism) বা পিতৃতান্ত্রিক আইনবাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বটি কেবল তাত্ত্বিক নয়, এটি মুসলিম নারীর প্রতিদিনের বেঁচে থাকা, তার মর্যাদা এবং তার অধিকারের সাথে সরাসরি জড়িত। শরিয়া কি নারীকে মুক্তি দিয়েছে, নাকি তাকে নতুন করে শৃঙ্খলিত করেছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে শরিয়ার ব্যাখ্যা দু’ভাগ হয়ে গেছে।

আল্লাহর দরবারে সবাই সমান: স্পিরিচুয়াল ইক্যুয়ালিজমের ভিত্তি

স্পিরিচুয়াল ইক্যুয়ালিজম (Spiritual Equalism) বা আধ্যাত্মিক সাম্যবাদের মূল ভিত্তি হলো কুরআনের সেই সুস্পষ্ট ঘোষণাগুলো যেখানে আল্লাহ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নারী ও পুরুষের সমতার কথা বলেছেন। সূরা আন-নিসার ১২৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “যে সৎকর্ম করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী, এবং সে মুমিন, তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি অণু পরিমাণও অবিচার করা হবে না।” সূরা আল-আহজাবের ৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নারী ও পুরুষকে পাশাপাশি উল্লেখ করে দশটি গুণের (যেমন – মুসলিম, মুমিন, অনুগত, সত্যবাদী, ধৈর্যশীল) কথা বলেছেন এবং উভয়ের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই আয়াতগুলো নির্দেশ করে যে, নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক জগতে লিঙ্গের কোনো ভেদাভেদ নেই। পাপের শাস্তি বা পুণ্যের পুরস্কারে কোনো ‘জেন্ডার ডিসকাউন্ট’ বা ‘জেন্ডার সারচার্জ’ নেই। জান্নাতের দরজা পুরুষের জন্য যতটা খোলা, নারীর জন্যও ততটাই। আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া (Taqwa) বা আল্লাহভীতি, জেন্ডার নয়।

এই দর্শনের অনুসারীরা বলেন, ইসলাম প্রাক-ইসলামি আরব সমাজের নারীদের যে করুণ দশা ছিল, তা থেকে তাদের উদ্ধার করেছে। কন্যাশিশু হত্যা বন্ধ করা, নারীকে সম্পত্তির অধিকার দেওয়া, এবং বিবাহের সময় নারীর সম্মতি বাধ্যতামূলক করা – এগুলো ছিল সপ্তম শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। স্পিরিচুয়াল ইক্যুয়ালিজম (Spiritual Equalism) মনে করে, শরিয়ার মূল উদ্দেশ্য বা মাকাসিদ (Maqasid) হলো সমাজে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। আর ন্যায়বিচার মানেই হলো সমতা। আল্লাহ যেহেতু ন্যায়পরায়ণ, তিনি কখনোই তার সৃষ্টির এক অর্ধেকের ওপর অন্য অর্ধেককে অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দিতে পারেন না। তাই যেখানেই শরিয়ার কোনো আইনকে বৈষম্যমূলক মনে হবে, বুঝতে হবে সেখানে মানুষের ব্যাখ্যার ভুল আছে, আল্লাহর আদেশের ভুল নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি মুসলিম নারীদের মনে এক অটুট বিশ্বাস এবং শক্তি জোগায় যে, তাদের ধর্ম তাদের শত্রু নয়, বরং তাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল।

আধুনিক যুগের বিখ্যাত ইসলামি স্কলার এবং নারীবাদী তাত্ত্বিক আমিনা ওয়াদুদ (Amina Wadud) তার যুগান্তকারী বই কুরআন অ্যান্ড ওম্যান (Qur’an and Woman)-এ এই স্পিরিচুয়াল ইক্যুয়ালিজমের পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, কুরআনে আল্লাহ যখন মানব সৃষ্টির কথা বলেছেন, তখন তিনি ‘নফস’ বা আত্মা শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যার কোনো লিঙ্গ নেই। আদম এবং হাওয়াকে একই নফস থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। বাইবেলের মতো হাওয়াকে আদমের পাঁজরের হাড় থেকে তৈরির গল্প কুরআনে নেই (যদিও হাদিসে রূপক অর্থে আছে)। ওয়াদুদ (Amina Wadud) যুক্তি দেন যে, কুরআনের সৃষ্টিতত্ত্ব বা কসমোলজি পুরোপুরি সমতার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। তার মতে, পিতৃতন্ত্র বা প্যাট্রিয়ার্কি কোনো ঐশ্বরিক বিধান নয়, বরং এটি একটি আইডল বা মূর্তি – যা আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহিদ (Tawhid)-এর পরিপন্থী। কারণ পিতৃতন্ত্র পুরুষকে নারীর ওপর খোদার আসনে বসাতে চায়। আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী কোনো নারী কখনোই কোনো পুরুষের নিরঙ্কুশ আধিপত্য মেনে নিতে পারে না, কারণ একমাত্র আল্লাহই নিরঙ্কুশ প্রভু (Wadud, 1999)।

ফিকহের পাতায় বৈষম্য: প্যাট্রিয়ার্কাল লিগালিজমের বাস্তবতা

কিন্তু যখন আমরা আধ্যাত্মিকতার জগত থেকে নেমে এসে ফিকহ বা ইসলামি আইনশাস্ত্রের জগতে প্রবেশ করি, তখন দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। এখানে রাজত্ব করে প্যাট্রিয়ার্কাল লিগালিজম (Patriarchal Legalism) বা পিতৃতান্ত্রিক আইনবাদ। ক্লাসিক্যাল ফিকহের বইগুলোতে নারী ও পুরুষের অধিকার এবং কর্তব্যের এক বিশাল তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে স্পষ্টতই পুরুষকে নারীর চেয়ে ওপরে রাখা হয়েছে। এই আইনবাদের মূল ভিত্তি হলো কুরআনের সূরা আন-নিসার ৩৪ নম্বর আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে: “পুরুষরা নারীদের ওপর কর্তৃত্বকারী (কাওয়ামুন)…”। এই একটি আয়াতের ওপর ভিত্তি করে ফিকহবিদরা পুরো একটি সামাজিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন যেখানে স্বামী হলো কর্তা বা প্রভু, আর স্ত্রী হলো অনুগত বা প্রজা।

প্যাট্রিয়ার্কাল লিগালিজম (Patriarchal Legalism) অনুযায়ী, সাক্ষ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে দুইজন নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষের সমান (আর্থিক লেনদেনে)। উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে বোন ভাইয়ের অর্ধেক পায়। বিবাহের ক্ষেত্রে একজন মুসলিম পুরুষ কিতাবিয়া (খ্রিস্টান বা ইহুদি) নারীকে বিয়ে করতে পারে, কিন্তু একজন মুসলিম নারী অমুসলিম পুরুষকে বিয়ে করতে পারে না। সবচেয়ে বড় বৈষম্য দেখা যায় বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাকের ক্ষেত্রে। পুরুষ চাইলেই কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে, কিন্তু নারীকে তালাক পেতে হলে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয় এবং নানারকম শর্ত পূরণ করতে হয় (খুলা)। এমনকি সন্তান জিম্মায় বা কাস্টডিতে রাখার ক্ষেত্রেও মায়ের অধিকার সীমিত। ফিকহবিদরা যুক্তি দেখান যে, যেহেতু পুরুষ পরিবারের ভরণপোষণ করে এবং মোহরানা দেয়, তাই তার কর্তৃত্ব বা অথরিটি থাকাটাই ন্যায়বিচার। তারা বলেন, সমতা মানে ‘হুবহু এক’ (Identical) হওয়া নয়, বরং সমতা মানে হলো যার যার দায়িত্ব অনুযায়ী অধিকার পাওয়া। একে তারা বলেন কমপ্লিমেন্টারিটি (Complementarity) বা পরিপূরকতা – নারী ও পুরুষ একে অপরের পরিপূরক, প্রতিযোগী নয়।

এই আইনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নারীকে মূলত ঘরের ভেতরের মানুষ হিসেবেই দেখে। তার প্রধান কাজ হলো স্বামীর সেবা করা এবং সন্তান লালন-পালন করা। রাষ্ট্র পরিচালনা বা বিচারক হওয়ার যোগ্যতা নারীর নেই বলে অধিকাংশ ক্লাসিক্যাল স্কলার মনে করেন। ইমাম আবু হানিফা অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে নারীর বিচারক হওয়ার অনুমতি দিয়েছেন, কিন্তু তাও সীমিত পরিসরে। প্যাট্রিয়ার্কাল লিগালিজম (Patriarchal Legalism)-এর কাছে শরিয়া হলো একটি হায়ারার্কিকাল বা স্তরভিত্তিক ব্যবস্থা – আল্লাহ সবার ওপরে, তারপর নবী, তারপর পুরুষ, এবং সবশেষে নারী। এই কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করা মানেই হলো আল্লাহর সাজানো ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা। তাদের কাছে নারীর স্বাধীনতা বা ফেমিনিজম হলো একটি পশ্চিমা ষড়যন্ত্র, যা মুসলিম পরিবারতন্ত্রকে ধ্বংস করার জন্য তৈরি হয়েছে।

দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু: আল্লাহ কি দ্বিমুখী নীতি দিয়েছেন?

এই দুই দর্শনের সংঘর্ষ শরিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছে। প্রশ্নটি অত্যন্ত অস্বস্তিকর – যে আল্লাহ আধ্যাত্মিক জগতে পূর্ণ সাম্য দিলেন, সেই আল্লাহই কি আইনি জগতে এত বড় বৈষম্য তৈরি করলেন? আল্লাহ কি তবে দ্বিমুখী? নাকি এই আইনি বৈষম্যগুলো তৎকালীন আরব সমাজের পিতৃতান্ত্রিক সংস্কলতির প্রতিফলন, যা ফিকহের মধ্যে ঢুকে পড়ে ‘আল্লাহর আইন’-এর সিলমোহর পেয়ে গেছে?

মরোক্কান সমাজবিজ্ঞানী এবং নারীবাদী তাত্ত্বিক ফাতেমা মার্নিসি (Fatema Mernissi) তার বিখ্যাত গবেষণা দ্য ভেইল অ্যান্ড দ্য মেল এলিট (The Veil and the Male Elite)-এ দেখিয়েছেন যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারীরা অনেক বেশি স্বাধীন এবং সক্রিয় ছিলেন। তারা যুদ্ধে যেতেন, রাজনীতি নিয়ে কথা বলতেন, এমনকি খলিফার সাথে তর্ক করতেন। কিন্তু নবীর মৃত্যুর পর, বিশেষ করে আব্বাসীয় আমলে, যখন ফিকহ সংকলিত হচ্ছিল, তখন পুরুষরা তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য হাদিস এবং কুরআনের ব্যাখ্যাকে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নেয়। মার্নিসি (Fatema Mernissi) যুক্তি দেন যে, অনেক নারীবিদ্বেষী হাদিস আসলে দুর্বল বা বানোয়াট, যা পিতৃতান্ত্রিক অভিজাত বা মেল এলিটরা তৈরি করেছিল নারীকে দমিয়ে রাখার জন্য। তার মতে, শরিয়ার নামে আজ যা চালানো হচ্ছে, তা আসলে আল্লাহর আইন নয়, বরং তা হলো পুরুষদের তৈরি করা ইতিহাস। তিনি একে বলেন পলিটিক্যাল ম্যানিপুলেশন (Political Manipulation) বা রাজনৈতিক কারচুপি (Mernissi, 1991)।

কন্ট্রাডিকশন বা স্ববিরোধিতাটা এখানেই – যদি আপনি স্পিরিচুয়াল ইক্যুয়ালিজম (Spiritual Equalism)-কে সত্য বলে মানেন, তবে ফিকহের অনেক আইনকে (যেমন বহুবিবাহ বা স্বামীর একতরফা তালাক) ডিফেন্ড করা নৈতিকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন আপনাকে স্বীকার করতেই হয় যে, এই আইনগুলো অন্যায্য এবং বদলানো দরকার। আর যদি আপনি প্যাট্রিয়ার্কাল লিগালিজম (Patriarchal Legalism)-কে ‘আল্লাহর অমোঘ বিধান’ বলে মেনে নেন, তবে আধ্যাত্মিক সাম্যের ধারণাটা একটা সান্ত্বনা পুরস্কার বা কনসোলেশন প্রাইজ-এর মতো শোনায়। যেন আল্লাহ বলছেন, “দুনিয়ায় তোমরা (নারীরা) পুরুষের অধীনে থাকো, কষ্ট করো; পরকালে তোমাদের পুষিয়ে দেব।” আধুনিক শিক্ষিত নারীরা এই ‘ডিল’ বা চুক্তি মানতে নারাজ। তারা দুনিয়া এবং আখিরাত – উভয় জাগাতেই ন্যায়বিচার চায়।

আধুনিকতার আয়নায় শরিয়ার মুখচ্ছবি

আজকের যুগে এই দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়েছে মানবাধিকার এবং সংবিধানের কারণে। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলে। কিন্তু যখনই তারা মুসলিম পারিবারিক আইন বা মুসলিম ফ্যামিলি ল প্রয়োগ করতে যায়, তখনই বৈষম্যগুলো সামনে চলে আসে। একজন নারী যখন দেখে যে তার ভাই তার চেয়ে দ্বিগুণ সম্পত্তি পাচ্ছে শুধু পুরুষ হওয়ার কারণে, তখন সে শরিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সে জানতে চায়, আমার বুদ্ধি বা ঈমান কি কম? আমি তো আমার ভাইয়ের চেয়ে বেশি যত্ন নিই বাবা-মায়ের। তবে কেন এই অবিচার?

এই প্রশ্নের উত্তরে আধুনিক মডার্নিস্ট বা সংস্কারবাদী স্কলাররা কনটেক্সচুয়ালিজম (Contextualism)-এর আশ্রয় নেন। তারা বলেন, কুরআনের বৈষম্যমূলক আয়াতগুলো ছিল সপ্তম শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে নারীদের জন্য এক বিশাল অগ্রগতি (যেমন সম্পত্তির অধিকার দেওয়া, যা আগে ছিলই না)। কিন্তু সেগুলোই শেষ কথা নয়। কুরআনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বা ট্রাজেক্টরি (Trajectory) হলো পূর্ণ সাম্য। যেমন দাসপ্রথা ধাপে ধাপে বিলোপ করা হয়েছে, তেমনি নারীর অধিকারও ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠিত হবে। ফজলুর রহমান (Fazlur Rahman)-এর মতো তাত্ত্বিকরা বলেন, কুরআনের আইনি আয়াতগুলোর চেয়ে তার এথিক্যাল বা নৈতিক আয়াতগুলোর (যেমন আদল ও ইহসান) গুরুত্ব বেশি। যদি আইনি আয়াত নৈতিকতার সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তবে নৈতিকতাকে প্রাধান্য দিতে হবে।

কিন্তু ট্র্যাডিশনালিস্ট বা ঐতিহ্যবাদীরা এই ব্যাখ্যার ঘোর বিরোধী। তারা বলেন, এটা শরিয়াকে বিকৃত করা। তাদের মতে, পুরুষের কর্তৃত্ব বা কিওয়ামাহ (Qiwamah) হলো ফ্যামিলি স্ট্রাকচার বা পারিবারিক কাঠামোর মেরুদণ্ড। এই মেরুদণ্ড ভেঙে দিলে পরিবার ব্যবস্থা ধসে পড়বে, যেমনটা পশ্চিমে হয়েছে। তারা যুক্তি দেখান যে, নারীর দায়িত্ব কম (তাকে আয় করতে হয় না), তাই তার অধিকারও ভিন্ন। এটা বৈষম্য নয়, এটা ইনসাফ। কিন্তু আধুনিক অর্থনীতিতে যখন নারীরাও আয় করছে এবং সংসারের হাল ধরছে, তখন এই যুক্তি ধোপে টেকে না। যখন স্বামী বেকার এবং স্ত্রী উপার্জনক্ষম, তখনও কি স্বামী ‘কর্তৃত্বকারী’ থাকবেন শুধু পুরুষ হওয়ার কারণে? আসমা বারলাস (Asma Barlas) তার বিলিভিং ওমেন (Believing Women) বইতে এই প্রশ্নটিই তুলেছেন। তিনি বলেন, কুরআনের কোথাও বলা নেই যে বায়োলজিক্যাল বা জৈবিক কারণেই পুরুষ শ্রেষ্ঠ। শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হয় কর্মের মাধ্যমে (Barlas, 2002)।

উপসংহার: এক অস্বস্তিকর সন্ধিক্ষণ

শরিয়া আজ নারী প্রশ্নে এক অস্বস্তিকর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে তার সোনালী আধ্যাত্মিক বার্তা, যা নারীকে মানুষের পূর্ণ মর্যাদা দেয়; অন্যদিকে তার ধূসর আইনি ইতিহাস, যা নারীকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে রাখে। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মুসলিম নারী আজ বিভ্রান্ত। সে আল্লাহকে ভালোবাসে, কিন্তু ফতোয়াকে ভয় পায়। সে কুরআন পড়ে শান্তি পায়, কিন্তু পারিবারিক আদালতে গিয়ে হতাশ হয়।

এই দ্বন্দ্বের সমাধান যতদিন না হচ্ছে, ততদিন শরিয়া আধুনিক বিশ্বের কাছে ‘নারীবিদ্বেষী’ হিসেবেই চিহ্নিত হতে থাকবে। সমাধান হয়তো লুকিয়ে আছে শরিয়াকে নতুন করে পাঠ করার মধ্যে – পুরুষের চোখ দিয়ে নয়, নারীর চোখ দিয়ে। এতদিন ইতিহাস এবং আইন লিখেছে পুরুষ; এখন সময় এসেছে নারীর কলমে শরিয়াকে ব্যাখ্যা করার। হয়তো তখনই স্পিরিচুয়াল ইক্যুয়ালিজম (Spiritual Equalism) এবং প্যাট্রিয়ার্কাল লিগালিজম (Patriarchal Legalism)-এর এই যুদ্ধের অবসান ঘটবে। কিন্তু সেই পথ অনেক দীর্ঘ এবং কণ্টকাকীর্ণ।

ফিকহ অব স্টেট বনাম ফিকহ অব সোসাইটি: ক্ষমতার লাঠি নাকি সমাজের দর্পণ?

শরিয়ার ঐতিহাসিক এবং আধুনিক বিবর্তনের দিকে তাকালে যে গভীর দার্শনিক এবং কাঠামোগত সংঘাতটি আমাদের চোখে পড়ে, তা হলো এর প্রয়োগের ক্ষেত্র নিয়ে। শরিয়া কি একটি রাষ্ট্রচালিত প্রজেক্ট, নাকি এটি একটি সমাজচালিত ইকোসিস্টেম? এই প্রশ্নের ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে বর্তমান মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক এবং সামাজিক অস্থিরতার একটি বড় অংশ। একদিকে আছে ফিকহ অব স্টেট (Fiqh of State) বা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ফিকহ, যা মনে করে শরিয়াকে টিকিয়ে রাখতে হলে রাষ্ট্রক্ষমতা, পুলিশ এবং দণ্ডবিধি অপরিহার্য। অন্যদিকে আছে ফিকহ অব সোসাইটি (Fiqh of Society) বা সমাজকেন্দ্রিক ফিকহ, যা বিশ্বাস করে শরিয়া হলো মানুষের দৈনন্দিন জীবন, নৈতিকতা এবং পারস্পরিক সম্পর্কের এক স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবস্থা, যা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এই দুই ইজমের লড়াই কেবল আইনের ধারা নিয়ে নয়; এটি শরিয়ার আত্মা বা সোল (Soul)-এর দখল নেওয়ার লড়াই। শরিয়া কি মানুষের ভয়ের কারণ হবে, নাকি ভালোবাসার উৎস হবে – তা নির্ভর করছে এই দুই মডেলের মধ্যে আমরা কোনটিকে বেছে নেব তার ওপর।

ক্ষমতার মসনদ এবং শরিয়া: ফিকহ অব স্টেটের রাজনীতি

ফিকহ অব স্টেট (Fiqh of State)-এর মূলমন্ত্র হলো – “ধর্ম এবং রাষ্ট্র যমজ ভাই” (আল-দিন ওয়া আল-মুলক তাওয়ামান)। এই দর্শন মনে করে, শরিয়া বাস্তবায়নের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা এবং ওপর থেকে আইন প্রয়োগ করা। এদের কাছে শরিয়া মানেই হলো সংবিধান, দণ্ডবিধি বা পেনাল কোড, এবং বিচার বিভাগ। আধুনিক পলিটিক্যাল ইসলাম (Political Islam) বা ইসলামিজম (Islamism)-এর পুরো বয়ানটি দাঁড়িয়ে আছে এই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক চিন্তার ওপর। সাইয়্যিদ আবুল আলা মওদুদী বা হাসান আল-বান্নার মতো তাত্ত্বিকরা মনে করতেন, একটি ইসলামি রাষ্ট্র বা ইসলামিক স্টেট (Islamic State) ছাড়া একজন মুসলমানের জীবন অসম্পূর্ণ। তাদের যুক্তি হলো, সমাজ এতই নষ্ট হয়ে গেছে যে, কেবল ওয়াজ-নসিহত দিয়ে কাজ হবে না; আইন এবং শাস্তির ভয় দেখিয়ে মানুষকে সঠিক পথে রাখতে হবে। তাই তাদের প্রধান এজেন্ডা হলো – আগে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করো, তারপর শরিয়া কায়েম করো।

এই দর্শনে শরিয়াকে দেখা হয় একটি কোডিফাইড ল বা বিধিবদ্ধ আইন হিসেবে। আধুনিক রাষ্ট্রের মতো এখানেও সবকিছু নির্দিষ্ট ধারায় লেখা থাকে। চুরির শাস্তি কী, জিনার শাস্তি কী, রাষ্ট্রের গঠন কেমন হবে – সবকিছুই ওপর থেকে ঠিক করে দেওয়া হয়। ফিকহ অব স্টেট (Fiqh of State) শরিয়াকে এক ধরণের পজিটিভিস্ট ল বা দৃষ্টবাদী আইনে পরিণত করে, যেখানে আইনের উৎস নৈতিকতা নয়, বরং রাষ্ট্রের সার্বভৌম ইচ্ছা বা সভরেন উইল (Sovereign Will)। এখানে কাজীর বা বিচারকের নিজস্ব কোনো স্বাধীনতা থাকে না; তাকে রাষ্ট্রের তৈরি করা কোডবুক বা আইনের বই দেখে রায় দিতে হয়। ইরান বা সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে আমরা এই মডেলের প্রয়োগ দেখি, যেখানে রাষ্ট্র নিজেই শরিয়ার একমাত্র ব্যাখ্যাকার বা ইন্টারপ্রিটার হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রের বিরোধিতাকে এখানে ধর্মের বিরোধিতা বা শরিয়ার বিরোধিতা হিসেবে দেখা হয়।

এই রাষ্ট্রকেন্দ্রিকতার একটি বড় বিপদ হলো – এটি শরিয়াকে ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত করে। শাসকরা নিজেদের অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য শরিয়াকে ব্যবহার করে। তারা জনগণের বাকস্বাধীনতা হরণ করে, রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করে এবং নারীদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে – সবই শরিয়ার নামে। কিন্তু বাস্তবে এর উদ্দেশ্য হলো শাসন টিকিয়ে রাখা। শরিয়া তখন আর ন্যায়বিচারের প্রতীক থাকে না, হয়ে যায় ভয়ের প্রতীক। জনগণ শরিয়াকে ভালোবাসার বদলে ভয় পেতে শুরু করে। ফিকহ অব স্টেট (Fiqh of State) শরিয়াকে তার আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক শিকড় থেকে উপড়ে ফেলে তাকে একটি শুষ্ক আইনি কঙ্কালে পরিণত করে।

সমাজের হৃৎস্পন্দন: ফিকহ অব সোসাইটির ঐতিহ্য

এর ঠিক বিপরীতে, ফিকহ অব সোসাইটি (Fiqh of Society) আমাদের মনে করিয়ে দেয় শরিয়ার আসল ইতিহাসের কথা। প্রাক-আধুনিক যুগে, অর্থাৎ কলোনিয়াল পিরিয়ড বা ঔপনিবেশিক আমলের আগে, শরিয়া কখনোই রাষ্ট্রের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে ছিল না। শরিয়া ছিল সমাজের নিজস্ব সম্পত্তি। আইন তৈরি করতেন আলেম এবং ফকিহরা, যারা ছিলেন সমাজের সাধারণ মানুষের অংশ, কোনো সরকারি আমলা নন। বিচার করতেন কাজীরা, যারা স্থানীয় রীতিনীতি বা উরফ (Urf) এবং মানুষের অবস্থাকে বিবেচনায় নিতেন। সুলতান বা খলিফার কাজ ছিল কেবল সীমান্ত রক্ষা করা এবং বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দমানো। মানুষের বিয়ে, ব্যবসা, ওয়াকফ, শিক্ষা – এসব চলত সমাজের নিজস্ব উদ্যোগে এবং শরিয়ার নীতিমালার আলোকে। রাষ্ট্র সেখানে নাক গলাত না। একে বলা হয় লিগ্যাল প্লুরালিজম (Legal Pluralism) বা আইনি বহুত্ববাদ।

ফিকহ অব সোসাইটি (Fiqh of Society)-র কাছে শরিয়া কোনো শাস্তির বিধান নয়, বরং একটি নৈতিক গাইডলাইন। এটি মানুষের ভেতর থেকে উৎসারিত হয়। একজন মানুষ নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, যাকাত দেয় বা সত্য কথা বলে – কোনো পুলিশের ভয়ে নয়, বরং তার নিজের ঈমান এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। এই ব্যবস্থায় শরিয়া ছিল অত্যন্ত ফ্লেক্সিবল বা নমনীয়। একজন মুফতি যখন ফতোয়া দিতেন, তিনি ফতোয়াগ্রহীতার ব্যক্তিগত সমস্যা, মানসিক অবস্থা এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট বুঝেই দিতেন। একই অপরাধের জন্য দুই ব্যক্তিকে দুই রকম পরামর্শ দেওয়া হতো, কারণ তাদের পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। সমাজ শরিয়াকে নিজের মতো করে লালন করত। ওয়াকফ (Waqf) ব্যবস্থা ছিল এর সেরা উদাহরণ। ধনীরা তাদের সম্পত্তি দান করতেন স্কুল, হাসপাতাল বা সরাইখানা বানানোর জন্য। রাষ্ট্রকে ট্যাক্স দিয়ে এসব করতে হতো না। সমাজ নিজেই নিজের অভাব পূরণ করত।

এই দর্শনের তাত্ত্বিকরা বলেন, শরিয়াকে রাষ্ট্রীয়করণ করার অর্থ হলো এর আত্মাকে হত্যা করা। শরিয়া যখন আইনে পরিণত হয়, তখন তা নৈতিকতা হারায়। যেমন, শরিয়া বলে বাবা-মায়ের সেবা করা সন্তানের দায়িত্ব। এটি একটি নৈতিক এবং সামাজিক বিধান। কিন্তু রাষ্ট্র যদি আইন করে যে “বাবা-মাকে সেবা না করলে ৬ মাসের জেল”, তখন সন্তান হয়তো জেলের ভয়ে সেবা করবে, কিন্তু তার মনে ভক্তি বা ভালোবাসা থাকবে না। ফিকহ অব সোসাইটি (Fiqh of Society) চায় মানুষ ভালো কাজ করুক আল্লাহর ভালোবাসায়, জেলের ভয়ে নয়। তাদের মতে, ইসলামি সমাজের ভিত্তি হলো তাকওয়া (Taqwa) বা আল্লাহভীতি, পুলিশি রাষ্ট্র নয়। সমাজ যত শক্তিশালী হবে, শরিয়া তত জীবন্ত হবে। রাষ্ট্র যত শক্তিশালী হবে, সমাজ তত পঙ্গু হবে।

আধুনিকতার ফাঁদ: অসম্ভব রাষ্ট্রের প্যারাডক্স

এই দুই দর্শনের দ্বন্দ্বটি আধুনিক যুগে এসে এক জটিল রূপ ধারণ করেছে। এর কারণ হলো আধুনিক রাষ্ট্রের প্রকৃতি। আধুনিক রাষ্ট্র বা মডার্ন স্টেট হলো সর্বগ্রাসী; সে তার নাগরিকদের জীবনের প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণ করতে চায় – জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। সে চায় ইউনিফর্মিটি বা সমরূপতা। সবাই এক আইন মানবে, এক সিলেবাসে পড়বে, এক নিয়ম মেনে চলবে। কিন্তু শরিয়া ঐতিহাসিকভাবে ছিল বৈচিত্র্যময় এবং বিকেন্দ্রীভূত। হানাফি, শাফেয়ী, মালেক – একেক এলাকায় একেক মাযহাব চলত। আধুনিক রাষ্ট্র এই বৈচিত্র্য সহ্য করতে পারে না। সে শরিয়াকে কোডিফাই বা বিধিবদ্ধ করে এক বইয়ে বন্দী করতে চায়।

এই প্রক্রিয়াটি শরিয়ার জন্য এক অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে। প্রখ্যাত আইনি ইতিহাসবিদ এবং তাত্ত্বিক ওয়ায়েল হাল্লাক (Wael Hallaq) তার বহুল আলোচিত বই দ্য ইম্পসিবল স্টেট (The Impossible State)-এ এই প্যারাডক্সটি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। হাল্লাক (Wael Hallaq) যুক্তি দেন যে, আধুনিক রাষ্ট্র এবং শরিয়া – এই দুটি কনসেপ্ট বা ধারণা একে অপরের বিপরীত। আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি হলো মানুষের তৈরি আইন এবং সার্বভৌম ক্ষমতা; আর শরিয়ার ভিত্তি হলো আল্লাহর আইন এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা। তিনি বলেন, একটি আধুনিক রাষ্ট্র কখনোই প্রকৃত অর্থে ‘ইসলামি’ হতে পারে না, কারণ রাষ্ট্রের কাঠামোটিই অনৈসলামিক। রাষ্ট্র চায় ক্ষমতা, শরিয়া চায় নৈতিকতা। রাষ্ট্র চায় নিয়ন্ত্রণ, শরিয়া চায় মানুষের বিবেক। যখনই কোনো দল রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে শরিয়া কায়েম করতে চায়, তারা আসলে একটি ফ্রাঙ্কেনস্টাইন তৈরি করে – যা দেখতে শরিয়ার মতো, কিন্তু আচরণ করে আধুনিক স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের মতো। হাল্লাক (Wael Hallaq) একেই বলেছেন “অসম্ভব রাষ্ট্র”।

কন্ট্রাডিকশন বা স্ববিরোধিতাটা এখানেই – রাষ্ট্র ছাড়া শরিয়ার কিছু অংশ (যেমন হুদুদ বা ফৌজদারি দণ্ডবিধি) বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। চোরের হাত কাটা বা খুনিকে কিসাস দেওয়া – এগুলো তো সমাজ বা এনজিও করতে পারে না; এর জন্য রাষ্ট্র বা অথরিটি লাগে। তাহলে রাষ্ট্র ছাড়া শরিয়া চলবে কী করে? আবার রাষ্ট্র যখনই শরিয়াকে হাতে নেয়, সে শরিয়াকে তার পলিটিক্যাল এজেন্ডা বা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে শুরু করে। শরিয়ার নমনীয়তা নষ্ট হয়ে যায়। বিচারক বা কাজী তখন আর বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন না, তিনি রাষ্ট্রের বেতনভুক কর্মচারী হয়ে যান। তিনি তখন আর আল্লাহর আইন খোঁজেন না, তিনি বসের নির্দেশ মানেন। অর্থাৎ, রাষ্ট্র শরিয়ার জন্য প্রয়োজন, আবার সেই রাষ্ট্রই শরিয়ার সবচেয়ে বড় শত্রু। এই শাঁখের করাতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের ইসলামি রাজনীতি।

ভবিষ্যতের পথ: রাষ্ট্র নাকি সমাজ?

আজকের মুসলিম বিশ্বে আমরা এই দ্বন্দ্বের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখি। একদিকে তালেবান বা ইরানের মতো রাষ্ট্রগুলো ফিকহ অব স্টেট (Fiqh of State) মডেল বাস্তবায়ন করছে, যেখানে দাড়ি মাপা হয়, মেয়েদের স্কুল বন্ধ করা হয় এবং রাস্তায় নৈতিক পুলিশ বা মোরালিটি পুলিশ টহল দেয়। তাদের দাবি, তারা শরিয়া রক্ষা করছে। কিন্তু এর ফলস্বরূপ, তরুণ প্রজন্ম ধর্ম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তারা শরিয়াকে স্বাধীনতার শত্রু মনে করছে। অন্যদিকে, তুরস্ক বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজের উদ্যোগে ফিকহ অব সোসাইটি (Fiqh of Society)-র এক নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে। সেখানে রাষ্ট্র সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে, কিন্তু সমাজ অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ। মানুষ স্বেচ্ছায় ইসলাম পালন করছে, এনজিও বা চ্যারিটি চালাচ্ছে, এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করছে। এখানে শরিয়া কোনো ভয়ের বস্তু নয়, বরং একটি সামাজিক শক্তি।

সমস্যা হলো, ফিকহ অব সোসাইটি (Fiqh of Society) একা চলতে পারে না। কারণ আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতি এবং গ্লোবাল কালচার বা বিশ্বসংস্কৃতি সমাজকে প্রতিনিয়ত আঘাত করছে। সুদভিত্তিক ব্যাংক, অশ্লীলতা, বা মাদকের বিস্তার – এগুলো সমাজ একা ঠেকাতে পারে না; এর জন্য রাষ্ট্রের আইনের সহায়তা লাগে। তাই সমাজকেন্দ্রিক শরিয়াও পুরোপুরি কার্যকর হতে পারছে না। আবার রাষ্ট্রকেন্দ্রিক শরিয়াও ব্যর্থ হচ্ছে কারণ তা মানুষের মন জয় করতে পারছে না।

তাহলে সমাধান কী? আধুনিক তাত্ত্বিকরা, যেমন রাশিদ আল-ঘানুশি (Rached Ghannouchi) বা তারিক রমজান (Tariq Ramadan), একটি মধ্যপস্থার কথা বলছেন। তারা বলছেন, শরিয়াকে রাষ্ট্রীয় আইন বা স্টেট ল হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। শরিয়া হওয়া উচিত এথিক্স বা নৈতিকতার উৎস, যা সমাজের মানুষ এবং রাষ্ট্রপরিচালকদের প্রভাবিত করবে। রাষ্ট্র হবে গণতান্ত্রিক, যেখানে মানুষ তাদের মূল্যবোধ অনুযায়ী আইন তৈরি করবে। যদি সমাজের মানুষ ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী হয়, তবে রাষ্ট্রের আইনেও তার প্রতিফলন ঘটবে – স্বাভাবিকভাবে, জোর করে নয়। একে বলা হচ্ছে সিভিলাইজেশনাল শরিয়া (Civilizational Sharia)। এই মডেলে শরিয়া কোনো দণ্ডবিধি নয়, বরং একটি সভ্যতা গড়ার দর্শন। কিন্তু এটি এখনো একটি ইউটোপিয়া বা স্বপ্ন। বাস্তবে, ক্ষমতার লোভ এবং ভয়ের রাজনীতি শরিয়াকে বারবার ফিকহ অব স্টেট (Fiqh of State)-এর খাঁচায় বন্দী করে ফেলছে।

ডিসকভারি বনাম লেজিসলেশন: আইন কি খোঁজা হয়, নাকি বানানো হয়?

আইন আসলে কোত্থেকে আসে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে শরিয়া এবং আধুনিক রাষ্ট্রের মধ্যে এক মৌলিক সংঘাত তৈরি হয়। আধুনিক গণতন্ত্র বা রাষ্ট্রব্যবস্থায় আমরা ধরে নিই যে, আইন হলো মানুষের তৈরি। পার্লামেন্টে এমপিরা বা সদস্যরা ভোট দিয়ে আইন পাস করেন। একে বলা হয় লেজিসলেশন (Legislation) বা আইন প্রণয়ন। এখানে মানুষই সার্বভৌম; তারা যখন খুশি নতুন আইন বানাতে পারে, আবার পুরোনো আইন বাতিল করতে পারে। আজ যদি পার্লামেন্ট মনে করে ট্রাফিক আইন বদলানো দরকার, তারা তা করবে। এখানে কোনো দৈব বাণীর অনুমতির দরকার নেই। মানুষের ইচ্ছা বা পপুলার উইল (Popular Will)-ই এখানে আইনের উৎস।

কিন্তু শরিয়ার ক্লাসিক্যাল দর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন। শরিয়া মনে করে, সার্বভৌম আইনদাতা বা লেজিসলেটর হলেন একমাত্র আল্লাহ (আল-হাকিম)। মানুষের কাজ কোনো আইন ‘তৈরি’ করা নয়। মানুষের কাজ হলো আল্লাহর তৈরি করা আইনটি খুঁজে বের করা। একে বলা হয় ডিসকভারি (Discovery) বা উদঘাটন। ফকিহ বা আইনজ্ঞরা কুরআন ও সুন্নাহর গভীর থেকে আইন ‘আবিষ্কার’ করেন, যেমন বিজ্ঞানী খনিতে হীরা আবিষ্কার করেন। হীরাটা আগে থেকেই সেখানে ছিল, বিজ্ঞানী ওটা বানাননি। ঠিক তেমনি, শরিয়ার সব আইন আল্লাহর জ্ঞানে আগে থেকেই আছে। মানুষের পক্ষে নতুন কোনো আইন ‘বানানো’ মানে হলো আল্লাহর ক্ষমতায় ভাগ বসানো, যা হাকিমিয়্যাহ (Hakimiyyah) বা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক এবং শিরক-এর শামিল হতে পারে।

সার্বভৌমত্বের সংকট: আল্লাহ নাকি পার্লামেন্ট?

এই ডিসকভারি (Discovery) বনাম লেজিসলেশন (Legislation)-এর দ্বন্দ্বটি আধুনিক ইসলামি রাষ্ট্রগুলোর সংবিধান রচনার সময় প্রকট হয়ে ওঠে। আধুনিক রাষ্ট্র চালাতে গেলে প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন আইনের দরকার হয় – সাইবার আইন, পরিবেশ আইন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন, ট্রাফিক আইন। কুরআনে বা হাদিসে ‘বিটকয়েন’ বা ‘কার্বন নিঃসরণ’ বা ‘লাল বাতিতে গাড়ি থামানো’ নিয়ে সরাসরি কোনো আয়াত নেই। তাহলে রাষ্ট্র এই আইনগুলো করবে কীভাবে? যদি শরিয়াকে কঠোরভাবে ডিসকভারি মডেল হিসেবে দেখা হয়, তবে বলতে হবে – যেহেতু টেক্সটে নেই, তাই এসব নিয়ে আইন করার এখতিয়ার মানুষের নেই। এতে রাষ্ট্র অচল বা প্যারালাইজড হয়ে পড়ে।

আবার যদি রাষ্ট্রকে লেজিসলেশন বা আইন তৈরির ক্ষমতা দেওয়া হয়, তবে প্রশ্ন ওঠে – পার্লামেন্ট কি আল্লাহর চেয়ে বেশি বোঝে? পার্লামেন্ট যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এমন কোনো আইন করে যা শরিয়ার স্পিরিটের সাথে যায় না (যেমন মদ্যপান বৈধ করা বা সুদের হার নির্ধারণ করা), তখন কী হবে? কার্ল শ্মিট (Carl Schmitt) তার পলিটিক্যাল থিওলজি (Political Theology)-তে যেমনটা বলেছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্রে সার্বভৌম সেই, যে আইন তৈরি করে এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। শরিয়া কি এই সার্বভৌমত্ব পার্লামেন্টকে দিতে প্রস্তুত? আধুনিক ইসলামি দলগুলো যখন ‘আল্লাহর আইন চাই’ বলে স্লোগান দেয়, তারা আসলে পার্লামেন্টের আইন তৈরির ক্ষমতাকেই চ্যালেঞ্জ করে। তারা বলে, পার্লামেন্ট কেবল প্রশাসনিক নিয়ম বানাতে পারে, কিন্তু মূল আইন বা শরিয়া পাল্টাতে পারে না।

ভেতরের দ্বন্দ্ব: কানুন বনাম শরিয়া

ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম শাসকরা এই সমস্যার একটি ব্যবহারিক সমাধান বের করেছিলেন। তারা আইনকে দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন: শরিয়া (Sharia) এবং কানুন (Qanun)। শরিয়া হলো আল্লাহর আইন (ইবাদত, পরিবার, উত্তরাধিকার), যা অপরিবর্তনীয়। আর কানুন হলো শাসকের তৈরি প্রশাসনিক আইন (কর, ভূমি, ট্রাফিক), যা জনস্বার্থে তৈরি করা হয় এবং পরিবর্তনযোগ্য। অটোমান সুলতানরা বা মুঘল বাদশাহরা প্রচুর ‘কানুন-নামা’ জারি করতেন। কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে, কানুনকে সবসময় শরিয়ার অধীন থাকতে হতো। কানুন কখনোই শরিয়াকে লঙ্ঘন করতে পারত না।

আধুনিক যুগে এসে এই বিভাজনটি আর কাজ করছে না। কারণ আধুনিক রাষ্ট্র জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আইন তৈরি করতে চায়। রাষ্ট্র এখন পারিবারিক আইন (বাল্যবিবাহ রোধ), ফৌজদারি আইন, এবং বাণিজ্যিক আইন – সবকিছুই পার্লামেন্টের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। ফলে শরিয়ার একচ্ছত্র এলাকাগুলো (যেমন পরিবার বা উত্তরাধিকার) এখন পার্লামেন্টের বা লেজিসলেশনের অধীনে চলে আসছে। এখানেই সংঘাত। শরিয়া পন্থীরা বলছেন, পার্লামেন্ট তার সীমা লঙ্ঘন করছে। আর আধুনিকতাবাদীরা বলছেন, জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে পার্লামেন্টের সব বিষয়ে আইন করার অধিকার আছে।

এই দ্বন্দ্বের ফলে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অনেক মুসলিম দেশের সংবিধানে লেখা থাকে, “আল্লাহর সার্বভৌমত্বই চূড়ান্ত”, আবার একই সাথে লেখা থাকে “জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস”। এই দুই বিপরীতমুখী বাক্য প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র আসলে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না – আইন কি আবিষ্কৃত হবে (আল্লাহর তরফ থেকে), নাকি নির্মিত হবে (মানুষের তরফ থেকে)? ওয়ায়েল হাল্লাক (Wael Hallaq) তার দ্য ইম্পসিবল স্টেট (The Impossible State)-এ দেখিয়েছেন যে, আধুনিক রাষ্ট্রের আইন তৈরির ক্ষমতা বা লেজিসলেটিভ অথরিটি এবং শরিয়ার নৈতিকতা – এই দুটো একসাথে চলা অসম্ভব। কারণ রাষ্ট্র চায় আইনের একরৈখিকতা বা ইউনিফর্মিটি, আর শরিয়া চায় নৈতিক নমনীয়তা।

সমাধানের উপায়: ইজতিহাদ নাকি সেক্যুলারিজম?

এই সংকট থেকে বের হওয়ার জন্য আধুনিক তাত্ত্বিকরা ইজতিহাদ (Ijtihad) বা গবেষণার কথা বলেন। তারা বলেন, পার্লামেন্ট আসলে আধুনিক যুগের ‘ইজতিহাদ’ করার জায়গা। এমপিরা যখন আইন পাস করেন, তারা আসলে শরিয়ার মূলনীতি (মাকাসিদ) মেনেই নতুন সমস্যার সমাধান করছেন। এটাকে ‘লেজিসলেশন’ না বলে ‘সমষ্টিগত ইজতিহাদ’ বা কালেক্টিভ ইজতিহাদ বলা যেতে পারে। মোহাম্মদ হাশিম কামালি (Mohammad Hashim Kamali) তার প্রিন্সিপালস অফ ইসলামিক জুরিসপ্রুডেন্স (Principles of Islamic Jurisprudence)-এ এই মতবাদকে সমর্থন করেন।

কিন্তু সমালোচকরা বলেন, পার্লামেন্টের এমপিরা তো মুজতাহিদ বা শরিয়া বিশেষজ্ঞ নন; তারা রাজনীতিবিদ। তাদের ভোট কি শরিয়ার ইজতিহাদ হতে পারে? তাছাড়া, ইজতিহাদ হলো ‘সত্য খোঁজার চেষ্টা’, আর লেজিসলেশন হলো ‘ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া’। দুটোর প্রকৃতি ভিন্ন। শরিয়া যদি কেবল ‘আবিষ্কার’ বা ডিসকভারি মডেলে আটকে থাকে, তবে দ্রুত পরিবর্তনশীল আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মেলানো তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ সব সমস্যার সমাধান ১৪০০ বছর আগের টেক্সটে ‘লুকিয়ে আছে’ এবং তা খুঁজে বের করতে হবে – এই দাবিটি আধুনিক প্রশাসনিক জটিলতার সামনে প্রায়ই অকার্যকর প্রমাণিত হয়। আর যদি শরিয়া মানুষকে আইন তৈরির (সীমিত পরিসরে হলেও) ক্ষমতা দেয়, তবে তার ‘ডিভাইন’ বা ঐশ্বরিক দাবিটি কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ণ হয়। এই উদঘাটন বনাম প্রণয়ন-এর দোলাচলে শরিয়া আজ এক বড় আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে। শরিয়া কি গণতান্ত্রিক হবে, নাকি থিওক্র্যাটিক বা ধর্মতান্ত্রিক থাকবে – এই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

শরিয়া অ্যাজ ফিক্সড ল’ বনাম শরিয়া অ্যাজ প্রসেস: স্থির গন্তব্য নাকি অনন্ত যাত্রা?

শরিয়াকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে – এটি একটি তৈরি পণ্য নাকি একটি চলমান পদ্ধতি – এই নিয়ে ইসলামি আইনতত্ত্বের জগতে এক চিরস্থায়ী বিতর্ক বা ডিবেট বিদ্যমান। এই বিতর্কটি শরিয়ার প্রকৃতি বা নেচার নিয়েই প্রশ্ন তোলে। এটি কি একটি ফিক্সড ল’ (Fixed Law) বা স্থির আইন, যা একবার তৈরি হয়েছে এবং চিরকালের জন্য অপরিবর্তনীয়? নাকি এটি একটি প্রসেস (Process) বা প্রক্রিয়া, যা প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হচ্ছে এবং নতুন নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করছে? এই দুই দর্শনের দ্বন্দ্ব শরিয়ার ইতিহাসে এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। একদিকে আছে নিশ্চয়তা বা সার্টেনিটি খোঁজার আকুতি, অন্যদিকে আছে সত্য বা ট্রুথ খোঁজার নিরন্তর প্রচেষ্টা। শরিয়া কি একটি সিন্দুক ভর্তি রত্ন, নাকি রত্ন খোঁজার মানচিত্র? এই মেটাফোর বা রূপকের আড়ালেই লুকিয়ে আছে শরিয়ার অস্তিত্বের সংকট।

অপরিবর্তনীয় শিলালিপি: শরিয়া অ্যাজ ফিক্সড ল’

ফিক্সড ল’ (Fixed Law) বা স্থির আইনবাদীদের মতে, শরিয়া হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি ‘ফাইনাল ভার্সন’ বা চূড়ান্ত সংস্করণ। তাদের কাছে শরিয়া কোনো গবেষণা বা এক্সপেরিমেন্ট নয়, বরং এটি একটি ডিভাইন কোড বা ঐশ্বরিক সংবিধান। যেমন একটি সফটওয়্যার প্যাকেজ – আপনি এটি ইনস্টল করবেন এবং ব্যবহার করবেন; এর সোর্স কোড বা মূল কাঠামোতে হাত দেওয়ার কোনো অধিকার আপনার নেই। এই দর্শনের অনুসারীরা বিশ্বাস করেন, আল্লাহ এবং তার রাসূল নবী মুহাম্মদ মানবজীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ের সমাধান দিয়ে গেছেন। যা হালাল তা কিয়ামত পর্যন্ত হালাল, আর যা হারাম তা কিয়ামত পর্যন্ত হারাম। এখানে সময়ের পরিবর্তনে আইনের পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই।

এই মতবাদের পেছনে একটি শক্তিশালী থিওলজিক্যাল বা ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তি কাজ করে। তারা বলেন, আল্লাহ হলেন সর্বজ্ঞ বা অমনিসিয়েন্ট। তিনি জানতেন ভবিষ্যতে কী হবে। তাই তিনি যে আইন দিয়েছেন, তা সব যুগের সব মানুষের জন্য প্রযোজ্য। যদি আমরা বলি যে শরিয়াকে যুগের সাথে বদলাতে হবে, তবে আমরা পরোক্ষভাবে আল্লাহর জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করছি। আমরা বলছি যে আল্লাহ আধুনিক যুগের সমস্যাগুলো বুঝতে পারেননি (নাউজুবিল্লাহ)। তাই ফিক্সড ল’ (Fixed Law)-এর প্রবক্তারা শরিয়াকে একটি অটল পর্বত হিসেবে দেখেন, যা ঝড়েও নড়ে না। তাদের কাছে পরিবর্তন মানেই বিদআত বা ইনোভেশন, যা ধর্মের বিশুদ্ধতা নষ্ট করে।

ব্যবহারিক জীবনে বা প্র্যাকটিক্যাল লাইফে এই দর্শনটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং কার্যকর। কারণ মানুষ স্বভাবতই অনিশ্চয়তা অপছন্দ করে। একজন সাধারণ মুসলমান জানতে চায় – ব্যাংকের সুদ হারাম কি না? মিউজিক শোনা জায়েজ কি না? সে জটিল দার্শনিক ব্যাখ্যা শুনতে চায় না; সে চায় একটি ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ উত্তর। ফিক্সড ল’ (Fixed Law) তাকে সেই পরিষ্কার উত্তর দেয়। এটি সমাজকে একটি স্থিতিশীল আইনি কাঠামো প্রদান করে। চোর জানবে চুরি করলে হাত কাটা যাবে; ব্যভিচারী জানবে তার শাস্তি কী। আইনের এই পূর্বানুমানযোগ্যতা বা প্রেডিক্টেবিলিটি সমাজের শৃঙ্খলার জন্য জরুরি। ঐতিহাসিকভাবে, রাষ্ট্র এবং আদালতগুলো সবসময় শরিয়াকে একটি ফিক্সড বা স্থির বডি অফ ল হিসেবে দেখতে চেয়েছে, কারণ পরিবর্তনশীল আইন দিয়ে দেশ শাসন করা কঠিন। অটোমান সাম্রাজ্যের মাজাল্লা (Majalla) ছিল শরিয়াকে কোডিফাই বা বিধিবদ্ধ করে ফিক্সড ল’ বানানোর প্রথম বড় রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা। সেখানে ফিকহের নমনীয়তাকে সরিয়ে নির্দিষ্ট ধারায় আইনকে বন্দী করা হয়েছিল।

সত্যের সন্ধানে নিরন্তর যাত্রা: শরিয়া অ্যাজ প্রসেস

এর ঠিক উল্টো মেরুতে অবস্থান করছে প্রসেস ভিউ (Process View) বা প্রক্রিয়াবাদী দর্শন। এই মতবাদের অনুসারীরা বলেন, শরিয়া কোনো ফিক্সড আইনের বই বা বুক অফ স্ট্যাটিউটস নয়। শরিয়া হলো আল্লাহর অসীম ইচ্ছাকে বা ডিভাইন উইল-কে বোঝার এবং মানবজীবনে প্রয়োগ করার একটি মেথডলজি বা পদ্ধতি। তাদের যুক্তি হলো, কুরআন এবং সুন্নাহতে খুব কম সংখ্যক আইনি বিধান (মাত্র কয়েকশ আয়াত) আছে। বাকি হাজার হাজার সমস্যার সমাধান তো সেখানে নেই। তাহলে শরিয়া কি অসম্পূর্ণ? না। শরিয়া সম্পূর্ণ কারণ এটি আমাদের চিন্তা করার, যুক্তি দেওয়ার এবং সমাধান বের করার একটি ‘প্রসেস’ শিখিয়ে দিয়েছে। একে বলা হয় ইজতিহাদ (Ijtihad)

প্রখ্যাত ইসলামি পণ্ডিত এবং সমাজবিজ্ঞানী জিয়াউদ্দিন সরদার (Ziauddin Sardar) তার বিভিন্ন লেখায় এই প্রসেস ভিউকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন, শরিয়া কোনো প্রডাক্ট বা পণ্য নয় যা সুপারমার্কেট থেকে কেনা যায়। শরিয়া হলো একটি সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়া বা প্রব্লেম সলভিং মেকানিজম। মানুষ তার সীমিত বুদ্ধি দিয়ে আল্লাহর অনন্ত ইচ্ছাকে বোঝার চেষ্টা করে। এই চেষ্টা বা স্ট্রাগল-ই হলো শরিয়া। যেহেতু মানুষের বুদ্ধি এবং পরিস্থিতি সবসময় বদলায়, তাই শরিয়ার ব্যাখ্যাও সবসময় বদলাতে বাধ্য। এক যুগের সঠিক ব্যাখ্যা পরের যুগে ভুল বা অপ্রাসঙ্গিক হতে পারে। এটি শরিয়ার দুর্বলতা নয়, বরং এটিই তার শক্তি। এই নমনীয়তা বা ফ্লেক্সিবিলিটি আছে বলেই শরিয়া মরুভূমির তাবু থেকে শুরু করে আধুনিক স্কাইস্ক্র্যাপার পর্যন্ত সব জায়গায় টিকে আছে।

প্রসেস ভিউ (Process View) অনুযায়ী, শরিয়া এবং ফিকহ এক জিনিস নয়। শরিয়া হলো ঐশ্বরিক আদর্শ (ন্যায়বিচার, দয়া), যা অপরিবর্তনীয়। আর ফিকহ হলো মানুষের তৈরি আইন, যা সেই আদর্শকে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করে। ফিকহ পরিবর্তনশীল, শরিয়া শাশ্বত। প্রক্রিয়াবাদীরা বলেন, যখন আমরা ফিকহকে শরিয়া মনে করি, তখনই আমরা ভুল করি। আমরা মানুষের তৈরি আইনকে আল্লাহর আইন বলে পবিত্র করে ফেলি। এর ফলে আইন পাথর হয়ে যায়। যেমন, দাসপ্রথা একসময় ফিকহে বৈধ ছিল। কিন্তু শরিয়ার প্রসেস বা স্পিরিট (মানুষের মুক্তি) ব্যবহার করে পরবর্তীকালে দাসপ্রথা বিলোপ করা হয়েছে। যদি শরিয়া ফিক্সড হতো, তবে দাসপ্রথা আজও বৈধ থাকত। এই উদাহরণটি প্রমাণ করে যে শরিয়া আসলে একটি ইভোলিউশন বা বিবর্তনের নাম।

স্থিরতা বনাম গতির প্যারাডক্স: অস্তিত্বের সংকট

এই দুই দর্শনের সংঘাত বা ক্ল্যাশ শরিয়ার ভেতরে এক গভীর কন্ট্রাডিকশন বা স্ববিরোধিতা তৈরি করেছে। এই দ্বন্দ্বটি শরিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং কার্যকারিতা – উভয়কেই চ্যালেঞ্জ করে।

প্রথমত, যদি শরিয়া ফিক্সড ল’ (Fixed Law) হয়, তবে ইতিহাসের পাতায় এত মাযহাব, এত ফিরকা, এবং এত মতভেদ কেন? হানাফি মাযহাব যা জায়েজ বলছে (যেমন অমুসলিম দেশে সুদের লেনদেন), শাফেয়ী মাযহাব তা কঠোরভাবে হারাম বলছে। শিয়া ফিকহ যা বলছে, সুন্নি ফিকহ তার উল্টোটা বলছে। এমনকি একই মাযহাবের ভেতরেও ইমামদের মধ্যে মতভেদ আছে। এই যে হাজার হাজার ভিন্নমত বা ডাইভারসিটি – এটা কি প্রমাণ করে না যে শরিয়া আসলে ফিক্সড কিছু নয়? যদি এটি সত্যিই একটি ‘তৈরি প্রোডাক্ট’ হতো, তবে তো সবার কাছে একই ভার্সন থাকত। চার মাযহাবের অস্তিত্বই ফিক্সড ল’ থিওরির সবচেয়ে বড় কাউন্টার-আর্গুমেন্ট বা পাল্টা যুক্তি। স্থিরতাবাদীরা এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন, এগুলো হলো শাখা-প্রশাখার মতভেদ, মূল বা শিকড় এক। কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য শাখা-প্রশাখাই আসল, কারণ তাদের জীবন চলে সেই শাখার ফতোয়া দিয়েই।

দ্বিতীয়ত, যদি শরিয়াকে কেবলই প্রসেস (Process) বলা হয়, তবে এর প্র্যাকটিক্যাল ইমপ্লিকেশন বা ব্যবহারিক প্রয়োগ নিয়ে বিশাল সমস্যা তৈরি হয়। সাধারণ মানুষ এবং বিচারকদের জন্য নির্দিষ্ট গাইডলাইন বা রুলবুক দরকার। একজন বিচারক আদালতে বসে বলতে পারেন না, “আমি এখন আল্লাহর আইন খোঁজার প্রসেসে আছি, তাই রায় দিতে পারছি না।” বা একজন সাধারণ মানুষ প্রতিদিন সকালে উঠে ভাবতে পারে না, “আজকের জন্য নামাজ কয় ওয়াক্ত হবে তা গবেষণা করে বের করি।” প্র্যাকটিক্যাল লাইফে আইনকে ফিক্সড হতেই হয়। আইন যদি তরল পদার্থের মতো সবসময় আকার বদলায়, তবে সমাজে কোনো স্থিতিশীলতা থাকে না। অপরাধীরা তখন আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাবে, আর দুর্বলেরা শোষিত হবে। প্রসেস ভিউ (Process View) ফিলোসফিক্যাল বা দার্শনিক লেভেলে খুব আকর্ষণীয় হলেও, লিগ্যাল বা আইনি লেভেলে এটি প্রয়োগ করা অত্যন্ত কঠিন। এটি শরিয়াকে সাবজেক্টিভ বা ব্যক্তিগত মতামতে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করে।

তৃতীয়ত, অথরিটি (Authority) বা কর্তৃপক্ষের সংকট। যদি শরিয়া ফিক্সড হয়, তবে অথরিটি থাকে অতীতের ইমামদের হাতে (তাকলিদ)। আর যদি শরিয়া প্রসেস হয়, তবে অথরিটি চলে আসে বর্তমানের গবেষক বা মুজতাহিদদের হাতে। আধুনিক যুগে কে মুজতাহিদ হওয়ার যোগ্য? যার হাতে পিএইচডি ডিগ্রি আছে, নাকি যার হাতে ইজাজা (সনদ) আছে? এই প্রশ্নের উত্তর নেই। ফলে শরিয়া এখন এক ‘ফ্রি-ফর-অল’ বা সবার জন্য উন্মুক্ত মাঠে পরিণত হয়েছে। ইন্টারনেটে যে কেউ নিজেকে স্কলার দাবি করে ‘প্রসেস’ চালাচ্ছে।

একটি মধ্যপস্থার খোঁজে: স্থির ও গতির সমন্বয়

শরিয়া আজ এই স্থিরতা আর গতির দোটানায় দুলছে। এটি একটি ক্লাসিক্যাল ডিলেমা বা উভয়সংকট। শরিয়াকে যদি খুব বেশি শক্ত বা রিজিড করা হয় (ফিক্সড ল’), তবে তা আধুনিক যুগের ধাক্কায় ভেঙে যাবে। মানুষ তখন শরিয়াকে সেকেলে বা ব্যাকডেটেড বলে বর্জন করবে। আবার যদি শরিয়াকে খুব বেশি নরম বা ফ্লেক্সিবল করা হয় (প্রসেস), তবে তা তার নিজস্বতা বা আইডেন্টিটি হারিয়ে ফেলবে। তখন যা খুশি তাই শরিয়া নামে চালিয়ে দেওয়া হবে।

আধুনিক তাত্ত্বিকরা, যেমন খালেদ আবু এল ফাদল (Khaled Abou El Fadl), এই দুইয়ের মধ্যে একটি সেতু বা ব্রিজ তৈরির চেষ্টা করেছেন। তিনি শরিয়াকে একটি অথরিটেটিভ প্রসেস (Authoritative Process) হিসেবে দেখেন। অর্থাৎ, এটি একটি প্রসেস ঠিকই, কিন্তু এর কিছু ফিক্সড বা স্থির বাউন্ডারি বা সীমানা আছে। তিনি বলেন, শরিয়ার কিছু মূলনীতি (যেমন ন্যায়বিচার, দয়া, তাওহিদ) হলো ফিক্সড বা ধ্রুবক; আর বাকি সব আইনি বিধান হলো ভেরিয়েবল বা চলক। এই মূলনীতিগুলো হলো ধ্রুবতারা, যা আমাদের পথ দেখায়; আর আইনি বিধানগুলো হলো সেই পথে চলার কৌশল, যা রাস্তা অনুযায়ী বদলাতে পারে।

আবু এল ফাদল (Khaled Abou El Fadl) তার স্পিকিং ইন গড’স নেম (Speaking in God’s Name) বইতে যুক্তি দেখান যে, শরিয়া হলো ঈশ্বরের ইচ্ছা এবং মানুষের বোঝাপড়ার মধ্যকার এক নিরন্তর সংলাপ বা ডায়ালগ। এই সংলাপ কখনো শেষ হয় না। আমরা যখন বলি “শরিয়া এটা বলেছে”, আমরা আসলে বলি “আমরা মনে করি শরিয়া এটা বলেছে”। এই বিনয়টুকু থাকলেই শরিয়া একই সাথে ফিক্সড এবং প্রসেস হতে পারে। ফিক্সড – কারণ আমরা ঈশ্বরের দিকে তাকিয়ে আছি; প্রসেস – কারণ আমরা ঈশ্বরের দিকে হাঁটছি। হাঁটা মানেই গতি, আর গন্তব্য মানেই স্থিরতা। শরিয়া হলো এই হাঁটা এবং গন্তব্যের এক অদ্ভুত সমন্বয় (Abou El Fadl, 2001)।

ন্যাচারাল পারসনহুড বনাম ফিকটিভ পারসনহুড: রক্ত-মাংসের মানুষ নাকি অদৃশ্য সত্তা?

আধুনিক অর্থনীতির দিকে তাকালে আমরা এক অদ্ভুত জাদুর খেলা দেখতে পাই। আমাদের চারপাশটা এমন সব বিশাল বিশাল সত্তা দিয়ে ঘেরা, যাদের রক্ত-মাংসের কোনো অস্তিত্ব নেই, অথচ তারা মানুষের চেয়েও শক্তিশালী। এই সত্তাগুলোর নাম ‘কর্পোরেশন’। গুগল, অ্যাপল, মাইক্রোসফট কিংবা আপনার পাড়ার ব্যাংকটি – এরা সবাই আইনের চোখে একেকজন ‘ব্যক্তি’। এরা চুক্তি করতে পারে, জমি কিনতে পারে, অন্যের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে, আবার নিজেরাও মামলার আসামি হতে পারে। এদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে হাজার হাজার কোটি টাকা জমা থাকে, এরা হাজার হাজার মানুষকে চাকরি দেয়। অথচ আপনি যদি অ্যাপল কোম্পানিকে খুঁজতে যান, আপনি স্টিভ জবসকে পাবেন (কিংবা পেতেন), টিম কুককে পাবেন, বড় বড় অফিস বা সার্ভার রুম পাবেন, কিন্তু ‘অ্যাপল’ নামের কোনো মানুষকে খুঁজে পাবেন না। এই যে অদৃশ্য অথচ জীবন্ত একটি সত্তা, একে আইনের ভাষায় বলা হয় ফিকটিভ পারসনহুড (Fictive Personhood) বা কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তা। এটি আধুনিক পুঁজিবাদের হৃৎপিণ্ড। এই ধারণাটি ছাড়া শেয়ার বাজার, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি কিংবা আধুনিক রাষ্ট্র – কোনোটিই টিকে থাকতে পারত না।

এখন প্রশ্ন হলো, শরিয়া কি এই অদৃশ্য ‘ব্যক্তি’কে চেনে? এখানেই শরিয়ার ভেতরের এক বিশাল আইনি ও দার্শনিক ফাটল ধরা পড়ে। ক্লাসিক্যাল শরিয়া আইন এবং ফিকহ অনুযায়ী, একমাত্র রক্ত-মাংসের মানুষই, অর্থাৎ ন্যাচারাল পারসন (Natural Person), আইনের চোখে ‘ব্যক্তি’ হতে পারে। যার জান আছে, যার রুহ বা আত্মা আছে, কেবল তার পক্ষেই সম্ভব আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ হওয়া। শরিয়া মনে করে, অধিকার এবং কর্তব্য – এগুলো ঈমানের সাথে জড়িত। একটা জড় বস্তু বা কোম্পানি কীভাবে ঈমান আনবে? কীভাবে সে পরকালে হিসাব দেবে? তাই সনাতন ইসলামি আইনে কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোনো সত্তা নেই; সব দায়ভার দিনশেষে কোনো না কোনো মানুষের ঘাড়েই বর্তায়। শরিয়ার দৃষ্টিতে, মানুষের তৈরি কোনো প্রতিষ্ঠান বা ‘লিগ্যাল ফিকশন’ আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব বা আমানত বহন করার যোগ্য নয়। আমানত কেবল মানুষই বহন করতে পারে।

আধুনিক অর্থনীতির সাথে শরিয়ার সংঘাত: দায়বদ্ধতার প্রশ্ন

এই ন্যাচারাল পারসনহুড (Natural Personhood) বনাম ফিকটিভ পারসনহুড (Fictive Personhood)-এর দ্বন্দ্বটি আধুনিক ইসলামি অর্থনীতি বা ইসলামিক ফাইন্যান্সের জন্য এক বিরাট মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্য দাঁড়িয়ে আছে ‘লিমিটেড লায়াবিলিটি’ বা সীমিত দায়বদ্ধতার ওপর। আপনি যদি কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনেন এবং কোম্পানিটি যদি হাজার কোটি টাকা ঋণী হয়ে দেউলিয়া হয়ে যায়, তবে পাওনাদাররা আপনার বাড়ি-গাড়ি বিক্রি করে টাকা আদায় করতে পারবে না। আপনার লোকসান হবে কেবল শেয়ারের মূল্যটুকু। কারণ, আইন বলছে – ঋণটা ‘কোম্পানি’র, আপনার ব্যক্তিগত নয়। কোম্পানি একটা আলাদা ‘ব্যক্তি’। সে নিজেই নিজের ঋণের জন্য দায়ী। মালিক বা শেয়ারহোল্ডাররা নিরাপদ। এই সুরক্ষাকবচ বা শিল্ড আছে বলেই মানুষ বড় বড় ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে সাহস পায়।

কিন্তু শরিয়ার ক্লাসিক্যাল দৃষ্টিতে, ঋণ সবসময় ব্যক্তিগত। কেউ যদি ঋণ নেয়, তবে তাকেই (বা তার ওয়ারিশদের) তা শোধ করতে হবে। কোনো কাল্পনিক কোম্পানির দোহাই দিয়ে ঋণের দায় এড়ানো অনৈতিক এবং অনেক ক্ষেত্রে হারাম হিসেবে গণ্য হতে পারে। শরিয়া বলে, ঋণদাতার হক আদায় করা ফরয। এখন যদি কোম্পানি দেউলিয়া হয় আর মালিকরা নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদ লুকিয়ে বলে, “আমাদের কোনো দায় নেই, সব দায় কোম্পানির” – তবে ঋণদাতার প্রতি জুলুম করা হয়। এই দর্শনের কারণে মুসলিম বিশ্বে ঐতিহাসিকভাবে বড় বড় দীর্ঘস্থায়ী কর্পোরেশন গড়ে ওঠেনি। সেখানে ছিল অংশীদারিত্ব বা মুদারাবা, যা কোনো অংশীদারের মৃত্যুর সাথে সাথেই ভেঙে যেত। তিমুর কুরান (Timur Kuran) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, এই ‘করপোরেট সত্তা’ বা আইনি ব্যক্তিত্বের অনুপস্থিতিই মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক স্থবিরতার অন্যতম কারণ ছিল। ওয়াকফ ব্যবস্থা ছিল, কিন্তু ওয়াকফ কোনো স্বাধীন আইনি সত্তা ছিল না; এটি মোতাওয়াল্লির মাধ্যমে পরিচালিত হতো এবং এর নমনীয়তা ছিল সীমিত। কুরানের মতে, শরিয়ার এই অনমনীয়তাই মুসলিম বিশ্বকে আধুনিক অর্থনীতির দৌড়ে পেছনে ফেলে দিয়েছে।

ভেতরের দ্বন্দ্ব: ঐতিহ্য বনাম প্রয়োজন

এখনকার ইসলামি ব্যাংকগুলো বা শরিয়া-কমপ্লায়েন্ট ব্যবসাগুলো এই সংকট মেটানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তারা এক ধরণের হাইব্রিড মডেল তৈরি করেছে, যেখানে আধুনিক আইনের ‘ফিকটিভ পারসন’ বা কৃত্রিম সত্তাকে মেনে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শরিয়ার তাত্ত্বিকরা এখনো পুরোপুরি একমত হতে পারেননি। একদল (আধুনিকতাবাদী) বলছে, জনস্বার্থ বা মাসলাহা (Maslaha)-র কারণে কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তাকে মেনে নিতে হবে, নইলে মুসলিমরা অর্থনীতিতে পিছিয়ে পড়বে। তারা যুক্তি দেয়, শরিয়া নমনীয় এবং যুগের প্রয়োজনে ইজতিহাদ করে নতুন আইনি সত্তা তৈরি করা সম্ভব। মুহাম্মদ তাকি উসমানি (Muhammad Taqi Usmani)-এর মতো আধুনিক ফিকহবিদরা সীমিত দায়বদ্ধতা বা লিমিটেড লায়াবিলিটিকে শর্তসাপেক্ষে জায়েজ বলেছেন। তাদের মতে, এটি ব্যবসার একটি চুক্তি বা কন্ডিশন, যা শরিয়ার মূলনীতির বিরোধী নয়।

আরেকদল (ঐতিহ্যবাদী) বলছে, এটি ইসলামি দায়বদ্ধতার ধারণা বা কনসেপ্ট অব অ্যাকাউন্টেবিলিটি-কে নষ্ট করে দিচ্ছে। যদি কোনো কোম্পানি প্রতারণা করে, তবে কাকে শাস্তি দেওয়া হবে? কোম্পানিকে তো আর জেলে ভরা যায় না বা দোজখে পাঠানো যায় না। তারা মনে করেন, এই কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তা আসলে মহাজনদের বা পুঁজিপতিদের রক্ষা করার একটি কৌশল। এটি মানুষকে দায়িত্বজ্ঞানহীন করে তোলে। শরিয়া চায় মানুষ তার প্রতিটি কাজের জন্য ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর কাছে এবং সমাজের কাছে দায়ী থাকুক। এই যে ‘ব্যক্তি’র সংজ্ঞায়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব – এটি শরিয়ার নৈতিক কাঠামোর সাথে আধুনিক পুঁজিবাদের এক গভীর সংঘাত। শরিয়া কি তার ‘ব্যক্তি’র ধারণা পাল্টে জড় বস্তুকে ‘রুহ’ দান করবে, নাকি আধুনিক অর্থনীতিকে প্রত্যাখ্যান করবে?

ওয়াকফ বনাম কর্পোরেশন: এক অসমাপ্ত তুলনা

শরিয়ার ইতিহাসে ওয়াকফ (Waqf) বা ধর্মীয় অনুদান ব্যবস্থাকে অনেকে আধুনিক কর্পোরেশনের পূর্বসূরি মনে করেন। ওয়াকফ হলো এমন একটি সম্পত্তি যা আল্লাহর নামে উৎসর্গ করা হয় এবং এর আয় জনকল্যাণে ব্যয় করা হয়। এটি অনেকটা ট্রাস্ট বা ফাউন্ডেশনের মতো। কিন্তু ওয়াকফ এবং কর্পোরেশনের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে, যা শরিয়ার সীমাবদ্ধতাকে নির্দেশ করে। কর্পোরেশন একটি জীবন্ত সত্তা; এর পরিচালকরা বা বোর্ড অব ডিরেক্টরস চাইলে ব্যবসার ধরণ পাল্টাতে পারে, সম্পত্তি বিক্রি করতে পারে বা নতুন বিনিয়োগ করতে পারে। এটি নিজের ভালো নিজেই বোঝে (আইনের দৃষ্টিতে)। কিন্তু ওয়াকফ একটি স্থির বা স্ট্যাটিক সত্তা। ওয়াকফ প্রতিষ্ঠাতা বা ওয়াকিফ যেভাবে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত সেভাবেই চলতে হবে। একে বলা হয় ‘মৃত হাতের শাসন’ বা ডেড হ্যান্ড রুল (Dead Hand Rule)। মোতাওয়াল্লি বা ব্যবস্থাপক কেবল একজন আমলা, তিনি মালিক নন।

এই অনমনীয়তার কারণে ওয়াকফ ব্যবস্থা আধুনিক কর্পোরেশনের মতো ডাইনামিক বা গতিশীল হতে পারেনি। মুসলিম বিশ্বে হাজার হাজার একর জমি ওয়াকফ হিসেবে পড়ে আছে, কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। আধুনিক শরিয়া স্কলাররা এখন ‘ক্যাশ ওয়াকফ’ বা নগদ অর্থের ওয়াকফ এবং করপোরেট ওয়াকফ-এর ধারণা নিয়ে আসছেন। তারা চেষ্টা করছেন ওয়াকফকে একটি আইনি ব্যক্তিসত্তা বা লিগ্যাল পারসন (Legal Person) হিসেবে দাঁড় করাতে। কিন্তু এর জন্য শরিয়ার মৌলিক কিছু নীতি ভাঙতে হচ্ছে বা নতুন করে ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটি খুব সহজ নয়। কারণ শরিয়ার প্রতিটি পরিবর্তনকে ধর্মতাত্ত্বিক বৈধতা বা থিওলজিক্যাল লেজিটিমেসি পেতে হয়। কর্পোরেশনকে ‘ব্যক্তি’ বলাটা কি বিদআত হবে, নাকি এটি মাসলাহা হবে – এই তর্কে শরিয়া আজও আটকে আছে।

অস্তিত্বের সংকট: শরিয়া কি অর্থনীতির ভাষা বুঝবে?

দিনশেষে, এই দ্বন্দ্বটি শরিয়ার অস্তিত্বের প্রশ্নের সাথে জড়িত। আধুনিক বিশ্ব এখন আর ব্যক্তিগত লেনদেনের ওপর চলে না; এটি চলে বিশাল বিশাল প্রতিষ্ঠানের ওপর। রাষ্ট্র নিজেও একটি বিশাল কর্পোরেশন। যদি শরিয়া এই ‘ফিকটিভ পারসন’ বা কৃত্রিম সত্তাকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে না পারে, তবে সে আধুনিক রাষ্ট্র ও অর্থনীতি পরিচালনা করতে পারবে না। তাকে কেবল ব্যক্তিগত পারিবারিক আইন বা ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। হ্যান্সম্যান (Henry Hansmann) এবং ক্রাকম্যান (Reinier Kraakman) তাদের আইনি গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, আধুনিক অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো ‘অর্গানাইজেশনাল ল’ বা সাংগঠনিক আইন, যা ব্যক্তিকে প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা করে। শরিয়া যদি এই সেপারেশন বা বিচ্ছেদ মেনে নিতে না পারে, তবে ‘ইসলামি অর্থনীতি’ কেবল একটি তাত্ত্বিক স্লোগান হয়েই থাকবে।

শরিয়াকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে – সে কি তার নৈতিক স্বচ্ছতা বা এথিক্যাল পিউরিটি বজায় রাখবে (যেখানে কেবল মানুষই দায়ী), নাকি সে আধুনিক অর্থনীতির জটিলতাকে আলিঙ্গন করবে (যেখানে প্রতিষ্ঠানও দায়ী)? এই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে শরিয়া আগামী দিনে কতটা প্রাসঙ্গিক থাকবে। 

হুদুদিজম বনাম মাসলাহা-ইজম: শাস্তির চাবুক নাকি কল্যাণের ছায়া?

শরিয়ার প্রয়োগ এবং দর্শনের ক্ষেত্রে যে বিতর্কটি জনমানসে সবচেয়ে বেশি ভীতি, কৌতূহল এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, তা হলো অপরাধ ও শাস্তির ধারণা নিয়ে। পশ্চিমা মিডিয়া বা সাধারণ মানুষের কাছে শরিয়া বলতেই ভেসে ওঠে হাত কাটা, পাথর মারা বা বেত্রাঘাতের ছবি। কিন্তু শরিয়ার অন্দরমহলে এই শাস্তিগুলো নিয়ে এক তুমুল দার্শনিক যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধের দুই পক্ষ হলো হুদুদিজম (Hududism) বা শাস্তিবাদ এবং মাসলাহা-ইজম (Maslaha-ism) বা জনকল্যাণবাদ। প্রশ্নটি খুব মৌলিক – শরিয়ার আসল রূপ কোনটি? এটি কি একটি কঠোর দণ্ডবিধি যা পাপীদের শায়েস্তা করার জন্য তৈরি, নাকি এটি একটি কল্যাণমুখী ব্যবস্থা যা সমাজকে অপরাধমুক্ত ও সুখী করার জন্য তৈরি? এই দুই ইজমের সংঘাত কেবল আইনের ধারা নিয়ে নয়, এটি শরিয়ার ভাবমূর্তি বা ইমেজ এবং তার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য বা টেলস (Telos) নিয়ে। শরিয়া কি জল্লাদের কুঠার, নাকি চিকিৎসকের ছুরি? এই মেটাফোর বা রূপকের আড়ালেই লুকিয়ে আছে আজকের আলোচনার সারাংশ।

কঠোরতার প্রতীক: হুদুদিজমের দর্শন

হুদুদিজম (Hududism) বা শাস্তিবাদের ফোকাস হলো ‘হুদুদ’ বা কুরআনে বর্ণিত নির্দিষ্ট শাস্তিগুলোর ওপর। হুদুদ (একবচনে হদ) মানে হলো সীমা বা বাউন্ডারি। কুরআনে মাত্র গুটিকয়েক অপরাধের (যেমন চুরি, ব্যভিচার, মদ্যপান, ডাকাতি, মিথ্যা অপবাদ) জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তির কথা বলা হয়েছে। হুদুদিজম (Hududism)-এর অনুসারীরা মনে করেন, এই শাস্তিগুলোই হলো শরিয়ার ফ্ল্যাগশিপ বা প্রধান পরিচয়। তাদের কাছে ‘শরিয়া কায়েম’ বা ‘ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা’ মানেই হলো আগামীকাল থেকে চোরের হাত কাটা শুরু করা এবং ব্যভিচারীকে পাথর মারা। আধুনিক যুগের অনেক ইসলামিস্ট গ্রুপ বা রাজনৈতিক দল এই মতবাদকে তাদের এজেন্ডার শীর্ষে রাখে। তাদের স্লোগান অনেকটা এমন: “আল্লাহর জমিনে আল্লাহর আইন চাই, এবং আল্লাহর আইন মানেই হুদুদ।”

এই দর্শনের পেছনে একটি শক্তিশালী সাইকোলজিক্যাল বা মনস্তাত্ত্বিক যুক্তি কাজ করে। তারা মনে করেন, মানুষ স্বভাবতই পাপপ্রবণ। কেবল ওয়াজ-নসিহত বা কাউন্সেলিং দিয়ে অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়। অপরাধ দমনের জন্য দরকার ডিটারেন্স বা ভীতি প্রদর্শন। যখন মানুষ দেখবে চুরির দায়ে হাত কাটা যাচ্ছে, তখন সে চুরির কথা কল্পনাও করবে না। হুদুদিজম (Hududism) বিশ্বাস করে যে, সমাজের শান্তি শৃঙ্খলার জন্য এই কঠোরতা বা হার্শনেস অপরিহার্য। তারা একে নিষ্ঠুরতা মনে করে না, বরং একে আল্লাহর চূড়ান্ত ন্যায়বিচার মনে করে। তাদের যুক্তি হলো – আল্লাহ যেহেতু মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তিনি জানেন মানুষকে কীভাবে সোজা রাখতে হয়। আধুনিক জেলের শাস্তি বা জেলখানা পদ্ধতি অপরাধীকে সংশোধন করে না, বরং তাকে আরও বড় অপরাধী বানায়। এর চেয়ে জনসম্মুখে এক ঘা বেত মারা অনেক বেশি কার্যকর। তাই হুদুদ প্রয়োগে কোনো শিথিলতা দেখানো মানেই হলো আল্লাহর আদেশের অবমাননা করা।

তবে হুদুদিজম (Hududism)-এর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর কনটেক্সট বা প্রেক্ষাপটহীনতা। তারা শাস্তির আক্ষরিক প্রয়োগের ওপর এতটাই জোর দেয় যে, অপরাধের পেছনের সামাজিক কারণগুলোকে উপেক্ষা করে। পাকিস্তান বা সুদানের মতো দেশে যখন হুদুদ অর্ডিন্যান্স বা হুদুদ আইন জারি করা হয়েছিল, তখন দেখা গেছে এর শিকার হয়েছে মূলত দরিদ্র এবং দুর্বল শ্রেণীর মানুষ। একজন ক্ষুধার্ত মানুষ রুটি চুরি করলে তার হাত কাটা হচ্ছে, কিন্তু বড় দুর্নীতিবাজরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে। এই বৈষম্যমূলক প্রয়োগ শরিয়ার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা নষ্ট করে এবং একে একটি ভয়ের বস্তুতে পরিণত করে। হুদুদিজম শরিয়াকে রিডিউস বা সংকুচিত করে ফেলে কেবল দণ্ডবিধির মধ্যে, যেন ইসলামের আর কোনো কাজ নেই শাস্তি দেওয়া ছাড়া। এটি শরিয়ার বিশাল আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক কল্যাণমূলক দিকটিকে আড়াল করে দেয়।

কল্যাণের আলোকবর্তিকা: মাসলাহা-ইজমের দর্শন

এর ঠিক বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে আছে মাসলাহা-ইজম (Maslaha-ism) বা জনকল্যাণবাদ। এই দর্শনের মূল ভিত্তি হলো মাসলাহা (Maslaha) বা পাবলিক ইন্টারেস্ট। এর তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করেছিলেন চতুর্দশ শতাব্দীর বিখ্যাত আন্দালুসিয়ান স্কলার ইমাম আল-শাতিবি (Al-Shatibi)। তিনি তার কালজয়ী গ্রন্থ আল-মুওয়াফাকাত (Al-Muwafaqat)-এ মাকাসিদ আল-শরিয়া (Maqasid al-Shari’ah) বা শরিয়ার উদ্দেশ্যের তত্ত্ব দাঁড় করান। আল-শাতিবি (Al-Shatibi) বলেন, শরিয়া কোনো খামখেয়ালি আদেশের সমষ্টি নয়; এর প্রতিটি আইনের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা পারপাস আছে। সেই উদ্দেশ্য হলো মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং ক্ষতি বা মাফাসাদা (Mafasada) দূর করা। তিনি শরিয়ার উদ্দেশ্যকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেন: ধর্ম (দ্বীন), জীবন (নফস), বুদ্ধি (আকল), বংশ (নসল) এবং সম্পদ (মাল) রক্ষা করা। একে বলা হয় শরিয়ার পঞ্চস্তম্ভ বা ফাইভ এসেনশিয়ালস।

মাসলাহা-ইজম (Maslaha-ism) বলে, হুদুদ বা শাস্তি কোনো লক্ষ্য বা গোল নয়; এটি লক্ষ্য অর্জনের একটি উপায় বা মিনস মাত্র। লক্ষ্য হলো সমাজকে অপরাধমুক্ত রাখা এবং মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা। যদি কোনো পরিস্থিতিতে হুদুদ প্রয়োগ করলে হিতে বিপরীত হয়, বা সমাজের ক্ষতি হয়, তবে সেই শাস্তি স্থগিত বা পরিবর্তন করা যায়। মাসলাহা-বাদীরা খলিফা উমরের উদাহরণ দেন, যিনি দুর্ভিক্ষের সময় চুরির শাস্তি স্থগিত করেছিলেন। উমর বুঝেছিলেন, পেটে ভাত না থাকলে হাত কাটার আইন প্রয়োগ করা হলো জুলুম। এটি শরিয়ার উদ্দেশ্যের (জীবন রক্ষা) বিরোধী। এই দর্শন অনুযায়ী, শরিয়া হলো ডায়নামিক বা গতিশীল। এটি পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়। যদি আজকের যুগে হাত কাটলে মানুষ কর্মক্ষমতা হারিয়ে সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, তবে মাসলাহা অনুযায়ী বিকল্প শাস্তি (যেমন জেল বা সংশোধনাগার) দেওয়া যেতে পারে, যতক্ষণ না তা অপরাধ দমনে কার্যকর হয়।

আধুনিক যুগে এই চিন্তাধারাকে সামনে নিয়ে এসেছেন মোহাম্মদ হাশিম কামালি (Mohammad Hashim Kamali) এবং তারিক রমজান (Tariq Ramadan)-এর মতো স্কলাররা। কামালি (Mohammad Hashim Kamali) তার শরিয়া ল: এন ইন্ট্রোডাকশন (Shari’ah Law: An Introduction) বইতে দেখিয়েছেন যে, ক্লাসিক্যাল ফিকহে হুদুদ প্রয়োগের জন্য এত কঠিন শর্ত বা এভিডেনশিয়ারি রিকোয়ারমেন্টস রাখা হয়েছিল যে, বাস্তবে হুদুদ প্রায় অসম্ভব ছিল। যেমন, জিনার শাস্তির জন্য চারজন চাক্ষুষ সাক্ষী লাগে, যারা নিজের চোখে ঘটনাটি ঘটতে দেখেছে – যা প্রায় অসম্ভব। এর মানে হলো, শরিয়া আসলে চায় না শাস্তি হোক; শরিয়া চায় পাপ গোপন থাকুক এবং মানুষ তওবা বা অনুশোচনা করুক। হুদুদ ছিল মূলত একটি ডেটারেন্ট বা ভীতিপ্রদ ব্যবস্থা, যা খুব কমই প্রয়োগ হতো। মাসলাহা-বাদীরা বলেন, আজ আমরা যদি হুদুদ প্রয়োগের আগে সমাজকে দারিদ্র্যমুক্ত না করি, শিক্ষা ও নৈতিকতা নিশ্চিত না করি, তবে আমরা শরিয়ার স্পিরিট বা আত্মাকে হত্যা করব। আগে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করো, তারপর শাস্তির কথা ভাবো – এটাই মাসলাহা-ইজমের মূলমন্ত্র (Kamali, 2008)।

দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু: ন্যায়বিচার নাকি অন্ধ আইন?

এই দুই ইজমের সংঘর্ষে শরিয়ার ভেতরে এক গভীর কন্ট্রাডিকশন বা স্ববিরোধিতা তৈরি হয়েছে। ধরুন, চুরির শাস্তি হাত কাটা। হুদুদিজম (Hududism) বলবে, “আইন আইনই। আল্লাহর হুকুম, তাই হাত কাটতেই হবে। এখানে দয়া দেখানোর সুযোগ নেই।” তাদের কাছে আইনের আক্ষরিক প্রয়োগই হলো ইবাদত। কিন্তু মাসলাহা-ইজম (Maslaha-ism) প্রশ্ন তুলবে, “চুরিটা কেন হলো? সমাজে কি সম্পদ সুষমভাবে বণ্টিত আছে? রাষ্ট্র কি তার দায়িত্ব পালন করেছে?” যদি সমাজে এমন বৈষম্য বা ইনইক্যুয়ালিটি থাকে যে মানুষ চুরি করতে বাধ্য হচ্ছে, তখন হাত কাটা কি ন্যায়বিচার হবে, নাকি এটি হবে গরিবের ওপর ধনীর অত্যাচার? শরিয়া কি গরিব মারার কল, নাকি ইনসাফ কায়েমের হাতিয়ার?

এই দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয় যখন আমরা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বা হিউম্যান রাইটস-এর মুখোমুখি হই। আধুনিক বিশ্ব পাথর মারা বা হাত কাটাকে ‘নিষ্ঠুর এবং অমানবিক শাস্তি’ বা ক্রুয়েল অ্যান্ড আনইউজুয়াল পানিশমেন্ট হিসেবে দেখে। হুদুদিজম (Hududism) বলে, “পশ্চিমা মানবাধিকার আমাদের দেখার বিষয় না। আমরা আল্লাহর আইন মানব।” এটি মুসলিম বিশ্বকে বাকি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন বা আইসোলেটেড করে ফেলে। অন্যদিকে, মাসলাহা-ইজম (Maslaha-ism) বলে, “শরিয়ার উদ্দেশ্য যদি হয় মানুষের সম্মান বা ডিগনিটি রক্ষা করা, তবে শাস্তিগুলো এমন হতে হবে যা মানুষের মর্যাদা হানি না করে।” তারা হুদুদকে নতুন করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। তারা বলে, হুদুদ হলো সর্বোচ্চ শাস্তি বা ম্যাক্সিমাম পেনাল্টি, যা কেবল চরম বা এক্সট্রিম ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সাধারণ অপরাধের জন্য তাজির বা লঘু শাস্তি (যা বিচারকের রায়ের ওপর নির্ভরশীল) দেওয়াই শরিয়ার রীতি।

কন্ট্রাডিকশনটা হলো – শরিয়ার পরিচিতি বা আইডেন্টিটি আসলে কী? এটি কি তার কঠোরতায়, নাকি তার মানবিকতায়? হুদুদিজম শরিয়াকে ভয়ের মোড়কে উপস্থাপন করে, যা মানুষকে ধর্মের প্রতি বিদ্বেষী করে তোলে। আর মাসলাহা-ইজম শরিয়াকে এতটাই নমনীয় বা ফ্লেক্সিবল করে ফেলে যে, অনেকে ভয় পায় এতে শরিয়ার আসল দাঁত-নখ কিছু থাকবে কি না। যদি সব শাস্তিই ‘জনকল্যাণের’ নামে মাফ করে দেওয়া হয় বা বদলে ফেলা হয়, তবে আল্লাহর সুনির্দিষ্ট আদেশের (যেমন ১০০ বেত্রাঘাত) গুরুত্ব কী রইল? শরিয়া কি তবে নিছক একটি সোশ্যাল ওয়ার্ক বা সমাজকর্মে পরিণত হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মুসলিম মানস আজ দ্বিধাবিভক্ত।

একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভবিষ্যতের সন্ধানে

আজকের দিনে এই ডিবেটটা সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে কারণ অনেক মুসলিম দেশ শরিয়া আইন চালুর দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু কোন শরিয়া? তালেবানের শরিয়া (হুদুদিজম), নাকি তিউনিসিয়ার শরিয়া (মাসলাহা-ইজম)?

তারিক রমজান (Tariq Ramadan) ২০০৫ সালে একটি বিতর্কিত প্রস্তাব দিয়েছিলেন – “হুদুদ শাস্তির ওপর আন্তর্জাতিক মোরাটোরিয়াম বা সাময়িক স্থগিতাদেশ”। তার যুক্তি ছিল, বর্তমান মুসলিম বিশ্বের যা অবস্থা – দুর্নীতি, দারিদ্র্য, এবং অশিক্ষা – তাতে হুদুদ প্রয়োগ করার কোনো নৈতিক অধিকার বা মোরাল গ্রাউন্ড আমাদের নেই। তিনি বলেন, শরিয়া মানে শুধু দণ্ডবিধি নয়; শরিয়া হলো সামাজিক ন্যায়বিচার। যতক্ষণ না আমরা একটি আদর্শ সমাজ গড়তে পারছি, ততক্ষণ হুদুদ প্রয়োগ করা হবে শরিয়ার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। তার এই প্রস্তাব হুদুদিজম পন্থীদের ক্ষ্যাপালেও, মাসলাহা-ইজম পন্থীদের মধ্যে নতুন চিন্তার খোরাক জোগায়।

আখিরাত-কেন্দ্রিকতা বনাম দুনিয়া-কেন্দ্রিকতা: জান্নাতের চাবি নাকি বিপ্লবের ইশতেহার?

শরিয়ার দর্শনের সর্বশেষ এবং সম্ভবত সবচেয়ে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ফাটলটি লুকিয়ে আছে এর চূড়ান্ত গন্তব্য বা লক্ষ্য নির্ধারণের মধ্যে। এই দ্বন্দ্বটি আইনি ধারার চেয়ে বেশি বিশ্ববীক্ষা বা ওয়ার্ল্ডভিউ (Worldview)-এর সংঘাত। প্রশ্নটি অত্যন্ত মৌলিক – শরিয়া আসলে কী? এটি কি পরকালের মুক্তির জন্য একটি পাসপোর্ট, নাকি এটি ইহকালকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করার একটি সংবিধান? এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর ভিত্তি করেই মুসলিম মানস দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে: আখিরাত-কেন্দ্রিকতা (Afterlife-centricity) বা পারলৌকিকতা এবং দুনিয়া-কেন্দ্রিকতা (Worldly-centricity) বা ইহলৌকিকতা। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি শরিয়াকে দুটি ভিন্ন চশমায় দেখে। একদলের কাছে পৃথিবীটা তুচ্ছ, একটি পরীক্ষাগার মাত্র; অন্যদলের কাছে পৃথিবীটা কর্মক্ষেত্র, যেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা ইবাদত। এই লড়াইয়ে শরিয়া কখনো হয়ে ওঠে সুফি খানকার নীরব সাধনা, আবার কখনো হয়ে ওঠে রাজপথের উত্তাল বিপ্লব। মুমিন ব্যক্তি এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক চিরন্তন দোটানায় ভোগেন – তিনি কি জায়নামাজে বসে কাঁদবেন, নাকি প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিলে যাবেন? শরিয়া কি তাকে বৈরাগী বানাবে, নাকি বিপ্লবী বানাবে?

পরীক্ষাগারের দর্শন: আখিরাত-কেন্দ্রিকতার প্রশান্তি ও নিষ্ক্রিয়তা

আখিরাত-কেন্দ্রিকতা (Afterlife-centricity)-র মূল দর্শন হলো – দুনিয়াটা ক্ষণস্থায়ী এবং তুচ্ছ। কুরআনের বহু আয়াতে দুনিয়ার জীবনকে ‘খেল-তামাশা’ এবং ‘ধোঁকার সামগ্রী’ বলা হয়েছে। এই দর্শনের অনুসারীরা মনে করেন, মানুষের আসল বাড়ি হলো জান্নাত। পৃথিবীটা হলো একটা ওয়েটিং রুম বা পরীক্ষাকেন্দ্র। এখানে মানুষ পাঠানো হয়েছে কেবল পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। তাই এখানে সুখ-শান্তি বা ন্যায়বিচার পাওয়াটা মুখ্য নয়। যদি কেউ গরিব হয়, অসুস্থ হয় বা অত্যাচারের শিকার হয়, তবে বুঝতে হবে আল্লাহ তাকে পরীক্ষা করছেন। এই দর্শনের প্রধান হাতিয়ার হলো দুটি কনসেপ্ট বা ধারণা: সবর (Sabr) বা ধৈর্য এবং তাওয়াক্কুল (Tawakkul) বা আল্লাহর ওপর নির্ভরতা। শরিয়া এখানে ব্যক্তিগত ইবাদত, জিকির, এবং আত্মশুদ্ধি বা তাজকিয়াহ (Tazkiyah)-র ওপর ফোকাস করে। রাষ্ট্র কী আইন করল, বা সমাজে কে শাসক হলো – তা নিয়ে এদের মাথাব্যথা কম। এদের কাছে শরিয়া মানে হলো – সঠিকভাবে নামাজ পড়া, হালাল রুজি খাওয়া এবং মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা।

ঐতিহাসিকভাবে, সুফি বা তাসাউফ (Tasawwuf) পন্থী এবং ট্র্যাডিশনালিস্ট আলেমরা এই মতবাদকে ধারণ করে আসছেন। তারা মনে করেন, বাইরের জগত পরিবর্তন করার চেয়ে নিজের নফস বা আত্মাকে পরিবর্তন করা অনেক বেশি জরুরি। তাদের যুক্তি হলো, দুনিয়ার কোনো সিস্টেমই পারফেক্ট হতে পারে না, কারণ দুনিয়া নিজেই ইম্পারফেক্ট। তাই শরিয়া দিয়ে দুনিয়ায় স্বর্গ বানানোর চেষ্টা করা বৃথা। বরং শরিয়া মানতে হবে যাতে পরকালে আল্লাহর সামনে লজ্জিত হতে না হয়। এই মানসিকতা মানুষকে এক ধরণের আধ্যাত্মিক প্রশান্তি দেয়। একজন রিকশাচালক যখন মনে করেন যে তার এই কষ্ট ক্ষণস্থায়ী এবং এর বিনিময়ে তিনি জান্নাত পাবেন, তখন তিনি জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার শক্তি পান। আখিরাত-কেন্দ্রিকতা (Afterlife-centricity) সমাজে এক ধরণের স্থিতিশীলতা বা স্ট্যাবিলিটি বজায় রাখে, কারণ এটি মানুষকে অল্পতে তুষ্ট থাকতে শেখায় এবং বিদ্রোহ থেকে দূরে রাখে।

কিন্তু এই দর্শনের একটি অন্ধকার দিকও আছে, যাকে সমালোচকরা বলেন ফ্যাটালিজম (Fatalism) বা নিয়তিবাদ। যখন মানুষ সব কিছুকেই ‘আল্লাহর ইচ্ছা’ বা ‘পরীক্ষা’ বলে মেনে নেয়, তখন তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার স্পৃহা হারিয়ে ফেলে। শাসকরা এই মানসিকতাকে খুব পছন্দ করেন। কারণ জনগণ যদি মনে করে যে “শাসক অত্যাচার করছে কারণ আল্লাহ আমাদের পাপের শাস্তি দিচ্ছেন”, তবে তারা আর রাজপথে নামবে না। তারা বলবে, “আমরা সবর করলাম, আল্লাহ বিচার করবেন।” কার্ল মার্ক্স ধর্মকে যে “আফিম” বলেছিলেন, তা মূলত ধর্মের এই ব্যাখ্যার দিকেই ইঙ্গিত করে। অতিরিক্ত আখিরাত-মুখিনতা সমাজকে স্থবির করে দেয়। চোর চুরি করছে, কিন্তু সমাজ তাকে না ধরে বলছে “আল্লাহর বিচার হবে” – এটি শরিয়ার ন্যায়বিচারের ধারণাকে হাস্যকর করে তোলে। শরিয়া তখন আর সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার থাকে না, হয়ে যায় ব্যক্তিগত সান্ত্বনার সামগ্রী।

ইনসাফের লড়াই: দুনিয়া-কেন্দ্রিকতা ও পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিজম

এর ঠিক উল্টো পিঠে দাঁড়িয়ে আছে দুনিয়া-কেন্দ্রিকতা (Worldly-centricity) বা পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিজম। আধুনিক যুগে একে আমরা পলিটিক্যাল ইসলাম (Political Islam) বা ইসলামিজম হিসেবে চিনি। এই দর্শনের প্রবক্তারা, যেমন সাইয়্যিদ কুতুব (Sayyid Qutb), আবুল আলা মওদুদী (Abul A’la Maududi) এবং ইরানের বিপ্লবী তাত্ত্বিক আলি শারিয়াতি (Ali Shariati), বলেন যে ইসলাম কোনো বৈরাগ্যবাদ বা অ্যাসেটিসিজম শেখায় না। তাদের মতে, ইসলাম হলো একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা বা নিজাম (Nizam)। কুরআন বারবার আদল (Adl) বা ন্যায়বিচার এবং কিসত (Qist) বা ইনসাফ কায়েম করার কথা বলেছে। আর ন্যায়বিচার আসমানে নয়, এই মাটিতেই প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং শোষণ – এগুলো আল্লাহর পরীক্ষা নয়, এগুলো হলো মানুষের তৈরি অবিচার বা জুলুম (Zulm)। শরিয়ার কাজ হলো এই জুলুমের ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা।

দুনিয়া-কেন্দ্রিকতা (Worldly-centricity) শরিয়াকে দেখে একটি সংবিধান বা কনস্টিটিউশন হিসেবে। তাদের কাছে নামাজ-রোজা যেমন ইবাদত, তেমনি ভোট দেওয়া, মিছিল করা এবং রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে ইসলামি আইন চালু করাও ইবাদত। তারা যুক্তি দেন, যদি রাষ্ট্র এবং সমাজব্যবস্থা ঠিক না থাকে, তবে ব্যক্তি একা ভালো হতে পারে না। একটা সুদি অর্থনীতির ভেতরে থেকে কেউ পুরোপুরি হালাল খেতে পারে না; একটা অশ্লীল সংস্কৃতির ভেতরে থেকে কেউ চোখ হেফাজত করতে পারে না। তাই আগে সিস্টেম বদলাতে হবে। আলি শারিয়াতি (Ali Shariati) তার বিখ্যাত বিশ্লেষণে ধর্মকে দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন: “স্ট্যাটাস কো-র ধর্ম” (যা আখিরাতের দোহাই দিয়ে মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে রাখে) এবং “বিপ্লবের ধর্ম” (যা মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তোলে)। তিনি বলেন, নবী-রাসূলরা কেবল তসবিহ জপার জন্য আসেননি, তারা সমাজপতি এবং অত্যাচারী রাজাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছিলেন। তাই শরিয়া মানেই হলো অ্যাক্টিভিজম বা সক্রিয়তা।

এই দর্শনের ফলে মুসলিম বিশ্বে বিশাল রাজনৈতিক জাগরণ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এর বিপদও কম নয়। যখন ধর্মকে অতিরিক্ত দুনিয়ামুখী করা হয়, তখন তা তার পবিত্রতা বা স্পিরিচুয়ালিটি হারিয়ে ফেলে। ধর্ম তখন নিছক একটি পলিটিক্যাল আইডিওলজি বা রাজনৈতিক মতবাদে পরিণত হয় – যেমন সোশালিজম বা ক্যাপিটালিজমঅলিভিয়ের রয় (Olivier Roy) তার দ্য ফেইলার অফ পলিটিক্যাল ইসলাম (The Failure of Political Islam) বইতে দেখিয়েছেন যে, ইসলামিস্টরা রাষ্ট্র দখল করতে গিয়ে ধর্মকেই সেক্যুলারাইজ বা ইহজাগতিক করে ফেলেছেন। তাদের কাছে এখন ক্ষমতার অংক, ভোটের হিসাব এবং দলীয় স্বার্থই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর আল্লাহর সন্তুষ্টি বা আত্মশুদ্ধি গৌণ হয়ে গেছে। শরিয়া এখানে ব্যবহৃত হয় স্লোগান হিসেবে, আধ্যাত্মিক মুক্তির পথ হিসেবে নয়। মসজিদে তখন খুতবার চেয়ে রাজনৈতিক ভাষণ বেশি গুরুত্ব পায়। মুমিন ব্যক্তি তখন আর ‘আল্লাহর বান্দা’ থাকেন না, তিনি হয়ে যান ‘পার্টি ক্যাডার’।

ব্যালেন্সের প্যারাডক্স: সুফি নাকি বিপ্লবী?

এই দুই ইজমের সংঘর্ষে শরিয়া এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের বা প্যারাডক্সের মধ্যে আটকে আছে। একদিকে আখিরাত-কেন্দ্রিকতা (Afterlife-centricity) বলছে, “থামো, নিজের দিকে তাকাও। দুনিয়া ঠিক করার আগে নিজেকে ঠিক করো।” অন্যদিকে দুনিয়া-কেন্দ্রিকতা (Worldly-centricity) বলছে, “চলো, সমাজ বদলাই। তুমি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকলে এতিমের হক আদায় করবে কে?” মুমিন ব্যক্তি কোন দিকে যাবেন?

যদি তিনি পুরোপুরি আখিরাতমুখী হন, তবে তিনি সমাজের প্রতি দায়িত্বহীন হয়ে পড়েন। তিনি হয়তো তাহাজ্জুদ পড়েন, কিন্তু তার পাশের বাড়ির লোক না খেয়ে মারা যাচ্ছে, তাতে তার কোনো বিকার নেই। তিনি ভাবেন, “এটা ওর তকদির।” শরিয়া কি এমন স্বার্থপর ধার্মিকতা চায়? আবার যদি তিনি পুরোপুরি দুনিয়ামুখী হন, তবে তিনি হয়তো সমাজসেবা করেন, রাজনীতি করেন, কিন্তু তার ইবাদতে কোনো স্বাদ নেই, তার আখলাকে কোনো কোমলতা নেই। তিনি তার বিরোধীদের ‘কাফের’ বা ‘মুনাফিক’ বলতে দ্বিধা করেন না, কারণ তার কাছে ক্ষমতাটাই আসল সত্য। শরিয়া কি এমন উগ্র বিপ্লবী চায়?

সমস্যা হলো ব্যালেন্স বা ভারসাম্য নিয়ে। ইসলাম তাত্ত্বিকভাবে “ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ” (দুনিয়ায় কল্যাণ এবং আখিরাতে কল্যাণ) – এই দুয়ের সমন্বয়ের কথা বলে। একে বলা হয় মিডল পাথ (Middle Path) বা মধ্যপন্থা। কিন্তু বাস্তবে এই ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন। ইতিহাস সাক্ষী, যখনই কোনো দল শরিয়া কায়েম করতে গেছে, তারা হয় সুফি হয়ে সংসার ত্যাগ করেছে, নয়তো যোদ্ধা হয়ে তরবারি হাতে তুলে নিয়েছে। এই দুইয়ের মাঝখানে যে ‘নাগরিক মুসলমান’ – যিনি একই সাথে আল্লাহকে ভয় করেন এবং সমাজের উন্নয়নে কাজ করেন – তাকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রথম আর্টিকেলটিতে (পাশ্চাত্যে আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার উদ্ভব) এমন কিছু গভীর ধর্মতাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের কথা উঠে এসেছে – যেমন অকেশনালিজম (Occasionalism), করপোরেট সত্তা (Corporate Personhood) এবং সার্বভৌম আইন প্রণয়ন (Legislative Sovereignty) – যা শরিয়ার অভ্যন্তরীণ কাঠামোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় আর্টিকেলে শরিয়ার অনেকগুলো দ্বন্দ্ব (যেমন টেক্সট বনাম কনটেক্সট) আলোচিত হলেও, প্রথম আর্টিকেলে নির্দেশিত প্রাতিষ্ঠানিক ও সত্তাতাত্ত্বিক (Ontological) সংকটগুলো সেখানে অনুপস্থিত।

শরিয়ার দ্বান্দ্বিক তাত্ত্বিকবৃন্দ: চিন্তার স্থপতি ও সংস্কারক

শরিয়ার ভেতরের যে এতগুলো মহাকাব্যিক দ্বন্দ্বের কথা আমরা এতক্ষণ আলোচনা করলাম, সেগুলো কোনো শূন্যস্থান থেকে জন্ম নেয়নি। এই প্রতিটি দ্বন্দ্বের পেছনে রয়েছেন ইতিহাসের একেকজন বড় বড় চিন্তাবিদ, ফকিহ, এবং দার্শনিক। এরা কেউ লড়াই করেছেন টেক্সটের পবিত্রতা রক্ষা করার জন্য, কেউ লড়াই করেছেন যুক্তির মশাল জ্বালানোর জন্য, আবার কেউ চেষ্টা করেছেন রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে ভারসাম্য আনার। এই অংশে আমরা সেই মহান তাত্ত্বিকদের (Theorists) চিন্তাজগৎ বিশ্লেষণ করব, যারা শরিয়ার এই অভ্যন্তরীণ বিবাদগুলোকে কেবল উস্কে দেননি, বরং সেগুলোকে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো বা ইন্টেলেকচুয়াল ফ্রেমওয়ার্ক (Intellectual Framework) দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাদের কাজ এবং দর্শনের মাধ্যমেই আমরা বুঝতে পারব – কেন শরিয়া আজও একটি জীবন্ত এবং বিতর্কিত বিষয়। এই তাত্ত্বিকরা কেবল আইনের ধারা লেখেননি; তারা শরিয়ার ‘সোল’ বা আত্মার সন্ধানে জীবন পার করেছেন। আমরা এখানে ক্লাসিক্যাল বা ধ্রুপদী যুগ থেকে শুরু করে মডার্ন বা আধুনিক যুগ পর্যন্ত এমন কতিপয় কি-ফিগার বা মূল ব্যক্তিত্বকে বেছে নেব, যাদের চিন্তা ছাড়া শরিয়ার এই দ্বন্দ্বগুলো বোঝা অসম্ভব।

ইমাম আল-শাফেয়ী: মধ্যপন্থার স্থপতি এবং টেক্সচুয়ালিজমের ভিত্তি

শরিয়ার তাত্ত্বিক কাঠামোর কথা বললে যার নাম সবার আগে আসে, তিনি হলেন ইমাম আল-শাফেয়ী (Al-Shafi’i)। তাকে বলা হয় ‘উসুল আল-ফিকহ’ বা ইসলামি আইনতত্ত্বের জনক। তিনি যখন অষ্টম ও নবম শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে তার কাজ শুরু করেন, তখন মুসলিম বিশ্ব র‍্যাশনালিজম (Rationalism) বা আহল আল-রায় এবং টেক্সচুয়ালিজম (Textualism) বা আহল আল-হাদিস – এই দুই মেরুতে বিভক্ত ছিল। একদল বলছিল শুধু বুদ্ধি দিয়ে বিচার করো, আরেকদল বলছিল শুধু হাদিস মানো, বুদ্ধি বা যুক্তি ব্যবহারের দরকার নেই। আল-শাফেয়ী (Al-Shafi’i) তার অমর গ্রন্থ আল-রিসালা (Al-Risala)-এর মাধ্যমে এই দুই দলের মধ্যে একটি মহান আপস বা সিন্থেসিস (Synthesis) তৈরি করার চেষ্টা করেন। তিনি ওহির টেক্সটকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিলেন ঠিকই, কিন্তু টেক্সট থেকে আইন বের করার জন্য কিয়াস বা অ্যানালজিক্যাল রিজনিং (Analogical Reasoning)-এর পদ্ধতিও বৈধ করলেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হলো তিনি দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ফেলেছেন, কিন্তু বাস্তবে তিনি শরিয়ার ভেতরে টেক্সচুয়ালিজম (Textualism)-এর বীজ এমন গভীরভাবে বপন করলেন যা আজও বিদ্যমান।

আল-শাফেয়ী (Al-Shafi’i)-র দর্শন ছিল মূলত টেক্সট-কেন্দ্রিক। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, এমন কোনো সমস্যা নেই যার সমাধান কুরআন বা সুন্নাহর টেক্সটে নেই – হয় সরাসরি, নতুবা ইশারায়। তিনি বললেন, মানুষের বুদ্ধি বা আকল (Aql) স্বাধীনভাবে ভালো-মন্দ বিচার করতে পারে না। বুদ্ধির কাজ হলো কেবল টেক্সটের অর্থ বের করা। এর মাধ্যমে তিনি ডিভাইন কমান্ড থিওরি (Divine Command Theory)-কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলেন। তার মেথডলজি শরিয়াকে একটি সুশৃঙ্খল সিস্টেম বা পদ্ধতি দিল বটে, কিন্তু এটি কনটেক্সট বা প্রেক্ষাপটের গুরুত্ব কমিয়ে দিল। শাফেয়ীর প্রভাবে পরবর্তী হাজার বছর ধরে ফিকহশাস্ত্রে টেক্সটের আক্ষরিক অর্থ বা লিটারাল মিনিং প্রাধান্য পেয়েছে, আর মানুষের স্বাধীন যুক্তি বা ইজতিহাদ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। আধুনিক যুগে যারা শরিয়াকে ফিক্সড ল’ (Fixed Law) হিসেবে দেখেন, তারা মূলত শাফেয়ীর তৈরি করা কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়েই কথা বলেন। তিনি শরিয়াকে স্থিতিশীলতা দিয়েছিলেন, কিন্তু তার এই স্থিতিশীলতাই পরবর্তীকালে শরিয়ার নমনীয়তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অনেক আধুনিক সংস্কারক মনে করেন।

ইমাম আল-গাজালি: আইন ও আত্মার সেতুবন্ধন

একাদশ শতাব্দীর দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদ ইমাম আবু হামিদ আল-গাজালি (Al-Ghazali) শরিয়ার ইতিহাসে এসেছিলেন এক ঝড়ের মতো। তিনি ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি লিগালিজম (Legalism) এবং মোরালিজম (Moralism)-এর মধ্যকার দ্বন্দ্বকে সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করেছিলেন। তৎকালীন বাগদাদের নিজামিয়া মাদ্রাসার প্রধান অধ্যাপক হিসেবে তিনি দেখেছিলেন যে, ফকিহরা বা আইনজ্ঞরা কীভাবে শরিয়াকে একটি শুষ্ক, প্রাণহীন তর্কের বিষয়ে পরিণত করেছেন। তারা আইনের খুঁটিনাটি নিয়ে ঝগড়া করছেন, কিন্তু তাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় বা ভালোবাসা নেই। এই যান্ত্রিকতা দেখে গাজালি (Al-Ghazali) গভীর বিষাদ বা ডিপ্রেশনে চলে যান এবং সবকিছু ছেড়ে সত্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। ফিরে এসে তিনি লেখেন তার ম্যাগনাম অপাস বা শ্রেষ্ঠ কর্ম ইহইয়া উলুম আল-দীন (Ihya’ ‘Ulum al-Din)। এই বইটিতে তিনি ফিকহ বা আইন এবং তাসাউফ বা আধ্যাত্মিকতাকে এক করার চেষ্টা করেন।

গাজালি (Al-Ghazali) যুক্তি দেখান যে, শরিয়ার দুটি স্তর আছে: একটি হলো খোলস (ফিকহ), অন্যটি হলো শাঁস (আখলাক)। তিনি ফকিহদের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, তারা দুনিয়াবি ক্ষমতার লোভে শরিয়াকে ব্যবহার করছে। তার মতে, যে আইন মানুষকে বিনয়ী করে না, যে ইবাদত মানুষের ইগো বা অহংবোধ ধ্বংস করে না, তা শরিয়া নয়। তিনি আখিরাত-কেন্দ্রিকতা (Afterlife-centricity)-র দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন এবং মনে করতেন দুনিয়া হলো পরকালের শস্যক্ষেত্র। গাজালির অবদান হলো, তিনি শরিয়াকে কেবল আদালতের এজলাস থেকে বের করে মানুষের হৃদয়ের ভেতরে স্থাপন করেছিলেন। তবে তার দর্শনের একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো, তিনি যুক্তিবাদ বা ফিলোসফি (ফালসাফা)-কে কঠোরভাবে আক্রমণ করেছিলেন, যার ফলে মুসলিম বিশ্বে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক চিন্তার পথ কিছুটা সংকুচিত হয়ে পড়ে। তবুও, শরিয়ার নৈতিক ভিত্তি বা এথিক্যাল ফাউন্ডেশন রক্ষায় গাজালির অবদান অনস্বীকার্য।

ইমাম আল-শাতিবি: মাকাসিদ তত্ত্ব এবং হুদুদিজমের চ্যালেঞ্জ

চতুর্দশ শতাব্দীর আন্দালুসিয়ান স্কলার ইমাম আবু ইশাক আল-শাতিবি (Al-Shatibi) শরিয়ার চিন্তাজগতে এক প্যারাডাইম শিফট বা আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসেন। তিনি দেখলেন যে, ফকিহরা টেক্সটের আক্ষরিক অর্থ নিয়ে এত বেশি ব্যস্ত যে, তারা আল্লাহর আসল উদ্দেশ্যটাই ভুলে যাচ্ছেন। এর বিপরীতে তিনি দাঁড় করালেন মাকাসিদ আল-শরিয়া (Maqasid al-Shari’ah) বা শরিয়ার উদ্দেশ্যের তত্ত্ব। তার বিখ্যাত বই আল-মুওয়াফাকাত (Al-Muwafaqat)-এ তিনি দেখালেন যে, শরিয়া কোনো অন্ধ আদেশের সমষ্টি নয়। আল্লাহ যা কিছুই আদেশ করেছেন, তার পেছনে মানুষের কল্যাণ বা মাসলাহা (Maslaha) নিহিত আছে। তিনি বললেন, শরিয়ার উদ্দেশ্য পাঁচটি মৌলিক বিষয় রক্ষা করা: ধর্ম, জীবন, বুদ্ধি, বংশ এবং সম্পদ।

আল-শাতিবি (Al-Shatibi)-র এই তত্ত্ব হুদুদিজম (Hududism) বা শাস্তিবাদের বিরুদ্ধে এক বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ। তিনি বোঝাতে চাইলেন, হাত কাটা বা পাথর মারাটা আসল লক্ষ্য নয়; আসল লক্ষ্য হলো সম্পদ ও বংশ রক্ষা করা। যদি শাস্তি ছাড়াই সেই লক্ষ্য অর্জন করা যায়, তবে শাস্তির দরকার নেই। তার এই দর্শন শরিয়াকে ইনডাক্টিভ মেথড (Inductive Method) বা আরোহী পদ্ধতির দিকে নিয়ে যায়, যেখানে ছোট ছোট আইনগুলো পর্যালোচনা করে একটি বড় বা ইউনিভার্সাল নীতি বের করা হয়। আধুনিক যুগে যারা শরিয়াকে মানবাধিকার বা হিউম্যান রাইটস-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে চান, তাদের প্রধান হাতিয়ার হলো শাতিবির এই মাকাসিদ তত্ত্ব। তিনি শরিয়াকে একটি র‍্যাশনাল বা যৌক্তিক ভিত্তি দান করার চেষ্টা করেছিলেন।

ফজলুর রহমান: ঐতিহাসিকতা এবং ডাবল মুভমেন্ট

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামি চিন্তাবিদ ফজলুর রহমান (Fazlur Rahman) শরিয়ার আধুনিক ব্যাখ্যায় এক বৈপ্লবিক মেথডলজি উপহার দিয়েছেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, টেক্সচুয়ালিজম (Textualism) এবং কনটেক্সচুয়ালিজম (Contextualism)-এর লড়াইটা আসলে ইতিহাসের লড়াই। তার মতে, কুরআনের আয়াতগুলো দুটি ভাগে বিভক্ত: কিছু আয়াত নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়েছে (যেমন যুদ্ধের আয়াত বা দাসপ্রথা), আর কিছু আয়াত শাশ্বত নীতি হিসেবে এসেছে (যেমন ন্যায়বিচার)। সমস্যা হলো, ট্র্যাডিশনালিস্টরা এই ঐতিহাসিক আয়াতগুলোকেও শাশ্বত মনে করে বসে আছেন। এই সমস্যা সমাধানে ফজলুর রহমান (Fazlur Rahman) তার বিখ্যাত ডাবল মুভমেন্ট থিওরি (Double Movement Theory) প্রস্তাব করেন তার বই ইসলাম অ্যান্ড মডার্নিটি (Islam and Modernity)-তে।

প্রথম মুভমেন্ট বা নড়াচড়া হলো বর্তমান থেকে অতীতে (সপ্তম শতাব্দীতে) যাওয়া। সেখানে গিয়ে দেখতে হবে, কেন একটি আয়াত নাজিল হয়েছিল এবং তার পেছনের সামাজিক সমস্যাটা কী ছিল। সেখান থেকে সেই আয়াতের পেছনের শাশ্বত নৈতিক নীতিটি বা মরাল প্রিন্সিপালটি খুঁজে বের করতে হবে। দ্বিতীয় মুভমেন্ট হলো সেই নীতিটি নিয়ে আবার বর্তমানে ফিরে আসা এবং আজকের প্রেক্ষাপটে তা প্রয়োগ করা। যেমন, কুরআনে সুদের নিষেধাজ্ঞা। অতীতে গিয়ে দেখা গেল, সুদ ছিল গরিবকে শোষণ করার হাতিয়ার। তাহলে নীতি হলো “শোষণ বন্ধ করা”। এখন বর্তমানে এসে দেখতে হবে, আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থায় সেই একই শোষণ আছে কি না। যদি না থাকে, তবে হয়তো আধুনিক সুদ আর কুরআনিক রিবা এক নয়। ফজলুর রহমান (Fazlur Rahman)-এর এই তত্ত্ব তাকলিদিজম (Taqlidism)-এর কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয় এবং ইজতিহাদিজম (Ijtihadism)-এর দরজা সম্পূর্ণ খুলে দেয়। যদিও রক্ষণশীল সমাজের বাধার মুখে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল, কিন্তু তার চিন্তাধারা আজও আধুনিক স্কলারদের পথ দেখাচ্ছে।

ওয়ায়েল হাল্লাক: আধুনিক রাষ্ট্র এবং শরিয়ার মৃত্যু

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ফিলিস্তিনি খ্রিস্টান তাত্ত্বিক ওয়ায়েল হাল্লাক (Wael Hallaq) শরিয়া এবং আধুনিক রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে যে বিশ্লেষণ করেছেন, তা এক কথায় বিধ্বংসী। তিনি ফিকহ অব স্টেট (Fiqh of State) বনাম ফিকহ অব সোসাইটি (Fiqh of Society)-র দ্বন্দ্বটি অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তার বহুল পঠিত বই দ্য ইম্পসিবল স্টেট (The Impossible State)-এ তিনি যুক্তি দেখান যে, ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ ধারণাটিই একটি অক্সিমোরন বা স্ববিরোধিতা। কারণ আধুনিক রাষ্ট্র বা মডার্ন নেশন-স্টেট-এর ডিএনএ-তে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য (যেমন সার্বভৌমত্ব, আমলাতন্ত্র, এবং আইনি একরৈখিকতা) আছে যা শরিয়ার নৈতিক প্রকৃতির সম্পূর্ণ বিরোধী।

হাল্লাক (Wael Hallaq) দেখান যে, প্রাক-আধুনিক যুগে শরিয়া ছিল সমাজের আইন, রাষ্ট্রের নয়। বিচারকরা বা কাজীরা স্বাধীন ছিলেন। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র শরিয়াকে কোডিফাই বা বিধিবদ্ধ করে তাকে রাষ্ট্রের দাস বানিয়ে ফেলেছে। যখন শরিয়াকে রাষ্ট্রীয় আইনে পরিণত করা হয়, তখন তা তার নমনীয়তা এবং আধ্যাত্মিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। তিনি বলেন, আধুনিক ইসলামিস্টরা যারা রাষ্ট্র দখলের মাধ্যমে শরিয়া কায়েম করতে চায়, তারা আসলে জানে না যে তারা শরিয়াকে রক্ষা করছে না, বরং শরিয়াকে হত্যা করছে। হাল্লাকের এই তত্ত্ব আধুনিক পলিটিক্যাল ইসলাম (Political Islam)-এর গোড়ায় আঘাত করেছে। তিনি আমাদের ভাবতে শিখিয়েছেন যে, শরিয়ার ভবিষ্যৎ হয়তো রাজনীতিতে নয়, বরং নৈতিক সমাজ গঠনে নিহিত। তার মতে, রাষ্ট্র যত শক্তিশালী হবে, শরিয়া তত দুর্বল হবে – এই প্যারাডক্সটি এড়ানো অসম্ভব।

ফাতেমা মার্নিসি ও আমিনা ওয়াদুদ: পিতৃতন্ত্রের বিনির্মাণ

শরিয়ার ভেতরে নারী ও পুরুষের অবস্থান নিয়ে যে প্যাট্রিয়ার্কাল লিগালিজম (Patriarchal Legalism) বনাম স্পিরিচুয়াল ইক্যুয়ালিজম (Spiritual Equalism)-এর দ্বন্দ্ব, তার প্রধান ভাষ্যকার হলেন মরোক্কান সমাজবিজ্ঞানী ফাতেমা মার্নিসি (Fatema Mernissi) এবং আফ্রিকান-আমেরিকান ধর্মতত্ত্ববিদ আমিনা ওয়াদুদ (Amina Wadud)। তারা শরিয়ার টেক্সটগুলোকে নারীবাদী দৃষ্টিকোণ বা ফেমিনিস্ট লেন্স দিয়ে পুনরায় পাঠ করেছেন। ফাতেমা মার্নিসি (Fatema Mernissi) তার ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, হাদিস সংকলনের সময় এবং ফিকহ তৈরির সময় পুরুষরা কীভাবে তাদের নিজেদের স্বার্থে টেক্সটের ব্যাখ্যাকে ম্যানিপুলেট বা প্রভাবিত করেছে। তিনি বিশেষ করে আবু হুরায়রার মতো বিখ্যাত সাহাবির কিছু হাদিসকে (যা নারীদের জন্য অবমাননাকর) ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দিয়ে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তার মতে, শরিয়ার অরিজিনাল স্পিরিট ছিল নারীর মুক্তি, কিন্তু আব্বাসীয় রাজদরবারের প্রভাবে তা পিতৃতান্ত্রিক হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, আমিনা ওয়াদুদ (Amina Wadud) কুরআনের হারমেনিউটিকস বা ব্যাখ্যানীতির ওপর জোর দিয়েছেন। তার বই কুরআন অ্যান্ড ওম্যান (Qur’an and Woman)-এ তিনি ‘তাওহিদ‘ বা একত্ববাদের ধারণা ব্যবহার করে পিতৃতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহর একত্ববাদ মানে হলো আল্লাহ ছাড়া আর কারও প্রভুত্ব নেই। যখন পুরুষ নারীর ওপর প্রভুত্ব দাবি করে, তখন সে আসলে আল্লাহর জায়গায় নিজেকে বসাতে চায়, যা শিরক-এর শামিল। ওয়াদুদ (Amina Wadud) বলেন, কুরআনে আল্লাহ যখন মানুষকে ‘খলিফা‘ বা প্রতিনিধি বলেছেন, তখন তিনি নারী-পুরুষ উভয়কেই বুঝিয়েছেন। তাই শরিয়ার আইনি ব্যাখ্যায় যদি নারীকে পুরুষের নিচে রাখা হয়, তবে তা কুরআনের সৃষ্টিতত্ত্বের বিরোধী। এই দুই তাত্ত্বিক শরিয়াকে জেন্ডার জাস্টিস বা লিঙ্গীয় ন্যায়বিচারের হাতিয়ার হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন, যা ট্র্যাডিশনালিস্টদের কাছে অস্বস্তিকর হলেও আধুনিক শিক্ষিত নারীদের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য।

আব্দুল্লাহি আহমেদ আন-নাইম: ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে শরিয়ার ভবিষ্যৎ

সুদানি বংশোদ্ভূত আমেরিকান আইনের অধ্যাপক আব্দুল্লাহি আহমেদ আন-নাইম (Abdullahi Ahmed An-Na’im) শরিয়ার রাজনৈতিক প্রয়োগ নিয়ে সবচেয়ে সাহসী এবং বিতর্কিত তত্ত্বটি উপস্থাপন করেছেন। তিনি ইউনিভার্সালিজম (Universalism) এবং পার্টিকুলারিজম (Particularism)-এর দ্বন্দ্ব নিরসনে শরিয়া ও রাষ্ট্রের বিচ্ছেদ বা সেপারেশন দাবি করেন। তার গুরু মাহমুদ মুহাম্মদ তাহার-এর চিন্তাধারাকে এগিয়ে নিয়ে তিনি বলেন, কুরআনের মাক্কি আয়াতগুলো (যা মক্কায় নাজিল হয়েছে) হলো ইসলামের আসল এবং চিরন্তন বার্তা, যেখানে সাম্য, স্বাধীনতা এবং জাস্টিসের কথা বলা হয়েছে। আর মাদানি আয়াতগুলো (যা মদিনায় নাজিল হয়েছে) ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রয়োজনে সাময়িক আইন।

আন-নাইম (Abdullahi Ahmed An-Na’im) তার টুওয়ার্ড এন ইসলামিক রিফর্মেশন (Toward an Islamic Reformation) বইতে যুক্তি দেখান যে, আমরা যদি মাক্কি আয়াতের ইউনিভার্সাল বার্তা গ্রহণ করি, তবে শরিয়া মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রের সাথে পুরোপুরি খাপ খেয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, শরিয়া পালনের জন্য রাষ্ট্রীয় জবরদস্তির দরকার নেই। রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ বা সেক্যুলার, যেখানে সব ধর্মমতের মানুষ সমান অধিকার পাবে। আর শরিয়া থাকবে মানুষের ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনে। তার মতে, “রাষ্ট্র শরিয়া কায়েম করতে পারে না, কারণ শরিয়া রাষ্ট্র দ্বারা কায়েম হলে তা আর শরিয়া থাকে না, তা হয়ে যায় পলিটিক্যাল উইল বা রাজনৈতিক ইচ্ছা।” তার এই তত্ত্ব আধুনিক সেক্যুলার ডেমোক্রেসি এবং ইসলামি নিষ্ঠার মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করার চেষ্টা করে, যদিও এটি মেইনস্ট্রিম বা মূলধারার আলেমদের কাছে এখনো গ্রহণযোগ্য হয়নি।

খালেদ আবু এল ফাদল: সৌন্দর্য ও কর্তৃত্বের সন্ধানে

কুয়েতি-আমেরিকান আইনজ্ঞ খালেদ আবু এল ফাদল (Khaled Abou El Fadl) শরিয়ার নান্দনিক এবং নৈতিক দিকটি নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি লিগালিজম (Legalism)-এর কঠোর সমালোচক। তিনি বলেন, আধুনিক সালাফি বা ওয়াহাবি আন্দোলন শরিয়াকে কুৎসিত এবং ভীতিপ্রদ করে তুলেছে। তার মতে, শরিয়া হলো ‘বিউটি’ বা সৌন্দর্যের প্রকাশ। আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। তাই যে আইন অসুন্দর, অমানবিক বা নিষ্ঠুর, তা আল্লাহর আইন হতে পারে না। আবু এল ফাদল (Khaled Abou El Fadl) একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দেখিয়েছেন: অথরিটেটিভ (Authoritative) এবং অথরিটারিয়ান (Authoritarian)-এর মধ্যে। শরিয়া অথরিটেটিভ বা কর্তৃত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু যখন কোনো মানুষ বলে “আমি যা বলছি সেটাই আল্লাহর কথা এবং এর বাইরে কোনো কথা নেই”, তখন সে অথরিটারিয়ান বা স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে।

তিনি শরিয়াকে একটি প্রসেস (Process) হিসেবে দেখেন, যেখানে পাঠক এবং টেক্সটের মধ্যে প্রতিনিয়ত সংলাপ চলে। তিনি বলেন, টেক্সট বা পাঠ কখনোই নীরব নয়, আবার পাঠকও কখনো নিরপেক্ষ নয়। পাঠক তার নিজের নৈতিকতা, শিক্ষা এবং সংস্কার নিয়েই টেক্সট পড়ে। তাই শরিয়ার ব্যাখ্যায় মানবিক ভুলত্রুটি থাকা স্বাভাবিক। এই ভুল স্বীকার করার মানসিকতাই হলো শরিয়ার আসল শক্তি। তার তত্ত্ব শরিয়াকে একটি মানবিক এবং সহনশীল রূপ দেয়, যা আজকের উগ্রবাদের যুগে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

এই তাত্ত্বিকরা – শাফেয়ী থেকে শুরু করে আবু এল ফাদল পর্যন্ত – প্রত্যেকেই শরিয়ার বিশাল ক্যানভাসে একেকটি রঙের প্রলেপ দিয়েছেন। তাদের চিন্তা, বিতর্ক এবং লেখার মাধ্যমেই শরিয়া আজ পর্যন্ত টিকে আছে। এগুলোই নির্দেশ করে যে, শরিয়া কোনো মৃত আইন নয়; এটি একটি জীবন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধক্ষেত্র। তাদের কেউ চেয়েছেন শরিয়াকে রক্ষা করতে, কেউ চেয়েছেন শরিয়াকে মুক্ত করতে। কিন্তু সবার উদ্দেশ্য ছিল একটাই – কিভাবে আল্লাহর ইচ্ছাকে মানুষের জীবনে সবচেয়ে সুন্দরভাবে প্রতিফলিত করা যায়। এই তাত্ত্বিকদের কাজ না বুঝলে শরিয়ার ভেতরের দ্বন্দ্বসমূহকে বোঝা সম্ভব নয়।

উপসংহার

ওপরে আলোচিত এই মৌলিক দ্বন্দ্ব বা দার্শনিক সংঘাতগুলো আমাদের শেষ পর্যন্ত কী বার্তা দেয়? এই যে পদে পদে মতভেদ, এক অংশের সাথে অন্য অংশের টেনশন – এগুলো কি প্রমাণ করে যে শরিয়া একটি ত্রুটিপূর্ণ বা অকার্যকর ব্যবস্থা? নাকি এগুলো প্রমাণ করে যে এটি একটি জীবন্ত এবং বিবর্তনশীল বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য?

এর উত্তর খুব সহজ নয়, তবে গভীর। এই দ্বন্দ্বগুলোই আসলে শরিয়ার প্রাণভোমরা। যদি এই টেনশন বা টানাপোড়েন না থাকত, তবে শরিয়া কবেই ইতিহাসের জাদুঘরে ফসিল হয়ে যাওয়া এক মৃত আইনে পরিণত হতো। টেক্সট এবং কনটেক্সটের লড়াই আছে বলেই শরিয়া একই সাথে প্রাচীন টেক্সটের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে আবার আধুনিক সময়ের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করতে পারে। আইন এবং নৈতিকতার দ্বন্দ্ব আছে বলেই ফিকহবিদরা এবং সুফি-সাধকরা প্রতিনিয়ত নতুন সমাধানের খোঁজে এবং আত্মশুদ্ধির পথে ধাবিত হন। এটি এমন এক ইকোসিস্টেম যেখানে একটি পক্ষ অপর পক্ষকে সম্পূর্ণ গ্রাস করতে পারে না; বরং একে অপরের অস্তিত্বের জন্য জরুরি হয়ে পড়ে।

শরিয়া কোনো সরলরেখা বা সোজা রাস্তা নয়। এটি একটি জিগজ্যাগ পথ, যেখানে প্রতিটি মোড়ে দাঁড়িয়ে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় – এখন আমি কোন দিকে ঝুঁকব? যুক্তির দিকে না আবেগের দিকে? কঠোরতার দিকে না দয়ার দিকে? রাষ্ট্রের দণ্ডমণ্ডের দিকে না সমাজের কল্যাণের দিকে? এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়ভার শেষ পর্যন্ত মানুষের কাঁধেই এসে পড়ে। শরিয়া কোনো স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র নয় যে বোতাম চাপলেই ন্যায়বিচার বেরিয়ে আসবে; এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া বা প্রসেস। কেউ যদি এক পাশ বেশি জোরে টানে, তবে অন্য পাশ আলগা হয়ে যায়, ভারসাম্য নষ্ট হয়। তাই শরিয়ার ইতিহাস হলো এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য (Balance) বজায় রাখার এক অনন্ত এবং ক্লান্তিকর প্রচেষ্টা।

তথ্যসূত্র

  • Abou El Fadl, K. (2001). Speaking in God’s Name: Islamic Law, Authority and Women. Oneworld Publications.
  • Al-Alwani, T. J. (1990). Usul al-Fiqh al-Islami: Source Methodology in Islamic Jurisprudence. International Institute of Islamic Thought.
  • Al-Ghazali, A. H. (n.d.). Ihya’ ‘Ulum al-Din (The Revival of the Religious Sciences).
  • Al-Ghazali, A. H. (n.d.). The Incoherence of the Philosophers (Tahafut al-Falasifah).
  • Al-Shafi’i, M. I. (1961). Al-Risala (Islamic Jurisprudence). Johns Hopkins University Press.
  • An-Na’im, A. A. (1990). Toward an Islamic Reformation: Civil Liberties, Human Rights, and International Law. Syracuse University Press.
  • An-Na’im, A. A. (2008). Islam and the Secular State: Negotiating the Future of Shari’a. Harvard University Press.
  • Averroes (Ibn Rushd). (n.d.). The Incoherence of the Incoherence (Tahafut al-Tahafut).
  • Barlas, A. (2002). Believing Women in Islam: Unreading Patriarchal Interpretations of the Qur’an. University of Texas Press.
  • Ghannouchi, R. (2016). Public Liberties in the Islamic State.
  • Hallaq, W. B. (2009). Shari’a: Theory, Practice, Transformations. Cambridge University Press.
  • Hallaq, W. B. (2012). The Impossible State: Islam, Politics, and Modernity’s Moral Predicament. Columbia University Press.
  • Hansmann, H., & Kraakman, R. (2000). “The Essential Role of Organizational Law”. The Yale Law Journal, 110(3), 387–440.
  • Hourani, G. F. (1985). Reason and Tradition in Islamic Ethics. Cambridge University Press.
  • Huff, T. E. (2003). The Rise of Early Modern Science: Islam, China, and the West. Cambridge University Press.
  • Iqbal, M. (1930). The Reconstruction of Religious Thought in Islam. Stanford University Press (Reprint edition).
  • Kamali, M. H. (1991). Principles of Islamic Jurisprudence. Islamic Texts Society.
  • Kamali, M. H. (2008). Shari’ah Law: An Introduction. Oneworld Publications.
  • Kuran, T. (2011). The Long Divergence: How Islamic Law Held Back the Middle East. Princeton University Press.
  • Mernissi, F. (1991). The Veil and the Male Elite: A Feminist Interpretation of Women’s Rights in Islam. Basic Books.
  • Moosa, E. (2005). Ghazali and the Poetics of Imagination. University of North Carolina Press.
  • Qutb, S. (1964). Milestones (Ma’alim fi al-Tariq). Maktabah Wahbah.
  • Rahman, F. (1982). Islam and Modernity: Transformation of an Intellectual Tradition. University of Chicago Press.
  • Ramadan, T. (2004). Western Muslims and the Future of Islam. Oxford University Press.
  • Ramadan, T. (2009). Radical Reform: Islamic Ethics and Liberation. Oxford University Press.
  • Reinhart, A. K. (1995). Before Revelation: The Boundaries of Muslim Moral Thought. State University of New York Press.
  • Roy, O. (1994). The Failure of Political Islam. Harvard University Press.
  • Saeed, A. (2006). Interpreting the Qur’an: Towards a Contemporary Approach. Routledge.
  • Saliba, G. (2007). Islamic Science and the Making of the European Renaissance. MIT Press.
  • Sardar, Z. (1979). The Future of Muslim Civilization. Croom Helm.
  • Schacht, J. (1964). An Introduction to Islamic Law. Clarendon Press.
  • Schmitt, C. (1922). Political Theology: Four Chapters on the Concept of Sovereignty. MIT Press (Translated edition).
  • Shariati, A. (1979). On the Sociology of Islam. Mizan Press.
  • Shatibi, I. (n.d.). Al-Muwafaqat fi Usul al-Shari’a.
  • Usmani, M. T. (2002). An Introduction to Islamic Finance. Arab and Islamic Law Series.
  • Wadud, A. (1999). Qur’an and Woman: Rereading the Sacred Text from a Woman’s Perspective. Oxford University Press.

Leave a comment

Your email will not be published.