সম্পাদকীয়সংশয়বাদ

অন্ধকারের ঈশ্বর

মানুষের ইতিহাস আসলে অন্ধকারের বিরুদ্ধে মানুষের দীর্ঘ বিদ্রোহের ইতিহাস। গুহার দেয়ালে আগুনের ছায়া দেখে যে মানুষ একদিন বিস্ময়ে কেঁপে উঠেছিল, সেই মানুষই পরে নক্ষত্রের দূরত্ব মেপেছে, পরমাণুর ভেতরে ঢুকেছে, জীবনের কোড পড়েছে, রোগের কারণ খুঁজেছে, বজ্রপাতের রহস্য ভেঙেছে, মহাবিশ্বের বয়স অনুমান করেছে। এই যাত্রা কোনো একদিনে শুরু হয়নি। শুরু হয়েছিল একেকটি সরল প্রশ্ন থেকে—বৃষ্টি কেন হয়? বজ্রপাত কেন হয়? মানুষ জন্মায় কীভাবে? রোগ আসে কোথা থেকে? মৃত্যু হলে মানুষ কোথায় যায়? আকাশে তারা কেন জ্বলে? সূর্য প্রতিদিন পুব দিক থেকে ওঠে কেন?

এই প্রশ্নগুলোই সভ্যতার প্রকৃত জন্মদাতা। কিন্তু প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আরেকটি প্রবণতাও জন্ম নিয়েছিল—অজানাকে সহ্য করতে না পারার প্রবণতা। মানুষ জিজ্ঞাসু প্রাণী, কিন্তু মানুষ একইসঙ্গে ভয়গ্রস্ত প্রাণীও। সে জানতে চায়, কিন্তু না-জানার শূন্যতা তাকে আতঙ্কিত করে। এই আতঙ্ক থেকেই জন্ম নেয় কল্পনা, মিথ, দেবতা, অলৌকিকতা, অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক, আকাশের বিচারক, পাতালের প্রভু, ভাগ্যের লেখক। যেখানে মানুষ জানত না, সেখানে সে ব্যাখ্যা বানিয়েছে। যেখানে পর্যবেক্ষণ পৌঁছায়নি, সেখানে কাহিনী বসিয়েছে। যেখানে যুক্তি থেমে গেছে, সেখানে ঈশ্বরকে বসিয়ে বলেছে—“এই তো উত্তর।”

কঠিন শুনালেও সত্যটি নির্মম: মানুষের অজ্ঞানতার অন্ধকারের সবচেয়ে পুরোনো নামগুলোর একটি হলো ঈশ্বর।

ঈশ্বর ধারণার সবচেয়ে বড় শক্তি তার প্রমাণে নয়; তার শক্তি মানুষের অজ্ঞতা, ভয়, অসহায়তা ও মৃত্যুভীতির ওপর দাঁড়িয়ে। মানুষ যেখানে নিজেকে দুর্বল মনে করে, সেখানে সে আশ্রয় কল্পনা করে। মানুষ যেখানে ব্যাখ্যা পায় না, সেখানে সে উদ্দেশ্য কল্পনা করে। মানুষ যেখানে নিয়ন্ত্রণ হারায়, সেখানে সে নিয়ন্ত্রক কল্পনা করে। আর এই কল্পিত নিয়ন্ত্রকের নামই কখনো ঈশ্বর, কখনো ভাগ্য, কখনো কর্মফল, কখনো অলৌকিক বিধান।

তর্কে প্রায়ই দেখা যায়, ঈশ্বরবিশ্বাসী মানুষ প্রশ্ন করতে করতে আপনাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যেতে চায় যেখানে বর্তমান জ্ঞান এখনো পূর্ণ উত্তর দিতে পারেনি। সে জিজ্ঞেস করবে—মানুষ কোথা থেকে এলো? আপনি বলবেন, বিবর্তনের ধারায়। সে বলবে—প্রথম জীবন কোথা থেকে এলো? আপনি বলবেন, রাসায়নিক বিবর্তন ও অ্যাবায়োজেনেসিস নিয়ে গবেষণা চলছে। সে বলবে—পানি কোথা থেকে এলো? আপনি বলবেন, মহাজাগতিক ও ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা আছে। সে বলবে—মহাবিশ্ব কোথা থেকে এলো? আপনি বলবেন, বিগ ব্যাং-পরবর্তী মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক মডেল আছে, কিন্তু বিগ ব্যাং-এর “আগে” কথাটিই পদার্থবিজ্ঞানের প্রচলিত স্থান-কাল ধারণায় জটিল ও অনির্দিষ্ট। তখন সে বিজয়ীর হাসি দিয়ে বলে উঠবে—“সেখানেই তো ঈশ্বর!”

এই উত্তর আসলে উত্তর নয়; এটি আত্মসমর্পণ। এটি জ্ঞানের বিজয় নয়, অজ্ঞতার ওপর পতাকা গেড়ে তাকে মন্দির বানানো। প্রশ্ন করতে করতে যে জায়গায় মানুষ এখনো জানে না, সেখানে গিয়ে ঈশ্বর বসিয়ে দেওয়া মানে ঈশ্বরকে জ্ঞানের আলোতে নয়, অজ্ঞতার ছায়ায় খুঁজে পাওয়া। তখন বিশ্বাসী ব্যক্তি নিজেই স্বীকার করে ফেলে—তার ঈশ্বরের বাস জ্ঞানের ভেতরে নয়, জ্ঞানের অনুপস্থিতিতে।

অর্থাৎ ঈশ্বর তখন সত্যের ব্যাখ্যা নয়; অজানার ওপর বসানো এক অলঙ্কৃত নামমাত্র।

এই পদ্ধতিকে বলা যায় ব্যাখ্যার বদলে নামকরণ। “আমি জানি না” বলা সৎ বুদ্ধির লক্ষণ। কিন্তু “আমি জানি না, তাই ঈশ্বর”—এটি যুক্তির আত্মহত্যা। অজ্ঞতা কোনো প্রমাণ নয়। কোনো কিছুর উত্তর এখনো অজানা—এ কথা থেকে কখনোই প্রমাণিত হয় না যে তার পেছনে কোনো সচেতন, সর্বশক্তিমান, নৈতিক বিচারক, প্রার্থনাগ্রহী, শাস্তিদাতা, পুরস্কারদাতা সত্তা আছে। “জানি না” থেকে “ঈশ্বর আছে”—এই লাফটি যুক্তির নয়, মানসিক সান্ত্বনার লাফ।

ধরুন, আমি জানি না সূর্য কেন পুব দিকে ওঠে। আমি খুব সহজে বলতে পারি—ঈশ্বর চান সূর্য পুব দিকে উঠুক, তাই সূর্য পুব দিকে ওঠে। এ বক্তব্য শুনতে ধর্মীয়, কিন্তু ব্যাখ্যাগতভাবে শূন্য। এতে সূর্যের গতি, পৃথিবীর ঘূর্ণন, দিকনির্ণয়, জ্যোতির্বিদ্যা—কোনো কিছুই বোঝা যায় না। এটি শুধু অজ্ঞতাকে গাম্ভীর্যের পোশাক পরায়। পরে যদি আমি বিজ্ঞান পড়ে জানতে পারি যে পৃথিবীর নিজ অক্ষের ওপর ঘূর্ণনের কারণেই সূর্যকে পুব দিক থেকে উঠতে দেখা যায়, তখনও আমি পুরোনো বিশ্বাস ছাড়তে না চাইলে বলতে পারি—ঈশ্বরই পৃথিবীকে ঘোরান, ঈশ্বরই নিয়ম বানিয়েছেন, তাই সূর্য পুব দিকে ওঠে।

কিন্তু এই দ্বিতীয় বক্তব্যও আসলে প্রথম অজ্ঞতার পরিশীলিত সংস্করণ। আগে ঈশ্বরকে বসানো হয়েছিল সরাসরি অজানার জায়গায়; এখন ঈশ্বরকে বসানো হলো জানা নিয়মের পেছনে। অর্থাৎ ব্যাখ্যা পাল্টাল, কিন্তু মনস্তত্ত্ব পাল্টাল না। যেখানে বিজ্ঞান কারণ দেখায়, ধর্ম সেখানে কারণের পেছনে আরেক অদৃশ্য ইচ্ছা বসিয়ে দেয়। এভাবে ঈশ্বর কখনো বজ্রপাতের কারণ, কখনো রোগের কারণ, কখনো নৈতিকতার উৎস, কখনো মহাবিশ্বের নির্মাতা, কখনো মৃত্যুর পরের বিচারক। বিজ্ঞান যত এগোয়, ঈশ্বর তত পিছোয়; কিন্তু বিশ্বাস তাকে আবার নতুন ফাঁকে লুকিয়ে রাখে।

মৃত্যুর প্রশ্নেও একই প্রবণতা কাজ করে। মানুষ জানে মৃত্যু অনিবার্য। মানুষ দেখে, যে মানুষ কথা বলত, হাসত, ভালোবাসত, চিন্তা করত, একসময় নিথর দেহে পরিণত হয়। এই দৃশ্য মানুষকে সহ্য করতে কষ্ট হয়। তাই সে কল্পনা করে—মৃত্যু শেষ নয়; কোথাও আরেক জীবন আছে; আত্মা আছে; বিচার আছে; স্বর্গ আছে; নরক আছে; পুনর্জন্ম আছে। এগুলো মানুষের বেদনা থেকে জন্ম নেওয়া কাহিনী। কিন্তু কোনো কাহিনী মানুষের ভয় কমাতে পারে বলে সেটি সত্য হয়ে যায় না। মরুভূমিতে তৃষ্ণার্ত মানুষের মরীচিকা যেমন পানি নয়, মৃত্যুভীত মানুষের পরকাল-স্বপ্নও সত্যের প্রমাণ নয়।

ঈশ্বর ধারণার ইতিহাস তাই শুধু ধর্মের ইতিহাস নয়; এটি মানুষের মানসিক দুর্বলতা, কল্পনাশক্তি, ভয়, ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ইতিহাস। আদিম মানুষ প্রকৃতির সামনে অসহায় ছিল। ঝড়, বন্যা, খরা, রোগ, মৃত্যু, দুর্ভিক্ষ—সবই ছিল অজ্ঞাত শক্তির আঘাত। মানুষ এসব শক্তিকে ব্যক্তি করে তুলল। আকাশ রাগ করে, নদী অভিশাপ দেয়, আগুন পবিত্র, সূর্য দেবতা, চন্দ্র দেবী, যুদ্ধের ঈশ্বর, উর্বরতার দেবী, মৃত্যুর প্রভু—এভাবে প্রকৃতির ঘটনাগুলোকে মানুষ মানবরূপ দিল। এই anthropomorphism বা মানবাকৃতি আরোপের প্রবণতাই ধর্মীয় কল্পনার প্রাচীন শিকড়। মানুষ নিজের মনকে মহাবিশ্বে প্রতিফলিত করে ভেবেছে—যেহেতু মানুষের ইচ্ছা আছে, তাই প্রকৃতিরও ইচ্ছা আছে; যেহেতু রাজা আছে, তাই মহাবিশ্বেরও রাজা আছে; যেহেতু মানুষ শাস্তি দেয়, তাই আকাশও শাস্তি দেয়।

এখানেই ধর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোটিফটি স্পষ্ট হয়—অন্ধকারকে অর্থে রূপান্তর করা। মানুষ অন্ধকারে ভয় পায়। ধর্ম সেই অন্ধকারে মুখ এঁকে দেয়। মানুষ শূন্যতাকে ভয় পায়। ধর্ম সেই শূন্যতায় কণ্ঠস্বর বসায়। মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায়। ধর্ম মৃত্যুর ওপারে দরজা আঁকে। মানুষ অনিশ্চয়তাকে ভয় পায়। ধর্ম বলে—সব লেখা আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ভয় কমানো আর সত্য বলা কি একই জিনিস? কোনো বিশ্বাস যদি মানুষের মানসিক সান্ত্বনা দেয়, তাতেই কি সেটি বাস্তবতার মানচিত্র হয়ে যায়? শিশুকে ঘুম পাড়ানোর গল্প যেমন শিশুকে শান্ত করে, তেমনি ধর্মও মানুষকে শান্ত করতে পারে। কিন্তু শান্তি সত্যের বিকল্প নয়।

দর্শনের ইতিহাসে ঈশ্বর ধারণা বহুবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। এ আঘাত শুধু নাস্তিকদের কাছ থেকে আসেনি; এসেছে যুক্তি, জ্ঞানতত্ত্ব, নৈতিক দর্শন, বিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ব, ইতিহাসচর্চা—সব দিক থেকে। গ্রিক দার্শনিকরা মিথের পরিবর্তে logos বা যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যার দিকে হাঁটতে শুরু করেছিলেন। প্রকৃতিকে দেবতার খেয়াল দিয়ে নয়, নিয়ম দিয়ে বোঝার চেষ্টা শুরু হয়েছিল। সক্রেটিস মানুষকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিলেন। প্রশ্নের মূল্য তিনি নিজের জীবন দিয়ে দিয়েছেন। এই ঘটনাটি সভ্যতার এক অনিবার্য প্রতীক—যে সমাজ প্রশ্নকে ভয় পায়, সে সমাজ প্রশ্নকারীকে হত্যা করে।

এরিস্টোটল ছিলেন বিশাল মাপের চিন্তক। যুক্তিবিদ্যা, জীববিজ্ঞান, নীতিশাস্ত্র, রাজনীতি, কাব্যতত্ত্ব—অসংখ্য ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব গভীর। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা হলো: কোনো চিন্তক যত বড়ই হোক, তাকে যদি প্রশ্নাতীত কর্তৃত্বে পরিণত করা হয়, তবে তার চিন্তাই জ্ঞানের শত্রু হয়ে উঠতে পারে। সমস্যা এরিস্টোটল নন; সমস্যা হলো এরিস্টোটলকে প্রায় পবিত্র গ্রন্থের পর্যায়ে তুলে দেওয়া। একসময় তাঁর মতকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যেন জ্ঞানের কাজ নতুন করে দেখা নয়, বরং পুরোনো কর্তৃত্বের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া।

এই রোগ ধর্মে আরও ভয়াবহ। কারণ ধর্ম শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক কর্তৃত্ব তৈরি করে না; ধর্ম তৈরি করে পবিত্র কর্তৃত্ব। দার্শনিককে ভুল বলা যায়; নবীকে ভুল বলা যায় না। বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব সংশোধন করা যায়; ওহী সংশোধন করা যায় না। বইয়ের ব্যাখ্যা বদলানো যায়, কিন্তু বইকে ভুল বলা যায় না। এখানেই ধর্ম জ্ঞানের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। জ্ঞান এগোয় সংশোধনের মাধ্যমে; ধর্ম টিকে থাকে অমোঘতার দাবিতে। জ্ঞান বলে—প্রমাণ দাও। ধর্ম বলে—বিশ্বাস করো। জ্ঞান বলে—ভুল হলে বদলাও। ধর্ম বলে—ভুল দেখলে ব্যাখ্যা পাল্টাও, কিন্তু বিশ্বাস ছাড়ো না।

গ্যালিলিওর গল্প তাই কেবল একজন জ্যোতির্বিদের গল্প নয়; এটি চোখ বনাম কর্তৃত্বের গল্প। দূরবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা বাস্তবতা যখন ধর্মীয় মহাবিশ্বচিত্রের সঙ্গে মেলেনি, তখন বাস্তবতাকে সংশোধন করা হয়নি; সংশোধন করতে চাওয়া হয়েছে পর্যবেক্ষককে। ব্রুনোর মৃত্যুও শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়; এটি চিন্তার আগুনকে আগুন দিয়েই নেভানোর ইতিহাস। সক্রেটিসের বিষপান, ব্রুনোর দহন, গ্যালিলিওর নিপীড়ন—এই ঘটনাগুলো মানবসভ্যতার ওপর খোদাই করা সতর্কবাণী: যে সমাজ পবিত্রতার নামে প্রশ্নকে দমন করে, সে সমাজ সত্যকে দমন করে।

নিটশে যখন বলেছিলেন “ঈশ্বর মৃত”, তিনি কোনো আকাশবাসী প্রাণীর মৃত্যু সংবাদ দেননি। তিনি ইউরোপীয় সভ্যতার নৈতিক ও বৌদ্ধিক কেন্দ্রের পতনের কথা বলেছিলেন। মানুষের ওপর চাপানো ঐশ্বরিক কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়েছে—এই ছিল সেই ঘোষণা। কিন্তু ঈশ্বরের মৃত্যু মানে মানুষের মুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে যায় না। পুরোনো ঈশ্বর মরলে মানুষ অনেক সময় নতুন ঈশ্বর বানায়—জাতি, নেতা, মতবাদ, দল, বই, বাজার, রাষ্ট্র, পরিচয়। মানুষের ভয়, আনুগত্য ও কর্তৃত্বপ্রীতি যদি অক্ষত থাকে, তবে ঈশ্বরের জায়গায় অন্য মূর্তি বসে। তাই নাস্তিকতা শুধু ঈশ্বর অস্বীকার নয়; নাস্তিকতার প্রকৃত শক্তি হলো পবিত্রতার রাজনীতি অস্বীকার, কর্তৃত্বের সামনে চিন্তার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা, এবং অজানার সামনে সৎভাবে দাঁড়ানোর সাহস।

ধর্ম মানুষকে কী শিক্ষা দেয়—এই প্রশ্নে সবচেয়ে আগে দেখতে হবে ধর্ম মানুষের চিন্তাকে কোথায় দাঁড় করায়। ধর্ম যদি বলে, প্রশ্ন করো কিন্তু শেষ পর্যন্ত পূর্বনির্ধারিত উত্তরেই পৌঁছাতে হবে, তবে সেটি প্রশ্ন নয়; সেটি বুদ্ধির অভিনয়। ধর্ম যদি বলে, অনুসন্ধান করো কিন্তু ধর্মগ্রন্থ ভুল হতে পারে—এ কথা বলার অধিকার নেই, তবে সেটি অনুসন্ধান নয়; সেটি বন্দিত্ব। ধর্ম যদি বলে, বিজ্ঞান গ্রহণ করো কিন্তু বিজ্ঞান ধর্মগ্রন্থের বিপক্ষে গেলে বিজ্ঞানই ভুল, তবে সেটি জ্ঞান নয়; সেটি কুসংস্কারের আধুনিক পোশাক।

বিশেষ করে যে সমাজে ধর্মগ্রন্থকে অপরিবর্তনীয় সত্য হিসেবে ধরা হয়, সেখানে জ্ঞানের স্বাভাবিক প্রবাহ থেমে যায়। কারণ সেখানে সত্য অনুসন্ধানের আগে সিদ্ধান্ত স্থির করে দেওয়া থাকে। মহাবিশ্ব কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, জীবন কীভাবে এসেছে, নৈতিকতা কোথা থেকে আসে, নারী-পুরুষের অধিকার কী হবে, স্বাধীন চিন্তার সীমা কোথায়—সব প্রশ্নে যদি আগেই বলা থাকে “গ্রন্থ যা বলেছে তাই চূড়ান্ত”, তবে চিন্তা আর চিন্তা থাকে না; তা হয়ে যায় উদ্ধৃতি সংগ্রহ। এই উদ্ধৃতি-নির্ভর মানসিকতা মানুষকে জ্ঞানী করে না, বরং কর্তৃত্বের দাসে পরিণত করে।

মুসলিম সমাজে এই সংকট অত্যন্ত স্পষ্ট। আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে দাঁড়িয়ে কুরআনের বৈজ্ঞানিক ভুল, ঐতিহাসিক অসঙ্গতি, নৈতিক বর্বরতা, উত্তরাধিকার-গণিতের সমস্যা, দাসপ্রথা, নারী-অধিকার, যুদ্ধনীতি—এসব প্রশ্নকে সরাসরি বিচার না করে বিপুল পরিমাণ এপোলোজেটিক ব্যাখ্যা তৈরি করা হয়। যখন বিজ্ঞান মিলে যায় বলে মনে হয়, তখন বলা হয়—সব বিজ্ঞান কুরআনে আছে। যখন বিজ্ঞান মেলে না, তখন বলা হয়—বিজ্ঞান এখনো বুঝতে পারেনি। যখন আয়াত স্পষ্টভাবে সমস্যাজনক, তখন বলা হয়—প্রসঙ্গ বুঝতে হবে। যখন প্রসঙ্গও রক্ষা করতে পারে না, তখন বলা হয়—এটি রূপক। এই পদ্ধতি জ্ঞানচর্চা নয়; এটি বিশ্বাস রক্ষার আইনজীবীসুলভ কৌশল।

ধর্মীয় সমাজে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, সেখানে মানুষ সত্যের চেয়ে পরিচয়কে বেশি ভালোবাসতে শেখে। “এটি সত্য কি না?”—এই প্রশ্নের বদলে তারা জিজ্ঞেস করে—“এটি আমাদের ধর্মের পক্ষে না বিপক্ষে?” তখন সত্য আর সত্য থাকে না; সত্য হয়ে যায় গোত্রের সম্পত্তি। যুক্তি হয়ে যায় অস্ত্র, প্রমাণ হয়ে যায় সুবিধামতো ব্যবহারের জিনিস, আর বিরুদ্ধমত হয়ে যায় শত্রুতা। এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় বই পোড়ানো, চিন্তক হত্যা, ব্লাসফেমি আইন, ধর্মত্যাগীর বিরুদ্ধে ঘৃণা, নারীকে নিয়ন্ত্রণ, শিল্পকে সেন্সর, বিজ্ঞানের ওপর সন্দেহ, এবং ইতিহাসকে মিথে বদলে ফেলার চেষ্টা।

মানুষের আরেকটি গভীর মানসিক ভুল হলো নির্মাতা-ভ্রম। আমরা ঘর বানাই, রাস্তা বানাই, মেশিন বানাই, বই লিখি, শহর গড়ি। তাই আমরা ভাবতে অভ্যস্ত—যা আছে, তা কেউ বানিয়েছে। এই অভ্যাস থেকে আমরা মহাবিশ্বের দিকে তাকিয়ে বলি—এত বিশাল ব্যবস্থা, নিশ্চয়ই কেউ বানিয়েছে। কিন্তু মানুষের তৈরি জিনিস থেকে মহাবিশ্বের অস্তিত্বে একই যুক্তি চালানো শিশুসুলভ সরলীকরণ। ঘড়ি দেখে ঘড়িনির্মাতা অনুমান করা যায়, কারণ আমরা ঘড়ি বানাতে মানুষকে দেখেছি। কিন্তু মহাবিশ্বের বাইরে দাঁড়িয়ে মহাবিশ্ব বানাতে কাউকে কেউ দেখেনি। আমাদের কারিগরি অভিজ্ঞতা দিয়ে অস্তিত্বের মৌলিক প্রশ্নের ওপর নির্মাতা চাপিয়ে দেওয়া যুক্তির সীমা লঙ্ঘন।

আমরা এমন এক বিশ্বে জন্মেছি যেখানে প্রায় সব সামাজিক জিনিস মানুষের বানানো—বাড়ি, ভাষা, আইন, পোশাক, শহর, প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র। তাই “কিছু না বানালে কিছু থাকে কীভাবে”—এই প্রশ্ন আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু প্রকৃতি মানুষের কারখানা নয়। নক্ষত্র মানুষের তৈরি বাতি নয়। পাহাড় মানুষের বানানো মূর্তি নয়। নদী কোনো স্থপতির আঁকা নকশা নয়। জীবনের বিবর্তন কোনো কারিগরের হাতে বানানো যন্ত্র নয়। মানুষের তৈরি জিনিসের যুক্তি প্রকৃতির ওপর বসালে আমরা প্রকৃতিকে বুঝি না; আমরা প্রকৃতির ওপর নিজের সমাজের ছায়া ফেলি।

এই জায়গায় বিজ্ঞান ও ধর্মের মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট। বিজ্ঞান অজানাকে অজানা বলার সাহস রাখে। বিজ্ঞান বলে—এখানে আমরা জানি, এখানে জানি না, এখানে অনুমান করছি, এখানে পরীক্ষা দরকার। ধর্ম বলে—এখানে উত্তর আছে, কারণ গ্রন্থে আছে, নবী বলেছেন, ঈশ্বর বলেছেন। বিজ্ঞান ভুল করলে সংশোধিত হয়; ধর্ম ভুল ধরা পড়লে ব্যাখ্যা পাল্টায়। বিজ্ঞান অনিশ্চয়তাকে পদ্ধতির অংশ বানায়; ধর্ম অনিশ্চয়তাকে বিশ্বাস দিয়ে ঢেকে দেয়। বিজ্ঞান অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালায়; ধর্ম অনেক সময় অন্ধকারকেই পবিত্র বলে ঘোষণা করে।

তবে এই প্রবন্ধের বক্তব্য এই নয় যে মানুষ কখনো ধর্মীয় সান্ত্বনা পায় না। মানুষ পায়। মানুষ গানেও সান্ত্বনা পায়, কবিতায় পায়, প্রেমে পায়, মিথে পায়, মাতৃস্মৃতিতে পায়, পতাকার নিচেও পায়। কিন্তু সান্ত্বনা সত্যের প্রমাণ নয়। কোনো বিশ্বাস মানুষের চোখের জল মুছে দিতে পারে, কিন্তু তাতে বিশ্বাসটি বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায় না। মিথ মানুষের মানসিক প্রয়োজন মেটাতে পারে, কিন্তু মিথকে জ্ঞানের আসনে বসালে বিপদ শুরু হয়। ধর্ম ব্যক্তিগত সান্ত্বনা হিসেবে থাকলে একরকম; কিন্তু ধর্ম যখন আইন, রাষ্ট্র, শিক্ষা, নৈতিকতা, বিজ্ঞান, নারী-স্বাধীনতা, চিন্তার অধিকার নির্ধারণ করতে চায়, তখন সেটি আর সান্ত্বনা থাকে না—সেটি ক্ষমতা হয়ে ওঠে।

এই ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম দীর্ঘ। প্রতিটি যুগে কিছু মানুষ ছিল যারা বলেছে—আমি জানি না, তাই জানতে চাই। আর প্রতিটি যুগে কিছু প্রতিষ্ঠান ছিল যারা বলেছে—জানার দরকার নেই, বিশ্বাস করো। এই দ্বন্দ্বই সভ্যতার প্রধান দ্বন্দ্ব। একদিকে প্রশ্ন, অন্যদিকে আনুগত্য। একদিকে পরীক্ষা, অন্যদিকে নিষেধ। একদিকে সন্দেহ, অন্যদিকে পবিত্র ভয়। একদিকে মানুষ, অন্যদিকে মানুষের তৈরি ঈশ্বরের নামে মানুষের ওপর মানুষের শাসন।

সক্রেটিসের বিষপাত্র, ব্রুনোর আগুন, গ্যালিলিওর বিচার, অসংখ্য অজ্ঞাত চিন্তকের নির্বাসন, নিষিদ্ধ বই, দমন করা কণ্ঠ—এসব কেবল অতীতের ঘটনা নয়। এগুলো বারবার ফিরে আসে নতুন পোশাকে। কখনো ধর্মের নামে, কখনো রাষ্ট্রের নামে, কখনো জাতির নামে, কখনো সংস্কৃতির নামে, কখনো আঘাতপ্রাপ্ত অনুভূতির নামে। কিন্তু মূল ভয় একই—মানুষ যদি প্রশ্ন করতে শেখে, তবে কর্তৃত্ব টেকে না। মানুষ যদি প্রমাণ চাইতে শেখে, তবে মিথ টেকে না। মানুষ যদি অজানাকে সৎভাবে অজানা বলতে শেখে, তবে ঈশ্বরের বাজার ছোট হয়ে যায়।

মানুষের মুক্তি শুরু হয় সেই মুহূর্তে, যখন সে অজানার সামনে হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা না করে দাঁড়িয়ে বলে—আমি জানি না, কিন্তু জানতে চাই।

এই “জানতে চাই” বাক্যটি ধর্মীয় সভ্যতার কাছে বিপজ্জনক। কারণ এই বাক্য মানুষকে শিশুর আসন থেকে চিন্তকের আসনে বসায়। এই বাক্য পুরোহিত, মোল্লা, পাদ্রি, গুরু, নবী, গ্রন্থ, প্রথা—সব কর্তৃত্বকে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। এই বাক্য বলে—কেউ পবিত্র নয়; কোনো বই প্রশ্নাতীত নয়; কোনো দাবি প্রমাণের ঊর্ধ্বে নয়; কোনো বিশ্বাস সমালোচনার বাইরে নয়।

মানুষের সবচেয়ে বড় নৈতিক সাহস হলো সত্যকে সান্ত্বনার ওপরে রাখা। সত্য সবসময় আরামদায়ক নয়। সত্য কখনো বলে—মৃত্যুর পর কিছু নেই। সত্য কখনো বলে—মানুষ মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়। সত্য কখনো বলে—নৈতিকতা আকাশ থেকে নামে না, মানুষই তৈরি করে। সত্য কখনো বলে—তোমার পবিত্র বই ভুল হতে পারে। সত্য কখনো বলে—তোমার নবী, গুরু, দার্শনিক, নেতা, পূর্বপুরুষ—সবাই মানুষ, সবাই ভুল করতে পারে। এই সত্যগুলো কঠিন, কিন্তু কঠিন বলেই মূল্যবান। কারণ মুক্ত মানুষ হতে হলে শিশুসুলভ সান্ত্বনা ছাড়তে হয়।

ঈশ্বর ধারণার বিরুদ্ধে যুক্তির লড়াই তাই শুধু অধিবিদ্যার লড়াই নয়; এটি মানুষের পরিণত হওয়ার লড়াই। আমরা কি অজানাকে ঈশ্বর দিয়ে ভরাট করব, নাকি অজানাকে অনুসন্ধানের ক্ষেত্র বানাব? আমরা কি ভয়কে প্রার্থনায় বদলাব, নাকি জিজ্ঞাসায় বদলাব? আমরা কি কর্তৃত্বের সামনে মাথা নত করব, নাকি প্রমাণ চাইব? আমরা কি প্রাচীন কাহিনীর বন্দি হয়ে থাকব, নাকি জ্ঞানের অসমাপ্ত যাত্রায় অংশ নেব?

মানুষের ইতিহাসে ধর্ম বহুবার অন্ধকারকে পবিত্র করেছে, কিন্তু জ্ঞান সেই অন্ধকার ভেঙেছে। বজ্রপাত দেবতার রাগ ছিল না; বিদ্যুৎ। রোগ অভিশাপ ছিল না; জীবাণু, জিন, পরিবেশ, দেহের জটিলতা। সূর্য দেবতার রথে চড়ে ওঠে না; পৃথিবীর ঘূর্ণনে আমরা তাকে উঠতে দেখি। মানুষ মাটি থেকে হঠাৎ বানানো হয়নি; জীবনের দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাসের অংশ। মহাবিশ্ব কোনো উপজাতীয় দেবতার নাট্যমঞ্চ নয়; এটি পদার্থ, শক্তি, স্থান, কাল ও নিয়মের গভীর বাস্তবতা।

অতএব ঈশ্বরকে প্রশ্ন করা মানে শুধু ধর্মকে প্রশ্ন করা নয়; মানুষের ভয়ের রাজনীতি, অজ্ঞতার অলঙ্কার, কর্তৃত্বের নাটক, পবিত্রতার নামে চিন্তার দমন—এসবকেই প্রশ্ন করা। যে মানুষ প্রশ্ন করে, সে শুধু অবিশ্বাসী নয়; সে জেগে ওঠা মানুষ। যে মানুষ প্রমাণ চায়, সে শুধু সংশয়বাদী নয়; সে সভ্যতার প্রকৃত উত্তরাধিকারী। যে মানুষ অজানাকে অজানা বলতে পারে, সে-ই জ্ঞানের পথে হাঁটতে পারে।

আজও পৃথিবীর বহু সমাজে অন্ধকারকে ঈশ্বরের নামে রক্ষা করা হয়। আজও প্রশ্নকারীকে বিদ্রোহী বলা হয়। আজও সন্দেহকে পাপ বলা হয়। আজও স্বাধীন চিন্তাকে আঘাত বলা হয়। কিন্তু ইতিহাসের বৃহত্তর রেখা স্পষ্ট: অন্ধবিশ্বাস সাময়িকভাবে দমন করতে পারে, হত্যা করতে পারে, নির্বাসিত করতে পারে, বই পোড়াতে পারে; কিন্তু জিজ্ঞাসাকে শেষ করতে পারে না। কারণ জিজ্ঞাসাই মানুষের প্রকৃত আগুন। এই আগুনই মানুষকে গুহা থেকে নক্ষত্রের দিকে নিয়ে এসেছে।

যারা এই অচলায়তন ভাঙতে চায়, যারা অজ্ঞানতার অন্ধকারকে পবিত্র না বলে অন্ধকারই বলে, যারা ঈশ্বরের নামে প্রতিষ্ঠিত ভয়কে প্রশ্ন করে, যারা মানুষকে আবার মানুষ হিসেবে দাঁড় করাতে চায়—তারাই সভ্যতার প্রকৃত নির্মাতা। আজ তারা আক্রান্ত হতে পারে, নিন্দিত হতে পারে, নির্বাসিত হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসে শেষ পর্যন্ত তাদেরই জয় হয়। কারণ মিথের বয়স যতই দীর্ঘ হোক, একটি প্রমাণ তার ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে। অন্ধকার যতই পুরোনো হোক, একটি প্রদীপই যথেষ্ট।

ঈশ্বর অজানার রাজা হতে পারে; কিন্তু মানুষ জ্ঞানের বিদ্রোহী। আর শেষ পর্যন্ত ইতিহাস এগোয় রাজাদের হাতে নয়, বিদ্রোহীদের হাতে।

About This Article

Genre: Literary-Philosophical, Skeptical, and Critical Essay on God, Ignorance, Knowledge, and Religious Authority

Epistemic Position: Secular Humanism, Scientific Skepticism, Anti-Authoritarian Rationalism, Historical Criticism, Philosophy of Religion, and Freedom of Inquiry

This article examines the idea of God as one of humanity's oldest responses to ignorance, fear, uncertainty, death anxiety, and the psychological need for control.

Its scope includes the God-of-the-gaps argument, myth-making, anthropomorphism, fear of death, religious consolation, sacred authority, philosophical skepticism, scientific explanation, Galileo, Bruno, Socrates, Nietzsche, and the conflict between inquiry and obedience.

The article follows Shongshoy's tradition of sharp, evidence-based, non-apologetic criticism. It does not treat God-belief as intellectually protected merely because it gives comfort, identity, emotional security, or cultural belonging. It asks whether the claim is true, coherent, justified, and compatible with evidence.

The central argument is that “I do not know” is an honest beginning of knowledge, but “I do not know, therefore God” is not an explanation; it is the decoration of ignorance with metaphysical language.

The article distinguishes personal consolation from truth. A belief may comfort human beings, reduce fear, or give meaning, but that does not make it a reliable map of reality, nor does it give religion the right to control science, law, morality, education, sexuality, history, or freedom of thought.

This article should be evaluated through philosophical clarity, logical rigor, scientific literacy, historical awareness, critique of authority, and commitment to intellectual freedom—not through religious sensitivity, apologetic expectation, inherited reverence, fear of blasphemy, emotional attachment to faith, or the demand that sacred claims be exempt from ordinary standards of evidence.

আসিফ মহিউদ্দীন

আসিফ মহিউদ্দীন সম্পাদক সংশয় - চিন্তার মুক্তির আন্দোলন [email protected]

Leave a comment

Your email will not be published.