তৃতীয় অধ্যায়: রাজনীতি

নবি মুহাম্মদের ২৩ বছর

তৃতীয় অধ্যায়: রাজনীতি

আলি দস্তি

সূচিপত্র

  1. দেশান্তর
  2. মুহাম্মদের ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন
  3. একটি সুগঠিত অর্থনীতির প্রতিষ্ঠা
  4. ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ
  5. নবুওতি ও শাসন
  6. ইসলামে নারী
  7. নারী ও মুহাম্মদ

দেশান্তর

ইতিহাস চলমান। তবে এর পাতায় পাতায় আমরা এমন অনেক তারিখ খুঁজে পাই যা বিরাট কোনো পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে আমাদের মনে গেথে থাকে। এমনই একটি দিন ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর বা ১২ রবিউল আউয়াল। এই দিন নবি মুহাম্মদ ইয়াসরিব শহরে পদার্পণ করেন। স্রেফ ধর্মীয় কারণে মুসলমানরা নবির এই দেশান্তরকে (হিজরত) একটি নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখে থাকেন। প্রাচীন আরবীয়রা নির্দিষ্ট কোনো যুগের অন্তর্গত ছিল না। খুব সম্ভবত ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের দিকে আব্রাহার নেতৃত্বে আবিসিনীয় বাহিনী মক্কা আক্রমণ করে পৌত্তলিকতার তীর্থভূমি কাবাঘর ধ্বংস করে ফেলতে চান। এটি হাতির বছর নামেও পরিচিত”। কারণ আবিসিনীয় বাহিনী এই যুদ্ধে শতাধিক হাতি ব্যবহার করেছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত আবিসিনীয় বাহিনী মক্কাবাসীর সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়। অনেকে সেদিন হতে নতুন দিনপঞ্জি গণনা করতে শুরু করেন। হিজরতের সময় হতে মুসলমানদের নতুন যুগের সূচনার দাবির পিছনে আরেকটি কারণ চিহ্নিত করা যায়। হিজরতের পর থেকে নবির প্রতি আনুগত্যের কারণে মুসলমানদের সাহস অনেক বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাঁরা ক্ষমতা পেয়েছেন এই হিজরতের পর। মদিনার আউস ও খাজরাজ গোত্রের সদস্যরাও এ-সময় নবিকে নিরাপত্তাদানের গুরুত্ব অনুধাবন করেন। তাদের পরিচিতি হয় ‘আনসার’ হিসেবে।

তবে ইসলামের নতুন যুগের গণনা শুরু রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ থেকে শুরু হয়নি। একই বছরের প্রথম মাস মহরমের প্রথম তারিখ (১৬ জুলাই, ৬২২ খ্রিস্টাব্দ) থেকে গণনা করা হয়। স্বাভাবিকভাবে তৎকালীন আরবদের মনে এমন কোনো চিন্তা আসেনি যে, ওই বছরের ১২ই রবিউল আউয়াল তারিখটিই পরবর্তীতে তাদের জীবনধারায় এক বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হয়ে দাঁড়াবে। সমসাময়িক বিশ্বেরও কেউ ভাবতে পারেনি যে একদল মরুবাসী, যারা সভ্যতার ইতিহাসে কখনো কোনো অবদান রাখেনি, যারা উন্নততর গোষ্ঠী রোমান রাজা সিজার ও ইরানি বাদশাহ খসরু-১’র অনুগত হয়ে নিজেদের গর্বিত মনে করত, তারা দ্রুতই প্রাচীন সভ্যতার এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূখণ্ডের সর্বেসর্বা হয়ে উঠবে। (পারস্যের জরথুস্ত্র ধর্মাবলম্বী এই রাজার নাম খসরু১ আনুশিরুওয়ান’, যার অর্থ ‘অমর আত্মা খসরু। তিনি ৫৩১ থেকে ৫৭৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সাসানিদ রাজবংশের শাসক ছিলেন। তার জন্ম ৫০১ খ্রিস্টাব্দে। পারস্যের ইতিহাসে শিল্পকলার একজন মহান সংস্কারক ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বিবেচিত হন।)

এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে স্থানান্তরিত হওয়া আরবদের নিকট নতুন কিছু ছিল না। একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে, ষষ্ঠ শতাব্দীর দিকে ইয়েমেনের প্রাচীন মারিব(৪৫) বাঁধ ভাঙার পর দক্ষিণ আরবীয় গোষ্ঠীগুলোর উত্তর সীমান্তের দিকে অভিবাসিত হওয়া। সে তুলনায় মুহাম্মদ ও তার সঙ্গীদের এবং কুরাইশ পৌত্তলিকদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে কিছু অভিবাসীর মক্কা থেকে ইয়াসরিবে স্থানান্তরকে ইতিহাসের আলোকে অগুরুত্বপূর্ণ বলা যায়। তবে অগুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই এক দশকের মাথায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে। দশ বছরের মাথায় যে সকল ব্যক্তি মুহাম্মদের সাথে মক্কা ত্যাগ করেছিলেন, তারাই মক্কার শাসক হয়ে ওঠেন এবং তাদের প্রতিপক্ষকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেন। প্রতিপক্ষের উপাস্য সকল মূর্তি ভেঙে ফেলা হয়। কুরাইশদের পরিচালিত কাবার চিরাচরিত নিয়মকানুন সব বাদ দেয়া হয়। আবু লাহাব ও আবু জেহেলের উত্তরসূরি আবু সুফিয়ান প্রাণভয়ে আত্মসমর্পণ করেন। এছাড়া অন্যান্য সকলে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ব্যক্ত করেন। ছোট ছোট ঘটনার সমন্বয়ে একটি বড় ঘটনার সৃষ্টি হওয়া ইতিহাসে বিরল নয়। উদাহরণ হিসেবে আছে ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব এবং ইরানে মঙ্গলীয় আগ্রাসন।

মুহাম্মদকে ধর্ম প্রচারকালের শুরু থেকে কুরাইশ প্রধানদের সাথে লড়াই করতে হয়েছে। সম্ভবত তিনি প্রথমে আশা করেননি যে, তার প্রচারিত ধর্ম প্রাথমিকভাবে যৌক্তিক ও অন্যান্য দুই সেমিটিক ধর্মের সাথে সদৃশ হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে এমন বিরোধের সমূখীন হতে হবে। তিনি খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে এটা ভেবে দেখেননি যে, তার দীক্ষা গ্রহণের কারণে কুরাইশদের প্রাধান্য ক্ষমতা, অর্থ, বিত্তকে খাটো করে দেবে। তাদের শত্রুভাবাপন্নতা যখন বেড়ে যায় তখন নবি তা প্রতিরোধ করার উপায় বের করার পরিকল্পনা করতে বাধ্য হন। ইয়াসরিবে চলে যাওয়ার আগে তিনি এ ব্যাপারে আগেই দুটি পদক্ষেপ নিয়ে রেখেছিলেন। প্রথম পদক্ষেপটি ছিল আবিসিনিয়ায় কিছু মুসলমানকে পর পর দুই দলে বিভক্ত করে পাঠানো। গরিব, অসহায় ও কুরাইশ কর্তৃক নির্যাতিত মুসলমানরা নবির কাছ থেকে আবিসিনিয়ায় যাওয়ার পরামর্শ পেয়েছিলেন। দ্বিতীয় দলের সদস্যের (যাদের মধ্যে নবির চাচাত ভাই এবং হজরত আলির আপন বড়ভাই জাফর বিন আবু তালেবও ছিলেন) পরিচয় লাভের মাধ্যমে এ বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্তে আসা যায়। নিগাসের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশাও মুহাম্মদের মনে এসেছিল। আবিসিনিয়ার একজন খ্রিস্টান শাসক হিসেবে নিগাস স্বাভাবিকভাবে পৌত্তলিকতার বিরোধী হবেন। যখন তিনি জানতে পারবেন মক্কায় একদল একেশ্বরবাদী জোট হয়ে পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে বিপ্লবের চেষ্টা করছেন এবং তাঁরা সেখানে নিগৃহীত হচ্ছে, তখন তিনি তাদের সহায়তা করার জন্য একটি বাহিনী হয়তো পাঠিয়ে দিতে পারেন। নিগ্রহের শিকার না হওয়া ও তুলনামূলক সন্ত্রান্ত পরিবার থেকে আসা জাফর বিন আবু তালিবের অংশগ্রহণের কারণ এ থেকে বোঝা যায়। একই সময়ে কুরাইশরা আমর ইবনে আল-আস ও আব্দুল্লাহ বিন আবু রাবিয়াকে আবিসিনিয়ার বাদশাহ নিগাসের কাছে কিছু উপহারসহ পাঠিয়ে দেন। তাদের আশা ছিল এতে করে মুসলমানদের প্রস্তাবিত কোনো বিষয়ে নিগাস যেন রাজি না হন এবং সম্ভব হলে তাদের ঐতিহ্য রক্ষার্থেও তিনি যেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

দ্বিতীয় পদক্ষেপটি ছিল ৬২০ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদের তায়েফের উদ্দেশ্যে যাত্রা। নিজের চাচা ও আশ্রয়দাতা আবু তালিব এবং বিবি খাদিজাকে হারানোর পর তাঁকে আগের চেয়ে অনেক বেশি শত্রুভাবাপন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। তিনি তায়েফ-নিবাসী বানু সাকিফ গোষ্ঠীর নিকট থেকে সাহায্য আশা করেছিলেন, যাদের সাথে তার মাতৃবংশীয় সম্পর্ক ছিল। তায়েফে অন্যান্য গোষ্ঠীর মধ্যে বানু সাকিফদের অবস্থান সমানের দিক থেকে অনেক উচুতে ছিল। তায়েফের জনগণ মক্কার অবস্থান ও বেদুইনদের মাঝে কুরাইশদের সমানকে ঈর্ষার চোখে দেখত। কুরাইশদের আধিপত্য এড়ানোর জন্য তাঁরা স্বাভাবিকভাবে নিজেদের শহরকে আরবীয়দের মিলনমেলায় পরিণত করতে চাইত। এটা কোনো কলপনা নয় বরং প্রমাণিত সত্য। কারণ নবিকে সাকিফ-প্রধানদের সাথে একটি সাক্ষাতের কথা স্মরণ করতে দেখা গেছে। সাকিফ-প্রধানরা বলেছিলেন, তায়েফকে নতুন ধর্মের কেন্দ্র ও পবিত্র ভূমি ঘোষণা করা হয় তবে তায়েফের জনগণ অবশ্যই ইসলাম গ্রহণ করবে। এর আগে তায়েফের আরেকটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী বানু আমেরও নবির কাছে এরকম একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। তাঁরা অনুরোধ করেছিল তাদের সাহায্যে যদি ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভ করে তবে কুরাইশদের স্থলে তাদেরকেই যেন আরবের সবচেয়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠী বানিয়ে দেয়া হয়। পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে নবির তায়েফ যাত্রার মূল উদ্দেশ্য ছিল নিজের রাস্তা পরিষ্কার করা। তাঁকে সাহায্য করার ইচ্ছা যদি বানু সাকিফদের মধ্যে থাকত তবে কুরাইশদের পরাস্ত করা সম্ভব ছিল। এ-কারণে তিনি গোপনে তার মুক্ত ক্রীতদাস ও পালিত পুত্র জায়েদ বিন হারিসকে নিয়ে অন্য কোনো সঙ্গী ছাড়াই তায়েফ সফরে গিয়েছিলেন। তবে তার আশা অবশ্য ভঙ্গ হয়েছিল, কারণ বানু সাকিফ-প্রধানরা তাঁকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।

আরব বেদুইনদের মাঝে আধ্যাত্মিক বিষয়ে কখনো তেমন আগ্রহ ছিল না। এমনকি আজও মুহাম্মদের চৌদ্দ শতক পরেও তারা ধর্মকে পার্থিব অর্জন হিসেবে দেখে। বানু সাকিফরা ভবিষ্যতের মুক্তির কথা ভেবে নিজেদের জীবিকার প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক ছিলেন। তায়েফ মূলত গ্রীষ্মকালে ব্যস্ত হয়ে উঠত। তায়েফের জনগণ মক্কার পর্যটকদের কাছ থেকে এবং বাণিজ্যিক লেনদেনের মাধ্যমে আয়-উপার্জন করতেন। কুরাইশরা মুহাম্মদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল এবং তাঁকে কোনোরূপ সাহায্য দিতে দেখলে আরও বেশি শত্রভাবাপন্ন হয়ে উঠতে পারে। কাজেই নবির অপ্রমাণিত প্রতিশ্রতির তুলনায় তায়েফের জনগণের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের দিকে নজর দেয়াটাকে বানু সাকিফদের যৌক্তিক মন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। লাভ ক্ষতির এমন সমীকরণের সামনে থেকে তায়েফের-প্রধানরা মুহাম্মদকে সাহায্য করতে শুধু অস্বীকৃতিই জানাননি, তার প্রতি বিদ্বেষও সৃষ্টি করেছিল। তাঁরা নবিকে আঘাত করেছিল, অপমানিত করেছিল, এমনকি নবির শেষ অনুরোধটিও পর্যন্ত তাঁরা রাখেননি। যা ছিল তার এই অসফল সফর প্রসঙ্গে কুরাইশদেরকে কিছু না জানানো। কিন্তু কুরাইশরা ঠিকই বার্তা পেলেন। ফলে মক্কায় নবির বিরোধীরা আরও বেশি সহিংস হয়ে উঠেন। শেষে পৌত্তলিকদের কিছু নেতা মুহাম্মদের নবুওতি ভাবনার (যা তাদের অবস্থান ও বিত্তের প্রতি হুমকি হয়ে উঠেছিল) সমাপ্তি টানার উপায় বের করার জন্য সমাবেশে মিলিত হন। যে তিনটি প্রস্তাব উঠে এসেছিল সেগুলো ছিল নবিকে নির্বাসিত করা, কারাবন্দী করা অথবা হত্যা করা। এক্ষেত্রে তাঁরা শেষ প্রস্তাবটিই বেছে নেন।

তায়েফের পাশাপাশি হেজাজের আরেকটি শহরও অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বের দিক থেকে মক্কার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিল। সেটি ছিল ইয়াসরিব, যা মদিনা (স্থানীয় ইহুদিদের দ্বারা প্রবর্তিত একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ “নগর)(৪৭) নামে পরিচিত। আরবের জনপ্রিয় মূর্তিগুলোর সুসজ্জিত উপাসনালয়গুলোর কারণে মক্কা শহরটি আরবদের কাছে, বিশেষ করে বেদুইন ও কুরাইশদের কাছে ধর্মীয় তীর্থভূমি বলে বিবেচিত হতো। কাবার রক্ষণাবেক্ষণ ও এর পরিদর্শকদের প্রয়োজন মেটানোর দায়িত্বে নিয়োজিত যা মক্কায় একেবারে ছিল না। সেইসাথে বাণিজ্যিক উন্নয়ন ও তিনটি ইহুদি গোত্রের কারণে অধিবাসীদের মধ্যে শিক্ষার হারের সন্তোষজনক অবস্থানের ফলে ইয়াসরিবের সাংস্কৃতিক-সামাজিক মান মক্কার তুলনায় উচ্চতর অবস্থায় ছিল। তারপরও হেজাজের শহরগুলোর মধ্যে ইয়াসরিবকে মক্কার পরে দ্বিতীয় স্থানে গণ্য করা হতো।

ইয়াসরিবের অধিবাসীদের মধ্যে কুরাইশদের সাথে শত্রভাবাপন্ন দুটি আরবীয় গোষ্ঠী বসবাস করত। এরা হচ্ছে আউস এবং খাজরাজ। দুই গোষ্ঠীরই আবার ইয়াসরিবের দুই-একটি ইহুদি গোষ্ঠীর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। আউস এবং খাজরাজ ছিল কাহতানি আরব, অর্থাৎ ইয়েমেন-বংশোদ্ভূত। আদনানি বা উত্তর আরবীয় বংশোদ্ভূত কুরাইশদের সাথে তাদের বিরোধ বহু প্রাচীন। কৃষি ও বাণিজ্যে অদক্ষতা ও অনভিজ্ঞতার কারণে আউস এবং খাজরাজ গোত্র তাদের ইহুদি প্রতিবেশীদের মতো অগ্রসর ছিলেন না। তাদের অনেকে ইহুদিদের অধীনে কাজ করতেন। ফলে কিছু নির্দিষ্ট ইহুদি গোষ্ঠীর সাথে মিত্রতা থাকলেও যেসব ইহুদিদেরকে তাঁরা প্রভু মানতেন, তাদের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতাকে সহজভাবে নেননি। মক্কায় নবি মুহাম্মদের উত্থান ও ইসলামের প্রচার এবং কুরাইশদের সাথে তার বিরোধের সংবাদ হেজাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। ইয়াসরিবের অনেকেই এ-বিষয়ে অত্যন্ত উৎসুক ছিলেন। মক্কা থেকে আগত ইয়াসরিবের পর্যটকদের বর্ণনা শুনে কিছু সংখ্যক আউস এবং খাজরাজ গোত্রের লোক ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার কথা ভাবতে থাকেন। নবি মুহাম্মদ ও তার সঙ্গীদের যদি এখানে আনা যায় এবং কোনোভাবে যদি মুহাম্মদের সাথে জোট বাঁধা যায়, তবে হয়তো অনেক সমস্যারই সমাধান হতে পারে। যেহেতু মুহাম্মদ ও তার সঙ্গীরাও কুরাইশ গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, তাই এতে করে কুরাইশদের সংহতির দেয়ালও ভেঙে ফেলা যেতে পারে। মুহাম্মদ ও তার সঙ্গীদের সাথে গড়ে তোলা জোটের সাহায্যে আউস এবং খাজরাজের মধ্যেকার দীর্ঘদিনের জাতিগত বিদ্বেষও মিটিয়ে ফেলা যেতে পারে। তাছাড়া মুহাম্মদ একটি নতুন ধর্ম নিয়ে এসেছেন। এই ধর্ম যদি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় তবে ইহুদিরা আর তাদের উপর অবস্থান করতে পারবে না। মুহাম্মদ ও তার সঙ্গীদের সাথে সমঝোতার ফলে ইয়াসরিবের তিন ইহুদি গোষ্ঠীর সাথে আউস ও খাজরাজের সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পারে।

৬২০ খ্রিস্টাব্দের হজ মৌসুমে ইয়াসরিবের ছয়জন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি মুহাম্মদের সাথে দেখা করেন এবং মুহাম্মদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন। পরের বছর একই সময়ে মক্কার বাইরে আল-আকাবায় বারো সদস্যের একটি দল নবির সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা দেখলেন নবির শিক্ষার একটা সুদূরপ্রসার প্রভাব রয়েছে এবং নবির চাওয়াও খুব বেশি কিছু নয়। সবাইকে ব্যাভিচার,

সুদের ব্যবসা, মিথ্যাচার পরিহার করতে হবে এবং মানব নির্মিত মূর্তির পরিবর্তে এক আল্লাহ- তে বিশ্বাস করতে হবে। সেই বারো জন ব্যক্তি মুহাম্মদের সাথে মিত্রতা স্থাপন করে ইয়াসরিবে ফিরে আসেন ও তাদের আত্মীয়স্বজনদের জানান যে, তাঁরা মুসলমান হয়ে গিয়েছেন এবং মুহাম্মদের সাথে তাদের চুক্তিও হয়েছে। তাদের কাজ ও প্রস্তাবনা ইয়াসরিবের অনেক স্থানে স্বীকৃতি লাভ করে। পরের বছর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন নারীর একটি বড় প্রতিনিধিদল মুহাম্মদের সাথে একই স্থানে দেখা করতে যান এবং দ্বিতীয় চুক্তি সম্পন্ন করেন।

দেশান্তরের বিষয়টি মুহাম্মদের মনে হঠাৎ করে জেগে ওঠেনি। যে-সব মুসলমান আবিসিনিয়ায় গিয়েছিলেন তাদের সূত্রে বিষয়টা স্পষ্ট হয়। সুরা জুমার’র এই আয়াতে রয়েছে বলো, হে বিশ্বাসী দাসগণ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। যারা এ-পৃথিবীতে ভালো কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ। আল্লাহর পৃথিবী প্রশস্ত। (৩৯: ১০)। আল-আকাবা চুক্তিতে অবশ্যই মুহাম্মদের আশার প্রতিফলন ঘটেছিল। তের বছর ধরে মক্কায় তেমন সফলতা অর্জন করতে পারেননি। কিছু সদ্য ধর্মান্তরিত মুসলমান তাদের আরব-চরিত্রের কারণে ইসলাম ত্যাগ করে পুনরায় পূর্বের ধর্মে ফিরে গিয়েছিলেন। বিশেষ করে যখন তাঁরা দেখলেন মুহাম্মদের আদর্শ খুব একটা বিস্তার লাভ করছে না এবং মুসলমান বলে তাদেরকে লাঞ্ছনার শিকার হতে হচ্ছে। ধনী ও প্রভাবশালী পৌত্তলিকরা তাদের অনেককে ইসলাম ত্যাগে বাধ্য করেছিল। তায়েফের বানু সাকিফদের সাথে নবির যোগাযোগ শুধু ব্যর্থই হয়নি, এতে করে কুরাইশদের সাথে তার শত্রুতা তীব্রতর হয়ে গিয়েছিল। যদিও নিজ গোষ্ঠী বানু হাশেমি তাঁকে রক্ষা করে আসছিল, তবে তাঁরা শুধু শারীরিকভাবে আহত হওয়া থেকে রক্ষা করতেন। তাঁরা কুরাইশদের বিপক্ষে যুদ্ধে অংশ নেবে এমনটা আশা করা সম্ভব ছিল না। আউস এবং খাজরাজদের সাথে স্থাপিত মিত্রতা অবশ্য এই আশা পূরণ করতে পারত। তাদের সমর্থন থাকলে কুরাইশদের বিপক্ষে যুদ্ধ করা সম্ভব ছিল। মক্কায় ইসলাম দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি তবে ইয়াসরিবে সেটা সম্ভব ছিল। এর প্রধান কারণ হচ্ছে কুরাইশদের সাথে আউস এবং খাজরাজ গোষ্ঠীর ঈর্ষাকাতরতা। এছাড়া ইয়াসরিবের উন্নত বাণিজ্য ও কৃষিব্যবস্থার কারণে মুসলমানরা তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজও খুঁজে নিতে পারবেন।

আল-আকাবায় নবি এবং আউস ও খাজরাজদের মধ্যে আলাপকালে আব্বাস বিন আব্দুল মোতালেব (তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেননি, তবে নিজের ভাতিজাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছিলেন) হাজির হন। তিনি অন্যদেরকে তাদের অবস্থান ও ইচ্ছার ব্যাপারে স্পষ্ট হতে বলেন। ইয়াসরিবের প্রতিনিধিদের আব্বাস সরাসরি বলেন: তাঁরা এবং মুহাম্মদ কুরাইশদের হামলার শিকার হতে পারে; এবং এ ক্ষেত্রে তাদের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে তাঁরা মুহাম্মদকে ততটাই প্রতিরক্ষা দিবে যতটা তাঁরা নিজেদের স্ত্রীসন্তানদের দিয়ে থাকে এবং তাঁরা যেন মিথ্যা প্রতিশ্রতি দিয়ে মুহাম্মদকে বিভ্রান্ত না করেন। এ-সময় খাজরাজ গোত্রের প্রতিনিধির মধ্য থেকে আল-বারা বিন আল-মারুর উত্তেজনার বশে বলেন, তাঁরা সবাই নির্ভীক, লড়াকু যোদ্ধা এবং তাঁরা সকল প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত আছেন। একজন বয়োজ্যষ্ঠ ও অভিজ্ঞ আউস প্রতিনিধি আবুল হাসিম বিন তায়েহান নবিকে বলেন: ইহুদিদের সাথে আমাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে যা আপনার ও আপনার সঙ্গীদের সাথে করা চুক্তির কারণে ভেঙে যেতে পারে।

হয়তো আপনার আদর্শ আরও এগিয়ে যাবে। তখন আপনি কি আমাদের ছেড়ে দিয়ে আপনার নিজ গোষ্ঠীর সাথে সমঝোতা করে ফেলবেন? প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক আবু মুহাম্মদ আব্দুল মালিক বিন হিশাম (মৃত্যু হিজরি ২১২/২১৮ বা ৮২৮৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ), যিনি ইবনে হিশাম নামে বেশি পরিচিত, তার সম্পাদিত দ্যা লাইফ অব দ্যা প্রফেট গ্রন্থ অনুসারে নবি তখন হেসে উত্তর দিয়েছিলেন: রক্তের জন্য রক্ত, ধ্বংসের জন্য ধ্বংস। আমি আপনাদের সাথে থাকব, আপনারা আমার সাথে থাকবেন। আপনাদের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করবে আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব আর যারা আপনাদের সাথে শান্তি বজায় রাখবে আমিও তাদের সাথে শান্তি বজায় রাখব।;

এখানে ‘রক্ত’, ‘ধ্বংস’ শব্দগুলোর উল্লেখ বিখ্যাত ফরাসি বিপ্লবী জ্যাঁ পল মারাতের উক্তি ‘আমি রক্ত চাই’- এর কথা মনে করিয়ে দেয়। উল্লেখ্য আবুল হাসিম বিন তায়েহানের প্রশ্নের উত্তরে আরেকটি কথা নবি বলেছিলেন বলে জানা যায়, লাল ও কালোদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। সম্ভবত এর দ্বারা তিনি সকল বর্ণের সাথে যুদ্ধের কথা বুঝিয়েছিলেন; আরবীয় হোক আর অনারবীয় হোক। এ-বক্তব্য নবি মুহাম্মদের ভবিষ্যত চিন্তা ও গোপন অভীপ্সার কথা জানান দেয়। আবুল হাসিমকে দেয়া উত্তর নির্দেশ করে, এটা ছিল নবি হৃদয় থেকে বের হয়ে আসা আর্তনাদ, দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষিত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। আউস ও খাজরাজদের সমর্থন সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দুয়ার খুলে দিতে পারে। এতে করে নবি ইসলামের প্রসারে আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারবেন, বিরোধী কুরাইশদের বিরোধিতার জবাব দিতে পারবেন এবং দীর্ঘদিনের নিজস্ব চিন্তাও প্রকাশ করতে পারবেন। মক্কায় গত তের বছর ধরে তার প্রচার খুবই ক্ষীণ প্রভাব ফেলেছে, সমগ্র আরবের সামনে এখন ইসলামকে আনা সম্ভব হবে।

মুহাম্মদের ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন

আমাদের চারপাশে অনেক ঘটনাই আছে যা আপাতদৃষ্টিতে অগুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও পরবর্তীতে তা পৃথিবীর ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। নেপোলিয়ন বা হিটলারের কাহিনী এক্ষেত্রে উপযুক্ত উদাহরণ হিসেবে আসতে পারে। নবি মুহাম্মদের ইয়াসরিবযাত্রাকে দেখলে হয়তো একটি সাধারণ অভিবাসন ছাড়া কিছুই মনে হয় না, কিন্তু আরবের নিয়তি ও বিশ্ব-ইতিহাসের এক বিশাল পরিবর্তনের শুরু আসলে এর মাধ্যমেই হয়েছিল। নবির অভিবাসন-পরবর্তী ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির কারণ, পরিপ্রেক্ষিত ও সামাজিক প্রেক্ষাপট উদ্ধারে নিয়োজিত গবেষকদের গবেষণার দুয়ারও খুলে দিয়েছিল।

এই সকল বিষয়ের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং নিশ্চিতভাবে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছিল, অন্যতম এই ঐতিহাসিক চরিত্রের ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন। যদিও ব্যক্তিত্বের পরিবর্তনের বিষয়টি অনেকের কাছে সন্তোষজনক নাও মনে হতে পারে। তাই একে মুহাম্মদের অন্তঃপুরুষের প্রস্ফুটন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। হিজরত তাই ঐতিহাসিক এক পটপরিবর্তনের সূচনা হয়তো করেছিল, তবে সেটা নবি মুহাম্মদের ব্যক্তিত্বের পরিবর্তনকে অনুসরণ করে হয়েছিল, যা নিবিড়ভাবে তুলনামূলক মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

তখন পর্যন্ত নবি মুহাম্মদ ধর্মানুগত ছিলেন এবং তার সময়ের অনৈতিক কাজকর্ম থেকে বিরত থাকতেন। তিনি ইহজগতের শেষসীমা এবং শেষ বিচারের দিনের চিত্রকে হাতের কাছে নিয়ে এসেছিলেন। মক্কায় থাকাকালে মৃত্যু পরবর্তী জীবনের উপর তার ধারণাকে ভিত্তি করে তিনি সঙ্গীদের মহাবিশ্বের স্রষ্টার বশে আনতে, সহিংসতা, অবিচার ও গরিবদের প্রতি অনাচার থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে গেছেন। আর মদিনায় (ইয়াসরিব) যাওয়ার পর তিনি দূরদর্শী রাজনীতিবিদ এবং সুদক্ষ এক যোদ্ধার রূপ ধারণ করেছেন। যিনি তরবারি দিয়ে লড়াই করে সকল প্রতিরোধ ভেঙে নিজস্ব ধর্মের বিস্তার ঘটিয়েছেন এবং একটি রাষ্ট্রের প্রধান হয়েছেন। সময়ের আবর্তে একজন ত্রাণকর্তা মসিহ ডেভিডে (নবি দাউদ) পরিণত হতে পারেন। একজন মানুষ যিনি বিশ বছরেরও অধিক সময় একজন স্ত্রীর সঙ্গেই জীবনযাপন করেছেন, তিনিই পরে অধিক নারীসঙ্গ লাভ করেছেন।

ইংরেজ ঔপন্যাসিক এইচ জি ওয়েলসের মতে, মানুষ সর্বদাই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। কিন্তু এই পরিবর্তনের ধীর গতি এবং সহজে ঠাহর করতে না পারার কারণে আমরা একজন পঞ্চাশ বছর বয়স্ক মানুষের থেকে তেমনটাই আশা করি যেমনটা তিনি বিশের কোঠায় থাকতে করতেন। যেখানে ওই ব্যক্তি ধীরে লয়ে কিন্তু প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়েছেন। বয়স বাড়লে তার শারীরিক সক্ষমতা যেমন হ্রাস পায় তেমনি তার মানসিকতা, সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষার মাধ্যমে পরিপক্ক হয়ে ওঠে। একজন বিশ বছরের তরুণ আর একজন পঞ্চাশ বছরের ব্যক্তির মধ্যে প্রধান পার্থক্য হল প্রথমজনের থাকে প্রচণ্ড শারীরিক ও আবেগময় আকাঙ্ক্ষা আর দ্বিতীয়জনের থাকে অভিজ্ঞতা অর্জন ও চিন্তা করার মতো সময়। উপযুক্ত মনে হলেও এই ধারণটি সবসময় সত্যি হয় না এবং নবি মুহাম্মদের ক্ষেত্রেও তা ভুল ছিল। মদিনায় যাওয়ার পর যে বয়সে অধিকাংশ মানুষের শারীরিক ও মানসিক কর্মতৎপরতা কমতির দিকে থাকে, সেই ৫৩ বছর বয়সে এক নতুন মুহাম্মদকে দেখা যায়। মক্কায় তের বছর ধরে তিনি যেভাবে মানবতার বাণী প্রচার করে গেছেন, মদিনায় কাটানো জীবনের শেষ দশ বছরে তিনি আর তেমনটি ছিলেন না। আল্লাহর প্রতি অনুগত নবি এরপর তার নিজের গোষ্ঠীকে বশে আনতে ও অন্যান্য গোষ্ঠীগুলোর ওপর (যারা এতদিন তাঁকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করে আসছিল) কর্তৃত্ব স্থাপনে শক্তিমান এক নবির রূপধারণ করেন। সুরা শোআরা-তে বলা হয়েছে: “তুমি তোমার আত্মীয়স্বজনকে সতর্ক করে দাও।”(২৬: ২১৪)। সুরা শুরা-তে বলা হয়েছে তুমি সতর্ক করতে পার নগরমাতার (মক্কার) অধিবাসীদেরকে ও তার আশেপাশে যারা বাস করে তাদেরকে… (৪২: ৭)। মদিনায় তিনি সতর্ককারী রূপ ত্যাগ করেন, শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের বর্ম পরিধান করেন, ইয়েমেন থেকে সিরিয়া পর্যন্ত সমস্ত আরবকে এক পতাকা তলে নিয়ে আসার লক্ষ স্থির করেন।

যিশু এবং জেরেমিয়ার আধ্যাত্মিক ধর্মপ্রচারের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার মতো এবং আত্মাকে জাগরিত করবার মতো মূর্ছনা ও কাব্য আমরা মক্কি সুরাগুলোর মধ্যে খুঁজে পাই। যার ছিটেফোঁটা দেখা গিয়েছে মদিনার সুরাগুলোর মধ্যে। কাব্যিক ও ছন্দময় সুরগুলো সেখানে আদেশমূলক নিয়ম-নির্দেশনার দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। মদিনায় সকল নিয়ম ও নির্দেশনা একজন সেনাপতির মাধ্যমে প্রদান করা হত যিনি বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি ক্ষমা করতেন না। আদেশ অমান্য, নিয়ম ভাঙা বা অবহেলার জন্য গুরুতর শাস্তির ঘোষণা দেয়া হয়েছিল।

পশ্চিমা বিশেষজ্ঞ ইজহাক গোল্ডজিহার° নবির এই আকসিক পরিবর্তনকে অভ্যন্তরীণ তাড়না হিসেবে চিহ্নিত করেছেন আর অ্যাডলফ হারন্যাক একে অতিমানবের মনোকষ্ট এবং তার অসাধারণ শক্তিমত্তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ-ধরনের তাড়না মহান ব্যক্তিদেরকে সকল দ্বিধাবোধ, অবসাদ এবং নৈরাশ্য প্রতিরোধে সক্ষম করে তোলে। বাধা যতোই মৃত্যুসম হোক না কেন তা প্রতিরোধে তাদেরকে ভয়শূন্য করে তোলে। অন্য কোনো কিছু দ্বারা তাদের এই সাধারণ মানুষের চেয়ে অধিক অর্জনের কৃতিত্বকে ব্যাখ্যা করা যায় না। হিজরতের পরবর্তী সময়কালে নবি মুহাম্মদের মধ্যে আমরা যে পরিবর্তনসমূহ লক্ষ করি তা শুধুমাত্র সে সময়কার ঘটনাবলীর মাধ্যমেই নয়, মক্কা ও মদিনায় অবতীর্ণ বিভিন্ন সুরার মাধ্যমেও তা প্রতিধ্বনিত হয়েছে। মক্কি সুরা মুজ্জামিল-এ নবিকে নিষেধ করা হয়েছে এই বলে যে: “লোকে যা বলে তাতে তুমি ধৈর্য ধরো, আর সৌজন্য সহকারে ওদেরকে এড়িয়ে চলো। বিলাসবস্তুর অধিকারী অবিশ্বাসীদেরকে আমার হাতে ছেড়ে দাও। আমার কাছে শিকল, জ্বলন্ত আগুন…’ (৭৩: ১০১২)।

তফসির আল-জালালাইনে বলা হয়েছে, অবিশ্বাসীদের প্রতি লড়াই এবং তাদেরকে হত্যা করার যে নির্দেশনা কোরআনে দেয়া হয়েছে, তার পূর্বে অবিশ্বাসীদের সাথে শিষ্টাচার বজায় রেখে দূরত্ব মেপে চলার নির্দেশনা কোরআনে নাজিল হয়েছে। এই বক্তব্যটি আরও বাস্তবসম্মতভাবে সত্য হবে, যদি বলা হয়ে থাকে নবি আউস ও খাজরাজ গোত্রের সহায়তা নিয়ে ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করার পূর্বে সুরা মুজামিলের উক্ত আয়াতগুলি তৈরি হয়েছে। যখন নবি এবং তার সাহাবির কাছে তরবারি ভিন্ন আর কোনো কিছুই ভরসা করার মতো ছিল না, তখনই সুরা বাকারার (মাদানি সুরা) এই নির্দেশটি আসে: আর যেখানেতাদেরকে তোমরা পাবে সেখানেই তাদেরকে হত্যা করবে আর যেখান থেকে তারা তোমাদেরকে বের করে দিয়েছে, তোমরাও সেখান থেকে তাদেরকে বের করে দেবে। ফিৎনা হত্যার চেয়ে মারাত্মক। (২: ১৯১)। অথচ মক্কি সুরা আনআম-এ আমরা দেখি উল্লেখ করা হয়েছে: ‘তারা আল্লাহকে ছেড়ে যাদেরকে ডাকে, তাদেরকে তোমরা গাল দেবে না, তা হলে, তারা অজ্ঞানতাবশত আল্লাহকেও গাল দেবে। এভাবে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের চোখে তাদের কার্যকলাপ শোভন করেছি। তারপর তাদের প্রতিপালকের কাছে তারা ফিরে যাবে। তখন তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকার্য সম্বন্ধে জানিয়ে দেবেন।’ (৬: ১০৮)।

বহুবচন অর্থে প্রেরিত এই উপদেশ বাণীটি নবি এবং তার স্পষ্টবাক সাহাবি ওমর ইবনে আল-খাত্তাব কিংবা হামজা বিন আব্দুল মোতালেব, কার প্রতি প্রেরিত হয়েছিল তা স্পষ্ট নয়। যা হোক, মুসলমানদের ক্ষমতা যখন বৃদ্ধি পেল কুরাইশদের উপাস্য দেবতাদেরকে অভিশাপ দেয়াটা আর আটকে থাকল না। অবিশ্বাসীদের প্রতি শান্তিপূর্ণ ও আন্তরিকভাবে যোগাযোগকে নিষেধ করা হলো। মদিনায় অবতীর্ণ সুরা মুহাম্মদ-এর বক্তব্য অনুযায়ী তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং সন্ধির প্রস্তাব করো না, তোমরাই প্রবল, আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে আছেন, তিনি তোমাদের কর্মফল ক্ষুন্ন করবেন না।: (৪৭: ৩৫)।

কোরআনের একই সুরায় কখনো কখনো দুটি অসঙ্গতিপূর্ণ আয়াতের উপস্থিতি রয়েছে। সুরা বাকারা কালপঞ্জি অনুসারে নবির হিজরতের পর প্রথম অবতীর্ণ হয়েছিল, তবে এর দৈর্ঘ্য দেখে অনুমান করা যায় সম্পূর্ণ সুরাটি একসঙ্গে অবতীর্ণ হয়নি। এক বা দুই বছরের বেশি সময় ধরে খণ্ডিত আকারে এটি অবতীর্ণ হয়েছে। সেই সময়ের প্রথমদিকে অবতীর্ণ হওয়ার উপাত্ত আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই। সৎপথ ভ্রান্তপথ থেকে সুস্পষ্ট হয়েছে। সুতরাং যে অসত্য দেবতাকে অস্বীকার করবে ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করবে সে এমন এক শক্ত হাতল ধরবে যা কখনও ভাঙবে না। (২: ২৫৭)। অপরদিকে একই সুরার ১৯৩ নম্বর আয়াত, যা সম্ভবত মুসলমান সম্প্রদায় শক্তিশালী হবার পরে অথবা তাদের শক্তিশালী হবার সাথে সম্পর্কিত কোনো ঘটনার পরে অবতীর্ণ হয়েছিল, যেখানে শক্তি প্রয়োগের আদেশ দেয়া হয় এভাবে: তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকো যতক্ষণ না ফিৎনা দূর হয় ও আল্লাহর ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু তারা যদি বিরত হয়, তবে জুলুমকারীদের ছাড়া কারও ওপর হস্তক্ষেপ করবে না। (২: ১৯৩)। সুরা তওবা (সুরা আল-বারা নামেও পরিচিত) কালপঞ্জি অনুসারে কোরআনের সর্বশেষ সুরা, এখানে শক্তিপ্রয়োগের আদেশকে অনস্বীকার্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে: (১) যাদের ওপর কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে তাদের মধ্যে যারা আল্লাহ- তে বিশ্বাস করে না ও পরকালেও বিশ্বাস করে না তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে…। (৯: ২৯)। (২) আত্মীয়স্বজন হলেও অংশীবাদীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নবি ও বিশ্বাসীদের জন্য সংগত নয়। (৯: ১১৩)। (৩) হে নবি! অবিশ্বাসী ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করো ও ওদের প্রতি কঠোর হও। ওদের বাসস্থান জাহান্নাম। আর কী সে মন্দ পরিণাম!’ (৯: ৭৩)। (৪) হে বিশ্বাসিগণ! অবিশ্বাসীদের মধ্যে যারা তোমাদের নিকটবর্তী তাদের সাথে যুদ্ধ করো। আর তারা তোমাদের কঠোরতা দেখুক… (৯: ১২৩)।

মদিনায় অবতীর্ণ সুরা তাহরিম-এর ৯ নম্বর আয়াতে একই ভাষায় বলা হয়েছে: হে নবি! অবিশ্বাসী ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করো ও তাদের প্রতি কঠোর হও। ওদের আশ্রয়স্থান জাহান্নাম। (৬৬.৯)। প্রাথমিকভাবে কোথাও কোথাও শক্তিপ্রয়োগ কিংবা রূঢ় আচরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়নি। যেমন মদিনায় অবতীর্ণ সুরা হজ-এ অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অনুমোদন দেয়া হলেও এতে ব্যবহৃত ক্রিয়াপদটি আদেশসূচক অর্থে ব্যবহৃত হয়নি; যারা আক্রান্ত হয়েছে তাদের যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল, কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। (২২: ৩৯) একই সুরার পরবর্তী আয়াতে মুসলমানদের প্রতি অন্যায় আচরণকে সুনির্দিষ্টভাবে দেখানো হয়েছে: তাদের ঘরবাড়ি থেকে অন্যায়ভাবে বের করা হয়েছে শুধু এজন্য যে তারা বলে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। (২২: ৪০)। পারস্যের ইসলামি পণ্ডিত আল-জামাখশারির মতে পৌত্তলিক বা ইসলামে অবিশ্বাসীদের সাথে যুদ্ধ করার প্রথম অনুমোদনটি আসে ৭০টিরও বেশি কোরআনের আয়াতের পরে এবং ওই আয়াতগুলোতে সহিংসতার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা ছিল। যুদ্ধ অনুমোদনের যথার্থতা প্রতিপন্ন করতে গিয়ে নবি মুহাম্মদ মানব চরিত্রকে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করেছেন। মক্কা থেকে বিতাড়িত হবার স্মৃতিচারণে মুসলমানদের হয়তো কুরাইশদের ওপর প্রতিশোধ নেবার ইচ্ছা তাড়িত করত। কোরআনেও এই অকাট্য চিন্তার অলঙ্কারময় বর্ণনা অন্য একটি প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়েছে ইজরাইলের সন্তানদের নাম করে, কিন্তু বক্তব্যটি প্রযোজ্য ছিল মুসলমানদের জন্য: “তারা বলল, যখন নিজেদের ঘরবাড়ি ও সন্তানসন্ততি থেকে দূরে পড়ে আছি তখন কেন আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবো না?”(২: ২৪৬)। যদি কোরআনের বর্ণনায় এই যুদ্ধটি ছিল বনি-ইসরাইলের সন্তানদের কিন্তু ব্যক্তিগত দুঃখজনক সূতিও মুসলমানদেরকে প্রতিশোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উদ্দীপ্ত করে থাকতে পারে।

নবি যখন মক্কায় অবস্থান করছিলেন তখন যুদ্ধের কোনো প্রশ্নই ছিল না। সুরা আনআম-এর ৬৮ নম্বর আয়াতে দেখা যায়, নবি তখন পৌত্তলিকদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতেন এবং তারা নবির সাথে অভদ্র আচরণ ও কোরআনের আয়াত নিয়ে উপহাস করত: ‘তুমি যখন দেখ তারা আমার নিদর্শন (কোরআনের আয়াত) নিয়ে নিরর্থক আলোচনায় মেতে আছে তখন তুমি দূরে সরে যাবে যেপর্যন্ত না তারা অন্য প্রসঙ্গে যোগ দেয়। আর শয়তান যদি তোমাকে ভুল করায়, তবে খেয়াল হওয়ার পরে সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়ের সঙ্গে বসবে না। (৬৬৮)। মক্কায় অবতীর্ণ সুরা আনকাবুত-এ কিতাবিদের মর্যাদা দিয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে: “তোমরা কিতাবিদের সঙ্গে তর্কবিতর্ক করবে, কিন্তু সৌজন্যের সাথে, তবে ওদের মধ্যে যারা সীমালঙ্ঘন করে তাদের সাথে নয়। আর বলো, “আমাদের ওপর ও তোমাদের ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে আমরা বিশ্বাস করি। আমাদের উপাস্য ও তোমাদের উপাস্য তো একই, আর তারই কাছে আমরা আত্মসমর্পণ করি।”(২৯: ৪৬) সুরা আনকাবুতের এই নির্দেশনাটি কেবল নবি মুহাম্মদের জন্য নয়, বহুবচনে ব্যবহৃত হয়েছে বিধায় তা সমগ্র মুসলমান জাতির জন্যই জারি করা হয়েছে। মক্কা ও মদিনায় অবতীর্ণ (প্রথম দিকের) বিভিন্ন আয়াতে অমুসলমান কিতাবিদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন আচরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেমন সুরা আল-ই-ইমরান-এ বলা হয়েছে বলো, আমি ও আমার অনুসারীরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তুমি তাদেরকে ও সাধারণ জনতাকে’ বলো, তোমরা কি আত্মসমর্পণ করেছ?” (৩: ২০)। যারা বিশ্বাস করে ও যারা ইহুদি হয়েছে এবং যারা খ্রিস্টান ও সাবেয়ি (ইসলাম-পূর্ব যুগের দক্ষিণ আরবের বাসিন্দা, বাইবেলীয় বর্ণনায় সাবা রাজ্যের অধিবাসী), যারা আল্লাহ ও শেষদিবসে বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে পুরস্কার আছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। (২৬২)। প্রায় একই বক্তব্য দেখা যায় সুরা মায়িদার ৭৭ নম্বর আয়াতে। প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে বোঝা যায় এই আয়াতগুলো সম্ভবত হিজরতের পরবর্তীকালে এক বা দুই বছরের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে।

মদিনায় এক দশক অতিক্রান্ত হবার পর, বিশেষ করে মক্কা বিজয়ের পর সুরা তওবা যেন অমুসলিম কিতাবিদের (খ্রিস্টান, ইহুদিদের) ওপর বজ্রাঘাত হানে। যে মানুষগুলোর সাথে এতোদিন আল্লাহর আদেশে মুসলমানরা নম্রভাবে ভাব বিনিময় করতেন, কোনো ধরনের হুমকি প্রদান করতেন না তাদেরকে এই সুরার আয়াতগুলিতে ইসলামকে স্বীকার না করলে ভবিষ্যত শাস্তির বার্তা প্রদান করা হয়। এতোদিন কেবল নবির কাজ ছিল জনতার কাছে সতর্কবার্তা পাঠানো, উপদেশ প্রদান করা, দশ বছর পর মৃত্যুদণ্ডের ভীতি প্রদর্শনের বার্তা দিলেন। সুরা তওবার এই আয়াতে নির্দেশ দেয়া হলো: যাদের ওপর কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে তাদের মধ্যে যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না ও পরকালেও বিশ্বাস করে না এবং আল্লাহ ও তার রসুল যা হারাম করেছেন তা হারাম করে না ও সত্যধর্ম অনুসরণ করে না তাদের সাথে যুদ্ধ করবে যে-পর্যন্ত না তারা বশ্যতা স্বীকার করে আনুগত্যের নিদর্শনস্বরূপ স্বেচ্ছায় জিজিয়া দেয়। (৯: ২৯)। সুরা বাইয়িনা-তে বলা হলো, বছরের পর বছর অতিক্রান্ত হবার পর কিতাবি ও অংশীবাদীরা সৃষ্টির অধম প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। (৯৮৬)। মদিনার ইহুদিদের উচ্ছেদ, খায়বার ও ফাদাক ইহুদি-গ্রাম দখল এবং মক্কা বিজয়ের পর নবি মুহাম্মদ এই ঐশ্বরিক নির্দেশের কথা প্রদান করেন। এ-ইতিহাস থেকে বোঝা যায়, ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবার পর ভিন্নমতাবলম্বীদের সাথে পূর্বের মতো নম্র ও যৌক্তিক বাক্য ব্যবহার করে কথোপকথনের প্রয়োজন নেই। ভবিষ্যতে যুদ্ধের ময়দানে তরবারির ভাষায় ফয়সালা হবে সবকিছুর।

একটি সুগঠিত অর্থনীতির প্রতিষ্ঠা

ইয়াসরিবে গমনের পর নবি মুহাম্মদ তার স্থানীয় সমর্থক (আনসার) আউস ও খাজরাজ গোত্রের লোক এবং অভিবাসী মুসলমানদের (মুহাজির) সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেন। আনসাররা মুহাজিরদের পালক ভ্রাতা হিসেবে নিজেদের ঘরে আশ্রয় দেন। মুহাজিররা কর্মঠ ছিলেন। তাঁরা ইয়াসরিবে এসে কৃষি-শ্রমিক এবং বাজারে দোকানের কাজ জুটিয়ে নেন। তথাপি এখানে তাদের অবস্থান সহজ কিংবা নিরাপদ, কোনোটাই ছিল না। মক্কায় থাকাকালীন সময়ে কুরাইশদের সাথে পেরে উঠতে না পেরে তাঁরা নির্ভরযোগ্য জীবিকার অন্বেষণ করছিলেন, যা তাদেরকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করতে পারবে। নবি মুহাম্মদ নিজে কোনো পেশা গ্রহণ করেননি। মুহাজির ও আনসারদের অনুদানের ওপর নির্ভর করতেন। তিনি এ-সময় কঠোর সময়কাল অতিক্রম করছিলেন। তাঁকে প্রায়শ রাত্রিকালীন আহার না করে শয্যায় যেতে হতো কিংবা কয়েক দিনের ক্ষুধা এক দিনে উপশম করতে হত। ফলে ইয়াসরিবে এসে সংখ্যালঘু মুসলমান জনগোষ্ঠীকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমূখীন হতে হলো। বেঁচে থাকার জন্য তাদেরকে একটি কম বিপজ্জনক এবং স্বনির্ভর অর্থনৈতিক ভিত্তি খুঁজে নিতে হবে। এ-সমস্যার সমাধানে নবির গৃহীত ব্যবস্থাসমূহ নিচে আলোচনা করা হয়েছে।

ইসলাম-পূর্ব সময় থেকে আরব গোত্রগুলোর সম্পদ বৃদ্ধির একটি ঐতিহ্যগত প্রথা হচ্ছে এক গোত্র কর্তৃক অন্য গোত্রকে আক্রমণ, অপরের গবাদিপশু ও অন্যান্য সম্পদ দখলে নেয়া। কৃষিভিত্তিক স্থায়ী পেশা বা জীবিকা অর্জনের পথ খুব দুরূহ থাকায় তৎকালীন আরবের বেশিরভাগ গোত্র এভাবে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করতেন। ইয়াসরিব-অভিবাসী মুসলমানদেরও নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তনের জন্য অন্য কোনো উপায় ছিল না। ফলে তাঁরা বিদেশ যাত্রী, বাণিজ্যিক কাফেলা কিংবা শত্রুগোত্রের ওপর হঠাৎ আক্রমণের পন্থা বেছে নিলেন। আরবি গাজওয়া শব্দের অর্থ হচ্ছে আকস্মিক আক্রমণ’। এই শব্দটি ব্যবহৃত হয় কোনো বাণিজ্যিক কাফেলা কিংবা গোত্রের ওপর আকস্মিক আক্রমণ করে তাদের সম্পদ ও নারীদের ছিনিয়ে নেয়া। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করে এভাবে অর্জিত সম্পদ আরব অঞ্চলের শুষ্ক রুক্ষ পরিবেশে জীবনযাপনকে তাৎক্ষণিকভাবে সহজ করে দিত।

একবার নবির কাছে সংবাদ পৌঁছাল কুরাইশদের একটি বাণিজ্যিক কাফেলা আমর বিন আল-হাদরামির নেতৃত্বে বিশাল মালামালের বহর নিয়ে সিরিয়া থেকে মক্কার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। নবি আব্দুল্লাহ বিন জাহেশ এর নেতৃত্বে মুহাজিরদের একটি দলকে ওই কাফেলার সম্পদ দখলের জন্য প্রেরণ করেন। মুহাজিররা নাখলা নামক একটি যাত্রাবিরতির স্থানে আকসিক আক্রমণ এলেন মুহাজিররা। সাথে দুইজনকে জিমি করেও নিয়ে আসা হলো। ইসলামের ইতিহাসে এই সফল অভিযানকে নাখলার অভিযান’নামে অভিহিত করা হয়।

মুহাজিরদের নাখলা-অভিযানের ঘটনা তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে মক্কায় এবং ইয়াসরিবে। কারণ এটি ছিল মুসলমানদের প্রথম আক্রমণ এবং যা রজব মাসের প্রথম দিনে সংঘটিত হয়েছিল। প্রাচীন আরব-রীতি অনুযায়ী চারটি মাসে (মহরম, রজব, জিলকুদ ও জিলহজ) আক্রমণ করা নিষিদ্ধ, যার মধ্যে রজব মাস একটি। স্বাভাবিকভাবে এই আক্রমণের পর কুরাইশরা তীব্র ঘৃণা প্রদর্শন করল মুহাজিরদের প্রতি। অন্যান্য গোত্র থেকেও তেমনি প্রতিক্রিয়া নির্গত হলো। ইতিহাস-পাঠে মনে হয় এই প্রতিকূল প্রেক্ষাপট নবিকেও শঙ্কার মধ্যে ফেলে দেয়। তিনি আব্দুল্লাহ বিন জাহশ ও তার লোকজনের প্রতি শীতল আচরণ করলেন। ভবিষ্যতপন্থা নির্ধারণেও কিছুটা সংশয়ী মনোভাব প্রকাশ করলেন। আব্দুল্লাহ বিন জাহশ দাবি করলেন এই আক্রমণ জুমাদা আস-সানি মাসের শেষ দিনে করা হয়েছে। এক্ষেত্রে একটি সমাধানের পথ পাওয়া গেল। কিন্তু যুদ্ধে লব্ধ মাল নিয়ে সমস্যা রয়ে গেল, যা মুহাজিরদের প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থানে প্রয়োজনীয় ছিল। এ-কারণে কুরাইশদের দাবির মুখে মালগুলো ফিরিয়ে দেবার কোনো সুযোগ ছিল না। হয়তো কয়েকজন সাহাবি নবিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যা ঘটে গেছে তা আর বদলানো যাবে না এবং কোনো প্রকারের অস্বীকারমূলক বক্তব্য মুহাজিরদের অপরাধী এবং শত্রুকে নির্দোষ বানাবে। মুহাজিরদের অর্থনৈতিক অবস্থার মুক্তির জন্য গনিমতের মালের প্রয়োজনীয়তার কথা নিশ্চিতভাবে তাদের মনে কাজ করছিল।

একটি সুস্পষ্ট এবং দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী সমাধান আসে সুরা বাকারার এই আয়াতে: পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে লোকে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, বলো, সেই সময় যুদ্ধ করা ভীষণ অন্যায়। কিন্তু আল্লাহর কাছে তার চেয়েও বড় অন্যায় আল্লাহর পথে বাধা দেয়া, আল্লাহকে অস্বীকার করা, কাবাশরিফে উপাসনায় বাধা দেয়া ও সেখানকার অধিবাসীদের সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়া। ফিৎনাং হত্যার চেয়েও ভীষণ অন্যায়। পারলে তারা সব সময় তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকবে যে-পর্যন্ত না তারা তোমাদের ধর্ম থেকে তোমাদেরকে ফিরিযে দেয় (২: ২১৭)। নাখলা অভিযানের পর কুরাইশ এবং আরও কয়েকটি শত্রুভাবাপন্ন গোত্রের ওপর সফল গাজওয়া পরিচালিত হলে মুহাজিরদের আর্থিক অবস্থানে পরিবর্তন আসে। এ-অভিযানগুলো নবি এবং সাহাবিদের ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর রাস্ত করে দেয় এবং সমগ্র আরবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ছিল চূড়ান্ত রূপ। তবে তাৎক্ষণিকভাবে যে পদক্ষেপটি মুসলমানদের মর্যাদা ও আর্থিকভিত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল তা হচ্ছে ইয়াসরিবের ইহুদি সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ।

ইয়াসরিবে তিনটি ইহুদি গোত্র বাস করত। এরা হচ্ছে বানু কায়নোকা, বানু-নাজির ও বানু কুরাইজা। এই ইহুদি গোত্রগুলি ইয়াসরিবে কৃষি ও শিল্পে নিজস্ব দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ব্যাপক উন্নতি করেছিল। ধর্মীয় শিক্ষা ও সাহিত্যের চর্চার মাধ্যমে তারা ইয়াসরিবের অন্য দুটি গোত্র আউস ও খাজরাজের চেয়ে উন্নত সংস্কৃতির অধিকারী হয়ে ওঠে। ইহুদিরা অনেক আউস ও খাজরাজ গোত্রের লোককে কৃষিশ্রমিক ও দোকান-গুদামের বিক্রময়কর্মী ও প্রহরী হিসেবে নিযুক্ত করে। আউস ও খাজরাজ গোত্রের লোকেরা এ-জন্য প্রতিনিয়ত হীনমন্যতায় ভুগতেন এবং ইহুদি গোত্র তিনটির প্রতি ঈর্ষা অনুভব করতেন। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে আউস ও খাজরাজ গোত্রের লোকেরা নবি মুহাম্মদের সাথে আল-আকাবা চুক্তি সম্পাদন করার মূল কারণ ছিল ইয়াসরিবে ইহুদিআধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে নিজেদের হীনমন্যতা থেকে মুক্ত করা। ইয়াসরিবে আগমনের পর নবির মধ্যে প্রথমে একটি বিচক্ষণ পরিণামদর্শিতা বজায় ছিল। তিনি ইহুদিদের সাথে যে কোনো প্রকার বিতর্ক এড়িয়ে চলতেন। ইহুদিরা ছিল শক্তিশালী ও বিত্তশালী। তিনি তাদের সাথে অনাক্রমণমূলক একটি চুক্তিও (আহদ আল-মুয়ারা) করেছিলেন, যা উভয় গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করে। চুক্তিতে ঠিক হল মুসলমান ও ইহুদিরা নিজস্ব ধর্মীয় সমাজে বসবাস করবে এবং কুরাইশ ও অন্য যে কোনো গোত্র থেকে আক্রমণ করা হলে উভয় ধর্মাবলম্বী যৌথভাবে ইয়াসরিবকে রক্ষা করবেন। একই সাথে উভয় পক্ষই মধ্যে একটি সাধারণ সম্পর্কের যোগসূত্র হচ্ছে উভয় গোষ্ঠী পৌত্তলিকতা ও মূর্তিপূজা পরিহার করেছিলেন এবং প্রার্থনার সময় উভয় গোষ্ঠীই একই দিকে তাদের মাথা নত করতেন।

ইয়াসরিবে মুসলমানরা যখন দুর্বল ছিলেন তখন উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা ঘটেনি। এমন-কি ইয়াসরিবে অভিবাসনের দেড় বছর ধরে নবি প্রার্থনার জন্য কিবলার দিক দূরতম মসজিদকে (জেরুজালেমে অবস্থিত) অনুসরণ করতেন তখনও কোনো বিরোধ বাধেনি। কিন্তু পরে কিবলার দিক পরিবর্তন করে মক্কার কাবাঘরের দিকে করা হয়। এই পদক্ষেপের পর থেকে ইহুদিরা প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। তাদের প্রশ্নের জবাব আসে সুরা বাকারা-এর এই আয়াতে: পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফেরানোতে কোনো পুণ্য নেই; কিন্তু পুণ্য আছে আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতা, সব কিতাব ও নবিদের ওপর বিশ্বাস করলে করলে…। (২: ১৭৭)। এই নির্দেশনাটি আসলে ইহুদিদের জন্য ছিল একটি সতর্কবার্তা। তাদের উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে গেল যখন ছোটোখাট আকসিক অভিযান ও মক্কার বাণিজ্যিক কাফেলার ওপর গাজওয়ার সাফল্য আসতে লাগল। ইহুদিদের উৎকণ্ঠার চূড়ান্ত পরিণতি দেখা গেল বদরের ময়দানে। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে কুরাইশদের বিপক্ষে নবি এবং সাহাবিদের বিজয়ের মাধ্যমে। এবার ইয়াসরিবের ইহুদিরা মুখোমুখি হলেন আউস ও খাজরাজ গোত্রের সাথে। যাদের একদা কিছুই ছিল না, তারপরও ইহুদি মালিকদের অধীনে তাঁরা কাজ করতে উৎসাহী ছিলেন না। ইহুদিরা দেখলেন মুহাজির আর আনসাররা নবি মুহাম্মদের পতাকাতলে মিলিত হয়ে একটি শক্তিশালী জোটবদ্ধ সংগঠন গড়ে তুলেছেন, যার আসল নাম ইসলাম। ইসলামের উত্থানে মক্কায় গিয়ে পরাজিত কুরাইশদের প্রতি সহমর্মিতা জানালেন। কুরাইশদেরকে মুহাম্মদ এবং তার অনুসারীদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য তাগিদ দিলেন। এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় সুরা নিসা-এর এই আয়াতে: তুমি কি তাদেরকে দেখনি যাদেরকে কিতাবের এক অংশ দেয়া হয়েছিল? তারা প্রতিমা ও অসত্য দেবতার ওপর বিশ্বাস করে। তারা অবিশ্বাসীদের সম্বন্ধে বলে যে, বিশ্বাসীদের চেয়ে এদের পথই ভালো।’(৪: ৫১)। এই আয়াতে পৌত্তলিকতা ও মূর্তিপূজা নিষেধকারী ধর্মশাস্ত্রের অধিকারী বলে দাবি করা লোকদেরকে তিরস্কার করা হয়েছে যারা কিনা আবার পৌত্তলিকদের সাথেই ঐক্য গড়ে তোলে এবং নবি মুহাম্মদের একেশ্বরবাদী অনুসারীগণের তুলনায় সেই সব পৌত্তলিকদের বড় দেখানোর চেষ্টা করে।

এ-সন্ধিক্ষণে ইয়াসরিবের বাজারে একটি সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে বানু কায়নোকার গোত্রের সাথে সংঘর্ষ বাধে। এর সমাপ্তি ঘটে মুসলমানদের দ্বারা কায়নোকা গোত্রের রাস্তা দখলের মাধ্যমে। ইয়াসরিব নিবাসী একজন আনসার নারী কায়নোকা গোত্রের একজন স্বর্ণকারের দোকানে গিয়েছিলেন। স্বর্ণকার নারীকে দেখে কৃত্রিম ভালোবাসা দেখাতে শুরু করে এবং ওই নারী তা প্রত্যাখ্যান করেন। প্রতিশোধ স্পৃহার বশবর্তী হয়ে স্বর্ণাকার তখন নারীকে হয়রানি করেন এবং চেয়ারের সাথে ওই নারীর ঘাগরা ও ব্লাউজ পিন মেরে আটকে দেয়। নারীটি যখন ওঠে দাঁড়ান তখন পোশাকের নিম্নভাগ উন্মোচিত হয়ে যায় এবং উপস্থিত লোকজন হাসিতে ফেটে পড়ে। ওই নারী উচ্চস্বরে প্রতিবাদ জানালে একজন মুসলমান তার সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেন। ক্রুদ্ধ মুসলমান ওই স্বর্ণকারকে হত্যা করেন। এ-খবর শোনা মাত্র অন্য ইহুদিরা স্বর্ণাকারের সাহায্যে এগিয়ে আসেন এবং ওই মুসলমান ব্যক্তিকে তারা হত্যা করেন। গোটা ঘটনাটিই দ্রুত দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটায়। মুসলমানরা নবির কাছে বিচারের দাবি জানান। তাঁরা নবির অনুমতিক্রমে বানু কায়নোকা গোত্রের বসতিতে প্রবেশের রাস্তা জোরপূর্বক দখলে নিলেন এবং কায়নোকা গোত্রের খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হল। পনের দিন পর প্রস্তাবিত কিছু শর্ত মেনে বানু কায়নোকা গোত্র আত্মসমর্পণ করে। শর্তগুলো হল তাদের জীবন রক্ষা পাবে তবে ইয়াসরিব ছেড়ে চলে যেতে হবে। যাবার আগে তারা সমস্ত সম্পদ একত্রে জমা করবে, সেখান থেকে ভারবাহী পশু বহনে সক্ষম সম্পদগুলো বাদ দিয়ে বাকিগুলো ওই স্থানে রেখে যাবে যা ইয়াসরিবের গৃহহীন, দরিদ্র মুহাজিরদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।

এ-ঘটনার পর ইয়াসরিবে মুসলমানদের অর্থনৈতিক অবস্থা যথেষ্ট সুসংহত হয়। আর স্বাভাবিকভাবে ইহুদি গোত্রগুলো আতঙ্কিত মুহাম্মদ বিন মাসলামা। বানু-নাজির গোত্রের কাব বিন আল-আশরাফের রক্তের দাম নির্ণয়ে নবি এবং তার অনুসারীদের সাথে বিতর্ক হয়। এ-সময় সুযোগ বুঝে নবিকে হত্যা করতে গেলে মুসলমানদের সাথে লড়াই বেধে যায় বানু-নাজির গোত্রের। নবির আদেশে যুদ্ধ শুরু হলে মুসলমানরা বানু-নাজির গোত্রের বসতিতে প্রবেশের রাস্তা অবরোধ করে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিলেন। বানু-নাজির পূর্ব থেকেই যুদ্ধের কৌশল কিছুটা আন্দাজ করায় তারা বানু কায়নোকা থেকে তীব্রভাবে পাল্টা আক্রমণ করে। মুসলমানরাও সাহসিকতার সাথে লড়াই করছিলেন। বানু-নাজিরের লড়াকু প্রতিক্রিয়া দেখে নবি আশঙ্কা করলেন মুসলমানরা হয়তো যুদ্ধের ময়দানে টিকে থাকতে পারবেন না, তারা আরবের ঐতিহ্যগত পরিবর্তশীলতায় বশীভূত হয়ে নিজেদের ঘরে ফিরে যাবে। তিনি দ্রুত আদেশ দিলেন বানু-নাজির গোত্রের খেজুরগাছগুলো যেন পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

উট এবং ভেড়ার মতো খেজুরগাছও আরবের অন্যতম খাদ্য ও সম্পদের উৎস। বানু-নাজির এ-ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তারা নবিকে প্রশ্ন করে: কিভাবে এই কাজটি করা সম্ভব হল?”, তাহলে কিভাবে আপনি নিজেকে সতর্ককারী হিসেবে এবং মন্দ ও ধ্বংসের বিরোধী হিসেবে দাবি করেন, যেখানে আপনি নিজেই একটি উৎপাদনশীল উৎসভাণ্ডার ধ্বংস করে দিয়েছেন। এই প্রশ্নবাণে নবি পশ্চাৎপদ হননি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নাজিল হলো সুরা হাশর-এর এই আয়াতগুলো: আল্লাহ ওদেরকে নির্বাসন দেয়ার সিদ্ধান্ত না করলে পৃথিবীতে অন্য শাস্তি দিতেন; আর পরকালে ওদের জন্য রয়েছে আগুনের শাস্তি। উহা এজন্য যে ওরা আল্লাহ ও তার রসুলের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। আর কেউ আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করলে, আল্লাহ তো শাস্তিদানে কঠোর। তোমরা যে কত খেজুরগাছ কেটেছ আর কতক না-কেটে রেখে দিয়েছ, তা তো আল্লাহরই অনুমতিক্রমে। উহা এজন্য যে, এ দিয়ে আল্লাহ সত্যত্যাগীদেরকে অপদস্থ করবেন।’(৫৯: ৩-৫)। এই আয়াতত্রয়ের গৃঢ় অর্থ হচ্ছে শেষ পরিণতি দ্বারাই যুদ্ধজয়ের পদক্ষেপগুলো নির্ধারিত হয়। অমানবিক হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধের এই কৌশল তৎকালীন আরব গোত্রগুলোর কাছে গৃহীত হয়েছে। অষ্টম হিজরিতে (৬৩০ খ্রিস্টাব্দ) সাকিফ গোত্রের সাথে লড়াইয়ে এবং তায়েফ দখলের সময়েও নবি এই আয়াতগুলো ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে (৬১ হিজরি) নবির দৌহিত্র এবং হজরত আলির পুত্র হোসেন বিন আলিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য উমাইয়া সেনারাও প্রাসাদে নারী-শিশুসহ সকলের জন্য খাদ্য-পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। যা হোক, বানু-নাজির গোত্র শেষ পর্যন্ত বিশ দিন পর আত্মসমর্পণ করে। খাজরাজ গোত্রের কয়েকজন নেতার মধ্যস্থতায় এই মতৈক্যে পৌঁছানো হলো বহনযোগ্য সকল সম্পদ একটি নির্দিষ্ট জায়গায় মুসলমানদের মধ্যে বিতরণের জন্য জমা রেখে তারা নিরাপদে ইয়াসরিব ত্যাগ করবে।

ইয়াসরিবে অবস্থানকারী বাকি একমাত্র ইহুদি গোত্র ছিল বানু কুরাইজা। ৬২৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে (হিজরি ৫ম বর্ষে) তাদের অবস্থা খারাপ হয়। অভিযোগ পাওয়া গেল তারা ইয়াসরিবে থেকে মক্কার কুরাইশদের সাথে যোগাযোগ করছে এবং কুরাইশদেরকে সাহায্য করতেও রাজি হয়েছে। নবি কৌশলে কুরাইজার মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি করেছেন, ফলে তারা শেষ পর্যন্ত আবু সুফিয়ান বাহিনীকে সহায়তা করেনি। কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান যখন মদিনা দখলের আশা ত্যাগ করে অবরোধ তুলে নিলেন মুসলমানরা তখন বানু কুরাইজার রাস্তা পচিশ দিন ধরে অবরোধ করে রাখেন। কুরাইজা গোত্র তখন তাৎক্ষণিকভাবে অন্য গোত্রের ন্যায় আত্মসমর্পণের চুক্তি করে সহায়সম্পত্তি জমা দিয়ে নিরাপদে স্থান ত্যাগ করার জন্য রাজি ছিল। কিন্তু আবু সুফিয়ানের সাথে সম্পর্ক রাখার কারণে নবি তাদের উপর খুব রুষ্ট ছিলেন। ফলে তিনি তাদেরকে এই সুযোগ দিলেন না। তিনি হয়তো আরও চিন্তা করেছিলেন ইসলামের গরিমা বৃদ্ধির জন্য এবং প্রতিপক্ষের প্রতি ভীতিপ্রদ সতর্কবার্তার জন্য ধ্বংসও প্রয়োজন আছে। পূর্বের দুইটি ইহুদি গোত্র খাজরাজ গোত্রের নেতাদের হস্তক্ষেপে মুক্তি পেয়েছিল। কুরাইজা গোত্র এবার আউস গোত্রের সাহায্য কামনা করলেন। নবিও মুসলমানদের পক্ষে আউস গোত্রের একজনকে মধ্যস্থতাকার নিয়োগ দিলেন। তার নাম সাদ ইবনে মুয়াজ। তিনি পূর্ব থেকেই কুরাইজা গোত্রের ওপর ক্ষিপ্ত এবং কুরাইজা গোত্রের বিরুদ্ধে অবরোধ চলার সময় তিনি লড়াইয়ে আহত হয়েছিলেন। ক্ষুব্ধ সাদ ইবনে মুয়াজ রায় দিলেন কুরাইজা গোত্রের সকল পুরুষকে হত্যা করা হবে, তাদের নারী-শিশুকে দাস হিসেবে বিক্রি করা হবে এবং তাদের সম্পত্তি মুসলমানদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।

এই সিদ্ধান্ত অন্যায্য হওয়া সত্ত্বেও তা পরিবর্তনের সুযোগ ছিল না। কারণ আউস গোত্রের লোকেরা সাদ ইবনে মুয়াজের রায় মেনে নিয়েছিলেন। একটি টেকসই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক সময় অনেক নির্দয় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কুরাইজা গোত্রের বিরুদ্ধেও তাই এ-রকম সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ইয়াসরিবের বাজারে কিছু পরিখা খনন করা হয়েছিল যাতে যুদ্ধের সময় নিরাপদে স্থান ত্যাগ করা যায়। ওই পরিখাগুলো কুরাইজা গোত্রের আত্মসমর্পণকৃত সাতশজন (ভিন্নসূত্র মতে এক হাজার সংখ্যক) পুরুষ ইহুদির শিরোচ্ছেদকৃত দেহ দাফন করা হয়। অবশ্য সাদ ইবনে মুয়াজের নির্দেশ অমান্য করে একজন ইহুদি নারীকেও হত্যা করা হয়েছিল। তিনি ছিলেন কুরাইজা গোত্রের হাসান আল-কুরাইজির স্ত্রী। তিনি বিবি আয়েশার বান্ধবী ছিলেন। মৃত্যুর আগ মুহুর্তে তিনি বিবি আয়েশার সাথে কথা বলছিলেন। পরে তিনি সহাস্যে এবং উৎফুল্ল চিত্তে শিরোচ্ছেদের স্থানে হেঁটে গেলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল বানু কুরাইজা গোত্রের বিরুদ্ধে অবরোধের সময় তিনি মুসলমানদের ওপর পাথর ছুড়ে মেরেছিলেন। ওই নারী সম্পর্কে বিবি আয়েশার বক্তব্য ছিল: ‘আমি তার মতো সুন্দরী, ভদ্র এবং দয়ালু মহিলা কখনো দেখিনি। তিনি যখন শিরোচ্ছেদের স্থানে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন, আমি তাকে বললাম, আপনাকে নির্ঘাৎ হত্যা করা হবে। তিনি প্রত্যুত্তরে বললেন, বেঁচে থাকাটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নয়।’

ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ

হিজরতের পর প্রথম দশকে আমরা ইয়াসরিবে নতুন একটি রাষ্ট্রের সূচনা দেখতে পাই। মক্কায় তের বছর ধরে নবি মুহাম্মদের লক্ষ ছিল মানুষের নিকট ইসলাম প্রচার করা, উপদেশ দেয়া ও শেষ বিচারের দিন সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করা। ইয়াসরিবে এসে তার নবুওতের উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করে। মানুষকে প্রভাবিত করে তাদেরকে নতুন ধর্মীয় বিধি গ্রহণ করানো মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। এ-পর্যায়ে এসে সকল ধরনের কৌশলই প্রয়োগের বিবেচনা করা হয়েছিল। আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিকতার যেসব ধারা শেখানো হয়েছিল তা এখানে গুরুত্ব রাখেনি।

সেসময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে ছিল রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, বিনা উস্কানিতে হামলা এবং কয়েকটি নির্দিষ্ট উপগোষ্ঠীর উপর আক্রমণ যারা মোটেও আগ্রাসী মনোভাবের ছিল না। গুপ্তচরেরা জানিয়েছিল এরা মুসলমানদের প্রতি অসহিষ্ণু হতে পারে। তাই রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই এ ধরনের সব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। কুরাইশদের বাণিজ্যিক গাড়িবহরে হামলার মাধ্যমে মুহাজিররা অনেক দিন থেকে লাভবান হয়েছিলেন। এতে যেমন কুরাইশরা আহত হয়েছিল, তাদের পণ্য দখল করা গিয়েছিল তেমনি মুহাজিরদের সামরিক দক্ষতা ও মর্যাদা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছিল; এবং সর্বোপরি সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকেও ভয় দেখানো সম্ভব হয়েছিল। ওই একই সময়ে ইসলামের বেশিরভাগ আইন ও বিধিবিধান প্রকাশ করা হয়েছিল এবং ইসলামি অর্থনৈতিক ও সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছিল।

নবি মক্কায় থাকাকালে কোনো আইন প্রয়োগ করা হয়নি। ইসলাম-বিশেষজ্ঞ ইজহাক গোল্ডজিহার এ-প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন: মক্কায় যা নাজিল হয়েছে তা একটি নতুন ধর্মের সূচনা করে না। মক্কায় নাজিল হওয়া কোরআনের আয়াতগুলোর বেশিরভাগই ধর্মপ্রাণ হওয়ার, একমাত্র আল্লাহর উপাসনা ও প্রশংসা করা, অন্যদের প্রতি খেয়াল রাখা এবং পানাহারের ক্ষেত্রে পরিমিত পরিমাণ বজায় রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। মক্কায় শুধু পাঁচটি ফরজ পালনের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। যেমন: (এক) এক আল্লাহর অস্তিত্বে এবং নবিদের কাজে বিশ্বাস রাখা, (দুই) নামাজ পড়া, (তিন) জাকাত প্রদান করা। তখন স্বেচ্ছায় মুক্তহস্তে দানের মাধ্যমে এটা করা হতো। (চার) রোজা রাখা। তখন ইহুদিদের মতো করে পালন করা হতো। (পাঁচ) হজ। তখনকার কাবা ঘর পরিদর্শনের কথা বোঝানো হয়েছে।

বিশিষ্ট তফসিরকারক জালালউদ্দিন সুয়তির মতে মক্কায় থাকাকালীন সময়ে ইসলামি আইনে কোনো শাস্তির নির্দেশ ছিল না। কারণটা স্বাভাবিক। কোনো আইন তখনো কার্যকর হয়নি। আল-তাবারির মতে যে সুরাগুলোতে কোনো ধরনের আইনগত বাধ্যবাধকতা করে দেয়া হয়েছে সেগুলো নিঃসন্দেহে মদিনায় নাজিল হয়েছে। বিবি আয়েশাকেও বলতে শোনা গিয়েছে, মক্কার কোরআনের একমাত্র বিষয় ছিল বেহেশত আর দোজখ। হালাল আর হারামের নীতিমালা ইসলামের প্রসারের পর সৃষ্টি করা হয়েছে।

নবির জীবনের শেষ দশকে যে আইন ও নীতিমালা প্রণিত হয়েছে তা ইসলামকে শুধু যে আইনগত অনুমোদন দিয়েছে তাই নয় একটি আরব রাষ্ট্র গঠনের রাস্তাও তৈরি করে দিয়েছে। নবির প্রথম উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল নামাজের জন্য কিবলাকে জেরুজালেমের সবচেয়ে দূরের মসজিদ (আল-আকসা মসজিদ) থেকে সরিয়ে মক্কার কাবা শরিফের দিকে নিয়ে আসা। ফলে ইহুদিদের থেকে পৃথকভাবে ধর্মাচরণ করা সম্ভব হয়। এতে করে ইসলাম ধর্মের স্বতন্ত্রতা তৈরি হওয়ার ফলে মদিনার মুসলমানরা হীনমন্যতা কাটিয়ে উঠতে পারে। আরবের প্রায় সকল গোষ্ঠী কাবা শরিফকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করত। পৌত্তলিক উপাসনালয় থেকে কাবা একসময় সকল আরবীয়দের পূর্বপুরুষ ইব্রাহিম ও ইসমাইলের ঘরে পরিণত হয়। রোজা রাখার ক্ষেত্রেও নবি ইহুদিদের নিয়ম অনুসরণ থেকে সরে আসেন। মহরম মাসের দশম দিন থেকে রোজা রাখার নিয়ম পরিবর্তন করে রমজান মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিন রোজা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে পুরো রমজান মাসই রোজা রাখা হবে বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার শাস্তি ও ক্ষতিপূরণসহ আরও বিভিন্ন ফৌজদারি আইন প্রণয়ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নাপাক, খৎনা এবং খাদ্য ও পানীয়ের উপর নিষেধাজ্ঞার আইনগুলোও এসময় প্রণীত হয়। যদিও এসব আইনের বেশিরভাগই ইহুদি বা অন্যান্য পৌত্তলিক আরবীয় আইন থেকেই নেয়া হয়েছিল তবুও স্বতন্ত্রতা রক্ষার জন্য বেশ কিছু পরিবর্তন-পরিবর্ধন এখানে আনা হয়েছিল। ইহুদি ও পৌত্তলিকতার ছোঁয়া থাকলেও এ-ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে এসবের উদ্দেশ্য ছিল সমাজে আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা এবং গোত্র-সম্প্রদায়ের সবার মধ্যে সুসম্পর্ক সৃষ্টি করা। প্রত্যেক সম্প্রদায় বা জাতির সভ্যতার মধ্যেই অন্য সম্প্রদায়ের সভ্যতার ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতিটি ধর্মেই বেশকিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠান থাকে যা সম্পাদনের জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। এগুলোর সংগঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে কিছুটা হলেও কোনো ধরনের গুরুত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু কোনো চিন্তাশীল ব্যক্তিই মক্কার উদ্দেশ্যে হজযাত্রা এবং সেখানে গিয়ে হাজিদের পালন করা আচার-আচরণের পিছনে কোনো দার্শনিক যুক্তি খুঁজে পান না।

৬২৮ খ্রিস্টাব্দে নবি মুহাম্মদের কাবার উদ্দেশ্যে যাত্রার সিদ্ধান্তটি বেশ আশ্চর্যজনক ছিল। তিনি কি সত্যিই কাবাকে ‘আল্লাহর ঘর বলে বিশ্বাস করতেন? না-কি তার যেসব অনুসারীর কাছে কাবা দর্শন করা প্রাচীনকাল থেকে মেনে চলা এক ঐতিহ্য ছিল, তাদের জন্যই এমন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন? এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল কুরাইশদের সাথে হতাশাজনক হুদায়বিয়ার সন্ধির পরে। সেই কুরাইশদের সাথে যারা মুসলমানদেরকে কাবা শরিফে প্রবেশে বাধা দিতো। তাহলে ওই সিদ্ধান্ত কি মুসলমানদের সামরিক শক্তি দিয়ে কুরাইশদের মোড়লিপনা থামাতে এবং সাধারণ মক্কাবাসীকে নিজের নতুন ধর্মের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য নেয়া হয়েছিল? যে ব্যক্তি নিজের নতুন ধর্ম ও আইনকে আরব জনগণের সামনে তুলে ধরেছিলেন এবং নিজের কাছের মানুষদের সকল ভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস ও কুসংস্কারকে ছুড়ে ফেলেছিলেন, তিনিই আবার কিভাবে পুরানো ধর্মের প্রধান অংশটিকে নতুন মোড়কে তার নিজের ধর্মে যোগ করলেন? ইসলামের প্রধান স্থপতি ও আইনপ্রণেতা নিরাকার বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদকে সবার উপরে প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন, মানুষকে বলে এসেছেন যে, এক আল্লাহের ওপর বিশ্বাসই সফলকাম হওয়ার একমাত্র পথ। তিনি বলেছেন: . তোমাদের মধ্যে সেই আল্লাহর কাছে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন যে বেশি সাবধানি। (৪৯: ১৩)। তবে কি নবি জাতিগত অনুভূতিতে বশীভূত হয়ে পড়েছিলেন? কাবা ঘরের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনকে কি তিনি আরবের জাতীয় পরিচিতির প্রতীক বানাতে চেয়েছিলেন? যাই হোক না কেন, এই সিদ্ধান্তটি এতটাই বিস্ময়কর ও ইসলামি নিয়ম-নীতি হতে বিচ্যুত ছিল যে মুসলমানদের অনেকেই কিছুটা মনোক্ষন্ন হয়েছিলেন। অনেকেই সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে চলাচলের নিয়মের বিরোধিতা করেছিলেন, কারণ এটা আরবীয় পৌত্তলিকদের ধর্মাচার ছিল। কিন্তু সুরা বাকারা-এর এই আয়াতের মাধ্যমে ইসলামে স্থায়ীভাবে স্থান দেয়া হয়েছিল: নিশ্চয় দুটি পাহাড় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। (২: ১৫৮)।

হজের সময় হজরে আসওয়াদ বা কালো পাথরে চুমু খাওয়া সম্পর্কে একটা বহুল প্রচলিত হাদিস আছে। নবির সবচেয়ে প্রজ্ঞাবান সাহাবিদের অন্যতম হজরত ওমর বিন আল-খাত্তাব ওই কালো পাথরকে উদ্দেশ্য করে একদা বলেছিলেন; আমি জানি তুমি একটা পাথর ছাড়া কিছুই নও, মানুষকে সাহায্য করা বা ক্ষতি করার তোমার কোনো ক্ষমতা নেই। যদি আমি আল্লাহর রসুলকে তোমায় চুম্বন করতে না দেখতাম, তাহলে আমি তোমাকে কখনো চুম্বন করতাম না। বরং কাবাঘর হতে বহিষ্কৃত করে তোমাকে দূরে নিক্ষেপ করতাম। সূত্র; বুখারি শরিফ, ভলিউম ২, বুক ২৬ নম্বর ৬৬৭- অনুবাদক)। প্রভাবশালী ইসলামি দার্শনিক ইমাম গাজ্জালি’ হজ সম্পর্কে বলেছেন, তিনি হজের আনুষ্ঠানিকতার কোনো ব্যাখ্যাই খুঁজে পাননি, কিন্তু তারপরও তা করেছেন, কারণ এটা একটি প্রতিপাদিত ঘটনা। ইরাকের বসরায় জন্মগ্রহণকারী সুফি সন্ন্যাসী রাবেয়া বসরি (৭১৭-৮০১ খ্রিস্টাব্দ) হজ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন: “হজে গিয়ে আমি শুধু ইট আর একটি ভবন দেখেছি। এর থেকে আমি কি পুণ্য অর্জন করবো?” পারস্যের বিশিষ্ট সুফি সাধক বায়োজিদ বোস্তামি (৮০৪-৮৭৪ খ্রিস্টাব্দ) হজে যাবার পূর্বে এক বৃদ্ধের সাক্ষাৎ লাভ করেন। বৃদ্ধ ব্যক্তি তাঁকে বলেছিলেন: “আমাকে ঘিরে সাতবার প্রদক্ষিণ কর। কাবাতে গিয়ে তাওয়াফ করা আর আমাকে ঘিরে প্রদক্ষিণ করা একই কথা। সুবিধা হলো তোমার সময় বাঁচবে আর দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে। বায়েজিদ তাই করে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন। FE: Benjamin Walker, Foundations of Islam: The Making of a World Faith, Rupa & Co, Nwe Delhi, India, 2002, pp. 216, – অনুবাদক)। কোরআনের সুরা তওবা-তে একটি আয়াত আছে যা এই ধোঁয়াশার ওপর কিছুটা আলোকপাত করে। হে বিশ্বাসীগণ! অংশীবাদীরা তো অপবিত্র; তাই এ-বছরের পর তারা যেন মসজিদ-উল-হারামের কাছে না আসে। যদি তোমরা দারিদ্রের ভয় কর তবে জেনে রাখো আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমাদের অভাব দূর করতে পারেন। (৯: ২৮)। তফসির আলজালালাইন-এর বক্তব্য অনুযায়ী এই আয়াতের অর্থ হচ্ছে আল্লাহ আরবদেরকে বিজয় ও সম্মান দিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে দেবেন। এই সুরা (তওবা) সময়ের ক্রমানুসারে কোরআনের সর্বশেষ সুরা। ৬৩১ খ্রিস্টাব্দ বা হিজরি ১০ সালে মক্কা বিজয়ের পর এটি নাজিল হয়েছিল। অমুসলিম গোষ্ঠী কর্তৃক মক্কা ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রদানের কারণে মক্কার মানুষদের ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠার কথা ছিল। কারণ তাদের ব্যবসার প্রতিপত্তি ও জীবন-জীবিকার মান অন্যান্য আরবীয় গোষ্ঠীর নিয়মিত ভ্রমণের উপর নির্ভর করত। যদিও মক্কাবাসীরা এবং নবি একই গোষ্ঠীর ছিলেন তবে তাদের বেশিরভাগই মুসলিম হয়েছিলেন বাধ্য করার কারণে। মক্কা যদি তার জৌলুশ হারাতো, তবে ইসলাম-ত্যাগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ারও ঝুঁকি ছিল। তাই মুসলমানদের জন্য মক্কা-ভ্রমণকে (হজ) বাধ্যতামূলক ঘোষণা করার মাধ্যমে এই ঝুঁকিকে প্রশমিত করা হয়েছে। এমন বিশ্লেষণকে আপাতত শুধু অনুমান-নির্ভর বলা যায়। এ-বিষয়টি আসলে কতটুকু সত্য তা শতভাগ কখনো জানা যাবে না। ইসলামের হজ-ব্যবস্থায় পূর্বের পৌত্তলিকদের রেওয়াজ বহাল রাখার কোনো যৌক্তিকতা পাওয়া যায় না। বিশ্বনন্দিত আরব কবি আবুল-আলা আল-মারি**হজনিয়ে মন্তব্য করেছেন এভাবে: ‘এই পৃথিবীর দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। (শয়তানের প্রতি) পাথর ছুড়তে আর কালো পাথর চুম্বন করতে। কী উদ্ভট কথাই না তারা বলে! তবে কি সত্য অবলোকন করতে গিয়ে মানুষ অন্ধত্ব বরণ করেছে।

মদিনায় সুরা-পান ও জুয়া খেলা নিষিদ্ধকরণের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল এবং তা প্রয়োগ করা হয়েছিল। মদিনায় শুরুর দিকে জাকাত প্রদানকে কেন ঐচ্ছিক ঘোষণা করা হয়েছিল এবং এক পর্যায়ে নবপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে জাকাতকে কর আদায়ের অন্যতম প্রক্রিয়ায় কেন রূপান্তরিত করা হয়েছিল তা বুঝতে পারা মোটেও কঠিন কিছু না। আর ওই একই সময়ে ধর্মীয় যুদ্ধ বা জিহাদকে আইনগত ভিত্তি প্রদান করা হয়েছিল যার সদৃশ আর কোনো বিধান ছিল না। প্রথমে যুদ্ধের অনুমতি শুধুমাত্র সুরা হজে এই আয়াতের মাধ্যমে দেয়া হয়েছিল: “যারা আক্রান্ত হয়েছে তাদের যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল, কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। (২২: ৩৯)।

এক পর্যায়ে ক্রিয়াপদগুলোকে নির্দেশনামূলক বানিয়ে ও বাক্যের ভাবকে আরও জোরালো করে যুদ্ধকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সুরা বাকারা, সুরা আনফাল, সুরা তওবাসহ বিভিন্ন মাদানি সুরাতে বলপ্রয়োগের নির্দেশনা যুক্ত করা হয়েছে। লক্ষণীয় হচ্ছে মক্কি সুরায় পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কোনো নির্দেশনা খুঁজে পাওয়া যায় না। অন্যদিকে মাদানি সূরাগুলো এমন সব বিষয় দিয়ে পূর্ণ, যা পাঠ করলে মনে হয় অন্য যে কোনো বিষয়ের চেয়ে জিহাদ করা অনেক বেশি বাধ্যতামূলক নবি আরবদের নিয়ন্ত্রণ করা ও তাদের নিয়ে তরবারি ব্যবহার না করে একটি ইসলামি রাষ্ট্র ও সমাজ গঠন করা কতটা কঠিন তা বুঝতে পেরেই এই সিদ্ধান্তটি বেছে নিয়েছেন। কারণ সমগ্র আরবের মূল সংস্কৃতির মধ্যে যুদ্ধ অঙ্গাঅঙ্গিভাবে গাঁথা। তাই আরবীয়দের মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চাইলে যুদ্ধকে অস্বীকার করার কোনো পথ ছিল না। জিহাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে মানুষের মূল্যবান মানবিক অধিকারগুলোকে অবজ্ঞা করার প্রয়োজন হতো। যেমন চিন্তা করার স্বাধীনতা বা ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস পালনের স্বাধীনতা। আর এ-কারণে আরবের আশেপাশে বিভিন্ন অঞ্চলে সমালোচনা ও প্রশ্ন উঠেছিল, যেগুলোর জবাব দেয়া সহজ ছিল না। যেমন, একটি ধর্ম বা মতবাদ প্রচার বা পালনে মানুষকে তরবারির দ্বারা বাধ্য করা কতটুকু যৌক্তিক? মানবিকতা ও ন্যায় বিচারের নীতির সাথে এগুলো কি আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ?

স্পষ্টত আমরা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে অনাচার ও ভ্রষ্টাচার বিভিন্ন আঙ্গিকে ছড়িয়ে পড়তে দেখেছি। তবে ন্যূনতম প্রজ্ঞার অধিকারী কোনো ব্যক্তির কাছে সাধারণ মানুষের চিন্তার বা বিশ্বাস করার স্বাধীনতাকে শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক কেড়ে নেয়ার চেয়ে নির্মম ও অযৌক্তিক স্বৈরাচার আর কিছু হতে পারে না। প্রতিপক্ষকে দমিয়ে রাখতে কোনো শাসকের অমানবিক প্রচেষ্টাকেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাজনীতির মাঠে টিকে থাকার কৌশল হিসেবে উপস্থাপন করা যেতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষকেও শাসকগোষ্ঠীর ন্যায় চিন্তা করতে বা শাসকগোষ্ঠীর মতবাদ অনুসারে চলতে বাধ্য করা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সকল জাতিকেই কোনো না কোনো সময় এ ধরনের পীড়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সংকীর্ণ অবস্থানে দেখেছি। এমন প্রবণতা সাধারণ জনগণের মধ্যেও দেখা যায়, যখন তারা অন্যের মতামত ও বিশ্বাসকে মূল্য দিতে অপারগ হয়ে স্বৈরাচারী নীতিতে নিজেরাও বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। মানবজাতির ইতিহাসে বিভিন্ন অন্ধকার যুগের সূত্রপাত এই ধরনের রক্ষণশীল পন্থার কারণেই হয়েছিল। এই উগ্রতা বা গোঁড়ামি মানুষদের ভিন্নমতাবলম্বী অন্য মানুষকে পোড়াতে, শিরোচ্ছেদ করতে, ফাঁসিতে ঝোলাতে, অঙ্গহানি করতে ও বন্দী করে রাখতে এমনকি জাতিগত গণহত্যা সাধনেও উদ্বুদ্ধ করেছে। বর্তমান যুগে আমরা বিভিন্ন দেশে নাৎসি ও কমিউনিস্ট শাসকদের দ্বারা সংঘটিত গণহত্যার ঘটনা উদাহরণ হিসেবে দেখতে পাই।

ইতিহাসের শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে অনেক দেশে চিন্তা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা লঙ্ঘিত হয়েছে এ-নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। যে প্রশ্নটি এখানে চিন্তার উদ্রেক ঘটায় তা হলো মানবাধিকারের এই লঙ্ঘনগুলো কি আধ্যাত্মিক স্রষ্টার দায়িত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তিনি তো পূর্বে জানিয়েছিলেন: ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই। (২: ২৫৬)। এছাড়া তার সিদ্ধান্ত হচ্ছে: . . . যার ধ্বংস হওয়ার কথা সে যেন (সত্যাসত্যের) প্রমাণ স্পষ্ট প্রকাশের পর ধ্বংস হয় এবং যার জীবিত থাকার কথা সে যেন (সত্যাসত্যের) প্রমাণ স্পষ্ট প্রকাশের পর জীবিত থাকে। (৮: ৪২)। আল্লাহ তো নবিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “আমি তোমাকে বিশ্বের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে পাঠিয়েছি। (২১: ১০৭) এবং তুমি অবশ্যই সুমহান চরিত্রের সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছ। (৬৮: ৪)।

মক্কায় থাকাকালীন ৯০ তম সুরা বালাদ নাজিলের সময় আবুল আসাদ নামের একজন দাম্ভিক ব্যক্তির কথা পূর্বে বলা হয়েছে। তার বিপুল সম্পদ ছিল। শারীরিকভাবেও তিনি অনেক শক্তিশালী ছিলেন। ওকাজ মেলায় তিনি কাপেটের উপর দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিতেন, যদি কেউ তার পায়ের নিচ থেকে ওই কার্পেট সরাতে পারে তবে তাকে বড় অঙ্কের অর্থ পুরস্কার দেয়া হবে। যুবকেরা অত্যন্ত উৎসাহী হয়ে বিভিন্ন দিক থেকে কাপেট টানাটানি করত। কিন্তু কার্পেট ছিড়ে না যাওয়া পর্যন্ত টানতে থাকত আর আসাদ যেখানে দাঁড়িয়ে থাকতেন সেখান থেকে কেউ তাঁকে সরাতে পারতেন না। এমন দাম্ভিক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা সত্ত্বেও সুরা বালাদে নবি মুহাম্মদের অগাধ বিশ্বাস প্রকাশ পেয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোরআনের এই সুরার সুমিষ্টতা অন্য কোনো ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করা যায় না। তথাপি এই সুরার ৪ থেকে ১৭ নম্বর আয়াতের অর্থ দুর্বল অনুবাদের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করছি; আমি মানুষকে শ্রমনির্ভর করেই সৃষ্টি করেছি। সে কি মনে করে যে কেউ কখনও তাকে কাবু করতে পারবে না? সে বলে, আমি প্রচুর ধনসম্পদ ব্যয় করেছি। সে কি মনে করে যে তাকে কেউ দেখেনি? আমি কি তাকে দুটো চোখ, জিহা আর ঠোঁট দিইনি? আর দুটো পথই কি আমি তাকে দেখাইনি? সে তো কষ্টসাধ্য পথ অবলম্বন করেনি? তুমি কি জান কষ্টসাধ্য পথ কী? সে হচ্ছে, দাসমুক্তি কিংবা দুর্ভিক্ষের দিনে অন্নদান এতিম আতীয়কে বা দুর্দশাগ্রস্ত অভাবীকে; তার ওপর তাদের শামিল হওয়া যারা বিশ্বাস করে, পরস্পরকে ধৈর্য ধরার উপদেশ দেয় ও উপদেশ দেয় দয়াদাক্ষিণ্যের।’ (৯০৪-১৭)।

যে পৈত্রিক-ধর্মত্যাগী ব্যক্তি মক্কায় তার নিজস্ব বিশ্বাস ও অন্যদের প্রতি আল্লাহর অনুকম্পা প্রচার করে গিয়েছেন দীর্ঘ তের বছর ধরে, সেই মানুষটিই মদিনায় গিয়ে সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে যুদ্ধের নির্দেশ দিতে থাকলেন: তোমাদের জন্য যুদ্ধের বিধান দেয়া হল। (২: ২১৬), . . . যে সত্যধর্ম অনুসরণ করে না তাদের সাথে যুদ্ধ করবে…’ (৯: ২৯), কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম চাইলে তা কখনও গ্রহণ করা হবে না… (৩.৮৫), ‘যখন তোমরা অবিশ্বাসীদের সঙ্গে যুদ্ধে মোকাবিলা কর তখন তাদের ঘাড়েগর্দানে আঘাত করো। শেষে যখন তোমরা ওদেরকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করবে তখন ওদেরকে শক্ত করে বাঁধবে…। (৪৭: ৪)

এরকম কয়েক ডজন কঠোর আয়াত মদিনায় নাজিল হয়েছিল। মক্কায় ‘লোহার মূল্য’ উল্লেখ করা হয়নি, তবে মাদানি সুরা হাদিদ-এ বলা হয়েছে: আর আমি দিয়েছি লোহা, যার মধ্যে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি ও মানুষের জন্য নানা উপকার; আর এ এজন্য যে, আল্লাহ যেন জানতে পারেন কে না-দেখে তাঁকে ও তার রসূলদেরকে সাহায্য করে। (৫৭: ২৫)। এ আয়াত থেকে মনে হতে পারে, মক্কায় হয়তো নবির কাছে লোহা (লোহা দিয়ে তৈরি অস্ত্র) ছিল না, কিংবা লোহা ব্যবহারের সুযোগ ছিল না কিংবা আল্লাহ রসুলের দুর্ভোগ চিহ্নিতকরণের উপায় নির্ধারণে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। মক্কায় থাকতে আল্লাহ মুহাম্মদকে আদেশ করেছিলেন: ‘তুমি মানুষকে হিকমত ও সৎ উপদেশ দিয়ে তোমার প্রতিপালকের পথে ভাক দাও ও ওদের সাথে ভালোভাবে আলোচনা করো। তার পথ ছেড়ে যে বিপথে যায় তার সম্বন্ধে তোমার প্রতিপালক ভালো করেই জানেন। আর যে সৎপথে আছে তাও তিনি ভালো করে জানেন। (১৬: ১২৫)।

এভাবে একটি আধ্যাত্মিক কাঠামো থেকে ইসলাম ক্রমেই আক্রমণ-প্রতিরক্ষাভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়। ইসলামের অগ্রযাত্রা গাজওয়া থেকে লব্ধ মালামাল ও জাকাতের মাধ্যমে অর্জিত রাজস্বের ওপর নির্ভরশীল ছিল। মদিনায় হিজরতের পরে নবির যাবতীয় পদক্ষেপ এবং সিদ্ধান্তগুলো একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণকে কেন্দ্র করে নেয়া হয়েছে। অবশ্য যুদ্ধবন্দী হত্যা, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডসহ তার নির্দেশে সংঘটিত বেশকিছু কাজই বিদেশি পণ্ডিতদের কাছে নানাভাবে সমালোচিত হয়েছে।

বদরের যুদ্ধের পর যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে কী করা যেতে পারে তা নিয়ে নবি অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। তার মনের মধ্যে প্রশ্ন ঘোরপাক খাচ্ছিল, তিনি কি এই যুদ্ধবন্দীদের কিছু মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দিবেন, যার মাধ্যমে ইসলামের যোদ্ধাদের বেতন দেয়া যেতে পারে? নাকি তাদেরকে দাস হিসেবে ব্যবহার করা উচিত হবে? নাকি তাদেরকে গৃহবন্দী করে রাখা হবে? তখন বাস্তববাদী ও দূরদর্শী সাহাবি হজরত ওমর বিন আল-খাত্তাব (যাকে ইসলামি রাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়) পরামর্শ দিলেন, যুদ্ধবন্দীদের মেরে ফেলাই যৌক্তিক হবে। ওমরের মতে মুক্তিপণের বিনিময়ে বন্দীদের মুক্তি দেয়া ঠিক হবে না, কারণ এতে করে তারা পুনরায় শত্রুপক্ষের বাহিনীতে যোগ দিয়ে আরও তীব্রভাবে যুদ্ধ করতে পারে। আবার এদেরকে দাস হিসেবে রাখলে বা অন্তরীণ করে রাখলে তাদের পাহারা দিয়ে রাখার পেছনে অনেক খরচ হবে প্রতিনিয়ত। তাই যুদ্ধবন্দীদের হত্যা করলে তাদের সমস্ত গোষ্ঠী যেমন ভয় পেয়ে যাবে তেমনি ইসলামের সামরিক মর্যাদাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। সূরা আনফালের এই আয়াতের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়: দেশে সম্পূর্ণভাবে শত্রু নিপাত না করা পর্যন্ত বন্দি রাখা কোনো নবির পক্ষে সমীচীন নয়। তোমরা চাও পার্থিব সম্পদ আর আল্লাহ চান পরলোকের কল্যাণ। (৮৬৭)।

বদর যুদ্ধে বন্দীদের মধ্যে দুইজন হচ্ছেন কুরাইশ বংশের বিখ্যাত সাহিত্যিক নদর বিন আল-হারিস এবং ওকুবা বিন আবু মোয়াইত। উল্লেখ্য নদর বিন আল-হারিস একসময় আল হিরার লাখমিদ রাজদরবারের রাজকবিও ছিলেন। তিনি ফেরদৌসি নামের একটি মনোমুগ্ধকর কবিতাও লিখেছিলেন। নদর পূর্বে বিভিন্ন সময় কোরআনের সুরার মতো কবিতা লেখার দাবিও করেছিলেন। তিনি দাবি করতেন, কোরআনের আদ-সামুদ-লুতের বর্ণনার চেয়ে তিনি আরও সুন্দর করে পারস্যের বিখ্যাত রুস্তমইসফানদার এররাজকীয়ও বীরত্বপূর্ণ কাহিনী-গাথা বলতে পারেন। নবি নদর ও ওকবা দুজনকে শিরোচ্ছেদ করার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু সাহাবি আল-মিক্‌দাদ বিন আমর চেয়েছিলেন নদরের কাছ থেকে মোটা অংকের মুক্তিপণ আদায় করে ছেড়ে দিতে। তিনি নবিকে বললেন, “এই লোক আমার বন্দী। তাই সে আমার গনিমতের মাল হিসেবে বিবেচ্য। নবি মিক্‌দাদকে জিজ্ঞেস করলেন, নদর লোকটি কোরআনের আয়াত নিয়ে পূর্বে যেসব কটুক্তি করেছে, তা কি ভুলে গেছ? নদর সম্পর্কে কোরআনে মন্তব্য করা হয়েছে: যখন তাদের কাছে আমার আয়াত আবৃত্তি করা হয় তখন তারা বলে, “আমরা তো শুনলাম, ইচ্ছা করলে আমরাও এরকম বলতে পারি, এ তো শুধু সেকালের উপকথা। (৮: ৩১)। শেষ পর্যন্ত নদরকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। মিকুদাদও তার উপর থেকে নিজের দাবি তুলে নিয়েছিলেন। নদরের মাথা কেটে ফেলা হয়েছিল। এর পরে যাত্রা বিরতিতে কবি ওকবা বিন আবু মোয়াইতকে নবির সামনে হাজির করা হয়। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ আসিম বিন সাবিতকে দেয়া হয়েছিল। ইসলামের ইতিহাসের প্রথম দিককার নবির জীবনী-লেখক ইবনে ইসহাক তার সিরাত রসুল আল্লাহ’ বইয়ে জানিয়েছেন, সাহাবি আসিম বিন সাবিত ওকবা বিন মোয়াতকে হত্যা করতে উদ্যত হলে ওকবা কাঁদতে কাঁদতে নবিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমি মারা গেলে আমার সন্তানদের কি হবে? নবি উত্তরে বলেছিলেন: জাহান্নামের আগুন। (দ্রষ্টব্য; মুসলিম শরিফ, চ্যাপ্টার ৩৮, বুক নম্বর ১৯ নম্বর ৪৪২১-৪৪২২ – অনুবাদক)।

মক্কা বিজয়ের পর নবি মুহাম্মদের পক্ষ থেকে বিরুদ্ধবাদীদের জন্য একটি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে সেখানে কিছু ব্যতিক্রম ছিল। ছয়জন পুরুষকে যেখানে পাওয়া যাবে সেখানেই হত্যার নির্দেশ দেয়া হলো। এমনকি কাবা ঘরে দেখলেও তা প্রযোজ্য ছিল। এরা হচ্ছেন: সাফওয়ান বিন উমাইয়া, আব্দুল্লাহ বিন আল-খাতাল, মিকাস ইবনে সাবাবা আল-লায়থি, ইকরিমা বিন আবু জেহেল, আল হুরায়েস ইবনে নুকায়েদ বিন ওহাব এবং আব্দুল্লাহ বিন সাদ বিন আবু সারাহ। শেষোক্ত ব্যক্তি মদিনায় হজরত উসমানের পিতামাতা কর্তৃক পালিত সন্তান ছিলেন। তিনি একসময় নবি মুহাম্মদের বেশ প্রিয়ভাজন ব্যক্তি ছিলেন। বিভিন্ন অনুলিখনের সময় নবি একবার এক আয়াতের শেষে যখন বলেছিলেন; এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী ও বিজ্ঞ (আরবিতে আজিজ’, ‘হাকিম) শব্দগুলো যোগ করার জন্য, আব্দুল্লাহ বিন সাদ বিন আবু সারাহ বাক্যটি সংশোধন করে পরামর্শ দিলেন, এবং আল্লাহ সব জানেন ও বিজ্ঞ’(আরবিতে আলিম’, ‘হাকিম) লেখার জন্য। নবি অমত করলেন না, লেখার অনুমতি দিলেন। কোরআন আল্লাহর বাণী হলে নিশ্চয়ই কারো পক্ষে পরিবর্তন-সংযোজন করা সম্ভব নয়। তাহলে আব্দুল্লাহ বিন সাদের মতো একজন সাধারণ অনুলেখক কোরআনের আয়াতের পরিবর্তন করে চলছেন, এটা সাদের মনেও সন্দেহ সৃষ্টি করে। তিনি কোরআনের অলৌকিতায় সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করেন এবং কিছুদিনের মধ্যেই ইসলাম ত্যাগ করে মক্কায় গিয়ে কুরাইশদের দলে যোগদান করেন। পারস্যের ফার্স রাজ্যে জন্মগ্রহণকারী ইসলামি পণ্ডিত ও কাজি আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর আলবায়দাওয়ি (মৃত্যু ১২৮৬ খ্রিস্টাব্দ) তার “আছরার উত-তাজিল ওয়া আছরার উত-তায়িল শিরোনামের কোরআনের তফসিরে বলেছেন: নবি একদিন কোরআনের সুরা মুমিনুন-এর ১২ থেকে ১৪ পর্যন্ত আয়াত লেখার জন্য আব্দুল্লাহ বিন সাদ বিন আবু সারাহকে বললেন। আয়াতগুলো হচ্ছে: ‘আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির নির্যাস থেকে। তারপর তাকে বীর্যরূপে এক নিরাপদ আধারে রাখি, পরে আমি বীর্যকে তৈরি করেছি একটি জমাট রক্তপিণ্ডে, তারপর রক্তপিণ্ড থেকে মাংসপিণ্ড তৈরি করেছি, তারপর মাংসপিণ্ড থেকে হাড় তৈরি করে, অতঃপর হাড়গুলোকে মাংস দ্বারা আবৃত করেছি। অবশেষে তাকে নতুন রূপে দাঁড় করিয়েছি। (২৩: ১২-১৪)। নবি এতটুকু বলার পর আব্দুল্লাহ বিন সাদ বলে উঠলেন, নিপুণ স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান!” নবি বললেন, “এই বাক্যটি লাগিয়ে দাও। আবদুল্লাহ বিন সাদ তখন হতবাক হয়ে গেলেন। মানুষের বক্তব্য কোরআনের আয়াতে সংযুক্ত হয় কিভাবে? তার মনে সংশয়ের সৃষ্টি হয়। আল্লাহর নামে প্রচারিত কোরআনের বাণী তাহলে কার? শেষে আব্দুল্লাহ বিন সাদ ইসলাম ত্যাগ করে কুরাইশ দলে যোগ দিয়ে প্রচার করতে থাকেন; ‘কোরআন আল্লাহর ঐশীবাণী নয়, এটা নবি মুহাম্মদের নিজস্ব বক্তব্য। আমি নিজেও কোরআনের কয়েকটি আয়াত সংশোধন করে দিয়েছি। পারস্যের বিশিষ্ট ঐতিহাসিক আল-তাবারি (৮৩৯-৯২৩ খ্রিস্টাব্দ) কোরআনের ৬ নম্বর সুরা আনআম-এর ৯৩ নম্বর আয়াতের তফসিরে আব্দুল্লাহ বিন সাদ- এর “মুরতাদ হয়ে যাওয়া নিয়ে একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তার বহুল প্রচারিত হিস্ট্রি অব আল-তাবারি’বইয়ে (ইংরেজিতে অনুদিত দ্যা লাস্ট ইয়ারস অব দ্যা প্রফেট, ভলিউম ৯, পৃ. ১৪৮) আব্দুল্লাহ বিন সাদ- এর মুরতাদ হয়ে যাওয়া এবং এর পরবর্তী ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ আছে। – অনুবাদক)।

তথাপি আব্দুল্লাহ বিন সাদের ভাগ্য ভালো। মক্কা বিজয়ে পর হত্যা- তালিকায় নাম থাকার সংবাদ তিনি দুধভাই হজরত উসমানের মাধ্যমে পেয়ে যান। প্রাণ বাঁচাতে ভীত আব্দুল্লাহ বিন সাদ হজরত উসমানের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। উসমানও দুধভাইকে রক্ষার জন্য মক্কা বিজয়ের তাৎক্ষণিক উত্তেজনা প্রশমনের আগ পর্যন্ত কিছু দিন লুকিযে রাখেন। পরে তিনি একদিন সুযোগ মতো সাদকে নিয়ে নবির সামনে উপস্থিত হন ও তাঁকে ক্ষমা করে দেবার অনুরোধ জানান। দীর্ঘক্ষণ চুপ থাকার পর নবি সম্মতিসূচক উত্তর প্রদান করেন। নবি হয়তো অনিচ্ছা সত্ত্বেও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন উসমানের মধ্যস্থতা মেনে নেন। ইরাকের বাগদাদে জন্মগ্রহণকারী বিশিষ্ট মুসলিম পণ্ডিত ইবনে সাদ আল-বাগদাদি (৭৮৪-৮৪৫ খ্রিস্টাব্দ) তার কিতাব আল-তাবাকাত আল-কবির বইয়ে (ভলিউম ২, পৃ. ১৭৪) উল্লেখ করেছেন, হজরত উসমান তার দুধভাইকে নিয়ে চলে যাওয়ার পর কয়েকজন সাহবি যখন নবিকে তার এই দীর্ঘ নীরবতার কারণ জিজ্ঞাসা করেন, নবি উত্তরে বলেন: আব্দুল্লাহ বিন সাদ বিন আবু সারাহ স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি প্রাণভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। আমি ভেবেছিলাম আব্দুল্লাহ বিন সাদ আমার সামনে এসে কিছু বলার জন্য উঠে দাঁড়াবেন এবং তোমাদের মধ্যে কেউ একজন তার গর্দান কেটে ফেলবে। এমনটা বলার কারণ হলো নবি পূর্বেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, যেকোনো স্থানে সাদের রক্ত ঝরানো জায়েজ হবে, যদি তা কাবা শরিফের পর্দায় লেগে যায় তাহলেও সমস্যা নেই। মদিনার এক আনসার নবির বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বললেন: নবি কেন ইশারা করেননি? নবি পুনরায় জানালেন, আল্লাহর রসূলদের চোখ মিথ্যা হতে পারে না। অর্থাৎ তিনি নীরব থাকার ভান করে চোখ দিয়ে হত্যা করার ইশারা দিতে পারেন না। হজরত উসমান খলিফা হওয়ার পর আব্দুল্লাহ বিন সাদকে উত্তর আফ্রিকা আক্রমণে আরব সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দান করেন। এই যুদ্ধে আব্দুল্লাহ বিন সাদ তার দায়িত্ব এতো সুচারুরূপে পালন করেছিলেন যে উসমান মিশর দখলকারী আমর ইবনে আল-আসকে সরিয়ে আব্দুল্লাহ বিন সাদকে মিশরের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

হত্যা- তালিকায় উল্লেখিত আব্দুল্লাহ বিন আল-খাতালসহ তার ফারহানা ও কারিবা নামের দুইজন দাসীও ছিলেন। যারা নবিকে ব্যঙ্গ করে গান গাইতেন। তাদের তিনজনকেই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা ও সারা নামের দুইজন নারীকে একই কারণে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। সারাবানু আব্দুল মোতালেব গোত্রের আমর বিন হাশিমের মুক্তদাসী ছিলেন। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা নবির প্রতি নিজের আনুগত্য প্রকাশ করে ক্ষমা চাওয়ায় তাঁকে ক্ষমা করা হয়েছিল। আর মুক্তদাসীসারা নবির কাছে অনুনয়-বিনয় করে প্রাণভিক্ষা পেলেও পরে হজরত ওমর তাঁকে ঘোড়ার নীচে পদদলিত করে হত্যা করেন।

বানু-নাজির গোত্রের ইহুদি কাব বিন আল-আশরাফের হত্যাকাণ্ডের কথা পূর্বে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে। কাবের পিতা ছিলেন তাঈ গোত্রের এবং মাতা বানু-নাজির গোত্রের। বদরের যুদ্ধের পর ইসলামের ক্রমবর্ধনশীলতা দেখে কাব মক্কায় চলে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি কুরাইশদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন এবং লড়াই অব্যহত রাখার অনুরোধ জানান। কিছুদিন পর ৬২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি মদিনায় ফিরে আসেন এবং মুসলিম নারীদের নিয়ে প্রণয়াত্মক কবিতা লিখেন। এ কবিতায় তিনি নিজের কামজনিত ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেছিলেন। নবি এসংবাদ শুনে ক্ষুব্ধ হন। তিনি সাহাবিদেরকে বলেন, “আমার হয়ে কাব বিন আল-আশরাফকে শায়েস্তা করার জন্য কে আছ? তখন মুহাম্মদ বিন মাসলামা নামের একজন সাহাবি নিজের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। নবি তাঁকে অনুমতি প্রদান করেন। মুহাম্মদ বিন মাসলামার সাথে ছিলেন আবু বিন জবর আল-হারিস বিন আউস, আব্বাস বিন বশির এবং কাবের এক জ্ঞাতি ভাই আবু নায়েলা। আবু নায়েলাকে সঙ্গে রাখার কারণ ছিল কাব যেন সন্দেহ করতে না পারেন এবং ইয়াসরিবের শেষ প্রান্তে অবস্থিত তার সুরক্ষিত বাড়িতে লুকিয়ে না থাকেন। নবি শহরের শেষ মাথা পর্যন্ত তাদের সাথে যান এবং সেখান থেকে তাদের বিদায় জানিয়ে আল্লাহর নিকট তাদের সাহায্য করার জন্য দোয়া করেন। মাসলামার নেতৃত্বে তারা কাবের বাড়ির ভেতরে ঢুকেন। আবু নায়েলাকে দেখে কাব বিন আল-আশরাফ সন্দেহ করেননি। তিনিও তাদের সাথে বাড়ি থেকে বের হয়ে কথা বলতে থাকেন এবং শহরের দিকে হাঁটতে থাকেন। এক- পর্যায়ে মাসলামাসহ বাকিরা কাবের ওপর চড়াও হন এবং ধস্তাধস্তির পর তাকে হত্যা করেন।

ইয়াসরিবে পৌঁছে মাসলামা দেখেন নবি গভীর রাত অবদি জেগে আছেন এবং শুভ সংবাদের অপেক্ষা করছেন। হজরত জাবির বিন আব্দুল্লাহর বর্ণীত হাদিস অনুযায়ী . . . . মুহাম্মদ বিন-মাসলামা দুজন সঙ্গী (আবু বিন জবর আল-হারিস বিন আউস এবং আব্বাস বিন বশির) নিয়ে প্রথম দিন কাব বিন আল-আশরাফের কাছে গিয়ে বললেন, “ওই মানুষটি (নবি মুহাম্মদ) আমাদের কাছে কর দাবি করছেন, তিনি আমাদেরকে বড়ই জ্বালাতন করছেন। কাব বললেন, ঈশ্বরের কসম! ওই লোকটির উপদ্রবে তোমাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে। মাসলামা বললেন, ‘যেহেতু আমরা তাকে নবি বলে মেনে নিয়েছি, তাই সহজে ছেড়ে আসতে পারি না। আমরা এখন দেখার অপেক্ষায় আছি কোন পথে কিভাবে তার ধ্বংস হয়। আমরা এসেছি তোমার কাছে, তুমি যদি এক বস্তা খাদ্য আমাদের কর্জ দিয়ে সাহায্য করো। কাব রাজি হলেন। মাসলামা যাবার আগে বললেন, “আমরা আগামীকাল আসবো। পরের দিন গভীর রাতে তারা আসলেন। পথিমধ্যে মাসলামা তার সঙ্গীদেরকে বললেন, আমি যখন কাবের মাথা দুহাতে চেপে ধরবো তখনি তোমরা তাকে আক্রমণ করবে। কাব ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় তার স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, এতো গভীর রাতে কোথায় যাওয়া হচ্ছে? কাব বললেন, আমার বন্ধুরা এসেছে একটু সাহায্য চায়। কাবকে নিয়ে ঘর হতে বের হওয়ার পর কিছু দূর গিয়ে মাসলামা বললেন, কী দারুণ মিষ্টি সুগন্ধ তোমার চুলে, আমি কি একটু শুকে দেখতে পারি? সহাস্য মুখে গর্বিত কণ্ঠে কাব বললেন, আরব দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী আমার ঘরে, তাই এই সুগন্ধ! মাসলামা চুলের সুগন্ধ শুকার ভান করে চুলসহ কাবের মাথা শক্ত করে দুহাতে চেপে ধরেন। সাথে-সাথে সঙ্গীরা দুদিক থেকে কাবের পাঁজর বরাবর তরবারি ঢুকিয়ে দেন। তারপর মাসলামা কাবের মস্তক কেটে নবির পায়ের কাছে নিয়ে রাখলেন। দ্রষ্টব্য: বুখারি শরিফ, ভলিউম ৫, বুক ৫৯, নম্বর ৩৬৯ – অনুবাদক)।

আরেকজন প্রভাবশালী ইহুদি ও আউস গোত্রের পুরনো বন্ধু সালাম বিন আবিল হুকায়েক ইয়াসরিব থেকে খায়বার চলে গিয়েছিলেন। খাজরাজদের কয়েকজন ওই ইহুদি নেতা সালামকে হত্যার অনুমতি প্রার্থনা করেন। নবি অনুমতি দেন এবং আব্দুল্লাহ বিন আতিককে দলের নেতা হিসেবে নিয়োগ দেন। তারা তাদের কাজ ঠিকঠাকভাবে সম্পন্ন করেছিলেন এবং ফিরে আসার পর নবিকে সমস্বরে ‘আল্লাহ মহান বলে সংবাদটি প্রদান করেছিলেন। কাব ও সালাম নিহত হওয়ার পর আরেকজন ইহুদি ধর্মাবলম্বী ইয়াসির বিন রেজামকে হত্যা করার জন্য আব্দুল্লাহ বিন রাওহার নেতৃত্বে আরেকটি দল পাঠানো হয়েছিল। ইয়াসির খায়বারে গিয়ে বেদুইনদের একটি বড় গোষ্ঠী বানু গাতাফানকে নবির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য উৎসাহিত করছিলেন। হোজায়েল গোষ্ঠীর নেতা খালেদ বিন সুফিয়ান নাখলায় নিজের গোত্রের লোকদেরকে নবির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য উস্কানি দিয়েছিলেন। নবি সংবাদটি শুনে আব্দুল্লাহ বিন ওনায়েসকে পরিস্থিতি সামাল দিতে নির্দেশ দেন। পরে খালেদকে হত্যা করা হয়।

রেফা বিন কায়েস নিজ গোষ্ঠীর মধ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালালে নবি ক্ষুব্ধ হন এবং ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আব্দুল্লাহ বিন হাদ্রাদকে নির্দেশ দেন। আব্দুল্লাহ প্রথমে তীর ছুড়ে রেফাকে হত্যা করেন, পরে কুড়াল দিয়ে মস্তক আলাদা করে ফেলে নবির সামনে নিয়ে আসেন। ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানকে হত্যার জন্য মক্কার একজন পেশাদার খুনি আমর ইবনে উমাইয়াকে নিয়োগ করা হয়। আবু সুফিয়ান বিষয়টি টের পেয়ে পালিয়ে যান। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও আমর ইবনে উমাইয়া আবু সুফিয়ানকে হত্যা করতে পারেননি। উমাইয়া রাগের মাথায় একজন নিরীহ কুরাইশকে হত্যা করেন এবং অন্যজনকে গ্রেফতার করে ইয়াসরিবে নিয়ে যান। ১২০ বছর বয়সী একজন বয়োবৃদ্ধ আবু আফাককে হত্যা করা হয়েছিল কারণ তিনি নবির সমালোচনা করেছিলেন। নবির নির্দেশে সালেম বিন ওমর এই কাজ করেছিলেন। বয়োবৃদ্ধ মানুষকে হত্যা করায় ইয়াসরিবের ইহুদি নারী কবি আসমা বিনতে মারওয়ান ব্যথিত হয়েছিলেন। তিনি বানু খাতমা গোত্রের অধিবাসী। তার স্বামী ইয়াজিদ বিন জায়েদ, এবং পাঁচটি সন্তান নিয়ে তাদের সংসার। আসমা বিনতে মারওয়ান নবির বিরুদ্ধে একাধিক কবিতা লিখে সমালোচনা করেছিলেন। তিনি ইয়াসরিববাসীকে উত্তেজিত করতে চেয়েছিলেন মুহাম্মদের বিরুদ্ধে একত্রিত হতে। বদর যুদ্ধের পর ইসলামের প্রসার মেনে নিতে পারেননি। তিনি কবিতায় আউস, খাজরাজসহ ইয়াসরিবের বিভিন্ন গোত্র, যারা নবিকে সহযোগিতা করতেন এবং যারা নিস্পৃহ ছিল উভয়কে নিয়ে ব্যঙ্গ করেন। ইসলামের ইতিহাসের প্রথম দিককার নবির জীবনী-লেখক ইবনে ইসহাক তার সিরাত রসুল আল্লাহ (ইংরেজিতে অনুদিত দ্যা লাইফ অব মুহাম্মদ) বইয়ে বলেছেন, ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের রমজান মাসের ২৫ তারিখ নবির নির্দেশে উমায়ের বিন আদিয়া আল-খাতামি ঘুমন্ত অবস্থায় পাঁচ শিশুসন্তানসহ আসমা বিনতে মারওয়ানকে হত্যা করেন।

বদর যুদ্ধের দুই বন্দী আবু আজ্জা আল-জুমাহি ও মুয়াবিয়া বিন মুগিরাকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দিয়ে ইয়াসরিবে থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন নবি। ওহুদের যুদ্ধে নবি-বাহিনীর পরাজয় হলে মুয়াবিয়া পালিয়ে আত্মগোপন করেন এবং আবু আজ্জা পুরোপুরি মুক্তির জন্য আবেদন করেন। নবি তৎক্ষণাৎ আবু আজ্জাকে এবং মুয়াবিয়া বিন মুগিরাকে গ্রেফতার করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ প্রদান করেন। উভয় নির্দেশই পালন করা হয়। জোবায়ের বিন আল-আওয়াম আবু আজ্জার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন।

ইয়াসরিবের খাজরাজ গোত্রের আব্দুল্লাহ বিন উবায়ের প্রথম দিকে ইসলামের প্রতি নিজের আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু ক্রমে যখন ইসলামের প্রসার বাড়তে থাকে, নবির সামাজিক ও রাজনৈতিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায় তখন তিনি তখন মুহাম্মদের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন। তিনি নবি মুহাম্মদের বিরোধিতা করে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রচার করতে শুরু করেন। মুসলমানরা তাঁকে মুনাফেকদের প্রধান হিসেবে চিহ্নিত করেন। এক পর্যায়ে হজরত ওমর খাজরাজের নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবায়েরকে হত্যা করাই উচিৎ বলে মন্তব্য করেন। তবে নবির আরেক অনুসারী, খাজরাজ গোত্রের সাদ বিন উবায়দা আব্দুল্লাহর প্রতি সদয় হবার অনুরোধ করেন। তিনি আরও বলেন, “আমাদের শাসক হবার ইচ্ছা যাতে আব্দুল্লাহ বিন উবায়েরের পূরণ না হয়, সেজন্য আল্লাহই আপনাকে আমাদের কাছে প্রেরণ করেছেন। অন্যথায় আমরা এতোদিন তার মাথায় মুকুট পরিয়ে তার হাতে সীলমোহর তুলে দিতাম।

বর্তমানকালের মিশরীয় বুদ্ধিজীবী মুহাম্মদ হোসেন হায়কলের (১৮৮৮-১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দ) লেখা দ্য লাইফ অব মুহাম্মদ নামের নবি মুহাম্মদের জীবনী-গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: নবি হজরত ওমরের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আমি যদি তখন তোমার কথা অনুসরণ করে আব্দুল্লাহ বিন উবায়কে হত্যা করার নির্দেশ প্রদান করতাম তবে তার গোত্রের আত্মীয়-স্বজনেরা প্রতিশোধ নেবার জন্য আমাদের ওপর আক্রমণ করত। কিন্তু আমি এখন আদেশ দিলে তার আত্মীয়রা বরং সেটা আগে পালন করবে। হায়কলের মতে, আব্দুল্লাহ বিন উবায়ের এর ছেলে অন্য কারো হাতে নিজের পিতার মৃত্যু দেখার চেয়ে নিজেই তার পিতাকে হত্যা করতে আগ্রহী ছিলেন। নবি নির্দেশ দিলে তিনি নিজেই এমনটা করবেন বলে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মিশরীয় ইসলামি পণ্ডিত জালালউদ্দিন আল-সুয়তি (১৪৪৫-১৫০৫ খ্রিস্টাব্দ) মন্তব্য করেছেন, কোরআনের সুরা নিসা-এর ৮৮ নম্বর আয়াতটি আব্দুল্লাহ বিন উবায়ের প্রেক্ষিতে এসেছে: তোমাদের মধ্যে কী হয়েছে যে, তোমরা মুনাফিকদের সম্বন্ধে দুই দলে বিভক্ত হয়ে গেলে, যখন আল্লাহ তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদেরকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছেন? আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তোমরা তাকে সৎপথে পরিচালিত করতে চাও? আসলে আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তুমি তার জন্য কখনও কোনো পথ পাবে না। (৪৮৮)। সুয়তির বর্ণনায়, আব্দুল্লাহ বিন উবায়ের প্রতি ক্রোধের কারণে নবি তার অনুসারীদের বলেছিলেন যে, লোকটি সবসময় নিজ বাড়িতে প্রতিপক্ষ শিবিরের লোকজন নিয়ে বৈঠক করেন এবং বিপদ ঘটানোর চেষ্টা করেন, সে লোকটিকে সরিয়ে দিতে কেউ রাজি আছেন কি-না? ঘটনাক্রমে আব্দুল্লাহ বিন উবায়কে একসময় ক্ষমা করা হয়। এরপর তিনি হিজরি ৯ সালে (৬৩১ খ্রিস্টাব্দ) মারা যান। নবি তার শেষকৃত্যের আয়োজনও করেছিলেন।

যেসব হত্যাকাণ্ড শুধুমাত্র পরাক্রম প্রদর্শন কিংবা ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে সংগঠিত হয়েছিল, সেগুলোকে কৌশলে অনেক সময় অনেকে ইসলামের জন্য নিবেদিত সেবা বলে চালিয়েছেন। যেমন ইয়াসরিবে এক ইহুদি দোকানদার ভালো ব্যবসা করতেন। অনেক মুসলমান ক্রেতার সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল। যেদিন নবি বানু কুরাইজা গোত্রের সকল ইহুদি পুরুষকে হত্যার নির্দেশ দেন, সে-সময় মুহায়সা বিন মাসুদ দৌড়ে এসে ইবনে সুনাইনা নামের ওই নিরীহ দোকানদারটিকে হত্যা করেন। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য মুহায়সা বিন মাসুদকে একজনই মাত্র তিরস্কার করেছিলেন, সে হচ্ছে তার আপন ভাই।

অষ্টম হিজরিতে রোমানদের বিরুদ্ধে যখন সমর অভিযানের পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছিল তখন নবির কাছে বার্তা আসে, শোয়ালেম নামের এক ইহুদির বাড়িতে বেশকিছু লোকের সমাগম হয়েছে। কিভাবে রোমানদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের এই যুদ্ধ প্রতিরোধ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। নবি তখন সাহাবি তালহা বিন ওবায়দুল্লাহসহ কয়েকজনকে সে-বাড়িটি চারদিক থেকে ঘিরে আগুন ধরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। একজন মাত্র মানুষ আগুনে পুড়ে যাওয়া বাড়ি থেকে বের হতে পেরেছিলেন। কিন্তু পালাতে গিয়ে তার পা ভেঙে যায়। সুরা তওবার একটি আয়াতে যেসব মুসলিম গরমের কারণে এই অভিযানে যোগ দিতে পারেনি, তাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে: আর তারা বলল, গরমের মধ্যে অভিযানে বের হয়ো না। বলো, জাহান্নামের আগুনই সবচেয়ে গরম। (৯: ৮১)।

নবুওতি ও শাসন

নবি হিসেবে মুহাম্মদের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই মক্কি সুরা বিশেষ করে সুরা মুমিনুন এবং সুরা নজম পাঠ করতে হবে। এই সুরায় মুহাম্মদকে যিশুর মতো আধ্যাত্মিক ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আর রাষ্ট্রনেতা, শাসক, আইনপ্রণেতা হিসেবে মুহাম্মদের ভূমিকা জানতে আমাদের পড়তে হবে সুরা বাকারা, সুরা নিসা, সুরা মুহাম্মদ, এবং সবশেষে সুরা তওবার মতো মাদানি সুরাগুলো। মদিনায় হিজরতের তিন-চার বছর পর ইহুদি গোত্রগুলো নির্মুল হলে এবং বানু মুস্তালিক গোত্রকে (মদিনার পশ্চিমে বসবাসকারী একটি বেদুইন উপজাতি) পরাজিত করার পর নবি মুহাম্মদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

মুহাম্মদের জীবনী লিখতে গিয়ে ইতিহাসবিদ ইবনে হিশাম একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। একবার ইহুদি ধর্মের বানু-নাজির গোত্রের হাওয়া বিন আক্তাবের কন্যা সাফিয়া স্বপ্নে দেখেন চাঁদ তার কোমরে নেমে এসেছে। সাফিয়া তার স্বামী কেনানা বিন আবু রাবিয়াকে স্বপ্নের ঘটনাটি বললে তিনি ক্রোধে সাফিয়ার চোখে জোরে আঘাত করেন। ফলে সাফিয়ার চোখ ফুলে উঠে। কেনান বিন রাবিয়া স্ত্রীকে গাল দিয়ে বলেন: তুমি কি হেজাজের রাজার স্ত্রী হবার স্বপ্ন দেখ নাকি? পরবর্তীতে খায়বার দখলের পর নবি সাফিয়াকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। ইবনে হিশামের বর্ণনায় আরেকটি ঘটনার উল্লেখ আছে। বানু কায়নোকা গোত্রের আব্দুল্লাহ বিন সালাম ইসলাম গ্রহণ করলে ইহুদিরা তাঁকে নিয়ে ব্যঙ্গ করতেন। তারা বলতেন, তুমি ভালো করেই জানো নবুওত শুধুমাত্র ইহুদি সন্তানরাই লাভ করতে পারে। এটি আরবদের জন্যে নয়। তোমার মুনিব কোনোভাবেই নবি নন, তিনি একজন রাজা মাত্র। মক্কা বিজয়ের পর প্রাণভয়ে যখন কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তিনি আব্বাস বিন আব্দুল মোতালেবকে বলেন; তোমার ভাতিজার দখলে তো আছে বিশাল অঞ্চল। আব্বাস ফিরতি জবাব দিলেন: “হ্যাঁ। নবুওত প্রাপ্তির জন্যই এই রাজত্ব।”

হজরত ওমর বিন আল-খাত্তাব ইসলামের ইতিহাসে একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। চারিত্রিক দৃঢ়তার জন্য তিনি নবি মুহাম্মদের কাছে খুব বিশ্বস্ত এবং শ্রদ্ধেয় ছিলেন। ওমরের চারিত্রিক এই গুণাবলীর কারণেই ইসলাম প্রচারের শুরু থেকে নবি ওমরকে তার ঘনিষ্ঠজনের বৃত্তে নিয়ে আসেন। কুরাইশদের সাথে হুদায়বিয়ার সন্ধিতে মুহাম্মদের সম্মতি নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন হজরত ওমর। তার কাছে এসন্ধি ছিল এক ধরনের পরাজয়। হুদায়বিয়ার সন্ধির আগে নবি কয়েকজন সাহাবি ও বেদুইন অনুসারীদের সাথে মক্কার বাইরে অবস্থান নিয়ে হজ পালনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কুরাইশরা এ-সংবাদ শোনা মাত্র মুহাম্মদের প্রবেশ ঠেকাতে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। মক্কা থেকে ছয় মাইল দূরে অবস্থান নিয়ে মুসলমানরা সমঝোতার চেষ্টা করেন। শেষে উভয়ে এই শর্তে উপনীত হয় যে, মুসলমানেরা এ-বছর মদিনায় ফিরে যাবে তবে পরের বছর তারা কাবায় হজ করতে পারবেন। এ-প্রস্তাবে ওমর ভেবেছিলেন কুরাইশরা নবিকে তাদের সব শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করেছে। তাই তিনি আবেগ-তাড়িত হয়ে মুহাম্মদের কাছে এবিষয়ে জানতে চান। নবি তখন উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং চিৎকার করে বলেন: ‘তোমার মা তোমার জন্য শোক করুক।’ নবির মুখে এ অভিশাপের কথা শুনে ওমর নিজেকে সংবরণ করেন। যে নবি হুদায়বিয়ার সন্ধি করেছিলেন আর যে নবি দশ/বারো বছর আগে প্রবল আগ্রহ নিয়ে ওমর ও হামজাকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করেছিলেন, দুজনের পার্থক্য আছে। হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে কুরাইশদের নিকট আত্মসমর্পনের যুক্তিকে ভিন্ন আঙ্গিকে ভিত্তি দিতে নাজিল হয় সুরা ফাতাহ-এর প্রথম আয়াত: ‘আল্লাহ তোমার জন্য সুস্পষ্ট বিজয় অবধারিত করেছেন। (৪৮: ১)। বর্তমানে সবাই স্বীকার করেন হজরত আবু বকরের কুশলী ভূমিকা ওমরসহ অনেকের অসন্তুষ্টি কমাতে ভূমিকা রেখেছিল।

যদিও হুদায়বিয়ার সন্ধি এক দৃষ্টিতে মুসলমানদের পিছপা হওয়া এবং এজন্য নবিকে ওমরসহ কয়েকজন সাহাবির অসন্তুষ্টির সমুখীন হতে হয় তবু এ-সন্ধি থেকে নবির গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায়। নবি হয়তো এ-সময় কুরাইশদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েননি কারণ তিনি সম্ভবত নিশ্চিত ছিলেন না, মুসলমানরা আদৌ কুরাইশদের পরাজিত করতে পারবে কিনা। ফলে একটি সাময়িক আপোস বা সন্ধি তার কাছে অধিক নিরাপদ ছিল। নবি জানতেন মুসলমানদের একটি পরাজয় কুরাইশদের শক্তিশালী করবে। তাছাড়া এ পরাজয় বেদুইনদের ওপর মুসলমানদের প্রভাব হ্রাস করবে এবং ইহুদিদের ক্ষোভ উসকে দিবে। যা মুসলমানদের ভবিষ্যতকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে। এসব দিক বিবেচনা করেই সম্ভবত নবি কুরাইশদের সাথে সন্ধি করেন। তিনি সম্ভবত কুরাইশদের শর্তাবলী মেনে নিয়েছিলেন এই চিন্তা করে যে, শর্ত মানার ফলে তার প্রভাব ও মর্যাদা সমুন্নত থাকবে এবং পরবর্তী বছর তার অনুসারীরা হজ করতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে পরাজয়ের কোনো শঙ্কা থাকবে না।

হুদায়বিয়ার সন্ধিতে মুহাম্মদ যে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেবিষয়ে অনুধাবণ করা যায় তার পরবর্তী খায়বার যুদ্ধযাত্রা থেকে। মুহাজিরদের অনেক নিকট-আত্মীয় তখনো মক্কায় বাস করতেন। তাই নবি জানতেন, মুহাজিরদের অনেকে সে-জন্যে কুরাইশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে প্রাণপণে লড়াই করবেন না। কিন্তু ইহুদিদের শেষ শক্তিশালী ঘাঁটি খায়বার আক্রমণে সেধরনের কোনো শঙ্কা নেই। বরং খায়বারের যুদ্ধ জয় মুসলমানদের মনোবল ও গনিমতের মাল দুই-ই বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে। সুরা ফাতহ-এর কয়েকটি আয়াতে এ-সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়েছে। যেমন এই আয়াতে বলা হয়েছে: বিশ্বাসীরা যখন গাছের নিচে তোমার কাছে তোমার আনুগত্যের শপথ নিল তখন আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট হলেন। তাদের অন্তরে যা ছিল তিনি তা জানতেন…। (৪৮: ১৮)।

হুদায়বিয়ায় যখন কুরাইশদের সাথে নবির যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী মনে হয়েছিল, তখন নবি মুসলমানদের নিয়ে একটি গাছের নিচে দাঁড়ান। কুরাইশদের যেকোনো প্রতিরোধের মুখে যুদ্ধ করে যাবার শপথ গ্রহণ করেন সবাই। ইসলামের ইতিহাসে এই শপথের নাম ‘আল্লাহর সন্তুষ্টির শপথ’(বায়াত অর-রেদওয়ান)। মানে আল্লাহ এই শপথ থেকে খুবই আনন্দিত হয়েছেন। আর তাদের জন্য স্থির করলেন আসন্ন বিজয়। (৪৮: ১৮)। যুদ্ধে (তারা) লাভ করবে বিপুল সম্পদ। (৪৮: ১৯)। আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তোমরা যুদ্ধ- লভ্য বিপুল সম্পদের অধিকারী হবে। তিনি তোমাদের জন্য এ ত্বরান্বিত করবেন। (৪৮: ২০)। হুদায়বিয়ার সন্ধির পর নবি দ্রুত মদিনাতে ফিরে আসেন এবং সেখানে এক পক্ষ কাটিয়ে খায়বারের উদ্দেশ্যে সৈন্য নিয়ে যাত্রা করেন। তিনি সন্দেহ করেছিলেন মুসলমানেরা হুদায়বিয়ার সন্ধি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলতে পারে। আবার তিনি এ-ও জানতেন, খায়বার যুদ্ধ জয় হলে সন্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেয়ে গনিমতের মালের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন সবাই।

গনিমতের মাল হস্তগত করার বিষয়টি বেদুইনদের এতোই আন্দোলিত করেছিল যে, যারা কুরাইশদের সাথে যুদ্ধে যেতে রাজি ছিলেন না তারাও পর্যন্ত খায়বার আক্রমণে সঙ্গী হতে রাজি হয়ে গেলেন। সুরা ফাতহ-এর ১৫ নম্বর আয়াতে এ-সম্পর্কেই বলা হয়েছে: তোমরা যখন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সংগ্রহের জন্য যাবে তখন যারা ঘরে থেকে গিয়েছিল তারা বলবে, আমাদেরকেও তোমাদের সঙ্গে যেতে দাও। (৪৮: ১৫)। এর পরের আয়াতে আল্লাহ নবিকে নির্দেশ দিয়েছেন, “যে-সব মরুবাসী আরব ঘরে থেকে গিয়েছিল তাদেরকে বলো, তোমাদেরকে ডাকা হবে এক প্রবলপরাক্রান্ত জাতির সাথে যুদ্ধ করতে। তোমরা ওদের সাথে যুদ্ধ করবে যতক্ষণ না ওরা আত্মসমর্পণ করে। তোমরা এ-নির্দেশ পালন করলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালো পুরস্কার দেবেন। কিন্তু তোমরা যদি আগের মতো পালিয়ে যাও তিনি তোমাদেরকে দারুণ শাস্তি দেবেন। (৪৮: ১৬)। খায়বারের জলাশয়ে কাছে কয়েকটি রাজকীয় প্রাসাদ ছিল। প্রথম দিনে সালাম বিন মেশকাম প্রাসাদটি আক্রমণ করেন মুসলমানরা। কিন্তু দখলের আগে ভয়াবহ লড়াইয়ে ৫০ জন মুসলমান যোদ্ধা প্রাণ হারান। অন্যদিকে হজরত আবু বকরের নেতৃত্বে নাওম প্রাসাদ আক্রমণ করা হয়। কিন্তু সফল হতে পারেননি। হজরত ওমরের নেতৃত্বে আক্রমণ করেও দখল নেয়া যায়নি প্রাসাদটি। অবশেষে হজরত আলি প্রাসাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। অন্যদিকে জাবির প্রাসাদের পানি-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। ফলে প্রাসাদে অবস্থানকারীরা বের হয়ে আসতে বাধ্য হয়। বাইরে এসে তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলেও শেষমেশ ব্যর্থ হয়ে পালিয়ে যায়। এভাবে একের পর এক কয়েকটি প্রাসাদের পতন ঘটে। সবশেষে মুসলমানেরা আস-সুলেমান এবং আল-ওয়াথি প্রাসাদদ্বয়ে পৌঁছেন। এই প্রাসাদ দুটিতে পূর্ব থেকে ইহুদি নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার জন্য আলাদা করে রাখা হয়েছিল। ইহুদিরা শেষমেশ যুদ্ধ বিরতির আবেদন করেন। নবি যুদ্ধবন্দীদের বাঁচিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং ইহুদিদের কৃষি জমির মালিকানা মুসলমানদের হাতে দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। যদিও ইহুদিরা সে জমিতে কাজ করতে পারবে এবং তারা তাদের উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক মুসলমানদের দেবে।

খায়বার যুদ্ধ থেকে নবির কাছে গনিমতের ভাগ পড়ে সাফিয়া নামের ইহুদি রমণী। সেই সাফিয়া, যিনি স্বপ্নে চাঁদকে তার কোমরে নামতে দেখেছিলেন এবং স্বামীকে তা বলার পর আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। মদিনায় ফেরত আসার আগে নবি সাফিয়াকে বিয়ে করেন। খায়বারের পূর্বে ফাদাকের জলাশয়ের কাছে অন্য ইহুদি গোত্র বসবাস করত, তাও মুসলমানরা দখল নিতে সক্ষম হোন। এ-জন্যে তাদের কোনো যুদ্ধ করতে হয়নি। খায়বারের ইহুদিদের পরিণতির কথা বলতে ফাদাকের ইহুদিরা ভয়ে বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পন করেন এবং তাদের উৎপাদিত শস্যের অর্ধেক মুসলমানদের দিতে রাজি হোন। মদিনার দক্ষিণে ওয়াদি আল-কোরা ও তায়মাতে বসবাসকারী ইহুদিরাও মুসলমানদের নিকট আত্মসমর্পণ করেন এবং আরোপিত শর্ত হিসেবে জিজিয়া কর দিতে রাজি হন। এভাবে মুসলমানদের বিজয় রথ এগুতে থাকে। হেজাজের সমস্ত দক্ষিণাঞ্চল নবি মুহাম্মদের শাসনাধীন হয়। এটা উল্লেখ্য যে খায়বার যুদ্ধ জয়কে নবি অত্যন্ত দক্ষতার সহিত কূটনীতিতে কাজে লাগিয়েছেন। যুদ্ধ জয়ের পর বেদুইনদের বানু গাতাফান গোষ্ঠীকে নবি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন। এই গোষ্ঠী ইহুদিদের সাথে বেশ সম্পর্কিত ছিল। তারা নবির সাহচর্যে না এসে ইহুদিদের সাথে থাকলে হয়তো মুসলমানদের এ-যুদ্ধ জয় করা অনেক কষ্টসাধ্য হতো। বানু গাতাফান গোষ্ঠীকে তাই গনিমতের মালের অর্ধেকই দিয়ে দেন নবি।

হিজরতের পরে নবির কার্যাবলী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এসময় নবি ধর্মপ্রচারের সাথে সাথে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সময় দিয়েছেন বেশি। যুদ্ধ জয়ে মুসলমানদের অন্যতম কৌশল ছিল ‘গাজওয়াবা আকস্মিক আক্রমণ করা। অন্য অনেক পদ্ধতি অনুসরণ করে আক্রমণ করা হতো, তবে তা সুনির্দিষ্ট গুপ্তচরদের পাঠানো গোপন তথ্যের উপর ভিত্তি করে। এভাবে কয়েকটি কুরাইশ বাণিজ্যিক কাফেলাকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করা হয়। এসব আক্রমণ যেমন বিপক্ষ দলকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তেমনি প্রাপ্ত গনিমতের মাল বিজয়ী মুসলমানদের আরও নিবেদিতপ্রাণ যোদ্ধা হতে উৎসাহিত করেছে।

হিজরি ৩ সালে (৬২৫ খ্রিস্টাব্দ) মদিনার নিকট ওহুদ পাহাড়ের ময়দানে সংঘটিত যুদ্ধে পরাজয় মুসলমানদের জন্য ছিল একটি বিরাট ধাক্কা। কিন্তু এই পরাজয় অবধারিত ছিল না। যুদ্ধে পরাজিত মুসলমানদের মদিনায় ফেরত না পাঠিয়ে আবু সুফিয়ানের কুরাইশ দল মক্কায় ফেরত চলে যায়। এই যুদ্ধে নবির রণকৌশল অনুসরণ করা হয়নি। নবির নির্দেশ মেনে মুসলমানরা পাহাড়ের ঢালে অবস্থান নেননি। নিলে অবশ্য এই যুদ্ধে হারতেন না। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে কেউ কেউ গনিমতের মাল আগেভাগেই হস্তগত করার জন্য যার যার জায়গা ছেড়ে যান। ফলে যুদ্ধে পরাজিত হন।

হিজরি ৫ সালে (৬২৭ খ্রিস্টাব্দে) মুসলমানরা পুনরায় বিপদের সমুখীন হোন। কুরাইশ এবং বেদুইনরা সমিলিতভাবে মদিনা দখলের চেষ্টা করেন। ইসলামের ইতিহাসে এ-ঘটনাকে বলা হয় খন্দকের যুদ্ধে। এই যুদ্ধে মুসলমানরা মদিনার চারপাশে এক ধরনের পরিখা খনন করেন যা আগে কখনো দেখা যায়নি। প্রচলিত আছে যে, এই পরিখা নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম ইরানি নাগরিক সালমান আল-ফার্সি। কুরাইশদের পক্ষে পুনরায় নেতৃত্বে ছিলেন আবু সুফিয়ান। একজন কুরাইশ যোদ্ধাও পরিখা পার হয়ে মদিনায় প্রবেশ করতে পারেননি। মুসলমানদের জন্য ঝুঁকি ছিল মদিনার ভেতরে থাকা ইহুদি বানু কুরাইজা গোষ্ঠী কুরাইশদের সাথে যোগ দিতে পারে। কুরাইজা গোষ্ঠী যদি কুরাইশদের সাথে যোগ দিতো তবে মুসলমানরা এ যুদ্ধে পরাজিত হবার ও ইসলামের প্রসার থমকে যাবার সম্ভাবনা ছিল। নবি মুহাম্মদের কৌশলের কারণে সে যাত্রায় বিপদ কেটে যায়। দুই সপ্তাহ পর কুরাইশরা যুদ্ধ থেকে ক্ষান্ত দেন।

ও কুরাইশদের মধ্যে দ্বন্দু সৃষ্টির জন্য নিযুক্ত করেন। নোয়াম বিন মাসুদের সাথে মদিনার ইহুদি ও কুরাইশদের সাথে সুসম্পর্ক ছিল। ফলে উভয়েই তাকে নবি মুহাম্মদের প্রতিপক্ষ ভেবেছিলেন এবং তার বক্তব্য বিশ্বাস করেছিলেন। নোয়াম বিন মাসুদের ভূমিকার ফলে বানু কুরাইজা ও কুরাইশ বাহিনী একে অপরকে অবিশ্বাস করেন। অবশেষে বানু কুরাইজাদের তরফ থেকে কোনো সহযোগিতা না পেয়ে এবং হঠাৎ করে শৈতপ্রবাহে টিকতে না পেরে কুরাইশরা মক্কায় ফিরে যান। কুরাইশরা মক্কা ফেরত যাবার পরই নবি সশস্ত্র সৈনিকের একটি দল প্রেরণ করেন বানু কুরাইজাদের রাস্তায়। বানু কুরাইজা ভেবেছিল আবু সুফিয়ানের বাহিনীকে সাহায্য না করায় মুসলমানরা বোধহয় এবার সহনশীল আচরণ করবে। কিন্তু মুসলমানদের জন্য ভবিষ্যতের হুমকি মনে হওয়াতে নবি তাদেরকে মদিনা থেকে সমূলে বিতাড়িত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কুরাইজাদের বিনাশ ইসলামের বিকশিত শক্তি সম্পর্কে অন্যদের ভীত করবে, মুসলমানদের জন্য বিশাল গনিমতের ব্যবস্থা হবে, তেমনি মদিনার আউস ও খাজরাজ গোষ্ঠীর লোকেরা ইসলামের পতাকার প্রতি আরও অনুগত হবেন।

৬২৫ খ্রিস্টাব্দের প্রেক্ষাপটে বানু-নাজির গোত্রের খেজুর গাছের বাগানে মুসলমানদের আগুন দেয়া ছিল ঘৃণিত একটি কাজ। যুদ্ধে পরাস্ত করার অন্য কোনো উপায় দেখে নবি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কোরআনের সুরা হাশর-এর ২-১৭ নম্বর আয়াত নবির সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক ভিত্তি দেবার জন্য নাজিল হয়েছে। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানরা একই ধরনের কঠোর পদ্ধতি গ্রহণ করেন তায়েফ-নিবাসী বানু সাকিফদের অবরোধ করে রাখার সময়। অবরোধের মাধ্যমে মুসলমানরা বানু সাকিফদের বাইরে থেকে খাদ্য আসা বন্ধ করে দেন। কিন্তু শীঘ্রই মুসলমানরা বুঝতে পারেন, বানু সাকিফদের আবাসস্থলের ভেতরে খাদ্যের বড় মজুদ রয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে অবরুদ্ধ করে রাখলেও তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। অন্যদিকে নবি আরব মুসলমান সৈনিকদের অস্থির চরিত্রের কথা চিন্তা করেন। অচিরেই সৈনিকেরা ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়বেন। তাই দ্রুত যুদ্ধ জয়ের কথা চিন্তা করে বানু সাকিফদের আঙ্গুরের ক্ষেত পুড়িয়ে দেবার আদেশ দেন। জীবিকার উৎস হিসেবে বানু সাকিফদের নিকট এই আঙ্গুরের ক্ষেত ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই তারা নবির কাছে একজন দূত প্রেরণ করে মুসলমানদের এ-রকম ধংসাত্মক কাজ থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেন। বিনিময়ে সমস্ত আঙ্গুর ক্ষেতের মালিকানা মুসলমানদের দিয়ে দেবার প্রস্তাব দেন। নবি তায়েফ অবরোধ স্থগিত করে মক্কা ফিরে যান এবং হাওয়াজেন গোত্র থেকে নেয়া গনিমতের মাল বন্টন করেন। বানু সাকিফ গোত্রের এক নেতা মালেক বিন আউসকে প্রস্তাব দেন, মালেক ইসলামে দীক্ষিত হলে তার স্ত্রী-সন্তানদের মুক্তি দেবার সাথে সাথে একশত উট প্রদান করা হবে। প্রস্তাবে রাজি হয়ে মালেক বিন আউস নিজের ধর্ম-গোত্র ত্যাগ করে নবির উপস্থিতিতে ইসলাম গ্রহণ করেন। এই সব ঘটনা ইসলামের প্রাথমিক যুগে লিখিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে লেখা আছে এবং তা নির্ভরযোগ্যও। ইসলামের প্রাথমিক বছরগুলোর ঘটনা নবি মুহাম্মদের মানসিকতা ও নতুন ধর্ম হিসেবে ইসলামের দ্রুত প্রসারের লৌকিক ব্যাখ্যা প্রদান করে।

মক্কা জয়ের পর এবং তায়েফ জয়ের পূর্বে নবি হাওয়াজেন গোত্রকে পরাস্ত করে প্রচুর গনিমতের মাল লাভ করেন। গনিমতের মাল বন্টনের সময় মুসলমানরা ভয় পেতেন, নবি উদারভাবে নব্য মুসলমানদের গনিমতের মাল সব দান করে ফেলবেন। যেভাবে তিনি মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায় কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান, তার সন্তান মুয়াবিয়া, আল-হারেস বিন আলহারেস, আল-হারেস বিন হিশাম, সোহেল বিন অমর এবং হাওয়াতেব বিন আব্দুল ওজাকে ১০০টি করে উট উপহার দিয়েছিলেন। এ ঘটনায় মদিনার আনসারগণ অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি সাদ বিন ওবাদা নবির কাছে আনসারদের এ ক্ষোভের কথা জানান। নবি তখন আনসারদের ডেকে পাঠান, তাদের বক্তব্য শোনার জন্য। নবির এই কার্যক্রম তার কূটনৈতিক ও অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা প্রমাণ করে। নবি আনসারদের উদ্দেশ্যে বলেন, ও আমার আনসারেরা এটা কি ভালো নয় যে অন্যরা উট নিয়ে ফিরে গেল আর তোমরা ফিরে যাবে আল্লাহর দয়া নিয়ে?” মদিনায় অবস্থানকালীন সময়ে নবি মুহাম্মদ সম্পর্কে যে দলিল বা তথ্য ইসলামের ইতিহাসের প্রথমদিককার ঐতিহাসিকরা প্রকাশ করেছেন তাতে নবির চরিত্রে ধর্মপ্রচারকের সাথে একজন রাষ্ট্রনায়কের চিত্রও ধরা পড়ে। মুহাম্মদের জীবনী নিয়ে যে কোনো একনিষ্ঠ পাঠক পড়াশুনা করলে এ-ধরনের অসংখ্য প্রমাণ পাবেন।

তফসির আল-জালালাইনে সুরা নিসা-এর ১০৫-১০৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় নীচের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। তমা বিন ইবরিক নামের একজন ব্যক্তি একজন সৈনিকের পোশাক চুরি করে তা ইহুদি ব্যক্তির ঘরে লুকিয়ে রাখেন। পোশাকের মালিক পোশাকটি লুকানো স্থানে খুঁজে পান। পোশাকের মালিক যখন পোশাক চুরির জন্যে তমাকে দায়ী করেন তখন তমা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ওই ইহুদি ব্যক্তিকে ‘চোর বলে দাবি করেন। তমার আত্মীয়রা এ-বিষয়টি নবির সামনে উপস্থাপন করেন এমনভাবে যে, তমা একজন মুসলমান তাই নবি যেন তমার পক্ষপাতিত্ব করেন। কিন্তু নবি তা করেননি। পক্ষপাতিত্বের চেয়ে তিনি সত্যকেই প্রাধান্য দিলেন। সুরা নিসার ১০৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে; আমি তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি যাতে তুমি মানুষের মধ্যে সেই মতো বিচার করতে পার আল্লাহ তোমাকে যেমন জানিয়েছেন। তুমি বিশ্বাসঘাতকদের জন্য তর্ক করো না। (৪: ১০৫)। সুরা হজুরাত-এর ৯ নম্বর আয়াতেও একই ধরনের বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এখান থেকে নবি মুহাম্মদের নেতৃত্বের গুণাবলীই যে প্রকাশিত হয় শুধুতাই নয়, সেই সাথে তৎকালীন আরব মুসলমান সমাজের অবস্থা ও দলাদলির চিত্রও উঠে এসেছে। আয়াতটি হল: বিশ্বাসীদের দুই দল দ্বন্দুে লিপ্ত হলে তুমি তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবে। তারপর তাদের এক দল যদি অন্য দলের বিরুদ্ধে সীমা ছাড়িয়ে যায়, তবে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের কাছে আত্মসমর্পণ করে। যদি তারা আত্মসমর্পণ করে তবে তাদের ন্যায়ের সঙ্গে ফয়সালা করে দেবে, সুবিচার করবে। আয়াতটি একই সাথে পরিষ্কার এবং বোধগম্য। তফসির আল-জালালাইনে আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ আছে যেখানে তৎকালীন আরবের সমাজিক অবস্থা ও নবি অনুসারীদের মধ্যকার মনোমালিন্যের বিষয়টি ফুটে ওঠেছে; নবি একবার একটি গাধার পিঠে চড়ছিলেন এবং যখন তিনি আব্দুল্লাহ বিন উবায়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন গাধাটি শুকনো মলত্যাগ করে। ইবনে উবায় দুর্গন্ধের জন্যে নিজের নাক চেপে ধরেন। তখন সেখানে উপস্থিত আনসারদের এক নেতা আব্দুল্লাহ বিন রাওহা বলেন, ইবনে উবায়, আল্লাহর নামে শপথ নিয়ে বলছি, রসুলের কাছে তোমার শরীরে ব্যবহার করা সুগন্ধির চেয়ে গাধার এই মলের গন্ধ কম অসহনীয়। ইবনে রাওহার এই বক্তব্য নিয়ে তার অনুসারীদের সাথে ইবনে উবায়ের অনুসারীদের সাথে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে লাঠি-জুতা নিয়ে দুই পক্ষ মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে।

মক্কা বিজয়ের পর কবি বোজায়ের বিন জোহায়ের বিন আবু সালমা তার ভাই কবি কাব বিন জোহায়েরকে একটি চিঠি লিখেন: যে কবিরা নবির নামে কবিতা লিখেছেন কিংবা নবির মনে কষ্ট দিয়েছেন, তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হচ্ছে। যারা এ ধরনের কাজ করেছিল তাদের অনেকেই এখন মক্কা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তাই আপনি নিরাপদে থাকতে চাইলে নবির কাছে গিয়ে ক্ষমা চাওয়া উচিত। অতীত কাজের জন্য যারা ক্ষমা প্রার্থনা করছেন নবি তাদেরকে শাস্তি দিচ্ছেন না। অন্যথায় আপনার উচিত মক্কা ছেড়ে চলে যাওয়া যাতে মুসলমানরা আপনাকে দেখতে না পায়। কাব ঠিক করলেন তিনি ইসলাম গ্রহণ করবেন। জীবন বাঁচাতে তিনি নবির প্রশংসা করে একটি কবিতা লেখেন যা আলখাল্লার কবিতা নামে পরিচিত। কারণ নবি কবিতাটি শুনে এতো খুশি হয়েছিলেন যে, তিনি কাবকে তার নিজের একটি আলখাল্লাল উপহার দিয়েছিলেন।

ওই সময়ে আরবের মানুষ সরল এবং অনানুষ্ঠানিক জীবনযাপন করতেন। তাই তারা তাদের নেতার সাথে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মতো স্বতঃস্ফূর্ত আচরণ করতেন। তাদের কাছে একমাত্র বাধ্যবাধকতা ছিল কোরআনের নির্দেশ মেনে চলা। তারা নবি মুহাম্মদকে নিজেদের একজন মনে করতেন। কিন্তু এ ধরনের সম্পর্ক বেশি দিন থাকেনি। নিয়ম-কানুনের বাধ্যবাধকতা ও রীতিনীতি মেনে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নবি মুহাম্মদকে সমান দেখানো প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। সুরা হুজুরাত-এর ১-৫ নম্বর আয়াতে এবং কোরআনের আরও কিছু আয়াতের মাধ্যমে নবির জন্য তার অনুসারীদের আদব-কায়দা নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে; হে বিশ্বাসিগণ! আল্লাহ ও তার রসুলের আগে যাওয়ার চেষ্টা করো না। (৪৯: ১)। যেহেতু আল্লাহর উপস্থিতি চোখে দেখা যায় না, তাই এই আয়াতের মর্মার্থ হচ্ছে, বিশ্বাসিগণ, তোমাদের সামনে নবি উপস্থিত থাকলে নবি স্থান ত্যাগ করা না পর্যন্ত তোমরা কোনো কথা বলো না বা কোনো কাজ করো না। পরবর্তী আয়াত হচ্ছে: “হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা নবির কণ্ঠস্বরের ওপরে নিজেদের কণ্ঠস্বর উচু করো না আর নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচুগলায় কথা বলো তার সঙ্গে সেভাবে উচুগলায় কথা বলো না। (৪৯: ২)। এই আয়াতের মাধ্যমে বুঝানো হয়েছে তারা যেন হজরত ওমরের মতো কোনো আচরণ না করেন। যেমন, হজরত ওমর হুদায়বিয়ার সন্ধির পর অন্যদের সমুখেই সন্ধির শর্তাবলী নিয়ে উচ্চস্বরে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং মুহাম্মদকে ‘আল্লাহর রসুলনা বলে শুধু মুহাম্মদ বলে সম্বোধন করেছিলেন। ‘যারা আল্লাহর রসুলের সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নিচু করে, আল্লাহ তাদের অন্তরকে পরিশোধন করেছেন, যাতে তারা সাবধান হয়ে চলতে পারে। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।’(৪৯: ৩)। স্পষ্টত আরবেরা এ ধরনের আদব-কায়দার সাথে পরিচিত ছিলেন না। নবি মুহাম্মদের ক্ষমতা গ্রহণের পরই তারা এসব পালন করা শেখে। (হে নবি!) যারা ঘরের পেছন থেকে তোমাকে উচুগলায় ডাকে তাদের বেশির ভাগই হচ্ছে নির্বোধ। (৪৯: ৪)। নবির বাড়ির পেছন দিকে তার স্ত্রীরা থাকতেন। সেদিক দিয়ে যারা চলাফেরা করত এবং নবিকে শুধু মুহাম্মদ বলে সম্বোধন করত, তা নবি পছন্দ করতেন না। (অথবা আল্লাহ এই আচরণ পছন্দ করতেন না, কারণ এই বাক্যগুলো তো আল্লাহর!) একটা সময় পর্যন্ত এই ধরনের সম্বোধন স্বাভাবিক ছিল। নবি তার সার্থী ও অনুসারীদের নিয়ে একসাথে কাজ করতেন। যুদ্ধের জন্য পরিখা পর্যন্ত খনন করেছেন। কিন্তু ক্ষমতায় আরোহণের পর তা বন্ধ হয়ে যায়। তোমার বের হয়ে আসা পর্যন্ত তারা যদি ধৈর্য ধরত তা হলে তাই হতো তাদের জন্য ভালো।’(৪৯: ৫)। মুসলমানদের জন্য শিষ্টাচারের সুনির্দিষ্ট নিয়ম তৈরি হয় সুরা মুজাদালা-এর এই আয়াতের মাধ্যমে: হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা রসুলের সাথে একান্তে কথা বলতে চাইলে তার আগে কিছু সদকা দেবে।’(৫৮: ১২)। অর্থাৎ নবির সাথে আদব-কায়দা প্রদর্শন কেমন হবে তা পরিষ্কার হয় এই আয়াত থেকে। কিন্তু যেসব দরিদ্র মুসলমানের নিকট এই নিয়ম মেনে চলা কষ্টসাধ্য মনে হয়েছিল তাদের জন্য পরবর্তী আয়াতে শৈথিল্য প্রদর্শন করা হয়েছে: “যদি তোমরা সদকা দিতে না পার, তবে আল্লাহ তোমাদের দিকে মুখ তুলে চাইবেন…। (৫৮: ১৩)।

নবির বাড়িতে প্রবেশের বিধি-নিষেধ আবার আসে সুরা আহজাব-এর ৫৩ নম্বর আয়াতে: হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদেরকে অনুমতি না দেয়া হলে, খাবার তৈরির জন্য অপেক্ষা না করেণ, খাওয়ার জন্য নবির বাড়ির ভেতরে ঢুকবে না। তবে তোমাদেরকে ডাকা হলে তোমরা যাবে ও খাওয়ার পর চলে আসবে। কথাবার্তায় তোমরা মেতে যেও না; এমন ব্যবহার নবির বিরক্তির সৃষ্টি করে। সে তোমাদেরকে উঠে যাওয়ার জন্য বলতে সংকোচ বোধ করে। কিন্তু আল্লাহ সত্য কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন না…। (৩৩: ৫৩)। এই আয়াত নিয়ে মন্তব্যের প্রয়োজন নেই, কারণ তখন যা ঘটতো তারই সাক্ষী দিচ্ছে এই আয়াত। সাহাবিরা প্রায়ই আগে থেকে না-জানিয়ে নবির বাড়িতে প্রবেশ করতেন। খাবারের জন্য অপেক্ষা করতেন এবং খাবারের পর একে অন্যের সাথে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করতেন। মুহাম্মদ রসুল হবার পর থেকে এ-ধরনের আচরণ আশোভন হিসেব বিবেচনা করা হয়। মুহাম্মদের সাথে সাধারণ মানুষের কিছুটা দূরে রাখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়। কিন্তু সেটা মুহাম্মদের পক্ষে সরাসরি বলা অস্বস্তিকর। কিন্তু আল্লাহর জন্য নয়, কারণ তিনি এ-সকল অস্বস্তির ঊর্ধ্বে। অথবা অন্যভাবে বলা যায়, আল্লাহ তার রসুলের কণ্ঠে সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি সঠিক ব্যবহারের শিক্ষা প্রদান করেন। এই ব্যখ্যার ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করে একই আয়াতের পরের বাক্যটি। যদিও এক্ষেত্রে বিষয়বস্তুর ভিন্নতা রয়েছে; তোমরা তার (নবির) স্ত্রীদের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এ-বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য পবিত্রতর…। (৩৩: ৫৩)। হজরত আয়েশা বর্ণিত একটি হাদিস থেকে জানা যায়, রসুল মুহাম্মদ ও আমি একবার এক থালা থেকেই খাবার খাচ্ছিলাম। তখন হজরত ওমর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। রসুল ওমরকে আমাদের সাথে খাবারের আমন্ত্রণ জানালেন। ওমর আমাদের সাথে খেতে বসলে ওমরের আঙুল আমার আঙুলকে স্পর্শ করে। ওমর নবিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যদি পূর্বে আমার উপদেশ কর্ণপাত করতেন, তবে কারো চোখ তাকে (আয়েশা) দেখতে পারতো না। এরপর-ই পর্দা সম্পর্কে উপরোক্ত আয়াত নাজিল হয়।

আব্দুল্লাহ বিন আল-আব্বাসের বর্ণিত একটি হাদিস অনুযায়ী সুরা আহজাবের ৫৩ নম্বর আয়াত নাজিলের কারণ হচ্ছে হজরত ওমরের মন্তব্য। যেখানে হজরত ওমর নবিকে বলেন, আপনার স্ত্রীরা অন্য স্ত্রীলোকের মতো নয়। সুরা আহজাবের ৩২ নম্বর আয়াতও শুরু হয়েছে একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে: “হে নবিপত্নীগণ! তোমরা তো অন্য নারীদের মতো নও। (৩৩: ৩২)। কেন রসুলের স্ত্রীরা অন্যদের থেকে আলাদা হবেন? কারণ সোজা কথায় নবি মুহাম্মদের মর্যাদা অন্য সাধারণ মানুষের মতো একই পর্যায়ে ছিল না। নবির মর্যাদা ধরে রাখার জন্যে তার স্ত্রীদের মর্যাদাও ধরে রাখতে হবে। তাদেরকে প্রাচ্যের রাজকুমারীদের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে হবে। সুরা আহজাব-এর ৫৩নম্বর আয়াতের (যার অংশবিশেষ ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে) শেষ বাক্য উপরোক্ত বিষয়বস্তুকে সমর্থন করে: . . . তোমাদের কারও পক্ষে আল্লাহর রসুলকে কষ্ট দেয়া বা তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীদেরকে বিবাহ করা সংগত হবে না। আল্লাহর কাছে এ গুরুতর অপরাধ। (৩৩: ৫৩)। নবি মুহাম্মদ তার স্ত্রীদের নিয়ে খুব সংবেদনশীল ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, ইজরাইলের প্রাচীন রাজাদের মতো তার স্ত্রীরা কোনো পরপুরুষ থেকে অস্পৃশ্য থাকবেন। এমন কি নবি মারা গেলেও। সাধারণ ধর্মান্তরিত মুসলমান থেকে নবি মুহাম্মদের মর্যাদা বেশি তা কোরআনের ভিন্ন আরেকটি আয়াত থেকে ধারণা পাওয়া যায়। মক্কা বিজয়ের পর সুরা হুজুরাত-এর ১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: আরব মরুবাসীরা বলে, “আমরা বিশ্বাস করলাম। বলো, তোমরা বিশ্বাস করনি। বরং বলো, আমরা আত্মসমর্পন করার ভাব দেখাচ্ছি। কারণ এখনও তোমাদের অন্তরে বিশ্বাস জন্মায়নি। (৪৯: ১৪)।

সদ্য মুসলমান হওয়া ব্যক্তিরা যখন বলেন, তারা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছেন, বল প্রয়োগ কিংবা যুদ্ধের ফলে ভীত হয়ে ধর্মান্তরিত হননি, তখন সুরা হুজুরাত-এর ১৭ নম্বর আয়াত নাজিল হয় ‘ওরা মনে করে ওরা আত্মসমর্পণ করে তোমাকে ধন্য করেছে। বলো, তোমাদের আত্মসমর্পণ আমাকে ধন্য করেছে মনে করো না, বরং বিশ্বাসের দিকে পরিচালিত করে আল্লাহই তোমাদেরকে ধন্য করেছেন। (৪৯: ১৭)। অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণ করলেই বিশ্বাসী প্রমাণিত হয় না। নবির মতো ইসলামের জন্য উৎসর্গিকৃতও বোঝা যায় না। ফলে তাদের সাথে নবির মান-মর্যাদা তুলনীয় নয়। - অনুবাদক। সদ্য ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়া মুসলমানদের অত্যুৎসাহী মনোভাব আর গরিমার কথা জানতে পেরে নবি তাদের সমালোচনা করেন এবং সদকা দিতে নির্দেশ দেন। মক্কি সুরা ফাজর-এ এরকম ব্যক্তিদের সম্পর্কে একটি সুন্দর বর্ণনা রয়েছে। এই সুরাটি তিনি কাবা ঘরের দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে পাঠ করে মক্কাবাসীকে শুনিয়েছিলেন। দুঃখজনক হচ্ছে আরবি কোরআনের এই মনোমুগ্ধকর আর চাঞ্চল্যে ভরা সুর আক্ষরিক অনুবাদের মধ্যে ফুটে ওঠে না। তথাপি এই সুরার কিছু আয়াত দুর্বল অনুবাদের মাধ্যমে তুলে ধরা হল: তুমি কি দেখনি তোমার প্রতিপালক কী করেছিলেন আদ বংশের ইরাম গোত্রের ওপর যারা অধিকারী ছিল সুউচ্চ প্রাসাদের”, যার সমতুল্য কোনো দেশে তৈরি হয়নি? আর সামুদদের ওপর? যারা কুরা উপত্যকায় পাথর কেটে ঘর বানিয়েছিল? আর বহু শিবিরের অধিপতি ফেরাউনের ওপর? যারা দেশে সীমালঙ্ঘন করেছিল, ও সেখানে অশান্তি বাড়িয়েছিল। তারপর তোমার প্রতিপালক তাদের ওপর শাস্তির কশাঘাত হানলেন। তোমার প্রতিপালক তো সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।’ (৮৯৬-১৪)। না, আসলে তোমরা পিতৃহীনকে সম্মান কর না, তোমরা অভাবগ্রস্তদের অন্নদানে পরস্পরকে উৎসাহিত কর না, আর তোমরা উত্তরাধিকারীদের জন্য রেখে-যাওয়া ধনসম্পদ পুরো খেয়ে ফেল, আর তোমরা ধনসম্পদ বড় বেশি ভালোবাস। (৮৯: ১৭-২০)।

লাগাম টেনে ধরার দরকার ছিল। সুরা নিসা-এর এই আয়াতে দেখতে পাই: হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা যখন আল্লাহর পথে বের হবে তখন পরীক্ষা করে নেবে। আর কেউ তোমাদের মঙ্গল কামনা করলে বা শ্রদ্ধা জানলে ইহজীবনের সম্পদের লোভে তাকে বলো না, তুমি বিশ্বাসী নও। কারণ আল্লাহর কাছে অনায়াসলভ্য সম্পদ (গনিমতের মাল) প্রচুর রয়েছে। তোমরা তো পূর্বে এমনই ছিলে! তারপর আল্লাহ তোমাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন, সুতরাং তোমরা পরীক্ষা করে নেবে। তোমরা যা কর আল্লাহ তা ভালো করেই জানেন। (৪৯৪)। এই আয়াতটি যে ঘটনার প্রেক্ষিতে নাজিল হয় তা হচ্ছে: এক অভিযানের সময় নবির কয়েকজন অনুসারী সোলায়াম গোত্রের এক মেষ-পালককে আক্রমণ করেন। সেই মেষ-পালক তাদেরকে সালাম জানিয়ে সম্ভাষণ করেছিলেন, যা মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত প্রিয় ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু অনুসারীরা ধরে নিলেন, মেষ-পালকটি ভীত হয়ে তাদেরকে সালাম দিয়েছেন তাই মেষ-পালককে হত্যা করতে দ্বিধা করলেন না। আর মেষগুলো গনিমতের মাল হিসেবে দখলে নেন তারা।

আরব সমাজে সে-সময় প্রচলিত আদব-কায়দার আরও কিছু উল্লেখ পাওয়া যায় সুরা হুজুরাত-এর ১১ নম্বর আয়াতে: ‘হে বিশ্বাসিগণ! কোনো পুরুষ যেন অপর পুরুষকে উপহাস না করে, কেননা যাকে উপহাস করা হয়, সে উপহাসকারীর চেয়ে ভালো হতে পারে; আর কোনো নারীও অপর নারীকেযেন উপহাস না করে, কেননা যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারিণীর চেয়ে ভালো হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না। আর তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাকে মন্দ নামে ডাকা খারাপ কাজ। (৪৯: ১১)। এই আয়াত নাজিল হওয়া সম্পর্কে জানা যায়, তামিম গোত্রের কয়েকজন আমার, শোয়েবসহ কয়েকজন গরীব-অসহায় মুসলমানদের নিয়ে ঠাট্টা-মশকারা করেছিলেন। কোরআনে এরকম ডজনখানেক আয়াত রয়েছে যা মানুষের মূল্যবোধ, আচার-আচরণ, আদব-কায়দার প্রতি দিকনির্দেশনা দেয়; যেমন, কোন অবস্থায় কী করতে হবে, কী করা যাবে না, কিভাবে কী বলতে হবে এবং কখন নিশ্চপ থাকতে হবেইত্যাদি। একই সাথে এই আয়াতগুলি থেকে নবি মুহাম্মদের সময় আরব মানুষের সামাজিক আচরণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

ইসলামে নারী

‘নারীদের সহৃদয়তার সাথে দেখাশোনা কর! তারা অবরুদ্ধ” এবং তাদের নিজেদের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। হিজরি ৯ সালে (৬৩১ খ্রিস্টাব্দে) মক্কায় নবি মুহাম্মদ বিদায় হজের ভাষণে নারীদের সম্পর্কে এ-উক্তি করেছিলেন। প্রাক-ইসলামি যুগে আরব সমাজে নারীদের স্বাধীন নাগরিকের মর্যাদা ছিল না। পুরুষের অধীন বলে গণ্য করা হত। নারীদের প্রতি প্রায় সব ধরনের অমানবিক আচরণ বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি পেত। অন্য যে কোনো অস্থাবর সম্পত্তির (দাস) মতো আরব নারীও কোনো ব্যক্তির উত্তরসূরির হাতে উত্তরাধিকার সূত্রে চলে যেতেন। নতুন মালিক ওই নারীকে কোনো প্রকার দেনমোহর প্রদান করা ছাড়াই নিজের স্ত্রী করে রাখতে পারতো। ওই নারী যদি মালিকের স্ত্রী হতে অস্বীকৃতি জানায় তবে মালিক নারীর সম্পদ দখল নিতে পারতেন। যদি ওই নারী সেটাও না করতেন তবে মালিক আমৃত্যু তাকে আটকে রাখতে পারতো।

সুরা নিসা-এর ১৯ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে এই অমানবিক বিধান তুলে দেয়া হয়; হে বিশ্বাসিগণ! জবরদস্তি করে নারীদেরকে তোমাদের উত্তরাধিকার গণ্য করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়। তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ তা থেকে কিছু আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে তাদের ওপর অত্যাচার করো না। তারা যদি প্রকাশ্যে ব্যভিচার না করে, তবে তোমরা তাদের সাথে সৎভাবে জীবনযাপন করবে। (৪: ১৯)। সুরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াতে পুরুষ নারীর রক্ষাকর্তা উক্তিটি সমাজে নারী-পুরুষের অসাম্যের কথা প্রকাশ করে। নারীর তুলনায় পুরুষের উচ্চতর অবস্থানের কথা উক্ত আয়াতের পরের দুই বাক্যে উল্লেখ করেছেন; কারণ আল্লাহ তাদের এককে অপরের ওপর বিশিষ্টতা দান করেছেন, আর এ এজন্য যে, পুরুষরা তাদের ধনসম্পদ থেকে ব্যয় করে…। তবে ঠিক কোন কারণে আল্লাহ নারী অপেক্ষা পুরুষকে শ্রেয়তর হিসেবে বেছে নিয়েছেন নির্দিষ্ট করে তার ব্যাখ্যা করা হয়নি।

তফসির আল-জালালাইন-এর বক্তব্য অনুযায়ী পুরুষ নারী অপেক্ষা শ্রেয়তর কারণ তাদের বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞানের পরিধি, প্রশাসনিক দক্ষতা। আল-জামাখশারি”, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর আল-বায়দাওয়ি এবং আরও অনেক মুসলিম পণ্ডিত অবশ্য এই বক্তব্যের আরও গভীরে গিয়ে অধিবিদ্যাগত রূপ দিতে চেষ্টা করেছেন। তাঁরা নারীর ওপর পুরুষের কর্তৃত্বকে কোনো বিষয়ের ওপর তার নিয়মের কর্তৃত্বের সাথে তুলনা করেছেন। নবুওতি, ইমামতি, শাসনের অধিকারগুলো একমাত্র পুরুষের জন্য বরাদ্দ রেখেছেন, কারণ তাদের মতে এটা তুলনমূলক বেশি শক্তিশালী, বেশি বুদ্ধিমান ও বেশি বিচক্ষণ। ইসলামি আইনে পুরুষ উত্তরাধিকারসূত্রে নারী অপেক্ষা বেশি সম্পত্তি পায়। একজন পুরুষের সাক্ষ্যও নারীর তুলনায় বেশি গ্রহণযোগ্য। নির্দিষ্ট করে বললে পুরুষের ভাগের প্রাপ্য সম্পত্তি নারীর ভাগের তুলনায় দ্বিগুণ। একইভাবে আদালতেও একজন পুরুষের সাক্ষ্য একজন নারীর সাক্ষ্যের তুলনায় দ্বিগুণ গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করা হয়। জিহাদে অংশগ্রহণ করা বা শুক্রবারের জুমার নামাজে অংশ নেয়াও নারীদের জন্য জায়েজ নয়। তালাক দেয়ার অধিকার শুধুমাত্র স্বামীর রয়েছে; স্ত্রীর এতে কোনো হাত নেই। আরও বিভিন্ন কাজ, যেমন আজান দেয়া, মসজিদে ইমামতি করা, ঘোড়ায় চড়া, তীর-ধনুক চালানো, বড় ধরনের কোনো অপরাধে সাক্ষ্য দেয়া ইত্যাদি শুধু পুরুষদের জন্যই সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।

এই পুরুষতান্ত্রিকতার পক্ষের যুক্তিগুলোর দুর্বলতা পাঠকেরা খুব সহজে ধরতে পারবেন। তৎকালীন সামাজিক পরিবেশই ছিল পুরুষের শাসকসুলভ-মনোভাব এবং নারীর নীচু অবস্থানের প্রধান কারণ। বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানেও নারীকে পুরুষের তুলনায় কম সম্মানের স্থান দেয়া হতো। ইসলামে নারীদের মূল্য উত্তরাধিকার ও সাক্ষ্যে পুরুষের তুলনায় অর্ধেক বলে বিবেচনা করা হয়। এ ধরনের বৈষম্য শুধুমাত্র ইসলামের জন্য বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। বরং নারীজাতির ক্রমাগত অবমাননার ফলাফল। বিষয়গুলো পুরোপুরি পরিষ্কার। ফলে হালকা চালে সাফাই গেয়ে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ইতিহাসের শুরু থেকে সকল আদিম সমাজে পুরুষ জাতি বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রামের জন্ম দিয়েছে এবং নারীকে দ্বিতীয় আসনে ঠেলে দিয়েছে। জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিক নিৎসের ভাষায় নারীকে দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ বলে গণ্য করা হয়েছে। প্রাচীন আরবে এই দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রতি বর্বরতা আরও ভয়ঙ্কররূপে ছিল। নবি মুহাম্মদ কোরআনের আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নারীদের কিছু অধিকার দিয়ে বর্বরতার ধার অনেকটুকু কমিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন। সুরা নিসার বেশিরভাগ আয়াতেই নারীদের প্রতি বৈষম্য হ্রাস ও আইনি অধিকার বিষয়ে মন্তব্য রয়েছে।

তবে যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে ইসলাম বিশেষজ্ঞদের তুলে ধরা বিভিন্ন বক্তব্যে যুক্তির পরিমাণ খুবই সামান্য। মূলত তাদের বক্তব্য প্রাচীন আরবীয় নিয়মকেই নতুন রূপে দাঁড় করানোর চেষ্টা। অবশ্য এর জন্য তাদেরকে খুব বেশি দোষ দেয়া যায় না। কারণ তাদের বক্তব্যের একমাত্র উদ্দেশ্যই হচ্ছে, কিভাবে আল্লাহ নারী অপেক্ষা পুরুষকে বেশি পছন্দ করেন, বা নারী অপেক্ষা পুরুষকে বেশি বিশিষ্টতা দান করেছেন সেই কোরআনীয় বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেয়া। সুরা নিসার ৩৪নম্বর আয়াতের আরেকটি ব্যাখ্যা আছে, ‘পুরুষ নারীর পিছনে অর্থ ব্যয় করে এটা শুনতে যৌক্তিক মনে হতে পারে। যেহেতু নারীর খরচের দায়িত্ব পুরুষ ঘাড়ে তুলে নিয়েছে, সেহেতু নারী পুরুষের ওপর নির্ভরশীল। এ-কারণে নারী পুরুষের সকল আদেশ-নির্দেশ মানতে বাধ্য। আর এ-কারণে আল-জামাখশারি, আল-বায়দাওয়িসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞ রায় দেন, পুরুষই হলো প্রভু এবং নারী হলো ভৃত্যস্বরূপ। সুরা নিসার উপরোক্ত আয়াতের এই বাক্য থেকে উপসংহার টানা যায় এভাবে: তাই সাধবী স্ত্রীরা অনুগতা এবং যা লোকচক্ষুর অন্তরালে আল্লাহর হেফাজতে তারা তার হেফাজত করে। অর্থাৎ ভাল স্ত্রী তাকে বলা যায় যে তার স্বামীর কথা মেনে চলেন এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজেকে স্বামীর জন্য গচ্ছিত রাখেন। বোঝা যাচ্ছে স্ত্রীরা সবাই তাদের স্বামীর অধীন এবং এ-কথা ভুলে যাওয়া যাবে না।

এতো কিছুর পরও বলা যায় সুরা নিসা অনেক ক্ষেত্রেই নারীকে বেশ কিছু অধিকার দিয়েছে। প্রাচীন আরবীয় নিময়-কানুনের তুলনায় কোরআনের বিধি কিভাবে নারীকে সহায়তা করেছে তা সুরা নিসার আয়াতগুলি থেকে বুঝা যায়। একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, সুরা নিসার ২০-২১ আয়াতদ্বয়ে রয়েছে পুরুষের প্রতি নির্দেশ: “যদি তোমরা এক স্ত্রীর জায়গায় অন্য স্ত্রী নেওয়া ঠিক কর আর তাদের একজনকে প্রচুর অর্থও দিয়ে থাক তবুও তার থেকে কিছুই নেবে না। তোমরা কি মিথ্যা অপবাদ দিয়ে ও জুলুম করে তা নিয়ে নেবে? কেমন করে তোমরা তা নেবে, যখন তোমরা পরস্পর সহবাস করেছ ও তারা তোমাদের কাছ থেকে শক্ত প্রতিশ্রুতি নিয়েছে? (৪: ২০-২১)। স্ত্রীসঙ্গ উপভোগের পর বিবাহের সময় ধার্য দেনমোহর পরিশোধ না করে কোনো পুরুষ তালাক দিয়ে পুনরায় বিয়ে করতে পারবে না। দেনমোহর যা ধরা হয়েছিল তা ওই পুরুষকে পরিশোধ করতেই হবে। তবে এই সুরা নিসায় আবার প্রাচীন আরবের কিছু নারী-বিদ্বেষী নিয়মকে মেনে নেয়া হয়েছে। যেমন সুরা নিসার ওই ৩৪নম্বর আয়াতে শেষ বাক্যে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে প্রহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে: স্ত্রীদের মধ্যে যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদেরকে ভালো করে উপদেশ দাও, তারপর তাদের বিছানায় যেয়ো না ও তাদেরকে প্রহার করো। পুরুষেরা তাদের দৈহিক শক্তির কারণে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও কাপুরুষোচিত কাজ সেই সুপ্রাচীনকাল থেকেই করে আসছে। এমন-কী এই বিংশ শতাব্দীতেও তা সমান তালে চলছে। প্রকৃতপক্ষে কোরআনে বর্ণিত এ-বিধান নারীর প্রতি এ নিষ্ঠুরতাকে ধরে রেখেছে।

প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিয়মকানুনগুলো তাদের আচার-আচরণ, নৈতিকতাবোধকে প্রতিফলিত করে। সুরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াতকে আমরা সেভাবেই দেখতে পারি যে, প্রাচীন আরবীয়দের কাছে স্বামী ছিল প্রভুর মতো, স্ত্রীকে শারীরিক-মানসিক আঘাত করার সব রকম অধিকার তাদের ছিল। জুবায়ের বিন আল-আওয়ামের চতুর্থ স্ত্রী এবং হজরত আবু বকরের কন্যা আসমাকে একবার বলতে দেখা যায়, জুবায়ের যখন স্ত্রীদের ওপর রেগে যেতেন তখন লাঠি না ভাঙা পর্যন্ত প্রহার করতে থাকতেন। এ-ব্যাপারে ইসলামি আইনে অন্তত কিছু সীমারেখা এবং স্তরবিন্যাস করে দেয়া হয়েছে। প্রথমত সতর্কবাণী প্রদান করা হয়েছে। যৌনমিলনে বাধা প্রদানের ক্ষেত্রে স্ত্রীকে প্রহার করাকে সর্বশেষ বৈধ অস্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। অনেক তফসিরকারক এবং ইসলামি আইন-বিশেষজ্ঞদের মতে স্ত্রীকে প্রহার করা জায়েজ হলেও তা যেন হাড় ভাঙার পর্যায়ে চলে না যায়। তাহলে আবার শারীরিক আঘাতের কারণে ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি উঠতে পারে। ৩৪নম্বর আয়াত প্রসঙ্গে আল-জামাখশারি মন্তব্য করেছেন: ইসলামবিশেষজ্ঞদের অনেকে অবাধ্য স্ত্রীর প্রাপ্য শাস্তির এই স্তরবিন্যাস মেনে নিতে রাজি নন। তাঁরা একই সাথে তিন ধরনের শাস্তি প্রদানকেই অনুমোদন দিয়েছেন। এ ধরনের ব্যাখ্যা একমাত্র ইবনে হানবল, ইবনে তায়মিয়ার মতো আরবীয় ধর্মীয় নেতাই দিতেন পারেন। তবে এ-সকল বক্তব্যের অর্থ একদম পরিষ্কার এবং পরবর্তী আয়াতে তা নিশ্চিত করে; আর যদি দুজনের (স্বামীস্ত্রীর) মধ্যে বিরোধ আশঙ্কা কর তবে তোমরা তার (স্বামীর) পরিবার থেকে একজন ও ওর (স্ত্রীর) পরিবার হতে একজন সালিশ নিযুক্ত করবে। যদি তারা উভয়ে নিষ্পত্তি চায় তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে ফয়সালার অনুকুল অবস্থা সৃষ্টি করবেন। (৪: ৩৫)।

নিকট আত্নীয়ের সাথে বিবাহের নিষেধাজ্ঞা সুরা নিসার ২৩ নম্বর আয়াতে দেখতে পাই। এই বিধানটি ইহুদি আইনেও আছে এবং প্রাচীন আরবের পৌত্তলিক সমাজেও এই নীতি অনুসরণ করা হতো। তবে ব্যতিক্রম হচ্ছে এর পূর্বের আয়াতে, নারীদের মধ্যে তোমাদের পিতৃপুরুষ যাদেরকে বিয়ে করেছে তোমরা তাদেরকে বিয়ে করো না। পূর্বে যা হয়ে গেছে, তা হয়ে গেছে। (৪: ২২)। কোরআনের এ-রকম বিধান এবং বিশেষ শর্তারোপ থেকে আমরা বুঝতে পারি, ইসলাম-পূর্ব আরবে এমন জঘন্য ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। তবে ২৪ নম্বর আয়াতের বিধান নতুন কিছু নয়। ইসলাম-পূর্ব যুগেও সেটা প্রযোজ্য ছিল। তবে বিস্ময়কর হচ্ছে, এই আয়াতের মাধ্যমে দাসীদেরকেও মালিকদের কাছে হস্তগত করা হয়েছে। অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করা, কিংবা যুদ্ধে বন্দী হওয়া দাসীকে কোনো মানবিকতা ও আইনি বাধ্যবাধকতা ছাড়াই বিবাহের জন্য হস্তান্তর করা যায়। এমন কী ওই দাসীর স্বামী জীবিত থাকলেও। ইবনে সাদের* একটি উক্তি রয়েছে: হুনাইনের নিকট আওতাসের যুদ্ধে কয়েকজন নারী বন্দী আমাদের ভাগে পড়ে। যেহেতু ওই নারীদের স্বামী জীবিত ছিল, তাই তাদের সাথে যৌনমিলনে না গিয়ে নবির সাথে আলোচনা করতে গেলাম। তখন এই সুরা নিসার ২৪ নম্বর আয়াত নাজিল হয়: ‘নারীদের মধ্যে তোমাদের ভান হাতের নারী (যুদ্ধবন্দী) ছাড়া সকল বিবাহিত নারী তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ। (৪: ২৪)। এভাবে ওই যুদ্ধবন্দিনীদের কর্তৃত্ব আমরা পেয়ে গেলাম। আবার একই আয়াতে আমরা নবির মনে নারী অধিকার ও তৎকালীন কুপ্রথা নিয়ে সচেতনতা দেখতে পাই। শেষ তিনটি বাক্যে রয়েছে; তোমাদের জন্য এ আল্লাহর বিধান। উল্লিখিত নারীরা ছাড়া আর সকলকে ধনসম্পদ দিয়ে বিয়ে করা বৈধ করা হলো, ব্যভিচারের জন্য নয়। তাদের মধ্যে যাদেরকে তোমরা উপভোগ করবে তাদেরকে নির্ধারিত মোহর দেবে। মোহর নির্ধারণের পর কোনো বিষয়ে পরস্পর রাজি হলে তাতে তোমাদের কোনো দোষ নেই। যাদেরকে তোমরা উপভোগ করবে তাদেরকে নির্ধারিত মোহর দেবে- এই ধরনের বক্তব্য থেকে প্রশ্ন ওঠে ইসলামে কি অস্থায়ী বিবাহ (মুতাপ বিবাহ জায়েজ? সুন্নি পণ্ডিতরা বলেন, এমনটা জায়েজ নয়। কারণ এই বক্তব্যগুলো মুসলমানদের মক্কা বিজয়ের পর নাজিল হয়েছিল এবং এর মেয়াদ ছিল মাত্র তিনদিন। শিয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বিবাহ ইসলাম অনুযায়ী জায়েজ।

সুরা মুমতাহানা-এর ১০ নম্বর আয়াত থেকে ওই সময়ের নারী-পুরুষের সামাজিক সম্পর্ক বুঝা যায়: হে বিশ্বাসিগণ! বিশ্বাসী নারীরা দেশত্যাগী হয়ে তোমাদের কাছে এলে তোমরা তাদেরকে পরীক্ষা করো। আল্লাহ তাদের বিশ্বাস সম্বন্ধে ভালো করে জানেন। যদি তোমরা জানতে পার যে তারা বিশ্বাসী তবে তাদেরকে অবিশ্বাসীদের কাছে ফেরত পাঠিয়ো না। বিশ্বাসী নারীরা অবিশ্বাসীদের জন্য বৈধ নয়, আর অবিশ্বাসীরা বিশ্বাসী নারীদের জন্য বৈধ নয়। অবিশ্বাসীরা যা খরচ করেছে তা তাদেরকে ফিরিয়ে দিয়ো। তারপর তোমরা তাদেরকে বিয়ে করলে তোমাদের কোনো পাপ হবে না, যদি তোমরা দেনমোহর দাও। তোমরা অবিশ্বাসী নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না। তোমরা যা খরচ করেছ তা ফেরত চাইবে ও অবিশ্বাসীরা ফেরত চাইবে তারা যা খরচ করেছে। (৬০: ১০)। অর্থাৎ কোনো বিবাহিত নারী যদি ইসলাম গ্রহণ করে পালিয়ে যায় তবে তার অবিশ্বাসী স্বামী স্ত্রীর ওপর অধিকার হারিয়ে ফেলে। সে অনুরোধ করলেও মুসলমানরা স্ত্রীকে ওই অমুসলমান ব্যক্তির কাছে ফিরিয়ে দিবেন না। তবে মুসলমানরা ওই ব্যক্তির স্ত্রীর প্রতি তার খরচের ক্ষতিপূরণ অবশ্য দিবেন। একইভাবে কোনো মুসলমানের স্ত্রী যদি অবিশ্বাসী হয়ে যান, তবে ওই ব্যক্তি স্ত্রীকে রাখার জন্য জোর করতে পারবেন না এবং ওই নারীকে তার সম্প্রদায়ের কাছে ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে ফেরত পাঠিয়ে দিতে হবে।

স্ত্রীর প্রতি অসুস্থ মানসিকতা থেকে আরবীয়দের পরিবর্তনের জন্য নবির মানবিক চিন্তা চেতনার প্রতিফলন আমরা সুরা বাকারা-এর বিভিন্ন আয়াতে দেখতে পাই। যেমন: যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দাও এবং তারা ইদ্দতকাল পূর্ণ করে, তখন তাদের যথাবিধি রেখে দেবে বা তাদেরকে ভালোভাবে বিদায় দেবে। তাদেরকে অত্যাচার বা তাদের ওপর বাড়াবাড়ির উদ্দেশ্যে আটক করে রাখবে না। (২: ২৩১)। অর্থাৎ যখন কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দেয়ার কথা উচ্চারণ করে ফেলেন তবে একটি নির্দিষ্ট করতে পারবেন না। আর তাদের বিয়ের পক্ষে বা বিপক্ষের সব সিদ্ধান্তই সমানজনকভাবে এবং দুই পক্ষের আপোসের মাধ্যমে নিতে হবে। দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে রেখে বা কোনো রকম হুমকির মাধ্যমে স্ত্রীর অধিকার খর্ব করা যাবে না। পরবর্তী আয়াতে এমনই নির্দেশ আমরা দেখি তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দাও আর তারা তাদের ইদ্দতকাল পূর্ণ করতে থাকে তখন তারা যদি পরস্পর সম্মত হয়ে তাদের (পূর্বের) স্বামীদের বিধিমতো বিয়ে করতে চায় তবে তাদেরকে বাধা দেবে না। (২: ২৩২)। বলা হয়ে থাকে এই আয়াতটি এসেছে, মাকিল বিন ইয়াসিরের একটি আচরণের কারণে। তিনি তার বোনকে তালাকদাতা স্বামীর সাথে বিয়ে দিতে বাধা দিচ্ছিলেন।

সুরা বাকারা’র একটি কম আলোচিত বিষয়ের প্রতি আমরা এখন আলোকপাত করব। এই আয়াত থেকে আমরা নবি মুহাম্মদের সময়কার সমাজ-ব্যবস্থার এক ঝলক দৃশ্য দেখতে পাই: রজঃস্রাবকালে স্ত্রীসঙ্গ বর্জন করবে, আর যতদিন না তারা পবিত্র হয়, তাদের কাছে (সহবাসের জন্য) যেয়ো না। তারপর যখন তারা পরিশুদ্ধ হবে, তখন তাদের কাছে ঠিক সেইভাবে যাবে যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। (২: ২২২)। তফসির আল-জালালাইনের বক্তব্য অনুযায়ী ঠিক সেইভাবে যাবে মানে রজঃস্রাবের পূর্বে যেভাবে স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হতেন, সেটাকে বুঝাচ্ছে। কিন্তু পরবর্তী আয়াতেই আমরা পরস্পর-বিরোধী একটি বক্তব্য দেখতে পাই: তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র। অতএব তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা যেতে পার।’ (২: ২২৩)। তফসির আল-জালালাইনে তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা যেতে পার’- কে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এভাবে,

‘দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে, সামনে থেকে, পাশ থেকে, অথবা পিছন থেকে যেভাবে ইচ্ছা যৌনমিলনকে বুঝানো হচ্ছে। এই তফসিরে আরও বলা হয়েছে, এই আয়াত নাজিলের উদ্দেশ্য হচ্ছে সে-সময়ের একটি ইহুদি সংস্কারকে সবার মন থেকে দূর করা। ইহুদি সংস্কার অনুযায়ী, পেছন থেকে সঙ্গম করলে সন্তান ট্যারা চোখের, অথবা বাহাতি হয়ে জন্মায়। জালাল উদ্দিন আল-সুয়তি’র মতে ২২২নম্বর আয়াতের ঠিক সেইভাবে যাবে যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন নির্দেশ পরবর্তী আয়াতের মাধ্যমে খারিজ হয়ে গিয়েছে। হজরত ওমরসহ নবির বেশ কয়েকজন সাহাবির আবেদনের ফলে এটি খারিজ হয়েছে। খ্রিস্টান-ইহুদিরা নারীর সাথে পাশ ফিরে মিলনে যেত। মদিনার আনসারেরাও একই প্রথা অবলম্বন করতেন। আর মুহাজিররা কুরাইশ ও অন্যান্য মক্কাবাসীর যৌন-আচরণ অনুসরণ করতেন। তারা নারীদের সাথে বিভিন্নভাবে মিলন করতেন। কখনো নারীদের বুকের ওপর, কখনোবা পিঠের ওপর বসিয়ে। কখনো পেছন থেকে, কখনো সামনে থেকে তাদের সঙ্গিনীর সাথে যৌনমিলন করতেন। কোনো মুহাজির পুরুষ কোনো আনসার নারীকে বিয়ে করলে তার সাথেও এরকম যৌন-আচরণ করতে চাইতেন। কিন্তু আনসার স্ত্রী অস্বীকৃতি জানিয়ে বলতেন, আমরা কেবল পাশ ফিরে শুয়ে থাকি। বিষয়টি নবির কানেও পৌঁছায় এবং এ-বিষয়ে পুরুষদের করণীয় সম্পর্কে আয়াত নাজিল হয়। আহমদ ইবনে হানবল এবং তিরমিজির মতে আয়াতটির অর্থ হচ্ছে, “সামনে অথবা পিছন থেকে, মাথার উপরে অথবা নিচে রেখে। হজরত ওমর এক সকালে নবির কেমন কাটল?” প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, গতকাল রাতে আমি আমার পদ্ধতি পরিবর্তন করেছিলাম। কিন্তু আনন্দ পাইনি। এরপর এই আয়াতটি নাজিল হয়।

কোরআনের আয়াত এবং ইসলামের শিক্ষা থেকে বোঝা যায় প্রাচীন আরবে নারীদের মর্যাদা অত্যন্ত নিচু ছিল। পুরুষেরা নারীকে অত্যন্ত অমানবিক দৃষ্টিতে বিচার করতেন। যেমন সুরা নুর-এর ৩৩নম্বর আয়াতে আর্থিক লাভের জন্য দাসীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দেহ ব্যবসায় বাধ্য করতে নিষেধ করা হয়: তোমাদের দাসীরা সতীত্ব রক্ষা করতে চাইলে, পার্থিব জীবনের টাকাপয়সার লোভে তাদেরকে ব্যভিচারিণী হতে বাধ্য করো না।’ (২৪: ৩৩)। প্রচলিত আছে যে, আব্দুল্লাহ বিন উবায় পূর্বে এমন ঘৃণ্য ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলেন। উবায় শুধু একমাত্র ব্যক্তি নন, আরব সমাজে দাসীদের যৌনব্যবসায় বাধ্য করে মালিকদের পকেট ভারী করা অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা ছিল; ফলে অনেকেই এ-ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। নবির মক্কা বিজয়ের পর মক্কাবাসী নারীদের একটি বড় অংশ ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং নবির কাছে আনুগত্য প্রকাশ করেন। এ-প্রেক্ষিতে সুরা মুমতাহানা-এর ১২নম্বর আয়াত নাজিল হয়। মক্কাবাসী নারীদের বিশ্বাস ও আচরণের ওপর শর্তারোপ করে ইসলামে দীক্ষিত হবার সুযোগ দেয়া হয়: হে নবি! বিশ্বাসী নারীরা যখন তোমার কাছে আনুগত্যের শপথ করতে এসে বলে যে, তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তানদের হত্যা করবে না, অপরের সন্তানকে স্বামীর ঔরসে আপন গর্ভজাত সন্তান বলে মিথ্যা দাবি করবে না, এবং সৎকাজে তোমাকে অমান্য করবে না, তখন তাদের আনুগত্য গ্রহণ করো আর তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। (৬০: ১২)। এই শর্তাবলীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ইসলামে দীক্ষিত হওয়া সহজবোধ্য এবং সহজে গ্রহণযোগ্য। শুধু পূর্বে পালন করা কুপ্রথাগুলি ত্যাগ করার কথা এখানে বলা হচ্ছে। এছাড়া ইসলামে নারীদের জোরে শব্দ করার ওপর নিষেধ করা হয়। পোশাকের কলার তুলে রাখা, চুল এলোমেলো রাখা ইত্যাদি অভ্যাসও ত্যাগ করার কথা বলে ইসলাম। মক্কা বিজয়ের পর এ ধরনের শর্তাবলী প্রকাশের পর কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা বলেন, আদর্শ ঘরের কোনো স্বাধীন নারীই ব্যভিচার ও দেহব্যবসায় জড়াতে পারেন না।’

ইসলামি শিক্ষায় নিষিদ্ধ অন্যতম কুপ্রথা হচ্ছে নারী শিশুদের হত্যা করা। সুরা তাকভির-এর ৮-৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: ‘জীবন্ত-কবর দেয়া কন্যাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হবে, কী দোষে ওকে হত্যা করা হয়েছিল?’(৮১৮-৯)। ইসলাম-পূর্ব আরবে পুত্রসন্তানকে মূল্যবান বিবেচনা করা হতো। পুত্রসন্তান জন্ম হলে সবাই অহংকার করত। কিন্তু কন্যাসন্তানকে বোঝা ও অবমাননাকর মনে করতো। তারা এতোটাই নির্বোধ ছিল যে মানব-জাতির ভবিষ্যত রক্ষায় নারীদের যে প্রয়োজনীতা রয়েছে, সেটা তারা আন্দাজ করতে পারতেন না। সূরা নাহল-এর ৫৮-৫৯ নম্বর আয়াতদ্বয়ে বলা হয়েছে: “ওদের কাউকেও যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয় তখন ওদের মুখ কালো হয়ে যায় ও মন ছোট হয়ে যায়। আর যে-খবর সে পায় তার লজ্জায় সে নিজের সম্প্রদায় থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখে। (ভাবে) অপমান সহ্য করে সে ওকে রাখবে? না মাটিতে পুতে ফেলবে? আহ! কী খারাপ ওদের সিদ্ধান্ত (১৬: ৫৮-৫৯)।

নারী ও মুহাম্মদ

পশ্চিমা পণ্ডিত ইজহাক গোল্ডজিহার বলেছেন, ইসলাম প্রতিষ্ঠাতার কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কোরআন, হাদিস ও জীবনীগ্রন্থগুলো যেভাবে অকপট ও বিস্তারিত তথ্যসমৃদ্ধ, অন্যান্য ধর্মের পবিত্রগ্রন্থ, ধর্মপ্রচারকের কীর্তিগাঁথা এবং ইতিহাসের বইগুলো সেদিক থেকে সমকক্ষ নয়। গোল্ডজিহার তার অত্যন্ত মূল্যবান বই Le dogme et la loi de l’Islam – slā একটি অধ্যায়ে প্রশংসাসূচক মন্তব্যের মাধ্যমে নারীদের প্রতি নবি মুহাম্মদের ক্রমবর্ধান প্রীতি সম্পর্কে বিশদভাবে নথিভুক্ত ঐতিহাসিক সত্যগুলো তুলেধরেছেন। ইব্রাহিম এবং নুহ ছাড়াও যিশু এবং মুসা নবির জীবন সম্পর্কে আমরা যা জানি তা আসলে জনপ্রিয় কল্পপুরাণে তৈরি কুয়াশার বাতাবরণে ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার ধারণায় আবদ্ধ। নবি মুহাম্মদের জীবন সম্পর্কে কোরআনের আয়াত, নির্ভরযোগ্য হাদিস এবং প্রথমদিককার জীবনী-গ্রন্থগুলোতে শতাধিক বর্ণনা রয়েছে যেগুলো পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ থেকে মুক্ত। এ-উৎসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কোরআন, যার আয়াতে সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটনাবলী সম্পর্কে তথ্য সরাসরি পাওয়া যায়; এবং আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময়কালীন প্রেক্ষাপটসমূহ তফসিরকারকদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে জানা যায়। নবি মুহাম্মদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কিত আয়াতগুলোর সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে অনেক বেশি।

কোরআনের সকল তফসিরকারক একমত যে, ইহুদিদের দ্বারা নবির নারীসঙ্গ প্রীতির সমালোচনার প্রেক্ষিতে সুরা নিসা-এর ৫৪ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল। ইহুদিদের অভিযোগ ছিল স্ত্রীসঙ্গ গ্রহণ ছাড়া নবির অন্য কোনো কাজ নেই। আয়াতে বলা হয়েছে: “তারা কি ঈর্ষা করে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা-যা দিয়েছেন? কারণ আমি ইব্রাহিমের বংশধরকে তো কিতাব ও হিকমত দিয়েছিলাম, আর তাদেরকে দিয়েছিলাম এক বিশাল রাজ্য। (৪: ৫৪)।

আল্লাহ-প্রদত্ত নবুওতির অধিকার এবং অধিক সংখ্যক স্ত্রী থাকার দরুন মুহাম্মদের প্রতি ইহুদিরা ঈর্ষান্বিত ছিল। ইহুদিদের বক্তব্য ছিল, একজন সত্যিকারের নবি এতোবেশিসংখ্যক স্ত্রী গ্রহণ করতে পারেন না। আয়াতের দ্বিতীয় বাক্যে সমালোচকদের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বলা হয়েছে এবং আবশ্যিকভাবে তা দাউদ এবং সলোমনের মতো নবিদের প্রতি ইঙ্গিত করা হচ্ছে। উক্ত নবিদের নিরানব্বইজন করে স্ত্রী ও এক হাজারের মতো হারেমবাসী নারীসঙ্গী থাকার পরেও তাদের দুজনের নবি হিসেবে মর্যাদায় কোনো হানি ঘটেনি। ইসরাইলের সন্তানদের অন্যান্য রাজার কাহিনীর মতো এই ধারণাগুলো কল্পনার সুতোয় বোনা অত্যুক্তি মাত্র।

কোনো কোনো ইউরোপীয় সমালোচকদের মতে, যে ধর্মপ্রচারক পূর্বপুরুষের সংস্কার-বিশ্বাসকে প্রত্যাখান করে, সংশোধন করে নিজস্ব ধর্মপ্রচার করে গিয়েছেন, তার ব্যক্তিত্বের সাথে এরূপ মাত্রাতিরিক্ত নারীসঙ্গপ্রীতি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সমালোচক কয়েকজনের মতে, ইসলামের যেসব বিধি-বিধান নারীর মর্যাদা এবং অধিকারের উন্নয়ন ঘটিয়েছে সেগুলো নারীর প্রতি মুহাম্মদের ভালোলাগা থেকেই উৎসারিত হয়েছে।

অবশ্যই একজন মানুষ এবং প্রতিটি মানুষেরই দুর্বল দিক রয়েছে। যৌনচাহিদা মানুষের একটি আবশ্যিক প্রবৃত্তি এবং অন্যদের সম্পর্কে চিন্তা ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এটা তখনই তিরস্কারযোগ্য যখন সমাজে ক্ষতিকর আচরণের বিস্তার ঘটায়। অন্যথায় একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনযাপনের ভালো-মন্দ, শক্তি-দুর্বলতা নিয়ে আলোচনার কোনো অর্থ নেই। খ্রিস্টপূর্ব কাল থেকে সক্রেটিসের ভাবনা এথেন্স থেকে গ্রিসের সর্বত্র এবং পর্যায়ক্রমে সমগ্র মানবজাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। সক্রেটিসের ব্যক্তিগত জীবন কি ঘৃণ্য ছিল, এই প্রশ্নটি গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে যদি না তিনি তার জীবনাচরণের মাধ্যমে সমাজের কোনো ক্ষতি সাধন করে থাকেন। অ্যাডলফ হিটলারকে যৌনপ্রবৃত্তির ঊর্ধ্বে বলা যায় কারণ এদিক থেকে তিনি অক্ষম কিংবা সীমিতভাবে সক্ষম ছিলেন। পক্ষান্তরে তিনি ধ্বংসাত্মক চিন্তাধারা পোষণ করতেন যা পৃথিবীকে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

নবি মুহাম্মদ নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতেন। তিনি নিজেকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করেছেন। তার জনগণকে পৌত্তলিকতার অন্ধকূপ থেকে উদ্ধারে ব্রত ছিলেন। মুহাম্মদের নারী-প্রীতি কিংবা অনেক স্ত্রী গ্রহণের ঘটনা তার চূড়ান্ত লক্ষ্যের প্রতি যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেনি কিংবা তা অন্যদের অধিকারকেও ক্ষুন্ন করেনি। মহান নেতাদের কাজের ধরন ও চিন্তাধারাকে সমসাময়িক সামাজিক প্রেক্ষাপট অনুসারে এবং সমাজ ও মানবজাতির কল্যাণে এগুলোর অবদানের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা উচিত। অথচ এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করলে, মানুষের চিন্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণের ফলে যারা একমাত্র বাধ্য হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, অথবা বেঁচে থাকার জন্য কতগুলো কঠোর শর্তের ভিত্তিতে নিজেদের সহায়-সম্পদ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল, তাদের এই বিষয়গুলো নিয়ে তুলনামূলকভাবে প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ বেশি রয়েছে।

মুসলমানদের বিবেচনাবোধে ভুল ছিল, যদিও তা সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার। ইসলামের প্রতিষ্ঠাতাকে মহিমান্বিত করতে গিয়ে মুসলিম পণ্ডিতেরা এমন সব বক্তব্য পেশ করেছেন ও লিখেছেন যা কোরআনের স্পষ্টভাবে বোধগম্য আয়াত এবং নির্ভরযোগ্য আদি ঐতিহাসিক তথ্যগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক। মিশরীয় গবেষক এবং শিক্ষামন্ত্রী মুহাম্মদ হোসেন হায়কল তার লাইফ অব মুহাম্মদ বইয়ে বিংশ শতাব্দীর জ্ঞানের আলোকে এই বিষয়ে নিরীক্ষা করতে গিয়ে পাশ্চাত্য সমালোচনার প্রতি উষ্মা প্রকাশ করেছেন। এমন-কী বইটির একটি অধ্যায়ে অযাচিতভাবে নবির নারীপ্রীতিকে পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। ওই অধ্যায়ের একটি অনুচ্ছেদ এখানে উল্লেখ করা হলো: “খাদিজার সাথে দীর্ঘ বিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে নবি মুহাম্মদ কখনো একাধিক স্ত্রী গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেননি। …এটা খুবই স্বাভাবিক এবং অবশ্যম্ভাবী একটি ব্যাপার। খাদিজা একজন ধনী সন্ত্রান্ত মহিলা ছিলেন। তিনি একজন গরীব, কিন্তু সৎ ও কঠোর পরিশ্রমী কর্মচারীকে বিয়ে করেছিলেন। খাদিজা মুহাম্মদকে নিজ গৃহে জায়গা দিয়েছিলেন, কেননা স্বীয় স্বভাব কিংবা দারিদ্র্যের কারণে মুহাম্মদ অন্যান্য কুরাইশ যুবকের মতো উদাম যৌনতার স্রোতে গা ভাসিয়ে দেননি। এ কারণেই বয়স্ক ও অভিজ্ঞ খাদিজা মনেপ্রাণে নিজের থেকে পনেরো বছরের ছোট স্বামীর যত্ন নিয়েছেন। নিজের অর্থবিত্ত কাজে লাগিয়ে মুহাম্মদকে সচ্ছলভাবে জীবনযাপনে সাহায্য করেছেন যেন মুহাম্মদ তার বাল্যজীবনের দুঃখকষ্ট ও চাচার উপর নির্ভরতার কথা ভুলে থাকতে পারেন। খাদিজার গৃহের নিরিবিলি ও আরামদায়ক পরিবেশে মুহাম্মদ তার দশ-বারো বছর ধরে জমে থাকা চিন্তাভাবনাকে পরিপূর্ণতা দানের সুযোগ পেয়েছেন। খাদিজা নিজে মুহাম্মদের মৌলিক চিন্তাধারার সাথে একমত ছিলেন। কেননা ওয়ারাকা বিন নওফলের চাচাতো বোন হিসেবে তিনিও হানিফদের নন্দনতত্ত্বের প্রতি আগ্রহী ছিলেন”। মুহাম্মদের নবুওতি লাভের পর খাদিজা তার স্বামীর লক্ষের সত্যতা ও স্বগীয় অনুপ্রেরণার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং সর্বপ্রথম ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। উল্লেখ্য খাদিজা মুহাম্মদের চার কন্যা জয়নাব, রোকেয়া, উমে কুলসুম এবং ফাতেমার মাতা ছিলেন”। এই পরিস্থিতিতে খাদিজার জীবদ্দশায় মুহাম্মদ কিভাবে আরেকজন স্ত্রী গ্রহণ করতে পারতেন? কেবল খাদিজার মৃত্যুর পরে মুহাম্মদ আয়েশার পাণিপ্রার্থী হয়েছিলেন। অন্যদিকে আয়েশা যেহেতু সাত বছর বয়সী শিশু ছিলেন সেজন্য আস-সাকরান বিন আমরের বিধবা স্ত্রী সওদাকে বিয়ে করেছিলেন। এরপর হায়কল তার বইয়ে মন্তব্য করেন, ‘সওদার না ছিল রূপ, না ছিল ধনদৌলত। তাঁকে বিয়ে করে নবি মুহাম্মদ আবিসিনীয় একজন মুসলিম অভিবাসীর নিঃসঙ্গ বিধবা স্ত্রীর প্রতি বদান্যতা ও কৃপার কাজ করেছেন।

নবি মুহাম্মদ সওদাকে বিয়ে করেছেন কারণ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা হিসেবে তিনি গৃহকার্যে পারদর্শী এবং চারটি শিশুকন্যাকে দেখাশোনায় সক্ষম-হায়কল এমনটা লিখলে আরও ভালো হতো। যদিও এই বক্তব্যের বিরোধিতার সুযোগ রয়েছে। কারণ নবি মুহাম্মদ প্রথমে আয়েশার কথা চিন্তা করেছিলেন। আয়েশা এতোটা অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন যে, তিনি দুবছর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে করতে পারতেন না। পরবর্তীতে মুহাম্মদ সওদাকে বিয়ে করেন। হতে পারে তিনি স্ত্রীসঙ্গবিহীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন না। এমন যুক্তিকে সমালোচনা করার কারণ নেই। সম্ভাব্য আরেকটি কারণ হতে পারে, ওই সময়ে বিয়ের উপযোগী অন্য কোনো মহিলার অনুপস্থিতি। কুরাইশরা মুহাম্মদকে নিজেদের কন্যাদানে অনাগ্রহী ছিলেন। আবার মুসলমানদের বিয়ের উপযোগী কোনো কন্যাসন্তান ছিল না। সময়টা ছিল খাদিজার মৃত্যু-পরবর্তীকালীন দুই বাতিন বছর। নবি তখন মক্কায় অবস্থান করছিলেন। ইয়াসরিব বা মদিনায় অভিবাসনের পর নবি মুহাম্মদের জীবনধারা পাল্টে যায়। তখন নারীদের প্রতি আগ্রহ পূরণের সুযোগ আসে। এই সত্যকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। সহীহ বুখারিতে নবি মুহাম্মদের নয় জন স্ত্রী ও দুই জন দাসীর সাথে যৌন সম্পর্ক থাকার কথা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে এবং বলা বাহুল্য, সে যুগের নৈতিকতার সাথে ব্যাপারটি বেমানান নয়। কিন্তু তাঁকে সর্বকালের জন্য মানুষের আদর্শ বলে দাবি করলে বিপত্তির সূচনা ঘটে – অনুবাদক) নবি মুহাম্মদের স্ত্রীদের মোটামুটি একটি পূর্ণ তালিকা নীচে উল্লেখ করা হল:

  • ১. খুয়েলিদ ইবনে আসাদের কন্যা খাদিজা একজন ধনী, সন্ত্রান্ত মহিলা। মুহাম্মদ ছিলেন খাদিজার তৃতীয় স্বামী। খাদিজার গর্ভে নবি মুহাম্মদের প্রথম পুত্র সন্তান কাশেম, দুই বছর অতিক্রান্ত হওয়ার আগে মৃত্যু হয়। এরপর জয়নাব, রোকেয়া, উম্মে কুলসুম এবং ফাতেমা চার কন্যাসন্তানের জন্ম দেন খাদিজা। আত-তাহের নামের আরেকটি পুত্রসন্তান হয় তাদের ঘরে। কিন্তু ওই পুত্র সন্তানটিও শৈশবে মারা যান।
  • ২. জামার কন্যা সওদা। তিনি আবিসিনিয়ায় অভিবাসিত একজন মুসলমানের বিধবা স্ত্রী। মিশরীয় বুদ্ধিজীবী হায়কলের অভিমত, নবি তাঁকে বিয়ে করেছিলেন একজন নিঃসঙ্গ মুসলমান বিধবার প্রতি করুণা হিসেবে। হায়কলের অভিমত উপরে আলোচনা করা হয়েছে।
  • ৩. হজরত আবু বকর আস-সিদ্দিকির কন্যা আয়েশা। সাত বছর বয়সে মুহাম্মদের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয় এবং নয় বছর বয়সে তিনি মুহাম্মদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দুজনের বয়সের পার্থক্য প্রায় চল্লিশ বছর। হিজরি ১১ সনে (৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) যখন মুহাম্মদ মৃত্যুবরণ করেন, তখন আয়েশার বয়স ষোল অথবা সতের। তিনি নবির সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী ছিলেন। হৃদয় থেকে কোরআন শিক্ষালাভকারীদের মধ্যে তিনি অন্যতম। নবির বচন ও কর্মের (হাদিস) এবং মুসলমানদের সংস্কৃতি সম্পর্কিত তথ্যেরও একজন গুরুত্বপূর্ণ উৎস তিনি। খলিফা উসমান হত্যাকাণ্ডের পর বিবি আয়েশা আলি বিন আবু তালিবের খলিফা পদে আসীন হওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন। আয়েশা হিজরি ৩৬ (৬৫৬ খ্রিস্টাব্দ) সনে আলির বিরুদ্ধে জঙ্গে জামাল বা উটের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেপরাজিত হোন।
  • ৪. মক্কা থেকে মদিনায় অভিবাসী এবং ওহুদের যুদ্ধে আহত হয়ে মৃত্যুবরণকারী একজন মুসলমানের স্ত্রী উমে সালমা।
  • ৫. হজরত ওমর বিন আল-খাত্তাবের কন্যা হাফসা। স্বামী মৃত্যুর পর তারও নবির সাথে বিয়ে হয়। এই বিয়ের একটি প্রায়োগিক দিক রয়েছে বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন।
  • ৬. জাহাশের কন্যা জয়নাব। তিনি নবির পালকপুত্র (মুক্তদাস) জায়েদ বিন আল-হারিসের প্রাক্তন স্ত্রী। জয়নাবের সঙ্গে নবি মুহাম্মদের বিয়েকে অন্যতম ভালোবাসার বন্ধন হিসেবে গণ্য করা হয়। জায়েদ ও জয়নাবের সম্পর্ক নিয়ে একটি দীর্ঘ বর্ণনামূলক কবিতা রয়েছে। জয়নাবের জন্য নবির প্রীতি ও আদর এতোই বেশি ছিল, তাকে আয়েশার একজন প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত করে।
  • ৭. মুসতালিক গোত্রের প্রধান আল-হারিস বিন আবু দেরার-এর কন্যা ও মুসাফির বিন সাফওয়ানের প্রাক্তন স্ত্রী জুয়ায়রিয়া। হিজরি ৫৪ (৬২৭ খ্রিস্টাব্দে) সালে বানু-মুসতালিক গোত্রের পরাজয়ের পর জুয়ায়রিয়াকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটক করা হয় এবং পরবর্তীতে মুসলমান যোদ্ধাদের মধ্যে একজনের গনিমতের মালে হিসেবে জায়গা হয়। জুয়ায়রিয়ার মালিক তাঁকে একটি নির্দিষ্ট মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা ছিল তার সাধ্যের বাইরে। জুয়ায়রিয়া তাই নবি মুহাম্মদের বাড়িতে গিয়ে সাহায্য চাইলেন, নবি যেন মুক্তিপণের পরিমাণ কমাতে মধ্যস্থতার দায়িত্ব নেন। পরবর্তী কাহিনী বিবি আয়েশার বর্ণনা অনুযায়ী, জুয়ায়রিয়ার সৌন্দর্য ও মাধুর্য এমনই ছিল যে, তাঁকে দেখামাত্র সবাই পুলকিত বোধ করত। জুয়ায়রিয়াকে আমার ঘরের দরজার সামনে দেখে আমি বিচলিত বোধ করি। কেননা নিশ্চিত ছিলাম আল্লাহর বান্দা তাঁকে দেখামাত্র পছন্দ করবেন এবং সেটাই হলো। জুয়ায়রিয়া যখন নবির সাথে দেখা করার সুযোগ পেলেন এবং আর্জি ব্যক্ত করলেন, নবি তখন বললেন, তিনি জুয়ায়রিয়ার জন্য আরও ভালো কিছু করবেন- নবি নিজে তার মুক্তিপণ পরিশোধ করবেন এবং পাণিপ্রার্থী হবেন। জুয়ায়রিয়া তা শুনে খুশি হয়ে সম্মতি জানালেন। নবির সাথে জুয়ায়রিয়ার বিয়ের পর মুসলমানরা মুসতালিক গোত্রের বন্দীদের অনেককে ছেড়ে দিলেন। যেহেতু তাঁরা নবি মুহাম্মদের তালাতো ভাইবোন ছিল। আমি অন্য কোনো নারীর কথা জানি না, যে নিজের আত্মীয়-স্বজনদের জন্য এমন সুন্দর পরিণতি ও আশীর্বাদ বয়ে নিয়ে এসেছে।’
  • ৮. আবু সুফিয়ানের কন্যা উমে হাবিবা (আরেক নাম রামালা)। তার প্রথম স্বামী উবাদুল্লাহ বিন জাহাশ আবিসিনায় মৃত্যুবরণ করেন।
  • ৯. খায়বারের ইহুদি নেতা কেনানা বিন আবু রাবিয়ার স্ত্রী সাফিয়া। তিনি হোয়ায় বিন আকতাবের কন্যা। খায়বার যুদ্ধে বন্দী হওয়ার পর নবি তাঁকে গনিমতের মাল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। খায়বার থেকে মদিনায় আসার পরে নবি তাকে বিয়ে করেন।
  • ১০. হেলাল গোত্রের আল-হারিসের কন্যা মায়মুনা। মায়মুনার এক বোনের বিয়ে হয়েছিল আবু সুফিয়ানের সাথে এবং আরেক বোনের সাথে আব্বাস বিন আব্দুল মোতালেবের বিয়ে হয়েছিল। মায়মুনা খালেদ বিন আল-ওয়ালিদের খালা। (খালেদ পরবর্তীতে সিরিয়া দখলে ভূমিকা রাখেন)। কথিত আছে মায়মুনার সাথে নবির বিয়ের পর খালেদ ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নবি তাকে কয়েকটি ঘোড়া উপহার দিয়ে বরণ করে নেন।
  • ১১. শোরাইয়ার কন্যা ফাতেমা।
  • ১২. ইয়াজিদের কন্যা হিন্দ (উম্মে সালমা)।
  • ১৩. শাবার কন্যা আসমা।
  • ১৪. খোজায়মার কন্যা জয়নাব।
  • ১৫. কায়েসের কন্যা হবলা। হাবলার ভাই আল-আশাত বিন কায়েস দক্ষিণ আরবের এক নেতা। তিনি ইরান দখলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। (৭০)
  • ১৬. নোমানের কন্যা আসমা। নবি এই বিয়েকে পূর্ণতা দান করেননি।
  • ১৭. আদ-জাহাকের কন্যা ফাতেমা। এই বিয়েও পূর্ণতা পায়নি।
  • ১৮. মিশরীয় কপটিক খ্রিস্টান ক্রীতদাসী মারিয়া (মেরি দ্য কপ্ট বা মারিয়া কিবতিয়া)। তাঁকে ৬২৮ সালে মিশরের রোমান গভর্নর (ইসলামের ইতিহাসে মিশরের শাসকদের ‘আল-মুকাওকিস”নামে ডাকা হয়) উপহারস্বরূপ দান করেছিলেন নবিকে”। মারিয়ার গর্ভে নবির ইব্রাহিম নামের এক পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু শৈশবেই শিশুটির মৃত্যু ঘটে।
  • ১৯. মারিয়ার মতো রায়হানাও কোরআনের ভাষায় তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যাদের মালিক হয়ে যায় বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ রায়হানা ছিলেন একজন ক্রীতদাসী। তার সাথে বিয়ের প্রয়োজন ছিল না এবং যৌন সম্পর্ক স্থাপনেও কোনো বাধা ছিল না। তিনি ইহুদি গোত্র বানু-কুরাইজার একজন যুদ্ধবন্দী। যুদ্ধ শেষে তিনি গনিমতের মাল হিসেবে নবির কাছে জায়গা হয়েছিল। কিন্তু তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণে রাজি হননি এবং নবির সাথে কোনো চুক্তিভিত্তিক বিয়েতেও রাজি হননি। শেষে নবির গৃহে একজন গৃহপরিচারিকা হিসেবেই ছিলেন।
  • ২০. দাউস গোত্রের উম্মে শারিক। তিনি সেই চারজন নারীর মধ্যে একজন, যারা নিজেদের নবির কাছে সমর্পণ করেছিলেন। চুক্তিভিত্তিক বিবাহিত নারী এবং অস্থায়ী সঙ্গী ছাড়াও নবির গৃহে আরও কয়েকজন নারী ছিলেন তাঁরা এই শ্রেণিতে পড়েন। চুক্তিভিত্তিক বিবাহিত স্ত্রীর সংখ্যা সর্বোচ্চ চারজন হতে পারে। এ-ধরনের বিয়েতে মোহরানা, সাক্ষীদের উপস্থিতি এবং নারীর পিতা কিংবা অন্য অভিভাবকের সমতির প্রয়োজন রয়েছে। ক্রীতদাসীর সাথে মুসলমানদের যৌনসম্পর্ক স্থাপনে বৈধতা দেয়া হয়েছে, যদি ওই নারীর স্বামী পৌত্তলিক কিংবা অবিশ্বাসী হয়ে থাকেন। আর কেবলমাত্র নবির ক্ষেত্রে নিজেকে সমর্পণকারী কোনো নারীর সাথে নবির বিয়ের বৈধতা দেয়া হয়েছে সুরা আহজাব-এর ৫০ নম্বর আয়াতের শেষ অংশে। নবির কাছে নিজেদেরকে সমর্পণকারী অন্য তিনজন মহিলা হচ্ছেন মায়মুনা, জয়নাব এবং খাওলা।

উমে শারিক যখন নিজেকে নবির কাছে উপহার হিসেবে সমর্পণ করলেন বিবি আয়েশা তখন উদ্বিগ্ন বোধ করলেন। কেননা উমে শারিক ছিলেন খুব সুন্দরী এবং মুহাম্মদ উপহার হিসেবে তৎক্ষণাৎ গ্রহণ করেন। হাদিসে আছে এ- ঘটনায় ঈর্ষা ও অসমান অনুভব করেন বিবি আয়েশা। তিনি বলেন, যে নারী নিজেকে একজন পুরুষের কাছে সমর্পিত করে, তার নিজের কী মূল্য থাকতে পারে এ ভেবে আমি আশ্বর্যান্বিত হই। সুরা আহজাবের ৫০ নম্বর আয়াতের শেষাংশ কোনো বিশ্বাসী নারী নবির কাছে নিবেদন করলে আর নবি তাকে বিয়ে করে বৈধ করতে চাইলে সেও বৈধ এই ঘটনার প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছিল যেখানে উম্মে শারিককে উপহার হিসেবে নবি কর্তৃক গ্রহণকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। একথা শুনে আয়েশা রাগান্বিত হয়ে বলেন: আপনার প্রভু আপনার ইচ্ছাকে অনুমোদন দিতে ওহি পাঠাতে খুব একট বিলম্ব করেন না, তা তো দেখতেই পাচ্ছি।

(বুখারি হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী: খাওলা বিনতে হাকিমসহ কয়েকজন বিয়ের জন্য আল্লাহর নবির কাছে নিজেদের সমর্পন করেছিলেন। আয়েশা বললেন, ‘এই মেয়েদের কী লজ্জা-শরম নেই, তাঁরা যেচে এসে পুরুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করছে? এ-সময় সুরা আহজাবের ৫০-৫১ নম্বর আয়াতদ্বয় নাজিল হয়, যেখানে বলা হয়েছে, . . . তুমি ওদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তোমার কাছ থেকে দূরে রাখতে পার ও যাকে ইচ্ছা গ্রহণ করতে পার… (৩৩: ৫১)। আয়েশা তখন বলেন, ‘হে আল্লাহর নবি! আপনাকে খুশি করতে আপনার প্রভু তো দেখি খুব একটা দেরি করেন না। দ্রষ্টব্য: বুখারি শরিফ, ভলিউম ৭, বুক ৬২ নম্বর ৪৮ – অনুবাদক)।

তফসির আল-জালালাইনের লেখক মিশরের বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ জালালউদ্দিন আল-মাহালি ও জালালউদ্দিন আল-সুয়তির ভাষ্য থেকে বিবি আয়েশা ও নবির মনোমালিন্যের বর্ণনা পাওয়া যায়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী উম্মে শারিকের সাথে নবির সম্পর্ক হওয়ার পর এবং সুরা আহজাব-এর ৫০ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ হবার পর আয়েশা রূঢ়ভাবে বলে ওঠেন, যে নারী নিজেকে একজন পুরুষের কাছে আগ বাড়িয়ে সমর্পিত করে, তার নিজের কী মূল্য থাকতে পারে, এ ভেবে আমি আশ্চর্যান্বিত হই। পরবর্তীতে ৫১ নম্বর আয়াতে আয়েশাকে তিরস্কার করা হয় এবং ওই আয়াত অবতীর্ণ হবার পরেই নবির ইচ্ছাপূরণে প্রভু সময়ক্ষেপণ করেন না বলে আয়েশা মন্তব্য করেন। সুরা আহজাব-এর ৫০ নম্বর আয়াতে স্ত্রী ও ক্রীতদাসী গ্রহণে নবির অধিকারের কথা বলা হয়েছে: “হে নবি! আমি তোমার জন্য তোমার স্ত্রীদেরকে বৈধ করেছি যাদেরকে তুমি দেনমোহর দিয়েছ ও বৈধ করেছি তোমার ভান হাতের অধিকারভুক্ত দাসীদেরকে যাদেরকে আমি দান করেছি, এবং বিয়ের জন্য বৈধ করেছি তোমার চাচাতো, করলে আর নবি তাকে বিয়ে করে বৈধ করতে চাইলে সেও বৈধ। এ বিশেষ করে তোমারই জন্য, অন্য বিশ্বাসীদের জন্য নয়…।” (৩৩: ৫০)। একই আয়াতে আরও বলা হয়েছে: বিশ্বাসীদের স্ত্রী ও তাদের দাসীদের সম্বন্ধে আমি যা নির্ধারণ করেছি তা আমি জানি। এই আয়াতের শেষাংশ নিয়ে বিবি আয়েশা প্রতিবাদ করলে ৫১ নম্বর আয়াতে সতর্কতা জারি করা হয়, যার মাধ্যমে স্ত্রীর ওপর নবির ক্ষমা চূড়ান্ত এবং অসীম পর্যায়ে উন্নীত করা হয়। এর ফলে স্ত্রীরা নবির কোনো কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হন: তুমি ওদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা দূরে রাখতে পার ও যাকে ইচ্ছা গ্রহণ করতে পার, আর তুমি যাকে দূরে রেখেছ তাকে কামনা করলে তোমার কোনো দোষ নেই। এ-বিধান এজন্য যে, এতে ওদেরকে খুশি করা সহজ হবে আর ওরা দুঃখ পাবে না, এবং ওদেরকে তুমি যা দেবে তাতে ওদের প্রত্যেকেই খুশি থাকবে। তোমাদের অন্তরে যা আছে আল্লাহ তা জানেন। আল্লাহ সব জানেন, সহ্য করেন। (৩৩: ৫১)।

আল-জামাখশারি তার লেখা কোরআনের তফসিরগ্রন্থ “আল-কাশশাফ- এ সুরা আহজাবের ৫১ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, “নবির স্ত্রীরা যারা একে অন্যের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তারা নিজেরা বেশি করে গনিমতের মালের ভাগ চেয়েছিলেন। (বানু কুরাইজা লোকদের হত্যা করার পর, মুসলমানরা প্রচুর পরিমাণ গনিমতের মাল পেয়েছিলেন। তখন নবির স্ত্রীরা এখান থেকে এক পঞ্চমাংশ ভাগ পাওয়ার আশা করেছিলেন)। বিবি আয়েশাকে উদ্ধৃত করে জামাখশারি বলেন, ৫১ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ হবার আগ পর্যন্ত এক মাস নবি তার স্ত্রীদের সঙ্গ ত্যাগ করেন। ওই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর ভীতসন্ত্রস্ত স্ত্রীরা নবিকে তার ইচ্ছানুযায়ী আর্থিক সহায়তা ও ব্যক্তিগত সাহচর্য দেবার কথা বলেন।

অর্থাৎ স্ত্রীদের সাথে নবি কিভাবে আচরণ করবেন তা নির্ধারণে নবির একচ্ছত্র আধিপত্যকে তার স্ত্রীরা স্বীকার করে নিলেন। জামাখশারি সুরা আহজাব-এর ৫১ নম্বর আয়াতের বিস্তারিত ব্যাখ্যায় বলেছেন, এই আয়াত নবিকে তার ইচ্ছামতো সমাজের যেকোনো নারীকে বিয়ে করার আগ্রহ, প্রস্তাব, স্ত্রীরূপে গ্রহণ কিংবা যে কোনো স্ত্রী বা সকল স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করেছে। এছাড়া হাসান বিন আলিকে উদ্ধৃত করে জামাখশারি লিখেছেন, নবি যদি একজন নারীর পাণিগ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করতেন, তবে অন্য কারো পক্ষে সেই নারীকে স্ত্রীরূপে গ্রহণের ক্ষমতা নেই, যদি না নবি তার মত পরিবর্তন করেন। জামাখশারি আরও লিখেছেন, ওই সময়ে নবির নয়জন স্ত্রী ছিলেন যাদের সবাইকে সমান সঙ্গ দেবার কথা থাকলেও তিনি তা ক্রমানুযায়ী করেননি, কিংবা পাঁচজনকে একেবারেই সঙ্গ দেননি। এই পাঁচজন হচ্ছেন সওদা, জুয়ায়রিয়া, সাফিয়া, মায়মুনা এবং উমে হাবিবা। যাদেরকে অনুগ্রহ করে নিয়মিত সঙ্গ দিয়েছেন তাঁরা হলেন আয়েশা, হাফসা, উমে সালমা এবং জয়নাব। আয়েশাকে আবার উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, কোনো কোনো দিন এমন হতো যে, নবি আমাদের সবাইকে একে একে না ভেকে, শুধু তাদেরকেই অনুগ্রহ করতেন যাদের পালা আসতো এবং যাদের সাথে তার ওইদিন থাকার কথা। নবি তালাক দিয়ে দিবেন এই ভেবে উদ্বিগ্ন সওদা বিন জামা নবিকে বলছেন, “আমার জন্য সময় বরাদ দেবার প্রয়োজন নেই! আপনার সাথে আমার দাম্পত্য জীবনের আশা আমি পরিত্যাগ করেছি এবং আমার জন্য বরাদ সময় আয়েশাকে অর্পণ করলাম। কিন্তু আমাকে তালাক দিবেন না। কেননা শেষ-বিচারের দিনে আমি আপনার একজন স্ত্রী হিসেবে গণ্য হতে চাই।’

৫১ নম্বর আয়াতের বক্তব্য হচ্ছে, দাম্পত্য অধিকার হারানোর ফলে নবির স্ত্রীরা তুলনামূলকভাবে বেশি খুশি থাকবেন। যদিও স্বগীয় আদেশের মাধ্যমে নবিকে পূর্ণ দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে, এবং তার স্ত্রীদেরকে নবির কাছ থেকে যেকোনো পাওনা অধিকার আদায়ে বঞ্চিত করেছে, তথাপি এই বঞ্চনার মাধ্যমে তাদের কল্যাণ সাধিত হয়েছে। এর মাধ্যমে তাদের নিজেদের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দিতার অবসান হবে এবং তারা ভবিষ্যতে সুখী হবেন।

হয়তো নবির স্ত্রীরা মানসিকভাবে আঘাত পেয়েছিলেন এবং তাদের আত্মসমানের উপর আঘাত এসেছিল, সেই প্রেক্ষিতে সুরা আহজাব-এর ৫২ নম্বর আয়াতে সান্তনাসূচক বক্তব্য এলো। এই আয়াতের প্রতিটি শব্দে তাদের প্রতি সান্তনা এবং আশ্বাসের বাণী রয়েছে: (মুহাম্মদ!) এরপর তোমার জন্য কোনো নারী বৈধ নয় আর তোমার স্ত্রীদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রগ্রহণও বৈধ নয়, যদি ওদের সৌন্দর্য তোমাকে মুগ্ধও করে, তবে তোমার ডান হাতের অধিকারভুক্ত দাসীদের ব্যাপারে এ-বিধান প্রয়োজ্য নয়। আল্লাহ সমস্ত কিছুর ওপর কড়া নজর রাখেন।’

এই আয়াতে তথাপি একটি সমস্যা রয়ে গিয়েছে। যেমন বিবি আয়েশার একটি বক্তব্য সকল হাদিস-সংগ্রহকারক নির্ভরযোগ্যহাদিস হিসেবে উদ্ধৃত করেছেন: “সকল স্ত্রীর অনুমোদন না থাকা অবস্থায় নবি মারা যাননি। অর্থাৎ নবির মৃত্যুর আগে সকল স্ত্রীই তার জন্য অনুমোদিত ছিল। প্রভাবশালী সুন্নি পণ্ডিত ইসমাইল ইবনে কাসির (১৩০০-১৩৭৩ খ্রিস্টাব্দ) তার বিখ্যাত তফসির গ্রন্থে বলেছেন, সুন্নি ধর্মতাত্ত্বিক এবং হাদিস সংগ্রহকারক ইমাম আহমদ ইবনে হানবলের (৭৮০-৮৫৫ খ্রিস্টাব্দ) সংগ্রহে বিবি আয়েশার উদ্ধৃত এই হাদিসটি রয়েছে। এছাড়া মুহাম্মদ ইবনে ইসা আত-তিরমিজি (৮২৪-৮৯২ খ্রিস্টাব্দ) এবং ইমাম আহমদ আন-নাসাইর (৮২৯-৯১৫ খ্রিস্টাব্দ) সংগৃহীত হাদিসেও তা রয়েছে। যেমন: ‘সুনান আন-নাসাই’, (ইংরেজি অনুবাদ) ভলিউম৪, বুক-২৬, হাদিস-৩২০৭ – অনুবাদক) আল-জামাখশারির মতে, সুরা আহজাবের ৫২ নম্বর আয়াতটি ৫০ নম্বর আয়াত দ্বারা বাতিল হয়েছিল। অর্থাৎ হে নবি! আমি তোমার জন্য তোমার স্ত্রীদেরকে বৈধ করেছি… বক্তব্য টিকে গেছে আর (মুহাম্মদ) এরপর তোমার জন্য কোনো নারী বৈধ নয়…’ বক্তব্যটি বাতিল হয়ে গিয়েছে। হজরত আয়েশার উদ্ধৃত হাদিসটিও ৫০ নম্বর আয়াতের সত্যতার দিকে ইঙ্গিত করে। কিন্তু অন্য কিছু না হোক, সামঞ্জস্য বজায় রাখার জন্য হলেও কোরআনের কোনো একটি আয়াত বাতিল হলে সেটি থাকবে উপরে, যে আয়াত দ্বারা বাতিল হয়েছে তা থাকবে নীচে। কারণ ভবিষ্যতের সম্ভাব্য কোনো কাজকে বর্তমানের কোনো বক্তব্য দিয়ে সংশোধন করা যায় না, বরং অতীতের কাজকে সংশোধন করা যায় বর্তমানের বক্তব্য দিয়ে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা দেখি বাতিলকৃত আয়াতটি (৫২নম্বর আয়াত) রয়ে গিয়েছে নীচে আর যে আয়াতটি বাতিল করেছে (৫০ নম্বর আয়াত) এটা অবস্থান করছে উপরে। কোরআনের আয়াতের ধারাবাহিকতা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এমন গরমিল হলো কিভাবে? (আল্লাহ কি নিজে এই গরমিল করেছেন, নাকি নবি-পরবর্তী খলিফাদের কোরআন সংকলন কমিটি আয়াত বিন্যাস করতে গিয়ে এই গরমিল করেছেন? - অনুবাদক। জালালউদ্দিন আল-সুয়তিও আল-ইতকান ফি উলুম আল-কোরআন নামের বইয়ে কোরআনের সমস্যাগুলো নিয়ে একটি নিবন্ধে মত প্রকাশ করেছেন, ‘সুরা আহজাবের এই পূর্ববর্তী আয়াত দ্বারা পরবর্তী আয়াত বাতিল হয়েছে।”

সুরা আহজাবের বিভিন্ন আয়াতে বর্ণিত নবির বিয়ে সম্পর্কিত অধিকারগুলো যখন একের পর এক যোগ হতে থাকে, তখন এগুলো থেকে বিস্ময়কর সুবিধা-প্রাপ্তির বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্যান্য বিশ্বাসীদের জন্য চারজনে সীমাবদ্ধ থাকলেও নবির জন্য এর চেয়েও বেশি স্ত্রী গ্রহণ করা সম্ভব ছিল। নবির জন্য তার সাথে মদিনায় অভিবাসনকারী কাজিনদের বিয়ে করা অনুমোদিত ছিল, কোনো ধরনের যৌতুক প্রদান কিংবা সাক্ষীর উপস্থিতি ব্যতিরেকে নিজেকে তার কাছে সমর্পণকারী কোনো নারীকে নবি বিয়ে করতে পারতেন। স্ত্রীদের সমঅধিকার প্রদানে কিংবা তা রক্ষায় নবির কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না, তিনি যে কোনো স্ত্রীর সহচর্য স্থগিত কিংবা বাতিল করতে পারতেন। তিনি যদি কোনো নারীর পাণিপ্রার্থী হতেন, তবে অন্য পুরুষদের সেই নারীর পাণিপ্রার্থী হওয়ার আশা পরিত্যাগ করতে হতো; এবং নবির মৃত্যুর পরে অন্য কেউ তার কোনো স্ত্রীকে বিয়ে করার অনুমোদন ছিল না। এছাড়াও নবির কোনো স্ত্রীর বাড়তি ভাতা পাওয়ার দাবি জানানোর অনুমতি ছিল না।

নবিকে ব্যাপক সুবিধা এবং স্বাধীনতা দেবার বিপরীতে তার স্ত্রীগণের ওপর নানা বিধি-নিষেধ আরোপিত হয়েছিল। তারা আর দশজন নারীর মতো থাকতে পারলেন না। তাদেরকে সবসময় লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতে হবে। তাদেরকে অবশ্যই পর্দার পিছনে থেকে পুরুষের সাথে কথা বলতে হবে। পৌত্তলিক সংস্কৃতির কোনো গয়না পরিধান তাদের জন্য নিষিদ্ধ হলো। ভাতার পরিমাণ যাই হোক না কেন নবির স্ত্রীদের তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হবে; তাদের পালা যদি না আসে তবে তারা অভিযোগ করতে পারবে না এবং কোনো অবস্থাতেই তাঁরা পুনরায় বিয়ে করতে পারবে না। ৫৩ নম্বর আয়াতের শেষের দিকে সুনির্দিষ্টভাবে মুসলমান পুরুষদের জন্য আরোপিত হয়েছে: . . . তোমাদের কারও পক্ষে আল্লাহর রসুলকে কষ্ট দেয়া তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীদেরকে বিবাহ করা সংগত হবে না। আল্লাহর কাছে এ গুরুতর অপরাধ। ইহুদিদের নীতিশাস্ত্র তালমুদেও ইহুদি-রাজার স্ত্রীদের পুনরায় বিয়ের ওপর একই রকম নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

আবদুল্লাহ বিন আল-আব্বাসের” বক্তব্য অনুযায়ী, একবার একজন ব্যক্তি নবির একজন স্ত্রীর সাথে দেখা করতে গেল, এবং নবি তাকে পুনরায় এ কাজ করতে নিষেধ করেন। লোকটি প্রতিবাদ করে এই বলে যে, নবির স্ত্রী তার চাচার মেয়ে এবং তাদের দুজনের এ-সাক্ষাতের পেছনে কোনো খারাপ অভিসন্ধি নেই। নবি প্রত্যুত্তর দিলেন, “আমি এ-সম্পর্কে অবগত আছি, কিন্তু আল্লাহ এবং আমার মতো কোনো ঈর্ষাপরায়ণ দ্বিতীয়জন নেই। লোকটি ক্রুদ্ধ হয়ে ফিরে যাবার সময় গজগজ করে বলে গেল, তিনি আমাকে আমার চাচাতো বোনের সাথে কথা বলতে নিষেধ করলেন। যাই হোক, নবির মৃত্যুর পর আমি আমার চাচাতো বোনকে বিয়ে করবো। এ-ঘটনার পরই সুরা আহজাবের ৫৩ নম্বর আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।

একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন যে, এমন কোনো সময় আসেনি যখন নবির গৃহে তার বিশজন স্ত্রী একত্রে অবস্থান করেছেন। তার সমানিত স্ত্রী খাদিজার মৃত্যুর কথা পূর্বেই বলা হয়েছে। নবির স্ত্রী জয়নাব বিনতে খোজায়মানবির জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণ করেন। রায়হানা নামের দাসীরও মৃত্যু হয় নবির জীবদ্দশাতেই। তিনি দুটি বিয়েকে পূর্ণতা প্রদান করেননি। তার মৃত্যুকালে নয়জনের বেশি পূর্ণ স্ত্রী ছিলেন না।

নবির স্ত্রীদের মধ্যে একসময় দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের আবির্ভাব ঘটেছিল। একপক্ষে ছিলেন আয়েশা, হাফসা, সওদা এবং সাফিয়া। অন্যপক্ষে জয়নাব বিনতে জাহাশ, উম্মে সালমাসহ আরও তিনজন। নবির কয়েকজন স্ত্রী এমন সব ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছিলেন, যেগুলো পরবর্তীতে ইসলামি ইতিহাস এবং সাহিত্যে স্থান পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছে বিবি আয়েশা ও সাফওয়ান বিন আল-মোয়াত্তালকে কেন্দ্র করে ঘটা ঘটনাটি।

হিজরি ৫ সালে (৬২৭ খ্রিস্টাব্দ) বানু-মোসতালিক গোত্রের সাথে লড়াইয়ের সময় হজরত ওমরের একজন ক্রীতদাস ও মদিনার খাজরাজ গোত্রের একজন আনসারের সাথে ঝগড়া বেধে যায়। এই ঘটনায় খাজরাজ গোত্রের একজন নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবায় (যাকে মুসলমানরা বিশ্বাসঘাতকদের নেতা বলেই চিনতেন) ক্রুদ্ধ হয়ে তার আনসার সমর্থকদেরকে বললেন, “আমরা নিজেরাই নিজেদের বিপদ ডেকে এনেছি। (মদিনার সবকিছু মুহাজিরদের দখলের চলে যাচ্ছে এমন ইঙ্গিত করে) কথায় আছে, কুকুরকে খাওয়ালেও সে ঠিকই কামড়ায়, এই প্রবাদটি এখন আমাদের ক্ষেত্রে সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে। চলুন আমরা সবাই ইয়াসরিবে ফিরে যাই। ওখানে বেশিরভাগ মানুষই আমাদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু। এই সংখ্যালঘুদের উৎখাত করতে হবে। নবি এই বক্তব্য শুনে তাড়াতাড়ি মদিনার দিকে যাত্রা করলেন, যাতে আব্দুল্লাহ বিন উবায়ের যে কোনো বিরুদ্ধবাদী কিংবা চক্রান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন। ফিরতিপথে কয়েকটি সংক্ষিপ্ত বিরতি দিয়ে তিনি দ্রুত চললেন।

এই অভিযানের সময় নবির সাথে ছিলেন বিবি আয়েশা। একটি যাত্রাবিরতিতে বিবি আয়েশা প্রাকৃতিক ক্রিয়া সম্পন্ন করতে মরুভূমির ভেতরে প্রবেশ করলেন। পালকির মধ্যে আসার সময় খেয়াল করলেন, তার পুতির মালাটি হারিয়ে গেছে। খোঁজাখুঁজি করতে দেরি হয়ে যায়। এদিকে বিবি আয়েশার অনুপস্থিতি খেয়াল না থাকায় নবি তার অনুসারীদের নিয়ে স্থান ত্যাগ করলেন। আয়েশা এসে দেখলেন তার হাওদা (হাতি কিংবা উটের পিঠের উপরে বসানো কাপড় ঘেরা বসার স্থান) বহনকারী উটটি অন্যান্য উটের সাথে সেই স্থান ত্যাগ করেছে। বিবি আয়েশা মরুভূমিতে একা পড়ে রইলেন। এরই মধ্যে সাফওয়ান বিন আল-মোয়াত্তাল আয়েশাকে দেখতে পেলেন। সাফওয়ানের দায়িত্ব ছিল মুসলমান সৈনিকদের একটু দূরে থেকে অনুসরণ করা, ভুল করে ফেলে যাওয়া জিনিসপত্র সংগ্রহ করা। মরুভূমির মধ্যে আয়েশাকে একা অবস্থান করতে দেখে চিনতে পারলেন। নিজের উটের পেছনের আসনে বসিয়ে তাকে মদিনায় নিয়ে আসেন। এই ঘটনার কথা গোপন থাকল না।

বিবি আয়েশার প্রতিদ্বন্দ্বী জয়নাবের বোন হামনা এ-ঘটনা শুনে সুযোগ কাজে লাগাতে চাইলেন এবং অভিযোগ করলেন আয়েশা ও সাফওয়ান ব্যভিচারে লিপ্ত। বিখ্যাত কবি হাসান বিন সাবিত ও মেসতা বিন ওসাসা নামের একজন মুহাজির হামনার সাথে কণ্ঠ মেলালেন। অন্যদিকে সুযোগ-সন্ধানী আব্দুল্লাহ বিন উবায় মদিনা শহরে গুজব ছড়িয়ে দিলেন। পরিস্থিতি মোটেও আয়েশার অনুকূলে ছিল না। অভিযানে নবির সঙ্গী হবার পর এই অল্পবয়স্কা ও সুন্দরী নারী নিজেকে আরও দুজন নতুন এবং একই রকম সুন্দরী রমণীর প্রতিপক্ষ হিসেবে আবিষ্কার করলেন। প্রথমজন হলেন জয়নাব বিনতে জাহাশ, যাকে বিয়ে করার জন্য কোরআনের আয়াত নাজিল হয়ে নবিকে সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয়জন হলেন জোয়ায়রিয়া বিন আল-হারিস, যিনি মোসতালিক গোত্রের মুসাফি নামের একজনের প্রাক্তন স্ত্রী। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, জোয়ায়রিয়াকে অভিযানের পর বন্দী করা হয় এবং নবি তাকে তার মালিকের কাছ থেকে চারশ দিরহাম মুক্তিপণের বিনিময়ে কিনে নেবার কিছুদিন পরে বিয়ে করেন।

এটা অসম্ভব নয়, প্রতিপক্ষের আবির্ভাবে আয়েশার নারীত্ব এমনই আঘাত পেয়েছিল ও রুষ্ট হয়েছিল যে নবিকে সতর্ক করে তিনি জেনে-শুনে পাপ করেছিলেন কিংবা একটি অভিসারের অবতারণা ঘটিয়েছিলেন। যখন আয়েশার হাওদা উটের উপর তোলা হলো, কেউ লক্ষ্য করল না তা বেশি হালকা, এমনটা ভাবা কষ্টকর। মনে আরও প্রশ্ন জেগে উঠে। বিশ্রাম থেকে যাত্রা শুরুর পূর্বে নবি কেন তার প্রিয়তমা স্ত্রীর হাল-হকিকত জিজ্ঞেস করলেন না। আয়েশা কিভাবে এমন বেখেয়াল হয়ে পড়লেন যে, শতশত মুসলমানদের যাত্রা-প্রস্তুতি তার নজরে পড়ল না? তিনি সময়মত ফিরতে পারলেন না। সাফওয়ান তাকে খুঁজে পাবার আগ পর্যন্ত আয়েশা কিভাবে একা মরুভূমিতে পড়ে রইলেন? যদিও সাফওয়ানের কাজ ছিল অভিযান চলাকালীন সময়ে কিছু দূরত্ব বজায় রেখে একে অনুসরণ করা। যাত্রী ও পশুদের জন্য পরবর্তী যাত্রা বিরতির সময় তার কি অভিযানের যাত্রাবিরতির স্থানে পৌঁছে যাওয়া উচিত ছিল না? সাফওয়ানের আকস্মিক উদয় হওয়া এবং অভিযান চলে যাবার বেশ কিছু সময় পর আয়েশার উদ্ধার হবার ঘটনাটি তথ্য-প্রমাণ এবং যুক্তির বিচারে ধোপে টিকানো কষ্টকর। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে সাফওয়ানের সাথে যোগসাজশ করেই বিবি আয়েশা পেছনে থেকে গিয়েছিলেন।

সকালে যখন সাফওয়ান আয়েশাকে উটের পিছনের আসনে বসিয়ে শহরে প্রবেশ করলেন, শহরে তখন গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল এবং যতই তা ছড়িয়ে পড়ল ততই কুৎসিত আকার ধারণ করল। যেহেতুমদিনা শহরটি অনেক ছোট ছিল, ছোট ছোট বিষয়গুলোও কারো কাছে গোপন থাকে না। প্রশ্ন জাগে, এই ভয়ংকর গুজবের পর কিভাবে বিশ দিন সময় লাগল আয়েশার কাছে পৌঁছাতে? এবং তা শোনামাত্রই কেন আয়েশা অসুস্থ হয়ে পড়লেন? তিনি অবশ্য অসুস্থতার ভানও করে থাকতে পারেন। অসুস্থতার কারণে আয়েশাকে তার পিতার গৃহে ফিরে যাবার সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল। স্বাভাবিক বিচার-বুদ্ধিতে ধারণা করা যায়, তিনি শুরু থেকে এই গুজব সম্পর্কে অবগত ছিলেন এবং তখনই অসুস্থতার ভান করে পিতার গৃহে ফিরে গেলেন যখন নবির কানে গুজবটি পৌঁছে গিয়েছিল। নবি যখন আয়েশার প্রতি শীতল আচরণ করতে লাগলেন এবং দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করলেন। এতো সব বাহ্যিক উপস্থাপন এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়লেও আয়েশার নির্দোষ হওয়াকে অসম্ভব বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না। সম্পূর্ণ ঘটনাকে একটি ছেলেমানুষী ও নারীদের চাতুর্যপূর্ণ নাটক হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। সম্ভাবনা আরও জোরালো হয় যখন জানা যায় সাফওয়ান বহু আগে থেকে একজন কুখ্যাত নারীবিদ্বেষী লোক ছিলেন।

ঘটনা যাই হোক না কেন, লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া এই গুজব নবিকে চরমভাবে বিচলিত করেছিল। তিনি বিশ্বস্ত দুজন সহচর ওসামা বিন জায়েদ ও আলি বিন আবু তালিবের পরামর্শ গ্রহণ করেন। ওসামা দৃঢ়ভাবে মত প্রকাশ করেন, আয়েশা নির্দোষ এবং হজরত আবু বকরের মেয়ে হিসেবে তিনি কোনো অনৈতিক কাজে প্রলুব্ধ হতে পারেন না। অন্যদিকে আলির মত ছিল, নবির বিয়ে করার জন্য মেয়ের অভাব নেই, এবং ওই অভিসার-সম্পর্কিত আসল সত্য ঘটনা সম্ভবত আয়েশার দাসীর কাছ থেকে জানা যাবে। এরপরেই আলি ওই হতভাগ্য দাসীকে বেদম প্রহার করে সত্য উদ্ধারের চেষ্টা করলেন কিন্তু ওই দাসী কিছুই জানতেন না এবং কসম খেয়ে বললেন যে, বিবি আয়েশা নির্দোষ।

নবির মনে তবুও সন্দেহ দানা বেঁধে ছিল। যে কারণে নিজেই আবু বকরের গৃহে আয়েশাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেলেন। কিন্তু তিনি কেবল কান্নাভেজা কণ্ঠে আয়েশার নিদোর্য হবার দাবি শুনতে পেলেন। তিনি যখন সেখানে অবস্থান করছিলেন, হঠাৎই একটি স্বগীয় প্রত্যাদেশ নবির কাছে অবতীর্ণ হওয়ায় নবি মূর্ছা গেলেন। সবাই তাকে কাপড়ে মুড়ে, মাথার নিচে একটি বালিশ রেখে দিল। তিনি এতটাই ঘর্মাক্ত হয়ে গেলেন যে তার আলখাল্লা পুরোটা ঘামে ভিজে গেল। কিছুক্ষণ পর যখন তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেন তখনই ২৪ নম্বর সুরা নুর অবতীর্ণ হলো। এই সূরাটি একটি দীর্ঘ অংশে (২-২৬ নম্বর আয়াত) ব্যভিচার এবং ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগ করার শাস্তি এবং ওই মিথ্যা অভিসারের কাহিনী নিয়ে বক্তব্য রয়েছে। এই আয়াতের মাধ্যমে আয়েশাকে ব্যভিচারের অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

আল-জামাখশারির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী কোরআনে এর থেকে অন্য কোনো বিষয়ে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ২৩ নম্বর আয়াত এর সর্বোত্তম উদাহরণ: “যারা সাধবী, নিরীহ ও বিশ্বাসী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে তারা ইহলোক ও পরলোকে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। (২৪: ২৩)। মিথ্যা অভিসারের কাহিনীর সমাপ্তি ঘটে তিনজন কুৎসারটনাকারীকে শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে। তারা হলেন হামনা, হাসান বিন সাবিত এবং মেসতা। সুরা নুর-এর ৪ নম্বর আয়াত অনুযায়ী তাদের প্রত্যেককে আশিবার বেত্রাঘাত করা হয়। পূর্ববর্তী ঘটনার প্রেক্ষিতে এই শাস্তি প্রদান করা হয়, কেননা তারা যখন অপরাধ করেন, তখনও এই আয়াত অবতীর্ণ হয়নি।

নবির জীবনী-গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত আরও একটি ঘটনা যা কোরআনের আয়াতগুলোতে প্রতিধ্বনিত হয়েছে তা হলো নবির পালক-পুত্র জায়েদ বিন হারিসের স্ত্রী জয়নাব বিনতে জাহাশের প্রতি নবির প্রীতি ও তার সাথে নবির বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। জায়েদ একজন যুদ্ধবন্দী, পরে ক্রীতদাস হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। বিবি খাদিজা তাকে ক্রয় করে মুহাম্মদকে উপহার দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে নবি তাকে মুক্ত করে দিলেন এবং সমসাময়িক একটি প্রথা অনুযায়ী পালক-পুত্ররূপে গ্রহণ করলেন। প্রাক-ইসলামি যুগের আরব সংস্কৃতিতে পালক সন্তানদের রক্তের সন্তানের সমান অধিকার দেওয়া হতো এবং তাদের ওপর একই বিধিনিষেধ আরোপিত হতো। যেমন উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে এবং আত্মীয়তা ও বিয়ের ক্ষেত্রে পছন্দের ভিন্নতায়। সুরা আহজাব-এর আয়াত ৪৬ এ নিষেধাজ্ঞা আসার পূর্ব পর্যন্ত মুসলমানরা আরবের প্রাচীন প্রথা পালন করতেন। এই বিষয়ে আব্দুল্লাহ বিন ওমর একবার বলেছিলেন, “আমরা যারা নবির সান্নিধ্যে ছিলাম তারা জায়েদকে জায়েদ বিন মুহাম্মদ নামে সম্বোধন করতাম। তিনি শুধু নবির পুত্রই ছিলেন না, নবির জন্য অন্যতম নিবেদিত- প্রাণ এবং দৃঢ়বিশ্বাসী সাহাবিও ছিলেন।

জয়নাবের মায়ের নাম ছিল ওমায়মা, তিনি আবার আব্দুল মোতালেবের কন্যা। অর্থাৎ সম্পর্কে জয়নাব মুহাম্মদের ফুফাতো বোন। নবি নিজেই অনুরোধ করেছিলেন, জয়নাবকে যেন জায়েদের সাথে বিয়ে দেয়া হয়। প্রথমদিকে জয়নাব এবং তার ভাই আব্দুল্লাহ বিয়ের সম্মতি দানে আপত্তি করছিলেন। কারণ জায়েদ ছিলেন একজন মুক্ত ক্রীতদাস। ফলে জায়েদের সাথে তাদের সামাজিক মানমর্যাদার অসাম্য নিয়ে চিন্তিত হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সুরা আহজাব-এর ৩৬ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ হবার পর তারা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন: আল্লাহ ও তার রসুল কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোনো বিশ্বাসী পুরুষ বা নারীর সে-বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না। কেউ আল্লাহ ও তার রসুলকে অমান্য করলে সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।’ (৩৩৩৬)। এই প্রত্যাদেশের পর জয়নাবের সাথে জায়েদের বিয়ে দেয়া হয়। জয়নাবের প্রতি নবির ভালবাসাবোধ তৈরি হয় আরও পরে। যার সময়কাল এবং পরিস্থিতির বহু বর্ণনা রয়েছে। তফসির আল-জালালাইনের বর্ণনা অনুযায়ী, জায়েদের সাথে বিয়ের পরে জয়নাবের প্রতি নবির দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে: কিছু সময় পর জয়নাবের প্রতি নবির দৃষ্টি পড়ে এবং নবির হৃদয়ে তার প্রতি ভালবাসার বীজ অঙ্কুরিত হয়।’

সুরা আহজাব-এর ৩৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জামাখশারি বলেছেন, জায়েদের সাথে বিয়ের পরই জয়নাবের প্রতি নবির দৃষ্টি পড়ে। জয়নাব নবিকে এতটা বিমোহিত করেছিলেন যে, নবি তার ভালোবাসাবোধ নিয়ে মন্তব্য করেছেন- হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টির জন্য আল্লাহর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা। নবি জয়নাবকে আগেও দেখেছেন। কিন্তু তখন তিনি নবিকে প্রীত করতে পারেননি, বা নবির মধ্যে ভালোবাসাবোধ জাগেনি। না-হলে নবি হয়তো নিজেই তার পাণিপ্রার্থী হতেন। নবির প্রশংসার কথা জেনে জয়নাব জায়েদকে তা অবহিত করেন। জায়েদের মন বলছিল, আল্লাহ তার হৃদয়ে জয়নাবের অবস্থানে একটি অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাই তাড়াতাড়ি নবির কাছে ছুটে গিয়ে নিজ স্ত্রীকে তালাক দেবার অনুমতি চাইলেন। নবি পুরো ঘটনা জানতে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘জায়েদ জয়নাবকে সন্দেহ করেন কিনা? প্রত্যুত্তরে জায়েদ বললেন, জয়নাবের কাছ থেকে তিনি দয়ালু আচরণই পেয়েছেন, কিন্তু তিনি উদ্বিগ্ন এই কারণে যে, জয়নাব নিজেকে তার থেকে অভিজাত মনে করেন এবং নিজেকে নবির স্ত্রী হবার যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করেন। এ-সময় ৩৭ নম্বর আয়াতের সেই শব্দগুলো প্রত্যাদেশ হিসেবে আসলো: ‘তুমি তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছে রাখো, আল্লাহকে ভয় করো। এই তাৎপর্যপূর্ণ আয়াতটি নবি মুহাম্মদের সততা এবং জবাবদিহিতার একটি অনন্যসাধারণ উদাহরণ। আয়াতটির সম্পূর্ণ অনুবাদ এখানে দেয়া হল: সারণ করো, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন ও তুমিও যাকে অনুগ্রহ করেছ তুমি তাকে বলেছিলে, “তুমি তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছে রাখো, আল্লাহকে ভয় করো। তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন করেছিলে আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন। তুমি লোকভয় করছিলে, অথচ আল্লাহকেই ভয় করা তোমার পক্ষে অধিকতর সংগত ছিল। তারপর জায়েদ যখন (জয়নাবের সাথে) বিবাহ-সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ করলাম যাতে বিশ্বাসীদের পোষ্যপুত্ররা নিজ স্ত্রীর সাথে বিবাহসূত্র ছিন্ন করলে সেসব রমণীকে বিয়ে করতে বিশ্বাসীদের কোনো বাধা না হয়। আল্লাহর আদেশ কার্যকর হয়েই থাকে। (৩৩: ৩৭)।

এই আয়াতটি যথেষ্ট পরিষ্কার এবং বিশদ ব্যাখ্যার কোনো প্রয়োজন নেই। নবি জয়নাবকে পছন্দ করতেন, কিন্তু জায়েদ যখন নবির সাথে দেখা করে জয়নাবকে তালাক প্রদানের অনুমতি প্রার্থনা করলেন, নবি বিরুদ্ধ-মত দিয়ে জয়নাবের সাথে সংসার চালিয়ে যাবার পরামর্শ দিলেন। জায়েদকে উপদেশ দিয়ে নবি নিজের মনের ইচ্ছা আড়াল করলেন। কিন্তু আল্লাহ নবিকে বললেন যে, লোকে তাকে মন্দ বলবে এই ভয়ে জয়নাবের তালাকের জন্য নিজের সমর্থন প্রকাশে নবি বিরত রয়েছেন। নবির উপদেশ উপেক্ষা করে জায়েদ যখন জয়নাবকে তালাক প্রদান সম্পন্ন করলেন, তাকে বিয়ে করতে আল্লাহ তখন নবিকে অনুমতি দিলেন যেন মুসলমানরা কখনো তাদের পালক-পুত্রের সাবেক স্ত্রীদের বিয়ে করতে কোনো বিধি-নিষেধের সম্মুখীন না হয়।

সম্ভবত জায়েদের সাথে বিয়ের অনুষ্ঠানে জয়নাবের প্রতি নবির দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে। জয়নাবের আলাদা বসবাস করার কারণে জায়েদ নবির সাথে দেখা করে তালাকের অনুমতি চাওয়ার ঘটনা থেকে বোঝা যায়, খুব বেশি দিন স্থায়ী না হলেও তারা দুইজন একটি স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্কে ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে আল-জামাখশারির বর্ণিত ঘটনাবলী ক্রমানুসারে সাজানো যেতে পারে: বিয়ের অনুষ্ঠানে জয়নাবকে একনজর দেখার পর মুহাম্মদ তার সুখানুভূতি প্রকাশ করেন এই বলে, “হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টির জন্য আল্লাহর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা। নবির এ-কথা শুনতে পেয়ে এবং সম্ভবত তার প্রতি নবির দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দেখে জয়নাব নবির প্রকৃত অনুভূতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠলেন। এই অনুভূতি জয়নাবকে প্রেরণা যোগায় এমন একটি লক্ষ্য অর্জনে, যেখানে তিনি কুরাইশ গোত্রের সবচেয়ে সম্রান্ত ব্যক্তির স্ত্রীর মর্যাদা পাবেন। এই আশার বশবর্তী হয়ে এবং যেহেতু জয়নাব কখনো জায়েদকে স্বামী হিসেবে কামনা করেননি, তাই তিনি জায়েদের সাথে শীতল আচরণ করতে শুরু করেন। নিজ লক্ষ্য অর্জনে এতোটা অগ্রসর হলেন যে, নিজের সন্ত্রান্ত পরিচয় নিয়ে দম্ভ প্রকাশ করতে শুরু করলেন। তার প্রতি নবির অনুভূতি নিয়ে গর্ববোধ করা শুরু করলেন। জায়েদ তার নেতা এবং মুক্তিদাতার প্রতি কৃতজ্ঞচিত্তে তৎক্ষণাৎ জয়নাবকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্তনিলেন এবং নবির উপদেশ উপেক্ষা করে তালাকের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেন।

ক্যামব্রিজ তফসিরে’ এক ভিন্নবিবরণ রয়েছে: একদিন আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ (আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক তার ওপর) জয়নাবের বাড়িতে জায়েদের সাথে দেখা করতে গেলেন, সেখানে জয়নাবকে একটি চৌবাচ্চায় সুগন্ধি ঢালতে দেখেন। নবি তাকে দেখে প্রীত হলেন এবং জয়নাবকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করার বাসনা জেগে ওঠে। নবিকে দেখে জয়নাব তাকে নিজ হাত দিয়ে স্পর্শ করলেন। নবি তখন বললেন, ‘প্রশংসনীয় সৌষ্ঠব এবং সৌন্দর্যদায়িনী! হায় জয়নাব হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টির জন্য আল্লাহর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা!’ এ-কথাটি দুইবার বলে নবি চলে গেলেন। জায়েদ ফেরার পর জয়নাব তাকে ঘটনা খুলে বললেন এবং জানালেন, আপনি আর আমাকে পাবার অধিকার রাখেন না। যান এবং তালাকের অনুমতি চেয়ে আসুন। জায়েদের মনে জয়নাবের প্রতি বিদ্বেষ জেগে ওঠে। তিনি আর জয়নাবকে দৃষ্টিসীমার মাঝে সহ্য করতে পারছিলেন না। তালাক সম্পন্ন হবার পর, নবি জায়েদকে অনুরোধ করেন, জায়েদ যেন জয়নাবের সাথে দেখা করে বলেন, আল্লাহ তাকে নবির স্ত্রী হিসেবে মনোনীত এখন কি প্রয়োজন থাকতে পারে? জায়েদ উত্তর দিলেন, তিনি আল্লাহর রসুলের কাছ থেকে জয়নাবের জন্য একটি বার্তা নিয়ে এসেছেন। সকল প্রশংসা আল্লাহর রসুলের জন্য বলে জয়নাব দরজা খুলে দিলেন। জায়েদ ভেতরে প্রবেশ করা মাত্র জয়নাব কাঁদতে শুরু করলেন। জায়েদ বললেন, ‘এখন কাঁদার সময় নয়। আল্লাহ তোমাকে আমার চেয়েও ভালো একজন স্বামী দিয়েছেন। জয়নাব উত্তর দিলেন, আপনি কিছু মনে নিবেন না! কে সেই স্বামী? জায়েদ যখন জানালেন, আল্লাহর রসুলই সেই ব্যক্তি, জয়নাব তখন মাটিতে মাথা ঠুকে প্রার্থনায় নিমগ্ন হলেন।

অন্য আরেকটি বর্ণনা অনুযায়ী জায়েদ বলেছেন: ‘আমি জয়নাবের গৃহে গিয়ে তাকে রুটি সেঁকতে দেখি। যেহেতু সে শীঘ্রই নবির স্ত্রী হতে যাচ্ছে, নবির প্রতি আমার শ্রদ্ধার কারণে আমি তার দিকে সরাসরি তাকালাম না। আমি তার দিকে পিছু ফিরে জানালাম, নবি জয়নাবের পাণিপ্রার্থী হতে চেয়েছেন।”

তফসির আল-জালালাইনের মতে বিবাহ-বিচ্ছেদের পর পুনরায় বিবাহের জন্য মধ্যবর্তী যে কয়েকটি দিন অপেক্ষা করতে হয়, নবি সেদিনগুলো অপেক্ষা করেন এবং তা শেষ হওয়ার সাথে সাথে নবি কোনো প্রারম্ভিক অনুষ্ঠান ব্যতিরেকে জয়নাবের বাড়িতে উপস্থিত হলেন। সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে একটি ভেড়া জবাই করে বিবাহ-ভোজের আয়োজন করা হয়। ভোজের অনুষ্ঠান এবং মানুষের মাঝে রুটি ও মাংস বিতরণের কর্মযজ্ঞ অনেক রাত অবধি চলেছিল। প্রচলিত আছে যে, হজরত ওমর এবং বিবি আয়েশা উভয়েই মন্তব্য করেছেন, সুরা আহজাব-এর ৩৭ নম্বর আয়াতে নবির সততা ও সত্যবাদিতার প্রমাণ পাওয়া যায়। আয়েশা আরও বলেছিলেন, নবি যদি কোনো কিছু লুকিয়ে রাখার ইচ্ছা করতেন, তবে জয়নাবের প্রতি তার মনের ভাবনা কখনো কোরআনে উল্লেখ হতো না। যেমন এই আয়াতে বলা হয়েছে, “তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন করেছিলে আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন এ শব্দগুলো কখনো অবতীর্ণ হতো না।

শুধুমাত্র কোরআনের সুরা আহজাব-ই নয়, কোরআনের আরও অনেক সুরা থেকে নবির সততা এবং সত্যবাদিতার পরিচয় পাওয়া যায়। নবি তার মানবিক দুর্বলতা স্বীকারে কুষ্ঠাবোধ করেননি। যদিও মুসলমান রক্ষণশীলরা দীর্ঘদিন ধরে এই সত্যকে স্বীকার করতে চান না, যারা কিনা রাজার থেকেও বেশি রাজকীয় আচরণে প্রলুব্ধ এবং অলৌকিকতার প্রতি চরম আসক্ত। পূর্ববর্তী অধ্যায়ে এ সম্পর্কে সামান্য পরিমাণে আলোকপাত করা হয়েছে। হাদিসের অনেকগুলো স্পষ্ট প্রমাণ ও সুরা আহজাব-এর ৩৭ নম্বর আয়াতের পরিষ্কার অর্থকে অগ্রাহ্য করে ইসলামি পণ্ডিত আল-তাবারি” মন্তব্য করেছেন, তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন করেছিলে আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেনবাক্যটি নবি মুহাম্মদকে উদ্দেশ্য করে অবতীর্ণ হয়নি। এটা জায়েদকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। জায়েদের মনের মাঝে কোনো কিছু গোপন ছিল! আল-তাবারি এই ভিত্তিহীন ব্যাখ্যাকে গ্রহণযোগ্য করতে গিয়ে অভিযোগ করলেন; জায়েদের একটি মারাত্মক ব্যাধি ছিল, যার খবর তিনি গোপন করেছিলেন। এই ব্যাধির কারণে তিনি জয়নাবকে তালাক দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সমাজের কাছ থেকে তার রোগের খবর গোপন রাখা জায়েদের উদ্দেশ্য ছিল। ৭৬

ফুফাতো বোন। নবি তাঁকে পূর্বেও দেখেছেন এবং বিয়ে করার কোনো ইচ্ছা প্রকাশ করেননি। তিনি তাই জয়নাবকে তালাক না দেবার জন্য জায়েদকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু জায়েদ তার পথপ্রদর্শকের উপদেশ অমান্য করে ঠিকই নিজের স্ত্রীকে তালাক দিলেন। পরবর্তীতে পৌত্তলিক-আরবের প্রথা ভঙ্গের জন্য নবি জয়নাবকে বিয়ে করলেন বিশ্বাসীদেরকে দেখানোর জন্য যে, দত্তক গ্রহণের পর দত্তক পুত্রের সাবেক স্ত্রীকে বিয়ের অনুমোদন রয়েছে। জয়নাবকে বিয়ে করার পেছনে এটি একমাত্র কারণ এবং সম্ভবত এ-কারণেই তিনি বিচ্ছেদ-পরবর্তী বিরতি সমাপ্ত হবার পর তাড়াতাড়ি জয়নাবের গৃহে যান এবং বিয়ের উৎসব সম্পন্ন করেন। হায়কলের মতে, নবির বেশিরভাগ বিয়ের পেছনে রাজনৈতিক কারণ রয়েছে কিংবা বিয়েগুলোর মাধ্যমে তার ধর্ম প্রচারে সুবিধা হয়েছে। নিজের এই দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থনে তিনি নবির সাথে হজরত ওমর বিন আল-খাত্তাবের মেয়ে হাফসার বিয়ের ঘটনার একটি উদাহরণ টেনেছেন: ‘একদিন ওমর তার স্ত্রীর সাথে একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। ওমরের স্ত্রী রাগান্বিত ও ঝাঁঝালো ভাষায় তর্ক চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ওমর রেগে গিয়ে বললেন, নারীরা জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে পুরুষের সাথে আলোচনার উপযুক্ত নয়। তাদের মতামত প্রকাশ করারও কোনো প্রয়োজন নেই। তার স্ত্রী প্রত্যুত্তরে বললেন, আপনার কন্যা আল্লাহর রসুলের সাথে এতো বেশি ঝগড়া করে যে, তা-নিয়ে নবি সারাদিনই রেগে থাকেন। স্ত্রীর মুখে এই কথা শুনে ওমর সরাসরি হাফসার বাড়িতে গেলেন তাঁকে জিজ্ঞেস করার জন্য। তিনি হাফসাকে আল্লাহর শাস্তি ও নবির রাগ থেকে সতর্ক হবার কথা বললেন। তিনি আরও বললেন, ‘এই অল্পবয়স্কা মেয়েটিকে (আয়েশা) নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ো না, যে কিনা নিজের সৌন্দর্য এবং তার প্রতি নবির ভালবাসার কারণে দাম্ভিক আচরণ করে! নবি তোমাকে আমার কারণে বিয়ে করেছেন, তোমাকে ভালবাসেন বলে নয়।’

এটা ঠিক যে নবির অনেকগুলো বিয়ের মধ্যে কয়েকটি সম্পন্ন হয়েছিল আতীয়তার সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ইসলাম-প্রচারের জন্য। হায়কলের মতে, এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই আলি এবং উসমানকে নবি জামাতা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। খালেদ বিন আল-ওয়ালিদ ইসলাম গ্রহণ করে হিজরি ৭ সালে (৬২৯ খ্রিস্টাব্দে) মক্কায় হিজরত করতে যান। কারণ সে-সময় নবি সর্বশেষ স্ত্রী মায়মুনাকে বিয়ে করেছিলেন। মায়মুনা খালেদের খালা ছিলেন এবং নবির দুই চাচা আব্বাস ও হামজার স্ত্রীদের একজনের বোন ছিলেন।

বিবাহ সম্পর্কিত আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়, যা ওই সময়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং কোরআনেও এ-সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত, নবি মারিয়া নামের ক্রীতদাসীর সাথে শয়নকক্ষে প্রবেশ করেন। হাফসা তখন আকস্মিকভাবে সেখানে উপস্থিত হোন। নবির দিকে অসমানসূচক ভাষায় চিৎকার করে বলেন, আপনি কেন আপনার দাসীকে নিয়ে আমার বিছানায় শুয়ে আছেন? হাফসাকে সন্তুষ্ট করতে নবি আর কখনো মারিয়াকে স্পর্শ না করার প্রতিজ্ঞা করলেন। ঝড় শান্ত হয় গেলে নবি মত পরিবর্তন করলেন। হয়তো তিনি মারিয়াকে পছন্দ করতেন কিংবা মারিয়া এ-ঘটনায় মনে আঘাত পেয়েছেন এই ভেবে। সুরা তাহরিম-এর প্রথম পাঁচটি আয়াতে নবির তখনকার আচরণ সম্পর্কে ইঙ্গিত করা হয়েছে; হে নবি আল্লাহ তোমার জন্য যা বৈধ করেছেন কেন তুমি তা নিষিদ্ধ করছ তোমার স্ত্রীদেরকে খুশি করার জন্য? আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আল্লাহ তোমাদের শপথ থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, আল্লাহ তোমাদের সহায়। আর তিনি সর্বজ্ঞ, তত্ত্বজ্ঞানী। (৬৬: ১২)। সুরা মায়িদা-এর ৮৯ নম্বর আয়াতের বক্তব্য অনুযায়ী, ভুলবশত বা নিরর্থক শপথ বাতিলের জন্য দশজন গরীবকে মাঝারি ধরনের খাবার দিয়ে, বা কাপড় দিয়ে সহায়তা কিংবা একজন দাসকে অবমুক্ত করা অথবা তিনদিন রোজা থাকার কথা কোরআনে বলা হয়েছে। মোকাত্তেল বিন সুলেমানের” একটি হাদিস ভাষ্যে রয়েছে, নবি মারিয়াকে স্পর্শ না করার যে শপথ করেছিলেন,

সুরা মায়িদার নির্দেশ অনুযায়ী একজন দাসকে অবমুক্তকরণের মাধ্যমে সেই শপথ বাতিল করেন; এবং হাসান বিন আলির একটি হাদিস অনুযায়ী সুরা ফাতিহার ২ নম্বর আয়াতের যিনি পরম করুণাময়, পরম দয়াময়’ শব্দগুলো থেকে বোঝা যায় আল্লাহ নবিকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।

‘(সরণ করো) নবি তার স্ত্রীদের একজনকে গোপনে কিছু বলেছিল। তারপর সেই স্ত্রী তা অন্যকে বলে দেয়, আল্লাহ নবিকে তা জানিয়ে দেন। এ-বিষয়ে নবি সেই স্ত্রীকে কিছু বললও না। নবি যখন তাকে বলল, সে জিজ্ঞেস করল, ‘কে আপনাকে একথা জানাল?’ নবি বলল, “আমাকে জানিয়েছেন তিনি, যিনি সর্বজ্ঞ, যাঁর সব জানা। (৬৬: ৩)। এই আয়াত নিয়ে আলোকপাত করা দরকার: নবি হাফসাকে অনুরোধ করেছিলেন, এ- ঘটনা যেন অন্য কেউ জানতে না পারে এবং মারিয়াকে আর তিনি স্পর্শ করবেন না বলে শপথ নিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনাটি বিবি হাফসা বিবি আয়েশাকে বলে ফেলেন। নবি যখন হাফসার সাথে কথা বলেন এবং এও জানান, হাফসার বক্তব্য ফাঁসের কথা ইতিমধ্যে আল্লাহ তাকে জানিয়েছেন। যদিও নবি কতটুকু জানেন তা পরিষ্কার করেননি। হাফসা ভেবে নিলেন, আয়েশা হয়তো নবিকে এ-বিষয়ে অবহিত করেছেন। তিনি যখন জিজ্ঞেস করলেন নবি কিভাবে জানেন, নবি প্রত্যুত্তরে বললেন যে, আল্লাহ তাকে এ সম্পর্কে অবহিত করেছেন। কোরআনের প্রতিটি পাঠকই এ-বিষয়ে একমত হবেন যে, মানব-জাতির জন্য সর্বকালের পবিত্র ধর্মগ্রন্থে এ-ধরনের ব্যক্তিগত বিষয়াবলীর অন্তর্ভুক্তি অবশ্যই আমাদেরকে আশ্চর্যজনক ধাঁধার মধ্যে ফেলে দেয়। কোরআনের তফসিরকারকদের দেয়া ব্যাখ্যাগুলোও বিস্ময়কর। যেমন ক্যামব্রিজ তফসির-এ বর্ণিত একটি বক্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে: হাফসা যখন আয়েশাকে নবির এই ঘটনা জানালেন এবং আল্লাহ যখন নবিকে হাফসা কর্তৃক এই তথ্য ফাঁসের খবর সম্পর্কে অবহিত করলেন, নবি এর প্রমাণ দেয়ার জন্য হাফসা আয়েশাকে যা বলেছেন তার কিয়দংশ হাফসাকে অবহিত করলেন।”

এ-ধরনের ব্যক্তিগত সাংসারিক বিষয়াবলী, মেয়েলি-কথাবার্তা যা পৃথিবীর যেকোনো সময় যেকোনো প্রান্তে ঘটে থাকতে পারে, তা কিভাবে কোরআনের আলোচ্য-সূচিতে জায়গা পেতে পারে? এর মাধ্যমে আল্লাহকে, সমগ্র বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তাকে ছোট করা হয়নি? আল্লাহকে হাফসার সাথে আয়েশার কথাবার্তার একজন তথ্য-ফাঁসকারী পর্যায়ে নামিয়ে আনেননি? যেকোনো পরিস্থিতিতে, সুরা তাহরিম-এর প্রথম তিনটি আয়াত স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য-কলহের একটি সাধারণ পরিস্থিতি মাত্র।

পরবর্তী দুটি আয়াতের (৪-৫ নম্বর আয়াত) মাধ্যমে হাফসা এবং আয়েশাকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। তারা দুজন যদি প্রতিবাদ করতে থাকেন এবং স্ত্রী- স্বরূপ ঈর্ষা প্রকাশ করতে থাকেন তবে তারা নবির বিরাগভাজন হবেন। এজন্য শেষ হাতিয়ার স্বরূপ নবি তাদেরকে তালাক দিতে পারবেন। তোমাদের হৃদয় যা কামনা করেছিল তার জন্য তোমরা দুজন অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যাও। তোমরা যদি তার (নবির) বিরুদ্ধে একে অপরকে সাহায্য কর, তবে (জেনে রাখো) আল্লাহ তার অভিভাবক; জিবরাইল ও সৎকর্মপরায়ণ বিশ্বাসীরা, আর তার ওপর ফেরেশতারাও, তাকে সাহায্য করবে। (৬৬: ৪)। নবি যদি তোমাদের সকলকে তালাক দেয়, তবে তার প্রতিপালক তোমাদের পরিবর্তে হয়তো তোমাদের চেয়ে আরও ভালো স্ত্রী তাকে দেবেন; যারা মুসলমান, বিশ্বাসী, তওবা করে, এবাদত করে, রোজা রাখে, অকুমারী ও কুমারী।’(৬৬৫)। যদিও এই আয়াতগুলোর অর্থ এবং অবতারণার পরিস্থিতি উভয়েই পরিষ্কার, তথাপি কোনো কোনো তফসিরকারক এই আয়াতগুলোকে এমন উদ্ভট উপায়ে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন, তা অবিশ্বাস্য! পাঠক হিসেবে তা আমাদের মধ্যে শুধু মৃদু হাস্যরসের সৃষ্টি করে। ক্যামব্রিজ তফসির অনুযায়ী এই আয়াতে ব্যবহৃত ইহায়ইবল (বিধবা কিংবা তালাকপ্রাপ্তরা) বলতে মিশরের ফারাও রাজার স্ত্রী আসিয়াকে বোঝানো হয়েছে। কুমারী (আবকার) শব্দ দ্বারা যিশু খ্রিস্টের মাতা মেরিকে বোঝানো হয়েছে। তাদের দুজনই নবি মুহাম্মদকে বিয়ে করার জন্য স্বর্গে অপেক্ষা করে আছেন।

সুরা তাহরিম-এর প্রথম পাঁচটি আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সম্পূর্ণ আরেকটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট জানা যায়। এই ভাষ্য-অনুযায়ী, নবি জয়নাবের বাড়িতে কিছু মধু পান করেছিলেন এবং এতে ঈর্ষান্বিত হয়ে আয়েশা এবং হাফসা নবিকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার মুখ দিয়ে বাজে গন্ধ আসছে যে। প্রশ্নের আকসিকতায় বিব্রত নবি তখন প্রতিজ্ঞা করলেন, তিনি আর কখনো মধু খাবেন না। পরবর্তীতে (সম্ভবত নিজের প্রতিজ্ঞায় অনুশোচনাবোধ থেকে) এই প্রতিজ্ঞাকে অস্বীকার করে সুরা তাহরিম-এর ১নম্বর আয়াত অবতীর্ণ হয়। তখন থেকে ক্ষতিপূরণ প্রদানপূর্বক প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের নিয়ম চালু হয় এবং নবির স্ত্রীদের সতর্ক করা হয় এই বলে যে, তাদেরকে নবি তালাক দিতে বাধ্য হবেন যদি না তারা নিজের মধ্যকার ঈর্ষা এবং প্রতিদ্বন্দিতা বন্ধ করেন। এই ভাষ্যটি স্বীকৃত হাদিস হবার সম্ভাবনা কম, কেননা তা হাফসার জানা তথ্যকে এবং নবির গোপন খবর ফাঁস হবার ঘটনা বেমালুম চেপে গিয়েছে।

——————-

পাদটীকা

৪৪. কোরআনের ১০৫ তম সুরা ফিল-এ এই ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। আবিসিনীয়রা এই যুদ্ধে একটি বিশাল রাজকীয় হাতি ব্যবহার করেন। সুরা ফিল-এর ৩-৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবিল পাখি কঙ্কর ফেলে আবিসিনীয় বাহিনীকে কুপোকাত করে ফেলে। ইতিহাসবিদ ইকরিমা এবং কোরআনের বিশিষ্ট তফসিরকারক আল-তাবারির মতে, কোরআনের এই আয়াতগুলো রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, আসলে যুদ্ধের ময়দানে আবিসিনীয়রা গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়েছিল।

৪৫. ধারণা করা হয়, কোরআনের ৩৪ তম সুরা সাবার ১৫-১৬ নম্বর আয়াতদ্বয় এই ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে। প্রত্নতাত্ত্বিক ও শিলালিপির নিদর্শন থেকে জানা গেছে, এই ঘটনা ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে ঘটেছিল।

৪৬. মক্কা থেকে প্রায় ৫০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত তুলনামূলক বড় শহর। এখানে স্বল্পপরিসরে কৃষিকাজের মাধ্যমে খাদ্যশস্যের চাষ হতো। বাণিজ্যিক কাফেলা ও মরুযাত্রীর ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য এই শহর গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পৌত্তলিকদের দেবী আল-লাতের একটি উপাসনালয়ও এখানে ছিল।

৪৭. কোরআনে একবার (৩৩: ১৩) এই শহরের নাম ইয়াসরিব উল্লেখ করা হয়েছে এবং চারবার আল-মদিনা (৯: ১০১, ৯: ১২০, ৩৩: ৬০, ৬৩: ৮) উল্লেখ করা হয়েছে।

8৮. Le dogme et la loi de l’Islam SFFITT: Felix Arin, দ্বতীয় সংস্করণ, প্যারিস ১৯৫৮, পৃ. ৩।

৪৯, উমিয়িন শব্দটিকে অনেকক্ষেত্রে নিরক্ষর হিসেবে ধরা হয়। তবে ক্ষেত্রবিশেষে এবং কোরআনের অনেক জায়গায় যাদেরকে ধর্মগ্রন্থ দেয়া হয়নি বলতে বোঝানো হয়েছে।

৫০. সুরা বাকারার ১৯১ নম্বর আয়াতে ফিৎনা শব্দটি যন্ত্রণা প্রদান অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। নৈরাজ্য অর্থে ব্যবহৃত হয়নি।

৫১. ইরানের খোরাসানের তুশ শহরের আবু হামিদ মুহাম্মদ আল-গাজ্জালি (১০৫৮-১১১১ খ্রিস্টাব্দ) একজন অসামান্য মরমী সাধক ও ধর্মবিশারদ ছিলেন। তার সবচেয়ে বহুল পঠিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে: ইহিয়া উলুম ঈদ-দ্বিন’ (নীতিনৈতিকতা বিষয়ক গ্রন্থ),

কিমিয়ায়ে সাদাত’, ‘তামফাতুল আল-ফালাসিফা (অধিবিদ্যাবিষয়ক দর্শন) এবং আল-মনকেদ মেন আদ-দালাল (আত্মজৈবনিক)। ইমাম গাজ্জালি যদিও একজন বিশিষ্ট সুন্নি বিশেষজ্ঞ, তবে তার লিখিত রচনাবলী শিয়া মতাবলম্বীদের অনেকেই সমানের চোখে দেখে থাকেন।

৫২. দ্রষ্টব্য: পাদটীকা ২০।

৫৩. দ্রষ্টব্য: পাদটীকা ৬।

৫৪. খুব সম্ভবত নবির রেওয়াজ অনুসরণ করে আব্বাসীয় শাসক এবং পরবর্তী মুসলমান শাসকরা সম্মানসূচক উপহার হিসেবে ‘আলখাল্লা পরিধান করতেন। যদিও প্রাচ্যে এই পোশাকটি ইসলামের প্রচারের অনেক আগে থেকে পরিধান করা হতো। মিশরীয় কবি শরাফ উদ্দিন আল-বুশিরির (১২১২-১২৯৬ খ্রিস্টাব্দ) লিখিত আলখাল্লা গাথা নামে জনপ্রিয় একটি ধর্মীয় কবিতা রয়েছে। কবিতাটা তিনি লিখেছেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার পর। একদিন কবি স্বপ্নে দেখেন নবি তার দিকে একটি আলখাল্লা ছুড়ে দিচ্ছেন, সেখান থেকে তিনি কবিতা লেখার প্রেরণা লাভ করেন।

৫৫. আলি দস্তি বাক্যটি ব্যবহার করেছেন এভাবে খাবার রান্নার জন্য বসে আছো এমন ভাব প্রদর্শন করিও না।’

৫৬. আরবি হিজাব’শব্দটির মূল অর্থ ঢেকে রাখা’। ‘বোরখা শব্দের অর্থে পর্দা শব্দের ব্যবহার অনেক পরে শুরু হয়েছে।

৫৭. ইসলামি পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, আদ্য হচ্ছে একটি প্রাচীন জাতির নাম আর ইরাম হচ্ছে তাদের শহর। অবশ্য ভিন্নমতে ওই গোষ্ঠীর প্রধানের নাম হচ্ছে ইরাম। আল্লাহ প্রেরিত নবি হুদকে অপমান করায় ওই জনগোষ্ঠীকে বন্যা ও অনাবৃষ্টির কবলে পড়তে হয়। ফলে তারা ধ্বংস হয়ে যায়।

৫৮. আরেকটি প্রাচীন জনগোষ্ঠীর নাম হচ্ছে সামুদ। রোমান লেখনীতেও এদের নাম উল্লেখ আছে। তারা পেত্রা নগরীর নাবাতিয়ানদের সমগোত্রীয় ছিল এবং সেমেটিক রচনা ও লিপিতে এখনো তাদের কিছু লেখা অবশিষ্ট খোঁজ পাওয়া যায়। রোমানরা পেত্রা নগরী দখল করার পর তাদের শহর আল-হেইর (হেজাজের উত্তরে অবস্থিত) ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রে ছিল অনেক দিন ধরে। আল হেরা থেকে উদ্ধার করা পাথরের লিপিতে (পেত্রা থেকে কিছুটা ছোট) সামুদের লেখা রয়েছে। ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, নবি সালেহকে অস্বীকার করায় সামুদবাসীরা বজ্রাঘাত ও ভূমিকম্পের ফলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

৫৯. সাধারণভাবে আরবি ওয়াতাদ’ শব্দের অর্থ কাঠের টুকরোর স্ত্র অথবা তাবু গাঁথার পেরেক বোঝায়। শিবির বা তাবুর অধিপতি কথাটির কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত কোনো তফসিরকারক বা ইসলামি চিন্তাবিদ দিতে পারেননি।

৬০. আলফ্রেড গিয়োম অনূদিত ইবনে ইসহাকের লাইফ অব মুহাম্মদ, অক্সফোর্ড ১৯৫৫, পৃ. ৬৫১। আলি দস্তি এবং আলফ্রেড গিয়োম উভয়েই আরবি ‘আওয়ান’ শব্দটিকে বন্দী’ বা অবরুদ্ধ’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আক্ষরিক অর্থে এটি হচ্ছে মধ্যবর্তী’। এক্ষেত্রে সম্ভবত ‘স্বাধীন ও পরাধীনের মধ্যবর্তী কিছু বোঝানো হয়েছে। সুরা বাকারা-এর ৬৮ নম্বর আয়াতে বয়স্ক ও কমবয়সীর মধ্যবর্তী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ভিন্নমতে এটি হচ্ছে আরবি ‘আনিয়া’ শব্দের বহুবচন, যার অর্থ হচ্ছে “অক্ষমতায় যন্ত্রণাক্লিষ্ট’।

৬১. মাহমুদ বিন ওমর আল-জামাখশারি (১০৭৫-১১৪৪ খ্রিস্টাব্দ) কোরআনের তফসিরসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বই রচনা করেছেন। তার আল-কাশশাফ’ নামের কোরআনের তফসিরসহ আরবি ব্যাকরণ ও আরবি-ফার্সি অভিধানও তিনি রচনা করেছেন। তিনি

ইসলামের যুক্তিবাদী মুতাজিলা দর্শনের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। একই সাথে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও কোরআনের লৌকিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন।

৬২. আব্দুল্লাহ বিন ওমর আল-বায়দাওয়ি আরবিতে কোরআনের তফসির রচনা করেছেন। এখনো সুন্নি মুসলমানরা এই তফসির গুরুত্বের সঙ্গে ব্যবহার করেন। আনোয়ার উল-তানজি শিরোনামের এই তফসির গ্রন্থটি আল-জামাখশারির আল-কাশশাফ – কে ভিত্তি করে রচিত তবে মুতাজিলা দর্শনের প্রভাবমুক্ত।

৬৩. বাগদাদে জন্মগ্রহণকারী ইমাম আহমদ বিন হানবল (৭৮০-৮৫৫ খ্রিস্টাব্দ) হাদিসের সংকলন আল-মোসনাদ’- এর রচয়িতা। সংকলনটি শেষ পর্যন্ত হানবলের পুত্র আব্দুল্লাহ সমাপ্ত করেন। ইসলামি ধর্মতত্ত্বের আক্ষরিক ও নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা অনুসরণের তিনি পথিকৃৎ। তিনি হানবলি দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা। আব্বাসীয় শাসনামলে মুতাজিলা মতাদর্শের বিপক্ষে দাঁড়ানোর কারণে নির্যাতনের শিকার হন এবং কারাবাসও করতে হয়। দামেস্ক শহরের নাগরিক আহমদ বিন তায়মিয়া (১২২২-১৩২৮ খ্রিস্টাব্দ) পরবর্তীতে হানবলি মতাদর্শকে প্রসারিত করেন এবং বই রচনা করেন। যা কট্টরপন্থী ওয়াহাবি মতাদর্শ বিকাশে ভূমিকা রেখেছিল।

৬৪. ইরাকের বসরা শহরে জন্মগ্রহণকারী মুহাম্মদ বিন সাদ (৭৮৪-৮৪৫ খ্রিস্টাব্দ) কিতাব আল-তাবাকাত গ্রন্থের রচয়িতা। এই গ্রন্থে নবি ও সাহাবিদের জীবনী এবং ৪২৫০ টি হাদিসের উল্লেখ রয়েছে।

৬৫. আরবি ভাষায় মুতা পরিভাষাটির আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে উপভোগ করা। সুরা নিসার ২৪ নম্বর আয়াতে উল্লেখিত যাদেরকে তোমরা উপভোগ করবেশব্দসমষ্টিও একই উৎসের অর্থ প্রকাশ করে।

৬৬. আরবি ইদা”শব্দের অর্থ ‘অপেক্ষার প্রহর’। এটা সেই সময়কালকে বোঝায় যখন কোনো বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত নারীর দ্বিতীয় বিবাহের অনুমতি থাকে না। কারণ এই সময়কালে তার আগের স্বামী কর্তৃক অন্তঃসত্ত্বা হবার সম্ভাবনা থাকে। ইসলামি শাস্ত্র অনুযায়ী, কোনো বিধবার জন্য ইদ্দতকাল হচ্ছে ৪ মাস ১০ দিন, কোনো তালাকপ্রাপ্ত নারীর জন্য ৩ মাস, বিধবা দাসীর জন্য ২ মাস, তালাকপ্রাপ্ত দাসীর জন্য ১.৫ মাস।

৬৭. আব্বাসীয় খলিফার শাসনামলে মুহাম্মদ আত-তিরমিজির (মৃত্যু ২৭৯ হিজরি বা ৮৯২ খ্রিস্টাব্দ) জন্ম পারস্যে। সুন্নি ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যতম ছয়টি হাদিস সংকলনের অন্যতম জামি আত-তিরমিজি সংকলনটি করেছেন তিনি। সুন্নি মুসলমানদের কাছে এই হাদিসের স্থান শীর্ষে।

৬৮. হানিফ সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে প্রথম অধ্যায়ে।

৬৯. নবি মুহাম্মদের কন্যা জয়নাবের প্রথম বিয়ে হয়েছিল খাদিজার বোনের ছেলে আবুল-আসের সাথে। রোকেয়া ও উমে কুলসুমের বিয়ে হয়েছিল মুহাম্মদের চাচা আবু লাহাবের দুই পুত্র ওতবা ও ওতাইবার সাথে। আর ফাতেমার বিয়ে হয়েছিল মুহাম্মদের চাচাতো ভাই আলি বিন আবু তালিবের সাথে। ইসলাম প্রচার শুরু করলে নবি মুহাম্মদের সাথে চাচা আবু লাহাবের দ্বন্দু শুরু হয় এবং লাহাব পুত্রদেরকে মুহাম্মদের কন্যাদ্বয়কে তালাক দিতে বাধ্য করেন। পরে রোকেয়ার সাথে বিয়ে হয় হজরত উসমানের। রোকেয়ার মৃত্যুর পর উসমান বিয়ে করেন মুহাম্মদের আরেক কন্যা উম্মে কুলসুমকে।

৭০. এনসাইক্লোপেডিয়া অব ইসলাম”- এ লেখক এইচ. রেকেনডফ মেয়েটির নাম বলেছেন কায়লা। (দ্রষ্টব্য: Encyclopedia of Islam, 2nd ed., Leiden 1960, vol. I, p. 697, article al-Ash’ath) ISIRTFI ডব্লিউ. এম. ওয়াট মেয়েটির নাম বলেছেন

“čFTERTĞii”(Muhammad at Madina, Oxford 1956, p. 397) | উভয় লেখকই উল্লেখ করেছেন, নবি মুহাম্মদের সাথে তার বাগদান সম্পন্ন হয়েছিল কিন্তু মেয়েটি মদিনা পৌঁছানোর আগেই নবির মৃত্যু ঘটে।

৭১. ইরানের বাদশাহ খশরু-২ পারভেজের সেনারা ৬১৬ খ্রিস্টাব্দে মিশর আক্রমণ করে। ৬২৮ সাল পর্যন্ত মিশরের বিশাল অংশ ইরানের দখলে ছিল। ঐতিহাসিক আল-তাবারি হিস্ট্রি অব দ্যা প্রফেটস এন্ড কিংস (তারিক আল-রসুল ওয়া আল-মুলুক) বইয়ে বলেছেন, ষষ্ঠ হিজরিতে (৬২৭-৬২৮ খ্রিস্টাব্দ) বিশিষ্ট কবি এবং সাহাবি হাসান ইবনে সাবিত মিশর ভ্রমণকালে মিশরের রোমান গভর্নর (আল-মুকাওকিস নামে সম্বোধন করা হয়) নবির জন্য খ্রিস্টান ক্রীতদাসী মারিয়া কিবতিয়া এবং সাবিতকে মারিয়ার বোন শিরিনকে উপহার হিসেবে প্রদান করেন। সম্ভবত ৬২৮ সালের পূর্বে মারিয়া মদিনায় এসে পৌঁছান।

৭২. নবির চাচাতো ভাই ও আব্বাসীয় খেলাফতের পূর্বপুরুষ আব্দুল্লাহ বিন আল-আব্বাস (ইবনে আব্বাস নামেও পরিচিত) প্রচুর সংখ্যক হাদিস-বক্তা হিসেবে সুপরিচিত। ৬৮৭ খ্রিস্টাব্দে (৬৮ হিজরি) তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

৭৩. দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনে আল-খাত্তাবের পুত্র আব্দুল্লাহ বিন ওমর (৬১৪-৬৯৩ খ্রিস্টাব্দ)। মুসলমানদের পক্ষে তিনি অসংখ্য যুদ্ধে লড়াই করেছেন। কিন্তু উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করতে তিনি সবসময় অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। একজন সৎ ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ এবং অভ্রান্ত হাদিস-বক্তা হিসেবে তিনি সুপরিচিত।

৭৪.দ্রষ্টব্য: পাদটীকা ৪৩।

৭৫. দ্রষ্টব্য; পাদটীকা ১।

৭৬. প্রথম পক্ষের স্ত্রীর গর্ভে জন্মানো ওসামা নামে এক পুত্রসন্তান ছিল জায়েদের। ৬২৬ সালে জয়নাবকে তালাক দেবার পর তিনি আরও বিয়ে করেন এবং অনেক সন্তানের পিতা হন। মুসলমানদের পক্ষে তিনি অনেক যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। নবি তাঁকে প্রথম সিরিয়া-অভিযানের সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। ওই যুদ্ধে (মুতা যুদ্ধ নামে পরিচিত) তিনি মৃত্যুবরণ করেন। জায়েদের তরুণ পুত্র ওসামা ৬৩২ সালের সিরিয়া অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেনাপতির দায়িত্বে ওসামার নিয়োগ নিয়ে অনেক শীর্ষ সাহাবি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।

৭৭. আল-জামাখশারি তার বিখ্যাত কোরআনের তফসির আল-কাশশাফ – এ (পাদটীকা ৬১ দ্রষ্টব্য) হাদিসটি মোকাত্তেল বিন সুলেমানের বলে উল্লেখ করেছেন। আলি দস্তিও আল-জামাখশারির এই হাদিসটি গ্রহণ করেছেন। (তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. পল প্র্যাকম্যান)।

আরও বই