ধর্মঅবশ্যপাঠ্যইতিহাসইতিহাসে ধর্মইসলামখ্রিস্টানধর্ম ও রাজনীতিমানবাধিকারসম্পাদকীয়

পাশ্চাত্যে আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার উদ্ভবে ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা (খ্রিস্টীয় ও ইসলামী ধর্মতত্ত্বের পার্থক্যের ভিত্তিতে)

Table of Contents

ভূমিকা

আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং জটিল ধাঁধাটি হলো ‘দ্য গ্রেট ডাইভারজেন্স’ বা মহামিলন ও মহাবিচ্ছেদের গল্প। গত পাঁচশ বছরে পৃথিবীটা এমন অদ্ভুত এবং নাটকীয়ভাবে বদলে গেল কেন? কেন শিল্প বিপ্লব, আধুনিক নেশন-স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র, কিংবা বিজ্ঞানের অভাবনীয় জয়জয়কার – সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল নির্দিষ্ট একটি অঞ্চল, যাকে আমরা ‘পশ্চিম’ বা ইউরোপ বলে ডাকি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা সচরাচর খুব দৃশ্যমান বা ভৌত কারণগুলোর দিকেই আঙুল তুলি। কেউ বলি ভূগোলের সুবিধার কথা, কেউ দায়ী করি ঔপনিবেশিক শোষণকে, আবার কেউ বা মনে করি হয়তো তাদের সামরিক শক্তি বা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা একটু বেশিই ছিল। কিন্তু ইতিহাসকে গভীরভাবে ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যায়, ব্যাপারটা এত সরলরৈখিক নাও হতে পারে। যদি শুধু সম্পদ, জনসংখ্যা বা প্রাথমিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা ধরা হয়, তবে একসময় অটোমান সাম্রাজ্য, সাফাভিদ ইরান কিংবা মুঘল ভারত ইউরোপের চেয়ে ঢের এগিয়ে ছিল। তাদেরও নিজস্ব আইন ছিল, রাজকীয় বিচারক ছিল, বিশাল সব মাদ্রাসা আর জগৎখ্যাত পণ্ডিত ছিল। তবু, আধুনিক অর্থে যাকে আমরা ‘ইমপারসোনাল ইনস্টিটিউশন’ (Impersonal Institution) বা ব্যক্তিনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান বলি – যা কোনো শাসকের ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না – সেটা সেখানে দানা বাঁধেনি।

তাহলে সেই অদৃশ্য পার্থক্যটা আসলে কোথায় ছিল?

সমাজবিজ্ঞানী এবং রাজনৈতিক তাত্ত্বিকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, পার্থক্যটা মাটির নিচে কিংবা কামানের গোলার ভেতরে ছিল না; পার্থক্যটা ছিল মানুষের মনের আকাশে – যাকে আমরা কেতাবি ভাষায় ‘পলিটিক্যাল থিওলজি’ (Political Theology) বা রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব বলি। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি বা সমাজবিজ্ঞান নিয়ে আমরা ওপর দিয়ে যত কথাই বলি না কেন, এর শিকড় লুকিয়ে থাকতে পারে ধর্মতত্ত্বের অত্যন্ত সুক্ষ্ম এবং জটিল কিছু সমীকরণে। কার্ল শ্মিট (Carl Schmitt) নামের এক বিখ্যাত জার্মান তাত্ত্বিক এবং আইনজ্ঞ গত শতাব্দীর শুরুর দিকে একটি বিস্ফোরক হাইপোথিসিস দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ ধারণাই আসলে ‘সেক্যুলারাইজড থিওলজি’ (Secularized Theology) বা ধর্মনিরপেক্ষতার মোড়কে মোড়া ধর্মতত্ত্ব ছাড়া আর কিছু নয় (Schmitt, 1922)। অর্থাৎ, প্রাচীনকালে মানুষ যেভাবে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে কল্পনা করত, আধুনিক যুগে ঠিক সেভাবেই সে হয়তো সর্বশক্তিমান রাষ্ট্রকে কল্পনা করে।

এখন প্রশ্ন হলো – পশ্চিমা সেক্যুলারিজমের উদ্ভবের পেছনে কি খ্রিস্টীয় ঈশ্বরের কোনো বিশেষ ধারণার ভূমিকা ছিল? এই তাত্ত্বিক কাঠামোর প্রবক্তারা যুক্তি দেন যে, খ্রিস্টধর্মে ঈশ্বরকে এমনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছিল (Institutionalized), যাতে তিনি সর্বশক্তিমান হয়েও জগত পরিচালনার ক্ষেত্র থেকে নিজেকে একটু “গুটিয়ে” নেন। তাত্ত্বিকভাবে, তিনি জগতের চাকা ঘুরিয়ে দিয়ে পেছনে সরে দাঁড়ান, যাতে মানুষের তৈরি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো সামনে এসে কাজ করতে পারে। এই “পেছনে সরে যাওয়া” বা ‘সেলফ-উইথড্রয়াল’ (Self-withdrawal)-এর ধারণাটিই পশ্চিমের সেক্যুলারিজম আর উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি হতে পারে বলে অনেক পণ্ডিত মনে করেন।

অন্যদিকে, সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বে বা প্রাচ্যের ধর্মতত্ত্বে ঈশ্বরকে জগতের প্রতিটি অণু-পরমাণুর সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখা হয়েছিল, যেখানে তাঁর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছাড়া গাছের একটি পাতাও নড়ে না। ফলে সেখানে মানুষের তৈরি কোনো প্রতিষ্ঠান ঈশ্বরের সমকক্ষ হয়ে ‘স্বাধীনভাবে’ কাজ করবে – এটা হয়তো ধর্মতাত্ত্বিকভাবে কঠিন একটি প্রস্তাবনা ছিল। আজকের আলোচনায় আমরা ইতিহাসের এই বিশেষ দার্শনিক ব্যাখ্যাটি খতিয়ে দেখব। আমরা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব, কীভাবে ঈশ্বরের অসীম ক্ষমতাকে স্বেচ্ছায় সংকুচিত বা ‘সেলফ-লিমিটেশন’ (Self-limitation) করার ধারণাটি আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তনে প্রভাব ফেলে থাকতে পারে।

ঈশ্বরের স্বেচ্ছা-সংযম বা কেনোসিস (Kenosis)

আমরা যখন সচরাচর ঈশ্বরের কথা ভাবি, তখন আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে এক অসীম শক্তিধর সত্তার প্রতিচ্ছবি। তিনি এমন এক সত্তা, যার ইচ্ছার সামান্য ইশারাতেই মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও লয় ঘটে। তিনি যখন খুশি আকাশ থেকে বৃষ্টি নামাতে পারেন, আবার যখন খুশি তা থামিয়ে দিতে পারেন। তার ক্ষমতার কোনো সীমানা নেই, তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো ধূলিকণাও নেই। সাধারণ ধর্মবিশ্বাসে ঈশ্বর মানেই হলো ‘সর্বশক্তিমান’ বা অমনিপোটেন্ট (Omnipotent)। কিন্তু ইতিহাসের এক অদ্ভুত বাঁকে, বিশেষ করে খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বে, খুব গোড়ার দিকেই এমন একটি ধারণা প্রবেশ করেছিল যা এই চিরাচরিত ‘সর্বশক্তিমান’ ঈশ্বরের ধারণাকে একটি বড় ধাক্কা দেয়। এই ধারণাটির নাম ‘ইনকারনেশন’ (Incarnation) বা ঈশ্বরের মানবদেহ ধারণ। এটি নিছক কোনো অলৌকিক গল্প নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল পশ্চিমা সভ্যতার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর। খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করতে শুরু করল যে, ঈশ্বর অসীম হওয়া সত্ত্বেও যিশুর রূপে সসীম মানুষ হয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন। এই যে অসীম ঈশ্বর নিজেকে মানুষের ক্ষুদ্র অবয়বে বন্দী করলেন, এর দার্শনিক অভিঘাত ছিল সুদূরপ্রসারী।

এই বিশ্বাসটি আপাতদৃষ্টিতে শুধুই একটি ধর্মীয় আখ্যান মনে হতে পারে, কিন্তু এর রাজনৈতিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর। ঈশ্বর যখন মানুষ হন, তখন তিনি অসীম হয়েও সীমার মধ্যে নিজেকে আটকে ফেলেন। তিনি চাইলেই সব কিছু করতে পারেন না, কারণ তিনি এখন মানুষ – তিনি ক্ষুধা অনুভব করেন, ব্যথা পান, অপমানিত হন এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন। গ্রিক ধর্মতত্ত্বে এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘কেনোসিস’ (Kenosis), যার শাব্দিক অর্থ হলো নিজেকে শূন্য করা বা সেলফ-এম্পটিং (Self-emptying)। ফিলিপীয়দের প্রতি পলের চিঠিতে এই শব্দটির প্রথম ব্যবহার দেখা যায়, যেখানে বলা হয়েছে ঈশ্বর স্বেচ্ছায় নিজের দেবত্ব ও ক্ষমতা সংকুচিত করে দাসের রূপ ধারণ করেছেন। এর মানে কী দাঁড়াল? এর মানে হলো, ঈশ্বর ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের ক্ষমতাকে সীমিত করলেন বা সেলফ-লিমিটেশন (Self-limitation) ঘটালেন। তিনি জগতকে বা সৃষ্টিজগতকে পুরোপুরি নিজের ‘মাইক্রো-ম্যানেজমেন্ট’-এর অধীনে না রেখে, একে তার নিজস্ব নিয়মে চলতে দেওয়ার জন্য একটি ‘স্পেস’ বা জায়গা ছেড়ে দিলেন। এই ‘ছেড়ে দেওয়া’ বা ত্যাগের ধারণাটিই পশ্চিমের মানুষকে শিখিয়েছে যে, সার্বভৌম ক্ষমতা থাকলেই তা সব সময় প্রয়োগ করতে হয় না; বরং ক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রকাশ হলো ক্ষমতাকে সংযত রাখা এবং অন্যদের (যেমন মানুষের তৈরি প্রতিষ্ঠানকে) কাজ করার স্বাধীনতা দেওয়া।

অবতারবাদ ও ঐশ্বরিক ক্ষমতার সংকোচনের রাজনীতি

ঈশ্বরের এই মানবীয় রূপ ধারণের বিষয়টি পশ্চিমা রাষ্ট্রচিন্তায় এক বিশাল প্যারাডক্স বা বৈপরীত্য তৈরি করেছিল। সাধারণত রাজারা বা শাসকরা ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের অসীম ক্ষমতার অধিকারী মনে করতেন। কিন্তু খ্রিস্টীয় ধর্মে দেখা গেল, স্বয়ং ঈশ্বরই নিজেকে ক্ষমতাহীন করেছেন, তিনি ক্রুশবিদ্ধ হয়েছেন এবং জাগতিক বিচারে পরাজিত হয়েছেন। এই চিত্রকল্পটি পশ্চিমা মানসজগতে একটি নতুন বার্তা দিল: ক্ষমতা মানেই জোরজবরদস্তি নয়। ঈশ্বর যদি নিজেকে সংযত করতে পারেন, তবে রাষ্ট্র বা সমাজও সার্বভৌম ক্ষমতার চর্চায় সংযম দেখাতে বাধ্য। মার্সেল গশ্যে (Marcel Gauchet) তার বিখ্যাত বই The Disenchantment of the World-এ দেখিয়েছেন, খ্রিস্টধর্ম হলো এমন এক ধর্ম যা ধর্ম থেকেই মানুষকে বের হওয়ার পথ দেখায় (Gauchet, 1997)। কারণ, এখানে ঈশ্বর জগত থেকে নিজেকে এতটাই আলাদা বা ট্রান্সেন্ডেন্ট (Transcendent) করে ফেলেন এবং যিশুর মাধ্যমে এতটাই মানবিক হয়ে যান যে, জগতের দৈনন্দিন কাজকর্মে অলৌকিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়।

ঈশ্বরের এই ‘সেলফ-উইথড্রয়াল’ (Self-withdrawal) বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার ধারণাটি জগতকে একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়। ঈশ্বর যেহেতু নিজেকে ‘কেনোসিস’-এর মাধ্যমে শূন্য করেছেন, তাই সেই শূন্যস্থান পূরণ করার দায়িত্ব এখন মানুষের। মানুষ এখন আর ঈশ্বরের হাতের পুতুল নয়, বরং সে ঈশ্বরের রেখে যাওয়া সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক বা ট্রাস্টি (Trustee)। এই ট্রাস্টিশিপের ধারণা থেকেই পশ্চিমে ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার জন্ম হয়েছে। ঈশ্বর যখন পেছনে সরে দাঁড়ান, তখন সামনে এসে কাজ করতে পারে মানুষের যুক্তি, বিজ্ঞান এবং আইন। চার্লস টেইলর তার কালজয়ী গ্রন্থ A Secular Age-এ খুব চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, কীভাবে এই ধর্মতাত্ত্বিক পরিবর্তনটি পশ্চিমা মানুষকে জগত সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে (Taylor, 2007)। টেইলরের মতে, আধুনিক সেক্যুলারিজম কোনো বিয়োগান্তক ঘটনা নয় যেখানে মানুষ ধর্ম হারিয়ে ফেলেছে; বরং এটি খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের একটি বিবর্তিত রূপ, যেখানে ঈশ্বর জগতকে ‘সাবালক’ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন।

আশআরী ধর্মতত্ত্ব বনাম প্রাকৃতিক কার্যকারণ

অন্যদিকে, ইসলামি ধর্মতত্ত্বে, বিশেষ করে একাদশ শতাব্দীর পর থেকে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা আশআরী (Ash’arite) মতবাদে, ঈশ্বরের এই “সরে দাঁড়ানো” বা ক্ষমতা সীমিত করার ধারণাটি ছিল কল্পনারও অতীত। সেখানে ঈশ্বর হলেন ‘রাব্বুল আলামিন’ – যিনি প্রতিটা মুহূর্তে, প্রতিটা সেকেন্ডে জগতের সবকিছুর ওপর পূর্ণ এবং প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ রাখেন। আশআরী তত্ত্বে ‘অকেশনালিজম’ (Occasionalism) নামের একটি ধারণা অত্যন্ত প্রবল। এই মতবাদ অনুযায়ী, জগতে যা কিছু ঘটে – আগুন জ্বলছে, পাতা নড়ছে, মানুষ কথা বলছে – সবকিছুই ঈশ্বরের মুহূর্তের ইচ্ছার ফসল। আগুনের নিজস্ব কোনো পোড়ানোর ক্ষমতা নেই; ঈশ্বর প্রতিবার আগুনের সাথে পোড়ার ঘটনাটি ‘সৃষ্টি’ করেন বা সংযোগ ঘটিয়ে দেন। ইমাম আল-গাজালি (Al-Ghazali) তার লেখায় কার্যকারণ বা কজালিটি (Causality) সম্পর্কে এই দার্শনিক অবস্থানটি খুব জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন। তার মতে, প্রকৃতিতে যা ঘটে তা কোনো অমোঘ নিয়ম নয়, বরং তা ঈশ্বরের অভ্যাস (Habit of God)। ঈশ্বর চাইলে যেকোনো মুহূর্তে আগুনের ধর্ম বদলে দিতে পারেন।

এই দর্শনটি ঈশ্বরের সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করে ঠিকই, কিন্তু এটি জগতের ‘অটোনমি’ (Autonomy) বা নিজস্ব সত্তাকে অস্বীকার করে। গাছের পাতাটিও যদি ঈশ্বরের হুকুম ছাড়া না নড়ে, তবে সেখানে ‘প্রকৃতির আইন’ বা ‘রাষ্ট্রের আইন’ বলে কোনো স্বাধীন সত্তার অস্তিত্ব থাকতে পারে না। সবকিছুই ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ ইচ্ছার অধীন। এই মানসিকতায় ঈশ্বরকে জগত থেকে এক মুহূর্তের জন্যও আলাদা করা যায় না। ফলে, এমন কোনো ‘সেক্যুলার স্পেস’ বা নিরপেক্ষ জায়গা তৈরি হয় না যেখানে মানুষ নিজের যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালাবে এবং ঈশ্বর সেখানে হস্তক্ষেপ করবেন না। মুসলিম বিশ্বে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির বিকাশে একসময় যে ভাটা পড়েছিল, তার পেছনে এই ধর্মতাত্ত্বিক কারণটি গভীরভাবে দায়ী বলে অনেক তাত্ত্বিক মনে করেন। কারণ, বিজ্ঞান চর্চা করার জন্য এমন একটি জগতের প্রয়োজন যেখানে নিয়মগুলো স্থির এবং অপরিবর্তনীয় – ঈশ্বর প্রতিদিন সকালে সেই নিয়মগুলো নতুন করে লেখেন না। পশ্চিমে ‘কেনোসিস’-এর ধারণা ঈশ্বরকে সেই নিয়ম পরিবর্তনের দায় থেকে মুক্তি দিয়েছিল, কিন্তু আশআরী মতবাদ ঈশ্বরকে সেই দায়ের মধ্যেই আটকে রেখেছিল।

শূন্যস্থান পূরণ: যুক্তি, বিজ্ঞান ও আমলাতন্ত্রের উত্থান

পশ্চিমে ঈশ্বর যখন ‘কেনোসিস’-এর মাধ্যমে নিজেকে সংকুচিত করলেন, তখন সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একটা বিশাল ফাঁকা জায়গা বা ‘ভ্যাকুয়াম’ তৈরি হলো। প্রশ্ন উঠল, ঈশ্বর যদি সরাসরি দেশ না চালান, তবে দেশ চালাবে কে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই মানুষ তার নিজের যুক্তি বা রিজন (Reason)-কে আঁকড়ে ধরল। তৈরি হলো এমন সব প্রতিষ্ঠান, যারা ঈশ্বরের দোহাই না দিয়েই কাজ করতে পারে। একে বলা হয় ‘ইমপারসোনাল ইনস্টিটিউশন’ (Impersonal Institution)। একটি ব্যাংক যখন লোন দেয়, সে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে না, সে তার নিজস্ব গাণিতিক নিয়মে চলে। একটি আদালত যখন বিচার করে, সে দৈববাণীর অপেক্ষা করে না, সে লিখিত আইনের ধারায় চলে। এই যে ঈশ্বরকে বাদ দিয়েও জগত চলতে পারে – এই সাহসটি পশ্চিম পেয়েছিল তাদের ধর্মতত্ত্ব থেকেই। আমলাতন্ত্র বা ব্যুরোক্রেসি (Bureaucracy) হলো এই চিন্তার চূড়ান্ত ফসল। আমলাতন্ত্র একটি যন্ত্রের মতো, যার কোনো আত্মা নেই, কিন্তু আছে নিখুঁত কার্যকারিতা।

ঈশ্বর জগতকে মানুষের হাতে ‘ট্রাস্ট’ (Trust) করে বা বিশ্বাস করে ছেড়ে দিয়েছেন – এই ধারণাটি পশ্চিমে বিজ্ঞানের জয়যাত্রাকেও ত্বরান্বিত করেছে। সপ্তদশ শতাব্দীতে আইজ্যাক নিউটন বা রবার্ট বয়ল যখন বিজ্ঞান চর্চা করছিলেন, তারা ভাবতেন না যে তারা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যাচ্ছেন। বরং তারা ভাবতেন, ঈশ্বর একটি ঘড়ি বানিয়ে তাতে দম দিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন (Clockwork Universe), আর বিজ্ঞানীদের কাজ হলো সেই ঘড়ির কলকবজাগুলো কীভাবে কাজ করে তা খুঁজে বের করা। আমোস ফানকেনস্টাইন (Amos Funkenstein) তার Theology and the Scientific Imagination বইটিতে দেখিয়েছেন, কীভাবে মধ্যযুগীয় ধর্মতত্ত্বের এই ধারণাগুলোই আধুনিক বিজ্ঞানের জন্ম দিয়েছে (Funkenstein, 1986)। ঈশ্বর যদি প্রতি মুহূর্তে হস্তক্ষেপ করতেন, তবে মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কার করা সম্ভব হতো না; কারণ আজ আপেল নিচে পড়লে কাল হয়তো ওপরে উঠত। ঈশ্বরের এই ‘অনুপস্থিতি’ বা ‘নীরবতা’ই বিজ্ঞানীদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

সার্বভৌমত্বের বিবর্তন: ঈশ্বর থেকে রাষ্ট্র

ঈশ্বর যখন নিজেকে গুটিয়ে নিলেন, তখন তার সেই সার্বভৌম ক্ষমতার ধারণাটি বাতিল হয়ে গেল না; বরং তা স্থানান্তরিত হলো। কার্ল শ্মিটের সেই বিখ্যাত উক্তিটি এখানে আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে: আধুনিক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব হলো ঈশ্বরের সার্বভৌমত্বেরই একটি ধর্মনিরপেক্ষ রূপ। আগে মানুষ বিশ্বাস করত ঈশ্বর সবকিছুর ঊর্ধ্বে, তিনি আইনের ঊর্ধ্বে। আধুনিক যুগে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করল ‘রাষ্ট্র’ সবকিছুর ঊর্ধ্বে। কিন্তু পার্থক্য হলো, রাষ্ট্র এই ক্ষমতা পেয়েছে জনগণের সম্মতি এবং যুক্তির মাধ্যমে, কোনো দৈব বাণীর মাধ্যমে নয়। ‘কেনোসিস’-এর ফলে ঈশ্বরের যে ক্ষমতাটি ‘শূন্য’ হয়ে গিয়েছিল, রাষ্ট্র সেই ক্ষমতাটি দখল করে নিল। কিন্তু রাষ্ট্র যাতে আবার ঈশ্বরের মতো স্বেচ্ছাচারী হয়ে না ওঠে, সেজন্য তৈরি হলো ‘কনস্টিটিউশনালিজম’ (Constitutionalism) বা সংবিধানবাদ।

মুসলিম বিশ্বে এই প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয়েছে কারণ সেখানে সার্বভৌমত্ব কখনোই পুরোপুরি ঈশ্বরের হাত থেকে মানুষের হাতে বা রাষ্ট্রের হাতে হস্তান্তরিত হতে দেওয়া হয়নি। সেখানে সব সময়ই মনে করা হয়েছে, আসল শাসক হলেন আল্লাহ, এবং কোনো মানুষ বা প্রতিষ্ঠান যদি আইন তৈরি করতে যায়, তবে তা হবে ঈশ্বরের ক্ষমতায় ভাগ বসানোর শামিল। এই ভয় বা সতর্কতা থেকেই সেখানে আইনসভা বা পার্লামেন্ট – যারা স্বাধীনভাবে আইন তৈরি করতে পারে – গড়ে উঠতে অনেক সময় লেগেছে। পশ্চিমে, ঈশ্বর নিজেই সরে গিয়ে সেই ভয় দূর করে দিয়েছিলেন। তিনি যেন বলেছিলেন, “তোমরা তোমাদের মতো করে জগত চালাও, আমি শেষ বিচারের দিন হিসাব নেব।” এই স্বাধীনতাটুকু পশ্চিমের মানুষকে ভুল করার সুযোগ দিয়েছে, আবার সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংশোধন করারও সুযোগ দিয়েছে। আর এই ভুল ও সংশোধনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে আজকের আধুনিক, উন্নত এবং প্রাতিষ্ঠানিক পশ্চিম।

দুটি তরবারি বা ‘ডুয়াল সভারেনটি’ (Dual Sovereignty)

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মুহূর্ত আসে যা আপাতদৃষ্টিতে খুব সামান্য মনে হয়, কিন্তু সেই মুহূর্তগুলোই ভবিষ্যতের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। যিশু খ্রিস্টের একটি মাত্র বাক্য পশ্চিমা সভ্যতার ডিএনএ বা জিনের গঠন চিরতরে বদলে দিয়েছিল। তিনি যখন একদল লোকের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, “সিজারের যা প্রাপ্য তা সিজারকে দাও, আর ঈশ্বরের যা প্রাপ্য তা ঈশ্বরকে দাও” (Render unto Caesar the things that are Caesar’s, and unto God the things that are God’s), তখন তিনি আসলে নিছক কোনো কর বা ট্যাক্স সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান দিচ্ছিলেন না। তিনি আসলে এক বিশাল রাজনৈতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছিলেন। প্রাচীন পৃথিবীতে, বিশেষ করে রোমান সাম্রাজ্যে বা মিশরীয় ফারাওদের যুগে, সম্রাট এবং ঈশ্বর ছিলেন একাকার। সম্রাটই ছিলেন দেবতা, আবার দেবতাই ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান। কিন্তু যিশুর এই একটি লাইনের মাধ্যমে জগতটা হঠাৎ করে দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। এক ভাগ হলো ঈশ্বরের রাজ্য বা কিংডম অফ গড (Kingdom of God), আর আরেক ভাগ হলো এই নশ্বর পৃথিবীর জাগতিক রাজ্য বা আর্থলি কিংডম (Earthly Kingdom)। এই বিভাজনের অর্থ দাঁড়াল অত্যন্ত গভীর – রাজার আইন আর ঈশ্বরের আইন এক নয়; রাষ্ট্র চালানো আর আত্মার মুক্তি খোঁজা – এই দুটো সম্পূর্ণ আলাদা কাজ এবং এদের এলাকাও আলাদা।

এই ধারণাটি পশ্চিমা রাজনৈতিক চিন্তার মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, যাকে আমরা ‘ডুয়াল সভারেনটি’ (Dual Sovereignty) বা দ্বৈত সার্বভৌমত্ব বলি। এর মূল কথা হলো, মানুষের জীবনের ওপর কারোরই একচ্ছত্র আধিপত্য নেই। আধ্যাত্মিক বিষয়ে চার্চ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান শেষ কথা বলবে, আর জাগতিক বা প্রশাসনিক বিষয়ে রাষ্ট্র বা রাজা শেষ কথা বলবেন। এই বিভাজনটি ছিল আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেক্যুলারিজম (Secularism)-এর ভ্রূণ। কারণ, যখনই আপনি মেনে নিচ্ছেন যে জীবনের এমন একটা অংশ আছে যা ‘সিজারের’ (অর্থাৎ রাষ্ট্রের) এবং সেখানে ঈশ্বরের সরাসরি হস্তক্ষেপ বা ম্যান্ডেট জরুরি নয়, তখনই আপনি মূলত একটি ধর্মনিরপেক্ষ বা সেক্যুলার পরিসর তৈরি করে ফেলছেন। সেন্ট অগাস্টিন বা অগাস্টিন অফ হিপ্পো (Augustine of Hippo) তার কালজয়ী গ্রন্থ The City of God-এ এই ধারণাটিকে আরও দার্শনিক ভিত্তি দিয়েছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে, মানুষের আনুগত্য দুটি ভিন্ন শহরের প্রতি – একটি হলো ‘ঈশ্বরের শহর’ (Civitas Dei) আর অন্যটি ‘মানুষের শহর’ (Civitas Terrena)। এই দুই শহরের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভিন্ন। এই দার্শনিক বিভাজনটিই পরবর্তীতে পশ্চিমকে এমন এক পথে চালিত করেছে, যেখানে রাষ্ট্র নিজেকে ধর্ম থেকে আলাদা করে একটি দক্ষ প্রশাসনিক যন্ত্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছে।

গেলাসিয়াসের ‘দুই তরবারি’ তত্ত্ব এবং ক্ষমতার ভারসাম্য

যিশুর সেই উক্তি এবং অগাস্টিনের দর্শনের ওপর ভিত্তি করে পঞ্চম শতাব্দীতে পোপ প্রথম গেলাসিয়াস (Pope Gelasius I) বাইজেন্টাইন সম্রাট আনাস্তাসিয়াসের কাছে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে তিনি এক বৈপ্লবিক তত্ত্বের অবতারণা করেন, যা ইতিহাসে ‘ডকট্রিন অফ টু সোর্ডস’ (Doctrine of Two Swords) বা দুই তরবারি তত্ত্ব নামে পরিচিত। গেলাসিয়াস বাইবেলের লুকের সুসমাচারের একটি অংশের রূপক ব্যাখ্যা করে বলেন, ঈশ্বর জগত পরিচালনার জন্য দুটি তরবারি বা ক্ষমতা দান করেছেন। একটি হলো ‘পবিত্র কর্তৃত্ব’ বা স্যাকরেড অথরিটি (Auctoritas Sacrata) যা চার্চের যাজকদের হাতে থাকে, আর অন্যটি হলো ‘রাজকীয় ক্ষমতা’ বা রয়্যাল পাওয়ার (Regalis Potestas) যা রাজার হাতে থাকে। গেলাসিয়াসের এই তত্ত্বের সারমর্ম ছিল – রাজা চার্চের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাবেন না, আবার চার্চও রাষ্ট্র পরিচালনার দৈনন্দিন কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না। যদিও মধ্যযুগে পোপ এবং রাজারা প্রায়ই এই সীমা লঙ্ঘন করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু নীতিগতভাবে এই বিভাজনটি সব সময় স্বীকৃত ছিল।

এই ‘দুই তরবারি’র ধারণা পশ্চিমে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। যেহেতু সমাজে ক্ষমতার দুটি কেন্দ্র ছিল – একদিকে পোপ, অন্যদিকে সম্রাট – তাই কেউই নিরঙ্কুশ বা অ্যাবসলিউট (Absolute) ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেননি। রাজা চাইলেই যা খুশি তাই করতে পারতেন না, কারণ চার্চের হাতে তাকে সমাজচ্যুত বা ‘এক্সকমিউনিকেট’ (Excommunicate) করার ক্ষমতা ছিল। আবার পোপও চাইলেই সৈন্য সামন্ত নিয়ে দেশ দখল করতে পারতেন না, কারণ ‘সিজারের তরবারি’ ছিল রাজার হাতে। এই টানাটানি বা দ্বন্দ্বের একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ হলো একাদশ শতাব্দীর ইনভেস্টিচার কনট্রোভার্সি (Investiture Controversy)। এই সংঘাতে প্রশ্ন উঠেছিল – বিশপ বা ধর্মীয় নেতাদের নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা কার? রাজার নাকি পোপের? এই দ্বন্দ্বের ফলেই শেষ পর্যন্ত আইন এবং বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ঘটে। বিখ্যাত আইন ইতিহাসবিদ হ্যারল্ড বারম্যান (Harold Berman) তার Law and Revolution বইতে দেখিয়েছেন যে, পোপ এবং সম্রাটের এই সংঘাতের ফলেই পশ্চিমে প্রথম আধুনিক আইন ব্যবস্থা বা ক্যানন ল (Canon Law) এবং তার বিপরীতে রাজকীয় আইনের বিকাশ ঘটে (Berman, 1983)। ক্ষমতার এই ভারসাম্য বা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা বা লিবার্টি (Liberty) রক্ষায় বড় ভূমিকা রেখেছিল, কারণ তারা এক পক্ষের অত্যাচার থেকে বাঁচতে অন্য পক্ষের আশ্রয় নিতে পারত।

ইসলামি তাওহিদ এবং অখণ্ড সার্বভৌমত্বের ধারণা

পশ্চিমে যখন ক্ষমতার এই বিভাজন বা দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠছে, ঠিক সেই সময়ে বা তার কিছু পরে মুসলিম বিশ্বে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব দানা বাঁধছিল। ইসলামের মূল ভিত্তি হলো তাওহিদ (Tawhid) বা একত্ববাদ। এই একত্ববাদ শুধু আল্লাহর সত্তার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, এটি সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। ইসলামি চিন্তায় ‘দীন’ (ধর্ম) এবং ‘দুনিয়া’ (জাগতিক জীবন) ওতপ্রোতভাবে জড়িত; এদের আলাদা করা মানেই হলো জীবনের অখণ্ডতাকে ভেঙে ফেলা। নবী মুহম্মদের জীবন এবং মদিনার রাষ্ট্রকাঠামো এই অখণ্ডতারই মূর্ত প্রতীক। তিনি একইসাথে ছিলেন আল্লাহর নবী (ধর্মীয় নেতা), সেনাপতি (সামরিক নেতা) এবং মদিনার শাসক (রাষ্ট্রনায়ক)। তার মধ্যে এই তিনটি সত্তা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। ফলে ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তায় এমন কোনো ‘স্পেস’ বা জায়গা তৈরি হয়নি, যেখানে ঈশ্বরের আইন খাটে না বা যা শুধুই মানুষের বুদ্ধি দিয়ে চলবে।

ইসলামি খিলাফত ব্যবস্থায় খলিফা ছিলেন ‘আমিরুল মুমিনিন’ বা বিশ্বাসীদের নেতা। তার দায়িত্ব ছিল ধর্মকে রক্ষা করা এবং একইসাথে দুনিয়াকে শাসন করা। প্রখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন (Ibn Khaldun) তার Muqaddimah গ্রন্থে খিলাফতের সংজ্ঞায় বলেছেন যে, খিলাফত হলো শরিয়াহ অনুযায়ী জনগণকে ইহকালীন এবং পরকালীন কল্যাণের পথে পরিচালনা করা। এখানে সিজার এবং ঈশ্বরের কোনো ভাগাভাগি নেই; পুরো রাজত্বই ঈশ্বরের এবং খলিফা হলেন তার প্রতিনিধি বা ট্রাস্টি। এই অখণ্ড সার্বভৌমত্বের ধারণা বা ইউনিটারি সভারেনটি (Unitary Sovereignty) মুসলিম সমাজে সামাজিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী সংহতি তৈরি করলেও, এটি আধুনিক অর্থে ‘সেক্যুলার আইন’ বা ‘স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র’ গঠনে একটি তাত্ত্বিক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ, রাষ্ট্র যদি ঈশ্বরের আইনের বাইরে গিয়ে নিজের মতো করে আইন তৈরি করতে চায়, তবে ইসলামি তত্ত্বে তা ঈশ্বরের সার্বভৌমত্বে ভাগ বসানোর বা ‘শিরক’ করার শামিল হতে পারে। ফলে আইন তৈরির ক্ষমতা বা লেজিসলেশন (Legislation) সব সময়ই ধর্মতাত্ত্বিকদের বা উলামাদের হাতে কুক্ষিগত ছিল, যা রাষ্ট্রের নিজস্ব আইনি সত্তা বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

সিজারের রাজ্য: আমলাতন্ত্র ও সেক্যুলার রাষ্ট্রের জন্ম

পশ্চিমে যিশুর সেই ‘দুই রাজ্য’ বা ‘ডুয়াল সভারেনটি’র ধারণাটি শেষ পর্যন্ত আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র বা মডার্ন স্টেট (Modern State)-এর জন্ম দেয়। রাষ্ট্র যখন বুঝল যে তার কাজ মানুষের আত্মার মুক্তি দেওয়া নয়, মানুষকে স্বর্গে পাঠানো তার দায়িত্ব নয়, তখন সে নিজেকে একটি দক্ষ ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’ বা সেবা প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিল। রাজার কাজ হলো রাস্তাঘাট বানানো, সীমান্ত রক্ষা করা, কর আদায় করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। এই কাজগুলো করার জন্য বাইবেল পড়ার দরকার নেই, দরকার দক্ষ হিসাবরক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার এবং প্রশাসক। এখান থেকেই জন্ম নিল আধুনিক আমলাতন্ত্র বা ব্যুরোক্রেসি (Bureaucracy)। আমলাতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি ব্যক্তিনিরপেক্ষ এবং ধর্ম নিরপেক্ষ। একজন আমলা ধার্মিক হতে পারেন বা না-ও হতে পারেন, কিন্তু রাষ্ট্রের কাজে তিনি কেবল আইনের নিয়ম মেনে চলবেন।

মধ্যযুগের শেষের দিকে এবং রেনেসাঁসের সময় নিকালো ম্যাকিয়াভেলি বা টমাস হবস (Thomas Hobbes)-এর মতো চিন্তাবিদরা যখন রাজনীতি নিয়ে লিখলেন, তারা এই বিভাজনটাকে আরও পাকাপোক্ত করলেন। ম্যাকিয়াভেলি তার The Prince বইতে রাজনীতিকে নৈতিকতা বা ধর্ম থেকে আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র কারিগরি বিদ্যা বা টেকনিক্যাল আর্ট (Technical Art) হিসেবে উপস্থাপন করলেন। এটি সম্ভব হয়েছিল কারণ পশ্চিমা মনস্তত্ত্বে আগেই মেনে নেওয়া হয়েছিল যে, সিজারের রাজ্যের নিয়মকানুন ঈশ্বরের রাজ্যের নিয়মকানুন থেকে ভিন্ন হতে পারে। রাষ্ট্র একটি ‘কৃত্রিম সত্তা’ বা আর্টিফিশিয়াল পারসন (Artificial Person) হিসেবে দাঁড়িয়ে গেল। ইতিহাসবিদ আর্নেস্ট কান্টোরোভিচ (Ernst Kantorowicz) তার বিখ্যাত বই The King’s Two Bodies-এ দেখিয়েছেন কীভাবে ইউরোপে রাজার দুটি সত্তা কল্পনা করা হতো – একটি তার নশ্বর দেহ যা মারা যায়, আর অন্যটি তার রাজনৈতিক দেহ যা রাষ্ট্রের প্রতীক হিসেবে অমর (Kantorowicz, 1957)। এই বিমূর্ত বা অ্যাবস্ট্রাক্ট (Abstract) রাষ্ট্রের ধারণাটি মুসলিম বিশ্বে অনুপস্থিত ছিল, কারণ সেখানে রাষ্ট্র সবসময়ই শাসকের ব্যক্তিগত ধর্মবোধ এবং শরিয়াহর সাথে যুক্ত ছিল। ফলে পশ্চিমে রাষ্ট্র, আইন এবং প্রশাসন – ধর্ম থেকে আলাদা হয়ে নিজেদের মতো করে বিকশিত হওয়ার (Evolution) এবং আধুনিক হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল, যা প্রাচ্যের একীভূত ব্যবস্থায় সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি।

প্রাকৃতিক আইন বনাম ঐশ্বরিক আদেশ (Natural Law vs. Divine Command)

মানব সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশের প্রশ্নটি যখনই সামনে আসে, তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক বিতর্কটি আবর্তিত হয় কার্যকারণ বা কজালিটি (Causality)-কে কেন্দ্র করে। আমরা সাধারণ চোখে যা দেখি, তা হলো একটি ঘটনা আরেকটি ঘটনার জন্ম দেয়। যেমন – আগুনের সংস্পর্শে এলে তুলা জ্বলে ওঠে, বা মেঘ জমলে বৃষ্টি হয়। এই যে ‘ক’ ঘটলে ‘খ’ ঘটে – একে আমরা প্রাকৃতিক নিয়ম বা ন্যাচারাল ল (Natural Law) বলি। বিজ্ঞান মূলত এই নিয়মগুলো খুঁজে বের করার এবং তার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যদ্বাণী করার শাস্ত্র। কিন্তু মধ্যযুগে, যখন ধর্মই ছিল জ্ঞানের একমাত্র মাপকাঠি, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন পণ্ডিতদের ভাবিয়ে তুলেছিল: এই নিয়মগুলো কি আসলেই প্রকৃতির নিজস্ব, নাকি এগুলো প্রতি মুহূর্তে ঈশ্বরের সরাসরি ইচ্ছার প্রতিফলন? কাগজ কেন পোড়ে? আগুনের কি নিজস্ব কোনো ‘পোড়ানোর ক্ষমতা’ আছে, নাকি ঈশ্বর সেই মুহূর্তে চান বলেই কাগজটি পোড়ে? এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর নির্ভর করছিল বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ। যদি উত্তর হয় ‘ঈশ্বরের ইচ্ছায়’, তবে বিজ্ঞানের কোনো শক্ত ভিত্তি থাকে না। আর যদি উত্তর হয় ‘প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে’, তবে বিজ্ঞান তার চলার পথ খুঁজে পায়।

এই বিতর্কটি ইতিহাসের দুটি প্রধান সভ্যতা – ইসলামি এবং পশ্চিমা – দুই ভিন্ন পথে সমাধান করেছিল, যা তাদের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। মুসলিম বিশ্বে একাদশ শতাব্দীর পর থেকে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা ধর্মতাত্ত্বিকরা, বিশেষ করে যারা আশআরী (Ash’arite) ঘরানার অনুসারী ছিলেন, তারা ঈশ্বরের নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব বা অমনিপোটেন্স (Omnipotence) রক্ষার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, যদি বলা হয় আগুনের পোড়ানোর নিজস্ব ক্ষমতা আছে, তবে এর মানে দাঁড়ায় আগুনের এমন একটি শক্তি আছে যা ঈশ্বরের মুখাপেক্ষী নয়। এটি ঈশ্বরের একচ্ছত্র ক্ষমতায় ভাগ বসানোর শামিল। তাই বিখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক ইমাম আল-গাজালি (Al-Ghazali) তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Incoherence of the Philosophers (তাহাফুত আল-ফালাসিফা)-এ অ্যারিস্টটলীয় কার্যকারণ তত্ত্বের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “কার্য এবং কারণের মধ্যে কোনো আবশ্যিক বা যৌক্তিক সম্পর্ক নেই।” আগুন এবং পোড়া – এই দুটি আলাদা ঘটনা, যা ঈশ্বর তার ইচ্ছায় বা অভ্যাসবশত (Habit) পরপর সংঘটন করেন। এই দার্শনিক অবস্থানকে বলা হয় অকেশনালিজম (Occasionalism)। এই মতবাদ অনুযায়ী, জগতে কোনো ‘সেকেন্ডারি কজ’ বা গৌণ কারণ নেই; একমাত্র এবং অদ্বিতীয় কারণ হলেন ঈশ্বর।

অকেশনালিজম এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসার সংকট

অকেশনালিজমের এই ধারণাটি ধর্মতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ভক্তিপূর্ণ। এটি একজন মুমিনকে প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শেখায়। কিন্তু বিজ্ঞানের জন্য এটি একটি বড় সংকট তৈরি করে। কারণ, বিজ্ঞান কাজ করে ‘ইউনিভার্সাল ল’ বা সার্বজনীন সূত্রের ওপর ভিত্তি করে। বিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন যে, আজ যদি জল ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফোটে, তবে আগামীকালও তা ফুটবে, এবং এক হাজার বছর পরেও ফুটবে – যদি না বাতাসের চাপ বা অন্য কোনো ভৌত শর্ত পরিবর্তিত হয়। কিন্তু অকেশনালিজম বলে, আগামীকাল জল ফুটবে কি না তা সম্পূর্ণ ঈশ্বরের মর্জির ওপর নির্ভরশীল; তিনি চাইলে পানিকে বরফেও পরিণত করতে পারেন, যেমন তিনি নবী ইব্রাহিমের জন্য আগুনকে শীতল করে দিয়েছিলেন। যখন প্রকৃতির প্রতিটি ঘটনাকে একটি সম্ভাব্য অলৌকিক বা ‘মিরাকল’ (Miracle) হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে, তখন সেখানে কোনো অমোঘ সূত্র বা ল অফ নেচার (Law of Nature) আবিষ্কার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এই অনিশ্চয়তা বা ‘কন্টিনজেন্সি’ (Contingency) বিজ্ঞানীদের মনে এক ধরণের তাত্ত্বিক দ্বিধা তৈরি করেছিল। যদি মহাবিশ্বের কোনো নিজস্ব স্থিতিশীলতা না থাকে, তবে তা নিয়ে গবেষণা করার অর্থ কী? মুসলিম বিশ্বে জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত বা চিকিৎসাশাস্ত্রে বিশাল অগ্রগতি হলেও, এই অকেশনালিজমের প্রভাবে একটি সামগ্রিক ‘প্রাকৃতিক দর্শন’ বা ন্যাচারাল ফিলোসফি (Natural Philosophy) গড়ে উঠতে বাধা পেয়েছিল, যা ইউরোপে নিউটনীয় বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। বিজ্ঞান ঐতিহাসিক টবি হাফ (Toby Huff) তার The Rise of Early Modern Science গ্রন্থে এই বিষয়টিকে খুব গুরুত্বের সাথে বিশ্লেষণ করেছেন। হাফের মতে, ইসলামি আইনি এবং ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোতে ‘প্রকৃতির আইন’-এর কোনো স্থান ছিল না, কারণ আইন কেবল ঈশ্বরের আদেশ বা ডিভাইন কমান্ড (Divine Command)-এর বিষয় হতে পারে; কোনো জড় পদার্থের আইন মেনে চলার প্রশ্নই আসে না (Huff, 2003)। ফলে সেখানে বিজ্ঞান চর্চা ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে, তা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারেনি।

টমাস একুইনাস এবং যুক্তিবাদী ধর্মতত্ত্বের উত্থান

অন্যদিকে, ইউরোপে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এক যুগান্তকারী বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব ঘটে। এই বিপ্লবের নায়ক ছিলেন সেন্ট টমাস একুইনাস (Thomas Aquinas)। তিনি ছিলেন একজন ডমিনিকান যাজক এবং মধ্যযুগীয় দর্শনের এক বিশাল স্তম্ভ। একুইনাস দেখলেন যে, অ্যারিস্টটলের যুক্তিবাদী দর্শন এবং খ্রিস্টধর্মের ওহি বা প্রত্যাদেশ (Revelation)-এর মধ্যে একটি সংঘাত চলছে। তিনি এই সংঘাত নিরসনের জন্য একটি চমৎকার মধ্যপন্থা বা সিন্থেসিস (Synthesis) তৈরি করলেন, যা টোমিজম (Thomism) নামে পরিচিত। একুইনাস বললেন, সত্য দুই প্রকার – এক, যা ওহির মাধ্যমে পাওয়া যায় (যেমন বাইবেল), আর দুই, যা মানুষের যুক্তি বা রিজন (Reason) দিয়ে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে পাওয়া যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি তিনি বললেন – এই দুই সত্য কখনোই পরস্পরবিরোধী হতে পারে না, কারণ দুটোরই উৎস এক ঈশ্বর। ঈশ্বর মিথ্যা বলতে পারেন না, তাই তার সৃষ্টি (প্রকৃতি) এবং তার বাণী (ধর্মগ্রন্থ) অবশ্যই এক সুরে কথা বলবে।

একুইনাস যুক্তি দিলেন যে, ঈশ্বর অবশ্যই সর্বশক্তিমান, কিন্তু তিনি খামখেয়ালি বা বিশৃঙ্খল নন। তিনি জগত সৃষ্টি করার সময় কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম বা ‘প্রাকৃতিক আইন’ (Natural Law) ঠিক করে দিয়েছেন। ঈশ্বর তার অসীম প্রজ্ঞায় (Wisdom) এই আইনগুলো তৈরি করেছেন এবং তিনি সাধারণ অবস্থায় এই আইনগুলো লঙ্ঘন করেন না। তিনি জগতকে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার মধ্যে ছেড়ে দিয়েছেন, যাকে বলা হয় অর্ডো ন্যাচারি (Ordo Naturae) বা প্রকৃতির শৃঙ্খলা। এর মানে হলো, ঈশ্বর বারবার আগুনের পোড়ানোর ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করেন না; তিনি আগুনকে এমনভাবেই বানিয়েছেন যে তার ধর্মই হলো পোড়ানো। ঈশ্বরের এই ‘সেলফ-বাইন্ডিং’ বা নিজেকে নিয়মের মধ্যে বেঁধে ফেলার ধারণাটি বিজ্ঞানীদের জন্য এক বিশাল স্বস্তির বার্তা নিয়ে এল। তারা বুঝলেন, ঈশ্বরের মন বোঝার জন্য সবসময় গির্জায় বসে প্রার্থনা করার দরকার নেই; বরং তার সৃষ্টিকে বা প্রকৃতিকে ব্যবচ্ছেদ করলেই ঈশ্বরের কারিগরির মহিমা বোঝা যাবে। বিখ্যাত বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলার বা গ্যালিলিও যখন তাদের সূত্রগুলো আবিষ্কার করছিলেন, তারা মনে করতেন তারা ঈশ্বরের জ্যামিতিক ভাষা পাঠ করছেন।

ঈশ্বরের ‘রিটায়ারমেন্ট’ এবং যান্ত্রিক বিশ্বভঙ্গি

একুইনাসের এই দর্শনের হাত ধরে ইউরোপে এক নতুন বিশ্বভঙ্গি বা ওয়ার্ল্ডভিউ (Worldview) গড়ে উঠল। ঈশ্বরকে প্রকৃতির দৈনন্দিন কাজ থেকে এক ধরণের সম্মানজনক ‘রিটায়ারমেন্ট’ বা অবসর দেওয়া হলো। মনে করা হলো, ঈশ্বর হলেন একজন দক্ষ ঘড়ি-নির্মাতা বা ওয়াচমেকার (Watchmaker)। তিনি মহাবিশ্ব নামের এই বিশাল ঘড়িটি নিখুঁতভাবে বানিয়েছেন, এতে শক্তির দম দিয়েছেন এবং তারপর একে চলতে দিয়েছেন। এখন ঘড়িটি তার নিজস্ব মেকানিজম বা যান্ত্রিক নিয়মে চলছে। একে বলা হয় মেকানিকাল ফিলোসফি (Mechanical Philosophy)। সপ্তদশ শতাব্দীতে রেনে দেকার্ত এবং আইজ্যাক নিউটনের হাতে এই দর্শন পূর্ণতা পায়। তারা জগতকে একটি বিশাল যন্ত্র হিসেবে কল্পনা করলেন, যার প্রতিটি অংশ গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এখানে কোনো ভূত-প্রেত বা রহস্যময় আত্মার স্থান নেই; আছে শুধু ভর, গতি এবং বল।

এই যান্ত্রিক বিশ্বভঙ্গি বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় বিপ্লব ঘটিয়ে দিল। যেহেতু ঈশ্বর বারবার হস্তক্ষেপ করছেন না, তাই বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির গোপন রহস্য উদ্ঘাটনে সাহসী হলেন। তারা জানতেন, আজ যা সত্য, কালও তা সত্য থাকবে। এই নিশ্চয়তা বা সার্টেন্টি (Certainty)-ই আধুনিক প্রযুক্তি এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভিত্তি। আপনি যখন একটি ব্রিজ বানান বা রকেট পাঠান, আপনি ধরে নেন মাধ্যাকর্ষণ শক্তি হঠাৎ করে কাজ করা বন্ধ করবে না। মুসলিম বিশ্বে বা প্রাচ্যের অন্য অনেক সংস্কৃতিতে, যেখানে প্রকৃতিকে জীবন্ত বা ঐশ্বরিক শক্তির লীলাক্ষেত্র মনে করা হতো, সেখানে প্রকৃতিকে এভাবে নির্জীব যন্ত্র হিসেবে দেখার সাহস বা মানসিকতা তৈরি হয়নি। সেখানে প্রকৃতিকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বা ‘জয়’ করার চেয়ে প্রকৃতির সাথে ‘হার্মনি’ বা সামঞ্জস্য রেখে চলার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু পশ্চিমে, প্রাকৃতিক আইনের ধারণা মানুষকে প্রকৃতির প্রভু বা মাস্টার অ্যান্ড পজেসর (Master and Possessor) হওয়ার লাইসেন্স দিয়ে দিল।

ভলান্টারিজম বনাম ইন্টেলেকচুয়ালিজম: আইনের উৎসের বিতর্ক

এই পুরো বিতর্কটিকে দর্শনের ভাষায় ভলান্টারিজম (Voluntarism) বনাম ইন্টেলেকচুয়ালিজম (Intellectualism)-এর দ্বন্দ্ব হিসেবেও দেখা যায়। ভলান্টারিজম বা ইচ্ছাবাদ মনে করে, ঈশ্বরের ইচ্ছাই (Will) সবকিছুর মূল। কোনো কাজ ভালো কারণ ঈশ্বর তা আদেশ করেছেন; ঈশ্বর আদেশ করলে মিথ্যা বলাও ভালো হতে পারত (তাত্ত্বিকভাবে)। ইসলামি আশআরী মতবাদ এবং খ্রিস্টান ওকামিস্ট (William of Ockham) ধারা এই ভলান্টারিজমে বিশ্বাসী ছিল। অন্যদিকে, ইন্টেলেকচুয়ালিজম বা বৌদ্ধিকতাবাদ মনে করে, ঈশ্বরের বুদ্ধি বা প্রজ্ঞাই (Intellect) প্রধান। ঈশ্বর কোনো কাজ আদেশ করেন কারণ কাজটি তার নিজস্ব গুণেই ভালো; ঈশ্বর চাইলেও অযৌক্তিক কিছু করতে পারেন না (যেমন – বর্গাকার বৃত্ত বানানো)। একুইনাস ছিলেন এই ইন্টেলেকচুয়ালিজমের প্রবক্তা।

পশ্চিমা আইন ব্যবস্থা বা লিগ্যাল সিস্টেম গড়ে ওঠার পেছনেও এই ন্যাচারাল ল বা বৌদ্ধিকতাবাদী দর্শনের বিশাল ভূমিকা ছিল। যেহেতু বিশ্বাস করা হতো যে মানুষের যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে ঈশ্বরের শাশ্বত আইন বা ইটারনাল ল (Eternal Law)-এর একটি অংশ (প্রাকৃতিক আইন) বোঝা সম্ভব, তাই আইন তৈরির জন্য সবসময় ওহি বা ধর্মগ্রন্থের দরকার হতো না। মানুষ তার বিবেক এবং যুক্তি ব্যবহার করে ন্যায়-অন্যায় বিচার করতে পারত। এখান থেকেই পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক আইন বা ইন্টারন্যাশনাল ল (International Law) এবং মানবাধিকারের ধারণা জন্ম নেয়। হুগো গ্রোশিয়াস (Hugo Grotius), যাকে আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের জনক বলা হয়, তিনি সপ্তদশ শতাব্দীতে একটি বিস্ফোরক মন্তব্য করেছিলেন: “ঈশ্বর যদি না-ও থাকতেন (Etiamsi daremus), তবুও প্রাকৃতিক আইন সত্য এবং কার্যকর হতো।” এই কথার মাধ্যমে তিনি আইনকে ধর্মতত্ত্ব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বা স্বাধীন করে ফেলেছিলেন। আইন এখন আর ঈশ্বরের আদেশের অপেক্ষায় নেই; এটি মানুষের যুক্তি এবং প্রকৃতির বাস্তবতা থেকেই উৎসারিত। এই বৈপ্লবিক চিন্তাই পশ্চিমকে একটি সেক্যুলার, যুক্তিবাদী এবং বিজ্ঞানমনস্ক সভ্যতা হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে।

চার্চ বনাম রাষ্ট্র – সংঘাত যখন আশীর্বাদ

সাধারণত সামাজিক শান্তি ও স্থিতিকেই আমরা উন্নয়নের পূর্বশর্ত বলে মনে করি। আমাদের সহজাত ধারণা হলো, একটি সমাজ বা রাষ্ট্র তখনই সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছাতে পারে যখন সেখানে রাজা, প্রজা, ধর্মগুরু এবং প্রশাসন সবাই মিলেমিশে এক সুরে কথা বলে। ঐক্যের এই রোমান্টিক ধারণাটি প্রাচ্যের দর্শনে, বিশেষ করে কনফুসীয় বা ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তায় অত্যন্ত প্রবল। কিন্তু ইউরোপের ইতিহাসের দিকে তাকালে এক সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যায়। পশ্চিমা সভ্যতার যে অভাবনীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ, তার মূলে কোনো শান্তিচুক্তি বা মৈত্রী ছিল না; বরং ছিল প্রচণ্ড এক বিরামহীন ঝগড়া। এই ঐতিহাসিক ঝগড়াটি বা সংঘাতটি ছিল ক্ষমতার দুটি প্রধান কেন্দ্রের মধ্যে – একদিকে পোপ বা চার্চ (ধর্মীয় আধিপত্য), আর অন্যদিকে সম্রাট বা রাষ্ট্র (রাজনৈতিক আধিপত্য)। এই দুই দানবীয় শক্তির রেষারেষি ইউরোপকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি ঠিকই, কিন্তু এই সংঘাতের ফলেই এমন কিছু উপজাত বা ‘বাই-প্রোডাক্ট’ তৈরি হয়েছে, যা আজকের আধুনিক গণতন্ত্র এবং আইনের শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। এই সংঘাত যদি না ঘটত, যদি ইউরোপে কোনো একক ক্ষমতাধর শাসকের অধীনে পূর্ণাঙ্গ শান্তি বিরাজ করত, তবে হয়তো আজকের এই প্রাতিষ্ঠানিক বহুত্ববাদ বা ইনস্টিটিউশনাল প্লুরালিজম (Institutional Pluralism) আমরা দেখতে পেতাম না।

একাদশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত ইউরোপের চিত্রটা ছিল অনেকটা অস্পষ্ট। চার্চ এবং রাষ্ট্র তখনো পুরোপুরি আলাদা হয়নি। রাজারা প্রায়ই বিশপ নিয়োগ দিতেন এবং চার্চের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতেন। কিন্তু ১০৭৫ সালে পোপ সপ্তম গ্রেগরি (Pope Gregory VII) এমন এক ঘোষণা দিলেন, যা মধ্যযুগীয় রাজনীতির ভিত্তি কাঁপিয়ে দিল। এই ঘটনাটি ইতিহাসে ‘পোপাল রিভোলিউশন’ (Papal Revolution) বা পোপীয় বিপ্লব নামে পরিচিত। পোপ গ্রেগরি তার বিখ্যাত দলিল Dictatus Papae-তে ঘোষণা করলেন যে, চার্চ হলো ঈশ্বরের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন সত্তা। তাই বিশপ বা ধর্মীয় নেতা নিয়োগ করার ক্ষমতা কোনো জাগতিক রাজার নেই; এই ক্ষমতা শুধুই পোপের। তৎকালীন পবিত্র রোমান সম্রাট চতুর্থ হেনরি (Henry IV) এই দাবি মেনে নিতে অস্বীকার করলেন। তিনি বললেন, “আমার রাজ্যে বিশপরা একই সাথে সামন্ত প্রভুর দায়িত্ব পালন করেন, তাই তাদের নিয়োগ দেওয়ার অধিকার আমার আছে।” শুরু হলো এক ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ইনভেস্টিচার কনট্রোভার্সি’ (Investiture Controversy)। এটি নিছক পদ-পদবি বা পোশাক পরানোর অধিকার নিয়ে ঝগড়া ছিল না; এটি ছিল সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন – কে বড়? ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে পোপ, নাকি রাজ্যের মালিক হিসেবে রাজা?

আইনি বিপ্লব: ক্যানন ল বনাম রয়্যাল ল

এই সংঘাতের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফলটি যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং আদালতের এজলাসে দেখা গেল। পোপ গ্রেগরি এবং তার উত্তরসূরিরা যখন বুঝলেন যে শুধু মুখের কথায় রাজাদের থামানো যাবে না, তখন তারা চার্চকে একটি সুসংগঠিত আইনি কাঠামোর ওপর দাঁড় করানোর প্রয়োজন অনুভব করলেন। তারা রোমান আইনের পুরোনো পান্ডুলিপিগুলো ঘেঁটে নতুন এক আইন ব্যবস্থা তৈরি করলেন, যার নাম ‘ক্যানন ল’ (Canon Law) বা যাজকীয় আইন। এটি ছিল ইতিহাসের প্রথম আধুনিক এবং পদ্ধতিগত আইনি ব্যবস্থা। চার্চ দাবি করল, বিয়ে, উত্তরাধিকার, শপথ এবং যাজকদের বিচার – এসব বিষয় ক্যানন ল-এর অধীনে হবে এবং এর বিচার করবে চার্চের নিজস্ব আদালত। রাষ্ট্র বা রাজার আদালত এখানে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। বিখ্যাত আইনি ইতিহাসবিদ হ্যারল্ড বারম্যান (Harold Berman) তার কালজয়ী গবেষণাগ্রন্থ Law and Revolution-এ দেখিয়েছেন যে, আধুনিক পশ্চিমা আইন ব্যবস্থার প্রকৃত জন্ম হয়েছে এই সংঘাতের মধ্য দিয়েই (Berman, 1983)। বারম্যানের মতে, পোপীয় বিপ্লব চার্চকে একটি ‘করপোরেট’ সত্তায় রূপান্তর করেছিল, যা রাষ্ট্রের সমান্তরালে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম।

অন্যদিকে, রাজারাও বসে থাকলেন না। চার্চের এই আইনি আগ্রাসনের মোকাবেলা করার জন্য তারাও নিজেদের আইন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজালেন। তারা রোমান সিভিল ল বা জাস সিভিল (Jus Civile)-কে নতুন করে ব্যবহার করতে শুরু করলেন এবং রাজকীয় আদালতগুলোকে আরও শক্তিশালী করলেন। এর ফলে ইউরোপে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, যাকে বলা হয় ‘লিগ্যাল প্লুরালিজম’ (Legal Pluralism) বা আইনি বহুত্ববাদ। একজন সাধারণ নাগরিকের সামনে বিচারের জন্য একাধিক রাস্তা খুলে গেল। যদি রাজার স্থানীয় সামন্ত প্রভু তার ওপর অত্যাচার করত, সে চার্চের আদালতে গিয়ে নালিশ করতে পারত। আবার চার্চ যদি তার ওপর অবিচার করত, সে রাজার আদালতে আশ্রয় চাইতে পারত। ক্ষমতার এই বিভাজন এবং প্রতিযোগিতা বিচার ব্যবস্থার মান উন্নত করতে বাধ্য করল। কারণ, বিচার পাওয়ার জন্য মানুষের কাছে বিকল্প ছিল। একক সার্বভৌমত্বের অধীনে বিচারক যা বলতেন তাই আইন, কিন্তু এখানে আইনকে যুক্তিসঙ্গত হতে হতো যাতে মানুষ সেই আদালতের প্রতি আস্থা রাখে। আইনের শাসন বা রুল অফ ল (Rule of Law)-এর প্রাথমিক ধারণা এখান থেকেই অঙ্কুরিত হয় – যেখানে শাসকের ইচ্ছাই আইন নয়, বরং আইন একটি স্বতন্ত্র সত্তা যা শাসক এবং শাসিত উভয়ের ওপরে অবস্থান করে।

ক্ষমতার ফাঁকফোকর এবং স্বাধীনতার উত্থান

এই যে দুই বিশাল হাতির লড়াই – পোপ এবং সম্রাট – এর মাঝখানে পড়ে সাধারণ মানুষ পিষ্ট হলো না, বরং তারা এক নতুন ধরণের স্বাধীনতা খুঁজে পেল। যখন সমাজে ক্ষমতার একটিমাত্র কেন্দ্র থাকে (যেমন – একনায়কতন্ত্র বা পরম রাজতন্ত্র), তখন সেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব। কিন্তু যখন ক্ষমতার দুটি বা ততোধিক কেন্দ্র থাকে যারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী, তখন তাদের মাঝখানে কিছু ‘ফাঁকা জায়গা’ বা জোন অফ লিবার্টি (Zone of Liberty) তৈরি হয়। ইউরোপের স্বাধীন শহর বা ‘ফ্রি সিটি’ (Free City)-গুলো এই সংঘাতের ফসল। ইতালির ভেনিস, জেনোয়া কিংবা জার্মানির বাণিজিক শহরগুলো পোপ এবং সম্রাটের রেষারেষিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের জন্য স্বায়ত্তশাসন আদায় করে নিয়েছিল। তারা সম্রাটকে বলত, “আমাদের স্বাধীনতা দিন, নাহলে আমরা পোপের পক্ষ নেব।” আবার পোপকে বলত, “আমাদের ব্যবসায় বাধা দেবেন না, নাহলে আমরা সম্রাটের সৈন্য ডাকব।” এই দরাদরি বা বার্গেনিং করার ক্ষমতাটিই ইউরোপে বুর্জোয়া শ্রেণি বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটিয়েছিল।

একইভাবে, ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এই সংঘাতের সুযোগ নিয়েছিল। বোলোনিয়া, প্যারিস বা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কোনোটিই পুরোপুরি চার্চের বা পুরোপুরি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। তারা উভয় পক্ষের কাছ থেকে সনদ বা চার্টার সংগ্রহ করত। ফলে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে তারা এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন বা করপোরেট অটোনমি (Corporate Autonomy) ভোগ করত। শিক্ষক এবং ছাত্ররা নিজেদের একটি আলাদা গিল্ড বা সংঘ মনে করত, যাদের নিজস্ব নিয়মকানুন আছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা মুসলিম বিশ্বে বা চীনে কল্পনা করা কঠিন ছিল, কারণ সেখানে রাষ্ট্র বা শাসকের ক্ষমতার বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন সত্তা থাকার কথা ভাবাই যেত না। লর্ড অ্যাক্টন (Lord Acton) নামে এক ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ একবার বলেছিলেন, “স্বাধীনতা কোনো শাসকের দয়া বা দানের ফল নয়; স্বাধীনতা হলো ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার ফল।” ইউরোপে চার্চ রাষ্ট্রকে এবং রাষ্ট্র চার্চকে সীমাবদ্ধ করেছিল বলেই মাঝখান থেকে ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা জন্ম নিতে পেরেছিল। এই ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা ভারসাম্যই পশ্চিমের রাজনৈতিক আধুনিকতার মূলমন্ত্র।

মুসলিম বিশ্ব: ঐক্যের বিড়ম্বনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা

এখন যদি আমরা এই লেন্স দিয়ে মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসের দিকে তাকাই, তবে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখতে পাই। ইসলামি রাজনৈতিক দর্শনে উলামা (ধর্মীয় পণ্ডিত) এবং সুলতান (শাসক)-এর সম্পর্কটি ছিল সহযোগিতামূলক বা কমপ্লিমেন্টারি (Complementary), সাংঘর্ষিক নয়। যদিও ইতিহাসে অনেক সময় উলামারা শাসকদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন, কিন্তু গঠনগতভাবে ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ধর্ম এবং প্রশাসনের কোনো স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজন ছিল না। সেখানে আদর্শ রাষ্ট্র বা খিলাফতের ধারণা ছিল এমন – যেখানে ধর্ম এবং রাষ্ট্র একে অপরের হাত ধরে চলবে। সুলতানের দায়িত্ব হলো ধর্মের রক্ষণাবেক্ষণ করা, আর উলামাদের দায়িত্ব হলো সুলতানের শাসনকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়া (যতক্ষণ তিনি শরিয়াহ মেনে চলছেন)। একে বলা হতো ‘দীন ও দুনিয়ার যমজ সম্পর্ক’। এই ঐক্যের ফলে মুসলিম সমাজগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক সংহতি বজায় ছিল ঠিকই, কিন্তু এর একটি বড় মূল্য দিতে হয়েছে। সেই মূল্যটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তনের অভাব।

বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা (Francis Fukuyama) তার The Origins of Political Order গ্রন্থে এই বিষয়টিকে খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। ফুকুয়ামার মতে, সত্যিকারের আইনের শাসন বা রুল অফ ল (Rule of Law) তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন আইন প্রণয়নকারী এবং আইন প্রয়োগকারী – এই দুই সত্তা আলাদা হয় এবং একে অপরের ওপর নজরদারি করতে পারে (Fukuyama, 2011)। মুসলিম বিশ্বে আইন (শরিয়াহ) আসত ঈশ্বর বা উলামাদের কাছ থেকে, কিন্তু সেই আইন প্রয়োগ করার, বিচারক নিয়োগ করার এবং মাদ্রাসাগুলোতে অর্থায়ন করার চূড়ান্ত ক্ষমতা ছিল সুলতানের হাতে। অটোমান সাম্রাজ্যে বা মুঘল ভারতে প্রধান মুফতি বা ‘শাইখুল ইসলাম’-কে নিয়োগ দিতেন স্বয়ং সুলতান। ফলে ধর্মগুরুরা রাষ্ট্রের কর্মচারী বা আমলাতন্ত্রের অংশ হয়ে গিয়েছিলেন। চার্চের মতো তাদের নিজস্ব কোনো স্বাধীন অর্থনৈতিক ভিত্তি বা সেনাবাহিনী ছিল না যা দিয়ে তারা সুলতানের স্বেচ্ছাচারিতাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। ক্ষমতার এই এককেন্দ্রীকরণের ফলে সেখানে কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হয়নি। আর প্রতিযোগিতা না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো স্থবির হয়ে পড়েছিল; তারা নিজেদের সংস্কার করার বা নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার তাগিদ অনুভব করেনি।

উপসংহার: সংঘাতের সৃজনশীলতা

ইউরোপের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, সমাজের জন্য সবসময় শান্তি বা ঐক্যই একমাত্র কাম্য লক্ষ্য হতে পারে না। অনেক সময় ‘ফলপ্রসূ সংঘাত’ বা প্রোডাক্টিভ কনফ্লিক্ট (Productive Conflict) সমাজের সুপ্ত সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলে। পোপ এবং সম্রাটের সেই মহাকাব্যিক লড়াই যদি না হতো, তবে হয়তো ইউরোপও প্রাচ্যের মতো কোনো বিশাল, শক্তিশালী কিন্তু স্থবির সাম্রাজ্যের অধীনে থাকত। চার্চ বনাম রাষ্ট্রের এই দ্বন্দ্ব ইউরোপীয় মানুষকে শিখিয়েছে যে, কোনো একক কর্তৃপক্ষই চূড়ান্ত সত্য বা ক্ষমতার অধিকারী নয়। সত্য এবং ন্যায়বিচার বেরিয়ে আসে বিতর্কের মাধ্যমে, সংঘর্ষের মাধ্যমে এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের মাধ্যমে। এই শিক্ষাটিই পরবর্তীতে ইউরোপে সংসদীয় গণতন্ত্র, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান তৈরির পথ সুগম করেছে। পশ্চিমের উন্নয়ন তাই কোনো সরলরৈখিক অগ্রগতির গল্প নয়; এটি হলো একটি ‘ডায়ালেক্টিকাল’ বা দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া, যেখানে প্রতিটি সংকট নতুন সমাধানের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে, মুসলিম বিশ্ব তার কাঙ্ক্ষিত ঐক্য ধরে রাখতে গিয়ে সেই দ্বান্দ্বিক বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, যা আধুনিক প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য অপরিহার্য ছিল।

কর্পোরেশন এবং কৃত্রিম ব্যক্তি (Legal Personhood)

আধুনিক অর্থনীতির দিকে তাকালে আমরা এক অদ্ভুত জাদুর খেলা দেখতে পাই। আমাদের চারপাশটা এমন সব বিশাল বিশাল সত্তা দিয়ে ঘেরা, যাদের রক্ত-মাংসের কোনো অস্তিত্ব নেই, অথচ তারা মানুষের চেয়েও শক্তিশালী। এই সত্তাগুলোর নাম ‘কর্পোরেশন’। গুগল, অ্যাপল, মাইক্রোসফট কিংবা আপনার পাড়ার ব্যাংকটি – এরা সবাই আইনের চোখে একেকজন ‘ব্যক্তি’। এরা চুক্তি করতে পারে, জমি কিনতে পারে, অন্যের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে, আবার নিজেরাও মামলার আসামি হতে পারে। এদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে হাজার হাজার কোটি টাকা জমা থাকে, এরা হাজার হাজার মানুষকে চাকরি দেয়। অথচ আপনি যদি অ্যাপল কোম্পানিকে খুঁজতে যান, আপনি স্টিভ জবসকে পাবেন (কিংবা পেতেন), টিম কুককে পাবেন, বড় বড় অফিস বা সার্ভার রুম পাবেন, কিন্তু ‘অ্যাপল’ নামের কোনো মানুষকে খুঁজে পাবেন না। এই যে অদৃশ্য অথচ জীবন্ত একটি সত্তা, একে আইনের ভাষায় বলা হয় ‘লিগ্যাল পারসনহুড’ (Legal Personhood) বা কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তা। এটি আধুনিক পুঁজিবাদের হৃৎপিণ্ড। এই ধারণাটি ছাড়া শেয়ার বাজার, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি কিংবা আধুনিক রাষ্ট্র – কোনোটিই টিকে থাকতে পারত না। প্রশ্ন হলো, এই ‘ফিকশনাল পারসন’ বা ‘ফিক্টিভ পারসন’ (Fictive Person)-এর আজব ধারণাটি মানুষের মাথায় এল কোত্থেকে? মানুষ তো সাধারণত নিজের চোখের দেখা আর স্পর্শ করা জিনিসের বাইরে কিছু বিশ্বাস করতে চায় না। তাহলে এমন বিমূর্ত একটি সত্তাকে বিশ্বাস করার এবং তাকে আইনি ক্ষমতা দেওয়ার সাহস মানুষ পেল কোথায়?

এর উত্তর খুঁজতে আমাদের আবারও ফিরে যেতে হবে সেই মধ্যযুগে, সেই চার্চের কাছে। আধুনিক সেক্যুলার কর্পোরেশনের জন্মদাতা আসলে ওয়াল স্ট্রিটের কোনো ধূর্ত ব্যবসায়ী নয়, বরং ভ্যাটিকানের ধর্মতাত্ত্বিকরা। মধ্যযুগে ক্যাথলিক চার্চ এক বিশাল সংকটের মুখে পড়েছিল। চার্চের অধীনে অনেক মঠ বা মনেস্ট্রি ছিল, যাদের প্রচুর সম্পত্তি, জমিজমা এবং সম্পদ ছিল। সমস্যা হলো, মঠের সন্ন্যাসীরা বা যাজকরা তো মানুষ, তারা নশ্বর। একজন প্রধান যাজক বা অ্যাবট (Abbot) যখন মারা যান, তখন সেই মঠের সম্পত্তির মালিক কে হবে? যদি সম্পত্তির মালিকানা সেই যাজকের ব্যক্তিগত হয়, তবে তার মৃত্যুর পর তার আত্মীয়স্বজনরা সেই সম্পত্তির দাবি করতে পারে। এতে চার্চের সম্পদ ভাগ হয়ে যাওয়ার বা বেহাত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীর ক্যানন ল’ইয়াররা বা যাজকীয় আইনজ্ঞরা রোমান আইনের সাহায্য নিলেন এবং এক বৈপ্লবিক তত্ত্বের জন্ম দিলেন। তারা বললেন, মঠ বা চার্চ কেবল একদল মানুষের সমষ্টি নয়; এটি একটি ‘অমর’ সত্তা। যাজকরা আসবেন এবং যাবেন, পোপরা মারা যাবেন এবং নতুন পোপ আসবেন, কিন্তু ‘চার্চ’ নামের প্রতিষ্ঠানটি চিরকাল টিকে থাকবে। ধর্মতাত্ত্বিকভাবে একে বলা হলো ‘করপাস মিস্টিকাম’ (Corpus Mysticum) বা যিশুর আধ্যাত্মিক দেহ। যিশু যেমন স্বর্গে থেকেও তার চার্চের মধ্যে বেঁচে আছেন, তেমনি চার্চ একটি অবিভাজ্য ও অবিনশ্বর শরীর।

পোপ চতুর্থ ইনোসেন্ট এবং ‘পারসোনা ফিক্টা’র জন্ম

এই ধর্মতাত্ত্বিক বিমূর্তায়নকে আইনি ভাষায় রূপ দেওয়ার কৃতিত্ব দেওয়া হয় পোপ চতুর্থ ইনোসেন্ট (Pope Innocent IV)-কে। ১২৫০ সালের দিকে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নের সমাধান করতে গিয়ে বললেন যে, কোনো মঠ বা যাজক-সংঘ (যাকে বলা হতো ইউনিভার্সিতাস (Universitas) বা কলেজিয়াম (Collegium)) আসলে কোনো বাস্তব মানুষ নয়। এদের কোনো আত্মা নেই, তাই এদের পাপ করার বা নরকে যাওয়ার ভয় নেই। এরা হলো ‘পারসোনা ফিক্টা’ (Persona Ficta) বা কল্পিত ব্যক্তি। এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেললেন। এর ফলাফল হলো সুদূরপ্রসারী। এর মানে দাঁড়াল – চার্চের সম্পত্তি কোনো বিশপের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি ‘চার্চ’ নামক কল্পিত ব্যক্তির সম্পত্তি। বিশপ কেবল সেই সম্পত্তির ব্যবস্থাপক বা ট্রাস্টি মাত্র। এই ধারণাটি পশ্চিমে এক নতুন ধরণের ‘মালিকানা’র জন্ম দিল, যা ব্যক্তির আয়ুষ্কালের ওপর নির্ভরশীল নয়। ব্যক্তি মরে যায়, কিন্তু প্রতিষ্ঠান বেঁচে থাকে। এই ‘পারপেচুয়িটি’ বা চিরস্থায়িত্ব (Perpetuity) হলো কর্পোরেশনের সবচেয়ে বড় শক্তি। পরবর্তীতে যখন ইউরোপে বাণিজ্যের প্রসার ঘটল, তখন ব্যবসায়ীরা ভাবল – চার্চ যদি এমন একটা কাল্পনিক সত্তা তৈরি করতে পারে যা হাজার বছর ধরে সম্পদ ধরে রাখতে পারে, তবে আমরা কেন পারব না? এই চিন্তা থেকেই জন্ম নিল জয়েন্ট স্টক কোম্পানি এবং আধুনিক বাণিজ্যিক কর্পোরেশনরাষ্ট্র নিজেও এই প্রক্রিয়ায় একটি কর্পোরেশনে পরিণত হলো। আগে রাষ্ট্র আর রাজার মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না; লুই চতুর্দশ বলতেন, “আমিই রাষ্ট্র।” কিন্তু কর্পোরেট তত্ত্ব আসার পর বলা হলো – রাজা হলেন রাষ্ট্রের সেবক মাত্র, রাষ্ট্র নিজেই এক অমর সত্তা।

ইসলামি আইন ও ওয়াকফ: একটি অসমাপ্ত বিপ্লব

এখন যদি আমরা মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকাই, তবে দেখব সেখানে সম্পদের ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ বা ইনস্টিটিউশনালাইজেশনের গল্পটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলামি আইনে দানশীলতা এবং জনকল্যাণের জন্য একটি চমৎকার ব্যবস্থা ছিল, যার নাম ‘ওয়াকফ’ (Waqf)। ওয়াকফ মানে হলো কোনো সম্পত্তিকে আল্লাহর নামে আটকে দেওয়া বা ‘স্থির’ করা, যাতে সেই সম্পত্তির আয় থেকে নির্দিষ্ট জনকল্যাণমূলক কাজ (যেমন – মসজিদ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল বা সরাইখানা চালানো) করা যায়। মধ্যযুগে মুসলিম বিশ্বে শিক্ষার প্রসার, নগর উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তার মূল ভিত্তি ছিল এই ওয়াকফ। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, ওয়াকফ বুঝি পশ্চিমা কর্পোরেশনের মতোই একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আইনি কাঠামোর গভীরে গিয়ে দেখলে বোঝা যায়, দুটোর মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং ইতিহাসবিদ তিমুর কুরান (Timur Kuran) তার গবেষণালব্ধ বই The Long Divergence-এ এই পার্থক্যটি অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন (Kuran, 2011)। কুরানের মতে, ওয়াকফ এবং কর্পোরেশনের মূল পার্থক্য হলো ‘লিগ্যাল পারসনহুড’ বা আইনি ব্যক্তিসত্তার অভাব।

ইসলামি আইন বা শরিয়াহ অনুযায়ী, একমাত্র রক্ত-মাংসের মানুষই (Natural Person) আইনের চোখে ‘ব্যক্তি’ হতে পারে, যার অধিকার ও দায়বদ্ধতা আছে। কোনো জড় বস্তু বা বিমূর্ত ধারণা (যেমন – স্কুল বা ব্যাংক) ব্যক্তি হতে পারে না। ফলে ওয়াকফ কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ আইনি সত্তা বা লিগ্যাল এনটিটি (Legal Entity) ছিল না। ওয়াকফ পরিচালনা করতেন একজন ব্যক্তি, যাকে বলা হতো ‘মোতাওয়াল্লি’ (Mutawalli)। কিন্তু এই মোতাওয়াল্লি কর্পোরেশনের সিইও-র মতো স্বাধীন ছিলেন না। তিনি ওয়াকফ প্রতিষ্ঠাতার লিখিত নির্দেশনার (Waqf Deed) বাইরে একচুলও নড়তে পারতেন না। ওয়াকফ প্রতিষ্ঠাতা মারা যাওয়ার কয়েকশো বছর পরেও তার ইচ্ছা অনুযায়ীই সম্পত্তি চালাতে হতো। একে বলা হয় ‘ডেড হ্যান্ড রুল’ (Dead Hand Rule) বা মৃত হাতের শাসন। অন্যদিকে, পশ্চিমা কর্পোরেশন ছিল জীবন্ত; এর পরিচালকরা বা বোর্ড অফ ডিরেক্টরস সময়ের প্রয়োজনে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে পারত, ব্যবসার ধরণ পাল্টাতে পারত। কিন্তু ওয়াকফ ছিল স্থির বা স্ট্যাটিক। এর চেয়েও বড় সমস্যা হলো, ওয়াকফ নিজে কারো বিরুদ্ধে মামলা করতে পারত না বা কেউ ওয়াকফের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারত না; মামলা হতো মোতাওয়াল্লির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে। এই আইনি সীমাবদ্ধতা মুসলিম বিশ্বের প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি নির্দিষ্ট আকারের পর আর বড় হতে দেয়নি।

অংশীদারিত্বের সীমাবদ্ধতা এবং পুঁজির বিখণ্ডন

কর্পোরেশনের আরেকটি জাদুকরী ক্ষমতা হলো ‘লিমিটেড লায়াবিলিটি’ (Limited Liability) বা সীমিত দায়বদ্ধতা। আপনি যদি কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনেন এবং কোম্পানিটি যদি দেউলিয়া হয়ে যায়, তবে আপনার লোকসান হবে কেবল সেই শেয়ারের মূল্যটুকু। পাওনাদাররা আপনার বাড়ি-গাড়ি বিক্রি করে টাকা আদায় করতে পারবে না। কারণ, আইনিভাবে আপনি আর কোম্পানি এক নন। এই সুরক্ষা কবচটি মানুষকে বড় বড় ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করেছিল। সপ্তদশ শতাব্দীতে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো দানবীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পেছনে ছিল এই আইনি সুরক্ষা। হাজার হাজার মানুষ অল্প অল্প টাকা দিয়ে বিশাল মূলধন বা ক্যাপিটাল (Capital) গড়ে তুলত, যা দিয়ে তারা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দেশ দখল করত। কিন্তু মুসলিম বিশ্বে ব্যবসার প্রধান মাধ্যম ছিল ‘মুদারাবা’ (Mudaraba) বা অংশীদারিত্ব। এটি ছিল মূলত ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ব্যবসা। ইসলামি অংশীদারিত্ব আইনের একটি বড় দুর্বলতা ছিল এই যে, অংশীদারদের মধ্যে একজন মারা গেলেই ব্যবসাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেঙে যেত বা বিলুপ্ত হতো। এরপর সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ করে দিতে হতো।

ইসলামি উত্তরাধিকার আইন বা ইসলামিক ইনহেরিটেন্স ল (Islamic Inheritance Law) অত্যন্ত সুষম এবং বিস্তারিত, যেখানে পরিবারের অনেক সদস্য সম্পত্তির ভাগ পায়। এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য চমৎকার হলেও, দীর্ঘমেয়াদী পুঁজি গঠনের জন্য এটি একটি বড় বাধা ছিল। একজন বড় ব্যবসায়ীর মৃত্যুর পর তার বিশাল ব্যবসা স্ত্রী, সন্তান, এবং দূর সম্পর্কের আত্মীয়দের মধ্যে টুকরো টুকরো হয়ে যেত। ফলে কোনো ব্যবসাই বংশপরম্পরায় টিকে থেকে বিশাল কর্পোরেট রূপ নিতে পারত না। তিমুর কুরান একে বলেছেন ‘পুঁজির বিখণ্ডন’ বা ফ্র্যাগমেন্টেশন অফ ক্যাপিটাল (Fragmentation of Capital)। পশ্চিমে প্রাইমোজেনিচার (Primogeniture) বা জ্যেষ্ঠপুত্রের সব পাওয়ার নিয়ম এবং কর্পোরেট কাঠামোর কারণে সম্পদ এক জায়গায় পুঞ্জীভূত হতে পেরেছিল। মুসলিম বণিকরা তাদের জীবদ্দশায় হয়তো অনেক ধনী হতেন, কিন্তু তাদের মৃত্যুর পর সেই ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য আর টিকত না। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে এমন কোনো ‘ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড’ বা ‘ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ তৈরি হয়নি যা শত শত বছর ধরে টিকে থেকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি হতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল ক্ষণস্থায়ী এবং ব্যক্তি-নির্ভর।

কেনোসিস এবং ডি-পারসোনালাইজেশন অফ পাওয়ার

এখানেই সেই ধর্মতাত্ত্বিক সূত্রটি আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। পশ্চিমে ঈশ্বর যেমন নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে জগতকে একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে চলতে দিয়েছিলেন (কেনোসিস), ঠিক তেমনি আইনি জগতেও তারা রক্ত-মাংসের মানুষকে সরিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে একটি স্বাধীন সত্তা বা ‘পারসন’ হিসেবে দাঁড় করিয়েছিল। একে বলা যেতে পারে অর্থনীতির ডি-পারসোনালাইজেশন (Depersonalization) বা নৈর্ব্যক্তিকীকরণ। ব্যবসা বা রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট সুলতান বা বণিকের ব্যক্তিগত খেয়ালখুশির ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি একটি বিমূর্ত সিস্টেমের ওপর চলে। এই বিমূর্তায়নের ক্ষমতাটি পশ্চিমের মানুষ পেয়েছিল তাদের ধর্মতত্ত্ব থেকে, যেখানে তারা অদৃশ্য চার্চকে ‘যিশুর শরীর’ হিসেবে কল্পনা করতে শিখেছিল। এই কাল্পনিক সত্তার ওপর আস্থা রাখার অভ্যাসটিই পরবর্তীতে তাদেরকে কাগজ (শেয়ার সার্টিফিকেট), ফিয়াট কারেন্সি এবং ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ওপর আস্থা রাখতে শিখিয়েছে।

অন্যদিকে, মুসলিম মানসজগতে এই ধরণের বিমূর্তায়ন বা ‘ফিকশন’ তৈরি করা ছিল কঠিন। ইসলামে সত্য বা ‘হক’ সব সময়ই মূর্ত এবং বাস্তব। যা দেখা যায় না, বা যার কোনো রুহ বা আত্মা নেই, তাকে ‘ব্যক্তি’র মর্যাদা দেওয়া – এটা অনেকের কাছেই অনৈসলামিক বা প্রতারণামূলক মনে হতে পারে। ইসলামি আইনে মানুষের দায়বদ্ধতা বা অ্যাকাউন্টেবিলিটি (Accountability) সরাসরি আল্লাহর কাছে; কোনো কাল্পনিক কোম্পানির আড়ালে লুকিয়ে পাপ করার বা দায় এড়ানোর সুযোগ সেখানে নেই। একজন মুসলিম ব্যবসায়ী যখন ঋণ নেন, তখন তিনি ব্যক্তিগতভাবে সেই ঋণের জন্য দায়ী থাকেন। তিনি বলতে পারেন না যে, “এটা আমার ঋণ নয়, এটা আমার কোম্পানির ঋণ।” এই নৈতিক স্বচ্ছতা বা এথিক্যাল ট্রান্সপারেন্সি (Ethical Transparency) ব্যক্তিগত পর্যায়ে অত্যন্ত প্রশংসনীয় হলেও, জটিল আধুনিক অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ, আধুনিক অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে এই ‘দায় এড়ানোর’ আইনি কৌশলের ওপরই। পশ্চিমারা এই কৌশলটি আয়ত্ত করেছিল বলেই তারা এমন সব প্রতিষ্ঠান গড়তে পেরেছিল, যারা মানুষের আয়ুষ্কাল, দুর্বলতা এবং আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে পারে।

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ এবং ইসলামি অর্থনীতির রূপান্তর

উনবিংশ শতাব্দীতে যখন ইউরোপীয় শক্তিগুলো মুসলিম বিশ্বে উপনিবেশ স্থাপন করতে শুরু করল, তখন মুসলিমরা প্রথমবারের মতো তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো টের পেল। তারা দেখল, ইউরোপীয় ব্যাংক এবং কোম্পানিগুলোর সাথে তাদের সনাতন অংশীদারিত্ব বা পারিবারিক ব্যবসা পেরে উঠছে না। ফরাসি বা ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো ছিল চিরস্থায়ী এবং বিশাল পুঁজির অধিকারী, অন্যদিকে মুসলিম ব্যবসাগুলো ছিল ছোট এবং ভঙ্গুর। এই অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য পরবর্তীতে মুসলিম বিশ্বকেও বাধ্য হয়ে পশ্চিমা ধাঁচের বাণিজ্যিক আইন বা কমার্শিয়াল কোড (Commercial Code) গ্রহণ করতে হয়েছে। ১৯শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে অটোমান সাম্রাজ্য এবং মিশর তাদের আইনি ব্যবস্থা সংস্কার করে ইউরোপীয় স্টাইলে কর্পোরেশন এবং ব্যাংক খোলার অনুমতি দেয়। কিন্তু তিমুর কুরান এবং অন্যান্য গবেষকরা মনে করেন, এই পরিবর্তনটি ছিল ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া; এটি সমাজের ভেতর থেকে বা ধর্মতাত্ত্বিক বিবর্তনের মাধ্যমে আসেনি। ফলে আজও মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশে আধুনিক কর্পোরেট কালচার এবং ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সংঘাত রয়ে গেছে। মানুষ এখনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বা ‘ওয়াসতা’ (Wasta)-কে বেশি গুরুত্ব দেয়।

আজকের যুগে ইসলামি ব্যাংকিং বা ইসলামি ফাইন্যান্স যে জনপ্রিয় হচ্ছে, তা আসলে এই ঐতিহাসিক শূন্যতা পূরণেরই একটি আধুনিক প্রচেষ্টা। ইসলামি স্কলাররা এখন চেষ্টা করছেন শরিয়াহর মূলনীতির মধ্যে থেকেই কীভাবে আধুনিক কর্পোরেশনের সুবিধাগুলো (যেমন – সীমিত দায়, আইনি সত্তা) গ্রহণ করা যায়। তারা ‘ওয়াকফ’কে আধুনিকীকরণ করে ‘ক্যাশ ওয়াকফ’ বা করপোরেট ওয়াকফ-এর ধারণা নিয়ে আসছেন। কিন্তু ইতিহাসের সেই পাঁচশো বছরের ব্যবধান বা দ্য লং ডাইভারজেন্স (The Long Divergence) পূরণ করা সহজ কাজ নয়। পশ্চিমের কর্পোরেট বিপ্লব একদিনে হয়নি; এটি ছিল হাজার বছরের ধর্মতাত্ত্বিক, আইনি এবং সামাজিক বিবর্তনের ফল। যেখানে চার্চের ‘কৃত্রিম শরীর’ থেকে রাষ্ট্রের ‘বিমূর্ত শরীর’ এবং শেষে কোম্পানির ‘বাণিজ্যিক শরীর’ তৈরি হয়েছে। এই বিবর্তনের মূলে ছিল সেই অদ্ভুত সাহস – ঈশ্বর এবং মানুষকে আলাদা করা, এবং মানুষের তৈরি প্রতিষ্ঠানকে ঈশ্বরের সৃষ্টি মানুষের সমান মর্যাদা দেওয়া। এই ‘ফিকশন’ বা কল্পকাহিনীটিই পশ্চিমকে আজকের বাস্তব পৃথিবীর শাসকে পরিণত করেছে।

প্রশাসন থেকে ঈশ্বরের অপসারণ (De-theologization of Governance)

আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক এবং সম্ভবত সবচেয়ে বড় প্যারাডক্স বা ধাঁধাটি লুকিয়ে আছে তাদের প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে। আমরা সাধারণত মনে করি, সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা বুঝি ধর্মের বিরুদ্ধে এক বিশাল বিদ্রোহের ফল। যেন একদল নাস্তিক বা ধর্মবিদ্বেষী মানুষ হুট করে একদিন ঠিক করল, তারা ঈশ্বরকে সমাজ থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে। কিন্তু ইতিহাসের গভীরে ডুব দিলে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং চমকপ্রদ সত্য বেরিয়ে আসে। পশ্চিমারা ঈশ্বরকে ঘৃণা করতে করতে নয়, বরং ঈশ্বরকে অতিরিক্ত সম্মান দেখাতে গিয়েই তাকে প্রশাসনিকভাবে অপ্রয়োজনীয় করে ফেলেছে। শুনতে খুব অদ্ভুত শোনালেও, প্রশাসনিক ইতিহাসের বাস্তবতা এটাই। তারা মনে করেছে, মহান ঈশ্বর এতটাই পবিত্র এবং মহিমান্বিত যে, মানুষের তৈরি নর্দমার ড্রেনেজ সিস্টেম, ব্যাংকের সুদের হিসাব কিংবা আদালতের জটিল নথিপত্রের মধ্যে তাকে টেনে আনাটা তার শানের খেলাফ। তাই তারা ঈশ্বরকে সসম্মানে স্বর্গের সিংহাসনে বা মানুষের হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে রেখে দিল, আর জগত চালানোর দায়িত্ব নিল মানুষের তৈরি নিরেট যুক্তি ও জাগতিক নিয়ম। এই প্রক্রিয়াটিকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় শাসনের ‘ডি-থিওলজাইজেশন’ (De-theologization) বা প্রশাসন থেকে ধর্মতত্ত্বের অপসারণ। এই প্রক্রিয়ার ফলেই আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র এমন একটি রূপ পেয়েছে যেখানে ঈশ্বর আছেন কি নেই, তাতে ফাইলের কাজ আটকায় না।

এই নাটকীয় পরিবর্তনের শুরুটা হয়েছিল ষোড়শ শতাব্দীতে, ইউরোপের প্রোটেস্ট্যান্ট রিফর্মেশন (Protestant Reformation)-এর মাধ্যমে। মার্টিন লুথার এবং জন ক্যালভিনের মতো সংস্কারকরা যখন ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন, তখন তারা অজান্তেই আধুনিক পুঁজিবাদের এবং আমলাতন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে ক্যালভিনিস্টরা এক বৈপ্লবিক তত্ত্ব নিয়ে এল। মধ্যযুগে বিশ্বাস করা হতো, যারা মঠ বা গির্জায় থাকে – যেমন সন্ন্যাসী বা যাজক – তারাই কেবল ‘পবিত্র’ কাজ করে; আর যারা জুতা সেলাই করে বা কৃষি কাজ করে, তাদের কাজ হলো নিছকই পেটের দায়। কিন্তু প্রোটেস্ট্যান্টরা বলল, এই বিভাজন ভুল। ঈশ্বরের কাছে সব কাজই সমান পবিত্র, যদি তা সততার সাথে করা হয়। জার্মান ভাষায় একে বলা হয় ‘বেরুফ’ (Beruf) বা ‘কলিং’ (Calling)। অর্থাৎ, ঈশ্বর তোমাকে যে কাজের জন্য পাঠিয়েছেন – হোক তা রাজার শাসন কিংবা মুচির জুতা সেলাই – সেটাই তোমার ইবাদত। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) তার কালজয়ী গ্রন্থ The Protestant Ethic and the Spirit of Capitalism-এ এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনটি চমৎকারভাবে ধরেছেন (Weber, 1905)। ওয়েবার দেখালেন, যখন একজন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করল যে তার দৈনন্দিন কাজই হলো ঈশ্বরের উপাসনা, তখন সে সেই কাজটি নিখুঁতভাবে করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। কারণ, ঈশ্বরের উপাসনায় তো আর ফাঁকি দেওয়া যায় না!

কর্মক্ষেত্রের পবিত্রতা ও জাদুমুক্তকরণ (Disenchantment)

এই যে ধর্ম গির্জা থেকে বেরিয়ে মানুষের কর্মক্ষেত্রে বা কারখানায় ঢুকে পড়ল, এর ফলাফল হলো অভাবনীয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এতে বুঝি সমাজ আরও বেশি ধর্মপ্রাণ হয়ে উঠল। কিন্তু বাস্তবে ঘটল ঠিক উল্টো ঘটনা। ধর্ম যখন কর্মক্ষেত্রে ঢুকল, তখন সে তার অলৌকিকতা বা মিরাকলের ক্ষমতা হারাল। কারণ, কর্মক্ষেত্রের নিয়ম আর প্রার্থনালয়ের নিয়ম এক নয়। একজন প্রোটেস্ট্যান্ট ব্যাংকার যখন মনে করেন যে ব্যাংক চালানো তার ধর্মীয় দায়িত্ব বা ইবাদত, তখন তিনি সেই ব্যাংকটি চালানোর জন্য বাইবেলের ভার্স খুঁজবেন না; তিনি খুঁজবেন নিখুঁত হিসাববিজ্ঞান বা অ্যাকাউন্টিং (Accounting)। কারণ, হিসাবের খাতায় ভুল করা মানে ঈশ্বরের দেওয়া দায়িত্বে অবহেলা করা। ঈশ্বরের করুণা দিয়ে ব্যালেন্স শিট মেলানো যায় না, সেখানে গণিত লাগে। একইভাবে, একজন প্রকৌশলী যখন ব্রিজ বানাবেন, তখন তিনি মনে করবেন এই ব্রিজটি শক্ত করে বানানোই তার ধর্ম। আর ব্রিজ শক্ত করতে হলে তাকে ফিজিক্স বা পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র মানতে হবে, কোনো পীরের দোয়া বা তাবিজ দিয়ে ব্রিজ টিকবে না।

এভাবেই ধীরে ধীরে মানুষের কাজের জগত থেকে ‘জাদু’ বা ‘ম্যাজিক’ হারিয়ে গেল। ম্যাক্স ওয়েবার এই প্রক্রিয়াকে নাম দিয়েছেন ‘ডিজএনচ্যান্টমেন্ট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ (Disenchantment of the World) বা বিশ্বের জাদুমুক্তকরণ। আগে মানুষ মনে করত, ব্যবসা ভালো হওয়ার জন্য ঈশ্বরের সন্তুষ্টি দরকার। এখন মানুষ বুঝল, ব্যবসা ভালো হওয়ার জন্য দরকার বাজার বিশ্লেষণ, মূলধন ব্যবস্থাপনা এবং সঠিক বিপণন কৌশল। ঈশ্বর এখানে ‘সাইলেন্ট পার্টনার’ হয়ে গেলেন, কিন্তু সক্রিয় ব্যবস্থাপক রইলেন না। ইউরোপের মানুষ মেনে নিল যে, ঈশ্বর অবশ্যই আছেন, তিনি স্বর্গে বা পরকালে আমাদের বিচার করবেন; কিন্তু এই দুনিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো – যেমন ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, আদালত, বিশ্ববিদ্যালয় – এগুলো চলবে সম্পূর্ণ সেক্যুলার বা ইহজাগতিক যুক্তি দিয়ে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হলো যেন এগুলো ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে’ চলতে পারে, এখানে ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের কোনো জায়গা রাখা হলো না। এই মানসিকতা থেকেই পশ্চিমে আধুনিক পেশাদারিত্ব বা প্রফেশনালিজম (Professionalism)-এর জন্ম হয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে অফিসের দরজার বাইরে রেখে আসার রেওয়াজ তৈরি হয়েছে।

হুগো গ্রোশিয়াস এবং আইনের স্বকীয়তা

প্রশাসন থেকে ঈশ্বরকে সরানোর এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছিল আইনের জগত থেকে। সপ্তদশ শতাব্দীতে ইউরোপ জুড়ে চলছিল ভয়াবহ ‘ত্রিশ বছরের যুদ্ধ’ (Thirty Years’ War)। ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্টরা একে অপরকে কচুকাটা করছিল শুধু এই তর্কে যে – কার ঈশ্বর সঠিক? এই রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে হুগো গ্রোশিয়াস (Hugo Grotius) নামের এক ডাচ আইনজ্ঞ ও দার্শনিক ভাবলেন, এমন একটি আইন ব্যবস্থা দরকার যা ধর্মের ওপর নির্ভরশীল নয়। কারণ, ধর্ম যেখানে বিভাজনের উৎস, সেখানে আইনকে হতে হবে ঐক্যের ভিত্তি। ১৬২৫ সালে তিনি তার বিখ্যাত বই De Jure Belli ac Pacis (যুদ্ধ ও শান্তির আইন)-এ একটি বোমা ফাটালেন। তিনি ল্যাটিন ভাষায় একটি বাক্য লিখলেন: “এতিয়ামসি দারেমুস নন এসে দেউম” (Etiamsi daremus non esse Deum), যার অর্থ হলো – “এমনকি আমরা যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে ঈশ্বর নেই (যদিও এটা মহাপাপ), তবুও প্রাকৃতিক আইন বা ন্যাচারাল ল সত্য এবং কার্যকর থাকবে।”

গ্রোশিয়াসের এই উক্তিটি ছিল আধুনিক আইনের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। এর মানে দাঁড়াল – চুক্তি রক্ষা করা, অন্যের ক্ষতি না করা, বা সত্য কথা বলা – এগুলো সঠিক হওয়ার জন্য ঈশ্বরের আদেশের দরকার নেই; এগুলো মানুষের সামাজিক প্রকৃতির কারণেই সঠিক। ১+১=২ যেমন ঈশ্বরের আদেশের ওপর নির্ভর করে না, তেমনি ন্যায়বিচারও কোনো বিশেষ ধর্মের ওপর নির্ভর করে না। এই ‘হাইপোথিসিস অফ অ্যাথেইজম’ (Hypothesis of Atheism) বা নাস্তিকতার তাত্ত্বিক সম্ভাবনাটিকে কাজে লাগিয়ে গ্রোশিয়াস আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি স্থাপন করলেন। এর ফলে রাষ্ট্র এবং আইন তার ধর্মতাত্ত্বিক শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। আগে আইন ছিল ঈশ্বরের ইচ্ছা (Divine Will), এখন আইন হয়ে গেল মানুষের যুক্তির (Human Reason) ফসল। আইন এখন একটি অটোনমাস সিস্টেম (Autonomous System) বা স্বায়ত্তশাসিত ব্যবস্থা। বিচারক যখন বিচার করেন, তিনি কোনো ধর্মগ্রন্থ খুলে বসেন না; তিনি সংবিধান এবং দণ্ডবিধি দেখেন। এই পরিবর্তনটি সমাজকে একটি বিশাল স্থিতিশীলতা দিয়েছিল। কারণ, শাসকের ধর্ম পাল্টালেও রাষ্ট্রের আইন আর পাল্টাচ্ছিল না। এই আইনি স্থিতিশীলতাই বাণিজ্যের প্রসার এবং পুঁজিবাদের বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

সার্বভৌম আইনসভা বনাম ঐশ্বরিক একনায়কত্ব

এখন প্রশ্ন হলো, এই একই প্রক্রিয়া মুসলিম বিশ্বে কেন ঘটল না? বা কেন সেখানে এই ‘ডি-থিওলজাইজেশন’ এত কঠিন হয়ে দাঁড়াল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ইসলামি রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের একেবারে কেন্দ্রে থাকা একটি ধারণায়, যাকে বলা হয় ‘হাকিমিয়্যাহ’ (Hakimiyyah) বা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, একমাত্র আল্লাহই হলেন আইনদাতা বা লেজিসলেটর (Legislator)। মানুষের কাজ আইন তৈরি করা নয়, মানুষের কাজ হলো আল্লাহর তৈরি করা আইন (শরিয়াহ) খুঁজে বের করা এবং তা প্রয়োগ করা। মানুষ বড়জোর প্রশাসনিক নিয়মকানুন বা ‘কানুন’ (Qanun) তৈরি করতে পারে, কিন্তু তা কখনোই শরিয়াহর মৌলিক কাঠামোর বাইরে যেতে পারবে না। ফলে, পাশ্চাত্যে যেমন ‘পার্লামেন্ট’ বা আইনসভা সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে নিজের ইচ্ছামতো আইন তৈরি করতে পারে, মুসলিম বিশ্বে তাত্ত্বিকভাবে কোনো মানুষের বা প্রতিষ্ঠানের সেই ক্ষমতা ছিল না।

পাশ্চাত্যে যখন ঈশ্বরকে সমীকরণ থেকে বাদ দিয়ে সমাজ চালানোর সাহস দেখানো হচ্ছিল, তখন মুসলিম বিশ্বে সেটাকে দেখা হচ্ছিল চূড়ান্ত ধৃষ্টতা বা ‘কুফরি’ হিসেবে। কারণ, আইন তৈরি করা মানেই হলো ভালো এবং মন্দ নির্ধারণ করা। আর ভালো-মন্দ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র আল্লাহর। কোনো সংসদ যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ভোট দিয়ে ঠিক করে যে এখন থেকে সুদ বৈধ, বা মদ্যপান বৈধ – তবে তা ইসলামি দৃষ্টিতে ঈশ্বরের ক্ষমতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ। এই ধর্মতাত্ত্বিক বাধার কারণে মুসলিম বিশ্বে আধুনিক অর্থে ‘লেজিসলেটিভ অথরিটি’ (Legislative Authority) বা আইন প্রণয়নী কর্তৃপক্ষ গড়ে উঠতে অনেক সময় লেগেছে। অটোমান সাম্রাজ্যে সুলতানরা ‘কানুন-নামা’ বা রাজকীয় ডিক্রি জারি করতেন ঠিকই, কিন্তু সেগুলোকে সবসময় শরিয়াহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হতো, অথবা অন্তত শরিয়াহর সাথে সাংঘর্ষিক হওয়া যেত না। এর ফলে আইনের জগতে এক ধরণের দ্বৈততা বা জড়তা থেকে গিয়েছিল। রাষ্ট্র চাইলেই যুগের প্রয়োজনে হুট করে আইন বদলাতে পারত না, তাকে সবসময় উলামাদের বা ধর্মীয় পণ্ডিতদের অনুমোদনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো।

প্রশাসনিক নাস্তিকতা: আধুনিক রাষ্ট্রের গোপন মন্ত্র

শেষমেশ পশ্চিমারা যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলল, তাকে তাত্ত্বিকভাবে বলা যেতে পারে ‘মেথডোলজিক্যাল অ্যাথেইজম’ (Methodological Atheism) বা পদ্ধতিগত নাস্তিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র। এর মানে এই নয় যে রাষ্ট্রের মানুষরা নাস্তিক, বা রাষ্ট্র ধর্মবিরোধী। এর মানে হলো, রাষ্ট্র তার প্রশাসনিক কাজে এমনভাবে আচরণ করে যেন ঈশ্বরের কোনো অস্তিত্ব নেই। একটি আধুনিক পাসপোর্ট অফিস, একটি মিউনিসিপ্যালিটি কর্পোরেশন, কিংবা একটি পাবলিক হাসপাতাল – এরা যখন কাজ করে, তখন তারা কোনো অলৌকিক শক্তির ওপর ভরসা করে না। তারা কার্যকারণ, পরিসংখ্যান এবং বিজ্ঞানের ওপর ভরসা করে। ঈশ্বরকে তারা পাঠিয়ে দিয়েছে ‘প্রাইভেট স্ফিয়ার’ বা ব্যক্তিগত পরিসরে। আপনি আপনার ঘরে বসে যত খুশি প্রার্থনা করুন, কিন্তু পাবলিক স্ফিয়ারে বা জনপরিসরে এসে আপনাকে যুক্তির ভাষায় কথা বলতে হবে।

এই বিভাজনটা মুসলিম মানসজগতে তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন ছিল এবং এখনো আছে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান বা কমপ্লিট কোড অফ লাইফ (Complete Code of Life) হওয়ার কারণে, এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র – রাষ্ট্রনীতি থেকে শুরু করে অর্থনীতি, এমনকি টয়লেটে যাওয়ার নিয়ম পর্যন্ত – নির্ধারণ করে দেয়। যেখানে ধর্ম জীবনের প্রতিটি ইঞ্চিতে উপস্থিত, সেখানে প্রশাসন থেকে ধর্মকে আলাদা করা বা ঈশ্বরকে ‘রিটায়ারমেন্ট’ দেওয়া প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। মুসলিম সংস্কারকরা গত দুইশো বছর ধরে চেষ্টা করছেন কীভাবে ইসলামি মূল্যবোধ ঠিক রেখেও আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা যায়। কিন্তু পশ্চিমের সেই ‘র‍্যাডিকাল’ বা আমূল পরিবর্তন – যেখানে ঈশ্বরকে কেবল ‘সৃষ্টির আদি কারণ’ হিসেবে রেখে বাকি সব দায়িত্ব মানুষের কাঁধে তুলে দেওয়া হয়েছে – সেটা প্রাচ্যে পুরোপুরি ঘটেনি। আর ঘটেনি বলেই, পশ্চিমের মতো সেই স্বয়ংক্রিয়, আবেগহীন এবং যান্ত্রিক গতির আমলাতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠান প্রাচ্যে দানা বাঁধতে পারেনি। পশ্চিমের উন্নয়ন তাই কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; এটি হলো ঈশ্বরকে সসম্মানে বিদায় জানিয়ে মানুষের নিজের কাঁধে জগত চালানোর দায়িত্ব নেওয়ার এক সাহসী, এবং হয়তো কিছুটা বিষাদময়, ইতিহাসের ফসল।

আধুনিক সেক্যুলারিজম – ঈশ্বরের রেখে যাওয়া শূন্যস্থান

সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটা কানে এলেই আমাদের মানসপটে সাধারণত ধর্মহীনতার এক ধূসর ছবি ভেসে ওঠে। আমরা ধরে নিই, সেক্যুলারিজম মানেই হলো নাস্তিকতা, ধর্মবিদ্বেষ কিংবা সমাজ থেকে ঈশ্বরকে চিরতরে মুছে ফেলার এক গভীর ষড়যন্ত্র। কিন্তু ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষণ এবং সমাজবিজ্ঞানের গভীর তত্ত্ব আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প শোনায়। আধুনিক পশ্চিমা সেক্যুলারিজম কোনো বহিরাগত আক্রমণ বা বিজ্ঞানের হঠাৎ আবিষ্কারের ফলে তৈরি হওয়া কোনো ধারণা নয়; বরং এটি খোদ খ্রিস্টধর্মের অভ্যন্তরীণ বিবর্তনেরই এক অনিবার্য ও বিশেষ পরিণতি। শুনতে খুব অদ্ভুত এবং স্ববিরোধী মনে হতে পারে, কিন্তু সত্য হলো – ইউরোপে ধর্মকে দুর্বল করার কাজটি কোনো নাস্তিক দার্শনিক করেননি, করেছিলেন ধর্মতাত্ত্বিকরাই। তারা ঈশ্বরকে মহিমান্বিত করতে গিয়ে জগত থেকে এতটাই দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন যে, শেষ পর্যন্ত জগতটা ঈশ্বরের উপস্থিতি ছাড়াই চলতে শিখে গিয়েছিল। ফরাসি দার্শনিক মার্সেল গশ্যে (Marcel Gauchet) তার যুগান্তকারী তত্ত্বে এই প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তিনি খ্রিস্টধর্মকে বলেছেন ‘রিলিজিয়ন অফ দ্য এক্সিট ফ্রম রিলিজিয়ন’ (Religion of the exit from religion) বা ‘ধর্ম থেকে বের হওয়ার ধর্ম’। গশ্যে বোঝাতে চেয়েছেন যে, খ্রিস্টধর্মের কাঠামোর ভেতরেই এমন কিছু শক্তিশালী উপাদান বা বীজ সুপ্ত ছিল, যা মানুষকে ধর্মের প্রথাগত গণ্ডি থেকে বের হয়ে একটি স্বাধীন ও যুক্তিবাদী জগত গড়তে উৎসাহিত করেছে। অন্য কোনো ধর্মে, বিশেষ করে ইসলাম বা হিন্দুধর্মে, এই বিশেষ ‘এক্সিট রুট’ বা বের হওয়ার দরজাটি ছিল না।

গশ্যের এই তত্ত্বটি বুঝতে হলে আমাদের ঈশ্বরের অবস্থানের ধরণটি বুঝতে হবে। আদিম সমাজে বা ‘অ্যানিমিস্ট’ সমাজে মানুষ বিশ্বাস করত যে, প্রতিটি গাছ, নদী বা পাথরের ভেতরে আত্মা বা দেবতা আছে। একে বলা হয় সর্বপ্রাণবাদ। এখানে জগত এবং দেবতা একাকার। এরপর এল একেশ্বরবাদ, যা বলল – না, দেবতা সব জায়গায় নেই, ঈশ্বর একজন এবং তিনি স্বর্গে থাকেন। খ্রিস্টধর্ম, বিশেষ করে প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কারের পর, এই ধারণাটিকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেল। তারা বলল, ঈশ্বর হলেন সম্পূর্ণভাবে ‘ট্রান্সেন্ডেন্ট’ (Transcendent) বা জাগতিক সীমার ঊর্ধ্বে থাকা এক সত্তা। তিনি এই নোংরা, নশ্বর এবং পাপী পৃথিবীর অংশ হতে পারেন না। তিনি জগত সৃষ্টি করেছেন ঠিকই, কিন্তু তিনি জগত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বা ‘আদার’ (Other)। এই যে ঈশ্বরকে জগত থেকে আলাদা করে সুউচ্চ আসনে বসানো হলো, এর ফলে পৃথিবীতে একটা বিশাল ‘শূন্যস্থান’ বা ‘ভয়েড’ (Void) তৈরি হলো। আগে যেখানে মানুষ মনে করত জঙ্গলে ঢুকলে বা ব্যবসা করলে ঈশ্বরের সাথে দেখা হবে, এখন তারা দেখল জগতটা আসলে ঈশ্বরের অনুপস্থিতিতে ভরা এক জড় বস্তু মাত্র। এই ‘ঈশ্বরহীন’ জগতটাকেই পরবর্তীতে সেক্যুলার জগত নাম দেওয়া হলো। অর্থাৎ, সেক্যুলারিজম ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নয়, বরং এটি ঈশ্বরের অত্যধিক পবিত্রায়ন বা ‘অ্যাবসলিউট ট্রান্সেন্ডেন্স’ (Absolute Transcendence)-এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। ঈশ্বর যখন স্বর্গে গিয়ে বসলেন, তখন মর্ত্য বা পৃথিবীটা মানুষের স্বাধীন বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হলো।

ইমানেন্সের সংকট: ঈশ্বর যখন সব জায়গায়

এর ঠিক বিপরীত চিত্রটি আমরা দেখতে পাই ইসলামি ধর্মতত্ত্ব এবং প্রাচ্যের অন্যান্য দর্শনে। ইসলামে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বা তাওহিদ (Tawhid)-এর ধারণাটি অত্যন্ত শক্তিশালী। আল্লাহ অবশ্যই সবকিছুর ঊর্ধ্বে, কিন্তু একই সাথে তিনি ‘ইমানেন্ট’ (Immanent) বা সৃষ্টির মাঝে সর্বদা বিরাজমান। কুরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ মানুষের ঘাড়ের ধমনীর (Jugular Vein) চেয়েও নিকটে। ইসলামি সুফিদর্শন এবং মূলধারার ধর্মতত্ত্বে বিশ্বাস করা হয় যে, আল্লাহর ‘নূর’ বা সত্তা জগতের প্রতিটি অণু-পরমাণুকে ঘিরে আছে। এমন কোনো জায়গা নেই, এমন কোনো মুহূর্ত নেই, যেখানে আল্লাহ উপস্থিত নেই বা তার হুকুম কার্যকর হচ্ছে না। এই দর্শনটি একজন বিশ্বাসীর জন্য অত্যন্ত আধ্যাত্মিক প্রশান্তির উৎস হলেও, আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্র গড়ার ক্ষেত্রে এটি এক বড় তাত্ত্বিক বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, সেক্যুলারিজমের প্রথম শর্তই হলো একটি ‘নিউট্রাল স্পেস’ (Neutral Space) বা নিরপেক্ষ পরিসর তৈরি করা – যেখানে ধর্মের নিয়ম খাটবে না, খাটবে শুধু মানুষের যুক্তি। কিন্তু যে বিশ্বাসে ঈশ্বর আলো-বাতাসের মতো সব জায়গায় মিশে আছেন, সেখানে আপনি তাকে সরিয়ে ‘নিরপেক্ষ জায়গা’ তৈরি করবেন কীভাবে?

মুসলিম বিশ্বে রাজনীতি, অর্থনীতি বা সমাজনীতি – সবকিছুই ধর্মের চাদরে মোড়ানো। সেখানে বাজার করা, যুদ্ধ করা কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনা করা – সবই ইবাদতের অংশ। ফলে সেখানে জীবনকে ‘ধর্মীয়’ এবং ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ – এই দুই ভাগে ভাগ করা বা ‘বাইফারকেশন’ (Bifurcation) করা সম্ভব হয়নি। পশ্চিমে যখন চার্চ এবং রাষ্ট্র আলাদা হয়ে গেল, তখন তারা সহজেই বলতে পারল যে, রবিবার হলো ঈশ্বরের দিন, আর সোমবার থেকে শনিবার হলো মানুষের কাজের দিন। কিন্তু ইসলামে শুক্রবারের জুমার নামাজ কেবল প্রার্থনা নয়, এটি একটি রাজনৈতিক সমাবেশও বটে। ইসলামে দীন (ধর্ম) এবং দুনিয়া (সংসার) এমনভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে যে, এখান থেকে ঈশ্বরকে সরিয়ে কোনো ‘সেক্যুলার স্পেস’ তৈরি করার চেষ্টা করলেই তা ধর্মের ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য হয়। সমাজবিজ্ঞানী হোসে ক্যাসানোভা (José Casanova) তার Public Religions in the Modern World বইতে দেখিয়েছেন যে, আধুনিকতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘ডিফারেন্সিয়েশন’ (Differentiation) বা বিভিন্ন পরিসরের পৃথকীকরণ। ধর্ম, অর্থনীতি, রাজনীতি – এরা আলাদা আলাদা নিয়মে চলবে। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো এই পৃথকীকরণকে কখনোই পূর্ণ বৈধতা দেয়নি। সেখানে মনে করা হয়, আল্লাহর আইন যদি আদালতেও না চলে, তবে সেই আদালতের কোনো বৈধতাই নেই। এই ‘সর্বব্যাপী ঈশ্বর’-এর ধারণাটি প্রাতিষ্ঠানিক সেক্যুলারিজমের পথে প্রাচ্যের প্রধান দার্শনিক প্রতিবন্ধক।

পাবলিক স্ফিয়ার: যুক্তির রাজত্ব এবং ঈশ্বরের নীরবতা

পশ্চিমে ঈশ্বর যখন জগত থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলেন বা ‘ট্রান্সেন্ডেন্ট’ হয়ে গেলেন, তখন তার রেখে যাওয়া সেই বিশাল শূন্যস্থানটি পূর্ণ করল কে? সেই শূন্যস্থানটি পূর্ণ করল একটি নতুন ধারণা, যার নাম ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ (Public Sphere) বা জনপরিসর। বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক ইয়ুর্গেন হাবারমাস (Jürgen Habermas) তার The Structural Transformation of the Public Sphere গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক বিবর্তনটি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন (Habermas, 1962)। হাবারমাসের মতে, অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপের কফি হাউস, সেলন এবং সংবাদপত্রগুলোর মাধ্যমে এমন একটি সামাজিক পরিসর গড়ে উঠল, যেখানে মানুষ মিলিত হতো এবং রাষ্ট্রের ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা করত। এই আলোচনার ভিত্তি কোনো ধর্মগ্রন্থ বা পোপের বাণী ছিল না; এর ভিত্তি ছিল বিশুদ্ধ মানবীয় যুক্তি বা র‍্যাশনাল ডিসকোর্স (Rational Discourse)। পাবলিক স্ফিয়ার হলো সেই জায়গা যেখানে সবাই সমান, যেখানে ‘আর্গুমেন্ট’ বা তর্কের শক্তিই আসল শক্তি। এখানে কেউ বলতে পারে না, “ঈশ্বর বলেছেন তাই এটা সত্য।” বরং তাকে যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে হয় কেন এটা সত্য।

ঈশ্বরকে এই পাবলিক স্ফিয়ার থেকে বের করে দেওয়ার ফলেই আধুনিক গণতন্ত্রের জন্ম হয়েছে। কারণ, গণতন্ত্রের মূল কথা হলো – আমরা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেব। যদি ঈশ্বরের আদেশ বা ওহি মাঝখানে চলে আসে, তবে তো আলোচনার কোনো সুযোগ থাকে না; ঈশ্বরের আদেশ মানতে সবাই বাধ্য। তাই পশ্চিমারা খুব সচেতনভাবে ঈশ্বরকে পাবলিক স্ফিয়ার থেকে বিদায় জানাল। তারা বলল, “ঈশ্বর, আমরা আপনাকে সম্মান করি, কিন্তু পার্লামেন্টে বা টক-শোতে আমরা আপনাকে চাই না। সেখানে আমরা শুধু মানুষের কথা শুনতে চাই।” এই যে ঈশ্বরবিহীন নিরপেক্ষ জায়গা, এটাই আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্রের প্রাণভোমরা। এখানে আইন তৈরি হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে, কোনো ঐশ্বরিক বিধানের ভিত্তিতে নয়। মুসলিম বিশ্বে এই ধরণের ‘গড-ফ্রি জোন’ তৈরি করা সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য ছিল। সেখানে উলামা বা ধর্মীয় পণ্ডিতরা পাবলিক ডিসকোর্সের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তারা সবসময় নিশ্চিত করতেন যে, জনগণের আলোচনা যেন শরিয়াহর সীমার বাইরে না যায়। ফলে সেখানে হাবারমাসীয় পাবলিক স্ফিয়ারের বদলে একটি ‘রিলিজিয়াস পাবলিক স্ফিয়ার’ (Religious Public Sphere) গড়ে উঠেছিল, যেখানে যুক্তির চেয়ে বিশ্বাসই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি।

প্রাইভেট স্ফিয়ার: ঈশ্বরের নির্বাসন নাকি নতুন আশ্রয়?

তাহলে প্রশ্ন জাগে, ঈশ্বর কি পশ্চিমা জগত থেকে হারিয়ে গেলেন? না, তিনি হারাননি। তিনি কেবল তার ঠিকানা বদল করেছেন। পাবলিক স্ফিয়ার থেকে বিতাড়িত হয়ে ঈশ্বর আশ্রয় নিলেন ‘প্রাইভেট স্ফিয়ার’ (Private Sphere) বা মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে। একে বলা হয় ধর্মের ‘প্রাইভেটাইজেশন’ (Privatization) বা ব্যক্তিগতকরণ। আধুনিক পশ্চিমে ধর্ম হয়ে উঠল একান্তই ব্যক্তিগত রুচি বা পছন্দের বিষয় (Matter of Choice)। আগে ধর্ম ছিল মানুষের পরিচয় এবং সামাজিক বাধ্যবাধকতা; এখন ধর্ম হয়ে গেল অনেকটা শখের মতো। কেউ চাইলে রবিবার চার্চে যেতে পারে, কেউ চাইলে ইয়োগা করতে পারে, আবার কেউ নাস্তিক হতে পারে – রাষ্ট্রের তাতে কিছুই যায় আসে না। পিটার বার্জার (Peter Berger) তার The Sacred Canopy বইতে এই বিষয়টিকে বর্ণনা করেছেন ‘পবিত্র আচ্ছাদন’ বা স্যাকরড ক্যানোপি (Sacred Canopy) ভেঙে পড়া হিসেবে (Berger, 1967)। আগে ধর্ম পুরো সমাজকে একটি ছাতার মতো ঢেকে রাখত, এখন ধর্ম সমাজের একটি ক্ষুদ্র উপাদানে পরিণত হয়েছে।

ঈশ্বরকে এই ব্যক্তিগত কুঠুরিতে বন্দী করার ফলেই পশ্চিমারা এত দ্রুত উন্নতি করতে পেরেছে – এই দাবিটি শুনতে রূঢ় শোনালেও সত্য। কারণ, যখন ধর্ম ব্যক্তিগত হয়ে যায়, তখন তা আর বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরিতে বা অর্থনীতির শেয়ার বাজারে নাক গলায় না। একজন বিজ্ঞানী ব্যক্তিগত জীবনে ধার্মিক হতেই পারেন, কিন্তু ল্যাবে ঢোকার সময় তিনি তার বিশ্বাসকে কোটের পকেটে রেখে ঢোকেন। তিনি জানেন, তার গবেষণার ফলাফলের ওপর ঈশ্বরের কোনো হাত নেই। এই মানসিক বিভাজন বা ‘কগনিটিভ ডিজোন্যান্স’ (Cognitive Dissonance) সামলানোর দক্ষতা পশ্চিমারা অর্জন করেছে তাদের ধর্মতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের কারণেই। কিন্তু ইসলামে ধর্মকে ব্যক্তিগত করার ধারণাটি অত্যন্ত সমস্যাজনক। ইসলামে ‘আমর বিল মারুফ ওয়া নানি আনিল মুনকার’ (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) একটি সামষ্টিক দায়িত্ব। সমাজ থেকে অন্যায় দূর করা প্রত্যেক মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব। ফলে ধর্মকে কেবল ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে আটকে রাখা ইসলামি দর্শনের পরিপন্থী। অনেক মুসলিম তাত্ত্বিক মনে করেন, ইসলামকে যদি কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতে সীমাবদ্ধ করা হয়, তবে তা আর ইসলাম থাকে না, তা খ্রিস্টধর্মের মতো একটি ‘অনুষ্ঠানসর্বস্ব’ ধর্মে পরিণত হয়। এই ভয় থেকেই মুসলিম বিশ্ব সেক্যুলারিজমের এই প্রাইভেটাইজেশন মডেলকে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

সার্বভৌমত্বের শূন্যস্থান এবং গণতন্ত্রের শর্ত

ঈশ্বরের সরে যাওয়ার ফলে যে শূন্যস্থান তৈরি হলো, তার রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও গভীর। ফরাসি রাজনৈতিক দার্শনিক ক্লদ লেফোর্ট (Claude Lefort) গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘দ্য এম্পটি প্লেস অফ পাওয়ার’ (The Empty Place of Power) বা ক্ষমতার শূন্য স্থান হিসেবে (Lefort, 1988)। রাজতন্ত্রে বা থিওক্রেসিতে (ধর্মরাষ্ট্র) ক্ষমতার সিংহাসনে রাজা বা ধর্মগুরু বসে থাকেন, যিনি নিজেকে ঈশ্বরের ছায়া বা প্রতিনিধি মনে করেন। অর্থাৎ, ক্ষমতা এবং ব্যক্তি একাকার হয়ে থাকে। কিন্তু ঈশ্বর যখন সরে দাঁড়ান এবং রাজতন্ত্রের পতন হয়, তখন সেই সিংহাসনটি খালি হয়ে যায়। গণতন্ত্রে এই সিংহাসনটি চিরকালের জন্য খালি রাখা হয়। কোনো প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট এই সিংহাসনের মালিক নন; তারা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেখানে বসেন এবং সময় শেষ হলে নেমে যান। কেউ বলতে পারেন না যে “আমিই রাষ্ট্র” বা “আমিই আইন।” এই যে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুকে ‘শূন্য’ বা নিরাকার রাখা – এটা সম্ভব হয়েছে কারণ পশ্চিমারা আগেই তাদের মানসজগৎ থেকে পরম ক্ষমতাধর ঈশ্বরকে রাজনীতির মঞ্চ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল।

যেখানে ঈশ্বর বা তার প্রতিনিধিরা রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন, সেখানে ক্ষমতার স্থানটি কখনোই ‘শূন্য’ হতে পারে না। সেখানে সবসময় একটি ‘পরম সত্য’ বা অ্যাবসলিউট ট্রুথ (Absolute Truth) বিরাজ করে। আর যেখানে পরম সত্য বিরাজ করে, সেখানে ভিন্নমত বা বিরোধী দলের কোনো জায়গা থাকে না। কারণ, সত্যের বিরোধিতা করা মানেই তো মিথ্যা বা পাপের সমর্থন করা। পশ্চিমের সেক্যুলারিজম এই পরম সত্যের দাবিকে রাজনীতি থেকে মুছে ফেলেছে। তারা মেনে নিয়েছে যে, রাজনীতিতে কোনো চূড়ান্ত সত্য নেই, আছে শুধু আপেক্ষিক সত্য এবং সমঝোতা। এই ‘রিলেটিভিজম’ (Relativism) বা আপেক্ষিকতাবাদের জন্ম হয়েছে ঈশ্বরের রেখে যাওয়া সেই বিশাল শূন্যস্থান থেকেই। ঈশ্বর নেই (রাজনীতিতে), তাই এখন আমাদেরই ঠিক করতে হবে কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল। এই গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়েই আধুনিক মানুষ তার সভ্যতা গড়ে তুলেছে। তাই বলা যায়, পশ্চিমের সেক্যুলারিজম বা আধুনিকতা আসলে ঈশ্বরের অনুপস্থিতিতে মানুষের সাবালক হয়ে ওঠার গল্প। ঈশ্বর জগতকে ‘পরিত্যাগ’ করেছেন বলেই মানুষ জগতকে ‘আপন’ করে নিতে পেরেছে। এই বিচ্ছেদ বেদনাদায়ক হতে পারে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের জন্য এটি ছিল অপরিহার্য।

প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তন এবং স্থবিরতা

ইতিহাসের এক পর্যায়ে এসে আমাদের সামনে এক কঠিন সত্য উন্মোচিত হয়। কেন কিছু জাতি ধনী হয় আর কিছু জাতি গরিব থেকে যায়? কেন ছোট্ট একটি দ্বীপরাষ্ট্র ইংল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডস তাদের চেয়ে বহুগুণ বড় এবং সম্পদশালী মুঘল সাম্রাজ্য বা অটোমান সাম্রাজ্যকে টেক্কা দিয়ে দিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা প্রায়ই ভূগোল, আবহাওয়া কিংবা মানুষের বুদ্ধিমত্তার দিকে তাকাই। কিন্তু নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদরা, বিশেষ করে ডগলাস নর্থ (Douglass North), আমাদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিয়েছেন এক ভিন্ন দিকে। তারা বলছেন, পার্থক্যটা সম্পদ বা ভূগোল নয়; পার্থক্যটা হলো ‘খেলার নিয়ম’ বা রুলস অফ দ্য গেম (Rules of the Game)। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এই নিয়মগুলোকেই বলা হয় ‘প্রতিষ্ঠান’ বা ইনস্টিটিউশন (Institution)। প্রতিষ্ঠান মানে কোনো ইট-পাথরের দালান বা অফিস নয়; প্রতিষ্ঠান হলো সেই অদৃশ্য সুতো যা সমাজকে বেঁধে রাখে – আইন, বিচার ব্যবস্থা, সম্পত্তির অধিকার এবং চুক্তির সুরক্ষা। পশ্চিমের উত্থান এবং প্রাচ্যের পতনের মূল কারণ লুকিয়ে আছে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিবর্তনের ইতিহাসের মধ্যে। পশ্চিমে ঈশ্বর যখন ধর্মতাত্ত্বিকভাবে জগত থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন, তখন সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মতো করে গড়ে ওঠার এবং ভুল সংশোধন করার সুযোগ পেল। অন্যদিকে, প্রাচ্যে বা মুসলিম বিশ্বে ঈশ্বর এবং তার আইন (শরিয়াহ) এতটাই প্রবলভাবে উপস্থিত ছিল যে, সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে বদলাতে পারেনি; তারা এক পবিত্র স্থবিরতার বা স্ট্যাগনেশন (Stagnation)-এর ফাঁদে আটকা পড়েছিল।

এই পার্থক্যের মূলে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক নমনীয়তা বা অ্যাডাপটিভ এফিসিয়েন্সি (Adaptive Efficiency)ডগলাস নর্থ তার Institutions, Institutional Change and Economic Performance বইতে দেখিয়েছেন যে, দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য সমাজকে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয় যা সময়ের প্রয়োজনে নিজেকে বদলাতে পারে (North, 1990)। পশ্চিমে যেহেতু কোনো মানুষের বা চার্চের কাছে ‘পরম সত্য’ ছিল না (কারণ ঈশ্বর রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন), তাই তারা ধরে নিয়েছিল যে তাদের তৈরি আইন বা সিস্টেমে ভুল থাকতে পারে। এই ‘ভুল হতে পারে’ – এই মানসিকতা থেকেই তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বারবার ভেঙেছে এবং নতুন করে গড়েছে। কিন্তু মুসলিম বিশ্বে, যেখানে মনে করা হতো শাসকের হাতে ঈশ্বরের পবিত্র আমানত রয়েছে এবং শরিয়াহ হলো চূড়ান্ত সত্য, সেখানে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করা বা নতুন আইন তৈরি করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। একে দেখা হতো ‘বিদআত’ বা ধর্মীয় উদ্ভাবন হিসেবে, যা পাপের শামিল। ফলে পশ্চিমারা যখন তাদের ভুল শুধরে এগিয়ে যাচ্ছিল, প্রাচ্যের সমাজগুলো তখন তাদের গৌরবময় অতীতের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল।

অনিশ্চয়তা এবং গণতন্ত্রের জন্ম

গণতন্ত্র বা ডেমোক্রেসি (Democracy) নিয়ে আমাদের অনেক রোমান্টিক ধারণা আছে। কিন্তু অর্থনৈতিক ইতিহাসের দৃষ্টিতে দেখলে, গণতন্ত্র আসলে কোনো মহৎ আদর্শ নয়; এটি হলো ভুল সংশোধন করার একটি অত্যন্ত কার্যকরী মেকানিজম বা যন্ত্র। পশ্চিমে ঈশ্বর যখন রাজনীতি এবং আইনসভার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিলেন, তখন এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হলো। প্রশ্ন উঠল – আইন কে বানাবে? এবং সেই আইন যে সঠিক, তার গ্যারান্টি কে দেবে? আগে পোপ বা রাজা বলতেন, “ঈশ্বরের ইচ্ছায় আমি এই আইন দিলাম।” কিন্তু সেক্যুলার যুগে সেই দাবি আর খাটছিল না। তখন মানুষ বাধ্য হয়ে এক নতুন ব্যবস্থায় এল। তারা বলল, “যেহেতু আমাদের কারোর কাছেই ঈশ্বরের ওহি আসছে না, এবং আমরা কেউই নিশ্চিত জানি না কোনটা সঠিক, তাই চলো আমরা সবাই মিলে আলোচনা করি, তর্ক করি এবং ভোট দিই। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যা বলবে, আপাতত সেটাই আইন। যদি পরে দেখি ভুল হয়েছে, তবে আবার ভোট দিয়ে বদলে ফেলব।” এই যে সত্যের ব্যাপারে বিনয় বা এপিস্টেমিক হিউমিলিটি (Epistemic Humility), এটাই গণতন্ত্রের ভিত্তি।

গণতন্ত্র হলো এমন এক ব্যবস্থা যেখানে ধরে নেওয়া হয় যে, শাসকের কাছে কোনো ‘অ্যাবসলিউট ট্রুথ’ (Absolute Truth) বা পরম সত্য নেই। যেহেতু পরম সত্য নেই, তাই বিরোধী দলের সমালোচনা বা ভিন্নমতকে দমন করার কোনো নৈতিক অধিকারও শাসকের নেই। এই ব্যবস্থার ফলে পশ্চিমে এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিযোগিতা বা ইনস্টিটিউশনাল কম্পিটিশন (Institutional Competition) শুরু হলো। রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের ভুল ধরিয়ে দিল, যার ফলে রাষ্ট্র ব্যবস্থা ক্রমাগত উন্নত বা ‘আপগ্রেড’ হতে থাকল। কিন্তু মুসলিম বিশ্বে চিত্রটা ছিল ভিন্ন। সেখানে খলিফা বা সুলতান মনে করতেন (এবং উলামারাও তা সমর্থন করতেন) যে, তারা আল্লাহর আইনের রক্ষক। আর আল্লাহর আইন তো নিখুঁত, তাতে কোনো ভুল থাকতে পারে না। তাই শাসকের সমালোচনা করা মানেই হলো সত্যের বিরোধিতা করা, যা প্রায়ই রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা ধর্মদোহিতার শামিল হতো। এই মানসিকতার কারণে সেখানে বিরোধী দল বা ‘অপজিশন’ (Opposition)-এর সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। আলোচনার চেয়ে আনুগত্য বা ওবিডিয়েন্স (Obedience) সেখানে বেশি গুরুত্ব পেত। আর যেখানে সমালোচনা নেই, সেখানে ভুল সংশোধনের কোনো সুযোগ থাকে না। ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রটি ভেতর থেকে পচে গেলেও বাইরে থেকে তা বোঝা যেত না, যতক্ষণ না পুরো সাম্রাজ্যটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ত।

আইনের শাসন বনাম শাসকের শাসন

প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং আইনের শাসন বা রুল অফ ল (Rule of Law)। আধুনিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগকারীরা তখনই টাকা ঢালে, যখন তারা নিশ্চিত জানে যে সরকার চাইলেই তাদের সম্পদ কেড়ে নিতে পারবে না। পশ্চিমে এই নিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল রাজার হাত থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করার মাধ্যমে। এর পেছনেও ছিল সেই ধর্মতাত্ত্বিক বিচ্ছেদ। যেহেতু রাজা আর ঈশ্বরের প্রতিনিধি নন, তাই রাজাও আইনের ঊর্ধ্বে নন। ১৬৮৮ সালে ইংল্যান্ডে যে ‘গ্লোরিয়াস রিভোলিউশন’ (Glorious Revolution) হলো, তার মূল কথাই ছিল এটা – রাজা পার্লামেন্টের অনুমতি ছাড়া কর বসাতে পারবেন না বা আইন ভাঙতে পারবেন না। ড্যারন আজেমোগলু (Daron Acemoglu) এবং জেমস রবিনসন (James Robinson) তাদের বিখ্যাত বই Why Nations Fail-এ একে বলেছেন ‘ইনক্লুসিভ ইনস্টিটিউশন’ (Inclusive Institution) বা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানের শুরু (Acemoglu & Robinson, 2012)। এই প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতার একচেটিয়া অধিকার ভেঙে দেয় এবং সাধারণ মানুষের সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করে।

অন্যদিকে, অটোমান বা মুঘল সাম্রাজ্যে বিচার ব্যবস্থা ছিল অনেকটাই শাসকের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। সেখানে কাজি বা বিচারকরা শরিয়াহ অনুযায়ী বিচার করতেন ঠিকই, কিন্তু তারা ছিলেন রাষ্ট্রের কর্মচারী। সুলতান চাইলেই প্রধান বিচারপতিকে বরখাস্ত করতে পারতেন। এর চেয়েও বড় সমস্যা ছিল সম্পত্তির অধিকার বা প্রপার্টি রাইটস (Property Rights) নিয়ে। মুসলিম বিশ্বে ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’র ধারণা ছিল, কিন্তু তা রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাছে ছিল অসহায়। সুলতান বা বাদশাহ যখন খুশি যে কোনো ধনী বণিকের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারতেন, যাকে বলা হতো ‘মুসাদারা’ (Musadara) বা কনফিসকেশন। মুঘল ভারতে কোনো বড় ওমরাহ বা অভিজাত মারা গেলে তার সম্পত্তি তার সন্তানদের কাছে যেত না, তা ফেরত যেত সম্রাটের কাছে। এই অনিশ্চয়তার কারণে মানুষ দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে ভয় পেত। তারা ভাবত, “আজ কষ্ট করে কারখানা বানিয়ে কী লাভ? কাল তো সম্রাট এটা কেড়ে নিতে পারেন।” এই ভয়ের কারণেই সেখানে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। পশ্চিমে ঈশ্বরহীন সেক্যুলার আইন রাজাকে এমনভাবে বেঁধে ফেলেছিল যে, রাজা চাইলেও কোনো বণিকের টাকা মারতে পারতেন না। এই আইনি নিরাপত্তাই বাণিজ্যের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল।

প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা এবং পথ-নির্ভরতার ফাঁদ

অর্থনীতিতে একটি বিখ্যাত তত্ত্ব আছে, যার নাম ‘পাথ ডিপেন্ডেন্স’ (Path Dependence) বা পথ-নির্ভরতা। এর সারমর্ম হলো – ইতিহাসের কোনো এক মোড়ে আপনি কোন রাস্তাটি বেছে নিলেন, তা আপনার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়; চাইলেই আপনি পরে হুট করে রাস্তা বদলাতে পারেন না। মুসলিম বিশ্ব এবং পশ্চিমের প্রাতিষ্ঠানিক পার্থক্যটি এই পথ-নির্ভরতার এক ধ্রুপদী উদাহরণ। পশ্চিম যখনই কোনো সংকটে পড়েছে, তারা নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করে তা সমাধান করেছে। যেমন – বাণিজ্যিক ঝুঁকি কমানোর জন্য তারা জয়েন্ট স্টক কোম্পানি বানাল, রাজার ক্ষমতা কমানোর জন্য পার্লামেন্ট বানাল। কিন্তু মুসলিম বিশ্ব যখন সংকটে পড়ল, তারা নতুন প্রতিষ্ঠান না বানিয়ে পুরোনো ঐতিহ্য বা ধর্মের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়ল। তারা ভাবল, “আমাদের সমস্যা হচ্ছে কারণ আমরা ধর্ম থেকে দূরে সরে গেছি, তাই আমাদের আরও বেশি করে পুরোনো নিয়মে ফিরে যেতে হবে।” এই রক্ষণশীল প্রতিক্রিয়া বা কনজারভেটিভ ব্যাকল্যাশ (Conservative Backlash) তাদেরকে আধুনিকায়নের পথ থেকে বারবার বিচ্যুত করেছে।

অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাস এর জ্বলন্ত প্রমাণ। অষ্টাদশ শতাব্দীতে যখন অটোমানরা ইউরোপের কাছে যুদ্ধে হারতে শুরু করল, তখন তারা বুঝল তাদের সেনাবাহিনী এবং কর ব্যবস্থা অচল হয়ে গেছে। তারা সংস্কার করার চেষ্টা করল (যেমন – নিজাম-ই-জেদিদ বা তানজিমাত সংস্কার), কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো – যেমন জেনিসারি বাহিনী বা ওয়াকফ ব্যবস্থা – এতটাই শক্তিশালী এবং অনড় হয়ে গিয়েছিল যে, সেগুলোকে আর বদলানো সম্ভব ছিল না। জেনিসারিরা সংস্কারের কথা শুনলেই বিদ্রোহ করত, আর উলামারা বলতেন কাফেরদের অনুকরণ করা যাবে না। একে বলা হয় ‘ইনস্টিটিউশনাল রিজিডিটি’ (Institutional Rigidity) বা প্রাতিষ্ঠানিক অনমনীয়তা। সমাজ যখন মনে করে তাদের বর্তমান ব্যবস্থাই হলো ঈশ্বরের দেওয়া শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা, তখন তারা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। পশ্চিমের সুবিধা ছিল, তাদের ব্যবস্থাটি ঈশ্বরের দেওয়া ছিল না, তাই সেটা বদলাতে তাদের কোনো ধর্মতাত্ত্বিক কষ্ট বা অপরাধবোধ ছিল না। তারা নির্দয়ভাবে তাদের পুরোনো প্রতিষ্ঠান ভেঙে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়েছে, যাকে জোসেফ শুম্পিটার বলেছেন ‘ক্রিয়েটিভ ডেসট্রাকশন’ (Creative Destruction)। মুসলিম বিশ্ব এই ধ্বংসাত্মক সৃষ্টিশীলতার সাহস দেখাতে পারেনি, কারণ তাদের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িয়ে ছিল ধর্মীয় পবিত্রতার অনুভূতি।

বৃত্তাকার ন্যায়বিচার বনাম বিবর্তনের রেখা

প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক দর্শনে সময়ের ধারণাটিও ছিল ভিন্ন, যা তাদের প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করেছে। অটোমান বা প্রাচীন মুসলিম রাষ্ট্রচিন্তায় বিশ্বাস করা হতো ‘সার্কেল অফ জাস্টিস’ (Circle of Justice) বা ন্যায়বিচারের বৃত্তে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, জগত একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় আছে এবং শাসকের কাজ হলো সেই ভারসাম্য বজায় রাখা। এখানে পরিবর্তনের কোনো ধারণা নেই; লক্ষ্য হলো স্থিতাবস্থা বা স্ট্যাটাস কো (Status Quo) বজায় রাখা। অন্যদিকে, আধুনিক পশ্চিমা চিন্তাধারা ছিল রৈখিক বা লিনিয়ার (Linear)। তারা বিশ্বাস করত প্রগতিতে বা প্রগ্রেস (Progress)-এ। তারা মনে করত, আজকের দিনটি গতকালের চেয়ে ভালো হতে হবে, এবং আগামীর দিনটি আজকের চেয়েও উন্নত হবে। এই প্রগতিশীল মানসিকতা তাদেরকে প্রতিনিয়ত তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো ঘষামাজা করতে উৎসাহিত করেছে।

প্রগতিশীলতার এই ধারণাটি এসেছে সেই সেক্যুলারিজম থেকেই। যখন আপনি বিশ্বাস করেন যে স্বর্গের সুখ পরকালে নয়, বরং এই পৃথিবীতেই তৈরি করতে হবে, তখন আপনি সমাজকে নিখুঁত করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। মুসলিম বিশ্বে যেহেতু চূড়ান্ত সাফল্যের মাপকাঠি ছিল পরকাল বা আখিরাত, তাই এই নশ্বর দুনিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিখুঁত করার জন্য অতিরিক্ত শক্তি ব্যয় করাকে অনেক সময় নিরর্থক বা দুনিয়াপ্রীতি (Hubb-e-Dunya) হিসেবে দেখা হতো। এর ফলে মেধা এবং সম্পদের একটি বিশাল অংশ জাগতিক প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে না লেগে ধর্মীয় আচার বা আধ্যাত্মিক চর্চায় ব্যয় হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলাফল হয়েছে ভয়াবহ। মুঘল বা অটোমানরা যখন তাদের পুরোনো তলোয়ার আর পুরোনো আমলাতন্ত্র নিয়ে বসে ছিল, পশ্চিমারা তখন স্টিম ইঞ্জিন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং আধুনিক সেনাবাহিনী তৈরি করে ফেলেছে। তাদের এই প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তনের গতি এতই দ্রুত ছিল যে, প্রাচ্যের স্থির সমাজগুলো চোখের পলকে ছিটকে পড়ল। পতনের কারণ তাই কোনো ষড়যন্ত্র বা বিশ্বাসঘাতকতা ছিল না; কারণ ছিল এই – একদল মানুষ সময়ের সাথে নিজেদের বদলাতে পেরেছিল, আর একদল মানুষ তাদের পবিত্র ঐতিহ্যের খাঁচায় বন্দী হয়ে সময়ের কাছে পরাজিত হয়েছিল।

সমালোচনামূলক বীক্ষণ: এসেনশিয়ালিজম এবং ইউরোসেন্ট্রিক ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা

ইতিহাসের যেকোনো বড় ঘটনাকে যখন আমরা মাত্র একটি তত্ত্ব বা লেন্স দিয়ে দেখার চেষ্টা করি, তখন একটা বড় বিপদের সম্ভাবনা থাকে। এতক্ষণ আমরা যে আলোচনা করলাম – যেখানে বলা হলো খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের ভেতরেই সেক্যুলারিজমের বীজ ছিল এবং ইসলামি ধর্মতত্ত্বের অনমনীয়তাই প্রাচ্যের পিছিয়ে পড়ার কারণ – এই বয়ানটি পশ্চিমা অ্যাকাডেমিয়ায় অত্যন্ত জনপ্রিয়। একে বলা হয় ‘কালচারালিস্ট’ বা সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা। কিন্তু মুদ্রার কি উল্টো পিঠ নেই? অবশ্যই আছে। আধুনিক সমাজবিজ্ঞান এবং ইতিহাসের বিবাদী ঘরানার পণ্ডিতরা এই ‘ওয়েবারিয়ান’ বা ওয়েবার-প্রভাবিত ব্যাখ্যার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, এই তত্ত্বটি আসলে এসেনশিয়ালিজম (Essentialism) বা সারবত্তাবাদের দোষে দুষ্ট। এসেনশিয়ালিজম মানে হলো কোনো একটি সংস্কৃতি বা ধর্মকে স্থির, অপরিবর্তনযোগ্য এবং একশিলা (Monolithic) হিসেবে ধরে নেওয়া। যেন ইসলামের একটা নির্দিষ্ট ‘স্বভাব’ আছে যা কখনোই বদলায় না, আবার খ্রিস্টধর্মের একটা ‘স্বভাব’ আছে যা সবসময় প্রগতিশীল। কিন্তু ইতিহাস তো সরলরেখায় চলে না। যদি খ্রিস্টধর্মের ‘সেলফ-উইথড্রয়াল’ বা ঈশ্বরকে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই উন্নয়নের চাবিকাঠি হতো, তবে আধুনিক বিজ্ঞানের জন্ম ইতালির রোমে না হয়ে প্রোটেস্ট্যান্ট লন্ডনে কেন হলো? গ্যালিলিওকে কেন চার্চের আদালতের সামনে নতজানু হতে হলো? আবার যদি ইসলামি ধর্মতত্ত্ব বা আশআরী মতবাদই বিজ্ঞানের শত্রু হতো, তবে আশআরী মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেও ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে কীভাবে নাসির আল-দীন আল-তুসি বা ইবনে আল-শাতেরের মতো বিজ্ঞানীরা জন্মালেন? এই অংশে আমরা সেই ‘সাংস্কৃতিক’ ব্যাখ্যার ব্যবচ্ছেদ করব এবং দেখব – ধর্মতত্ত্বই কি সব, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে ভূ-রাজনীতি, অর্থনীতি এবং ক্ষমতার এক জটিল সমীকরণ।

এসেনশিয়ালিজম বা ওরিয়েন্টালিজমের তাত্ত্বিক সংকট

আমরা যখন বলি যে, “ইসলামি আইনে বা ধর্মতত্ত্বে যুক্তিবাদের অভাব ছিল,” তখন আমরা আসলে এডওয়ার্ড সাঈদ (Edward Said)-এর ভাষায় ওরিয়েন্টালিজম (Orientalism) বা প্রাচ্যতত্ত্বের ফাঁদে পা দিই (Said, 1978)। সাঈদ তার কালজয়ী গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, পশ্চিমা পণ্ডিতরা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রাচ্য বা ইসলামকে ‘অযৌক্তিক’, ‘আবেগপ্রবণ’ এবং ‘স্থবির’ হিসেবে চিত্রিত করেছেন, যাতে পশ্চিমের ‘যৌক্তিক’, ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ এবং ‘প্রগতিশীল’ ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করা যায়। এই লেখার আগের অংশ বা অধ্যায়গুলোতে আমরা যে ‘কেনোসিস’ বা ঈশ্বরের সরে দাঁড়ানোর তত্ত্ব দেখেছি, তা এই ওরিয়েন্টালিস্ট কাঠামোরই একটি পরিশীলিত রূপ হতে পারে। সমালোচকরা বলেন, ইসলাম কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মতত্ত্বের নাম নয়। ইসলামি ইতিহাসে কেবল আশআরী মতবাদ ছিল না; সেখানে মু’তাজিলা (Mu’tazila) বা যুক্তিবাদী সম্প্রদায় ছিল, যারা বিশ্বাস করত যে ভালো-মন্দ মানুষের যুক্তি দিয়েই বোঝা সম্ভব। সেখানে ইবনে রুশদ (Averroes)-এর মতো দার্শনিক ছিলেন, যিনি অ্যারিস্টটলকে ইউরোপের কাছে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

পশ্চিমা পণ্ডিতরা প্রায়ই তাদের সুবিধামতো ইতিহাসের কিছু অংশ বেছে নেন। তারা আল-গাজালির ‘অকেশনালিজম’-কে ইসলামের একমাত্র কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরেন, কিন্তু ইবনে রুশদের যুক্তিবাদকে এড়িয়ে যান। অথচ দ্বাদশ শতাব্দীতে ইউরোপের রেনেসাঁসের পেছনে এই ইবনে রুশদের দর্শনের প্রভাব ছিল অপরিসীম। অন্যদিকে, খ্রিস্টধর্মের ইতিহাসও সবসময় ‘যৌক্তিক’ ছিল না। স্প্যানিশ ইনকুইজিশন, ডাইনি শিকার (Witch-hunting) বা ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, খ্রিস্টীয় চার্চও ক্ষমতার প্রশ্নে কম হিংস্র ছিল না। তাই মার্শাল হজসন (Marshall Hodgson) তার বিশাল গ্রন্থ The Venture of Islam-এ যুক্তি দিয়েছেন যে, মুসলিম বিশ্বের পিছিয়ে পড়ার কারণ তাদের ধর্মের ভেতরে খোঁজাটা ভুল; বরং এর কারণ খুঁজতে হবে তাদের ভৌগোলিক এবং সামরিক পরিস্থিতির মধ্যে (Hodgson, 1974)। হজসন মনে করেন, ইসলাম এবং খ্রিস্টধর্ম – উভয়ই ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রগতিশীল এবং রক্ষণশীল – উভয় রূপেই আবির্ভূত হয়েছে। কোনো একটি ধর্মকে চিরস্থায়ীভাবে ‘প্রগতির বন্ধু’ বা ‘প্রগতির শত্রু’ হিসেবে ট্যাগ দেওয়াটা ঐতিহাসিক সত্যের অপলাপ।

গ্রেট ডাইভারজেন্স: ধর্মতত্ত্ব নাকি কয়লা আর কলোনি?

এতক্ষণ আমরা যা আলোচনা করলাম, তা হলো আইডিয়া বা ভাবাদর্শের ইতিহাস। কিন্তু একদল ঐতিহাসিক, বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়া স্কুলের পণ্ডিতরা বলেন – বাদ দিন এসব ধর্মতত্ত্বের কচকচানি! আসল পার্থক্যটা ঈশ্বরের ধারণায় নয়, আসল পার্থক্যটা হলো কয়লা এবং উপনিবেশে। এই মতবাদের প্রধান প্রবক্তা হলেন কেনেথ পমেরানজ (Kenneth Pomeranz)। তিনি তার বিখ্যাত বই The Great Divergence-এ এক বৈপ্লবিক তথ্য সামনে আনেন (Pomeranz, 2000)। পমেরানজ প্রচুর পরিসংখ্যান দিয়ে দেখান যে, ১৭৫০ সাল পর্যন্তও চীন এবং ভারতের জীবনযাত্রার মান, বাজার ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির স্তর ইংল্যান্ড বা ফ্রান্সের সমকক্ষ ছিল। চীনের ইয়াংজি বদ্বীপ বা ভারতের বাংলা অঞ্চল তখনো ইউরোপের মতোই ধনী এবং উন্নত ছিল। যদি ধর্মতত্ত্ব বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাই প্রাচ্যের সমস্যার মূল কারণ হতো, তবে ১৭৫০ সাল পর্যন্ত তারা ইউরোপের সাথে পাল্লা দিল কীভাবে?

পমেরানজের মতে, ইউরোপের (বিশেষ করে ইংল্যান্ডের) হঠাৎ এগিয়ে যাওয়ার পেছনে দুটি ‘ভৌগোলিক দুর্ঘটনা’ বা জিওগ্রাফিক্যাল এক্সিডেন্ট (Geographical Accident) কাজ করেছে।

  • প্রথমত, ইংল্যান্ডের মাটির নিচে ছিল অফুরন্ত কয়লার খনি, যা তাদের শিল্প বিপ্লবের শক্তি যুগিয়েছে। চীন বা মুসলিম বিশ্বের অনেক জায়গায় কয়লা ছিল খনি থেকে অনেক দূরে।
  • দ্বিতীয়ত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ইউরোপের হাতে ছিল ‘নিউ ওয়ার্ল্ড’ বা আমেরিকা মহাদেশ। কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করার পর ইউরোপ এক বিশাল ভূখণ্ড এবং সম্পদ (Ghost Acreage) পেয়ে যায়।

আমেরিকা থেকে লুট করা সোনা-রুপা, চিনি এবং তুলা ইউরোপের অর্থনীতিকে এক বিশাল ধাক্কা (Boost) দিয়েছিল। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল আটলান্টিক দাস ব্যবসা। ত্রিনিদাদের ইতিহাসবিদ এরিক উইলিয়ামস (Eric Williams) তার Capitalism and Slavery বইতে স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, ব্রিটেনের শিল্প বিপ্লবের প্রাথমিক পুঁজি এসেছিল দাস ব্যবসা এবং ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে, প্রোটেস্ট্যান্ট এথিক বা ক্যালভিনিজম থেকে নয় (Williams, 1944)। মুসলিম বিশ্ব বা চীনের হাতে এমন কোনো ‘নতুন পৃথিবী’ বা কলোনি ছিল না যা তাদের অর্থনীতির সীমাবদ্ধতা কাটাতে সাহায্য করতে পারে। তাই সমালোচকরা বলেন, পশ্চিমারা আগে বড়লোক হয়েছে অন্যের সম্পদ দিয়ে, আর তারপর বড়লোক হওয়ার পর তারা নিজেদের সাফল্যের সাফাই গাওয়ার জন্য এই সুন্দর সুন্দর ধর্মতাত্ত্বিক তত্ত্বগুলো (যেমন – ঈশ্বরের সরে দাঁড়ানো, বা সেক্যুলারিজম) আবিষ্কার করেছে। অর্থাৎ, সেক্যুলারিজম বা উন্নত প্রতিষ্ঠান উন্নয়নের কারণ (Cause) নয়, বরং উন্নয়নের ফলাফল (Consequence)

ইসলামি বিজ্ঞানের পতন: একটি ভুল আখ্যান

প্রচলিত বয়ান অনুযায়ী, ইমাম আল-গাজালি যখন একাদশ শতাব্দীতে তার The Incoherence of the Philosophers বইটি লিখলেন এবং কার্যকারণ সম্পর্ককে অস্বীকার করলেন, তখন থেকেই নাকি ইসলামি বিজ্ঞানের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়া হলো। একে বলা হয় ‘আল-গাজালি থিসিস’ বা গাজালির পতনের তত্ত্ব। কিন্তু বিজ্ঞানের আধুনিক ইতিহাসবিদরা এই তত্ত্বকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জর্জ সালিবা (George Saliba) তার Islamic Science and the Making of the European Renaissance গ্রন্থে প্রমাণ করেছেন যে, তথাকথিত ‘পতনের যুগ’ বা গাজালি-পরবর্তী যুগেও ইসলামি বিজ্ঞান অত্যন্ত উর্বর ছিল (Saliba, 2007)। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে, অর্থাৎ গাজালির মৃত্যুর প্রায় দুইশো বছর পর, ইসলামি জ্যোতির্বিদ্যা তার স্বর্ণযুগে প্রবেশ করে। দামেস্ক এবং মারাগা মানমন্দিরে এমন সব গাণিতিক মডেল বা মারাগা রেভোলিউশন (Maragha Revolution) তৈরি হয়েছিল, যা ছাড়া কোপার্নিকাসের পক্ষে সৌরকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্ব দেওয়া সম্ভব ছিল না।

সালিবা প্রশ্ন তোলেন, যদি ধর্মতত্ত্বই বিজ্ঞানের শত্রু হতো, তবে মসজিদের মুওয়াক্কিত (সময় নির্ধারণকারী) বা ধর্মীয় কাজের জন্যই কেন জ্যামিতি এবং ত্রিকোণমিতির এত উন্নতি হলো? আসলে মুসলিম বিশ্বে বিজ্ঞানের পতন কোনো ধর্মতাত্ত্বিক কারণে হয়নি, হয়েছে অর্থনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক কারণে। ১৪৯২ সালে আমেরিকা আবিষ্কারের পর বিশ্ব বাণিজ্যের রুট বদলে যায়। আগে বাণিজ্য হতো ভারত মহাসাগর এবং ভূমধ্যসাগর দিয়ে, যার নিয়ন্ত্রণ ছিল মুসলিমদের হাতে। কিন্তু নতুন রুটে বাণিজ্য চলে গেল আটলান্টিক মহাসাগরে, যার নিয়ন্ত্রণ ছিল ইউরোপের হাতে। বাণিজ্যের টাকা কমে যাওয়ায় মুসলিম শাসকরা আর বিজ্ঞান গবেষণায় বড় বড় অনুদান বা ফান্ডিং দিতে পারছিলেন না। বিজ্ঞানীরা যখন দেখলেন রাজদরবারে টাকা নেই, তখন গবেষণা কমে গেল। এটা ছিল নিছকই অর্থনীতির হিসাব, আশআরী ধর্মতত্ত্বের কোনো ভেলকি নয়। তাছাড়া, ইউরোপে ছাপাখানা বা প্রিন্টিং প্রেস (Printing Press) আসার ফলে জ্ঞান যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, অটোমানরা নিরাপত্তার স্বার্থে শুরুতে আরবি ভাষায় প্রিন্টিং প্রেস নিষিদ্ধ করায় সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। এই প্রযুক্তিগত রক্ষণশীলতার পেছনে ধর্মীয় কারণের চেয়েও বেশি ছিল ক্যালিগ্রাফার বা লিপি-শিল্পীদের গিল্ডের অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষা।

আধুনিক রাষ্ট্র কি নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ?

আমরা এতক্ষণ ধরে ধরে নিয়েছি যে, আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্র বা নেশন-স্টেট হলো ইতিহাসের চূড়ান্ত গন্তব্য বা শ্রেষ্ঠ মডেল। আর মুসলিম বিশ্ব যেহেতু এই মডেলটি তৈরি করতে পারেনি, তাই তারা ‘ব্যর্থ’। কিন্তু এই ধারণাটি নিজেই একটি ইউরোসেন্ট্রিক বা ইউরোপ-কেন্দ্রিক অহংবোধ। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়ায়েল হাল্লাক (Wael Hallaq) তার চিন্তাজাগানিয়া বই The Impossible State-এ এক অমোঘ যুক্তি তুলে ধরেছেন (Hallaq, 2012)। হাল্লাক বলেন, আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা আসলে কোনো নিরপেক্ষ বা নিরীহ যন্ত্র নয়; এটি একটি নৈতিকভাবে সমস্যাজনক সত্তা। আধুনিক রাষ্ট্র নিজের স্বার্থে মানুষ খুন করতে পারে (যুদ্ধ), পরিবেশ ধ্বংস করতে পারে এবং মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি কোণায় নজরদারি করতে পারে। ইসলামি শরিয়াহ শাসনব্যবস্থায় শাসকের ক্ষমতা কখনোই এতটা নিরঙ্কুশ ছিল না। সেখানে নৈতিকতা বা মোরালিটি সবসময় আইনের ঊর্ধ্বে ছিল।

হাল্লাকের মতে, মুসলিমরা যে আধুনিক রাষ্ট্র তৈরি করতে পারেনি, তা তাদের ‘ব্যর্থতা’ নয়, বরং তা তাদের ‘নৈতিক বিজয়’ হতে পারে। কারণ ইসলামি আইন বা শরিয়াহ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা কল্পনা করে, যেখানে নৈতিকতা বাদ দিয়ে কোনো আইন হতে পারে না। অন্যদিকে, আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্র নিজেকে নৈতিকতার ঊর্ধ্বে তুলে নিয়েছে। ম্যাক্স ওয়েবার যাকে বলেছেন ‘রাষ্ট্রের সহিংসতার একচেটিয়া অধিকার’ (Monopoly on Violence)। হাল্লাক যুক্তি দেন যে, ইসলামি শাসনব্যবস্থা এবং আধুনিক নেশন-স্টেট – এই দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী প্যারাডাইম। ইসলামি প্যারাডাইমে ‘ঈশ্বর’ কেন্দ্রে আছেন বলেই সেখানে মানুষকে যান্ত্রিক বা পণ্য মনে করা কঠিন। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রে ঈশ্বর সরে যাওয়ার ফলে রাষ্ট্র নিজেই এক নতুন ‘ঈশ্বর’ বা মর্টাল গড (Mortal God) হয়ে উঠেছে (হবসের ভাষায়)। এই নতুন ঈশ্বর বা রাষ্ট্র আগের ঈশ্বরের চেয়েও অনেক বেশি হিংস্র এবং সর্বগ্রাসী। তাই মুসলিম বিশ্ব যে পশ্চিমা ধাঁচের সেক্যুলারিজম গ্রহণ করতে পারেনি, তার কারণ হয়তো তাদের অক্ষমতা নয়, বরং তাদের অবচেতন মনের নৈতিক প্রতিরোধ। তালাল আসাদ (Talal Asad) তার Formations of the Secular বইতে দেখিয়েছেন যে, সেক্যুলারিজম কোনো শান্তির বার্তা নয়, বরং এটি আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষমতা বিস্তারের একটি হাতিয়ার, যা ধর্মকে নিয়ন্ত্রণ ও পোষ মানাতে চায় (Asad, 2003)।

প্রাতিষ্ঠানিক নমনীয়তার ভিন্ন পাঠ

আমরা আগের অধ্যায়গুলোতে বলেছি যে, মুসলিম বিশ্বে করপোরেট সত্তা বা আইনি ব্যক্তির ধারণা ছিল না বলে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো স্থবির হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এই সমালোচনাটিও আংশিক সত্য। ইসলামি আইন বা ফিকাহ শাস্ত্র কখনোই এতটা অনড় বা রিজিড ছিল না। সেখানে ‘হিলা’ (Hila) বা আইনি কৌশলের মাধ্যমে পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বহু উদাহরণ আছে। অটোমান সাম্রাজ্যে ‘ওয়াকফ’ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেই এক ধরণের মিউনিসিপ্যাল বা পৌরসেবা দেওয়া হতো, যা শত শত বছর ধরে অত্যন্ত কার্যকর ছিল। পশ্চিমা মডেলের ‘করপোরেশন’ বা চিরস্থায়ী কোম্পানিই যে ব্যবসা করার একমাত্র উপায়, এটা ভাবা ভুল। মুসলিম বনিকরা তাদের নেটওয়ার্ক এবং বিশ্বাসের (Trust) ওপর ভিত্তি করে ভারত মহাসাগর জুড়ে যে বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল, তা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছাড়াই শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে ছিল।

অর্থনীতিবিদরা এখন বলছেন যে, আমরা যখন পশ্চিমাদের চশমা দিয়ে প্রাচ্যকে দেখি, তখন আমরা প্রাচ্যের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে চিনতেই পারি না। আমরা খুঁজি লিখিত সংবিধান বা পার্লামেন্ট। কিন্তু প্রাচ্যে হয়তো সেটা ছিল মৌখিক চুক্তি বা সামাজিক সম্পর্কের বাঁধন। মুসলিম বিশ্বে আইনের শাসন ছিল না – এটা বলা ভুল। সেখানে ছিল ‘রুল অফ শরিয়াহ’, যা শাসকের স্বেচ্ছাচারিতাকে নিয়ন্ত্রণ করত। উলামারা বা সুফিরা প্রায়ই সুলতানের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়াতেন। এই ব্যবস্থাটি পশ্চিমা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’-এর মতো প্রাতিষ্ঠানিক ছিল না ঠিকই, কিন্তু সামাজিকভাবে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্র এই সামাজিক ভারসাম্যকে ভেঙে দিয়েছে, কিন্তু তার বদলে কার্যকর কোনো নতুন নৈতিক কাঠামো দিতে পারেনি। ফলে মুসলিম বিশ্বে আজ আমরা যে অস্থিরতা দেখছি, তা হয়তো ইসলামি ধর্মতত্ত্বের কারণে নয়, বরং পশ্চিমা সেক্যুলার মডেলকে জোর করে এমন একটি জমিনে চাপিয়ে দেওয়ার ফলে হয়েছে, যা সেই মডেলের জন্য প্রস্তুত ছিল না।

সেক্যুলারাইজেশন থিসিসের গলদ

সর্বশেষে, খোদ সেক্যুলারাইজেশন থিসিস বা ‘ধর্মনিরপেক্ষতার তত্ত্ব’ নিয়েই দার্শনিকদের মধ্যে বিশাল বিতর্ক আছে। আমরা ধরে নিই যে, খ্রিস্টধর্মের ভেতর থেকেই সেক্যুলারিজম ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে (কন্টিনিউইটি থিসিস)। এই মতের পক্ষে ছিলেন কার্ল লোভিথ (Karl Löwith)। কিন্তু জার্মান দার্শনিক হান্স ব্লুমেনবার্গ (Hans Blumenberg) তার The Legitimacy of the Modern Age বইতে এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন (Blumenberg, 1966)। ব্লুমেনবার্গের মতে, আধুনিকতা বা সেক্যুলারিজম খ্রিস্টধর্মের ধারাবাহিকতা নয়; বরং এটি খ্রিস্টধর্মের বিরুদ্ধে একটি ‘সেলফ-অ্যাসার্শন’ বা মানুষের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বিদ্রোহ। আধুনিক যুগ নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে মধ্যযুগের ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নয়, বরং সেই প্রশ্নগুলোকে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করে। অর্থাৎ, পশ্চিমের উন্নতি হয়েছে ধর্মকে ‘রূপান্তরিত’ করে নয়, বরং ধর্মকে ‘অস্বীকার’ বা ‘কাট-অফ’ করে।

যদি ব্লুমেনবার্গের কথাই সত্য হয়, তবে আমাদের এই পুরো আর্গুমেন্টটি – যে খ্রিস্টধর্মের বিশেষত্বের কারণেই সেক্যুলারিজম এসেছে – তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। হয়তো সেক্যুলারিজম কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বা সংস্কৃতির সম্পত্তি নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক পর্যায়, যা যেকোনো সমাজ তার নিজস্ব পথে অর্জন করতে পারে। জাপানের দিকে তাকালে আমরা দেখি, তারা খ্রিস্টান না হয়েও বা তাদের নিজস্ব ‘শিন্তো’ বা বৌদ্ধ ঐতিহ্য বজায় রেখেও অত্যন্ত আধুনিক এবং উন্নত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। তারা তাদের সম্রাটকে ‘দেবতা’ মনে করত (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত), তবুও তারা শিল্প বিপ্লব ঘটাতে পেরেছিল। এটি প্রমাণ করে যে, উন্নয়নের জন্য ‘ঈশ্বরকে সরে দাঁড়ানো’ বা ধর্মতত্ত্বকে বদলানোর কোনো আবশ্যিক শর্ত নেই। প্রয়োজন হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থনৈতিক কৌশল এবং শিক্ষার প্রসার। তাই মুসলিম বিশ্ব বা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর ব্যর্থতাকে শুধুই তাদের ধর্ম বা ঈশ্বরের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়াটা এক ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক অলসতা। এর মাধ্যমে আমরা হয়তো পশ্চিমের আধিপত্যকে তাত্ত্বিকভাবে জায়েজ করি, কিন্তু ইতিহাসের জটিল সত্যকে আড়াল করে ফেলি।

ভাবাদর্শের প্রত্যাবর্তন: কেন শুধুই ভূগোল বা কয়লা দিয়ে ইতিহাসের ব্যাখ্যা চলে না

ইতিহাসের এক অদ্ভুত স্বভাব আছে। একে আপনি যেদিক থেকেই দেখার চেষ্টা করুন না কেন, মনে হবে ওটাই একমাত্র সত্য, কিন্তু একটু পরেই টের পাওয়া যায় যে কোথাও একটা বড় ফাঁক রয়ে গেছে। আমরা আগের অধ্যায়ে দেখলাম, একদল পন্ডিত বেশ জোর গলায় বললেন যে ধর্মতত্ত্ব বা দর্শনের কোনো দোষ নেই, আসল দোষ হলো ভূগোলের, কয়লার খনির অবস্থানের, কিংবা উপনিবেশ থেকে লুটে আনা সম্পদের। শুনতে বেশ আরামদায়ক লাগে। মনে হয়, যাক বাবা, আমাদের চিন্তাভাবনায় কোনো ভুল ছিল না, ভুলটা ছিল আমাদের মাটির নিচে কয়লা না থাকায়। কিন্তু এই ‘বস্তুবাদী’ বা ম্যাটেরিয়ালিস্ট (Materialist) ব্যাখ্যাটা মেনে নিতে গেলেই মনের ভেতর খচখচ করতে থাকে। প্রশ্ন জাগে, ব্যাপারটা কি আসলেই এত সরল? শুধুই কি ইট-কাঠ-পাথর আর সোনা-রুপার হিসাব? যদি তাই হতো, তবে ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী সাম্রাজ্যগুলো কেন ধুলোয় মিশে গেল, আর কুয়াশাচ্ছন্ন এক দ্বীপের দরিদ্র মানুষরা কেন বিশ্ব শাসন করল? স্পেনের কথা ভাবুন। আমেরিকা আবিষ্কারের পর ইনকা আর অ্যাজটেক সাম্রাজ্য লুট করে তারা জাহাজে জাহাজে সোনা আর রুপা এনেছিল। এত সম্পদ ইতিহাসে আর কেউ দেখেনি। কিন্তু সেই স্পেন কি শিল্প বিপ্লব ঘটাতে পেরেছিল? পারেনি। সেই সোনা দিয়ে তারা বড়লোক হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আধুনিক হতে পারেনি। বরং সেই লুটের টাকা শেষ হয়ে যাওয়ার পর স্পেন দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে, ইংল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডসের কাছে স্পেনের মতো অঢেল সোনা ছিল না, কিন্তু তাদের কাছে ছিল অন্য কিছু। সেটা কী? সেটা হলো সেই সম্পদকে কাজে লাগানোর মতো মানসিকতা এবং প্রতিষ্ঠান। তাই কয়লা আর কলোনির গল্পটা শুনতে যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন, মানুষের মনের জগতটাকে বা কালচারাল ফ্যাক্টর (Cultural Factor)-কে বাদ দিয়ে ইতিহাসের এই বিশাল ধাঁধা মেলানো অসম্ভব।

ইতিহাসবিদ ডেভিড ল্যান্ডস (David Landes) তার বিখ্যাত বই The Wealth and Poverty of Nations-এ এই কথাটিই খুব শক্তভাবে বলেছেন। তিনি বলছেন, “যদি আমরা ইতিহাসের দিকে তাকাই, তবে দেখব যে সংস্কৃতিই সব পার্থক্য গড়ে দেয়।” ল্যান্ডসের মতে, কয়লা বা সম্পদ হলো সুযোগ, কিন্তু সেই সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য দরকার একটা বিশেষ ধরণের ‘সাংস্কৃতিক চশমা’। চীন বা অটোমান সাম্রাজ্যের মাটির নিচেও সম্পদ ছিল, তাদেরও বিশাল বাজার ছিল। কিন্তু সেই সম্পদকে তারা ‘পুঁজি’ বা ক্যাপিটাল (Capital)-এ রূপান্তর করতে পারেনি। কারণ, তাদের সমাজ ব্যবস্থা, তাদের ধর্মতত্ত্ব এবং তাদের আইন সেই রূপান্তরের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কয়লা থাকলেই শিল্প বিপ্লব হয় না, যেমনটা রান্নাঘরে চাল থাকলেই বিরিয়ানি হয় না; রাঁধুনিকে জানতে হয় কীভাবে মশলা মেশাতে হয়। ইউরোপের সেই ‘জানা’টা এসেছিল তাদের শত শত বছরের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা থেকে, যা তাদের ধর্মতত্ত্বের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। তাই আগের অংশে আমরা যে ‘সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা’ বা কালচারালিস্ট এক্সপ্ল্যানেশন (Culturalist Explanation)-কে বাতিল করে দিতে চেয়েছিলাম, তাকে অত সহজে বাতিল করা যাচ্ছে না। ঘুরেফিরে সেই মানুষের বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের গল্পের কাছেই আমাদের ফিরে আসতে হয়।

প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি এবং জ্ঞানের উপযোগিতা

একটা সমাজ কতটা এগিয়ে যাবে, সেটা নির্ভর করে সেই সমাজ ‘জ্ঞান’ বা নলেজকে কীভাবে দেখে তার ওপর। জ্ঞান কি শুধুই পুরনো কিতাব মুখস্থ করা, নাকি জ্ঞান হলো নতুন কিছু সৃষ্টি করা যা দিয়ে মানুষের জীবন সহজ হয়? অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ জোয়েল মকির (Joel Mokyr) তার The Gifts of Athena বইটিতে এই বিষয়টি নিয়ে অসাধারণ আলোচনা করেছেন। মকির বলছেন, শিল্প বিপ্লবের আগে ইউরোপে এক বিশেষ ধরণের ‘জ্ঞান বিপ্লব’ ঘটেছিল। তারা জ্ঞানকে কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, তারা সেটাকে প্রযুক্তিতে রূপান্তর করেছিল। একে তিনি বলছেন ইউজফুল নলেজ (Useful Knowledge) বা প্রয়োজনীয় জ্ঞান। এখন প্রশ্ন হলো, এই মানসিকতা তারা পেল কোথায়? এটা কি হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়েছিল? না। এর শেকড় ছিল মধ্যযুগের সেই মঠ আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, যেখানে চার্চের পন্ডিতরা বিশ্বাস করতেন যে, ঈশ্বর এই জগতকে মানুষের ব্যবহারের জন্যই তৈরি করেছেন। প্রকৃতিকে বশ করা বা তার নিয়ম জেনে তাকে কাজে লাগানো – এটা তাদের কাছে ঈশ্বরের আদেশেরই অংশ ছিল।

অন্যদিকে, মুসলিম বিশ্বে বা চীনে জ্ঞানের সংজ্ঞাটা ছিল একটু ভিন্ন। সেখানে জ্ঞানচর্চার মূল উদ্দেশ্য ছিল নৈতিক উৎকর্ষ সাধন বা সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। অটোমান সাম্রাজ্যে যখন ছাপাখানা বা প্রিন্টিং প্রেস (Printing Press) এল, তখন তারা সেটাকে নিষিদ্ধ করেছিল। কেন? অনেক ঐতিহাসিক বলেন, এর পেছনে ছিল ক্যালিগ্রাফার বা লিপি-শিল্পীদের রুজিরোজগার রক্ষার অর্থনৈতিক কারণ। এটা সত্য, কিন্তু এর পেছনে একটা গভীর ধর্মতাত্ত্বিক ভয়ও ছিল। তারা মনে করতেন, পবিত্র ধর্মগ্রন্থ যদি যন্ত্রের মাধ্যমে ছাপা হয়, তবে তার পবিত্রতা নষ্ট হতে পারে। এই যে ‘পবিত্রতা রক্ষার ভয়’ – এটা একটা সাংস্কৃতিক বা ধর্মতাত্ত্বিক বাধা। নিয়াল ফার্গুসন (Niall Ferguson) তার Civilization: The West and the Rest বইতে একে পশ্চিমা সভ্যতার অন্যতম ‘কিলার অ্যাপ’ বা মারণাস্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ফার্গুসন দেখান যে, বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির প্রতি এই উন্মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি পশ্চিমকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে দিয়েছে। প্রাচ্যের পন্ডিতরা যখন আকাশের নক্ষত্র দেখে ভবিষ্যৎবাণী করতে ব্যস্ত ছিলেন, পশ্চিমের পন্ডিতরা তখন সেই নক্ষত্র দেখে সমুদ্রের পথ মাপার যন্ত্র বানাচ্ছিলেন। এই পার্থক্যের কারণ কয়লা নয়, কারণ হলো মনস্তত্ত্ব।

আমরা প্রায়ই বলি যে, মুসলিম বিজ্ঞানীদের হাত ধরেই তো ইউরোপ বিজ্ঞান শিখেছে। এটা শতভাগ সত্য। কিন্তু তারপর কী হলো? ত্রয়োদশ শতাব্দীর পর ইউরোপ সেই জ্ঞানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিল। তারা বিশ্ববিদ্যালয় বানাল, রয়্যাল সোসাইটি বানাল, যেখানে বিজ্ঞানীদের কাজই ছিল সারাদিন গবেষণা করা। আর আমাদের এখানে বিজ্ঞান রয়ে গেল ব্যক্তিগত শখের বিষয়। একজন সুলতান বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা করলেন তো বিজ্ঞান এগোল, পরের সুলতান ধার্মিক হলেন তো বিজ্ঞান বন্ধ হয়ে গেল। সমাজবিজ্ঞানী রডনি স্টার্ক (Rodney Stark) তার The Victory of Reason গ্রন্থে দাবি করেছেন যে, খ্রিস্টধর্মের ভেতরেই যুক্তিবাদের বা র‍্যাশনালিজম (Rationalism)-এর একটা প্রবল স্রোত ছিল, যা ইউরোপীয়দের প্রতিষ্ঠান গড়তে শিখিয়েছে। স্টার্কের মতে, ঈশ্বর যে যুক্তিবাদী এবং তার সৃষ্টি যে একটা নিয়মের রাজত্ব – এই বিশ্বাসই বিজ্ঞানের জন্ম দিয়েছে। তাই বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির বিকাশকে ধর্মতত্ত্ব থেকে আলাদা করে দেখাটা হবে ইতিহাসের এক বিশাল ভুল পাঠ।

বিশ্বাস বনাম ব্যবস্থা: বাণিজ্যিক আস্থার সংকট

ব্যাবসা-বাণিজ্য তো সবাই করে। অটোমান বা মুঘল বণিকরাও হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ব্যবসা করতেন। কিন্তু তাদের ব্যবসা আর ইউরোপীয়দের ব্যবসার মধ্যে একটা মৌলিক ফারাক ছিল, যা আমরা আগের আলোচনাগুলোতেও কিছুটা ছুঁয়ে গেছি। এই ফারাকটা হলো ‘বিশ্বাস’ বা ট্রাস্ট (Trust)-এর ধরণ। অর্থনীতিবিদ অ্যাভনার গ্রেইফ (Avner Greif) মধ্যযুগের ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের ওপর গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, দুই ধরণের সমাজ ব্যবস্থা ছিল। একদল হলো ‘মাগরিবি বণিক’ (মুসলিম ও ইহুদি), যারা ব্যবসা করত ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে। তারা তাদের গোত্র বা পরিবারের মানুষের বাইরে কাউকে বিশ্বাস করত না। আরেকদল হলো ‘জেনোইস বণিক’ (ইতালীয়), যারা ব্যবসা করত আইনি চুক্তির ভিত্তিতে। তারা এমন মানুষের সাথেও ব্যবসা করত যাকে তারা চেনে না, কিন্তু তারা জানত যে আইনি ব্যবস্থা বা আদালত তাদের প্রতারণা থেকে রক্ষা করবে।

এই পার্থক্যটা কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে আপনি একটা ছোট বা মাঝারি ব্যবসা চালাতে পারেন, কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো বিশাল প্রতিষ্ঠান চালাতে পারেন না। বিশাল প্রতিষ্ঠান চালাতে হলে আপনাকে অচেনা মানুষের ওপর ভরসা করতে হবে, আর সেই ভরসাটা তৈরি করে দেয় ‘ইমপারসোনাল ইনস্টিটিউশন’ বা ব্যক্তিনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। গ্রেইফ দেখাচ্ছেন যে, এই ব্যক্তিনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনে পশ্চিমাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী সংস্কৃতি বা ইন্ডিভিজুয়ালিজম (Individualism) কাজ করেছে। আর এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ এসেছে তাদের ধর্মতত্ত্ব থেকে, যেখানে প্রতিটি মানুষ ঈশ্বরের কাছে আলাদাভাবে দায়ী। অন্যদিকে, প্রাচ্যের সামষ্টিক বা কালেক্টিভিস্ট (Collectivist) সংস্কৃতিতে মানুষ সবসময় গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে সেখানে এমন আইনি কাঠামো তৈরির প্রয়োজন পড়েনি যা অচেনা মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে পারে।

সমালোচকরা বলতেই পারেন যে, এগুলো তো নিছকই তাত্ত্বিক কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যখন ইউরোপীয়রা জয়েন্ট স্টক কোম্পানি বা কর্পোরেশন (Corporation) নিয়ে এল, তখন প্রাচ্যের হাজার বছরের পুরনো অংশীদারিত্ব প্রথা বা মুদারাবা (Mudaraba) টিকতে পারল না। তিমুর কুরানের গবেষণা, যা আমরা আগেও উল্লেখ করেছি, তাকে কয়লা-কলোনির মত সম্পদ-ভিত্তিক ব্যাখ্যা দিয়ে খণ্ডন করা কঠিন। কারণ, কয়লা বা কলোনি দিয়ে আপনি মূলধন পেতে পারেন, কিন্তু সেই মূলধনকে শত শত বছর ধরে টিকিয়ে রাখার জন্য যে ‘লিগ্যাল পারসনহুড’ বা আইনি সত্তা দরকার, সেটা কয়লা খনি থেকে আসে না; সেটা আসে রোমান আইন এবং চার্চের ধর্মতত্ত্বের সংমিশ্রণ থেকে। তাই অর্থনৈতিক ইতিহাসকে যদি আমরা শুধুই সম্পদের ইতিহাস মনে করি, তবে আমরা এর আত্মাকেই অস্বীকার করব।

নৈতিকতার প্রশ্ন এবং ক্ষমতার বাস্তবতা

ওয়ায়েল হাল্লাক বা অন্য সমালোচকরা যখন বলেন যে, আধুনিক রাষ্ট্র হলো একটা নৈতিকভাবে দেউলিয়া বা অনৈতিক দানব, তখন তাদের কথায় একটা গভীর সত্য লুকিয়ে থাকে। আসলেই তো, আধুনিক রাষ্ট্র বা পুঁজিবাদ মানুষের আত্মাকে শুকিয়ে ফেলেছে, পরিবেশ ধ্বংস করেছে এবং যুদ্ধের নামে কোটি কোটি মানুষ মেরেছে। নৈতিকতার মানদণ্ডে বিচার করলে প্রাক-আধুনিক বা ইসলামি শাসনব্যবস্থা অনেক বেশি মানবিক ছিল। সেখানে সুলতান চাইলেই যা খুশি তাই করতে পারতেন না, শরিয়াহর নৈতিক আইন তাকে বেঁধে রাখত। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, ইতিহাস সবসময় নৈতিকতার পুরস্কার দেয় না। ইতিহাস অনেক সময় তাকেই জয়ী করে যে বেশি দক্ষ, বেশি শক্তিশালী এবং বেশি নির্মম। আধুনিকতা বা মডার্নিটি (Modernity) হয়তো নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ নয়, কিন্তু এটি ‘ফাংশনালি’ বা কার্যকারিতার দিক থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী।

আমরা যখন ‘দ্য গ্রেট ডাইভারজেন্স’ বা মহামিলন ও মহাবিচ্ছেদের কারণ খুঁজি, তখন আমরা আসলে ‘কে ভালো আর কে খারাপ’ – সেই বিচার করছি না। আমরা বিচার করছি ‘কে জিতল আর কে হারল’। পশ্চিম জিতেছে কারণ তারা এমন এক রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরি করতে পেরেছিল যা আবেগহীনভাবে, যান্ত্রিকভাবে কাজ করতে পারে। এই রাষ্ট্রযন্ত্র বানাতে গিয়ে তারা ঈশ্বরকে সরিয়ে দিয়েছে, নৈতিকতাকে আপেক্ষিক করে ফেলেছে। এটা তাদের জন্য আধ্যাত্মিক ট্র্যাজেডি হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটাই তাদের বিশ্বজয়ের চাবিকাঠি। হাল্লাকের সমালোচনা আমাদের নৈতিকভাবে সচেতন করে ঠিকই, কিন্তু কেন অটোমানরা ভিয়েনার গেট থেকে ফিরে এল আর কেন ব্রিটিশরা দিল্লির মসনদে বসল – সেই ক্ষমতার সমীকরণের উত্তর দেয় না। সেই উত্তর পেতে হলে আমাদের সেই রিয়েলপলিটিক (Realpolitik) এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার দিকেই তাকাতে হবে, যা ধর্মতাত্ত্বিক বিবর্তনের ফসল।

তাই সমালোচকরা যখন এসেনশিয়ালিজম বা ওরিয়েন্টালিজমের দোষে দুষ্ট হবার অভিযোগ তোলেন, তখন তারা হয়তো একটি বিষয় এড়িয়ে যান। এসেনশিয়ালিজম তখনই খারাপ যখন আমরা বলি যে, “মুসলিমরা স্বভাবতই বা জন্মগতভাবেই বিজ্ঞানে অক্ষম।” কিন্তু এখানে তা বলা হচ্ছে না। বরং বলা হচ্ছে, ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাদের ধর্মতাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক পছন্দগুলো এমন এক পথে মোড় নিয়েছিল, যা আধুনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার অনুকূল ছিল না। এটা কোনো জন্মগত ত্রুটি নয়, এটা হলো ঐতিহাসিক নির্বাচনের ফলাফল। মানুষ ইতিহাস তৈরি করে, কিন্তু তারা তাদের ইচ্ছামতো ইতিহাস তৈরি করতে পারে না – তাদের অতীতের উত্তরাধিকার বা পাথ ডিপেন্ডেন্স (Path Dependence) তাদের নির্দিষ্ট পথে ঠেলে দেয়। পশ্চিমের উত্তরাধিকার তাদের এক পথে নিয়েছে, প্রাচ্যের উত্তরাধিকার তাদের অন্য পথে।

জাপানের উদাহরণ: নকল নাকি অভিযোজন?

অনেকে জাপানের উদাহরণ টেনে বলেন, “দেখুন, জাপান তো খ্রিস্টান না হয়েও দিব্যি আধুনিক হয়ে গেল। তাহলে আর ধর্মতত্ত্বের দরকার কী?” এই যুক্তিটা আপাতদৃষ্টিতে খুব শক্ত মনে হয়। কিন্তু জাপানের ইতিহাস গভীরভাবে পড়লে দেখা যায়, ব্যাপারটা উল্টো। জাপান যখন দেখল যে তারা পশ্চিমাদের সাথে পেরে উঠছে না, তখন তারা ১৮৬৮ সালে ‘মেইজি রেস্টোরেশন’ বা মেইজি বিপ্লবের মাধ্যমে এক বিশাল পরিবর্তন আনল। তারা বলল, “পশ্চিমাদের যা কিছু আছে – তাদের আইন, তাদের সংবিধান, তাদের স্কুল, তাদের মিলিটারি – সব আমরা হুবহু নকল করব।” তারা জার্মানি থেকে সংবিধান আনল, ফ্রান্স থেকে আইন আনল, ব্রিটেন থেকে নৌবাহিনী আনল। একে বলা হয় ডিফেন্সিভ মডার্নাইজেশন (Defensive Modernization) বা আত্মরক্ষামূলক আধুনিকায়ন।

জাপান আধুনিক হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তারা সেটা করেছে পশ্চিমা ‘সফটওয়্যার’ বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে নিজের দেশে ইনস্টল করে। এই সফটওয়্যারটা – অর্থাৎ এই সংবিধান, এই বাণিজ্যিক আইন – এগুলো তো আকাশ থেকে পড়েনি; এগুলো তৈরি হয়েছিল ইউরোপের সেই বিশেষ ধর্মতাত্ত্বিক ও সামাজিক কারখানায়। জাপান সেই সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পেরেছে, কিন্তু সেই সফটওয়্যার তৈরি করার জন্য যে ঐতিহাসিক ব্যাকগ্রাউন্ড দরকার ছিল, সেটা জাপানের ছিল না। জাপান বা আজকের চীন হলো আধুনিকতার সার্থক ‘ব্যবহারকারী’ (User), কিন্তু এই আধুনিকতার ‘উদ্ভাবক’ (Inventor) হলো পশ্চিম। আর পশ্চিম এটা উদ্ভাবন করতে পেরেছিল কারণ তাদের ধর্মতত্ত্ব, তাদের চার্চ-রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব এবং তাদের ঈশ্বরকে সরিয়ে দেওয়ার সাহস – সব মিলে এক উর্বর জমি তৈরি করেছিল। আপনি বাজার থেকে আইফোন কিনে ব্যবহার করতেই পারেন, তার মানে এই নয় যে আইফোন বানানোর প্রক্রিয়াটা গুরুত্বহীন। জাপান আইফোন ব্যবহার করেছে, কিন্তু আইফোনটা বানিয়েছে পশ্চিমের সেই বিশেষ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া।

সুতরাং, দিনশেষে আমাদের সেই পুরনো কথাতেই ফিরে আসতে হয়। কয়লা, কলোনি, কিংবা ভূগোল – সবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কোনোটাই এককভাবে ইতিহাসের গতিপথ ঠিক করে দেয় না। আসল খেলাটা হয় মানুষের মনের ভেতরে, তার বিশ্বাস আর প্রতিষ্ঠানের কাঠামোতে। মানুষ যখন বিশ্বাস করতে শুরু করল যে জগতটা ঈশ্বরের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই চলে, তখনই সে বিজ্ঞানের সূত্র খুঁজতে বেরোল। মানুষ যখন বিশ্বাস করল যে আইন কোনো শাসকের ব্যক্তিগত ইচ্ছা নয় বরং এক বিমূর্ত সত্তা, তখনই সে কর্পোরেশন বানাল। এই বিশ্বাসগুলো, এই আইডিয়াগুলো হলো ইতিহাসের আসল ইঞ্জিন। কয়লা সেই ইঞ্জিনের জ্বালানি হতে পারে, কিন্তু ইঞ্জিনের নকশাটা এসেছে ধর্মতত্ত্বের ড্রয়িংবোর্ড থেকেই। তাই আধুনিক বিশ্বকে বুঝতে হলে, আমাদের সেই ড্রয়িংবোর্ডের দিকে তাকাতেই হবে, তা সে যত পুরনো বা ধুলোবালিমাখা হোক না কেন।

হারানো সুর: ইসলামি চিন্তার যুক্তিবাদী ধারা ও তার ঐতিহাসিক পরাজয়

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে আমরা প্রায়ই একটা ভুল ধারণার ফাঁদে পা দিই। আমরা মনে করি, বর্তমানে আমরা যা দেখছি, অতীত বুঝি সবসময় এমনই ছিল। আজ যখন আমরা বলি যে ইসলামি ধর্মতত্ত্ব বা মেইনস্ট্রিম থিওলজি আধুনিক বিজ্ঞান কিংবা পুঁজিবাদের সাথে খাপ খাওয়াতে পারেনি, তখন আমাদের মনে হতে পারে যে ইসলামি চিন্তাজগৎ বুঝি জন্মগতভাবেই এমন রক্ষণশীল বা অনড় ছিল। কিন্তু সত্যটা হলো, ইতিহাসের মহাফেজখানায় কান পাতলে আমরা এমন কিছু ভিন্ন সুর বা ‘অল্টারনেটিভ ভয়েস’ শুনতে পাই, যা যদি মূলধারা হয়ে উঠত, তবে আজকের পৃথিবীর ইতিহাস হয়তো সম্পূর্ণ অন্যরকম হতো। ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগে এমন সব দার্শনিক, বিজ্ঞানী এবং আইনজ্ঞের জন্ম হয়েছিল, যাদের চিন্তাভাবনা ছিল অত্যন্ত প্রগতিশীল, যুক্তিবাদী এবং অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক সেক্যুলার চিন্তার খুব কাছাকাছি। তারা কার্যকারণ বা কজালিটি (Causality)-তে বিশ্বাস করতেন, তারা প্রাকৃতিক আইনে বিশ্বাস করতেন এবং তারা মনে করতেন যে রাষ্ট্র বা সমাজ পরিচালনার জন্য সবসময় ওহি বা প্রত্যাদেশের দরকার নেই, মানুষের বুদ্ধিই যথেষ্ট। কিন্তু ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর পরিহাসে এই ধারাগুলো টিকতে পারেনি। তারা হেরে গিয়েছিল, কিংবা বলা ভালো, তাদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কেন এবং কীভাবে এই সম্ভাবনাময় ধারাগুলো ‘মারজিনালাইজড’ বা প্রান্তিক হয়ে গেল, তা বোঝাটা জরুরি। কারণ, এটা কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা ছিল না, এটা ছিল বিশুদ্ধ ক্ষমতার রাজনীতি বা পলিটিক্স অফ পাওয়ার (Politics of Power)-এর খেলা। এই অংশে আমরা সেই হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনাগুলোর ব্যবচ্ছেদ করব এবং দেখব কেন ইসলামি যুক্তিবাদ তার নিজের ঘরেই পরবাসী হয়ে রইল।

মু’তাজিলা সম্প্রদায়: নৈতিক বস্তুবাদ ও প্রাকৃতিক আইনের ভ্রুণ

ইসলামি ইতিহাসের একেবারে শুরুর দিকে, অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে, এমন একদল ধর্মতাত্ত্বিকের আবির্ভাব ঘটেছিল যারা বিশ্বাস করতেন যে আল্লাহ মানুষকে ‘আকল’ বা বুদ্ধি দিয়েছেন ব্যবহার করার জন্যই। এদের বলা হয় মু’তাজিলা (Mu’tazila)। এদের দর্শন ছিল অত্যন্ত বৈপ্লবিক। আমরা আগের আলোচবাগুলোতে দেখেছি যে আশআরী মতবাদ অনুযায়ী, কোনো কিছু ভালো বা মন্দ হয় কারণ আল্লাহ সেটা বলেছেন (ডিভাইন কমান্ড থিওরি)। কিন্তু মু’তাজিলারা এর সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বললেন। তারা বললেন, ভালো এবং মন্দ হলো ‘বস্তুগত’ বা অবজেক্টিভ (Objective) সত্য। মিথ্যা বলা খারাপ – এটা আল্লাহ নিষেধ করেছেন বলেই খারাপ নয়; মিথ্যা বলা তার নিজস্ব স্বভাবের কারণেই খারাপ এবং মানুষের বুদ্ধি বা রিজন সেটা বুঝতে সক্ষম। একে বলা হয় এথিক্যাল অবজেক্টিভিজম (Ethical Objectivism)। এই দর্শনের গুরুত্ব অপরিসীম। যদি আমরা মেনে নিই যে মানুষের বুদ্ধি দিয়েই ভালো-মন্দ বা ন্যায়-অন্যায় বিচার করা সম্ভব, তবে আইন তৈরি করার জন্য সবসময় ধর্মগ্রন্থের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না। এখান থেকেই জন্ম হতে পারত ‘প্রাকৃতিক আইন’ বা ন্যাচারাল ল (Natural Law)-এর, যা পরবর্তীতে ইউরোপে সেক্যুলার আইন ব্যবস্থার ভিত্তি হয়েছিল।

মু’তাজিলারা আরও বিশ্বাস করতেন যে, মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি বা ফ্রি উইল (Free Will) আছে। মানুষ তার কাজের জন্য পুরোপুরি দায়ী। আল্লাহ আগে থেকে সব ঠিক করে রাখেননি (তাকদির)। এই বিশ্বাসটি আধুনিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ এবং গণতন্ত্রের জন্য জরুরি ছিল। কিন্তু এই উজ্জ্বল সম্ভাবনাটি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায় এক রাজনৈতিক ভুলের কারণে। আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুন (Al-Mamun) মু’তাজিলা দর্শন দ্বারা এতটাই প্রভাবিত ছিলেন যে, তিনি একে রাষ্ট্রের একমাত্র বৈধ মতবাদ হিসেবে ঘোষণা করেন এবং জোর করে সবার ওপর চাপিয়ে দিতে চান। তিনি বিরোধীদের ওপর নির্যাতন চালান, যা ইতিহাসে মিহনা (Mihna) বা ইনকুইজিশন নামে পরিচিত। এই জবরদস্তির ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে মু’তাজিলাদের প্রতি ঘৃণা তৈরি হয়। তারা মু’তাজিলাদের দেখত ‘এলিট’ বা অভিজাতদের দর্শন হিসেবে, যারা সাধারণের ঈমান নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। এর বিপরীতে দাঁড়িয়েছিলেন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (Ahmad ibn Hanbal), যিনি রক্ষণশীল বা ট্র্যাডিশনালিস্ট মতবাদের পক্ষে সাধারণ মানুষের নায়ক হয়ে ওঠেন। শেষ পর্যন্ত খলিফা মুতাওয়াক্কিল রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়ার জন্য মু’তাজিলাদের বর্জন করেন এবং রক্ষণশীলদের কাছে নতি স্বীকার করেন। সেই যে যুক্তিবাদীরা জনসমর্থন হারাল, আর কখনোই তারা মূলধারায় ফিরতে পারেনি। ক্ষমতার সাথে যুক্তিবাদকে গুলিয়ে ফেলার এই ঐতিহাসিক ভুলটিই ইসলামি বিশ্বে প্রাকৃতিক আইনের বিকাশকে রুদ্ধ করে দিয়েছিল।

ইবনে রুশদ ও দর্শনের নির্বাসন: কর্ডোবার কান্না

ইউরোপ যখন অন্ধকারের যুগে ধুঁকছে, তখন দ্বাদশ শতাব্দীতে স্পেনের কর্ডোবায় বসে এক মুসলিম দার্শনিক এমন সব কথা লিখছিলেন যা তিনশ বছর পরে ইউরোপে রেনেসাঁসের আগুন জ্বালিয়েছিল। তার নাম ইবনে রুশদ (Averroes)। তিনি ছিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা অ্যারিস্টটলীয় দার্শনিকইমাম আল-গাজালি যখন তার The Incoherence of the Philosophers বইতে কার্যকারণ সম্পর্ককে অস্বীকার করে দর্শনকে আক্রমণ করেছিলেন, তখন ইবনে রুশদ তার জবাবে লিখেছিলেন The Incoherence of the Incoherence (তাহাফুত আল-তাহাফুত)। ইবনে রুশদ যুক্তি দিলেন যে, ধর্ম এবং দর্শন কখনোই পরস্পরবিরোধী হতে পারে না, কারণ সত্য দুই প্রকার নয়। তিনি বললেন, কুরআনের ভাষা অনেক সময় রূপক বা মেটাফোরিক্যাল হয়, তাই সাধারণ মানুষ এবং দার্শনিকরা তা ভিন্নভাবে বুঝবে। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম বা ফিজিক্সের সূত্রগুলো অমোঘ। আগুন যে পোড়ায়, এটা ঈশ্বরের অভ্যাস নয়, এটা আগুনের নিজস্ব ধর্ম। ইবনে রুশদের এই দর্শন ছিল বিজ্ঞানের জন্য অক্সিজেনস্বরূপ। তিনি ধর্মতত্ত্বকে বিজ্ঞান থেকে আলাদা করার এক শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন, যাকে বলা হয় ডকট্রিন অফ ডাবল ট্রুথ (Doctrine of Double Truth)-এর পূর্বসুরি।

কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, ইবনে রুশদ তার নিজের সমাজেই ব্রাত্য হয়ে রইলেন। তৎকালীন আলমোহাদ শাসকরা রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ছিলেন। খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তাদের কট্টর রক্ষণশীল উলামাদের সমর্থন দরকার ছিল। উলামারা ফতোয়া দিলেন যে দর্শন চর্চা করা কুফরি। ফলে শাসক ইয়াকুব আল-মনসুর, যিনি একসময় ইবনে রুশদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তিনি তাকে নির্বাসনে পাঠালেন এবং তার বইগুলো কর্ডোবার চত্বরে পুড়িয়ে ফেলার আদেশ দিলেন। মুসলিম বিশ্ব যখন ইবনে রুশদকে প্রত্যাখ্যান করল, ঠিক তখনই ল্যাটিন ইউরোপ তাকে লুফে নিল। প্যারিস এবং পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বইগুলো পাঠ্য হলো। ইউরোপীয়রা তাকে ডাকত ‘দ্য কমেন্টেটর’ নামে। সেন্ট টমাস একুইনাস, যার হাত ধরে ইউরোপে যুক্তিবাদী ধর্মতত্ত্বের জন্ম, তিনি ইবনে রুশদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। ঐতিহাসিক আর্নেস্ট রেনাঁ (Ernest Renan) তার Averroes and Averroism বইতে আক্ষেপ করে বলেছেন, ইবনে রুশদ ছিলেন সেই দার্শনিক যিনি মুসলিম বিশ্বে ভুল সময়ে জন্মেছিলেন; তার আলোয় আলোকিত হলো ইউরোপ, আর তার নিজের ঘর রইল অন্ধকারে। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামি সভ্যতায় যুক্তিবাদের রসদ ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক সমীকরণ সেই রসদকে কাজে লাগাতে দেয়নি।

নাজমুদ্দিন আল-তুফি ও জনস্বার্থের সার্বভৌমত্ব

আধুনিক গণতন্ত্রের মূল কথা হলো – জনগণের স্বার্থই আইনের উৎস। আইন কোনো আকাশ থেকে পড়া অপরিবর্তনীয় শিলালিপি নয়, বরং মানুষের প্রয়োজনে তা পরিবর্তনযোগ্য। চতুর্দশ শতাব্দীর হাম্বলি মাজহাবের এক অখ্যাত কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী আইনজ্ঞ, নাজমুদ্দিন আল-তুফি (Najm al-Din al-Tufi), এমন একটি তত্ত্ব দিয়েছিলেন যা আধুনিক সেক্যুলার আইনের ভিত্তি হতে পারত। তার তত্ত্বের নাম মাসলাহা (Maslaha) বা জনস্বার্থ। তুফি বললেন, সামাজিক লেনদেন বা ‘মুয়ামালাত’-এর ক্ষেত্রে যদি কোনো নির্দিষ্ট হাদিস বা টেক্সট জনস্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তবে জনস্বার্থ বা মাসলাহা টেক্সটের ওপর প্রাধান্য পাবে। তিনি যুক্তি দিলেন, শরিয়াহর মূল উদ্দেশ্যই হলো মানুষের কল্যাণ। তাই কোনো আইন যদি মানুষের ক্ষতি করে, তবে তা শরিয়াহর উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করে। তুফির এই বক্তব্য ছিল অত্যন্ত র‍্যাডিকাল বা বৈপ্লবিক। এর মানে হলো, রাষ্ট্র বা সমাজ মানুষের প্রয়োজনে নতুন আইন তৈরি করতে পারে এবং প্রয়োজনে ধর্মগ্রন্থের আক্ষরিক অর্থ থেকে সরে আসতে পারে।

যদি তুফির এই তত্ত্বটি ইসলামি আইনের মূলনীতি হিসেবে গৃহীত হতো, তবে মুসলিম বিশ্বে আইনসভা বা পার্লামেন্ট গড়ে ওঠা সময়ের ব্যাপার ছিল মাত্র। কারণ, পার্লামেন্টের কাজই হলো ‘মাসলাহা’ বা জনস্বার্থ অনুযায়ী আইন বানানো। কিন্তু তুফির এই মতবাদ মূলধারার উলামাদের কাছে প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হয়। তারা ভয় পেলেন যে, যদি ‘মাসলাহা’কে টেক্সটের ওপর স্থান দেওয়া হয়, তবে আইনের ওপর তাদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বা মনোপলি নষ্ট হয়ে যাবে। শাসকরা তখন নিজেদের ইচ্ছামতো আইন বানাবে এবং বলবে এটাই জনস্বার্থ। উলামারা চাইলেন আইনের স্থিতিশীলতা বা লিগ্যাল স্ট্যাবিলিটি (Legal Stability) বজায় রাখতে, তাই তারা টেক্সট বা নস-এর আক্ষরিক অনুসারী হয়ে রইলেন। তুফির ‘মাসলাহা’ তত্ত্বটি শরিয়াহর একটি গৌণ নীতি হিসেবেই থেকে গেল, তা কখনোই সাংবিধানিক ভিত্তি হতে পারল না। আধুনিক যুগে এসে সংস্কারকরা আবার তুফির দিকে তাকাচ্ছেন, কিন্তু মাঝখানের সাতশো বছরের প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা পূরণ করা সহজ নয়। এই ঘটনা দেখায় যে, ইসলামি আইনের ভেতরেই নমনীয়তার বীজ ছিল, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের দ্বন্দ্বে তা অঙ্কুরিত হতে পারেনি।

ইবনে খালদুন: সমাজবিজ্ঞানের একাকী পথিক

চতুর্দশ শতাব্দীতে তিউনিসিয়ায় বসে ইবনে খালদুন (Ibn Khaldun) ইতিহাস ও সমাজকে দেখার যে লেন্স তৈরি করেছিলেন, তা ছিল সময়ের চেয়ে অন্তত পাঁচশো বছর এগিয়ে। তার অমর সৃষ্টি মুকাদ্দিমা (Muqaddimah)-তে তিনি ইতিহাসের ঘটনাগুলোকে ঈশ্বরের অলৌকিক ইচ্ছা দিয়ে ব্যাখ্যা করেননি; তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন অর্থনীতি, ভূগোল এবং সামাজিক সংহতি বা আসাবিয়্যাহ (Asabiyyah) দিয়ে। খালদুন বললেন, রাষ্ট্র হলো একটি জীবন্ত প্রাণীর মতো – তার জন্ম আছে, যৌবন আছে এবং মৃত্যু আছে। তিনি অর্থনীতির সূত্র দিয়ে দেখালেন যে, কর বা ট্যাক্স কম থাকলে কীভাবে উৎপাদন বাড়ে এবং রাষ্ট্র ধনী হয় (যা আধুনিক লাফার কার্ভ (Laffer Curve)-এর জনক)। তিনি কোনো ধর্মতাত্ত্বিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নির্মোহ সমাজবিজ্ঞানী বা রিয়ালিস্ট। তিনি রাষ্ট্রকে দেখেছিলেন একটি মানবীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে, ঐশ্বরিক ছায়া হিসেবে নয়।

খালদুনের এই বস্তুবাদী বা সেক্যুলার বিশ্লেষণ পদ্ধতি যদি মুসলিম বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থায় ঢুকে পড়ত, তবে সেখানে হয়তো অনেক আগেই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং অর্থনীতির জন্ম হতো। কিন্তু অটোমান বা মামলুক শাসকরা খালদুনকে ব্যবহার করলেন খুব সীমিত অর্থে। তারা তার রাষ্ট্রের পতন সংক্রান্ত তত্ত্বটি নিলেন নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে, কিন্তু তার সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ পদ্ধতিকে তারা গ্রহণ করলেন না। মাদ্রাসার সিলেবাসে খালদুনের স্থান হলো না। সেখানে লজিক বা মানতিক পড়ানো হতো, কিন্তু সমাজ কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে খালদুনীয় ধাঁচের কোনো গবেষণা হতো না। ঐতিহাসিক মুহসিন মাহদি (Muhsin Mahdi) তার Ibn Khaldun’s Philosophy of History গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, খালদুন ছিলেন ইসলামি দর্শনের এক নিঃসঙ্গ ধ্রুবতারা। তার চিন্তার কোনো উত্তরাধিকারী বা ‘স্কুল অফ থট’ তৈরি হয়নি, কারণ তৎকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ ছিল রক্ষণশীল এবং ঐতিহ্যমুখী। সমাজকে ঈশ্বরের লেন্স ছাড়া মানুষের লেন্স দিয়ে দেখার এই সাহসটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পাওয়ায় মুসলিম বিশ্ব আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

বাণিজ্যিক পুঁজিবাদের অপমৃত্যু: আইনের বেড়াজাল

আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, ইসলাম একটি প্রবলভাবে বাণিজ্যবান্ধব ধর্ম। নবী মুহাম্মদ নিজে একজন ব্যবসায়ী ছিলেন এবং মক্কা ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্র। ইসলামি সভ্যতার প্রথম কয়েক শতাব্দীতে এমন সব বাণিজ্যিক ও আইনি যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছিল যা আজকের আধুনিক ব্যাংকিংয়ের পূর্বসুরি। যেমন – সুফতাজা (Suftaja) বা বিল অফ এক্সচেঞ্জ, চেক (যা আরবি ‘সাক্ক’ থেকে এসেছে), এবং মুদারাবা (Mudaraba) বা অংশীদারিত্ব কারবার। নবম-দশম শতাব্দীতে মুসলিম বণিকরা চীন থেকে স্পেন পর্যন্ত এক বিশাল গ্লোবাল ইকোনমি বা বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করত। ঐতিহাসিক এস. ডি. গোইতেন (S. D. Goitein) কায়রোর জেনিজা নথিপত্র ঘেঁটে দেখিয়েছেন যে, মধ্যযুগে মুসলিম ও ইহুদি বণিকদের মধ্যে এক অত্যন্ত উন্নত ও মুক্ত বাজার ব্যবস্থা চালু ছিল। তাহলে প্রশ্ন হলো, এই ‘প্রোটো-ক্যাপিটালিজম’ বা আদি-পুঁজিবাদ কেন শিল্প বিপ্লবে রূপ নিল না?

এর কারণ হিসেবে অনেকে বলেন, সমস্যাটা ধর্মতত্ত্বে ছিল না, সমস্যাটা ছিল রাজনীতি এবং আইনের প্রায়োগিক ক্ষেত্রে। আব্বাসীয় বা পরবর্তী অটোমান শাসকরা বণিক শ্রেণিকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। তারা ভয় পেতেন যে, বণিকরা বেশি ধনী হলে তারা ক্ষমতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই রাষ্ট্র কখনোই বণিকদের স্বার্থরক্ষার জন্য স্বাধীন আইনি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে দেয়নি। উল্টো, যখনই কোনো বণিক বেশি ধনী হতো, রাষ্ট্র তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করত। এছাড়া, আমরা আগেই আলোচনা করেছি যে, ইসলামি আইনে ‘কর্পোরেশন’ বা কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তার অভাব ছিল। কিন্তু আধুনিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, আইনজ্ঞরা চাইলে ‘ওয়াকফ’ বা অন্য কোনো উপায়ে এই সমস্যার সমাধান করতে পারতেন। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই তা হয়নি। অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল-আরিয়ান (Abdullah Al-Arian) যুক্তি দেন যে, মুসলিম বিশ্বে পুঁজিবাদের বিকাশ না হওয়ার কারণ হলো ‘রাষ্ট্রের অতিরিক্ত ক্ষমতা’। রাষ্ট্র বা স্টেট আইনকে ব্যবহার করেছে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে, বাণিজ্যের সহায়ক হিসেবে নয়। ফলে বনিকরা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের বদলে দ্রুত মুনাফা এবং টাকা লুকিয়ে ফেলার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। পুঁজিবাদের এই সম্ভাবনাটি ধর্মের কারণে নয়, বরং স্বৈরাচারী রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণেই নষ্ট হয়েছিল।

সুফিবাদের ভিন্ন সুর: প্রেমের সার্বভৌমত্ব

মেইনস্ট্রিম বা অর্থোডক্স ইসলামি ধর্মতত্ত্ব যখন আইন এবং ভয়ের ওপর জোর দিচ্ছিল, তখন সুফিবাদ বা সুফিজম (Sufism) নিয়ে এসেছিল প্রেমের বার্তা। সুফি দর্শনে, বিশেষ করে ইবনে আরাবি বা রুমির চিন্তায়, ঈশ্বর এবং মানুষের সম্পর্কটি ছিল অনেক বেশি ব্যক্তিগত এবং নমনীয়। সুফিরা বলতেন, শরিয়াহ হলো বাইরের খোলস, আসল হলো ‘হকিকত’ বা সত্য। তাদের দর্শনে ‘ইউনিভার্সাল লাভ’ বা সর্বজনীন প্রেমের যে ধারণা ছিল, তা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে এক করার ক্ষমতা রাখত। এই আধ্যাত্মিক মানবতাবাদ বা স্পিরিচুয়াল হিউম্যানিজম (Spiritual Humanism) ইউরোপের রেনেসাঁস মানবতাবাদের মতোই শক্তিশালী হতে পারত। মুঘল সম্রাট আকবর বা দারা শিকোহ এই সুফি দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই এক ধরণের বহুত্ববাদী বা প্লুরালিস্টিক সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন।

দারা শিকোহ তার মাজমা-উল-বাহরাইন (দুই সাগরের মিলন) বইতে হিন্দু এবং ইসলামি দর্শনের মিলগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলেন। এটি ছিল এক উদারনৈতিক ধর্মতত্ত্বে পৌঁছানোর সাহসী প্রচেষ্টা। কিন্তু রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে রক্ষণশীল আওরঙ্গজেবের কাছে দারা শিকোহ পরাজিত ও নিহত হন। এই পরাজয় কেবল একজন রাজপুত্রের পরাজয় ছিল না, এটি ছিল একটি উদারনৈতিক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির পরাজয়। এরপর থেকে রাষ্ট্রযন্ত্র আরও বেশি শরিয়াহ-কেন্দ্রিক এবং রক্ষণশীল হয়ে পড়ে। যদি সুফিবাদের এই উদার ধারাটি রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হতো, তবে হয়তো মুসলিম বিশ্বে এমন এক ধরণের সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা আসত যা ধর্মকে বাদ দিয়ে নয়, বরং সব ধর্মকে আলিঙ্গন করে গড়ে উঠত। কিন্তু উলামা এবং রাষ্ট্রের আঁতাত বা নেক্সাস (Nexus) সেই সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনাশ করে দেয়। তারা সুফিবাদকে কেবল মাজার কেন্দ্রিক উপাসনায় সীমাবদ্ধ করে ফেলে, এর দার্শনিক বিপ্লবকে ভয় পায়।

উপসংহার: বেছে নেওয়া ইতিহাস

সুতরাং, আমরা দেখতে পাই যে, ইসলামি ধর্মতত্ত্বের ভেতরে আধুনিকায়ন, গণতন্ত্র বা পুঁজিবাদের কোনো ‘স্থায়ী শত্রু’ বসে ছিল না। বরং সেখানে এমন অনেক উপাদান ছিল – মু’তাজিলাদের যুক্তিবাদ, ইবনে রুশদের বিজ্ঞানমনস্কতা, তুফির জনস্বার্থবাদ, খালদুনের সমাজতত্ত্ব এবং সুফিদের মানবতাবাদ – যা একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল সমাজ গড়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। এগুলো মারজিনালাইজড বা হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক। মুসলিম বিশ্বের শাসকরা তাদের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার জন্য এমন একটি ধর্মতাত্ত্বিক ভাষ্যকে বেছে নিয়েছিলেন যা প্রশ্ন করার চেয়ে আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা আশআরী মতবাদ এবং রক্ষণশীল ফিকাহকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন কারণ এটি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করত। আর যুক্তিবাদী বা দার্শনিক ধারাগুলোকে তারা দমন করেছিলেন কারণ সেগুলো ছিল পরিবর্তনকামী এবং বিপজ্জনক।

পশ্চিমে যেমন চার্চ এবং রাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের ফাঁক দিয়ে স্বাধীনতা বেরিয়ে এসেছিল, প্রাচ্যে রাষ্ট্র এবং ধর্মগুরুর একজোট হওয়ার ফলে সেই ফাঁকটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই ‘ঐতিহাসিক নির্বাচন’ বা হিস্টোরিকাল সিলেকশন (Historical Selection) প্রক্রিয়াই আজকের এই পার্থক্যের জন্ম দিয়েছে। তাই ইসলামি থিওলজি আধুনিকতার বিরোধী – এই কথাটি অর্ধসত্য। পূর্ণ সত্য হলো, ইসলামের ভেতরেই আধুনিকতার একটি ভ্রুণ ছিল, কিন্তু রাজনীতির অনাদরে এবং ক্ষমতার জাঁতাকলে তা কখনোই মহীরুহ হয়ে উঠতে পারেনি। এই ‘হারানো বিকল্পগুলো’র ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভবিষ্যৎ এখনো লেখা হয়নি; অতীতের সেই নিভে যাওয়া প্রদীপগুলো থেকে আলো নিয়ে হয়তো আবারও নতুন কোনো পথ তৈরি করা সম্ভব।

বিস্মৃত প্রতিরোধ: খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের আধুনিকতাবিরোধী ধারা ও তাদের ঐতিহাসিক বিলুপ্তি

ইতিহাসের এক অদ্ভুত জাদুকরী ক্ষমতা আছে; সে বিজয়ীর গাথা গাইতে গিয়ে পরাজিতদের দীর্ঘশ্বাসকে বেমালুম গায়েব করে দেয়। আমরা যখন বলি যে খ্রিস্টধর্মের প্রটেস্ট্যান্ট নৈতিকতা পুঁজিবাদের জন্ম দিয়েছে, কিংবা চার্চের আইন থেকে আধুনিক রাষ্ট্র এসেছে – তখন মনে হয় পুরো ইউরোপ বুঝি এক পায়ে দাঁড়িয়ে ছিল আধুনিক হওয়ার জন্য। যেন যিশুর প্রতিটি বাণী এবং গির্জার প্রতিটি ঘণ্টা কেবল গণতন্ত্র আর বিজ্ঞানের জয়গান গাওয়ার জন্যই অপেক্ষা করছিল। কিন্তু সত্যটা এত সরলরৈখিক নয়, বরং অনেক বেশি সংঘাতময় এবং রক্তাক্ত। খ্রিস্টীয় থিওলজি বা ধর্মতত্ত্বের ভেতরেই এমন প্রবল কিছু ধারা ছিল, যা আধুনিকতাকে কেবল সন্দেহের চোখে দেখেনি, বরং একে শয়তানের কারসাজি বলে মনে করত। তারা গণতন্ত্রকে মনে করত ঈশ্বরের সাজানো বাগানে বিশৃঙ্খলা, পুঁজিবাদকে মনে করত লোভের উৎসব, আর বিজ্ঞানকে মনে করত মানুষের অহংকারের চূড়ান্ত প্রকাশ। এই ধারাগুলো কিন্তু কোনো প্রান্তিক বা ‘ফ্রিঞ্জ’ গ্রুপ ছিল না; একসময় এগুলোই ছিল মূলধারা বা মেইনস্ট্রিম (Mainstream)। পোপ থেকে শুরু করে বড় বড় ধর্মতাত্ত্বিকরা বিশ্বাস করতেন যে রাজা ঈশ্বরের প্রতিনিধি, জনগণ নয়। তারা বিশ্বাস করতেন সুদ খাওয়া মহাপাপ, তা ব্যাংকের নামেই হোক আর মহাজনের নামেই হোক। তবুও কেন এই শক্তিশালী ধারাগুলো হেরে গেল? কেন আধুনিকতার রেসে তারা টিকতে পারল না? এদের ইতিহাস না জানলে পশ্চিমের এই রূপান্তরের গল্পটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই অধ্যায়ে আমরা সেই ‘হারানো খ্রিস্টধর্ম’ বা লস্ট ক্রিস্টিয়ানিটি (Lost Christianity)-র ধ্বংসাবশেষ খুঁড়ে দেখব।

রাজতন্ত্রের পবিত্রতা ও গণতন্ত্রের অভিশাপ

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বিশ্বাস করা কঠিন যে, একসময় গণতন্ত্রকে খ্রিস্টানরা ‘পাপ’ বা সিন মনে করত। সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের প্রভাবশালী ধর্মতত্ত্ব ছিল ডিভাইন রাইট অফ কিংস (Divine Right of Kings) বা রাজাদের ঐশ্বরিক অধিকার। এই মতবাদের মূল কথা হলো, রাজারা তাদের ক্ষমতা জনগণের কাছ থেকে পান না, তারা ক্ষমতা পান সরাসরি ঈশ্বরের কাছ থেকে। ঈশ্বর যেমন স্বর্গের একচ্ছত্র অধিপতি, রাজাও তেমনি রাজ্যের একচ্ছত্র মালিক। এই দর্শনের সবচেয়ে বড় প্রবক্তা ছিলেন স্যার রবার্ট ফিল্মার (Robert Filmer)। তার বিখ্যাত বই প্যাট্রিয়ার্কা (Patriarcha)-তে তিনি বাইবেলের অ্যাডামের উদাহরণ টেনে এক অদ্ভুত যুক্তি দেন। ফিল্মার বলেন, ঈশ্বর প্রথম মানুষ আদমকে সৃষ্টি করে তাকেই পৃথিবীর শাসনভার দিয়েছিলেন। আদম ছিলেন প্রথম রাজা এবং প্রথম পিতা। পরবর্তী সব রাজা আদমের সেই পিতৃসুলভ ক্ষমতার উত্তরাধিকারী। তাই প্রজার কাজ হলো রাজাকে প্রশ্নহীনভাবে মেনে নেওয়া, ঠিক যেমন সন্তান পিতাকে মানে। ফিল্মারের কাছে গণতন্ত্র বা জনগণের শাসন ছিল এক ধরণের ‘অরাজকতা’ বা অ্যানার্কি (Anarchy), যা ঈশ্বরের সাজানো হাইয়ারার্কি বা পদমর্যাদাক্রমকে ভেঙে ফেলে।

একই সময়ে ফ্রান্সে বিশপ জ্যাক-বেনিন বোসুয়ে (Jacques-Bénigne Bossuet) বাইবেল থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন যে, রাজতন্ত্রই হলো একমাত্র প্রাকৃতিক ও ঐশ্বরিক শাসনব্যবস্থা। বোসুয়ে বলতেন, “রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা আর ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা একই কথা।” এই থিওলজি আধুনিক গণতন্ত্র বা সামাজিক চুক্তি মতবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। তাহলে এই শক্তিশালী মতবাদটি হারিয়ে গেল কেন? কারণটা ছিল পিউরিটান বিপ্লব এবং উদীয়মান বণিক শ্রেণির স্বার্থ। ইংল্যান্ডে যখন গৃহযুদ্ধ বা সিভিল ওয়ার (Civil War) শুরু হলো, তখন রাজা প্রথম চার্লস এই ডিভাইন রাইটের দোহাই দিয়ে পার্লামেন্টকে পাত্তা দিতে চাইলেন না। কিন্তু বণিকরা এবং পার্লামেন্টারিয়ানরা চাইলেন ক্ষমতার ভাগ। শেষ পর্যন্ত রাজা চার্লসের শিরশ্ছেদ করা হলো। এই ঘটনাটি ছিল ডিভাইন রাইট থিওলজির কফিনে শেষ পেরেক। জন লক (John Locke) তার টু ট্রিটিজেস অফ গভর্নমেন্ট (Two Treatises of Government)-এ ফিল্মারের যুক্তিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন। লক দেখালেন, আদমের সাথে স্টুয়ার্ট রাজাদের রক্তের সম্পর্ক প্রমাণ করা অসম্ভব। লক জিতলেন, কারণ তার তত্ত্ব বণিকদের সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করত, যা ফিল্মারের তত্ত্বে সুরক্ষিত ছিল না। অর্থাৎ, একটি ধর্মতত্ত্ব (ডিভাইন রাইট) আরেকটি ধর্মতত্ত্বের (প্রটেস্ট্যান্ট ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ) কাছে হেরে গেল, কারণ দ্বিতীয়টি অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে বেশি পারদর্শী ছিল।

পোপের সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা: আধুনিকতার বিরুদ্ধে ভ্যাটিকান

ঊনবিংশ শতাব্দীতে যখন ইউরোপ জুড়ে রেললাইন বসছে, কারখানা হচ্ছে এবং গণতন্ত্রের হাওয়া বইছে, তখন রোমের ভ্যাটিকান সিটি থেকে পোপ নবম পায়াস বা পোপ পায়াস নাইন (Pope Pius IX) আধুনিকতার বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। ১৮৬৪ সালে তিনি জারি করলেন এক ঐতিহাসিক দলিল, যার নাম সিলেবাস অফ এররস (Syllabus of Errors)। এই দলিলে তিনি আশিটি ভ্রান্ত ধারণা বা ‘এরর’ তালিকাভুক্ত করলেন। এর মধ্যে ৮০ নম্বর পয়েন্টটি ছিল সবচেয়ে চমকপ্রদ। সেখানে পোপ বললেন, “রোমান পন্টিফ (পোপ) প্রগতি, উদারতাবাদ এবং আধুনিক সভ্যতার সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবেন বা আপোষ করবেন – এটা মনে করা একটি মারাত্মক ভুল।” ভাবা যায়? খোদ চার্চের প্রধান ঘোষণা দিচ্ছেন যে তিনি ‘প্রগতি’ বা প্রোগ্রেস (Progress)-এর বিরোধী! এই মতবাদকে বলা হয় আল্ট্রামনটানিজম (Ultramontanism), যা পোপের ক্ষমতাকে যেকোনো রাষ্ট্র বা সংবিধানের ঊর্ধ্বে স্থান দিত।

এই ধারাটি বিশ্বাস করত যে, রাষ্ট্র এবং চার্চকে আলাদা করা বা সেপারেশন অফ চার্চ অ্যান্ড স্টেট (Separation of Church and State) একটি শয়তানি চক্রান্ত। তারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সেক্যুলার শিক্ষার ঘোর বিরোধী ছিল। তাদের যুক্তি ছিল, সত্য একটাই (ক্যাথলিক সত্য), আর মিথ্যা প্রচার করার অধিকার কারো থাকতে পারে না। অর্থাৎ, এরর হ্যাজ নো রাইটস (Error has no rights)। এই কট্টর অবস্থানটি আধুনিক নেশন-স্টেট বা জাতিরাষ্ট্রের জন্য ছিল এক বিশাল হুমকি। জার্মানিতে চ্যান্সেলর বিসমার্ক এই ক্যাথলিক প্রভাব কমানোর জন্য কুলটুরকাম্পফ (Kulturkampf) বা সংস্কৃতির সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত এই আল্ট্রামনটানিস্ট ধারাটি কেন টিকল না? কারণ, ১৮৭০ সালে ইতালীয় জাতীয়তাবাদীরা রোম দখল করে নেয় এবং পোপের জাগতিক ক্ষমতা কেড়ে নেয়। পোপ ভ্যাটিকানের প্রাসাদে ‘বন্দী’ হয়ে পড়েন। বাস্তব ক্ষমতা হারিয়ে চার্চ বাধ্য হয় কৌশলী হতে। প্রায় একশো বছর পর, ১৯৬০-এর দশকে দ্বিতীয় ভ্যাটিকান কাউন্সিল (Second Vatican Council)-এর মাধ্যমে চার্চ শেষমেশ গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের আধুনিক ধারণাগুলোকে মেনে নেয়। এই মেনে নেওয়াটা ছিল এক ধরণের ‘সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি’ বা টিকে থাকার কৌশল। আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রের বিশাল শক্তির সামনে মধ্যযুগীয় থিওলজি নতজানু হতে বাধ্য হয়েছিল।

র‍্যাডিকাল আনাপ্টিজম: প্রটেস্ট্যান্টবাদের সাম্যবাদী স্বপ্ন

আমরা সাধারণত ম্যাক্স ওয়েবারের কথা শুনে মনে করি, প্রটেস্ট্যান্টরা বুঝি সবাই খুব পরিশ্রমী, মিতব্যয়ী এবং পুঁজিবাদী ছিল। কিন্তু প্রটেস্ট্যান্ট রিফর্মেশনের ভেতরেই এমন একদল বিপ্লবী বা র‍্যাডিকাল (Radical) ছিল, যারা ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা প্রাইভেট প্রপার্টিকে পাপ মনে করত। এদের বলা হয় অ্যানাব্যাপ্টিস্ট (Anabaptist)। ষোড়শ শতাব্দীতে জার্মানিতে টমাস মুনৎজার (Thomas Müntzer)-এর মতো নেতারা ডাক দিলেন এক নতুন ঈশ্বরের রাজ্যের, যেখানে কোনো রাজা থাকবে না, কোনো ধনী-গরিব থাকবে না, সবাই হবে সমান। তারা বাইবেলের ‘প্রেরিতদের কার্য’ বা অ্যাক্টস অফ দি অ্যাপস্টলস (Acts of the Apostles) অধ্যায়টি আক্ষরিক অর্থে পালন করতে চাইল, যেখানে প্রাথমিক খ্রিস্টানরা তাদের সব সম্পদ এক জায়গায় জমা করত এবং যার যা প্রয়োজন তা নিয়ে নিত। একে বলা যায় এক ধরণের ধর্মীয় সাম্যবাদ বা রিলিজিয়াস কমিউনিজম (Religious Communism)

এই ধারার চূড়ান্ত এবং রক্তাক্ত রূপ দেখা যায় ১৫৩৪ সালে জার্মানির মুনস্টার শহরে। একদল কট্টর অ্যানাব্যাপ্টিস্ট শহরটি দখল করে নেয় এবং সেখানে ‘নতুন জেরুজালেম’ ঘোষণা করে। তারা টাকা-পয়সা নিষিদ্ধ করে, ব্যক্তিগত মালিকানা তুলে দেয় এবং বহুবিবাহ চালু করে। তারা বিশ্বাস করত, কেয়ামত বা অ্যাপোক্যালিপ্স (Apocalypse) আসন্ন, তাই এখনই পৃথিবীতে ঈশ্বরের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই ঘটনাকে বলা হয় মুনস্টার রেবেলিয়ন (Münster Rebellion)। এই আন্দোলন যদি সফল হতো, তবে ইউরোপে পুঁজিবাদ কখনোই দানা বাঁধতে পারত না। কিন্তু এই বিদ্রোহকে অত্যন্ত নির্মমভাবে দমন করা হয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো, এই দমনে ক্যাথলিক এবং লুথারান – দুই পক্ষই একজোট হয়েছিল। মার্টিন লুথার, যিনি নিজে একজন সংস্কারক ছিলেন, তিনি এই কৃষকদের বিরুদ্ধে এগেইনস্ট দ্য মার্ডারাস, থিভিং হোর্ডস অফ পিজেন্টস (Against the Murderous, Thieving Hordes of Peasants) নামে এক ভয়ংকর প্যামফলেট লিখলেন। লুথার বললেন, এদেরকে কুকুরের মতো হত্যা করা উচিত। কেন? কারণ লুথারের সংস্কার ছিল রাজাদের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। তিনি চেয়েছিলেন ধর্ম সংস্কার করতে, সমাজ বা অর্থনীতি উল্টে দিতে নয়। ফলে প্রটেস্ট্যান্টবাদের এই সাম্যবাদী ধারাটি বা মিলেনারিয়ানিজম (Millenarianism) ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হলো। জয়ী হলো লুথার আর ক্যালভিনের সেই ধারাটি, যা বণিক এবং রাজাদের স্বার্থের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছিল।

মিস্টিসিজম ও কুয়াইটিজম: কর্মবিমুখতার আধ্যাত্মিকতা

পুঁজিবাদের জন্য সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক বাধা ছিল খ্রিস্টীয় মরমীবাদ বা মিস্টিসিজম (Mysticism)। মধ্যযুগের বিখ্যাত মরমী সাধক, যেমন মেইস্টার একহার্ট (Meister Eckhart) বা জন অফ দ্য ক্রস (John of the Cross), শেখাতেন যে ঈশ্বরের সাথে মিলনের একমাত্র উপায় হলো নিজেকে শূন্য করে দেওয়া। তারা বলতেন, বাইরের জগত নিয়ে ব্যস্ত থেকো না, নিজের ভেতরে তাকাও। একে বলা হয় ভায়া নেগেটিভা (Via Negativa) বা নেতিবাচক পথ। সপ্তদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সে এই দর্শনের একটি উগ্র রূপ দেখা দেয়, যার নাম কুয়াইটিজম (Quietism)মাদাম গুইয়ন এবং আর্চবিশপ ফেনেলোঁ ছিলেন এর প্রধান প্রচারক। কুয়াইটিজম শেখাত যে, মানুষের নিজস্ব কোনো ইচ্ছাশক্তি বা উইল থাকা উচিত নয়; তাকে ঈশ্বরের ইচ্ছার কাছে এতটাই নিষ্ক্রিয় বা প্যাসিভ হতে হবে যে নিজের ভালো-মন্দ বা মুক্তির চিন্তাও সে করবে না।

এখন ভাবুন, যদি সমাজের সবাই এই কুয়াইটিজম মেনে চলে, তবে কি কেউ ব্যাংক চালাবে? কেউ কি জাহাজ নিয়ে বাণিজ্যে যাবে? কেউ কি শিল্প বিপ্লব ঘটাবে? অবশ্যই না। কারণ পুঁজিবাদের মূলমন্ত্র হলো অদম্য আকাঙ্ক্ষা, ঝুঁকি নেওয়া এবং নিরন্তর কাজ করা। কুয়াইটিজমের এই ‘নিষ্ক্রিয়তা’ বা প্যাসিভিটি (Passivity) ছিল আধুনিক কর্মচঞ্চল সমাজের সম্পূর্ণ বিপরীত। চার্চ এবং রাষ্ট্র – উভয়েই এই মতবাদকে বিপদ হিসেবে দেখেছিল। রাজা চতুর্দশ লুই ভয় পেলেন যে, এই মতবাদ মানুষকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব থেকে বিমুখ করে ফেলবে। শেষ পর্যন্ত পোপ এই মতবাদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। যেই খ্রিস্টধর্ম একসময় মরুভূমির সন্ন্যাসীদের প্রশংসা করত, সেই খ্রিস্টধর্মই এখন কর্মবিমুখতাকে পাপ হিসেবে দেখতে শুরু করল। ম্যাক্স ওয়েবারের ভাষায়, ধর্ম এখন ‘ইনার-ওয়ার্ল্ডলি’ বা জগতমুখী হয়ে গেল। যারা জগতবিমুখ বা আদার-ওয়ার্ল্ডলি (Other-worldly) ছিল, তারা মারজিনালাইজড হয়ে গেল। এই আধ্যাত্মিক ধারাটি হেরে গেল কারণ এটি আধুনিক রাষ্ট্র এবং অর্থনীতির জন্য ‘উৎপাদনশীল’ বা প্রোডাক্টিভ ছিল না।

খ্রিস্টীয় সমাজতন্ত্র ও ডিস্ট্রিবিউটিজম: যন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, যখন শিল্প বিপ্লব তার চূড়ান্ত পর্যায়ে এবং শ্রমিকরা কারখানায় পশুর মতো খাটছে, তখন খ্রিস্টধর্মের ভেতর থেকে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে এক নতুন প্রতিবাদী স্বর জেগে উঠল। পোপ ত্রয়োদশ লিও ১৮৯১ সালে জারি করলেন এক এনসাইক্লিক্যাল বা পোপীয় চিঠি, যার নাম রেরাম নোভেরাম (Rerum Novarum)। এতে তিনি অবাধ পুঁজিবাদ বা লেসে-ফেয়ার ক্যাপিটালিজম (Laissez-faire Capitalism) এবং সমাজতন্ত্র বা সোশ্যালিজম – উভয়েরই কঠোর সমালোচনা করলেন। তিনি বললেন, শ্রমিক কোনো পণ্য নয় যে তাকে বাজারের দরে কেনাবেচা করা যাবে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি পাওয়া তার মানবাধিকার। এই চিন্তাধারা থেকে পরবর্তীতে জন্ম নিল খ্রিস্টীয় সমাজতন্ত্র (Christian Socialism) এবং ডিস্ট্রিবিউটিজম (Distributism)

জি.কে. চেস্টারটন (G.K. Chesterton) এবং হিলেয়ার বেলক (Hilaire Belloc) ছিলেন ডিস্ট্রিবিউটিজমের প্রধান তাত্ত্বিক। তারা বললেন, সমস্যা যন্ত্রে নয়, সমস্যা মালিকানায়। তারা চাইলেন এমন এক সমাজ যেখানে সবার নিজস্ব এক টুকরো জমি বা ছোট দোকান থাকবে। তারা ওয়াল-মার্ট বা আমাজনের মতো বিশাল চেইন শপের বদলে ছোট পারিবারিক ব্যবসার স্বপ্ন দেখতেন। তাদের স্লোগান ছিল, “তিন একর জমি এবং একটি গরু” (Three acres and a cow)। এটি ছিল পুঁজিবাদের অমানবিকতার বিরুদ্ধে এক রোমান্টিক এবং নৈতিক বিদ্রোহ। কিন্তু এই ধারাটিও শেষ পর্যন্ত মূলধারার অর্থনীতি হতে পারেনি। কেন? কারণ, আধুনিক শিল্পায়নের স্কেল বা ইকোনমিস অফ স্কেল (Economies of Scale)-এর সামনে ছোট ছোট কুটির শিল্প বা পারিবারিক ব্যবসা টিকতে পারেনি। ফোর্ড বা জেনারেল মোটরস যে সস্তায় গাড়ি দিতে পারত, ডিস্ট্রিবিউটিস্টরা তা পারত না। তাছাড়া, রাষ্ট্রগুলো তখন জিডিপি বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় মত্ত ছিল, আর জিডিপি বাড়ানোর জন্য বড় কর্পোরেশন বা ইন্ডাস্ট্রি দরকার ছিল। নৈতিকভাবে ডিস্ট্রিবিউটিজম শ্রেষ্ঠ হলেও, অর্থনৈতিক দক্ষতার যুদ্ধে তা হেরে যায়।

উপসংহার: বিজয়ী থিওলজির আধিপত্য

সুতরাং, আমরা দেখতে পাই যে, খ্রিস্টীয় থিওলজি মানেই আধুনিকতার বন্ধু নয়। এর ভেতরে রাজতন্ত্রের পক্ষে, গণতন্ত্রের বিপক্ষে, সম্পত্তির বিপক্ষে এবং কর্মচাঞ্চল্যের বিপক্ষে অত্যন্ত শক্তিশালী সব যুক্তি ছিল। ফিল্মারের ডিভাইন রাইট, পোপের সিলেবাস অফ এররস, মুনস্টার বিদ্রোহের সাম্যবাদ, কুয়াইটিস্টদের নিরাসক্তি এবং চেস্টারটনের ডিস্ট্রিবিউটিজম – এগুলো সবই ছিল আধুনিক পুঁজিবাদী সেক্যুলার বিশ্বের বিরুদ্ধে একেকটি ব্যারিকেড। কিন্তু এই ব্যারিকেডগুলো ভেঙে পড়েছে। কেন? কারণ, ইতিহাসের একটা নির্মম নিয়ম আছে – যে মতবাদ বা আইডিয়া ক্ষমতা এবং সম্পদের জোগান দিতে পারে, শেষ পর্যন্ত সেই আইডিয়াই টিকে থাকে। একে বলা যেতে পারে ডারউইনিয়ান সিলেকশন অফ আইডিয়াস (Darwinian Selection of Ideas)

যে প্রটেস্ট্যান্ট এবং ক্যাথলিক ধারাগুলো রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে পেরেছিল, বিজ্ঞানকে অস্ত্র বানাতে পেরেছিল এবং বাণিজ্যের পথ খুলে দিয়েছিল, তারাই ইতিহাসে ‘খ্রিস্টধর্ম’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আর যারা বলেছিল “আমার রাজ্য এই পৃথিবীর নয়” বা “সুদ খাওয়া পাপ”, তারা হয়ে গেছে ইতিহাসের পাদটীকা। এই ধারাগুলো মারজিনালাইজড হয়েছে কোনো ঐশ্বরিক কারণে নয়, বরং অত্যন্ত জাগতিক কারণে – তারা আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র এবং বাজার অর্থনীতির ক্ষুধা মেটাতে ব্যর্থ হয়েছিল। আজকের সেক্যুলার পশ্চিম তাই খ্রিস্টধর্মের ‘স্বাভাবিক’ পরিণতি নয়; এটি হলো খ্রিস্টধর্মের ভেতরের একটি নির্দিষ্ট এবং বিশেষ অংশের জয়লাভ, যারা বাকি অংশগুলোকে নির্মমভাবে ছেঁটে ফেলেছিল।

ঐতিহাসিক নির্বাচনের নেপথ্য কারিগর: ক্ষমতা, উপযোগিতা এবং টিকে থাকার সমীকরণ

ইতিহাসকে আমরা সাধারণত বিজয়ী আর বিজিতের গল্প হিসেবে দেখি, কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নাটকীয়তা আসলে যুদ্ধের ময়দানে নয়, বরং ঘটে মানুষের চিন্তার জগতে। আমরা আগের আলোচনাগুলোতে দুটি খুব গুরুত্বপূর্ণ চিত্র দেখেছি। একদিকে ইসলামি সভ্যতার ভেতরে লুকিয়ে থাকা যুক্তিবাদ ও প্রগতির ভ্রুণ, যা রাজনৈতিক কারণে কখনোই ভূমিষ্ঠ হতে পারেনি; অন্যদিকে খ্রিস্টীয় সভ্যতার ভেতরে থাকা সাম্যবাদ ও জগৎবিমুখতার শক্তিশালী ধারা, যা আধুনিক পুঁজিবাদের স্বার্থে নির্মমভাবে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। এই যে দুটো বিপরীত চিত্র, এর থেকে একটা বিষয় স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ হয়ে ওঠে – কোনো ধর্মই এককভাবে আধুনিকতা বা প্রগতির ঠিকাদার নয়, আবার কেউ জন্মগতভাবে পশ্চাৎপদও নয়। আসল খেলাটা ধর্মের নয়, আসল খেলাটা হলো ‘নির্বাচন’ বা সিলেকশন (Selection)-এর। ইতিহাসের এক অমোঘ নিয়ম হলো, কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে হাজারো মতবাদ বা আইডিয়া বাজারে ভাসে, কিন্তু টিকে থাকে শুধু সেটাই, যা তৎকালীন ক্ষমতা কাঠামোর জন্য ‘উপকারী’ বা ফাংশনাল (Functional)। একে আমরা জীববিজ্ঞানের ভাষায় বলতে পারি মতবাদের প্রাকৃতিক নির্বাচন বা ন্যাচারাল সিলেকশন অফ আইডিয়াস (Natural Selection of Ideas)। এই অধ্যায়ে আমরা সেই অদৃশ্য ছাঁকুনি বা ফিল্টার নিয়ে আলোচনা করব, যা নির্ধারণ করে দিয়েছে কেন ইবনে রুশদ কর্ডোবার রাস্তায় ধুলোয় গড়াগড়ি খাবেন, আর কেন জন লক আধুনিক গণতন্ত্রের পিতা হিসেবে পূজিত হবেন। এই নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি বুঝতে পারলে আমরা দেখব, আধুনিকায়ন বা ধর্মনিরপেক্ষকরণ কোনো ঐশ্বরিক আশীর্বাদ নয়, বরং এটি হলো টিকে থাকার প্রয়োজনে সমাজ ও রাষ্ট্রের নেওয়া এক দীর্ঘমেয়াদী এবং অত্যন্ত হিসেবি সিদ্ধান্ত।

যুদ্ধের রাষ্ট্র এবং উপযোগিতার রাজনীতি

ইউরোপ কেন আধুনিক হলো – এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা প্রায়ই রেনেসাঁস বা রিফর্মেশনের কথা বলি। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানী চার্লস টিলি (Charles Tilly) আমাদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেন এক সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং রূঢ় বাস্তবতার দিকে। টিলি তার বিখ্যাত মন্তব্যে বলেছিলেন, “যুদ্ধ রাষ্ট্র তৈরি করেছে, এবং রাষ্ট্র যুদ্ধ তৈরি করেছে।” মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগের সন্ধিক্ষণে ইউরোপ ছিল এক অবিরাম যুদ্ধক্ষেত্র। ফ্রান্স লড়ছে ইংল্যান্ডের সাথে, স্পেন লড়ছে ডাচদের সাথে। এই যে টিকে থাকার প্রাণান্তকর লড়াই, এটাই ইউরোপীয় শাসকদের বাধ্য করেছিল এমন সব ধর্মতত্ত্ব এবং দর্শনকে বেছে নিতে, যা তাদের যুদ্ধজয়ের রসদ জোগাবে। একজন রাজার দরকার ছিল প্রচুর টাকা এবং উন্নত প্রযুক্তি। এখন তার সামনে যদি দুটো ধর্মতত্ত্ব থাকে – একটি বলছে “সম্পদ ত্যাগ করো এবং ধ্যানে মগ্ন হও” (যেমন কুয়াইটিজম), আর অন্যটি বলছে “পরিশ্রম করো, সম্পদ গড়ো এবং রাষ্ট্রকে কর দাও” (যেমন ক্যালভিনিজম) – তবে রাজা স্বভাবতই দ্বিতীয়টি বেছে নেবেন। এখানে রাজার ভক্তি বা ঈমানের চেয়ে তার ‘সারভাইভাল’ বা টিকে থাকাটা বেশি জরুরি ছিল।

এই প্রক্রিয়াটিকেই অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় র‍্যাশনাল চয়েস থিওরি (Rational Choice Theory) বা যৌক্তিক চয়ন তত্ত্ব। শাসকরা ধর্মতত্ত্বের বাজার থেকে সেই পণ্যটিই কিনেছেন, যা তাদের ক্ষমতার আয়ু বাড়িয়েছে। ইউরোপে রাষ্ট্রগুলো ছিল ছোট এবং একে অপরের প্রতিযোগী। তাই সেখানে ‘ভুল’ ধর্মতত্ত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। যদি কোনো রাষ্ট্র বিজ্ঞানবিমুখ ধর্মতত্ত্ব আঁকড়ে ধরে থাকত, তবে পাশের রাষ্ট্র উন্নত কামান বানিয়ে তাকে দখল করে নিত। এই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বা কম্পিটিটিভ এনভায়রনমেন্ট (Competitive Environment) ইউরোপকে বাধ্য করেছিল প্রগতিশীল এবং প্রযুক্তিবান্ধব আইডিয়াগুলোকে ‘সিলেক্ট’ বা নির্বাচন করতে। অন্যদিকে, অটোমান বা মুঘল সাম্রাজ্য ছিল বিশাল এবং অনেকটা এককেন্দ্রিক। তাদের কোনো তাৎক্ষণিক অস্তিত্বের সংকট ছিল না। তাদের ভয় ছিল বাইরের শত্রু নয়, বরং ভেতরের বিদ্রোহ বা ‘ফিতনা’। তাই তারা এমন ধর্মতত্ত্ব বেছে নিয়েছিল যা প্রশ্নাতীত আনুগত্য শেখায়। তারা আশআরী মতবাদকে বেছে নিয়েছিল কারণ এটি রাজাকে ঈশ্বরের ছায়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করত এবং সমাজকে শান্ত রাখত। অর্থাৎ, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের এই পার্থক্য কোনো ধর্মীয় পার্থক্য নয়, এটি হলো ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে নেওয়া ভিন্ন ভিন্ন ‘স্ট্র্যাটেজিক চয়েস’ বা কৌশলগত সিদ্ধান্তের ফল।

বুর্জোয়া মর্যাদা এবং কথার জাদুকরী পরিবর্তন

ইতিহাসের এই বাঁক বদলের পেছনে শুধু তলোয়ার বা বন্দুক ছিল না, ছিল কথার জাদুকরী পরিবর্তনও। অর্থনীতিবিদ এবং ঐতিহাসিক ডিইড্রে ম্যাকক্লোস্কি (Deirdre McCloskey) তার Bourgeois Dignity বইতে এক অসাধারণ তত্ত্ব হাজির করেছেন। তিনি বলছেন, আধুনিক পুঁজিবাদের উত্থান কয়লা বা উপনিবেশ দিয়ে হয়নি, হয়েছে মানুষ কীভাবে ব্যবসায়ীদের দিকে তাকাত, সেই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে। হাজার বছর ধরে সব সমাজেই – হোক তা খ্রিস্টান, মুসলিম বা কনফুসীয় – ব্যবসায়ী বা বণিকদের নিচু চোখে দেখা হতো। সম্মান ছিল শুধু যোদ্ধা, পুরোহিত বা জমিদারদের। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দীর হল্যান্ড এবং ইংল্যান্ডে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। সেখানে ধর্মতাত্ত্বিক এবং বুদ্ধিজীবীরা বলতে শুরু করলেন যে, ব্যবসা করা কোনো নিচু কাজ নয়, বরং এটি একটি সম্মানজনক এবং পবিত্র পেশা। এই যে ‘কথার পরিবর্তন’ বা রেটোরিক্যাল চেঞ্জ (Rhetorical Change) – এটাই ছিল আসল বিপ্লব।

এই পরিবর্তনটি আকাশ থেকে পড়েনি। রাষ্ট্র যখন দেখল যে যুদ্ধের খরচ মেটাতে আর সামন্ত প্রভুদের খাজনায় কুলোচ্ছে না, তখন তারা বণিকদের দিকে হাত বাড়াল। আর বণিকদের খুশি করতে হলে তাদের কাজের ধর্মীয় এবং সামাজিক স্বীকৃতি দিতে হবে। ফলে চার্চের পন্ডিতরা, যারা একসময় সুদকে মহাপাপ বলতেন, তারা এখন সুদের নাম পাল্টে ‘বিনিয়োগের লভ্যাংশ’ বলে হালাল করতে শুরু করলেন। জন ক্যালভিনের মতো ধর্মতাত্ত্বিকরা এসে বললেন, ব্যবসায়িক সাফল্য ঈশ্বরের আশীর্বাদ। এই নতুন বয়ানটি সমাজে বণিকদের মর্যাদা বা ডিগনিটি (Dignity) বাড়িয়ে দিল। ফলে সমাজের সবচেয়ে মেধাবী ছেলেটি আর যাজক বা সৈনিক হতে চাইল না, সে হতে চাইল উদ্যোক্তা। অন্যদিকে, মুসলিম বিশ্বে বা চীনে এই ‘রেটোরিক্যাল চেঞ্জ’ বা বয়ানের পরিবর্তনটি ঘটেনি। সেখানে উলামা এবং আমলারা বা ব্যুরোক্র্যাটস (Bureaucrats) সমাজের শীর্ষস্থান দখল করে রেখেছিল। একজন ধনী বণিকের চেয়ে একজন গরিব সুফি বা মাদ্রাসার ছাত্রের সামাজিক মর্যাদা ছিল বেশি। যেহেতু সমাজ মেধাবীদের বাণিজ্যে উৎসাহিত করেনি, তাই সেখানে পুঁজিবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি বা ইন্টেলেকচুয়ালিজম (Intellectualism) গড়ে ওঠেনি। ম্যাকক্লোস্কির এই তত্ত্ব আমাদের শেখায় যে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শুধু ব্যাংক বা রাস্তাঘাট বানালে হয় না, সমাজে সম্পদ সৃষ্টিকারীদের নৈতিক স্বীকৃতি বা মোরাল লেজিটিমেসি (Moral Legitimacy) দিতে হয়।

প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তন এবং পথ-নির্ভরতার ফাঁদ

আমরা যখন বলি যে একটি নির্দিষ্ট ধর্মতাত্ত্বিক ধারা জয়ী হয়েছে, তখন বুঝতে হবে যে সেই জয়টি একদিনে আসেনি। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল, যাকে সমাজবিজ্ঞানে বলা হয় পাথ ডিপেন্ডেন্স (Path Dependence) বা পথ-নির্ভরতা। একবার সমাজ কোনো একটি নির্দিষ্ট রাস্তায় পা বাড়ালে, সেখান থেকে ফিরে আসা খুব কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ সেই রাস্তার সাথে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের স্বার্থ বা ভেস্টেড ইন্টারেস্ট (Vested Interest)। পশ্চিমে যখন চার্চ এবং রাষ্ট্রের দ্বন্দ্বে একটি আইনি শূন্যস্থান তৈরি হলো, তখন সেখানে আইনজীবীরা বা লইয়ারস (Lawyers) ঢুকে পড়লেন। তারা এমন সব নিয়মকানুন তৈরি করলেন যা রাজার ক্ষমতা কমাবে এবং ব্যক্তির অধিকার বাড়াবে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই চর্চা চলতে চলতে একসময় তা একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান বা ইনস্টিটিউশন (Institution)-এ রূপ নিল। তখন চাইলেও কোনো রাজা আর স্বৈরাচারী হতে পারতেন না, কারণ পুরো সিস্টেমটাই আইনের শাসনের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে।

অন্যদিকে, প্রাচ্যে যখন শাসকরা যুক্তিবাদীদের সরিয়ে রক্ষণশীলদের বেছে নিলেন, তখন তারা এমন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন (যেমন মাদ্রাসা, ওয়াকফ, শরিয়াহ আদালত) যা সেই রক্ষণশীলতাকেই পুষ্ট করতে থাকল। অটোমান সাম্রাজ্যে উলামারা রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেলেন। তারা শিক্ষার সিলেবাস এমনভাবে তৈরি করলেন যাতে শুধু ফিকাহ আর হাদিস থাকে, দর্শন বা বিজ্ঞান নয়। ৫০০ বছর ধরে এই সিস্টেমে চলার পর সমাজ এমন এক জায়গায় পৌঁছাল যে, সেখান থেকে হুট করে আধুনিক হওয়ার আর উপায় রইল না। কারণ, আধুনিক হতে গেলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা, আইন ব্যবস্থা এবং সামাজিক কাঠামো ভেঙে ফেলতে হতো, যা অসম্ভব ছিল। এই অবস্থাকে বলা হয় ইনস্টিটিউশনাল লক-ইন (Institutional Lock-in)। অর্থাৎ, তারা তাদের অতীতের সাফল্যেরই বন্দি হয়ে পড়েছিল। পশ্চিমের সুবিধা ছিল যে তাদের অতীতটা (মধ্যযুগ) খুব একটা সুখকর ছিল না, তাই তারা সেটা ভাঙতে দ্বিধা করেনি। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের অতীত ছিল অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল, তাই সেই গৌরবের স্মৃতি আঁকড়ে ধরেই তারা পরিবর্তনের পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল। এই মনস্তাত্ত্বিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা বা ইনার্শিয়া (Inertia) আধুনিকায়নের পথে অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

মনস্তত্ত্বের বিবর্তন: উইয়ার্ড (WEIRD) মানুষের উত্থান

ইতিহাসের এই নির্বাচন প্রক্রিয়া কেবল রাষ্ট্র বা অর্থনীতিকেই বদলে দেয়নি, বদলে দিয়েছে খোদ মানুষের মগজ বা মনস্তত্ত্বকেও। বিবর্তনমূলক জীববিজ্ঞানী এবং নৃতাত্ত্বিক জোসেফ হেনরিখ (Joseph Henrich) তার যুগান্তকারী বই The WEIRDest People in the World-এ দেখিয়েছেন যে, পশ্চিমা মানুষ মানসিকভাবে বাকি বিশ্বের চেয়ে আলাদা। WEIRD শব্দটির মানে হলো Western, Educated, Industrialized, Rich, and Democratic। হেনরিচ বলেন, এই মানসিক পরিবর্তনের মূলে ছিল ক্যাথলিক চার্চের একটি অদ্ভুত নীতি – আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে বা কাজিন ম্যারেজ নিষিদ্ধ করা। মধ্যযুগে চার্চ যখন ঘোষণা করল যে কাজিন ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে করা যাবে না, তখন ইউরোপের হাজার বছরের পুরনো গোত্রপ্রথা বা ক্ল্যান সিস্টেম (Clan System) ভেঙে পড়ল। মানুষ আর তার বৃহৎ পরিবারের ওপর নির্ভর করতে পারল না। তাকে বাধ্য হয়ে বাইরের মানুষের সাথে মিশতে হলো, নতুন সামাজিক নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হলো।

এই সামাজিক পরিবর্তনের ফলে ইউরোপীয়দের মধ্যে এক নতুন ধরণের মনস্তত্ত্ব তৈরি হলো, যাকে বলা হয় ইমপারসোনাল প্রো-সোশ্যালিটি (Impersonal Pro-sociality)। অর্থাৎ, অচেনা মানুষের প্রতি বিশ্বাস এবং সহযোগিতা করার ক্ষমতা। এটি আধুনিক রাষ্ট্র এবং বাজার অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। আপনি যখন জানবেন না যে আপনার ক্রেতা কে, তখন কেবল এই ইমপারসোনাল বিশ্বাসই আপনাকে ব্যবসা করতে সাহস জোগাবে। অন্যদিকে, মুসলিম বিশ্ব বা প্রাচ্যে কাজিন ম্যারেজ বা গোত্রভিত্তিক বিয়ে চালু ছিল (এবং এখনো আছে)। এর ফলে সেখানে পারিবারিক বন্ধন বা কিনশিপ (Kinship) অত্যন্ত শক্তিশালী রয়ে গেছে। এই নিবিড় পারিবারিক বন্ধন সামাজিকভাবে খুব আরামদায়ক হলেও, এটি আধুনিক প্রতিষ্ঠান গড়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, মানুষ সবসময় তার পরিবারের স্বার্থকে রাষ্ট্রের বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের আগে স্থান দেয়। হেনরিখের এই গবেষণা প্রমাণ করে যে, ধর্মতত্ত্ব বা চার্চের আইন কেবল পরকালের মুক্তি নিশ্চিত করেনি, বরং তা মানুষের মস্তিষ্কের গঠন এবং সামাজিক আচরণের বিবর্তন ঘটিয়ে তাকে আধুনিক বিশ্বের উপযোগী করে তুলেছে। এই ‘মনস্তাত্ত্বিক নির্বাচন’ বা সাইকোলজিক্যাল সিলেকশন (Psychological Selection)-ই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আধুনিকায়নের গতিতে বিশাল ব্যবধান গড়ে দিয়েছে।

সহিংসতার একচেটিয়া অধিকার এবং রাষ্ট্রের চরিত্র

আধুনিকায়ন বা সেক্যুলারিজমের বিকাশে আরেকটি বড় ফ্যাক্টর হলো সহিংসতা বা ভায়োলেন্স (Violence)-কে রাষ্ট্র কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী নর্বার্ট এলিয়াস (Norbert Elias) তার The Civilizing Process গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, আধুনিক সভ্যতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের ব্যক্তিগত সহিংসতা কমে যাওয়া এবং রাষ্ট্রের হাতে সহিংসতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়া। মধ্যযুগে ইউরোপে নাইটরা বা সামন্ত প্রভুরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করত, ডুয়েল লড়ত। চার্চ এবং রাষ্ট্র মিলে ধীরে ধীরে এই ব্যক্তিগত মারামারি বন্ধ করে দিল। তারা বলল, “বিচার করার অধিকার শুধু আদালতের, আর যুদ্ধ করার অধিকার শুধু রাজার।” এই প্রক্রিয়ার ফলে সমাজ অনেক বেশি সুশৃঙ্খল হলো, যা বাণিজ্য ও শিল্পের জন্য জরুরি ছিল।

কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি সফল হওয়ার পেছনেও ছিল সেই ধর্মতাত্ত্বিক আপোষ। চার্চ যখন রাজাকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে মেনে নিল, তখন রাজার তলোয়ার পবিত্র হয়ে গেল। রাজা যখন কোনো বিদ্রোহী বা ডাকাতকে হত্যা করতেন, তখন সেটাকে আর পাপ মনে করা হতো না, মনে করা হতো ন্যায়বিচার। অন্যদিকে, মুসলিম বিশ্বে রাষ্ট্রের পাশাপাশি বিভিন্ন গোত্র বা ট্রাইবগুলোর হাতেও অস্ত্র থাকত। রাষ্ট্র কখনোই পুরোপুরিভাবে সহিংসতার ওপর একচেটিয়া অধিকার বা মনোপলি অন ভায়োলেন্স (Monopoly on Violence) প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। প্রত্যন্ত অঞ্চলের গোত্রপতিরা প্রায়ই কেন্দ্রের শাসন মানত না। এই অস্থিতিশীলতা বা ইনস্ট্যাবিলিটি (Instability) আধুনিক রাষ্ট্রগঠনের পথে বড় অন্তরায় ছিল। কারণ, আধুনিক রাষ্ট্র চায় প্রতিটি নাগরিকের ওপর সমান নিয়ন্ত্রণ, যা শক্তিশালী গোত্রপ্রথা থাকলে সম্ভব নয়। পশ্চিমা শাসকরা ধর্মতত্ত্বকে ব্যবহার করে গোত্রপ্রথা ভেঙে ফেলেছিলেন, কিন্তু প্রাচ্যের শাসকরা গোত্রপ্রথার সাথে আপোষ করে চলেছিলেন। এই ভিন্ন ভিন্ন কৌশলগত সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত দুই সভ্যতার গন্তব্য আলাদা করে দিয়েছে।

উপসংহার: ইতিহাসের নির্দয় ছাঁকুনি

পরিশেষে আমরা বলতে পারি, ইতিহাস কোনো দয়ালু শিক্ষক নয়, বরং এক নির্দয় পরীক্ষক। সে কোনো আবেগের ধার ধারে না। যে সমাজ বা সভ্যতা সময়ের প্রয়োজনে নিজেকে বদলাতে পারে, তাকেই সে টিকিয়ে রাখে। পশ্চিমের খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের ভেতরে এমন কিছু ছিল না যা তাকে ‘স্বভাবতই’ আধুনিক করে তুলেছিল। বরং ইউরোপের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিবেশ – অবিরাম যুদ্ধ, অর্থের প্রয়োজন এবং সামাজিক ভাঙন – তাদের বাধ্য করেছিল ধর্মতত্ত্বের ভেতর থেকে এমন সব উপাদান খুঁজে বের করতে, যা তাদের এই সংকট থেকে উদ্ধার করবে। তারা বাইবেল ঘেঁটে সুদের বৈধতা বের করেছে, রাজার ক্ষমতা কমানোর যুক্তি বের করেছে এবং অচেনা মানুষকে বিশ্বাস করার নৈতিকতা তৈরি করেছে। এটি ছিল একটি সচেতন এবং অনেক ক্ষেত্রে অবচেতন নির্বাচন প্রক্রিয়া।

অন্যদিকে, প্রাচ্যের সমাজগুলো তাদের রাজনৈতিক প্রয়োজনে – বিশাল সাম্রাজ্য রক্ষা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল থামানো এবং ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা – এমন সব ধর্মতত্ত্বকে আঁকড়ে ধরেছিল যা স্থিতিশীলতা দেয়। তারা মু’তাজিলাদের যুক্তি বা ইবনে রুশদের বিজ্ঞানকে ছুড়ে ফেলেছিল, কারণ সেগুলো তৎকালীন ক্ষমতার কাঠামোর জন্য ‘বিপজ্জনক’ মনে হয়েছিল। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা হয়তো সেই সিদ্ধান্তকে ভুল বলতে পারি, কিন্তু সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে শাসকদের কাছে সেটাই ছিল টিকে থাকার শ্রেষ্ঠ উপায়। তাই আধুনিকায়ন, গণতন্ত্রায়ণ বা পুঁজিবাদের বিকাশ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের সাফল্য বা ব্যর্থতা নয়; এটি হলো হিস্টোরিকাল অ্যাডাপটেশন বা ঐতিহাসিক অভিযোজনের গল্প। যারা পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিজেদের বিশ্বাস ও প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে সাজাতে পেরেছে (কখনোবা পুরনো বিশ্বাসকে বিসর্জন দিয়ে), তারাই ইতিহাসের এই নতুন অধ্যায়ের লেখক হয়েছে। আর যারা তা পারেনি, তারা পরিণত হয়েছে সেই ইতিহাসেরই পাঠকে।

চিন্তার স্থপতিরা: সেক্যুলারিজম ও আধুনিকতার তাত্ত্বিক রূপকার

ইতিহাসের এক অদ্ভুত ও জটিল গোলকধাঁধা নিয়ে আমরা এতক্ষণ আলোচনা করলাম। কীভাবে পশ্চিমের আকাশে ঈশ্বর ধীরে ধীরে মেঘের আড়ালে সরে গেলেন এবং সেই ফাঁকা মঞ্চে দাঁড়িয়ে মানুষ তার নিজের তৈরি আইন, রাষ্ট্র ও বিজ্ঞানের জয়গান গাইতে শুরু করল – এই গল্পটি কোনো রূপকথা নয়। এটি সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং দর্শনের এক বিশাল ও গভীর বোঝাপড়ার ফসল। এই বোঝাপড়াটা একদিনে তৈরি হয়নি। গত একশ বা তারও বেশি সময় ধরে বিশ্বের বাঘা বাঘা চিন্তাবিদ, দার্শনিক এবং সমাজবিজ্ঞানীরা তাদের জীবনের পুরোটা সময় ব্যয় করেছেন এই ধাঁধাটি মেলাতে। তারা কেউ ধুলোবালি মাখা প্রাচীন আইনের নথিপত্র ঘেঁটেছেন, কেউ অর্থনীতির জটিল সব গ্রাফ বিশ্লেষণ করেছেন, আবার কেউ ধর্মের গভীর মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করেছেন। এই অধ্যায়ে আমরা সেই ‘মহামনীষী’ বা তাত্ত্বিকদের সাথে পরিচিত হব। এঁরা হলেন সেই চিন্তার স্থপতি, যাঁরা আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজের কঙ্কালটিকে ব্যবচ্ছেদ করতে হয়। এঁদের তত্ত্ব বা থিওরিগুলো না জানলে পশ্চিমের এই ‘ধর্মতত্ত্ব থেকে বেরিয়ে আসার’ জার্নিটা পুরোপুরি বোঝা অসম্ভব। আমরা এখানে দেখব, ম্যাক্স ওয়েবার থেকে শুরু করে চার্লস টেইলর, কিংবা কার্ল শ্মিট থেকে তিমুর কুরান – কীভাবে তারা প্রত্যেকেই এই বিশাল পাজল বা ধাঁধার একেকটি টুকরো মিলিয়েছেন।

এই তাত্ত্বিকদের আলোচনা কেবল অ্যাকাডেমিক বা কেতাবি কোনো বিষয় নয়। আমরা বর্তমানে যে রাষ্ট্রে বাস করি, যে ব্যাংকে টাকা রাখি, কিংবা যে আইনের শাসন চাই – তার পেছনের দর্শনগুলো এঁদেরই মস্তিষ্কপ্রসূত। এঁরা আমাদের দেখান যে, সমাজটা যেমন চলছে, তা এমনি এমনি চলছে না; এর পেছনে কাজ করছে অদৃশ্য সব সুতো। কেউ ঈশ্বরকে সরিয়ে রাষ্ট্রকে বসিয়েছেন, কেউবা দেখিয়েছেন কীভাবে চার্চের আইন থেকেই জন্ম নিয়েছে আধুনিক কর্পোরেশন। এই অধ্যায়ে আমরা তাদের চিন্তার জগতে ডুব দেব। দেখব, কীভাবে একজন জার্মান সমাজবিজ্ঞানী জুতা সেলাইয়ের মধ্যে ঈশ্বরের ইবাদত খুঁজে পেলেন, কিংবা কীভাবে একজন কানাডিয়ান দার্শনিক আমাদের বোঝালেন যে আমরা এখন আর ‘ছিদ্রযুক্ত’ আত্মা নই, আমরা হলাম ‘বাফার্ড’ বা সুরক্ষিত আত্মা। চলুন, পরিচিত হওয়া যাক আধুনিকতার এই কারিগরদের সাথে।

ম্যাক্স ওয়েবার: জাদুমুক্তকরণ এবং লোহার খাঁচা

আধুনিক সমাজবিজ্ঞান বা সোশিওলজির জনক যদি কাউকে বলতে হয়, তবে তিনি নিঃসন্দেহে ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber)। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এই জার্মান ভদ্রলোক এমন কিছু কথা বলে গেছেন, যা আজও আমাদের সমাজ বোঝার মূলমন্ত্র। ওয়েবারের সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ হলো The Protestant Ethic and the Spirit of Capitalism। এই বইটিতেই তিনি প্রথম দেখান যে, ধর্ম বা আইডিয়া কীভাবে অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে। মার্কসবাদীরা বলত, টাকাপয়সা বা অর্থনীতিই ধর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে। ওয়েবার বললেন, “না, বরং উল্টোটা। ধর্মই ঠিক করে দেয় মানুষ টাকা কীভাবে কামাবে।” ওয়েবার লক্ষ্য করলেন, ইউরোপের ক্যাথলিক দেশগুলোর চেয়ে প্রোটেস্ট্যান্ট (বিশেষ করে ক্যালভিনিস্ট) দেশগুলোতে পুঁজিবাদের বিকাশ বেশি হয়েছে। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে তিনি পেলেন এক অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব। ক্যালভিনিস্টরা বিশ্বাস করত, কে স্বর্গে যাবে আর কে নরকে যাবে, তা ঈশ্বর আগেই ঠিক করে রেখেছেন (Predestination)। এই অনিশ্চয়তা বা টেনশন থেকে বাঁচার জন্য তারা পাগলপারা হয়ে কাজ করতে শুরু করল। তারা ভাবল, ব্যবসায় সাফল্য বা জাগতিক উন্নতি হয়তো ঈশ্বরের সন্তুষ্টির লক্ষণ। এই যে ধর্মকে গির্জা থেকে বের করে কারখানায় বা অফিসে নিয়ে আসা – এটাই ওয়েবারের মতে আধুনিক পুঁজিবাদের জন্ম দিয়েছে। একে তিনি বলেছেন ‘ওয়ার্ল্ডলি অ্যাসেটিজম’ বা জাগতিক বৈরাগ্য (Worldly Asceticism)

ওয়েবারের আরেকটি যুগান্তকারী ধারণা হলো ‘ডিসএনচ্যান্টমেন্ট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ (Disenchantment of the World) বা বিশ্বের জাদুমুক্তকরণ। তিনি বললেন, প্রাচীনকালে মানুষ মনে করত পৃথিবীটা জাদুময়; গাছে, নদীতে বা পাথরে আত্মা আছে। কিন্তু আধুনিক যুক্তিবাদ এবং বিজ্ঞান এসে জগত থেকে এই রহস্যময়তা বা জাদু দূর করে দিল। এখন পৃথিবীটা একটা বিশাল যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়, যার সবকিছুই কার্যকারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। এই প্রক্রিয়ায় ঈশ্বর বা অলৌকিক শক্তির আর কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা রইল না। তবে ওয়েবার এই আধুনিকতা নিয়ে খুব একটা আশাবাদী ছিলেন না। তিনি ভয় পেয়েছিলেন যে, জাদুমুক্ত এই পৃথিবী মানুষকে একটি ‘আয়রন কেজ’ (Iron Cage) বা লোহার খাঁচায় বন্দি করে ফেলবে। এই খাঁচাটি হলো আমলাতন্ত্র বা ব্যুরোক্রেসি। যেখানে আবেগ, দয়া বা মানবিকতার কোনো স্থান নেই; আছে শুধু নিয়ম আর আইনের কঠোর শাসন। ওয়েবারের এই তত্ত্ব আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, কেন পশ্চিমে ঈশ্বরকে প্রশাসন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল – কারণ জাদুমুক্ত আমলাতন্ত্রের সাথে ঈশ্বরের অলৌকিকতা খাপ খায় না।

কার্ল শ্মিট: রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের অন্ধকার যুবরাজ

ম্যাক্স ওয়েবার যদি আধুনিকতার স্থপতি হন, তবে কার্ল শ্মিট (Carl Schmitt) হলেন তার অন্ধকার বা ডার্ক সাইডের বিশ্লেষক। শ্মিট ছিলেন একজন তুখোড় জার্মান আইনজ্ঞ এবং রাজনৈতিক তাত্ত্বিক, কিন্তু তার নাৎসি সম্পৃক্ততার কারণে তিনি ইতিহাসের এক বিতর্কিত চরিত্র। তবে তার মেধা নিয়ে কারো সন্দেহ নেই। শ্মিটের সবচেয়ে বিখ্যাত লাইনটি হলো: “সার্বভৌম সে-ই, যে জরুরি অবস্থা বা এক্সেপশন (Exception) সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়।” শ্মিট তার Political Theology বইতে এক বিস্ফোরক দাবি করলেন। তিনি বললেন, “আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বের সব গুরুত্বপূর্ণ ধারণাই হলো সেক্যুলারাইজড থিওলজি।” অর্থাৎ, আগে মানুষ যেভাবে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরে বিশ্বাস করত, এখন সেভাবে সে সর্বশক্তিমান রাষ্ট্রে বিশ্বাস করে। মধ্যযুগে ঈশ্বর যেমন প্রকৃতির নিয়ম ভেঙে ‘মিরাকল’ বা অলৌকিক ঘটনা ঘটাতে পারতেন, আধুনিক যুগে রাষ্ট্রপ্রধান বা সার্বভৌম শাসক তেমনি সংবিধান স্থগিত করে ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করতে পারেন। এই জরুরি অবস্থা হলো আধুনিক যুগের মিরাকল।

শ্মিটের তত্ত্ব আমাদের এই আর্টিকেলের মূল বিষয়বস্তু – ঈশ্বরের সরে দাঁড়ানো এবং রাষ্ট্রের উত্থান – বোঝার জন্য অত্যন্ত জরুরি। শ্মিট দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্র কখনোই পুরোপুরি নিরপেক্ষ বা যান্ত্রিক হতে পারে না। রাষ্ট্রের একটা ‘আত্মা’ বা ‘সার্বভৌম ইচ্ছা’ লাগে, যা যুক্তির ঊর্ধ্বে। পশ্চিমারা ঈশ্বরকে সরিয়ে সেই জায়গায় রাষ্ট্রকে বসিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই ‘ঐশ্বরিক ক্ষমতা’র কাঠামোটা তারা ধরে রেখেছে। শ্মিট উদারনৈতিক গণতন্ত্র বা লিবারেল ডেমোক্রেসিকে ঘৃণা করতেন। তিনি মনে করতেন, পার্লামেন্টে বসে শুধু তর্কাতর্কি করলে রাষ্ট্র চলে না; রাষ্ট্রের দরকার একজন শক্তিশালী ডিসিশন-মেকার। তার এই তত্ত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সেক্যুলারিজম মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়; বরং ঈশ্বরবিহীন রাষ্ট্রে সার্বভৌম ক্ষমতা আরও ভয়ংকর রূপ নিতে পারে, কারণ সেখানে শাসকের ওপর ঈশ্বরের কোনো ভয় থাকে না। আধুনিক যুগে জাতীয়তাবাদ বা ন্যাশনালিজম যে ধর্মের জায়গা দখল করেছে, তা শ্মিটের পলিটিক্যাল থিওলজি দিয়েই সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা করা যায়।

চার্লস টেইলর: বাফার্ড সেলফ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার যুগ

একবিংশ শতাব্দীতে এসে ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেক্যুলারিজম নিয়ে সবচেয়ে গভীর এবং বিস্তারিত কাজ করেছেন কানাডিয়ান দার্শনিক চার্লস টেইলর (Charles Taylor)। তার বিশাল গ্রন্থ A Secular Age হলো এই বিষয়ের বাইবেল। টেইলর প্রশ্ন তুললেন: “১৫০০ সালে যেখানে ঈশ্বরে অবিশ্বাস করা ছিল অসম্ভব, সেখানে ২০০০ সালে এসে ঈশ্বরে বিশ্বাস করাটা কেন কেবল একটা অপশন বা বিকল্প হয়ে দাঁড়াল?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি এক বিশাল ঐতিহাসিক ভ্রমণ করেছেন। টেইলর বলেন, সেক্যুলারিজম মানে শুধু ধর্ম কমে যাওয়া নয় (Subtraction Story); বরং সেক্যুলারিজম হলো বিশ্বাস করার নতুন সব শর্ত তৈরি হওয়া। তিনি দুটি চমৎকার ধারণার অবতারণা করেছেন: ‘পোরাস সেলফ’ (Porous Self) এবং ‘বাফার্ড সেলফ’ (Buffered Self)

প্রাচীন বা মধ্যযুগের মানুষ ছিল ‘পোরাস’ বা ছিদ্রযুক্ত। তাদের মনে হতো, বাইরের জগত – ভূত, প্রেত, ঈশ্বরের আশীর্বাদ বা অভিশাপ – সরাসরি তাদের মনের ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে। তারা জগত থেকে নিজেদের আলাদা করতে পারত না। কিন্তু আধুনিক পশ্চিমা মানুষ হলো ‘বাফার্ড’ বা সুরক্ষিত। তাদের মন এবং বাইরের জগতের মাঝখানে একটা দেয়াল আছে। তারা মনে করে, “আমি যা ভাবি, তা একান্তই আমার মনের ব্যাপার; বাইরের কোনো আত্মা বা জাদু আমাকে দখল করতে পারবে না।” টেইলর দেখান, এই ‘বাফার্ড সেলফ’ তৈরি হওয়ার ফলেই ঈশ্বরকে ব্যক্তিগত পরিসরে বা প্রাইভেট স্ফিয়ারে পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। কারণ, এখন আমি আর ঈশ্বরের হাতের পুতুল নই; আমি এক স্বতন্ত্র সত্তা যে যুক্তির মাধ্যমে জগতকে বিচার করে। টেইলর আরও দেখান যে, প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার এবং পরবর্তীতে ‘ডেইজম’ (Deism) বা প্রকৃতিবাদী ঈশ্বরবাদ কীভাবে ঈশ্বরকে একজন নিছক ‘ইঞ্জিনিয়ার’-এ পরিণত করেছে, যিনি মহাবিশ্ব বানিয়ে দূরে সরে গেছেন। টেইলরের এই বিশ্লেষণ আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, কেন পশ্চিমে ধর্ম ব্যক্তিগত হয়ে গেল এবং কেন প্রাচ্যে (যেখানে মানুষ এখনো অনেকখানি ‘পোরাস’) তা সম্ভব হলো না।

মার্সেল গশ্যে: খ্রিস্টধর্মের আত্মহনন

চার্লস টেইলরের মতোই আরেক ফরাসি দার্শনিক মার্সেল গশ্যে (Marcel Gauchet) ধর্মনিরপেক্ষতাকে দেখেছেন ধর্মেরই বিবর্তন হিসেবে। তার বিখ্যাত বই The Disenchantment of the World-এ তিনি এক প্যারাডক্সিক্যাল বা আপাতবিরোধী তত্ত্ব দেন। গশ্যে বলেন, “খ্রিস্টধর্ম হলো সেই ধর্ম, যা ধর্ম থেকে বের হওয়ার পথ দেখায়।” তার মতে, ধর্মের ইতিহাসের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের এবং ঈশ্বরের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করা। আদিম ধর্মে মানুষ এবং দেবতা একাকার ছিল। কিন্তু একেশ্বরবাদ এসে ঈশ্বরকে উঁচুতে তুলল। খ্রিস্টধর্ম, বিশেষ করে যিশুর ইনকারনেশন বা অবতারবাদের মাধ্যমে, ঈশ্বরকে একদিকে মানুষের খুব কাছে আনল, আবার অন্যদিকে তার ঐশ্বরিক ক্ষমতাকে সীমিত বা ‘সেলফ-লিমিটেড’ করে ফেলল।

গশ্যের মতে, ঈশ্বর যখন সম্পূর্ণভাবে ‘ট্রান্সেন্ডেন্ট’ বা জাগতিক সীমার বাইরে চলে যান, তখন জগতটা মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। মানুষ তখন জগতকে বোঝার জন্য আর ঈশ্বরের দিকে তাকায় না, নিজের বুদ্ধির দিকে তাকায়। এভাবে খ্রিস্টধর্ম নিজের অজান্তেই নিজের কবর খুঁড়েছে। সে মানুষকে এতটাই স্বাধীন করে দিয়েছে যে, মানুষ শেষ পর্যন্ত ধর্মকেই অপ্রয়োজনীয় মনে করতে শুরু করেছে। গশ্যে একে বলেছেন ধর্মের ঐতিহাসিক কাজ বা ফাংশন (Function) শেষ হয়ে যাওয়া। আধুনিক গণতন্ত্র হলো সেই ব্যবস্থা, যেখানে সমাজ নিজের আইন নিজেই তৈরি করে, কোনো অদৃশ্য শক্তির আদেশের অপেক্ষা করে না। গশ্যের এই তত্ত্বটি আমাদের আর্টিকেলের সেই মূল পয়েন্টটিকে সমর্থন করে – যে সেক্যুলারিজম কোনো নাস্তিক্যবাদী ষড়যন্ত্র নয়, বরং এটি ধর্মতাত্ত্বিক বিবর্তনেরই একটি চূড়ান্ত পর্যায়।

হ্যারল্ড বারম্যান: আইনের বিপ্লব এবং পশ্চিমা ঐতিহ্য

আইন বা ল (Law) যে পশ্চিমা সভ্যতার মেরুদণ্ড, এবং এই মেরুদণ্ডটি যে চার্চ এবং রাষ্ট্রের ঝগড়া থেকে তৈরি হয়েছে – এই তত্ত্বটি সবচেয়ে জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন আমেরিকান আইনি ইতিহাসবিদ হ্যারল্ড বারম্যান (Harold Berman)। তার Law and Revolution বইটি আইনি ইতিহাসের এক মাস্টারপিস। বারম্যান আমাদের শেখান যে, আমরা যাকে ‘আধুনিক আইন’ বলি, তার জন্ম ফরাসি বিপ্লব বা শিল্প বিপ্লব থেকে হয়নি; তার জন্ম হয়েছে একাদশ শতাব্দীর ‘পোপাল রিভোলিউশন’ (Papal Revolution) থেকে। বারম্যান দেখান, যখন পোপ সপ্তম গ্রেগরি ঘোষণা করলেন যে চার্চ একটি স্বাধীন সত্তা এবং রাজার আইনের অধীন নয়, তখনই পশ্চিমে প্রথম ‘আইনের শাসন’ বা রুল অফ ল (Rule of Law)-এর ধারণা তৈরি হলো।

বারম্যানের মতে, এই বিপ্লবের ফলে ইউরোপে এক ধরণের আইনি বহুত্ববাদ বা লিগ্যাল প্লুরালিজম (Legal Pluralism) তৈরি হয়। চার্চের আইন (Canon Law), রাজার আইন (Royal Law), বণিকদের আইন (Mercantile Law), এবং শহরের আইন (Urban Law) – এই সব আইন একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করত। এই প্রতিযোগিতার ফলেই আইন ব্যবস্থা এত উন্নত এবং সূক্ষ্ম হয়ে ওঠে। বারম্যান যুক্তি দেন যে, এই আইনি ঐতিহ্যটিই হলো পশ্চিমের আসল শক্তি। এটি সরকারকে স্বৈরাচারী হতে বাধা দেয় এবং বাণিজ্যের জন্য একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে। বারম্যানের কাজ আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, কেন মুসলিম বিশ্বে – যেখানে ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা ছিল এবং আইনের এমন প্রাতিষ্ঠানিক বহুত্ববাদ ছিল না – সেখানে আধুনিক আইনি রাষ্ট্র গড়ে উঠতে দেরি হয়েছে।

তিমুর কুরান: অর্থনীতির দীর্ঘ বিচ্ছেদ

এবার আসা যাক অর্থনীতির জগতে। কেন মধ্যপ্রাচ্য একসময় বাণিজ্যে সবার চেয়ে এগিয়ে থেকেও পরে পিছিয়ে পড়ল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তুর্কি-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ তিমুর কুরান (Timur Kuran) তার The Long Divergence বইতে এক অসাধারণ গবেষণা তুলে ধরেছেন। কুরান ধর্ম বা সংস্কৃতিকে দোষারোপ করেননি; তিনি আঙুল তুলেছেন সুনির্দিষ্ট কিছু ইসলামি আইনের দিকে, যা একসময় উপকারী ছিল কিন্তু পরে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কুরানের মূল ফোকাস ছিল দুটি বিষয়ের ওপর: ইসলামি অংশীদারিত্ব আইন এবং উত্তরাধিকার আইন

কুরান দেখান যে, ইসলামি আইনে ‘করপোরেট পারসনহুড’ (Corporate Personhood) বা কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তার ধারণা ছিল না। ব্যবসা ছিল দুই বা ততোধিক ব্যক্তির ব্যক্তিগত চুক্তি। একজন অংশীদার মারা গেলেই সেই ব্যবসা ভেঙে যেত। এর সাথে যুক্ত ছিল ইসলামি উত্তরাধিকার আইনের জটিলতা, যা মৃত ব্যক্তির সম্পদকে অনেক ভাগে ভাগ করে দিত। এর ফলে মুসলিম বিশ্বে সম্পদ কখনোই এক জায়গায় পুঞ্জীভূত হয়ে বড় কোনো দীর্ঘস্থায়ী কোম্পানিতে রূপ নিতে পারত না। অন্যদিকে, ইউরোপে ‘কর্পোরেশন’ এবং ‘প্রাইমোজেনিচার’ (বড় ছেলেকে সব সম্পদ দেওয়া) আইনের ফলে বিশাল বিশাল পুঁজি গঠিত হলো, যা দিয়ে তারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো দানবীয় প্রতিষ্ঠান বানাল। কুরান আরও দেখান যে, ‘ওয়াকফ’ (Waqf) ব্যবস্থাটি শুরুতে জনকল্যাণে দারুণ কাজ করলেও, এটি ছিল অনমনীয় বা রিজিড। যুগের প্রয়োজনে ওয়াকফের সম্পদ বিক্রি বা রূপান্তর করা যেত না, ফলে প্রচুর সম্পদ অর্থনীতিতে অকেজো হয়ে পড়ে থাকত। কুরানের এই ‘ইনস্টিটিউশনাল ট্র্যাপ’ বা প্রাতিষ্ঠানিক ফাঁদের তত্ত্বটি পশ্চিমা এবং মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক বৈষম্য বোঝার জন্য অপরিহার্য।

ডগলাস নর্থ এবং ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা: প্রতিষ্ঠানই সব

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ (Douglass North) এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা (Francis Fukuyama) – এই দুজন যদিও আলাদা আলাদা ক্ষেত্রে কাজ করেছেন, কিন্তু তাদের সুর এক। নর্থ তার Institutions, Institutional Change and Economic Performance বইতে বললেন, “ইনস্টিটিউশন ম্যাটারস” (Institutions matter)। নর্থ দেখালেন, ইংল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডস ধনী হয়েছে কারণ তারা এমন প্রতিষ্ঠান গড়েছিল যা শাসকের হাত-পা বেঁধে রেখেছিল। রাজা চাইলেই কারো সম্পত্তি দখল করতে পারতেন না। এই নিরাপত্তা বা প্রপার্টি রাইটস (Property Rights) নিশ্চিত করার ফলেই মানুষ বিনিয়োগে আগ্রহী হয়েছিল। নর্থের মতে, পশ্চিমে এই প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছিল তাদের রাজনৈতিক সংঘাত এবং আপোষের মধ্য দিয়ে।

অন্যদিকে, ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা তার The Origins of Political Order বইতে দেখান যে, একটি সফল আধুনিক রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ লাগে: ১) শক্তিশালী রাষ্ট্র (State), ২) আইনের শাসন (Rule of Law), এবং ৩) দায়বদ্ধ সরকার (Accountable Government)। ফুকুয়ামা বিশ্লেষণ করে দেখান যে, অটোমান সাম্রাজ্যে শক্তিশালী রাষ্ট্র ছিল, কিন্তু আইনের শাসন (যেটা শাসকের ঊর্ধ্বে) এবং দায়বদ্ধতা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল ছিল। ফুকুয়ামা মনে করেন, চার্চ এবং রাষ্ট্রের দ্বন্দ্বই পশ্চিমে আইনের শাসনকে শাসকের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে বাধ্য করেছিল। তিনি দেখান যে, মুসলিম বিশ্বে উলামারা এক ধরণের ‘চেক’ বা বাধা হিসেবে কাজ করলেও, তাদের ক্ষমতা ছিল অনানুষ্ঠানিক; ফলে তারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুলতানের ক্ষমতাকে ব্যালেন্স করতে পারেনি।

টবি হাফ এবং জেমস ই. ম্যাকলেলান: বিজ্ঞানের পথচলা

বিজ্ঞান কেন পশ্চিমে বিকশিত হলো এবং অন্যত্র থেমে গেল – এই প্রশ্নে সমাজবিজ্ঞানী টবি হাফ (Toby Huff)-এর অবদান অনস্বীকার্য। হাফ তার The Rise of Early Modern Science বইতে দাবি করেন যে, বিজ্ঞানের উত্থানের জন্য কেবল মেধাবী বিজ্ঞানী থাকলেই হয় না, দরকার বিজ্ঞান চর্চার জন্য স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। হাফ দেখান যে, ইউরোপে দ্বাদশ শতাব্দীতেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ‘লিগ্যাল অটোনমি’ বা আইনি স্বায়ত্তশাসন পেয়েছিল। প্যারিস বা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় চার্চ বা রাজার সরাসরি নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে নিজেদের পাঠ্যক্রম ঠিক করতে পারত। তারা অ্যারিস্টটল বা প্রাকৃতিক দর্শন নিয়ে তর্ক করত।

হাফের মতে, মুসলিম বিশ্বে মাদ্রাসাগুলো ছিল মূলত ‘ওয়াকফ’ ভিত্তিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। সেখানে ‘ফরেন সায়েন্সেস’ বা গ্রিক দর্শন ও বিজ্ঞান চর্চা করাটা ব্যক্তিগত আগ্রহের বিষয় ছিল, প্রাতিষ্ঠানিক কারিকুলামের অংশ ছিল না। মাদ্রাসার মূল লক্ষ্য ছিল শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ তৈরি করা, বিজ্ঞানী তৈরি করা নয়। তাছাড়া, হাফ মনে করেন যে ইসলামি আইনে ‘প্রাকৃতিক আইন’ বা ন্যাচারাল ল (Natural Law)-এর ধারণার অনুপস্থিতি বিজ্ঞানীদের মনে এক ধরণের দ্বিধা তৈরি করেছিল। প্রকৃতি যদি ঈশ্বরের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে তার সূত্র আবিষ্কার করার সাহস করা কঠিন। যদিও জর্জ সালিবার মতো সমালোচকরা হাফের অনেক তথ্যের বিরোধিতা করেছেন, তবু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর গুরুত্ব নিয়ে হাফের যুক্তি অত্যন্ত শক্তিশালী।

ওয়ায়েল হাল্লাক এবং তালাল আসাদ: সমালোচকের দৃষ্টি

সবশেষে, আমাদের এই পুরো আলোচনার একজন বড় সমালোচক বা ক্রিটিকের কথা না বললেই নয়। তিনি হলেন ফিলিস্তিনি-আমেরিকান পণ্ডিত ওয়ায়েল হাল্লাক (Wael Hallaq)। তার The Impossible State বইটি আধুনিক রাষ্ট্র সম্পর্কে আমাদের মুগ্ধতা ভেঙে দেয়। হাল্লাক বলেন, আমরা যে বলি “ইসলামি রাষ্ট্র” সম্ভব কি না – এটা একটা ভুল প্রশ্ন। কারণ, আধুনিক ‘রাষ্ট্র’ (State) এবং ইসলামি ‘শাসন’ (Governance) – এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। আধুনিক রাষ্ট্র হলো একটি নৈতিকতাহীন সত্তা, যা নিজেকে ঈশ্বর মনে করে। অন্যদিকে ইসলামি শাসনব্যবস্থা দাঁড়িয়ে ছিল নৈতিকতা বা শরিয়াহর ওপর, যা কখনোই রাষ্ট্রকে সার্বভৌম ক্ষমতা দেয়নি। হাল্লাক যুক্তি দেন যে, মুসলিমরা যে পশ্চিমা ধাঁচের রাষ্ট্র বানাতে পারেনি, তা তাদের ব্যর্থতা নয়; বরং তা প্রমাণ করে যে ইসলামি নৈতিকতার সাথে আধুনিক রাষ্ট্রের দানবীয় ক্ষমতার সংঘাত অনিবার্য।

একইভাবে, নৃবিজ্ঞানী তালাল আসাদ (Talal Asad) তার Formations of the Secular বইতে দেখান যে, সেক্যুলারিজম কোনো নিরপেক্ষ বা নিরীহ জিনিস নয়। এটি হলো ক্ষমতার একটি আধুনিক প্রজেক্ট। আসাদ বলেন, পশ্চিমারা ধর্ম এবং সেক্যুলার – এই দুটি ক্যাটাগরি তৈরি করেছে যাতে তারা বিশ্বকে শাসন করতে পারে। তারা বলে, “তোমরা যদি আমাদের মতো সেক্যুলার হও, তবে তোমরা সভ্য; আর যদি ধর্ম নিয়ে থাকো, তবে তোমরা মধ্যযুগীয়।” আসাদ এবং হাল্লাকের কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা যখন ওয়েবার বা টেইলরের চশমা দিয়ে বিশ্বকে দেখি, তখন আমাদের সতর্ক থাকতে হবে – আমরা যেন পশ্চিমের ইতিহাসকেই একমাত্র সঠিক ইতিহাস বা ‘ইউনিভার্সাল স্ট্যান্ডার্ড’ মনে না করি।

এই তাত্ত্বিকরা প্রত্যেকেই ইতিহাসের অন্ধকারের ওপর একেকটি টর্চলাইটের আলো ফেলেছেন। ওয়েবার আলো ফেলেছেন কর্মক্ষেত্রের ওপর, শ্মিট সার্বভৌমত্বের ওপর, টেইলর মানুষের মনের ওপর, আর কুরান অর্থনীতির ওপর। তাদের আলোতে আমরা দেখতে পাই, পশ্চিমের উত্থান এবং প্রাচ্যের স্থবিরতা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি ছিল ধর্মতত্ত্ব, আইন, এবং প্রতিষ্ঠানের এক দীর্ঘ জটিল মিথস্ক্রিয়া। এই তাত্ত্বিকদের ছাড়া আমাদের আধুনিকতা বোঝার চেষ্টা অনেকটা কম্পাস ছাড়া সমুদ্রে জাহাজ চালানোর মতোই হতো। তাদের চিন্তাগুলো একে অপরের সাথে তর্ক করে, কখনো একমত হয়, আবার কখনো সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলে। আর এই তাত্ত্বিক বিতর্কের মাধ্যমেই ইতিহাসের সত্যটা একটু একটু করে আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

উপসংহার

পুরো আলোচনার পর তাহলে সারকথা কী দাঁড়াল? পশ্চিমের এই যে চোখধাঁধানো উন্নয়ন, আইনের শাসন, আর প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা – এটা কি শুধুই কোনো ঐতিহাসিক কাকতালীয় ঘটনা? নাকি এর পেছনে কাজ করেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলতে থাকা এক গভীর ‘ধর্মতাত্ত্বিক ইঞ্জিনিয়ারিং’ (Theological Engineering)?

আমরা বিভিন্ন তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ বিশ্লেষণ করে দেখলাম, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের প্রাতিষ্ঠানিক পার্থক্যের মূলে নিছক সমাজে ধর্ম থাকা বা না থাকার বিষয়টি নাও থাকতে পারে। বরং পার্থক্যটা হয়তো রাষ্ট্র ও সমাজের কাঠামোতে ঈশ্বরকে ঠিক কোথায় স্থান দেওয়া হচ্ছে তার ওপর। এই বিশেষ ঐতিহাসিক পাঠ অনুযায়ী, খ্রিস্টীয় ঐতিহ্য – বিশেষ করে তার পশ্চিমা ধারাটি – ঈশ্বরকে অসীম সম্মানের সাথে এমন এক উচ্চ আসনে (Transcendence) বসিয়েছে, যেখান থেকে তিনি জগতকে দেখেন ঠিকই, কিন্তু চট করে দৈনন্দিন কার্যক্রমে হাত দেন না। তাত্ত্বিকরা যুক্তি দেন যে, এই ‘সেলফ-উইথড্রয়িং গড’ (Self-withdrawing God) বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া ঈশ্বরই আধুনিক পশ্চিমাকে জন্ম দেওয়ার প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধিতার মতো শোনালেও, এই তত্ত্ব অনুযায়ী পশ্চিমের ঈশ্বর সার্বভৌমত্ব ধরে রেখেও মানুষকে ‘ট্রাস্টি’ হিসেবে স্বাধীনতা দিয়েছেন। তিনি আইন সৃষ্টি করেও নিজেকে জাগতিক আইনের ঊর্ধ্বে তুলে নিয়েছেন এবং প্রকৃতিকে ‘প্রাকৃতিক নিয়মে’র (Natural Law) রাজত্বে ছেড়ে দিয়েছেন। এই ‘থিওলজিক্যাল কনসেশন’ (Theological Concession) বা ধর্মতাত্ত্বিক ছাড়টুকু না থাকলে আধুনিক বিজ্ঞান, গাণিতিক অর্থনীতি, পুঁজিবাদ কিংবা ধর্মনিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র – কোনোটাই হয়তো আজকের এই রূপ পেত না। কারণ, বিজ্ঞান বা অর্থনীতি কাজ করার জন্য এমন একটি জগতের দরকার হয়, যেখানে অলৌকিকতা বা মিরাকল প্রতিদিনের নিয়ম ভাঙে না। পশ্চিম হয়তো সেই ‘স্থির’ জগতটি পেয়েছিল তাদের বিশেষ ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর কারণেই।

বিপরীতক্রমে, মুসলিম বিশ্ব বা প্রাচ্যের অনেক সমাজেই ঈশ্বরকে এত বেশি ‘সক্রিয়’ (Active Agent) এবং ‘উপস্থিত’ (Immanent) রাখা হয়েছে যে, সেখানে মানুষের তৈরি সেক্যুলার প্রতিষ্ঠানগুলো ঈশ্বরের বিশাল ছায়ার নিচে বড় হওয়ার বা স্বকীয়তা অর্জনের সুযোগ হয়তো কম পেয়েছে। সেখানে যখনই ঈশ্বরকে সরিয়ে কোনো মানবসৃষ্ট আইন বা প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত ক্ষমতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, তখনই ‘ঐশ্বরিক আদেশ’ (Divine Command) এবং ‘মানবীয় যুক্তি’র (Human Reason) মধ্যে সংঘর্ষ বেধেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো হয়তো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি।

সুতরাং, এই বিশ্লেষণ কাঠামো অনুযায়ী, পশ্চিমের বিশেষত্ব হলো – ঈশ্বরকে শ্রদ্ধার সাথে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে (Private Sphere) পাঠিয়ে দিয়ে সমাজকে ‘অটোনমাস’ বা স্বয়ংক্রিয় (Autonomous) হতে দেওয়া। এটা কোনো জাদুর কাঠি নয়, এটা হলো মানুষের সাথে ঈশ্বরের সম্পর্কের এক বিশেষ বোঝাপড়া। যেখানে ঈশ্বর নিজেই যেন বলছেন, “আমি সরে দাঁড়াচ্ছি, যাতে তোমরা এবং তোমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো সাবালক হতে পারো।” পশ্চিমা সমাজ সেই সুযোগটা গ্রহণ করেছে এবং এমন এক জগত তৈরি করেছে যেখানে ব্যাংক চালাতে, বিচার করতে বা রাষ্ট্র চালাতে আর ঈশ্বরকে সরাসরি দরকার হয় না। এটি ঈশ্বরের জন্য ট্র্যাজেডি নাকি মানুষের মুক্তি – তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে এটুকু নিশ্চিত, ঈশ্বরের এই ‘সরে দাঁড়ানো’র ধারণাটুকু না থাকলে আজকের আধুনিক বিশ্ব হয়তো আমরা দেখতাম না। ইতিহাস আসলে বিজয়ী বা বিজিতের কোনো সাধারণ গল্প নয়; ইতিহাস হলো মানুষের মনের গহীনে এবং রাষ্ট্রের কাঠামোতে ঈশ্বরকে জায়গা দেওয়ার বা না দেওয়ার এক অনন্ত আখ্যান – যেখানে ‘ডি-থিওলজাইজেশন’ (De-theologization) বা শাসনব্যবস্থা থেকে ঈশ্বরকে বিযুক্ত করাই হয়ে দাঁড়িয়েছে আধুনিকতার এক অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

তথ্যসূত্র

  • Acemoglu, D., & Robinson, J. A. (2012). Why Nations Fail: The Origins of Power, Prosperity, and Poverty. Crown Currency.
  • Al-Azmeh, A. (2009). Ibn Khaldun: An Essay in Reinterpretation. Central European University Press.
  • Asad, T. (2003). Formations of the Secular: Christianity, Islam, Modernity. Stanford University Press.
  • Belloc, H. (1912). The Servile State. T.N. Foulis.
  • Berger, P. L. (1967). The Sacred Canopy: Elements of a Sociological Theory of Religion. Doubleday.
  • Berman, H. J. (1983). Law and Revolution: The Formation of the Western Legal Tradition. Harvard University Press.
  • Blumenberg, H. (1983). The Legitimacy of the Modern Age (R. M. Wallace, Trans.). MIT Press. (Original work published 1966).
  • Bossuet, J. B. (1709). Politics Drawn from the Very Words of Holy Scripture (P. Riley, Trans.). Cambridge University Press. (Original work published posthumously).
  • Casanova, J. (1994). Public Religions in the Modern World. University of Chicago Press.
  • Chesterton, G. K. (1926). The Outline of Sanity. Methuen & Co.
  • Diamond, J. (1997). Guns, Germs, and Steel: The Fates of Human Societies. W. W. Norton & Company.
  • Elias, N. (1978). The Civilizing Process. Urizen Books. (Original work published 1939).
  • Ferguson, N. (2011). Civilization: The West and the Rest. Penguin Books.
  • Filmer, R. (1991). Patriarcha and Other Writings (J. P. Sommerville, Ed.). Cambridge University Press. (Original work published 1680).
  • Fukuyama, F. (2011). The Origins of Political Order: From Prehuman Times to the French Revolution. Farrar, Straus and Giroux.
  • Funkenstein, A. (1986). Theology and the Scientific Imagination from the Middle Ages to the Seventeenth Century. Princeton University Press.
  • Gauchet, M. (1997). The Disenchantment of the World: A Political History of Religion. Princeton University Press.
  • Goitein, S. D. (1967). A Mediterranean Society: The Jewish Communities of the Arab World as Portrayed in the Documents of the Cairo Geniza. University of California Press.
  • Grant, E. (1996). The Foundations of Modern Science in the Middle Ages: Their Religious, Institutional and Intellectual Contexts. Cambridge University Press.
  • Gregory, B. S. (2012). The Unintended Reformation: How a Religious Revolution Secularized Society. Belknap Press.
  • Greif, A. (2006). Institutions and the Path to the Modern Economy: Lessons from Medieval Trade. Cambridge University Press.
  • Grotius, H. (1625). De Jure Belli ac Pacis (On the Law of War and Peace). Paris: Buon.
  • Habermas, J. (1989). The Structural Transformation of the Public Sphere: An Inquiry into a Category of Bourgeois Society (T. Burger, Trans.). MIT Press. (Original work published 1962).
  • Hallaq, W. B. (2012). The Impossible State: Islam, Politics, and Modernity’s Moral Predicament. Columbia University Press.
  • Hansmann, H., & Kraakman, R. (2000). The Essential Role of Organizational Law. The Yale Law Journal, 110(3), 387–440.
  • Henrich, J. (2020). The WEIRDest People in the World: How the West Became Psychologically Peculiar and Particularly Prosperous. Farrar, Straus and Giroux.
  • Hodgson, M. G. S. (1974). The Venture of Islam: Conscience and History in a World Civilization (Vol. 1-3). University of Chicago Press.
  • Hourani, A. (1983). Arabic Thought in the Liberal Age, 1798–1939. Cambridge University Press.
  • Huff, T. E. (2003). The Rise of Early Modern Science: Islam, China, and the West. Cambridge University Press.
  • Ibn Rushd. (1954). The Incoherence of the Incoherence (S. Van Den Bergh, Trans.). Luzac & Co. (Original work published 12th Century).
  • Kantorowicz, E. H. (1957). The King’s Two Bodies: A Study in Mediaeval Political Theology. Princeton University Press.
  • Kuran, T. (2011). The Long Divergence: How Islamic Law Held Back the Middle East. Princeton University Press.
  • Landes, D. S. (1998). The Wealth and Poverty of Nations: Why Some Are So Rich and Some So Poor. W. W. Norton & Company.
  • Lefort, C. (1988). Democracy and Political Theory. Polity Press.
  • Leo XIII. (1891). Rerum Novarum: Encyclical of Pope Leo XIII on Capital and Labor. Vatican Press.
  • Locke, J. (1988). Two Treatises of Government (P. Laslett, Ed.). Cambridge University Press. (Original work published 1689).
  • Mahdi, M. (1957). Ibn Khaldun’s Philosophy of History: A Study in the Philosophic Foundation of the Science of Culture. University of Chicago Press.
  • Makdisi, G. (1981). The Rise of Colleges: Institutions of Learning in Islam and the West. Edinburgh University Press.
  • McCloskey, D. N. (2010). Bourgeois Dignity: Why Economics Can’t Explain the Modern World. University of Chicago Press.
  • Mokyr, J. (2002). The Gifts of Athena: Historical Origins of the Knowledge Economy. Princeton University Press.
  • North, D. C. (1990). Institutions, Institutional Change and Economic Performance. Cambridge University Press.
  • Pius IX. (1864). The Syllabus of Errors. Vatican Press.
  • Pomeranz, K. (2000). The Great Divergence: China, Europe, and the Making of the Modern World Economy. Princeton University Press.
  • Rahman, F. (1982). Islam and Modernity: Transformation of an Intellectual Tradition. University of Chicago Press.
  • Renan, E. (1866). Averroès et l’Averroïsme: Essai Historique. Michel Lévy Frères.
  • Said, E. W. (1978). Orientalism. Pantheon Books.
  • Saliba, G. (2007). Islamic Science and the Making of the European Renaissance. MIT Press.
  • Schmitt, C. (1922). Political Theology: Four Chapters on the Concept of Sovereignty. MIT Press (Translated edition).
  • Stark, R. (2005). The Victory of Reason: How Christianity Led to Freedom, Capitalism, and Western Success. Random House.
  • Tawney, R. H. (1926). Religion and the Rise of Capitalism. Harcourt, Brace and Company.
  • Taylor, C. (2007). A Secular Age. Belknap Press of Harvard University Press.
  • Tilly, C. (1990). Coercion, Capital, and European States, AD 990–1990. Blackwell.
  • Tufi, N. (1987). Risalah fi Ri’ayat al-Maslahah (M. Z. al-Qasimi, Ed.). Dar al-Kutub al-Misriyah. (Original work published 14th Century).
  • Weber, M. (1905). The Protestant Ethic and the Spirit of Capitalism. Routledge (Translated edition).
  • Williams, E. (1944). Capitalism and Slavery. University of North Carolina Press.

Leave a comment

Your email will not be published.