তিন

হুজুর কেবলা

তিন

আবুল মনসুর আহমদ

তিন

এমদাদ দেখিল: পীর সাহেবের একতলা পাকা বাড়ি। বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। অন্দরবাড়ির সব ক'খানা ঘর পাকা হইলেও বৈঠকখানাটি অতি পরিপাটি প্রকাণ্ড খড়ের আটচালা।

সে সুফি সাহেবের পিছনে পিছনে বৈঠকখানায় প্রবেশ করিল। দেখিল: ঘরে বহু লোক জানু পাতিয়া বসিয়া আছেন। বৈঠকখানার মাঝখানে দেয়াল ঘেঁষিয়া অপেক্ষাকৃত উচ্চ আসনে মেহেদি-রঞ্জিত দাড়ি-বিশিষ্ট একজন বৃদ্ধ লোক তাকিয়া হেলান দিয়া আলবোলায় তামাক টানিতেছেন।

এমদাদ বুঝিল: ইনিই পীর সাহেব।

'আসসালামু আলাইকুম' বলিয়া সুফি সাহেব সোজা পীর সাহেবের নিকট উপস্থিত হইয়া হাঁটু পাতিয়া বসিলেন। পীর সাহেব সম্মুখস্থ তাকিয়ার উপর একটি পা তুলিয়া দিলেন। সুফি সাহেব সেই পায়ে হাত ঘষিয়া নিজের চোখে, মুখে ও বুকে লাগাইলেন।

তৎপর পীর সাহেব তাঁর হাত বাড়াইয়া দিলেন। সুফি সাহেব তা চুম্বন করিয়া দাঁড়াইয়া উঠিলেন এবং পিছাইয়া-পিছাইয়া কিছুদূর গিয়া অন্য সকলের ন্যায় জানু পাতিয়া বসিলেন।

পীর সাহেব এতক্ষণে কথা বলিলেন: কিরে বেটা, খবর কী? তুই কি এরই মধ্যে দায়েরায়ে হকিকতে মহব্বত ও জযবায়েযাতি-বনাম হোব্বে এশক হাসেল করিয়া ফেললি নাকি?

পীর সাহেবের এই ঠাট্টায় লজ্জা পাইয়া সুফি সাহেব মাথা নিচু করিয়া মাজা ঈষৎ উঁচু করিয়া বলিলেন: হযরত, বান্দাকে লজ্জা দিতেছেন!

পীর সাহেব তেমনি হাসিয়া বলিলেন: তা না হইলে নিজের চিন্তা ছাড়িয়া অপরের রুহের সুপারিশ করিতে আমার নিকট আসিলে কেন? কই, তোর সঙ্গী কোথায়? আহা! বেচারা বড়ই অশান্তিতে দিনপাত করিতেছে।

এই বলিয়া পীরসাহেব চক্ষু বুজিলেন এবং প্রায় এক মিনিট কাল ধ্যানস্থ থাকিয়া চক্ষু মেলিয়া বলিলেন: সে এই ঘরেই হাজির আছে দেখিতেছি।

উপস্থিত মুরিদগণের সকলে মুখ চাওয়াচাওয়ি করিতে লাগিল। এমদাদ ভক্তি ও বিস্ময়ে স্তব্ধ হইয়া একদৃষ্টে পীর সাহেবের দিকে চাহিয়া রহিল। মেহেদি-রঞ্জিত দাড়ি-গোঁফের ভিতর দিয়া পীর সাহেবের মুখ হইতে এক প্রকার জ্যোতি বিকীর্ণ হইতে লাগিল।

সুফি সাহেব এমদাদকে আগাইয়া আসিতে ইশারা করিলেন। সে ধীরে ধীরে পীর সাহেবের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া সুফি সাহেবের ইঙ্গিতে অনভ্যস্ত হাতে কদমবুসি করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া রহিল।

পীর সাহেব 'বস্ বেটা, তোর ভালো হইবে। আহা, বড় গরিব! ' বলিয়া আলবোলার নলে দম কষিলেন।

সুফি সাহেব আমতা আমতা করিয়া বলিলেন: হযরত, এর অবস্থা তত গরিব নয়। বেশ ভালো তালুক-সম্পত্তি—

পীর সাহেব নলে খুব লম্বা টান কষিয়াছিলেন; কিন্তু মধ্যপথে দম ছাড়িয়া দিয়া মুখে ধোঁয়া লইয়াই বলিলেন: বেটা, তোরা আজিও দুনিয়ার ধন-দওলত দিয়া ধনী-গরিব বিচার করিস। এটা তোদের বুঝিবার ভুল। আমি গরিব কথায় দুনিয়াবি গোরবৎ বুঝাই নাই। মুসলমানদের জন্য দুনিয়ার ধন-দওলত হারাম। এই ধন-দওলত এনসানের রুহানিয়ত হাসেলে বাধা জন্মায়, তার মধ্যে নফসানিয়ত পয়দা করে।

আল্লাহ তায়ালা বলিয়াছেন: (আরবি ও উর্দু) বেশক দুনিয়ার ধন-দওলত শয়তানের ওয়াস-ওয়াসা, ইহা হইতে দূরে পলায়ন করো। কিন্তু দুনিয়ার মায়া কাটানো কি সহজ কথা? তোদের আমি দোষ দিই না। তোদের অনেকেই এখন যেকেরের দরজাতেই পড়িয়া আছিস। যেকরে জলি ও যেকরে খফি এই দুই দরজার যেকের সারিয়া পরে ফেকেরের দরজায় পৌঁছিতে হয়। ফেকের হইতে যহুর এবং যহুর হইতে মোরাকেবা-মোশাহেদার কাবেলিয়ত হাসেল হয়। খোদার ফজলে আমি আরেফিন, সালেহিন ও সিদ্দিকিনের মোকামাতের বিভিন্ন দায়েরার ভিতর দিয়া যেভাবে এলমে লাদুন্নির ফয়েজ হাসেল করিয়াছি, তোদের কলব অতটা কুশাদা হইতে অনেক দেরি অনেক বলিয়া তিনি হুক্কার নলটা ছাড়িয়া দিয়া সোজা হইয়া বসিলেন এবং চোখ বুজিয়া ধ্যানস্থ হইলেন।

কিছুক্ষণ চোখ বুজিয়া থাকিয়া হাসিয়া উঠিলেন এবং চিৎকার করিয়া বলিলেন: কুদরতে-ইযদানি! কুদরতে-ইযদানি! মুরিদরা সব সে চিৎকারে সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিলেন।

কিন্তু কেউ কোনো কথা জিজ্ঞাসা করিতে সাহস করিলেন না।

পীর সাহেব চিৎকার করিয়াই আবার চোখ বুজিয়াছিলেন। তিনি এবার ঈষৎ হাসিয়া চোখ মেলিয়া বলিলেন: আমরা কত বৎসর হইল এখানে বসিয়া আছি?

জনৈক মুরিদ বলিলেন: হযরত, বৎসর কোথায়? এই না কয়েক ঘণ্টা হইল।

পীর সাহেব হাসিলেন। বলিলেন: অনেক দেরি — অনেক দেরি। আহা বেচারারা চোখের বাহিরে আর কিছুই দেখিতে পায় না।

অপর মুরিদ বলিলেন: হুজুর কেবলা, আপনার কথা মোটেই বুঝিতে পারিলাম না। পীর সাহেব মৃদু হাসিয়া বলিলেন: অত সহজে কি আর সব কথা বোঝা যায় রে বেটা? চেষ্টা কর্, চেষ্টা কর্।

মুরিদটি ছিলেন একটু আবদেরে রকমের। তিনি বায়না ধরিলেন: না কেবলা, আমাদিগকে বলিতেই হইবে। কেন আপনি বৎসরের কথা জিজ্ঞাসা করিলেন?

পীর সাহেব বলিলেন: ও কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করিস না। তার চেয়ে অন্য কথা শোন্। এই যে সাদুল্লাহ (সুফি সাহেবের নাম) একটি ছেলেকে আমার নিকট মুরিদ করিতে লইয়া আসিল, আমি সে কথা কী করিয়া জানিতে পারিলাম? আজ তোমরা তাজ্জব হইতেছ। কিন্তু ইনশাআল্লাহ, যখন তোমরা মোরাকেবায়ে নেসবতে বায়নান্নাসে তালিম লইবে, তখন অপরের নেসবত সম্বন্ধে তোমাদের কলব আয়নার মতো রওশন হইয়া যাইবে। আলগরজ ইহাও খোদার এক শানে আযিম। সাদুল্লাহ যখন আমার দস্তবুসি করে, তখন তার মুখের দিকে আমার নজর পড়িল এবং সঙ্গে সঙ্গে আমার রুহ সাদুল্লাহর রুহের দিকে মুতাওয়াজ্জোহ হইয়া গেল। সেখানে আমি দেখিলাম, সাদুল্লাহর রুহ আর একটা নতুন রুহের সঙ্গে আলাপ করিতেছে। উহাতেই আমি সব বুঝিয়া লইলাম। আল্লাহু আযিমুশশান।

বলিয়া পীর সাহেব একজন মুরিদকে হুক্কার দিকে ইঙ্গিত করিলেন।

মুরিদ হুক্কার মাথা হইতে চিলিম লইয়া তামাক সাজিতে বাহির হইয়া গেল। পীর সাহেব বলিলেন: তোরা আমার নিজের নুৎফার ছেলের মতো। তথাপি তোদের নিকট হইতে আমাকে অনেক গায়েবের কথা গোপন রাখিতে হয়। কারণ তোরা সে সমস্ত বাতেনি কথা বরদাশ্ত করিতে পারবি না। যেকের ও ফেকের দ্বারা কলব কুশাদা করিবার আগেই কোনো বড়রকমের নূরে তজল্লি তাতে ঢালিয়া দিলে তাতে কলব অনেক সময় ফাটিয়া যায়। এলমে লাদুন্নি হাসেল করিবার আগেই আমি একবার লওহে-মাওফুযে উপস্থিত হইয়াছিলাম। তখন আমি মাত্র দায়েরায়ে হকিকতে লাতা আইউনে তালিম লইতেছিলাম। সায়েরে নাযাবির ফয়েজ তখনো আমার হাসেল হয় নাই। কাজেই আরশে-মওয়াল্লার পরদা আমার চোখের সামনে হইতে উঠিয়া যাইতেই আমি নূরে ইয্দানি দেখিয়া বেহুঁশ হইয়া পড়িলাম। তারপর আমার জেসমের মধ্যে আমার রুহের সন্ধান না পাইয়া আমার মুর্শেদ কেবলা — তোরা তো জানিস আমার ওয়ালেদ সাহেবই আমার মুর্শেদ লওহে-মাহফুজ হইতে আমার রুহ আনিয়া আমার জেসমের মধ্যে ভরিয়া দেন এবং নিজের দায়রার বাহিরে যাওয়ার জন্য আমাকে বহুৎ তম্বিহু করেন। কাজেই দেখিতেছিস, কাবেলিয়ত হাসেল না করিয়া কোনো কাজে হাত দিতে নাই। খানিকক্ষণ আগে আমি জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম: আমরা কত বৎসর যাবৎ এখানে বসিয়া আছি? শুনিয়া তোরা অবাক হইয়াছিলি। কিন্তু এর মধ্যে যে ঘটনা ঘটিয়াছে, তা শুনিলে তো আরো তাজ্জব হইয়া যাইবি। সে জন্যই সে কথা বলিতে চাই নাই। কিন্তু কিছু কিছু না বলিলে তোরা শিখবি কোথা হইতে? তাই সে কথা বলাই উচিত মনে করিতেছি। সাদুল্লাহ এখানে আসিবার পর আমি আমার রুহকে ছাড়িয়া দিয়াছিলাম। সে তামাম দুনিয়া ঘুরিয়া সাত হাজার বৎসর কাটাইয়া তারপর আমার জেসমে পুনরায় প্রবেশ করিয়াছে। এই সাত হাজার বৎসরে কত বাদশাহ ওফাত করিয়াছে, কত সুলতানাৎ মেসমার হইয়াছে, কত লড়াই হইয়াছে, সব আমার সাফসাফ মনে আছে। সেরেফ এইটুকুই বলিলাম; ইহার বেশি শুনিলে তোদের কলব ফাটিয়া যাইবে।

ইতিমধ্যে তামাক আসিয়াছিল।

পীর সাহেব নল হাতে লইয়া ধীরে ধীরে টানিতে লাগিলেন।

সভা নিস্তব্ধ রহিল। কলব ফাটিয়া যাইবার ভয়ে কেহ কোনো কথা জিজ্ঞাসা করিল না।

এমদাদ পীর সাহেবের কথা কান পাতিয়া শুনিতেছিল। কৌতূহল ও বিস্ময়ে সে অস্থিরতা বোধ করিতে লাগিল।

সে স্থির করিল, ইহার কাছে মুরিদ হইবে।

আরও বই