দুই
দিন যাইতে লাগিল।
ক্রমে এমদাদ একটা অস্বস্তি বোধ করিতে লাগিল।
বহু চেষ্টা করিয়াও সে এবাদতে তেমন নিষ্ঠা আনিতে পারিতেছিল না। নিজেকে বহু শাসাইল, বহু প্রক্রিয়া অবলম্বন করিল; কিন্তু তথাপি পোড়া ঘুম তাকে তাহাজ্জতের নামাজ তরক করিতে বাধ্য করিতে লাগিল।
অগত্যা সে নামাজে বসিয়া খোদার নিকট হাত তুলিয়া কাঁদিবার বহু চেষ্টা করিল। চোখের পানির অপেক্ষায় আগে হইতে কান্নার মতো মুখ বিকৃত করিয়া রাখিল। কিন্তু পোড়া চোখের পানি কোনোমতেই আসিল না।
সে স্থানীয় কংগ্রেস ও খেলাফত কমিটির সেক্রেটারি ছিল।
সেখানে প্রত্যহ সকাল-বিকালে চারিপাশের বহু মওলানা-মওলবি সমবেত হইয়া কাবুলের আমিরের ভারত-আক্রমণের কত দিন বাকি আছে তার হিসাব করিতেন এবং খেলাফত নোট-বিক্রয়লব্ধ পয়সায় প্রত্যহ পান ও জরদা এবং সময় সময় নাশতা খাইতেন।
ইহাদের একজনের সুফি বলিয়া খ্যাতি ছিল। তিনি এক পীর সাহেবের স্থানীয় খলিফা ছিলেন এবং অনেক রাত পর্যন্ত 'এলহু, এলহু' করিতেন।
অল্পদিন পূর্বে 'এস্তেখারা' করিয়া তিনি দেখিয়াছিলেন যে চারি বৎসরের মধ্যে কাবুলের আমির হিন্দুস্থান দখল করিবেন।
তাঁহার কথায় সকলেই বিশ্বাস করিয়াছিল; কারণ মেয়েলোকের উপর জিনের আসর হইলে তিনি জিন ছাড়াইতে পারিতেন।
এই সুফি সাহেবের নিকট এমদাদ তার প্রাণের বেদনা জানাইল।
সুফি সাহেব দাড়িতে হাত বুলাইয়া মৃদু হাসিয়া ইংরাজি-শিক্ষিতদের উদ্দেশ্য করিয়া অনেক বাঁকাবাঁকা কথা বলিয়া উপসংহারে বলিলেন: হকিকতান যদি আপনি রুহের তরক্কি হাসেল করিতে চান, তবে আপনাকে আমার কথা রাখিতে হইবে। আচ্ছা; মাস্টার সাহেব, আপনি কার মুরিদ?
এমদাদ অপ্রতিভভাবে বলিল: আমি তো কারো মুরিদ হই নাই।
সুফি সাহেব যেন রোগ নির্ণয় করিয়া ফেলিয়াছিলেন এইভাবে মাথা নাড়িতে নাড়িতে বলিলেন: হ-ম, তাই বলুন। গোড়াতেই গলদ। পীর না ধরিয়া কি কেহ রুহানিয়ত হাসেল করিতে পারে? হাদিস শরিফে আসিয়াছে: (এইখানে সুফি সাহেব বিশুদ্ধরূপে আইন গাইনের উচ্চারণ করিয়া কিছু আরবি আবৃত্তি করিলেন এবং উর্দুতে তার মানে মতলব বয়ান করিয়া অবশেষে বাংলায় বলিলেন): জয্বা ও সলুক খতম করিয়া ফানা ও বাকা লাভে সমর্থ হইয়াছেন এরূপ কামেল ও মোকাম্মেল, সালেক ও মজ্যুব পীরের দামন না ধরিয়া কেহ জমিরের রওশনি ও রুহের তরক্কি হাসেল করিতে পারে না।
হাদিসের এই সুস্পষ্ট নির্দেশের কথা শুনিয়া এমদাদ নিতান্ত ঘাবড়াইয়া গেল।
সে ধরা-গলায় বলিল: কী হইবে আমার তাহা হইলে সুফি সাহেব?
সুফি সাহেব এমদাদের কাঁধে হাত রাখিয়া বলিলেন: ঘাবড়াইবার কোনো কারণ নাই। কামেল পীরের কাছে গেলে এক দিনে তিনি সব ঠিক করিয়া দিবেন।
স্বস্তিতে এমদাদের মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল।
সে আগ্রহাতিশয্যে সুফি সাহেবের হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিল: কোথায় পাইব কামেল পীর? আপনার সন্ধানে আছে?
উত্তরে সুফি সাহেব সুর করিয়া একটি ফারসি বয়েত আবৃত্তি করিয়া তার অর্থ বলিলেন: জওহরের তালাশে যারা জীবন কাটাইয়াছে, তারা ব্যতীত আর কেহ জওহরের খবর দিতে পারে? হাজার শোকর খোদার দরগায়, বহু তালাশের পর তিনি জওহর মিলাইয়াছেন।
সুফি সাহেবের হাত তখনো এমদাদের মুঠার মধ্যে ছিল। সে ত আরো জোরে চাপিয়া ধরিয়া বলিল: আমাকে লইয়া যাইবেন না সেখানে?
সুফি সাহেব বলিলেন: কেন লইয়া যাইব না? হাদিস শরিফে আসিয়াছে: (আরবি ও উর্দু) যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় আসিতে চায়, তার সাহায্য করো।
সংসারে একমাত্র বন্ধন এবং অভিভাবক বৃদ্ধা ফুফুকে কাঁদাইয়া একদিন এমদাদ সুফি সাহেবের সঙ্গে পীর-জিয়ারতে বাহির হইয়া পড়িল।
