পাঁচ

হুজুর কেবলা

পাঁচ

আবুল মনসুর আহমদ

পাঁচ

পীর সাহেব বলিলেন: আজ তোমাদের আমি যে মোরাকেবার তরকিব দেখাইব, ইহা দ্বারা যেকোনো লোকের রুহের সঙ্গে কথা বলিতে পারি। আমি যদি নিজে মোরাকেবায় বসি, তবে সেই রুহ গোপনে আমার সঙ্গে কথা বলিয়া চলিয়া যাইবে। তোমরা কিছুই দেখিতে পাইবে না। তোমাদের মধ্যে একজন মোরাকেবায় বসো, আমি তার রুহের দিকে তোমরা যার কথা বলিবে তার রুহের তাওয়াজ্জোহ দেখাইয়া তার রুহের ফয়েজ হাসিল করিব। তৎপর তোমরা যে কেউ তার সঙ্গে কথা বলিতে পারিবে। তোমাদের মধ্যে কে মোরাকেবায় বসিবে?

সকলে মুখ চাওয়াচাওয়ি করিতে লাগিল।

কেউই কোনো কথা বলিল না, মোরাকেবায় বসিতে কেউই অগ্রসর হইল না।

এমদাদ দাঁড়াইয়া বলিল: আমি বসিব।

পীর সাহেব একটু হাসিলেন।

বলিলেন: বাবা, মোরাকেবা অত সোজা নয়। তুই আজিও যেকরে খফি আমল করিস নাই, মোরাকেবায় বসিতে চাস?

— বলিয়া তিনি হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন।

দেখাদেখি উপস্থিত সকলেই হাসিয়া উঠিল।

লজ্জায় এমদাদের রাগ হইল। সে বসিয়া পড়িল।

পীর সাহেব আবার বলিলেন: কি, আমার মুরিদগণের মধ্যে আজিও কারো এতদূর রুহানি তরক্কি হাসেল হয় নাই, যে মোরাকেবায় বসিতে পারে? আমার খলিফাদের মধ্যেও কেহ নাই?

বলিয়া তিনি শাগরেদদের দিকে দৃষ্টি ফিরাইলেন।

প্রধান খলিফা সুফি সাহেব উঠিয়া বলিলেন: হুজুর কেবলা কি তবে বান্দাকে হুকুম করিতেছেন? আমি তো আপনার আদেশে কতবার মোরাকেবায়-নেসবতে বায়নান্নাসে বসিয়াছি। কোনো নতুন লোককে বসাইলে হইত না?

সুফি সাহেব আরো অনেকবার বসিয়াছেন শুনিয়া মুরিদগণের অন্তরে একটু সাহসের উদ্রেক হইল।

তারা সকলে সমস্বরে বলিল: আপনিই বসুন, আপনিই বসুন।

অগত্যা পীর সাহেবের আদেশে সুফি সাহেব মোরাকেবায় বসিলেন।

পীর সাহেব উপস্থিত দর্শকদের দিকে চাহিয়া বলিলেন: কার রুহের ফয়েজ হাসিল করিব?

মুরিদগণের মুখে কথা যোগাইবার আগেই জনৈক শাগরেদ বলিল: এই মাত্র মৌলুদ-শরিফ হইয়াছে, হযরত পয়গম্বর সাহেবের মোয়াজেযা বয়ান হইয়াছে। তাঁরই রুহ আনা হোক।

সকলেই খুশি হইয়া বলিল: তাই হউক, তাই হউক।

তাই হইল।

সুফি সাহেব আতর-সিক্ত মখমলের গালিচায় তাকিয়া হেলান দিয়া বসিলেন। চারিদিকে আগরবাতি জ্বালাইয়া দেওয়া হইল। মেশক্ যাফরান ও আতরের গন্ধে ঘর ভরিয়া গেল।

পীর সাহেব তাঁর প্রধান খলিফার রুহে শেষ পয়গম্বর হযরত মোহাম্মদের রুহ-মোবারক নাযেল করিবার জন্য ঠিক তাঁর সামনে বসিলেন।

শাগরেদরা চারিদিক ঘিরিয়া বসিয়া মিলিত কণ্ঠে সুর করিয়া দরুদ পাঠ করিতে লাগিল। পীর সাহেব কখনো জোরে কখনো বা আস্তে নানা প্রকার দোয়া কালাম পড়িয়া সুফি সাহেবের চোখে-মুখে ফুঁকিতে লাগিলেন।

কিছুক্ষণ ফুঁকিবার পর শাগরেদগণকে চুপ করিতে ইঙ্গিত করিয়া পীর সাহেব বুকে হাত বাঁধিয়া একদৃষ্টে সুফি সাহেবের বুকের দিকে চাহিয়া রহিলেন।

সুফি সাহেবের বুকের দুইটা বোতাম খুলিয়া তাঁর বুকের খানিকটা অংশ ফাঁক করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। পীর সাহেব তাঁর দৃষ্টি সেইখানেই নিবদ্ধ করিলেন।

অল্পক্ষণের মধ্যেই সুফি সাহেবের শরীর কাঁপিতে লাগিল। কম্পন ক্রমেই বাড়িয়া গেল। সুফি সাহেব ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলিতে লাগিলেন এবং হাত-পা ছুড়িতে ছুড়িতে মূর্ছিতের ন্যায় বিছানায় লুটাইয়া পড়িলেন।

পীর সাহেব মুরিদগণের দিকে চাহিয়া বলিলেন: বদর বাবাজির একটু তকলিফ হইল! কী করিব? পরের রুহের উপর অন্য রুহের ফয়েজ হাসেল আসানির সঙ্গে করা বিলকুল না-মুমকিন। যা হউক, হযরতের রুহ তশরিফ আনিয়াছেন। তোরা সকলে উঠিয়া কেয়াম কর।

— বলিয়া তিনি স্বয়ং উঠিয়া পড়িলেন। সকলেই দাঁড়াইয়া সমস্বরে পড়িতে লাগিল: ইয়া নবি সালাম আলায়কা ইত্যাদি।

কেয়াম ও দরুদ শেষ হইলে অভ্যাসমতো অনেকেই বসিয়া পড়িল।

পীর সাহেব ধমক দিয়া বলিলেন: হযরতের রুহে পাক এখনো এই মজলিশে হাজির আছেন, তোমরা কেহ বসিতে পারিবে না। কার কী সওয়াল করিবার আছে করিতে পারো।

এমদাদ একটা বিষয় ধাঁধায় পড়িয়া গেল। সে ইহাকে কিছুতেই সত্য বলিয়া মানিয়া লইতে পারিল না।

— মাথায় এক ফন্দি আঁটিয়া অগ্রসর হইয়া বলিল: কেবলা, আমি কোনো সওয়াল করিতে পারি?

পীর সাহেব চোখ গরম করিয়া বলিলেন: যাও না, জিজ্ঞাসা করো না গিয়া!

— বলিয়া কণ্ঠস্বর অপেক্ষাকৃত মোলায়েম করিয়া আবার বলিলেন: বাবা সকলের কথাই যদি রুহে পাকের কাছে পৌঁছিত, তবে দুনিয়ার সব মানুষই ওলি-আল্লাহ হইয়া যাইত।

এমদাদ তথাপি সুফি সাহেবের দিকে চাহিয়া বলিল: আপনি যদি হযরত পয়গম্বর সাহেবের রুহ হন, তবে আমার দরুদ-সালাম জানিবেন।

হযরতের রুহ কোনো জবাব দিল না।

পীর সাহেব এমদাদের কাঁধে হাত দিয়া তাকে একদিকে ঠেলিয়া দিয়া বলিলেন: অধিক্ষণ রুহে পাকে রাখা বেআদবি হইবে। তোমাদের যদি কাহারও সিনা সাফ হইয়া থাকে, তবে আসিয়া যেকোনো সওয়াল করিতে পারো।

— বলিতেই পীর সাহেবের অন্যতম খলিফা মওলানা বেলায়েতপুরী সাহেব অগ্রসর হইয়া 'আসসালামু আলাইকুম ইয়া রসুলুল্লাহ' বলিয়া সুফি সাহেবের সামনে দাঁড়াইলেন।

সকলে বিস্মিত হইয়া শুনিল সুফি সাহেবের মুখ দিয়া বাহির হইল: ওয়া আলাইকুমুস সালাম, ইয়া উম্মতি।

মওলানা সাহেব বলিলেন: হে রেসালাত-পনা, সৈয়দুল কাওনায়েন, আমি আপনার খেদমতে একটা আরজ করিতে চাই।

আওয়াজ হইল: শিগগির বলো, আমার আর দেরি করিবার উপায় নাই।

মওলানা: আমাদের পীর দস্তগির কেবলা সাহেব নূরে-ইযদানির জলওয়া সহ্য করিতে পারেন না, ইহার কারণ কী? তার আমলে কি কোনো গলদ আছে?

কঠোর সুরে উত্তর হইল: হ্যাঁ আছে।

পীর সাহেব শিহরিয়া উঠিলেন। তিনি কাঁদো কাঁদো সুরে নিজেই বলিলেন: কী গলদ আছে, ইয়া রাসুলুল্লাহ? আমার পঞ্চাশ বৎসরের রঞ্জ-কশি কি তবে সব পণ্ড হইয়াছে?

— বলিয়া পীর সাহেব কাঁদিয়া ফেলিলেন।

সুফি সাহেবের অচেতন দেহের মধ্যে হইতে আওয়াজ হইল: হে আমার পিয়ারা উম্মত, ঘাবড়াইও না। তোমার উপর আল্লাহর রহমত হইবে। তুমি মারফত খুঁজিতেছ। কিন্তু শরিয়ত ত্যাগ করিয়া কি মারফত হয়?

পীর সাহেব হাত কচলাইয়া বলিলেন: হুজুর, আমি কবে শরিয়ত অবহেলা করিলাম?

উত্তর হইল: অবহেলা করো নাই, কিন্তু পালনও করো নাই। আমি শরিয়তে চার বিবি হালাল করিয়াছি। কিন্তু তোমার মাত্র তিন বিবি। যারা সাধারণ দুনিয়াদার মানুষ তাদের এক বিবি হইলেও চলিতে পারে। কিন্তু যারা রুহানি ফয়েজ হাসিল করিতে চায়, তাদের চার বিবি ছাড়া উপায় নাই! আমি চার বিবির ব্যবস্থা কেন করিয়াছি, তোমরা কিছু বুঝিয়াছ? চার দিয়াই এ দুনিয়া, চার দিয়াই আখেরাত। চারদিকে যা দেখ সবই খোদা চার চিজ দিয়া পয়দা করিয়াছেন। চার চিজ দিয়া খোদাতায়ালা আদম সৃষ্টি করিয়া তার হেদায়েতের জন্য চার কেতাব পাঠাইয়াছেন। সেই হেদায়েত পাইতে হইলে মানুষকে চার এমামের চার তরিকা মানিয়া চলিতে হয়। এইভাবে মানুষকে চারের ফাঁদে ফেলিয়া খোদাতায়ালা চার কুরসির অন্তরালে লুকাইয়া আছেন। এই চারের পরদা ঠেলিয়া আলমে-আমরে নূরে-ইযদানিতে ফানা হইতে হইবে, দুনিয়াতে চার বিবির ভজনা করিতে হইবে।

পীর সাহেব সকলকে শুনাইয়া হযরতের রুহের দিকে চাহিয়া বলিলেন: এই বৃদ্ধ বয়সে আবার বিবাহ করিব?

— তুমি বৃদ্ধ? আমি ষাট বৎসর বয়সে নবমবার বিবাহ করিয়াছিলাম।

পীর সাহেব মিনতি ভরা কণ্ঠে বলিলেন: না রেসালাত-পনা: আমি আর বিবাহ করিব না।

— না করো, ভালোই। কিন্তু তোমার রুহানি কামালিয়ত হাসেল হইবে না, তুমি নূরে-ইযদানির জলওয়া বরদাশ্ত করিতে পারিবে না। তোমার মুরিদানের কেহই নফসানিয়তের হাত এড়াইতে পারিবে না।

পীর সাহেব হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া বলিলেন: আমি নিজের জন্য ভাবি না ইয়া রসুলুল্লাহ; কিন্তু যখন আমার মুরিদগণের অনিষ্ট হইবে, তখন বিবাহ করিতে রাজি হইলাম। কিন্তু আমি এক বুড়িকে বিবাহ করিব।

— তুমি তওবা আসতাগফার পড়ো। তুমি খোদার কলম রদ করিতে চাও? তোমার বিবাহ ঠিক হইয়া আছে। বেহেশতে আমি তার ছবি দেখিয়া আসিয়াছি।

— সে কে, ইয়া রসুলুল্লাহ?

— এই বাড়ির তোমার মুরিদের ছোট ছেলে রজবের স্ত্রী কলিমন।

— ইয়া রসুলুল্লাহ, আমি মুরিদের স্ত্রীকে বিবাহ করিব? সে যে আমার বেটার বউয়ের শামিল।

— ইয়া উম্মতি, আমি আমার পালিত পুত্র যায়েদের স্ত্রীকে নিকাহ করিয়াছিলাম, আর তুমি একজন মুরিদের স্ত্রীকে নিকাহ করিতে পারিবে না?

— ইয়া রসুলুল্লাহ, সে যে সধবা।

— রজবকে বলো স্ত্রীকে তালাক দিতে। কলিমন তোমার জন্যই হালাল। এ মারফতি নিকাহে ইদ্দত পালনের প্রয়োজন হইবে না। আমি আর থাকিতে পারি না। চলিলাম। অররহহুমাতুল্লাহ আলায়কুম, ইয়া উম্মতি।

মূর্ছিত সুফি সাহেব একটা বিকট চিৎকার করিলেন। পীর সাহেবের অপর-অপর শাগরেদরা তাঁকে সজোরে পাখার বাতাস করিতে লাগিল।

মুরিদগণের সনির্বন্ধ অনুরোধ সত্ত্বেও পীর সাহেব মাথা নাড়িয়া বলিতে লাগিলেন: চাই না আমি রুহানি কামালিয়ত। আমি মুরিদের বউকে বিবাহ করিতে পারিব না।

গ্রাম্য মুরিদগণ আখেরাতের ভয়ে পীর সাহেবের অনেক হাত-পায়ে ধরিল। পীর সাহেব অটল।

এই সময় প্রধান খলিফা সুফি সাহেব স্মরণ করাইয়া দিলেন: এই নিকাহ না করিলে কেবল পীর সাহেবের একারই রুহানি লোকসান হইবে না, তাঁর মুরিদগণের সকলের রুহের উপরও বহুত মুসিবত পড়িবে।

তখন পীর সাহেব অগত্যা নিজের রেজামন্দী জানাইয়া দাড়িতে হাত বুলাইতে বুলাইতে বলিতে লাগিলেন: ছোবহান আল্লাহ! এ সবই কুদরতে এলাহি! তাঁরই শানে আজিম! আল্লাহ পাক নিজেই কোরান মজিদে ফরমাইয়াছেন: (আরবি ও উর্দু)....।

বাপ-চাচা পাড়া-পড়শির অনুরোধে, আদেশে, তিরস্কারে ও অবশেষে উৎপীড়নে তিষ্ঠিতে না পারিয়া রজব তার এক বছর আগে বিয়া-করা আদরের স্ত্রীকে তালাক দিল এবং কাপড়ের খুঁটে চোখ মুছিতে মুছিতে বাড়ির বাহির হইয়া গেল।

কলিমনের ঘন-ঘন মূর্ছার মধ্যে অতিশয় ত্রস্ততার সঙ্গে শুভকার্য সমাধান হইয়া গেল।

এমদাদ স্তম্ভিত হইয়া বরবেশে সজ্জিত পীর সাহেবের দিকে চাহিয়া ছিল। তার চোখ হইতে আগুন ঠিকরাইয়া বাহির হইতেছিল।

এইবার তার চেতনা ফিরিয়া আসিল। সে একলাফে বরাসনে উপবিষ্ট পীর সাহেবের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া তাঁর মেহেদি-রঞ্জিত দাড়ি ধরিয়া হেঁচকা টান মারিয়া বলিল: রে ভণ্ড শয়তান! নিজের পাপ-বাসনা পূর্ণ করিবার জন্য দুইটা তরুণ প্রাণ এমন দুঃখময় করিয়া দিতে তোর বুকে বাজিল না?

আর বলিতে পারিল না। শাগরেদ-মুরিদরা সকলে মার মার করিয়া আসিয়া এমদাদকে ধরিয়া ফেলিল এবং চড়-চাপড় মারিতে লাগিল।

এমদাদ গ্রামের মাতব্বর সাহেবের দিকে চাহিয়া বলিল: তোমরা নিতান্ত মূর্খ। এই ভণ্ডের চালাকি বুঝিতে পারিতেছ না? নিজের শখ মিটাইবার জন্য সে হযরত পয়গম্বর সাহেবকে লইয়া তামাশা করিয়া তাঁর অপমান করিতেছে। তোমরা এই শয়তানকে পুলিশে দাও।

পীর সাহেবের প্রতি এমদাদের বেয়াদবিতে মুরিদরা ইতিপূর্বে একটু অসন্তুষ্ট হইয়া ছিল। এবার তার মস্তিষ্কবিকৃতি সম্বন্ধে তারা নিঃসন্দেহ হইল। মাতব্বর সাহেব হুকুম করিলেন: এই পাগলটা আমাদের হুজুর কেবলার অপমান করিতেছে। তোমরা কয়েকজন ইহাকে কান ধরিয়া গ্রামের বাহির করিয়া দিয়া আসো।

ভূলুণ্ঠিত পীর সাহেব ইতিমধ্যে উঠিয়া আস্তাগফিরুল্লাহ পড়িতে পড়িতে তাঁর আলুলায়িত দাড়িতে আঙুল দিয়া চিরুনি করিতেছিলেন। মাতব্বর সাহেবের হুকুমের পিঠে তিনি হুকুম করিলেন: দেখিস বাবারা, ওকে বেশি মারপিট করিস না। ও পাগল। ওর মাথা খারাপ। ওর বাপ ওকে আমার হাতে সঁপিয়া দিয়াছিল। অনেক তাবিজ দিলাম। কিন্তু কোনো ফল হইল না। খোদা যাকে সাফা না দেন, তাকে কে ভালো করিতে পারে?

আরও বই