বিজ্ঞানঅবশ্যপাঠ্যসম্পাদকীয়

ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে পৃথিবী আগে সৃষ্টি নাকি মহাকাশ?

সংক্ষিপ্তসার

এই প্রবন্ধে কোরআন, হাদিস এবং ধ্রুপদী ইসলামি ব্যাখ্যাগ্রন্থে পাওয়া মহাবিশ্ব ও পৃথিবীর সৃষ্টি-সংক্রান্ত কয়েকটি নির্দিষ্ট কালানুক্রমিক দাবি আধুনিক কসমোলজি, জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান, গ্রহবিজ্ঞান ও ভূবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সময়রেখার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আলোচনার কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি হচ্ছে: পৃথিবী, আকাশমণ্ডলী এবং নক্ষত্ররাজির উৎপত্তি সম্পর্কে ইসলামি টেক্সটে যে আগে-পরে ক্রম পাওয়া যায়, পর্যবেক্ষণলব্ধ মহাজাগতিক ইতিহাস কি সেই একই ক্রম দেখায়?

বিশেষভাবে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে কোরআন ২:২৯ এবং ৪১:৯–১২। প্রথম আয়াতে পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব মানুষের জন্য সৃষ্টি করার পরে আকাশের দিকে মনোনিবেশ করে তাকে সাত আকাশে বিন্যস্ত করার কথা বলা হয়েছে। সূরা ফুসসিলাতের ধারাবর্ণনায় প্রথমে পৃথিবী সৃষ্টি, তারপর তাতে পর্বত স্থাপন, বরকত প্রদান ও খাদ্য/জীবিকার ব্যবস্থা নির্ধারণ, তারপর ধোঁয়া-অবস্থায় থাকা আকাশের দিকে মনোনিবেশ, তাকে সাত আকাশে বিন্যস্ত করা এবং নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালায় সুশোভিত করার বিবরণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ আলোচ্য সমস্যা ছয় “দিন” কত ঘণ্টার ছিল, এটি নয়; মূল প্রশ্ন হলো ঘটনাগুলোর ক্রম।

আধুনিক বিজ্ঞানের সময়রেখা এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখায়। মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর; পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর। অর্থাৎ মহাবিশ্বের জন্ম এবং পৃথিবীর জন্মের মধ্যে প্রায় ৯.৩ বিলিয়ন বছরের ব্যবধান রয়েছে। বিগ ব্যাং-এর পর পৃথিবী তো দূরের কথা, প্রথমদিকে কোনো নক্ষত্র বা গ্যালাক্সিও ছিল না। মহাবিশ্ব শীতল হওয়ার পরে প্রথম নক্ষত্রের জন্ম হয়; নক্ষত্রীয় নিউক্লিওসিন্থেসিস এবং পরবর্তী নাক্ষত্রিক বিবর্তনের বহু প্রজন্মের মধ্য দিয়ে কার্বন, অক্সিজেন, সিলিকন, লোহাসহ ভারী মৌল সমৃদ্ধ হয়; সেই পূর্ববর্তী মহাজাগতিক ইতিহাসের বহু পরে সূর্য ও সৌরজগত গঠিত হয়; এবং তারপর সৌরজাগতিক পদার্থের accretion থেকে পৃথিবীর জন্ম হয়। [1] [2] [3]

মূল ধাক্কাটা এখানেই—পৃথিবী অস্তিত্বে আসার আগেই মহাবিশ্ব প্রায় ৯৩০ কোটি বছরের ইতিহাস পার করে ফেলেছিল। পৃথিবী কোনো আদিম মহাজাগতিক মঞ্চ নয়, যার চারপাশে পরে আকাশ ও নক্ষত্র সাজানো হয়েছে। বরং পৃথিবী নিজেই পূর্ববর্তী মহাবিশ্ব, পূর্ববর্তী নক্ষত্র, ভারী মৌলের উৎপাদন এবং সৌরজগতের গঠন—এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতার ফল। পৃথিবীর শিলার লোহা, দেহের কার্বন, পানির অক্সিজেন—এসবের উপাদানগত ইতিহাসও পৃথিবীর চেয়ে পুরনো। ফলে পৃথিবীকে আগে প্রস্তুত করে পরে মহাজাগতিক আকাশকে নক্ষত্রমালায় সাজানোর কোনো বাস্তব মহাজাগতিক পর্ব ছিল না।

এই কারণে “দিন” (يوم) শব্দকে ২৪ ঘণ্টা না ধরে কোটি বা শত কোটি বছরের “যুগ” হিসেবে অনুবাদ করলেও সমস্যার সমাধান হয় না। সময়ের একক বড় করলে ক্রম উল্টে যায় না। “পৃথিবীর কাজ → তারপর ধোঁয়া-আকাশ → তারপর সাত আকাশ ও প্রদীপমালা”—এই ক্রমকে প্রতিটি ধাপে এক বিলিয়ন বছর করে দিলেও বিজ্ঞান যা বলছে তা হয়ে যায় না। বিজ্ঞান বলছে: মহাবিশ্ব → নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি → ভারী মৌল → সূর্য ও সৌরজগত → পৃথিবী → পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন → জীবজগৎ। সমস্যাটি duration conflict নয়; এটি মূলত sequence conflict।

প্রবন্ধটিতে আরও পরীক্ষা করা হবে ইসলামি কসমোলজির অন্যান্য উপাদান—সৃষ্টির পূর্বে পানির ওপর আরশ, “সর্বপ্রথম” কলম সৃষ্টি, পৃথিবীকে নড়াচড়া থেকে রক্ষার জন্য পর্বত স্থাপন, আকাশকে সাত স্তরে বিন্যস্ত করা, নিকটবর্তী আকাশে প্রদীপমালা, কাবার উল্লম্ব বরাবর বায়তুল মামুর এবং পৃথিবীর স্থিরতা সম্পর্কে প্রভাবশালী আলেমদের ব্যাখ্যা। এগুলো আলাদা বিচ্ছিন্ন বাক্য হিসেবে নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রাক-বৈজ্ঞানিক কসমোলজিক্যাল কাঠামোর অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হবে।

পদ্ধতি: প্রথমে সংশ্লিষ্ট কোরআনিক আয়াত, হাদিস এবং ধ্রুপদী ও প্রভাবশালী ইসলামি তাফসীরের বক্তব্য উপস্থাপন করা হবে। বিশেষভাবে সালাফি আকীদায় স্বীকৃত, প্রধান ইসলামি আলেমদের ব্যবহৃত এবং বহুল প্রচলিত ধর্মীয় উৎসগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এরপর এসব উৎসে উপস্থাপিত মহাজাগতিক দাবিগুলো বর্তমান কসমোলজি, জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান, গ্রহবিজ্ঞান ও ভূবিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণভিত্তিক সময়রেখার সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা হবে।

কোরআনের এই সৃষ্টিক্রম আধুনিক মহাজাগতিক ইতিহাসের সঙ্গে মেলে না। বিরোধটা কোনো ছোটখাটো সংখ্যা বা অনুবাদের ভুলেও সীমাবদ্ধ নয়; পৃথিবী মহাবিশ্বের ইতিহাসে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখানেই দুই বর্ণনা মুখোমুখি সংঘর্ষে পড়ে। আধুনিক বিজ্ঞানে পৃথিবী একটি অত্যন্ত পরবর্তী গ্রহ; আলোচ্য ধর্মীয় ধারাবর্ণনায় পৃথিবীই প্রথমদিকের নির্মাণের কেন্দ্র, আর আকাশের বিন্যাস ও প্রদীপমালার সজ্জা আসে পরবর্তী পর্যায়ে।


ভূমিকা

কোনো ধর্মগ্রন্থ মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য, নৈতিকতা, ঈশ্বর বা পরকালের মতো পরীক্ষাতীত বিষয়ে বক্তব্য দিলে সেগুলো সরাসরি পরীক্ষাগারে যাচাই করা সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু একই গ্রন্থ যখন পৃথিবী, আকাশ, সূর্য, নক্ষত্র, পর্বত, পানি কিংবা সৃষ্টি-ঘটনার আগে-পরে ক্রম সম্পর্কে বক্তব্য দেয়, তখন অন্তত সেই বক্তব্যের বাস্তব অংশটুকু আর পরীক্ষার বাইরে থাকে না। বাস্তব জগত সম্পর্কে করা দাবি বাস্তব জগতের প্রমাণ দিয়েই যাচাই করতে হয়।

কোনো গ্রন্থের ভৌত জগত সম্পর্কিত বক্তব্যকে বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করা যায়। পৃথিবী, আকাশ, নক্ষত্র বা সৃষ্টির আগে-পরে ক্রম সম্পর্কে বক্তব্যও এর ব্যতিক্রম নয়। কোরআনে পৃথিবীর ব্যবস্থা সম্পন্ন করার পরে ধোঁয়া-অবস্থার আকাশকে সাত আকাশে বিন্যস্ত করার যে ধারাবর্ণনা এসেছে, সেটিকে তাই বাস্তব মহাজাগতিক ইতিহাসের সময়রেখার সঙ্গেই মিলিয়ে দেখা হবে।

আধুনিক ইসলামি “বৈজ্ঞানিক মিরাকল” প্রচারণায় বিগ ব্যাং, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, ভ্রূণতত্ত্ব, পর্বতের ভূমিকা, লোহার মহাজাগতিক উৎসসহ বহু আধুনিক আবিষ্কার কোরআনে আগে থেকেই ছিল বলে দাবি করা হয়। এই প্রবন্ধে সেই দাবির একটি মৌলিক ক্ষেত্র—মহাবিশ্ব ও পৃথিবীর সৃষ্টিক্রম—সরাসরি বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সময়রেখার মুখোমুখি করা হবে। সেই তুলনায় ইসলামি সৃষ্টিতত্ত্বের ঘটনাক্রম ব্যর্থ হয়।

সৃষ্টিতত্ত্বের ক্ষেত্রে পালানোর জায়গা আরও কম। আধুনিক বিজ্ঞান শুধু এটুকু জানে না যে মহাবিশ্ব “অনেক পুরনো”; আমরা তার ইতিহাসের বিশাল অংশের সময়রেখাও পুনর্গঠন করতে পারি। স্বাধীন বহু প্রমাণ একসঙ্গে মিলিয়ে একটি বিস্তৃত কালানুক্রম তৈরি করা সম্ভব হয়েছে: মহাজাগতিক প্রসারণ ও cosmic microwave background থেকে আদি মহাবিশ্ব; নক্ষত্রের গঠন ও বিবর্তন থেকে ভারী মৌলের ইতিহাস; উল্কাপিণ্ড ও isotopic dating থেকে সৌরজগতের বয়স; radiometric dating থেকে পৃথিবীর বয়স; এবং শিলা, খনিজ ও জীবাশ্ম থেকে পৃথিবীর পরবর্তী বিবর্তন। এই সময়রেখার বিভিন্ন অংশ আলাদা বিজ্ঞানশাখা থেকে পাওয়া হলেও তারা পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কোরআনের সূরা ফুসসিলাত ৪১:৯–১২ এই আলোচনার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে প্রথমে পৃথিবী সৃষ্টি, তারপর তাতে পর্বত স্থাপন, বরকত প্রদান এবং খাদ্যের পরিমাণ/ব্যবস্থা নির্ধারণের কথা আসে। এরপর ব্যবহৃত হয়েছে ثُمَّ—“তারপর/অতঃপর”—এবং বলা হয়েছে স্রষ্টা আকাশের দিকে মনোনিবেশ করলেন, যখন সেটি ছিল دُخَانٌ—ধোঁয়া। তারপর সেই আকাশকে সাত আকাশে বিন্যস্ত করা এবং নিকটবর্তী আকাশকে مَصَابِيحَ—প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত করার কথা আসে। কোরআন ২:২৯-এও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সৃষ্টি করার পরে আকাশের দিকে মনোযোগ দিয়ে সাত আকাশে বিন্যস্ত করার একই সাধারণ ক্রম পাওয়া যায়।

এখানে কোরআনের ক্রমটাও অস্পষ্ট নয়: পৃথিবী সৃষ্টি, তাতে পর্বত ও খাদ্যব্যবস্থা নির্ধারণের পরে ধোঁয়া-অবস্থার আকাশকে সাত আকাশে বিন্যস্ত করা এবং নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালায় সুশোভিত করা হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান এর সম্পূর্ণ বিপরীত ইতিহাস দেখায়। পৃথিবীর জন্মের বহু বিলিয়ন বছর আগেই নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি ছিল; এমনকি পৃথিবীর বহু আগে গ্রহব্যবস্থাও গঠিত হয়েছিল। তাই বিরোধটা কোনো একটি আরবি শব্দের অর্থ নিয়ে নয়; বিরোধটা পুরো ঘটনাক্রমে।

“দিন”কে ২৪ ঘণ্টা না বলে একেকটি দীর্ঘ যুগ বানালেও কিছুই বদলায় না। প্রতিটি “দিন”কে এক বিলিয়ন বছর ধরলেও “পৃথিবী → পর্বত ও খাদ্যব্যবস্থা → তারপর ধোঁয়া-আকাশ → সাত আকাশ ও প্রদীপমালা” ক্রমটি একই থাকে। সময় বাড়িয়ে ভুল সৃষ্টিক্রমকে সঠিক করা যায় না; সময় বাড়ানো যায়, ঘটনা অদলবদল করা যায় না।

এই প্রবন্ধে তাই তিনটি বিষয় সরাসরি দেখা হবে। প্রথমত, কোরআন, হাদিস ও ধ্রুপদী তাফসীরে মহাবিশ্ব ও পৃথিবীর সৃষ্টিক্রম কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে? দ্বিতীয়ত, আধুনিক বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণভিত্তিক সময়রেখায় নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, সূর্য, পৃথিবী ও জীবনের অবস্থান কোথায়? তৃতীয়ত, এই দুই সময়রেখাকে পাশাপাশি রাখলে অসামঞ্জস্যটি কি কেবল অনুবাদের স্তরে থাকে, নাকি তা সৃষ্টিতত্ত্বের কাঠামোগত স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায়?

এই তুলনার আগে প্রাচীন বিশ্বের কসমোলজিক্যাল পরিবেশটিও দেখা প্রয়োজন। কারণ সাত স্তরের আকাশ, পৃথিবীকে মানুষের জন্য বিস্তৃত মঞ্চ, আকাশকে উপরের কাঠামো, মহাজাগতিক পানি, আকাশীয় গোলক এবং পৃথিবীকেন্দ্রিক দৃশ্যমান জগত—এসব ধারণা সপ্তম শতাব্দীতে সাংস্কৃতিক শূন্যতার মধ্যে হঠাৎ জন্ম নেয়নি। প্রাচীন নিকটপ্রাচ্য, গ্রিক-রোমান দর্শন এবং লেট-অ্যান্টিক ইহুদি-খ্রিস্টীয় সাহিত্যে এর বহু পূর্বসূরি ও সমান্তরাল ধারণা ছিল। আধুনিক কোরআন-গবেষণাতেও কোরআনিক কসমোলজিকে এই Late Antique বৌদ্ধিক পরিবেশের সঙ্গে তুলনা করে অধ্যয়ন করা হয়। [4]

একবিংশ শতাব্দীর আবিষ্কার হাতে নিয়ে সপ্তম শতাব্দীর শব্দের অর্থ পাল্টে দিলে সেটি বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস হয় না; সেটি হয় পরে বসানো ব্যাখ্যা। টেক্সটকে তার নিজস্ব ভাষা, বক্তব্যের ক্রম এবং ঐতিহাসিক কসমোলজিক্যাল পরিবেশে পড়লেই দেখা যায়—এখানে আধুনিক মহাবিশ্বের বিবরণ নেই; রয়েছে প্রাক-বৈজ্ঞানিক যুগের পরিচিত মহাজাগতিক কাঠামো।


প্রাচীন বিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব ও মহাজাগতিক ধারণা

কোরআনিক কসমোলজির ভাষা বুঝতে হলে সপ্তম শতাব্দীর মানুষ কোন বৌদ্ধিক পরিবেশে মহাবিশ্ব সম্পর্কে চিন্তা করত, সেটি জানা জরুরি। আধুনিক মানুষ “আকাশ” বলতে প্রায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে atmosphere, interplanetary space, interstellar space এবং billions of galaxies-সমৃদ্ধ মহাবিশ্ব কল্পনা করে। কিন্তু প্রাচীন ও লেট-অ্যান্টিক জগতে “আকাশ” এই আধুনিক ধারণার সমার্থক ছিল না। বিভিন্ন সভ্যতায় পৃথিবী, আকাশ, সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্রকে একটি সীমাবদ্ধ এবং সুসজ্জিত মহাজাগতিক স্থাপত্যের অংশ হিসেবে কল্পনা করা হতো।

প্রাচীন নিকটপ্রাচ্য, মিশরীয়, গ্রিক-রোমান এবং লেট-অ্যান্টিক কসমোলজির বিভিন্ন ধারায় কয়েকটি মোটিফ বারবার ফিরে আসে: পৃথিবী ও আকাশকে পৃথক মহাজাগতিক অঞ্চল হিসেবে দেখা; আকাশের একাধিক স্তর বা অঞ্চল; পৃথিবীর উপরে কোনো দৃঢ় আকাশীয় কাঠামো; মহাজাগতিক পানি; নক্ষত্রের জন্য নির্দিষ্ট আকাশীয় অঞ্চল; এবং মানুষের বসবাসযোগ্য পৃথিবীকে মহাবিশ্ব-বর্ণনার কেন্দ্রীয় রেফারেন্স হিসেবে নেওয়া।

পৃথিবী

আকাশ ও পৃথিবীর পৃথকীকরণ: প্রাচীন একটি বহুল প্রচলিত মোটিফ

আকাশ ও পৃথিবী আদিতে সংযুক্ত ছিল এবং পরে কোনো দেবতা বা ঐশ্বরিক ক্রিয়ায় পৃথক হয়েছে—এই ধারণা কোরআনের বহু শতাব্দী আগেই বিভিন্ন সৃষ্টিতত্ত্বে উপস্থিত ছিল। মিশরীয় পুরাণে আকাশের দেবী নুট (Nut) ও পৃথিবীর দেবতা গেবকে (Geb) শু (Shu) পৃথক করেন; গ্রিক ঐতিহ্যে Gaia ও Uranus-এর পৃথকীকরণ মহাজাগতিক বিন্যাসের অংশ; মেসোপটেমীয় ঐতিহ্যেও আকাশ ও পৃথিবীর বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির একটি মৌলিক মোটিফ হিসেবে পাওয়া যায়। ফলে “আকাশ ও পৃথিবী এক ছিল, পরে আলাদা হলো”—এই বাক্যগঠন নিজে কোনো আধুনিক Big Bang ধারণার স্বাক্ষর নয়; এটি প্রাচীন সৃষ্টিতত্ত্বে আগে থেকেই পরিচিত একটি ধারণাগত কাঠামো।

এখানেই “বৈজ্ঞানিক মিরাকল” দাবির আরেকটি ভিত্তি ভেঙে পড়ে। আকাশ ও পৃথিবী আগে যুক্ত ছিল—এই ধারণা সপ্তম শতাব্দীর মানুষের কল্পনার বাইরে ছিল না; বহু পুরনো সৃষ্টিকাহিনিতেই এটি ছিল পরিচিত মোটিফ। আধুনিক Big Bang model আদৌ বলে না যে “আকাশ ও পৃথিবী একসাথে ছিল” এবং পরে দুটিকে আলাদা করা হয়েছে। পৃথিবীর অস্তিত্বই Big Bang-এর প্রায় ৯.৩ বিলিয়ন বছর পরে। Big Bang cosmology বর্ণনা করে উত্তপ্ত ও ঘন আদি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, primordial nucleosynthesis, cosmic microwave background এবং পরবর্তী structure formation-এর ইতিহাস। ফলে প্রাচীন “আকাশ ও পৃথিবী সংযুক্ত ছিল, পরে পৃথক হলো” মোটিফকে Big Bang-এর বিবরণ বলা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পূর্বাভাস নয়; এটি আধুনিক কসমোলজিকে একটি প্রাচীন সৃষ্টিকাহিনির ওপর পশ্চাৎমুখীভাবে চাপিয়ে দেওয়া।


স্তরবিশিষ্ট আকাশ ও মহাজাগতিক কাঠামো

একাধিক আকাশ বা স্তরবিশিষ্ট স্বর্গের ধারণা কোরআনের বহু আগেই প্রচলিত ছিল। ইহুদি ও লেট-অ্যান্টিক ধর্মীয় সাহিত্যে বহুস্তর আকাশ এবং “সাত আকাশ”-এর ধারণা ইসলাম-পূর্ব যুগেই পাওয়া যায়। আধুনিক গবেষক Julien Decharneux কোরআনিক কসমোলজিকে Late Antique biblical ও বিশেষত Syriac Christian cosmological tradition-এর প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেছেন। [4]

কোরআনে সাত আকাশের উল্লেখ একবার নয়, একাধিকবার এসেছে—২:২৯, ১৭:৪৪, ২৩:৮৬, ৪১:১২, ৬৫:১২, ৬৭:৩, ৭১:১৫ এবং ৭৮:১২-সহ বিভিন্ন স্থানে। ৬৭:৩ ও ৭১:১৫-এ আকাশগুলোকে ṭibāqan বা স্তরে-স্তরে/একটির ওপর আরেকটি বিন্যস্ত বলে বর্ণনা করা হয়। বহুস্তর আকাশ ছিল প্রাচীন ও লেট-অ্যান্টিক কসমোলজির পরিচিত ধারণা; এটি আধুনিক galaxy, dimension বা atmospheric layer-এর কোনো বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস নয়। পরবর্তী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সঙ্গে “সাত আকাশ”কে জোড়ার চেষ্টা সরাসরি পশ্চাৎমুখী পুনর্ব্যাখ্যা।


গ্রিক কসমোলজি: কেন্দ্রে পৃথিবী, চারপাশে আকাশীয় গোলক

গ্রিক প্রাকৃতিক দর্শনে বিশেষত এরিস্টটলীয় কসমোলজিতে পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রে স্থির ছিল। পৃথিবীর চারদিকে চাঁদ, সূর্য, গ্রহ ও নক্ষত্রের জন্য পৃথক আকাশীয় গোলক কল্পনা করা হতো। পৃথিবীর কাছের “সাবলুনারি” জগৎ ছিল পরিবর্তনশীল—পৃথিবী, পানি, বায়ু ও আগুনের অঞ্চল; এর ওপরে “সুপারলুনারি” জগৎ ছিল ভিন্ন প্রকৃতির, নিয়মিত বৃত্তীয় গতির আকাশীয় অঞ্চল। এরিস্টটলীয় ব্যবস্থায় বহু celestial sphere-এর ধারণা সুস্পষ্ট ছিল। [5]

পরবর্তী সময়ে ক্লডিয়াস টলেমি পৃথিবীকেন্দ্রিক জ্যোতির্বিদ্যাকে অত্যন্ত উন্নত গাণিতিক কাঠামো দেন। deferent, epicycle এবং অন্যান্য জ্যামিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে গ্রহগুলোর আকাশে দেখা জটিল গতি পূর্বানুমান করা সম্ভব ছিল। টলেমীয় ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণকে কিছুটা সফলভাবে গণনা করতে পারলেও এর কেন্দ্রীয় মহাজাগতিক কাঠামো ভুল ছিল: পৃথিবী মহাবিশ্বের স্থির কেন্দ্র নয়। ফলে প্রাচীন কোনো কসমোলজি জটিল বা প্রভাবশালী ছিল—এতে তার ভৌত দাবিগুলো সত্য হয়ে যায় না।


লেট অ্যান্টিক পরিবেশ ও কোরআনিক কসমোলজি

কোরআনের আবির্ভাব এমন কোনো বিচ্ছিন্ন মরুভূমিতে হয়নি যেখানে বাইরের ধর্মীয় বা দার্শনিক ধারণার কোনো উপস্থিতি ছিল না। সপ্তম শতাব্দীর আরব ছিল বৃহত্তর Late Antique Near East-এর অংশ—যেখানে ইহুদি, বিভিন্ন খ্রিস্টীয় সম্প্রদায়, জরথুস্ত্রী, আরব ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং গ্রিক-সিরিয়াক বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার পরস্পরের সংস্পর্শে ছিল। আধুনিক কোরআন-গবেষণায় তাই কোরআনের কাহিনি, ধর্মতত্ত্ব এবং কসমোলজিকে Late Antique context-এর মধ্যে পড়া একটি প্রতিষ্ঠিত গবেষণা-পদ্ধতি।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট। সাত আকাশ, পৃথিবী-আকাশের পৃথকীকরণ, আকাশীয় প্রদীপ, মহাজাগতিক পানি এবং পৃথিবীকেন্দ্রিক মহাবিশ্ব—এসব ধারণা সপ্তম শতাব্দীর আরবে কোনো অজানা বৈজ্ঞানিক রহস্য ছিল না; পূর্ববর্তী ও সমকালীন ধর্মীয়-কসমোলজিক্যাল ঐতিহ্যে এসবের সুস্পষ্ট পূর্বসূরি ছিল। Julien Decharneux-এর গবেষণাতেও কোরআনিক কসমোলজির Late Antique ভিত্তি এবং পূর্ববর্তী খ্রিস্টীয় ও ইহুদি কসমোলজির সঙ্গে তার ধারাবাহিকতা বিস্তারিতভাবে দেখানো হয়েছে। অতএব এসব পুরনো কসমোলজিক্যাল মোটিফকে আধুনিক Big Bang, astrophysics বা cosmology-এর অলৌকিক পূর্বাভাস হিসেবে চালানো ইতিহাস নয়, বিজ্ঞানও নয়; এটি আধুনিক জ্ঞান আবিষ্কারের পরে প্রাচীন টেক্সটকে সেই জ্ঞানের ভাষায় পুনর্লিখন করা। [6]

বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাসের অর্থই হলো এমন কিছু আগে বলা, যা তখনকার প্রচলিত ধারণার বাইরে এবং পরে স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়। কিন্তু কোনো টেক্সট যদি তার সমকালীন জগতের পরিচিত কসমোলজিক্যাল ভাষা—পৃথিবী, বহুস্তর আকাশ, প্রদীপসদৃশ নক্ষত্র, আকাশ-পৃথিবীর বিচ্ছেদ—ব্যবহার করে, তবে আধুনিক জ্ঞান আবিষ্কারের পরে সেই শব্দগুলোকে galaxies, spacetime, Big Bang বা astrophysics-এর ভাষায় পুনঃঅনুবাদ করা পূর্বাভাস নয়; এটি পশ্চাৎমুখী পুনর্ব্যাখ্যা।


মহাবিশ্বের উদ্ভব এবং কালানুক্রমিক বিবর্তন

প্রথমে বাস্তব মহাবিশ্বের সময়রেখাটা সামনে রাখা যাক। আধুনিক কসমোলজি, জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান, নাক্ষত্রিক পদার্থবিজ্ঞান, গ্রহবিজ্ঞান এবং ভূবিজ্ঞানের সমন্বিত তথ্য আমাদের এমন একটি মহাজাগতিক সময়রেখা দিয়েছে, যেখানে পৃথিবীর অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার: পৃথিবী মহাবিশ্বের প্রাথমিক সৃষ্টি নয়; এটি মহাবিশ্বের প্রায় ৯৩০ কোটি বছরের পূর্ববর্তী বিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল একটি অনেক পরের উৎপাদ।

আধুনিক বিশ্বতত্ত্বে মহাবিশ্ব বলতে শুধু আমাদের চোখে দেখা সূর্য, চাঁদ, নক্ষত্র বা গ্যালাক্সিকে বোঝানো হয় না। স্থান (space), কাল (time), পদার্থ (matter), শক্তি (energy), বিকিরণ, সাধারণ পদার্থ, গুপ্ত পদার্থ (dark matter), তমোশক্তি (dark energy), নক্ষত্র, গ্যালাক্সি এবং বৃহৎ মহাজাগতিক কাঠামো—সবই মহাবিশ্বের অংশ। এই মহাবিশ্বের বর্তমান বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বা ১,৩৮০ কোটি বছর। [1]


বিগ ব্যাং: পৃথিবী, সূর্য বা নক্ষত্র দিয়ে মহাবিশ্বের শুরু হয়নি

বিগ ব্যাংকে প্রায়ই একটি ফাঁকা মহাশূন্যের মধ্যে সংঘটিত সাধারণ বিস্ফোরণ হিসেবে কল্পনা করা হয়। আধুনিক কসমোলজির বক্তব্য তা নয়। মহাবিশ্বের অতীত অনুসরণ করলে আমরা একটি অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন প্রাথমিক অবস্থায় পৌঁছাই, যেখান থেকে স্থানসহ মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ও বিবর্তনের ইতিহাস শুরু হয়। এই প্রাথমিক মহাবিশ্বে আজকের পৃথিবী, সূর্য, সৌরজগত, নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির কোনো অস্তিত্ব ছিল না।

এই তথ্যটিই কোরআনিক “আকাশ ও পৃথিবী”কে মহাবিশ্বের আদিম দুই সত্তা হিসেবে কল্পনা করার সঙ্গে প্রথম মৌলিক সংঘাত তৈরি করে। বিগ ব্যাং-এর সময়ে “আকাশ” একদিকে এবং “পৃথিবী” আরেকদিকে—এমন দুটি বস্তু ছিল না, যাদের একত্রিত বা পৃথক করার প্রশ্ন উঠতে পারে। পৃথিবী নামক গ্রহটির অস্তিত্বই শুরু হয়েছে মহাবিশ্বের জন্মের প্রায় ৯৩০ কোটি বছর পরে।


প্রথম কয়েক মিনিট: পৃথিবীর উপাদানও তখন তৈরি হয়নি

বিগ ব্যাং-এর পর মহাবিশ্ব দ্রুত প্রসারিত ও শীতল হতে থাকে। প্রথম কয়েক মিনিটে সংঘটিত Big Bang nucleosynthesis-এর মাধ্যমে প্রধানত হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের নিউক্লিয়াস এবং সামান্য লিথিয়াম তৈরি হয়। কিন্তু পৃথিবীর শিলা, পর্বত, মহাসাগর এবং জীবদেহ গঠনের জন্য অপরিহার্য কার্বন, অক্সিজেন, সিলিকন, লোহাসহ অধিকাংশ ভারী মৌল তখনো তৈরি হয়নি।

এখানেই পৃথিবীর উৎপত্তি সম্পর্কে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণগত সত্য পাওয়া যায়। পৃথিবী শুধু মহাবিশ্বের পরে তৈরি হয়েছে—এতটুকুই নয়; পৃথিবী যে পদার্থ দিয়ে তৈরি, সেই পদার্থের একটি বড় অংশও আদিম মহাবিশ্বে ছিল না। পৃথিবীর লোহা, শিলার সিলিকন, পানির অক্সিজেন এবং জীবনের কার্বনের nuclear history পরবর্তী নক্ষত্রীয় বিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।


প্রায় ৩,৮০,০০০ বছর পরে: তখনো কোনো পৃথিবী বা নক্ষত্র নেই

বিগ ব্যাং-এর প্রায় ৩,৮০,০০০ বছর পরে মহাবিশ্ব যথেষ্ট ঠান্ডা হলে electron ও atomic nucleus মিলিত হয়ে neutral atom গঠন করতে শুরু করে। এই পর্যায়কে recombination বলা হয়। এরপর আলো মহাবিশ্বের ভেতর তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে চলতে পারে। সেই প্রাচীন বিকিরণের অবশেষই আজ আমরা Cosmic Microwave Background (CMB) হিসেবে পর্যবেক্ষণ করি। [1]

এই সময়েও কোনো পৃথিবী ছিল না, কোনো সূর্য ছিল না, এমনকি একটি নক্ষত্রও জ্বলছিল না। সমগ্র মহাবিশ্বে পৃথিবীকে “প্রস্তুত” করা, পর্বত বসানো, খাদ্য নির্ধারণ করা বা পৃথিবীর পরে আকাশে নক্ষত্র সাজানোর প্রশ্নই ওঠে না। বাস্তব মহাজাগতিক ইতিহাস তখনও নক্ষত্র গঠনের পর্যায়েই পৌঁছেনি।


প্রথম নক্ষত্র: পৃথিবীর প্রায় ৯০০ কোটি বছর আগে

মহাকর্ষের প্রভাবে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম-সমৃদ্ধ গ্যাসের ঘন অঞ্চলগুলো ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। বর্তমান মহাজাগতিক মডেল অনুযায়ী বিগ ব্যাং-এর প্রায় ১০ কোটি বছর পর থেকেই প্রথম নক্ষত্র গঠিত হতে শুরু করতে পারে। এই প্রথম প্রজন্মের নক্ষত্রগুলোকে সাধারণভাবে Population III stars বলা হয়। [7]

এর অর্থ অত্যন্ত পরিষ্কার: পৃথিবী তৈরি হওয়ার প্রায় ৯০০ কোটি বছর আগে থেকেই মহাবিশ্বে নক্ষত্রের যুগ শুরু হয়ে গিয়েছিল। কাজেই পৃথিবী প্রথমে তৈরি হয়েছে এবং তার পরে মহাজাগতিক “আকাশে” নক্ষত্র বা প্রদীপের পর্যায় এসেছে—এমন কোনো বাস্তব মহাজাগতিক সময়রেখা নেই। বাস্তব ইতিহাস ঠিক উল্টো।


নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি: পৃথিবীর বহু বিলিয়ন বছর আগের মহাবিশ্ব

প্রথম নক্ষত্রের জন্মের পর মহাকর্ষের প্রভাবে নক্ষত্র, গ্যাস ও dark matter বৃহত্তর কাঠামোয় সংগঠিত হয়ে প্রথম গ্যালাক্সিগুলো গঠন করতে থাকে। এরপর কয়েকশ কোটি বছর ধরে গ্যালাক্সির ভেতরে নতুন নতুন প্রজন্মের নক্ষত্র জন্মায়, বিবর্তিত হয় এবং মৃত্যুবরণ করে। অর্থাৎ পৃথিবীর জন্মের আগে মহাবিশ্ব কোনো অস্পষ্ট “ধোঁয়া” হিসেবে অপেক্ষা করছিল না; সেখানে ইতোমধ্যেই নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু, গ্যালাক্সির গঠন ও বিবর্তন এবং রাসায়নিক enrichment-এর বিশাল ইতিহাস ঘটে গেছে।

পৃথিবী যখন তৈরি হয়, তখন মহাবিশ্ব নতুন বা অসম্পূর্ণ ছিল না। মহাবিশ্বের বয়স তখন প্রায় ৯.২ বিলিয়ন বছর। পৃথিবীর জন্মের মুহূর্তের আগেই অসংখ্য নক্ষত্র তাদের পূর্ণ জীবনচক্র শেষ করেছে, গ্যালাক্সি বিবর্তিত হয়েছে এবং গ্রহ তৈরির উপযোগী ভারী মৌলে আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যম সমৃদ্ধ হয়েছে।


নক্ষত্রের ভেতর তৈরি হলো পৃথিবীর কাঁচামাল

প্রথম দিকের মহাবিশ্ব প্রধানত হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামে সমৃদ্ধ ছিল। পরবর্তী নক্ষত্রগুলো তাদের কেন্দ্রের nuclear fusion-এর মাধ্যমে হালকা মৌল থেকে ক্রমে ভারী মৌল তৈরি করে। নক্ষত্রের বিবর্তন, supernova বিস্ফোরণ এবং অন্যান্য উচ্চ-শক্তির নাক্ষত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব মৌল মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। NASA-র ব্যাখ্যায়ও কার্বন ও অক্সিজেনের মতো মৌল নক্ষত্রীয় fusion-এর মাধ্যমে এবং লোহাসহ ভারী মৌলের ইতিহাস massive stars ও supernova-র সঙ্গে যুক্ত। [8]

এই কারণে আমাদের শরীরের কার্বন, রক্তের লোহা, পৃথিবীর শিলার সিলিকন এবং পানির অক্সিজেনের ইতিহাস পৃথিবীর জন্মের আগের। এগুলো কোনো সদ্য নির্মিত পৃথিবীর ভেতরে শূন্য থেকে তৈরি হয়নি। পূর্ববর্তী মহাজাগতিক ও নাক্ষত্রিক বিবর্তনের উপাদান থেকেই পৃথিবী গঠিত হয়েছে।

অতএব নক্ষত্র পৃথিবীর পরে আসেনি; পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্যই পূর্ববর্তী নক্ষত্রীয় ইতিহাস প্রয়োজন ছিল। এই একটি বৈজ্ঞানিক সত্যই পৃথিবী-প্রথম সৃষ্টিক্রমকে ভেঙে দেয়। যে গ্রহের নির্মাণসামগ্রী পূর্ববর্তী নক্ষত্র থেকে এসেছে, সেই গ্রহকে নক্ষত্রের আগের সৃষ্টি বানানো কার্যকারণকেই উল্টো করে দেওয়া।


সূর্যের জন্ম: পৃথিবীর আগে

প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে আন্তঃনাক্ষত্রিক gas ও dust-সমৃদ্ধ একটি molecular cloud-এর অংশ মহাকর্ষের প্রভাবে সংকুচিত হয়ে একটি ঘূর্ণায়মান solar nebula বা protoplanetary disk তৈরি করে। এর কেন্দ্রীয় অঞ্চলে জন্ম নেয় সূর্য; চারপাশে অবশিষ্ট পদার্থের সংঘর্ষ ও accretion-এর মাধ্যমে গ্রহ, উপগ্রহ, asteroid এবং সৌরজগতের অন্যান্য বস্তু গঠিত হয়। [9]

অর্থাৎ সূর্যকে পরে পৃথিবীর আকাশে “বসানো” হয়নি। পৃথিবী এমন একটি disk-এর পদার্থ থেকে তৈরি হয়েছে যার কেন্দ্রেই সূর্যের জন্ম হয়েছে। সূর্য ছাড়া পৃথিবীর বর্তমান গ্রহীয় অস্তিত্বের ইতিহাসই ব্যাখ্যা করা যায় না। পৃথিবী ও সূর্যের সম্পর্ক কোনো আগে তৈরি পৃথিবীর ওপর পরে একটি প্রদীপ ঝুলিয়ে দেওয়ার সম্পর্ক নয়; পৃথিবী সূর্যকেন্দ্রিক protoplanetary system-এর উৎপাদ।


পৃথিবীর জন্ম: প্রায় ৪৫৪ কোটি বছর আগে

Radiometric dating, meteorite dating এবং সৌরজগতের প্রাচীন পদার্থের isotopic analysis থেকে পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪.৫৪ ± ০.০৫ বিলিয়ন বছর নির্ধারিত হয়েছে। [10]

পৃথিবীর জন্মের অর্থও আজকের পৃথিবীর সবকিছু একসঙ্গে তৈরি হয়ে যাওয়া নয়। নবগঠিত পৃথিবী ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত, সংঘর্ষপ্রবণ এবং ভূতাত্ত্বিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি গ্রহ। পরবর্তী দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে crust, atmosphere, ocean, continent এবং জীবনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বর্তমান পৃথিবী কোনো ছয় দিনের নির্মাণশেষে প্রস্তুত অবস্থায় দাঁড়িয়ে যায়নি; এটি কয়েকশ কোটি বছরের ধারাবাহিক প্রাকৃতিক বিবর্তনের ফল।


পৃথিবীপূর্ব মহাজাগতিক ইতিহাস: ৯৩০ কোটি বছরের বিশাল ব্যবধান

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যাগুলো পাশাপাশি রাখা যাক:

  • মহাবিশ্বের বয়স: প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর বা ১,৩৮০ কোটি বছর।
  • প্রথম নক্ষত্রের সূচনা: বিগ ব্যাং-এর প্রায় ১০ কোটি বছর পর থেকেই।
  • সৌরজগতের বয়স: প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর বা ৪৬০ কোটি বছর।
  • পৃথিবীর বয়স: প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর বা ৪৫৪ কোটি বছর।
  • মহাবিশ্ব ও পৃথিবীর বয়সের ব্যবধান: প্রায় ৯.২৬ বিলিয়ন বছর—সহজ হিসাবে প্রায় ৯৩০ কোটি বছর।

অর্থাৎ পৃথিবী তৈরি হওয়ার আগে প্রায় ৯৩০ কোটি বছর ধরে মহাবিশ্বের ইতিহাস চলেছে। এই সময়ের মধ্যে নক্ষত্র জন্মেছে, নক্ষত্র মারা গেছে, গ্যালাক্সি গঠিত ও বিবর্তিত হয়েছে, ভারী মৌল তৈরি ও ছড়িয়ে পড়েছে, নতুন প্রজন্মের নক্ষত্র তৈরি হয়েছে এবং গ্রহ গঠনের রাসায়নিক উপাদান প্রস্তুত হয়েছে। পৃথিবী এই দীর্ঘ ইতিহাসের শেষে তৈরি হওয়া একটি গ্রহ।

এই সময়রেখার সামনে পৃথিবীকে মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রথম পর্যায়ের বস্তু বানানোর কোনো সুযোগ নেই। আরও স্পষ্ট করে বললে, পৃথিবী মহাবিশ্বের প্রাথমিক মঞ্চ নয়; মহাবিশ্বের দীর্ঘ পূর্ববর্তী ইতিহাসই পৃথিবীর জন্মের শর্ত তৈরি করেছে।


দুই সময়রেখার সংঘাত এখানেই শুরু

এই বৈজ্ঞানিক সময়রেখা সামনে রাখলে পরবর্তী ইসলামি বর্ণনাগুলো যাচাই করা অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়। কোরআনিক ধারাবর্ণনায় পৃথিবী সৃষ্টির পর তাতে পর্বত, বরকত ও খাদ্যের ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়; তারপর ধোঁয়া-অবস্থার আকাশের দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়; তারপর তাকে সাত আকাশে বিন্যস্ত এবং নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালায় সুশোভিত করা হয়। বাস্তব মহাজাগতিক ইতিহাসে ঘটনাক্রমটি উল্টো: নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির যুগ পৃথিবীর বহু বিলিয়ন বছর আগে শুরু হয়েছে, সেই নক্ষত্রীয় ইতিহাস থেকেই পৃথিবীর উপাদান এসেছে, সূর্য গঠনের পরে তার চারপাশের protoplanetary disk থেকে পৃথিবী তৈরি হয়েছে।

তাই এটি কোনো ক্ষুদ্র সংখ্যাগত ভুল নয়। এটি মহাজাগতিক ইতিহাসের মৌলিক ক্রম উল্টে দেওয়া। একদিকে বিজ্ঞান বলছে:

আদি মহাবিশ্ব → প্রথম নক্ষত্র → গ্যালাক্সি → নাক্ষত্রিক বিবর্তন → ভারী মৌল → পরবর্তী নক্ষত্র ও গ্রহব্যবস্থা → সূর্য → পৃথিবী → পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ও জৈব বিবর্তন।

অন্যদিকে আলোচ্য ইসলামি ধারাবর্ণনায় পৃথিবী ও তার ব্যবস্থা প্রথমদিকের নির্মাণের কেন্দ্রে, এবং তার পরে ধোঁয়া-আকাশের বিন্যাস ও প্রদীপমালার পর্যায় আসে। দুটি সময়রেখা একই হতে পারে না। একটি পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ, পদার্থবিজ্ঞান ও রেডিওমেট্রিক প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে; অন্যটি প্রাক-বৈজ্ঞানিক ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্বের বর্ণনা।


পৃথিবীর উৎপত্তি ও বয়স: একটি মহাজাগতিক কালানুক্রম

আগের পরিচ্ছেদে আমরা দেখেছি, পৃথিবীর জন্মের আগে মহাবিশ্বের প্রায় ৯৩০ কোটি বছরের ইতিহাস ইতোমধ্যেই অতিক্রান্ত হয়েছিল। সেই দীর্ঘ সময়ে নক্ষত্র জন্মেছে, গ্যালাক্সি গঠিত হয়েছে, নক্ষত্রের ভেতরে ভারী মৌল তৈরি হয়েছে, নক্ষত্র বিস্ফোরিত হয়ে সেই মৌল মহাকাশে ছড়িয়ে দিয়েছে এবং নতুন প্রজন্মের নক্ষত্র ও গ্রহব্যবস্থা গঠনের উপাদান প্রস্তুত হয়েছে। এই দীর্ঘ মহাজাগতিক বিবর্তনের অনেক পরে আমাদের সূর্য এবং তার চারপাশের সৌরজগতের জন্ম। পৃথিবী সেই সৌরজগতেরই একটি পরবর্তী উৎপাদ।

অর্থাৎ বাস্তব মহাজাগতিক ইতিহাসে পৃথিবী কোনো আদিম কেন্দ্র নয়, যাকে আগে তৈরি করে পরে তার মাথার ওপর আকাশ, সূর্য, নক্ষত্র ও গ্রহ সাজানো হয়েছে। পৃথিবী নিজেই পূর্ববর্তী নক্ষত্র, পূর্ববর্তী মৌল-উৎপাদন এবং পূর্ববর্তী মহাজাগতিক বিবর্তনের ফল। এই একটি সত্যই পৃথিবী-প্রথম সৃষ্টিতত্ত্বের ভিত্তি ধ্বংস করে দেয়।


সৌরজগতের জন্ম: প্রথমে সূর্য, তারপর গ্রহ

প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বা ৪৬০ কোটি বছর আগে আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস ও ধূলিকণার একটি বিশাল molecular cloud-এর অংশ মহাকর্ষের প্রভাবে সংকুচিত হতে শুরু করে। সংকোচনের ফলে একটি ঘূর্ণায়মান solar nebula বা protoplanetary disk তৈরি হয়। এর কেন্দ্রে পদার্থের অধিকাংশ জমা হয়ে সূর্যের জন্ম দেয়; আর চারপাশে ঘূর্ণায়মান অবশিষ্ট ধূলিকণা, বরফ, শিলা ও ধাতব পদার্থ পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষ ও accretion-এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে planetesimal, protoplanet এবং শেষ পর্যন্ত গ্রহে পরিণত হয়। [9]

এখানে ঘটনাক্রমটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবী আগে তৈরি হয়নি। সূর্য এবং তাকে ঘিরে থাকা protoplanetary disk-এর ভেতর থেকেই পৃথিবী গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবীর জন্মের জন্য সূর্য এবং সৌরজাগতিক কাঠামোর পূর্ববর্তী অস্তিত্ব অপরিহার্য। পৃথিবী তৈরি করে পরে তার জন্য সূর্য বা নক্ষত্রের ব্যবস্থা করার কোনো বাস্তব জ্যোতির্পদার্থবৈজ্ঞানিক পর্যায় নেই।


পৃথিবীর বয়স: প্রায় ৪৫৪ কোটি বছর

পৃথিবীর বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের ক্ষয় বা radiometric dating, প্রাচীন উল্কাপিণ্ড, চন্দ্রশিলা এবং সৌরজগতের প্রাচীনতম কঠিন পদার্থের বয়স বিশ্লেষণ করে। পৃথিবীর স্বীকৃত বয়স প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বা ৪৫৪ কোটি বছর। অর্থাৎ মহাবিশ্বের প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের ইতিহাসের প্রথম প্রায় ৯.৩ বিলিয়ন বছর পৃথিবী নামের কোনো গ্রহের অস্তিত্বই ছিল না।

নবগঠিত পৃথিবী আজকের নীল, সবুজ ও জীবনে ভরা পৃথিবীও ছিল না। প্রাথমিক পৃথিবী ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত, প্রচণ্ড সংঘর্ষপ্রবণ এবং ব্যাপক গলিত পদার্থসমৃদ্ধ। accretion, radioactive decay এবং বৃহৎ সংঘর্ষ থেকে উৎপন্ন তাপে গ্রহটির ভেতর গলন ও differentiation ঘটে; ভারী পদার্থ কেন্দ্রে নেমে core গঠন করে এবং অপেক্ষাকৃত হালকা পদার্থ mantle ও crust গঠন করে। পরবর্তী কয়েকশ কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে পৃথিবী আজকের অবস্থায় এসেছে।

অর্থাৎ “পৃথিবী সৃষ্টি” এবং “বাসযোগ্য পৃথিবী প্রস্তুত”—এই দুটিও একই ঘটনা নয়। পৃথিবীর জন্মের পরেও দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস অতিক্রম করে atmosphere, ocean, crust, continent এবং জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পৃথিবী কোনো প্রস্তুত মঞ্চ হিসেবে আবির্ভূত হয়নি; এটি নিজেই দীর্ঘ প্রাকৃতিক বিবর্তনের ফল।


পৃথিবী প্রথম গ্রহ নয়

পৃথিবী যে মহাবিশ্বের প্রথম গ্রহ নয়, সেটি শুধু নক্ষত্র-বিবর্তনের তাত্ত্বিক ফল নয়; আমরা বাস্তবেই পৃথিবীর চেয়ে বহু পুরনো planetary system পর্যবেক্ষণ করেছি। আমাদের ছায়াপথেই এমন গ্রহব্যবস্থা রয়েছে, যেগুলো পৃথিবী জন্মের বহু বিলিয়ন বছর আগে গঠিত হয়েছিল। এগুলো পৃথিবী-প্রথম মহাজাগতিক কল্পনাকে সরাসরি ভেঙে দেয়।


TRAPPIST-1: পৃথিবীর চেয়ে বিলিয়ন বছর পুরনো সাত গ্রহের ব্যবস্থা

TRAPPIST-1 পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০ আলোকবর্ষ দূরের একটি ultra-cool red dwarf star। এই নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে সাতটি পৃথিবী-আকারের পাথুরে গ্রহ আবর্তন করছে। NASA-র প্রকাশিত বয়স-অনুমান অনুযায়ী TRAPPIST-1 ব্যবস্থার বয়স প্রায় ৫.৪ থেকে ৯.৮ বিলিয়ন বছর। [11]

অর্থাৎ এই গ্রহব্যবস্থার বয়সের নিম্নসীমাই পৃথিবীর বয়সের চেয়ে প্রায় এক বিলিয়ন বছর বেশি; আর উচ্চসীমা ধরলে পৃথিবীর চেয়ে পাঁচ বিলিয়ন বছরেরও বেশি পুরনো। পৃথিবী তখনও তৈরি হয়নি, অথচ অন্য নক্ষত্রের চারপাশে ইতোমধ্যেই সম্পূর্ণ planetary system বিদ্যমান ছিল।

এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ পৃথিবী-প্রথম সৃষ্টিতত্ত্বে মহাজাগতিক ঘটনাগুলোকে মানুষের গ্রহকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়। বাস্তব মহাবিশ্বে এমন কোনো কেন্দ্রীয় মর্যাদা পৃথিবীর নেই। পৃথিবী জন্মের বহু আগে অন্য সূর্যের চারপাশে অন্য গ্রহ ঘুরছিল।


Kepler-444: পৃথিবীর প্রায় ৬৬০ কোটি বছর আগের গ্রহমালা

TRAPPIST-1-এর চেয়েও বিধ্বংসী উদাহরণ হলো Kepler-444। এই নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে পাঁচটি ছোট পাথুরে গ্রহ আবর্তন করছে। NASA/JPL-এর তথ্য অনুযায়ী এই ব্যবস্থা প্রায় ১১.২ বিলিয়ন বা ১,১২০ কোটি বছর আগে গঠিত হয়েছিল—যখন মহাবিশ্বের বর্তমান বয়সের ২০ শতাংশও অতিক্রান্ত হয়নি। [12]

পৃথিবীর বয়স ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর আর Kepler-444-এর বয়স ১১.২ বিলিয়ন বছর। অর্থাৎ এই গ্রহব্যবস্থা পৃথিবীর জন্মের প্রায় ৬.৬ বিলিয়ন বা ৬৬০ কোটি বছর আগে থেকেই বিদ্যমান। পৃথিবী সৃষ্টি হওয়ার সময় Kepler-444-এর গ্রহগুলো ইতোমধ্যেই পৃথিবীর বর্তমান বয়সের চেয়েও বেশি সময় ধরে মহাকাশে ঘুরছিল।

এই তথ্যের সামনে “পৃথিবী আগে, পরে আকাশের নক্ষত্র-গ্রহের বিন্যাস”—জাতীয় ধারণা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। এখানে ব্যবধান কয়েক হাজার বা কয়েক মিলিয়ন বছরের নয়; শত শত কোটি বছরের। পৃথিবীর অস্তিত্বের বহু আগে মহাবিশ্বে পূর্ণাঙ্গ গ্রহব্যবস্থা ছিল।


মেথুসেলা: পৃথিবীর প্রায় তিন গুণ বয়সী একটি গ্রহ

আরও চরম উদাহরণ হলো PSR B1620-26 b, যাকে জনপ্রিয়ভাবে “Methuselah” বলা হয়। এটি Milky Way-এর প্রাচীন globular cluster M4-এ একটি pulsar এবং white dwarf-এর binary system-কে প্রদক্ষিণ করে। NASA/Hubble-এর তথ্য অনুযায়ী এই গ্রহটির আনুমানিক বয়স প্রায় ১৩ বিলিয়ন বছর। [13]

মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। অর্থাৎ এই গ্রহটি মহাবিশ্বের একেবারে প্রাচীন যুগেই গঠিত হয়েছিল—পৃথিবীর জন্মের প্রায় ৮.৫ বিলিয়ন বছর আগে। তখন আমাদের সূর্যও ছিল না, পৃথিবীও ছিল না, সৌরজগতের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। অথচ একটি গ্রহ ইতোমধ্যেই মহাকাশে তার নক্ষত্রব্যবস্থাকে প্রদক্ষিণ করছিল।

পৃথিবীকে সৃষ্টির প্রাথমিক কেন্দ্র বানানো ধারণার বিরুদ্ধে এর চেয়ে পরিষ্কার বাস্তব উদাহরণ আর প্রয়োজন হয় না। পৃথিবীর জন্মের বিলিয়ন বিলিয়ন বছর আগে শুধু নক্ষত্র নয়, গ্রহও ছিল।


পৃথিবীর আগেই নক্ষত্র, গ্রহ এবং সম্পূর্ণ মহাজাগতিক ব্যবস্থা

এখন সময়রেখাটি পাশাপাশি রাখা যাক:

  • মহাবিশ্ব: প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর।
  • PSR B1620-26 b: প্রায় ১৩ বিলিয়ন বছর।
  • Kepler-444: প্রায় ১১.২ বিলিয়ন বছর।
  • TRAPPIST-1: প্রায় ৫.৪–৯.৮ বিলিয়ন বছর।
  • সৌরজগত: প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর।
  • পৃথিবী: প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর।

এই সময়রেখা কোনো ব্যাখ্যার জায়গা রাখে না। মহাবিশ্ব → নক্ষত্র → প্রাচীন গ্রহব্যবস্থা → আরও নক্ষত্র ও গ্রহ → সূর্য → পৃথিবী—এটাই বাস্তব কালানুক্রম। পৃথিবী এই ধারার শেষের দিকের একটি স্থানীয় গ্রহমাত্র।

পৃথিবীর আগেই নক্ষত্র ছিল, কারণ নক্ষত্রের ভেতর তৈরি ভারী মৌল ছাড়া পৃথিবী তৈরি হতো না। পৃথিবীর আগেই গ্রহ ছিল, যার প্রত্যক্ষ উদাহরণ Kepler-444, TRAPPIST-1 এবং PSR B1620-26 b। পৃথিবীর আগেই গ্যালাক্সি ও planetary system-এর বিবর্তন চলছিল। অতএব পৃথিবীকে আগে সৃষ্টি করে পরে আকাশ, নক্ষত্র ও মহাজাগতিক কাঠামো সাজানোর ধারণা বাস্তব ইতিহাসের সম্পূর্ণ বিপরীত।


পৃথিবীকেন্দ্রিক সৃষ্টিকাহিনির সঙ্গে বাস্তব মহাবিশ্বের সংঘাত

প্রাচীন সৃষ্টিতত্ত্বে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে মহাবিশ্ব কল্পনা করা স্বাভাবিক ছিল, কারণ মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় পৃথিবীই ছিল পুরো দৃশ্যমান জগতের মঞ্চ। আকাশ উপরে, পৃথিবী নিচে, সূর্য ও নক্ষত্র আকাশে চলাচল করছে—মানুষের চোখে দৃশ্যটি এমনই মনে হয়। সেই প্রাক-বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পৃথিবীকে আগে তৈরি করে পরে তার চারপাশের মহাজাগতিক কাঠামো সাজানোর গল্প বোধগম্য।

কিন্তু আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সেই দৃশ্যমান ভ্রম ভেঙে দিয়েছে। পৃথিবী কোনো কেন্দ্র নয়; সূর্যও মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়; আমাদের সৌরজগত Milky Way-এর শত শত বিলিয়ন নক্ষত্রের মধ্যে একটি সাধারণ নক্ষত্রব্যবস্থা; আর Milky Way নিজেই পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের বিপুল গ্যালাক্সিসমূহের একটি। এই বাস্তবতায় পৃথিবীর জন্ম একটি স্থানীয়, দেরিতে সংঘটিত planetary event—মহাবিশ্ব সৃষ্টির কেন্দ্রীয় ঘটনা নয়।

ফলে কোরআনিক সৃষ্টিক্রমের সমস্যাটি আরও গভীর হয়। সমস্যা শুধু পৃথিবীর বয়স ৪.৫৪ বিলিয়ন এবং মহাবিশ্বের বয়স ১৩.৮ বিলিয়ন—এই দুই সংখ্যার পার্থক্য নয়। সমস্যা হলো কার্যকারণ ও ইতিহাসের দিকটাই উল্টো। বাস্তবে পূর্ববর্তী মহাবিশ্ব ও নক্ষত্রের ইতিহাস পৃথিবীকে সম্ভব করেছে; অথচ পৃথিবীকেন্দ্রিক ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্বে পৃথিবীকে প্রথমদিকে স্থাপন করে তার পরে আকাশীয় কাঠামোর বিন্যাস বর্ণিত হয়েছে।

পৃথিবী মহাবিশ্বের শুরু নয়; পৃথিবী মহাবিশ্বের বহু বিলিয়ন বছরের বিবর্তনের ফল। এই মৌলিক সত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পরবর্তী প্রশ্নটি আরও সরাসরি হয়ে দাঁড়ায়: পৃথিবী যদি এত দেরিতে জন্ম নেয় এবং পৃথিবীর বহু আগে থেকেই নক্ষত্র ও গ্রহব্যবস্থা থাকে, তাহলে এমন একটি ধর্মীয় সৃষ্টিক্রম কতটা বাস্তবসম্মত, যেখানে পৃথিবীর নির্মাণ ও ব্যবস্থা সম্পন্ন করার পরে ধোঁয়া-আকাশকে বিন্যস্ত ও প্রদীপমালায় সাজানোর কথা বলা হয়েছে?


পৃথিবীর গতিশীলতা বনাম স্থিরতাঃ ইসলাম ও বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক সত্য হলো—পৃথিবী স্থির নয়। পৃথিবী নিজ অক্ষের ওপর আবর্তন করছে, সূর্যের চারদিকে পরিভ্রমণ করছে, সূর্যসহ পুরো সৌরজগত মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করছে এবং মিল্কিওয়ে নিজেও মহাজাগতিক গতির অংশ। আমরা যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে পৃথিবীকে স্থির বলে অনুভব করি, সেটি আমাদের ইন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতা; বাস্তব পদার্থবিজ্ঞানের বর্ণনা নয়।

কিন্তু কোরআন, হাদিস এবং ধ্রুপদী ইসলামি কসমোলজির বিভিন্ন বর্ণনায় পৃথিবীর ছবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে পৃথিবী মানুষের জন্য স্থাপিত একটি মঞ্চ; আকাশ তার ওপরে; আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীকে ধরে রাখেন যাতে সেগুলো স্থানচ্যুত না হয়; পৃথিবী যাতে মানুষকে নিয়ে নড়ে বা হেলে না পড়ে, তার জন্য পাহাড় স্থাপন করা হয়; আর আকাশের একটি নির্দিষ্ট স্তরে কাবার ঠিক ওপর বরাবর বায়তুল মামুরের অবস্থান বর্ণিত হয়। পরবর্তী মুসলিম আলেমদের একাংশ এই টেক্সটগুলোর ওপর দাঁড়িয়েই স্পষ্টভাবে পৃথিবীর স্থিরতা এবং সূর্যের পৃথিবীকে প্রদক্ষিণের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।

এই কসমোলজি আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটি পৃথিবীকে একটি চলমান গ্রহ হিসেবে নয়, বরং মানুষের বসবাসের জন্য স্থাপন ও স্থিতিশীল করা কেন্দ্রীয় ভূমি হিসেবে কল্পনা করে। নিচের ধর্মীয় উৎসগুলো পাশাপাশি পড়লে সেই বিশ্বচিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

পৃথিবী 1

পৃথিবী ও আকাশকে স্থানচ্যুত হওয়া থেকে ধরে রাখা

সূরা ফাতির ৩৫:৪১-এ বলা হয়েছে, আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীকে ধরে রাখেন যাতে সেগুলো স্থানচ্যুত না হয়; আর সেগুলো স্থানচ্যুত হলে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ সেগুলোকে ধরে রাখতে পারবে না। আয়াতটির ব্যবহৃত ধারণাটি আধুনিক orbital mechanics-এর ভাষা নয়। এখানে পৃথিবীকে একটি অবিরাম ঘূর্ণায়মান ও সূর্যকে প্রদক্ষিণরত গ্রহ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়নি; বরং আকাশ ও পৃথিবীকে তাদের নির্ধারিত অবস্থান থেকে সরে যাওয়া ঠেকিয়ে রাখার কথা বলা হয়েছে। [14]

আল্লাহই আসমান ও যমীনকে স্থির রাখেন যাতে ও দু’টো টলে না যায়। ও দু’টো যদি টলে যায় তাহলে তিনি ছাড়া কে ও দু’টোকে স্থির রাখবে? তিনি পরম সহিষ্ণু, পরম ক্ষমাশীল।
— Taisirul Quran
আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে সংরক্ষণ করেন যাতে ওরা স্থানচ্যূত না হয়, ওরা স্থানচ্যুত হলে তিনি ব্যতীত কে ওদেরকে সংরক্ষণ করবে? তিনি অতি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনকে ধরে রাখেন যাতে এগুলো স্থানচ্যুত না হয়। আর যদি এগুলো স্থানচ্যুত হয়, তাহলে তিনি ছাড়া আর কে আছে, যে এগুলোকে ধরে রাখবে? নিশ্চয় তিনি পরম সহনশীল, অতিশয় ক্ষমাপরায়ণ।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় আল্লাহ্‌ আসমানসমূহ ও যমীনকে ধারণ করেন, যাতে তারা স্থানচ্যুত না হয়, আর যদি তারা স্থানচ্যুত হয়, তবে তিনি ছাড়া কেউ নেই যে, তাদেরকে ধরে রাখতে পারে [১]। নিশ্চয় তিনি অতি সহনশীল, অসীম ক্ষমাপরায়ণ।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে পৃথিবীকে তার জায়গায় “ধরে রাখার” জন্য কোনো অদৃশ্য স্থিতিশীলকারী ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না। সূর্যের মহাকর্ষ এবং পৃথিবীর কক্ষপথগত বেগের সমন্বয়ে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একটি কক্ষপথে অবিরাম মুক্তপতনের অবস্থায় রয়েছে। একইভাবে চাঁদ পৃথিবীকে এবং সৌরজগত মিল্কিওয়ের কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করছে। মহাজাগতিক বস্তুগুলোর স্বাভাবিক অবস্থা স্থির থাকা নয়; গতি মহাবিশ্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

ফলে আকাশ ও পৃথিবীকে “স্থানচ্যুত হয়ে যাওয়া” থেকে ধরে রাখার এই ভাষা আধুনিক মহাজাগতিক গতিবিদ্যার বর্ণনা নয়; এটি এমন একটি প্রাক-বৈজ্ঞানিক বিশ্বচিত্রের ভাষা, যেখানে স্থিতি স্বাভাবিক এবং স্থানচ্যুতি বিপর্যয়।


কাবার সরাসরি উপরে বায়তুল মামুর

পৃথিবীকেন্দ্রিক ইসলামি কসমোলজির আরও স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় বায়তুল মামুর সংক্রান্ত বর্ণনায়। হাদিসে বায়তুল মামুরকে সপ্তম আকাশে ফেরেশতাদের ইবাদতের স্থান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাফসীরের প্রচলিত ব্যাখ্যায় আরও নির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে—এটি পৃথিবীর কাবার ঠিক ওপরে অবস্থিত; অর্থাৎ আকাশ থেকে নিচে পড়লে কাবার ওপরেই পড়বে।

এই ধারণাটি একটি স্থির, উল্লম্বভাবে স্তরবিন্যস্ত মহাবিশ্ব ধরে নেয়: নিচে পৃথিবী ও কাবা, তার ওপর ধারাবাহিক আকাশসমূহ, এবং একই উল্লম্ব রেখায় বায়তুল মামুর। কিন্তু বাস্তব পৃথিবী নিজ অক্ষের ওপর ঘুরছে, সূর্যের চারদিকে ঘণ্টায় প্রায় এক লক্ষ কিলোমিটারের বেশি বেগে চলছে, আর সূর্য নিজেই গ্যালাক্সির ভেতর গতিশীল। মহাকাশে কাবার ওপর একটি চিরস্থায়ী absolute “উপর” রেখা নেই।

একটি গোলাকার, আবর্তনশীল ও কক্ষপথে চলমান পৃথিবীর ক্ষেত্রে “কাবার ঠিক ওপর” বলতে স্থানীয়ভাবে পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে কাবার মধ্য দিয়ে বাইরে প্রসারিত একটি দিক বোঝানো যায়; কিন্তু পৃথিবীর rotation ও revolution-এর সঙ্গে সেই দিক মহাকাশে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। ফলে সপ্তম আকাশে একটি স্থির স্থাপনা চিরকাল কাবার ঠিক ওপর অবস্থান করছে—এই কসমোলজি বাস্তব জ্যামিতি ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে মেলে না। এটি পৃথিবীকে স্থির রেখে ওপর-নিচে স্তর সাজানো প্রাচীন মহাজাগতিক মানচিত্রের সঙ্গে মেলে।

আসুন এই বিষয়ে আহমদুল্লাহ সাহেবের বক্তব্য এবং এরপর প্রচলিত তাফসীরগুলোর ব্যাখ্যা দেখি,


তাফসীরে যাকারিয়া

তাফসীরে যাকারিয়াতে সরাসরি বলা হয়েছে, বায়তুল মামুর নামক আসমানি ইবাদতগৃহটি দুনিয়ার কাবার ঠিক উপরে অবস্থিত। [15]

আকাশস্থিত ফেরেশতাদের কা’বাকে বায়তুল মা’মুর বলা হয়। এটা দুনিয়ার কা’বার ঠিক উপরে অবস্থিত। হাদীসে আছে যে, মে’রাজের রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বায়তুল মা’মুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এতে প্রত্যহ সত্তর হাজার ফেরেশতা ইবাদতের জন্যে প্রবেশ করে। এরপর তাদের পুনরায় এতে প্রবেশ করার পালা আসে না। প্রত্যহ নতুন ফেরেশতাদের নম্বর আসে।

পৃথিবী 3

তাফসীরে মাযহারী

তাফসীরে মাযহারীতেও বায়তুল মামুর ও পৃথিবীর কাবার মধ্যে একই উল্লম্ব সম্পর্কের বর্ণনা পাওয়া যায়। [16]

‘বায়তুল মা’মুর’ হচ্ছে কাবা শরীফের সোজা উপরে সপ্তম আকাশে অবস্থিত মসজিদ। ওই মসজিদের আর এক নাম সাররাখ। পৃথিবীতে কাবা শরীফকে যেভাবে সম্মান করা হয়, তেমনি আকাশজগতে সম্মান করা হয় বায়তুল মামুরকে।

পৃথিবী 5

তাফসীরে ইবনে কাসীর

তাফসীরে ইবনে কাসীরেও একই কসমোলজিক্যাল কাঠামো পাওয়া যায়—আকাশের বায়তুল মামুরকে পৃথিবীর কাবার সঙ্গে সরাসরি উল্লম্বভাবে সম্পর্কিত করে দেখানো হয়েছে। [17]

ইন জারীর (র) খালিদ ইব্‌ন আরআরাহ (র) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, খালিদ ইন্ন আরআরাহ (র) বলেন: এক ব্যক্তি হযরত আলী (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিল যে, বায়তুল মা’মূর কি জিনিস? উত্তরে হযরত আলী (রা) বলিলেন: কা’বা শরীফের বরাবর উপরে আকাশে অবস্থিত ‘ছুরাহ’ নামক একটি ঘর। দুনিয়াবাসীর নিকট বায়তুল্লাহর যেমন মর্যাদা, আকাশবাসীর নিকট তাহার তেমনি মর্যাদা। তাহাতে প্রত্যহ সত্তর হাজার ফেরেশতা সালাত আদায় করিয়া বাহির হইয়া যায়। পুনরায় আর কখনো তাঁহারা তাহাতে প্রবেশ করে না।

কাতাদা, রবী ইব্‌ন আনাস ও সুদ্দী (র) বলেন। আমাদের নিকট বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) একদিন তাঁহার সাহাবীদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, তোমরা কি জান যে, বায়তুল মা’মূর কি জিনিস? উত্তরে তাঁহারা বলিলেন, আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলই এ ব্যাপারে ভালো জানেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলিলেন, “বায়তুল মা’মূর কা’বার ঠিক বরাবর আকাশে অবস্থিত একটি মসজিদ। কথার কথা যদি কখনো উহা ভাঙ্গিয়া পড়ে তো ঠিক কা’বার উপরেই পড়িবে। প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা তাহাতে সালাত আদায় করে। অতঃপর তাঁহারা বাহির হইয়া যায় পুনরায় আর কখনো ফিরিয়া আসে না।

পৃথিবী 7
পৃথিবী 9

তিনটি তাফসীরের বক্তব্য একই মৌলিক মহাজাগতিক জ্যামিতি প্রকাশ করে: পৃথিবীতে একটি নির্দিষ্ট পবিত্র কেন্দ্র, তার সোজা ওপরে আসমানি সমকক্ষ, এবং তাদের মাঝে স্তরবিন্যস্ত আকাশ। এটি আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানের কোনো মডেল নয়। এটি একটি পৃথিবীকেন্দ্রিক উল্লম্ব মহাবিশ্ব।


পৃথিবীকে নড়াচড়া থেকে রক্ষার জন্য পাহাড়

কোরআনের আরেকটি বারবার পুনরাবৃত্ত কসমোলজিক্যাল দাবি হলো—পৃথিবীতে পাহাড় স্থাপন করা হয়েছে যাতে পৃথিবী মানুষকে নিয়ে নড়ে, দুলে বা হেলে না পড়ে। সূরা লুকমান ৩১:১০-এ এই কারণগত সম্পর্ক অত্যন্ত পরিষ্কার: আল্লাহ পৃথিবীতে সুদৃঢ় পাহাড় স্থাপন করেছেন যাতে তা তোমাদেরকে নিয়ে নড়াচড়া না করে। [18]

তিনি আকাশমন্ডলী নির্মাণ করেছেন স্তম্ভ ছাড়া যা তোমরা দেখছ। তিনি পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান পর্বতমালাযাতে পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে নড়াচড়া না করে আর তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সকল প্রকার জীবজন্তু, আর আমিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি, অতঃপর তাতে উদ্গত করি যাবতীয় কল্যাণকর উদ্ভিদ।
— Taisirul Quran
তিনি আকাশমন্ডলী নির্মাণ করেছেন স্তম্ভ ব্যতীত, তোমরা এটা দেখছ। তিনিই পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন পর্বতমালা যাতে এটাতোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্ব প্রকার জীব-জন্তু এবং আমিই আকাশ হতে বারি বর্ষণ করে এতে উদ্ভব করি সর্বপ্রকার কল্যাণকর উদ্ভিদ।
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনি খুঁটি ছাড়া আসমানসমূহ সৃষ্টি করেছেন, যা তোমরা দেখছ, আর যমীনে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পাহাড়, যাতে তাতোমাদেরকে নিয়ে হেলে না পড়ে, আর তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রত্যেক প্রকারের প্রাণী; আর আসমান থেকে আমি পানি পাঠাই। অতঃপর তাতে আমি জোড়ায় জোড়ায় কল্যাণকর উদ্ভিদ জন্মাই।
— Rawai Al-bayan
তিনি আসমানসমূহ নির্মাণ করেছেন খুঁটি ছাড়া—তোমরা এটা দেখতে পাচ্ছ;তিনিই যমীনে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বতমালা যাতেএটা তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সব ধরনের জীব-জন্তু। আর আমরা আকাশ হতে বারি বর্ষণ করি তারপর এতে উদ্গত করি সব ধরণের কল্যাণকর উদ্ভিদ।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
[ কোরআন ৩১ঃ১০ ]

আধুনিক ভূবিজ্ঞান ঠিক উল্টো কারণগত সম্পর্ক দেখায়। পর্বত পৃথিবীর crust-এর ওপর বাইরে থেকে বসানো কোনো stabilizer নয়। বিশাল পর্বতমালার একটি বড় অংশ tectonic plate-এর সংঘর্ষ, subduction, uplift, faulting এবং crustal deformation-এর ফল। হিমালয় তৈরি হয়েছে ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষে; আন্দিজের গঠন subduction-এর সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ যে ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াগুলো পর্বত তৈরি করে, সেই একই tectonic system-ই বড় বড় ভূমিকম্পের কারণ।

ফলে “পাহাড় পৃথিবীকে নড়াচড়া থেকে রক্ষা করে”—এই causal model বাস্তব ভূতত্ত্বের বিপরীত। পৃথিবীর সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলোর বহু অংশই বিশাল পর্বতমালা ও সক্রিয় plate boundary-এর সঙ্গে যুক্ত। পাহাড় ভূমিকম্প বন্ধ করে না; পাহাড় এবং ভূমিকম্প বহু ক্ষেত্রে একই tectonic dynamics-এর পৃথক ফল।

পাহাড়ের গভীর crustal root বা isostatic compensation থাকার তথ্যকেও “পৃথিবীর খুঁটি” বানানো যায় না। crustal root হলো কম ঘনত্বের continental crust-এর buoyancy ও isostatic equilibrium-এর ফল; এটি পৃথিবীর rotation বন্ধ করে না, orbital stability নিয়ন্ত্রণ করে না এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধও করে না। প্রাচীন “পাহাড় দিয়ে ভূমি স্থির করা” ধারণাকে আধুনিক plate tectonics-এর আবিষ্কার হিসেবে চালানো তাই বিজ্ঞানের ভাষাকে উল্টো অর্থে ব্যবহার করা।


ধ্রুপদী ইসলামি ব্যাখ্যায় স্থির পৃথিবী

পৃথিবী স্থির এবং তাকে পাহাড়ের মাধ্যমে স্থিতিশীল করা হয়েছে—এই ধারণা শুধু আধুনিক বাংলা অনুবাদ পড়ে তৈরি হওয়া কোনো সমালোচনা নয়। প্রভাবশালী ইসলামি তাফসীর ও কসমোলজিক্যাল রচনাতেও পৃথিবীকে স্থিত ও কেন্দ্রীয় ভূমি হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। তাফসীরে ইবনে কাসীরের সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যায় পৃথিবী ও পাহাড়ের সম্পর্ক সেই প্রাচীন স্থিতিশীলতার ধারণার মধ্যেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। [19]

আস্ সুদ্দী স্বীয় তাফসীরে ইবন মাসউদ ও অন্যান্য সাহাবা (রা) হইতে পর্যায়ক্রমে মুরাহ, ইব্‌ন আব্বাস, আবু সালেহ ও আবূ মালিক হইতে বর্ণনা করেন- সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ্ তা’আলার আরশ পানির উপর সংস্থাপিত ছিল। পানির পূর্বে আল্লাহ্ পাক কোন বস্তুই সৃষ্টি করেন নাই। সুতরাং সৃজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সর্বপ্রথম তিনি পানি হইতে বাষ্প সৃষ্টি করিলেন। উহা ক্রমান্বয়ে ঊর্ধ্বলোকে উত্থিত হইল এবং উত্থিত বাষ্প ছাদরূপ পরিগ্রহ করিয়া আকাশে পরিণত হইল। এইজন্য উহার নাম হইল সামাউ (سماء) বা ঊর্ধ্বলোক। অতঃপর পানি শুকাইয়া একটি ভূখণ্ড দেখা দিল। তখন উহাকে সপ্তখণ্ডে বিভক্ত করা হইল। রবি-সোম দুই দিনে এই সপ্তখণ্ড সৃষ্টি হইল। অতঃপর পৃথিবীকে সেই মৎসের উপর স্থাপন করা হইল যাহার বর্ণনা সূরা ‘নূন ওয়াল কলম’-এ আসিয়াছে। মৎসটি পানির উপর এবং পানির নীচে সাখরা জাতীয় পদার্থ বা পরিচ্ছন্ন মৃত্তিকা শিলা বিদ্যমান। মৃত্তিকা শিলার ধারক হইলেন ফেরেশতা। ফেরেশতা দণ্ডায়মান প্রস্তরের আস্তরের উপর এবং প্রস্তরের আস্তরটি বায়ুমণ্ডলের উপর ভাসমান রহিয়াছে। লুকমান হাকীম এই প্রস্তর আস্তরের কথাই বলিয়াছেন। উহা আকাশ কিংবা পৃথিবীর কোথাও স্থাপিত নহে। মৎসটি নড়াচড়া করা মাত্র পৃথিবী কম্পিত হয় এবং ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। তাই পৃথিবীকে পাহাড় চাপা দেওয়া হইল। ফলে পৃথিবী সুস্থির হইল। পর্বত তাই পৃথিবীর কাছে নিজের বড়াই করিয়া থাকে।
আল্লাহ্ পাক বলেন:
…
আর পৃথিবীকে স্থিরভাবে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য পর্বতমালা স্থাপন করিয়াছি।’

পৃথিবী 11

জাকারিয়া আল-কাজউইনি ত্রয়োদশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত মুসলিম ভূগোলবিদ, কসমোগ্রাফার ও লেখক। তাঁর ʿAjāʾib al-Makhlūqāt wa Gharāʾib al-Mawjūdāt বা The Wonders of Creation মুসলিম বিশ্বের অন্যতম পরিচিত কসমোগ্রাফিক রচনা। পরবর্তী তুর্কি অনুবাদ ও পাণ্ডুলিপির চিত্রগুলোতে পৃথিবী ও মহাবিশ্বের যে স্তরবিন্যস্ত কসমোলজিক্যাল চিত্র পাওয়া যায়, তা আধুনিক গোলাকার গ্রহ-নক্ষত্রের মহাবিশ্ব নয়; বরং প্রাক-আধুনিক ইসলামি কসমোগ্রাফির জগৎ। নিচের ছবিটি সেই ঐতিহ্যের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।

পৃথিবী

আধুনিক সালাফি আলেম উসাইমীন: সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী সালাফি আলেম শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন সরাসরি বলেছেন, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে এবং পৃথিবী স্থির। এই সিদ্ধান্তের পক্ষে তিনি একের পর এক কোরআনিক আয়াত ও হাদিসকে দলিল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। [20] [21]

উসাইমীন তাঁর সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন সূর্যের উদয়-অস্ত, সূর্যের চলা, রাত-দিনের অনুসরণ এবং সূর্যের আরশের নিচে গিয়ে সিজদা করার মতো কোরআনিক ও হাদিসি বর্ণনা একত্রে পাঠ করে। তাঁর দীর্ঘ ফতোয়াটি তাই দেখায়, এসব ধর্মীয় বর্ণনা থেকে একটি স্থির পৃথিবী ও পৃথিবীকে প্রদক্ষিণকারী সূর্যের কসমোলজি কীভাবে সরাসরি নির্মিত হয়েছে।

প্রশ্ন: (১৬) সূর্য কি পৃথিবীর চার দিকে ঘুরে?
উত্তর: মান্যবর শাইখ উত্তরে বলেন যে, শরী‘আতের প্রকাশ্য দলীলগুলো প্রমাণ করে যে, সূর্যই পৃথিবীর চতুর্দিকে ঘুরে। এ ঘুরার কারণেই পৃথিবীতে দিবা-রাত্রির আগমণ ঘটে। আমাদের হাতে এ দলীলগুলোর চেয়ে বেশি শক্তিশালী এমন কোনো দলীল নেই, যার মাধ্যমে আমরা সূর্য ঘূরার দলীলগুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারি। সূর্য ঘুরার দলীলগুলো হলো আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿فَإِنَّ ٱللَّهَ يَأۡتِي بِٱلشَّمۡسِ مِنَ ٱلۡمَشۡرِقِ فَأۡتِ بِهَا مِنَ ٱلۡمَغۡرِبِ﴾ [البقرة: ٢٥٨]
“আল্লাহ তা‘আলা সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন। তুমি পারলে পশ্চিম দিক থেকে উদিত কর।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৮] সূর্য পূর্ব দিক থেকে উঠার মাধ্যমে প্রকাশ্য দলীল পাওয়া যায় যে, সূর্য পৃথিবীর উপর পরিভ্রমণ করে।
২) আল্লাহ বলেন,
﴿فَلَمَّا رَءَا ٱلشَّمۡسَ بَازِغَةٗ قَالَ هَٰذَا رَبِّي هَٰذَآ أَكۡبَرُۖ فَلَمَّآ أَفَلَتۡ قَالَ يَٰقَوۡمِ إِنِّي بَرِيٓءٞ مِّمَّا تُشۡرِكُونَ ٧٨﴾ [الانعام: ٧٨]
“অতঃপর যখন সূর্যকে চকচকে অবস্থায় উঠতে দেখলেন তখন বললেন, এটি আমার রব, এটি বৃহত্তর। অতপর যখন তা ডুবে গেল, তখন বলল হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যেসব বিষয়ে শরীক কর আমি ওসব থেকে মুক্ত।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৭৮]
এখানে নির্ধারণ হয়ে গেল যে, সূর্য অদৃশ্য হয়ে যায়। একথা বলা হয় নি যে, সূর্য থেকে পৃথিবী ডুবে গেল। পৃথিবী যদি ঘূরত তাহলে অবশ্যই তা বলা হত।
৩) আল্লাহ বলেন,
﴿وَتَرَى ٱلشَّمۡسَ إِذَا طَلَعَت تَّزَٰوَرُ عَن كَهۡفِهِمۡ ذَاتَ ٱلۡيَمِينِ وَإِذَا غَرَبَت تَّقۡرِضُهُمۡ ذَاتَ ٱلشِّمَالِ﴾ [الكهف: ١٧]
“তুমি সূর্যকে দেখবে, যখন উদিত হয়, তাদের গুহা থেকে পাশ কেটে ডান দিকে চলে যায় এবং যখন অস্ত যায়, তাদের থেকে পাশ কেটে বাম দিকে চলে যায়।” [সূরা কাহাফ, আয়াত: ১৭] পাশ কেটে ডান দিকে বা বাম দিকে চলে যাওয়া প্রমাণ করে যে, নড়াচড়া সূর্য থেকেই হয়ে থাকে। পৃথিবী যদি নড়াচড়া করত তাহলে অবশ্যই বলতেন সূর্য থেকে গুহা পাশ কেটে যায়। উদয় হওয়া এবং অস্ত যাওয়াকে সূর্যের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এটা থেকে বুঝা যায় যে, সূর্যই ঘুরে। পৃথিবী নয়।
৪) আল্লাহ বলেন,
﴿وَهُوَ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلَّيۡلَ وَٱلنَّهَارَ وَٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَۖ كُلّٞ فِي فَلَكٖ يَسۡبَحُونَ ٣٣﴾ [الانبياء: ٣٣]
“এবং তিনিই দিবা-নিশি এবং চন্দ্র-সূর্য সৃষ্টি করেছেন। সবাই আপন আপন কক্ষ পথে বিচরণ করে।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৩৩]
ইবন আব্বাস বলেন, লাটিম যেমন তার কেন্দ্র বিন্দুর চার দিকে ঘুরতে থাকে, সূর্যও তেমনিভাবে ঘুরে।
৫) আল্লাহ বলেন,
﴿يُغۡشِي ٱلَّيۡلَ ٱلنَّهَارَ يَطۡلُبُهُۥ حَثِيثٗا﴾ [الاعراف: ٥٤]
“তিনি রাতকে আচ্ছাদিত করেন দিনের মাধ্যমে, দিন দৌড়ে দৌড়ে রাতের পিছনে আসে।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৫৪]
আয়াতে রাতকে দিনের অনুসন্ধানকারী বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অনুসন্ধানকারী পিছনে পিছনে দ্রুত অনুসন্ধান করে থাকে। এটা জানা কথা যে, দিবা-রাত্রি সূর্যের অনুসারী।
৬) আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرْضَ بِٱلۡحَقِّۖ يُكَوِّرُ ٱلۡلَّيۡلَ عَلَى ٱلنَّهَارِ وَيُكَوِّرُ ٱلنَّهَارَ عَلَى ٱلۡلَّيۡلِۖ وَسَخَّرَ ٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَۖ كُلّٞ يَجۡرِي لِأَجَلٖ مُّسَمًّىۗ أَلَا هُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡغَفَّارُ ٥﴾ [الزمر: ٥]
“তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে। তিনি রাত্রিকে দিবস দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে কাজে নিযুক্ত করেছেন। প্রত্যেকেই বিচরণ করে নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত। জেনে রাখুন, তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৫]
আয়াতের মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম যে, পৃথিবীর উপরে দিবা-রাত্রি চলমান রয়েছে। পৃথিবী যদি ঘুরতো তাহলে তিনি বলতেন, দিবা-রাত্রির উপর পৃথিবীকে ঘূরান। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “সূর্য এবং চন্দ্রের প্রত্যেকেই চলমান”। এ সমস্ত দলীলের মাধ্যমে জানা গেল যে, সুস্পষ্টভাবেই সূর্য ও চন্দ্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করছে। এ কথা সুস্পষ্ট যে, চলমান বস্তুকে বশীভূত করা এবং কাজে লাগানো একস্থানে অবস্থানকারী বস্তুকে কাজে লাগানোর চেয়ে অধিক যুক্তিসঙ্গত।
৭) আল্লাহ বলেন,
﴿وَٱلشَّمۡسِ وَضُحَىٰهَا ١ وَٱلۡقَمَرِ إِذَا تَلَىٰهَا ٢﴾ [الشمس: ١، ٢]
“শপথ সূর্যের ও তার কিরণের, শপথ চন্দ্রের যখন তা সূর্যের পশ্চাতে আসে।” [সূরা আশ-শামস, আয়াত: ১-২]
এখানে বলা হয়েছে যে, চন্দ্র সূর্যের পরে আসে। এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, সূর্য এবং চন্দ্র চলাচল করে এবং পৃথিবীর উপর ঘুরে। পৃথিবী যদি চন্দ্র বা সূর্যের চার দিকে ঘুরত, তাহলে চন্দ্র সূর্যকে অনুসরণ করত না। বরং চন্দ্র একবার সূর্যকে, আর একবার সূর্য চন্দ্রকে অনুসরণ করত। কেননা সূর্য চন্দ্রের অনেক উপরে। এ আয়াত দিয়ে পৃথিবী স্থির থাকার ব্যাপারে দলীল গ্রহণ করার ভিতরে চিন্তা-ভাবনার বিষয় রয়েছে।
৮) মহান আল্লাহ বলেন,
﴿وَٱلشَّمۡسُ تَجۡرِي لِمُسۡتَقَرّٖ لَّهَاۚ ذَٰلِكَ تَقۡدِيرُ ٱلۡعَزِيزِ ٱلۡعَلِيمِ ٣٨ وَٱلۡقَمَرَ قَدَّرۡنَٰهُ مَنَازِلَ حَتَّىٰ عَادَ كَٱلۡعُرۡجُونِ ٱلۡقَدِيمِ ٣٩ لَا ٱلشَّمۡسُ يَنۢبَغِي لَهَآ أَن تُدۡرِكَ ٱلۡقَمَرَ وَلَا ٱلۡلَّيۡلُ سَابِقُ ٱلنَّهَارِۚ وَكُلّٞ فِي فَلَكٖ يَسۡبَحُونَ ٤٠﴾ [يس: ٣٨، ٤০]
“সূর্য তার নির্দিষ্ট অবস্থানে আবর্তন করে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারণ। চন্দ্রের জন্যে আমি বিভিন্ন মঞ্জিল নির্ধারিত করেছি। অবশেষে সে পুরাতন খর্জুর শাখার অনুরূপ হয়ে যায়। সূর্যের পক্ষে চন্দ্রকে নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। রাতের পক্ষেও দিনের অগ্রবর্তী হওয়া সম্ভব নয়। প্রত্যেকেই আপন আপন কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে।” [সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৩৮-৪০]
সূর্যের চলা এবং এ চলাকে মহা পরাক্রমশালী আল্লাহর নির্ধারণ বলে ব্যাখ্যা করা এটাই প্রমাণ করে যে, সূর্য প্রকৃতভাবেই চলমান। আর এ চলাচলের কারণেই দিবা-রাত্রি এবং ঋতুর পরিবর্তন হয়। চন্দ্রের জন্য মঞ্জিল নির্ধারণ করার অর্থ এ যে, সে তার মঞ্জিলসমূহে স্থানান্তরিত হয়। যদি পৃথিবী ঘুরত, তাহলে পৃথিবীর জন্য মঞ্জিল নির্ধারণ করা হত। চন্দ্রের জন্য নয়। সূর্য কর্তৃক চন্দ্রকে ধরতে না পারা এবং দিনের অগ্রে রাত থাকা সূর্য, চন্দ্র, দিন এবং রাতের চলাচলের প্রমাণ বহন করে।
৯) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় আবু যরকে বলেছেন,
«أَتَدْرِي أَيْنَ تَذْهَبُ قُلْتُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ قَالَ فَإِنَّهَا تَذْهَبُ حَتَّى تَسْجُدَ تَحْتَ الْعَرْشِ فَتَسْتَأْذِنَ فَيُؤْذَنُ لَهَا وَيُوشِكُ أَنْ تَسْجُدَ فَلَا يُقْبَلَ مِنْهَا وَتَسْتَأْذِنَ فَلَا يُؤْذَنَ لَهَا يُقَالُ لَهَا ارْجِعِي مِنْ حَيْثُ جِئْتِ فَتَطْلُعُ مِنْ مَغْرِبِهَا»
“হে আবু যর! তুমি কি জান সূর্য যখন অস্ত যায় তখন কোথায় যায়? আবু যার বললেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় ‘আরশের নিচে গিয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং পুনরায় উদিত হওয়ার অনুমতি চায়। অতঃপর তাকে অনুমতি দেওয়া হয়। সে দিন বেশি দূরে নয়, যে দিন অনুমতি চাবে কিন্তু তাকে অনুমতি দেওয়া হবে না। তাকে বলা হবে যেখান থেকে এসেছ, সেখানে ফেরত যাও। অতঃপর সূর্য পশ্চিম দিক থেকেই উদিত হবে।”[1]
এটি হবে কিয়ামতের পূর্ব মুহূর্তে। আল্লাহ সূর্যকে বলবেন, যেখান থেকে এসেছ সেখানে ফেরত যাও, অতঃপর সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সূর্য পৃথিবীর উপরে ঘুরছে এবং তার এ ঘুরার মাধ্যমেই উদয়-অস্ত সংঘটিত হচ্ছে।
১০) অসংখ্য হাদীসের মাধ্যমে জানা যায় যে, উদয় হওয়া, অস্ত যাওয়া এবং ঢলে যাওয়া এ কাজগুলো সূর্যের সাথে সম্পৃক্ত। এগুলো সূর্য থেকে প্রকাশিত হওয়া খুবই সুস্পষ্ট। পৃথিবী হতে নয়। হয়তো এ ব্যাপারে আরো দলীল-প্রমাণ রয়েছে। সেগুলো আমার এ মুহূর্তে মনে আসছে না। তবে আমি যা উল্লেখ করলাম, এ বিষয়টির দ্বার উন্মুক্ত করবে এবং আমি যা উদ্দেশ্য করেছি, তা পূরণে যথেষ্ট হবে। আল্লাহর তাওফীক চাচ্ছি!
[1] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: বাদউল খালক; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান

পৃথিবী 14
পৃথিবী 16
পৃথিবী 18

এই অবস্থান শুধু উসাইমীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সৌদি আরবের আরেকজন অত্যন্ত প্রভাবশালী সালাফি আলেম শায়খ আবদুল আজিজ ইবনু বায তাঁর রচনাসমূহের মধ্যে সরাসরি “সূর্যের চলন ও পৃথিবীর স্থিরতা” প্রমাণের জন্য একটি স্বতন্ত্র রিসালা লিখেছিলেন—আল-আদিল্লাহ আন-নাকলিয়্যাহ ওয়াল-হিসসিয়্যাহ ‘আলা জারইয়ানিশ-শামস ওয়া সুকুনিল-আরদ…। অর্থাৎ পৃথিবীর স্থিরতা আধুনিক সমালোচকের আরোপিত কোনো ব্যাখ্যা নয়; বিংশ শতাব্দীর প্রধান সালাফি আলেমদের একজন নিজেই বিষয়টিকে শরয়ি ও ইন্দ্রিয়গত দলিল দিয়ে প্রমাণ করার আলাদা গ্রন্থের বিষয় করেছেন। [22]


উসাইমীনের যুক্তিই সমস্যাটিকে নগ্ন করে দেয়

উসাইমীনের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ শুধু এই কারণে নয় যে তিনি পৃথিবীকে স্থির বলেছেন; বরং তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন কেন একটি আক্ষরিক ইসলামি কসমোলজি পৃথিবীকে স্থির ধরে। কোরআনে সূর্য “উদিত” হয়, “অস্ত” যায়, “চলে”, চাঁদ তার মঞ্জিল অতিক্রম করে, দিন রাতকে অনুসরণ করে; হাদিসে সূর্য অস্ত যাওয়ার পরে আরশের নিচে গিয়ে সিজদা করে এবং আবার উদিত হওয়ার অনুমতি নেয়। এই পুরো narrative-এর পর্যবেক্ষক পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আছে এবং মহাজাগতিক গতির ভাষা সূর্য-চাঁদের ওপর আরোপ করা হয়েছে।

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান দেখিয়েছে, দৈনিক সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের প্রধান কারণ সূর্যের পৃথিবীকে দিনে একবার প্রদক্ষিণ করা নয়; পৃথিবীর নিজের rotation। বছরে ঋতুচক্র ও সূর্যের apparent annual motion-এর পেছনে রয়েছে পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণ এবং অক্ষের ঝোঁক। উসাইমীনের সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল, কিন্তু তাঁর উদ্ধৃতি ইসলামি টেক্সটের প্রাক-বৈজ্ঞানিক apparent-motion language কত সহজে একটি geocentric worldview তৈরি করে তা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করে।


বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা: পৃথিবী অবিরাম গতিশীল

পৃথিবী নিজ অক্ষের ওপর প্রায় ২৪ ঘণ্টায় একবার আবর্তিত হয়। বিষুবরেখার কাছে এই আবর্তনের রৈখিক বেগ ঘণ্টায় প্রায় ১,৬৭০ কিলোমিটার। একই সময়ে পৃথিবী প্রায় এক বছরে সূর্যের চারদিকে একটি পূর্ণ কক্ষপথ সম্পন্ন করে; এর গড় orbital speed ঘণ্টায় প্রায় ১,০৭,০০০ কিলোমিটার। সূর্যও স্থির নয়; পুরো সৌরজগত নিয়ে মিল্কিওয়ের কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করছে।

এই বিশাল গতিগুলো আমরা শরীরে অনুভব করি না, কারণ আমরা, বায়ুমণ্ডল এবং পৃথিবীর পৃষ্ঠ একই গতিশীল reference frame-এর অংশ এবং পৃথিবীর গতি তুলনামূলকভাবে মসৃণ। ট্রেন বা বিমানের ভেতরে সমবেগে চলার সময় যাত্রী যেমন শুধু গতি থাকার কারণে পেছনে ছিটকে পড়ে না, পৃথিবীর ক্ষেত্রেও একই মৌলিক পদার্থবিজ্ঞান কাজ করে। “আমরা নড়াচড়া অনুভব করি না, তাই পৃথিবী স্থির”—এটি ইন্দ্রিয়নির্ভর প্রাক-বৈজ্ঞানিক অনুমান।

পৃথিবীর rotation-এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ রয়েছে Foucault pendulum, Coriolis effect, equatorial bulge, satellite dynamics এবং জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে। পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণের প্রমাণ রয়েছে stellar parallax, aberration of starlight, planetary dynamics এবং মহাকাশযানের navigation-এ। আধুনিক সভ্যতার satellite, GPS, interplanetary mission এবং orbital calculation এই গতিশীল পৃথিবীর পদার্থবিজ্ঞানের ওপর নির্ভর করে প্রতিদিন কাজ করছে।


প্রাক-বৈজ্ঞানিক পৃথিবীকেন্দ্রিক বিশ্বচিত্র

এখন কোরআনিক ও ইসলামি বর্ণনাগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি ধারাবাহিক বিশ্বচিত্র দেখা যায়:

  • পৃথিবী মানুষের বসবাসের জন্য স্থাপিত কেন্দ্রীয় ভূমি;
  • আকাশ পৃথিবীর ওপর স্তরে-স্তরে বিন্যস্ত;
  • আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীকে ধরে রাখেন যাতে তারা স্থানচ্যুত না হয়;
  • পৃথিবী মানুষকে নিয়ে নড়ে না যায় বলে তাতে পাহাড় স্থাপন করা হয়েছে;
  • পৃথিবীর কাবার ঠিক ওপর আকাশে বায়তুল মামুর;
  • সূর্য চলাচল করে, অস্ত যায়, আরশের নিচে সিজদা করে এবং আবার উদিত হওয়ার অনুমতি নেয়;
  • এবং এই টেক্সটগুলো থেকেই প্রভাবশালী সালাফি আলেম পৃথিবীর স্থিরতা ও সূর্যের পৃথিবী-প্রদক্ষিণের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

এগুলো বিচ্ছিন্ন কয়েকটি রূপক নয়; একত্রে এগুলো পৃথিবীকেন্দ্রিক, ওপর-নিচে স্তরবিন্যস্ত, স্থিতিশীল ভূমি ও চলমান আকাশীয় বস্তুর একটি প্রাক-বৈজ্ঞানিক কসমোলজি তৈরি করে। এই বিশ্বচিত্র মানুষের খালি চোখে পৃথিবী থেকে আকাশ দেখলে স্বাভাবিক মনে হয়—মাটি স্থির, সূর্য চলে, আকাশ ওপরে। কিন্তু প্রকৃত মহাবিশ্ব এমন নয়।

আধুনিক বিজ্ঞান দেখিয়েছে পৃথিবী কোনো স্থির cosmic platform নয়; এটি একটি আবর্তনশীল, পরিভ্রমণশীল গ্রহ। পাহাড় পৃথিবীকে নড়াচড়া থেকে রক্ষা করে না; tectonic activity-ই পাহাড় এবং ভূমিকম্প উভয়ের প্রধান উৎসগুলোর একটি। কাবার ওপর সপ্তম আকাশে স্থির একটি উল্লম্ব স্থাপনার জ্যামিতি বাস্তব গতিশীল পৃথিবীর সঙ্গে মেলে না। আর সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত পৃথিবীর চারদিকে সূর্যের দৈনিক প্রদক্ষিণের ফল নয়।

সুতরাং সংঘাতটি পরিষ্কার: ধর্মীয় কসমোলজিতে পৃথিবী স্থিতিশীল কেন্দ্রীয় মঞ্চ; বিজ্ঞানে পৃথিবী একটি অবিরাম গতিশীল গ্রহ। মানুষের চোখে যা মনে হয়েছিল, ধর্মীয় বর্ণনায় সেটিই মহাজাগতিক বাস্তবতা হয়ে উঠেছে; আধুনিক পর্যবেক্ষণ ও পদার্থবিজ্ঞান সেই দৃশ্যমান ভ্রমকে ভেঙে দিয়েছে।


ইসলামি বর্ণনায় মহাবিশ্ব সৃষ্টির পূর্বে

আধুনিক কসমোলজি মহাবিশ্বের আদি ইতিহাস অনুসন্ধান করে পর্যবেক্ষণ, পদার্থবিজ্ঞান ও গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে। ইসলামি সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি আদিচিত্র উপস্থাপন করে। সেখানে মহাবিশ্বের আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির আগেই উপস্থিত ছিল আল্লাহ, একটি আরশ বা সিংহাসন এবং পানি; অন্য একটি বহুল স্বীকৃত হাদিসে আবার সৃষ্টির একেবারে শুরুতে উপস্থিত হয় একটি কলম, যাকে ভবিষ্যতের সমস্ত ঘটনা লিখে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এখানে কোনো মহাজাগতিক প্রসারণ, আদি প্লাজমা, মৌল গঠন, মহাকর্ষীয় structure formation বা নক্ষত্রের জন্মের ইতিহাস নেই। বরং সৃষ্টির আদি দৃশ্যটিই নির্মিত হয়েছে মানুষের পরিচিত বস্তু ও শাসনব্যবস্থার প্রতীকে—সিংহাসন, পানি, কলম এবং লিখিত তাকদীর। অর্থাৎ মহাবিশ্বের উৎপত্তির ব্যাখ্যায়ও দৃশ্যপটটি প্রকৃতির মৌলিক প্রক্রিয়াভিত্তিক নয়; মানুষের রাজকীয় ও প্রশাসনিক জগতের ভাষায় নির্মিত।


আসমান ও পৃথিবীর আগেই পানির ওপর আরশ

সহিহ বুখারীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনায় মুহাম্মদকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—এই পৃথিবী সৃষ্টির আগে কী ছিল? উত্তরে তিনি বলেন, আল্লাহ ছিলেন, তাঁর আরশ ছিল পানির ওপর; তারপর তিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেন এবং সবকিছু লাওহে মাহফুজে লিখে রাখেন। ইসলামি সৃষ্টিতত্ত্বের আদি দৃশ্যটি এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট: আসমান-যমীনের আগে পানি, পানির ওপর আরশ, তারপর আসমান ও পৃথিবীর সৃষ্টি।

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮৬/ জাহ্‌মিয়াদের মতের খণ্ডন ও তাওহীদ প্রসঙ্গ
পরিচ্ছেদঃ ৩১২৪. মহান আল্লাহ্‌র বাণীঃ তখন তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল। তিনি আরশে আযীমের প্রতিপালক। আবুল আলীয়া (রহঃ) বলেন, اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ এর মর্মার্থ হচ্ছে আসমানকে উড্ডীন করেছেন। فَسَوَّاهُنَّ এর মর্মার্থ হচ্ছে, তিনি আসমানরাজিকে সৃষ্টি করেছেন। মুজাহিদ (র) বলেছেন, اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ এর মর্মার্থ হল, আরশের উপর অধিষ্ঠিত হলেন। আবদুল্লাহ্ ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, مَجِيد অর্থ সম্মানিত, الوَدُود অর্থ প্রিয়। বলা হয়ে থাকে, حَمِيدٌ مَجِيدٌ মূলত প্রশংসনীয় ও পবিত্র। বস্তুত এটি مَاجِدٍ থেকে فَعِيلٌ এর ওযনে এসেছে। আর مَحْمُودٌ (প্রশংসনীয়) এসেছে حمد থেকে
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৬৯১৩ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৭৪১৮
৬৯১৩। আবদান (রহঃ) … ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ছিলাম। এমন সময় তাঁর কাছে বনূ তামীম এর কাওমটি এল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ হে বনূ তামীম। তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। প্রতি উত্তরে তারা বলল, আপনি আমাদেরকে শুভ সংবাদ যখন প্রদান করেছেন, তাহলে কিছু দান করুন। এ সময় ইয়ামানবাসী কতিপয় লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সেখানে উপস্থিত হল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উদ্দেশ্যে বললেনঃ হে ইয়ামানবাসী! তোমাদের জন্য সুসংবাদ। বনূ তামীম তা গ্রহণ করল না।
তারা বলে উঠল, আমরা গ্রহণ করলাম শুভ সংবাদ। যেহেতু আমরা আপনার কাছে এসেছি দ্বীনী জ্ঞান হাসিল করার উদ্দেশ্যে এবং জিজ্ঞাসা করার জন্য এসেছি যে, এ দুনিয়া সৃষ্টির আগে কি ছিল? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ তখন ছিলেন, তাঁর আগে আর কিছু ছিল না। তার আরশ তখন পানির ওপর ছিল। এরপর তিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করলেন। এবং লাওহে মাফফুযে সব বস্তু সম্পর্কে লিখে রাখলেন। রাবী বলেন, এরপর আমার কাছে এক ব্যক্তি এসে বলল, হে ইমরান! তোমার উষ্ট্রী পালিয়ে গিয়েছে, তার খবর নাও। আমি উষ্ট্রীর সন্ধানে চললাম। দেখলাম, উষ্ট্রী মরীচিকার আড়ালে আছে। আমি আল্লাহর কসম করে বলছি! আমার মন চাচ্ছিল উষ্ট্রী চলে যায় যাক তবুও আমি মজলিস ছেড়ে যেন না উঠি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ)

এই বর্ণনার কসমোলজিক্যাল কাঠামো কয়েকটি ধাপে সাজানো যায়:

  • আল্লাহর অস্তিত্ব: দৃশ্যমান জগতের পূর্বে আল্লাহ বিদ্যমান।
  • পানির ওপর আরশ: আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির আগেই পানি এবং তার ওপর একটি আরশ বিদ্যমান।
  • আসমান ও পৃথিবীর সৃষ্টি: এই পূর্ববর্তী আরশ-পানি অবস্থার পরে আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়।
  • লিখিত মহাজাগতিক নিয়তি: সমস্ত ঘটনার ভবিষ্যৎ একটি মহাজাগতিক নথিতে লিখে রাখা হয়।

এটি কোনো আধুনিক কসমোলজিক্যাল মডেল নয়। এখানে মহাবিশ্বের আদি ইতিহাস ব্যাখ্যা করা হচ্ছে পদার্থের মৌলিক অবস্থা বা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া দিয়ে নয়; বরং রাজসিংহাসন, পানি এবং লিখিত দলিল দিয়ে। একজন শাসক সিংহাসনে থাকেন, তাঁর আদেশ লিখে রাখা হয়, আর ভবিষ্যৎ একটি নথিতে সংরক্ষিত থাকে—মানব সমাজের এই পরিচিত রাজনৈতিক-প্রশাসনিক কাঠামোই এখানে মহাজাগতিক স্তরে সম্প্রসারিত হয়েছে।


পানির আদিম অস্তিত্ব বনাম মহাবিশ্বের রাসায়নিক ইতিহাস

হাদিসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বস্তুগত দাবি হলো আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির আগেই পানির অস্তিত্ব। পানি কোনো মৌলিক পদার্থ নয়; সাধারণ পানি হলো H₂O—দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু এবং একটি অক্সিজেন পরমাণুর যৌগ। আর অক্সিজেন আদিম মহাবিশ্বের প্রধান মৌলগুলোর একটি ছিল না।

Big Bang nucleosynthesis-এর ফলে প্রধানত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম এবং সামান্য লিথিয়াম তৈরি হয়েছিল। অক্সিজেনের মতো ভারী মৌল পরবর্তী সময়ে নক্ষত্রের অভ্যন্তরে nuclear fusion-এর মাধ্যমে তৈরি হয় এবং stellar evolution ও supernova-সহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ পানির অপরিহার্য উপাদান অক্সিজেনের অস্তিত্বই নক্ষত্রপূর্ব মহাবিশ্বে ছিল না। পৃথিবীর পানি তো আরও পরের ইতিহাসের অংশ।

ফলে ধর্মীয় সৃষ্টিকাহিনির সময়রেখা এবং বাস্তব রাসায়নিক সময়রেখা সরাসরি বিপরীত:

হাদিসের ক্রম: পানি → আরশ → আসমান ও পৃথিবী।

বৈজ্ঞানিক ক্রম: আদি মহাবিশ্ব → প্রথম নক্ষত্র → নক্ষত্রে অক্সিজেনসহ ভারী মৌল → আন্তঃনাক্ষত্রিক রসায়ন → পানি → বহু পরে সৌরজগত ও পৃথিবী।

অর্থাৎ যে পদার্থকে ধর্মীয় বর্ণনায় মহাজাগতিক আকাশ-পৃথিবীর আগের অবস্থায় বসানো হয়েছে, সেই পানিরই রাসায়নিক উপাদান তৈরির জন্য বাস্তবে পূর্ববর্তী মহাবিশ্ব এবং নক্ষত্রের প্রয়োজন। এখানেও কার্যকারণ উল্টো হয়ে গেছে।

পানির বাস্তব রাসায়নিক ইতিহাস ধর্মীয় সৃষ্টিক্রমের সঙ্গে মেলে না। H₂O গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন এসেছে নক্ষত্রীয় নিউক্লিওসিন্থেসিসের বহু পরের ইতিহাস থেকে। অথচ হাদিসে পানি উপস্থিত আসমান ও পৃথিবীরও আগে। বর্ণনাটির কালানুক্রম সরাসরি উল্টো।


আদি পানি: আরও পুরনো সৃষ্টিকাহিনির পরিচিত মোটিফ

সৃষ্টির শুরুতে পানি বা মহাজাগতিক জলরাশি থাকার ধারণাও সপ্তম শতাব্দীর নতুন কোনো তথ্য নয়। প্রাচীন নিকটপ্রাচ্যের বহু সৃষ্টিতত্ত্বে primordial waters বা আদি জলরাশি মহাবিশ্বের সূচনাপর্বে উপস্থিত। মেসোপটেমীয় সৃষ্টিকাহিনিতে আদিম জলীয় সত্তা, বাইবেলের Genesis-এ সৃষ্টির শুরুতেই “deep”-এর ওপর পানি এবং তার ওপর ঈশ্বরের আত্মার উপস্থিতি—এই মোটিফ ইসলাম-পূর্ব ধর্মীয় জগতে বহু আগেই প্রতিষ্ঠিত ছিল।

কোরআনেও বলা হয়েছে আল্লাহর আরশ পানির ওপর ছিল। অর্থাৎ ইসলামি আদি কসমোলজির এই পানিও কোনো আধুনিক cosmochemistry-এর আবিষ্কার নয়; এটি প্রাচীন সৃষ্টিতত্ত্বের অত্যন্ত পরিচিত একটি উপাদান। পরে বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে পানির প্রকৃত রাসায়নিক গঠন ও মহাজাগতিক উৎপত্তির ইতিহাস—এবং সেই ইতিহাস আদি মহাবিশ্বের ওপর ভাসমান পানির কোনো দৃশ্য দেখায় না।


সৃষ্টির শুরুতেই মহাজাগতিক কলম

ইসলামি সৃষ্টিতত্ত্বের আরেকটি বহুল প্রচলিত বর্ণনায় সৃষ্টির একেবারে প্রথম পর্যায়ে আসে একটি কলম। আল্লাহ কলম সৃষ্টি করেন এবং তাকে আদেশ করেন কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে সব লিখে রাখতে। অর্থাৎ মহাবিশ্বের আদিমতম দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি সম্পূর্ণ মানবীয় প্রশাসনিক বস্তু—লেখার কলম এবং ভবিষ্যতের লিখিত নথি। [23]

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৭. তাকদীর সম্পর্কে
৪৭০০। আবূ হাফসাহ (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা উবাদাহ ইবনুস সামিত (রাঃ) তার ছেলেকে বললেন, হে আমার প্রিয় পুত্র! তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত ঈমানের স্বাদ পাবে না যতক্ষণ না তুমি জানতে পারবে ’’যা তোমার উপর ঘটেছে তা ভুলেও এড়িয়ে যাওয়ার ছিলো না। পক্ষান্তরে, যা এড়িয়ে গেছে তা তোমার উপর ভুলেও ঘটবার ছিলো না।
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম যে বস্তু সৃষ্টি করেছেন তা হচ্ছে কলম। অতঃপর তিনি তাকে বললেন, লিখো! কলম বললো, হে রব! কি লিখবো? তিনি বললেন, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক বস্তুর তাকদীর লিখো। হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি এরূপ বিশ্বাস ছাড়া মারা যায় সে আমার (উম্মাতের) নয়।[1]
সহীহ।
[1]. তিরমিযী, আহমাদ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

কলম একটি লেখার যন্ত্র। লেখার ধারণা সৃষ্টি হয়েছে তথ্যকে প্রতীকী চিহ্নে ধারণ করার মানবীয় প্রয়োজন থেকে। কিন্তু এই হাদিসে সেই মানবিক প্রযুক্তিকেই মহাবিশ্বের আদিম স্তরে নিয়ে গিয়ে একটি সচেতন, কথোপকথনে সক্ষম মহাজাগতিক কলমে রূপান্তর করা হয়েছে—আল্লাহ তাকে বলেন “লিখো”, কলম প্রশ্ন করে “কী লিখব?”, তারপর তাকে সমগ্র ভবিষ্যৎ লিখে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এই বর্ণনায় মহাবিশ্বের ইতিহাস একটি বিশাল রাজকীয় প্রশাসনের রূপ নেয়: স্রষ্টা, সিংহাসন, লিখনযন্ত্র, পূর্বলিখিত বিধান এবং সংরক্ষিত নথি। এগুলো পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক উপাদান নয়; এগুলো মানুষের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সভ্যতার পরিচিত প্রতীক।

আর আধুনিক কসমোলজি যেখানে আদি মহাবিশ্বের তাপমাত্রা, ঘনত্ব, পদার্থ, বিকিরণ, মৌল গঠন এবং মহাকর্ষীয় বিবর্তনের প্রমাণ হাজির করে, সেখানে “সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করে ভবিষ্যৎ লিখিয়ে নেওয়া” কোনো পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাজাগতিক ব্যাখ্যা দেয় না। এটি একটি ধর্মতাত্ত্বিক গল্প—বিজ্ঞান নয়।


আরশ, পানি, কলম ও লাওহে মাহফুজ: একটি মানবসদৃশ মহাজাগতিক প্রশাসন

এই বর্ণনাগুলো একত্রে রাখলে ইসলামি pre-creation cosmology-এর একটি স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়:

  • স্রষ্টার একটি আরশ বা সিংহাসন আছে;
  • সেই আরশ পানির ওপর থাকে;
  • একটি কলম সৃষ্টি করা হয়;
  • কলমের সঙ্গে কথোপকথন হয়;
  • সমস্ত ভবিষ্যৎ লিখে রাখা হয়;
  • একটি মহাজাগতিক সংরক্ষিত নথি বা লাওহে মাহফুজ-এর ধারণা থাকে;
  • তারপর আসমানসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টি ঘটে।

এটি প্রকৃতির ইতিহাসকে প্রকৃতির ভাষায় ব্যাখ্যা করে না। বরং মানব সভ্যতার রাজতন্ত্র, লেখালেখি, আদেশ, নথিপত্র ও প্রশাসনের কাঠামোকে মহাবিশ্বের বাইরে এবং মহাবিশ্বের আগেও বসিয়ে দেয়। সিংহাসনে শাসক, তাঁর আদেশ, সেই আদেশের লিখিত রেকর্ড এবং ভবিষ্যতের পূর্বনির্ধারিত নথি—একটি প্রাচীন রাজদরবারের কাঠামো এখানে মহাজাগতিক বাস্তবতার রূপ পেয়েছে।

পরবর্তী ইসলামি সৃষ্টিবর্ণনায় আমরা দেখব, এই আরশ-পানি-কলমের দৃশ্যের পরেই আসে আসমান ও পৃথিবী; তারপর পৃথিবীকে কেন্দ্র করে পর্বত, খাদ্য ও অন্যান্য ব্যবস্থা; এরপর ধোঁয়া-আকাশকে সাত স্তরে বিন্যস্ত করা এবং নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালায় সাজানো। অর্থাৎ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই পৃথিবীকেন্দ্রিক ও প্রাক-বৈজ্ঞানিক কসমোলজিক্যাল কাঠামো ধারাবাহিকভাবে উপস্থিত।


ইসলামি বর্ণনায় মহাবিশ্বের শুরু

ইসলামি সৃষ্টিতত্ত্বে “আসমান ও যমীন” বারবার একটি যুগ্ম মহাজাগতিক একক হিসেবে উপস্থিত হয়। কোরআন ও হাদিসে “যেদিন আসমান ও যমীন সৃষ্টি করা হয়েছিল” কথাটি এমন একটি নির্দিষ্ট আদিম সৃষ্টিমুহূর্তকে নির্দেশ করে, যেখান থেকে মহাজাগতিক সময়, মাসের বিন্যাস, মক্কার পবিত্রতা এবং পরবর্তী সৃষ্টিব্যবস্থার সূচনা ধরা হয়েছে। এই ভাষায় আসমান ও পৃথিবীকে ৯৩০ কোটি বছরের ব্যবধানে উৎপন্ন দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন জ্যোতির্পদার্থবৈজ্ঞানিক ঘটনা হিসেবে দেখা হয় না; বরং একই সৃষ্টিকর্মের দুই প্রধান অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

আধুনিক কসমোলজির সময়রেখা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর, পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর। “আসমান ও যমীন সৃষ্টি” কোরআনিক ভাষায় একটি যুগ্ম মহাজাগতিক সৃষ্টি-বাক্যাংশ হিসেবে এসেছে; কিন্তু বাস্তব মহাজাগতিক ইতিহাসে পৃথিবী মহাবিশ্বের আদিম পর্যায়ের কোনো সত্তা নয়। মহাবিশ্বের জন্মের প্রায় ৯৩০ কোটি বছর পরে পৃথিবী তৈরি হয়েছে।


আসমান ও পৃথিবীর সৃষ্টি: কোরআনের সূচনা-বিন্দু

সূরা তওবা ৯:৩৬-এ বলা হয়েছে, আল্লাহর বিধানে মাসের সংখ্যা বারো—“যেদিন তিনি আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন” সেই দিন থেকেই। অর্থাৎ কোরআন এখানে আসমান ও পৃথিবীর সৃষ্টিকে একটি নির্দিষ্ট মহাজাগতিক সূচনা-বিন্দু হিসেবে ব্যবহার করছে। [24]

আসমান-যমীন সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর কিতাবে (লৌহ মাহফুজে) মাসগুলোর সংখ্যা হল বার। তার মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস। এটা হল সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন। কাজেই ঐ সময়ের মধ্যে নিজেদের উপর যুলম করো না। মুশরিকদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করে। জেনে রেখ, আল্লাহ অবশ্যই মুত্তাকীদের সঙ্গে আছেন।
— Taisirul Quran
নিশ্চয়ই আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে আল্লাহর বিধানে মাস গণনায় বারটি। এর মধ্যে বিশেষ রূপে চারটি মাস হচ্ছে সম্মানিত। এটাই হচ্ছে সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম। অতএব তোমরা এ মাসগুলিতে (ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ করে) নিজেদের ক্ষতি সাধন করনা, আর মুশরিকদের বিরুদ্ধে সকলে একযোগে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সকলে একযোগে যুদ্ধ করে। আর জেনে রেখ যে, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে রয়েছেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় মাসসমূহের গণনা আল্লাহর কাছে বার মাস আল্লাহর কিতাবে, (সেদিন থেকে) যেদিন তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্য থেকে চারটি সম্মানিত, এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন। সুতরাং তোমরা এ মাসসমূহে নিজদের উপর কোন যুলম করো না, আর তোমরা সকলে মুশরিকদের সাথে লড়াই কর যেমনিভাবে তারা সকলে তোমাদের সাথে লড়াই করে, আর জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টির দিন থেকেই [১] আল্লাহ্‌র বিধানে [২] আল্লাহ্‌র কাছে গণনায় মাস বারটি [৩], তার মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস [৪], এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন [৫]। কাজেই এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করো না এবং তোমরা মুশরিকদের সাথে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করে থাকে। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ মুত্তাকীদের সাথে আছেন।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
Indeed, the number of months with Allah is twelve [lunar] months in the register of Allah [from] the day He created the heavens and the earth; of these, four are sacred.1 That is the correct religion [i.e., way], so do not wrong yourselves during them.2 And fight against the disbelievers collectively as they fight against you collectively. And know that Allah is with the righteous [who fear Him].
— Saheeh International

আয়াতটির ভাষা লক্ষ্য করলে দেখা যায়, “আসমানসমূহের সৃষ্টি” এবং “পৃথিবীর সৃষ্টি”কে আলাদা বিলিয়ন-বছরব্যাপী যুগের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। ব্যবহৃত হয়েছে একক বাক্যাংশ—يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ—“যেদিন তিনি আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।” এই সৃষ্টিদিবস থেকেই বারো মাসের বিধান কার্যকর বলে বলা হচ্ছে।

এখানে বারো মাসের ধর্মীয় সময়ব্যবস্থাকে “আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন” পর্যন্ত পেছনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ মাস মানুষের পর্যবেক্ষণযোগ্য জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বাস্তবতায় পৃথিবী-চাঁদ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত, আর সেই ব্যবস্থা মহাবিশ্বের আদিম পর্যায়ে ছিল না। অর্থাৎ পৃথিবীর একটি স্থানীয় সময়ব্যবস্থাকে মহাজাগতিক সৃষ্টির আদিম বিধানের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি আধুনিক কসমোলজির সময়রেখা নয়; পৃথিবীকেন্দ্রিক ধর্মীয় সময়চেতনার ভাষা।


হাদিসেও একই “আসমান-যমীন সৃষ্টির দিন”

কোরআনের এই ভাষা বিচ্ছিন্ন নয়। সহিহ বুখারীর হাদিসেও “আসমান ও যমীন সৃষ্টির দিন”কে সময়ের আদিম মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে মুহাম্মদ বলেন, সময় আবার সেই অবস্থায় ফিরে এসেছে যে অবস্থায় ছিল আসমান ও যমীন সৃষ্টির দিনে; এরপর তিনি বারো মাস এবং চারটি পবিত্র মাসের কথা বলেন। [25]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ ২৩৯৮. আল্লাহ তা’আলার বাণীঃ নিশ্চয় আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন হতেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট মাস গননায়, মাস বারোটি। তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান (৯ঃ ৩৬) القيم শব্দটি قائم (প্রতিষ্ঠিত) অর্থে ব্যবহৃত হয়।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৩০৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৬৬১ – ৪৬৬২
২৩৯৭. অনুচ্ছেদ: আল্লাহর বাণীঃ সে দিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দিয়ে দাগিয়ে দেয়া হবে তাদের কপাল, তাদের পাঁজর এবং তাদের পৃষ্ঠদেশ, বলা হবেঃ এগুলো হল তা, যা তোমরা নিজেদের জন্য জমা করে রেখেছিলে। সুতরাং যা তোমরা জমা করে রাখতে তার সাদ গ্রহণ কর। (৯: ৩৫)
আহমাদ ইবন শু’আয়ব ইবন সা’ঈদ (রহঃ) … খালিদ ইবনু আসলাম (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে বের হলাম। তখন তিনি বললেন, এ আয়াতটি যাকাতের বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বের। এরপর যাকাতের বিধান অবতীর্ণ হলে আল্লাহ তা সম্পদের পরিশুদ্ধকারী রূপে নির্ধারণ করেন।
৪৩০৫ আবদুল্লাহ ইবনু আবদুল ওয়াহাব (রহঃ) … আবূ বকর (রাঃ) কর্তৃক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আল্লাহর যেদিন আসমান যমীন সৃষ্টি করে সেদিন যেভাবে কাল (যামানা) ছিল তা আজও অনুরূপভাবে বিদ্যমান। বারোমাসে এক বছর, তন্মধ্যে চার মাস পবিত্র। যার তিন মাস ধারাবাহিক যথা যিলকাদ, যিলহাজ্জ ও মুহাররম আর মুযার গোত্রের রজব যা জামিদিউস সানী ও সাবান মাসদ্বয়ের মধ্যবর্তী।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)

এখানে আবারও একই কাঠামো: আসমান ও যমীনের সৃষ্টি একটি মহাজাগতিক আদিম দিন, এবং সেই দিনের সঙ্গে বারো মাসের সময়ব্যবস্থা যুক্ত। মহাবিশ্বের প্রথম ৯৩০ কোটি বছর পৃথিবী ছিল না—এই বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার সঙ্গে এই কল্পনা মেলে না। পৃথিবী না থাকলে পৃথিবীর বছর নেই; চাঁদ না থাকলে চন্দ্রমাস নেই; অথচ ধর্মীয় বর্ণনায় এই পৃথিবীকেন্দ্রিক ক্যালেন্ডারকে মহাবিশ্বের আদিম সৃষ্টিদিন পর্যন্ত পেছনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।


মক্কার পবিত্রতাও আসমান-যমীন সৃষ্টির দিন থেকে

সহিহ মুসলিমের আরেকটি হাদিসে এই পৃথিবীকেন্দ্রিক কালানুক্রম আরও স্পষ্ট হয়। মক্কা বিজয়ের দিন মুহাম্মদ বলেন, আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টির দিন থেকেই মক্কাকে পবিত্র করেছেন। [26]

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৬। হজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ৮২. মক্কার হারামে হওয়া, হারামের অভ্যন্তরে ও উপকণ্ঠে শিকার কার্য চিরস্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ, এখানকার গাছপালা উপড়ানো ও ঘাস কাটা নিষেধ
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৩১৯৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৩৫৩
৩১৯৩-(৪৪৫/১৩৫৩) ইসহাক ইবনু ইবরাহীম আল হানযালী (রহঃ) ….. ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাহ (মক্কা) বিজয়ের দিন বলেছেনঃ হিজরাতের আর প্রয়োজন নেই, কিন্তু জিহাদ ও নিয়্যাত অব্যাহত থাকবে। তোমাদেরকে যখন জিহাদের আহবান জানানো হয় তখন জিহাদে যোগদান কর। মক্কাহ (মক্কা) বিজয়ের দিন তিনি আরও বলেন, আল্লাহ তা’আলা এ শহরকে সম্মানিত করেছেন- যেদিন তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন সেদিন থেকে। অতএব কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তা’আলা এ শহরের মর্যাদা ও সম্মান অক্ষুন্ন রাখবেন। তিনি এ শহরে আমার পূর্বে আর কারও জন্য যুদ্ধ বৈধ করেননি। আমার জন্য মাত্র এক দিনের কিছু সময় তিনি এখানে যুদ্ধ বৈধ করেছিলেন। অতএব তথায় যুদ্ধ বিগ্রহ করা হারাম। আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক কিয়ামত পর্যন্ত নিষিদ্ধ করার কারণে এখানকার কোন কাঁটাযুক্ত গাছ উপড়ানো যাবে না, এখানকার শিকারের পশ্চাদ্ধাবণ করা যাবে না, এখানকার পতিত জিনিস তোলা যাবে না। তখন “আব্বাস (রাযিঃ) বললেন, হে আল্লাহর রসূল! কিন্তু ইযখির (লম্বা ঘাস) সম্পর্কে (অনুমতি দিন)। কারণ তা স্বর্ণকার ও তাদের ঘরের কাজে লাগে। তিনি বললেন, কিন্তু ইযখির (তোলার অনুমতি দেয়া হল)। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩১৬৮, ইসলামীক সেন্টার ৩১৬৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

এই বক্তব্যের আক্ষরিক কালানুক্রম আরও সমস্যাজনক। মক্কা একটি নির্দিষ্ট ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলের মানববসতি; কিন্তু হাদিসে তার পবিত্রতার সূচনা নিয়ে যাওয়া হয়েছে “আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন”-এ। বাস্তব পৃথিবী জন্মের পরও বর্তমান ভূত্বক, আরব উপদ্বীপ, মক্কার ভূপ্রকৃতি বা মানববসতি একসঙ্গে উপস্থিত হয়নি। পৃথিবীর পৃষ্ঠ plate tectonics, volcanism, erosion, sedimentation এবং বিলিয়ন বছরের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান অবস্থায় এসেছে।

অর্থাৎ ধর্মীয় কাহিনিতে বর্তমান পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট শহরের ধর্মীয় মর্যাদাকে সরাসরি মহাবিশ্বের আদিম সৃষ্টিক্ষণে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি ইতিহাস বা ভূবিজ্ঞানের সময়রেখা নয়; বর্তমান ধর্মীয় ভূগোলকে সৃষ্টির শুরু পর্যন্ত পেছনে সম্প্রসারিত করা।


তাফসীরেও পৃথিবী আগে, আকাশ পরে

তাফসীর গ্রন্থগুলোতে এই পৃথিবী-প্রথম সৃষ্টিক্রম আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাফসীরে ইবনে কাসীরের সংশ্লিষ্ট আলোচনায় পৃথিবী ও আকাশের সৃষ্টির ক্রম, পৃথিবীর উপাদান ও পরবর্তী আকাশ-সজ্জার বিবরণ স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। [27]

পৃথিবী 20
পৃথিবী 22
পৃথিবী 24
পৃথিবী 26

এই ব্যাখ্যাগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ এগুলো দেখায়, “আসমান ও যমীন”কে আধুনিক কসমোলজির ভাষায় পুনর্ব্যাখ্যা করার আগের ইসলামি বোঝাপড়া কেমন ছিল। পৃথিবীকে প্রথমদিকে নির্মাণ, তার উপাদান ও ব্যবস্থা স্থাপন, তারপর আকাশের বিন্যাস—এই ক্রম ধ্রুপদী ব্যাখ্যার মধ্যেই উপস্থিত। আজকের Big Bang, galaxy formation বা planetary accretion-এর জ্ঞান সেখানে নেই; আছে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সাজানো সৃষ্টির ধারাবর্ণনা।


বাস্তব সময়রেখা বনাম ধর্মীয় সময়রেখা

এখন দুইটি সময়রেখা পাশাপাশি রাখলে সংঘাতটি পরিষ্কার:

ইসলামি বর্ণনা:
আদি আরশ ও পানি → আসমান ও যমীনের সৃষ্টির দিন → সেই দিন থেকেই বারো মাস → সেই দিন থেকেই মক্কার পবিত্রতা → পৃথিবী ও আকাশকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সৃষ্টিব্যবস্থা।

বৈজ্ঞানিক সময়রেখা:
আদি উত্তপ্ত মহাবিশ্ব → প্রথম পরমাণু → প্রথম নক্ষত্র → গ্যালাক্সি → নক্ষত্রে ভারী মৌল → বহু প্রজন্মের নক্ষত্র ও গ্রহব্যবস্থা → প্রায় ৯৩০ কোটি বছর পরে সূর্য ও পৃথিবী → পরে চাঁদ → বহু পরে বর্তমান মহাদেশ, আরব উপদ্বীপ, মক্কার ভূপ্রকৃতি ও মানবসভ্যতা।

দুইটি ধারাবর্ণনা একই ইতিহাস নয়। ইসলামি কসমোলজিতে পৃথিবী এবং মানুষের ধর্মীয় ভূগোল মহাবিশ্বের সৃষ্টির শুরু থেকেই কেন্দ্রীয়; বিজ্ঞানে পৃথিবী একটি বিলম্বিত গ্রহ, আর মক্কা তারও বহু পরে গঠিত ভূতাত্ত্বিক ও মানবিক স্থান।

পৃথিবী মহাবিশ্বের সঙ্গে সৃষ্টি হয়নি। পৃথিবীর মাস মহাবিশ্বের শুরু থেকে চলেনি। মক্কাও মহাবিশ্বের জন্মমুহূর্তের কোনো ভৌত সত্তা ছিল না। এই তিনটি বাস্তব তথ্য ইসলামি “আসমান-যমীন সৃষ্টির দিন”কে কেন্দ্র করে নির্মিত কালানুক্রমের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ সৃষ্টি করে।

এরপর কোরআন আরও একটি নির্দিষ্ট দাবি করে: আসমান ও পৃথিবী আগে সংযুক্ত ছিল, পরে তাদের পৃথক করা হয়েছে। আধুনিক ইসলামি “বৈজ্ঞানিক মিরাকল” প্রচারণায় এই আয়াতকে Big Bang-এর ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। পরের পরিচ্ছেদে দেখা হবে—এই দাবিটি Big Bang-এর সঙ্গে সত্যিই মেলে, নাকি এটি প্রাচীন sky–earth separation cosmology-এর আরেকটি পরিচিত রূপ।


আসমান ও পৃথিবী একসাথে ছিল, পরে পৃথক হলো

কোরআনের সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৩০-এ বলা হয়েছে, আসমানসমূহ ও পৃথিবী একসময় সংযুক্ত, মিশ্রিত বা ওতপ্রোতভাবে একত্রে ছিল; পরে আল্লাহ তাদের পৃথক করে দেন। আধুনিক ইসলামি প্রচারণায় এই আয়াতটি কোরআনের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত “বৈজ্ঞানিক মিরাকল”-এর একটি। দাবি করা হয়, সপ্তম শতাব্দীর কোরআন এখানে নাকি আধুনিক Big Bang তত্ত্বের কথা বলে দিয়েছে।

দাবিটি ভুল। Big Bang cosmology কোথাও বলে না যে “আকাশ” এবং “পৃথিবী” নামের দুটি বস্তু প্রথমে একসঙ্গে জোড়া লাগানো ছিল এবং পরে তাদের বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। পৃথিবীর অস্তিত্বই শুরু হয়েছে Big Bang-এর প্রায় ৯৩০ কোটি বছর পরে। যে বস্তুটি তখন অস্তিত্বেই ছিল না, সেটি মহাবিশ্বের আদিম অবস্থায় “আকাশের সঙ্গে সংযুক্ত” থাকার প্রশ্নই ওঠে না।

আয়াতটি পড়লে আধুনিক Big Bang-এর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ছবি পাওয়া যায়: একদিকে আকাশ, অন্যদিকে পৃথিবী; দুটো আগে যুক্ত ছিল, পরে আলাদা করা হয়েছে। এটি আধুনিক কসমোলজির বর্ণনা নয়; বরং প্রাচীন সৃষ্টিতত্ত্বে বহুল পরিচিত sky–earth separation বা আকাশ-পৃথিবী পৃথকীকরণের কাহিনি।

অবিশ্বাসীরা কি দেখে না যে, আকাশ আর যমীন এক সঙ্গে সংযুক্ত ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে আলাদা করে দিলাম, আর প্রাণসম্পন্ন সব কিছু পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?
— Taisirul Quran
যারা কুফরী করে তারা কি ভেবে দেখেনা যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে; অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং প্রাণবান সমস্ত কিছু সৃষ্টি করলাম পানি হতে; তবুও কি তারা বিশ্বাস করবেনা?
— Sheikh Mujibur Rahman
যারা কুফরী করে তারা কি ভেবে দেখে না যে, আসমানসমূহ ও যমীন ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল*, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম, আর আমি সকল প্রাণবান জিনিসকে পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবুও কি তারা ঈমান আনবে না? * আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে আদিতে আকাশ, সূর্য, নক্ষত্র ও পৃথিবী ইত্যাদি পৃথক সত্তায় ছিল না; বরং সবকিছুই ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল। তখন মহাবিশ্ব ছিল অসংখ্য গ্যাসীয় কণার সমষ্টি। পরবর্তীকালে মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে নক্ষত্র, সূর্য, পৃথিবী ও গ্রহসমূহ সৃষ্টি হয়। এটিই বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ থিওরী।
— Rawai Al-bayan
যারা কুফরী করে তারা কি দেখে না [১] যে, আসমানসমূহ ও যমীন মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে, তারপর আমরা উভয়কে পৃথক করে দিলাম [২] এবং প্রাণবান সব কিছু সৃষ্টি করলাম পানি থেকে [৩]; তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
[ কোরআন ২১:৩০ ]


Big Bang-এ পৃথিবী ছিলই না

এই আয়াতকে Big Bang-এর সঙ্গে মেলানোর প্রথম এবং সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পৃথিবীর বয়স। মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর, আর পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর। অর্থাৎ মহাবিশ্বের জন্মের প্রথম প্রায় ৯.৩ বিলিয়ন বছর পৃথিবী নামক কোনো গ্রহের অস্তিত্বই ছিল না।

Big Bang-এর পরে প্রথমে ছিল উত্তপ্ত ও ঘন প্রাথমিক মহাবিশ্ব। পরে পরমাণু তৈরি হয়েছে, প্রথম নক্ষত্র জন্মেছে, গ্যালাক্সি গঠিত হয়েছে, নক্ষত্রের ভেতরে ভারী মৌল তৈরি হয়েছে, বহু প্রজন্মের নক্ষত্র জন্ম-মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গেছে। তারপর প্রায় ৯৩০ কোটি বছর পরে আমাদের সূর্য ও সৌরজগত তৈরি হয়; সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই পৃথিবীর জন্ম।

সুতরাং বৈজ্ঞানিক সময়রেখা হলো:

Big Bang → প্রথম পরমাণু → প্রথম নক্ষত্র → গ্যালাক্সি → ভারী মৌল → বহু প্রজন্মের নক্ষত্র → সূর্য → পৃথিবী।

কোরআনিক বর্ণনা হলো:

আকাশ + পৃথিবী একত্রে → দুটিকে পৃথক করা।

এ দুটি একই ঘটনা নয়। প্রথমটি ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের মহাজাগতিক বিবর্তন; দ্বিতীয়টি আকাশ ও পৃথিবী নামের দুটি পৃথক সত্তার বিচ্ছেদের সৃষ্টিকাহিনি।


Big Bang কোনো “আকাশ-পৃথিবী বিচ্ছেদ” নয়

Big Bang-কে “সবকিছু একসঙ্গে ছিল, পরে আলাদা হয়েছে”—এই এক লাইনে নামিয়ে আনা বিজ্ঞানকে বিকৃত করা। Big Bang model-এর মৌলিক বিষয় হলো মহাবিশ্বের অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন প্রাথমিক অবস্থা এবং পরবর্তী cosmic expansion। এখানে কোনো প্রস্তুত “পৃথিবী” ছিল না, কোনো প্রস্তুত “আকাশ” ছিল না, এবং কোনো দেবতা দুইটি বস্তু ধরে একে অপরের কাছ থেকে টেনে আলাদা করেছেন—এমন কোনো ঘটনা নেই।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, Big Bang-এ পৃথিবী মহাবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বেরিয়ে আসেনি। পৃথিবী তৈরি হয়েছে বহু পরে একটি নির্দিষ্ট নক্ষত্র—সূর্যের চারপাশের protoplanetary disk থেকে accretion-এর মাধ্যমে। পৃথিবীর উৎপত্তির সঙ্গে “আকাশ থেকে পৃথিবীকে আলাদা করা”-র কোনো সম্পর্ক নেই। তাই ২১:৩০-কে Big Bang বলা শুধু ভুল তুলনা নয়; এটি দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ঘটনাকে এক করে ফেলা। একটিতে spacetime ও মহাজাগতিক পদার্থের দীর্ঘ বিবর্তন, অন্যটিতে আকাশ ও পৃথিবীর পৌরাণিক বিচ্ছেদ।

ধ্রুপদী তাফসীরেও এই আয়াতকে আধুনিক Big Bang-এর ভাষায় বোঝানো হয়নি। কুরতুবী ২১:৩০-এর আকাশ-পৃথিবীর সংযুক্তি ও পৃথকীকরণকে তাঁর পৃথিবী, আদি ধোঁয়া, সাত আকাশ এবং পৃথিবীর পরবর্তী বিস্তারের সৃষ্টিক্রমের সঙ্গেই যুক্ত করেছেন। অর্থাৎ তাঁর আলোচনার কাঠামোটি আধুনিক cosmic expansion নয়; এটি আসমান ও যমীনের সৃষ্টি ও বিন্যাসের ধ্রুপদী কসমোলজি। [28]


আকাশ-পৃথিবী একত্রে থাকা: কোরআনের বহু আগের সৃষ্টিকাহিনি

আকাশ ও পৃথিবী প্রথমে একত্রে ছিল এবং পরে তাদের পৃথক করা হয়েছে—এই ধারণাটি কোরআনের কোনো মৌলিক আবিষ্কার নয়। কোরআনের বহু শতাব্দী, এমনকি বহু সহস্রাব্দ আগের সৃষ্টিকাহিনিতেও একই মৌলিক কাঠামো পাওয়া যায়। প্রাচীন মিশর, গ্রিক সাহিত্য এবং মেসোপটেমীয় সৃষ্টিতত্ত্বে sky–earth separation একটি পরিচিত মহাজাগতিক মোটিফ ছিল। [29]


প্রাচীন মিশর: নুট ও গেবকে পৃথক করলেন শু

প্রাচীন মিশরীয় সৃষ্টিতত্ত্বে আকাশের দেবী নুট (Nut) এবং পৃথিবীর দেবতা গেব (Geb) প্রথমে একসঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাতাসের দেবতা শু (Shu) তাদের পৃথক করেন—নুটকে ওপরে তুলে আকাশ এবং গেবকে নিচে রেখে পৃথিবীর বিন্যাস তৈরি করেন। এই বিচ্ছেদের মাধ্যমেই আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে বর্তমান বাসযোগ্য জগতের স্থান সৃষ্টি হয়।

পৃথিবী 28

গ্রিক ঐতিহ্য: আকাশ ও পৃথিবীর পূর্ববর্তী ঐক্য

গ্রিক ঐতিহ্যেও আকাশ ও পৃথিবীর মিলিত অবস্থা এবং পরবর্তী বিচ্ছেদের ধারণা ছিল। ধ্রুপদী নাট্যকার ইউরিপিদেসের রচনায় পৃথিবী ও আকাশ একসময় একত্রে ছিল এবং পরে বিচ্ছিন্ন হয়েছে—এমন প্রাচীন কাহিনির উল্লেখ পাওয়া যায়। Gaia বা পৃথিবী এবং Uranus বা আকাশের সম্পর্কও গ্রিক সৃষ্টিতত্ত্বের কেন্দ্রীয় অংশ।

পৃথিবী 30

মেসোপটেমিয়া: আন ও কি

সুমেরীয় কসমোলজিতে আন (An) আকাশ এবং কি (Ki) পৃথিবীর প্রতিনিধিত্ব করে। প্রাচীন সৃষ্টিবর্ণনায় আকাশ ও পৃথিবীর বিচ্ছিন্নতা জগতের বিন্যাসের মৌলিক ঘটনা। অন্য মেসোপটেমীয় ধারায়ও আদিম একত্রিত মহাজাগতিক সত্তাকে বিভক্ত করে আকাশ ও পৃথিবী নির্মাণের কাহিনি পাওয়া যায়।

অর্থাৎ সপ্তম শতাব্দীতে “আকাশ ও পৃথিবী আগে একত্রে ছিল, পরে পৃথক হয়েছে” বলা কোনো অজানা মহাজাগতিক তথ্য প্রকাশ করা নয়। এই ধারণা ইসলাম-পূর্ব প্রাচীন সৃষ্টিতত্ত্বে বহু শতাব্দী ধরে প্রচলিত ছিল। আধুনিক Big Bang আবিষ্কারের পরে সেই পুরনো মোটিফের গায়ে নতুন বৈজ্ঞানিক নাম লাগানো হয়েছে।


অনুবাদের টীকাতেই আধুনিক বিজ্ঞান ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে

উপরের Rawai Al-bayan অনুবাদের টীকাটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। মূল আয়াতে Big Bang, gas particles, মহাবিস্ফোরণ, নক্ষত্রের গঠন বা আধুনিক cosmology-এর কোনো technical description নেই। কিন্তু টীকাকার সরাসরি আধুনিক Big Bang theory আয়াতের পাশে বসিয়ে দিয়েছেন। ফলে পাঠকের কাছে এমন impression তৈরি হয় যেন আধুনিক বিজ্ঞানের পুরো ধারণাটিই মূল আরবি বাক্যের ভেতরে রয়েছে।

বাস্তবে প্রক্রিয়াটি উল্টো: প্রথমে আধুনিক বিজ্ঞান Big Bang আবিষ্কার করেছে; তারপর পুরনো “আকাশ ও পৃথিবী এক ছিল, পরে আলাদা হলো” বাক্যকে সেই আবিষ্কারের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এটি prediction নয়, post-hoc reinterpretation—ঘটনা জানার পরে পুরনো টেক্সটকে নতুন অর্থ দেওয়া।

মূল আয়াতে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, পৃথিবীর বিলিয়ন বছর পরের উৎপত্তি, প্রথম নক্ষত্রের যুগ কিংবা cosmic microwave background-এর কোনো বর্ণনা নেই। সেখানে যে দৃশ্যটি পাওয়া যায় তা অনেক সরল এবং অনেক পুরনো: আকাশ ও পৃথিবী জোড়া ছিল, ঈশ্বর তাদের আলাদা করলেন।


কোরআনিক দৃশ্য বনাম বাস্তব মহাজাগতিক ইতিহাস

দুটি মডেল পাশাপাশি রাখলে পার্থক্যটি আর লুকানো যায় না:

  • কোরআনিক দৃশ্য: আকাশ ও পৃথিবী একসঙ্গে যুক্ত → আল্লাহ তাদের পৃথক করেন।
  • বৈজ্ঞানিক ইতিহাস: উত্তপ্ত আদি মহাবিশ্ব → সম্প্রসারণ → পরমাণু → নক্ষত্র → গ্যালাক্সি → ভারী মৌল → সৌরজগত → প্রায় ৯৩০ কোটি বছর পরে পৃথিবী।
  • প্রাচীন পৌরাণিক দৃশ্য: আকাশ ও পৃথিবী একত্রে → দেবতা/ঐশ্বরিক শক্তি তাদের পৃথক করে → বর্তমান জগতের বিন্যাস।

কোরআনের বর্ণনা কোনটির সঙ্গে বেশি মেলে, তা স্পষ্ট। এটি modern cosmology-এর quantitative ও evolutionary model-এর সঙ্গে নয়; প্রাচীন sky–earth separation cosmology-এর সঙ্গে একই ধারণাগত কাঠামো ভাগ করে।

আর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি সেই ৯৩০ কোটি বছরের ব্যবধান। পৃথিবী যদি Big Bang-এর সময় অস্তিত্বই না রাখে, তাহলে “Big Bang-এর সময় আকাশ ও পৃথিবী একসঙ্গে ছিল”—এই দাবি শুরুতেই ভেঙে পড়ে। পৃথিবী আদি মহাবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি; পৃথিবী বহু বিলিয়ন বছর পরে মৃত ও জীবিত নক্ষত্রের রাসায়নিক উত্তরাধিকার বহনকারী একটি সৌরজাগতিক disk থেকে তৈরি হয়েছে।

অতএব সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৩০ Big Bang-এর কোনো বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস নয়। এটি আকাশ ও পৃথিবীর পৃথকীকরণ নিয়ে প্রাচীন সৃষ্টিতাত্ত্বিক ধারণার একটি ধর্মীয় সংস্করণ। আধুনিক বিজ্ঞানকে আয়াতের ভেতরে পাওয়া যায়নি; আধুনিক বিজ্ঞান আবিষ্কৃত হওয়ার পরে আয়াতের ভেতরে ঢোকানো হয়েছে।


আলাদা হওয়ার পরের কার্যক্রম

আকাশ ও পৃথিবীকে পৃথক করার বর্ণনার পরে কোরআনের অন্য আয়াতগুলোতে সৃষ্টির আরও বিস্তারিত ক্রম পাওয়া যায়। আর এখানেই সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোরআনিক ধারাবর্ণনায় পৃথিবী কোনো শেষের দিকের গ্রহ নয়; বরং পৃথিবী ও তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার কাজ আগে এগোয়, এরপর আসে আকাশকে সাত স্তরে বিন্যস্ত করা এবং নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালায় সুশোভিত করার পর্যায়।

সূরা বাকারা ২:২৯-এ ক্রমটি খুবই সরল: প্রথমে পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব মানুষের জন্য সৃষ্টি করা হয়, তারপর আকাশের দিকে মনোনিবেশ করে তাকে সাত আকাশে বিন্যস্ত করা হয়।

পৃথিবীর সবকিছু তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি আকাশের দিকে মনোসংযোগ করেন এবং তা সপ্তাকাশে বিন্যস্ত করেন, তিনি সকল বিষয়ে বিশেষভাবে অবহিত।
— Taisirul Quran
পৃথিবীতে যা কিছু আছে সমস্তই তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন; অতঃপর তিনি আকাশের প্রতি মনঃসংযোগ করেন, অতঃপর সপ্ত আকাশ সুবিন্যস্ত করেন এবং তিনি সর্ব বিষয়ে মহাজ্ঞানী।
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনিই যমীনে যা আছে সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারপর আসমানের প্রতি খেয়াল করলেন এবং তাকে সাত আসমানে সুবিন্যস্ত করলেন। আর সব কিছু সম্পর্কে তিনি সম্যক জ্ঞাত।
— Rawai Al-bayan
তিনিই যমীনে যা আছে সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারপর [১] তিনি আসমানের প্রতি মনোনিবেশ [২] করে সেটাকে সাত আসমানে বিন্যস্ত করেছেন; আর তিনি সবকিছু সম্পর্কে সবিশেষ অবগত।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
[ কোরআন ২ঃ২৯ ]

এখানে ব্যবহৃত ক্রমটি লক্ষণীয়: পৃথিবীর বস্তুসমূহ → তারপর আকাশ → সাত আকাশে বিন্যাস। আধুনিক মহাজাগতিক ইতিহাসে এই ক্রমের কোনো অস্তিত্ব নেই। পৃথিবীর জন্মের প্রায় ৯০০ কোটি বছর আগেই নক্ষত্রের যুগ শুরু হয়েছিল, বহু বিলিয়ন বছর আগেই গ্যালাক্সি গঠিত হয়েছিল, এবং পৃথিবীর বহু আগে অন্য নক্ষত্রের চারপাশে গ্রহও তৈরি হয়েছিল। পৃথিবী তাই আকাশীয় জগতের আগের কোনো সৃষ্টি নয়; বরং সেই বহু পুরনো মহাজাগতিক জগতেরই পরবর্তী উৎপাদ।


সূরা ফুসসিলাতে আরও বিস্তারিত সৃষ্টিক্রম

সূরা ফুসসিলাত ৪১:৯–১২ একই ক্রমকে আরও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে। এখানে প্রথমে পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়। তারপর পৃথিবীতে পর্বত স্থাপন, বরকত প্রদান এবং খাদ্যের ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়। এরপর আল্লাহ আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন—যে আকাশ তখন ছিল ধোঁয়া। তারপর তাকে সাত আকাশে বিন্যস্ত করা হয় এবং নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত করা হয়।

বলুন, তোমরা কি সে সত্তাকে অস্বীকার কর যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দু’দিনে এবং তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ স্থীর কর? তিনি তো সমগ্র বিশ্বের পালনকর্তা।
তিনি পৃথিবীতে উপরিভাগে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, তাতে কল্যাণ নিহিত রেখেছেন এবং চার দিনের মধ্যে তাতে তার খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন-পূর্ণ হল জিজ্ঞাসুদের জন্যে।
অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন যা ছিল ধুম্রকুঞ্জ, অতঃপর তিনি তাকে ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা স্বেচ্ছায় আসলাম।
অতঃপর তিনি আকাশমন্ডলীকে দু’দিনে সপ্ত আকাশ করে দিলেন এবং প্রত্যেক আকাশে তার আদেশ প্রেরণ করলেন। আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত ও সংরক্ষিত করেছি। এটা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর ব্যবস্থাপনা।
[ কোরআন ৪১ঃ৯-১২ ]

আয়াতগুলোর ঘটনাক্রম আলাদা করে লিখলে দাঁড়ায়:

  • প্রথমে: পৃথিবী সৃষ্টি;
  • তারপর: পৃথিবীতে পর্বত স্থাপন;
  • তারপর: পৃথিবীতে বরকত ও খাদ্যের ব্যবস্থা নির্ধারণ;
  • অতঃপর: ধোঁয়া-অবস্থার আকাশের দিকে মনোনিবেশ;
  • এরপর: সেই আকাশকে সাত আকাশে বিন্যস্ত করা;
  • শেষে: নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত করা।

এখানে শুধু পৃথিবীর অস্তিত্বই আকাশের বিন্যাসের আগে নয়; পৃথিবীতে পর্বত, বরকত এবং খাদ্যের ব্যবস্থাও ধোঁয়া-আকাশকে সাত আকাশে বিন্যস্ত করার আগেই বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবীকে একটি প্রাথমিক মঞ্চ হিসেবে সাজিয়ে নেওয়ার পরে আকাশের নির্মাণ ও সজ্জার দিকে যাওয়া হচ্ছে।

বাস্তব মহাজাগতিক ইতিহাসে ঘটনাটি উল্টো। পৃথিবী তৈরি হওয়ার সময় মহাবিশ্ব প্রায় ৯.২ বিলিয়ন বছরের পুরনো। নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যুর বহু প্রজন্ম ইতোমধ্যেই পার হয়ে গেছে, গ্যালাক্সি বহু বিলিয়ন বছর ধরে বিবর্তিত হয়েছে, ভারী মৌল তৈরি হয়েছে, পৃথিবীর চেয়ে বহু পুরনো গ্রহব্যবস্থা গঠিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত একটি পুরনো গ্যালাক্সির একটি নক্ষত্রকে ঘিরে তৈরি protoplanetary disk থেকে পৃথিবীর জন্ম হয়েছে।

অর্থাৎ বিজ্ঞানের ক্রম:

আদি মহাবিশ্ব → নক্ষত্র → গ্যালাক্সি → বহু প্রজন্মের নক্ষত্র → ভারী মৌল → গ্রহব্যবস্থা → সূর্য → পৃথিবী → পর্বত ও পরবর্তী ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন।

আর সূরা ফুসসিলাতের ক্রম:

পৃথিবী → পর্বত ও খাদ্যের ব্যবস্থা → ধোঁয়া-আকাশ → সাত আকাশ → নিকটবর্তী আকাশে প্রদীপমালা।

দুটি ক্রম বিপরীত। পৃথিবীর পর্বত তো দূরের কথা, পৃথিবী নিজেই তৈরি হয়েছে নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির বিলিয়ন বছরের ইতিহাসের পরে। অথচ কোরআনিক ধারাবর্ণনায় পৃথিবীর নির্মাণ ও তার ব্যবস্থা সম্পন্ন হওয়ার পর আকাশকে ধোঁয়া-অবস্থা থেকে সাত স্তরে বিন্যস্ত ও নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালায় সুশোভিত করার পর্যায় আসে।


ধোঁয়া-আকাশও পৃথিবীর পরে

আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। পৃথিবীতে পর্বত ও খাদ্যের ব্যবস্থা করার পরে যে আকাশের দিকে আল্লাহ মনোনিবেশ করেন, সেটিকে তখনও دُخَانٌ—ধোঁয়া বলা হয়েছে। অর্থাৎ এই বর্ণনায় পৃথিবী ইতোমধ্যে বিদ্যমান এবং তার ওপর পর্বত ও জীবিকার ব্যবস্থা করা হয়েছে, অথচ আকাশ তখনও ধোঁয়া-অবস্থায় এবং সাত আকাশে বিন্যস্ত হয়নি।

বাস্তব মহাবিশ্বে পৃথিবী জন্মের বহু বিলিয়ন বছর আগে থেকেই মহাজাগতিক আকাশ নক্ষত্র ও গ্যালাক্সিতে পরিপূর্ণ ছিল। পৃথিবীর নিজস্ব নির্মাণসামগ্রীও এসেছে সেই পূর্ববর্তী নক্ষত্রগুলোর ভেতরে তৈরি মৌল থেকে। তাই “পৃথিবী প্রস্তুত, আকাশ তখনও ধোঁয়া”—এই সৃষ্টিচিত্র বাস্তব মহাজাগতিক ইতিহাসের ঠিক বিপরীত।


পৃথিবীর পরে প্রদীপমালার পর্যায়

৪১:১২-এ সাত আকাশের বিন্যাসের পর নিকটবর্তী আকাশকে مَصَابِيحَ—প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত করার কথা বলা হয়েছে। কোরআনের অন্যান্য আয়াতে এই “প্রদীপ”কে নক্ষত্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। সূরা মুলক ৬৭:৫-এ বলা হয়েছে, “আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দিয়ে সুশোভিত করেছি।” ফলে এই কসমোলজিতে পৃথিবী ও তার ব্যবস্থা আগে, আর নক্ষত্রময় নিকটবর্তী আকাশের সজ্জা পরে।

বিজ্ঞান এর ঠিক উল্টো ছবি দেখায়। নক্ষত্র পৃথিবীর পরে নয়; পৃথিবীর বহু বিলিয়ন বছর আগে। এমনকি পৃথিবীর লোহা, কার্বন, অক্সিজেন ও সিলিকনের মতো মৌলগুলোর ইতিহাসও পূর্ববর্তী নক্ষত্রের সঙ্গে যুক্ত। যে পৃথিবীর উপাদানই এসেছে পূর্ববর্তী নক্ষত্রীয় বিবর্তন থেকে, সেই পৃথিবীকে আগে রেখে নক্ষত্রময় আকাশকে পরে সাজানোর সৃষ্টিক্রম ভৌত ইতিহাসের সঙ্গে মেলে না।

কোরআন ২:২৯ এবং ৪১:৯–১২ একত্রে পড়লে তাই একটি ধারাবাহিক পৃথিবী-প্রথম বিশ্বচিত্র পাওয়া যায়: পৃথিবী এবং পৃথিবীর ব্যবস্থা আগে; আকাশের পূর্ণ বিন্যাস ও নিকটবর্তী আকাশের প্রদীপমালা পরে। পরের অংশে বিভিন্ন বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদে একই ধারাবর্ণনা কীভাবে এসেছে, সেটি দেখা যাবে।


বিভিন্ন অনুবাদে পৃথিবী ও মহাকাশ

আগের আয়াতগুলোতে যে সৃষ্টিক্রম পাওয়া গেল, সেটি কোনো একটি বাংলা অনুবাদের বিশেষ শব্দচয়ন নয়। বিভিন্ন অনুবাদে ভাষা কিছুটা বদলেছে, কিন্তু ঘটনাগুলোর আগে-পরে ক্রম বদলায়নি। প্রথমে পৃথিবী, তারপর পৃথিবীতে পর্বত, বরকত ও খাদ্যের ব্যবস্থা; অতঃপর ধোঁয়া-অবস্থার আকাশের দিকে মনোনিবেশ; এরপর সাত আকাশে বিন্যাস এবং নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালায় সুশোভিত করা।

কেউ “ধোঁয়া” বলেছেন, কেউ “ধূম্রকুঞ্জ”; কেউ “মনোনিবেশ”, কেউ “মনোযোগ”; কিন্তু মূল ধারাবর্ণনা একই। নিচে বিভিন্ন অনুবাদে সেই বক্তব্যগুলো দেখা যাক। প্রথমে বাংলা তাফসীর, কুর’আনুল কারীম, প্রফেসর ডঃ মুহাম্মদ মুজীবুর রহমানের অনুবাদ দেখি,

২৯. তিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীতে যা কিছু আছে- সমস্তই সৃষ্টি করেছেন; অতঃপর তিনি আকাশের প্রতি মনঃসংযোগ করেন, অতঃপর সপ্ত আকাশ সুবিন্যস্ত করেন এবং তিনি সর্ব বিষয়ে মহাজ্ঞানী।

পৃথিবী 32
পৃথিবী 34

৯. বলঃ তোমরা কি তাঁকে অস্বীকার করবেই যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দুই দিনে এবং তোমরা তাঁর সমকক্ষ দাঁড় করাতে চাও? তিনি তো জগতসমূহের প্রতিপালক।
১০. তিনি স্থাপন করেছেন (অটল)
পর্বতমালা ভূ-পৃষ্ঠে এবং তাতে রেখেছেন বরকত এবং চার দিনের মধ্যে এতে ব্যবস্থা করেছেন খাদ্যের, সমভাবে (এতে উত্তর) রয়েছে জিজ্ঞাসুদের জন্যে।
১১. অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন যা ছিল ধুম্র বিশেষ। অনন্তর তিনি ওটাকে ও পৃথিবীকে বললেনঃ তোমরা উভয়ে এসো ইচ্ছা অথবা অনিচ্ছায়। তারা বললোঃ আমরা আসলাম অনুগত হয়ে।
১২. অতঃপর তিনি তাকে দুই দিনে সপ্তাকাশে পরিণত করলেন এবং প্রত্যেক আকাশে তার বিধান ব্যক্ত করলেন এবং আমি দুনিয়ার আকাশকে সুশোভিত করলাম প্রদীপমালা দ্বারা এবং করলাম সুরক্ষিত। এটা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর ব্যবস্থাপনা।

পৃথিবী 36
পৃথিবী 38

এবারে আল বায়ান ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত আল কুরআনুল কারীম, সরল অর্থানুবাদ দেখি,

তিনিই যমীনে যা আছে সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।
তারপর আসমানের প্রতি খেয়াল করলেন এবং তাকে সাত আসমানে সুবিন্যস্ত করলেন। আর সব কিছু সম্পর্কে তিনি সম্যক জ্ঞাত।

পৃথিবী 40
পৃথিবী 42
  1. বল, ‘তোমরা কি তাঁকে অস্বীকার করবে যিনি দু’দিনে যমীন সৃষ্টি করেছেন? আর তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ বানাতে চাচ্ছ? তিনিই সৃষ্টিকুলের রব’।
  2. আর তার উপরিভাগে তিনি দৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছেন এবং তাতে বরকত দিয়েছেন, আর তাতে চারদিনে প্রার্থীদের জন্য সমভাবে খাদ্য নিরূপণ করে দিয়েছেন।
  3. তারপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করেন। তা ছিল ধোঁয়া। তারপর তিনি আসমান ও যমীনকে বললেন, ‘তোমরা উভয়ে স্বেচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় আস’। তারা উভয়ে বলল, ‘আমরা অনুগত হয়ে আসলাম’।
  1. তারপর তিনি দু’দিনে আসমানসমূহকে সাত আসমানে পরিণত করলেন। আর প্রত্যেক আসমানে তার কার্যাবলী ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন। আর আমি নিকটবর্তী আসমানকে প্রদীপমালার দ্বারা সুসজ্জিত করেছি আর সুরক্ষিত করেছি। এ হল মহা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নির্ধারণ।
পৃথিবী 44
পৃথিবী 46

অনুবাদগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় আর অস্পষ্ট থাকে না। শব্দচয়নে পার্থক্য থাকলেও পৃথিবী-সংক্রান্ত কাজের পরে আকাশের দিকে যাওয়া—এই ক্রমটিই বারবার এসেছে। সূরা বাকারা ২:২৯-এ পৃথিবীতে যা আছে তা সৃষ্টির পরে সাত আকাশের বিন্যাস; সূরা ফুসসিলাত ৪১:৯–১২-এ পৃথিবী, পর্বত, বরকত ও খাদ্যের ব্যবস্থার পরে ধোঁয়া-আকাশ, সাত আকাশ এবং নিকটবর্তী আকাশের প্রদীপমালা।

এই ক্রম আধুনিক মহাজাগতিক ইতিহাসের সঙ্গে মেলে না। পৃথিবীর জন্মের বহু বিলিয়ন বছর আগেই নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি ছিল, পৃথিবীর চেয়েও বহু পুরনো গ্রহব্যবস্থা ছিল, আর পৃথিবীর নির্মাণসামগ্রীর একটি বড় অংশই এসেছে পূর্ববর্তী নক্ষত্রীয় বিবর্তন থেকে। বাস্তবে আকাশীয় জগত পৃথিবীর জন্য অপেক্ষা করেনি; বরং সেই পূর্ববর্তী মহাজাগতিক ইতিহাস থেকেই পৃথিবীর জন্ম হয়েছে।

তাই অনুবাদ বদলালেও মূল সংঘাত বদলায় না। কোরআনিক ধারাবর্ণনায় পৃথিবী ও তার ব্যবস্থা আগে, আকাশের সাত স্তরে বিন্যাস ও প্রদীপমালার সজ্জা পরে; বিজ্ঞানের সময়রেখায় নক্ষত্র-গ্যালাক্সি ও দীর্ঘ নাক্ষত্রিক বিবর্তন আগে, পৃথিবী বহু বিলিয়ন বছর পরে।


হাদিসে পৃথিবী ও মহাকাশ সৃষ্টি

কোরআনের সৃষ্টিক্রমের পাশাপাশি সহিহ মুসলিমে আরও নির্দিষ্ট একটি দিনভিত্তিক সৃষ্টি-বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে শনিবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে মাটি, পর্বত, বৃক্ষরাজি, বিপদাপদ, নূর, পশু-পাখি এবং সর্বশেষে আদম সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। [30] [31]

সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৫২। কিয়ামাত, জান্নাত ও জান্নামের বর্ণনা
পরিচ্ছদঃ ১. সৃষ্টির সূচনা এবং আদাম (আঃ) এর সৃষ্টি
৬৯৪৭-(২৭/২৭৮৯) সুরায়জ ইবনু ইউনুস ও হারূন ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রহঃ) ….. আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে বললেন, আল্লাহ তা’আলা শনিবার দিন মাটি সৃষ্টি করেন এবং এতে পর্বত সৃষ্টি করেন রবিবার দিন। সোমবার দিন তিনি বৃক্ষরাজি সৃষ্টি করেন। মঙ্গলবার দিন তিনি বিপদাপদ সৃষ্টি করেন। তিনি নূর সৃষ্টি করেন বুধবার দিন। তিনি বৃহস্পতিবার দিন পৃথিবীতে পশু-পাখি ছড়িয়ে দেন এবং জুমুআর দিন আসরের পর জুমুআর দিনের শেষ মুহূর্তে অর্থাৎ আসর থেকে নিয়ে রাত পর্যন্ত সময়ের মধ্যবর্তী সময়ে সর্বশেষ মাখলুক আদাম (আঃ) কে সৃষ্টি করেন। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৭৯৭, আন্তর্জাতিক ২৭৮৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

হাদিসটির ঘটনাক্রম সরাসরি লিখলে দাঁড়ায়:

  • শনিবার: মাটি;
  • রবিবার: পর্বত;
  • সোমবার: বৃক্ষরাজি;
  • মঙ্গলবার: বিপদাপদ;
  • বুধবার: নূর;
  • বৃহস্পতিবার: পৃথিবীতে পশু-পাখি;
  • শুক্রবার: সর্বশেষে আদম।

এটি কেবল অস্পষ্ট “যুগ” বা প্রতীকী পর্যায়ের বর্ণনা নয়; সপ্তাহের নাম ধরে একের পর এক সৃষ্টিকাজ সাজানো হয়েছে। শনিবার মাটি, রবিবার পর্বত, সোমবার গাছ, বুধবার নূর, বৃহস্পতিবার প্রাণী এবং শুক্রবার মানুষ—একটি সম্পূর্ণ পৃথিবীকেন্দ্রিক সৃষ্টি-সূচি।


বৃক্ষরাজি আগে, নূর পরে

এই বর্ণনার সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো দিকগুলোর একটি হলো—বৃক্ষরাজি সৃষ্টি করা হয়েছে সোমবার, আর নূর সৃষ্টি করা হয়েছে বুধবার। অর্থাৎ হাদিসের নিজস্ব ক্রমেই গাছপালা নূরের আগে।

বাস্তব জীববিজ্ঞানে উদ্ভিদের অস্তিত্ব আলোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সবুজ উদ্ভিদের শক্তির মূল উৎস photosynthesis, যেখানে আলোকশক্তি রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। পৃথিবীর উদ্ভিদজগৎ কোনো অন্ধকার পৃথিবীতে আগে তৈরি হয়ে পরে আলো পাওয়ার ব্যবস্থা হয়নি। সূর্যের আলো পৃথিবীর জীবজগতের বহু আগেই উপস্থিত ছিল; পৃথিবী নিজেই সূর্যকে কেন্দ্র করে গঠিত একটি গ্রহ।

হাদিসে অবশ্য শুধু “নূর” বলা হয়েছে; কিন্তু তার নিজের ধারাবর্ণনাতেই বৃক্ষরাজি → পরে নূর ক্রমটি লেখা আছে। এই ক্রম আধুনিক জীববিজ্ঞান ও পৃথিবীর বাস্তব ইতিহাসের সঙ্গে মেলে না।


পর্বত পৃথিবীর একেবারে শুরুর কাজ নয়

হাদিসে মাটি সৃষ্টির পরের দিনই পর্বত সৃষ্টি করা হয়েছে। বাস্তবে পৃথিবী গঠনের পর সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান ধরনের পর্বতমালা দাঁড়িয়ে যায়নি। নবগঠিত পৃথিবী ছিল উত্তপ্ত ও প্রচণ্ড সংঘর্ষপ্রবণ। ভূত্বক, mantle dynamics এবং plate tectonics-এর দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পর্বতমালা গড়ে উঠেছে। হিমালয়, আন্দিজ বা আল্পসের মতো পর্বত পৃথিবীর জন্মমুহূর্তের কাঠামো নয়; এগুলো পৃথিবীর বহু পরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের ফল।

তাই মাটি → পরের দিন পর্বত ধরনের সৃষ্টি-সূচি বাস্তব geology-এর ইতিহাস নয়। পৃথিবীর গঠন এবং পর্বত গঠন একই ধরনের ঘটনা নয়, একই সময়ের ঘটনাও নয়।


সাত দিনের একটি পৃথিবীকেন্দ্রিক সৃষ্টি-সূচি

হাদিসটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর পুরো দৃষ্টি পৃথিবীর দিকে। মহাবিশ্বের ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের ইতিহাস, প্রথম নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ভারী মৌল, সূর্য ও সৌরজগতের গঠন—এসবের কোনো স্থান নেই। বর্ণনাটি শুরু হয় পৃথিবীর মাটি দিয়ে এবং শেষ হয় পৃথিবীর মানুষ দিয়ে। মাঝখানে রয়েছে পাহাড়, গাছপালা, নূর ও পশু-পাখি।

বিজ্ঞানের সময়রেখা সম্পূর্ণ ভিন্ন:

আদি মহাবিশ্ব → প্রথম নক্ষত্র → গ্যালাক্সি → নাক্ষত্রিক বিবর্তন → ভারী মৌল → সূর্য ও সৌরজগত → পৃথিবী → ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন → জীবনের দীর্ঘ বিবর্তন → বহু পরে মানুষ।

আর হাদিসের সময়রেখা:

মাটি → পর্বত → বৃক্ষরাজি → বিপদাপদ → নূর → পশু-পাখি → আদম।

দুটি বর্ণনা একই পৃথিবীর ইতিহাস নয়। একটিতে মহাবিশ্ব ও পৃথিবীর কয়েকশ কোটি বছরের বিবর্তন; অন্যটিতে এক সপ্তাহের মধ্যে পৃথিবীর মাটি থেকে মানুষ পর্যন্ত সাজানো একটি প্রাক-বৈজ্ঞানিক সৃষ্টি-সূচি।


কোরআনের ছয় দিন, হাদিসের শনিবার থেকে শুক্রবার

এখানে আরেকটি সরাসরি অসঙ্গতিও চোখে পড়ে। কোরআনে আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির জন্য বারবার ছয় দিনের কথা বলা হয়েছে। অথচ এই হাদিসে শনিবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত সাতটি পৃথক দিন ধরে সৃষ্টি-কার্য সাজানো হয়েছে। শনিবার মাটি দিয়ে শুরু করে শুক্রবার আদম সৃষ্টি—গণনায় এটি স্পষ্টতই সাত দিন।

অর্থাৎ একই ইসলামি সৃষ্টিতত্ত্বের ভেতরেই একদিকে ছয় দিনের মহাজাগতিক সৃষ্টি, অন্যদিকে সাত দিনের নাম ধরে পৃথিবী ও জীবজগতের সৃষ্টি-বর্ণনা পাওয়া যায়। সংখ্যাটা শুধু আলাদা নয়; ঘটনাগুলোর বিন্যাসও সম্পূর্ণ আলাদা কাঠামোর।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই হাদিসটি কোরআনের পৃথিবী-প্রথম সৃষ্টিচিত্রকে আরও পৃথিবীকেন্দ্রিক করে তোলে। এখানে মহাবিশ্বের ইতিহাস শুরু হয় না মহাবিশ্ব দিয়ে; শুরু হয় মাটি দিয়ে। তারপর পাহাড়, গাছ, নূর, প্রাণী এবং মানুষ। আধুনিক কসমোলজি, ভূবিজ্ঞান ও বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের সঙ্গে এর কোনো কালানুক্রমিক মিল নেই।


তাফসীর গ্রন্থগুলোতে পৃথিবী ও মহাকাশ

কোরআনের আয়াতগুলোর এই আগে-পরে ক্রম শুধু আধুনিক অনুবাদ পড়ে তৈরি হওয়া কোনো ধারণা নয়। ধ্রুপদী ও বহুল প্রচলিত তাফসীরগুলোতেও পৃথিবী ও আকাশের সৃষ্টিকে একই ধারাবাহিকতার মধ্যে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিশেষ করে সূরা বাকারা ২:২৯ এবং সূরা ফুসসিলাত ৪১:৯–১২-এর ব্যাখ্যা দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়।


তাফসীরে ইবনে কাসীর: সূরা বাকারা ২:২৯

তাফসীরে ইবনে কাসীরে সূরা বাকারা ২:২৯-এর ব্যাখ্যায় পৃথিবীর সৃষ্টি এবং এরপর আকাশের দিকে মনোনিবেশ করে সাত আকাশ নির্মাণের ধারাবাহিকতাই বর্ণিত হয়েছে। ইবনে কাসীর মুজাহিদসহ পূর্ববর্তী মুফাসসিরদের বক্তব্যও উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে পৃথিবীকে আকাশের আগের সৃষ্টি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নিচে সংশ্লিষ্ট অংশগুলো দেওয়া হলো।

২৯. তিনিই তোমাদের জন্য পৃথিবীর সব কিছু সৃষ্টি করিয়াছেন। অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করিলেন এবং উহা সপ্ত আকাশে বিন্যস্ত করিলেন। তিনি সর্ববিষয়ে সবিশেষ অবহিত।
তাফসীর: পূর্ব আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা মানবের সৃষ্টি রহস্য ও তাহাদের ক্রমবিবর্তন ধারা বর্ণনার মাধ্যমে স্বীয় অসীম সৃজন কৌশল ও গোটা সৃষ্টি বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের অপরিসীম ক্ষমতার প্রমাণ তুলিয়া ধরেন। অতঃপর আলোচ্য আয়াতে ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলের সৃষ্টিতত্ত্ব ও উহাতে বিরাজমান বস্তুকুলকে স্বীয় অস্তিত্ব ও অসীম ক্ষমতার দ্বিতীয় প্রমাণ হিসাবে তুলিয়া ধরেন।
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ্ পাক বলেন, পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে সবই তিনি তোমাদের স্বার্থে সৃষ্টি করিয়াছেন। পৃথিবীর সৃষ্টি পূর্ণতায় পৌছাইয়া তিনি নভোমণ্ডলের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং সপ্ত আকাশের বিন্যাস ঘটান। استوى অর্থ ইচ্ছা করিলেন বা মনোনিবেশ করিলেন। উহার হইল الى এবং فسوهن অর্থ বিভক্ত ও বিন্যস্ত করা। আয়াতাংশের অর্থ দাঁড়াইল, তিনি উহাকে সপ্ত আকাশে বিভক্ত ও বিন্যস্ত করিলেন। এখানে لسماء। শব্দটি اسم جنس )শ্রেণীবাচক বিশেষ্য)। তাই উহা দ্বারা আকাশমণ্ডলী বা সপ্ত আকাশের কথা বুঝানো হয়। وَهُوَ بِكُلِّ شَيْء عَلِيمٌ বলিয়া তিনি জানাইয়া দিলেন, তাঁহার জ্ঞান সৃষ্টি জগতের প্রতিটি বস্তুকে বেষ্টন করিয়া রহিয়াছে এবং আসমান যমীন সকল কিছু সম্পর্কেই তিনি পুরাপুরি অবহিত রহিয়াছেন। তিনি কুরআন পাকের অন্যত্র বলেন : أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ অর্থাৎ যিনি সৃষ্টিকর্তা তিনি কি অনবহিত ও বেখবর থাকেন?

‘তুমি বল, তোমরা কি সেই মহান সত্তার অস্তিত্ব অস্বীকার করিতেছ কিংবা তাঁহার অংশীদার দাঁড় করাইতেছ যিনি দুই দিনে পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন? তিনিই তো নিখিল সৃষ্টির প্রতিপালক। তিনি পাহাড় গাড়িয়া ভূপৃষ্ঠ স্থিতিশীল করিয়াছেন এবং পৃথিবীকে নানাবিধ দানে ধন্য করিয়াছেন। অতঃপর চারিদিনে উহা বিন্যস্ত করিয়া উর্বরা শক্তি দিয়াছেন। জিজ্ঞাসুদের জন্য উহাতে সন্তোষজনক সমাধান রহিয়াছে। অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করিলেন। তখন আকাশ ছিল বাষ্পাকার। তিনি আকাশ ও পৃথিবীকে বলিলেন- ইচ্ছায় কি অনিচ্ছায় আমার পরিকল্পিত রূপ পরিগ্রহ কর। তাহারা বলিল- আমরা স্বেচ্ছায় বাস্তব রূপ গ্রহণ করিতেছি। এইভাবে দুই দিনে অকাশকে সপ্ত খণ্ডে বিভক্ত ও বিন্যস্ত করা হইল এবং প্রত্যেক আকাশের কাজ নির্ধারণ করিয়া দেওয়া হইল। পৃথিবীর নিকটবর্তী আকাশকে নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুসজ্জিত করা হইল এবং শয়তানের অনাচার প্রতিরোধের জন্য প্রহরার ব্যবস্থা হইল। এই হইল সেই মহাপরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ সত্তার সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা।’
এই আয়াতে বুঝা যায় যে, আল্লাহ্ তা’আলা তাঁহার সৃষ্টি পরিকল্পনার সূচনা করিয়াছেন পৃথিবী সৃষ্টি দ্বারা। অতঃপর সপ্ত আকাশ সৃষ্টির পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করিয়াছেন। যে কোন স্থাপত্য শিল্পের নিয়মই হইল এই যে, সর্বপ্রথম সৌধের নিম্নভাগের ভিত্তি স্থাপন করা। অতঃপর সৌধের উপরিভাগের কাজে হাত দেওয়া। আল্লাহর এই সৃষ্টি পরিকল্পনাও অনুরূপভাবে বাস্তবায়িত হইয়াছে। ব্যাখ্যাকারগণ এই আয়াতের তদ্রূপ ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন। এই ব্যাপারে যথাস্থানে সবিস্তারে আলোচনা করার ইচ্ছা রহিল। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক অন্যত্র বলেন:

একদল ব্যাখ্যাকার আয়াতদ্বয়ের আপাত বৈসাদৃশ্য দূরীকরণার্থে বলেন, এই আয়াতে
পৃথিবীর সম্প্রসারণ ও বিন্যাস কার্যের বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। উহা সৃষ্টির কথা বলা হয় নাই। সুতরাং আমাদের আলোচ্য আয়াতে প্রথমে পৃথিবী সৃষ্টি করিয়া পরে আকাশ সৃষ্টি এবং এই আয়াতে উহার পর পৃথিবীকে পরিপূর্ণরূপে বিন্যস্ত করা বুঝা যাইতেছে। ফলে কোন বৈপরীত্য ঘটিতেছে না।
কেহ কেহ বলেন, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করার পরপরই উহার সংস্থাপন কার্য করা হয়। এই অভিমতটি হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে আলী ইব্‌ন আবু তালহা বর্ণনা করেন।
আস্ সুদ্দী স্বীয় তাফসীরে ইবন মাসউদ ও অন্যান্য সাহাবা (রা) হইতে পর্যায়ক্রমে মুরাহ, ইব্‌ন আব্বাস, আবু সালেহ ও আবূ মালিক হইতে বর্ণনা করেন- সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ্ তা’আলার আরশ পানির উপর সংস্থাপিত ছিল। পানির পূর্বে আল্লাহ্ পাক কোন বস্তুই সৃষ্টি করেন নাই। সুতরাং সৃজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সর্বপ্রথম তিনি পানি হইতে বাষ্প সৃষ্টি করিলেন। উহা ক্রমান্বয়ে ঊর্ধ্বলোকে উত্থিত হইল এবং উত্থিত বাষ্প ছাদরূপ পরিগ্রহ করিয়া আকাশে পরিণত হইল। এইজন্য উহার নাম হইল ماء )ঊর্ধ্বলোক)। অতঃপর পানি শুকাইয়া একটি ভূখণ্ড দেখা দিল। তখন উহাকে সপ্তখণ্ডে বিভক্ত করা হইল। রবি-সোম দুই দিনে এই সপ্তখণ্ড সৃষ্টি হইল। অতঃপর পৃথিবীকে সেই মৎসের উপর স্থাপন করা হইল যাহার বর্ণনা সূরা ‘নূন ওয়াল কলম’-এ আসিয়াছে। মৎসটি পানির উপর এবং পানির নীচে সকাত জাতীয় পদার্থ বা পরিচ্ছন্ন মৃত্তিকা শিলা বিদ্যমান। মৃত্তিকা শিলার ধারক হইলেন ফেরেশতা। ফেরেশতা দণ্ডায়মান প্রস্তরের আস্তরের উপর এবং প্রস্তরের আস্তরটি বায়ুমণ্ডলের উপর ভাসমান
রহিয়াছে। লুকমান হাকীম এই প্রস্তর আস্তরের কথাই বলিয়াছেন। উহা আকাশ কিংবা পৃথিবীর কোথাও স্থাপিত নহে। মৎসটি নড়াচড়া করা মাত্র পৃথিবী কম্পিত হয় এবং ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। তাই পৃথিবীকে পাহাড় চাপা দেওয়া হইল। ফলে পৃথিবী সুস্থির হইল। পর্বত তাই পৃথিবীর কাছে নিজের বড়াই করিয়া থাকে।
আল্লাহ্ পাক বলেনঃ
وَجَعَلْنَا فِي الأَرْضِ رَوَاسِي أَنْ تَمِيدَ بِهِمْ
রাখার জন্য পর্বতমালা স্থাপন করিয়াছি।’

পাহাড়-পর্বত, ফল-মূল, প্রাণীকুল, গাছপালা ইত্যাদি যাহা কিছু পৃথিবীর জন্য প্রয়োজন ছিল, সব কিছু তিনি মঙ্গল-বুধ এই দুই দিনে সৃষ্টি করিয়াছেন। এই কথাই আল্লাহ্ তা’আলা হা-মীম সূরা হইতে ইতিপূর্বে উদ্ধৃত-
قُلْ أَئِنَّكُمْ لَتَكْفُرُونَ بِالَّذِي خَلَقَ الأَرْضِ فِي يَوْمَيْنِ وَتَجْعَلُونَ لَهُ أَنْدَادًا . ذَلِكَ رَبُّ الْعَالَمِينَ – وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِي مِنْ فَوْقِهَا وَبَارَكَ فِيهَا করিয়াছেন। অতঃপর وَقَدَّرَ فِيْهَا أَقْوَاتَها আয়াতাংশে গাছপালা-তরুলতা ও উহার উপরিভাগস্থ বস্তুসমূহ সৃষ্টির কথা বলিয়াছেন। এই সব সৃষ্টি করিতে যে মোট চারদিন লাগিয়াছে … নিঃশ্বাস। উহা দ্বারা প্রথমে এক আকাশ ও পরে উহা হইতে সপ্ত আকাশ সৃষ্টি হইয়াছে। এই কাজ বৃহস্পতি-শুক্র দুই দিনে সম্পন্ন হইয়াছে। যেহেতু আকাশ ও পৃথিবীর সমগ্র সৃষ্ট বস্তুকে আল্লাহ্ তা’আলা শুক্রবারে একত্রিত করিয়াছেন, তাই উহার নাম ইয়াওমুল জুমুআ হইয়াছে।
وأَوْحَى فِي كُلِّ سَمَاءِ أَمْرَهَا আয়াতাংশের মর্ম এই যে, আল্লাহ্ পাক প্রত্যেক আকাশে ফেরেশতা, নদ-নদী, বরফের পাহাড় ও নানাবিধ অজানা বস্তু সৃষ্টি করিয়াছেন। অতঃপর তিনি পৃথিবীর নিকটতর আকাশকে নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুসজ্জিত করিয়া এক দিকে আকাশ ও পৃথিবীর শোভা বর্ধন ও অন্যদিকে শয়তানের অনাচার হইতে ঊর্ধ্বলোককে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করিয়াছেন। আল্লাহ তাঁহার পরিকল্পিত বস্তুসমূহ সৃষ্টি শেষে স্বীয় আরশের দিকে মনোনিবেশ করিলেন। যেমন তিনি বলেন:
خَلَقَ السَّمَوتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ পৃথিবীর সৃষ্টি কাজ ছয় দিনে সম্পন্ন করিয়া তিনি আরশের উপর মনোনিবেশ করিলেন।”
তিনি আরও বলেনঃ
” كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلُّ شَيْءٍ حَيَ উভয়ই বাষ্প ছিল। অতঃপর আমি উভয়কে পৃথকভাবে বিন্যস্ত করিয়াছি। অনন্তর আমি প্রত্যেক বস্তুকে পানি দ্বারা সপ্রাণ করিয়াছি।”
ইন জারীর বলেন- আমাকে মুছান্না, তাঁহাকে আব্দুল্লাহ ইব্‌ন সালেহ, তাঁহাকে আবূ মা’শার, সাঈদ ইব্‌ন আবু সাঈদ হইতে, তিনি আবদুল্লাহ ইব্‌ন সালাম হইতে এই বর্ণনা শুনান:
আল্লাহ্ তা’আলা রবিবার সৃষ্টি কাজ আরম্ভ করেন এবং রবি-সোম দুইদিনে পৃথিবীর সপ্তখণ্ড সৃষ্টি করেন। পর্বতরাজি ও জীবিকার শক্তি ও উপকরণ সৃষ্টি করেন মঙ্গল-বুধ দুই দিনে। বৃহস্পতি ও শুক্রবারে সপ্ত আকাশ সৃষ্টি করেন। শুক্রবার দিন শেষভাগে তিনি অবসর হইলেন। তখনই কালবিলম্ব না করিয়া আদমকে সৃষ্টি করিলেন। সৃষ্টির এই শেষ সময়টিতেই সৃষ্টি ধ্বংসের কিয়ামত সংঘটিত হইবে।
… সৃষ্টির আগে আল্লাহ্ তা’আলা পৃথিবী সৃষ্টি করেন। পৃথিবী সৃষ্টির পর উহা হইতে ধোঁয়া উত্থিত হয়।

পৃথিবী 48
পৃথিবী 50
পৃথিবী 52
পৃথিবী 54
পৃথিবী 56
পৃথিবী 58

এই ব্যাখ্যার সঙ্গে আধুনিক মহাজাগতিক ইতিহাসের দূরত্ব বিশাল। বাস্তবে পৃথিবীর জন্মের প্রায় ৯৩০ কোটি বছর আগে থেকেই মহাবিশ্বের ইতিহাস চলছে; পৃথিবীর বহু আগেই নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি তৈরি হয়েছে। অথচ এখানে পৃথিবীকে সৃষ্টিক্রমের শুরুতে রেখে তার পরে আকাশের বিন্যাসের কথা বলা হচ্ছে।


তাফসীরে কুরতুবী: পৃথিবী, ধোঁয়া-আকাশ ও সৃষ্টির ক্রম

তাফসীরে কুরতুবীর সূরা বাকারা ২:২৯-এর ব্যাখ্যাটি এই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কুরতুবী সৃষ্টির ক্রম নিয়ে একাধিক প্রাচীন বর্ণনা পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন। একটি ব্যাখ্যায় প্রথমে আসমানের ধোঁয়া সৃষ্টি, তারপর পৃথিবী, এরপর ধোঁয়া-অবস্থার আসমানকে সাত আসমানে সুবিন্যস্ত এবং তার পরে পৃথিবী বিস্তৃত করার কথা বলা হয়েছে। আবার অন্য একটি বর্ণনায় পৃথিবীকে পানির বাষ্প বা ধোঁয়া ঊর্ধ্বগামী হওয়ার আগেই সৃষ্টি করা হয়েছে বলে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ ধ্রুপদী তাফসীরের ভেতরেই সৃষ্টির নির্দিষ্ট ক্রম নিয়ে একাধিক ভিন্ন বর্ণনা সংরক্ষিত ছিল। [28]

মূল আরবি
قُلْتُ: وَقَوْلُ قَتَادَةَ يَخْرُجُ عَلَى وَجْهٍ صَحِيحٍ إِنْ شَاءَ اللَّهُ تَعَالَى، وَهُوَ أَنَّ اللَّهَ تَعَالَى خَلَقَ أَوَّلًا دُخَانَ السَّمَاءِ ثُمَّ خَلَقَ الْأَرْضَ، ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ وَهِيَ دُخَانٌ فَسَوَّاهَا، ثُمَّ دَحَا الْأَرْضَ بَعْدَ ذَلِكَ. وَمِمَّا «1» يَدُلُّ عَلَى أَنَّ الدُّخَانَ خُلِقَ أَوَّلًا قَبْلَ الْأَرْضِ مَا رَوَاهُ السُّدِّيُّ عَنْ أَبِي مَالِكٍ، وَعَنْ أَبِي صَالِحٍ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، وَعَنْ مُرَّةَ الْهَمْدَانِيِّ عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ وَعَنْ نَاسٍ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي قَوْلِهِ عز وجل:” هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعاً ثُمَّ اسْتَوى إِلَى السَّماءِ فَسَوَّاهُنَّ سَبْعَ سَماواتٍ” [البقرة: 29] قَالَ: إِنَّ اللَّهَ تبارك وتعالى كانَ عَرْشُهُ عَلَى الْماءِ وَلَمْ يَخْلُقْ شَيْئًا قَبْلَ الْمَاءِ، فَلَمَّا أَرَادَ أَنْ يَخْلُقَ الْخَلْقَ أَخْرَجَ مِنَ الْمَاءِ دُخَانًا فَارْتَفَعَ فَوْقَ الْمَاءِ، فَسَمَا عَلَيْهِ، فَسَمَّاهُ سَمَاءً، ثُمَّ أَيْبَسَ الْمَاءَ فَجَعَلَهُ أَرْضًا وَاحِدَةً، ثُمَّ فَتَقَهَا فَجَعَلَهَا سَبْعَ أَرَضِينَ فِي يَوْمَيْنِ، فِي الْأَحَدِ وَالِاثْنَيْنِ.
فَجَعَلَ الْأَرْضَ عَلَى حُوتٍ- وَالْحُوتُ هُوَ النُّونُ الَّذِي ذَكَرَ اللَّهُ تبارك وتعالى فِي الْقُرْآنِ بِقَوْلِهِ:” ن وَالْقَلَمِ «2» ” [القلم: 1] والحوت في الماء و [الماء «3»] عَلَى صَفَاةٍ «4»، وَالصَّفَاةُ عَلَى ظَهْرِ مَلَكٍ، وَالْمَلَكُ عَلَى الصَّخْرَةِ، وَالصَّخْرَةُ فِي الرِّيحِ- وَهِيَ الصَّخْرَةُ الَّتِي ذَكَرَ لُقْمَانُ: لَيْسَتْ فِي السَّمَاءِ وَلَا فِي الْأَرْضِ- فَتَحَرَّكَ الْحُوتُ فَاضْطَرَبَ، فَتَزَلْزَلَتِ الْأَرْضُ، فَأَرْسَلَ عَلَيْهَا الْجِبَالَ فَقَرَّتْ، فَالْجِبَالُ تَفْخَرُ عَلَى الْأَرْضِ، وَذَلِكَ قَوْلُهُ تَعَالَى:” وَأَلْقى فِي الْأَرْضِ رَواسِيَ أَنْ تَمِيدَ بِكُمْ «5» ” [النحل: 15] وَخَلَقَ الْجِبَالَ فِيهَا، وَأَقْوَاتَ أَهْلِهَا وَشَجَرَهَا، وَمَا يَنْبَغِي لَهَا فِي يَوْمَيْنِ، فِي الثُّلَاثَاءِ وَالْأَرْبِعَاءِ، وذلك حين يقول:” قُلْ أَإِنَّكُمْ لَتَكْفُرُونَ بِالَّذِي خَلَقَ الْأَرْضَ فِي يَوْمَيْنِ وَتَجْعَلُونَ لَهُ أَنْداداً ذلِكَ رَبُّ الْعالَمِينَ.
وَجَعَلَ فِيها رَواسِيَ مِنْ فَوْقِها وَبارَكَ فِيها وَقَدَّرَ فِيها أَقْواتَها فِي أَرْبَعَةِ أَيَّامٍ سَواءً لِلسَّائِلِينَ «6» ” [فصلت: 9، 10] يَقُولُ: مَنْ سَأَلَ فَهَكَذَا الْأَمْرُ،” ثُمَّ اسْتَوى إِلَى السَّماءِ وَهِيَ دُخانٌ” وَكَانَ ذَلِكَ الدُّخَانُ مِنْ تَنَفُّسِ الْمَاءِ حِينَ تَنَفَّسَ، فَجَعَلَهَا سَمَاءً واحدة، ثم فتقها فجعلها سبع سموات فِي يَوْمَيْنِ، فِي الْخَمِيسِ وَالْجُمُعَةِ، وَإِنَّمَا سُمِّيَ يوم الجمعة لأنه جمع(1). يلاحظ أن المؤلف رحمه الله خرج عما سنه في مقدمته لهذا الكتاب من إضرابه عن هذا القصص وأمثاله مما ملئت به كتب التفسير الأخرى والذي لا يتمشى مع روح الدين الإسلامي، فجل من له العصمة.(2).
راجع ج 18 ص 223.(3). تكملة عن تفسير الطبري وتاريخه.(4). الصفاة: العريض من الحجارة الأملس.(5). راجع ج 10 ص 90.(6). راجع ج 15 ص 342.
বাংলা তাফসীর
আমি বলি: কাতাদাহর বক্তব্যটি একটি সঠিক পন্থায় ব্যাখ্যা করা সম্ভব, ইনশাআল্লাহ। তা হলো, মহান আল্লাহ প্রথমে আসমানের ধোঁয়া সৃষ্টি করেন, অতঃপর পৃথিবী সৃষ্টি করেন, তারপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করেন যখন তা ধোঁয়াচ্ছন্ন ছিল এবং তা সুবিন্যস্ত করেন, আর এরপরে তিনি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেন। আসমানের ধোঁয়া পৃথিবীর পূর্বে সৃষ্টি হওয়ার স্বপক্ষে একটি দলীল হলো আস-সুদ্দী কর্তৃক বর্ণিত বর্ণনা, যা তিনি আবু মালিক থেকে, তিনি আবু সালিহ থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস থেকে, এবং মুররাহ আল-হামদানী ইবনে মাসউদ থেকে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কয়েকজন সাহাবী থেকে মহান আল্লাহর এই বাণী সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন: “তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীর সব কিছু সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং সাত আসমানে বিন্যস্ত করেন।” [বাকারা: ২৯] তিনি বলেন: আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলার আরশ পানির ওপর ছিল এবং পানির পূর্বে তিনি আর কিছু সৃষ্টি করেননি।
যখন তিনি সৃষ্টিজগত সৃষ্টির ইচ্ছা করলেন, তখন পানি থেকে ধোঁয়া নির্গত করলেন যা পানির ওপর উত্থিত হলো এবং উচ্চতায় আরোহণ করল, অতঃপর তিনি একে ‘আসমান’ নামকরণ করলেন। তারপর তিনি পানিকে শুষ্ক করলেন এবং তা থেকে একটি জমিন তৈরি করলেন, এরপর একে বিদীর্ণ করে দুই দিনে—রবিবার ও সোমবার—সাতটি জমিনে বিভক্ত করলেন। তিনি পৃথিবীকে একটি বিশালাকার মাছের ওপর স্থাপন করলেন—আর এই মাছটি হলো সেই ‘নূন’ যার উল্লেখ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা কুরআনে করেছেন এই বাণীতে: “নূন, কলমের শপথ”। মাছটি পানির মধ্যে অবস্থিত, আর পানি একটি প্রশস্ত মসৃণ পাথরের ওপর, পাথরটি একজন ফেরেশতার পিঠের ওপর, ফেরেশতাটি একটি বিশাল শিলার ওপর এবং শিলাটি বায়ুর মধ্যে অবস্থিত—এটি সেই শিলা যার কথা লোকমান উল্লেখ করেছিলেন: যা আসমানেও নেই এবং জমিনেও নেই।
অতঃপর মাছটি নড়ে উঠল এবং অস্থির হয়ে পড়ল, ফলে পৃথিবী প্রকম্পিত হতে লাগল। তখন আল্লাহ এর ওপর পাহাড়সমূহ স্থাপন করলেন এবং এটি স্থির হলো। তাই পাহাড়সমূহ পৃথিবীর ওপর গর্ব করে। আর এটিই মহান আল্লাহর বাণী: “এবং তিনি জমিনের ওপর সুদৃঢ় পাহাড় স্থাপন করেছেন যাতে এটি তোমাদের নিয়ে নড়ে না ওঠে।” এবং তিনি এতে পাহাড়সমূহ, এর অধিবাসীদের খাদ্যসামগ্রী, এর বৃক্ষরাজি এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু দুই দিনে—মঙ্গলবার ও বুধবার—সৃষ্টি করেন। আর তা হলো মহান আল্লাহর এই বাণীর মর্ম: “বলুন, তোমরা কি সেই সত্তাকে অস্বীকার করো যিনি পৃথিবীকে দুই দিনে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর সমকক্ষ দাঁড় করাও?
তিনি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক। তিনি এতে উপরিভাগে সুদৃঢ় পাহাড় স্থাপন করেছেন এবং এতে বরকত দিয়েছেন এবং চার দিনে এতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন সকল প্রার্থনাকারীর জন্য সমানভাবে।” তিনি বলছেন: যে কেউ জিজ্ঞাসা করে, বিষয়টি এভাবেই ঘটেছে। “অতঃপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করলেন যখন তা ধোঁয়াচ্ছন্ন ছিল।” আর সেই ধোঁয়া ছিল পানির নিঃশ্বাস থেকে যখন তা বাষ্পায়িত হয়েছিল। তিনি একে একটি আসমান বানান, অতঃপর একে বিদীর্ণ করে দুই দিনে—বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার—সাত আসমানে পরিণত করেন। শুক্রবারকে ‘জুমুআহ’ বলা হয় কারণ এদিন আল্লাহ সৃষ্টির কাজ একত্র করেছিলেন…(১).
লক্ষণীয় যে, লেখক (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) এই কিতাবের ভূমিকায় এই ধরণের কিচ্ছা ও অন্যান্য বর্ণনা পরিহার করার যে নীতি নির্ধারণ করেছিলেন, তিনি এখানে তা থেকে বিচ্যুত হয়েছেন যা কি না তাফসীরের অন্যান্য কিতাবসমূহে ভরপুর এবং যা ইসলামের মৌলিক চেতনার সাথে সংগতিপূর্ণ নয়; আল্লাহই একমাত্র নিষ্কলঙ্ক।(২). দেখুন খণ্ড ১৮, পৃষ্ঠা ২২৩।(৩). তাবারীর তাফসীর ও তারিখ থেকে সংগৃহীত।(৪). সাফা: প্রশস্ত ও মসৃণ পাথর।(৫). দেখুন খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ৯০।(৬). দেখুন খণ্ড ১৫, পৃষ্ঠা ৩৪২।

মূল আরবি
فيه خلق السموات والأرض،” وَأَوْحى فِي كُلِّ سَماءٍ أَمْرَها” [فصلت: 12] قَالَ: خَلَقَ فِي كُلِّ سَمَاءٍ خَلْقَهَا مِنَ الْمَلَائِكَةِ وَالْخَلْقِ الَّذِي فِيهَا مِنَ الْبِحَارِ وَجِبَالِ الْبَرَدِ وَمَا لَا يُعْلَمُ، ثُمَّ زَيَّنَ السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِالْكَوَاكِبِ، فَجَعَلَهَا زِينَةً وَحِفْظًا تُحْفَظُ مِنَ الشَّيَاطِينِ. فَلَمَّا فَرَغَ مِنْ خَلْقِ مَا أَحَبَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ، قَالَ فَذَلِكَ حِينَ يَقُولُ:” خَلَقَ السَّماواتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ” [الحديد: 4] ويقول:” كانَتا رَتْقاً فَفَتَقْناهُما «1» ” [الأنبياء: 30] وَذَكَرَ الْقِصَّةَ فِي خَلْقِ آدَمَ عليه السلام، عَلَى مَا يَأْتِي بَيَانُهُ فِي هَذِهِ السُّورَةِ إِنْ شَاءَ اللَّهُ تَعَالَى.
وَرَوَى وَكِيعٌ عَنِ الْأَعْمَشِ عَنْ أَبِي ظَبْيَانَ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: إِنَّ أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ عز وجل من شي” الْقَلَمُ” فَقَالَ لَهُ اكْتُبْ. فَقَالَ: يَا رَبِّ وَمَا أَكْتُبُ؟ قَالَ: اكْتُبِ الْقَدَرَ. فَجَرَى بِمَا هُوَ كَائِنٌ مِنْ ذَلِكَ الْيَوْمِ إِلَى قِيَامِ السَّاعَةِ. قَالَ: ثُمَّ خَلَقَ النُّونَ فَدَحَا الْأَرْضَ عليها، فارتفع بخار الماء ففتق منه السموات، وَاضْطَرَبَ النُّونُ فَمَادَتِ الْأَرْضُ فَأُثْبِتَتْ بِالْجِبَالِ، فَإِنَّ الْجِبَالَ تَفْخَرُ عَلَى الْأَرْضِ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ.
فَفِي هَذِهِ الرِّوَايَةِ خَلْقُ الْأَرْضِ قَبْلَ ارْتِفَاعِ بُخَارِ الْمَاءِ الَّذِي هُوَ الدُّخَانُ، خِلَافَ الرِّوَايَةِ الْأُولَى. وَالرِّوَايَةُ الْأُولَى عَنْهُ وَعَنْ غَيْرِهِ أَوْلَى، لقوله تعالى:” وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذلِكَ دَحاها «2» ” [النازعات: 30] وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا فَعَلَ، فَقَدِ اخْتَلَفَتْ فِيهِ الْأَقَاوِيلُ، وَلَيْسَ لِلِاجْتِهَادِ فِيهِ مَدْخَلٌ. وَذَكَرَ أَبُو نُعَيْمٍ عَنْ كَعْبِ الْأَحْبَارِ أَنَّ إِبْلِيسَ تَغَلْغَلَ إِلَى الْحُوتِ الَّذِي عَلَى ظَهْرِهِ الْأَرْضُ كُلُّهَا، فَأَلْقَى فِي قَلْبِهِ، فَقَالَ: هَلْ تَدْرِي مَا عَلَى ظَهْرِكَ يَا لُوثِيَا مِنَ الْأُمَمِ وَالشَّجَرِ وَالدَّوَابِّ وَالنَّاسِ وَالْجِبَالِ!
لَوْ نَفَضْتَهُمْ أَلْقَيْتَهُمْ عَنْ ظَهْرِكَ أَجْمَعَ. قَالَ: فَهَمَّ لُوثِيَا بِفِعْلِ ذَلِكَ، فَبَعَثَ اللَّهُ دَابَّةً فَدَخَلَتْ فِي مَنْخَرِهِ، فَعَجَّ إلى الله منها فَخَرَجَتْ. قَالَ كَعْبٌ: وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، إِنَّهُ لَيَنْظُرُ إِلَيْهَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَنْظُرُ إِلَيْهِ إِنْ هَمَّ بِشَيْءٍ مِنْ ذَلِكَ عَادَتْ حَيْثُ كَانَتْ. السَّابِعَةُ- أَصْلُ خَلْقِ الْأَشْيَاءِ كُلِّهَا مِنَ الْمَاءِ لِمَا رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ فِي سُنَنِهِ، وَأَبُو حَاتِمٍ الْبُسْتِيُّ فِي صَحِيحِ مُسْنَدِهِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِذَا رَأَيْتُكَ طَابَتْ نَفْسِي وَقَرَّتْ عَيْنِي، أَنْبِئْنِي عَنْ كل شي.
قال: (كل شي خلق من الماء) فقلت: أخبرني عن(1). راجع ج 11 ص 282.(2). راجع ج 19 ص 202
বাংলা তাফসীর
এতে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছে, “এবং তিনি প্রত্যেক আকাশে তার বিধান ওহী করলেন” [ফুসসিলাত: ১২]। তিনি বলেন: তিনি প্রত্যেক আকাশে তার সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত ফেরেশতাদের এবং তাতে বিদ্যমান সমুদ্র, শিলাবৃষ্টির পাহাড় ও যা কিছু মানুষের অজ্ঞাত তা সৃষ্টি করেছেন; এরপর তিনি দুনিয়ার আকাশকে নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুশোভিত করেছেন এবং একে সৌন্দর্য ও শয়তানদের থেকে সুরক্ষার মাধ্যম বানিয়েছেন। যখন তিনি যা সৃষ্টির ইচ্ছা করেছিলেন তা শেষ করলেন, তখন আরশের ওপর সমাসীন হলেন। তিনি বলেন, এটি সেই সময়ের বর্ণনা যখন তিনি বলেন: “তিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন” [আল-হাদিদ: ৪] এবং বলেন: “উভয়টি মিলিত ছিল, অতঃপর আমি তাদের পৃথক করে দিলাম” [আল-আম্বিয়া: ৩০]।
আর তিনি আদম আলাইহিস সালামের সৃষ্টির কাহিনী বর্ণনা করেছেন, যা এই সূরায় সামনে বিস্তারিতভাবে আসবে ইনশাআল্লাহ তায়ালা। ওয়াকি আল-আমাশ থেকে, তিনি আবু জাবইয়ান থেকে এবং তিনি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম যা সৃষ্টি করেছেন তা হলো “কলম”। অতঃপর তিনি তাকে বললেন: লেখ। সে বলল: হে আমার প্রতিপালক, আমি কী লিখব? তিনি বললেন: তাকদির (ভাগ্য) লেখ। অতঃপর কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে তা সব সেই দিনই লিপিবদ্ধ হয়ে গেল। তিনি বলেন: অতঃপর তিনি নুন (বিশাল মাছ) সৃষ্টি করলেন এবং তার ওপর পৃথিবীকে বিস্তৃত করলেন। অতঃপর পানির বাষ্প উর্ধ্বগামী হলো এবং তা থেকে আকাশমন্ডলী পৃথক (সৃষ্টি) করলেন।
এরপর নুন নড়ে ওঠায় পৃথিবী দুলতে লাগল, তখন পাহাড় দ্বারা একে স্থির করা হলো। তাই কিয়ামতের দিন পর্যন্ত পাহাড় পৃথিবীর ওপর গৌরব করতে থাকবে। এই বর্ণনায় পানির বাষ্প বা ধোঁয়া উপরে ওঠার আগেই পৃথিবী সৃষ্টির কথা এসেছে, যা প্রথম বর্ণনার বিপরীত। তবে ইবনে আব্বাস ও অন্যদের থেকে বর্ণিত প্রথম বর্ণনাটিই অধিক যুক্তিযুক্ত; কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “এবং এরপর তিনি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন” [আন-নাযিয়াত: ৩০]। আর আল্লাহই ভালো জানেন তিনি কী করেছেন; এ বিষয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে এবং এতে গবেষণার (ইজতিহাদ) কোনো সুযোগ নেই। আবু নুআইম কাব আল-আহবার থেকে বর্ণনা করেন যে, ইবলিস সেই মাছটির কাছে পৌঁছাল যার পিঠে সমগ্র পৃথিবী অবস্থিত।
সে তার মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে বলল: হে লুথিয়া! তোমার পিঠে কত জাতি, বৃক্ষরাজি, জীবজন্তু, মানুষ ও পাহাড় রয়েছে তা কি তুমি জানো? তুমি যদি একবার ঝাড়া দাও তবে তাদের সবাইকে তোমার পিঠ থেকে ফেলে দিতে পারবে। তিনি বলেন: লুথিয়া তখন তাই করার সংকল্প করল; তখন আল্লাহ একটি ক্ষুদ্র প্রাণী পাঠালেন যা তার নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করল। সে আল্লাহর কাছে কাতর প্রার্থনা করল, ফলে সেটি বেরিয়ে এল। কাব বলেন: যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ, সে তার সামনে সেই প্রাণীটির দিকে তাকিয়ে থাকে এবং প্রাণীটিও তার দিকে তাকিয়ে থাকে; সে যদি পুনরায় তেমন কিছু করার ইচ্ছা করে, তবে সেটি তার পূর্বের স্থানে ফিরে যায়।
সপ্তম- সকল বস্তুর সৃষ্টির মূল হলো পানি। কারণ ইবনে মাজাহ তার সুনান গ্রন্থে এবং আবু হাতিম আল-বুস্তি তার সহিহ মুসনাদে আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনাকে দেখলে আমার অন্তর প্রশান্ত হয় এবং চক্ষু জুড়ায়; আমাকে প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে অবহিত করুন। তিনি বললেন: (সবকিছুই পানি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে)। আমি বললাম: আমাকে খবর দিন…(১). দ্রষ্টব্য: খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ২৮২।(২). দ্রষ্টব্য: খণ্ড ১৯, পৃষ্ঠা ২০২।

আরেক বর্ণনা সম্পর্কে কুরতুবী নিজেই বলেন, সেখানে “পানির বাষ্প বা ধোঁয়া উপরে ওঠার আগেই পৃথিবী সৃষ্টির কথা এসেছে, যা প্রথম বর্ণনার বিপরীত।” ফলে এখানে আধুনিক কসমোলজির কোনো সুস্পষ্ট পূর্বনির্ধারিত chronology পাওয়া যাচ্ছে না; বরং আয়াতগুলোর ক্রম মিলিয়ে নেওয়ার জন্য ধ্রুপদী যুগেই একাধিক reconstruction প্রচলিত ছিল।

পৃথিবী 60

তাফসীরে ইবন আব্বাস: সূরা বাকারা ২:২৯

ইবন আব্বাসের নামে প্রচলিত তাফসীরেও সূরা বাকারা ২:২৯-এর একই সৃষ্টিবর্ণনা ব্যাখ্যা করা হয়েছে—পৃথিবীর বিষয়টির পর আকাশের দিকে মনোনিবেশ এবং সাত আকাশের বিন্যাস। সংশ্লিষ্ট অংশ নিচে দেওয়া হলো।

২৯. তিনিই তোমাদের জন্য পৃথিবীর সব কিছু সৃষ্টি করেছেন, তারপর আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন এবং তাকে সপ্তাকাশে বিন্যস্ত করলেন। তিনি সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত।
৩০. স্মরণ করুন, যখন আপনার প্রতিপালক ফেরেস্তাদের বললেন, আমি পৃথিবীতে এক প্রতিনিধি সৃষ্টি করছি, তারা বললো, আপনি কি পৃথিবীতে তাদের প্রতিষ্ঠিত করবেন, যারা সেখানে অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে? আমরাই তো আপনার প্রশংসা পাঠ করি এবং স্মরণ করি আপনার পবিত্র সত্তাকে। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই আমি যা জানি তোমরা তা জান না।
)كَيْفَ تَكْفُرُونَ بِاللَّهِ( কি আশ্চর্য! হে অজ্ঞ মানব সমাজ তোমরা কিরূপে আল্লাহর সাথে কুফরী কর? ও তাঁর প্রতি কৃতঘ্ন হতে পার? )وَكُنْتُمْ أَمْوَاتًاً( কারণ তোমরা তোমাদের পিতৃ পৃষ্ঠদেশে বীর্যরূপে মৃত ছিলে। )فَاحْيَاكُمْ( তারপর তিনি তোমাদেরকে মাতৃগর্ভে জীবন দান করেছেন। )ثُمَّ يُمِيتُكُمْ( এরপর তিনিই তোমাদের আয়ুষ্কাল শেষ হলে মৃত্যু ঘটাবেন। )ثُمَّ يُحْيِيكُمْ( তারপর তিনিই তোমাদেরকে জীবন দান করে পুনরুত্থিত করবেন। )ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجِعُون তারপর তোমরা সকলেই তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করবে, (পরকালে) যেখানে তোমাদের কার্যকলাপের সমস্ত পুরস্কার ও বিনিময় দেয়া হবে। এরপর আল্লাহ্ পাক মানুষের জন্য কি অবদান রেখেছেন তার বর্ণনা দিয়ে বলেন : )هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ( তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন )مافى الأرض( যা কিছু পৃথিবীতে আছে জীবজন্তু, উদ্ভিদ ইত্যাদি। )جميعًا( সবগুলিকেই তোমাদের মঙ্গলের জন্যই )ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّماء তারপর তিনি আকাশমণ্ডলী সৃষ্টি করার ইচ্ছা করলেন )فَسَوْهُن( তারপর তিনি তাদেরকে )سبع سموت( সপ্ত আকাশে সুবিন্যস্ত করে দিলেন, এবং পৃথিবীর উপর সমভাগে বিস্তৃত করলেন )وَهُوَ بِكُلِّ شَيْئ( তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টির সর্ববিষয়ে (১) সর্বজ্ঞানী। এরপর তিনি ফিরিশতাদের ঘটনাবলির উল্লেখ করেন, যারা হযরত আদম (আ)-কে সিজদা করার আদেশ প্রাপ্ত হয়েছিল:
)وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلْئِكَةِ( ণ করুন। যখন আপনার প্রতিপালক যারা পৃথিবীর কাজে নিয়োজিত ফেরেস্তাদেরকে বললেন, )انى جاعل( নিশ্চয়ই আমি সৃষ্টি করব )في الأرض( পৃথিবীতে অর্থাৎ মাটি হতে )خليفة( তোমাদের মধ্য হতে স্থলাভিষিক্ত )قالُوا أتجعَلُ فيها( তারা বললেন, হে প্রভু! আপনি তবে পৃথিবীতে এমন জীব সৃষ্টি করতে ইচ্ছা করেন )مَنْ يُفْسِدُ فيها( যারা পৃথিবীতে পাপে লিপ্ত হবে। ويسفك )الماء এবং যারা তথায় রক্তপাত করবে, অত্যাচার করবে।
( وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ) এবং আপনার আদেশে সালাত আদায় করে থাকি। )وَنُقَدِّسُ لَكَ( এবং আমরা আপনাকে স্মরণ করি পবিত্র অবস্থায়। )قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ( আল্লাহ্ তা’আলা বললেন, আমি জানি এই খলিফা দ্বারা কি কাজ হবে ১৩( )تعلمون যা তোমরা জান না।
(۳۱) وَعَلَمَ آدَمَ الأَسْمَاءُ كُلَهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَنبِئُونِي بِأَسْمَاءِ هَؤُلَاءِ إِنْ كُنْتُمْ صَدِقِينَ
(۳۲) قَالُوا سُبُحْنَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَيْتَنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
(۳۳) قَالَ يَادَمُ ابْنَتَهُم بِأَسْمَائِهِمْ فَلَمَّا أَننَاهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ قَالَ أَلَمْ أَقُلْ لَكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ غَيْبَ السَّمَواتِ وَالْأَرْضِ وَاعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا كُنتُمْ تَكْتُمُونَ )
৩১. আল্লাহ আদমকে যাবতীয় বস্তুর নাম শিক্ষা দিলেন, অতঃপর যে সব বস্তু ফেরেস্তাদের সামনে প্রকাশ করলেন। তারপর বললেন, এ সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।
৩২. তারা বলল, আপনি পবিত্র। আপনি আমাদের যতটুকু শিক্ষা দিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের কিছুই জানা নেই। নিশ্চয়ই আপনিই প্রকৃত জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়।
৩৩. তিনি বললেন, হে আদম! তুমি ফেরেস্তাদেরকে এ সব বস্তুর নাম বলে দাও। সে যখন তাদেরকে সে সবের নাম বলে দিল, তিনি বললেন, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর অদৃশ্য বস্তুরাজির সম্বন্ধে আমি সম্যক অবহিত এবং তোমরা যা ব্যক্ত কর ও যা গোপন রাখ তাও জানি?
(وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاء كُلَّهَا ) প্রত্যেক জীব এর নাম ইত্যাদি শিখালেন। এমনকি বড় ও ক্ষুদ্র পাত্রগুলির নামও শিক্ষা দিলেন। এবং ছোট ছোট পান পাত্রের নামও শিক্ষা দিলেন। )ثُمَّ عَرَضَهُمْ( তারপর তাদেরকে ব্যক্তিত্ব মনে করে উত্থাপিত করলেন )عَلَى الْمَلَئِكَة( ফেরেস্তাগণের সম্মুখে যাদেরকে সিজদার আদেশ করা হয়েছিল )فَقَالَ أَنْبِئُونی( তারপর তিনি তাদেরকে বললেন, তোমরা আমাকে বলে দাও। )بأسماء هؤلاء ( এই সব সৃষ্ট বস্তু ও ভ্রূণের নামগুলি। )اِن كُنْتُمْ صدقين( যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তোমাদের প্রথম দাবীতে।
قَالُوا سُبْحَنَكَ তারা বললেন, হে আল্লাহ্, আমরা এরূপ উক্তি হতে তওবা করছি। কারণ لا عِلْمٌ لَ )لا ماعلمتنا। আমাদের কোনই জ্ঞান নেই শুধু যা আপনি আমাদেরকে শিখিয়েছেন إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلَيْمُ )لْحَكِيمُ। নিশ্চয়ই আপনি আমাদের এবং তাদের অবস্থা জ্ঞাত আছেন, আপনি মহাজ্ঞানী।

পৃথিবী 62
পৃথিবী 64

তাফসীরে জালালাইন: সূরা বাকারা ২:২৯

তাফসীরে জালালাইনেও আয়াতটির পৃথিবী থেকে আকাশের দিকে অগ্রসর হওয়া সৃষ্টিক্রমই বজায় থাকে। আকাশ তখন ধোঁয়া-অবস্থায় ছিল এবং তাকে সাত আকাশে বিন্যস্ত করার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

২৯. এবং আল্লাহ তা’আলা পুনরুত্থানের প্রমাণ স্বরূপ ইরশাদ করেন যখন তারা তা অস্বীকার করেছে। তিনি ঐ সত্তা যিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন পৃথিবীতে অর্থাৎ পৃথিবী এবং এতে যা কিছু বিদ্যমান যাবতীয় সবকিছু যেন এগুলোর মাধ্যমে তোমরা উপকৃত হতে পার এবং শিক্ষা গ্রহণ করতে পার।
তারপর পৃথিবী সৃষ্টির পর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দেন অর্থাৎ আকাশ সৃষ্টির অভিপ্রায় করলেন। তারপর তাকে সপ্তাকাশে বিন্যস্ত করলেন অর্থাৎ গঠন করলেন। যেমন, অন্য একটি আয়াতে উল্লেখ রয়েছে نَتَضْهُنَّ ]অনন্তর তিনি তৈরি করলেন][তাদেরকে সর্বনামটি এ স্থানে اء বিশেষ্যের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে। :الا শব্দটি যদিও একবচন তবুও আগত অবস্থা হিসেবে তাকে বহুবচন অর্থে গণ্য করা হয়েছে। আর তিনি সর্ববিষয়ে সবিশেষ অবহিত সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত সকল বিষয়ে। এই বিষয়টি কি তোমরা লক্ষ্য কর না যে, তোমাদের অপেক্ষা বৃহৎ এই সকল কিছু যিনি শুরুতে সৃষ্টি করতে সক্ষম ও ক্ষমতাশীল তিনি তোমাদেরকে পুনরায় সৃষ্টি করতেও সক্ষম?

পৃথিবী 66

মা‘আরেফুল কোরআন: সূরা বাকারা ২:২৯

মা‘আরেফুল কোরআনের ব্যাখ্যাতেও পৃথিবী ও আকাশের সৃষ্টির ক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যার অংশগুলো নিচে দেওয়া হলো।

মৃত্যুদান করবেন। পুনরায় তোমাদেরকে জীবনদান করবেন অতঃপর তারই প্রতি প্রত্যাবর্তন করবে। (২৯) তিনিই সে সত্তা যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য-যা কিছু জমীনে রয়েছে সে সমস্ত। তারপর তিনি মনোসংযোগ করেছেন আকাশের প্রতি। বস্তুত তিনি তৈরী করেছেন সাত আসমান। আর আল্লাহ্ সববিষয়ে অবহিত।
তফসীরের সার-সংক্ষেপ
(আচ্ছা!) তোমরা কেমন করে আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার, (অর্থাৎ-তাঁর দয়া ও অনুগ্রহরাজির কথা ভুলে অন্যকে পূজ্য বলে মেনে নাও,) অথচ (একমাত্র তিনিই যে উপাসনা ও আরাধনার অধিকারী এ সম্পর্কে অজস্র জাজ্বল্যমান ও অকাট্য প্রমাণ রয়েছে। যথা-বীর্ষে প্রাণ সঞ্চারের পূর্বে) তোমরা ছিলে নিষ্প্রাণ, অতঃপর তিনি তোমাদেরকে প্রাণদান করলেন। পরে তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন। অতঃপর (কিয়ামতের দিন) তোমাদেরকে পুনরুজ্জীবিত করবেন। অবশেষে (হিসাব-নিকাশের জন্য হাশর প্রান্তরে) তারই সম্মুখে তোমাদেরকে উপস্থিত করা হবে। সে মহান সত্তাই ভূমণ্ডলে যা কিছু রয়েছে সে সব তোমাদের কল্যাণার্থ সৃষ্টি করেছেন। (এ কল্যাণ ব্যাপক। পানাহার সম্পর্কেও হতে পারে বা বেশভূষা সম্পর্কেও হতে পারে, অথবা বিয়ে-শাদী অথবা আত্মার পরিপুষ্টি ও সজীবতা সঞ্চার সম্পর্কেও হতে পারে। এদ্বারা একথাও বোঝা গেল যে, মানুষের উপকারে আসতে পারে না, জগতে এমন কোন বস্তুই নেই। কিন্তু তাঁর অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেক বস্তুর সব ধরনের ব্যবহারই ঠিক ও ধর্মসম্মত। মারাত্মক কোন বিষও মানুষের কোন উপকারে আসে না, এমন নয়। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে তা খেয়ে ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।) অতঃপর তিনি আসমানের (সৃষ্টি ও পরিপূর্ণতা বিধানের) প্রতি মনোনিবেশ করেন এবং (নিখুঁত ও সুবিন্যস্তভাবে) সাত (স্তরে) আসমান তৈরী করেন। আর তিনি তো সব বিষয়েই অবহিত।

ثم উল্লেখিত আয়াতে ও শব্দের দ্বারা পূর্বে পৃথিবী ও পরে আকাশ সৃষ্টি করা হয়েছে বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এবং এটাই সঠিক। সূরা আন্নাষে’আতে وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَلِكَ دَحَاهَا والارض بعد -)অতঃপর তিনি ভূমণ্ডল বিস্তীর্ণ করেছেন) আয়াত
থেকে পৃথিবীর সৃষ্টি আকাশের পরে হয়েছে বলে বোঝা যায় না। বরং এর অর্থ ভূমণ্ডলের বিন্যাস ও পরিপূর্ণতা সাধন এবং তা থেকে নানাবিধ দ্রব্য-সামগ্রীর উৎপাদন-সংক্রান্ত বিস্তারিত কাজ নভোমণ্ডল সৃষ্টির পরেই সম্পন্ন হয়েছে। অবশ্য মূল পৃথিবীর সৃষ্টি আকাশ সৃষ্টির পূর্বেই সাধিত হয়েছিল।

পৃথিবী 68
পৃথিবী 70
পৃথিবী 72

তাফসীরে ইবনে কাসীর: সূরা ফুসসিলাত ৪১:৯–১২

সূরা ফুসসিলাতের ৯–১২ নম্বর আয়াতে ঘটনাক্রম আরও বিস্তারিত। তাফসীরে ইবনে কাসীরের ব্যাখ্যাতেও প্রথমে পৃথিবী, এরপর পৃথিবীতে পর্বত ও জীবিকার ব্যবস্থা, তারপর ধোঁয়া-অবস্থার আকাশ এবং সাত আকাশের বিন্যাসের ধারাবর্ণনা পাওয়া যায়। নিচে ইবনে কাসীরের সংশ্লিষ্ট দীর্ঘ ব্যাখ্যাটি দেওয়া হলো।

৯. বল, তোমরা কি তাহাকে অস্বীকার করিবেই যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন দুই দিনে এবং তোমরা তাঁহার সমকক্ষ দাঁড় করাইতে চাহ? তিনিতো জগতসমূহের প্রতিপালক।
১০. তিনি স্থাপন করিয়াছেন অটল পর্বতমালা ভূপৃষ্ঠে এবং উহাতে রাখিয়াছেন কল্যাণ এবং চারদিনের মধ্যে ইহাতে ব্যবস্থা করিয়াছেন খাদ্যের ‘সমভাবে যাচনাকারীদিগের জন্য।
১১. অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন যাহা ছিল ধূম্রপুঞ্জ বিশেষ। অনন্তর তিনি উহাকে ও পৃথিবীকে বলিলেন, তোমরা উভয়ে আস, ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। উহারা বলিল, আমরা আসিলাম অনুগত হইয়া।
১২. অতঃপর তিনি আকাশমন্ডলকে দুই দিনে সপ্তাকাশে পরিণত করিলেন এবং প্রত্যেক আকাশে উহার বিধান ব্যক্ত করিলেন এবং আমি নিকটবর্তী আকাশকে সুশোভিত করিলাম প্রদীপমালা দ্বারা এবং করিলাম সুরতি। ইহা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর ব্যবস্থাপনা।
তাফসীর: এই স্থানে মুশরিকদিগকে তাচ্ছিল্য করা হইয়াছে যাহারা আল্লাহ্হ্ সহিত আরো অনেককে যোগ করিয়া সকলের উপাসনা করে। অথচ একমাত্র আল্লাহই সকলকিছুর স্রষ্টা। আল্লাহ্ একমাত্র ক্ষমাকারী এবং একমাত্র তিনিই সবকিছুর একচ্ছত্র قُلْ أَئِنَّكُمْ لَتَكْفُرُونَ بِالَّذِي خَلَقَ الأَرْضَ فِي يَوْمَيْن : RICE وَتَجْعَلُونَ لَهُ أَنْدَادًا অর্থাৎ বল, তোমরা কি তাঁহাকে অস্বীকার করিবেই যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন দুই দিনে এবং তোমরা তাঁহার সমকক্ষ, তাঁহার অনুরূপ কোন সত্তা দাঁড় করাইতে চাহ? (যাহাকে তাঁহার সহিত সংযুক্ত করিয়া তাহার ইবাদত করিবে?)
ذَلِكَ رَبُّ الْعَلَمِينَ তিনি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক। অর্থাৎ তিনিই সকল কিছুর স্রষ্টা এবং বিশ্বজগতের সকল কিছুর তিনিই একমাত্র প্রতিপালক।
উল্লেখ্য যে, অন্যস্থানে আসিয়াছে যে, خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ অর্থাৎ পৃথিবী ও আকাশ মণ্ডলীকে ছয় দিনে তৈরী করিয়াছেন। অতএব বুঝা গেল যে, আলোচ্য আয়াতে পৃথিবী তৈরী হইতে আকাশ তৈরীর মোট সময়কে ভাগ করা হইয়াছে। আরো বুঝা গেল যে, আকাশের চেয়ে পৃথিবীকে আগে তৈরী করা হইয়াছে কেননা পৃথিবী আকাশের ভিত স্বরূপ। আর ভিত সব সময়ই আগে তৈরী করা হইয়া থাকে। এবং ভিত তৈরী হইয়া গেলে উহার উপর ছাদ দেওয়া হয়।

অর্থাৎ তিনি পৃথিবীর সকল কিছু তোমাদিগের জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন, তৎপর তিনি আকাশের দিকে মনঃসংযোগ করেন এবং উহাকে সপ্তাকাশে বিন্যস্ত করেন।
অন্য আয়াতে আরো ব্যাখ্যা করিয়া তিনি বলিয়াছেন যে,
أَأَنْتُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمِ السَّمَاء بَنَاهَا – رَفَعَ سَمْكَهَا فَسَوَّاهَا – وَأَغْطَشَ لَيْلَهَا وَاخْرَجَ ضُحَاهَا – وَالْأَرْضِ بَعْدَ ذَلِكَ دَحَاهَا أَخْرَحَ مِنْهَا مَاءَهَا وَمَرْعَاهَا – وَالْجِبَالَ
أَرْسَاهَا – مَتَاعًا لَّكُمْ وَلِأَنْعَامِكُمْ
অর্থাৎ তোমদিগের সৃষ্টি কঠিনতর, না আকাশের (সৃষ্টি কঠিনতর)? তিনিই ইহা নির্মাণ করিয়াছেন। তিনি ইহাকে সুউচ্চ ও সুবিন্যস্ত করিয়াছেন। তিনি রাত্রিকে করেন অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং দিবসে প্রকাশ করেন সূর্যালোক। অত:পর পৃথিবীকে বিস্তৃত করেন, তিনি উহা হইতে উহার প্রস্রবণ ও চারণভূমি বহির্গত করেন; এবং পর্বতকে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করেন। এই সমস্ত তোমাদিগের ও তোমাদিগের গৃহপালিত জন্তুদিগের জন্য।
উল্লেখ্য যে, উপরোক্ত আয়াতে বলা হইয়াছে যে, আকাশমন্ডলী সৃষ্টির পর পৃথিবীকে বিস্তৃত করিয়াছেন। আর ৩ বা (বিস্তৃতি)-এর ব্যাখ্যা করা হইয়াছে এই أخْرَجَ مِنْهَا مَاءَهَا وَمَرْعَاهَا ও চারণভূমি বহির্গত করেন। এই সকল আসমান সৃষ্টির পর সৃষ্টি করা হইয়াছে। অতএব কুরআনের এই আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, আকাশের পূর্বে পৃথিবীকে সৃষ্টি করা হইয়াছে। এবং বিস্তৃতি হইয়াছে আকাশ সৃষ্টির পর।

আর এক স্থানে আল্লাহ্ তা’আলা বলিয়াছেন:
أَنْتُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمِ السَّمَاء بَنَاهَا …….. وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَلِكَ دَحَاهَا
অর্থাৎ তোমাদিগের সৃষ্টি কঠিনতর, না আকাশের? তিনিই ইহা নির্মাণ করিয়াছেন। তিনি ইহাকে সুউচ্চ ও সুবিন্যস্ত করিয়াছেন। তিনি রাত্রিকে করেন অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং দিবসে প্রকাশ করেন সূর্যালোক। অত:পর পৃথিবীকে বিস্তৃত করেন। এই আয়াতে পৃথিবীর পূর্বে আকাশমন্ডলী সৃষ্টির কথা ব্যক্ত হইয়াছে। অথচ অন্যত্র বলা خَلَقَ الأَرض في يومين : قُلْ إِنَّكُمْ لَتَكْفُرُونَ بِالَّذِي خَلَقَ তাঁহাকে অস্বীকার করিবেই যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন দুই দিনে এবং তোমরা তাঁহার সমকক্ষ দাঁড় করাইতে চাহ? তিনি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক! তিনি ভূপৃষ্ঠে অটল পর্বতমালা স্থাপন করিয়াছেন এবং পৃথিবীতে রাখিয়াছেন কল্যাণ এবং চার দিনের মধ্যে ইহাতে ব্যবস্থা করিয়াছেন খাদ্যের সমানভাবে সকলের জন্য যাহারা ইহার অনুসন্ধান করে। অত:পর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন যাহা ছিল ধূম্র-পুঞ্জ বিশেষ। অনন্তর তিনি উহাকে ও পৃথিবীকে বলিলেন, তোমরা উভয়ে আমার আদেশ পালনের
জন্য প্রস্তুত হও ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। উহারা বলিল, আমরা তো আনুগত্যের সহিত প্রস্তুত আছি। উল্লেখ্য যে, এই আয়াতে পৃথিবীকে আকাশের পূর্বে সৃষ্টি করিয়াছেন বলিয়া বলিয়াছেন।

তাহারা গোপন রাখিতে পারিবে না। অর্থাৎ কিয়ামাতের দিন যখন আল্লাহ্ তা’আলা মুসলমানদিগকে ক্ষমা করিয়া দিতে থাকিবেন তখন বিদিশা হইয়া মুশরিকরা বলিতে থাকিবে, আমরাও তো কখনো শিরক করি নাই। অতএব আমাদিগকেও ক্ষমা করিয়া দেওয়া হোক। অত:পর তৎক্ষণাৎ আল্লাহ্ তা’আলা উহাদিগের মুখে মোহর লাগাইয়া দিবেন। তৎপর উহাদিগের অঙ্গ-প্রতঙ্গসমূহ উহাদিগের প্রত্যেকটি পাপের সাক্ষ্য দিতে থাকিবে। অতএব বুঝা যায় যে, আল্লাহ্ তা’আলার নিকট কোন কথাই গোপন রাখা সম্ভব না। তাই এই আয়াতে বলা হইয়াছে যে,
يَوْمَئِذٍ يُوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَعَصَوا الرَّسُولَ لَوْتُسَوِبِهِمُ الْأَرْضِ وَلَا يَكْتُمُوْنَ
اللَّهَ حَدِيثًا –
অর্থাৎ যাহারা সত্য প্রত্যাখ্যান করিয়াছে এবং রাসূলের অবাধ্য হইয়াছে তাহারা সেদিন কামনা করিবে যদি তাহারা মাটির সহিত মিশিয়া যাইত এবং তাহারা আল্লাহ্ হইতে কোন কথাই গোপন করিতে পারিবে না।
আর পৃথিবী ও আকাশ সৃষ্টির মধ্যেও মূলত কোন দ্বন্দ নাই। প্রথমে দুইদিনে পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন। ইহার পর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং দুই দিনে আকাশমন্ডলী সৃষ্টি করেন। অত:পর তিনি দুই দিনে পৃথিবীর বুক হইতে প্রস্রবণ ও চারণভূমি বহির্গত করেন, মযবৃতভাবে পর্বত প্রোথিত করেন এবং পৃথিবীর বুকে সৃষ্টি করেন জড় ও অজড় বহু পদার্থ। আর এতে বলিয়া এই কথাই বলা হইয়াছে বা বুঝান হইয়াছে। অতএব خَلَقَ الْأَرْضَ فِي يَوْمَيْنِ অর্থাৎ পৃথিবীকে দুই দিনে এবং পৃথিবীর অন্যান্য বস্তুকে আরো দুই দিনে মোট চার দিনে এবং আকাশমন্ডলীকে সৃষ্টি করিয়াছেন দুই দিনে।
আর যে বলা হইয়াছে : وَكَانَ اللَّهُ غَفُوْرًا رَّحِيمًا অর্থাৎ তিনি পরম দয়ালু, করুণাশীল। বস্তুত তিনি সর্বাবস্থায় এই গুণে গুণান্বিত থাকিবেন এবং আল্লাহর কোন ইচ্ছা পূর্ণ হওয়া ব্যতীত অপূর্ণ রহিবে না। অতএব বুঝা গেল যে, কুরআনের মধ্যে মূলত দ্বান্দ্বিক কোন বিষয় নাই। কুরআনের প্রত্যেকটি কথাই বাস্তব সত্য এবং দ্বন্দ্বমুক্ত। কেননা ইহার প্রতিটি শব্দ আল্লাহর পক্ষ হইতে আসিয়াছে। কুরআনের ভাব ও বিষয় স্বয়ং আল্লাহ্ নিজে উদ্ভাবন ও রচনা করিয়াছেন।
বুখারী স্বীয় সূত্রে … ইব্‌ন আমর ওরফে মিনহাল হইতে এই হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। خَلَقَ الْأَرْضَ فِي يومين অর্থাৎ পৃথিবীকে রবি ও সোমবার সৃষ্টি e c o وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِي مِنْ فَوْقِهَا وَبَارَكَ فِيهَا face বরকতময় করিয়াছেন। আর তোমরা উহাতে বীজ বপন কর। উহাতে বৃক্ষ ও ফল এবং পৃথিবীর অধিবাসীদিগের যাহা প্রয়োজন তাহা সব উৎপন্ন হয়। তিনি উহাতে ক্ষেত ও

বাগান করার জায়গা তৈরী করিয়াছেন। পৃথিবীর বুকে মঙ্গল ও বুধবার তিনি এই সকল সৃষ্টি করিয়াছেন অর্থাৎ মোট চার দিনে পৃথিবী ও উহার অভ্যন্তরে সকল কিছু সৃষ্টি করা ة في أربعَةِ أَيَّامٍ سواء لِلسَّائِلِينَ : 2ICE 201 02 : 22 যাহাদিগের জানিবার ইচ্ছা রহিয়াছে তাহাদিগের প্রশ্নের জবাব ইহাতে বিবৃত হইয়াছে।
ইকরিমা ও মুজাহিদ (র( وَقَدَّرَ فِيْهَا أَقْوَاتُهَا এই আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেন যে, পৃথিবীর যে অংশের লোকের জন্য যে ধরনের খাদ্য উপযুক্ত সেই ধরনের খাদ্য তিনি সেই অঞ্চলে উৎপাদিত করেন। যথা ইয়ামান চাদর ও পাগড়ী উৎপাদনের জন্য, শুষ্ক আরব উপসাগরীয় অঞ্চলে খেজুর উৎপাদনের জন্য এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার জন্য পশমী টুপী ও পোশাক ইত্যাদি।
ইব্‌ন আব্বাস, কাতাদাহ ও সুদ্দী (র( سَوَاءٌ لِلسَّائِينَ -এর মর্মার্থে বলেন যে, যাহারা এই ব্যাপারে অনুসন্ধান করে তাহাদিগের অনুসন্ধানের ফল ইহার মধ্যে রহিয়াছে।
ইবন যায়দ (র) বলেন, ইহার অর্থ হইল যে, যাহার যাহা প্রয়োজন হইবে তাহার জন্য তাহা সহজসাধ্য করিয়া দিয়াছেন। এই ভাবার্থ এই আয়াতটির অর্থের সহিত সামঞ্জস্য রাখে যে, وَأَتَاكُمْ مِّنْ كُلِّ مَا سَأَلْتُمُوهُ অর্থাৎ তোমাদিগের যে যাহা প্রার্থনা করিয়াছে তাহাকে তাহা তিনি দিয়াছেন। (আল্লাহই ভাল জানেন)।
ইহার পর আল্লাহ্ তা’আলা বলিয়াছেন : ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ وَهِيَ دُخَانُ অর্থাৎ পৃথিবী সৃষ্টি করার পর যখন তিনি আকাশ সৃষ্টি করার জন্য মনোনিবেশ করিলেন তখন উর্দ্ধলোক বাষ্পায়িত ধূম-পুঞ্জবিশেষ ছিল।
فَقَالَ لَهَا وَلِلْأَرْضِ انْتِيَا طَوْعًا أَوْ كَرْهًا পৃথিবীকে বলিলেন, তোমরা উভয়ে আমার আদেশ পালনের জন্য প্রস্তুত হও ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়।
ছাওরী ….ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, ইব্‌ন আব্বাস (রা) আলোচ্য আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেন, আল্লাহ্ তা’আলা আকাশকে এই আদেশ করিয়াছেন যে, তুমি সূর্য, চন্দ্র ও গ্রহ-নক্ষত্র উদিত কর এবং পৃথিবীকে আদেশ করিয়াছিলেন যে, তুমি প্রস্রবণ প্রবাহিত কর এবং উৎপন্ন কর ফল ও ফসল। ইহারা উভয়ে জবাবে বলিল- قَالَتًا أَتَيْنَا طَائِعِين আমরা তো আনুগত্যের সহিত প্রস্তুত রহিয়াছি।
তবে ইবন জারীর (র) ইহার ব্যাখ্যায় বলিয়াছেন যে, আমরা তো আনুগত্যের সহিত প্রস্তুত আছি-ই বরং এই সব স্থানে জিন ও মানব নামক যাহাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন তাহারাও সকলে আপনার আদেশ পালনে প্রস্তুত থাকিবে।

আরববাসী জনৈক ব্যক্তি হইতে ইন্ন জারীর উহা বর্ণনা করিয়াছেন। আর কেহ বলেন, আকাশ ও পৃথিবীর সহিত আল্লাহর এই কথা বলা বাকশক্তি সম্পন্ন কোন ব্যক্তির সহিত কথা বলার ন্যায় বলিয়াছেন।
কেহ বলিয়াছেন, পৃথিবীর যে ভূমিটুকুর উপর কা’বা শরীফ প্রতিষ্ঠিত সেই অংশটুকু তখন এই কথা আল্লাহকে বলিয়াছিল। আর কাবা শরীফের সোজা উপরে আসমানের যে অংশটুকু রহিয়াছে সেই অংশটুকু আল্লাহ্র সহিত তখন এই কথা বলিয়াছিল। (আল্লাহই ভাল জানেন।)
হাসান বসরী (র) বলেন, যদি আকাশ ও পৃথিবী আল্লাহ্র আদেশ মানিতে অস্বীকৃতি জানাইত তাহা হইলে উহাদের উভয়কে কঠোর শাস্তি প্রদান করা হইত এবং তাহারা অনুভব করিতে পারিত। ইব্‌ন আবূ হাতিম ইহা বর্ণনা করিয়াছেন।
করিয়াছেন। বৃহস্পতি ও শুক্র এই শেষ দুই দিনে তিনি আকাশ সৃষ্টি করিয়াছেন। فَقَضَاهُنَّ سَبْعَ سَمَوَاتٍ فِي يَوْمَيْنِ
وأوحى فِي كُلِّ سَمَاءِ أَمْرَهَا
স্থাপিত করিতে চাহিলেন এবং যে যে ফেরেশতা নির্ধারিত চাহিলেন তাহা করিলেন।
যাহা সম্পর্কে একমাত্র তিনিই পরিজ্ঞাত আছেন। وَزَيَّنَا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيحَ এবং তিনি পৃথিবীর নিকটবর্তী আকাশকে উজ্জ্বল গ্রহ ও নক্ষত্র দ্বারা সুশোভিত করিলেন। وحفظ এবং করিলেন সুরক্ষিত। অর্থাৎ মালা-এ আ’লার কথাবার্তা শয়তানের কর্ণে যাহাতে না পৌঁছিতে পারে সে ব্যবস্থা করিলেন।
ذلك تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ এই সব পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহ্ কর্তৃক
সুবিন্যস্ত। অর্থাৎ এই সব প্রযুক্তি ও রৌশন সেই পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর যিনি সবার উপরে শক্তিমান এবং যিনি সমগ্র সৃষ্টির প্রতিটি বস্তুর গোপন-প্রকাশ্য সকল আচার-আচরণ সম্পর্কে সম্যক অবগত রহিয়াছেন।
ইন জারীর ….ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একদা একজন ইয়াহুদী আসিয়া রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, “আল্লাহ্ তা’আলা রবি ও সোমবারে পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন, মঙ্গলবার সৃষ্টি করিয়াছেন পাহাড়-পর্বত এবং পৃথিবীস্থ জীবকুলের প্রয়োজন ও উপকারার্থে যাহা কিছু তৈরী করা হইয়াছে তাহা এবং বুধবার সৃষ্টি করিয়াছেন বৃক্ষ, পানি, শহর, আবাদী জনপদ ও অনাবাদী ভূমি-সাকুল্যে চারদিনে পৃথিবী সৃষ্টি করা হইয়াছে।

অত:পর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেন:
قُلْ أَئِنَّكُمْ لَتَكْفُرُونَ بِالَّذِي خَلَقَ الْأَرْضِ فِي يَوْمَيْنِ وَتَجْعَلُونَ لَهُ أَنْدَادًا ذَلِكَ رَبُّ الْعَلَمِينَ – وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِي مِنْ فَوْقِهَا وَبَرَكَ فِيهَا وَقَدَّرَ فِيهَا أَقْوَاتَهَا فِي
أربَعَةِ أَيَّامٍ سَوَاءٌ لِلسَّائِلِينَ
অর্থাৎ বল, তোমরা কি তাঁহাকে অস্বীকার করিবেই যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন দুই দিনে এবং তোমরা তাহার সমকক্ষ দাঁড় করাইতে চাহ? তিনি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক! তিনি ভূপৃষ্ঠে অটল পর্বতমালা স্থাপন করিয়াছেন এবং পৃথিবীতে রাখিয়াছেন কল্যাণ এবং চার দিনের মধ্যে ইহাতে ব্যবস্থা করিয়াছেন খাদ্যের, সমানভাবে সকলের জন্য যাহারা ইহার অনুসন্ধান করে।
আর বৃহস্পতিবার সৃষ্টি করিয়াছেন আকাশসমূহ, জুমার দিন, শুক্রবার সৃষ্টি করিয়াছেন নক্ষত্র, সূর্য, চন্দ্র এবং দিনের তিন ঘন্টা বাকী থাকার সময় সৃষ্টি করিয়াছেন ফেরেশতাকুল। দিনের অবশিষ্ট তিন ঘন্টার প্রথম ঘন্টায় প্রত্যেক বস্তুর উপর আপদ আপতিত করেন যাহাতে মানুষ সকল বস্তু দ্বারা উপকৃত হইতে পারে। দ্বিতীয় ঘন্টায় আদম (আ)-কে সৃষ্টি করিয়া জান্নাতে বসতি দান করেন এবং ইবলিসকে সিজদা করার জন্য আদেশ করেন। অত:পর শেষ ঘন্টায় আদম (আ)-কে জান্নাত হইতে বহিষ্কার করেন।
ইহার পর ইয়াহুদী লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করিল, ইহার পর কি হইল, হে মুহাম্মদ! তিনি বলিলেন:
ثُمَّ أَسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ অত:পর আল্লাহ্ তা’আলা আরশে আরোহণ করেন।
ইয়াহুদী লোকটি বলিল, আপনি সবই সঠিক বলিয়াছেন, কিন্তু শেষ কথাটি বলেন নাই। অর্থাৎ অতঃপর তিনি বিশ্রাম গ্রহণ করেন। এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ্ (সা) অত্যন্ত রাগান্বিত হন। অতঃপর তৎক্ষণাৎ আল্লাহ্ তা’আলা নাযিল করেন:
وَلَقَدْ خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَمَا مَسَّنَا مِنْ لُغُوبٍ
فَأَصْبِرْ عَلَى مَا يَقُولُونَ –
অর্থাৎ আমি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং উহাদিগের অন্তরবর্তী সমস্ত কিছু সৃষ্টি করিয়াছি ছয় দিনে; আমাকে ক্লান্তি স্পর্শ করে নাই। অতএব উহারা যাহা বলে তাহাতে তুমি ধৈর্য ধারণ কর। তবে হাদীসটি ‘গরীব’ পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।
ইন জুরাইজ (রা) …. আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমার হাত ধরিয়া রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, “আল্লাহ্ তা’আলা শনিবার দিন মাটি তৈরী করিয়াছেন, মাটির উপরে পাহাড় তৈরী করিয়াছেন রবিবার দিন, সোমবার দিন সৃষ্টি

করিয়াছেন বৃক্ষরাজি, অনিষ্ট সৃষ্টি করিয়াছেন মঙ্গলবার দিন, বুধবার দিন সৃষ্টি করিয়াছেন নূর, জন্তু-জানোয়ার সৃষ্টি করিয়া যমীনের উপর বিস্তৃত করিয়া দিয়াছেন বৃহস্পতিবার দিন এবং জুমার দিন আসরের পরে দিনের একেবারে শেষ সময়ে রাত্রি আগমনের পূর্বক্ষণে আদম (আ)-কে সৃষ্টি করিয়াছেন।”
ইবন জুরাইজের হাদীসে উপরোক্ত সূত্রে মুসলিম ও নাসায়ীও ইহা বর্ণনা করিয়াছেন। হাদীসটি সহীহ ও গরীব। ইমাম বুখারী (র) স্বীয় তারীখ গ্রন্থে এই হাদীসটি সম্পর্কে সমালোচনা করিয়াছেন। তবে তিনি বলিয়াছেন যে, কেহ কেহ বলিয়াছেন যে আবূ হুরায়রা (রা) কা’ব আহবার (র) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। ইহাই বিশুদ্ধ।

পৃথিবী 74
পৃথিবী 76
পৃথিবী 78
পৃথিবী 80
পৃথিবী 82
পৃথিবী 84
পৃথিবী 86
পৃথিবী 88

আদ-দুররুল মানসূর: পৃথিবী, আকাশ ও নক্ষত্রের সৃষ্টিক্রম

আদ-দুররুল মানসূরের সূরা ফুসসিলাতের ব্যাখ্যায় সৃষ্টির ক্রম নিয়ে আরও বিস্তারিত প্রাচীন বর্ণনা সংরক্ষিত হয়েছে। একটি বর্ণনায় পৃথিবী সৃষ্টির পরে জীবনোপকরণ ও খাদ্যসামগ্রী এবং তারপর আকাশমণ্ডলী সৃষ্টির কথা এসেছে; অন্য একটি বর্ণনায় রবিবার ও সোমবার পৃথিবী, মঙ্গলবার পাহাড়, বুধবার শহর, খাদ্য ও নদ-নদী এবং বৃহস্পতিবার আকাশমণ্ডলী সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। [32]

মূল আরবি
عَلَيْهِ السَّلَام فِي تِلْكَ السَّاعَة الَّتِي لَا يُوَافِقهَا عبد يَدْعُو ربه إِلَّا اسْتَجَابَ لَهُ فَهُوَ مَا بَين صَلَاة الْعَصْر إِلَى أَن تغيب الشَّمْس
وَأخرج أَبُو الشَّيْخ عَن عِكْرِمَة رضي الله عنه أَن الْيَهُود قَالُوا للنَّبِي صلى الله عليه وسلم: مَا يَوْم الْأَحَد قَالَ: خلق الله فِيهِ الأَرْض قَالُوا: فَيوم الْأَرْبَعَاء قَالَ: الأقوات قَالُوا: فَيوم الْخَمِيس قَالَ: فِيهِ خلق الله السَّمَوَات قَالُوا: فَيوم الْجُمُعَة قَالَ: خلق فِي ساعتين الْمَلَائِكَة وَفِي ساعتين الْجنَّة وَالنَّار وَفِي ساعتين الشَّمْس وَالْقَمَر وَالْكَوَاكِب وَفِي ساعتين اللَّيْل وَالنَّهَار قَالُوا: أَلَسْت تذكر الرَّاحَة فَقَالَ سُبْحَانَ الله
فَأنْزل الله (وَلَقَد خلقنَا السَّمَوَات وَالْأَرْض وَمَا بَينهمَا فِي سِتَّة أَيَّام وَمَا مسنا من لغوب) (ق 38)
وَأخرج أَبُو الشَّيْخ من وَجه آخر عَن عِكْرِمَة عَن ابْن عَبَّاس رضي الله عنهما عَن النَّبِي صلى الله عليه وسلم قَالَ: إِن الله تَعَالَى فرغ من خلقه فِي سِتَّة أَيَّام
أولهنَّ يَوْم الْأَحَد والاثنين وَالثُّلَاثَاء وَالْأَرْبِعَاء وَالْخَمِيس وَالْجُمُعَة خلق يَوْم الْأَحَد السَّمَوَات وَخلق يَوْم الِاثْنَيْنِ الشَّمْس وَالْقَمَر وَخلق يَوْم الثُّلَاثَاء دَوَاب الْبَحْر ودواب الأَرْض وفجر الْأَنْهَار وقوت الأقوات وَخلق الْأَشْجَار يَوْم الْأَرْبَعَاء وَخلق يَوْم الْخَمِيس الْجنَّة وَالنَّار وَخلق آدم عليه السلام يَوْم الْجُمُعَة ثمَّ أقبل على الْأَمر يَوْم السبت
وَأخرج ابْن جرير عَن أبي بكر رضي الله عنه قَالَ: جَاءَ الْيَهُود إِلَى النَّبِي صلى الله عليه وسلم فَقَالُوا: يَا مُحَمَّد أخبرنَا مَا خلق الله من الْخلق فِي هَذِه الْأَيَّام السِّتَّة فَقَالَ: خلق الله الأَرْض يَوْم الْأَحَد والإثنين وَخلق الْجبَال يَوْم الثُّلَاثَاء وَخلق الْمَدَائِن والاقوات والأنهار وعمرانها وخرابها يَوْم الْأَرْبَعَاء وَخلق السَّمَوَات وَالْمَلَائِكَة يَوْم الْخَمِيس إِلَى ثَلَاث سَاعَات يَعْنِي من يَوْم الْجُمُعَة وَخلق فِي أول سَاعَة الْآجَال وَفِي الثَّانِيَة الآفة وَفِي الثَّالِثَة آدم قَالُوا: صدقت أَن تممت فَعرف النَّبِي صلى الله عليه وسلم مَا يُرِيدُونَ فَغَضب فَأنْزل الله (وَمَا مسنا من لغوب فاصبر على مَا يَقُولُونَ)
وَأخرج ابْن الْمُنْذر وَالْحَاكِم وَصَححهُ وَالْبَيْهَقِيّ فِي الْأَسْمَاء وَالصِّفَات عَن ابْن عَبَّاس رضي الله عنهما فِي قَوْله فَقَالَ لَهَا وللأرض ائتيا طَوْعًا أَو كرها قَالَ: قَالَ
বাংলা তাফসীর
তার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক; এটি এমন এক মুহূর্ত যা কোনো বান্দা তার রবের কাছে প্রার্থনা করা অবস্থায় পায় না, তবে তিনি তা কবুল করেন। আর এটি আসরের সালাত থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে।আবুশ শায়খ ইকরিমাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ইয়াহুদীরা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করল: “রবিবার কী?” তিনি বললেন: “আল্লাহ সেদিন পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।” তারা বলল: “তবে বুধবার কী?” তিনি বললেন: “সেদিন জীবনোপকরণ ও খাদ্যসামগ্রী সৃষ্টি করেছেন।” তারা বলল: “তবে বৃহস্পতিবার কী?” তিনি বললেন: “সেদিন আল্লাহ আকাশমন্ডলী সৃষ্টি করেছেন।” তারা বলল: “তবে শুক্রবার কী?” তিনি বললেন: “তিনি দুই প্রহরে ফেরেশতাদের সৃষ্টি করেছেন, দুই প্রহরে জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন, দুই প্রহরে সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি সৃষ্টি করেছেন এবং দুই প্রহরে রাত ও দিন সৃষ্টি করেছেন।” তারা বলল: “আপনি কি বিশ্রামের কথা উল্লেখ করবেন না?” তখন তিনি বললেন: “সুবহানাল্লাহ (আল্লাহ সকল পবিত্রতার অধিকারী)!” অতঃপর আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন: (নিশ্চয় আমি আকাশমন্ডলী, পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সব কিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছি, আর আমাকে কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করেনি) (সূরা ক্বাফ: ৩৮)আবুশ শায়খ অন্য সূত্রে ইকরিমাহ থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে এবং তিনি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন: “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ ছয় দিনে তাঁর সৃষ্টিজগত সমাপ্ত করেছেন।”তার প্রথম দিনটি ছিল রবিবার, তারপর সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার।
রবিবার তিনি আকাশমন্ডলী সৃষ্টি করেছেন; সোমবার সূর্য ও চন্দ্র সৃষ্টি করেছেন; মঙ্গলবার সমুদ্রের প্রাণী ও স্থলের জীবজন্তু সৃষ্টি করেছেন, নদ-নদী প্রবাহিত করেছেন এবং জীবনোপকরণ নির্ধারণ করেছেন; বুধবার বৃক্ষরাজি সৃষ্টি করেছেন; বৃহস্পতিবার জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন; এবং শুক্রবার আদম (আলাইহিস সালাম)-কে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর শনিবার তিনি আরশের কার্যে মনোনিবেশ করেন।ইবনে জারীর আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন যে, ইয়াহুদীরা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে বলল: “হে মুহাম্মদ! এই ছয় দিনে আল্লাহ কী কী সৃষ্টি করেছেন তা আমাদের জানান।” তিনি বললেন: “আল্লাহ রবিবার ও সোমবার পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন; মঙ্গলবার পাহাড়সমূহ সৃষ্টি করেছেন; বুধবার শহরসমূহ, খাদ্যদ্রব্য, নদ-নদী এবং সেগুলোর আবাদ ও ধ্বংসের বিষয়সমূহ সৃষ্টি করেছেন; বৃহস্পতিবার আকাশমন্ডলী ও ফেরেশতাদের সৃষ্টি করেছেন শুক্রবারের তিন প্রহর পর্যন্ত।
অর্থাৎ শুক্রবারের প্রথম প্রহরে মৃত্যুর সময়কাল, দ্বিতীয় প্রহরে আপদ-বিপদ এবং তৃতীয় প্রহরে আদমকে সৃষ্টি করেছেন।” তারা বলল: “আপনি সত্য বলেছেন, যদি আপনি তা পূর্ণ করেন (অর্থাৎ বিশ্রামের কথা বলেন)।” নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বুঝতে পারলেন তারা কী ইঙ্গিত করছে, ফলে তিনি রাগান্বিত হলেন। তখন আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন: (আর আমাকে কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করেনি; সুতরাং তারা যা বলে তাতে আপনি ধৈর্য ধারণ করুন।)ইবনুল মুনযির, আল-হাকিম (যিনি একে সহীহ বলেছেন) এবং আল-বায়হাকী ‘আল-আসমা ওয়াস সিফাত’ গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে আল্লাহর বাণী— অতঃপর তিনি আকাশ ও পৃথিবীকে বললেন: তোমরা উভয়ে আসো ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়—এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন:

মূল আরবি
للسماء أَخْرِجِي شمسك اخْرُجِي قمرك ونجومك وَقَالَ للْأَرْض: شققي أنهارك وأخرجي ثمارك قَالَتَا أَتَيْنَا طائعين
وَأخرج ابْن جرير وَابْن أبي حَاتِم عَن ابْن عَبَّاس رضي الله عنهما فِي قَوْله ائتيا قَالَ: اعطيا وَفِي قَوْله أَتَيْنَا قَالَ: أعطينا
وَأخرج الْفرْيَابِيّ وَعبد بن حميد عَن مُجَاهِد رضي الله عنه فِي قَوْله وَأوحى فِي كل سَمَاء أمرهَا قَالَ: مَا أَمر بِهِ وأراده من خلق النيرات وَغير ذَلِك
وَأخرج عبد بن حميد عَن قَتَادَة رضي الله عنه وَأوحى فِي كل سَمَاء أمرهَا قَالَ: خلق فِيهَا شمسها وقمرها ونجومها وصلاحها
الْآيَات 13 – 18
বাংলা তাফসীর
আকাশকে তিনি বললেন: তোমার সূর্য নির্গত করো, তোমার চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি নির্গত করো। আর পৃথিবীকে বললেন: তোমার নদীসমূহ বিদীর্ণ করো এবং তোমার ফলমূল নির্গত করো। তারা উভয়ে বলল: আমরা অনুগত হয়ে আসলাম।ইবনে জারীর ও ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে আল্লাহর বাণী তোমরা আসো প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: তোমরা প্রদান করো। আর তাঁর বাণী আমরা আসলাম প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন: আমরা প্রদান করলাম।ফিরইয়াবী ও আবদ ইবনে হুমাইদ মুজাহিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে আল্লাহর বাণী এবং তিনি প্রত্যেক আকাশে তার নির্দেশ ওহী করলেন প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: জ্যোতিষ্কসমূহ সৃষ্টি এবং অন্যান্য যা কিছু তিনি আদেশ ও ইচ্ছা করেছেন।আবদ ইবনে হুমাইদ কাতাদাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে এবং তিনি প্রত্যেক আকাশে তার নির্দেশ ওহী করলেন প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: তিনি তাতে সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররাজি এবং তার উপযোগিতা সৃষ্টি করেছেন।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, একই তাফসীরে ইবনে আব্বাসের ব্যাখ্যায় “তোমরা উভয়ে আসো” প্রসঙ্গে আকাশকে বলা হয়েছে: “তোমার সূর্য নির্গত করো, তোমার চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি নির্গত করো।” মুজাহিদ ও কাতাদাহর বর্ণনাতেও আকাশের বিধানের ব্যাখ্যায় সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্র সৃষ্টির কথা এসেছে। অর্থাৎ প্রাচীন তাফসীরের এই পাঠে পৃথিবী ও তার জীবনোপকরণের পরবর্তী পর্যায়ে আকাশ এবং তার জ্যোতিষ্কগুলোর বিন্যাস একটি একেবারেই প্রত্যক্ষ সৃষ্টি-চিত্র হিসেবে উপস্থিত।


ধ্রুপদী তাফসীরের সৃষ্টিক্রম

এই তাফসীরগুলো সামনে রাখার গুরুত্ব খুব সরল। কোরআনের পৃথিবী-আগে, আকাশ-পরে ধারাবর্ণনা কোনো সাম্প্রতিক সমালোচকের আবিষ্কার নয়। মুসলিম মুফাসসিররাই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় পৃথিবী, তারপর আকাশ এবং সাত আকাশের বিন্যাসের ধারাবাহিকতা বর্ণনা করেছেন।

বিশেষ করে ফুসসিলাতের বর্ণনায় পৃথিবী শুধু উপস্থিতই নয়; তার ওপর পর্বত স্থাপন এবং জীবিকার ব্যবস্থা নির্ধারণের কথাও এসেছে ধোঁয়া-আকাশকে সাত আকাশে বিন্যস্ত করার আগে। এরপর নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালায় সুশোভিত করা হয়েছে।

এখানে আধুনিক কসমোলজির সঙ্গে সংঘাত সরাসরি। পৃথিবীর আগে শুধু “আকাশ” ছিল—এতটুকু নয়; পৃথিবীর বহু বিলিয়ন বছর আগেই নক্ষত্র, গ্যালাক্সি এবং গ্রহব্যবস্থার ইতিহাস শুরু হয়ে গেছে। পৃথিবী নিজেই সেই পুরনো নক্ষত্রীয় ইতিহাসের উপাদান দিয়ে তৈরি।

তাই ধ্রুপদী তাফসীর সামনে রাখলে কোরআনিক সৃষ্টিচিত্রটি আরও পরিষ্কার হয়: পৃথিবীকে আগে নির্মাণ ও প্রস্তুত করা হচ্ছে, তারপর ধোঁয়া-আকাশকে বিন্যস্ত করা হচ্ছে। আর বাস্তব মহাজাগতিক ইতিহাসে পৃথিবী এসেছে বহু বিলিয়ন বছর পরে—একটি পূর্ব থেকেই নক্ষত্র ও গ্যালাক্সিতে পরিপূর্ণ মহাবিশ্বে।


সূর্যের আগেই গাছপালা সৃষ্টি?

ইসলামি সৃষ্টিবর্ণনায় গাছপালা ও আলোর আগে-পরে ক্রম নিয়ে সবচেয়ে সরাসরি বক্তব্যটি কোরআনে নয়, সহিহ মুসলিমের সেই সৃষ্টি-বর্ণনায় পাওয়া যায় যা আগের পরিচ্ছেদে উদ্ধৃত হয়েছে। সেখানে সোমবার বৃক্ষরাজি সৃষ্টি এবং বুধবার নূর সৃষ্টি করার কথা বলা হয়েছে। [33]

কোরআন ৪১:১০-এ অবশ্য সরাসরি “গাছপালা” শব্দটি নেই; সেখানে পৃথিবীতে পর্বত, বরকত এবং أَقْوَاتَهَا—তার খাদ্য/জীবিকার ব্যবস্থা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। কোরআনের সমস্যাটি মৌলিক: পৃথিবী ও পৃথিবীর ব্যবস্থা বর্ণনার পর ধোঁয়া-অবস্থার আকাশকে সাত আকাশে বিন্যস্ত এবং নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালায় সুশোভিত করার পর্যায় এসেছে। আর সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় আলাদাভাবে বৃক্ষরাজিকে নূরের আগেই বসানো হয়েছে।

বাস্তব মহাজাগতিক ও জৈব ইতিহাসে ক্রমটি এমন নয়। সূর্য ও সৌরজগতের গঠন শুরু হয় প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে; পৃথিবী তৈরি হয় প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর আগে। পৃথিবীর উদ্ভিদজগৎ তার বহু পরে এসেছে। পৃথিবীর জীবনের শক্তির প্রধান উৎসও সূর্য; সবুজ উদ্ভিদের photosynthesis সরাসরি আলোকশক্তির ওপর নির্ভরশীল। পৃথিবী ও তার বৃক্ষরাজি আগে প্রস্তুত ছিল, আর পরে তাদের জন্য মহাজাগতিক আলো বা নক্ষত্রময় আকাশের ব্যবস্থা করা হয়েছে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক ইতিহাস নেই। [9]

এই ধরনের সৃষ্টিক্রম ইসলামি বর্ণনার একার বৈশিষ্ট্যও নয়। বাইবেলের আদিপুস্তক ১-এ তৃতীয় দিনে পৃথিবীতে ঘাস, বীজধারী উদ্ভিদ ও ফলদ বৃক্ষের কথা বলা হয়েছে, আর সূর্য-চন্দ্রসহ আকাশের প্রধান জ্যোতিগুলো আসে চতুর্থ দিনের বর্ণনায়। [34] প্রাক-বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিতত্ত্বে পৃথিবীকে আগে একটি প্রস্তুত মঞ্চ হিসেবে সাজিয়ে পরে আকাশীয় আলোকবস্তু স্থাপন করার এই কাঠামো তাই পরিচিত।

মূল সংঘাতটি এখানেই: বাস্তবে পৃথিবী, তার ভূপ্রকৃতি এবং জীবজগতের ইতিহাস সূর্য ও তারও বহু আগের নক্ষত্রীয় ইতিহাসের ওপর নির্ভরশীল। পৃথিবী নক্ষত্রের আগের মঞ্চ নয়; নক্ষত্রীয় বিবর্তনের বহু বিলিয়ন বছরের ইতিহাসই পৃথিবীকে সম্ভব করেছে।


ইসলাম বনাম বিজ্ঞানঃ দুইটি টাইমলাইন

এতক্ষণ বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন আয়াত, হাদিস ও তাফসীর দেখা হয়েছে। এবার মূল ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে পার্থক্যটি আরও পরিষ্কার হয়। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার: কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের chronology নিয়ে ধ্রুপদী মুফাসসিরদের মধ্যেই মতভেদ ছিল। কেউ পৃথিবীকে আগে বলেছেন, কেউ আদি ধোঁয়া-আকাশকে আগে রেখেছেন, আবার কেউ পৃথিবীর সৃষ্টি ও তার পরবর্তী বিস্তারকে দুই আলাদা পর্যায়ে ভাগ করেছেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যাগুলোর কোনোটি আধুনিক মহাজাগতিক সময়রেখা তৈরি করে না। পৃথিবীর বহু বিলিয়ন বছর আগে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি এবং গ্রহব্যবস্থা থাকার বৈজ্ঞানিক ইতিহাস এসব ব্যাখ্যার কোনোটিতেই পাওয়া যায় না।

ইসলামি বর্ণনায় সৃষ্টির ধারা
বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসে পাওয়া প্রধান পর্যায়গুলো এখানে পাশাপাশি সাজানো হয়েছে। কোরআন ২১:৩০-এর আকাশ-পৃথিবীর সংযুক্তি এবং ৪১:৯–১২-এর দিনভিত্তিক বর্ণনাকে জোর করে একই অবিচ্ছিন্ন chronology হিসেবে ধরা হয়নি।
১. আরশ ও পানি
আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির আগে আল্লাহর আরশ পানির ওপর ছিল। সূত্র: সহীহ বুখারী ৭৪১৮
২. কলম ও তাকদীর
আরেক বর্ণনায় সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করে কিয়ামত পর্যন্ত সবকিছুর তাকদীর লিখতে বলা হয়। সূত্র: সুনান আবু দাউদ ৪৭০০
৩. আসমান ও যমীন সংযুক্ত, পরে পৃথক
কোরআন ২১:৩০-এ আসমানসমূহ ও পৃথিবীকে একসময় সংযুক্ত বা ওতপ্রোত অবস্থায় বর্ণনা করে, পরে তাদের পৃথক করার কথা বলা হয়েছে। সূত্র: কোরআন ২১:৩০
৪. পৃথিবী সৃষ্টি
সূরা ফুসসিলাতের ধারাবর্ণনায় পৃথিবী সৃষ্টির জন্য দুই দিনের কথা বলা হয়েছে। সূত্র: কোরআন ৪১:৯
৫. পৃথিবীতে পর্বত, বরকত ও খাদ্যের ব্যবস্থা
পৃথিবীতে পর্বত স্থাপন, বরকত প্রদান এবং তার খাদ্য/জীবিকার ব্যবস্থা নির্ধারণ করে চার দিন পূর্ণ করার কথা বলা হয়েছে। সূত্র: কোরআন ৪১:১০
৬. ধোঁয়া-অবস্থার আসমানের দিকে মনোনিবেশ
এরপর বর্ণনা আসমানের দিকে যায়; তখন সেটিকে ধোঁয়া বলা হয়েছে। সূত্র: কোরআন ৪১:১১
পৃথিবী

পৃথিবী, পর্বত, বরকত ও খাদ্যের ব্যবস্থার বর্ণনা ইতোমধ্যে এসেছে।

আসমান

এই পর্যায়ে আসমানকে ধোঁয়া-অবস্থায় বর্ণনা করে পরবর্তী বিন্যাসের দিকে যাওয়া হয়েছে।

৭. সাত আকাশে বিন্যাস ও নিকটবর্তী আকাশে প্রদীপমালা
ধোঁয়া-অবস্থার আসমানকে দুই দিনে সাত আকাশে বিন্যস্ত করা হয় এবং নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দিয়ে সুশোভিত করার কথা বলা হয়। সূত্র: কোরআন ৪১:১২
ব্যাখ্যার ভিন্নতা ক্রমগত সমস্যাটি মুছে দেয় না।

কিছু ধ্রুপদী ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, পৃথিবীর আগেই আসমানের একটি আদিম ধোঁয়া-অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল; পরে পৃথিবী সৃষ্টি হয়, তারপর সেই আসমানকে সাত আকাশে সুবিন্যস্ত করা হয়, এবং আরও পরে পৃথিবী বিস্তৃত করা হয়। আবার কোনো কোনো ব্যাখ্যায় নাযিয়াত ৭৯:২৭–৩০-এর ভিত্তিতে আকাশকেই পৃথিবীর আগে রাখা হয়েছে। [35] [36]

কিন্তু “আদি ধোঁয়া আগে ছিল” বললেই আধুনিক কসমোলজির ক্রম পাওয়া যায় না। বিজ্ঞানের বক্তব্য হলো পৃথিবীর জন্মের বিলিয়ন বছর আগেই পূর্ণাঙ্গ নক্ষত্র, গ্যালাক্সি এবং গ্রহব্যবস্থা ছিল। একটি অনির্দিষ্ট “ধোঁয়া-আকাশ”কে আগে বসিয়ে তারপর পৃথিবী, তারপর সাত আকাশের বিন্যাস ও প্রদীপমালা—এটি সেই ইতিহাস নয়।

একইভাবে ثُمَّ শব্দকে যদি এখানে সময়গত “তারপর” না ধরে শুধু বক্তব্যের সংযোগ হিসেবে নেওয়া হয়, তাহলে এই আয়াতগুলো থেকে নির্দিষ্ট আগে-পরে সৃষ্টিক্রমই আর পাওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে বিরোধ এড়ানো যেতে পারে কেবল chronology-টিকেই অনির্দিষ্ট করে; কিন্তু সেখান থেকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক chronology বের করা যায় না। [37]
আধুনিক বিজ্ঞান: মহাজাগতিক কালানুক্রম
পর্যবেক্ষণ, জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান, নাক্ষত্রিক বিবর্তন এবং radiometric dating থেকে পাওয়া সময়রেখা।
১. আদি মহাবিশ্ব — প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে
অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন প্রাথমিক অবস্থা থেকে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ও বিবর্তন। তখন পৃথিবী, সূর্য, নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি ছিল না। সূত্র: NASA Science — Cosmic History
২. প্রথম নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি
বিগ ব্যাং-এর আনুমানিক ১০ কোটি বছর পর থেকেই প্রথম নক্ষত্র গঠনের যুগ শুরু হতে পারে; পরবর্তী সময়ে গ্যালাক্সি ও বৃহৎ মহাজাগতিক কাঠামো গড়ে ওঠে। সূত্র: NASA Webb — What Were the First Stars Like?
৩. নক্ষত্রে তৈরি হলো পৃথিবীর কাঁচামাল
নক্ষত্রীয় বিবর্তনের মাধ্যমে কার্বন, অক্সিজেন, সিলিকন, লোহাসহ ভারী মৌল তৈরি ও মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবী তৈরির উপাদানের ইতিহাস পৃথিবীর চেয়েও পুরনো।
৪. পৃথিবীর আগেই গ্রহব্যবস্থা
পৃথিবীর বহু আগে অন্য নক্ষত্রের চারপাশে গ্রহ তৈরি হয়েছিল। Kepler-444 ব্যবস্থার বয়স প্রায় ১১.২ বিলিয়ন বছর—পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ৬.৬ বিলিয়ন বছর পুরনো।
৫. সূর্য ও সৌরজগত — প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে
একটি molecular cloud থেকে সূর্য ও তাকে ঘিরে protoplanetary disk তৈরি হয়। সেই disk-এর পদার্থ থেকেই গ্রহগুলোর গঠন শুরু হয়।
৬. পৃথিবী — প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর আগে
সূর্যকে ঘিরে থাকা protoplanetary disk থেকে accretion-এর মাধ্যমে পৃথিবী গঠিত হয়। অর্থাৎ মহাবিশ্বের জন্মের প্রায় ৯.৩ বিলিয়ন বছর পরে পৃথিবীর আবির্ভাব। সূত্র: USGS — Age of the Earth
৭. পরবর্তী ভূতাত্ত্বিক ও জৈব বিবর্তন
পৃথিবী জন্মের পর দীর্ঘ সময় ধরে crust, ocean, atmosphere, plate tectonics, পর্বতমালা এবং জীবজগতের বিবর্তন ঘটে। উদ্ভিদ ও মানুষ পৃথিবীর জন্মমুহূর্তের সৃষ্টি নয়; তারা পৃথিবীর বহু পরের ইতিহাসের অংশ।
বাস্তব ক্রমটি তাই: মহাবিশ্ব → নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি → ভারী মৌল → প্রাচীন গ্রহব্যবস্থা → সূর্য ও সৌরজগত → পৃথিবী → পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ও জৈব বিবর্তন।

দুইটি টাইমলাইন পাশাপাশি রাখলে মূল পার্থক্যটি আর শব্দের ব্যাখ্যায় আটকে থাকে না। ইসলামি ব্যাখ্যার ভেতরে আকাশ আগে না পৃথিবী আগে—এ নিয়ে একাধিক মত তৈরি করা সম্ভব; এমনকি ثُمَّ-কে সময়গত ক্রম না ধরেও পড়া সম্ভব। কিন্তু এই ব্যাখ্যাগত নমনীয়তার কোনোটিই সেই বাস্তব ইতিহাস তৈরি করে না যেখানে পৃথিবীর জন্মের বহু বিলিয়ন বছর আগেই নক্ষত্র, গ্যালাক্সি ও গ্রহব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল।

আকাশ আগে না পৃথিবী আগে—এই দুই বিকল্পের মধ্যে শব্দ ঘোরালেই বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান হয় না। বিজ্ঞানের সময়রেখা নির্দিষ্ট: পৃথিবী একটি অতি-পরবর্তী গ্রহ, যার জন্মই সম্ভব হয়েছে তার বহু আগের নক্ষত্রীয় ও মহাজাগতিক বিবর্তনের কারণে। এই কারণগত ইতিহাস কোরআনিক সৃষ্টিবর্ণনার কোনো পাঠ থেকেই পাওয়া যায় না।


উপসংহার

ইসলামি সৃষ্টিতত্ত্বের বিভিন্ন বর্ণনা পাশাপাশি রাখলে একটি ধারাবাহিক প্রাক-বৈজ্ঞানিক বিশ্বচিত্র সামনে আসে। আসমান ও পৃথিবীর আগেই পানির ওপর আরশ, মহাজাগতিক কলম ও লিখিত তাকদীর; আকাশ ও পৃথিবীর সংযুক্ত অবস্থা ও পরবর্তী পৃথকীকরণ; পৃথিবীর সৃষ্টি ও তার ওপর পর্বত, বরকত ও খাদ্যের ব্যবস্থা; এরপর ধোঁয়া-অবস্থার আকাশকে সাত আকাশে বিন্যস্ত করা এবং নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালায় সুশোভিত করা—এই পুরো কাঠামো আধুনিক মহাজাগতিক ইতিহাসের সঙ্গে মেলে না।

বিজ্ঞানের সময়রেখা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর, পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর। পৃথিবী আসার আগেই প্রায় ৯৩০ কোটি বছর ধরে মহাবিশ্বের ইতিহাস চলেছে। এই দীর্ঘ সময়ে নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি তৈরি হয়েছে, নক্ষত্রের ভেতরে ভারী মৌল সৃষ্টি হয়েছে, বহু নক্ষত্র জন্ম নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে এবং পৃথিবীর বহু আগেই অন্য নক্ষত্রের চারপাশে গ্রহব্যবস্থাও গড়ে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত সেই পূর্ববর্তী মহাজাগতিক ইতিহাসের উপাদান থেকেই সূর্য ও সৌরজগতের জন্ম, এবং সূর্যকে ঘিরে থাকা protoplanetary disk থেকে পৃথিবীর সৃষ্টি।

পৃথিবী তাই মহাবিশ্বের শুরু নয়; পৃথিবী মহাবিশ্বের বহু বিলিয়ন বছরের বিবর্তনের ফল। এই একটি বাস্তবতাই পৃথিবীকে সৃষ্টির প্রথমদিকের মঞ্চ বানিয়ে তার পরে আকাশীয় কাঠামো সাজানোর ধারণাকে উল্টে দেয়। পৃথিবীর শিলার লোহা, পানির অক্সিজেন, জীবদেহের কার্বন—এসবের ইতিহাসও পৃথিবীর চেয়ে পুরনো। যে গ্রহের নির্মাণসামগ্রীই পূর্ববর্তী নক্ষত্রের ইতিহাসের ফল, সেই গ্রহকে নক্ষত্রময় মহাবিশ্বের আগের পর্যায়ে বসানো বাস্তব কার্যকারণের বিপরীত।

এই সংঘাতকে “দিন” শব্দের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে মেটানো যায় না। ছয় দিনকে ছয়টি দীর্ঘ যুগ ধরলেও ঘটনাগুলোর আগে-পরে অবস্থান বদলায় না। একইভাবে ধোঁয়া-আকাশের কোনো প্রাথমিক অবস্থা পৃথিবীর আগে ছিল বলা, পৃথিবীর “সৃষ্টি” ও পরবর্তী “বিস্তার”কে আলাদা করা কিংবা ثُمَّ শব্দকে সব ক্ষেত্রে সময়গত ক্রম না ধরা—এসব ব্যাখ্যা দিয়ে আয়াতগুলোর মধ্যে ভিন্ন ক্রম তৈরি করা সম্ভব হলেও আধুনিক কসমোলজির প্রকৃত সময়রেখা তাতে পাওয়া যায় না। পৃথিবীর বহু বিলিয়ন বছর আগেই পূর্ণাঙ্গ নক্ষত্র, গ্যালাক্সি ও গ্রহব্যবস্থা ছিল—এই মৌলিক সত্য কোনো শব্দের পুনর্ব্যাখ্যায় বদলায় না।

সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৩০-কে Big Bang-এর ভবিষ্যদ্বাণী বলার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। Big Bang কোনো প্রস্তুত “আকাশ” ও “পৃথিবী”কে জোড়া অবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার ঘটনা নয়। Big Bang-এর সময় পৃথিবী ছিলই না; পৃথিবী তৈরি হয়েছে প্রায় ৯৩০ কোটি বছর পরে। বরং আকাশ ও পৃথিবী প্রথমে সংযুক্ত এবং পরে পৃথক—এই মোটিফ কোরআনের বহু আগের মিশরীয়, মেসোপটেমীয় ও অন্যান্য প্রাচীন সৃষ্টিতত্ত্বে পরিচিত ছিল। আধুনিক Big Bang আবিষ্কারের পরে সেই পুরনো sky–earth separation মোটিফকে আধুনিক কসমোলজির ভাষায় পুনর্ব্যাখ্যা করলেই তা বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস হয়ে যায় না।

পৃথিবীর স্থিরতা ও স্থিতিশীলতার বর্ণনাতেও একই প্রাক-বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়। পৃথিবীকে মানুষসহ নড়ে না যাওয়ার জন্য পাহাড় দ্বারা স্থিত করা, পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট স্থানের সোজা ওপরে স্তরবিন্যস্ত আকাশে বায়তুল মামুরের অবস্থান, সূর্যের চলাচল ও অস্ত যাওয়ার পর আরশের নিচে সিজদার বর্ণনা—এসবের সঙ্গে ধ্রুপদী ও আধুনিক সালাফি ব্যাখ্যায় স্থির পৃথিবীর ধারণা যুক্ত হয়েছে। উসাইমীনের মতো প্রভাবশালী আলেম সরাসরি কোরআন-হাদিসের এসব বক্তব্য থেকেই সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে এবং পৃথিবী স্থির—এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। অথচ বাস্তবে পৃথিবী নিজ অক্ষে ঘূর্ণায়মান, সূর্যকে প্রদক্ষিণরত এবং বৃহত্তর মহাজাগতিক গতির অংশ।

পর্বতের ক্ষেত্রেও ধর্মীয় causal model এবং ভূবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা বিপরীত। কোরআনিক বর্ণনায় পৃথিবী যাতে মানুষকে নিয়ে নড়ে বা ঢলে না পড়ে, সে জন্য পাহাড় স্থাপনের কথা এসেছে। আধুনিক ভূবিজ্ঞানে পাহাড় পৃথিবীর ওপর বসানো স্থিতিকারক খুঁটি নয়; বিশাল পর্বতমালার বহু অংশই plate tectonics, collision, subduction ও crustal deformation-এর ফল। যে tectonic dynamics পাহাড় তৈরি করে, সেই ব্যবস্থাই ভূমিকম্পেরও প্রধান উৎসগুলোর একটি।

সহিহ মুসলিমের শনিবার থেকে শুক্রবারের সৃষ্টি-বর্ণনাও একই পৃথিবীকেন্দ্রিক কাঠামো বহন করে: মাটি, পর্বত, বৃক্ষরাজি, বিপদাপদ, নূর, পশু-পাখি এবং সর্বশেষে আদম। এখানে মহাবিশ্বের বিলিয়ন বছরের পূর্ববর্তী ইতিহাস অনুপস্থিত; সৃষ্টি-সূচি শুরু হয় পৃথিবীর মাটি দিয়ে এবং শেষ হয় মানুষ দিয়ে। এমনকি বৃক্ষরাজিকে নূরের আগেও স্থাপন করা হয়েছে। এই সময়রেখা আধুনিক কসমোলজি, ভূবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের ইতিহাস নয়।

সবগুলো বর্ণনা একসঙ্গে রাখলে একটি পরিচিত কাঠামো দেখা যায়: মানুষের পৃথিবী কেন্দ্রীয় মঞ্চ, আকাশ তার ওপরে স্তরবিন্যস্ত, নক্ষত্র প্রদীপসদৃশ আকাশীয় সজ্জা, পাহাড় ভূমিকে স্থিত রাখে, আকাশ ও পৃথিবী আগে যুক্ত ছিল, আর সৃষ্টির আদিতে রয়েছে পানি, সিংহাসন ও লিখিত নিয়তি। এটি সপ্তম শতাব্দীর এবং তার আগের ধর্মীয়-কসমোলজিক্যাল জগতের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মানানসই; আধুনিক astrophysics, planetary science বা cosmology-এর সঙ্গে নয়।

আধুনিক বিজ্ঞান মহাবিশ্বকে মানুষের জন্য সাজানো একটি ছোট পৃথিবীকেন্দ্রিক স্থাপত্য হিসেবে আবিষ্কার করেনি। আবিষ্কার করেছে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের এক বিশাল বিবর্তনশীল মহাবিশ্ব, যেখানে পৃথিবী একটি অতি-পরবর্তী, স্থানীয় গ্রহমাত্র। আমাদের আগে ছিল অসংখ্য নক্ষত্র; পৃথিবীর আগেই ছিল গ্রহ; সূর্যের আগেই ছিল গ্যালাক্সির দীর্ঘ ইতিহাস; আর মানুষের আবির্ভাব মহাবিশ্বের ইতিহাসের একেবারে শেষ প্রান্তের ঘটনা।

সুতরাং ইসলামি সৃষ্টিতত্ত্ব এবং আধুনিক বিজ্ঞানের মধ্যে বিরোধ কোনো ছোটখাটো অনুবাদগত সমস্যা নয়। বিরোধটি মহাবিশ্বের বয়স, ঘটনাক্রম, কার্যকারণ, পৃথিবীর অবস্থান এবং মহাজাগতিক কাঠামোর মৌলিক স্তরে। আধুনিক জ্ঞান আবিষ্কারের পরে প্রাচীন শব্দের নতুন অর্থ তৈরি করে এই ব্যবধান ঢেকে দেওয়া যায়, কিন্তু তাতে মূল টেক্সট আধুনিক বিজ্ঞান হয়ে যায় না। টেক্সটকে তার নিজস্ব সৃষ্টিক্রম ও ঐতিহাসিক পরিবেশে পড়লে যে চিত্রটি পাওয়া যায়, সেটি আধুনিক মহাবিশ্বের নয়—একটি প্রাক-বৈজ্ঞানিক পৃথিবীকেন্দ্রিক সৃষ্টিজগতের।



তথ্যসূত্রঃ
  1. NASA Science — Cosmic History 1 2 3
  2. NASA — What Were the First Stars Like? ↩︎
  3. USGS — Geologic Time: Then and Now ↩︎
  4. Julien Decharneux, Creation and Contemplation: The Cosmology of the Qur’an and Its Late Antique Background, De Gruyter, 2023 1 2
  5. Stanford Encyclopedia of Philosophy — Nicolaus Copernicus, §2.1 Pre-Copernican Astronomy ↩︎
  6. Julien Decharneux, Creation and Contemplation: The Cosmology of the Qur’an and Its Late Antique Background, De Gruyter, 2023, বিশেষত pp. 2, 185–193 ↩︎
  7. NASA Webb — What Were the First Stars Like? ↩︎
  8. NASA Goddard — Dispersion of Elements ↩︎
  9. NASA — How Did Our Solar System Form? 1 2 3
  10. USGS — Age of the Earth ↩︎
  11. NASA — TRAPPIST-1 Is Older Than Our Solar System ↩︎
  12. NASA/JPL — Astronomers Discover Ancient System with Five Small Planets ↩︎
  13. NASA/Hubble — Messier 4 and PSR B1620-26 b ↩︎
  14. কোরআন ৩৫:৪১ ↩︎
  15. কুরআনুল কারীম, ২য় খণ্ড – ড. যাকারীয়া, পৃষ্ঠা ২৪৮২ ↩︎
  16. তাফসীরে মাযহারী, ১১তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২২ ↩︎
  17. তাফসীরে ইবনে কাসীর, খণ্ড ১০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ৪৮০-৪৮১ ↩︎
  18. কোরআন ৩১:১০ ↩︎
  19. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬৯ ↩︎
  20. ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম, ঈমান, শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহঃ) ↩︎
  21. ফতোয়ায়ে আরকানুল ইসলাম, শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন, পৃষ্ঠা ৩৭, ৩৮, ৩৯ ↩︎
  22. মাজমু‘ ফাতাওয়া ইবনু বায, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১১–১৫ ↩︎
  23. সুনান আবু দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৭০০ ↩︎
  24. সূরা তওবা, আয়াত ৩৬ ↩︎
  25. সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), হাদিস নম্বরঃ ৪৩০৫ ↩︎
  26. সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী), হাদিস নাম্বারঃ ৩১৯৩ ↩︎
  27. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৮৩-৫৮৬ ↩︎
  28. তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৫৬–২৬০ 1 2
  29. The Separation of Sky and Earth at Creation (II) ↩︎
  30. সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী), হাদিসঃ ৬৯৪৭ ↩︎
  31. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৭৯৭ ↩︎
  32. তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৪৩৮–৪৪২ ↩︎
  33. সহীহ মুসলিম, আন্তর্জাতিক হাদিস নম্বরঃ ২৭৮৯; হাদিস একাডেমীঃ ৬৯৪৭; ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৬৭৯৭ ↩︎
  34. বাইবেল, আদিপুস্তক ১:১১–১৯ ↩︎
  35. তাফসীরে কুরতুবী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৫৫–২৫৬ ↩︎
  36. তাফসীর আল-বাসীত, আল-ওয়াহিদী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩০১–৩০২ ↩︎
  37. তাফসীরে রাযী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৮০–৩৮১ ↩︎

About This Article

Genre: Quranic Cosmology Critique, Creation-Sequence Analysis, Islamic Tafsir Review, Astrophysics, Planetary Science, and Geology-Based Chronology Review

Epistemic Position: Scientific Skepticism, Secular Humanism, Evidence-Based Cosmology, Historical Criticism, Source Criticism, Anti-Apologetic Reasoning, and Naturalistic Analysis of Creation Claims

This article examines Quranic, hadith-based, and classical Islamic descriptions of the creation sequence involving the Earth, the heavens, mountains, sustenance, seven skies, stars, and cosmic order.

The central argument is that the Islamic creation sequence conflicts with modern cosmic history: the universe, stars, galaxies, heavy elements, the Sun, and older planetary systems existed long before the Earth was formed.

The article also discusses Quran 2:29 and 41:9–12, the sequence of Earth before heaven, the “smoke” of the sky, seven heavens, lamps in the nearest heaven, the throne over water, the first creation of the Pen, mountains as stabilizers, Bayt al-Ma‘mur, classical tafsir, Late Antique cosmology, stellar nucleosynthesis, solar-system formation, radiometric dating, and ancient exoplanet systems such as TRAPPIST-1, Kepler-444, and PSR B1620-26 b.

This article should be evaluated through cosmology, astrophysics, planetary science, geology, radiometric dating, source chronology, tafsir evidence, and falsifiable scientific evidence—not through miracle apologetics, elastic reinterpretation of “days,” post-hoc harmonization, selective translation, ancient seven-heaven cosmology, or the demand that a pre-scientific Earth-centered creation order be treated as modern astronomy.

আসিফ মহিউদ্দীন

আসিফ মহিউদ্দীন সম্পাদক সংশয় - চিন্তার মুক্তির আন্দোলন [email protected]

7 thoughts on

  1. অাদমকে যদি সৃষ্টি করে থাকেন তবে তাকে বেহেশতে সৃষ্টি করেছেনে । পৃথিবীর দিন রাত্রির সময় হিসেবে কেন বর্ণনা থাকবে? সেখানে কোন সুর্যের অালোর বর্ণনা করা হচ্ছে ?

  2. মুমিন বিজ্ঞানীরা তো একেবারে শহীদ হয়ে যাবে। তারা না পারবে বিজ্ঞানকে অস্বীকার করতে না পারবে কোরআনকে। না পারবে বিজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারবে কোরআনকে।

  3. ভাই বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল। আগে সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর প্রদক্ষিনের কথা বলায় গ্যালিলিওর কি অবস্থা করা হয়েছিল মনে আছে কি? তাও আবার মাত্র ৪০০ বছর আগে ১৬ শতকের দিকে।
    এখন যা না জানি তা ভবিষ্যতে জানার সম্ভাবনা রয়েছে।
    আলোর চেয়ে অন্য কোন কিছুর গতি দ্রুত যেদিন বের হবে, সেদিন রাতা-রাতি সমগ্র বিজ্ঞানের জগৎ পাল্টে যাবে। বিজ্ঞানের অনেক ভিত্তি অনেক সূত্র আবার নতুন করে আবিষ্কৃত হবে।
    আর যখনই নতুন কিছু আবিষ্কৃত হবে আর তার সঙ্গে কোরআনের সাদৃশ্য পাওয়া যাবে, তখনই আমরা বলব একথা কোরআনে আরো অনেক আগে থেকেই ছিল, শুধু পর্যাপ্ত জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে তা আমরা বুঝতে পারিনি। সুতরাং কোরআন শরীফ constant আর বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল।
    আমার কাছে আরো অনেক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে,যা কুরআন শরীফের সাথে সম্পূর্ণ রূপে মিলে যায় আলহামদুলিল্লাহ। তবে তা আপনাকে জানানো সম্পূর্ণ অর্থহীন। কারণ আপনাদের মত লোকেরা জেনেও না জানার ভান করবে, বুঝেও না বুঝার ভান করবে। ঘুমন্ত ব্যক্তিকে জাগানো যায় তবে ঘুমের ভান করা ব্যক্তিকে জাগানো যায় না। তবে যেদিন প্রকৃত অর্থেই বুঝবেন সেদিন হয়তো আর হাতে সময় থাকবে না। আমার রবের দয়া অসীম, তাই সময় থাকতে ফিরে আসুন। আল্লাহ আপনাকে হেদায়েত নসিব করুক।

Leave a comment

Your email will not be published.