চার

হুজুর কেবলা

চার

আবুল মনসুর আহমদ

চার

পীর সাহেব অনেক নিষেধ করিলেন। বলিলেন: বাবা, সংসার ছাড়িয়া থাকিতে পারবে না, তাসাউওয়াফ বড় কঠিন জিনিস ইত্যাদি।

কিন্তু এমদাদ তাওয়াজ্জোহ লইল।

পীর সাহেব নিজের লতিফায় যেকের জারি করিয়া সেই যেকের এমদাদের লতিফায় নিক্ষেপ করিলেন।

সে দিবানিশি দুই চোখ বুজিয়া পীর সাহেবের নির্দেশমতো 'এলহু এলহু' করিতে লাগিল।

পীর সাহেব বলিয়াছিলেন: খেলওয়াৎ-দর-অঞ্জুমান দ্বারা নিজের কলবকে স্বীয় লতিফার দিকে মুতাওয়াজ্জোহ করিতে পারিলে তার কলবে যাতে আহাদিয়াতের ফয়েজ হাসেল হইবে এবং তার রুহ ঘড়ির কাঁটার ন্যায় কাঁপিতে থাকিবে।

কিন্তু এমদাদ অনেক চেষ্টা করিয়াও তার কলবকে লতিফায় মুতাওয়াজ্জোহ করিতে পারিল না। তৎপরিবর্তে তার চোখের সামনে পীর সাহেবের মেহেদি-রঞ্জিত দাড়ি ও তাঁর রুপা-বাঁধানো গড়গড়ার ছবি ভাসিয়া উঠিতে লাগিল।

ফলে তার কলবে যাতে আহাদিয়াতের ফয়েজ হাসেল হইয়া তার রুহকে ঘড়ির কাঁটার মতো কাঁপাইবার পরিবর্তে ফুফু-আম্মার স্মৃতি বাড়ি যাইবার জন্য তার মনকে উচাটন করিয়া তুলিতে লাগিল।

দিন যাইতে লাগিল।

অনাহারে-অনিদ্রায় এমদাদের চোখ দুটি মস্তকের মধ্যে প্রবেশ করিল। তার শরীর নিতান্ত দুর্বল ও মন অত্যন্ত অস্থির হইয়া পড়িল।

সে বুঝিল, এইভাবে আরো কিছুদিন গেলে তার রুহ বস্তুতই জেসম হইতে আযাত হইয়া আলমে-আমরে চলিয়া যাইবে।

সে স্থির করিল: পীর সাহেবের কাছে নিজের অক্ষমতার কথা নিবেদন করিয়া সে একদিন বিদায় হইবে।

কিন্তু বলি বলি করিয়াও কথাটা বলিতে পারিল না।

একটা নতুন ঘটনায় সে বিদায়ের কথাটা আপাতত চাপিয়া গেল! দূরবর্তী একস্থানে মুরিদগণ পীর সাহেবকে দাওয়াত করিল।

প্রকাণ্ড বজরায় এক মণ ঘি, আড়াই মণ তেল, দশ মণ সরু চাউল, তিনশত মুরগি, সাত সের অম্বুরি তামাক এবং তেরো জন শাগরেদ লইয়া পীর সাহেব 'মুরিদানে' রওয়ানা হইলেন।

পীর সাহেবের ভ্রমণবৃত্তান্ত ইংরাজিতে লিখিয়া কলিকাতায় সংবাদপত্রে পাঠাইবার জন্য এমদাদকেও সঙ্গে লওয়া হইল। নদীর সৌন্দর্য, নদীপারের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এমদাদের কাছে বেশ লাগিল।

পীর সাহেব গন্তব্যস্থানে উপস্থিত হইলেন।

তিনি মুরিদগণের নিকট যে অভ্যর্থনা পাইলেন, তাহা দেখিলে অনেক রাজা-বাদশাহ রাজত্ব ছাড়িয়া মোরাকেবা-মোশাহেদায় বসিতেন।

পীর সাহেব গ্রামের মোড়লের বাড়িতে আস্তানা করিলেন।

বিভিন্ন দিন বিভিন্ন মুরিদের বাড়িতে বিরাট ভোজ চলিতে লাগিল।

পীর সাহেবের একটু দূরে বসিয়া গুরুভোজন করিয়া এমদাদ এত দিনের কৃচ্ছ্রসাধনার প্রতিশোধ লইতে লাগিল। ইহাতে প্রথম প্রথম তার একটু পেটে পীড়া দেখা দিলেও শীঘ্রই সে সামলাইয়া উঠিল এবং তার শরীর হৃষ্টপুষ্ট ও চেহারা বেশ চিকনাই হইয়া উঠিতে লাগিল।

পীর সাহেবের ভাত ভাঙিবার কসরত দেখার সুযোগ ইতিপূর্বে এমদাদের হয় নাই। এইবার সে ভাগ্যলাভ করিয়া এমদাদ বুঝিল: পীর সাহেবের রুহানি শক্তি যত বেশিই থাকুক না কেন, তাঁর হজমশক্তি নিশ্চয়ই তার চেয়ে বেশি।

সন্ধ্যায় পুরুষদের জন্য মজলিশ বসিত।

রাতে এশার নামাজের পর অন্দরমহলে মেয়েদের জন্য ওয়াজ হইত। কারণ অন্য সময় মেয়েদের কাজে ব্যস্ত থাকিতে হয়।

সেখানে পুরুষদের প্রবেশ নিষেধ ছিল।

স্ত্রীলোকদিগকে ধর্মকথা বুঝাইতে একটু দেরি হইত। কারণ মেয়েলোকদের বুদ্ধিসুদ্ধি বড় কম — তারা নাকেস-আকেল।

কিন্তু বাড়িওয়ালার ছেলে রজবের সুন্দরী স্ত্রী কলিমন সম্বন্ধে পীর সাহেবের ধারণা ছিল অন্যরকম। মেয়ে-মজলিশে ওয়াজ করিবার সময় তিনি ইহারই দিকে ঘন ঘন দৃষ্টিপাত করিতেন।

তিনি অনেক সময় বলিতেন: তাসাউওয়াফের বাতেনি কথা বুঝিবার ক্ষমতা এই মেয়েটার মধ্যেই কিছু আছে। ভালো করিয়া তাওয়াজ্জোহ দিলে তাকে আবেদা রাবেয়ার দরজায় পৌঁছাইয়া দেওয়া যাইতে পারে।

এশার নামাজের পর দাঁড়িয়া চিরুনি ও কাপড়ে আতর লাগানো সুন্নত এবং পীর সাহেব সুন্নতের একজন বড় মো'তেকাদ ছিলেন।

ওয়াজ করিবার সময় পীর সাহেবের প্রায়ই জযবা আসিত।

সে জযবাকে মুরিদগণ 'ফানাফিল্লাহ' বলিত।

এই ফানাফিল্লাহর সময় পীর সাহেব 'জ্বলিয়া গেলাম' 'পুড়িয়া গেলাম' বলিয়া চিৎকার করিয়া চিৎ হইয়া শুইয়া পড়িতেন। এই সময় পীর সাহেবের রুহ আলমে-খাল্ক্ হইতে আলমে-আমরে পৌঁছিয়া রুহে ইযদানির সঙ্গে ফানা হইয়া যাইত এবং নূরে ইযদানি তার চোখের উপর আসিয়া পড়িত। কিন্তু সে নূরের জলওয়া পীর সাহেবের চক্ষে সহ্য হইত না বলিয়া তিনি এইরূপ চিৎকার করিতেন।

তাই জযবার সময় একখণ্ড কালো মখমল দিয়া পীর সাহেবের চোখ-মুখ ঢাকিয়া দিয়া তাঁর হাত-পা টিপিয়া দিবার ওসিয়ত ছিল।

এইরূপ জযবা পীর সাহেবের প্রায়ই হইত।

— এবং মেয়েদের সামনে ওয়াজ করিবার সময়েই একটু বেশি হইত।

এইসব ব্যাপারে এমদাদের মনে একটু খটকার সৃষ্টি হইল।

কিন্তু সে জোর করিয়া মনকে ভক্তিমান রাখিবার চেষ্টা করিতে লাগিল।

সে চেষ্টায় সফল হইবার আগেই কিন্তু ও-পথে বাধা পড়িল। প্রধান খলিফা সুফি বদরুদ্দীন সাহেবের সঙ্গে পীর সাহেবকে প্রায়ই কানাকানি করিতে দেখিয়া এমদাদের মনের খটকা বাড়িয়া গেল। তার মনে পীর সাহেবের প্রতি একটা দুর্নিবার সন্দেহের ছায়াপাত হইল।

এমন সময় পীর সাহেব অত্যন্ত অকস্মাৎ একদিন ঘোষণা করিলেন: তিনি আর দু-এক দিনের বেশি সে অঞ্চলে তশরিফ রাখিবেন না।

এই গভীর শোক সংবাদে শাগরেদ-মুরিদগণের সকলেই নিতান্ত গমগিন হইয়া পড়িল।

জনৈক শাগরেদ সুফি সাহেবের ইশারায় বলিলেন: হুজুর কেবলা, আপনি একদিন বলিয়াছিলেন: এবার এ অঞ্চলের মুসলমানগণকে কেরামতে-নেসবতে বায়নান্নাস দেখাইবেন? তা না দেখাইয়াই কি হুজুর এখান হইতে তশরিফ লইয়া যাইবেন? এখানকার মুরিদগণের অনেকেই বলিতেছেন: হুজুর মাঝে মাঝে কেরামত দেখান না বলিয়া উম্মি মুরিদগণের অনেকেই গোমরাহ হইয়া যাইতেছে। মাওলানা লকবধারী ঐ ভণ্ডটা ও-পাড়ার অনেক মুরিদকে ভাগাইয়া নিতেছে; সে নাকি বৎসর বৎসর একবার আসিয়া কেরামত দেখাইয়া যায়।

পীর সাহেব গম্ভীর মুখে বলিলেন: (আরবি ও উর্দু) আল্লাহই কেরামতের একমাত্র মালিক, মানুষের সাধ্য কী কেরামত দেখায়? ওসব শয়তানের চেলাদের কথা আমার সামনে বলিও না। তবে হ্যাঁ, মোরাকেবায়ে-নেসবতে বায়নান্নাস-এর তরকিব দেখাইব বলিয়াছিলাম বটে, কিন্তু তার আর সময় কোথায়?

সমস্ত শাগরেদ ও মুরিদগণ সমস্বরে বলিয়া উঠিল: না হুজুর, সময় করিতেই হইবে, এবার উহা না দেখিয়া ছাড়িব না।

অগত্যা পীর সাহেব রাজি হইলেন।

স্থির হইল, সেই রাতেই মোরাকেবা বসিবে।

সারা দিন আয়োজন চলিল।

রাত্রে মৌলুদের মহফেল বসিল। হযরত পয়গম্বর সাহেবের অনেক অনেক মোওয়াজেযাত বর্ণিত হইল।

মৌলুদ শেষে খাওয়াদাওয়া হইল এবং তৎপর মোরাকেবার বৈঠক বসিল।

আরও বই