ইসলামইতিহাসপ্রোপাগান্ডা

ইসলামে হাদিসের গুরুত্ব এবং অপরিহার্যতা

ভূমিকা

হাদিসের অস্বস্তিকর বিবরণ নিয়ে লজ্জিত একশ্রেণির মুসলিম ধর্মীয় বিতর্কে একটি সুবিধাজনক অবস্থান গ্রহণ করেন: তাঁরা হাদিস মানেন না, শুধু কোরআনই যথেষ্ট। মুহাম্মদের বক্তব্য, আচরণ এবং তাঁর নামে প্রচলিত বিধান নিয়ে মুক্তমনা নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী ও সংশয়বাদীদের সমালোচনার মুখে এই ঘোষণা দিয়ে সমালোচনার বিষয়টিকেই ইসলামের বাইরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। দাবি করা হয়, যা বলার সব কোরআনেই বলা আছে; কোরআনের বাইরের বর্ণনা বিকৃত, অপ্রয়োজনীয় অথবা গ্রহণযোগ্য নয়। অথচ প্রচলিত ইসলামের ইবাদত, হালাল–হারাম, বিবাহ, উত্তরাধিকার ও অপরাধের শাস্তির বহু নির্দিষ্ট বিধান কোরআনের পাঠে পাওয়া যায় না। সেগুলো গ্রহণ করার সময় হাদিসের কর্তৃত্ব ব্যবহার করে, সমালোচনার মুখে সেই কর্তৃত্ব অস্বীকার করা অসংগত। একই উৎস সুবিধাজনক বিধানের ক্ষেত্রে ধর্মের ভিত্তি হবে, আর অস্বস্তিকর বিধানের ক্ষেত্রে ধর্মের বাইরের বিষয় হয়ে যাবে—এটি প্রমাণের সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহার নয়; এটি নিজের পছন্দ অনুযায়ী ধর্মীয় কর্তৃত্ব বাছাই করার অসততা।

কোরআন ও হাদিসের সংরক্ষণের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতা এই অবস্থানকে আরও বিভ্রান্তিকর করে। কোরআনের সংরক্ষণে মুখস্থ করা, লিখে রাখা এবং শিক্ষক থেকে ছাত্রে পাঠ শেখানোর ভূমিকা ছিল। হাদিসের ক্ষেত্রেও মুখস্থ, লিখিত নথি, পাঠদান এবং বর্ণনার ধারাবাহিকতা ব্যবহৃত হয়েছে। কোরআনের হাফেজের পাশাপাশি ইসলামের ইতিহাসে হাদিসের হাফেজও ছিলেন; তাঁরা বিপুলসংখ্যক বর্ণনা এবং সেগুলোর বর্ণনাসূত্র সম্পর্কে জ্ঞান সংরক্ষণ করতেন। শিক্ষকরা ছাত্রদের হাদিস শেখাতেন, মুখস্থ করাতেন এবং পাঠ, শব্দ ও উচ্চারণের শিক্ষাও দিতেন। কোরআন ও হাদিসের সংকলনপ্রক্রিয়া হুবহু অভিন্ন ছিল না, কিন্তু উভয়ের সংরক্ষণেই মানুষের স্মৃতি, লিখিত উপকরণ এবং প্রজন্মান্তরে শিক্ষাদানের ভূমিকা ছিল। হাদিসের ব্যক্তিগত লিখিত সংরক্ষণ এবং পরবর্তী বৃহৎ গ্রন্থসংকলনও পৃথক বিষয়। বৃহৎ সংকলন পরে তৈরি হয়েছে বলে তার আগে কোনো লিখিত বর্ণনা ছিল না—এমন সিদ্ধান্ত ভুল। আবার প্রাথমিক লিখিত সংরক্ষণের বর্ণনা পাওয়া গেলেই পরবর্তী প্রতিটি হাদিসের প্রতিটি শব্দ নির্ভুলভাবে সংরক্ষিত হয়েছে—এ সিদ্ধান্তও অনুসরণ করে না। কোনো উৎস শরিয়তে কর্তৃত্ব পায় কি না এবং সেই উৎসের প্রতিটি বক্তব্য ঐতিহাসিকভাবে কতটা নির্ভরযোগ্য—এগুলো পৃথক প্রশ্ন।

কোরআন নিজেই মুহাম্মদকে অনুসরণ করতে, তাঁর নির্দেশ গ্রহণ করতে এবং তাঁর ফয়সালার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বলে। মানুষের কাছে অবতীর্ণ বক্তব্য স্পষ্ট করে দেওয়ার দায়িত্বও তাঁর ওপর দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশগুলো কার্যকর করতে হলে মুহাম্মদ কী বলেছেন, কী নিষেধ করেছেন, কোন আচরণ অনুমোদন করেছেন এবং কোনো আয়াত কীভাবে প্রয়োগ করেছেন—সেগুলো জানা প্রয়োজন। তাঁর মৃত্যুর পরে এই তথ্য কোরআনের বাইরের সংরক্ষিত বর্ণনা ও অনুশীলনের মাধ্যমে পাওয়া যায়। কোরআনে কোনো কাজের সাধারণ নির্দেশ থাকলেও সেই কাজের নির্দিষ্ট পদ্ধতি মুহাম্মদের অনুশীলন দিয়ে নির্ধারিত হলে, সেই অনুশীলনের বিবরণ বাদ দিয়ে একই বিধান পাওয়া যায় না। রাসুলের আনুগত্যের ঘোষণা তাঁর নির্দেশের বিষয়বস্তু সরবরাহ করে না; নির্দেশটি কী ছিল, তা জানার জন্য বর্ণিত তথ্য প্রয়োজন। ফলে কোরআনের নির্দেশ মেনে মুহাম্মদকে অনুসরণ করার দাবি এবং তাঁর নির্দেশ জানার উৎসগুলো নির্বিচারে অস্বীকার করার দাবি পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে।

হাদিসের ভূমিকা কোরআনের কয়েকটি কঠিন শব্দের অর্থ বুঝিয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হাদিস কোরআনের সাধারণ নির্দেশের বিস্তারিত রূপ দেয়, বিধানের প্রযোজ্য ক্ষেত্র নির্ধারণ করে, ব্যতিক্রম প্রতিষ্ঠা করে এবং কোরআনে সরাসরি অনুল্লিখিত বিধানও সরবরাহ করে। কোরআনে নামাজ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ আছে, কিন্তু প্রচলিত নামাজের সম্পূর্ণ বিন্যাস, রাকাতসংখ্যা এবং বহু নির্দিষ্ট আচরণ সেখানে ধারাবাহিক নির্দেশিকা হিসেবে লেখা নেই। যাকাতের নির্দেশ থাকলেও কোন সম্পদে কত পরিমাণ যাকাত আদায় হবে, তার পূর্ণ তালিকা কোরআনে নেই। হজের বিভিন্ন নির্দেশ থাকলেও প্রচলিত হজের সম্পূর্ণ আচরণবিধি জানতে মুহাম্মদের অনুশীলনের বিবরণ প্রয়োজন হয়। একইভাবে চুরির শাস্তির আয়াত থেকে চুরির ন্যূনতম মূল্য, দণ্ডযোগ্য ব্যক্তির শর্ত এবং অন্যান্য ব্যতিক্রমের সম্পূর্ণ বিধান পাওয়া যায় না। বিবাহের বৈধতা, দুধসম্পর্ক, উত্তরাধিকার, ওসিয়ত এবং খাদ্যের বিধানেও কোরআনের বাইরের বর্ণনা আইনগত ফল নির্ধারণ করে। একটি আদেশ লেখা থাকা এবং সেই আদেশকে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য পূর্ণ বিধানে পরিণত করা এক বিষয় নয়।

কোরআনের ভাষাগত অর্থ বোঝা এবং কোনো আয়াতের নির্দিষ্ট, বাধ্যতামূলক শরিয়তি অর্থ স্থির করাও পৃথক কাজ। আয়াতটি কোন ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত, কাদের উদ্দেশে বলা, কোন পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য এবং তার নির্দেশের পরিসর কতটুকু—এসব তথ্য সব ক্ষেত্রে আয়াতের ভেতরে লেখা থাকে না। নাজিলের সময়, প্রেক্ষাপট এবং শানে নুযূলসংক্রান্ত তথ্যের বড় অংশ হাদিস ও সংশ্লিষ্ট বর্ণিত ঐতিহ্যে সংরক্ষিত। এই তথ্য বাদ দিলে কোনো বাক্যের সাধারণ অর্থ পড়া সম্ভব হলেও প্রচলিত ইসলামে সেই বাক্য থেকে গৃহীত নির্দিষ্ট বিধানের ভিত্তি হারিয়ে যায়। একই আয়াতের একাধিক পাঠের মধ্যে কোনটি মুহাম্মদের প্রতিষ্ঠিত অর্থ বলে গ্রহণ করতে হবে, তার জন্যও তাঁর ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের বিবরণ ব্যবহৃত হয়। সেই বিবরণ প্রত্যাখ্যান করে নিজের নির্বাচিত অর্থকে মুহাম্মদের বিধান হিসেবে ঘোষণা করলে ব্যক্তিগত ব্যাখ্যাকে নবীর কর্তৃত্বের জায়গায় বসানো হয়। কোরআনের পাঠ তখনও থাকে, কিন্তু তার নামে প্রতিষ্ঠিত নির্দিষ্ট শরিয়তি সিদ্ধান্ত আর শুধু সেই পাঠ দিয়ে প্রমাণিত হয় না।

প্রচলিত ইসলামি ব্যাখ্যাব্যবস্থায় মুহাম্মদ কীভাবে কোরআন বুঝিয়েছেন ও পালন করেছেন, সাহাবিরা তাঁর কাছ থেকে কী গ্রহণ করেছেন এবং তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈদের মাধ্যমে সেই শিক্ষা কীভাবে সংরক্ষিত হয়েছে—এসবকে প্রামাণ্য ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। হাদিস, আছার এবং সংশ্লিষ্ট বর্ণনাগুলো তাই ইসলামের বাইরে পড়ে থাকা কিছু বিচ্ছিন্ন গল্প নয়; কোরআনের নামে প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় অনুশীলন ও বিধানের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত বর্ণনাতেও শুধু কোরআনে পাওয়া নির্দেশ গ্রহণ করে তাঁর অন্য নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করার অবস্থানের বিরুদ্ধে সতর্কতা আছে। এসব বর্ণনা ইসলামি ঐতিহ্যে কোরআনবহির্ভূত নবী-নির্দেশের বাধ্যতামূলক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্যবহৃত হয়েছে। হাদিসের সংকলন, বিষয়বস্তু ও এই আইনগত ভূমিকা সম্পর্কে না জেনে গোটা হাদিস-ঐতিহ্যকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করা সেই ব্যবস্থার মৌলিক কাঠামো সম্পর্কে অজ্ঞতা। যে বর্ণনা দিয়ে বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই বর্ণনা অস্বীকার করার পরে বিধানটিকে আগের মতোই প্রতিষ্ঠিত বলে চালানো যায় না।

কোরআনের সংকলন ও পাঠ-ইতিহাস সম্পর্কেও বহু তথ্য কোরআনের নিজের বক্তব্য থেকে নয়, কোরআনের বাইরের বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়। কোন বক্তব্যকে মুহাম্মদের সাধারণ কথা এবং কোন বক্তব্যকে কোরআনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল, আয়াতগুলো কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং সংকলিত পাঠ কীভাবে প্রচারিত হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে ইসলামি ঐতিহ্য সংরক্ষিত বিবরণের ওপর নির্ভর করে। কোরআনের একটি পাণ্ডুলিপি পাওয়া এবং তার প্রতিটি অংশের উৎস, সংগ্রহ ও ধর্মীয় মর্যাদার ইতিহাস জানা পৃথক বিষয়। কোরআনের গ্রহণযোগ্য ইতিহাস প্রতিষ্ঠার সময় বর্ণিত ঐতিহ্যের সাহায্য নেওয়া, অথচ একই ঐতিহ্যকে নীতিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা একটি অসংগত অবস্থান। শুধু কোনো গ্রন্থ নিজেকে আল্লাহর বাণী বলেছে বলে সেই দাবির ইতিহাস ও সত্যতা স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না।

হাদিস ও সংশ্লিষ্ট বর্ণিত ঐতিহ্য সরিয়ে দিলে কোরআন প্রচলিত শরিয়তের পূর্ণাঙ্গ আইনগ্রন্থ হিসেবে কার্যকর থাকার প্রয়োজনীয় ভিত্তি হারায়। নামাজের প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি, যাকাতের নির্দিষ্ট হার, বিবাহের অতিরিক্ত নিষেধ, উত্তরাধিকারের ব্যতিক্রম কিংবা অপরাধের বিশেষ দণ্ড তখন একইভাবে বহাল রাখা যায় না। কোনো বিধান বাদ যাবে, কোনোটি বদলাবে এবং কোনোটি নতুন ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়াবে। এই পরিবর্তনের পরে আগের শরিয়তই অপরিবর্তিত আছে বলে দাবি করা মিথ্যা। হাদিস ছাড়া কোরআনকে যে অর্থে নির্জীব কিতাব বলা যায়, সেটি তার এই আইনগত অক্ষমতা: পাঠটি উপস্থিত থাকে, কিন্তু প্রচলিত শরিয়তের নির্দিষ্ট বিধান ও বাধ্যতামূলক প্রয়োগের সম্পূর্ণ ব্যবস্থা সেই পাঠে পাওয়া যায় না। নিজের পছন্দমতো ব্যাখ্যা গ্রহণ করে তাকে আল্লাহর অপরিবর্তনীয় আইন ঘোষণা করলে ব্যক্তির পছন্দই ঐশ্বরিক কর্তৃত্বের নামে কার্যকর হয়। কোরআনের পবিত্রতার দাবি এই অনুপস্থিত বিধানগুলো তৈরি করে না এবং হাদিসের ওপর প্রতিষ্ঠিত আইনকে হাদিস অস্বীকার করার পরেও স্বয়ংসম্পূর্ণ কোরআনিক আইন বানিয়ে দেয় না।


হাদিস কাকে বলে?

হাদিসের শাব্দিক অর্থ নতুন; এটি প্রাচীন বা পুরোনোর বিপরীত। এর আরেকটি অর্থ কথা, বক্তব্য বা সংবাদ। ইসলামি পরিভাষায় নবী মুহাম্মদের কথা, কাজ, অনুমোদন এবং তাঁর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সংরক্ষিত বর্ণনাকে হাদিস বলা হয়। তিনি কোনো বিষয়ে যা বলেছেন, নিজে যা করেছেন এবং অন্যের কোনো কথা বা কাজ জেনে যেভাবে মৌখিক বা মৌন সমর্থন দিয়েছেন, সেগুলো এই বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী মুহাম্মদ আল্লাহর নির্দেশ কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন ও পালন করেছেন, তার বিবরণও হাদিসে পাওয়া যায়। হাদিসের নির্দেশ মুসলমানদের জীবনাচরণ ও ব্যবহারবিধির অন্যতম ভিত্তি; কোরআন এবং হাদিস ইসলামের নীতি, আইন ও ব্যাখ্যার প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মুহাম্মদের কাছ থেকে সাহাবিরা কী শিখেছেন এবং কীভাবে তা পালন করেছেন, তার বিবরণও হাদিস-সংকলনে সংরক্ষিত। একই গ্রন্থে সাহাবিদের নিজস্ব বক্তব্য ও কাজের বর্ণনাও থাকতে পারে। যেমন, উমর তাঁর শাসনামলে কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, তার বিবরণ আছার হিসেবে সংরক্ষিত হয়; তাঁর নিজের বক্তব্য ও কাজের বর্ণনা পরিভাষায় মওকুফ, যা সরাসরি মুহাম্মদের নামে বর্ণিত মারফু হাদিস থেকে পৃথক [1]

وهو ما يروى عن الصحابة رضي الله عنهم من أقوالهم أو أفعالهم ونحوها، فيوقف عليهم، ولا يتجاوز به إلى رسول الله – صلى الله عليه وسلم -. ثم إن منه ما يتصل الإسناد فيه إلى الصحابي، فيكون من الموقوف الموصول. ومنه ما لا يتصل إسناده، فيكون من الموقوف غير الموصول، على حسب ما عرف مثله في المرفوع إلى رسول الله – صلى الله عليه وسلم -، والله أعلم.

বাংলা অনুবাদ:মওকুফ হলো সাহাবিদের—আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন—কথা, কাজ ও অনুরূপ বিষয় সম্পর্কে বর্ণিত সংবাদ, যা তাঁদের কাছেই থামে; সেটিকে আল্লাহর রাসুলের দিকে নিয়ে যাওয়া হয় না। এর মধ্যে কোনো কোনো বর্ণনার সনদ সাহাবি পর্যন্ত সংযুক্ত থাকে; সেটি সংযুক্ত মওকুফ। আবার কোনো কোনো বর্ণনার সনদ সংযুক্ত থাকে না; সেটি অসংযুক্ত মওকুফ। আল্লাহর রাসুলের নামে বর্ণিত মারফুর ক্ষেত্রেও অনুরূপ সংযোগ ও বিচ্ছিন্নতার বিষয় রয়েছে। আল্লাহই সর্বাধিক জানেন।

ইসলামে কোরআনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ জানার প্রধান উপাদানের একটি হাদিস। এর সঙ্গে বিভিন্ন ঐতিহাসিকের লিখিত সীরাত বা জীবনীগ্রন্থও ব্যবহৃত হয়। কোরআনের আয়াত, হাদিস, সাহাবি ও তাবেঈদের বর্ণনা, ভাষা এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাবিবরণের ভিত্তিতে তাফসির রচিত হয়। তাফসিরের বর্ণনাভিত্তিক ধারায় কোরআনের পরে মুহাম্মদের ব্যাখ্যা ও অনুশীলনের বিবরণ বিশেষ গুরুত্ব পায়। সহিহ ও হাসান হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হাদিসকে ইসলামি হাদিসশাস্ত্রে গ্রহণযোগ্য বর্ণনা হিসেবে গণ্য করা হয় এবং শরিয়তের বিধান নির্ধারণে ব্যবহার করা হয়। বর্ণনাকারী, সনদের সংযোগ, সংরক্ষণের মান এবং বর্ণনার ত্রুটি সম্পর্কে বিচার করে এই শ্রেণি নির্ধারিত হয়। সেই বিচারকে প্রতিটি বর্ণনার অব্যর্থ ঐতিহাসিক সত্যতার নিশ্চয়তা বলা যায় না। ইসলামি ব্যবস্থায় বর্ণনাটির আইনগত কর্তৃত্ব আছে—এটি এক তথ্য; বর্ণনাটির প্রতিটি শব্দ ও বিবরণ ভুলের সমস্ত সম্ভাবনা থেকে মুক্ত—এটি পৃথক এবং আরও শক্ত দাবি।

মুহাম্মদের কথা, কাজ ও অনুমোদনের বিবরণ অনুযায়ী হাদিসের প্রধান তিনটি ধরন হলো ক্বওলী, ফে’লী ও তাকরীরী। কথা থেকে সরাসরি কোনো নির্দেশ বা নিষেধ পাওয়া যেতে পারে; কাজ থেকে কোনো নির্দেশ কীভাবে পালন করা হয়েছিল, তার বিবরণ পাওয়া যায়; আর অনুমোদন থেকে অন্যের কোনো আচরণ তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল কি না, তা নির্ধারণ করা হয়। ফলে হাদিসের বিষয়বস্তু শুধু মুহাম্মদের মুখের কথায় সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর অনুশীলন এবং জ্ঞাত কোনো আচরণের প্রতি অনুমোদনও ইসলামের ব্যবহারিক বিধান নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়।

হাদিসের ধরনসংজ্ঞা
ক্বওলী হাদিসকোনো বিষয়ে নবী মুহাম্মদ যা বলেছেন, অর্থাৎ যে হাদিসে তাঁর কোনো কথা বিবৃত হয়েছে, তাকে ক্বওলী বা বাণী সম্পর্কিত হাদিস বলা হয়।
ফে’লী হাদিসমুহাম্মদের কাজকর্ম, চরিত্র ও আচার-আচরণের ভেতর দিয়ে তাঁর অনুশীলনের বিবরণ পাওয়া যায়। যে হাদিসে তাঁর কোনো কাজের বিবরণ উল্লেখিত হয়েছে, তাকে ফে’লী বা কর্ম সম্পর্কিত হাদিস বলা হয়।
তাকরীরী হাদিসসাহাবিদের যেসব কথা বা কাজ মুহাম্মদের অনুমোদন ও সমর্থন পেয়েছে, সে ধরনের কথা বা কাজের বিবরণ থেকেও শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি জানা যায়। এইসব হাদিসকে তাকরীরী বা সমর্থনমূলক হাদিস বলা হয়। মৌন অনুমোদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পর্কে তাঁর অবগত থাকা বিবরণের একটি প্রয়োজনীয় উপাদান।

সনদ: হাদিসের দুইটি অংশ থাকে। একটি সনদ, আরেকটি মতন। হাদিসের মূল বক্তব্য যে সূত্রপরম্পরায় গ্রন্থসংকলনকারী পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে বর্ণিত হয়, তাকে সনদ বলা হয়। এতে বর্ণনাকারীদের নাম একের পর এক সাজানো থাকে এবং কে কার কাছ থেকে বর্ণনাটি গ্রহণ করেছেন, তার পরিচয় দেওয়া হয়। গ্রন্থসংকলনকারী যে ব্যক্তির কাছ থেকে শুনেছেন, তাঁর শিক্ষক এবং তার আগের বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে এই ধারা পূর্ববর্তী উৎস পর্যন্ত পৌঁছায়। সনদ তাই একটি বক্তব্যের বর্ণনাপথ; বক্তব্যটি কোরআনের কোন আয়াতের ব্যাখ্যা, কোনো নির্দেশের বিস্তারিত রূপ, নাকি পৃথক কোনো বিধান—সেই বিষয়টি পাওয়া যায় মতনের মধ্যে।

মতন: হাদিসের মূল বক্তব্য ও তার শব্দসমষ্টিকে মতন বলা হয়। মুহাম্মদের নামে বর্ণিত কোনো নির্দেশ, তাঁর কাজের বিবরণ, কোনো প্রশ্নের উত্তর অথবা কারও আচরণের অনুমোদন—এসব মতনের বিষয়বস্তু হতে পারে। সনদে কার মাধ্যমে সংবাদ এসেছে, তার তালিকা থাকে; মতনে সংবাদটি কী বলছে, তা থাকে। শরিয়তের বিধান নির্ধারণে মতনের বক্তব্য ব্যবহৃত হয়। কোনো আয়াতের সাধারণ নির্দেশ কতটুকু প্রযোজ্য, কোনো আচরণ কীভাবে সম্পন্ন হবে কিংবা কোন বিষয় নিষিদ্ধ—এসব নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত বর্ণনার বিষয়বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে বর্ণনাপথ এবং বর্ণিত বক্তব্য হাদিসের পৃথক কিন্তু পরস্পরসম্পর্কিত দুইটি উপাদান।

সুন্নাহ বা সুন্নাত শব্দের অর্থ চলার পথ, অনুসৃত রীতি, কর্মের নীতি ও পদ্ধতি। মুহাম্মদ যে পন্থা ও রীতি অবলম্বন করেছেন এবং যে আদর্শ প্রচার করেছেন, ইসলামি পরিভাষায় তা তাঁর সুন্নাহ। হাদিসশাস্ত্রে হাদিস ও সুন্নাহ অনেক ক্ষেত্রে কাছাকাছি বা সমার্থক অর্থে ব্যবহৃত হয়। বর্ণনা ও অনুশীলনের সম্পর্ক বোঝাতে হাদিসকে সেই কথা, কাজ ও অনুমোদনের বিবরণ এবং সুন্নাহকে তার মাধ্যমে জানা অনুসরণীয় আদর্শ বলা যায়। হাদিসের ব্যবহার তাই কেবল অতীতের একটি ঘটনা জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেই বর্ণনা থেকে একটি আচরণকে অনুসরণীয় কিংবা কোনো নির্দেশকে বাধ্যতামূলক বলে গ্রহণ করা হয়। মুহাম্মদের অনুশীলন অন্যদের মাধ্যমে শেখা ও প্রচলিত হওয়ার বিবরণও এই বর্ণিত ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত।

কোরআনের একটি নির্দেশ এবং মুহাম্মদ সেই নির্দেশ কীভাবে প্রয়োগ করেছেন বলে বর্ণিত হয়েছে—এই দুইটি উপাদান মিলিয়ে প্রচলিত ইসলামের বহু বিধান নির্ধারিত হয়। কোরআনে নামাজের নির্দেশ থাকলে তাঁর নামাজের অনুশীলন সেই নির্দেশের নির্দিষ্ট রূপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়; কোনো নিষেধ সাধারণভাবে থাকলে হাদিস তার প্রযোজ্য ক্ষেত্র বা ব্যতিক্রম নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়। হাদিসে কোরআনে সরাসরি অনুল্লিখিত নির্দেশ ও নিষেধও সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে হাদিস কোরআনের পাশে রাখা একটি অপ্রয়োজনীয় জীবনীসংগ্রহ নয়। কোরআনের নামে প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় আচরণ ও আইনগত বিধানের বিষয়বস্তু নির্ধারণে এর প্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে। এই বর্ণিত উপাদান বাদ দিলে তার ওপর প্রতিষ্ঠিত নির্দিষ্ট বিধানগুলোর দলিলও বাদ পড়ে।


হাদিস কি ২০০ বছর পরে লিখিত?

বর্তমান সময়ে অনলাইন, ফেসবুক ও ইউটিউবের ধর্মীয় আলোচনায় কিছু ইসলামিক বক্তা তাঁদের অনুসারীদের বলেন, হাদিস মানা জরুরি নয়; কারণ হাদিস মুহাম্মদের মৃত্যুর ২০০ বছর পরে লিখিত হয়েছে। সব হাদিসের প্রথম লিখিত সংরক্ষণকে এই সময়ের মধ্যে ফেলে দেওয়া ভুল এবং বিভ্রান্তিকর। ইসলামি উৎসেই মুহাম্মদের জীবদ্দশায় তাঁর বক্তব্য লিখে রাখার বিবরণ রয়েছে; ব্যক্তিগত নথি, সংগঠিত সংগ্রহ এবং পরবর্তী বৃহৎ গ্রন্থসংকলন হাদিসের লিখিত সংরক্ষণের পৃথক রূপ। এই পার্থক্য না জেনে গোটা ইতিহাসকে একটি সংখ্যার মধ্যে আটকে দেওয়া সাধারণ জ্ঞানের অভাবের পরিচয়। কোনো নির্দিষ্ট গ্রন্থ পরে সংকলিত হয়েছে—এ তথ্য থেকে তার আগে কোনো বর্ণনা লেখা হয়নি বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া অজ্ঞতাপ্রসূত বোকামি। বুখারি বা মুসলিমের সংকলনের সময়কে সমস্ত হাদিসের প্রথম লেখার সময় বলে চালানো ইতিহাসের পৃথক ঘটনাকে এক করে ফেলে।

সুনান আবু দাউদে আবদুল্লাহ ইবন আমরের নামে সংরক্ষিত বর্ণনায় তিনি জানিয়েছেন, মুহাম্মদের কাছ থেকে যা শুনতেন, মনে রাখার উদ্দেশ্যে লিখে রাখতেন। কুরাইশের আপত্তির পরে তিনি লেখা বন্ধ করেন এবং বিষয়টি মুহাম্মদকে জানান। বর্ণনাটিতে মুহাম্মদ তাঁকে আবার লিখতে বলেন এবং নিজের মুখের দিকে ইঙ্গিত করে তাঁর বক্তব্যের সত্যতার দাবি করেন। এখানে ব্যক্তিগতভাবে বক্তব্য লিখে রাখা, লেখার বিরুদ্ধে আপত্তি এবং পুনরায় লেখার নির্দেশ—তিনটি বিষয়ই সংরক্ষিত আছে। এই বিবরণে লেখালেখির সময় মুহাম্মদের জীবদ্দশা; বুখারির মতো পরবর্তী সংকলকের যুগ নয় [2]

كُنْتُ أَكْتُبُ كُلَّ شَىْءٍ أَسْمَعُهُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أُرِيدُ حِفْظَهُ فَنَهَتْنِي قُرَيْشٌ وَقَالُوا أَتَكْتُبُ كُلَّ شَىْءٍ تَسْمَعُهُ وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بَشَرٌ يَتَكَلَّمُ فِي الْغَضَبِ وَالرِّضَا فَأَمْسَكْتُ عَنِ الْكِتَابِ فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَوْمَأَ بِأُصْبُعِهِ إِلَى فِيهِ فَقَالَ «اكْتُبْ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا يَخْرُجُ مِنْهُ إِلاَّ حَقٌّ».

বাংলা অনুবাদ:আমি আল্লাহর রাসুলের কাছ থেকে যা শুনতাম, মনে রাখার উদ্দেশ্যে সব লিখে রাখতাম। কুরাইশ আমাকে বাধা দিল এবং বলল, “তুমি যা শোনো সবই কি লিখে রাখো? আল্লাহর রাসুল তো একজন মানুষ; তিনি রাগ ও সন্তুষ্টি—দুই অবস্থাতেই কথা বলেন।” তখন আমি লেখা বন্ধ করলাম এবং বিষয়টি আল্লাহর রাসুলকে জানালাম। তিনি নিজের আঙুল দিয়ে মুখের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “লেখো। যার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ—এ মুখ থেকে সত্য ছাড়া কিছু বের হয় না।”

ব্যক্তিগতভাবে বক্তব্য লিখে রাখা এবং বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ছড়িয়ে থাকা বর্ণনা সংগ্রহ করে শিক্ষাদান ও প্রচারের ব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্যে পার্থক্য আছে। সহিহ বুখারির কিতাবুল ইলমের একটি অধ্যায়-শিরোনামে উমর ইবন আবদুল আজিজের আবু বকর ইবন হাজমকে পাঠানো নির্দেশ সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানে হাদিস অনুসন্ধান করে লিখে রাখতে বলা হয়েছে, কারণ জ্ঞান বিলুপ্ত হওয়া এবং আলেমদের মৃত্যু নিয়ে আশঙ্কা ছিল। নির্দেশের মধ্যে জ্ঞান প্রচার এবং অজ্ঞ ব্যক্তিকে শেখানোর কথাও রয়েছে। ব্যক্তিগত নথির পাশাপাশি সংগঠিত সংগ্রহ ও পাঠদানের প্রয়োজন ইসলামি সংরক্ষণ-ইতিহাসের অংশ হিসেবে এই বিবরণে উপস্থিত [3]

وَكَتَبَ عُمَرُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ إِلَى أَبِي بَكْرِ بْنِ حَزْمٍ انْظُرْ مَا كَانَ مِنْ حَدِيثِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاكْتُبْهُ، فَإِنِّي خِفْتُ دُرُوسَ الْعِلْمِ وَذَهَابَ الْعُلَمَاءِ، وَلاَ تَقْبَلْ إِلاَّ حَدِيثَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَلْتُفْشُوا الْعِلْمَ، وَلْتَجْلِسُوا حَتَّى يُعَلَّمَ مَنْ لاَ يَعْلَمُ، فَإِنَّ الْعِلْمَ لاَ يَهْلِكُ حَتَّى يَكُونَ سِرًّا.

বাংলা অনুবাদ:উমর ইবন আবদুল আজিজ আবু বকর ইবন হাজমকে লিখলেন: “আল্লাহর রাসুলের যেসব হাদিস আছে, সেগুলো অনুসন্ধান করে লিখে রাখো; কারণ আমি জ্ঞান মুছে যাওয়া এবং আলেমদের চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছি। নবীর হাদিস ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করো না। তোমরা জ্ঞান ছড়িয়ে দাও এবং এমনভাবে বসো, যাতে যে জানে না তাকেও শেখানো হয়। কারণ জ্ঞান গোপন না হওয়া পর্যন্ত ধ্বংস হয় না।”

ব্যক্তিগত সহিফা বা নোট, বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষিত বর্ণনার সংগঠিত সংগ্রহ এবং বিষয় বা বর্ণনাকারী অনুযায়ী সাজানো বৃহৎ গ্রন্থ—এই রূপগুলোকে এক করে ফেললে লিখিত সংরক্ষণের ইতিহাস বোঝা যায় না। একই সময়েও মুখস্থ করা, লিখে রাখা এবং শিক্ষক থেকে ছাত্রে শেখানোর চর্চা চলতে পারে। পরে কোনো সংকলক সেই বর্ণনাগুলো একত্র করে গ্রন্থ তৈরি করলে নতুন গ্রন্থটি সংকলিত হলো; তার অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি বক্তব্য সেই মুহূর্তেই প্রথম লেখা হলো—এ সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে না। কোনো সংকলনের প্রকাশকাল, বর্ণনাটির পূর্ববর্তী লিখিত উপস্থিতি এবং তার নামে দাবি করা ঘটনার সময় পৃথক তথ্য। এই তথ্যগুলোকে আলাদা করেই “২০০ বছর পরে লেখা” কথাটির নির্দিষ্ট অর্থ ও সত্যতা নির্ধারিত হয়।

ইসলামি উৎসে প্রাথমিক লেখালেখির বিবরণ থাকা এবং বর্তমানে পাওয়া কোনো নির্দিষ্ট বর্ণনার প্রতিটি শব্দ সেই সময় থেকেই অবিকল সংরক্ষিত থাকা একই দাবি নয়। প্রাচীন ব্যক্তিগত নথি, তার পরবর্তী অনুলিপি এবং বৃহৎ সংকলনে গৃহীত পাঠের সম্পর্ক বর্ণনাভেদে পরীক্ষা করতে হয়। একইভাবে কোনো গ্রন্থ পরে সংকলিত হয়েছে বলে তার সমস্ত বিষয়বস্তু সেই সংকলকের যুগে তৈরি হয়েছে—এ দাবিরও পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন। গ্রন্থসংকলনের তারিখ দিয়ে বর্ণনার সব পূর্ববর্তী ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। “২০০ বছর পরে” সংখ্যাটি একা কোনো নির্দিষ্ট বর্ণনাকে সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করে না এবং শরিয়তে সেই বর্ণনার নথিবদ্ধ ব্যবহারও বিলুপ্ত করে না।


মুহাম্মদ কি হাদিস লিখতে নিষেধ করেছেন?

মুহাম্মদ হাদিস লিখে রাখতে নিষেধ করেছিলেন—এমন বর্ণনা সহিহ মুসলিমে রয়েছে। আবু সাঈদ খুদরীর বর্ণনায় কোরআন ছাড়া তাঁর কাছ থেকে অন্য কিছু লিখতে নিষেধ করা হয়েছে এবং ইতিমধ্যে লেখা থাকলে তা মুছে ফেলতে বলা হয়েছে। একই বর্ণনায় তাঁর কথা অন্যদের কাছে বর্ণনা করার অনুমতিও রয়েছে। ফলে লিখে রাখার নিষেধ এবং কথা বর্ণনার নিষেধ এক বিষয় নয়; উদ্ধৃত নির্দেশে প্রথমটি আছে, দ্বিতীয়টি নেই। এই নিষেধের খবরটিও কোরআনের কোনো আয়াত থেকে পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় হাদিস থেকেই। বর্ণনাটি সংরক্ষিত ও সংকলিত না হলে পরবর্তী মানুষ এই নির্দিষ্ট নির্দেশের ভাষা জানত না। নির্দেশটি মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে গ্রহণ করার অর্থ হলো, তাঁর নির্দেশ নির্ধারণে এই হাদিসকে তথ্যসূত্র হিসেবে গ্রহণ করা। কোরআনের সরাসরি পাঠে অনুপস্থিত এই তথ্য হাদিসের মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে। [4] [5]

حَدَّثَنَا هَدَّابُ بْنُ خَالِدٍ الأَزْدِيُّ، حَدَّثَنَا هَمَّامٌ، عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ «لاَ تَكْتُبُوا عَنِّي وَمَنْ كَتَبَ عَنِّي غَيْرَ الْقُرْآنِ فَلْيَمْحُهُ وَحَدِّثُوا عَنِّي وَلاَ حَرَجَ وَمَنْ كَذَبَ عَلَىَّ — قَالَ هَمَّامٌ أَحْسِبُهُ قَالَ — مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ».

বাংলা অনুবাদ:
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৬/ যুহুদ ও দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণহীনতা সম্পর্কিত বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ ১৬. ধীর-স্থীরভাবে হাদীস বর্ণনা করা এবং ইলম লিপিবদ্ধ করার হুকুম
৭২৩৮। হাদ্দাব ইবনু খালিদ আযদী (রহঃ) … আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমার বাণী তোমরা লিপিবদ্ধ করোনা। কুরআন ব্যাতিত কেউ যদি আমার বানী লিপিবদ্ধ করে থাকে তবে যেন তা মুছে ফেলে। আমার হাদিস বর্ণনা কর, এতে কোন অসুবিধা নেই। যে ব্যাক্তি আমার উপর মিথ্যারোপ করবে- হাম্মাম (রহঃ) বলেন, আমার মনে হয় তিনি বলেছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে; তবে সে যেন জাহান্নামে তাঁর ঠিকানা বানিয়ে নেয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)

হাদিস লিখে রাখার অনুমতির বর্ণনাও একই হাদিসসাহিত্যে রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবন আমরের বর্ণনায় তিনি মুহাম্মদের কাছ থেকে যা শুনতেন, তা সংরক্ষণের জন্য লিখে রাখতেন। কুরাইশের লোকেরা আপত্তি করেছিল যে, মুহাম্মদ একজন মানুষ এবং রাগ ও সন্তুষ্টি উভয় অবস্থাতেই কথা বলেন; তাই তাঁর সমস্ত কথা লিখে রাখা ঠিক নয়। এই আপত্তির কারণে আবদুল্লাহ লেখা বন্ধ করেন। বিষয়টি মুহাম্মদকে জানালে তিনি নিজের মুখের দিকে ইশারা করে লিখতে বলেন এবং তাঁর মুখ থেকে সত্য ছাড়া কিছু বের হয় না বলে দাবি করেন। এখানে লেখা বন্ধ করার তাৎক্ষণিক কারণ কুরাইশের আপত্তি; সেটিকে মুহাম্মদের দেওয়া নিষেধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি। কোরআনের হাফেজের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় আগের নিষেধ তুলে নেওয়া হয়েছিল—এমন কারণ বা সময়ক্রমও এই বর্ণনায় নেই। [6] [7]

حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، وَأَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ قَالاَ حَدَّثَنَا يَحْيَى، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ الأَخْنَسِ، عَنِ الْوَلِيدِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي مُغِيثٍ، عَنْ يُوسُفَ بْنِ مَاهَكَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ كُنْتُ أَكْتُبُ كُلَّ شَىْءٍ أَسْمَعُهُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أُرِيدُ حِفْظَهُ فَنَهَتْنِي قُرَيْشٌ وَقَالُوا أَتَكْتُبُ كُلَّ شَىْءٍ تَسْمَعُهُ وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بَشَرٌ يَتَكَلَّمُ فِي الْغَضَبِ وَالرِّضَا فَأَمْسَكْتُ عَنِ الْكِتَابِ فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَوْمَأَ بِأُصْبُعِهِ إِلَى فِيهِ فَقَالَ «اكْتُبْ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا يَخْرُجُ مِنْهُ إِلاَّ حَقٌّ».

বাংলা অনুবাদ:
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৯/ শিক্ষা-বিদ্যা, (জ্ঞান-বিজ্ঞান)
পরিচ্ছেদঃ ৪১৭. ইলম লিপিবদ্ধ করা সম্পর্কে।
৩৬০৭. মুসাদ্দাদ (রহঃ) ….. আবদুল্লাহ ইবন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি যা কিছু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হতে শ্রবণ করতাম, তা লিখে রাখতাম। আমি ইচ্ছা করতাম যে, আমি এর সবই সংরক্ষণ করি। কিন্তু কুরাইশরা আমাকে এরূপ করতে নিষেধ করে এবং বলেঃ তুমি যা কিছু শোন তার সবই লিখে রাখ, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন মানুষ, তিনি তো কোন সময় রাগান্বিত অবস্থায় কথাবার্তা বলেন এবং খুশীর অবস্থায়ও বলেন। একথা শুনে আমি লেখা বন্ধ করি এবং বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবহিত করি। তখন তিনি তার আংগুল দিয়ে নিজের মুখের প্রতি ইশারা করে বলেনঃ তুমি লিখতে থাক, ঐ যাতের কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন, যা কিছু এ মুখ হতে বের হয়, তা সবই সত্য।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ)

কোরআনের সঙ্গে হাদিস মিশে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রথমে নিষেধ এবং সেই আশঙ্কা দূর হওয়ার পরে অনুমতি—এই ব্যাখ্যা নববীর সহিহ মুসলিমের ভাষ্যে উল্লিখিত হয়েছে। নববী একে “বলা হয়েছে” বলে উপস্থাপন করেছেন; পাশাপাশি একই সহিফায় কোরআন ও হাদিস একত্রে লেখার ওপর নিষেধ ছিল বলেও আরেকটি ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন। নিষেধ ও অনুমতির বর্ণনা দুটি নিজেরা কোনো নির্দিষ্ট তারিখ দেয় না, কিংবা কোন নির্দেশটি আগে ও কোনটি পরে বলা হয়েছিল তা এই উদ্ধৃতিগুলোতে নির্ধারণ করে না। ফলে নিষেধ বাতিল হওয়ার কালক্রম এবং কোরআন–হাদিস মিশ্রণের আশঙ্কাকে বর্ণনাকারীর সরাসরি বক্তব্য হিসেবে চালানো ভুল। এগুলো পরবর্তী ভাষ্যকারদের ব্যাখ্যা, যার সাহায্যে তাঁরা সংরক্ষিত বর্ণনাগুলোর সম্পর্ক নির্ধারণ করেছেন। [8]

وقيل : إن حديث النهي منسوخ بهذه الأحاديث ، وكان النهي حين خيف اختلاطه بالقرآن فلما أمن ذلك أذن في الكتابة ، وقيل : إنما نهى عن كتابة الحديث مع القرآن في صحيفة واحدة ; لئلا يختلط ، فيشتبه على القارئ في صحيفة واحدة . والله أعلم .

বাংলা অনুবাদ:
বলা হয়েছে: নিষেধের হাদিসটি এসব হাদিস দ্বারা রহিত হয়েছে। কোরআনের সঙ্গে তা মিশে যাওয়ার আশঙ্কা থাকাকালে নিষেধ করা হয়েছিল; সেই আশঙ্কা দূর হলে লেখার অনুমতি দেওয়া হয়। আবার বলা হয়েছে: একই সহিফায় কোরআনের সঙ্গে হাদিস লেখাই নিষেধ করা হয়েছিল, যাতে দুটো মিশে গিয়ে একই সহিফায় পাঠকের কাছে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে। আল্লাহই ভালো জানেন।

লেখার নিষেধ, লেখার অনুমতি এবং নিষেধ রহিত হওয়ার ব্যাখ্যা—তিনটির তথ্যভিত্তিই কোরআনের বাইরের বর্ণনা ও তার ভাষ্য। মুহাম্মদ কী লিখতে নিষেধ করেছিলেন, কাকে লিখতে বলেছিলেন, কোন কথাকে নিজের বক্তব্য হিসেবে সংরক্ষণের অনুমতি দিয়েছিলেন—এসবের উত্তর শুধু কোরআনের পাঠ থেকে পাওয়া যায় না। এমনকি হাদিস লেখার বিরুদ্ধে মুহাম্মদের কর্তৃত্ব ব্যবহার করতে গেলেও তাঁর নামে সংরক্ষিত হাদিসের ওপর নির্ভর করতে হয়। নিষেধের বর্ণনার যে অংশে “আমার হাদিস বর্ণনা কর” বলা হয়েছে, সেটি বাদ দিয়ে নিষেধটিকে সমস্ত নববী বর্ণনা প্রত্যাখ্যানের নির্দেশ বানালে উৎসের অর্থ বদলে যায়। ইসলামি প্রথার ভেতরে মুহাম্মদের নির্দেশের পরিধি নির্ধারণের এই নির্ভরতা দেখায় যে, কোরআনের বাইরে সংরক্ষিত বক্তব্য বাদ দিয়ে তাঁর নামে প্রচলিত নির্দেশব্যবস্থাটি আর আগের অবস্থায় থাকে না।


হাদিস কখন লিখিত হয়?

মুহাম্মদের আমলেই ব্যক্তিগতভাবে হাদিস লিখে রাখা হয়েছিল—এমন বর্ণনা হাদিসগ্রন্থগুলোতে রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবন আমরের লিখে রাখার কথা আবু হুরায়রার বর্ণনাতেও পাওয়া যায়; আবু হুরায়রা নিজের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য বোঝাতে বলেছেন, আবদুল্লাহ লিখতেন, তিনি লিখতেন না। ব্যক্তিগত সহিফায় লেখা, মুখস্থ করে বর্ণনা করা এবং বহু বর্ণনা একত্র করে বিষয়ভিত্তিক বৃহৎ গ্রন্থ সংকলন করা আলাদা কাজ। বুখারী ও মুসলিমের মতো পরবর্তী সংকলনের সময়কে সমস্ত হাদিস প্রথম লেখার সময় বানিয়ে “মুহাম্মদের মৃত্যুর দুইশ বছর পরে হাদিস লেখা শুরু হয়েছে” বলা ভুল। এই বক্তব্য প্রাথমিক সহিফার বর্ণনাগুলোকে উপেক্ষা করে এবং হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর মুয়াত্তার মতো সংকলনকেও হিসাবের বাইরে রাখে। আবু হুরায়রার লিখন ও স্মৃতিসংক্রান্ত বর্ণনাগুলোতে সংরক্ষণের এই ভিন্ন পদ্ধতিগুলো স্পষ্টভাবে উপস্থিত। [9] [10] [11] [12]

حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، قَالَ حَدَّثَنَا عَمْرٌو، قَالَ أَخْبَرَنِي وَهْبُ بْنُ مُنَبِّهٍ، عَنْ أَخِيهِ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ، يَقُولُ مَا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَحَدٌ أَكْثَرَ حَدِيثًا عَنْهُ مِنِّي، إِلاَّ مَا كَانَ مِنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو فَإِنَّهُ كَانَ يَكْتُبُ وَلاَ أَكْتُبُ. تَابَعَهُ مَعْمَرٌ عَنْ هَمَّامٍ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ.

বাংলা অনুবাদ:
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩/ ইলম বা জ্ঞান
পরিচ্ছেদঃ ৮১। ইলম লিপিবদ্ধ করা
১১৪। আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) …. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীগণের মধ্য আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) ব্যতীত আর কারো কাছে আমার চাইতে বেশী হাদীস নেই। কারণ তিনি লিখে রাখতেন, আর আমি লিখতাম না। মা’মার (রহঃ) হাম্মাম (রহঃ) সূত্রে আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

আবু হুরায়রার আরেকটি বর্ণনায় বহু হাদিস শুনে ভুলে যাওয়ার কথা এবং চাদর মেলে ধরার পরে আর কিছু না ভোলার দাবি রয়েছে। এখানে কোনো সহিফা, লেখক বা লিখিত নথির কথা বলা হয়নি; এটি তাঁর স্মৃতিশক্তি সম্পর্কে একটি বর্ণনা। তাই এই ঘটনাকে হাদিস লিখিত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করলে লিখিত সংরক্ষণ এবং মুখস্থ সংরক্ষণের মধ্যে পার্থক্য মুছে যায়। আবদুল্লাহ ইবন আমরের ক্ষেত্রে লেখার কথা সরাসরি আছে, আর আবু হুরায়রার এই বর্ণনায় আছে স্মৃতির পরিবর্তনের দাবি। সংকলিত হাদিসসাহিত্যে দুই ধরনের বিবরণই স্থান পেয়েছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মুহাম্মদের বক্তব্য পৌঁছানোর ইতিহাসে উভয় পদ্ধতির কথাই বলা হয়েছে। [10] [13]

حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ أَبِي بَكْرٍ أَبُو مُصْعَبٍ، قَالَ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ بْنِ دِينَارٍ، عَنِ ابْنِ أَبِي ذِئْبٍ، عَنْ سَعِيدٍ الْمَقْبُرِيِّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنِّي أَسْمَعُ مِنْكَ حَدِيثًا كَثِيرًا أَنْسَاهُ. قَالَ «ابْسُطْ رِدَاءَكَ» فَبَسَطْتُهُ. قَالَ فَغَرَفَ بِيَدَيْهِ ثُمَّ قَالَ «ضُمَّهُ» فَضَمَمْتُهُ فَمَا نَسِيتُ شَيْئًا بَعْدَهُ.

বাংলা অনুবাদ:
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩/ ইলম বা জ্ঞান
পরিচ্ছেদঃ ৮৪। ইলম মুখস্ত করা
১২০। আবূ মুস‘আব আহমদ ইবনু আবূ বাকর (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার কাছ থেকে বহু হাদীস শুনি কিন্তু ভুলে যাই। তিনি বললেনঃ তোমার চাঁদর খুলে ধর। আমি খুলে ধরলাম। তিনি দু’হাত অঞ্জলী করে তাতে কিছু ঢেলে দেওয়ার মত করে বললেনঃ এটা তোমার বুকের সাথে লাগিয়ে ধর। আমি তা বুকের সাথে লাগালাম। এরপর আমি আর কিছুই ভুলিনি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

আবু হুরায়রা নিজের অধিক হাদিস বর্ণনার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুহাজিরদের বাজারের কাজ, আনসারদের জমিজমার কাজ এবং নিজের মুহাম্মদের সঙ্গে লেগে থাকার কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী অন্যরা যেখানে উপস্থিত থাকতেন না, সেখানে তিনি উপস্থিত থাকতেন এবং অন্যরা যা মুখস্থ করতেন না, তা তিনি মুখস্থ করতেন। একই বর্ণনায় কোরআনের দুটি আয়াতকে জ্ঞান গোপন না করার কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আয়াত দুটি তাঁর বর্ণিত ঘটনাগুলোর বিবরণ দেয় না; তিনি নিজের জানা বক্তব্য প্রচারের বাধ্যবাধকতা ব্যাখ্যা করতে সেগুলো উদ্ধৃত করেছেন। এখানে কোরআনের সাধারণ নির্দেশ এবং মুহাম্মদের সম্পর্কে ব্যক্তির সংরক্ষিত তথ্য একসঙ্গে কাজ করছে, কিন্তু তথ্যগুলো নিজেরা কোরআনের আয়াতের মধ্যে উপস্থিত নয়। [11] [14]

حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ حَدَّثَنِي مَالِكٌ، عَنْ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ الأَعْرَجِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ إِنَّ النَّاسَ يَقُولُونَ أَكْثَرَ أَبُو هُرَيْرَةَ، وَلَوْلاَ آيَتَانِ فِي كِتَابِ اللَّهِ مَا حَدَّثْتُ حَدِيثًا، ثُمَّ يَتْلُو {إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ} إِلَى قَوْلِهِ {الرَّحِيمُ} إِنَّ إِخْوَانَنَا مِنَ الْمُهَاجِرِينَ كَانَ يَشْغَلُهُمُ الصَّفْقُ بِالأَسْوَاقِ، وِإِنَّ إِخْوَانَنَا مِنَ الأَنْصَارِ كَانَ يَشْغَلُهُمُ الْعَمَلُ فِي أَمْوَالِهِمْ، وَإِنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ كَانَ يَلْزَمُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِشِبَعِ بَطْنِهِ وَيَحْضُرُ مَا لاَ يَحْضُرُونَ، وَيَحْفَظُ مَا لاَ يَحْفَظُونَ.

বাংলা অনুবাদ:
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩/ ইলম বা জ্ঞান
পরিচ্ছেদঃ ৮৪। ইলম মুখস্ত করা
১১৯। ‘আবদুল ‘আযীয ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ লোকে বলে, আবূ হুরায়রা (রাঃ) বড় বেশী হাদীস বর্ণনা করে। (জেনে রাখ,) কিতাবে দুটি আয়াত যদি না থাকত, তবে আমি একটি হাদিসও বর্ণনা করতাম না। এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেনঃ
“আমি সেসব স্পষ্ট নিদর্শন ও পথ-নির্দেশ অবতীর্ণ করেছি মানুষের জন্য কিতাবে তা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করার পরও যারা তা গোপন রাখে আল্লাহ তাদেরকে লা‘নত দেন এবং অভিশাপকারিগণও তাদেরকে অভিশাপ দেয় কিন্তু যারা তওবা করে এবং নিজদিগকে সংশোধন আর সত্যকে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে, ওরাই তারা, যাদের প্রতি আমি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা বাকারাঃ ১৫৯-১৬০)
(প্রকৃত ঘটনা এই যে,) আমার মুহাজির ভাইয়েরা বাজারে কেনাবেচায় এবং আমার আনসার ভাইয়েরা জমা-জমির কাজে মশগুল থাকত। আর আবূ হুরায়রা (রাঃ) (খেয়ে না খেয়ে) তুষ্ট থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে লেগে থাকত। তাই তারা যখন উপস্থিত থাকত না, তখন সে উপস্থিত থাকত এবং তারা যা মুখস্থ করত না সে তা মুখস্থ রাখত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

মুহাম্মদের ঘনিষ্ঠ সাহাবি আলীর কাছেও একটি সহিফা থাকার কথা সহিহ বুখারীতে রয়েছে। তিনি কোরআনের পাশাপাশি মুহাম্মদ থেকে পাওয়া এই সহিফার কথা বলেছেন এবং তার কয়েকটি বিধান বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে মদিনার সুরক্ষিত এলাকার সীমা, সেখানে অপরাধ করা বা অপরাধীকে আশ্রয় দেওয়া, মুসলিমের দেওয়া নিরাপত্তা লঙ্ঘন করা এবং ওয়ালার সম্পর্ক পরিবর্তনের বিধান রয়েছে। এই বর্ণনা আলীর কাছে লিখিত উপকরণ থাকার কথা বলে; তিনি নিজ হাতে সেটি লিখেছিলেন কি না, তা উদ্ধৃত বক্তব্যে নির্দিষ্ট করা হয়নি। কোরআনের সঙ্গে আলাদা সহিফার উল্লেখ এবং সহিফার বিধানগুলোর বিবরণ দেখায় যে, ইসলামি বর্ণনাপ্রথায় কোরআনের বাইরের লিখিত নির্দেশও আইনসংক্রান্ত তথ্যের উৎস হিসেবে সংরক্ষিত ছিল। [15] [16]

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنِ الأَعْمَشِ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ التَّيْمِيِّ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَلِيٍّ — رضى الله عنه — قَالَ مَا عِنْدَنَا شَىْءٌ إِلاَّ كِتَابُ اللَّهِ، وَهَذِهِ الصَّحِيفَةُ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم «الْمَدِينَةُ حَرَمٌ، مَا بَيْنَ عَائِرٍ إِلَى كَذَا، مَنْ أَحْدَثَ فِيهَا حَدَثًا، أَوْ آوَى مُحْدِثًا، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلاَئِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ، لاَ يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَلاَ عَدْلٌ». وَقَالَ «ذِمَّةُ الْمُسْلِمِينَ وَاحِدَةٌ، فَمَنْ أَخْفَرَ مُسْلِمًا فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلاَئِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ، لاَ يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَلاَ عَدْلٌ، وَمَنْ تَوَلَّى قَوْمًا بِغَيْرِ إِذْنِ مَوَالِيهِ، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلاَئِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ، لاَ يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَلاَ عَدْلٌ».

বাংলা অনুবাদ:
আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমাদের কাছে আল্লাহর কিতাব এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে পাওয়া এই সহিফা ছাড়া আর কিছু নেই। এতে আছে: “আয়ির থেকে অমুক স্থান পর্যন্ত মদিনা হারাম। যে ব্যক্তি সেখানে কোনো অপরাধ ঘটায় অথবা অপরাধীকে আশ্রয় দেয়, তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সমস্ত মানুষের অভিশাপ। তার কোনো নফল ও ফরজ ইবাদত কবুল করা হবে না।” তিনি আরও বলেন: “মুসলিমদের দেওয়া নিরাপত্তার অঙ্গীকার এক। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দেওয়া নিরাপত্তার অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সমস্ত মানুষের অভিশাপ। তার কোনো নফল ও ফরজ ইবাদত কবুল করা হবে না। আর যে ব্যক্তি নিজের মুক্তিদাতা মনিবদের অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে ওয়ালার সম্পর্ক স্থাপন করে, তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সমস্ত মানুষের অভিশাপ। তার কোনো নফল ও ফরজ ইবাদত কবুল করা হবে না।”

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত বাংলা অনুবাদ:
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২২/ হজ্ব (হাজ্জ)
পরিচ্ছেদঃ ১১৭০. মদীনা হারম হওয়া
১৭৪৯। মুহাম্মদ ইবনু বাশশার (রহঃ) … আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের নিকট আল্লাহর কিতাব এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত এই সহীফা ছাড়া আর কিছুই নাই। তিনি আরো বলেন, ’আয়ির নামক স্থান থেকে অমুক স্থান পর্যন্ত মদিনা হল হারাম। যদি কেউ এতে কুরআন–সুন্নাহর খেলাফ অসঙ্গত কোন কাজ করে অথবা কুরআন-সুন্নাহর খেলাফ, আচরণকারী আশ্রয় দেয়, তাহলে তাঁর উপর আল্লাহর লা’নত এবং সকল ফেরেশতা এবং মানুষের। সে ব্যাক্তির কোন নফল এবং ফরজ ইবাদাত কবুল করা হবে না।
তিনি আরো বলেন, মুসলিম কর্তৃক নিরাপত্তাদানের অধিকার সকলের ক্ষেত্রে সমান। তাই যে ব্যাক্তি কোন মুসলিমের দেওয়া নিরাপত্তাকে লঙ্ঘন করবে, তাঁর প্রতি আল্লাহর লা’নত এবং সকল মানুষের ও ফিরিশতাদের। আর কবুল করা হবে না তাঁদের কোন নফল এবং ফরজ ইবাদাত। যে ব্যাক্তি তাঁর মাওলার (মিত্রের) অনুমতি ব্যতীত অন্য অন্য কাওমের সাথে বন্ধুত্ব করবে, তাঁর প্রতিও আল্লাহর লা’নত এবং সকল ফেরেশতা ও মানুষের। সে ব্যাক্তির কোন নফল এবং ফরজ ইবাদাত কবুল করা হবে না। আবূ ‘আবদুল্লাহ (রহঃ) বলেন, “আদলুন” অর্থ বিনিময়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আলী ইবনু আবী তালিব (রাঃ)

প্রকাশিত বাংলা অনুবাদে “মাওলা”কে “মিত্র” এবং “তাওয়াল্লা”কে সাধারণ বন্ধুত্বের ভাষায় অনুবাদ করায় বিধানটির অর্থ পরিবর্তিত হয়েছে। এখানে ওয়ালা বলতে মুক্তিপ্রাপ্ত দাস এবং তার মুক্তিদাতা মনিবদের সঙ্গে যুক্ত আনুগত্যের সম্পর্ক বোঝানো হয়েছে; আরবি বাক্যটি সেই সম্পর্ক অনুমতি ছাড়া অন্য গোষ্ঠীতে স্থানান্তরের কথা বলছে। একই সহিফার আরেকটি বর্ণনায় দিয়াত, বন্দী মুক্ত করা এবং কাফিরের পরিবর্তে মুসলিমকে হত্যা না করার বিধান এসেছে। সহিফার এসব বিষয় সরাসরি আইনি; অপরাধ, নিরাপত্তা, মুক্তিপ্রাপ্ত দাসের সম্পর্ক, ক্ষতিপূরণ এবং হত্যার বিধান এই লিখিত উপকরণে একত্রে সংরক্ষিত হয়েছে বলে বর্ণিত হচ্ছে। আবু জুহাইফা আলীর কাছে কোরআনের বাইরে কী রয়েছে জানতে চাইলে তিনি কোরআন বোঝার ক্ষমতা এবং এই সহিফার বিষয়বস্তুর কথা বলেছেন। [17] [18]

حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ يُونُسَ، حَدَّثَنَا زُهَيْرٌ، حَدَّثَنَا مُطَرِّفٌ، أَنَّ عَامِرًا، حَدَّثَهُمْ عَنْ أَبِي جُحَيْفَةَ — رضى الله عنه — قَالَ قُلْتُ لِعَلِيٍّ — رضى الله عنه — هَلْ عِنْدَكُمْ شَىْءٌ مِنَ الْوَحْىِ إِلاَّ مَا فِي كِتَابِ اللَّهِ قَالَ وَالَّذِي فَلَقَ الْحَبَّةَ وَبَرَأَ النَّسَمَةَ مَا أَعْلَمُهُ إِلاَّ فَهْمًا يُعْطِيهِ اللَّهُ رَجُلاً فِي الْقُرْآنِ، وَمَا فِي هَذِهِ الصَّحِيفَةِ. قُلْتُ وَمَا فِي الصَّحِيفَةِ قَالَ الْعَقْلُ وَفَكَاكُ الأَسِيرِ، وَأَنْ لاَ يُقْتَلَ مُسْلِمٌ بِكَافِرٍ.

বাংলা অনুবাদ:
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ১৯১২. বন্দীকে মুক্ত করা। এ বিষয়ে আবু মুসা (রাঃ) কর্তৃক নবী (সাঃ) থেকে হাদীস বর্ণিত রয়েছে
২৮৩৩। আহমদ ইবনু ইউনুস (রহঃ) … আবূ জুহাইফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আলী (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম, আল্লাহর কোরআনে যা কিছু আছে তা ছাড়া আপনাদের নিকট ওহীর কোন কিছু আছে কি? তিনি বললেন, না, সে আল্লাহ তা‘আলার কসম! যিনি শস্যদানাকে বিদীর্ন করেন এবং প্রাণী সৃষ্টি করেন। আল্লাহ কুরআন সম্পর্কে মানুষকে যে জ্ঞান দান করেছেন এবং সহীফার মধ্যে যা রয়েছে, এ ছাড়া আমি আর কিছু জানিনা। আমি বললাম, এ সহীফাটিতে কি আছে? তিনি বললেন, ‘দীয়াতের বিধান, বন্দী মুক্তকরণ এবং কোন মুসলিমকে যেন কোন কাফিরের পরিবর্তে হত্যা করা না হয় (এ সম্পর্কিত নির্দেশ)।’
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ জুহাইফাহ (রাঃ)

হাদিসগ্রন্থসমূহের মধ্যে মালিকের মুয়াত্তা প্রাচীনতম ও সবচেয়ে প্রভাবশালী সংকলনগুলোর একটি। একে সমস্ত হাদিসগ্রন্থের সর্বপ্রথম সংকলন বলা ভুল; জারকানীর ভূমিকায় উদ্ধৃত সংকলন-ইতিহাসে মক্কায় ইবন জুরাইজের রচনা, ইয়েমেনে মামারের সংকলন এবং তার পরে মদিনায় মুয়াত্তার কথা রয়েছে। একই বিবরণে ইবন উয়াইনা ও সুফিয়ান সাওরীর গ্রন্থের উল্লেখও আছে। মুয়াত্তার গুরুত্ব তাই একেবারে প্রথম লেখার দাবি দিয়ে নির্ধারিত হয় না; হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীতে বর্ণনা সংগ্রহ, বিষয়ভিত্তিক বিন্যাস এবং শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রন্থ পাঠের যে ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার মধ্যে এটি একটি প্রধান সংকলন। ব্যক্তিগত সহিফা থেকে বৃহৎ গ্রন্থে যাওয়ার এই বিকাশকে পরবর্তী বুখারী বা মুসলিমের সংকলন দিয়ে শুরু হয়েছে বলে দেখানো সংকলন-ইতিহাসের সঙ্গে অসঙ্গত। [19]

وقال أبو طالب المكي في ” القوت ” : هذه الكتب حادثة بعد سنة عشرين أو ثلاثين ومائة ، ويقال أول ما صنف كتاب ابن جريج بمكة في الآثار وحروف من التفاسير ، ثم كتاب معمر باليمن جمع فيه سننا منثورة مبوبة ، ثم ” الموطأ ” بالمدينة ، ثم ابن عيينة ” الجامع ” ، والتفسير في أحرف من علم القرآن وفي الأحاديث المتفرقة ، و ” جامع ” سفيان الثوري صنفه أيضا في هذه المدة وقيل : إنها صنفت سنة ستين ومائة ، انتهى .

বাংলা অনুবাদ:
আবু তালিব মাক্কী “আল-কূত” গ্রন্থে বলেছেন: এসব গ্রন্থ একশ বিশ বা একশ ত্রিশ হিজরির পরে রচিত হয়েছে। বলা হয়, প্রথম সংকলিত হয়েছিল মক্কায় ইবন জুরাইজের গ্রন্থ, যাতে ছিল আসার এবং তাফসিরের কিছু বিষয়। তারপর ইয়েমেনে মামারের গ্রন্থ, যাতে তিনি বিচ্ছিন্নভাবে থাকা সুন্নাহগুলো বিষয়ভিত্তিক পরিচ্ছেদে একত্র করেন। তারপর মদিনায় “আল-মুয়াত্তা”; তারপর ইবন উয়াইনার “আল-জামি” এবং কোরআনবিষয়ক কিছু জ্ঞান ও বিভিন্ন হাদিস নিয়ে তাফসির। সুফিয়ান সাওরীর “আল-জামি”ও এই সময়ে সংকলিত হয়েছিল। আবার বলা হয়েছে, এগুলো একশ ষাট হিজরিতে সংকলিত হয়। উদ্ধৃতি শেষ।

মালিকের জন্মের বহুল প্রচলিত সাল ৯৩ হিজরি বা ৭১১ খ্রিস্টাব্দ এবং মৃত্যুর সাল ১৭৯ হিজরি বা ৭৯৫ খ্রিস্টাব্দ। জারকানীর ভূমিকায় জন্মের অন্য সালও উল্লেখ আছে; মৃত্যুর তারিখ হিসেবে রবিউল আউয়ালের দশ বা চৌদ্দ তারিখের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। তাঁর একলক্ষ হাদিস থেকে বাছাই করার কথাও সংকলন ও জীবনীসংক্রান্ত বর্ণনায় পাওয়া যায়। মুয়াত্তার জন্য দেওয়া প্রায় একহাজার নয়শ বর্ণনার হিসাব সব বর্ণনাসংস্করণের অভিন্ন সংখ্যা প্রকাশ করে না। জারকানী এক জায়গায় দশহাজার থেকে পাঁচশ, আরেক জায়গায় নয়হাজার থেকে সাতশ এবং অন্য বিবরণে চারহাজারের বেশি থেকে একহাজারের কিছু বেশি হওয়ার কথা উদ্ধৃত করেছেন। আবু বকর আবহারীর হিসাবে মোট ১৭২০টি বর্ণনার মধ্যে নববী বর্ণনা ছাড়াও সাহাবি ও তাবিঈদের বক্তব্য রয়েছে। এই সংখ্যাগুলো একই গণনাপদ্ধতিতে তৈরি একক পরিসংখ্যান নয়। [20]

قال القاضي أبو بكر بن العربي في شرح الترمذي : الموطأ هو الأصل الأول ، و ” اللباب ” و ” البخاري ” الأصل الثاني في هذا الباب ، وعليها بنى الجميع كمسلم والترمذي . قال : وذكر ابن الهياب أن مالكا روى مائة ألف حديث جمع منها الموطأ عشرة آلاف ، ثم لم يزل يعرضها على الكتاب والسنة ويختبرها بالآثار والأخبار حتى رجعت إلى خمسمائة . وقال إلكيا الهراسي : موطأ مالك كان تسعة آلاف حديث ثم لم يزل ينتقي حتى رجع إلى سبعمائة . وفي ” المدارك ” عن سليمان بن بلال : ألف مالك الموطأ وفيه أربعة آلاف حديث أو أكثر ، ومات وهي ألف حديث ونيف ، يخلصها عاما عاما بقدر ما يرى أنه أصلح للمسلمين وأمثل في الدين . وقال أبو بكر الأبهري : جملة ما في الموطأ من الآثار عن النبي صلى الله عليه وسلم وعن الصحابة والتابعين ألف وسبعمائة وعشرون حديثا ، المسند منها ستمائة حديث ، والمرسل مائتان واثنان وعشرون حديثا ، والموقوف ستمائة وثلاثة عشر . ومن قول التابعين مائتان وخمسة وثمانون . وقال الغافقي : ” مسند الموطأ ” ستمائة حديث وستة وستون حديثا .

বাংলা অনুবাদ:
কাজি আবু বকর ইবনুল আরাবী তিরমিজীর ভাষ্যে বলেছেন: মুয়াত্তা প্রথম ভিত্তি; আর এই বিষয়ে “আল-লুবাব” ও “আল-বুখারী” দ্বিতীয় ভিত্তি। মুসলিম ও তিরমিজীর মতো সবাই এগুলোর ওপর ভিত্তি করে রচনা করেছেন। তিনি বলেন: ইবনুল হিয়াব উল্লেখ করেছেন, মালিক একলক্ষ হাদিস বর্ণনা করেছিলেন; সেগুলো থেকে মুয়াত্তায় দশহাজার একত্র করেন। এরপর তিনি সেগুলো কিতাব ও সুন্নাহর সঙ্গে মিলিয়ে এবং আসার ও বর্ণনার সাহায্যে পরীক্ষা করতে থাকেন, যতক্ষণ না সেগুলো পাঁচশতে নেমে আসে। ইলকিয়া হাররাসী বলেছেন: মালিকের মুয়াত্তায় নয়হাজার হাদিস ছিল; তিনি বাছাই করতে করতে তা সাতশতে নামিয়ে আনেন। “আল-মাদারিক”-এ সুলায়মান ইবন বিলাল থেকে আছে: মালিক মুয়াত্তা সংকলন করেন, তখন তাতে চারহাজার বা তারও বেশি হাদিস ছিল। মৃত্যুর সময়ে তাতে একহাজারের কিছু বেশি ছিল; মুসলিমদের জন্য অধিক উপযোগী এবং ধর্মের জন্য উত্তম মনে করে তিনি বছর বছর তা বাছাই করতেন। আবু বকর আবহারী বলেছেন: মুয়াত্তায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবি ও তাবিঈদের থেকে আসা বর্ণনা মোট একহাজার সাতশ বিশটি। এর মধ্যে মুসনাদ ছয়শ, মুরসাল দুইশ বাইশ, মাওকুফ ছয়শ তেরো এবং তাবিঈদের বক্তব্য দুইশ পঁচাশি। গাফিকী বলেছেন: “মুসনাদ আল-মুয়াত্তা”য় ছয়শ ছেষট্টিটি হাদিস রয়েছে।

মুয়াত্তা হাদিসশাস্ত্র অধ্যয়নে মুসলিম মনীষীদের প্রধান আকর্ষণগুলোর একটি হয়ে ওঠে এবং বর্ণনা সংগ্রহ ও গ্রন্থ পাঠের ধারায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়। এর আগে আবু হানিফার দেশ-দেশান্তরে সফর করে হাদিস সংগ্রহ এবং চল্লিশহাজার থেকে আহকামের বর্ণনা বাছাইয়ের বিবরণও তাঁর জীবনীসংক্রান্ত আলোচনায় উল্লেখিত হয়েছে। “ইমাম ইবনে মাজাহ আওর ইলমে হাদীস”-এ সদরুল আইম্মা মুয়াফফাক বিন আহমদের “মানাকিবুল ইমামিল আযম”-এর সূত্রে উদ্ধৃত বক্তব্যটি হলো: “ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ৪০ হাজার হাদীস থেকে বাছাই করে কিতাবুল আছার লিখেছেন।” চল্লিশহাজারের এই সংখ্যা তাঁর সংগ্রহ ও বাছাই সম্পর্কে জীবনীমূলক একটি দাবি হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছে। “কিতাবুল আছার” নামে প্রচলিত সংকলনগুলো তাঁর ছাত্র আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ ইবন হাসান শায়বানীর সূত্রে সংরক্ষিত। ব্যক্তিগত সংগ্রহ, শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষার্থীর বর্ণনা গ্রহণ এবং পরবর্তী সংকলন—এই ধাপগুলো হাদিসগ্রন্থের ইতিহাসে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। [21]

এই সংকলনধারার পরবর্তী বিকাশে শাফেয়ীর “কিতাবুল উম্ম” এবং আহমদ ইবন হাম্বলের “মুসনাদ” গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে স্থান পায়। “আল-উম্ম” একটি ফিকহগ্রন্থ, যেখানে হাদিসও আইনসংক্রান্ত আলোচনার উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে; “মুসনাদ” নববী বর্ণনার বৃহৎ সংকলন। হিজরি তৃতীয় শতাব্দীতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বর্ণনা সংগ্রহ ও সংকলনের ধারায় বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজী, নাসাঈ এবং ইবন মাজাহর গ্রন্থগুলো বিশেষ পরিচিতি পায়। তাঁদের সংকলন যথাক্রমে সহিহ বুখারী, সহিহ মুসলিম, সুনান আবু দাউদ, জামি বা সুনান আত-তিরমিজী, সুনান নাসাঈ এবং সুনান ইবন মাজাহ। এই ছয়টি গ্রন্থকে কুতুবুস সিত্তাহ বলা হয়; “সিহাহ সিত্তাহ” নামও প্রচলিত। শেষোক্ত নামকে আক্ষরিকভাবে ছয়টি গ্রন্থের প্রত্যেক বর্ণনার বিশুদ্ধতার ঘোষণা হিসেবে ব্যবহার করা ভুল। বুখারী ও মুসলিমের সঙ্গে সুনানগ্রন্থগুলোর সংকলনপদ্ধতি ও বর্ণনার মান এক নয়; সুনানগ্রন্থে সহিহ, হাসান ও দুর্বল বর্ণনাও রয়েছে। ইরাকীও সমস্ত সুনানগ্রন্থকে “সহিহ” বলাকে স্পষ্ট শিথিলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। [22]

أي ومن أطلق الصحيح على كتب السنن ، فقد تساهل ، كأبي طاهر السلفي حيث قال في الكتب الخمسة: اتفق على صحتها علماء المشرق والمغرب وكأبي عبد الله الحاكم حيث أطلق على الترمذي الجامع الصحيح ، وكذلك الخطيب أطلق عليه ، وعلى النسائي اسم الصحيح.

বাংলা অনুবাদ:
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি সুনানগ্রন্থগুলোকে “সহিহ” বলেছে, সে শিথিলতা করেছে। যেমন আবু তাহির সিলাফী পাঁচটি গ্রন্থ সম্পর্কে বলেছেন: পূর্ব ও পশ্চিমের আলেমরা এগুলোর সহিহ হওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন। একইভাবে আবু আবদুল্লাহ হাকিম তিরমিজীর গ্রন্থকে “আল-জামি আস-সহিহ” বলেছেন। খতিবও তিরমিজী এবং নাসাঈর গ্রন্থের জন্য “সহিহ” নাম ব্যবহার করেছেন।

আব্বাসীয় যুগে প্রধান হাদিসসংকলনগুলোর বিকাশ ঘটে; হাদিস লিপিবদ্ধ করার সমস্ত কাজ তখনই পরিসমাপ্ত হয়েছিল—এই দাবি ভুল। বৃহৎ সংকলনের পরে আরও সংকলন, বিদ্যমান গ্রন্থের বর্ণনা প্রচার, ব্যাখ্যা, পুনর্বিন্যাস এবং বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে রচনা চলতে থাকে। ব্যক্তিগত সহিফা থেকে বিষয়ভিত্তিক গ্রন্থ, মুসনাদ ও সুনান পর্যন্ত এই ধারায় মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত বক্তব্য সংগ্রহ, নির্বাচন ও বিন্যাস করেছেন মানুষ। প্রাথমিক লিখন থাকার বিবরণ সেই নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে বিলুপ্ত করে না। আলীর সহিফার বিষয়বস্তু থেকে মুয়াত্তা ও সুনানগ্রন্থের আহকাম পর্যন্ত কোরআনের বাইরে সংরক্ষিত বর্ণনা আইনসংক্রান্ত তথ্য বহন করেছে। ফলে হাদিসগ্রন্থ বাদ দিলে শুধু কিছু ঐতিহাসিক গল্প বাদ পড়ে না; প্রচলিত শরীয়তের বহু বিধান, শর্ত, ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের তথ্যসূত্রই বাদ পড়ে। কোরআনের পাঠ তখনও থাকে, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত এই নির্দিষ্ট আইনব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিষয়বস্তু কোরআনের আয়াতের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়ে যায় না।


সহিহ/হাসান/জইফ/জাল হাদিস

সহিহ, হাসান, জইফ ও জাল—এই নামগুলো হাদিসের বর্ণনাসূত্র ও বিষয়বস্তু বিচার করে দেওয়া শ্রেণিবিন্যাস। সহিহ হওয়ার প্রচলিত শর্ত হলো সনদের সংযোগ, বর্ণনাকারীদের বিশ্বস্ততা ও যথাযথ সংরক্ষণক্ষমতা, শায বর্ণনা না হওয়া এবং গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করে এমন গোপন ত্রুটি না থাকা। নববীর সংজ্ঞায় “শুযূয” ও “ইল্লাত” বর্ণনার সমস্যা; এগুলোকে শুধু বিরল বা ত্রুটিপূর্ণ বর্ণনাকারীর উপস্থিতি হিসেবে অনুবাদ করলে সংজ্ঞার অর্থ বদলে যায়। বর্ণনাকারী কতজন এবং তাঁদের বর্ণনা কতটা গ্রহণযোগ্য—এগুলোও আলাদা বিচার। প্রথমটির ভিত্তিতে মুতাওয়াতির ও আহাদ, দ্বিতীয়টির ভিত্তিতে সহিহ, হাসান ও দুর্বল বর্ণনার শ্রেণি নির্ধারিত হয়। মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীমের গ্রন্থে সংযোগ, বর্ণনাকারীর গুণ এবং বর্ণনাকারীর সংখ্যার এই বিভাগগুলো একসঙ্গে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। [23]

৫। যেসব হাদীসের সনদের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয় নাই, মাঝখানের কোন বর্ণনাকারী যদি উহ্য বা লুপ্ত হইয়া থাকে, তবে তাহাকে ‘হাদীসে মুনকাতা حدیث منقطع বলা হয়।৫০
হাদীস বর্ণনাকারীদের নিজস্ব গুণ-পার্থক্যের দৃষ্টিতেও হাদীসের কতকগুলি বিভাগ হইয়া থাকে এবং উহাদের প্রত্যেকটিরই এক-একটি পারিভাষিক নাম দেওয়া হয়। যথাঃ
১। যে হাদীসের বর্ণনাসূত্র ধারাবাহিক রহিয়াছে, সনদের প্রত্যেক স্তরের বর্ণনাকারীর নাম সঠিকরূপে উল্লিখিত হইয়াছে, বর্ণনাকারিগণ সর্বতোভাবে বিশ্বস্ত- সিকাহ, যাঁহাদের স্মরণ শক্তি অত্যন্ত প্রখর এবং যাঁহাদের সংখ্যা কোন স্তরেই মাত্র একজন হয় নাই, এইরূপ হাদীসকে পরিভাষায় ‘হাদীসে সহীহ’ )حدیث صحیح( বলা হয়।
ইমাম নববী লিখিয়াছেনঃ
الصَّحِيحُ فَهُوَ مَا اتَّصَلَ سَنَدُهُ بِالْعُدُولِ الضَّابِطِينَ مِنْ غَيْرِ شُذُوذٍ وَلَا عِلَّةٍ
যে হাদীসের সনদ নির্ভরযোগ্য ও সঠিকরূপে সংরক্ষণকারী বর্ণনাকারীদের সংযোজনে পরম্পরাপূর্ণ ও যাহাতে বিরল ও ত্রুটিযুক্ত বর্ণনাকারী একজনও নাই, তাহাই ‘হাদীসে সহীহ’। ৫১
২। উপরিউক্ত সকল গুণ বর্তমান থাকার পর বর্ণনাকারীদের স্মরণ-শক্তি যদি কিছুটা দুর্বল প্রমাণিত হয়, তবে সেই হাদীসের পারিভাষিক নাম ‘হাদীসে হাসান’
ا ( حديث حسن )
ইহার সংজ্ঞাদান প্রসঙ্গে ইমাম নববী লিখিয়াছেনঃ
الْحَسَنُ مَا عُرِفَ مَخْرَجُهُ وَاشْتَهَرَ رِجَالُهُ
যে হাদীসের উৎস সর্বজনজ্ঞাত ও যাহার বর্ণনাকারীগণ প্রখ্যাত, তাহাই হাদীসে হাসান। ৫২
৩। উপরিউক্ত সবরকমের গুণই যদি বর্ণনাকারিদের মধ্যে কম মাত্রায় পাওয়া যায়, তবে তাহাদের বর্ণিত হাদীসকে ‘হাদীসে যয়ীফ’ حديث ضعيف বলা হয়। ৫০
ইমাম নববী বলিয়াছেনঃ
الضَّعِيفُ فَهُوَ مَا لَمْ يُوجَدُ فِيهِ شُروط الصحة وَلَا شُرُوطُ الْحَسَنِ

যাহাতে সহীহ্ ও হাসান হাদীসের শর্তসমূহ পাওয়া যায় না তাহাই ‘যয়ীফ হাদীস’। ৫৪
বর্ণনাকারীদের সংখ্যাভিত্তিক হাদীস বিভাগ
হাদীসের বর্ণনাকারীদের সংখ্যা সকল ক্ষেত্রে একই রূপ হয় নাই। বিভিন্ন হাদীসের বর্ণনাকারীদের সংখ্যা বিভিন্ন হইয়াছে। এই দিক দিয়া হাদীসের কয়েকটি বিভাগ এবং প্রত্যেকটি বিভাগের এক একটি পারিভাষিক নাম রহিয়াছে। এইখানে এই বিভাগগুলির সংক্ষিপ্ত বিবরণ উল্লেখ করা যাইতেছে।
১। মুতাওয়াতির (متواتر) যে হাদীসের সনদের সকল স্তরেই বর্ণনাকারীদের সংখ্যা এত বেশী যে, তাঁহাদের সকলের একত্রিত হইয়া মিথ্যা কথা রচনা বা বলা স্বভাবতই অসম্ভব বলিয়া মনে হয়, এইরূপ হাদীসকে ‘হাদীসে মুতাওয়াতির’ বলা হয়। যেমন হাদীস انما الا عمال بالنيات সকল আমলের মূল্যায়ন নিয়ত অনুযায়ীই হয়। এই হাদীসটি সাত শতেরও অধিক সনদসূত্রে বর্ণিত হইয়াছে। ৫৫
২। খবরে ওয়াহিদ (خبر واحد) যে হাদীসের বর্ণনাকারীদের সংখ্যা ও সনদ ‘মুতাওয়াতির’ হাদীস অপেক্ষা কিছুটা কম, তাহা ‘খবরে ওয়াহিদ’। এই ধরনের হাদীস তিন প্রকারের হইয়া থাকেঃ
ক. সাহাবীদের পরবর্তী স্তরসমূহের কোন স্তরে বর্ণনাকারীদের সংখ্যা যদি তিনজন হইতে কম না হয়, তবে তাহা ‘হাদীসে মশহুর’ )حدیث مشهور(
খ. কোন স্তরেই যদি বর্ণনাকারীদের সংখ্যা দুইজনের কম না হয়, তবে তাহা ‘হাদীসে আযীয )حديث عزیز(
গ. কোন স্তরে যদি বর্ণনাকারীদের সংখ্যা মাত্র একজন হয়, তবে সেই হাদীস ‘হাদীসে গরীব’ )حدیث غریب( নামে পরিচিত।

হাদিস
হাদিস

উদ্ধৃত গ্রন্থের “যাঁহাদের সংখ্যা কোন স্তরেই মাত্র একজন হয় নাই” বাক্যটিকে সহিহ হাদিসের বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে গ্রহণ করা ভুল। একটি হাদিস সনদের কোনো স্তরে একজন বর্ণনাকারীর মাধ্যমে এসেও সহিহ হতে পারে; বর্ণনাকারীর সংখ্যা দিয়ে দেওয়া “গরিব” শ্রেণি এবং গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে দেওয়া “সহিহ” শ্রেণি তাই একই সঙ্গে প্রযোজ্য হতে পারে। নববীর সহিহের সংজ্ঞায় প্রত্যেক স্তরে একাধিক বর্ণনাকারী থাকার শর্ত নেই। তিনি সহিহের বিভিন্ন স্তর আলোচনা করতে গিয়ে নিশ্চিত জ্ঞান এবং সম্ভাবনাভিত্তিক গ্রহণযোগ্যতার পার্থক্যও উল্লেখ করেছেন। তাঁর উদ্ধৃত আলোচনায় বুখারী বা মুসলিমের কোনো বর্ণনা গ্রহণ করা হয়েছে বলেই সেটিকে সকলের কাছে সংশয়াতীত সত্য ধরে নেওয়া হয়নি; মুতাওয়াতির না হলে তা সম্ভাবনাভিত্তিক জ্ঞান দেয়—এই মতও স্পষ্টভাবে রয়েছে। [24]

الخامسة: الصحيح أقسام: أعلاها ما اتفق عليه البخاري ومسلم، ثم ما انفرد به البخاري، ثم مسلم، ثم ما على شرطهما، ثم على شرط البخاري، ثم مسلم، ثم صحيح عند غيرهما، وإذا قالوا صحيح متفق عليه أو على صحته فمرادهم اتفاق الشيخين، وذكر الشيخ تقي الدين أن ما روياه أو أحدهما فهو مقطوع بصحته والعلم القطعي حاصل فيه، وخالفه المحققون والأكثرون، فقالوا: يفيد الظن ما لم يتواتر، والله أعلم.

বাংলা অনুবাদ:
পঞ্চম আলোচনা: সহিহের কয়েকটি বিভাগ রয়েছে। সর্বোচ্চ হলো যে বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম একমত হয়েছেন; তারপর যা শুধু বুখারী বর্ণনা করেছেন; তারপর শুধু মুসলিম; তারপর উভয়ের শর্ত অনুযায়ী সহিহ; তারপর বুখারীর শর্ত অনুযায়ী; তারপর মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী; তারপর অন্যদের কাছে সহিহ। “সহিহ, যার বিষয়ে একমত” অথবা “এর সহিহ হওয়ার বিষয়ে একমত” বলা হলে তাঁদের উদ্দেশ্য দুই শায়খের ঐকমত্য। শায়খ তকি উদ্দীন উল্লেখ করেছেন, তাঁরা উভয়ে অথবা তাঁদের একজন যা বর্ণনা করেছেন, তার সহিহ হওয়া নিশ্চিত এবং তা থেকে নিশ্চিত জ্ঞান অর্জিত হয়। গবেষক ও অধিকাংশ আলেম তাঁর বিরোধিতা করে বলেছেন: মুতাওয়াতির না হলে তা সম্ভাবনাভিত্তিক জ্ঞান দেয়। আল্লাহই ভালো জানেন।

হাসান বর্ণনার ক্ষেত্রে শুধু বর্ণনাকারী পরিচিত হলেই যথেষ্ট নয়; তাঁর গ্রহণযোগ্যতা, সংরক্ষণক্ষমতা, সনদের অবস্থা এবং বর্ণনার ত্রুটিও বিচার করা হয়। উদ্ধৃত বাংলা গ্রন্থে “যে হাদীসের উৎস সর্বজনজ্ঞাত ও যাহার বর্ণনাকারীগণ প্রখ্যাত” সংজ্ঞাটি নববীর নামে এসেছে। নববী নিজের গ্রন্থে এই বক্তব্যটি খাত্তাবীর বক্তব্য হিসেবে উদ্ধৃত করেছেন এবং তার পরে আরও বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর আলোচনায় একদিকে এমন বর্ণনা আছে, যা অন্য বর্ণনাসূত্রের সমর্থন পায়; অন্যদিকে এমন বর্ণনাকারীর কথা আছে, যিনি সত্যবাদিতা ও আমানতদারির জন্য পরিচিত হলেও সংরক্ষণ ও নির্ভুলতার ক্ষেত্রে সহিহের পর্যায়ে পৌঁছাননি। ফলে “হাসান” শুধু জনপ্রিয়তা বা পরিচিতির নাম নয়; এটি বর্ণনা গ্রহণের একটি নির্দিষ্ট মূল্যায়ন। [25]

قال الخطابي رحمه الله: هو ما عرف مخرجه واشتهر رجاله، وعليه مدار أكثر الحديث، ويقبله أكثر العلماء، ويستعمله عامة الفقهاء. قال الشيخ: هو قسمان أحدهما لا يخلو إسناده من مستور لم تتحقق أهليته وليس مغفلا كثير الخطأ ولا ظهر منه سبب مفسق، ويكون متن الحديث معروفا برواية مثله أو نحوه من وجه آخر. الثاني أن يكون راويه مشهورا بالصدق والأمانة ولم يبلغ درجة الصحيح لقصوره في الحفظ والإتقان، وهو مرتفع عن حال من يعد تفرده منكرا ثم الحسن كالصحيح في الاحتجاج به وإن كان دونه في القوة؛ ولهذا أدرجته طائفة في نوع الصحيح، والله أعلم.

বাংলা অনুবাদ:
খাত্তাবী বলেছেন: এটি সেই বর্ণনা, যার উৎস জানা এবং বর্ণনাকারীরা পরিচিত। অধিকাংশ হাদিসের ব্যবহার এর ওপর নির্ভর করে; অধিকাংশ আলেম তা গ্রহণ করেন এবং সাধারণভাবে ফকিহরা তা ব্যবহার করেন। শায়খ বলেছেন: এটি দুই প্রকার। প্রথমটির সনদে এমন একজন অপ্রকাশিত অবস্থার বর্ণনাকারী থাকে, যার যোগ্যতা সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি; কিন্তু তিনি অসতর্ক ও অধিক ভুলকারী নন এবং তাঁর মধ্যে নৈতিক অযোগ্যতার কোনো কারণও প্রকাশ পায়নি। বর্ণনাটির বিষয়বস্তু অন্য কোনো সূত্রে একই বা অনুরূপভাবে বর্ণিত হওয়ার মাধ্যমে পরিচিত থাকে। দ্বিতীয়টির বর্ণনাকারী সত্যবাদিতা ও আমানতদারির জন্য পরিচিত, কিন্তু সংরক্ষণ ও নির্ভুলতায় ঘাটতির কারণে সহিহের স্তরে পৌঁছাননি; তাঁর অবস্থা এমন ব্যক্তির চেয়ে উন্নত, যার একক বর্ণনাকে মুনকার গণ্য করা হয়। দলিল হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে হাসান সহিহের মতো, যদিও শক্তিতে তার নিচে; এ কারণে একটি দল একে সহিহের প্রকারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছে। আল্লাহই ভালো জানেন।

জইফ হওয়ার অর্থ বর্ণনাকারীদের সব গুণ একসঙ্গে কম পাওয়া নয়; গ্রহণযোগ্যতার প্রয়োজনীয় কোনো শর্ত অনুপস্থিত থাকলেও একটি বর্ণনা জইফ হতে পারে। সনদের বিচ্ছিন্নতা, বর্ণনাকারীর অজ্ঞাত পরিচয়, সংরক্ষণে দুর্বলতা অথবা বর্ণনার অন্য ত্রুটি—দুর্বলতার কারণ একরকম নয়। জাল বা মাওদু বর্ণনার ক্ষেত্রে দাবি আরও নির্দিষ্ট: বক্তব্যটি বানিয়ে কারও নামে আরোপ করা হয়েছে। তাই কোনো সনদ গ্রহণযোগ্য প্রমাণিত না হওয়া এবং বক্তব্যটি জাল প্রমাণিত হওয়া এক সিদ্ধান্ত নয়। নববী মাওদুর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বানানো বর্ণনা শনাক্ত করার লক্ষণ উল্লেখ করেছেন; একই সঙ্গে ইবনুল জাওযীর মাওদু-সংকলনে এমন বহু বর্ণনা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সমালোচনা করেছেন, যেগুলোর জাল হওয়ার প্রমাণ নেই, বরং সেগুলো দুর্বল। [26]

هو المختلق المصنوع وشر الضعيف، ويحرم روايته مع العلم به في أي معنى كان إلا مبينا، ويعرف الوضع بإقرار واضعه أو معنى إقراره، أو قرينة في الراوي أو المروي، فقد وضعت أحاديث يشهد بوضعها ركاكة لفظها ومعانيها، وقد أكثر جامع الموضوعات في نحو مجلدين، أعني أبا الفرج بن الجوزي، فذكر كثيرا مما لا دليل على وضعه، بل هو ضعيف.

বাংলা অনুবাদ:
এটি বানানো ও তৈরি করা বর্ণনা এবং দুর্বল বর্ণনার সবচেয়ে নিকৃষ্ট ধরন। এটি জাল বলে জানা থাকলে, যে বিষয়েই হোক, তার জাল হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট না করে বর্ণনা করা নিষিদ্ধ। রচয়িতার স্বীকারোক্তি, স্বীকারোক্তির সমতুল্য বক্তব্য অথবা বর্ণনাকারী কিংবা বর্ণিত বক্তব্যের কোনো লক্ষণ দিয়ে জাল হওয়া শনাক্ত করা হয়। এমন হাদিসও বানানো হয়েছে, যার ভাষা ও অর্থের অসংগতি তার জাল হওয়ার সাক্ষ্য দেয়। প্রায় দুই খণ্ডে মাওদু বর্ণনা সংকলনকারী—অর্থাৎ আবু ফারাজ ইবনুল জাওযী—এ বিষয়ে অতিরিক্ত অন্তর্ভুক্তি করেছেন; এমন বহু বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, যেগুলোর জাল হওয়ার প্রমাণ নেই, বরং সেগুলো দুর্বল।

বর্ণনাকারীর সংখ্যাভিত্তিক বিভাগেও প্রতিটি স্তরের অবস্থা আলাদাভাবে বিবেচিত হয়। মুতাওয়াতির হওয়ার জন্য শুধু পরবর্তী সময়ে বহু সনদ তৈরি হওয়া যথেষ্ট নয়; বর্ণনাপ্রবাহের শুরু থেকে প্রয়োজনীয় সংখ্যাধিক্যের শর্ত বজায় থাকতে হয়। মশহুর, আযীয ও গরিবের ক্ষেত্রে সনদের সবচেয়ে কম বর্ণনাকারীযুক্ত স্তর গুরুত্বপূর্ণ: মুতাওয়াতিরের শর্ত পূরণ না করে অন্তত তিনজনের স্তর মশহুর, সর্বনিম্ন দুইজনের স্তর আযীয এবং কোনো স্তরে একক বর্ণনাকারী থাকলে গরিব হিসেবে চিহ্নিত হয়। “ইন্নামাল আমালু বিন নিয়্যাত”কে মুতাওয়াতিরের উদাহরণ হিসেবে দেওয়া তাই ভুল। ইবন রজব বর্ণনাটির প্রাথমিক একক ধারাটি স্পষ্ট করেছেন; সাতশ বর্ণনাকারীর কথাটি এসেছে পরবর্তী পর্যায়ে ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ থেকে বর্ণনা করার প্রসঙ্গে। পরবর্তী সংখ্যাধিক্য প্রাথমিক একক ধারাকে বহুসূত্রে পরিণত করে না। [27]

هذا الحديث تفرد بروايته يحيى بن سعيد الأنصاري ، عن محمد بن إبراهيم التيمي ، عن علقمة بن أبي وقاص الليثي ، عن عمر بن الخطاب رضي الله عنه ، وليس له طريق تصح غير هذا الطريق ، كذا قال علي بن المديني وغيره . وقال الخطابي : لا أعلم خلافا بين أهل الحديث في ذلك ، مع أنه قد روي من حديث أبي سعيد وغيره ، وقد قيل إنه قد روي من طرق كثيرة ، لكن لا يصح من ذلك شيء عند الحفاظ . ثم رواه عن الأنصاري الخلق الكثير والجم الغفير ، فقيل : رواه عنه أكثر من مائتي راو ، وقيل : رواه عنه سبعمائة راو ، ومن أعيانهم : مالك ، والثوري ، والأوزاعي ، وابن المبارك ، والليث بن سعد وحماد بن زيد ، وشعبة ، وابن عيينة ، وغيرهم .

বাংলা অনুবাদ:
এই হাদিসটি ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ আনসারী এককভাবে বর্ণনা করেছেন মুহাম্মদ ইবন ইবরাহিম তাইমী থেকে, তিনি আলকামা ইবন আবি ওয়াক্কাস লাইসী থেকে, তিনি উমর ইবন খাত্তাব থেকে। এই সূত্র ছাড়া এর অন্য কোনো সহিহ সূত্র নেই—আলী ইবন মাদিনী ও অন্যরা এ কথা বলেছেন। খাত্তাবী বলেছেন: এই বিষয়ে হাদিসবিশারদদের কোনো মতভেদ আমার জানা নেই। যদিও আবু সাঈদ ও অন্যদের সূত্রেও এটি বর্ণিত হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে বহু সূত্রে এসেছে, হাফেজদের কাছে সেগুলোর কোনোটি সহিহ নয়। এরপর আনসারী থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ এটি বর্ণনা করেছেন। বলা হয়েছে, তাঁর কাছ থেকে দুইশর বেশি বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন; আবার বলা হয়েছে, সাতশ বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন। তাঁদের প্রধানদের মধ্যে মালিক, সাওরী, আওযাঈ, ইবনুল মুবারক, লাইস ইবন সাআদ, হাম্মাদ ইবন যায়দ, শুবা, ইবন উয়াইনা ও অন্যরা রয়েছেন।

সহিহ–জইফের মূল্যায়ন এবং মুতাওয়াতির–আহাদের বিভাগ একই প্রশ্নের উত্তর দেয় না। একটি বর্ণনা আহাদ হয়েও হাদিসশাস্ত্রের বিচারে সহিহ হতে পারে; আবার বহু সূত্রের দাবি থাকলেও প্রতিটি সূত্রের গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষা করতে হয়। একই পুরোনো সূত্রের বহু পরবর্তী পুনরাবৃত্তি স্বাধীন সাক্ষ্য হয়ে যায় না। এই শ্রেণিবিন্যাস হাদিস যাচাইয়ের অভ্যন্তরীণ পদ্ধতি; ইতিহাসের প্রতিটি ঘটনার সত্যতা বা কোনো বিধানের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতার সর্বজনীন মাপকাঠি নয়। কোরআনের আয়াত এসব বর্ণনার পৃথক সনদ, বর্ণনাকারীর গুণ কিংবা শ্রেণি নির্ধারণ করে দেয় না। প্রচলিত শরীয়তের জন্য কোন বর্ণনা গ্রহণ করা হবে এবং তার মাধ্যমে আয়াতের কোন ব্যাখ্যা বা প্রয়োগ প্রতিষ্ঠিত হবে, সেই সিদ্ধান্তে মানুষের সংকলন ও মূল্যায়ন অপরিহার্য ভূমিকা রাখে।


সিহাহ সিত্তাহ হাদিস সংগ্রহের শর্তাবলী

ছয়টি প্রখ্যাত হাদিসগ্রন্থের সংকলকেরা একই উদ্দেশ্যে, একই বিন্যাসে এবং একই মানের সমস্ত বর্ণনা সংগ্রহ করেননি। সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমের মূল সংকলনের শর্ত এবং সুনান বা জামি গ্রন্থগুলোর সংকলনপদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। “সিহাহ সিত্তাহ” নাম প্রচলিত হলেও এই নামের সাহায্যে ছয়টি গ্রন্থের প্রত্যেক বর্ণনাকে একই মানের সহিহ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সংকলকের নিজস্ব বক্তব্য, তাঁর গ্রন্থে বাস্তবে অন্তর্ভুক্ত বর্ণনা এবং পরবর্তী গবেষকের সেই গ্রন্থ পরীক্ষা করে নির্ণয় করা শর্ত—এই তিন ধরনের তথ্যও এক নয়। মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম বুখারী, মুসলিম, নাসাঈ, আবু দাউদ, তিরমিজী ও ইবন মাজাহর সংকলনশর্তের একটি বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন, যার মধ্যে বর্ণনাকারীর পরিচয়, সংযোগ, সাক্ষাৎ, সংরক্ষণ এবং বর্ণনার ব্যবহারসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় এসেছে। [28]

সিহাহ-সিত্তাহ সংকলকদের শর্তাবলী
‘সিহাহ্-সিত্তাহ্’ গ্রন্থাবলীর সংকলকগণও হাদীস গ্রহণের ব্যাপারে নিজস্বভাবে বহু জরুরী শর্ত আরোপ করিয়াছেন। এখানে প্রত্যেকের আরোপিত শর্তাবলী স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করা যাইতেছে।
ইমাম বুখারী (র)
১. হাদীসের বর্ণনাসূত্রের পরস্পরা )سلسلة سند( ধারাবাহিক, সংযুক্ত ও অবিচ্ছিন্ন )متصل( হইবে। হাকেম আবু আবদুল্লাহ্ নিশাপুরী (র) লিখিয়াছেনঃ
الدَّرَجَةُ الأولى مِنَ الصَّحِيحِ وَهُوَ أَنْ يُرْوَى الْحَدِيثَ عَنِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الصَّحَابِيُّ الْمَشْهُورُ وَلَهُ رَاوِيَانِ ثِقَتَانِ ثُمَّ يَرْوِي عَنْهُ اتَّابِعِي الْمَشْهُورُ بِارِّوَايَةِ عَنِ الصَّحَابِي وَلَهُ رَاوِيَانِ ثِقَتَانِ ثُمَّ يَرْوِيْهِ عَنْهُ مِنْ أَتْبَاعِ التَّابِعِينَ حَافِظٌ مُتْقِنٌ وَلَهُ رُوَاةٌ ثِقَاتُ مِنَ الطَّبْقَةِ الرَّابِعَةِ ثُمَّ يَكُونُ شَيْخُ الْبُخَارِي حَافِظًا مَشْهُورًا بِالْعَدَالَةِ فِي رِوَايَتِهِ
প্রথম শ্রেণীর সহীহ্ হাদীস সেইটি, যাহাকে একজন প্রখ্যাত সাহাবী রাসূলে করীমের নিকট হইতে বর্ণনা করিবেন এবং সেই হাদীসের অন্তত আরো দুইজন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী থাকিবেন। অতঃপর সেই সাহাবীর নিকট হইতে এমন একজন তাবেয়ী উহার বর্ণনা করিবেন, যিনি সাধারণত সাহাবীর নিকট হইতেই হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে প্রখ্যাত এবং এই পর্যায়েও উহার উপর দুইজন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী থাকিবেন। তাহার পর এমন তাবে-তাবেয়ীন উহার বর্ণনা করিবেন, যাঁহারা হাদীসের হাফেজ ও অতিশয় সতর্ক। এক পর্যায়ে উহার বর্ণনাকারী হইবেন বহু এবং নির্ভরযোগ্য, যাঁহারা চতুর্থ পর্যায়ের বর্ণনাকারীদের মধ্যে গণ্য। তাহার পর হইবেন ইমাম বুখারীর উস্তাদ- হাদীসের হাফেজ ও হাদীস বর্ণনায় বিশ্বস্ততা রক্ষা করার দিক দিয়া প্রখ্যাত। ১১৪৪
২. হাদীসের বর্ণনাকারীকে তাহার উস্তাদদের সাহচর্যে অধিক দিন বসবাসকারী হইতে হইবে।
৩. বর্ণনাকারীকে প্রথম শ্রেণীর বর্ণনাকারীদের মধ্যে গণ্য, প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য। (ট) হইতে হইবে।
৪. যিনি যাঁহার নিকট হইতে হাদীস বর্ণনা করিবেন, তাঁহাদের পরস্পরের সহিত বাস্তব সাক্ষাৎ প্রমাণিত হইতে হইবে।
ইমাম মুসলিম (র)
শায়খ আবু আমর ইবনুস্ সালাহ লিখিয়াছেনঃ
شَرَطَ مُسْلِمُ فِي صَحِيحِهِ أَنْ يَكُونَ الْحَدِيثُ مُتَّصِلُ لِإِسْنَادِ بِنَقْلِ الثَّقَةِ عَنِ
الثَّقَةِ مِنْ أَوْلِهِ إِلَى مُنْتَهَاهُ سَالِمًا مِنَ الشُّذُوذِ وَالْعِلَّةِ
ইমাম মুসলিম তাঁহার সহীহ্ গ্রন্থে হাদীস গ্রহণের জন্য এই শর্ত করিয়াছেন যে, হাদীসের সনদসূত্র অবশ্যই ‘মুত্তাসিল’ পরস্পর সংযুক্ত ও অবিচ্ছিন্ন হইবে, একজন ‘সিকাহ’ ব্যক্তি অপর ‘সিকাহ’ ব্যক্তির নিকট হইতে বর্ণনা করিবেন, প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত এই অবস্থাই হইবে এবং উহা ‘শায’ )شاذ( ও ‘ইল্লাত’ )علت( হইতে বিমুক্ত হইবে।
২. হাদীস যিনি যাঁহার নিকট হইতে বর্ণনা করিবেন, তাঁহাদের উভয়ের একই যুগের ও একই সময়ের লোক হইতে হইবে।
৩. হাদীসের কোন বর্ণনাকারীই ‘মজহুল’ )مجهول( অজ্ঞাত পরিচয় হইবেন না। তাঁহাকে সর্বজন পরিচিত হইতে হইবে।
৪. মূল হাদীসে কোন দোষত্রুটির অস্তিত্ব থাকিবে না।
হাদীস গ্রহণের শর্তে ইমাম বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে পার্থক্য রহিয়াছে। এই কারণে বহু হাদীস ইমাম বুখারীর নিকট সহীহ্ কিন্তু ইমাম মুসলিমের নিকট সহীহ্ নয় বরং ইহার বিপরীত। এই কারণে যাঁহাদের নিকট হইতে ইমাম বুখারী হাদীস গ্রহণ করিয়াছেন, কিন্তু ইমাম মুসলিম গ্রহণ করেন নাই, আর ইমাম মুসলিম গ্রহণ করিয়াছেন কিন্তু ইমাম বুখারী গ্রহণ করেন নাই- এমন শায়খ বা হাদীসের উস্তাদদের সংখ্যা ৬২৫ জন। ১১৪৫
ইমাম নাসায়ী ও ইমাম আবু দাউদস (র)
১. সহীহ্ হাদীসের প্রধান দুইখানি গ্রন্থ বুখারী ও মুসলিম শরীফে যেসব হাদীস সন্নিবেশিত হইয়াছে সেসব সনদসূত্রে; তাহা সবই এই ইমামদ্বয়ের নিকট অবশ্যই গ্রহণযোগ্য।
২. প্রধান হাদীস-গ্রন্থদ্বয়ে হাদীস গ্রহণের যে শর্ত অনুসৃত হইয়াছে তাহাতে উত্তীর্ণ সকল হাদীসই গ্রহণযোগ্য।
৩. যেসব হাদীস সর্ববাদী সম্মতভাবে ও মুহাদ্দিসীনের ঐকমত্যের ভিত্তিতে পরিত্যক্ত হয় নাই ও যে সবের সনদ ‘মুত্তাসিল’- ধারাবাহিক বর্ণনা পরম্পরাসূত্রে কোন বর্ণনাকারীই উহ্য নহে, তাহা অবশ্যই গ্রহণ করা হইবে। মূল হাদীস সহীহ্ হইলে এবং ‘মুরসাল’ )مرسل( কিংবা ‘মুনকাতা’ )منقطع( না হইলে তাহাও গ্রহণযোগ্য।
৪. চতুর্থ পর্যায়ের বর্ণনাকারীদের মধ্যে উত্তম বর্ণনাকারী হইতে বর্ণিত হাদীসও গ্রহণযোগ্য।
৫. প্রকৃত সহীহ্ হাদীসের সমর্থন পাওয়া গেলে ইমাম আবূ দাউদ এমন হাদীসও গ্রহণ করেন, যাহার বর্ণনাকারী যঈফ, দুর্বল ও অজ্ঞাতনামা।
এইসব শর্ত ইমাম নাসায়ী ও ইমাম আবু দাউদের নিকট সমভাবে গৃহীত। কিন্তু
কয়েকটি ক্ষেত্রে ইমাম নাসায়ীর আরোপিত শর্ত ইমাম আবু দাউদ অপেক্ষাও অধিক উন্নত এবং কড়া। ইমাম নাসায়ী হাদীস গ্রহণের ব্যাপারে বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করিয়াছেন। তাঁহাদের অবস্থা সম্পর্কে অধিকতর খোঁজ-খবর লওয়ার প্রয়োজন মনে করিয়াছেন। এই কারণেই ইমাম নাসায়ী এমন অনেক বর্ণনাকারীর বর্ণিত হাদীস গ্রহণ করেন নাই, যাঁহাদের নিকট হইতে ইমাম আবু দাউদ ও ইমাম তিরমিযী হাদীস গ্রহণ করিয়াছেন। হাফেজ ইবনে হাজার আল-আসকালানী (র) এই সম্পর্কে বলিয়াছেন, তাঁহাদের বর্ণিত হাদীসও গ্রহণযোগ্য।
كَمْ مِنْ رَجُلٍ أَخْرَجَ لَهُ أَبُو دَاوُدَ وَ التَّرْمِذِى تَجَنَّبَ النَّسَائِيُّ إِخْرَاجَ حَدِيْثِهِ بَلْ تَجَنَّبَ النَّسَائِيُّ إِخْرَاجَ حَدِيْثِ جَمَاعَةٍ مِّنْ رِّجَالِ الصَّحِيحَيْنِ
এমন অনেক বর্ণনাকারীই আছেন, যাঁহাদের নিকট হইতে ইমাম আবু দাউদ ও তিরমিযী হাদীস গ্রহণ করিয়াছেন; কিন্তু ইমাম নাসায়ী তাঁহাদের বর্ণিত হাদীস গ্রহণ হইতে বিরত রহিয়াছে। বরং বুখারী ও মুসলিম শরীফে যাঁহাদের বর্ণিত হাদীস গৃহীত হইয়াছে এমন এক বিরাট সংখ্যক বর্ণনাকারীরও হাদীসগ্রহণ করিতে ইমাম নাসায়ী প্রস্তুত হন নাই। ১১৪৬
ইমাম তিরমিযী (র)
১. প্রথম দুইখানি সহীহ গ্রন্থ বুখারী ও মুসলিমে উদ্ধৃত সমস্ত হাদীসই গ্রহণযোগ্য।
২. প্রধানত মুহাদ্দিস ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের আরোপিত শর্তে আর যেসব হাদীসই উত্তীর্ণ ও সহীহ্ প্রমাণিত হইবে তাহা গ্রহণীয়।
৩. ইমাম আবূ দাউদ ও ইমাম নাসায়ী যেসব হাদীস গ্রহণ করিয়াছেন ও উহাদের দোষ-ত্রুটি দূর করিয়া দিয়াছেন, তাহাও গ্রহণীয়।
৪. ফিকাহবিদগণ যেসব হাদীস অনুযায়ী আমল করিয়াছেন, তাহাও গ্রহণীয়।
৫. যেসব হাদীসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হইবে এমন এক নির্দেশ, যাহা সব সময়ই কার্যকর হইয়াছে, তাহাও গ্রহণীয়।
৬. যেসব সিকাহ্ বর্ণনাকারীর সমালোচনা করা হইয়াছে এবং তাঁহাদের সম্পর্কে সবকিছু সুস্পষ্টরূপে প্রকাশিত হইয়াছে, তাঁহাদের হাদীসসমূহও গ্রহণীয়।
৭. যেসব বর্ণনাকারীর বর্ণিত হাদীসসমূহের সমালোচনা করা হইয়াছে এবং তাঁহাদের বিশ্বস্ততাও প্রমাণিত হইয়াছে তাঁহাদের বর্ণিত হাদীসও গ্রহণযোগ্য।
ইমাম ইবনে মাজাহ্ (র)
১. প্রথমোক্ত পাঁচজন মুহাদ্দিস যেসব হাদীসগ্রহণ করিয়াছেন তাহা তাঁহার নিকটও গ্রহণীয়।
২. পূর্বোক্ত পাঁচজনের আরোপিত শর্তে অন্যান্য যেসব হাদীস উত্তীর্ণ হইতে পারে তাহাও গ্রহণীয়।
৩. বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য আলেমগণ যেসব হাদীস অনুযায়ী আমল করেন তাহাও গ্রহণযোগ্য।
৪. চতুর্থ পর্যায়ের উত্তম বর্ণনাকারীদের বর্ণিত সেইসব হাদীসও গ্রহণীয়, যাহা যাচাই ও পরীক্ষা করার পর সহীহ্ প্রমাণিত হইয়াছে।
বস্তুত ইলমে হাদীসের ইমামগণের আরোপিত শর্তসমূহ ও হাদীস সমালোচনার পদ্ধতির গুরুত্ব এবং যথার্থতা ইসলামের দুশমনগণও স্বীকার করিতে বাধ্য। ১১৪৭

হাদিস 2
হাদিস 4
হাদিস 6
হাদিস 8

সংকলনশর্তের এই বিবরণের সব বাক্য সংকলকদের নিজেদের ঘোষিত বিধান নয়। ইবন তাহির মাকদিসী “শুরুতুল আইম্মাতিস সিত্তাহ”-তে বলেছেন, এসব সংকলকের প্রত্যেকের কাছ থেকে নির্দিষ্ট শর্তের ঘোষণা পাওয়া যায় না; তাঁদের গ্রন্থ পরীক্ষা করে শর্ত নির্ণয় করা হয়। ফলে পরবর্তী লেখকের শর্তের তালিকা এবং সংকলকের প্রত্যক্ষ বক্তব্যের মধ্যে প্রমাণের স্তর আলাদা। বুখারী ও মুসলিমের ক্ষেত্রে প্রত্যেক স্তরে একই হাদিসের অন্তত দুইজন বর্ণনাকারী থাকার বাধ্যতামূলক শর্তও তিনি দেননি। সাহাবি থেকে একজন বর্ণনাকারী থাকলেও তাঁর কাছে পৌঁছানোর সূত্র সহিহ হলে তাঁরা বর্ণনা সংকলন করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। হাকিমের উদ্ধৃত আরবিতে কোনো বর্ণনাকারীর দুইজন বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী থাকার কথা এবং প্রতিটি নির্দিষ্ট হাদিসের দুটি স্বাধীন সূত্র থাকার দাবি এক বিষয় নয়। [29]

قلت: اعلم أن البخاري ومسلما ومن ذكرنا بعدهم، لم ينقل عن واحد منهم أنه قال: شرطت أن أخرج في كتابي ما يكون على الشرط الفلان، وإنما يُعرف ذلك مِن سَبْر كتبهم، فيعلم بذلك شرط كل رجل منهم. فاعلم أن شرط البخاري ومسلم: أن يخرجا الحديث المتفق علي ثقة نقلته إلى الصحابي المشهور، من غير اختلاف بين الثقات الأثبات. ويكون إسناده متصلا غير مقطوع. فإن كان للصحابي راويان فصاعدا فحسن، وإن لم يكن له إلا راو واحد إذا صح الطريق إلى ذلك الراوي أخرجاه، إلا أن مسلما أخرج أحاديث أقوام ترك البخاري حديثهم – لشبهة وقعت في نفسه – أخرج مسلم أحاديثهم بإزالة الشبهة: مثل حماد بن سلمة وسهيل بن أبي صالح وداود بن أبي هند وأبي الزبير والعلاء بن عبد الرحمن وغيرهم. جعلنا هؤلاء الخمسة مثالا لغيرهم لكثرة روايتهم وشهرتهم.

বাংলা অনুবাদ:
আমি বলি: জেনে রাখো, বুখারী, মুসলিম এবং তাঁদের পরে যাঁদের উল্লেখ করেছি, তাঁদের কোনো একজনের কাছ থেকেও এমন বক্তব্য উদ্ধৃত হয়নি যে, “আমি আমার গ্রন্থে অমুক নির্দিষ্ট শর্ত অনুযায়ী বর্ণনা অন্তর্ভুক্ত করার শর্ত করেছি।” তাঁদের গ্রন্থ পরীক্ষা করে এই বিষয় জানা যায় এবং তার মাধ্যমে প্রত্যেকের শর্ত নির্ণয় করা হয়। বুখারী ও মুসলিমের শর্ত হলো এমন হাদিস সংকলন করা, যার বর্ণনাকারীদের বিশ্বস্ততা বিখ্যাত সাহাবি পর্যন্ত স্বীকৃত এবং বিশ্বস্ত ও নির্ভুল বর্ণনাকারীদের মধ্যে বিরোধ নেই। সনদ সংযুক্ত ও বিচ্ছিন্নতামুক্ত হতে হবে। সাহাবির দুইজন বা তার বেশি বর্ণনাকারী থাকলে ভালো; আর একজন বর্ণনাকারী থাকলেও তাঁর কাছে পৌঁছানোর সূত্র সহিহ হলে তাঁরা তা সংকলন করেছেন। মুসলিম এমন কিছু লোকের বর্ণনাও সংকলন করেছেন, যাঁদের বর্ণনা বুখারী নিজের মনে একটি সংশয় থাকার কারণে বাদ দিয়েছেন; মুসলিম সেই সংশয় দূর করে তাঁদের বর্ণনা সংকলন করেছেন। যেমন হাম্মাদ ইবন সালামা, সুহাইল ইবন আবি সালিহ, দাউদ ইবন আবি হিন্দ, আবু যুবাইর, আলা ইবন আবদুর রহমান ও অন্যরা। তাঁদের অধিক বর্ণনা ও পরিচিতির কারণে এই পাঁচজনকে অন্যদের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছি।

বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে সাক্ষাতের শর্তের পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে শুধু “মুসলিমের কাছে একই যুগের লোক হলেই যথেষ্ট” বলা অসম্পূর্ণ। মুসলিমের বক্তব্যে বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী, একই যুগে অবস্থান, সাক্ষাৎ ও শ্রবণের বাস্তব সম্ভাবনা এবং সাক্ষাৎ বা শ্রবণ না হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণের অনুপস্থিতি একসঙ্গে এসেছে। তিনি বলেছেন, এমন অবস্থায় বর্ণনাকে শ্রবণভিত্তিক ধরা হবে, যদিও তাঁদের সাক্ষাতের পৃথক সংবাদ পাওয়া না যায়। একই আলোচনায় পরিচিত মুদাল্লিসের ক্ষেত্রে শ্রবণ পরীক্ষা করার কথাও রয়েছে। ফলে দুই ব্যক্তির জন্ম-মৃত্যুর সাল কোনোভাবে একই সময়ের মধ্যে পড়লেই তাঁদের সব বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়—এমন শর্ত তিনি দেননি। সনদের সংযোগ নির্ধারণে সম্ভাবনা, প্রত্যক্ষ তথ্য এবং বর্ণনাকারীর অবস্থার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি পদ্ধতি এখানে রয়েছে। [30]

وذلك أن القول الشائع المتفق عليه بين أهل العلم بالأخبار والروايات قديما وحديثا أن كل رجل ثقة روى عن مثله حديثا وجائز ممكن له لقاؤه والسماع منه لكونهما جميعا كانا في عصر واحد وإن لم يأت في خبر قط أنهما اجتمعا ولا تشافها بكلام فالرواية ثابتة والحجة بها لازمة إلا أن يكون هناك دلالة بينة أن هذا الراوي لم يلق من روى عنه أو لم يسمع منه شيئا فأما والأمر مبهم على الأمكان الذي فسرنا فالرواية على السماع أبدا حتى تكون الدلالة التي بينا.

বাংলা অনুবাদ:
এর কারণ হলো, প্রাচীন ও বর্তমান বর্ণনা ও সংবাদবিশারদদের মধ্যে প্রচলিত ও স্বীকৃত বক্তব্য এই যে: কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তি তাঁর মতো আরেকজনের কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করলে, তাঁদের উভয়ের একই যুগে থাকার কারণে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তাঁর কাছ থেকে শোনার সুযোগ সম্ভব হলে, সেই বর্ণনা প্রতিষ্ঠিত এবং তার দ্বারা দলিল গ্রহণ আবশ্যক। তাঁরা কখনো মিলিত হয়েছেন বা মুখোমুখি কথা বলেছেন—এমন কোনো সংবাদ না এলেও এ বিধান প্রযোজ্য। ব্যতিক্রম হলো, বর্ণনাকারী যাঁর কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন তাঁর সঙ্গে দেখা করেননি অথবা তাঁর কাছ থেকে কিছুই শোনেননি—এমন সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা। বিষয়টি আমরা যে সম্ভাবনার ব্যাখ্যা দিয়েছি তার মধ্যে অনির্দিষ্ট থাকলে, উল্লিখিত প্রমাণ উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত বর্ণনাটি শ্রবণভিত্তিক বলে গণ্য হবে।

কোনো হাদিস একটি গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে এবং অন্যটিতে হয়নি—এই তথ্য থেকে দ্বিতীয় সংকলক সেটিকে জইফ মনে করেছেন, এমন সিদ্ধান্ত আসে না। একইভাবে একজন বর্ণনাকারীর বর্ণনা কোনো গ্রন্থে না থাকাও তাঁর সমস্ত বর্ণনা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার প্রমাণ নয়। উদ্ধৃত গ্রন্থের ৬২৫ জনের হিসাবটি দুই সংকলনের বর্ণনাকারী ব্যবহারের পার্থক্যসংক্রান্ত একটি দাবি; সেই সংখ্যা দিয়ে প্রত্যেকের সব বর্ণনার মান নির্ধারিত হয় না। নববী বলেছেন, বুখারী ও মুসলিম সমস্ত সহিহ হাদিস একত্র করেননি এবং তা করার অঙ্গীকারও করেননি। ফলে সংকলনের বাইরে থাকা এবং অসহিহ হওয়া এক করে দেখালে গ্রন্থে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্তকে বর্ণনার সত্যতা বা গ্রহণযোগ্যতার সম্পূর্ণ রায় বানানো হয়। সংকলকের নির্বাচন এবং বর্ণনার মানের মধ্যে এই পার্থক্য সংকলনশর্তের অর্থ নির্ধারণেও প্রযোজ্য। [31]

الثانية: أول مصنف في الصحيح المجرد، صحيح البخاري، ثم مسلم، وهما أصح الكتب بعد القرآن، والبخاري أصحهما وأكثرهما فوائد، وقيل مسلم أصح، والصواب الأول، واختص مسلم بجمع طرق الحديث في مكان، ولم يستوعبا الصحيح ولا التزماه، قيل لم يفتهما منه إلا قليل وأنكر هذا، والصواب أنه لم يفت الأصول الخمسة إلا اليسير، أعني الصحيحين، وسنن أبي داود والترمذي، والنسائي.

বাংলা অনুবাদ:
দ্বিতীয় আলোচনা: শুধু সহিহ বর্ণনা নিয়ে প্রথম সংকলন সহিহ বুখারী, তারপর মুসলিম। কোরআনের পরে এ দুটো সবচেয়ে সহিহ গ্রন্থ; দুটোর মধ্যে বুখারী অধিক সহিহ ও অধিক উপকারী। বলা হয়েছে মুসলিম অধিক সহিহ; সঠিক হলো প্রথম বক্তব্য। মুসলিমের বিশেষত্ব হলো একই স্থানে হাদিসের বর্ণনাসূত্রগুলো একত্র করা। তাঁরা সমস্ত সহিহ বর্ণনা অন্তর্ভুক্ত করেননি এবং তা করার অঙ্গীকারও করেননি। বলা হয়েছে, অল্প কিছু ছাড়া সহিহ বর্ণনা তাঁদের বাইরে নেই; এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। সঠিক হলো, পাঁচটি মূল গ্রন্থের বাইরে অল্প কিছু সহিহ বর্ণনা রয়েছে—অর্থাৎ দুই সহিহ গ্রন্থ এবং আবু দাউদ, তিরমিজী ও নাসাঈর সুনান।

আবু দাউদের সুনানের ক্ষেত্রে সব সনদ অবিচ্ছিন্ন এবং সব বর্ণনা একই মানের সহিহ—এই ধারণা তাঁর নিজের বক্তব্যের সঙ্গে মেলে না। মক্কাবাসীর কাছে লেখা পত্রে তিনি নিজের গ্রন্থে গুরুতর দুর্বলতা থাকা বর্ণনা এবং সনদ সহিহ না হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন; গুরুতর দুর্বলতা তিনি জানিয়ে দিয়েছেন বলেও দাবি করেছেন। যে বর্ণনার বিষয়ে কিছু বলেননি, তাকে তিনি “সালিহ” বলেছেন এবং কিছু বর্ণনা অন্যগুলোর তুলনায় অধিক সহিহ বলেছেন। “সালিহ”কে প্রতিটি ক্ষেত্রে “সহিহ”র সমার্থক বানালে তাঁর ব্যবহৃত শব্দের পার্থক্য মুছে যায়। একই পত্রে তিনি নিজের গ্রন্থকে কোরআনের পরে মানুষের শেখার জন্য বিশেষ প্রয়োজনীয় বলে দাবি করেছেন। ফলে এই সংকলন শুধু বর্ণনার তালিকা নয়; ইসলামি নির্দেশ ও আইন শেখার একটি নির্দিষ্ট মাধ্যম হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছে। [32]

وما كان في كتابي من حديث فيه وهن شديد فقد بينته ومنه ما لا يصح سنده. ما لم أذكر فيه شيئا فهو صالح وبعضها أصح من بعض. وهذا لو وضعه غيري لقلت أنا فيه أكثر استقصاؤه وهو كتاب لا ترد عليك سنة عن النبي صلى الله عليه وسلم بإسناد صالح إلا وهي فيه إلا أن يكون كلام استخرج من الحديث ولا يكاد يكون هذا. ولا أعلم شيئا بعد القرآن ألزم للناس أن يتعلموه من هذا الكتاب ولا يضر رجلا أن لا يكتب من العلم بعد ما يكتب هذه الكتب شيئا وإذا نظر فيه وتدبره وتفهمه حينئذ يعلم مقداره.

বাংলা অনুবাদ:
আমার গ্রন্থে যে হাদিসে গুরুতর দুর্বলতা রয়েছে, তা আমি স্পষ্ট করেছি; এর মধ্যে এমনও আছে, যার সনদ সহিহ নয়। যে বর্ণনার বিষয়ে আমি কিছু উল্লেখ করিনি, তা সালিহ; আর কিছু বর্ণনা অন্যগুলোর চেয়ে অধিক সহিহ। অন্য কেউ এই গ্রন্থ রচনা করলে আমি বলতাম, এতে অধিক অনুসন্ধান করা হয়েছে। এটি এমন একটি গ্রন্থ যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোনো সালিহ সনদে সুন্নাহ তোমার কাছে এলে তা এই গ্রন্থে থাকবে; ব্যতিক্রম হলো হাদিস থেকে নির্ণীত কোনো বক্তব্য, আর এমনটি খুব কমই ঘটে। কোরআনের পরে মানুষের শেখার জন্য এই গ্রন্থের চেয়ে অধিক প্রয়োজনীয় কিছু আমার জানা নেই। এই গ্রন্থগুলো লেখার পরে আর কিছু না লিখলে একজন মানুষের ক্ষতি হবে না। যখন সে এর মধ্যে দৃষ্টিপাত করবে, চিন্তা করবে এবং বুঝবে, তখন এর মূল্য উপলব্ধি করবে।

তিরমিজীর সংকলনে কোনো বর্ণনার ফিকহি ব্যবহার, বর্ণনাকারীর মূল্যায়ন এবং হাদিসের নিজস্ব শ্রেণি একসঙ্গে আলোচিত হয়েছে। তিনি নিজের “হাসান” পরিভাষার ব্যাখ্যায় শুধু “আলেমরা আমল করেছেন” বলেননি; সনদে মিথ্যার অভিযোগযুক্ত ব্যক্তি না থাকা, বর্ণনাটি শায না হওয়া এবং অন্য সূত্রে একই ধরনের বর্ণনা আসার কথা বলেছেন। এই ব্যাখ্যায় “আমাদের কাছে” কথাটি আছে—অর্থাৎ এটি তাঁর গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের ভাষা। তিনি একই আলোচনায় “গরিব” শব্দের বিভিন্ন ব্যবহারও ব্যাখ্যা করেছেন এবং দেখিয়েছেন যে, বহু ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে একজনের কাছ থেকে বর্ণনা করলে বর্ণনাটি প্রসিদ্ধ হয়েও মূল সূত্রে একক থাকতে পারে। সংকলনের নাম, প্রচার, ব্যবহার এবং বর্ণনার শ্রেণি তাই একে অন্যের বিকল্প নয়। [33]

قال أبو عيسى وما ذكرنا في هذا الكتاب حديث حسن فإنما أردنا به حسن إسناده عندنا كل حديث يروى لا يكون في إسناده من يتهم بالكذب ولا يكون الحديث شاذا ويروى من غير وجه نحو ذاك فهو عندنا حديث حسن وما ذكرنا في هذا الكتاب حديث غريب فإن أهل الحديث يستغربون الحديث لمعان رب حديث يكون غريبا لا يروى إلا من وجه واحد مثل ما حدث حماد بن سلمة عن أبي العشراء عن أبيه قال قلت يا رسول الله أما تكون الذكاة إلا في الحلق واللبة فقال لو طعنت في فخذها أجزأ عنك فهذا حديث تفرد به حماد بن سلمة عن أبي العشراء ولا يعرف لأبي العشراء عن أبيه إلا هذا الحديث وإن كان هذا الحديث مشهورا عند أهل العلم وإنما اشتهر من حديث حماد بن سلمة لا يعرف إلا من حديثه فيشتهر الحديث لكثرة من روى عنه.

বাংলা অনুবাদ:
আবু ঈসা বলেছেন: এই গ্রন্থে যাকে হাসান হাদিস বলেছি, তার দ্বারা আমাদের কাছে তার সনদ হাসান হওয়া বোঝানো হয়েছে। যে বর্ণনার সনদে মিথ্যার অভিযোগযুক্ত ব্যক্তি নেই, বর্ণনাটি শায নয় এবং অন্য সূত্রেও অনুরূপ বর্ণনা আসে, সেটি আমাদের কাছে হাসান হাদিস। এই গ্রন্থে যাকে গরিব হাদিস বলেছি, হাদিসবিশারদরা বিভিন্ন কারণে বর্ণনাকে গরিব বলেন। কোনো হাদিস গরিব হয় এবং শুধু একটি সূত্রে আসে। যেমন হাম্মাদ ইবন সালামা আবু উশারা থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন: আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, জবাই কি শুধু গলা ও গলার গোড়াতেই হয়? তিনি বললেন: তুমি যদি তার উরুতে আঘাত করতে, তবুও তোমার জন্য যথেষ্ট হতো। এই বর্ণনায় হাম্মাদ ইবন সালামা আবু উশারা থেকে একক বর্ণনাকারী; আবু উশারার পিতা থেকে তাঁর আর কোনো হাদিস জানা নেই। যদিও এই হাদিস আলেমদের কাছে পরিচিত, তা পরিচিত হয়েছে হাম্মাদ ইবন সালামার বর্ণনার মাধ্যমে; তাঁর বর্ণনা ছাড়া এটি জানা যায় না। তাঁর কাছ থেকে বহু ব্যক্তি বর্ণনা করায় হাদিসটি প্রসিদ্ধ হয়।

উদ্ধৃত বাংলা গ্রন্থে শর্তসমূহের গুরুত্ব ও যথার্থতা “ইসলামের দুশমনগণও স্বীকার করিতে বাধ্য” বলে দাবি করা হয়েছে। এই বাক্য দিয়ে শর্তগুলোর বাস্তব প্রয়োগে ভুল, সংকলকদের নির্বাচনের পার্থক্য অথবা কোনো বর্ণনার মূল্যায়নের সীমা বিলুপ্ত হয় না। সংকলনশর্ত, বর্ণনার শ্রেণি এবং আইন হিসেবে তার প্রয়োগ মানুষের তথ্য সংগ্রহ, বিচার ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে। কোরআন কোনো নির্দিষ্ট হাদিসের সনদকে সহিহ ঘোষণা করে না, কোনো সংকলকের তালিকাকে নিজে বেছে দেয় না এবং ছয়টি গ্রন্থের পৃথক অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্তও নির্ধারণ করে না। প্রচলিত শরীয়তে কোরআনের নির্দেশের কার্যকর বিষয়বস্তু নির্ধারণে এই বাছাই করা বর্ণনাগুলো ব্যবহৃত হয়। ফলে কোরআনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ কার্যকর আইনগ্রন্থ বলে উপস্থাপন করলে তার প্রয়োগে অপরিহার্য এই মানবনির্ধারিত তথ্য ও মূল্যায়নের স্তরটি আড়াল করা হয়।


হাদিস অগ্রাহ্য করার সমস্যাবলী

ইসলামের মৌলিক ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস: আল্লাহর অস্তিত্ব, মুহাম্মদের নবুয়ত, জিব্রাইলের মাধ্যমে ওহি এবং পরকালের পুরস্কার–শাস্তি অপ্রমাণিত বিশ্বাসনির্ভর দাবি। এই বিশ্বাসগুলোকে কেন্দ্র করে যে বিস্তারিত ধর্মীয় আচরণ ও আইনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তার অন্যতম প্রধান তথ্যসূত্র হাদিসশাস্ত্র। হাদিসে মুহাম্মদের বক্তব্য, নির্দেশ, পরামর্শ, কাজ এবং প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ বা মৌন অনুমোদনের বিবরণ সংরক্ষিত হয়েছে। কোরআনের কোনো নির্দেশ তিনি কীভাবে বুঝেছেন, কীভাবে পালন করেছেন এবং সাহাবিদের কীভাবে শিখিয়েছেন—এই তথ্যও সেই বর্ণনাগুলো সরবরাহ করে। হাদিস বাতিল করলে প্রচলিত ইসলামের এই নির্দিষ্ট আচরণবিধি ও শরীয়তের ভিত্তি ভেঙে পড়ে। তখন যার যেমন ইচ্ছা আয়াতের নতুন ব্যাখ্যা তৈরি করতে পারেন; সেই ব্যাখ্যাকে মুহাম্মদের শেখানো অর্থ ও প্রয়োগ বলে প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রয়োজনীয় নববী বর্ণনাগুলোই বাদ পড়ে যায়।

কোরআনে নামাজ, রোজা, যাকাত ও হজের নির্দেশ থাকলেই সেগুলোর সমস্ত কার্যকর নিয়ম কোরআনের মধ্যে উপস্থিত হয়ে যায় না। নামাজের নির্দিষ্ট রাকাতসংখ্যা, পূর্ণ পদ্ধতি, হজের আচারগুলোর বিস্তারিত প্রয়োগ এবং রোজার বিভিন্ন বিধান নির্ধারণে নববী বক্তব্য ও আচরণ ব্যবহার করা হয়েছে। শাফেয়ী তাঁর “আল-রিসালা”-তে কোরআনের সংক্ষিপ্ত নির্দেশ এবং নবীর মাধ্যমে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যাকে সরাসরি পৃথক করেছেন। তিনি এমন বিধানের কথাও বলেছেন, যার নির্দিষ্ট নির্দেশ কোরআনে নেই, কিন্তু নবী তা প্রবর্তন করেছেন। ফলে তাঁর উপস্থাপিত ইসলামি আইনব্যবস্থায় হাদিস শুধু আয়াতের পাশে রাখা অতিরিক্ত তথ্য নয়; বিধানের বিষয়বস্তু, পরিমাণ ও প্রয়োগ নির্ধারণের উৎস। এই উৎস বাদ দিলে শুধু ব্যাখ্যার একটি বই বাদ পড়ে না, আইনব্যবস্থার প্রয়োজনীয় তথ্যের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে। [34]

قال الشافعي: فجِمَاع ما أبان الله لخلقه في كتابه، مما تَعَبَّدَهم به، لما مضى من حكمه جل ثناؤه: من وجوه. فمنها ما أبانه لخلقه نصا. مثلُ جمُل فرائضه، في أن عليهم صلاةً وزكاةً وحجا وصوما وأنه حرَّم الفواحش، ما ظهر منها، وما بطن، ونصِّ الزنا والخمر، وأكل الميتة والدم، ولحم الخنزير، وبيَّن لهم كيف فَرْضُ الوضوء، مع غير ذلك مما بين نصا. ومنه: ما أَحكم فرضه بكتابه، وبيَّن كيف هو على لسان نبيه؟ مثل عدد الصلاة، والزكاة، ووقتها، وغير ذلك من فرائضه التي أنزل من كتابه. ومنه: ما سَنَّ رسول الله ﷺ مما ليس لله فيه نصُّ حكم، وقد فرض الله في كتابه طاعة رسوله ﷺ، والانتهاء إلى حكمه، فمَن قبل عن رسول الله فبِفَرْضِ الله قَبِل.

বাংলা অনুবাদ:
শাফেয়ী বলেছেন: আল্লাহ তাঁর কিতাবে সৃষ্টির কাছে যে বিষয়গুলো স্পষ্ট করেছেন এবং তাঁর পূর্বনির্ধারিত বিধান অনুযায়ী তাদের যে কর্তব্য দিয়েছেন, সেগুলো কয়েক ধরনের। এর মধ্যে এমন বিষয় আছে, যা তিনি সরাসরি পাঠে স্পষ্ট করেছেন। যেমন তাঁর ফরজগুলোর সাধারণ নির্দেশ: তাদের ওপর নামাজ, যাকাত, হজ ও রোজা রয়েছে; তিনি প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা এবং যিনা, মদ, মৃত প্রাণী, রক্ত ও শূকরের মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করেছেন; অজুর ফরজ কীভাবে পালন করতে হবে তা এবং আরও কিছু বিষয় সরাসরি পাঠে স্পষ্ট করেছেন। আবার এমন বিষয় আছে, যার ফরজ হওয়া তিনি কিতাবে নির্ধারণ করেছেন এবং তা কীভাবে পালন করতে হবে নিজের নবীর বক্তব্যের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন নামাজের সংখ্যা, যাকাত ও তার সময় এবং কিতাবে নাজিল করা তাঁর অন্যান্য ফরজ। আবার এমন বিষয় আছে, যা আল্লাহর রাসুল প্রবর্তন করেছেন, অথচ সে বিষয়ে আল্লাহর নির্দিষ্ট পাঠভিত্তিক বিধান নেই। আল্লাহ তাঁর কিতাবে রাসুলের আনুগত্য এবং তাঁর বিধান মেনে নেওয়া ফরজ করেছেন। ফলে যে ব্যক্তি রাসুলের কাছ থেকে কোনো বিধান গ্রহণ করে, সে আল্লাহর ফরজের কারণেই তা গ্রহণ করে।

নামাজের পদ্ধতি শেখানোর বর্ণনায় মুহাম্মদ নিজের প্রদর্শিত আচরণকে অনুসরণ করতে বলেছেন। মালিক ইবন হুওয়াইরিসের বর্ণনা অনুযায়ী, কিছু যুবক তাঁর কাছে বিশ দিন অবস্থান করার পরে নিজেদের পরিবারে ফিরে গিয়ে শিক্ষা দেওয়ার নির্দেশ পান। তাঁদের বলা হয়, তাঁকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখেছেন, সেভাবে নামাজ পড়তে। এখানে একটি কাজের আদর্শ নির্ধারিত হচ্ছে প্রত্যক্ষভাবে দেখা নববী আচরণের মাধ্যমে। পরবর্তী প্রজন্ম মুহাম্মদকে দেখে নামাজ শিখতে পারে না; তাঁর নামে সংরক্ষিত বর্ণনা ও সেই আচরণের প্রচলিত শিক্ষার ওপর নির্ভর করে। কোরআনের “নামাজ প্রতিষ্ঠা কর” নির্দেশের মধ্যে এই প্রদর্শিত পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিবরণ নেই। তাই শুধু নির্দেশের বাক্য রেখে প্রদর্শিত পদ্ধতির তথ্য বাদ দিলে প্রচলিত নামাজের নির্দিষ্ট রূপকে সেই বাক্য থেকে পুনর্গঠন করা যায় না। [35]

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْمُثَنَّى، قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَهَّابِ، قَالَ حَدَّثَنَا أَيُّوبُ، عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ، قَالَ حَدَّثَنَا مَالِكٌ، أَتَيْنَا إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَنَحْنُ شَبَبَةٌ مُتَقَارِبُونَ، فَأَقَمْنَا عِنْدَهُ عِشْرِينَ يَوْمًا وَلَيْلَةً، وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم رَحِيمًا رَفِيقًا، فَلَمَّا ظَنَّ أَنَّا قَدِ اشْتَهَيْنَا أَهْلَنَا أَوْ قَدِ اشْتَقْنَا سَأَلَنَا عَمَّنْ تَرَكْنَا بَعْدَنَا فَأَخْبَرْنَاهُ قَالَ «ارْجِعُوا إِلَى أَهْلِيكُمْ فَأَقِيمُوا فِيهِمْ وَعَلِّمُوهُمْ وَمُرُوهُمْ ـ وَذَكَرَ أَشْيَاءَ أَحْفَظُهَا أَوْ لاَ أَحْفَظُهَا ـ وَصَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي، فَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلاَةُ فَلْيُؤَذِّنْ لَكُمْ أَحَدُكُمْ وَلْيَؤُمَّكُمْ أَكْبَرُكُمْ».

বাংলা অনুবাদ:
মুহাম্মদ ইবন মুসান্না, আবদুল ওয়াহহাব, আইয়ুব ও আবু কিলাবার সূত্রে মালিক বর্ণনা করেছেন: আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলাম; আমরা কাছাকাছি বয়সের যুবক ছিলাম। তাঁর কাছে বিশ দিন ও রাত অবস্থান করলাম। আল্লাহর রাসুল ছিলেন দয়ালু ও কোমল আচরণের। তিনি যখন মনে করলেন যে আমরা পরিবারের কাছে যেতে চাই অথবা তাদের জন্য ব্যাকুল হয়েছি, তখন আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন, পেছনে কাদের রেখে এসেছি। আমরা তাঁকে জানালাম। তিনি বললেন: “তোমাদের পরিবারের কাছে ফিরে যাও, তাদের মধ্যে অবস্থান কর, তাদের শেখাও এবং নির্দেশ দাও।” তিনি আরও কিছু বিষয় উল্লেখ করেছিলেন, যা আমার মনে আছে অথবা মনে নেই। “আর আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখেছ, সেভাবে নামাজ পড়ো। নামাজের সময় হলে তোমাদের একজন তোমাদের জন্য আজান দেবে এবং তোমাদের মধ্যে বয়সে বড় ব্যক্তি ইমামতি করবে।”

রোজার ক্ষেত্রেও সাধারণ নির্দেশ এবং তার সম্পূর্ণ প্রয়োগবিধি এক নয়। সূরা বাকারার ২:১৮৭ আয়াতে রোজার রাতে স্ত্রীর সঙ্গে যৌনসম্পর্কের অনুমতি, সুবহে সাদিক পর্যন্ত খাওয়া–পান করা, রাত পর্যন্ত রোজা সম্পূর্ণ করা এবং মসজিদে ইতিকাফের সময়ে যৌনসম্পর্ক না করার কথা রয়েছে। আয়াতের এই নির্দেশগুলো নির্দিষ্ট কাজের অনুমতি ও সময়সীমা দেয়। রোজা অবস্থায় যৌনসম্পর্কের পরে দাস মুক্ত করা, ধারাবাহিক দুই মাস রোজা রাখা কিংবা ষাটজন দরিদ্রকে খাওয়ানোর যে কাফফারা প্রচলিত শরীয়তে এসেছে, তার বিবরণ এই আয়াতে নেই। ফলে রোজার আয়াত গ্রহণ এবং রোজাসংক্রান্ত প্রচলিত শরীয়তের সমস্ত বিধান গ্রহণ একই কাজ নয়। প্রথমটির সঙ্গে দ্বিতীয়টি যুক্ত করতে কোরআনের বাইরের বর্ণনাও ব্যবহার করা হয়েছে। [36]

أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَىٰ نِسَائِكُمْ ۚ هُنَّ لِبَاسٌ لَكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَهُنَّ ۗ عَلِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَخْتَانُونَ أَنْفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنْكُمْ ۖ فَالْآنَ بَاشِرُوهُنَّ وَابْتَغُوا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ ۚ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ۖ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ ۚ وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنْتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ ۗ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَقْرَبُوهَا ۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ.

বাংলা অনুবাদ:
রোজার রাতে তোমাদের স্ত্রীদের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক তোমাদের জন্য অনুমোদিত করা হয়েছে। তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক। আল্লাহ জানতেন যে তোমরা নিজেদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছিলে; তাই তিনি তোমাদের তওবা গ্রহণ করেছেন এবং তোমাদের ক্ষমা করেছেন। এখন তাদের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক কর এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তা অনুসন্ধান কর। আর খাও ও পান কর, যতক্ষণ না ভোরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়। তারপর রাত পর্যন্ত রোজা সম্পূর্ণ কর। মসজিদে ইতিকাফে থাকা অবস্থায় তাদের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করো না। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা; সেগুলোর কাছে যেয়ো না। এভাবেই আল্লাহ মানুষের কাছে তাঁর আয়াতগুলো স্পষ্ট করেন, যাতে তারা সংযত হয়।

আবু হুরায়রার বর্ণনায় রোজা অবস্থায় স্ত্রীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করা একজন ব্যক্তি মুহাম্মদের কাছে এসে নিজের বিপদের কথা জানিয়েছেন। মুহাম্মদ তাঁকে পর্যায়ক্রমে দাস মুক্ত করা, টানা দুই মাস রোজা রাখা এবং ষাটজন দরিদ্রকে খাওয়ানোর সামর্থ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছেন। শেষে তাঁর দারিদ্র্যের বিবরণ শুনে পাওয়া খেজুর নিজের পরিবারকে খাওয়াতে বলেছেন। এই বর্ণনায় কাজটির পরবর্তী বিধান, বিকল্প ব্যবস্থা এবং ব্যক্তির সামর্থ্য বিবেচনার তথ্য রয়েছে। কোরআনের রোজার নির্দেশ থেকে এই নির্দিষ্ট সংখ্যাগুলো, ব্যবস্থাগুলো এবং ঘটনাটির শেষ সিদ্ধান্ত নিজে থেকে বের করা যায় না। প্রচলিত কাফফারার বিধান প্রতিষ্ঠা করতে এই ধরনের হাদিসই ব্যবহৃত হয়। হাদিস বাদ দিয়ে একই কাফফারা বহাল রাখলে বিধানটি যে তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া হয়েছে, তা বাদ দিয়েই তার ফল গ্রহণ করা হয়। [37]

حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ، أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، قَالَ أَخْبَرَنِي حُمَيْدُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ بَيْنَمَا نَحْنُ جُلُوسٌ عِنْدَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم إِذْ جَاءَهُ رَجُلٌ، فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ هَلَكْتُ. قَالَ «مَا لَكَ». قَالَ وَقَعْتُ عَلَى امْرَأَتِي وَأَنَا صَائِمٌ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «هَلْ تَجِدُ رَقَبَةً تُعْتِقُهَا». قَالَ لاَ. قَالَ «فَهَلْ تَسْتَطِيعُ أَنْ تَصُومَ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ». قَالَ لاَ. فَقَالَ «فَهَلْ تَجِدُ إِطْعَامَ سِتِّينَ مِسْكِينًا». قَالَ لاَ. قَالَ فَمَكَثَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم، فَبَيْنَا نَحْنُ عَلَى ذَلِكَ أُتِيَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بِعَرَقٍ فِيهَا تَمْرٌ ـ وَالْعَرَقُ الْمِكْتَلُ ـ قَالَ «أَيْنَ السَّائِلُ». فَقَالَ أَنَا. قَالَ «خُذْهَا فَتَصَدَّقْ بِهِ». فَقَالَ الرَّجُلُ أَعَلَى أَفْقَرَ مِنِّي يَا رَسُولَ اللَّهِ فَوَاللَّهِ مَا بَيْنَ لاَبَتَيْهَا ـ يُرِيدُ الْحَرَّتَيْنِ ـ أَهْلُ بَيْتٍ أَفْقَرُ مِنْ أَهْلِ بَيْتِي، فَضَحِكَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم حَتَّى بَدَتْ أَنْيَابُهُ ثُمَّ قَالَ «أَطْعِمْهُ أَهْلَكَ».

বাংলা অনুবাদ:
আবু ইয়ামান, শুআইব, যুহরী ও হুমাইদ ইবন আবদুর রহমানের সূত্রে আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন: আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বসে ছিলাম। তখন একজন ব্যক্তি এসে বললেন: হে আল্লাহর রাসুল, আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। তিনি বললেন: “তোমার কী হয়েছে?” লোকটি বললেন: আমি রোজা অবস্থায় আমার স্ত্রীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করেছি। আল্লাহর রাসুল বললেন: “মুক্ত করার মতো কোনো দাস তোমার আছে?” তিনি বললেন: না। তিনি বললেন: “তুমি কি ধারাবাহিক দুই মাস রোজা রাখতে পারবে?” লোকটি বললেন: না। তিনি বললেন: “তুমি কি ষাটজন দরিদ্রকে খাওয়াতে পারবে?” লোকটি বললেন: না। এরপর নবী কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। আমরা সেই অবস্থায় থাকা সময়ে তাঁর কাছে খেজুরভর্তি একটি ঝুড়ি আনা হলো। তিনি বললেন: “প্রশ্নকারী কোথায়?” লোকটি বললেন: আমি। তিনি বললেন: “এটি নাও এবং দান কর।” লোকটি বললেন: হে আল্লাহর রাসুল, আমার চেয়েও দরিদ্র কাউকে? আল্লাহর শপথ, এই দুই পাথুরে এলাকার মধ্যে আমার পরিবারের চেয়ে দরিদ্র কোনো পরিবার নেই। তখন নবী এমনভাবে হাসলেন যে তাঁর দাঁত দেখা গেল। এরপর বললেন: “তোমার পরিবারকে এটি খাওয়াও।”

হাদিস অগ্রাহ্য করলে নামাজ, হজ ও রোজার নির্দেশের সঙ্গে যুক্ত প্রচলিত শরীয়তের বহু নির্দিষ্ট নিয়মের তথ্যভিত্তি বাদ পড়ে যায়। নামাজের পূর্ণ রূপ ও রাকাতসংখ্যা, হজের বিস্তারিত আচরণ এবং রোজার প্রয়োগ ও কাফফারার মতো বিষয়ে এই তথ্য অপরিহার্য। একটি কাজ করার সংক্ষিপ্ত আদেশ সেই কাজের সমস্ত নিয়ম এবং নিয়মভঙ্গের প্রতিকার নিজে থেকে নির্ধারণ করে না। তখন পাঠক নিজস্ব নিয়ম তৈরি করতে পারেন, কিন্তু সেই নিয়ম মুহাম্মদের প্রদর্শিত বা অনুমোদিত নিয়ম—এই দাবির জন্য আবার তাঁর সম্পর্কে সংরক্ষিত তথ্য প্রয়োজন হয়। কোরআনের ব্যাখ্যাকারী ও প্রয়োগকারী হিসেবে মুহাম্মদের ভূমিকা বাদ দিয়ে একই শরীয়তকে কোরআনের স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধান বলা অসঙ্গত। আয়াতের পাঠ এবং সেই পাঠের ওপর প্রতিষ্ঠিত কার্যকর আইনব্যবস্থা এক জিনিস নয়; হাদিসের তথ্য বাদ গেলে প্রচলিত আইনব্যবস্থার পূর্ণ বিষয়বস্তু আয়াতের মধ্যে আপনাআপনি উপস্থিত হয় না।


কোরআন হাদিস আলাদা করার উপায় কি?

হাদিস বলতে মুহাম্মদের বক্তব্য, নির্দেশ, পরামর্শ, জীবনযাপন, কাজ এবং প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ বা মৌন সম্মতির বর্ণনা বোঝায়। কোনো বক্তব্যকে তিনি কোরআনের আয়াত হিসেবে ঘোষণা করেছেন—এই ঘোষণার বর্ণনাও তাঁর বক্তব্য সম্পর্কিত একটি বর্ণনা। ঘোষিত আয়াতটি কোরআনের অংশ; কখন, কোথায়, কীভাবে তিনি সেটিকে ওহি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, সেই বিবরণ আয়াতের বাইরে সংরক্ষিত হয়। কোন আয়াতের স্থান তিনি নির্ধারণ করেছেন বা কোন আয়াত কোন সূরার সঙ্গে যুক্ত করতে বলেছেন—এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করতেও সেই নির্দেশ সম্পর্কে তথ্য প্রয়োজন। শুধু একটি বাক্য পড়ে তার ঐশ্বরিক উৎস প্রত্যক্ষভাবে শনাক্ত করা যায় না। কোরআনের পাঠ, মুহাম্মদের নামে তার ঘোষণার বিবরণ এবং সেই ঘোষণার ঐশ্বরিকতার দাবি পৃথক বিষয়; ইসলামি ঐতিহ্যে এগুলোকে যুক্ত করে মানুষের সংরক্ষিত বর্ণনা ও শিক্ষা।

মুহাম্মদের ওপর কোরআন নাজিল হওয়ার প্রচলিত বিবরণটি ২৩ বছর ধরে পৃথক উপলক্ষে পর্যায়ক্রমে ওহি আসার বিবরণ। ইবন আব্বাসের বর্ণনায় মক্কায় তেরো বছর এবং হিজরতের পরে দশ বছরের কথা আছে; এই দুই সময় যোগ করেই তেইশ বছরের হিসাব পাওয়া যায়। এই কালক্রম কোরআনের প্রতিটি আয়াতের সঙ্গে তারিখ হিসেবে লেখা নেই, এসেছে মুহাম্মদের জীবন ও ওহি সম্পর্কে সংরক্ষিত বর্ণনা থেকে। বিভিন্ন সময়ে আয়াত ঘোষণা করা এবং সেই আয়াত সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন, পরিস্থিতি ও শিক্ষা তাই একই ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে। পৃথক উপলক্ষে বক্তব্য ঘোষণার এই বিবরণে ঘোষণার সময়, উপলক্ষ এবং উপস্থিত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে; বর্তমান মুসহাফে আয়াতের অবস্থান থেকেই এসব তথ্য নির্ধারিত হয় না। নির্দিষ্ট কালক্রমের দাবির তথ্যসূত্রও হাদিসসাহিত্যেই উপস্থিত। [38]

حَدَّثَنَا مَطَرُ بْنُ الْفَضْلِ، حَدَّثَنَا رَوْحٌ، حَدَّثَنَا هِشَامٌ، حَدَّثَنَا عِكْرِمَةُ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ـ رضى الله عنهما ـ قَالَ بُعِثَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لأَرْبَعِينَ سَنَةً، فَمَكُثَ بِمَكَّةَ ثَلاَثَ عَشْرَةَ سَنَةً يُوحَى إِلَيْهِ، ثُمَّ أُمِرَ بِالْهِجْرَةِ فَهَاجَرَ عَشْرَ سِنِينَ، وَمَاتَ وَهُوَ ابْنُ ثَلاَثٍ وَسِتِّينَ.

বাংলা অনুবাদ:
মাতার ইবন ফাদল, রাওহ, হিশাম ও ইকরিমার সূত্রে ইবন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন: আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চল্লিশ বছর বয়সে প্রেরিত হন। এরপর তিনি মক্কায় তেরো বছর অবস্থান করেন, তখন তাঁর কাছে ওহি আসত। তারপর তাঁকে হিজরত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। হিজরতের পরে তিনি দশ বছর অবস্থান করেন এবং তেষট্টি বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

কোরআন একবারে নাজিল না হওয়ার প্রশ্ন কোরআনেও এসেছে। সূরা ফুরকানের ২৫:৩২–৩৩ আয়াতে একসঙ্গে পুরো কোরআন নাজিল করার প্রশ্নের উত্তরে মুহাম্মদের হৃদয় দৃঢ় করা, পাঠ সুবিন্যস্ত করা এবং উত্থাপিত বক্তব্যের জবাব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ধাপে ধাপে ঘোষণার সঙ্গে শ্রোতাদের প্রশ্ন এবং সেই প্রশ্নের ব্যাখ্যামূলক জবাবের সম্পর্ক আয়াতগুলোতে সরাসরি উপস্থিত। দীর্ঘ সময়ে ঘোষণার এই বিবরণে পাঠ পৌঁছানো, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং মুহাম্মদের কর্তৃত্বে তা বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া যুক্ত হয়েছে। মুহাম্মদ নির্দিষ্ট উপলক্ষে আয়াত ঘোষণা করেছেন এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন বা আচরণের জবাব দিয়েছেন—এই প্রক্রিয়ার বিস্তারিত জানতে সেই সময়কার বক্তব্য ও ঘটনার তথ্য প্রয়োজন। একটি সূরার বর্তমান পাঠে প্রতিটি প্রশ্নকারীর পরিচয়, ঘটনার তারিখ এবং সংশ্লিষ্ট কথোপকথনের সম্পূর্ণ বিবরণ লেখা থাকে না। [39] [40]

وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةً وَاحِدَةً ۚ كَذَٰلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ ۖ وَرَتَّلْنَاهُ تَرْتِيلًا. وَلَا يَأْتُونَكَ بِمَثَلٍ إِلَّا جِئْنَاكَ بِالْحَقِّ وَأَحْسَنَ تَفْسِيرًا.

বাংলা অনুবাদ:
যারা অবিশ্বাস করেছে, তারা বলেছে: “তার ওপর পুরো কোরআন একসঙ্গে নাজিল করা হলো না কেন?” এভাবেই, যাতে এর মাধ্যমে তোমার হৃদয় দৃঢ় করি; আর আমরা একে সুবিন্যস্তভাবে পাঠ করেছি। তারা তোমার কাছে কোনো বক্তব্য বা উদাহরণ নিয়ে এলে আমরা তোমার কাছে সত্য এবং তার উত্তম ব্যাখ্যা নিয়ে আসি।

আনাস ইবন মালিকের বর্ণনায় মুহাম্মদ উপস্থিত লোকদের বলেছেন, তাঁর ওপর সদ্য একটি সূরা নাজিল হয়েছে। এরপর তিনি সূরা কাওসার পাঠ করেছেন এবং কাওসার কী, তা ব্যাখ্যা করেছেন। সূরার তিনটি আয়াত এবং মুহাম্মদের ঘোষণার ভাষা এখানে আলাদা করে সংরক্ষিত হয়েছে: প্রথমটি কোরআনের পাঠ, দ্বিতীয়টি সেই পাঠ নাজিল হওয়ার ঘোষণা ও ব্যাখ্যার হাদিস। সূরার নিজের আয়াতগুলোতে উপস্থিত শ্রোতাদের পরিচয় বা এই কথোপকথনের বিবরণ নেই। কাওসারকে নদী, হাউজ এবং কিয়ামতের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করার বিস্তারিত বক্তব্যও সূরার তিনটি আয়াতের মধ্যে নেই। মুহাম্মদ কোন কথাকে সূরা বলেছেন এবং সেই সূরার শব্দকে কী নির্দিষ্ট অর্থ দিয়েছেন—দুটোর তথ্যই এই বর্ণনা বহন করছে। কোরআনের পরিচয় ও তার নববী ব্যাখ্যার সঙ্গে হাদিসের সম্পর্ক এখানে সরাসরি দৃশ্যমান। [41]

حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ حُجْرٍ السَّعْدِيُّ، حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ مُسْهِرٍ، أَخْبَرَنَا الْمُخْتَارُ بْنُ فُلْفُلٍ، عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، ح وَحَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، ـ وَاللَّفْظُ لَهُ ـ حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ مُسْهِرٍ، عَنِ الْمُخْتَارِ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ بَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ذَاتَ يَوْمٍ بَيْنَ أَظْهُرِنَا إِذْ أَغْفَى إِغْفَاءَةً ثُمَّ رَفَعَ رَأْسَهُ مُتَبَسِّمًا فَقُلْنَا مَا أَضْحَكَكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ «أُنْزِلَتْ عَلَىَّ آنِفًا سُورَةٌ». فَقَرَأَ «بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ {إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ * فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ * إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الأَبْتَرُ}». ثُمَّ قَالَ «أَتَدْرُونَ مَا الْكَوْثَرُ». فَقُلْنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ «فَإِنَّهُ نَهْرٌ وَعَدَنِيهِ رَبِّي عَزَّ وَجَلَّ عَلَيْهِ خَيْرٌ كَثِيرٌ هُوَ حَوْضٌ تَرِدُ عَلَيْهِ أُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ آنِيَتُهُ عَدَدُ النُّجُومِ فَيُخْتَلَجُ الْعَبْدُ مِنْهُمْ فَأَقُولُ رَبِّ إِنَّهُ مِنْ أُمَّتِي. فَيَقُولُ مَا تَدْرِي مَا أَحْدَثَتْ بَعْدَكَ». زَادَ ابْنُ حُجْرٍ فِي حَدِيثِهِ بَيْنَ أَظْهُرِنَا فِي الْمَسْجِدِ. وَقَالَ «مَا أَحْدَثَ بَعْدَكَ».

বাংলা অনুবাদ:
আলী ইবন হুজর সাআদী এবং আবু বকর ইবন আবি শাইবার সূত্রে, আলী ইবন মুসহির ও মুখতার ইবন ফুলফুলের মাধ্যমে আনাস ইবন মালিক বর্ণনা করেছেন: একদিন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মধ্যে ছিলেন। তিনি কিছুক্ষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেন, তারপর হাসিমুখে মাথা তুললেন। আমরা বললাম: হে আল্লাহর রাসুল, কী আপনাকে হাসিয়েছে? তিনি বললেন: “আমার ওপর এইমাত্র একটি সূরা নাজিল হয়েছে।” তারপর পাঠ করলেন: “পরম করুণাময়, দয়ালু আল্লাহর নামে। নিশ্চয়ই আমরা তোমাকে কাওসার দিয়েছি। তাই তোমার রবের জন্য নামাজ পড় এবং কোরবানি কর। নিশ্চয়ই তোমার বিদ্বেষীই নির্বংশ।” তারপর বললেন: “তোমরা কি জানো কাওসার কী?” আমরা বললাম: আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন। তিনি বললেন: “এটি একটি নদী, যা আমার রব আমাকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন; তাতে বিপুল কল্যাণ রয়েছে। এটি এমন একটি হাউজ, যেখানে কিয়ামতের দিন আমার উম্মত আসবে। এর পাত্রগুলোর সংখ্যা তারকার সংখ্যার মতো। তাদের মধ্যে একজনকে সরিয়ে নেওয়া হবে। আমি বলব: হে আমার রব, সে তো আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত। তখন বলা হবে: তুমি জানো না, তোমার পরে সে কী নতুন বিষয় ঘটিয়েছে।” ইবন হুজর তাঁর বর্ণনায় “আমাদের মধ্যে মসজিদে” কথাটি যোগ করেছেন এবং শেষে বলেছেন: “তোমার পরে সে কী নতুন বিষয় ঘটিয়েছে।”

আয়াত লিখিয়ে নেওয়ার বর্ণনাতেও একই তথ্যগত সম্পর্ক রয়েছে। যায়দ ইবন সাবিতের বর্ণনা অনুযায়ী, মুহাম্মদ তাঁকে সূরা নিসার ৪:৯৫ আয়াতের বক্তব্য লিখিয়ে দিচ্ছিলেন। সেই সময়ে অন্ধ ব্যক্তি ইবন উম্মে মাকতুম নিজের অক্ষমতার কথা জানান; এরপর অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য ব্যতিক্রমের শব্দ নাজিল হওয়ার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। আয়াতে ব্যতিক্রমটি আছে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম, তাঁর কথোপকথন, লিখিয়ে নেওয়ার সময় এবং যায়দের অভিজ্ঞতা আয়াতের মধ্যে নেই। এসব তথ্য মুহাম্মদের ঘোষণা, লেখকের শ্রবণ এবং উপস্থিত ব্যক্তির ঘটনার বর্ণনা থেকে এসেছে। ফলে কোনো বক্তব্য কোরআনের আয়াত হিসেবে লেখা হয়েছিল এবং তার কোনো অংশ কোন পরিস্থিতিতে যুক্ত হয়েছিল—এই দাবিগুলোর সঙ্গে সংরক্ষিত হাদিসের সম্পর্ক অবিচ্ছিন্ন। শুধু আয়াতের বর্তমান পাঠ দিয়ে এই নির্দিষ্ট ঘটনাবিবরণ উদ্ধার করা যায় না। [42]

حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ حَدَّثَنِي إِبْرَاهِيمُ بْنُ سَعْدٍ، عَنْ صَالِحِ بْنِ كَيْسَانَ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، قَالَ حَدَّثَنِي سَهْلُ بْنُ سَعْدٍ السَّاعِدِيُّ، أَنَّهُ رَأَى مَرْوَانَ بْنَ الْحَكَمِ فِي الْمَسْجِدِ، فَأَقْبَلْتُ حَتَّى جَلَسْتُ إِلَى جَنْبِهِ، فَأَخْبَرَنَا أَنَّ زَيْدَ بْنَ ثَابِتٍ أَخْبَرَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَمْلَى عَلَيْهِ لاَ يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَجَاءَهُ ابْنُ أُمِّ مَكْتُومٍ وَهْوَ يُمِلُّهَا عَلَىَّ قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَاللَّهِ لَوْ أَسْتَطِيعُ الْجِهَادَ لَجَاهَدْتُ ـ وَكَانَ أَعْمَى ـ فَأَنْزَلَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ صلى الله عليه وسلم وَفَخِذُهُ عَلَى فَخِذِي، فَثَقُلَتْ عَلَىَّ حَتَّى خِفْتُ أَنْ تُرَضَّ فَخِذِي، ثُمَّ سُرِّيَ عَنْهُ، فَأَنْزَلَ اللَّهُ {غَيْرَ أُولِي الضَّرَرِ}.

বাংলা অনুবাদ:
ইসমাইল ইবন আবদুল্লাহ, ইবরাহিম ইবন সাআদ, সালিহ ইবন কাইসান ও ইবন শিহাবের সূত্রে সাহল ইবন সাআদ সাআদী বর্ণনা করেছেন: তিনি মসজিদে মারওয়ান ইবন হাকামকে দেখেন এবং তাঁর পাশে গিয়ে বসেন। মারওয়ান জানান, যায়দ ইবন সাবিত তাঁকে বলেছেন যে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে লিখিয়ে দিয়েছিলেন: “মুমিনদের মধ্যে বসে থাকা ব্যক্তিরা এবং আল্লাহর পথে জিহাদকারীরা সমান নয়।” যায়দ বলেন: তিনি যখন আমাকে এটি লিখিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন ইবন উম্মে মাকতুম এসে বললেন: হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর শপথ, আমি জিহাদ করতে সক্ষম হলে অবশ্যই জিহাদ করতাম। তিনি অন্ধ ছিলেন। এরপর আল্লাহ তাঁর রাসুলের ওপর ওহি নাজিল করলেন। তাঁর উরু আমার উরুর ওপর ছিল এবং এত ভারী হয়ে গেল যে আমার উরু চূর্ণ হয়ে যাওয়ার ভয় হলো। এরপর তাঁর সেই অবস্থা কেটে গেল এবং আল্লাহ নাজিল করলেন: “অক্ষম ব্যক্তিদের ছাড়া।”

কোন আয়াত কখন ঘোষণা করা হয়েছিল, কোন ঘটনায় তার কোনো বক্তব্য এসেছিল, উপস্থিত কারা তা শুনেছিলেন এবং মুহাম্মদ কীভাবে তার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন—এসব নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর বহু ক্ষেত্রে কোরআনের বাইরে সংরক্ষিত বর্ণনা সরবরাহ করে। এই তথ্য বাদ দিলে আয়াতের সঙ্গে যুক্ত সেই নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটও বাদ পড়ে। মুহাম্মদের সাধারণ উপদেশ এবং তাঁর কোরআন হিসেবে ঘোষিত বক্তব্যের মধ্যে ঐতিহ্যগত পার্থক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও ঘোষণার এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। “এটি আল্লাহর ওহি”—এই দাবি সত্য কি না এবং মুহাম্মদ কোনো বক্তব্যকে ওহি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন কি না, প্রশ্ন দুটি এক নয়। প্রথমটি ঐশ্বরিক উৎসের দাবি; দ্বিতীয়টি তাঁর বক্তব্য সম্পর্কে তথ্যের দাবি। একটি ঘোষণার হাদিস সংরক্ষিত থাকলেই ঐশ্বরিক উৎস প্রমাণিত হয় না, কিন্তু সেই ঘোষণার পরিচয় ও ব্যাখ্যার তথ্য বহন করে বর্ণনাটি।

মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত ঘোষণা ও ব্যাখ্যা বাদ দিয়ে কোনো আয়াতকে তাঁর নিজস্ব উপদেশ, নির্দিষ্ট পরিস্থিতির নির্দেশ কিংবা জিব্রাইলের মাধ্যমে পাওয়া অপরিবর্তনীয় ওহি হিসেবে ব্যাখ্যা করার মধ্যে যে পার্থক্য, তার তথ্যগত ভিত্তি একই থাকে না। নবীর কর্তৃত্ব ব্যবহার করে কোনো ব্যাখ্যাকে অন্য ব্যাখ্যার ওপর বাধ্যতামূলক স্থান দিতে হলে তিনি কী বলেছেন বা করেছেন, সেই তথ্য প্রয়োজন হয়। হাদিস প্রত্যাখ্যান করে মুহাম্মদের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার কর্তৃত্ব বহাল রাখা তাই অসঙ্গত। কোরআনের আয়াতকে কোন পরিস্থিতিতে কোন অর্থে প্রয়োগ করতে হবে—প্রচলিত শরীয়তে তার উত্তর এই অতিরিক্ত বর্ণনাগুলোর সাহায্যে নির্ধারিত হয়। এগুলো বাদ দিলে আয়াতের পাঠের সঙ্গে সংযুক্ত নববী ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের কাঠামো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং পরবর্তী পাঠকের নিজস্ব ব্যাখ্যা সেই জায়গা দখল করে।


কলেমায় শাহাদাহঃ কোরআনে কোথায়?

ইসলামের অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে কলেমা বা বিশ্বাসের ঘোষণা। কালেমা বলতে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস সংবলিত কয়েকটি আরবি বাক্যকে বোঝানো হয়। এর মাধ্যমে ইসলামের প্রথম স্তম্ভ শাহাদাহ বা বিশ্বাসের সাক্ষ্য প্রকাশ করা হয়; আরবি “শাহাদাহ” শব্দের অর্থ সাক্ষ্য দেওয়া। প্রচলিত কলেমায় শাহাদাহ বলতে আল্লাহর একত্ব এবং মুহাম্মদ যে আল্লাহর বার্তাবাহক, সেই বিশ্বাসের সাক্ষ্য দেওয়াকে বোঝায়। নিচের ঘোষণার “রাসুলুল্লাহ” কথাটির অর্থ আল্লাহর বার্তাবাহক; “শেষ নবী” কথাটি এই বাক্যের সরাসরি অনুবাদ নয়। সুন্নি ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের মধ্যে এই সাক্ষ্যকে স্থান দেওয়া হয়েছে। ফলে এখানে শুধু দুটি ধর্মীয় বক্তব্যের অর্থ বোঝার বিষয় নেই; সেগুলোকে একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাসের ঘোষণা হিসেবে গ্রহণ করা এবং ধর্মের ভিত্তিগত কর্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ও রয়েছে।

আরবিতে: أشهد أن لا إله إلاَّ الله، وأشهد أن محمدًا رسول الله

ইংরেজিতে অনুবাদ: I testify that there is none worthy of worship except Allah, and I testify that Muhammad is the messenger of Allah.

বাংলায় অনুবাদ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া উপাসনার যোগ্য কিছু নেই, এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর বার্তাবাহক|

শাহাদাহর প্রথম বক্তব্য—আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই—কোরআনে রয়েছে। সূরা মুহাম্মদের ৪৭:১৯ আয়াতে এই কথাটি জানার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং নিজের পাপ ও বিশ্বাসী নারী–পুরুষের জন্য ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে। এই আয়াতের ভাষা একটি বিশ্বাসের বক্তব্য এবং ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ বহন করে। সেখানে প্রচলিত শাহাদাহর দুটি অংশ একত্রে “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি” বলে উচ্চারণ করার পূর্ণ বাক্য নেই; এই ঘোষণাকে ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের প্রথমটি বলেও আয়াতটি চিহ্নিত করেনি। একটি বক্তব্য কোরআনের মধ্যে থাকা এবং সেই বক্তব্যকে নির্দিষ্ট ধর্মীয় ঘোষণা ও কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করা পৃথক বিষয়। আয়াতের পাঠ থেকেই পরের সব নিয়ম পাওয়া যায় না; প্রচলিত ধর্মীয় কাঠামো গঠনে নবীর নামে সংরক্ষিত নির্দেশ ব্যবহৃত হয়েছে। [43]

فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَثْوَاكُمْ.

বাংলা অনুবাদ:
সুতরাং জেনে রাখো যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আর তোমার পাপের জন্য এবং বিশ্বাসী পুরুষ ও বিশ্বাসী নারীদের জন্য ক্ষমা চাও। আল্লাহ তোমাদের চলাফেরা এবং অবস্থানস্থল জানেন।

শাহাদাহর দ্বিতীয় বক্তব্য—মুহাম্মদ আল্লাহর বার্তাবাহক—সূরা ফাতহের ৪৮:২৯ আয়াতে সরাসরি আছে। আয়াতটির বাকি অংশে তাঁর সঙ্গীদের আচরণ, সিজদার চিহ্ন এবং বিশ্বাস ও কাজের পুরস্কার সম্পর্কে বক্তব্য রয়েছে। এখানে মুহাম্মদের রাসুল হওয়ার দাবি ঘোষিত হয়েছে; এর সঙ্গে শাহাদাহর প্রথম অংশ জুড়ে একটি নির্দিষ্ট মৌখিক ঘোষণাকে ইসলামের প্রথম স্তম্ভ করার পূর্ণ নির্দেশ আয়াতটিতে নেই। তাই শাহাদাহর বিশ্বাসগত বিষয়বস্তু কোরআনে রয়েছে, আর তার প্রচলিত সম্মিলিত রূপ ও পাঁচ স্তম্ভের মধ্যে অবস্থানের নির্দিষ্ট বিবরণ পাওয়া যায় হাদিসে। কোরআনের দুটি পৃথক বক্তব্যকে একত্রে একটি ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে নববী নির্দেশের ভূমিকা এখানেই। শুধু পৃথক বাক্য দুটির উপস্থিতি দেখিয়ে সেই অতিরিক্ত নির্দেশও কোরআনের মধ্যে উপস্থিত বলে দাবি করা যায় না। [44]

مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ ۚ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ ۖ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا ۖ سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِنْ أَثَرِ السُّجُودِ ۚ ذَٰلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَاةِ ۚ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنْجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْأَهُ فَآزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَىٰ عَلَىٰ سُوقِهِ يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ ۗ وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا.

বাংলা অনুবাদ:
মুহাম্মদ আল্লাহর বার্তাবাহক। আর যারা তাঁর সঙ্গে আছে, তারা অবিশ্বাসীদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে দয়ালু। তুমি তাদের রুকু ও সিজদা করতে দেখবে; তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করে। সিজদার প্রভাবে তাদের মুখে তাদের চিহ্ন রয়েছে। তওরাতে তাদের বর্ণনা এই। আর ইঞ্জিলে তাদের উপমা এমন একটি ফসলের মতো, যা তার অঙ্কুর বের করে, তারপর তাকে শক্তিশালী করে; এরপর তা মোটা হয়ে নিজ কাণ্ডের ওপর দাঁড়ায় এবং চাষিদের আনন্দিত করে—তাদের মাধ্যমে অবিশ্বাসীদের রাগান্বিত করার জন্য। তাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস করেছে এবং সৎকাজ করেছে, আল্লাহ তাদের ক্ষমা ও বিরাট পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ইসলাম পাঁচটি বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত—এই নির্দিষ্ট বিন্যাস বুখারীর হাদিসে স্পষ্টভাবে রয়েছে। ইবন উমারের সূত্রে মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল—এই সাক্ষ্য, নামাজ প্রতিষ্ঠা, যাকাত দেওয়া, হজ এবং রমজানের রোজা। এখানেই শাহাদাহর দুটি বিশ্বাসকে একই সাক্ষ্যের মধ্যে যুক্ত করা এবং সেই সাক্ষ্যকে ধর্মের ভিত্তির একটি হিসেবে নির্ধারণ করার বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। কোরআনের বিভিন্ন স্থানে এসব বিষয়ের উল্লেখ থাকা থেকে এই সম্মিলিত পাঁচভিত্তিক বিন্যাসের নির্দিষ্ট পাঠ নিজে থেকে তৈরি হয় না। প্রচলিত ইসলামের পরিচিত কাঠামো গ্রহণ করতে এই বর্ণনার মতো উৎস ব্যবহার করা হয়েছে। হাদিস বাদ দিয়ে একই পাঁচ স্তম্ভকে মুহাম্মদের নির্ধারিত বিন্যাস বলে বহাল রাখলে তার ঘোষণার তথ্যসূত্রই বাদ দেওয়া হয়। [45]

حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ مُوسَى، قَالَ أَخْبَرَنَا حَنْظَلَةُ بْنُ أَبِي سُفْيَانَ، عَنْ عِكْرِمَةَ بْنِ خَالِدٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالْحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ».

বাংলা অনুবাদ:
উবাইদুল্লাহ ইবন মুসা আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: হানযালা ইবন আবি সুফিয়ান আমাদের জানিয়েছেন, ইকরিমা ইবন খালিদের মাধ্যমে ইবন উমার (রাঃ) থেকে। তিনি বলেছেন: আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “ইসলাম পাঁচটি বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত: সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল; নামাজ প্রতিষ্ঠা করা; যাকাত দেওয়া; হজ করা এবং রমজানের রোজা রাখা।”

বিশ্বাসের এই ঘোষণাকে নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচরণের সঙ্গে যুক্ত করার বর্ণনাও হাদিসে আছে। সহিহ মুসলিমে অজু সম্পূর্ণ করার পরে আল্লাহর একত্ব এবং মুহাম্মদ যে আল্লাহর দাস ও রাসুল, সেই সাক্ষ্য দেওয়ার সঙ্গে জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি যুক্ত হয়েছে। একই বর্ণনায় অজুর পরে মনোযোগ দিয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়ার প্রতিশ্রুত পুরস্কারও আছে। ফলে শুধু ঘোষণার বিষয়বস্তু নয়, কখন তা বলতে হবে, কোন আচরণের পরে বলতে হবে এবং তার সঙ্গে কী ধর্মীয় ফল যুক্ত হবে—এসব অতিরিক্ত বিবরণ হাদিস সরবরাহ করছে। কোরআনের একত্ববাদ ও রাসুলসংক্রান্ত পৃথক বাক্যগুলোতে এই সম্পূর্ণ আচরণবিধি উপস্থিত নেই। হাদিস প্রত্যাখ্যান করে এই নিয়ম ও প্রতিশ্রুতিও একই নববী কর্তৃত্বে গ্রহণ করার তথ্যগত ভিত্তি থাকে না। [46]

حَدَّثَنِي مُحَمَّدُ بْنُ حَاتِمِ بْنِ مَيْمُونٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ مَهْدِيٍّ، حَدَّثَنَا مُعَاوِيَةُ بْنُ صَالِحٍ، عَنْ رَبِيعَةَ ـ يَعْنِي ابْنَ يَزِيدَ ـ عَنْ أَبِي إِدْرِيسَ الْخَوْلاَنِيِّ، عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ، ح وَحَدَّثَنِي أَبُو عُثْمَانَ، عَنْ جُبَيْرِ بْنِ نُفَيْرٍ، عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ، قَالَ كَانَتْ عَلَيْنَا رِعَايَةُ الإِبِلِ فَجَاءَتْ نَوْبَتِي فَرَوَّحْتُهَا بِعَشِيٍّ فَأَدْرَكْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَائِمًا يُحَدِّثُ النَّاسَ فَأَدْرَكْتُ مِنْ قَوْلِهِ «مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَتَوَضَّأُ فَيُحْسِنُ وُضُوءَهُ ثُمَّ يَقُومُ فَيُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ مُقْبِلٌ عَلَيْهِمَا بِقَلْبِهِ وَوَجْهِهِ إِلاَّ وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ». قَالَ فَقُلْتُ مَا أَجْوَدَ هَذِهِ. فَإِذَا قَائِلٌ بَيْنَ يَدَىَّ يَقُولُ الَّتِي قَبْلَهَا أَجْوَدُ. فَنَظَرْتُ فَإِذَا عُمَرُ قَالَ إِنِّي قَدْ رَأَيْتُكَ جِئْتَ آنِفًا قَالَ «مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ يَتَوَضَّأُ فَيُبْلِغُ ـ أَوْ فَيُسْبِغُ ـ الْوُضُوءَ ثُمَّ يَقُولُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ إِلاَّ فُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ الثَّمَانِيَةُ يَدْخُلُ مِنْ أَيِّهَا شَاءَ».

বাংলা অনুবাদ:
মুহাম্মদ ইবন হাতিম ইবন মাইমুন আমাকে বর্ণনা করেছেন; আবদুর রহমান ইবন মাহদী আমাদের বর্ণনা করেছেন; মুআবিয়া ইবন সালিহ আমাদের বর্ণনা করেছেন, রাবিআ—অর্থাৎ ইবন ইয়াযীদের—সূত্রে, আবু ইদরিস খাওলানীর মাধ্যমে উকবা ইবন আমির থেকে। আর আবু উসমান আমাকে বর্ণনা করেছেন, জুবাইর ইবন নুফাইরের মাধ্যমে উকবা ইবন আমির থেকে। তিনি বলেছেন: উট চরানোর দায়িত্ব আমাদের ছিল। আমার পালা এলে আমি সন্ধ্যায় উটগুলো ফিরিয়ে আনলাম এবং আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাঁড়িয়ে লোকদের সঙ্গে কথা বলতে পেলাম। তাঁর বক্তব্যের এই অংশ শুনলাম: “কোনো মুসলিম ভালোভাবে অজু করে, তারপর দাঁড়িয়ে হৃদয় ও মুখের মনোযোগসহ দুই রাকাত নামাজ পড়লে তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়।” আমি বললাম: কী চমৎকার কথা! তখন আমার সামনে একজন বললেন: এর আগের কথাটি আরও চমৎকার। তাকিয়ে দেখলাম, তিনি উমার। তিনি বললেন: আমি দেখেছি, তুমি এইমাত্র এসেছ। তিনি বলেছেন: “তোমাদের কেউ অজু করে তা সম্পূর্ণ করলে—অথবা ভালোভাবে সম্পন্ন করলে—তারপর বললে, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর দাস ও তাঁর রাসুল’, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হয়; সে যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারে।”

শাহাদাহর ক্ষেত্রে হাদিসের প্রয়োজন তাই ধর্মের একেবারে প্রাথমিক পরিচয় পর্যন্ত বিস্তৃত। আল্লাহর একত্ব ও মুহাম্মদের রাসুল হওয়ার বক্তব্য, সেই বক্তব্যের সম্মিলিত সাক্ষ্য, পাঁচ স্তম্ভের মধ্যে তার অবস্থান এবং অজুর পরে তা বলার প্রতিশ্রুত ফল—এই বিষয়গুলো একই তথ্য নয়। প্রচলিত ধর্মীয় ব্যবস্থায় এগুলোকে একত্রে গ্রহণ করা হয়, অথচ এই সমগ্র ব্যবস্থার নির্দিষ্ট বিবরণ কোরআনে দেওয়া নেই। হাদিস বাদ গেলে পরবর্তী ব্যক্তি নিজে একটি ঘোষণা ও আচরণবিধি তৈরি করতে পারেন, কিন্তু সেটিকে মুহাম্মদের শেখানো ঘোষণা ও আচরণবিধি বলার জন্য তাঁর বক্তব্যের বর্ণনাই প্রয়োজন হয়। কোরআনের বক্তব্যকে নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয় ও কর্তব্যে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে মানুষের সংরক্ষিত নববী বর্ণনার ওপর এই নির্ভরতা দূর হয় না।


ইসলামে চুরির শাস্তিঃ কতটুকু হাত কাটা?

ইসলামে চুরির শাস্তি হিসেবে কোরআনে বলা হয়েছে, চোর পুরুষ বা নারী হলে তাদের হাত কেটে দিতে। সূরা মায়িদার ৫:৩৮ আয়াতের আরবি পাঠে “ডান হাত” বলা নেই, কতটুকু হাত কাটতে হবে তাও নির্দিষ্ট নেই। একই আয়াতে চুরিকৃত সম্পদের ন্যূনতম মূল্যও নির্ধারণ করা হয়নি। কেউ গাছ থেকে একটি আম নেয় কিংবা একটুকরো রুটি চুরি করে—এসব কাজের ক্ষেত্রে কোন মূল্যসীমা ও শর্ত পূরণ হলে অঙ্গচ্ছেদের বিধান প্রযোজ্য হবে, তার উত্তর এই আয়াত দেয় না। অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি এবং বিবেচনাবোধহীন মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তির দায় সম্পর্কে ব্যতিক্রমও এখানে লেখা নেই। অথচ মানুষের অঙ্গ কেটে দেওয়ার মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তি প্রয়োগ করতে এই প্রশ্নগুলোর নির্দিষ্ট উত্তর প্রয়োজন। প্রচলিত শরীয়তে হাদিসসহ বাইরের উৎস ব্যবহার করে সেই সীমা ও প্রয়োগ নির্ধারিত হয়েছে। [47]

وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالًا مِنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ.

বাংলা অনুবাদ:
আর চোর ও চোরনী তাদের হাত কেটে দাও, তাদের কৃতকর্মের ফল স্বরূপ, আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। আল্লাহ হলেন মহাপরাক্রান্ত, মহাবিজ্ঞানী।
Taisirul Quran
আর যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে, তোমরা তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসাবে তাদের (ডান হাত) কেটে ফেল, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি, আর আল্লাহ অতিশয় ক্ষমতাবান, মহা প্রজ্ঞাময়।
Sheikh Mujibur Rahman
আর পুরুষ চোর ও নারী চোর তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও তাদের অর্জনের প্রতিদান ও আল্লাহর পক্ষ থেকে শিক্ষণীয় আযাবস্বরূপ এবং আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
Rawai Al-bayan
আর পুরুষ চোর ও নারী চোর, তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও; তাদের কৃতকর্মের ফল ও আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে (১)। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
( কোরআন ৫ঃ৩৮ )

উদ্ধৃত অনুবাদগুলোর একটিতে বন্ধনীর মধ্যে “ডান হাত” যোগ করা হয়েছে। আরবি আয়াতের “আইদিয়াহুমা” শব্দে ডান বা বাম দিকের নাম নেই; ডান হাতের কথাটি অনুবাদকের ব্যাখ্যামূলক সংযোজন। এই সংযোজনকে আয়াতের নিজস্ব শব্দ বলে ব্যবহার করলে অনুবাদ এবং ব্যাখ্যার পার্থক্য মুছে যায়। একইভাবে “হাত” শব্দটি কোন সীমা পর্যন্ত অঙ্গ বোঝাচ্ছে এবং কোথা থেকে তা বিচ্ছিন্ন করতে হবে—এই নির্দিষ্ট প্রয়োগ আয়াতের মধ্যে বলা হয়নি। অঙ্গচ্ছেদের আদেশ থাকা এবং সেই আদেশ কার্যকর করার সম্পূর্ণ নিয়ম থাকা পৃথক বিষয়। অনুবাদের বন্ধনীর ব্যাখ্যা কিংবা প্রচলিত প্রয়োগ মেনে নেওয়া মানে আয়াতের বাইরে থেকে তথ্য গ্রহণ করা। তারপর সেই অতিরিক্ত তথ্য বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ বিধানটিকে কোরআনের সরাসরি, স্বয়ংসম্পূর্ণ নির্দেশ বলে উপস্থাপন করা অসঙ্গত।

চুরিকৃত সম্পদের মূল্যসীমা সম্পর্কে আয়েশার সূত্রে বুখারীতে সংরক্ষিত বক্তব্য হচ্ছে, এক-চতুর্থাংশ দিনার বা তার বেশি মূল্যের চুরিতে হাত কাটা হবে। এখানে অঙ্গচ্ছেদের সাধারণ আদেশের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ যুক্ত হচ্ছে। এই সংখ্যা সূরা মায়িদার ৫:৩৮ আয়াতে নেই, “চোর” শব্দের সাধারণ অর্থ থেকেও এক-চতুর্থাংশ দিনার পাওয়া যায় না। রুটি বা ফল নেওয়ার আগের উদাহরণগুলোতেও চুরিকৃত বস্তুর মূল্যকে শাস্তির যোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত করতে আয়াতের বাইরের এই ধরনের নির্দেশ প্রয়োজন হয়। ফলে প্রচলিত বিধানের মূল্যসংক্রান্ত সীমা গ্রহণ করা এবং শুধু কোরআনের আয়াত গ্রহণ করা একই কাজ নয়। হাদিস বাতিল করে এই নির্দিষ্ট সীমা বহাল রাখলে যে বর্ণনা থেকে সীমাটি নেওয়া হয়েছে, তা প্রত্যাখ্যান করেও তার বিধান গ্রহণ করা হয়। [48]

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْلَمَةَ، حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ سَعْدٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عَمْرَةَ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم «تُقْطَعُ الْيَدُ فِي رُبُعِ دِينَارٍ فَصَاعِدًا». تَابَعَهُ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ خَالِدٍ وَابْنُ أَخِي الزُّهْرِيِّ وَمَعْمَرٌ عَنِ الزُّهْرِيِّ.

বাংলা অনুবাদ:
আবদুল্লাহ ইবন মাসলামা আমাদের বর্ণনা করেছেন; ইবরাহিম ইবন সাআদ আমাদের বর্ণনা করেছেন, ইবন শিহাবের সূত্রে, আমরার মাধ্যমে আয়েশা থেকে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “এক-চতুর্থাংশ দিনার বা তার বেশি মূল্যের চুরিতে হাত কাটা হবে।” আবদুর রহমান ইবন খালিদ, যুহরীর ভাইয়ের ছেলে এবং মামারও যুহরীর সূত্রে এই বর্ণনায় তাঁকে অনুসরণ করেছেন।

গাছে থাকা ফল নেওয়ার ক্ষেত্রেও সুনানে আবু দাউদে একাধিক পরিস্থিতি আলাদা করা হয়েছে। অভাবী ব্যক্তি সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য জমা না করে সেখানেই কিছু ফল খেলে তার ওপর কোনো দায় নেই; কিছু ফল নিয়ে চলে গেলে দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ ও শাস্তির কথা বলা হয়েছে। আবার ফল সংরক্ষণের স্থানে রাখার পরে চুরি হলে এবং তার মূল্য একটি ঢালের দামে পৌঁছালে অঙ্গচ্ছেদের কথা এসেছে। ফলে ফল নেওয়ার প্রতিটি ঘটনাকে একই শাস্তির অধীনে রাখার বিবরণ এটি নয়; নেওয়ার ধরন, সংরক্ষণের অবস্থা ও মূল্য অনুযায়ী ভিন্ন ফল নির্ধারিত হয়েছে। একটি আম বা অন্য ফল নেওয়ার উদাহরণে এই পার্থক্যগুলোর তথ্য ৫:৩৮ আয়াতের মধ্যে নেই। প্রচলিত শাস্তির পরিসর নির্ধারণে তাই নববী নির্দেশের বর্ণনা অপরিহার্য হয়ে উঠছে। [49]

حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، عَنِ ابْنِ عَجْلاَنَ، عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ سُئِلَ عَنِ الثَّمَرِ الْمُعَلَّقِ فَقَالَ «مَنْ أَصَابَ بِفِيهِ مِنْ ذِي حَاجَةٍ غَيْرَ مُتَّخِذٍ خُبْنَةً فَلاَ شَىْءَ عَلَيْهِ وَمَنْ خَرَجَ بِشَىْءٍ مِنْهُ فَعَلَيْهِ غَرَامَةُ مِثْلَيْهِ وَالْعُقُوبَةُ وَمَنْ سَرَقَ مِنْهُ شَيْئًا بَعْدَ أَنْ يُئْوِيَهُ الْجَرِينُ فَبَلَغَ ثَمَنَ الْمِجَنِّ فَعَلَيْهِ الْقَطْعُ». وَذَكَرَ فِي ضَالَّةِ الإِبِلِ وَالْغَنَمِ كَمَا ذَكَرَهُ غَيْرُهُ قَالَ وَسُئِلَ عَنِ اللُّقَطَةِ فَقَالَ «مَا كَانَ مِنْهَا فِي طَرِيقِ الْمِيتَاءِ أَوِ الْقَرْيَةِ الْجَامِعَةِ فَعَرِّفْهَا سَنَةً فَإِنْ جَاءَ طَالِبُهَا فَادْفَعْهَا إِلَيْهِ وَإِنْ لَمْ يَأْتِ فَهِيَ لَكَ وَمَا كَانَ فِي الْخَرَابِ ـ يَعْنِي ـ فَفِيهَا وَفِي الرِّكَازِ الْخُمُسُ».

বাংলা অনুবাদ:
কুতাইবা ইবন সাঈদ আমাদের বর্ণনা করেছেন; লাইস আমাদের বর্ণনা করেছেন, ইবন আজলানের সূত্রে, আমর ইবন শুআইবের মাধ্যমে তাঁর পিতা থেকে, তাঁর দাদা আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন আস থেকে। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গাছে ঝুলন্ত ফল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি বললেন: “কোনো অভাবী ব্যক্তি সঙ্গে নেওয়ার জন্য কাপড়ে জমা না করে মুখে কিছু খেলে তার ওপর কোনো দায় নেই। আর যে কিছু ফল নিয়ে চলে যায়, তার ওপর দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ ও শাস্তি রয়েছে। আর ফল শুকানো ও সংরক্ষণের স্থানে রাখার পরে কেউ কিছু চুরি করলে এবং তার মূল্য একটি ঢালের দামে পৌঁছালে তার ওপর হাত কাটার শাস্তি রয়েছে।” হারানো উট ও ছাগল সম্পর্কে তিনি অন্য বর্ণনাকারীদের মতোই উল্লেখ করেছেন। বর্ণনাকারী বলেন: তাঁকে কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: “যা চলাচলের পথে বা জনবহুল বসতিতে পাওয়া যায়, তা এক বছর ঘোষণা করবে। তার দাবিদার এলে তাকে দিয়ে দেবে; আর না এলে তা তোমার। আর যা পরিত্যক্ত স্থানে পাওয়া যায়—অর্থাৎ—তা এবং মাটিতে পোঁতা গুপ্তধনের এক-পঞ্চমাংশ দিতে হবে।”

অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি এবং মানসিক অক্ষমতার কারণে বিবেচনাবোধহীন ব্যক্তির দায়ের প্রশ্নও হাদিসে এসেছে। আয়েশার সূত্রে আবু দাউদে ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগা পর্যন্ত, আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হওয়া পর্যন্ত এবং শিশু বড় হওয়া পর্যন্ত তাদের ওপর থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়ার কথা সংরক্ষিত হয়েছে। বর্ণনাটি “মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি চুরি করলে বা হদের অপরাধ করলে” শিরোনামের পরিচ্ছেদে রাখা হয়েছে। এখানে ব্যক্তির অবস্থা ও দায়িত্ব বহনের ক্ষমতা সাধারণ বিধানের প্রয়োগে যুক্ত হচ্ছে। সূরা মায়িদার চুরির আয়াতে শুধু অপরাধ ও শাস্তির সাধারণ বক্তব্য আছে; এই তিন অবস্থার ব্যতিক্রম সেখানে নেই। শিশু কিংবা বিবেচনাবোধহীন ব্যক্তিকে একই অঙ্গচ্ছেদের বিধানের আওতায় না নেওয়ার প্রচলিত সিদ্ধান্তে তাই আয়াতের বাইরের দায়িত্বসংক্রান্ত বর্ণনা ব্যবহার করা হয়েছে। হাদিস বাদ দিলে সেই নির্দিষ্ট ব্যতিক্রমের নববী তথ্যসূত্রও বাদ পড়ে। [50]

حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ هَارُونَ، أَخْبَرَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ، عَنْ حَمَّادٍ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ، عَنِ الأَسْوَدِ، عَنْ عَائِشَةَ، رضى الله عنها أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ «رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلاَثَةٍ عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ وَعَنِ الْمُبْتَلَى حَتَّى يَبْرَأَ وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَكْبَرَ».

বাংলা অনুবাদ:
উসমান ইবন আবি শাইবা আমাদের বর্ণনা করেছেন; ইয়াযিদ ইবন হারুন আমাদের বর্ণনা করেছেন; হাম্মাদ ইবন সালামা আমাদের জানিয়েছেন, হাম্মাদের সূত্রে, ইবরাহিমের মাধ্যমে আসওয়াদ থেকে, আয়েশা (রাঃ) থেকে। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তিন ব্যক্তির ওপর থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগা পর্যন্ত; আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হওয়া পর্যন্ত এবং শিশু বড় হওয়া পর্যন্ত।”

কতটুকু হাত কাটতে হবে, তার প্রচলিত প্রয়োগের বিবরণও কোরআনের এই আয়াতের বাইরে রয়েছে। ইবন কুদামার “আল-মুগনি”-তে হাত বেঁধে টেনে তালু ও বাহুর সংযোগস্থল স্পষ্ট করা এবং সেই সন্ধিতে ধারালো ছুরি দিয়ে বিচ্ছিন্ন করার বর্ণনা আছে। এটি কবজি থেকে অঙ্গচ্ছেদের একটি নির্দিষ্ট প্রয়োগপদ্ধতি; শুধু “হাত কেটে দাও” বাক্যে এই শারীরিক সীমা ও পদ্ধতি বলা হয়নি। ফলে কোরআনের আদেশ থেকে বাস্তবে একজন মানুষের অঙ্গ বিচ্ছিন্ন করার পর্যায়ে পৌঁছাতে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। আয়াতের শব্দ, নবীর নামে সংরক্ষিত শাস্তির শর্ত এবং আইনগ্রন্থে নির্ধারিত কার্যপদ্ধতি মিলিয়েই প্রচলিত বিধানটির পূর্ণ রূপ দাঁড়ায়। এই অতিরিক্ত তথ্যকে গ্রহণ করার পরে সেই সম্পূর্ণ বিধান কেবল আয়াতের মধ্যেই রয়েছে বলা ভুল। [51]

فصل ويقطع السارق بأسهل ما يمكن، فيجلس ويضبط لئلا يتحرك فيجني على نفسه، وتشد يده بحبل، وتجر حتى يبين مفصل الكف من مفصل الذراع، ثم يوضع بينهما سكين حاد، ويدق فوقهما بقوة ليقطع في مرة واحدة، أو توضع السكين على المفصل وتمدى مدة واحدة. وإن علم قطع أوحى من هذا، قطع به.

বাংলা অনুবাদ:
পরিচ্ছেদ: চোরের অঙ্গ যতটা সম্ভব সহজ পদ্ধতিতে কাটা হবে। তাকে বসানো ও স্থির করে রাখা হবে, যাতে নড়াচড়া করে নিজের আরও ক্ষতি না করে। তার হাত দড়ি দিয়ে বাঁধা হবে এবং টানা হবে, যাতে তালু ও বাহুর সন্ধিস্থল স্পষ্ট হয়। তারপর তাদের মাঝখানে ধারালো ছুরি রাখা হবে এবং তার ওপর জোরে আঘাত করা হবে, যাতে একবারেই বিচ্ছিন্ন হয়; অথবা সন্ধিস্থলে ছুরি রেখে এক টানে কাটা হবে। এর চেয়ে দ্রুত কোনো কাটার পদ্ধতি জানা থাকলে তা ব্যবহার করা হবে।

চুরির শাস্তিতে হাদিস বাদ দেওয়ার সমস্যাটি তাই কয়েকটি অনুপস্থিত তথ্যের সমস্যা: অপরাধের মূল্যসীমা, নেওয়ার ধরন, ব্যক্তির দায়িত্ব বহনের ক্ষমতা এবং শাস্তির নির্দিষ্ট প্রয়োগ। আয়াতের অঙ্গচ্ছেদের আদেশকে কার্যকর করতে এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন, অথচ প্রচলিত উত্তরগুলো শুধু আয়াতের শব্দ থেকে পাওয়া যায় না। হাদিস বাদ দিলে এই সীমা ও ব্যতিক্রম আবার মানুষের সিদ্ধান্তে নির্ধারণ করতে হয়; মানুষের সংরক্ষিত বর্ণনা গ্রহণ করলে শরীয়ত সেই বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল হয়। উভয় অবস্থায় প্রচলিত সম্পূর্ণ বিধানকে কোরআনের নিজস্ব স্বয়ংসম্পূর্ণ আইন বলা মিথ্যা। অঙ্গচ্ছেদ মানুষের শরীরে স্থায়ী ক্ষতি ঘটায়। এমন শাস্তিকে অপরিবর্তনীয় ঐশ্বরিক আদেশ বললেই তার নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয় না; ধর্মীয় কর্তৃত্বের দাবি মানুষের অঙ্গ স্থায়ীভাবে নষ্ট করার যৌক্তিকতা সরবরাহ করে না।


কোরআনে মৃত মাছ কোথায় হালাল?

কোরআনে মৃত প্রাণী ও রক্ত খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সূরা বাকারার ২:১৭৩ এবং সূরা মায়িদার ৫:৩ আয়াতে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা প্রাণীর কথা রয়েছে। দ্বিতীয় আয়াতে শ্বাসরোধ, আঘাত, পতন ও শিংয়ের আঘাতে মারা যাওয়া এবং হিংস্র প্রাণীর খাওয়া পশুর কথাও এসেছে। এই সাধারণ নিষেধের সঙ্গে জলজ খাদ্যের অনুমতি এবং রক্তের নির্দিষ্ট বর্ণনা মিলিয়ে খাদ্যবিধান নির্ধারিত হয়। মাছ যবেহ না করেও খাওয়া, মৃত মাছের অবস্থান এবং কলিজা–প্লীহা গ্রহণের প্রচলিত বিধান তাই শুধু একটি নিষেধের বাক্য পড়ে নির্ধারণ করা হয় না। এসব বিষয়ে কোরআনের অন্য আয়াত এবং নবীর নামে সংরক্ষিত ব্যাখ্যা ও অনুমোদন ব্যবহার করা হয়েছে। [52] [53]

إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ وَلَحْمَ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ بِهِ لِغَيْرِ اللَّهِ ۖ فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ.

বাংলা অনুবাদ:
মরা প্রাণী, রক্ত, শুকরের মাংস এবং যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে উৎসর্গ করা — শুধুমাত্র এগুলোই তিনি তোমাদের জন্য হারাম করেছেন। কিন্তু কেউ যদি বাধ্য হয় এগুলো খেতে এবং তার ভেতরে খাওয়ার কোনো আকাঙ্খা না থাকে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত না খায়, তাহলে তার কোনো পাপ হবে না। আল্লাহ অবশ্যই অনেক ক্ষমা করেন, তিনি নিরন্তর দয়ালু।
( কোরআন ২ঃ ১৭৩ )

حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ وَأَنْ تَسْتَقْسِمُوا بِالْأَزْلَامِ ۚ ذَٰلِكُمْ فِسْقٌ ۗ الْيَوْمَ يَئِسَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ دِينِكُمْ فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَاخْشَوْنِ ۚ الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ۚ فَمَنِ اضْطُرَّ فِي مَخْمَصَةٍ غَيْرَ مُتَجَانِفٍ لِإِثْمٍ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ.

বাংলা অনুবাদ:
তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে মৃত জীব, রক্ত, শুকরের মাংস, যেসব জন্তু আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকৃত হয়, যা কন্ঠরোধে মারা যায়, যা আঘাত লেগে মারা যায়, যা উচ্চ স্থান থেকে পতনের ফলে মারা যায়, যা শিং এর আঘাতে মারা যায় এবং যাকে হিংস্র জন্তু ভক্ষণ করেছে, কিন্তু যাকে তোমরা যবেহ করেছ। আরও নিষিদ্ধ করা হয়েছে যা বেদিতে যবেহ করা হয় এবং তীরের মাধ্যমে ভাগ্য নির্ধারণ করা। এসব অবাধ্যতা। আজ অবিশ্বাসীরা তোমাদের ধর্মের ব্যাপারে নিরাশ হয়েছে; তাই তাদের ভয় করো না, আমাকে ভয় কর। আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম পূর্ণ করেছি, তোমাদের ওপর আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করেছি এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেছি। কেউ পাপের দিকে ঝুঁকে না পড়ে তীব্র ক্ষুধায় বাধ্য হলে আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।
( কোরআন ৫ঃ৩ )

মৃত প্রাণীর নিষেধের সঙ্গে মাছের অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে সূরা মায়িদার ৫:৯৬ আয়াতও প্রাসঙ্গিক। এখানে জলাশয়ের শিকার এবং তার খাদ্য অনুমোদিত করা হয়েছে; আর ইহরাম অবস্থায় স্থলের শিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আয়াতের “ওয়া তাআমুহু” কথাটির অর্থ “এবং তার খাদ্য”; এটি শুধু শিকার করার কাজের পুনরাবৃত্তি নয়। ফলে আয়াতে কেবল জীবিত প্রাণী ধরে শিকার করার অনুমতি আছে, খাদ্যের অন্য কোনো অবস্থা বিবেচনায় নেই—এমন দাবি আয়াতের সম্পূর্ণ ভাষার সঙ্গে মেলে না। মৃত মাছ এই খাদ্যের মধ্যে কীভাবে গণ্য হবে এবং যবেহের সাধারণ নিয়মের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী, সেই নির্দিষ্ট নববী ব্যাখ্যা হাদিসে পাওয়া যায়। প্রচলিত খাদ্যবিধানে সাধারণ নিষেধ, জলজ খাদ্যের অনুমতি এবং এই ব্যাখ্যাকে একত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। [54]

أُحِلَّ لَكُمْ صَيْدُ الْبَحْرِ وَطَعَامُهُ مَتَاعًا لَكُمْ وَلِلسَّيَّارَةِ ۖ وَحُرِّمَ عَلَيْكُمْ صَيْدُ الْبَرِّ مَا دُمْتُمْ حُرُمًا ۗ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ.

বাংলা অনুবাদ:
তোমাদের জন্য সমুদ্র শিকার ও তার খাদ্য হালাল করা হয়েছে। তোমাদের এবং ভ্রমণকারীদের উপকারের জন্য। আর তোমরা যতক্ষণ ইহরামে থাকবে, ততক্ষণ স্থলের শিকার তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর কাছে তোমাদের সমবেত করা হবে।
( কোরআন ৫:৯৬ )

কোরআনের জলাশয়সংক্রান্ত ভাষা শুধু লোনা সমুদ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সূরা ফাতিরের ৩৫:১২ আয়াতে মিঠা ও পানযোগ্য জল এবং লোনা ও তিক্ত জলকে দুটি “বাহর” হিসেবে উল্লেখ করে উভয়টি থেকেই তাজা মাংস খাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাই নদী বা মিঠা পানির মাছের খাদ্যগত অনুমতি কোরআনে নেই বলা ভুল। একই সঙ্গে এই আয়াত মাছের মৃত্যুর সমস্ত অবস্থা, যবেহের ব্যতিক্রম এবং নবীর অনুমোদনের ঘটনাবিবরণ সরবরাহ করে না। জলজ খাদ্যের সাধারণ উল্লেখ এবং মৃত মাছ সম্পর্কে সরাসরি নববী ঘোষণার মধ্যে এই পার্থক্য রয়েছে। প্রচলিত বিধানকে মুহাম্মদের ব্যাখ্যা ও অনুমোদন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে তাঁর নামে সংরক্ষিত বক্তব্যও ব্যবহৃত হয়; শুধু “বাহর” শব্দকে লোনা সমুদ্রের অর্থে সীমিত করলে কোরআনের নিজের ভাষাই বিকৃত হয়। [55]

وَمَا يَسْتَوِي الْبَحْرَانِ هَٰذَا عَذْبٌ فُرَاتٌ سَائِغٌ شَرَابُهُ وَهَٰذَا مِلْحٌ أُجَاجٌ ۖ وَمِنْ كُلٍّ تَأْكُلُونَ لَحْمًا طَرِيًّا وَتَسْتَخْرِجُونَ حِلْيَةً تَلْبَسُونَهَا ۖ وَتَرَى الْفُلْكَ فِيهِ مَوَاخِرَ لِتَبْتَغُوا مِنْ فَضْلِهِ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ.

বাংলা অনুবাদ:
দুটি জলাশয় সমান নয়: এটি মিঠা, তৃষ্ণা নিবারক ও পান করার উপযোগী; আর এটি লোনা ও তিক্ত। উভয়টি থেকেই তোমরা তাজা মাংস খাও এবং অলংকার বের কর, যা তোমরা পরিধান কর। আর তুমি তাতে নৌযানগুলোকে পানি চিরে চলতে দেখ, যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে পার এবং কৃতজ্ঞ হও।

মৃত মাছ ও কলিজা–প্লীহার প্রসঙ্গে ইবন মাজাহর বর্ণনা সরাসরি দুটি মৃতজীব এবং দুই ধরনের রক্তের অনুমতি ঘোষণা করেছে। আবদুল্লাহ ইবন উমারের সূত্রে সংরক্ষিত বক্তব্যে মৃতজীব হিসেবে মাছ ও পঙ্গপাল এবং রক্ত হিসেবে কলিজা ও প্লীহা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে কোনো সাধারণ শব্দ থেকে অনুমান করে ওই চারটি খাদ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে না; মুহাম্মদের নামে নির্দিষ্ট নামসহ অনুমতি সংরক্ষিত হয়েছে। প্রচলিত শরীয়তে এই বর্ণনা গ্রহণের মাধ্যমে খাদ্যগুলোর অনুমতিকে নববী কর্তৃত্ব দেওয়া হয়। হাদিস প্রত্যাখ্যান করলে ওই নির্দিষ্ট ঘোষণাটিও প্রত্যাখ্যাত হয়। কোরআনের অন্য আয়াত থেকে খাদ্যগত ব্যাখ্যা তৈরি করা এবং সেই ব্যাখ্যাকে মুহাম্মদের এই ঘোষণার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করা পৃথক কাজ; দ্বিতীয়টির তথ্যসূত্র এই বর্ণনা। [56] [57]

حَدَّثَنَا أَبُو مُصْعَبٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنِ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ قَالَ «أُحِلَّتْ لَنَا مَيْتَتَانِ وَدَمَانِ فَأَمَّا الْمَيْتَتَانِ فَالْحُوتُ وَالْجَرَادُ وَأَمَّا الدَّمَانِ فَالْكَبِدُ وَالطِّحَالُ».

বাংলা অনুবাদ:
সুনানে ইবনে মাজাহ
অধ্যায়ঃ ২৩/ আহার ও তার শিষ্টাচার
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
পরিচ্ছদঃ ২৩/৩১. কলিজা ও পীলহা।
১/৩৩১৪। আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের জন্য দু’ প্রকারের মৃতজীব ও দু’ ধরনের রক্ত হালাল করা হয়েছে। মৃত জীব দু’টি হলো মাছ ও টিড্ডি এবং দু’ প্রকারের রক্ত হলো কলিজা ও প্লীহা।
আহমাদ ৫৬, ৯০, সহিহাহ ১১১৮। তাহকীক আলবানীঃ সহিহ। উক্ত হাদিসের রাবী আবদুর রহমান বিন যায়দ বিন আসলাম সম্পর্কে আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী বলেন, তার দুর্বলতার ব্যাপারে সকলে একমত। আবুল কাসিম বিন বিশকাওয়াল বলেন, তার ভাই তাকে দুর্বল বলেছেন। আবু বাকর আল-বায়হাকী বলেন, তার হাদিস দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়, তিনি দুর্বল। আবু যুরআহ আর-রাযী ও ইমাম তিরমিযি বলেন, তিনি হাদিস বর্ণনায় দুর্বল। (তাহযীবুল কামালঃ রাবী নং ৩৮২০, ১৭/১১৪ নং পৃষ্ঠা) উক্ত হাদিসটি সহিহ কিন্তু আবদুর রহমান বিন যায়দ বিন আসলাম এর কারণে সানাদটি দুর্বল। হাদিসটির ২৯ টি শাহিদ হাদিস রয়েছে, ১০ টি খুবই দুর্বল, ৯ টি দুর্বল, ৮ টি হাসান, ২ টি সহিহ হাদিস পাওয়া যায়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ আহমাদ ৫৬৯০, দারাকুতনী ৪৬৮৭, শারহুস সুন্নাহ ২৮০৩।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

কলিজা ও প্লীহার প্রসঙ্গে কোরআনের রক্তসংক্রান্ত ভাষার নির্দিষ্টতাও রয়েছে। সূরা আনআমের ৬:১৪৫ আয়াতে নিষিদ্ধ রক্তকে “দামান মাসফুহান”, অর্থাৎ ক্ষরিত বা প্রবাহিত রক্ত বলা হয়েছে। ফলে রক্তের সাধারণ উল্লেখকে যেকোনো রক্তসম্পর্কিত অঙ্গের ওপর একইভাবে প্রয়োগ করা আয়াতটির পূর্ণ ভাষার সঙ্গে মেলে না। ইবন মাজাহর বর্ণনায় কলিজা ও প্লীহাকে “দুই ধরনের রক্ত” নামে আলাদা অনুমতির মধ্যে রাখা হয়েছে; কোরআনের আয়াতে আবার রক্তের অবস্থাকে বিশেষণ দিয়ে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। প্রচলিত খাদ্যবিধানে এই পাঠগুলোকে মিলিয়েই নিষেধের সীমা ও অনুমতির ব্যাখ্যা নির্ধারিত হয়। হাদিসের ভূমিকা এখানে নির্দিষ্ট নববী ঘোষণার তথ্য সরবরাহ করা; কোরআনের রক্তসংক্রান্ত বিশেষণ মুছে দিয়ে সমস্ত খাদ্যগত অনুমতির একমাত্র উৎস হাদিস বলা আয়াতটির তথ্য বাদ দেওয়া। [58]

قُلْ لَا أَجِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا عَلَىٰ طَاعِمٍ يَطْعَمُهُ إِلَّا أَنْ يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنزِيرٍ فَإِنَّهُ رِجْسٌ أَوْ فِسْقًا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ ۚ فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَإِنَّ رَبَّكَ غَفُورٌ رَحِيمٌ.

বাংলা অনুবাদ:
বলো: আমার কাছে যে ওহি এসেছে, তাতে কোনো ভক্ষণকারীর জন্য কোনো খাবার নিষিদ্ধ পাই না, যদি না তা মৃত প্রাণী, ক্ষরিত রক্ত অথবা শূকরের মাংস হয়—কারণ তা অপবিত্র—অথবা অবাধ্যতার এমন কিছু হয়, যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। কেউ বিদ্রোহী বা সীমালঙ্ঘনকারী না হয়ে বাধ্য হলে তোমার রব ক্ষমাশীল, দয়ালু।

সমুদ্রের মৃত প্রাণী সম্পর্কে আবু হুরায়রার সূত্রে আবু দাউদে আরও সরাসরি একটি বক্তব্য রয়েছে। সমুদ্রে যাত্রা করা একজন ব্যক্তি অল্প পানীয় জল অজুতে ব্যবহার করলে তৃষ্ণার আশঙ্কার কথা জানান এবং সমুদ্রের পানি দিয়ে অজু করা যাবে কি না জিজ্ঞাসা করেন। উত্তরে মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত হয়েছে, সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং তার মৃত প্রাণী হালাল। প্রশ্নটি অজু সম্পর্কে হলেও উত্তরে খাদ্যের অবস্থানও নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে শুধু জলজ খাদ্যের সাধারণ উল্লেখ নয়, মৃত প্রাণীর অনুমতিকে মুহাম্মদের নির্দিষ্ট বক্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার তথ্যও হাদিস বহন করছে। প্রচলিত বিধান থেকে এই বর্ণনা বাদ দিলে “মুহাম্মদ সরাসরি মৃত সামুদ্রিক প্রাণী হালাল বলেছেন”—এই দাবির সংশ্লিষ্ট প্রমাণও বাদ পড়ে। [59]

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْلَمَةَ، عَنْ مَالِكٍ، عَنْ صَفْوَانَ بْنِ سُلَيْمٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ سَلَمَةَ ـ مِنْ آلِ ابْنِ الأَزْرَقِ ـ أَنَّ الْمُغِيرَةَ بْنَ أَبِي بُرْدَةَ ـ وَهُوَ مِنْ بَنِي عَبْدِ الدَّارِ ـ أَخْبَرَهُ أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا هُرَيْرَةَ يَقُولُ سَأَلَ رَجُلٌ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّا نَرْكَبُ الْبَحْرَ وَنَحْمِلُ مَعَنَا الْقَلِيلَ مِنَ الْمَاءِ فَإِنْ تَوَضَّأْنَا بِهِ عَطِشْنَا أَفَنَتَوَضَّأُ بِمَاءِ الْبَحْرِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «هُوَ الطَّهُورُ مَاؤُهُ الْحِلُّ مَيْتَتُهُ».

বাংলা অনুবাদ:
আবদুল্লাহ ইবন মাসলামা আমাদের বর্ণনা করেছেন, মালিকের সূত্রে, সাফওয়ান ইবন সুলাইমের মাধ্যমে সাঈদ ইবন সালামা থেকে—তিনি ইবন আজরাকের পরিবারের সদস্য। মুগিরা ইবন আবি বুরদা—তিনি বনু আবদুদ দারের সদস্য—তাঁকে জানিয়েছেন যে, তিনি আবু হুরায়রাকে বলতে শুনেছেন: একজন ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন: হে আল্লাহর রাসুল, আমরা সমুদ্রে যাত্রা করি এবং সঙ্গে অল্প পানি নিই। সেই পানি দিয়ে অজু করলে আমরা তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ব। আমরা কি সমুদ্রের পানি দিয়ে অজু করতে পারি? আল্লাহর রাসুল বললেন: “তার পানি পবিত্র এবং তার মৃত প্রাণী হালাল।”

খাদ্যবিধানে হাদিসের কাজ সাধারণ নিষেধের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুমতি, ব্যতিক্রম এবং মুহাম্মদের বক্তব্যের কর্তৃত্ব যুক্ত করা। কোরআনে জলজ খাদ্য ও ক্ষরিত রক্তের উল্লেখ আছে; আর হাদিসে মাছ, পঙ্গপাল, কলিজা, প্লীহা ও সামুদ্রিক মৃত প্রাণী সম্পর্কে সরাসরি অনুমতির বর্ণনা রয়েছে। এই বর্ণনাগুলো বাদ দিয়ে একই অনুমতিকে মুহাম্মদের ঘোষিত বিধান বলার জন্য তাঁর বক্তব্যের অন্য কোনো সংরক্ষিত তথ্য প্রয়োজন হয়। উদ্ধৃত ইবন মাজাহ সংস্করণে সনদের দুর্বলতা এবং সামগ্রিকভাবে সহিহ বলার আলোচনা রয়েছে; এই শ্রেণিবিন্যাস হাদিসশাস্ত্রের নিজস্ব মূল্যায়ন, ঐশ্বরিক উৎস বা নির্ভুল ঐতিহাসিক সত্যের স্বতন্ত্র প্রমাণ নয়। শরীয়তের ক্ষেত্রে কার্যকর বিষয়টি হচ্ছে, সাধারণ কোরআনি পাঠকে নির্দিষ্ট নববী খাদ্যবিধানে রূপ দেওয়ার জন্য এই সংরক্ষিত বর্ণনার কর্তৃত্ব ব্যবহার করা হয়েছে।


হাদিস না মানার সবচেয়ে বড় সমস্যা

সূরা আহযাবের ৩৩:৫২ আয়াতে মুহাম্মদের জন্য এরপর নতুন নারী গ্রহণ এবং বিদ্যমান স্ত্রীদের বদলে অন্য স্ত্রী নেওয়ার নিষেধ এসেছে; নারীর সৌন্দর্য তাঁকে আকৃষ্ট করলেও নিষেধের কথা বলা হয়েছে। একই বাক্যে তাঁর মালিকানাধীন দাসীদের আলাদা করা হয়েছে। আয়াতের এই নিষেধকে বিবাহের কার্যকর বিধান হিসেবে গ্রহণ করলে কোন সময় থেকে তা প্রযোজ্য, পরে তা বহাল ছিল কি না এবং অন্য কোনো নির্দেশে তার প্রয়োগ পরিবর্তিত হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নও সামনে আসে। বর্তমান আয়াতে নিজের নাজিল হওয়ার তারিখ এবং পরবর্তী বিধানপরিবর্তনের সম্পূর্ণ বিবরণ লেখা নেই। ফলে মুহাম্মদের কোনো বিবাহ এই নিষেধের অন্তর্ভুক্ত ছিল কি না নির্ধারণ করতে তাঁর জীবনের ঘটনাবিবরণ এবং বিধানের সময়ক্রম সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য প্রয়োজন হয়। [60]

لَا يَحِلُّ لَكَ النِّسَاءُ مِنْ بَعْدُ وَلَا أَنْ تَبَدَّلَ بِهِنَّ مِنْ أَزْوَاجٍ وَلَوْ أَعْجَبَكَ حُسْنُهُنَّ إِلَّا مَا مَلَكَتْ يَمِينُكَ ۗ وَكَانَ اللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ رَقِيبًا.

বাংলা অনুবাদ:
এরপর আপনার জন্যে কোন নারী হালাল নয় এবং তাদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করাও হালাল নয় যদিও তাদের রূপলাবণ্য আপনাকে মুগ্ধ করে, তবে দাসীর ব্যাপার ভিন্ন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ের উপর সজাগ নজর রাখেন।
( কোরআন ৩৩ঃ৫২ )

ইবন কাসীরের “আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া”-তে মুহাম্মদের বিভিন্ন বিবাহ এবং সহবাস না হওয়া বিবাহগুলোর বর্ণনা রয়েছে। ফাতিমা বিনত দাহহাকের প্রসঙ্গের পর আসমা, আমরা, উম্মু শুরায়ক এবং কাতীলা বিনত কায়সের বিবরণ এসেছে। কাতীলার বিবাহের একটি বর্ণনায় নবম হিজরীর রবিউল মাসের কথা আছে; অন্য বর্ণনায় মৃত্যুর দুই মাস আগে কিংবা শেষ অসুস্থতার সময়ের কথা বলা হয়েছে। এগুলো গ্রন্থে সংকলিত পৃথক বর্ণনা, একই ঘটনার একটিমাত্র নিশ্চিত তারিখ নয়। শেষ জীবনের বিবাহের এই বর্ণনাগুলোর সঙ্গে ৩৩:৫২ আয়াতের সম্পর্ক নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট সময়ের নিষেধ ও অনুমতির তথ্যও প্রয়োজন। শুধু গোটা সূরার সাধারণ কালপরিচয় দিয়ে তার প্রতিটি আয়াতের নাজিল হওয়ার নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত হয় না। বিবাহসংক্রান্ত আলোচনা। [61] [62]

قال وتزوجها في ذي القعدة سنة ثمان، وماتت سنة ستين (3). وذكر يونس عن ابن إسحاق فيمن تزوجها عليه السلام ولم يدخل بها أسماء بنت كعب الجونية وعمرة بنت يزيد الكلابية. وقال ابن عباس وقتادة: أسماء بنت النعمان بن أبي الجون. فالله أعلم. قال ابن عباس لما استعاذت منه خرج من عندها مغضبا، فقال له الاشعث: لا يسؤك ذلك يا رسول الله فعندي أجمل منها، فزوجه أخته قتيلة. وقال غيره كان ذلك في ربيع سنة تسع. وقال سعيد بن أبي عروبة عن قتادة: تزوج رسول الله صلى الله عليه وسلم خمس عشرة امرأة، فذكر منهن أم شريك الانصارية النجارية قال: وقد قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: “إني لاحب أن أتزوج من الانصار ولكني أكره غيرتهن” ولم يدخل بها. قال وتزوج أسماء (4) بنت الصلت من بني حرام ثم من بني سلم ولم يدخل بها، وخطب حمزة (5) بنت الحارث المزنية. وقال الحاكم أبو عبد الله النيسابوري وقال أبو عبيدة معمر بن المثنى: تزوج رسول الله ثماني عشرة امرأة، فذكر منهن قتيلة بنت قيس أخت الاشعث بن قيس، فزعم بعضهم أنه تزوجها قبل وفاته بشهرين، وزعم آخرون أنه تزوجها في مرضه. قال ولم يكن قدمت عليه ولا رآها ولم يدخل بها. قال: وزعم آخرون أنه عليه السلام أوصى أن تخير قتيلة فإن شاءت يضرب عليها الحجاب وتحرم على المؤمنين، وإن شاءت فلتنكح من شاءت، فاختارت النكاح فتزوجها عكرمة بن أبي جهل بحضرموت، فبلغ ذلك أبا بكر فقال: لقد هممت أن أحرق عليهما. فقال عمر بن الخطاب: ما هي من أمهات المؤمنين ولا دخل بها ولا ضرب عليها الحجاب قال أبو عبيدة: وزعم بعضهم أن رسول الله صلى الله عليه وسلم لم يوص فيها بشئ، وأنها ارتدت بعده فاحتج عمر على أبي بكر بارتدادها أنها ليست من أمهات المؤمنين.

বাংলা অনুবাদ:
বর্ণনাকারী বলেন, নবী করীম (সা) তাকে বিয়ে করেছিলেন আট হিজরীর যিলকদ মাসে, আর তার মৃত্যু হয়েছিল ষাট হিজরীতে। নবী করীম (সা) যাদের বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু তাদের সংগে সহবাস করেননি, এ তালিকায় ইবন ইসহাক (র) হতে ইউনুস (র) উল্লেখ করেছেন, আসমা বিনত কা’ব জাওনী ও ‘আমরা বিনত ইয়াযীদ কিলাবীকে। তবে ইব্‌ন আব্বাস (রা) ও কাতাদা (র) বলেছেন, আসমা বিনতুন নু’মান ইব্‌ন আবুল জাওন।-আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।
ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, সে নবী করীম (সা) হতে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করলে তিনি রুষ্ট হয়ে তাঁর নিকট থেকে বেরিয়ে আসলে আশ’আছ (রা) তাকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি এতে দুঃখিত হবেন না। আমার কাছে তার চেয়ে সুন্দরী গুণবতী রয়েছে। পরে তিনি নিজের বোন কাতীলাকে তার সংগে বিয়ে দিলেন। অন্যান্য বর্ণনা মতে এটি ছিল নবম হিজরীর রাবী (আউয়াল/ছানী) মাসের ঘটনা।
সা’ঈদ ইব্‌ন আবূ আরুবা (র) বলেন, কাতাদা (র) থেকে, রাসূলুল্লাহ (সা) পনের জন মহিলাকে পরিণয় বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। তিনি এদের মাঝে নাজ্জার গোত্রের আনসারী মহিলা উম্মু শুরায় (রা)-কেও উল্লেখ করেছেন। সা’ঈদ (র) আরো বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছিলেন, “আনসারীদের মাঝে বিয়ে করা আমার পসন্দনীয়। কিন্তু আমি তাদের টনটনে আত্মমর্যাদা বোধ পসন্দ করিনা।” রাসূল (সা) উম্মু শুরায়ক (রা)-এর সংগেও নিভৃত বাস করেননি। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি বনু হারাস ও পরে বনূ সুলায়ম গোত্রীয় আসমা বিনতুস সালতকেও বিয়ে করেছিলেন এবং তার সংগেও নিভৃত বাস করেন নি। আর হামযা বিনতুল হারিছ আল মুযানীকে তিনি পয়গাম পাঠিয়েছিলেন।
হাকিম আবূ অবদুল্লাহ নিশাপুরী (র) বলেন, আবু উবায়দা মা’মার ইবনুল মুছান্না (র) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) আঠার জন নারীকে বিয়ে করেছিলেন। এ বর্ণনায় তিনি আশ’আছ ইবন কায়স-এর বোন কাতীলা বিনত কায়স (রা)-কেও এ সংখ্যার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এ বিষয়ে কেউ কেউ বলেছেন, নবী করীম (সা) তার ওফাতের দুই মাস আগে তাকে বিয়ে করেছিলেন। অন্য অনেকের মতে এ বিয়ে হয়েছিল নবী করীম (সা)-এর ওফাত পূর্ববর্তী অসুস্থতাকালে। বর্ণনাকারী বলেন, তাই, তাকে নবী করীম (সা)-এর কাছে নিয়ে আসা হয়নি এবং তিনি তাকে দেখেনও নি বা তার সংগে বাসরও করেননি। বর্ণনাকারী বলেন, অন্য অনেকে এ কথাও বলেছেন যে, নবী করীম (সা) এ মর্মে ওসীয়ত করে গিয়েছিলেন যে, কাতীলাকে এখতিয়ার দেওয়া হবে। সুতরাং সে ইচ্ছা করলে তার জন্য নবী পত্নীসুলভ পর্দার হুকুম সাব্যস্ত হবে এবং মু’মিনদের জন্য তাকে বিয়ে করা হারাম হবে। আর ইচ্ছা করলে সে যাকে পসন্দ বিয়ে করতে পারবে। পরে সে বিয়ে করা ইখতিয়ার করলে ইকরিমা ইব্‌ন আবু জাহল হাযরামাওতে তাকে বিয়ে করলেন। আবূ বকর (রা)-এর কাছে এ খবর পৌঁছলে তিনি বললেন, আমি তাঁদের দু’জনকে ভস্মীভূত করে দেয়ার সংকল্প করেছি। তখন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) বললেন, সে তো উম্মুল মুমিনীনগণের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং নবী করীম (সা) তার সংগে নিভৃত বাসও করেন নি। তাকে পর্দার অন্তরালও করেন নি। তবে আবূ উবায়দা (র) বলেছেন, কেউ কেউ বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) তার ব্যাপারে কোন ওসীয়ত করে যান নি। নবী করীম (সা)-এর ইন্তিকালের পর সে ধর্ম ত্যাগ করেছিল। তার এ ধর্ম ত্যাগের যুক্তিতে উমর আবূ বকরের কাছে বলেন যে, সে উম্মুল মুমিনীনগণের অন্তর্ভুক্ত নয়।

হাদিস 10

নিষেধ কার্যকর থাকা অবস্থায় নিষিদ্ধ বিবাহ সংঘটিত হলে তা আদেশ লঙ্ঘন হবে। কিন্তু নিষেধের আয়াতের বর্তমান উপস্থিতি, বিবাহের সময় এবং সেই সময়ে নিষেধ বহাল থাকার প্রশ্ন পৃথক তথ্যের প্রশ্ন। আয়েশার সূত্রে নাসায়ীতে সংরক্ষিত বক্তব্য হচ্ছে, মুহাম্মদের মৃত্যুর আগে তাঁকে নারীদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা বিয়ে করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই বর্ণনায় অনুমতি পরিবর্তনের দাবি আছে; অনুমতি পাওয়ার পরে তিনি অবশ্যই নতুন বিবাহ করেছেন—এমন ঘটনা বলা হয়নি। প্রচলিত নিষেধ–অনুমতির ধারাটি প্রতিষ্ঠা করতে তাই এই ধরনের বর্ণনা ব্যবহার করা হয়। হাদিস বাদ দিলে আয়াতের পাঠ থেকে মৃত্যুর আগে ওই অনুমতি দেওয়ার ঘোষণা নিজে থেকে পাওয়া যায় না; সেই ঘোষণার সংশ্লিষ্ট তথ্যসূত্রই বাদ পড়ে। [63] [64]

أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الْمُبَارَكِ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو هِشَامٍ ـ وَهُوَ الْمُغِيرَةُ بْنُ سَلَمَةَ الْمَخْزُومِيُّ ـ قَالَ حَدَّثَنَا وُهَيْبٌ، قَالَ حَدَّثَنَا ابْنُ جُرَيْجٍ، عَنْ عَطَاءٍ، عَنْ عُبَيْدِ بْنِ عُمَيْرٍ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ مَا تُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حَتَّى أَحَلَّ اللَّهُ لَهُ أَنْ يَتَزَوَّجَ مِنَ النِّسَاءِ مَا شَاءَ.

বাংলা অনুবাদ:
সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৬/ নিকাহ (বিবাহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূলের উপর যা ফরয করেছেন এবং অন্যদের জন্য যা হারাম করেছেন- আল্লাহর নৈকট্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে
৩২০৮. মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন মুবারক (রহঃ) আমাদের জানিয়েছেন। তিনি বলেন: আবূ হিশাম—অর্থাৎ মুগিরা ইবন সালামা মাখযূমী—আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: উহাইব আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: ইবন জুরাইজ আমাদের বর্ণনা করেছেন, আতার সূত্রে, উবাইদ ইবন উমাইরের মাধ্যমে আয়েশা (রাঃ) থেকে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইনতিকালের পূর্বে আল্লাহ তাআলা তার জন্য হালাল করে দিয়েছিলেন যাকে ইচ্ছা তিনি মহিলাদের মধ্য থেকে বিবাহ করতে পারবেন।
তাহক্বীকঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

বিধান রহিত বা মানসুখ হওয়ার দাবির সঙ্গে সূরা বাকারার ২:১০৬ আয়াতের সম্পর্কও রয়েছে। আয়াতে কোনো আয়াত রহিত করা বা বিস্মৃত করানোর পরে তার চেয়ে উত্তম অথবা সমপর্যায়ের আয়াত আনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই সাধারণ বক্তব্য কোন নির্দিষ্ট আয়াত কখন রহিত হয়েছিল, তার তালিকা দেয় না। সূরা আহযাবের ৫২তম আয়াতের নিষেধ রহিত হয়েছে—এই সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করতে তাই নির্দিষ্ট পরিবর্তনের পরিচয় ও সময় সম্পর্কে তথ্য প্রয়োজন। বর্তমান মুসহাফে “৫২তম আয়াতের এই নিষেধ এখন রহিত”—এমন স্বতন্ত্র ঘোষণা নেই। অনুমতিসংক্রান্ত আয়াতের বর্তমান অবস্থান এবং তাদের নাজিল হওয়ার সময়ও একই তথ্য নয়। ফলে আয়াতের আইনগত কার্যকারিতা বহাল ছিল নাকি পরিবর্তিত হয়েছিল, তা নির্ধারণে কোরআনের বাইরে সংরক্ষিত বিধানপরিবর্তনের বর্ণনা ব্যবহার করা হয়েছে। [65]

مَا نَنْسَخْ مِنْ آيَةٍ أَوْ نُنْسِهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِنْهَا أَوْ مِثْلِهَا ۗ أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.

বাংলা অনুবাদ:
আমি কোন আয়াত রহিত করলে অথবা বিস্মৃত করিয়ে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা তার সমপর্যায়ের আয়াত আনয়ন করি। তুমি কি জান না যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর শক্তিমান?
( সূরা বাকারাঃ ১০৬ )

সূরা আহযাবের ৩৩:৫১ আয়াতে মুহাম্মদকে নারীদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা স্থগিত রাখা, যাকে ইচ্ছা নিজের কাছে নেওয়া এবং আগে সরিয়ে রাখা কাউকে আবার গ্রহণ করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। বর্তমান মুসহাফে এই আয়াতের পরেই ৫২তম আয়াতের নিষেধ রয়েছে। ৫১তম আয়াতের ভাষায় নিজেকে ৫২তম আয়াতের পরবর্তী নির্দেশ বা তার বিধান রহিতকারী বলে ঘোষণা করা হয়নি। তাই কোনো ব্যাখ্যায় ৫১তম আয়াতকে ৫২তম আয়াতের নিষেধ রহিতকারী হিসেবে গ্রহণ করলে, তার পরবর্তী সময়ে নাজিল হওয়ার দাবিটিও আলাদা তথ্যের ওপর দাঁড়ায়। মুসহাফের পাঠক্রম থেকে সেই কালক্রম পাওয়া যায় না। নিষেধের সঙ্গে অনুমতির সম্পর্ক নির্ধারণে এই অতিরিক্ত ঘোষণার ভূমিকা রয়েছে; শুধু আয়াতের ক্রমিক সংখ্যা দিয়ে প্রচলিত বিধানপরিবর্তনের ইতিহাস পুনর্গঠন করা যায় না। [66]

تُرْجِي مَنْ تَشَاءُ مِنْهُنَّ وَتُؤْوِي إِلَيْكَ مَنْ تَشَاءُ ۖ وَمَنِ ابْتَغَيْتَ مِمَّنْ عَزَلْتَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكَ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَنْ تَقَرَّ أَعْيُنُهُنَّ وَلَا يَحْزَنَّ وَيَرْضَيْنَ بِمَا آتَيْتَهُنَّ كُلُّهُنَّ ۚ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا فِي قُلُوبِكُمْ ۚ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَلِيمًا.

বাংলা অনুবাদ:
তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তুমি স্থগিত রাখতে পার এবং যাকে ইচ্ছা নিজের কাছে নিতে পার। যাদের তুমি সরিয়ে রেখেছ, তাদের কাউকে আবার চাইলে তোমার কোনো দোষ নেই। এতে তাদের চোখ জুড়ানোর, দুঃখ না করার এবং তুমি তাদের সবাইকে যা দিয়েছ তাতে সন্তুষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আল্লাহ জানেন তোমাদের হৃদয়ে কী আছে; আর আল্লাহ জ্ঞানী, সহনশীল।

ইবন কাসীরের তাফসীরে নিষেধ রহিত হওয়ার ব্যাখ্যার সঙ্গে আয়েশা ও উম্মু সালামার বর্ণনা যুক্ত করা হয়েছে। উম্মু সালামার বর্ণনায় ৫১তম আয়াতের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তাঁকে যাকে ইচ্ছা বিবাহ করার অনুমতির কথা বলা হয়েছে; ইবন কাসীর এটিকে পাঠক্রমে পরের আয়াতের বিধান রহিত হওয়ার ব্যাখ্যায় ব্যবহার করেছেন। একই আলোচনায় তিনি বলেছেন, নিষেধ তুলে নেওয়ার পরে মুহাম্মদ নতুন বিবাহ করেননি। ফলে তাঁর তাফসীরের এই সিদ্ধান্ত এবং তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে সংকলিত শেষ জীবনের বিবাহের বিভিন্ন বর্ণনাকে একই নিশ্চিত ঘটনার বিবরণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। একটি অনুমতির ঘোষণা, একটি বিবাহের ঘটনাবর্ণনা এবং নিষেধ রহিত হওয়ার সিদ্ধান্ত—এই তিনটি বিষয় পৃথক। বিধানপরিবর্তনের দাবিটি প্রতিষ্ঠা করতে এখানে বর্ণনাগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্যসূত্র হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে। [67]

ذكر غير واحد من العلماء – كابن عباس ، ومجاهد ، والضحاك ، وقتادة ، وابن زيد ، وابن جرير ، وغيرهم – أن هذه الآية نزلت مجازاة لأزواج النبي صلى الله عليه وسلم ورضا عنهن ، على حسن صنيعهن في اختيارهن الله ورسوله والدار الآخرة ، لما خيرهن رسول الله صلى الله عليه وسلم ، كما تقدم في الآية . فلما اخترن رسول الله صلى الله عليه وسلم ، كان جزاؤهن أن [ الله ] قصره عليهن ، وحرم عليه أن يتزوج بغيرهن ، أو يستبدل بهن أزواجا غيرهن ، ولو أعجبه حسنهن إلا الإماء والسراري فلا حجر عليه فيهن . ثم إنه تعالى رفع عنه الحجر في ذلك ونسخ حكم هذه الآية ، وأباح له التزوج ، ولكن لم يقع منه بعد ذلك تزوج لتكون المنة للرسول صلى الله عليه وسلم عليهن . قال الإمام أحمد : حدثنا سفيان ، عن عمرو ، عن عطاء ، عن عائشة ، رضي الله عنها ، قالت : ما مات رسول الله صلى الله عليه وسلم حتى أحل الله له النساء . ورواه أيضا من حديث ابن جريج ، عن عطاء ، عن عبيد بن عمير ، عن عائشة . ورواه الترمذي والنسائي في سننيهما . وقال ابن أبي حاتم : حدثنا أبو زرعة ، حدثنا عبد الرحمن بن عبد الملك بن شيبة ، حدثني عمر بن أبي بكر ، حدثني المغيرة بن عبد الرحمن الحزامي ، عن أبي النضر مولى عمر بن عبيد الله ، عن عبد الله بن وهب بن زمعة ، عن أم سلمة أنها قالت : لم يمت رسول الله صلى الله عليه وسلم حتى أحل الله له أن يتزوج من النساء ما شاء ، إلا ذات محرم ، وذلك قول الله عز وجل : ( ترجي من تشاء منهن وتؤوي إليك من تشاء ) . فجعلت هذه ناسخة للتي بعدها في التلاوة ، كآيتي عدة الوفاة في البقرة ، الأولى ناسخة للتي بعدها ، والله أعلم .

বাংলা অনুবাদ:
ইবন আব্বাস, মুজাহিদ, দাহহাক, কাতাদা, ইবন যায়দ, ইবন জারিরসহ একাধিক আলেম উল্লেখ করেছেন যে, নবীর স্ত্রীদের পুরস্কার ও তাঁদের প্রতি সন্তুষ্টি হিসেবে এই আয়াত নাজিল হয়েছিল; কারণ রাসুল তাঁদের বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলে তাঁরা আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও পরকাল বেছে নিয়েছিলেন, যেমন আগের আয়াতের আলোচনায় এসেছে। তাঁরা রাসুলকে বেছে নেওয়ার পরে তাঁদের পুরস্কার ছিল এই যে, আল্লাহ তাঁকে তাঁদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করেন এবং অন্য নারীকে বিয়ে করা কিংবা তাঁদের বদলে অন্য স্ত্রী নেওয়া তাঁর জন্য নিষিদ্ধ করেন, সৌন্দর্য তাঁকে আকৃষ্ট করলেও। দাসী ও যৌনসম্পর্কের জন্য অধিকারভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে তাঁর ওপর সেই নিষেধ ছিল না। তারপর আল্লাহ এই বাধা তুলে নেন, আয়াতের বিধান রহিত করেন এবং তাঁকে বিয়ে করার অনুমতি দেন। কিন্তু এরপর তাঁর কোনো নতুন বিবাহ ঘটেনি, যাতে তাঁদের প্রতি অনুগ্রহটি রাসুলের পক্ষ থেকে হয়। ইমাম আহমাদ বলেছেন: সুফিয়ান আমাদের বর্ণনা করেছেন, আমরের সূত্রে, আতার মাধ্যমে আয়েশা (রাঃ) থেকে। তিনি বলেছেন: আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যু হয়নি, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর জন্য নারীদের অনুমোদিত করেন। ইবন জুরাইজ, আতা ও উবাইদ ইবন উমাইরের মাধ্যমে আয়েশা থেকেও তিনি এটি বর্ণনা করেছেন। তিরমিযি এবং নাসায়ী তাঁদের সুনানেও এটি বর্ণনা করেছেন। ইবন আবি হাতিম বলেছেন: আবু যুরআ আমাদের বর্ণনা করেছেন; আবদুর রহমান ইবন আবদুল মালিক ইবন শাইবা আমাদের বর্ণনা করেছেন; উমর ইবন আবি বকর আমাকে বর্ণনা করেছেন; মুগিরা ইবন আবদুর রহমান হিযামী আমাকে বর্ণনা করেছেন, উমর ইবন উবাইদুল্লাহর মুক্তদাস আবু নাদরের সূত্রে, আবদুল্লাহ ইবন ওয়াহব ইবন যামআর মাধ্যমে উম্মু সালামা থেকে। তিনি বলেছেন: আল্লাহর রাসুলের মৃত্যু হয়নি, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর জন্য নারীদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা বিয়ে করার অনুমতি দেন, মাহরাম নারী ছাড়া। আর সেটিই আল্লাহর এই বক্তব্য: “তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তুমি স্থগিত রাখতে পার এবং যাকে ইচ্ছা নিজের কাছে নিতে পার।” ফলে তিনি এটিকে তিলাওয়াতের ক্রমে এর পরের আয়াতের বিধান রহিতকারী হিসেবে গণ্য করেছেন; যেমন সূরা বাকারার মৃত্যুর পরে অপেক্ষাকালসংক্রান্ত দুটি আয়াতের প্রথমটি পরেরটির বিধান রহিত করেছে। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।

এই ঘটনাগুলোতে হাদিসের ওপর নির্ভরতা শুধু কোনো আয়াতের শব্দের ব্যাখ্যায় সীমিত নেই; কোন নির্দেশ কার্যকর ছিল, কোন সময় তার প্রয়োগ বদলেছে এবং মুহাম্মদের আচরণের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী—এসব নির্ধারণেও বর্ণনা ব্যবহার করা হয়েছে। নিষেধের সময়ে নিষিদ্ধ কাজ ঘটলে আদেশ লঙ্ঘনের প্রশ্ন উঠবে; নিষেধ পরে তুলে নেওয়া হয়েছে বললে সেই পরিবর্তনের প্রমাণ প্রয়োজন হবে। বর্তমান কোরআনি পাঠ একা সংশ্লিষ্ট বিবাহের তারিখ কিংবা পরিবর্তনের ঘোষণার সম্পূর্ণ বিবরণ দেয় না। হাদিস প্রত্যাখ্যান করলে প্রচলিত নিষেধ–অনুমতির এই ধারার তথ্যসূত্রও প্রত্যাখ্যাত হয়। তখন একই বিধানপরিবর্তনকে মুহাম্মদের জীবনের প্রতিষ্ঠিত নববী বিধান বলে বহাল রাখার ভিত্তি থাকে না। মানুষের সংরক্ষিত বর্ণনা ছাড়া প্রচলিত শরীয়তের এই নির্দিষ্ট কালক্রম ও কার্যকারিতা আয়াতের পাঠ থেকে আপনাআপনি তৈরি হয় না।


হাদিস সম্পর্কে কোরআন কী বলে?

কোরআনে বারবার মুহাম্মদকে অনুসরণ এবং তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার নির্দেশ এসেছে। সূরা আহযাবের ৩৩:৩৬ আয়াতে আল্লাহ ও রাসুল কোনো বিষয়ে ফয়সালা দিলে বিশ্বাসী নারী–পুরুষের জন্য সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে। তাঁদের অমান্য করাকে স্পষ্ট পথভ্রষ্টতা বলা হয়েছে। ফলে রাসুলের সিদ্ধান্ত এখানে কেবল পরামর্শ বা ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হিসেবে উপস্থিত নেই; বিশ্বাসীর ওপর বাধ্যতামূলক কর্তৃত্ব হিসেবে উপস্থিত। এই কর্তৃত্ব বাস্তবে প্রয়োগ করতে মুহাম্মদ কোন বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, সেই তথ্যও প্রয়োজন হয়। আয়াতটি তাঁর সিদ্ধান্ত মানার নির্দেশ দেয়, কিন্তু তাঁর জীবনের সমস্ত সিদ্ধান্তের বিবরণ দেয় না। প্রচলিত শরীয়তে সেই নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু নির্ধারণে তাঁর বক্তব্য, কাজ ও অনুমোদনের সংরক্ষিত বর্ণনা ব্যবহার করা হয়েছে। [68]

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ۗ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا.

বাংলা অনুবাদ:
আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোন নির্দেশ দিলে কোন মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারী উক্ত নির্দেশের ভিন্নতা করার কোন অধিকার রাখে না। যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে অমান্য করে সে স্পষ্টতই সত্য পথ হতে দুরে সরে পড়ল।
Taisirul Quran
আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোন মু’মিন পুরুষ কিংবা মু’মিনা নারীর সে বিষয়ে কোন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবেনা। কেহ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে সেতো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট।
Sheikh Mujibur Rahman
আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন নির্দেশ দিলে কোন মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য নিজদের ব্যাপারে অন্য কিছু এখতিয়ার করার অধিকার থাকে না; আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।
Rawai Al-bayan
আর আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সে বিষয়ে তাদের কোনো (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার সংগত নয়। আর যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হলো (১)।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
( কোরআন ৩৩ঃ৩৬ )

মুহাম্মদের দায়িত্ব হিসেবে মানুষকে নাজিল করা বক্তব্য স্পষ্ট করে দেওয়ার কথাও কোরআনে আছে। সূরা নাহলের ১৬:৪৪ আয়াতে তাঁর প্রতি “যিকর” নাজিল করার সঙ্গে মানুষের কাছে তাদের জন্য নাজিল করা বিষয় ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব যুক্ত হয়েছে। এখানে পাঠ অবতীর্ণ হওয়া এবং সেই পাঠ মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়ার কাজ পৃথক ক্রিয়া হিসেবে উপস্থিত। মুহাম্মদ কী ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন, কোন প্রশ্নের উত্তরে কী বলেছেন এবং কোন আচরণের মাধ্যমে নির্দেশ পালন করে দেখিয়েছেন—এসব নির্দিষ্ট তথ্য আয়াতটির সাধারণ ঘোষণায় লেখা নেই। ফলে তাঁর ব্যাখ্যাকে অন্য ব্যাখ্যার ওপর কর্তৃত্ব দিতে হলে তাঁর নামে সংরক্ষিত বক্তব্য ও আচরণের তথ্য গ্রহণ করতে হয়। হাদিস বাদ দিয়ে একই নববী ব্যাখ্যা বহাল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় বর্ণনাগুলোই বাদ পড়ে যায়। [69]

بِالْبَيِّنَاتِ وَالزُّبُرِ ۗ وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ.

বাংলা অনুবাদ:
(অতীতের রসূলদেরকে পাঠিয়েছিলাম) স্পষ্ট প্রমাণাদি আর কিতাব দিয়ে; আর এখন তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করছি মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে আর যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।
Taisirul Quran
তাদের প্রেরণ করেছিলাম স্পষ্ট নিদর্শন ও গ্রন্থসহ এবং তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল, যাতে তারা চিন্তা ভাবনা করে।
Sheikh Mujibur Rahman
(তাদের প্রেরণ করেছি) স্পষ্ট প্রমাণাদি ও কিতাবসমূহ এবং তোমার প্রতি নাযিল করেছি কুরআন, যাতে তুমি মানুষের জন্য স্পষ্ট করে দিতে পার, যা তাদের প্রতি নাযিল হয়েছে। আর যাতে তারা চিন্তা করে।
Rawai Al-bayan
স্পষ্ট প্রমাণাদি ও গ্রন্থাবলীসহ (১)। আর আপনার প্রতি আমরা কুরআন নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে (২), তা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেন এবং যাতে তারা চিন্তা করে।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
( কোরআন ১৬ঃ৪৪ )

সূরা হাশরের ৫৯:৭ আয়াতে রাসুল যা দেন তা গ্রহণ এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ আছে। আয়াতের প্রথম অংশে জনপদ থেকে পাওয়া সম্পদের বণ্টন এবং তা শুধু ধনীদের মধ্যে আবর্তিত না হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই সম্পূর্ণ ভাষার মধ্যে রাসুলের প্রদান ও নিষেধের কর্তৃত্ব এসেছে। হাদিসসাহিত্যে এই নির্দেশকে সম্পদ বণ্টনের বাইরেও নববী নিষেধ মানার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করার বর্ণনা রয়েছে। তাই আয়াতের অর্থ এবং পরবর্তী ধর্মীয় প্রয়োগের সম্পর্ক নির্ধারণে মূল পাঠের সঙ্গে সেই প্রয়োগের তথ্যও যুক্ত হয়। মুহাম্মদ কোন জিনিস দিয়েছেন বা নিষেধ করেছেন, তা না জেনে শুধু “গ্রহণ কর” ও “বিরত থাক” আদেশ দিয়ে নির্দিষ্ট বিধানের বিষয়বস্তু জানা যায় না। [70]

مَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَىٰ رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَىٰ فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ ۚ وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ.

বাংলা অনুবাদ:
আল্লাহ জনপদগুলোর অধিবাসীদের কাছ থেকে তাঁর রাসুলকে যে সম্পদ দিয়েছেন, তা আল্লাহ, রাসুল, নিকটাত্মীয়, এতিম, দরিদ্র ও পথিকদের জন্য, যাতে তা তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়। রাসুল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক। আল্লাহকে ভয় কর; নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।

Taisirul Quran:
রসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর তোমাদেরকে যাত্থেকে নিষেধ করে তাত্থেকে বিরত থাক, আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা।
Taisirul Quran
অতএব রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা হতে বিরত থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর।
Sheikh Mujibur Rahman
রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর।
Rawai Al-bayan
রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমারা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ কর তা থেকে বিরত থাক (২) এবং তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ্‌ শাস্তি দানে কঠোর।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
( কোরআন ৫৯ঃ৭ )

বুখারীর বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ উল্কি আঁকা–আঁকানো, মুখের লোম তোলা এবং সৌন্দর্যের জন্য দাঁতের ফাঁক তৈরি করার বিষয়ে মুহাম্মদের অভিশাপের কথা বলেছেন। উম্মু ইয়াকুব নামের এক নারী জানান, তিনি পুরো কোরআন পড়েও এই বক্তব্য পাননি। উত্তরে ইবন মাসউদ সূরা হাশরের “রাসুল যা দেন তা গ্রহণ কর” নির্দেশ উদ্ধৃত করেন এবং বলেন, রাসুল এসব থেকে নিষেধ করেছেন। এখানে নির্দিষ্ট নিষেধের বিষয়বস্তু কোরআনের ওই বাক্যে নেই; এসেছে মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত বক্তব্য থেকে। আয়াতটি সেই বক্তব্য গ্রহণের কর্তৃত্ব হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে সাধারণ আনুগত্যের আয়াত এবং একটি নির্দিষ্ট নববী নিষেধ মিলিয়ে ধর্মীয় বিধান প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি বর্ণনাটিতে সরাসরি উপস্থিত। হাদিস বাদ দিলে সাধারণ কর্তৃত্বের বাক্য থেকে এই নির্দিষ্ট নিষেধগুলো পুনরুদ্ধার করা যায় না। [71]

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يُوسُفَ ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ ، عَنْ مَنْصُورٍ ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ ، عَنْ عَلْقَمَةَ ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ ، قَالَ لَعَنَ اللَّهُ الْوَاشِمَاتِ وَالْمُوتَشِمَاتِ وَالْمُتَنَمِّصَاتِ وَالْمُتَفَلِّجَاتِ لِلْحُسْنِ الْمُغَيِّرَاتِ خَلْقَ اللَّهِ‏.‏ فَبَلَغَ ذَلِكَ امْرَأَةً مِنْ بَنِي أَسَدٍ يُقَالُ لَهَا أُمُّ يَعْقُوبَ، فَجَاءَتْ فَقَالَتْ إِنَّهُ بَلَغَنِي أَنَّكَ لَعَنْتَ كَيْتَ وَكَيْتَ‏.‏ فَقَالَ وَمَا لِي لاَ أَلْعَنُ مَنْ لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَمَنْ هُوَ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَقَالَتْ لَقَدْ قَرَأْتُ مَا بَيْنَ اللَّوْحَيْنِ فَمَا وَجَدْتُ فِيهِ مَا تَقُولُ‏.‏ قَالَ لَئِنْ كُنْتِ قَرَأْتِيهِ لَقَدْ وَجَدْتِيهِ، أَمَا قَرَأْتِ ‏‏{‏وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا‏}‏‏.‏ قَالَتْ بَلَى‏.‏ قَالَ فَإِنَّهُ قَدْ نَهَى عَنْهُ‏.‏ قَالَتْ فَإِنِّي أَرَى أَهْلَكَ يَفْعَلُونَهُ‏.‏ قَالَ فَاذْهَبِي فَانْظُرِي‏.‏ فَذَهَبَتْ فَنَظَرَتْ فَلَمْ تَرَ مِنْ حَاجَتِهَا شَيْئًا، فَقَالَ لَوْ كَانَتْ كَذَلِكَ مَا جَامَعْتُها.

বাংলা অনুবাদ:
মুহাম্মদ ইবন ইউসুফ আমাদের বর্ণনা করেছেন; সুফিয়ান আমাদের বর্ণনা করেছেন, মানসুরের সূত্রে, ইবরাহিমের মাধ্যমে আলকামা থেকে, আবদুল্লাহ থেকে। তিনি বলেছেন: আল্লাহ সেই নারীদের অভিশাপ দিয়েছেন যারা উল্কি আঁকে ও আঁকায়, মুখের লোম তুলে এবং সৌন্দর্যের জন্য দাঁতের ফাঁক তৈরি করে, আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করে। এই কথা বনু আসাদের উম্মু ইয়াকুব নামের এক নারীর কাছে পৌঁছালে তিনি এসে বললেন: আমার কাছে পৌঁছেছে যে আপনি অমুক অমুক নারীকে অভিশাপ দিয়েছেন। তিনি বললেন: আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদের অভিশাপ দিয়েছেন এবং যার কথা আল্লাহর কিতাবে আছে, তাদের আমি অভিশাপ দেব না কেন? নারীটি বললেন: আমি কিতাবের দুই মলাটের মধ্যকার সমস্ত পাঠ পড়েছি; আপনি যা বলছেন, তা পাইনি। তিনি বললেন: তুমি তা পড়ে থাকলে অবশ্যই পেয়েছ। তুমি কি পড়নি, “রাসুল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক”? তিনি বললেন: হ্যাঁ। ইবন মাসউদ বললেন: তিনি এসব থেকে নিষেধ করেছেন। নারীটি বললেন: আমি তো আপনার স্ত্রীকে এগুলো করতে দেখি। তিনি বললেন: যাও, দেখে এসো। তিনি গিয়ে দেখলেন, কিন্তু তাঁর অভিযোগের সমর্থনে কিছুই পেলেন না। তখন ইবন মাসউদ বললেন: সে তেমন হলে আমি তার সঙ্গে ঘর করতাম না।

আল্লাহর সঙ্গে রাসুলের আনুগত্যের নির্দেশ একাধিক আয়াতে পুনরাবৃত্ত হয়েছে। সূরা নিসার ৪:৮০ আয়াতে রাসুলের আনুগত্যকে আল্লাহর আনুগত্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে মুহাম্মদের নির্দেশ পালনকে ধর্মীয়ভাবে আল্লাহর নির্দেশ পালনের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। ফলে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত কোনো আদেশের ওপর শুধু মানবীয় পরামর্শের মর্যাদা থাকছে না; আয়াতের কর্তৃত্বে সেটি ধর্মীয় আনুগত্যের বিষয় হয়ে উঠছে। এই সংযোগ কার্যকর করতে তাঁর প্রকৃত নির্দেশের পরিচয় ও বিষয়বস্তু জানা প্রয়োজন। “রাসুলের আনুগত্য কর” বাক্যটি সেই নির্দেশগুলোর পূর্ণ তালিকা সরবরাহ করে না। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তাঁর বক্তব্য ও আচরণের সংরক্ষিত বর্ণনা তাই আনুগত্যের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু নির্ধারণের তথ্যসূত্র। সাধারণ কর্তৃত্বের ঘোষণা এবং সেই কর্তৃত্বে প্রতিষ্ঠিত বিধান একসঙ্গে গ্রহণ করা হয়। [72] [73] [74] [75] [76] [77]

مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ ۖ وَمَنْ تَوَلَّىٰ فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا.

বাংলা অনুবাদ:
যে রসূলের আনুগত্য করল, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল, কেউ মুখ ফিরিয়ে নিলে (জোরপূর্বক তাকে সৎপথে আনার জন্য) আমি তোমাকে তাদের প্রতি পাহারাদার করে পাঠাইনি।
Taisirul Quran
যে কেহ রাসূলের অনুগত হয় নিশ্চয়ই সে আল্লাহরই অনুগত হয়ে থাকে, এবং যে ফিরে যায় আমি তার জন্য তোমাকে রক্ষক রূপে প্রেরণ করিনি।
Sheikh Mujibur Rahman
যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে বিমুখ হল, তবে আমি তোমাকে তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক করে প্রেরণ করিনি।
Rawai Al-bayan
কেউ রাসূলের আনুগত্য করলে সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল (১), আর কেউ মুখ ফিরিয়ে নিলে আপনাকে তো আমরা তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক করে পাঠাই নি।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
( কোরআন ৪ঃ৮০ )

সূরা মুহাম্মদের ৪৭:৩৩ আয়াতে আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্যের নির্দেশের সঙ্গে নিজেদের কাজ বিনষ্ট না করার নির্দেশও এসেছে। আনুগত্য এখানে বিশ্বাসীর কাজের ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে রাসুলের নির্দেশের পরিচয় জানা শুধু কোনো ঘটনার তথ্য জানার বিষয় নয়; কোন আচরণকে কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, সেই প্রশ্নেরও অংশ। মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত নির্দেশ বাদ দিয়ে প্রচলিত ধর্মীয় কাজের একই গ্রহণযোগ্যতা ও কর্তব্য বহাল রাখলে তার নির্দিষ্ট নিয়মগুলোর উৎসের প্রশ্ন থেকেই যায়। আয়াতটি আনুগত্যের দাবি ঘোষণা করছে; নামাজ, লেনদেন, বিবাহ বা খাদ্যসংক্রান্ত প্রতিটি নববী নির্দেশের বিবরণ এই বাক্যের মধ্যে নেই। এসব নির্দিষ্ট নিয়ম নির্ধারণে যে অতিরিক্ত বর্ণনা ব্যবহৃত হয়েছে, তা সাধারণ আনুগত্যের ঘোষণার বাইরের তথ্য। [73]

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَلَا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ.

বাংলা অনুবাদ:
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর আর রসূলের আনুগত্য কর আর তোমাদের ‘আমালগুলোকে নষ্ট করে দিও না।
Taisirul Quran
হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের কর্মফল বিনষ্ট করনা।
Sheikh Mujibur Rahman
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর। আর তোমরা তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করো না।
Rawai Al-bayan
হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর, আর তোমরা তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করো না।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
( কোরআন ৪৭ঃ৩৩ )

সূরা মায়িদার ৫:৯২ আয়াতে আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্যের সঙ্গে সতর্ক থাকার নির্দেশ রয়েছে। একই আয়াতে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া হলে রাসুলের দায়িত্বকে সুস্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। নির্দেশ পৌঁছে দেওয়া এবং সেই নির্দেশ মানা এখানে প্রেরক ও প্রাপকের পৃথক কাজ। মুহাম্মদ তাঁর কর্তৃত্বে কী নির্দেশ পৌঁছে দিয়েছেন, তা নির্দিষ্ট করে না জানলে আনুগত্যের সাধারণ দাবি দিয়ে সেই নির্দেশের ব্যবহারিক বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা যায় না। কোনো বিধান কোরআনের সরাসরি পাঠে আছে কি না এবং মুহাম্মদের নামে তার ব্যাখ্যা বা প্রয়োগের নির্দেশ সংরক্ষিত আছে কি না—এগুলো পৃথক তথ্যের প্রশ্ন। প্রচলিত শরীয়তে উভয় ধরনের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। হাদিসের নির্দেশ গ্রহণের ক্ষেত্রে এই আয়াত আনুগত্যের ধর্মীয় কর্তৃত্ব সরবরাহ করে। [74]

وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَاحْذَرُوا ۚ فَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّمَا عَلَىٰ رَسُولِنَا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ.

বাংলা অনুবাদ:
তোমরা আল্লাহকে মেনে চল আর তাঁর রসূলকে মেনে চল আর (মন্দ থেকে) সতর্ক থাক আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে জেনে রেখ আমার রসূলের দায়িত্ব হল সুস্পষ্টভাবে (আমার বাণী) পৌঁছে দেয়া।
Taisirul Quran
আর তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করতে থাক ও রাসূলের অনুগত হও এবং সতর্ক থাকো, আর যদি বিমুখ থাকো তাহলে জেনে রেখ যে, আমার রাসূলের দায়িত্ব ছিল শুধু স্পষ্টভাবে (আদেশ) পৌঁছে দেয়া।
Sheikh Mujibur Rahman
আর তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং আনুগত্য কর রাসূলের আর সাবধান হও। তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রাখ যে, আমার রাসূলের দায়িত্ব শুধু সুস্পষ্ট প্রচার।
Rawai Al-bayan
আর তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর। আর সাবধানতা অবলম্বন কর; তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রাখ যে, আমাদের রাসূলের দায়িত্ব তো কেবল সুস্পষ্টভাবে প্রচার করা।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
( কোরআন ৫ঃ৯২ )

সূরা নূরের ২৪:৫৪ আয়াতে রাসুলের ওপর অর্পিত দায়িত্ব এবং বিশ্বাসীদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব আলাদা করে বলা হয়েছে। তাঁর আনুগত্য করলে সঠিক পথ পাওয়ার কথাও আছে। ফলে দায়িত্বের এই বিভাজন রাসুলের কর্তৃত্বকে অপ্রয়োজনীয় করে না; বিশ্বাসীর ওপর তাঁর নির্দেশ মানার দাবি বহাল রাখে। সেই দাবি পরবর্তী প্রজন্মের আচরণে প্রয়োগ করতে তাঁর নির্দেশ ও শিক্ষার নির্দিষ্ট বিবরণ প্রয়োজন হয়। কেবল একটি আয়াতের সাধারণ আনুগত্যের ভাষা থেকে তিনি কোন প্রশ্নের কী উত্তর দিয়েছিলেন বা কোনো বিধান কীভাবে পালন করেছিলেন, তা পাওয়া যায় না। হাদিসে সংরক্ষিত বক্তব্য ও আচরণ এই অনুপস্থিত তথ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই বর্ণনাগুলো বাদ দিয়ে একই নির্দিষ্ট আচরণকে তাঁর দেখানো সঠিক পথ বলে প্রতিষ্ঠা করার তথ্যগত ভিত্তি বাদ পড়ে যায়। [75]

قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ ۖ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا عَلَيْهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيْكُمْ مَا حُمِّلْتُمْ ۖ وَإِنْ تُطِيعُوهُ تَهْتَدُوا ۚ وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ.

বাংলা অনুবাদ:
বল : আল্লাহর আনুগত্য ও রসূলের আনুগত্য কর, অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে লও তাহলে তার (অর্থাৎ রসূলের) উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য সে দায়ী, আর তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরাই দায়ী, তোমরা যদি তার আনুগত্য কর তবে সঠিক পথ পাবে, রসূলের দায়িত্ব হচ্ছে স্পষ্টভাবে (বাণী) পৌঁছে দেয়া।
Taisirul Quran
বলঃ তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর; অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে তার উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য সে দায়ী এবং তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরা দায়ী; এবং তোমরা তার আনুগত্য করলে সৎ পথ পাবে, রাসূলের দায়িত্বতো শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া।
Sheikh Mujibur Rahman
বল, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর।’ তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে সে শুধু তার উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য দায়ী এবং তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরাই দায়ী। আর যদি তোমরা তার আনুগত্য কর তবে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে। আর রাসূলের দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া।
Rawai Al-bayan
বলুন, ‘তোমরা আল্লাহ্‌র আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর।’ তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তার উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তিনিই দায়ী এবং তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরাই দায়ী; আর তোমরা তার আনুগত্য করলে সৎপথ পাবে, মুলতঃ রাসূলের দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
( কোরআন ২৪ঃ৫৪ )

সূরা তাগাবুনের ৬৪:১২ আয়াতেও আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য এবং রাসুলের সুস্পষ্টভাবে বাণী পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব একসঙ্গে উপস্থিত। একই কর্তৃত্বের এই পুনরাবৃত্তি প্রচলিত ইসলামি ব্যবস্থায় মুহাম্মদের নির্দেশকে ধর্মীয় বিধানের উৎস হিসেবে গ্রহণের ভিত্তি দেয়। তাঁর মৃত্যুর পরে সরাসরি তাঁকে প্রশ্ন করা বা তাঁর আচরণ দেখা সম্ভব নয়; তাঁর সম্পর্কে মানুষের সংরক্ষিত বর্ণনা ও শিক্ষা থেকেই সেই নির্দেশ জানা হয়। তাই আনুগত্যের দাবি বহাল রেখে সংশ্লিষ্ট তথ্যসূত্র অগ্রাহ্য করলে নির্দিষ্ট কর্তব্যের পরিচয় নির্ধারণের সমস্যা তৈরি হয়। আয়াতের সাধারণ দাবি কোনো ব্যক্তির তৈরি নতুন নিয়মকে আপনাআপনি মুহাম্মদের নিয়মে পরিণত করে না। সেই পরিচয় দিতে হলে তাঁর নামে সংরক্ষিত বক্তব্য, কাজ বা অনুমোদনের তথ্যের প্রয়োজন হয়। [76]

وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ ۚ فَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَإِنَّمَا عَلَىٰ رَسُولِنَا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ.

বাংলা অনুবাদ:
তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও রসূলের আনুগত্য কর। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে লও (তাহলে তোমাদেরকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য জোর জবরদস্তি করা হবে না) কেননা, আমার রসূলের দায়িত্ব কেবল (আমার বাণী) স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া।
Taisirul Quran
আল্লাহর আনুগত্য কর এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে আমার রাসূলের দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে প্রচার করা।
Sheikh Mujibur Rahman
তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর। কিন্তু তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে আমার রাসূলের তো একমাত্র দায়িত্ব হচ্ছে স্পষ্টভাবে বাণী পৌঁছে দেয়া।
Rawai Al-bayan
আর তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর; অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে আমাদের রাসূলের দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে প্রচার করা।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
( কোরআন ৬৪ঃ১২ )

মুহাম্মদের অনুসরণকে আল্লাহর ভালোবাসা ও পাপ ক্ষমার প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে। সূরা আলে ইমরানের ৩:৩১ আয়াতে আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি থাকলে মুহাম্মদকে অনুসরণ করার নির্দেশ এসেছে। ফলে তাঁর অনুসরণ এখানে কেবল প্রশাসনিক আনুগত্য বা সামাজিক অভ্যাসের বিষয় নয়; বিশ্বাসীর সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্কের দাবির অংশ। এই সম্পর্কের ভিত্তিতে তাঁর আচরণকে ধর্মীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কোন আচরণ তাঁর ছিল এবং তিনি কোন কাজ অনুমোদন বা নিষেধ করেছিলেন—এই নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া অনুসরণের বিষয়বস্তু প্রতিষ্ঠা করা যায় না। হাদিসের বর্ণনা সেই তথ্য সরবরাহ করে এবং কোরআনের সাধারণ অনুসরণের নির্দেশের সঙ্গে তাকে যুক্ত করা হয়। বর্ণনাগুলো বাদ দিয়ে একই আদর্শকে মুহাম্মদের অনুসরণের নির্দিষ্ট রূপ হিসেবে বহাল রাখা তাই তথ্যসূত্রের ওপর নির্ভরতার প্রশ্ন এড়ায় না। [77]

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ.

বাংলা অনুবাদ:
বলে দাও, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তবে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহসকল ক্ষমা করবেন, বস্তুতঃ আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’।
Taisirul Quran
তুমি বলঃ যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস তাহলে আমার অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসেন ও তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করেন; এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়।
Sheikh Mujibur Rahman
বল, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’।
Rawai Al-bayan
বলুন, ‘তোমরা যদি আল্লহকে ভালোবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর (১), আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ্‌ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
( কোরআন ৩ঃ৩১ )

মতবিরোধের নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও কোরআন রাসুলের কর্তৃত্বকে সামনে এনেছে। সূরা নিসার ৪:৫৯ আয়াতে আল্লাহ, রাসুল ও নিজেদের মধ্যে কর্তৃত্বশীলদের আনুগত্যের নির্দেশের পরে কোনো বিষয়ে বিরোধ হলে তা আল্লাহ ও রাসুলের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্দেশকে পরবর্তী সময়ের আইনগত বিরোধে প্রয়োগ করতে মুহাম্মদের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তথ্য প্রয়োজন হয়। জীবদ্দশায় তাঁর কাছে সরাসরি বিচার চাওয়া এবং মৃত্যুর পরে তাঁর নামে সংরক্ষিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা একভাবে তথ্য পাওয়ার প্রক্রিয়া নয়। পরবর্তী প্রজন্মকে তাঁর বক্তব্য ও আচরণের বর্ণনার সাহায্য নিতে হয়। ফলে কোরআনের বিরোধ নিষ্পত্তির সাধারণ নির্দেশকে নির্দিষ্ট নববী সিদ্ধান্তে রূপ দিতে হাদিসের তথ্য ব্যবহার করা হয়; আয়াতটি প্রতিটি পরবর্তী বিরোধের সম্পূর্ণ সিদ্ধান্ত নিজে লিখে দেয় না। [78]

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ ۖ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا.

বাংলা অনুবাদ:
হে বিশ্বাসীরা, আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসুলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্যে কর্তৃত্বশীলদেরও। কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে বিরোধ হলে তা আল্লাহ ও রাসুলের কাছে ফিরিয়ে নাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর বিশ্বাস কর। এটাই উত্তম এবং পরিণতির দিক থেকে উৎকৃষ্ট।

সূরা নিসার ৪:৬৫ আয়াতে এই বিচারিক কর্তৃত্ব আরও কঠোরভাবে এসেছে। বিশ্বাসের স্বীকৃতিকে নিজেদের বিরোধে মুহাম্মদকে বিচারক হিসেবে গ্রহণ, তাঁর সিদ্ধান্তে মনের মধ্যে আপত্তি না রাখা এবং সম্পূর্ণ সমর্পণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এখানে শুধু বাহ্যিকভাবে কোনো আদেশ পালন করার দাবি নেই; ফয়সালার প্রতি অন্তরের গ্রহণযোগ্যতাও দাবি করা হয়েছে। ফলে একটি সিদ্ধান্ত মুহাম্মদের বলে প্রতিষ্ঠিত হলে তার ধর্মীয় কর্তৃত্ব বিশ্বাসীর নিজস্ব আপত্তির ওপর স্থান পায়। এই কর্তৃত্বের বাস্তব বিষয়বস্তু নির্ধারণের জন্য তিনি কী বিচার করেছিলেন, সেই তথ্য অপরিহার্য হয়। হাদিস বাদ দিয়ে পরবর্তী কারও সিদ্ধান্তকে একই বাধ্যতামূলক নববী সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করার ভিত্তি পাওয়া যায় না। সাধারণ বিচারকত্বের আয়াত নির্দিষ্ট বিচারের ঘটনাবিবরণ ও বক্তব্যের বিকল্প নয়। [79]

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا.

বাংলা অনুবাদ:
না, তোমার রবের শপথ, তারা বিশ্বাসী হবে না, যতক্ষণ না নিজেদের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধে তোমাকে বিচারক হিসেবে গ্রহণ করে; তারপর তোমার দেওয়া সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিজেদের মনে কোনো আপত্তি না পায় এবং সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করে।

মুহাম্মদকে অমান্য করার সঙ্গে শাস্তির হুমকিও কোরআনে যুক্ত হয়েছে। সূরা জিনের ৭২:২৩ আয়াতে আল্লাহর বাণী ও তাঁর বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বের পরে আল্লাহ ও রাসুলকে অমান্যকারীর জন্য জাহান্নামের আগুন এবং সেখানে চিরস্থায়ী থাকার কথা বলা হয়েছে। ফলে আনুগত্যের দাবি ধর্মীয় পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কোন নির্দেশকে রাসুলের নির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে, সেই তথ্য এখানে বিশ্বাসীর আচরণ ও পরকালসংক্রান্ত দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়। হাদিসের নামে সংরক্ষিত একটি নিষেধকে তাঁর নিষেধ বলে গ্রহণ করলে এই সাধারণ আনুগত্যের কর্তৃত্ব তার ওপর আরোপ করা হয়। বর্ণনাটির নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু আয়াতের মধ্যে উপস্থিত না থাকলেও ধর্মীয় কর্তৃত্বের দাবিটি আয়াতের সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। [80]

إِلَّا بَلَاغًا مِنَ اللَّهِ وَرِسَالَاتِهِ ۚ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ لَهُ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا.

বাংলা অনুবাদ:
আল্লাহর বাণী পৌঁছানো ও তাঁর পায়গাম প্রচার করাই আমার কাজ। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে অমান্য করে, তার জন্য আছে জাহান্নামের আগুন; তাতে তারা চিরকাল থাকবে।
Taisirul Quran
কেবল আল্লাহর বাণী পৌঁছানো এবং তা প্রচার করাই আমার কাজ। যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে।
Sheikh Mujibur Rahman
কেবল আল্লাহর বাণী ও তাঁর রিসালাত পৌঁছানোই দায়িত্ব। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে, তার জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাতে তারা চিরস্থায়ী হবে।
Rawai Al-bayan
‘শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকে পৌঁছানো এবং তাঁর রিসালতের বাণী প্রচারই আমার দায়িত্ব। আর যে-কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে তার জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে (১)।’
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
( কোরআন ৭২ঃ২৩ )

কোরআনের এই নির্দেশগুলোতে মুহাম্মদের সিদ্ধান্ত, ব্যাখ্যা, প্রদান, নিষেধ, অনুসরণ ও বিচারিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হাদিসে তাঁর নামে সংরক্ষিত নির্দিষ্ট বক্তব্য ও আচরণকে সেই কর্তৃত্বের বিষয়বস্তু হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ফলে কোরআনের সাধারণ নির্দেশ এবং শরীয়তের বিস্তারিত বিধানের মধ্যে বর্ণনাগুলো প্রয়োজনীয় তথ্যের ভূমিকা পালন করে। এগুলো বাদ দিলে পরবর্তী ব্যক্তি নিজের ব্যাখ্যা ও নিয়ম তৈরি করতে পারেন, কিন্তু সেই নিয়ম মুহাম্মদের নির্দিষ্ট নির্দেশ বা প্রদর্শিত আচরণ—এই দাবির জন্য তাঁর সম্পর্কে তথ্য প্রয়োজন হয়। একটি সাধারণ আনুগত্যের বাক্য থেকে সমস্ত নববী সিদ্ধান্ত উদ্ধার করা যায় না। প্রচলিত শরীয়তে কোরআনের কর্তৃত্ব কার্যকর করার সময় তাই মানুষের সংরক্ষিত বর্ণনার কর্তৃত্বও ব্যবহৃত হয়েছে; হাদিসের তথ্য বাদ দিয়ে একই বিস্তারিত ব্যবস্থা বহাল রাখার ভিত্তি থাকে না।


মুহাম্মদ কী হালাল হারাম করতে পারেন?

কোরআনে মুহাম্মদের হালাল–হারাম নির্ধারণের ভূমিকা সরাসরি বর্ণিত হয়েছে। সূরা আরাফের ৭:১৫৭ আয়াতে তাঁকে সৎকাজের নির্দেশদাতা, অসৎকাজের নিষেধকারী, পবিত্র বস্তু অনুমোদনকারী এবং অপবিত্র বস্তু নিষিদ্ধকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এখানে শুধু কোনো পাঠ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নয়; নির্দিষ্ট কাজ ও বস্তুর অনুমতি–নিষেধের কর্তৃত্বও রয়েছে। কোন বস্তু বা আচরণকে তিনি অনুমোদন বা নিষেধ করেছেন, সেই তালিকা আয়াতটির সাধারণ বিশেষণগুলোর মধ্যে সম্পূর্ণ দেওয়া নেই। “পবিত্র” ও “অপবিত্র” শব্দ দুটিও প্রতিটি নির্দিষ্ট খাদ্য বা সামাজিক আচরণের নামের বিকল্প নয়। প্রচলিত শরীয়তে তাঁর নামে সংরক্ষিত বক্তব্য ও আচরণ ব্যবহার করে এই নির্দিষ্ট অনুমতি–নিষেধ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেই তথ্য বাদ দিয়ে একই বিস্তারিত নববী বিধানের পরিচয় বহাল রাখা যায় না। [81]

الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ ۚ فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنْزِلَ مَعَهُ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ.

বাংলা অনুবাদ:
যারা প্রেরিত উম্মী নাবীকে অনুসরণ করবে যা তাদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইনজীলে তারা লিখিত পাবে। সে তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেয়, অসৎ কাজ করতে নিষেধ করে, পবিত্র বস্তুসমূহ তাদের জন্য হালাল করে, অপবিত্র বস্তুগুলো তাদের জন্য নিষিদ্ধ করে, তাদের থেকে গুরুভার সরিয়ে দেয় আর সেই শৃঙ্খল (হালাল-হারামের বানোয়াট বিধি-নিষেধ) যাতে ছিল তারা বন্দী। কাজেই যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে সম্মান প্রদর্শন করে, তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করে আর তার উপর অবতীর্ণ আলোর অনুসরণ করে, তারাই হচ্ছে সফলকাম।
Taisirul Quran
যারা সেই নিরক্ষর রাসূলের অনুসরণ করে চলে যার কথা তারা তাদের নিকট রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জীল কিতাবে লিখিত পায়, যে মানুষকে সৎ কাজের নির্দেশ দেয় ও অন্যায় কাজ করতে নিষেধ করে, আর সে তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ বৈধ করে এবং অপবিত্র ও খারাপ বস্তুকে তাদের প্রতি অবৈধ করে, আর তাদের উপর চাপানো বোঝা ও বন্ধন হতে তাদেরকে মুক্ত করে। সুতরাং তার প্রতি যারা ঈমান রাখে, তাকে সম্মান করে এবং সাহায্য করে ও সহানুভূতি প্রকাশ করে, আর সেই আলোকের অনুসরণ করে চলে যা তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে, তারাই (ইহকালে ও পরকালে) সাফল্য লাভ করবে।
Sheikh Mujibur Rahman
যারা অনুসরণ করে রাসূলের, যে উম্মী নবী; যার গুণাবলী তারা নিজদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়, যে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎ কাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে বোঝা ও শৃংখল- যা তাদের উপরে ছিল- অপসারণ করে। সুতরাং যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং তার সাথে যে নূর নাযিল করা হয়েছে তা অনুসরণ করে তারাই সফলকাম।
Rawai Al-bayan
‘যারা অনুসরণ করে রাসূলের, উম্মী (১) নবীর, যার উল্লেখ তারা তাদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জীলে লিপিবদ্ধ পায় (২), যিনি তাদের সৎকাজের আদেশ দেন, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন, তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করেন (৩)। আর তাদেরকে তাদের গুরুভার ও শৃংখল হতে মুক্ত করেন যা তাদের উপর ছিল (৪)। কাজেই যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং যে নূর তার সাথে নাযিল হয়েছে সেটার অনুসরণ করে, তারাই সফলকাম (৫)।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
( কোরআন ৭ঃ১৫৭ )

মিকদাম ইবন মাদিকারিবের নামে সংরক্ষিত বর্ণনায় কিতাবের সঙ্গে তার মতো আরেকটি বিষয় দেওয়ার দাবি এবং কেবল কোরআনের সরাসরি হালাল–হারাম গ্রহণ করার অবস্থানের বিরুদ্ধে বক্তব্য রয়েছে। হাদিস সম্ভারে এই মূল বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে; মিশকাতের পূর্ণ বর্ণনায় এর সঙ্গে গৃহপালিত গাধা, দন্তবিশিষ্ট শিকারি প্রাণী, চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তির হারানো সম্পদ এবং অতিথি আপ্যায়নের নির্দিষ্ট বিধানও রয়েছে। এখানে সাধারণ নববী কর্তৃত্বের দাবি এবং সেই কর্তৃত্বে নির্দিষ্ট বিধান প্রতিষ্ঠা একই বর্ণনার মধ্যে উপস্থিত। “আল্লাহর রাসুল যা হারাম করেন, তা আল্লাহর হারাম করার মতো”—এই বক্তব্যের মাধ্যমে নবীর নিষেধকে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার সমপর্যায়ে স্থাপন করা হয়েছে। ফলে হাদিসের বিধান গ্রহণের জন্য প্রতিটি নিষেধের একই ভাষা কোরআনে পুনরাবৃত্ত থাকার শর্ত এই বর্ণনা দেয় না। [82] [83] [84]

وَعَن الْمِقْدَام بن معدي كرب عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنه قَالَ: «أَلا إِنِّي أُوتيت الْكتاب وَمِثْلَهُ مَعَهُ أَلَا يُوشِكُ رَجُلٌ شَبْعَانٌ عَلَى أَرِيكَتِهِ يَقُولُ عَلَيْكُمْ بِهَذَا الْقُرْآنِ فَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَلَالٍ فَأَحِلُّوهُ وَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَرَامٍ فَحَرِّمُوهُ وَإِنَّ مَا حَرَّمَ رَسُولُ الله كَمَا حَرَّمَ اللَّهُ أَلَا لَا يَحِلُّ لَكُمُ لحم الْحِمَارُ الْأَهْلِيُّ وَلَا كُلُّ ذِي نَابٍ مِنَ السَّبع وَلَا لُقَطَةُ مُعَاهَدٍ إِلَّا أَنْ يَسْتَغْنِيَ عَنْهَا صَاحِبُهَا وَمَنْ نَزَلَ بِقَوْمٍ فَعَلَيْهِمْ أَنْ يُقْرُوهُ فَإِنْ لَمْ يَقْرُوهُ فَلَهُ أَنْ يُعْقِبَهُمْ بِمِثْلِ قِرَاهُ» رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَرَوَى الدَّارِمِيُّ نَحْوَهُ وَكَذَا ابْنُ مَاجَهْ إِلَى قَوْلِهِ: «كَمَا حَرَّمَ الله»

বাংলা অনুবাদ:
হাদীস সম্ভার
১৩/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ সুন্নাহ পালনের গুরুত্ব ও তার কিছু আদব প্রসঙ্গে
(১৪৯৯) মিকদাম বিন মা’দিকারিব বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শোন! আমাকে কুরআন দান করা হয়েছে এবং তারই সাথে তারই মতো (সুন্নাহ) দান করা হয়েছে। শোন! সম্ভবতঃ নিজ গদিতে বসে থাকা কোন পরিতৃপ্ত লোক বলবে, ‘তোমরা এই কুরআনের অনুসরণ কর; তাতে যা হালাল পাও, তাই হালাল মনে কর এবং তাতে যা হারাম পাও, তাই হারাম মনে কর। সতর্ক হও! আল্লাহর রসূল যা হারাম করেন, তাও আল্লাহর হারাম করার মতোই। তোমাদের জন্য গৃহপালিত গাধার মাংস, শিকারি পশুদের মধ্যে দন্তবিশিষ্ট প্রাণী এবং চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তির হারানো জিনিস অনুমোদিত নয়, যদি না তার মালিক তা আর প্রয়োজন না করেন। কেউ কোনো সম্প্রদায়ের কাছে অতিথি হলে তাদের তাকে আপ্যায়ন করতে হবে। তারা তা না করলে আপ্যায়নের সমপরিমাণ তাদের কাছ থেকে আদায় করার অধিকার তার রয়েছে। আবূ দাউদ এটি বর্ণনা করেছেন এবং দারিমি অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। ইবন মাজাহও “আল্লাহ হারাম করার মতোই” বক্তব্য পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন।
(আবূ দাঊদ ৪৬০৪, ইবনে মাজাহ ১২, দারেমী ৫৮৬, মিশকাত ১৬৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মিকদাম (রাঃ)

ইবন মাজাহর বর্ণনায় একই কর্তৃত্বের দাবি আরও সরাসরি আছে: মুহাম্মদের কোনো হাদিস শোনার পরে “আমাদের ও তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাবই আছে” বলে শুধু কিতাবে পাওয়া হালাল–হারাম গ্রহণের অবস্থান প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এরপর রাসুলের নিষেধকে আল্লাহর নিষেধের মতো ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে এখানে কোরআনের সাধারণ আনুগত্যের আয়াতকে কীভাবে অতিরিক্ত নববী বিধানের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট। কোনো কাজের নিষেধ সরাসরি আয়াতের ভাষায় না পেলেও মুহাম্মদের নামে সেই নিষেধ গ্রহণের ধর্মীয় দাবি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। হাদিস বাদ দিয়ে এই একই দাবি বহাল রাখলে নিষেধের নির্দিষ্ট বক্তব্যের উৎসই বাদ পড়ে। কোরআনের সাধারণ কর্তৃত্ব এবং হাদিসে থাকা বিশেষ বিধান মিলে প্রচলিত আইনটির বিষয়বস্তু নির্ধারিত হয়েছে। [85]

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ ، حَدَّثَنَا زَيْدُ بْنُ الْحُبَابِ ، عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ صَالِحٍ ، حَدَّثَنِي الْحَسَنُ بْنُ جَابِرٍ ، عَنِ الْمِقْدَامِ بْنِ مَعْدِيكَرِبَ الْكِنْدِيِّ ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ قَالَ ‏ “‏ يُوشِكُ الرَّجُلُ مُتَّكِئًا عَلَى أَرِيكَتِهِ يُحَدَّثُ بِحَدِيثٍ مِنْ حَدِيثِي فَيَقُولُ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ كِتَابُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فَمَا وَجَدْنَا فِيهِ مِنْ حَلاَلٍ اسْتَحْلَلْنَاهُ وَمَا وَجَدْنَا فِيهِ مِنْ حَرَامٍ حَرَّمْنَاهُ ‏.‏ أَلاَ وَإِنَّ مَا حَرَّمَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ مِثْلُ مَا حَرَّمَ اللَّهُ ‏”‏ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
আবু বকর ইবন আবি শাইবা আমাদের বর্ণনা করেছেন; যায়দ ইবন হুবাব আমাদের বর্ণনা করেছেন, মুআবিয়া ইবন সালিহের সূত্রে। হাসান ইবন জাবির আমাকে বর্ণনা করেছেন, মিকদাম ইবন মাদিকারিব কিন্দি থেকে। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “শিগগিরই এমন ব্যক্তি হবে, যে নিজের আসনে হেলান দিয়ে থাকবে। আমার কোনো হাদিস তাকে বলা হলে সে বলবে, আমাদের ও তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব আছে; তাতে যা হালাল পাই, আমরা তা হালাল গ্রহণ করি এবং যা হারাম পাই, তা হারাম গ্রহণ করি। জেনে রাখো, আল্লাহর রাসুল যা হারাম করেছেন, তা আল্লাহ যা হারাম করেছেন তার মতোই।”

নির্দিষ্ট বিধানের এই উৎস আলাদা করে দেখা যায় গৃহপালিত গাধা ও দন্তবিশিষ্ট শিকারি প্রাণীর নিষেধে। সূরা আরাফের সাধারণ “পবিত্র বস্তু হালাল” এবং “অপবিত্র বস্তু হারাম” বক্তব্য নিজে ওই প্রাণীগুলোর নাম বলে না; মিকদামের বর্ণনায় নামসহ তাদের নিষেধ এসেছে। হারানো সম্পদের মালিকের অধিকার এবং অতিথিকে আপ্যায়ন না করলে আপ্যায়নের সমপরিমাণ আদায়ের বিধানও একই বর্ণনায় নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ফলে নববী কর্তৃত্ব শুধু আয়াতের শব্দের অর্থ বলার মধ্যে সীমিত থাকছে না; নির্দিষ্ট কাজের অনুমতি, নিষেধ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার উৎস হয়ে উঠছে। হাদিসের এই তথ্য বাদ দিলে একই বিধানগুলোকে মুহাম্মদের ঘোষিত বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সংশ্লিষ্ট প্রমাণও বাদ পড়ে। সাধারণ কর্তৃত্বের আয়াত তখন ওই নির্দিষ্ট বিধানের সম্পূর্ণ বিষয়বস্তু সরবরাহ করতে পারে না।

এই ব্যবস্থায় মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত একটি নিষেধকে কোরআনের সাধারণ আনুগত্য ও হালাল–হারাম নির্ধারণের কর্তৃত্বের সাহায্যে বাধ্যতামূলক ধর্মীয় বিধানে রূপ দেওয়া হয়। পরবর্তী মানুষের কাছে সেই নিষেধের পরিচয় আসে মানুষের সংরক্ষিত বর্ণনা থেকে। ফলে প্রচলিত শরীয়তের নির্দিষ্ট বিধানকে অপরিবর্তনীয় ঐশ্বরিক আইন বলার দাবির মধ্যেই মানবীয় সংরক্ষণ ও বর্ণনার ওপর নির্ভরতা রয়েছে। হাদিস অগ্রাহ্য করলে ওই নির্দিষ্ট বিধানের তথ্যসূত্র বাদ পড়ে; গ্রহণ করলে সেই বর্ণনার বিষয়বস্তুকেই ধর্মীয় কর্তৃত্ব দেওয়া হয়। কেবল একটি আনুগত্যের আয়াত থেকে নির্দিষ্ট নিষেধের ঐতিহাসিক সত্যতা বা নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। কারও নামে বিধান সংরক্ষিত থাকা এবং সেই বিধানকে সব সময়ের জন্য ন্যায়সংগত ও অপরিবর্তনীয় আইন হিসেবে গ্রহণ করা পৃথক দাবি।


মুহাম্মদ কী শেষ রাসুল?

কোরআনে মুহাম্মদকে শেষ নবী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আহযাবের ৩৩:৪০ আয়াতে ব্যবহৃত আরবি অভিব্যক্তি “খাতামান নাবিয়্যীন”; এর সঙ্গে সিল বা সিলমোহরের ধারণা যুক্ত, আবার সমাপ্তি ও শেষ হওয়ার অর্থও যুক্ত। এর অর্থ এক একজন এক একভাবে গ্রহণ করলে নবুয়তের সমাপ্তি সম্পর্কে একই ধর্মগ্রন্থ থেকে ভিন্ন বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হয়। আহমদিয়াগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যা ভিন্নভাবে করেছেন। আরও লক্ষ্য করার বিষয়, আয়াতটিতে মুহাম্মদকে আল্লাহর রাসুল এবং নবীদের খাতাম বলা হয়েছে; আলাদা করে “খাতামুল মুরসালীন” বা “শেষ রাসুল” অভিব্যক্তি ব্যবহার করা হয়নি। এই শব্দপার্থক্য নিজে নতুন রাসুলের বৈধতা প্রমাণ করে না। কেউ হাদিস অস্বীকার করে নিজেকে আরেকজন রাসুল হিসেবে দাবি করলে, প্রচলিত বিশ্বাসে সেই দাবি প্রত্যাখ্যানের জন্য ব্যবহৃত মুহাম্মদের সরাসরি ঘোষণাগুলোও বাদ পড়ে যায়। নবুয়ত ও রিসালাতের সমাপ্তি সম্পর্কে প্রচলিত মতবাদের নির্দিষ্ট ভাষা প্রতিষ্ঠায় তাই আয়াতের সঙ্গে হাদিসের বক্তব্যও ব্যবহার করা হয়েছে। [86] [87]

مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَٰكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ ۗ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا.

বাংলা অনুবাদ:
মুহাম্মাদ (সাঃ) তোমাদের মধ্যেকার কোন পুরুষের পিতা নয়, কিন্তু (সে) আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞাতা।
Taisirul Quran
মুহাম্মাদ (সাঃ) তোমাদের মধ্যেকার কোন পুরুষের পিতা নয়, কিন্তু (সে) আল্লাহর রসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞাতা।
Sheikh Mujibur Rahman
মুহাম্মাদ তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নয়; তবে আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী।* আর আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বজ্ঞ। * মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ নবী; তাঁর পর আর কোন নবী আসবেন না-এ বিষয়টি আল-কুরআনের এই আয়াত দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত।
Rawai Al-bayan
মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন (১); বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আর আল্লাহ্ সর্বকিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
( কুরআন ৩৩ঃ৪০ )

আরবি শব্দটির অর্থ শুধু সিলমোহরের বস্তুগত ধারণায় সীমাবদ্ধ নয়। লিসানুল আরব অভিধানে “খিতামুল কওম”, “খাতিমুহুম” ও “খাতামুহুম” দিয়ে কোনো জনগোষ্ঠীর শেষ ব্যক্তিকে বোঝানোর ব্যবহার দেওয়া হয়েছে। একই আলোচনায় মুহাম্মদকে নবীদের খাতাম বলার সঙ্গে শেষ হওয়ার অর্থ যুক্ত করা হয়েছে। ফলে “সিলমোহর” অনুবাদটি পাওয়া গেলেই “শেষ” অর্থটি ভাষাগতভাবে অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। একটি শব্দের সম্ভাব্য অর্থ, বাক্যে তার ব্যবহার এবং ধর্মীয় মতবাদে সেই ব্যবহারকে যে নির্দিষ্ট অর্থ দেওয়া হয়েছে—এই তিনটি বিষয় এক নয়। নবুয়তের সমাপ্তির প্রচলিত ব্যাখ্যা শব্দটির সমাপ্তিসংক্রান্ত ব্যবহার গ্রহণ করে এবং মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত ঘোষণাগুলোকে তার ব্যাখ্যার সঙ্গে যুক্ত করে। অভিধানের অর্থ এবং নববী বক্তব্য একসঙ্গে ব্যবহার করেই সেই নির্দিষ্ট মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। [88]

وختام الوادي : أقصاه . وختام القوم وخاتمهم وخاتمهم : آخرهم ; عن اللحياني ; ومحمد – صلى الله عليه وسلم – خاتم الأنبياء ، عليه وعليهم الصلاة والسلام . التهذيب : والخاتم والخاتم من أسماء النبي – صلى الله عليه وسلم – . وفي التنزيل العزيز : ما كان محمد أبا أحد من رجالكم ولكن رسول الله وخاتم النبيين ; أي آخرهم ، قال : وقد قرئ وخاتم ; وقول العجاج : مبارك للأنبياء خاتم إنما حمله على القراءة المشهورة فكسر ، ومن أسمائه العاقب أيضا ومعناه آخر الأنبياء .

বাংলা অনুবাদ:
উপত্যকার খিতাম হলো তার শেষ প্রান্ত। কোনো জনগোষ্ঠীর খিতাম, তাদের খাতিম ও খাতাম হলো তাদের শেষ ব্যক্তি; এটি আল-লিহইয়ানির সূত্রে বর্ণিত। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবীদের খাতিম; তাঁর ও তাঁদের ওপর সালাম বর্ষিত হোক। তাহযিব গ্রন্থে আছে: খাতিম ও খাতাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামগুলোর অন্তর্ভুক্ত। কোরআনে আছে: “মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং আল্লাহর রাসুল এবং নবীদের খাতাম”—অর্থাৎ তাঁদের শেষ ব্যক্তি। তিনি বলেছেন: এটি “খাতিম” হিসেবেও পড়া হয়েছে। আল-আজ্জাজের বক্তব্য: “নবীদের জন্য বরকতময় খাতিম।” তিনি প্রচলিত পাঠের অনুসরণে শব্দটিকে কাসরা দিয়ে পড়েছেন। তাঁর নামগুলোর মধ্যে “আকিব”ও আছে; এর অর্থও শেষ নবী।

বুখারীর বর্ণনায় নবীদের ধারাবাহিকতার সমাপ্তি বোঝাতে একটি ভবনের উপমা এসেছে। মুহাম্মদ ও তাঁর পূর্ববর্তী নবীদের তুলনা করা হয়েছে এমন একটি সুন্দর ভবনের সঙ্গে, যার এক কোণে একটি ইটের জায়গা খালি রয়েছে। মানুষ ভবনটি দেখে মুগ্ধ হলেও খালি জায়গাটিতে ইট বসানোর কথা বলে। বর্ণনায় মুহাম্মদ নিজেকে সেই ইট এবং নবীদের খাতাম বলেছেন। এখানে খাতাম পরিচয়টি একটি অসম্পূর্ণ ভবনের শেষ শূন্যস্থান পূরণের উপমার মধ্যে এসেছে। ফলে সমাপ্তির অর্থ গ্রহণের জন্য শুধু একটি বাংলা অনুবাদের ওপর নির্ভর করা হচ্ছে না; হাদিসে সংরক্ষিত ব্যাখ্যামূলক উপমাও ব্যবহার করা হচ্ছে। কোরআনের একই অভিব্যক্তির নির্দিষ্ট ধর্মীয় অর্থ প্রতিষ্ঠায় এই বর্ণনা অতিরিক্ত বিষয়বস্তু সরবরাহ করে। হাদিস বাদ দিলে মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত এই উপমাটিও ব্যাখ্যার তথ্যসূত্র থেকে বাদ পড়ে যায়। [89]

حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ ، حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ جَعْفَرٍ ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ دِينَارٍ ، عَنْ أَبِي صَالِحٍ ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏”‏ إِنَّ مَثَلِي وَمَثَلَ الأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِي كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى بَيْتًا فَأَحْسَنَهُ وَأَجْمَلَهُ، إِلاَّ مَوْضِعَ لَبِنَةٍ مِنْ زَاوِيَةٍ، فَجَعَلَ النَّاسُ يَطُوفُونَ بِهِ وَيَعْجَبُونَ لَهُ، وَيَقُولُونَ هَلاَّ وُضِعَتْ هَذِهِ اللَّبِنَةُ قَالَ فَأَنَا اللَّبِنَةُ، وَأَنَا خَاتِمُ النَّبِيِّينَ ‏”‏‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
কুতাইবা ইবন সাঈদ আমাদের বর্ণনা করেছেন; ইসমাঈল ইবন জাফর আমাদের বর্ণনা করেছেন, আবদুল্লাহ ইবন দিনারের সূত্রে, আবু সালিহের মাধ্যমে আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আমার ও আমার পূর্ববর্তী নবীদের উদাহরণ এমন এক ব্যক্তির মতো, যে একটি বাড়ি নির্মাণ করেছে এবং সেটিকে সুন্দর ও মনোরম করেছে, কিন্তু এক কোণে একটি ইটের জায়গা বাদ রেখেছে। লোকেরা বাড়িটির চারদিকে ঘুরে দেখে, মুগ্ধ হয় এবং বলে, এই ইটটি বসানো হলো না কেন? আমি সেই ইট এবং আমি নবীদের খাতাম।”

তিরমিজীর আরেকটি বর্ণনায় একই পরিচয়ের পরে সরাসরি “আমার পরে কোনো নবী নেই” বাক্য এসেছে। সেখানে ত্রিশজন মিথ্যা নবুয়তের দাবিদারের কথা বলা হয়েছে এবং তাদের দাবির বিপরীতে মুহাম্মদের নবুয়তসমাপ্তির ঘোষণা স্থাপন করা হয়েছে। এই বর্ণনায় “খাতামান নাবিয়্যীন” অভিব্যক্তি এবং তার পরে নবী না থাকার কথা পাশাপাশি উপস্থিত। ফলে প্রচলিত বিশ্বাসে আয়াতের শব্দটিকে কী নির্দিষ্ট অর্থে গ্রহণ করা হচ্ছে, তার জন্য একটি সরাসরি নববী ঘোষণা পাওয়া যায়। এই ঘোষণার বাক্য কোরআনের ৩৩:৪০ আয়াতের হুবহু বাক্য নয়; হাদিসের পৃথক বক্তব্য। আয়াতের পরিচয় এবং হাদিসের ঘোষণাকে মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। হাদিসের বক্তব্য বাদ দিয়ে একই ঘোষণাকে মুহাম্মদের নিজস্ব বক্তব্য হিসেবে উদ্ধৃত করার উৎস আর থাকে না। [90]

حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ ، حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ ، عَنْ أَيُّوبَ ، عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ ، عَنْ أَبِي أَسْمَاءَ الرَّحَبِيِّ ، عَنْ ثَوْبَانَ ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ لاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَلْحَقَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِي بِالْمُشْرِكِينَ وَحَتَّى يَعْبُدُوا الأَوْثَانَ وَإِنَّهُ سَيَكُونُ فِي أُمَّتِي ثَلاَثُونَ كَذَّابُونَ كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ نَبِيٌّ وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ لاَ نَبِيَّ بَعْدِي ‏” ‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
কুতাইবা আমাদের বর্ণনা করেছেন; হাম্মাদ ইবন যায়দ আমাদের বর্ণনা করেছেন, আইয়ুবের সূত্রে, আবু কিলাবার মাধ্যমে আবু আসমা আর-রাহাবি থেকে, সাওবান থেকে। তিনি বলেছেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না আমার উম্মতের কিছু গোত্র মুশরিকদের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং তারা মূর্তির উপাসনা করে। আমার উম্মতের মধ্যে ত্রিশজন মিথ্যাবাদী হবে; প্রত্যেকেই দাবি করবে যে সে নবী। আমি নবীদের খাতাম; আমার পরে কোনো নবী নেই।” আবু ঈসা বলেছেন: এই হাদিস হাসান সহিহ।

রাসুল ও নবী শব্দের পার্থক্যসংক্রান্ত প্রশ্নে তিরমিজীর আনাস-বর্ণনায় আরও নির্দিষ্ট বক্তব্য আছে। সেখানে রিসালাত ও নবুয়ত দুটিরই সমাপ্তি ঘোষণা করে মুহাম্মদের পরে কোনো রাসুল বা নবী না থাকার কথা বলা হয়েছে। একই বর্ণনায় মানুষের প্রশ্ন, সেই ঘোষণায় তাদের কষ্ট পাওয়া এবং অবশিষ্ট সুসংবাদ হিসেবে মুসলিমের স্বপ্নের কথা রয়েছে। ফলে কোনো নতুন রাসুলের দাবি প্রত্যাখ্যানের জন্য প্রচলিত বিশ্বাসে শুধু “নবী” শব্দ থেকে অনুমান করা হচ্ছে না; হাদিসে “রাসুল” শব্দ ব্যবহার করে সরাসরি সমাপ্তির ঘোষণাও পাওয়া যাচ্ছে। এই অতিরিক্ত বাক্যটি কোরআনের আলোচিত আয়াতে নেই। হাদিস অগ্রাহ্য করলে নবুয়ত ও রিসালাতের সমাপ্তি সম্পর্কে মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত এই স্পষ্ট ভাষাটিও অগ্রাহ্য করতে হয়। সাধারণ পরিচয়ের আয়াত এবং বিস্তারিত ঘোষণার হাদিস এখানে একই মতবাদের দুটি তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। [91]

حَدَّثَنَا الْحَسَنُ بْنُ مُحَمَّدٍ الزَّعْفَرَانِيُّ ، حَدَّثَنَا عَفَّانُ بْنُ مُسْلِمٍ ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَاحِدِ يَعْنِي ابْنَ زِيَادٍ ، حَدَّثَنَا الْمُخْتَارُ بْنُ فُلْفُلٍ ، حَدَّثَنَا أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ إِنَّ الرِّسَالَةَ وَالنُّبُوَّةَ قَدِ انْقَطَعَتْ فَلاَ رَسُولَ بَعْدِي وَلاَ نَبِيَّ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ فَشَقَّ ذَلِكَ عَلَى النَّاسِ فَقَالَ ‏”‏ لَكِنِ الْمُبَشِّرَاتُ ‏”‏ ‏.‏ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا الْمُبَشِّرَاتُ قَالَ ‏”‏ رُؤْيَا الْمُسْلِمِ وَهِيَ جُزْءٌ مِنْ أَجْزَاءِ النُّبُوَّةِ ‏” ‏ ‏.‏ وَفِي الْبَابِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَحُذَيْفَةَ بْنِ أَسِيدٍ وَابْنِ عَبَّاسٍ وَأُمِّ كُرْزٍ ‏.‏ قَالَ هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ غَرِيبٌ مِنْ هَذَا الْوَجْهِ مِنْ حَدِيثِ الْمُخْتَارِ بْنِ فُلْفُلٍ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
হাসান ইবন মুহাম্মদ আয-যাফারানি আমাদের বর্ণনা করেছেন; আফফান ইবন মুসলিম আমাদের বর্ণনা করেছেন; আবদুল ওয়াহিদ অর্থাৎ ইবন যিয়াদ আমাদের বর্ণনা করেছেন; মুখতার ইবন ফিলফিল আমাদের বর্ণনা করেছেন; আনাস ইবন মালিক আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “রিসালাত ও নবুয়তের সমাপ্তি হয়েছে; আমার পরে কোনো রাসুল নেই এবং কোনো নবীও নেই।” আনাস বলেছেন: এতে মানুষের কষ্ট হলো। তিনি বললেন: “কিন্তু সুসংবাদসমূহ থাকবে।” তাঁরা বললেন: হে আল্লাহর রাসুল, সুসংবাদসমূহ কী? তিনি বললেন: “মুসলিমের স্বপ্ন; তা নবুয়তের অংশগুলোর একটি অংশ।” এই বিষয়ে আবু হুরাইরা, হুযাইফা ইবন আসিদ, ইবন আব্বাস ও উম্মু কুরযের সূত্রেও বর্ণনা আছে। তিনি বলেছেন: মুখতার ইবন ফিলফিলের সূত্রে এই ধারায় হাদিসটি হাসান সহিহ গরিব।

ইবন কাসিরের তাফসিরে আয়াতের ব্যাখ্যা, নবী ও রাসুলের শ্রেণিগত সম্পর্ক এবং হাদিসের বক্তব্য একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর ব্যাখ্যায় প্রত্যেক রাসুল নবী, কিন্তু প্রত্যেক নবী রাসুল নন; সে কারণে নবী না থাকলে রাসুলও থাকবে না। তিনি এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একদল সাহাবির সূত্রে বর্ণিত হাদিসের কথাও যুক্ত করেছেন। ফলে তাঁর তাফসিরে “শেষ নবী” থেকে “শেষ রাসুল” সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পদ্ধতি স্পষ্ট। এটি আরবি বাক্যের মধ্যে নতুন করে “খাতামুল মুরসালীন” শব্দ বসানো নয়; নবী–রাসুল সম্পর্কের ব্যাখ্যা এবং সংরক্ষিত বর্ণনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। প্রচলিত মতবাদের অর্থ নির্ধারণে এই ব্যাখ্যাগত সম্পর্কও কার্যকর। কোরআনের বাক্য, তার ব্যাখ্যা এবং ব্যাখ্যাকে সমর্থনকারী হাদিস মিলেই এখানে ধর্মীয় কর্তৃত্বের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু তৈরি হয়েছে। [92]

وقوله : ( ولكن رسول الله وخاتم النبيين وكان الله بكل شيء عليما ) كقوله : ( الله أعلم حيث يجعل رسالته ) [ الأنعام : 124 ] فهذه الآية نص في أنه لا نبي بعده ، وإذا كان لا نبي بعده فلا رسول [ بعده ] بطريق الأولى والأحرى; لأن مقام الرسالة أخص من مقام النبوة ، فإن كل رسول نبي ، ولا ينعكس . وبذلك وردت الأحاديث المتواترة عن رسول الله صلى الله عليه وسلم من حديث جماعة من الصحابة .

বাংলা অনুবাদ:
তাঁর বক্তব্য, “বরং আল্লাহর রাসুল এবং নবীদের খাতাম; আর আল্লাহ সব বিষয়ে সর্বজ্ঞ”—এটি তাঁর এই বক্তব্যের মতো: “আল্লাহ ভালো জানেন কোথায় তাঁর রিসালাত স্থাপন করবেন” [আনআম: ১২৪]। এই আয়াত তাঁর পরে কোনো নবী নেই—এ বিষয়ে স্পষ্ট পাঠ। তাঁর পরে কোনো নবী না থাকলে আরও অগ্রাধিকারসহ তাঁর পরে কোনো রাসুলও নেই; কারণ রিসালাতের মর্যাদা নবুয়তের মর্যাদার তুলনায় বিশেষায়িত। প্রত্যেক রাসুল নবী, কিন্তু এর বিপরীতটি সত্য নয়। এ বিষয়ে একদল সাহাবির সূত্রে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মুতাওয়াতির হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

নবুয়তের সমাপ্তির বিশ্বাস প্রতিষ্ঠায় কোরআনের একটি অভিব্যক্তির সঙ্গে ভবনের শেষ ইটের উপমা, “আমার পরে কোনো নবী নেই” ঘোষণা এবং “আমার পরে কোনো রাসুলও নেই” ঘোষণা যুক্ত হয়েছে। হাদিস এখানে শুধু অতীতের কোনো ঘটনাবিবরণ হিসেবে উপস্থিত নেই; বিশ্বাসের সীমা নির্ধারণ এবং একই আয়াতের একটি নির্দিষ্ট অর্থকে কর্তৃত্ব দেওয়ার উৎস হিসেবেও উপস্থিত। এই বর্ণনাগুলো বাদ দিলে কোরআনের পাঠের সঙ্গে যুক্ত সেই নির্দিষ্ট নববী ব্যাখ্যা ও ঘোষণাগুলো বাদ পড়ে যায়। তখন কোনো ব্যাখ্যাকে মুহাম্মদের ঘোষণার সঙ্গে মিলিয়ে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের জন্য ব্যবহৃত তথ্যসূত্রও সংকুচিত হয়। প্রচলিত ইসলামি বিশ্বাসের যে নির্দিষ্ট রূপকে অপরিবর্তনীয় বলা হয়, তার বিষয়বস্তু প্রতিষ্ঠায় তাই কোরআনের পাশাপাশি মানুষের সংরক্ষিত নববী বর্ণনাও কার্যকর ভূমিকা রাখে।


এদের সম্পর্কে মুহাম্মদের সতর্কবাণী

মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত বর্ণনাগুলোতে কেবল কোরআনে সরাসরি পাওয়া বিধান গ্রহণ করে তাঁর আদেশ–নিষেধ অগ্রাহ্য করার অবস্থানের বিরুদ্ধে সতর্কবাণী আছে। সহিহ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হাদিসে নবী মুহাম্মদের এমন বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। আবু দাউদের আবু রাফি-বর্ণনায় তাঁর কোনো কর্তব্য বা নিষেধের খবর পৌঁছলে “আমরা যা আল্লাহর কিতাবে পাব শুধু তারই অনুসরণ করব” বলা ব্যক্তির অবস্থান প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এখানে কোরআন পাঠ করার বিরুদ্ধে আপত্তি নেই; কোরআনের সরাসরি বাক্যে কোনো নির্দেশ না পেলে মুহাম্মদের নামে পৌঁছানো নির্দেশ গ্রহণ না করার অবস্থানের বিরুদ্ধে আপত্তি আছে। ফলে বর্ণনাটির ধর্মীয় কাজ হলো নববী আদেশ–নিষেধকে আলাদা কর্তৃত্ব দেওয়া। হাদিসের তথ্য বাদ দিয়ে একই কর্তৃত্ব গ্রহণ করলে সেই কর্তৃত্বে কী নির্দিষ্ট আদেশ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তার তথ্যসূত্র বাদ পড়ে। [93] [94] [95] [96] [97] [98] [99] [100]

حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ حَنْبَلٍ ، وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُحَمَّدٍ النُّفَيْلِيُّ ، قَالاَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ ، عَنْ أَبِي النَّضْرِ ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي رَافِعٍ ، عَنْ أَبِيهِ ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏”‏ لاَ أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ مُتَّكِئًا عَلَى أَرِيكَتِهِ يَأْتِيهِ الأَمْرُ مِنْ أَمْرِي مِمَّا أَمَرْتُ بِهِ أَوْ نَهَيْتُ عَنْهُ فَيَقُولُ لاَ نَدْرِي مَا وَجَدْنَا فِي كِتَابِ اللَّهِ اتَّبَعْنَاهُ ‏”‏ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
আহমদ ইবন মুহাম্মদ ইবন হাম্বল ও আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ আন-নুফাইলি বর্ণনা করেছেন; তাঁরা বলেছেন, সুফিয়ান আমাদের বর্ণনা করেছেন, আবু নাযরের সূত্রে।

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ৬. সুন্নাতের অনুসরণ আবশ্যক
৪৬০৫। উবাইদুল্লাহ ইবনু আবূ রাফি‘ (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ অচিরেই তোমাদের মধ্যকার কোনো ব্যক্তি তার গদি আঁটা আসনে হেলান দিয়ে বসে থাকাবস্থায় তার নিকট আমার নির্দেশিত কোনো কর্তব্য বা নিষেধাজ্ঞা পৌঁছবে, তখন সে বলবে, আমি অবহিত নই। আমরা যা আল্লাহর কিতাবে পাবো শুধু তারই অনুসরণ করবো।(1)
সহীহ।
(1). তিরমিযী, হাকিম। ইমাম তিরমিযী বলেনঃ এই হাদীসটি হাসান সহীহ। ইমাম হাকিম ও যাহাবী একে শাখইনের শর্তে সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উবায়দুল্লাহ ইবনে আবু রাফে (রাঃ)

তিরমিজীর আবু রাফি-বর্ণনাতেও একই অবস্থানের বিরুদ্ধে বক্তব্য রয়েছে। সেখানে মুহাম্মদের আদিষ্ট বিষয় বা নিষেধের খবর পৌঁছানোর পরে কেবল আল্লাহর কিতাবে পাওয়া বিষয় অনুসরণের ঘোষণা গ্রহণ করা হয়নি। বর্ণনাটি নববী বক্তব্যকে ধর্মীয় আদেশের তথ্যসূত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে। এর সঙ্গে গ্রন্থকার বর্ণনার বিভিন্ন সনদ কীভাবে এসেছে, সেই তথ্যও সংরক্ষণ করেছেন। ফলে একই বক্তব্য আবু দাউদ, তিরমিজী ও অন্য গ্রন্থে থাকা মানেই প্রতিটি গ্রন্থ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ঐতিহাসিক সাক্ষ্য পাওয়া নয়; উদ্ধৃতিগুলোতে একই আবু রাফি-বর্ণনার বিভিন্ন সংকলন ও বর্ণনাপথ উপস্থিত। ধর্মীয় ব্যবস্থায় তাদের ব্যবহারিক ভূমিকা হলো মুহাম্মদের নির্দেশকে কোরআনের সরাসরি বাক্যের বাইরে গ্রহণযোগ্য বিধানের উৎস করা। এই নির্দেশের বিষয়বস্তু জানতে হলে যে বর্ণনা ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও কোরআনের বাইরের তথ্য। [101] [102]

حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ بْنُ عُيَيْنَةَ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْمُنْكَدِرِ، وَسَالِمٍ أَبِي النَّضْرِ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي رَافِعٍ، عَنْ أَبِي رَافِعٍ، وَغَيْرُهُ، رَفَعَهُ قَالَ ‏ “‏ لاَ أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ مُتَّكِئًا عَلَى أَرِيكَتِهِ يَأْتِيهِ أَمْرٌ مِمَّا أَمَرْتُ بِهِ أَوْ نَهَيْتُ عَنْهُ فَيَقُولُ لاَ أَدْرِي مَا وَجَدْنَا فِي كِتَابِ اللَّهِ اتَّبَعْنَاهُ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ ‏.‏ وَرَوَى بَعْضُهُمْ عَنْ سُفْيَانَ عَنِ ابْنِ الْمُنْكَدِرِ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم مُرْسَلاً وَسَالِمٍ أَبِي النَّضْرِ عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي رَافِعٍ عَنْ أَبِيهِ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم ‏.‏ وَكَانَ ابْنُ عُيَيْنَةَ إِذَا رَوَى هَذَا الْحَدِيثَ عَلَى الاِنْفِرَادِ بَيَّنَ حَدِيثَ مُحَمَّدِ بْنِ الْمُنْكَدِرِ مِنْ حَدِيثِ سَالِمٍ أَبِي النَّضْرِ وَإِذَا جَمَعَهُمَا رَوَى هَكَذَا ‏.‏ وَأَبُو رَافِعٍ مَوْلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم اسْمُهُ أَسْلَمُ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
কুতাইবা বর্ণনা করেছেন; সুফিয়ান ইবন উয়াইনাহ তাঁকে বর্ণনা করেছেন, মুহাম্মদ ইবনুল মুনকাদির ও সালিম আবু নাযরের সূত্রে, উবাইদুল্লাহ ইবন আবু রাফি থেকে, আবু রাফি ও অন্যদের মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য হিসেবে।

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩৯/ জ্ঞান
পরিচ্ছেদঃ ১০. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীসের ব্যাপারে যা বলা নিষেধ
২৬৬৩। আবূ রাফি’ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি যেন তোমাদের মধ্যে কাউকে এমন অবস্থায় না পাই যে, সে তার সুসজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে বসে থাকবে এবং তার নিকট যখন আমার আদিষ্ট কোন বিষয় অথবা আমার নিষেধ সম্বলিত কোন হাদীস উত্থাপিত হবে তখন সে (তাচ্ছিল্যভরে) বলবে, আমি তা জানি না, আল্লাহ তা’আলার কিতাবে আমরা যা পাই, তারই অনুসরণ করবো।
সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (১৩)
আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান। এ হাদীসটি কোন কোন বর্ণনাকারী সুফইয়ান-ইবনুল মুনকাদির (রাহঃ)-এর সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে মুরসালভাবে বর্ণনা করেছেন। আবার কোন কোন বর্ণনাকারী সালিম আবূন নাযর হতে, তিনি উবাইদুল্লাহ ইবনু আবী রাফি হতে, তিনি তার পিতা হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে, এই সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
ইবনু উয়াইনাহ যখন পৃথকভাবে উভয় সনদের উল্লেখ করতেন তখন মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদিরের বর্ণনাকে সালিম আবূন নাযরের বর্ণনা হতে পৃথক করে বর্ণনা করতেন এবং যখন উভয় সনদ একত্র করে বর্ণনা করতেন তখন প্রথমোক্তভাবে সনদটির উল্লেখ করতেন। আবূ রাফি’ (রাযিঃ) ছিলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুক্তদাস, তার নাম আসলাম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ রাফি‘ (রাঃ)

মিকদামের সূত্রে ইবন মাজাহর বর্ণনায় শুধু নববী নির্দেশ অগ্রাহ্য করার অবস্থান প্রত্যাখ্যান করা হয়নি; রাসুল যা হারাম করেছেন, তা আল্লাহ যা হারাম করেছেন তার অনুরূপ বলেও ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে কোরআনের সরাসরি পাঠে কোনো নিষেধের একই ভাষা খুঁজে না পেলেও সেই নিষেধকে মুহাম্মদের নিষেধ বলে গ্রহণের ধর্মীয় ভিত্তি তৈরি হয়। একটি বর্ণনায় নির্দিষ্ট আদেশ বা নিষেধের সংবাদ এবং অন্য বক্তব্যে সেই সংবাদ গ্রহণের কর্তৃত্ব মিলে বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে হাদিস কোরআনের কোনো শব্দের সাধারণ ভাষাগত অর্থ বলার মধ্যেই সীমিত নয়; নিষেধের ধর্মীয় মর্যাদা নির্ধারণের দাবিও বহন করে। এই তথ্যসূত্র বাদ দিলে কোরআনের সাধারণ আনুগত্যের বাক্য থেকে একই নির্দিষ্ট নিষেধের সম্পূর্ণ বিষয়বস্তু উদ্ধার করা যায় না। [85]

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ ، حَدَّثَنَا زَيْدُ بْنُ الْحُبَابِ ، عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ صَالِحٍ ، حَدَّثَنِي الْحَسَنُ بْنُ جَابِرٍ ، عَنِ الْمِقْدَامِ بْنِ مَعْدِيكَرِبَ الْكِنْدِيِّ ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ قَالَ ‏ “‏ يُوشِكُ الرَّجُلُ مُتَّكِئًا عَلَى أَرِيكَتِهِ يُحَدَّثُ بِحَدِيثٍ مِنْ حَدِيثِي فَيَقُولُ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ كِتَابُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فَمَا وَجَدْنَا فِيهِ مِنْ حَلاَلٍ اسْتَحْلَلْنَاهُ وَمَا وَجَدْنَا فِيهِ مِنْ حَرَامٍ حَرَّمْنَاهُ ‏.‏ أَلاَ وَإِنَّ مَا حَرَّمَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ مِثْلُ مَا حَرَّمَ اللَّهُ ‏”‏ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
আবু বকর ইবন আবি শাইবা বর্ণনা করেছেন; যায়দ ইবন হুবাব তাঁকে বর্ণনা করেছেন, মুআবিয়া ইবন সালিহের সূত্রে। হাসান ইবন জাবির তাঁকে মিকদাম ইবন মাদিকারিবের সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

সুনান ইবনু মাজাহ
ভূমিকা পর্ব
পরিচ্ছেদঃ ২. রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাদীসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তার বিরুদ্ধবাদীর প্রতি কঠোর মনোভাব পোষণ।
১/১২। আল-মিক্বদাম ইবনু মাদীকারিব আল-কিনদী (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ অচিরেই কোন ব্যাক্তি তার আসনে হেলান দেয়া অবস্থায় বসে থাকবে এবং তার সামনে আমার হাদীস থেকে বর্ণনা করা হবে, তখন সে বলবে, আমাদের ও তোমাদের মাঝে মহামহিম আল্লাহ্‌র কিতাবই যথেষ্ট। আমরা তাতে যা হালাল পাবো তাকেই হালাল মানবো এবং তাতে যা হারাম পাবো তাকেই হারাম মানবো। (মহানবী (সাঃ) বলেন) সাবধান! নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা হারাম করেছেন তা আল্লাহ যা হারাম করেছেন তার অনুরূপ।
তাখরীজ কুতুবুত সিত্তাহ:তিরমিযী ২৬৬৪, আবূ দাঊদ ৪৬০৪, দারিমী ৫৮৬।
তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ। তাখরীজ আলবানী: তাখরীজুল মিশকাত ১৬৩।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মিকদাম (রাঃ)

ইবন মাজাহর পরের বর্ণনাটি আবু রাফির সূত্রে এসেছে এবং মুহাম্মদের আদেশ বা নিষেধ পৌঁছানোর পরে “আমরা আল্লাহর কিতাবে যা পাব তার অনুসরণ করব” বলার অবস্থানকে আবার প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই এর বক্তব্যকে কেবল সাধারণভাবে ধর্মীয় নিষেধ মানার উপদেশ হিসেবে সীমিত করা যায় না। কোনো নির্দেশ গ্রহণের জন্য কোরআনে তার সরাসরি উপস্থিতিকে একমাত্র শর্ত করার প্রশ্নটিই এখানে সামনে এসেছে। বর্ণনাটি মুহাম্মদের নির্দেশ সম্পর্কে অতিরিক্ত সংবাদ গ্রহণের দাবি করে। তাঁর মৃত্যুর পরে এই অতিরিক্ত সংবাদ জানার পথ মানুষের সংরক্ষিত বক্তব্য ও ঘটনার বর্ণনা। ফলে কোরআন মানার সঙ্গে সেই বর্ণনাগুলোর কর্তৃত্ব গ্রহণও যুক্ত হয়। সাধারণ আনুগত্যের আদেশকে নির্দিষ্ট নববী বিধানে রূপ দেওয়ার জন্য কোরআনের বাইরের তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে। [103]

حَدَّثَنَا نَصْرُ بْنُ عَلِيٍّ الْجَهْضَمِيُّ ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ بْنُ عُيَيْنَةَ ، فِي بَيْتِهِ أَنَا سَأَلْتُهُ، عَنْ سَالِمٍ أَبِي النَّضْرِ ، ثُمَّ مَرَّ فِي الْحَدِيثِ قَالَ أَوْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي رَافِعٍ عَنْ أَبِيهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ قَالَ ‏ “‏ لاَ أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ مُتَّكِئًا عَلَى أَرِيكَتِهِ يَأْتِيهِ الأَمْرُ مِمَّا أَمَرْتُ بِهِ أَوْ نَهَيْتُ عَنْهُ فَيَقُولُ لاَ أَدْرِي مَا وَجَدْنَا فِي كِتَابِ اللَّهِ اتَّبَعْنَاهُ ‏”‏ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
নাসর ইবন আলি আল-জাহদামি বর্ণনা করেছেন: আমি সুফিয়ান ইবন উয়াইনাহকে তাঁর ঘরে প্রশ্ন করলে তিনি সালিম আবু নাযরের সূত্রে বর্ণনা করেন। তারপর বর্ণনার মধ্যে তিনি বলেন: অথবা যায়দ ইবন আসলামের সূত্রে, উবাইদুল্লাহ ইবন আবু রাফি থেকে, তাঁর পিতার মাধ্যমে।

সুনান ইবনু মাজাহ
ভূমিকা পর্ব
পরিচ্ছেদঃ ২. রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাদীসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তার বিরুদ্ধবাদীর প্রতি কঠোর মনোভাব পোষণ।
২/১৩। আবূ রাফি (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি যেন তোমাদের কাউকে এরূপ না পাই যে, সে তার আসনে হেলান দিয়ে বসে থাকবে এবং (এই অবস্থায়) আমার প্রদত্ত কোন আদেশ অথবা আমার প্রদত্ত কোন নিষেধাজ্ঞা তার নিকট পৌঁছলে সে বলবে, আমি কিছু জানি না, আমরা আল্লাহ্‌র কিতাবে যা পাবো তার অনুসরণ করবো।
তাখরীজ কুতুবুত সিত্তাহ: তিরমিযী ২৬৬৩, আবূ দাঊদ ৪৬০৫, আহমাদ ২৩২৪৯।
তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ। তাখরীজ আলবানী: তাখরীজুল মিশকাত ১৬২।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ রাফি‘ (রাঃ)

ইবন আব্বাসের নামে সংরক্ষিত বিদায়হজের ভাষণের এই বর্ণনায় কিতাব ও নবীর সুন্নাহ দুটিকে আঁকড়ে ধরে পথভ্রষ্টতা এড়ানোর কথা এসেছে। একই ভাষণে মুসলিমদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, অন্যের সম্পদ গ্রহণে স্বেচ্ছাসম্মতি এবং পরস্পরের গর্দান আঘাত করে কাফির হয়ে ফিরে না যাওয়ার নির্দেশও আছে। ফলে কিতাব ও সুন্নাহর যুগল কর্তৃত্ব একটি সামাজিক আচরণ ও সম্পদের অধিকারসংক্রান্ত নির্দেশের মধ্যেই উপস্থিত। এখানে “সুন্নাহ” শব্দটি নবীর পথ ও বিধান বোঝাচ্ছে; সেটি কোনো পরবর্তী সংকলকের নির্দিষ্ট গ্রন্থের নাম নয়। সেই পথের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু পরবর্তী মানুষের কাছে পৌঁছায় সংরক্ষিত বর্ণনার মাধ্যমে। হাদিস সম্ভারের উদ্ধৃতির সঙ্গে হাকেমের মুসতাদরাকে থাকা পূর্ণ বক্তব্য মিলিয়ে দেখলে কিতাবের পাশাপাশি নববী আচরণ ও নির্দেশ গ্রহণের দাবিটি স্পষ্ট থাকে। [104]

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَطَبَ النَّاسَ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ ، فَقَالَ : ” قَدْ يَئِسَ الشَّيْطَانُ بِأَنْ يُعْبَدَ بِأَرْضِكُمْ  ، وَلَكِنَّهُ رَضِيَ أَنْ يُطَاعَ فِيمَا سِوَى ذَلِكَ مِمَّا تُحَاقِرُونَ مِنْ أَعْمَالِكُمْ ، فَاحْذَرُوا يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي قَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا إِنِ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ فَلَنْ تَضِلُّوا أَبَدًا كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، إِنَّ كُلَّ مُسْلِمٍ أَخٌ مُسْلِمٌ ، الْمُسْلِمُونَ إِخْوَةٌ ، وَلَا يَحِلُّ لِامْرِئٍ مِنْ مَالِ أَخِيهِ إِلَّا مَا أَعْطَاهُ عَنْ طِيبِ نَفْسٍ ، وَلَا تَظْلِمُوا ، وَلَا تَرْجِعُوا مِنْ بَعْدِي كُفَّارًا يَضْرِبُ بَعْضُكُمْ رِقَابَ بَعْضٍ ” .

বাংলা অনুবাদ:
হাদীস সম্ভার
১৩/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ সুন্নাহ পালনের গুরুত্ব ও তার কিছু আদব প্রসঙ্গে
(১৫০১) ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখাৎ বর্ণিত, বিদায়ী হজ্জে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকেদের মাঝে খোতবা (ভাষণ) দিলেন। তাতে তিনি বললেন, ‘‘শয়তান এ বিষয়ে নিরাশ হয়ে গেছে যে, তোমাদের এই মাটিতে তার উপাসনা হবে। কিন্তু এতদ্ব্যতীত তোমরা যে সমস্ত কর্মসমূহকে অবজ্ঞা কর, তাতে তার আনুগত্য করা হবে—এ নিয়ে সে সন্তুষ্ট। সুতরাং তোমরা সতর্ক থেকো! অবশ্যই আমি তোমাদের মাঝে এমন জিনিস ছেড়ে যাচ্ছি; যদি তা দৃঢ়তার সাথে ধারণ করে থাকো তবে কখনই তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না; আর তা হল আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবীর সুন্নাহ (কুরআন ও হাদীস) প্রত্যেক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই; মুসলিমরা ভাই ভাই। কারও জন্য তার ভাইয়ের সম্পদ গ্রহণ বৈধ নয়, সে স্বেচ্ছায় যতটুকু দেয় তা ছাড়া। তোমরা জুলুম করো না এবং আমার পরে একে অপরের গর্দান আঘাত করে কাফির হয়ে ফিরে যেয়ো না।’’
(হাকেম ৩১৮, সহীহ তারগীব ৩৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

আবদুল্লাহ ইবন আমরের বর্ণনায় ধর্মীয় কাজের প্রবল উদ্যম এবং তার পরে নিরুদ্যমতার কথা বলা হয়েছে। সেই নিরুদ্যমতা মুহাম্মদের সুন্নাহর মধ্যে থাকলে হেদায়াত এবং অন্যদিকে গেলে ধ্বংসের কথা এসেছে। ফলে এখানে কোনো ব্যক্তির ইবাদতের পরিমাণকে একমাত্র মানদণ্ড করা হয়নি; নববী পদ্ধতির সঙ্গে তার সম্পর্ককে গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড করা হয়েছে। কোন আচরণ সেই পদ্ধতির মধ্যে আছে, তা নির্ধারণেও মুহাম্মদের বক্তব্য ও আচরণের তথ্য প্রয়োজন। কোরআনের সাধারণভাবে ইবাদত করার নির্দেশ থেকে এই বর্ণনার নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও ঘটনাগত ব্যাখ্যা নিজে পাওয়া যায় না। নবীর সুন্নাহকে ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতার সীমা হিসেবে ব্যবহার করতে তাই তাঁর সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য গ্রহণ করা হয়। এই তথ্য বাদ দিয়ে একই সীমাকে মুহাম্মদের প্রতিষ্ঠিত সীমা বলে ঘোষণা করার ভিত্তি থাকে না। [105]

ثنا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ ثنا ابْنُ فُضَيْلٍ عَنْ حُصَيْنٍ عَنْ مُجَاهِدٍ عَنْ عبد الله بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “لِكُلِّ عَمَلٍ شِرَّةٌ وَلِكُلِّ شِرَّةٍ فَتْرَةٌ فَمَنْ كَانَتْ فَتْرَتُهُ إِلَى سُنَّتِي فَقَدِ اهْتَدَى وَمَنْ كَانَتْ فَتْرَتُهُ إِلَى غَيْرِ ذَلِكَ فَقَدْ هلك”. إسناده صحيح على شرط الشيخين.

বাংলা অনুবাদ:
আবু বকর ইবন আবি শাইবা বর্ণনা করেছেন; ইবন ফুদাইল তাঁকে বর্ণনা করেছেন, হুসাইনের সূত্রে, মুজাহিদের মাধ্যমে আবদুল্লাহ ইবন আমর থেকে।

হাদীস সম্ভার
১৩/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ সুন্নাহ পালনের গুরুত্ব ও তার কিছু আদব প্রসঙ্গে
(১৫০৩) আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, প্রত্যেক কর্মের উদ্যম আছে এবং প্রত্যেক উদ্যমের আছে নিরুদ্যমতা। সুতরাং যার নিরুদ্যমতা আমার সুন্নাহর গণ্ডির ভিতরেই থাকে সে হেদায়াতপ্রাপ্ত হয় এবং যার নিরুদ্যমতা এ ছাড়া অন্য কিছুতে (সুন্নাত বর্জনে) অতিক্রম করে সে ধ্বংস হয়ে যায়।
সনদটি বুখারী ও মুসলিমের শর্ত অনুসারে সহিহ।
(ইবনে আবী আসেম, ইবনে হিব্বান, আহমাদ ৬৯৫৮, ত্বাহাবী, সহীহ তারগীব ৫৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ)

মুসনাদে আহমদের দীর্ঘ বর্ণনায় এই বক্তব্যের সঙ্গে আবদুল্লাহ ইবন আমরের দৈনন্দিন আচরণের বিবরণ যুক্ত আছে। সেখানে রোজা ও নামাজে ব্যস্ততার কারণে স্ত্রীর কাছে না যাওয়া, মাসে তিন দিন রোজার নির্দেশ, আরও বেশি করতে চাওয়ার পরে এক দিন রোজা ও এক দিন বিরতির নির্দেশ এবং কোরআন পড়ার সময়সীমা নির্ধারণের আলোচনা এসেছে। এসব নির্দিষ্ট নির্দেশ কেবল “ইবাদত কর” বা “কোরআন পড়” ধরনের সাধারণ বাক্যের সমান নয়। কত ঘনঘন রোজা রাখা এবং কত দিনে পাঠ সম্পন্ন করা হচ্ছে, সেই ব্যবহারিক বিষয়ও নববী নির্দেশের মাধ্যমে নির্ধারিত হচ্ছে। ফলে একটি সাধারণ ধর্মীয় কর্তব্যের বাস্তব প্রয়োগে মানুষের সংরক্ষিত ঘটনাবিবরণ অতিরিক্ত নিয়মের উৎস হয়। সুন্নাহর সীমা বলতে কী আচরণ বোঝানো হয়েছে, দীর্ঘ বর্ণনাটি সেই নির্দিষ্ট তথ্য সরবরাহ করে। [106]

عن عبد الله بن عمرو: أنه تزوج امرأة من قريش، فكان لا يأتيها، كان يشغله الصوم والصلاة، فذكر ذلك للنبي صلى الله عليه وسلم، فقال: ” صم من كل شهر ثلاثة أيام “، قال: إني أطيق أكثر من ذلك، فما زال به حتى قال له: ” صم يوما، وأفطر يوما ” وقال له: ” اقرإ القرآن في كل شهر “، قال: إني أطيق أكثر من ذلك، قال: ” اقرأه في كل خمس عشرة “، قال: إني أطيق أكثر من ذلك، قال: ” اقرأه في كل سبع “، حتى قال: ” اقرأ في كل ثلاث ” وقال النبي صلى الله عليه وسلم: ” إن لكل عمل شرة، ولكل شرة فترة، فمن كانت فترته إلى سنتي، فقد أفلح، ومن كانت فترته إلى غير ذلك، فقد هلك “

বাংলা অনুবাদ:
আবদুল্লাহ ইবন আমর থেকে বর্ণিত: তিনি কুরাইশের এক নারীকে বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু স্ত্রীর কাছে যেতেন না; রোজা ও নামাজ তাঁকে ব্যস্ত রাখত। বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানানো হলে তিনি বললেন: “প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখো।” আবদুল্লাহ বললেন: আমি এর চেয়ে বেশি করতে পারি। তাঁর সঙ্গে আলোচনা চলতে থাকল, শেষ পর্যন্ত তিনি বললেন: “এক দিন রোজা রাখো এবং এক দিন রোজা ছেড়ে দাও।” তিনি তাঁকে আরও বললেন: “প্রতি মাসে কোরআন পড়ো।” আবদুল্লাহ বললেন: আমি এর চেয়ে বেশি করতে পারি। তিনি বললেন: “পনেরো দিনে পড়ো।” আবদুল্লাহ বললেন: আমি এর চেয়ে বেশি করতে পারি। তিনি বললেন: “সাত দিনে পড়ো।” শেষ পর্যন্ত তিনি বললেন: “তিন দিনে পড়ো।” নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “প্রত্যেক কাজের প্রবল উদ্যম আছে এবং প্রত্যেক উদ্যমের নিরুদ্যমতা আছে। যার নিরুদ্যমতা আমার সুন্নাহর দিকে থাকে, সে সফল হয়েছে; যার নিরুদ্যমতা অন্যদিকে থাকে, সে ধ্বংস হয়েছে।”

আনাসের বর্ণনায় তিন ব্যক্তির ইবাদতের পরিকল্পনার সঙ্গে মুহাম্মদের নিজস্ব আচরণের তুলনা এসেছে। তাঁরা সারারাত নামাজ, অবিরত রোজা এবং নারীদের থেকে দূরে থেকে চিরকাল বিয়ে না করার পরিকল্পনা করেছিলেন। মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে সংরক্ষিত উত্তরে রোজা রাখা ও বিরতি দেওয়া, নামাজ পড়া ও ঘুমানো এবং নারীদের বিয়ে করার কথা এসেছে। শেষে তাঁর সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়াকে তাঁর অনুসারিত্বের বাইরে যাওয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে এখানে সুন্নাহ বলতে নির্দিষ্ট আচরণসহ একটি ধর্মীয় আদর্শ উপস্থিত। সেই আচরণের খবর বর্ণনাটিই সরবরাহ করছে। কোরআনের সাধারণ আনুগত্যের নির্দেশ দিয়ে তিন ব্যক্তির পরিকল্পনা এবং মুহাম্মদের এই নির্দিষ্ট উত্তরের ঘটনাবিবরণ জানা যায় না। প্রচলিত ব্যবস্থায় ওই বর্ণনাকে গ্রহণ করেই তাঁর আদর্শের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা হয়। [107] [108]

حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ أَبِي مَرْيَمَ ، أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرٍ ، أَخْبَرَنَا حُمَيْدُ بْنُ أَبِي حُمَيْدٍ الطَّوِيلُ ، أَنَّهُ سَمِعَ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ ـ رضى الله عنه ـ يَقُولُ جَاءَ ثَلاَثَةُ رَهْطٍ إِلَى بُيُوتِ أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم يَسْأَلُونَ عَنْ عِبَادَةِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَلَمَّا أُخْبِرُوا كَأَنَّهُمْ تَقَالُّوهَا فَقَالُوا وَأَيْنَ نَحْنُ مِنَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَدْ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ‏.‏ قَالَ أَحَدُهُمْ أَمَّا أَنَا فَإِنِّي أُصَلِّي اللَّيْلَ أَبَدًا‏.‏ وَقَالَ آخَرُ أَنَا أَصُومُ الدَّهْرَ وَلاَ أُفْطِرُ‏.‏ وَقَالَ آخَرُ أَنَا أَعْتَزِلُ النِّسَاءَ فَلاَ أَتَزَوَّجُ أَبَدًا‏.‏ فَجَاءَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ ‏”‏ أَنْتُمُ الَّذِينَ قُلْتُمْ كَذَا وَكَذَا أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لأَخْشَاكُمْ لِلَّهِ وَأَتْقَاكُمْ لَهُ، لَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ، وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي ‏”‏‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
সাঈদ ইবন আবি মারইয়াম বর্ণনা করেছেন; মুহাম্মদ ইবন জাফর তাঁকে জানিয়েছেন; হুমাইদ ইবন আবি হুমাইদ আত-তাওয়িল তাঁকে জানিয়েছেন যে তিনি আনাস ইবন মালিকের কাছ থেকে শুনেছেন।

হাদীস সম্ভার
১৩/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ সুন্নাহ পালনের গুরুত্ব ও তার কিছু আদব প্রসঙ্গে
(১৫০৪) আনাস (রাঃ) বলেন, তিন ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীদের বাসায় এলেন। তাঁরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। অতঃপর যখন তাঁদেরকে এর সংবাদ দেওয়া হল তখন তাঁরা যেন তা অল্প মনে করলেন এবং বললেন, ‘আমাদের সঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তুলনা কোথায়? তাঁর তো আগের ও পরের সমস্ত গোনাহ মোচন ক’রে দেওয়া হয়েছে। (সেহেতু আমাদের তাঁর চেয়ে বেশী ইবাদত করা প্রয়োজন)।’ সুতরাং তাঁদের মধ্যে একজন বললেন, ‘আমি সারা জীবন রাতভর নামায পড়ব।’
দ্বিতীয়জন বললেন, ‘আমি সারা জীবন সিয়াম রাখব, কখনো সিয়াম ছাড়ব না।’ তৃতীয়জন বললেন, ‘আমি নারী থেকে দূরে থাকব, জীবনভর বিয়েই করব না।’ অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের নিকট এলেন এবং বললেন, ‘‘তোমরা এই এই কথা বলেছ? শোনো! আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের চেয়ে বেশী আল্লাহকে ভয় করি, তার ভয় অন্তরে তোমাদের চেয়ে বেশী রাখি। কিন্তু আমি (নফল) সিয়াম রাখি এবং সিয়াম ছেড়েও দিই, নামায পড়ি এবং নিদ্রাও যাই। আর নারীদের বিয়েও করি। সুতরাং যে আমার সুন্নাত হতে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।’’
(বুখারী ৫০৬৩, মুসলিম ৩৪৬৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

এই বর্ণনাগুলোতে সুন্নাহ গ্রহণের দাবি ধর্মীয় কর্তৃত্ব, হালাল–হারামের মর্যাদা, হেদায়াত, ধ্বংস এবং অনুসারিত্বের সীমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। হাদিস তাই শুধু কোরআনের পাশে রাখা ঐচ্ছিক ইতিহাসের বইয়ের ভূমিকা পালন করছে না; প্রচলিত ধর্মীয় ব্যবস্থায় কী বিশ্বাস গ্রহণ করা হবে, কোন নিষেধ মানতে হবে এবং কোন আচরণ নবীর পথ বলে গণ্য হবে, সেই বিষয়বস্তু নির্ধারণেও ব্যবহৃত হচ্ছে। কোনো সাধারণ আনুগত্যের আয়াত নিজে সমস্ত নববী আদেশ, নিষেধ ও আচরণের বিবরণ দেয় না। সেই অনুপস্থিত তথ্য মানুষের সংরক্ষিত বর্ণনা থেকে গ্রহণ করে তার ওপর ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। বর্ণনার বিষয়বস্তু ছাড়া একই বিস্তারিত ব্যবস্থা বহাল থাকে না। ফলে কোরআনের কর্তৃত্ব কার্যকর করার দাবির মধ্যে হাদিসের মানবীয় সংরক্ষণ ও বর্ণনার ওপর নির্ভরতা সরাসরি উপস্থিত।


শুধু নবীর নির্দেশ মানলে হবে?

মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত হাদিসে তাঁর জীবদ্দশায় কয়েকজনকে জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়ার কথা আছে। আরবি আশারা শব্দের অর্থ দশ এবং মুবাশশারা অর্থ সুসংবাদপ্রাপ্ত; আশারায়ে মুবাশশারা বলতে সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজনকে বোঝানো হয়। ইসলামি পরিভাষায় এটি দশজন পুরুষ সাহাবির পরিচয় হিসেবে ব্যবহৃত, যাঁরা হাদিস অনুযায়ী জান্নাতের প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন। নারীদের জান্নাতের সুসংবাদ পাওয়ার বর্ণনাও আছে। ইবন মাজাহর ১৩৩ নম্বর বর্ণনায় গণনার মধ্যে মুহাম্মদ নিজেও দশম ব্যক্তি হিসেবে উপস্থিত; সাঈদ ইবন যায়দ নিজের নাম নবম হিসেবে জানিয়েছেন। ফলে এই বর্ণনার গণনা এবং প্রচলিত দশ সাহাবির তালিকার গণনা একইভাবে তৈরি নয়। নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের এই মর্যাদা কোরআনের আয়াতে নামসহ দেওয়া নেই; হাদিসের তথ্য গ্রহণ করেই তাঁদের সম্পর্কে এই ধর্মীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়। [109] [110]

حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ عَمَّارٍ ، حَدَّثَنَا عِيسَى بْنُ يُونُسَ ، حَدَّثَنَا صَدَقَةُ بْنُ الْمُثَنَّى أَبُو الْمُثَنَّى النَّخَعِيُّ ، عَنْ جَدِّهِ، رِيَاحِ بْنِ الْحَارِثِ سَمِعَ جَدَّهُ، سَعِيدَ بْنَ زَيْدِ بْنِ عَمْرِو بْنِ نُفَيْلٍ يَقُولُ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ عَاشِرَ عَشَرَةٍ فَقَالَ ‏ “‏ أَبُو بَكْرٍ فِي الْجَنَّةِ وَعُمَرُ فِي الْجَنَّةِ وَعُثْمَانُ فِي الْجَنَّةِ وَعَلِيٌّ فِي الْجَنَّةِ وَطَلْحَةُ فِي الْجَنَّةِ وَالزُّبَيْرُ فِي الْجَنَّةِ وَسَعْدٌ فِي الْجَنَّةِ وَعَبْدُ الرَّحْمَنِ فِي الْجَنَّةِ ‏”‏ ‏.‏ فَقِيلَ لَهُ مَنِ التَّاسِعُ قَالَ أَنَا ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
হিশাম ইবন আম্মার বর্ণনা করেছেন; ঈসা ইবন ইউনুস তাঁকে বর্ণনা করেছেন; সাদাকা ইবনুল মুসান্না আবু মুসান্না আন-নাখাঈ তাঁকে তাঁর দাদা রিয়াহ ইবনুল হারিসের সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

সুনান ইবনু মাজাহ
ভূমিকা পর্ব
পরিচ্ছেদঃ ১৮. জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবা (রাঃ)-দের সম্মান
১/১৩৩। রিয়াহ ইবনুল হারিসের সূত্রে সাঈদ ইবনু যায়দ ইবনু আমর ইবনু নুফায়ল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশ ব্যাক্তির মধ্যে দশম জন। তিনি বলেনঃ আবূ বাকর জান্নাতী, উমার জান্নাতী, উসমান জান্নাতী, আলী জান্নাতী, ত্বলহাহ্ জান্নাতী, যুবায়র জান্নাতী, সা’দ জান্নাতী ও আবদুর রহমান ইবনু আওফ জান্নাতী। সাঈদ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হল, নবম ব্যাক্তি কে? তিনি বলেন, আমি।
তাখরীজ কুতুবুত সিত্তাহ: তিরমিযী ৩৭৪৮
তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ। তাখরীজ আলবানী: মিশকাত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

তিরমিজীর আবদুর রহমান ইবন আওফ-বর্ণনায় দশজন সাহাবির নাম একসঙ্গে এসেছে; সেখানে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহর নামও আছে। এই তালিকার সঙ্গে ইবন মাজাহর আগের বর্ণনার গণনা তুলনা করলে জান্নাতের সুসংবাদ সম্পর্কিত পরিচয়টি নির্দিষ্ট বর্ণনার তথ্য থেকে কীভাবে গড়ে উঠছে, তা স্পষ্ট হয়। একই ধর্মীয় মর্যাদার বর্ণনা বিভিন্ন সূত্রে সংরক্ষিত হয়েছে, আর প্রচলিত পরিচয় নির্ধারণে সেই বর্ণনাগুলো ব্যবহার করা হয়। কাউকে সম্মানিত ব্যক্তি বা জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত বলা এবং তাঁর প্রতিটি বক্তব্যকে ভুলের ঊর্ধ্বে ঘোষণা করা পৃথক দাবি। উদ্ধৃত বর্ণনাটি সুসংবাদের দাবি করে; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের নির্ভুলতা ঘোষণা করে না। সাহাবিদের বিশেষ মর্যাদার বিষয়বস্তু জানতে কোরআনের বাইরের এই তথ্য প্রয়োজন হয়। [111]

حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ ، قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ مُحَمَّدٍ ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ حُمَيْدٍ ، عَنْ أَبِيهِ ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ أَبُو بَكْرٍ فِي الْجَنَّةِ وَعُمَرُ فِي الْجَنَّةِ وَعُثْمَانُ فِي الْجَنَّةِ وَعَلِيٌّ فِي الْجَنَّةِ وَطَلْحَةُ فِي الْجَنَّةِ وَالزُّبَيْرُ فِي الْجَنَّةِ وَعَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ عَوْفٍ فِي الْجَنَّةِ وَسَعْدٌ فِي الْجَنَّةِ وَسَعِيدٌ فِي الْجَنَّةِ وَأَبُو عُبَيْدَةَ بْنُ الْجَرَّاحِ فِي الْجَنَّةِ ‏” ‏ ‏.‏ أَخْبَرَنَا أَبُو مُصْعَبٍ ، قِرَاءَةً عَنْ عَبْدِ الْعَزِيزِ بْنِ مُحَمَّدٍ ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ حُمَيْدٍ ، عَنْ أَبِيهِ ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم نَحْوَهُ وَلَمْ يَذْكُرْ فِيهِ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ ‏.‏ قَالَ وَقَدْ رُوِيَ هَذَا الْحَدِيثُ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ حُمَيْدٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ سَعِيدِ بْنِ زَيْدٍ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم نَحْوَ هَذَا وَهَذَا أَصَحُّ مِنَ الْحَدِيثِ الأَوَّلِ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
কুতাইবা বর্ণনা করেছেন; আবদুল আযীয ইবন মুহাম্মদ তাঁকে বর্ণনা করেছেন, আবদুর রহমান ইবন হুমাইদের সূত্রে, তাঁর পিতার মাধ্যমে আবদুর রহমান ইবন আওফ থেকে। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আবু বকর জান্নাতে, উমর জান্নাতে, উসমান জান্নাতে, আলি জান্নাতে, তালহা জান্নাতে, যুবাইর জান্নাতে, আবদুর রহমান ইবন আওফ জান্নাতে, সা’দ জান্নাতে, সাঈদ ইবন যায়দ জান্নাতে এবং আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ জান্নাতে।” আবু মুসআব পাঠের মাধ্যমে আবদুল আযীয ইবন মুহাম্মদ থেকে, আবদুর রহমান ইবন হুমাইদের সূত্রে, তাঁর পিতার মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনুরূপ জানিয়েছেন; সেখানে আবদুর রহমান ইবন আওফের নাম বর্ণনাসূত্রে উল্লেখ করেননি। তিনি বলেছেন: এই হাদিস আবদুর রহমান ইবন হুমাইদ থেকে, তাঁর পিতার মাধ্যমে সাঈদ ইবন যায়দ থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য হিসেবেও অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে; এটি প্রথম বর্ণনার তুলনায় অধিক সঠিক।

খাদিজার বিষয়ে মুসলিমের বর্ণনায় জিবরাইলের মাধ্যমে তাঁর রবের সালাম এবং জান্নাতে একটি ঘরের সুসংবাদ দেওয়ার কথা আছে। এই নির্দিষ্ট সুসংবাদও কোরআনে খাদিজার নামসহ দেওয়া কোনো আয়াত থেকে পাওয়া নয়; নবীর জীবনের বর্ণনা থেকে পাওয়া তথ্য। ফলে হাদিস বাদ দিলে শুধু আইনগত নিয়মই বাদ পড়ে না, ব্যক্তিদের সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত বহু ধর্মীয় মর্যাদার তথ্যও বাদ পড়ে। প্রচলিত ইসলামি স্মৃতি ও বিশ্বাসে খাদিজার অবস্থানের এই বিশেষ বিষয়বস্তু সংরক্ষিত বর্ণনার ওপর নির্ভর করে। কোরআনের সাধারণভাবে জান্নাতের প্রতিশ্রুতির কথা এবং কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ঘরের সুসংবাদ দেওয়ার বর্ণনা একই তথ্য নয়। নির্দিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে এবং কী বলা হয়েছে—এসব বর্ণনাটিই সরবরাহ করছে। [112]

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ ، وَأَبُو كُرَيْبٍ وَابْنُ نُمَيْرٍ قَالُوا حَدَّثَنَا ابْنُ فُضَيْلٍ ، عَنْ عُمَارَةَ ، عَنْ أَبِي زُرْعَةَ ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ ، قَالَ أَتَى جِبْرِيلُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ هَذِهِ خَدِيجَةُ قَدْ أَتَتْكَ مَعَهَا إِنَاءٌ فِيهِ إِدَامٌ أَوْ طَعَامٌ أَوْ شَرَابٌ فَإِذَا هِيَ أَتَتْكَ فَاقْرَأْ عَلَيْهَا السَّلاَمَ مِنْ رَبِّهَا عَزَّ وَجَلَّ وَمِنِّي وَبَشِّرْهَا بِبَيْتٍ فِي الْجَنَّةِ مِنْ قَصَبٍ لاَ صَخَبَ فِيهِ وَلاَ نَصَبَ ‏.‏ قَالَ أَبُو بَكْرٍ فِي رِوَايَتِهِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَلَمْ يَقُلْ سَمِعْتُ ‏.‏ وَلَمْ يَقُلْ فِي الْحَدِيثِ وَمِنِّي ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
আবু বকর ইবন আবি শাইবা, আবু কুরাইব ও ইবন নুমাইর বর্ণনা করেছেন: ইবন ফুদাইল আমাদের বর্ণনা করেছেন, উমারার সূত্রে, আবু যুরআর মাধ্যমে। তিনি বলেছেন: আমি আবু হুরাইরার কাছে শুনেছি। তিনি বলেছেন: জিবরাইল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, খাদিজা আপনার কাছে আসছেন; তাঁর সঙ্গে একটি পাত্রে তরকারি, খাবার অথবা পানীয় আছে। তিনি এলে তাঁকে তাঁর রবের পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে সালাম দেবেন এবং জান্নাতে মুক্তার তৈরি এমন একটি ঘরের সুসংবাদ দেবেন, যেখানে কোনো কোলাহল নেই এবং কোনো ক্লান্তি নেই। আবু বকর তাঁর বর্ণনায় “আবু হুরাইরা থেকে” বলেছেন; “আমি শুনেছি” বলেননি এবং হাদিসে “আমার পক্ষ থেকে” কথাটিও বলেননি।

মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত ইরবায-বর্ণনায় তাঁর সুন্নাহর পাশাপাশি হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাহ অনুসরণের নির্দেশ এসেছে। বর্ণনায় তা দাঁত দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরার কথা আছে; আনুগত্যের আরেকটি উপমায় বিশ্বাসীকে নাসারন্ধ্রে লাগাম পরানো উটের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যাকে যে দিকে টানা হয় সে সেদিকেই যায়। দুটি উপমা পৃথক বক্তব্যের অংশ। এখানে শুধু নবীর কোনো আদেশের খবর দেওয়া হয়নি; পরবর্তী নেতৃত্বের পথ অনুসরণ এবং মতবিরোধের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট কর্তৃত্ব ধরে রাখার দাবিও আছে। প্রচলিত ধর্মীয় ব্যবস্থায় সেই দাবির বিষয়বস্তু নির্ধারণে নেতৃত্ব, তাদের সুন্নাহ ও আচরণ সম্পর্কে বর্ণনা প্রয়োজন হয়। কোরআনের সাধারণ আনুগত্যের বাক্য ওই সমস্ত নির্দিষ্ট আচরণের পূর্ণ বিবরণ সরবরাহ করে না। [113] [114]

حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ بِشْرِ بْنِ مَنْصُورٍ ، وَإِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ السَّوَّاقُ ، قَالاَ حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ مَهْدِيٍّ ، عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ صَالِحٍ ، عَنْ ضَمْرَةَ بْنِ حَبِيبٍ ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَمْرٍو السَّلَمِيِّ ، أَنَّهُ سَمِعَ الْعِرْبَاضَ بْنَ سَارِيَةَ ، يَقُولُ وَعَظَنَا رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ مَوْعِظَةً ذَرَفَتْ مِنْهَا الْعُيُونُ وَوَجِلَتْ مِنْهَا الْقُلُوبُ فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ هَذِهِ لَمَوْعِظَةُ مُوَدِّعٍ فَمَاذَا تَعْهَدُ إِلَيْنَا قَالَ ‏ “‏ قَدْ تَرَكْتُكُمْ عَلَى الْبَيْضَاءِ لَيْلُهَا كَنَهَارِهَا لاَ يَزِيغُ عَنْهَا بَعْدِي إِلاَّ هَالِكٌ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ فَسَيَرَى اخْتِلاَفًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِمَا عَرَفْتُمْ مِنْ سُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَعَلَيْكُمْ بِالطَّاعَةِ وَإِنْ عَبْدًا حَبَشِيًّا فَإِنَّمَا الْمُؤْمِنُ كَالْجَمَلِ الأَنِفِ حَيْثُمَا قِيدَ انْقَادَ ‏” ‏ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
ইসমাঈল ইবন বিশর ইবন মানসুর ও ইসহাক ইবন ইবরাহিম আস-সাওওয়াক বর্ণনা করেছেন: আবদুর রহমান ইবন মাহদি আমাদের বর্ণনা করেছেন, মুআবিয়া ইবন সালিহের সূত্রে, দামরা ইবন হাবিবের মাধ্যমে আবদুর রহমান ইবন আমর আস-সুলামি থেকে। তিনি ইরবায ইবন সারিয়ার কাছে শুনেছেন।

সুনানে ইবনে মাজাহ
অধ্যায়ঃ ভূমিকা পর্ব
পরিচ্ছেদঃ ৬. হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ি রাশিদীনের সুন্নাতের অনুসরণ।
২/৪৩। ইরবায ইবনু সারিয়াহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এমন হৃদয়গ্রাহী নাসীহাত করেন যে, তাতে (আমাদের) চোখগুলো অশ্রু ঝরালো এবং অন্তরসমূহ প্রকম্পিত হল। আমরা বললাম, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! এতো যেন নিশ্চয়ই বিদায়ী ভাষণ। অতএব আপনি আমাদের থেকে কি প্রতিশ্রুতি নিবেন (আদেশ দিবেন)? তিনি বলেনঃ আমি তোমাদের আলোকিত দ্বীনের উপর রেখে যাচ্ছি, তার রাত তার দিনের মতই (উজ্জ্বল)। আমার পরে নিজেকে ধ্বংসকারীই কেবল এ দ্বীন ছেড়ে বিপথগামী হবে।
তোমাদের মধ্যে যে বেঁচে থাকবে সে অচিরেই অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। অতএব তোমাদের উপর তোমাদের নিকট পরিচিত আমার আদর্শ এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদ্বীনের আদর্শ অনুসরণ করা অবশ্য কর্তব্য। তোমরা তা শক্তভাবে দাঁত দিয়ে আকড়ে ধরে থাকবে। তোমরা অবশ্যই আনুগত্য করবে, যদি হাবশী গোলামও (তোমাদের নেতা নিযুক্ত) হয়। কেননা মুমিন ব্যাক্তি হচ্ছে নাসারন্ধ্রে লাগাম পরানো উটতুল্য। লাগাম ধরে যে দিকেই তাকে টানা হয়, সে দিকেই যেতে বাধ্য হয়।
তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ। 
তাখরীজ আলবানী: সহীহাহ ৯৩৭।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইরবায ইবনু সারিয়াহ্ (রাঃ) 

মুহাম্মদের যুগ, তার পরবর্তী প্রজন্ম এবং তার পরের প্রজন্মের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণাও হাদিসে সংরক্ষিত হয়েছে। ইসলামি পরিভাষায় এই ধারার সঙ্গে সাহাবি, তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈ পরিচয় যুক্ত হয়। ইসলামের বিধান সম্পর্কে তাঁদের বর্ণনা ও বোঝাপড়া প্রচলিত ব্যাখ্যার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বুখারীর এই বর্ণনায় প্রথম প্রজন্মগুলোর শ্রেষ্ঠত্বের পরে পরবর্তী লোকদের সাক্ষ্য ও শপথের অবস্থার সমালোচনা আছে। প্রজন্মের শ্রেষ্ঠত্ব থেকে প্রত্যেক ব্যক্তির প্রতিটি ব্যাখ্যা নির্ভুল অথবা পরবর্তী সব ব্যাখ্যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ—এই সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে না। পুরোনো ব্যাখ্যাকে পরবর্তী ব্যাখ্যার ওপর ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়ার জন্য এই শ্রেষ্ঠত্বের বর্ণনা ব্যবহার করা হয়; সেই ব্যবহারের তথ্যগত ভিত্তিও হাদিস। কোরআনের সাধারণ বাক্য নিজে এই প্রজন্মভিত্তিক নির্দিষ্ট ঘোষণা ও তার ঘটনাবিবরণ দেয় না। [115] [116] [117] [118] [119]

حَدَّثَنَا عَبْدَانُ ، عَنْ أَبِي حَمْزَةَ ، عَنِ الأَعْمَشِ ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ ، عَنْ عَبِيدَةَ ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏”‏ خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ يَجِيءُ مِنْ بَعْدِهِمْ قَوْمٌ تَسْبِقُ شَهَادَتُهُمْ أَيْمَانَهُمْ وَأَيْمَانُهُمْ شَهَادَتَهُمْ ‏”‏‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
আবদান বর্ণনা করেছেন, আবু হামযার সূত্রে, আমাশের মাধ্যমে ইবরাহিম থেকে, উবাইদার মাধ্যমে আবদুল্লাহ থেকে।

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৬৮/ কোমল হওয়া
পরিচ্ছেদঃ ২৬৮৯. দুনিয়ার জাঁকজমক ও দুনিয়ার প্রতি আসক্তি থেকে সতর্কতা
৫৯৮৬। আবদান (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শ্রেষ্ঠ হল আমার যমানার লোক। তারপর উত্তম হল এদের পরবর্তী যমানার লোক তারপর উত্তম হল এদের পরবর্তী যমানার লোক, তারপর এমন সব লোকের আবির্ভাব হবে, যাদের সাক্ষ্য তাদের কসমের পূর্বেই হবে, আর তাদের কসম তাদের সাক্ষ্যের পূর্বেই হবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ‌ ইব্‌ন মাসউদ (রাঃ)

মুসলিমের হাসান ইবন আলি আল-হুলওয়ানি সূত্রের বর্ণনাতেও প্রথম প্রজন্মগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব এবং পরবর্তী লোকদের সাক্ষ্য–শপথের অসংগতির কথা রয়েছে। এতে তৃতীয় বা চতুর্থ উল্লেখ সম্পর্কে বর্ণনাকারীর অনিশ্চয়তাও সংরক্ষিত হয়েছে। ফলে প্রচলিত ধর্মীয় মর্যাদা নির্ধারণের বক্তব্যটি মানুষের বর্ণনার মধ্য দিয়ে এসেছে এবং সেই বর্ণনার ভাষার অংশ হিসেবেই স্মৃতিসংক্রান্ত তথ্য উপস্থিত। হাদিস গ্রহণের মাধ্যমে একটি প্রজন্মকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ধর্মীয় ভিত্তি তৈরি হয়। সেই ভিত্তি এবং সেই প্রজন্মের প্রত্যেক সদস্যের সব বক্তব্য নির্ভুল হওয়ার দাবি একই নয়। প্রাচীন ব্যাখ্যার ধর্মীয় মর্যাদা কেবল বয়স বা পুরোনো হওয়ার কারণে তৈরি হচ্ছে না; মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত ঘোষণার সাহায্যে তা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তাই ওই মর্যাদার দাবিও কোরআনের বাইরের সংরক্ষিত তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। [120]

وَحَدَّثَنِي الْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ الْحُلْوَانِيُّ ، حَدَّثَنَا أَزْهَرُ بْنُ سَعْدٍ السَّمَّانُ ، عَنِ ابْنِ عَوْنٍ ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ ، عَنْ عَبِيدَةَ ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏”‏ خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ‏”‏ ‏.‏ فَلاَ أَدْرِي فِي الثَّالِثَةِ أَوْ فِي الرَّابِعَةِ قَالَ ‏”‏ ثُمَّ يَتَخَلَّفُ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ تَسْبِقُ شَهَادَةُ أَحَدِهِمْ يَمِينَهُ وَيَمِينُهُ شَهَادَتَهُ ‏”‏ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
হাসান ইবন আলি আল-হুলওয়ানি বর্ণনা করেছেন; আযহার ইবন সাঈদ আস-সাম্মান তাঁকে বর্ণনা করেছেন, ইবন আওনের সূত্রে, ইবরাহিমের মাধ্যমে উবাইদা থেকে, আবদুল্লাহ থেকে।

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৬/ সাহাবী (রাঃ) গণের ফযীলত
পরিচ্ছেদঃ ৫২. সাহাবা, অতঃপর যারা তাদের সন্নিকটে, অতঃপর যারা তাদের সন্নিকটে (অর্থাৎ তাবিঈ ও তাবে তাবিঈগনের) ফযীলত
৬২৪২। হাসান ইবনু আলী আল-হুলওয়ানী (রহঃ) … আবদুল্লাহ (রাঃ) এর সুত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ সর্বাপেক্ষা উত্তম মানুষ আমার যুগ (অর্থাৎ সাহাবীগণ) এরপর যারা তাদের সাথে সংযুক্ত (অর্থাৎ তাবীঈগণ) এরপর যারা তাদের সাথে সংযুক্ত (অর্থাৎ তাবে-তাবেঈগন)। এরপর তিনি বলেন, আমি সঠিক জানি না তৃতীয় কিংবা চতুর্থটি সম্পর্কে। তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন, এরপর তাদের পরবর্তীতে এমন লোক আসবে, যাদের কেউ কেউ কসমের আগে সাক্ষ্য দেবে এবং সাক্ষ্যের আগে কসম করবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ‌ ইব্‌ন মাসউদ (রাঃ)

নাসাঈর ইমরান ইবন হুসাইন-বর্ণনায় প্রথম প্রজন্মগুলোর শ্রেষ্ঠত্বের পরে খিয়ানত, আমানত রক্ষা না করা, না চাইতেই সাক্ষ্য দেওয়া এবং মানত পূরণ না করার কথা এসেছে। এখানে পরবর্তী সমাজের আচরণের সমালোচনার সঙ্গে প্রাথমিক প্রজন্মের মর্যাদা যুক্ত হয়েছে। এই বর্ণনার নির্দিষ্ট ভাষা কোরআনের কোনো সাধারণ আনুগত্যের বাক্যে উপস্থিত নেই। ধর্মীয় আদর্শের যুগ নির্ধারণ এবং কোন ঐতিহাসিক সমাজের আচরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সেই ধারণা গঠনে বর্ণনাটি তথ্য সরবরাহ করে। একই হাদিসের নম্বর সংস্করণভেদে ভিন্ন: মূল বাংলা উদ্ধৃতির ইসলামিক ফাউন্ডেশন নম্বর ৩৮১০, আর সংযুক্ত আরবি–ইংরেজি সংস্করণের বর্তমান নম্বর ৩৮০৯। বর্ণনার পরিচয় নির্ধারিত হয় বর্ণনাকারী ও পূর্ণ বক্তব্য মিলিয়ে; কেবল একটি সংস্করণের সংখ্যা অন্য সংস্করণে বসিয়ে নয়। [121]

أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الأَعْلَى ، قَالَ حَدَّثَنَا خَالِدٌ ، قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ ، عَنْ أَبِي جَمْرَةَ ، عَنْ زَهْدَمٍ ، قَالَ سَمِعْتُ عِمْرَانَ بْنَ حُصَيْنٍ ، يَذْكُرُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ خَيْرُكُمْ قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ‏”‏ ‏.‏ فَلاَ أَدْرِي أَذَكَرَ مَرَّتَيْنِ بَعْدَهُ أَوْ ثَلاَثًا ثُمَّ ذَكَرَ قَوْمًا يَخُونُونَ وَلاَ يُؤْتَمَنُونَ وَيَشْهَدُونَ وَلاَ يُسْتَشْهَدُونَ وَيُنْذِرُونَ وَلاَ يُوفُونَ وَيَظْهَرُ فِيهِمُ السِّمَنُ ‏ .‏ قَالَ أَبُو عَبْدِ الرَّحْمَنِ هَذَا نَصْرُ بْنُ عِمْرَانَ أَبُو جَمْرَةَ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
মুহাম্মদ ইবন আবদুল আ’লা জানিয়েছেন; খালিদ তাঁকে বর্ণনা করেছেন; শুবা তাঁকে বর্ণনা করেছেন, আবু জামরার সূত্রে, যাহদামের মাধ্যমে।

সূনান নাসাঈ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৫/ মানত ও কসম
পরিচ্ছেদঃ ২৮. মান্নত পূর্ণ করা
৩৮১০. মুহাম্মদ ইন আবদুল আ’লা (রহঃ) … ইমরান ইবন হুসায়ন (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে আমার সময়ের লোকই উত্তম, এরপর তারা, যারা তাদের নিকটবর্তী। এরপর যারা তাদের পরবর্তী, তারপর তাদের পরবর্তী। বর্ণনাকারী বলেনঃ আমার স্মরণ নেই, তিনি তা দু’বার বলেছেন, না তিনবার। এরপর তিনি ঐসকল লোকের কথা বললেনঃ যারা খিয়ানত করে, আমানতদারী রক্ষা করে না। তারা সাক্ষ্য দেয়, অথচ তাদেরকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য ডাকা হয় না; মান্নত করে অথচ মান্নত পূর্ণ করে না। আর তারা মোটা-তাজা হবে।
আবু আবদুর রহমান বলেছেন: এই ব্যক্তি নাসর ইবন ইমরান আবু জামরা।
তাহক্বীকঃ সহীহ। সহীহ আত-তিরমিযী ২২২২, সহীহুল জামে’ ৩৩১৭।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ)

তিরমিজীর ইবন মাসউদ-বর্ণনাতেও একই প্রথম প্রজন্মগুলোর মর্যাদা এবং পরবর্তী সাক্ষ্য–শপথের অবস্থার সমালোচনা আছে। এই পুনরাবৃত্তি একই বক্তব্য বিভিন্ন সংকলনে সংরক্ষিত থাকার তথ্য দেয়। প্রত্যেক সংকলনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পূর্ণ স্বাধীন সাক্ষ্য গণনা করলে বর্ণনাসূত্রের সম্পর্ক বাদ পড়ে যায়। এখানে বুখারী, মুসলিম ও তিরমিজীর উদ্ধৃতিগুলোতে ইবন মাসউদের বর্ণনা এবং সংশ্লিষ্ট বর্ণনাপথের সম্পর্ক দৃশ্যমান। প্রচলিত ব্যবস্থায় তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া ব্যাখ্যা ও ধর্মীয় শিক্ষাকে মর্যাদা দেওয়ার পদ্ধতিতে এসব বর্ণনা ব্যবহৃত হয়। ফলে শুধু কোরআনের পাঠ রাখলেই একই ঐতিহাসিক প্রজন্মের কর্তৃত্ব আপনাআপনি প্রতিষ্ঠিত হয় না; তাঁদের পরিচয়, বক্তব্য এবং মর্যাদার সংবাদও গ্রহণ করতে হয়। হাদিসের তথ্য বাদ দিলে সেই ধর্মীয় কর্তৃত্বের নির্দিষ্ট ভিত্তির একটি অংশ বাদ পড়ে। [122]

حَدَّثَنِي هَنَّادٌ ، حَدَّثَنَا أَبُو مُعَاوِيَةَ ، عَنِ الأَعْمَشِ ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ ، عَنْ عَبِيدَةَ، هُوَ السَّلْمَانِيُّ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ يَأْتِي قَوْمٌ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ تَسْبِقُ أَيْمَانُهُمْ شَهَادَاتِهِمْ أَوْ شَهَادَاتُهُمْ أَيْمَانَهُمْ ‏” ‏ ‏.‏ وَفِي الْبَابِ عَنْ عُمَرَ وَعِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ وَبُرَيْدَةَ ‏.‏ هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
হান্নাদ বর্ণনা করেছেন; আবু মুআবিয়া তাঁকে বর্ণনা করেছেন, আমাশের সূত্রে, ইবরাহিমের মাধ্যমে উবাইদা আস-সালমানি থেকে, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ থেকে।

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৪৬/ রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তার সাহাবীগণের মর্যাদা
পরিচ্ছেদঃ ৫৭. যে লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেছেন এবং তার সাহচর্য লাভ করেছেন তার মর্যাদা
৩৮৫৯৷ আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার যুগের ব্যক্তিরাই উত্তম। তারপর তাদের পরবর্তীগণ, তারপর তার পরবর্তীগণ। তারপর এরূপ ব্যক্তিদের আগমন ঘটবে, যারা সাক্ষী দেবার আগে শপথ করবে অথবা শপথের আগে সাক্ষ্য দিবে।
সহীহঃ ইবনু মাজাহ (২৩৬২), বুখারী ও মুসলিম।
এ অনুচ্ছেদে ‘উমার, ইমরান ইবনু হুসাইন ও বুরাইদাহ (রাযিঃ) কর্তৃকও হাদীস বর্ণিত আছে। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ‌ ইব্‌ন মাসউদ (রাঃ)


হাদিস সংকলনের ইতিহাস

হাদিস সংকলনের ইতিহাসে ব্যক্তিগত লিখিত সহিফা, শিক্ষকের কাছ থেকে ছাত্রের বর্ণনা, প্রশাসনিক সংগ্রহের উদ্যোগ, বিষয়ভিত্তিক গ্রন্থ এবং পরবর্তী বড় সংকলন পৃথক পর্যায়। একটি বড় সংকলন পরবর্তী শতাব্দীতে তৈরি হওয়া মানেই তার সমস্ত উপাদান সেই শতাব্দীতে প্রথম সৃষ্টি হয়েছে—এ সিদ্ধান্ত ভুল। একইভাবে আগের কোনো লিখিত উপাদানের অস্তিত্ব থেকে পরবর্তী সমস্ত বর্ণনার নির্ভুলতাও প্রতিষ্ঠিত হয় না। সংকলনের সময়, অন্তর্ভুক্ত উপাদানের পূর্ববর্তী অস্তিত্ব, বর্তমান পাণ্ডুলিপির বয়স এবং কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার সত্যতা পৃথক প্রশ্ন। এই পর্যায়গুলোতে মানুষের স্মৃতি, লিখন, পাঠদান, নির্বাচন ও সম্পাদনা কার্যকর ছিল। ধর্মীয় বিধান হিসেবে ব্যবহৃত তথ্য এই মানবীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই পরবর্তী সমাজে পৌঁছেছে। কোনো তথ্য সংরক্ষিত হয়েছে—এই দাবি এবং সেই তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত বিধান অপরিবর্তনীয় ঐশ্বরিক আইন—এই দাবিও পৃথক।

সহিফা হাম্মাম ইবনে মুনাব্বিহ একটি হাদিস সংকলন, যা আবু হুরাইরার ছাত্র হাম্মাম ইবনে মুনাব্বিহের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি ওয়াহব ইবনে মুনাব্বিহের ভাই ছিলেন এবং সপ্তম–অষ্টম খ্রিস্টীয় শতাব্দীর বর্ণনাকারীদের অন্তর্ভুক্ত। ঠিক কত সালে সহিফাটি সংকলিত হয়েছিল, তা নির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও আবু হুরাইরার জীবদ্দশায় তাঁর কাছ থেকে সংগ্রহের ভিত্তিতে এর প্রাথমিক উপাদান প্রথম হিজরি শতকে স্থাপন করা হয়। আবু হুরাইরার মৃত্যুর জন্য ৫৮ হিজরি গ্রহণ করলে তাঁর কাছ থেকে সংগ্রহের সময় তার আগের হবে; এটি বর্তমান পাণ্ডুলিপির বয়সের দাবি নয়। [123] বিংশ শতাব্দীতে মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ এটি তাহকীক করে প্রকাশ করেন। দামেস্ক ও বার্লিনে পাওয়া দুইটি অনুলিপি সামনে রেখে তিনি সম্পাদনা করেন এবং একটি বিস্তৃত ভূমিকা লেখেন। আরবি প্রকাশনার সঙ্গে উর্দু ও ফরাসি ভাষায় প্রকাশের বৃত্তান্তও যুক্ত রয়েছে। [124] প্রাথমিক সংগ্রহের সম্ভাব্য সময় এবং পরে টিকে থাকা অনুলিপির সময় এক করে দিলে সংরক্ষণের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো বাদ পড়ে যায়।

বুখারীর কিতাবুল ইলমে উমর ইবন আবদুল আযীযের হাদিস লিখে রাখার নির্দেশ উদ্ধৃত হয়েছে। সেখানে জ্ঞান ক্ষয় এবং আলেমদের হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে নবীর হাদিস সংগ্রহ ও শিক্ষার প্রসার ঘটানোর কথা আছে। এই নির্দেশের ভাষায় সংরক্ষণ একটি সচেতন মানবীয় কাজ; ক্ষয় এবং হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও স্পষ্ট। ফলে একটি সংকলনের উপস্থিতি থেকে সমস্ত উপাদান বিনষ্ট হওয়ার বাইরে ছিল বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। লিখে রাখা, পাঠদান এবং প্রচারের ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়েছিল বলেই সেই কাজের নির্দেশ এসেছে। পরবর্তী ধর্মীয় বিধান যে তথ্যের ওপর নির্ভর করে, তা এমন সংগ্রহ ও শিক্ষার প্রক্রিয়ার সাহায্যে পৌঁছেছে। সংকলনের ইতিহাস তাই বিধানের বিষয়বস্তু মানুষের সংরক্ষণের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার প্রত্যক্ষ বর্ণনাও বহন করে। [125]

وَكَتَبَ عُمَرُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ إِلَى أَبِي بَكْرِ بْنِ حَزْمٍ انْظُرْ مَا كَانَ مِنْ حَدِيثِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاكْتُبْهُ، فَإِنِّي خِفْتُ دُرُوسَ الْعِلْمِ وَذَهَابَ الْعُلَمَاءِ، وَلاَ تَقْبَلْ إِلاَّ حَدِيثَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَلْتُفْشُوا الْعِلْمَ، وَلْتَجْلِسُوا حَتَّى يُعَلَّمَ مَنْ لاَ يَعْلَمُ، فَإِنَّ الْعِلْمَ لاَ يَهْلِكُ حَتَّى يَكُونَ سِرًّا. حَدَّثَنَا الْعَلاَءُ بْنُ عَبْدِ الْجَبَّارِ قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ مُسْلِمٍ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ دِينَارٍ بِذَلِكَ، يَعْنِي حَدِيثَ عُمَرَ بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ إِلَى قَوْلِهِ ذَهَابَ الْعُلَمَاءِ.

বাংলা অনুবাদ:
উমর ইবন আবদুল আযীয আবু বকর ইবন হাযমকে লিখেছিলেন: আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস যা আছে, তা খুঁজে দেখো এবং লিখে রাখো। আমি জ্ঞান ক্ষয়ে যাওয়া এবং আলেমদের হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস ছাড়া কিছু গ্রহণ কোরো না। তোমরা জ্ঞানের প্রসার ঘটাও এবং শিক্ষা দেওয়ার জন্য বসো, যাতে যারা জানে না তারা জানতে পারে। জ্ঞান গোপন হয়ে না পড়া পর্যন্ত তা ধ্বংস হয় না। আলা ইবন আবদুল জব্বার আমাদের বর্ণনা করেছেন; আবদুল আযীয ইবন মুসলিম তাঁকে আবদুল্লাহ ইবন দিনারের সূত্রে এটি বর্ণনা করেছেন—অর্থাৎ উমর ইবন আবদুল আযীযের বক্তব্যের “আলেমদের হারিয়ে যাওয়া” অংশ পর্যন্ত।

ইমাম আবু হানিফার সঙ্গে সম্পর্কিত হাদিস সংকলন গ্রন্থ রয়েছে [126] , মালিকের মুয়াত্তাও এই প্রাথমিক সংকলনধারার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ [127]। মুহাম্মদ আবদুর রহীম তাঁর গ্রন্থে এই সংগ্রহ, গ্রন্থবিন্যাস ও প্রচারের ইতিহাস আলোচনা করেছেন, এখানে বিভিন্ন ছাত্রের সূত্রে সংকলনের পরিচয়, বিষয়ভিত্তিক অধ্যায়, সাহাবি ও তাবেঈদের বক্তব্যের অন্তর্ভুক্তি এবং সংকলন থেকে উপাদান বাছাইয়ের বিবরণ আছে। এই প্রক্রিয়াগুলো একটি গ্রন্থের আকার এবং তার আইনগত ব্যবহারের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে। কোনো সংকলনের নামের সঙ্গে একজন ইমামের নাম যুক্ত থাকা এবং বর্তমান রূপটি তাঁর নিজের হাতে লেখা মূল অনুলিপি হওয়া একই তথ্য নয়। বর্ণনাকারী, ছাত্র, অনুলিপিকার ও সম্পাদকদের মধ্য দিয়ে গ্রন্থের নির্দিষ্ট পাঠ পরবর্তী সময়ে পৌঁছায়। [128]

সালেম যে বিষয়ে আদিষ্ট হইয়াছিলেন, তাহা তিনি পুরাপুরি লিখিয়া পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি (সালেম) তাঁহাকে ইহাও লিখিয়া পাঠাইয়াছিলেন যে, হযরত উমর (রা) তাঁহার আমলেও তদানীন্তন লোকদের মধ্যে যেসব কাজ করিয়াছিলেন, আপনিও যদি আপনার আমলে এখনকার লোকদের মধ্যে অনুরূপ। কাজ করেন তবে আপনি আল্লাহ্র নিকট উমর ফারূক হইতেও উত্তম ব্যক্তি বলিয়া বিবেচিত ও পরিগণিত হইবেন। ৭৬৭
এই সম্পর্কে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহমান আনসারী বলেনঃ
لَمَّا اسْتَخْلَفَ عُمَرُ بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ أَرْسَلَ إِلَى الْمَدِينَةِ يَلْتَمِسُ كِتَابَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِى الصَّدَقَاتِ وَكِتَابُ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ فَوُجِدَ عِنْدَ الِ عُمَرُ بْنِ حَزَمٍ كِتَابَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى عُمَرُو بْنِ حَزَمٍ فِي الصَّدَقَاتِ وَوُجِدَ عِنْدَ آلِ عُمَرَ كِتَابٌ عُمَرَ فِي الصَّدَقَاتِ مِثْلُ كِتَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فَنُعِيْنَا لَهُ
উমর ইবনে আবদুল আযীয যখন খলীফা নির্বাচিত হইলেন, তখন তিনি মদীনায় রাসূলে করীমের ও হযরত উমরের যাকাত ইত্যাদি সংক্রান্ত লিখিত দস্তাবেজ সংগ্রহের জন্য তাকীদ করিয়া পাঠাইলেন। পরে আমর ইবনে হাযমের বংশধরদের নিকট রাসূলে করীমের লিখিত দস্তাবেজ এবং হযরত উমরের বংশধরদের নিকট রাসূলে করীমের অনুরূপ লিখিত দস্তাবেজ পাওয়া গেল। ৭৬৮
উমর ইবনে আবদুল আযীয ইমাম জুরীকে বিশেষভাবে হাদীস সংকলনের কাজে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। ৭৬৯ ইমাম জুহরী সম্পর্কে উমর ইবনে আবদুল আজীজ নিজেই বলিয়াছেনঃ
لَمْ يَبْقِ أَحَدٌ أَعْلَمُ بِسُنَّةٍ مَاضِيَّةٍ مِنَ الزُّهْرِى
সুন্নাত ও হাদীস সম্পর্কে যুহরী অপেক্ষা বড় আলিম বিগত কালের আর একজনও বাঁচিয়া নাই। ৭৭০

এ সম্পর্কে ইমাম ইবনে শিহাব যুহরী (র) নিজেই বলেনঃ
أَمَرَنَا عُمَرُ بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ بِجَمْعِ السُّنَنِ فَكَتَيْنَاهَا دَفْتَرًا دَفْتَرًا فَبَعَثَ إِلَى كُلِّ أَرْضِ لَهُ عَلَيْهَا سُلْطَانُ دَفْتَرًا –
উমর ইবনে আবদুল আযীয আমাদিগকে হাদীস সংগ্রহ ও সংকলন করার জন্য আদেশ করিলেন। এই আদেশ পাইয়া আমরা হাদীসের বিরাট গ্রন্থ লিখিয়া তাঁহার নিকট পাঠাইয়া দিলাম। অতঃপর তিনি নিজেই তাঁহার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি
প্রদেশে এক-একখানি গ্রন্থ পাঠাইয়া দিলেন। ‘৭৭১
সংগৃহীত হাদীস সম্পদ যে কিছুমাত্র বিনষ্ট হয় নাই, এই কথা হইতে তাহা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়।
ইমাম মালিক (রা) বলিয়াছেনঃ
أوَّلُ مَنْ دَوْنَ الْعِلْمَ ابْنُ شِهَابٍ
সর্বপ্রথম যিনি হাদীস সংকলন করেন, তিনি হইলেন ইবনে শিহাব যুহরী। ৭৭২
ইমাম আবদুল আযীয দারাওয়ার্দী নামক অপর এক মনীষীও এই কথারই সমর্থন করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেনঃ
أَوَّلُ مَنْ رَونَ الْعِلْمَ وَكَتَبَهُ بْنُ شِهَابٍ
হাদীস সংকলন ও উহা লিপিবদ্ধকরণের কাজ সর্বপ্রথম করিয়াছেন ইবনে শিহাব যুহরী। ৭৭৩
ইমাম যুহরী এই গৌরবের দাবি করিয়া নিজেই বলিয়াছেনঃ
لمْ يُدَوِّنَ هَذَا لَعِلْمَ أَحَدٌ قَبْلَ تَدْوينِي
আমার পূর্বে ইলমে হাদীস আর কেহ সংকলিত করেন নাই। ৭৭৪
উমর ইবনে আবদুল আযীয কেবল হাদীস সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করণেরই নির্দেশ দেন নাই, বরং সর্বত্র উহার ব্যাপক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করার জন্যও তিনি সুস্পষ্ট ফরমান পাঠাইয়াছিলেন।
অপর একজন শাসনকর্তার নামে নিম্নোক্ত ভাষায় এক ফরমান প্রেরিত হইয়াছিলঃ
أَمَّا بَعْدُ فَأَمُرْ أَهْلِ الْعِلْمِ أَنْ يُنْشِرُوا الْعِلْمَ فِى مَسَاجِدِهِمْ فَإِنَّ السُّنَّةَ كَانَتْ قدا مينت

হাদীসবিদ ও বিদ্বান লোকদিগকে আদেশ করুন, তাঁহারা যেন মসজিদে মসজিদে হাদীসের শিক্ষাদান ও উহার ব্যাপক প্রচার করেন। কেননা হাদীসের জ্ঞান প্রায় বিলীন হইয়া যাইবার উপক্রম হইতেছে। ৭৭৫
উপরিউক্ত উদ্ধৃতি ও ঐতিহাসিক দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে এই কথায় কোনই সন্দেহ থাকে না যে, উমর ইবনে আবদুল আযীযের হাদীস-সংগ্রহ সম্পর্কিত ফরমান বিশেষ একটি মাত্র স্থানে প্রেরিত হয় নাই, বরং ইসলামী রাজ্যের সর্বত্রই এই ফরমান পাঠানো হইয়াছিল এবং উহার ফলে সর্বত্রই হাদীস সংগ্রহ ও সংকলনের অভিযান সুষ্ঠুভাবে শুরু হইয়া গিয়াছিল। এই অভিযানের অনিবার্য ফলস্বরূপ সর্বত্রই হাদীস সংকলিত হয়। সেই সময় জীবিত প্রায় সকল হাদীসবিদই হাদীস সংকলনের মহতি কাজে আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন এবং তাঁহাদের সংকলিত বিরাট বিপুল সম্পদ মুসলিম সমাজের নিকট চিরকালের অমূল্য ধনরূপে গণ্য ও সংরক্ষিত হইয়া রহিয়াছে।
উমর ইবনে আবদুল আযীয (র) অন্য লোকদিগকে আদেশ করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, তিনি নিজেও হাদীস লিখিয়া লইবার কাজ শুরু করিয়াছিলেন, এইরূপ উল্লেখ পাওয়া যায়।
প্রসিদ্ধ তাবেয়ী ও হযরত আনাস হইতে হাদীস বর্ণনাকারী আবু কালাবা ৭৭৬ বলিয়াছেনঃ
خَرَجَ عَلَيْنَا عُمَرُ بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ لِصَلوةِ الظُّهْرِ وَمَعَهُ قِرْطَاسٌ ثُمَّ خَرَجَ عَلَيْنَا لصلوةِ الْعَصْرِ وَهُوَ مَعَهُ فَقُلْتُ لَهُ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ مَا هَذَا الْكِتَابُ قَالَ هُذَا حَدِيثٌ حَدَّثَنِي بِهِ عَوْنُ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ فَأَعْجَبَنِي فَكَتَبَتُهُ فَإِذَا فِيهِ هَذَا الْحَدِيثُ
উমর ইবনে আবদুল আযীয একদা জুহরের নামাযের জন্য মসজিদে আসিলে আমরা তাঁহার হাতে কিছু কাগজ দেখিতে পাইলাম। পরে আসরের নামাযের জন্য বাহির হইয়া আসিলেও তাঁহার সহিত সেই কাগজই দেখিলাম। আমি জিজ্ঞাসা করিলামঃ হে আমীরুল মুমিনীন! এই লিখিত জিনিসটি কি? জওয়াবে তিনি বলিলেনঃ আওন ইবনে আবদুল্লাহ্ আমার নিকট হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন, উহা আমার খুব পছন্দ হইয়াছে, আমি তাহা লিখিয়া লইয়াছি। তাহার মধ্যে এই হাদীসটিও রহিয়াছে। ৭৭৭
ইমাম যুহরীর পরবর্তী সময়ে যাঁহারা ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন কেন্দ্রে হাদীস সংকলন ও গ্রন্থ প্রণয়নের কাজ করিয়াছেন, তাঁহাদের মধ্যে নিম্নোক্ত মনীষিগণ উল্লেখযোগ্যঃ
মক্কা শরীফে ইবনে জুরাইজ (১৫০ হিঃ); মদীনায় ইবনে ইসহাক (১৫১ হিঃ) ও ইমাম মালিক (১৭৯ হিঃ); বসরায় রুবাই ইবনে সুবাইহ্ (১৬০ হিঃ), সায়ীদ ইবনে

আবূ আরুবা (১৫৬ হিঃ) ও হাম্মাদ ইবনে সালমা (১৭৬ হিঃ); কুফায় সুফিয়ান আস-সওরী (১৬১ হিঃ); সিরিয়ায় ইমাম আওযায়ী (১৫৬ হিঃ); ওয়াসত-এ হুশাইম (১৮৮ হিঃ); ইয়েমেনে মা’মার (১৫৩ হিঃ); এবং খোরাসানে জরীর ইবনে আবদুল হামীদ (১৮৮ হিঃ); ও আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (র) (১৮১ হিঃ)। ৭৭৮
উপরে প্রত্যেক নামের সঙ্গে উল্লিখিত সন তারিখ হইতে স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায় যে, তাঁহারা সকলেই সমসাময়িক ও প্রায় একই যুগের লোক ছিলেন এবং একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে থাকিয়া রাসূলে করীম (স)-এর হাদীস সম্পদ সংগ্রহ ও হাদীস গ্রন্থ সংকলন করিয়াছেন। কাজেই এই ব্যাপারে তাঁহাদের মধ্যে সর্বপ্রথম কে এই কাজ করিয়াছেন, তাহা নিশ্চিত করিয়া বলার উপায় নাই। কিন্তু আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী তাঁহাদের মধ্যে অগ্র-পরের একটি বিন্যাস কায়েম করিয়া দিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেনঃ
فَتَأَوَّلُ مَنْ جَمَعَ ذَلِكَ الرَّبَيْعُ بْنِ صُبَيْحِ وَسَعَدُ بْنِ أَبِي عَرُوبَةً وَغَيْرُ هُمَا فَكَانُوا يُصَنِّفُونَ كُلِّ بَابٍ عَلَى حِدَةٍ
সর্বপ্রথম হাদীস সংগ্রহ ও সংকলনের কাজ করেন রুবাই ইবনে সুবাইহ্ ও সাদ ইবনে আবু আরুবা এবং তাঁহাদের ছাড়া আরো কেহ কেহ। তাঁহারা হাদীসের প্রত্যেকটি অধ্যায়কে স্বতন্ত্রভাবে গ্রন্থাবদ্ধ করিতেন। ৭৭৯
এই পর্যায়ে ইমাম মক্কলের নামও উল্লেখযোগ্য। কেননা তিনি গ্রন্থ প্রণয়নের কাজ ব্যাপকভাবে শুরু হওয়ার পূর্বেই ‘কিতাবুস সুনান’ নামে হাদীসের একখানি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। ৭৮০
কুফা নগরে ইমাম শা’বী একই বিষয় সম্পর্কিত হাদীসসমূহ একই স্থানে সন্নিবদ্ধ করার কাজে সর্বপ্রথম হাত দেন। ৭৮১ প্রথমত তিনি হাদীস লিখন ও হাদীস গ্রন্থ প্রণয়নের পক্ষপাতী ছিলেন না, কিন্তু কেবলমাত্র খলীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনে আবদুল আযীযের নির্দেশ পাইয়াই হাদীস গ্রন্থ প্রণয়ন শুরু করেন। কেননা তিনি কুফা প্রদেশে উমর ইবনে আবদুল আযীযের নিযুক্ত বিচারপতি ছিলেন। ৭৮২
আল্লামা সুয়ূতী ইবনে হাজর আসকালানী হইতে উদ্ধৃত করিয়াছেনঃ
إِمَّا جَمْعُ حَدِيثٍ إِلَى مِثْلِهِ فَقَدْ سَبَقَ إِلَيْهِ الشَّعْبِي فَإِنَّهُ رَوَى عَنْهُ إِنَّهُ قَالَ هُذَا بَابٌ مِّنَ الطَّلَاقِ جَسِيمُ وَسَاقَ فِيْهِ أَحَادِيثَ

একই বিষয় সম্পর্কিত হাদীসসমূহ একত্র সংকলন করার কাজ সর্বপ্রথম করেন ইমাম শা’বী। কেননা তাঁহার সম্পর্কে বর্ণিত হইয়াছে যে, তিনি ‘ইহা তালাক সম্পর্কে এক বিরাট অধ্যায়’ বলিয়া উহাতে বহু সংখ্যক হাদীস একত্রে লিখিয়া দিয়াছেন। ৭৮৩
ইমাম শা’বী ২২ হিজরী সনে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাবের খিলাফত আমলে জন্মগ্রহণ করেন, আর ইন্তেকাল করেন ১০৪ হিজরীতে। ইমাম মহুলের ইন্তেকাল হয় ১২৪ সনে। আর ইমাম যুহরীও এই ১২৩, ১২৪ কিংবা ১২৫ হিজরী সনে ইন্তেকাল করেন। এই হিসাবের ভিত্তিতে বলা যায়, হাদীস-গ্রন্থ প্রণয়নের ক্ষেত্রে ইমাম মকহুল প্রথম ব্যক্তি।
কিন্তু বিশেষভাবে বিচার করিলে এই সিদ্ধান্তই গ্রহণ করিতে হয় যে, হাদীস সংগ্রহ ও সংকলনের কাজ সর্বপ্রথম করিয়াছেন মদীনার হাদীসবিদগণ-আবূ বকর ইবনে হাজম, সালেম ও ইমাম যুহরী প্রমুখ। আর অধ্যায় ভিত্তিতে হাদীসের গ্রন্থ প্রণয়নের কাজ করিয়াছেন কুফার মুহাদ্দিসগণ- ইমাম শা’বী ও অন্যান্য। ৭৮৪
উমাইয়া বংশের ‘খলীফায়ে রাশেদা’ উমর ইবনে আবদুল আযীয হাদীস সংগ্রহ ও সংকলনের ফরমান জারি করার পর বেশী দিন জীবিত ছিলেন না। কিন্তু তাঁহার এই ফরমানের ফলে হাদীস সংগ্রহ ও সংকলনের যে প্রবাহ তরংগায়িত হইয়া উঠিয়াছিল, তাহা অতঃপর কয়েক শতাব্দীকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ইমাম যুহরীর পরবর্তী মনীষী ও হাদীসবিদগণ হাদীস সংগ্রহ ও সংকলনের কাজে পূর্ণমাত্রায় আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন। অতঃপর এই কাজ পূর্ণোদ্যমে চলিতে থাকে।

হিজরী দ্বিতীয় শতকে হাদীস সংকলন
উমর ইবনে আবদুল আযীয ১০১ হিজরীর ২৫শে রজব ইন্তেকাল করেন। তাঁহার খিলাফতের মেয়াদ ছিল দুই বৎসর পাঁচ মাস। ইমাম শা’বী ইমাম যুহরী, ইমাম মকহুল দেমাশকী ও কাযী আবূ বকর ইবনে হাযমের সংকলিত হাদীস গ্রন্থাবলী তাঁহারই খিলাফতকালের অমর অবদান। প্রথম হিজরী শতকের মধ্যেই এই গ্রন্থাবলীর সংকলন কার্য সম্পূর্ণতা লাভ করিয়াছিল।
প্রথম হিজরী শতকে এই পর্যায়ে যতটুকু কাজ সম্পন্ন হইয়াছিল, পরিমাণে ও আকারে তাহা বিরাট কিছু না হইলেও উহার ফলে যে হাদীসগ্রন্থ-সংকলনের দ্বার উন্মুক্ত হইয়াছিল, তাহা অনস্বীকার্য। ফলে দ্বিতীয় হিজরী শতকের প্রথম হইতেই এই কাজ যথোপযুক্ত গুরুত্ব সহকারে সম্পন্ন হইতে শুরু করে। এই পর্যায়ে কেবলমাত্র রাসূল (স)-এর কথা ও কাজ সম্পর্কিত হাদীসই নহে, সাহাবায়ে কিরামের কথা, ফতোয়া, তাবেয়ীদের কুরআন-হাদীসভিত্তিক বিভিন্ন ফতোয়া এবং দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে তাঁহাদের কথাবার্তা ও নসীহতের বাণী পর্যন্ত এই যুগের হাদীস গ্রন্থাবলীতে সন্নিবেশিত হইবার সুযোগ লাভ করে।
কিতাবুল আ’সার
তাবেয়ী যুগের মুহাদ্দিসদের সংকলিত হাদীস গ্রন্থাবলী স্বীয় স্বতন্ত্র অস্তিত্ব লইয়া পরবর্তীকালের হাদীসানুধ্যায়ীদের নিকট পৌঁছায় নাই। এই দিক দিয়া আমাদের নিকট বিরাজমান কেবলমাত্র একখানি গ্রন্থেরই নাম করা যাইতে পারে এবং তাহা হইতেছে ‘কিতাবুল আ’সার। ইমাম আবু হানীফা (র) হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রা)-এর সময়ে প্রতিষ্ঠিত ৭৮৫ কুফার জামে মসজিদের প্রসিদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্রের প্রধান শিক্ষাগুরু নিযুক্ত হইয়া একদিকে যেমন ‘ইলমে ফিকাহ্’র ভিত্তি স্থাপন করেন, অপরদিকে সেই সঙ্গেই তিনি রাসূল (স)-এর আদেশ-নিষেধমূলক হাদীসসমূহেরও একটি সংকলন নির্ভরযোগ্য সূত্রে সংকলিত হাদীস সমূহের সমন্বয়ে রচনা করেন। এই গ্রন্থেরই নাম হইতেছে ‘কিতাবুল আ’সার’। দুনিয়ার মুসলিম জাতির নিকট ইহা অপেক্ষা প্রাচীনতম হাদীস গ্রন্থ সম্ভবত আর একখানিও বর্তমান নাই। অথবা বলা যায়, মুসলিম উম্মতের নিকট মওজুদ হাদীস গ্রন্থাবলীর মধ্যে ইহাই সর্বাধিক প্রাচীন হাদীস-গ্রন্থ। ইমাম আবূ হানীফার পূর্বে হাদীস সংগ্রহকারিগণ কর্তৃক যেন-তেনভাবে হাদীসসমূহ সংগ্রহ ও সংকলন করার কাজই হইয়াছিল। ঠিক গ্রন্থ প্রণয়নের ধারায় হাদীসের কোন গ্রন্থই বিরচিত হয় নাই। ইমাম শা’বী একই বিষয়ের হাদীস একস্থানে একত্র করিয়া একখানি

গ্রন্থের রূপ দিয়াছিলেন বটে; কিন্তু তাহা মাত্র কয়েকটি অধ্যায় পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল, ইহার বেশী কিছু করা তাঁহার পক্ষে সম্ভব হয় নাই। এই কাজ অতঃপর আর অগ্রসরও হইতে পারে নাই। এই কারণে হাদীসসমূহকে পরিচ্ছেদ (কিতাব) ও অধ্যায় (বাবু) হিসাবে, গ্রন্থ প্রণয়নের ধারা ও পদ্ধতি অনুসারে সুসংকলিত করার কাজ তখন পর্যন্তও অসম্পন্নই রহিয়া গিয়াছিল। ইমাম আবূ হানীফা (র) ‘কিতাবুল আ’সার’ প্রণয়ন করিয়া এই দায়িত্ব বিশেষ যোগ্যতা ও বিজ্ঞতা সহকারেই পালন করিয়াছিলেন। হাফেজ সুয়ূতী ইমাম আবু হানীফা (র) সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ
مِنْ مَنَاقِبِ أَبِي حَنِيفَةَ الَّتِي انْفَرَدَ بِهَا إِنَّهُ أَوَّلُ مَنْ دَوْنَ عِلْمَ الشَّرِيعَةِ وَرَتَّبَهُ أَبْوَابًا ثُمَّ تَبِعَهُ مَالِكُ بْنِ أَنَسٍ فِي تَرْتِيبِ الْمُوَطًا وَلَمْ يَسْبُقَ أَبَا حَنِيفَةَ
ইমাম আবূ হানীফা (রর) বিশেষ একটি কীর্তি-যাহাতে তিনি একক, তাহা এই যে, তিনিই সর্বপ্রথম ইলমে শরীয়াতকে সুসংবদ্ধ করিয়াছেন এবং উহাকে অধ্যায় হিসাবে সংকলিত করিয়াছেন। ইমাম মালিক (র) ‘মুয়াত্তা’ প্রণয়নে তাহারই অনুসরণ করিয়াছেন। কিন্তু এইরূপ গ্রন্থ প্রণয়নের ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা (র)-কে সময়ের দিক দিয়া কেহই অতিক্রম করিয়া যাইতে পারেন নাই। ‘৭৮৬
ইমাম আবু হানীফা (র)-এর সংকলিত ‘কিতাবুল আ’সার’ সম্পর্কে হাফেজ ইবনে হাজর আল-আসকালানী লিখিয়াছেনঃ
وَالْمَوْجُودَ مِنْ حَدِيثٍ أَبِي حَنِيفَةَ مُفْرَدًا إِنَّمَا هُوَ كِتَابُ الْآثَارِ الَّتِي رَوَاهَا مُحَمَّدُ بْنِ حَسَنٍ عَنْهُ
ইমাম আবূ হানীফা (র) বর্ণিত স্বতন্ত্র হাদীস-গ্রন্থ বর্তমান। আর তাহা হইতেছে ‘কিতাবুল আ’সার’; ইহা তাঁহার নিকট হইতে মুহাম্মাদ ইবনে হাসান বর্ণনা করিয়াছেন। ৭৮৭
ইমাম আলাউদ্দিন ‘কাশানী’ এই কিতাবের উল্লেখ করিয়াছেন آثار ابی حنیفه ইমাম আবূ হানীফা (র) সংকলিত ‘কিতাবুল আ’সার’ বলিয়া। ৭৮৮
‘কিতাবুল আ’সার’ নামক হাদীসগ্রন্থখানি প্রণয়নের ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা (র) ব্যাপকভাবে হাদীস সংগ্রহ ও ছাঁটাই-বাছাই করিয়াছেন। সদরুল আয়িম্মা মুয়াফফিক ইবনে আহমদ মক্কী তাঁহার গ্রন্থে লিখিয়াছেনঃ
وَانْتَخَبَ أَبُو حَنِيفَةَ رَحِمَهُ اللهُ الْآثَارَ مِنْ أَرْبَعِينَ أَلْفَ حَدِيثٍ –

ইমাম আবূ হানীফা (র) চল্লিশ সহস্র হাদীস হইতে ছাঁটাই-বাছাই করিয়া ‘কিতাবুল আ’সার’-এর এই গ্রন্থখানি প্রণয়ন করেন। ৭৮৯
হাদীস চয়ন ও হাদীস গ্রহণের ব্যাপারে তাঁহার এই অসামান্য সতর্কতার কথা সকল হাদীস-পারদর্শী ব্যক্তিই স্বীকার করিয়াছেন। ইমাম ওকী (র) বলিয়াছেনঃ
لقد وجدَ الوَرْعُ عَنْ أَبِي حَنِيفَةَ فِي الْحَدِيثِ مَا لَمْ يُوْجَدْ عَنْ غَيْرِهِ
হাদীস গ্রহণের ব্যাপারে ইমাম আবূ হানীফা (র) কর্তৃক যেরূপ সতর্কতা অবল’িত হইয়াছে, তদ্রুপ আর কাহারও দ্বারা অবল’িত হয় নাই। ৭৯০
ঠিক এই কারণেই মনে হয় মুহাদ্দিসগণ ইমাম আবু হানীফা (র)-এর সমালোচনা করিতে গিয়া তাঁহাকে – مشدد في الرواية হাদীস বর্ণনায় অত্যন্ত কঠোর ও কড়া লোক’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন এবং এই কারণেই তাঁহার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা খুব বেশী হইতে পারে নাই। ঐতিহাসিক আল্লামা ইবনে খালদুন ইহার কারণ বর্ণনা প্রসংগে লিখিয়াছেনঃ
وَلَاِمَامُ أَبُو حَنِيفَةَ إِنَّمَا قَلَتْ رَوَايَتُهُ لِمَا شَدَّدَ فِي شُرُوطِ الرِّوَايَةِ وَالتَّحَمل ইমাম আবু হানীফা (র)-এর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম হওয়ার কারণ এই যে, তিনি হাদীস গ্রহণ ও বর্ণনার ব্যাপারে কঠোর নৈতিক শর্ত আরোপ
করিতেন। ৭৯১
ইমাম আবূ হানীফা (র)-এর সংগ্রহীত হাদীসের বিপুলতা ও উহা সামান্য পরিমাণ বর্ণনা করা সম্পর্কে স্বয়ং ইমাম আবু হানীফা (র)-এর হইতে একটি উক্তি এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলিয়াছেনঃ
عِنْدِي صَنَادِيقُ مِنَ الْحَدِيثِ مَا أَخْرَجْتُ مِنْهَا إِلَّا الْيَسِيرَ الَّذِي يُنْتَفَعُ بِهِ
আমার নিকট কয়েক সিন্দুক ভর্তি লিখিত হাদীস-সম্পদ মজুদ রহিয়াছে। কিন্তু আমি তাহা হইতে অতি অল্প সংখ্যকই প্রকাশ ও বর্ণনা করিয়াছি, যাহা লোকদের ব্যবহারিক জীবনের উপকার দিবে। ৭৯২

অন্যান্য হাদীস-গ্রন্থের ন্যায় ‘কিতাবুল আ’সার’-এর ‘নুসখা’ (অনুলিপি) রহিয়াছে। এই কারণে তাহা এক-একজন ছাত্রের নামেই প্রখ্যাত হইয়াছে। অন্যথায় মূল গ্রন্থ ইমাম আবূ হানীফারই সংকলিত একখানি মাত্র হাদীসগ্রন্থ। এই ‘নুসখা’ প্রকাশকারীদের মধ্যে নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের নাম উল্লেখযোগ্যঃ
১. ইমাম যুফার ইবনুল হুযাইলঃ এই সম্পর্কে প্রামাণ্য গ্রন্থাবলীতে উদ্ধৃত হইয়াছেঃ
أَحْمَدُ بْنِ بَكْرٍ رَوَى أَبُو وَهَبٍ عَنْ زُفَرِ بْنِ الْهُزَيْلِ عَنْ أَبِي حَنِيفَةً كِتَابَ لَأَثَارِ
আহমদ ইবনে বকর যুফার ইবনুল হুযাইলের ছাত্র আবূ ওহাবের নিকট হইতে আবু হানীফা (র)-এর সংকলিত ‘কিতাবুল আ’সার’ বর্ণনা করিয়াছেন। ৭৯৩
২. ইমাম আবূ ইউসুফ ইবনে আবূ ইউসুফঃ তাঁহার সম্পর্কে উদ্ধৃত হইয়াছেঃ
روى كِتَابَ الْأَثَارِ عَنْ أَبِيهِ عَنْ أَبِي حَنِيفَةً وَهُوَ مُجَلَّدُ ضَخْمُ
ইমাম আবূ হানীফা (র)-এর নিকট হইতে তাঁহার সংকলিত ‘কিতাবুল আ’সার’ তাঁহার পিতার সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন। উহা একখানি বিরাট আকারের গ্রন্থ। ৭৯৪
৩. ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে হাসান শায়বানীঃ তাঁহার তৈরী করা সংকলনটিই প্রসিদ্ধ এবং ইহাই বর্তমানে ভুলক্রমে ইমাম মুহাম্মাদ (র)-এর সংকলিত ‘কিতাবুল আ’সার’ বলিয়া পরিচিত।
৪. ইমাম হাসান ইবনে যিয়াদ লু’লুয়ীঃ ইবনে হাজর আসকালানী (র) ইহার সম্পর্কে মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীমের আলোচনা প্রসঙ্গে লিখিয়াছেনঃ مُحَمَّدُ بْنِ إِبْرَاهِيمَ رَوَى عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ شُجَاعٍ عَنِ الْحَسَنِ بْنِ زِيَادٍ عَنْ أَبِي حَنِيفَةً كِتَابَ الْأَثَارِ
মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম ইমাম আবূ হানীফা (র)-এর ‘কিতাবুল আ’সার’ মুহাম্মাদ ইবনে শুজা তাহার ওস্তাদ হাসান ইবনে যিয়াদের সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন। ৭৯৫
মুয়াত্তা ইমাম মালিক
ইমাম আবূ হানীফা (র)-এর সংকলিত ‘কিতাবুল আ’সার’-এর পরে পরেই সংকলিত হাদীস গ্রন্থ হিসাবে আমরা দেখিতে পাই ইমাম মালিক (র)-এর সংকলিত ‘মুয়াত্তা’।

কিতাবুল আ’সার ও মুয়াত্তা ইমাম মালিক (র)-এর মধ্যে একটি প্রধান পার্থক্য এই যে, প্রথমোক্ত গ্রন্থে হিজায, ইরাক, সিরিয়া ও মুসলিম জাহানের অন্যান্য হাদীস-বর্ণনাকারী লোকদের বর্ণিত হাদীসসমূহ সন্নিবেশিত হইয়াছে; কিন্তু ‘মুয়াত্তা ইমাম মালিক’-এ রহিয়াছে কেবলমাত্র মদীনায় অবস্থানকারী মুহাদ্দিসদের বর্ণিত হাদীস। কেননা ইমাম মালিক (র) সম্পর্কে পূর্ববর্তী আলোচনা হইতে আমরা দেখিয়াছি যে, তিনি হাদীস সংগ্রহের জন্য মদীনার বাহিরে কখনো সফরে গমন করেন নাই।
‘মুয়াত্তা’ গ্রন্থের ধারা এইভাবে সাজানো হইয়াছে যে, প্রথমে রাসূলে করীম (স)-এর হাদীস- কথা বা কাজের বিবরণ উল্লেখ করা হইয়াছে। তাহার পর উহাতে সাহাবায়ে কিরামের কথা এবং তাবেয়ীদের কুরআন-হাদীস ভিত্তিক ফতোয়াসমূহ সন্নিবেশিত হইয়াছে। ৭৯৬
ইমাম মালিক (র) হাদীসের এই গ্রন্থখানি সংকলন করেন আব্বাসী খলীফা আল-মনসুর-এর আদেশক্রমে। মুহাম্মাদ আবূ যাহু নামক এ যুগের একজন মিসরীয় গ্রন্থ-প্রণেতা লিখিয়াছেনঃ
طَلَبَ أَبُو جَعْفَرَ الْمَنْصُورُ الْخَلِيفَةُ الْعَبَّاسِي إِلَى الْإِمَامِ مَالِكِ أَنْ يَجْمَعَ مَا ثَبَتَ لَدَيْهِ وَيُدَوِّنَهُ فِي كِتَابٍ وَيُؤْطَنُهُ لِلنَّاسِ فَتَالَّفَ كِتَابَهُ هُذَا وَسَمَّاهُ الموطاء
আব্বাসী খলীফা আবূ জাফর আল-মনসুর ইমাম মালিক (র)-কে ডাকিয়া বলিলেনঃ তিনি যেন তাঁহার নিজের নিকট প্রমাণিত ও সহীরূপে সাব্যস্ত হাদীসসমূহ সংকলন ও একখানি গ্রন্থাকারে তাহা প্রণয়ন করেন এবং উহাকে যেন তিনি লোকদের ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগ করার জন্য নির্দিষ্ট করেন। অতঃপর তিনি তাঁহার এই গ্রন্থ প্রণয়ন করেন এবং উহার নাম নির্দিষ্ট করেন- ‘আল-মুয়াত্তা’। ৭৯৭
ইমাম মালিক (র) এই গ্রন্থখানি প্রণয়নে অপরিসীম শ্রম-মেহনত ও অমলিন ধৈর্য ও অধ্যবসায় নিয়োগ করিয়াছিলেন। ইমাম সুয়ূতী ইবনুল হুবাব-এর সূত্রে উল্লেখ করিয়াছেনঃ
أَنَّ مَالِكًا رَوَى مِائَةَ أَلْفَ حَدِيثٍ جَمَعَ مِنْهُ الْمُوَطًا عَشَرَةَ الْآفِ ثُمَّ لَمْ يَزِلْ يَعْرِضُهَا عَلَى الْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ وَيُخْبِرُهَا بِلَاثَارِ وَلَأَخْبَارِ حَتَّى رَجَعَتْ إِلَى خَمْسَمِائَة
ইমাম মালিক (র) প্রথমে একলক্ষ হাদীস বর্ণনা করেন। তাহা হইতে দশ হাজার হাদীসের সমন্বয়ে ‘মুয়াত্তা’ গ্রন্থ সংকলন করেন। অতঃপর তিনি উহাকে কুরআন ও

সুন্নাহর দৃষ্টিতে যাঁচাই করিতে থাকেন। সাহাবীদের আ’সার ও অন্যান্য খবর-এর ভিত্তিতেও উহার পরীক্ষা করেন। শেষ পর্যন্ত উহাতে মাত্র পাঁচশত হাদীস সন্নিবেশিত করেন। ৭৯৮
ইমাম সুয়ূতী আতীক ইবেন ইয়াকুবের সূত্রে নিম্নোক্ত বর্ণনাও উদ্ধৃত করিয়াছেনঃ وَضَعَ مَالِكُ الْمُوَطًا نَحْوَ مِنْ عَشَرَةَ الْآفِ حَدِيثٍ فَلَمْ يَزِلْ يَنْظُرُ فِيْهِ كُلَّ سَنَةٍ وَيُسْقِطْ مِنْهُ حَتَّى بَقِيَ مِنْهُ هُذَا –
ইমাম মালিক প্রায় দশ সহস্র হাদীসের সমন্বয়ে ‘মায়াত্তা’ রচনা করেন। অতঃপর তিনি উহার উপর প্রত্যেক বৎসর দৃষ্টি দিতে ও যাঁচাই করিতে এবং উহা হইতে হাদীস প্রত্যাহার করিতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত বর্তমান আকারে উহা পূর্ণ পরিণতি লাভকরে। ৭৯৯
এই গ্রন্থ প্রণয়ন চূড়ান্তভাবে সম্পূর্ণ করিতে ইমাম মালিকের পূর্ণ চল্লিশটি বৎসর সময় লাগিয়াছে। এ সম্পর্কে বলা হইয়াছেঃ
قَالُوا إِنَّهُ مَكَثَ فِي تَالِيفِهِ أَرْبَعِينَ سَنَةٌ كَامِلَةٌ يُنَقِحُهُ وَيُهَذِّبُهُ –
মুহাদ্দিসগণ বলিয়াছেন, ইমাম মালিক এই গ্রন্থখানি প্রণয়নে পূর্ণ চল্লিশটি বৎসর অতিবাহিত করিয়াছেন। এই দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তিনি উহাকে যাঁচাই ও ছাঁটাই করিতেছিলেন এবং উহাকে সুসংবদ্ধরূপে সজ্জিত, নির্ভুল ও শৃংখলিত করিতে ব্যস্ত ছিলেন। ৮০০
এই গ্রন্থের নামকরণ সম্পর্কে ইমাম মালিক নিজেই বলিয়াছেনঃ
عَرَّضْتُ كِتَابِي هُذَا عَلَى سَبْعِينَ فَقِيْهَا مِنْ فُقَهَاءِ الْمَدِينَةِ فَكُلُّهُمْ وَطَانِي عَلَيْهِ فَسَمَّيْتُهُ الْمُوَطَّاء
আমার এই কিতাবখানা আমি মদীনায় বসবাসকারী সত্তর জন ফিকাহবিদ-এর সম্মুখে পেশ করিয়াছি। তাঁহারা প্রত্যেকেই উহার জন্য আমাকে উপদেশ দিয়াছেন। এই কারণে আমি উহার নাম রাখিয়াছি ‘মুয়াত্তা’। ৮০১
উপরে ইবনুল হুবাবের সূত্রে উল্লেখিত ইমাম সুয়ূতীর উদ্ধৃতি হইতে জানা গিয়াছে যে, ইমাম মালিক দশ হাজার হাদীস হইতে ছাঁটাই-বাছাই করিয়া মাত্র পাঁচশত হাদীস তাঁহার গ্রন্থে রাখিয়াছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘মুয়াত্তা’ গ্রন্থে মোট কতটি হাদীস সন্নিবেশিত হইয়াছে, তাহা এই উদ্ধৃতি হইতে জানা যায় না। এই সম্পর্কে ইমাম সুয়ূতীর নিম্নোক্ত উদ্ধৃতি হইতে নির্দিষ্ট সংখ্যা জানা যায়। তিনি আবু বকর আল-আবরাহীর সূত্রে উল্লেখ করিয়াছেনঃ

গ্রন্থ পাঠানো এবং শিক্ষা প্রসারের উদ্যোগের বিবরণ থেকে “সংগৃহীত হাদিস সম্পদ কিছুমাত্র বিনষ্ট হয়নি” সিদ্ধান্তটি অনুসরণ করে না। কোনো সংগ্রহ একাধিক অঞ্চলে পাঠানো হলে সেই পাঠানোর তথ্য জানা যায়; সমস্ত সংগ্রহ ও সমস্ত অনুলিপির পরবর্তী ইতিহাস তার দ্বারা জানা যায় না। সংরক্ষণে সফল হওয়া অংশ এবং হারিয়ে যাওয়া অংশের পরিমাণও শুধু একটি প্রশাসনিক নির্দেশ থেকে নির্ধারণ করা যায় না। একইভাবে কারও মৃত্যুসন অন্য কারও মৃত্যুসনের আগে বা পরে হওয়া থেকে তাঁর গ্রন্থটি আগে লেখা হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। গ্রন্থরচনার সময় সম্পর্কে আলাদা তথ্য প্রয়োজন। সংকলনের ক্ষেত্রে “সর্বপ্রথম” দাবির অর্থও কাজের ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট করতে হয়: ব্যক্তিগত লিখন, বৃহত্তর সংগ্রহ এবং অধ্যায়ভিত্তিক গ্রন্থবিন্যাস এক কাজের নাম নয়।

কিতাবুল আসারের সঙ্গে আবু হানিফার নাম এবং বিভিন্ন ছাত্রের নাম যুক্ত হওয়ার বিবরণ গ্রন্থসংরক্ষণের মানবীয় স্তরগুলো দেখায়। একজন শিক্ষকের বর্ণনা ছাত্র সংগ্রহ করতে পারেন, ছাত্রের পাঠ অন্য ছাত্র বর্ণনা করতে পারেন এবং সেই ধারার বিভিন্ন অনুলিপি পরে সম্পাদিত হতে পারে। এই সম্পর্ক থাকলেই প্রতিটি অনুলিপি শিক্ষকের নিজস্ব লিখিত মূলগ্রন্থের অভিন্ন প্রতিরূপ বলে প্রতিষ্ঠিত হয় না। একই বক্তব্য একাধিক গ্রন্থে পুনরাবৃত্ত থাকলেও তারা পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল হলে স্বাধীন সাক্ষ্যের সংখ্যা বাড়ে না। সংকলনের পরিচয় ও গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণে তাই বর্ণনা, অনুলিপি এবং পাঠের সম্পর্ক কার্যকর। প্রচলিত শরীয়তের নির্দিষ্ট বিধান এই সংরক্ষিত উপাদান থেকেই গ্রহণ করা হয়। গ্রন্থের ধর্মীয় মর্যাদা সেই উপাদানের মানবীয় সংরক্ষণপ্রক্রিয়াকে বিলুপ্ত করে না।

মুয়াত্তার বিবরণে নবীর কথা ও কাজের সঙ্গে সাহাবিদের বক্তব্য এবং তাবেঈদের ফতোয়া অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে একটি প্রাথমিক সংকলনের সব উপাদানকে এক ধরনের নববী উক্তি গণনা করলে গ্রন্থের অভ্যন্তরীণ পার্থক্য হারিয়ে যায়। মোট বর্ণনার সংখ্যা, শুধু সরাসরি নববী বর্ণনার সংখ্যা, সনদবিহীন বা বিচ্ছিন্ন বর্ণনার সংখ্যা এবং একই বক্তব্যের পুনরাবৃত্ত গণনা এক ফল দেয় না। সংকলকের বাছাই ও পরে উপাদান বাদ দেওয়ার বিবরণও গ্রন্থরূপ তৈরিতে মানুষের সিদ্ধান্তের ভূমিকা প্রকাশ করে। কোন বক্তব্যকে কোন ধরনের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হবে, সেই বিষয় নির্ধারণে সংকলনের শ্রেণিবিন্যাস প্রয়োজন হয়। এই তথ্য বাদ দিয়ে কেবল গ্রন্থের পবিত্র মর্যাদা ঘোষণা করলে তার প্রতিটি উপাদানের উৎস ও আইনগত ভূমিকা জানা যায় না।

হাদিস সংকলনের ধারাটি একটিমাত্র দিনে সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া একটি অভিন্ন গ্রন্থ তৈরির প্রক্রিয়া নয়। ব্যক্তিগত সহিফা, সংগ্রহের নির্দেশ, বিষয়ভিত্তিক সংকলন, নির্দিষ্ট বর্ণনাসূত্র এবং বড় গ্রন্থের নির্বাচন মিলিয়ে বর্তমান সাহিত্য তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আগের উপাদান পরে সংরক্ষিত হতে পারে, আবার পরবর্তী সম্পাদনা ও বর্ণনার স্তরও থাকতে পারে। একটি নির্দিষ্ট বর্ণনার সময় ও গ্রহণযোগ্যতা পুরো সাহিত্যের জন্য এক ঘোষণা দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। আইন হিসেবে ব্যবহারের সময় যে বক্তব্য বেছে নেওয়া হচ্ছে, তার পরিচয় এই সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। ধর্মীয় কর্তৃত্বের দাবি তাই ইতিহাসের বাইরে দাঁড়িয়ে নেই; মানুষ যে তথ্য সংরক্ষণ করেছে, সেই তথ্যকে কর্তৃত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়েই তা কার্যকর হয়।

হাদিস 12
হাদিস 14
হাদিস 16
হাদিস 18
হাদিস 20
হাদিস 22
হাদিস 24
হাদিস 26
হাদিস 28
হাদিস 30
হাদিস 32

সৌদি ফতোয়া কমিটি ও ইসলামকিউএ-র বক্তব্য

ইসলামকিউএ মুহাম্মদ সালিহ আল-মুনাজ্জিদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ধর্মীয় প্রশ্নোত্তর ওয়েবসাইট। এর ১১৫১২৫ নম্বর উত্তরে সুন্নাহকে শরীয়তের দ্বিতীয় উৎস বলা হয়েছে এবং সুন্নাহর প্রামাণ্যতা সাধারণভাবে অস্বীকার করা ব্যক্তির ধর্মীয় অবস্থান সম্পর্কে কঠোর সিদ্ধান্ত উদ্ধৃত হয়েছে। উত্তরটিতে সৌদি স্থায়ী ফতোয়া কমিটি, সুয়ূতি, ইবনুল ওয়াজির, শাফিঈ, আহমদ, বারবাহারি ও ইবন তাইমিয়ার বক্তব্য ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে এটি একটি নির্দিষ্ট ফতোয়াভিত্তিক অবস্থানের দলিল, যেখানে কোরআনের সাধারণ আনুগত্যকে হাদিসের নির্দিষ্ট বক্তব্য গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। “সহিহ” হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ কোনো বক্তব্যকে মুহাম্মদের বক্তব্য জেনেও প্রত্যাখ্যান করা এবং বক্তব্যটি তাঁর কি না, সেই পরিচয় নিয়ে আপত্তি করা—দুটি অবস্থান উত্তরটিতে আলাদা করা হয়েছে। প্রথমটির সঙ্গে কুফর এবং দ্বিতীয়টির সঙ্গে শর্তসাপেক্ষ সমালোচনার আলোচনা যুক্ত। এই পার্থক্য অনুযায়ী প্রত্যাখ্যানের ধর্মীয় সিদ্ধান্তও ভিন্নভাবে নির্ধারিত হয়েছে। [129] [130] [131]

هل يكفر من يرد الحديث الصحيح ؟ أحد الإخوة يرد بعض الأحاديث الصحيحة الواردة فی الصحيح : البخاری ومسلم وغيرها… بحجة أنها تعارض القرآن ، فما حکم من يرد الحديث الصحيح ، هل يکفر ؟
الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله، وبعد:
أولا :
السنة النبوية هي المصدر الثاني للتشريع ، فقد كان الوحي ينزل على النبي صلى الله عليه وسلم بالسنة كما ينزل عليه بالقرآن ، ومصداق ذلك قول الله تعالى : ( وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى . إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى ) النجم/3-4.
وقد أوجب الله تعالى على المؤمنين التسليم التام لكلام النبي صلى الله عليه وسلم وحديثه وحكمه ، حتى لقد أقسم بنفسه سبحانه أن من سمع كلام النبي صلى الله عليه وسلم ثم رده ولم يقبل به : أنه ليس من الإيمان في شيء ، فقال عز وجل : ( فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ) النساء/65.
ولذلك وقع الاتفاق بين أهل العلم على أنَّ مَن أنكر حجية السنة بشكل عام ، أو كذَّبَ حديث النبي صلى الله عليه وسلم – وهو يعلم أنه من كلامه صلى الله عليه وسلم – فهو كافر ، لم يحقق أدنى درجات الإسلام والاستسلام لله ورسوله .
قال الإمام إسحاق بن راهويه رحمه الله :
” من بلغه عن رسول الله صلى الله عليه وسلم خبرٌ يُقرُّ بصحته ثم رده بغير تقية فهو كافر” انتهى.
وقال السيوطي رحمه الله :
” اعلموا رحمكم الله أنَّ مَن أنكر كون حديث النبي صلى الله عليه وسلم – قولا كان أو فعلا بشرطه المعروف في الأصول – حجة كفر ، وخرج عن دائرة الإسلام ، وحشر مع اليهود والنصارى أو من شاء من فرق الكفرة ” انتهى.
“مفتاح الجنة في الاحتجاج بالسنة” (ص/14)
وقال العلامة ابن الوزير رحمه الله :
” التكذيب لحديث رسول الله صلى الله عليه وسلم مع العلم أنه حديثه كفر صريح ” انتهى.
“العواصم والقواصم” (2/274)
جاء في “فتاوى اللجنة الدائمة” :
” الذي ينكر العمل بالسنة يكون كافرا ؛ لأنه مكذب لله ولرسوله ولإجماع المسلمين ” انتهى.
“المجموعة الثانية” (3/194)
وانظر جواب السؤال رقم : (604 ) ، (13206 ) ، (77243 )
ثانيا :
أما مَن رَدَّ الحديث ولم يقبله ، مُنكِرًا أن يكون من كلام النبي صلى الله عليه وسلم ، فهذا ليس كالقسم الأول ، ونحن ندرك أن أكثر أصحاب التيار ” التنويري ” الجديد ، هم الذين تصدوا للحكم على السنة النبوية من خلال آرائهم وتوجهاتهم ، وهؤلاء ـ في واقع الأمر ـ لم يأتوا بجديد ، وإنما هم امتداد لأهل البدع من قبلهم ، الذين حكى أهل العمل شبهاتهم ، وتولوا الردع عليها .
ولهؤلاء ، وأمثالهم نقول :
المنهجية العلمية تقتضي النظر في أمور مهمة قبل رد الحديث وإنكار أن يكون من كلام النبي صلى الله عليه وسلم ، وهذه الشروط هي :
الشرط الأول :
المناقضة التامة بين ما ورد في الحديث وما ورد في القرآن الكريم من نص واضح الدلالة غير منسوخ ، ونحن نؤكد هنا على قيد ” المناقضة التامة “، وليس مجرد تعارض ظاهري يبدو في ذهن الناظر العجل ، ولعل أولئك الذين يخوضون في إنكار الأحاديث يوافقوننا على هذا التقييد ؛ لأن غالب التعارض الظاهري الذي يعرض في أذهان كثير من الناس لا حقيقة له ، وإنما هو ظنٌّ قائمٌ في ذهن المعترض ، يمكن بالتأمل وتلمس أوجه اللغة والمعاني الجواب عليه ، وبيان موافقته لأصول الشريعة ومقاصدها ، ومن تأمل كتاب العلامة ابن قتيبة الدينوري ، المسمى ” مختلف الحديث “، عرف قدر المجازفة التي جازفها كثيرون في إنكارهم الأحاديث بدعوى عدم موافقتها للقرآن ، أو عدم تصديق العقل بما فيها ، ثم إذا ذكر ابن قتيبة تفسير العلماء الصحيح لهذه الأحاديث تبين أن لها أوجها صحيحة موافقة للشريعة ، وأن توهم المعارضة للقرآن إنما هو ظنون فاسدة .
إننا نسأل هؤلاء وأمثالهم ممن يتجرأ على رد السنة ، والطعن في أحاديث النبي صلى الله عليه وسلم ، من غير منهجية علمية ، أو أصول نقدية مقبولة ، ومن غير أن يحكموا أصول العلم الذي يتحدثون فيه :
هل ترون أن مِن الممكن أن يناقض الحديثُ القرآن الكريم مناقضة تامة بحيث يجزم الناقد بأن هذا الحديث ليس من كلام النبي صلى الله عليه وسلم ، ونرى مع ذلك جميع علماء الإسلام ، من لدن صحابة رسول الله صلى الله عليه وسلم إلى يومنا هذا ، متوافقين على قبول هذا الحديث وشرحه وتفسيره والاستدلال به والعمل بما جاء فيه ؟!
ألا يقضي العقل السليم – الذي يزعمون التحاكم إليه – باحترام اتفاق أهل التخصص على أمر هو في صلب تخصصهم ؟!
هل يجرؤ أحد على تخطئة علماء الفيزياء أو الكيمياء أو الرياضيات أو علوم التربية أو الاقتصاد مثلا إذا اتفقوا وتواردوا على أمر معين ، خاصة إذا لم يكن المعترض عليهم من أهل العلم بذلك التخصص ، وإنما غاية أمره أن يكون قد قرأ بعض المقالات حوله ، أو شيئا من كتب : تبسيط العلوم ، أو : العلم لكل الناس ؟!
الشرط الثاني :
وجود حلقة من حلقات الضعف الإسنادي ، التي تتحمل الخطأ الوارد في المتن :
ونظن – كذلك – أن هذا الشرط منهجي قويم ، لا ينبغي أن يخالف فيه من يفهم شيئا في أصول النقد العلمي ، وذلك أن إنكار المتن أن يكون من كلام النبي صلى الله عليه وسلم ، يعني وجود حلقة ضعيفة في السند هي التي أوهمتنا أن هذا الحديث من كلام النبي صلى الله عليه وسلم ، وهو ـ فعليا ـ ليس كذلك .
يقول الإمام الشافعي رحمه الله ، وهو من هو في منازل العلم والإيمان ، وهو أول من صنف في علم أصول الفقه :
” الحديث إذا رواه الثقات عن رسول الله صلى الله عليه وسلم ، فذلك ثبوته “
“اختلاف الحديث ـ ضمن الأم ـ (10/107) ” .
ويقول :
” لا يُستدل على أكثر صدق الحديث وكذبه ، إلا بصدق المُخْبِر ، إلا في الخاص القليل من الحديث ” .
“الرسالة” : فقرة (1099) .
ويقول أيضا :
” المسلمون العدولُ : عدولٌ أصحاء الأمر فى أنفسهم … ، وقولُهم عن خبر أنفسهم ، وتسميتُهم : على الصحة والسلامة ، حتى نستدل من فعلهم بما يخالف ذلك ، فنحترسَ منهم في الموضع الذي خالف فعلُهم فيه ما يجب عليهم ” .
“الرسالة” : فـ (1029-1030) ، وانظر : الأم (8/518-519) .
وبعد أن يحكي الإمام الشافعي رحمه الله بعض الأصول العلمية في هذا الباب ، وهو أمر تعرض له كثيرا في كتبه المختلفة ، يذكر لنا أن ما قرره ، مما نلقلنا بعضه هنا ، ليس اجتهادا فرديا ، أو مذهبا شخصيا له ، وإنما هي أصول أجمع عليها أهل العلم من قبله . يقول :
” فحكيت عامة معاني ما كتبت في صدر كتابي هذا ، لعدد من المتقدمين في العلم بالكتاب والسنة ، واختلاف الناس ، والقياس ، والمعقول ، فما خالف منهم واحدٌ واحدا ، وقالوا: هذا مذهبُ أهل العلم من أصحاب رسول الله ، والتابعين ، وتابعي التابعين ، ومذهبُنا ؛ فمن فارق هذا المذهب : كان عندنا مفارقَ سبيلِ أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم ، وأهلِ العلم بعدَهم إلى اليوم ، وكان من أهل الجهالة ، وقالوا معا : لا نرى إلا إجماع أهل العلم في البلدان على تجهيل من خالف هذا السبيل ، وجاوزوا ، أو أكثرهم ، فيمن يخالف هذا السبيل ، إلى ما لا أبالي أن لا أحكيه ” !!
” اختلاف الحديث” ـ الأم ـ ( 10/21) ، وانظر نحوا من ذلك في : الرسالة : فـ (1236-1249) .
إن أول ما يجب على من رد حديثا مسندا إلى النبي صلى الله عليه وسلم ، أن يبحث ويفسر من هو الراوي الذي أخطأ في نقله هذا الحديث ، فإذا لم يجد المُنكِرُ سببا إسناديا مقبولا لإنكاره الحديث فذلك علامة على خطأ منهجيٍّ ، وهو علامة أيضا على ضرورة مراجعة فهم الحديث والقرآن والمقاصد الشرعية .
فكيف إذا كان الحديث واردا بأصح الأسانيد على وجه الأرض ، بل كيف لو كان الحديث قد ورد بطرق كثيرة جدا – كما هو حال أكثر الأحاديث التي يردها ” التنويريون ” – ، وعن جماعة من الصحابة رضوان الله عليهم ؟!
الشرط الثالث :
نسبة الأمر كله إلى الاجتهاد المحتمل ، ونبذ أساليب الجزم والحسم واتهام المخالف والطعن في عقول المسلمين ، وهذا فيما إذا كان هناك وجه لهذا الاحتمال ، وكان من يتكلم في هذا مؤهلا ـ بأدوات البحث اللازمة ـ لإدراك ذلك والبحث فيه . فقد يبدو لأحد العلماء ضعف حديث معين لعلة معينة ، ولكنه لا يستعمل لغة الاتهام لكل من قبل الحديث .
فمن خالف هذه الشروط الثلاثة ، وأصر على إنكار الحديث وتكذيبه ، فهذا على خطر عظيم ، إذ لا يجوز للمسلم أن يتأول متهجما من غير شروط ولا ضوابط ، وإلا أثم ووقع في الحرج .
يقول الإمام أحمد رحمه الله :
” من رد حديث رسول الله صلى الله عليه وسلم فهو على شفا هلكة ” انتهى.
ويقول الحسن بن علي البربهاري :
” وإذا سمعت الرجل يطعن على الأثر ، أو يرد الآثار ، أو يريد غير الآثار : فاتّهمه على الإسلام ، ولا تشك أنه صاحب هوى مبتدع .
وإذا سمعت الرجل تأتيه بالأثر فلا يريده ويريد القرآن ، فلا تشك أنه رجل قد احتوى على الزندقة ، فقمْ من عنده وودّعه ” انتهى.
“شرح السنة” (113-119) باختصار.
ويقول شيخ الإسلام ابن تيمية رحمه الله :
” إن ما أخبر به الرسول صلى الله عليه وسلم عن ربه ، فإنه يجب الإيمان به ، سواء عرفنا معناه أو لم نعرف ؛ لأنه الصادق المصدوق . فما جاء في الكتاب والسنة وجب على كل مؤمن الإيمان به ، وإن لم يفهم معناه ” انتهى.
“مجموع الفتاوى” (3/41)
وانظر جواب السؤال رقم : (245 ) ، (9067 ) ، (20153 )
والله أعلم .

বাংলা অনুবাদ:
প্রশ্ন ১১৫১২৫:
কেউ যদি সহীহ হাদিস অস্বীকার করে তাহলে কি সে অবিশ্বাসী তে পরিণত হয়? একজন ভাই বুখারী, মুসলিম এবং অন্যত্র বর্ণিত কিছু সংখ্যক সহীহ হাদীস কোরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হবার কারণে তা অস্বীকার করেন। সহীহ হাদিস অস্বীকার কারীর ব্যাপারে ফয়সালা কি? সে কি একজন অবিশ্বাসী তে পরিণত হয়?
উত্তর
সকল প্রশংসা আল্লাহর। রাসুলের ওপর দরুদ ও সালাম; অতঃপর:
প্রথমত:
ইসলামিক শরীয়াহর দ্বিতীয় উৎস হল নবীর সুন্নাহ। নবীর (সা:) কাছে সেই রূপে সুন্নাহর মাধ্যমে বাণী এসেছে, ঠিক যে রূপে এসেছে কোরআনের মাধ্যমে। আল্লাহর নিজের বাণী ই তার প্রমাণ:
“আর তিনি মনগড়া কথা বলেন না।তাতো কেবল ওহী, যা তার প্রতি ওহীরূপে প্রেরিত হয়।” [আন- নাজম ৫৩:৩-৪ ]
আল্লাহ বিশ্বাসীদের উপর নবীর কথা, হাদীস এবং নির্দেশনা সমূহ এমন ভাবে গ্রহণ করতে বলেছেন যে; তিনি তার পবিত্র সত্তার কসম খেয়ে বলেন, যে কেউ নবীর কথা শ্রবণ করে, তারপর সেটা প্রত্যাখ্যান করে এবং তাদেরকে স্বীকার করে নেয় না তাদের মধ্যে ঈমানের কোনো অংশই নেই। তিনি বলেন:
“কিন্তু না, আপনার রবের শপথ তারা মুমিন হবে না যতক্ষন পর্যন্ত তারা নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার আপনার উপর অর্পণ না করে; অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়।” [আন নিসা ৪:৬৫]
এ কারণে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ঐক্যমত্য ছিল যে, যদি কেউ এটা সাধারণ ভাবে অস্বীকার করে যে সুন্নাহ শরীয়তের একটি দালিলিক উৎস, অথবা নবীর কোনো হাদিস প্রত্যাখ্যান করে এটা জানা সত্ত্বেও যে সেটা নবীর বাণী–তবে সে একজন অবিশ্বাসী, যে কিনা ইসলামের এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি বিশ্বাসের নিম্নতম স্তরেও পৌঁছাতে পারেনি।
ইমাম ইস- হাক ইব্ন রহাওয়াহ বলেনঃ
যদি কেউ আল্লাহর রাসূলের বর্ণিত কিছু শোনে এবং যদি সেটা সে হাদিসটি সহিহ হওয়ার কথা স্বীকার করে, তারপর সেটা প্রত্যাখ্যান করে, প্রাণ বা নিরাপত্তার হুমকির কারণে বাধ্য হয়ে বিপরীত কথা বলার অবস্থা ছাড়া তাহলে সে একজন অবিশ্বাসী।
আস- সুয়ূতী বলেনঃ
এটা বুঝতে হবে যে, যদি কেউ এটা অস্বীকার করে যে নবীর হাদিস শরীয়াহর একটি প্রামাণ্য দলিল- যদি সে এমন কোন বিবরণ অস্বীকার করে যেটা এমন কিছু বর্ণনা করে যা নবী বলেছেন বা করেছেন, যদি সেই হাদিস টা হাদিসের উসুলের শর্ত সমূহ পূরণ করে- তাহলে সে কুফরি করল এবং ইসলামের গণ্ডির বাইরে চলে গেল এবং সে ইহুদি এবং খ্রিস্টান দের দলভুক্ত হবে (কিয়ামতের দিন) অথবা অন্য যে কোন অবিশ্বাসী দলের সাথে যার সাথে আল্লাহ চান। [মিফতাহ আল-জান্নাহ ফী’ ইহতিযাজ বি’স – সুন্নাহ (পৃষ্ঠা ১৪)]
আল- ‘ আল্লামাহ ইবন আল- ওয়াজির বলেনঃ
যখন কেউ জেনে শুনে আল্লাহর রাসূলের হাদিস অস্বীকার করে এটা ভয়ংকর অবিশ্বাসের সামিল। [আল-‘ আওয়াসিম ওয়া’ল – কাওয়াসিম (২/২৭৪)]
ফাতাওয়া আল – লাজনাহ আদ – দা ‘ ইমাহ তে বলা হয়েছে:
যে ব্যক্তি এটা অস্বীকার করে যে, আমাদের সুন্নাহ্ মেনে চলা উচিৎ তাহলে সে একজন অবিশ্বাসী, কারন সে আল্লাহ এবং তার রাসূলের প্রতি অবিশ্বাস জ্ঞাপন করছে এবং সমগ্র মুসলিমদের ঐক্যমত কে পরিত্যাগ করছে। [ফাতাওয়া আল – লাজনাহ আদ – দা ‘ ইমাহ (ভল.২,৩/১৯৪)
আরও দেখুন: প্রশ্ন ৬০৪, ১৩২০৬ ও ৭৭২৪৩।
দ্বিতীয়ত:
আর যে ব্যক্তি কোন হাদিস স্বীকার না করে তা পরিত্যাগ করে এ জন্য যে তা আসলে নবীর কথা নয়, সে প্রথম শ্রেণীভুক্ত মানুষদের মত নয়। আমরা এটা বুঝি যে নতুন “যুক্তিবাদী জ্ঞানালোকিত” ধারার অনেক অনুসারী আছেন- যারা তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ধ্যান ধারণা দিয়ে নবীর সুন্নাহ কে বিচার করছেন – তারা আসলে নতুন কিছুই করছেন না। উপরন্তু তারা তাদের পূর্ববর্তী বিদআতীদের ই অনুসারী, যাদের অসার দাবিকে বিশেষজ্ঞ গন তাদের যুক্তি দ্বারাই খণ্ডন করেছেন।
এ সকল ব্যক্তিবর্গ এবং তাদের মত আরও যারা আছেন তাদের প্রতি এটাই বলবো যে:
তাত্ত্বিক পদ্ধতি অনুযায়ী কোন হাদীস প্রত্যাখ্যান করার পূর্বে অথবা সেটা যে রাসূলের বাণী তা অস্বীকার করার পূর্বে আমাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ন বিষয় যাচাই করে দেখতে হবে। এই শর্তসমূহ নিম্নরূপঃ
প্রথম শর্ত:
আমাদের দেখতে হবে যে হাদীসে যা বর্ণিত হয়েছে তার সাথে কোরআনের পরিষ্কার এবং দ্ব্যর্থহীন ভাবে উল্লেখিত কোন কিছু যা পরবর্তীতে বাতিল করা হয়নি তার মধ্যে কোন বৈসাদৃশ্য আছে কিনা। এখানে আমাদের সম্পূর্ণ বৈপরীত্য আছে কিনা এই শর্তের উপর জোর দিতে হবে – কোন আপাত প্রতীয়মান বৈসাদৃশ্য থেকে কোন সিদ্ধান্তে আসা যাবে না যেটা হাদিস পরীক্ষা করে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তে আসতে চাওয়া কারো মাথায় আসতে পারে। সম্ভবত যারা হাদিস অস্বীকার করতে চায় তারাও আমাদের সাথে এই শর্তের ব্যপারে একমত হবে। কারন অধিকাংশ আপাত বৈসাদৃশ্য যেগুলো মানুষের মনে উদয় হয় সেগুলো আসলে বাস্তবিক অর্থে বৈসাদৃশ্য নয়; বরঞ্চ সেগুলো আপত্তিকারির মনে উদিত হওয়া নিছক কল্পনা মাত্র এবং যে ব্যক্তি বৈসাদৃশ্য আছে মনে করে- সুচিন্তিত পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন শব্দের বৈচিত্রপূর্ন অর্থ সমূহ পরীক্ষা করে তাকে জবাব দেয়া সম্ভব এবং এটা প্রমাণ করা যায় যে কিভাবে হাদিস সমূহ বুনিয়াদি বিষয়াদির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং তা শরীয়তের উদ্দেশ্য কে মহিমান্বিত করে। কেউ যদি আল-‘আলামাহ্ ইবন কুতাইবাহ আদ- দীরুনির মুখতালিফ আল-হাদিস পড়ে তাহলে অনুধাবন করতে পারবে যে, যারা কুরআনের সাথে সামঞ্জ্যপূর্ণ নয় অথবা তারা যুক্তিগ্রাহ্য বিচারে বৈসাদৃশ্য পূর্ন এই অভিযোগে হাদিস সমূহ অস্বীকার করে তাদের অনেকেই কত টা বেপরোয়া। কিন্তু যখন ইবন কুতাইবাহ্ স্কলার দের দেয়া এসব হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা পেশ করেন, এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে এ সব হাদিসের যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা আছে যা ইসলামের শিক্ষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং এই সমস্ত হাদিস সমূহ কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক বলে যে ধারণা প্রচলিত আছে তা আসলে বিকৃত উপলব্ধির উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।
যে সমস্ত মানুষ সুন্নাহ কে প্রত্যাখ্যান করার ধৃষ্টতা দেখায় এবং কোন তাত্ত্বিক পদ্ধতি অথবা গ্রহণযোগ্য স্পষ্ট নির্দেশিকা ছাড়া রাসূলের হাদিস সমূহ কে সমালোচনা করে এবং সঠিক ভাবে হাদিস শাস্ত্রের বুনিয়াদী বিষয় সমূহ অনুধাবন না করে সে সম্পর্কে কথা বলে সেই সব লোকদের কাছে আমাদের প্রশ্ন:
কোন নিরীক্ষকের মনে হতে পারে যে এই হাদিস আসলে রাসূলের বাণী নয়, এর উপর ভিত্তি করে আপনি কি মনে করেন যে কোন হাদিস সম্পূর্ণ রূপে পবিত্র কোরআনের বিপরীত হতে পারে যেখানে আমরা দেখতে পাই যে আল্লাহর রাসূলের সাহাবীগণের সময়কাল থেকে আজ পর্যন্ত সকল ইসলামী বিশেষজ্ঞগণ হাদিসের গ্রহণ যোগ্যতার উপর ঐক্যমত পোষণ করেন এবং এর উপর মন্তব্য করেন, ব্যাখ্যা করেন, প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং এর উপর আমল করেন।
যুক্তিসংগত চিন্তাধারা (যেটাকে তারা তাদের যুক্তির ভিত্তি বলে দাবি করে) কি এটাই নির্দেশ করে না যে তারা বিশেষজ্ঞদের সেই বিষয়ের উপর ঐক্যমত্যকে সম্মান করবে যেটা তাদের বিশেষ জ্ঞানের কেন্দ্রীয় অংশ।
উদাহরণ স্বরূপ কেউ কি এমন কথা বলার দুঃসাহস দেখাবে যে পদার্থবিদগণ, রসায়নবিদগণ, গণিতবিদগণ, শিক্ষাবিদগণ অথবা অর্থনীতিবিদরা একটি ভুল করে ফেলেছেন যদি তারা কোন বিষয়ের উপর একমত হন – বিশেষত যখন সেই ব্যক্তি যিনি তাদের উপর অভিযোগ করছেন নিজেই ওই বিষয়ের উপর বিশেষজ্ঞ না হন; বরঞ্চ যেটা বলা যেতে পারে যে তিনি ওই বিষয়ে কয়েকটি নিবন্ধ পড়েছেন মাত্র অথবা বিজ্ঞান সংক্রান্ত কিছু শিক্ষানবিস বই অথবা বিজ্ঞান বিষয়ক ‘The complete idiot’s guide’ (যে বইগুলো কোন বিষয়ের উপর একেবারে প্রাথমিক ধারণা দেয়)।
দ্বিতীয় শর্ত:
সনদে উল্লেখিত সূত্র সমূহের মধ্যে কোন একটি তে দুর্বলতা থাকবে যেটার মাধ্যমে হাদীসে উল্লেখিত ভুল হয়ে থাকতে পারে।
অনুরূপভাবে, আমরা মনে করি যে এই শর্তটি যুক্তিযুক্ত কার্যপ্রণালীর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং একটি অকাট্য শর্ত। যারা একাডেমিক সমালোচনার মূলনীতি সম্পর্কে কোন কিছু বোঝে তারা কখনই এই বিষয়ে ভিন্নমত করবে না। কোন হাদিস কে রাসূলের বাণী হিসেবে অস্বীকার করার মানে এই হবে যে বর্ণনা সূত্র সমূহের মধ্যে কোন একটি দুর্বল সূত্র রয়েছে যেটা আমাদের ভুলবশত বিশ্বাস করতে প্ররোচিত করে যে এই হাদিসটি রাসূলের বাণী, কিন্তু আসলে তা নয়।
ইমাম আশ- শাফা ‘ ই যিনি জ্ঞান এবং বিশ্বাসের জন্য বিখ্যাত এবং উসুল- আল ফিকহ বিষয়ে লেখা লেখি করা প্রথম ব্যক্তি- বলেছেনঃ
যদি কোন হাদিস রাসূলের নিকট হতে কোন বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনাকারীর মাধ্যমে বর্ণিত হয়, তাহলে এটিকে সহীহ হাদীস হিসেবে বিবেচনা করতে এটি ই যথেষ্ঠ হবে। [ইখতিলাফ আল- হাদীস,ইন আল- উম্ম (১০/১০৭)]
এবং তিনি বলেনঃ
খুব অল্প কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া, কোন হাদিস সহীহ কিনা তা নির্ধারণ করতে বর্ণনাকারীরা কত টা সৎ এবং বিশ্বাসযোগ্য তা যাচাই করা ছাড়া ভিন্ন কোন পথ নেই। [আর- রিসালাহ (পারা ১০৯৯)
এবং তিনি আরো বলেন:
ন্যায়পরায়ণ মুসলিমদের নিজেদের অবস্থা ন্যায়পরায়ণ ও সঠিক বলে গণ্য করা হয়; নিজেদের সম্পর্কে তাঁদের বিবরণ ও পরিচয়ও সঠিক ও অক্ষত বলে গ্রহণ করা হয়, যতক্ষণ না তাঁদের কাজ থেকে তার বিপরীত কিছু জানা যায়। সুতরাং তাদের কাছ থেকে যেটা প্রত্যাশিত সেটা থেকে যখন তাদের কাজের অমিল হয় সেই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তাঁদের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। [আর- রিসালাহ (প্যারা ১০২৯-১০৩০); আরো দেখুন আল- উম্ম (৮/৫১৮-৫১৯)]
এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত কিছু একাডেমিক মূলনীতি উদ্ধৃত করে, যেটা তিনি তার বিভিন্ন কিতাবে প্রচুর পরিমাণে আলোচনা করেছেন- ইমাম আশ- শাফা ‘ ই বলেন – (যার মধ্যে কিছু আমরা এখানে উল্লেখ করেছি) – তিনি যা বলেছেন তা শুধুমাত্র অল্প কয়েক জন বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গী নয়, অথবা তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী নয়, বরঞ্চ এগুলো সেই সব মূলনীতি যার উপরে আলেমগণের ঐকমত্য ছিল যারা তার আগে এসেছেন।
তিনি বলেনঃ
আমার এই বইয়ের শুরুতে, আমি যে মূলনীতি এবং নির্দেশনা সমূহের ব্যাপারে আলোচনা করেছি তার সমর্থনে আমি পূর্ববর্তী বহু আলেমগণের উদ্ধৃতি দিয়েছি যাদের কুরআন এবং সুন্নাহর জ্ঞান ছিল, ভিন্ন ভিন্ন মতামত, ব্যাখ্যা এবং যুক্তির প্রয়োগ ছিল,
এবং তাদের কেউই অন্যদের সাথে এ ব্যপারে ভিন্নমত করেন নি। তারা বলেছেনঃ এটা হল আল্লাহর নবীর সাহাবী, তাবিয়ীন এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মের আলেমগণের দৃষ্টিভঙ্গী এবং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও তাই। আমাদেরকে মতে, যে এই পথ থেকে বিচ্যুত হয় সে আল্লাহর রাসূলের সাহাবীদের এবং তার পর হতে আজ পর্যন্ত আগত আলেমগণের পথ হতে বিচ্যুত হয়েছে এবং সে মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত। এবং তাদের সবাই বলেছেন: আমরা সমগ্র অঞ্চলের আলেমগণের মধ্যে এ ব্যপারে ঐকমত্য ব্যতীত আর কিছুই দেখি না, সর্বসম্মতি ক্রমে তাকে মূর্খ হিসেবে অভিহিত করতে যে এই পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে । এবং তারা অথবা তাদের মধ্যে অধিকাংশই আরো অগ্রসর হয়ে যারা এই পথ থেকে বিচ্যুত হয় তাদের ব্যাপারে আরো কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করছেন, কিন্তু সেগুলো এখানে উদ্ধৃত করার কোন প্রয়োজন নেই।
[ইখতিলাফ আল-হাদিস, আল- উম্ম (১০/২১)। আরো দেখুন: আর- রিসালাহ (প্যারা ১২৩৬-১২৪৯)]
যে নবীর সাথে সংশ্লিষ্ট কোন হাদিস প্রত্যাখ্যান করেছে তার প্রথম যেটি অবশ্যই করা উচিৎ তা হল বর্ণনাকারীর পরিচয় গবেষণা করে খুঁজে বের করা যে এই হাদিস বর্ণনা করার সময় ভুল করেছে। যে হাদিস প্রত্যাখ্যান করে সে যদি হাদিস টি প্রত্যাখ্যান করার জন্য সনদে কোন গ্রহণযোগ্য কারন খুঁজে না পায়, তাহলে এটা নির্দেশ করে যে সে তার কার্যপ্রণালি তে ভুল করছে। এটা আরো নির্দেশ করে যে, এটা জরুরী যে আরো ভালো ভাবে দেখা এবং হাদিস ও কুরআন এবং শরীয়তের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করা ।
যদি হাদিসটি পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধতম সনদে বর্ণিত হয়ে থাকে তাহলে সে ক্ষেত্রে কী হবে? সেক্ষেত্রে কি হবে যদি সেই হাদিসটি অনেকে গুলি সূত্রে বর্ণিত হয় এবং অনেক সাহাবীর কাছ থেকে – যেটা আসলে বেশির ভাগ হাদিসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যা নব্য বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত।
তৃতীয় শর্ত:
কোন হাদিসের ব্যপারে কারো বিচার সে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী রূপে সীমাবদ্ধ রাখবে, যেটা সঠিক ও হতে পারে, ভুল ও হতে পারে এবং তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গীকে নিশ্চিত রূপে সঠিক বলা থেকে বিরত থাকা উচিৎ। এছাড়া যারা তার সাথে দ্বিমত করে তাদের প্রতি অভিযোগ করা থেকে এবং মুসলিম আলেমগণের বুদ্ধিমত্তার উপর কুৎসা রটনা থেকে ও বিরত থাকা উচিৎ। এটা সেই সব ক্ষেত্রে ও প্রযোজ্য যেখানে এ রকম দৃষ্টিভঙ্গী রাখার পিছনে যুক্তিগ্রাহ্য কারণ রয়েছে, এবং সে যদি এই ব্যপারে কথা বলার যোগ্যতাসম্পন্ন এবং এ গুলো বোঝা ও পর্যালোচনা করার মত দক্ষও হয়। একটি হাদিস কোন বিশেষ কারণে একজন আলেমের কাছে যঈফ মনে হতে পারে, কিন্তু তিনি যারা হাদিসটি গ্রহণ করেছে তাদের ব্যাপারে বিদ্বেষপূর্ণ সুরে কথা বলবেন না।
যে এই ৩ টি শর্তের সাথে একমত নয় এবং হাদিস অস্বীকার এবং প্রত্যাখ্যান করার ব্যপারে অটল থাকে সে নিজেকে বিশাল বিপদের মধ্যে নিমজ্জিত করছে। কারণ কোন মুসলিমের জন্য যথাযথ কার্যপদ্ধতি এবং কোন নীতিমালা অনুসরণ ব্যতীত উপসংহারে উপনীত হওয়া এবং অন্য আলেমদেরকে সমালোচনা করা (যারা তার সাথে দ্বিমত করে) জায়েজ নয়। তা না হলে সে ত্রুটি এবং পাপের মধ্যে নিমজ্জিত হতে পারে।
ইমাম আহমাদ বলেছেন: যে আল্লাহর রাসূলের হাদিস কে প্রত্যাখ্যান করে সে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত।
আল- হাসান ইবন ‘ আলী আল- বর্বাহারি বলেছেনঃ
যদি তুমি কোন মানুষকে কোন হাদিসের উপর বিষোদগার করতে অথবা অস্বীকার করতে শোন অথবা হাদিসের উপরে অন্য কিছুকে অগ্রাধিকার দিতে দেখ , তাহলে ইসলামের প্রতি তার অঙ্গীকারকে সন্দেহ করো, সে সন্দেহাতীত ভাবে খেয়াল খুশি মত নিজের ইচ্ছা এবং বিদআতের অনুসরণ করছে।
যখন তুমি কোন হাদিস উদ্ধৃত করো যদি দেখো কেও তার প্রতি মনোযোগ দিচ্ছে না এই কারণে যে সে শুধুমাত্র কুরআন থেকে উদ্ধৃতি শুনতে আগ্রহী, তাহলে তুমি কোন সন্দেহ পোষণ করবে না যে সেই ব্যক্তি পথভ্রষ্টদের পথ অনুসরণ করছে। অতএব তাকে ত্যাগ করো এবং তাকে বিদায় জানিয়ে দাও।
শরহে আস- সুন্নাহ (১১৩-১১৯)।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেছেনঃ
রাসূল তার রবের কাছ থেকে যা কিছুই বর্ণনা করেন তা বিশ্বাস করা বাধ্যামূলক, আমরা তার অর্থ বুঝি আর না বুঝি, কারণ তিনি সর্বাধিক সত্যবাদী। কুরআন এবং সুন্নাহ তে যা কিছুই বলা আছে, প্রত্যেক বিশ্বাসী কে তাতে বিশ্বাস রাখতে হবে, যদি সে এটার অর্থ না ও বোঝে।
মাজমু ‘ আল ফাতাওয়া (৩/৪১)
আরও দেখুন: প্রশ্ন ২৪৫, ৯০৬৭ ও ২০১৫৩।
আল্লাহ সর্বাধিক জ্ঞাত।

English translation:
Ruling on one who rejects a saheeh hadith
115125
Publication : 02-03-2016
Question
Does the one who rejects a saheeh hadith become a disbeliever? One of the brothers rejects some of the saheeh hadiths that are narrated in al-Bukhaari, Muslim and elsewhere, on the grounds that they contradict the Quran. What is the ruling on one who rejects a saheeh hadith? Does he become a disbeliever?
Answer
Praise be to Allah.
Firstly:
The Prophet’s Sunnah is the second source of Islamic sharee‘ah. The revelation came down to the Prophet (blessings and peace of Allah be upon him) with the Sunnah as it came down to him with the Qur’an. The proof of that is the words of Allah, may He be exalted (interpretation of the meaning):
“Nor does he speak of (his own) desire.
It is but a revelation revealed”
[an-Najm 53:3-4].
Allah, may He be exalted, has enjoined upon the believers complete submission to the words of the Prophet (blessings and peace of Allah be upon him) and his hadith and rulings, to the extent that He, may He be glorified, swore by His divine self that whoever hears the words of the Prophet (blessings and peace of Allah be upon him), then rejects them and does not accept them, has nothing to do with faith at all. He, may He be glorified and exalted, said (interpretation of the meaning):
“But no, by your Lord, they can have no Faith, until they make you (O Muhammad (blessings and peace of Allah be upon him)) judge in all disputes between them, and find in themselves no resistance against your decisions, and accept (them) with full submission”
[an-Nisa’ 4:65].
Hence there was consensus among the scholars that whoever denies that the Sunnah constitutes shar‘i evidence in general terms, or rejects a hadith of the Prophet (blessings and peace of Allah be upon him – knowing that it is the words of the Prophet (blessings and peace of Allah be upon him) – is a disbeliever, who has not attained even the lowest level of Islam and submission to Allah and His Messenger.
Imam Is-haaq ibn Raahawayh (may Allah have mercy on him) said:
Whoever hears a report from the Messenger of Allah (blessings and peace of Allah be upon him) that he accepts as being sound, then rejects it, not by way of dissimulation (when he has no choice because of a threat), is a disbeliever. End quote
As-Suyooti (may Allah have mercy on him) said:
You should understand, may Allah have mercy on you, that whoever denies that the hadith of the Prophet (blessings and peace of Allah be upon him) constitutes shar‘i evidence – whether he denies a report that speaks of something that the Prophet (blessings and peace of Allah be upon him) said or did, if that hadith fulfils the conditions stipulated in usool al-hadith – has committed an act of disbelief that puts him beyond the bounds of Islam, and he will be gathered (on the Day of Resurrection) with the Jews and Christians, or with whomever Allah wills of the disbelieving groups. End quote.
Miftaah al-Jannah fi’l-Ihtijaaj bi’s-Sunnah (p 14)
Al-‘Allaamah Ibn al-Wazeer (may Allah have mercy on him) said:
Rejecting the hadith of the Messenger of Allah (blessings and peace of Allah be upon him) when one is aware that it is his hadith constitutes blatant disbelief. End quote.
Al-‘Awaasim wa’l-Qawaasim (2/274)
It says in Fataawa al-Lajnah ad-Daa’imah:
The one who denies that we should follow the Sunnah is a disbeliever, because he is expressing disbelief in Allah and His Messenger, and rejecting the consensus of the Muslims. End quote.
Fataawa al-Lajnah ad-Daa’imah (vol. 2, 3/194)
See also the answers to questions no. 604, 13206 and 77243
Secondly:
As for the one who rejects a hadith and does not accept it, denying that it is the words of the Prophet (blessings and peace of Allah be upon him), he is not like those who come under the first category. We understand that many followers of the new “enlightenment” trend – who have taken it upon themselves to judge the Prophet’s Sunnah on the basis of their views and affiliation – in fact, have not come up with anything new. Rather they are a continuation of the innovators who came before them, whose specious arguments the scholars quoted and took it upon themselves to refute them.
To these people and others like them we say:
Academic methodology dictates that we should examine several important matters before rejecting a hadith or denying that it is the words of the Prophet (blessings and peace of Allah be upon him). These conditions are as follows:
The first condition:
We should see whether there is a complete contradiction between what is mentioned in the hadith and what is mentioned in a Qur’anic text that is clear and unambiguous in meaning and not abrogated. We should emphasise here the condition of complete contradiction – and not just an apparent contradiction that may come to the mind of one who hastens to jump to conclusions when examining hadith. Perhaps those who are involved in denying the hadiths will agree with us on this condition, because most of the apparent contradictions that occur to many people are not contradictions in reality; rather they are mere speculation in the mind of the objector and it is possible, with deliberation and by examining the shades of meaning of different words, to answer the one who thinks that there is a contradiction, and demonstrate how the hadith is in harmony with the fundamentals and sublime aims of sharee‘ah. Whoever studies the book of al-‘Allaamah Ibn Qutaybah ad-Deenoori entitled Mukhtalif al-Hadith will realise how reckless many of them were in their denial of hadiths on the basis of the claim that they are not in accordance with the Qur’an, or that they contradict sound reasoning, but when Ibn Qutaybah mentions the correct explanation of these hadiths given by the scholars, it becomes clear that there is a sound interpretation for them that is in harmony with Islamic teachings, and that the notion that these hadiths contradict the Quran is based on corrupt understanding.
We ask these people and their ilk, who have the audacity to reject the Sunnah and cast aspersions on the hadiths of the Prophet (blessings and peace of Allah be upon him) without any academic methodology or acceptable critical guidelines, and without properly understanding the fundamentals of hadith science that they are talking about, the following:
Do you think that it is possible for a hadith to completely contradict the Holy Qur’an to the extent that the examiner may think that this hadith is not the words of the Prophet (blessings and peace of Allah be upon him), at the time when we see all the scholars of Islam, from the time of the Companions of the Messenger of Allah (blessings and peace of Allah be upon him) up until the present day, in agreement on accepting this hadith and commenting on it, interpreting it, quoting it as evidence and acting upon it?
Doesn’t rational thinking – on which they claim to base their argument – dictate that they should respect the consensus of specialists on the matter that is at the heart of their specialty?
Can anyone have the audacity to say that physicists, chemists, mathematicians, educationalists or economists, for example, have made a mistake if they agree on a matter – especially when the one who is objecting to them is not one of the specialists in that field; rather all that can be said is that he has read some articles about it or a few books along the lines of Science For Dummies or The Complete Idiot’s Guide to Science [i.e., books that offer a basic introduction to a field]?
The second condition:
There should be a weakness in one of the links of the isnaad that could have led to the mistake mentioned in the text.
Similarly, we think that this condition is in harmony with sound methodology and is a valid condition. No one should disagree on this point who understands anything about the principles of academic criticism. Denying that a text is the words of the Prophet (blessings and peace of Allah be upon him) should mean that there is a weak link in the chain of narration that led us to mistakenly believe that this hadith is the words of the Prophet (blessings and peace of Allah be upon him), when in fact it is not.
Imam ash-Shaafa‘i (may Allah have mercy on him) – who is prominent in terms of knowledge and faith, and was the first one to write on the topic of usool al-fiqh – said:
If a hadith is narrated by trustworthy narrators from the Messenger of Allah (blessings and peace of Allah be upon him), then that is sufficient to regard it as a sound hadith.
Ikhtilaaf al-Hadith, in al-Umm (10/107).
And he said:
There is no other way to determine whether a hadith is sound or otherwise except by knowing how honest and trustworthy the narrators are, with the exception of very few hadiths.
Ar-Risaalah (para. 1099)
And he also said:
Muslims of good character are those who are good and sound in and of themselves… As for what they say and do, it is to be regarded as sound and acceptable, unless we find something in their actions that indicate otherwise. So we should be cautious with them in cases where their actions differ from what is expected of them.
Ar-Risaalah (para. 1029-1030); see also al-Umm (8/518-51 9)
After narrating some of the academic principles concerning this matter, which is something that he discussed a great deal in his various books, Imam ash-Shaafa‘i (may Allah have mercy on him) says that what he stated – some of which we have quoted here – is not the view of only a few scholars, or his own personal view; rather these are the principles on which there was consensus among the scholars who came before him. He says:
At the beginning of this book of mine, I quoted, in support of what I discuss of principles and guidelines, from a number of earlier scholars who had knowledge of the Qur’an and Sunnah, different scholarly opinions, analogy and rational thinking, and none of them differed with another. They said: This is the view of the scholars among the Companions of the Messenger of Allah, the Taabi‘een, and the generation who followed them, and it is our view. Whoever diverges from this path is, in our view, diverging from the path of the Companions of the Messenger of Allah (blessings and peace of Allah be upon him) and the path of the scholars who came after them, until the present day, and he is one of the people of ignorance. And all of them said: we cannot see anything but the consensus of the scholars in all regions, unanimously agreeing to regard as ignorant the one who departs from this path. And they – or most of them – went even further and expressed more stringent views with regard to the one who departs from this path, but there is no need to quote them here.
Ikhtilaaf al-Hadith, al-Umm (10/21). See also: ar-Risaalah (para. 1236-1249).
The first thing that the one who rejected a hadith that is attributed to the Prophet (blessings and peace of Allah be upon him) must do is research and find out the identity of the narrator who was mistaken in his transmission of this hadith. If the one who denies the hadith cannot find an acceptable reason in the isnaad for rejecting the hadith, then this indicates that he is mistaken in his methodology. It also indicates that it is essential to have another look and try to understand the hadith and the Qur’an and the aims and goals of sharee‘ah.
So how about if the hadith was narrated with the soundest isnaads on the face of the earth? How about if the hadith was narrated via many chains of transmission – as is the case with most of the hadiths that are rejected by the proponents of “enlightenment” – and from a number of the Sahaabah (may Allah be pleased with them)?
The third condition:
One should express his reservations about a hadith as a personal view based on his own reasoning, which may be right or wrong, and he should avoid stating his view as certainty, as if it is the correct view. He should also avoid making accusations against others who differ with him or casting aspersions on the intelligence of Muslim scholars. This applies in cases where there is a valid reason to hold such a view, and provided that one is qualified to speak about such matters and is proficient in the skills needed to understand and research them. A hadith may appear to be da‘eef (weak) to one scholar for a particular reason, but he should not speak in accusatory tones of those who accepted the hadith.
Whoever does not comply with these three conditions and persists in denying and rejecting the hadiths is exposing himself to grave danger, because it is not permissible for a Muslim to reach a conclusion that is not based on proper methodology and without following any guidelines, and criticise other scholars (who disagree with him), otherwise he may fall into sin and error.
Imam Ahmad (may Allah have mercy on him) said: Whoever rejects the hadith of the Messenger of Allah (blessings and peace of Allah be upon him) is on the brink of doom. End quote.
Al-Hasan ibn ‘Ali al-Barbahaari said:
If you hear a man casting aspersions upon a hadith or denying a hadith, or giving precedence to something else over a hadith, then suspect his commitment to Islam, for he is undoubtedly following whims and desires and innovation.
If you hear a man, when you quote a hadith, showing no interest in it on the basis that he only wants to hear quotations from the Qur’an, you should not doubt that he is a man who is following the path of the heretics, so get up and leave him, and bid him farewell. End quote.
Sharh as-Sunnah (113-119)
Shaykh al-Islam Ibn Taymiyah (may Allah have mercy on him) said:
Whatever the Messenger (blessings and peace of Allah be upon him) narrates from his Lord, it is obligatory to believe in it, whether we understand its meaning or not, because he is the most truthful one [namely the Prophet (blessings and peace of Allah be upon him)]. Whatever it says in the Qur’an and Sunnah, every believer must believe in it, even if he does not understand its meaning. End quote.
Majmoo‘ al-Fataawa (3/41)
See also the answers to questions no. 245, 9067 and 20153
And Allah knows best.

এই ফতোয়ার মূল বক্তব্যে সুন্নাহর প্রামাণ্যতা অস্বীকারকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। নির্দিষ্ট হাদিসের উৎস সম্পর্কে আপত্তির জন্যও কোরআনের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিরোধ, সনদে ভুলের উৎস এবং নিজের সিদ্ধান্তকে সম্ভাব্য বিচার হিসেবে প্রকাশের শর্ত দেওয়া হয়েছে। এই শর্তগুলো ওয়েবসাইটটির ধর্মীয় পদ্ধতির অংশ। কোনো সমালোচক সনদে একটি নির্দিষ্ট ভুলের উৎস শনাক্ত করতে পারেননি—এই তথ্য থেকে বক্তব্যটি অবশ্যই সত্য, অথবা তার আইন অবশ্যই ন্যায়সংগত—কোনোটিই প্রতিষ্ঠিত হয় না। বর্ণনার উৎস, ঐতিহাসিক সত্যতা এবং বিধানের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা পৃথক প্রশ্ন। উত্তরে ব্যবহার করা ধর্মীয় মানদণ্ড সেই প্রশ্নগুলোকে একই ফলাফলে নিয়ে যাওয়ার দাবি করে। সুন্নাহর কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য এই পদ্ধতিতে স্বাধীন আপত্তির গ্রহণযোগ্য পরিসরও সীমিত করা হয়েছে। [132]

هل يكفر من يرد الحديث الصحيح ؟ أحد الإخوة يرد بعض الأحاديث الصحيحة الواردة فی الصحيح : البخاری ومسلم وغيرها… بحجة أنها تعارض القرآن ، فما حکم من يرد الحديث الصحيح ، هل يکفر ؟
الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله، وبعد:
أولا :
السنة النبوية هي المصدر الثاني للتشريع ، فقد كان الوحي ينزل على النبي صلى الله عليه وسلم بالسنة كما ينزل عليه بالقرآن ، ومصداق ذلك قول الله تعالى : ( وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى . إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى ) النجم/3-4.
وقد أوجب الله تعالى على المؤمنين التسليم التام لكلام النبي صلى الله عليه وسلم وحديثه وحكمه ، حتى لقد أقسم بنفسه سبحانه أن من سمع كلام النبي صلى الله عليه وسلم ثم رده ولم يقبل به : أنه ليس من الإيمان في شيء ، فقال عز وجل : ( فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ) النساء/65.
ولذلك وقع الاتفاق بين أهل العلم على أنَّ مَن أنكر حجية السنة بشكل عام ، أو كذَّبَ حديث النبي صلى الله عليه وسلم – وهو يعلم أنه من كلامه صلى الله عليه وسلم – فهو كافر ، لم يحقق أدنى درجات الإسلام والاستسلام لله ورسوله .
قال الإمام إسحاق بن راهويه رحمه الله :
” من بلغه عن رسول الله صلى الله عليه وسلم خبرٌ يُقرُّ بصحته ثم رده بغير تقية فهو كافر” انتهى.
وقال السيوطي رحمه الله :
” اعلموا رحمكم الله أنَّ مَن أنكر كون حديث النبي صلى الله عليه وسلم – قولا كان أو فعلا بشرطه المعروف في الأصول – حجة كفر ، وخرج عن دائرة الإسلام ، وحشر مع اليهود والنصارى أو من شاء من فرق الكفرة ” انتهى.
“مفتاح الجنة في الاحتجاج بالسنة” (ص/14)
وقال العلامة ابن الوزير رحمه الله :
” التكذيب لحديث رسول الله صلى الله عليه وسلم مع العلم أنه حديثه كفر صريح ” انتهى.
“العواصم والقواصم” (2/274)
جاء في “فتاوى اللجنة الدائمة” :
” الذي ينكر العمل بالسنة يكون كافرا ؛ لأنه مكذب لله ولرسوله ولإجماع المسلمين ” انتهى.
“المجموعة الثانية” (3/194)
وانظر جواب السؤال رقم : (604 ) ، (13206 ) ، (77243 )
ثانيا :
أما مَن رَدَّ الحديث ولم يقبله ، مُنكِرًا أن يكون من كلام النبي صلى الله عليه وسلم ، فهذا ليس كالقسم الأول ، ونحن ندرك أن أكثر أصحاب التيار ” التنويري ” الجديد ، هم الذين تصدوا للحكم على السنة النبوية من خلال آرائهم وتوجهاتهم ، وهؤلاء ـ في واقع الأمر ـ لم يأتوا بجديد ، وإنما هم امتداد لأهل البدع من قبلهم ، الذين حكى أهل العمل شبهاتهم ، وتولوا الردع عليها .
ولهؤلاء ، وأمثالهم نقول :
المنهجية العلمية تقتضي النظر في أمور مهمة قبل رد الحديث وإنكار أن يكون من كلام النبي صلى الله عليه وسلم ، وهذه الشروط هي :
الشرط الأول :
المناقضة التامة بين ما ورد في الحديث وما ورد في القرآن الكريم من نص واضح الدلالة غير منسوخ ، ونحن نؤكد هنا على قيد ” المناقضة التامة “، وليس مجرد تعارض ظاهري يبدو في ذهن الناظر العجل ، ولعل أولئك الذين يخوضون في إنكار الأحاديث يوافقوننا على هذا التقييد ؛ لأن غالب التعارض الظاهري الذي يعرض في أذهان كثير من الناس لا حقيقة له ، وإنما هو ظنٌّ قائمٌ في ذهن المعترض ، يمكن بالتأمل وتلمس أوجه اللغة والمعاني الجواب عليه ، وبيان موافقته لأصول الشريعة ومقاصدها ، ومن تأمل كتاب العلامة ابن قتيبة الدينوري ، المسمى ” مختلف الحديث “، عرف قدر المجازفة التي جازفها كثيرون في إنكارهم الأحاديث بدعوى عدم موافقتها للقرآن ، أو عدم تصديق العقل بما فيها ، ثم إذا ذكر ابن قتيبة تفسير العلماء الصحيح لهذه الأحاديث تبين أن لها أوجها صحيحة موافقة للشريعة ، وأن توهم المعارضة للقرآن إنما هو ظنون فاسدة .
إننا نسأل هؤلاء وأمثالهم ممن يتجرأ على رد السنة ، والطعن في أحاديث النبي صلى الله عليه وسلم ، من غير منهجية علمية ، أو أصول نقدية مقبولة ، ومن غير أن يحكموا أصول العلم الذي يتحدثون فيه :
هل ترون أن مِن الممكن أن يناقض الحديثُ القرآن الكريم مناقضة تامة بحيث يجزم الناقد بأن هذا الحديث ليس من كلام النبي صلى الله عليه وسلم ، ونرى مع ذلك جميع علماء الإسلام ، من لدن صحابة رسول الله صلى الله عليه وسلم إلى يومنا هذا ، متوافقين على قبول هذا الحديث وشرحه وتفسيره والاستدلال به والعمل بما جاء فيه ؟!
ألا يقضي العقل السليم – الذي يزعمون التحاكم إليه – باحترام اتفاق أهل التخصص على أمر هو في صلب تخصصهم ؟!
هل يجرؤ أحد على تخطئة علماء الفيزياء أو الكيمياء أو الرياضيات أو علوم التربية أو الاقتصاد مثلا إذا اتفقوا وتواردوا على أمر معين ، خاصة إذا لم يكن المعترض عليهم من أهل العلم بذلك التخصص ، وإنما غاية أمره أن يكون قد قرأ بعض المقالات حوله ، أو شيئا من كتب : تبسيط العلوم ، أو : العلم لكل الناس ؟!
الشرط الثاني :
وجود حلقة من حلقات الضعف الإسنادي ، التي تتحمل الخطأ الوارد في المتن :
ونظن – كذلك – أن هذا الشرط منهجي قويم ، لا ينبغي أن يخالف فيه من يفهم شيئا في أصول النقد العلمي ، وذلك أن إنكار المتن أن يكون من كلام النبي صلى الله عليه وسلم ، يعني وجود حلقة ضعيفة في السند هي التي أوهمتنا أن هذا الحديث من كلام النبي صلى الله عليه وسلم ، وهو ـ فعليا ـ ليس كذلك .
يقول الإمام الشافعي رحمه الله ، وهو من هو في منازل العلم والإيمان ، وهو أول من صنف في علم أصول الفقه :
” الحديث إذا رواه الثقات عن رسول الله صلى الله عليه وسلم ، فذلك ثبوته “
“اختلاف الحديث ـ ضمن الأم ـ (10/107) ” .
ويقول :
” لا يُستدل على أكثر صدق الحديث وكذبه ، إلا بصدق المُخْبِر ، إلا في الخاص القليل من الحديث ” .
“الرسالة” : فقرة (1099) .
ويقول أيضا :
” المسلمون العدولُ : عدولٌ أصحاء الأمر فى أنفسهم … ، وقولُهم عن خبر أنفسهم ، وتسميتُهم : على الصحة والسلامة ، حتى نستدل من فعلهم بما يخالف ذلك ، فنحترسَ منهم في الموضع الذي خالف فعلُهم فيه ما يجب عليهم ” .
“الرسالة” : فـ (1029-1030) ، وانظر : الأم (8/518-519) .
وبعد أن يحكي الإمام الشافعي رحمه الله بعض الأصول العلمية في هذا الباب ، وهو أمر تعرض له كثيرا في كتبه المختلفة ، يذكر لنا أن ما قرره ، مما نلقلنا بعضه هنا ، ليس اجتهادا فرديا ، أو مذهبا شخصيا له ، وإنما هي أصول أجمع عليها أهل العلم من قبله . يقول :
” فحكيت عامة معاني ما كتبت في صدر كتابي هذا ، لعدد من المتقدمين في العلم بالكتاب والسنة ، واختلاف الناس ، والقياس ، والمعقول ، فما خالف منهم واحدٌ واحدا ، وقالوا: هذا مذهبُ أهل العلم من أصحاب رسول الله ، والتابعين ، وتابعي التابعين ، ومذهبُنا ؛ فمن فارق هذا المذهب : كان عندنا مفارقَ سبيلِ أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم ، وأهلِ العلم بعدَهم إلى اليوم ، وكان من أهل الجهالة ، وقالوا معا : لا نرى إلا إجماع أهل العلم في البلدان على تجهيل من خالف هذا السبيل ، وجاوزوا ، أو أكثرهم ، فيمن يخالف هذا السبيل ، إلى ما لا أبالي أن لا أحكيه ” !!
” اختلاف الحديث” ـ الأم ـ ( 10/21) ، وانظر نحوا من ذلك في : الرسالة : فـ (1236-1249) .
إن أول ما يجب على من رد حديثا مسندا إلى النبي صلى الله عليه وسلم ، أن يبحث ويفسر من هو الراوي الذي أخطأ في نقله هذا الحديث ، فإذا لم يجد المُنكِرُ سببا إسناديا مقبولا لإنكاره الحديث فذلك علامة على خطأ منهجيٍّ ، وهو علامة أيضا على ضرورة مراجعة فهم الحديث والقرآن والمقاصد الشرعية .
فكيف إذا كان الحديث واردا بأصح الأسانيد على وجه الأرض ، بل كيف لو كان الحديث قد ورد بطرق كثيرة جدا – كما هو حال أكثر الأحاديث التي يردها ” التنويريون ” – ، وعن جماعة من الصحابة رضوان الله عليهم ؟!
الشرط الثالث :
نسبة الأمر كله إلى الاجتهاد المحتمل ، ونبذ أساليب الجزم والحسم واتهام المخالف والطعن في عقول المسلمين ، وهذا فيما إذا كان هناك وجه لهذا الاحتمال ، وكان من يتكلم في هذا مؤهلا ـ بأدوات البحث اللازمة ـ لإدراك ذلك والبحث فيه . فقد يبدو لأحد العلماء ضعف حديث معين لعلة معينة ، ولكنه لا يستعمل لغة الاتهام لكل من قبل الحديث .
فمن خالف هذه الشروط الثلاثة ، وأصر على إنكار الحديث وتكذيبه ، فهذا على خطر عظيم ، إذ لا يجوز للمسلم أن يتأول متهجما من غير شروط ولا ضوابط ، وإلا أثم ووقع في الحرج .
يقول الإمام أحمد رحمه الله :
” من رد حديث رسول الله صلى الله عليه وسلم فهو على شفا هلكة ” انتهى.
ويقول الحسن بن علي البربهاري :
” وإذا سمعت الرجل يطعن على الأثر ، أو يرد الآثار ، أو يريد غير الآثار : فاتّهمه على الإسلام ، ولا تشك أنه صاحب هوى مبتدع .
وإذا سمعت الرجل تأتيه بالأثر فلا يريده ويريد القرآن ، فلا تشك أنه رجل قد احتوى على الزندقة ، فقمْ من عنده وودّعه ” انتهى.
“شرح السنة” (113-119) باختصار.
ويقول شيخ الإسلام ابن تيمية رحمه الله :
” إن ما أخبر به الرسول صلى الله عليه وسلم عن ربه ، فإنه يجب الإيمان به ، سواء عرفنا معناه أو لم نعرف ؛ لأنه الصادق المصدوق . فما جاء في الكتاب والسنة وجب على كل مؤمن الإيمان به ، وإن لم يفهم معناه ” انتهى.
“مجموع الفتاوى” (3/41)
وانظر جواب السؤال رقم : (245 ) ، (9067 ) ، (20153 )
والله أعلم .

বাংলা অনুবাদ:
প্রশ্ন ১১৫১২৫:
কেউ যদি সহীহ হাদিস অস্বীকার করে তাহলে কি সে অবিশ্বাসী তে পরিণত হয়? একজন ভাই বুখারী, মুসলিম এবং অন্যত্র বর্ণিত কিছু সংখ্যক সহীহ হাদীস কোরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হবার কারণে তা অস্বীকার করেন। সহীহ হাদিস অস্বীকার কারীর ব্যাপারে ফয়সালা কি? সে কি একজন অবিশ্বাসী তে পরিণত হয়?
উত্তর
সকল প্রশংসা আল্লাহর। রাসুলের ওপর দরুদ ও সালাম; অতঃপর:
প্রথমত:
ইসলামিক শরীয়াহর দ্বিতীয় উৎস হল নবীর সুন্নাহ। নবীর (সা:) কাছে সেই রূপে সুন্নাহর মাধ্যমে বাণী এসেছে, ঠিক যে রূপে এসেছে কোরআনের মাধ্যমে। আল্লাহর নিজের বাণী ই তার প্রমাণ:
“আর তিনি মনগড়া কথা বলেন না।তাতো কেবল ওহী, যা তার প্রতি ওহীরূপে প্রেরিত হয়।” [আন- নাজম ৫৩:৩-৪ ]
আল্লাহ বিশ্বাসীদের উপর নবীর কথা, হাদীস এবং নির্দেশনা সমূহ এমন ভাবে গ্রহণ করতে বলেছেন যে; তিনি তার পবিত্র সত্তার কসম খেয়ে বলেন, যে কেউ নবীর কথা শ্রবণ করে, তারপর সেটা প্রত্যাখ্যান করে এবং তাদেরকে স্বীকার করে নেয় না তাদের মধ্যে ঈমানের কোনো অংশই নেই। তিনি বলেন:
“কিন্তু না, আপনার রবের শপথ তারা মুমিন হবে না যতক্ষন পর্যন্ত তারা নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার আপনার উপর অর্পণ না করে; অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়।” [আন নিসা ৪:৬৫]
এ কারণে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ঐক্যমত্য ছিল যে, যদি কেউ এটা সাধারণ ভাবে অস্বীকার করে যে সুন্নাহ শরীয়তের একটি দালিলিক উৎস, অথবা নবীর কোনো হাদিস প্রত্যাখ্যান করে এটা জানা সত্ত্বেও যে সেটা নবীর বাণী–তবে সে একজন অবিশ্বাসী, যে কিনা ইসলামের এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি বিশ্বাসের নিম্নতম স্তরেও পৌঁছাতে পারেনি।
ইমাম ইস- হাক ইব্ন রহাওয়াহ বলেনঃ
যদি কেউ আল্লাহর রাসূলের বর্ণিত কিছু শোনে এবং যদি সেটা সে হাদিসটি সহিহ হওয়ার কথা স্বীকার করে, তারপর সেটা প্রত্যাখ্যান করে, প্রাণ বা নিরাপত্তার হুমকির কারণে বাধ্য হয়ে বিপরীত কথা বলার অবস্থা ছাড়া তাহলে সে একজন অবিশ্বাসী।
আস- সুয়ূতী বলেনঃ
এটা বুঝতে হবে যে, যদি কেউ এটা অস্বীকার করে যে নবীর হাদিস শরীয়াহর একটি প্রামাণ্য দলিল- যদি সে এমন কোন বিবরণ অস্বীকার করে যেটা এমন কিছু বর্ণনা করে যা নবী বলেছেন বা করেছেন, যদি সেই হাদিস টা হাদিসের উসুলের শর্ত সমূহ পূরণ করে- তাহলে সে কুফরি করল এবং ইসলামের গণ্ডির বাইরে চলে গেল এবং সে ইহুদি এবং খ্রিস্টান দের দলভুক্ত হবে (কিয়ামতের দিন) অথবা অন্য যে কোন অবিশ্বাসী দলের সাথে যার সাথে আল্লাহ চান। [মিফতাহ আল-জান্নাহ ফী’ ইহতিযাজ বি’স – সুন্নাহ (পৃষ্ঠা ১৪)]
আল- ‘ আল্লামাহ ইবন আল- ওয়াজির বলেনঃ
যখন কেউ জেনে শুনে আল্লাহর রাসূলের হাদিস অস্বীকার করে এটা ভয়ংকর অবিশ্বাসের সামিল। [আল-‘ আওয়াসিম ওয়া’ল – কাওয়াসিম (২/২৭৪)]
ফাতাওয়া আল – লাজনাহ আদ – দা ‘ ইমাহ তে বলা হয়েছে:
যে ব্যক্তি এটা অস্বীকার করে যে, আমাদের সুন্নাহ্ মেনে চলা উচিৎ তাহলে সে একজন অবিশ্বাসী, কারন সে আল্লাহ এবং তার রাসূলের প্রতি অবিশ্বাস জ্ঞাপন করছে এবং সমগ্র মুসলিমদের ঐক্যমত কে পরিত্যাগ করছে। [ফাতাওয়া আল – লাজনাহ আদ – দা ‘ ইমাহ (ভল.২,৩/১৯৪)
আরও দেখুন: প্রশ্ন ৬০৪, ১৩২০৬ ও ৭৭২৪৩।
দ্বিতীয়ত:
আর যে ব্যক্তি কোন হাদিস স্বীকার না করে তা পরিত্যাগ করে এ জন্য যে তা আসলে নবীর কথা নয়, সে প্রথম শ্রেণীভুক্ত মানুষদের মত নয়। আমরা এটা বুঝি যে নতুন “যুক্তিবাদী জ্ঞানালোকিত” ধারার অনেক অনুসারী আছেন- যারা তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ধ্যান ধারণা দিয়ে নবীর সুন্নাহ কে বিচার করছেন – তারা আসলে নতুন কিছুই করছেন না। উপরন্তু তারা তাদের পূর্ববর্তী বিদআতীদের ই অনুসারী, যাদের অসার দাবিকে বিশেষজ্ঞ গন তাদের যুক্তি দ্বারাই খণ্ডন করেছেন।
এ সকল ব্যক্তিবর্গ এবং তাদের মত আরও যারা আছেন তাদের প্রতি এটাই বলবো যে:
তাত্ত্বিক পদ্ধতি অনুযায়ী কোন হাদীস প্রত্যাখ্যান করার পূর্বে অথবা সেটা যে রাসূলের বাণী তা অস্বীকার করার পূর্বে আমাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ন বিষয় যাচাই করে দেখতে হবে। এই শর্তসমূহ নিম্নরূপঃ
প্রথম শর্ত:
আমাদের দেখতে হবে যে হাদীসে যা বর্ণিত হয়েছে তার সাথে কোরআনের পরিষ্কার এবং দ্ব্যর্থহীন ভাবে উল্লেখিত কোন কিছু যা পরবর্তীতে বাতিল করা হয়নি তার মধ্যে কোন বৈসাদৃশ্য আছে কিনা। এখানে আমাদের সম্পূর্ণ বৈপরীত্য আছে কিনা এই শর্তের উপর জোর দিতে হবে – কোন আপাত প্রতীয়মান বৈসাদৃশ্য থেকে কোন সিদ্ধান্তে আসা যাবে না যেটা হাদিস পরীক্ষা করে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তে আসতে চাওয়া কারো মাথায় আসতে পারে। সম্ভবত যারা হাদিস অস্বীকার করতে চায় তারাও আমাদের সাথে এই শর্তের ব্যপারে একমত হবে। কারন অধিকাংশ আপাত বৈসাদৃশ্য যেগুলো মানুষের মনে উদয় হয় সেগুলো আসলে বাস্তবিক অর্থে বৈসাদৃশ্য নয়; বরঞ্চ সেগুলো আপত্তিকারির মনে উদিত হওয়া নিছক কল্পনা মাত্র এবং যে ব্যক্তি বৈসাদৃশ্য আছে মনে করে- সুচিন্তিত পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন শব্দের বৈচিত্রপূর্ন অর্থ সমূহ পরীক্ষা করে তাকে জবাব দেয়া সম্ভব এবং এটা প্রমাণ করা যায় যে কিভাবে হাদিস সমূহ বুনিয়াদি বিষয়াদির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং তা শরীয়তের উদ্দেশ্য কে মহিমান্বিত করে। কেউ যদি আল-‘আলামাহ্ ইবন কুতাইবাহ আদ- দীরুনির মুখতালিফ আল-হাদিস পড়ে তাহলে অনুধাবন করতে পারবে যে, যারা কুরআনের সাথে সামঞ্জ্যপূর্ণ নয় অথবা তারা যুক্তিগ্রাহ্য বিচারে বৈসাদৃশ্য পূর্ন এই অভিযোগে হাদিস সমূহ অস্বীকার করে তাদের অনেকেই কত টা বেপরোয়া। কিন্তু যখন ইবন কুতাইবাহ্ স্কলার দের দেয়া এসব হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা পেশ করেন, এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে এ সব হাদিসের যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা আছে যা ইসলামের শিক্ষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং এই সমস্ত হাদিস সমূহ কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক বলে যে ধারণা প্রচলিত আছে তা আসলে বিকৃত উপলব্ধির উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।
যে সমস্ত মানুষ সুন্নাহ কে প্রত্যাখ্যান করার ধৃষ্টতা দেখায় এবং কোন তাত্ত্বিক পদ্ধতি অথবা গ্রহণযোগ্য স্পষ্ট নির্দেশিকা ছাড়া রাসূলের হাদিস সমূহ কে সমালোচনা করে এবং সঠিক ভাবে হাদিস শাস্ত্রের বুনিয়াদী বিষয় সমূহ অনুধাবন না করে সে সম্পর্কে কথা বলে সেই সব লোকদের কাছে আমাদের প্রশ্ন:
কোন নিরীক্ষকের মনে হতে পারে যে এই হাদিস আসলে রাসূলের বাণী নয়, এর উপর ভিত্তি করে আপনি কি মনে করেন যে কোন হাদিস সম্পূর্ণ রূপে পবিত্র কোরআনের বিপরীত হতে পারে যেখানে আমরা দেখতে পাই যে আল্লাহর রাসূলের সাহাবীগণের সময়কাল থেকে আজ পর্যন্ত সকল ইসলামী বিশেষজ্ঞগণ হাদিসের গ্রহণ যোগ্যতার উপর ঐক্যমত পোষণ করেন এবং এর উপর মন্তব্য করেন, ব্যাখ্যা করেন, প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং এর উপর আমল করেন।
যুক্তিসংগত চিন্তাধারা (যেটাকে তারা তাদের যুক্তির ভিত্তি বলে দাবি করে) কি এটাই নির্দেশ করে না যে তারা বিশেষজ্ঞদের সেই বিষয়ের উপর ঐক্যমত্যকে সম্মান করবে যেটা তাদের বিশেষ জ্ঞানের কেন্দ্রীয় অংশ।
উদাহরণ স্বরূপ কেউ কি এমন কথা বলার দুঃসাহস দেখাবে যে পদার্থবিদগণ, রসায়নবিদগণ, গণিতবিদগণ, শিক্ষাবিদগণ অথবা অর্থনীতিবিদরা একটি ভুল করে ফেলেছেন যদি তারা কোন বিষয়ের উপর একমত হন – বিশেষত যখন সেই ব্যক্তি যিনি তাদের উপর অভিযোগ করছেন নিজেই ওই বিষয়ের উপর বিশেষজ্ঞ না হন; বরঞ্চ যেটা বলা যেতে পারে যে তিনি ওই বিষয়ে কয়েকটি নিবন্ধ পড়েছেন মাত্র অথবা বিজ্ঞান সংক্রান্ত কিছু শিক্ষানবিস বই অথবা বিজ্ঞান বিষয়ক ‘The complete idiot’s guide’ (যে বইগুলো কোন বিষয়ের উপর একেবারে প্রাথমিক ধারণা দেয়)।
দ্বিতীয় শর্ত:
সনদে উল্লেখিত সূত্র সমূহের মধ্যে কোন একটি তে দুর্বলতা থাকবে যেটার মাধ্যমে হাদীসে উল্লেখিত ভুল হয়ে থাকতে পারে।
অনুরূপভাবে, আমরা মনে করি যে এই শর্তটি যুক্তিযুক্ত কার্যপ্রণালীর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং একটি অকাট্য শর্ত। যারা একাডেমিক সমালোচনার মূলনীতি সম্পর্কে কোন কিছু বোঝে তারা কখনই এই বিষয়ে ভিন্নমত করবে না। কোন হাদিস কে রাসূলের বাণী হিসেবে অস্বীকার করার মানে এই হবে যে বর্ণনা সূত্র সমূহের মধ্যে কোন একটি দুর্বল সূত্র রয়েছে যেটা আমাদের ভুলবশত বিশ্বাস করতে প্ররোচিত করে যে এই হাদিসটি রাসূলের বাণী, কিন্তু আসলে তা নয়।
ইমাম আশ- শাফা ‘ ই যিনি জ্ঞান এবং বিশ্বাসের জন্য বিখ্যাত এবং উসুল- আল ফিকহ বিষয়ে লেখা লেখি করা প্রথম ব্যক্তি- বলেছেনঃ
যদি কোন হাদিস রাসূলের নিকট হতে কোন বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনাকারীর মাধ্যমে বর্ণিত হয়, তাহলে এটিকে সহীহ হাদীস হিসেবে বিবেচনা করতে এটি ই যথেষ্ঠ হবে। [ইখতিলাফ আল- হাদীস,ইন আল- উম্ম (১০/১০৭)]
এবং তিনি বলেনঃ
খুব অল্প কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া, কোন হাদিস সহীহ কিনা তা নির্ধারণ করতে বর্ণনাকারীরা কত টা সৎ এবং বিশ্বাসযোগ্য তা যাচাই করা ছাড়া ভিন্ন কোন পথ নেই। [আর- রিসালাহ (পারা ১০৯৯)
এবং তিনি আরো বলেন:
ন্যায়পরায়ণ মুসলিমদের নিজেদের অবস্থা ন্যায়পরায়ণ ও সঠিক বলে গণ্য করা হয়; নিজেদের সম্পর্কে তাঁদের বিবরণ ও পরিচয়ও সঠিক ও অক্ষত বলে গ্রহণ করা হয়, যতক্ষণ না তাঁদের কাজ থেকে তার বিপরীত কিছু জানা যায়। সুতরাং তাদের কাছ থেকে যেটা প্রত্যাশিত সেটা থেকে যখন তাদের কাজের অমিল হয় সেই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তাঁদের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। [আর- রিসালাহ (প্যারা ১০২৯-১০৩০); আরো দেখুন আল- উম্ম (৮/৫১৮-৫১৯)]
এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত কিছু একাডেমিক মূলনীতি উদ্ধৃত করে, যেটা তিনি তার বিভিন্ন কিতাবে প্রচুর পরিমাণে আলোচনা করেছেন- ইমাম আশ- শাফা ‘ ই বলেন – (যার মধ্যে কিছু আমরা এখানে উল্লেখ করেছি) – তিনি যা বলেছেন তা শুধুমাত্র অল্প কয়েক জন বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গী নয়, অথবা তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী নয়, বরঞ্চ এগুলো সেই সব মূলনীতি যার উপরে আলেমগণের ঐকমত্য ছিল যারা তার আগে এসেছেন।
তিনি বলেনঃ
আমার এই বইয়ের শুরুতে, আমি যে মূলনীতি এবং নির্দেশনা সমূহের ব্যাপারে আলোচনা করেছি তার সমর্থনে আমি পূর্ববর্তী বহু আলেমগণের উদ্ধৃতি দিয়েছি যাদের কুরআন এবং সুন্নাহর জ্ঞান ছিল, ভিন্ন ভিন্ন মতামত, ব্যাখ্যা এবং যুক্তির প্রয়োগ ছিল,
এবং তাদের কেউই অন্যদের সাথে এ ব্যপারে ভিন্নমত করেন নি। তারা বলেছেনঃ এটা হল আল্লাহর নবীর সাহাবী, তাবিয়ীন এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মের আলেমগণের দৃষ্টিভঙ্গী এবং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও তাই। আমাদেরকে মতে, যে এই পথ থেকে বিচ্যুত হয় সে আল্লাহর রাসূলের সাহাবীদের এবং তার পর হতে আজ পর্যন্ত আগত আলেমগণের পথ হতে বিচ্যুত হয়েছে এবং সে মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত। এবং তাদের সবাই বলেছেন: আমরা সমগ্র অঞ্চলের আলেমগণের মধ্যে এ ব্যপারে ঐকমত্য ব্যতীত আর কিছুই দেখি না, সর্বসম্মতি ক্রমে তাকে মূর্খ হিসেবে অভিহিত করতে যে এই পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে । এবং তারা অথবা তাদের মধ্যে অধিকাংশই আরো অগ্রসর হয়ে যারা এই পথ থেকে বিচ্যুত হয় তাদের ব্যাপারে আরো কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করছেন, কিন্তু সেগুলো এখানে উদ্ধৃত করার কোন প্রয়োজন নেই।
[ইখতিলাফ আল-হাদিস, আল- উম্ম (১০/২১)। আরো দেখুন: আর- রিসালাহ (প্যারা ১২৩৬-১২৪৯)]
যে নবীর সাথে সংশ্লিষ্ট কোন হাদিস প্রত্যাখ্যান করেছে তার প্রথম যেটি অবশ্যই করা উচিৎ তা হল বর্ণনাকারীর পরিচয় গবেষণা করে খুঁজে বের করা যে এই হাদিস বর্ণনা করার সময় ভুল করেছে। যে হাদিস প্রত্যাখ্যান করে সে যদি হাদিস টি প্রত্যাখ্যান করার জন্য সনদে কোন গ্রহণযোগ্য কারন খুঁজে না পায়, তাহলে এটা নির্দেশ করে যে সে তার কার্যপ্রণালি তে ভুল করছে। এটা আরো নির্দেশ করে যে, এটা জরুরী যে আরো ভালো ভাবে দেখা এবং হাদিস ও কুরআন এবং শরীয়তের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করা ।
যদি হাদিসটি পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধতম সনদে বর্ণিত হয়ে থাকে তাহলে সে ক্ষেত্রে কী হবে? সেক্ষেত্রে কি হবে যদি সেই হাদিসটি অনেকে গুলি সূত্রে বর্ণিত হয় এবং অনেক সাহাবীর কাছ থেকে – যেটা আসলে বেশির ভাগ হাদিসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যা নব্য বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত।
তৃতীয় শর্ত:
কোন হাদিসের ব্যপারে কারো বিচার সে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী রূপে সীমাবদ্ধ রাখবে, যেটা সঠিক ও হতে পারে, ভুল ও হতে পারে এবং তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গীকে নিশ্চিত রূপে সঠিক বলা থেকে বিরত থাকা উচিৎ। এছাড়া যারা তার সাথে দ্বিমত করে তাদের প্রতি অভিযোগ করা থেকে এবং মুসলিম আলেমগণের বুদ্ধিমত্তার উপর কুৎসা রটনা থেকে ও বিরত থাকা উচিৎ। এটা সেই সব ক্ষেত্রে ও প্রযোজ্য যেখানে এ রকম দৃষ্টিভঙ্গী রাখার পিছনে যুক্তিগ্রাহ্য কারণ রয়েছে, এবং সে যদি এই ব্যপারে কথা বলার যোগ্যতাসম্পন্ন এবং এ গুলো বোঝা ও পর্যালোচনা করার মত দক্ষও হয়। একটি হাদিস কোন বিশেষ কারণে একজন আলেমের কাছে যঈফ মনে হতে পারে, কিন্তু তিনি যারা হাদিসটি গ্রহণ করেছে তাদের ব্যাপারে বিদ্বেষপূর্ণ সুরে কথা বলবেন না।
যে এই ৩ টি শর্তের সাথে একমত নয় এবং হাদিস অস্বীকার এবং প্রত্যাখ্যান করার ব্যপারে অটল থাকে সে নিজেকে বিশাল বিপদের মধ্যে নিমজ্জিত করছে। কারণ কোন মুসলিমের জন্য যথাযথ কার্যপদ্ধতি এবং কোন নীতিমালা অনুসরণ ব্যতীত উপসংহারে উপনীত হওয়া এবং অন্য আলেমদেরকে সমালোচনা করা (যারা তার সাথে দ্বিমত করে) জায়েজ নয়। তা না হলে সে ত্রুটি এবং পাপের মধ্যে নিমজ্জিত হতে পারে।
ইমাম আহমাদ বলেছেন: যে আল্লাহর রাসূলের হাদিস কে প্রত্যাখ্যান করে সে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত।
আল- হাসান ইবন ‘ আলী আল- বর্বাহারি বলেছেনঃ
যদি তুমি কোন মানুষকে কোন হাদিসের উপর বিষোদগার করতে অথবা অস্বীকার করতে শোন অথবা হাদিসের উপরে অন্য কিছুকে অগ্রাধিকার দিতে দেখ , তাহলে ইসলামের প্রতি তার অঙ্গীকারকে সন্দেহ করো, সে সন্দেহাতীত ভাবে খেয়াল খুশি মত নিজের ইচ্ছা এবং বিদআতের অনুসরণ করছে।
যখন তুমি কোন হাদিস উদ্ধৃত করো যদি দেখো কেও তার প্রতি মনোযোগ দিচ্ছে না এই কারণে যে সে শুধুমাত্র কুরআন থেকে উদ্ধৃতি শুনতে আগ্রহী, তাহলে তুমি কোন সন্দেহ পোষণ করবে না যে সেই ব্যক্তি পথভ্রষ্টদের পথ অনুসরণ করছে। অতএব তাকে ত্যাগ করো এবং তাকে বিদায় জানিয়ে দাও।
শরহে আস- সুন্নাহ (১১৩-১১৯)।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেছেনঃ
রাসূল তার রবের কাছ থেকে যা কিছুই বর্ণনা করেন তা বিশ্বাস করা বাধ্যামূলক, আমরা তার অর্থ বুঝি আর না বুঝি, কারণ তিনি সর্বাধিক সত্যবাদী। কুরআন এবং সুন্নাহ তে যা কিছুই বলা আছে, প্রত্যেক বিশ্বাসী কে তাতে বিশ্বাস রাখতে হবে, যদি সে এটার অর্থ না ও বোঝে।
মাজমু ‘ আল ফাতাওয়া (৩/৪১)
আরও দেখুন: প্রশ্ন ২৪৫, ৯০৬৭ ও ২০১৫৩।
আল্লাহ সর্বাধিক জ্ঞাত।

ফতোয়াটিতে হাদিসের নির্দিষ্ট বক্তব্য গ্রহণের দাবি কেবল অতীতের একটি তথ্য গ্রহণের দাবি হিসেবে থাকছে না। বক্তব্যটি নবীর বলে প্রতিষ্ঠিত হলে তা প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের সংকট যুক্ত হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে মানুষের সংরক্ষিত একটি বর্ণনা গ্রহণের ওপর বিশ্বাসীর আনুগত্য ও ইসলামের গণ্ডির মধ্যে থাকার প্রশ্ন নির্ভর করে। যে বক্তব্য কোনো আয়াতে সরাসরি নেই, তার বিষয়বস্তুও এই ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার অধীনে আসে। ফলে কোরআনের সাধারণ কর্তৃত্ব হাদিসের বিশেষ বক্তব্যকে কার্যকর বিধানে পরিণত করার কাজে ব্যবহৃত হয়। হাদিস বাদ দিলে সেই বিশেষ বক্তব্যের পরিচয় ও বিষয়বস্তু বাদ পড়ে; গ্রহণ করলে বর্ণনাকারী ও সংকলকদের সংরক্ষিত তথ্যের ওপর নির্ভরতা বহাল থাকে। এই নির্ভরতাই প্রচলিত ব্যবস্থার ভেতরে হাদিসের অপরিহার্য ভূমিকা দেখায়।

ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের ঐকমত্যকে পদার্থবিদ, রসায়নবিদ বা গণিতবিদদের ঐকমত্যের সঙ্গে তুলনা করলেই দুই ধরনের দাবির যাচাইপদ্ধতি অভিন্ন হয় না। কোনো বক্তব্যের পরীক্ষাযোগ্যতা, ব্যবহৃত প্রমাণ এবং ভুল প্রমাণিত হওয়ার সুযোগ আলাদাভাবে বিচারযোগ্য বিষয়। বিশেষজ্ঞের মর্যাদা কোনো নির্দিষ্ট যুক্তির ত্রুটি দূর করে না। একইভাবে সহিহ শ্রেণির সনদ থেকে ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতিটি বিবরণ অবিকল ঘটেছিল অথবা তার নির্দেশ সকল যুগে ন্যায়সংগত—এই সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। ফতোয়ার শর্তগুলো ধর্মীয় প্রামাণ্যতা রক্ষার জন্য নির্ধারিত; সেগুলোকে সর্বজনীন ঐতিহাসিক সত্যের একমাত্র মানদণ্ড করলে যে সিদ্ধান্ত প্রমাণ করার কথা, সেটিই শুরুতে ধরে নেওয়া হয়। একটি ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ গ্রহণযোগ্যতা এবং বাইরের প্রমাণে তার যথার্থতা পৃথক স্তর।

উত্তরের শেষের ইবন তাইমিয়ার উদ্ধৃতিতে কোরআন ও সুন্নাহর বক্তব্যের অর্থ না বুঝলেও বিশ্বাস করার দাবি আছে। বারবাহারির উদ্ধৃতিতে কেবল কোরআন শুনতে চাওয়া ব্যক্তিকে সন্দেহ এবং ত্যাগ করার নির্দেশও রয়েছে। ফলে হাদিসের কর্তৃত্ব এখানে বর্ণনার উৎস সম্পর্কে গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সামাজিক সম্পর্ক ও ধর্মীয় অন্তর্ভুক্তির সীমা নির্ধারণেও কার্যকর। বিশ্বাসী কোন তথ্য গ্রহণ করবেন, কার সমালোচনা শুনবেন এবং কোন বক্তব্যকে প্রশ্নের বাইরে রাখবেন—এসবের ওপর এই কর্তৃত্ব প্রভাব ফেলে। কোনো বক্তব্যকে পবিত্র বা বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা তার সত্যতা বা ন্যায়সংগততা প্রমাণের বিকল্প নয়। অজ্ঞাত অর্থ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা যে পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে ব্যক্তির নিজস্ব বিচার ধর্মীয় আনুগত্যের অধীন হয়ে পড়ে।

আইন হিসেবে কোনো নিষেধ মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও অধিকারে প্রভাব ফেলে। সেই নিষেধের উৎস একটি হাদিস হলে শুধু তার ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাস ঘোষণা করে ওই প্রভাবের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। মুহাম্মদের নামে বর্ণিত হওয়া, কোনো সংকলনে গ্রহণ করা এবং আইন হিসেবে বাধ্যতামূলক করা তিনটি পৃথক ধাপ। প্রথম দুটি ধাপে মানুষের তথ্যসংরক্ষণ ও বিচার কাজ করে; শেষ ধাপে সেই তথ্যকে মানুষের ওপর প্রয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়। ঐশ্বরিক কর্তৃত্বের ঘোষণা এই ধাপগুলোর পার্থক্য দূর করে না। কোনো বিধান অমানবিক বা অন্যায্য হলে তা বাতিলের যৌক্তিকতা তার ফল ও নীতিগত মূল্যায়ন থেকে আসে। একটি ধর্মীয় ফতোয়া আপত্তিকে কুফর বা পথভ্রষ্টতা বলেছে—এ কারণে সেই আপত্তির প্রমাণ ও যুক্তি ভুল হয়ে যায় না।


অন্যান্য আলেমদের মতামত

সমকালীন আলেমদের বক্তৃতা ধর্মীয় শিক্ষার প্রচার এবং কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীরের একটি ভিডিও , ড. আবু বকর যাকারিয়ার ভিডিও এবং আবদুল্লাহ ইবনে আবদুর রাজ্জাকের একটি ভিডিও সমকালীন ধর্মীয় বক্তৃতার উদাহরণ। একই ধরনের বক্তৃতার আরও একটি ভিডিওও এই ধারার প্রচারমাধ্যম। আলেমের নাম ও সামাজিক মর্যাদা একটি বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতায় প্রভাব ফেলতে পারে; বক্তব্যটির প্রমাণ এবং যুক্তি সেই মর্যাদার সঙ্গে অভিন্ন নয়। ধর্মীয় শিক্ষায় সুন্নাহর কর্তৃত্ব গ্রহণ করা হলে নির্দিষ্ট আদেশ–নিষেধের পরিচয়ের জন্য নবীর বক্তব্য ও আচরণের বর্ণনা প্রয়োজন হয়। সেই বর্ণনাকে আইনগত প্রমাণ করা এবং তা থেকে কোনো ব্যাখ্যা গ্রহণের পদ্ধতি লিখিত গ্রন্থেও সংরক্ষিত রয়েছে। বক্তৃতা, লিখিত ব্যাখ্যা এবং বর্ণনার এই ধারায় কোরআনের সাধারণ আনুগত্যকে নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচরণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

শাফিঈ তাঁর আর-রিসালায় সুন্নাহর কর্তৃত্বকে কোরআনে নির্দিষ্ট পাঠ থাকা এবং না থাকা—উভয় ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর বক্তব্যে নবীর সুন্নাহ আল্লাহর ফরজের অর্থ, সময় ও প্রয়োগ বোঝানোর কাজে প্রয়োজনীয়। তিনি সাধারণ নির্দেশ, নির্দিষ্ট নির্দেশ এবং কোরআনে সরাসরি বিধানের পাঠ নেই এমন ক্ষেত্রেও সুন্নাহর ভূমিকা উল্লেখ করেছেন। ফলে হাদিসের গুরুত্বকে শুধু কোরআনের কোনো কঠিন শব্দের অভিধানগত অর্থ বোঝানোর কাজ হিসেবে সীমিত করলে তাঁর বর্ণিত পদ্ধতি বাদ পড়ে যায়। এখানে সুন্নাহ ধর্মীয় কর্তব্যের বাস্তব বিষয়বস্তু নির্ধারণের উৎস। সেই সুন্নাহ জানা যায় নবীর নামে সংরক্ষিত বক্তব্য ও আচরণ থেকে। কোরআনের সাধারণভাবে আনুগত্য করার নির্দেশের সঙ্গে এই নির্দিষ্ট তথ্য যুক্ত করেই প্রচলিত বিধানের কার্যকর রূপ তৈরি হয়। [133]

وأيُّ هذا كان، فقد بيَّن الله أنه فرَضَ فيه طاعة رسوله، ولم يجعل لأحد من خلقه عذرا بخلاف أمرٍ عرَفَه من أمر رسول الله، وأنْ قد جعل الله بالناس الحاجةَ إليه في دينهم، وأقام عليهم حجتَه بما دلَّهم عليه من سنن رسول الله مَعَاني ما أراد الله بفرائضه في كتابه، ليعلم مَن عرَف منها ما وصَفْنا أن سنته – صلى الله عليه – إذا كانت سنة مبيِّنة عن الله معنى ما أراد من مَفْروضه فيما فيه كتابٌ يتْلونَه، وفيما ليس فيه نصُّ كتاب أخْرَى ^{[138] } فهي كذلك أيْنَ كانت، لا يختلف حكمُ الله ثم حكمُ رسوله، بل هو لازم بكلِّ حال. وكذلك قال رسول الله في حديث أبي رافع الذي كتبنا قبْل هذا. وسأذكر مما وصفنا من السنة مع كتاب الله، والسنةِ فيما ليس فيه نص كتاب، بعضَ ما يدل على جملة ما وصفنا منه، إن شاء الله. فأوَّل ما نبدأ به من ذِكْر سنة رسول الله مع كتاب الله: ذِكرُ الاستدلال بسنته على الناسِخ والمَنْسوخ من كتاب الله، ثم ذِكر الفرائض المَنْصوصة التي سن رسول الله معها، ثم ذكر الفرائض الجُمَل التي أبان رسول الله عن الله كيف هي ومواقيتَها، ثم ذكر العام من أمر الله الذي أراد به العام، والعامَّ الذي أراد به الخاصَّ، ثم ذِكرُ سنته فيما ليس فيه نص كتاب.

বাংলা অনুবাদ:
এগুলোর যে ব্যাখ্যাই হোক, আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে এতে তিনি তাঁর রাসুলের আনুগত্য ফরজ করেছেন। তাঁর রাসুলের কোনো আদেশ জানা থাকলে তার বিরোধিতা করার জন্য কোনো সৃষ্টিকে অজুহাত দেননি। তিনি মানুষের ধর্মীয় বিষয়ে তাঁর প্রয়োজন স্থাপন করেছেন এবং রাসুলের সুন্নাহর মাধ্যমে কিতাবে আল্লাহর ফরজ দ্বারা কী অর্থ চাওয়া হয়েছে, তা জানিয়ে তাদের ওপর প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। যাতে এই বিষয়গুলো জানে এমন ব্যক্তি বুঝতে পারে: তাঁর সুন্নাহ যখন পাঠযোগ্য কিতাবের বিধানে আল্লাহর উদ্দেশ্যের ব্যাখ্যা দেয় এবং অন্য যে বিষয়ে কিতাবের সরাসরি পাঠ নেই সেখানেও বিধান দেয়, তখন তা সব ক্ষেত্রেই একই অবস্থানে থাকে। আল্লাহর বিধান এবং তারপর তাঁর রাসুলের বিধানের কর্তৃত্ব পরিবর্তিত হয় না; তা সর্বাবস্থায় বাধ্যতামূলক। আগেই লিখিত আবু রাফির হাদিসে রাসুল এভাবেই বলেছেন। আল্লাহ চাইলে কিতাবের সঙ্গে থাকা সুন্নাহ এবং সরাসরি কিতাবের পাঠ নেই এমন বিষয়ে সুন্নাহর যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তার সামগ্রিক অর্থ বোঝায় এমন কিছু বিষয় উল্লেখ করব। কিতাবের সঙ্গে রাসুলের সুন্নাহর আলোচনায় প্রথমে তাঁর সুন্নাহ দিয়ে কিতাবের নাসিখ ও মানসূখ নির্ণয়, তারপর কিতাবে স্পষ্ট পাঠ থাকা ফরজের সঙ্গে তাঁর সুন্নাহ, তারপর সংক্ষেপে ঘোষিত ফরজের পদ্ধতি ও সময় তিনি কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, তারপর আল্লাহর সাধারণ নির্দেশ যেখানে সাধারণ অর্থ চাওয়া হয়েছে এবং যেখানে বিশেষ অর্থ চাওয়া হয়েছে, এবং শেষে কিতাবের সরাসরি পাঠ নেই এমন বিষয়ে তাঁর সুন্নাহ উল্লেখ করা হবে।

এই পদ্ধতিতে কোরআনের সাধারণ বাক্য এবং সুন্নাহর বিস্তারিত বিষয়বস্তু একসঙ্গে ধর্মীয় আইন গঠন করে। নির্দিষ্ট আচরণ, সময়, শর্ত ও নিষেধের তথ্য ছাড়া সাধারণ কর্তৃত্বের ঘোষণা দিয়ে একই বিধানসমগ্র পাওয়া যায় না। ধর্মীয় বক্তা বা গ্রন্থকার সেই তথ্যকে গ্রহণ করে যে ব্যাখ্যা দেন, তাতেও বর্ণনা নির্বাচন এবং অর্থ নির্ধারণের কাজ রয়েছে। ওই কাজ মানুষের ব্যাখ্যার কাজ; তাকে ঐশ্বরিক মর্যাদা দিলে তার মানবীয় উপাদান মুছে যায় না। আলেমের মর্যাদা, প্রাচীন গ্রন্থের পরিচয় এবং ধর্মীয় আনুগত্যের দাবি কোনো বিধানের ন্যায়সংগততার স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রমাণ নয়। আইন হিসেবে প্রয়োগের ন্যায্যতা এবং বর্ণনার ঐতিহাসিক সত্যতা দুটিরই আলাদা প্রমাণ প্রয়োজন। সুন্নাহর ওপর নির্ভরতা প্রতিষ্ঠা করা সেই সমস্ত বর্ণনা বা সমস্ত বিধানকে সত্য ও ন্যায়সংগত বলে প্রতিষ্ঠা করা নয়।


হাদিসের কতিপয় পরিভাষা

হাদিসের পরিভাষাগুলো বর্ণনার উৎস, বর্ণনাসূত্রের সংযোগ, রাবীর গুণ, মতনের সম্পর্ক এবং ধর্মীয় ব্যবহারের পৃথক দিক বোঝায়। মারফূ বললে কার দিকে বক্তব্য আরোপিত তা বোঝায়; মুত্তাসিল বললে সনদের সংযোগ বোঝায়; সহিহ বললে একগুচ্ছ অভ্যন্তরীণ গ্রহণযোগ্যতার শর্ত পূরণের দাবি বোঝায়। একটির পরিচয় থেকে অন্যটির ফল নিজে পাওয়া যায় না। কোনো বর্ণনা মারফূ হলেও তার সনদ দুর্বল হতে পারে; একটি জনপ্রিয় বক্তব্যের পরিচয়ও তার উৎসের নিশ্চয়তা নয়। ইবন হাজরের নুখবাতুল ফিকরে সহিহ, হাসান, শায, মুনকার, মুতাবি, শাহিদ এবং সনদের বিচ্ছেদের শ্রেণি আলাদা করা হয়েছে। এই শ্রেণিবিন্যাস মানুষের সংরক্ষিত তথ্য পরীক্ষা করার পদ্ধতি; কোনো বিধান ন্যায়সংগত বা অপরিবর্তনীয়—এই নৈতিক সিদ্ধান্ত তার সংজ্ঞার মধ্যে নেই। [134]

وخَبَرُ الآحادِ بِنَقْلِ عَدلٍ تَامِّ الضَّبْطِ، مُتَّصِلَ السَّنَدِ، غَيْرَ مُعَلَّلٍ وَلآ شَاذٍّ: هُوَ الصَّحِيحُ لِذَاتِهِ . وَتَتَفَاوتُ رُتَبُهُ بِتَفَاوُتِ هذِهِ الأَوْصَافِ . وَمِنْ ثَمَّ قُدِّمَ صَحِيحُ الْبُخَارِيِّ، ثُمَّ مُسْلم، ثُمَّ شَرْطُهُمَا . فإِنْ خَفَّ الضَّبْطُ، فَالْحَسَنُ لِذَاتِهِ ، وَبِكَثْرَةِ طُرُقِهِ يُصَحَّحُ. فَإِنْ جُمِعَا فللتَّرَدُّدِ فِي النّاقِل حَيْثُ التَّفَرُّدُ ، وإلا فبِاعْتِبارِ إسْنَادَيْنِ . وزيَادَةُ رَاويهمَا مَقْبُولَةٌ مَا لَمْ تَقَعْ مُنَافِيَةً لِمَنْ هُوَ أَوْثَقُ . فإِنْ خُولِف بِأَرْجَحَ فَالرَّاجِحُ الْمَحْفُوظُ، وَمُقَابِلُهُ الشَّاذُّ ، وَمَعَ الضَّعْف فَالرَّاجِحُ الْمَعْرُوفُ، وَمُقَابلُهُ الْمُنْكَرُ . والْفَرْدُ النِّسْبي إِنْ وَافَقَهُ غَيْرُهُ فَهُوَ المُتَابِعُ ، وَإِنْ وُجِدَ مَتْنٌ يُشْبِهُهُ فهُوَ الشَّاهِدُ. وَتَتَبُّعُ الطُّرُقِ لِذلِكَ هُوَ: الاعْتِبَارُ . ثمَّ الْمَقْبُولُ: إِنْ سَلِمَ مِنَ الْمُعَارَضَةِ، فَهُوَ الْمُحْكَمُ، وَإِنْ عُورضَ بِمثْلِهِ فإِنْ أَمْكَنَ الْجَمْعُ فمُخْتَلِفُ الحَدِيث ، أَوْ لآ، وَثَبَتَ الْمُتَأَخِّرُ فهُوَ النَّاسِخُ وَالآخَرُ الْمَنْسُوخُ ، وَإِلَّا فَالترْجيحُ، ثمَّ التَّوَقُّفُ . ثمَّ الْمَرْدُودُ: إِمَّا أَنْ يكونَ لِسَقَطٍ أَوْ طَعْنٍ: فالسَّقَطُ إِمَّا أَنْ يَكونَ مِنْ مَبَادي السَّنَدِ مِنْ مُصَنِّفٍ، أَوْ مِنْ آخِرِهِ بَعْدَ التَّابِعيّ، أَوْ غَيْر ذلِكَ، فَالأَوَّلُ الْمُعَلَّقُ . وَالثَّاني الْمُرْسَلُ . وَالثَّالِثُ إِنْ كانَ بِاثْنَيْنِ فَصَاعِدًا مَعَ التَّوَالي فهُو الْمُعْضَلُ ، وَإِلا فَالْمُنْقَطِعُ. ثمَّ قَدْ يَكُونُ وَاضِحًا أَوْ خَفِيًّا. فَالأَوَّلُ يُدْرَكُ بعَدَمِ التَّلَاقِي، وَمِنْ ثَمَّ احْتِيجَ إِلَى التَّارِيخِ ، والثَّانِي المُدَلَّسُ، وَيَرِدُ بِصِيغَةٍ تَحْتَمِلُ اللُّقِيَّ كَعَنْ، وَقَالَ، وَكَذَا الْمُرْسَلُ الْخَفيُّ مِنْ مُعَاصِرٍ لَمْ يَلْقَ .

বাংলা অনুবাদ:
ন্যায়পরায়ণ ও পূর্ণ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বর্ণনাকারীর মাধ্যমে আসা, সংযুক্ত সনদবিশিষ্ট, ক্ষতিকর ইল্লত ও শায থেকে মুক্ত আহাদ বর্ণনা সহিহ লিযাতিহি। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর তারতম্যে তার স্তরও ভিন্ন হয়। সে কারণে বুখারীর সহিহ, তারপর মুসলিমের সহিহ, তারপর তাঁদের শর্তকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ধারণক্ষমতা কিছু কম হলে তা হাসান লিযাতিহি; বর্ণনাপথের যথাযথ বহুত্বে তা সহিহ করা হয়। একই বর্ণনায় হাসান ও সহিহ দুটো বলা হলে একক বর্ণনাকারীর ক্ষেত্রে তার সম্পর্কে বিচারের দ্বিধা বোঝানো হতে পারে; অন্য ক্ষেত্রে দুইটি সনদের বিবেচনা হতে পারে। তাঁদের বর্ণনাকারীর অতিরিক্ত তথ্য গ্রহণযোগ্য, যতক্ষণ তা অধিক নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির বিরোধী না হয়। অধিক শক্তিশালী বক্তব্যের বিরোধ হলে অগ্রাধিকারপ্রাপ্তটি মাহফুয এবং বিপরীতটি শায; দুর্বলতার সঙ্গে বিরোধ হলে অগ্রাধিকারপ্রাপ্তটি মা’রুফ এবং বিপরীতটি মুনকার। আপেক্ষিকভাবে একক বর্ণনার সঙ্গে অন্য কেউ একমত হলে সে মুতাবি; অনুরূপ মতন পাওয়া গেলে তা শাহিদ। এই বর্ণনাপথগুলো অনুসন্ধান করাকে ই’তিবার বলা হয়। গ্রহণযোগ্য বর্ণনা বিরোধ থেকে মুক্ত হলে মুহকাম; অনুরূপ গ্রহণযোগ্য বর্ণনার সঙ্গে বিরোধ হলেও সমন্বয় সম্ভব হলে মুখতালিফুল হাদিস। সমন্বয় সম্ভব না হয়ে পরেরটি নির্ধারিত হলে পরেরটি নাসিখ এবং আগেরটি মানসূখ; তা না হলে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, তারপর সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়। প্রত্যাখ্যাত বর্ণনা হয় সনদে বিচ্ছেদ অথবা সমালোচনাযোগ্য ত্রুটির কারণে। বিচ্ছেদ গ্রন্থকারের দিক থেকে সনদের শুরুতে হলে মু‘আল্লাক; তাবেঈর পরে শেষদিকে হলে মুরসাল; অন্য স্থানে ধারাবাহিকভাবে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি বাদ পড়লে মু‘দাল; অন্যথায় মুনকাতি। বিচ্ছেদ প্রকাশ্য বা গোপন হতে পারে। সাক্ষাৎ না হওয়ার তথ্য দিয়ে প্রকাশ্য বিচ্ছেদ জানা যায়, তাই কালানুক্রম জানা প্রয়োজন। গোপন ধরনের মধ্যে মুদাল্লাস আসে, যেখানে “থেকে” বা “বলেছেন” ধরনের সাক্ষাৎ বোঝাতে পারে এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়। সমসাময়িক হয়েও সাক্ষাৎ করেননি এমন ব্যক্তির মুরসাল খফিও এই আলোচনায় আসে।

পরিভাষাসংজ্ঞা ও ব্যবহার
সাহাবীযিনি ঈমানের সঙ্গে মুহাম্মদের সাহচর্য লাভ করেছেন এবং ঈমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করেছেন তাকে মুহাম্মদের সাহাবী বলা হয়।
তাবেঈযিনি মুহাম্মদের কোন সাহাবীর নিকট হাদীস শিক্ষা করেছেন অথবা অন্ততপক্ষ তাঁকে দেখেছেন এবং মুসলমান হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁকে তাবেঈ বলা হয়।
তাবে-তাবেঈযিনি কোন তাবেঈ এর নিকট হাদীস শিক্ষা করেছেন অথবা অন্ততপক্ষ তাঁকে দেখেছেন এবং মুসলমান হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁকে তাবে-তাবেঈ বলা হয়।
মুহাদ্দিসযিনি হাদীস চর্চা করেন এবং বহু সংখ্যক হাদীসের সনদ ও মতন সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান রাখেন তাঁকে মুহাদ্দিস বলা হয়।
শাইখহাদীসের শিক্ষাদাতা রাবীকে শায়খ বলা হয়।
শাইখানসাহাবীগনের মধ্যে আবূ বকর (রা.) ও উমর (রা.) – কে একত্রে শাইখান বলা হয়। কিন্তু হাদীস শাস্ত্রে ইমাম বুখারী (রাহি.) ও ইমাম মুসলিম (রাহি.)-কে এবং ফিক্বহ-এর পরিভাষায় ইমাম আবূ হানীফা (রাহি.) ও আবূ ইউসুফ (রাহি.)-কে একত্রে শাইখান বলা হয়।
হাফিযযিনি সনদ ও মতনের বৃত্তান্ত সহ এক লাখ হাদীস আয়ত্ত করেছেন তাঁকে হাফিয বলা হয়। এই সংখ্যায় একই মতনের পৃথক সনদ ও বর্ণনাপথও গণনা হতে পারে; এটি এক লাখ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র নববী বক্তব্যের দাবি নয়।
হুজ্জাতঅনুরূপভাবে যিনি তিন লক্ষ হাদীস আয়ত্ত করেছেন তাঁকে হুজ্জাত বলা হয়। এই গণনাতেও পৃথক সনদ ও বর্ণনাপথ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। উপাধির সংখ্যাগত ব্যাখ্যা এবং স্বতন্ত্র বক্তব্যের সংখ্যা এক নয়।
হাকিমযিনি সব হাদীস আয়ত্ত করেছেন তাকে হাকিম বলা হয়। এটি জ্ঞানগত মর্যাদার উপাধির একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা; মহাবিশ্বের প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া বর্ণনা জানা ছিল বলে প্রমাণ নয়।
রিজালহাদীসের রাবী সমষ্টিকে রিজাল বলে। যে শাস্ত্রে রাবীগণের জীবনী বর্ণনা করা হয়েছে তাকে আসমাউর-রিজাল বলা হয়।
রিওয়ায়াতহাদীস বর্ণনা করাকে রিওয়ায়াত বলে। কখনও কখনও মূল হাদীসকেও রিওয়ায়াত বলা হয়। যেমন- এই কথার সমর্থনে একটি রিওয়ায়াত (হাদীস) আছে।
মারফূমুহাম্মদের কথা, কাজ, অনুমোদন বা গুণবিবরণের দিকে আরোপিত বর্ণনাকে মারফূ বলা হয়। এই আরোপের পরিচয় এবং সনদ অবিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিচয় এক নয়; মারফূ বর্ণনার সনদ সংযুক্ত বা বিচ্ছিন্ন উভয়ই হতে পারে।
মাওকূফযে হাদীসের বর্ণনা- সূত্র ঊর্ধ্ব দিকে সাহাবী পর্যন্ত পৌঁছেছে , অর্থাৎ যে সনদ -সূত্রে কোন সাহাবীর কথা বা কাজ বা অনুমোদন বর্ণিত হয়েছে তাকে মাওকূফ হাদীস বলে। এর অপর নাম আসার। আসার শব্দটি অন্য বর্ণনার জন্যও ব্যবহৃত হয়; এটি কেবল মাওকূফের একচেটিয়া নাম নয়।
মাকতূকোনো তাবেঈ বা তার পরবর্তী ব্যক্তির কথা, কাজ বা অনুমোদনের দিকে আরোপিত বর্ণনাকে মাকতূ বলা হয়। বর্ণনাটি কার দিকে আরোপিত, এই শ্রেণি তা বোঝায়; সনদ বিচ্ছিন্ন বোঝানো মুনকাতি পরিভাষার সঙ্গে এটি এক নয়।
তা’লীকগ্রন্থকার সনদের নিজের দিকের শুরু থেকে এক বা একাধিক ধারাবাহিক বর্ণনাকারী বাদ দিলে তাকে তা’লীক বলা হয়। কখনও পূর্ণ সনদ বাদ দিয়ে মূল বক্তব্যও লেখা হয়। এই পদ্ধতিতে থাকা বর্ণনাকে মু‘আল্লাক বলা হয়।
মুদাল্লাসরাবী নিজের প্রকৃত শিক্ষকের নাম আড়াল করে অথবা যার কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট হাদিস শোনেননি তার সূত্রে এমন ভাষায় বর্ণনা করলে, যাতে প্রত্যক্ষ শ্রবণের ধারণা হয়, তাকে তাদ্লীস বলা হয়। বর্ণনাটি মুদাল্লাস এবং এই কাজের বর্ণনাকারী মুদাল্লিস। শিক্ষককে অস্পষ্ট নামে পরিচয় দেওয়ার ধরনও তাদ্লীসের আলোচনায় আসে। নিজে শোনা এবং শুনেছেন বলে ধারণা সৃষ্টি করা তাই এক ঘটনা নয়।
মুযতারাবএকটি বর্ণনার মতন বা সনদ এমন পরস্পরবিরোধী রূপে এসেছে, যেগুলোর মধ্যে গ্রহণযোগ্য সমন্বয় বা কোনো একটির যথার্থ অগ্রাধিকার নির্ধারণ সম্ভব নয়—এমন হলে তাকে মুযতারাব বলা হয়। শুধু একাধিক ভাষা বা রূপ থাকা যথেষ্ট নয়। এই অমীমাংসিত অসংগতি থাকলে বর্ণনাটি সেই অবস্থায় প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারযোগ্য থাকে না।
মুদ্রাজযে হাদীসের মধ্যে রাবী নিজের অথবা অপরের উক্তিকে অনুপ্রবেশ করিয়েছেন, সে হাদীসকে মুদ্রাজ এবং এইরূপ করাকে ‘ইদরাজ’ বলা হয়।
মুত্তাসিলযে হাদীসের সনদের ধারাবাহিকতা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পূর্ণরূপে রক্ষিত আছে, কোন স্তরেই কোন রাবীর নাম বাদ পড়ে নি তাকে মুত্তাসিল হাদীস বলে।
মুনকাতিযে হাদীসের সনদে ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয় নি, মাঝখানে কোন এক স্তরে কোন রাবীর নাম বাদ পড়েছে, তাকে মুনকাতি হাদীস, আর এই বাদ পড়াকে ইনকিতা বলা হয়।
মুরসালযে হাদীসের সনদে ইনকিতা শেষের দিকে হয়েছে, অর্থাৎ সাহাবীর নাম বাদ পড়েছে এবং তাবেঈ সরাসরি মুহাম্মদের উল্লেখ করে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাকে মুরসাল হাদীস বলা হয়। এটি পরবর্তী মুহাদ্দিসদের বিশেষ সংজ্ঞা; বিস্তৃত ব্যবহারে অন্যান্য বিচ্ছিন্ন বর্ণনাকেও মুরসাল বলা হয়েছে।
মু’আল্লাকসনদের শুরুতে গ্রন্থকারের দিক থেকে এক বা একাধিক ধারাবাহিক রাবী বাদ পড়লে বর্ণনাকে মু‘আল্লাক বলা হয়। শুরু বলতে সাহাবির পরের অংশ নয়; সংশ্লিষ্ট গ্রন্থকার বা বর্ণনাকারী থেকে তাঁর শিক্ষকের দিকে শুরু হওয়া অংশ বোঝায়। কখনও পুরো সনদ বাদ পড়ে শুধু মূল বক্তব্য থাকে।
মু‘দালসনদে দুই বা ততোধিক রাবী ধারাবাহিকভাবে বাদ পড়লে তাকে মু‘দাল বলা হয়। শুধু মোট দুইজনের নাম বাদ থাকা যথেষ্ট নয়; একই ধারার পাশাপাশি স্তরে বিচ্ছেদ থাকা এই পরিভাষার নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য।
মুতাবি ও শাহিদএকই সাহাবির সূত্রে কোনো বর্ণনার পক্ষে অন্য বর্ণনাপথ পাওয়া গেলে তাকে মুতাবি এবং এই সম্পর্ককে মুতাবা’আত বলা হয়। অন্য সাহাবির সূত্রে অনুরূপ বিষয়বস্তু পাওয়া গেলে তাকে শাহিদ এবং সম্পর্ককে শাহাদাত বলা হয়। এগুলো দিয়ে প্রথম বর্ণনার শক্তি বৃদ্ধি পেতে পারে; একই দুর্বল মূল থেকে তৈরি একাধিক অনুলিপি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাধীন সমর্থন নয়। সমর্থনের প্রকৃতি তাই আলাদাভাবে নির্ধারিত হয়।
মা‘রূফ ও মুনকারকোন দুর্বল রাবীর বর্ণিত হাদীস অপর কোন মাকবূল (গ্রহণযোগ্য) রাবীর বর্ণিত হাদীসের বিরোধী হলে তাকে মুনকার বলা হয় এবং মাকবূল রাবীর হাদীসকে মা‘রূফ বলা হয়।
সহীহযে মুত্তাসিল হাদীসের সনদে উল্লেখিত প্রত্যেক রাবীই পূর্ণ আদালত ও যাবত (ধারণ ক্ষমতা) গুণ সম্পন্ন এবং হাদীসটি যাবতীয় দোষত্রুটি ও শায মুক্ত তাকে সহীহ হাদীস বলে। এখানে দোষত্রুটি বলতে ক্ষতিকর ইল্লত বোঝায়। এটি হাদিসশাস্ত্রের অভ্যন্তরীণ গ্রহণযোগ্যতার সংজ্ঞা; বিধানের নৈতিক ন্যায্যতা এই সংজ্ঞার অংশ নয়।
হাসানসনদের সংযোগ, রাবীর আদালত, শায ও ক্ষতিকর ইল্লত থেকে মুক্তিসহ সহিহের অন্যান্য শর্ত থাকে, কিন্তু রাবীর যাবত বা ধারণক্ষমতা সহিহের পূর্ণ মানের তুলনায় কিছু কম—এমন বর্ণনাকে হাসান লিযাতিহি বলা হয়। যাবত একেবারেই অনুপস্থিত থাকে না। যথাযথ সমর্থনের ফলে দুর্বল বর্ণনা হাসান লিগাইরিহি হিসেবে গৃহীত হওয়ার শ্রেণিও আছে। ফকিহরা সাধারণত সহিহ ও হাসান বর্ণনা আইনগত বিধান নির্ধারণে ব্যবহার করেন।
যঈফসহিহ বা হাসান হিসেবে গ্রহণের প্রয়োজনীয় এক বা একাধিক শর্ত পূরণ না হলে বর্ণনাকে যঈফ বা দুর্বল বলা হয়। দুর্বলতা শুধু রাবীর গুণের ঘাটতি থেকে নয়; সনদের বিচ্ছেদ, অসংগতি বা ক্ষতিকর ইল্লত থেকেও আসতে পারে। এই অভ্যন্তরীণ শ্রেণি একা কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে চূড়ান্ত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত দেয় না।
মাওযূ‘মুহাম্মদের নামে তৈরি করে আরোপিত জাল বর্ণনাকে মাওযূ‘ বলা হয়। কোনো রাবী জীবনে ইচ্ছাকৃতভাবে নবীর নামে মিথ্যা বর্ণনা করেছেন বলে প্রমাণিত হলে তাঁর নির্ভরযোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট বর্ণনা গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সেই তথ্য থেকে তাঁর নামে আসা প্রত্যেক পৃথক বক্তব্যের ঘটনাগত বিষয়বস্তু কখনো ঘটেনি বলে এক সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না; নির্দিষ্ট বর্ণনাটি জাল হওয়ার প্রমাণ আলাদাভাবে বিবেচিত হয়।

রাবীর সংখ্যা বিচারে হাদীস প্রধানত দু‘প্রকার। যথা: ১. মুতওয়াতির (متواتر) ও ২. আহাদ (أحاد)। আহাদের মধ্যে মাশহুর, আযীয ও গরীব শ্রেণি রয়েছে। এই সংখ্যাগত শ্রেণি এবং সহিহ–হাসান–যঈফের গ্রহণযোগ্যতার শ্রেণি এক নয়। একটি বর্ণনা আহাদ হয়েও হাদিসশাস্ত্রের শর্তে সহিহ হতে পারে; শুধু কোনো সংকলনে বহুবার লেখা থাকলেই তা মুতাওয়াতির হয় না। একই ব্যক্তির একটি বক্তব্য বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে নেওয়া হলে গ্রন্থের সংখ্যা এবং স্বাধীন বর্ণনাপথের সংখ্যা আলাদা থাকে। মানুষের সংরক্ষিত তথ্য আইন হিসেবে গ্রহণের সময় এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। বর্ণনা কত পথে এসেছে, কার মাধ্যমে এসেছে এবং তাকে কী ধর্মীয় কর্তৃত্ব দেওয়া হচ্ছে—এই তিন প্রশ্নের উত্তর এক শব্দের শ্রেণিবিন্যাস থেকে পাওয়া যায় না।

পরিভাষাসংজ্ঞা ও ব্যবহার
১. মুতওয়াতিরবৃহৎ সংখ্যক রাবীর বর্ণিত হাদীস, মিথ্যার ব্যাপারে যাদের উপর একাট্টা হওয়া অসম্ভব, সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ সংখ্যা বিদ্যমান থাকলে হাদীসকে মুতওয়াতির (متواتر) বলা হয়। একই বক্তব্য বিভিন্ন বইয়ে পুনরাবৃত্ত হওয়া একা এই শর্ত পূরণ করে না; সংশ্লিষ্ট বর্ণনাপথের সম্পর্ক প্রয়োজন।
২. আহাদأحاد তিন প্রকার। যথা:
মাশহুরযে কোন স্তরে হাদীস বর্ণনা কারীর সংখ্যা যদি দুই এর অধিক হয়, কিন্তু মুতওয়াতির এর পর্যায়ে পৌঁছে না তাকে মাশহুর (مشهور) বলে। এখানে সনদের সংখ্যাগত শ্রেণি বোঝানো হয়েছে। মানুষের মুখে কোনো কথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত হওয়াও অন্য ব্যবহারে মাশহুর নামে পরিচিত।
আযীযযে কোন স্তরে হাদীস বর্ণনা কারীর সংখ্যা যদি দু‘জন হয় । সংশ্লিষ্ট বর্ণনাধারায় সর্বনিম্ন রাবীসংখ্যা দুই থাকা বোঝানো হয়; অন্য স্তরে সংখ্যা বেশি হতে পারে।
গরীবযে কোন স্তরে হাদীস বর্ণনা কারীর সংখ্যা যদি এক জন হয় । অন্তত একটি স্তরে একজন বর্ণনাকারীর ওপর নির্ভরতা বোঝানো হয়। শুধু গরীব হওয়া থেকেই বর্ণনা সহিহ বা যঈফ নির্ধারিত হয় না।
শাযএকাধিক নির্ভরযোগ্য রাবীর বিপরীত একজন নির্ভরযোগ্য রাবীর বর্ণনাকে শায হাদীস বলে।
কিয়াসঅর্থ অনুমান, পরিমাপ, তুলনা ইত্যাদি। পরিভাষায়: শাখাকে মূলের সঙ্গে তুলনা করা, যার ফলে শাখা ও মূল একই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
তাক্বলীদকোনো ব্যক্তির মতামতের দলিল নিজে না জেনে বা স্বাধীনভাবে যাচাই না করে তা গ্রহণ করাকে তাক্বলীদ বলা হয়। মতামত গ্রহণের সময় দলিল মুখে উল্লেখ না করা এবং দলিল না জেনে গ্রহণ করা একই অবস্থা নয়; পরিভাষাটির কেন্দ্র দ্বিতীয় ধরনের নির্ভরতা।
ইজতিহাদদলিল থেকে কোনো শরঈ বিধান নির্ণয়ে যোগ্য ব্যক্তির সর্বশক্তি প্রয়োগের প্রচেষ্টাকে ইজতিহাদ বলা হয়। উদ্দিষ্ট জ্ঞান অর্জনের সাধারণ চেষ্টা শব্দটির ভাষাগত অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত; আইনগত পরিভাষায় এটি বিধান নির্ণয়ের বিশেষ প্রক্রিয়া।
শরীয়াতঅর্থ: আইন, বিধান, পথ, পন্থা ইত্যাদি। পরিভাষায়: মহান আল্লাহ্‌ স্বীয় দ্বীন হতে বান্দার জন্য যা বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন তাকে শরীয়াত বলে।
মাযহাবঅর্থ- মত, পথ, মতবাদ ইত্যাদি। ফিক্বহী পরিভাষায়: ইবাদাত ও মু‘আমালাতের ক্ষেত্রে শারঈ হুকুম পালনের জন্য বান্দা যে পথ অনুসরণ করে এবং প্রত্যেক দলের জন্য একজন ইমামের উপর অথবা ইমামের ওসীয়ত কিংবা ইমামের প্রতিনিধির উপর নির্ভর করে তাকে মাযহাব বলে। এটি নির্দিষ্ট আইনগত ব্যাখ্যা ও পদ্ধতির ধারাকেও বোঝায়। ধর্মগ্রন্থের পাঠ এবং সেই পাঠ থেকে তৈরি ব্যাখ্যাধারা এক বস্তু নয়।
নাযরকোন বিষয়ে উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য চিন্তা-ভাবনা করাকে নাযর বলে।
আমসীমাবদ্ধ করা ছাড়াই যা দুই বা ততোধিক বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে তাকে আম বলে।
খাসআম এর বিপরীত, যা নির্দিষ্ট বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে।
ইজমামুহাম্মদের পরে কোনো এক যুগের যোগ্য মুজতাহিদদের কোনো শরঈ বিষয়ে ঐকমত্যকে ইজমা বলা হয়। শুধু একটি অঞ্চলের কিছু আলেম বা একটি মতবাদের অনুসারীদের সম্মতি এই পূর্ণ সংজ্ঞার সমান নয়। ঐকমত্যের দাবি করা এবং সেই ঐকমত্যের অস্তিত্ব প্রমাণ করাও পৃথক কাজ।
মুসনাদএখানে হাদিসের শ্রেণি হিসেবে মুসনাদ বলতে নবীর দিকে আরোপিত এবং বাহ্যিকভাবে সংযুক্ত সনদবিশিষ্ট বর্ণনা বোঝানো হয়েছে; পরিভাষাটির ব্যবহারে সংজ্ঞাগত পার্থক্যও আছে। গ্রন্থের ধরন হিসেবে মুসনাদ বলতে সাহাবি বর্ণনাকারীর নাম অনুযায়ী সাজানো হাদিসসংকলনও বোঝায়। সনদের সংযোগ এবং গ্রন্থবিন্যাস পৃথক ব্যবহার।
ফিক্বহইজতিহাদ বা গবেষণার মাধ্যমে বিস্তারিত দলিল থেকে ব্যবহারিক শরঈ বিধান সম্পর্কে অর্জিত জ্ঞানকে ফিক্বহ বলা হয়। এটি বিধান সম্পর্কে জানার জ্ঞান ও পদ্ধতির ফল; শুধু বিধান জানার জন্য আরেকটি বিধানের নাম নয়।
আসল বা মূলএমন প্রথম বিষয়, যার উপর ভিত্তি করে কোন কিছু গড়ে উঠে। যেমন- দেয়ালের ভিত্তি।
ফারা বা শাখাআসলের বিপরীত যা কোন ভিত্তির উপর গড়ে উঠে।
ওয়াজিবযা পালন করলে ধর্মীয় সংজ্ঞায় সওয়াবের যোগ্য এবং পরিত্যাগ করলে শাস্তির যোগ্য বলে গণ্য হয়, তাকে ওয়াজিব বলা হয়। কর্তব্য পালন ও পরিত্যাগের এই শ্রেণিবিন্যাস কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি অবশ্যই পুরস্কার বা শাস্তি পেয়েছেন—এমন ঘটনাগত বিবরণ নয়।
মানদূবযা পালন করলে ধর্মীয় সংজ্ঞায় সওয়াব পাওয়া যায়, কিন্তু পরিত্যাগে শাস্তি নির্ধারিত হয় না, তাকে মানদূব বলা হয়। সুপারিশকৃত বা উৎসাহিত কাজের এই শ্রেণি বাধ্যতামূলক কাজের সঙ্গে এক নয়; কোনো কাজকে সাধারণভাবে সুন্নাহ বলা হলেই তার ব্যবহারিক বিধান একভাবে নির্ধারিত হয় না।
মাহযূরনিষিদ্ধ কাজকে মাহযূর বলা হয়: ধর্মীয় সংজ্ঞায় তা পরিত্যাগে সওয়াব এবং সম্পাদনে শাস্তির যোগ্যতা রয়েছে। এই শ্রেণি অগ্রহণযোগ্যতার বিধান বোঝায়; কোনো কাজ ঐতিহাসিকভাবে ঘটেছে কি না, সেই তথ্য আলাদা।
মাকরূহসাধারণ উসুলি ব্যবহারে যা পরিত্যাগে সওয়াব পাওয়া যায় এবং সম্পাদনে শাস্তি নির্ধারিত হয় না, তাকে মাকরূহ বলা হয়। এটি অপছন্দনীয় কাজের শ্রেণি। এখানে আল-ওয়ারাকাতে ব্যবহৃত সাধারণ শ্রেণির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
ফাৎওয়াজিজ্ঞাসিত ব্যক্তির নিকট থেকে দলীল ভিত্তিক শারঈ হুকুম সুস্পষ্ট বর্ণনা করে নেয়াকে ফাৎওয়া বলে।
নাসিখপরবর্তী শরঈ দলিল পূর্ববর্তী দলিলে প্রতিষ্ঠিত কোনো বিধান রহিত করলে পরবর্তী দলিলকে নাসিখ বলা হয়। শুধু শব্দ বদল বা নতুন ব্যাখ্যা হওয়া যথেষ্ট নয়; আগে প্রতিষ্ঠিত বিধানের কার্যকারিতা উঠিয়ে নেওয়ার সম্পর্ক প্রয়োজন।
মানসূখআর যে হুকুমটি রহিত হয়ে যায় সেটাই মানসূখ।
মুতলাক্বকোনো অতিরিক্ত শর্ত বা গুণ দিয়ে সীমিত না করে একটি অনির্দিষ্ট সদস্য বা বিষয় বোঝানো শব্দকে মুতলাক বলা হয়। এটি জাতির সকল সদস্যকে একসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা আম শব্দের সমার্থক নয়। যেমন “একজন দাস” বলা এবং “সব দাস” বলা আলাদা।
মুকাইয়্যাদমুতলাক বিষয়কে নির্দিষ্ট গুণ, শর্ত বা সীমা দিয়ে বর্ণনা করলে তাকে মুকাইয়্যাদ বলা হয়। যেমন “একজন বিশ্বাসী দাস” বললে অনির্দিষ্ট দাসের পরিচয়ে বিশ্বাসের গুণ যুক্ত হয়। এখানে গুণের দ্বারা সীমিত করা হচ্ছে; কেবল সকলকে অন্তর্ভুক্ত না করাই পূর্ণ সংজ্ঞা নয়।
হাক্বীকাতশব্দকে আসল অর্থে ব্যবহার করাকে হাক্বীকত বলে। যেমন- সিংহ শব্দটি এক প্রজাতির হিংস্র প্রাণীকে বুঝায়।
মাজাযশব্দ যখন আসল অর্থকে অতিক্রম করে তার সাথে সাদৃশ্য রাখে এমন অর্থ প্রকাশ করে তখন তাকে মাজায বলে। যেমন- সাহসী লোককে সিংহের সাথে তুলনা করা।

উসুলের পরিভাষায় ওয়াজিব, মানদূব, মুবাহ, নিষিদ্ধ ও মাকরূহ মানুষের আচরণের ওপর আরোপিত পৃথক বিধান বোঝায়। একই কাজে ধর্মীয়ভাবে উৎসাহ দেওয়া, বাধ্যতামূলক করা এবং নিষিদ্ধ করা এক মাত্রার নির্দেশ নয়। জুয়াইনির আল-ওয়ারাকাতে এসব শ্রেণির সঙ্গে পালন বা পরিত্যাগের ধর্মীয় ফল যুক্ত করা হয়েছে। ফলে কোনো কাজের ঐতিহাসিক বিবরণ জানা এবং তার ওপর কোন বিধান প্রয়োগ হবে তা নির্ধারণ পৃথক কাজ। সংরক্ষিত নববী বক্তব্য বা আচরণকে এই শ্রেণির কোনো একটির অধীনে নেওয়ার জন্য ব্যাখ্যা প্রয়োজন। কোরআনের সাধারণ আনুগত্যের দাবি নিজে প্রতিটি আচরণের এই বিস্তারিত শ্রেণিবিন্যাস দেয় না। ধর্মীয় পাঠ, বর্ণনা এবং উসুলি ব্যাখ্যা মিলে তার আইনগত রূপ নির্ধারণ করা হয়। [135]

هذه ورقات تشتمل على معرفة فصول من أصول الفقه ، وذلك مؤلف من جزأين مفردين ، فالأصل: ما يبنى عليه غيره ، والفرع: ما بُنى على غيره ، والفقه: معرفة الأحكام الشرعية التي طريقها الاجتهاد . والأحكام سبعة: الواجب والمندوب والمباح والمحظور والمكروه والصحيح والفاسد (1) فالواجب: ما يثاب على فعله ويعاقب على تركه (2) والمندوب: ما يثاب على فعله ولا يعاقب على تركه (3) والمباح: ما لا يثاب على فعله ولا يعاقب على تركه (4) والمحظور: ما يثاب على تركه ويعاقب على فعله (5) والمكروه: ما يثاب على تركه ولا يعاقب على فعله (6) والصحيح: ما يتعلق به النفوذ ويعتد به (7) والفاسد: ما لا يتعلق به النفوذ ولا يعتد به .

বাংলা অনুবাদ:
এই কয়েকটি পাতা উসুলুল ফিকহের কিছু অধ্যায় সম্পর্কে জ্ঞান ধারণ করে। শব্দটি দুইটি পৃথক অংশ দিয়ে গঠিত। আসল হলো যার ওপর অন্য কিছু নির্মিত হয় এবং ফারা হলো যা অন্য কিছুর ওপর নির্মিত হয়। ফিকহ হলো ইজতিহাদের মাধ্যমে জানা শরঈ বিধান সম্পর্কে জ্ঞান। বিধান সাতটি: ওয়াজিব, মানদূব, মুবাহ, নিষিদ্ধ, মাকরূহ, সহিহ ও ফাসিদ। ওয়াজিব হলো যা পালন করলে পুরস্কার এবং পরিত্যাগ করলে শাস্তি হয়। মানদূব হলো যা পালন করলে পুরস্কার হয়, কিন্তু পরিত্যাগে শাস্তি হয় না। মুবাহ হলো যা করা বা না করার কারণে পুরস্কার বা শাস্তি নির্ধারিত হয় না। নিষিদ্ধ হলো যা পরিত্যাগ করলে পুরস্কার এবং পালন করলে শাস্তি হয়। মাকরূহ হলো যা পরিত্যাগ করলে পুরস্কার হয়, কিন্তু পালন করলে শাস্তি হয় না। সহিহ হলো যার সঙ্গে কার্যকারিতা যুক্ত এবং যা গণ্য হয়। ফাসিদ হলো যার সঙ্গে কার্যকারিতা যুক্ত হয় না এবং যা গণ্য হয় না।

জুয়াইনির একই গ্রন্থে আহাদ বর্ণনার ক্ষেত্রে আমলের বাধ্যবাধকতা এবং নিশ্চিত জ্ঞান পৃথক করা হয়েছে; ভুলের সম্ভাবনা থাকাকে এই পার্থক্যের কারণ বলা হয়েছে। ফলে একটি বিধান ধর্মীয়ভাবে অনুসরণযোগ্য গণ্য হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রতিটি তথ্য নিশ্চিতভাবে সত্য হওয়া এক সিদ্ধান্ত নয়। প্রচলিত আইন অনেক ক্ষেত্রে যে বর্ণনার ওপর নির্ভর করে, তার গ্রহণযোগ্যতা সেই ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ নীতিতে নির্ধারিত হয়। এই গ্রহণযোগ্যতাকে সর্বজনীন ঐতিহাসিক নিশ্চয়তা বলে ঘোষণা করলে উৎসের নিজস্ব পার্থক্যও বাদ পড়ে যায়। কোন সংবাদ কীভাবে পাঠ করা বা বর্ণনা করা হয়েছে, সেই শিক্ষাপদ্ধতির কথাও গ্রন্থে রয়েছে। সংরক্ষিত তথ্য এবং তা গ্রহণের নিয়মের ওপর ধর্মীয় প্রয়োগের এই নির্ভরতা মানুষের বর্ণনাপ্রক্রিয়াকে ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ করে। [136]

(10) وأما الأخبار: فالخبر ما يدخله الصدق والكذب . والخبر ينقسم إلى آحاد ومتواتر (1) فالمتواتر ما يوجب العلم وهو: أن يرويه جماعة لا يقع التواطؤ على الكذب عن مثلهم إلى أن ينتهي إلى المخبر عنه ، فيكون في الأصل عن مشاهدة أو سماع لا عن اجتهاد (2) والآحاد هو: الذي يوجب العمل ولا يوجب العلم لاحتمال الخطأ فيه ، وينقسم إلى مرسل ومسند ، فالمسند ما اتصل إسناده ، والمرسل ما لم يتصل إسناده ، فإن كان من مراسيل غير الصحابة: فليس بحجة إلاّ مراسيل سعيد بن المسيب ، فإنها فتشت فوجدت مسانيد 0 والعنعنة تدخل على الإسناد ، وإذا قرأ الشيخ يجوز للراوي أن يقول: [137] ، وإن قرأ هو على الشيخ فيقول: [138] ولا يقول: حدثني ، وإن أجازه الشيخ من غير قراءة فيقول الراوي: [139] .

বাংলা অনুবাদ:
সংবাদ হলো যা সত্য বা মিথ্যা হতে পারে। সংবাদ আহাদ ও মুতাওয়াতিরে বিভক্ত। মুতাওয়াতির জ্ঞান প্রদান করে: এমন একটি দল তা অনুরূপ দল থেকে বর্ণনা করে, যাদের মধ্যে মিথ্যার জন্য একমত হওয়ার ঘটনা সম্ভব নয়, এভাবে মূল সংবাদদাতা পর্যন্ত পৌঁছায়। মূল তথ্য প্রত্যক্ষ দেখা বা শোনার ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে, ইজতিহাদের ওপর নয়। আহাদ আমলের বাধ্যবাধকতা প্রদান করে, কিন্তু ভুলের সম্ভাবনার কারণে নিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করে না। এটি মুরসাল ও মুসনাদে বিভক্ত। মুসনাদ হলো যার সনদ সংযুক্ত এবং মুরসাল হলো যার সনদ সংযুক্ত নয়। সাহাবি ছাড়া অন্যদের মুরসাল প্রমাণ নয়; সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিবের মুরসাল ব্যতিক্রম, কারণ অনুসন্ধানে সেগুলোর সংযুক্ত সনদ পাওয়া গেছে। “থেকে” ভাষায় বর্ণনা সনদের মধ্যে আসে। শিক্ষক পড়লে বর্ণনাকারী “আমাকে বর্ণনা করেছেন” বা “আমাকে জানিয়েছেন” বলতে পারেন। ছাত্র শিক্ষকের সামনে পড়লে “আমাকে জানিয়েছেন” বলবেন, “আমাকে বর্ণনা করেছেন” বলবেন না। শিক্ষক পাঠ ছাড়াই অনুমতি দিলে বর্ণনাকারী “আমাকে অনুমতি দিয়েছেন” বা “অনুমতির মাধ্যমে জানিয়েছেন” বলবেন।


উপসংহার

প্রচলিত ইসলামি শরীয়তে কোরআনের কার্যকর অর্থ ও বিস্তারিত আইনগত প্রয়োগ হাদিস এবং নববী সুন্নাহর তথ্যের ওপর নির্ভর করে। নামাজের নির্দিষ্ট পদ্ধতি, শাস্তির শর্ত, খাদ্যসংক্রান্ত বিশেষ নিষেধ, মুহাম্মদের সিদ্ধান্ত এবং ধর্মীয় আদর্শের বহু বিষয় কোরআনের সাধারণ বক্তব্য থেকে একা উদ্ধার করা যায় না। কোরআন আনুগত্য ও অনুসরণের কর্তৃত্ব ঘোষণা করে; হাদিস সেই কর্তৃত্বে কী নির্দিষ্ট কথা, কাজ ও নিষেধ গ্রহণ করতে হবে, তার তথ্য সরবরাহ করে। হাদিস বাদ দিয়ে একই বিধানসমগ্র বহাল রাখার দাবি তাই তার তথ্যসূত্র বাদ দিয়েও তথ্য বহাল রাখার দাবি। এমন অবস্থায় পরবর্তী ব্যক্তির তৈরি নিয়ম বা ব্যাখ্যা গ্রহণ করা সম্ভব, কিন্তু সেই নিয়ম মুহাম্মদের নির্দিষ্ট নির্দেশ—এই পরিচয়ের জন্য তাঁর সম্পর্কে সংরক্ষিত বর্ণনা প্রয়োজন হয়।

কোরআন ও হাদিস সংরক্ষণে মৌখিক বর্ণনা, লিখিত উপাদান এবং মানুষের সংগ্রহ ও সম্পাদনার ভূমিকা আছে; দুইটির সংকলন একদম একইভাবে হয়েছে—এ দাবি সঠিক নয়। কোরআনের পাঠসমষ্টি সংগ্রহ ও অনুলিপি তৈরির প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন সনদসহ বিপুল হাদিসকে বহু পৃথক গ্রন্থে বাছাই করার প্রক্রিয়া অভিন্ন নয়। একইভাবে হাদিস ছাড়া কোরআনের অস্তিত্বই নেই—এ সিদ্ধান্তও সংগ্রহের ইতিহাস থেকে আসে না। হাদিসের নির্ভরতা এখানে প্রচলিত ব্যাখ্যার কর্তৃত্ব এবং বিস্তারিত বিধানের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে। একটি আয়াতের সাধারণ বাক্য অর্থবোধক হলেও তা একই প্রচলিত আইন ও আচরণের সমস্ত তথ্য বহন করে না। সেই অনুপস্থিত তথ্য হাদিস থেকে নেওয়া হয় এবং কোরআনের সাধারণ কর্তৃত্বে বাধ্যতামূলক করা হয়।

অনেক মুসলিম হাদিস অস্বীকার করতে চান; কোনো বিধান বা বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করার অধিকারে আমাদের আপত্তি নেই। আমাদের আপত্তি সেই দাবির অসংগতিতে, যেখানে প্রচলিত ইসলামের একই আইনগত কাঠামো রেখে তার অপরিহার্য তথ্যসূত্রকে অস্বীকার করা হয়। আমরা নাস্তিকরাও হাদিসের ধর্মীয় কর্তৃত্ব মানি না; সেটি ঐশ্বরিক আইন ও ধর্মীয় আনুগত্যের দাবিই গ্রহণ না করার অবস্থান। সুন্নাহর কর্তৃত্ব অস্বীকার করে একই সুন্নাহনির্ভর বিধানকে অপরিবর্তনীয় ইসলামের বিধান বলা যৌক্তিক নয়। কোনো ব্যক্তি নিজেকে কী ধর্মীয় পরিচয়ে পরিচিত করবেন, তা দিয়ে একটি যুক্তির সত্যতা নির্ধারিত হয় না। প্রচলিত সুন্নি বিধানব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি গ্রহণের দাবি এবং সেই ভিত্তির আইনগত প্রামাণ্যতা অস্বীকারের দাবি পাশাপাশি রাখলে অসংগতি থেকেই যায়।

হাদিসে অবৈজ্ঞানিক বক্তব্য এবং মুহাম্মদের আচরণ সম্পর্কে কঠোর নৈতিক আপত্তির কারণ হয় এমন বিবরণ রয়েছে। অস্বস্তিকর বিবরণ বাদ দেওয়ার মাধ্যমে তাঁর একটি সুবিধাজনক নতুন চরিত্র তৈরি করলে তা সংরক্ষিত তথ্যের মূল্যায়নের বিকল্প হয় না। ধর্মীয় ভাবমূর্তি রক্ষা কোনো বর্ণনার সত্যতা নির্ধারণের মানদণ্ড নয়; একইভাবে সহিহ বা যঈফের শ্রেণি একা সমস্ত ঘটনার সর্বজনীন ঐতিহাসিক ফয়সালা দেয় না। কোনো বর্ণনা কত আগে পাওয়া যায়, অন্য বর্ণনার ওপর তার নির্ভরতা কী এবং ঘটনাটির সঙ্গে অন্য তথ্যের সম্পর্ক কী—এসব ইতিহাসের প্রশ্ন। একটি বক্তব্য ধর্মীয়ভাবে গ্রহণ করা হয়েছে বলে তার বিষয়বস্তু বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য বা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। অস্বস্তি দূর করতে তথ্যসূত্র প্রত্যাখ্যান করা এবং প্রমাণ দিয়ে তথ্য যাচাই করা পৃথক কাজ।

একটি বর্ণনার ওপর আইন প্রতিষ্ঠিত হলে সেই আইন মানুষের স্বাধীনতা, দেহ, সম্পদ ও সম্পর্কের ওপর বাস্তব ক্ষমতা প্রয়োগ করে। সেই ক্ষমতার ন্যায্যতা শুধু বর্ণনাটিকে নবীর নামে আরোপ অথবা ধর্মীয়ভাবে সহিহ ঘোষণা করে প্রতিষ্ঠিত হয় না। চুরির জন্য হাত কাটার মতো শাস্তির ক্ষেত্রে বর্ণনা ও ব্যাখ্যা শর্ত নির্ধারণ করতে পারে; শাস্তিটির মানবিক গ্রহণযোগ্যতা তার ফলে সৃষ্ট ক্ষতি ও ন্যায়ের প্রশ্ন থেকে বিচার করতে হয়। অতীতের কোনো সমাজে বিধান প্রচলিত থাকা বর্তমান সমাজে তাকে অপরিবর্তনীয়ভাবে প্রয়োগের যৌক্তিকতা নয়। অমানবিক আইন বাতিল করা এবং পরিবর্তিত বাস্তবতায় নতুন ন্যায়সংগত আইন তৈরি করা মানুষের অধিকার। ঐশ্বরিক বলে ঘোষণা করা কোনো ব্যবস্থাকে এই নৈতিক বিচারের বাইরে রাখার গ্রহণযোগ্য কারণ নয়।

প্রচলিত শরীয়তের নির্দিষ্ট রূপ একটি পাঠের সঙ্গে বহু মানুষের সংরক্ষিত বর্ণনা, নির্বাচিত গ্রন্থ এবং ব্যাখ্যার নিয়ম যুক্ত করে তৈরি হয়েছে। তার কর্তৃত্বকে অপরিবর্তনীয় ঐশ্বরিক আইন বলা হলেও আইনটির নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু মানুষের কাজ ছাড়া প্রতিষ্ঠিত হয় না। এই মানবীয় নির্ভরতা বাদ দিয়ে শুধু কোরআনের নাম রেখে একই বিস্তারিত ব্যবস্থা বহাল থাকে না। আবার সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই তার সমস্ত উপাদান সত্য, ন্যায়সংগত এবং সব যুগে অপরিবর্তনীয় হয়ে যায় না। তথ্যসংরক্ষণ, ধর্মীয় অনুমোদন এবং নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তিনটি পৃথক প্রশ্ন। অন্ধ আনুগত্যের দাবি দিয়ে এগুলোকে এক সিদ্ধান্তে পরিণত করা প্রমাণের বিকল্প নয়। মানুষের তৈরি ব্যাখ্যা ও অতীতের বিধান মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করবে কি না, সেই সিদ্ধান্তও মানুষের যুক্তি, অধিকার ও ন্যায়বোধের বিচারাধীন।


তথ্যসূত্রঃ
  1. ইবনুস সালাহ, উলুমুল হাদিস, মওকুফের সংজ্ঞা, পৃষ্ঠা ৪৬ ↩︎
  2. সুনান আবু দাউদ ৩৬৪৬ ↩︎
  3. সহিহ বুখারি, কিতাবুল ইলম, পরিচ্ছেদ ৩৪: কীভাবে জ্ঞান উঠিয়ে নেওয়া হবে ↩︎
  4. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৭২৩৮ ↩︎
  5. সহিহ মুসলিম, প্রচলিত আরবি নম্বরঃ ৩০০৪ ↩︎
  6. সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৩৬০৭ ↩︎
  7. সুনান আবু দাউদ, প্রচলিত আরবি নম্বরঃ ৩৬৪৬ ↩︎
  8. নববী, শরহ সহিহ মুসলিম, হাদিস লিপিবদ্ধ করার বিধানসংক্রান্ত পরিচ্ছেদ ↩︎
  9. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ১১৪ ↩︎
  10. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ১২০ 1 2
  11. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ১১৯ 1 2
  12. সহিহ বুখারী, প্রচলিত আরবি নম্বরঃ ১১৩ ↩︎
  13. সহিহ বুখারী, প্রচলিত আরবি নম্বরঃ ১১৯ ↩︎
  14. সহিহ বুখারী, প্রচলিত আরবি নম্বরঃ ১১৮ ↩︎
  15. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ১৭৪৯ ↩︎
  16. সহিহ বুখারী, প্রচলিত আরবি নম্বরঃ ১৮৭০ ↩︎
  17. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ২৮৩৩ ↩︎
  18. সহিহ বুখারী, প্রচলিত আরবি নম্বরঃ ৩০৪৭ ↩︎
  19. জারকানী, শরহ আল-মুয়াত্তা, ভূমিকা: প্রাথমিক সংকলনগুলোর বিবরণ ↩︎
  20. জারকানী, শরহ আল-মুয়াত্তা, ভূমিকা: মালিকের জীবনী ও মুয়াত্তার বর্ণনাসংখ্যা ↩︎
  21. ইমাম ইবনে মাজাহ আওর ইলমে হাদীস, পৃ: ১৬৪ ↩︎
  22. ইরাকী, শরহ আত-তাবসিরা ওয়াত-তাজকিরা, সুনানগ্রন্থগুলোকে সহিহ বলার আলোচনা ↩︎
  23. হাদিস সংকলনের ইতিহাস, মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম, খায়রুন প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪৬, ৪৭ ↩︎
  24. নববী, আত-তাকরিব ওয়াত-তাইসির, সহিহের স্তর ও নিশ্চিত জ্ঞানের আলোচনা ↩︎
  25. নববী, আত-তাকরিব ওয়াত-তাইসির, হাসান হাদিসের পরিচ্ছেদ ↩︎
  26. নববী, আত-তাকরিব ওয়াত-তাইসির, মাওদু হাদিসের পরিচ্ছেদ ↩︎
  27. ইবন রজব, জামি আল-উলুম ওয়াল-হিকাম, প্রথম হাদিসের বর্ণনাসূত্র ↩︎
  28. হাদিস সংকলনের ইতিহাস, মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম, খায়রুন প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪৪৬ – ৪৪৯ ↩︎
  29. ইবন তাহির মাকদিসী, শুরুতুল আইম্মাতিস সিত্তাহ, বুখারী ও মুসলিমের শর্ত ↩︎
  30. মুসলিম, সহিহ মুসলিমের ভূমিকা, মুআনআন হাদিসের গ্রহণযোগ্যতার আলোচনা ↩︎
  31. নববী, আত-তাকরিব ওয়াত-তাইসির, সহিহ বুখারী ও মুসলিমের সংকলনের পরিধি ↩︎
  32. আবু দাউদ, রিসালা ইলা আহলি মাক্কা, দুর্বল বর্ণনা ও গ্রন্থের প্রয়োজনীয়তা ↩︎
  33. তিরমিজী, আল-ইলাল আস-সাগির, হাসান ও গরিব পরিভাষার ব্যাখ্যা ↩︎
  34. শাফেয়ী, আল-রিসালা, “বায়ান কীভাবে হয়” পরিচ্ছেদ ↩︎
  35. সহিহ বুখারী, হাদিস ৬৩১ ↩︎
  36. কোরআন, সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৭ ↩︎
  37. সহিহ বুখারী, হাদিস ১৯৩৬ ↩︎
  38. সহিহ বুখারী, হাদিস ৩৯০২ ↩︎
  39. কোরআন, সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৩২ ↩︎
  40. সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৩৩ ↩︎
  41. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪০০ক ↩︎
  42. সহিহ বুখারী, হাদিস ৪৫৯২ ↩︎
  43. কোরআন, সূরা মুহাম্মদ, ৪৭:১৯ ↩︎
  44. কোরআন, সূরা আল-ফাতহ, ৪৮:২৯ ↩︎
  45. সহিহ বুখারী, হাদিস ৮ ↩︎
  46. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩৪ক ↩︎
  47. কোরআন ৫ঃ৩৮ ↩︎
  48. সহিহ বুখারী, হাদিস ৬৭৮৯ ↩︎
  49. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৭১০ ↩︎
  50. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৩৯৮ ↩︎
  51. ইবন কুদামা, আল-মুগনি, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১০৭, পরিচ্ছেদ ৭২৭৭ ↩︎
  52. কোরআন ২ঃ ১৭৩ ↩︎
  53. কোরআন ৫ঃ৩ ↩︎
  54. কোরআন ৫:৯৬ ↩︎
  55. কোরআন, সূরা ফাতির, ৩৫:১২ ↩︎
  56. সুনানে ইবনে মাজাহ, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৩৩১৪ ↩︎
  57. সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস ৩৩১৪, আরবি পাঠ ↩︎
  58. কোরআন, সূরা আল-আনআম, ৬:১৪৫ ↩︎
  59. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৮৩ ↩︎
  60. কোরআন ৩৩ঃ৫২ ↩︎
  61. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, আল্লামা ইবনে কাসীর, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮৯ ↩︎
  62. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, বিবাহসংক্রান্ত আরবি পাঠ ↩︎
  63. সুনান আন-নাসায়ী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৩২০৮ ↩︎
  64. সুনান আন-নাসায়ী, Sunnah.com-এর নম্বর ৩২০৫ ↩︎
  65. সূরা বাকারাঃ ১০৬ ↩︎
  66. কোরআন, সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৫১ ↩︎
  67. তাফসীর ইবন কাসীর, সূরা আহযাব ৩৩:৫২-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  68. কোরআন ৩৩ঃ৩৬ ↩︎
  69. কোরআন ১৬ঃ৪৪ ↩︎
  70. কোরআন ৫৯ঃ৭ ↩︎
  71. সহিহ বুখারী, হাদিস ৪৮৮৬ ↩︎
  72. কোরআন ৪ঃ৮০ ↩︎
  73. কোরআন ৪৭ঃ৩৩ 1 2
  74. কোরআন ৫ঃ৯২ 1 2
  75. কোরআন ২৪ঃ৫৪ 1 2
  76. কোরআন ৬৪ঃ১২ 1 2
  77. কোরআন ৩ঃ৩১ 1 2
  78. কোরআন, সূরা আন-নিসা, ৪:৫৯ ↩︎
  79. কোরআন, সূরা আন-নিসা, ৪:৬৫ ↩︎
  80. কোরআন ৭২ঃ২৩ ↩︎
  81. কোরআন ৭ঃ১৫৭ ↩︎
  82. হাদীস সম্ভার, হাদিস নম্বরঃ ১৪৯৯ ↩︎
  83. মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস ১৬৩, পূর্ণ বর্ণনা ↩︎
  84. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৬০৪ ↩︎
  85. সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস ১২ 1 2
  86. আহমদিয়া সম্প্রদায়ের নিজস্ব ব্যাখ্যা, Finality of Prophethood ↩︎
  87. কুরআন ৩৩ঃ৪০ ↩︎
  88. ইবন মানজুর, লিসানুল আরব, “খাতাম” শব্দের সমাপ্তিসংক্রান্ত ব্যবহার ↩︎
  89. সহিহ বুখারী, হাদিস ৩৫৩৫ ↩︎
  90. সুনানে তিরমিজী, হাদিস ২২১৯ ↩︎
  91. সুনানে তিরমিজী, হাদিস ২২৭২ ↩︎
  92. তাফসির ইবন কাসির, সূরা আহযাব ৩৩:৪০ ↩︎
  93. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিস নম্বরঃ ৪৬০৫ ↩︎
  94. সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিস নম্বরঃ ২৬৬৩ ↩︎
  95. সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস নম্বরঃ ১২ ↩︎
  96. সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস নম্বরঃ ১৩ ↩︎
  97. হাদীস সম্ভার, হাদিস নম্বরঃ ১৫০১ ↩︎
  98. হাদীস সম্ভার, হাদিস নম্বরঃ ১৫০৩ ↩︎
  99. হাদীস সম্ভার, হাদিস নম্বরঃ ১৫০৪ ↩︎
  100. সুনানে আবু দাউদ, ৪৬০৫-এর আরবি পাঠ ↩︎
  101. সুনানে তিরমিজী, হাদিস ২৬৬৩, আরবি ও বাংলা পাঠ ↩︎
  102. সুনানে তিরমিজী, হাদিস ২৬৬৩ ↩︎
  103. সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস ১৩ ↩︎
  104. হাকেম, আল-মুসতাদরাক, বিদায়হজের ভাষণ; ১ম খণ্ড, পৃ. ২৮৪, এই সংস্করণের হাদিস ৩২৪ ↩︎
  105. ইবন আবি আসিম, কিতাবুস সুন্নাহ, হাদিস ৫১ ↩︎
  106. মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৬৭৬৪, পূর্ণ ঘটনাবিবরণ ↩︎
  107. সহিহ বুখারী, হাদিস ৫০৬৩ ↩︎
  108. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪০১; একই বিষয়ের বর্ণনা ↩︎
  109. সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস নম্বরঃ ১৩৩ ↩︎
  110. সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস ১৩৩ ↩︎
  111. সুনানে তিরমিজী, হাদিস ৩৭৪৭ ↩︎
  112. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৪৩২ ↩︎
  113. সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস নম্বরঃ ৪৩ ↩︎
  114. সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস ৪৩ ↩︎
  115. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৫৯৮৬ ↩︎
  116. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৬২৪২ ↩︎
  117. সূনান নাসাঈ , ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৩৮১০ ↩︎
  118. সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিস নম্বরঃ ৩৮৫৯ ↩︎
  119. সহিহ বুখারী, বর্তমান নম্বর ৬৪২৯ ↩︎
  120. সহিহ মুসলিম ২৫৩৩d; ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ৬২৪২-এর সমান্তরাল পাঠ ↩︎
  121. সুনানে নাসাঈ, হাদিস ৩৮০৯, পূর্ণ আরবি পাঠ ↩︎
  122. সুনানে তিরমিজী, হাদিস ৩৮৫৯ ↩︎
  123. Are There Any Early Hadiths? ↩︎
  124. সহিফা হাম্মাম ইবনে মুনাব্বিহ ↩︎
  125. সহিহ বুখারী, কিতাবুল ইলম, “জ্ঞান কীভাবে উঠিয়ে নেওয়া হয়” অধ্যায়ের ভূমিকা ↩︎
  126. ইমাম আবু হানিফার হাদিস সংকলন গ্রন্থ ↩︎
  127. প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় খণ্ড ↩︎
  128. হাদিস সংকলনের ইতিহাস, মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম, খায়রুন প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৩০৫-৩১৫ ↩︎
  129. Ruling on one who rejects a saheeh hadith ↩︎
  130. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১১৫১২৫, সম্পূর্ণ আরবি উত্তর ↩︎
  131. ইসলামকিউএ-র নিজস্ব পরিচিতি ↩︎
  132. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১১৫১২৫, আরবি মূল ও পূর্ণ বাংলা বক্তব্য ↩︎
  133. শাফিঈ, আর-রিসালা, সুন্নাহর কর্তৃত্ব ও ফরজের ব্যাখ্যা ↩︎
  134. ইবন হাজর, নুখবাতুল ফিকর; নুযহাতুন নাযারের সঙ্গে মুদ্রিত মূল পাঠ ↩︎
  135. জুয়াইনি, আল-ওয়ারাকাত, ফিকহ ও বিধানের শ্রেণি ↩︎
  136. জুয়াইনি, আল-ওয়ারাকাত, সংবাদ ও বর্ণনার অধ্যায় ↩︎
  137. حَدَّثَنِي أو أَخْبَرَنِي ↩︎
  138. أَخْبَرَنِي ↩︎
  139. أَجَازَنِي أو أَخْبَرَنِي إِجَازَةً ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

আসিফ মহিউদ্দীন

আসিফ মহিউদ্দীন সম্পাদক সংশয় - চিন্তার মুক্তির আন্দোলন [email protected]

5 thoughts on

  1. হায়রে আসিফ ভাই আপনি নিজেই উল্লেখ করলেন সনদের বিষয়টা,যেখানে কিনা ৫-৬ জন বর্ণনাকারী থাকে,এই ৫-৬ জন বর্ণনাকারীর সাহায্যে হাজার হাজার হাদিস এসেছে, তো মুহাম্মদের আমলে হাদিস লিখা থাকলে তার মৃত্যুর পরে কেনো এই ৫-৬ জন বর্ণনাকারীর সাহায্যে হাদিস আনা হলো(যেখানে বর্ণনাকারীরা সৎ ছিলো কিনা,স্বরণশক্তি ভালো ছিলো কিনা এসব দেখা হয়েছে), এর দ্বারাই তো স্পষ্ট বুঝা যায় যে অধিকাংশ হাদিসেই যে সমস্যা রহিয়াছে,

    এটা ইসলামের ভিত্তিকে দুর্বল করে,আর আপনি এইভাবে তাদের পক্ষে কথা লিখলেন??

    যারা হাদিসের সমস্যা নিয়ে কথা বলছে তারা ঠিকই বলেছে,অধিকাংশ হাদিসই মুহাম্মদের মৃত্যুর বহু পরে লিখিত।

  2. Sunnah. com এর সুনান-আন-নাসাই হাদিসগ্রন্থের ৫৫৭৪ এবং ৫৫৭৫ নাম্বারে দুইটা হাদিস আছে যেটা দেখে আমি প্রায় ‘থ’ কিংবা ভাল পরিমাণ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।

    একই হাদিস, একটা শব্দ তো পরের কথা, একটা লেটার এমনকি একটা দাঁড়ি-কমাও কমবেশী নাই কিন্তু একটা হাদিস সহি আর একটা হাদিস জঈফ।

  3. হাদিসকে ইসলামের বিধান হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আপনারা তথাকথিত অজ্ঞ নামধারী মুসলিমদের মতো যেভাবে উঠে-পড়ে লেগেছেন, তা দেখা খুব হাসি পাচ্ছে।

    আসল কথা হচ্ছে, আপনারা হাদিসকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান যাতে করে প্রকৃত ইসলামকে নিয়ে কুৎসা রটাতে পারেন।

Leave a comment

Your email will not be published.