বিজ্ঞানঅবশ্যপাঠ্যসম্পাদকীয়

পৃথিবী আগে সৃষ্টি নাকি মহাকাশ?

Table of Contents

সংক্ষিপ্তসার (Abstract)

এই গবেষণাধর্মী প্রবন্ধে ইসলামি সৃষ্টিতত্ত্বের (কোরআন ও প্রচলিত হাদিস-বর্ণনা) একটি নির্দিষ্ট কালানুক্রমিক দাবি—অর্থাৎ “পৃথিবীকে প্রস্তুত/প্রাণোপযোগী করার পর আকাশমণ্ডলীকে ধোঁয়া-অবস্থা থেকে স্তরে-স্তরে সাজানো, এবং শেষে নক্ষত্র/প্রদীপমালায় সুশোভিত করা”—কে আধুনিক কসমোলজি, জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান, ভূ-তত্ত্ব এবং গ্রহবিজ্ঞান থেকে পাওয়া পর্যবেক্ষণলব্ধ সময়রেখার সাথে তুলনা করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশ্লেষণের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সহজ কিন্তু পরীক্ষাযোগ্য প্রশ্ন: মহাবিশ্বের বিবর্তনের বাস্তব সময়রেখায় পৃথিবী কি “প্রথম/আগে” এবং আকাশ কি “পরে ধোঁয়া থেকে সাজানো”—এই ক্রমটি টিকে থাকে, নাকি উল্টোটা?

আধুনিক বৈজ্ঞানিক কনসেনসাস অনুযায়ী মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর (ΛCDM মডেল ও মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণসমূহের ভিত্তিতে), আর পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪.৫৪ ± ০.০৫ বিলিয়ন বছর (রেডিওমেট্রিক ডেটিং, উল্কাপিণ্ড/প্রাচীন খনিজ বিশ্লেষণ ইত্যাদির সমন্বিত প্রমাণে)। ফলে মহাবিশ্বের ইতিহাসের প্রায় ৯.৩ বিলিয়ন বছর সময় জুড়ে পৃথিবীর কোনো অস্তিত্বই ছিল না—এটাই তুলনার জন্য সবচেয়ে “লোড-বিয়ারিং” (মূল ভরকেন্দ্রীয়) ফ্যাক্ট।

এই ফ্যাক্টকে কেন্দ্র করে প্রবন্ধটি দেখায়: (ক) নক্ষত্র-গ্যালাক্সি পৃথিবীর বহু আগে বিদ্যমান ছিল—পৃথিবী “আদি” বস্তু নয়, বরং অনেক পরের উৎপাদ; (খ) “আকাশ ধোঁয়া ছিল”—জাতীয় বর্ণনা যদি পৃথিবীর পরে আকাশের দিকে মনোযোগ/সাজানোকে ইঙ্গিত করে, তবে তা আধুনিক মহাজাগতিক বিবর্তনের সাথে ব্যাপকভাবে সাংঘর্ষিক; এবং (গ) যেসব ব্যাখ্যায় “দিন”কে দীর্ঘ “পর্ব/এপক” বলা হয়, তাতেও ক্রম–সংক্রান্ত সমস্যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিটে যায় না, কারণ এখানে বিতর্কটি প্রধানত sequence conflict (আগে–পরে) নিয়ে।

পদ্ধতি (Method): (১) কোরআন/হাদিস থেকে সংশ্লিষ্ট ক্রম-সংক্রান্ত দাবিগুলো আলাদা করা, (২) আধুনিক কসমোলজি ও পৃথিবীবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত টাইমলাইন (বিগ ব্যাং → প্রথম নক্ষত্র/গ্যালাক্সি → সূর্য/সৌরজগত → পৃথিবী → মহাসাগর/বায়ুমণ্ডল) সাজানো, (৩) দুই সময়রেখার “অনিবার্য মিল/অমিল” কোথায় তৈরি হচ্ছে—তা তুলনামূলকভাবে ম্যাপ করা।

সীমাবদ্ধতা (Limitations): এই প্রবন্ধ “আল্লাহ আছেন/নেই” বা “ইসলাম সত্য/মিথ্যা”—এ প্রশ্ন নিষ্পত্তি করে না। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর ফোকাস করে: প্রাচীন ধর্মীয় টেক্সটে উপস্থিত মহাজাগতিক সময়রেখা-দাবির সাথে আধুনিক পর্যবেক্ষণ-ভিত্তিক টাইমলাইনের সামঞ্জস্য/অসামঞ্জস্য। তাছাড়া হাদিস-সমূহের সংকলন, বর্ণনাকারী-শৃঙ্খল, এবং পরবর্তী ব্যাখ্যাগত মতভেদ, তাফসীর—এসবও বিবেচ্য; উদাহরণস্বরূপ, সৃষ্টির সপ্তাহের দিনভিত্তিক একটি বিখ্যাত বর্ণনা (মুসলিম ২৭৮৯) ঐতিহাসিকভাবে বিতর্কিত/সমালোচিত—এ ধরনের ক্ষেত্রে প্রবন্ধটি “টেক্সট আছে” বনাম “টেক্সটের অবস্থান নিয়ে মতভেদ আছে”—দুটোই আলাদা করে চিহ্নিত করবে।


ভূমিকা

ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্ব সাধারণত দুই ধরনের দাবি করে: (১) “কেন/কার ইচ্ছায় সৃষ্টি”—জাতীয় উদ্দেশ্য/টেলিওলজি, এবং (২) “কখন/কীভাবে/কোন ক্রমে সৃষ্টি”—জাতীয় ঘটনা-ক্রম বা টাইমলাইন। প্রথমটি মূলত দার্শনিক/ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্র; কিন্তু দ্বিতীয়টি অন্তত আংশিকভাবে পর্যবেক্ষণযোগ্য বাস্তবতার সাথে তুলনা করা যায়, কারণ আধুনিক বিজ্ঞান মহাবিশ্ব ও পৃথিবীর ইতিহাসকে বিভিন্ন স্বাধীন পদ্ধতির (মহাজাগতিক বিকিরণ/প্রসারণ-পরিমাপ, নক্ষত্র-বিবর্তন মডেলিং, রেডিওমেট্রিক ডেটিং, উল্কাপিণ্ড-রসায়ন, প্রাচীন শিলা/খনিজ) সমন্বয়ে টাইমলাইনে বসাতে সক্ষম হয়েছে।

এই প্রবন্ধে আলোচ্য ইসলামি বর্ণনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো: পৃথিবীকে “স্থাপন/প্রস্তুত” করা, তাতে খাদ্য/পর্বত/ব্যবস্থা নিশ্চিত করা—এর পরে “ধোঁয়া-অবস্থার” আকাশকে স্তরে স্তরে বিন্যস্ত করা এবং নক্ষত্ররাজি দ্বারা সাজানো—এমন একটি ধারাবর্ণনা। আপনার ড্রাফটে এই দাবি-গুচ্ছকে কুরআনের (বিশেষ করে ৪১:৯–১২) বক্তব্য-ধারার সাথে যুক্ত করে দেখানো হয়েছে, এবং পরে তা আধুনিক কসমোলজির টাইমলাইনের সাথে তুলনা করা হয়েছে।

এখানে মূল সমস্যা “ধর্মগ্রন্থ বিজ্ঞান বই কিনা”—এ জাতীয় সাধারণ বিতর্ক নয়। বরং সমস্যা হলো: যদি একটি টেক্সট নির্দিষ্ট ক্রমে সৃষ্টির কথা বলে, এবং সেই ক্রম যদি পর্যবেক্ষণলব্ধ ইতিহাসের সাথে ধারাবাহিকভাবে উল্টো/অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবে সেটি টেক্সটটির উৎপত্তি-পরিবেশ (প্রাক-বৈজ্ঞানিক বিশ্ববীক্ষা, আকাশকে স্তরভাগ, নক্ষত্রকে প্রদীপমালা, ধোঁয়া-আকাশ ইত্যাদি ধারণা) সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়—এটাই এই গবেষণার থিসিস।

অতএব, প্রবন্ধটি তিনটি গবেষণা-প্রশ্ন সামনে রাখছে: (১) ইসলামি টেক্সটে উপস্থাপিত “পৃথিবী–আকাশ” সৃষ্টিক্রম ঠিক কীভাবে দাঁড়ায় (টেক্সচুয়াল রিডিং), (২) আধুনিক বৈজ্ঞানিক টাইমলাইনে পৃথিবী ও নক্ষত্র/গ্যালাক্সির অবস্থান কোথায় (এভিডেন্স-বেসড টাইমলাইন), এবং (৩) এই দুইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব যদি তৈরি হয়—তা কি কেবল “দিন” শব্দের ব্যাখ্যায় মিটে যায়, নাকি দ্বন্দ্বটি মূলত “আগে–পরে ক্রম”–এর স্তরে থেকেই যায় (বিশ্লেষণ/ইমপ্লিকেশন)।

পরবর্তী অংশগুলোতে (ক) প্রাচীন বিশ্বের সাধারণ কসমোলজি-ধারণা কী ছিল, (খ) মহাবিশ্ব ও পৃথিবীর বয়স/বিবর্তনের বৈজ্ঞানিক টাইমলাইন কীভাবে দাঁড়ায়, (গ) ইসলামি সূত্রগুলোতে সৃষ্টির আগে-পরে কী কী বর্ণনা আছে, এবং (ঘ) শেষাংশে দুইটি টাইমলাইন ডায়াগ্রামের মাধ্যমে তুলনাটি দৃশ্যমানভাবে উপস্থাপন করা হবে।


প্রাচীন বিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব ও মহাজাগতিক ধারণা

আধুনিক কসমোলজি/গ্রহবিজ্ঞান তৈরি হওয়ার বহু আগে মানুষের মহাবিশ্ব-ধারণা গড়ে উঠেছিল মূলত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতা, লোককথা, ধর্মীয় কল্পনা, এবং সীমিত পর্যবেক্ষণের ওপর। আকাশের দিকে তাকালে দেখা যায়—সূর্য ওঠে-ডোবে, চাঁদ ঘুরে বেড়ায়, নক্ষত্রগুলো একরকম “স্থির” থেকে রাতভর পুরো আকাশপটে ঘুরে যায়। আবার পৃথিবীতে দেখা যায়—কোনো বস্তু ছেড়ে দিলে তা “নিচে” পড়ে। এই দুই ধরনের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে বহু সভ্যতায় এমন একটি “কমন-সেন্স” কসমোলজি গড়ে ওঠে, যেখানে পৃথিবীকে স্থির/কেন্দ্রে ধরা হয়, আর আকাশকে কোনো না কোনোভাবে স্তরভাগ/বেষ্টনী/ছাদের মতো কল্পনা করা হয়। [1]

এই “কমন-সেন্স” কসমোলজির একটি প্রভাবশালী প্রশ্ন ছিল: পৃথিবী যদি কোথাও “ভর” করে না থাকে, তবে তা পড়ে যাচ্ছে না কেন? মহাকর্ষ (gravity) বা কক্ষপথগত গতি (orbital dynamics) সম্পর্কে তাত্ত্বিক কাঠামো না থাকায় প্রাচীন চিন্তায় “পৃথিবীকে ধরে রাখার” জন্য প্রয়োজন পড়ে কোনো দৃঢ় ভিত্তি—স্তম্ভ, পর্বত, প্রোথিত শিকড়, বা বিশ্বসমুদ্রের ওপর ভাসমান কোনো ডিস্ক—জাতীয় ধারণার। এ ধরনের ধারণা শুধুই “অজ্ঞতা” নয়; বরং এটি ছিল সীমিত উপকরণে বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করার একটি ঐতিহাসিক চেষ্টা। [2]

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: প্রাচীন কসমোলজিগুলো প্রায়ই “আকাশ”কে নিছক ফাঁকা শূন্যস্থান (vacuum) হিসেবে কল্পনা করেনি। বরং অনেক ঐতিহ্যে আকাশকে কল্পনা করা হয়েছে—

  • স্তরভাগ/স্তরে-স্তরে সাজানো অঞ্চল (multiple heavens বা layered heavens);
  • কঠিন/দৃঢ় বেষ্টনী বা ছাদ (firmament/raqia টাইপ ধারণা);
  • “উপরে পানি” বনাম “নিচে পানি”—এক ধরনের কসমিক জলভাণ্ডার, যেখান থেকে বৃষ্টি/ঝর্ণা/সমুদ্র ব্যাখ্যা করা হয়; এবং
  • দরজা/জানালা/গেটওয়ে—যার মাধ্যমে সূর্য-চাঁদ-নক্ষত্র চলাচল করে, বা যেখান দিয়ে “উপরের পানি” নেমে আসে।

এই মোটিফগুলো (firmament, upper waters, pillars/ foundations, layered heavens) প্রাচীন নিকটপ্রাচ্য (Ancient Near East), ইহুদি-খ্রিস্টীয় বাইবেলীয় সাহিত্য, এবং পরবর্তী লেট-অ্যান্টিক কসমোলজিগুলোতে বহুভাবে উপস্থিত—কখনো আক্ষরিক, কখনো রূপক, কখনো মিশ্র আকারে। [3]

গ্রিক-রোমান (ক্লাসিক্যাল) কসমোলজি: ভূকেন্দ্রিকতা ও আকাশ-গোলক

প্রাচীন গ্রিক দর্শন-জ্যোতির্বিদ্যায় একটি দীর্ঘকাল প্রভাবশালী কাঠামো ছিল ভূকেন্দ্রিক (geocentric) বিশ্বমডেল। এখানে পৃথিবীকে কেন্দ্র/স্থির ধরে আকাশকে কল্পনা করা হয় একাধিক গোলক/স্ফেয়ার (celestial spheres) হিসেবে—চাঁদের গোলক, গ্রহদের গোলক, এবং সবচেয়ে বাইরের দিকে “স্থির নক্ষত্রের” গোলক। এর ফলে আকাশকে “স্তর” বা “সপ্ত” ইত্যাদি ভাগে ভাবা সাংস্কৃতিকভাবে অস্বাভাবিক ছিল না; বরং এটি নির্দিষ্ট সময়ের জ্ঞান-পরিমণ্ডলে একটি স্বাভাবিক ধারণা হয়ে উঠেছিল। [4]

এরিস্টটলের প্রাকৃতিক দর্শনে “সাবলুনারি” (চাঁদের নিচের জগৎ) আর “সুপারলুনারি” (চাঁদের ওপরের জগৎ)—এই দ্বিখণ্ডন গুরুত্বপূর্ণ। সাবলুনারি অঞ্চলে চার উপাদান, জন্ম-মৃত্যু, পরিবর্তন—এসব; আর সুপারলুনারিতে বৃত্তীয়/চিরন্তন গতি, “আকাশীয় পদার্থ” (aether) এবং অপেক্ষাকৃত নিখুঁত নিয়মিততা—এমন ধারণা দেখা যায়। ফলে আকাশের জগতকে “ভিন্ন প্রকৃতির” স্তর/ডোমেইন হিসেবে কল্পনা করার বুদ্ধিবৃত্তিক জমি তৈরি হয়। [5]

পরবর্তীতে টলেমির (Ptolemy) গাণিতিক জ্যোতির্বিদ্যা ভূকেন্দ্রিক কাঠামোর ভেতরেই সূর্য-চাঁদ-গ্রহের পর্যবেক্ষিত গতি ব্যাখ্যা করতে deferent/epicycle জাতীয় জ্যামিতিক নির্মাণ ব্যবহার করে, যা দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষিত মহলে মান্যতা পায়। এই “স্তরে-স্তরে আকাশ” ধারণা তাই শুধু ধর্মীয় কল্পনা নয়—ক্লাসিক্যাল বিজ্ঞান-ঐতিহ্যেও নানা রূপে টিকে ছিল। [6]

লেট অ্যান্টিক প্রেক্ষাপট ও “সপ্ত আকাশ” ধারণার সাংস্কৃতিক বিস্তার

লেট অ্যান্টিক যুগে (প্রায় ৩য়–৭ম শতক) ভূমধ্যসাগরীয়-নিকটপ্রাচ্যের ধর্মীয়/দার্শনিক পরিবেশে “বহুস্তর স্বর্গ/আকাশ” (multiple heavens) ধারণা বিভিন্ন ধারায় ঘুরে বেড়ায়—ইহুদি রহস্যবাদ, খ্রিস্টীয় ব্যাখ্যাপ্রথা, হেলেনিস্টিক জ্যোতির্বিদ্যা, এবং স্থানীয় কসমোলজি—সব মিলিয়ে। এই পটভূমিতে কোরআনের কসমোলজি নিয়ে আধুনিক একাডেমিক গবেষণায় “লেট অ্যান্টিক ব্যাকগ্রাউন্ড” গুরুত্ব পায়—অর্থাৎ, টেক্সটটি যে সাংস্কৃতিক-জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিবেশে গঠিত, তার সাথে সাদৃশ্য/সংলাপ খোঁজা হয়। [7]

সুতরাং, যখন কোনো ধর্মগ্রন্থ “আকাশকে ধোঁয়া অবস্থায় পাওয়া”, “আকাশকে স্তরে-স্তরে বিন্যস্ত করা”, বা “নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালায় সুশোভিত করা”—জাতীয় ভাষায় কথা বলে, তখন সেটিকে বুঝতে হলে শুধু আধুনিক বিজ্ঞান-জ্ঞান নয়; বরং প্রাচীন/লেট-অ্যান্টিক বিশ্ববীক্ষার সাধারণ মোটিফগুলোও বিবেচনায় আনতে হয়। এই প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে তাই প্রথমে আধুনিক পর্যবেক্ষণ-ভিত্তিক টাইমলাইন (কসমোলজি→নক্ষত্র→সৌরজগত→পৃথিবী) সাজানো হবে, তারপর দেখা হবে—ধর্মীয় টেক্সটের বর্ণিত ক্রম (sequence) ওই টাইমলাইনের সাথে কোথায় মেলে/কোথায় ভাঙে।


মহাবিশ্বের উদ্ভব এবং কালানুক্রমিক বিবর্তন

আধুনিক বিশ্বতত্ত্ব বা কসমোলজির সংজ্ঞায়, মহাবিশ্ব কেবল আমাদের দৃশ্যমান গ্রহ-নক্ষত্রের সমষ্টি নয়। এটি হলো স্থান (Space), কাল (Time), সমস্ত প্রকার পদার্থ (Matter) এবং শক্তির (Energy) একটি জটিল ও অখণ্ড বুনন। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে দৃশ্যমান সাধারণ পদার্থ, রহস্যময় গুপ্ত পদার্থ (Dark Matter), তমোশক্তি (Dark Energy), এবং মহাজাগতিক বিকিরণ। আধুনিক বিজ্ঞানে মহাবিশ্বের বিবর্তন ব্যাখ্যা করার জন্য সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মডেল হলো Lambda CDM (Lambda Cold Dark Matter) নকশা।

মহাবিশ্বের বয়স ও আদি অবস্থা

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এডুইন হাবলের পর্যবেক্ষণ এবং পরবর্তীতে মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ (Cosmic Microwave Background Radiation) বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের একটি নির্ভুল বয়স নির্ধারণ করেছেন। বর্তমানে মহাবিশ্বের বয়স আনুমানিক ১৩.৮ বিলিয়ন বা ১,৩৮০ কোটি বছর

মহাবিশ্বের আদিমতম অবস্থায় কোনো গ্রহ, নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির অস্তিত্ব ছিল না। বিগ ব্যাং-এর পরবর্তী কয়েক লক্ষ বছর মহাবিশ্ব ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত এবং আয়নিত প্লাজমায় পূর্ণ একটি ঘন পিণ্ড। এরপর কয়েক কোটি বছর ধরে মহাকর্ষ বলের প্রভাবে আদিম গ্যাসীয় মেঘ ঘনীভূত হয়ে প্রথম প্রজন্মের নক্ষত্রসমূহ তৈরি করে।


পৃথিবীপূর্ব মহাজাগতিক ইতিহাস: ৯৩০ কোটি বছরের ব্যবধান

আপনার প্রবন্ধের মূল আলোচনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হলো মহাবিশ্ব সৃষ্টি এবং পৃথিবীর জন্মের মধ্যবর্তী সুদীর্ঘ সময়ের ব্যবধান।

  • মহাবিশ্বের বয়স: ১৩.৮ বিলিয়ন বছর।
  • পৃথিবীর বয়স: ৪.৫ বিলিয়ন বছর।
  • পার্থক্য: ৯.৩ বিলিয়ন বা ৯৩০ কোটি বছর।

অর্থাৎ, মহাবিশ্ব সৃষ্টির পর প্রায় ৯৩০ কোটি বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর পৃথিবীর জন্ম হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে মহাবিশ্বে কোটি কোটি গ্যালাক্সি গঠিত হয়েছে এবং অসংখ্য বিশালকায় নক্ষত্রের জন্ম ও মৃত্যু (সুপারনোভা) ঘটেছে। এই মৃত নক্ষত্রগুলোর ভেতরেই মূলত লোহা, কার্বন, অক্সিজেন এবং সিলিকনের মতো ভারী মৌলগুলো তৈরি হয়েছিল, যা পরবর্তীতে পৃথিবী এবং মানুষের দেহের মতো কঠিন বস্তু গঠনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আসুন জেনে নিই, এই পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুসারে মহাবিশ্ব এবং পৃথিবীর উদ্ভব সম্পর্কে বিজ্ঞান কী বলছে।


পৃথিবীর উৎপত্তি ও বয়স: একটি মহাজাগতিক কালানুক্রম

সৌরজগতের গঠন ও বিবর্তনের ইতিহাসে পৃথিবী নামক গ্রহটির উদ্ভব একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কিন্তু অপেক্ষাকৃত পরবর্তী পর্যায়ের ঘটনা। আধুনিক জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান ও ভূ-তত্ত্বের সমন্বিত গবেষণা অনুযায়ী, পৃথিবী সৌরজগতের সূর্য থেকে দূরত্বের ক্রমানুসারে তৃতীয় এবং এর আটটি গ্রহের মধ্যে পঞ্চম বৃহত্তম। এটি মূলত একটি পাথুরে বা ‘টেরেসট্রিয়াল’ (Terrestrial) গ্রহ, যা এর উচ্চ ঘনত্ব এবং কঠিন ভূত্বকের জন্য পরিচিত।

পৃথিবীর বয়স ও গঠন প্রক্রিয়া

তেজস্ক্রিয় ডেটিং (Radiometric Dating) এবং উল্কাপিণ্ড বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, আজ থেকে প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী গঠিত হয়েছিল। মহাজাগতিক ধূলিকণা এবং গ্যাসের ঘনীভবন (Accretion) প্রক্রিয়ায় সূর্যের জন্মের কিছুকাল পরে পৃথিবীর আদি রূপ তৈরি হয়।

তবে মহাজাগতিক প্রেক্ষাপটে এই সময়কালটি মোটেও আদিম নয়। মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর, যার অর্থ হলো মহাবিশ্ব সৃষ্টি হওয়ার প্রায় ৯ বিলিয়ন বছর পর পৃথিবীর জন্ম হয়েছে। অর্থাৎ, মহাবিশ্বের ইতিহাসের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সময় পৃথিবীর কোনো অস্তিত্বই ছিল না।


গ্রহীয় বয়সের বৈচিত্র্য: ট্রাপিস্ট-১ (TRAPPIST-1) সিস্টেম

পৃথিবীই মহাবিশ্বের প্রথম বা প্রাচীনতম গ্রহ নয়—এই সত্যটি প্রমাণের জন্য ‘ট্রাপিস্ট-১’ একটি চমৎকার উদাহরণ। ৩৯ আলোকবর্ষ দূরে কুম্ভ নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত এই অতি-শীতল বামন তারকাটিকে (Ultra-cool dwarf star) কেন্দ্র করে সাতটি পৃথিবী-সদৃশ্য গ্রহ আবর্তিত হচ্ছে।

  • আবিষ্কারের ইতিহাস: ২০১৫ সালে চিলির ‘লা সিলা’ মানমন্দিরে মাইকেল গিলনের নেতৃত্বে ‘ট্রানজিট ফটোমেট্রি’ পদ্ধতিতে এটি আবিষ্কৃত হয়। পরবর্তীতে নাসার ‘স্পিটজার স্পেস টেলিস্কোপ’ (Spitzer Space Telescope) এবং ‘ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ’ (VLT) এর সাহায্যে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়।
  • বয়সের তুলনা: গবেষণার উপাত্ত অনুযায়ী, ট্রাপিস্ট-১ সিস্টেমের বয়স প্রায় ৫.৪ থেকে ৯.৮ বিলিয়ন বছর। অর্থাৎ, এই সিস্টেমের গ্রহগুলো আমাদের পৃথিবীর চেয়ে কয়েক বিলিয়ন বছর আগে থেকেই মহাকাশে বিদ্যমান ছিল। এটি প্রমাণ করে যে, পৃথিবী সৃষ্টির অনেক আগেই মহাকাশে গ্রহ ও নক্ষত্রমণ্ডলীর জটিল বিন্যাস সম্পন্ন হয়েছিল।

মহাবিশ্বের প্রাচীনতম গ্রহ: মেথুসেলা (PSR B1620-26 b)

পৃথিবীর বয়স যে মহাজাগতিক টাইমলাইনে খুবই নগণ্য, তার চূড়ান্ত প্রমাণ হলো এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রাচীনতম গ্রহ PSR B1620-26 b, যা ‘মেথুসেলা’ (Methuselah) নামে পরিচিত।

  • বয়স: এই গ্রহটির আনুমানিক বয়স প্রায় ১২.৭ বিলিয়ন বছর
  • তাৎপর্য: এটি বিগ ব্যাং-এর মাত্র ১ বিলিয়ন বছর পরেই গঠিত হয়েছিল। যখন পৃথিবীর কোনো চিহ্নই ছিল না, এমনকি আমাদের সূর্যও তৈরি হয়নি, তার প্রায় ৮ বিলিয়ন বছর আগে থেকেই এই গ্রহটি মহাকাশে বিদ্যমান ছিল।

এই তথ্যগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ যৌক্তিক সিদ্ধান্ত প্রদান করে: মহাবিশ্ব বা আকাশমণ্ডলী সৃষ্টির কয়েক বিলিয়ন বছর পর পৃথিবী গঠিত হয়েছে। সুতরাং, কোনো তত্ত্বে বা প্রাচীন গ্রন্থে যদি দাবি করা হয় যে পৃথিবী সৃষ্টির সময় আকাশমণ্ডলী ‘ধোঁয়া’ (Smoke) অবস্থায় ছিল বা পৃথিবী আগে সৃষ্টি হয়েছে, তবে তা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের অকাট্য প্রমাণের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। পৃথিবী মহাবিশ্বের আদিকাল থেকে নেই, বরং এটি মহাজাগতিক বিবর্তনের একটি অনেক পরের উৎপাদন।


পৃথিবীর গতিশীলতা বনাম স্থিরতাঃ ইসলাম ও বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং ভূ-তত্ত্বের (Geology) অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হলো পৃথিবীর গতিশীলতা। পৃথিবী তার নিজ অক্ষের ওপর আবর্তন (Rotation) করছে এবং সূর্যের চারদিকে পরিভ্রমণ (Revolution) করছে। তবে প্রাচীন সৃষ্টিতাত্ত্বিক বর্ণনা এবং ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিক সূত্রগুলোতে পৃথিবীকে একটি স্থির এবং অটল বস্তু হিসেবে চিত্রিত করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

পৃথিবী 1

পৃথিবী স্থির রাখার ঐশ্বরিক দাবি

কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আসমান ও জমিনকে ‘স্থানচ্যুত হওয়া’ বা ‘টলে যাওয়া’ থেকে রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। এই বর্ণনাগুলো থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, পৃথিবী এবং আকাশমন্ডলী একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে স্থির রয়েছে এবং স্রষ্টা সেগুলোকে ধারণ করে রেখেছেন যাতে সেগুলো নড়াচড়া না করে।[8]

আল্লাহই আসমান ও যমীনকে স্থির রাখেন যাতে ও দু’টো টলে না যায়। ও দু’টো যদি টলে যায় তাহলে তিনি ছাড়া কে ও দু’টোকেস্থির রাখবে? তিনি পরম সহিষ্ণু, পরম ক্ষমাশীল।
— Taisirul Quran
আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে সংরক্ষণ করেন যাতে ওরা স্থানচ্যূত না হয়, ওরাস্থানচ্যূত হলে তিনি ব্যতীত কে ওদেরকে সংরক্ষণ করবে? তিনি অতি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনকে ধরে রাখেন যাতে এগুলো স্থানচ্যুত না হয়। আর যদি এগুলোস্থানচ্যুত হয়, তাহলে তিনি ছাড়া আর কে আছে, যে এগুলোকে ধরে রাখবে? নিশ্চয় তিনি পরম সহনশীল, অতিশয় ক্ষমাপরায়ণ।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় আল্লাহ্‌ আসমানসমূহ ও যমীনকে ধারণ করেন, যাতে তারা স্থানচ্যুত না হয়, আর যদি তারাস্থানচ্যুত হয়, তবে তিনি ছাড়া কেউ নেই যে, তাদেরকে ধরে রাখতে পারে [১]। নিশ্চয় তিনি অতি সহনশীল, অসীম ক্ষমাপরায়ণ।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
[ কোরআন ৩৫ঃ৪১ ]


কাবার সরাসরি উপরে বায়তুল মামুর

ইসলামী হাদিস ও তাফসীর গ্রন্থসমূহে এমন একটি ধারণার উল্লেখ পাওয়া যায় যে, পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল বলে বিবেচিত ( ইসলাম অনুসারে) কাবা শরীফের ‘ঠিক ওপরে’ সাত আসমানের ওপরে রয়েছে একটি অলৌকিক মসজিদ — বায়তুল মামুর। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমসহ একাধিক হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত আছে যে এটি ফেরেশতাদের উপাসনাস্থল, যা আল্লাহর আরশের নিকটে অবস্থান করে এবং কাবার প্রতিচ্ছবি হিসেবে বিবেচিত হয়। তাফসীর গ্রন্থগুলোতে বিবরণ পাওয়া যায় যে, এই মসজিদটির অবস্থান পৃথিবীর কাবার ঠিক বরাবর উপরে।

এ ধরনের ধারণা মুসলিমদের মাঝে দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত থাকলেও, আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান এবং দর্শনের আলোকে এটি পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় — বায়তুল মামুর সম্পর্কিত দাবি বাস্তবিক, ভৌত বা বৈজ্ঞানিক দিক থেকে সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য এবং কেবল ধর্মীয় রূপকথার গল্প হিসেবে বিশ্লেষিত হওয়া উচিত। এই বক্তব্য থেকে এটিও বোঝা যায় যে, মুহাম্মদের দৃষ্টিতে পৃথিবী নামক গ্রহটি একটি স্থির বস্তুই ছিল। আসুন এই বিষয়ে আহমদুল্লাহ সাহেবের একটি বক্তব্য শুনে নিই, এরপরে আমরা তাফসীরগুলোতে দেখবো।


তাফসীরে যাকারিয়া

তাফসীরে জাকারিয়াতে খুব পরিষ্কারভাবে বলা আছে, বায়তুল মামুর নামক আসমানি মসজিদ দুনিয়ার কাবার ঠিক উপরে রয়েছে। [9]

পৃথিবী 3

তাফসীরে মাযহারী

এবারে আসুন তাফসীরে মায়হারী থেকে দেখে নেয়া যাক, [10]

পৃথিবী 5

তাফসীরে ইবনে কাসীর

এবারে আসুন দেখি তাফসীরে ইবনে কাসিরে কী বলা হয়েছে, [11]

পৃথিবী 7
পৃথিবী 9

স্থিতিশীলতার উপাদান হিসেবে পর্বতমালার ভূমিকা

ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, পৃথিবীর ভারসাম্য বজায় রাখা এবং মানুষের বসবাসের সুবিধার্থে একে নড়াচড়া (Shake/Tilt) থেকে বিরত রাখতে পর্বতমালার সৃষ্টি করা হয়েছে। এখানে পর্বতকে ‘খুঁটি’ বা ‘ভারসাম্য রক্ষাকারী ওজন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, পাহাড় পর্বত না থাকলে পৃথিবীর ঢলে পড়ার সম্ভাবনা ছিল! [12]

তিনি আকাশমন্ডলী নির্মাণ করেছেন স্তম্ভ ছাড়া যা তোমরা দেখছ। তিনি পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন দৃঢ়ভাবে দন্ডায়মান পর্বতমালাযাতে পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে নড়াচড়া না করে আর তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সকল প্রকার জীবজন্তু, আর আমিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি, অতঃপর তাতে উদ্গত করি যাবতীয় কল্যাণকর উদ্ভিদ।
— Taisirul Quran
তিনি আকাশমন্ডলী নির্মাণ করেছেন স্তম্ভ ব্যতীত, তোমরা এটা দেখছ। তিনিই পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন পবর্তমালা যাতে এটাতোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্ব প্রকার জীব-জন্তু এবং আমিই আকাশ হতে বারি বর্ষণ করে এতে উদ্ভব করি সর্বপ্রকার কল্যাণকর উদ্ভিদ।
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনি খুঁটি ছাড়া আসমানসমূহ সৃষ্টি করেছেন, যা তোমরা দেখছ, আর যমীনে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পাহাড়, যাতে তাতোমাদেরকে নিয়ে হেলে না পড়ে, আর তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রত্যেক প্রকারের প্রাণী; আর আসমান থেকে আমি পানি পাঠাই। অতঃপর তাতে আমি জোড়ায় জোড়ায় কল্যাণকর উদ্ভিদ জন্মাই।
— Rawai Al-bayan
তিনি আসমানসমূহ নির্মাণ করেছেন খুঁটি ছাড়া—তোমরা এটা দেখতে পাচ্ছ;তিনিই যমীনে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বতমালা যাতেএটা তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সব ধরনের জীব-জন্তু। আর আমরা আকাশ হতে বারি বর্ষণ করি তারপর এতে উদ্গত করি সব ধরণের কল্যাণকর উদ্ভিদ।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
[ কোরআন ৩১ঃ১০ ]


ইসলামি ঐতিহাসিক এবং তাফসিরের ব্যাখ্যা

পৃথিবী স্থির থাকার এই ধারণাটি কেবল আয়াতের আক্ষরিক অনুবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ইসলামের স্বর্ণযুগের জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং পরবর্তীকালের প্রভাবশালী মুফাসসিরদের ব্যাখ্যাতেও এর প্রতিফলন পাওয়া যায় [13]

পৃথিবী 11

জাকারিয়া আল-কাজউইনি হচ্ছেন ত্রয়োদশ শতাব্দীর ইসলামি স্বর্ণযুগের একজন ফারসী জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তিনি ইরানের কাজউইন শহরে ৬০০ হিজরি/ ১২০৩ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নবী মুহাম্মাদের একজন বিশিষ্ট সাহাবী আনাস ইবনে মালিকের বংশধর। উনার গ্রন্থ The Wonders of Creation, Translated into Turkish from Arabic. Istanbul: ca. 1553 থেকে আমরা পৃথিবী ও মহাবিশ্বের ইসলামিক ধারণা পাই নিচের ছবিটির মত।

পৃথিবী

আধুনিক ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থান: শায়েখ উসাইমীনের ফতোয়া

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী সৌদি স্কলার শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন আধুনিক বিজ্ঞানের তথ্য জানা সত্ত্বেও ধর্মীয় টেক্সটের আক্ষরিক অর্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তার মতে, কুরআন ও হাদিসের প্রকাশ্য বর্ণনা অনুযায়ী সূর্যই পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে এবং পৃথিবী স্থির। তিনি সূর্যকেন্দ্রিক মডেলের বিপরীতে ভূ-কেন্দ্রিক মডেলের পক্ষে একাধিক ধর্মীয় যুক্তি প্রদান করেছেন। [14] [15]

প্রশ্ন: (১৬) সূর্য কি পৃথিবীর চার দিকে ঘুরে?
উত্তর: মান্যবর শাইখ উত্তরে বলেন যে, শরী‘আতের প্রকাশ্য দলীলগুলো প্রমাণ করে যে, সূর্যই পৃথিবীর চতুর্দিকে ঘুরে। এ ঘুরার কারণেই পৃথিবীতে দিবা-রাত্রির আগমণ ঘটে। আমাদের হাতে এ দলীলগুলোর চেয়ে বেশি শক্তিশালী এমন কোনো দলীল নেই, যার মাধ্যমে আমরা সূর্য ঘূরার দলীলগুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারি। সূর্য ঘুরার দলীলগুলো হলো আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿فَإِنَّ ٱللَّهَ يَأۡتِي بِٱلشَّمۡسِ مِنَ ٱلۡمَشۡرِقِ فَأۡتِ بِهَا مِنَ ٱلۡمَغۡرِبِ﴾ [البقرة: ٢٥٨]
“আল্লাহ তা‘আলা সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন। তুমি পারলে পশ্চিম দিক থেকে উদিত কর।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৮] সূর্য পূর্ব দিক থেকে উঠার মাধ্যমে প্রকাশ্য দলীল পাওয়া যায় যে, সূর্য পৃথিবীর উপর পরিভ্রমণ করে।
২) আল্লাহ বলেন,
﴿فَلَمَّا رَءَا ٱلشَّمۡسَ بَازِغَةٗ قَالَ هَٰذَا رَبِّي هَٰذَآ أَكۡبَرُۖ فَلَمَّآ أَفَلَتۡ قَالَ يَٰقَوۡمِ إِنِّي بَرِيٓءٞ مِّمَّا تُشۡرِكُونَ ٧٨﴾ [الانعام: ٧٨]
“অতঃপর যখন সূর্যকে চকচকে অবস্থায় উঠতে দেখলেন তখন বললেন, এটি আমার রব, এটি বৃহত্তর। অতপর যখন তা ডুবে গেল, তখন বলল হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যেসব বিষয়ে শরীক কর আমি ওসব থেকে মুক্ত।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৭৮]
এখানে নির্ধারণ হয়ে গেল যে, সূর্য অদৃশ্য হয়ে যায়। একথা বলা হয় নি যে, সূর্য থেকে পৃথিবী ডুবে গেল। পৃথিবী যদি ঘূরত তাহলে অবশ্যই তা বলা হত।
৩) আল্লাহ বলেন,
﴿وَتَرَى ٱلشَّمۡسَ إِذَا طَلَعَت تَّزَٰوَرُ عَن كَهۡفِهِمۡ ذَاتَ ٱلۡيَمِينِ وَإِذَا غَرَبَت تَّقۡرِضُهُمۡ ذَاتَ ٱلشِّمَالِ﴾ [الكهف: ١٧]
“তুমি সূর্যকে দেখবে, যখন উদিত হয়, তাদের গুহা থেকে পাশ কেটে ডান দিকে চলে যায় এবং যখন অস্ত যায়, তাদের থেকে পাশ কেটে বাম দিকে চলে যায়।” [সূরা কাহাফ, আয়াত: ১৭] পাশ কেটে ডান দিকে বা বাম দিকে চলে যাওয়া প্রমাণ করে যে, নড়াচড়া সূর্য থেকেই হয়ে থাকে। পৃথিবী যদিনড়াচড়া করত তাহলে অবশ্যই বলতেন সূর্য থেকে গুহা পাশ কেটে যায়। উদয় হওয়া এবং অস্ত যাওয়াকে সূর্যের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এটা থেকে বুঝা যায় যে, সূর্যই ঘুরে। পৃথিবী নয়।
৪) আল্লাহ বলেন,
﴿وَهُوَ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلَّيۡلَ وَٱلنَّهَارَ وَٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَۖ كُلّٞ فِي فَلَكٖ يَسۡبَحُونَ ٣٣﴾ [الانبياء: ٣٣]
“এবং তিনিই দিবা-নিশি এবং চন্দ্র-সূর্য সৃষ্টি করেছেন। সবাই আপন আপন কক্ষ পথে বিচরণ করে।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৩৩]
ইবন আব্বাস বলেন, লাটিম যেমন তার কেন্দ্র বিন্দুর চার দিকে ঘুরতে থাকে, সূর্যও তেমনিভাবে ঘুরে।
৫) আল্লাহ বলেন,
﴿يُغۡشِي ٱلَّيۡلَ ٱلنَّهَارَ يَطۡلُبُهُۥ حَثِيثٗا﴾ [الاعراف: ٥٤]
“তিনি রাতকে আচ্ছাদিত করেন দিনের মাধ্যমে, দিন দৌড়ে দৌড়ে রাতের পিছনে আসে।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৫৪]
আয়াতে রাতকে দিনের অনুসন্ধানকারী বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অনুসন্ধানকারী পিছনে পিছনে দ্রুত অনুসন্ধান করে থাকে। এটা জানা কথা যে, দিবা-রাত্রি সূর্যের অনুসারী।
৬) আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ بِٱلۡحَقِّۖ يُكَوِّرُ ٱلَّيۡلَ عَلَى ٱلنَّهَارِ وَيُكَوِّرُ ٱلنَّهَارَ عَلَى ٱلَّيۡلِۖ وَسَخَّرَ ٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَۖ كُلّٞ يَجۡرِي لِأَجَلٖ مُّسَمًّىۗ أَلَا هُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡغَفَّٰرُ ٥﴾ [الزمر: ٥]
“তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে। তিনি রাত্রিকে দিবস দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে কাজে নিযুক্ত করেছেন। প্রত্যেকেই বিচরণ করে নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত। জেনে রাখুন, তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৫]
আয়াতের মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম যে, পৃথিবীর উপরে দিবা-রাত্রি চলমান রয়েছে। পৃথিবী যদি ঘুরতো তাহলে তিনি বলতেন, দিবা-রাত্রির উপর পৃথিবীকে ঘূরান। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “সূর্য এবং চন্দ্রের প্রত্যেকেই চলমান”। এ সমস্ত দলীলের মাধ্যমে জানা গেল যে, সুস্পষ্টভাবেই সূর্য ও চন্দ্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করছে। এ কথা সুস্পষ্ট যে, চলমান বস্তুকে বশীভুত করা এবং কাজে লাগানো একস্থানে অবস্থানকারী বস্তুকে কাজে লাগানোর চেয়ে অধিক যুক্তিসঙ্গত।
৭) আল্লাহ বলেন,
﴿وَٱلشَّمۡسِ وَضُحَىٰهَا ١ وَٱلۡقَمَرِ إِذَا تَلَىٰهَا ٢﴾ [الشمس: ١، ٢]
“শপথ সূর্যের ও তার কিরণের, শপথ চন্দ্রের যখন তা সূর্যের পশ্চাতে আসে।” [সূরা আশ-শামস, আয়াত: ১-২]
এখানে বলা হয়েছে যে, চন্দ্র সূর্যের পরে আসে। এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, সূর্য এবং চন্দ্র চলাচল করে এবং পৃথিবীর উপর ঘুরে। পৃথিবী যদি চন্দ্র বা সূর্যের চার দিকে ঘুরত, তাহলে চন্দ্র সূর্যকে অনুসরণ করতনা। বরং চন্দ্র একবার সূর্যকে, আর একবার সূর্য চন্দ্রকে অনুসরণ করত। কেননা সূর্য চন্দ্রের অনেক উপরে। এ আয়াত দিয়ে পৃথিবী স্থীর থাকার ব্যাপারে দলীল গ্রহণ করার ভিতরে চিন্তা-ভাবনার বিষয় রয়েছে।
৮) মহান আল্লাহ বলেন,
﴿وَٱلشَّمۡسُ تَجۡرِي لِمُسۡتَقَرّٖ لَّهَاۚ ذَٰلِكَ تَقۡدِيرُ ٱلۡعَزِيزِ ٱلۡعَلِيمِ ٣٨ وَٱلۡقَمَرَ قَدَّرۡنَٰهُ مَنَازِلَ حَتَّىٰ عَادَ كَٱلۡعُرۡجُونِ ٱلۡقَدِيمِ ٣٩ لَا ٱلشَّمۡسُ يَنۢبَغِي لَهَآ أَن تُدۡرِكَ ٱلۡقَمَرَ وَلَا ٱلَّيۡلُ سَابِقُ ٱلنَّهَارِۚ وَكُلّٞ فِي فَلَكٖ يَسۡبَحُونَ ٤٠﴾ [يس: ٣٨، ٤٠]
“সূর্য তার নির্দিষ্ট অবস্থানে আবর্তন করে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারণ। চন্দ্রের জন্যে আমি বিভিন্ন মঞ্জিল নির্ধারিত করেছি। অবশেষে সে পুরাতন খর্জুর শাখার অনুরূপ হয়ে যায়। সূর্যের পক্ষে চন্দ্রকে নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। রাতের পক্ষেও দিনের অগ্রবতী হওয়া সম্ভব নয়। প্রত্যেকেই আপন আপন কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে।” [সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৩৮-৪০]
সূর্যের চলা এবং এ চলাকে মহা পরাক্রমশালী আল্লাহর নির্ধারণ বলে ব্যাখ্যা করা এটাই প্রমাণ করে যে, সূর্য প্রকৃতভাবেই চলমান। আর এ চলাচলের কারণেই দিবা-রাত্রি এবং ঋতুর পরিবর্তন হয়। চন্দ্রের জন্য মঞ্জিল নির্ধারণ করার অর্থ এ যে, সে তার মঞ্জিলসমূহে স্থানান্তরিত হয়। যদি পৃথিবী ঘুরত, তাহলে পৃথিবীর জন্য মঞ্জিল নির্ধারণ করা হত। চন্দ্রের জন্য নয়। সূর্য কর্তৃক চন্দ্রকে ধরতে না পারা এবং দিনের অগ্রে রাত থাকা সূর্য, চন্দ্র, দিন এবং রাতের চলাচলের প্রমাণ বহন করে।
৯) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় আবু যরকে বলেছেন,
«أَتَدْرِي أَيْنَ تَذْهَبُ قُلْتُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ قَالَ فَإِنَّهَا تَذْهَبُ حَتَّى تَسْجُدَ تَحْتَ الْعَرْشِ فَتَسْتَأْذِنَ فَيُؤْذَنُ لَهَا وَيُوشِكُ أَنْ تَسْجُدَ فَلَا يُقْبَلَ مِنْهَا وَتَسْتَأْذِنَ فَلَا يُؤْذَنَ لَهَا يُقَالُ لَهَا ارْجِعِي مِنْ حَيْثُ جِئْتِ فَتَطْلُعُ مِنْ مَغْرِبِهَا»
“হে আবু যর! তুমি কি জান সূর্য যখন অস্ত যায় তখন কোথায় যায়? আবু যার বললেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় ‘আরশের নিচে গিয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং পুনরায় উদিত হওয়ার অনুমতি চায়। অতঃপর তাকে অনুমতি দেওয়া হয়। সে দিন বেশি দূরে নয়, যে দিন অনুমতি চাবে কিন্তু তাকে অনুমতি দেওয়া হবে না। তাকে বলা হবে যেখান থেকে এসেছ, সেখানে ফেরত যাও। অতঃপর সূর্য পশ্চিম দিক থেকেই উদিত হবে।”[1]
এটি হবে কিয়ামতের পূর্ব মুহূর্তে। আল্লাহ সূর্যকে বলবেন, যেখান থেকে এসেছ সেখানে ফেরত যাও, অতঃপর সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সূর্য পৃথিবীর উপরে ঘুরছে এবং তার এ ঘুরার মাধ্যমেই উদয়-অস্ত সংঘটিত হচ্ছে।
১০) অসংখ্য হাদীসের মাধ্যমে জানা যায় যে, উদয় হওয়া, অস্ত যাওয়া এবং ঢলে যাওয়া এ কাজগুলো সূর্যের সাথে সম্পৃক্ত। এগুলো সূর্য থেকে প্রকাশিত হওয়া খুবই সুস্পষ্ট। পৃথিবী হতে নয়। হয়তো এ ব্যাপারে আরো দলীল-প্রমাণ রয়েছে। সেগুলো আমার এ মুহূর্তে মনে আসছেনা। তবে আমি যা উল্লেখ করলাম, এ বিষয়টির দ্বার উম্মুক্ত করবে এবং আমি যা উদ্দেশ্য করেছি, তা পূরণে যথেষ্ট হবে। আল্লাহর তাওফীক চাচ্ছি!
[1] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: বাদউল খালক; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান

পৃথিবী 14
পৃথিবী 16
পৃথিবী 18

বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা ও অসংগতি

বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবী স্থির নয়। এটি নিজ অক্ষের ওপর ঘণ্টায় প্রায় ১,৬৭০ কিলোমিটার বেগে ঘুরছে এবং সূর্যের চারপাশে ঘণ্টায় প্রায় ১,০৭,০০০ কিলোমিটার বেগে প্রদক্ষিণ করছে।

ধর্মীয় তত্ত্বে পৃথিবীকে স্থির রাখার জন্য পাহাড়ের যে ভূমিকার কথা বলা হয়েছে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে অকার্যকর। পর্বত মূলত পৃথিবীর ভূত্বকের (Crust) একটি অংশ, যা পৃথিবীর আবর্তন বা অক্ষীয় স্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকা রাখে না। তাছাড়া, পৃথিবী যদি মহাকাশে ‘পড়ে যাওয়ার’ ভয়ে স্থির রাখার প্রয়োজন হয়, তবে সেই একই যুক্তি সূর্য বা অন্য নক্ষত্রগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সত্য হলো, মহাকর্ষ বল এবং মহাজাগতিক গতির কারণেই মহাকাশীয় বস্তুগুলো একে অপরের সাপেক্ষে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ভাসমান থাকে, কোনো ‘স্থির’ স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে নয়।


উপরোক্ত ধর্মীয় রেফারেন্স এবং আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের তুলনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, প্রাচীন ধর্মতাত্ত্বিক ধারণাগুলো মূলত প্রাক-বৈজ্ঞানিক যুগের ‘ভূ-কেন্দ্রিক’ (Geocentric) চিন্তাধারার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। যেখানে মানুষের সীমাবদ্ধ দৃষ্টিতে পৃথিবীকে স্থির এবং সূর্যকে গতিশীল মনে হতো, ঠিক সেই অভিজ্ঞতাই ধর্মগ্রন্থে ঐশ্বরিক সত্য হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণ এবং গাণিতিক প্রমাণের সাথে এই স্থির পৃথিবীর ধারণাটি সরাসরি সাংঘর্ষিক।


ইসলামি বর্ণনায় মহাবিশ্ব সৃষ্টির পূর্বে

ইসলামি ধর্মতত্ত্বে মহাবিশ্ব বা দৃশ্যমান জগৎ সৃষ্টির পূর্ববর্তী অবস্থা সম্পর্কে একটি বিশেষ ধারণা প্রদান করা হয়েছে। এটি মূলত আধুনিক বিজ্ঞানের ‘বিগ ব্যাং’ (Big Bang) বা ‘সিংগুলারিটি’ (Singularity) ধারণার বিপরীতে একটি অলৌকিক এবং উপাদানভিত্তিক আদি অবস্থার কথা বলে। সহীহ বুখারীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনায় সৃষ্টির এই পর্যায়ক্রমিক ধারাটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। সহীহ বুখারীর এই হাদিসটি ইসলামি কসমোলজির একটি প্রধান ভিত্তি। এই বর্ণনা অনুযায়ী, মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় স্রষ্টার অবস্থান এবং নির্দিষ্ট কিছু উপাদানের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল।

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮৬/ জাহ্‌মিয়াদের মতের খণ্ডন ও তাওহীদ প্রসঙ্গ
পরিচ্ছেদঃ ৩১২৪. মহান আল্লাহ্‌র বাণীঃ তখন তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল। তিনি আরশে আযীমের প্রতিপালক। আবুল আলীয়া (রহঃ) বলেন, اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ এর মমার্থ হচ্ছে আসমানকে উড্ডীন করেছেন। فَسَوَّاهُنَّ এর মর্মার্থ হচ্ছে, তিনি আসমানরাজিকে সৃষ্টি করেছেন। মুজাহিদ (র) বলেছেন, اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ এর মর্মাথ হল, আরশের উপর অধিষ্ঠিত হলেন। আবদুল্লাহ্ ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, مَجِيد অর্থ সম্মানতি, الوَدُود অর্থ প্রিয়। বলা হয়ে থাকে, حَمِيدٌ مَجِيدٌ মূলত প্রশংসনীয় ও পবিত্র। বস্তুত এটি مَاجِدٍ থেকে فَعِيلٌ এর ওযনে এসেছে। আর مَحْمُودٌ (প্রশংসনীয়) এসেছে حمد থেকে
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৬৯১৩ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৭৪১৮
৬৯১৩। আবদান (রহঃ) … ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ছিলাম। এমন সময় তাঁর কাছে বনূ তামীম এর কাওমটি এল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ হে বনূ তামীম। তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। প্রতি উত্তরে তারা বলল, আপনি আমাদেরকে শুভ সংবাদ যখন প্রদান করেছেন, তাহলে কিছু দান করুন। এ সময় ইয়ামানবাসী কতিপয় লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সেখানে উপস্থিত হল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উদ্দেশ্যে বললেনঃ হে ইয়ামানবাসী! তোমাদের জন্য সুসংবাদ। বনূ তামীম তা গ্রহন করল না।
তারা বলে উঠল, আমরা গ্রহণ করলাম শুভ সংবাদ। যেহেতু আমরা আপনার কাছে এসেছি দ্বীনী জ্ঞান হাসিল করার উদ্দেশ্যে এবং জিজ্ঞাসা করার জন্য এসেছি যে, এ দুনিয়া সৃষ্টির আগে কি ছিল? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ তখন ছিলেন, তাঁর আগে আর কিছু ছিল না। তার আরশ তখন পানির ওপর ছিল। এরপর তিনি আসমান সমুহ ও যমীন সৃষ্টি করলেন। এবং লাওহে মাফফুযে সব বস্তু সম্পর্কে লিখে রাখলেন। রাবী বলেন, এরপর আমার কাছে এক ব্যাক্তি এসে বলল, হে ইমরান! তোমার উষ্ট্রী পালিয়ে গিয়েছে, তার খবর নাও। আমি উষ্ট্রীর সন্ধানে চললাম। দেখলাম, উষ্ট্রী মরীচিকার আড়ালে আছে। আমি আল্লাহর কসম করে বলছি! আমার মন চাচ্ছিল উষ্ট্রী চলে যায় যাক তবুও আমি মজলিস ছেড়ে যেন না উঠি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ)


এই হাদিসটি থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক বিষয় বেরিয়ে আসে:

  • স্রষ্টার একক অস্তিত্ব: শুরুতে কেবল আল্লাহ ছিলেন এবং তার পূর্বে বা তার সাথে অন্য কিছুর অস্তিত্ব ছিল না।
  • পানির ওপর আরশ (Throne): আসমান ও যমীন সৃষ্টির পূর্বেই স্রষ্টার ‘আরশ’ বা সিংহাসন পানির ওপর বিদ্যমান ছিল।
  • পর্যায়ক্রমিক সৃষ্টি: পানির ওপর আরশ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেন এবং লাওহে মাহফুজে সকল বস্তু লিপিবদ্ধ করেন।

পানির আদিম অস্তিত্ব বনাম আধুনিক রসায়ন

এই বর্ণনায় ‘পানি’ (Water) নামক উপাদানটির আদিম অস্তিত্ব একটি বড় তাত্ত্বিক প্রশ্ন তৈরি করে। আধুনিক বিজ্ঞান অনুযায়ী, পানি একটি যৌগিক পদার্থ (H2O), যা অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেন পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত।

  • বৈজ্ঞানিক যুক্তি: অক্সিজেন একটি ভারী মৌল যা নক্ষত্রের অভ্যন্তরে নিউক্লিয়ার ফিউশন (Stellar Nucleosynthesis) প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়। মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রথম কয়েক লক্ষ বছর পানি গঠিত হওয়ার মতো কোনো অক্সিজেন পরমাণু মহাকাশে ছিল না।
  • অসঙ্গতি: হাদিস অনুযায়ী আসমান (মহাবিশ্ব) সৃষ্টির পূর্বেই ‘পানি’ বিদ্যমান ছিল। কিন্তু বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, আসমান বা মহাকাশে প্রথম প্রজন্মের নক্ষত্র সৃষ্টি ও তাদের মৃত্যুর আগে অক্সিজেন, এবং ফলশ্রুতিতে পানি তৈরি হওয়া অসম্ভব। এটি নির্দেশ করে যে, এই বর্ণনাটি মূলত প্রাচীন মানুষের একটি সাধারণ ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে পানিকে জীবনের এবং জগতের আদি উৎস মনে করা হতো (যেমনটি প্রাচীন মেসোপটেমীয় বা গ্রিক দর্শনে দেখা যায়)।

ধর্মীয় এই বর্ণনাটিকে যখন আধুনিক কসমোলজির মানদণ্ডে বিচার করা হয়, তখন কয়েকটি মৌলিক বৈপরীত্য ধরা পড়ে:

  • ১. উপাদানের অসংগতি: হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন পরমাণু সৃষ্টির আগে পানির অস্তিত্ব বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব।
  • ২. কালানুক্রমিক অসংগতি: আরশ-পানি -> আসমান-যমীন—এই ধারাক্রমটি মহাবিশ্বের ১৩৮০ কোটি বছরের বিবর্তনলব্ধ ইতিহাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
  • ৩. স্থানিক অসংগতি: ‘আরশ’ এবং ‘পানি’ মহাকাশে ঠিক কোথায় ছিল তার কোনো বাস্তবসম্মত বা পর্যবেক্ষণলব্ধ প্রমাণ নেই, যা এই বর্ণনাটিকে কেবল একটি বিশ্বাস বা ‘ডগমা’ হিসেবে সীমাবদ্ধ করে।

এই হাদিসটি প্রাচীন প্রাক-বৈজ্ঞানিক যুগের সেই বিশ্ববীক্ষাকেই ধারণ করে, যেখানে আকাশকে একটি ছাদ এবং পৃথিবীর চারপাশের আদিম অবস্থাকে পানি দ্বারা বেষ্টিত মনে করা হতো। আধুনিক জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের প্রসারের ফলে এই আদিম সৃষ্টিতত্ত্ব তার প্রাসঙ্গিকতা ও যৌক্তিকতা হারিয়েছে।


প্রথম সৃষ্ট পদার্থ ছিল কলম

একটি হাদিসে বলা হয়েছে সর্বপ্রথম সৃষ্ট বস্তু হচ্ছে কলম। কিন্তু কলম তো মানুষের মানবীয় একটি আবিষ্কার। মহাবিশ্বের সর্বপ্রথম সৃষ্ট বস্তু হচ্ছে কলম, এই কথাটিও খুবই উদ্ভট। আসুন হাদিসটি পড়ি [16]

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৭. তাকদীর সম্পর্কে
৪৭০০। আবূ হাফসাহ (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা উবাদাহ ইবনুস সামিত (রাঃ) তার ছেলেকে বললেন, হে আমার প্রিয় পুত্র! তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত ঈমানের স্বাদ পাবে না যতক্ষণ না তুমি জানতে পারবে ’’যা তোমার উপর ঘটেছে তা ভুলেও এড়িয়ে যাওয়ার ছিলো না। পক্ষান্তরে, যা এড়িয়ে গেছে তা তোমার উপর ভুলেও ঘটবার ছিলো না।
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম যে বস্তু সৃষ্টি করেছেন তা হচ্ছে কলম। অতঃপর তিনি তাকে বললেন, লিখো! কলম বললো, হে রব! কি লিখবো? তিনি বললেন, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক বস্তুর তাকদীর লিখো। হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি এরূপ বিশ্বাস ছাড়া মারা যায় সে আমার (উম্মাতের) নয়।[1]
সহীহ।
[1]. তিরমিযী, আহমাদ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


ইসলামি বর্ণনায় মহাবিশ্বের শুরু

ইসলামিক ধর্মতাত্ত্বিক সৃষ্টিতত্ত্বের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আকাশমন্ডলী (আসমান) এবং পৃথিবী (যমীন)-কে একটি একক এবং অবিভাজ্য সৃষ্টির ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা। ইসলামি ধর্মগ্রন্থসমূহে ‘আসমান ও যমীন’ শব্দবন্ধটি প্রায়ই একত্রে ব্যবহৃত হয়, যা এই দুইয়ের উৎপত্তি একই সময়ে বা একই প্রক্রিয়ায় হয়েছে বলে ইঙ্গিত দেয়। তবে আধুনিক জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের তথ্যানুযায়ী, এই সমসাময়িক সৃষ্টির ধারণাটি একটি গুরুতর তথ্যগত অসঙ্গতি।

আসমান ও পৃথিবীর সহ-সৃষ্টিঃ মহাবিশ্বের শুরু

কোরআনের সুরা তওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে, মহাবিশ্বের ১২ মাসের যে কালচক্র, তা মূলত আসমান ও যমীন সৃষ্টির দিন থেকেই নির্ধারিত। এটি নির্দেশ করে যে, আসমান ও যমীন সৃষ্টির দিনটি একটি সুনির্দিষ্ট ‘শুরুর বিন্দু, যেখান থেকে সময়ের গণনা শুরু হয়েছে [17]

আসমান-যমীন সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর কিতাবে (লৌহ মাহফুজে) মাসগুলোর সংখ্যা হল বার। তার মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস। এটা হল সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন। কাজেই ঐ সময়ের মধ্যে নিজেদের উপর যুলম করো না। মুশরিকদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করে। জেনে রেখ, আল্লাহ অবশ্যই মুত্তাকীদের সঙ্গে আছেন।
— Taisirul Quran
নিশ্চয়ই আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে আল্লাহর বিধানে মাস গণনায় বারটি। এর মধ্যে বিশেষ রূপে চারটি মাস হচ্ছে সম্মানিত। এটাই হচ্ছে সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম। অতএব তোমরা এ মাসগুলিতে (ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ করে) নিজেদের ক্ষতি সাধন করনা, আর মুশরিকদের বিরুদ্ধে সকলে একযোগে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সকলে একযোগে যুদ্ধ করে। আর জেনে রেখ যে, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে রয়েছেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় মাসসমূহের গণনা আল্লাহর কাছে বার মাস আল্লাহর কিতাবে, (সেদিন থেকে) যেদিন তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্য থেকে চারটি সম্মানিত, এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন। সুতরাং তোমরা এ মাসসমূহে নিজদের উপর কোন যুলম করো না, আর তোমরা সকলে মুশরিকদের সাথে লড়াই কর যেমনিভাবে তারা সকলে তোমাদের সাথে লড়াই করে, আর জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টির দিন থেকেই [১] আল্লাহ্‌র বিধানে [২] আল্লাহ্‌র কাছে গণনায় মাস বারটি [৩], তার মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস [৪], এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন [৫]। কাজেই এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করো না এবং তোমরা মুশরিকদের সাথে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করে থাকে। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ মুত্তাকীদের সাথে আছেন।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
Indeed, the number of months with Allah is twelve [lunar] months in the register of Allah [from] the day He created the heavens and the earth; of these, four are sacred.1 That is the correct religion [i.e., way], so do not wrong yourselves during them.2 And fight against the disbelievers collectively as they fight against you collectively. And know that Allah is with the righteous [who fear Him].
— Saheeh International

এই আয়াতে “আসমান ও যমীন সৃষ্টির দিন” (يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ) শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করা হয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে এটি ইঙ্গিত দেয় যে, আসমান এবং যমীনের অস্তিত্ব একই আদিম লগ্নে শুরু হয়েছিল। যদি এ দুটির সৃষ্টির মাঝে শত কোটি বছরের ব্যবধান থাকতো, তবে একই দিনে বা একই লগ্নে ১২ মাসের ক্যালেন্ডার নির্ধারিত হওয়ার দাবিটি যৌক্তিক ভিত্তি হারাত।


হাদিস গ্রন্থগুলোতে সহ-সৃষ্টিঃ মহাবিশ্বের শুরু

হাদিস শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য উৎসগুলোতেও আসমান ও যমীন সৃষ্টির সময়কালকে একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও মহাজাগতিক বিন্দু হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। বিশেষ করে মক্কার পবিত্রতা এবং সময়ের আবর্তন সংক্রান্ত বর্ণনায় বারবার এই ‘সহ-সৃষ্টির’ প্রসঙ্গটি এসেছে। আবূ বকর (রাঃ) বর্ণিত এই হাদিসে বলা হয়েছে যে, কাল বা জামানা (Time) তার আদি রূপে ফিরে এসেছে ঠিক তেমনভাবে, যেমনটি ছিল আসমান ও যমীন সৃষ্টির দিনে। এটি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী আসমান ও যমীন কোনো বিচ্ছিন্ন সময়ে সৃষ্টি হয়নি, বরং তারা একই মহাজাগতিক ইভেন্টের অংশ ছিল। আসুন হাদিসগুলো দেখি, [18]। একইভাবে মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ মক্কার পবিত্রতা সম্পর্কে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেখানেও আসমান ও যমীন সৃষ্টির দিনটিকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। [19]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ ২৩৯৮. আল্লাহ তা’আলার বাণীঃ নিশ্চয় আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন হতেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট মাস গননায়, মাস বারোটি। তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান (৯ঃ ৩৬) القيم শব্দটি قائم (প্রতিষ্ঠিত) অর্থে ব্যবহৃত হয়।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৩০৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৬৬১ – ৪৬৬২
২৩৯৭. অনুচ্ছেদ: আল্লাহর বাণীঃ সে দিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দিয়ে দাগিয়ে দেয়া হবে তাদের কপাল, তাদের পাঁজর এবং তাদের পৃষ্ঠদেশ, বলা হবেঃ এগুলো হল তা, যা তোমরা নিজেদের জন্য জমা করে রেখেছিলে। সুতরাং যা তোমরা জমা করে রাখতে তার সাদ গ্রহণ কর। (৯: ৩৫)
আহমাদ ইবন শু’আয়ব ইবন সা’ঈদ (রহঃ) … খালিদ ইবনু আসলাম (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে বের হলাম। তখন তিনি বললেন, এ আয়াতটি যাকাতের বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বের। এরপর যাকাতের বিধান অবতীর্ণ হলে আল্লাহ তা সম্পদের পরিশুদ্ধকারী রূপে নির্ধারণ করেন।
৪৩০৫ আবদুল্লাহ ইবনু আবদুল ওয়াহাব (রহঃ) … আবূ বকর (রাঃ) কর্তৃক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আল্লাহর যেদিন আসমান যমীন সৃষ্টি করে সেদিন যেভাবে কাল (যামানা) ছিল তা আজও অনুরূপভাবে বিদ্যমান। বারোমাসে এক বছর, তন্মধ্যে চার মাস পবিত্র। যার তিন মাস ধারাবাহিক যথা যিলকাদ, যিলহাজ্জ ও মুহাররম আর মুযার গোত্রের রজব যা জামিদিউস সানী ও সাবান মাসদ্বয়ের মধ্যবর্তী।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৬। হজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ৮২. মক্কার হারামে হওয়া, হারামের অভ্যন্তরে ও উপকণ্ঠে শিকার কার্য চিরস্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ, এখানকার গাছপালা উপড়ানো ও ঘাস কাটা নিষেধ
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৩১৯৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৩৫৩
৩১৯৩-(৪৪৫/১৩৫৩) ইসহাক ইবনু ইবরাহীম আল হানযালী (রহঃ) ….. ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাহ (মক্কা) বিজয়ের দিন বলেছেনঃ হিজরাতের আর প্রয়োজন নেই, কিন্তু জিহাদ ও নিয়্যাত অব্যাহত থাকবে। তোমাদেরকে যখন জিহাদের আহবান জানানো হয় তখন জিহাদে যোগদান কর। মক্কাহ (মক্কা) বিজয়ের দিন তিনি আরও বলেন, আল্লাহ তা’আলা এ শহরকে সম্মানিত করেছেন- যেদিন তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন সেদিন থেকে। অতএব কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তা’আলা এ শহরের মর্যাদা ও সম্মান অক্ষুন্ন রাখবেন। তিনি এ শহরে আমার পূর্বে আর কারও জন্য যুদ্ধ বৈধ করেননি। আমার জন্য মাত্র এক দিনের কিছু সময় তিনি এখানে যুদ্ধ বৈধ করেছিলেন। অতএব তথায় যুদ্ধ বিগ্রহ করা হারাম। আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক কিয়ামত পর্যন্ত নিষিদ্ধ করার কারণে এখানকার কোন কাঁটাযুক্ত গাছ উপড়ানো যাবে না, এখানকার শিকারের পশ্চাদ্ধাবণ করা যাবে না, এখানকার পতিত জিনিস তোলা যাবে না। তখন “আব্বাস (রাযিঃ) বললেন, হে আল্লাহর রসূল! কিন্তু ইযখির (লম্বা ঘাস) সম্পর্কে (অনুমতি দিন)। কারণ তা স্বর্ণকার ও তাদের ঘরের কাজে লাগে। তিনি বললেন, কিন্তু ইযখির (তোলার অনুমতি দেয়া হল)। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩১৬৮, ইসলামীক সেন্টার ৩১৬৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)


তাফসীর গ্রন্থগুলোতে সহ-সৃষ্টিঃ মহাবিশ্বের শুরু

তাফসীর গ্রন্থগুলোতেও এই বিষয়গুলো খুব পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, স্বয়ং নবী এবং নবীর সাহাবীগণ অনেকেই একই বক্তব্য দিয়েছেন [20]

পৃথিবী 20
পৃথিবী 22
পৃথিবী 24
পৃথিবী 26

সৃষ্টির পূর্বে পৃথিবী ও মহাবিশ্ব একসাথে ছিল

কোরআনে বলা হয়েছে, পৃথিবী ও আসমান আগে একসাথে ছিল, পরে এগুলো আলাদা হয়েছে [21]

অবিশ্বাসীরা কি দেখে না যে, আকাশ আর যমীন এক সঙ্গে সংযুক্ত ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে আলাদা করে দিলাম, আর প্রাণসম্পন্ন সব কিছু পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?
— Taisirul Quran
যারা কুফরী করে তারা কি ভেবে দেখেনা যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে; অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং প্রাণবান সমস্ত কিছু সৃষ্টি করলাম পানি হতে; তবুও কি তারা বিশ্বাস করবেনা?
— Sheikh Mujibur Rahman
যারা কুফরী করে তারা কি ভেবে দেখে না যে, আসমানসমূহ ও যমীন ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল*, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম, আর আমি সকল প্রাণবান জিনিসকে পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবুও কি তারা ঈমান আনবে না? * আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে আদিতে আকাশ, সূর্য, নক্ষত্র ও পৃথিবী ইত্যাদি পৃথক সত্তায় ছিল না; বরং সবকিছুই ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল। তখন মহাবিশ্ব ছিল অসংখ্য গ্যাসীয় কণার সমষ্টি। পরবর্তীকালে মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে নক্ষত্র, সূর্য, পৃথিবী ও গ্রহসমূহ সৃষ্টি হয়। এটিই বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ থিওরী।
— Rawai Al-bayan
যারা কুফরী করে তারা কি দেখে না [১] যে, আসমানসমূহ ও যমীন মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে, তারপর আমরা উভয়কে পৃথক করে দিলাম [২] এবং প্রাণবান সব কিছু সৃষ্টি করলাম পানি থেকে [৩]; তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria


আলাদা হওয়ার পরের কার্যক্রম

এবারে আসুন, এই সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতগুলো দেখে নিই।

পৃথিবীর সবকিছু তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি আকাশের দিকে মনোসংযোগ করেন এবং তা সপ্তাকাশে বিন্যস্ত করেন, তিনি সকল বিষয়ে বিশেষভাবে অবহিত।
— Taisirul Quran
পৃথিবীতে যা কিছু আছে সমস্তই তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন; অতঃপর তিনি আকাশের প্রতি মনঃসংযোগ করেন, অতঃপর সপ্ত আকাশ সুবিন্যস্ত করেন এবং তিনি সর্ব বিষয়ে মহাজ্ঞানী।
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনিই যমীনে যা আছে সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারপর আসমানের প্রতি খেয়াল করলেন এবং তাকে সাত আসমানে সুবিন্যস্ত করলেন। আর সব কিছু সম্পর্কে তিনি সম্যক জ্ঞাত।
— Rawai Al-bayan
তিনিই যমীনে যা আছে সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারপর [১] তিনি আসমানের প্রতি মনোনিবেশ [২] করে সেটাকে সাত আসমানে বিন্যস্ত করেছেন; আর তিনি সবকিছু সম্পর্কে সবিশেষ অবগত।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
[ কোরআন ২ঃ২৯ ]

বলুন, তোমরা কি সে সত্তাকে অস্বীকার কর যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দু’দিনে এবং তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ স্থীর কর? তিনি তো সমগ্র বিশ্বের পালনকর্তা।
তিনি পৃথিবীতে উপরিভাগে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, তাতে কল্যাণ নিহিত রেখেছেন এবং চার দিনের মধ্যে তাতে তার খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন-পূর্ণ হল জিজ্ঞাসুদের জন্যে।
অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেনযা ছিল ধুম্রকুঞ্জ, অতঃপর তিনি তাকে ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা স্বেচ্ছায় আসলাম।
অতঃপর তিনি আকাশমন্ডলীকে দু’দিনে সপ্ত আকাশ করে দিলেন এবং প্রত্যেক আকাশে তার আদেশ প্রেরণ করলেন। আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত ও সংরক্ষিত করেছি। এটা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর ব্যবস্থাপনা।
[ কোরআন ৪১ঃ৯-১২ ]


বিভিন্ন অনুবাদে পৃথিবী ও মহাকাশ

ইসলামের দাবী অনুসারে, আসমান বা মহাকাশের যাবতীয় বস্তু ও পৃথিবী একই সময়ে সৃষ্টি হলেও, পৃথিবীকে আল্লাহপাক আগে সজ্জিত করেন। সেই সময়টুকুতে আসমান ছিল একটি ধুম্রকুঞ্জ। পৃথিবী সজ্জিত করার পরে আল্লাহ আসমানের দিকে মন দেন এবং আসমানকে সজ্জিত করেন। এরপরে তিনি নিকটবর্তী আসমানে প্রদীপ বা সূর্যের মত নক্ষত্র, তারা ইত্যাদি তৈরি করেন। আসুন, বিষয়গুলো কোরআনের কয়েকটি অনুবাদ থেকে দেখে নিই।

পৃথিবী 28
পৃথিবী 30
পৃথিবী 32
পৃথিবী 34
পৃথিবী 36
পৃথিবী 38
পৃথিবী 40
পৃথিবী 42

হাদিসে পৃথিবী ও মহাকাশ সৃষ্টি

এবারে আসুন দেখা যাক, সহিহ হাদিস কী বলে। উল্লেখ্য, অনেকেই দাবী করেন যে, ছয় দিনে মহাবিশ্ব সৃষ্টির ছয়দিন বলতে নাকি ছয় যুগ বা ছয় কাল বোঝানো হয়েছে। অথচ সহিহ হাদিসে একদম শনি রবি সোম বার উল্লেখ করেই দিনের হিসেব করা হয়েছে। যা থেকে নিঃসন্দেহে বোঝা যায়, ঐ ছয় দিন আসলে পৃথিবীরই দিন। তাই এই বিষয়ে মিথ্যাচার করার আর কোন উপায় নেই।

সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৫২। কিয়ামাত, জান্নাত ও জান্নামের বর্ণনা
পরিচ্ছদঃ ১. সৃষ্টির সূচনা এবং আদাম (আঃ) এর সৃষ্টি
৬৯৪৭-(২৭/২৭৮৯) সুরায়জ ইবনু ইউনুস ও হারূন ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রহঃ) ….. আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে বললেন, আল্লাহ তা’আলা শনিবার দিন মাটি সৃষ্টি করেন এবং এতে পর্বত সৃষ্টি করেন রবিবার দিন। সোমবার দিন তিনি বৃক্ষরাজি সৃষ্টি করেন। মঙ্গলবার দিন তিনি বিপদাপদ সৃষ্টি করেন। তিনি নূর সৃষ্টি করেন বুধবার দিন। তিনি বৃহস্পতিবার দিন পৃথিবীতে পশু-পাখি ছড়িয়ে দেন এবং জুমুআর দিন আসরের পর জুমুআর দিনের শেষ মুহূর্তে অর্থাৎ আসর থেকে নিয়ে রাত পর্যন্ত সময়ের মধ্যবর্তী সময়ে সর্বশেষ মাখলুক আদাম (আঃ) কে সৃষ্টি করেন। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৭৯৭,ইসলামিক সেন্টার ৬৮৫১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫৩/ কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ
পরিচ্ছদঃ ২. সৃষ্টির সূচনা এবং আদম (আঃ) এর সৃষ্টি
৬৭৯৭। সুরায়জ ইবনু ইউনুস ও হারুন ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে বললেন, আল্লাহ তাআলা শনিবার দিন মাটি সৃষ্টি করেন। রোববার দিন তিনি এতে পর্বত সৃষ্টি করেন। সোমবার দিন তিনি বৃক্ষরাজি সৃষ্টি করেন। মঙ্গলবার দিন তিনি আপদ বিপদ সৃষ্টি করেন। বুধবার দিন তিনি নূর সৃষ্টি করেন। বৃহস্পতিবার দিন তিনি পৃথিবীতে পশু-পাখি ছড়িয়ে দেন এবং জুমুআর দিন আসরের পর তিনি আদম (আলাইহিস সালাম) কে সৃষ্টি করেন। অর্থাৎ জুমুআর দিনের সময়সমূহের শেষ মুহূর্তে (মাখলূক) আসর থেকে রাত পর্যন্ত সময়ের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

পৃথিবী 44
পৃথিবী 46

তাফসীর গ্রন্থগুলোতে পৃথিবী ও মহাকাশ

এবারে, সর্বাধিক প্রখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে ইবনে কাসীরে সুরা বাকারার ২৯ নম্বর আয়াত সম্পর্কে কী বলা হয়েছে।

পৃথিবী 48
পৃথিবী 50
পৃথিবী 52
পৃথিবী 54
পৃথিবী 56
পৃথিবী 58

এবারে, প্রখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে ইবন আব্বাসে সুরা বাকারার ২৯ নম্বর আয়াত সম্পর্কে কী বলা হয়েছে।

পৃথিবী 60
পৃথিবী 62

এবারে, প্রখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে জালালাইনে সুরা বাকারার ২৯ নম্বর আয়াত সম্পর্কে কী বলা হয়েছে।

পৃথিবী 64

এবারে, মা’আরেফুল কোরআনে সুরা বাকারার ২৯ নম্বর আয়াত সম্পর্কে কী বলা হয়েছে।

পৃথিবী 66
পৃথিবী 68
পৃথিবী 70

এবারে, সর্বাধিক প্রখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে ইবনে কাসীরে সুরা ফুসসিলাতের ৯-১২ নম্বর আয়াত সম্পর্কে কী বলা হয়েছে।

পৃথিবী 72
পৃথিবী 74
পৃথিবী 76
পৃথিবী 78
পৃথিবী 80
পৃথিবী 82
পৃথিবী 84
পৃথিবী 86

সূর্যের আগেই গাছপালা সৃষ্টি?

নিচের আয়াতগুলো মন দিয়ে পড়ুন। এখানে বলা হচ্ছে, আল্লাহ পৃথিবীর উপরিভাগে অটল পর্বতমালা স্থাপন, এরপরে পৃথিবীতে খাদ্যের ব্যবস্থা করলেন। অর্থাৎ গাছপালা পশুপাখী তৈরি করলে। সেই সময়ে আকাশ ছিল ধুম্রকুঞ্জ। এরপরে তিনি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা অর্থাৎ সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্র দ্বারা সুশোভিত করলেন। অর্থাৎ, ইসলাম অনুসারে সূর্যের সৃষ্টি পৃথিবীর গাছপালা সৃষ্টির পরে। কিন্তু সূর্য না থাকলে সালোক সংশ্লেষণ ও গাছপালা কীভাবে সৃষ্টি হওয়া সম্ভব, তা পাঠকের বোধবুদ্ধির ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।

বলুন, তোমরা কি সে সত্তাকে অস্বীকার কর যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দু’দিনে এবং তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ স্থীর কর? তিনি তো সমগ্র বিশ্বের পালনকর্তা।
তিনি পৃথিবীতে উপরিভাগে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, তাতে কল্যাণ নিহিত রেখেছেন এবং চার দিনের মধ্যে তাতে তার খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন-পূর্ণ হল জিজ্ঞাসুদের জন্যে।
অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন যা ছিল ধুম্রকুঞ্জ, অতঃপর তিনি তাকে ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা স্বেচ্ছায় আসলাম।
অতঃপর তিনি আকাশমন্ডলীকে দু’দিনে সপ্ত আকাশ করে দিলেন এবং প্রত্যেক আকাশে তার আদেশ প্রেরণ করলেন। আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত ও সংরক্ষিত করেছি। এটা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর ব্যবস্থাপনা।
কুরআন ৪১ঃ৯-১২

পৃথিবী 40
পৃথিবী 42

ইসলাম বনাম বিজ্ঞানঃ দুইটি টাইমলাইন

ইসলামি বর্ণনা: সৃষ্টি-ধারার “একইসাথে → আলাদা → আগে পৃথিবী, পরে আকাশ” ক্রম
এখানে দেখানো হচ্ছে: (১) প্রথমে “আসমান–যমীন” একসাথে/সংযুক্ত ছিল, (২) পরে আলাদা হয়—বামে “যমীন (পৃথিবী)”, ডানে “আসমান (ধোঁয়া/ধূম্রকুঞ্জ)”, (৩) এরপর আল্লাহ আগে পৃথিবীর কাজ সম্পন্ন করেন, তারপর আকাশকে স্তরে-স্তরে বিন্যস্ত করে নক্ষত্র/প্রদীপমালায় সাজান।
১. আদি অবস্থা: আরশ ও পানি
আসমান-যমীন সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহর আরশ (সিংহাসন) পানির ওপর বিদ্যমান ছিল—এর বাইরে আর কিছুর উল্লেখ নেই। সূত্র: সহীহ বুখারী ৭৪১৮
২. কলম সৃষ্টি ও তাকদীর লিখন
আল্লাহ ‘কলম’ সৃষ্টি করে কিয়ামত পর্যন্ত যা ঘটবে—তার লিখন/লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দেন। সূত্র: সুনান আবু দাউদ ৪৭০০
৩. একই সময়ে একসাথে অস্তিত্ব: সংযুক্ত আসমান–যমীন
সৃষ্টির প্রাথমিক পর্যায়ে “আসমান” ও “যমীন” আলাদা দুইটি সম্পূর্ণ তৈরি জিনিস হিসেবে নয়—বরং একইসাথে/সংযুক্ত (joined) এক অবস্থায় ছিল; পরে আল্লাহ তা বিচ্ছিন্ন/আলাদা করেন। সূত্র: কুরআন ২১:৩০
বাম পাশে: যমীন (Earth) 🌍

আলাদা হওয়ার পর “যমীন”কে কেন্দ্র করে পরবর্তী নির্মাণ/সাজসজ্জার কাজ এগোয়।

ডান পাশে: আসমান (Heaven/Sky) ☁️

আলাদা হওয়ার মুহূর্তে আসমানকে “ধোঁয়া/ধূম্রকুঞ্জ” অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

৪. আলাদা হওয়ার পর: আগে পৃথিবীর দিকে মনোযোগ (২ দিন)
আলাদা হওয়ার পর আল্লাহ প্রথমে “যমীন/পৃথিবী”কে স্থাপন/গঠন করেন—এ পর্যায়কে ২ দিনের কাজ হিসেবে বলা হয়েছে (এখানে ‘দিন’ শব্দের ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু ক্রমটি পরিষ্কারভাবে পৃথিবী-প্রথম দেখায়)। সূত্র: কুরআন ৪১:৯ (এবং দিনভিত্তিক বর্ণনার ক্ষেত্রে সহীহ মুসলিম ৬৯৪৭ উল্লেখ করা হয়)
৫. পৃথিবীর “কমপ্লিট” করা: পর্বত, বরকত, খাদ্য-ব্যবস্থা (আরও ২ দিন)
এরপর পৃথিবীর ভেতরেই “পর্বত স্থাপন”, “বরকত/ব্যবস্থা নির্ধারণ”, এবং জীবজগতের প্রয়োজনীয় “রিযিক/খাদ্য-ব্যবস্থা” সম্পন্ন করা হয়—এ অংশটিও পৃথক ২ দিনের কাজ হিসেবে বর্ণিত। সূত্র: কুরআন ৪১:১০ (এবং দিনভিত্তিক বর্ণনার ক্ষেত্রে সহীহ মুসলিম ৬৯৪৭ উল্লেখ করা হয়) এই পর্যায়ে “পৃথিবীর কাজ আগে শেষ” — তারপর “আসমান/মহাকাশের কাজ” শুরু—এটাই আপনার কাঙ্ক্ষিত মূল থিম।
৬. এরপর ডানের দিকে: ধোঁয়া-অবস্থার আসমানের দিকে মনোযোগ
পৃথিবীর নির্মাণ/ব্যবস্থা সম্পন্ন করার পরে আল্লাহ “আসমানের দিকে মনোযোগ দেন”—এবং তখন আসমান ছিল ধোঁয়া/ধূম্রকুঞ্জ (smoke-like state)। সূত্র: কুরআন ৪১:১১
বাম (Earth): কাজ সম্পন্ন ✅

পৃথিবীর স্থাপন, পর্বত/ব্যবস্থা, এবং রিযিক/খাদ্য-ব্যবস্থা “শেষ” হওয়ার পর দৃষ্টি আসমানে যায়।

ডান (Sky): ধোঁয়া অবস্থা ☁️

এই অবস্থাকে পরবর্তী ধাপে স্তরে-স্তরে সাজানো/বিন্যস্ত করার কথা বলা হয়।

৭. আসমান “ফাইনালাইজ”: সপ্ত আকাশ + নক্ষত্র/প্রদীপমালা (২ দিন)
শেষে আল্লাহ ধোঁয়া-অবস্থার আসমানকে সপ্ত আকাশে বিন্যস্ত করেন এবং নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা/নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুশোভিত করেন—এ পর্যায়কে ২ দিনের কাজ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সূত্র: কুরআন ৪১:১২ (এবং দিনভিত্তিক বর্ণনার ক্ষেত্রে সহীহ মুসলিম ৬৯৪৭ উল্লেখ করা হয়) এখানেই “পৃথিবী আগে সম্পন্ন, তারপর মহাকাশ/আকাশে গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি”—এই ক্রমটি দৃশ্যমান হয়।
আধুনিক বিজ্ঞান: মহাজাগতিক কালানুক্রম
১. বিগ ব্যাং (≈ ১৩৮০ কোটি বছর আগে)
একটি অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন প্রাথমিক অবস্থা থেকে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ—স্থান, কাল এবং শক্তি-পদার্থের বিবর্তনের সূচনা।
২. প্রথম নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি (খুব প্রাচীন সময়েই)
মহাবিশ্ব শীতল হওয়ার পর গ্যাসীয় মেঘ ঘনীভূত হয়ে প্রথম নক্ষত্র/গ্যালাক্সি গঠিত হয়—এগুলো পৃথিবী জন্মের বহু আগে উপস্থিত ছিল।
৩. ভারী মৌল তৈরি (নক্ষত্র-বিবর্তন/সুপারনোভা)
নক্ষত্রের ভেতর এবং নক্ষত্র-মৃত্যুর ঘটনাগুলোতে কার্বন, অক্সিজেন, সিলিকন, লোহা ইত্যাদি ভারী মৌল তৈরি হয়—পরে এগুলো থেকেই গ্রহ-শিলা-জীবদেহের কাঁচামাল আসে।
৪. সূর্যের জন্ম (≈ ৪৬০ কোটি বছর আগে)
সৌর নীহারিকা (solar nebula) সংকুচিত হয়ে আমাদের সৌরজগতের নক্ষত্র “সূর্য” গঠিত হয়।
৫. পৃথিবীর গঠন (≈ ৪৫৪ কোটি বছর আগে)
সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান ধূলিকণা ও শিলাখণ্ড জমে পৃথিবী গঠিত হয়—শুরুতে তা ছিল উত্তপ্ত/অগ্নিপিণ্ডসদৃশ।
৬. বায়ুমণ্ডল ও মহাসাগর (≈ ৪০০ কোটি বছর আগে)
পৃথিবী ধীরে ধীরে শীতল হওয়ার পর আদি বায়ুমণ্ডল ও তরল পানির স্থিতিশীল মহাসাগর তৈরি হয়।
৭. জটিল স্থলজ উদ্ভিদ ও অক্সিজেন-বৃদ্ধি (≈ ৪৫ কোটি বছর আগে)
স্থলজ উদ্ভিদের বিস্তার ও ফটোসিনথেসিসের দীর্ঘ ইতিহাসে বায়ুমণ্ডলীয় অক্সিজেনের ধরণ বদলায়—এগুলো সূর্য/নক্ষত্রের জন্মের বহু পরে ঘটে। [তুলনা-পয়েন্ট: বিজ্ঞান মতে নক্ষত্র আগে, তারপর পৃথিবী/জীবজগৎ; ইসলামি ক্রমে পৃথিবী-ব্যবস্থা আগে, তারপর আকাশে “প্রদীপমালা”।]

উপসংহার

উপরের কোরআনের আয়াত, হাদিস-ভিত্তিক বর্ণনা, তাফসীর-ধারা এবং প্রচলিত ইসলামি ব্যাখ্যাধারা/মুফাসসির-আলেমদের পাঠ অনুযায়ী দেখা যায়—সৃষ্টি-সংক্রান্ত ইসলামি “কালানুক্রম” (sequence) আধুনিক জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান ও ভূ-বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সময়রেখার সাথে মৌলিক স্তরে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলামি বর্ণনায় একটি কেন্দ্রীয় ইঙ্গিত হলো: আসমান–যমীন প্রথমে একসাথে/সংযুক্ত অবস্থায় ছিল, পরে আলাদা করা হয়; এরপর পৃথিবীর গঠন ও পৃথিবীর “ব্যবস্থা” (পর্বত স্থাপন, রিযিক/খাদ্য নির্ধারণ—যা গাছপালা/জীবজগতের অনুকূল পরিবেশ তৈরির দিকে ইঙ্গিত করে) আগে সম্পন্ন হয়, এবং তারপর আল্লাহ “ধোঁয়া-অবস্থার” আসমানের দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকে স্তরে-স্তরে বিন্যস্ত করেন ও নক্ষত্ররাজি/প্রদীপমালায় সুশোভিত করেন। এখানে ‘ধোঁয়া’ শব্দটিকে কেউ রূপক/অলংকারিক অর্থে নিলেও, আলোচ্য দ্বন্দ্বটি মূলত ক্রমগত (sequence): পৃথিবীর কাজ আগে সম্পন্ন, তারপর আকাশকে নক্ষত্ররাজিতে সাজানো—এই কাঠামোর সাথে আধুনিক টাইমলাইনের অসামঞ্জস্য থেকেই যায়। এই ক্রমটি টেক্সচুয়াল পাঠে পৃথিবীকে “প্রাথমিক ফোকাস” হিসেবে উপস্থিত করে—এবং নক্ষত্র/আকাশকে তুলনামূলকভাবে পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখায়।

সংক্ষেপে: ইসলামি বর্ণনায় আগে পৃথিবী ‘সম্পন্ন’ → পরে আকাশ ‘ফাইনালাইজ’ (সপ্তাকাশ/প্রদীপমালা); আর বিজ্ঞান-টাইমলাইনে আগে নক্ষত্র/গ্যালাক্সি → পরে সৌরজগত/পৃথিবী। কিন্তু আধুনিক বৈজ্ঞানিক টাইমলাইন বলছে ভিন্ন কথা। পর্যবেক্ষণ-ভিত্তিক কসমোলজি ও রেডিওমেট্রিক ডেটিংয়ের কনসেনসাস অনুযায়ী মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর, আর পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর। অর্থাৎ পৃথিবী মহাবিশ্বের উৎপত্তির অন্তত ~৯.৩ বিলিয়ন বছর পরে তৈরি হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়পর্বে গ্যালাক্সি গঠিত হয়েছে, নক্ষত্র জন্মেছে ও মারা গেছে, এবং নক্ষত্র-বিবর্তনের মাধ্যমেই ভারী মৌল (কার্বন, অক্সিজেন, সিলিকন, লোহা ইত্যাদি) তৈরি হয়ে পরবর্তী গ্রহ-গঠনের “কাঁচামাল” হয়েছে। ফলে পৃথিবী মহাবিশ্বের ‘প্রাথমিক’ সৃষ্টি নয়; বরং নক্ষত্র-গ্যালাক্সির দীর্ঘ বিবর্তনের পরবর্তী ধাপে গঠিত একটি গ্রহ। এই বাস্তবতায় “পৃথিবী আগে পূর্ণাঙ্গ, তারপর ধোঁয়া-আকাশ থেকে নক্ষত্র সৃষ্টি”—জাতীয় ক্রমগত কাঠামোটি বৈজ্ঞানিক সময়রেখার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না; অতএব দ্বন্দ্বটি ‘দিন’কে পর্ব/এপক ধরলেই মিটে যায় না; এটি প্রধানত আগে–পরে ক্রম (sequence conflict)–সংক্রান্ত।

শেষে একটি অনুরোধ: এখানে উল্লিখিত প্রতিটি আয়াত/হাদিস/তাফসীর-রেফারেন্স নিজে দেখে নিন, প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যাগুলো পাশাপাশি মিলিয়ে নিন, এবং তারপর সিদ্ধান্তে আসুন। লক্ষ্য হওয়া উচিত বিশ্বাস-অনুমান নয়, বরং যুক্তি, ধারাবাহিকতা, এবং যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে বিচার করা।


তথ্যসূত্রঃ
  1. Ancient geocentric intuition ↩︎
  2. Foundation/pillars motif ↩︎
  3. Ancient Near Eastern cosmology motifs ↩︎
  4. Celestial spheres; geocentrism ↩︎
  5. Aristotle: sublunary vs superlunary ↩︎
  6. Ptolemaic system ↩︎
  7. Decharneux 2023: late antique background ↩︎
  8. কোরআন ৩৫:৪১ ↩︎
  9. কুরআনুল কারীম, ২য় খণ্ড – ড. যাকারীয়া, পৃষ্ঠা ২৪৮২ ↩︎
  10. তাফসীরে মাযহারী, ১১তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২২ ↩︎
  11. তাফসীরে ইবনে কাসীর, খণ্ড ১০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ৪৮০-৪৮১ ↩︎
  12. কোরআন ৩১:১০ ↩︎
  13. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬৯ ↩︎
  14. ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম, ঈমান, শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহঃ) ↩︎
  15. ফতোয়ায়ে আরকানুল ইসলাম, শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেদ আল উসাইমীন, পৃষ্ঠা ৩৭, ৩৮, ৩৯ ↩︎
  16. সুনান আবু দাউদ(তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৭০০ ↩︎
  17. সূরা তওবা, আয়াত ৩৬ ↩︎
  18. সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), হাদিস নম্বরঃ ৪৩০৫ ↩︎
  19. সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী), হাদিস নাম্বারঃ ৩১৯৩ ↩︎
  20. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৮৩- ৫৮৬ ↩︎
  21. সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৩০ ↩︎

আসিফ মহিউদ্দীন

আসিফ মহিউদ্দীন সম্পাদক সংশয় - চিন্তার মুক্তির আন্দোলন [email protected]

7 thoughts on

  1. অাদমকে যদি সৃষ্টি করে থাকেন তবে তাকে বেহেশতে সৃষ্টি করেছেনে । পৃথিবীর দিন রাত্রির সময় হিসেবে কেন বর্ণনা থাকবে? সেখানে কোন সুর্যের অালোর বর্ণনা করা হচ্ছে ?

  2. মুমিন বিজ্ঞানীরা তো একেবারে শহীদ হয়ে যাবে। তারা না পারবে বিজ্ঞানকে অস্বীকার করতে না পারবে কোরআনকে। না পারবে বিজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারবে কোরআনকে।

  3. ভাই বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল। আগে সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর প্রদক্ষিনের কথা বলায় গ্যালিলিওর কি অবস্থা করা হয়েছিল মনে আছে কি? তাও আবার মাত্র ৪০০ বছর আগে ১৬ শতকের দিকে।
    এখন যা না জানি তা ভবিষ্যতে জানার সম্ভাবনা রয়েছে।
    আলোর চেয়ে অন্য কোন কিছুর গতি দ্রুত যেদিন বের হবে, সেদিন রাতা-রাতি সমগ্র বিজ্ঞানের জগৎ পাল্টে যাবে। বিজ্ঞানের অনেক ভিত্তি অনেক সূত্র আবার নতুন করে আবিষ্কৃত হবে।
    আর যখনই নতুন কিছু আবিষ্কৃত হবে আর তার সঙ্গে কোরআনের সাদৃশ্য পাওয়া যাবে, তখনই আমরা বলব একথা কোরআনে আরো অনেক আগে থেকেই ছিল, শুধু পর্যাপ্ত জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে তা আমরা বুঝতে পারিনি। সুতরাং কোরআন শরীফ constant আর বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল।
    আমার কাছে আরো অনেক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে,যা কুরআন শরীফের সাথে সম্পূর্ণ রূপে মিলে যায় আলহামদুলিল্লাহ। তবে তা আপনাকে জানানো সম্পূর্ণ অর্থহীন। কারণ আপনাদের মত লোকেরা জেনেও না জানার ভান করবে, বুঝেও না বুঝার ভান করবে। ঘুমন্ত ব্যক্তিকে জাগানো যায় তবে ঘুমের ভান করা ব্যক্তিকে জাগানো যায় না। তবে যেদিন প্রকৃত অর্থেই বুঝবেন সেদিন হয়তো আর হাতে সময় থাকবে না। আমার রবের দয়া অসীম, তাই সময় থাকতে ফিরে আসুন। আল্লাহ আপনাকে হেদায়েত নসিব করুক।

Leave a comment

Your email will not be published.