মিথোলজি বা পুরাণ

ওডিসি (Odyssey): প্রত্যাবর্তন, পরিচয় ও মানবজীবনের মহাকাব্য – পর্ব ১

ভূমিকা

প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য তথা বিশ্বসাহিত্যের এক অবিসংবাদিত ও কালজয়ী স্তম্ভ হলো হোমারের মহাকাব্য (Epic)। তাঁর প্রথম সাহিত্যকর্ম ‘ইলিয়াড’ যেখানে যুদ্ধের দামামা, দৈহিক শক্তি, ধ্বংস এবং অ্যাকিলিসের ক্রোধের এক রক্তক্ষয়ী আখ্যান, সেখানে ‘ওডিসি’ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক সুরের ঝংকার। এটি কেবল এক দীর্ঘ, রোমাঞ্চকর সমুদ্রযাত্রার গল্প নয়; বরং এটি মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তা এবং শেকড়ের সন্ধানে ছুটে চলার এক চিরন্তন দলিল। ট্রয়যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে একজন মানুষের নিজের ঘর, পরিবার ও রাজ্যের দিকে ফিরে আসার যে দুর্বার আকুলতা, প্রাচীন গ্রিক দর্শনে তাকে বলা হয় প্রত্যাবর্তন (Nostos)। ওডিসি মূলত এই নস্টসেরই এক মহাজাগতিক ও মহাকাব্যিক আখ্যান। হোমার এই মহাকাব্যে এমন এক নায়কের চিত্রায়ণ করেছেন, যার প্রধান অস্ত্র শাণিত তলোয়ার বা গায়ের জোর নয়, বরং তার অসম্ভব পরিণত মস্তিষ্ক। ওডিসিউসের চরিত্রটি তাই প্রথাগত গ্রিক বীরদের চেয়ে অনেকটাই আলাদা; সে ধূর্ত, বাস্তববাদী এবং যেকোনো ভয়াবহ প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে সক্ষম। গ্রিক ভাষায় এই বিশেষ বুদ্ধিবৃত্তিক গুণ ও চাতুর্যকে বলা হয় কৌশল (Metis)

এই মহাকাব্যের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে মানবচরিত্রের নানা দিক – প্রলোভন, ধৈর্য, অহংকার এবং নৈতিকতার এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য। সমুদ্রের পদে পদে ওত পেতে থাকা দানবীয় বাধা, সাইরেনদের মায়াবী জাদুকরী গান কিংবা দেবী ক্যালিপসোর অমরত্বের প্রলোভন – এসব কেবল বাহ্যিক বা শারীরিক বিপদ নয়, বরং মানুষের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা ও নৈতিকতার এক গভীর রূপক পরীক্ষা। এই যাত্রাপথে আমরা দেখতে পাই, অলিম্পাসের দেবতাদের রোষানল ও খেয়ালখুশির শিকার হয়েও একজন মরণশীল মানুষ কীভাবে তার চূড়ান্ত গন্তব্যে অবিচল থাকতে পারে। প্রাচীন গ্রিক সমাজে মানুষের নৈতিকতা ও সভ্যতার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি ছিল আতিথেয়তা (Xenia), যা এই মহাকাব্যের একটি অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ও দার্শনিক ভিত্তি। যারা এই পবিত্র নিয়ম লঙ্ঘন করেছে – হোক সে সাইক্লপস পলিফেমাস কিংবা ইথাকার ঔদ্ধত্যপূর্ণ প্রণয়প্রার্থীরা – তাদের সবার জন্যই অপেক্ষা করেছে অনিবার্য পতন। অহংকার বা সীমালঙ্ঘন, যাকে গ্রিকরা বলতো অহংকার (Hubris), তা কীভাবে মানুষের পতন ডেকে আনে, তার চমৎকার চিত্রায়ণ রয়েছে এখানে।

তবে ওডিসি কেবল ওডিসিউসের একার গল্প নয়; এটি একইসঙ্গে দুটি সমান্তরাল অস্তিত্বের গল্প। একদিকে এটি পেনেলোপির অটল বিশ্বস্ততা ও প্রজ্ঞার আখ্যান, যিনি তার বুনন ও খোলার কৌশলে বছরের পর বছর প্রণয়প্রার্থীদের ঠেকিয়ে রেখেছেন। অন্যদিকে এটি টেলেমাকাসের বেড়ে ওঠার গল্প – কীভাবে পিতৃহীন এক অসহায় বালক অ্যাথেনার প্রেরণায় তার নিজস্ব আত্মবিশ্বাস খুঁজে পায় এবং নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় এক যোগ্য পুরুষে রূপান্তরিত হয়, গ্রিক ভাষায় এই আত্মিক বিকাশকে বলা হয় উত্তরাধিকার (Telemachy)। অজস্র বিপত্তি পেরিয়ে নিজ অস্তিত্বকে পুনরায় প্রমাণ করার যে দীর্ঘ সংগ্রাম, তা এই আখ্যানকে একটি নিছক রূপকথার গণ্ডি পেরিয়ে এক গভীর দার্শনিক যাত্রায় পরিণত করেছে। হোমার এখানে দেখিয়েছেন যে, একজন মানুষের আসল যুদ্ধ কেবল রণভূমিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং নিজের আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখা এবং শত প্রলোভন ও বাধা ডিঙিয়ে নিজের পরিবারের কাছে ফিরে আসাই হলো মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠতম জয়।

ওডিসির পটভূমি (Background to the Odyssey): মহাকাব্য, বীর ও গ্রিক জগতের পরিচয়

ওডিসি কী (What is the Odyssey): মহাকাব্যের পরিচয় ও গুরুত্ব

হোমার ও মহাকাব্যের পটভূমি (Homer and the Background of the Epic): প্রাচীন গ্রিসের কথ্য ঐতিহ্য

বিশ্বসাহিত্যের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে যেসব সাহিত্যকর্মকে বিবেচনা করা হয়, তার একেবারে প্রথম সারিতে অবস্থান করছে প্রাচীন গ্রিক মহাকাব্য (Epic)। খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর দিকে গ্রিস ভূখণ্ডে সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক নতুন জোয়ার শুরু হয়। এই সময়টিতেই রচিত হয় পশ্চিমা সাহিত্যের দুটি অমর স্তম্ভ – ইলিয়াড (Iliad) এবং ওডিসি (Odyssey)। ঐতিহ্যগতভাবে এই দুটি মহাকাব্যের রচয়িতা হিসেবে হোমার (Homer) নামের এক অন্ধ চারণকবির নাম উল্লেখ করা হয়। প্রাচীন গ্রিকরা বিশ্বাস করত যে, হোমার ছিলেন একজন ঐশ্বরিক ক্ষমতাসম্পন্ন কবি, যার কণ্ঠে দেবতারা কথা বলতেন। তবে আধুনিক সাহিত্য সমালোচক ও ইতিহাসবিদদের মতে, এই মহাকাব্যগুলো কোনো একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির একক সৃষ্টি নয়। এগুলো শত শত বছর ধরে গ্রিক চারণকবিদের মুখে মুখে ফেরা গল্পগাথার এক চূড়ান্ত সংকলন, যা পরবর্তীকালে লিখিত রূপ লাভ করে। এই দীর্ঘ বিতর্কিত বিষয়টিকে সাহিত্য জগতে হোমারীয় প্রশ্ন (Homeric Question) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় (Graziosi, 2016)।

প্রাচীন গ্রিসের ব্রোঞ্জ যুগ (Bronze Age) থেকে শুরু করে অন্ধকার যুগ বা ডার্ক এজে মানুষের বিনোদন ও ইতিহাস সংরক্ষণের একমাত্র উপায় ছিল মৌখিক ঐতিহ্য (Oral Tradition)। চারণকবিরা এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরে ঘুরে রাজাদের ভোজসভায় বীরত্বগাথা শোনাতেন। তারা কোনো স্ক্রিপ্ট বা বই দেখে পড়তেন না, বরং তাদের বিশাল স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করে গান গাইতেন। হোমারের মহাকাব্যগুলো রচিত হয়েছে এক বিশেষ ধরনের ছন্দোবদ্ধ বিন্যাসে, যাকে বলা হয় ড্যাকটাইলিক হেক্সামিটার (Dactylic Hexameter)। এই ছন্দের জাদুকরী কাঠামোর কারণে হাজার হাজার লাইনের কবিতা মনে রাখা অত্যন্ত সহজ হতো। বিংশ শতাব্দীতে মিলম্যান প্যারি এবং আলবার্ট লর্ড নামের দুই পণ্ডিত যুগান্তকারী গবেষণার মাধ্যমে দেখান যে, হোমারীয় মহাকাব্যগুলো মৌখিক সূত্রবদ্ধ রচনা (Oral-Formulaic Composition)-এর নিখুঁত উদাহরণ। এখানে নির্দিষ্ট কিছু বাক্যাংশ বা বিশেষণ বারবার ঘুরেফিরে আসে, যা কবিকে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন লাইন তৈরি করতে সাহায্য করত (Lord, 1960)।

ইলিয়াড যেখানে ট্রয়যুদ্ধের দশম বছরের কয়েক সপ্তাহের একটি রক্তক্ষয়ী ও ধ্বংসাত্মক আখ্যান, সেখানে ওডিসি হলো সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে একজন মানুষের নিজের ঘরে ফেরার গল্প। প্রথমটিতে যুদ্ধের দামামা, দৈহিক আস্ফালন এবং মৃত্যুর জয়গান গাওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়টিতে ফুটে উঠেছে টিকে থাকার নিরন্তর লড়াই, সমুদ্রের বিশালতা, দানবদের সাথে সংঘাত এবং মানুষের ভেতরের বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ। যুদ্ধ শেষে গ্রিক বীররা যখন নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাচ্ছিল, তখন ইথাকার রাজা ওডিসিউস (Odysseus)-এর ভাগ্যে জোটে এক অন্তহীন দুর্ভোগ। দেবতাদের রোষানলে পড়ে তাকে দীর্ঘ দশ বছর সাগরের বুকে দিকভ্রান্ত হয়ে ঘুরতে হয়। এই মহাকাব্যটি শুধু একজন বীরের অ্যাডভেঞ্চার নয়, এটি প্রাচীন গ্রিসের সমাজ, রাজনীতি, দর্শন এবং মানুষের মনস্তত্ত্বের এক বিশাল বিশ্বকোষ। আড়াই হাজার বছর পরও এই সাহিত্যকর্মটি তার আবেদন একটুও হারায়নি, কারণ এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইটি সর্বজনীন ও চিরন্তন।

আখ্যানের মূল কাঠামো ও বিন্যাস (Main Structure and Arrangement of the Narrative): জটিল বুনন ও স্বগতোক্তি

হোমারের এই মহাকাব্যটি এর আখ্যানকৌশল বা ন্যারেশন স্টাইলের জন্য সাহিত্যজগতে একটি বিস্ময় হিসেবে স্বীকৃত। সাধারণত কোনো গল্প শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি সরল রেখায় এগোয়। কিন্তু হোমার এই প্রথাগত রৈখিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে অত্যন্ত জটিল এবং আধুনিক একটি বিন্যাস তৈরি করেছেন। মহাকাব্যটি শুরু হয় না ট্রয়যুদ্ধের শেষের দিনগুলো থেকে, বরং এটি শুরু হয় ট্রয়যুদ্ধের প্রায় দশ বছর পর থেকে। গল্প বলার এই বিশেষ কৌশলটিকে ল্যাটিন ভাষায় বলা হয় ইন মিডিয়া রেস (In Medias Res), যার অর্থ হলো ‘মাঝখান থেকে শুরু হওয়া’। মহাকাব্যের একেবারে শুরুতে আমরা দেখি ওডিসিউস দেবী ক্যালিপসোর দ্বীপে বন্দি হয়ে আছেন এবং তার নিজের রাজ্য ইথাকায় একদল উদ্ধত তরুণ তার সিংহাসন দখলের পাঁয়তারা করছে। গল্পের এই মাঝখান থেকে শুরু হওয়ার কাঠামোটি পাঠকের মনে এক তীব্র কৌতূহল তৈরি করে এবং অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি দারুণ সংযোগ স্থাপন করে (Rutherford, 1996)।

পুরো মহাকাব্যটি ২৪টি সর্গে বা বইয়ে বিভক্ত, যাকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম থেকে চতুর্থ সর্গ পর্যন্ত অংশটিকে বলা হয় টেলেম্যাকি (Telemachy)। এখানে ওডিসিউস উপস্থিত নেই; বরং তার ছেলে টেলেমাকাস (Telemachus) তার পিতার সন্ধানে বের হয়। এই অংশটি মূলত একজন তরুণের আত্মবিকাশ ও পুরুষত্বে পদার্পণের গল্প। পঞ্চম থেকে দ্বাদশ সর্গ পর্যন্ত অংশে ওডিসিউসের দীর্ঘ এবং রোমাঞ্চকর সমুদ্রযাত্রার বিবরণ পাওয়া যায়। আর ত্রয়োদশ থেকে চব্বিশতম সর্গ পর্যন্ত অংশে বর্ণিত হয়েছে ইথাকায় ওডিসিউসের গোপন প্রত্যাবর্তন, ছদ্মবেশ এবং শত্রুদের ওপর রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধের আখ্যান। এই তিনটি সমান্তরাল আখ্যান কীভাবে শেষ পর্যন্ত একটি বিন্দুতে এসে মিলিত হয়, তা হোমারের অসামান্য সাহিত্যিক দক্ষতার প্রমাণ দেয়। পাঠক একই সাথে ইথাকার রাজনৈতিক সংকট এবং সাগরের বুকে একজন বীরের টিকে থাকার লড়াইয়ের সাথে যুক্ত থাকতে পারেন।

এই কাঠামোর সবচেয়ে চমৎকার দিকটি হলো এর ফ্ল্যাশব্যাক মেকানিজম বা অতীত স্মৃতিচারণ। ফাইয়াকীয়দের রাজা আলকিনোয়াসের প্রাসাদে বসে ওডিসিউস যখন নিজের পরিচয় প্রকাশ করেন, তখন তিনি তার গত তিন বছরের ভয়ানক সব অভিজ্ঞতার কথা নিজের মুখে বর্ণনা করেন। এই অংশটিকে বলা হয় অ্যাপোলোগোই (Apologoi)। সাইক্লপস, সাইরেন, সার্সির জাদু এবং পাতাললোকে ভ্রমণের মতো রোমাঞ্চকর ঘটনাগুলো কোনো তৃতীয় ব্যক্তির বর্ণনায় আসেনি, বরং ওডিসিউস নিজে স্বগতোক্তি (First-person Narrative)-এর মাধ্যমে সেগুলো শুনিয়েছেন। এই কৌশলটি গল্পটিকে অনেক বেশি জীবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। একজন মানুষ তার নিজের ট্রমা এবং অভিজ্ঞতাগুলো কীভাবে বয়ান করে, তা এখানে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। আখ্যানের এই স্তর বা লেয়ারিং দেখায় যে, এটি কেবল একটি প্রাচীন লোককথা নয়, এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং উন্নত সাহিত্যকর্ম।

নস্টস: প্রত্যাবর্তনের দর্শন (Nostos: The Philosophy of Return): আত্মপরিচয় ও শেকড়ের সন্ধান

প্রাচীন গ্রিক দর্শনে এবং সাহিত্যে নস্টস (Nostos) শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর আক্ষরিক অর্থ হলো ‘বাড়ি ফেরা’ বা ‘প্রত্যাবর্তন’। আধুনিক ইংরেজি ভাষার নস্টালজিয়া শব্দটি এই নস্টস থেকেই এসেছে, যার অর্থ হলো বাড়ি ফেরার জন্য মানুষের ভেতরের তীব্র আকুলতা এবং যন্ত্রণা। হোমারের এই মহাকাব্যটি আগাগোড়া এই নস্টসের ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ওডিসিউসের কাছে তার রাজ্য ইথাকা কোনো বিশাল বা সম্পদশালী সাম্রাজ্য ছিল না; এটি ছিল একটি রুক্ষ ও পাথুরে দ্বীপ। তারপরও এই পাথুরে ভূখণ্ডের জন্যই তার এত ব্যাকুলতা। কারণ সেখানে তার শেকড় প্রোথিত, সেখানে তার পরিবার অবস্থান করছে। নস্টস কেবল একটি ভৌগোলিক গন্তব্য নয়, এটি হলো একজন মানুষের তার হারানো আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার এক মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা (Fowler, 2004)।

এই প্রত্যাবর্তনের দর্শনটি গ্রিক বীরত্বের প্রচলিত ধারণাকে পুরোপুরি চ্যালেঞ্জ করে। ইলিয়াডে আমরা দেখি, গ্রিক বীরদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য হলো যুদ্ধক্ষেত্রে সম্মানজনক মৃত্যু বরণ করে ক্লিওস (Kleos) বা শাশ্বত খ্যাতি অর্জন করা। একিলিস দীর্ঘ সাধারণ জীবনের বদলে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গৌরবময় জীবন বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু ওডিসিউস এই ক্লিওসকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি রণভূমিতে বীরের মতো মরে যাওয়ার চেয়ে যেকোনো মূল্যে বেঁচে থাকাকে এবং নিজের গন্তব্যে পৌঁছানোকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এমনকি দেবী ক্যালিপসো যখন তাকে অমরত্ব এবং অনন্ত যৌবনের প্রস্তাব দেন, তখনো তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তিনি অমরত্বের বিনিময়ে তার মানবিক সত্তা, তার বার্ধক্য এবং তার স্ত্রীর সাথে কাটানো সাধারণ মরণশীল জীবনটিকেই বেছে নিয়েছিলেন। এই সিদ্ধান্ত তুলে ধরতে চায়, একজন মানুষের কাছে তার শেকড় এবং মানবিক পরিচয়ের মূল্য যেকোনো ঐশ্বরিক প্রলোভনের চেয়ে অনেক বেশি।

সাগরের বুকে ওডিসিউসের এই দীর্ঘ ভ্রমণ আসলে মানুষের অবচেতন মনের এক বিশাল রূপক। সাগর হলো সেই অনিশ্চিত এবং ভীতিকর জগত, যেখানে মানুষের নিয়ন্ত্রণ বলতে কিছু নেই। এই যাত্রাপথে লোটাস-ভোজীদের দ্বীপে প্রলোভন আসে অতীত ভুলে যাওয়ার, যাকে গ্রিকরা বলত বিস্মৃতি (Lethe)। শেকড় ভুলে গেলে মানুষের অস্তিত্বের আর কোনো অর্থ থাকে না। ওডিসিউস তার সমস্ত প্রলোভন ও বাধা অতিক্রম করে নিজের স্মৃতি এবং লক্ষ্যকে অটুট রেখেছেন। তার এই যাত্রা আমাদের শেখায় যে, জীবনের সার্থকতা কেবল বিশ্বজয়ে বা অসীম ক্ষমতা অর্জনে নিহিত নেই; এটি নিহিত রয়েছে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখে নিজ পরিচয়ে, সসম্মানে নিজের গৃহে ফিরে আসায়। নস্টসের এই গভীর দর্শনটিই এই মহাকাব্যকে তিন হাজার বছর ধরে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের কাছে এত বেশি প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।

গ্রিক সমাজব্যবস্থা ও নৈতিকতার দর্পণ (Greek Social Structure and the Mirror of Morality): জেনিয়া ও অইকোস

হোমারের এই সাহিত্যকর্মটিকে প্রাচীন গ্রিসের ব্রোঞ্জ এবং প্রাথমিক লৌহ যুগের সমাজব্যবস্থার একটি নিখুঁত এনসাইক্লোপিডিয়া বা বিশ্বকোষ বলা যায়। এই সমাজের সবচেয়ে বড় এবং পবিত্র নিয়মটি ছিল জেনিয়া (Xenia) বা আতিথেয়তা। আধুনিক যুগে আতিথেয়তা বলতে আমরা যা বুঝি, প্রাচীন গ্রিসে তার অর্থ ছিল অনেক বেশি গভীর ও পবিত্র। এটি ছিল এমন একটি চুক্তি, যা গৃহস্বামী এবং অতিথির মধ্যে একটি অলিখিত কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী নৈতিক বন্ধন তৈরি করত। স্বয়ং দেবতাদের রাজা জিউস ছিলেন এই নিয়মের রক্ষক। পুরো আখ্যান জুড়ে আমরা দেখতে পাই যে, কারা এই নিয়ম পালন করেছে এবং কারা এটি লঙ্ঘন করে চরম পরিণতি ভোগ করেছে। নেস্টর, মেনেলাউস এবং ফাইয়াকীয়রা জেনিয়ার নিয়ম পালন করে সভ্যতার চরম নিদর্শন দেখিয়েছে, অন্যদিকে সাইক্লপস এবং লেস্ট্রিগোনীয়রা আতিথেয়তা লঙ্ঘন করে বন্যতার প্রতীক হয়ে উঠেছে (Griffin, 1987)।

গ্রিক সমাজের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিল অইকোস (Oikos) বা গৃহ। অইকোস বলতে কেবল স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানদের বোঝাত না; এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল পরিবারের সমস্ত সম্পদ, দাস-দাসী, গবাদিপশু এবং পারিবারিক সম্মান। একটি সুস্থ অইকোস ছিল সমাজের মূল ভিত্তি। ওডিসিউসের দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে ইথাকার রাজপ্রাসাদে এই অইকোসের যে চরম অবক্ষয় ঘটেছিল, তা এই মহাকাব্যের অন্যতম প্রধান সংঘাত। ইথাকার একশ আটজন প্রণয়প্রার্থী যখন প্রাসাদে জাঁকিয়ে বসে, তখন তারা কেবল ওডিসিউসের সম্পদই লুট করছিল না, তারা ইথাকার সমাজের নৈতিক কাঠামোটিকেও ভেতর থেকে পচিয়ে দিচ্ছিল। তারা জেনিয়ার নিয়মকে অবজ্ঞা করে নিজেদের অতিথি হিসেবে দাবি করত এবং দখলদারের মতো আচরণ করত। এই সামাজিক পচন দূর করার জন্যই ওডিসিউসের প্রত্যাবর্তন অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।

এই মহাকাব্যে সমাজকাঠামোর পাশাপাশি নারী ও দাসদের অবস্থানও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। ওডিসিউসের স্ত্রী পেনেলোপি (Penelope) কেবল একজন অপেক্ষমাণ নারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান শাসক, যিনি তার স্বামীর অবর্তমানে নিজের বুদ্ধি দিয়ে ইথাকার রাজবংশকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তিনি তার মেটিস দিয়ে একশ আটজন শত্রুকে তিন বছর ধরে বোকা বানিয়ে রেখেছিলেন। অন্যদিকে, সমাজের সবচেয়ে নিচু স্তরের একজন সাধারণ দাস বা শূকরপালক ইউমেয়াস (Eumaeus)-এর চরিত্রটি গ্রিক সাহিত্যের ইতিহাসে অত্যন্ত অনন্য। সে তার প্রভুর প্রতি যে অবিচল বিশ্বস্ততা দেখিয়েছে, তা অনেক অভিজাত মানুষের আনুগত্যকেও হার মানায়। ইউমেয়াসের চরিত্রটি দেখায় যে, নৈতিকতা ও আভিজাত্য কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণির একচেটিয়া সম্পদ নয়। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের এই নিখুঁত চিত্রায়ণ মহাকাব্যটিকে একটি জীবন্ত সামাজিক দর্পণে পরিণত করেছে।

মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ও চরিত্রের বহুমাত্রিকতা (Psychological Transformation and Multidimensionality of Characters): মেটিস ও সহনশীলতা

হোমারের মহাকাব্যে চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা এবং বহুমাত্রিকতা এর অন্যতম বড় শক্তি। প্রথাগত মহাকাব্যগুলোতে নায়কেরা সাধারণত একমাত্রিক বা একগুঁয়ে প্রকৃতির হয়ে থাকেন, যারা কেবল গায়ের জোরে সবকিছু জয় করতে চান। কিন্তু ওডিসিউস হলেন প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের সবচেয়ে বহুমাত্রিক চরিত্র, যাকে হোমার পলিট্রোপস (Polytropos) বা ‘বহু রূপের মানুষ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি একই সাথে একজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, একজন ধূর্ত চোর, একজন বাগ্মী বক্তা এবং একজন স্নেহশীল পিতা। তিনি জানেন যে সাগরের দানবদের সাথে পেশিশক্তি বা বিয়া (Bia) দিয়ে লড়াই করা সম্ভব নয়। তাই তিনি তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি বা মেটিস (Metis)-এর আশ্রয় নিয়েছেন। সাইক্লপসের গুহায় নিজেকে ‘কেউ নয়’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া বা সাইরেনদের গান শোনার সময় নিজেকে মাস্তুলে বেঁধে রাখা – এই সবকিছুই তার অসামান্য উপস্থিত বুদ্ধির প্রমাণ দেয় (Heubeck et al., 1988)।

ওডিসিউসকে গ্রিক সাহিত্যে “পলিটলাস” বা ‘যিনি অনেক কিছু সহ্য করেছেন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তার এই চরম সহনশীলতা বা এন্ডিউরেন্স (Endurance) কেবল শারীরিক কষ্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছিল এক চূড়ান্ত মানসিক দৃঢ়তা। ইথাকায় ফিরে আসার পর ভিখারির ছদ্মবেশে নিজেরই প্রাসাদে দিনের পর দিন অপমান সহ্য করার ক্ষমতা দেখায় যে, চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য তিনি নিজের অহংকারকেও বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন। এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর কেবল ওডিসিউসের মধ্যেই ঘটেনি; তার ছেলে টেলেমাকাসের মাঝেও আমরা একটি চমৎকার বিবর্তন দেখতে পাই। একজন ভীরু ও অবদমিত বালক থেকে শুরু করে একজন যোগ্য যোদ্ধা ও রাজপুত্র হিসেবে টেলেমাকাসের এই রূপান্তর বা ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট অত্যন্ত প্রেরণাদায়ক। সে তার পিতার ছায়ায় থেকে শেখে কীভাবে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং কীভাবে বৃহত্তর স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

মহাকাব্যটিতে যুদ্ধফেরত সৈনিকদের মানসিক ট্রমা এবং তাদের সমাজে পুনরায় মিশে যাওয়ার যে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই, তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিত্রিত হয়েছে। দশ বছর রণভূমিতে কাটানোর পর একজন মানুষ যখন সাধারণ জীবনে ফিরে আসতে চায়, তখন তাকে যে ভয়াবহ মানসিক বিচ্ছিন্নতা বা এলিয়েনেশনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, ওডিসিউসের সমুদ্রযাত্রা মূলত তারই এক বিরাট রূপক। তাকে পদে পদে নিজের নাবিকদের সাহস জোগাতে হয়েছে, আবার নিজের ভেতরের হতাশাগুলোকে সযত্নে লুকিয়ে রাখতে হয়েছে। মানুষের ভেতরের লোভ, ভীতি এবং টিকে থাকার আদিম প্রবৃত্তির এই নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ মহাকাব্যটিকে একটি সাধারণ অ্যাডভেঞ্চার গল্প থেকে এক কালজয়ী দার্শনিক দলিলে উন্নীত করেছে।

বিশ্বসাহিত্যে ওডিসির কালজয়ী প্রভাব (Timeless Influence of the Odyssey in World Literature): পশ্চিমা সাহিত্যের ডিএনএ

আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে রচিত হলেও, পশ্চিমা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এমন কোনো শাখা নেই যেখানে হোমারের এই মহাকাব্যের প্রভাব পড়েনি। এই সাহিত্যকর্মটিকে পুরো পশ্চিমা ক্যাননের ডিএনএ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রোমান সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে বিখ্যাত কবি ভার্জিল যখন রোমের জাতীয় মহাকাব্য ইনিড রচনা করেন, তখন তিনি সরাসরি হোমারের আখ্যানকৌশল এবং প্রত্যাবর্তনের থিম ধার করেছিলেন। পরবর্তীতে দান্তে থেকে শুরু করে শেকসপিয়র পর্যন্ত সবাই কোনো না কোনোভাবে এই প্রাচীন কাঠামোর ওপর নির্ভর করেছেন। মানুষের জীবনের একটি সুদীর্ঘ যাত্রা, পথে অসংখ্য বাধা, প্রলোভন এবং শেষে আত্মোপলব্ধির স্তরে পৌঁছানোর যে ধারণা, তা জোসেফ ক্যাম্পবেলের মতে পৃথিবীর সব গল্পের আদি কাঠামো বা মোনোমিথ (Monomyth)-এর নিখুঁত রূপ।

আধুনিক সাহিত্যে এই মহাকাব্যের প্রভাব আরও বেশি চমকপ্রদ। বিংশ শতাব্দীর আধুনিকতাবাদের চূড়ান্ত নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত আইরিশ লেখক জেমস জয়েস তার ইউলিসিস উপন্যাসে হোমারের বিশাল সামুদ্রিক মহাকাব্যকে ডাবলিন শহরের মাত্র এক দিনের সাধারণ ঘটনার ফ্রেমে আটকে দিয়েছিলেন। জয়েস দেখিয়েছিলেন যে, সাধারণ মানুষের আটপৌরে জীবনের মধ্যেই এক মহাকাব্যিক লড়াই লুকিয়ে থাকে। একইভাবে, মার্গারেট অ্যাটউডের মতো নারীবাদী লেখকরা দ্য পেনেলোপিয়াড রচনার মাধ্যমে এই মহাকাব্যের নারী চরিত্রগুলোকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। তারা পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে পেনেলোপি এবং দাসীদের নীরব কণ্ঠস্বরগুলোকে সাহিত্যে আবার জাগিয়ে তুলেছেন।

সাহিত্য পেরিয়ে চলচ্চিত্র, টেলিভিশন এবং আধুনিক পপ-কালচারেও এই আখ্যানকৌশল একটি অলিখিত ব্যাকরণ হিসেবে কাজ করে। রোড মুভি থেকে শুরু করে সাই-ফাই স্পেস এক্সপ্লোরেশনের গল্প – সবখানেই একটি দল কোনো গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য দীর্ঘ যাত্রা করে এবং প্রতি পর্বে নতুন নতুন দানব বা নৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি হয়, যা সরাসরি হোমারের কাঠামো থেকে অনুপ্রাণিত। এই মহাকাব্যটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মানবজীবনের প্রতিটি পদক্ষেপই এক একটি পরীক্ষা। আড়াই হাজার বছর পরও আমরা এই বইটি পড়ি কারণ আমরা ওডিসিউসের মাঝে নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। মানুষের কষ্ট, সংগ্রাম, বেঁচে থাকার তীব্র আকুলতা এবং নিজের শেকড় খুঁজে পাওয়ার যে চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা, তা হোমার যে ভাষায় লিপিবদ্ধ করে গেছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনোদিন পুরোনো হবে না।

হোমার (Homer): কবি, কিংবদন্তি ও হোমারীয় প্রশ্ন

হোমারের ঐতিহাসিক অস্তিত্ব ও কিংবদন্তি (Historical Existence and Legends of Homer)

প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও পশ্চিমা ক্যাননের আদি পিতা হিসেবে হোমার (Homer)-এর নাম এমনভাবে মিশে আছে, যেন তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং একটি সম্পূর্ণ যুগের প্রতিমূর্তি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মহান কবির নিজের জীবন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। প্রাচীন গ্রিকরা হোমারকে এক ঐশ্বরিক ক্ষমতাসম্পন্ন কবি হিসেবে ভক্তি করত। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, হোমার ছিলেন একজন অন্ধ চারণকবি বা অয়িডোস (Aoidos), যিনি গ্রিসের এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরে ঘুরে নিজের বীণার সুরে মহাকাব্য শোনাতেন। প্রাচীনকালের বেশ কয়েকটি শহর, যেমন কায়োস, স্মির্না এবং কলোফোন, হোমারকে তাদের নিজেদের সন্তান হিসেবে দাবি করত। তবে হোমারের জীবনকাল নিয়েও প্রাচীন লেখকদের মধ্যে ব্যাপক মতভেদ রয়েছে। বিখ্যাত গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাসের মতে, হোমার তার চেয়ে মাত্র চারশ বছর আগে, অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব নবম শতাব্দীর দিকে বেঁচে ছিলেন। আবার অন্যান্য সূত্র দাবি করে যে, হোমার ট্রয়যুদ্ধ (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতাব্দী) শেষ হওয়ার পরপরই পৃথিবীতে এসেছিলেন (Graziosi, 2002)।

হোমারকে অন্ধ হিসেবে চিত্রিত করার পেছনে একটি গভীর পৌরাণিক ও দার্শনিক প্রতীকী অর্থ লুকিয়ে আছে। গ্রিক পুরাণে অন্ধত্বকে অনেক সময় আধ্যাত্মিক বা ঐশ্বরিক দৃষ্টির প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। যেমন, বিখ্যাত ভবিষ্যদ্বক্তা টাইরেসিয়াস ছিলেন অন্ধ, কিন্তু তিনি অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ দেখতে পারতেন। হোমার অন্ধ ছিলেন বলে বিশ্বাস করা হতো যে, তার বাহ্যিক দৃষ্টি না থাকলেও তার ভেতরের ঐশ্বরিক দৃষ্টি বা ইনার ভিশন (Inner Vision) অত্যন্ত প্রখর ছিল। এই ভেতরের দৃষ্টির মাধ্যমেই তিনি দেবতাদের ইচ্ছা এবং মানবজীবনের সবচেয়ে সূক্ষ্ম আবেগগুলোকে এত নিখুঁতভাবে তার গানে তুলে আনতে পেরেছিলেন। হোমারের অন্ধত্বের এই কিংবদন্তি পরবর্তীকালে সাহিত্যিকদের কাছে এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, অনেক রোমান ও রেনেসাঁ যুগের ভাস্কর্যে হোমারকে একজন বৃদ্ধ, চোখ বন্ধ করা এবং বীণা হাতে বসে থাকা অবস্থায় তুলে ধরা হয়েছে।

তবে আধুনিক ইতিহাসবিদরা হোমারের এই রোমান্টিক ও কিংবদন্তি রূপটিকে খুব সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করেন। তাদের মতে, হোমার হয়তো সত্যিই একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান চারণকবি ছিলেন, যিনি খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম বা সপ্তম শতাব্দীর দিকে গ্রিসের আয়োনিয়া অঞ্চলে বাস করতেন। ওই সময়ে গ্রিসে কোনো নির্দিষ্ট লিখিত সাহিত্যের প্রচলন ছিল না, তাই তার জীবনকাহিনি সংরক্ষণের কোনো উপায়ও ছিল না। হোমারের নামটির উৎপত্তি নিয়েও নানা তত্ত্ব রয়েছে। গ্রিক ভাষায় হোমার শব্দের একটি অর্থ হলো ‘যে ব্যক্তি অন্যদের সাথে বন্দি’ বা ‘যে ব্যক্তি অন্ধ’। আবার কেউ কেউ মনে করেন, হোমার কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম নয়, বরং এটি একটি উপাধি, যা সে যুগের শ্রেষ্ঠ চারণকবিদের দেওয়া হতো। এই সমস্ত রহস্য এবং কিংবদন্তি মিলে হোমারকে সাহিত্যের ইতিহাসে এক অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং চিরন্তন ধাঁধায় পরিণত করেছে।

হোমারীয় প্রশ্ন: একক রচয়িতা নাকি বহু কবির সংকলন (The Homeric Question: Single Author or a Compilation of Many Poets)

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে পশ্চিমা সাহিত্য সমালোচকদের মধ্যে একটি অত্যন্ত জটিল বিতর্কের জন্ম হয়, যা আজও সাহিত্য ও ইতিহাস গবেষণার একটি অন্যতম প্রধান বিষয়। এই বিতর্কটিকে বলা হয় হোমারীয় প্রশ্ন (Homeric Question)। এর মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো: হোমার কি সত্যিই একজন একক ব্যক্তি ছিলেন, নাকি ইলিয়াড এবং ওডিসি মহাকাব্য দুটি বহু বছর ধরে বহু চারণকবির মুখে মুখে ফেরা গল্পগাথার এক সম্মিলিত রূপ? ১৭৯৫ সালে জার্মান পণ্ডিত ফ্রিডরিখ অগাস্ট উলফ তার প্রোলেগোমেনা অ্যাড হোমেরাম (Prolegomena ad Homerum) নামক গ্রন্থে প্রথম এই প্রশ্নটি জোরালোভাবে উত্থাপন করেন। উলফ দাবি করেন যে, হোমারের যুগে গ্রিসে কোনো বর্ণমালা বা লেখার পদ্ধতি ছিল না। তাই এত বিশাল দুটি মহাকাব্য (প্রায় আটাশ হাজার লাইন) কোনো একক মানুষের পক্ষে মুখস্থ করে রচনা করা একেবারেই অসম্ভব। উলফের মতে, এই মহাকাব্যগুলো মূলত অনেকগুলো ছোট ছোট খণ্ডগানের সমষ্টি, যা পরবর্তীকালে কোনো একজন সম্পাদক বা সম্পাদকমণ্ডলী একত্র করে লিখিত রূপ দিয়েছিলেন (Fowler, 2004)।

উলফের এই তত্ত্ব সাহিত্যজগতে দুটি প্রধান শিবিরের জন্ম দেয়: বিশ্লেষক বা অ্যানালিস্ট (Analysts) এবং ঐকিক বা ইউনিটেরিয়ান (Unitarians)। অ্যানালিস্টদের মতে, মহাকাব্যগুলোর ভেতরে প্রচুর অসঙ্গতি, ভাষার ভিন্নতা এবং কাহিনীর পুনরাবৃত্তি রয়েছে। যেমন, কোনো একটি চরিত্র এক জায়গায় মারা যাওয়ার পর আবার অন্য সর্গে জীবিত অবস্থায় ফিরে এসেছে। এই ত্রুটিগুলো দেখায় যে, এগুলো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কবির দ্বারা রচিত হয়েছিল এবং পরে জোড়াতালি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ইউনিটেরিয়ানরা বিশ্বাস করেন যে, মহাকাব্য দুটির মূল কাঠামো, থিম এবং চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ এতটাই সুসংগঠিত এবং নিখুঁত যে, এর পেছনে অবশ্যই একজন একক জিনিয়াসের হাত রয়েছে। তাদের মতে, ছোটখাটো ত্রুটিগুলো দীর্ঘকাল ধরে মুখে মুখে ফেরা বা ট্রান্সমিশনের কারণে যুক্ত হতে পারে, কিন্তু এর মূল স্রষ্টা হোমার নামের একজন ব্যক্তিই ছিলেন।

এই বিতর্কটি কেবল হোমারের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তোলেনি, এটি সাহিত্যের আদিম রূপ এবং তার বিকাশের প্রক্রিয়া নিয়েও একটি গভীর গবেষণার পথ খুলে দেয়। ইউনিটেরিয়ানরা যুক্তি দেখান যে, ইলিয়াড এবং ওডিসির মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ধারাবাহিকতা রয়েছে। ইলিয়াডে যেখানে যুদ্ধের দামামা এবং তারুণ্যের আস্ফালন, ওডিসিতে সেখানে পরিণত বয়সের প্রজ্ঞা এবং টিকে থাকার লড়াই। একজন কবির যৌবন এবং বার্ধক্যের চিন্তাধারার সাথে এই দুটি মহাকাব্যের টোন অত্যন্ত মিলে যায়। তবে হোমারীয় প্রশ্নের কোনো একটি সুনির্দিষ্ট উত্তর আজও পাওয়া যায়নি। আধুনিক পণ্ডিতরা সাধারণত একটি মাঝামাঝি অবস্থান গ্রহণ করেন। তারা মনে করেন যে, হোমার নামের একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান কবি হয়তো বিদ্যমান লোকগাথা এবং ছোট গানগুলোকে সংগ্রহ করে, সেগুলোকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে সাজিয়ে এই মহাকাব্যগুলোর চূড়ান্ত রূপ দিয়েছিলেন।

মৌখিক ঐতিহ্য এবং মিলম্যান প্যারির যুগান্তকারী গবেষণা (Oral Tradition and Milman Parry’s Groundbreaking Research)

হোমারীয় প্রশ্নের সবচেয়ে বড় ব্রেক থ্রু বা যুগান্তকারী সমাধানটি আসে বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে, যখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণ স্কলার মিলম্যান প্যারি (Milman Parry) একটি সম্পূর্ণ নতুন গবেষণার পদ্ধতি নিয়ে হাজির হন। প্যারি লক্ষ্য করেন যে, হোমারের মহাকাব্যগুলোতে নির্দিষ্ট কিছু বাক্যাংশ বা বিশেষণ বারবার ঘুরেফিরে আসে। যেমন, ওডিসিউসকে বোঝাতে বারবার “ধূর্ত ওডিসিউস” বা “অনেক কিছু সহ্য করা ওডিসিউস” এবং ভোরকে বোঝাতে “গোলাপ-আঙুলের ভোর” ব্যবহার করা হয়েছে। প্যারি এই নির্দিষ্ট বাক্যাংশগুলোকে ফর্মুলা (Formula) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি দাবি করেন যে, এই ফর্মুলাগুলো কোনো লেখকের অলসতার প্রমাণ নয়, বরং এগুলো হলো একটি বিশেষ সাহিত্যিক প্রক্রিয়ার অংশ, যাকে বলা হয় মৌখিক সূত্রবদ্ধ রচনা (Oral-Formulaic Composition) (Lord, 1960)।

প্যারি তার তত্ত্ব প্রমাণের জন্য ১৯৩০-এর দশকে যুগোস্লাভিয়ায় (বর্তমান বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা) যান এবং সেখানকার নিরক্ষর চারণকবি বা গুসলারদের নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এই গুসলাররা কোনো লিখিত স্ক্রিপ্ট ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাজার হাজার লাইনের মহাকাব্যিক গান গাইতে পারত। প্যারি এবং তার সহকারী আলবার্ট লর্ড পর্যবেক্ষণ করেন যে, এই চারণকবিরা পুরো গানটি মুখস্থ করে না; তারা কেবল গল্পের মূল কাঠামোটি জানে এবং গান গাওয়ার সময় তাৎক্ষণিকভাবে ফর্মুলার সাহায্যে নতুন লাইন তৈরি করে। এই ফর্মুলাগুলো নির্দিষ্ট ছন্দের সাথে মিলে যায় বলে কবির জন্য তাৎক্ষণিক রচনা বা ইম্প্রোভাইজেশন (Improvisation) অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়। প্যারির এই গবেষণা দেখায় যে, হোমারের মহাকাব্যগুলোও ঠিক এই একই প্রক্রিয়ায় রচিত হয়েছিল।

প্যারির এই তত্ত্ব সাহিত্য সমালোচনায় এক বিশাল বিপ্লব নিয়ে আসে। এটি দেখায় যে, হোমারকে আধুনিক যুগের কোনো লেখকের সাথে তুলনা করা ভুল। একজন আধুনিক লেখক কলম আর কাগজ নিয়ে নিজের ডেস্কে বসে কাটাকুটি করে লেখেন, কিন্তু হোমারের মতো চারণকবিরা দর্শকদের সামনে দাঁড়িয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কবিতা তৈরি করতেন। তাদের সৃষ্টি ছিল পারফরম্যান্স-নির্ভর। এই মৌখিক ঐতিহ্যের কারণেই মহাকাব্যগুলোতে কিছু অসঙ্গতি বা কাহিনীর পুনরাবৃত্তি দেখা যায়, যা অ্যানালিস্টদের প্রধান অভিযোগ ছিল। প্যারির গবেষণার পর হোমারীয় প্রশ্নের মেরুকরণ অনেকটাই কমে আসে। পণ্ডিতরা মেনে নেন যে, হোমার ছিলেন এই মৌখিক ঐতিহ্যের একজন শ্রেষ্ঠ মাস্টার, যিনি তার পূর্বসূরিদের কাছ থেকে পাওয়া ফর্মুলা এবং গল্পগুলোকে এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্যিক রূপ দান করেছিলেন।

ড্যাকটাইলিক হেক্সামিটার: মহাকাব্যের জাদুকরী ছন্দ (Dactylic Hexameter: The Magical Meter of the Epic)

হোমারীয় মহাকাব্যগুলোর আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিস্ময়কর দিক হলো এর ছান্দিক কাঠামো। ইলিয়াড এবং ওডিসি উভয়ই একটি নির্দিষ্ট এবং অত্যন্ত জটিল ছন্দে রচিত, যাকে বলা হয় ড্যাকটাইলিক হেক্সামিটার (Dactylic Hexameter)। প্রাচীন গ্রিক ভাষায় রচিত এই ছন্দটি ইংরেজি বা বাংলা ছন্দের মতো উচ্চারণের ঝোঁক বা স্ট্রেসের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি সিলেবল বা অক্ষরের দৈর্ঘ্যের ওপর নির্ভর করে। একটি ড্যাকটাইলিক হেক্সামিটার লাইনে ছয়টি মেট্রিকাল ফুট বা পর্ব থাকে। এর প্রথম পাঁচটি পর্ব সাধারণত একটি দীর্ঘ সিলেবল এবং দুটি হ্রস্ব সিলেবল (যেমন, ডুম-ডি-ডি) নিয়ে গঠিত হয়, যাকে ড্যাকটাইল বলা হয়। আর শেষের পর্বটি দুটি দীর্ঘ সিলেবল বা একটি দীর্ঘ ও একটি হ্রস্ব সিলেবল নিয়ে গঠিত হয়। এই ছন্দের একটি নির্দিষ্ট গাম্ভীর্য এবং ছন্দোময় দোল দোল ভাব বা রিদম (Rhythm) রয়েছে, যা দীর্ঘ বর্ণনামূলক আখ্যানের জন্য অত্যন্ত উপযোগী (West, 2014)।

এই ছন্দটি কোনো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কথ্য ভাষার মতো ছিল না। এটি ছিল এক ধরনের কৃত্রিম এবং শৈল্পিক ভাষা, যা কেবল মহাকাব্যিক গান গাওয়ার জন্যই ব্যবহৃত হতো। চারণকবিরা যখন তাদের বীণার তালে তালে এই ছন্দে গান গাইতেন, তখন তা শ্রোতাদের ওপর এক ধরনের জাদুকরী বা হিপনোটিক (Hypnotic) প্রভাব ফেলত। এই ছন্দের কারণেই হাজার হাজার লাইনের কবিতা মনে রাখা এবং তাৎক্ষণিকভাবে রচনা করা সম্ভব হয়েছিল। কারণ চারণকবির মস্তিষ্ক কেবল শব্দ খুঁজত না, সে এমন শব্দ খুঁজত যা এই হেক্সামিটারের নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে ঠিকমতো খাপ খাবে। মিলম্যান প্যারি যেমন দেখিয়েছিলেন, হোমারের ফর্মুলাগুলো এই ছন্দের সাথে এমনভাবে গাঁথা ছিল যে, কবি চাইলে কোনো বীরের নাম লাইনের প্রথমে, মাঝখানে বা শেষে বসাতে পারতেন, কেবল তার সাথে মানানসই বিশেষণ বা ফর্মুলাটি ব্যবহার করে।

ড্যাকটাইলিক হেক্সামিটারের এই ব্যবহার দেখায় যে, হোমারীয় সমাজ কতটা উন্নত এবং শিল্পমণ্ডিত ছিল। এই ছন্দটি কোনো একজন ব্যক্তির দ্বারা রাতারাতি তৈরি হয়নি; এটি শত শত বছর ধরে গ্রিক চারণকবিদের অভিজ্ঞতার ফসল। হোমার এই ছন্দের কাঠামোর ভেতরে থেকেই মানুষের গভীরতম আবেগ, যুদ্ধের দামামা এবং সাগরের গর্জনের মতো বিষয়গুলোকে অত্যন্ত জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। পরবর্তীকালে রোমান কবি ভার্জিল যখন তার ইনিড রচনা করেন, তখন তিনিও ল্যাটিন ভাষায় এই হেক্সামিটার ছন্দটিকেই ব্যবহার করেছিলেন। তবে আধুনিক ভাষায়, বিশেষ করে ইংরেজিতে, এই ছন্দের হুবহু অনুবাদ করা প্রায় অসম্ভব, কারণ আধুনিক ভাষাগুলো মূলত স্ট্রেস-নির্ভর। তবুও হোমারের ছন্দের সেই জাদুকরী অনুরণন তার অনুবাদগুলোতেও এক ধরনের ধ্রুপদী গাম্ভীর্য ধরে রাখতে সাহায্য করে।

মিথ, ইতিহাস এবং ব্রোঞ্জ যুগের প্রতিচ্ছবি (Myth, History, and the Reflection of the Bronze Age)

হোমারের মহাকাব্যগুলো কি কেবলই রূপকথা এবং দেবতাদের কল্পকাহিনি, নাকি এর ভেতরে কোনো ঐতিহাসিক সত্য লুকিয়ে আছে – এই প্রশ্নটি ইতিহাসবিদদের দীর্ঘকাল ধরে ভাবিয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত অধিকাংশ পণ্ডিত মনে করতেন যে ট্রয় শহর বা ট্রয়যুদ্ধ পুরোপুরি কাল্পনিক। কিন্তু ১৮৭০-এর দশকে জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদ হাইনরিখ শ্লিমান (Heinrich Schliemann) তুরস্কের হিসারলিকে খনন কাজ চালিয়ে একটি প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেন, যা হোমারের বর্ণিত ট্রয়ের ভৌগোলিক অবস্থানের সাথে হুবহু মিলে যায়। শ্লিমানের এই আবিষ্কার দেখায় যে, হোমারের মহাকাব্যগুলো পুরোপুরি মিথ নয়; এর মূলে একটি ঐতিহাসিক সত্য বা হিস্টোরিক্যাল কোর (Historical Core) লুকিয়ে রয়েছে (Wood, 1985)।

তবে হোমারের বর্ণিত সমাজ এবং ট্রয়যুদ্ধের আসল সময়ের মধ্যে একটি বড় গ্যাপ বা ব্যবধান রয়েছে। ইতিহাসবিদদের মতে, ট্রয়যুদ্ধ ঘটেছিল ব্রোঞ্জ যুগের শেষ দিকে, অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দের কাছাকাছি সময়ে। আর হোমার তার মহাকাব্য রচনা করেছিলেন এর প্রায় চারশ বছর পর, খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর দিকে, যা গ্রিসের লৌহ যুগের বা আয়রন এজ (Iron Age)-এর প্রারম্ভিক সময়। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানের কারণে হোমারের বর্ণনায় ব্রোঞ্জ যুগ এবং লৌহ যুগের সমাজব্যবস্থার এক অদ্ভুত মিশ্রণ বা অ্যানাক্রোনিজম (Anachronism) দেখতে পাওয়া যায়। যেমন, হোমার তার বীরদের ব্রোঞ্জ যুগের অস্ত্রশস্ত্র এবং রথ ব্যবহার করতে দেখিয়েছেন, কিন্তু মৃতদেহ সৎকারের ক্ষেত্রে তিনি লৌহ যুগের পোড়ানোর রীতির বর্ণনা দিয়েছেন। এই মিশ্রণটি দেখায় যে, হোমার তার নিজের যুগের সামাজিক নিয়মগুলোকে প্রাচীন যুগের কাহিনীর ওপর আরোপ করেছিলেন।

এই ঐতিহাসিক জটিলতা সত্ত্বেও, হোমারের মহাকাব্যগুলো প্রাচীন গ্রিসের সমাজ, রাজনীতি এবং মূল্যবোধ বোঝার জন্য সবচেয়ে বড় দর্পণ। সেখানে আমরা দেখতে পাই কীভাবে একজন রাজার ক্ষমতা তার গায়ের জোর এবং সম্পদের ওপর নির্ভর করত, কীভাবে দাসপ্রথা সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল এবং কীভাবে আতিথেয়তার পবিত্র নিয়ম বা জেনিয়া মানুষের নৈতিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করত। হোমার কেবল রাজাদের যুদ্ধই বর্ণনা করেননি, তিনি ইউমেয়াসের মতো একজন শূকরপালকের জীবনের কষ্ট এবং বিশ্বস্ততাও অত্যন্ত দরদের সাথে তুলে ধরেছেন। দেবতাদের সাথে মানুষের সম্পর্ক, ভাগ্যের অমোঘ নিয়ম এবং মৃত্যুর পরের জগত সম্পর্কে প্রাচীন গ্রিকদের যে বিশ্বাস বা বিলিফ সিস্টেম (Belief System) ছিল, তা হোমারের লেখায় সবচেয়ে নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত রয়েছে।

পশ্চিমা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে হোমারের অমোঘ উত্তরাধিকার (The Inevitable Legacy of Homer in Western Literature and Culture)

হোমারকে যদি কেবল প্রাচীন গ্রিসের একজন কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে তার প্রতি চরম অবিচার করা হবে। তিনি হলেন সমগ্র পশ্চিমা সাহিত্য এবং ক্যাননের সেই আদি স্থপতি, যার তৈরি করা কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে পরবর্তী তিন হাজার বছরের সাহিত্যিক ঐতিহ্য। হোমারের ইলিয়াড এবং ওডিসি কেবল দুটি গল্প নয়; এগুলো হলো সাহিত্য রচনার অলিখিত ব্যাকরণ। একজন নায়কের দীর্ঘ যাত্রা, পথে নানা বাধা, প্রলোভন, দেবতাদের হস্তক্ষেপ এবং শেষে নিজের আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়ার যে মোনোমিথ (Monomyth) বা ‘হিরোজ জার্নি’ জোসেফ ক্যাম্পবেল বর্ণনা করেছেন, তা মূলত হোমারের মহাকাব্য থেকেই সরাসরি উদ্ভূত। ভার্জিলের ইনিড থেকে শুরু করে দান্তের ডিভাইন কমেডি এবং আধুনিক যুগে জেমস জয়েসের ইউলিসিস – সবখানেই হোমারের আখ্যানকৌশলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে (Graziosi, 2002)।

হোমারের চরিত্রগুলো তাদের নিজস্ব যুগ পেরিয়ে এক একটি সর্বজনীন আর্কিটাইপে পরিণত হয়েছে। একিলিসের ক্রোধ, হেক্টরের আত্মত্যাগ, ওডিসিউসের ধূর্ততা এবং পেনেলোপির বিশ্বস্ততা – এই বিষয়গুলো মানুষের চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের প্রতীক। আধুনিক যুগে আমরা যখন কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত বা বিপদের মুখোমুখি হই, তখনো আমরা “বিটুইন স্কিলা অ্যান্ড ক্যারিবডিস” (Between Scylla and Charybdis)-এর মতো হোমারীয় প্রবাদ ব্যবহার করি। হোমারের মহাকাব্যগুলো কেবল সাহিত্যেই নয়, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, চলচ্চিত্র এবং এমনকি আধুনিক ভিডিও গেমেও অত্যন্ত প্রবলভাবে রাজত্ব করছে। কারণ তিনি মানবজীবনের এমন কিছু মৌলিক সত্য নিয়ে কাজ করেছেন – যেমন টিকে থাকার লড়াই, শেকড়ের প্রতি টান এবং ক্ষমতার লোভ – যা কোনো নির্দিষ্ট যুগে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

পরিশেষে বলা যায়, হোমারীয় প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনোদিন পুরোপুরি জানা যাবে না। তিনি কি একজন অন্ধ চারণকবি ছিলেন, নাকি অনেক কবির একটি সংকলনের নাম, তা হয়তো ইতিহাসের পাতায় চিরকাল রহস্য হয়েই থাকবে। কিন্তু এই রহস্য হোমারের মহত্ত্বকে একটুও ম্লান করে না। বরং, তিনি কে ছিলেন তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি আমাদের কী দিয়ে গেছেন। তার রেখে যাওয়া এই দুটি মহাকাব্য মানবজাতির ইতিহাসে এক অকল্পনীয় সম্পদ, যা আমাদের শেখায় কীভাবে চরম ধ্বংস এবং হতাশার মাঝেও মানুষ তার নিজের বুদ্ধি, সাহস এবং ভালোবাসার জোরে আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে। হোমার তাই কেবল একজন কবি বা কিংবদন্তি নন; তিনি হলেন মানব সভ্যতার সেই চিরন্তন কণ্ঠস্বর, যা হাজার বছর ধরে আমাদের নিজেদের গল্পই আমাদের শুনিয়ে আসছে।

হোমারীয় মহাকাব্যদ্বয় (The Homeric Epics): ইলিয়াড ও ওডিসির পারস্পরিক সম্পর্ক

দুটি মহাকাব্য, একটি অখণ্ড বিশ্ব (Two Epics, One Unified World)

প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে বিবেচিত হোমার (Homer)-এর দুটি মহাকাব্য – ইলিয়াড (Iliad) এবং ওডিসি (Odyssey) – আলাদা আখ্যান হওয়া সত্ত্বেও একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। এই দুটি মহাকাব্য মূলত একই মহাজাগতিক ও পৌরাণিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যাকে গ্রিক দর্শনে হিরোইক এইজ (Heroic Age) বলা হয়। ইলিয়াড যেখানে ট্রয়যুদ্ধের দামামা, দৈহিক আস্ফালন এবং মৃত্যুর জয়গানের একটি রক্তক্ষয়ী আখ্যান, ওডিসি সেখানে সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে আসা একজন মানুষের নিজের ঘরে ফেরার এক মনস্তাত্ত্বিক গল্প। অনেকেই এই দুটি মহাকাব্যকে একটি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হিসেবে দেখেন। ইলিয়াড যদি হয় ধ্বংস এবং বীরত্বের চূড়ান্ত আস্ফালনের গল্প, তবে ওডিসি হলো সেই ধ্বংসের পর টিকে থাকা এবং পুনর্নির্মাণের সংগ্রাম। এই দুটি সাহিত্যকর্ম মিলে প্রাচীন গ্রিসের সমাজ, রাজনীতি, দেবতা এবং মানুষের অস্তিত্বের একটি অখণ্ড ও পূর্ণাঙ্গ বিশ্ব বা ইউনিফায়েড ওয়ার্ল্ড (Unified World) তৈরি করে (Nagy, 1979)।

এই অখণ্ড বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো চরিত্রগুলোর ধারাবাহিকতা। ইলিয়াড-এ যে চরিত্রগুলো আমরা রণভূমিতে তাদের চূড়ান্ত শারীরিক শক্তির পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে দেখি, ওডিসি-তে তাদেরই ভিন্ন পরিবেশে, ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক অবস্থায় ফিরে আসতে দেখি। যেমন, মাইসিনির রাজা আগামেমনন ইলিয়াড-এ একজন অত্যন্ত ক্ষমতাবান এবং অহংকারী নেতা, যার নির্দেশে পুরো গ্রিক বাহিনী ট্রয়ের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওডিসি-তে পাতাললোকে আমরা সেই একই আগামেমননকে দেখি একজন প্রতারিত এবং মৃত আত্মা হিসেবে, যে তার স্ত্রীর হাতে গুপ্তহত্যার শিকার হয়ে চরম হতাশায় ভুগছে। এই ধারাবাহিকতা দেখায় যে, হোমার কেবল যুদ্ধের গল্প বলতে চাননি; তিনি যুদ্ধের পরবর্তী প্রভাব এবং মানুষের নিয়তির পরিণতিও দেখাতে চেয়েছেন।

তদুপরি, দেব-দেবীদের আচরণ ও ভূমিকাও এই দুটি মহাকাব্যে একটি সুনির্দিষ্ট সূত্র মেনে চলে। জিউস, অ্যাথেনা, পসেইডন বা অ্যাপোলোর মতো দেবতারা ইলিয়াড-এ যেমন মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন, ওডিসি-তেও তারা ঠিক একইভাবে মানুষের জীবনের নিয়ন্তা হিসেবে কাজ করেছেন। তবে একটি বড় পার্থক্য হলো, ইলিয়াড-এ দেবতারা প্রায়ই সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে মানুষের সাথে লড়াই করেছেন, কিন্তু ওডিসি-তে তাদের হস্তক্ষেপ অনেক বেশি পরোক্ষ এবং মনস্তাত্ত্বিক। অ্যাথেনা ওডিসিউসকে সরাসরি কোনো দানব থেকে বাঁচাননি, বরং তিনি ওডিসিউসের বুদ্ধিকে শাণিত করেছেন। এই পরিবর্তন দেখায় যে, ইলিয়াড-এর জগত থেকে ওডিসি-র জগত কিছুটা বেশি পরিণত এবং মানবকেন্দ্রিক, যেখানে মানুষের নিজস্ব পছন্দ এবং চাতুর্যের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে।

একিলিস বনাম ওডিসিউস: বীরত্বের দুটি ভিন্ন সংজ্ঞা (Achilles vs. Odysseus: Two Different Definitions of Heroism)

ইলিয়াড এবং ওডিসির তুলনামূলক আলোচনায় সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো এদের প্রধান দুই নায়কের চরিত্র এবং বীরত্বের ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী অবস্থান। ইলিয়াড-এর প্রধান নায়ক একিলিস (Achilles) হলেন শারীরিক শক্তি, ক্রোধ এবং রণভূমিতে মৃত্যুর মাধ্যমে অর্জিত খ্যাতির বা ক্লিওস (Kleos)-এর প্রতীক। একিলিস জানতেন যে, ট্রয়যুদ্ধে অংশ নিলে তিনি মারা যাবেন, কিন্তু তিনি দীর্ঘ ও সাধারণ জীবনের বদলে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গৌরবময় জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তার কাছে বীরত্ব মানেই হলো সম্মুখসমরে আত্মত্যাগ। অন্যদিকে, ওডিসি-র নায়ক ওডিসিউস (Odysseus) হলেন বুদ্ধিবৃত্তিক চাতুর্য বা মেটিস (Metis)-এর চূড়ান্ত প্রতিমূর্তি। ওডিসিউস রণভূমিতে বীরের মতো মরে যাওয়ার চেয়ে যেকোনো মূল্যে বেঁচে থাকাকে এবং নিজের গন্তব্যে পৌঁছানোকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তার এই বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা বা সারভাইভালিস্ট ইন্সটিঙ্কট (Survivalist Instinct) তাকে একিলিসের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে তুলেছে (Pucci, 1987)।

এই দুটি ভিন্ন দর্শনের সবচেয়ে চমৎকার সংঘাত দেখা যায় ওডিসির একাদশ সর্গে, যখন পাতাললোকে ওডিসিউস এবং একিলিসের আত্মার সাক্ষাৎ হয়। ওডিসিউস একিলিসকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন যে, একিলিস জীবিত অবস্থায় যেমন সম্মান পেয়েছিলেন, মৃত্যুর পর এই পাতাললোকেও তিনি তেমনি একজন রাজার মতো রাজত্ব করছেন। কিন্তু একিলিসের উত্তরটি ছিল গ্রিক মহাকাব্যের চিরাচরিত বীরত্বের ধারণার ওপর এক চরম চপেটাঘাত। একিলিস বলেন যে, এই পাতাললোকে মৃতদের রাজা হওয়ার চেয়ে পৃথিবীতে একজন দরিদ্র কৃষকের দাস হয়ে বেঁচে থাকাও অনেক বেশি সম্মানের। একিলিস বুঝতে পেরেছিলেন যে, মৃত্যুর পর খ্যাতি বা গৌরবের কোনো মূল্যই নেই। জীবন যত কষ্টের বা সাধারণই হোক না কেন, তা মৃত্যুর এই অনন্ত অন্ধকারের চেয়ে অনেক বেশি কাঙ্ক্ষিত। একিলিসের এই উপলব্ধি মূলত ওডিসিউসের টিকে থাকার দর্শনকেই সঠিক বলে দেখায়।

এই বৈপরীত্য কেবল শারীরিক বা দার্শনিক স্তরে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি তাদের কাজের পদ্ধতিতেও প্রতিফলিত হয়েছে। একিলিস যুদ্ধ করতেন তার বর্শা এবং ক্রোধ দিয়ে; তিনি কখনো কোনো ছদ্মবেশ বা প্রতারণার আশ্রয় নিতেন না। কিন্তু ওডিসিউসের প্রধান অস্ত্র ছিল তার মগজ। তিনি ট্রয়যুদ্ধে কাঠের ঘোড়ার মতো এক জঘন্য প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন, যা সামরিক নীতিমালার পরিপন্থী ছিল। ইথাকায় ফিরে আসার পরও তিনি তার নিজের স্ত্রী, পিতা এবং বিশ্বস্ত দাসদের সাথে দিনের পর দিন মিথ্যা গল্প ফেঁদেছেন। একিলিস যেখানে তার ক্রোধ প্রকাশ করে ধ্বংস ডেকে এনেছেন, ওডিসিউস সেখানে নিজের ক্রোধকে চেপে রেখে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় প্রতিশোধের নীল নকশা তৈরি করেছেন। এই দুটি চরিত্র তাই গ্রিক বীরত্বের দুটি ভিন্ন মেরুকে প্রতিনিধিত্ব করে, যা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে পুরো গ্রিক মনস্তত্ত্বকে ধারণ করে।

যুদ্ধের দামামা থেকে গৃহের প্রত্যাবর্তন: থিমের বিবর্তন (From the Din of War to the Return Home: Evolution of Theme)

ইলিয়াড এবং ওডিসির মধ্যে থিমের যে বিবর্তন বা থিম্যাটিক ইভোল্যুশন (Thematic Evolution) ঘটেছে, তা প্রাচীন গ্রিক সমাজের মানসিকতার পরিবর্তনের একটি চমৎকার দলিল। ইলিয়াড-এর মূল থিম হলো যুদ্ধ, ক্রোধ এবং ধ্বংস। সেখানে ব্যক্তিগত ইগো এবং সম্মানের জন্য পুরো একটি শহর এবং হাজার হাজার মানুষের জীবন বাজি রাখা হয়। আগামেমনন এবং একিলিসের মধ্যকার দ্বন্দ্বই পুরো মহাকাব্যের চালিকাশক্তি। কিন্তু ওডিসি-তে এসে এই থিমটি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। এখানে মূল থিম হলো নস্টস (Nostos) বা বাড়ি ফেরার আকুলতা। ট্রয়যুদ্ধ শেষে গ্রিক বীররা যখন নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাচ্ছিল, তখন তাদের মনে আর কোনো রাজ্য জয় করার বাসনা ছিল না; তারা কেবল একটি সাধারণ, শান্তিময় জীবনে ফিরে যেতে চাইছিল। এই পরিবর্তন দেখায় যে, যুদ্ধের উন্মাদনা একসময় শেষ হয় এবং মানুষের ভেতরের শেকড়ের টান বা পরিবারের প্রতি ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় (Rutherford, 1996)।

ওডিসি-তে আমরা যুদ্ধের কোনো গ্ল্যামার বা রোমান্টিসিজম দেখতে পাই না। ওডিসিউস যখন ফাইয়াকীয়দের প্রাসাদে বসে ট্রয়যুদ্ধের স্মৃতিচারণকারী চারণকবির গান শোনেন, তখন তিনি কোনো বিজয়ী বীরের মতো আনন্দ প্রকাশ করেন না। উল্টো, তিনি তার চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে শিশুর মতো কাঁদতে শুরু করেন। হোমার এই কান্নার তুলনা করেছেন এমন এক নারীর সাথে, যে তার মৃত স্বামীর লাশের ওপর আছড়ে পড়ে কাঁদে। এই উপমাটি দেখায় যে, যুদ্ধের কোনো আসল বিজয়ী নেই। ওডিসিউস ট্রয় জয় করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই যুদ্ধের ট্রমা বা মানসিক আঘাত তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। তিনি একজন বিজয়ীর অহংকার নিয়ে নয়, বরং একজন পরাজিত মানুষের মতোই কাঁদছিলেন। ইলিয়াড যেখানে যুদ্ধকে মহিমান্বিত করেছে, ওডিসি সেখানে যুদ্ধের ভয়ংকর মানসিক পরিণতি বা পোস্ট-ট্রমাটিক ইফেক্ট (Post-traumatic Effect)-কে অত্যন্ত রূঢ়ভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

এছাড়া, ওডিসি-তে গৃহ বা অইকোস (Oikos)-এর ধারণাটি অত্যন্ত কেন্দ্রীয় একটি বিষয় হয়ে ওঠে। ইলিয়াড-এ পরিবার বা গৃহের প্রসঙ্গ এসেছে খুবই সামান্য; যেমন হেক্টর এবং অ্যান্ড্রোম্যাকের বিদায়দৃশ্যে। কিন্তু ওডিসি-র পুরো আখ্যানটিই আবর্তিত হয়েছে একটি ক্ষতবিক্ষত পরিবারকে আবার জোড়া লাগানোর সংগ্রামের ওপর। ওডিসিউস, পেনেলোপি এবং টেলেমাকাসের এই পারিবারিক ঐক্য বা ফ্যামিলি ইউনিটি (Family Unity) দেখায় যে, একটি পরিবার যখন ভেতর থেকে শক্তিশালী থাকে, তখন বাইরের কোনো শত্রু বা প্রলোভন তাকে ধ্বংস করতে পারে না। ইলিয়াড যদি হয় ঘর ভাঙার গল্প, তবে ওডিসি হলো সেই ভাঙা ঘর আবার নতুন করে গড়ার আখ্যান।

আতিথেয়তা ও নৈতিকতার মানদণ্ড: দুই মহাকাব্যের সামাজিক ভিত্তি (Standards of Hospitality and Morality: The Social Foundation of Both Epics)

প্রাচীন গ্রিক সমাজের অন্যতম প্রধান সামাজিক ও ধর্মীয় স্তম্ভ ছিল জেনিয়া (Xenia) বা আতিথেয়তা। এই পবিত্র নিয়মটি ইলিয়াড এবং ওডিসি উভয় মহাকাব্যেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তবে এর প্রয়োগ এবং ফলাফল ছিল ভিন্ন ভিন্ন। ইলিয়াড-এর পুরো সংঘাতের মূল কারণই ছিল জেনিয়ার চরম লঙ্ঘন। ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস যখন স্পার্টার রাজা মেনেলাউসের প্রাসাদে অতিথি হিসেবে যায়, তখন সে আতিথেয়তার নিয়ম ভেঙে মেনেলাউসের স্ত্রী হেলেনকে নিয়ে পালিয়ে আসে। একজন অতিথির এই চরম বিশ্বাসঘাতকতা পুরো গ্রিসকে ট্রয়ের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নামতে বাধ্য করেছিল। অর্থাৎ, ইলিয়াড-এ জেনিয়ার লঙ্ঘন একটি আন্তর্জাতিক এবং সামরিক সংঘাতের জন্ম দেয় (Griffin, 1987)।

অন্যদিকে, ওডিসি-তে জেনিয়া হলো মানুষের নৈতিকতা এবং সভ্যতা মাপার সবচেয়ে বড় মানদণ্ড বা লিটমাস টেস্ট (Litmus Test)। ওডিসিউস যখন সাগরের বুকে দিকভ্রান্ত হয়ে বিভিন্ন দ্বীপে পৌঁছাতেন, তখন তিনি মূলত এই জেনিয়ার নিয়মের ওপর নির্ভর করেই বেঁচে থাকার চেষ্টা করতেন। যারা জেনিয়ার নিয়ম পালন করেছে, যেমন নেস্টর, মেনেলাউস এবং ফাইয়াকীয়রা, তারা সভ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। আর যারা এটি লঙ্ঘন করেছে, যেমন সাইক্লপস এবং লেস্ট্রিগোনীয়রা, তারা বিবেচিত হয়েছে বন্য দানব বা অসভ্য হিসেবে। ওডিসি-তে জেনিয়ার এই পরীক্ষাটি অনেক বেশি ব্যক্তিগত এবং মনস্তাত্ত্বিক। এটি কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের মধ্যে বিস্তৃত।

ইথাকার রাজপ্রাসাদে একশ আটজন প্রণয়প্রার্থী যখন জেনিয়ার নিয়ম লঙ্ঘন করে ওডিসিউসের সম্পদ লুট করছিল এবং তাকে ভিখারির ছদ্মবেশে অপমান করছিল, তখন তারা মূলত প্যারিসের মতোই একটি চরম অপরাধ করছিল। ওডিসিউস যখন তাদের হত্যা করে প্রাসাদের শুদ্ধি বা ক্যাথারসিস (Catharsis) সম্পন্ন করেন, তখন তিনি মূলত আতিথেয়তার এই চরম অবমাননার বিচার বা জাস্টিস (Justice) নিশ্চিত করছিলেন। উভয় মহাকাব্যেই এটি প্রমাণিত হয় যে, দেবতাদের আইন বা জেনিয়া লঙ্ঘন করে পৃথিবীর কোনো শক্তিশালী মানুষ বা সমাজই টিকে থাকতে পারে না। তবে ইলিয়াড-এ যেখানে এই বিচারটি একটি ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, ওডিসি-তে সেখানে এটি একটি সুনির্দিষ্ট এবং পরিকল্পিত সামাজিক শুদ্ধিকরণের রূপ লাভ করে।

নারী চরিত্রের বিবর্তন: প্যাসিভ বস্তু থেকে সক্রিয় প্রভাবক (Evolution of Female Characters: From Passive Objects to Active Influencers)

ইলিয়াড এবং ওডিসির নারী চরিত্রগুলোর বিশ্লেষণ করলে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং চমকপ্রদ বিবর্তন লক্ষ করা যায়। ইলিয়াড-এ নারীদের মূলত যুদ্ধজয়ের পুরস্কার বা প্যাসিভ বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে হেলেন, ব্রিসেইস বা ক্রিসেইসের মতো নারীদের নিজেদের জীবনের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তারা ছিল কেবল পুরুষদের ক্ষমতা এবং অহংকারের প্রতীক। ব্রিসেইসকে নিয়ে আগামেমনন এবং একিলিসের মধ্যকার দ্বন্দ্বই ছিল ইলিয়াড-এর মূল সংঘাতের কারণ, কিন্তু ব্রিসেইসের নিজের কোনো কণ্ঠস্বর সেখানে ছিল না। এই মহাকাব্যে নারীদের অস্তিত্ব কেবল পুরুষ চরিত্রগুলোর উত্থান বা পতনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এটি প্রাচীন গ্রিক সমাজের গভীর পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা বা প্যাট্রিয়ার্কাল মাইন্ডসেট (Patriarchal Mindset)-এর নিখুঁত প্রতিফলন (Foley, 2001)।

কিন্তু ওডিসি-তে এসে নারী চরিত্রগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী, সক্রিয় এবং স্বাধীন সত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এখানে নারী কেবল কোনো যুদ্ধজয়ের ট্রফি নয়, সে নিজেই একটি যুদ্ধের অন্যতম প্রধান নিয়ন্তা। ওডিসিউসের স্ত্রী পেনেলোপি দীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে তার স্বামীর অবর্তমানে নিজের বুদ্ধি দিয়ে ইথাকার রাজবংশকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তার সেই বিখ্যাত কাফন বোনার কৌশলটি দেখায় যে, তিনি কেবল একজন সতী নারীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান শাসক। তিনি প্রণয়প্রার্থীদের কথা দিয়েছিলেন যে, তার শ্বশুর লায়ার্তেসের জন্য একটি কাফনের কাপড় বোনা শেষ হলেই তিনি তাদের মধ্য থেকে কাউকে স্বামী হিসেবে বেছে নেবেন। কিন্তু দিনের বেলায় যা বুনতেন, রাতের অন্ধকারে তিনি তা খুলে ফেলতেন। এই ভাঙাগড়ার খেলা দিয়ে তিনি টানা তিন বছর শত্রুদের বোকা বানিয়ে রেখেছিলেন।

এছাড়া, ওডিসি-তে দেবী অ্যাথেনার ভূমিকাও অত্যন্ত সক্রিয় এবং মানবকেন্দ্রিক। ইলিয়াড-এ দেবতারা যেমন মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতেন, অ্যাথেনা এখানে সেভাবে কাজ করেননি। তিনি ওডিসিউস এবং টেলেমাকাসকে পদে পদে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছেন এবং তাদের পরিকল্পনার অংশীদার হয়েছেন। সার্সি এবং ক্যালিপসোর মতো ক্ষমতাধর দেবীরাও এই মহাকাব্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তারা ওডিসিউসকে আটকে রেখেছিলেন ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা তাকে সাহায্যও করেছিলেন। ওডিসি-তে নারীদের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা দেখায় যে, হোমারীয় সমাজ কেবল পুরুষদের যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না; সেখানে নারীদেরও একটি নিজস্ব এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী জগত ছিল।

আখ্যানকৌশল এবং ভাষার পার্থক্য: একটি দীর্ঘ সাহিত্যিক বিবর্তন (Differences in Narrative Technique and Language: A Long Literary Evolution)

ইলিয়াড এবং ওডিসির মধ্যে আখ্যানকৌশল বা ন্যারেশন স্টাইল (Narration Style)-এর যে পার্থক্য রয়েছে, তা সাহিত্যজগতে একটি বিস্ময় হিসেবে স্বীকৃত। ইলিয়াড সাধারণত একটি রৈখিক বা সরল রেখায় এগোয়। সেখানে ঘটনার পর ঘটনা ঘটতে থাকে এবং আমরা সরাসরি যুদ্ধের ময়দানের বিবরণ পাই। কিন্তু ওডিসির কাঠামো অনেক বেশি জটিল এবং আধুনিক। এটি শুরু হয় না ট্রয়যুদ্ধের শেষের দিনগুলো থেকে, বরং এটি শুরু হয় ট্রয়যুদ্ধের প্রায় দশ বছর পর থেকে। গল্প বলার এই বিশেষ কৌশলটিকে ল্যাটিন ভাষায় বলা হয় ইন মিডিয়া রেস (In Medias Res), যার অর্থ হলো ‘মাঝখান থেকে শুরু হওয়া’। মহাকাব্যের একেবারে শুরুতে আমরা দেখি ওডিসিউস দেবী ক্যালিপসোর দ্বীপে বন্দি হয়ে আছেন এবং তার নিজের রাজ্য ইথাকায় একদল উদ্ধত তরুণ তার সিংহাসন দখলের পাঁয়তারা করছে। গল্পের এই মাঝখান থেকে শুরু হওয়ার কাঠামোটি পাঠকের মনে এক তীব্র কৌতূহল তৈরি করে (Fowler, 2004)।

ওডিসির আরেকটি চমৎকার দিক হলো এর ফ্ল্যাশব্যাক মেকানিজম বা অতীত স্মৃতিচারণ। ফাইয়াকীয়দের রাজা আলকিনোয়াসের প্রাসাদে বসে ওডিসিউস যখন নিজের পরিচয় প্রকাশ করেন, তখন তিনি তার গত তিন বছরের ভয়ানক সব অভিজ্ঞতার কথা নিজের মুখে বর্ণনা করেন। সাইক্লপস, সাইরেন, সার্সির জাদু এবং পাতাললোকে ভ্রমণের মতো রোমাঞ্চকর ঘটনাগুলো কোনো তৃতীয় ব্যক্তির বর্ণনায় আসেনি, বরং ওডিসিউস নিজে স্বগতোক্তি (First-person Narrative)-এর মাধ্যমে সেগুলো শুনিয়েছেন। এই কৌশলটি গল্পটিকে অনেক বেশি জীবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। একজন মানুষ তার নিজের ট্রমা এবং অভিজ্ঞতাগুলো কীভাবে বয়ান করে, তা এখানে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।

ভাষাগত দিক থেকেও পণ্ডিতরা এই দুটি মহাকাব্যের মধ্যে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য লক্ষ করেছেন। ইলিয়াড-এর ভাষা অনেক বেশি ভারী, গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং যুদ্ধকেন্দ্রিক। অন্যদিকে, ওডিসি-র ভাষায় অনেক বেশি রূপক, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং দৈনন্দিন জীবনের ছোঁয়া রয়েছে। এই ভাষাগত এবং কাঠামোগত পার্থক্যগুলো অনেক সাহিত্য সমালোচককে ভাবতে বাধ্য করেছে যে, এই দুটি মহাকাব্য হয়তো একই ব্যক্তির লেখা নয়, অথবা এগুলো একজন কবির যৌবন এবং বার্ধক্যের দুটি ভিন্ন পর্যায়ের সৃষ্টি। তবে কারণ যাই হোক না কেন, ইলিয়াড এবং ওডিসি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের এক অখণ্ড এবং অমর উত্তরাধিকার তৈরি করেছে, যা তিন হাজার বছর ধরে বিশ্বসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে আসছে।

ওডিসিউস (Odysseus): ইথাকার রাজা ও মহাকাব্যের নায়ক

বংশপরিচয় এবং নামের উৎপত্তি (Lineage and the Origin of the Name): মিথলজির শিকড়

প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যে ওডিসিউস (Odysseus)-এর চরিত্রটি কেবল তার ব্যক্তিগত সংগ্রাম বা বুদ্ধিমত্তার জন্যই বিখ্যাত নয়; তার রক্তে মিশে ছিল এক অত্যন্ত জটিল এবং দ্বিমুখী বংশগত উত্তরাধিকার। তিনি ছিলেন ইথাকার রাজা লায়ার্তেস এবং রানী অ্যান্টিক্লেয়ার পুত্র। কিন্তু তার চরিত্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি এসেছে তার মায়ের বংশ থেকে। অ্যান্টিক্লেয়া ছিলেন অটোলিকাস নামের এক কুখ্যাত চোর এবং ধূর্ত ব্যক্তির কন্যা, যাকে গ্রিক পুরাণে চুরি এবং শপথ ভঙ্গের রাজা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অটোলিকাস আবার ছিলেন দেবতাদের বার্তাবাহক এবং চোরদের রক্ষাকর্তা হার্মিসের সন্তান। ওডিসিউসের ধমনিতে তাই একদিকে যেমন ছিল লায়ার্তেসের মতো একজন সৎ ও ধার্মিক রাজার রক্ত, অন্যদিকে ছিল অটোলিকাসের ধূর্ততা এবং প্রতারণার জিন। এই বংশগত মিশ্রণই ওডিসিউসকে গ্রিক সাহিত্যের সবচেয়ে বহুমাত্রিক এবং জটিল নায়কে বা পলিট্রোপস (Polytropos)-এ পরিণত করেছে (Nagy, 1979)।

ওডিসিউস নামের উৎপত্তি নিয়েও হোমার অত্যন্ত চমৎকার একটি পৌরাণিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ওডিসিউসের জন্মের পর তার মাতামহ অটোলিকাস যখন ইথাকায় এসেছিলেন, তখন লায়ার্তেস তাকে নাতির একটি নাম রাখার অনুরোধ করেন। অটোলিকাস অত্যন্ত গর্বের সাথে বলেছিলেন যে, তিনি সারা জীবন বহু মানুষের সাথে শত্রুতা করেছেন এবং বহু মানুষকে কষ্ট দিয়েছেন। তাই তিনি তার নাতির নাম রাখেন ‘ওডিসিউস’, গ্রিক ভাষায় যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘যিনি অন্যদের কষ্ট দেন’ বা ‘যিনি নিজে কষ্ট পান’। এই নামটি ওডিসিউসের পুরো জীবনের এক অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে কাজ করেছে। তিনি যেমন ট্রয়ের যুদ্ধে এবং সাগরের বুকে দানবদের চরম কষ্ট দিয়েছেন, ঠিক তেমনি পসেইডনের রোষানলে পড়ে তিনি নিজেও সীমাহীন যন্ত্রণার শিকার হয়েছেন। তার পুরো জীবনটাই হলো এই ব্যথা দেওয়া এবং ব্যথা পাওয়ার একটি দীর্ঘ মহাকাব্যিক চক্র।

এই বংশপরিচয় ওডিসিউসকে অন্যান্য গ্রিক বীরদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি স্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়। একিলিস বা হেক্টরের মতো বীরেরা যেখানে তাদের ঐশ্বরিক বা রাজকীয় রক্তের অহংকারে মত্ত থাকতেন, ওডিসিউস সেখানে তার ধূর্ততা এবং বাস্তববোধ নিয়ে কাজ করতেন। তিনি জানতেন যে, তার মধ্যে এমন কিছু প্রবৃত্তি রয়েছে যা একজন আদর্শ বীরের সাথে পুরোপুরি মানানসই নয়। কিন্তু তিনি এই নেতিবাচক গুণগুলোকেও অত্যন্ত সুকৌশলে তার টিকে থাকার বা সারভাইভাল (Survival)-এর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তার এই বংশগত দ্বৈততা দেখায় যে, মানব চরিত্র কখনোই পুরোপুরি সাদা বা কালো হয় না; এটি বিভিন্ন প্রভাব ও অভিজ্ঞতার এক জটিল সংমিশ্রণ।

ইথাকার রাজা: পিতৃতন্ত্র ও সম্পদের রক্ষক (King of Ithaca: Patriarchy and the Protector of Wealth)

ওডিসিউসকে কেবল একজন যাযাবর বা রণক্লান্ত সৈনিক হিসেবে দেখলে তার চরিত্রের একটি বড় অংশ অদেখা থেকে যাবে। তিনি ছিলেন ইথাকার একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং শক্তিশালী রাজা। হোমারের মহাকাব্যে ইথাকাকে কোনো বিশাল সাম্রাজ্য হিসেবে দেখানো হয়নি; এটি ছিল একটি রুক্ষ, পাথুরে এবং কৃষিকাজের জন্য বেশ অনুপযোগী একটি ছোট দ্বীপ। কিন্তু ওডিসিউস এই ছোট দ্বীপটিকেই তার দক্ষতা এবং প্রজ্ঞা দিয়ে একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও সুশৃঙ্খল রাজ্যে পরিণত করেছিলেন। তিনি তার প্রজাদের ওপর কোনো স্বৈরাচারী শাসক ছিলেন না; বরং তিনি একজন স্নেহশীল পিতার মতো তাদের শাসন করতেন। মহাকাব্যে আমরা বারবার দেখতে পাই যে, ইথাকার সাধারণ মানুষ এবং বিশ্বস্ত দাসেরা ওডিসিউসকে একজন আদর্শ শাসক হিসেবে স্মরণ করে এবং তার ফিরে আসার জন্য প্রার্থনা করে (Finley, 1978)।

একজন রাজা হিসেবে ওডিসিউসের প্রধান দায়িত্ব ছিল তার পরিবার বা অইকোস (Oikos) এবং তার সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। প্রাচীন গ্রিক সমাজে একজন মানুষের ক্ষমতা মাপা হতো তার সম্পদের পরিমাণ দিয়ে। ওডিসিউস তার যৌবনে বিভিন্ন রাজ্যে অভিযান চালিয়ে এবং উপহার বা জেনিয়া (Xenia)-এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ বা টিমে (Time) অর্জন করেছিলেন। এই সম্পদই তাকে ইথাকা এবং পার্শ্ববর্তী দ্বীপগুলোর অন্যান্য অভিজাতদের ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য বা হেজিমনি (Hegemony) স্থাপন করতে সাহায্য করেছিল। ট্রয়যুদ্ধে যাওয়ার সময় তিনি তার এই বিশাল সম্পদ এবং পরিবারের দায়িত্ব অত্যন্ত সযত্নে তার স্ত্রীর হাতে বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। তার এই দায়িত্ববোধ দেখায় যে, তিনি কেবল যুদ্ধ করতেই ভালোবাসতেন না, তিনি তার শেকড় এবং সম্পদের প্রতিও অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন।

তবে ওডিসিউসের অবর্তমানে ইথাকার এই সমাজকাঠামো ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। একশ আটজন প্রণয়প্রার্থী যখন তার প্রাসাদে জাঁকিয়ে বসে এবং তার সম্পদ লুটেপুটে খেতে শুরু করে, তখন ওডিসিউস সাগরের বুকে বসেও সেই ধ্বংসের আঁচ অনুভব করতেন। ইথাকায় ফিরে আসার পর তিনি যখন ভিখারির ছদ্মবেশে নিজের বাড়িতে প্রবেশ করেন, তখন তিনি কেবল তার স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করতেই লড়াই করেননি; তিনি তার সেই তিল তিল করে জমানো সম্পদ এবং রাজকীয় অধিকার পুনরুদ্ধার করার জন্যও মরিয়া ছিলেন। প্রণয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে তার এই রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধ তাই কেবল ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; এটি ছিল একজন রাজার তার নিজের রাজ্য এবং পিতৃতান্ত্রিক অধিকার বা প্যাট্রিয়ার্কাল অথরিটি (Patriarchal Authority) পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার এক চূড়ান্ত লড়াই।

মেটিসের মাস্টারমাইন্ড: শারীরিক শক্তির চেয়ে বুদ্ধির জয় (Mastermind of Metis: The Triumph of Intellect over Physical Strength)

গ্রিক সাহিত্যের ইতিহাসে ওডিসিউসের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং কৌশল বা মেটিস (Metis)। তিনি হলেন সেই বিরল বীর, যিনি পেশিশক্তি বা বিয়া (Bia)-এর চেয়ে মগজের জোরকে সবসময় বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ট্রয়ের দশ বছরের যুদ্ধে যখন একিলিস বা হেক্টরের মতো মহাবীররা গায়ের জোরে যুদ্ধ করে মারা গিয়েছিলেন, তখন ওডিসিউস বুঝতে পেরেছিলেন যে, কেবল তলোয়ার দিয়ে এই অজেয় নগরী জয় করা সম্ভব নয়। তিনি সেই বিখ্যাত কাঠের ঘোড়ার পরিকল্পনা করেন, যা ট্রয়ের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেদ করে এবং গ্রিকদের চূড়ান্ত বিজয় এনে দেয়। তার এই কৌশল দেখায় যে, তিনি প্রথাগত বীরদের মতো আবেগের বশবর্তী হয়ে কাজ করেন না; তিনি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত (Pucci, 1987)।

সাগরের বুকে দানবদের সাথে লড়াই করার সময়ও তার এই মেটিস বারবার তার প্রাণ বাঁচিয়েছে। সাইক্লপস পলিফেমাসের গুহায় আটকা পড়ার পর ওডিসিউস যদি তলোয়ার দিয়ে দানবকে হত্যা করতেন, তবে বিশাল পাথরের কারণে তারা গুহার ভেতরেই মারা পড়তেন। তাই তিনি রাগকে নিয়ন্ত্রণ করে দানবকে মদ খাইয়ে অন্ধ করার এবং ভেড়ার পেটের নিচে লুকিয়ে পালানোর যে কৌশল আবিষ্কার করেন, তা মেটিসের এক চূড়ান্ত নিদর্শন। সবচেয়ে চমকপ্রদ ছিল নিজেকে ‘কেউ নয়’ বা আউটিস (Outis) হিসেবে পরিচয় দেওয়ার কৌশলটি। এই একটি মিথ্যা নাম তাকে অন্যান্য সাইক্লপসদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করেছিল। ওডিসিউস জানতেন যে দানবদের গায়ের জোর বেশি হলেও তাদের মগজ অত্যন্ত দুর্বল, আর ঠিক এই দুর্বলতার সুযোগটিই তিনি নিয়েছিলেন।

ইথাকায় ফিরে আসার পর তার মেটিসের সবচেয়ে পরিণত রূপটি দেখা যায়। তিনি সরাসরি প্রাসাদে আক্রমণ না করে ভিখারির ছদ্মবেশ ধারণ করেন। তিনি তার নিজের স্ত্রী, পিতা এবং বিশ্বস্ত দাসদের কাছেও নিজের আসল পরিচয় গোপন রাখেন এবং মিথ্যা গল্প ফেঁদে তাদের মনের অবস্থা পরীক্ষা করেন। তিনি অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে তার শত্রুদের দুর্বলতাগুলো পর্যবেক্ষণ করেন, তাদের অস্ত্র সরিয়ে ফেলেন এবং শেষ পর্যন্ত ধনুকের পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের এমন একটি ফাঁদে ফেলেন যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় ছিল না। ওডিসিউসের এই নিখুঁত হিসাব-নিকাশ বা ক্যালকুলেশন তাকে কেবল একজন সেনাপতি হিসেবে নয়, বরং একজন মাস্টারমাইন্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যার কাছে আবেগ নয়, বরং যৌক্তিকতাই হলো সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

সহনশীলতা ও মানসিক দৃঢ়তার প্রতীক (Symbol of Endurance and Mental Fortitude)

ওডিসিউসকে গ্রিক সাহিত্যে প্রায়শই “পলিটলাস” বা ‘যিনি অনেক কিছু সহ্য করেছেন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তার এই সহনশীলতা কেবল শারীরিক কষ্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল এক চূড়ান্ত মানসিক দৃঢ়তা বা রেজিলিয়েন্স (Resilience)। সাগরের বুকে সতেরো দিন টানা ভেলায় ভেসে থাকা, পলিফেমাসের গুহায় সঙ্গীদের মৃত্যু দেখা, অথবা ক্যারিবডিসের ঘূর্ণির ওপর ডুমুর গাছের ডালে বাদুড়ের মতো ঝুলে থাকা – এই প্রতিটি ঘটনাই যেকোনো সাধারণ মানুষকে পাগল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ওডিসিউস কখনো তার মানসিক ভারসাম্য হারাননি। তিনি প্রতিটি বিপর্যয়ের পর নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নিয়েছেন এবং আবার তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে গেছেন। তার এই হার না মানা মনোভাব তাকে মহাকাব্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজিক এবং একইসাথে অপরাজিত নায়কে পরিণত করেছে (Montiglio, 2011)।

তার সহনশীলতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হয়েছিল দেবী ক্যালিপসোর দ্বীপে। সেখানে তাকে কোনো শারীরিক কষ্ট দেওয়া হয়নি; উল্টো তাকে অমরত্ব এবং অনন্ত যৌবনের প্রলোভন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওডিসিউস সেই আরামদায়ক এবং মৃত্যুহীন জীবন প্রত্যাখ্যান করে তার নিজের মরণশীল সত্তাকেই বেছে নেন। টানা সাত বছর ধরে তিনি প্রতিদিন সমুদ্রের তীরে বসে ইথাকার জন্য কেঁদেছেন। এই কান্না কোনো দুর্বলতা ছিল না; এটি ছিল তার ভেতরের শেকড়ের টান বা নস্টস (Nostos)-এর বহিঃপ্রকাশ। তিনি জানতেন যে, অমর হয়ে গেলে তার জীবনের সমস্ত মানবিক অর্থ হারিয়ে যাবে। নিজের দুঃখ, কষ্ট এবং বার্ধক্যকে মেনে নেওয়ার এই মানসিক শক্তি ওডিসিউসকে দেবতাদের চেয়েও মহান করে তুলেছে।

ইথাকায় ফিরে আসার পরও তার এই সহনশীলতার পরীক্ষা শেষ হয়নি। নিজের বাড়িতে একজন ভিখারির মতো বসে থাকা এবং নিজের স্ত্রীকে অন্যের সাথে হাসিমুখে কথা বলতে দেখা একজন স্বামীর জন্য চরম মানসিক যন্ত্রণার বিষয়। অ্যান্টিনোয়াস যখন তাকে টুল দিয়ে আঘাত করে বা দাসীরা যখন তাকে বিদ্রূপ করে, তখন তার পেশি হয়তো পাল্টা আঘাত করার জন্য কেঁপে উঠেছিল, কিন্তু তার মেটিস তাকে শান্ত রাখে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য তাকে তার ইগো বা অহংকারকে পুরোপুরি বিসর্জন দিতে হবে। তার এই মানসিক দৃঢ়তা দেখায় যে, তিনি কেবল বাহ্যিক যুদ্ধেই জয়ী হননি, তিনি তার ভেতরের আবেগ এবং প্রবৃত্তির যুদ্ধেও পুরোপুরি বিজয়ী হয়েছিলেন।

বহুমাত্রিকতা এবং নৈতিক দ্বৈততা (Multidimensionality and Moral Duality)

ওডিসিউস কোনো একমুখী বা ত্রুটিহীন চরিত্র নন; তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের সবচেয়ে বহুমাত্রিক চরিত্র। তিনি একইসাথে একজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, একজন ধূর্ত চোর, একজন দক্ষ কাঠমিস্ত্রি (যিনি নিজের শয্যা ও ভেলা তৈরি করেছেন), একজন বাগ্মী বক্তা এবং একজন স্নেহশীল পিতা। পরিস্থিতির প্রয়োজনে তিনি খুব সহজেই নিজের রূপ এবং আচরণ বদলাতে পারেন। তিনি যখন নওসিকার সামনে দাঁড়ান, তখন তিনি অত্যন্ত সুশীল এবং সংযমী একজন মানুষের মতো কথা বলেন। আবার যখন তিনি ইথাকার হলরুমে অস্ত্র হাতে নেন, তখন তিনি হয়ে ওঠেন এক নির্মম এবং রক্তপিপাসু শিকারি। তার এই বহুমাত্রিকতা তাকে প্রায়শই এক ধরনের পরিচয় সংকট (Identity Crisis)-এর মধ্যে ফেলে দেয়, যেখানে তিনি নিজেই নিজের সত্তা থেকে দূরে সরে যান (Stanford, 1963)।

তবে এই বহুমাত্রিকতার পাশাপাশি ওডিসিউসের চরিত্রে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট নৈতিক দ্বৈততা বা মোরাল ডুয়ালিটি (Moral Duality) রয়েছে। তাকে অনেক সময় একজন হিরোর বদলে একজন ভিলেন বা অ্যান্টি-হিরো হিসেবেও দেখা যায়। তিনি তার উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যেকোনো ধরনের মিথ্যা বা প্রতারণার আশ্রয় নিতে দ্বিধা করেননি। আইওলাসের বায়ুর থলের ঘটনাটি দেখায় যে, একজন নেতা হিসেবে তিনি তার অনুসারীদের সাথে স্বচ্ছ যোগাযোগ বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, যার ফলে তার পুরো নৌবহর বিপদে পড়ে। স্কিলা ও ক্যারিবডিসের প্রণালী পার হওয়ার সময় তিনি তার সঙ্গীদের কাছে স্কিলার কথা গোপন রাখেন, যা শেষ পর্যন্ত ছয়জন সঙ্গীর নির্মম মৃত্যুর কারণ হয়। বৃহত্তর স্বার্থে নিজের সঙ্গীদের এভাবে বলির পাঁঠা বানানো আধুনিক নৈতিকতার মানদণ্ডে অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ।

এছাড়াও, ওডিসিউসের চরিত্রের অন্যতম বড় ত্রুটি ছিল তার অহংকার বা হিউব্রিস (Hubris)। পলিফেমাসের গুহা থেকে পালানোর সময় তিনি যদি কেবল ‘কেউ নয়’ হিসেবেই পালিয়ে যেতেন, তবে হয়তো এত বড় ট্র্যাজেডি এড়ানো যেত। কিন্তু তিনি তার আসল নাম চিৎকার করে দানবকে জানিয়ে দেন, যা পলিফেমাসকে তার পিতা পসেইডনের কাছে সরাসরি অভিশাপ দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। এই একটিমাত্র মুহূর্তের অহংকার তার সঙ্গীদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং তার নিজের ফেরার পথ দশ বছরের জন্য দীর্ঘায়িত করে। হোমার ওডিসিউসের এই দুর্বলতাগুলো আড়াল করেননি, বরং এগুলোকে তার চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখিয়েছেন, যা তাকে আরও বেশি মানবিক এবং বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।

আধুনিক যুগে ওডিসিউসের প্রাসঙ্গিকতা (Relevance of Odysseus in the Modern Age)

তিন হাজার বছর আগে রচিত হলেও, ওডিসিউসের চরিত্রটি আধুনিক যুগেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং আকর্ষণীয়। এর মূল কারণ হলো, ওডিসিউস কোনো ঐশ্বরিক শক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিলেন না; তিনি তার নিজের বুদ্ধি, শ্রম এবং টিকে থাকার ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর করতেন। আধুনিক যুগের মানুষের জীবনেও হয়তো দানব বা দেবতাদের রোষ নেই, কিন্তু সেখানে প্রতিনিয়ত রয়েছে বেঁচে থাকার সংগ্রাম, ক্যারিয়ারের চ্যালেঞ্জ, পরিচয় সংকট এবং নিজের শেকড় খুঁজে পাওয়ার ব্যাকুলতা। ওডিসিউসের এই দীর্ঘ যাত্রা তাই অনন্তকাল ধরে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য একটি মনস্তাত্ত্বিক দর্পণ হিসেবে কাজ করে, যেখানে মানুষ তার নিজের দুর্বলতা এবং শক্তিগুলোকে নতুন করে আবিষ্কার করতে পারে (Fowler, 2004)।

ওডিসিউস আমাদের শেখান যে, জীবনের প্রতিটি বাধা কেবল শারীরিক শক্তি দিয়ে পার হওয়া যায় না; এর জন্য প্রয়োজন হয় ধৈর্য, কৌশল এবং চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। তিনি দেখিয়েছেন যে, মানুষ যতই বড় বিপদে পড়ুক না কেন, যদি তার মধ্যে নিজের গন্তব্যের প্রতি অটল বিশ্বাস থাকে, তবে সে যেকোনো মায়াজাল বা প্রলোভন ছিন্ন করে বেরিয়ে আসতে পারে। ক্যালিপসোর অমরত্ব প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে তিনি আধুনিক মানুষকে এই শিক্ষাই দেন যে, একটি সাধারণ, মরণশীল এবং ভালোবাসায় পূর্ণ জীবন যেকোনো ঐশ্বরিক বা কৃত্রিম সুখের চেয়ে অনেক বেশি অর্থবহ।

পরিশেষে বলা যায়, ওডিসিউস হলেন পশ্চিমা সাহিত্যের সেই আদি আর্কিটাইপ, যার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে অসংখ্য সাহিত্য, চলচ্চিত্র এবং পপ-কালচারের নায়ক তৈরি হয়েছে। তার ধূর্ততা, তার কান্না, তার প্রতিশোধ এবং তার পুনর্মিলন – সবকিছু মিলিয়েই তিনি এমন এক জীবন্ত চরিত্র, যাকে সম্পূর্ণভাবে ভালোবাসা বা ঘৃণা করা যায় না, কিন্তু তাকে উপেক্ষা করাও অসম্ভব। ওডিসিউস তাই কেবল ইথাকার রাজা বা হোমারের মহাকাব্যের নায়ক নন; তিনি হলেন মানবজাতির সেই চিরন্তন টিকে থাকার লড়াইয়ের চূড়ান্ত প্রতীক, যা যুগ যুগ ধরে আমাদের অনুপ্রাণিত করে আসছে।

ট্রয়যুদ্ধের পটভূমি (Background of the Trojan War): সংঘাতের কারণ ও প্রধান পক্ষসমূহ

পেলাউস ও থেটিসের বিবাহ এবং গোল্ডেন অ্যাপল (Marriage of Peleus and Thetis and the Golden Apple)

প্রাচীন গ্রিক পুরাণে ট্রয়যুদ্ধের মতো এক মহাকাব্যিক ও ধ্বংসাত্মক সংঘাতের বীজ রোপিত হয়েছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত একটি জায়গায় – একটি বিবাহের অনুষ্ঠানে। এই বিবাহটি ছিল একজন মরণশীল রাজা পেলাউস (Peleus) এবং সমুদ্রের দেবী থেটিস (Thetis)-এর মধ্যে। অলিম্পাসের দেবতাদের রাজা জিউস নিজেই এই বিবাহের আয়োজন করেছিলেন, কারণ একটি প্রাচীন ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী থেটিসের গর্ভে এমন এক সন্তানের জন্ম হওয়ার কথা ছিল, যে তার পিতার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হবে। জিউস ভয় পাচ্ছিলেন যে থেটিসের সাথে তার বা অন্য কোনো দেবতার সম্পর্ক হলে অলিম্পাসের ক্ষমতা হুমকির মুখে পড়বে। তাই অত্যন্ত সুকৌশলে তিনি একজন মরণশীল মানুষের সাথে এই দেবীর বিবাহের ব্যবস্থা করেন। পেলিয়ন পর্বতে আয়োজিত এই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে অলিম্পাসের সমস্ত দেব-দেবীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, কেবল একজনকে ছাড়া। তিনি হলেন বিবাদ ও কলহের দেবতা এরিস (Eris) (Burgess, 2001)।

আমন্ত্রণ না পেয়ে এরিস অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বিবাহের অনুষ্ঠানে অলক্ষ্যে প্রবেশ করেন এবং অতিথিদের মাঝখানে একটি সোনার আপেল ছুড়ে মারেন। এই আপেলের গায়ে গ্রিক ভাষায় লেখা ছিল “কালিস্টেই” (Kallistei), যার অর্থ “সবচেয়ে সুন্দরীর জন্য”। এই একটিমাত্র আপেল অলিম্পাসের তিন প্রধান দেবী – জিউসের স্ত্রী হেরা (Hera), প্রজ্ঞার দেবী অ্যাথেনা (Athena) এবং প্রেমের দেবী অ্যাফ্রোডাইটি (Aphrodite)-এর মধ্যে এক তীব্র ইগো ও অহংকারের দ্বন্দ্ব তৈরি করে। প্রত্যেকেই দাবি করতে শুরু করেন যে এই সোনার আপেলের প্রকৃত অধিকারী তিনিই। এই দ্বন্দ্ব এতটাই চরমে পৌঁছায় যে, দেবতারা নিজেদের মধ্যে মারামারি শুরু করার উপক্রম করেন। জিউস অত্যন্ত চতুরতার সাথে এই বিবাদের বিচারকের দায়িত্ব নিজের কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলেন এবং সিদ্ধান্ত নেন যে, এই বিচার করবে পৃথিবীর সবচেয়ে সুদর্শন মরণশীল পুরুষ।

জিউস দেবতাদের বার্তাবাহক হার্মিসকে নির্দেশ দেন ওই তিন দেবীকে নিয়ে ট্রয়ের মাউন্ট আইডায় যেতে, যেখানে ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস (Paris) মেষপালক হিসেবে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিল। প্যারিসের জন্মলগ্নে একটি ভবিষ্যদ্বাণী হয়েছিল যে সে পুরো ট্রয় নগরীর ধ্বংসের কারণ হবে, তাই তাকে শৈশবেই পাহাড়ের ওপর ফেলে আসা হয়েছিল। কিন্তু সে অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় এবং একজন মেষপালক হিসেবে বড় হতে থাকে। তিন দেবী যখন প্যারিসের সামনে উপস্থিত হন এবং তাকে বিচারক হিসেবে ঘোষণা করেন, তখন তারা প্রত্যেকেই তাকে প্রলুব্ধ করার জন্য অত্যন্ত লোভনীয় সব প্রস্তাব দিতে শুরু করেন। হেরা তাকে পুরো এশিয়া ও ইউরোপের শাসনভার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন; অ্যাথেনা তাকে যুদ্ধে অসীম জ্ঞান ও বিজয়ের প্রস্তাব দেন; আর অ্যাফ্রোডাইটি প্রস্তাব দেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারীকে তার স্ত্রী হিসেবে পাওয়ার। প্যারিস, একজন তরুণ এবং আবেগপ্রবণ পুরুষ হিসেবে, ক্ষমতা বা জ্ঞানের চেয়ে প্রেমের প্রস্তাবটিকেই বেশি আকর্ষণীয় মনে করে এবং সোনার আপেলটি অ্যাফ্রোডাইটির হাতে তুলে দেয়। এই সিদ্ধান্তটি বা জাজমেন্ট অব প্যারিস (Judgment of Paris)-ই মূলত ট্রয়যুদ্ধের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক স্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করে।

হেলেনের সৌন্দর্য এবং টিন্ডারিউসের শপথ (Beauty of Helen and the Oath of Tyndareus)

অ্যাফ্রোডাইটি প্যারিসকে যে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারীর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেই নারীর নাম ছিল হেলেন (Helen)। হেলেন ছিলেন স্পার্টার রাজা টিন্ডারিউস এবং রানী লিডার কন্যা (তবে পুরাণে বলা হয় যে তার আসল পিতা ছিলেন স্বয়ং জিউস, যিনি রাজহাঁসের রূপ ধরে লিডার সাথে মিলিত হয়েছিলেন)। হেলেনের রূপের খ্যাতি পুরো গ্রিস বা হেলেনিক বিশ্বে এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে, গ্রিসের প্রায় সমস্ত শক্তিশালী রাজা এবং রাজপুত্র তাকে বিয়ে করার জন্য স্পার্টায় এসে ভিড় জমিয়েছিলেন। এই বিপুল সংখ্যক ক্ষমতাবান পাণিপ্রার্থীদের উপস্থিতি রাজা টিন্ডারিউসকে চরম রাজনৈতিক সংকটের মুখে ফেলে দেয়। তিনি বুঝতে পারছিলেন যে, তিনি যাকে হেলেনের স্বামী হিসেবে বেছে নেবেন, বাকিরা তার ওপর ক্ষুব্ধ হবে এবং স্পার্টায় এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ বা সিভিল ওয়ার (Civil War) শুরু হয়ে যাবে (Hughes, 2005)।

এই সংকট সমাধানের জন্য এগিয়ে আসেন ইথাকার ধূর্ত রাজা ওডিসিউস (Odysseus)। ওডিসিউস নিজেও হেলেনের পাণিপ্রার্থী হিসেবে স্পার্টায় এসেছিলেন, কিন্তু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে হেলেনকে পাওয়ার সম্ভাবনা তার অত্যন্ত ক্ষীণ। তাই তিনি টিন্ডারিউসের সাথে একটি অত্যন্ত সুকৌশলী চুক্তি করেন। ওডিসিউস বলেন যে, তিনি এই সংকট সমাধানের একটি পথ বাতলে দেবেন, তবে বিনিময়ে টিন্ডারিউসকে তার ভাইঝি পেনেলোপির সাথে ওডিসিউসের বিবাহের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। টিন্ডারিউস এই প্রস্তাবে রাজি হলে ওডিসিউস একটি ঐতিহাসিক শপথের প্রস্তাব দেন, যা গ্রিক পুরাণে টিন্ডারিউসের শপথ (Oath of Tyndareus) নামে পরিচিত। এই শপথ অনুযায়ী, হেলেন যাকে স্বামী হিসেবে বেছে নেবেন, বাকি সমস্ত পাণিপ্রার্থীদের সেই বিবাহ মেনে নিতে হবে এবং যদি ভবিষ্যতে কেউ হেলেনকে অপহরণ করে বা তার স্বামীর কোনো ক্ষতি করে, তবে সমস্ত গ্রিক রাজারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেই অপরাধীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন।

সমস্ত পাণিপ্রার্থী, যারা প্রত্যেকেই ভেবেছিল যে হেলেন হয়তো তাকেই বেছে নেবে, তারা সানন্দে একটি বলি দেওয়া ঘোড়ার মাংসের ওপর দাঁড়িয়ে এই শপথ গ্রহণ করে। হেলেন শেষ পর্যন্ত মাইসিনির শক্তিশালী রাজা আগামেমননের ভাই মেনেলাউস (Menelaus)-কে তার স্বামী হিসেবে বেছে নেন। মেনেলাউস স্পার্টার রাজা হিসেবে অধিষ্ঠিত হন এবং গ্রিস ভূখণ্ডে সাময়িক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এই শপথটি ছিল মূলত একটি সুপ্ত টাইমবোমা। ওডিসিউস যে শপথটি তৈরি করেছিলেন একটি যুদ্ধ এড়ানোর জন্য, নিয়তির নির্মম পরিহাসে সেই একই শপথ পরবর্তীকালে গ্রিসের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক যুদ্ধের বৈধতা বা ক্যাসাস বেলি (Casus Belli) হিসেবে কাজ করেছিল।

আতিথেয়তার অবমাননা ও হেলেনের অপহরণ (Violation of Hospitality and the Abduction of Helen)

প্যারিস যখন তার হারানো রাজকীয় পরিচয় ফিরে পায় এবং ট্রয়ের রাজপুত্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে, তখন সে অ্যাফ্রোডাইটির প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য স্পার্টার উদ্দেশ্যে একটি কূটনৈতিক যাত্রা শুরু করে। স্পার্টায় পৌঁছানোর পর রাজা মেনেলাউস তাকে অত্যন্ত সাদরে গ্রহণ করেন। প্রাচীন গ্রিক সমাজের সবচেয়ে পবিত্র নিয়ম জেনিয়া (Xenia) বা আতিথেয়তা অনুযায়ী মেনেলাউস প্যারিসকে সেরা খাবার, পানীয় এবং বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু কয়েক দিন পর মেনেলাউসকে একটি জরুরি কাজে স্পার্টা ছেড়ে ক্রিট দ্বীপে যেতে হয়। মেনেলাউসের এই অনুপস্থিতি প্যারিসের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দেয়। সে আতিথেয়তার পবিত্র নিয়মকে সম্পূর্ণভাবে পদদলিত করে এবং মেনেলাউসের প্রাসাদের চরম অবমাননা করে (Reece, 1993)।

প্যারিস এবং হেলেনের মধ্যে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে সাহিত্যিক এবং ঐতিহাসিকদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক রয়েছে। অনেক প্রাচীন বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, অ্যাফ্রোডাইটির জাদুর প্রভাবে হেলেন প্যারিসের প্রেমে অন্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় তার সাথে পালিয়ে গিয়েছিলেন। আবার অন্য বর্ণনায় দাবি করা হয় যে, প্যারিস বলপ্রয়োগ করে হেলেনকে অপহরণ বা অ্যাবডাকশন (Abduction) করেছিল এবং সাথে স্পার্টার রাজকোষের প্রচুর ধনসম্পদও লুট করে নিয়েছিল। তবে হেলেন স্বেচ্ছায় গিয়েছিলেন নাকি অপহৃত হয়েছিলেন – এই বিষয়টি গ্রিক রাজাদের কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তাদের কাছে প্রধান বিষয় ছিল জেনিয়ার চরম লঙ্ঘন এবং একজন গ্রিক রাজার সম্মানের ওপর এক বিদেশি রাজপুত্রের আঘাত। একজন অতিথি হয়ে গৃহস্বামীর স্ত্রীকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া ছিল দেবতাদের চোখে ক্ষমার অযোগ্য এক চরম অহংকার বা হিউব্রিস (Hubris)

মেনেলাউস ক্রিট থেকে ফিরে এসে যখন দেখেন যে তার স্ত্রী এবং সম্পদ কিছুই নেই, তখন তার ক্ষোভের কোনো সীমা থাকে না। তিনি সরাসরি তার বড় ভাই, মাইসিনির পরাক্রমশালী রাজা আগামেমনন (Agamemnon)-এর কাছে যান। আগামেমনন ছিলেন তৎকালীন গ্রিসের সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক বা প্যারামাউন্ট কিং (Paramount King)। তিনি বুঝতে পারেন যে, এটি কেবল তার ভাইয়ের ব্যক্তিগত অপমান নয়; এটি পুরো গ্রিক জাতির ওপর ট্রয়ের একটি সরাসরি আক্রমণ। আগামেমনন কালবিলম্ব না করে টিন্ডারিউসের সেই পুরোনো শপথের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে গ্রিসের সমস্ত রাজাদের কাছে বার্তাবাহক পাঠান। তিনি ঘোষণা করেন যে, এখন সময় এসেছে শপথ রক্ষা করার এবং হেলেনকে উদ্ধার করে গ্রিকদের হারানো সম্মান বা টিমে (Time) ফিরিয়ে আনার। এভাবেই একটি ব্যক্তিগত পরকীয়া বা অপহরণের ঘটনা একটি আন্তর্জাতিক মহাযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করে দেয়।

গ্রিক বাহিনীর একত্রীকরণ এবং আগামেমননের নেতৃত্ব (Unification of the Greek Forces and Agamemnon’s Leadership)

আগামেমননের ডাকে সাড়া দিয়ে গ্রিসের বিভিন্ন স্বাধীন নগররাষ্ট্র বা পোলিস (Polis) থেকে রাজারা তাদের নিজ নিজ সেনাবাহিনী এবং নৌবহর নিয়ে আউলিস বন্দরে এসে জড়ো হতে শুরু করেন। এটি ছিল গ্রিসের ইতিহাসে প্রথম কোনো ঘটনা, যেখানে এতগুলো স্বাধীন রাজ্য একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে ঐক্যবদ্ধ বা প্যান-হেলেনিক (Pan-Hellenic) শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। এই বাহিনীর মধ্যে ছিলেন স্পার্টার মেনেলাউস, আরগোসের ডিওমেডিস, পিলাসের প্রবীণ রাজা নেস্টর, সালাামিসের গ্রেটার এজাক্স এবং অবশ্যই ইথাকার ওডিসিউস। তবে এই ঐক্যবদ্ধ বাহিনী গঠন করা মোটেও সহজ কাজ ছিল না। অনেক রাজাই নিজেদের রাজ্য ছেড়ে এত দূরের এক যুদ্ধে যেতে আগ্রহী ছিলেন না। বিশেষ করে ওডিসিউস, যিনি সদ্য পিতা হয়েছিলেন, তিনি পাগল সাজার ভান করে যুদ্ধ এড়াতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার কৌশল ধরা পড়ে যায় এবং তাকে বাধ্য হয়ে যুদ্ধে যোগ দিতে হয় (Finkelberg, 2005)।

এই গ্রিক বা আকিয়ান (Achaean) বাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য সদস্য ছিলেন ফথিয়ার রাজপুত্র একিলিস। ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যে একিলিস ছাড়া ট্রয় জয় করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। একিলিসের মা দেবী থেটিস জানতেন যে ট্রয়যুদ্ধে গেলে তার ছেলে মারা পড়বে, তাই তিনি একিলিসকে মেয়েদের পোশাক পরিয়ে স্কাইরোস দ্বীপে লুকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু ধূর্ত ওডিসিউস সেখানে গিয়ে একিলিসের আসল পরিচয় বের করে আনেন এবং তাকে যুদ্ধে যোগ দিতে রাজি করান। একিলিস তার বিখ্যাত মাইরমিডন বা পিঁপড়ার মতো পরিশ্রমী যোদ্ধাদের নিয়ে আউলিসে এসে পৌঁছান। প্রায় বারোশো জাহাজের এক বিশাল নৌবহর এবং লক্ষাধিক সৈন্য নিয়ে আগামেমনন এই সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান সেনাপতি বা কমান্ডার-ইন-চিফ (Commander-in-Chief) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তবে আউলিস বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করার আগেই গ্রিক বাহিনীকে এক ভয়ংকর ঐশ্বরিক পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। দেবী আর্টেমিসের রোষানলে পড়ে আউলিস বন্দরে বাতাস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে জাহাজগুলো সাগরে ভাসানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। ভবিষ্যদ্বক্তা ক্যালকাস জানান যে, আর্টেমিসের রোষ শান্ত করতে হলে আগামেমননকে তার নিজের মেয়ে ইফিগেনিয়াকে বেদিতে বলি দিতে হবে। একজন নেতার জন্য এটি ছিল চরম অমানবিক একটি পরীক্ষা। আগামেমনন তার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং পুরো বাহিনীর চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত নিজের মেয়েকে বলি দেন (যদিও কোনো কোনো বর্ণনায় বলা হয় আর্টেমিস শেষ মুহূর্তে মেয়েটিকে বাঁচিয়ে একটি হরিণকে বলির স্থানে রেখে দেন)। এই ঘটনাটি দেখায় যে, এই যুদ্ধটি শুরু হওয়ার আগে থেকেই রক্ত এবং চরম মানসিক মূল্যের বিনিময়ে তার বৈধতা আদায় করে নিয়েছিল। ইফিগেনিয়ার বলিদানের পর বাতাস আবার বইতে শুরু করে এবং গ্রিক নৌবহর ট্রয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।

ট্রয়ের ভৌগোলিক গুরুত্ব ও ট্রোজানদের প্রতিরক্ষা (Geographical Significance of Troy and the Defense of the Trojans)

গ্রিক বাহিনীর গন্তব্য ট্রয় (Troy) বা ইলিওন কোনো সাধারণ শহর ছিল না। এটি ছিল এশিয়া মাইনরের (বর্তমান তুরস্ক) উত্তর-পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং ধনী নগরী। ট্রয়ের এই অঢেল সম্পদের মূল কারণ ছিল এর ভৌগোলিক অবস্থান। শহরটি দার্দানেলিস প্রণালীর কাছে অবস্থিত হওয়ার কারণে ইজিয়ান সাগর থেকে কৃষ্ণসাগরে যাতায়াতকারী সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজকে ট্রয়ের উপকূল হয়ে যেতে হতো। ট্রোজানরা এই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণ টোল বা কর আদায় করত। অনেক আধুনিক ইতিহাসবিদ মনে করেন যে, ট্রয়যুদ্ধের আসল কারণ কেবল হেলেনকে উদ্ধার করা ছিল না; এর পেছনে গ্রিকদের একটি বড় অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য বা ইকোনমিক মোটিভ (Economic Motive) কাজ করেছিল। গ্রিকরা মূলত ট্রয়ের এই বাণিজ্যিক একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল (Wood, 1985)।

ট্রয়ের শাসন ক্ষমতায় ছিলেন অত্যন্ত বয়োজ্যেষ্ঠ এবং প্রজ্ঞাবান রাজা প্রিয়াম। তার অধীনে ট্রয় নগরী এক সুদৃঢ় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। ট্রয়ের চারপাশ ঘিরে ছিল এক দুর্ভেদ্য এবং উঁচু পাথরের প্রাচীর, যা স্বয়ং দেবতা পসেইডন এবং অ্যাপোলো নির্মাণ করে দিয়েছিলেন বলে পুরাণে উল্লেখ আছে। এই প্রাচীর ভেদ করে শহরের ভেতরে প্রবেশ করা কোনো মরণশীল মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। রাজা প্রিয়ামের ছিল পঞ্চাশজন পুত্র, যারা প্রত্যেকেই একেকজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। এদের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন যুবরাজ হেক্টর (Hector), যিনি ছিলেন ট্রোজান বাহিনীর প্রধান সেনাপতি। হেক্টর কেবল একজন যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত দায়িত্বশীল পিতা এবং স্বামী। তার কাছে যুদ্ধ কোনো রোমাঞ্চ বা গৌরবের বিষয় ছিল না; তিনি যুদ্ধ করছিলেন কেবল তার জন্মভূমি এবং পরিবারকে রক্ষা করার জন্য।

ট্রোজান বাহিনী কেবল তাদের নিজেদের শহরের সৈন্যদের নিয়েই গঠিত ছিল না। রাজা প্রিয়ামের সাথে এশিয়া মাইনরের বিভিন্ন শক্তিশালী জাতির অত্যন্ত ভালো রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক বা অ্যালায়েন্স (Alliance) ছিল। যখন গ্রিক নৌবহর ট্রয়ের দিকে ধেয়ে আসছিল, তখন প্রিয়ামের ডাকে সাড়া দিয়ে লাইসিয়ান, থ্রেসিয়ান, অ্যামাজন এবং ইথিওপিয়ানদের মতো দুর্ধর্ষ মিত্র বাহিনী ট্রয়ের প্রতিরক্ষায় যোগ দেয়। এই মিত্র বাহিনীর উপস্থিতি ট্রয়যুদ্ধকে কেবল দুটি শহরের লড়াইয়ের বদলে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের এক বিশাল আন্তর্জাতিক সংঘাতে পরিণত করে। হেক্টরের নেতৃত্বে এই সম্মিলিত ট্রোজান বাহিনী গ্রিকদের জন্য এমন এক বিশাল প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়, যা ভাঙতে গ্রিকদের পুরো দশটি বছর সময় লেগেছিল।

দেবতাদের বিভাজন এবং মহাজাগতিক ছায়াযুদ্ধ (Division of the Gods and the Cosmic Proxy War)

ট্রয়যুদ্ধ কেবল মরণশীল মানুষদের রক্তক্ষয়ী লড়াই ছিল না; এটি ছিল অলিম্পাসের দেবতাদের নিজেদের মধ্যকার ইগো, ক্ষোভ এবং ক্ষমতার এক বিশাল ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সি ওয়ার (Proxy War)। প্যারিসের সেই সোনার আপেলের বিচারের জেরে অলিম্পাসের দেবতারা সুস্পষ্টভাবে দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে যান। যে দেবীরা প্যারিসের কাছে হেরে গিয়েছিলেন, অর্থাৎ হেরা এবং অ্যাথেনা, তারা তাদের সমস্ত শক্তি নিয়ে গ্রিকদের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ট্রয় নগরীকে পুরোপুরি ধ্বংস করে নিজেদের অপমানের প্রতিশোধ নেওয়া। অন্যদিকে, অ্যাফ্রোডাইটি স্বাভাবিকভাবেই প্যারিস এবং ট্রোজানদের পক্ষ নেন। তার সাথে যোগ দেন যুদ্ধের দেবতা আরেস এবং সূর্যদেবতা অ্যাপোলো। অ্যাপোলো ট্রয়ের প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন বলে তিনি ট্রোজানদের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ছিলেন (Nagy, 1999)।

দেবতাদের এই বিভাজন যুদ্ধক্ষেত্রকে অত্যন্ত জটিল এবং অনেক ক্ষেত্রে অন্যায়ভাবে প্রভাবিত করেছিল। দেবতারা মাঝে মাঝেই মানুষের রূপ ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে আসতেন এবং তাদের প্রিয় বীরদের সাহায্য করতেন বা শত্রুদের পতন নিশ্চিত করতেন। যেমন, একিলিস যখন হেক্টরের সাথে চূড়ান্ত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন, তখন অ্যাথেনা হেক্টরের ভাইয়ের রূপ ধরে তাকে ধোঁকা দেন, যা হেক্টরের মৃত্যুর পথ প্রশস্ত করে। আবার অন্যদিকে অ্যাপোলো প্যারিসের তীরকে দিকনির্দেশনা দিয়ে একিলিসের দুর্বল গোড়ালিতে আঘাত হানতে সাহায্য করেন। দেবতাদের এই প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ দেখায় যে, ট্রয়যুদ্ধে কোনো মানুষেরই তার নিজের ভাগ্যের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল না। মানুষের বীরত্ব এবং মৃত্যু অনেক ক্ষেত্রেই দেবতাদের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর করত।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভূমিকাটি ছিল দেবতাদের রাজা জিউসের। জিউস কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের প্রতি পুরোপুরি ঝুঁকে পড়েননি, যদিও ট্রয়ের প্রতি তার কিছুটা দুর্বলতা ছিল। তিনি মূলত একটি ভারসাম্য বা ব্যালেন্স অব পাওয়ার (Balance of Power) বজায় রাখার চেষ্টা করতেন। তিনি মাঝে মাঝেই তার সোনার দাঁড়িপাল্লায় দুই পক্ষের ভাগ্য মাপতেন এবং যখন যার ভাগ্য ভারী হতো, তাকে বিজয়ের সুযোগ দিতেন। জিউসের এই নিরপেক্ষ অবস্থান মহাকাব্যে একটি চরম সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে: যতই ঐশ্বরিক বা মানবিক শক্তি থাকুক না কেন, চূড়ান্ত নিয়তি বা ময়রা (Moira)-র ওপর কারও হাত নেই। ট্রয়যুদ্ধের এই পটভূমি তাই কেবল একটি ঐতিহাসিক বা সামরিক প্রস্তুতি নয়; এটি হলো মানুষের অহংকার, দেবতাদের রাজনীতি এবং অলঙ্ঘনীয় নিয়তির এক মহাকাব্যিক ক্যানভাস, যার ওপর রক্ত দিয়ে লেখা হয়েছিল পশ্চিমা সাহিত্যের আদি এবং অকৃত্রিম ইতিহাস।

ইলিয়াডের কাহিনি (Story of the Iliad): ট্রয়যুদ্ধের শেষ পর্যায়ের ঘটনাবলি

একিলিসের ক্রোধ এবং গ্রিক শিবিরের অন্তর্দ্বন্দ্ব (Wrath of Achilles and the Internal Conflict of the Greek Camp)

প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের আদি এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী মহাকাব্য ইলিয়াড (Iliad)-এর শুরুটা কোনো বিশাল যুদ্ধের দামামা বা ট্রয় নগরীর পতন দিয়ে হয়নি; এটি শুরু হয়েছে একজন মানুষের ব্যক্তিগত ক্ষোভ এবং ইগো বা অহংকারের আখ্যান দিয়ে। মহাকাব্যের একেবারে প্রথম লাইনেই হোমার মিউজের কাছে প্রার্থনা করেছেন একিলিস (Achilles)-এর ক্রোধের গান গাওয়ার জন্য। ট্রয়যুদ্ধের দশম বছরে এসে গ্রিক বা আকিয়ান (Achaean) শিবিরে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি হয়। গ্রিক বাহিনীর প্রধান সেনাপতি আগামেমনন (Agamemnon) ট্রয়ের পার্শ্ববর্তী একটি অঞ্চলে আক্রমণ চালিয়ে অ্যাপোলোর একজন পুরোহিতের কন্যা ক্রিসেইসকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে নিজের কাছে রেখে দেন। পুরোহিত যখন তার মেয়েকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মুক্তিপণ নিয়ে আসেন, তখন আগামেমনন অত্যন্ত উদ্ধত ভাষায় তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন। এই অপমানের প্রতিশোধ হিসেবে দেবতা অ্যাপোলো গ্রিক শিবিরে এক ভয়ংকর মহামারি লেলিয়ে দেন, যার ফলে প্রতিদিন শত শত গ্রিক সৈন্য মারা পড়তে থাকে (Fagles, 1990)।

মহামারি থেকে বাঁচার জন্য একিলিস গ্রিক রাজাদের একটি জনসভা ডাকেন। সেখানে ভবিষ্যদ্বক্তা ক্যালকাস জানান যে, ক্রিসেইসকে তার পিতার কাছে ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত অ্যাপোলোর রোষ শান্ত হবে না। আগামেমনন বাধ্য হয়ে ক্রিসেইসকে ফিরিয়ে দিতে রাজি হন, কিন্তু তার ভেতরের চরম অহংকার বা হিউব্রিস (Hubris) এই পরাজয় মেনে নিতে পারে না। তিনি দাবি করেন যে, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে গ্রিক শিবিরের অন্য কোনো বীরের যুদ্ধজয়ের পুরস্কার বা জেরাস (Geras) তাকে দিতে হবে। এরপর তিনি একিলিসের তাঁবু থেকে তার প্রিয় যুদ্ধবন্দিনী ব্রিসেইসকে জোর করে কেড়ে নেন। ব্রিসেইসকে কেড়ে নেওয়ার এই ঘটনাটি একিলিসের আত্মসম্মান এবং খ্যাতির ওপর এক চরম আঘাত ছিল। একিলিস মনে করতেন যে, ট্রয়যুদ্ধে গ্রিকদের সমস্ত বিজয় মূলত তার নিজের তরোয়ালের জোরেই অর্জিত হয়েছে, অথচ আগামেমনন তাকে একজন সাধারণ দাসের মতো অপমান করেছেন।

এই চরম অপমানের পর একিলিস একটি অত্যন্ত নাটকীয় এবং ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, তিনি এবং তার দুর্ধর্ষ মাইরমিডন যোদ্ধারা আর গ্রিকদের হয়ে ট্রয়যুদ্ধে অংশ নেবে না। তিনি তার তাঁবুতে নিজেকে গুটিয়ে নেন এবং তার মা, সমুদ্রের দেবী থেটিসের কাছে গিয়ে প্রার্থনা করেন যেন দেবতারা ট্রোজানদের যুদ্ধে জয়ী হতে সাহায্য করেন। একিলিসের উদ্দেশ্য ছিল আগামেমননকে এটা বুঝিয়ে দেওয়া যে, তাকে ছাড়া গ্রিক বাহিনী কতটা অসহায়। একিলিসের এই ক্রোধ বা মেনিস (Menis) কোনো সাধারণ রাগ ছিল না; এটি ছিল পুরো মহাকাব্যের চালিকাশক্তি। তার এই একটিমাত্র সিদ্ধান্তের কারণে অগণিত গ্রিক যোদ্ধাকে প্রাণ হারাতে হয় এবং ট্রয়যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি পুরোপুরি উল্টে যায়।

ট্রোজানদের পাল্টা আক্রমণ এবং গ্রিকদের বিপর্যয় (Counterattack of the Trojans and the Disaster of the Greeks)

একিলিসের অনুপস্থিতির সুযোগটি অত্যন্ত সুকৌশলে কাজে লাগায় ট্রোজান বাহিনী। ট্রয়ের প্রধান সেনাপতি এবং রাজপুত্র হেক্টর (Hector) বুঝতে পারেন যে, গ্রিক শিবিরের সবচেয়ে বড় ঢালটি এখন সরে গেছে। হেক্টরের নেতৃত্বে ট্রোজানরা তাদের দুর্ভেদ্য প্রাচীরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে গ্রিকদের ওপর প্রবল আক্রমণ শুরু করে। এই আক্রমণগুলো কোনো সাধারণ খণ্ডযুদ্ধ ছিল না; এগুলো ছিল সরাসরি গ্রিকদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত। জিউস, যিনি থেটিসের প্রার্থনায় একিলিসের সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি ট্রোজানদের পক্ষে কাজ করতে শুরু করেন। তিনি গ্রিকদের মনে ভীতি সঞ্চার করেন এবং ট্রোজানদের মনে অসীম সাহস জোগিয়ে দেন। হেক্টরের রণকৌশল এবং দেবতাদের আনুকূল্যের সামনে গ্রিক বাহিনীর বড় বড় বীরেরা, যেমন মেনেলাউস, ডিওমেডিস এবং এমনকি ধূর্ত ওডিসিউসও পিছু হটতে বাধ্য হন (Redfield, 1979)।

যুদ্ধের এই পর্যায়ে গ্রিক বাহিনীর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়ে। ট্রোজানরা কেবল গ্রিকদের পিছু হটিয়েই শান্ত হয়নি, তারা গ্রিকদের সুরক্ষিত প্রাচীর ভেঙে ফেলে এবং তাদের জাহাজের কাছে এসে পৌঁছায়। হেক্টরের মূল লক্ষ্য ছিল গ্রিকদের জাহাজগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া, যাতে তাদের দেশে ফেরার কোনো উপায় অবশিষ্ট না থাকে। জাহাজ পুড়িয়ে দেওয়ার এই হুমকি গ্রিকদের জন্য এক চূড়ান্ত বিপর্যয়ের সংকেত ছিল। আগামেমনন বুঝতে পারেন যে তিনি কত বড় ভুল করেছেন। তিনি একিলিসকে শান্ত করার জন্য ওডিসিউস এবং এজাক্সকে প্রচুর ধনসম্পদ এবং ব্রিসেইসকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে একিলিসের তাঁবুতে পাঠান। এই পর্বটিকে বলা হয় দি অ্যাম্বাসি টু একিলিস (The Embassy to Achilles)

ওডিসিউস অত্যন্ত বাগ্মিতার সাথে একিলিসকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, এখন তার ক্রোধ ভুলে গ্রিকদের বাঁচানো উচিত, নচেৎ পুরো গ্রিক বাহিনী ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু একিলিস তার জেদ থেকে একচুলও সরে আসেন না। তিনি বলেন যে, আগামেমননের সম্পদ তার কাছে মূল্যহীন এবং তিনি আগামীকালই তার জাহাজ নিয়ে দেশে ফিরে যাবেন। একিলিসের এই প্রত্যাখ্যান দেখায় যে, তার কাছে রাজনৈতিক আপসের চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত সম্মান এবং ইগো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তার এই অনড় অবস্থান গ্রিক বাহিনীকে এক নিশ্চিত ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। হেক্টর যখন প্রথম গ্রিক জাহাজটিতে আগুন ধরিয়ে দিতে সক্ষম হন, তখন মনে হচ্ছিল যেন ট্রয়যুদ্ধে ট্রোজানদের চূড়ান্ত বিজয় কেবল সময়ের ব্যাপার।

প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যু এবং একিলিসের রূপান্তর (Death of Patroclus and the Transformation of Achilles)

গ্রিক জাহাজগুলোতে যখন আগুন জ্বলছে এবং গ্রিক বাহিনীর পতন যখন প্রায় নিশ্চিত, তখন একিলিসের তাঁবুতে এক চরম আবেগপূর্ণ দৃশ্যের অবতারণা হয়। একিলিসের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু এবং যুদ্ধসঙ্গী প্যাট্রোক্লাস (Patroclus) গ্রিকদের এই দুর্দশা দেখে আর স্থির থাকতে পারে না। সে কাঁদতে কাঁদতে একিলিসকে অনুরোধ করে যেন অন্তত তাকে একিলিসের বিখ্যাত বর্মটি পরে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। প্যাট্রোক্লাসের ধারণা ছিল, ট্রোজানরা যখন একিলিসের বর্ম দেখবে, তখন তারা ভয়ে পিছু হটবে এবং গ্রিকরা কিছুটা স্বস্তির শ্বাস ফেলার সুযোগ পাবে। একিলিস শেষ পর্যন্ত এই শর্তে রাজি হন যে, প্যাট্রোক্লাস কেবল জাহাজগুলো রক্ষা করবে, কিন্তু কোনোভাবেই ট্রয়ের প্রাচীর পর্যন্ত তাড়া করে যাবে না (Schein, 1984)।

প্যাট্রোক্লাস একিলিসের বর্ম পরে রণভূমিতে নামার সাথে সাথেই যুদ্ধের মোড় আবার ঘুরে যায়। ট্রোজানরা সত্যিই তাকে একিলিস ভেবে ভয়ে পালাতে শুরু করে। প্যাট্রোক্লাস অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে এবং ট্রোজানদের জাহাজ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু যুদ্ধের নেশায় এবং বিজয়ের আনন্দে সে একিলিসের সেই সতর্কবাণী পুরোপুরি ভুলে যায়। সে ট্রোজানদের তাড়া করে একেবারে ট্রয়ের প্রাচীরের নিচ পর্যন্ত চলে যায়। এই সীমালঙ্ঘন বা হিউব্রিস (Hubris) প্যাট্রোক্লাসের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। দেবতা অ্যাপোলো পেছন থেকে তাকে আঘাত করে তার বর্ম খুলে ফেলেন, এবং শেষ পর্যন্ত হেক্টর তার বর্শা দিয়ে প্যাট্রোক্লাসকে হত্যা করেন। হেক্টর অত্যন্ত গর্বের সাথে একিলিসের সেই বিখ্যাত বর্মটি নিজের গায়ে জড়িয়ে নেন।

প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যুর খবর যখন একিলিসের কাছে পৌঁছায়, তখন তার ভেতরের পৃথিবী চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে নিজের মাথায় ধুলো মাখতে থাকেন এবং এমনভাবে বিলাপ করতে শুরু করেন যে তার মা থেটিস সাগরের তলদেশ থেকে ছুটে আসেন। প্যাট্রোক্লাসের এই মৃত্যু একিলিসের চরিত্রের এক চূড়ান্ত রূপান্তর বা ট্রান্সফরমেশন (Transformation) ঘটায়। তার যে ক্রোধ বা মেনিস এতদিন আগামেমননের প্রতি ছিল, তা এখন পুরোপুরি হেক্টরের দিকে ঘুরে যায়। একিলিস বুঝতে পারেন যে তার নিজের জেদের কারণেই আজ তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে প্রাণ হারাতে হলো। তিনি আগামেমননের সাথে সমস্ত বিবাদ ভুলে যান এবং তার মায়ের মাধ্যমে দেবতা হেফায়েস্টাসের তৈরি করা এক নতুন ঐশ্বরিক বর্ম পরিধান করে রণভূমিতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। একিলিসের এই প্রত্যাবর্তন ট্রয়যুদ্ধের শেষ এবং সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সূচনা করে।

হেক্টরের সাথে চূড়ান্ত লড়াই এবং মৃতদেহের অবমাননা (The Final Battle with Hector and the Desecration of the Corpse)

একিলিস যখন তার নতুন বর্ম পরে রণভূমিতে নামেন, তখন তিনি কোনো সাধারণ যোদ্ধা ছিলেন না; তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অন্ধ এবং রক্তপিপাসু যমদূত। তার সামনে যে ট্রোজান সৈন্যই পড়েছে, তাকেই তিনি নির্মমভাবে হত্যা করেছেন। তিনি স্ক্যামান্ডার নদীকে লাশে ভরিয়ে দেন, যার ফলে নদীর দেবতা তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে ডুবিয়ে মারার চেষ্টা করেন, কিন্তু দেবতারা তাকে রক্ষা করেন। একিলিসের এই উন্মত্ততা দেখে ট্রোজান বাহিনীর সমস্ত সৈন্য ভয়ে ট্রয়ের প্রাচীরের ভেতরে পালিয়ে যায়। কেবল একজন মানুষ প্রাচীরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন; তিনি হলেন হেক্টর। হেক্টরের পিতামাতা প্রাচীরের ওপর থেকে কাঁদতে কাঁদতে তাকে ভেতরে আসার অনুরোধ করেন, কিন্তু হেক্টরের ভেতরের সম্মানবোধ তাকে পিছু হটতে দেয় না। সে বুঝতে পারে যে তার নিজের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণেই আজ ট্রোজান বাহিনীর এত বড় ক্ষতি হয়েছে (Mueller, 1984)।

তবে একিলিসকে ধেয়ে আসতে দেখে হেক্টরের ভেতরেও মুহূর্তের জন্য মানবিক ভীতি কাজ করে। সে ট্রয় নগরীর চারপাশ ঘিরে তিনবার দৌড়ে পালায় এবং একিলিস তাকে তাড়া করেন। শেষ পর্যন্ত দেবী অ্যাথেনা হেক্টরের ভাই ডেইফোবাসের ছদ্মবেশ ধরে হেক্টরকে থামতে এবং লড়াই করতে প্ররোচিত করেন। হেক্টর যখন বুঝতে পারেন যে দেবতারা তাকে ধোঁকা দিয়েছে এবং তার মৃত্যু অনিবার্য, তখন সে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে তার তলোয়ার বের করে একিলিসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু একিলিসের বর্শার নিখুঁত আঘাত হেক্টরের গলার সেই জায়গাটিতে বিদ্ধ হয়, যেখানে কোনো বর্মের আচ্ছাদন ছিল না। হেক্টর মৃত্যুর আগে একিলিসকে অনুরোধ করে যেন তার মৃতদেহটি তার পিতামাতার কাছে ফেরত দেওয়া হয়, কিন্তু একিলিস অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

হেক্টরের মৃত্যুর পর একিলিসের ভেতরের ক্রোধ শান্ত হয়নি, বরং তা এক বন্য আক্রোশে পরিণত হয়। তিনি হেক্টরের মৃতদেহটির পায়ের গোড়ালি ফুটো করে চামড়ার দড়ি দিয়ে তার রথের পেছনে বাঁধেন। এরপর তিনি রথ ছুটিয়ে ট্রয়ের প্রাচীরের সামনে দিয়ে হেক্টরের মৃতদেহটি ধুলোয় টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যান। ট্রয়ের প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে রাজা প্রিয়াম এবং হেক্টরের স্ত্রী অ্যান্ড্রোম্যাকি এই বীভৎস দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রাচীন গ্রিক সমাজে মৃতদেহের এই ধরনের অবমাননা বা ডেসিক্রেশন (Desecration) ছিল চরম অমার্জনীয় একটি কাজ। একিলিস টানা বারো দিন ধরে হেক্টরের মৃতদেহটিকে প্যাট্রোক্লাসের সমাধির চারপাশে টেনেহিঁচড়ে অবমাননা করেন। তার এই আচরণ দেখায় যে, শোক এবং ক্রোধ মানুষকে কীভাবে তার সমস্ত মানবিক গুণাবলি ভুলিয়ে দিয়ে একটি পশুতে পরিণত করতে পারে।

রাজা প্রিয়ামের মিনতি এবং মানবিকতার পুনর্জাগরণ (King Priam’s Plea and the Reawakening of Humanity)

একিলিসের এই অমানবিক আচরণ অলিম্পাসের দেবতাদের কাছেও অত্যন্ত দৃষ্টিকটু এবং অগ্রহণযোগ্য মনে হয়। স্বয়ং জিউস সিদ্ধান্ত নেন যে এই অবমাননার এবার অবসান হওয়া প্রয়োজন। তিনি থেটিসের মাধ্যমে একিলিসকে নির্দেশ দেন হেক্টরের মৃতদেহ ফেরত দেওয়ার জন্য। অন্যদিকে, দেবতা হার্মিস রাতের অন্ধকারে ট্রয়ের বৃদ্ধ রাজা প্রিয়ামকে অত্যন্ত গোপনে গ্রিক শিবিরের ভেতরে একিলিসের তাঁবুতে নিয়ে আসেন। প্রিয়াম একাকী এবং নিরস্ত্র অবস্থায় তার সবচেয়ে বড় শত্রুর তাঁবুতে প্রবেশ করেন। তিনি সরাসরি একিলিসের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েন এবং সেই হাতগুলোতে চুম্বন করেন, যে হাতগুলো তার অগণিত সন্তানকে হত্যা করেছে। এই দৃশ্যটি পশ্চিমা সাহিত্যের ইতিহাসে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং আবেগঘন একটি মুহূর্ত হিসেবে স্বীকৃত (MacLeod, 1982)।

প্রিয়াম অত্যন্ত করুণ স্বরে একিলিসকে তার নিজের বৃদ্ধ পিতা পেলাউসের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, “একিলিস, তোমার পিতাও আমার মতো বৃদ্ধ এবং সে হয়তো তোমার ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। কিন্তু আমি পৃথিবীর সবচেয়ে হতভাগ্য পিতা, কারণ আমি আমার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হারিয়েছি এবং আমাকে সেই সন্তানের খুনির হাতে চুম্বন করতে হচ্ছে।” প্রিয়ামের এই কথাগুলো একিলিসের বরফের মতো শক্ত হৃদয়কে গলিয়ে দেয়। তিনি তার নিজের পিতা এবং প্যাট্রোক্লাসের কথা ভেবে কাঁদতে শুরু করেন। তাঁবুর ভেতরে দুই শত্রু – একজন বৃদ্ধ পিতা এবং একজন তরুণ যোদ্ধা – একসাথে বসে তাদের নিজ নিজ শোকের জন্য কাঁদতে থাকে।

এই কান্নার মধ্য দিয়ে একিলিসের ভেতরের সেই হারানো মানবিকতা বা হিউম্যানিটি (Humanity) আবার ফিরে আসে। তিনি প্রিয়ামকে সসম্মানে তুলে বসান এবং হেক্টরের মৃতদেহটি ধুয়ে পরিষ্কার করে তাকে ফেরত দেন। শুধু তাই নয়, একিলিস হেক্টরের সৎকারের জন্য বারো দিনের একটি যুদ্ধবিরতি বা ট্রুস (Truce) ঘোষণা করেন। এই ঘটনাটি দেখায় যে, যুদ্ধের ময়দানে যতই রক্তপাত এবং ক্রোধ থাকুক না কেন, মানুষের শোক এবং বেদনার ভাষা সব জায়গাতেই এক। একিলিস এবং প্রিয়ামের এই বোঝাপড়া ইলিয়াড-এর মূল সংঘাতের একটি অত্যন্ত চমৎকার এবং দার্শনিক সমাধান তৈরি করে।

হেক্টরের সৎকার এবং মহাকাব্যের দার্শনিক পরিসমাপ্তি (Hector’s Funeral and the Philosophical Conclusion of the Epic)

ইলিয়াড মহাকাব্যটি ট্রয় নগরীর পতন বা একিলিসের মৃত্যুর মতো কোনো চূড়ান্ত বিজয়ের দৃশ্য দিয়ে শেষ হয় না। হোমার অত্যন্ত সচেতনভাবে এই মহাকাব্যের সমাপ্তি টেনেছেন হেক্টরের সৎকারের একটি অত্যন্ত ভাবগম্ভীর এবং শোকাবহ দৃশ্য দিয়ে। হেক্টরের মৃতদেহ যখন ট্রয়ে নিয়ে আসা হয়, তখন পুরো শহর কান্নায় ভেঙে পড়ে। হেক্টরের স্ত্রী অ্যান্ড্রোম্যাক, তার মা হেকুবা এবং এমনকি হেলেনও হেক্টরের জন্য বিলাপ করেন। হেলেন স্বীকার করেন যে, পুরো ট্রয়ে হেক্টরই একমাত্র মানুষ ছিল যে কখনো তাকে অপমান করেনি বা তার প্রতি রূঢ় আচরণ করেনি। হেক্টরের এই সৎকার কেবল একজন বীরের বিদায় ছিল না; এটি ছিল মূলত ট্রয় নগরীর আসন্ন ধ্বংসের এক প্রতীকী পূর্বাভাস (Griffin, 1980)।

ট্রোজানরা হেক্টরের মৃতদেহ একটি বিশাল চিতায় পুড়িয়ে তার ছাই একটি সোনার পাত্রে সংগ্রহ করে এবং তার ওপর একটি বিশাল পাথরের সমাধি বা ব্যারো (Barrow) তৈরি করে। হোমার মহাকাব্যের শেষ লাইনটি লিখেছেন অত্যন্ত সাদামাটাভাবে: “এভাবেই তারা অশ্ব-নিয়ন্ত্রক হেক্টরের সৎকার সম্পন্ন করেছিল।” এই সমাপ্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে ইলিয়াড কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের বিজয়ের গান নয়। এটি হলো যুদ্ধ এবং মানবজীবনের সেই অমোঘ ট্র্যাজেডির গল্প, যেখানে জয় এবং পরাজয় উভয়েরই মূল্য চোকাতে হয় মানুষের রক্ত এবং চোখের জল দিয়ে।

একিলিসের ক্রোধ থেকে শুরু করে হেক্টরের সৎকারে এসে শেষ হওয়া এই মহাকাব্যটি মূলত মানুষের ইগো, শোক এবং মানবিকতার এক বিস্তৃত মনস্তাত্ত্বিক ক্যানভাস। হোমার দেখিয়েছেন যে, যুদ্ধের ময়দানে বীরত্ব বা ক্লিওস অর্জন করা হয়তো অত্যন্ত গৌরবের, কিন্তু এর পরিণতি সবসময়ই হয় ধ্বংসাত্মক এবং বেদনার। একিলিস তার হারানো সম্মান ফিরে পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তার জন্য তাকে তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে হারাতে হয়েছিল। আর হেক্টর তার শহর রক্ষা করতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ইলিয়াড-এর এই দার্শনিক পরিসমাপ্তি আমাদের শিখিয়ে যায় যে, মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে সমস্ত মানুষই সমান অসহায়, এবং সবচেয়ে বড় শত্রুতার মাঝেও মানুষের প্রতি মানুষের একটু করুণা বা সহানুভূতিই হলো মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় শক্তি।

ট্রয় নগরীর পতন (Fall of Troy): ট্রোজান হর্স ও যুদ্ধের সমাপ্তি

একিলিসের মৃত্যু ও যুদ্ধের অচলবস্থা (Death of Achilles and the Stalemate of the War)

গ্রিক সাহিত্যের অমর মহাকাব্য ইলিয়াড-এর সমাপ্তি ঘটেছিল ট্রয়ের রাজপুত্র হেক্টরের সৎকারের মধ্য দিয়ে। কিন্তু হেক্টরের মৃত্যুর পরও ট্রয়যুদ্ধের অবসান হয়নি। ট্রয় নগরী তখনো তার দুর্ভেদ্য প্রাচীরের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল, আর গ্রিক বাহিনী সাগরের তীরে তাদের শিবিরে অবস্থান করছিল। হেক্টরের মৃত্যুর পর ট্রোজানদের মনোবল তলানিতে গিয়ে ঠেকলেও, তারা অ্যামাজনদের রানী পেন্থেসিলিয়া এবং ইথিওপিয়ার রাজা মেমননের মতো শক্তিশালী মিত্রদের সাহায্য লাভ করে। এই নতুন মিত্রদের আগমনে যুদ্ধ আবার নতুন মাত্রায় শুরু হয়। গ্রিকদের শ্রেষ্ঠ বীর একিলিস (Achilles) অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই দুই নতুন সেনাপতিকে হত্যা করেন, কিন্তু তার নিজের মৃত্যুর দিনও খুব দ্রুত ঘনিয়ে আসছিল। একটি প্রাচীন ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, একিলিস জানতেন যে ট্রয়ের মাটিতেই তার মৃত্যু লেখা আছে, আর সেই ভবিষ্যদ্বাণী শেষ পর্যন্ত সত্যে পরিণত হয় (Burgess, 2001)।

একিলিসের মৃত্যু কোনো সম্মুখসমরে বা শক্তিশালী যোদ্ধার তরোয়ালের আঘাতে হয়নি। ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস, যে কিনা এই পুরো যুদ্ধের মূল কারণ ছিল, সে শহরের প্রাচীরের ওপর থেকে একটি বিষাক্ত তীর নিক্ষেপ করে। দেবতা অ্যাপোলো, যিনি ট্রয়ের প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন এবং ট্রোজানদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, তিনি প্যারিসের তীরের দিকনির্দেশনা পরিবর্তন করে দেন। তীরটি গিয়ে সরাসরি একিলিসের পায়ের গোড়ালিতে বিদ্ধ হয়। গ্রিক পুরাণে একিলিসের শরীর ছিল প্রায় অজেয়, কারণ তার মা দেবী থেটিস তাকে জন্মের পর স্টিক্স নদীর পবিত্র জলে চুবিয়েছিলেন। কিন্তু জলে চোবানোর সময় থেটিস তাকে গোড়ালি ধরে রেখেছিলেন বলে সেই জায়গাটিতে জল পৌঁছায়নি, এবং সেটিই হয়ে দাঁড়ায় তার একমাত্র দুর্বল জায়গা বা অ্যাকিলিস হিল (Achilles Heel)। এই একটিমাত্র তীরের আঘাতেই গ্রিকদের সবচেয়ে বড় আশার প্রদীপ নিভে যায়।

একিলিসের মৃত্যুর পর গ্রিক শিবিরে এক চরম হতাশা ও অচলবস্থা বা স্টেলমেট (Stalemate) নেমে আসে। দীর্ঘ দশ বছর ধরে তারা ট্রয়ের প্রাচীর ভাঙার চেষ্টা করেছে, তাদের শ্রেষ্ঠ বীরদের হারিয়েছে, কিন্তু নগরীটি এখনো অটুট। একিলিসের মৃত্যুর পর তার সেই বিখ্যাত ঐশ্বরিক বর্মটি কে পাবে, তা নিয়ে গ্রিক শিবিরে ওডিসিউস এবং গ্রেটার এজাক্সের মধ্যে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক লড়াই শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত গ্রিক রাজারা ওডিসিউসকে তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধির জন্য বর্মটি প্রদান করেন, যার ফলে এজাক্স অপমানিত হয়ে আত্মহত্যা করেন। একের পর এক শ্রেষ্ঠ বীরদের হারিয়ে গ্রিক বাহিনী বুঝতে পারে যে, কেবল পেশিশক্তি বা বিয়া (Bia) দিয়ে এই অজেয় নগরী জয় করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাদের এখন এমন কোনো কৌশলের প্রয়োজন ছিল, যা ট্রয়ের উঁচু প্রাচীরকে ভেতর থেকে ভেঙে দিতে পারে।

ওডিসিউসের পরিকল্পনা: মেটিসের চূড়ান্ত রূপ (Odysseus’s Plan: The Ultimate Form of Metis)

যুদ্ধের এই চরম অচলবস্থার মুহূর্তে ইথাকার রাজা ওডিসিউস (Odysseus) তার সেই বিখ্যাত উপস্থিত বুদ্ধি বা মেটিস (Metis) নিয়ে এগিয়ে আসেন। ওডিসিউস বুঝতে পেরেছিলেন যে, ট্রয়ের প্রাচীর বাইরে থেকে ভাঙা অসম্ভব, কারণ দেবতা পসেইডন এবং অ্যাপোলো অত্যন্ত নিপুণভাবে এটি নির্মাণ করেছিলেন। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, প্রাচীর ভাঙার বদলে এমন কোনো কৌশল করতে হবে, যাতে ট্রোজানরা নিজেরাই তাদের শহরের দরজা খুলে দেয়। ওডিসিউস একটি বিশাল এবং ফাঁপা কাঠের ঘোড়া বা ট্রোজান হর্স (Trojan Horse) নির্মাণের প্রস্তাব দেন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রিক বাহিনীর শ্রেষ্ঠ যোদ্ধারা এই ঘোড়ার পেটের ভেতর লুকিয়ে থাকবে, আর বাকি গ্রিক বাহিনী তাদের তাঁবু পুড়িয়ে দিয়ে জাহাজে করে পালানোর ভান করবে। তারা এমনভাবে আচরণ করবে যেন তারা দীর্ঘ দশ বছরের যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে অবশেষে হার মেনে নিয়েছে (Finkelberg, 2005)।

এই কাঠের ঘোড়াটি নির্মাণ করার জন্য ওডিসিউস ইপিয়াস নামের একজন অত্যন্ত দক্ষ কারিগরকে নিয়োগ করেন। দেবী অ্যাথেনা, যিনি আগাগোড়া গ্রিকদের পক্ষে ছিলেন এবং ওডিসিউসের চাতুর্যকে অত্যন্ত পছন্দ করতেন, তিনি এই ঘোড়া নির্মাণে ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণা জোগান। ঘোড়াটি এতটাই বিশাল ছিল যে, এর ভেতরে প্রায় ত্রিশ থেকে চল্লিশজন পূর্ণাঙ্গ সশস্ত্র যোদ্ধা অনায়াসে লুকিয়ে থাকতে পারত। ওডিসিউসের নেতৃত্বে মেনেলাউস, ডিওমেডিস এবং একিলিসের ছেলে নিওপ্টোলেমাসসহ গ্রিকদের শ্রেষ্ঠ বীরেরা সেই ঘোড়ার পেটে প্রবেশ করেন। অন্যদিকে, আগামেমননের নেতৃত্বে গ্রিক বাহিনীর বাকি সদস্যরা তাদের দশ বছরের পুরোনো শিবিরটি আগুনে পুড়িয়ে দেয় এবং জাহাজে উঠে সমুদ্রের দিকে যাত্রা শুরু করে। তবে তারা খুব বেশি দূর যায়নি; তারা নিকটবর্তী টেনেডোস দ্বীপের আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রাখে, যাতে ট্রোজানরা তাদের দেখতে না পায়।

এই পরিকল্পনাটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। যদি ট্রোজানরা কোনোভাবে বুঝতে পারত যে ঘোড়ার ভেতর গ্রিকরা লুকিয়ে আছে, তবে তারা ঘোড়াটিতে আগুন ধরিয়ে দিতে পারত, যার ফলে গ্রিকদের সমস্ত শ্রেষ্ঠ বীর জীবন্ত পুড়ে মারা পড়ত। ওডিসিউসের এই কৌশলটি সামরিক নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল, কারণ প্রাচীন গ্রিকরা সম্মুখসমরকে বেশি সম্মানজনক মনে করত। কিন্তু দশ বছরের হতাশা এবং একিলিসের মৃত্যুর পর ওডিসিউস দেখায়ন যে, যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য অনেক সময় সম্মান বা ইগোর চেয়ে প্রতারণা অনেক বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। ওডিসিউস এই পরিকল্পনার মাধ্যমে মূলত পেশিশক্তির ওপর বুদ্ধিবৃত্তির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা পুরো গ্রিক মহাকাব্যের গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়।

সাইননের মিথ্যা গল্প ও ট্রোজানদের বিভ্রান্তি (Sinon’s False Tale and the Confusion of the Trojans)

গ্রিক বাহিনী যখন তাদের শিবির পুড়িয়ে দিয়ে চলে যায়, তখন ট্রোজানরা প্রাচীরের ওপর থেকে সেই দৃশ্য দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে দীর্ঘ দশ বছরের অবরোধের অবসান ঘটেছে। তারা শহরের ফটক খুলে দিয়ে সমুদ্রের তীরে আসে এবং সেখানে পরিত্যক্ত শিবির আর সেই বিশাল কাঠের ঘোড়াটি দেখতে পায়। ঘোড়াটির গায়ে গ্রিক ভাষায় খোদাই করা ছিল যে, এটি দেবী অ্যাথেনার উদ্দেশ্যে গ্রিকদের একটি পবিত্র নৈবেদ্য, যাতে তারা নিরাপদে দেশে ফিরে যেতে পারে। ট্রোজানরা এই বিশাল মূর্তিটি দেখে চরম বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। কেউ কেউ প্রস্তাব দেয় যে, এটি একটি ফাঁদ হতে পারে, তাই এটিকে পুড়িয়ে দেওয়া বা সাগরে ফেলে দেওয়া উচিত। আবার অনেকেই মনে করে যে, এটি একটি পবিত্র বস্তু এবং একে শহরের ভেতরে নিয়ে যাওয়া উচিত (Wood, 1985)।

এই বিভ্রান্তির মুহূর্তে ওডিসিউসের পরিকল্পনার দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি কাজ শুরু করে। গ্রিকরা সাইনন নামের একজন তরুণ যোদ্ধাকে ইচ্ছে করে সৈকতে ফেলে গিয়েছিল। সাইননকে এমনভাবে বেঁধে রাখা হয়েছিল যেন সে গ্রিকদের হাত থেকে পালানো কোনো বন্দী। ট্রোজানরা সাইননকে ধরে রাজা প্রিয়ামের সামনে নিয়ে আসে। সাইনন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তার মিথ্যা গল্প বা ফ্যাব্রিকেশন (Fabrication) বলতে শুরু করে। সে জানায় যে, গ্রিকরা তাকে দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলি দেওয়ার জন্য নির্বাচন করেছিল, কিন্তু সে কোনোমতে তাদের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচে। সাইনন আরও জানায় যে, এই কাঠের ঘোড়াটি অ্যাথেনার জন্য তৈরি করা হয়েছে, কারণ গ্রিকরা অ্যাথেনার একটি পবিত্র মূর্তি ট্রয় থেকে চুরি করে তার রোষানলে পড়েছিল।

সাইনন অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে একটি মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ পাতে। সে ট্রোজানদের বলে যে, গ্রিকরা ইচ্ছে করেই ঘোড়াটি এত বড় করে বানিয়েছে, যাতে ট্রোজানরা এটিকে শহরের ভেতরে নিয়ে যেতে না পারে। কারণ, যদি ট্রোজানরা এই ঘোড়াটিকে তাদের শহরের ভেতরে নিয়ে যায়, তবে দেবী অ্যাথেনার আশীর্বাদ ট্রয়ের ওপর বর্ষিত হবে এবং ট্রয় এশিয়া মাইনরের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হবে। সাইননের এই কথাগুলো ট্রোজানদের ইগো এবং ধর্মানুভূতিতে গভীরভাবে আঘাত করে। তারা ভেবে বসে যে, এই ঘোড়াটিকে শহরের ভেতরে নেওয়া মানে হলো গ্রিকদের চূড়ান্ত পরাজয় নিশ্চিত করা। সাইননের এই মিথ্যা গল্পটি দেখায় যে, ওডিসিউসের মেটিস কেবল কাঠের ঘোড়ার নকশায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি শত্রুর মনস্তত্ত্ব নিয়ে খেলার একটি নিখুঁত চিত্রনাট্য তৈরি করেছিলেন।

লাওকুনের মৃত্যু এবং ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ (Death of Laocoön and Divine Intervention)

সাইননের মিথ্যা গল্পের পরও ট্রয়ের সবাই এই কাঠের ঘোড়াটিকে সহজে বিশ্বাস করতে প্রস্তুত ছিল না। ট্রয়ের একজন অত্যন্ত প্রবীণ এবং সম্মানিত পুরোহিত, যার নাম ছিল লাওকুন (Laocoön), তিনি এই ঘোড়াটির তীব্র বিরোধিতা করেন। লাওকুন ট্রোজানদের সতর্ক করে বলেন যে, গ্রিকদের কোনো উপহারকেই বিশ্বাস করা উচিত নয়, এমনকি তারা যদি কোনো পবিত্র নৈবেদ্যও রেখে যায়। লাওকুন তার হাতের বর্শাটি সজোরে সেই কাঠের ঘোড়ার পেটে ছুড়ে মারেন। বর্শার আঘাতে ঘোড়ার পেট থেকে একটি ফাঁপা এবং ধাতব শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়, যা প্রমাণ করছিল যে এর ভেতরে শূন্যস্থান বা কোনো কিছু লুকিয়ে আছে। লাওকুনের এই পদক্ষেপটি ট্রোজানদের মনে পুনরায় সন্দেহ জাগিয়ে তোলে এবং ওডিসিউসের পুরো পরিকল্পনাটি প্রায় ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয় (Hughes, 2005)।

কিন্তু অলিম্পাসের দেবতারা, বিশেষ করে পসেইডন এবং অ্যাথেনা, যারা ট্রয়ের ধ্বংস চাইছিলেন, তারা লাওকুনের এই হস্তক্ষেপ মেনে নেননি। ঠিক সেই মুহূর্তে সমুদ্রের জল তোলপাড় করে দুটি বিশাল এবং অত্যন্ত ভয়ংকর সামুদ্রিক সাপ উঠে আসে। সাপ দুটি সরাসরি সৈকতে লাওকুন এবং তার দুই ছেলের দিকে তেড়ে যায়। লাওকুন তার ছেলেদের বাঁচানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু সাপগুলো অত্যন্ত দ্রুত তাদের তিনজনকেই পেঁচিয়ে ধরে এবং তাদের শরীর পিষে মেরে ফেলে। লাওকুনকে হত্যা করার পর সাপ দুটি ধীরে ধীরে ট্রয়ের ভেতরে প্রবেশ করে এবং অ্যাথেনার মন্দিরের নিচে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে। এই দৃশ্যটি উপস্থিত ট্রোজানদের মনে এক চরম ঐশ্বরিক ভীতি বা ডিভাইন টেরর (Divine Terror) তৈরি করে।

ট্রোজানরা এই ঘটনাটিকে একটি অমোঘ ঐশ্বরিক সংকেত বা ওমেন (Omen) হিসেবে ব্যাখ্যা করে। তারা বিশ্বাস করে যে, লাওকুন ওই পবিত্র কাঠের ঘোড়াকে বর্শা দিয়ে আঘাত করে দেবী অ্যাথেনাকে অপমান করেছে বলেই দেবতারা তাকে এই চরম শাস্তি দিয়েছেন। এই ভয়ংকর মৃত্যু ট্রোজানদের ভেতরের সমস্ত সন্দেহ পুরোপুরি মুছে দেয়। তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, যেকোনো মূল্যে এই পবিত্র ঘোড়াকে শহরের ভেতরে নিয়ে যেতে হবে, নচেৎ পুরো শহরের ওপর অ্যাথেনার অভিশাপ নেমে আসবে। দেবতাদের এই পরোক্ষ হস্তক্ষেপ দেখায় যে, ট্রয়ের পতন কেবল গ্রিকদের চাতুর্যের কারণে হয়নি; এটি ছিল মহাজাগতিক শৃঙ্খলার এক পূর্বনির্ধারিত রায়, যেখানে সত্যবাদীকেও অনেক সময় দেবতাদের রোষের শিকার হতে হয়।

শহরের পতন ও রাতের হত্যাযজ্ঞ (Fall of the City and the Nocturnal Massacre)

লাওকুনের মৃত্যুর পর ট্রোজানরা সেই বিশাল কাঠের ঘোড়াটিকে শহরের ভেতরে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ঘোড়াটি এতটাই বড় ছিল যে, সেটি ট্রয়ের সাধারণ ফটক দিয়ে ঢোকানো সম্ভব ছিল না। তাই ট্রোজানরা তাদের নিজেদের শহরের সেই দুর্ভেদ্য প্রাচীরের একটি অংশ ভেঙে ফেলে, যা তাদের পূর্বপুরুষরা অত্যন্ত সযত্নে রক্ষা করে আসছিলেন। ঘোড়াটিকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার পর ট্রয়ে এক নজিরবিহীন উৎসব শুরু হয়। দীর্ঘ দশ বছর পর তারা মনে করে যে তারা স্বাধীন হয়েছে এবং যুদ্ধ শেষ। ট্রোজানরা প্রচুর মদ পান করে এবং আনন্দে আত্মহারা হয়ে নাচে-গানে মেতে ওঠে। কিন্তু এই উৎসবটি ছিল মূলত তাদের নিজেদের ধ্বংসের এক করুণ আয়োজন। গভীর রাতে যখন পুরো ট্রয় নগরী মদের নেশায় এবং ক্লান্তিতে ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন সাইনন অত্যন্ত গোপনে ঘোড়ার পেটের একটি দরজা খুলে দেয় (Kullmann, 1960)।

ওডিসিউস এবং তার সঙ্গীরা অত্যন্ত নিঃশব্দে দড়ির মই বেয়ে ঘোড়ার পেট থেকে নিচে নেমে আসেন। তারা প্রথমেই শহরের পাহারাদারদের হত্যা করেন এবং ট্রয়ের মূল ফটক খুলে দেন। ততক্ষণে টেনেডোস দ্বীপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা গ্রিক নৌবহর রাতের অন্ধকারে আবার ট্রয়ের উপকূলে ফিরে আসে। ফটক খোলার সাথে সাথেই হাজার হাজার গ্রিক সৈন্য বন্যার জলের মতো ট্রয়ের ভেতরে প্রবেশ করতে শুরু করে। শুরু হয় এক নারকীয় এবং একতরফা হত্যাযজ্ঞ। ঘুমন্ত এবং অপ্রস্তুত ট্রোজানদের ওপর গ্রিকরা হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। ট্রয়ের রাজপথে রক্তের বন্যা বয়ে যায়। গ্রিক সৈন্যরা ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়, যার ফলে রাতের অন্ধকার দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

এই হত্যাযজ্ঞে গ্রিকরা কোনো দয়া বা মানবিকতার পরিচয় দেয়নি। দশ বছরের জমে থাকা ক্ষোভ এবং হতাশা যেন এক রাতেই বিস্ফোরিত হয়। রাজা প্রিয়ামকে তার নিজ প্রাসাদের জিউসের বেদির সামনে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে একিলিসের ছেলে নিওপ্টোলেমাস। হেক্টরের শিশুপুত্র অ্যাস্টিয়ানাক্সকে ট্রয়ের প্রাচীর থেকে নিচে ছুড়ে ফেলে হত্যা করা হয়, যাতে ট্রয়ের রাজবংশের কোনো ভবিষ্যৎ বংশধর বেঁচে না থাকে। নারী এবং শিশুদের যুদ্ধবন্দী হিসেবে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয়। ট্রয়ের এই পতন দেখায় যে, যুদ্ধে বিজয়ের নেশা অনেক সময় মানুষকে তার সমস্ত মানবিক মূল্যবোধ ভুলিয়ে দিয়ে একটি পশুতে পরিণত করে। গ্রিকরা হয়তো যুদ্ধ জিতেছিল, কিন্তু ট্রয়ের এই ধ্বংসলীলা তাদের অনেককেই দেবতাদের চোখে অপরাধীতে পরিণত করেছিল।

ধ্বংসের মূল্য ও প্রত্যাবর্তনের নতুন সংকট (The Cost of Destruction and the New Crisis of Return)

ট্রয় নগরীর এই সম্পূর্ণ ধ্বংস কোনো সাধারণ বিজয় ছিল না; এটি ছিল একটি সভ্যতার চিরস্থায়ী অবসান। পরদিন সকালে যখন সূর্য ওঠে, তখন ট্রয় নামের সেই অজেয় নগরীর জায়গায় পড়ে থাকে কেবল ধোঁয়া ওঠা ছাই এবং অগণিত মৃতদেহ। গ্রিকরা তাদের জাহাজগুলো লুণ্ঠিত সম্পদ এবং দাসীদের দিয়ে পূর্ণ করে। কিন্তু এই বিজয়ের আনন্দ তাদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ট্রয় জয় করার পর গ্রিকদের ঔদ্ধত্য বা হিউব্রিস এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তারা দেবতাদের মন্দিরগুলোর পবিত্রতা পর্যন্ত নষ্ট করেছিল। ক্যাসান্দ্রাকে অ্যাথেনার মন্দির থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনা হয়েছিল, যা স্বয়ং দেবী অ্যাথেনাকে গ্রিকদের প্রতি চরমভাবে ক্ষুব্ধ করে তোলে।

এই ঐশ্বরিক রোষের কারণেই গ্রিকদের দেশে ফেরার পথটি এক চরম সংকটে পরিণত হয়। ট্রয় থেকে রওনা হওয়ার আগে গ্রিক শিবিরের ভেতরেই এক বড় ধরনের বিভক্তি দেখা দেয়। দুই ভাই আগামেমনন এবং মেনেলাউসের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়। মেনেলাউস চাইছিলেন যত দ্রুত সম্ভব সাগর পাড়ি দিয়ে দেশে ফিরতে। অন্যদিকে আগামেমনন চাইছিলেন দেবতাদের উদ্দেশ্যে বিপুল পশু উৎসর্গ করে তাদের সন্তুষ্ট করতে। এই মতবিরোধের জেরে গ্রিক নৌবহর দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় এবং তাদের সম্মিলিত শক্তি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। ট্রয়ের এই পতন তাই কেবল ট্রোজানদের জন্যই ট্র্যাজেডি ছিল না; এটি ছিল গ্রিকদের জন্যও এক দীর্ঘ এবং যন্ত্রণাদায়ক অভিশাপের শুরু।

ট্রয়যুদ্ধের এই সমাপ্তি দেখায় যে, যুদ্ধ কখনো কোনো সমাধান বয়ে আনে না। যারা ট্রয় জয় করেছিল, তাদের অনেকেই সাগরের বুকে প্রাণ হারায়, আর যারা দেশে ফিরেছিল, তাদের অনেককেই নিজ প্রাসাদে গুপ্তহত্যার শিকার হতে হয়। ওডিসিউসের মতো ধূর্ত বীর, যার বুদ্ধিতে ট্রয়ের পতন ঘটেছিল, তাকেও এই বিজয়ের চরম মূল্য চোকাতে হয়। তাকে দশ বছর ধরে সাগরের বুকে দিকভ্রান্ত হয়ে ঘুরতে হয় এবং নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য এক নতুন লড়াই শুরু করতে হয়। ট্রয় নগরীর পতন তাই গ্রিক মহাকাব্যের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যা যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক প্রকৃতি এবং মানুষের অহংকারের চরম পরিণতিকে চিরকালের জন্য একটি শিক্ষণীয় আখ্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ওডিসির প্রধান চরিত্র, দেবতা ও স্থানসমূহ (Major Characters, Gods and Places of the Odyssey): আখ্যানের মৌলিক পরিচয়

ইথাকার রাজপরিবার ও বিশ্বস্ত দাসেরা (Royal Family of Ithaca and Loyal Servants)

হোমারের মহাকাব্য ওডিসি-র কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি পরিবার বা অইকোস (Oikos), যার ভাঙন এবং পুনর্গঠনই পুরো আখ্যানের চালিকাশক্তি। এই পরিবারের প্রধান হলেন ওডিসিউস (Odysseus), যিনি ইথাকার রাজা এবং ট্রয়যুদ্ধের এক কিংবদন্তি বীর। ওডিসিউস কোনো প্রথাগত বীর নন, যিনি কেবল গায়ের জোরে যুদ্ধ করেন; তার প্রধান অস্ত্র হলো তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি বা মেটিস (Metis)। তিনি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার এবং নিজের পরিচয় গোপন রাখার অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী। তার স্ত্রী পেনেলোপি (Penelope) এই মহাকাব্যের অন্যতম শক্তিশালী এবং প্রজ্ঞাবান চরিত্র। দীর্ঘ কুড়ি বছর স্বামীর জন্য অপেক্ষা করার সময় তিনি একশ আটজন প্রণয়প্রার্থীকে নিজের বুনন ও খোলার কৌশলের মাধ্যমে বোকা বানিয়ে রেখেছিলেন। পেনেলোপির এই বিশ্বস্ততা এবং বুদ্ধিমত্তা তাকে তার স্বামীর প্রকৃত সমকক্ষ বা হোমোফ্রোসিন (Homophrosyne) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে (Katz, 1991)।

ওডিসিউস এবং পেনেলোপির একমাত্র সন্তান টেলেমাকাস (Telemachus) মহাকাব্যের শুরুতে একজন অবদমিত এবং ক্ষমতাহীন তরুণ হিসেবে আবির্ভূত হয়। তবে দেবী অ্যাথেনার প্রেরণায় সে তার পিতার সন্ধানে বের হয় এবং ধীরে ধীরে একজন যোগ্য উত্তরাধিকারী হিসেবে গড়ে ওঠে। তার এই মানসিক বিকাশের যাত্রাকে টেলেম্যাকি (Telemachy) বলা হয়। রাজপরিবারের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলেন ওডিসিউসের বৃদ্ধ পিতা লায়ার্তেস (Laertes), যিনি ছেলের শোকে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে খামারবাড়িতে একাকী জীবনযাপন করছিলেন। মহাকাব্যের শেষে ওডিসিউসের ফিরে আসার পর তিনি আবার নতুন করে জীবনশক্তি ফিরে পান।

রাজপরিবারের বাইরে ইথাকার সমাজে কিছু অত্যন্ত বিশ্বস্ত দাস-দাসী ছিল, যাদের ভূমিকা মহাকাব্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো শূকরপালক ইউমেয়াস (Eumaeus)। একজন সাধারণ দাস হয়েও সে তার প্রভুর প্রতি যে অটল বিশ্বস্ততা এবং আতিথেয়তা দেখিয়েছে, তা তাকে মহাকাব্যের অন্যতম মহৎ চরিত্রে পরিণত করেছে। অন্যদিকে, ওডিসিউসের পুরোনো ধাত্রী ইউরিক্লিয়া (Eurycleia) ছিল রাজপরিবারের একজন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মানুষ, যে ওডিসিউসের পায়ের ক্ষতচিহ্ন দেখে সবার আগে তাকে চিনতে পেরেছিল। এই বিশ্বস্ত দাসেরা দেখায় যে, ইথাকার সমাজে আভিজাত্য কেবল রক্তের সম্পর্কে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি কর্ম ও নৈতিকতার ওপরও নির্ভরশীল ছিল (Thalmann, 1998)।

অলিম্পাসের দেবমণ্ডলীতে ক্ষমতার বিন্যাস (Power Dynamics in the Pantheon of Olympus)

প্রাচীন গ্রিক মহাকাব্যগুলোতে দেবতাদের ভূমিকা কেবল দূরবর্তী পর্যবেক্ষকের নয়; তারা মানুষের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। ওডিসি-তে দেবতাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছেন প্রজ্ঞা, কৌশল এবং যুদ্ধের দেবী অ্যাথেনা (Athena)। অ্যাথেনা ওডিসিউসকে পছন্দ করতেন কারণ ওডিসিউসের মেটিস বা বুদ্ধিমত্তা ছিল অ্যাথেনার নিজস্ব গুণের প্রতিচ্ছবি। পুরো মহাকাব্য জুড়ে অ্যাথেনা ওডিসিউস এবং টেলেমাকাসকে নানাভাবে সাহায্য করেছেন, তাদের ছদ্মবেশ দিয়েছেন এবং তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছেন। অ্যাথেনার এই নিরন্তর সমর্থন ছাড়া ওডিসিউসের পক্ষে কখনোই ইথাকায় ফিরে আসা বা সিংহাসন পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হতো না (Clay, 1983)।

অন্যদিকে, ওডিসিউসের সবচেয়ে বড় ঐশ্বরিক প্রতিপক্ষ ছিলেন সমুদ্র এবং ভূমিকম্পের দেবতা পসেইডন (Poseidon)। ওডিসিউস যখন পসেইডনের ছেলে, সাইক্লপস পলিফেমাসকে অন্ধ করে দেন, তখন পসেইডন চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি ওডিসিউসকে ইথাকায় ফিরতে বাধা দেওয়ার জন্য সাগরের বুকে বারবার প্রলয়ংকরী ঝড় তুলেছেন। পসেইডনের এই রোষ বা মেনিস (Menis) ওডিসিউসের যাত্রাকে দশ বছরের এক যন্ত্রণাদায়ক অভিশাপে পরিণত করেছিল। পসেইডন এবং অ্যাথেনার এই বিপরীতমুখী অবস্থান মহাকাব্যে মানুষের ভাগ্যের ওপর দেবতাদের দ্বিমুখী প্রভাবের একটি চমৎকার উদাহরণ।

অলিম্পাসের দেবতাদের রাজা জিউস (Zeus) এই মহাকাব্যে একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী বা ব্যালেন্স অব পাওয়ার (Balance of Power)-এর ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি সরাসরি কোনো পক্ষে অবস্থান না নিলেও, মহাজাগতিক শৃঙ্খলা বা ডাইক (Dike) রক্ষার দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত ছিল। যখন সূর্যদেবতা হেলিওস (Helios)-এর পবিত্র গবাদিপশু ওডিসিউসের সঙ্গীরা হত্যা করে, তখন জিউস নিজে বজ্রপাত করে তাদের শাস্তি দেন। আবার মহাকাব্যের শেষে ইথাকায় যখন গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখন জিউসই অ্যাথেনাকে নির্দেশ দিয়ে সেখানে শান্তি স্থাপন করেন। জিউসের এই ভূমিকা দেখায় যে, দেবতারা মানুষের জীবন নিয়ে খেললেও শেষ পর্যন্ত মহাজাগতিক ন্যায়বিচারের একটি অলঙ্ঘনীয় নিয়ম সেখানে কার্যকর থাকে।

সমুদ্রযাত্রায় দানব ও জাদুকরীদের জগৎ (World of Monsters and Sorceresses in the Sea Voyage)

ওডিসিউসের দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় তিনি এমন সব চরিত্রের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যারা পৃথিবীর পরিচিত মানচিত্রের বাইরের এক অজানা এবং অতিপ্রাকৃত জগতের বাসিন্দা। এদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক ছিল পলিফেমাস (Polyphemus), এক একচক্ষুবিশিষ্ট বিশাল দানব বা সাইক্লপস। পলিফেমাসের গুহায় ওডিসিউস তার সঙ্গীদের নির্মমভাবে মরতে দেখেছেন এবং নিজের উপস্থিত বুদ্ধি বা মেটিস প্রয়োগ করে ‘কেউ নয়’ সেজে সেখান থেকে পালিয়েছেন। পলিফেমাস ছিল প্রাচীন গ্রিক সমাজে অসভ্যতা এবং আতিথেয়তাহীনতার চরম প্রতীক। একইভাবে, লেস্ট্রিগোনীয়রা (Laestrygonians) ছিল একদল নরখাদক দানব, যারা বাহ্যিকভাবে সভ্য মনে হলেও ভেতরে অত্যন্ত বন্য ছিল। তাদের আক্রমণেই ওডিসিউসের এগারোটি জাহাজ এবং শত শত নাবিক ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল (Mondi, 1983)।

দানবদের বাইরে ওডিসিউস দুজন অত্যন্ত ক্ষমতাধর ঐশ্বরিক নারীর মুখোমুখি হয়েছিলেন। এদের একজন হলেন জাদুকরী দেবী সার্সি (Circe), যিনি আইয়া দ্বীপে বাস করতেন। সার্সি তার জাদুর ওষুধ বা ফার্মাকন দিয়ে পুরুষদের পশুতে পরিণত করতেন। কিন্তু ওডিসিউস হার্মিসের সাহায্যে তার জাদু নিষ্ক্রিয় করে দেন এবং শেষ পর্যন্ত সার্সি তার অন্যতম মিত্র হয়ে ওঠেন। সার্সির নির্দেশেই ওডিসিউস পাতাললোকে গিয়েছিলেন। আরেকজন দেবী হলেন ক্যালিপসো (Calypso), যিনি ওজিজিয়া দ্বীপে ওডিসিউসকে দীর্ঘ সাত বছর আটকে রেখেছিলেন। ক্যালিপসো তাকে অমরত্বের প্রলোভন দেখিয়েছিলেন, কিন্তু ওডিসিউস তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এই নারী চরিত্রগুলো মহাকাব্যে মানুষের প্রবৃত্তি এবং প্রলোভনের এক অত্যন্ত জটিল মনস্তাত্ত্বিক রূপক হিসেবে কাজ করেছে।

সাগরের বুকে ওডিসিউসকে এমন কিছু প্রাকৃতিক ও অতিপ্রাকৃত বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, যা কোনো তলোয়ার দিয়ে জেতা সম্ভব ছিল না। সাইরেন (Sirens)-দের মায়াবী গান ছিল এমন এক প্রলোভন, যা মানুষের জ্ঞানস্পৃহা জাগিয়ে তুলে তাকে মৃত্যুর দিকে টেনে নিত। অন্যদিকে, স্কিলা (Scylla) এবং ক্যারিবডিস (Charybdis) ছিল সেই দুই ভয়ংকর দানব, যাদের মাঝখান দিয়ে যাওয়ার সময় ওডিসিউসকে তার ছয়জন সঙ্গীকে ইচ্ছাকৃতভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে হয়েছিল। এই চরিত্র এবং বাধাগুলো ওডিসিউসের যাত্রাকে কেবল একটি ভৌগোলিক অভিযান হিসেবে নয়, বরং মানবজীবনের এক চরম নৈতিক এবং মানসিক পরীক্ষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ইথাকার প্রণয়প্রার্থী ও অবিশ্বস্ত দাসেরা (Suitors of Ithaca and the Disloyal Servants)

ইথাকার রাজপ্রাসাদে ওডিসিউসের অনুপস্থিতিতে যে অরাজকতার সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রধান কারিগর ছিল একশ আটজন প্রণয়প্রার্থী (Suitors)। এরা ছিল ইথাকা এবং আশেপাশের দ্বীপগুলোর অভিজাত পরিবারের সন্তান। এদের মধ্যে সবচেয়ে উদ্ধত এবং ক্ষমতালোভী ছিল অ্যান্টিনোয়াস (Antinous)। সে পেনেলোপিকে বিয়ে করে ইথাকার সিংহাসন দখল করতে চেয়েছিল এবং টেলেমাকাসকে গুপ্তহত্যা করার পরিকল্পনা করেছিল। অ্যান্টিনোয়াসের ভেতরে আতিথেয়তার কোনো সম্মান ছিল না, যা সে ভিখারিবেশী ওডিসিউসকে টুল দিয়ে আঘাত করে দেখায়ছিল। আরেকজন প্রধান প্রণয়প্রার্থী ছিল ইউরিমেকাস (Eurymachus), যে অ্যান্টিনোয়াসের চেয়ে একটু বেশি ধূর্ত এবং মিষ্টভাষী ছিল। সে সরাসরি আক্রমণ না করে কথার মায়াজালে পেনেলোপিকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করত (Newton, 2008)।

প্রণয়প্রার্থীদের এই ঔদ্ধত্যের কারণে প্রাসাদের ভেতরের সমাজকাঠামোও ভেঙে পড়েছিল। অনেক দাস-দাসী তাদের প্রভুর প্রতি আনুগত্য ভুলে প্রণয়প্রার্থীদের সাথে হাত মিলিয়েছিল। এদের মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণ্য চরিত্র ছিল ছাগলপালক মেলান্থিয়াস (Melanthius)। সে তার নিজের প্রভুকে ভিখারির ছদ্মবেশে দেখে লাথি মেরেছিল এবং লড়াইয়ের সময় প্রণয়প্রার্থীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিল। মেলান্থিয়াসের এই বিশ্বাসঘাতকতা বা ট্রিজন (Treason) তাকে মহাকাব্যের অন্যতম খলচরিত্রে পরিণত করেছে। একইভাবে, দাসীদের মধ্যে মেলান্থো (Melantho) ছিল অত্যন্ত উদ্ধত, যে পেনেলোপির প্রতি চরম অবজ্ঞা দেখিয়েছিল এবং প্রণয়প্রার্থীদের শয্যাসঙ্গিনী হয়েছিল।

এই চরিত্রগুলো মহাকাব্যে নৈতিক অবক্ষয় এবং পরজীবী মানসিকতার প্রতীক। তারা জেনিয়ার পবিত্র নিয়ম লঙ্ঘন করে অন্যের সম্পদ লুটে খাচ্ছিল এবং একটি রাজবংশকে ধ্বংস করার চক্রান্ত করছিল। ওডিসিউস যখন ফিরে এসে তাদের হত্যা করেন এবং অবিশ্বস্ত দাসদের অত্যন্ত বীভৎস শাস্তি দেন, তখন তা কেবল একটি প্রতিশোধ থাকে না; এটি পরিণত হয় একটি সামাজিক শুদ্ধিকরণ বা ক্যাথারসিস (Catharsis)-এ। প্রণয়প্রার্থী এবং অবিশ্বস্ত দাসদের এই চরিত্রগুলো দেখায় যে, একটি সমাজের পতন কেবল বাইরের শত্রুর আক্রমণেই হয় না, ভেতরের মানুষের নৈতিক স্খলনও তার জন্য সমানভাবে দায়ী।

পাতাললোকের আত্মারা: অতীত ও ভবিষ্যতের যোগসূত্র (Souls of the Underworld: Link Between Past and Future)

সার্সির নির্দেশে ওডিসিউস যখন পাতাললোক বা হেডিসের রাজ্যে প্রবেশ করেন, তখন তিনি এমন কিছু চরিত্রের মুখোমুখি হন, যারা তার অতীত এবং ভবিষ্যৎকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়। পাতাললোকে তার মূল লক্ষ্য ছিল থিবসের অন্ধ ভবিষ্যদ্বক্তা টাইরেসিয়াস (Tiresias)-এর সাথে দেখা করা। টাইরেসিয়াস ছিলেন এমন এক ঐশ্বরিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি, যিনি মৃত্যুর পরও তার প্রজ্ঞা হারাননি। তিনি ওডিসিউসকে তার সামনের বিপদের কথা, বিশেষ করে হেলিওসের গবাদিপশু হত্যার পরিণতি এবং ইথাকায় পৌঁছানোর পর তাকে কী করতে হবে, সে সম্পর্কে অত্যন্ত নিখুঁত ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। টাইরেসিয়াসের এই ভবিষ্যদ্বাণী পুরো মহাকাব্যের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের একটি ব্লু-প্রিন্ট বা রূপরেখা তৈরি করে দেয় (Sourvinou-Inwood, 1995)।

পাতাললোকে ওডিসিউস তার নিজের মৃত মা অ্যান্টিক্লেয়া (Anticleia)-এর আত্মার সাথে দেখা করেন। তার মা তাকে জানান যে, ওডিসিউসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে এবং তার বিরহে কাঁদতেই তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। মায়ের এই কথা ওডিসিউসের মনে তার বাড়ির প্রতি বা নস্টসের আকুলতা হাজার গুণ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া ওডিসিউস ট্রয়যুদ্ধের সেই বিখ্যাত বীরদের আত্মার সাথেও দেখা করেন। মাইসিনির রাজা আগামেমনন (Agamemnon) তাকে জানান কীভাবে তার স্ত্রী তাকে বিশ্বাসঘাতকতা করে হত্যা করেছে, যা ওডিসিউসকে ইথাকায় ফিরে যাওয়ার সময় অত্যন্ত সতর্ক হতে শিখিয়েছিল। অন্যদিকে, গ্রিকদের শ্রেষ্ঠ বীর একিলিস (Achilles) তাকে জানান যে, পাতাললোকে রাজার মতো থাকার চেয়ে পৃথিবীতে একজন সাধারণ কৃষক হয়ে বেঁচে থাকাও অনেক বেশি সম্মানের।

এই আত্মাদের সাথে ওডিসিউসের কথোপকথন মহাকাব্যের অত্যন্ত গভীর এবং দার্শনিক একটি অংশ। পাতাললোকের এই চরিত্রগুলো কোনো সক্রিয় কার্যকলাপে অংশ নেয়নি, কিন্তু তাদের আখ্যানগুলো ওডিসিউসের মানসিক জগতকে পুরোপুরি বদলে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন যে, মৃত্যুর পর খ্যাতি বা গৌরবের কোনো মূল্য নেই; আসল মূল্য হলো বেঁচে থাকা এবং নিজের শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া। পাতাললোকের এই অভিজ্ঞতা ওডিসিউসকে তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি দেয় এবং তাকে তার পরবর্তী দীর্ঘ যাত্রার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে।

ভৌগোলিক ও পৌরাণিক স্থানসমূহ (Geographical and Mythological Places): বাস্তব ও কল্পনার মিশেল

ওডিসি মহাকাব্যের স্থানগুলো বা সেটিং মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত: একটি হলো বাস্তব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং আরেকটি হলো সম্পূর্ণ কাল্পনিক বা পৌরাণিক জগত। মহাকাব্যের শুরু এবং শেষ হয় ইথাকা (Ithaca)-তে, যা গ্রিসের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত একটি বাস্তব দ্বীপ। ইথাকা কোনো ঐশ্বরিক স্থান নয়; এটি একটি রুক্ষ, পাথুরে এবং সাধারণ মানুষের বাসভূমি। কিন্তু ওডিসিউসের কাছে এটি ছিল তার জীবনের একমাত্র কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য। অন্যদিকে, স্পার্টা এবং পাইলোস হলো গ্রিসের মূল ভূখণ্ডের দুটি বাস্তব রাজ্য, যেখানে টেলেমাকাস তার পিতার সন্ধানে গিয়েছিল। এই জায়গাগুলো গ্রিক সমাজের আতিথেয়তা এবং সভ্যতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে (Romm, 1992)।

তবে ওডিসিউসের সমুদ্রযাত্রার অধিকাংশ স্থানই পৃথিবীর পরিচিত মানচিত্রের বাইরে অবস্থিত। ওজিজিয়া এবং আইয়া দ্বীপগুলো যথাক্রমে ক্যালিপসো এবং সার্সির মায়াবী আবাসস্থল, যা মানুষের স্বাভাবিক বিচারবোধের বাইরে এক ঐশ্বরিক জগত। সাইক্লপসদের দ্বীপ বা লেস্ট্রিগোনীয়দের টেলিপাইলাস নগরী হলো এমন কিছু স্থান, যেখানে প্রকৃতির নিয়মগুলো সম্পূর্ণ আলাদা এবং যেখানে কোনো সামাজিক আইন বা সভ্যতা নেই। এই পৌরাণিক স্থানগুলো মূলত মানুষের ভেতরের ভয়, প্রলোভন এবং অস্তিত্বের সংকটের রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থানটি হলো ফাইয়াকীয়দের দেশ শেরিয়ার (Scheria)। এটি বাস্তব এবং কল্পনার ঠিক মাঝখানে অবস্থিত একটি জগত। ফাইয়াকীয়রা মানুষের মতোই জীবনযাপন করে, কিন্তু তাদের জাহাজগুলো জাদুকরী এবং তাদের সমাজ কোনো প্রকার যুদ্ধ বা সংঘাত থেকে পুরোপুরি মুক্ত। তারা মূলত ওডিসিউসকে তার সেই পৌরাণিক এবং বিভীষিকাময় জগত থেকে বাস্তব জগতের ইথাকায় ফিরিয়ে আনার সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। হোমার অত্যন্ত নিপুণভাবে এই বাস্তব এবং কল্পনার স্থানগুলোকে মিশিয়ে এমন এক মহাকাব্যিক ভূগোল তৈরি করেছেন, যা আড়াই হাজার বছর ধরে পাঠকদের মনে এক অনন্ত রোমাঞ্চ এবং বিস্ময়ের জন্ম দিয়ে আসছে।

ইথাকার সংকট ও টেলেমাকাসের অনুসন্ধান (Crisis in Ithaca and the Quest of Telemachus): অনুপস্থিত রাজা ও বিপন্ন রাজপরিবার

ট্রয়যুদ্ধের পর ওডিসিউস (Odysseus after the Trojan War): দীর্ঘ প্রত্যাবর্তনের সূচনা

ট্রয়ের পতন ও বিজয়োল্লাসের উন্মাদনা (Fall of Troy and the Madness of Victory)

দীর্ঘ দশ বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে পতন ঘটল এক অজেয় নগরীর। ট্রয় (Troy) নগরীর পতন কোনো সাধারণ সামরিক বিজয়ের ফল ছিল না, এটি ছিল এক চরম বুদ্ধিবৃত্তিক চাতুর্যের চূড়ান্ত ফসল। একিলিস (Achilles) বা হেক্টর (Hector)-এর মতো মহাবীররা যখন একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন, তখন গায়ের জোরের চেয়ে মগজের জোর বেশি জরুরি হয়ে পড়েছিল। ঠিক সেই সময়েই দৃশ্যপটে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে হাজির হন ইথাকার রাজা ওডিসিউস (Odysseus)। বিশাল এক কাঠের ঘোড়ার পেটে লুকিয়ে থেকে শত্রুর দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেদ করার যে পরিকল্পনা তিনি করেছিলেন, তা পুরো যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। গ্রিক সৈন্যরা রাতের অন্ধকারে ঘোড়ার পেট থেকে বেরিয়ে যখন শহরের ফটক খুলে দেয়, তখন শুরু হয় এক নজিরবিহীন হত্যাযজ্ঞ। দশ বছরের জমে থাকা ক্ষোভ, ক্লান্তি আর আক্রোশ যেন এক নিমেষে বিস্ফোরিত হয় ট্রয়ের রাজপথে। চারদিকে আগুন, নারী ও শিশুদের কান্না আর ধনসম্পদ লুটের উন্মাদনায় গ্রিক সৈন্যরা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। এই ধ্বংসলীলার মাঝেই লুকিয়ে ছিল ওডিসিউসের দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক প্রত্যাবর্তনের বীজ।

বিজয়োল্লাসে মত্ত গ্রিকরা একটি ভয়াবহ ভুল করে বসেছিল। তারা ভুলে গিয়েছিল যে দেবতাদের সহায়তা ছাড়া এই বিজয় কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। বিশেষ করে দেবী অ্যাথেনা (Athena), যিনি আগাগোড়া গ্রিকদের পক্ষে ছিলেন এবং ওডিসিউসের প্রতি যার বিশেষ দুর্বলতা ছিল, তিনিও গ্রিকদের ঔদ্ধত্য দেখে মুখ ফিরিয়ে নেন। লুটপাটের সময় গ্রিক সৈন্যরা মন্দিরগুলোর পবিত্রতা নষ্ট করে। রাজা প্রিয়ামের প্রাসাদে ঢুকে তারা যাকে সামনে পেয়েছে, তাকেই নির্দয়ভাবে হত্যা করেছে। বয়স্ক রাজা প্রিয়ামকে হত্যা করা হয় খোদ জিউসের বেদির সামনে। বিজয়ের নেশায় অন্ধ হয়ে যাওয়া মানুষের হিতাহিত জ্ঞান কীভাবে লোপ পায়, হোমার তার মহাকাব্য ইলিয়াড (Iliad) ও পরবর্তীকালে ওডিসি (Odyssey)-এর নানা বর্ণনায় তা তুলে ধরেছেন। যুদ্ধ শেষে ওডিসিউসের হাতে ছিল বারোটি জাহাজের এক বহর এবং বিপুল পরিমাণ লুণ্ঠিত ধনসম্পদ। তার মনে তখন কেবল একটিই চিন্তা – কত দ্রুত নিজের রাজ্য ইথাকায় ফেরা যায় (Fagles, 1990)।

গ্রিকদের এই উন্মাদনা তাদের বীরত্বের সংজ্ঞাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। যারা দশ বছর ধরে একটি আদর্শের জন্য যুদ্ধ করার দাবি করেছিল, বিজয়ের রাতে তারা সাধারণ দস্যুদের মতো আচরণ করে। ট্রয়ের রাজকন্যা ক্যাসান্দ্রা (Cassandra)-কে দেবী অ্যাথেনার মন্দিরের ভেতর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনা হয়। এই ধরনের সীমালঙ্ঘন বা হিউব্রিস (Hubris) দেবতাদের চোখে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ ছিল। গ্রিকরা ভেবেছিল ট্রয় জয় করার পর তাদের ফেরার পথটি হবে মসৃণ ও গৌরবময়। ওডিসিউস নিজেও হয়তো ভেবেছিলেন, ট্রয়ের বিপুল সম্পদ নিয়ে যখন তিনি ইথাকার বন্দরে পৌঁছাবেন, তখন তার প্রজারা তাকে দেবতার মতো বরণ করে নেবে। বাস্তবে এই ধারণাটি একেবারেই ভুল ছিল। সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার জন্য যে ঐশ্বরিক আনুকূল্য প্রয়োজন, তা তারা ওই রাতেই হারিয়ে বসেছিল। ট্রয়ের মাটিতে গড়িয়ে পড়া নিরপরাধ মানুষের রক্ত আর দেবতাদের প্রতি অসম্মান তাদের ফেরার পথকে এক গোলকধাঁধায় পরিণত করে।

গ্রিক শিবিরের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও প্রস্থান (Internal Conflict of the Greek Camp and Departure)

ট্রয় জয় করার পরদিন সকালে গ্রিক শিবিরের ভেতরে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও বড় ধরনের বিভক্তি দেখা দেয়। দুই ভাই আগামেমনন (Agamemnon) এবং মেনেলাউস (Menelaus)-এর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়। মেনেলাউস চাইছিলেন যত দ্রুত সম্ভব সাগর পাড়ি দিয়ে দেশে ফিরতে, কারণ তার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে এবং তিনি হেলেনকে ফিরে পেয়েছেন। অন্যদিকে গ্রিক বাহিনীর প্রধান সেনাপতি আগামেমনন চাইছিলেন দেবতাদের উদ্দেশ্যে বিপুল পশু উৎসর্গ করে তাদের সন্তুষ্ট করতে, যাতে যাত্রা নিরাপদ হয়। এই মতবিরোধ কোনো সাধারণ তর্ক ছিল না; এটি ছিল একটি বিশাল সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিভাজন। জনসভায় দুই ভাইয়ের এই প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব গ্রিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেয়। একদল সৈন্য মেনেলাউসের পক্ষে অবস্থান নেয়, আর অন্য দল আগামেমননের কথায় সায় দিয়ে ট্রয়ের উপকূলেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে (Finley, 1978)।

ওডিসিউসের জন্য এই পরিস্থিতিটি ছিল বেশ জটিল। তিনি প্রথমে মেনেলাউসের সাথে ট্রয় ছেড়ে রওনা হয়েছিলেন। তিনি তার বারোটি জাহাজের বহর নিয়ে টেনেডোস দ্বীপ পর্যন্ত চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তার মনে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ কাজ করতে শুরু করে। তিনি বুঝতে পারছিলেন যে আগামেমনন হলেন গ্রিকদের প্রধান নেতা, এবং তার সাথে সম্পর্ক খারাপ করাটা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষতিকর হতে পারে। পাশাপাশি দেবতাদের সন্তুষ্ট করার বিষয়টিও তার বাস্তববাদী মস্তিষ্কে যৌক্তিক মনে হয়েছিল। তাই তিনি মাঝপথ থেকে আবার তার জাহাজ ঘুরিয়ে ট্রয়ের উপকূলে আগামেমননের কাছে ফিরে আসেন। এই দোদুল্যমানতা এবং সিদ্ধান্তহীনতা ওডিসিউসের মতো ধূর্ত মানুষের চরিত্রের একটি ভিন্ন দিক উন্মোচন করে। তিনি পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে দ্রুত নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারতেন।

এই বিভক্তি গ্রিকদের সম্মিলিত শক্তিকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়। যারা দশ বছর ধরে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছিল, তারা এখন আলাদা আলাদা গন্তব্যে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সাগরের বুকে যাত্রা শুরু করে। একতা বা ইউনিটি (Unity)-এর এই অভাব তাদের প্রতিটি নৌবহরকে সাগরের দানব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সামনে একা ও অরক্ষিত করে তোলে। ওডিসিউস যখন চূড়ান্তভাবে আগামেমননের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করেন, তখন তার সাথে অন্য কোনো বড় গ্রিক নেতার নৌবহর ছিল না। তিনি তার নিজের বারোটি জাহাজ এবং ইথাকার নাবিকদের নিয়েই ইজিয়ান সাগরের বুকে পাড়ি জমান। ট্রয়ের উপকূল ধীরে ধীরে দিগন্তে মিলিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ওডিসিউস এক অজানা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে প্রবেশ করেন, যেখানে তার রাজনৈতিক দক্ষতা বা সেনাপতির পদের কোনো মূল্য ছিল না।

দেবতাদের রোষ ও পসেইডনের অভিশাপ (Wrath of the Gods and Poseidon’s Curse)

গ্রিক নৌবহর যখন ইজিয়ান সাগরের বুকে, তখন অলিম্পাস পর্বতে দেবতাদের মধ্যে এক ভয়ংকর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দেবী অ্যাথেনা, যিনি পুরো ট্রয়যুদ্ধে গ্রিকদের সবচেয়ে বড় রক্ষাকর্ত্রী ছিলেন, তিনি ক্যাসান্দ্রার অপমানের কারণে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। তিনি সরাসরি সমুদ্রের দেবতা পসেইডন (Poseidon)-এর কাছে গিয়ে অনুরোধ করেন গ্রিকদের ফেরার পথ যেন কণ্টকাকীর্ণ করে তোলা হয়। পসেইডন এমনিতেই ট্রয়ের প্রাচীর নির্মাণের সময় থেকে কিছু পুরোনো ক্ষোভ পুষে রেখেছিলেন, তাই তিনি অ্যাথেনার এই প্রস্তাবে সানন্দে রাজি হয়ে যান। ফলে গ্রিক নৌবহর যখন সাগরের মাঝপথে, তখন নেমে আসে এক প্রলয়ংকরী ঝড়। আকাশ কালো হয়ে যায়, সাগরের ঢেউগুলো পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে আছড়ে পড়তে থাকে জাহাজের ওপর। অনেক জাহাজ ডুবে যায়, অনেক বীর যোদ্ধা যারা দশ বছরের যুদ্ধে একটুও আঁচড় খায়নি, তারা অসহায়ভাবে সলিলসমাধি লাভ করে (Knox, 1996)।

এই প্রলয়ের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপটি আছড়ে পড়েছিল লেসার এজাক্স (Ajax)-এর ওপর। যে মানুষটি অ্যাথেনার মন্দিরে অপরাধ করেছিল, পসেইডনের ঝড়ে তার জাহাজটি প্রথমে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এজাক্স একটি পাথরের ওপর আশ্রয় নিতে সক্ষম হলেও, তার দম্ভ শেষ হয়নি। সে চিৎকার করে দেবতাদের চ্যালেঞ্জ করে বলে যে, দেবতাদের ক্ষমতা নেই তাকে সাগরের বুকে ডুবিয়ে মারার। এই আস্ফালন শুনে পসেইডন তার ত্রিশূল দিয়ে সেই পাথরটিতে প্রচণ্ড আঘাত করেন। পাথরটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে সাগরের অতল গহ্বরে তলিয়ে যায় এবং এজাক্সের অহংকারের চিরস্থায়ী অবসান ঘটে। এই ঘটনাটি অন্য গ্রিক নাবিকদের জন্য এক বিশাল সতর্কবার্তা ছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, সাগরের বুকে মানুষের তলোয়ার বা গায়ের জোরের কোনো দাম নেই। এখানে টিকে থাকতে হলে প্রকৃতির শক্তির কাছে মাথা নত করতে হয়।

ওডিসিউসের বারোটি জাহাজ এই প্রলয়ের হাত থেকে কোনোরকমে রক্ষা পেলেও, তারা তাদের নির্দিষ্ট পথ থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়ে। ঝড়ের তোড়ে তারা এমন এক অজানা জলসীমায় প্রবেশ করে, যেখানকার ভূগোল বা বিপদ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না। এই প্রারম্ভিক বিপর্যয় ওডিসিউসকে একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ট্রয়ের ময়দানে তার যে পরিচিতি ছিল – এক অপরাজেয় সেনাপতি ও কৌশলী যোদ্ধা হিসেবে, সাগরের বুকে তার সেই পরিচয়ের কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। জিউস এবং পসেইডনের মিলিত রোষ যখন তাদের ওপর নেমে এল, তখন ওডিসিউস বুঝতে পারলেন এই যাত্রায় টিকে থাকতে হলে পেশিশক্তির চেয়ে মানসিক দৃঢ়তা বেশি প্রয়োজন। তার সহযোদ্ধারা অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েছিল, বারবার তারা হাল ছেড়ে দিতে চাইছিল। ওডিসিউসকে একাধারে জাহাজের ক্যাপ্টেন, একজন পথপ্রদর্শক এবং একজন মনস্তাত্ত্বিকের ভূমিকা পালন করতে হয়।

নস্টস বা প্রত্যাবর্তনের মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা (Psychological Outline of Nostos or Return)

ট্রয়যুদ্ধ শেষে গ্রিক বীরদের এই বাড়ি ফেরার তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে গ্রিক দর্শনে বলা হয় নস্টস (Nostos)। আধুনিক যুগে আমরা যে নস্টালজিয়া শব্দটি ব্যবহার করি, তার উৎপত্তিও এই গ্রিক শব্দ থেকেই, যার অর্থ হলো বাড়ি ফেরার পথে যে মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় তা। ওডিসিউসের কাছে তার রাজ্য ইথাকা (Ithaca) কোনো বিশাল বা সম্পদশালী সাম্রাজ্য ছিল না। এটি ছিল পাথুরে, রুক্ষ এবং কৃষিকাজের জন্য বেশ অনুপযোগী একটি ছোট দ্বীপ। স্পার্টা বা মাইসিনির মতো জাঁকজমক সেখানে ছিল না। তারপরও এই পাথুরে ভূখণ্ডের জন্যই তার এত ব্যাকুলতা। কারণ সেখানে তার শেকড় প্রোথিত। সেখানে তার বৃদ্ধ পিতা লায়ার্তেস, তার স্ত্রী পেনেলোপি এবং তার একমাত্র পুত্র টেলেমাকাস অপেক্ষা করছে। এই নস্টস কেবল একটি ভৌগোলিক গন্তব্যের বিষয় ছিল না; এটি ছিল নিজের হারানো পরিচয় ফিরে পাওয়ার এক ব্যাকুল আর্তি (Shay, 2002)।

দীর্ঘ দশ বছরের যুদ্ধ একজন মানুষের মনস্তত্ত্বে যে গভীর ক্ষত তৈরি করে, তা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো নিজের শেকড়ে ফিরে যাওয়া। ওডিসিউস এবং তার নাবিকরা যুদ্ধক্ষেত্রের ট্রমা বা মানসিক আঘাত বহন করছিল। তারা প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সাথে বসবাস করেছে, অগণিত লাশ দেখেছে এবং মানবিক অনুভূতির বাইরে গিয়ে এক যান্ত্রিক যোদ্ধার জীবন কাটিয়েছে। এখন তারা সেই রক্তমাখা অতীত থেকে বেরিয়ে একটি স্বাভাবিক, শান্তিময় জীবনের স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু সাগরের বুকে তাদের এই যাত্রা দেখায় যে, অতীত থেকে এত সহজে মুক্তি পাওয়া যায় না। দেবতাদের দেওয়া বাধাগুলো যেন তাদের অতীতের করা পাপেরই এক একটি রূপক। নস্টস তাই কেবল বাড়ি ফেরা নয়, এটি হলো নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে নিজেকে শুদ্ধ করার এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

ওডিসিউসের জন্য এই নস্টস ছিল আরও বেশি জটিল। তিনি কেবল একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন রাজা। তাকে কেবল নিজের জীবন বাঁচালেই চলত না, তার অধীনস্থ নাবিকদের জীবন বাঁচানোর দায়িত্বও তার কাঁধে ছিল। কিন্তু সাগরের অনন্ত জলরাশির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি অনুভব করেন যে, তার ক্ষমতা কতটা সীমিত। যখন নাবিকরা তার নির্দেশ অমান্য করে, যখন বাতাস তাদের জাহাজকে ভুল পথে ভাসিয়ে নেয়, তখন তিনি চরম একাকীত্ব অনুভব করেন। একজন নেতার এই একাকীত্ব এবং অসহায়ত্ব ওডিসির প্রথম দিককার একটি বড় বৈশিষ্ট্য। তাকে পদে পদে নিজের নাবিকদের সাহস জোগাতে হয়েছে, আবার নিজের ভেতরের হতাশাগুলোকে সযত্নে লুকিয়ে রাখতে হয়েছে। প্রত্যাবর্তনের এই মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা ওডিসিউসকে একজন সাধারণ যোদ্ধা থেকে এক সহনশীল দর্শনিকে পরিণত করে।

বীরত্বের অহংকার ও নিয়তির সংঘাত (Pride of Heroism and the Conflict of Fate)

হোমারের মহাকাব্যে একটি পরিষ্কার রূপান্তর দেখা যায়, যা ইলিয়াড থেকে ওডিসিতে প্রবেশের সময় খুব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ইলিয়াডে যেখানে বীরত্বের মাপকাঠি ছিল দৈহিক শক্তি, সাহস ও সম্মুখসমরে আত্মত্যাগ, ওডিসিতে এসে সেই সংজ্ঞা পুরোপুরি পাল্টে যায়। ট্রয়ের যুদ্ধে অংশ নেওয়া প্রতিটি গ্রিক বীরের প্রধান লক্ষ্য ছিল রণভূমিতে গৌরব অর্জন করা। কিন্তু সাগরের বুকে এসে ওডিসিউস আবিষ্কার করেন, ঢেউয়ের গর্জনের সামনে এই তথাকথিত সামরিক গৌরবের একেবারেই কোনো অর্থ নেই। এখানে টিকে থাকতে হলে গায়ের জোরের চেয়ে উপস্থিত বুদ্ধি ও চাতুর্যের প্রয়োজন অনেক বেশি। প্রাচীন গ্রিকরা শারীরিক শক্তিকে বলতো বিয়া (Bia) এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধি বা কৌশলকে বলতো মেটিস (Metis)। সমুদ্রযাত্রার শুরু থেকেই ওডিসিউসকে তার বিয়া বা শারীরিক অহংকার ত্যাগ করে মেটিসের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হয় (Nagy, 1999)।

নিয়তি যেন পদে পদে গ্রিক বীরদের বীরত্ব নিয়ে উপহাস করেছে। যারা দশ বছর ধরে ট্রয়ের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভাঙার চেষ্টা করেছে, তারা সাগরের একটি সামান্য ঝড়ে খড়কুটোর মতো ভেসে গেছে। ওডিসিউসকে তাই তার প্রচলিত বীরের খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। একজন রাজা বা সেনাপতি যখন দেখেন তার আদেশ প্রকৃতির খেয়ালের কাছে পুরোপুরি অসহায়, তখন তার ভেতরের অহংবোধ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ওডিসিউসকে এই মানসিক ভাঙনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তিনি বুঝেছিলেন, বীরত্বের মানে কেবল শত্রুকে হত্যা করা নয়, বরং চরম প্রতিকূলতার মাঝে নিজের এবং নিজের অনুসারীদের জীবন বাঁচিয়ে রাখাও এক ধরনের মহত্ত্ব। সাগরের এই অনন্ত জলরাশি তাই কেবল তাদের গন্তব্যে যাওয়ার পথ ছিল না, এটি ছিল তাদের অহংকার চূর্ণ করে নতুন এক বাস্তবতার শিক্ষা দেওয়ার এক বিশাল পাঠশালা।

এই সংঘাতটি মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা এবং দেবতাদের নির্ধারিত নিয়তির মধ্যকার এক চিরন্তন লড়াই। ওডিসিউস তার বুদ্ধি দিয়ে হয়তো অনেক তাৎক্ষণিক বিপদ থেকে বাঁচতে পেরেছেন, কিন্তু সাগরের বাতাস কোন দিকে বইবে, তা তার নিয়ন্ত্রণে ছিল না। তিনি যতবারই ইথাকার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, নিয়তি তাকে ততবারই দূরে ঠেলে দিয়েছে। এই লড়াই যেন দেখাতে চাচ্ছে যে, মানুষ যতই শক্তিশালী বা ধূর্ত হোক না কেন, মহাজাগতিক শৃঙ্খলার সামনে সে নিতান্তই তুচ্ছ। তবে ওডিসিউসের মহত্ত্ব এখানেই যে, তিনি এই নিয়তির কাছে কখনো পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করেননি। তিনি তার মেটিস এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে বারবার নিয়তির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।

অনিশ্চিত গন্তব্য ও ইথাকার জন্য শূন্যতা (Uncertain Destination and the Void for Ithaca)

ট্রয়ের উপকূল ছেড়ে আসার পর প্রথম ঝড়টি ওডিসিউসের নৌবহরকে পৃথিবীর পরিচিত মানচিত্রের বাইরে ঠেলে দেয়। ব্রোঞ্জ যুগের গ্রিক নাবিকদের একটি নির্দিষ্ট নৌপথ বা ট্রেড রুট ছিল। কিন্তু পসেইডনের রোষ তাদের এমন এক জগতে প্রবেশ করায়, যা ছিল পুরোপুরি পৌরাণিক এবং দানবীয়। তাদের সামনে আর কোনো পরিচিত ভূখণ্ড ছিল না, দিক নির্ণয়ের জন্য পরিচিত কোনো নক্ষত্রও তাদের সাহায্য করতে পারছিল না। প্রতিটি নতুন সূর্যোদয়ে তারা একটি নতুন দ্বীপের দেখা পেত, কিন্তু তারা জানত না সেখানে সভ্য মানুষ বাস করে নাকি কোনো নরখাদক দানব অপেক্ষা করছে। এই চরম অনিশ্চয়তা তাদের প্রতিদিনের জীবনকে এক ভয়াবহ আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দেয়। ওডিসিউস বুঝতে পারেন যে তার এই যাত্রা কয়েক মাস বা বছরের নয়, এটি হয়তো তার জীবনের বাকি সময়টুকু কেড়ে নেবে (Segal, 1994)।

অন্যদিকে, ওডিসিউস যখন সাগরের বুকে দিকভ্রান্ত হয়ে ঘুরছেন, তখন তার রাজ্য ইথাকায় এক বিশাল রাজনৈতিক ও সামাজিক শূন্যতা তৈরি হয়। একজন শক্তিশালী শাসকের অনুপস্থিতিতে ইথাকার সামাজিক কাঠামো ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করে। ট্রয়যুদ্ধে যাওয়ার সময় ওডিসিউস তার পরিবারের যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে গিয়েছিলেন, সময়ের সাথে সাথে তা সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়ে। তার বৃদ্ধ পিতা ক্ষমতা ছেড়ে খামারবাড়িতে আশ্রয় নেন, তার স্ত্রী একা একদল ক্ষমতালোভী মানুষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বাধ্য হন এবং তার ছেলে একটি অবদমিত পরিবেশে বড় হতে থাকে। সাগরের বুকে ওডিসিউসের এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি ইথাকার জন্য এক চরম বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ওডিসিউস নিজে হয়তো জানতেন না যে তার অনুপস্থিতিতে তার রাজ্যে কী ঘটছে, কিন্তু তার ভেতরের এক প্রবৃত্তি তাকে সারাক্ষণ তাগিদ দিত দ্রুত বাড়ি ফেরার জন্য। তিনি জানতেন যে তার পরিবার তাকে ছাড়া নিরাপদ নয়। ট্রয়যুদ্ধের পর ওডিসিউসের এই দীর্ঘ প্রত্যাবর্তনের সূচনা তাই একই সাথে দুটি সমান্তরাল আখ্যানের জন্ম দেয়। একদিকে সাগরের বুকে তার টিকে থাকার রোমাঞ্চকর লড়াই, আর অন্যদিকে ইথাকার প্রাসাদে তার পরিবারের নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার রাজনৈতিক সংগ্রাম। এই দুই আখ্যানই একটি বিন্দুতে এসে মিলিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকে, আর সেই বিন্দুটি হলো ইথাকার সিংহাসনে ওডিসিউসের চূড়ান্ত পদার্পণ।

ইথাকায় প্রণয়প্রার্থীদের দখল (Suitors in Ithaca): প্রাসাদ, ভোগ ও বিশৃঙ্খলা

অনুপস্থিত রাজার শূন্যস্থান ও ক্ষমতার সংকট (Vacuum of the Absent King and Crisis of Power)

ট্রয়ের যুদ্ধ শেষে গ্রিক বীরেরা একে একে নিজেদের গৃহে ফিরতে শুরু করলেও, ইথাকার পাথুরে উপকূলে রাজার জাহাজের মাস্তুল দেখা যায়নি। দীর্ঘ কুড়িটি বছর কেটে গেছে, অথচ ওডিসিউস (Odysseus)-এর কোনো খোঁজ নেই। একজন শক্তিশালী শাসকের এতটা দীর্ঘ অনুপস্থিতি যেকোনো রাষ্ট্রের জন্যই ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ইথাকার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ব্রোঞ্জ যুগের গ্রিক সমাজব্যবস্থায় একজন রাজা বা বাসিলিউস (Basileus) ছিলেন আইন, বিচার ও সামাজিক শৃঙ্খলার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। তার অনুপস্থিতিতে ইথাকার রাজনৈতিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। কুড়ি বছর ধরে সেখানে কোনো জনসভা বা এসেম্বলি বসেনি, কোনো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়নি। প্রবীণ নাগরিকরা, যারা ট্রয়যুদ্ধে যাননি, তাদের হাতে বয়সের ভারে কোনো ক্ষমতা অবশিষ্ট ছিল না। ফলে সমাজে এমন এক বিশৃঙ্খল শূন্যতার সৃষ্টি হয়, যেখানে শক্তিমানরাই নিজেদের খেয়ালখুশিমতো আইন তৈরি করতে শুরু করে। বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মান বা চিরাচরিত আইনের প্রতি আনুগত্য ধীরে ধীরে উধাও হয়ে যায় (Pomeroy et al., 1999)।

এই রাজনৈতিক শূন্যতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছিল খোদ রাজপরিবারের ওপর। প্রাচীন গ্রিসে রাষ্ট্র এবং পরিবারের ধারণাকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ ছিল না। একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তির পরিবার বা অইকোস (Oikos) ছিল তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার মূল ভিত্তি। ইথাকায় ওডিসিউসের অইকোস ছিল সবচেয়ে ধনী এবং প্রভাবশালী। কিন্তু রক্ষকবিহীন সেই অঢেল সম্পদ খুব দ্রুতই পার্শ্ববর্তী এলাকার ক্ষমতালোভী তরুণদের নজরে চলে আসে। সিংহাসনের কোনো সুস্পষ্ট উত্তরাধিকারী সাবালক না থাকায়, ক্ষমতা দখলের একটি সহজ সমীকরণ তাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। রাজা নেই, তার মানে রানী এখন বিধবা। সুতরাং রানীকে বিয়ে করতে পারলেই ইথাকার বিশাল সম্পদ ও ক্ষমতার বৈধ নিয়ন্ত্রণ পাওয়া যাবে। এই চিন্তাধারা থেকেই শুরু হয় এক নজিরবিহীন সামাজিক অবক্ষয়।

ক্ষমতার এই সংকট কেবল একটি সিংহাসন দখলের লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল প্রাচীন গ্রিক সমাজের মূল্যবোধের চূড়ান্ত পতনের চিত্র। মেন্টর (Mentor) বা হ্যালিথার্সেস (Halitherses)-এর মতো যে প্রবীণ হিতাকাঙ্ক্ষীরা রাজপরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন, তরুণ প্রজন্মের ঔদ্ধত্যের সামনে তারা বারবার অপদস্ত হয়েছেন। ইথাকার সাধারণ প্রজারাও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। তারা রাজার প্রতি আনুগত্য ভুলে গিয়ে বরং উদীয়মান ক্ষমতাবানদের সাথেই আপস করা শুরু করে। একটি সমাজ কীভাবে তার রক্ষকের অনুপস্থিতিতে ভেতর থেকে পচে যেতে পারে, ইথাকার এই চিত্র তার এক নিখুঁত উদাহরণ। আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়লে কীভাবে একদল সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী পুরো ব্যবস্থাকে জিম্মি করে ফেলে, হোমার অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে তার বর্ণনা দিয়েছেন (Foley, 2001)।

প্রণয়প্রার্থীদের উদ্ভব ও প্রাসাদের অবরুদ্ধ অবস্থা (Emergence of the Suitors and the Besieged Palace)

রাজ্যের এই বিশৃঙ্খল অবস্থার সুযোগ নিয়ে ইথাকা এবং তার আশেপাশের দ্বীপগুলো – যেমন দুলিচিয়ন, সামে এবং জাসিন্থাস থেকে একদল অভিজাত তরুণ রাজপ্রাসাদে এসে জড়ো হতে থাকে। এদের সংখ্যা ছিল একশ আট জন। তারা নিজেদের পেনেলোপি (Penelope)-এর প্রণয়প্রার্থী হিসেবে দাবি করে। তবে তাদের আসল উদ্দেশ্য কোনোভাবেই প্রেমের নিবেদন ছিল না, বরং তাদের লক্ষ্য ছিল ক্ষমতা ও সম্পদ কুক্ষিগত করা। এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং উদ্ধত হিসেবে আবির্ভূত হয় অ্যান্টিনোয়াস (Antinous) এবং ইউরিমেকাস (Eurymachus)। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, পেনেলোপিকে সরাসরি বলপ্রয়োগ করে বিয়ে করা সম্ভব নয়, তাই তারা কৌশল পরিবর্তন করে। তারা প্রাসাদের ভেতরেই আস্তানা গাড়ে এবং দাবি করে যে রানী তাদের মধ্য থেকে কাউকে স্বামী হিসেবে বেছে না নেওয়া পর্যন্ত তারা প্রাসাদ ছেড়ে যাবে না।

প্রণয়প্রার্থীদের এই অবস্থান প্রাসাদটিকে এক প্রকার অবরুদ্ধ নগরীতে পরিণত করে। বাইরে থেকে কোনো সৈন্যবাহিনী এসে আক্রমণ করেনি, কিন্তু প্রাসাদের ভেতরের পরিস্থিতি ছিল শত্রুর দ্বারা অবরুদ্ধ থাকার মতোই। তারা প্রাসাদের উঠান, বড় বড় হলরুম এবং অতিথি কক্ষগুলো দখল করে নেয়। রাজপরিবারের নিজস্ব দাস-দাসীদের অনেকেই এই নতুন প্রভুদের আনুগত্য মেনে নেয়। ফলে রাজপরিবারের গোপন কথা বা কৌশল খুব সহজেই প্রণয়প্রার্থীদের কানে পৌঁছে যেত। এই অবরুদ্ধ অবস্থা রানী এবং তার পুত্রের জন্য এক ভয়াবহ মানসিক চাপের সৃষ্টি করে। দিনের পর দিন নিজেদের বাড়ির ভেতরেই তাদের বন্দীর মতো জীবনযাপন করতে হচ্ছিল। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তাদের দেখতে হতো একদল অচেনা, উদ্ধত পুরুষ তাদের বাড়ির উঠানে দম্ভভরে ঘুরে বেড়াচ্ছে (Cohen, 1995)।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই দখলদারিত্ব কোনো সাধারণ অবরোধ ছিল না, এটি ছিল এক ধরনের সামাজিক ও মানসিক ধর্ষণ। প্রণয়প্রার্থীরা প্রাসাদের দাসীদের সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হতে শুরু করে। তারা রাজপরিবারের পবিত্রতাকে পদদলিত করে। অ্যান্টিনোয়াস তো কথায় কথায় রাজপরিবারের সদস্যদের অপমান করত এবং প্রকাশ্যে রাজার মৃত্যুর কথা বলে উল্লাস করত। তারা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিল যেখানে রাজপরিবারের সদস্যদের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল নজরদারির ভেতরে। নিজেদেরই প্রাসাদে তারা হয়ে পড়েছিল সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন ও পরজীবী। এই তরুণ অভিজাতরা এক নতুন ধরনের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল, যেখানে তলোয়ারের চেয়ে মানসিক নিপীড়ন ছিল প্রধান অস্ত্র।

আতিথেয়তার অপব্যবহার ও সামাজিক নিয়মের লঙ্ঘন (Abuse of Hospitality and Violation of Social Norms)

প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল আতিথেয়তার পবিত্র নিয়ম, যাকে বলা হতো জেনিয়া (Xenia)। স্বয়ং দেবতাদের রাজা জিউস এই নিয়মের রক্ষক ছিলেন। জেনিয়া অনুযায়ী, কোনো অতিথি বাড়িতে এলে গৃহস্বামী তাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেবেন, তাকে খাওয়াবেন এবং বিদায়ের সময় সাধ্যমতো উপহার দেবেন। বিনিময়ে অতিথির দায়িত্ব হলো গৃহস্বামীর কোনো ক্ষতি না করা এবং তার সম্পদের অপচয় না করা। প্রণয়প্রার্থীরা ঠিক এই পবিত্র নিয়মটিরই জঘন্যতম অপব্যবহার করেছিল। তারা নিজেদের অতিথি হিসেবে দাবি করত, কিন্তু আচরণ করত দখলদারের মতো। তারা গৃহস্বামীর কোনো অনুমতি ছাড়াই প্রাসাদে প্রবেশ করেছিল এবং বছরের পর বছর ধরে আতিথ্য গ্রহণ করে যাচ্ছিল, যা জেনিয়ার নিয়মের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল (Reece, 1993)।

তাদের এই আচরণ কেবল সামাজিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন ছিল না, এটি ছিল সরাসরি দেবতাদের প্রতি এক ধরনের স্পর্ধা প্রদর্শন। গ্রিক দর্শনে এই ধরনের অহংকার বা সীমালঙ্ঘনকে বলা হয় হিউব্রিস (Hubris)। প্রণয়প্রার্থীরা এতটাই অন্ধ অহংকারে মত্ত ছিল যে, তারা দেবতাদের সম্ভাব্য শাস্তির কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। তারা ওডিসিউসের পশুসম্পদ নির্বিচারে হত্যা করত, তার দামি মদ পান করত এবং রানীর প্রতি চরম অসম্মান প্রদর্শন করত। হ্যালিথার্সেসের মতো ভবিষ্যদ্বক্তারা যখন ঈগলের ওড়া দেখে তাদের সতর্ক করেছিলেন যে ওডিসিউস ফিরে এসে চরম প্রতিশোধ নেবেন, তখন তারা সেই সতর্কবাণী হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিল। এই হিউব্রিস তাদের এতটাই গ্রাস করেছিল যে, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা তাদের লোপ পেয়েছিল।

মজার ব্যাপার হলো, ওডিসিউস যখন সমুদ্রের বুকে পথ হারিয়ে অজানা দ্বীপে দ্বীপে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং অপরিচিত মানুষদের আতিথেয়তার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন, ঠিক তখনই তার নিজের বাড়িতে আতিথেয়তার ধারণাকে পদদলিত করা হচ্ছিল। প্রণয়প্রার্থীরা জানত যে পেনেলোপি সামাজিক নিয়মের কারণে তাদের সরাসরি ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে পারবেন না। তারা এই সামাজিক বাধ্যবাধকতারই সুযোগ নিচ্ছিল। তারা অতিথি সাজার ভান করে আসলে গৃহস্বামীর অস্তিত্বকেই মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। একটি সমাজের নৈতিক কাঠামো কতটা দুর্বল হয়ে পড়লে এমন একটি প্রকাশ্য অনাচার দিনের পর দিন চলতে পারে, এটি তার এক নির্মম দৃষ্টান্ত।

ভোগবাদ, অহংকার ও সম্পদের লুণ্ঠন (Consumerism, Arrogance and Plunder of Wealth)

প্রণয়প্রার্থীদের দৈনন্দিন রুটিন ছিল অবিরাম ভোজ, উল্লাস ও বিনোদনের এক অন্তহীন চক্র। তারা প্রতিদিন সকালে উঠে প্রাসাদের পশুশালা থেকে সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান গরু, ভেড়া ও শূকরগুলো জবাই করত। ওডিসিউসের ভাণ্ডার থেকে সবচেয়ে দামি মদগুলো পিপা ভেঙে বের করা হতো। এই অবাধ লুণ্ঠন কেবল তাদের ক্ষিদে মেটানোর জন্য ছিল না। এর পেছনে ছিল এক সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ষড়যন্ত্র। তারা চেয়েছিল ওডিসিউসের অইকোস বা পারিবারিক সম্পদ পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে। সম্পদ শেষ হয়ে গেলে রাজপরিবারের প্রভাবও কমে যাবে এবং তখন পেনেলোপিকে বাধ্য হয়ে তাদের কারও কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। এই ধীরগতির অর্থনৈতিক যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং সুচারুভাবে পরিচালিত (Donlan, 1982)।

তাদের এই সীমাহীন ভোগবাদের সাথে যুক্ত হয়েছিল চরম অহংকার। ইউরিমেকাস ছিল অ্যান্টিনোয়াসের চেয়ে একটু ভিন্ন স্বভাবের। সে সরাসরি রূঢ় কথা না বলে মিষ্টি কথায় পেনেলোপিকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করত। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ছিল সমান ধূর্ত ও বিপজ্জনক। তারা সারা দিন প্রাসাদের আঙিনায় খেলাধুলা করত, দাসীদের নিয়ে আমোদপ্রমোদ করত এবং রাতে মাতাল হয়ে গানবাজনা করত। তাদের এই উল্লাসের শব্দ প্রাসাদের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতো, যা পেনেলোপি ও তার পুত্রের জন্য ছিল এক অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণার কারণ। ওডিসিউস যে সম্পদ নিজের রক্তঘাম আর বুদ্ধি দিয়ে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন, তা চোখের সামনে একদল অকর্মণ্য তরুণের হাতে ধ্বংস হতে দেখা ছিল এক চরম ট্র্যাজেডি।

এই লুণ্ঠনের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, রাজপরিবারের বিশ্বস্ত কর্মচারীরাও এর আঁচ থেকে বাঁচতে পারেনি। শূকরপালক ইউমেয়াস (Eumaeus)-এর মতো বিশ্বস্ত দাসদের বাধ্য করা হতো প্রতিদিন সবচেয়ে ভালো প্রাণীগুলো প্রাসাদে নিয়ে আসতে। যারা প্রতিবাদ করার চেষ্টা করত, তাদের ভাগ্যে জুটত চরম অপমান ও মারধর। প্রণয়প্রার্থীরা মনে করত তারা সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তারা ছিল এমন এক পরজীবী শ্রেণি, যারা নিজেদের শ্রমে কিছুই অর্জন করেনি, কিন্তু অন্যের সঞ্চিত সম্পদ নির্লজ্জভাবে ভোগ করার অধিকার দাবি করত। তাদের এই আচরণ দেখায় যে, সমাজে যখন আইনের শাসন থাকে না, তখন ভোগবাদ ও অহংকার কীভাবে মানবিকতাকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে ফেলে।

পেনেলোপির কৌশল ও সময়ক্ষেপণের রাজনীতি (Strategy of Penelope and the Politics of Delay)

এমন এক ভয়াবহ ও দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে পেনেলোপি এক অভাবনীয় বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন। তিনি জানতেন, শারীরিক শক্তি বা সৈন্যবল দিয়ে একশ আট জন সশস্ত্র তরুণের মোকাবেলা করা তার পক্ষে অসম্ভব। তাই তিনি বেছে নেন কৌশলের পথ। গ্রিক দর্শনে এই ধরনের সূক্ষ্ম বুদ্ধি ও চাতুর্যকে বলা হয় মেটিস (Metis), যে গুণে তার স্বামী ওডিসিউস ছিলেন অদ্বিতীয়। পেনেলোপি ঘোষণা করেন যে, তার শ্বশুর লায়ার্তেস (Laertes)-এর মৃত্যুর পর তার সৎকারের জন্য একটি বিশাল ও নিখুঁত কাফনের কাপড় বুনতে হবে। তিনি প্রণয়প্রার্থীদের কথা দেন, এই কাপড় বোনার কাজ শেষ হলেই তিনি তাদের মধ্য থেকে একজনকে স্বামী হিসেবে বেছে নেবেন (Katz, 1991)।

শুরু হয় তার সেই বিখ্যাত সময়ক্ষেপণের কৌশল। তিনি দিনের আলোতে সবার সামনে বিশাল তাঁতে সেই কাফনের কাপড় বুনতে থাকতেন। প্রণয়প্রার্থীরা দেখত রানীর কাজ দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে, যখন সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন পেনেলোপি তার বিশ্বস্ত দাসীদের নিয়ে দিনের বেলা বোনা অংশটুকু সাবধানে খুলে ফেলতেন। এই ভাঙাগড়ার খেলা চলতে থাকে টানা তিন বছর। এটি কেবল একটি সাধারণ বুননের কাজ ছিল না, এটি ছিল এক নারীর নীরব অথচ জোরালো রাজনৈতিক প্রতিরোধ। তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে প্রণয়প্রার্থীদের আশা জাগিয়ে রাখতেন, আবার একই সাথে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে তাদের বিরত রাখতেন। তার এই মেটিস বা কৌশল দেখায় যে, তিনি কেবল ওডিসিউসের স্ত্রীই ছিলেন না, বুদ্ধিমত্তায় তিনি ছিলেন তার সমকক্ষ।

পেনেলোপির এই লড়াইটি ছিল অত্যন্ত একাকী ও বিপজ্জনক। তাকে সারাক্ষণ সতর্ক থাকতে হতো যেন তার এই গোপন কৌশল কেউ ধরে না ফেলে। তিনি মাঝে মাঝেই প্রণয়প্রার্থীদের কাছে এমন সব বার্তা পাঠাতেন যা তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করত। তিনি কাউকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করতেন না, আবার কাউকেই পুরোপুরি প্রশ্রয় দিতেন না। তার এই দ্বিমুখী আচরণ প্রণয়প্রার্থীদের বিভ্রান্ত করে রাখত। নিজের সম্মান, স্বামীর স্মৃতি এবং পুত্রের ভবিষ্যৎ রক্ষা করার জন্য একজন নারী কীভাবে বছরের পর বছর ধরে একদল ধূর্ত শত্রুর সাথে স্নায়ুযুদ্ধে লিপ্ত থাকতে পারেন, পেনেলোপির চরিত্রটি তার এক কালজয়ী উদাহরণ। তার এই ধৈর্য ও প্রজ্ঞাই মূলত ইথাকার রাজবংশকে চূড়ান্ত পতনের হাত থেকে রক্ষা করেছিল।

টেলেমাকাসের অসহায়ত্ব ও মনস্তাত্ত্বিক অবদমন (Helplessness of Telemachus and Psychological Suppression)

মা যখন তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে শত্রুদের ঠেকিয়ে রাখছিলেন, পুত্র টেলেমাকাস (Telemachus) তখন পার করছিলেন এক নিদারুণ হতাশা ও অবদমনের জীবন। ওডিসিউস যখন ট্রয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন, টেলেমাকাস তখন নিতান্তই এক শিশু। বাবার কোনো স্মৃতিই তার মনে নেই। যৌবনে পদার্পণ করতে যাওয়া এই তরুণ এক অদ্ভুত সংকটের মধ্যে বড় হতে থাকে। সে জানে সে ইথাকার যুবরাজ, কিন্তু নিজের বাড়িতে তার কানাকড়িও দাম নেই। সে দেখে তার চোখের সামনে তার বাবার সম্পদ লুটেপুটে খাওয়া হচ্ছে, অথচ বাধা দেওয়ার মতো শারীরিক বা রাজনৈতিক শক্তি তার নেই। প্রণয়প্রার্থীরা তাকে তাচ্ছিল্য করত, তাকে শিশুর মতো জ্ঞান করত এবং পদে পদে তাকে অপমান করত। এই পরিস্থিতি তার ভেতরে এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক অবদমন বা ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সের জন্ম দেয় (Rose, 1992)।

টেলেমাকাসের এই মানসিক যন্ত্রণা ছিল অত্যন্ত গভীর। সে এক কিংবদন্তি পিতার সন্তান, যার বীরত্বের গল্প পুরো গ্রিস জুড়ে মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। অথচ সেই পিতার সন্তান হয়েও সে নিজের মাকে একদল পরজীবীর হাত থেকে রক্ষা করতে পারছে না। প্রণয়প্রার্থীরা যখন তাকে লক্ষ্য করে বিদ্রূপের হাসি হাসত, তখন সে রাগে কাঁপত, কিন্তু সেই রাগ প্রকাশের কোনো জায়গা তার ছিল না। তাকে বাধ্য হয়ে তাদের সাথেই একই টেবিলে বসে খেতে হতো এবং তাদের উল্লাস সহ্য করতে হতো। নিজের বাড়িতে একপ্রকার বন্দিদশা তার স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছিল। সে বুঝতে পারছিল না কীভাবে একজন প্রকৃত পুরুষ হয়ে উঠতে হয়, কারণ তার সামনে কোনো আদর্শ পুরুষালি চরিত্র উপস্থিত ছিল না।

প্রণয়প্রার্থীদের আসল ভয় ছিল এই টেলেমাকাসকে নিয়েই। তারা জানত, এই তরুণ একদিন সাবালক হবে এবং তখন সে তার পিতার সিংহাসন ও সম্পদের দাবি নিয়ে দাঁড়াবে। তাই তারা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করত তাকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে রাখতে। তারা চাইত টেলেমাকাস যেন কখনো আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে না পারে। তবে এই নিদারুণ অবদমন ও যন্ত্রণাই শেষ পর্যন্ত টেলেমাকাসকে ভেতর থেকে পরিণত করে তোলে। দিনের পর দিন শত্রুদের আস্ফালন সহ্য করতে করতে তার ভেতরে যে ক্ষোভ জমা হচ্ছিল, তা তাকে ধীরে ধীরে বাস্তবমুখী ও কঠোর হতে সাহায্য করে। চরম অসহায়ত্ব ও অপমানের এই দিনগুলোই মূলত তাকে ভবিষ্যতের এক যোগ্য রাজা হিসেবে গড়ে ওঠার মানসিক প্রস্তুতি নিতে বাধ্য করেছিল।

টেলেমাকাস ও অ্যাথেনার সাক্ষাৎ (Telemachus Meets Athena): আত্মবিশ্বাস ও যাত্রার আহ্বান

অলিম্পাসে দেবতাদের সভা ও অ্যাথেনার প্রস্তাব (Council of the Gods on Olympus and Athena’s Proposal)

ইথাকার রাজপ্রাসাদে যখন চরম নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা চলছিল, ঠিক সেই সময়ে স্বর্গের সর্বোচ্চ শিখর অলিম্পাস পর্বতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্যপট তৈরি হয়। হোমার তাঁর মহাকাব্যের শুরুতেই মর্ত্যের সংঘাতময় জীবনের বিপরীতে দেবতাদের এক সুশৃঙ্খল সভার চিত্র তুলে ধরেছেন। এই দেবতাদের সভা (Council of the Gods) প্রাচীন গ্রিক মহাকাব্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশল, যার মাধ্যমে আখ্যানের মূল গতিপ্রকৃতি নির্ধারিত হয়। এই সভায় দেবতাদের রাজা জিউস মানুষের স্বভাব নিয়ে এক গভীর দার্শনিক আলোচনা শুরু করেন। তিনি অ্যাগামেমননের হত্যাকারী ইজিসথাসের উদাহরণ টেনে বলেন যে, মানুষ সবসময় তাদের নিজেদের দুর্দশার জন্য দেবতাদের দোষারোপ করে। জিউসের মতে, দেবতারা মানুষকে সতর্ক করেন ঠিকই, কিন্তু মানুষের নিজস্ব লোভ ও হঠকারিতাই তাদের পতন ডেকে আনে। এখানে হোমার অত্যন্ত সুকৌশলে স্বাধীন ইচ্ছা (Free Will) এবং নিয়তি (Fate)-এর মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্বের বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন। মানুষের জীবনের পরিণতি কি পূর্বনির্ধারিত, নাকি তার নিজস্ব কর্মফলের ফসল – এই প্রশ্নটিই জিউসের কথার মাধ্যমে প্রতিধ্বনিত হয়।

দেবতাদের এই আলোচনার মাঝখানেই দেবী অ্যাথেনা (Athena) অত্যন্ত চতুরতার সাথে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে ফেলেন। তিনি জিউসের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ইথাকার অনুপস্থিত রাজা ওডিসিউসের দিকে। দীর্ঘ দশ বছর ট্রয়ের যুদ্ধে লড়াই করার পর আরও প্রায় দশ বছর ধরে ওডিসিউস সাগরের বুকে ভাসছেন। বর্তমানে তিনি দেবী ক্যালিপসোর দ্বীপে একপ্রকার বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন। অ্যাথেনা জিউসকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ওডিসিউস সবসময় দেবতাদের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং প্রচুর নৈবেদ্য উৎসর্গ করেছেন। একজন ধার্মিক ও ন্যায়পরায়ণ মানুষের এমন করুণ পরিণতি অলিম্পাসের দেবতাদের সুবিচারের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। অ্যাথেনার এই যুক্তি খণ্ডন করার মতো কোনো সুযোগ জিউসের ছিল না। বিশেষ করে সমুদ্রের দেবতা পসেইডন, যিনি ওডিসিউসের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন, তিনি সেই মুহূর্তে অলিম্পাসে উপস্থিত ছিলেন না। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে অ্যাথেনা ওডিসিউসকে দেশে ফিরিয়ে আনার একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করেন (Clay, 1983)।

অ্যাথেনার প্রস্তাবটি ছিল দ্বিমুখী। একদিকে তিনি দেবতাদের বার্তাবাহক হার্মিসকে পাঠাতে চান ক্যালিপসোর দ্বীপে, যাতে সে ওডিসিউসকে মুক্ত করার রাজকীয় নির্দেশ পৌঁছে দেয়। অন্যদিকে তিনি নিজে যেতে চান ইথাকায়, ওডিসিউসের পুত্র টেলেমাকাস (Telemachus)-এর কাছে। অ্যাথেনা বুঝতে পেরেছিলেন যে, পিতা ফিরে আসার আগে পুত্রের নিজস্ব একটি প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে। একটি বিশৃঙ্খল রাজ্যে দীর্ঘকাল ধরে অবদমিত অবস্থায় থাকা এক তরুণের আত্মবিশ্বাস রাতারাতি ফিরে আসে না। তাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হয়। স্বর্গের এই সিদ্ধান্তটি মর্ত্যের ঘটনাপ্রবাহে এক বিশাল পরিবর্তনের সূচনা করে। অলিম্পাসের শান্ত পরিবেশ থেকে দেবী অ্যাথেনা এক নতুন মিশন নিয়ে পাড়ি জমান ইথাকার সেই কোলাহলপূর্ণ ও শত্রুকবলিত রাজপ্রাসাদের দিকে, যা মহাকাব্যের আখ্যানকে এক নতুন মাত্রা প্রদান করে।

মেন্টেসের ছদ্মবেশে অ্যাথেনার আগমন (Arrival of Athena in the Disguise of Mentes)

ইথাকার মাটিতে পা রাখার আগে দেবী অ্যাথেনাকে একটি বিশেষ কৌশল অবলম্বন করতে হয়। প্রাচীন গ্রিক পুরাণে দেবতারা সরাসরি নিজেদের রূপে মানুষের সামনে খুব কমই আবির্ভূত হতেন। তারা সাধারণত কোনো পরিচিত মানুষের রূপ ধারণ করতেন, যাকে বলা হয় ঐশ্বরিক ছদ্মবেশ (Divine Disguise)। অ্যাথেনা এক্ষেত্রে বেছে নেন ওডিসিউসের পুরোনো পারিবারিক বন্ধু এবং টাফিয়ানদের দলপতি মেন্টেস (Mentes)-এর রূপ। হাতে একটি ব্রোঞ্জের বর্শা নিয়ে একজন সাধারণ পথিকের বেশে তিনি ইথাকার রাজপ্রাসাদের ফটকে এসে দাঁড়ান। এই ছদ্মবেশ ধারণের একটি বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক কারণ ছিল। অ্যাথেনা সরাসরি দেবী রূপে এলে টেলেমাকাস হয়তো ভয়ে বা ভক্তিভরে তাঁর নির্দেশ পালন করত, কিন্তু তাতে তার নিজস্ব আত্মবিশ্বাসের কোনো বিকাশ ঘটত না। মেন্টেসের মতো একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ও সম্মানিত মানুষের রূপে এসে তিনি মূলত টেলেমাকাসের নিজস্ব বিচারবোধ ও চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন।

প্রাসাদের ফটকে অ্যাথেনা এমন এক দৃশ্য দেখতে পান, যা যেকোনো সভ্য মানুষের মনে চরম বিরক্তির সৃষ্টি করবে। একদল উদ্ধত তরুণ রাজপ্রাসাদের আঙিনায় পশুর চামড়ার ওপর বসে জুয়া খেলছে, দাসেরা তাদের জন্য মদ মেশাচ্ছে এবং চারপাশে চলছে মাংস কাটার উৎসব। আর এই সমস্ত কোলাহলের ঠিক মাঝখানে এক বিষণ্ণ ও নিঃসঙ্গ মূর্তির মতো বসে আছে টেলেমাকাস। হোমার এখানে টেলেমাকাসের মানসিক অবস্থার এক অসাধারণ চিত্র তুলে ধরেছেন। তরুণ যুবরাজ চোখের সামনে শত্রুদের আস্ফালন দেখছে, অথচ সে শারীরিকভাবে তাদের বাধা দেওয়ার বদলে মনের ভেতরে এক কল্পনার জগৎ তৈরি করে রেখেছে। সে স্বপ্ন দেখছে, হঠাৎ একদিন তার পিতা আকাশ থেকে নেমে আসবেন, সমস্ত প্রণয়প্রার্থীদের ঘাড় ধরে বের করে দেবেন এবং রাজ্যের হারানো শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবেন। এই নিষ্ক্রিয় দিবাস্বপ্ন দেখায় যে টেলেমাকাস তখনও শৈশবের গণ্ডি পেরিয়ে একজন দায়িত্বশীল পুরুষ হয়ে উঠতে পারেনি (Murnaghan, 1987)।

দিবাস্বপ্নে বিভোর থাকা অবস্থাতেই টেলেমাকাসের চোখ পড়ে প্রাসাদের ফটকে দাঁড়িয়ে থাকা আগন্তুকের দিকে। একটি মুহূর্তের জন্য সে থমকে যায়। তার নিজের বাড়িতে একজন অতিথি দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে, আর কেউ তাকে ভেতরে ডাকার প্রয়োজনও বোধ করছে না – এই দৃশ্যটি তাকে তীব্রভাবে লজ্জিত করে। সে দ্রুত আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় এবং আগন্তুকের দিকে এগিয়ে যায়। এই একটি ছোট পদক্ষেপই ছিল টেলেমাকাসের দীর্ঘ মানসিক পরিবর্তনের প্রথম ধাপ। সে জানত না যে আগন্তুকের ছদ্মবেশে স্বয়ং দেবী অ্যাথেনা তার সামনে উপস্থিত। তার কাছে এটি ছিল কেবলই একজন অতিথির আগমন। তবে এই অতিথির আগমনই তার অবদমিত জীবনে প্রথম বাইরের পৃথিবীর একটি জানালা খুলে দেয়। নিষ্ক্রিয়তা থেকে বেরিয়ে এসে টেলেমাকাস অবশেষে কোনো একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যা তাকে তার পিতার যোগ্য উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রমাণের প্রথম সুযোগ এনে দেয়।

আতিথেয়তার নীতি ও ইথাকার অবক্ষয় (Principle of Hospitality and the Decay of Ithaca)

আগন্তুককে দেখে টেলেমাকাসের তড়িঘড়ি করে ছুটে যাওয়া কোনো সাধারণ ভদ্রতা ছিল না, এটি ছিল প্রাচীন গ্রিক সমাজের সবচেয়ে পবিত্র সামাজিক নিয়ম পালনের তাগিদ। এই নিয়মটিকে বলা হয় জেনিয়া (Xenia) বা আতিথেয়তা। জেনিয়ার নিয়ম অনুযায়ী, অতিথির পরিচয় জানার আগেই তাকে সম্মান প্রদর্শন করা, তার আরামের ব্যবস্থা করা এবং তাকে খাবার খেতে দেওয়া গৃহস্বামীর অবশ্য কর্তব্য। টেলেমাকাস ঠিক এই কাজগুলোই অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করে। সে আগন্তুকের ডান হাত ধারণ করে, তার কাছ থেকে ভারী ব্রোঞ্জের বর্শাটি নিজের হাতে তুলে নেয় এবং তাকে প্রাসাদের ভেতরে নিয়ে যায়। বর্শাটি সে এমন একটি স্তম্ভের সাথে রাখে, যেখানে তার পিতা ওডিসিউসের অনেক পুরোনো অস্ত্রশস্ত্র রাখা ছিল। এই ছোট একটি কাজের মাধ্যমে হোমার ইঙ্গিত দেন যে, টেলেমাকাস ধীরে ধীরে তার পিতার শূন্যস্থান পূরণ করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ভেতরে গিয়ে টেলেমাকাস আগন্তুকের জন্য একটি সুন্দর কারুকাজ করা চেয়ারের ব্যবস্থা করে। তবে সে অত্যন্ত সচেতনভাবে অতিথির বসার জায়গাটি প্রণয়প্রার্থীদের কোলাহল থেকে একটু দূরে নির্বাচন করে। এর পেছনে দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, সে চায়নি এই অসভ্য ও উদ্ধত লোকগুলোর চিৎকারে তার সম্মানিত অতিথির খাবারে ব্যাঘাত ঘটুক। দ্বিতীয়ত, সে আগন্তুকের সাথে একান্ত নির্জনে নিজের পিতার ব্যাপারে কথা বলতে চেয়েছিল। টেলেমাকাসের এই পদক্ষেপগুলো দেখায় যে, প্রণয়প্রার্থীদের ক্রমাগত মানসিক নিপীড়নের শিকার হলেও তার ভেতর থেকে রাজকীয় শিষ্টাচার ও আভিজাত্য পুরোপুরি মুছে যায়নি। চারপাশের চরম অবক্ষয়ের মাঝেও সে প্রাচীন মূল্যবোধগুলোকে আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করছে। দাসীরা রূপার পাত্রে হাত ধোয়ার জল নিয়ে আসে, সামনে পরিবেশন করা হয় রুটি ও পোড়ানো মাংসের সুস্বাদু টুকরো (Goldhill, 1991)।

এই দৃশ্যটি ইথাকার সার্বিক অবস্থার একটি তীব্র বৈপরীত্য তুলে ধরে। একদিকে একজন তরুণ যুবরাজ তার সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও প্রাচীন আতিথেয়তার নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে একদল অভিজাত তরুণ, যারা নিজেদের ইথাকার ভবিষ্যৎ শাসক হিসেবে দাবি করে, তারা বন্য পশুর মতো অন্যের সম্পদ গিলছে। তারা জেনিয়ার নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেদেরই অতিথির মতো নয়, বরং দখলদারের মতো আচরণ করছে। অ্যাথেনা চুপচাপ বসে এই বৈপরীত্য পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি বুঝতে পারেন যে, পরিবেশ যতটাই প্রতিকূল হোক না কেন, টেলেমাকাসের ভেতরে ওডিসিউসের রক্ত ঠিকই বহমান রয়েছে। প্রাসাদের এই ভোজসভার দৃশ্যটি কেবল একটি খাবারের আয়োজন নয়, এটি মূলত ইথাকার সামাজিক ও নৈতিক কাঠামোর পতন এবং সেই পতনের মুখে দাঁড়িয়ে একজন তরুণের নীরব প্রতিরোধের এক জীবন্ত দলিল।

টেলেমাকাসের মনস্তাত্ত্বিক জাগরণ (Psychological Awakening of Telemachus)

খাওয়াদাওয়া শেষ হওয়ার পর শুরু হয় কথোপকথন। মেন্টেসের ছদ্মবেশে থাকা অ্যাথেনা অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে টেলেমাকাসের পরিচয় এবং প্রাসাদের এই বিশৃঙ্খল অবস্থার কারণ জানতে চান। এই প্রথমবার টেলেমাকাস বাইরের পৃথিবীর কারও কাছে নিজের ভেতরের জমানো ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করার সুযোগ পায়। সে অকপটে স্বীকার করে যে, এই বাড়িটি একসময় অনেক ধনী ও সম্মানিত ছিল, কিন্তু এখন একদল সুযোগসন্ধানী তরুণ এটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। তারা তার মায়ের পাণিপ্রার্থী হিসেবে এসে প্রাসাদের সমস্ত সম্পদ লুটেপুটে খাচ্ছে। টেলেমাকাসের কথার মধ্যে এক ধরনের গভীর বিষাদ ও আত্মসমর্পণের সুর ছিল। সে যেন মেনেই নিয়েছিল যে তার পিতা আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না এবং এই ধ্বংসলীলা থামানোর কোনো শক্তি তার নেই।

ঠিক এই মুহূর্তটিতেই অ্যাথেনা তার আসল কাজটি শুরু করেন। তিনি টেলেমাকাসের বিষণ্ণ কথায় সহানুভূতি দেখানোর বদলে তাকে একটি নতুন সম্ভাবনার কথা শোনান। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দাবি করেন যে, ওডিসিউস এখনো বেঁচে আছেন। হয়তো কোনো দূরবর্তী দ্বীপে তিনি আটকা পড়েছেন, কিন্তু তিনি ঠিকই ফিরে আসার পথ খুঁজে বের করবেন। পিতার বেঁচে থাকার এই খবরটি টেলেমাকাসের জন্য এক প্রচণ্ড ধাক্কার মতো ছিল। এতগুলো বছর ধরে সে যে কথাটি শোনার জন্য অপেক্ষা করছিল, মেন্টেসের মুখ থেকে তা শুনে তার ভেতরে এক ধরনের মানসিক জাগরণ (Psychological Awakening) ঘটে। অ্যাথেনা কেবল আশার বাণী শুনিয়েই থেমে যাননি, তিনি টেলেমাকাসকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করান। তিনি স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেন যে, ঘরে বসে দিবাস্বপ্ন দেখার দিন শেষ হয়ে গেছে। এখন তাকে নিজের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে হবে (Felson, 1994)।

অ্যাথেনা তাকে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বাতলে দেন। তিনি বলেন, আগামীকালই ইথাকার সমস্ত নাগরিককে নিয়ে একটি সভা বা এসেম্বলি ডাকতে হবে। সেখানে প্রকাশ্যে প্রণয়প্রার্থীদের প্রাসাদ ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিতে হবে। এই নির্দেশনাটি টেলেমাকাসের জন্য ছিল এক বিশাল মানসিক চ্যালেঞ্জ। যে তরুণটি এতকাল ধরে মুখ বুজে সব অপমান সহ্য করেছে, তাকে বলা হচ্ছে জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে শত্রুদের চ্যালেঞ্জ করতে। অ্যাথেনা তাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেন তার বয়স ও শারীরিক সামর্থ্যের কথা। তিনি ওরেস্টেসের উদাহরণ টানেন, যে তার পিতার হত্যাকারীকে বদলা নিয়ে সমাজে নিজের সম্মান প্রতিষ্ঠা করেছিল। অ্যাথেনার প্রতিটি শব্দ ছিল অত্যন্ত সুচিন্তিত, যা টেলেমাকাসের ভেতরের ঘুমন্ত রাজাকে জাগিয়ে তোলার জন্য নিখুঁতভাবে কাজ করেছিল। এই কথোপকথনের মাধ্যমেই টেলেমাকাস বুঝতে পারে যে, তার অস্তিত্ব কেবল তার পিতার পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়, তাকে তার নিজস্ব কর্মের মাধ্যমেই সমাজে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে।

আত্মপরিচয়ের সংকট ও পিতৃত্বের স্বীকৃতি (Crisis of Identity and Recognition of Paternity)

মেন্টেস ও টেলেমাকাসের আলাপের একটি পর্যায়ে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয় উঠে আসে, যা পুরো মহাকাব্যের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের একটি অন্যতম ভিত্তি। মেন্টেস যখন টেলেমাকাসের চেহারা ও উচ্চতার প্রশংসা করে বলেন যে সে দেখতে ঠিক তার পিতা ওডিসিউসের মতোই হয়েছে, তখন টেলেমাকাস একটি গভীর বিষণ্ণ উত্তর দেয়। সে বলে, তার মা দাবি করেন যে সে ওডিসিউসের সন্তান, কিন্তু কোনো মানুষই নিশ্চিতভাবে তার নিজের জন্মদাতা পিতাকে চিনতে পারে না। এই উক্তিটি কেবল একটি সাধারণ সন্দেহ নয়, এটি তার ভেতরের এক তীব্র আত্মপরিচয়ের সংকট (Crisis of Identity)-এর প্রকাশ। একজন কিংবদন্তি বীরের সন্তান হওয়ার সামাজিক চাপ কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা টেলেমাকাসের এই কথায় স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। সে নিজের চোখের সামনে তার প্রাসাদের পতন দেখছে এবং নিজেকে সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন মনে করছে। এই অক্ষমতা তাকে নিজের পিতৃপরিচয় নিয়েই সন্দিহান করে তুলেছে।

প্রাচীন গ্রিসের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ (Patriarchal Society) ব্যবস্থায় একজন মানুষের সামাজিক মূল্য নির্ধারিত হতো তার বংশমর্যাদা ও পিতার পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে। পিতার অনুপস্থিতিতে টেলেমাকাস কেবল একজন অভিভাবককেই হারায়নি, সে তার নিজের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার আয়নাটিও হারিয়েছিল। সে তার বাবাকে কখনো দেখেনি, কেবল মানুষের মুখে তার বীরত্বের গল্প শুনেছে। সেই বিশাল ব্যক্তিত্বের ছায়ার নিচে নিজের এক স্বাধীন অস্তিত্ব দাঁড় করানো তার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অ্যাথেনা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তার এই হীনম্মন্যতা দূর করার চেষ্টা করেন। তিনি টেলেমাকাসের মাথা ও চোখের গঠনের সাথে ওডিসিউসের নিখুঁত মিলগুলো ধরিয়ে দেন। এই শারীরিক মিলের স্বীকৃতি তার মানসিক জোর বাড়াতে সাহায্য করে। অ্যাথেনা বুঝিয়ে দেন যে, ওডিসিউসের রক্ত যার ধমনিতে বইছে, সে কখনোই এতটা দুর্বল হতে পারে না (Slatkin, 1996)।

পিতৃত্বের এই স্বীকৃতি টেলেমাকাসের মানসিক বিকাশে এক জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। সে বুঝতে পারে যে, তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভয় ও সংশয়গুলো অমূলক। অ্যাথেনার কথাগুলো তার মধ্যে এই বিশ্বাস স্থাপন করে যে, সে কোনো সাধারণ তরুণের মতো নয়, বরং সে ইথাকার শ্রেষ্ঠ বীরের সন্তান। এই পরিচয় কেবল একটি তকমা নয়, এটি একটি বিশাল দায়িত্ব। যে মুহূর্তে সে নিজের এই পরিচয়টিকে মন থেকে মেনে নেয়, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই তার ভেতরের ভীতি দূর হতে শুরু করে। নিজের জন্মের সত্যতা নিয়ে যে সংশয় তাকে এতদিন কুঁকড়ে রেখেছিল, মেন্টেসের আশ্বাসে তা সম্পূর্ণ কেটে যায়। সে অনুভব করে যে, পিতার যোগ্য সন্তান হিসেবে নিজের বাড়ি ও মাকে রক্ষা করার দায়িত্ব এখন পুরোপুরি তার ওপর বর্তেছে। এই মানসিক স্থিরতা ও আত্মবিশ্বাস অর্জনই ছিল পরবর্তী কঠিন পদক্ষেপগুলো নেওয়ার পূর্বশর্ত।

যাত্রার আহ্বান ও পুরুষত্বের বিকাশ (Call to Journey and Development of Manhood)

আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলার পর অ্যাথেনা টেলেমাকাসকে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নেওয়ার নির্দেশনা দেন। তিনি তাকে পরামর্শ দেন একটি জাহাজ প্রস্তুত করে সাগরে বেরিয়ে পড়তে। গন্তব্য হলো পাইলোস এবং স্পার্টা, যেখানে তাকে দেখা করতে হবে যথাক্রমে রাজা নেস্টর এবং রাজা মেনেলাউসের সাথে। তারা দুজনেই ছিলেন ট্রয়যুদ্ধে ওডিসিউসের পুরোনো সহযোদ্ধা। তাদের কাছে গিয়ে পিতার জীবিত বা মৃত হওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট খবর নিয়ে আসাই হলো এই যাত্রার মূল উদ্দেশ্য। গ্রিক মহাকাব্যের ভাষায় এই সমুদ্রযাত্রাকে বলা হয় টেলেম্যাকি (Telemachy)। এই যাত্রাটি কেবল কিছু তথ্য সংগ্রহের জন্য ছিল না। এটি ছিল মূলত টেলেমাকাসের শৈশব থেকে পুরুষত্বে পদার্পণের এক অপরিহার্য আচার বা প্রথা। নিজের পরিচিত গণ্ডি ও মায়ের আঁচল ছেড়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক জগতে পা রাখার মাধ্যমেই তাকে বাস্তব পৃথিবীর সাথে লড়াই করতে শিখতে হবে।

সমস্ত নির্দেশনা দেওয়ার পর অ্যাথেনা বিদায় নেন। তবে তিনি দরজা দিয়ে হেঁটে বের হননি, বরং একটি পাখির রূপ ধারণ করে ছাদের ওপর দিয়ে উড়ে চলে যান। এই অতিপ্রাকৃত বিদায়ের দৃশ্যটি টেলেমাকাসকে হতবাক করে দেয়। সে মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারে যে, এতক্ষণ ধরে সে যার সাথে কথা বলছিল, তিনি কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন অমর দেবতা। একজন দেবতা তার মতো একজন অসহায় যুবরাজের কাছে এসে তাকে পথনির্দেশনা দিয়েছেন – এই উপলব্ধি তার শিরায় শিরায় এক নতুন শক্তির সঞ্চার করে। তার বুকের ভেতর জমে থাকা ভয় ও জড়তা যেন এক নিমেষে উধাও হয়ে যায়। সে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে। যে টেলেমাকাস কিছুক্ষণ আগেও হতাশার সাগরে ডুবে ছিল, সে এখন এক অদম্য সাহসে বুক বেঁধে সামনের দিকে তাকায় (Alden, 2017)।

এই রূপান্তরের প্রমাণ পাওয়া যায় ঠিক তার পরের ঘটনাতেই। অ্যাথেনা চলে যাওয়ার পর টেলেমাকাস যখন আবার সেই কোলাহলপূর্ণ হলরুমে ফিরে যায়, তখন তার হাঁটার ভঙ্গি ও চাহনিতে এক বিশাল পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। সে সরাসরি তার মায়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে নির্দেশ দেয়, যা এর আগে সে কখনোই করেনি। এরপর সে সেই উদ্ধত প্রণয়প্রার্থীদের দিকে ফিরে অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠিন ভাষায় তাদের জানিয়ে দেয় যে, পরদিন সকালে সে একটি সভা ডাকবে এবং সেখানে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাসাদ ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে। টেলেমাকাসের এই অকস্মাৎ কঠোর রূপ দেখে প্রণয়প্রার্থীরা স্তম্ভিত হয়ে যায়। তারা বুঝতে পারে না যে, এত শান্ত ও ভীরু একটি ছেলে হঠাৎ করে কোথা থেকে এত সাহস পেল। মূলত অ্যাথেনার ওই একটি সাক্ষাৎ কেবল টেলেমাকাসের ভেতরে আত্মবিশ্বাসই জাগিয়ে তোলেনি, বরং তাকে নিজের অধিকার আদায়ের জন্য মাথা তুলে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছিল।

টেলেমাকাসের পাইলোস ও স্পার্টাযাত্রা (Telemachus in Pylos and Sparta): পিতার সন্ধান ও বীরত্বশিক্ষা

ইথাকার সীমানা পেরিয়ে প্রথম সমুদ্রযাত্রা (First Voyage Beyond the Borders of Ithaca)

দেবী অ্যাথেনার নির্দেশ ও প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে টেলেমাকাস (Telemachus) তার জীবনের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপটি গ্রহণ করে। তার এই যাত্রা কেবল পিতার সন্ধানে বের হওয়া নয়; এটি তার নিজস্ব আত্মপরিচয় খোঁজার এক সুদীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। হোমারের মহাকাব্যে এই অংশটিকে উত্তরাধিকারের যাত্রা (Telemachy) বলে অভিহিত করা হয়, যা মূলত একজন তরুণের শৈশবের খোলস ভেঙে পূর্ণাঙ্গ পুরুষে পরিণত হওয়ার আখ্যান। ইথাকার গণপরিষদে প্রণয়প্রার্থীদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার পর টেলেমাকাস বুঝতে পারে যে, নিজ ভূমিতে তার আর করার মতো বিশেষ কিছু নেই। প্রণয়প্রার্থীরা তার কথায় বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করেনি, উল্টো তাকে উপহাস করেছে। এই অবজ্ঞা টেলেমাকাসকে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তোলে। সে বুঝতে পারে, ইথাকার সীমানার ভেতরে বসে থাকলে সে চিরকাল ওই উদ্ধত তরুণদের অবদমনের শিকারই থেকে যাবে। তাকে বাইরের পৃথিবীতে পা রাখতে হবে, জানতে হবে তার কিংবদন্তি পিতার বীরত্বগাথা। অ্যাথেনা, যিনি এবার মেন্টরের রূপ ধারণ করেছিলেন, টেলেমাকাসকে একটি জাহাজ ও উপযুক্ত নাবিক জোগাড় করতে সাহায্য করেন। রাতের অন্ধকারে, সবার অলক্ষ্যে, রাজপ্রাসাদের পুরোনো ও বিশ্বস্ত দাসী ইউরিক্লিয়ার কাছ থেকে কিছু রসদ নিয়ে টেলেমাকাস সাগরের বুকে তার প্রথম যাত্রা শুরু করে (Ahl & Roisman, 1996)।

এই সমুদ্রযাত্রা টেলেমাকাসের জন্য ছিল এক সম্পূর্ণ অজানা ও ভীতিপ্রদ অভিজ্ঞতা। ইথাকার নিরাপদ ও পরিচিত গণ্ডি পেরিয়ে ইজিয়ান সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মুখোমুখি হওয়া তার জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। প্রাচীন গ্রিক সমাজে সমুদ্রযাত্রা সবসময়ই বিপৎসংকুল বলে বিবেচিত হতো। পদে পদে মৃত্যুর হাতছানি আর দেবতাদের খেয়ালখুশির ওপর নাবিকদের ভাগ্য নির্ভর করত। কিন্তু মেন্টরের ছদ্মবেশে অ্যাথেনা তার পাশে থাকায় টেলেমাকাস এক অদ্ভুত সাহস অনুভব করে। সাগরের লোনা বাতাস আর জাহাজের পালের শব্দ তাকে এক নতুন স্বাধীনতার স্বাদ দেয়। এতকাল ধরে সে ইথাকার প্রাসাদে যে অবরুদ্ধ জীবনযাপন করেছে, এই যাত্রা তাকে সেই গ্লানি থেকে মুক্তি দেয়। সে প্রথমবারের মতো নিজেকে একজন স্বাধীন ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে অনুভব করতে শুরু করে।

টেলেমাকাসের এই যাত্রার একটি গভীর প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। হোমার এখানে পিতা ও পুত্রের যাত্রার এক চমৎকার সমান্তরাল রেখা এঁকেছেন। একদিকে ওডিসিউস (Odysseus) দীর্ঘ দশ বছর ধরে সমুদ্রের বুকে পথ হারিয়ে নিজের দেশে ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে তার পুত্র ঠিক একই সমুদ্র পাড়ি দিয়ে তাকে খুঁজতে বেরিয়েছে। উভয়ের যাত্রাই প্রতিকূলতা ও অনিশ্চয়তায় ঘেরা। তবে ওডিসিউসের যাত্রা হলো ঘরে ফেরার, আর টেলেমাকাসের যাত্রা হলো ঘর থেকে বের হওয়ার। ওডিসিউস চান তার হারানো পরিচয় ফিরে পেতে, আর টেলেমাকাস চাইছে তার নতুন পরিচয় তৈরি করতে। এই যাত্রা তাই কেবল ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম করা নয়, এটি টেলেমাকাসের মানসিক পরিপক্বতা অর্জনের এক অপরিহার্য ধাপ।

পাইলোসে আগমন ও নেস্টরের আতিথেয়তা (Arrival in Pylos and the Hospitality of Nestor)

টেলেমাকাসের জাহাজ যখন পাইলোস (Pylos)-এর বালুকাময় উপকূলে এসে নোঙর ফেলে, তখন সেখানে এক বিশাল ধর্মীয় উৎসব চলছিল। পাইলোসের বৃদ্ধ রাজা নেস্টর (Nestor) তার প্রজাদের নিয়ে সমুদ্রের দেবতা পসেইডনের উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণ ষাঁড় উৎসর্গ করছিলেন। এই দৃশ্যটি টেলেমাকাসকে প্রথম দর্শনেই কিছুটা ঘাবড়ে দেয়। এত বিপুল জনসমাগম এবং এমন এক জাঁকজমকপূর্ণ রাজকীয় উৎসব সে ইথাকায় কখনো দেখেনি। একজন অপরিচিত ও অনভিজ্ঞ তরুণ হিসেবে তার ভেতরে এক ধরনের জড়তা কাজ করছিল। সে মেন্টরকে (অ্যাথেনা) দ্বিধাভরে বলে যে, নেস্টরের মতো একজন প্রবীণ ও মহান রাজার সামনে দাঁড়িয়ে সে কী কথা বলবে তা সে জানে না। অ্যাথেনা তাকে সাহস জুগিয়ে বলেন যে, সঠিক সময়ে দেবতাদের আশীর্বাদে তার মুখ থেকে ঠিক কথাই বের হবে। এই ছোট ঘটনাটি দেখায় যে টেলেমাকাস তখনও তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা রাজকীয় আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি খুঁজে পায়নি। তবে অ্যাথেনার উৎসাহে সে ধীর পদক্ষেপে নেস্টরের দিকে এগিয়ে যায় (Clarke, 1967)।

নেস্টরের দরবারে টেলেমাকাসের অভিজ্ঞতা ইথাকার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। ইথাকায় যেখানে আতিথেয়তার পবিত্র নিয়ম বা জেনিয়াকে প্রতিদিন পদদলিত করা হচ্ছিল, পাইলোসে সে ঠিক তার উল্টো চিত্র দেখতে পায়। নেস্টরের পুত্ররা কোনো প্রশ্ন করার আগেই এই আগন্তুকদের সাদরে গ্রহণ করে। তাদের সম্মানজনক আসনে বসতে দেওয়া হয়, দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত মাংস ও মদ খেতে দেওয়া হয়। খাওয়া শেষ হওয়ার পর নেস্টর অত্যন্ত ভদ্রভাবে তাদের পরিচয় জানতে চান। টেলেমাকাস এবার আর কোনো জড়তা ছাড়াই অত্যন্ত স্পষ্ট ও রাজকীয় ভঙ্গিতে নিজের এবং তার পিতার নাম উল্লেখ করে। সে নেস্টরকে তার আসার উদ্দেশ্য বর্ণনা করে এবং তার পিতা ওডিসিউসের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা জানানোর জন্য বিনীত অনুরোধ করে। নেস্টরের মতো একজন প্রবীণ ও সম্মানিত রাজার সামনে টেলেমাকাসের এই আত্মবিশ্বাসী কথোপকথন তার মানসিক বিকাশের একটি বড় প্রমাণ। সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিল কীভাবে একজন রাজপুত্রের মতো আচরণ করতে হয়।

নেস্টর ছিলেন ট্রয়যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী গ্রিক রাজাদের মধ্যে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ এবং প্রজ্ঞাবান। তিনি টেলেমাকাসের মধ্যে তার বন্ধু ওডিসিউসের প্রতিচ্ছবি দেখতে পান। নেস্টর অত্যন্ত আবেগের সাথে ট্রয়যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি জানান যে ওডিসিউসের মতো এত ধূর্ত ও বুদ্ধিমান যোদ্ধা গ্রিক শিবিরে আর কেউ ছিল না। নেস্টর টেলেমাকাসকে আশ্বস্ত করেন যে, যার বাবা এত মহান একজন বীর, তার নিজের ভেতরেও সেই একই যোগ্যতা লুকিয়ে আছে। এই কথাগুলো টেলেমাকাসের মনে এক গভীর প্রভাব ফেলে। সে ইথাকায় সারাজীবন শুনেছে তার বাবার বীরত্বের গল্প, কিন্তু এবার একজন প্রত্যক্ষদর্শীর মুখে সেই গল্প শুনে তার ভেতরে এক নতুন গর্বের জন্ম হয়। নেস্টরের এই আতিথেয়তা ও স্বীকৃতি টেলেমাকাসের আত্মপরিচয়ের সংকট দূর করতে দারুণভাবে সাহায্য করে। সে বুঝতে পারে যে, সে কেবল একজন অসহায় তরুণ নয়, সে এক কিংবদন্তি বীরের যোগ্য উত্তরসূরি।

আগামেমননের পরিণতি ও টেলেমাকাসের জন্য সতর্কবার্তা (Fate of Agamemnon and a Warning for Telemachus)

নেস্টরের স্মৃতিচারণের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল ট্রয়যুদ্ধ শেষে গ্রিক বীরদের দেশে ফেরার হৃদয়বিদারক কাহিনী। তিনি টেলেমাকাসকে জানান যে, ট্রয়ের পতনের পর গ্রিক শিবিরের ভেতরে এক বড় ধরনের বিভক্তি দেখা দিয়েছিল। দেবী অ্যাথেনার রোষানলে পড়ে গ্রিক নৌবহর প্রচণ্ড ঝড়ের মুখে পড়ে। অনেকে পথ হারিয়ে ফেলে, অনেকে সাগরে ডুবে মারা যায়। নেস্টর অত্যন্ত বেদনার সাথে মাইসিনির রাজা আগামেমনন (Agamemnon)-এর মর্মান্তিক পরিণতির কথা তুলে ধরেন। আগামেমনন যখন বিজয়ী বীরের বেশে তার দেশে ফেরেন, তখন তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি যে তার নিজের প্রাসাদে তার জন্য মৃত্যু ওত পেতে আছে। তার স্ত্রী ক্লাইটেমনেস্ট্রা এবং তার প্রেমিক ইজিসথাস মিলে আগামেমননকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই ঘটনাটি প্রাচীন গ্রিক পুরাণে আস্থার চরম বিশ্বাসভঙ্গ ও পারিবারিক বিশ্বাসঘাতকতার এক নিকৃষ্টতম উদাহরণ হিসেবে পরিচিত (Malkin, 1998)।

নেস্টর এই গল্পটি টেলেমাকাসকে কোনো সাধারণ রূপকথার মতো শোনাননি। এর পেছনে একটি গভীর শিক্ষণীয় উদ্দেশ্য ছিল। তিনি টেলেমাকাসকে আগামেমননের পুত্র ওরেস্টেস (Orestes)-এর উদাহরণ দেন। ওরেস্টেস কীভাবে তার পিতার হত্যাকারীদের বদলা নিয়ে নিজের সম্মান ও সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেছিল, নেস্টর তা অত্যন্ত জোর দিয়ে বর্ণনা করেন। এই গল্পটি টেলেমাকাসের জন্য এক প্রচ্ছন্ন সতর্কবার্তা ও অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। নেস্টর মূলত বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, পরিস্থিতি যতটাই প্রতিকূল হোক না কেন, একজন পুত্রের দায়িত্ব হলো তার পিতার সম্মান রক্ষা করা। ইথাকার রাজপ্রাসাদে যে প্রণয়প্রার্থীরা জাঁকিয়ে বসেছে, তাদের আচরণ ইজিসথাসের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। টেলেমাকাসকে ওরেস্টেসের মতোই সাহসী ও প্রতিশোধপরায়ণ হতে হবে। এই আলোচনা টেলেমাকাসের ভেতরে এক নতুন রাজনৈতিক সচেতনতার জন্ম দেয়। সে প্রথমবারের মতো বুঝতে পারে যে, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা এবং সম্মান পুনরুদ্ধার করা কতটা কঠিন ও নির্মম হতে পারে।

তবে নেস্টর ওডিসিউসের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। তিনি কেবল এটুকু জানান যে, ট্রয় থেকে ফেরার পথে ওডিসিউসের সাথে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় এবং এরপর আর কোনো খবর তিনি পাননি। এই তথ্য টেলেমাকাসকে কিছুটা হতাশ করলেও, নেস্টর তাকে আশাহত হতে নিষেধ করেন। তিনি পরামর্শ দেন স্পার্টার রাজা মেনেলাউস (Menelaus)-এর কাছে যাওয়ার জন্য। মেনেলাউস সবার শেষে দেশে ফিরেছেন এবং তার কাছে হয়তো ওডিসিউসের কোনো খবর থাকতে পারে। নেস্টর কেবল পরামর্শ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি তার নিজের পুত্র পিসিস্ট্রেটাসকে টেলেমাকাসের সাথে স্পার্টায় যাওয়ার জন্য সঙ্গী হিসেবে দেন। এই সাহায্য ও দিকনির্দেশনা টেলেমাকাসের যাত্রাকে আরও সুদৃঢ় করে। সে বুঝতে পারে যে বাইরের পৃথিবীটা ইথাকার মতো এত শত্রুভাবাপন্ন নয়। সেখানে এখনো এমন মানুষ আছে যারা তার পিতাকে সম্মান করে এবং তাকে সাহায্য করতে প্রস্তুত।

স্পার্টার জাঁকজমক ও মেনেলাউসের ঐশ্বর্য (Splendor of Sparta and the Wealth of Menelaus)

পাইলোস থেকে একটি রথে চড়ে টেলেমাকাস ও পিসিস্ট্রেটাস যখন স্পার্টা (Sparta) নগরীতে এসে পৌঁছায়, তখন তারা এক সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের মুখোমুখি হয়। স্পার্টার রাজপ্রাসাদ ছিল ঐশ্বর্য ও জাঁকজমকের এক চূড়ান্ত নিদর্শন। মেনেলাউস তখন তার কন্যা হারমিওনি এবং পুত্র মেগাপেন্থেসের বিবাহ উপলক্ষে এক বিশাল ভোজের আয়োজন করেছিলেন। প্রাসাদটি সোনা, রুপা, ব্রোঞ্জ এবং হাতির দাঁতের কারুকাজে ঝলমল করছিল। ইথাকার রুক্ষ ও সাদামাটা পরিবেশ থেকে আসা টেলেমাকাস এই বিপুল ঐশ্বর্য দেখে রীতিমতো হতবাক হয়ে যায়। সে ফিসফিস করে তার বন্ধুকে বলে যে, স্বয়ং জিউসের অলিম্পাসও হয়তো এতটা সুন্দর নয়। তবে মেনেলাউস তার এই মন্তব্য শুনতে পেয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জানান যে, মানুষের সম্পদের সাথে দেবতাদের ঐশ্বর্যের কোনো তুলনাই চলে না। মেনেলাউসের এই উত্তর তার পরিণত বয়সের প্রজ্ঞা ও দেবতাদের প্রতি চূড়ান্ত ভক্তির এক চমৎকার প্রমাণ।

মেনেলাউসের আতিথেয়তা ছিল নেস্টরের মতোই নিখুঁত। তিনি আগন্তুকদের পরিচয় না জেনেই তাদের প্রাসাদে সাদরে বরণ করে নেন। তবে আহার পর্ব চলাকালে মেনেলাউস যখন তার ট্রয়যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে শুরু করেন, তখন পরিবেশটি হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে। তিনি জানান যে, এই বিপুল ঐশ্বর্য তার মনে কোনো শান্তি এনে দিতে পারেনি। কারণ এই সম্পদ তিনি অর্জন করেছেন তার ভাই আগামেমনন এবং তার অগণিত বন্ধুদের রক্তের বিনিময়ে। বিশেষ করে ওডিসিউসের কথা স্মরণ করে তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, গ্রিকদের মধ্যে ওডিসিউস যতটা কষ্ট সহ্য করেছে এবং যতটা ত্যাগ স্বীকার করেছে, তা আর কেউ করেনি। পিতার প্রতি এমন গভীর ভালোবাসা ও সম্মান দেখে টেলেমাকাস নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না। তার চোখ বেয়ে জল পড়তে থাকে এবং সে নিজের চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে কান্না লুকানোর চেষ্টা করে (West, 2014)।

এই কান্নার দৃশ্যটি মেনেলাউসের দৃষ্টি এড়ায় না। তিনি বুঝতে পারেন যে এই তরুণ আর কেউ নয়, স্বয়ং ওডিসিউসের পুত্র। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রাসাদের ভেতরের কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন স্পার্টার রানী, বিখ্যাত ও অপরূপ সুন্দরী হেলেন (Helen)। ট্রয়যুদ্ধের মূল কারণ এই হেলেন অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারিণী ছিলেন। তিনি টেলেমাকাসকে দেখেই চিনে ফেলেন এবং অত্যন্ত উচ্ছ্বাসের সাথে তার চেহারার সাথে ওডিসিউসের মিলগুলো বর্ণনা করেন। হেলেনের এই স্বীকৃতি টেলেমাকাসের পিতৃপরিচয়কে আরও একবার সুদৃঢ় করে। স্পার্টার এই ঐশ্বর্যশালী পরিবেশে, গ্রিসের সবচেয়ে ক্ষমতাবান রাজা ও রানীর মুখে নিজের পিতার এমন প্রশংসা শুনে টেলেমাকাসের ভেতরের সমস্ত হীনম্মন্যতা চিরতরে দূর হয়ে যায়। সে অনুধাবন করে যে, সে এমন এক পিতার সন্তান, যার নাম শুনলে গ্রিসের শ্রেষ্ঠ রাজাদের চোখও জলে ভরে ওঠে।

হেলেনের স্মৃতিচারণ ও ওডিসিউসের কৌশলের গল্প (Helen’s Reminiscence and the Tale of Odysseus’s Cunning)

স্পার্টার রাজপ্রাসাদে রাতের ভোজসভার পরিবেশ যখন কিছুটা বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিল, তখন হেলেন এক জাদুকরী ওষুধ মেশানো মদ পরিবেশন করেন। এই ওষুধটি ছিল সমস্ত শোক ও স্মৃতি ভুলিয়ে দেওয়ার এক প্রাচীন মিশরীয় টোটকা। এরপর হেলেন শুরু করেন তার নিজের স্মৃতিচারণ। তিনি ট্রয়যুদ্ধের এমন এক ঘটনার কথা শোনান, যা টেলেমাকাস এর আগে কখনো শোনেনি। হেলেন জানান, কীভাবে ওডিসিউস একবার একজন ভিখারির ছদ্মবেশ ধারণ করে ট্রয় নগরীর ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন। তাকে এমনভাবে চাবুক মেরে রক্তাত করা হয়েছিল যে কেউ তাকে চিনতে পারেনি। কেবল হেলেন তাকে চিনতে পেরেছিলেন, কিন্তু তিনি গ্রিকদের প্রতি তার পুরোনো আনুগত্যের কারণে ওডিসিউসকে ধরিয়ে দেননি। ওডিসিউস সেই ছদ্মবেশে ট্রয়ের ভেতরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে নিরাপদে গ্রিক শিবিরে ফিরে এসেছিলেন। এই গল্পটি ওডিসিউসের শারীরিক শক্তির চেয়ে তার অসীম ধৈর্য এবং কৌশল (Metis)-এর এক অসাধারণ প্রমাণ (Kullmann, 1960)।

মেনেলাউস এরপর আরেকটি রোমাঞ্চকর গল্প শোনান। তিনি সেই বিখ্যাত ট্রোজান ঘোড়ার ভেতরের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির বর্ণনা দেন। কাঠের ঘোড়ার পেটে যখন গ্রিক বীরেরা লুকিয়ে ছিল, তখন হেলেন বাইরে থেকে প্রতিটি গ্রিক যোদ্ধার স্ত্রীর কণ্ঠস্বর নকল করে তাদের ডাকতে শুরু করেছিলেন। এই মায়াবী ডাকে অনেক যোদ্ধা বিভ্রান্ত হয়ে সাড়া দিতে চেয়েছিল, যা তাদের নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিত। কিন্তু ওডিসিউস অত্যন্ত কঠোর হাতে সবাইকে নিবৃত্ত করেন। তিনি তার এক সঙ্গীর মুখ চেপে ধরে রেখেছিলেন, যাতে সে কোনো শব্দ করতে না পারে। মেনেলাউস অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করেন যে, সেদিন ওডিসিউসের সেই অকল্পনীয় মানসিক দৃঢ়তা ও উপস্থিত বুদ্ধি না থাকলে গ্রিকদের সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যেত এবং তারা সবাই মারা পড়ত।

এই গল্পগুলো টেলেমাকাসের জন্য কেবল রোমাঞ্চকর কাহিনী ছিল না, এগুলো ছিল তার পিতার চরিত্রের এক গভীর পাঠ। সে বুঝতে পারে যে, তার পিতার সবচেয়ে বড় অস্ত্র তলোয়ার নয়, বরং তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। ইথাকায় যে প্রণয়প্রার্থীরা প্রতিদিন তার ওপর মানসিক নির্যাতন করছে, তাদের সাথে লড়াই করতে হলে কেবল গায়ের জোর দিয়ে কাজ হবে না। তাকে তার পিতার মতোই ছদ্মবেশ, ধৈর্য এবং ধূর্ততার আশ্রয় নিতে হবে। হেলেন এবং মেনেলাউসের এই স্মৃতিচারণগুলো টেলেমাকাসকে এক নতুন ধরনের বীরত্বের সাথে পরিচিত করে। সে অনুধাবন করে যে, আসল বীরত্ব কেবল শত্রুকে হত্যা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নিজের আবেগ ও পরিস্থিতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখার নামই হলো প্রকৃত বীরত্ব।

প্রটিয়াসের ভবিষ্যদ্বাণী ও ওডিসিউসের জীবিত থাকার নিশ্চয়তা (Prophecy of Proteus and the Assurance of Odysseus’s Survival)

পরদিন সকালে টেলেমাকাস অত্যন্ত সরাসরি মেনেলাউসের কাছে তার পিতার সর্বশেষ খবর জানতে চায়। মেনেলাউস তখন তার নিজের সমুদ্রযাত্রার এক অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ও অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন। ট্রয় থেকে ফেরার পথে তিনি মিশরের উপকূলে আটকা পড়েছিলেন। সেখানে তাকে সমুদ্রের দেবতা পসেইডনের এক অধীনস্থ দেবতা প্রটিয়াস (Proteus)-এর মুখোমুখি হতে হয়েছিল। প্রটিয়াসকে বলা হতো ‘সাগরের বৃদ্ধ মানব’, যিনি সব রূপ ধারণ করতে পারতেন এবং ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন। মেনেলাউস অত্যন্ত সাহসের সাথে প্রটিয়াসকে পরাস্ত করে তার কাছ থেকে অন্যান্য গ্রিক বীরদের ভাগ্য সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন। প্রটিয়াস তাকে আগামেমননের মৃত্যুর খবর এবং লেসার এজাক্সের সলিলসমাধির কথা জানিয়েছিলেন। এই অতিপ্রাকৃত সাক্ষাৎকারের গল্পটি টেলেমাকাস অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শোনে (Burgess, 2001)।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি প্রটিয়াস দিয়েছিলেন ওডিসিউস সম্পর্কে। তিনি মেনেলাউসকে জানিয়েছিলেন যে, ওডিসিউস এখনো জীবিত আছেন। তিনি দেবী ক্যালিপসো (Calypso)-এর দ্বীপে একপ্রকার বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন। তার কাছে কোনো জাহাজ বা নাবিক নেই, তাই তিনি সাগরের বিশাল জলরাশি পাড়ি দিয়ে নিজের দেশে ফিরতে পারছেন না। এই খবরটি টেলেমাকাসের জন্য ছিল এক অসীম স্বস্তির কারণ। এত বছর ধরে যে অনিশ্চয়তার পাহাড় তার বুকের ওপর চেপে বসেছিল, তা নিমেষেই সরে যায়। সে নিশ্চিত হয় যে তার পিতা মৃত নন, এবং একদিন না একদিন তিনি ঠিকই ইথাকায় ফিরে আসবেন। অ্যাথেনা ইথাকায় বসে তাকে যে আশ্বাস দিয়েছিলেন, মেনেলাউসের কথায় তার এক বাস্তব প্রমাণ সে পেয়ে যায়। এই সুসংবাদ টেলেমাকাসের ভেতরে এক অভাবনীয় মানসিক শক্তির সঞ্চার করে।

পিতার জীবিত থাকার খবর পাওয়ার পর টেলেমাকাসের যাত্রার মূল উদ্দেশ্য সফল হয়। মেনেলাউস তাকে স্পার্টায় আরও কয়েক দিন থেকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন এবং তাকে অত্যন্ত দামি তিনটি ঘোড়া ও একটি সুন্দর রথ উপহার দিতে চান। কিন্তু টেলেমাকাস অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সেই উপহার প্রত্যাখ্যান করে। সে জানায় যে, ইথাকার পাথুরে ভূমিতে ঘোড়া চালানো সম্ভব নয়। এই প্রত্যাখ্যানটি দেখায় যে টেলেমাকাস এখন আর কোনো অনভিজ্ঞ বা আবেগপ্রবণ তরুণ নেই। সে অত্যন্ত বাস্তববাদী এবং নিজের রাজ্যের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সে এখন পুরোপুরি সচেতন। স্পার্টার জাঁকজমকের মোহ তাকে অন্ধ করতে পারেনি। সে জানে যে তার আসল যুদ্ধ ইথাকার ওই অবরুদ্ধ প্রাসাদে তার জন্য অপেক্ষা করছে। পাইলোস এবং স্পার্টার এই দীর্ঘ যাত্রা টেলেমাকাসকে তার পিতার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে মানসিক ও রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত করে তোলে।

টেলেমাকাসকে হত্যার ষড়যন্ত্র (Plot against Telemachus): প্রত্যাবর্তনের বিপদ

প্রণয়প্রার্থীদের উদ্ঘাটন ও ক্ষমতার নতুন সমীকরণ (Discovery by the Suitors and the New Equation of Power)

ইথাকার রাজপ্রাসাদে প্রণয়প্রার্থীরা যখন প্রতিদিনের মতো উল্লাস আর লুণ্ঠনে ব্যস্ত, ঠিক তখনই একটি অপ্রত্যাশিত খবর তাদের সমস্ত আনন্দ মাটি করে দেয়। তারা জানতে পারে যে, যে তরুণকে তারা এতকাল একটি ক্ষমতাহীন ও ভীরু বালক বলে তাচ্ছিল্য করে এসেছে, সেই টেলেমাকাস (Telemachus) তাদের নাকের ডগা দিয়ে একটি আস্ত জাহাজ ও একদল সুদক্ষ নাবিক নিয়ে সাগরে পাড়ি জমিয়েছে। নোয়েমন নামের এক ইথাকান নাগরিক যখন অ্যান্টিনোয়াসের কাছে এসে তার ধার দেওয়া জাহাজটি ফেরত চায়, তখনই এই গোপন যাত্রার খবরটি ফাঁস হয়ে যায়। নোয়েমন সম্পূর্ণ সরল বিশ্বাসে জানতে চেয়েছিল যে টেলেমাকাস কবে পাইলোস থেকে ফিরে আসবে। এই একটি সাধারণ প্রশ্নই প্রণয়প্রার্থীদের পায়ের তলার মাটি নাড়িয়ে দেয়। তারা বুঝতে পারে যে, তারা টেলেমাকাসের মানসিক বিকাশ ও রাজনৈতিক সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে অবমূল্যায়ন করেছে (Thalmann, 1998)।

এই উদ্ঘাটন প্রণয়প্রার্থীদের মধ্যে এক ধরনের তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। তারা এত বছর ধরে যে নিশ্চিন্ত পরজীবী জীবন কাটাচ্ছিল, টেলেমাকাসের এই একটি মাত্র পদক্ষেপে তার অবসান ঘটার উপক্রম হয়। অ্যান্টিনোয়াস (Antinous), যিনি ছিলেন প্রণয়প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্ধত ও ক্ষমতালোভী, এই খবর শোনার পর রাগে ফেটে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন, টেলেমাকাস যদি পাইলোস বা স্পার্টা থেকে তার কিংবদন্তি পিতা ওডিসিউস (Odysseus)-এর কোনো খবর নিয়ে আসে, অথবা সেখান থেকে কোনো শক্তিশালী মিত্রবাহিনী নিয়ে ইথাকায় ফিরে আসে, তবে তাদের অস্তিত্ব চরম হুমকিতে পড়বে। এত দিন ধরে তারা কেবল সিংহাসন দখলের স্বপ্ন দেখছিল, কিন্তু এখন তাদের সামনে নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেয়। এই পরিস্থিতি ইথাকার ক্ষমতার সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। এতদিন যে লড়াইটি ছিল কেবল একতরফা অবদমন, এখন তা প্রকাশ্যে একটি রাজনৈতিক ও অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে রূপ নেয়।

এই খবরটি প্রণয়প্রার্থীদের অহংকার বা হিউব্রিস (Hubris)-এর মূলে প্রচণ্ড আঘাত হানে। তারা ভেবেছিল, ইথাকার মতো একটি ছোট দ্বীপে তাদের ক্ষমতা অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু টেলেমাকাসের এই পদক্ষেপ দেখায় দেয় যে, তাদের নজরদারির মধ্যেও গলদ রয়েছে। তরুণ যুবরাজ কেবল তাদের চোখই ফাঁকি দেয়নি, সে ইথাকার সাধারণ নাগরিকদের একটি অংশকেও নিজের পক্ষে টানতে সক্ষম হয়েছে, যারা তাকে জাহাজ ও নাবিক দিয়ে সাহায্য করেছে। এই বিষয়টি প্রণয়প্রার্থীদের জন্য সবচেয়ে বেশি ভীতিকর ছিল। কারণ সাধারণ মানুষের সমর্থন একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে তাদের আর কোনো আইনি বা সামাজিক ভিত্তি থাকবে না। ফলে তারা অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে একটি গোপন সভায় বসে এবং টেলেমাকাসকে চিরতরে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার এক ভয়ংকর পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

হত্যার ষড়যন্ত্র ও অ্যান্টিনোয়াসের পরিকল্পনা (Assassination Plot and the Plan of Antinous)

প্রণয়প্রার্থীদের গোপন সভায় অ্যান্টিনোয়াস অত্যন্ত সরাসরি ও নির্মম একটি প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, টেলেমাকাসকে আর কোনোভাবেই জীবিত অবস্থায় ইথাকায় পা রাখতে দেওয়া যাবে না। তার প্রস্তাবটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। তিনি একটি দ্রুতগামী জাহাজ ও কুড়িজন সশস্ত্র লোক নিয়ে ইথাকা এবং সামে দ্বীপের মধ্যবর্তী অ্যাসটেরিস নামক একটি পাথুরে ও জনমানবহীন দ্বীপে লুকিয়ে থাকবেন। টেলেমাকাস যখন পাইলোস বা স্পার্টা থেকে ফিরে আসবে, তখন সেই সরু প্রণালীতে তার জাহাজের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালানো হবে। তাকে মাঝসাগরে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলা হবে, যাতে কেউ কখনো জানতে না পারে তার পরিণতি কী হয়েছিল। এই ধরনের গুপ্তহত্যা প্রাচীন গ্রিক সমাজে চরম অসম্মানজনক ও জঘন্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো, যাকে বলা হতো মায়াসমা (Miasma) বা নৈতিক দূষণ (Faraone, 2001)।

অ্যান্টিনোয়াসের এই পরিকল্পনাটি কেবল একটি সাধারণ গুপ্তহত্যার ছক ছিল না। এটি ছিল ইথাকার প্রাচীন রাজবংশকে সমূলে উৎপাটন করার এক চূড়ান্ত নীলনকশা। তিনি ভালো করেই জানতেন যে, টেলেমাকাস মারা গেলে ওডিসিউসের আর কোনো প্রত্যক্ষ পুরুষ উত্তরাধিকারী থাকবে না। তখন ইথাকার বিপুল ধনসম্পদ ও ক্ষমতার একমাত্র দাবিদার হবে তারা নিজেরা। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, অ্যান্টিনোয়াস এই হত্যার দায়ভার অন্য কারও ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টাও করেননি। তিনি নিজেই এই হত্যাকারী দলের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তার এই বেপরোয়া মনোভাব দেখায় যে, তিনি ক্ষমতার লোভে কতটা অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। দেবতারা বা সমাজ কী ভাববে, সেই তোয়াক্কা তিনি আর করছিলেন না। তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল নিজের পথ থেকে সমস্ত কাঁটা সরিয়ে ফেলা।

তবে প্রণয়প্রার্থীদের এই গোপন সভার খবর বেশি দিন গোপন থাকেনি। প্রাসাদের একজন বিশ্বস্ত চারণকবি ও বার্তাবাহক মেডন (Medon) আড়াল থেকে এই ভয়াবহ পরিকল্পনার কথা শুনে ফেলেন। প্রাচীন গ্রিক সমাজে চারণকবিদের একটি বিশেষ সম্মানজনক অবস্থান ছিল। তারা সমাজের সত্য ও নৈতিকতার এক ধরনের ধারক হিসেবে কাজ করতেন। মেডন যদিও প্রণয়প্রার্থীদের ভয়ে এতদিন চুপ ছিলেন, কিন্তু যুবরাজকে হত্যার এই জঘন্য পরিকল্পনার কথা শুনে তার বিবেক নাড়া দিয়ে ওঠে। তিনি বুঝতে পারেন, এই ষড়যন্ত্র যদি সফল হয়, তবে ইথাকার রাজবংশ চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে। কালবিলম্ব না করে তিনি সরাসরি রানী পেনেলোপি (Penelope)-এর কাছে ছুটে যান এবং তাকে এই বিপদের কথা জানান। মেডনের এই একটি পদক্ষেপ ষড়যন্ত্রটির মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং পেনেলোপিকে চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

পেনেলোপির শোক ও মাতৃসত্তার জাগরণ (Grief of Penelope and the Awakening of Motherhood)

মেডনের মুখ থেকে টেলেমাকাসের গোপনে সমুদ্রযাত্রা এবং তাকে হত্যার এই ষড়যন্ত্রের কথা শুনে পেনেলোপির পায়ের তলার মাটি সরে যায়। তিনি এত বছর ধরে অত্যন্ত সাহসিকতা ও চাতুর্যের সাথে প্রণয়প্রার্থীদের ঠেকিয়ে রেখেছিলেন, কিন্তু এই খবরটি তার সমস্ত মানসিক শক্তি কেড়ে নেয়। দুঃখে ও আতঙ্কে তার বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। তিনি প্রাসাদের মেঝেতে বসে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। তার এই কান্না কেবল একজন রাণীর কান্না ছিল না, এটি ছিল একজন অসহায় মায়ের আর্তনাদ। তিনি বুঝতে পারছিলেন না যে, তার পুত্র কেন তাকে না জানিয়ে এমন একটি বিপৎসঙ্কুল যাত্রায় বের হলো। তিনি তার বিশ্বস্ত দাসীদের তিরস্কার করেন, কারণ তারা সব জেনেও তাকে কিছু জানায়নি। ওডিসিউসকে হারানোর পর টেলেমাকাসই ছিল তার বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। সেই সম্বলটিও যদি এভাবে মাঝসাগরে হারিয়ে যায়, তবে তার আর বেঁচে থাকার কোনো অর্থ থাকবে না (Heitman, 2005)।

এই গভীর শোক ও হতাশার মাঝেই পেনেলোপির ভেতর থেকে একজন প্রকৃত মায়ের সত্তা জেগে ওঠে। তিনি আর প্রাসাদের মেঝেতে বসে কেবল কান্নাকাটি করাকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। তিনি দ্রুত একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি ঠিক করেন যে, তাকে যেভাবেই হোক এই ষড়যন্ত্র রুখতে হবে। তিনি নির্দেশ দেন তার বৃদ্ধ শ্বশুর লায়ার্তেস (Laertes)-এর কাছে খবর পাঠানোর জন্য। তিনি আশা করেছিলেন যে, লায়ার্তেস হয়তো সাধারণ প্রজাদের কাছে গিয়ে এই জঘন্য চক্রান্তের কথা প্রকাশ করবেন এবং একটি গণজাগরণ তৈরি করবেন। কিন্তু দাসী ইউরিক্লিয়া (Eurycleia) তাকে এই কাজ থেকে বিরত রাখেন। ইউরিক্লিয়া জানান যে, লায়ার্তেস এখন এতটাই বৃদ্ধ ও শোকাহত যে, এই খবরটি তাকে বাঁচতে দেবে না। ইউরিক্লিয়ার পরামর্শে পেনেলোপি তখন মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়ার বদলে দেবতাদের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

পেনেলোপি দ্রুত স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করেন এবং দেবী অ্যাথেনার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা শুরু করেন। তিনি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ভাষায় অ্যাথেনাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ওডিসিউস সারা জীবন দেবতাদের কতটা ভক্তি করেছেন। তিনি দেবীর কাছে মিনতি করেন তার নিষ্পাপ পুত্রকে ওই নরপিশাচদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। পেনেলোপির এই প্রার্থনাটি ছিল অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। এটি দেখায় যে, মানুষের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা যখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন তার শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে কেবল দেবতারাই অবশিষ্ট থাকেন। অ্যাথেনা তার এই প্রার্থনা শোনেন এবং তাকে আশ্বস্ত করার জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি পেনেলোপির বোন ইফথিমের রূপ ধারণ করে একটি ছায়ামূর্তি বা ফ্যান্টম পাঠান। রাতের অন্ধকারে সেই ছায়ামূর্তি পেনেলোপির স্বপ্নে এসে তাকে শান্ত করে এবং জানায় যে টেলেমাকাস দেবী অ্যাথেনার বিশেষ সুরক্ষায় রয়েছে। এই স্বপ্নটি পেনেলোপির মনে সাময়িক শান্তি ফিরিয়ে আনলেও, সাগরের বুকে ওত পেতে থাকা বিপদের কথা ভেবে তার আতঙ্ক পুরোপুরি কাটে না।

সমুদ্রপথে বিপদ ও অ্যাথেনার সুরক্ষা (Danger at Sea and the Protection of Athena)

পেনেলোপি যখন ইথাকার প্রাসাদে প্রার্থনায় মগ্ন, অ্যান্টিনোয়াস তখন তার সশস্ত্র অনুচরদের নিয়ে সাগরের বুকে ওঁত পেতে বসে আছে। তারা অ্যাসটেরিস দ্বীপের সেই সরু প্রণালীতে জাহাজ নোঙর করে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে থাকে। তাদের চোখ সারাক্ষণ দিগন্তের দিকে নিবদ্ধ। তারা জানত, টেলেমাকাসকে স্পার্টা থেকে ফিরতে হলে এই পথ দিয়েই আসতে হবে। সাগরের এই বিস্তীর্ণ জলরাশি, যা একসময় গ্রিক বীরদের জন্য গৌরব ও বিজয়ের প্রতীক ছিল, এখন তা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এক ভয়ংকর মরণফাঁদ। হোমার এখানে সমুদ্রের এই দ্বৈত রূপটি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। যে সমুদ্র ওডিসিউসকে তার বাড়ি ফিরতে বাধা দিচ্ছে, সেই একই সমুদ্র এখন তার পুত্রের জন্য একটি সম্ভাব্য কবরস্থানে পরিণত হয়েছে (Cook, 1995)।

কিন্তু অ্যান্টিনোয়াস ও তার দলবল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে গিয়েছিল। তারা কেবল মানুষের হিসাব-নিকাশ নিয়ে ব্যস্ত ছিল, কিন্তু দেবতাদের ইচ্ছার কথা তাদের মাথায় ছিল না। দেবী অ্যাথেনা, যিনি টেলেমাকাসের যাত্রার শুরু থেকেই তার ছায়াসঙ্গী হিসেবে ছিলেন, তিনি এই ষড়যন্ত্রের কথা খুব ভালো করেই জানতেন। স্পার্টায় যখন টেলেমাকাস রাজা মেনেলাউসের প্রাসাদে অবস্থান করছিল, তখন অ্যাথেনা তাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে দ্রুত ইথাকায় ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি টেলেমাকাসকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ওই গুপ্তঘাতকদের সম্পর্কে সতর্ক করে দেন। তিনি তাকে এমন একটি পথ দিয়ে জাহাজ চালানোর পরামর্শ দেন, যা দিয়ে সচরাচর কেউ যায় না। রাতের অন্ধকারে, সবার অলক্ষ্যে জাহাজ চালিয়ে ইথাকার অন্য একটি নিরাপদ উপকূলে নামার নির্দেশ দেন তিনি।

অ্যাথেনার এই সতর্কবার্তা টেলেমাকাসের জীবন বাঁচিয়ে দেয়। স্পার্টা থেকে ফেরার পথে সে অত্যন্ত সাবধানে তার জাহাজ পরিচালনা করে। সে অ্যাসটেরিস দ্বীপের সেই পরিচিত পথ এড়িয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পথ বেছে নেয়। রাতের অন্ধকারে, যখন সাগরের বুকে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না, তখন দেবী অ্যাথেনা নিজে তার জাহাজের অনুকূলে বাতাস বইয়ে দেন, যাতে জাহাজটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ইথাকার দিকে এগিয়ে যায়। এই ঘটনাটি মহাকাব্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এটি দেখায় যে, দেবতারা কেবল ভাগ্য নির্ধারণ করেই ক্ষান্ত হন না, তারা তাদের অনুগত মানুষদের বিপদের মুহূর্তে সরাসরি সাহায্যও করেন। অ্যাথেনার এই প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের ফলেই অ্যান্টিনোয়াসের নিখুঁত গুপ্তহত্যার পরিকল্পনাটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে যায়। টেলেমাকাস তার সমস্ত বিপদ এড়িয়ে অত্যন্ত নিরাপদে ইথাকার মাটিতে পা রাখতে সক্ষম হয়।

টেলেমাকাসের প্রত্যাবর্তন ও মানসিক পরিপক্বতা (Return of Telemachus and Mental Maturity)

টেলেমাকাস যখন স্পার্টা থেকে ফিরে ইথাকার উপকূলে পা রাখে, তখন সে আর সেই আগের ভীরু ও দ্বিধাগ্রস্ত তরুণটি নেই। এই একটি মাত্র সমুদ্রযাত্রা এবং মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা তাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। সে এখন জানে যে তার শত্রুরা কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে এবং তার নিজের জীবন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। সে ইথাকার মূল বন্দরে জাহাজ না থামিয়ে অত্যন্ত গোপনে অন্য একটি নিরাপদ উপকূলে নেমে পড়ে। সে তার সঙ্গীদের নির্দেশ দেয় জাহাজ নিয়ে শহরে চলে যাওয়ার জন্য, আর নিজে হেঁটে রওনা হয় বিশ্বস্ত শূকরপালক ইউমেয়াস (Eumaeus)-এর কুটিরের দিকে। এই সিদ্ধান্তটি দেখায় যে টেলেমাকাস এখন অত্যন্ত বাস্তববাদী এবং দূরদর্শী। সে বুঝতে পেরেছিল যে সরাসরি প্রাসাদে গেলে সে হয়তো শত্রুদের হাতে ধরা পড়ে যাবে (Lateiner, 1995)।

ইউমেয়াসের কুটিরের দিকে তার এই হাঁটাটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এতদিন সে কেবল রাজপ্রাসাদের আরাম-আয়েশের ভেতরেই বড় হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবন বা তাদের দুঃখ-কষ্ট সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না। কিন্তু এখন তাকে একজন সাধারণ পথিকের মতো ইথাকার পাথুরে পথ ধরে হাঁটতে হচ্ছে। এই হাঁটাটি মূলত তার নিজের রাজ্যের মাটির সাথে তার নতুন করে পরিচিত হওয়ার একটি প্রতীকী রূপ। সে অনুধাবন করতে শুরু করে যে, একজন রাজাকে কেবল সিংহাসনে বসে থাকলেই চলে না, তাকে তার রাজ্যের সাধারণ মানুষের সাথেও মিশতে হয়। ইউমেয়াসের মতো বিশ্বস্ত কর্মচারীরা যে ইথাকার আসল শক্তি, এই সত্যটি সে প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করতে পারে।

টেলেমাকাসের এই প্রত্যাবর্তন ইথাকার ক্ষমতার লড়াইয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। সে যখন ইথাকা ছেড়েছিল, তখন সে ছিল একজন অসহায় বালক, যে তার পিতার সন্ধান খুঁজছিল। কিন্তু যখন সে ফিরে এল, তখন সে একজন পরিণত মানুষ, যে তার শত্রুদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরেছে। এই আত্মবিশ্বাস তাকে পরবর্তী কঠিন পদক্ষেপগুলো নেওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে। সে এখন আর কেবল তার পিতার প্রত্যাবর্তনের জন্য অপেক্ষা করে বসে নেই। সে নিজেই ইথাকার হারানো সম্মান পুনরুদ্ধারের জন্য একটি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। অ্যাথেনার নির্দেশনায় শুরু হওয়া তার এই যাত্রা তাকে কেবল পিতার খবরই এনে দেয়নি, বরং তাকে নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা একজন প্রকৃত রাজপুত্রকে আবিষ্কার করতে সাহায্য করেছে।

ষড়যন্ত্রের ব্যর্থতা ও আসন্ন সংঘাতের পূর্বাভাস (Failure of the Plot and Foreshadowing of Impending Conflict)

অন্যদিকে, সাগরের বুকে টানা কয়েক দিন অপেক্ষা করার পর যখন অ্যান্টিনোয়াস বুঝতে পারে যে টেলেমাকাস তাদের ফাঁকি দিয়ে ইথাকায় পৌঁছে গেছে, তখন তার ক্ষোভের কোনো সীমা থাকে না। সে তার দলবল নিয়ে অত্যন্ত হতাশা ও রাগের সাথে ইথাকার বন্দরে ফিরে আসে। এই ব্যর্থতা প্রণয়প্রার্থীদের মধ্যে এক ধরনের বিভেদ ও ভীতির সৃষ্টি করে। তারা বুঝতে পারে যে, তারা যে কাজটিকে অত্যন্ত সহজ ভেবেছিল, তা মোটেও সহজ নয়। টেলেমাকাস কেবল বেঁচে ফিরে আসেনি, সে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং সতর্ক। অ্যান্টিনোয়াস পুনরায় একটি সভা ডাকে এবং সেখানে টেলেমাকাসকে এবার শহরের ভেতরেই গুপ্তহত্যা করার প্রস্তাব দেয়। তার মতে, টেলেমাকাস যদি একবার সাধারণ জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের এই পূর্ববর্তী ষড়যন্ত্রের কথা ফাঁস করে দেয়, তবে জনগণ খেপে উঠবে এবং তাদের ইথাকা থেকে বিতাড়িত করবে।

কিন্তু এবার প্রণয়প্রার্থীদের মধ্যে সবাই অ্যান্টিনোয়াসের এই বেপরোয়া প্রস্তাবে রাজি হয় না। অ্যাম্ফিনোমাস (Amphinomus) নামে এক প্রণয়প্রার্থী, যিনি ছিলেন তুলনামূলকভাবে একটু বেশি ধার্মিক ও সংযত, তিনি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, রাজবংশের কাউকে হত্যা করা অত্যন্ত ভয়ংকর একটি অপরাধ। দেবতাদের স্পষ্ট কোনো নির্দেশ ছাড়া এমন কাজ করা মোটেও উচিত হবে না। তার এই কথায় অন্য প্রণয়প্রার্থীরাও কিছুটা থমকে যায়। তারা বুঝতে পারে যে, ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে তারা এমন একটি পথে পা বাড়িয়েছে, যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো সুযোগ নেই। এই মতানৈক্য প্রণয়প্রার্থীদের ভেতরের ফাটলটিকে স্পষ্ট করে তোলে। তারা আর আগের মতো ঐক্যবদ্ধ ছিল না (Newton, 2008)।

এই পুরো ঘটনাটি ইথাকায় একটি আসন্ন ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পূর্বাভাস দেয়। টেলেমাকাসকে হত্যার ষড়যন্ত্রটি ব্যর্থ হওয়ার মাধ্যমে এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, প্রণয়প্রার্থীরা বিনা রক্তপাতে ইথাকা ছাড়বে না। আবার টেলেমাকাসও এখন আর তাদের অত্যাচার নীরবে মুখ বুজে সহ্য করবে না। পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে যেকোনো সময় একটি চূড়ান্ত লড়াই শুরু হতে পারে। হোমার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই ষড়যন্ত্রের আখ্যানটি ব্যবহার করে মহাকাব্যের মূল সংঘাতের ভিত্তি প্রস্তুত করেছেন। সাগরের বুকে যে বিপদটি ওত পেতে ছিল, তা এখন ইথাকার প্রাসাদের ভেতরে স্থানান্তরিত হয়েছে। আর ঠিক এই শ্বাসরুদ্ধকর ও চরম উত্তেজনাময় মুহূর্তেই, দেবী অ্যাথেনার পরিকল্পনার দ্বিতীয় অংশটি বাস্তবায়িত হতে শুরু করে, যা ইথাকার এই ক্ষমতার লড়াইয়ের সমীকরণকে চিরতরে বদলে দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল।

ক্যালিপসো থেকে ফাইয়াকীয়দের দেশ (From Calypso to the Land of the Phaeacians): বন্দিত্ব, মুক্তি ও আতিথেয়তা

ক্যালিপসোর দ্বীপে ওডিসিউস (Odysseus on Calypso’s Island): অমরত্বের প্রলোভন ও স্বদেশাকাঙ্ক্ষা

ওজিজিয়া দ্বীপের মায়াজাল ও প্রকৃতির বন্দিশালা (Illusion of Ogygia and the Prison of Nature)

গ্রিক পুরাণের বিশাল ও বৈচিত্র্যময় ভূগোলে ওজিজিয়া (Ogygia) এক বিচ্ছিন্ন, রহস্যময় এবং প্রায় অনাবিষ্কৃত এক দ্বীপ। ট্রয়যুদ্ধ শেষে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় সঙ্গীদের হারিয়ে, জাহাজডুবি হয়ে, সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় ওডিসিউস (Odysseus) একটি ভাসমান কাঠের টুকরো আঁকড়ে ধরে এই দ্বীপে এসে পৌঁছান। বাইরে থেকে দেখলে এই দ্বীপটিকে পৃথিবীর বুকে এক খণ্ড স্বর্গের মতো মনে হতে পারে। হোমার তাঁর মহাকাব্যে এই দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা যেকোনো মরণশীল মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। দ্বীপের চারপাশ ঘিরে ছিল ঘন বনানী, যেখানে অ্যালডার, পপলার আর সুগন্ধি সাইপ্রেস গাছ আকাশ ছুঁতে চাইত। গুহার মুখ পেঁচিয়ে বেড়ে উঠেছিল আঙুরলতা, আর চারপাশের চারটি ঝরনা থেকে স্ফটিকস্বচ্ছ জল বইত। নরম ঘাস আর বুনো ফুলে ঢাকা এই দ্বীপের এমন মায়াবী রূপ স্বয়ং দেবতাদেরও মুগ্ধ করত।

তবে এই অপরূপ সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অদৃশ্য শেকল। দ্বীপটির একমাত্র অধিবাসী ছিলেন দেবী ক্যালিপসো (Calypso), যিনি ছিলেন টাইটান অ্যাটলাসের কন্যা। গ্রিক ভাষায় তাঁর নামের অর্থ হলো ‘গোপনকারিণী’ বা যিনি লুকিয়ে রাখেন। নামের অর্থের সাথে মিল রেখেই তিনি বহির্বিশ্ব থেকে ওডিসিউসকে পুরোপুরি আড়াল করে ফেলেছিলেন। ওজিজিয়ার এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ওডিসিউসের কাছে কোনো আনন্দের উৎস ছিল না, বরং তা পরিণত হয়েছিল এক সুসজ্জিত কারাগারে। চারদিকে বিস্তৃত অনন্ত জলরাশি আর কোনো জাহাজ বা নাবিক না থাকায়, এই দ্বীপ থেকে পালিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় ওডিসিউসের জানা ছিল না। দিনের পর দিন এই ঐশ্বরিক বন্দিদশায় আটকে থেকে তার ভেতরের যোদ্ধাসত্তা ধীরে ধীরে নিস্তেজ হতে শুরু করে। দেবী ক্যালিপসোর মায়াবী গান আর সোনার মাকু দিয়ে বোনা কাপড়ের জৌলুস তাকে আকর্ষণ করার বদলে আরও বেশি হাঁপিয়ে তুলত (Doherty, 1995)।

একটি সুন্দর পরিবেশ কীভাবে মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গেলে নরকে পরিণত হতে পারে, হোমার এখানে সেই মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টি তুলে ধরেছেন। ওজিজিয়ায় কোনো অভাব ছিল না, কোনো যুদ্ধ ছিল না, ছিল না কোনো মৃত্যুর ভয়। তবে সেখানে একটি জিনিসের তীব্র সংকট ছিল, আর তা হলো মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা। ওডিসিউস একজন স্বাধীন শাসক এবং বীর যোদ্ধা হিসেবে নিজের জীবন পরিচালনা করতে অভ্যস্ত ছিলেন। সেখানে তাকে একজন দেবীর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হচ্ছিল। এই পরনির্ভরশীলতা তার আত্মসম্মানে প্রচণ্ড আঘাত হানে। দ্বীপের মায়াজাল তাকে শারীরিকভাবে বেঁধে রাখলেও, মানসিকভাবে তিনি কখনোই এই পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। তার কাছে গুহার ভেতরের আরামদায়ক শয্যার চেয়ে সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের বুকে অনিশ্চিত যাত্রাও অনেক বেশি কাম্য ছিল।

অমরত্বের প্রলোভন বনাম মরণশীলতার অহংকার (Temptation of Immortality vs. the Pride of Mortality)

ওজিজিয়া দ্বীপে ওডিসিউসের বন্দিজীবনের সবচেয়ে বড় দার্শনিক পরীক্ষাটি কেবল আটকে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেবী ক্যালিপসো তাকে এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা প্রত্যাখ্যান করার কথা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন। তিনি ওডিসিউসকে আজীবন তার সাথে থেকে যাওয়ার শর্তে অমরত্ব (Athanasia) এবং চিরযৌবনের প্রলোভন দেখিয়েছিলেন। গ্রিক পুরাণে মরণশীল মানুষের দেবতা হয়ে ওঠার বা অমরত্ব লাভের ঘটনা একেবারেই বিরল নয়। তবে ওডিসিউসের কাছে এই প্রস্তাবটি ছিল তার আত্মপরিচয় মুছে ফেলার এক চূড়ান্ত ষড়যন্ত্র। একজন গ্রিক বীরের মহত্ত্ব বা ক্লিওস অর্জিত হয় তার জীবনের ঝুঁকি নেওয়া, কষ্ট সহ্য করা এবং শেষ পর্যন্ত বীরত্বের সাথে মৃত্যুবরণ করার মধ্য দিয়ে। মৃত্যুহীন জীবনে বীরত্বের কোনো অস্তিত্ব নেই। অমরত্ব গ্রহণ করার অর্থ হলো মানুষের জীবনের সমস্ত চ্যালেঞ্জ, দুঃখ ও অর্জনকে অস্বীকার করা।

ক্যালিপসো বারবার তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, সাগরের বুকে পাড়ি দিলে তাকে অভাবনীয় কষ্টের সম্মুখীন হতে হবে। তিনি নিজের সৌন্দর্যের সাথে ওডিসিউসের স্ত্রী পেনেলোপি (Penelope)-এর তুলনা টেনে এনেছেন। একজন দেবী হিসেবে ক্যালিপসো কখনোই বৃদ্ধ হবেন না, তার সৌন্দর্য কখনো ম্লান হবে না। অন্যদিকে পেনেলোপি একজন রক্তমাংসের মানুষ, বয়সের সাথে সাথে তার শরীরে বার্ধক্যের ছাপ পড়বে এবং একদিন তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বেন। এই অকাট্য যুক্তির সামনে দাঁড়িয়ে ওডিসিউস যে উত্তর দিয়েছিলেন, তা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি দার্শনিক অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি ক্যালিপসোর সমস্ত যুক্তি মেনে নেন। তিনি স্বীকার করেন যে রূপ বা অমরত্বের দিক থেকে তার স্ত্রী কোনোভাবেই একজন দেবীর সমকক্ষ নন। তারপরও তিনি এই মরণশীল মানুষের জীবনটাকেই বেছে নেন (Vernant, 1991)।

ওডিসিউস অমরত্ব প্রত্যাখ্যান করে মূলত মনুষ্যত্বের সীমানা (Human Condition)-কে আপন করে নিয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, জীবনের সৌন্দর্য এর স্থায়িত্বের মধ্যে নয়, বরং এর ভঙ্গুরতার মধ্যে নিহিত। মানুষের জীবন সসীম বলেই এর প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি সম্পর্ক এত দামি। ক্যালিপসোর সাথে থেকে গেলে তিনি হয়তো কোনোদিন বৃদ্ধ হতেন না, কিন্তু তার জীবনের কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য অবশিষ্ট থাকত না। তিনি কেবল একজন দেবীর খেলনা হয়ে অনন্তকাল পার করে দিতেন। নিজের বাড়ি ফেরা, স্ত্রীর সাথে পুনরায় মিলিত হওয়া, ছেলের বেড়ে ওঠা দেখা এবং নিজের রাজ্যের দায়িত্ব নেওয়ার মতো সাধারণ মানবিক চাওয়াগুলোর কাছে অমরত্বের প্রলোভন তার কাছে অত্যন্ত তুচ্ছ মনে হয়েছিল। এই প্রত্যাখ্যান দেখায় যে, ওডিসিউসের কাছে নিজের শেকড় এবং মানবিক পরিচয়ের মূল্য যেকোনো ঐশ্বরিক প্রলোভনের চেয়ে অনেক বেশি।

ক্যালিপসোর মনস্তত্ত্ব ও দেবীদের নিঃসঙ্গতা (Psychology of Calypso and the Loneliness of Goddesses)

মহাকাব্যের পাতায় ক্যালিপসোকে কেবল একজন বাধাদানকারী বা প্রলুব্ধকারী চরিত্র হিসেবে দেখলে তার প্রতি অবিচার করা হবে। হোমার অত্যন্ত সুনিপুণভাবে এই দেবীর ভেতরের নিঃসঙ্গতা ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনকে চিত্রিত করেছেন। ক্যালিপসো ওডিসিউসকে কেবল আটকে রাখেননি, তিনি তাকে গভীর ভালোবাসায় জড়িয়ে ফেলেছিলেন। যখন ওডিসিউসের জাহাজ ধ্বংস হয়ে তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় দ্বীপে এসে পৌঁছান, তখন এই দেবীই তাকে পরম মমতায় সুস্থ করে তুলেছিলেন। বছরের পর বছর একটি জনমানবহীন দ্বীপে একা বসবাস করা যেকোনো সত্তার জন্যই কষ্টদায়ক। ওডিসিউসের মতো একজন ধীমান ও সাহসী পুরুষকে কাছে পেয়ে ক্যালিপসো তার সেই দীর্ঘ নিঃসঙ্গতা কাটানোর সুযোগ পেয়েছিলেন। তার ভালোবাসা ছিল স্বার্থপর, তবে তা ছিল অত্যন্ত গভীর ও সত্য।

ক্যালিপসোর চরিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী দিকটি উন্মোচিত হয় যখন তিনি অলিম্পাসের দেবতাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তোলেন। যখন হার্মিস এসে তাকে জিউসের নির্দেশ জানান যে ওডিসিউসকে ছেড়ে দিতে হবে, তখন ক্যালিপসো ফেটে পড়েন তীব্র ক্ষোভে। তিনি দেবতাদের এই আচরণকে চরম ভণ্ডামি ও লৈঙ্গিক বৈষম্য (Gender Inequality) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি সরাসরি উল্লেখ করেন, পুরুষ দেবতারা যখন ইচ্ছা কোনো মরণশীল নারীকে নিজেদের শয্যাসঙ্গিনী করে নেন, তখন অলিম্পাস নীরব থাকে। কিন্তু কোনো দেবী যদি কোনো মরণশীল পুরুষকে ভালোবেসে নিজের কাছে রাখতে চান, তখন অন্য দেবতাদের ইগোতে আঘাত লাগে এবং তারা সেই সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। দেবী ডন ও কালপুরুষ ওরিয়নের প্রেমকাহিনীর উদাহরণ টেনে তিনি দেবতাদের এই দ্বিমুখী নীতির তীব্র সমালোচনা করেন (Foley, 2001)।

ক্যালিপসোর এই ক্ষোভ ও যুক্তি প্রাচীন সাহিত্যে নারীবাদী দৃষ্টিকোণের এক অসামান্য ঝলক। তিনি স্পষ্টতই একজন ক্ষমতাধর দেবী, কিন্তু অলিম্পাসের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর কাছে তিনিও এক প্রকার অসহায়। তিনি ওডিসিউসকে জোর করে আটকে রাখলেও, যখন জিউসের নির্দেশ আসে, তখন তাকে সেই নির্দেশ মাথা পেতে নিতে হয়। বিদায়বেলায় তার কষ্ট ও অসহায়ত্ব পাঠকের মনেও এক ধরনের সহানুভূতির জন্ম দেয়। তিনি ওডিসিউসের ক্ষতি চাননি, তিনি কেবল তার একাকিত্ব দূর করার জন্য একজন সঙ্গী চেয়েছিলেন। দেবতাদের অমর জীবন যে অনেক সময় চরম নিঃসঙ্গ ও অর্থহীন হতে পারে, ক্যালিপসোর চরিত্রটি তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার এই নিঃসঙ্গতাই তাকে ওডিসিউসের মতো একজন মরণশীল মানুষের প্রতি এতটা নির্ভরশীল করে তুলেছিল।

স্মৃতিকাতরতা ও ইথাকার জন্য অন্তহীন অপেক্ষা (Nostalgia and the Endless Wait for Ithaca)

ওজিজিয়া দ্বীপের দিনগুলো ওডিসিউসের জন্য ছিল এক দীর্ঘ মানসিক অবদমনের অধ্যায়। ট্রয়যুদ্ধের সেই দুর্ধর্ষ সেনাপতি, যার উপস্থিত বুদ্ধিতে বিশাল নগরীর পতন ঘটেছিল, তাকে এখন দেখা যায় সমুদ্রসৈকতে পাথরের ওপর বসে অঝোরে কাঁদতে। হোমার তাকে চিত্রিত করেছেন এমন এক মানুষ হিসেবে, যে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সমুদ্রের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকে এবং চোখের জলে বুক ভাসায়। তার এই কান্না কোনো দুর্বলতা ছিল না, এটি ছিল তার নিজের রাজ্য, পরিবার ও শেকড়ের প্রতি তীব্র আকুলতার প্রকাশ। গ্রিক দর্শনে বাড়ি ফেরার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে বলা হয় নস্টস (Nostos)। ওডিসিউসের অস্তিত্বের প্রতিটি কোষে এই নস্টস এমনভাবে মিশে ছিল যে, ক্যালিপসোর কোনো জাদুই তা ভুলিয়ে দিতে পারেনি।

রাতের বেলা ক্যালিপসোর গুহায় তাকে বাধ্য হয়ে দেবীর শয্যাসঙ্গী হতে হতো, কিন্তু তার মন সেখানে থাকত না। শরীর সেখানে উপস্থিত থাকলেও তার আত্মা পড়ে থাকত ইথাকার সেই পাথুরে ভূমিতে। একজন বন্দি মানুষের এই দ্বৈত জীবন তার ভেতরের পরিচয় সংকট (Identity Crisis)-কে আরও ঘনীভূত করে তুলেছিল। সাতটি দীর্ঘ বছর ধরে একই রুটিন, একই সমুদ্রের ঢেউ, একই পাখি ডাকা সকাল তাকে মানসিকভাবে প্রায় স্থবির করে দিয়েছিল। তিনি জানতেন না ইথাকায় তার স্ত্রী কেমন আছে, তার ছেলে বড় হয়ে কী করছে। এই অনিশ্চয়তা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। সাগরের যে জলরাশি তার আর ইথাকার মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেই জলরাশির দিকে তাকিয়ে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দিতেন। সমুদ্র একইসাথে তার বন্দিশালা এবং মুক্তির একমাত্র পথ হিসেবে তার সামনে উপস্থিত ছিল (Montiglio, 2011)।

এই স্মৃতিকাতরতা ওডিসিউসকে বাঁচিয়েও রেখেছিল। যদি তিনি একবার ইথাকার স্মৃতি ভুলে যেতেন, তবে তিনি হয়তো লোটাস-ভোজীদের দ্বীপে তার সঙ্গীদের মতো বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতেন এবং ক্যালিপসোর অমরত্বের প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করতেন। কিন্তু ওই দূরবর্তী দ্বীপের স্মৃতি তাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দিত যে তিনি কে এবং তার আসল পরিচয় কী। তার এই অন্তহীন অপেক্ষা দেখায় যে, মানুষের মানসিক শক্তি তার শারীরিক সীমানার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তীর্ণ। তিনি জানতেন না কবে বা কীভাবে তিনি মুক্তি পাবেন, আদৌ কখনো ফিরতে পারবেন কি না। তারপরও তিনি আশা ছাড়েননি। সমুদ্রের নোনা বাতাসের দিকে মুখ করে তিনি প্রতিদিন ইথাকার ঘ্রাণ খোঁজার চেষ্টা করতেন। এই অপরাজিত মানসিকতাই তাকে মহাকাব্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

অলিম্পাসের হস্তক্ষেপ ও হার্মিসের আগমন (Intervention of Olympus and the Arrival of Hermes)

ওডিসিউসের এই দীর্ঘ স্থবির জীবনে পরিবর্তনের হাওয়া আসে অলিম্পাস পর্বত থেকে। ইথাকার প্রাসাদে যখন টেলেমাকাস তার পিতার সন্ধানে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক সেই সময় অলিম্পাসে দেবতাদের এক সভা বসে। দেবী অ্যাথেনা জিউসের কাছে ওডিসিউসের করুণ অবস্থার কথা তুলে ধরেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন ধার্মিক মানুষ, যে সারাজীবন দেবতাদের সম্মান করেছে, তাকে কেন এভাবে দ্বীপের বন্দিশালায় ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে। জিউস এই যুক্তির কাছে নতিস্বীকার করেন এবং দেবতাদের বার্তাবাহক হার্মিস (Hermes)-কে পাঠান ক্যালিপসোর কাছে একটি চূড়ান্ত নির্দেশ নিয়ে। হার্মিসের এই যাত্রাটি মহাকাব্যে একটি চমৎকার গতির সঞ্চার করে। অলিম্পাস থেকে পিয়েইরিয়া হয়ে, সাগরের ঢেউয়ের ওপর দিয়ে জলকাক পাখির মতো উড়ে হার্মিস নিমেষেই এসে পৌঁছান ওজিজিয়া দ্বীপে।

হার্মিস যখন ক্যালিপসোর গুহায় প্রবেশ করেন, তখন চারপাশের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত শান্ত ও মায়াবী। ক্যালিপসো সোনার মাকু দিয়ে কাপড় বুনছিলেন আর গান গাইছিলেন। হার্মিসকে দেখে তিনি তৎক্ষণাৎ চিনে ফেলেন, কারণ দেবতারা একে অপরকে খুব সহজেই চিনতে পারেন। তিনি অত্যন্ত সম্মান ও আতিথেয়তার সাথে হার্মিসকে বরণ করে নেন। তাকে বসার আসন দেন এবং দেবতাদের পানীয় নেকটার ও অ্যামব্রোসিয়া পরিবেশন করেন। খাওয়া শেষ হওয়ার পর হার্মিস অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জিউসের নির্দেশটি তাকে জানান। তিনি বলেন, নিয়তি বা নিয়তি (Moira) অনুযায়ী ওডিসিউসের মৃত্যু এই দ্বীপে লেখা নেই। তাকে তার নিজের দেশে, নিজের মানুষদের কাছে ফিরে যেতে দিতে হবে। জিউসের এই নির্দেশ অমান্য করার কোনো সুযোগ ক্যালিপসোর ছিল না (Louden, 1999)।

এই হস্তক্ষেপটি গ্রিক পুরাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। দেবতারা যদিও মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করেন, কিন্তু তারা চূড়ান্ত নিয়তিকে অস্বীকার করতে পারেন না। ওডিসিউসের ইথাকায় ফেরাটা ছিল পূর্বনির্ধারিত। ক্যালিপসো হয়তো তাকে সাময়িকভাবে আটকে রেখেছিলেন, কিন্তু চিরকালের জন্য তাকে নিজের করে নেওয়ার ক্ষমতা কোনো দেবীরই ছিল না। হার্মিসের আগমনের মধ্য দিয়ে ওডিসিউসের ভাগ্যের চাকা নতুন করে ঘুরতে শুরু করে। এটি কেবল একটি বার্তা পৌঁছানোর ঘটনা ছিল না, এটি ছিল একটি রুদ্ধশ্বাস নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কের সূচনা। অলিম্পাসের এই সিদ্ধান্ত ওজিজিয়ার শান্ত ও নিস্তব্ধ পরিবেশকে ভেঙে দিয়ে সেখানে নিয়ে আসে মুক্তির এক নতুন কোলাহল।

বিদায়ের প্রস্তুতি ও মুক্তির সমীকরণ (Preparation for Departure and the Equation of Freedom)

জিউসের নির্দেশ পাওয়ার পর ক্যালিপসোর আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি ভারাক্রান্ত মনে সমুদ্রসৈকতে যান, যেখানে ওডিসিউস যথারীতি বসে কাঁদছিলেন। তিনি গিয়ে ঘোষণা করেন যে, ওডিসিউসকে আর চোখের জল ফেলতে হবে না, তিনি এবার তাকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছেন। এই কথা শুনে ওডিসিউস আনন্দে লাফিয়ে ওঠার বদলে চরম সন্দেহ প্রকাশ করেন। টানা সাত বছর যে দেবী তাকে আটকে রেখেছেন, তিনি হঠাৎ এত দয়ালু হয়ে গেলেন কেন – এই প্রশ্ন তাকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি ক্যালিপসোকে সন্দেহ করেন যে এটি হয়তো তাকে সমুদ্রে ডুবিয়ে মারার কোনো নতুন ষড়যন্ত্র। ওডিসিউসের এই সন্দেহপ্রবণতা তার কৌশল (Metis) ও বাস্তবজ্ঞানের এক দারুণ নিদর্শন। তিনি ক্যালিপসোকে বাধ্য করেন স্টিক্স নদীর নামে একটি কঠিন শপথ করতে, যে তিনি ওডিসিউসের কোনো ক্ষতি করবেন না (Newton, 1998)।

শপথ নেওয়ার পর ক্যালিপসো তাকে একটি ভেলা বা র‍্যাফট তৈরি করার সরঞ্জাম দেন। একটি কুঠার, একটি কাঠ কাটার করাত এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পেয়ে ওডিসিউসের ভেতরের নিস্তেজ সত্তা যেন হঠাৎ জেগে ওঠে। টানা সাত বছর নিষ্ক্রিয় থাকার পর তিনি আবার নিজের হাতে কাজ করার সুযোগ পান। তিনি নিজেই জঙ্গলে গিয়ে বিশটি বড় গাছ কাটেন, সেগুলোকে ছাঁটেন এবং নিপুণ হাতে একটি মজবুত ভেলা তৈরি করেন। এই ভেলা তৈরির প্রক্রিয়াটি কেবল একটি কারিগরি কাজ ছিল না, এটি ছিল তার হারানো আত্মবিশ্বাস ও সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার এক রূপক। তিনি নিজের হাতে নিজের মুক্তির বাহন তৈরি করছিলেন। চার দিন ধরে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে তিনি ভেলাটি সমুদ্রে ভাসানোর উপযোগী করে তোলেন।

পঞ্চম দিনে বিদায়ের পালা ঘনিয়ে আসে। ক্যালিপসো তাকে পরার জন্য পরিষ্কার কাপড় দেন এবং ভেলার ভেতরে প্রচুর খাবার, মিষ্টি মদ ও জল গুছিয়ে দেন। বিদায়বেলায় তিনি অনুকূল বাতাস বইয়ে দেন, যাতে ওডিসিউস সহজেই সাগর পাড়ি দিতে পারেন। ক্যালিপসোর এই শেষ দিককার আচরণ দেখায় যে তিনি জিউসের আদেশে বাধ্য হলেও, ওডিসিউসের প্রতি তার ভালোবাসা বিন্দুমাত্র কমেনি। ভেলায় চড়ে বসার পর ওডিসিউস নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে নিজের গতিপথ ঠিক করেন। ক্যালিপসো তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন কালপুরুষ মণ্ডলীকে সবসময় বাঁ দিকে রেখে জাহাজ চালাতে। এই বিদায় ছিল অত্যন্ত আবেগপূর্ণ এবং একইসাথে মুক্তির এক পরম স্বস্তিদায়ক মুহূর্ত। ওজিজিয়ার সেই প্রাকৃতিক বন্দিশালা পেছনে ফেলে ওডিসিউস যখন সাগরের বুকে ভেলা ভাসালেন, তখন তার চোখে অমরত্বের কোনো মোহ ছিল না, ছিল কেবল ইথাকার সেই পাথুরে মাটির গন্ধ ফিরে পাওয়ার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা।

ভেলা, সমুদ্রঝড় ও পসেইডন (Raft, Storm and Poseidon): মুক্তির পথে নতুন বিপদ

নক্ষত্রের নির্দেশ ও সাগরের বুকে নিঃসঙ্গ যাত্রা (Guidance of the Stars and the Solitary Journey on the Sea)

দেবী ক্যালিপসোর মায়াবী দ্বীপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর ওডিসিউস (Odysseus) যে যাত্রা শুরু করেন, তা ছিল তার জীবনের অন্যতম নিঃসঙ্গ ও ঝুঁকিপূর্ণ এক অধ্যায়। তার সঙ্গী বলতে তখন কেউ ছিল না, এমনকি একটি মানানসই জাহাজও তার কাছে ছিল না। নিজের হাতে তৈরি করা একটি কাঠের ভেলাই ছিল তার একমাত্র ভরসা। এই ভেলাটি খুব নিখুঁতভাবে তৈরি করা হলেও, বিশাল ইজিয়ান সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সামনে তা ছিল নেহায়েত একটি খড়কুটোর মতো। ওডিসিউস একটানা সতেরো দিন ও সতেরো রাত এই ভেলায় বসে নির্ঘুমভাবে সাগর পাড়ি দেন। প্রাচীন গ্রিক নাবিকদের কাছে কম্পাস বা আধুনিক কোনো দিকনির্ণায়ক যন্ত্র ছিল না। তাদের একমাত্র ভরসা ছিল আকাশের নক্ষত্রমণ্ডলী। ক্যালিপসো তাকে যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেই অনুযায়ী ওডিসিউস কালপুরুষ বা ওরিয়ন (Orion) এবং সপ্তর্ষি বা গ্রেট বিয়ার (Great Bear) মণ্ডলীর দিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখে নিজের দিক ঠিক রেখেছিলেন।

এই সতেরো দিনের যাত্রা ওডিসিউসের অসীম ধৈর্য ও শারীরিক সক্ষমতার এক চরম পরীক্ষা ছিল। সাগরের বুকে একা একটি ভেলায় বসে থাকা কোনো সাধারণ রোমাঞ্চকর কাজ নয়; এটি এক ধরনের ভয়াবহ মানসিক চাপ। যেকোনো মুহূর্তে বাতাস উল্টে যেতে পারে, কিংবা কোনো সামুদ্রিক হাঙর আক্রমণ করতে পারে। কিন্তু ওডিসিউস তার চোখ ঘুম নামক শান্তির কাছে একবারের জন্যও সমর্পণ করেননি। কারণ তিনি জানতেন, একবার যদি দিক ভুল হয়ে যায়, তবে হয়তো চিরকালের মতো সাগরের বুকেই তাকে হারিয়ে যেতে হবে। এই সময়টিতে হোমার তাকে কেবল একজন শারীরিক বীর হিসেবেই দেখাননি, বরং একজন অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ নাবিক হিসেবেও তুলে ধরেছেন। গ্রিক পুরাণে বীরত্বের যে প্রচলিত ধারণা, যেখানে পেশিশক্তিই প্রধান, ওডিসিউস এখানে সেই ধারণা ভেঙে দিয়ে দেখিয়েছেন যে চরম প্রতিকূলতার মাঝে টিকে থাকার জন্য মগজ ও ধৈর্যের কোনো বিকল্প নেই (Fenik, 1974)।

আঠারোতম দিনে তার এই অমানুষিক পরিশ্রমের ফল চোখের সামনে ধরা দেয়। দিগন্তের রেখায় ভেসে ওঠে ফাইয়াকীয়দের দ্বীপ শেরিয়ার ছায়াময় পর্বতচূড়া। এটি দেখতে অনেকটা সাগরের বুকে ভাসমান একটি ঢালের মতো মনে হচ্ছিল। দীর্ঘ সতেরো দিন পর মাটির দেখা পেয়ে ওডিসিউসের মনে কী পরিমাণ আনন্দের সঞ্চার হয়েছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মনে হচ্ছিল যেন তার দীর্ঘ বন্দিদশা ও যন্ত্রণার অবসান ঘটতে চলেছে। কিন্তু প্রাচীন গ্রিক পুরাণের একটি নিষ্ঠুর নিয়ম হলো, দেবতারা মানুষকে খুব সহজে তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে দেন না। ঠিক যখন ওডিসিউস ভাবছিলেন যে তার সমস্ত কষ্টের শেষ হতে চলেছে, তখনই নিয়তি তার সামনে এক নতুন ও ভয়ংকরতম বিপদের জাল বিছিয়ে দেয়। অলিম্পাসের দেবতাদের সভা থেকে যে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছিল, তার একটি বড় ফাঁক রয়ে গিয়েছিল, আর সেই ফাঁক গলেই নেমে আসে এক প্রলয়ংকরী বিপদ।

পসেইডনের প্রত্যাবর্তন ও দেবতার রোষ (Return of Poseidon and the Wrath of the God)

ওডিসিউস যখন ক্যালিপসোর দ্বীপ থেকে মুক্তি পান, তখন সমুদ্রের দেবতা পসেইডন (Poseidon) অলিম্পাসে বা সাগরের তলদেশে তার নিজ প্রাসাদে ছিলেন না। তিনি ইথিওপিয়ানদের আমন্ত্রণে এক বিশাল ভোজে যোগ দিতে অনেক দূরে গিয়েছিলেন। ইথিওপিয়ানরা ছিল গ্রিক পুরাণে বর্ণিত এক অত্যন্ত ধার্মিক জাতি, যারা দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রচুর নৈবেদ্য উৎসর্গ করত। পসেইডন যখন ভোজ শেষে নিজের রথে চড়ে ফিরে আসছিলেন, তখন সলিমি পর্বতের চূড়া থেকে হঠাৎ তার নজর পড়ে সাগরের বুকে ভাসমান একটি ছোট ভেলার দিকে। সেই ভেলায় বসা মানুষটিকে চিনতে তার এক মুহূর্তও দেরি হয়নি। ওডিসিউসকে দেখতে পেয়ে পসেইডনের ভেতরে জমে থাকা পুরোনো ক্ষোভ দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। তিনি বুঝতে পারেন যে, তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে অন্যান্য দেবতারা, বিশেষ করে অ্যাথেনা এবং জিউস, ওডিসিউসকে ক্যালিপসোর বন্দিদশা থেকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন (Friedrich, 1975)।

পসেইডনের এই ক্ষোভের একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও ব্যক্তিগত কারণ ছিল। ওডিসিউস তার ছেলে, সাইক্লপস পলিফেমাসকে অন্ধ করে দিয়েছিলেন। প্রাচীন গ্রিক সমাজে পিতার কাছে সন্তানের ওপর হওয়া যেকোনো আঘাত নিজের ওপর আঘাত হিসেবেই বিবেচিত হতো। পসেইডন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে ওডিসিউসকে তিনি সহজে ইথাকায় ফিরতে দেবেন না। তিনি জিউসের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারতেন না, কারণ জিউস দেবতাদের রাজা এবং নিয়তি ওডিসিউসের ফেরার পক্ষেই ছিল। কিন্তু পসেইডন ভালো করেই জানতেন যে, জিউসের আদেশে ওডিসিউসের ফেরা লেখা থাকলেও, তার সেই ফেরার পথটিকে কতটা কণ্টকাকীর্ণ করা যায়, তার পুরো নিয়ন্ত্রণ একজন সমুদ্রের দেবতা হিসেবে তার নিজের হাতেই রয়েছে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, ফাইয়াকীয়দের দেশে পৌঁছানোর আগে ওডিসিউসকে তিনি জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ যন্ত্রণার স্বাদ দেবেন।

পসেইডন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে তার বিখ্যাত ত্রিশূল বা ট্রাইডেন্ট (Trident) দিয়ে সাগরের জলে প্রচণ্ড আঘাত করেন। তিনি সমস্ত মেঘমালাকে একত্র করে আকাশ অন্ধকার করে দেন এবং পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ – চার দিক থেকেই ভয়ংকর সব বাতাসকে একই সাথে লেলিয়ে দেন। এই দৃশ্যটি হোমারের মহাকাব্যে প্রকৃতির ধ্বংসাত্মক রূপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বর্ণনা। মুহূর্তের মধ্যে শান্ত সাগর এক উন্মত্ত দানবের রূপ ধারণ করে। ঢেউগুলো পাহাড়ের সমান উঁচু হয়ে আছড়ে পড়তে শুরু করে। এই প্রলয়ংকরী ঝড়ের সামনে ওডিসিউসের সেই সযত্নে তৈরি করা ভেলাটি যেন একটি সামান্য খেলনায় পরিণত হয়। পসেইডনের এই রোষ কেবল একজন মানুষের প্রতি একজন দেবতার ক্ষোভ ছিল না, এটি ছিল মানুষের ক্ষুদ্রতা ও প্রকৃতির অসীম শক্তির মধ্যকার এক অসম লড়াইয়ের চূড়ান্ত রূপ।

ঝড়ের তাণ্ডব ও ওডিসিউসের হতাশা (Havoc of the Storm and the Despair of Odysseus)

পসেইডনের লেলিয়ে দেওয়া ঝড়ের তাণ্ডবে ওডিসিউসের দীর্ঘ সতেরো দিনের সঞ্চিত আশা এক নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়। চারদিক থেকে ধেয়ে আসা বাতাসের ঝাপটায় তার ভেলার মাস্তুল ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় এবং পালের কাপড় সাগরের জলে ভেসে যায়। একটি বিশাল ঢেউ এসে সরাসরি ওডিসিউসের ওপর আছড়ে পড়ে, যার ফলে তিনি ভেলা থেকে ছিটকে সাগরের অতল গহ্বরে তলিয়ে যান। ক্যালিপসোর দেওয়া ভারী কাপড়গুলো জলে ভিজে আরও ভারী হয়ে যায়, যা তাকে দমবন্ধ করে মারার উপক্রম করে। অনেকক্ষণ জলের নিচে হাবুডুবু খাওয়ার পর তিনি কোনোমতে ভেসে ওঠেন এবং প্রাণপণে সাঁতার কেটে আবার সেই ভাঙা ভেলার একটি কাঠ আঁকড়ে ধরেন। সাগরের ঢেউ তাকে ভেলার সাথে এমনভাবে আছাড় মারতে থাকে, যেন তিনি কোনো বল, যা দিয়ে বিশাল দানবরা খেলা করছে (Nagy, 1999)।

এই চরম বিপদের মুহূর্তে ওডিসিউসের মনের ভেতর দিয়ে যে ভয়ংকর হতাশার স্রোত বয়ে যায়, হোমার তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছেন। ওডিসিউস প্রথমবারের মতো তার মৃত্যুর ব্যাপারে এতটা নিশ্চিত হয়ে পড়েন। তিনি ভাবেন, ট্রয়ের যুদ্ধে যদি তিনি অন্য বীরদের মতো বুক চিতিয়ে লড়াই করে মারা যেতেন, তবে অন্তত তার ভাগ্যে এক গৌরবময় শেষকৃত্য বা ক্লিওস (Kleos) জুটত। ট্রয়ের মাটিতে মারা গেলে তার মৃতদেহটি সসম্মানে পোড়ানো হতো এবং তার নাম যুগের পর যুগ স্মরণ করা হতো। কিন্তু সাগরের বুকে এভাবে একটি সামান্য কাঠের টুকরো আঁকড়ে ধরে বেনামে, বেওয়ারিশ হিসেবে মারা যাওয়া একজন গ্রিক বীরের জন্য চরম অসম্মানের। এই মৃত্যুতে কোনো গৌরব নেই, আছে কেবল হাহাকার। তার এই হতাশা দেখায় যে, তিনি কেবল মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছিলেন না, তিনি ভয় পাচ্ছিলেন একটি অর্থহীন ও সম্মানহীন মৃত্যুকে।

ওডিসিউস বুঝতে পারছিলেন যে তার টিকে থাকার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। পসেইডন তাকে একটি ইঁদুরের মতো সাগরের ঢেউয়ের সাথে খেলাচ্ছিলেন। একবার তাকে উঁচু ঢেউয়ের চূড়ায় তুলে নেওয়া হচ্ছিল, আবার পরক্ষণেই আছড়ে ফেলা হচ্ছিল সাগরের গভীরে। এই নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখে পড়েও ওডিসিউস কিন্তু হাল ছেড়ে দেননি। তিনি ভাঙা ভেলাটিকে দুই হাতে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার এক মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যান। মানুষের টিকে থাকার প্রবৃত্তি কতটা আদিম ও প্রবল হতে পারে, ওডিসিউসের এই লড়াই তার এক জ্বলন্ত প্রমাণ। তিনি জানতেন যে তার লড়াইটি অসম, কিন্তু তবুও শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত তিনি বিনা যুদ্ধে সাগরের কাছে আত্মসমর্পণ করতে রাজি ছিলেন না।

লিউকোথিয়ার আবির্ভাব ও ঐশ্বরিক সাহায্য (Appearance of Leucothea and Divine Assistance)

ওডিসিউস যখন মৃত্যুর একেবারে দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই এক অভাবনীয় ঐশ্বরিক সাহায্য তার কাছে এসে পৌঁছায়। দেবী লিউকোথিয়া (Leucothea), যিনি একসময় আইনো নামে একজন মরণশীল নারী ছিলেন এবং পরে সমুদ্রের এক দেবীতে পরিণত হন, তিনি সাগরের গভীর থেকে একটি জলকাক পাখির রূপ ধরে ওডিসিউসের ভেলার ওপর এসে বসেন। লিউকোথিয়া ওডিসিউসের এই অসহায় অবস্থা দেখে করুণা বোধ করেন। গ্রিক পুরাণে এই ছোট ছোট দেবদেবীদের হস্তক্ষেপ অনেক সময় প্রধান দেবতাদের রোষানল থেকে মানুষকে বাঁচতে সাহায্য করে। লিউকোথিয়া মানুষের দুঃখ-কষ্ট খুব ভালো করেই বুঝতেন, কারণ তিনি নিজেই একসময় মানুষ ছিলেন। তিনি ওডিসিউসকে সরাসরি বলেন যে, পসেইডন তাকে প্রচণ্ড কষ্ট দিলেও তাকে হত্যা করতে পারবেন না (Segal, 1994)।

লিউকোথিয়া ওডিসিউসকে একটি অদ্ভুত ও ঝুঁকিপূর্ণ পরামর্শ দেন। তিনি তাকে বলেন ওই ভাঙা ভেলাটি ছেড়ে দিতে এবং ক্যালিপসোর দেওয়া ওই ভারী কাপড়গুলো খুলে ফেলতে, যা তাকে ডুবিয়ে মারছে। এরপর তিনি নিজের গা থেকে একটি জাদুকরী ওড়না বা ক্রেমডেমেনন (Kredemnon) খুলে ওডিসিউসকে দেন এবং বলেন এটি নিজের বুকে বেঁধে সাঁতার কাটতে। লিউকোথিয়া তাকে আশ্বস্ত করেন যে, এই জাদুকরী ওড়নাটি তার বুকে বাঁধা থাকলে সাগরের কোনো ঢেউ তাকে ডোবাতে পারবে না। তবে তিনি একটি কঠিন শর্তও জুড়ে দেন। তিনি বলেন, যখন ওডিসিউস ডাঙায় পৌঁছাবেন, তখন এই ওড়নাটি যেন পিছন ফিরে না তাকিয়ে সরাসরি সাগরের জলে ছুড়ে ফেলা হয়, যাতে এটি পুনরায় দেবীর কাছে ফিরে যেতে পারে।

ওডিসিউস স্বভাবতই অত্যন্ত সন্দেহপ্রবণ মানুষ ছিলেন। ক্যালিপসোর ক্ষেত্রে যেমন তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, লিউকোথিয়ার এই পরামর্শের ক্ষেত্রেও তিনি প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি ভাবেন, এটি হয়তো অন্য কোনো দেবতার নতুন কোনো ফাঁদ, যা তাকে তার শেষ আশ্রয় ওই ভাঙা ভেলাটি থেকে সরিয়ে দিয়ে দ্রুত ডুবিয়ে মারার জন্য পাতা হয়েছে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে যতক্ষণ ওই কাঠের টুকরোগুলো এক সাথে লেগে থাকবে, ততক্ষণ তিনি ভেলাটি ছাড়বেন না। কিন্তু তার এই সিদ্ধান্ত বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। পসেইডন একটি বিশাল ঢেউ দিয়ে ভেলাটিকে পুরোপুরি চুরমার করে দেন। তখন আর কোনো উপায় না দেখে ওডিসিউস লিউকোথিয়ার নির্দেশমতো কাপড় খুলে ফেলেন, ওড়নাটি বুকে বাঁধেন এবং সাগরের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই ঘটনাটি দেখায় যে, ওডিসিউস কেবল নিজের বুদ্ধির ওপর ভরসা করতেন না, চরম বিপদে তিনি ঐশ্বরিক সাহায্য গ্রহণ করতেও কুণ্ঠাবোধ করতেন না।

পাথুরে উপকূলের বিপদ ও অ্যাথেনার হস্তক্ষেপ (Danger of the Rocky Coast and the Intervention of Athena)

লিউকোথিয়ার জাদুকরী ওড়না বুকে বেঁধে ওডিসিউস টানা দুই দিন ও দুই রাত সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে লড়াই করে সাঁতার কাটেন। তৃতীয় দিনে বাতাস কিছুটা শান্ত হয়ে আসে এবং তিনি খুব কাছ থেকে ফাইয়াকীয়দের দ্বীপ শেরিয়ার উপকূল দেখতে পান। কিন্তু ডাঙার এত কাছে এসেও তার বিপদ বিন্দুমাত্র কমেনি। তিনি দেখেন যে পুরো উপকূলটি অত্যন্ত খাড়া, ধারালো পাথরে ঘেরা এবং সেখানে সাগরের ঢেউ প্রচণ্ড আক্রোশে আছড়ে পড়ছে। সেখানে জাহাজ ভেড়ানোর বা সাঁতরে ওঠার মতো কোনো নরম বালুকাময় সৈকত নেই। এই দৃশ্য দেখে ওডিসিউসের মনে আবারও হতাশা গ্রাস করে। তিনি বুঝতে পারেন, এত কষ্ট করে সাঁতার কেটে আসার পর এখন যদি তিনি ডাঙায় ওঠার চেষ্টা করেন, তবে ঢেউয়ের তোড়ে ওই ধারালো পাথরে আছড়ে পড়ে তার মাথা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে (Fagles, 1990)।

ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তে দেবী অ্যাথেনা (Athena), যিনি পসেইডনের ঝড়ের সময় কিছুটা দূরে ছিলেন, তিনি আবার ওডিসিউসের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। অ্যাথেনা সরাসরি নিজে এসে ওডিসিউসকে জল থেকে তুলে নেননি, বরং তিনি ওডিসিউসের মস্তিষ্কে এক অসাধারণ উপস্থিত বুদ্ধি বা মেটিসের সঞ্চার করেন। যখন একটি বিশাল ঢেউ ওডিসিউসকে পাথরের দিকে আছড়ে ফেলার জন্য ধেয়ে আসে, তখন অ্যাথেনার প্রেরণায় ওডিসিউস দুই হাতে একটি বড় পাথর শক্ত করে আঁকড়ে ধরেন। ঢেউটি যখন তাকে টেনে আবার সাগরের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখন তার হাতের চামড়া পাথরের সাথে ঘষে ছিলে যায়, কিন্তু তিনি পাথরটি ছাড়েন না। অ্যাথেনার এই সূক্ষ্ম হস্তক্ষেপ দেখায় যে, দেবতারা মানুষকে সাহায্য করার সময় অনেক ক্ষেত্রেই সরাসরি জাদুর বদলে মানুষের নিজস্ব সক্ষমতা ও বুদ্ধিকে শাণিত করে তোলেন।

পাথরের সাথে লড়াই করে কোনোমতে বেঁচে যাওয়ার পর ওডিসিউস বুঝতে পারেন যে এই জায়গা দিয়ে ডাঙায় ওঠা অসম্ভব। তিনি আবার সাগরের জলে ভেসে থেকে উপকূল বরাবর সাঁতার কাটতে শুরু করেন। তিনি খুঁজতে থাকেন এমন কোনো জায়গা, যেখানে কোনো নদীর মোহনা সাগরে এসে মিশেছে। কারণ নদীর মোহনায় সাধারণত স্রোত শান্ত থাকে এবং ধারালো পাথর থাকে না। অনেকক্ষণ খোঁজার পর তিনি একটি নদীর মোহনা দেখতে পান এবং নদীর দেবতার উদ্দেশ্যে আকুলভাবে প্রার্থনা করেন তাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য। নদীর দেবতা তার প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে স্রোত শান্ত করে দেন। শেষ পর্যন্ত ওডিসিউস সমস্ত শক্তি ক্ষয় করে, অর্ধমৃত অবস্থায় নদীর মোহনার একটি নরম কাদার চরে এসে লুটিয়ে পড়েন। তার শরীর ফুলে গিয়েছিল, মুখ ও নাক দিয়ে সাগরের নোনা জল বের হচ্ছিল। এই ডাঙায় ওঠা কোনো বীরোচিত অবতরণ ছিল না, এটি ছিল একজন নিঃস্ব মানুষের কেবল প্রাণে বেঁচে ফেরার এক করুন চিত্র।

পুনর্জন্মের প্রতীকী রূপ ও প্রকৃতির কোলে আশ্রয় (Symbolic Representation of Rebirth and Shelter in the Lap of Nature)

ডাঙায় ওঠার পর ওডিসিউসের প্রথম কাজটি ছিল লিউকোথিয়ার শর্ত পালন করা। তিনি পিছন ফিরে না তাকিয়ে সেই জাদুকরী ওড়নাটি সাগরের জলে ছুড়ে ফেলেন। এই কাজটি তার কৃতজ্ঞতা ও দেবতাদের প্রতি প্রতিশ্রুতির এক চমৎকার নিদর্শন। এরপর তিনি নদীর তীরের একটি জঙ্গলে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি দুটি জলপাই গাছের ঝোপ দেখতে পান – একটি বন্য এবং অন্যটি চাষ করা। এই দুটি গাছের ডালপালা এমনভাবে জড়িয়ে ছিল যে সেখানে সূর্যের আলো বা সাগরের কনকনে বাতাস প্রবেশ করতে পারত না। ওডিসিউস ওই ঝোপের নিচে শুকনো পাতার একটি স্তূপ তৈরি করেন এবং সেই পাতার নিচে নিজেকে পুরোপুরি লুকিয়ে ফেলেন। হোমার এই দৃশ্যটির তুলনা করেছেন এমন এক কৃষকের সাথে, যে আগুনের একটি স্ফুলিঙ্গ ছাইয়ের নিচে লুকিয়ে রাখে, যাতে পরদিন সকালে সে তা দিয়ে আবার আগুন জ্বালাতে পারে (Austin, 1975)।

এই পাতার নিচে লুকিয়ে পড়ার দৃশ্যটি মহাকাব্যে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রূপক হিসেবে কাজ করে। ওডিসিউস যেন মাতৃগর্ভে পুনরায় প্রবেশ করছেন। সাগরের নোনা জল, নগ্ন শরীর এবং পাতার নিচে কুঁকড়ে শুয়ে থাকা – এসব কিছু মিলিয়ে এটি যেন তার একটি প্রতীকী পুনর্জন্ম (Symbolic Rebirth)। ট্রয়যুদ্ধের সেই অহংকারী বীর সেনাপতি, যিনি নিজের বুদ্ধির জোরে শহর জয় করেছিলেন, সাগরের বুকে তিনি তার সমস্ত অহংকার ও শক্তি হারিয়ে একবারে শূন্যে নেমে এসেছেন। পসেইডনের রোষ তাকে তার অস্তিত্বের একেবারে শিকড়ে নামিয়ে এনেছে। এখন তাকে সম্পূর্ণ নতুন করে, নতুন পরিচয়ে তার যাত্রা শুরু করতে হবে। এই পুনর্জন্ম ছাড়া ফাইয়াকীয়দের মতো একটি উন্নত ও সভ্য সমাজে তার প্রবেশ সম্ভব ছিল না।

প্রকৃতির এই নরম কোলে আশ্রয় নিয়ে ওডিসিউস অবশেষে এক গভীর ও শান্তির ঘুমে তলিয়ে যান। দেবী অ্যাথেনা তার চোখের ওপর এই প্রশান্তির ঘুম ঢেলে দেন, যাতে তার শরীরের সমস্ত ক্লান্তি ও ক্ষত দূর হয়ে যায়। পসেইডন তাকে যে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, অ্যাথেনার এই ঘুম যেন তার এক মধুর প্রলেপ। ওডিসিউস এখন ক্যালিপসোর মায়াবী দ্বীপের বন্দি নন, আবার পসেইডনের ঝড়ের খেলনাও নন। তিনি এখন এমন এক ভূখণ্ডে অবস্থান করছেন, যা তাকে তার স্বপ্নের ইথাকার দিকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। মুক্তির পথে এই নতুন বিপদ তাকে প্রায় ধ্বংস করে দিলেও, শেষ পর্যন্ত তা তার ভেতরের অদম্য টিকে থাকার ইচ্ছাকে আরও বেশি ইস্পাতের মতো শক্ত করে তুলেছে।

নওসিকার সঙ্গে সাক্ষাৎ (Meeting with Nausicaa): আশ্রয়, সংযম ও সহায়তা

অ্যাথেনার স্বপ্ন ও নওসিকার নদীর তীরে আগমন (Athena’s Dream and Nausicaa’s Arrival at the Riverbank)

শেরিয়ার নদীর তীরে ঝোপের আড়ালে যখন ওডিসিউস (Odysseus) গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক সেই সময়ে দেবী অ্যাথেনা (Athena) ফাইয়াকীয়দের রাজপ্রাসাদে এক সূক্ষ্ম পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে শুরু করেন। ওডিসিউসকে এই সম্পূর্ণ অপরিচিত দ্বীপে একা ফেলে রাখলে তার টিকে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাকে রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য একজন মধ্যস্থতাকারী প্রয়োজন ছিল। অ্যাথেনা এই কাজের জন্য বেছে নেন ফাইয়াকীয় রাজা আলকিনোয়াসের যুবতী কন্যা নওসিকা (Nausicaa)-কে। রাতের অন্ধকারে অ্যাথেনা নওসিকার প্রিয় সখীর রূপ ধরে তার স্বপ্নে প্রবেশ করেন। স্বপ্নে অ্যাথেনা তাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে তার বিয়ের বয়স ঘনিয়ে এসেছে। একজন রাজকন্যার বিয়ের জন্য পরিষ্কার ও সুন্দর পোশাক থাকা অত্যন্ত জরুরি। তাই পরদিন সকালেই তার উচিত প্রাসাদের সমস্ত ময়লা কাপড় নিয়ে নদীর তীরে ধুতে যাওয়া। এই স্বপ্নটি প্রাচীন গ্রিক সমাজের বিবাহপূর্ব প্রস্তুতির একটি চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক চিত্র তুলে ধরে (Murnaghan, 1995)।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নওসিকা অত্যন্ত লজ্জিত ও সংকুচিত বোধ করে। সে তার পিতার কাছে গিয়ে সরাসরি বিয়ের কথা বলতে পারছিল না। তাই সে কৌশল অবলম্বন করে। সে তার পিতাকে বলে যে, প্রাসাদের পুরুষদের, বিশেষ করে তার অবিবাহিত ভাইদের সবসময় পরিষ্কার কাপড় পরা প্রয়োজন, আর সেই দায়িত্ব তার নিজের। রাজা আলকিনোয়াস মেয়ের এই আবদারের পেছনের আসল কারণটি বুঝতে পারলেও তিনি হাসিমুখে সম্মতি দেন। তিনি একটি সুন্দর রথ প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন। দাসীরা রথে সমস্ত ময়লা কাপড়, সুস্বাদু খাবার এবং অলিভ অয়েলের বোতল গুছিয়ে দেয়। এরপর নওসিকা তার সখীদের নিয়ে নদীর মোহনার দিকে রথ ছুটিয়ে দেয়। এই পুরো ঘটনাটি দেখায় যে ফাইয়াকীয় সমাজ ছিল অত্যন্ত শান্ত, সুশৃঙ্খল এবং সেখানে পারিবারিক সম্পর্কগুলো ছিল স্নেহপূর্ণ ও সহজবোধ্য।

নদীর তীরে পৌঁছানোর পর রাজকন্যা ও তার দাসীরা কাপড় ধোয়ার কাজ শুরু করে। তারা নদীর পরিষ্কার জলে কাপড়গুলো ভিজিয়ে পায়ের সাহায্যে মাড়িয়ে ধুতে থাকে। কাপড় ধোয়া শেষ হওয়ার পর সেগুলো রোদে শুকানোর জন্য সৈকতের নুড়িপাথরের ওপর বিছিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তারা সবাই স্নান করে অলিভ অয়েল মেখে নিজেদের সতেজ করে তোলে। খাবার শেষে শুরু হয় তাদের খেলাধুলা। তারা নিজেদের মাথায় পরা ওড়না খুলে ফেলে সৈকতে বল খেলতে শুরু করে। এই দৃশ্যটি একাধারে অত্যন্ত পবিত্র এবং প্রাণবন্ত। এটি যেন মানবসমাজের এক নিখুঁত ও কলুষমুক্ত রূপ। আর ঠিক এই প্রশান্ত ও আনন্দময় পরিবেশেই অ্যাথেনা তার পরিকল্পনার দ্বিতীয় অংশটি কার্যকর করেন, যা ওডিসিউসের ঘুম ভাঙিয়ে তাকে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

ওডিসিউসের ঘুম ভাঙা ও সভ্যতার সংকট (Waking of Odysseus and the Crisis of Civilization)

সৈকতে যখন বল খেলা চলছিল, তখন অ্যাথেনার ইশারায় নওসিকা বলটি একটু বেকায়দায় ছুড়ে মারে। বলটি দাসীদের ধরতে না পেরে সরাসরি গভীর নদীর জলে গিয়ে পড়ে। বলটি জলে পড়ে যাওয়ার শব্দে এবং দাসীদের সম্মিলিত চিৎকারে ওডিসিউসের কাঁচা ঘুম ভেঙে যায়। পাতার নিচে শুয়ে থাকা অবস্থায় তিনি চমকে ওঠেন। তার মনে প্রশ্ন জাগে, এই অজানা দ্বীপে তিনি কাদের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছেন। এরা কি কোনো অসভ্য ও বন্য সাইক্লপস, নাকি এমন কোনো সভ্য জাতি যারা দেবতাদের সম্মান করে? এই প্রশ্নটি ওডিসিউসের মনে এমনিতেই তৈরি হয়নি। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় তিনি এমন সব ভয়ংকর জাতির সম্মুখীন হয়েছিলেন, যাদের কাছে আতিথেয়তার কোনো মূল্য ছিল না। তাই তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পাতার ঝোপ থেকে মাথা বের করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন (Rose, 1992)।

ওডিসিউসের শারীরিক অবস্থা তখন অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। টানা বিশ দিন সাগরে ভেসে থাকার ফলে তার শরীর ছিল ফুলে যাওয়া, ক্ষতবিক্ষত এবং কাদামাখা। তার গায়ে সুতোর কোনো আচ্ছাদন ছিল না। তিনি একটি জলপাই গাছের ডাল ভেঙে নিজের শরীরের গোপন অঙ্গ ঢেকে নেন। হোমার তাকে একটি ক্ষুধার্ত পাহাড়ি সিংহের সাথে তুলনা করেছেন, যে বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে মেষপালের দিকে এগিয়ে যায়। এই তুলনাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ ওডিসিউস তখন আক্ষরিক অর্থেই তার অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে মরিয়া ছিলেন। তিনি যখন পাতার ঝোপ থেকে বেরিয়ে ওই তরুণীদের সামনে এসে দাঁড়ান, তখন তার সেই বিকট ও বন্য রূপ দেখে দাসীরা আতঙ্কে চিৎকার করে চারদিকে পালাতে শুরু করে। তাদের কাছে মনে হচ্ছিল যেন সাগর থেকে উঠে আসা কোনো দানব তাদের আক্রমণ করতে আসছে।

কিন্তু দাসীরা পালালেও রাজকন্যা নওসিকা তার জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অ্যাথেনা তার মনের ভেতর থেকে সমস্ত ভয় দূর করে তাকে অসীম সাহস দান করেছিলেন। এই দৃশ্যটি একটি চরম বৈপরীত্যের জন্ম দেয়। একদিকে একজন অভিজাত, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুসজ্জিত রাজকন্যা, আর অন্যদিকে একজন উলঙ্গ, কাদামাখা ও বিধ্বস্ত মানুষ। এটি কেবল দুটি মানুষের সাক্ষাৎ ছিল না, এটি ছিল সভ্যতা ও আদিমতার এক অভাবনীয় মুখামুখি অবস্থান। ওডিসিউস বুঝতে পারছিলেন যে এই মুহূর্তটি তার জীবনের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তিনি যদি একটি ভুল পদক্ষেপ ফেলেন বা ভুল কথা বলেন, তবে রাজকন্যা হয়তো ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে এবং এই দ্বীপে তার বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকুও বিলীন হয়ে যাবে। তাই তাকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তার পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।

ওডিসিউসের সংযম ও বাগ্মিতার পরীক্ষা (Restraint of Odysseus and the Test of Eloquence)

নওসিকাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওডিসিউস চরম দ্বিধায় পড়ে যান। গ্রিক সমাজে কোনো আগন্তুকের সাহায্য চাওয়ার একটি নির্দিষ্ট প্রথা ছিল, যাকে বলা হতো সাপ্লিকেশন (Supplication)। এই প্রথা অনুযায়ী, সাহায্যপ্রার্থীকে গৃহস্বামীর বা ক্ষমতাবান ব্যক্তির হাঁটুর কাছে বসে তার হাঁটু জড়িয়ে ধরে প্রার্থনা করতে হতো। ওডিসিউস একবার ভাবলেন যে তিনি ছুটে গিয়ে রাজকন্যার হাঁটু জড়িয়ে ধরবেন। কিন্তু পরক্ষণেই তার পরিণত মস্তিষ্ক বা মেটিস (Metis) তাকে সতর্ক করে দিল। তিনি ভাবলেন, তার এই উলঙ্গ ও বীভৎস রূপ দেখে যদি তিনি হঠাৎ একটি তরুণীর গায়ে হাত দেন, তবে মেয়েটি ভয় পেয়ে বা অপমানিত বোধ করে তাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। তাই তিনি শারীরিক স্পর্শের পথ পরিহার করে মানসিক দূরত্বের পথ বেছে নিলেন। তিনি বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত বিনীতভাবে তার কথা শুরু করলেন (Martin, 1989)।

ওডিসিউস তার বাগ্মিতার চরম উৎকর্ষ প্রদর্শন করেন এই কথোপকথনে। তিনি সরাসরি নওসিকার রূপের প্রশংসা দিয়ে কথা শুরু করেন। তিনি প্রশ্ন করেন, নওসিকা কি কোনো মরণশীল মানুষ নাকি কোনো দেবী। তিনি অত্যন্ত কৌশলে নওসিকাকে দেবী আর্টেমিসের সাথে তুলনা করেন, যিনি ছিলেন কুমারীত্ব ও শিকারের দেবী। একজন তরুণীর জন্য এর চেয়ে বড় প্রশংসা আর কিছু হতে পারে না। এরপর তিনি নওসিকার পিতামাতা ও সম্ভাব্য স্বামীর প্রশংসা করেন। এই কথাগুলোর মধ্য দিয়ে ওডিসিউস মূলত প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে তিনি দেখতে বন্য হলেও, মননে ও আচরণে তিনি অত্যন্ত সভ্য ও শিক্ষিত। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে তিনি সমাজের নিয়মকানুন ও শিষ্টাচার সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত।

প্রশংসা পর্ব শেষ করার পর ওডিসিউস অত্যন্ত সাবলীলভাবে তার নিজের দুর্দশার কথা বর্ণনা করেন। তিনি জানান যে তিনি দীর্ঘ বিশ দিন সাগরে ভেসে আজ এই দ্বীপে এসে পৌঁছেছেন। তিনি নওসিকার কাছে কোনো বড় দাবি করেননি। তিনি কেবল কিছু পুরানো কাপড় বা কাপড়ের টুকরো চেয়েছেন, যা দিয়ে তিনি তার নগ্ন শরীর ঢাকতে পারেন, এবং শহরে যাওয়ার পথের নির্দেশনা চেয়েছেন। ওডিসিউসের এই বক্তব্য ছিল অত্যন্ত মার্জিত, সুপরিকল্পিত এবং সংযমী। তিনি তার কথায় এমন এক ধরনের আভিজাত্য ফুটিয়ে তুলেছিলেন, যা নওসিকাকে আশ্বস্ত করেছিল যে এই লোকটি কোনো সাধারণ জলদস্যু বা বিপদজনক কেউ নয়। চরম বিপদে পড়েও একজন মানুষ কীভাবে তার আবেগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, ওডিসিউসের এই বাগ্মিতা তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

নওসিকার পরিণত প্রজ্ঞা ও আতিথেয়তার প্রতিশ্রুতি (Mature Wisdom of Nausicaa and the Promise of Hospitality)

ওডিসিউসের কথা শোনার পর নওসিকা যে উত্তর দেয়, তা ছিল তার বয়সের তুলনায় অনেক বেশি পরিণত। সে বুঝতে পারে যে এই আগন্তুক দেখতে যতই কদর্য হোক না কেন, তার কথার মধ্যে একটি গভীর আভিজাত্য লুকিয়ে আছে। নওসিকা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ওডিসিউসকে জানায় যে, অলিম্পাসের দেবতা জিউস মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করেন। তিনি ভালো বা খারাপ যেকোনো মানুষকে সুখ বা দুঃখ দিতে পারেন। যেহেতু জিউস ওডিসিউসকে এই কষ্ট দিয়েছেন, তাই তাকে এটি সহ্য করতেই হবে। তবে নওসিকা তাকে আশ্বস্ত করে যে, ফাইয়াকীয়দের দেশে যখন তিনি এসে পৌঁছেছেন, তখন তার আর কোনো অভাব থাকবে না। এই কথাগুলো দেখায় যে, নওসিকা কেবল একজন সুন্দরী রাজকন্যাই ছিল না, সে ছিল অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান এবং দেবতাদের নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল (Foley, 2001)।

এরপর নওসিকা তার দাসীদের দিকে ফিরে তাদের তিরস্কার করে। সে দাসীদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ফাইয়াকীয়রা অত্যন্ত শান্তিপ্রিয় জাতি এবং দেবতাদের প্রিয়পাত্র, তাই তাদের আক্রমণ করার সাহস কারও নেই। সে আরও বলে যে, সব অপরিচিত মানুষ ও ভিখারিরা জিউসের তরফ থেকেই আসে, তাই তাদের সেবা করা প্রতিটি গৃহস্থের পবিত্র দায়িত্ব। গ্রিক সমাজে আতিথেয়তার এই নিয়ম বা জেনিয়া (Xenia) অত্যন্ত কঠোরভাবে পালন করা হতো। নওসিকা দাসীদের নির্দেশ দেয় ওডিসিউসকে কাপড়, খাবার এবং অলিভ অয়েল দেওয়ার জন্য, যাতে তিনি স্নান করে নিজেকে পরিপাটি করে নিতে পারেন। একজন অনভিজ্ঞ তরুণী হয়েও নওসিকা যেভাবে পরিস্থিতিটি সামাল দেয়, তা মহাকাব্যে নারীর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার এক অসাধারণ উদাহরণ।

নওসিকার এই আতিথেয়তার প্রতিশ্রুতি ওডিসিউসের জন্য ছিল এক নতুন জীবনের শুরু। তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি এমন এক সমাজে এসে পড়েছেন, যেখানে পাশবিক শক্তির চেয়ে নৈতিকতা ও সভ্যতার মূল্য অনেক বেশি। তিনি দাসীদের হাত থেকে কাপড় ও তেল গ্রহণ করেন, তবে স্নান করার সময় তিনি তাদের দূরে সরে যেতে বলেন। তিনি জানান যে একজন পুরুষ হিসেবে তরুণীদের সামনে উলঙ্গ হয়ে স্নান করা তার জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। ওডিসিউসের এই শালীনতাবোধ নওসিকার মনে তার প্রতি শ্রদ্ধা আরও বাড়িয়ে দেয়। স্নান শেষে অ্যাথেনা ওডিসিউসের চেহারা থেকে সমস্ত ক্লান্তি ও বার্ধক্যের ছাপ মুছে দেন। তার চুলগুলো হায়াসিন্থ ফুলের মতো কোঁকড়া ও সুন্দর হয়ে যায়। স্নান শেষে পরিষ্কার কাপড় পরে ওডিসিউস যখন আবার সৈকতে ফিরে আসেন, তখন তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনো অমর দেবতা পৃথিবীতে নেমে এসেছেন।

রাজপ্রাসাদে প্রবেশের নির্দেশনা ও সামাজিক সতর্কবাণী (Instructions for Entering the Palace and Social Warnings)

ওডিসিউসের এই পরিবর্তিত রূপ দেখে নওসিকা মুগ্ধ হয়ে যায়। সে তার দাসীদের কাছে ফিসফিস করে বলে যে, এই মানুষটি যদি তার স্বামী হতো তবে সে নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যবতী মনে করত। তবে নওসিকা তার আবেগকে প্রশ্রয় না দিয়ে অত্যন্ত বাস্তববাদী একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সে ওডিসিউসকে খাবার খেতে দেয় এবং এরপর তাকে রাজপ্রাসাদে প্রবেশের জন্য একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও সতর্ক নির্দেশনা প্রদান করে। নওসিকা জানায় যে, শহরের সীমানা পর্যন্ত ওডিসিউস তাদের রথের পেছনে পেছনে হেঁটে যেতে পারবেন। কিন্তু যখনই তারা শহরের ভেতরে প্রবেশ করবে, তখন ওডিসিউসকে রথের সঙ্গ ছেড়ে দিতে হবে। কারণ ফাইয়াকীয় সমাজের কিছু নিজস্ব সামাজিক নিয়ম ও গসিপের প্রবণতা রয়েছে, যা রাজকন্যার সম্মান নষ্ট করতে পারে (Reece, 1993)।

নওসিকা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে যে, ফাইয়াকীয়রা মূলত নাবিক জাতি এবং তারা অত্যন্ত উদ্ধত স্বভাবের। তারা যদি দেখে একজন অপরূপ সুন্দরী রাজকন্যা একটি অপরিচিত ও সুঠাম পুরুষের সাথে একই রথে শহরে প্রবেশ করছে, তবে তারা নানা ধরনের অপবাদ ছড়াতে শুরু করবে। তারা হয়তো ভাববে যে রাজকন্যা নিজের দেশের কোনো পাত্রকে পছন্দ না করে বাইরে থেকে কোনো স্বামী জুটিয়ে এনেছে। এই ধরনের অপবাদ রাজপরিবারের সম্মানের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই নওসিকা ওডিসিউসকে নির্দেশ দেয় শহরের বাইরে দেবী অ্যাথেনার একটি পবিত্র কাননে অপেক্ষা করার জন্য। যখন রথটি প্রাসাদে পৌঁছে যাবে এবং যথেষ্ট সময় পার হবে, কেবল তখনই ওডিসিউস যেন শহরে প্রবেশ করে প্রাসাদের দিকে যান।

নওসিকার এই দিকনির্দেশনা ওডিসিউসকে ফাইয়াকীয় সমাজের অভ্যন্তরীণ গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা দেয়। তিনি বুঝতে পারেন যে এটি কেবল একটি সভ্য দেশ নয়, এটি এমন এক সমাজ যেখানে মানুষের কথার দাম ও সামাজিক সম্মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নওসিকা আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য দেয়। সে ওডিসিউসকে বলে যে প্রাসাদে গিয়ে তিনি যেন রাজা আলকিনোয়াসের কাছে না গিয়ে সরাসরি রানী আরেতের কাছে যান এবং রানীর হাঁটু জড়িয়ে ধরে সাহায্য প্রার্থনা করেন। কারণ রানীর সিদ্ধান্তই এই প্রাসাদে চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়। একটি প্রাচীন সমাজে নারীর এমন অসীম ক্ষমতার কথা শুনে ওডিসিউস হয়তো কিছুটা বিস্মিত হলেও, তিনি নওসিকার প্রতিটি কথা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে স্মরণ রাখেন।

অ্যাথেনার প্রার্থনা ও সফলতার পূর্বাভাস (Prayer to Athena and Foreshadowing of Success)

নওসিকার সমস্ত নির্দেশ শোনার পর ওডিসিউস বুঝতে পারেন যে তার সামনে এখন একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট পথ খোলা রয়েছে। সূর্য যখন ডুবতে শুরু করে, তখন রথটি শহরের সীমানায় এসে পৌঁছায়। পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ওডিসিউস রথের সঙ্গ ছেড়ে দেন এবং দেবী অ্যাথেনার পবিত্র কাননে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি একটি নিরাপদ জায়গায় বসে অ্যাথেনার উদ্দেশ্যে একটি অত্যন্ত গভীর ও একাগ্র প্রার্থনা শুরু করেন। তিনি দেবীর কাছে মিনতি করেন যে, ফাইয়াকীয়দের প্রাসাদে গেলে তারা যেন তাকে দয়া ও সম্মানের চোখে দেখে। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা ও চরম বিপদের মুহূর্তে অ্যাথেনা তাকে বারবার সাহায্য করলেও, ওডিসিউস জানতেন যে চূড়ান্ত সফলতা এখনো অনেক দূরে (Stanford, 1963)।

অ্যাথেনা তার এই প্রার্থনা শুনতে পান, কিন্তু তিনি সরাসরি ওডিসিউসের সামনে আবির্ভূত হননি। কারণ সমুদ্রের দেবতা পসেইডন তখনো ওডিসিউসের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং পসেইডন ছিলেন ফাইয়াকীয়দের অন্যতম প্রধান উপাস্য দেবতা। তাই অ্যাথেনা সরাসরি হস্তক্ষেপ করে পসেইডনকে রাগাতে চাননি। তবে তিনি পরোক্ষভাবে ওডিসিউসকে সাহায্য করার সমস্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ওডিসিউসের এই প্রার্থনাটি মহাকাব্যে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। এটি দেখায় যে, একজন মানুষ যত কৌশলী বা বুদ্ধিমানই হোক না কেন, দেবতাদের আনুকূল্য ছাড়া সে কখনো তার চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না।

এই পুরো পর্বটি ওডিসিউসের দীর্ঘ প্রত্যাবর্তনের আখ্যানে একটি স্বস্তির শ্বাস হিসেবে কাজ করে। পসেইডনের ভয়ংকর ঝড়ের পর এই শান্ত নদীর তীর, নওসিকার মতো একজন প্রজ্ঞাবান রাজকন্যার সহায়তা এবং অ্যাথেনার নীরব উপস্থিতি ওডিসিউসকে এক নতুন ভরসা জোগায়। তিনি এখন আর সাগরের বুকে ভাসমান কোনো বেওয়ারিশ মানুষ নন। তিনি এখন এমন এক ভূখণ্ডের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে তার ইথাকায় ফেরার সম্ভাবনা সবচেয়ে উজ্জ্বল। নওসিকার সাথে এই সাক্ষাৎটি কেবল একটি আশ্রয় পাওয়ার ঘটনা ছিল না, এটি ছিল ওডিসিউসের অহংকার, সংযম এবং সভ্যতার এক চরম পরীক্ষা, যে পরীক্ষায় তিনি অত্যন্ত সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

আলকিনোয়াসের প্রাসাদ (Palace of Alcinous): আতিথেয়তা ও পরিচয়গোপন

শেরিয়ার পথে অ্যাথেনার কুয়াশা ও দিকনির্দেশনা (Fog of Athena and Guidance on the Way to Scheria)

দেবী অ্যাথেনার পবিত্র কানন থেকে বেরিয়ে যখন ওডিসিউস (Odysseus) ফাইয়াকীয়দের শহর শেরিয়ার দিকে পা বাড়ান, তখন তার মনে এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি কাজ করছিল। একদিকে আশ্রয় পাওয়ার আশা, অন্যদিকে অচেনা ও উদ্ধত নাবিক জাতির হাতে অপদস্ত হওয়ার ভয়। রাজকন্যা নওসিকা আগেই তাকে সতর্ক করেছিল যে এই শহরের লোকেরা অপরিচিত মানুষদের খুব একটা পছন্দ করে না। তাদের প্রধান উপাস্য দেবতা পসেইডন, আর পসেইডনের সাথে ওডিসিউসের বৈরিতার কথা কারো অজানা নয়। ঠিক এই কারণেই দেবী অ্যাথেনা (Athena) একটি বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি ওডিসিউসের চারপাশে এক ধরনের জাদুকরী ও পুরু কুয়াশা তৈরি করে দেন, যাতে শহরের কোনো মানুষ তাকে দেখতে না পায় এবং তাকে কোনো অপ্রীতিকর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে না হয়। এই ঐশ্বরিক কুয়াশা বা ক্যালিপ্ট্রা (Kalyptra) প্রাচীন গ্রিক মহাকাব্যে দেবতাদের একটি সাধারণ হাতিয়ার, যা তারা তাদের প্রিয় মানুষদের সুরক্ষার জন্য ব্যবহার করতেন (Garner, 1990)।

শহরে ঢোকার মুখে ওডিসিউসের সাথে একটি ছোট মেয়ের দেখা হয়, যে একটি কলসি নিয়ে জল আনতে যাচ্ছিল। এই ছোট মেয়েটি আসলে ছিল ছদ্মবেশী অ্যাথেনা। ওডিসিউস অত্যন্ত বিনীতভাবে তার কাছে রাজা আলকিনোয়াসের প্রাসাদের পথ জানতে চান। অ্যাথেনা তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, তবে একটি শর্ত জুড়ে দেন। তিনি ওডিসিউসকে সতর্ক করে দেন যে, পথ চলার সময় তিনি যেন কারও দিকে না তাকান এবং কারও সাথে কোনো কথা না বলেন। ফাইয়াকীয়রা সমুদ্রযাত্রায় অত্যন্ত পারদর্শী হলেও, বাইরের পৃথিবীর মানুষের প্রতি তাদের এক ধরনের সন্দেহ ও অবজ্ঞা রয়েছে। এই সতর্কতা ওডিসিউসের ভেতরের উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তিনি অত্যন্ত নিঃশব্দে সেই ছোট মেয়েটির পিছু পিছু চলতে থাকেন, আর তার চারপাশের কুয়াশা তাকে সমস্ত উৎসুক দৃষ্টি থেকে আড়াল করে রাখে।

পথ চলতে চলতে অ্যাথেনা ওডিসিউসকে ফাইয়াকীয় রাজপরিবারের বংশপরিচয় ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সম্পর্কে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেন। তিনি জানান যে, রাজা আলকিনোয়াস (Alcinous) এবং রানী আরেতে (Arete) একই বংশের মানুষ। আরেতে হলেন আলকিনোয়াসের ভাই রিক্সেনরের কন্যা, যিনি অকালে মারা গিয়েছিলেন। পরে আলকিনোয়াস তার নিজের ভাতিজি আরেতেকে বিয়ে করেন। এই ধরনের অন্তর্বিবাহ বা এন্ডোগ্যামি (Endogamy) প্রাচীন কিছু রাজবংশে ক্ষমতা ও সম্পদ ধরে রাখার জন্য প্রচলিত ছিল। অ্যাথেনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে তথ্যটি দেন তা হলো, এই প্রাসাদে রানী আরেতের ক্ষমতাই চূড়ান্ত। রাজা আলকিনোয়াস তার স্ত্রীর বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞাকে এতটাই সম্মান করেন যে, রানীর সম্মতি ছাড়া কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। অ্যাথেনা ওডিসিউসকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেন যে, প্রাসাদে ঢুকে তাকে সবার আগে রানীর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে। রানীর মন জয় করতে পারলেই তার ইথাকায় ফেরার পথ সুগম হবে।

আলকিনোয়াসের প্রাসাদের ঐশ্বর্য ও অমরত্বের ছোঁয়া (Splendor of the Palace of Alcinous and the Touch of Immortality)

ছোট মেয়েটির রূপ ধারণ করা অ্যাথেনা যখন প্রাসাদের ফটকের কাছে এসে বিদায় নেন, তখন ওডিসিউস এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ান। ফটকের ভেতর দিয়ে তিনি যে দৃশ্য দেখতে পান, তা মরণশীল মানুষের কল্পনারও অতীত। রাজা আলকিনোয়াসের এই প্রাসাদটি কোনো সাধারণ ব্রোঞ্জ যুগের রাজপ্রাসাদ ছিল না, এটি ছিল এক ধরনের ঐশ্বরিক বা ইউটোপিয়ান স্থাপত্যের নিদর্শন। প্রাসাদের দেয়ালগুলো ছিল নিরেট ব্রোঞ্জের তৈরি, যার ওপর দিয়ে ছুটে গেছে গাঢ় নীল রঙের এনামেলের বর্ডার। ভেতরের দরজাগুলো ছিল খাঁটি সোনার, আর দরজার চৌকাঠগুলো রুপার। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল ফটকের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সোনা ও রুপার কুকুরগুলো। এই কুকুরগুলো দেবতা হেফায়েস্টাস তার নিজস্ব দক্ষতায় তৈরি করেছিলেন। এগুলো ছিল অমর এবং এদের কাজ ছিল প্রাসাদের পাহারা দেওয়া। এই যান্ত্রিক অথচ অমর প্রহরীদের বর্ণনা প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যে অটোমেটা (Automata) বা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের আদি ধারণার ইঙ্গিত দেয় (Mayor, 2014)।

প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে এক বিশাল ও মনোরম বাগান, যা কখনোই শুকিয়ে যায় না। সেখানে সারা বছর ধরে ডুমুর, আপেল, নাশপাতি এবং আঙুর ফলে থাকে। ঋতু পরিবর্তনের কোনো প্রভাব এই বাগানের ওপর পড়ে না। পশ্চিমের বাতাস সব সময় সেখানে বইতে থাকে, যা পুরোনো ফলগুলোকে পাকায় এবং নতুন ফুল ফোটায়। এই চিরসবুজ বাগানের ঠিক পাশেই রয়েছে দুটি ঝরনা, যার একটির জল সারা প্রাসাদে সরবরাহ করা হয় এবং অন্যটি শহরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকে। এই ইউটোপিয়ান পরিবেশটি ট্রয়যুদ্ধের বাস্তব ও নিষ্ঠুর পৃথিবীর সম্পূর্ণ বিপরীত। ফাইয়াকীয়রা এমন এক জগতে বাস করে, যা মানুষের জগত হয়েও দেবতাদের জগতের খুব কাছাকাছি। তারা যুদ্ধবিগ্রহ, মহামারি বা সাধারণ মানুষের দুঃখকষ্ট থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

এই বিপুল ঐশ্বর্য ও শান্তির দৃশ্য ওডিসিউসকে গভীরভাবে বিমোহিত করে। তিনি দীর্ঘক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে এই সৌন্দর্য অবলোকন করতে থাকেন। একজন মানুষ, যে গত কুড়ি বছর ধরে কেবল রক্ত, মৃত্যু আর সাগরের ভয়ংকর তাণ্ডব দেখেছে, তার কাছে এই প্রাসাদ যেন এক স্বপ্নের মতো মনে হয়। তবে ওডিসিউস এই মোহে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন না। তিনি জানেন যে এই ঐশ্বর্য তার নিজের নয়। স্পার্টার রাজা মেনেলাউসের প্রাসাদেও প্রচুর ঐশ্বর্য ছিল, কিন্তু সেখানে রক্তের গন্ধ মিশে ছিল। আলকিনোয়াসের প্রাসাদে কোনো রক্তের দাগ নেই, কিন্তু এখানেও রয়েছে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা। ফাইয়াকীয়রা পৃথিবীর অন্যান্য মানুষের দুঃখকষ্ট থেকে এতটাই দূরে যে, তাদের এই সুখ এক ধরনের অবাস্তব বা কৃত্রিম সুখের মতো মনে হয়। ওডিসিউস তার বাস্তবতাবোধকে অটুট রেখে, কুয়াশার চাদরে নিজেকে ঢেকে প্রাসাদের মূল হলরুমের দিকে পা বাড়ান।

সাপ্লিকেশন প্রথা ও রানীর কাছে আত্মসমর্পণ (Custom of Supplication and Surrender to the Queen)

প্রাসাদের বিশাল হলরুমে তখন ফাইয়াকীয়দের সমস্ত অভিজাত ব্যক্তি ও মন্ত্রীরা ভোজসভায় উপস্থিত ছিলেন। তারা ঘুমাতে যাওয়ার আগে দেবতাদের বার্তাবাহক হার্মিসের উদ্দেশ্যে তাদের শেষ পানীয় উৎসর্গ করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ওডিসিউস হলরুমে প্রবেশ করেন। অ্যাথেনার দেওয়া সেই জাদুকরী কুয়াশা তখনও তাকে ঢেকে রেখেছিল, ফলে কেউ তাকে দেখতে পায়নি। তিনি সোজা হেঁটে রানী আরেতের আসনের কাছে যান। ঠিক যখন তিনি রানীর সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসেন, তখন অ্যাথেনা তার চারপাশ থেকে কুয়াশা সরিয়ে নেন। হঠাৎ করে একজন অপরিচিত, বিধ্বস্ত ও বয়স্ক মানুষকে রানীর পায়ের কাছে বসে থাকতে দেখে হলরুমের সমস্ত মানুষ স্তব্ধ হয়ে যায়। সবার মুখ থেকে কথা হারিয়ে যায়। এই নাটকীয় আবির্ভাবটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং প্রাচীন গ্রিক সমাজে এর একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ছিল (Crotty, 1994)।

ওডিসিউস বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে গ্রিক সমাজের সেই পবিত্র প্রথা বা সাপ্লিকেশন (Supplication)-এর নিয়ম অনুযায়ী রানীর হাঁটু জড়িয়ে ধরেন। তিনি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও বিনীত ভাষায় তার আবেদন শুরু করেন। তিনি রাজা আলকিনোয়াস বা সেখানে উপস্থিত অন্য কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির দিকে ফিরেও তাকাননি, তার সমস্ত মনোযোগ ছিল রানীর দিকে। ওডিসিউস রানীর কাছে প্রার্থনা করেন যে, দেবতারা যেন রানী ও তার পরিবারকে চিরকাল সুখে রাখেন। এরপর তিনি অত্যন্ত করুন স্বরে জানান যে তিনি দীর্ঘকাল ধরে সাগরের বুকে সীমাহীন কষ্ট ভোগ করছেন এবং এখন কেবল নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য তিনি ফাইয়াকীয়দের সাহায্য চাইছেন। তার এই আবেদনটি ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা অসহায়ত্ব ও মরিয়া ভাব সবার হৃদয় স্পর্শ করার জন্য যথেষ্ট ছিল।

আবেদন শেষ করেই ওডিসিউস রানীর পায়ের কাছ থেকে সরে যান এবং হলরুমের মেঝের ছাইয়ের মধ্যে গিয়ে বসেন। এটি ছিল সাপ্লিকেশনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আচার। ছাইয়ের মধ্যে বসার অর্থ হলো সাহায্যপ্রার্থী নিজেকে সবচেয়ে নিচু ও অসহায় অবস্থানে নামিয়ে এনেছেন। তিনি গৃহস্বামীর দয়া ও সিদ্ধান্তের ওপর নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিয়েছেন। ওডিসিউসের এই আচরণ ফাইয়াকীয়দের জন্য ছিল এক ধরনের নৈতিক পরীক্ষা। তারা যদি এই অসহায় মানুষটিকে ছাইয়ের মধ্যে বসে থাকতে দেয়, তবে তারা জেনিয়ার নিয়ম ভঙ্গ করবে এবং দেবতাদের রোষানলে পড়বে। পুরো হলরুমে তখন পিনপতন নীরবতা। রানী আরেতেও প্রথমে কোনো কথা বলেননি। এই নীরবতা দেখায় যে, ফাইয়াকীয়রা অপরিচিত মানুষের মুখোমুখি হতে খুব একটা অভ্যস্ত ছিল না। তাদের এই দ্বিধা ও বিস্ময় ওডিসিউসের স্নায়ুর ওপর এক প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে।

আতিথেয়তার নিয়ম পালন ও জেনিয়ার পরীক্ষা (Observance of the Rules of Hospitality and the Test of Xenia)

হলরুমের এই অস্বস্তিকর নীরবতা ভাঙেন একেনিয়াস নামের এক বয়োজ্যেষ্ঠ ও অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান ফাইয়াকীয় মন্ত্রী। তিনি রাজা আলকিনোয়াসের দিকে ফিরে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, একজন অতিথিকে এভাবে ছাইয়ের মধ্যে বসিয়ে রাখা ফাইয়াকীয় রাজপরিবারের সম্মানের জন্য মোটেও শোভনীয় নয়। এটি পবিত্র আতিথেয়তার নিয়ম বা জেনিয়া (Xenia)-এর সরাসরি লঙ্ঘন। একেনিয়াস রাজাকে অনুরোধ করেন অতিথিকে মাটি থেকে তুলে এনে সম্মানজনক আসনে বসাতে এবং তার জন্য খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা করতে। এই প্রবীণ মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে আলকিনোয়াসের সম্বিত ফিরে আসে। তিনি বুঝতে পারেন যে, দেবতার প্রিয় জাতি হিসেবে তাদের নৈতিক দায়িত্ব পালনে কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। তিনি দ্রুত তার আসন থেকে উঠে আসেন এবং নিজে হাতে ওডিসিউসকে মাটি থেকে তুলে নেন (Reece, 1993)।

আলকিনোয়াস কেবল তাকে তুলে নিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি তার সবচেয়ে প্রিয় পুত্র লাওডামাসকে তার আসন থেকে সরিয়ে দিয়ে সেই জায়গায় ওডিসিউসকে বসতে দেন। এটি ছিল অতিথিকে দেওয়া সর্বোচ্চ সম্মানের একটি নিদর্শন। দাসীরা রূপার পাত্রে হাত ধোয়ার জল নিয়ে আসে এবং ওডিসিউসের সামনে সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করা হয়। ওডিসিউস টানা বিশ দিন সাগরে না খেয়ে থাকার পর অবশেষে সভ্য মানুষের খাবার গ্রহণ করেন। আহার পর্ব চলার সময় আলকিনোয়াস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। তিনি উপস্থিত সবাইকে জানান যে, পরদিন সকালে তারা আবার সমবেত হবেন এবং এই অপরিচিত অতিথিকে কীভাবে তার দেশে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া যায়, তার ব্যবস্থা করবেন। আলকিনোয়াস একটি সন্দেহের কথাও প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই অতিথি কোনো সাধারণ মানুষ না হয়ে ছদ্মবেশী কোনো দেবতাও হতে পারেন, যারা মাঝে মাঝেই ফাইয়াকীয়দের ভোজে অংশ নিতে আসেন।

ওডিসিউস অত্যন্ত চতুরতার সাথে রাজার এই সন্দেহটি দূর করেন। তিনি আলকিনোয়াসকে আশ্বস্ত করেন যে তিনি কোনো অমর দেবতা নন, বরং তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী ও হতভাগ্য একজন মরণশীল মানুষ। তিনি বলেন যে তার পেটের ক্ষুধা দেখায় তিনি সাধারণ রক্তমাংসের মানুষ, কারণ দেবতাদের পেটে ক্ষুধা থাকে না। তিনি শুধু একটি কথাই বারবার জোর দিয়ে বলেন যে, তার একমাত্র চাওয়া হলো নিজের দেশে ফেরা। তিনি বলেন, “আমাকে কেবল আমার দেশে পৌঁছে দিন, তারপর যদি আমাকে মরতেও হয়, আমি শান্তিতে মরব।” এই কথাগুলো আলকিনোয়াস এবং উপস্থিত সবার মনে এক গভীর রেখাপাত করে। তারা বুঝতে পারেন যে এই মানুষটি সত্যিই তার বাড়ির জন্য আকুল হয়ে আছে। আতিথেয়তার এই প্রাথমিক পরীক্ষায় আলকিনোয়াস অত্যন্ত সফলভাবে উত্তীর্ণ হন এবং ওডিসিউসও তার প্রথম বাধাটি অতিক্রম করেন।

আরেতের তীক্ষ্ণ নজর ও পরিচয়গোপনের কৌশল (Sharp Gaze of Arete and the Strategy of Concealing Identity)

ভোজসভা শেষে যখন অন্যান্য অতিথিরা নিজ নিজ ঘরে ফিরে যান, তখন হলরুমে কেবল রাজা আলকিনোয়াস, রানী আরেতে এবং ওডিসিউস রয়ে যান। এতক্ষণ ধরে রানী আরেতে চুপচাপ ছিলেন, কিন্তু তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ওডিসিউসের প্রতিটি পদক্ষেপ ও আচরণের ওপর নিবদ্ধ ছিল। হঠাৎ রানীর চোখ পড়ে ওডিসিউসের পরিহিত কাপড়ের দিকে। এই কাপড়গুলো নওসিকা তাকে নদীর তীরে দিয়েছিল, যা মূলত রানীর নিজেরই বোনা ছিল। আরেতে সরাসরি ওডিসিউসকে প্রশ্ন করেন, “তুমি কে? কোথা থেকে এসেছ? এবং এই কাপড় তুমি কোথায় পেলে?” রানীর এই সরাসরি প্রশ্ন ওডিসিউসকে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলে দেয়। তিনি যদি সত্যি কথা বলেন যে নওসিকা তাকে সাহায্য করেছে, তবে রাজার মনে সন্দেহ তৈরি হতে পারে যে তার মেয়ে একজন অপরিচিত পুরুষের সাথে একা সময় কাটিয়েছে (Dougherty, 2001)।

ওডিসিউস এখানে তার স্বভাবসুলভ ধূর্ততা ও বুদ্ধিদীপ্ত বাচনভঙ্গির আশ্রয় নেন। তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে তার আসল নাম ও পিতৃপরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখেন। গ্রিক মহাকাব্যে এই পরিচয়গোপন (Concealment of Identity) একটি অত্যন্ত শক্তিশালী আখ্যানকৌশল। ওডিসিউস যদি প্রথমেই বলে দিতেন যে তিনি ইথাকার রাজা ওডিসিউস, যাকে পসেইডন ঘৃণা করেন, তবে হয়তো ফাইয়াকীয়রা তাকে সাহায্য করতে ভয় পেত। তাই তিনি নিজের নামের বদলে নিজের দুর্দশার ওপর জোর দেন। তিনি রানীকে জানান কীভাবে তিনি দেবী ক্যালিপসোর দ্বীপে সাত বছর বন্দি ছিলেন, কীভাবে পসেইডন তার ভেলা ভেঙে দিয়েছেন এবং কীভাবে তিনি সাঁতার কেটে এই দ্বীপে এসে পৌঁছেছেন। তার এই গল্পটি ছিল আংশিক সত্য, কিন্তু অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সাজানো।

কাপড়ের প্রশ্নের উত্তরে ওডিসিউস অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে নওসিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি সত্যটি স্বীকার করেন যে রাজকন্যা তাকে নদীর তীরে সাহায্য করেছে এবং এই কাপড়গুলো দিয়েছে। তবে তিনি একটি ছোট মিথ্যা কথা বলেন। তিনি বলেন যে নওসিকা তাকে রথে করে প্রাসাদে আসতে বলেছিল, কিন্তু তিনি নিজেই ভয়ে এবং লজ্জায় রাজকন্যার সাথে আসতে রাজি হননি। এই মিথ্যা কথাটি আলকিনোয়াসকে দারুণভাবে খুশি করে। রাজা ভাবেন যে এই অতিথি অত্যন্ত ভদ্র ও সম্মানজ্ঞানী, যে তার মেয়ের সম্মানের কথা ভেবে এতটা সতর্ক থেকেছে। আলকিনোয়াস উল্টো তার মেয়েকেই দোষ দেন যে সে কেন এই অতিথিকে সরাসরি প্রাসাদে নিয়ে আসেনি। ওডিসিউসের এই কৌশলটি পুরোপুরি সফল হয়। তিনি কেবল নিজের পরিচয়ই গোপন রাখেননি, বরং একই সাথে নওসিকার সম্মান রক্ষা করে রাজা ও রানীর আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হন।

আলকিনোয়াসের প্রস্তাব ও ওডিসিউসের অটল লক্ষ্য (Proposal of Alcinous and Odysseus’s Unwavering Goal)

ওডিসিউসের ভদ্রতা ও প্রজ্ঞায় মুগ্ধ হয়ে রাজা আলকিনোয়াস একটি অভাবনীয় প্রস্তাব দিয়ে বসেন। তিনি বলেন যে, ওডিসিউসের মতো একজন বিচক্ষণ ও সুশীল মানুষকে তিনি অত্যন্ত পছন্দ করেছেন। ওডিসিউস যদি চান, তবে তিনি ফাইয়াকীয়দের দেশেই থেকে যেতে পারেন। আলকিনোয়াস তাকে তার মেয়ে নওসিকার সাথে বিয়ে দেওয়ার এবং বিপুল সম্পদ ও বাড়ি উপহার দেওয়ার প্রস্তাব দেন। একজন গৃহহীন ও নিঃস্ব মানুষের জন্য এই প্রস্তাবটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো। ফাইয়াকীয়দের মতো একটি উন্নত, শান্ত ও ঐশ্বর্যশালী সমাজে রাজার জামাই হয়ে জীবন কাটানোর সুযোগ যেকোনো মরণশীল মানুষের জন্যই এক পরম আরাধ্য বিষয়। ক্যালিপসোর অমরত্বের প্রস্তাবের পর এটি ছিল ওডিসিউসের সামনে দ্বিতীয় বড় প্রলোভন (Rose, 1992)।

কিন্তু ওডিসিউসের মনে তখন অন্য কোনো হিসাব বা প্রলোভন কাজ করছিল না। তার সামনে কেবল একটিই ছবি ভাসছিল, আর তা হলো ইথাকার সেই রুক্ষ ও পাথুরে ভূমি। তিনি আলকিনোয়াসের প্রস্তাবটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এড়িয়ে যান। তিনি রাজাকে ধন্যবাদ জানান, কিন্তু বারবার স্মরণ করিয়ে দেন যে তার একমাত্র লক্ষ্য হলো আগামীকাল ভোরে একটি জাহাজে চড়ে নিজের দেশে ফেরা। ওডিসিউসের এই অটল সংকল্প দেখায় যে, তার কাছে নিজের শেকড় ও আসল পরিচয়ের চেয়ে বড় আর কোনো ঐশ্বর্য নেই। তিনি ফাইয়াকীয়দের সুখ ও শান্তিতে পূর্ণ ইউটোপিয়ান সমাজকে সম্মান করেন ঠিকই, কিন্তু তিনি এটাও জানেন যে এই সমাজ তার নিজের নয়। এখানে থেকে গেলে তাকে চিরকাল নিজের পরিচয় লুকিয়ে এক ধরনের পরজীবী হয়েই বাঁচতে হবে।

আলকিনোয়াস ওডিসিউসের এই দৃঢ়তা দেখে আর জোরাজুরি করেননি। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, পরদিন ফাইয়াকীয় নাবিকরা তাকে তার দেশে পৌঁছে দেবে, তা সেই দেশ যত দূরেই হোক না কেন। ফাইয়াকীয়দের জাহাজগুলো এতটাই দ্রুতগামী এবং জাদুকরী ছিল যে তারা কোনো পথপ্রদর্শক বা কম্পাস ছাড়াই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারত। রাজার এই প্রতিশ্রুতি পেয়ে ওডিসিউসের মনে এক বিশাল স্বস্তি নেমে আসে। রানীর নির্দেশে দাসীরা বারান্দায় তার জন্য নরম বিছানা প্রস্তুত করে। দীর্ঘ কুড়ি বছর পর, ওডিসিউস অবশেষে এমন একটি বিছানায় ঘুমাতে যান, যেখানে কোনো ঝড়ের ভয় নেই, কোনো দানবের আতঙ্ক নেই। তবে তিনি তখনো জানতেন না যে, পরদিন তার জন্য আরও একটি মানসিক ও আবেগপূর্ণ পরীক্ষা অপেক্ষা করছে, যেখানে তাকে তার গোপন পরিচয় সবার সামনে প্রকাশ করতে বাধ্য হতে হবে।

ডিমোডোকাসের গান (Songs of Demodocus): ট্রয়ের স্মৃতি ও আত্মপ্রকাশ

ফাইয়াকীয়দের উৎসব ও চারণকবির মর্যাদা (Festival of the Phaeacians and the Status of the Bard)

ফাইয়াকীয়দের দেশে আগন্তুক ওডিসিউস (Odysseus)-কে দেশে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজা আলকিনোয়াস (Alcinous) পরদিন সকালে এক বিশাল জনসভার ডাক দেন। এই জনসভার উদ্দেশ্য ছিল কেবল একটি জাহাজ প্রস্তুত করা নয়, বরং অতিথিকে নিজেদের ঐশ্বর্য, সংস্কৃতি ও আতিথেয়তার চরম নিদর্শন দেখানো। দেবী অ্যাথেনা (Athena) এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ওডিসিউসের চারপাশে এক ধরনের ঐশ্বরিক দীপ্তি বা গ্ল্যামার ছড়িয়ে দেন, যাতে তাকে আরও বেশি রাজকীয় ও বিশাল মনে হয়। ফাইয়াকীয়রা যখন শহরের মূল চত্বরে জড়ো হয়, তখন তারা এই অপরিচিত অতিথির রূপ ও গাম্ভীর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। আলকিনোয়াস ঘোষণা করেন যে, বায়ান্ন জন শ্রেষ্ঠ তরুণ নাবিক একটি জাদুকরী জাহাজ প্রস্তুত করবে এবং এরপর রাজপ্রাসাদে এক বিশাল ভোজের আয়োজন করা হবে। এই ভোজসভার মূল আকর্ষণ হিসেবে আলকিনোয়াস তার প্রাসাদের শ্রেষ্ঠ চারণকবি বা অয়িডোস (Aoidos)-কে ডেকে পাঠান (Ford, 1992)।

এই চারণকবির নাম ছিল ডিমোডোকাস (Demodocus)। হোমারের মহাকাব্যে ডিমোডোকাসের চরিত্রটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ অনেকে মনে করেন যে হোমার এই অন্ধ চারণকবির চরিত্রের মাধ্যমে নিজেরই এক ধরনের আত্মপ্রতিকৃতি বা সেলফ-রিফ্লেকশন (Self-reflection) তুলে ধরেছেন। ডিমোডোকাস ছিলেন অন্ধ, কিন্তু দেবতারা তাকে একটি অমূল্য উপহার দিয়েছিলেন – তার কণ্ঠস্বর ছিল জাদুকরী এবং তার স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ। প্রাচীন গ্রিক সমাজে চারণকবিদের অবস্থান ছিল অত্যন্ত উঁচুতে। তারা কেবল বিনোদনদাতা ছিলেন না, তারা ছিলেন সমাজের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বীরত্বগাথার রক্ষক। তাদের গানগুলো মুখস্থ করা কোনো কবিতা ছিল না, এগুলো ছিল দেবতাদের প্রেরণা বা মিউজ (Muse)-এর দান। ডিমোডোকাস যখন এক হাতে তার রূপার বাঁধানো লিয়ার বা বীণা ধরে প্রাসাদের মাঝখানে এসে বসেন, তখন সমস্ত কোলাহল থেমে যায়।

ডিমোডোকাসের এই উপস্থিতি ওডিসিউসের জন্য এক ধরনের মানসিক প্রস্তুতির মঞ্চ তৈরি করে। গত কুড়ি বছর ধরে ওডিসিউস কেবল যুদ্ধ, রক্ত আর সাগরের নির্মমতার সাথেই লড়াই করেছেন। তার নিজের বীরত্বের কথা শোনার কোনো সুযোগ তার হয়নি। ডিমোডোকাস যখন তার বীণায় প্রথম সুর তোলেন, তখন ওডিসিউস বুঝতে পারেননি যে এই গান তাকে তার নিজের ফেলে আসা অতীতের এক ভয়ংকর সুন্দর দর্পণের সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে। ফাইয়াকীয়দের এই ভোজসভা তাই কেবল একটি আতিথেয়তার অনুষ্ঠান ছিল না, এটি ছিল ওডিসিউসের নিজের ভেতরকার সেই ঘুমন্ত যোদ্ধাসত্তাকে জাগিয়ে তোলার এক ঐশ্বরিক আয়োজন।

প্রথম গান: ওডিসিউস ও একিলিসের দ্বন্দ্ব (First Song: The Quarrel of Odysseus and Achilles)

ভোজসভার এক পর্যায়ে ডিমোডোকাস তার বীণায় একটি অত্যন্ত পরিচিত ও মহাকাব্যিক সুর তোলেন। তিনি গাইতে শুরু করেন ট্রয়যুদ্ধের এমন এক ঘটনার কথা, যা তখন সারা গ্রিস জুড়ে মানুষের মুখে মুখে ফিরত। গানটির বিষয়বস্তু ছিল গ্রিক শিবিরের ভেতরে একিলিস (Achilles) এবং ওডিসিউসের মধ্যকার এক তীব্র বাকবিতণ্ডা। দেবতাদের এক ভোজসভায় এই দুই শ্রেষ্ঠ বীর কোনো একটি কৌশলগত বিষয়ে একে অপরের সাথে তীব্র তর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। একিলিস ছিলেন শারীরিক শক্তির প্রতীক বা বিয়া (Bia), আর ওডিসিউস ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তিক চাতুর্য বা মেটিস (Metis)-এর প্রতীক। ডিমোডোকাসের গানে এই দুই বিপরীতমুখী দর্শনের সংঘাত অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। গানটি শুনে ফাইয়াকীয়রা হাততালি দিয়ে ওঠে, কারণ তাদের কাছে এটি ছিল একটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর বীরত্বগাথা (Nagy, 1999)।

কিন্তু ওডিসিউসের কাছে এই গানটি কোনো বিনোদন ছিল না। এটি ছিল তার নিজের জীবনের এক রক্তমাখা অধ্যায়ের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। ডিমোডোকাসের প্রতিটি শব্দ তার মনে সেই পুরোনো স্মৃতিগুলো উসকে দেয়। তিনি স্পষ্ট দেখতে পান সেই যুদ্ধক্ষেত্র, সেই তাঁবু, এবং তার সেই সহযোদ্ধাদের, যাদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই। একিলিসের মতো এক অজেয় বীর, যে সাগরের বুকে নয়, বরং সম্মানজনকভাবে রণভূমিতে প্রাণ হারিয়েছিল, তার কথা মনে করে ওডিসিউসের বুক ফেটে কান্না আসে। তিনি অত্যন্ত দ্রুত নিজের মাথা থেকে সেই বিশাল বেগুনি রঙের চাদরটি টেনে নিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলেন, যাতে ফাইয়াকীয়রা তার চোখের জল দেখতে না পায়। যখন ডিমোডোকাস গান থামাচ্ছিলেন, ওডিসিউস তখন চোখের জল মুছে দেবতাদের উদ্দেশ্যে মদ ঢালছিলেন, কিন্তু গান আবার শুরু হলেই তিনি আবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন।

ওডিসিউসের এই কান্না কোনো দুর্বলতা ছিল না। গ্রিক দর্শনে এই ধরনের শোককে বলা হয় ক্যাথারসিস (Catharsis) বা আবেগের শুদ্ধি। তিনি তার নিজের ক্লিওস বা খ্যাতির গান শুনে কাঁদছিলেন। এটি দেখায় যে, নিজের খ্যাতি বা নামডাক শোনার চেয়ে বেঁচে থাকার বাস্তব যন্ত্রণা অনেক বেশি তীব্র। ফাইয়াকীয়রা ওডিসিউসের এই কান্না লক্ষ্য করেনি, কারণ তারা গানে বিভোর ছিল। কিন্তু আলকিনোয়াসের তীক্ষ্ণ নজর ওডিসিউসের এই অস্বাভাবিক আচরণ এড়িয়ে যায়নি। তিনি বুঝতে পারেন যে, এই গানের সাথে অতিথির কোনো এক গভীর ও বেদনাদায়ক সম্পর্ক রয়েছে। তবে তিনি সরাসরি কোনো প্রশ্ন না করে অত্যন্ত কৌশলে পরিস্থিতি সামাল দেন। তিনি ডিমোডোকাসকে গান থামাতে বলেন এবং সবাইকে বাইরের মাঠে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা ও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান, যাতে অতিথির মন ভালো হয়।

ফাইয়াকীয়দের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও ওডিসিউসের ক্ষোভ (Athletic Contests of the Phaeacians and Odysseus’s Wrath)

আলকিনোয়াসের নির্দেশে প্রাসাদের সবাই খোলা মাঠে গিয়ে জড়ো হয়। ফাইয়াকীয়রা মূলত দৌড়, কুস্তি, লাফ দেওয়া এবং ডিসকাস নিক্ষেপের মতো খেলাধুলায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিল। তারা তাদের এই শারীরিক সক্ষমতা অতিথির সামনে প্রদর্শন করতে চাইছিল। যুবরাজ লাওডামাস এবং তার বন্ধু ইউরিয়ালাস (Euryalus) ছিল এই প্রতিযোগিতার প্রধান আকর্ষণ। তারা তাদের নৈপুণ্য দেখিয়ে সবার হাততালি কুড়াচ্ছিল। একপর্যায়ে লাওডামাস অত্যন্ত বিনয়ের সাথে ওডিসিউসকে আহ্বান জানায় তাদের সাথে খেলায় অংশ নেওয়ার জন্য। লাওডামাসের যুক্তি ছিল যে, একজন মানুষের শারীরিক শক্তির চেয়ে বড় কোনো খ্যাতি হতে পারে না। ওডিসিউস অত্যন্ত ভদ্রভাবে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি জানান যে, দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা এবং সীমাহীন কষ্ট তার শরীরের সমস্ত শক্তি কেড়ে নিয়েছে। এখন তার মন কোনো খেলাধুলায় নেই, সে কেবল নিজের দেশে ফেরার জন্য উদগ্রীব (Slatkin, 1996)।

ওডিসিউসের এই প্রত্যাখ্যান ইউরিয়ালাসের ইগোতে আঘাত করে। ইউরিয়ালাস ছিল অত্যন্ত অহংকারী এবং উদ্ধত। সে সরাসরি ওডিসিউসকে অপমান করে বসে। সে বলে যে, ওডিসিউসকে দেখতে কোনো বীর বা ক্রীড়াবিদ মনে হয় না; বরং তাকে দেখতে মনে হয় কোনো সওদাগর বা জাহাজের ক্যাপ্টেন, যার সারা দিন কাটে কেবল মালের হিসাব-নিকাশ আর লাভের আশায়। প্রাচীন গ্রিক সমাজে, বিশেষ করে হোমারীয় যুগে, একজন অভিজাত মানুষের জন্য সওদাগর বা ব্যবসায়ী হওয়া অত্যন্ত অপমানজনক বলে বিবেচিত হতো। কারণ বীরত্ব বা খ্যাতি অর্জিত হয় রণভূমিতে, বাজারে নয়। ইউরিয়ালাসের এই কথাটি ওডিসিউসের ভেতরের সেই ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিকে জাগিয়ে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন যে, তার নীরবতা ও ভদ্রতাকে এরা দুর্বলতা হিসেবে ধরে নিচ্ছে।

ওডিসিউস তৎক্ষণাৎ তার বিশাল চাদরটি ছুড়ে ফেলেন। তার চোখ রাগে জ্বলজ্বল করতে থাকে। তিনি ইউরিয়ালাসকে চরম ভাষায় তিরস্কার করে বলেন যে, দেবতারা সবাইকে সব গুণ একসাথে দেন না। কাউকে তারা সুন্দর চেহারা দেন, কিন্তু তার মগজে কোনো বুদ্ধি দেন না। ইউরিয়ালাসের চেহারা হয়তো দেবতাদের মতো, কিন্তু তার মাথাটি পুরোপুরি ফাঁকা। এরপর ওডিসিউস আর কোনো কথা না বলে সরাসরি একটি বিশাল ও ভারী ডিসকাস হাতে তুলে নেন, যা ফাইয়াকীয়দের ডিসকাসের চেয়ে অনেক বড় ছিল। তিনি এক ঝটকায় সেটি শূন্যে ছুড়ে মারেন। ডিসকাসটি এত জোরে এবং এত দূরে গিয়ে পড়ে যে, ফাইয়াকীয়রা ভয়ে মাথা নিচু করে ফেলে। অ্যাথেনা মানব রূপ ধরে সেই ডিসকাসের পতনস্থল চিহ্নিত করেন এবং ঘোষণা করেন যে কোনো ফাইয়াকীয় এর চেয়ে দূরে ডিসকাস ছুড়তে পারবে না। ওডিসিউসের এই একটিমাত্র আস্ফালন ফাইয়াকীয়দের অহংকার চূর্ণ করে দেয় এবং দেখায় যে তার শরীরে এখনো একজন প্রকৃত বীরের রক্ত বইছে।

দ্বিতীয় গান: আরেস ও অ্যাফ্রোডাইটির প্রেমের কেলেঙ্কারি (Second Song: The Scandal of Ares and Aphrodite)

ক্রীড়া প্রতিযোগিতার এই টানটান উত্তেজনার পর রাজা আলকিনোয়াস পরিবেশ শান্ত করার জন্য একটি ভিন্ন উদ্যোগ নেন। তিনি বুঝতে পারেন যে শারীরিক শক্তিতে এই অতিথিকে হারানো সম্ভব নয়। তাই তিনি ফাইয়াকীয়দের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা – নৃত্য ও সংগীতের দিকে মনোযোগ ঘোরান। তিনি ডিমোডোকাসকে আবার ডাকেন এবং একদল তরুণকে চমৎকার একটি নাচের আয়োজন করতে বলেন। ডিমোডোকাস এবার যে গানটি শুরু করেন, তার বিষয়বস্তু ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি কোনো যুদ্ধ বা বীরত্বের গান ছিল না, এটি ছিল দেবতাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এক হালকা ও হাস্যরসাত্মক গান। গানটির বিষয় ছিল প্রেমের দেবী অ্যাফ্রোডাইটি (Aphrodite) এবং যুদ্ধের দেবতা আরেস (Ares)-এর গোপন প্রেমের কেলেঙ্কারি এবং অ্যাফ্রোডাইটির স্বামী, পঙ্গু দেবতা হেফায়েস্টাস (Hephaestus)-এর প্রতিশোধ (Brown, 1989)।

গানে বলা হয় যে, অ্যাফ্রোডাইটি তার স্বামী হেফায়েস্টাসকে ফাঁকি দিয়ে আরেসের সাথে গোপনে প্রেম করতেন। হেফায়েস্টাস এই খবর জানতে পেরে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। তবে তিনি আরেসের মতো শারীরিকভাবে শক্তিশালী ছিলেন না যে তার সাথে সরাসরি লড়াই করবেন। তাই তিনি তার বুদ্ধিমত্তা ও কারিগরি বিদ্যা বা মেটিসের আশ্রয় নেন। তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও অদৃশ্য একটি জালের ফাঁদ তৈরি করেন এবং সেটি তার নিজের বিছানার ওপর বিছিয়ে রাখেন। যখন আরেস ও অ্যাফ্রোডাইটি সেই বিছানায় মিলিত হন, তখন সেই জাদুকরী জাল তাদের চারদিক থেকে পেঁচিয়ে ধরে। তারা কোনোভাবেই সেই জাল ছিঁড়ে বের হতে পারেন না। এরপর হেফায়েস্টাস অলিম্পাসের সমস্ত দেবতাকে ডেকে আনেন এবং তাদের এই কেলেঙ্কারি সবার সামনে উন্মোচন করেন। দেবতারা এই দৃশ্য দেখে হাসিতে ফেটে পড়েন।

এই গানটি ফাইয়াকীয়দের কাছে অত্যন্ত আনন্দদায়ক ছিল, কিন্তু এর একটি গভীর রূপক অর্থ রয়েছে যা ওডিসিউসের জীবনের সাথে মিলে যায়। হেফায়েস্টাসের মতো ওডিসিউসও শারীরিকভাবে শক্তিশালী শত্রুদের (যেমন সাইক্লপস বা ইথাকার প্রণয়প্রার্থীরা) বিরুদ্ধে মেটিস বা কৌশল ব্যবহার করেন। অন্যদিকে, এই গানটি দাম্পত্য বিশ্বাসভঙ্গের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। ওডিসিউস যখন এই গানটি শুনছিলেন, তখন তার মনে হয়তো নিজের স্ত্রী পেনেলোপির কথা ভাসছিল। দীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে তার স্ত্রী ইথাকায় একদল উদ্ধত তরুণের সাথে লড়াই করছেন। এই গানটি তাকে মনে করিয়ে দেয় যে, দাম্পত্য বিশ্বস্ততা অত্যন্ত ঠুনকো হতে পারে এবং তাকে যত দ্রুত সম্ভব ইথাকায় ফিরে তার নিজের রাজ্য ও সংসারকে রক্ষা করতে হবে। গানটি শেষ হওয়ার পর ওডিসিউস ফাইয়াকীয়দের নাচ ও ডিমোডোকাসের গানের ভূয়সী প্রশংসা করেন, যা আলকিনোয়াসকে দারুণভাবে খুশি করে।

তৃতীয় গান: ট্রোজান ঘোড়া এবং ওডিসিউসের কান্না (Third Song: The Trojan Horse and the Tears of Odysseus)

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে সবাই আবার প্রাসাদের মূল হলরুমে ফিরে আসে। রানীর নির্দেশে ওডিসিউসকে স্নান করিয়ে অত্যন্ত দামি ও পরিষ্কার কাপড় পরানো হয়। ভোজসভা আবার শুরু হলে ওডিসিউস নিজেই একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কাজ করেন। তিনি নিজের প্লেট থেকে সবচেয়ে ভালো ও চর্বিযুক্ত শূকরের মাংসের একটি টুকরো কেটে একজন চারণকবির মাধ্যমে ডিমোডোকাসকে উপহার হিসেবে পাঠান। তিনি ডিমোডোকাসকে বলেন যে, পৃথিবীর সমস্ত মানুষের কাছে চারণকবিরা সম্মানের পাত্র, কারণ মিউজ তাদের গান শিখিয়েছেন। এরপর ওডিসিউস ডিমোডোকাসকে একটি নির্দিষ্ট গান গাওয়ার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, “তুমি যদি সত্যিই দেবতাদের আশীর্বাদপুষ্ট হও, তবে আমাকে সেই কাঠের ঘোড়ার গল্পটি শোনাও, যা ইপিয়াস তৈরি করেছিল এবং ওডিসিউস যার ভেতরে লুকিয়ে থেকে ট্রয় নগরী ধ্বংস করেছিল” (MacLeod, 2001)।

ওডিসিউস কেন নিজেরই বীরত্বের কথা শুনতে চাইলেন, তা নিয়ে মহাকাব্য বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। অনেকে মনে করেন, তিনি হয়তো পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন যে ডিমোডোকাসের গান সত্যিই বাস্তব ঘটনার কতটা কাছাকাছি। আবার অনেকে মনে করেন, তিনি হয়তো তার সেই হারানো ক্লিওস বা খ্যাতিকে শেষবারের মতো আস্বাদন করতে চেয়েছিলেন। ডিমোডোকাস মিউজের প্রেরণা নিয়ে গান শুরু করেন। তিনি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেন কীভাবে গ্রিকরা তাদের শিবির পুড়িয়ে দিয়ে জাহাজে করে পালানোর ভান করেছিল, কীভাবে ট্রোজানরা সেই বিশাল কাঠের ঘোড়াকে নিজেদের শহরের ভেতরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল, এবং কীভাবে রাতের অন্ধকারে ওডিসিউস ও তার সঙ্গীরা ঘোড়ার পেট থেকে বেরিয়ে এসে শহর ধ্বংস করেছিল।

এই গানটি শোনার সময় ওডিসিউসের মনে আর কোনো অহংকার অবশিষ্ট ছিল না। তিনি ট্রয়ের সেই বীভৎস রাতের কথা স্মরণ করেন, যখন বাতাসে কেবল নারী ও শিশুদের কান্না আর মৃত্যুর গন্ধ ভাসছিল। হোমার ওডিসিউসের এই কান্নার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও হৃদয়বিদারক উপমা ব্যবহার করেছেন। হোমার বলেন, ওডিসিউস এমনভাবে কাঁদছিলেন, যেমন একজন নারী তার মৃত স্বামীর লাশের ওপর আছড়ে পড়ে কাঁদে, যে স্বামী তার শহর ও সন্তানদের রক্ষা করতে গিয়ে শত্রুর হাতে প্রাণ দিয়েছে। শত্রুরা যখন ওই নারীকে দাসী হিসেবে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়, তখন তার যে কষ্ট হয়, ওডিসিউস ঠিক সেই একই কষ্ট অনুভব করছিলেন। এই উপমাটি দেখায় যে, যুদ্ধের কোনো আসল বিজয়ী নেই। ওডিসিউস ট্রয় জয় করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই যুদ্ধের ট্রমা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। তিনি একজন বিজয়ীর অহংকার নিয়ে নয়, বরং একজন পরাজিত মানুষের মতোই কাঁদছিলেন।

আত্মপরিচয় প্রকাশ ও দীর্ঘ আখ্যানের সূচনা (Revelation of Identity and the Beginning of the Long Narrative)

ওডিসিউসের এই অঝোর কান্না এবার আর রাজা আলকিনোয়াসের চোখ এড়ায় না। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন যে, এই গানের সাথে অতিথির কোনো না কোনোভাবে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আলকিনোয়াস সঙ্গে সঙ্গে ডিমোডোকাসকে গান থামাতে বলেন। তিনি অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সাথে ওডিসিউসের দিকে ফিরে বলেন যে, আতিথেয়তার নিয়ম অনুযায়ী তারা অতিথিকে সব ধরনের সাহায্য করেছেন। এখন সময় এসেছে অতিথির নিজের আসল পরিচয় প্রকাশ করার। আলকিনোয়াস সরাসরি প্রশ্ন করেন, “তুমি কে? তোমার দেশের নাম কী? তুমি সাগরের বুকে কোথায় কোথায় ঘুরেছ এবং কেন ট্রয়ের কথা শুনলে তুমি এমনভাবে কাঁদো যেন তোমার কোনো আপনজন সেখানে মারা গেছে?” (Segal, 1994)।

রাজার এই সরাসরি প্রশ্নগুলোর সামনে ওডিসিউসের আর কোনো পরিচয় লুকিয়ে রাখার সুযোগ ছিল না। তিনি বুঝতে পারেন যে ফাইয়াকীয়রা অত্যন্ত সৎ এবং সাহায্যকারী জাতি। তারা তার পরিচয় জেনে তাকে কোনো ক্ষতি করবে না। ওডিসিউস অত্যন্ত ধীরে তার চোখের জল মুছে ফেলেন। তিনি আলকিনোয়াসের দিকে তাকিয়ে এমন একটি উক্তি করেন, যা পুরো মহাকাব্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি বলেন, “আমি লায়ার্তেসের পুত্র ওডিসিউস। আমার চাতুর্যের কথা পৃথিবীর সব মানুষ জানে এবং আমার খ্যাতি আকাশ ছুঁয়েছে। আমার বাড়ি ইথাকায়, যেখানে মাউন্ট নেরিটনের পাতাগুলো বাতাসে কাঁপে।” এই ঘোষণার সাথে সাথে পুরো হলরুমে এক পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। ফাইয়াকীয়রা বুঝতে পারে যে এতক্ষণ ধরে তারা যে মানুষটিকে কেবল একজন হতভাগ্য ভিখারি ভেবেছিল, সে আসলে গ্রিসের সর্বশ্রেষ্ঠ বীরদের একজন।

এই আত্মপ্রকাশটি কেবল একটি নামের ঘোষণা ছিল না, এটি ছিল ওডিসিউসের নিজের হারানো সত্তাকে পুনরায় ফিরে পাওয়ার এক বিশাল পদক্ষেপ। দীর্ঘ সাত বছর ক্যালিপসোর দ্বীপে নামহীন হয়ে থাকার পর এবং সাগরের বুকে সমস্ত পরিচয় হারানোর পর, তিনি প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে নিজের নামটি উচ্চারণ করলেন। এই ঘোষণার সাথে সাথেই হোমারের মহাকাব্য তার মূল আখ্যানে প্রবেশ করে। ওডিসিউস এরপর শুরু করেন তার সেই দীর্ঘ, রোমাঞ্চকর এবং ভয়ংকর সমুদ্রযাত্রার গল্প। ট্রয় থেকে রওনা হওয়ার পর থেকে শুরু করে ফাইয়াকীয়দের দেশে পৌঁছানো পর্যন্ত তার জীবনে যা যা ঘটেছে, তিনি তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করতে শুরু করেন। আলকিনোয়াসের প্রাসাদের এই রাতটি তাই কেবল একটি ভোজসভার রাত ছিল না, এটি ছিল ওডিসিউসের নিজের জীবনের গল্প নিজের মুখে রচনা করার এক মহাকাব্যিক প্রারম্ভ।

ওডিসিউসের সমুদ্রাভিযান (Voyages of Odysseus): দানব, প্রলোভন ও বেঁচে থাকা

সিকোনেস ও লোটাসভোজীরা (Cicones and Lotus-Eaters): লোভ, বিস্মৃতি ও ক্ষতি

ট্রয়ের প্রস্থান ও ইসমারাস আক্রমণ (Departure from Troy and the Attack on Ismarus)

ফাইয়াকীয়দের রাজা আলকিনোয়াসের প্রাসাদে নিজের পরিচয় প্রকাশের পর ওডিসিউস (Odysseus) শুরু করেন তার সেই দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর আখ্যান, যা গত সাত বছর ধরে তার বুকের ভেতর চাপা পড়ে ছিল। তিনি শুরু করেন ঠিক সেই জায়গা থেকে, যেখানে ট্রয়যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছিল। ট্রয়ের পতনের পর গ্রিক বীরেরা যখন বিজয়োল্লাসে মত্ত হয়ে নিজেদের জাহাজে উঠছিল, তখন তাদের চোখেমুখে ছিল কেবলই দেশে ফেরার আনন্দ আর লুণ্ঠিত সম্পদের অহংকার। ওডিসিউস তার বারোটি জাহাজের বহর নিয়ে ইথাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। বাতাস তাদের অনুকূলেই ছিল এবং তাদের প্রথম গন্তব্য ছিল থ্রেস অঞ্চলের ইসমারাস (Ismarus) নগরী। এটি ছিল সিকোনেস (Cicones) নামক এক দুর্ধর্ষ জাতির বাসভূমি। ট্রয়যুদ্ধে সিকোনেসরা ট্রোজানদের পক্ষে লড়াই করেছিল, তাই ব্রোঞ্জ যুগের যুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী তাদের নগরী আক্রমণ করাটা গ্রিকদের কাছে সম্পূর্ণ বৈধ ও স্বাভাবিক একটি কাজ বলে মনে হয়েছিল (Vidal-Naquet, 1986)।

ইসমারাসে পৌঁছানোর পর ওডিসিউস ও তার সঙ্গীরা এক ভয়াবহ লুণ্ঠন শুরু করে। তারা কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়াই নগরীটি আক্রমণ করে এবং চোখের সামনে যাকেই পায়, তাকেই হত্যা করে। নারী ও শিশুদের বন্দি করা হয় এবং প্রচুর ধনসম্পদ নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেওয়া হয়। এই আক্রমণটি কোনো কৌশলগত কারণে ছিল না; এটি ছিল কেবল বিজয়ী যোদ্ধাদের অন্ধ লোভের বহিঃপ্রকাশ। ট্রয়ের যুদ্ধে দশ বছর লড়াই করেও তাদের রক্তপিপাসা মেটেনি। তারা ভেবেছিল, ইসমারাস একটি দুর্বল নগরী এবং একে ধ্বংস করে তারা কিছু অতিরিক্ত সম্পদ নিয়ে ইথাকায় ফিরবে। এই ধরনের জলদস্যুতা প্রাচীন গ্রিক সমাজে খুব সাধারণ ঘটনা হলেও, হোমার এখানে অত্যন্ত সুকৌশলে মানুষের লোভ বা গ্রিড (Greed)-এর ধ্বংসাত্মক রূপটি তুলে ধরেছেন। ওডিসিউস কেবল অ্যাপোলোর একজন পুরোহিত, যার নাম ছিল ম্যারন, তাকে এবং তার পরিবারকে ছেড়ে দেন। এই ম্যারন কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ওডিসিউসকে বারো বয়াম অত্যন্ত কড়া ও সুমিষ্ট মদ উপহার দেন।

লুটপাট শেষে ওডিসিউস তার সঙ্গীদের নির্দেশ দেন দ্রুত জাহাজ ভাসানোর জন্য। তিনি অত্যন্ত বাস্তববাদী মানুষ ছিলেন এবং বুঝতে পারছিলেন যে ইসমারাসের বেঁচে যাওয়া মানুষেরা নিশ্চুপ বসে থাকবে না। তিনি তার সঙ্গীদের সতর্ক করে বলেন যে, তাদের অবিলম্বে এই জায়গা ছেড়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু তার সঙ্গীরা ছিল বিজয়ের নেশায় সম্পূর্ণ অন্ধ। দশ বছর পর এত বিপুল পরিমাণ সম্পদ এবং নারী হাতে পেয়ে তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। তারা ওডিসিউসের নির্দেশ অমান্য করে সমুদ্রসৈকতে বসে প্রচুর পশু জবাই করে এবং মদ খেয়ে উল্লাসে মেতে ওঠে। এই অবাধ্যতা ছিল ওডিসিউসের নেতৃত্বের প্রতি প্রথম সরাসরি চ্যালেঞ্জ। এটি দেখায় যে, একজন নেতার ক্ষমতা কতটা সীমাবদ্ধ হতে পারে, যখন তার অনুসারীরা নিজেদের প্রবৃত্তি দ্বারা পরিচালিত হয়।

সিকোনেসদের পাল্টা আক্রমণ ও চরম ক্ষতি (Counterattack of the Cicones and Severe Loss)

ওডিসিউসের আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হলো। সৈকতে যখন গ্রিক নাবিকরা মাতাল হয়ে উৎসব করছিল, ইসমারাসের বেঁচে যাওয়া মানুষেরা তখন রাতের অন্ধকারে তাদের প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোতে খবর পাঠিয়ে দিয়েছিল। ভোরের আলো ফোটার আগেই সমুদ্রসৈকতে এসে জড়ো হয় হাজার হাজার সিকোনেস যোদ্ধা। হোমার এই সিকোনেসদের তুলনা করেছেন বসন্তের ঘন পাতার সাথে, যার অর্থ হলো তারা সংখ্যায় ছিল অগণিত এবং তারা লড়াইয়ের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল। সিকোনেসরা ছিল মূলত অশ্বারোহী যোদ্ধা, তবে তারা পায়ে হেঁটে যুদ্ধ করতেও সমান পারদর্শী ছিল। ভোরের আলোতে সৈকতের বালুর ওপর শুরু হয় এক অসম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। গ্রিকরা সংখ্যায় অনেক কম ছিল এবং রাতের বেলা মদ খেয়ে তারা শারীরিকভাবেও খুব একটা প্রস্তুত ছিল না (Finley, 1978)।

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্রিকরা কোনোমতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়। কিন্তু দুপুরের পর থেকে সিকোনেসদের প্রবল আক্রমণের মুখে তারা আর টিকতে পারে না। তাদের প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেঙে পড়ে এবং শুরু হয় একতরফা হত্যাযজ্ঞ। ওডিসিউস চোখের সামনে দেখতে পান তার সেই সহযোদ্ধাদের কচুকাটা হতে, যাদের সাথে তিনি দীর্ঘ দশ বছর ট্রয়ের ময়দানে লড়াই করেছেন। অনেক কষ্টে, নিজেদের জীবন বাজি রেখে তারা জাহাজগুলোকে সমুদ্রে ভাসাতে সক্ষম হয়। কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে। প্রতিটি জাহাজ থেকে ছয়জন করে মোট বাহাত্তর জন গ্রিক যোদ্ধা এই সৈকতে প্রাণ হারায়। ট্রয়যুদ্ধে দশ বছর লড়াই করেও তাদের যে ক্ষতি হয়নি, কেবল একদিনের অবিমৃষ্যকারিতা ও লোভের কারণে তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি হয়ে যায়।

এই পরাজয় ওডিসিউসের জন্য ছিল এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা। তিনি বুঝতে পারেন যে, ট্রয়ের বিজয়ী বীর হওয়ার অহংকার সাগরের বুকে কোনো কাজেই আসবে না। তার সঙ্গীদের এই মৃত্যু কেবল শত্রুর হাতে মৃত্যু ছিল না; এটি ছিল তাদের নিজেদের লোভ ও অবাধ্যতার চরম মূল্য। সাগরের বুকে নোঙর ভাসিয়ে তারা যখন মৃত সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে তিনবার করে শোকধ্বনি দিচ্ছিল, তখন জাহাজের ভেতরের পরিবেশ ছিল চরম বিষণ্ণ। এটি ছিল তাদের দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক প্রত্যাবর্তনের প্রথম বড় আঘাত। এই ঘটনাটি দেখায় যে, অহংকার বা হিউব্রিস (Hubris) মানুষকে কীভাবে অন্ধ করে দেয় এবং তার অনিবার্য পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। সিকোনেসদের সৈকত ছেড়ে আসার পর ওডিসিউস আর কখনো তার সঙ্গীদের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারেননি।

ঝড়ের তাণ্ডব ও কেপ মালিয়া অতিক্রম (Havoc of the Storm and Rounding Cape Malea)

সিকোনেসদের সৈকতে প্রচুর রক্ত ঝরানোর পর ওডিসিউসের নৌবহর ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ইথাকার দিকে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু তাদের এই যাত্রা মসৃণ ছিল না। যাত্রা শুরু করার পরপরই অলিম্পাসের দেবতা জিউস তাদের ওপর এক প্রলয়ংকরী ঝড় লেলিয়ে দেন। আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢেকে যায় এবং উত্তরের প্রবল বাতাস তাদের জাহাজগুলোকে কাগজের নৌকার মতো ছিন্নভিন্ন করার উপক্রম করে। জাহাজের মাস্তুল ভেঙে যায় এবং পালের কাপড় ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এই অবস্থায় সাগরের বুকে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ওডিসিউস ও তার সঙ্গীরা প্রাণভয়ে জাহাজগুলোকে পার্শ্ববর্তী একটি উপকূলে ভেড়াতে বাধ্য হন। সেখানে তারা টানা দুই দিন ও দুই রাত চরম ক্লান্তি ও আতঙ্কের মধ্যে কাটান (Malkin, 1998)।

তৃতীয় দিনে বাতাস কিছুটা শান্ত হলে তারা আবার নোঙর তোলেন এবং ইথাকার দিকে পাল ওড়ান। এবার তাদের গন্তব্য ছিল পেলেপনেসীয় উপদ্বীপের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত কেপ মালিয়া (Cape Malea)। এটি ছিল গ্রিসের অন্যতম বিপজ্জনক একটি নৌপথ, যেখানে সাগরের স্রোত ও বাতাস অত্যন্ত প্রতিকূল থাকে। প্রাচীন গ্রিক নাবিকরা এই পথটি অতিক্রম করার সময় সবসময় আতঙ্কে ভুগতেন। ওডিসিউস ভেবেছিলেন যে, কেপ মালিয়া পার হতে পারলেই তিনি তার নিজের রাজ্য ইথাকার কাছাকাছি চলে যাবেন। কিন্তু নিয়তির হিসাব ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা যখন কেপ মালিয়া পার হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই উত্তর দিক থেকে আবারও প্রবল বাতাস বইতে শুরু করে এবং সাগরের ভয়ংকর স্রোত তাদের জাহাজগুলোকে সঠিক পথ থেকে পুরোপুরি ছিটকে দেয়।

এই স্রোত ও বাতাস তাদের ইথাকার উল্টো দিকে অর্থাৎ উত্তর আফ্রিকার অজানা উপকূলের দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। টানা নয় দিন নয় রাত সাগরের বুকে দিকভ্রান্ত হয়ে ঘোরার পর দশম দিনে তারা একটি অদ্ভুত ও শান্ত দ্বীপে এসে পৌঁছান। এই নয় দিনের যাত্রা ছিল এক চরম মানসিক ও শারীরিক পরীক্ষার সময়। জাহাজে খাবার ও পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দেয় এবং নাবিকরা তাদের আশা প্রায় ছেড়ে দেয়। তারা বুঝতে পারে না যে তারা কোথায় যাচ্ছে বা আদৌ তারা কোনোদিন ডাঙার মুখ দেখতে পাবে কি না। কেপ মালিয়া অতিক্রম করতে না পারার এই ব্যর্থতা কেবল একটি নৌ-দুর্ঘটনা ছিল না, এটি ছিল ওডিসিউসের ভাগ্য বিপর্যয়ের এক বিশাল মোড়। এখান থেকেই মূলত তার সেই অন্তহীন এবং রহস্যময় সমুদ্রযাত্রার সূচনা ঘটে, যা তাকে পৃথিবীর পরিচিত মানচিত্রের বাইরে এক অজানা জগতে নিয়ে যায়।

লোটাস-ভোজীদের দ্বীপের মায়াবী পরিবেশ (Magical Environment of the Island of the Lotus-Eaters)

টানা নয় দিন সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে লড়াই করার পর ওডিসিউস ও তার সঙ্গীরা যখন দশম দিনে ডাঙায় পা রাখেন, তখন তারা এক সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের মুখোমুখি হন। এটি ছিল উত্তর আফ্রিকার উপকূলবর্তী কোনো এক স্থান, যা পুরাণে লোটাস-ভোজী (Lotus-Eaters)-দের দেশ হিসেবে পরিচিত। এই দ্বীপের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত শান্ত, মায়াবী ও নিশ্চিন্ত। সেখানে সাগরের কোনো গর্জন ছিল না, বাতাসের কোনো তাণ্ডব ছিল না। চারদিকে কেবল এক স্নিগ্ধ ও ঘুমন্ত নীরবতা বিরাজ করছিল। সিকোনেসদের সৈকতে যেমন তারা তরোয়ালের ঝনঝনানি ও রক্তের সম্মুখীন হয়েছিল, এখানে তার সম্পূর্ণ বিপরীত এক প্রশান্তির রাজত্ব ছিল। ওডিসিউস অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তার নাবিকদের সৈকতে নামার নির্দেশ দেন এবং খাবার ও জল সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন (Segal, 1994)।

দ্বীপটি সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকায় ওডিসিউস তার তিনজন সঙ্গীকে পাঠান খোঁজখবর নেওয়ার জন্য। তিনি জানতে চেয়েছিলেন যে এই দ্বীপে কারা বাস করে এবং তারা সভ্য মানুষ নাকি বন্য দানব। এই তিনজন সঙ্গী যখন দ্বীপের ভেতরে প্রবেশ করে, তখন তারা স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে মিলিত হয়। লোটাস-ভোজীরা ছিল অত্যন্ত বন্ধুভাবাপন্ন এবং শান্তিপ্রিয়। তাদের মধ্যে কোনো আগ্রাসন বা যুদ্ধের স্পৃহা ছিল না। তারা গ্রিক নাবিকদের সাদরে গ্রহণ করে এবং তাদের প্রধান খাদ্য হিসেবে লোটাস নামের এক জাদুকরী ফুল বা ফল খেতে দেয়। এই ফুলটির স্বাদ ছিল মধুর চেয়েও মিষ্টি এবং এর প্রভাব ছিল অত্যন্ত মোহময়। লোটাস-ভোজীদের আতিথেয়তায় কোনো খাদ ছিল না, কিন্তু তাদের এই আতিথেয়তার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ।

লোটাস ফুল কেবল একটি সাধারণ খাবার ছিল না; এটি ছিল এক ধরনের শক্তিশালী মাদক, যা মানুষের মনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলত। যারা এই ফুলটি খেত, তারা তাদের অতীত, তাদের পরিবার এবং তাদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের কথা সম্পূর্ণ ভুলে যেত। তাদের মনে কেবল একটাই ইচ্ছা কাজ করত – এই শান্ত মায়াবী দ্বীপে অনন্তকাল ধরে বসে বসে লোটাস খাওয়া। তারা আর কোনোদিন সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে লড়াই করতে চাইত না বা নিজেদের দেশে ফিরতে চাইত না। এই পরিবেশটি মানুষের ভেতরের সেই আদিম বাসনাকে জাগিয়ে তোলে, যেখানে মানুষ সমস্ত দায়িত্ব ও সংঘাত থেকে পালিয়ে এক ধরনের চিরস্থায়ী স্বস্তির সন্ধান করে। লোটাস-ভোজীদের এই দ্বীপটি তাই বাহ্যিকভাবে নিরাপদ হলেও, অভ্যন্তরীণভাবে এটি ছিল মানুষের অস্তিত্বের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।

বিস্মৃতি ও নস্টসের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব (Oblivion and the Psychological Conflict of Nostos)

ওডিসিউসের পাঠানো সেই তিনজন সঙ্গী লোটাস ফুল খাওয়ার পর আর সৈকতে ফিরে আসেনি। অনেক সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর ওডিসিউস যখন বুঝতে পারেন যে কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে, তখন তিনি নিজেই দ্বীপের ভেতরে যান। তিনি গিয়ে দেখেন যে তার সঙ্গীরা লোটাস-ভোজীদের সাথে বসে আছে এবং তাদের চোখেমুখে এক ধরনের মোহগ্রস্ত ও শূন্য দৃষ্টি। তারা ওডিসিউসকে চিনতে পারে, কিন্তু তারা ইথাকায় ফেরার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করে। তারা কাঁদতে কাঁদতে বলে যে তারা এই দ্বীপ ছেড়ে কোথাও যাবে না। এই পরিস্থিতিটি ওডিসিউসের জন্য ছিল সিকোনেসদের আক্রমণের চেয়েও বেশি ভয়ংকর। সিকোনেসরা আক্রমণ করেছিল তাদের শরীরের ওপর, আর এই লোটাস ফুল অজান্তেই আক্রমণ করেছে তাদের অস্তিত্ব ও লক্ষ্যের ওপর (Doherty, 1995)।

গ্রিক পুরাণে মানুষের শেকড় ভুলে যাওয়াকে বলা হয় বিস্মৃতি (Lethe)। একজন মানুষের আসল পরিচয় তার স্মৃতির ওপর নির্ভর করে। যখন সে তার অতীত ও পরিবারকে ভুলে যায়, তখন তার আর বেঁচে থাকার কোনো অর্থ থাকে না। অন্যদিকে, ওডিসিউসের পুরো যাত্রার মূল চালিকাশক্তি ছিল নস্টস (Nostos) বা বাড়ি ফেরার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। লোটাস-ভোজীদের দ্বীপে এসে এই নস্টস এবং লেদের মধ্যে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। ওডিসিউস বুঝতে পারেন, এই লোটাসের মায়া যদি একবার পুরো দলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তাদের ফেরা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। এটি কেবল একটি শারীরিক বন্দিদশা নয়, এটি মনের এক অন্তহীন কারাগার। আরাম ও বিস্মৃতির প্রলোভন অনেক সময় ধারালো তলোয়ারের চেয়েও বেশি প্রাণঘাতী হতে পারে।

ওডিসিউস কালবিলম্ব না করে এক অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি জোড় করে তার সেই তিন সঙ্গীকে টেনেহিঁচড়ে জাহাজে নিয়ে আসেন। তারা বারবার ফিরে যাওয়ার জন্য কাঁদছিল এবং ধস্তাধস্তি করছিল, কিন্তু ওডিসিউস তাদের জাহাজের মাস্তুলের সাথে শক্ত করে বেঁধে রাখেন। এরপর তিনি বাকি সঙ্গীদের দ্রুত নোঙর তুলতে নির্দেশ দেন, যেন আর কেউ ওই জাদুকরী ফুলের স্বাদ নিতে না পারে। তিনি তার সঙ্গীদের সতর্ক করে দেন যে, কেউ যেন ভুল করেও লোটাসের স্বাদ গ্রহণ না করে। ওডিসিউসের এই পদক্ষেপ দেখায় যে, একজন সত্যিকারের নেতা কেবল শত্রুর হাত থেকেই তার অনুসারীদের বাঁচান না, বরং তাদের নিজেদের দুর্বলতা ও মোহ থেকেও রক্ষা করেন।

স্মৃতির বিজয় ও পরবর্তী যাত্রার প্রস্তুতি (Victory of Memory and Preparation for the Next Journey)

লোটাস-ভোজীদের দ্বীপ থেকে পালানোর দৃশ্যটি মহাকাব্যে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। ওডিসিউস যদি সেদিন একটু দুর্বলতা দেখাতেন বা ওই মোহময় পরিবেশে নিজেকে ভাসিয়ে দিতেন, তবে ট্রয়ের সেই কিংবদন্তি বীরের গল্প ওখানেই শেষ হয়ে যেত। তিনি এবং তার সঙ্গীরা লোটাস-ভোজীদের মতোই ইতিহাসের পাতা থেকে চিরতরে মুছে যেতেন। কিন্তু ওডিসিউস তা হতে দেননি। তিনি বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির জয় নিশ্চিত করেছেন। তার এই জয় শারীরিক কোনো যুদ্ধের জয় নয়; এটি ছিল মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও শেকড়ের প্রতি অটল আনুগত্যের জয়। মাস্তুলের সাথে বাঁধা সঙ্গীদের কান্না শুনতে শুনতে জাহাজের বাকি নাবিকরা দ্রুত পাল তুলে দেয় এবং সেই মায়াবী দ্বীপ পেছনে ফেলে আবার সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে (West, 2014)।

এই ঘটনাটি ওডিসিউসকে একটি বড় শিক্ষা দেয়। তিনি বুঝতে পারেন যে তাদের এই যাত্রা আর কোনো সাধারণ সমুদ্রযাত্রা নেই। তারা এখন এমন এক জগতে প্রবেশ করেছে, যেখানে বিপদ কেবল বাইরে থেকে আসে না, ভেতর থেকেও আসে। মানুষের নিজের লোভ, ক্লান্তি এবং শান্তি খোঁজার প্রবৃত্তিই অনেক সময় সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। সিকোনেসদের দ্বীপে তারা লোভের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, আর লোটাস-ভোজীদের দ্বীপে তারা প্রায় নিজেদের পরিচয় হারিয়ে ফেলেছিল। এই দুটি অভিজ্ঞতাই ওডিসিউসকে পরবর্তী বিপদের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তোলে। তিনি অনুধাবন করেন যে, এই সাগরে টিকে থাকতে হলে কেবল অস্ত্রের জোর দিয়ে হবে না, নিজের মনকে ইস্পাতের মতো শক্ত রাখতে হবে।

লোটাস-ভোজীদের দ্বীপ ছেড়ে যাওয়ার পর ওডিসিউসের নৌবহর যখন আরও গভীরে, আরও অজানা জলসীমার দিকে এগোতে থাকে, তখন জাহাজের ভেতরের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত থমথমে। সঙ্গীদের মনে তখনো সেই মায়াবী ফুলের স্বাদ নেওয়ার এক সুপ্ত বাসনা হয়তো লুকিয়ে ছিল, কিন্তু ক্যাপ্টেনের কঠোর আদেশের সামনে তারা অসহায়। ওডিসিউস জানতেন না যে সামনে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে। তবে তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, ইথাকায় ফেরার পথে তাদের আরও অনেক ভয়ংকর ও অচেনা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। লোটাসের মায়াজাল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসার এই মানসিক শক্তিই মূলত তাকে পরবর্তী দানবীয় বাধাগুলো অতিক্রম করার প্রেরণা জুগিয়েছিল।

পলিফেমাসের গুহা (Cave of Polyphemus): বুদ্ধি, অহংকার ও অভিশাপ

সাইক্লপসদের দ্বীপ এবং সভ্যতার অনুপস্থিতি (Island of the Cyclopes and the Absence of Civilization)

লোটাস-ভোজীদের মায়াবী দ্বীপ থেকে নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে পালিয়ে আসার পর ওডিসিউস (Odysseus) ও তার সঙ্গীরা সাগরের বুকে আবার দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন। বেশ কিছুদিন সাগরে ভাসার পর তারা একটি নতুন ভূখণ্ডের কাছাকাছি এসে পৌঁছান। এই ভূখণ্ডটি ছিল একটি বিশাল দ্বীপের অংশ, যার পরিবেশ বাইরে থেকে দেখতে অত্যন্ত সবুজ ও উর্বর মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক আদিম ও বন্য সমাজ। এই দ্বীপটি ছিল সাইক্লপস (Cyclopes)-দের বাসভূমি। গ্রিক পুরাণে সাইক্লপসরা হলো একচক্ষুবিশিষ্ট এক বিশাল দানব জাতি, যাদের কপালের ঠিক মাঝখানে একটিমাত্র বিশাল চোখ থাকে। তারা মূলত পসেইডন এবং বিভিন্ন অপদেবতার সন্তান। ওডিসিউস যখন তার জাহাজ নিয়ে এই দ্বীপের কাছাকাছি আসেন, তখন তিনি দেখতে পান যে দ্বীপটিতে কৃষিকাজ, আইন বা সমাজব্যবস্থা বলতে কিছুই নেই। সেখানে প্রকৃতির অকৃপণ দানে প্রচুর আঙুর, গম ও বার্লি জন্মায়, কিন্তু সাইক্লপসরা সেগুলো চাষ করে না; তারা কেবল প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে (Mondi, 1983)।

হোমার অত্যন্ত সুকৌশলে সাইক্লপসদের এই সমাজকে গ্রিক সভ্যতার সম্পূর্ণ বিপরীত একটি মেরুতে দাঁড় করিয়েছেন। প্রাচীন গ্রিক সমাজে মানুষের সভ্যতার মাপকাঠি ছিল কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়: আইন বা বিচারব্যবস্থা, কৃষিকাজ, জাহাজ নির্মাণ ও বাণিজ্য, এবং দেবতাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ বা আতিথেয়তার নিয়ম। সাইক্লপসদের মধ্যে এর একটিও উপস্থিত ছিল না। তাদের কোনো জনসভা বা এসেম্বলি নেই, যেখানে তারা নিজেদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে পারে। তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ গুহায় একা বাস করে এবং নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের ওপর স্বৈরাচারী শাসন চালায়। একে অপরের সাথে তাদের কোনো সামাজিক বন্ধন বা সম্পর্ক নেই। ওডিসিউস, যিনি একজন সভ্য সমাজের রাজা, তার কাছে এই ধরনের জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর ও একই সাথে কৌতূহলোদ্দীপক। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন যে এই দানবেরা আসলে কেমন আচরণ করে।

দ্বীপের মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার আগে ওডিসিউস তার নৌবহরকে একটি ছোট ও সুরক্ষিত পার্শ্ববর্তী দ্বীপে নোঙর করেন। এই ছোট দ্বীপটি ছিল বুনো ছাগলে পরিপূর্ণ, যেখানে মানুষ বা দানব কারও যাতায়াত ছিল না। গ্রিক নাবিকরা সেখানে নেমে প্রচুর ছাগল শিকার করে এবং পেটপুরে মাংস ও মদ খেয়ে তাদের ক্লান্তি দূর করে। পরদিন সকালে ওডিসিউস তার নিজের জাহাজের ১২ জন শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাকে বেছে নিয়ে মূল ভূখণ্ডে সাইক্লপসদের গুহার দিকে রওনা হন। তার মনে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না; তিনি কেবল জেনিয়ার নিয়ম অনুযায়ী এই দ্বীপের অধিবাসীদের সাথে পরিচিত হতে এবং তাদের কাছ থেকে কোনো উপহার বা সাহায্য পেতে চেয়েছিলেন। তার এই কৌতূহল এবং সভ্যতার অহংকারই মূলত তাকে ও তার সঙ্গীদের জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদের মুখে ঠেলে দেয়।

গুহায় প্রবেশ ও পলিফেমাসের নির্মমতা (Entering the Cave and the Cruelty of Polyphemus)

ওডিসিউস ও তার সঙ্গীরা যখন মূল ভূখণ্ডে নামেন, তখন তারা পাহাড়ের ঢালে একটি বিশাল গুহা দেখতে পান। গুহাটির প্রবেশপথটি ছিল বিশাল পাথরের ব্লক ও পাইন গাছের ডালপালা দিয়ে ঘেরা, যা দেখে মনে হচ্ছিল এটি কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির অধিকারীর বাসস্থান। ওডিসিউস সাহসে ভর করে তার সঙ্গীদের নিয়ে গুহার ভেতরে প্রবেশ করেন। গুহার ভেতরে তখন কেউ ছিল না, তবে সেখানে প্রচুর সম্পদ ছিল। বাঁশের খাঁচায় প্রচুর ভেড়া ও ছাগল রাখা ছিল, আর তাকের ওপর থরে থরে সাজানো ছিল পনিরের বিশাল সব চাকা এবং বালতি ভর্তি দুধ ও মাঠা। সঙ্গীরা ওডিসিউসকে অনুরোধ করে যে, এই পনির ও ভেড়াগুলো চুরি করে নিয়ে দ্রুত জাহাজে ফিরে যেতে। কিন্তু ওডিসিউস সেই প্রস্তাবে রাজি হননি। তিনি গুহার মালিকের সাথে দেখা করতে চেয়েছিলেন এবং আতিথেয়তার নিয়ম অনুযায়ী তার কাছ থেকে উপহার পাওয়ার আশা করছিলেন। তার এই জেদ ছিল গ্রিক অভিজাত বা অ্যারিস্টোক্রেসি (Aristocracy)-এর অহংকারের একটি প্রকাশ (Friedrich, 1987)।

সন্ধ্যার দিকে গুহার মালিক ফিরে আসে। তার নাম ছিল পলিফেমাস (Polyphemus), যে ছিল স্বয়ং সমুদ্রের দেবতা পসেইডনের সন্তান। পলিফেমাসের বিশাল আকার এবং বন্য রূপ দেখে গ্রিক নাবিকদের রক্ত হিম হয়ে যায়। সে গুহার ভেতরে ঢুকে একটি বিশাল পাথর দিয়ে গুহার মুখ বন্ধ করে দেয়। এই পাথরটি এতই ভারী ছিল যে, বাইশটি চার চাকার ঘোড়ার গাড়ি দিয়েও তা এক ইঞ্চি সরানো সম্ভব ছিল না। এরপর সে তার স্বাভাবিক কাজ, অর্থাৎ ভেড়া দোহনের কাজ শুরু করে। কাজ শেষ করার পর তার বিশাল একমাত্র চোখটি গিয়ে পড়ে গুহার এক কোণে লুকিয়ে থাকা ওডিসিউস ও তার সঙ্গীদের ওপর। সে অত্যন্ত কর্কশ গলায় তাদের পরিচয় জানতে চায়। ওডিসিউস অত্যন্ত সাহসের সাথে এগিয়ে এসে তাদের পরিচয় দেন এবং বলেন যে তারা ট্রয় থেকে ফিরে আসা গ্রিক বীর। এরপর তিনি পলিফেমাসকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, আতিথেয়তার নিয়ম বা জেনিয়ার রক্ষক স্বয়ং জিউস, তাই পলিফেমাসের উচিত তাদের সম্মানজনকভাবে গ্রহণ করা ও উপহার দেওয়া।

পলিফেমাসের উত্তর ছিল অত্যন্ত নির্মম ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ। সে সরাসরি ঘোষণা করে যে সাইক্লপসরা জিউস বা অলিম্পাসের কোনো দেবতাকে পরোয়া করে না, কারণ তারা দেবতাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এই কথা বলার সাথে সাথেই সে তার বিশাল হাত বাড়িয়ে ওডিসিউসের দুজন সঙ্গীকে ধরে ফেলে এবং কুকুরছানার মতো মাটিতে আছাড় মারে। তাদের মগজ ছিটকে মেঝের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর পলিফেমাস তাদের শরীর টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে কাঁচা মাংস, হাড় ও রক্ত চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। খাওয়ার পর সে প্রচুর দুধ পান করে এবং মেঝেতে শুয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমাতে শুরু করে। এই বীভৎস দৃশ্য দেখে ওডিসিউস ও তার সঙ্গীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। যে ওডিসিউস ট্রয়ের ময়দানে অগণিত মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন, তিনি এমন আদিম ও পাশবিক মৃত্যু দেখে পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যান। তিনি বুঝতে পারেন যে, সভ্যতার কোনো নিয়ম বা দেবতার ভয় এই দানবের ওপর কাজ করবে না।

মেটিস বা বুদ্ধির খেলা: কেউ নয় (The Play of Metis: Nobody)

পলিফেমাস ঘুমিয়ে পড়ার পর ওডিসিউস প্রথমে তার তলোয়ার বের করে দানবের বুকে আঘাত করার কথা ভাবেন। কিন্তু তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি বা মেটিস (Metis) তাকে সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক করে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, যদি তিনি পলিফেমাসকে মেরে ফেলেন, তবে গুহার মুখের সেই বিশাল পাথরটি সরানোর মতো শক্তি তাদের কারও নেই। ফলে তাদের সবাইকে ওই গুহার ভেতরেই তিলে তিলে না খেয়ে মরতে হবে। তাই তিনি রাগকে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং একটি বিকল্প কৌশলের কথা ভাবতে শুরু করেন। পরদিন সকালে পলিফেমাস ঘুম থেকে উঠে আরও দুজন গ্রিক নাবিককে আছাড় মেরে খেয়ে ফেলে এবং তার ভেড়ার পাল নিয়ে গুহা থেকে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার সময় সে আবার সেই বিশাল পাথর দিয়ে গুহার মুখ বন্ধ করে দিয়ে যায়। গুহায় আটকা পড়া অবস্থায় ওডিসিউস সারা দিন ধরে একটি নিখুঁত পালানোর পরিকল্পনা তৈরি করেন (Austin, 1975)।

গুহার ভেতরে পলিফেমাসের একটি বিশাল জলপাই কাঠের লাঠি পড়ে ছিল, যা দেখতে একটি জাহাজের মাস্তুলের মতো বড়। ওডিসিউস তার সঙ্গীদের নিয়ে সেই লাঠিটির একটি অংশ কেটে নেন এবং তার এক প্রান্ত চেঁছে অত্যন্ত ধারালো করেন। এরপর সেই ধারালো প্রান্তটি আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করে নেন এবং লাঠিটি গুহার আবর্জনার নিচে লুকিয়ে রাখেন। সন্ধ্যায় পলিফেমাস ফিরে এসে আরও দুজন নাবিককে খেয়ে ফেলে। তখন ওডিসিউস তার পরিকল্পনার দ্বিতীয় অংশটি শুরু করেন। তিনি এগিয়ে গিয়ে সেই ম্যারনের দেওয়া কড়া মদের একটি বিশাল বাটি পলিফেমাসকে অফার করেন। সাইক্লপসরা মদ তৈরিতে অভ্যস্ত ছিল না, তাই এই কড়া মদ খাওয়ার পর পলিফেমাস অত্যন্ত আনন্দিত হয়। সে আরও মদ চায় এবং তিন বাটি মদ খাওয়ার পর সে পুরোপুরি মাতাল হয়ে পড়ে।

মাতাল অবস্থায় পলিফেমাস ওডিসিউসের নাম জানতে চায় এবং প্রতিজ্ঞা করে যে নাম বললে সে তাকে একটি বিশেষ উপহার দেবে। ওডিসিউস অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এবং চতুরতার সাথে বলেন যে তার নাম হলো ‘কেউ নয়’ বা গ্রিক ভাষায় আউটিস (Outis)। পলিফেমাস এই অদ্ভুত নামটি শুনে হো হো করে হেসে ওঠে এবং তার সেই প্রতিশ্রুত উপহারের কথা জানায়। সে বলে, “কেউ নয়, আমি তোমাকে সবার শেষে খাব, তোমার সঙ্গীদের খাওয়ার পর। এটাই তোমার উপহার।” এই কথা বলতে বলতেই পলিফেমাস মাতাল হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে এবং গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ওডিসিউসের এই ‘কেউ নয়’ নামটি কেবল একটি মিথ্যা পরিচয় ছিল না, এটি ছিল মহাকাব্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি ভাষাতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। তিনি জানতেন যে দানবকে পরাস্ত করার জন্য তলোয়ারের চেয়ে মগজের জোর অনেক বেশি প্রয়োজন, আর এই মিথ্যা নামটি ছিল সেই মগজের লড়াইয়ের চূড়ান্ত অস্ত্র।

অন্ধকরণ ও পলায়নের কৌশল (Blinding and the Strategy of Escape)

পলিফেমাস গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ার পর ওডিসিউস তার সঙ্গীদের ইশারা করেন। তারা দ্রুত সেই লুকিয়ে রাখা লাঠিটি বের করে আনে এবং এর ধারালো প্রান্তটি আগুনের মধ্যে ঢুকিয়ে লাল টুকটুকে গরম করে তোলে। এরপর ওডিসিউস ও তার চারজন শক্তিশালী সঙ্গী মিলে সেই গনগনে লাঠিটি পলিফেমাসের একমাত্র বিশাল চোখের ঠিক মাঝখানে সজোরে ঢুকিয়ে দেন। হোমার এই অন্ধকরণের দৃশ্যটি অত্যন্ত নিখুঁত ও ভয়ানকভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি তুলনা করেছেন একজন কামারের সাথে, যে একটি গরম কুঠারকে ঠান্ডা জলে চুবিয়ে দেয় এবং তখন যে হিসহিস শব্দ হয়, পলিফেমাসের চোখ পোড়ার সময় ঠিক তেমন শব্দ হচ্ছিল। লাঠিটি ঘোরানোর সময় পলিফেমাসের চোখের মণি, ভ্রু এবং রক্তনালীগুলো পুরোপুরি পুড়ে ছাই হয়ে যায় (Dimock, 1989)।

তীব্র যন্ত্রণায় পলিফেমাস এক বিকট চিৎকার করে ওঠে এবং তার চোখ থেকে সেই রক্তমাখা লাঠিটি টেনে বের করে ছুড়ে ফেলে। তার চিৎকারে চারপাশের পাহাড় কেঁপে ওঠে এবং আশেপাশের গুহাগুলো থেকে অন্যান্য সাইক্লপসরা ছুটে আসে। তারা পলিফেমাসের গুহার বাইরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে যে কে তাকে এমন কষ্ট দিচ্ছে বা কে তার সম্পদ চুরি করছে। ভেতর থেকে পলিফেমাস চিৎকার করে বলে, “‘কেউ নয়’ আমাকে মারছে! ‘কেউ নয়’ আমাকে ধোঁকা দিচ্ছে!” এই কথা শুনে বাইরের সাইক্লপসরা মনে করে যে পলিফেমাস হয়তো কোনো রোগে আক্রান্ত হয়েছে বা দেবতারা তাকে শাস্তি দিচ্ছে। তারা বলে যে, যদি কেউ তাকে আক্রমণ না করে থাকে, তবে তাদের কিছুই করার নেই। এই বলে তারা যার যার গুহায় ফিরে যায়। ওডিসিউসের সেই ‘কেউ নয়’ বা আউটিস কৌশলটি এভাবেই পুরোপুরি সফল হয়।

পরদিন সকালে অন্ধ পলিফেমাস তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে গুহার মুখের পাথরটি সরিয়ে বসে থাকে, যাতে ভেড়াগুলো চড়তে বাইরে যেতে পারে। সে তার দুই হাত প্রসারিত করে রাখে, যাতে ভেড়ার বদলে কোনো মানুষ বেরিয়ে যেতে না পারে। কিন্তু ওডিসিউস এর জন্যও একটি কৌশল বের করে রেখেছিলেন। তিনি গুহার বড় বড় ভেড়াগুলোকে তিনটি করে একেকটি দলে ভাগ করেন এবং প্রতিটি দলের মাঝখানের ভেড়ার পেটের নিচে একজন করে সঙ্গীকে লতা দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেন। তিনি নিজে গুহার সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী পুরুষ ভেড়াটির পেটের নিচে পশম আঁকড়ে ধরে ঝুলে থাকেন। ভেড়াগুলো যখন একে একে গুহা থেকে বের হচ্ছিল, তখন পলিফেমাস তাদের পিঠে হাত বুলিয়ে পরীক্ষা করছিল, কিন্তু সে বুঝতে পারেনি যে তার শত্রুরা ভেড়ার পেটের নিচে লুকিয়ে আছে। এভাবেই ওডিসিউসের ক্ষুরধার বুদ্ধির কাছে দানবের বিশাল শারীরিক শক্তি পুরোপুরি পরাস্ত হয় এবং তারা নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পায়।

ওডিসিউসের অহংকার বা হিউব্রিস (Pride or Hubris of Odysseus)

গুহা থেকে বের হওয়ার পর ওডিসিউস ও তার সঙ্গীরা দ্রুত ভেড়াগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে নিজেদের জাহাজের দিকে ছুটে যান। তারা জাহাজে উঠে দ্রুত নোঙর তোলেন এবং নিরাপদ দূরত্বে যাওয়ার জন্য পাল ওড়ান। কিন্তু জাহাজ যখন তীর থেকে কিছুটা দূরে, তখন ওডিসিউসের ভেতরের সেই পুরোনো গ্রিক অহংকার বা হিউব্রিস (Hubris) মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তিনি কেবল চুপচাপ পালিয়ে যাওয়ায় সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি চেয়েছিলেন পলিফেমাস জানুক যে কে তাকে অন্ধ করেছে। তিনি জাহাজের ডেক থেকে চিৎকার করে পলিফেমাসকে উদ্দেশ্য করে বলতে শুরু করেন যে, জিউস ও অন্যান্য দেবতারা তাকে তার আতিথেয়তার নিয়ম ভঙ্গের উপযুক্ত শাস্তি দিয়েছেন। এই চিৎকার শুনে পলিফেমাস রাগে অন্ধের মতো পাহাড়ের একটি বিশাল চুড়া ভেঙে সাগরের দিকে ছুড়ে মারে। পাথরটি জাহাজের ঠিক সামনে এসে পড়ে এবং এর ফলে সৃষ্ট বিশাল ঢেউ জাহাজটিকে আবার তীরের দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় (Pucci, 1987)।

সঙ্গীরা প্রাণপণে দাঁড় টেনে জাহাজটিকে আবার সাগরের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তারা বারবার ওডিসিউসকে অনুরোধ করে যেন তিনি আর দানবকে রাগিয়ে না তোলেন। তারা বুঝতে পারছিল যে তাদের ক্যাপ্টেনের এই অহংকার তাদের সবার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। কিন্তু ওডিসিউস কারও কথা শোনেননি। তার কাছে তার নিজের নাম ও খ্যাতি বা ক্লিওস প্রতিষ্ঠা করা জীবনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জাহাজ যখন আবার নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছায়, তখন ওডিসিউস তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করেন। তিনি চিৎকার করে নিজের আসল পরিচয় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “হে সাইক্লপস, যদি কোনো মরণশীল মানুষ তোমাকে জিজ্ঞেস করে কে তোমার চোখ অন্ধ করেছে, তবে তাকে বোলো যে এটি করেছে নগর ধ্বংসকারী ওডিসিউস, লায়ার্তেসের পুত্র, যার বাড়ি ইথাকায়।”

ওডিসিউসের এই পরিচয় প্রকাশ কোনো সাধারণ বোকামি ছিল না; এটি ছিল গ্রিক বীরদের মানসিকতার একটি চরম প্রতিফলন। তারা বিশ্বাস করত যে, যদি শত্রু জানতে না পারে কে তাকে পরাজিত করেছে, তবে সেই বিজয়ের কোনো মূল্য নেই। ‘কেউ নয়’ হিসেবে দানবকে পরাস্ত করে ওডিসিউস হয়তো তার বুদ্ধি দেখায়ছিলেন, কিন্তু এতে তার নামের কোনো গৌরব বাড়েনি। তাই তিনি তার আসল নাম প্রকাশ করে মূলত তার বীরত্বকে অমর করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, পলিফেমাস কোনো সাধারণ দানব নয়, সে সমুদ্রের দেবতা পসেইডনের সন্তান। ওডিসিউসের এই একটিমাত্র অহংকারী মুহূর্ত তার পরবর্তী জীবনের সমস্ত দুর্দশার পথ প্রশস্ত করে দেয়।

পলিফেমাসের অভিশাপ ও পসেইডনের রোষ (Curse of Polyphemus and the Wrath of Poseidon)

ওডিসিউসের মুখ থেকে তার আসল নাম ও ইথাকার ঠিকানা শোনার পর পলিফেমাস হঠাৎ শান্ত হয়ে যায়। সে একটি প্রাচীন ভবিষ্যদ্বাণীর কথা স্মরণ করে। টেলেমাস নামের এক ভবিষ্যদ্বক্তা তাকে আগেই সতর্ক করেছিল যে একদিন ওডিসিউস নামের এক মানুষের হাতে সে তার দৃষ্টি হারাবে। পলিফেমাস ভেবেছিল যে ওডিসিউস হয়তো তার মতোই কোনো বিশাল দানব হবে। কিন্তু একটি সামান্য, ক্ষুদ্র মরণশীল মানুষের হাতে এমনভাবে পরাস্ত হওয়া তার কাছে চরম অপমানের মনে হয়। রাগে ও ক্ষোভে সে দুই হাত আকাশের দিকে তুলে তার পিতা পসেইডনের উদ্দেশ্যে এক ভয়ংকর অভিশাপ দেয়, যা গ্রিক মহাকাব্যে অভিশাপ (Ara) হিসেবে পরিচিত। এই অভিশাপটি ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং ভয়ংকর (Louden, 1999)।

পলিফেমাস প্রার্থনা করে, “হে পৃথিবী-কম্পনকারী পসেইডন, যদি আমি সত্যিই তোমার পুত্র হই, তবে নগর ধ্বংসকারী ওডিসিউস যেন কখনো তার বাড়ি ইথাকায় ফিরতে না পারে। আর নিয়তি যদি তার ফেরা নির্ধারণ করেই থাকে, তবে সে যেন ফেরে অনেক দেরিতে, সীমাহীন কষ্ট ভোগ করে, তার সমস্ত সঙ্গীদের হারিয়ে, অন্য কারও জাহাজে চড়ে এবং ফিরে গিয়ে যেন সে তার নিজের বাড়িতে কেবল অনাচার দেখতে পায়।” পলিফেমাসের এই অভিশাপটি অলিম্পাসে পসেইডনের কান পর্যন্ত পৌঁছায় এবং তিনি তার পুত্রের এই প্রার্থনা গ্রহণ করেন। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই ওডিসিউসের সমুদ্রযাত্রার চরিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। এতদিন তারা হয়তো দিকভ্রান্ত হয়ে ঘুরছিল, কিন্তু এখন স্বয়ং সাগরের দেবতা তাদের ধ্বংস করার জন্য ওত পেতে রইলেন।

ওডিসিউসের বুদ্ধি তাকে সাইক্লপসের গুহা থেকে বাঁচিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তার অহংকার তাকে এক অন্তহীন বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। পলিফেমাসের গুহার এই ঘটনাটি পুরো মহাকাব্যের একটি অন্যতম প্রধান টার্নিং পয়েন্ট। এখান থেকেই ওডিসিউসের যাত্রায় ঐশ্বরিক রোষ সরাসরি যুক্ত হয়। তিনি যদি নিজের নাম গোপন করে কেবল ‘কেউ নয়’ হিসেবেই পালিয়ে যেতেন, তবে হয়তো তার সঙ্গীদের প্রাণ হারাতে হতো না এবং তাকেও দশ বছর ধরে সাগরের বুকে ভাসতে হতো না। মানুষের বুদ্ধি তাকে যত বড় বিপদ থেকেই উদ্ধার করুক না কেন, তার নিজস্ব অহংকারই অনেক সময় তার সবচেয়ে বড় পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পলিফেমাসের এই অভিশাপের বোঝা কাঁধে নিয়েই ওডিসিউসের নৌবহর আবার অজানা সাগরের দিকে পাড়ি জমায়, যেখানে তাদের জন্য আরও ভয়ংকর সব দানব অপেক্ষা করছিল।

আইওলাস ও বায়ুর থলে (Aeolus and the Bag of Winds): স্বদেশের কাছে ব্যর্থতা

ভাসমান দ্বীপ আইওলিয়া এবং বায়ুর অধিপতি (Floating Island of Aeolia and the Keeper of the Winds)

সাইক্লপস পলিফেমাসের গুহা থেকে জীবন বাঁচিয়ে পালানোর পর, ওডিসিউস (Odysseus) ও তার সঙ্গীরা যখন আবার সাগরের বুকে যাত্রা শুরু করেন, তখন তাদের মনে চরম হতাশা আর অনিশ্চয়তা। পলিফেমাসের দেওয়া অভিশাপ তখনো তাদের কানে বাজছিল। বেশ কয়েক দিন সাগরে ভেসে থাকার পর তারা এক অদ্ভুত ভূখণ্ডের দেখা পান। এটি ছিল আইওলিয়া (Aeolia) নামের এক ভাসমান দ্বীপ। দ্বীপটির চারপাশ ঘিরে ছিল এক নিরেট ব্রোঞ্জের অভেদ্য প্রাচীর, আর সেই প্রাচীরের নিচে সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ে এক ভয়ংকর শব্দ তৈরি করত। এই দ্বীপের অধিবাসী ছিলেন আইওলাস (Aeolus), যাকে অলিম্পাসের রাজা জিউস সমস্ত বাতাসের নিয়ন্ত্রক বা অধিপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আইওলাসের ক্ষমতা ছিল যেকোনো বাতাসকে নিজের ইচ্ছামতো আটকে রাখা বা বইতে দেওয়া। প্রাচীন গ্রিক পুরাণে আইওলাসকে কোনো নির্দিষ্ট দেবতা হিসেবে দেখানো হয়নি, বরং তিনি ছিলেন দেবতাদের বিশেষ আনুকূল্য পাওয়া একজন ক্ষমতাধর মরণশীল মানুষ (Heubeck & Hoekstra, 1989)।

আইওলাসের পরিবার এবং সমাজব্যবস্থা ছিল সাইক্লপসদের সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি তার স্ত্রী, ছয় ছেলে ও ছয় মেয়েকে নিয়ে এক অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন। তার প্রাসাদে সবসময় ভোজের আয়োজন থাকত, বাতাস সবসময় সুগন্ধে ভরে থাকত, আর পরিবারের সবাই মিলে এক শান্ত ও ঐশ্বর্যশালী ইউটোপিয়ান জীবন কাটাত। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আইওলাস তার নিজের ছেলেদের সাথেই নিজের মেয়েদের বিয়ে দিয়েছিলেন। প্রাচীন গ্রিক সমাজে এই ধরনের ইনসেস্ট বা অজাচার নিষিদ্ধ থাকলেও, আইওলাসের মতো কিছু বিচ্ছিন্ন ও পৌরাণিক চরিত্রে এটি এক ধরনের পবিত্র বা ঐশ্বরিক রক্তের বিশুদ্ধতা বজায় রাখার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ওডিসিউস যখন তার সঙ্গীদের নিয়ে এই ভাসমান দ্বীপে এসে পৌঁছান, তখন আইওলাস তাদের অত্যন্ত সাদরে গ্রহণ করেন এবং তাদের আতিথেয়তার কোনো ত্রুটি রাখেননি।

আইওলাস ওডিসিউসকে টানা এক মাস তার প্রাসাদে অতিথি হিসেবে রেখে দেন। এই এক মাস ধরে আইওলাস অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে ট্রয়যুদ্ধের গল্প, গ্রিক বীরদের বীরত্বগাথা এবং গ্রিক জাহাজগুলোর দেশে ফেরার কাহিনী শোনেন। দীর্ঘ এক মাস পর ওডিসিউস যখন নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তখন আইওলাস তাকে কোনো বাধা দেননি। বরং তিনি ওডিসিউসকে এমন একটি উপহার দেন, যা পৃথিবীর অন্য কোনো মানুষের পক্ষে দেওয়া সম্ভব ছিল না। আইওলাস একটি বিশাল নয় বছর বয়সী ষাঁড়ের চামড়া দিয়ে একটি শক্ত থলে তৈরি করেন। তিনি সেই থলের ভেতরে পৃথিবীর সমস্ত প্রতিকূল ও ঝোড়ো বাতাসকে বন্দী করে ফেলেন। এরপর তিনি একটি রুপার তার দিয়ে সেই থলেটি ওডিসিউসের জাহাজে শক্ত করে বেঁধে দেন, যাতে একবিন্দু বাতাসও সেখান থেকে লিক করতে না পারে। আইওলাস কেবল পশ্চিমের বাতাস বা জেফাইরাস (Zephyrus)-কে মুক্ত রাখেন, কারণ এই বাতাসটি সরাসরি ইথাকার দিকে বইত।

ইথাকার সীমানায় ওডিসিউসের ঘুম (Odysseus’s Sleep at the Borders of Ithaca)

আইওলাসের দেওয়া এই অমূল্য উপহার নিয়ে ওডিসিউসের নৌবহর যখন আইওলিয়া দ্বীপ ছাড়ে, তখন সবার মনেই এক চরম আনন্দ আর স্বস্তি বিরাজ করছিল। পশ্চিমের শান্ত ও অনুকূল বাতাস তাদের জাহাজগুলোকে সরাসরি ইথাকার দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল। ওডিসিউস এতটাই মরিয়া ছিলেন যে তিনি টানা নয় দিন ও নয় রাত জাহাজের হাল একা নিজের হাতে ধরে রেখেছিলেন। তিনি তার কোনো সঙ্গীকে হাল ধরার দায়িত্ব দেননি, কারণ তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে একটু এদিক-ওদিক হলেই হয়তো জাহাজ পথ হারিয়ে ফেলবে। এই নয় দিনের নির্ঘুম যাত্রা ছিল ওডিসিউসের অসীম সহ্যক্ষমতা ও বাড়ি ফেরার তীব্র আকাঙ্ক্ষার এক চরম নিদর্শন। তার চোখ দিয়ে ঘুম বা ক্লান্তি যেন পুরোপুরি উধাও হয়ে গিয়েছিল (Katz, 1991)।

দশম দিনে অবশেষে দিগন্তে ইথাকার চেনা উপকূল রেখা ভেসে ওঠে। তারা এতটাই কাছাকাছি চলে এসেছিলেন যে, জাহাজ থেকে ইথাকার উপকূলে জ্বলতে থাকা আগুনের কুণ্ডলী এবং মানুষদের চলাচল স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল। দীর্ঘ দশ বছরের যুদ্ধ এবং সাগরের বুকে সীমাহীন কষ্টের পর নিজের জন্মভূমির মাটি চোখের সামনে দেখতে পাওয়ার অনুভূতি যেকোনো মানুষের জন্যই এক অবর্ণনীয় আনন্দের মুহূর্ত। ঠিক এই মুহূর্তে এসে ওডিসিউস তার সবচেয়ে বড় ভুলটি করেন। তিনি ভাবেন যে বিপদ এবার পুরোপুরি কেটে গেছে। ইথাকার এত কাছে এসে তিনি আর নিজের চোখ খোলা রাখতে পারেন না। দীর্ঘ নয় দিনের জমাট বাঁধা ক্লান্তি আর নির্ঘুমতা তাকে গ্রাস করে নেয়। তিনি জাহাজের ডেকের ওপরেই এক গভীর ঘুমে ঢলে পড়েন।

ওডিসিউসের এই ঘুম কোনো সাধারণ ক্লান্তি থেকে আসা ঘুম ছিল না। গ্রিক মহাকাব্যে এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নায়কের ঘুমিয়ে পড়ার ঘটনাকে অনেক সময় দেবতাদের একটি সূক্ষ্ম হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়। পসেইডনের রোষ এবং পলিফেমাসের অভিশাপ তখনো ওডিসিউসের নিয়তির ওপর ছায়া ফেলে রেখেছিল। ওডিসিউসের এই ঘুম মূলত তার অনুসারীদের ভেতরের অন্ধকার দিকটি উন্মোচন করার একটি সুযোগ তৈরি করে দেয়। যে মানুষটি তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি দিয়ে সাইক্লপসকে হারিয়েছে, সে তার নিজের দেশের সীমানায় এসে কেবল একটু বিশ্রামের অভাবে তার সারা জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়। এই ঘুম দেখায় যে মানুষ যতই শক্তিশালী বা বুদ্ধিমান হোক না কেন, তার শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাকে যেকোনো সময় চরম বিপদে ফেলতে পারে।

সঙ্গীদের সন্দেহ, লোভ ও থলে উন্মোচন (Suspicion of the Crew, Greed and Opening of the Bag)

ওডিসিউস ঘুমে ঢলে পড়ার পরপরই জাহাজের নাবিকদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়। তারা দেখতে পাচ্ছিল যে ইথাকা চলে এসেছে, কিন্তু তাদের মনে তখনো আইওলাসের দেওয়া সেই চামড়ার থলেটি নিয়ে প্রচণ্ড কৌতূহল ছিল। তারা ভাবতে শুরু করে যে আইওলাস নিশ্চয়ই ওডিসিউসকে প্রচুর সোনা, রুপা ও দামি রত্ন ওই থলেতে ভরে দিয়েছেন। তাদের মনে এক তীব্র ক্ষোভ ও ঈর্ষা কাজ করতে থাকে। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে যে, তারাও তো ট্রয়ের যুদ্ধে সমানভাবে লড়াই করেছে, সাগরের সমান কষ্ট সহ্য করেছে, কিন্তু তারা দেশে ফিরছে খালি হাতে। আর তাদের ক্যাপ্টেন ওডিসিউস ট্রয়ের লুণ্ঠিত সম্পদের পাশাপাশি এখন আইওলাসের কাছ থেকেও বিপুল ধনসম্পদ নিয়ে ফিরছেন (Dougherty, 2001)।

এই ক্ষোভ ও লোভ নাবিকদের হিতাহিত জ্ঞান পুরোপুরি লোপ করে দেয়। তারা ভুলে যায় যে ওডিসিউস তাদের কত বিপদ থেকে বাঁচিয়েছেন। তারা ভুলে যায় যে ওই থলেটি খোলার ব্যাপারে তাদের কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছিল। তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে থলেতে কী আছে তা তাদের দেখতে হবে এবং সেই সম্পদের একটি ভাগ তাদেরও প্রাপ্য। তারা চুপিচুপি থলের কাছে যায় এবং রুপার তারটি খুলে ফেলে। তাদের ধারণা ছিল যে ভেতরে হয়তো চকচকে স্বর্ণমুদ্রা থাকবে। কিন্তু থলের মুখ খোলার সাথে সাথেই এক ভয়ংকর বিপত্তি ঘটে। থলের ভেতরে বন্দী থাকা সমস্ত প্রতিকূল ও ঝোড়ো বাতাস একসাথে বিকট শব্দে মুক্ত হয়ে যায়।

বাতাসগুলো মুক্ত হওয়ার সাথে সাথে সাগরের বুকে এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের সৃষ্টি হয়। বাতাসগুলো প্রবল বেগে জাহাজগুলোকে ধাক্কা মেরে ইথাকার উপকূল থেকে দূরে ঠেলে নিয়ে যেতে শুরু করে। যে ইথাকা একটু আগেও তাদের হাতের নাগালে ছিল, তা মুহূর্তের মধ্যে চোখের আড়ালে চলে যায়। নাবিকরা তাদের ভুলের ভয়াবহতা বুঝতে পেরে কান্নায় ভেঙে পড়ে, কিন্তু তখন আর করার কিছুই ছিল না। এই ঘটনাটি হোমারের মহাকাব্যে মানুষের লোভ ও অবিশ্বাসের এক অত্যন্ত শক্তিশালী রূপক। ওডিসিউস তার সঙ্গীদের সাথে হয়তো সবকিছু শেয়ার করেছিলেন, কিন্তু তিনি তাদের ওই থলের আসল রহস্যটি জানাননি। এই তথ্যের ঘাটতি বা কমিউনিকেশন গ্যাপ (Communication Gap)-ই মূলত সঙ্গীদের মনে সন্দেহের বীজ বপন করেছিল। নেতার প্রতি অনুসারীদের আস্থার অভাব কীভাবে একটি সুনিশ্চিত বিজয়কে চরম পরাজয়ে রূপ দিতে পারে, এই ঘটনা তার এক নিখুঁত উদাহরণ।

ওডিসিউসের জাগরণ ও আত্মহত্যার চিন্তা (Awakening of Odysseus and Thoughts of Suicide)

বাতাসের ভয়ংকর গর্জনে ওডিসিউসের ঘুম ভেঙে যায়। তিনি লাফিয়ে উঠে দেখেন যে তার জাহাজ ইথাকার উপকূল থেকে দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে এবং তার সঙ্গীরা ভয়ে কুঁকড়ে কাঁদছে। থলের মুখ খোলা দেখে তার বুঝতে এক মুহূর্তও দেরি হয় না যে কী সর্বনাশা ঘটনা ঘটে গেছে। এই মুহূর্তে ওডিসিউসের মনের ভেতর দিয়ে যে প্রচণ্ড হতাশা ও যন্ত্রণার স্রোত বয়ে যায়, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ট্রয়যুদ্ধের দশ বছর এবং সাগরের বুকে সীমাহীন কষ্টের পর নিজের দেশের মাটি ছুঁতে গিয়েও ছুঁতে না পারার এই ব্যর্থতা তাকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন যে, সাইক্লপস বা দেবতাদের চেয়েও তার নিজের সঙ্গীদের লোভ তার জন্য বেশি ভয়ংকর প্রমাণিত হয়েছে (Clay, 1983)।

এই চরম হতাশার মুহূর্তে ওডিসিউসের মনে আত্মহত্যার চিন্তা উদয় হয়। তিনি ভাবেন যে এই ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই। তিনি জাহাজের ডেক থেকে উত্তাল সাগরের জলে ঝাঁপ দিয়ে সব যন্ত্রণার অবসান ঘটানোর কথা চিন্তা করেন। গ্রিক মহাকাব্যের নায়কদের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা খুব একটা দেখা যায় না। তারা সাধারণত রণভূমিতে বীরের মতো মৃত্যু কামনা করে। কিন্তু ওডিসিউসের এই মুহূর্তের হতাশা এতটাই গভীর ছিল যে তিনি তার সমস্ত ক্লিওস বা খ্যাতির আশা জলাঞ্জলি দিতে প্রস্তুত ছিলেন। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত নিজেকে সামলে নেন। তিনি বুঝতে পারেন যে আত্মহত্যা কোনো বীরের কাজ হতে পারে না।

ওডিসিউস তার চাদর দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলেন এবং জাহাজের পাটাতনে শুয়ে পড়েন। তিনি আর কোনো কথা বলেন না, কোনো নির্দেশ দেন না, বা তার সঙ্গীদের কোনো তিরস্কারও করেন না। তার এই নীরবতা ছিল তার সঙ্গীদের অবাধ্যতার প্রতি এক চরম ধিক্কার। তিনি তার নিয়তিকে মেনে নেন এবং ঝড়ের তাণ্ডবে জাহাজটিকে তার নিজের গতিতে ভাসতে দেন। এই ঘটনাটি দেখায় যে, মানুষের মানসিক শক্তি অনেক সময় শারীরিক শক্তির চেয়েও দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায়। ইথাকার এত কাছে এসে ফিরে যাওয়ার এই ট্রমা ওডিসিউসকে পরবর্তী দীর্ঘ সময়ের জন্য এক ধরনের মানসিক স্থবিরতার মধ্যে ফেলে দেয়।

আইওলিয়া দ্বীপে প্রত্যাবর্তন ও প্রত্যাখ্যান (Return to Aeolia and the Rejection)

মুক্ত বাতাসগুলো জাহাজগুলোকে প্রবল বেগে ভাসিয়ে নিয়ে আবার সেই ভাসমান দ্বীপ আইওলিয়ায় আছড়ে ফেলে। এটি ছিল নিয়তির এক চরম উপহাস। যেখান থেকে তারা এক মাস আগে বুকভরা আশা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, সেখানে তারা ফিরে আসে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও হতাশ হয়ে। সঙ্গীরা বুঝতে পারে যে তারা কী ভয়ংকর ভুল করেছে। তারা চুপচাপ সৈকতে নেমে আসে এবং অত্যন্ত অপরাধবোধ নিয়ে খাবার খায়। খাওয়া শেষ হওয়ার পর ওডিসিউস তার একজন বার্তাবাহক ও একজন সঙ্গীকে নিয়ে আবার আইওলাসের প্রাসাদের দিকে রওনা হন। তার আশা ছিল যে আইওলাস হয়তো তাদের এই দুর্দশা দেখে করুণা করবেন এবং আবার তাদের সাহায্য করবেন (Stanford, 1963)।

আইওলাসের প্রাসাদে পৌঁছে ওডিসিউস দেখেন যে তারা আগের মতোই ভোজসভায় ব্যস্ত। ওডিসিউস অত্যন্ত বিনীতভাবে দরজার কাছে গিয়ে বসেন। আইওলাস ও তার পরিবারের লোকজন ওডিসিউসকে এভাবে ফিরে আসতে দেখে অত্যন্ত বিস্মিত হন। তারা প্রশ্ন করেন, “ওডিসিউস, তোমার কী হয়েছে? কোন অশুভ দেবতা তোমার পিছু নিয়েছে? আমরা তো তোমাকে তোমার দেশে পৌঁছানোর সব ব্যবস্থাই করে দিয়েছিলাম।” ওডিসিউস তখন অত্যন্ত করুন স্বরে তার সঙ্গীদের লোভ ও নিজের দুর্ভাগ্যজনক ঘুমের কথা বর্ণনা করেন। তিনি আইওলাসের কাছে মিনতি করেন তাদের আবারও সাহায্য করার জন্য। তিনি বলেন যে, আইওলাসের পক্ষে তাদের আবার সঠিক বাতাস দেওয়া মোটেও কঠিন কোনো কাজ নয়।

কিন্তু আইওলাসের প্রতিক্রিয়া ছিল ওডিসিউসের আশার সম্পূর্ণ বিপরীত। আইওলাস হঠাৎ করে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন। তিনি চিৎকার করে ওডিসিউসকে তার প্রাসাদ এবং দ্বীপ থেকে এখনই বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। আইওলাসের যুক্তি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও ভয়ংকর। তিনি বলেন, “যে মানুষকে দেবতারা এত বেশি ঘৃণা করে, তাকে সাহায্য করার কোনো অধিকার আমার নেই। তুমি এখনই এই দ্বীপ থেকে দূর হয়ে যাও, কারণ তুমি দেবতাদের অভিশপ্ত।” আইওলাসের এই প্রত্যাখ্যান ওডিসিউসের জন্য ছিল একটি বড় ধাক্কা। তিনি বুঝতে পারেন যে পলিফেমাসের সেই অভিশাপ এখন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। দেবতাদের আনুকূল্য ছাড়া পৃথিবীর কোনো শক্তিশালী মানুষ বা রাজাও তাকে সাহায্য করতে পারবে না।

স্বদেশের কাছে ব্যর্থতার দার্শনিক তাৎপর্য (Philosophical Significance of Failure near the Homeland)

আইওলাসের প্রাসাদ থেকে মাথা নিচু করে ফিরে আসার পর ওডিসিউস তার সঙ্গীদের দ্রুত নোঙর তোলার নির্দেশ দেন। এবার আর তাদের সাথে কোনো অনুকূল বাতাস ছিল না। তাদের নিজেদের হাতে দাঁড় টেনে জাহাজ এগোতে হচ্ছিল। এই হাড়ভাঙা খাটুনি সঙ্গীদের মনে চরম ক্লান্তি ও হতাশা এনে দেয়। আইওলাস ও বায়ুর থলের এই পর্বটি হোমারের মহাকাব্যে অত্যন্ত গভীর একটি দার্শনিক তাৎপর্য বহন করে। এটি দেখায় যে মানুষের ভাগ্য কতটা পরিবর্তনশীল হতে পারে এবং কীভাবে একটি ছোট ভুল বা মুহূর্তের অসতর্কতা জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগকে নষ্ট করে দিতে পারে (Murnaghan, 1987)।

এই ঘটনাটি একই সাথে মানুষের লোভ ও অবিশ্বাসের একটি নির্মম সমালোচনা। নাবিকরা যদি তাদের ক্যাপ্টেনের ওপর বিশ্বাস রাখত এবং তাদের লোভকে সংযত করতে পারত, তবে তারা অনেক আগেই ইথাকায় ফিরে যেতে পারত। গ্রিক দর্শনে এই ধরনের সীমালঙ্ঘনকে বলা হয় অহংকার (Hubris), আর এই হিউব্রিসের শাস্তি হিসেবেই তাদের এই দুর্দশা ভোগ করতে হয়। অন্যদিকে, ওডিসিউসের ক্ষেত্রে এই ঘটনাটি তার নেতৃত্বের একটি চরম ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হয়। একজন ভালো নেতার উচিত তার অনুসারীদের সাথে স্বচ্ছ যোগাযোগ বজায় রাখা। তিনি যদি থলের ভেতরের রহস্যটি সঙ্গীদের আগেই বুঝিয়ে বলতেন, তবে হয়তো এই অবিশ্বাস জন্ম নিত না।

পরিশেষে, স্বদেশের এত কাছে এসে ফিরে যাওয়ার এই আখ্যানটি দেখায় যে, মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করা কখনোই সহজ নয়। যতক্ষণ না মানুষ তার গন্তব্যে পৌঁছায়, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়। ওডিসিউসের এই ব্যর্থতা তাকে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। তিনি অনুধাবন করেন যে, কেবল বুদ্ধি বা সাহস দিয়ে সব জয় করা যায় না; অনেক সময় নিয়তি এবং সঙ্গীদের আচরণের কাছে মানুষকে পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়তে হয়। এই চরম ব্যর্থতা ও হতাশা নিয়েই ওডিসিউসের নৌবহর সাগরের বুকে আবার এক অজানা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যায়, যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল লেস্ট্রিগোনীয়দের মতো এক ভয়ংকর ও রক্তপিপাসু দানব জাতি।

লেস্ট্রিগোনীয়দের আক্রমণ (Attack of the Laestrygonians): নৌবহরের ধ্বংস

টেলিপাইলাস নগরী ও রহস্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশ (City of Telepylus and the Mysterious Natural Environment)

আইওলাসের ভাসমান দ্বীপ থেকে অপমানিত হয়ে বিতাড়িত হওয়ার পর ওডিসিউস (Odysseus) ও তার সঙ্গীদের সাগরের বুকে টানা ছয় দিন ও ছয় রাত দাঁড় টানতে হয়। তাদের কাছে তখন কোনো অনুকূল বাতাস ছিল না, আর শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি তাদের চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। সপ্তম দিনে তারা একটি নতুন ভূখণ্ডের দেখা পান, যার নাম ছিল টেলিপাইলাস (Telepylus)। এটি ছিল লেস্ট্রিগোনীয় (Laestrygonians) নামক এক জাতির বাসভূমি। হোমার এই নগরীটির যে ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বর্ণনা দিয়েছেন, তা প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের অন্যতম রহস্যময় এবং অদ্ভুত চিত্রায়ণ। টেলিপাইলাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে দিন ও রাতের মধ্যে কোনো স্পষ্ট পার্থক্য নেই। সেখানে একজন মেষপালক যখন তার পাল নিয়ে চড়াতে বের হয়, তখন সে চাইলে আরেকজন মেষপালককে ডাকতে পারে, যে তার পাল নিয়ে ঘরে ফিরছে। হোমারের মতে, এই দেশে একজন মানুষ যদি কখনো না ঘুমিয়ে একটানা কাজ করতে পারত, তবে সে দ্বিগুণ মজুরি আয় করতে পারত (Frame, 1978)।

এই অদ্ভুত প্রাকৃতিক পরিবেশটি দেখায় যে ওডিসিউসের নৌবহর এখন পৃথিবীর পরিচিত ভূগোলের সীমানা ছাড়িয়ে এমন এক জগতে প্রবেশ করেছে, যেখানে প্রকৃতির সাধারণ নিয়মগুলো আর কাজ করে না। টেলিপাইলাসের বন্দরটি ছিল অত্যন্ত চমৎকার এবং সুরক্ষিত। এর চারপাশ ঘিরে ছিল খাড়া পাথরের পাহাড়, আর বন্দরের প্রবেশপথটি ছিল অত্যন্ত সরু। এই সরু পথ দিয়ে কেবল একটি জাহাজই ঢুকতে বা বের হতে পারত। বন্দরের ভেতরের জল ছিল আয়নার মতো শান্ত; সেখানে সাগরের কোনো ঢেউয়ের আঘাত লাগত না। এই শান্ত ও সুরক্ষিত বন্দরটি দেখে ওডিসিউসের এগারোটি জাহাজের নাবিকরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে। তারা দ্রুত তাদের জাহাজগুলোকে ওই সরু পথ দিয়ে বন্দরের ভেতরে নিয়ে যায় এবং একে অপরের খুব কাছাকাছি নোঙর করে। তারা ভেবেছিল, দীর্ঘ যাত্রার পর তারা অবশেষে একটি নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে।

তবে ওডিসিউস নিজে তার জাহাজটি বন্দরের ভেতরে নিয়ে যাননি। পলিফেমাসের গুহায় যে তিক্ত অভিজ্ঞতা তার হয়েছিল, তা তাকে অত্যন্ত সতর্ক ও সন্দেহপ্রবণ করে তুলেছিল। তিনি তার নিজস্ব জাহাজটিকে বন্দরের বাইরে, সেই খাড়া পাথরের পাহাড়ের সাথে একটি দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখেন। এই সিদ্ধান্তটি দেখায় যে ওডিসিউসের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি বা মেটিস (Metis) এখন অনেক বেশি বাস্তবমুখী ও সাবধানী হয়ে উঠেছে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, কোনো কিছু বাইরে থেকে খুব বেশি নিরাপদ বা সুন্দর মনে হলে তার ভেতরে অনেক সময় সবচেয়ে বড় বিপদ লুকিয়ে থাকে। ওডিসিউসের এই একটিমাত্র সতর্কতামূলক পদক্ষেপই শেষ পর্যন্ত তার নিজের এবং তার জাহাজের সঙ্গীদের জীবন রক্ষা করেছিল, যদিও বাকি নৌবহরের জন্য নিয়তি এক ভয়াবহ ধ্বংসের জাল বিছিয়ে রেখেছিল।

আর্টেসিয়া ঝরনা ও রাজকন্যার সাক্ষাৎ (Spring of Artacia and the Meeting with the Princess)

নিরাপদ দূরত্বে জাহাজ নোঙর করার পর ওডিসিউস একটি উঁচু পাথরের চূড়ায় ওঠেন চারপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করার জন্য। সেখান থেকে তিনি দেখতে পান যে, দূরে একটি উপত্যকা থেকে ধোঁয়া উড়ছে। এর মানে হলো সেখানে মানুষের বা কোনো প্রাণীর বাস রয়েছে। তবে তারা সভ্য মানুষ নাকি বন্য দানব, তা বোঝার কোনো উপায় ছিল না। তাই ওডিসিউস তার তিনজন বিশ্বস্ত সঙ্গীকে পাঠান খবর নিয়ে আসার জন্য। এই তিনজন সঙ্গী যখন শহরের দিকে এগোতে থাকে, তখন তাদের সাথে একটি তরুণীর দেখা হয়। মেয়েটি একটি বিশাল ঝরনার কাছে জল নিতে এসেছিল, যার নাম ছিল আর্টেসিয়া (Artacia)। মেয়েটি দেখতে সাধারণ মানুষের মতোই ছিল, তবে তার শারীরিক গড়ন ছিল বেশ সুঠাম। সঙ্গীরা তার কাছে গিয়ে অত্যন্ত ভদ্রভাবে শহরের রাজার নাম ও পরিচয় জানতে চায় (Nagy, 1999)।

তরুণীটি তাদের জানায় যে সে স্বয়ং এই শহরের রাজা অ্যান্টিফাতেস (Antiphates)-এর কন্যা। সে অত্যন্ত বন্ধুভাবাপন্ন আচরণ করে এবং তাদের তার পিতার প্রাসাদের পথ দেখিয়ে দেয়। এই দৃশ্যটি ওডিসিউসের সঙ্গীদের মনে এক ধরনের মিথ্যা নিরাপত্তার জন্ম দেয়। তারা ভাবে যে, রাজকন্যা যখন এত ভদ্র ও স্বাভাবিক, তখন রাজা এবং শহরের মানুষরাও হয়তো ফাইয়াকীয় বা আইওলাসের মতোই সভ্য ও অতিথিপরায়ণ হবে। তারা ভুলে যায় যে, সাইক্লপসদের দ্বীপেও প্রকৃতির সৌন্দর্য তাদের একইভাবে ধোঁকা দিয়েছিল। গ্রিক মহাকাব্যে অনেক সময় এই ধরনের ছোট ছোট আপাত-স্বাভাবিক ঘটনাগুলোকে বিশাল কোনো ট্র্যাজেডির পূর্বাভাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সঙ্গীরা রাজকন্যার দেখানো পথ ধরে শহরের বিশাল প্রাসাদের দিকে এগিয়ে যায়, কোনো ধরনের বিপদ বা ফাঁদের আশঙ্কা না করেই।

প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করে তারা যে দৃশ্য দেখে, তা তাদের সমস্ত কল্পনাকে হার মানায়। তারা দেখে অ্যান্টিফাতেসের স্ত্রী, অর্থাৎ রাজকন্যাটিকে, যে দেখতে কোনো স্বাভাবিক মানুষ নয়, বরং একটি বিশাল পাহাড়ের চূড়ার মতো। রানীর এই বিকট ও দানবীয় রূপ দেখে সঙ্গীদের রক্ত হিম হয়ে যায়। তারা বুঝতে পারে যে তারা এক ভয়ংকর ফাঁদে পা দিয়েছে। এই লেস্ট্রিগোনীয়রা দেখতে মানুষের মতো হলেও, আসলে তারা সাইক্লপসদের চেয়েও ভয়ংকর এবং রক্তপিপাসু দানব। রানীর বিকট রূপ দেখে সঙ্গীরা যখন পেছনের দিকে সরে আসার চেষ্টা করে, ঠিক তখনই রানী তার স্বামী অ্যান্টিফাতেসকে বাজার থেকে ডেকে পাঠায়। এবং অ্যান্টিফাতেসের আগমনের মধ্য দিয়েই শুরু হয় ওডিসিউসের নৌবহরের ওপর সবচেয়ে বড় এবং অপ্রত্যাশিত হত্যাযজ্ঞ।

অ্যান্টিফাতেসের নির্মমতা ও হত্যাযজ্ঞের সূচনা (Cruelty of Antiphates and the Beginning of the Massacre)

রাজা অ্যান্টিফাতেস প্রাসাদে ঢুকেই কোনো কথা না বলে সরাসরি ওডিসিউসের একজন সঙ্গীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে তার বিশাল হাত দিয়ে ওই নাবিকটিকে ধরে ফেলে এবং সবার চোখের সামনে তাকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। পলিফেমাসের মতো এই লেস্ট্রিগোনীয়রাও ছিল নরখাদক (Anthropophagous), তবে এদের নির্মমতা ও আক্রমণের ধরন ছিল সাইক্লপসদের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত ও দ্রুত। পলিফেমাস ছিল একা, কিন্তু অ্যান্টিফাতেসের সাথে ছিল তার পুরো জাতি। একজন সঙ্গীর এই বীভৎস মৃত্যু দেখে বাকি দুজন সঙ্গী মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারে যে তাদের আর এক সেকেন্ডও সেখানে থাকা নিরাপদ নয়। তারা কোনোমতে প্রাসাদের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসে এবং নিজেদের জাহাজের দিকে পাগলের মতো দৌড়াতে শুরু করে (Romm, 1992)।

সঙ্গীরা যখন দৌড়াচ্ছিল, অ্যান্টিফাতেস তখন সারা শহরে এক বিকট সতর্কসংকেত বা অ্যালার্ম বাজিয়ে দেয়। সেই শব্দ শুনে শহরের চারপাশ থেকে হাজার হাজার লেস্ট্রিগোনীয় দানব বেরিয়ে আসে। এরা দেখতে মানুষের মতো হলেও এদের শক্তি ছিল অকল্পনীয়। এরা কোনো সাধারণ অস্ত্র, যেমন তলোয়ার বা বর্শা নিয়ে আসেনি। এরা পাহাড় থেকে বিশাল বিশাল পাথর তুলে নিয়ে বন্দরের দিকে ছুটে আসে। যে এগারোটি জাহাজ বন্দরের ভেতরে অত্যন্ত নিরাপদ মনে করে নোঙর করেছিল, সেগুলো এখন এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়। বন্দরের প্রবেশপথটি এতটাই সরু ছিল যে, একসাথে একাধিক জাহাজ বের হওয়ার কোনো উপায় ছিল না। আর দানবদের আক্রমণের আকস্মিকতায় নাবিকরা এতই হতভম্ব হয়ে পড়েছিল যে তারা নোঙর তোলার বা হাল ঘোরানোর সুযোগটুকুও পায়নি।

পাহাড়ের ওপর থেকে দানবরা যখন বিশাল পাথরের ব্লকগুলো জাহাজগুলোর ওপর ছুড়তে শুরু করে, তখন সাগরের বুকে এক নারকীয় দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। পাথরের আঘাতে জাহাজের কাঠগুলো মড়মড় করে ভেঙে যায় এবং নাবিকরা চিৎকার করতে করতে সাগরের জলে পড়ে যায়। কিন্তু জলে পড়েও তাদের কোনো রক্ষা ছিল না। লেস্ট্রিগোনীয়রা মাছ ধরার মতো বিশাল বর্শা বা হারপুন দিয়ে জলে ভাসমান নাবিকদের গেঁথে ফেলে এবং তাদের ডাঙ্গায় টেনে তোলে। হোমার অত্যন্ত নির্মমভাবে বর্ণনা করেছেন যে, দানবরা নাবিকদের এমনভাবে বর্শায় গাঁথছিল যেন তারা রাতের ভোজের জন্য মাছ শিকার করছে। এই দৃশ্যটি গ্রিক মহাকাব্যের অন্যতম ভয়ংকর ও রক্তক্ষয়ী চিত্রায়ণ, যা দেখায় যে প্রকৃতির শক্তির কাছে মানুষের অহংকার ও প্রযুক্তি (জাহাজ) কতটা অসহায়।

এগারোটি জাহাজের ধ্বংস ও ওডিসিউসের পলায়ন (Destruction of Eleven Ships and the Escape of Odysseus)

বন্দরের ভেতরে যখন এই বীভৎস হত্যাযজ্ঞ চলছিল, ওডিসিউস তখন তার নিজের জাহাজ থেকে এই দৃশ্য দেখছিলেন। তিনি বুঝতে পারেন যে ভেতরে থাকা এগারোটি জাহাজের একটি নাবিককেও বাঁচানো সম্ভব নয়। এটি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। ট্রয়ের যুদ্ধে তিনি হয়তো অনেক সহযোদ্ধাকে হারিয়েছিলেন, কিন্তু চোখের সামনে এতগুলো জাহাজ ও নাবিককে এভাবে কচুকাটা হতে দেখা তার জন্য ছিল চরম যন্ত্রণাদায়ক। তবে ওডিসিউস এই মুহূর্তে কোনো আবেগ বা কান্নার সুযোগ নেননি। তিনি জানতেন যে, যদি তিনি এক মুহূর্ত দেরি করেন, তবে দানবদের নজর তার জাহাজের দিকেও পড়বে। তিনি অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে তার তলোয়ার বের করেন এবং যে দড়িটি দিয়ে জাহাজটি পাহাড়ের সাথে বাঁধা ছিল, তা এক কোপে কেটে ফেলেন (Malkin, 1998)।

ওডিসিউস তার জাহাজের সঙ্গীদের নির্দেশ দেন প্রাণপণে দাঁড় টানতে। তিনি চিৎকার করে বলেন যে, যদি তারা বাঁচতে চায়, তবে তাদের সাগরের বুকে দ্রুততম বেগে ছুটতে হবে। সঙ্গীরা মৃত্যুর ভয়ে এমনভাবে দাঁড় টানতে শুরু করে যেন তাদের পেশিগুলো ছিঁড়ে যাবে। ওডিসিউসের জাহাজটি যেহেতু বন্দরের বাইরে ছিল, তাই তারা পাথরের আঘাত থেকে বেঁচে যায় এবং অত্যন্ত দ্রুতগতিতে গভীর সাগরের দিকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এই পলায়ন কোনো বীরোচিত পলায়ন ছিল না; এটি ছিল কেবল প্রাণ নিয়ে পালানোর এক মরিয়া চেষ্টা। ওডিসিউস তার পেছনে ফেলে আসেন তার এগারোটি জাহাজ এবং তার শত শত বিশ্বস্ত সঙ্গীকে, যাদের সাথে তিনি ট্রয়ের ময়দানে লড়েছিলেন এবং যারা তার সাথে ইথাকায় ফেরার স্বপ্ন দেখেছিল।

এই বিশাল ক্ষতি ওডিসিউসের মনের ওপর এক দীর্ঘস্থায়ী প্রলেপ ফেলে। আইওলাসের থলের কারণে তারা যখন ইথাকা থেকে ফিরে এসেছিল, তখন তাদের মনে হতাশা ছিল, কিন্তু তাদের শক্তি ও সংখ্যা অক্ষুণ্ন ছিল। আর লেস্ট্রিগোনীয়দের আক্রমণের পর ওডিসিউসের বিশাল নৌবহর পরিণত হয় একটিমাত্র নিঃসঙ্গ জাহাজে। তার বারোটি জাহাজের মধ্যে কেবল একটি অবশিষ্ট থাকে। এই ঘটনাটি দেখায় যে, ওডিসিউসের এই দীর্ঘ যাত্রা কেবল একটি ভৌগোলিক অভিযান নয়; এটি হলো তার জীবনের সমস্ত অহংকার, শক্তি এবং অবলম্বনগুলো একে একে হারিয়ে ফেলার এক নির্মম প্রক্রিয়া। তাকে এখন কেবল নিজের বুদ্ধির ওপর নির্ভর করেই বাকি পথটুকু পাড়ি দিতে হবে।

লেস্ট্রিগোনীয়দের রূপক অর্থ ও সভ্যতার সংকট (Metaphorical Meaning of the Laestrygonians and the Crisis of Civilization)

লেস্ট্রিগোনীয়দের এই আক্রমণটি হোমারের মহাকাব্যে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রূপক বা মেটাফোর (Metaphor) হিসেবে কাজ করে। লেস্ট্রিগোনীয়রা সাইক্লপসদের মতো সম্পূর্ণ বন্য ছিল না। তাদের একটি শহর ছিল, রাজা ও রানী ছিল, এমনকি তাদের একটি চমৎকার বন্দরও ছিল। বাহ্যিকভাবে তাদের দেখলে একটি সভ্য সমাজ বলেই মনে হয়। কিন্তু তাদের ভেতরে লুকিয়ে ছিল নরখাদক প্রবৃত্তি। এটি দেখাতে চায় যে, সভ্যতা কেবল ইমারত বা সামাজিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না। যদি কোনো সমাজে নৈতিকতা, আতিথেয়তার নিয়ম বা জেনিয়া এবং মানবিক মূল্যবোধ না থাকে, তবে সেই সমাজ সাইক্লপসদের চেয়েও বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে (Vidal-Naquet, 1986)।

লেস্ট্রিগোনীয়রা মূলত সেই সব সমাজের প্রতীক, যারা বাহ্যিকভাবে উন্নত হলেও অভ্যন্তরীণভাবে অত্যন্ত আগ্রাসী এবং পরজীবী। তারা দুর্বল বা অপরিচিত মানুষদের শিকার হিসেবে দেখে। ওডিসিউসের নাবিকরা এই বাহ্যিক সৌন্দর্যের ফাঁদে পড়েই তাদের জীবন হারিয়েছিল। তারা ভেবেছিল যে শান্ত বন্দরটি তাদের নিরাপত্তা দেবে, কিন্তু সেই বন্দরটিই তাদের জন্য একটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছিল। হোমার এখানে অত্যন্ত সুকৌশলে এই বার্তাটি দিয়েছেন যে, মানুষের চারপাশের পরিবেশ অনেক সময় তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়াতে পারে। ওডিসিউসের মতো তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মানুষও এই বিপদের ভয়াবহতা আগে থেকে পুরোপুরি আঁচ করতে পারেননি, যদিও তার সতর্কতা তাকে এবং তার একটি জাহাজের সঙ্গীদের বাঁচিয়েছিল।

এই ঘটনাটি ওডিসিউসের যাত্রায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। তিনি অনুধাবন করেন যে, পৃথিবীর মানচিত্রের বাইরে এমন সব ভয়ংকর শক্তি লুকিয়ে আছে, যাদের সাথে লড়াই করার মতো কোনো অস্ত্র বা শক্তি মানুষের কাছে নেই। সাইক্লপসকে তিনি অন্ধ করে পালাতে পেরেছিলেন, কিন্তু লেস্ট্রিগোনীয়দের বিরুদ্ধে তার কোনো মেটিস বা বুদ্ধি কাজ করেনি। তাকে কেবল পালিয়ে বাঁচতে হয়েছে। এই চরম অসহায়ত্ব তাকে শিখিয়ে দেয় যে, বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সবসময় জয়ী হওয়া যায় না; অনেক সময় টিকে থাকাই হলো সবচেয়ে বড় জয়। লেস্ট্রিগোনীয়দের এই আখ্যানটি তাই কেবল একটি রক্তক্ষয়ী আক্রমণের গল্প নয়, এটি মানুষের অহংকার চূর্ণ হওয়ার এবং চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার এক নির্মম পাঠ।

নিঃসঙ্গতা ও পরবর্তী গন্তব্যের অনিশ্চয়তা (Loneliness and the Uncertainty of the Next Destination)

লেস্ট্রিগোনীয়দের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে ওডিসিউসের একমাত্র জাহাজটি যখন গভীর সাগরে ভেসে চলে, তখন জাহাজের ভেতরের পরিবেশ ছিল চরম শোকাবহ। যারা বেঁচে ফিরেছিল, তারা তাদের বন্ধুদের এই বীভৎস মৃত্যুর কথা ভুলতে পারছিল না। ওডিসিউস নিজেও গভীরভাবে শোকাহত ছিলেন। তার বারোটি জাহাজের গর্বিত বহর এখন একটিমাত্র ভাসমান কাষ্ঠখণ্ডে পরিণত হয়েছে। এই বিশাল ক্ষতি তাকে এক ধরনের চরম নিঃসঙ্গতা বা আইসোলেশন (Isolation)-এর মধ্যে ফেলে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন যে, তার সঙ্গীদের সংখ্যা কমে যাওয়ার মানে হলো তার শক্তি ও সম্পদও কমে যাওয়া। এখন তাদের যেকোনো বিপদের মুখোমুখি হওয়ার ক্ষমতা আগের চেয়ে বহুগুণ কমে গেছে (Segal, 1994)।

তবে এই নিঃসঙ্গতার একটি অন্য দিকও ছিল। ওডিসিউস এখন কেবল সেই সঙ্গীদের নিয়েই যাত্রা করছেন, যারা সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং যারা তার নিজের জাহাজে ছিল। এই ছোট দলটি হয়তো শক্তিতে দুর্বল, কিন্তু তারা এখন অনেক বেশি সতর্ক ও সাবধানী। তারা বুঝতে পেরেছে যে সাগরের বুকে প্রতিটি নতুন দ্বীপ এক একটি মৃত্যুফাঁদ হতে পারে। লেস্ট্রিগোনীয়দের আক্রমণের পর ওডিসিউসের মনে আর কোনো অহংকার বা কৌতূহল অবশিষ্ট ছিল না। তিনি কেবল চাইছিলেন কোনো নিরাপদ স্থানে নোঙর করতে, যেখানে কোনো দানব বা নরখাদক নেই। কিন্তু সাগরের বিশাল জলরাশি তাদের জন্য কী অপেক্ষা করে রেখেছে, তা তাদের কারও জানা ছিল না।

এই চরম অনিশ্চয়তা ও শোক নিয়ে ওডিসিউসের জাহাজটি এগোতে থাকে। লেস্ট্রিগোনীয়দের এই আখ্যানটি ওডিসিউসের প্রত্যাবর্তনের গল্পে একটি বিশাল বিভাজন রেখা বা টার্নিং পয়েন্ট তৈরি করে। এর আগে তিনি একজন সেনাপতির মতো তার নৌবহর পরিচালনা করতেন, আর এখন তাকে একটি মাত্র জাহাজের ক্যাপ্টেন হিসেবে টিকে থাকার লড়াই করতে হবে। তার এই রূপান্তর দেখায় যে, নিয়তি মানুষকে তার আসল গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে তার সমস্ত বাহ্যিক শক্তি কেড়ে নেয়, যাতে সে তার ভেতরের আসল মানসিক শক্তিটি আবিষ্কার করতে পারে। এই শোক ও নিঃসঙ্গতা নিয়েই ওডিসিউসের জাহাজটি অবশেষে এসে পৌঁছায় সার্সির মায়াবী দ্বীপে, যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের পরীক্ষা।

সার্সির দ্বীপ (Island of Circe): রূপান্তর, প্রলোভন ও মুক্তি

আইয়া দ্বীপের রহস্যময় পরিবেশ ও সতর্ক অনুসন্ধান (Mysterious Environment of Aeaea and Cautious Exploration)

লেস্ট্রিগোনীয়দের ভয়ংকর আক্রমণ থেকে কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়ে ওডিসিউস (Odysseus) ও তার একমাত্র জাহাজের সঙ্গীরা যখন নতুন একটি ভূখণ্ডে নোঙর করেন, তখন তাদের মনে কেবল একটাই অনুভূতি কাজ করছিল – চরম আতঙ্ক। এই নতুন দ্বীপটির নাম ছিল আইয়া (Aeaea), যা ছিল সূর্যদেবতা হেলিওসের কন্যা এবং বিখ্যাত জাদুকরী দেবী সার্সি (Circe)-এর বাসভূমি। ট্রয়ের যুদ্ধের দশ বছর এবং সাগরের বুকে দানবদের সাথে লড়াই করার পর ওডিসিউসের সঙ্গীরা এতটাই ক্লান্ত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল যে, ডাঙায় পা রাখার পর তারা টানা দুই দিন ও দুই রাত সৈকতেই শুয়ে থাকে। তারা আর কোনো নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কার করতে বা কোনো নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হতে চাইছিল না। তাদের মনে হচ্ছিল, প্রতিটি নতুন দ্বীপই তাদের জন্য এক একটি মৃত্যুফাঁদ (Yarnall, 1994)।

তৃতীয় দিনে ওডিসিউস বুঝতে পারেন যে, কেবল শুয়ে থাকলে বা ভয় পেলে তাদের সমস্যার কোনো সমাধান হবে না। খাবারের তীব্র সংকট তাদের তাড়া করে ফিরছিল। তিনি তার বর্শা ও তলোয়ার নিয়ে দ্বীপের ভেতরের দিকে একটু উঁচু জায়গায় ওঠেন চারপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করার জন্য। সেখান থেকে তিনি দেখতে পান যে, একটি ঘন জঙ্গলের মাঝখান থেকে ধোঁয়া উড়ছে। এই ধোঁয়া দেখার সাথে সাথে তার মনে পড়ে যায় লেস্ট্রিগোনীয়দের শহরের কথা, যেখানে ধোঁয়া দেখেই তারা এগিয়ে গিয়েছিল এবং চরম ধ্বংসের মুখে পড়েছিল। তিনি ঠিক করেন যে এবার আর কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। তিনি সৈকতে ফিরে আসেন এবং একটি বিশাল বুনো হরিণ শিকার করে তার সঙ্গীদের খাবারের ব্যবস্থা করেন। ওডিসিউসের এই সতর্ক পদক্ষেপ দেখায় যে, তিনি তার অতীত ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়েছেন এবং তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি বা মেটিস (Metis) এখন অনেক বেশি পরিপক্ব।

খাবার শেষে ওডিসিউস তার সঙ্গীদের দুই দলে ভাগ করেন। এক দলের নেতৃত্ব দেন তিনি নিজে, আর অন্য দলের নেতৃত্ব দেন তার অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং সাহসী সহযোদ্ধা ইউরিলোকাস (Eurylochus)। এরপর তিনি লটারি বা টস করেন যে কোন দলটি জঙ্গলের ভেতরের ওই ধোঁয়ার উৎস খুঁজতে যাবে। লটারিতে ইউরিলোকাসের নাম ওঠে। ফলে ইউরিলোকাস তার বাইশজন সঙ্গীকে নিয়ে ভারাক্রান্ত মনে ও চরম আতঙ্কের সাথে জঙ্গলের ভেতরের দিকে রওনা হয়। হোমার অত্যন্ত সুকৌশলে এই দৃশ্যটিতে একটি গা ছমছমে পরিবেশ তৈরি করেছেন। সঙ্গীরা যখন জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করছিল, তখন তারা জানত না যে তারা কোনো মানুষের প্রাসাদে যাচ্ছে নাকি কোনো দানবের গুহায়। তাদের এই যাত্রা ছিল অজানা আতঙ্কের দিকে এক নিঃশব্দ পদচারণা, যা মহাকাব্যের অন্যতম সেরা মনস্তাত্ত্বিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

সার্সির প্রাসাদ, জাদুকরী গান ও রূপান্তর (Circe’s Palace, Magical Song, and Transformation)

ইউরিলোকাস ও তার সঙ্গীরা যখন জঙ্গলের মাঝখানে সার্সির প্রাসাদের সামনে এসে পৌঁছায়, তখন তারা এক অত্যন্ত অদ্ভুত ও ভীতিকর দৃশ্য দেখতে পায়। প্রাসাদটি অত্যন্ত সুন্দর পালিশ করা পাথর দিয়ে তৈরি ছিল, কিন্তু এর চারপাশ ঘিরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল অসংখ্য বুনো নেকড়ে এবং পাহাড়ি সিংহ। সাধারণত এই ধরনের বন্য প্রাণীরা মানুষকে আক্রমণ করে, কিন্তু এরা সঙ্গীদের দেখে লেজ নাড়তে শুরু করে এবং কুকুরের মতো আদর চাইতে থাকে। সঙ্গীরা বুঝতে পারছিল না যে এই প্রাণীরা এত শান্ত কেন। হোমার এখানে রূপকের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন যে, এই প্রাণীগুলো আসলে একসময় মানুষ ছিল, যাদের সার্সি তার জাদু দিয়ে পশুতে রূপান্তরিত করেছেন। প্রাণীদের এই অদ্ভুত আচরণ সঙ্গীদের মনে চরম অস্বস্তি তৈরি করে, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই প্রাসাদের ভেতর থেকে ভেসে আসে এক জাদুকরী ও সুমিষ্ট নারী কণ্ঠের গান (Segal, 1968)।

সার্সি তখন তার বিশাল সোনার তাঁতে কাপড় বুনছিলেন এবং গান গাইছিলেন। এই গানের সুর এতটাই মোহময় ছিল যে সঙ্গীরা তাদের সমস্ত ভয় ভুলে যায়। পলিটেস নামের এক সঙ্গী, যে ছিল অত্যন্ত সরলমনা, সে প্রস্তাব দেয় যে ভেতরে থাকা নারীটিকে তাদের ডাকা উচিত। ইউরিলোকাস বাদে সবাই তার কথায় সায় দেয় এবং জোরে চিৎকার করে সার্সিকে ডাকে। সার্সি তৎক্ষণাৎ দরজা খুলে অত্যন্ত হাসিমুখে তাদের ভেতরে আমন্ত্রণ জানান। আতিথেয়তার নিয়ম বা জেনিয়া (Xenia) অনুযায়ী তিনি তাদের সম্মানজনক আসনে বসতে দেন এবং তাদের সামনে অত্যন্ত সুস্বাদু খাবার – পনির, বার্লি, মধু এবং প্রামনিয়ান মদ পরিবেশন করেন। ক্ষুধার্ত সঙ্গীরা কোনো কিছু চিন্তা না করেই সেই খাবার গোগ্রাসে গিলতে শুরু করে।

কিন্তু এই খাবারের ভেতরে সার্সি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও ভয়ংকর জাদু বা ফার্মাকন (Pharmakon) মিশিয়ে দিয়েছিলেন। এই জাদুর বৈশিষ্ট্য ছিল যে, এটি খাওয়ার পর মানুষ তার শেকড় ও স্মৃতি পুরোপুরি ভুলে যাবে। সঙ্গীরা যখন খাবার শেষ করে, তখন সার্সি তার জাদুর ছড়ি দিয়ে তাদের মাথায় হালকা করে আঘাত করেন। চোখের নিমেষে এক ভয়াবহ রূপান্তর ঘটে যায়। গ্রিক নাবিকদের শরীরগুলো হঠাৎ করে শূকরের আকার ধারণ করে। তাদের চামড়া, মুখ এবং গলার স্বর পুরোপুরি শূকরের মতো হয়ে যায়, কিন্তু তাদের মানুষের মন বা স্মৃতি অক্ষুণ্ন থাকে। অর্থাৎ তারা বুঝতে পারছিল যে তারা কী ভয়ংকর পরিণতির শিকার হয়েছে, কিন্তু তাদের আর কিছু করার ক্ষমতা ছিল না। সার্সি তাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে শূকরের খোঁয়াড়ে আটকে রাখেন এবং তাদের খাওয়ার জন্য কিছু শুকনা শিম ও অ্যাকর্ন ছুড়ে দেন। এটি ছিল মানুষের আত্মমর্যাদার চরম অবনমন।

ইউরিলোকাসের পলায়ন ও হার্মিসের ঐশ্বরিক সাহায্য (Escape of Eurylochus and the Divine Help of Hermes)

ইউরিলোকাস, যিনি অত্যন্ত সন্দেহপ্রবণ ছিলেন এবং সার্সির এই আতিথেয়তাকে শুরু থেকেই একটি ফাঁদ বলে মনে করেছিলেন, তিনি প্রাসাদের ভেতরে ঢোকেননি। তিনি বাইরে থেকেই এই ভয়ংকর রূপান্তরের দৃশ্য দেখতে পান। এই দৃশ্য দেখে তার শরীর অবশ হয়ে যায়। তিনি কোনোমতে সেখান থেকে দৌড়ে সৈকতে ফিরে আসেন, কিন্তু আতঙ্কে তার মুখ থেকে কোনো কথা বের হচ্ছিল না। অনেক কষ্টে তিনি ওডিসিউসকে এই বিপর্যয়ের কথা জানান এবং প্রস্তাব দেন যে, তাদের এখনই এই দ্বীপ ছেড়ে পালানো উচিত, কারণ ওই জাদুকরীর সাথে লড়াই করার ক্ষমতা তাদের নেই। কিন্তু ওডিসিউস এবার আর পালিয়ে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। তিনি তার তলোয়ার ও ধনুক তুলে নেন এবং সিদ্ধান্ত নেন যে, যেকোনো মূল্যে তিনি তার সঙ্গীদের উদ্ধার করবেন (Beck, 2005)।

ওডিসিউস যখন একাকী জঙ্গলের পথ ধরে সার্সির প্রাসাদের দিকে এগোচ্ছিলেন, তখন তার মনে কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। তিনি জানতেন না কীভাবে একজন জাদুকরীর জাদুর মোকাবেলা করতে হয়। ঠিক সেই মুহূর্তে অলিম্পাসের দেবতাদের বার্তাবাহক হার্মিস (Hermes) একজন সুদর্শন তরুণের ছদ্মবেশে তার সামনে আবির্ভূত হন। হার্মিস ওডিসিউসকে সরাসরি সতর্ক করে দেন যে, তার তলোয়ার সার্সির জাদুর সামনে কোনো কাজেই আসবে না। তবে তিনি ওডিসিউসকে সাহায্য করার জন্য একটি অত্যন্ত বিরল ও জাদুকরী গাছ দেন, যার নাম ছিল মলি (Moly)। এই গাছটির শেকড় ছিল কালো রঙের এবং এর ফুল ছিল দুধের মতো সাদা। হার্মিস জানান যে এই মলি গাছের প্রভাব সার্সির ফার্মাকন বা জাদুর ওষুধকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে দেবে।

হার্মিস ওডিসিউসকে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, সার্সি যখন ওডিসিউসকে জাদুর মদ খেতে দেবে এবং এরপর জাদুর ছড়ি দিয়ে আঘাত করতে আসবে, তখন ওডিসিউস যেন তার তলোয়ার বের করে সার্সির ওপর এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে যেন তাকে হত্যা করতে চাইছে। এতে সার্সি ভয় পেয়ে যাবে এবং ওডিসিউসকে তার সাথে শয্যাগ্রহণের প্রস্তাব দেবে। হার্মিস অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দেন যে, ওডিসিউস যেন এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান না করেন, কারণ এটিই তার সঙ্গীদের মুক্তির একমাত্র পথ। তবে শয্যায় যাওয়ার আগে সার্সিকে দিয়ে দেবতাদের নামে একটি চরম শপথ বা ওথ (Oath) করিয়ে নিতে হবে, যাতে সে আর কোনো নতুন জাদু প্রয়োগ করে ওডিসিউসকে দুর্বল করতে না পারে। হার্মিসের এই ঐশ্বরিক সাহায্য দেখায় যে, বুদ্ধি ও বীরত্ব যতই থাকুক না কেন, দেবতাদের আনুকূল্য ছাড়া জাদুর বিরুদ্ধে জয়ী হওয়া মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

জাদুর নিষ্ক্রিয়করণ ও সার্সির আত্মসমর্পণ (Neutralization of the Magic and the Surrender of Circe)

হার্মিসের নির্দেশমতো ওডিসিউস সার্সির প্রাসাদের দরজায় গিয়ে পৌঁছান। সার্সি তাকে আগের মতোই অত্যন্ত সাদরে গ্রহণ করেন এবং তাকে সম্মানজনক আসনে বসান। এরপর তিনি একটি সোনার পাত্রে সেই জাদুর মদ বা ফার্মাকন মিশিয়ে ওডিসিউসকে খেতে দেন। ওডিসিউস মলি গাছের জাদুকরী ক্ষমতার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে সেই মদ নিঃশেষে পান করেন। এরপর সার্সি যখন তার জাদুর ছড়ি নিয়ে ওডিসিউসের মাথায় আঘাত করে বলেন, “যাও, এখন গিয়ে তোমার সঙ্গীদের সাথে শূকরের খোঁয়াড়ে শুয়ে থাকো,” তখন এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটে। ওডিসিউসের শরীরে কোনো রূপান্তর তো ঘটেই না, উল্টো তিনি তার খাপ থেকে তলোয়ার বের করে হুংকার দিয়ে সার্সির দিকে তেড়ে যান (Doherty, 1995)।

সার্সি এই অপ্রত্যাশিত পাল্টা আক্রমণে চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন যে তার শক্তিশালী জাদু এই মানুষটির ওপর কোনো কাজ করছে না। তিনি ওডিসিউসের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েন এবং তার হাঁটু জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে তার পরিচয় জানতে চান। সার্সি বলেন যে, পৃথিবীর কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে তার এই জাদুর মদ খেয়ে অবিকৃত থাকা সম্ভব নয়। তিনি অনুমান করেন যে, এই মানুষটি নিশ্চয়ই সেই ইথাকার রাজা ওডিসিউস, যার আসার কথা হার্মিস তাকে অনেক আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন। সার্সি তার ভুল বুঝতে পেরে ওডিসিউসকে তার তলোয়ার নামিয়ে রাখতে বলেন এবং তাকে নিজের শয্যায় আমন্ত্রণ জানান, যাতে তাদের দুজনের মধ্যে বিশ্বাস ও বোঝাপড়া তৈরি হতে পারে।

তবে ওডিসিউস হার্মিসের সতর্কবাণী ভুলে যাননি। তিনি সার্সির প্রস্তাবে সাথে সাথে রাজি হননি। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দাবি করেন যে, শয্যায় যাওয়ার আগে সার্সিকে অলিম্পাসের দেবতাদের নামে একটি চরম শপথ করতে হবে যে সে আর কখনোই তার বা তার সঙ্গীদের কোনো ক্ষতি করবে না। সার্সি বাধ্য হয়ে সেই শপথ গ্রহণ করেন। এই ঘটনাটি মহাকাব্যে নারী ও পুরুষের ক্ষমতার এক অত্যন্ত চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব হিসেবে কাজ করে। সার্সি ছিলেন একজন অত্যন্ত ক্ষমতাধর জাদুকরী, যিনি পুরুষদের পশুতে পরিণত করতে অভ্যস্ত ছিলেন। কিন্তু ওডিসিউস তার মেটিস এবং হার্মিসের সাহায্যে সেই ক্ষমতাকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে দেন। সার্সির এই আত্মসমর্পণ দেখায় যে, কৌশল ও সাহসের কাছে অনেক সময় ঐশ্বরিক বা জাদুকরী শক্তিও হার মানতে বাধ্য হয়।

সঙ্গীদের মুক্তি ও আতিথেয়তার নতুন রূপ (Release of the Companions and a New Form of Hospitality)

সার্সির সাথে চুক্তির পর ওডিসিউস যখন প্রাসাদের ভেতরে শান্তভাবে অবস্থান করছিলেন, তখন সার্সি তাকে খাবার খেতে অনুরোধ করেন। কিন্তু ওডিসিউস অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন যে, যতক্ষণ না তার সঙ্গীদের শূকরের রূপ থেকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ তিনি এক দানা খাবারও গ্রহণ করবেন না। একজন নেতার তার অনুসারীদের প্রতি এই যে অটল প্রতিশ্রুতি, এটি ওডিসিউসের চরিত্রের অন্যতম মহৎ দিক। তিনি তার নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি তার সঙ্গীদের মুক্তির জন্য সার্সির ওপর মানসিক চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। সার্সি বুঝতে পারেন যে, ওডিসিউসের মতো একজন মানুষের মন জয় করতে হলে তাকে তার সঙ্গীদের মুক্তি দিতেই হবে (Murnaghan, 1987)।

সার্সি তার জাদুর ছড়ি নিয়ে শূকরের খোঁয়াড়ে যান এবং তাদের গায়ে আরেকটি জাদুকরী ওষুধ বা অ্যান্টিডোট মাখিয়ে দেন। চোখের নিমেষে শূকরগুলো তাদের পুরনো মানুষের রূপ ফিরে পায়। শুধু তাই নয়, তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাস্থ্যবান, তরুণ এবং সুন্দর হয়ে ওঠে। সঙ্গীরা তাদের আসল রূপ ফিরে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং তারা ওডিসিউসকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। এই দৃশ্যটি এতটাই আবেগময় ছিল যে স্বয়ং সার্সি, যিনি এর আগে অগণিত মানুষকে পশুতে পরিণত করেছেন, তিনিও কেঁদে ফেলেন। এই মুহূর্তটি সার্সির চরিত্রের এক নতুন মানবিক দিক উন্মোচন করে। তিনি আর সেই নিষ্ঠুর জাদুকরী থাকেন না, বরং তিনি একজন অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ও আতিথেয়তাপূর্ণ গৃহিণীতে পরিণত হন।

সার্সির আমন্ত্রণে ওডিসিউস তার বাকি সঙ্গীদেরও সৈকত থেকে প্রাসাদে নিয়ে আসেন। এরপর শুরু হয় সার্সির এক অন্য রূপের আতিথেয়তা। তিনি ওডিসিউস ও তার সঙ্গীদের জন্য অঢেল খাবার, দামি মদ এবং আরামদায়ক স্নানের ব্যবস্থা করেন। এই আতিথেয়তা কোনো ফাঁদ ছিল না; এটি ছিল জেনিয়ার পবিত্র নিয়ম পালনের এক নিখুঁত উদাহরণ। সার্সির দ্বীপটি, যা একদিন তাদের কাছে মৃত্যুফাঁদ মনে হয়েছিল, সেটিই এখন তাদের জন্য এক প্রশান্তির স্বর্গে পরিণত হয়। সার্সির এই রূপান্তর দেখায় যে, সঠিক নেতার অধীনে এবং সঠিক পরিস্থিতিতে মানুষের (বা দেবদেবীদের) চরিত্রের খারাপ দিকগুলো মুছে গিয়ে সবচেয়ে ভালো দিকগুলো বেরিয়ে আসতে পারে।

বিস্মৃতি, প্রলোভন ও পাতাললোকে যাত্রার নির্দেশ (Oblivion, Temptation, and the Instruction for the Journey to the Underworld)

সার্সির প্রাসাদের এই বিলাসবহুল জীবন ওডিসিউস ও তার সঙ্গীদের এতটা মোহগ্রস্ত করে ফেলে যে, তারা সেখানে টানা এক বছর পার করে দেন। এই এক বছরে তারা কেবল খেয়েদেয়ে, আমোদপ্রমোদ করে এবং সার্সির আতিথেয়তা উপভোগ করে সময় কাটান। হোমার এখানে লোটাস-ভোজীদের দ্বীপের সেই বিস্মৃতি বা লেদে (Lethe)-এর থিমটি আবার ফিরিয়ে এনেছেন, তবে এবার অনেক বেশি সূক্ষ্মভাবে। সার্সি তাদের সরাসরি কোনো জাদুর ওষুধ দিয়ে আটকে রাখেননি; তিনি তাদের আরাম ও বিলাসের প্রলোভন দিয়ে ভুলিয়ে রেখেছিলেন। ওডিসিউস, যিনি সারাজীবন কেবল ইথাকায় ফেরার জন্য কেঁদেছেন, তিনিও যেন এই এক বছরে তার গন্তব্যের কথা পুরোপুরি ভুলে বসেছিলেন। এটি ছিল মানুষের ভেতরের সেই চিরন্তন দ্বন্দ্ব, যেখানে আরামের কাছে অনেক সময় মানুষের জীবনের বৃহত্তর লক্ষ্যগুলোও ম্লান হয়ে যায় (Cook, 1995)।

এক বছর পর ওডিসিউসের সঙ্গীরা, যারা সার্সির জাদু থেকে মুক্তি পেয়েছিল, তারাই এবার ওডিসিউসের কাছে গিয়ে তাকে তার লক্ষ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তারা অত্যন্ত জোরালোভাবে বলে যে, এখন ইথাকায় ফেরার সময় হয়েছে। সঙ্গীদের এই কথাগুলো ওডিসিউসের ভেতরের সেই ঘুমন্ত আত্মসম্মানবোধকে জাগিয়ে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন যে, তিনি তার জীবনের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। তিনি দ্রুত সার্সির কাছে গিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তাকে তার বাড়ি ফেরার কথা জানান এবং সার্সিকে তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার জন্য অনুরোধ করেন। সার্সি কোনো বাধা দেননি। তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে বলেন যে, কেউ যদি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই প্রাসাদে থাকতে না চায়, তবে তিনি তাকে আটকে রাখবেন না।

তবে সার্সি ওডিসিউসকে একটি অত্যন্ত ভয়ংকর ও অপ্রত্যাশিত নির্দেশ দেন। তিনি বলেন যে, ইথাকায় ফেরার আগে ওডিসিউসকে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে যাত্রা করতে হবে। তাকে যেতে হবে পাতাললোকে বা হেডিসের রাজ্যে। সেখানে তাকে থিবসের অন্ধ ভবিষ্যদ্বক্তা টাইরেসিয়াস (Tiresias)-এর সাথে দেখা করতে হবে এবং তার কাছ থেকেই তিনি তার বাড়ি ফেরার সঠিক দিকনির্দেশনা পাবেন। জীবিত অবস্থায় পাতাললোকে যাওয়ার এই নির্দেশ শুনে ওডিসিউসের পায়ের তলার মাটি সরে যায়। তিনি বুঝতে পারেন যে, তার এই দীর্ঘ যাত্রার সবচেয়ে ভয়ংকর ও অন্ধকারতম অধ্যায়টি কেবল শুরু হতে যাচ্ছে। সার্সির দ্বীপ থেকে এই মুক্তি তাই সরাসরি ইথাকার পথে নয়, বরং এটি ছিল এক চূড়ান্ত ও অলৌকিক পরীক্ষার দিকে প্রথম পদক্ষেপ।

পাতাললোকে যাত্রা (Journey to the Underworld): ভবিষ্যদ্বাণী ও মৃতদের সাক্ষাৎ

ওশেনাস নদীর সীমানা ও নেকুইয়া আচার (Boundary of the River Oceanus and the Ritual of Nekyia)

জাদুকরী দেবী সার্সির নির্দেশ অনুযায়ী ওডিসিউস (Odysseus) ও তার সঙ্গীরা যখন পাতাললোকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন, তখন তাদের মনে চরম ভীতি ও অনিশ্চয়তা কাজ করছিল। জীবিত অবস্থায় পাতাললোক বা হেডিসের রাজ্যে প্রবেশ করা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। গ্রিক পুরাণে এই জগতটি হলো মৃত আত্মাদের অনন্ত কারাগার, যেখানে সূর্যের আলো কখনো পৌঁছায় না। ওডিসিউসের জাহাজ যখন উত্তরের বাতাস ধরে সাগরের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছায়, তখন তারা ওশেনাস (Oceanus) নদীর তীরে এসে নোঙর করেন। প্রাচীন গ্রিকদের ভৌগোলিক ধারণায় ওশেনাস ছিল পৃথিবীর একেবারে সীমানায় থাকা একটি বিশাল নদী, যা পুরো পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে। এই নদীর তীরেই বাস করত সিমেরিয়ান নামক এক জাতি, যাদের দেশ সবসময় মেঘ ও অন্ধকারে ঢাকা থাকত। সার্সির নির্দেশমতো ওডিসিউস তার সঙ্গীদের নিয়ে এই অন্ধকারাচ্ছন্ন তীর ধরে হাঁটতে শুরু করেন, যতক্ষণ না তারা আকেরন নদীর মোহনায় এসে পৌঁছান (Tsouras, 2005)।

এই মোহনায় এসে ওডিসিউসকে একটি বিশেষ ঐশ্বরিক আচার বা রিচুয়াল পালন করতে হয়, যাকে গ্রিক ভাষায় বলা হয় নেকুইয়া (Nekyia) বা মৃতদের সাথে যোগাযোগের আচার। তিনি তার তলোয়ার দিয়ে মাটিতে এক হাত চওড়া ও এক হাত গভীর একটি গর্ত খোঁড়েন। এরপর সেই গর্তের চারপাশে তিনি মৃত আত্মাদের উদ্দেশ্যে মধু মিশ্রিত দুধ, মিষ্টি মদ এবং জল ঢালেন। সবশেষে তিনি এর ওপর সাদা বার্লি ছিটিয়ে দেন। এই নৈবেদ্যগুলো ছিল পাতাললোকের অধিপতি হেডিস এবং তার স্ত্রী পার্সিফোনির উদ্দেশ্যে। এরপর ওডিসিউস তার সঙ্গীদের আনা একটি কালো ভেড়া এবং একটি কালো মেষী জবাই করেন এবং তাদের রক্ত সেই গর্তের ভেতরে প্রবাহিত হতে দেন। গ্রিক পুরাণে বিশ্বাস করা হতো যে, মৃত আত্মাদের কোনো শারীরিক অস্তিত্ব বা স্মৃতি থাকে না। কিন্তু তারা যখন এই তাজা রক্ত পান করে, তখন তারা সাময়িকভাবে তাদের স্মৃতি ও কথা বলার ক্ষমতা ফিরে পায়।

গর্তের ভেতরে তাজা রক্ত পড়ার সাথে সাথেই পাতাললোকের ভেতর থেকে অসংখ্য মৃত আত্মা পঙ্গপালের মতো ছুটে আসতে শুরু করে। তাদের মধ্যে ছিল সদ্য বিবাহিত তরুণী, বৃদ্ধ মানুষ, কুমারী নারী এবং যুদ্ধে নিহত হওয়া অগণিত বীর যোদ্ধা, যাদের গায়ে তখনো বর্ম এবং রক্তের দাগ লেগে ছিল। এই অগণিত আত্মার ভিড় দেখে ওডিসিউসের রক্ত হিম হয়ে যায়। তিনি ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যান এবং তার সঙ্গীদের দ্রুত বলি দেওয়া পশুগুলোর চামড়া ছাড়িয়ে আগুন জ্বালানোর নির্দেশ দেন। তিনি নিজে তার তলোয়ার হাতে নিয়ে গর্তের পাশে বসে পড়েন। তার লক্ষ্য ছিল থিবসের অন্ধ ভবিষ্যদ্বক্তা টাইরেসিয়াস (Tiresias)। যতক্ষণ না টাইরেসিয়াস এসে এই রক্ত পান করছেন, ততক্ষণ অন্য কোনো আত্মাকে তিনি এই রক্তের কাছাকাছি আসতে দেবেন না। এই চরম আতঙ্কের মুহূর্তেও ওডিসিউস তার মানসিক দৃঢ়তা ধরে রেখেছিলেন, যা তার নেতৃত্বের অন্যতম বড় গুণ।

এলপেনরের করুণ মিনতি ও সৎকারের প্রতিশ্রুতি (Pitiful Plea of Elpenor and the Promise of Burial)

রক্তের গন্ধে ছুটে আসা আত্মাদের ভিড় থেকে সবার আগে যে আত্মাটি ওডিসিউসের সামনে এসে দাঁড়ায়, তাকে দেখে ওডিসিউস চমকে ওঠেন। এটি ছিল তার নিজেরই দলের সবচেয়ে কমবয়সী এবং বোকা নাবিক এলপেনর (Elpenor)-এর আত্মা। সার্সির দ্বীপ থেকে রওনা হওয়ার ঠিক আগের রাতে এলপেনর প্রাসাদের ছাদে বসে প্রচুর মদ খেয়েছিল এবং সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। সকালে যখন সবাই যাত্রার জন্য তাড়াহুড়ো করছিল, তখন সে ঘুম থেকে ধড়মড় করে উঠে সিঁড়ির কথা ভুলে গিয়ে সোজা ছাদ থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ে এবং ঘাড় ভেঙে মারা যায়। সঙ্গীরা এতটাই তাড়াহুড়োয় ছিল যে তারা এলপেনরের মৃতদেহ সৎকারের সুযোগ পায়নি। প্রাচীন গ্রিক বিশ্বাস অনুযায়ী, যদি কোনো মানুষের মৃতদেহ সঠিকভাবে পোড়ানো বা সৎকার না করা হয়, তবে তার আত্মা কখনোই পাতাললোকে শান্তি পায় না এবং তাকে অনন্তকাল ধরে দুই জগতের মাঝখানে ঘুরে বেড়াতে হয় (Sourvinou-Inwood, 1995)।

এলপেনরের আত্মা অত্যন্ত করুন স্বরে ওডিসিউসের কাছে মিনতি করতে শুরু করে। সে তার ক্যাপ্টেনের কাছে কোনো ঐশ্বরিক সাহায্য বা প্রতিশোধ চায়নি, সে কেবল একটি সাধারণ মানুষের প্রাপ্য সম্মানটুকু চেয়েছিল। এলপেনর বলে, “হে ওডিসিউস, আমার মৃতদেহটি সার্সির প্রাসাদে অরক্ষিত ফেলে রেখো না। তুমি যখন এই পাতাললোক থেকে ফিরে যাবে, তখন দয়া করে আমার শরীরটি আগুনে পুড়িয়ে দিও এবং আমার বর্মটি আমার সাথে রেখো। এরপর সাগরের তীরে আমার জন্য একটি ছোট সমাধি তৈরি করে দিও এবং সেই সমাধির ওপর আমার সেই দাঁড়টি পুঁতে দিও, যা দিয়ে আমি জীবিত অবস্থায় আমার সঙ্গীদের সাথে সাগরের বুকে দাঁড় টানতাম।” এই কথাগুলো একজন সাধারণ নাবিকের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এবং তার পেশার প্রতি অসীম ভালোবাসার প্রতীক।

ওডিসিউস এলপেনরের এই করুণ মিনতি শুনে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি তাকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, সার্সির দ্বীপে ফিরে গিয়ে সবার আগে তিনি তার সৎকারের কাজ সম্পন্ন করবেন। এলপেনরের এই আখ্যানটি মহাকাব্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ওডিসিউসকে তার নিজের মানবিক দায়িত্বগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। একজন নেতা হিসেবে কেবল জীবিত সঙ্গীদের নয়, মৃত সঙ্গীদের প্রতিও তার সমান দায়িত্ব রয়েছে। এই ছোট ঘটনাটি দেখায় যে, মৃত্যু কোনো মানুষের অস্তিত্বকে পুরোপুরি মুছে দিতে পারে না; যতক্ষণ তার স্মৃতি এবং তার ব্যবহারের জিনিসপত্র (যেমন ওই দাঁড়টি) পৃথিবীতে টিকে থাকে, ততক্ষণ সে মানুষের মনে বেঁচে থাকে। এলপেনরকে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর ওডিসিউস তার তলোয়ার দিয়ে অন্য আত্মাদের দূরে সরিয়ে রাখতে থাকেন, কারণ তার মূল লক্ষ্য টাইরেসিয়াসের আগমনের অপেক্ষায় ছিল।

টাইরেসিয়াসের ভবিষ্যদ্বাণী ও নিয়তির রূপরেখা (Prophecy of Tiresias and the Outline of Fate)

অবশেষে ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসেন থিবসের বিখ্যাত অন্ধ ভবিষ্যদ্বক্তা টাইরেসিয়াস। তিনি তার হাতে একটি সোনার রাজদণ্ড ধরে ছিলেন, যা পাতাললোকেও তার সম্মানের প্রতীক। টাইরেসিয়াস ওডিসিউসকে তার তলোয়ারটি সরিয়ে নিতে বলেন, যাতে তিনি গর্তের রক্ত পান করে সত্য কথা বলতে পারেন। রক্ত পান করার পর টাইরেসিয়াসের কণ্ঠে ভর করে অমোঘ সত্য। তিনি শুরুতেই ওডিসিউসকে জানিয়ে দেন যে, তার দেশে ফেরার পথটি মোটেও মসৃণ হবে না। সমুদ্রের দেবতা পসেইডন, যার ছেলে সাইক্লপস পলিফেমাসকে ওডিসিউস অন্ধ করেছিলেন, তিনি এই যাত্রাপথে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করবেন। টাইরেসিয়াস স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, ওডিসিউস হয়তো একাই দেশে ফিরতে পারবেন, কিন্তু তার সমস্ত সঙ্গীকে সাগরের বুকেই প্রাণ হারাতে হবে। এই কথাগুলো ওডিসিউসের মনের ভেতর জমে থাকা সমস্ত আশার ওপর যেন এক বালতি ঠান্ডা জল ঢেলে দেয় (Heitman, 2005)।

টাইরেসিয়াস এরপর ওডিসিউসকে একটি চরম সতর্কবার্তা বা ট্যাবু (Taboo) সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি বলেন, থ্রিনাসিয়া দ্বীপে সূর্যদেবতা হেলিওসের যে পবিত্র গবাদিপশু চড়ে বেড়ায়, তাদের যেন কোনোভাবেই আঘাত বা হত্যা করা না হয়। যদি ওডিসিউসের সঙ্গীরা ক্ষুধার তাড়নায় বা লোভে পড়ে সেই পশুগুলোকে হত্যা করে, তবে তাদের নিশ্চিত ধ্বংস অনিবার্য এবং ওডিসিউসের নিজের ফেরার পথও আরও দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক হবে। টাইরেসিয়াস আরও ভবিষ্যৎবাণী করেন যে, ওডিসিউস যখন বহু কষ্ট সহ্য করে ইথাকায় পৌঁছাবেন, তখন তিনি দেখতে পাবেন তার নিজের প্রাসাদে একদল উদ্ধত মানুষ তার সম্পদ লুটে খাচ্ছে এবং তার স্ত্রীর পাণিপ্রার্থী হয়ে বসে আছে। ওডিসিউসকে নিজের বুদ্ধিতে এবং তলোয়ারের জোরে ওই প্রণয়প্রার্থীদের হত্যা করে নিজের সিংহাসন পুনরুদ্ধার করতে হবে।

সবচেয়ে রহস্যময় ভবিষ্যদ্বাণীটি টাইরেসিয়াস করেন ওডিসিউসের জীবনের শেষ অধ্যায় নিয়ে। তিনি জানান যে, ইথাকার সিংহাসন ফিরে পাওয়ার পর ওডিসিউসের যাত্রা শেষ হবে না। তাকে আবার একটি দাঁড় কাঁধে নিয়ে এমন এক দেশের খোঁজে বের হতে হবে, যেখানকার মানুষ কখনো সাগর দেখেনি এবং যারা খাবারে লবণ মিশিয়ে খায় না। সেখানে গিয়ে তাকে পসেইডনের উদ্দেশ্যে একটি বিশাল উৎসর্গ করতে হবে, যাতে পসেইডনের রোষ চিরতরে শান্ত হয়। এরপর ওডিসিউস ইথাকায় ফিরে এক দীর্ঘ ও শান্তিময় বার্ধক্য পার করবেন এবং সাগরের দিক থেকে আসা এক অত্যন্ত মৃদু মৃত্যুর মাধ্যমে তার জীবনের অবসান ঘটবে। টাইরেসিয়াসের এই দীর্ঘ ভবিষ্যদ্বাণীটি মূলত পুরো ওডিসি মহাকাব্যেরই এক ধরনের ব্লু-প্রিন্ট বা রূপরেখা, যা ওডিসিউসকে তার সামনের দিনগুলোর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তোলে।

মায়ের সাথে সাক্ষাৎ ও নস্টালজিয়ার যন্ত্রণা (Meeting with His Mother and the Pain of Nostalgia)

টাইরেসিয়াস বিদায় নেওয়ার পর ওডিসিউস এক অত্যন্ত হৃদয়বিদারক দৃশ্যের মুখোমুখি হন। তিনি দেখতে পান তার নিজের মা, অ্যান্টিক্লেয়া (Anticleia)-এর আত্মা তার দিকে এগিয়ে আসছে। ট্রয়যুদ্ধের উদ্দেশ্যে যখন ওডিসিউস ইথাকা ছেড়েছিলেন, তখন তার মা জীবিত ছিলেন। দীর্ঘ বছর সাগরের বুকে ভেসে থাকার কারণে তিনি জানতেন না যে তার মা আর পৃথিবীতে নেই। মায়ের আত্মাকে দেখে ওডিসিউস অঝোরে কেঁদে ফেলেন। তিনি মাকে গর্তের রক্ত পান করতে দেন, যাতে তিনি কথা বলতে পারেন। রক্ত পান করার পর অ্যান্টিক্লেয়া তার ছেলেকে চিনতে পারেন এবং অত্যন্ত বেদনার সাথে জিজ্ঞেস করেন যে, তিনি জীবিত অবস্থায় কীভাবে এই অন্ধকারের রাজ্যে এসে পৌঁছালেন। ওডিসিউস মাকে জানান যে তিনি টাইরেসিয়াসের সাথে দেখা করতে এসেছেন এবং এরপর তিনি ইথাকার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে মায়ের কাছে বিস্তারিত জানতে চান (Katz, 1991)।

অ্যান্টিক্লেয়া ওডিসিউসকে জানান যে তার স্ত্রী পেনেলোপি এখনো অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে তার জন্য অপেক্ষা করছেন এবং প্রতিদিন চোখের জল ফেলছেন। তার ছেলে টেলেমাকাস এখন বড় হয়েছে এবং রাজ্যের সম্পত্তির দেখাশোনা করছে। তবে সবচেয়ে করুন খবরটি অ্যান্টিক্লেয়া দেন তার নিজের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে। তিনি জানান যে, তিনি কোনো রোগে বা বার্ধক্যের কারণে মারা যাননি। তার মৃত্যুর একমাত্র কারণ ছিল ওডিসিউসের জন্য তার বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস এবং সীমাহীন অপেক্ষা। নিজের ছেলের দেশে ফেরার কোনো খবর না পেয়ে, দিনের পর দিন দুশ্চিন্তা ও শোকে তার হৃদয় ভেঙে গিয়েছিল। এই কথাটি ওডিসিউসের বুকের ভেতর একটি তীরের মতো এসে বিঁধে যায়। তিনি বুঝতে পারেন যে তার এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি তার পরিবারের ওপর কতটা ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে এবং এটি তার ভেতরের বাড়ি ফেরার আকাঙ্ক্ষা বা নস্টস (Nostos)-কে আরও হাজার গুণ বাড়িয়ে দেয়।

মায়ের এই কথা শোনার পর ওডিসিউস আবেগ ধরে রাখতে না পেরে তার মাকে জড়িয়ে ধরার জন্য দুই হাত প্রসারিত করেন। তিনি তিনবার তার মায়ের আত্মাকে আলিঙ্গন করার চেষ্টা করেন, কিন্তু প্রতিবারই মায়ের আত্মা তার হাতের ভেতর দিয়ে ধোঁয়ার মতো বা স্বপ্নের মতো মিলিয়ে যায়। ওডিসিউস হতাশ হয়ে মাকে জিজ্ঞেস করেন কেন তিনি তাকে একবারের জন্য ছুঁতে দিচ্ছেন না। অ্যান্টিক্লেয়া অত্যন্ত বিষণ্ণ স্বরে ব্যাখ্যা করেন যে, মৃত্যুর পর মানুষের আর কোনো হাড় বা মাংস অবশিষ্ট থাকে না; আগুনের লেলিহান শিখা সবকিছু পুড়িয়ে ছাই করে দেয় এবং আত্মা কেবল ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায়। এই দৃশ্যটি মানবজীবনের চরম অসহায়ত্ব এবং মৃত্যুর অমোঘ নিয়মের এক অসাধারণ চিত্রায়ণ। ওডিসিউস যতই শক্তিশালী হোন না কেন, তিনি তার মৃত মাকে একবারের জন্য ছুঁয়ে দেখার ক্ষমতাও রাখেন না।

বিখ্যাত নারীদের আত্মা ও বীরদের আখ্যান (Souls of Famous Women and the Narratives of Heroes)

মায়ের সাথে বিদায়ের পর ওডিসিউস গর্তের চারপাশে আরও অনেক আত্মার সমাগম দেখতে পান। এরা ছিল প্রাচীন গ্রিক পুরাণের অত্যন্ত বিখ্যাত সব নারীদের আত্মা। এদের মধ্যে ছিলেন টাইরো, যিনি পসেইডনের প্রেমে পড়েছিলেন; অ্যান্টিওপ, যিনি জিউসের সন্তান গর্ভে ধারণ করেছিলেন; এবং লিজা, মাইসিনির বিখ্যাত দুই বীর কাস্টর এবং পলিডিউসেসের মা। ওডিসিউস একে একে এই নারীদের জীবনের গল্প শুনতে থাকেন। হোমার এই অংশে নারীদের আখ্যান বা ক্যাটালগ অব উইমেন (Catalogue of Women) যুক্ত করেছেন, যা প্রাচীন গ্রিক সমাজে নারীদের ভূমিকা এবং দেবতাদের সাথে তাদের সম্পর্কের একটি দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরে। এই নারীদের জীবনের গল্পগুলো দেখায় যে, দেবতাদের সাথে সম্পর্ক অনেক সময় মরণশীল মানুষের জন্য গৌরব বয়ে আনলেও, এর পরিণতি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অত্যন্ত ট্র্যাজিক হয় (Foley, 2001)।

নারীদের পর ওডিসিউসের সামনে উপস্থিত হন ট্রয়যুদ্ধের সেই বিখ্যাত বীরেরা, যাদের সাথে তিনি একসময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন। সবার আগে আসেন মাইসিনির রাজা আগামেমনন (Agamemnon)। তার আত্মাকে দেখে ওডিসিউস অত্যন্ত ব্যথিত হন। আগামেমনন অত্যন্ত ক্ষোভ ও আক্ষেপের সাথে বর্ণনা করেন কীভাবে ট্রয়যুদ্ধ থেকে বিজয়ী বেশে ফেরার পর তার নিজের স্ত্রী ক্লাইটেমনেস্ট্রা এবং তার প্রেমিক ইজিসথাস তাকে নিজ প্রাসাদের ভোজসভায় নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। আগামেমনন ওডিসিউসকে সতর্ক করে দেন যে, পৃথিবীর কোনো নারীর ওপরই আর সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা উচিত নয়। তিনি ওডিসিউসকে পরামর্শ দেন যেন তিনি ইথাকায় ফিরে সরাসরি নিজের পরিচয় প্রকাশ না করেন এবং অত্যন্ত গোপনে নিজের প্রাসাদে প্রবেশ করেন। আগামেমননের এই চরম বিশ্বাসভঙ্গের গল্পটি ওডিসিউসকে অত্যন্ত সতর্ক করে তোলে এবং ইথাকায় তার পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করে।

এরপর আসেন গ্রিকদের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর একিলিস (Achilles)। ওডিসিউস তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন যে, একিলিস জীবিত অবস্থায় যেমন সম্মান পেয়েছিলেন, মৃত্যুর পর এই পাতাললোকেও তিনি তেমনি একজন রাজার মতো রাজত্ব করছেন। কিন্তু একিলিসের উত্তর ছিল গ্রিক মহাকাব্যের বীরত্ব বা ক্লিওস (Kleos)-এর ধারণার ওপর এক চরম চপেটাঘাত। একিলিস বলেন যে, এই পাতাললোকে মৃতদের রাজা হওয়ার চেয়ে পৃথিবীতে একজন দরিদ্র কৃষকের দাস হয়ে বেঁচে থাকাও অনেক বেশি সম্মানের। একিলিস বুঝতে পেরেছিলেন যে, মৃত্যুর পর খ্যাতি বা গৌরবের কোনো মূল্যই নেই। জীবন যত কষ্টের বা সাধারণই হোক না কেন, তা মৃত্যুর এই অনন্ত অন্ধকারের চেয়ে অনেক বেশি কাঙ্ক্ষিত। একিলিসের এই উপলব্ধির পর ওডিসিউস তাকে তার ছেলে নিওপ্টোলেমাসের বীরত্বের কথা শুনিয়ে সান্ত্বনা দেন, যা শুনে একিলিসের আত্মা কিছুটা শান্তি নিয়ে ফিরে যায়।

পাতাললোকের ত্রাস ও ওডিসিউসের পলায়ন (Terror of the Underworld and Odysseus’s Escape)

একিলিস এবং অন্যান্য বীরদের সাথে কথা বলার পর ওডিসিউস পাতাললোকের গভীরে আরও কিছু বিখ্যাত ও অভিশপ্ত আত্মাদের দেখতে পান। তিনি দেখতে পান রাজা মিনোসকে, যিনি মৃতদের বিচার করছেন। তিনি আরও দেখতে পান সেই ভয়ংকর শাস্তির দৃশ্যগুলো, যা দেবতারা কিছু নির্দিষ্ট মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি দেখেন ট্যানটালাসকে, যে একটি বিশাল হ্রদের মাঝখানে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু যখনই সে জল খেতে যায়, জল নিচে নেমে যায়; আর তার মাথার ওপর ফলের ডাল ঝুলছে, কিন্তু হাত বাড়ালেই বাতাস তা দূরে সরিয়ে নেয়। তিনি দেখেন সিসিফাসকে, যে একটি বিশাল পাথর পাহাড়ের চূড়ায় ঠেলে তোলার চেষ্টা করছে, কিন্তু চূড়ায় পৌঁছানোর ঠিক আগেই পাথরটি আবার গড়িয়ে নিচে পড়ে যাচ্ছে। এই দৃশ্যগুলো ছিল দেবতাদের নিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা সীমালঙ্ঘনের এক ভয়ংকর পরিণতির নিদর্শন (Sourvinou-Inwood, 1995)।

ওডিসিউস সেখানে দাঁড়িয়ে আরও অনেক বীরদের সাথে কথা বলার আশা করছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন থিসিউস বা পিরিথোউসের মতো প্রাচীন বীরদের দেখতে। কিন্তু ঠিক সেই সময় পাতাললোকের ভেতর থেকে হাজার হাজার আত্মা একসাথে বিকট চিৎকার করতে করতে তার দিকে ছুটে আসতে থাকে। এই অগণিত মৃত আত্মার সম্মিলিত চিৎকার ওডিসিউসের মনে এক চূড়ান্ত ত্রাস বা প্যানিক (Panic) তৈরি করে। তার মনে ভয় ঢুকে যায় যে, পাতাললোকের রানী পার্সিফোনি হয়তো রেগে গিয়ে গর্গন বা কোনো ভয়ংকর দানবকে তার দিকে লেলিয়ে দিয়েছেন। এই অন্ধকারের রাজ্যে জীবিত অবস্থায় এর চেয়ে বেশি সময় থাকাটা তার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে তার মনে হয়।

ওডিসিউস আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ান না। তিনি তার তলোয়ার খাপে ঢুকিয়ে দ্রুত তার জাহাজের দিকে দৌড়াতে শুরু করেন। তিনি তার সঙ্গীদের নির্দেশ দেন নোঙর তুলে দ্রুত ওশেনাস নদীর স্রোতে জাহাজ ভাসাতে। সঙ্গীরাও অত্যন্ত আতঙ্কের সাথে দাঁড় টানতে শুরু করে। ওশেনাস নদীর স্রোত ধরে তারা যখন আবার সাগরের বুকে এসে পৌঁছান, তখন তারা যেন নতুন করে জীবন ফিরে পান। পাতাললোকের এই যাত্রা ওডিসিউসকে কেবল তার ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাই দেয়নি, এটি তার ভেতরকার মৃত্যুভয়কে জয় করতে এবং জীবনের মূল্য নতুন করে বুঝতে সাহায্য করেছিল। তিনি এখন জানতেন যে তাকে ঠিক কী করতে হবে এবং কী করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এই ভয়ংকর ও অন্ধকার অভিজ্ঞতা সাথে নিয়ে ওডিসিউস আবার ফিরে চলেন সার্সির দ্বীপের দিকে, যেখান থেকে তাকে তার পরবর্তী কঠিন পরীক্ষাগুলোর মুখোমুখি হতে হবে।

সাইরেনদের গান (Song of the Sirens): জ্ঞানের প্রলোভন

এলপেনরের সৎকার ও সার্সির নতুন দিকনির্দেশনা (Burial of Elpenor and Circe’s New Guidance)

পাতাললোকের ভয়ংকর অন্ধকার থেকে ফিরে আসার পর ওডিসিউস (Odysseus) ও তার সঙ্গীরা যখন পুনরায় দেবী সার্সি (Circe)-এর দ্বীপ আইয়ায় এসে পৌঁছান, তখন সবার আগে তারা একটি অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করেন। পাতাললোকে নাবিক এলপেনরের আত্মাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, তারা তার মৃতদেহটি খুঁজে বের করেন। একটি উঁচু পাহাড়ের চূড়ায়, যেখান থেকে বিশাল সমুদ্র দেখা যায়, সেখানে তারা এলপেনরের চিতা তৈরি করেন। মৃতদেহটি তার বর্মসহ পুড়িয়ে ছাই করা হয় এবং এরপর সেই ছাইয়ের ওপর একটি ছোট মাটির স্তূপ বা সমাধি তৈরি করা হয়। সবার শেষে, এলপেনর জীবিত অবস্থায় যে দাঁড়টি দিয়ে সাগরের বুকে পরিশ্রম করত, সেই দাঁড়টি তার সমাধির ওপর শক্ত করে পুঁতে দেওয়া হয়। এই সৎকারের আচার কেবল একটি প্রতিশ্রুতি রক্ষা ছিল না, এটি ছিল একজন সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতি গ্রিক মহাকাব্যের চূড়ান্ত সম্মান প্রদর্শন (Foley, 2001)।

এলপেনরের সৎকার শেষ হওয়ার পর সার্সি তাদের জন্য প্রচুর খাবার ও মদের আয়োজন করেন। তিনি ওডিসিউসকে একা একটি নির্জন জায়গায় ডেকে নেন। সার্সি বুঝতে পেরেছিলেন যে, পাতাললোক থেকে ফিরে আসার পর ওডিসিউস এখন মানসিকভাবে অনেক বেশি প্রস্তুত। টাইরেসিয়াস ওডিসিউসকে গন্তব্যের কথা বলেছিলেন, কিন্তু সেই গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য সাগরের বুকে যে সুনির্দিষ্ট বাধাগুলো রয়েছে, তা কেবল সার্সিই জানতেন। সার্সি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ওডিসিউসকে তার সামনের পথ সম্পর্কে সতর্ক করেন। তিনি জানান যে, ইথাকার দিকে এগোতে হলে তাদের এমন কিছু সামুদ্রিক পথ অতিক্রম করতে হবে, যা পৃথিবীর অন্য কোনো মরণশীল মানুষ অতিক্রম করতে পারেনি।

সার্সির এই দিকনির্দেশনার প্রথম এবং সবচেয়ে ভয়ংকর বাধাটি ছিল সাইরেন (Sirens)-দের দ্বীপ। গ্রিক পুরাণে সাইরেনরা হলো একধরনের মায়াবী জাদুকরী প্রাণী, যাদের শরীরের ওপরের অংশ নারীর মতো এবং নিচের অংশ পাখির মতো। তারা সাগরের মাঝখানে একটি পাথুরে দ্বীপে বসে থাকে এবং তাদের সুমিষ্ট কণ্ঠের গান দিয়ে নাবিকদের প্রলুব্ধ করে। সার্সি ওডিসিউসকে জানান যে, যে মানুষ একবার সাইরেনদের গানের সুর শোনে, সে তার স্ত্রী, সন্তান বা বাড়ির কথা চিরতরে ভুলে যায়। গানের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে নাবিকরা জাহাজ নিয়ে ওই দ্বীপের দিকে ছুটে যায় এবং দ্বীপের ধারালো পাথরে ধাক্কা খেয়ে জাহাজ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। সার্সি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন যে, সাইরেনদের দ্বীপের চারপাশে অসংখ্য মানুষের পচা হাড় ও কঙ্কাল পড়ে আছে, যা তাদের প্রলোভনের নির্মম শিকারদের নিদর্শন।

মোমের প্রলেপ ও মাস্তুলে বন্দিদশা (Wax Seal and Captivity on the Mast)

সাইরেনদের এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচার জন্য সার্সি ওডিসিউসকে একটি অত্যন্ত কার্যকর ও চতুর কৌশল শিখিয়ে দেন। তিনি বলেন যে, যখন জাহাজ সাইরেনদের দ্বীপের কাছাকাছি আসবে, তখন ওডিসিউস যেন একটি বড় মোমের টুকরো গালিয়ে তার সঙ্গীদের দুই কান শক্ত করে বন্ধ করে দেন। এর ফলে সঙ্গীরা সাইরেনদের কোনো গান শুনতে পাবে না এবং তারা নির্বিঘ্নে দাঁড় টেনে জাহাজটিকে ওই বিপৎসীমা পার করে নিতে পারবে। কিন্তু সার্সি ওডিসিউসের কৌতূহলী ও জ্ঞানপিপাসু চরিত্রের কথা খুব ভালো করেই জানতেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, পৃথিবীর সবচেয়ে জাদুকরী সুর শোনার সুযোগ ওডিসিউস কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চাইবেন না। তাই তিনি ওডিসিউসের জন্য একটি বিশেষ শর্ত জুড়ে দেন (Doherty, 1995)।

সার্সি বলেন, ওডিসিউস যদি সাইরেনদের গান শুনতে চান, তবে তাকে অবশ্যই একটি চরম ঝুঁকি নিতে হবে। তাকে তার সঙ্গীদের নির্দেশ দিতে হবে যেন তারা তাকে জাহাজের মাস্তুলের সাথে অত্যন্ত শক্ত করে বেঁধে রাখে। তার হাত ও পা এমনভাবে দড়ি দিয়ে প্যাঁচাতে হবে যেন তিনি কোনোভাবেই নড়াচড়া করতে না পারেন। সার্সি আরও সতর্ক করে দেন যে, গানের মোহে পড়ে ওডিসিউস যখন তার সঙ্গীদের কাছে তাকে মুক্ত করে দেওয়ার জন্য আকুতি করবেন বা আদেশ দেবেন, তখন সঙ্গীরা যেন কোনোভাবেই তার কথা না শোনে। উল্টো, ওডিসিউস যত বেশি চিৎকার করবেন, সঙ্গীরা যেন তাকে তত বেশি শক্ত করে বাঁধে। এই কৌশলটি ছিল মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ বা রেস্ট্রেইন্ট (Restraint)-এর এক চূড়ান্ত পরীক্ষা, যেখানে একজন নেতা তার নিজের প্রবৃত্তিকে আটকাতে তার অনুসারীদের ওপর নির্ভর করছেন।

পরদিন সকালে অনুকূল বাতাসে ওডিসিউসের জাহাজ যখন সাইরেনদের দ্বীপের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন হঠাৎ করে বাতাস পুরোপুরি থেমে যায়। সাগরের জল আয়নার মতো শান্ত হয়ে যায়, যেন কোনো অলৌকিক শক্তি জাহাজটিকে ওই দ্বীপের কাছে আটকে রাখতে চাইছে। ওডিসিউস বুঝতে পারেন যে পরীক্ষার সময় চলে এসেছে। তিনি তার তলোয়ার দিয়ে একটি বড় মোমের চাকতি কাটেন এবং দুই হাত দিয়ে ডলে সেটি নরম করেন। এরপর তিনি একে একে তার সমস্ত সঙ্গীর কান সেই মোম দিয়ে শক্ত করে বন্ধ করে দেন। সঙ্গীরা আগে থেকেই নির্দেশ পেয়েছিল, তাই তারা ওডিসিউসকে জাহাজের মাস্তুলের সাথে অত্যন্ত শক্ত করে বেঁধে ফেলে। এরপর তারা আবার দাঁড় টানতে শুরু করে। ওডিসিউস এখন সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় মাস্তুলের সাথে বাঁধা, আর তার কান খোলা, অপেক্ষা করছে সেই মরণঘাতী জাদুকরী সুরের জন্য।

সাইরেনদের গানের বিষয়বস্তু: জ্ঞানের চূড়ান্ত প্রলোভন (Content of the Sirens’ Song: The Ultimate Temptation of Knowledge)

জাহাজটি যখন সাইরেনদের দ্বীপের এমন দূরত্বে পৌঁছায় যেখান থেকে মানুষের কথা শোনা যায়, তখন সাইরেনরা তাদের গান শুরু করে। হোমার তার মহাকাব্যে সাইরেনদের গানের যে কথাগুলো উল্লেখ করেছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাইরেনরা ওডিসিউসকে ডাকতে শুরু করে, “এসো, বিখ্যাত ওডিসিউস, গ্রিকদের মহান গৌরব, তোমার জাহাজ এখানে ভেড়াও এবং আমাদের গান শোনো। কেউ কখনো এই পথ দিয়ে আমাদের সুমিষ্ট গান না শুনে পার হতে পারেনি। যারা আমাদের গান শোনে, তারা অনেক আনন্দ নিয়ে ফেরে এবং তারা অনেক বেশি জ্ঞানী হয়ে ফিরে যায়।” সাইরেনদের এই ডাক কোনো সাধারণ কামুক প্রলোভন ছিল না; এটি ছিল একজন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহলকে জাগিয়ে তোলার এক নিখুঁত ফাঁদ (Pucci, 1987)।

সাইরেনরা আরও দাবি করে যে, ট্রয়ের বিশাল প্রান্তরে দেবতা ও মানুষের ইচ্ছায় গ্রিক এবং ট্রোজানরা যা কিছু সহ্য করেছে, তার সবকিছুই তারা জানে। শুধু তাই নয়, পৃথিবীর বুকে যা কিছু ঘটে, তার সমস্ত জ্ঞান তাদের কাছে রয়েছে। গ্রিক দর্শনে এই ধরনের সর্বজ্ঞানের দাবিকে বলা হয় অমনিসায়েন্স (Omniscience)। ওডিসিউস ছিলেন মূলত একজন জ্ঞানপিপাসু মানুষ, যিনি নতুন জিনিস জানতে এবং শিখতে পছন্দ করতেন। তার বুদ্ধি বা মেটিস ছিল তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সাইরেনরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে ঠিক সেই জায়গাতেই আঘাত করে। তারা ওডিসিউসকে শারীরিক অমরত্ব বা সম্পদের প্রলোভন দেখায়নি, বরং তারা তাকে এমন এক চূড়ান্ত জ্ঞানের প্রলোভন দেখিয়েছে, যা পেলে মানুষ দেবতাদের সমকক্ষ হয়ে যেতে পারে।

ট্রয়যুদ্ধের এই স্মৃতিচারণ ওডিসিউসের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিল। তিনি ভেবেছিলেন যে, সাইরেনদের কাছে হয়তো এমন কোনো গোপন সত্য আছে যা তিনি জানেন না। গানের সুর এবং কথার এই মায়াবী বুনন ওডিসিউসের মস্তিষ্ককে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে ফেলে। তিনি ভুলে যান সার্সির সতর্কবাণী, ভুলে যান ওই দ্বীপের পাথরে পড়ে থাকা কঙ্কালগুলোর কথা। তার মনে কেবল একটাই ইচ্ছা কাজ করতে থাকে – যেকোনো মূল্যে ওই দ্বীপে গিয়ে সাইরেনদের কাছ থেকে পৃথিবীর সমস্ত জ্ঞান অর্জন করা। জ্ঞানের এই প্রলোভন দেখায় যে, মানুষের মনের সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটি অনেক সময় তার সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গার সাথেই যুক্ত থাকে। ওডিসিউসের যে জ্ঞানস্পৃহা তাকে এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছিল, সেই জ্ঞানস্পৃহাই এখন তাকে ধ্বংসের দিকে টানতে শুরু করে।

মাস্তুলের লড়াই ও সঙ্গীদের বিশ্বস্ততা (Struggle at the Mast and the Loyalty of the Companions)

সাইরেনদের গান শুনে ওডিসিউসের ভেতরের স্থিরতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। তিনি পাগলের মতো ছটফট করতে শুরু করেন। তিনি তার সঙ্গীদের ইশারা করে, মাথা নেড়ে এবং ভ্রু কুঁচকে নির্দেশ দিতে থাকেন যেন তারা তাকে এখনই মুক্ত করে দেয়। তিনি চাইছিলেন সঙ্গীরা জাহাজের গতি পরিবর্তন করে ওই দ্বীপের দিকে এগিয়ে যাক। কিন্তু সঙ্গীদের কানে মোম দেওয়া থাকায় তারা সাইরেনদের গানও শুনতে পাচ্ছিল না এবং ওডিসিউসের কথাও বুঝতে পারছিল না। তারা কেবল দেখতে পাচ্ছিল যে তাদের ক্যাপ্টেন মাস্তুলের সাথে বাঁধা অবস্থায় অমানুষিক কষ্ট পাচ্ছেন এবং মুক্ত হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এই দৃশ্যটি ছিল চরম মানসিক যন্ত্রণার, যেখানে একজন মানুষ তার নিজের প্রবৃত্তির সাথে লড়াই করছে এবং হার মানতে চাইছে (Montiglio, 2011)।

ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তে ইউরিলোকাস এবং পেরিমিডেস নামের দুজন বিশ্বস্ত সঙ্গী তাদের ক্যাপ্টেনের নির্দেশের অবাধ্য হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা আগে থেকেই সার্সির পরিকল্পনার কথা জানত। তাই তারা ওডিসিউসকে মুক্ত করার বদলে আরও কিছু মোটা দড়ি নিয়ে আসে এবং তাকে আগের চেয়েও শক্ত করে মাস্তুলের সাথে বেঁধে ফেলে। ওডিসিউস যত বেশি ছটফট করেন, তারা দড়ির ফাঁস তত বেশি শক্ত করে দেয়। এই অবাধ্যতা ছিল মূলত ওডিসিউসের প্রতি তাদের সবচেয়ে বড় আনুগত্যের প্রমাণ। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, এই মুহূর্তে তাদের ক্যাপ্টেন তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই; তিনি এক মায়াবী জাদুর প্রভাবে আচ্ছন্ন। তাই তাকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় হলো তার আদেশ অমান্য করা।

সঙ্গীদের এই বিশ্বস্ততা ওডিসিউসকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে। তারা প্রাণপণে দাঁড় টানতে থাকে, যতক্ষণ না জাহাজটি সাইরেনদের দ্বীপের সীমানা পুরোপুরি পার হয়ে যায়। যখন সাইরেনদের গান আর শোনা যাচ্ছিল না, তখন সঙ্গীরা নিজেদের কান থেকে মোম খুলে ফেলে এবং ওডিসিউসের বাঁধন মুক্ত করে দেয়। বাঁধন খোলার পর ওডিসিউস যেন একটি ভয়ংকর স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠেন। তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি কী পরিমাণ মৃত্যুর কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন। সঙ্গীদের এই অবাধ্যতা না থাকলে তার সমস্ত জ্ঞানস্পৃহা ওই পাথুরে দ্বীপে পচা কঙ্কাল হয়ে পড়ে থাকত। এই ঘটনাটি দেখায় যে, একজন মানুষের একার পক্ষে সব প্রলোভন জয় করা সম্ভব নয়; চরম বিপদের মুহূর্তে নিজের বিশ্বস্ত সঙ্গীদের ওপর নির্ভর করাই হলো সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা।

শিল্প, মোহ ও সাইরেনদের রূপক (Art, Illusion, and the Metaphor of the Sirens)

হোমারের মহাকাব্যে সাইরেনদের এই আখ্যানটি কেবল একটি রোমাঞ্চকর দানবীয় বাধার গল্প নয়; এটি শিল্প, মোহ এবং জ্ঞানের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রূপক বা মেটাফোর (Metaphor)। সাইরেনদের গানকে অনেক সময় হোমারের নিজের মহাকাব্যিক গানের সাথে তুলনা করা হয়। চারণকবিরা বা মিউজরা যেমন তাদের গান দিয়ে শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে, সাইরেনরাও ঠিক তেমনি তাদের গান দিয়ে নাবিকদের আটকে ফেলে। তবে পার্থক্য হলো, চারণকবির গান মানুষকে অতীত সম্পর্কে সচেতন করে এবং তাকে আনন্দ দেয়, আর সাইরেনদের গান মানুষকে তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ভুলিয়ে দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। সাইরেনদের গান হলো শিল্পের সেই ধ্বংসাত্মক রূপ, যা মানুষকে বাস্তব জগৎ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে (Segal, 1994)।

অন্যদিকে, সাইরেনদের সর্বজ্ঞানের দাবিটি ছিল মূলত একটি বিভ্রম বা ইল্যুশন (Illusion)। তারা দাবি করেছিল যে তারা পৃথিবীর সবকিছু জানে, কিন্তু বাস্তবে তারা কেবল সেই নাবিকদেরই আকর্ষণ করতে পারত, যারা তাদের অতীত বা ট্রয়যুদ্ধের স্মৃতিতে আটকে থাকতে চাইত। যে মানুষ সবসময় অতীতের গৌরবের কথা শুনতে চায় এবং বর্তমানের দায়িত্ব (যেমন বাড়ি ফেরা) এড়িয়ে যায়, সাইরেনরা তাকেই তাদের প্রধান শিকার বানাত। ওডিসিউস যদি সাইরেনদের গানে বিশ্বাস করে সেখানে যেতেন, তবে তিনি নতুন কোনো জ্ঞান পেতেন না; তিনি কেবল তার অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করতে করতেই মারা যেতেন। সাইরেনরা তাই কোনো ঐশ্বরিক জ্ঞানের অধিকারী ছিল না; তারা ছিল মানুষের ভেতরের নস্টালজিয়া এবং অহংকারের এক ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি।

ওডিসিউস মাস্তুলের সাথে বাঁধা থেকে এই গান শোনার মাধ্যমে মূলত শিল্পের মোহ এবং বাস্তবতার মধ্যে একটি নিখুঁত ভারসাম্য তৈরি করেছিলেন। তিনি গানটি শুনেছিলেন, এর সৌন্দর্য এবং প্রলোভন অনুভব করেছিলেন, কিন্তু এর কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। তিনি তার শরীরকে বাস্তবতার সাথে (মাস্তুলের সাথে) শক্ত করে বেঁধে রেখেছিলেন, যাতে তার মন শিল্পের মোহে ভেসে গেলেও তার অস্তিত্ব বিপন্ন না হয়। এই ভারসাম্যটি দেখায় যে, ওডিসিউস কেবল একজন যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান মানুষ, যিনি নিজের দুর্বলতাগুলো জানতেন এবং সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায়ও বের করতে পারতেন।

জ্ঞান অর্জনের মূল্য ও পরবর্তী বিপদের ছায়া (Price of Acquiring Knowledge and the Shadow of Impending Danger)

সাইরেনদের দ্বীপ পার হওয়ার পর ওডিসিউস হয়তো এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি অনুভব করেছিলেন। তিনি পৃথিবীর সেই বিরলতম মানুষদের একজন হয়ে উঠেছিলেন, যিনি সাইরেনদের গান শুনেও জীবিত ফিরে আসতে পেরেছেন। কিন্তু এই জ্ঞান অর্জনের একটি মূল্য ছিল। এই গান তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল যে, পৃথিবীর অনেক রহস্যই মানুষের জন্য নিরাপদ নয়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, সব কিছু জানা বা শোনার অধিকার মানুষের নেই, এবং কিছু ক্ষেত্রে অজ্ঞানতা বা কানে মোম দিয়ে রাখাই মানুষের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ। তার সঙ্গীরা কানে মোম দিয়ে বেঁচে গিয়েছিল, আর তিনি জ্ঞান অর্জন করতে গিয়ে প্রায় নিজের জীবন হারাতে বসেছিলেন (Katz, 1991)।

সাইরেনদের এই প্রলোভন থেকে মুক্ত হওয়ার পর ওডিসিউসের নৌবহরে কোনো স্বস্তি ফিরে আসেনি। তারা কেবল একটি বিপদ পার হয়েছিল, কিন্তু সামনে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল আরও ভয়ংকর সব ঐশ্বরিক ফাঁদ। সার্সি তাকে আগেই বলে দিয়েছিলেন যে সাইরেনদের দ্বীপের পর তাদের একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ ও ভয়ংকর পথ পার হতে হবে, যেখানে কোনো বুদ্ধি বা কৌশল কাজ করবে না। সেখানে তাদের কেবল ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতে হবে এবং একটি অনিবার্য ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে। সাইরেনদের গান তাই কেবল একটি মানসিক পরীক্ষা ছিল, কিন্তু এর পরের পরীক্ষাটি হতে যাচ্ছিল চরম শারীরিক ও রক্তক্ষয়ী।

মাস্তুল থেকে মুক্ত হওয়ার পর ওডিসিউস যখন জাহাজের ডেকে বসে সামনের দিকে তাকাচ্ছিলেন, তখন তিনি দেখতে পান যে দূরে সাগরের বুকে এক বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে এবং সাগরের গর্জনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এটি ছিল স্কিলা এবং ক্যারিবডিসের ভয়ংকর প্রমত্ত জলরাশির পূর্বাভাস। ওডিসিউস বুঝতে পারেন যে, সাইরেনদের গান শোনার পর তার যে মানসিক প্রশান্তিটুকু ছিল, তা এখন এই গর্জনের নিচে চাপা পড়ে যাবে। তিনি তার সঙ্গীদের আবার প্রস্তুত হতে নির্দেশ দেন। সাইরেনদের প্রলোভন জয় করার পর ওডিসিউসের ভেতরের আত্মবিশ্বাস কিছুটা বেড়ে গেলেও, তিনি জানতেন যে সামনের লড়াইয়ে তাকে তার নিজের কিছু সঙ্গীর রক্ত দিতেই হবে। এই নির্মম বাস্তবতা মেনেই ওডিসিউসের জাহাজ সেই ভয়ংকর গর্জনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।

স্কিলা ও ক্যারিবডিস (Scylla and Charybdis): অনিবার্য ক্ষতির নির্বাচন

সরু প্রণালী এবং দুই ভয়ংকর দানবের অবস্থান (The Narrow Strait and the Location of the Two Terrible Monsters)

সাইরেনদের মায়াবী দ্বীপের সীমা সফলভাবে পার হওয়ার পর ওডিসিউস (Odysseus) ও তার সঙ্গীরা এক নতুন এবং আরও ভয়াবহ প্রাকৃতিক ও অতিপ্রাকৃত বিপদের সম্মুখীন হন। সামনে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল একটি অত্যন্ত সরু সমুদ্র প্রণালী। এই প্রণালীর দুই পাশে ছিল দুটি খাড়া ও মসৃণ পাথরের পাহাড়, যাদের চূড়া মেঘের ভেতরে ঢাকা থাকত। হোমার তাঁর বর্ণনায় এই পাহাড়গুলোকে এমনভাবে চিত্রিত করেছেন, যেন এরা কোনো মরণশীল মানুষের পক্ষে আরোহণ করা বা অতিক্রম করা একেবারেই অসম্ভব। এই দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া সাগরের স্রোত ছিল অত্যন্ত তীব্র ও ভয়ংকর। কিন্তু প্রকৃতির এই রুক্ষতার চেয়েও বড় বিপদ লুকিয়ে ছিল ওই দুই পাহাড়ের খাঁজে। দেবী সার্সি ওডিসিউসকে আগেই এই প্রণালী সম্পর্কে বিস্তারিত সতর্কবার্তা দিয়ে রেখেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন যে, এই সরু পথটি পার হওয়ার সময় ওডিসিউসকে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যা তার নেতৃত্বের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক (Ahl & Roisman, 1996)।

এই প্রণালীর ডান দিকের পাহাড়ের গুহায় বাস করত স্কিলা (Scylla) নামের এক বীভৎস দানবী। স্কিলার শারীরিক গঠন ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর। তার বারোটি বিকট পা ছিল, যেগুলো সাগরের নিচে ঝুলত, আর তার ছয়টি অত্যন্ত দীর্ঘ ঘাড় ছিল। প্রতিটি ঘাড়ের মাথায় ছিল একটি করে ভয়ংকর মাথা, যার প্রতিটিতে তিন সারি করে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও প্রাণঘাতী দাঁত ছিল। স্কিলা তার গুহার ভেতর থেকে মাথা বের করে রাখত এবং যখনই কোনো জাহাজ ওই পাহাড়ের পাশ দিয়ে যেত, তখন তার ছয়টি মাথা একসাথে ছোঁ মেরে জাহাজের ডেক থেকে ছয়জন নাবিককে তুলে নিত। স্কিলার কবল থেকে কোনো জাহাজের পক্ষেই পুরোপুরি অক্ষত অবস্থায় পার হওয়া সম্ভব ছিল না। এই দানবীকে কেউ কখনো তলোয়ার বা বর্শা দিয়ে পরাজিত করতে পারেনি, কারণ সে এমন উচ্চতায় গুহার ভেতর লুকিয়ে থাকত যে মানুষের অস্ত্র সেখানে পৌঁছাত না।

অন্যদিকে, বাঁ দিকের পাহাড়ের নিচে সাগরের তলদেশে বাস করত আরেক দানবী, যার নাম ক্যারিবডিস (Charybdis)। ক্যারিবডিস স্কিলার মতো সরাসরি মানুষ খেত না, বরং সে একটি বিশাল ও ভয়ংকর সামুদ্রিক ঘূর্ণির সৃষ্টি করত। দিনে তিনবার সে সাগরের বিশাল জলরাশি প্রচণ্ড শক্তিতে নিজের ভেতরে শুষে নিত এবং আবার তিনবার সেই জল সজোরে বমি করে বের করে দিত। যখন ক্যারিবডিস জল শুষে নিত, তখন তার কাছাকাছি থাকা যেকোনো জাহাজ, তা যত শক্তিশালী বা বড়ই হোক না কেন, সেই ঘূর্ণির ভেতরে চিরতরে তলিয়ে যেত। স্বয়ং সমুদ্রের দেবতা পসেইডনের পক্ষেও ক্যারিবডিসের ঘূর্ণি থেকে কোনো জাহাজকে রক্ষা করা সম্ভব ছিল না। এই সরু প্রণালীতে স্কিলা এবং ক্যারিবডিসের অবস্থান এমনভাবে ছিল যে, একটির হাত থেকে বাঁচতে গেলে জাহাজকে অপরটির একেবারে সীমানার মধ্যে ঢুকে যেতে হতো। ওডিসিউসকে এই দুই নিশ্চিত মৃত্যুর মাঝখান দিয়ে তার একমাত্র অবশিষ্ট জাহাজটিকে পার করতে হবে।

সার্সির উপদেশ এবং অনিবার্য ক্ষতির দর্শন (Circe’s Advice and the Philosophy of Inevitable Loss)

সার্সির দ্বীপে থাকাকালীন ওডিসিউস যখন এই দুই দানবের কথা শুনেছিলেন, তখন তিনি স্বভাবতই তার যোদ্ধা সত্তা বা হিরোইক স্পিরিট থেকে একটি প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি সার্সির কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে, এমন কোনো উপায় আছে কি না, যাতে তিনি ক্যারিবডিসের ঘূর্ণি এড়িয়ে স্কিলার গুহার কাছে যেতে পারেন এবং নিজের বর্শা বা তলোয়ার দিয়ে স্কিলাকে হত্যা করে তার সমস্ত সঙ্গীদের বাঁচাতে পারেন। ওডিসিউসের এই প্রশ্নটি ছিল গ্রিক মহাকাব্যের চিরাচরিত বীরত্বের ধারণার একটি সরাসরি প্রকাশ, যেখানে একজন বীর তার শারীরিক শক্তি বা তীক্ষ্ণ বুদ্ধি দিয়ে যেকোনো দানবকে পরাজিত করতে পারেন। কিন্তু সার্সি ওডিসিউসের এই হিরোইক অহংকার বা হিউব্রিস (Hubris)-এর কড়া সমালোচনা করেন (Cook, 1995)।

সার্সি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ওডিসিউসকে বলেন যে, স্কিলা কোনো সাধারণ মরণশীল দানব নয় যাকে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করা যায়। সে হলো এক আদিম ও অজেয় ঐশ্বরিক অভিশাপ। তার সাথে লড়াই করতে যাওয়া মানে কেবল নিজের বীরত্ব দেখানোর এক বৃথা চেষ্টা, যার ফল হবে সম্পূর্ণ ধ্বংস। সার্সি ওডিসিউসকে একটি চরম বাস্তব ও রূঢ় উপদেশের কথা জানান। তিনি নির্দেশ দেন যে, জাহাজ যখন প্রণালীতে প্রবেশ করবে, তখন ওডিসিউসকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে জাহাজটিকে স্কিলার পাহাড়ের গা ঘেঁষে চালিয়ে নিতে হবে। এর ফলে স্কিলা তার ছয়টি মাথা দিয়ে ছয়জন সঙ্গীকে তুলে নেবে ঠিকই, কিন্তু জাহাজটি ক্যারিবডিসের ঘূর্ণি থেকে রক্ষা পাবে। সার্সির যুক্তি ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার: পুরো জাহাজ ও সমস্ত সঙ্গীকে হারানোর চেয়ে কেবল ছয়জন সঙ্গীকে হারানো অনেক বেশি যৌক্তিক এবং বাস্তবসম্মত একটি সিদ্ধান্ত।

এই উপদেশটি গ্রিক দর্শনে ক্যালকুলেটেড লস (Calculated Loss) বা অনিবার্য ক্ষতির নির্বাচনের একটি চূড়ান্ত উদাহরণ। একজন নেতার জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে, যখন তার সামনে কোনো ‘উইন-উইন’ বা পুরোপুরি বিজয়ের অপশন থাকে না। তাকে দুটি খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে তুলনামূলকভাবে কম খারাপ পরিস্থিতিটি বেছে নিতে হয়। ওডিসিউসের জন্য এই সিদ্ধান্তটি ছিল প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক। ট্রয়ের যুদ্ধে তিনি তার সঙ্গীদের বাঁচানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন, কিন্তু এখন তাকে তার নিজের চোখের সামনে তার ছয়জন বিশ্বস্ত সঙ্গীকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে হবে। এটি কেবল একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল না; এটি ছিল একজন মানুষের তার নিজের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়ার এক চূড়ান্ত নৈতিক পরীক্ষা। সার্সি তাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, কিছু কিছু যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায় না, কেবল কোনোমতে টিকে থাকতে হয়।

প্রণালীতে প্রবেশ ও সঙ্গীদের কাছে সত্য গোপন (Entering the Strait and Concealing the Truth from the Crew)

সাইরেনদের দ্বীপ পার হওয়ার পর যখন সাগরের গর্জনের শব্দ প্রবল হতে শুরু করে, তখন ওডিসিউসের সঙ্গীদের মনে চরম আতঙ্ক কাজ করছিল। তারা বুঝতে পারছিল যে সামনে কোনো বিশাল সামুদ্রিক বিপদ অপেক্ষা করছে। ভয়ে তাদের হাত থেকে দাঁড়গুলো খসে পড়ে এবং জাহাজটি মাঝসাগরে থমকে দাঁড়ায়। এই সংকটময় মুহূর্তে ওডিসিউস একজন যোগ্য নেতার মতো জাহাজের ডেকে উঠে দাঁড়ান এবং তার সঙ্গীদের মনে সাহস জোগানোর চেষ্টা করেন। তিনি অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে তাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, তারা এর চেয়েও বড় বিপদ পার হয়ে এসেছেন। তিনি সাইক্লপস পলিফেমাসের গুহার কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন যে, যদি সেখানে তারা কেবল বুদ্ধির জোরে বেঁচে ফিরতে পারে, তবে এই বিপদ থেকেও তারা ঠিকই পার পেয়ে যাবে (Murnaghan, 1987)।

ওডিসিউস তার সঙ্গীদের নির্দেশ দেন যেন তারা দাঁড়ের ওপর শক্ত করে বসে এবং প্রাণপণে দাঁড় টানতে শুরু করে। তিনি জাহাজের হাল ধরে থাকা নাবিককে নির্দেশ দেন যেন সে কোনোভাবেই জাহাজটিকে মাঝখানের ঘূর্ণির দিকে বা বাঁ দিকের পাহাড়ের দিকে যেতে না দেয়। তাকে জাহাজটিকে ডান দিকের খাড়া পাহাড়ের গা ঘেঁষে চালানোর নির্দেশ দেন। তবে এই নির্দেশ দেওয়ার সময় ওডিসিউস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্য তার সঙ্গীদের কাছে গোপন রাখেন। তিনি তাদের স্কিলার কথা বিন্দুবিসর্গও জানাননি। তিনি জানতেন যে, যদি সঙ্গীরা একবার জানতে পারে যে ডান দিকের পাহাড়ের ওপর ছয় মাথাওয়ালা এক দানবী তাদের মধ্যে ছয়জনকে খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে, তবে তারা ভয়ে দাঁড় টানা বন্ধ করে দেবে এবং নিজেদের বাঁচাতে জাহাজের পাটাতনের নিচে লুকিয়ে পড়বে। আর তখন বাতাস বা স্রোতের টানে জাহাজটি সোজা ক্যারিবডিসের ঘূর্ণিতে গিয়ে পড়বে এবং তাদের সবার সলিলসমাধি ঘটবে।

ওডিসিউসের এই সত্য গোপন করাকে অনেকে তার নেতৃত্বের একটি নিষ্ঠুর দিক হিসেবে সমালোচনা করলেও, বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল জাহাজটিকে বাঁচানোর একমাত্র উপায়। একজন নেতাকে অনেক সময় বৃহত্তর স্বার্থে তার অনুসারীদের কাছ থেকে কিছু চরম সত্য আড়াল করতে হয়, যাকে বলা হয় নেসেসারি ডিসেপশন (Necessary Deception)। ওডিসিউস বুঝতে পেরেছিলেন যে এই মুহূর্তে আতঙ্কের চেয়ে শৃঙ্খলা অনেক বেশি প্রয়োজন। তিনি তার নিজের ভেতরের চরম অপরাধবোধ ও যন্ত্রণা চেপে রেখে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে তার সঙ্গীদের নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। তার এই মানসিক দ্বৈততা দেখায় যে, একজন বীরকে কেবল শারীরিক লড়াই করতে হয় না, অনেক সময় তাকে তার নিজের বিবেকের সাথেও চরম লড়াই করতে হয়।

ওডিসিউসের বীরত্ব ও সার্সির নির্দেশ অমান্য (Odysseus’s Heroism and the Disobedience of Circe’s Instruction)

জাহাজটি যখন সেই সরু প্রণালীতে প্রবেশ করে, তখন সাগরের জল এক ভয়ংকর গর্জনে ফেটে পড়ে। বাঁ দিকে ক্যারিবডিস তখন সাগরের জল প্রচণ্ড শক্তিতে শুষে নিচ্ছিল। জল শুষে নেওয়ার সময় সাগরের তলদেশের কালো বালি ও পাথর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল এবং ঘূর্ণির শব্দে মনে হচ্ছিল যেন পাহাড়ের বুক চিরে যাচ্ছে। সঙ্গীদের সমস্ত মনোযোগ এবং আতঙ্ক ছিল বাঁ দিকের সেই ক্যারিবডিসের ঘূর্ণির দিকে। তারা ভয়ে এতটাই আড়ষ্ট ছিল যে তাদের চোখ কেবল সেই বিশাল গর্তের দিকেই নিবদ্ধ ছিল। ঠিক এই সুযোগটিই কাজে লাগায় ডান দিকের পাহাড়ের চূড়ায় লুকিয়ে থাকা স্কিলা। সঙ্গীরা যখন বাঁ দিকে তাকিয়ে মৃত্যুর ভয় করছিল, তখন ডান দিক থেকে নিঃশব্দে ধেয়ে আসছিল আরেক মৃত্যু (Doherty, 1995)।

এই চরম উত্তেজনার মুহূর্তে ওডিসিউস সার্সির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ অমান্য করেন। সার্সি তাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন যেন তিনি স্কিলার সাথে লড়াই করার জন্য কোনো অস্ত্র হাতে তুলে না নেন। কিন্তু ওডিসিউসের ভেতরের সেই ট্রয়ের যোদ্ধা সত্তা এই অসহায়ত্ব মেনে নিতে পারেনি। তিনি তার উজ্জ্বল বর্ম পরিধান করেন এবং দুই হাতে দুটি দীর্ঘ বর্শা নিয়ে জাহাজের সামনের দিকে বা প্রোউতে গিয়ে দাঁড়ান। তিনি পাহাড়ের চূড়ার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে থাকেন, যদি স্কিলাকে দেখা যায়, তবে তিনি তাকে আঘাত করবেন। ওডিসিউসের এই পদক্ষেপটি ছিল মূলত তার নিজের হিরোইক পরিচয়ের প্রতি একটি চূড়ান্ত নিবেদন বা হিরোইক রিফ্লেক্স (Heroic Reflex)। তিনি জানতেন যে তার অস্ত্র কোনো কাজে আসবে না, কিন্তু তবুও তিনি তার সঙ্গীদের বিনা বাধায় মরতে দিতে পারছিলেন না।

ওডিসিউসের এই অস্ত্র ধারণ করাকে হোমার অত্যন্ত করুণভাবে চিত্রিত করেছেন। একজন মানুষ, যে তার নিজের বুদ্ধিতে সাইক্লপসকে হারিয়েছে, সে এখন এমন এক ঐশ্বরিক শক্তির সামনে বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে আছে, যার কাছে ওই বর্শার কোনো মূল্যই নেই। ওডিসিউসের চোখ পাহাড়ের চূড়ায় খুঁজতে থাকে, কিন্তু স্কিলা এমন এক ঘন কুয়াশা ও অন্ধকারে লুকিয়ে ছিল যে তাকে দেখার কোনো উপায় ছিল না। ওডিসিউস যখন নিজের চোখের সীমানায় স্কিলাকে খুঁজছিলেন, ঠিক তখনই স্কিলা তার ছয়টি বিশাল মাথা নিচ দিকে নামিয়ে আনে। ওডিসিউস তার সঙ্গীদের বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও, স্কিলার আক্রমণের গতি এতই দ্রুত ছিল যে তিনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই চরম ট্র্যাজেডিটি ঘটে যায়।

স্কিলার আক্রমণ ও সঙ্গীদের করুণ মৃত্যু (Scylla’s Attack and the Pitiful Death of the Companions)

সঙ্গীরা যখন ক্যারিবডিসের দিকে তাকিয়ে আতঙ্কে জমে ছিল, তখন স্কিলা তার গুহা থেকে বজ্রপাতের মতো দ্রুতগতিতে নিচে নেমে আসে। তার ছয়টি মাথা জাহাজের ডেক থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী ও শ্রেষ্ঠ ছয়জন নাবিককে ছোঁ মেরে তুলে নেয়। ওডিসিউস যখন চিৎকার শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকান, তখন তিনি কেবল দেখতে পান তার ছয়জন সঙ্গীর হাত-পা শূন্যে ঝুলছে। স্কিলা তাদের পাহাড়ের চূড়ার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। এই দৃশ্যটি হোমারের মহাকাব্যের অন্যতম সবচেয়ে ভয়ংকর এবং হৃদয়বিদারক চিত্রায়ণ। হোমার এখানে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী উপমা ব্যবহার করেছেন। তিনি স্কিলাকে তুলনা করেছেন একজন জেলের সাথে, যে পাহাড়ের ওপর বসে বড়শিতে টোপ দিয়ে মাছ ধরে এবং মাছগুলোকে শূন্যে ছটফট করতে করতে টেনে তোলে (Katz, 1991)।

সঙ্গীরা যখন শূন্যে ঝুলছিল, তখন তারা বুঝতে পারছিল যে তাদের মৃত্যু অনিবার্য। তারা তাদের জীবনের শেষ মুহূর্তে চরম আর্তনাদ করে ওঠে এবং তাদের প্রিয় ক্যাপ্টেন ওডিসিউসের নাম ধরে ডাকতে থাকে। এই ডাকটি ছিল ওডিসিউসের জীবনের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা। তিনি পরে ফাইয়াকীয়দের কাছে এই ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার সময় বলেছিলেন, “আমি সাগরের বুকে অনেক কষ্ট সহ্য করেছি, অনেক বীভৎস মৃত্যু দেখেছি, কিন্তু আমার সঙ্গীদের ওই ছটফট করা শরীর এবং আমাকে ধরে বাঁচার শেষ আকুতি আমার জীবনের সবচেয়ে করুণ দৃশ্য ছিল। আমার চোখ থেকে সেই দৃশ্য কখনোই মুছে যাবে না।” ওডিসিউসের এই স্বীকারোক্তি দেখায় যে তিনি কেবল একজন কঠোর সেনাপতি ছিলেন না, তার ভেতরেও একজন অত্যন্ত সংবেদনশীল মানুষ লুকিয়ে ছিল।

স্কিলা যখন ওই ছয়জন সঙ্গীকে তার গুহার মুখে নিয়ে গিয়ে কাঁচা চিবিয়ে খাচ্ছিল, তখন ওডিসিউস বা তার অন্য সঙ্গীদের কিছুই করার ছিল না। তারা কেবল পাহাড়ের ওপর থেকে ভেসে আসা হাড় ভাঙার মড়মড় শব্দ এবং আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছিল। কিন্তু তাদের দাঁড় টানা থামানোর কোনো সুযোগ ছিল না, কারণ একটু থমকে দাঁড়ালেই জাহাজটি ক্যারিবডিসের ঘূর্ণির টানে চলে যেত। ওডিসিউসকে তার নিজের চোখের সামনে তার বন্ধুদের এই ভয়ংকর মৃত্যু দেখতে হয়েছিল এবং একই সাথে বাকি সঙ্গীদের বাঁচানোর জন্য জাহাজটিকে দ্রুত ওই প্রণালী পার করে নিতে হয়েছিল। এই ঘটনাটি ওডিসিউসের ওপর এক চরম মানসিক ক্ষত বা ট্রমা (Trauma) তৈরি করে, যা তার বাকি জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তার সাথে ছায়ার মতো লেপ্টে ছিল।

অনিবার্য ক্ষতির দর্শন ও টিকে থাকার চূড়ান্ত পাঠ (Philosophy of Inevitable Loss and the Ultimate Lesson in Survival)

স্কিলা ও ক্যারিবডিসের এই আখ্যানটি কেবল একটি পৌরাণিক দানবের গল্প নয়; এটি মানবজীবনের একটি অত্যন্ত গভীর দার্শনিক রূপক। ইংরেজি ভাষায় “বিটুইন স্কিলা অ্যান্ড ক্যারিবডিস (Between Scylla and Charybdis)” প্রবাদটি এই ঘটনা থেকেই এসেছে, যার অর্থ হলো দুটি সমপরিমাণ খারাপ বিকল্পের মাঝখানে আটকে পড়া, যেখানে কোনো সঠিক বা নিরাপদ পথ নেই। মানবজীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে, যখন পুরোপুরি জয়ী হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। তখন মানুষকে হিসাব করে একটি ক্ষতি মেনে নিতে হয়, যাতে বড় ক্ষতি থেকে বাঁচা যায়। ওডিসিউসের এই সিদ্ধান্তটি ছিল মূলত সেই হিসাব করা ক্ষতিরই একটি বাস্তব প্রয়োগ। তিনি ছয়জন সঙ্গীকে হারিয়ে পুরো জাহাজটিকে বাঁচিয়েছিলেন, যা ছিল একজন নেতার জন্য চরম নির্মম কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি পদক্ষেপ (Montiglio, 2011)।

এই ঘটনাটি ওডিসিউসের চরিত্রকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ট্রয়ের যুদ্ধে তিনি হয়তো একজন অপরাজেয় বীর ছিলেন, কিন্তু স্কিলা ও ক্যারিবডিসের সামনে তিনি তার নিজের অসহায়ত্ব বুঝতে পারেন। তিনি অনুধাবন করেন যে, পৃথিবীর কিছু শক্তি এতই বিশাল এবং অজেয় যে, সেখানে বীরত্ব দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। সেখানে কেবল পরিস্থিতি মেনে নিতে হয় এবং যেকোনো মূল্যে টিকে থাকতে হয়। সার্সি তাকে যে শিক্ষাটি দিতে চেয়েছিলেন, ওডিসিউস তা অত্যন্ত মর্মান্তিক উপায়ে শিখেছিলেন। তার বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে থাকার বৃথা চেষ্টা দেখায় যে, তিনি তার হিরোইক অহংকার থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেননি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বাস্তবতাকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

স্কিলার গুহা এবং ক্যারিবডিসের ঘূর্ণি পেছনে ফেলে যখন ওডিসিউসের জাহাজটি একটি নিরাপদ জলসীমায় এসে পৌঁছায়, তখন জাহাজের ভেতরের পরিবেশ ছিল কবরের মতো শান্ত। কেউ কোনো কথা বলছিল না। যারা বেঁচে ফিরেছিল, তারা জানত যে তারা কেবল ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছে, আর তাদের ছয়জন বন্ধুকে সেই ভাগ্যের মূল্য হিসেবে দানবের মুখে সঁপে দেওয়া হয়েছে। এই ভারী এবং অপরাধবোধে পূর্ণ মন নিয়ে ওডিসিউস যখন সামনের দিকে তাকান, তখন তিনি দেখতে পান সূর্যদেবতা হেলিওসের দ্বীপ থ্রিনাসিয়া। টাইরেসিয়াসের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, এটি ছিল তাদের শেষ এবং সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। স্কিলা ও ক্যারিবডিসের ক্ষতি তাদের মানসিকভাবে এতটাই দুর্বল করে দিয়েছিল যে, থ্রিনাসিয়া দ্বীপে গিয়ে তাদের নিজেদের প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখাটা এক অসম্ভব চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়।

সূর্যদেবের গবাদিপশু (Cattle of the Sun God): নিষেধভঙ্গ ও সহযাত্রীদের মৃত্যু

থ্রিনাসিয়া দ্বীপে নোঙর করার সিদ্ধান্ত ও ওডিসিউসের সতর্কতা (Decision to Anchor at Thrinacia and Odysseus’s Warning)

স্কিলা ও ক্যারিবডিসের সেই ভয়ংকর প্রণালী পার হওয়ার পর ওডিসিউস (Odysseus) ও তার সঙ্গীরা যখন কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছিলেন, তখন সাগরের দিগন্তে আরেকটি নতুন দ্বীপ ভেসে ওঠে। এই দ্বীপটির নাম ছিল থ্রিনাসিয়া (Thrinacia)। দূর থেকেই ওডিসিউস শুনতে পান গবাদিপশুর হাম্বা ডাক এবং ভেড়ার পালের শব্দ। এই শব্দ শোনার সাথে সাথে তার মনে পড়ে যায় পাতাললোকে অন্ধ ভবিষ্যদ্বক্তা টাইরেসিয়াস এবং পরে দেবী সার্সির দেওয়া সেই চরম সতর্কবার্তার কথা। তারা দুজনেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছিলেন যে, এই দ্বীপে সূর্যদেবতা হেলিওস (Helios)-এর পবিত্র গবাদিপশু চড়ে বেড়ায়। এই পশুগুলোকে কোনোভাবেই হত্যা করা বা খাওয়া যাবে না। যদি কেউ এই নিষেধ অমান্য করে, তবে তার এবং তার সঙ্গীদের নিশ্চিত ধ্বংস অনিবার্য। এই সতর্কবাণী বা ট্যাবু (Taboo) ওডিসিউসের মনে গভীরভাবে খোদাই করা ছিল, তাই তিনি তার সঙ্গীদের নির্দেশ দেন যেন তারা কোনোভাবেই এই দ্বীপে নোঙর না করে (Brown, 1996)।

কিন্তু ওডিসিউসের এই নির্দেশের তীব্র বিরোধিতা করে বসে তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা ইউরিলোকাস (Eurylochus)। ইউরিলোকাস ছিল সেই ব্যক্তি, যে সার্সির দ্বীপে জাদুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছিল এবং পরে সাইরেনদের গান শোনার সময় ওডিসিউসকে মাস্তুলের সাথে শক্ত করে বেঁধে রেখেছিল। সে অত্যন্ত ক্লান্ত ও ক্ষুব্ধ স্বরে ওডিসিউসকে বলে যে, ওডিসিউসের শরীর হয়তো লোহার তৈরি হতে পারে, কিন্তু সাধারণ নাবিকদের শরীর লোহার তৈরি নয়। তারা দিনের পর দিন সাগরের বুকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাজ করেছে, স্কিলার আক্রমণে তাদের ছয়জন ভাইকে হারিয়েছে, এবং এখন তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে পুরোপুরি বিধ্বস্ত। ইউরিলোকাস দাবি করে যে, রাতের বেলা সাগরের বুকে থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ যেকোনো সময় ঝড় উঠতে পারে। তাই তাদের অন্তত এক রাতের জন্য থ্রিনাসিয়া দ্বীপে নেমে বিশ্রাম নেওয়া উচিত এবং পরদিন সকালে আবার যাত্রা শুরু করা উচিত।

ইউরিলোকাসের এই কথায় বাকি নাবিকরাও অত্যন্ত জোরালো সমর্থন জানায়। সঙ্গীদের এই সম্মিলিত দাবির মুখে ওডিসিউস বুঝতে পারেন যে, তিনি যদি এখন জোড় করে তাদের সাগরের বুকে আটকে রাখেন, তবে হয়তো জাহাজের ভেতরেই বিদ্রোহ বা মিউটিনি (Mutiny) শুরু হয়ে যাবে। তিনি চরম অসহায়ত্ব অনুভব করেন। একজন নেতা হিসেবে তিনি জানতেন যে এই দ্বীপে নামাটা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, কিন্তু তার অনুসারীদের শারীরিক ক্লান্তি এবং বিদ্রোহের হুমকির কাছে তিনি নতিস্বীকার করতে বাধ্য হন। তবে দ্বীপে নামার আগে তিনি তার সঙ্গীদের দিয়ে একটি অত্যন্ত কড়া শপথ বা ওথ (Oath) করিয়ে নেন। তিনি তাদের প্রতিজ্ঞা করান যে, দ্বীপে যদি তারা কোনো গবাদিপশু বা ভেড়ার পাল দেখতে পায়, তবে তারা যেন ভুলেও সেগুলোতে হাত না দেয়। তারা কেবল সেই খাবারই খাবে, যা সার্সি তাদের জাহাজে দিয়ে দিয়েছেন। সঙ্গীরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে এই শপথ গ্রহণ করে এবং জাহাজটিকে থ্রিনাসিয়া দ্বীপের উপকূলে নোঙর করে।

সাগরের বুকে আটকা পড়া ও খাদ্যাভাব (Stranded at Sea and Starvation)

প্রথম রাতের বিশ্রামটি বেশ শান্তিতেই কাটে। সঙ্গীরা সার্সির দেওয়া খাবার ও মদ খেয়ে নিজেদের ক্লান্তি দূর করে। কিন্তু পরদিন সকালে যখন তারা জাহাজ ভাসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন নিয়তি তাদের সাথে এক চরম নিষ্ঠুর খেলা শুরু করে। দক্ষিণ দিক থেকে এমন প্রবল বেগে বাতাস বইতে শুরু করে যে, সাগরের বুকে জাহাজ ভাসানো পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই দক্ষিণাবর্তী বাতাস বা নোটাস (Notus) টানা এক মাস ধরে একইভাবে বইতে থাকে। প্রাচীন গ্রিক নাবিকদের কাছে এই ধরনের একটানা বাতাস ছিল এক চরম বিভীষিকা, কারণ এর অর্থ হলো তারা একটি দ্বীপে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকা পড়েছে। প্রথম কয়েক দিন সঙ্গীরা ওডিসিউসের কাছে করা শপথ অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করে। তারা জাহাজে থাকা খাবার ও মদ খেয়েই দিন পার করছিল এবং হেলিওসের গবাদিপশুর দিকে একবারও তাকায়নি (Vidal-Naquet, 1986)।

কিন্তু সপ্তাহ গড়িয়ে যখন মাস পার হতে শুরু করে, তখন জাহাজের সমস্ত রসদ ফুরিয়ে যায়। খাবার শেষ হয়ে যাওয়ার পর সঙ্গীদের মধ্যে ক্ষুধার তাড়না শুরু হয়। তারা বেঁচে থাকার জন্য সাগরের তীরে মাছ ধরতে এবং পাখি শিকার করতে শুরু করে। কিন্তু মাছ বা পাখি শিকার করে এতগুলো ক্ষুধার্ত মানুষের পেট ভরানো সম্ভব ছিল না। ক্ষুধার জ্বালায় তাদের শরীর দুর্বল হতে থাকে এবং তাদের গাল ভেঙে ভেতরে ঢুকে যায়। তারা প্রতিদিন দেখত যে, তাদের চোখের সামনে হেলিওসের স্বাস্থ্যবান ও মাংসল গরুগুলো নিশ্চিন্তে চড়ে বেড়াচ্ছে, কিন্তু শপথের কারণে তারা সেগুলো ছুঁতে পারছে না। এই পরিস্থিতিটি মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ বা রেস্ট্রেইন্ট (Restraint)-এর এক চূড়ান্ত পরীক্ষা ছিল। মানুষের বেঁচে থাকার আদিম প্রবৃত্তি যখন তার নৈতিকতা বা শপথের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই লড়াইয়ে জেতা অত্যন্ত কঠিন।

এই খাদ্যাভাব কেবল সঙ্গীদের শরীরকেই দুর্বল করেনি, তাদের মানসিকতাকেও ধীরে ধীরে বিষাক্ত করে তুলছিল। তারা ভাবতে শুরু করে যে, না খেয়ে তিলে তিলে মরার চেয়ে দেবতাদের পশু খেয়ে মরে যাওয়াও অনেক ভালো। ওডিসিউস বুঝতে পারছিলেন যে পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তিনি তার সঙ্গীদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে কথার কোনো দাম নেই। ওডিসিউস তখন সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি দ্বীপের ভেতরের দিকে গিয়ে দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করবেন, যদি তারা কোনো অলৌকিক উপায়ে এই বাতাস থামিয়ে দেন বা খাবারের কোনো ব্যবস্থা করেন। তিনি একটি নির্জন জায়গায় গিয়ে হাত ধুয়ে অলিম্পাসের দেবতাদের উদ্দেশ্যে আকুল প্রার্থনা শুরু করেন। কিন্তু দেবতারা তার প্রার্থনা শোনার বদলে তার চোখের ওপর এক গভীর ঘুম বা হিপনস (Hypnos) ঢেলে দেন। ওডিসিউসের এই ঘুমই মূলত তার সঙ্গীদের জন্য সীমালঙ্ঘনের পথটি পুরোপুরি পরিষ্কার করে দেয়।

ইউরিলোকাসের বিদ্রোহ ও চরম সীমালঙ্ঘন (Eurylochus’s Rebellion and the Ultimate Transgression)

ওডিসিউস যখন দ্বীপের অন্যদিকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন ইউরিলোকাস সঙ্গীদের সামনে এসে দাঁড়ায়। সে অত্যন্ত জোরালো ও উসকানিমূলক ভাষায় একটি ভাষণ দেয়। সে বলে যে, মানুষের জীবনে মৃত্যু অনেকভাবেই আসতে পারে, কিন্তু না খেয়ে অনাহারে ধুঁকে ধুঁকে মরাটা হলো সবচেয়ে জঘন্য ও অসম্মানজনক মৃত্যু। সে সঙ্গীদের প্ররোচিত করে বলে যে, হেলিওসের গবাদিপশুগুলো জবাই করে তারা প্রথমে দেবতাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করবে এবং তারপর নিজেদের ক্ষুধা মেটাবে। ইউরিলোকাস অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে একটি যুক্তি দাঁড় করায়। সে বলে, “যদি আমরা ইথাকায় ফিরে যেতে পারি, তবে আমরা হেলিওসের উদ্দেশ্যে একটি বিশাল মন্দির নির্মাণ করে দেব এবং সেখানে প্রচুর সম্পদ উৎসর্গ করব। আর যদি সূর্যদেবতা আমাদের এই কাজের জন্য রাগ করে সাগরের বুকে আমাদের জাহাজ ডুবিয়ে দেন, তবে অন্তত আমরা না খেয়ে মরার চেয়ে সাগরে ডুবে মরব।” (Finley, 1978)।

ইউরিলোকাসের এই যুক্তি ছিল মূলত মানুষের লোভ ও যৌক্তিকতার ছদ্মবেশে এক চরম সীমালঙ্ঘন বা হিউব্রিস (Hubris)। সে জানত যে দেবতাদের পশু হত্যা করা এক অমার্জনীয় অপরাধ, কিন্তু সে সেই অপরাধটিকে ভবিষ্যৎ ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ন্যায্য করার চেষ্টা করছিল। ক্ষুধার্ত সঙ্গীরা তার এই কথায় অত্যন্ত সহজে প্রভাবিত হয়ে যায়। তারা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে হেলিওসের পাল থেকে সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান গরুগুলো বেছে নিয়ে আসে। যেহেতু তাদের কাছে উৎসর্গ করার জন্য কোনো যবের গুঁড়ো বা বার্লি ছিল না, তাই তারা ওক গাছের পাতা ছিঁড়ে সেগুলো গরুর মাথার ওপর ছিটিয়ে দেয়। এরপর তারা অত্যন্ত নির্মমভাবে গরুগুলোকে জবাই করে। তারা গরুর ঊরুর মাংস কেটে দেবতাদের উদ্দেশ্যে আগুনে পোড়ায় এবং বাকি মাংসগুলো নিজেদের জন্য রান্না করতে শুরু করে।

এই কাজটি ছিল কেবল একটি শপথ ভঙ্গ নয়, এটি ছিল মহাজাগতিক শৃঙ্খলার ওপর সরাসরি আঘাত। হেলিওসের এই পশুগুলো সাধারণ কোনো পশু ছিল না। এগুলো ছিল অমর এবং এদের সংখ্যা ছিল নির্দিষ্ট। প্রতিদিন আকাশে ওঠার সময় এবং সন্ধ্যায় অস্ত যাওয়ার সময় হেলিওস তার এই পশুগুলোকে দেখে আনন্দ পেতেন। সঙ্গীরা যখন এই অমর পশুগুলোকে হত্যা করে, তখন তারা মূলত দেবতাদের নিয়মের প্রতি এক চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করে। তারা রান্না করা মাংস খেতে শুরু করে এবং টানা ছয় দিন ধরে তারা এই মাংস দিয়ে উৎসব করে। তারা ভেবেছিল যে, তারা হয়তো দেবতাদের ঠকিয়ে বেঁচে গেছে, কিন্তু তারা জানত না যে এই উৎসবই তাদের জীবনের শেষ উৎসব হতে চলেছে।

ওডিসিউসের জাগরণ ও অশুভ সংকেত (Awakening of Odysseus and Ominous Signs)

ওডিসিউসের যখন ঘুম ভাঙে, তখন তিনি বুঝতে পারেন যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তিনি যখন জাহাজের দিকে ফিরে আসছিলেন, তখন দূর থেকেই রান্নাকরা মাংসের গন্ধ তার নাকে এসে পৌঁছায়। এই গন্ধ পাওয়া মাত্রই ওডিসিউস বুঝতে পারেন যে তার সঙ্গীরা সেই চরম অমার্জনীয় অপরাধটি করে ফেলেছে, যা থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি এত সতর্ক ছিলেন। তিনি দুই হাত আকাশের দিকে তুলে দেবতাদের উদ্দেশ্যে আর্তনাদ করে ওঠেন। তিনি জিউসকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “হে জিউস এবং অন্যান্য অমর দেবতারা, তোমরা আমাকে এই নিষ্ঠুর ঘুম পাড়িয়ে আমার সবচেয়ে বড় সর্বনাশটি করে দিলে! আমার সঙ্গীরা আমার অনুপস্থিতিতে এমন এক জঘন্য কাজ করেছে, যার কোনো প্রায়শ্চিত্ত নেই।” ওডিসিউসের এই কান্না ছিল তার চরম অসহায়ত্বের প্রকাশ। তিনি একজন নেতা হিসেবে তার অনুসারীদের শপথ রক্ষা করাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন (Segal, 1994)।

ওডিসিউস যখন জাহাজের কাছে এসে পৌঁছান, তখন তিনি দেখেন যে তার সঙ্গীরা নিশ্চিন্তে মাংস খাচ্ছে। তিনি একে একে সবাইকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় তিরস্কার করেন, কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন যে এখন তিরস্কার করে কোনো লাভ নেই, কারণ মৃত গরুগুলোকে আর জীবিত করা সম্ভব নয়। ঠিক এই সময় থ্রিনাসিয়া দ্বীপে কিছু অত্যন্ত ভয়ংকর ও অতিপ্রাকৃত সংকেত বা পোর্নটেন্ট (Portent) দেখা দিতে শুরু করে। দেবতারা সঙ্গীদের অপরাধের ভয়াবহতা বোঝানোর জন্য এই সংকেতগুলো পাঠিয়েছিলেন। ওডিসিউস দেখতে পান যে, জবাই করা গরুর চামড়াগুলো মাটির ওপর সাপের মতো হামাগুড়ি দিয়ে চলছে। আর যে মাংসগুলো আগুনের ওপর রোস্ট করা হচ্ছিল এবং যেগুলো কাঁচা অবস্থায় পড়ে ছিল, সেগুলো থেকে গরুর হাম্বা ডাক ভেসে আসছে।

এই অতিপ্রাকৃত দৃশ্যগুলো ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর। মৃত প্রাণীর মাংস থেকে ডাক ভেসে আসার এই ঘটনাটি দেখায় যে হেলিওসের পশুগুলো সাধারণ মরণশীল প্রাণী নয়। সঙ্গীরা এই দৃশ্য দেখে চরম আতঙ্কে শিউরে ওঠে, কিন্তু তাদের পেটের ক্ষুধা তাদের এই ভয়কেও ছাপিয়ে যায়। তারা টানা ছয় দিন ধরে ওই মাংস খেতে থাকে। ওডিসিউস এই ছয় দিন একটি দানা মাংসও মুখে তোলেননি। তিনি কেবল নিজের গন্তব্য ও নিয়তির কথা ভেবে চুপচাপ বসে ছিলেন। তিনি জানতেন যে, এই সীমালঙ্ঘনের পর দেবতারা তাদের কোনোভাবেই ক্ষমা করবেন না। তিনি কেবল অপেক্ষা করছিলেন যে কখন সেই চরম শাস্তি তাদের ওপর নেমে আসে।

হেলিওসের ক্রোধ ও জিউসের প্রতিশ্রুতি (Wrath of Helios and the Promise of Zeus)

থ্রিনাসিয়া দ্বীপে যখন এই অনাচার চলছিল, তখন অলিম্পাস পর্বতে ঘটে যায় এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। হেলিওসের কন্যা ল্যাম্পেটিয়া দ্রুত ছুটে গিয়ে তার পিতাকে এই গবাদিপশু হত্যার খবর দেয়। খবর শুনে সূর্যদেবতা হেলিওসের ক্ষোভের কোনো সীমা থাকে না। তিনি সরাসরি জিউসের কাছে গিয়ে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বিচার দাবি করেন। হেলিওস বলেন যে, ওডিসিউসের সঙ্গীরা তার সবচেয়ে প্রিয় সম্পদগুলো ধ্বংস করেছে। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে হুমকি দেন যে, যদি জিউস এই অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি না দেন, তবে তিনি আর পৃথিবীর ওপর আলো ছড়াবেন না। তিনি অলিম্পাস ছেড়ে সরাসরি পাতাললোকে গিয়ে মৃত আত্মাদের মাঝে আলো ছড়াতে শুরু করবেন (Louden, 1999)।

হেলিওসের এই হুমকিটি গ্রিক পুরাণে মহাজাগতিক শৃঙ্খলার জন্য এক বিশাল সংকট তৈরি করে। সূর্য যদি পৃথিবীতে আলো না দেয়, তবে সমস্ত জীবনচক্র ধ্বংস হয়ে যাবে। জিউস বুঝতে পারেন যে পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর। তিনি হেলিওসকে শান্ত করে প্রতিশ্রুতি দেন যে, সূর্য যেন তার নিয়ম অনুযায়ী পৃথিবীর ওপর আলো ছড়াতে থাকে। জিউস কথা দেন যে, তিনি নিজে ওডিসিউসের সঙ্গীদের এই ঔদ্ধত্যের চরম শাস্তি দেবেন। তিনি বলেন, “যখনই তারা আবার সাগরের বুকে জাহাজ ভাসাবে, তখন আমি আমার সবচেয়ে শক্তিশালী বজ্রপাত দিয়ে তাদের জাহাজটিকে মাঝসাগরে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেব।” জিউসের এই প্রতিশ্রুতি দেখায় যে, দেবতাদের নিয়ম ভাঙলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হয় না, তা সে যত বড় বীর বা নাবিকই হোক না কেন।

সপ্তম দিনে যখন হঠাৎ করেই সেই এক মাস ধরে বইতে থাকা প্রবল বাতাস থেমে যায়, তখন সঙ্গীরা ভেবেছিল যে তাদের বুঝি কপাল খুলে গেছে। তারা দ্রুত জাহাজে উঠে নোঙর তুলে ইথাকার দিকে পাল ওড়ায়। তারা জানত না যে এই বাতাস থামাটি মূলত তাদের সাগরের বুকে টেনে নিয়ে যাওয়ার একটি ঐশ্বরিক ফাঁদ ছিল। দ্বীপের সীমানা পার হয়ে যখন তারা গভীর সাগরে প্রবেশ করে এবং চারদিকে কেবল জল আর আকাশ ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছিল না, ঠিক তখনই আকাশের চেহারা বদলাতে শুরু করে। জিউস তার প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য এক ভয়ংকর কালো মেঘ বা স্টর্ম ক্লাউড (Storm Cloud) তৈরি করেন, যা সরাসরি তাদের জাহাজের মাথার ওপর এসে অবস্থান নেয়।

বজ্রপাত, নৌবহরের চূড়ান্ত ধ্বংস ও ওডিসিউসের টিকে থাকা (Thunderbolt, Ultimate Destruction of the Fleet, and Odysseus’s Survival)

সাগরের বুকে হঠাৎ করেই পশ্চিম দিক থেকে এক প্রলয়ংকরী ঝড় বা সাইক্লোন ধেয়ে আসে। বাতাসের প্রবল ঝাপটায় জাহাজের দুটি মাস্তুলই মড়মড় করে ভেঙে পড়ে। মাস্তুল ভেঙে পড়ার সময় এর নিচের ভারী কাঠগুলো সরাসরি জাহাজের হাল ধরে থাকা নাবিকের মাথার ওপর এসে পড়ে এবং তার মাথা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। সে জাহাজের ডেক থেকে সাগরের জলে ছিটকে পড়ে। ঠিক সেই মুহূর্তেই জিউস তার হাতের সেই ভয়ংকর বজ্রপাত বা থান্ডারবোল্ট (Thunderbolt) জাহাজের ঠিক মাঝখানে নিক্ষেপ করেন। বজ্রপাতের প্রচণ্ড আঘাতে জাহাজে আগুন ধরে যায় এবং পুরো জাহাজটি সালফারের দুর্গন্ধে ভরে ওঠে। এই বজ্রপাতের আঘাতটি এতই তীব্র ছিল যে, জাহাজের সমস্ত নাবিক একসাথে সাগরের জলে নিক্ষিপ্ত হয় (Ahl & Roisman, 1996)।

হোমার অত্যন্ত করুণভাবে বর্ণনা করেছেন যে, সঙ্গীরা সাগরের ঢেউয়ের ওপর সামুদ্রিক কাকের মতো ভাসতে থাকে। তারা বাঁচার জন্য খড়কুটো আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে, কিন্তু দেবতারা তাদের দেশে ফেরার সমস্ত পথ চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। চোখের সামনে নিজের শেষ সঙ্গীদের এভাবে সাগরের বুকে ডুবে মরতে দেখা ওডিসিউসের জন্য ছিল এক অকল্পনীয় যন্ত্রণা। যে সঙ্গীদের নিয়ে তিনি দশ বছর যুদ্ধ করেছেন, যাদের তিনি স্কিলার মুখ থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন, তারা তাদের নিজেদের লোভের কারণেই আজ সাগরের বুকে সলিলসমাধি লাভ করল। টাইরেসিয়াসের সেই ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হলো। ওডিসিউস এখন পুরোপুরি একা। তার কোনো জাহাজ নেই, কোনো সঙ্গী নেই, এমনকি তার ইথাকায় ফেরার কোনো অবলম্বনও অবশিষ্ট নেই।

কিন্তু ওডিসিউস হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিলেন না। তিনি জাহাজের ডেকের একটি বড় কাঠের টুকরো এবং মাস্তুলের ভাঙা অংশটি দড়ি দিয়ে বেঁধে একটি ছোট ভেলার মতো তৈরি করেন। তিনি সেই ভেলার ওপর বসে সাগরের ঢেউয়ের সাথে লড়াই করতে থাকেন। সারারাত ভাসার পর পরদিন সকালে স্রোতের টানে তিনি আবার সেই ভয়ংকর স্কিলা এবং ক্যারিবডিসের প্রণালীতে এসে পড়েন। ক্যারিবডিস তখন জল শুষে নিচ্ছিল। ওডিসিউস বুঝতে পারেন যে তিনি সরাসরি ঘূর্ণির দিকে যাচ্ছেন। তিনি চরম ক্ষিপ্রতার সাথে পাহাড়ের গায়ে থাকা একটি ডুমুর গাছের ডাল আঁকড়ে ধরে শূন্যে ঝুলে থাকেন, ঠিক যেমন একটি বাদুড় ঝুলে থাকে। ক্যারিবডিস যখন তার কাঠের টুকরোটি শুষে নেয়, তখন তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওই গাছের ডালে ঝুলে অপেক্ষা করেন। অবশেষে ক্যারিবডিস যখন আবার জল বমি করে বের করে দেয়, তখন তিনি ওই কাঠের টুকরোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং হাত দিয়ে জল কেটে সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচেন। এই টিকে থাকা দেখায় যে, সমস্ত কিছু হারানোর পরও একজন মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাকে মৃত্যুর মুখ থেকেও ফিরিয়ে আনতে পারে।

ওজিজিয়া দ্বীপে প্রত্যাবর্তন ও ক্যালিপসোর মায়াজাল (Return to the Island of Ogygia and the Illusion of Calypso): নিঃসঙ্গতা, অমরত্ব ও বন্দিত্ব

ক্যারিবডিসের ঘূর্ণি থেকে পলায়ন ও সাগরের বুকে ভেসে থাকা (Escape from Charybdis and Drifting on the Sea)

থ্রিনাসিয়া দ্বীপে সূর্যদেবতা হেলিওসের পবিত্র গবাদিপশু হত্যার চরম অপরাধের শাস্তি হিসেবে জিউস যখন ওডিসিউসের একমাত্র অবশিষ্ট জাহাজটিকে মাঝসাগরে বজ্রপাত দিয়ে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেন, তখন ওডিসিউস (Odysseus) তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ নিঃসঙ্গতার মুখোমুখি হন। তার চোখের সামনে তার শেষ সঙ্গীরা সাগরের বুকে খড়কুটোর মতো ভেসে যায় এবং সলিলসমাধি লাভ করে। টাইরেসিয়াসের অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়। ওডিসিউস এখন পুরোপুরি একা, তার কোনো জাহাজ নেই, কোনো সঙ্গী নেই, এমনকি তার ইথাকায় ফেরার কোনো অবলম্বনও অবশিষ্ট নেই। তবে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র তিনি ছিলেন না। তিনি জাহাজের ডেকের একটি বড় কাঠের টুকরো এবং মাস্তুলের ভাঙা অংশটি দড়ি দিয়ে বেঁধে একটি ছোট ভেলার মতো তৈরি করেন। তিনি সেই ভেলার ওপর বসে সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে লড়াই করতে থাকেন। সারারাত ভাসার পর পরদিন সকালে স্রোতের টানে তিনি আবার সেই ভয়ংকর স্কিলা এবং ক্যারিবডিসের প্রণালীতে এসে পড়েন (Nagy, 1999)।

ক্যারিবডিস তখন সাগরের জল প্রচণ্ড শক্তিতে নিজের ভেতরে শুষে নিচ্ছিল। ওডিসিউস বুঝতে পারেন যে তিনি সরাসরি ঘূর্ণির দিকে যাচ্ছেন এবং তার কাঠের টুকরোটি বাঁচানোর কোনো উপায় নেই। তিনি চরম ক্ষিপ্রতার সাথে পাহাড়ের গায়ে থাকা একটি বিশাল ডুমুর গাছের ডাল আঁকড়ে ধরেন এবং শূন্যে ঝুলে থাকেন, ঠিক যেমন একটি বাদুড় ঝুলে থাকে। ক্যারিবডিস যখন তার কাঠের টুকরোটি শুষে নেয়, তখন তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওই গাছের ডালে ঝুলে অপেক্ষা করেন। তার শারীরিক শক্তি ও মানসিক সহনশীলতার এই পরীক্ষাটি ছিল অকল্পনীয়। অবশেষে ক্যারিবডিস যখন আবার জল বমি করে বের করে দেয়, তখন ওডিসিউস অত্যন্ত নিখুঁত সময়ে ওই কাঠের টুকরোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি তার দুই হাত দিয়ে জল কেটে অত্যন্ত দ্রুত বেগে সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচেন। এই টিকে থাকা দেখায় যে, সমস্ত কিছু হারানোর পরও একজন মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকেও ফিরিয়ে আনতে পারে।

স্কিলা এবং ক্যারিবডিসের এই ভয়ংকর প্রণালী পার হওয়ার পর ওডিসিউস নিজেকে সাগরের অনন্ত জলরাশির কাছে পুরোপুরি সঁপে দেন। তার কাছে কোনো দিকনির্ণয়ক যন্ত্র বা নক্ষত্রের হিসাব ছিল না। তিনি টানা নয় দিন ও নয় রাত সাগরের বুকে ওই সামান্য কাঠের টুকরোটিকে আঁকড়ে ধরে ভাসতে থাকেন। এই নয় দিনের যাত্রা ছিল একাধারে তার শারীরিক ক্ষুধার সাথে লড়াই এবং তার অতীত স্মৃতির রোমন্থন। তিনি তার ধ্বংস হয়ে যাওয়া নৌবহর, মৃত সঙ্গীদের মুখ এবং ইথাকার জন্য তীব্র ব্যাকুলতায় ভুগছিলেন। হোমার এই দীর্ঘ ভাসমান দশাকে মানবজীবনের এক চরম অসহায়ত্বের রূপক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একজন রাজা, যিনি একসময় হাজার হাজার সৈন্য পরিচালনা করতেন, তিনি এখন প্রকৃতির খেয়ালের কাছে একটি ভাসমান পাতার মতো তুচ্ছ। দশম দিনের মাথায়, যখন তার শরীরে আর এক বিন্দু শক্তি অবশিষ্ট ছিল না, তখন স্রোতের টানে তিনি একটি রহস্যময় ও সুন্দর দ্বীপের উপকূলে এসে পৌঁছান।

ওজিজিয়া দ্বীপে পদার্পণ ও ক্যালিপসোর অভ্যর্থনা (Setting Foot on Ogygia and Calypso’s Welcome)

সাগরের স্রোত ওডিসিউসকে যে দ্বীপটিতে এনে ফেলেছিল, তার নাম ছিল ওজিজিয়া (Ogygia)। গ্রিক পুরাণের বিশাল ও বৈচিত্র্যময় ভূগোলে এটি এক বিচ্ছিন্ন, রহস্যময় এবং প্রায় অনাবিষ্কৃত এক দ্বীপ। ট্রয়যুদ্ধ শেষে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় সঙ্গীদের হারিয়ে, জাহাজডুবি হয়ে, সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় ওডিসিউস যখন এই দ্বীপের নরম বালুকাময় সৈকতে এসে লুটিয়ে পড়েন, তখন তিনি আক্ষরিক অর্থেই অর্ধমৃত। বাইরে থেকে দেখলে এই দ্বীপটিকে পৃথিবীর বুকে এক খণ্ড স্বর্গের মতো মনে হতে পারে। দ্বীপের চারপাশ ঘিরে ছিল ঘন বনানী, যেখানে অ্যালডার, পপলার আর সুগন্ধি সাইপ্রেস গাছ আকাশ ছুঁতে চাইত। গুহার মুখ পেঁচিয়ে বেড়ে উঠেছিল আঙুরলতা, আর চারপাশের চারটি ঝরনা থেকে স্ফটিকস্বচ্ছ জল বইত। নরম ঘাস আর বুনো ফুলে ঢাকা এই দ্বীপের এমন মায়াবী রূপ স্বয়ং দেবতাদেরও মুগ্ধ করার জন্য যথেষ্ট ছিল (Doherty, 1995)।

এই অপরূপ দ্বীপটির একমাত্র অধিবাসী ছিলেন দেবী ক্যালিপসো (Calypso), যিনি ছিলেন টাইটান অ্যাটলাসের কন্যা। গ্রিক ভাষায় তার নামের অর্থ হলো ‘গোপনকারিণী’ বা যিনি লুকিয়ে রাখেন। ক্যালিপসো যখন সৈকতে এই মুমূর্ষু মানুষটিকে দেখতে পান, তখন তিনি তাকে কোনো দানব বা অসভ্য মানুষের মতো আক্রমণ করেননি। তিনি অত্যন্ত মমতার সাথে ওডিসিউসকে তুলে নেন এবং তার নিজের গুহায় নিয়ে যান। ক্যালিপসো ওডিসিউসকে স্নান করান, তার ক্ষতগুলোতে ঐশ্বরিক প্রলেপ লাগান এবং তাকে দেবতাদের খাবার – নেকটারঅ্যামব্রোসিয়া – খেতে দেন। এই খাবার ও সেবার ফলে ওডিসিউস ধীরে ধীরে তার হারানো শক্তি ফিরে পান। ক্যালিপসোর এই আচরণ ছিল আতিথেয়তার পবিত্র নিয়ম বা জেনিয়া (Xenia)-এর এক নিখুঁত উদাহরণ, কিন্তু এর পেছনে একটি গভীর স্বার্থপর উদ্দেশ্যও লুকিয়ে ছিল।

ক্যালিপসো বছরের পর বছর ধরে এই দ্বীপে একাকী বসবাস করছিলেন। একজন দেবী হিসেবে তার কোনো কিছুর অভাব ছিল না, কিন্তু তার মনে এক তীব্র নিঃসঙ্গতা বা আইসোলেশন (Isolation) কাজ করত। ওডিসিউসের মতো একজন ধীমান, সাহসী এবং সুদর্শন পুরুষকে কাছে পেয়ে তিনি তার সেই দীর্ঘ নিঃসঙ্গতা কাটানোর সুযোগ পান। তিনি ওডিসিউসকে কেবল সুস্থই করে তোলেননি, তিনি তাকে গভীর ভালোবাসায় জড়িয়ে ফেলেন। ক্যালিপসো ওডিসিউসকে তার শয্যাসঙ্গী হতে বাধ্য করেন না, বরং তিনি তাকে নিজের মায়াবী গান এবং সৌন্দর্যের জালে ধীরে ধীরে আবদ্ধ করেন। ওডিসিউস, যিনি তখন তার সঙ্গীদের হারিয়ে চরম মানসিক ট্রমার মধ্যে ছিলেন, তিনি এই আরামদায়ক আশ্রয়ে কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পান। তবে তিনি তখনো বুঝতে পারেননি যে, এই সুন্দর ও মায়াবী গুহাটিই হতে যাচ্ছে তার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ এবং যন্ত্রণাদায়ক কারাগার।

অমরত্বের প্রলোভন ও মানুষের সসীম সত্তা (Temptation of Immortality and the Finite Nature of Man)

ওডিসিউস যখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং ক্যালিপসোর সাথে গুহায় বসবাস করতে শুরু করেন, তখন দেবী তার সামনে এমন একটি প্রস্তাব রাখেন, যা প্রত্যাখ্যান করার কথা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন। ক্যালিপসো তাকে আজীবন তার সাথে থেকে যাওয়ার শর্তে অমরত্ব (Athanasia) এবং চিরযৌবনের প্রলোভন দেখান। গ্রিক পুরাণে মরণশীল মানুষের দেবতা হয়ে ওঠার বা অমরত্ব লাভের ঘটনা একেবারেই বিরল নয়। ক্যালিপসোর যুক্তি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। তিনি ওডিসিউসকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, সাগরের বুকে পাড়ি দিলে তাকে অভাবনীয় কষ্টের সম্মুখীন হতে হবে। তিনি নিজের সৌন্দর্যের সাথে ওডিসিউসের স্ত্রী পেনেলোপির তুলনা টেনে আনেন। একজন দেবী হিসেবে ক্যালিপসো কখনোই বৃদ্ধ হবেন না, তার সৌন্দর্য কখনো ম্লান হবে না। অন্যদিকে পেনেলোপি একজন রক্তমাংসের মানুষ, বয়সের সাথে সাথে তার শরীরে বার্ধক্যের ছাপ পড়বে এবং একদিন সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে (Vernant, 1991)।

কিন্তু ওডিসিউসের কাছে এই প্রস্তাবটি ছিল তার আত্মপরিচয় মুছে ফেলার এক চূড়ান্ত ষড়যন্ত্র। একজন গ্রিক বীরের মহত্ত্ব বা ক্লিওস (Kleos) অর্জিত হয় তার জীবনের ঝুঁকি নেওয়া, কষ্ট সহ্য করা এবং শেষ পর্যন্ত বীরত্বের সাথে মৃত্যুবরণ করার মধ্য দিয়ে। মৃত্যুহীন জীবনে বীরত্বের কোনো অস্তিত্ব নেই। অমরত্ব গ্রহণ করার অর্থ হলো মানুষের জীবনের সমস্ত চ্যালেঞ্জ, দুঃখ ও অর্জনকে অস্বীকার করা। ওডিসিউস ক্যালিপসোর সমস্ত যুক্তি অত্যন্ত বিনীতভাবে মেনে নেন। তিনি স্বীকার করেন যে রূপ বা অমরত্বের দিক থেকে তার স্ত্রী কোনোভাবেই একজন দেবীর সমকক্ষ নন। তারপরও তিনি এই মরণশীল মানুষের জীবনটাকেই বেছে নেন। তার এই সিদ্ধান্ত বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি দার্শনিক অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়।

ওডিসিউস অমরত্ব প্রত্যাখ্যান করে মূলত মানুষের সসীম সত্তা বা হিউম্যান কন্ডিশন (Human Condition)-কে আপন করে নিয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, জীবনের সৌন্দর্য এর স্থায়িত্বের মধ্যে নয়, বরং এর ভঙ্গুরতার মধ্যে নিহিত। মানুষের জীবন সসীম বলেই এর প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি সম্পর্ক এত দামি। ক্যালিপসোর সাথে থেকে গেলে তিনি হয়তো কোনোদিন বৃদ্ধ হতেন না, কিন্তু তার জীবনের কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য অবশিষ্ট থাকত না। তিনি কেবল একজন দেবীর খেলনা হয়ে অনন্তকাল পার করে দিতেন। নিজের বাড়ি ফেরা, স্ত্রীর সাথে পুনরায় মিলিত হওয়া, ছেলের বেড়ে ওঠা দেখা এবং নিজের রাজ্যের দায়িত্ব নেওয়ার মতো সাধারণ মানবিক চাওয়াগুলোর কাছে অমরত্বের প্রলোভন তার কাছে অত্যন্ত তুচ্ছ মনে হয়েছিল। এই প্রত্যাখ্যান দেখায় যে, ওডিসিউসের কাছে নিজের শেকড় এবং মানবিক পরিচয়ের মূল্য যেকোনো ঐশ্বরিক প্রলোভনের চেয়ে অনেক বেশি।

স্মৃতিকাতরতা ও অন্তহীন অপেক্ষা (Nostalgia and the Endless Wait)

অমরত্বের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর ক্যালিপসো ওডিসিউসকে জোর করে আটকে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাকে দ্বীপে চলাফেরা করার স্বাধীনতা দেন, কিন্তু তাকে কোনো জাহাজ বা নাবিক দেন না, যাতে সে ইথাকায় ফিরতে পারে। শুরু হয় ওডিসিউসের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক বন্দিদশা। টানা সাতটি বছর তিনি এই ওজিজিয়া দ্বীপে কাটান। এই সাত বছরে তার দৈনন্দিন রুটিন ছিল অত্যন্ত একঘেয়ে এবং হতাশাজনক। হোমার তাকে চিত্রিত করেছেন এমন এক মানুষ হিসেবে, যে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সমুদ্রের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকে এবং চোখের জলে বুক ভাসায়। রাতের বেলা ক্যালিপসোর গুহায় তাকে বাধ্য হয়ে দেবীর শয্যাসঙ্গী হতে হতো, কিন্তু তার মন সেখানে থাকত না। শরীর সেখানে উপস্থিত থাকলেও তার আত্মা পড়ে থাকত ইথাকার সেই পাথুরে ভূমিতে (Montiglio, 2011)।

তার এই কান্না কোনো দুর্বলতা ছিল না, এটি ছিল তার নিজের রাজ্য, পরিবার ও শেকড়ের প্রতি তীব্র আকুলতার প্রকাশ। গ্রিক দর্শনে বাড়ি ফেরার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে বলা হয় নস্টস (Nostos)। আধুনিক যুগে আমরা যে নস্টালজিয়া শব্দটি ব্যবহার করি, তার উৎপত্তিও এই গ্রিক শব্দ থেকেই। ওডিসিউসের অস্তিত্বের প্রতিটি কোষে এই নস্টস এমনভাবে মিশে ছিল যে, ক্যালিপসোর কোনো জাদুই তা ভুলিয়ে দিতে পারেনি। একজন বন্দি মানুষের এই দ্বৈত জীবন তার ভেতরের পরিচয় সংকট বা আইডেনটিটি ক্রাইসিস (Identity Crisis)-কে আরও ঘনীভূত করে তুলেছিল। সাতটি দীর্ঘ বছর ধরে একই রুটিন, একই সমুদ্রের ঢেউ, একই পাখি ডাকা সকাল তাকে মানসিকভাবে প্রায় স্থবির করে দিয়েছিল। তিনি জানতেন না ইথাকায় তার স্ত্রী কেমন আছে, তার ছেলে বড় হয়ে কী করছে। এই অনিশ্চয়তা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।

এই স্মৃতিকাতরতা ওডিসিউসকে বাঁচিয়েও রেখেছিল। যদি তিনি একবার ইথাকার স্মৃতি ভুলে যেতেন, তবে তিনি হয়তো লোটাস-ভোজীদের দ্বীপে তার সঙ্গীদের মতো বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতেন এবং ক্যালিপসোর অমরত্বের প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করতেন। কিন্তু ওই দূরবর্তী দ্বীপের স্মৃতি তাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দিত যে তিনি কে এবং তার আসল পরিচয় কী। সাগরের যে জলরাশি তার আর ইথাকার মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেই জলরাশির দিকে তাকিয়ে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দিতেন। সমুদ্র একইসাথে তার বন্দিশালা এবং মুক্তির একমাত্র পথ হিসেবে তার সামনে উপস্থিত ছিল। তার এই অন্তহীন অপেক্ষা দেখায় যে, মানুষের মানসিক শক্তি তার শারীরিক সীমানার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তীর্ণ।

ক্যালিপসোর মনস্তত্ত্ব ও লৈঙ্গিক দ্বৈততা (Psychology of Calypso and Gender Duality)

ওডিসিউসকে বন্দি করে রাখার এই আখ্যানে দেবী ক্যালিপসোকে কেবল একজন বাধাদানকারী বা প্রলুব্ধকারী চরিত্র হিসেবে দেখলে তার প্রতি অবিচার করা হবে। হোমার অত্যন্ত সুনিপুণভাবে এই দেবীর ভেতরের নিঃসঙ্গতা ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনকে চিত্রিত করেছেন। ক্যালিপসোর ভালোবাসা ছিল অত্যন্ত গভীর ও সত্য, যদিও তা ছিল স্বার্থপর। তিনি ওডিসিউসকে কেবল আটকে রাখেননি, তিনি তার প্রতিটি প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেছেন। তার নামের অর্থ ‘গোপনকারিণী’ হলেও, তিনি ওডিসিউসের কাছ থেকে কোনো কিছু গোপন করেননি। তিনি কেবল চেয়েছিলেন যে ওডিসিউস তার নিঃসঙ্গ জীবনের সঙ্গী হোক। একজন দেবী হয়েও একজন মরণশীল মানুষের প্রতি তার এই নির্ভরশীলতা অলিম্পাসের দেবতাদের নিখুঁত জীবনের একটি বড় ত্রুটি বা শূন্যতা প্রকাশ করে (Foley, 2001)।

ক্যালিপসোর চরিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী দিকটি উন্মোচিত হয় যখন তিনি অলিম্পাসের দেবতাদের বিরুদ্ধে সরাসরি লৈঙ্গিক বৈষম্য বা জেন্ডার ইনইকুয়ালিটি (Gender Inequality)-এর অভিযোগ তোলেন। পুরুষ দেবতারা যখন ইচ্ছা কোনো মরণশীল নারীকে নিজেদের শয্যাসঙ্গিনী করে নেন, তখন অলিম্পাস নীরব থাকে। কিন্তু কোনো দেবী যদি কোনো মরণশীল পুরুষকে ভালোবেসে নিজের কাছে রাখতে চান, তখন অন্য দেবতাদের ইগোতে আঘাত লাগে এবং তারা সেই সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। দেবী ডন ও কালপুরুষ ওরিয়নের প্রেমকাহিনীর উদাহরণ টেনে ক্যালিপসো দেবতাদের এই দ্বিমুখী নীতির তীব্র সমালোচনা করেন।

তার এই ক্ষোভ প্রাচীন সাহিত্যে নারীবাদী দৃষ্টিকোণের এক অসামান্য ঝলক। তিনি স্পষ্টতই একজন ক্ষমতাধর দেবী, কিন্তু অলিম্পাসের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর কাছে তিনিও এক প্রকার অসহায়। তিনি ওডিসিউসকে জোর করে আটকে রাখলেও, যখন পরবর্তীতে জিউসের নির্দেশ আসবে, তখন তাকে সেই নির্দেশ মাথা পেতে নিতে হবে। ক্যালিপসোর চরিত্রটি তাই কেবল একজন জাদুকরীর নয়, এটি হলো একাকিত্ব, ভালোবাসা এবং লৈঙ্গিক রাজনীতির এক জটিল মিশ্রণ। তার এই নিঃসঙ্গতাই তাকে ওডিসিউসের মতো একজন মরণশীল মানুষের প্রতি এতটা নির্ভরশীল করে তুলেছিল, যা শেষ পর্যন্ত তার নিজের জন্যই এক বড় মনস্তাত্ত্বিক কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বন্দিদশার দার্শনিক তাৎপর্য ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা (Philosophical Significance of Captivity and the Yearning for Freedom)

ওজিজিয়া দ্বীপে ওডিসিউসের এই দীর্ঘ সাত বছরের বন্দিদশা মহাকাব্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক তাৎপর্য বহন করে। এই সময়টি ছিল ওডিসিউসের জীবনের একটি বিরতি বা পজ (Pause)। ট্রয়ের দশ বছরের যুদ্ধ এবং সাগরের বুকে দানবদের সাথে তিন বছরের নিরন্তর লড়াইয়ের পর, এই সাত বছর তাকে নিজের অতীতকে মূল্যায়ন করার এবং নিজের ভেতরের সত্তাকে নতুন করে চেনার সুযোগ করে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন যে, কেবল তলোয়ার বা মেটিস দিয়ে সব কিছু জয় করা যায় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষকে কেবল ধৈর্য ধরতে হয় এবং নিয়তির ওপর নির্ভর করতে হয়। ক্যালিপসোর দ্বীপটি তাই কেবল একটি কারাগার ছিল না, এটি ছিল তার আত্মশুদ্ধি বা ক্যাথারসিস (Catharsis)-এর একটি পর্যায় (Segal, 1994)।

এই বন্দিদশা তাকে আরও শিখিয়েছিল যে, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার স্বাধীনতা। ক্যালিপসোর দ্বীপে কোনো যুদ্ধ ছিল না, কোনো ক্ষুধা ছিল না, কিন্তু স্বাধীনতা না থাকায় সেই ঐশ্বরিক জীবন তার কাছে নরকের মতো মনে হয়েছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইথাকার পাথুরে মাটিতে নিজের ঘাম ঝরিয়ে যে ফসল ফলানো যায়, তার মূল্য ক্যালিপসোর দেওয়া অমরত্বের চেয়ে অনেক বেশি। মুক্তির জন্য তার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষাই শেষ পর্যন্ত অলিম্পাসের দেবতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।

যখন ওডিসিউস প্রতিদিন সমুদ্রের তীরে বসে কাঁদতেন, তখন তার সেই চোখের পানি কেবল ইথাকার জন্যই ছিল না; সেটি ছিল মানব অস্তিত্বের সসীমতা এবং তার শেকড়ের প্রতি অটল ভালোবাসার এক চূড়ান্ত ঘোষণা। এই সাত বছরের বন্দিদশা ওডিসিউসের মনকে ইস্পাতের মতো শক্ত করে তোলে, যা তাকে পরবর্তীতে ইথাকার রাজপ্রাসাদে তার শত্রুদের বিরুদ্ধে এক নির্মম এবং আবেগহীন প্রতিশোধ নিতে সাহায্য করেছিল। ক্যালিপসোর মায়াজাল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসার জন্য ওডিসিউস তাই মনে মনে পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলেন, কেবল অপেক্ষা করছিলেন অলিম্পাস থেকে আসা একটি চূড়ান্ত নির্দেশের জন্য, যা তার ভাগ্যের চাকা নতুন করে ঘোরাতে শুরু করবে।

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.