দ্বিতীয় অধ্যায়: ইসলাম ধর্ম

নবি মুহাম্মদের ২৩ বছর

দ্বিতীয় অধ্যায়: ইসলাম ধর্ম

আলি দস্তি

সূচিপত্র

  1. ধর্মীয় কাঠামো
  2. অলৌকিকত্ব
  3. কোরআনের অলৌকিকতা
  4. মুহাম্মদের মানবিকতা

ধর্মীয় কাঠামো

ধর্ম কখনো আরব বেদুইনদের মধ্যে পরিপূর্ণ অর্থে বিস্তার লাভ করেনি। এখনো আরব বেদুইনরা বিভিন্ন ধরনের আধ্যাত্মিক, অধিবিদ্যাগত বিষয়ের প্রতি তেমন কোনো আকর্ষণ বোধ করেন না। দুর্গম ও প্রতিকূল অঞ্চলে বসবাসের কারণে তাদের মধ্যে রীতিনীতি, প্রথা বা বিধিনিষেধ ব্যতীত তেমন কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। প্রাক-ইসলামি যুগ থেকে বেদুইনরা একদিকে যেমন স্বভাবে নমনীয় আবার অন্যদিকে মেজাজে উদ্বায়ী। কোনো কবিতার সাধারণ কোনো একটি পঙক্তিতেই তারা ক্ষুব্ধ হতে পারে অথবা অতি-আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে যেতে পারে। বেদুইনদের মধ্যে অনেকে আত্মকেন্দ্রিক ও দাম্ভিক প্রকৃতির। সর্বদা নিজের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বড়াই করার মানসিকতা তাদের মধ্যে রয়েছে। নিজেদের দুর্বল দিকগুলো, এমনকি অপরাধ ও পৈশাচিকতা নিয়েও তাদের অহঙ্কার দীর্ঘদিনের। অতীতকাল থেকে সহজে তারা বিভিন্ন কুসংস্কার ও অন্যান্য বিভ্রমের শিকার হতো। মরুভূমিতে প্রতিটি গাছ বা পাথরের নিচে কোনো না কোনো দানব লুকিয়ে আছে বলে বিশ্বাস করত। ভূমির রুক্ষতার কারণে তারা মানবসভ্যতার অন্যতম ভিত্তি কৃষিকাজ থেকে দূরে ছিল।

বেদুইনদের দৃষ্টিতে গরুর লেজ হচ্ছে অমর্যাদার প্রতীক আর ঘোড়ার মাথা হচ্ছে মর্যাদার প্রতীক। তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল নিজেদের তাৎক্ষণিক শারীরিক চাহিদা পূরণ, দেবতার প্রতি প্রার্থনার একমাত্র উদ্দেশ্যও ছিল ওই লক্ষ্য অর্জন করা। প্রতিপক্ষ অস্ত্রধারী না হলেও কিংবা আত্মরক্ষা করার মতো প্রস্তুতি না থাকলেওতাদেরআক্রমণ করা এবং আগ্রাসী মনোভাব প্রদর্শন বেদুইনদের ক্ষেত্রে সবসময় স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। সহিংস কোনো ঘটনা প্রায়-সময়ই অত্যধিক প্রশংসিত হতো এবং তা-নিয়ে বীরোচিত কবিতাও রচনা করা হতো। অন্য ব্যক্তির স্ত্রীকে বলপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার বর্ণনা দেয়ার ক্ষেত্রে বেদুইন-কবিরা ‘অসভ্যতা’র পরিচয় দিতেন। হামলার শিকার হওয়া মহিলার গোপনীয়তা প্রকাশ, তার শারীরিক নিগ্রহ বা বিড়ম্বনার বর্ণনা দিতে বেদুইন-কবিরা ন্যূনতম বিবেকবোধের পরিচয় দিতেন না।

বেদুইনরা ঈশ্বরকে এক কৃত্রিম এবং গতানুগতিক সত্তা বলেই মনে করতেন। তারা স্বাধীন ও নৈর্ব্যক্তিক কোনো ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন না। মজার বিষয় হচ্ছে, বেদুইনরা অন্য কোনো গোষ্ঠীর সাথে প্রতিযোগিতার সময় প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর কোনো বিখ্যাত দেবতার আদলে নিজেরাও একটি দেবতা তৈরি করে উপাসনা শুরু করে দিত। ইসলাম-পূর্ব যুগে মক্কার কাবা ঘরটি বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তিতে ভর্তি এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাসনালয় ছিল। বেদুইনরা এই পবিত্র স্থানে নিয়মিত আসত এবং গভীরভাবে সমান প্রদর্শন করত। কুরাইশদের সাথে বিরোধের জের ধরে একবার জোহায়না গোষ্ঠীর নেতা আব্দুদার বিন হুদায় তার জনগণকে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাওরা নামক স্থানে কাবার মতো আরেকটি উপাসনালয় বানানোর জন্য, যাতে বেদুইনদেরকে কাবার পরিবর্তে এই উপাসনালয়ে নিয়ে আসা যায়। কিন্তু জোহায়না গোষ্ঠীর লোকজন এ কাজ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে নেতার নির্দেশ উপেক্ষা করেছিল। এজন্য হিশাম বিন মুহাম্মদ আল-কালবি (হিজরি ১২০ বা ৭৩৭ খ্রিস্টাব্দ-হিজরি ২০৪/২০৬ বা ৮১৯/৮২১খ্রিস্টাব্দ) রচিত ‘তানকিস আল আসনাম’ গ্রন্থে(২৩) ব্যঙ্গধর্মী কবিতায় জোহায়না গোষ্ঠীর জনগণকে নিয়ে উপহাস করা হয়েছে। উল্লেখ্য হিশামের এই বইটি পৌত্তলিক আরবের ধর্মীয় ধ্যান-ধারণার স্পষ্ট চিত্র উপস্থাপনের ক্ষেত্রে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র। ইসলাম-পূর্ব আরব পৌত্তলিকদের মানসিকতা বোঝার জন্য এই বই থেকে কিছু উক্তি তুলে দেয়া যেতে পারে: ‘আব্রাহা (ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আবিসিনিয়া বিজয়ের পরে ইয়েমেনের একজন খ্রিস্টান শাসক) যখন সানায় অত্যন্ত মূল্যবান পাথর ও দামি গাছের গুড়ি দিয়ে কেলিস নামের গির্জা নির্মাণ করে শপথ নিয়েছিলেন তিনি তার হাতের মুঠি ততদিন পর্যন্ত আলগা করবেন না, যতদিন না আরবরা কাবাকে পরিত্যাগ করে এই গির্জায় আসা শুরু করে। এ সংবাদ শুনে আরবের একজন নেতা এক রাত্রে কিছু লোক পাঠালেন নোংরা আবর্জনা আর মলমূত্র দিয়ে গির্জাটি নষ্ট করতে।’ এক ছেলে তার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেয়ার পরিকল্পনা করে। এজন্য প্রথমে সে জুল-খালাসা নামের এক দেবতার মূর্তির কাছে যায়। রীতি অনুযায়ী ছেলেটি তীরের ফলক নিক্ষেপ করে জানতে চায় তার পিতার হত্যাকারীকে হত্যা করে বদলা নেয়া উচিত হবে কিনা। জুল-খালাসার অমত হয় তাতে। আরব ছেলেটি তখন ক্ষুব্ধ হয়ে জুল-খালাসা দেবতাকে নিজের পৃষ্ঠদেশ প্রদর্শন করে বলে, ‘আমার মতো আপনার পিতাও যদি খুন হতেন তবে আজ আপনি আমাকে না বলতে পারতেন না।’ প্রাক-ইসলামি যুগের এক কবির ভাষায়, ‘হে জুল-খালাসা আপনার সাথেও যদি এমন অনাচার হতো, আমার মতো আপনার পিতাও যদি আজ মাটির নিচে শায়িত থাকতেন, তবে শত্রুদের হত্যা করতে আপনি আমাকে কখনোই বারণ করতেন না।’(২৪) বিশ্বজুড়ে সে-সময়ের মানুষেরা যেখানে চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্রের পূজা করে বেড়িয়েছে তখন আরব বেদুইনরা আবিষ্ট ছিল পাথরের মধ্যে। পাথরকে কেন্দ্র করে চতুর্দিকে ঘোরা আর পাথর পূজা করা ছিল বেদুইনদের ধর্মীয় প্রথা। পাথরকে পূজা করার আরেকটি ব্যতিক্রমী রেওয়াজও ছিল তাদের মধ্যে। যেমন মরুভূমিতে যাত্রাপথের বিরতিতে বেদুইনদের প্রথম কাজ থাকত কোথাও থেকে চারটি পাথর খুঁজে বের করা। সবচেয়ে সুন্দর পাথরটাকে মাটিতে রেখে এর চারপাশে প্রদক্ষিণ করত তারা। অন্য তিনটি পাথরকে রান্নার পাত্র রাখার জন্য ব্যবহার করা হতো। এছাড়া মেষ, ছাগল বা উট কোরবানি দেয়ার সময় কোনো পাথরের সামনে এমনভাবে কোরবানি দেয়া হতো যেন পশুর রক্তে পাথরটি লাল হয়ে যায়।

প্রাচীন আরব-বেদুইনরা উপাসনায় খুব একটা আন্তরিক ছিল না। তানকিস আল আসনাম বই থেকে আরেকটি ঘটনা তুলে ধরা যায়: এক আরব তার উটগুলোকে ‘সাদ নামের এক উপাস্য-পাথরের কাছ থেকে আশীর্বাদ নিতে যায়। পশুর রক্তে রঞ্জিত লাল পাথরটি দেখে উটগুলো ভয়ে বারবার দূরে সরে যাচ্ছিল। এতে বিরক্ত হয়ে আরব ব্যক্তিটি ছোট পাথরের টুকরা নিয়ে সাদ নামের উপাস্য-পাথরটিকে ঢিল মেরে চেচিয়ে বলে, “তুমিও সাধারণ জনতার ভালবাসা-সম্মান থেকে বঞ্চিত হও! ইবনে ইসহাকের রচিত বইয়েও এই ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে(২৫):

‘সাদের কাছে আমরা আমাদের সৌভাগ্যের জন্য এসেছিলাম /
কিন্তু এই সাদ যখন তার সবই উড়িয়ে দিয়েছে, আমাদের তাই আর তার সাথে কোনো লেনদেন নাই।
আচ্ছা এই সাদ কি মাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকা শুধুই একটি পাথর নয়?
সে কোনোভাবেই আমাদের চলার পথের সঠিক বা ভুল নির্দেশ দিতে পারে না।’

মদিনার প্রথম দিকের বছরগুলোতে মুহাম্মদের জীবনেও এই বেদুইন-আচরণের দেখা পাওয়া যায়। যেমন হিজরতের পর নবি যখন জোরেশোরে ইসলাম প্রচার শুরু করলেন তখনঅনেক বেদুইন অন্যান্য গোষ্ঠী থেকে ভীত হয়ে কিংবা গনিমতের মাল লাভের আশায় মুসলমানদের দলে যোগদান করে। কিন্তু যখনই মুসলিমরা কোনোভাবে বিপাকে পড়েছিল যেমন ওহুদের যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল তখনই তারা অন্য কোনো দলে ডিগবাজি দিয়ে চলে যায়, নয়তো ভয়ে নবি বা মুসলমানদের কাছ থেকে দূরে থাকত। মুহাম্মদ বেদুইনদের এই মানসিকতা খুব ভালোভাবে জানতেন।কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে এ-ধরনের বৈশিষ্ট্যের কথা বর্ণিত হয়েছে। যেমন সুরা তওবা। কালপঞ্জি অনুসারে এটি কোরআনের সর্বশেষ সুরা এবং নবির বাণী হিসেবেও একে বিবেচনা করা হয়। এই সুরায় রয়েছে: অবিশ্বাস ও কপটতায় মরুবাসী আরব বেদুইনরা বড় বেশি পোক্ত। আর আল্লাহ তাঁর রসুলের ওপর যা অবতীর্ণ করেছেন তার (ন্যায়নীতির) সীমারেখা না শেখার যোগ্যতা এদের বেশি।’ (৯: ৯৭)। এ কারণেই তাদের আশা ছিল, যদি এ কোনো অনারব-এর ওপর অবতীর্ণ করা হতো (২৬: ১৯৮)। আসলে আরবের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে কুসংস্কার খুব গভীরে ছিল। যেনতেন কোনো চাহিদা পূরণে তারা মূর্তি বা প্রতিমার কাছে গিয়ে প্রার্থনার আশ্রয় নিত।

তবে হেজাজের, বিশেষ করে মক্কা বা ইয়াসরিব (পরবর্তীতে নামকরণ হয় মদিনা) এলাকার চিত্র এমন ছিল না। এই দুই শহরের মধ্যে বিশেষ করে ইয়াসরিবের অধিবাসীরা ইহুদি ও খ্রিস্ট ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত ছিল। ঈশ্বর শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে “আল্লাহ শব্দের ব্যবহারও তাদের মধ্যে ছিল। তারা নিজেদের ইব্রাহিমের বংশধর মনে করত। ওল্ড টেস্টামেন্টের কাহিনী অনুসরণে তারা নিজেদেরকে ইসরাইলের বংশধর বলে দাবি করত। আদম ও শয়তানের কাহিনী প্রায় সবারই জানা ছিল। তারা ফেরেশতা বিশ্বাস করত এবং তাঁদেরকে আল্লাহর কন্যা হিসেবে কল্পনা করত। তাঁদের এই ধারণা সম্পর্কে কোরআনে বেশ কয়েকবার পরোক্ষভাবে বলা হয়েছে: তোমরা কি মনে কর তোমাদের জন্য পুত্রসন্তান আর আল্লাহর জন্য কন্যাসন্তান?” (সুরা নজম: আয়াত ২১)। যাহোক এই নগরবাসী বেশ কয়েকটি ইহুদি প্রথাও অনুসরণ করত। যেমন খৎনা, ওজু করা, ঋতুবতী নারীদের বর্জন করা এবং বিশ্রামের জন্য সপ্তাহের একটি দিন বরাদ্দ রাখা। এজন্য তারা পরবর্তীতে শনিবারের স্থলে শুক্রবারকে বিশ্রামের দিন হিসেবে গ্রহণ করে।

স্পষ্ট বোঝা যায় ইসলাম প্রচারের জন্য হেজাজের সামাজিক পরিবেশ একেবারে আনকোরা কিছু ছিল না। ওখানে শুধু যে পৌত্তলিকতা-বর্জনকারী কিছু আধুনিক চিন্তার মানুষ ছিলেন তাই নয়, অনেক পৌত্তলিকও সেখানে আলোর রেখার দর্শন পেয়েছিলেন। কোরআনে তাঁদের কথা বেশ কয়েকবার উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন সুরা জুখরুফ-এ বলা হয়েছে: “যদি তুমি ওদেরকে জিজ্ঞেস কর, কে ওদেরকে সৃষ্টি করেছে, ওরা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। (৪৩: ৮৭)। আবার সুরা আনকাবুত-এ বলা হয়েছে; যদি তুমি ওদেরকে জিজ্ঞাসা কর, কে আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং চন্দ্র-সূর্যকে নিয়ন্ত্রণ করেন? ওরা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। তাহলে ওরা কোথায় ঘুরাপাক খাচ্ছে?’ (২৯: ৬১)। মক্কার কুরাইশ পৌত্তলিকরা তাদের মূর্তিগুলোকে শক্তির প্রতীক হিসেবে এবং এর মাধ্যমে ঈশ্বরের নিকটে যাওয়া যায় বলেও বিশ্বাস করত। কুরাইশদের এরকম ভাবনার কথা কোরআনে রয়েছে: “যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, আমরা এদের পূজা এজন্যই করি যে এরা আমাদেরকে আল্লাহর কাছাকাছি পৌঁছে দেবে।’ (৩৯: ৩)।

এরপরও মক্কায় ইসলাম তেমন বিকশিত হতে পারে নি। ১৩ বছর ধরে নবুওতি প্রচারের পরও, এমন কী মনোমুগ্ধকর মক্কি সুরাগুলো প্রকাশের পরও সেখানে ইসলাম-গ্রহণকারীর সংখ্যা একশ ছড়ায়নি। নবি মুহাম্মদ ১৩ বছর ধরে দিনরাত পরিশ্রম করেও কুরাইশদের দৃঢ় অবস্থান ভাঙতে পারেননি। এই সময় যে কয়েকজন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আবু বকর, ওমর, উসমান, হামজা বিন আব্দুল মোতালেব, আব্দুর রহমান বিন আউফ এবং সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস। এছাড়া বাকিরা ছিলেন দরিদ্র পরিবারের অথবা নিচু শ্রেণির। মক্কার সমাজে তাদের কোনো প্রভাব ছিল না।

একেশ্বরবাদী হানিফ মতাবলম্বী ওয়ারাকা বিন-নওফল ইসলাম গ্রহণ না করলেও মুহাম্মদকে সবসময় সমর্থন দিয়ে এসেছিলেন। আবু বকরকে ইসলামে নিয়ে আসার পরামর্শ তিনিই মুহাম্মদকে দিয়েছিলেন। কারণ আবু বকর মক্কার একজন প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য ও সমানিত ব্যক্তি ছিলেন। তার ইসলাম গ্রহণ স্বাভাবিকভাবে অন্যদের প্রভাবিত করবে। এবং তেমনটিই ঘটে। আবু বকরের ইসলাম গ্রহণের পর একে একে উসমান বিন আফফান, আব্দুর রহমান বিন আউফ, তালহা বিন উবায়দুল্লাহ, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস, জুবায়ের বিন আল-আওয়াম মুসলিম হয়েছিলেন।

ইসলামের প্রসারের পেছনে এক গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে নবি মুহাম্মদের একনিষ্ঠতা এবং গভীর আত্মবিশ্বাস। যা তাঁকে অনেক সুদৃঢ় লক্ষ্য অর্জনে তাঁর আত্মবিশ্বাসকে ধরে রেখেছিল। অনেক ব্যক্তির প্ররোচনা, হুমকি-ধামকি, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ কোনো কিছুই তাঁকে টলাতে পারেনি। একই সময় মুহাম্মদেরও যথেষ্ট সম্পদ ছিল, সেগুলোকে তিনি যথাসময়ে ব্যবহার করেছেন। ইসলাম প্রচারের পঞ্চম বছরে তিনি তাঁর এক অনুসারীকে আবিসিনিয়ার খ্রিস্টান রাজা আসামা ইবনে আবজরের (নিগাস) কাছে দূত হিসেবে পাঠান, রাজা যেন তাঁর রাষ্ট্রে মক্কার পৌত্তলিকতা-বিরোধী কয়েকজন মুসলমানকে সহায়তা করেন। প্রাচীন আবিসিনিয়ার রাজাদের নিগাস নামে ডাকা হতো। -অনুবাদক)। এ-ঘটনায় মক্কার কুরাইশ-প্রধানদের টনক নড়ে। তাঁরাও নিগাসের কাছে কুরাইশ বংশের বানু শাহম গোত্রের আমর ইবনে আল-আস (৫৮৫-৬৬৪ খ্রিস্টাব্দ) এবং আব্দুল্লাহ বিন আবু রাবিয়াকে দূত হিসেবে পাঠান, যাতে সেখানকার শাসকদের বোঝানো হয় তারা যেন অভিবাসী মুসলমানদেরকে বিদ্রোহী ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।

ইসলাম প্রচারের শুরুর দিকে কুরাইশরা মুহাম্মদকে খুব একটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেননি। তারা তাঁকে পাগল, কবি, জ্যোতিষী, জিন বা শয়তানে ভর করা ব্যক্তি ইত্যাদি বলে সম্বোধন করত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মুহাম্মদের মানসিক দৃঢ়তা এবং কতিপয় উল্লেখযোগ্য সাফল্য কুরাইশদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। স্বাভাবিকভাবে কুরাইশদের সাথে নবির শত্রুতা বাড়তে থাকে। কুরাইশ-প্রধানরা বুঝতে পেরেছিলেন যদি মুহাম্মদের প্রচারণা সাফল্য পেতে শুরু করে তবে তাদের নিজেদের জীবিকা নির্বাহের পথ ধ্বংসের মুখে পড়ে যাবে। প্রতি বছর হাজারো মানুষ একত্রিত হতো মক্কার কাবা ঘরকে কেন্দ্র করে। এটা ছিল আরবের বেদুইন গোষ্ঠীগুলোর প্রধান তীর্থস্থান। আরবের সকল কবি, সাহিত্যিক, বক্তৃতাকারীদের মিলনমেলা পরিচালিত হতো কাবা ঘরকে কেন্দ্র করে। মক্কাবাসীদের রুটি-রুজি ও কুরাইশদের মানসম্মান সবই তীর্থযাত্রীদের আসা-যাওয়ার উপর নির্ভরশীল ছিল। বেদুইনরা মূর্তিসজ্জিত কাবা ঘর (উপাসনালয়) দর্শন করতে আসত। নতুন ধর্মমতে যদি এই মূর্তিগুলো ধ্বংস করে দেয়া হয়, তবে বেদুইনরা হয়ত আর কখনোই এখানে আসবে না।

পনের বছর পর ইসলামের বিজয় যখন সাধিত হয়, মক্কার মুসলিমরাও পূর্বের মতো ঠিক তেমনি তাদের জীবিকা নির্বাহ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের আগস্টে মক্কা শহর বিজয়ের পর নাজিল হওয়া আয়াতে পৌত্তলিকদের কাবাঘরে গমন নিষিদ্ধ করা হয় এবং নিজেদের জীবিকা নিয়ে উদ্বিগ্নমক্কায় অবস্থানরত মুসলমানদেরকে সুরা তওবার ২৮ নং আয়াতের মাধ্যমে দুশ্চিন্তা দূর করা হয়; হে বিশ্বাসীগণ অংশীবাদীরা তো অপবিত্র; তাই এ-বছরের পর তারা যেন মসজিদ-উল-হারামের কাছে না আসে। (৯: ২৮)। অর্থাৎ ব্যবসায় লোকসানের ক্ষতিপূরণ তিনিই (আল্লাহ) প্রদান করবেন।

কুরাইশ-প্রধানরা যখন মুহাম্মদের ধৈর্য, ঐকান্তিকতার প্রতি লক্ষ করলো এবং নিজেদের সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারল তখন তারা তুলনামূলক ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তারা মুহাম্মদের চাচা বৃদ্ধ আবু তালিবের শরণাপন্ন হয়ে অনুরোধ জানান তিনি যেন মুহাম্মদকে ইসলাম প্রচার থামাতে বলেন এবং বিনিময়ে তাঁকে কাবা ঘর রক্ষণাবেক্ষণের এক পদে চাকুরির প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়। আবু তালিব অবশ্য ভাতিজাকে রাজি করাতে ব্যর্থ হলে প্রায় সব কুরাইশ-প্রধানই বানু হাশেমিকে সামাজিকভাবে একঘরে করার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যবসা-বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে বেশ কয়েকদিনের জন্য হাশেমি গোষ্ঠীর সদস্যদের কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অবশ্য হাশেমি গোষ্ঠীর দুর্দশা দেখে এক সময় অন্য আরবরা এগিয়ে এলে তাদের দুঃসময়ের অবসান হয়।

এ ঘটনার পর এবং বিশেষ করে আবু তালিবের মৃত্যুর পর নবি মুহাম্মদকে থামানোর আর কোনো আশা বাকি থাকে না। কুরাইশপ্রধানরা এবার কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রাথমিক আলোচনায় সম্ভাব্য তিনটি প্রস্তাব সামনে রাখা হয় নবি মুহাম্মদকে উপযুক্ত হবে। শুধু একটা শর্ত থাকল যে, সকলের হাতই মুহাম্মদের রক্তে রঞ্জিত করা হবে যাতে করে ভবিষ্যতে কাউকে যেন হাশেমি গোত্রের প্রতিশোধের শিকার না হতে হয়। মুহাম্মদের নবুওতির ১২-১৩ বছরের মাথায় এই পরিকল্পনা করা হয়। যা তাঁর মক্কা থেকে মদিনায় অভিবাসিত হওয়াকে প্রভাবিত করে।

——————–
পাদটীকা
২৩. হিশাম বিন মুহাম্মদ আল-কালবি রচিত তানকিস আল আসনাম” বইটি ১৯১২ সালে আহমদ জাকির সম্পাদনায় কায়রো থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৬৯ সালে ডব্লিউ. আতাউল্লাহ কর্তৃক সম্পাদনায় প্যারিস থেকে ফরাসি অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছে। সত্তর দশকের শুরুর দিকে ইরানের তেহরান থেকে ফার্সি অনুবাদ করেছেন সাঈদ মোহাম্মদ রেজা জালিলি নাইনি। ‘The Book of idols’ শিরোনামে ইংরেজি অনুবাদ করেছেন নাবিহ আমিন ফারিস। প্রকাশিত হয়েছে প্রিন্সটন থেকে ১৯৫২ সালে।
২৪. অনেকের মতে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর এবং কবিতা রচয়িতা একই ব্যক্তি। তাঁর নাম ইমরুল কায়েস, যাকে প্রাক-ইসলামি কবিদের রাজকুমার হিসেবে অভিহিত করা হয়। দ্রষ্টব্য: R A Nicholson, A Literary History of the Arabs, London, 1907, reprint in Cambridge 1953, pp. 103-105 to Encyclopaedia of Islam, 2nd ed., articles Dhu’l-Khalasa and Imru’ al-Kays.
২৫ . ইবনে ইসহাক রচিত ‘Life of Mohammad’ (অনুবাদ: A Guillaume), Oxford 1955, p.37-এ উদ্ধৃত রয়েছে।

অলৌকিকত্ব

অনেক ইরানি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, যে কোনো ইমামজাদা(২৬) প্রতি মুহুর্তেই কোনো না কোনো রকমের অলৌকিক কাজকারবার করতে পারেন। নবি মুহাম্মদ ও হজরত আলি ইবনে আবু তালিবের কোনো বংশধর কিংবা ইরানের স্থানীয় কোনো সন্ন্যাসীকে ইমামজাদাবলে সম্বোধন করা হয়। অবশ্য তাদের যদি কোরআন পড়ার সাধ্য থাকত তবে সেখানে আদৌ অলৌকিক কিছু নেই দেখে সত্যিই অবাক হয়ে যেত।

কোরআনে বিশটিরও অধিক আয়াতে উল্লেখ রয়েছে, সংশয়বাদীরা যখনই নবিকে কোনো অলৌকিক কাজ করে দেখাতে বলেছে, ততবারই তিনি হয় নীরব থেকেছেন, নয়তো বলেছেন তিনি আর দশজনের মতই সাধারণ মানুষ, শুধুমাত্র আল্লাহর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে সুসংবাদ ও সতর্কবাণী নিয়ে আসা ছাড়া তাঁর পক্ষে অন্য কিছু করা সম্ভব নয়। এই আয়াতে এই বিষয়টি স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে; আর ওরা বলে, ‘আমরা তোমাকে বিশ্বাস করব না যতক্ষণ না তুমি মাটি ফাটিয়ে একটি ঝরনা ফোটাবে, বা তোমার খেজুরের বা আঙুরের বাগান হবে যার ফাঁকে ফাঁকে অজস্র নদীনালা বইবে, বা তুমি যেমন বল, আকাশকে টুকরো টুকরো করে ভেঙে ফেলবে আমাদের ওপর, বা আল্লাহ ও ফেরেশতাদেরকে নিয়ে আসবে আমাদের সামনে বা তোমার জন্য একটা সোনার বাড়ি হবে, বা তুমি আকাশে আরোহণ করবে, কিন্তু তোমার আকাশে আরোহণ আমরা কখনও বিশ্বাস করব না যতক্ষণ না আমাদের পড়ার জন্য তুমি আমাদের ওপর এক কিতাব অবতীর্ণ করবে। বলো, ‘আমার প্রতিপালকের পবিত্র মহিমা! আমি একজন মানুষ, একজন সুসংবাদদাতা রসুল ছাড়া আর কী?’ (সুরা বনি-ইসরাইল; আয়াত ৯০-৯৩)।

পরের দুই আয়াতে সংশয়বাদীদের বিস্ময় প্রকাশিত হয়েছে এভাবে: আল্লাহ কি মানুষকে রসুল করে পাঠিয়েছেন? ওদের এই কথাই লোকদেরকে বিশ্বাস করতে বাধা দেয় যখন ওদের কাছে আসে পথের নির্দেশ। বলো, ‘ফেরেশতারা যদি নিশ্চিন্ত হয়ে পৃথিবীতে ঘোরাফেরা করতে পারত তবে আমি আকাশ থেকে এক ফেরেশতাকেই ওদের কাছে রসুল করে পাঠাতাম। (১৭: ৯৪-৯৫)। এই দুটি আয়াত অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ ও সহজবোধ্য। নবি হলেন সাধারণ লোকজনের মধ্যেকার এমন একজন মানুষ, যিনি অন্যদের থেকে তুলনামূলক বেশি দূরদর্শী ও চিন্তাশীল, এবং তিনি প্রচলিত কুসংস্কারের অসারতা ও অযৌক্তিকতা সবাইকে দেখাতে পারেন। এমন কী, সমাজে প্রচলিত নিষ্ঠুর ও ক্ষতিকর প্রথা থেকে লোকজনকে দূরে রাখতে পারেন। মুহাম্মদের বক্তব্যের স্বচ্ছতা, সহজবোধ্যতা ও গভীরতা নিয়ে কখনো প্রশ্ন উঠেনি। তাই তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের উঠেপড়ে লাগার কারণও পরিষ্কার। বেশিরভাগ মানুষ ঐ ধরনের হিংসামূলক আচার-আচরণে অভ্যস্ত ছিল। শৈশবকাল থেকে তারা এগুলো অনুসরণ করত। আজকের এই আধুনিক বিংশ শতাব্দীতেও একই দৃশ্য দেখা যায়। তাই সহজে বোঝা যায় আরবের তখনকার মানুষেরা এমন কোনো লোকের কথা সহজে মেনে নেবে না যিনি তাদের পূর্বসূরিদের ঐতিহ্যের বিরোধিতা করবেন। মুহাম্মদ যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে কথা বলার দাবি করলেন, তখন খুব স্বাভাবিকভাবে অন্যরা তার প্রমাণ দেখতে চাইল। মুহাম্মদ নিজেও পূর্বের বিভিন্ন নবির অলৌকিক কর্মকাণ্ডের কথা নানা সময় স্বীকার করেছেন এবং বিভিন্ন ধর্মের নবি সম্পর্কে বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিয়েছেন। পারস্যে একটি কথা প্রচলিত আছে এরকম: যে অন্যের বেশি প্রশংসা করে পরোক্ষভাবে সে নিজের অক্ষমতাই প্রকাশ করে।” এই কথার প্রভাব তখনও পড়েছিল। কুরাইশরা ভেবেছিল সময় এলে মুহাম্মদ নিজেও দৃশ্যমান কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়ে দেখাবেন। তাই তারা অন্য কোনো বিকল্প মানতে রাজি ছিল না। এজন্য তারা জিজ্ঞাসা করেছিল এভাবে: ‘ওরা বলে, “এ কেমন রসুল যে খাবার খায় ও হাটে-বাজারে চলাফেরা করে! তার কাছে কেন ফেরেশতা পাঠানো হয় না যে তার সঙ্গে থাকবে ও ভয় দেখাবে, বা তাকে ধনভাণ্ডার দেওয়া হয় না কেন, বা তার একটা বাগানও নেই কেন যেখান থেকে সে তার খাবার যোগাড় করতে পারবে?’ জালেমরা আরও বলে, তোমরা তো এক জাদুগ্রস্ত লোকের অনুসরণ করছ! (সুরা ফুরকান: আয়াত ৭-৮)।

কুরাইশদের এ-ধরনের দাবি কিংবা তীব্র অসন্তোষমূলক সমালোচনারও কোনো উত্তর দেননি নবি। অলৌকিক কিছু ঘটানোর গণদাবির মুখেও তিনি নীরব থেকেছেন। আল্লাহর তরফ থেকে প্রত্যাদেশ এলে তিনি পরে বলেন: তোমার পূর্বে আমি যেসব রসুল পাঠিয়েছি, তারা সকলেই তো খাওয়া-দাওয়া করত ও হাটে-বাজারে চলাফেরা করত। (২৫: ২০)। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা যায়: তারা বলে, ‘ওহে, যার ওপর এই উপদেশবাণী অবতীর্ণ হয়েছে, তুমি তো পাগল! তুমি সত্যবাদী হলে আমাদের সামনে ফেরেশতাদের নিয়ে আসছ না কেন? (সুরা হিজর; আয়াত ৬-৭)। আবার সুরা আম্বিয়াতে রয়েছে একই কথা: ‘সীমালঙ্ঘনকারীরা গোপনে পরার্শ করে, এ তো তোমাদেরই মতো একজন মানুষ, তবুও কি তোমরা দেখেশুনে জাদুর খপ্পরে পড়বে?’. . . ‘ওরা বলল, “অলীক স্বপ্ন! না, সে এ বানিয়েছে। না, সে তো এক কবি। সুতরাং সে আমাদের কাছে এক নিদর্শন আনুক, যেমন নিদর্শন দিয়ে পূর্বসূরিদের পাঠানো হয়েছিল। (২১: ৩, ৫)। একই সুরার পরবর্তী আয়াতে একটা উত্তর দেয়া হয়েছিল যেখানে আল্লাহ মুহাম্মদকে বলেন: “তোমার পূর্বে আমি প্রত্যাদেশ দিয়ে মানুষই পাঠিয়েছিলাম। পরবর্তী বাক্যে মুহাম্মদকে সংশয়বাদীদের উপদেশ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তোমরা যদি না জান, তবে উপদেশপ্রাপ্ত সম্প্রদায়দেরকে জিজ্ঞাসা করো। (২১: ৭)। আবারও পূর্বের নবিদের প্রসঙ্গ উঠলে বলা হয়: আর আমি তাদেরকে এমন দেহবিশিষ্ট করিনি যে তাদের খাবার খেতে হত না; তারা চিরস্থায়ীও ছিল না।’ (২১: ৮)।

সব মিলিয়ে মক্কি সূরাগুলোর মধ্যে ২৫টিরও বেশি আয়াতে দেখা যায়মুহাম্মদকে অনুরোধ করা হচ্ছে তিনি যদি একজন নবি হয়ে থাকেন, তবে এমন কোনো অলৌকিক কাজ করে দেখাতে যা সাধারণ মানুষ পারে না। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে মুহাম্মদ ছিলেন হয় নীরব নয়তো নিজেকে অন্য সাধারণ মানুষের মতোই বলে স্বীকার করেছেন। যদিও তিনি স্বয়ং আল্লাহর কাছ থেকে ওহি পেয়েছেন, তথাপি তিনি আর দশজনের মতোই মরণশীল ছিলেন। একটা কথা পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে সুরা ইউনুসে: ‘ওরা বলে, তার কাছে তার প্রতিপালকের কোনো নিদর্শন অবতীর্ণ হয় না কেন? বলো, অদৃশ্যের জ্ঞান তো কেবল আল্লাহরই। অতএব তোমরা প্রতীক্ষা করো, আমি তোমাদের সঙ্গে প্রতীক্ষা করছি।: (১০: ২০)। অন্যসব মানুষের মতো মুহাম্মদেরও আল্লাহর গায়েবি উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। সুরা রাদ-এ মুহাম্মদের নবুওতি ও অলৌকিক কিছু করার অক্ষমতা সম্পর্কে প্রশ্নগুলির উত্তর এভাবে দেয়া হয়েছে, তাঁর একমাত্র কাজ হল আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। যারা অবিশ্বাস করেছে তারা বলে, (মুহাম্মদের) প্রতিপালকের কাছ থেকে তার কাছে কোনো নিদর্শন অবতীর্ণ হয় না কেন? তুমি তো কেবল সতর্ককারী, আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য তো পথপ্রদর্শক আছে। ‘(২৭) (১৩: ৭)। এ-বক্তব্য থেকে বোঝা যায় কোনো প্রকার অলৌকিক কিছু করা একজন নবির কাজের মধ্যে পড়ে না।

একই ধরনের বক্তব্য দেখা যায় আরও একটি আয়াতেযেখানেপৌত্তলিকদের করা প্রশ্নের জবাবে মুহাম্মদ বলেন, তিনি একজন সতর্ককারী মাত্র, অলৌকিকতা কেবল আল্লাহই দেখাতে পারেন আর কেউ না। যদিও বর্তমানকালে কোরআন নাজিল হওয়াকে অনেকে অলৌকিক ঘটনা বলেই বিশ্বাস করেন। সুরা আনকাবুত-এ অবিশ্বাসীদের প্রশ্নের উত্তর মুহাম্মদকে এভাবে দিতে দেখা যায়: ‘ওরা বলে, “তার প্রতিপালকের কাছ থেকে তার কাছে নিদর্শন পাঠানো হয় না কেন?” বলো, নিদর্শন আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে, আর আমি তো একজন স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র। (২৯: ৫০)। আবার পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ বলেন, “এ কি তাদের জন্য যথেষ্ট নয় যে, যে-কিতাব তাদের কাছে আবৃত্তি করা হয় আমিই তা পাঠিয়েছি তোমার কাছে? এতে অবশ্যই বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য অনুগ্রহ ও উপদেশ রয়েছে। (২৯: ৫১)। সুরা মুলক-এ পৌত্তলিকদের জিজ্ঞাসার জবাবে বলা হয়েছে: ‘ওরা বলে, “তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে বলো এ-প্রতিশ্রুতি কবে পালন করা হবে? পরের আয়াতে মুহাম্মদ জবাব দেন: এর জ্ঞান কেবল আল্লাহরই আছে, আমি তো স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র।’ (৬৭: ২৬-২৭)। সুরা নাজিআত-এ পুনরুত্থান দিবস ও নবুওতি জ্ঞানের অলৌকিকত্ব সম্পর্কে অস্বীকার করতে দেখা যায় মুহাম্মদকে: ‘ওরা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, কেয়ামত কখন ঘটবে? তোমাকে কী বলা আছে এ-ব্যাপারে? এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তো কেবল তোমার প্রতিপালকের কাছে। তুমি তো একজন সতর্ককারী-তার জন্য যে একে ভয় করে। (৭৯: ৪২-৪৫)।

পৌত্তলিকদের জেদের মুখে এবং তাদের দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী অলৌকিক কাজ দেখালেই তারা বিশ্বাস করে ফেলবে মুহাম্মদ ও আল্লাহকে এমনটা ভেবে মুসলমান, এবং এমন কী মুহাম্মদের ভেতরেও আশা জন্মাতে থাকে যে আল্লাহ হয়তো সত্যিই একদিন তাঁকে দিয়ে অলৌকিক কিছু করে দেখাবেন, যাতে সব অবিশ্বাসীই বিশ্বাসী হয়ে যায়। সুরা আনআম-এ এই বিষয়টির সুরাহা হয় এভাবে; আর তারা আল্লাহর নামে কঠিন শপথ করে বলে, তাদের কাছে যদি কোনো নিদর্শন আসত তবে অবশ্যই তারা বিশ্বাস করত। বলো, নিদর্শন তো আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। আর তাদের কাছে নিদর্শন এলেও তারা যে বিশ্বাস করবে না, এ কীভাবে তোমাদেরকে বোঝানো যাবে?’(৬: ১০৯)। আল্লাহ এরপর নবিকে বলেন; আর তারা যেমন প্রথমবারে ওতে বিশ্বাস করেনি তেমনি আমিও তাদের অন্তরে ও নয়নে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করব আর অবাধ্যতায় তাদেরকে উদভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে দেব। তাদের কাছে ফেরেশতা পাঠালেও এবং মৃত ব্যক্তিরা তাদের সাথে কথা বললেও এবং সব জিনিস তাদের সামনে হাজির করলেও তারা বিশ্বাস করবে না, যদি না আল্লাহ চান, কারণ তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ। (৬: ১১০-১১১)।

সুরা আনআম-এর এই ৩টি আয়াত নিয়ে মন্তব্য করা প্রয়োজন: (১) আরবের পৌত্তলিকরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল মুহাম্মদ যদি কোনো ধরনের অলৌকিক ঘটনা দেখাতে পারেন তবে তারা ইসলাম গ্রহণ করবে। এর প্রেক্ষিতে আল্লাহ মুহাম্মদকে জবাব দিতে বলেন যে, অলৌকিক ঘটনা একমাত্র আল্লাহই করতে পারেন, তিনি বা অন্য কেউ নন। একজন মানুষের (হতে পারেন তিনি নবি)

এই ধরনের পরিষ্কার স্বীকারোক্তি থেকে বোঝা যায়, প্রকৃতির নিয়ম অলঙ্ঘনীয়। কারো পক্ষেই প্রাকৃতিক কোনো নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানো সম্ভব নয়। যেমন আগুন কখনো তার পোড়ানোর ক্ষমতা হারাতে পারে না। (২) নবি মুহাম্মদ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন, ভবিষ্যতে যদি কখনো অলৌকিক ঘটনা হয় আর অন্যরা যদি এতে বিশ্বাস না করে, তবে তিনি তা কিভাবে জানতে পারবেন? এখানে একটি পাল্টা প্রশ্নের উদ্ভব হয়, এটা কী নিশ্চিতভাবে বলা যায়, একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটলেই পৌত্তলিকরা তা বিশ্বাস করে ফেলবে? মানুষের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, অস্বাভাবিক কিছু দেখলে মানুষ বিস্মিত হয় এবং যে ব্যক্তি এই কাজ করে অনেকেই তার অনুগত হয়ে পড়ে। কোরআনের তফসিরকারকদের বর্ণনায় বুঝা যায়, স্বয়ং আল্লাহ তাঁর ভবিষ্যৎ-দৃষ্টিক্ষমতার মাধ্যমে বুঝতে পেরেছিলেন, কোনো ধরনের অলৌকিক ঘটনা না-ঘটলে অবিশ্বাসীরা কখনোই মুহাম্মদ বা কোরআনের বাণী স্বীকার করবে না। ৩) আল্লাহ সরাসরি জানিয়ে দেন, তাঁর পূর্বে পাঠানো নিদর্শন কে অবিশ্বাস করলে তিনি অবিশ্বাসীদের দৃষ্টি ও হৃদয়কে ভুলপথে নিয়ে যাবেন। এখানে প্রশ্ন দেখা দেয়, সর্বশক্তিমান আল্লাহ নিজেই কী সাধারণ মানুষের সত্য নির্ধারণের ক্ষমতা নষ্ট করে দিচ্ছেন? যদি তাই হয়, তবে মানবজাতির কাছে কী আশা করা যেতে পারে আর, কিংবা তাহলে তাদের কাছে বারেবারে নবি পাঠানোর প্রয়োজনটা কী? আর এটা পরিষ্কার নয়, পূর্বে পাঠানো নিদর্শন বলতে কি বোঝানো হয়েছে? পূর্বের নবিদের কিছু ঘটনা আছে, তেমনি মুহাম্মদেরও কিছু ঘটনা রয়েছে, হয়তো এগুলোর কোনো কিছুই হতে পারে। অবশ্য পূর্বের নবিদের সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে খুব কমই জানা যায়। কিন্তু কোরআন অনুসারে, যখনই পৌত্তলিকরা মুহাম্মদের কাছে অলৌকিক কিছু করে দেখানোর দাবি জানিয়েছে, তখনই তিনি নিজেকে শুধু আল্লাহর তরফ থেকে একজন সুসংবাদদাতা ও সর্তককারী বলে দাবি করেছেন। হতে পারে, পূর্বে পাঠানো নিদর্শনের প্রতি অবিশ্বাস বলতে কোরআনের অন্য আয়াতগুলোর কথা বোঝানো হয়েছে। তাই যদি হয়ে থাকে তবে এটা কখনো উপযুক্ত জবাব নয়। কারণ পৌত্তলিকরা কোরআনের অলৌকিক বাণীকে বিশ্বাস করতে চাইত না। মুহাম্মদের প্রতি তাদের দাবি ছিল – যিশু, মুসা, সালেহ বা অন্যান্য নবিদের যে রকম অলৌকিক ঘটনার কথা কোরআনে বলা হয়েছে, সেরকম যেন মুহাম্মদও কিছু করে দেখান। ৪) সুরা আনআম-এর ১১১নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্বয়ং জানিয়ে দিলেন, ফেরেশতা পাঠালেও অবিশ্বাসীরা (পৌত্তলিকরা) বিশ্বাস করবে না। এমনকি মৃত মানুষ জীবিত হয়ে উঠে এসে তাদের সাথে কথা বললেও নাকি তারা বিশ্বাস করবে না। তারা মুহাম্মদকে বারবার বলতো বেহেশত থেকে কোনো ফেরেশতা এনে দেখাতে বা যিশুর মতো কোনো মৃতকে জীবিত করে দেখাতে। মুহাম্মদ নিজেও সবসময় এমন কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটার আশায় ছিলেন। এরপর আল্লাহ নবিকে বলেন যে, তেমনটা ঘটলেও নাকি ওরা বিশ্বাস করবে না। ৫) এখন কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়। এসব পৌত্তলিক লোকের ভবিষ্যৎ-অবিশ্বাস ও অনমনীয় চিন্তাধারা যদি পূর্ব থেকেই নির্ধারিত হয়ে থাকে তাহলে আল্লাহর তরফ থেকে তাদেরকে সঠিক পথে আনতে নবি প্রেরণের কি দরকার? আল্লাহর মতো একজন সর্বজ্ঞানী, সবজান্তা এবং অব্যর্থ কেন এই ধরনের অর্থহীন কাজ করবেন? সনাতনপন্থীরা, ধর্মীয় ব্যাপারে যারা যুক্তি প্রয়োগ করতে রাজি নন, তারা এই বক্তব্যের একটা ব্যাখ্যা দিতে চান এভাবে: যেসব মানুষ অসৎ পথে চলে তাদেরকে মৃত্যুর পরের শাস্তি সম্পর্কে একটা চূড়ান্ত সতর্কবাণী দেয়ার জন্য এমনটা করা। কিন্তু সনাতনপন্থীদের এই ব্যাখ্যা এক্ষেত্রে খাটে না। কারণ ১১১ নম্বর আয়াতের পরের বাক্যে রয়েছে, যদি না আল্লাহ চান। বোঝা যায় এই পৌত্তলিক মানুষেরা কখনোই বিশ্বাস করতে পারবে না কারণ আল্লাহই চান না তারা বিশ্বাস করুক কোরআনের বাণীতে। এই বক্তব্যে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় একই সুরার ১১০ নম্বর আয়াত থেকে: “তারা যেমন প্রথমবারে ওতে বিশ্বাস করেনি তেমনি আমিও তাদের অন্তরে ও নয়নে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করব আর অবাধ্যতায় তাদেরকে উদভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে দেব। একই সুরার ১০৭নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন তবে তারা শরিক করত না।’(৬: ১০৭)। অর্থাৎ আল্লাহই নিজে চান তারা পৌত্তলিক থেকে যাক। তাই স্বাভাবিকভাবে সর্বশক্তিমান আল্লাহর নগণ্য সৃষ্টি মানুষেরা তো আল্লাহর ইচ্ছাকে পরিবর্তন করতে পারে না। এমন কী মুহাম্মদও পৌত্তলিকদেরকে তাদের অবিশ্বাস থেকে ফিরিয়ে আনতে পারবেন না, যদি তাদের এই অবিশ্বাস আল্লাহর ইচ্ছায় হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ‘কোরআনের প্রতি অবিশ্বাসে পৌত্তলিকদের কোনো দোষ দেয়া যায় না। তাদেরকে কেন মৃত্যুর পরের শাস্তির ভয় দেখানো হবে? একজনের ধর্মীয় বিশ্বাস যদি কোনো ঐশ্বরিক নির্দেশেই হয়ে থাকে তবে যুক্তি আমাদের বলে যে, সেই ঐশ্বরিক নির্দেশ ওই ব্যক্তির নিয়তি, ভবিষ্যৎ সুখ-দুঃখ নিয়ন্ত্রণ করবে। আর সেক্ষেত্রে কোনো নবি প্রেরণেরও প্রয়োজন থাকবে না, কোনো অলৌকিকতা দেখানোর দাবিও থাকবে না এবং অলৌকিকতা না দেখানোর কোনো অজুহাত খোঁজারও প্রয়োজন হবে না।

উপরের সব বিষয় বিবেচনা করে বোঝা যায় পৌত্তলিকদের অলৌকিকত্ব দেখানোর দাবি সম্পর্কে নবি মুহাম্মদ সবসময় নীরব থেকেছেন কিংবা পাশ কাটিয়ে গেছেন। মক্কি সুরাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কাব্যিক সুরা তাকভির-এ আমরা নবুওতি সম্পর্কে উজ্জ্বল বাগিতার প্রকাশ দেখতে পাই। সেখানে নবি মুহাম্মদ অবিশ্বাসীদের প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। আকারে ইঙ্গিতে আল্লাহর হয়ে কথা বলার দাবি জানিয়েছেন। সুরা তাকভির-এর প্রথম ১৮ আয়াত নাজিলকালে যেসব পৌত্তলিকঅবিশ্বাসীরা মুহাম্মদের নবুওতিকে মৃগীরোগীর বিভ্রম কিংবা জ্যোতিষীর কাজকারবার বলে উড়িয়ে দিয়েছে তাদের এভাবে জবাব দেয়া হয়: “সত্যই একথা এক সমানিত বার্তাবাহকের, যে শক্তিধর, আরশের অধিপতির নিকট মর্যাদাসম্পন্ন; যার আজ্ঞা সেখানে মান্য করা হয় এবং যে বিশ্বাসভাজন। আর (হে মক্কাবাসী!) তোমাদের সঙ্গী তো পাগল নয়। সে তো ওকে (ফেরেশতাকে) স্বচ্ছ দিগন্তে দেখেছে। সে অদৃশ্য প্রকাশ করতে কার্পণ্য করে না। আর এ তো অভিশপ্ত শয়তানের কথা নয়! (৮১: ১৯-২৫)।

মক্কার বেশিরভাগ অধিবাসীর চিন্তা ছিল মুহাম্মদ অলৌকিক কোনো কর্মকাণ্ড করে দেখালে তারা তখন ইসলাম গ্রহণ করার কথা ভাববে। সেখানে আল্লাহ জানিয়ে দেন, সাক্ষাৎ ফেরেশতা পাঠিয়ে দিলেও বা মরা-মানুষকে জীবিত করে তুললেও তারা বিশ্বাস করবে না। দশ-বারো বছর পর যখন নবির তরবারি ও অনুসারীরা অনেক শক্তিশালী হয়ে ওঠেন তখন তারা –দলে দলে আল্লাহর ধর্ম গ্রহণ করেন। (১১০: ২)। নবির অন্যতম কট্টর প্রতিপক্ষ এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আবু সুফিয়ান পর্যন্ত ৬৩১ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম গ্রহণ করেন।

সুফিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘এখন নিশ্চয় আপনি বুঝতে পারছেন এক সর্বশক্তিমান ছাড়া আর কোনো ঈশ্বর নাই? এবং তিনিই সর্বজ্ঞ। আবু সুফিয়ান জবাব দেন, হ্যাঁ, আমি সেই বিশ্বাসের দিকেই এগোচ্ছি, তবে এ নিয়ে আমাকে আরও ভাবতে হবে। আব্বাস তখন বলেন, আবু সুফিয়ান, তুমি এখনই মুসলমান হয়ে যাও, নয়তো নবিজি এই মুহুর্তে তোমার মাথা কেটে ফেলার নির্দেশ দিবেন। মুসলিম যোদ্ধা দ্বারা আবদ্ধ অবস্থায় আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করেন। আব্বাস বিন আব্দুল মোতালেবের পরামর্শে নবি আবু সুফিয়ানকে এই আশ্বাস দেন, তার গৃহ কাবার মতই নিরাপদ থাকবে, তার ঘরে যেই প্রবেশ করবে সেই নিরাপদ থাকবে। একই বছরের শেষের দিকে মুসলমানরা যখন হাওয়াজেন গোত্রকে পরাজিত করে বিপুল পরিমাণ সম্পদ লাভ করেন তখন আবু সুফিয়ানসহ অন্য কুরাইশ নেতাদের মুহাম্মদ এতো বেশি উপহার প্রদান করেন যে, আনসাররা (নবির মদিনাবাসী অনুসারীরা) অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল (আবিসিনিয়া থেকে আগত ক্রীতদাস) ওয়াশির ইসলাম গ্রহণ। ওয়াশি ৬২৫ সালের মার্চে ওহুদের যুদ্ধে হামজা বিন আব্দুল মোতালেবকে হত্যা করে তাঁর লাশ ছিড়ে টুকরো করে ফেলেন। এ-ঘটনায় নবি এতোই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি এর প্রতিশোধ নিতে দৃঢ় শপথ নিয়েছিলেন। কিন্তু ওয়াশি বন্দী অবস্থায় ইসলাম গ্রহণ করলে মুহাম্মদ তা মেনে নেন।

বোঝা যায় এই ধর্মান্তরের পিছনের প্রধান কারণ ছিল ভয়। শত্রুভীত হলে নবি তাদেকে ক্ষমা করতেন। সুরা আনআমের আয়াত তিনটি (১০৯-১১১) নিছক কোনো অনুমান বা প্রকল্পিত ছিল না। এগুলো কোরআনের অন্যান্য আয়াতের সারমর্ম। এখান থেকে দেখা যায়, যখন আল্লাহর কোনো সাহায্য নবির লক্ষ্যকে এগিয়ে নিতে আসছিল না তখন মুহাম্মদ ভীষণ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন। এটা স্পষ্ট হয় সুরা ইউনুসের এই আয়াতদ্বয় থেকে; আমি তোমার কাছে যা অবতীর্ণ করেছি তাতে যদি সন্দেহ হয় তবে তোমার আগের কিতাব যারা পড়ে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করো। তোমার প্রতিপালকের নিকট থেকে তোমার কাছে সত্য এসেছে। তুমি কখনও সন্দিহানদের শামিল হয়ো না। আর যারা আল্লাহর নিদর্শন প্রত্যাখ্যান করেছে তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না হলে, তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন হবে।’ (১০: ৯৪-৯৫)।

আয়াতগুলো ব্যাখ্যা করতে নাজিলের দৃশ্য কল্পনা করার কোনো প্রয়োজন হয় না। সংশয়বাদী এবং দ্বিধাচিত্তের মানুষদের বিশ্বাস করাতে গিয়ে নবি নিজেও সন্দেহের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন। পরে আল্লাহই তা দূর করে দেন। আরও ব্যাখ্যা দেয়া যায় যে, যখন কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটার আশা প্রায় শেষের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল তখন মুহাম্মদ মনে মনে নিজের সাথে কিভাবে কথা বলতেন তা এই আয়াতগুলোতে পাওয়া যায়।

মক্কার সুরাগুলোর অন্যান্য আয়াতে দেখা যায় মুহাম্মদ নিজেও কিছুটা আধ্যাত্মিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। সুরা হুদ-এ নবির প্রতি আল্লাহর বাণীকে এভাবে দেখা যায়: ‘ওরা যখন বলে, তার কাছে ধনভাণ্ডার পাঠানো হয় না কেন, বা তার সাথে ফেরেশতারা আসে না কেন? তখন তুমি যেন তোমার ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তার কিছু বর্জন না কর এবং এর জন্য তোমার হৃদয় যেন দমে না যায়। তুমি তো কেবল সতর্ককারী, আর আল্লাহ সকল বিষয়ের কর্মবিধায়ক। (১১: ১২)। অর্থাৎ লোকে যাই বলুক না কেন, নবির একমাত্র কাজ ছিল ধর্ম প্রচার করা। সুরা আন’আমে মুহাম্মদ আরেকটি দাবি খণ্ডনের দায় ঘাড়ে নেন: তাদের (কাফেরদের) মুখ ফিরিয়ে নেওয়াই যদি তোমার কাছে বড় মনে হয়, পারলে মাটির নিচে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে বা আকাশে সিড়ি লাগিয়ে তাদের জন্য নিদর্শন নিয়ে এসো। আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিশ্চয় সকলকে একসঙ্গে সৎপথে আনতেন। সুতরাং তুমি মূর্খদের মতো হয়ো না।’(৬: ৩৫)। সুরা নিসায় একই ঘটনা আবার দেখা যায়। সম্ভবত ইহুদিরাও মুহাম্মদের কাছে মোজেজার দাবি জানিয়েছিল। তাদের সন্তুষ্ট করতেই এই আয়াত নাজেল করা হয়; কিতাবিরা তোমাকে তাদের জন্য আকাশ থেকে কিতাব অবতীর্ণ করতে বলে, কিন্তু মুসার কাছে তারা এর চেয়েও বড় দাবি করেছিল। তারা বলেছিল, আমাদেরকে আল্লাহকে সাক্ষাৎ দেখাও। তাদের সীমালঙ্ঘনের জন্য তারা বজ্রাহত হয়েছিল। তারপর স্পষ্ট প্রমাণ তাদের কাছে প্রকাশ হওয়ার পরও তারা গোবৎসকে উপাস্য হিসাবে গ্রহণ করেছিল। আমি এও ক্ষমা করেছিলাম। আর আমি মুসাকে স্পষ্ট প্রমাণ দান করেছিলাম। (৪: ১৫৩)। সুরা বনি-ইসরাইলে অলৌকিকত্বের অনুপস্থিতিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এভাবে: পূর্ববর্তীরা নিদর্শন অস্বীকার করার ফলে আমি নিদর্শন প্রেরণ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখি। আমি স্পষ্ট নিদর্শন হিসেবে সামুদের কাছে এক মাদি উট পাঠিয়েছিলাম। তারা ওর ওপর জুলুম করেছিল। আমি ভয় প্রদর্শনের জন্য নিদর্শন প্রেরণ করি। (১৭: ৫৯)। এই আয়াত হয়েছিল। তাদের মধ্যে বিশ্বাস আনার জন্য আল্লাহ সালেহর মাধ্যমে একটি অলৌকিক ঘটনা দেখান। একটা পাথরখণ্ড থেকে একটা মাদি উট সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু সামুদরা উটটিকে মেরে নিজেদের অবিশ্বাসকেই আঁকড়ে রাখে। এতে আল্লাহ রেগে গিয়ে বজ্রপাতের মাধ্যমে তাদের সবাইকে ধ্বংস করে দেন। এখন আল্লাহ যদি মুহাম্মদের হয়েও কোনো অলৌকিক-বিসায়কর ঘটনা দেখাতেন আর সবাই যদি নিজেদের অবিশ্বাসকেই ধরে রাখত তবে তাদেরও ধবংস হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু নবির লক্ষ্যের কথা বিবেচনা করে আল্লাহ তাদের ধ্বংসের আদেশ মুলতবি করে রাখেন।’

ঠিক পরের আয়াতটিও বেশ আকর্ষণীয় এবং চিন্তা-উদ্রেককর: ‘সারণ করো, আমি তোমাকে বলেছিলাম যে, তোমার প্রতিপালক মানুষকে ঘিরে রয়েছেন। আমি যে-দৃশ্য তোমাকে (মিরাজে) দেখিয়েছি তা এবং কোরআনে উল্লিখিত অভিশপ্ত বৃক্ষ কেবল মানুষের জন্য। আমি তাদেরকে ভয় দেখাই, কিন্তু তা তাদের উগ্র অবাধ্যতাই বৃদ্ধি করে। (১৭৬০)। এর অর্থ হল যেহেতু আল্লাহ সকলকেই নিয়ন্ত্রণ করেন, নবির তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই, তিনি সতর্কবাণী প্রদান করে যাবেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণের পরীক্ষা নেয়ার জন্য বলা হচ্ছে, কারণ তাঁরা মুহাম্মদকে অবজ্ঞা করেছিল।

জাহান্নামের অভিশপ্ত জাক্কম বৃক্ষের কথা কোরআনের তিন জায়গায় (৩৭: ৬২, ৪৪: ৪৩এবং ৫৬: ৫৩) উল্লেখ করার মাধ্যমেও জনগণকে ভয় দেখানো হয়েছিল। কিন্তু এটা তাদের কাছে আরও বেশি হাস্যকর মনে হয়। উপহাসের সুরে আরবরা তখন জিজ্ঞাসা করতে থাকে, জাহান্নামের আগুনের মধ্যে একটা গাছ কিভাবে জন্মাতে বা বেঁচে থাকতে পারে। শেষ পর্যন্ত বিস্ময়কর ঘটনা প্রদর্শনের দায় থেকে সরে গিয়ে নবি সবাইকে কেয়ামত এবং জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করে বলেন: ‘এমন কোনো জনপদ নেই যা আমি কেয়ামতের দিনের পূর্বে ধ্বংস করব না বা যাকে কঠোর শাস্তি দেব না। এ তো কিতাবে লেখা আছে।’(১৭: ৫৮)। এটা সত্যিই বিস্ময়কর যে, আল্লাহ যিনি পরম দয়ালু, পরম করুণাময়তিনি সুরা সিজদা-তে দাবি করেছেন, “আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে সৎপথে পরিচালিত করতে পারতাম (৩২: ১৩), তিনি আবার সবাইকে মৃত্যুর পরের গুরুতর শাস্তির হুমকি দিয়ে চলেছেন। এ-ধরনের বক্তব্য প্রদানের বদলে সামান্য মোজেজা প্রদর্শন করে দিলেই কি বেশি ভালো হতো না? বিপুল সংখ্যক মানুষ তখন সহজেই ইসলাম গ্রহণ করত এবং সেই সাথে প্রচুর যুদ্ধ আর রক্তপাত এড়ানো সম্ভব হতো।

মোজেজার অনুপস্থিতির পৃথক একটি ব্যাখ্যা আমরা সুরা আনআম-এর ৩৭ নম্বর আয়াতে দেখতে পাই: “তারা বলে, তার প্রতিপালকের নিকট হতে তার কাছে কোনো নিদর্শন অবতীর্ণ হয় না কেন? বলো, নিদর্শন অবতারণ করতে নিশ্চয় আল্লাহ সক্ষম। কিন্তু তাদের অনেকেই (এ) জানে না। আয়াতটির শব্দগুলোর মধ্যে যুক্তির অভাব সহজেই দৃশ্যমান। অবিশ্বাসীরা অন্তত একটি অলৌকিক ঘটনা দেখার জন্য বারেবারে অনুরোধ করে যাচ্ছে অথচ তাদেরকে বারবার বলা হচ্ছে, আল্লাহ অলৌকিকবিস্ময়কর ব্যাপার দেখাতে পারেন কিন্তু দেখাচ্ছেন না। আল্লাহ সর্বশক্তিমান হলে অলৌকিকতা দেখানো খুব স্বাভাবিক একটা বিষয় কিন্তু তারপরও কোনো অলৌকিক কিছু ঘটেনি। আর ঘটলেও সুরা আনআমের এই আয়াত অনুসারে তাদের কেউই জানতে পারেনি। তাহলে সেটা কী ছিলযা তারা জানত না? তারা অবশ্যই বিশ্বাস করতযে আল্লাহ সর্বশক্তিমান, না-হলে তারা কখনোই অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শনের দাবি তুলত না। হেজাজের জনতার এই দাবির জবাব নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে তফসির আল-জালালাইনের বক্তব্য হচ্ছে, অলৌকিক ঘটনা দেখার বাসনাকারী বেশিরভাগই জানত না যে, বিস্ময়কর ঘটনা ঘটার পরও তারা অবিশ্বাস করলে ধ্বংস হয়ে যাবে। এখান থেকে দুটি প্রশ্ন উঠে প্রথমত, অলৌকিক ঘটনা ঘটার পরও কেন তারা অবিশ্বাস করবে? দ্বিতীয়ত, নির্বোধ এবং একরোখা মানুষ যারা আলৌকিক ঘটনা ঘটার পরও অবিশ্বাস করে যাবে তাদেরকে ধ্বংস করাটা কতটা যৌক্তিক?

কোরআনের অলৌকিকতা

পূর্বে বলা হয়েছে একটি দৃষ্টিগ্রাহ্য অলৌকিক শক্তি প্রদর্শনের জন্য মক্কার পৌত্তলিকদের পক্ষ থেকে মুহাম্মদের প্রতি যে বারবার দাবি করা হয়েছিল, তিনি সে দাবি পূরণে আগ্রহী ছিলেন না। মুহাম্মদের ভাষ্যমতে তিনি শুধুমাত্র শুভসংবাদ এবং সতর্কবাণী পৌঁছে দিতে এসেছেন। অপরদিকে কোরআনের অলৌকিকতার ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনোভাব পোষণ করতেন। মুহাম্মদ নিজে কোরআন তৈরি করেছেন কিংবা অন্য ব্যক্তিরা তার মুখ দিয়ে কোরআনের বাণী প্রচার করছে, মক্কার সংশয়বাদীদের এমন দাবির প্রত্যুত্তরে তাদের প্রতি কোরআনে একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়: “তারা কি বলে, “সে (মুহাম্মদ) এ বানিয়েছে?” বলো, তোমরা যদি সত্য কথা বল তবে তোমরা এ-ধরনের দশটি সুরা আনো আর আল্লাহ ছাড়া অন্য যাকে পার ডেকে আনো। (১১ সুরা হুদ; আয়াত ১৩)।

একই ধরনের দাবি সুরা বাকারার ২৩ নং আয়াতে রয়েছে: ‘আমি আমার দাসের প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকলে তোমরা তার মতো কোনো সুরা আনো।’ এবং সুরা ইউনুসের ৩৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “তারা কি বলে, সে (মুহাম্মদ) এ রচনা করেছে? বলো, তবে তোমরা এর মতো এক সুরা আনো, আর যদি তোমরা সত্য কথা বল তবে আল্লাহ ছাড়া অন্য যাকে পারো ডাকো। এ-ধরনের চ্যালেঞ্জ এক ধরণের বালখিল্যতা, এবং তা যুক্তির হেত্বাভাসের মধ্যে পড়ে। প্রথমত, কোরআনের মতো সুরা যাচাই করার পন্থা বা বৈশিষ্ট্যাবলী কি হবে, এ-বিষয়ে কোরআনে কিছু বলা হয়নি।

কেউ যদি কোরআনের মতো সুরা রচনা করতে চান, তবে কোন কোন নির্দেশক দিয়ে পরিমাপন করা হবে ঐ সুরা আদৌ কোরআনের মতো বা এর সমতুল্য হয়েছে কি-না, বা তার শ্রেষ্ঠত্ব কিভাবে নির্ধারণ করা হবে? কোরআনে এ-বিষয়ের কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, কোরআন গদ্যছন্দে রচিত অনন্য গ্রন্থ। কোরআনের মতো সুরা বলতে আসলে কী বোঝানো হয়েছে? কোরআনের মতো সুরা যদি কেউ লিখেন সেটা স্বাভাবিকভাবে কোরআন হবে না। সেটা ভিন্ন হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ওমর খৈয়ামের বিশ্ববিখ্যাত কবিতা বা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যের ভাষাজ্ঞান, রচনাশৈলীকে অনুকরণে কেউ কোনো কিছু রচনা করলেও এগুলো মোটেও খৈয়াম বা রবীন্দ্রের সাহিত্য বলে গণ্য হবে না। কারণ তাঁদের রচনা সাহিত্যের জগতে সর্বজনস্বীকৃত অনন্য সৃষ্টি। তেমনি কোরআন, তৌরাত, জবুর, ইঞ্জিল, গীতাও এরকম একেকটি অনন্য গ্রন্থ। এগুলোর সাহিত্যমান নিয়ে তুলনা করা, শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করা জটিল ও দুঃসাধ্য। তৃতীয়, সাহিত্যের দুটি বিষয়ের তুলনা অনেকাংশে আপেক্ষিক। একেক জনের কাছে একেক রকম মনে হতে পারে। হতে পারে বাংলাভাষী কোনো ব্যক্তির দৃষ্টিতে রবীন্দ্র-সাহিত্য হচ্ছে সাহিত্যের মানদণ্ড। একে মাপকাঠি ধরে অন্য সাহিত্য বিচার করা হয়। আবার অন্যের কাছে রবীন্দ্র-সাহিত্য সনাতন-ঘরানার মনে হতে পারে। আধুনিক, উত্তর-আধুনিক সাহিত্যগুলোর বৈশিষ্ট্যগুলোকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক মনে করতে পারেন তুলনামূলক বিচারের জন্য। আবার কারো কাছে গ্রিক কবি হোমারের ইলিয়ড, ওডিসি হচ্ছে অসাধারণ মহাকাব্য আবার কারো কাছে সেকেলে ধরনের লোকগাঁথা মনে হতে পারে।

ইংরেজ সাহিত্যিক শেক্সপিয়ের, শেলির সাহিত্য সম্পর্কেও এরকম মূল্যায়ন হতে পারে। এ-অবস্থায় অত্যন্ত স্পর্শকাতর ধর্মগ্রন্থ এর বাণীকে সাহিত্যমান অনুযায়ী বিচার করাটা আপেক্ষিক ও জটিল বিষয়। পঞ্চমত, সময়ের সাথে সাথে ভাষার পরিবর্তন ঘটে। বাক্য গঠন, ভাবের প্রকাশ, শব্দসম্ভার, শব্দের বানান, ব্যবহার, উচ্চারণসহ একাধিক রূপ এবং ব্যাকরণগত পরিবর্তন ঘটে থাকে। এই পরিবর্তন কোনো ভাষার জীবনীশক্তি এবং প্রবহমানতার বহিঃপ্রকাশ। একবিংশ শতকের কোনো ব্যক্তির পক্ষে চাইলে চর্যাপদ-যুগের সাহিত্য রচনা করা সম্ভব নয়। তেমনি হাজার ধরে আরবি ভাষাতেও পরিবর্তনপরিবর্ধন সাধিত হয়ে চলছে। তাই বর্তমানকালে রচিত কোনো সুরা ও কোরআনের সুরার মধ্যে ভাষাগত, সাহিত্যমানগত পার্থক্য থাকবেই। ফলে এই দুয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের তুলনা করা বা এরূপ কোনো মূল্যায়ন অনর্থক। -অনুবাদক। মক্কার পৌত্তলিকদের তরফ থেকে কোরআন কাল্পনিক কাহিনীতে পরিপূর্ণ বলে আরেকটি অভিযোগ ছিল। আর কেউ যখন তাদের নিকট আমার আয়াত আবৃত্তি করা হয় তখন তারা বলে, “আমরা তো শুনলাম, ইচ্ছা করলে আমরাও এরকম বলতে পারি, এ তো শুধু সেকালের উপকথা। (সুরা আনফাল; আয়াত ৩১)। আল-তাবারির দ্যা হিস্ট্রি অব আল-তাবারি’ (ভলিউম ৭) গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, পারস্য দেশ ভ্রমণকারী কুরাইশ গোত্রের বিখ্যাত কবি নদর বিন আল-হারিস (আল-হিরার লাখমিদ রাজার দরবারের রাজকবি ছিলেন একসময়) নবির এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। তিনি ফেরদৌসি নামে সুন্দর একটি কবিতা লিখে গণজমায়েতে পাঠ করে শুনালেন এবং দাবি করেন কোরআনে যেভাবে আদ, সামুদ, লুত, নুহ, সাবা প্রভৃতি সম্প্রদায়ের কাহিনী বলা হয়েছে, তার থেকে অনেক সুন্দর করে পারস্যের বিখ্যাত রুস্তম-ইসফানদার এররাজকীয়ও বীরত্বপূর্ণ কাহিনী-গাথা বলতে পারেন। কবি নদর বিন আল-হারিসকে পরবর্তীতে বদরের যুদ্ধে বন্দী করা হয় এবং নবির আদেশত্রুমে আলি বিন আবু তালিব তাঁকে শিরোচ্ছেদ করেন। সুরা বনি-ইসরাইলের ৮৮ নম্বর আয়াতে কবি নদরের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বলা হয়েছে: ‘বলো, যদি এ-কোরআনের মতো কোরআন আনার জন্য মানুষ ও জিন একযোগে পরস্পরকে সাহায্য করে তবুও তারা এর মতো আনতে পারবে না।’(১৭: ৮৮)।

মুহাম্মদ কোরআনকে নিজের নবুওতির সনদপত্র হিসেবে বিবেচনা করতেন। এই কিতাব যে মুহাম্মদ ঐশীগুণে লাভ করেছেন, সেসম্পর্কে মুসলিম পণ্ডিতগণ একমত। যদিও বাগিতা ও বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে কোরআন কতটুকু অলৌকিক, এ-বিষয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। মুসলিম পণ্ডিতগণ সাধারণভাবে উভয়দিক দিয়ে একে অলৌকিক বলে মনে করেন। কোনো নিরপেক্ষ পর্যালোচনা নয়, বরং কোরআনের প্রতি আবেগপূর্ণ গভীর বিশ্বাসই এই মতামতের প্রধান অবলম্বন। এক্ষেত্রে অমুসলিম পণ্ডিতেরা এমন অনেক শক্ত ভিত্তি খুঁজে পেয়েছেন, যেগুলোর উপর দাঁড়িয়ে কোরআনের বোধগম্যতা ও বাগিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। কোরআনের বক্তব্যের যে ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে সে ব্যাপারে মুসলিম পণ্ডিতেরা আগেই ঐক্যমতে পৌঁছেছেন। বিশিষ্ট তফসিরকারক জালাল উদ্দিন আল-সুয়ূতি (১৪৪৫-১৫০৫ খ্রিস্টাব্দ) রচিত কিতাব আল ইতকান ফি উলুম আল-কোরআন’(২৮) এর একটি পুরো অধ্যায় এই বিষয়ে রচিত। শুধুমাত্র উসমানীয় যুগের সংকলিত-সম্পাদিত কোরআনের মূল অংশের সমালোচনামূলক সংশোধনের মাধ্যমে পাঠ্যাংশের ক্রমান্বয়িকতার ভুল বিন্যাসই নয়, কোরআনের ভাষারীতিও অনেক ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি করে।

মুসলিম পণ্ডিতদের মাঝে ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং অত্যুক্তি চেপে বসার আগে ইব্রাহিম আন-নাজ্জামের (৭৭৫-৮৪৫ খ্রিস্টাব্দ) মতো অনেক মুতাজিলা দার্শনিক প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন কোরআনের বিন্যাস ও বাক্যগঠন অলৌকিক কিছু নয় এবং অন্য কোনো খোদাভীরু মানুষের পক্ষে একই ধরনের কাজ কিংবা এর থেকেও বেশি সাহিত্যমানসমৃদ্ধ কাজ করা সম্ভব। নাজ্জাম বলেন, ভাগ্যগণনাকারীদের ভবিষ্যদ্বাণীকে যে অর্থে অলৌকিক হিসেবে বলা হয়, কোরআন সে অর্থে অলৌকিক নয়। তবে পূর্বে সংঘটিত ঘটনাসমূহের সঠিক পরিণামদশী হিসেবে কোরআনকে অলৌকিক বলা যেতে পারে। পারস্যের ধর্মতাত্ত্বিক এবং একসময়ের মুতাজিলাপন্থী ইবনে ইসহাক আল-রাওয়ানদির (৮২৭-৯১১ খ্রিস্টাব্দ) মতে, নাজ্জামের এই উক্তিগুলো প্রচলিত ধর্মমতের বিরোধী। আব্দুল কাদের আল-বাগদাদি (মৃত্যু ৪২৯ হিজরি বা ১০৩৭ খ্রিস্টাব্দ) তাঁর কিতাবুল-ফারক বায়নাল-ফিরাক’ বইয়ে (এখানে বিভিন্ন ধর্মীয়-সম্প্রদায়ের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে) নাজ্জামকে দোষারোপ করার জন্য ধর্মদ্রোহিতাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আল-বাগদাদির মতে নাজ্জামের বক্তব্য কোরআনের সুরা বনি-ইসরাইলের ৮৮ নম্বর আয়াতের সুস্পষ্ট বিরোধী, যেখানে বলা হয়েছে, ‘কোরআন সর্বদাই অ-অনুকরণীয়, মানুষ এবং জিনেরা যৌথভাবে চেষ্টা করলেও একে অনুকরণ করতে পারবে না।’

নাজ্জামের শিষ্য ও মৃত্যুপরবর্তী গুণগ্রাহীরা, যেমন ইবনে হাজম এবং আল-খাইয়াত নাজ্জামকে সমর্থন করে কলম ধরেছেন। শীর্ষস্থানীয় মুতাজিলাপন্থী অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ নাজ্জামের যুক্তিগুলো প্রচার করেছেন। তারা নাজ্জামের দর্শনের সাথে কোরআনের বক্তব্যের কোনো বিরোধ খুঁজে পাননি। তাদের অনেকগুলো যুক্তির মাঝে একটি ছিল, আল্লাহ নবি মুহাম্মদকে কোরআনের অনুরূপ আয়াত তৈরির ক্ষমতা দেননি, তবে অন্য যেকোনো সময়ে এবং স্থানে কোরআনের আয়াতের অনুরূপ শব্দাবলি তৈরি করা সম্ভব এবং তা এমন কোনো কঠিন কাজ নয়। ধারণা করা হয় সিরিয়ার প্রখ্যাত অন্ধকবি আবু আল আলা আল-মারি (৯৭৩-১০৫৮ খ্রিস্টাব্দ) আল-ফুসুল ওয়া আল-গায়াত নামের ছড়াধর্মী ধর্মব্যাখ্যানটি (যার একটি অংশ আজও অবশিষ্ট আছে) কোরআনের ব্যঙ্গাত্মক অনুকরণে রচনা করেছেন।

কোরআনের বাক্যসমূহ অসম্পূর্ণ এবং সম্পূর্ণভাবে বোধগম্য হবার ক্ষেত্রে এগুলির ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়। এতে অনেক বিদেশি শব্দ, অপ্রচলিত আরবি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এবং অনেক শব্দ রয়েছে যেগুলোকে স্বীয় সাধারণ অর্থে ব্যবহার করা হয়নি। লিঙ্গ এবং সংখ্যার অন্বয়সাধন না করে বিশেষণ এবং ক্রিয়াপদের ধাতুরূপ করা হয়েছে। অনেক সময় সংশ্লিষ্টতা নেই এমন অপ্রয়োজনীয় ও ব্যাকরণগতভাবে ভুল সর্বনাম পদ ব্যবহার করা হয়েছে এবং ছন্দবদ্ধ অনুচ্ছেদসমূহে এমন অনেক বিধেয় পদ ব্যবহার করা হয়েছে যার সাথে সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদে আলোচ্য মূল বিষয়ের সাথে এগুলোর কোনো মিল নেই। ফলে ভাষাগত এমন অনেক অগ্রহণযোগ্য বিষয়াদি কোরআনের সমালোচকদের (যারা কোরআনের বোধগম্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন) সমালোচনার সুযোগ করে দিয়েছে। এই সমস্যাগুলো নিষ্ঠাবান মুসলমানদের মনেও যথেষ্ট প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ফলে কোরআনের তফসিরকারকরা কোরআনের বক্তব্যের ব্যাখ্যা খুঁজতে বাধ্য হয়েছেন। কোরআন অধ্যয়নের ক্ষেত্রে মতভিন্নতার পিছনে যেসব কারণ রয়েছে, এ বিষয়টি তাদের মধ্যে অন্যতম।

যেমন সুরা মুদদাসসির-এর প্রথম আয়াতের কথা উল্লেখ করা যায়; ওহে, তুমি যে কিনা নিজেকে চাদরে ডেকে রেখেছ। এখানে চাদরে ডেকে রাখা বা চাদরাবৃত – এর গ্রহণযোগ্য আরবি শব্দ হচ্ছে মুদদাসসির’। কিন্তু বহুল প্রচলিত একটি মতানুযায়ী এটি হওয়া উচিত মুতাদাসসের। তেমনি সুরা মুজ্জামিলের প্রথম আয়াত; ওহে, তুমি যে কিনা নিজেকে চাদরে জড়িয়ে রেখেছা এই চাদরাবৃত বা চাদরে জড়িয়ে থাকা শব্দটি আরবি কোরআনে মুজ্জামিল পাঠ করা হয়, কিন্তু প্রচলিত

মতানুযায় এটি হওয়া উচিৎ মুতাজামিল। সুরা নিসার ১৬২ নম্বর আয়াত; কিন্তু তাদের মধ্যে যারা স্থিতপ্রজ্ঞ তারা ও বিশ্বাসীরা তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতেও বিশ্বাস করে এবং যারা নামাজ পালনকারী, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে আমি তাদেরকে বড় পুরস্কার দেব। এখানে পালনকারী: শব্দটি কোরআনের এই আয়াতে কর্মকারকে ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু আস্থা-স্থাপনকারী, বিশ্বাসী, ঋণপরিশোধকারী শব্দগুলো যে নিয়মাত্মক রূপে ব্যবহার করা হয়, তা সেই অর্থে ব্যবহার করা ব্যাকরণসম্মত। সুরা হুজুরাত-এর ৯ নম্বর আয়াত: বিশ্বাসীদের দুই দল দ্বন্দুে লিপ্ত হলে তুমি তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবে…। কোরআনের এই আয়াতটিতে উল্লেখিত দ্বন্দুে লিপ্ত হলো ক্রিয়াপদটি বহুবচন অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু এটি বক্তব্য অনুযায়ী শুধুমাত্র দ্বিপক্ষীয় অর্থে ব্যবহার করা উচিত ছিল। সুরা বাকারা-এর ১৭৭ নম্বর আয়াত: ‘পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফেরানোতে কোনো পুণ্য নেই; কিন্তু পুণ্য আছে আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতা, সব কিতাব ও নবিদের উপর বিশ্বাস করলে…।” এই আয়াতটিতে জেরুজালেম থেকে মক্কার দিকে প্রার্থনার দিক পরিবর্তন করার ফলে ইহুদিদের কাছ থেকে যে প্রশ্ন উঠেছিল সে সম্পর্কে বলা হয়েছে। ভাষাশৈলীর দিক দিয়ে অসাধারণ হলেও আয়াতটিতে আভিধানিক জটিলতা রয়েছে। তফসির আল-জালালাইনের মন্তব্য হচ্ছে আয়াতের দ্বিতীয় অংশে পুণ্য (বা সৎকর্ম, ন্যায়নিষ্ঠা)-এর আরবি শব্দ হিসেবে বের ব্যবহৃত হয়েছে, যার আসল অর্থ হচ্ছে পুণ্যবান ব্যক্তি। বিশিষ্ট ব্যাকরণবিদ মুহাম্মদ বিন ইয়াজিদ আল-মুবাররাদের (মৃত্যু: হিজরি ২৮৫ বা ৮৯৮ খ্রিস্টাব্দ) মতে, এই আয়াতে ব্যবহৃত বের শব্দটি আসলে ‘বার (ধার্মিক বা পুণ্যবান ব্যক্তি) হিসেবে উচ্চারণ করা উচিত। এটি বের’ শব্দের গ্রহণযোগ্য একটি প্রকরণ। মুহাম্মদ বিন ইয়াজিদের এই মন্তব্যের কারণে তৎকালীন কট্টরপন্থীরা তাঁর ধর্মবিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং কোরআনবিরোধিতার অভিযোগ তুলে কুৎসা প্রচার করেছিলেন।

সুরা তাহা-এর ৬৩ নম্বর আয়াতটিতে নবি মুসা ও তাঁর ভাই হারুন সম্পর্কে ফেরাউনের লোকদের মন্তব্য প্রকাশ পেয়েছে: ‘ওরা বলল, ‘এরা দুজন নিশ্চয় জাদুকর, তারা জাদুবলে তোমাদেরকে দেশ থেকে তাড়াতে চায়। এবং তোমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে একেবারে নস্যাৎ করতে চায়। (২০: ৬৩)। এরা দুজন জাদুকর বলতে ফেরাউনের লোকেরা নবি মুসা ও তাঁর ভাই হারুনকে বুঝিয়েছে। এক্ষেত্রে এরা দুজন শব্দ দুটির ক্ষেত্রে কোরআনে আরবি ‘হাদানে শব্দটি নিয়মাত্মকরূপে ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু এটা এখানে কর্মকারকে (হাদায়নে) হওয়া উচিত ছিল। কারণ তা একটি পরিচিতিমূলক বর্ণনা অংশের পর এসেছে। কথিত আছে যে খলিফা উসমান এবং নবির বিবি আয়েশা এই আয়াতে হাদানে না বলে হাদায়নে পাঠ করতেন। কট্টরপন্থীদের মত অনুযায়ী, কোরআন আল্লাহর বাণী। এখানে কোনো ভুল থাকতে পারে না। এখানে মুসলমানদের সর্বসমত সিদ্ধান্ত লিপিবন্ধ আছে। খলিফা উসমান এবং বিবি আয়েশা হাদানের স্থলে হাদায়নে ব্যবহার করতেন তা মিথ্যে এবং দূরভিসন্ধিমূলক। তফসির আল-জালালাইনের মন্তব্য হচ্ছে, আয়াতটিতে এই দ্বৈতবিভক্তি তিনটি ক্ষেত্রে প্রকাশিত হয়েছে। নিয়মাত্মক ও কর্মকারক উভয় ক্ষেত্রেই আয়ন হিসেবে উচ্চারিত হবার প্রয়োজন নেই। যদিও বিশিষ্ট ভাষাবিদ এবং কোরআন-বিশেষজ্ঞ আবু আমর বিন আল-আলা (মৃত্যু হিজরি ১৫৪ বা ৭৭০ খ্রিস্টাব্দ) খলিফা উসমান এবং বিবি আয়েশার মতোই এই আয়াতে হাদায়নে উচ্চারণ করতেন।

সুরা নুর-এর ৩৩ নম্বর আয়াতের একটি মনুষোচিত এবং অভিবাদনীয় নির্দেশ থেকে তৎকালীন সময়ে প্রচলিত নির্দয় এবং অমানবিক একটি আচরণের পরিচয় মেলে তোমাদের দাসীরা সতীত্ব রক্ষা করতে চাইলে, পার্থিব জীবনের টাকা-পয়সার লোভে তাদেরকে ব্যভিচারিণী হতে বাধ্য করো না। তবে কেউ যদি তাদেরকে বাধ্য করে, তাদের ওপর সেই জবরদস্তির জন্য আল্লাহ তো তাদেরকে ক্ষমা করবেন, দয়া করবেন। তৎকালীন আরব-সমাজে দাসী-মালিক যারা নিজেদের দাসীদেরকে দিয়ে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করত এবং উপার্জিত অর্থ নিজেদের পকেটে রাখত, এই আয়াতে সুস্পষ্টভাবে তাদেরকে এ-কাজ থেকে নিবৃত্ত হতে বলা হয়েছে। আয়াতের প্রথম বাক্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক এই কাজে প্রবৃত্ত হওয়ার কারণে আল্লাহ এই দাসীদের ক্ষমা করে দেবেন। তবে আয়াতের উপসংহারের বাক্য থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, যেসব ব্যক্তি নিজেদের দাসীদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করে, আল্লাহ সেই ব্যক্তিদের প্রতি দয়া ও করুণা করেছেন। এই প্রচ্ছন্ন বাক্যটি থেকে প্রকৃত অর্থে মহানুভবতার কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না। কোরআন সম্পর্কে মুতাজিলা দার্শনিক ইব্রাহিম আন-নাজ্জামের মতামত পূর্বে বলা হয়েছে। তিনি শুধু একা নন, মুতাজিলা দার্শনিক হিশান বিন আমর আল-ফুয়াতি (মৃত্যু হিজরি ২১৮ বা ৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ) এবং আব্বাস বিন সোলায়মানের (মৃত্যু হিজরি ২৫০ বা ৮৬৪ খ্রিস্টাব্দ) মতো আরও অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তি রয়েছেন যারা একইমত পোষণ করতেন। তাঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন নিষ্ঠাবান ধার্মিক। তারা নিজেদের যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং একনিষ্ঠ বিশ্বাসের মধ্যে কোনো পার্থক্য তৈরি করতেন না।

প্রভাবশালী আরব মনীষী আবুল-আলা আল-মারি তাঁর নিজের কিছু লেখাকে কোরআনের সমতুল্য বলে মনে করতেন। সারকথা হচ্ছে, কোরআনে আরবি ভাষার সাধারণ নিয়মাবলী ও গঠনশৈলী থেকে অন্তত একশটি বিচ্যুতি লক্ষ করা যায়। বলা বাহুল্য, কোরআনের তফসিরকারকদের এই অসংলগ্নতাগুলোকে ব্যাখ্যা এবং সমর্থনীয় করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। তাঁদেরই একজন হচ্ছেন পারস্যের বিখ্যাত ইসলামি পণ্ডিত ও ভাষাবিদ এবং জার-আল্লাহ (আল্লাহর প্রতিবেশি) খেতাবে ভূষিত আলজামাখশারি, পুরো নাম আবু আল-কাশিম মাহমুদ ইবনে উমর আল-জামাখশারি (জন্ম হিজরি ৪৬৭ বা ১০৭৫ খ্রিস্টাব্দ-মৃত্যু হিজরি ৫৩৮ বা ১১৪৪ খ্রিস্টাব্দ) যার সম্পর্কে একজন মুরীয় (উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার আরব মুসলমান) লেখক বলেছেন, ‘ব্যাকরণঅনুরাগী এই তাত্ত্বিক একটি গুরুতর ভুল করেছেন। আরবি ব্যাকরণের সাথে মিল রেখে কোরআন পড়ানো আমাদের দায়িত্ব নয়। বরং আমাদের উচিত সম্পূর্ণ কোরআন যেভাবে আছে সেভাবে একে গ্রহণ করা এবং আরবি ব্যাকরণকে এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা।’

একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত দাবিটি সমর্থনযোগ্য। একটি জাতির শ্রেষ্ঠ বক্তা এবং লেখকেরা মাতৃভাষার ব্যাকরণগত নিয়মাবলীকে সম্মান করেন এবং ভাবপ্রকাশের ক্ষেত্রে জনসাধারণের কাছে দুর্বোধ্য এবং অগ্রহণযোগ্য শব্দাবলী ব্যবহার থেকে বিরত থাকেন। যদিও অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে শব্দচয়ন তাদের জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। প্রাক-ইসলামি যুগে আরবে যথেষ্ট পুথিশাস্ত্র-কাব্যলোকগাঁথা রচিত হয়েছে এবং ব্যাকরণের কাঠামোও দাঁড়িয়ে ছিল। মুসলমানদের কাছে ইসলাম-পূর্ববর্তী সকল সাহিত্য-রচয়িতার সৃষ্টিকর্ম থেকে উৎকৃষ্ট যে কোরআন, একে অবশ্যই ব্যাকরণের সাথে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

তথাপি ওই মুরীয় লেখক কর্তৃক জামাখশারির নিন্দা, লেখকের বক্তব্যকেই পাল্টা সমালোচনার একটি ভিত্তি করে দিয়েছে। কারণ লেখকের বক্তব্য প্রচলিত দাবিকেই উল্টিয়ে দেয়। আর এই দাবিটি হচ্ছে কোরআন আল্লাহর বাণী। কোরআনের একটি ভক্তি সৃষ্টিকারী মাধুর্যপূর্ণ বাগিতা রয়েছে, যা সকল মানুষের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। যে ব্যক্তির মাধ্যমে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে, সঙ্গত কারণেই তিনি একজন নবি। মুরীয় লেখকের মতে, কোরআন ভুলভ্রান্তিহীন যেহেতু তা আল্লাহর বাণী এবং এতে ব্যাকরণগত যেসব ভুল রয়েছে সেগুলো আরবি ব্যাকরণের নিয়মাবলী পরিবর্তনের মাধ্যমেই সংশোধন করতে হবে। অন্যকথায়, সংশয়ী বা অবিশ্বাসীদের প্রশ্নের উত্তরে মুহাম্মদের নবুওতিকে প্রমাণ করতে যেখানে অধিকাংশ মুসলিম কোরআনের বাগিতাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন, মুরীয় লেখক সেখানে কোরআনের স্বগীয় উৎপত্তি ও মুহাম্মদের নবুওতিকে স্বীকার করে সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে, কোরআনের বিষয়বস্তু এবং শব্দাবলী সম্পর্কিত আলোচনা গ্রহণযোগ্য নয়।

একই সাথে বলা যায়, কোরআন আসলেই স্বতন্ত্র এবং অসাধারণ। প্রাচীন আরবের প্রথমদিকের সাহিত্যে এর মতো কোনো দৃষ্টান্ত চোখে পড়েনি। মক্কায় অবতীর্ণ সুরাগুলোয় আমরা অনেক আগ্রহোদীপক এবং চিত্তাকর্ষক কাব্যিক অনুচ্ছেদ দেখতে পাই। এগুলো থেকে নবির চিন্তাশক্তি এবং বক্তৃতা দেবার সহজাত প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায় এবং তাঁর মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা সম্পর্কে অনুমান করা যায়। একটি চমৎকার উদাহরণ হতে পারে সুরা নজম। যদি আমরা এখান থেকে ৩২ নম্বর আয়াতটি উহ্য রাখি যা মদিনায় অবতীর্ণ হলেও কোনো এক অজানা কারণে খলিফা ওসমান এবং তার সংগ্রাহকগণ এই আয়াতকে মক্কি সুরার অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

জেরুজালেমের বালিকাগণ, যাদের স্তন গিলিয়াদ পর্বতের ছাগলের ন্যায় শুভ্র, তাদের সাথে কাটানো সময়ের উল্লেখ ব্যতিরেকে সলোমনের গানের একটি চিত্রকল্পীয় হৃদয়গ্রাহী স্মৃতিচারণের মাধ্যমে সুরা নজম উল্লাসের সাথে প্রচারক হিসেবে মুহাম্মদের ভূমিকা ও তাঁর পয়গম্বরীয় ঔজ্জ্বল্য এবং দূরদৃষ্টি ব্যাখ্যা করেছে। যদিও আরবি ভাষার এই শব্দের ঐক্যতান, ছন্দ এবং সৌন্দর্য্য স্বাভাবিকভাবেই অন্য ভাষায় প্রকাশ করা যথেষ্ট কঠিন, তারপরও সুরা নজমের প্রথম ১৮টি আয়াত নিম্নে উল্লেখিত অনুবাদের মাধ্যমে মুহাম্মদের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিসত্তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার খানিকটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়:

শপথ অস্তমিত নক্ষত্রের তোমাদের সঙ্গী বিভ্রান্ত নয়, পথভ্রষ্টও নয়
আর সে নিজের ইচ্ছেমতো কোনো কথা বলে না।
এ প্রত্যাদেশ যা তার ওপর) অবতীর্ণ হয়।
তাকে শিক্ষা দেয় এক মহাশক্তিধর° /
বুদ্ধিধর (জিবরাইল) আবির্ভূত হল ঊর্ধ্বে দিগন্তে।
তারপর সে তার কাছে এলো খুব কাছে
যার ফলে তাদের দুজনের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রইল।
তখন তিনি তার দাসের প্রতি যা প্রত্যাদেশ করার তা প্রত্যাদেশ করলেন।
সে যা দেখছিল তার হৃদয় তা অস্বীকার করেনি।
সে যা দেখেছিল তারা কি সে-সম্বন্ধে তর্ক করবে?
নিশ্চয় সে তাকে আরেকবার দেখেছিল,
শেষ সীমান্তে অবস্থিত সিদরা গাছের নিকট
যার কাছেই ছিল জনাতুল মাওয়া।
তখন সিদরা গাছটা ছেয়ে ছিল যা দিয়ে ছেয়ে থাকে।
তার দৃষ্টিবিভ্রম হয়নি বা দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি।
সে তার মহান প্রতিপালকের নিদর্শনগুলো নিশ্চয় দেখেছিল। (৫৩: ১-১৮)।

পরামর্শ গ্রহণের জন্য মানুষের কাছে অনেক পথই খোলা রয়েছে এবং সুরা নজমে পরবর্তীতে আল্লাহ নবিকে এ বিষয়টির সাথে পরিচয় করিয়ে দেন; অতএব যে আমাকে স্মরণ করতে বিমুখ তাকে উপেক্ষা করে চলো; সে তো কেবল পার্থিব জীবনই কামনা করে। ওদের জ্ঞানের দৌড় তো ঐ পর্যন্ত। তোমার প্রতিপালক নিশ্চয় ভালো জানেন কে তাঁর পথ থেকে ভ্রষ্ট; আর তিনিই ভালো জানেন কে সৎপথ পেয়েছে। (৫৩: ২৯-৩০)।

শোনা যায়, মুহাম্মদের চাচা আবু লাহাবের পত্নী উম্মে জামিল একদিন নবির কাছে গিয়ে বিদ্রুপ করে বললেন, “আমরা আশা করছি তোমার ভেতরের শয়তান তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। এটি ছিল বাণী নাজিলে বিঘ্ন হবার সময়কালীন ঘটনা। সে-সময় নবি এতোটাই নিরাশ এবং মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ছিলেন যে, পাহাড়চূড়া থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যার কথা পর্যন্ত ভেবেছিলেন। ধারণা করা হয় সুরা দোহা নাজিলের সময়ও এই বিঘ্ন ঘটেছিল, তবে এই সূরাটিও খুবই শ্রুতিমধুর:

শপথ দিনের প্রথম প্রহরের তার শপথ রক্রির যখন তা আচ্ছন্ন করে?
তোমার প্রতিপালক তোমাকে ছেড়ে যাননি ও তোমার ওপর তিনি অসন্তুষ্ট নন।
তোমার জন্য পরকাল ইহকালের চেয়ে ভালো।
তোমার প্রতিপালক তো তোমাকে অনুগ্রহ করবেনই আর তুমিও সন্তুষ্ট হবে।
তিনি কি তোমাকে ভুল পথে পেয়ে পথের হদিস দেননি?
তিনি তোমাকে কি অভাব দেখে অভাবমুক্ত করেননি?
সুতরাং তুমি পিতৃহীনদের প্রতি কঠোর হয়ে না
আর য়ে সাহায্য চায় তাকে ভৎসনা করো না
আর তুমি তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের কথা বর্ণনা করো। (৯৩১-৯)।

কোরআনের প্রতি সুবিচার করলে স্বীকার করতে হবে এটা অবশ্যই বিস্ময়কর। মক্কায় নাজিলকৃত অপেক্ষাকৃত ছোট সুরাগুলোর কাব্যিক ভাব ব্যক্ত করার জাদুকরি ক্ষমতা রয়েছে এবং সেই সাথে বিশ্বাসের প্রেরণাদায়ক। সুরায় ব্যবহৃত ভাষাশৈলীর কোনো নজির আরবি ভাষায় এর পূর্বে দেখা যায়নি। একজন মানুষ যিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেননি, তার মুখ থেকে ভাবের এমন বহিঃপ্রকাশ সত্যিই বিস্ময়কর। এদিক থেকে বিবেচনা করলে, কোরআনকে অলৌকিক হিসেবে গণ্য করা সমর্থনযোগ্য।

তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদকে ‘নিরক্ষর’ মানতে রাজি নন। তাঁদের মতে কোরআনে ব্যবহৃত ‘উম্মি’ শব্দটির অর্থ আসলে নিরক্ষর নয়, বরং ইহুদি নয় এমন ব্যক্তির কথাই বুঝানো হয়েছে। তাঁরা বক্তব্যের সপক্ষে কোরআনে উল্লেখিত পৌত্তলিক, অইহুদি, এবং অ-খ্রিস্টান আরবদের উদাহরণ দেখিয়েছেন। এই অ-ইহুদি’শব্দটি কোরআনের সুরা জুমআর আয়াত ২-এ ব্যবহৃত হয়েছে এভাবে: ইনিই সেই ব্যক্তি যাকে অ-ইহুদিদের মধ্য থেকে নবি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এরকম উদাহরণ কোরআনের আরও কয়েকটি আয়াতে দেখতে পাওয়া যায়, যেমন: সুরা বাকারা; আয়াত ৭৫; সুরা ইমরান; আয়াত ২০ ও ৭০; সুরা আ’রাফ; আয়াত ১৫৭-১৫৮। তথাপি প্রচলিত ধারণা, তথ্য এবং সে যুগের প্রথাসমূহের উপর নির্ভর করে সাধারণভাবে এটা বিশ্বাস করা হয় যে, মুহাম্মদ লিখতে জানতেন না, যদিও শেষ জীবনে হয়তো দু’একটি শব্দ পড়তে পারতেন। কোরআনে যেমন বলা হয়েছে: তুমি তো এর পূর্বে কোনো কিতাব পড়নি, বা নিজ হাতে কোনো কিতাব লেখনি যে মিথ্যাবাদীরা সন্দেহ করবে!’ (সুরা আনকাবুত; আয়াত ৪৮)। ওরা বলে, এগুলো তো সেকালের উপকথা যা সে লিখিয়ে নিয়েছে। এগুলো সকাল-সন্ধ্যা তাঁর কাছে পাঠ করা হয়। (সুরা ফুরকান; আয়াত ৫)।

কোরআনের এই আয়াতগুলো থেকে বিশ্বাস করা হয় যে, নবি মুহাম্মদ লিখতে-পড়তে জানতেন না, এটা পৌত্তলিকরা ধারণা করত। নবি মুহাম্মদ লিখতে-পড়তে জানতেন না, এ-বিষয়ে ইসলামের ইতিহাস ও হাদিসে প্রচুর ভিন্নতথ্য রয়েছে। পশ্চিমের অনেক ইসলাম-বিশেষজ্ঞ যেমন ফরাসি মার্কসবাদী ইতিহাসবিদ ও সমাজতাত্ত্বিক ম্যাক্সিম রডিনসন এবং স্কটিস ইতিহাসবিদ উইলিয়াম মন্টোগমেরি’র মতে নবি মুহাম্মদ নিরক্ষর ছিলেন না। তাঁদের মতে, কোরআনে নবিকে একেবারে নিরক্ষর বা লিখতে-পড়তে জানেন না বলে বোঝানো হয়নি বরং শুধু বোঝানো হয়েছে নবি ইতিপূর্বে ইহুদি-খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থ (তৌরাত, ইঞ্জিল) পাঠ করেননি। পশ্চিমা পণ্ডিতরা তাঁদের বক্তব্যের সমর্থনে সুরা আনকাবুতের ৪৮ নম্বর আয়াত হাজির করেন। তাঁদের মতে এই আয়াতে কিতাব বলতে ইহুদি-খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থের কথা কেন্দ্রভূমি এবং নবুওত প্রাপ্তির পূর্বে ছোটবেলা থেকে একাধিকবার নবি বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে মক্কার বাইরে গিয়েছেন। সেই বহির্বাণিজ্যে তিনি যথেষ্ট যোগ্যতার ছাপ রেখেছিলেন। একজন বণিকের যদি সামান্য অক্ষর জ্ঞান না থাকে এবং হিসাব-নিকাশ চালানোর মতো গণনা দক্ষতা না থাকে তাহলে বাণিজ্যে দক্ষতা অর্জন করা কঠিন। লেখা-পড়া জানা বিবি খাদিজা প্রথমে মুহাম্মদকে বাণিজ্যে দক্ষতার কারণে মুগ্ধ হয়ে বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিচালকরুপে নিয়োগ দিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে তাঁদের মধ্যে পরিণয়ের দিকে সম্পর্ক গড়ায়। খাদিজার মতো একজন ব্যবসায় সফল-অভিজ্ঞ রমণী তাঁর ব্যবসার বৈদেশিক দায়িত্ব একজন নিরক্ষর ব্যক্তির ওপর ছেড়ে দিবেন কেন? এছাড়া প্রচুর হাদিসেও রয়েছে: (১) উসরা হতে বর্ণিত, ছয় বছরের আয়েশার সাথে বিয়ের কাবিন রসুল মুহাম্মদ নিজেই লিখেছেন। (দ্রষ্টব্য; বুখারি শরিফ, ভলিউম ৭, বুক ৬২ নম্বর ৮৮)। (২) ইয়াজিদ ইবনে উকাইশের জন্য। বক্তব্য হচ্ছে: “তোমরা যদি অন্য কোনো ঈশ্বর বাদ দিয়ে একমাত্র আল্লাহকে মেনে নাও, মুহাম্মদকে আল্লাহর রসুল বলে স্বীকার করো, জাকাত দাও, নামাজ পড়ো তবে আল্লাহ এবং তাঁর রসুলের কাছ থেকে নিরাপত্তা পাবে। এরপর লোকটিকে জিজ্ঞেস করা হল, এই বার্তা কে লিখে দিয়েছে? লোকটি উত্তর দিল আল্লাহর রসুল’। (দ্রষ্টব্য: আবু দাউদ শরিফ, বুক ১৯, নম্বর ২৯৯৩)। (৩)

আল বারা হতে বর্ণিত, নবি ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় গেলে তাঁকে ঢুকতে দেয়া হয়নি, যতক্ষণ না তিনি রাজি হন মক্কাবাসীর সাথে একটি চুক্তি করতে। তিন দিন অপেক্ষার পর তিনি শান্তি চুক্তি করতে রাজি হলেন। চুক্তিতে লেখা হলো আল্লাহর নবি মুহাম্মদের (দঃ) পক্ষ হতে…। মক্কার লোকেরা প্রতিবাদ করে উঠলেন। তারা মুহাম্মদকে ‘আল্লাহর নবি বলে স্বীকার করতে চাইলেন না। বললেন, মুহাম্মদ, আব্দুল্লাহর পুত্র, এটাই লেখা হোক। এ নিয়ে দ্বন্দুে যখন চুক্তি প্রায় ভেঙ্গে যাবার উপক্রম তখন মুহাম্মদ হজরত আলিকে নির্দেশ দিলেন, চুক্তিপত্র হতে আল্লাহর নবি শব্দ কেটে দিতে। কিন্তু আলি রাজি না হওয়ায় মুহাম্মদ চুক্তিপত্র হাতে নিয়ে নিজ হাতে কেটে দিলেন এবং আল্লাহর নবি শব্দটির বদলে যোগ করলেন “আব্দুল্লাহর পুত্র। (দ্রষ্টব্য; বুখারি শরিফ, ভলিউম ৫, বুক ৫৯ নম্বর ৫৫৩)। -অনুবাদক)।

কোরআনকে বিষয়বস্তুগত কারণে অনেকে অলৌকিক মনে করেন। এক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে এতে এমন কোনো নতুন ধারণা নেই যা পূর্বে অন্যদের দ্বারা ব্যক্ত হয়নি। কোরআনের সকল বক্তব্যই স্বীয়-প্রতিষ্ঠিত এবং সর্বজনস্বীকৃত। কোরআনে বর্ণিত কাহিনীসমূহ ইহুদিখ্রিস্টানদের ধর্মীয় লোক-কাহিনীর অবিকল কিংবা সামান্য পরিবর্তিত রূপ। সিরিয়ার ভ্রমণের সময় মুহাম্মদ এই দুই সম্প্রদায়ের রাব্বি এবং সন্ন্যাসীদের সাথে পরিচিত হয়েছিলেন এবং তাঁদের সাথে আলাপচারিতাও করেছিলেন। এছাড়া আদ এবং সামুদ অধিবাসীর বংশানুক্রমে প্রাপ্ত কিছু কাহিনীর সাথে কোরআনে বর্ণিত কাহিনীগুলোরও মিল পাওয়া যায়।

নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করলে নবি মুহাম্মদের মহত্ত্বকে কোনোভাবেই খাটো করা যায় না। একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অনৈতিক, নিন্দনীয় সমাজ, যেখানে পেশিশক্তি ছাড়া অন্য কোনো আইন কাজ করে না এবং নির্দয়তার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত সেই সমাজের একজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-বঞ্চিত মুহাম্মদ সাহসিকতার সাথে অসংখ্য মন্দকাজ ও পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। সেই সাথে অন্যান্য সম্প্রদায়ের পূর্ব-অভিজ্ঞতাসমূহকে পুনঃপুনঃ ব্যক্ত করার মাধ্যমে উচ্চতর আদর্শ প্রচার করেছিলেন।

মুহাম্মদের এই উদ্যোগ তাঁর সহজাত প্রতিভা, আধ্যাত্মিক শক্তি, নৈতিক জ্ঞান ও ভক্তিভাবের পরিচায়ক। একজন কথিত নিরক্ষর ব্যক্তির মুখ থেকে নিঃসৃত সুরা আবাসা যেন তাঁরই ব্যাকুল হৃদয়ের স্পন্দন। সুরা আবাসা খুবই গীতিময়, সুরালায়িত এবং প্রবল আধ্যাত্মিক, যা হাফিজের কবিতা ছাড়া প্রকাশ করা অসম্ভব। তবে সুরা আবাসা এর ১৭-৩৩ আয়াতগুলোয় অসম্পূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে:

মানুষ ধ্বংস হোক সে কত অকৃতজ্ঞ।
তিনি তাকে কী থেকে সৃষ্টি করেছেন
তিনি তাকে শুরু থেকে সৃষ্টি করেন
তারপর তার জন্য পথ সহজ করে দেন তারপর তার মৃত্যু ঘটান ও তাকে কবরস্থ করেন।
এরপর যখন ইচ্ছা তিনি তাকে পুনর্জীবিত করবেন।
না তিনি তাকে য় আদেশ করেছেন সে তা পালন করে নি।
আমি প্রচুর বারিবর্মণ করি
তারপর ভূমিকে বিদীর্ণ করি
এবং তার মধ্যে উৎপন্ন করি
গাছগাছালির বাগান ফল ও গবাদি খাদ্য।
এ তোমাদের ও তোমাদের আনআমের (চতুস্পদ প্রাণী) ভোগের জন্য।
যেদিন মহানাদ (কেয়ামত) আসবে (৮০: ১৭-৩৩)।

মূলত অসাধারণ এবং নান্দনিক আধ্যাত্মিক উপদেশের মাধ্যমে মুহাম্মদ তাঁর চারপাশের মানুষকে একটি অপেক্ষাকৃত ভালোপথে চালিত করতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু নৈতিক শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কোরআনকে অলৌকিক বলে বিবেচনা করা যাবে না। মুহাম্মদ সেই সকল মূল্যবোধের পুনরাবৃত্তি করেছেন, যেগুলো পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলোয় বিশ্বজুড়ের মানবসমাজের বিভিন্ন স্থানেই উদ্ধৃত হয়েছে। কনফুসিয়াস, বুদ্ধ, জরথ্রস্ত, সক্রেটিস, মুসা, এবং যিশুও একই ধরনের বা কাছাকাছি মূল্যবোধ প্রচার করেছেন।

কোরআনে অনেক আইন ও বিধি রয়েছে যা মুহাম্মদকে ইসলামের আইনপ্রণেতা হিসেবে তুলে ধরে। যে বিষয়টি অবশ্যই মনে রাখা দরকার তা হলো, কোরআনে বর্ণিত আইন-কানুন তৈরি হয়েছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলীর নিমিত্তে এবং নির্যাতিত মানুষের আবেদনের প্রেক্ষিতে। ফলে এই আইনগুলোর মাঝে কিছু অসঙ্গতি রয়েছে এবং বাতিলকারী এবং বাতিলকৃত উভয় বিধিই কোরআনে রয়ে গিয়েছে। একথাও ভুললে চলবে না যেইসলামিক আইন-বিধিবিধানগুলো মুসলমান বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘকালীন প্রচেষ্টার ফসল, যা ইসলামি যুগের প্রথম তিন শতাব্দীতে তৈরি হয়েছে। কোরআনে বর্ণিত আইনগুলো সংক্ষিপ্ত এবং মুহাম্মদের জন্মের দেড়শ বছর পর তৈরি হওয়া বিশাল সংখ্যক মুসলমান জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটানোর জন্য এগুলো পর্যাপ্ত ছিল না।

ইসলামে সিয়াম (রোজা বা উপবাস) পালনের প্রথা এসেছে ইহুদিদের ধর্ম থেকে। ইসলাম-পূর্ব আরবে আরবি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মহরম মাসের (হিব্রু ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তিশরি’ মাস) দশম দিনে ইহুদিরা রোজা রাখতেন। আরবি ভাষায় আশুরার দিন (হিব্রুভাষায় আশর) নামে এ-দিবস পরিচিত। ইহুদিদের তৌরাতের ভাষ্যানুযায়ী এ-দিনে ঈশ্বরের আশীর্বাদ নিয়ে নবি মুসা ইসরাইলের সন্তানদের ফেরাউনের আক্রমণ থেকে রক্ষা করেন। ইহুদিদের ধর্মে এ-দিনের অনুষ্ঠানের নাম ‘জম কিপার’। ইহুদিরা জম কিপারের সময় প্রায় ২৫ ঘণ্টা উপবাস পালন করেন এবং সিনাগগে গিয়ে প্রার্থনা করেন, দান-খয়রাত করেন। নবি মুহাম্মদের মদিনায় গমনের পরে এবং প্রার্থনার দিক যখন জেরুজালেম থেকে মক্কার দিকে পরিবর্তিত হল, রোজার সময়সীমা তখন একদিন থেকে বেড়ে দাঁড়ালো দশ দিনে, অর্থাৎ মহরম মাসের দশ দিন নামে পরিচিত হলো। পরবর্তীতে মুসলমান ও ইহুদিদের মাঝে যখন চূড়ান্ত বিচ্ছেদ হয় তখন পুরো রমজান মাসকে রোজা পালনের জন্য সংরক্ষণ করা হলো।

প্রতিটি ধর্মে প্রার্থনা প্রচলিত রয়েছে। এক বা একাধিক দেবতার প্রতি ভক্তি নিবেদন এবং বিচার কামনা প্রতিটি ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলাম ধর্মে একজন মুসলমানের সর্বপ্রথম কর্তব্য হলো প্রার্থনা করা; এবং এই প্রার্থনা ব্যতিক্রমী ইসলামি-পদ্ধতি অনুযায়ী পালন করা হয়। তবে কোরআনে গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়ে কোনো প্রকার বিস্তারিত নির্দেশনা দেয়া হয়নি। নবি মুহাম্মদের ত্রিশ বছরে মক্কায় অবস্থানকালে এবং মদিনায় হিজরতের প্রথম দেড় বছরে মুসলমানরা ইহুদিদের মতো একই দিক বা অভিমুখে (কিবলা) প্রার্থনা করতেন। যা মূলত জেরুজালেমে অবস্থিত সবচেয়ে দূরের মসজিদ (বা প্রার্থনাস্থান) হিসেবে পরিচিত ছিল।

মক্কায় মুসলমানদের তীর্থযাত্রা হিজ প্রতিষ্ঠিত হবার পর আরবের বিভিন্ন জাতীয় প্রথাও প্রতিষ্ঠিত ও চিরস্থায়ী রূপ লাভ করে। হজের (জুলহজ মাসে তীর্থযাত্রা) এবং ওমরা’র সকল অনুষ্ঠানাদি, যেমন সেলাইবিহীন ঢিলেঢালা বস্ত্র পরিধান, কালো পাথরকে চুমু খাওয়া কিংবা স্পর্শ করা, সাফা এবং মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে দৌড়ানো, আরাফাতে অবস্থান এবং শয়তানের প্রতি পাথর নিক্ষেপের প্রথা ইসলাম-পূর্ব যুগেও আরবে পৌত্তলিকদের মধ্যে প্রচলিত ছিল এবং সামান্য কিছু পরিবর্তন সাপেক্ষে এগুলো ইসলামে বজায় থেকেছে।

পৌত্তলিক আরবরা কাবা ঘরকে প্রদক্ষিণকালে লাত, ওজা, মানাতসহ আরও অনেক গোত্র দেবতার নাম উচ্চারণ করত। যেমন ‘হে মানাত, আমি তোমার আদেশ পালন করতে প্রস্তুত’(লাব্বায়েকা) এবং দেবদেবীদের নাম ধরেও উচ্চারিত হতো। ইসলামে এই ধরনের সম্মোধনের রীতি আল্লাহকে সম্বোধন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তা পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়ায়, ‘লাব্বায়েকা আল্লাহুমা লাকবায়েকা!”

পৌত্তলিক আরবেরা তীর্থযাত্রার মাসে শিকার করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু নবি মুহাম্মদ তীর্থযাত্রার (হজ) যে দিনগুলোতে (ইহরাম) হাজিরা নিজেদেরকে উৎসর্গের জন্য ব্যয় করেন শুধুমাত্র সেই দিনগুলোর জন্য এই নিষেধাজ্ঞাকে বহাল রাখলেন। পৌত্তলিক আরবরা অনেক সময় নগ্ন হয়ে কাবা ঘরকে প্রদক্ষিণ করত। ইসলাম তা নিষিদ্ধ করে সেলাইবিহীন বস্ত্র পরিধানের রীতি প্রচলন করে। পৌত্তলিক আরবদের কোনো কোনো গোত্রে উৎসর্গকৃত প্রাণীর মাংস খাওয়ায় বিধি-নিষেধ ছিল। কিন্তু নবি এই নিষেধাজ্ঞা তুলে দেন।

মক্কা বিজয়ের পর কাবা ঘরে রক্ষিত কুরাইশদের মূর্তিগুলোকে ধ্বংস করা হয় নবি মুহাম্মদের নির্দেশে এবং মুসলমানরা সাফা এবং মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে দৌড়ানোর যে প্রথা প্রচলিত ছিল তা থেকে বিরত থাকেন। কারণ পূর্ববর্তীকালে এই দুই পাহাড়ের চূড়ায় দুজন দেবীর পাথরের প্রতিমা ছিল এবং পৌত্তলিকরা দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তীস্থানে দৌড়ার মাধ্যমে এবং প্রতিমাগুলোকে চুমু দিয়ে কিংবা স্পর্শ করে সৌভাগ্য অর্জনের চেষ্টা করত। যা হোক, এ-বিষয়ে একটি ঐশী বাণী নাজিল হয়; নিশ্চয় দুটি পাহাড় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। সুতরাং যে আল্লাহর ঘরে হজ বা ওমরা করে, তার জন্য এই দুটি প্রদক্ষিণ করলে কোনো পাপ নেই। (২: ১৫৮)। অর্থাৎ কোরআনের এই আয়াত সাফা-মারওয়া পাহাড়ের দৌড়কে শুধুমাত্র পাপমুক্তই করল না, একই সাথে এই দুই পাহাড়কে আল্লাহর নিদর্শনকারী হিসেবে ঘোষণা দিল। (কাবা সম্পর্কে পূর্ববর্তি আব্রাহামিক ধর্মীয় কিতাবসমূহে কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। এমনকি উপাস্য আল্লাহ সম্পর্কেও না। এগুলো যদি কেবলমাত্র পৌত্তলিকদের পবিত্র তীর্থস্থান ও উপাস্য না হত তবে পূর্ববর্তী ইসা বা মুসার কিতাবে অবশ্যই কোনো না কোনো উল্লেখ থাকত। কাবার সাথে ইব্রাহিমের যে যোগসূত্র দাবি করা হয় সেটা অপ্রমাণিত এবং অত্যন্ত অস্বাভাবিক -অনুবাদক।)

পারস্যের খোরাসান প্রদেশে জন্মগ্রহণকারী বিশিষ্ট মনীষী, ঐতিহাসিক এবং দার্শনিক আবু আল-ফাথ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল করিম আল-শাহরাস্তানি (১০৮৬-১১৫৩ খ্রিস্টাব্দ) ধর্ম ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ইতিহাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর রচিত কিতাব আল-মিলওয়াল ওয়া আল-নিহাল’কে ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনবিদ্যার প্রথমদিককার সুশৃঙ্খল ব্রুপদী গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইউনেস্কোর অর্থায়নে বইটির সর্বপ্রথম ফরাসি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৮৬ সালে এবং পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে। -অনুবাদক। আল-শাহরাস্তানি তাঁর ওই ধ্রুপদী বইয়ে লিখেছেন, ইসলামের অনেক পালনীয় বিধি এবং রীতিসমূহ পৌত্তলিক আরবদের প্রথাসমূহের ধারাবাহিক রূপ, যা তারা ইহুদিদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছেন।

ইসলাম-পূর্ব যুগে মা, মেয়েকে এবং পিতার স্ত্রীকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ ছিল এবং একই সাথে দুই সহোদরাকে বিয়ে করাও সামাজিকভাবে গ্রহণ করা হতো না। মৃতদেহকে স্পর্শ করার পর পুণ্যস্নান, পরিষ্কার পানি দিয়ে মুখ ধোয়া, জোরে শ্বাস টেনে পানিকে নাসারন্ধ পর্যন্ত তুলে ফেলা, মাথার চুলে তেল মাখা, মেসওয়াক বা দাঁত খিলাল ব্যবহার করা, মলত্যাগের পর ধৌতকরণ, বগল এবং শ্রোণিদেশের চুল কামানো, খৎনাকরণ এবং চোরের ডান হাত কেটে ফেলা ইত্যাদি রীতি ইসলাম আসার পূর্বে তৎকালীন আরবের পৌত্তলিক অধিবাসীরা পালন করত, যেগুলোর বেশিরভাগ তাঁরা ইহুদিদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিল।

পৌত্তলিক আরবদের আইন থেকে ইসলামের যে দুটি আইন ব্যতিক্রমী, সেগুলো হলো পবিত্র যুদ্ধে (জিহাদ) অংশগ্রহণ এবং জাকাত প্রদান করা। অন্য যেকোনো আইনি-কাঠামোতে তুলনামূলক কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপ না করার কারণ হল, অন্যান্য আইনপ্রণেতাদের থেকে নবি মুহাম্মদের উদ্দেশ্য ভিন্ন ছিল। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল একটি রাষ্ট্র গঠন। আর নবি বুঝতে পেরেছিলেন একটি রাষ্ট্র কখনোই সেনাবাহিনী ও আর্থিক উৎস ব্যতীত গঠিত হতে পারে না। জিহাদে অংশগ্রহণের এই ব্যতিক্রমী ও নজিরবিহীন ইসলামি আইনটিকে মুহাম্মদের দূরদৃষ্টি এবং বাস্তবতাবোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। মক্কায় প্রণীত অসাধারণ আধ্যাত্মিক সুরাগুলো যখন অকার্যকরী প্রমাণিত হলো, তখন যে একমাত্র সমাধানটি তিনি খুঁজে পেলেন তা হল, যুদ্ধের মাধ্যমে ফয়সালা করা।

যুদ্ধ করতে সক্ষম একটি সেনাবাহিনী, যেখানে প্রতিটি সৈনিকই যুদ্ধ করতে বাধ্য, এমন একটি সেনাবাহিনীকে ভরণ-পোষণ করা ব্যয়সাপেক্ষ। গনিমতের মাল এবং সম্পত্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা হয়তো সৈন্যদের যুদ্ধে আগ্রহী করে তুলতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অধিক নিরাপদ এবং স্থায়ী একটি আয়ের উৎসের প্রয়োজন রয়েছে যা কিনা ইসলামি আইনে জাকাতের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে।

নবসৃষ্ট সমাজের সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় দিকগুলো মুহাম্মদের গঠনমূলক চিন্তাধারায় স্থান পেয়েছে। তাঁর সকল উদ্যোগই এই সমাজের মঙ্গলের জন্য গ্রহণ করেছেন। যেমন নেশাজাতীয় দ্রব্য নিষিদ্ধকরণ। এটি আরেকটি ব্যতিক্রমী ইসলামি-আইন যা প্রাথমিকভাবে সামাজিক পরিস্থিতিকে বিবেচনা করে প্রণীত হয়েছিল। আরবরা আবহাওয়াগত কারণে উষ্ণ রক্তের, সহজে উত্তেজিত হয়ে যায় এবং উচ্ছঙ্খল প্রকৃতির হবার কারণে অবাধ-লভ্য নেশাজাতীয় পানীয় পান করে তারা বিভিন্ন অশোভন আচরণ করত এবং সমাজে বিশৃংখল পরিস্থিতি তৈরি করত। এই নিষেধাজ্ঞা তিনটি ধাপে জারি হল: প্রথমত, সুরা বাকারার এই আয়াত: -লোকে তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, বলো, দুয়ের মধ্যেই মহাদোষ, মানুষের জন্য উপকারও আছে, কিন্তু উপকারের চেয়ে ওদের দোষই বেশি।’(২: ২১৯)। পরবর্তীতে সুরা নিসার এই আয়াত যা মদিনায় একজন লোক মাতাল অবস্থায় নামাজে হাজির হলে আয়াতটি নাজিল হয়েছিল; হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছে যেয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা কী বলছ তা বুঝতে পার…। (৪: ৪৩)। সবশেষে সুরা মায়িদার দুটি আয়াতে এই নিষেধাজ্ঞা চিরস্থায়ী রূপ লাভ করে হে বিশ্বাসিগণ মদ, জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্যপরীক্ষার তীর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন করো যাতে তোমরা সফল হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়ার দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে এবং আল্লাহর ধ্যানে ও নামাজে তোমাদেরকে বাধা দিতে চায়! তা হলে তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না?’(৫৯০-৯১)। সুরা বাকারার ২১৯ নম্বর আয়াত এবং সুরা মায়িদার ৯০ নম্বর আয়াতের উভয়টিতেই মদ্যপানকে জুয়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে এবং শেষ আয়াতে মূর্তিপূজা এবং তীরের মাধ্যমে ভাগ্যপরীক্ষা করাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে; যেগুলো ইসলাম-পূর্ব আরবে পৌত্তলিকরা সাহায্য লাভের আশায় করত। সুরা মায়িদার ৯১ নম্বর আয়াতে মদ ও জুয়াকে এগুলোর বিষয়গত কারণে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল একটি বিশ্রী ঘটনা ঘটার পর। এই আয়াতের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী মদ্যপান ও জুয়া খেলা আরবদের মধ্যে অশান্তি এবং বিশৃংখলা সৃষ্টি করেছে।

বহুগামিতা, বিবাহবিচ্ছেদ, ব্যভিচার, অবৈধযৌনসম্পর্ক, পায়ুসঙ্গম এবং আরও অনেক বিষয়ে কোরআনের প্রত্যাদেশগুলো রচিত হয়েছে মূলত ইহুদি-আইনের সংশোধিত রূপ হিসেবে এবং আরবে প্রচলিত পূর্ববর্তী প্রথাগুলোর অনুসরণে। অলৌকিকতা আসলে শতাব্দীকাল ধরে ধোঁয়াশার জালে ঘেরা নয় এবং একমাত্র দুর্বল চিত্তের নিকট গ্রহণীয় সংস্কার নয়। বরং এটি জীবন্ত এবং অর্থবহ বিষয়। কোরআনের বাগিতা কিংবা এর নৈতিক এবং আইনি-দৃষ্টিভঙ্গির কোনোটিই অলৌকিক নয়। একজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত এবং দরিদ্র ব্যক্তি মুহাম্মদ প্রায় একা নিজ জাতির তীব্র বাধা অতিক্রম করে একটি স্থায়ী ধর্ম প্রতিষ্ঠায় সফলকাম হয়েছেন। গোত্র-প্রথায় বিভক্ত বিচ্ছিন্ন জাতিগুলোকে একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে পেরেছেন। এর ফলে বেপরোয়া মানুষগুলোকে অনুগত লোকে পরিণত করে নবি নিজস্ব ইচ্ছায় চালিত করতে পেরেছেন।

নবি কোরআনকে নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেছেন এবং একে নিজের নবুওতির প্রত্যয়নপত্র রূপে দাবি করেছেন। তাঁর মতে কোরআন আল্লাহর প্রেরিত বাণী এবং জনতার কাছে বার্তা প্রেরণের মাধ্যম হচ্ছেন মুহাম্মদ। আরবি ওহি শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রত্যাদেশ কিংবা উন্মোচিত করা; কোরআনে এটি ষাটবার ব্যবহৃত হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা একজন ব্যক্তির মনে কোনো কিছু ঢুকিয়ে দেয়ার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এটি আবার দ্রুত সঞ্চারণশীল ইঙ্গিতার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এ-কারণে প্রতিটি প্রত্যাদেশের পর নবি উদ্বিগ্ন থাকতেন যাতে একজন হস্তলিপিকর তা তৎক্ষণাৎ লিখে ফেলেন। নবির এই তাড়াহুড়া করার প্রবণতার প্রমাণ কোরআনে

পাওয়া যায়। যেমন সুরা তাহায় বর্ণিত হয়েছে: তোমার ওপর আল্লাহর প্রত্যাদেশ সম্পূর্ণ হওয়ার পূর্বে কোরআন পড়তে তুমি তাড়াতাড়ি করো না আর বলো, হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দাও। (২০: ১১৪)। এবং সুরা কিয়ামায় বর্ণিত হয়েছে: “এ (প্রত্যাদেশ) তাড়াতাড়ি (আয়ত্ত) করার জন্য তুমি এর সঙ্গে তোমার জিব নেড়ো না। এ-সংরক্ষণ ও আবৃত্তি করানোর (ভার) আমারই। সুতরাং যখন আমি পড়ি তুমি সেই পাঠের অনুসরণ করো। তারপর এর বিশদ ব্যাখ্যার (দায়িত্ব) আমারই। (৭৫: ১৬-১৯) |

নবি মুহাম্মদের এই তাড়াহুড়া করার প্রবণতা থেকে ‘ওহি নাজিলের সময় তাঁর মানসিক অবস্থার পরোক্ষ-পরিচয় পাওয়া যায়। তার অন্তরাত্মা সেই সময় যে আলোয় আলোকিত হত, তা কোনো স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা ছিল না। আবু সাইদ আল-কাদরি (মৃত্যু হিজরি ২৬১ হিজরি বা ৮৭৫ খ্রিস্টাব্দ) মদিনাবাসী সাহাবি। তিনি প্রচুরসংখ্যক হাদিসের বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর মতে, নিবি মুহাম্মদ অনুরোধ করেছেন, কোরআন ব্যতীত আমার অন্য কোনো ভাষ্য লিখে রেখ না! কেউ যদি কোরআন ছাড়া আমার কোনো ভাষ্য লিখে রাখে, তাহলে সে যেন সে-গুলো মুছে ফেলে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ওহি নাজিলের সময়ে নবি মুহাম্মদ অসংলগ্ন হয়ে পড়তেন। সম্ভবত একটি তীব্র আভ্যন্তরীণ প্রচেষ্টার প্রয়োজন হতো। সহি বুখারির একটি হাদিস রয়েছে,

নবির স্ত্রী আয়েশা থেকে বর্ণিত: হারেস বিন হিশাম একবার নবিকে প্রশ্ন করেছিলেন, (ওহি নাজিল হওয়ার) এই অনুভূতিগুলো কেমন?” নবি জবাব দিলেন, “সবচাইতে তীব্র হলো ঘণ্টাধ্বনির মতো যেগুলো বন্ধ হবার পরেও আমার মনে বেজে যায়। কোনো কোনো সময় একজন ফেরেশতা মনুষ্যরূপে আবির্ভূত হন এবং আমি বিষয়টি অনুধাবন করা মাত্র তিনি অদৃশ্য হয়ে যান।

বিবি আয়েশার বক্তব্য অনুযায়ী, ‘ওহি লাভের সময় নবির ভ্রন্থেকে ঘাম নির্গত হতো, এমনকি শীতের দিনেও আয়েশার বক্তব্যের সমর্থনে বুখারি, সাফওয়ান বিন বালির (মক্কা বিজয়ের পর তাঁর পিতা ইসলাম গ্রহণ করেন) প্রসঙ্গ উপস্থাপন করে বলেন: ওহি নাজিলের সময়কালে বালি মুহাম্মদকে পর্যবেক্ষণ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। একদিন একজন ব্যক্তি সুগন্ধি-মাখা একটি আলখাল্লা পরে এসে নবির কাছে জানতে চাইল সে এই কাপড় পরে ওমরা পালনকালে উৎসর্গের ভাবাবস্থা অর্জন করতে পারবে কিনা। মুহাম্মদের উপর তখন ওহি নাজিল হয়। হজরত ওমর বালিকে সামনে আসার সংকেত দিলেন। বালি ভেতরে প্রবেশ করে দেখলেন নবি প্রায় ঘুমন্ত অবস্থায় রয়েছেন, তিনি নাক ডাকছিলেন এবং তাঁর ওপর আল্লাহ-প্রদত্ত গায়ের রঙ ঠিকরে পড়ছিল। কিছুক্ষণ পর নবি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসলেন এবং প্রশ্নকারীকে আহ্বান করলেন। নবি তাঁকে বললেন, সে যেন প্রথমে ওই আলখাল্লাটি পরিষ্কার পানি দিয়ে তিনবার ধুয়ে একে সুগন্ধিমুক্ত করে এবং তারপর হজের বিধানের মতোই নিজেকে ওমরা পালনে উৎসর্গ করে।’

মুহাম্মদের মানবিকতা

নিবিরা আর দশজনের মতোই সাধারণ মানুষ ছিলেন। তবে তাঁদের উপস্থিতির জন্য তোমার এলাকায় পরশমণি বর্ষিত হয়েছে। – জালালুদ্দিন রুমি (১২০৭-১২৭৩ খ্রিস্টাব্দ)(৩৫)

প্রাথমিক যুগের অধিকাংশ ইসলাম-বিশেষজ্ঞ স্বীকার করেছেন আধ্যাত্মিক স্বতন্ত্রতা ব্যতীত নবি মুহাম্মদ আসলেই একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন। এই সত্যটি কোরআনের সুরা কাহাফে রয়েছে: ‘বলো, আমি তোমাদের মতোই একজন মানুষ; আমার ওপর প্রত্যাদেশ হয় যে আল্লাহই তোমাদের একমাত্র উপাস্য।’ (১৮: ১১০)। সুন্নি বিশেষজ্ঞদের অনেকে মুহাম্মদকে পরিপূর্ণ জ্ঞান এবং দোষক্রটির ঊর্ধ্বে বিবেচনা করেননি। তারা নবির নবুওতিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ উপহার হিসেবে দেখতেন। তাঁরা মনে করতেন আল্লাহ নবির দায়িত্ব পালনের জন্য এমন একজন মানুষকে নির্বাচন করেন যার জ্ঞান, দূরদৃষ্টি এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের মানবীয় গুণাবলী রয়েছে কিংবা যাকে মানুষের দিক-নির্দেশের দায়িত্ব অর্পণকালে এসব অনন্য গুণাবলী উপহার দেয়া হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমরা একজন মানুষের ওপর তখনই নবুওতির বিশ্বাস করি যখন আমরা তাঁকে স্রষ্টার বার্তাবাহক হিসেবে মনে করি। ওই বিশেষজ্ঞরা এমন কোনো যুক্তি দেখাননি যাতে মনে হয়, আমরা একজন মানুষকে বিশ্বাস করি কারণ স্রষ্টা তাঁকে আমাদের থেকে অধিকতর জ্ঞান এবং নৈতিক গুণাবলী দিয়ে পাঠিয়েছেন। তাদের এই মতামত কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যেমন সুরা শুরার এই আয়াত: ‘এভাবে আমি আমার আদেশত্রুমে তোমার কাছে এক আত্মা (ফেরেশতা) প্রেরণ করেছি যখন তুমি জানতে না কিতাব কী, বিশ্বাস কী। কিন্তু আমি একে করেছি আলো যা দিয়ে আমি আমার দাসদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথনির্দেশ করি; তুমি তো কেবল সরল পথই প্রদর্শন কর।’ (৪২: ৫২)। এই একই বিষয় পূর্ববর্তী আয়াতেও আলোচিত হয়েছে। এবং সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে এবং সুস্পষ্টরূপে আলোচিত হয়েছে সুরা আন’আমে, যেখানে মুহাম্মদকে অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য লোকেদের জবাব দেওয়া হয়েছে; বলো, আমি তোমাদেরকে বলি না যে আমার কাছে আল্লাহর ধনভাণ্ডার আছে। অদৃশ্য সম্পর্কেও আমি জানি না। তোমাদের এ-ও বলি না যে আমি ফেরেশতা। আমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ হয় আমি শুধু তা-ই অনুসরণ করি। বলো, “অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান? তোমরা কি চিন্তাভাবনা কর না? (৬: ৫০)। সুরা আ’রাফে মুহাম্মদকে এই বলে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে: ‘বলো, আল্লাহর ইচ্ছা আমার নিজের ভালোমন্দের ওপরও আমার কোনো অধিকার নেই। আমি যদি অদৃশ্যের খবর জানতাম তবে তো আমার অনেক ভালো হতো আর মন্দ কোনোকিছু আমাকে স্পর্শ করত না। আমি তো বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা মাত্র। (৭: ১৮৮)। সুরা আ’রাফের আয়াতটি হেজাজের পৌত্তলিকদের প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে। তাঁরা প্রশ্ন করেছিল, মুহাম্মদ যদি সত্যই অলৌকিক জগতের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন, তাহলে তিনি কেন ব্যবসায় নিয়োজিত হয়ে বিশাল মুনাফা অর্জন করছেন না।

এ-বিষয়ে কোরআনের আয়াত সুস্পষ্ট এবং পরিষ্কার। হাদিস ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য নবির জীবনবৃত্তান্ত প্রমাণ করে মুহাম্মদ কখনোই নিজেকে দোষত্রটির ঊর্ধ্বে এবং গায়েবি বিষয় নিয়ে জ্ঞান আছে, এমন দাবি করেননি। একটি নির্ভরযোগ্য হাদিস অনুযায়ী, ‘তিনি একবার পৌত্তলিকদের অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নবাণে বিব্রত হয়ে বলেছিলেন, তারা আমার কাছে কি চায়? আমি আল্লাহর এক বান্দা। আল্লাহ আমাকে যা শেখান তাই আমি জানি।’ মুহাম্মদের সত্যবাদিতা এবং সততাকে প্রশংসা করা হয়েছে সুরা আবাসার ১-১১ নম্বর আয়াতে যেখানে তার প্রতি সুস্পষ্ট একটি দৈব-তিরস্কার রয়েছে:

সে (মুহাম্মদ) ব্রুকুচকে মুখ ফিরিয়ে নিল
কারণ তার কাছে এক অন্ধ এসেছিল।
তুমি ওর সম্বন্ধে কী জান?
সে হয়তো পরিশুদ্ধ হ’ ত
ব? উপদেশ নিত ও উপদেশ থেকে উপকার পেত?
য়ে নিজেকে বড় ভাবে
বরং তার প্রতি তোমার মনোয়োগ!
যদি সে নিজেকে পরিশুদ্ধ না করে, তবে তাতে তোমার কোনো দোষ হতো না!
অথচ যে কিনা তোমার কাছে ছুটে এল
আর এাল ভয়ে-ভয়ে
তাকে তুমি অবজ্ঞা করলে!
কক্ষনে (তুমি এমন করবে না, এ এক উপদেশবাণী (৮০: ১-১১)।

নবি মুহাম্মদ কিছু ধনী এবং প্রভাবশালী লোককে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে সৎপন্থা অবলম্বন করেছিলেন। এটা সমর্থনযোগ্য একটি উদ্যোগ। কারণ পৌত্তলিকরা প্রশ্ন তুলেছিল; দু-দলের মধ্যে কোনটি মর্যাদায় শ্রেয় আর সমাজ হিসেবে কোনটা উত্তম। (১৯৭৩)। যে কোনো অবস্থাতে গণ্যমান্যদের সমর্থন অর্জন করা মুহাম্মদের জন্য খুবই স্বাভাবিক। একদিন তিনি যখন হেজাজের একজন প্রভাবশালী লোকের সাথে কথা বলছিলেন এবং তাঁকে ইসলামে বিশ্বাস করানোর জন্য একাগ্রতায় নিমজ্জিত ছিলেন, তখন আব্দুল্লাহ বিন ওম মাকতুম নামের একজন সদ্য ইসলাম-গ্রহণকারী অন্ধব্যক্তি মুহাম্মদকে জিজ্ঞেস করলেন: ‘আল্লাহ আপনাকে যা কিছু শিখিয়েছেন তার কিছুটা আমাকেও শেখান। নবি ওই অন্ধব্যক্তির কথায় কর্ণপাত না করে বাড়ি চলে গেলেন। এরপরই এই মহৎ সুরা আবাসার আয়াতগুলো নাজিল হয়, যেখানে নবিকে পরিষ্কারভাবেই তিরষ্কার করা হয়েছে। পরবর্তীতে যখনই আব্দুল্লাহ বিন ওম মাকতুমের সাথে নবির দেখা হত, তিনি তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতেন। সুরা মুমিনের একটি আয়াতে নবিকে ধৈর্যশীল হতে বলা হয়েছে; অতএব তুমি ধৈর্য ধরো, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। তুমি তোমার পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা ও সকাল-সন্ধ্যায় তোমার প্রতিপালকের পবিত্র মহিমা ঘোষণা করো। (৪০: ৫৫)। এই আয়াতে নবির চরিত্রে দোষ দেখিয়ে তাঁকে নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং মুহাম্মদের কোনো দোষত্রুটি নেই বলে পরবর্তীকালের মুসলমানদের মনে যে গভীর অন্ধবিশ্বাস জন্ম নিয়েছে তা কোরআনের এই ভায্যের বিরোধী।

একই বিষয়টি সুরা ইনশিরাহ এর প্রথম তিন আয়াতে ভিন্নভাবে ফুটে ওঠেছে; আমি কি তোমার বক্ষ উন্মুক্ত করিনি? আমি হালকা করেছি তোমার ভার, যা ছিল তোমার জন্য খুব কষ্টকর।’ (৯৪: ১-৩)। আরবি কোরআনে ব্যবহৃত ‘ওয়েজরশব্দটি (বাংলা অর্থ ‘ভার বা বোঝা) সূরা ফাতহ এর প্রথম দুটি আয়াতে ধানব শব্দ (বাংলা অর্থ ‘পাপ) দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে: আল্লাহ তোমার জন্য সুস্পষ্ট বিজয় অবধারিত করেছেন। এ এজন্য যে, তিনি তোমার অতীত ও ভবিষ্যতের ক্রটিগুলো মাফ করবেন, তোমার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন এবং তোমাকে সরল পথে পরিচালিত করবেন। (৪৮: ১-২)। অতএব কোরআনের এই স্পষ্টভাবে বর্ণিত এবং অপরিবর্তনযোগ্য আয়াতগুলো প্রমাণ করে, নবি মুহাম্মদ যাকে পরবর্তীতে মুসলমানরা সকল দোষক্রটির ঊর্ধ্বে এবং অলৌকিক ব্যক্তিত্বের মর্যাদা দিয়েছিলেন, তিনি কিন্তু নিজেকে মোটেও সেরকম মনে করতেন না এবং কোরআনেও সেভাবে ফুটে ওঠেনি। যৌক্তিক চিন্তা এবং জ্ঞানচর্চায় আগ্রহী যে কারো কাছে মুহাম্মদের এই আধ্যাত্মিক উৎকৃষ্টতা এবং সততা আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়।

ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাস, সামাজিক প্রথাসমূহ যেগুলো গণিতশাস্ত্রের নিশ্চয়তা এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রায়োগিক প্রমাণের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়, সে-সব বিষয়ে মানুষ নিজের যুক্তির কর্মদক্ষতা দেখাতে সবসময়ই অনিচ্ছা পোষণ করে এসেছে। পক্ষান্তরে তারা প্রথমেই বিশ্বাস অর্জন করেছে এবং নিজেদের বিশ্বাসের পক্ষের বক্তব্য দিয়ে মস্তিষ্ক পূর্ণ করেছে। স্বীকার করতে হবে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মতো ইসলামের ওলামারাও এই বৈশিষ্ট্যের বাইরে নন। নবি মুহাম্মদ সকল দোষত্রটির ঊর্ধ্বে-নিজেদের এই বিশ্বাসের প্রতি অন্ধ হয়ে এবং তা প্রমাণের আশায় তারা কোরআনের স্পষ্ট আয়াতগুলো পর্যন্ত ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।

নবি মুহাম্মদের মানবীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনায় এ-প্রসঙ্গে একটি গল্পের কথা মনে পড়ে যায়। ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমের রাজ্য খোজেস্তানের সুস্তান শহরে একজন খ্যাতিমান সুফি সাধক ছিলেন, তাঁর নাম শাহ আল-তুস্তারি (৮১৮-৮৯৬ খ্রিস্টাব্দ)। একদিন এই সাধকের কাছে তাঁর অনুসারীগণ গিয়ে বললেন, লোকজন বলাবলি করছে, আপনি নাকি পানির উপর দিয়ে হাঁটতে পারেন। আল-তুস্তারি বললেন, ‘মুয়াজ্জিনকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো, তিনি একজন সৎ ব্যক্তি। অনুসারীগণ মুয়াজ্জিনকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে জবাব দিলেন: ‘আমি এ-বিষয়ে কিছু জানি না। তাঁকে কখনো আমি পানির উপর দিয়ে হাঁটতে দেখিনি। তবে আমার মনে আছে তিনি একদিন পুণ্যস্নানের জন্য সাঁকোর উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি পা পিছলে পানিতে পড়ে যান। ডুবেও যেতেন, যদি না আমি তাঁকে টেনে তুলতাম। এ-ঘটনার একটি দিক যা কোনো নিরপেক্ষ সত্যসন্ধানী অস্বীকার করতে পারবেন না তা হলো, প্রমাণের প্রাচুর্য।

হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত ইসলাম-বিশেষজ্ঞ ইজহাক গোল্ডজিহার” মনে করেন হাদিসের সংকলন এবং মুহাম্মদের প্রথম দিককার জীবনীকারকগণ ইসলামের প্রতিষ্ঠাতাকে যেভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে এবং স্বচ্ছতার সাথে চিত্রায়িত করেছেন তা বিশ্বের অন্যান্য ধর্মের ঐতিহাসিক নথিপত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না; এবং কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই এগুলো মুহাম্মদকে মানবীয় নৈতিক, ভালোমন্দ, দোষ-গুণের অধিকারী হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছে।

এই তথ্যগুলো উপস্থাপনের মাধ্যমে নবি মুহাম্মদকে অলৌকিক ক্ষমতাধর অতিমানব বানাবার কোনো চেষ্টা করা হয়নি। বরং দেখানো হয়েছে তিনি তাঁর সাহাবি এবং সহযোগীদের নিয়ে একটি সমতাস্থলে অবস্থান করতেন। তাৎক্ষণিক উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ৫ম হিজরিতে (৬২৭ খ্রিস্টাব্দ) মদিনায় পরিখার যুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষের আর সবার মতো নবিও একইভাবে খননকাজ করেন। প্রচলিত আছে জীবনের প্রশান্তি সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, “আমি পৃথিবীতে তিনটি জিনিস পছন্দ করি: সুগন্ধি, নারী এবং সবার উপরে নামাজ। মুহাম্মদের জীবনাচরণে কঠোর এবং বিশ্বজনীন নয় এমন বিষয়াবলী খুব কমই খুঁজে পাওয়া যায়। নবিকে মানবীয় সীমাবদ্ধতার বাইরে রাখার চেষ্টা কোরআন, হাদিস এবং নবির জীবন চরিতের সাথে মোটেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। নবি মারা যাবার পর থেকে এই প্রচেষ্টা শুরু হয়। তাঁর মৃত্যুর একদিন পর হজরত ওমর (অথবা অন্য কোনো শীর্ষস্থানীয় সাহাবি) খোলা তরবারি নিয়ে হুমকি দিলেন, মুহাম্মদের মৃত্যুখবর যে প্রচার করবে, তিনি তার গলা কেটে ফেলবেন। তখন হজরত আবু বকর কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে প্রতিবাদ করলেন: তোমার মৃত্যু হবে, এবং তাদেরও। (সুরা জুমার; আয়াত ৩০)। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য ওমর নয়, আবু বকরই সঠিক ছিলেন। হিজরি ১১ সালে (৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) মুহাম্মদের মৃত্যুর পর মদিনা থেকে যত সময় এবং স্থানের দূরত্ব বাড়তে থাকল মুসলমানরাও তাদের কল্পনাগুলোকে ততটাই প্রসারিত করতে লাগলেন।

মুসলমানরা অতিরঞ্জন আর কাব্যিকতাকে এতোটাই প্রসারিত করলেন যে দুটি প্রধান ভিত্তিমূল, যেগুলো প্রতিদিনের পাঁচবার নামাজের সময় বলা হয় এবং কোরআনের বিভিন্ন আয়াতেও উদ্ধৃত আছে, সেগুলো তাঁরা ভুলে গেলেন: মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা এবং বার্তাবাহক। তাঁরা মুহাম্মদকে সৃষ্টির আদি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করলেন এই বলে যে: আপনি না থাকলে এই মহাবিশ্ব তৈরি হতো না। পারস্যের সুফিবাদী শায়েখ নজম আল-দিন দায়া রাজি (মৃত্যু হিজরি ৬৫৪ বা ১২৫৬ খ্রিস্টাব্দ) নামের গভীর বিশ্বাসী লেখক তাঁর “মেরসাদ আল-ইবাদ’ বইয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছেন: ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালা, যিনি শুধুমাত্র হওউচ্চারণ করেই সবকিছু সৃষ্টি করতে পারতেন, সেই আল্লাহই সর্বপ্রথম মুহাম্মদকে আলো হিসেবে তৈরি করেছিলেন এবং মুহাম্মদ যখন আলোর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন তখন সেই আলো লজ্জায় ঘামতে শুরু করল এবং সেই ঘামের ফোঁটা দিয়ে আল্লাহতায়ালা অন্য নবি ও ফেরেশতাদের আত্মা তৈরি করলেন।’

মুহাম্মদের আধুনিক জীবনীকারক মিশরীয় বংশোদ্ভুত মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ওস-সামান লিখেছেন: মুহাম্মদ আসলেই অন্যান্য নবির মতোই মানুষ ছিলেন। তাঁর জন্ম, মৃত্যু আর সকল মানুষের মতোই হয়েছিল। মুহাম্মদের নবুওতি তাঁর মানুষ পরিচয়ের জন্য কখনো কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আর সকলের মতোই তিনিও রাগতেন, সন্তুষ্ট, বিমর্ষ এবং উল্লসিত হতেন। তিনি একবার আসওয়াদ ইবনে আব্দুল মোতালেব ইবনে আসাদের প্রতি এতোটাই ক্রোধান্বিত হয়েছিলেন যে, তাঁকে অভিশাপ দেন এই বলে‘আল্লাহ যেন তাঁকে অন্ধ করে দেন এবং তাঁর পুত্রকে পিতৃহারা করেন।

মুহাম্মদ ইজ্জত দারওয়াজা (১৮৮৮-১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দ) ফিলিস্তিনি রাজনীতিবিদ-ইতিহাসবিদ, তিনি নবি মুহাম্মদের ওপর একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বইয়ে কোরআনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন কোনো নিজস্ব বক্তব্য প্রদানে বিরত থেকেছেন। মুহাম্মদ এবং ইসলামের প্রতি তাঁর একনিষ্ঠতা এবং ভক্তির উজ্জ্বল প্রমাণ পাওয়া যায় দুই খণ্ডে রচিত এই বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠায়। তিনি পরিতাপের সাথে শেষ পর্যন্ত উপসংহারে পৌঁছেছেন যে, মধ্যযুগের বিশিষ্ট হাদিস-ভাষ্যকারক আল-কাসতালিনি” (জন্ম হিজরি ৮৫১ বা ১৪৪৮ খ্রিস্টাব্দ-মৃত্যু হিজরি ৯২৩ বা ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দ) ইসলামি গ্রন্থ রচনায় সম্পূর্ণ উচ্ছন্নে গিয়েছিলেন এবং নিজের মনগড়া কাহিনী একের পর এক আরোপণ করেছিলেন তাঁর গ্রন্থে যেগুলোর কোনো ভিত্তি দারওয়াজা নিজে কোরআন এবং বিশ্বাসযোগ্য হাদিস ও অন্যান্য তথ্যবিবরণে খুঁজে পাননি। কাসতালিনির মতো অন্ধবিশ্বাসীরা কোনো প্রমাণ ছাড়াই বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন কারণ নবি মুহাম্মদ যেন মানবজাতিতে জন্মগ্রহণ করতে পারেন; এবং এই কারণে মুহাম্মদ হলেন মানবজাতি সৃষ্টির প্রাধন কারণ। কাসতালিনি আরও মনে করতেন লওহ, কলম, আরশ বা সিংহাসন, কুরসি বা চেয়ার থেকে শুরু করে আকাশ, পৃথিবী, জিন, মানুষ, বেহেশত, দোজখ সবকিছুই নবি মুহাম্মদের নুর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তাঁরা সুরা আন’আমের এই আয়াতের বক্তব্য ভুলে গেলেন: রিসালাতের দায়িত্ব আল্লাহ কার ওপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভালো জানেন।’(৬: ১২৪)। একই সাথে তাঁরা ইসলামের মৌলিক মূলনীতিও ভুলে গেলেন, যেখানে বলা হয়েছে কেবল আল্লাহই অস্তিত্বশীল জগতের চূড়ান্ত কারণ।

ফিলিস্তিনি লেখক দারওয়াজা আরও লিখেছেন যে, কোরআনের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে সকল নবিকে মরণশীল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যাদেরকে আল্লাহ মানবজাতিকে দিক-নির্দেশনা দেবার জন্য পাঠিয়েছেন। সুরা আম্বিয়ার ৭-৮ আয়াতদ্বয়ে বলা হয়েছে: তোমার পূর্বে আমি প্রত্যাদেশ দিয়ে মানুষই পাঠিয়েছিলাম; তোমরা যদি না জান তবে উপদেশপ্রাপ্ত সম্প্রদায়দেরকে জিজ্ঞাসা করো। আর তাদেরকে এমন দেহবিশিষ্ট করিনি যে তাদের খাবার খেতে হতো না; তারা চিরস্থায়ীও ছিল না। (২১: ৭-৮)। অর্থাৎ আল্লাহর বাণী প্রচারের জন্য নির্বাচিত হওয়া ছাড়া মুহাম্মদ আর কোনো ক্ষেত্রেই মানবজাতির বাইরের কেউ নন। কোরআনে এই বক্তব্য বারবার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে যেগুলো ফিলিস্তিনি লেখক ইজ্জত দারওয়াজা তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন। প্রাসঙ্গিক আরও আয়াত আমরা এখানে উল্লেখ করতে পারি: বলো, আমার প্রতিপালকের পবিত্র মহিমা! আমি এক সুসংবাদদাতা রসুল ছাড়া আর কী? আল্লাহ কি মানুষকে রসুল করে পাঠিয়েছেন? ওদের এই কথাই লোকদেরকে বিশ্বাস করতে বাধা দেয় যখন ওদের কাছে পথের নির্দেশ। (১৭: ৯৩-৯৪)। ওরা বলে, এ কেমন রসুল যে খাবার খায় হাটে-বাজারে চলাফেরা করে! তার কাছে ফেরেশতা পাঠানো হয় না যে তার সঙ্গে থাকবে ও ভয় দেখাবে।’ (২৫৭)। প্রত্যাদেশের মাধ্যমে তোমার কাছে এ-কোরআন প্রেরণ করে আমি তোমার কাছে সবচেয়ে ভালো কাহিনী বর্ণনা করেছি, যদিও এর পূর্বে তুমি ছিলে অসতর্কদের অন্তর্ভুক্ত।’(১২: ৩)। আমি তোমার পূর্বেও কোনো মানুষকে অমরত্ব দান করিনি। সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে ওরা কি চিরকাল বেঁচে থাকবে? (২১: ৩৪)। মুহাম্মদ রসুল ছাড়া আর কিছুই নয়, তার পূর্বে বহু রসুল গত হয়েছে। (৩: ১৪৪)। যখন তুমি জানতে না কিতাব কী, বিশ্বাস কী। (৪২: ৫২)। বলো, আমি তো রসুলদের মধ্যে এমন নতুন কিছু নই। আর আমাকে ও তোমাদেরকে নিয়ে কী করা হবে আমি তা জানি না। আমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ হয় আমি তা-ই অনুসরণ করি। আমি এক স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র। (৪৬: ৯)।

নবি মুহাম্মদের মনুষ্যত্ব, তাঁর মানবীয় গুণাবলী এবং ক্রটির ইঙ্গিত ইসলামের ইতিহাসের অনেকগুলো সমর্থিত সূত্র থেকে পাওয়া যায়। হিজরি ৪ সালে মাওনার বানু আমির ও বানু সেলিম গোত্রের সাথে লড়াইয়ে নবির পক্ষের প্রায় ৭০জন সাহাবি নিহত হন। এ-ঘটনায় নবি অসম্ভব বেদনাত হয়ে পড়েন। তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, “হে আল্লাহ! মোদারদেরকে (উত্তর-আরবীয় গোত্রসমূহ) পদদলিত করুন। ৬২৫ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত ওহুদের যুদ্ধে নবি পরাজিত হন এবং সেই যুদ্ধে নবির চাচা হামজা বিন আব্দুল মোতালেব মারা যান। আবিসিনিয়া থেকে আগত এক ক্রীতদাস ওয়াশি ইবনে হার্ব কুরাইশদের পক্ষ হয়ে লড়াইয়ে হামজার নাক-কান কেটে ফেলেন এবং তরবারি দিয়ে পেট ফুটো করে দেন। কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা বদর যুদ্ধে নিহত তাঁর পিতা উতবা ইবনে রাবিয়া হত্যার প্রতিশোধ নিতে হামজার পাকস্থলি চিরে ফেলেন এবং মুখ দিয়ে রক্তমাখা যকৃত চুষেন। হামজার ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন দেহ দেখে নবি এতোটা রাগান্বিত হন যে, তিনি চিৎকার করে বলেন, আল্লাহর নামে শপথ নিয়ে বলছি, পঞ্চাশ জন কুরাইশকে আমি ছিন্নভিন্ন করে দেব। এ-রকম আরও অসংখ্য ঘটনাবলীর মাধ্যমে তৎকালীন আরবদের মনের নির্দয়তা ও প্রতিহিংসার পরিচয় মেলে। তৎকালীন সামাজিক পরিবেশ এমনই ছিল যে একজন অভিজাতবংশীয় নারী যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে মৃতব্যক্তির পাকস্থলী চিরে ফেলত এবং যকৃত চুষে ছুড়ে ফেলত। যুদ্ধের সময় হিন্দ বিনতে উতবাসহ আরও অনেক সন্ত্রান্ত কুরাইশ নারী মক্কার যোদ্ধাদের মাঝে গিয়ে মেয়েলি আকর্ষণ এবং বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদেরকে উৎসাহিত করতেন।

ইবনে হিশামের নবি মুহাম্মদের জীবনচরিত” থেকে জানা যায়, বাজিলা গোত্রের কিছু লোক মদিনায় এসে অসুস্থ হয়ে পড়লে মুহাম্মদের কাছে গিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করেন। মুহাম্মদ তাঁদেরকে বললেন, উটের দুধ পান করলে তাঁরা সুস্থ হয়ে যাবে। তিনি তাঁদেরকে মদিনার বাইরে অবস্থিত তাঁর পশুপাল রক্ষণাবেক্ষণকারীর নিকট পাঠালেন। উটের দুধ খাওয়ার পর তাঁরা সুস্থ হয়ে ওঠে কিন্তু কোনো কারণে তাঁরা নবির সেই পশু রক্ষণাবেক্ষণকারীকে হত্যা করে। তাঁরা ওই ব্যক্তির চোখে ফলক ঢুকিয়ে উটের সাথে বেঁধে ছেড়ে দেয়। মর্মান্তিক এই খবরটি শোনার পর নবি খুবই উত্তেজিত হয়ে উঠেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কর্জ ইবনে জাবেরকে প্রেরণ করেন তাঁদেরকে ধরে নিয়ে আসার জন্য। এরা ধরা পড়ার পর নবির নিকট নিয়ে আসা হলো। নবি তাঁদের হাত-পা কাটার জন্য এবং চোখ উপড়ে ফেলার নির্দেশ দিলে তা বাস্তবায়িত হয়।

বুখারি হাদিসে উল্লেখ আছে নবি বলেছিলেন, “আমি একজন মানুষ, আমি রাগ, দুঃখ, কষ্ট অনুভব করি। ঠিক যেমনি অন্য সব মানুষ রেগে যায়। অন্যান্য সূত্র থেকে এই হাদিসের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়। সাহাবি আবু রহম আল-গিফারি বলেছেন, একবার এক অভিযানে তিনি যখন নবির পাশে চলছিলেন, তখন তাঁর বাহক পশুটি আকস্মিকভাবে তাঁকে এমনভাবে নবির কাছাকাছি নিয়ে যায় যে, তাঁর প্রশস্ত পা নবির হাঁটুর নিচে আঘাত করে এবং নবি এতে মারাত্মক ব্যথা পান। নবি তখন রেগে গিয়ে আবু রহমকে নিজের চাবুক দিয়ে আঘাত করেন। আবু রহম খুবই বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন এই ঘটনায়, কারণ তিনি মনে করেছিলেন তাঁর এই অশোভন আচরণের জন্য তাঁর সম্পর্কে একটি আয়াত নাজিল হতে পারে। জীবনের শেষ দিনগুলোতে নবি সিরিয়া অভিযানকারী সৈন্যদলের নেতৃত্ব তরুণ বয়সী ওসামা বিন জায়েদকে প্রদান করেন। আবু বকরের মতো বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবি আছেন এমন একটি সৈন্যদলের দায়িত্ব একজন বিশ বছর বয়সী ব্যক্তিকে প্রদানের ফলে সৈন্যদলের মাঝে অসন্তোষ ও অসমতির ধ্বনি শোনা যেতে লাগল। অসন্তুষ্টির তালিকায় নবির কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সাহাবিও ছিলেন। অসন্তোষের কথা শুনে নবি প্রচণ্ড বিরক্ত হলেন, তিনি অসুস্থ অবস্থায় শয্যাত্যাগ করে মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করেন। তারপর ঘোষণামঞ্চে দাঁড়িয়ে রাগান্বিত অবস্থায় জিজ্ঞেস করলেন, “আমি ওসামাকে নিযুক্ত করায় কার কি অভিযোগ রয়েছে? নবির শেষ সময়ের অসুস্থতায় তাঁর একজন স্ত্রী মায়মুনা আবিসিনিয়ায় থাকাকালীন সময়ে শেখা জ্ঞান দিয়ে একটি ওষুধ তৈরি করেন। এ-ওষুধ অজ্ঞান থাকা অবস্থায় নবিকে খাওয়ানো হয়। তিনি হঠাৎ জেগে উঠেন এবং রাগান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘কে এই কাজটি করেছে? উপস্থিত সবাই জানালেন, মায়মুনা ওষুধটি তৈরি করেছেন এবং আপনার চাচা আব্বাসকে দিয়ে ওষুধটি খাওয়ানো হয়েছে? নবি তখন নির্দেশ দিলেন ওষুধটি আব্বাস ব্যতীত উপস্থিত সবাইকে খাওয়ানো হোক। রোজা রাখা সত্ত্বেও সে-সময় মায়মুনা ওষুধটি পান করেছিলেন।

নবুওতির ২৩ বছর ধরে মুহাম্মদের বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে মানসিক প্রতিক্রিয়া এবং মানবিক অনুভূতির প্রকাশ প্রচুর ঘটনার বিবরণ থেকে জানতে পারা যায়। বিশেষ করে মদিনায় ১০ বছর অবস্থানকালীন সময়ের ঘটনাবলী। আয়েশা সম্পর্কিত মিথ্যা কথা বলার ঘটনা, মারিয়াকে স্বীয় আরোপিত অবজ্ঞা, জয়নাবকে বিয়ে করার জন্য তাড়াহুড়ো করা এবং বিচ্ছেদের সময়সীমা অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে জয়নাবকে নিজের ঘরে নিয়ে আসা ইত্যাদি ঘটনার প্রেক্ষিতে মুহাম্মদের মানসিক অবস্থার পরিচয় পাওয়া যায়। এতোসব সাক্ষ্যপ্রমাণের উপস্থিতি এবং কোরআনে অসংখ্যবার মুহাম্মদকে কোনো প্রকার অলৌকিক ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি স্পষ্টভাবে বলার পরও তিনি মারা যাওয়ার সাথে সাথে অতিধার্মিক এবং অলৌকিকতায় বিশ্বাসীরা বলতে শুরু করলেন, নবি সব-ধরনের অলৌকিক এবং বিস্ময়কর কাজ করে গিয়েছেন। সময় ও স্থান যতোই প্রসারিত হতে লাগল ততোই কল্পকথার পরিধি বৃদ্ধি পেতে লাগল।

যদিও অনেক ইসলামি পণ্ডিত এই ধরনের কল্পকাহিনীকে অসম্ভব ও অযোগ্য বলে মনে করতেন। তার কিছু উদাহরণ এখানে উল্লেখ করা যায়। কাজি আয়াদ ইবনে মুসা (১০৮৩-১১৪৯ খ্রিস্টাব্দ) একজন আন্দালুসীয় বিচারক, ধর্মতাত্ত্বিক। তিনি নবি মুহাম্মদকে প্রশংসা করে কিতাব আস-শিফা বি তারিফ হোকুক আল-মুস্তফা নামে একটি বই রচনা করেছেন। প্রত্যাশার বিপরীতে বইটি মুহাম্মদের আধ্যাত্মিক, নৈতিক এবং রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি নিয়ে রচিত নয়। বইটি পড়ে পাঠক আশ্চর্যন্বনিত হয়েছেন এই ভেবে যে, লেখকের মতো একজন শিক্ষিত, সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং সম্ভবত নির্বোধ নন, এমন ব্যক্তি কিভাবে নবি মুহাম্মদ সম্পর্কে এ-রকম লেখার কথা চিন্তা করতে পারেন। নবি মুহাম্মদের দাস এবং প্রসিদ্ধ হাদিস বর্ণনাকারী আনাস বিন মালেকেকে(৩৯) উদ্ধৃত করে, কাজি আয়াদ তাঁর বইয়ে নবি মুহাম্মদকে অলৌকিক যৌনক্ষমতার অধিকারী বলে মন্তব্য করেছেন। নবি নাকি প্রত্যহ নিজের এগারো জন স্ত্রী’র সাথে দৈহিক মিলন করতে পারতেন। নবির যৌনক্ষমতাকে কাজি আয়াদ ত্রিশজন সাধারণ পুরুষের যৌনক্ষমতার সমতুল্য বলে অ্যাখ্যায়িত করেছেন। এমন কী, আনাসকে সাক্ষী করে কাজি আয়াদ তাঁর বইয়ে নবি মুহাম্মদের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করিয়েছেন: সাধারণ মানুষ থেকে চারটি ক্ষেত্রে আমি শ্রেষ্ঠ। এগুলো হচ্ছে উদারতা, সাহস, সঙ্গম এবং ঘন ঘন বালশ (আরবি এই শব্দের অর্থ শত্রু নিপাত করা)। এই বক্তব্যটি যদি আনাস বিন মালেকের মুখ থেকেও নিঃসৃত হয় তবু একজন কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি তা বিশ্বাস করতে পারেন না। সত্য ঘটনা হচ্ছে, ইসলাম ধর্মের নবি মুহাম্মদ কখনো আত্মপ্রচারে নিমগ্ন ছিলেন না। আর কোরআনে কোথাও মুহাম্মদের দয়ালু মনোভাব এবং সাহসের উল্লেখ নেই। শুধু সুরা কলমে উল্লেখ আছে: ‘তুমি অবশ্যই সুমহান চরিত্রের সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছ। (৬৮: ৪)।

যদি কাজি আয়াদ নিজের দানশীলতা এবং নিভীকতার জন্য আত্মপ্রচারণা করতেন তাহলেও তা বিচারযোগ্য ছিল। কিন্তু অপর ব্যক্তির মুখ দিয়ে এমন এক ব্যক্তিকে যৌন ক্ষমতা এবং মানুষ হত্যা নিয়ে গর্ব করানোর কোনো অধিকার কাজি সাহেবের নেই। বিশেষ করে এই ব্যক্তিটি নবি মুহাম্মদ, তিনি কখনো এ-ধরনের কথা বলেন নি। আসল কথা হচ্ছে, সত্যকে পাশ কাটিয়ে কাজি আয়াদ নিজস্ব যৌনবাসনার উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতে চেয়েছেন। নবিকে মানুষের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়ার অভিপ্রায় থেকে তিনি এতো দূর পর্যন্ত অগ্রসর হলেন যে, তিনি তাঁর বইয়ে নবির মলমূত্র ও থুথুকে দিয়েও কথা বলিয়েছেন। তিনি বইয়ে উল্লেখ করেছেন, কিছু ওলামার বক্তব্য অনুযায়ী, এগুলো নাকি সম্পূর্ণ পবিত্র। নিজস্ব কাণ্ডজ্ঞানহীনতাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে তিনি গল্প ফাঁদলেন, নবির ব্যক্তিগত এক দাসী উমে আয়মান একদা নবির মূত্র পান করে শোথরোগ (শরীরে পানি সঞ্চারের ফলে ফোলারোগ) থেকে আরোগ্য লাভ করেন। নবি নাকি ওই দাসীকে বলেছেন, তাঁর মূত্রপানের ফলে সে আর কোনোদিন পেটের পীড়ায় ভুগবে না। উদ্ভট আরেকটি বিষয় হচ্ছে কাজি আয়াদ তাঁর বইয়ে এও দাবি করেছেন, নবি যখন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ঘর থেকে বের হতেন তখন পাথর এবং গাছগাছালি তাঁর চারপাশে এসে বেড়া দিত, যাতে লোকচক্ষুর অন্তরালে গিয়ে প্রাকৃতিক কর্ম সারতে পারেন। একজন পাঠক এই ধরনের আজগুবি বক্তব্য পড়ে সহজেই বুঝতে পারবেন, মুহাম্মদকে মানুষের উপরে স্থান দিতে গিয়ে কাজি আয়াদ অন্ধবিশ্বাসে আপ্লুত হয়ে কতটুকু সীমা অতিক্রম করেছিলেন। কাজি সাহেবের এই ধরনের কষ্টকল্পনা রচনার চেয়ে তিনি বরং সহজে বলতেই পারতেন, নবি মুহাম্মদকে আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো খাওয়া-দাওয়া ও প্রাকৃতিক কর্ম করতে হতো না। তাহলে অন্তত তাঁকে হাঁটাচলা করা পাথর ও গাছগাছালির গল্প তৈরি করতে হতো না।

এ-ধরনের প্রলাপবাক্য শুধু কাজি আয়াদ একা উচ্চারণ করেননি। পূর্বে উল্লেখিত হাদিস-ভাষ্যকারক আল-কাসতালিনির মতো আরও ভজন খানেক লেখক রয়েছেন যারা শতাধিক অযৌক্তিক হাস্যকর কাহিনীর পুনরাবৃত্তি করেছেন, যার ফলে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে নবি মুহাম্মদকে অকারণেই স্বতন্ত্র সমালোচনা ও বিদ্রুপের সমুখীন হতে হয়। নবিকে দিয়ে এটাও বলানো হয়েছে যে, আদমকে সৃষ্টি করার সময় আল্লাহ আমাকে আদমের কোমরে স্থাপন করেছিলেন, পরবর্তীতে নুহ, ইব্রাহিমের কোমরেও আমাকে তিনি প্রতিস্থাপন করেন। মাতৃগর্ভ থেকে জন্মলাভের আগ পর্যন্ত আমি তাঁদের পবিত্র কোমর ও গর্ভে অবস্থান করেছি। তার মানে কি এই যে, প্রতিটি মানুষ ঝোপ ঝাড়ের ভেতর থেকে হঠাৎ করেই অস্তিত্বশীল হয়ে ওঠেছে। স্বাভাবিকভাবে মাতৃগর্ভ থেকে জন্মলাভের আগে যদি মানুষের অস্তিত্বশীল হবার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে এই ঝোপঝাড়ের যুক্তির মাঝেও কোনো অসংগতি থাকার কথা নয়।

কাজি আয়াদ আরও বলেছেন, নবি মুহাম্মদ যখন কোনো জায়গা দিয়ে অতিক্রম করে যেতেন, তখন সেখানকার পাথর, গাছগাছালি তাঁর কাছে হেঁটে চলে এসে বলত: হে আল্লাহর দূত আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। চলাচল করতে সক্ষম, কণ্ঠস্বর্যন্ত্র এবং জিহ্বাসম্পন্ন প্রাণীরাও যদি এসে একথা বলত তাহলেও একটা কথা ছিল। কিন্তু মস্তিক, স্নায়ু, দৃষ্টি ও ইচ্ছাশক্তিহীন অজৈব পদার্থ কিভাবে নবিকে চিনতে পারল! সম্ভাষণ জানানো তো দূরের কথা। কেউ কেউ বলবেন এটা সম্পূর্ণ অলৌকিক বিষয়। তাই যদি হয় তাহলে মুহাম্মদের বাণীকে বিশ্বাস করার শর্ত হিসেবে কুরাইশরা যখন অলৌকিক কার্যাবলী দেখানোর দাবি তুলেছিল, সে-সময় কেন তা প্রদর্শিত হয়নি? কুরাইশরা যে-ধরনের অলৌকিকতা দেখতে চেয়েছিল তা আহামরি কিছু নয়। তাঁরা দাবি করেছিল মুহাম্মদ যেন পাথর থেকে পানি নির্গত করেন কিংবা পাথরকে সোনায় পরিণত করেন। যদি পাথর মুহাম্মদকে সম্ভাষণ জানাতে পারে তবে ওহুদের যুদ্ধে একটি পাথর কিভাবে মুহাম্মদের শরীরে আঘাত করে তাঁকে আহত করল? অলৌকিকতার-পূজারীরা এই পাথরকে নাস্তিক’ বলে চিহ্নিত করবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই!

সুন্নি এবং শিয়া লেখকদের অসংখ্য বইয়ে বলা হয়েছে নবি মুহাম্মদের কোনো প্রতিবিম্ব ছিল না। তিনি সামনে-পিছনে সমানভাবে দেখতে পেতেন। শাহরানি’ (মৃত্যু হিজরি ৯৭২ বা ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ) তাঁর বই কাশফ আল-ঘোমায় লিখেছেন: নবি মুহাম্মদ চতুর্দিকে সমানভাবে দেখতে পেতেন এবং রাতের বেলাতেও তিনি দিনের মতো পরিষ্কার দেখতে পেতেন। তিনি যখন একজন লম্বা মানুষের সাথে হাটতেন, তখন তাঁকে লম্বা দেখাত এবং তিনি যখন বসতেন তখন তাঁর কাঁধ অন্যদের চেয়ে উঁচু থাকত।

এই ধরনের বক্তব্যপ্রদানকারী মুসলমান লেখকেরা আসলে মুহাম্মদের মহানুভবতা, নৈতিক ও চারিত্রিক গুণাবলী, দক্ষতা নির্ণয়ে একেবারেই অক্ষম। তাঁদের চিন্তাভাবনা পুরোপুরি সেকেলে। যে কারণে তাঁরা বাহ্যিক অবয়ব, শারীরিক সক্ষমতাকে কেবলমাত্র শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হিসেবে মনে করেছেন। একজন মানুষকে অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠতর করতে যে আধ্যাত্মিক, বৌদ্ধিক এবং নৈতিক সক্ষমতাই বিচার্য, এগুলি তাঁদের স্কুলচিন্তাধারায় স্থান পায়নি। শুধু তাই নয় তাঁদের মনে কখনো এই প্রশ্ন আসেনি কোনো অলৌকিক ঘটনা কেন মুহাম্মদকে তাঁর উদ্দেশ্য সাধনে সাহায্য করেনি। তারা এও প্রশ্ন তুলেননি, মুহাম্মদ কেন কথিত দাবি অনুযায়ী লিখতে-পড়তে পারতেন না? নবিকে প্রতিবিম্বহীন এবং মাথা ও কাঁধের দিক দিয়ে অন্যদের তুলনায় উচ্চতর করার হাত দিয়ে কোরআন লিখলেন না? সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এই অলৌকিকতা-সন্ধানকারীরা নিজেরা মুসলিম ছিলেন, তাঁরা কোরআন পড়েছেন এবং কোরআনের অর্থ বোঝার জন্য যথেষ্ট আরবি জানতেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা বিভ্রমের শিকার হয়ে সেগুলোকে ব্যাকুলভাবে “সত্য হিসেবে প্রচার করেছেন, যেগুলো কিনা সরাসরিভাবে কোরআনের বক্তব্যের পরিপন্থী।

কোরআনের যেসব আয়াত মুহাম্মদকে সকল মানবীয় গুণসম্পন্ন একজন মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করে সেইসব আয়াত নিখুঁতভাবে পরিষ্কার এবং এগুলোকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করার কোনো সুযোগ নেই। মক্কায় অবতীর্ণ সুরা তাহা এর ১৩১ নম্বর আয়াতে নবিকে বলা হয়েছে; আমি অবিশ্বাসীদের কাউকে-কাউকে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য হিসেবে ভোগবিলাসের যেউপকরণ দিয়েছি তার দিকে তুমি কখনও লক্ষ্য কোরো না। তোমার প্রতিপালকের দেয়া জীবনের উপকরণ আরও ভালো ও আরও স্থায়ী। (২০: ১৩১)। একইভাবে মক্কায় অবতীর্ণ সুরা হিজরে বলা হয়েছে: “আমি তাদের (অবিশ্বাসীদের) কতককে ভোগবিলাসের যে-উপকরণ দিয়েছি তার দিকে তুমি কখনও চোখ দিয়ো না। আর (ওরা বিশ্বাসী না হওয়ার জন্য) তুমি দুঃখ করো না। তুমি বিশ্বাসীদের প্রতি বিনয়ী হও। (১৫: ৮৮)। এই আয়াতগুলোর বক্তব্য থেকে এটা স্বাভাবিকভাবে বোঝা যায়, নবি মুহাম্মদের মনে কোনো ধরনের উচ্চাশা ভর করেছিল। হয়তো তিনি আশা করছিলেন কুরাইশ নেতাদের মতো তিনিও বিপুল ধনসম্পদ এবং পুত্রসন্তানের অধিকারী হবেন।

মুহাম্মদের বেশিরভাগ প্রতিপক্ষ ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন। ফলে স্বাভাবিকভাবে তাঁরা পরিবর্তনের বিরোধী ছিলেন এবং তাঁদের অবস্থানকে টলাতে সক্ষম যে কোনো ধরনের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে দাবিয়ে রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। একইভাবে বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর মুহাম্মদের অনুগামী হওয়াটা স্বাভাবিক ব্যাপার। তাঁদের মধ্যেও দাবি আদায় ও বৈষম্য দূরীকরণের জন্য আকাঙ্ক্ষা ছিল। এই পরিস্থিতিতে নবি বিমর্যবোধ করলেন এবং কিছু ধনাঢ্য ব্যক্তিকে পক্ষে টানার আশা করলেন। তাঁদের উপরেই ইসলামের ভবিষ্যত নির্ভর করছে বলে তিনি স্থির করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে এই পথে যেতে নিষেধ করলেন। সুরা সাবায় এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে: “যখনই আমি কোনো জনপদে সতর্ককারী প্রেরণ করেছি সেখানকার বিত্তশালী অধিবাসীরা বলেছে, “তুমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছ আমরা তা অবিশ্বাস করি। আর ওরা আরও বলত, আমাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি বেশি, সুতরাং আমাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে না। (৩৪: ৩৪-৩৫)।

সুরা আন’আমের ৫২ নম্বর আয়াতে নবিকে যেভাবে সম্বোধন করার হয়েছে তাতে একজন চিন্তাশীল পাঠক চমকিত না হয়ে পারেন না: যারা তাদের প্রতিপালককে সকালে ও সন্ধ্যায় তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্য ডাকে তাদেরকে তুমি তাড়িয়ে দিয়ো না। তাদের কর্মের জবাবদিহির দায়িত্ব তোমার নয়, আর তোমার কোনো কর্মের জবাবদিহির দায়িত্বও তাদের নয় যে তুমি তাদের তাড়িয়ে দেবে, তাড়িয়ে দিলে তুমি সীমালঙ্ঘনকারীদের শামিল হবে।’ (৬: ৫২)। এই আয়াতে পরোক্ষভাবে তিরষ্কারমূলক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে যা মুহাম্মদের মানবিক চরিত্র ও আচরণের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রমাণ। পৌত্তলিকরা বলে আসছিল যে তাঁরা মুহাম্মদের দলে যোগ দিবেন না। কারণ তাঁর অনুসারীদের কোনো গুরুত্ব নেই। এ-কারণে সম্ভবত তিনি সমাজের প্রভাবশালী ও ধনীদের দলে টানতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন এবং নিজের হতদরিদ্র অনুসারীদের দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন। এই অনুমানটি সুরা কাহাফের ২৭-২৮ আয়াতদ্বয় দ্বারা সমর্থিত হয়েছে: “তুমি তোমার কাছে তোমার প্রতিপালক যে-কিতাব পাঠিয়েছেন তার থেকে আবৃত্তি করো। তাঁর বাণী পরিবর্তন করার কেউ নেই। তুমি কখনোই তাঁকে ছাড়া অন্য কোনো আশ্রয় পাবে না। তুমি তাদের সঙ্গে থাকবে যারা সকালসন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে ডাকে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের আশায়, আর তাদের ওপর থেকে মুখ চোখ ফিরিয়ে নিয়ো না পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে। আর যার হৃদয়কে আমি অমনোযোগী করেছি আমাকে সরণ করার ব্যাপারে, যে তার খেয়ালখুশির অনুসরণ করে আর যার কাজকর্ম সীমা ছাড়িয়ে যায় তাকে তুমি অনুসরণ করো না। (১৮: ২৭-২৮)।

তফসির আল-জালালাইনের মতে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল সেই মুহুর্তে যখন ওয়ানা বিন হোসেন নামের একজন উপজাতীয় নেতা এবং তাঁর অনুসারীরা ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল -যতক্ষণ পর্যন্ত না মুহাম্মদ তাঁর সহায়-সম্বলহীন দরিদ্র অনুসারীদের ত্যাগ করছেন। নবির ভ্রান্তি এবং সর্বোপরি একজন স্বাভাবিক মানুষের মতো তাঁর আচরণের পরিচয় পাওয়া যায় সুরা বনি-ইসরাইলের ৭৩-৭৫ নম্বর আয়াতত্রয়ে। যদিও আয়াতগুলো ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়েছিল, তথাপি এগুলোর প্রত্যেকটির অর্থ একই: ‘আমি তোমার কাছে যে-প্রত্যাদেশ পাঠিয়েছি তার থেকে তোমার বিচ্যুতি ঘটানোর জন্য ওরা চেষ্টা করবে যাতে তুমি আমার সম্বন্ধে কিছু মিথ্যা কথা বানাও, তা হলে, ওরা অবশ্যই বন্ধু হিসেবে তোমাকে গ্রহণ করবে। আমি তোমাকে অবিচলিত না রাখলে তুমি ওদের দিকে প্রায় কিছুটা ঝুঁকেই পড়তে। তুমি ঝুঁকে পড়লে অবশ্যই আমি তোমাকে ইহজীবন ও পরবীজনে দ্বিগুণ শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাতাম, তখন আমার বিপক্ষে তোমাকে কেউ সাহায্য করত না।’ (১৭: ৭৩-৭৫)। কিছু তফসিরকারকের মতে এই আয়াতগুলো নাজিল হয়েছিল যখন মুহাম্মদ কয়েকজন কুরাইশ নেতার সাথে (প্রথম অধ্যায়ের নবুওতি অর্জনের পর অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য) আলোচনা করেছিলেন। সে সময় তিনি সুরা নজম উচ্চারণ করেছিলেন এবং স্বীয় বক্তব্যের জন্য পরবর্তীতে নিজে অনুশোচনা করেছিলেন: ‘এরাই হচ্ছে সেই উড়ন্ত সারস। তাই এদের মধ্যস্থতা আশা করা যেতে পারে। (স্যাটানিক ভার্সেস বা শয়তানের আয়াত নামে পরবর্তীতে প্রচারিত)।

আবু হুরায়রা(৪২) এবং কাতাদার(৪২) বক্তব্য অনুযায়ী এই তিনটি আয়াত মুহাম্মদ ও কুরাইশ নেতাদের মধ্যে আলোচনার পর নাজিল হয়েছিল যেখানে কুরাইশ নেতারা মুহাম্মদকে তাঁদের উপাস্য দেবতাদের সমান করতে কিংবা অন্তত অসমান না করার দাবি জানিয়েছিলেন। বিনিময়ে তাঁরা মুহাম্মদকে শান্তিতে বসবাসের আশ্বাস দিয়েছিলেন এবং তাঁর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনেও আগ্রহ জ্ঞাপন করেছিলেন। এছাড়া তাঁরা গরীব, গৃহহীন মুসলমানদেরকে নির্যাতন, প্রহার ও রৌদ্রতপ্ত পাথর নিক্ষেপ বন্ধেরও আশ্বাস দিয়েছিলেন। নবি স্বাভাবিকভাবে প্রথমে এই প্রস্তাবের প্রতি নমনীয়ভাব প্রদর্শন করেছিলেন। যদিও তা প্রয়োগের সময়ে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন। তিনি চিন্তা করে দেখলেন, পৌত্তলিকতা এবং মূর্তিপূজা বিলোপের কুরাইশদের প্রস্তাবিত মীমাংসায় পৌঁছালে তাঁর এতোদিনের ধর্মপ্রচারের ফলাফল বিলোপ হয়ে যাবে। হয়তো তাঁকে ওমরের মতো নিষ্ঠাপ্রাণ, মাথা নত না করা অসীম সাহসী আলি এবং হামজার মতো বিশ্বাসী যোদ্ধারা বুঝিয়েছেন, যেকোনো প্রকার আপোস গুরুতর ভুল কিংবা পরাজয়ে রূপ নেবে। যেকোনো পরিস্থিতিতেই হোক, এই তিনটি আয়াত প্রমাণ করে নবি মুহাম্মদের চরিত্রে আবেগময়তা এবং প্রলুব্ধ হবার মতো মানবীয় গুণাবলী বিদ্যমান ছিল।

কোরআনের অন্য আয়াত থেকেও এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। সুরা ইউনুসের ৯৪-৯৫ আয়াতদ্বয়ে বলা হয়েছে: ‘আমি তোমার কাছে যা অবতীর্ণ করেছি তাতে যদি সন্দেহ হয় তবে তোমার আগের কিতাব যারা পড়ে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করো। তোমার প্রতিপালকের নিকট থেকে তোমার কাছে সত্য এসেছে। তুমি কখনও সন্দিহানদের শামিল হয়ো না। আর যারা আল্লাহর নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করেছে তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না; হলে, তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন হবে। (১০: ৯৪-৯৫)। একইভাবে সুরা মায়িদাতে বলা হয়েছে: হে রসুল! তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমার ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রচার করো, যদি না কর তবে তো তুমি তাঁর বার্তা প্রচার করলে না। আল্লাহ তোমাকে মানুষ থেকে রক্ষা করবেন। আল্লাহ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। (৫৬৭)। একজন বিশ্বাসী মুসলমান, যিনি কোরআনকে আল্লাহর বাণী হিসেবেই গ্রহণ করেছেন, তিনি এই আয়াতগুলো কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? নবিকে এভাবে ভৎসনা করার মানে কি?

নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এর একমাত্র ব্যাখ্যা হচ্ছে মানবিক দুর্বলতা এবং নৈতিক ক্রটি নবির শুভসত্তাকে গ্রাস করতে শুরু করেছিল। তিনি মানুষকে ভয় করতে শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে আল্লাহ তাঁকে অভয় দিলেন -যেকোনো প্রকার নিষ্পেষণ থেকে তিনি তাকে রক্ষা করবেন। কুরাইশ নেতা ওয়ালিদ বিন আল-মুগিরা, আলাস বিন ওয়ায়েল, আদি বিন কায়েস, আসওয়াদ বিন আব্দুল মোতালেব এবং আসওয়াদ বিন আবদে ইয়াগুস প্রমুখ মুহাম্মদের চরিত্র ও ধর্মপ্রচারকে ব্যঙ্গ করে গভীর কষ্ট দিয়েছিলেন। হয়তো তিনি বিরক্ত হয়ে ধর্মপ্রচার নিয়ে অনুতপ্ত হতে শুরু করেছিলেন কিংবা হয়তো মানুষকে তাদের মতো চলতে দিয়ে নিজের ধর্মপ্রচারকার্য পরিত্যাগ করার চিন্তাভাবনাও শুরু করেছিলেন। তা না-হলে সুরা হিজরের ৯৪-৯৫ নম্বর আয়াতদ্বয় তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হতো না; অতএব তোমাকে যে বিষয়ে আদেশ করা হয়েছে তা প্রকাশ্যে প্রচার করো আর অংশীবাদীদেরকে উপেক্ষা করো। যারা বিদ্রুপ করে তাদের বিরুদ্ধে তোমার জন্য আমিই যথেষ্ট।’ (১৫: ৯৪-৯৫)। এই সুরার পরবর্তী তিন আয়াতও প্রস্তাবিত ব্যাখ্যা সমর্থন করে; আমি তো জানি ওরা যা বলে তাতে তোমার মন ছোট হয়ে যায়। তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসা করে তাঁর মহিমাকীর্তন করো আর সিজদাকারীদের শামিল হও। তোমার কাছে নিশ্চিত বিশ্বাস (মৃত্যু) আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের উপাসনা করো। (১৫৯৭-৯৯)। কোরআনের কয়েকজন তফসিরকারক সুরা হিজরের ৯৯ নম্বর আয়াতে ব্যবহৃত ইয়াকিন শব্দটি মৃত্যুর অনিবার্যতাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে বলে ধরে নিয়েছেন। মুহাম্মদকে নৈতিক ক্রটির ঊর্ধ্বে বিবেচনা করার কারণে তাঁরা নবির দুর্বলতাকে স্বীকার করতে কুষ্ঠাবোধ করেছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে কোরআনের ভাষ্যের বিপরীত ব্যাখ্যা প্রণয়ন করেছেন। সুরা হিজরের তিনটি আয়াতের অর্থ সুস্পষ্ট। মুহাম্মদ ব্যাপকভাবে নিরাশায় ভুগছিলেন। যে-কারণে তাঁর মাঝে দ্বিধাবোধ তৈরি হয়েছিল। এমন কী নিজের যোগ্যতা নিয়েও তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল। যদিও আল্লাহকে প্রার্থনা ও প্রশংসার মাধ্যমে শেষপর্যন্ত তাঁর মনে নিশ্চয়তা ফিরে এসেছিল, তিনি তাঁর গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন। সুরা আহজাবের প্রথম আয়াতে মুহাম্মদকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে: হে নবি! তুমি আল্লাহকে ভয় করো। এবং তুমি অবিশ্বাসী ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না। আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ, তত্ত্বজ্ঞানী। (৩৩: ১)। তফসির আল-জালালাইন গ্রন্থে এই আয়াতের প্রথম ক্রিয়াপদকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে ভয় করতে থাক’হিসেবে। আরেকটি তফসির অনুযায়ী যদিও উভয় আদেশই মুহাম্মদের উদ্দেশ্যে নাজিল হয়েছে, তারপরও তা মূলত সমগ্র মুসলিম জাতির জন্যই অবতীর্ণ হয়েছিল। এই তফসিরকারকদের মোহগ্রস্ততা তাদের সত্যতা থেকে অনেক বেশি। কারণ এই সুরার পরের আয়াতেই আল্লাহ মুহাম্মদকে বলেছেন; তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমার ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তুমি তার অনুসরণ করো।’(৩৩: ২)।

উপরোক্ত আয়াতগুলো সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করে নবি স্বাভাবিক ও মানবিকভাবে তাঁর হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন এবং প্রতিপক্ষের দাবি মেনে নিবেন কিনা ভেবে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলেন। আল্লাহ তাঁকে এ-কাজে কঠোরভাবে নিষেধ করেন। বিজ্ঞানসম্মতভাবে বলা যায়: বিরোধী পক্ষের তীব্র আপত্তি, প্রতিবাদ, প্রতিরোধের মুখে নবি যখন নিঃশেষিত হতোদ্যম হয়ে গিয়েছিলেন, তখন নিজেকে পুনরায় আল্লাহর প্রতি সমর্পণের মাধ্যমে ও নিজের অভ্যন্তরীণ ইচ্ছাশক্তিতে বলীয়ান হয়ে পুনরায় নিজ কক্ষপথে ফিরে আসেন।

এই ব্যাখ্যাকে যদি অস্বীকার করাও হয় তাহলে অবশিষ্ট একমাত্র ব্যাখ্যা থাকতে পারে তা হলো, নবি মক্কার প্রতিকূল পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য প্রতিপক্ষের দাবির সাথে আপোষ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আল্লাহ তাঁকে এ কাজে নিষেধ করেন। মুহাম্মদের রাজনৈতিক বিচক্ষণতার কথা বিবেচনায় নিলে এই ধারণা বিতর্কযুক্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু আমরা যদি নবির সত্যনিষ্ঠতা, একাগ্রতা এবং নৈতিক শক্তির কথা বিবেচনা করি তাহলে তা আদৌ সম্ভব নয়। মুহাম্মদ যা বলতেন তিনি তা বিশ্বাস করেই বলতেন এবং তিনি নিজেকে আল্লাহর প্রেরিত দূত বলেই বিশ্বাস করতেন।

এই অধ্যায়ের শেষে প্রাসঙ্গিক হওয়ায় ক্যামব্রিজ তফসির(৪৩) (কোরআনের একটি প্রাচীন ফার্সি ভাষ্য) থেকে একটি গল্প উল্লেখ করা যেতে পারে। এখান থেকে কোরআন নাজিল হওয়ার ঘটনাবলীকে কেন্দ্র করে ইসলামের প্রথম কয়েকশ বছরে মুসলমানদের চিন্তাভাবনার একটি বিশদ চিত্র পাওয়া যাবে। এই গল্পটি ওই তফসিরের (পৃষ্ঠা ২৯৫, ভলিউম ২, তেহরান সংস্করণ) রয়েছে এভাবে; সুরা নজম শুরু হয়েছে, শপথ অস্তমিত নক্ষত্রের শব্দগুলো দ্বারা। সুরা নজম পাঠ করার পর চাচা আবু লাহাবের ছেলে ওতাইবা নবিকে বললেন, তিনি কোরআনে বর্ণিত নক্ষত্রে বিশ্বাস করেন না। নবি বিরক্ত বোধ করে তাকে অভিশাপ দিলেন। আল্লাহর উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করে বললেন: “হে আল্লাহ! তোমার শিকারী কোনো পশু দ্বারা যেন সে পরাজিত হয়। ওতাইবা এ-কথা শোনার পর ভয় পেয়ে গেলেন। কিছুদিন পর ওতাইবা একটি মরুযাত্রীদলের সাথে ভ্রমণ করছিলেন। ওই দলটি হারানে পৌঁছে যাত্রাবিরতি করে। ওতাইবা নিজের বন্ধুদের মাঝে শুয়ে পড়েন। আল্লাহ একটি সিংহ পাঠালেন, ওতাইবাকে তাঁর বন্ধুদের মধ্য থেকে তুলে নিয়ে গেল এবং তাঁর দেহ ছিন্নভিন্ন করে দিলেও অভিশপ্ত দেহাবশেষ ভক্ষণ করল না। ফলে সকল মানুষ জেনে গেল সিংহটি তাঁকে আহারের জন্য ধরে নিয়ে যায়নি, বরং নবির প্রার্থনা পূর্ণ করতে গিয়েছে। এই গল্পের রচয়িতাদের মনে এই কথা একবারো আসেনি, ওতাইবাকে অভিশাপ দেবার পরিবর্তে নবি বরং তাঁকে ক্ষমা করে দেবার জন্য এবং তাঁকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে পারতেন। এতে বরং ইসলামের মহানুভবতা অনেক বেশি প্রচারিত হতো। ইসলাম কী পরম করুণাময়, দয়াময়, জগতের কর্তার প্রতি বিশ্বাস নয়?

হিজরতের পর মদিনাতে ইসলাম শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। একটি নতুন আইনি কাঠামো এবং আরব রাষ্ট্রের ভিত্তিতে পরিণত হয়। নবুওতির শেষ দশ বছরে মুহাম্মদ যখন মদিনায় অবস্থান করছিলেন তখন ইসলামের সকল আদেশ এবং বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। প্রথম পদক্ষেপটি ছিল প্রার্থনা বা কিবলার দিক জেরুজালেম থেকে মক্কার দিকে পরিবর্তন করা। এই ঘটনার ফল দাঁড়াল মুসলমানদের চেয়ে ইহুদিদের থেকে আলাদাভাবে কর আদায় করা হতে লাগল। আরেকটি ঘটনা ঘটল মদিনার আরবরা তাদের দীর্ঘদিনের হীনমন্যতা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় এবং আরব বেদুইনদের মধ্যে জাতীয়তাবোধেরও উন্মেষ ঘটে। কাবা ঘরকে যেসব গোত্র তাঁদের উপাস্য-দেবতার মন্দির হিসেবে ব্যবহার করত তা সকল আরবদের পূর্বপুরুষ ইব্রাহিম ও ইসমাইলের গৃহ হিসেবে পরিগণিত হয়। একইভাবে উপবাসের ক্ষেত্রেও ইহুদিদের অনুকরণ করা বর্জিত হল। ইহুদিরা মহরম মাসের দশম দিন উপবাস পালন করত, যা আরও কয়েকদিন বর্ধিত করা হলো। পরবর্তীতে পুরো রমজান মাসকেই উপবাসের জন্য বরাদ্দ দেয়া হলো।

তবে বিবাহ, বিচ্ছেদ, রজঃস্রাব, উত্তরাধিকার, বহুগামিতা, অবৈধ যৌনসংগম, পরকীয়া ও চুরির ক্ষেত্রে জরিমানা, প্রতিশোধ, রক্তের দামও অন্যান্য অপরাধ সম্পর্কিত বিষয়ে এবং নাগরিক বিষয়াদি যেমন অপরিচ্ছন্নতা, খাদ্যাভাসে নিষেধাজ্ঞা, খৎনার ক্ষেত্রে প্রধানত ইহুদি আইনগুলো ও বৃহত্তর আরব-ঐতিহ্যকে অনুসরণ করে তা মদিনায় বাস্তবায়ন করা হয়েছে। নাগরিক ও অন্যান্য ব্যক্তিগত বিষয়ক ইহুদি ও পৌত্তলিক আরবীয় চিন্তাধারা, রীতিনীতি প্রভাবিত আইনসমূহ সামাজিকঅর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে বিনা-প্রশ্নে ব্যবহার করা হয়েছে।

————————–

পাদটীকা

২৬. ইরানের অনেক স্থানে ইমামজাদাদের মাজার পাওয়া যায়। ভক্তরা এখানে এসে মৌখিকভাবে অথবা কাগজে বা দাখিল নামক এক টুকরা কাপড়ে লিখে সাহায্যের আকুতি জানায়। কবরগুলোর অনেকগুলোর উপর গম্বুজ বানিয়ে রাখা হয়েছে যার কতগুলো আবার অনেক পুরনো। এদের মধ্যে কতগুলো কবর হল স্থানীয় সাধকদের। এদের বেশিভাগেরই জীবনী সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়নি। তারপরও এদেরকে ইমামদের বংশধর হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে আসছে।

২৭. আলি দস্তি এই অনুবাদটিকে গ্রহণ করেছেন। আরেকটি অনুবাদে পাওয়া যায় and a guide to every nation ব্যাকরণগতভাবে উভয়ই সঠিক।

২৮. জালালউদ্দিন আল-সুয়তি মিশরীয় বংশোদ্ভূত কোরআনের তফসিরকারক। কোরআনের তফসির আল-জালালাইনের সহলেখক।

২৯. ইব্রাহিম আন-নাজ্জাম নেতৃস্থানীয় মুতাজিলা দার্শনিক। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের স্বাধীন চিন্তার ফলেই কোরআন রচিত হয়েছে। যদিও তাঁর বেশ কিছু লেখা ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে কালের পরিক্রমায়, তবে তাঁর কিছু উদ্ধৃতি অন্যান্য মুতাজিলা দার্শনিকদের (যেমন আল-জাহেজ) লেখায় পাওয়া যায়।

৩০. নবম শতাব্দীর দিককার আবু আল-হাসান আহমেদ ইবনে ইয়াহিয়া ইবনে ইশহাক আল-রাওয়ানদি সংশয়বাদী মুতাজিলা দার্শনিক হিসেবে প্রখ্যাত। তাঁর অনেক লেখনী সমসাময়িক গোঁড়া মুসলমান ধর্মতাত্ত্বিক দ্বারা ধর্মদ্রোহী হিসেবে সমালোচিত

হয়েছে।

৩১. আবু মুহাম্মদ আলি বিন আহমেদ বিন হাজম (জন্ম হিজরি ৩৮৪ বা ৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দ-মৃত্যু হিজরি ৪৫৬ বা ১০৬৪ খ্রিস্টাব্দ) প্রভাবশালী মুরীয় ধর্মতাত্ত্বিক এবং ইতিহাসবিদ। ধর্ম ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ইতিহাস নিয়ে তাঁর বই আল-মেলাল ওয়াননিহাল মুসলিম দর্শন ও ধর্মের ইতিহাসের শিক্ষার্থীদের কাছে পরিচিত।

৩২. আবুল হোসেন আব্দুর রহিম বিন মুহাম্মদ আল-খাইয়াত (৮৩৫-৯১৩ খ্রিস্টাব্দ) বাগদাদ নিবাসী খ্যাতিমান মুতাজিলা দার্শনিক। তাঁর অনেক লেখা হারিয়ে গেলেও অবশিষ্ট এখনো কিছু বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া যায়।

৩৩. আলি দস্তি তাঁর বইয়ের মূল ফার্সি সংস্করণে ফেরেশতা শব্দ ব্যবহার করলেও সাধারণভাবে জিব্রাইল ফেরেশতার কথা প্রচলিত আছে।

৩৪. শামসুদ্দিন মুহাম্মদ হাফিজ (১৩২৫-১৩৯০ খ্রিস্টাব্দ) পারস্যের খ্যাতিমান কবি।

৩৫. জালালউদ্দিন রুমি পারস্যের সুফিবাদি মৌলভি হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর আরেকটি পরিচয় হচ্ছে তিনি একই সাথে প্রখ্যাত কবি। এশিয়া মাইনর অঞ্চলের কনিয়া অঞ্চলে তিনি বাস করতেন। কাব্যচর্চা ছাড়াও আলকেমির প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল।

৩৬. ইজহাক গোল্ডজিহার (খ্রিস্টাব্দ ১৮৫০-১৯২১) বুদাপেস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক। ইসলামের ইতিহাস,

মুহাম্মদের জীবনী নিয়ে তাঁর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ও গবেষণা রয়েছে; এর মধ্যে Muhammadanische Studien (2 vols, Halle 1889-90; translated by C. R. Barber and S. M. Stern as Muslim Studies, 2 vols, London 1967-71), Vorlesungen über den Islam (Heidelberg 1910, 2nd ed. 1923; translated by Felix Arin as Le dogme et la loi de l’Islam, Paris 1920, 2nd ed. 1958, and by A. and R. Hamori as Introduction to Islamic Theology and Law, Princeton 1981), and Die Richtungen der Islamischen Koranauslegung (Leiden 1920) উল্লেখযোগ্য।

৩৭. আবুল আব্বাস আহমেদ বিন মুহাম্মদ আল-কাসতালিনি মিশরের কায়রো নিবাসী লেখক। তিনি মুহাম্মদের জীবনী ও হাদিসের ভাষ্য নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন।

৩৮. দ্রষ্টব্য: পাদটীকা ১৫। আলফ্রেড গিয়োমের অনুবাদের ৬৭৭-৬৭৮ পৃষ্ঠায় সংযোজিত।

৩৯. হিজরতের কিছু পরে নবি মুহাম্মদ আনাস বিন মালেককে দাস হিসেবে গ্রহণ করেন। নবির মৃত্যু পর্যন্ত সাথেই ছিলেন। উমাইয়াদের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ করেছেন। ৯১ বছর বয়সে তিনি বসরাতে মৃত্যুবরণ করেন।

৪০. আব্দুল ওয়াহাব আস-শাহরানি মিশরের একজন প্রসিদ্ধ ধর্মীয় নেতা এবং লেখক।

৪১. আবু হুরায়রা (মৃত্যু হিজরি ৫৮ বা ৬৭৮ খ্রিস্টাব্দ) ইয়েমেন থেকে মদিনায় এসে বসবাস করেন। মুহাম্মদের মৃত্যুর প্রায় চার বছর আগে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। হাদিস ভাষ্যকার হিসেবে পরিচিত।

৪২, কাতাদা ইরাকের বসরাতে বসবাসকারী একজন অন্ধ বেদুইন। হাদিস-ভাষ্যকার হিসেবে পরিচিত।

৪৩. কোরআনের দুর্লভ ফার্সি ভাষার একটি তফসির প্রকাশ করেছে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি। এক হাজার খ্রিস্টাব্দের দিকে রচিত ফার্সি তফসিরটির মূল লেখক কে জানা যায় না। ধারণা করা হয় ১২৩১ খ্রিস্টাব্দের দিকে এর প্রতিলিপিকরণ করা হয়েছে। ক্যামব্রিজ তফসির- এ কোরআনের ১৯ নম্বর সুরা মরিয়ম থেকে ১১৪ নম্বর সুরা নাস-এর তফসির পাওয়া গেলেও আগের

সুরাগুলোর তফসির পাওয়া যায় নাই। ফার্সি ভাষায় এই তফসিরকে সবচেয়ে প্রাচীন দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৭০ সালের দিকে পুনরায় তেহরান থেকে দুই খণ্ডে তফসিরটি প্রকাশিত হয়েছে।

আরও বই