সম্পাদকীয়

কোরআন সংকলন ও পরিমার্জন: পাঠ, ক্ষমতা ও অপরিবর্তনীয়তার দাবি

সারসংক্ষেপ

কোরআনের বর্তমান রূপ মুহাম্মদের সময় থেকে আবু বকর ও উসমানের আমল এবং পরবর্তী সংশোধন পর্যন্ত বিস্তৃত একটি দীর্ঘ সংকলনপ্রক্রিয়ার ফল। এই ইতিহাসে রয়েছে সাহাবিদের পৃথক সংগ্রহ, ভিন্ন পাঠ, রাজনৈতিক ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং একটি রাষ্ট্রীয় মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার জন্য অন্য লিখিত সংস্করণ ধ্বংস করার ঘটনা। মুহাম্মদের সময়ে ছড়িয়ে থাকা লিখিত উপকরণ ও মৌখিক পাঠ থেকে শুরু করে পরবর্তী মুসহাফ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে সংগ্রহ, নির্বাচন ও বর্জন ঘটেছে। ধ্রুপদি ইসলামি গ্রন্থগুলোতেই হারিয়ে যাওয়া বা রহিত আয়াত, পাঠের ভাষাগত অসামঞ্জস্য, সূরার পরিসর ও বিন্যাস নিয়ে বিরোধ এবং পরে নুকতা ও হরকত যোগ করার বিবরণ সংরক্ষিত আছে। কোরআনের বর্তমান রূপ লাভে সাহাবি, সংকলক, শাসক ও পরবর্তী পাঠনির্ধারকদের ভূমিকা ছিল প্রত্যক্ষ। কোন বাক্য কোরআন হিসেবে পড়া হবে, কোনটি লিখিত সংগ্রহে স্থান পাবে, কোন পাঠ বর্জিত হবে এবং কোন অনুপস্থিত পাঠের বিধান বহাল থাকবে—এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানুষের স্মৃতি, সাক্ষ্য, ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব জড়িয়ে আছে। অপরিবর্তিত ও অবিকৃত গ্রন্থের প্রচলিত দাবির বিপরীতে এসব দলিল একটি পরিবর্তনশীল পাঠ ও তার ওপর মানুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তুলে ধরে। পরিবর্তনকে নসখ বলা, আল্লাহর অনুমোদিত ঘোষণা করা কিংবা খলিফার সিদ্ধান্তে বৈধতা দেওয়া সেই পরিবর্তনের ধর্মীয় মূল্যায়ন; এসব নামকরণ অতীতের সংযোজন, বিয়োজন ও সংশোধনকে ইতিহাস থেকে মুছে দেয় না। কোনো গ্রন্থের নির্ভুলতার প্রমাণ হিসেবে সেই গ্রন্থের নিজের ঘোষণাকে গ্রহণ করা হলে একই পদ্ধতিতে পৃথিবীর যেকোনো বই, মতবাদ কিংবা ব্যক্তিগত রচনাকেও সন্দেহাতীত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। তখন তথ্য, যুক্তি, ঐতিহাসিক সাক্ষ্য কিংবা স্বাধীন যাচাইয়ের প্রয়োজন পড়ে না; নিজের সম্পর্কে একটি জোরালো ঘোষণাই যথেষ্ট হয়ে যায়। সেই একই যুক্তি প্রয়োগ করে এই প্রবন্ধটি শুরু করার পূর্বে তাই একটি কথা খুব স্পষ্ট করে বলে দেয়া প্রয়োজন, সেটি হচ্ছেঃ

আরবি:
​ذَٰلِكَ الْمَقَالُ لَا رَيْبَ فِيهِ ۛ هُدًى لِّلْمُرْتَدِّينَ وَالْكَافِرِينَ
​বিশুদ্ধ আরবি উচ্চারণ:
​যালিকাল মাক্বালু লা রাইবা ফিহি, হুদাল লিলমুরতাদ্দীনা ওয়াল কাফিরীন।
​বাংলা অর্থ:
​এই সেই প্রবন্ধ, যাতে কোনো সন্দেহ নেই; এটি অবিশ্বাসী ও মুরতাদদের জন্য দিশারী (বা পথপ্রদর্শক)।

আশাকরি এই বক্তব্যটি শুরুতেই থাকার পরে এই প্রবন্ধ সম্পর্কে কারো মনে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকবে না।

কিন্তু এই ঘোষণা প্রবন্ধটির একটি বাক্যকেও সত্য প্রমাণ করে না। প্রবন্ধের তথ্য ভুল হলে তা ভুলই থাকবে; শুরুতে আরবি ভাষায় সন্দেহাতীত হওয়ার ঘোষণা দেওয়া সেই ভুলকে সত্যে পরিণত করবে না। একইভাবে কোরআনের নিজের সম্পর্কে করা নির্ভুলতা, সত্যতা কিংবা সন্দেহাতীত হওয়ার ঘোষণাও তার ঐতিহাসিক নির্ভুলতার স্বাধীন প্রমাণ নয়। একটি বক্তব্যকে সত্য প্রমাণ করতে হলে সেই বক্তব্যের বাইরে যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। অথচ ধর্মগ্রন্থের ক্ষেত্রে প্রায়ই এই সাধারণ যুক্তিগত মানদণ্ড পরিত্যাগ করে গ্রন্থের নিজের ঘোষণাকেই চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়। নিজের লেখা একটি প্রবন্ধের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি হাস্যকর ও অগ্রহণযোগ্য, ধর্মগ্রন্থের ক্ষেত্রে সেই একই পদ্ধতি অলৌকিক সত্য প্রতিষ্ঠার বৈধ উপায় হয়ে যেতে পারে না। কোরআনের সংকলন, পাঠের পার্থক্য, সংযোজন, বিয়োজন ও সংশোধনের ইতিহাস তাই কোনো ধর্মীয় ঘোষণার ভিত্তিতে নয়, বরং সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক দলিলের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে।

আলোচ্য বিষয়প্রধান প্রশ্ন ও প্রমাণের বিষয়বস্তুযে সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত হয়
কোরআনের অবতরণ, ভাষা ও ওহি পাওয়ার বিবরণঅবতরণের সময়কাল, প্রথম অবতীর্ণ অংশের ভিন্ন পরিচয়, কুরাইশি ভাষার দাবি, প্রথম লিখন এবং বিভিন্ন পদ্ধতিতে ওহি পাওয়ার বিবরণ।অবতরণ ও প্রথম লিখনের ইতিহাসে একাধিক পৃথক বর্ণনা রয়েছে; পরবর্তী প্রচারের সরল ছবিতে এই মতভেদগুলো অনুপস্থিত থাকে।
মুহাম্মদের আমলে লিখন, মুখস্থ ও সংগ্রহওহি লেখক, মুখস্থকারী, বিচ্ছিন্ন লিখিত উপকরণ, সম্পূর্ণ সংগ্রহকারীদের পৃথক তালিকা এবং মুহাম্মদের ভুলে যাওয়া আয়াত অন্যের পাঠে মনে পড়ার ঘটনা।পাঠ সংবহন মানুষের লেখা, স্মৃতি ও পারস্পরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল; ব্যক্তিগত স্মৃতি অভ্রান্ত ছিল না।
সাত আহরুফ ও অনুমোদিত পাঠভেদউমর–হিশামের বিরোধ, উবাইয়ের সংশয়, একাধিক পাঠের অনুমোদন এবং পরে রাষ্ট্রীয় মানে সীমাবদ্ধ করার ব্যাখ্যা।প্রাথমিক অনুমোদিত পাঠের পরিসর একটিমাত্র শব্দরূপে সীমাবদ্ধ ছিল না; পরবর্তী একীকরণ সেই বহুত্বের ওপর নির্বাচন আরোপ করেছে।
মানুষের প্রশ্নের পরে পঠিত আয়াতে নতুন শব্দরোজার আয়াতে “মিনাল ফাজর” সংযোজন এবং ইবনে উম্মে মাকতুমের বক্তব্যের পরে অক্ষমদের ব্যতিক্রম যুক্ত হওয়ার বিবরণ।আগে প্রচারিত বাক্য এবং পরবর্তী পূর্ণ বাক্য এক ছিল না; মানুষের নির্দিষ্ট সমস্যার পরে নতুন শব্দ ও সীমা যুক্ত হয়েছে।
উমরের মত, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সামাজিক চাপউমরের প্রস্তাবের সঙ্গে ওহির মিল, নবীপত্নীদের বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং সামাজিক ঘটনার সঙ্গে নির্দেশ পরিবর্তনের সম্পর্ক।ধর্মীয় নির্দেশের প্রকাশ মানুষের প্রস্তাব, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সামাজিক ক্ষমতার ঘটনাক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
ওহি লেখকদের ধর্মত্যাগ ও শব্দবদলের অভিযোগধর্মত্যাগী লেখকদের বিবরণ, আবদুল্লাহ ইবনে সাদের নামে সংরক্ষিত শব্দবদলের অভিযোগ, প্রাণদণ্ডের নির্দেশ ও পুনর্বাসন।ওহি লিখনকে ঘিরে শব্দ নির্ধারণের বিরোধ, ধর্মত্যাগ, শাস্তি এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ের ইতিহাস রয়েছে।
শয়তানের আয়াতসূরা নাজমের পাঠ, বিতর্কিত উচ্চারণ, শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া এবং পরে সেই বক্তব্য প্রত্যাহারের বর্ণনা ও তার সংবহন।প্রকাশিত বক্তব্যের গ্রহণ ও পরবর্তী বর্জনের বিবরণ ইসলামি সাহিত্যেই সংরক্ষিত; কোন উচ্চারণ ওহি হিসেবে গণ্য হবে, সেই কর্তৃত্বের প্রশ্নও সেখানে উপস্থিত।
শেষ অবতরণ, পূর্ণতা ও মৃত্যুশয্যাশেষ অবতীর্ণ আয়াতের পৃথক পরিচয়, দ্বীনের পূর্ণতার ঘোষণা, মৃত্যু পর্যন্ত ওহি চলার বিবরণ এবং শেষ নির্দেশ লিখে দেওয়ার বিরোধ।অবতরণের সমাপ্তি ও শেষ লিখিত নির্দেশের ইতিহাসে ভিন্ন সাক্ষ্য রয়েছে; পূর্ণতার ঘোষণা সেই ভিন্নতার স্বতন্ত্র নিষ্পত্তি নয়।
আবু বকরের সংকলনইয়ামামায় পাঠকদের মৃত্যু, কোরআন হারানোর আশঙ্কা, উমরের প্রস্তাব, যায়েদের অনুসন্ধান, লিখিত উপকরণ ও সাক্ষ্যের ব্যবহার।মৃত্যুর পরে বিচ্ছিন্ন উপাদান সংগ্রহ ও যাচাই করে গ্রন্থ প্রস্তুতের প্রয়োজন হয়েছিল; সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় মানুষের সিদ্ধান্ত কার্যকর ছিল।
আলী ও অন্য সাহাবিদের মুসহাফবিকল্প ব্যক্তিগত সংগ্রহ, বিন্যাসের ভিন্নতা এবং সংকলনের কর্তৃত্ব নিয়ে সুন্নি–শিয়া সাহিত্যের পৃথক দাবি।গৃহীত রাষ্ট্রীয় সংগ্রহের বাইরে অন্য সংগ্রহ ও কর্তৃত্বের দাবি ছিল; পরবর্তী স্বীকৃতি পূর্ববর্তী বহুত্ব মুছে দেয় না।
উসমানের রাষ্ট্রীয় মান্য পাঠ নির্ধারণআঞ্চলিক পাঠবিরোধ, হাফসার সহিফা, চার সদস্যের কমিটি, মতভেদে কুরাইশি ভাষা নির্বাচন এবং সরকারি কপি বিতরণ।মান্য মুসহাফ প্রতিষ্ঠা ছিল নির্দিষ্ট কমিটি, সিদ্ধান্তের নিয়ম ও রাষ্ট্রীয় প্রচারের মাধ্যমে পরিচালিত একটি প্রক্রিয়া।
বিকল্প মুসহাফ ধ্বংস ও প্রতিরোধঅন্য লিখিত সংগ্রহ পোড়ানোর নির্দেশ, ইবনে মাসউদের আপত্তি, হাফসার সহিফা ধ্বংস এবং উসমানবিরোধী অভিযোগ।একীকরণের সঙ্গে বিকল্প নথি অপসারণ ও সাহাবিদের প্রতিরোধ যুক্ত ছিল; ধ্বংসের ফলে পরবর্তী প্রত্যক্ষ তুলনার উপকরণও হারিয়েছে।
সূরা, আয়াত, বিন্যাস ও বিসমিল্লাহআয়াত গণনার পার্থক্য, সূরার সংখ্যা ও নাম, বর্তমান সূরাক্রম, আনফাল–তাওবার সম্পর্ক এবং বিসমিল্লাহর অবস্থান।গ্রন্থের গণনা, পরিচয়, বিন্যাস ও সীমানা পৃথক বিতর্কের বিষয় ছিল; সবগুলো শুরু থেকেই একইভাবে নির্ধারিত থাকার ছবি উৎসের সঙ্গে মেলে না।
রজমের আয়াত ও বহাল মৃত্যুদণ্ডউমরের অবতরণ ও পাঠের ঘোষণা, আয়াত লিখে দেওয়ার ইচ্ছা, সংযোজনের অভিযোগের আশঙ্কা এবং বর্তমান মুসহাফে অনুপস্থিতি।পূর্বে কোরআন হিসেবে পঠিত বলে ঘোষিত একটি পাঠ মুসহাফে নেই, অথচ তার নামে মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে।
দুধপানের আয়াত ও সহিফা খেয়ে ফেলার বর্ণনাদশবার থেকে পাঁচবার দুধপান, মুহাম্মদের মৃত্যুকালেও পাঠ চলার আয়েশার বক্তব্য এবং লিখিত সহিফা পোষা প্রাণীতে খেয়ে ফেলার বিবরণ।পাঠ ও বিধানের পর্যায়বদল এবং বর্তমান মুসহাফে সংশ্লিষ্ট পাঠের অনুপস্থিতির সাক্ষ্য রয়েছে; নির্দিষ্ট নথির ধ্বংসের বিবরণও সংরক্ষিত আছে।
হারানো আয়াত ও অনুপস্থিত সূরাআবু মুসার বিস্মৃত সূরা, আহযাব ও তাওবার পূর্বপরিসর সম্পর্কে বক্তব্য, খাল্‌–হাফ্‌দ এবং ইবনে উমরের সতর্কতা।পূর্বে পঠিত পাঠের পরিসর ও বর্তমান সংগ্রহের পরিসরের পার্থক্য সম্পর্কে সাহাবিদের নামেই সাক্ষ্য সংরক্ষিত হয়েছে।
মুসহাফে লিখনত্রুটির অভিযোগউসমানের “লাহন”, আয়েশার “লেখকেরা ভুল করেছে” এবং ইবনে আব্বাসের নামে বর্ণিত বিকল্প শব্দ ও সংশোধন।গৃহীত লিখিত পাঠের যথার্থতা নিয়ে সাহাবিদের সমালোচনা ইসলামি সূত্রেই রয়েছে; পরবর্তী ভাষ্যকারদের ব্যাখ্যা সেই বিরোধেরই প্রতিক্রিয়া।
সাহাবিদের পাঠ ও আঞ্চলিক কপিতে শব্দের পার্থক্যঅতিরিক্ত বাক্যাংশ, শব্দক্রম, প্রচলিত অংশ পড়তে অস্বীকৃতি এবং সরকারি আঞ্চলিক কপিতে বর্ণ ও পূর্ণ শব্দের উপস্থিতি–অনুপস্থিতি।পাঠভেদ কেবল স্বর বা উচ্চারণে সীমাবদ্ধ নয়; শব্দ, বাক্যাংশ ও লিখিত গঠনেও নির্দিষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
নুকতা, স্বরচিহ্ন ও হাজ্জাজের সংশোধননাসর, ইয়াহইয়া, আবুল আসওয়াদ ও খলিলের সঙ্গে যুক্ত লিখনপদ্ধতি এবং হাজ্জাজের নামে সংরক্ষিত এগারো পরিবর্তনের প্রতিবেদন।চিহ্নযুক্ত লিখনরূপ পরবর্তী বিকাশের ফল; সংশোধনের আরোপিত বিবরণ ও স্বতন্ত্র পাঠভেদের সম্পর্কও পৃথকভাবে অনুসন্ধানযোগ্য।
নাসেখ–মানসুখপাঠ ও বিধান উভয় রহিত, পাঠ রেখে বিধান রহিত এবং পাঠ সরিয়ে বিধান বহাল রাখার শ্রেণি ও উদাহরণ।ইসলামি ধর্মতত্ত্ব নিজেই পাঠ ও আইন অপসারণের ব্যবস্থা স্বীকার করে; রহিতকরণের অনুমোদন পরিবর্তনহীনতার প্রমাণ নয়।
কোরআনের ভেতরে বিধান পরিবর্তনবিধবার ব্যবস্থা, মদের বিধানের পর্যায়, ব্যক্তিগত আলাপের আগে সদকা এবং অন্যান্য নির্দেশের নসখসংক্রান্ত ব্যাখ্যা।কার্যকর নির্দেশ এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে বদলেছে; পূর্বের আয়াত মুসহাফে থাকলেই তার বিধান অপরিবর্তিত থাকে না।
কোরআন নাকি হাদিস: কার্যকর আইনগত কর্তৃত্বঅসিয়ত, খাদ্য, রজম ও ধর্মত্যাগের বিধান; সুন্নাহ দিয়ে ব্যাখ্যা, বিশেষায়ন, শর্তারোপ ও রহিতকরণের আলোচনা।মুসহাফের অক্ষর বহাল রেখেও হাদিস ও ফিকহ আয়াতের প্রয়োগের সীমানা এবং কার্যকর আইন নির্ধারণ করেছে।
উমরের আমলে বিধান ও প্রথার পুনর্নির্ধারণমুতআ, হজে তামাত্তু, উত্তরাধিকারের আউল, উম্মু ওয়ালাদ বিক্রি, প্রাপ্তবয়স্কের দুধপান এবং তারাবির সংগঠন।ধর্মীয় প্রথা ও বিধানের কার্যকর রূপ নির্ধারণে খলিফার নির্দেশ এবং পরবর্তী ফিকহের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল।
কোরআনের বক্তা ও সম্বোধনপ্রার্থনা, নির্দেশ, প্রথম ও তৃতীয় পুরুষের ব্যবহার, বক্তার পরিচয় এবং একই ধারায় সম্বোধনের পরিবর্তন।সব বাক্যকে একইভাবে আল্লাহর সরাসরি উক্তি ধরে নিলে বক্তা ও সম্বোধনের সমস্যা তৈরি হয়; সেগুলো নিষ্পত্তিতে ব্যাখ্যাগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হয়।
অভ্যন্তরীণ অসংগতি ও হাদিসের সঙ্গে সংঘাতজাহান্নামের খাদ্য, পাপের দায়, মৃতের শাস্তি, শিশুর শাস্তি, কাজ ও জান্নাত, সৃষ্টির দিন এবং মেরাজের নামাজ।বক্তব্যগুলোর মধ্যে অসংগতি ও সংঘাতের নির্দিষ্ট দৃষ্টান্ত রয়েছে; সমন্বয়ের দাবি পরবর্তী ব্যাখ্যা ও বাছাইয়ের ওপর নির্ভর করে।
শাশ্বত বাণী, লাওহে মাহফুজ ও পূর্বনির্ধারণসৃষ্ট–অনাদি বিতর্ক, মিহনা, পূর্বলিখিত কোরআন, তাকদির এবং মানুষের প্রশ্নের পরে প্রকাশিত সংশোধনের সম্পর্ক।পূর্বলিখনের বিশ্বাস পার্থিব ঘটনাক্রমে মানুষের ভূমিকা বা আগে–পরের পাঠগত পরিবর্তন মুছে দেয় না।
অপরিবর্তনীয়তার ঘোষণা ও সম্মিলিত হিসাবসংরক্ষণের আয়াত, অক্ষয় কিতাবের বর্ণনা, চক্রাকার প্রমাণ, সাহাবিদের গ্রহণযোগ্যতা এবং অবতরণ থেকে সংশোধন পর্যন্ত কালপঞ্জি।আত্মঘোষণা স্বাধীন প্রমাণ নয়; ধর্মীয় অনুমোদন ও রাষ্ট্রীয় নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত পাঠকে সর্বকালের অভিন্ন পাঠ বলা যুক্তিগতভাবে অসংগত।
উপসংহারপাঠের পরিবর্তন, সংগ্রহ, গ্রহণ-বর্জন, নথি ধ্বংস, বিধান পরিবর্তন এবং মানুষের কর্তৃত্বের সম্মিলিত তাৎপর্য।বর্তমান মুসহাফ একটি দীর্ঘ মানবীয় সংকলন ও মান নির্ধারণের ফল; সেই ইতিহাসের ওপর ঐশী অনুমোদন আরোপ করলে পরিবর্তনের ঘটনাগুলো বিলুপ্ত হয় না।

আলোচনার পরিসর ও গবেষণাপদ্ধতি

কোরআনের বর্তমান পাঠ কীভাবে গড়ে উঠেছে, কোন কোন পর্যায়ে তার লিখিত রূপ ও সীমানা নির্ধারিত হয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়ায় মানুষের সিদ্ধান্ত ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব কী ভূমিকা রেখেছে—এই প্রশ্নগুলো আলোচনার কেন্দ্র। মুহাম্মদের সময়ে ওহি প্রচার, লিপিবদ্ধকরণ ও মুখস্থকরণ; মানুষের প্রশ্ন ও আপত্তির পরে পাঠে নতুন শব্দের সংযোজন; একাধিক পাঠের অনুমোদন; ওহি লেখকদের অভিজ্ঞতা; প্রথম ও শেষ অবতরণের ভিন্ন বিবরণ; সাহাবিদের পৃথক পাঠ ও মুসহাফ; আবু বকর ও উসমানের সংকলন; বিকল্প লিখিত সংগ্রহ ধ্বংস এবং সংকলননীতি নিয়ে প্রতিরোধ—এই ধারাবাহিকতার অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি সূরা ও আয়াতের সীমানা, বিন্যাস ও বিসমিল্লাহর অবস্থান, রজম ও দুধপানের অনুপস্থিত পাঠ, হারানো আয়াত ও সূরা সম্পর্কে সাহাবিদের সাক্ষ্য, লিখনত্রুটির অভিযোগ, সরকারি আঞ্চলিক কপিতে শব্দের পার্থক্য এবং পরবর্তী নুকতা, হরকত ও হাজ্জাজের সংশোধনসংক্রান্ত বর্ণনা আলোচিত হয়েছে। পাঠের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নাসেখ–মানসুখ, কোরআনের ভেতরে বিধান পরিবর্তন, হাদিসের মাধ্যমে আয়াতের কার্যকর অর্থ ও প্রয়োগ নির্ধারণ এবং খলিফার সিদ্ধান্তে ধর্মীয় প্রথার পুনর্নির্ধারণ। কোরআনের বক্তা, বাণীর অভ্যন্তরীণ অসংগতি, হাদিসের সঙ্গে সংঘাত, শাশ্বত বাণী ও লাওহে মাহফুজের ধারণাও অপরিবর্তনীয়তার দাবির সঙ্গে সম্পর্কিত প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। প্রাচীন পাণ্ডুলিপি এবং হাফসের পাঠপরম্পরার বিস্তারিত আলোচনা পৃথক প্রবন্ধে রয়েছে; এখানে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ইসলামি সাহিত্যেই সংরক্ষিত অবতরণ, সংকলন, গ্রহণ-বর্জন, সংশোধন ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিবরণ।

প্রধান তথ্যসূত্র কোরআন, হাদিস, তাফসির, কিরাআত, উলুমুল কোরআন, নাসেখ–মানসুখ ও উসুলবিষয়ক ধ্রুপদি গ্রন্থ, সাহাবিদের মুসহাফসংক্রান্ত সংকলন এবং ইসলামি ইতিহাসের বিবরণ। শামেলা, ইসলামওয়েব ও ইসলামকিউএতে সংরক্ষিত মূল গ্রন্থের পাঠ এবং আলেমদের উদ্ধৃতি ও ব্যাখ্যার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট হাদিসের আরবি পাঠ ও প্রকাশিত অনুবাদ ব্যবহার করা হয়েছে। উৎসের বক্তব্য, সেখান থেকে অনুসরণযোগ্য ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এবং লেখকের যুক্তিগত সমালোচনা পৃথক স্তরে রাখা হয়েছে। কোনো বর্ণনার ঐতিহাসিক মূল্য নির্ধারণে তার সময়কাল, বর্ণনাপথ, বক্তব্যের রূপ, ভিন্ন পাঠ, ঘটনার কালানুক্রম, অন্য সাক্ষ্যের সঙ্গে সম্পর্ক এবং পরবর্তী গ্রহণ ও ব্যাখ্যা বিবেচিত হয়েছে। সহিহ ও দুর্বল পরিচয় ইসলামি হাদিসশাস্ত্রের নিজস্ব শ্রেণিবিভাগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে তার সঙ্গে অন্যান্য সাক্ষ্যও বিবেচ্য। দুর্বল সনদ একা কোনো ঘটনা না-ঘটার প্রমাণ নয়, যেমন কোনো গ্রন্থে একটি বর্ণনার উপস্থিতি একা তার প্রতিটি বিবরণের সত্যতার নিশ্চয়তা নয়। একই সংবাদ পরবর্তী একাধিক গ্রন্থে উদ্ধৃত হলে উদ্ধৃতিগুলোর উৎসগত নির্ভরতা শনাক্ত করা হয়েছে; একটি সংবহনধারার পুনরুল্লেখকে একাধিক স্বাধীন সাক্ষ্য হিসেবে গণনা করা হয়নি।

বর্তমান মুসহাফের সঙ্গে তুলনায় পাঠের পরিসর, শব্দের উপস্থিতি–অনুপস্থিতি, শব্দক্রম, ব্যাকরণিক রূপ, বানান, নুকতা, স্বরচিহ্ন, উচ্চারণ, সূরার বিন্যাস এবং আয়াত গণনার পার্থক্য পৃথকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একইভাবে পাঠ প্রত্যাহার, পাঠ বহাল রেখে বিধান রহিত করা এবং হাদিস বা ফিকহের মাধ্যমে প্রয়োগের সীমানা বদলানো পৃথক প্রক্রিয়া হিসেবে আলোচিত হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের শক্তি সংশ্লিষ্ট সাক্ষ্যের শক্তি ও পরিসরের সঙ্গে যুক্ত। ব্যক্তিগত বিস্মৃতি, একটি সহিফার ধ্বংস এবং গৃহীত মুসহাফে পূর্বপাঠের অনুপস্থিতি ভিন্ন ঘটনা; তাদের সম্পর্ক নির্ধারিত হয়েছে নির্দিষ্ট বর্ণনার ভিত্তিতে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে পরিবর্তনের অভিযোগ, তাঁর নামে সংরক্ষিত সংশোধনের প্রতিবেদন এবং স্বতন্ত্র সূত্রে পাওয়া পাঠগত পার্থক্যও নিজ নিজ পরিচয়ে রাখা হয়েছে। শব্দগত পার্থক্যকে শুধু লিখনচিহ্নের পরিবর্তন বলে আড়াল করা হয়নি; আবার আয়াত গণনা বা সূরার নামের মতভেদকে শব্দবিয়োজনের সমার্থক করা হয়নি। সংকলনের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, সিদ্ধান্তের বিষয়, ব্যবহৃত মানদণ্ড এবং তার ফলে কোন পাঠ বা নথি বহাল কিংবা বর্জিত হয়েছে—এই সম্পর্কগুলো বিশ্লেষণের ভিত্তি।

কোরআনের ঐশী উৎস, লাওহে মাহফুজে পূর্বসংরক্ষণ, নসখের ধর্মীয় বৈধতা এবং সংকলকদের ওপর আল্লাহর তত্ত্বাবধান বিশ্বাসের দাবি। কোন বক্তব্য কখন প্রচারিত হয়েছিল, কোন পাঠ কার কাছে ছিল, সংগ্রহের সময় কোন উপাদান খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, কোন মুসহাফে ভিন্ন শব্দ ছিল এবং কার নির্দেশে কোন নথি গ্রহণ বা ধ্বংস করা হয়েছিল—এসব ইতিহাসের প্রশ্ন। কোনো পরিবর্তনকে আল্লাহর অনুমোদিত বলা তার বৈধতার দাবি; পরিবর্তন না-ঘটার প্রমাণ নয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি পাঠ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তার ব্যাপক প্রচলনও পূর্ববর্তী সব পাঠের অভিন্নতা প্রমাণ করে না। অপরিবর্তনীয়তার দাবি তাই তার নির্দিষ্ট অর্থ অনুসারে পরীক্ষা করা হয়েছে: সব অবতীর্ণ পাঠ বর্তমান মুসহাফে আছে কি না, সব বর্ণিত পাঠে একই শব্দ ছিল কি না, লিখনরূপ কখন নির্ধারিত হয়েছে এবং কার্যকর বিধান কোন কোন পর্যায়ে বদলেছে। গ্রন্থের আত্মঘোষণা ও সংকলকদের ধর্মীয় মর্যাদাকে তাদের নিজেদের নির্ভুলতার স্বাধীন প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। ধ্রুপদি উৎসে সংরক্ষিত সংযোজন, বিয়োজন, প্রত্যাহার, নির্বাচন, ধ্বংস ও সংশোধনের সাক্ষ্যের সঙ্গে সর্বকালের অবিকল অভিন্নতার দাবির সামঞ্জস্যই মূল বিচার্য।


ভূমিকা

মুসলিমদের মধ্যে বহুল প্রচলিত একটি বিশ্বাস বা দাবি হচ্ছে, কোরআন মানব ইতিহাসের একমাত্র অবিকৃত গ্রন্থ, যা আল্লাহ যেভাবে নাজিল করেছিলেন, ঠিক সেভাবেই এখনো পাওয়া যায়। এমনকি এর একটি শব্দ বা অক্ষরও পরিবর্তিত হয়নি। এই দাবির সঙ্গে অন্য ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে আরেকটি রায় জুড়ে দেওয়া হয়: বাইবেলসহ পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলো মানুষের হাতে বিকৃত ও দূষিত হয়েছে; আল্লাহ যেভাবে পাঠিয়েছিলেন, সেভাবে আর নেই। অথচ খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসেও বাইবেলের লেখকদের ঈশ্বরের অনুপ্রেরণাপ্রাপ্ত বলে গণ্য করা হয়। মানুষ লিখেছেন ও সংকলন করেছেন, কিন্তু ঈশ্বর তাঁদের মাধ্যমে কাজ করেছেন—ঐশী অনুপ্রেরণার এই যুক্তিই গ্রন্থের ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্যবহৃত হয়। মুসলিম সংকলকদের বাছাই ও সংশোধন আল্লাহর ইচ্ছা বলে গ্রহণ করার পরে খ্রিষ্টীয় লেখক ও সংকলকদের একই ধরনের দাবিকে বাতিল করার জন্য স্বতন্ত্র প্রমাণ প্রয়োজন। শুধু নিজের গ্রন্থের ক্ষেত্রে ঈশ্বরের তত্ত্বাবধান ঘোষণা করলে প্রমাণের মানদণ্ড এক থাকে না।

মুসলিমদের প্রচলিত দাবিটি আরও নির্দিষ্ট। কোরআনকে শুধু ঐশী উৎসের গ্রন্থ বলা হয় না; বলা হয়, এর কোনো পরিবর্তনই হয়নি। মুহাম্মদের কাছে যে বাণী এসেছিল, বর্তমান মুসহাফে প্রতিটি শব্দ ঠিক সেভাবেই রয়েছে। এই ধারণার সঙ্গে মুহাম্মদের আমলেই আল্লাহর সরাসরি তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ কোরআন সংকলিত হওয়ার ধারণাও মিশে থাকে। ফলে অবতরণ, লিখে রাখা, মুখস্থ করা, বিচ্ছিন্ন উপকরণ একত্র করা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি পাঠ প্রতিষ্ঠা করা—ভিন্ন ভিন্ন কাজ একটি অবিচ্ছিন্ন অলৌকিক সংরক্ষণের ছবিতে ঢেকে যায়। ইসলামের নিজস্ব গ্রন্থে সংগ্রহ, পাঠবিরোধ, সংশোধন ও কপি ধ্বংসের যে বিবরণ রয়েছে, তা এই নিঃশর্ত অভিন্নতার দাবির সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে আসে। বর্তমান রূপের পেছনে মানুষের প্রত্যক্ষ ভূমিকা এসব বিবরণের মধ্যেই প্রকাশিত।

কোরআন সংকলন

কোরআন অবিকৃত এবং সব ধরনের দূষণমুক্ত—এই দাবির প্রমাণ হিসেবে অনেক ধার্মিক মানুষ কোরআন ও হাদিসের বক্তব্যই হাজির করেন। নিজের সত্যতার পক্ষে নিজের বক্তব্যকে প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করানো একটি হেত্বাভাস বা কুযুক্তি। এর নাম চক্রাকার কুযুক্তি। যে গ্রন্থের নির্ভুলতা যাচাইয়ের প্রশ্ন উঠেছে, সেই গ্রন্থের নিজের ঘোষণাকেই নির্ভুলতার ভিত্তি করলে দাবিটি আবার নিজের ওপর ফিরে আসে। নিচের উদাহরণগুলোতে একই চক্র দেখা যায়:

দাবিপ্রমাণ
বাইবেল সত্যকারণ বাইবেলে তা লেখা আছে।
কোরআন সত্যকারণ কোরআনেই লেখা আছে কোরআন সত্য।
এই লেখাটি সম্পূর্ণ সত্যকারণ এই লেখাতেই বলা হচ্ছে, এই লেখাটি সম্পূর্ণ সত্য।

একটি দাবির সমর্থনে আরেকটি দাবি আনা হলেও দ্বিতীয় দাবিটির একমাত্র ভিত্তি যদি প্রথম দাবিই হয়, তাহলে একই বৃত্ত তৈরি হয়। ঈশ্বর, গ্রন্থ, লেখক কিংবা গুরুর পরিচয় বদলালেও এই যুক্তির কাঠামো বদলায় না:

উদাহরণপ্রথম প্রশ্ন ও উত্তরদ্বিতীয় প্রশ্ন ও উত্তর
বাইবেল ও ঈশ্বরপ্রশ্ন: বাইবেল যে সত্য, তার প্রমাণ কী?
উত্তর: বাইবেল সত্য, কারণ ঈশ্বর বলেছেন বাইবেল সত্য।
প্রশ্ন: ঈশ্বর যে সত্য, তার প্রমাণ কী?
উত্তর: ঈশ্বর সত্য, কারণ বাইবেলে লেখা আছে ঈশ্বর সত্য।
কোরআন ও আল্লাহপ্রশ্ন: কোরআন যে আল্লাহর বাণী, তার প্রমাণ কী?
উত্তর: কোরআনে বলা আছে, এটি আল্লাহর বাণী।
প্রশ্ন: কোরআনের এই বক্তব্য সত্য বলে মানব কেন?
উত্তর: কারণ কোরআন আল্লাহর বাণী; আল্লাহ মিথ্যা বলেন না।
একটি বইয়ের নির্ভুলতাপ্রশ্ন: বইটির সব বক্তব্য নির্ভুল—এর প্রমাণ কী?
উত্তর: বইটির লেখক বলেছেন, তাঁর বইয়ে কোনো ভুল নেই।
প্রশ্ন: লেখকের এই দাবি নির্ভুল বলে মানব কেন?
উত্তর: কারণ তাঁর নির্ভুল বইতেই কথাটি লেখা আছে।
একজন গুরুর সর্বজ্ঞতাপ্রশ্ন: গুরু যে সর্বজ্ঞ, তার প্রমাণ কী?
উত্তর: তিনি নিজেই বলেছেন, তিনি সব জানেন।
প্রশ্ন: তাঁর এই কথাটি সত্য বলে মানব কেন?
উত্তর: কারণ তিনি সর্বজ্ঞ; তাঁর কথায় ভুল থাকতে পারে না।
একজন ব্যক্তির বিশ্বাসযোগ্যতাপ্রশ্ন: লোকটিকে বিশ্বাস করব কেন?
উত্তর: তিনি বলেছেন, তিনি কখনো মিথ্যা বলেন না।
প্রশ্ন: তিনি কখনো মিথ্যা বলেন না—এই কথাটি বিশ্বাস করব কেন?
উত্তর: কারণ তিনি একজন বিশ্বাসযোগ্য মানুষ।

প্রতিটি উদাহরণেই যে দাবিটি প্রমাণ করার কথা, সেটিকেই ঘুরিয়ে তার নিজের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাইবেলের সত্যতা ঈশ্বরের ওপর দাঁড় করানো হচ্ছে, আবার ঈশ্বরের সত্যতা দাঁড় করানো হচ্ছে বাইবেলের ওপর। কোরআনের ঐশিত্ব প্রমাণ করতে কোরআনের বক্তব্য গ্রহণ করা হচ্ছে, আবার সেই বক্তব্য গ্রহণের কারণ হিসেবে কোরআনের ঐশিত্বই দেখানো হচ্ছে। মাঝখানে কোনো স্বাধীন প্রমাণ নেই; দাবিটি নিজের কাছেই ফিরে আসছে। এটিই চক্রাকার যুক্তি এবং সে কারণে যুক্তিবিদ্যায় এটি কুযুক্তি হিসেবে চিহ্নিত। একটি গ্রন্থের নিজের দাবি দিয়ে তার সত্যতা প্রতিষ্ঠা করার এই পদ্ধতি যৌক্তিক আলোচনায় অগ্রহণযোগ্য। গ্রন্থের ঘোষণার সঙ্গে সেই গ্রন্থে ও তার অনুসারীদের সংরক্ষিত অন্য বিবরণের বিরোধ আবার সেই দাবির স্ববিরোধিতা প্রকাশ করে।

কোরআন, হাদিস এবং ইসলামের ধ্রুপদী যুগের গ্রন্থগুলোতেই কোরআনের অবিকৃত থাকার প্রচলিত দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বহু বিবরণ রয়েছে। সাধারণ মুসলিমদের অনেকেই এসব বিবরণ সম্পর্কে জানেন না। পাঠ বর্জন, সংকলকের নির্বাচন, পৃথক সংগ্রহ ধ্বংস এবং পরবর্তী সংস্কারের তথ্য ইসলামের নিজেদের গ্রন্থেই সংরক্ষিত আছে। ইহুদি, নাসারা বা নাস্তিকের কথিত ষড়যন্ত্র দিয়ে এসব তথ্যের অস্তিত্ব মুছে ফেলা যায় না। ইসলামের নিজের সংরক্ষিত সাক্ষ্যই অবিকৃত থাকার দাবির স্ববিরোধী চরিত্র প্রকাশ করে।

কোরআনে নিজের সংরক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহর বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এই দাবিটিই সংরক্ষণের ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তি।

ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে লাওহে মাহফুজে কোরআন সংরক্ষিত। সেই পূর্বলিখিত বাণী, মুহাম্মদের মুখে বিভিন্ন সময়ে উচ্চারিত পাঠ এবং বর্তমানে স্বীকৃত মুসহাফ—এই তিনটি সর্বাংশে অভিন্ন ছিল কি না, সেটিই একটি মৌলিক প্রশ্ন। এই অভিন্নতার দাবি ব্যর্থ হলে বর্তমান মুসহাফকে পূর্বলিখিত ঐশী বাণীর অবিকল প্রতিলিপি হিসেবে প্রতিষ্ঠার ভিত্তিও ভেঙে পড়ে। পূর্বলিখিত বাণীর সঙ্গে বর্তমান পাঠের অভিন্নতা কেবল ঘোষণা করে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। কোন শব্দ কখন বলা হয়েছিল, পরের সংশোধনে কী যুক্ত হয়েছিল, সংগ্রহের সময় কোনটি পাওয়া গিয়েছিল এবং কার সিদ্ধান্তে কোন রূপ গৃহীত হয়েছিল—অভিন্নতার দাবির প্রমাণ এই ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়েই আসতে হবে। আল্লাহর অনুপ্রেরণায় মানুষ সংকলন করেছেন বললে মানুষের কাজের ধর্মীয় বৈধতা দাবি করা হয়। তখন বাইবেলের লেখকদের ক্ষেত্রে ঈশ্বরের অনুপ্রেরণার যে যুক্তি প্রত্যাখ্যাত হয়, নিজের সংকলকদের জন্য সেই যুক্তিই ফিরে আসে।

মুসলিমদের দাবি যেহেতু এরকম যে, তাদের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ কোরআন এই পর্যন্ত বিন্দু পরিমাণ বিকৃত বা মানুষের দ্বারা দূষিত হয়নি, ঠিক লাওহে মাহফুজে আল্লাহ সৃষ্টির শুরুতে যেভাবে লিখেছিলেন, এখনো বর্তমান সময়ের কোরআনে তেমনটিই আমরা পাই, তাই যদি সামান্যতম বিকৃতও প্রমাণ করা যায়, তাহলে তাদের দাবিটি ভুল বলে গণ্য হবে। এই দাবিটি ভুল প্রমাণ করতে শতকরা ৫ ভাগ বা ১০ ভাগ কিংবা ১০০ ভাগ ভুল প্রমাণের প্রয়োজন নেই, শুধুমাত্র একটি ভুল বা বিকৃতিই যথেষ্ট। কোরআন নাজিলের ক্ষেত্রে যে যথাযথতার দাবি করা হয়, তার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য।

মুহীউদ্দীন খানের অনুবাদে কোরআন নাজিলের যথাযথতার পাশাপাশি “যতিচিহ্ন সহ” পাঠযোগ্য করার কথাও এসেছে। সেই ভাষা এবং পরবর্তী যতিচিহ্ন সংযোজনের ইতিহাস পাশাপাশি রাখলে প্রশ্ন আরও তীক্ষ্ণ হয়।

আল্লাহ যদি একটি বাণী নিখুঁত ও যথাযথভাবে অবতীর্ণ করে থাকেন, তাহলে সেই বাণীর নির্দিষ্ট রূপ স্থির করতে পরবর্তী মানুষের সংশোধন, বাছাই ও পাঠবর্জনের প্রয়োজন কেন হলো? কোন পাঠ রাখা হবে আর কোনটি সরানো হবে—সেই সিদ্ধান্তের কর্তৃত্ব মানুষ পেলেন কোথা থেকে? নবী, সাহাবি, তাবেয়ি ও পরবর্তী সংকলকের স্মৃতি এবং বিচারকে আল্লাহর সর্বজ্ঞতার সমান ধরে নেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। ইসলামি গ্রন্থগুলোতেই ভিন্ন পাঠের বিরোধ, সংকলকের নির্বাচন এবং পরবর্তী সংস্কারের বিবরণ রয়েছে। এসব কাজকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ধর্মীয় উত্তর হিসেবে হাজির হয়, সবই আল্লাহর ইচ্ছা! অথবা আল্লাহই ভালো জানেন। কিন্তু এই উত্তর প্রমাণ হিসেবে চললে বাইবেল বা অন্যান্য ধর্মগ্রন্থকে দূষিত বলার ক্ষেত্রেও একই উত্তর গ্রহণ করতে হয়। গ্রন্থের ইতিহাস যাচাইয়ে তথ্য ও যুক্তির একই মানদণ্ড প্রযোজ্য। তাকদিরের বিশ্বাস অনুসারে এই সমালোচনাও আল্লাহর ইচ্ছার বাইরের ঘটনা নয়। নইলে সমালোচনাটি লেখা সম্ভব হলো কীভাবে?

অপরিবর্তিত থাকার দাবি আর পরিবর্তনকে আলেম ওলামা দ্বারা ধর্মীয় অনুমোদন দেওয়ার দাবি এক কথা নয়। একটি পাঠ বদলানো হয়েছে কি না, সেটি ঘটনার প্রশ্ন; পরিবর্তনকারীকে আল্লাহ অনুমতি দিয়েছিলেন কি না, আলেম ওলামাগণ মেনে নিয়েছেন কিনা, সেটি বিশ্বাসের প্রশ্ন। বিশ্বাসের উত্তর দিয়ে ঘটনার প্রশ্ন মুছে ফেলা যায় না। একইভাবে, একটি পাঠ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় স্বীকৃতি পেয়েছে বলেই তার আগের সমস্ত পাঠ, সংশোধন এবং নির্বাচন ইতিহাস থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় না। যে দাবিটি সর্বাঙ্গীণ অভিন্নতার, তাকে শুধু বর্তমান সংস্করণের জনপ্রিয়তা দেখিয়েও প্রমাণ করা সম্ভব নয়।

পাণ্ডুলিপিগত পার্থক্যের বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে সানা ম্যানুস্ক্রিপ্টবিষয়ক প্রবন্ধে। হাফসের বর্ণনা ও তাঁর পাঠের কর্তৃত্ব নিয়ে আলোচনা রয়েছে হাফসের কোরআনবিষয়ক প্রবন্ধে। উসমানের সংকলন, তার আগের সংগ্রহ ও পাঠের অবস্থা এবং পরবর্তী প্রধান সংশোধন মিলিয়ে কোরআনের বর্তমান রূপ লাভের ইতিহাস গঠিত হয়েছে। উসমানের রাষ্ট্রীয় একীকরণ ও বহু পরে প্রতিষ্ঠিত পাঠপরম্পরা সেই ইতিহাসের পৃথক পর্যায়।


কোরআনের অবতরণ: সূচনা, ভাষা ও ওহি পাওয়ার বিবরণ

কোরআন, ওহি, সহিফা ও মুসহাফের পরিচয়

কোরআন (আরবি: القرآن‎‎ বা আল-কুরআন) শব্দের অর্থ হচ্ছে পঠিত বা পাঠ করা বা আবৃত্তি করা। কোরআন শব্দের ব্যুৎপত্তি সম্পর্কে পাঠ করা ও একত্র করার অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যাখ্যা রয়েছে। শব্দটির ব্যুৎপত্তি নিয়ে ইসলামি লেখকদের মধ্যেই একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। দুটি প্রধান মতামত হচ্ছে,

ব্যুৎপত্তির ব্যাখ্যাঅর্থ
আল-কার্‌উ বা একত্র করার অর্থের সঙ্গে সম্পর্কসংকলন বা সংগ্রহ
কারাআ বা পাঠ করার অর্থের সঙ্গে সম্পর্কপাঠ বা আবৃত্তি; এই মতটি বহু ইসলামি গবেষক গ্রহণ করেন।

শব্দটির ব্যুৎপত্তি সম্পর্কে একাধিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় [1] [2]

تقول: قرأته قرءًا وقراءة وقرآنًا، بمعنى واحد.

বাংলা অনুবাদ: তুমি বলো: আমি তা পড়েছি—কারআন, কিরাআতান ও কুরআনান; একই অর্থে।

বর্তমান কোরআনের লিখিত মান প্রতিষ্ঠায় খলিফা উসমানের সংকলন কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছে। তার আগে আবু বকরের সংগ্রহ এবং পরে লিপি, বানান, নুকতা ও হরকতের পরিমার্জন ঘটেছে। বর্তমান মুদ্রিত পাঠ সেই ধারাবাহিক সংগ্রহ, নির্বাচন ও সংশোধনের ফল।

কোরআন শব্দের অর্থ আর একটি নির্দিষ্ট মুসহাফের সংকলন আলাদা বিষয়। সুয়ূতির সংকলনে জাহিযের বক্তব্যে পুরো রচনাকে কোরআন, তার অংশকে সূরা, সূরার অংশকে আয়াত এবং আয়াতের শেষকে ফাসিলা বলা হয়েছে। এই নামগুলোর পাশাপাশি মুসহাফের পাঠ, বিন্যাস ও লিখিত রূপ সংকলনের ইতিহাসে নির্ধারিত হয়েছে। [3]

سَمَّى جُمْلَتَهُ قُرْآنًا كَمَا سَمَّوْا دِيوَانًا وَبَعْضُهُ سُورَةٌ كَقَصِيدَةٍ وَبَعْضُهَا آيَةٌ كَالْبَيْتِ وَآخِرُهَا فَاصِلَةٌ كقافية.

বাংলা অনুবাদ: তিনি এর সমগ্রকে কোরআন নাম দিয়েছেন, যেমন তারা দিওয়ান বলে; এর একটি অংশ সূরা, যেমন কাসিদা; তার একটি অংশ আয়াত, যেমন কবিতার পঙ্‌ক্তি; আর তার শেষ ফাসিলা, যেমন অন্ত্যমিল।

একই রচনার পঠিত বাণী, বিচ্ছিন্ন লিখিত উপকরণ এবং রাষ্ট্রের অনুমোদিত সংকলন ইতিহাসে পৃথক অবস্থায় পাওয়া যায়। কোন সময়ে কার কাছে কী পাঠ ছিল, কোন শব্দে মতভেদ উঠেছিল এবং পরের সংকলক কোন রূপ গ্রহণ করেছেন—সংকলন, আবৃত্তি ও মুসহাফের বর্ণনা এসব নির্দিষ্ট তথ্য বহন করে। কোরআন নামটি এসব পর্যায়ের ধর্মীয় পরিচয় বহন করেছে; প্রতিটি পর্যায়ে ঠিক একই শব্দ ছিল কি না, তার সাক্ষ্য আসে সংশ্লিষ্ট পাঠ ও সংগ্রহের বিবরণ থেকে। নামের ধারাবাহিকতা এবং পাঠের অক্ষরগত অভিন্নতা দুটি পৃথক দাবি, যার দ্বিতীয়টি নির্দিষ্ট দলিলের ওপর নির্ভরশীল।

ইসলামওয়েব কোরআনের পারিভাষিক সংজ্ঞায় মুহাম্মদের ওপর অবতীর্ণ আল্লাহর বাণী, তার অলৌকিকতার দাবি এবং তিলাওয়াতের উপাসনামূলক মর্যাদাকে একসঙ্গে রেখেছে। এই সংজ্ঞায় বাণীটির উৎস ও মর্যাদা আগেই নির্ধারিত; কে কোন সময়ে তার লিখিত রূপ স্থির করেছেন, সেই ইতিহাস সংজ্ঞাটি নিজে সরবরাহ করে না। [4]

فالقرآن كلام الله المنزل على محمد صلى الله عليه وسلم للإعجاز بسورة منه، المتعبد بتلاوته.

বাংলা অনুবাদ: কোরআন হলো মুহাম্মদের ওপর অবতীর্ণ আল্লাহর বাণী, যার একটি সূরার মাধ্যমেও অলৌকিকতার চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয় এবং যার তিলাওয়াতের মাধ্যমে উপাসনা করা হয়।

ওহি শব্দে বাণী পাওয়ার বা গোপনে সংবাদ পৌঁছানোর ধারণা রয়েছে। মান্না আল-কাত্তান এর ভাষাগত অর্থ ব্যাখ্যা করতে গোপনীয়তা ও দ্রুততার কথা বলেছেন। ধর্মীয় বর্ণনায় কোনো বক্তব্যকে ওহি বলা সেই বক্তব্যের দাবিকৃত উৎস চিহ্নিত করে। বক্তব্যটি কোন ভাষায় উচ্চারিত হলো, লেখক কী লিখলেন এবং সংগ্রাহক কোন পাঠ গ্রহণ করলেন—এই কাজগুলো আবার দৃশ্যমান মানবীয় প্রক্রিয়া। [5]

الإعلام الخفي السريع الخاص بمن يوجَّه إليه بحيث يخفى على غيره

বাংলা অনুবাদ: দ্রুত ও গোপনে এমন সংবাদ দেওয়া, যা নির্দিষ্ট প্রাপকের জন্য এবং অন্যদের কাছে গোপন থাকে।

সহিফা ও মুসহাফ লিখিত উপকরণের পরিচয় বহন করে। ইবনে মানযুরের লিসানুল আরবে সহিফা বলতে যে বস্তুতে লেখা হয় এবং মুসহাফ বলতে দুই মলাটের মধ্যে সংগৃহীত লিখিত সহিফাগুলোকে বোঝানো হয়েছে। ফলে একটি সহিফায় কোনো বক্তব্য থাকা, বহু সহিফা একত্র করা এবং সেই সংগ্রহকে কর্তৃত্বপূর্ণ পাঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা—তিনটি পৃথক ঘটনা। [6]

الصَّحِيفَةُ: الَّتِي يُكْتَبُ فِيهَا، وَالْجَمْعُ صَحَائِفُ وَصُحُفٌ وَصُحْفٌ.

বাংলা অনুবাদ: সহিফা হলো যে বস্তুতে লেখা হয়; এর বহুবচন সাহাইফ, সুহুফ ও সুহ্‌ফ।

মুসহাফ নামের মধ্যেই লিখিত পাতাগুলো একত্র করার কাজটি রয়েছে। লিসানুল আরবে আজহারির ব্যাখ্যাও সরাসরি সেই সংগ্রহের কথাই বলেছে। [7]

وَإِنَّمَا سُمِّيَ الْمُصْحَفُ مُصْحَفًا؛ لِأَنَّهُ أُصْحِفَ أَيْ جُعِلَ جَامِعًا لِلصُّحُفِ الْمَكْتُوبَةِ بَيْنَ الدَّفَّتَيْنِ.

বাংলা অনুবাদ: মুসহাফকে মুসহাফ বলা হয়েছে, কারণ তাকে দুই মলাটের মধ্যে লিখিত সহিফাগুলোর সংগ্রহে পরিণত করা হয়েছে।

পরিভাষাযা বোঝানো হচ্ছেইতিহাসের নির্দিষ্ট প্রশ্ন
কোরআনধর্মীয়ভাবে স্বীকৃত পঠিত বাণীকোন বক্তব্য কোরআনের অংশ হিসেবে গৃহীত হলো?
ওহিসংবাদ বা নির্দেশ পাওয়ার দাবিকৃত প্রক্রিয়াবক্তব্যটির উৎস সম্পর্কে কী সাক্ষ্য রয়েছে?
সহিফালিখিত পাতা বা লিখিত উপকরণকী লেখা ছিল এবং কার কাছে ছিল?
মুসহাফএকত্রিত লিখিত সহিফার সংগ্রহকে সংগ্রহ, বিন্যাস ও মান্য পাঠ নির্ধারণ করেছেন?

ইসলামকিউএও আবু বকরের উদ্যোগ ব্যাখ্যা করতে সম্পূর্ণ কোরআন এক বইয়ে একত্র করে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষার কথা বলেছে। অর্থাৎ একটি গ্রন্থে সংগ্রহ করার প্রয়োজন তাদের সংরক্ষণ-বিবরণের মধ্যেই স্বীকৃত। বাণী অবতীর্ণ হওয়ার দাবি আর তার লিখিত উপকরণকে এক বইয়ে আনার কাজ একই সময়ে সম্পন্ন হওয়া এক ঘটনা নয়। [8]

لجمع القرآن كاملا في كتابٍ واحدٍ حتى يبقى محفوظاً من الضياع

বাংলা অনুবাদ: সম্পূর্ণ কোরআন এক বইয়ে একত্র করার জন্য, যাতে তা হারিয়ে যাওয়া থেকে সংরক্ষিত থাকে।

ধর্মীয় সংজ্ঞায় গ্রন্থটিকে আল্লাহর বাণী বলা হয়েছে; সংকলনের বিবরণে কাজ করেছেন মানুষ। একটি নির্দিষ্ট মুসহাফে কোন পাঠ থাকবে, তার সিদ্ধান্তের ইতিহাস না দেখিয়ে কেবল প্রথম পরিচয়টি উচ্চারণ করলে দ্বিতীয় ইতিহাসটি চাপা পড়ে। লেখকের কলম, সংগ্রাহকের সাক্ষ্যবাছাই ও শাসকের অনুমোদনকে আসমানি উৎসের ঘোষণার আড়ালে সরিয়ে রাখলে বর্তমান লিখিত পাঠের উৎপত্তি ব্যাখ্যা হয় না। বরং যে মানবীয় কাজের ফল হাতে রয়েছে, সেই কাজকেই প্রশ্নের বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়।


কোরআনের ভাষা: আরবি, কুরাইশি ভাষার দাবি ও প্রাচীন আরবের লিখনপরম্পরা

লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত কোরআনের ভাষা কী ছিল? আল্লাহর মাতৃভাষা কি আরবি, নাকি আল্লাহ ও ফেরেশতাদের অন্য কোনো ভাষা ছিল? অন্য ভাষা থেকে আরবিতে অনুবাদ হয়ে থাকলে সেই অনুবাদ কে করলেন এবং কোন পাঠকে মূল বলা হবে? আল্লাহর শব্দ উচ্চারণের বর্ণনা এই প্রশ্নকে আরও নির্দিষ্ট করে। উচ্চারিত বাণীর শব্দ, ভাষা ও অর্থের মধ্যে সম্পর্ক থাকে। একটি ভাষার বক্তব্য অন্য ভাষায় নিলে শব্দবিন্যাস ও অর্থপ্রকাশ বদলে যায়। প্রতিটি শব্দকে সরাসরি আল্লাহর নির্ধারিত ভাষা বলার দাবিতে তাই আরবির মর্যাদা এবং পূর্বলিখিত পাঠের সঙ্গে তার সম্পর্ক মৌলিক বিষয়।

আরব উপদ্বীপ ও আশপাশের অঞ্চলে মুহাম্মদের আগেই একাধিক লিখনপরম্পরা প্রচলিত ছিল। অক্সফোর্ডে বিকশিত এবং বর্তমানে ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্ষিত ওসিয়ানা তথ্যভান্ডারে সাফাইটিককে একটি বর্ণমালার নাম বলা হয়েছে। বর্তমান দক্ষিণ সিরিয়া, উত্তর-পূর্ব জর্ডান ও উত্তর সৌদি আরবের যাযাবর জনগোষ্ঠীর বহু শিলালিপিতে এটি ব্যবহৃত হয়েছে। প্রচলিত কালনির্ধারণ খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতক থেকে খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতক; নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে এর সূচনা অন্তত খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে নিয়ে যাওয়ার কথাও রয়েছে। [9] [10]

They are conventionally dated between the first century BC and the fourth century AD

বাংলা অনুবাদ: প্রচলিতভাবে এগুলোর সময়কাল খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতক থেকে খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতকের মধ্যে ধরা হয়।

সাফাইটিকে আটাশটি স্বতন্ত্র ব্যঞ্জনচিহ্ন ছিল। স্বরধ্বনি সাধারণভাবে লেখা হতো না; লেখার দিকও স্থির ছিল না এবং শব্দের মধ্যে আলাদা বিভাজন থাকত না। নাম, বংশপরিচয়, প্রার্থনা, বিপদের কথা ও শোক শিলালিপিতে স্থান পেয়েছে। লিখিত চিহ্ন এবং মানুষ যেভাবে শব্দ উচ্চারণ করতেন, তার সম্পর্ক এখানে একটি নির্দিষ্ট মানবীয় লিখনপ্রথার মাধ্যমে গঠিত।

হিসমাইক শিলালিপির প্রধান বিস্তার বর্তমান দক্ষিণ জর্ডান ও উত্তর-পশ্চিম সৌদি আরবের হিসমা মরু অঞ্চলে। এর সময়কালও মোটামুটি সাফাইটিকের কাছাকাছি ধরা হয়; নির্দিষ্ট তারিখ স্থির করার প্রমাণ আরও কম। এই শিলালিপিগুলো মানুষের নাম, ভাষার রূপ, সামাজিক জীবন ও ধর্মীয় আচরণের লিখিত সাক্ষ্য। আরব অঞ্চলের ভাষা ও লিখন কোনো ইতিহাসহীন, একরূপ ব্যবস্থা ছিল না। বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নিজেদের চিহ্ন, ভাষার রীতি ও লেখার পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। [11]

though there is even less dating evidence in the case of Hismaic.

বাংলা অনুবাদ: হিসমাইকের ক্ষেত্রে কালনির্ধারণের প্রমাণ আরও কম।

কোরআন নিজের ভাষা হিসেবে আরবির পরিচয় দিয়েছে। ইউসুফের আয়াতে আরবি ভাষায় নাজিল করার সঙ্গে শ্রোতাদের বোঝার উদ্দেশ্য যুক্ত রয়েছে। বাণীর ভাষা এখানে নির্দিষ্ট মানবসমাজের বোধগম্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত। [12]

إِنَّآ أَنزَلۡنَٰهُ قُرۡءَٰنًا عَرَبِيّٗا لَّعَلَّكُمۡ تَعۡقِلُونَ

বাংলা অনুবাদ: নিশ্চয় আমরা একে আরবি কোরআন হিসেবে নাজিল করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।

ইবরাহিমের আয়াতেও রাসুলের ভাষার সঙ্গে তাঁর জনগোষ্ঠীর ভাষা ও তাদের বোঝানোর উদ্দেশ্য সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। ভাষানির্বাচনের এই ব্যাখ্যায় একজন ঐতিহাসিক বক্তা এবং তাঁর প্রথম শ্রোতাদের ভাষাগত পরিচয় কেন্দ্রীয় অবস্থানে রয়েছে। [13]

وَمَآ أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِۦ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ ۖ فَيُضِلُّ ٱللَّهُ مَن يَشَآءُ وَيَهْدِى مَن يَشَآءُ ۚ وَهُوَ ٱلْعَزِيزُ ٱلْحَكِيمُ

বাংলা অনুবাদ: আমরা কোনো রাসুলকেই তাঁর জনগোষ্ঠীর ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় পাঠাইনি, যাতে তিনি তাদের কাছে স্পষ্ট করে বোঝাতে পারেন। এরপর আল্লাহ যাকে চান ভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান পথ দেখান। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

শ্রোতার ভাষায় বোঝানোর প্রয়োজন এবং নির্দিষ্ট আরবি শব্দকে ঐশী মর্যাদা দেওয়ার দাবি পরবর্তী সংকলনে একত্র হয়েছে। বাণী বোঝার জন্য স্থানীয় ভাষা নির্বাচিত হয়েছে, আবার সেই ভাষার নির্দিষ্ট পাঠই অন্য জনগোষ্ঠীর জন্যও ধর্মীয় মানদণ্ড হয়েছে। এর লিখিত রূপ নির্ধারণে গোত্রীয় ভাষার যে নীতি কার্যকর হয়েছে, তা মানুষের সামাজিক পরিচয়কে সংকলনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত করে।

লাওহে মাহফুজের পাঠের ভাষা সম্পর্কে ইসলামকিউএতে উদ্ধৃত ইবনে বাজের বক্তব্য আরও নির্দিষ্ট: কোরআনের অক্ষর ও অর্থ দুটিই আল্লাহর বাণী এবং অক্ষর ও অর্থসহ তা লাওহে মাহফুজে বিদ্যমান। অর্থাৎ এই ব্যাখ্যায় লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত পাঠের অক্ষর ও অর্থকেও আল্লাহর বাণীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; লিখিত আরবি রূপ পর্যন্ত ঐশী মর্যাদার দাবির আওতায় রয়েছে। [14]

فالقرآن كله حروفه ومعانيه هو كلام الله، وهو موجود في اللوح المحفوظ، بحروفه ومعانيه

বাংলা অনুবাদ: কোরআনের সমগ্রটাই, তার অক্ষর ও অর্থসহ, আল্লাহর বাণী; আর তা অক্ষর ও অর্থসহ লাওহে মাহফুজে বিদ্যমান।

ইবনে বাজের বক্তব্যে কোরআনের অক্ষর, শব্দ ও অর্থ একসঙ্গে আল্লাহর বক্তব্য। তখন ভিন্ন শব্দের মধ্যে কোনটি লিখতে হবে, উচ্চারণের কোন রূপ মান্য হবে এবং কোন গোত্রের ভাষা প্রাধান্য পাবে—এসব সিদ্ধান্ত পাঠের ঐশী পরিচয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে যায়। একদিকে অক্ষর পর্যন্ত আল্লাহর নির্ধারিত বলে দাবি, অন্যদিকে সেই অক্ষরের লিখিত মান নির্ধারণে মানুষের ভাষাগত নির্বাচন। এই নির্বাচন সংকলকের কাজের ভেতরেই দৃশ্যমান।

উসমানের নির্দেশে কুরাইশি ভাষাই মতভেদ নিষ্পত্তির মানদণ্ড হয়েছে। যায়েদ ইবনে সাবিতের সঙ্গে কমিটির কুরাইশি সদস্যদের কোনো বিষয়ে অমিল হলে কুরাইশের ভাষায় লিখতে বলা হয়েছিল। বুখারির সংকলন-বিবরণে নির্দেশটি এভাবে এসেছে: [15]

إِذَا اخْتَلَفْتُمْ أَنْتُمْ وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ فِي شَىْءٍ مِنَ الْقُرْآنِ فَاكْتُبُوهُ بِلِسَانِ قُرَيْشٍ، فَإِنَّمَا نَزَلَ بِلِسَانِهِمْ

বাংলা অনুবাদ: কোরআনের কোনো বিষয়ে তোমাদের সঙ্গে জায়েদ ইবনে সাবিতের মতভেদ হলে তোমরা তা কুরাইশের ভাষায় লিখবে; কারণ তা তাদের ভাষাতেই নাজিল হয়েছে।

এই নির্দেশের মধ্যে মতভেদের সম্ভাবনা, মতভেদ মেটানোর কর্তৃত্ব এবং বিজয়ী ভাষার পরিচয়—তিনটিই রয়েছে। একাধিক ব্যক্তি লিখিত রূপ নিয়ে একমত না হলে তাঁদের সিদ্ধান্ত কুরাইশি ভাষার অধীন হবে। একটি গোত্রের ভাষাকে মানদণ্ড করার ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন খলিফা। ফলে বর্তমান লিখিত পাঠের ইতিহাসে ভাষা নিছক পরিবহনের বাহন নয়; পাঠ নির্বাচনের নীতিও। কুরাইশি ভাষা ও সাত আহরুফের সম্পর্কের বিস্তারিত রয়েছে কোরআন বিকৃতি ও সাত আহরুফের সাতকাহন প্রবন্ধে।


রমজান, শবে কদর ও তেইশ বছরে অবতরণ: এককালীন ও পর্যায়ক্রমিক নাজিলের বিবরণ

কোরআনে লাওহে মাহফুজে সংরক্ষণের কথা আছে, রমজান মাসে নাজিলের কথা আছে এবং কদরের রাতে নাজিলের কথাও আছে। মুহাম্মদের জীবনে আবার বহু বছর ধরে বিভিন্ন ঘটনায় আয়াত নাজিলের বর্ণনা রয়েছে। এই বক্তব্যগুলোর সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে লাওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানে একবারে সম্পূর্ণ পাঠ নামানো এবং পরে পৃথিবীতে ধাপে ধাপে পাঠানোর কাঠামো তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আগে থেকে প্রস্তুত পূর্ণ বাণী, একটি মধ্যবর্তী আসমানি সংগ্রহ এবং ঘটনানির্ভর ঘোষণার পৃথক পর্যায় রয়েছে।

ঘটনাসূরা ও আয়াতবিবরণসময়কাল
লওহে মাহফুজে সংরক্ষিতআল-বুরুজ ৮৫:২১–২২“নিশ্চয়ই সেই (কোরআন) মহিমান্বিত কিতাব লওহে মাহফুজে আছে।”এই আয়াতে সংরক্ষণের নির্দিষ্ট তারিখ দেওয়া হয়নি
রমজান মাসে নাজিলআল-বাকারা ২:১৮৫রমাযান মাস- যার মধ্যে কুরআন নাযিল করা হয়েছে লোকেদের পথ প্রদর্শক এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট বর্ণনারূপে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে…
— Taisirul Quran
রামাযান মাস, যে মাসে বিশ্বমানবের জন্য পথ প্রদর্শন এবং সু-পথের উজ্জ্বল নিদর্শন এবং হক ও বাতিলের প্রভেদকারী কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে।…
— Sheikh Mujibur Rahman
রমযান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।…
— Rawai Al-bayan
রমাদান মাস, এতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের হেদায়াতের জন্য এবং হিদায়াতের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে। …
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
রমজান মাস
শবে কদরে নাজিলসূরা আল-কদর, আয়াত ১-৫, সূরা আদ-দুখান, আয়াত: ১-৪আমি কুরআনকে কাদরের রাতে নাযিল করেছি,
— Taisirul Quran
নিশ্চয়ই আমি ইহা অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রাতে;
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয়ই আমি এটি নাযিল করেছি ‘লাইলাতুল ক্বাদরে।’
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় আমরা কুরআন নাযিল করেছি [১] ‘লাইলাতুল কদরে’ [২];
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
কদরের রাত
ধারাবাহিকভাবে ২৩ বছর ব্যাপী নাজিল(সীরাত, হাদিস ও ঐতিহাসিক উৎস)মক্কায় ১৩ এবং মদিনায় ১০ বছর; মোট ২৩ বছরে সমগ্র কোরআন অবতীর্ণ ২৩ বছরে

তেরো বছর মক্কায় এবং দশ বছর মদিনায় অবস্থানের হিসাব ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় সরাসরি পাওয়া যায়। মক্কার তেরো বছরের সঙ্গে ওহি আসার কথাও যুক্ত আছে। [16]

حَدَّثَنَا مَطَرُ بْنُ الْفَضْلِ، حَدَّثَنَا رَوْحٌ، حَدَّثَنَا هِشَامٌ، حَدَّثَنَا عِكْرِمَةُ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ـ رضى الله عنهما ـ قَالَ بُعِثَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لأَرْبَعِينَ سَنَةً، فَمَكُثَ بِمَكَّةَ ثَلاَثَ عَشْرَةَ سَنَةً يُوحَى إِلَيْهِ، ثُمَّ أُمِرَ بِالْهِجْرَةِ فَهَاجَرَ عَشْرَ سِنِينَ، وَمَاتَ وَهُوَ ابْنُ ثَلاَثٍ وَسِتِّينَ.

বাংলা অনুবাদ: মাতার ইবনে ফজল আমাদের বর্ণনা করেছেন; রাওহ আমাদের বর্ণনা করেছেন; হিশাম আমাদের বর্ণনা করেছেন; ইকরিমা আমাদের বর্ণনা করেছেন, ইবনে আব্বাস থেকে। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল চল্লিশ বছর বয়সে প্রেরিত হন। এরপর মক্কায় তেরো বছর অবস্থান করেন, তখন তাঁর কাছে ওহি আসত। পরে তাঁকে হিজরতের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং তিনি হিজরত করে দশ বছর অবস্থান করেন। তেষট্টি বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

ইসরার আয়াতে কোরআনকে ভাগ করে ও ধীরে ধীরে পাঠ করার উপযোগী করে নাজিলের কথা আছে। বাংলা অনুবাদগুলোতে “ক্রমশ”, “যথাযথভাবে” ও “পর্যায়ক্রমে” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। [17]

وَقُرْءَانًا فَرَقْنَاهُ لِتَقْرَأَهُ عَلَى النَّاسِ عَلَىٰ مُكْثٍ وَنَزَّلْنَاهُ تَنْزِيلًا

বাংলা অনুবাদ: আমি এ কুরআনকে ভাগে ভাগে বিভক্ত করেছি যাতে তুমি থেমে থেমে মানুষকে তা পাঠ করে শুনাতে পার, কাজেই আমি তা ক্রমশঃ নাযিল করেছি।
— Taisirul Quran
আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি খন্ড খন্ডভাবে যাতে তুমি তা মানুষের কাছে পাঠ করতে পার ক্রমে ক্রমে; এবং আমি তা যথাযথভাবে অবতীর্ণ করেছি।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর কুরআন আমি নাযিল করেছি কিছু কিছু করে, যেন তুমি তা মানুষের কাছে পাঠ করতে পার ধীরে ধীরে এবং আমি তা নাযিল করেছি পর্যায়ক্রমে।
— Rawai Al-bayan
আর আমরা কুরআন নাযিল করেছি খণ্ড খণ্ডভাবে যাতে আপনি তা মানুষের কাছে পাঠ করতে পারেন ক্রমে ক্রমে এবং আমরা তা পর্যায়ক্রমে নাযিল করেছি [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

মুহীউদ্দীন খানের অনুবাদে আরও নির্দিষ্ট ভাষা এসেছে: “যতিচিহ্ন সহ” পাঠের উপযোগী করার কথা। [18]

وَقُرْءَانًا فَرَقْنَاهُ لِتَقْرَأَهُ عَلَى النَّاسِ عَلَىٰ مُكْثٍ وَنَزَّلْنَاهُ تَنْزِيلًا

বাংলা অনুবাদ: আমি কোরআনকে যতিচিহ্ন সহ পৃথক পৃথকভাবে পাঠের উপযোগী করেছি, যাতে আপনি একে লোকদের কাছে ধীরে ধীরে পাঠ করেন এবং আমি একে যথাযথ ভাবে অবতীর্ণ করেছি।

এই অনুবাদে যতিচিহ্নও অবতরণের যথাযথতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আরবি পাঠে ভাগ করে দেওয়া, ধীরে পাঠ করা ও নাজিল করার ভাষা আছে; বাংলা অনুবাদের “যতিচিহ্ন” সেই বক্তব্যের একটি বাড়তি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা। পরবর্তী কালে নুকতা, হরকত ও অন্যান্য পাঠচিহ্ন যোগ করার ইতিহাসের সঙ্গে এই ভাষার টানাপোড়েন তাই সরাসরি। লিখিত পাঠের সমস্ত চিহ্ন প্রথম অবতরণ থেকেই স্থির—এমন ধারণায় পরবর্তী চিহ্ন সংযোজনের কাজটির জায়গা থাকে না।

এক রাতের অবতরণ এবং বহু বছরের অবতরণের সম্পর্ক নিয়েও ইসলামি গ্রন্থে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। সুয়ূতি প্রথম আসমানে একবারে নামানোর মতটিকে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ বলেছেন; এর পরে বিশ, তেইশ বা পঁচিশ বছরের অবতরণের হিসাব দিয়েছেন। মক্কায় নবুয়তের পরে অবস্থানকাল নিয়ে মতভেদের সঙ্গে এই সংখ্যাভেদ যুক্ত। [19]

أَنَّهُ نَزَلَ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا لَيْلَةَ الَقَدْرِ جُمْلَةً وَاحِدَةً ثُمَّ نَزَلَ بَعْدَ ذَلِكَ مُنَجَّمًا فِي عشرين سنة وثلاث وعشرين أو خمس وَعِشْرِينَ عَلَى حَسْبِ الْخِلَافِ فِي مُدَّةِ إِقَامَتِهِ بمكة بعد البعثة.

বাংলা অনুবাদ: তা কদরের রাতে একবারে নিকটবর্তী আসমানে নাজিল হয়েছে; তারপর ধাপে ধাপে বিশ, তেইশ অথবা পঁচিশ বছরে নাজিল হয়েছে—নবুয়তের পরে মক্কায় তাঁর অবস্থানকাল নিয়ে মতভেদ অনুসারে।

বাইতুল ইজ্জায় পূর্ণ পাঠ রাখার বর্ণনাটি ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত। ইসলামওয়েব নাসাঈ, হাকিম, ইবনে আবি শাইবা ও বায়হাকির সূত্র উল্লেখ করে এই বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে। এখানে লাওহে সংরক্ষণ থেকে মধ্যবর্তী আসমানি সংগ্রহ এবং সেখান থেকে জিবরাইলের অবতরণের ধারাটি পাওয়া যায়। [20]

فصل القرآن من الذكر فوضع في بيت العزة من السماء الدنيا فجعل جبريل ينزل به على النبي صلى الله عليه وسلم.

বাংলা অনুবাদ: কোরআনকে যিকর থেকে পৃথক করে নিকটবর্তী আসমানের বাইতুল ইজ্জায় রাখা হয়; এরপর জিবরাইল তা নিয়ে নবীর কাছে অবতরণ করতে থাকেন।

একই আলোচনায় সুয়ূতির উদ্ধৃত আরও দুটি মত আছে: প্রতি বছরের অংশ পৃথক কদরের রাতে নামানো এবং কদরের রাতে শুধু অবতরণ শুরু হওয়া। ফলে একই আয়াতের সঙ্গে যুক্ত অবতরণব্যবস্থার বিবরণও একটিমাত্র নয়।

ব্যাখ্যাকদরের রাতে কী ঘটেছেপরবর্তী অবতরণের সম্পর্ক
সম্পূর্ণ পাঠ একবারে নামানোলাওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানে পূর্ণ পাঠসেখান থেকে ধাপে ধাপে ঘোষণার বর্ণনা
প্রতি বছরের অংশ পৃথকভাবে নামানোবিশ, তেইশ বা পঁচিশটি কদরের রাতে বছরের নির্ধারিত অংশপ্রত্যেক বছরের অংশ পরে পৌঁছানো
অবতরণ শুরু হওয়ার ব্যাখ্যাকদরের রাতে প্রক্রিয়ার সূচনাপরে বিভিন্ন সময়ে অবতরণ চলতে থাকা

এই তিন ব্যাখ্যায় অবতরণ বলতে তিন ধরনের ঘটনা বোঝানো হচ্ছে। প্রথমটিতে এক রাতে সম্পূর্ণ গ্রন্থ স্থানান্তরিত হয়েছে; দ্বিতীয়টিতে প্রতি বছরের অংশ আলাদা করে পৌঁছেছে; তৃতীয়টিতে ওই রাতে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পূর্ণ সংগ্রহ, বার্ষিক কিস্তি এবং সূচনামুহূর্ত এক ঘটনা নয়। একই আয়াতের সময়সংক্রান্ত বক্তব্যের সঙ্গে কোন ঘটনাটি যুক্ত করা হবে, তা ব্যাখ্যাকারীরা পৃথকভাবে নির্ধারণ করেছেন। ফলে বহু বছরের ঘোষণাকে এক রাতের ঘোষণার সঙ্গে মেলানোর কাঠামোতেও মানুষের ব্যাখ্যা ও নির্বাচনের ভূমিকা রয়েছে।

ইসলামকিউএর আরেক ব্যাখ্যায় বাইতুল ইজ্জায় লিখিত পাঠ রাখার পরও জিবরাইল প্রত্যেকবার আল্লাহর কাছ থেকে আয়াত শুনে মুহাম্মদের কাছে আনতেন। এখানে মধ্যবর্তী লিখিত সংগ্রহ এবং আল্লাহর সরাসরি বক্তব্য শোনার দুটি ধারা পাশাপাশি বহাল থাকে। [21]

لكن جبريل عليه السلام كان ينزل بالآيات إلى النبي صلى الله عليه وسلم بعد أن يكلمه الله تعالى بها ويسمعها

বাংলা অনুবাদ: কিন্তু জিবরাইল নবীর কাছে আয়াত নিয়ে নামতেন আল্লাহ তাঁকে সেগুলো বলার এবং তাঁর সেগুলো শোনার পরে।

পূর্ণ পাঠ আগে থেকেই আসমানে সংরক্ষিত থাকার পর আবার প্রত্যেক ঘটনার সময়ে আল্লাহর নতুন করে বলার প্রয়োজনটি এই ব্যবস্থায় থেকে যায়। মধ্যবর্তী সম্পূর্ণ সংগ্রহটি বার্তা পৌঁছানোর কোন অপরিহার্য কাজটি করল? আগে স্থির করা পাঠের মধ্যে সংশোধিত ও রহিত অংশের অবস্থান কী? কোনো আয়াত মানুষের কাছে প্রথমে এক ভাষ্যে এল, পরে তাতে নতুন শব্দ ঢুকল—তখন আগের ও পরের কোন রূপটি ওই সম্পূর্ণ সংগ্রহের অংশ ছিল?

মানুষের কাছে একবারে সম্পূর্ণ কোরআন না আসার আপত্তি কোরআনেই রয়েছে। ফুরকানের আয়াতে অবিশ্বাসীদের প্রশ্ন উদ্ধৃত করে মুহাম্মদের অন্তর দৃঢ় করার উদ্দেশ্য বলা হয়েছে। [22]

وَقَالَ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ ٱلْقُرْءَانُ جُمْلَةًۭ وَٰحِدَةًۭ ۚ كَذَٰلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِۦ فُؤَادَكَ ۖ وَرَتَّلْنَـٰهُ تَرْتِيلًۭا

বাংলা অনুবাদ: অবিশ্বাসীরা বলে, তাঁর ওপর কোরআন একবারে সম্পূর্ণ নাজিল হলো না কেন? এভাবেই, যাতে এর মাধ্যমে তোমার অন্তর দৃঢ় করি; আর আমরা তা সুবিন্যস্তভাবে পাঠ করেছি।

ধাপে ধাপে পৌঁছানোর এই উদ্দেশ্য ঘোষিত বাণীর সময়বিন্যাস ব্যাখ্যা করে। কিন্তু আগে পঠিত অংশ পরে বর্জন করা, আয়াতে নতুন শর্ত যোগ করা কিংবা পূর্বের বিধান বদলানোর ঘটনাগুলো তখনও পাঠের ক্রমপরিবর্তনের সাক্ষ্য। সম্পূর্ণ পাঠ আগে থেকেই প্রস্তুত থাকলে সংশোধনীটি কোথায় লেখা ছিল, জিবরাইল কোন পর্যায়ের নির্দেশ আনলেন এবং মানুষের হাতে থাকা পূর্ববর্তী ভাষ্যের মর্যাদা কী হলো—এসব প্রশ্ন নির্দিষ্ট পাঠের সম্পর্ক নিয়ে। এক আসমান থেকে অন্য আসমানে স্থানান্তরের বিবরণ নিজে থেকে তার সমাধান দেয় না।

লাওহে মাহফুজে সংশোধন হয়েছে, নাকি সেখানে আগের ও পরের উভয় পর্যায় আগে থেকেই লেখা ছিল, নাকি কেবল চূড়ান্ত পাঠ ছিল—এই সম্ভাবনাগুলোতে আসমানি সংগ্রহের সঙ্গে পৃথিবীতে ঘোষিত পাঠের সম্পর্ক আলাদা হয়। শেষের পাঠকে আগে থেকেই নির্ধারিত বলা হলেও মানুষ প্রথমে একটি নির্দেশ এবং পরে তার সংশোধিত নির্দেশ পেয়েছেন। পূর্বপরিকল্পনার ধর্মীয় বিশ্বাস এই পরিবর্তনকে অনুমোদন করতে পারে; পরিবর্তন ঘটেনি বলে প্রমাণ করতে পারে না। নসখ, সংযোজন ও পাঠ প্রত্যাহারের বর্ণনা মেনে নিয়ে সব পর্যায়ে একই শব্দ ও একই বিধান বহাল ছিল বলা তাই সরাসরি অসঙ্গত।


প্রথম অবতীর্ণ সূরা ও আয়াতের পরস্পরভিন্ন পরিচয়

কোরআনের সূচনা সম্পর্কে সংরক্ষিত বর্ণনায় আলাক, মুদ্দাসসির ও ফাতিহার নাম পাওয়া যায়। প্রথম আয়াত, প্রথম সম্পূর্ণ সূরা এবং বিরতির পর প্রথম অবতরণ—পরবর্তী আলোচনায় প্রথমত্বের একাধিক সংজ্ঞা তৈরি হয়েছে। বর্তমান মুসহাফের সূচনায় রয়েছে ফাতিহা; প্রথম অবতরণের বহুল প্রচলিত বিবরণে রয়েছে আলাক।


সূরা আলাকের পক্ষে বর্ণনা

কোরআনের প্রথম অবতীর্ণ সূরা কোনটি? প্রচলিত বিবরণে চল্লিশ বছর বয়সে হেরা পর্বতের গুহায় মুহাম্মদের কাছে ফেরেশতা আসেন এবং সূরা আলাকের প্রারম্ভিক আয়াতগুলো জানান। পাঠ্যপুস্তক ও ধর্মীয় আলোচনায় প্রথম অবতরণের পরিচিত গল্পটি এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। আয়েশার নামে বুখারিতে সংরক্ষিত বর্ণনার সংশ্লিষ্ট অংশে রয়েছে: [23] [24]

حَتَّى جَاءَهُ الْحَقُّ وَهُوَ فِي غَارِ حِرَاءٍ، فَجَاءَهُ الْمَلَكُ فَقَالَ اقْرَأْ. قَالَ «مَا أَنَا بِقَارِئٍ». قَالَ «فَأَخَذَنِي فَغَطَّنِي حَتَّى بَلَغَ مِنِّي الْجَهْدَ، ثُمَّ أَرْسَلَنِي فَقَالَ اقْرَأْ. قُلْتُ مَا أَنَا بِقَارِئٍ. فَأَخَذَنِي فَغَطَّنِي الثَّانِيَةَ حَتَّى بَلَغَ مِنِّي الْجَهْدَ، ثُمَّ أَرْسَلَنِي فَقَالَ اقْرَأْ. فَقُلْتُ مَا أَنَا بِقَارِئٍ. فَأَخَذَنِي فَغَطَّنِي الثَّالِثَةَ، ثُمَّ أَرْسَلَنِي فَقَالَ {اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ * خَلَقَ الإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ * اقْرَأْ وَرَبُّكَ الأَكْرَمُ}».

বাংলা অনুবাদ: এমনিভাবে হেরা’ গুহায় অবস্থানকালে একদিন তাঁর কাছে ওহী এলো। তাঁর কাছে ফিরিশতা এসে বললেন, পড়ুন’। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “আমি বললাম, আমি পড়িনা’। তিনি বলেনঃ তারপর তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে এমন ভাবে চাপ দিলেন যে, আমার অত্যন্ত কষ্ট হল। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ুন’। আমি বললামঃ আমিতো পড়ি না। তিনি দ্বিতীয়বার আমাকে জড়িয়ে ধরে এমন ভাবে চাপ দিলেন যে, আমার অত্যন্ত কষ্ট হল। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেনঃ পড়ুন’। আমি জবাব দিলাম, আমিতো পড়িনা’। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তারপর তৃতীয়বার তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেন। এরপর ছেড়ে দিয়ে বললেন, “পড়ুন আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক থেকে। পড়ুন আর আপনার রব্ মহামহিমান্বিত। ” (৯৬: ১-৩)
তাখরীজ: ( বুখারীঃ তা.পা ৩, ৩৩৯২, ৪৯৫৩, ৪৯৫৫, ৪৯৫৬, ৪৯৫৭, ৬৯৮২; মুসলিম ১/৭৩ হাঃ ১৬০, আহমদ ২৬০১৮ ( আ.প্রঃ ৩, ইঃফাঃ ৩)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এই বর্ণনায় ফেরেশতার প্রথম আগমনের সঙ্গে আলাকের প্রথম তিন আয়াতের পাঠ যুক্ত হয়েছে; অন্য বিস্তারিত বর্ণনায় প্রারম্ভিক পাঁচ আয়াতের উল্লেখও আছে। অবতরণের ক্রম অনুসারে গ্রন্থ সাজানো হলে আলাকের এই অংশই সামনে থাকার কথা। বর্তমান কোরআনে আলাকের স্থান ৯৬ নম্বরে। সূরা আলাক ৯৬ নম্বরে গেল কীভাবে? কে ঠিক করলেন, প্রথম অবতীর্ণ অংশটি গ্রন্থের প্রায় শেষ প্রান্তে থাকবে? আল্লাহ কি এই বিন্যাসের কোনো নির্দেশ দিয়েছিলেন? দিয়ে থাকলে সেই নির্দেশ কোথায়? আর নির্দেশ না থাকলে অবতরণের ক্রম ভেঙে ফাতিহাকে প্রথমে বসানোর কর্তৃত্ব কার ছিল? প্রথম অবতরণের স্মৃতি এবং সংকলিত গ্রন্থের পাঠক্রমের মধ্যে এত বড় ব্যবধান সংকলকের সিদ্ধান্ত ও তার ভিত্তি সম্পর্কে প্রশ্ন তোলে। প্রথম নাজিল হওয়া অংশের পরিচয় নিয়েও একাধিক মত পাওয়া যায়।

প্রথম অবতরণ নিয়ে সুয়ূতি আয়েশার বর্ণনাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁর উদ্ধৃতিতে “পড়ো তোমার রবের নামে” থেকে “তিনি শিখিয়েছেন যা মানুষ জানত না” পর্যন্ত অংশের কথা আছে—অর্থাৎ আলাকের প্রারম্ভিক আয়াতসমূহ। আলাকের প্রথম অংশ অবতীর্ণ হওয়া এবং সম্পূর্ণ সূরা শেষ হওয়ার সময়ও এক নয়। [25]

فَقَالَ: {اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ} حَتَّى بَلَغَ: {مَا لَمْ يَعْلَمْ}

বাংলা অনুবাদ: তখন তিনি বললেন: “পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন”—এভাবে “যা সে জানত না” পর্যন্ত পৌঁছলেন।

আলাকের প্রথমত্বের আরেকটি উল্লেখ পাওয়া যায় আবু রাজা আল-উতারিদির নামে সংরক্ষিত শিক্ষাদানের বিবরণে। সুয়ূতির উদ্ধৃতি অনুযায়ী, আবু মুসা তাঁর শিক্ষার্থীদের এই সূরা পড়ানোর সময় একে মুহাম্মদের ওপর প্রথম অবতীর্ণ সূরা বলে পরিচয় দিতেন। প্রথমত্বের এই পরিচয় হেরা-গুহার ঘটনা বর্ণনার পাশাপাশি পরবর্তী কোরআনশিক্ষার মধ্যেও প্রচারিত হয়েছে। [26]

كَانَ أَبُو مُوسَى يُقْرِئُنَا فَيُجْلِسُنَا حِلَقًا عَلَيْهِ ثَوْبَانِ أَبْيَضَانِ فَإِذَا تَلَا هَذِهِ السُّورَةَ: {اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ}، قَالَ: هَذِهِ أَوَّلُ سُورَةٍ أُنْزِلَتْ عَلَى مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.

বাংলা অনুবাদ: আবু মুসা আমাদের কোরআন শেখাতেন এবং আমাদের বৃত্তাকারে বসাতেন। তাঁর পরনে দুটি সাদা পোশাক থাকত। তিনি যখন এই সূরা পড়তেন—“পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন”—তখন বলতেন, মুহাম্মদের ওপর প্রথম এই সূরাটিই নাজিল হয়েছে।

এই বিবরণে আলাকের প্রারম্ভিক অংশের অবতরণের কথা রয়েছে; বর্তমান মুসহাফে সূরাটি ৯৬ নম্বর স্থানে বিন্যস্ত হয়েছে। প্রথম অবতরণের গল্প দিয়ে বর্তমান সূরাক্রমের উৎস প্রমাণিত হয় না। কোন অংশ আগে নাজিল হলো, পরে সূরাটি কীভাবে পূর্ণ হলো এবং শেষ সংকলনে কোথায় স্থান পেল—এই তিনটির জন্য পৃথক সাক্ষ্য প্রয়োজন। প্রচলিত বর্ণনায় প্রথম অবতরণের নাটকীয় বিবরণ বিস্তারিত; আলাককে ৯৬ নম্বরে বসানোর নির্দেশ সেই বিবরণে নেই।

এই কারণেই সূরা ফাতিহা দিয়ে গ্রন্থের সূচনা এবং আলাককে অনেক পরে রাখা নিয়ে প্রশ্নটি শুধু সংখ্যার প্রশ্ন নয়। গ্রন্থের পাঠ-পরিকল্পনা কে তৈরি করেছেন, কোন রীতি মেনে করেছেন এবং তার পক্ষে সমসাময়িক কী সাক্ষ্য আছে—সেই প্রশ্ন। বর্তমান মুসহাফের বিন্যাসে অবতরণকালের ধারাবাহিকতার বদলে অন্য একটি ক্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; সেই ক্রমের কর্তৃত্ব নিয়েও মতভেদ সংরক্ষিত আছে। প্রথম ওহির কথোপকথনেও নির্দেশ ও অক্ষমতার উত্তরের মধ্যে একটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে: “পড়ো”—“আমি পড়তে জানি না”—শক্ত করে চেপে ধরা—তারপর আবার একই নির্দেশ। অক্ষরজ্ঞানহীনতার ঘোষণার উত্তরে অক্ষর শেখানো বা নির্দেশটি স্পষ্ট করার পরিবর্তে শারীরিক চাপের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। লিখিত পাঠবস্তুর প্রসঙ্গও সীরাতের বর্ণনায় সরাসরি উপস্থিত। ইবনে হিশামে সংরক্ষিত ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় মুহাম্মদ ঘুমন্ত অবস্থায় জিবরাইলকে লেখাযুক্ত রেশমি কাপড় নিয়ে আসতে দেখেন। সেখানে উত্তরের ভাষা “মা আকরা”—“আমি কী পড়ব?”; বুখারির “মা আনা বিকারি” এবং এই সীরাতের সংলাপ পৃথক ভাষায় সংরক্ষিত। [27] [28]

فجاءني جبريل ، وأنا نائم ، بنمط من ديباج فيه كتاب ، فقال اقرأ ؛ قال : قلت : ما أقرأ ؟ قال : فغتني به حتى ظننت أنه الموت

বাংলা অনুবাদ: আমি ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় জিবরাইল লেখাযুক্ত একটি রেশমি কাপড় নিয়ে আমার কাছে এলেন। তিনি বললেন, পড়ো। আমি বললাম, আমি কী পড়ব? তখন তিনি সেটি দিয়ে আমাকে এমনভাবে চেপে ধরলেন যে, আমি মনে করলাম মৃত্যু এসে গেছে।

লিখিত পাঠ পড়ার নির্দেশ হিসেবে কথোপকথনটি গ্রহণ করলে নিরক্ষর ব্যক্তির অক্ষমতার উত্তর সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক; কিন্তু সেই অক্ষমতার জবাবে বারবার চাপ প্রয়োগ পাঠ শেখানোর কোনো পদ্ধতি নয়। আর “পড়ো”কে শুধু “শুনে আবৃত্তি করো” বললেও নির্দেশদানের সমস্যাটি মেটে না: প্রথম নির্দেশের আগে পুনরাবৃত্তির জন্য নির্দিষ্ট কোনো বাক্য শোনানোর বিবরণ নেই; আলাকের বাক্যগুলো আসে কয়েক দফা চাপ প্রয়োগের পরে। শুনে পুনরাবৃত্তি করানোই উদ্দেশ্য হলে বাক্যটি আগে বলে দেওয়া এবং কী করতে হবে তা স্পষ্ট করাই যোগাযোগের সরাসরি উপায়। তার পরিবর্তে একই সংক্ষিপ্ত নির্দেশ, অক্ষমতার উত্তর এবং কষ্ট দেওয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। বর্ণিত ফলও অক্ষরজ্ঞান অর্জনের প্রদর্শন নয়; কাঁপতে কাঁপতে ফিরে আসা, নিজেকে ঢেকে দিতে বলা এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ। এখানে পাঠের অর্থ বদলে দিলেই বলপ্রয়োগের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। নিরক্ষরতা জানানো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দিয়ে একই আদেশ পুনরাবৃত্তি করা তাঁর অক্ষমতার সমাধান করে না। প্রথম পাঠের এই আখ্যান এবং পরে গ্রন্থের সূরাক্রম নির্ধারণ—দুই ক্ষেত্রেই কর্তৃত্বের দাবি রয়েছে; নির্দেশটি কীভাবে কার্যকর হলো এবং নির্দিষ্ট বিন্যাসটি কোন দলিলে প্রতিষ্ঠিত হলো, তার ব্যাখ্যা সেই দাবি থেকে আলাদাভাবে প্রয়োজন।

সংলাপের দিকবর্ণনার সামনে যে প্রশ্ন আসেচাপ প্রয়োগে যে সমস্যার সমাধান হয় না
লিখিত কিছু পড়তে বলা হচ্ছে“আমি পড়তে জানি না” অক্ষরজ্ঞানহীনতার উত্তর। সীরাতের পৃথক স্বপ্নবর্ণনায় লেখাযুক্ত কাপড়ও উপস্থিত।অক্ষর না-জানার অক্ষমতা চাপ দিয়ে দূর হয় না; অক্ষর শেখানোর প্রক্রিয়া এখানে বর্ণিত হয়নি।
শুনে পুনরাবৃত্তি করতে বলা হচ্ছেপ্রথম নির্দেশের আগে কোন নির্দিষ্ট বাক্য শুনিয়ে সেটি পুনরাবৃত্তি করতে বলা হয়েছিল?পুনরাবৃত্তির বিষয় স্পষ্ট করার পরিবর্তে একই আদেশ ও শারীরিক চাপ ফিরে এসেছে।
বারবার শারীরিক চাপ দেওয়া হচ্ছেঘোষিত অক্ষমতা দূর করতে বা নির্দেশটি স্পষ্ট করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো?চাপের সঙ্গে কষ্ট ও আতঙ্কের সম্পর্ক বর্ণিত; চাপ নিজে কীভাবে পাঠ শেখায় বা নির্দেশের অস্পষ্টতা দূর করে, সেই সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

সূরা মুদ্দাসসিরের পক্ষে বর্ণনা

জাবির ইবনে আবদুল্লাহর নামে সংরক্ষিত আরেক বর্ণনায় প্রথম অবতীর্ণ অংশের পরিচয় মুদ্দাসসির। ইয়াহইয়া ও আবু সালামার প্রশ্নোত্তরে আলাকের নাম সরাসরি তোলা হয়েছে, তারপরও উত্তর হিসেবে মুদ্দাসসিরের নাম এসেছে। বুখারি ও মুসলিমের এই বর্ণনার বুখারি-পাঠে রয়েছে: [29]

حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ مَنْصُورٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الصَّمَدِ، حَدَّثَنَا حَرْبٌ، حَدَّثَنَا يَحْيَى، قَالَ سَأَلْتُ أَبَا سَلَمَةَ أَىُّ الْقُرْآنِ أُنْزِلَ أَوَّلُ فَقَالَ {يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ} فَقُلْتُ أُنْبِئْتُ أَنَّهُ {اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ} فَقَالَ أَبُو سَلَمَةَ سَأَلْتُ جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ أَىُّ الْقُرْآنِ أُنْزِلَ أَوَّلُ فَقَالَ {يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ} فَقُلْتُ أُنْبِئْتُ أَنَّهُ {اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ} فَقَالَ لاَ أُخْبِرُكَ إِلاَّ بِمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «جَاوَرْتُ فِي حِرَاءٍ فَلَمَّا قَضَيْتُ جِوَارِي، هَبَطْتُ فَاسْتَبْطَنْتُ الْوَادِيَ فَنُودِيتُ، فَنَظَرْتُ أَمَامِي وَخَلْفِي وَعَنْ يَمِينِي وَعَنْ شِمَالِي فَإِذَا هُوَ جَالِسٌ عَلَى عَرْشٍ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالأَرْضِ، فَأَتَيْتُ خَدِيجَةَ فَقُلْتُ دَثِّرُونِي وَصُبُّوا عَلَىَّ مَاءً بَارِدًا، وَأُنْزِلَ عَلَىَّ {يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ * قُمْ فَأَنْذِرْ * وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ}».

বাংলা অনুবাদ: সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ আল্লাহ্‌র বাণীঃ وربك فكبر “এবং তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর (৭৪ঃ ৩)
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৫৬৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৯২৪
৪৫৬৩। ইসহাক ইবনু মানসুর (রহঃ) … ইয়াহইয়া (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবূ সালামা ইবনু আবদুর রহমান (রহঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম, কুরআনের কোন আয়াতটি প্রথম নাযিল হয়েছিল। তিলি বললেন, يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ (সূরা মুদ্দাসসির)। আমি বললাম, আমাকে তো বলা হয়েছে, اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ (সূরা আলাক)। এ কথা শুনে আবূ সালামা (রহঃ) বলেন, এ সম্পর্কে আমি জাবির (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করার পর তিনি বলেছেন, ‏يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ প্রথম নাযিল হয়েছে। তখন আমি বললাম, আমাকে তো বলা হয়েছে- ‏اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ প্রথমে নাযিল হয়েছিল। তখন তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন, আমি তোমাকে তাই বলছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি হেরা গুহায় ইতিকাফ রত অবস্থায় ছিলাম। ইতিকাফ শেষ হলে আমি সেখান থেকে নেমে উপত্যকার মাঝে পৌঁছলে আমি আমাকে ডাকার শব্দ শুনতে পেলাম। তখন আমি সামনে, পিছনে, ডানে ও বামে তাকালাম। দেখলাম সে (ফেরেশতা জিবরীল) আসমান ও জমিনের মাঝে রক্ষিত একটি আসনে বসে আছে। এরপর আমি খাদিজার (রাঃ) এর কাছে গিয়ে বললাম, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর এবং আমার গায়ে ঠাণ্ডা পানি ঢাল। তখন আমার প্রতি নাযিল হলঃ “হে বস্ত্রাবৃত! উঠুন, সতর্কবাণী প্রচার করুন এবং আপনার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন” (সূরা মুদ্দাসসির)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাসীর (রহঃ)

কোরআন সংকলন 1

প্রশ্নের ভাষা এখানে স্পষ্ট: কোরআনের কোন অংশ প্রথম নাজিল হয়েছে? উত্তরে মুদ্দাসসির, আপত্তিতে আলাক, তারপর আবার মুহাম্মদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে মুদ্দাসসিরের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। একই জাবিরের নামে আরেক বর্ণনায় ঘটনাটির আগে ওহির বিরতির উল্লেখ আছে এবং দেখা ফেরেশতাকে আগের হেরা-আগমনের সঙ্গে চেনানো হয়েছে। বুখারির সেই বর্ণনার মূল বক্তব্য: [30]

بَيْنَا أَنَا أَمْشِي، إِذْ سَمِعْتُ صَوْتًا مِنَ السَّمَاءِ، فَرَفَعْتُ بَصَرِي فَإِذَا الْمَلَكُ الَّذِي جَاءَنِي بِحِرَاءٍ جَالِسٌ عَلَى كُرْسِيٍّ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالأَرْضِ، فَرُعِبْتُ مِنْهُ، فَرَجَعْتُ فَقُلْتُ زَمِّلُونِي. فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى {يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ * قُمْ فَأَنْذِرْ} إِلَى قَوْلِهِ {وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ} فَحَمِيَ الْوَحْىُ وَتَتَابَعَ.

বাংলা অনুবাদ: আমি হাঁটছিলাম, এমন সময় আকাশ থেকে একটি শব্দ শুনলাম। চোখ তুলে দেখি, হেরায় আমার কাছে যে ফেরেশতা এসেছিলেন, তিনি আসমান ও জমিনের মাঝখানে একটি আসনে বসে আছেন। তাঁকে দেখে আমি ভয় পেয়ে ফিরে এসে বললাম, আমাকে ঢেকে দাও। তখন আল্লাহ নাজিল করলেন, “হে বস্ত্রাবৃত, ওঠো এবং সতর্ক করো”—এভাবে “অপবিত্রতা পরিত্যাগ করো” পর্যন্ত। এরপর ওহি প্রবলভাবে ও একের পর এক আসতে লাগল।

মুদ্দাসসিরকে প্রথম বলার বর্ণনা এবং আলাককে প্রথম বলার বর্ণনা মেলাতে সুয়ূতি একাধিক ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন। তাঁর একটি ব্যাখ্যা হলো, মুদ্দাসসিরের প্রথমত্ব ওহির বিরতির পরের সময়ের জন্য। ফলে “প্রথম” শব্দের সঙ্গে কোন শর্ত যুক্ত করা হচ্ছে, সেটিই ব্যাখ্যার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। [31]

أَنَّ مُرَادَ جَابِرٍ بالأولية مَخْصُوصَةٌ بِمَا بَعْدَ فَتْرَةِ الْوَحْيِ لَا أَوَّلِيَّةٌ مُطْلَقَةٌ.

বাংলা অনুবাদ: জাবিরের প্রথমত্বের উদ্দেশ্য ওহীর বিরতির পরের সময়ের জন্য নির্দিষ্ট; নিঃশর্ত প্রথমত্ব নয়।

একই আলোচনায় সম্পূর্ণ সূরা হিসেবে প্রথম, সতর্কবাণীর নির্দেশ হিসেবে প্রথম এবং নবুয়ত ও রিসালাতের সূচনার পার্থক্যের ব্যাখ্যাও আছে। অর্থাৎ বর্ণনাগুলো একভাবে বলা হয়নি; পরে “প্রথম”কে ভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে সমন্বয় করা হয়েছে। এই সমন্বয় কোথাও পাঠের বিস্তারিত ঘটনার ওপর দাঁড়ায়, কোথাও বিশেষ অর্থ নির্ধারণের ওপর। প্রথমত্বের প্রত্যেক ব্যাখ্যায় একই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য বাড়তি শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রথম অবতরণ সম্পর্কে বর্ণনাগুলোতে ভিন্ন সূরা ও ঘটনার পরিচয় পাওয়া যায়। পরবর্তী ভাষ্যকাররা কখনো সম্পূর্ণ সূরা হিসেবে প্রথম, কখনো সতর্ক করার নির্দেশ হিসেবে প্রথম, আবার কখনো নবুয়ত ও রিসালাতের সূচনা হিসেবে “প্রথম” শব্দটির অর্থ সীমিত করেছেন। মতভেদ সংরক্ষিত হয়েছে বলেই এই সমন্বয়মূলক ব্যাখ্যাগুলো তৈরি হয়েছে। অবতরণের শুরু সম্পর্কেও একক, সর্বসম্মত স্মৃতির বদলে পৃথক বর্ণনা এবং সেগুলো মেলানোর পরবর্তী প্রচেষ্টা রয়েছে।

ইসলামকিউএর আলোচনাতেও মুদ্দাসসিরের প্রথম পাঁচ আয়াতকে ওহির বিরতির পরের অবতরণ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। পূর্ণ সূরা একবারে নাজিল হওয়ার ব্যাখ্যা থেকে এটি আলাদা: এখানে সূরার পাঁচটি আয়াতের কথা বলা হচ্ছে। ফলে মুদ্দাসসিরকে প্রথম সম্পূর্ণ সূরা বলা এবং তার প্রারম্ভিক অংশকে বিরতির পর প্রথম বলা—সমন্বয়ের এই দুই পদ্ধতি একই তথ্য প্রতিষ্ঠা করে না। [32]

والأظهر: أن هذه الآيات الخمس من سورة المدثر نزلت بعد فتور الوحي، وسبقتها آيات سورة العلق.

বাংলা অনুবাদ: অধিকতর স্পষ্ট মত হলো, মুদ্দাসসিরের এই পাঁচ আয়াত ওহির বিরতির পরে নাজিল হয়েছে এবং তার আগে আলাকের আয়াতগুলো নাজিল হয়েছিল।


সূরা ফাতিহার পক্ষে বর্ণনা

তাবিয়ি আবু মাইসারার নামে সংরক্ষিত খবরকে ভিত্তি করে ফাতিহাকে প্রথম অবতীর্ণ সূরা বলা হয়েছে। বায়হাকির দালাইলুন নুবুওয়াহর দ্বিতীয় খণ্ডের ১৫৭–১৫৯ পৃষ্ঠায় প্রথম অবতরণ নিয়ে আলোচনা রয়েছে; ফাতিহার বর্ণনাটি ১৫৮–১৫৯ পৃষ্ঠায় সংরক্ষিত। ওয়াহিদির আসবাবুন নুজুলেও আবু মাইসারার নামে একটি পৃথক পাঠ আছে: [33] [34] [35]

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – كَانَ إِذَا بَرَزَ سَمِعَ مُنَادِيًا يُنَادِيهِ: يَا مُحَمَّدُ، فَإِذَا سَمِعَ الصَّوْتَ انْطَلَقَ هَارِبًا، فَقَالَ لَهُ وَرَقَةُ بْنُ نَوْفَلٍ: إِذَا سَمِعْتَ النِّدَاءَ فَاثْبُتْ حَتَّى تَسْمَعَ مَا يَقُولُ لَكَ. قَالَ: فَلَمَّا بَرَزَ سَمِعَ النِّدَاءَ: يَا مُحَمَّدُ، فَقَالَ: لَبَّيْكَ، قَالَ: قُلْ: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، ثُمَّ قَالَ: قُلْ: {الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ} حَتَّى فَرَغَ مِنْ فَاتِحَةِ الْكِتَابِ.

বাংলা অনুবাদ: রাসুলুল্লাহ বাইরে বের হলে একজন আহ্বানকারীর ডাক শুনতেন: হে মুহাম্মদ! শব্দ শুনলেই তিনি পালিয়ে যেতেন। ওয়ারাকা ইবনে নাওফিল তাঁকে বললেন, ডাক শুনলে স্থির থাকুন, যতক্ষণ না শুনতে পান সে আপনাকে কী বলে। এরপর বাইরে বের হলে তিনি ডাক শুনলেন: হে মুহাম্মদ! তিনি বললেন, আমি উপস্থিত। আহ্বানকারী বলল, বলুন: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল। তারপর বলল, বলুন: “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক, পরম করুণাময়, অতি দয়ালু, প্রতিফল দিবসের অধিপতি”—এভাবে ফাতিহাতুল কিতাব শেষ হওয়া পর্যন্ত।

কোরআনের বর্তমান বিন্যাসে সূরা ফাতিহাই প্রথম। আয়েশার নামে সংরক্ষিত প্রথম অবতরণের বিবরণে আলাকের প্রারম্ভিক অংশ রয়েছে। অবতরণের সূচনা আলাকের সঙ্গে এবং মুসহাফের সূচনা ফাতিহার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কালানুক্রমের বদলে নির্দিষ্ট গ্রন্থক্রম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এই পার্থক্য সূরা বিন্যাসের কর্তৃত্ব ও সংকলনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

অবতরণের এই ক্রম সত্য হলে নাজিলের ক্রম অনুসারে কোরআন সংকলিত হয়নি কেন? এই বিষয়ে কি আল্লাহর কোনো নির্দেশনা ছিল? নাজিলের সময়ানুক্রমে সূরাগুলোর বিন্যাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে এই লেখাটিতে। [36]

ফাতিহাকে প্রথম সূরা বলার মতটিও সুয়ূতি বাদ দেননি। তিনি কাশশাফের বক্তব্য উদ্ধৃত করে আলাককে প্রথম বলা ও ফাতিহাকে প্রথম বলার দুই মত উল্লেখ করেছেন। জামাখশারির উদ্ধৃত বক্তব্যে ফাতিহার প্রথমত্ব একটি স্বতন্ত্র মত হিসেবে এসেছে। [37]

ذَهَبَ ابْنُ عَبَّاسٍ وَمُجَاهِدٌ إِلَى أَنَّ أَوَّلَ سُورَةٍ نَزَلَتْ “اقْرَأْ ” وَأَكْثَرُ الْمُفَسِّرِينَ إِلَى أَنَّ أَوَّلَ سُورَةٍ نَزَلَتْ فَاتِحَةُ الْكِتَابِ.

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আব্বাস ও মুজাহিদ এই মত গ্রহণ করেছেন যে প্রথম নাজিল হওয়া সূরা “ইকরা”; আর অধিকাংশ মুফাসসিরের মত হিসেবে বলা হয়েছে, প্রথম নাজিল হওয়া সূরা ফাতিহাতুল কিতাব।

“অধিকাংশ” সম্পর্কে এই দাবির বিরোধিতাও সুয়ূতির একই আলোচনায় আছে। ইবনে হাজারের বক্তব্য অনুযায়ী অধিকাংশ ইমাম আলাককেই প্রথম বলেছেন; ফাতিহার পক্ষের মতসংখ্যা সম্পর্কে জামাখশারির হিসাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রথম সূরার পরিচয়ের পাশাপাশি কোন মতটি সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেই পরিচয়ও এখানে বিরোধের বিষয়। [38]

قَالَ ابْنُ حَجَرٍ: وَالَّذِي ذَهَبَ إِلَيْهِ أَكْثَرُ الْأَئِمَّةِ هُوَ الْأَوَّلُ.

বাংলা অনুবাদ: ইবনে হাজার বলেছেন: অধিকাংশ ইমাম যে মত গ্রহণ করেছেন, সেটি প্রথমটি।

ইসলামওয়েবের আলোচনায় আবু মাইসারার খবরের সনদে সংযোগবিচ্ছেদের কথা এসেছে এবং প্রথম সম্পূর্ণ সূরা হিসেবে মুদ্দাসসির ও ফাতিহার মতভেদও স্বীকার করা হয়েছে। আবু মাইসারা সরাসরি মুহাম্মদের সময়কার ঘটনার বিবরণ দিচ্ছেন; এখানে তাঁর ও মুহাম্মদের মধ্যবর্তী বর্ণনাকারীর নাম নেই। ইসলামি হাদিসশাস্ত্রে এই ধরনের বর্ণনা মুরসাল। ফাতিহার প্রথমত্বের বর্ণনাটি তাই আয়েশার আলাক-সংক্রান্ত বর্ণনা থেকে পৃথক সূত্র ও পৃথক মর্যাদায় সংরক্ষিত। [39]

قال القاضي أبو بكر في الانتصار: وهذا الخبر منقطع، وأثبت الأقاويل اقرأ باسم ربك، ويليه في القوة يا أيها المدثر.

বাংলা অনুবাদ: কাজি আবু বকর আল-ইনতিসারে বলেছেন: এই খবরের বর্ণনাসূত্র বিচ্ছিন্ন। মতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত হলো “পড়ো তোমার রবের নামে”; শক্তির বিচারে এর পরে “হে বস্ত্রাবৃত”।

নামাজে নিয়মিত পাঠ, গ্রন্থের মুখবন্ধ হিসেবে ব্যবহার এবং প্রথম নাজিল হওয়ার দাবি—এই তিনটি অবস্থান পৃথক। ফাতিহা নামাজের পাঠে এবং মুসহাফের মুখবন্ধে প্রতিষ্ঠিত; তার অবতরণের প্রথমত্ব নিয়ে পৃথক মত সংরক্ষিত আছে। গ্রন্থের শুরুতে ফাতিহা প্রতিষ্ঠিত হলেও প্রথম অবতরণ নিয়ে মতভেদ রয়ে গেছে।

ইসলামকিউএও ফাতিহার প্রথমত্বের মতটির অস্তিত্ব স্বীকার করে তাকে দুর্বল বলেছে। এখানে ফাতিহাকে মক্কায় অবতীর্ণ বলা এবং সমগ্র কোরআনের প্রথম অবতীর্ণ সূরা বলা দুটি স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত। মক্কি পরিচয় থেকে একাই তার সুনির্দিষ্ট প্রথমত্ব স্থির হয় না। [40]

بل ذهب بعض أهل العلم إلى أن الفاتحة أول ما أنزل، وهو ضعيف.

বাংলা অনুবাদ: কিছু আলেম এমন মতও গ্রহণ করেছেন যে ফাতিহাই প্রথম নাজিল হয়েছিল; এই মত দুর্বল।

বর্ণনা বা ব্যাখ্যাপ্রথমত্বের পরিচয়বর্তমান মুসহাফে অবস্থান
আয়েশার বর্ণনাআলাকের প্রারম্ভিক আয়াত; সুয়ূতির অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মতসূরা আলাক: ৯৬
ইয়াহইয়া–আবু সালামা–জাবিরের প্রশ্নোত্তরমুদ্দাসসির; প্রশ্নে আলাকের নামও সরাসরি উত্থাপিতসূরা মুদ্দাসসির: ৭৪
বিরতির বিবরণভিত্তিক ব্যাখ্যামুদ্দাসসিরের শুরু: ওহির বিরতির পর প্রথমসূরা মুদ্দাসসির: ৭৪
আবু মাইসারার নামে খবরফাতিহা পাঠের বিবরণ; প্রথম সূরা বলার মতের ভিত্তিসূরা ফাতিহা: ১
সম্পূর্ণ সূরা হিসেবে প্রথমত্বের ব্যাখ্যামুদ্দাসসির ও ফাতিহা নিয়ে পৃথক নির্বাচনসম্পূর্ণ হওয়ার ক্রম ও মুসহাফের ক্রম পৃথক

প্রথম লিখিত কোরআন: কখন, কার হাতে ও কোন উপকরণে

কোরআন কখন প্রথম লেখা হয়েছিল? ধর্মীয় বিশ্বাসে এর উত্তর লাওহে মাহফুজে পূর্বলিখন; পৃথিবীর লিখন-ইতিহাসে পাওয়া যায় মুহাম্মদের বক্তব্য শুনে মানুষের হাতে আয়াত লেখার বিবরণ। প্রথমটির সঙ্গে মহাবিশ্বের পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা, দ্বিতীয়টির সঙ্গে লেখক, লিখনসামগ্রী, মুখস্থ পাঠ ও পরবর্তী সংগ্রহের সম্পর্ক। বর্তমান মুসহাফের পেছনে এই পার্থিব সংগ্রহ ও বিন্যাসের ধারাবাহিক কাজ রয়েছে।


সৃষ্টির আগে পূর্বলিখন ও নির্ধারিত ঘটনাক্রম

মুসলিম বিশ্বাসে কোরআন আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ আসমানি কিতাব। লাওহে মাহফুজে তার পূর্বলিখন এবং সৃষ্টির আগেই সমগ্র তাকদীর নির্ধারিত থাকার এই বিশ্বাসে কোরআনের সূরা, আয়াত, ভাষা, বাক্যগঠন ও আলোচিত চরিত্রগুলোও সেই পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত। মুহাম্মদের জন্ম, তাঁর মাধ্যমে কোরআন প্রচার এবং বিভিন্ন আয়াত অবতরণের উপলক্ষও তখন একই পরিকল্পনার অংশ। মানুষের কাছে পরে যে ঘটনার সূত্রে একটি বক্তব্য এসেছে, আসমানি পূর্বলিখনের এই বিশ্বাসে সেই ঘটনাও আগেই নির্ধারিত। উপযুক্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং পরিস্থিতির উত্তরে আয়াত ঘোষণা—উভয়ই আল্লাহর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। কোরআনের বুরুজ সূরায় লাওহে মাহফুজে কোরআনের অবস্থান সম্পর্কে বলা হয়েছে: [41]

بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَجِيدٌ ۝ فِي لَوْحٍ مَحْفُوظٍ

বাংলা অনুবাদ: বরং এটা মহান কোরআন, লওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ।

সৃষ্টির আগের লিখন সম্পর্কে তিরমিজির বর্ণনায় আরও নির্দিষ্ট বক্তব্য আছে। আতা ইবনে আবু রাবাহ উম্মুল কিতাবের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ফেরাউন ও আবু লাহাবের উল্লেখ করেছেন। পরে উবাদা ইবনে সামিতের সূত্রে কলম সৃষ্টি ও তাকদীর লেখার বক্তব্য এসেছে। [42] [43] [44] [45]

حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ مُوسَى، قال: حَدَّثَنَا أَبُو دَاوُدَ الطَّيَالِسِيُّ، قال: حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَاحِدِ بْنُ سُلَيْمٍ، قَالَ قَدِمْتُ مَكَّةَ فَلَقِيتُ عَطَاءَ بْنَ أَبِي رَبَاحٍ فَقُلْتُ لَهُ يَا أَبَا مُحَمَّدٍ إِنَّ أَهْلَ الْبَصْرَةِ يَقُولُونَ فِي الْقَدَرِ. قَالَ يَا بُنَىَّ أَتَقْرَأُ الْقُرْآنَ قُلْتُ نَعَمْ. قَالَ فَاقْرَإِ الزُّخْرُفَ. قَالَ فَقَرَأْتُ: {حم * وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ * إِنَّا جَعَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ * وَإِنَّهُ فِي أُمِّ الْكِتَابِ لَدَيْنَا لَعَلِيٌّ حَكِيمٌ} فَقَالَ أَتَدْرِي مَا أُمُّ الْكِتَابِ قُلْتُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ فَإِنَّهُ كِتَابٌ كَتَبَهُ اللَّهُ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَوَاتِ وَقَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ الأَرْضَ فِيهِ إِنَّ فِرْعَوْنَ مِنْ أَهْلِ النَّارِ وَفِيهِ: {تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ} قَالَ عَطَاءٌ فَلَقِيتُ الْوَلِيدَ بْنَ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ صَاحِبِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَسَأَلْتُهُ مَا كَانَ وَصِيَّةُ أَبِيكَ عِنْدَ الْمَوْتِ قَالَ دَعَانِي أَبِي فَقَالَ لِي يَا بُنَىَّ اتَّقِ اللَّهَ وَاعْلَمْ أَنَّكَ لَنْ تَتَّقِيَ اللَّهَ حَتَّى تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ كُلِّهِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ فَإِنْ مُتَّ عَلَى غَيْرِ هَذَا دَخَلْتَ النَّارَ إِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ: «إِنَّ أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ فَقَالَ اكْتُبْ. فَقَالَ مَا أَكْتُبُ قَالَ اكْتُبِ الْقَدَرَ مَا كَانَ وَمَا هُوَ كَائِنٌ إِلَى الأَبَدِ». قَالَ أَبُو عِيسَى وَهَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ مِنْ هَذَا الْوَجْهِ.

বাংলা অনুবাদ: সূনান তিরমিজী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৫/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই।
২১৫৮. ইয়াহইয়া ইবন মূসা (রহঃ) ….. আবদুল ওয়াহিদ ইবন সালিম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার মক্কায় এলাম। সেখানে আতা ইবন আবু রাবাহ (রহঃ) এর সঙ্গে দেখা করলাম। তাঁকে বললামঃ হে আবূ মুহাম্মদ, বাসরাবাসরীরা তো তাকদীরের অস্বীকৃতিমূলক কথা বলে। তিনি বললেনঃ প্রিয় বৎস, তুমি কি কুরআন তিলাওয়াত কর? আমি বললামঃ হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ সূরা আয-যুখরুখ তিলাওয়াত কর তো। আমি তিলাওয়াত করলামঃ
হা-মীম, কসম সুস্পষ্ট কিতাবের, আমি তা অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায় কুরআন রূপে, যাতে তোমরা বুঝতে পার। তা রয়েছে আমার কাছে উম্মূল কিতাবে, এ তো মহান, জ্ঞান গর্ভ (৪৩ঃ ১, ২, ৩, ৪)।
তিনি বললেনঃ উম্মূল কিতাব কি তা জান? আমি বললামঃ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ এ হল একটি মহাগ্রন্থ, আকাশ সৃষ্টিরও পূর্বে এবং যমীন সৃষ্টিরও পূর্বে আল্লাহ তাআলা তা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। এতে আছে ফির‘আওন জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত, এতে আছে তাব্বাত ইয়াদা আবী লাহাবীও ওয়া তাব্বা ‏(‏تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ‏) আবূ লাহাবের দুটি হাত ধ্বংস হয়েছে আর ধ্বংস হয়েছে সে নিজেও।
আতা (রহঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্যতম সাহাবী উবাদা ইবন সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পুত্র ওয়ালীদ (রহঃ)-এর সঙ্গে আমি সাক্ষাত করেছিলাম। তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলামঃ মৃত্যুর সময় তোমার পিতা কি ওয়াসীয়ত করেছিলেন?
তিনি বললেনঃ তিনি আমাকে কাছে ডাকলেন। বললেনঃ হে প্রিয় বৎস, আল্লাহকে ভয় করবে। যেনে রাখবে যতক্ষণ না আল্লাহর উপর ঈমান আনবে এবং তাকদীরের সব কিছুর ভাল-মন্দের উপর ঈমান আনবে ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি কখনো আল্লাহর ভয় অর্জন করতে পারবে না। তা ছাড়া অন্য কোন অবস্থায় যদি তোমার মৃত্যু হয় তবে জাহান্নামে দাখেল হতে হবে। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ আল্লাহ তাআলা সর্ব প্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। এরপর একে নির্দেশ দিলেন, লিখ, সে বললঃ কি লিখব? তিনি বললেনঃ যা হয়েছে এবং অনন্ত কাল পর্যন্ত যা হবে সব তাকদীর লিখ। সহীহ, সহিহহ ১৩৩, তাখরিজুত তহাবিয়া ২৩২, মিশকাত ৯৪, আযযিলাল ১০২, ১০৫, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ২১৫৫ (আল মাদানী প্রকাশনী)
(আবু ঈসা বলেন) এ হাদীসটি এ সূত্রে গারীব।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

তাকদীর বিষয়ক হাদিস তিরমীজী শরিফ
আবু লাহাবের তাকদীর পুর্ব নির্ধারিত

আতার ব্যাখ্যায় ভবিষ্যতের ব্যক্তির নাম ও পরিণতি সৃষ্টির আগের গ্রন্থে নির্ধারিত রয়েছে। উবাদার বর্ণনায় ভালো-মন্দসহ সমগ্র তাকদীরে বিশ্বাসকে ঈমানের শর্ত করা হয়েছে। এই কাঠামোয় মুহাম্মদের বিরোধিতা, বিরোধীর বিরুদ্ধে আয়াত ঘোষণা এবং সেই আয়াতের ঘটনাপট—সবই পূর্বনির্ধারিত ধারার অংশ। আবু লাহাবের বিরুদ্ধে ঘোষণার ঘটনা ঘটার আগেই ঘোষণাটি লিখিত থাকলে তার বিরোধিতা আল্লাহর পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করার স্বাধীন ঘটনা হয় না; পরিকল্পনা বাস্তবায়নেরই উপাদান হয়ে দাঁড়ায়। আগে থেকে নির্ধারিত আচরণের জন্য মানুষকে শাস্তি দেওয়ার ন্যায়সংগততা তখন সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

পূর্বলিখিত পূর্ণ পাঠের ধারণা আয়াতের পরবর্তী সংশোধন নিয়েও একই প্রশ্ন তোলে। কোন বাক্য আগে ঘোষিত হবে, পরে কোন ব্যতিক্রম যোগ হবে, কোন বিধান বদলাবে এবং কোন পাঠ আর রাখা হবে না—সবই যদি শুরুতে নির্ধারিত থাকে, মানুষের কাছে পৌঁছানো প্রতিটি পর্যায়ের অবস্থান সেই পরিকল্পনায় থাকার কথা। প্রথম ঘোষণার পরে মানুষের প্রশ্ন বা আপত্তির প্রয়োজনটিও তখন পূর্বপরিকল্পিত। আল্লাহর আগে থেকে জানা ও মানুষের কাছে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভাষ্য পৌঁছানো এক বিষয় নয়: পূর্বজ্ঞান থাকলেও ঘোষিত পাঠের পরিবর্তন বাস্তব পরিবর্তনই থাকে।


মক্কা ও মদিনার লেখক এবং বিচ্ছিন্ন লিখিত উপকরণ

পৃথিবীতে কোরআন পৌঁছানোর বর্ণনায় মুহাম্মদ প্রথমে আয়াত উচ্চারণ করেন, অনুসারীরা শোনেন, মুখস্থ করেন এবং তাঁদের মধ্যে লেখাপড়া জানা ব্যক্তিরা লিখে রাখেন। জিবরাইলের মাধ্যমে বাণী পৌঁছানোর প্রচলিত বিবরণের পাশাপাশি স্বপ্ন, শব্দ শোনা ও অন্যভাবে নির্দেশ পাওয়ার বিবরণও আছে। এসব বর্ণনায় কখনো কোরআনের আয়াত, কখনো অন্যান্য নির্দেশ বা সংবাদ এসেছে। মানুষের হাতে লিখিত পাঠ তৈরি হওয়ার ঘটনাটি শ্রবণ, বোঝা ও লিপিবদ্ধ করার এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ঘটে।

ইবনে হাজার ফাতহুল বারিতে ওহি লেখকদের পরিচয় দিতে গিয়ে মক্কা ও মদিনার প্রথমত্ব পৃথক করেছেন। তাঁর বিবরণে মক্কায় কুরাইশদের মধ্যে প্রথম লেখক আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ; মদিনায় উবাই ইবনে কাব জায়েদ ইবনে সাবিতের আগে লেখার দায়িত্ব পালন করেন। লেখকদের এই তালিকায় তাই জায়েদের আগের লিখনপর্ব এবং পরে ধর্মত্যাগী হয়ে যাওয়া আবদুল্লাহর ভূমিকাও সংরক্ষিত রয়েছে। [46]

وَقَدْ كَتَبَ لَهُ قَبْلَ زَيْدِ بْنِ ثَابِتٍ أُبَيُّ بْنُ كَعْبٍ وَهُوَ أَوَّلُ مَنْ كَتَبَ لَهُ بِالْمَدِينَةِ، وَأَوَّلُ مَنْ كَتَبَ لَهُ بِمَكَّةَ مِنْ قُرَيْشٍ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ سَعْدِ بْنِ أَبِي سَرْحٍ ثُمَّ ارْتَدَّ ثُمَّ عَادَ إِلَى الْإِسْلَامِ يَوْمَ الْفَتْحِ.

বাংলা অনুবাদ: জায়েদ ইবনে সাবিতের আগে তাঁর জন্য লিখেছিলেন উবাই ইবনে কাব; মদিনায় তিনিই প্রথম তাঁর জন্য লিখেছিলেন। মক্কায় কুরাইশদের মধ্যে প্রথম তাঁর জন্য লিখেছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ। পরে তিনি ধর্মত্যাগ করেন এবং মক্কা বিজয়ের দিন আবার ইসলাম গ্রহণ করেন।

ইবনে হাজারের এই বিবরণে লেখকের প্রথমত্ব অঞ্চলভিত্তিক। প্রথম লিখিত আয়াতের নির্দিষ্ট দিন, সেই পাতার পরিচয় বা তার ধারাবাহিক সংরক্ষণের বিবরণ তিনি দেননি। তাঁর দেওয়া ক্রমে মক্কার লেখক, মদিনার প্রথম লেখক ও পরবর্তী সংগ্রাহকের ভূমিকা পৃথক ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত। আয়াত প্রথম লিপিবদ্ধ হওয়ার পরবর্তী ইতিহাসেও সেই বিচ্ছিন্ন লেখাগুলো জোগাড় করে নতুন সংগ্রহ তৈরির প্রয়োজন হয়েছে। লিখন এবং পরে সংগৃহীত গ্রন্থের মধ্যবর্তী কাজগুলো মানুষের হাতেই সম্পন্ন হয়েছে।

জায়েদের নামে তিরমিজিতে সংরক্ষিত আরেক বিবরণে মুহাম্মদের উপস্থিতিতে লিখিত খণ্ড থেকে কোরআন সাজানোর উল্লেখ আছে। এখানে ব্যবহৃত শব্দ “রিকাআ”—বিচ্ছিন্ন লিখনখণ্ড। মুহাম্মদের জীবদ্দশায় লিখিত উপকরণ নিয়ে কাজ করার বর্ণনাটি হলো: [47]

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، قَالَ حَدَّثَنَا وَهْبُ بْنُ جَرِيرٍ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبِي قَالَ، سَمِعْتُ يَحْيَى بْنَ أَيُّوبَ، يُحَدِّثُ عَنْ يَزِيدَ بْنِ أَبِي حَبِيبٍ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ شُمَاسَةَ، عَنْ زَيْدِ بْنِ ثَابِتٍ، قَالَ كُنَّا عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم نُؤَلِّفُ الْقُرْآنَ مِنَ الرِّقَاعِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «طُوبَى لِلشَّأْمِ». فَقُلْنَا لأَىٍّ ذَلِكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ «لأَنَّ مَلاَئِكَةَ الرَّحْمَنِ بَاسِطَةٌ أَجْنِحَتَهَا عَلَيْهَا». هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ إِنَّمَا نَعْرِفُهُ مِنْ حَدِيثِ يَحْيَى بْنِ أَيُّوبَ.

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদ ইবনে বাশশার, ওয়াহব ইবনে জারির, তাঁর পিতা, ইয়াহইয়া ইবনে আইয়ুব, ইয়াজিদ ইবনে আবি হাবিব ও আবদুর রহমান ইবনে শুমাসার সূত্রে জায়েদ ইবনে সাবিত বর্ণনা করেন: আমরা রাসুলুল্লাহর কাছে লিখিত খণ্ড থেকে কোরআন সাজাচ্ছিলাম। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, শামের জন্য সুসংবাদ। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কেন এমন, হে আল্লাহর রাসুল? তিনি বললেন, কারণ রহমানের ফেরেশতারা তার ওপর তাঁদের ডানা মেলে রেখেছেন। এটি হাসান গারিব হাদিস; ইয়াহইয়া ইবনে আইয়ুবের বর্ণনা ছাড়া আমরা এটি জানি না।

জায়েদের লিখিত খণ্ড থেকে কোরআন সাজানোর কথার ব্যাখ্যায় বায়হাকি বিচ্ছিন্ন আয়াতগুলো সংশ্লিষ্ট সূরায় বসানোর কথা বলেছেন। সুয়ূতি এই ব্যাখ্যাও উদ্ধৃত করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় মুহাম্মদের নির্দেশে তখনই আয়াতের অবস্থান নির্ধারণের কাজ চলছিল। ফলে লিখিত খণ্ড প্রস্তুত করা এবং সেই খণ্ডের বক্তব্য নির্দিষ্ট সূরার অন্তর্ভুক্ত করা—দুই ধরনের কাজ এই বিবরণে পাওয়া যায়। [48]

قَالَ الْبَيْهَقِيُّ: يُشَبَّهُ أَنْ يَكُونَ أن الْمُرَادُ بِهِ تَأْلِيفُ مَا نَزَلَ مِنَ الْآيَاتِ المتفرقة فِي سُوَرِهَا وَجَمْعُهَا فِيهَا بِإِشَارَةِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.

বাংলা অনুবাদ: বায়হাকি বলেছেন: সম্ভবত এর উদ্দেশ্য হলো বিচ্ছিন্নভাবে নাজিল হওয়া আয়াতগুলো তাদের সূরার মধ্যে সাজানো এবং নবীর নির্দেশে সেগুলো সেখানে একত্র করা।

বুখারিতে সংরক্ষিত সংগ্রহের বিবরণে এই লিখনখণ্ডের সঙ্গে কাঁধের হাড় ও খেজুরের ডালের উল্লেখ আছে। একই সংগ্রহের আরেক পাঠে পাতলা পাথরের নামও এসেছে। মানুষের মুখস্থ পাঠ এবং নানা উপকরণে লেখা অংশ—দুই উৎস মিলিয়ে সংগ্রহের কাজ হয়েছে। উপকরণগুলোর উল্লেখসহ জায়েদের বক্তব্যের সংশ্লিষ্ট অংশ: [49] [50]

فَقُمْتُ فَتَتَبَّعْتُ الْقُرْآنَ أَجْمَعُهُ مِنَ الرِّقَاعِ وَالأَكْتَافِ وَالْعُسُبِ وَصُدُورِ الرِّجَالِ.

বাংলা অনুবাদ: তখন আমি কাজে নেমে কোরআন খুঁজে সংগ্রহ করতে লাগলাম—লিখিত খণ্ড, কাঁধের হাড়, খেজুরের ডাল এবং মানুষের অন্তরে সংরক্ষিত পাঠ থেকে।

ইসলামকিউএর ব্যাখ্যায় “উসুব” বলতে খেজুরের ডাল বোঝানো হয়েছে, যার পাতা সরিয়ে চওড়া অংশে লেখা হতো। “লিখাফ” ছিল পাতলা পাথর। অন্য উত্তরে “রিকাআ” কাগজ বা চামড়ার খণ্ড এবং “আকতাফ” ভেড়া বা উটের কাঁধের হাড় হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। [51] [52]

العُسُب: جريد النخل، كانوا يكشطون الخوص ويكتبون في الطرف العريض. واللخاف: الحجارة الرقاق.

বাংলা অনুবাদ: উসুব: খেজুরের ডাল; তাঁরা পাতা ঘষে সরিয়ে চওড়া অংশে লিখতেন। লিখাফ: পাতলা পাথর।

বর্ণনায় ব্যবহৃত নামলিখনসামগ্রীসূত্রে উল্লিখিত ব্যবহার
রিকাআকাগজ বা চামড়ার বিচ্ছিন্ন খণ্ডমুহাম্মদের উপস্থিতিতে সাজানো ও পরবর্তী সংগ্রহ
আকতাফপশুর কাঁধের হাড়জায়েদের অনুসন্ধানে সংগৃহীত লিখিত অংশ
উসুবখেজুরের ডালের চওড়া অংশআয়াত লেখা এবং পরে সংগ্রহ
লিখাফপাতলা পাথরআবু বকরের আমলের সংগ্রহে উল্লিখিত উপকরণ

এই উপকরণের বিবরণে একাধিক ব্যক্তির হাতে ছড়িয়ে থাকা লিখিত অংশ এবং স্মৃতিনির্ভর পাঠ মিলিয়ে কাজ করার চিত্র পাওয়া যায়। সংকলনের জন্য অংশগুলো জোগাড়, পাঠ শনাক্ত এবং নির্দিষ্ট স্থানে বসানোর প্রয়োজন ছিল। পূর্ববর্তী লেখক কী লিখেছিলেন এবং পরবর্তী সংগ্রাহক কী গ্রহণ করলেন—এই দুই কাজের মধ্যে মানুষের যাচাই ও সিদ্ধান্তের পর্যায় রয়েছে। বিচ্ছিন্ন লিখনখণ্ড থেকে একত্রিত গ্রন্থ এবং পরে সকলের জন্য অনুমোদিত মুসহাফ তৈরি হওয়ার সঙ্গে সংগ্রাহক ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত যুক্ত হয়েছে।


বিচ্ছিন্ন লিখন, সংকলন ও অনুমোদিত মুসহাফ

সুয়ূতির আল-ইতকানে মুহাম্মদের সময়ে কোরআন লিখিত থাকার সঙ্গে একত্র গ্রন্থে সংগৃহীত থাকার পার্থক্য সরাসরি সংরক্ষিত আছে। বিবরণটি অনুযায়ী কোরআনের সবটাই লেখা হয়েছিল, কিন্তু এক জায়গায় সংগৃহীত ছিল না এবং সূরাগুলোও ক্রমে সাজানো ছিল না। পৃথক উপকরণে লেখার পরে সেগুলো একত্র করা ও গ্রন্থের বিন্যাস নির্ধারণের কাজ বাকি ছিল। [53]

وَقَدْ كَانَ الْقُرْآنُ كُتِبَ كُلُّهُ فِي عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَكِنْ غَيْرُ مَجْمُوعٍ فِي مَوْضِعٍ وَاحِدٍ ولا مرتب السور.

বাংলা অনুবাদ: রাসুলের সময়ে কোরআনের সবটাই লেখা হয়েছিল; কিন্তু এক স্থানে একত্র করা ছিল না এবং সূরাগুলোও ক্রমানুসারে বিন্যস্ত ছিল না।

কেন মুহাম্মদের জীবদ্দশায় এক মুসহাফে সংগ্রহ করা হয়নি, তার ব্যাখ্যায় খাত্তাবি বিধান বা পাঠ রহিত হওয়ার অপেক্ষার কথা বলেছেন। সুয়ূতি এই ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করেছেন। এখানে কোরআনের পাঠের কিছু অংশ পরে প্রত্যাহার হওয়ার সম্ভাবনাকেও সংকলন স্থগিত থাকার কারণ হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে। [54]

قَالَ الْخَطَّابِيُّ: إِنَّمَا لَمْ يُجْمَعِ الْقُرْآنُ فِي الْمُصْحَفِ لِمَا كَانَ يَتَرَقَّبُهُ مِنْ وُرُودِ نَاسِخٍ لِبَعْضِ أَحْكَامِهِ أَوْ تِلَاوَتِهِ فَلَمَّا انْقَضَى نُزُولُهُ بِوَفَاتِهِ أَلْهَمَ اللَّهُ الْخُلَفَاءَ الرَّاشِدِينَ ذَلِكَ وَفَاءً بِوَعْدِهِ الصَّادِقِ بِضَمَانِ حِفْظِهِ عَلَى هَذِهِ الْأُمَّةِ فَكَانَ ابْتِدَاءُ ذَلِكَ عَلَى يَدِ الصِّدِّيقِ بِمَشُورَةِ عُمَرَ.

বাংলা অনুবাদ: খাত্তাবি বলেছেন: কোরআন মুসহাফে একত্র করা হয়নি, কারণ তার কিছু বিধান বা তিলাওয়াত রহিতকারী নির্দেশ আসার অপেক্ষা ছিল। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে অবতরণ শেষ হলে এই উম্মতের জন্য কোরআন সংরক্ষণের সত্য প্রতিশ্রুতি পূরণে আল্লাহ খোলাফায়ে রাশেদিনকে এ কাজের প্রেরণা দেন। উমরের পরামর্শে সিদ্দিকের হাতে এর সূচনা হয়।

এই ব্যাখ্যায় মুহাম্মদের জীবদ্দশার পাঠকে আরও নির্দেশের মাধ্যমে বদলানোর অবকাশ ছিল। বিধান রহিত হলে আগের নির্দেশের প্রয়োগ বদলায়; তিলাওয়াত রহিত হলে আগে কোরআন হিসেবে পঠিত বক্তব্যই চূড়ান্ত পঠিত সংগ্রহের বাইরে যায়। ফলে প্রথমে ঘোষিত সমস্ত বক্তব্য এবং মৃত্যুর পরে সংগৃহীত পঠিত কোরআনকে একই পাঠসমষ্টি বলা যায় না। কোন বক্তব্য বহাল থাকবে, কোনটি রহিত হিসেবে বাদ যাবে এবং কোন বিন্যাসে রাখা হবে—চূড়ান্ত সংগ্রহের সঙ্গে এসব নির্ধারণ যুক্ত হয়েছে।

ইসলামকিউএর সংগ্রহের ধাপসংক্রান্ত আলোচনাতেও এক পরিচিত বিন্যাসে মুসহাফ তৈরি মুহাম্মদের মৃত্যুর পরে আবু বকরের আমলে হওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই শব্দ “সংগ্রহ” কখনো মুখস্থ রাখা, কখনো বিচ্ছিন্ন লেখা জড়ো করা, কখনো এক মুসহাফকে সর্বজনীন মান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা বোঝাচ্ছে। [55]

وهذا هو الذي تأخر إلى خلافة الصديق رضي الله عنه، بعد وفاة النبي صلى الله عليه وسلم.

বাংলা অনুবাদ: এই কাজটিই নবীর মৃত্যুর পরে সিদ্দিকের খিলাফত পর্যন্ত পিছিয়ে ছিল।

প্রথম উচ্চারণ, বিচ্ছিন্ন উপকরণে লিখন, ছড়িয়ে থাকা লেখা সংগ্রহ এবং নির্দিষ্ট বিন্যাসে অনুমোদিত কপি তৈরি—এগুলো পৃথক কাজ। আবু বকর ও উসমানের উদ্যোগের মধ্যে তাই নতুন সিদ্ধান্তের প্রশ্ন রয়েছে: কোন অংশ গ্রহণ করা হবে, কোন সাক্ষ্য যথেষ্ট হবে, কীভাবে সাজানো হবে এবং কোন কপি অন্য পাঠের ওপর কর্তৃত্ব পাবে? আসমানি পূর্বলিখনের বিশ্বাস দিয়ে পার্থিব সংগ্রাহকের এসব সিদ্ধান্তের নথি প্রতিস্থাপন করা যায় না। মানুষের কাছে প্রচলিত মুসহাফের ইতিহাসে মানবীয় সংগ্রহ, বিন্যাস ও অনুমোদন নির্ধারক ভূমিকা নিয়েছে।

লিখন বা সংরক্ষণের স্তরবিবরণে পাওয়া রূপসংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক প্রশ্ন
লাওহে মাহফুজে পূর্বলিখনের বিশ্বাসধর্মীয় দাবিতে বাণীর আসমানি অবস্থানপৃথিবীর লেখক, লিখনের সময় ও ব্যবহৃত উপকরণের পরিচয়
মুহাম্মদের জীবদ্দশার বিচ্ছিন্ন লিখনএকাধিক উপকরণে বিভিন্ন অংশ লেখাসকল অংশের একই বাঁধাই, সম্পূর্ণতা ও সূরাক্রম
আবু বকরের সময়ের সংগ্রহবিচ্ছিন্ন উপকরণ জড়ো করে একত্রিত করার উদ্যোগগ্রহণের সাক্ষ্য এবং পরবর্তী রাষ্ট্রীয় কপির সিদ্ধান্তের যথার্থতা
উসমানের অনুমোদিত মুসহাফনির্দিষ্ট লিখিত মানকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিঅনুমোদিত কপির সঙ্গে ধ্বংস করা কপিগুলোর প্রতিটি পাঠের সম্পর্ক

ওহি পাওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি

ওহি বলতে আল্লাহর কাছ থেকে নবী বা রাসুলের কাছে বার্তা কিংবা নির্দেশ আসাকে বোঝানো হয়। ইসলামি বর্ণনায় স্বপ্ন, অন্তরে বক্তব্য সঞ্চার, ফেরেশতার মাধ্যমে বার্তা এবং সরাসরি সম্বোধনসহ একাধিক পদ্ধতি রয়েছে। কোরআনের আয়াত এবং কোরআনের বাইরে থাকা ধর্মীয় নির্দেশ—উভয় ক্ষেত্রেই ওহির পরিচয় ব্যবহৃত হয়েছে।

ওহি শব্দটি কোরআনের আয়াতের পাশাপাশি অন্যান্য ঐশী নির্দেশের বর্ণনাতেও ব্যবহৃত হয়েছে। সুয়ূতি, যুহরির একটি বর্ণনায় ওহির এমন ধরনও উল্লেখ করেছেন যা মুখে পাঠ করে লিখিয়ে দেয়া হয় না; বরং মানুষের কাছে নির্দেশ হিসেবে জানানো হয়। ওহির বিবরণে কোরআনের আয়াতের পাশাপাশি অন্য বার্তা ও নির্দেশও রয়েছে। [56]

وَمِنْهُ مَا لَا يَتَكَلَّمُ بِهِ وَلَا يَكْتُبُهُ لْأَحَدٍ وَلَا يَأْمُرُ بِكِتَابَتِهِ وَلَكِنَّهُ يُحَدِّثُ بِهِ النَّاسَ حَدِيثًا وَيُبَيِّنُ لَهُمْ أَنَّ اللَّهَ أَمَرَهُ أَنْ يُبَيِّنَهُ لِلنَّاسِ ويبلغهم إياه.

বাংলা অনুবাদ: এর মধ্যে এমনও আছে যা তিনি পাঠ করেন না, কারও জন্য লেখেন না এবং লিখতেও আদেশ করেন না; বরং মানুষের কাছে তা বর্ণনা করেন এবং বুঝিয়ে দেন যে আল্লাহ তাঁকে তা মানুষের কাছে ব্যাখ্যা ও পৌঁছে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।

স্বপ্ন, অন্তরের অনুভূতি বা ফেরেশতার সংবাদকে ওহির মর্যাদা দেয়া হয়েছে; নির্দিষ্ট আরবি পাঠকে কোরআনের আয়াত হিসেবে চিহ্নিত করে প্রচার ও লিখনের পরে মুসহাফে স্থান দেওয়া হয়েছে সংকলনের প্রক্রিয়ায়। বার্তা পাওয়ার দাবির পর সেই বার্তার নির্দিষ্ট শব্দ মনে রাখা, লেখা, অন্যকে শেখানো এবং সংকলনে গ্রহণ করার প্রতিটি পর্যায়ে মানুষের ভূমিকা রয়েছে। কোন শব্দগুলো কোরআন হিসেবে বহাল হলো এবং কোনগুলো অন্য ধরনের ধর্মীয় বার্তা হিসেবে রয়ে গেল, তা সংগ্রহ ও গ্রহণের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। ওহির ঐশী পরিচয়ের দাবির পাশাপাশি তার লিখিত পরিসর নির্ধারণে মানুষের এই কর্তৃত্বও কাজ করেছে।

বর্ণিত মাধ্যমঅভিজ্ঞতার ধরনসংকলন-সম্পর্কিত প্রশ্ন
ঘণ্টাধ্বনির মতো শব্দমুহাম্মদের বর্ণিত শ্রবণ-অভিজ্ঞতাশোনা শব্দ কখন নির্দিষ্ট আয়াত হিসেবে চিহ্নিত হলো?
মানবরূপে ফেরেশতাদেখা ও কথোপকথনের দাবিসামনে থাকা মানুষকে ফেরেশতা বলে শনাক্ত করলেন কে?
অন্তরে ঢেলে দেয়াদেখা বা শোনা ছাড়াই অন্তর্গত বার্তাঅন্তরের বিষয় অন্যরা কীভাবে জানল?
পর্দার আড়াল থেকে কথাকথিত সরাসরি সম্বোধনকথোপকথনের কোন অংশ কোরআন হিসেবে প্রচারিত হলো?
স্বপ্ননিদ্রার অভিজ্ঞতাস্বপ্নের কোন বিষয় আয়াত, আর কোনটি অন্য নির্দেশ?
অন্য ফেরেশতার আগমনবার্তা বা সুসংবাদ আনার বর্ণনাবার্তাটিতে কোরআন নাজিলের কথা আছে, নাকি অন্য সংবাদ?

ঘণ্টাধ্বনির মতো শব্দ

হারিস ইবনে হিশাম মুহাম্মদকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাঁর কাছে ওহি কীভাবে আসে। উত্তরে ঘণ্টাধ্বনির মতো শব্দ এবং মানুষের রূপে ফেরেশতার কথোপকথন—দুটি পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। প্রথমটিকে মুহাম্মদ নিজের জন্য সবচেয়ে কষ্টকর বলেছেন। আয়েশা এর সঙ্গে প্রচণ্ড শীতেও তাঁর ঘাম ঝরার বর্ণনা যুক্ত করেছেন। [57] [58] [59]

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ أُمِّ الْمُؤْمِنِينَ ـ رضى الله عنها ـ أَنَّ الْحَارِثَ بْنَ هِشَامٍ ـ رضى الله عنه ـ سَأَلَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ يَأْتِيكَ الْوَحْىُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «أَحْيَانًا يَأْتِينِي مِثْلَ صَلْصَلَةِ الْجَرَسِ ـ وَهُوَ أَشَدُّهُ عَلَىَّ ـ فَيُفْصَمُ عَنِّي وَقَدْ وَعَيْتُ عَنْهُ مَا قَالَ، وَأَحْيَانًا يَتَمَثَّلُ لِيَ الْمَلَكُ رَجُلاً فَيُكَلِّمُنِي فَأَعِي مَا يَقُولُ». قَالَتْ عَائِشَةُ رضى الله عنها وَلَقَدْ رَأَيْتُهُ يَنْزِلُ عَلَيْهِ الْوَحْىُ فِي الْيَوْمِ الشَّدِيدِ الْبَرْدِ، فَيَفْصِمُ عَنْهُ وَإِنَّ جَبِينَهُ لَيَتَفَصَّدُ عَرَقًا.

বাংলা অনুবাদ: সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ ওহীর সূচনা
পরিচ্ছেদঃ ১/ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর প্রতি কিভাবে ওহী শুরু হয়েছিল
২। আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হারিস ইবনু হিশাম (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনার প্রতি ওহী কিভাবে আসে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কোন সময় তা ঘন্টাধ্বনির ন্যায় আমার নিকট আসে। আর এটি-ই আমার উপর সবচাইতে কষ্টদায়ক হয় এবং তা সমাপ্ত হতেই ফিরিশতা যা বলেন আমি তা মুখস্থ করে নিই, আবার কখনো ফিরিশতা মানুষের আকৃতিতে আমার সঙ্গে কথা বলেন। তিনি যা বলেন আমি তা মুখস্থ করে ফেলি। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি প্রচন্ড শীতের দিনে ওহী নাযিলরত অবস্থায় তাঁকে দেখেছি। ওহী শেষ হলেই তাঁর কপাল থেকে ঘাম ঝরে পড়ত।
তাহক্বীক: মারফু হাদিস।
তাখরীজ: ( বুখারীঃ তা.পা ২, ৩২১৫; তিরমিযীঃ ৩৯৯৪; নাসাঈঃ ৯৪২; আহমাদঃ ২৬৯৫২; মুয়াত্তাঃ ৪৭৯। মুসলিম ৪৩/২৩, হা: ২৩৩৩ , আহমাদ ২৫৩০৭ ( আধুনিক প্রকাশনী. ২ , ই.ফা. ২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

ফেরেশতা মানুষের আকৃতিতে আসতো

ঠিক একইসাথে, মুহাম্মদ এটিও বলেছেন যে, ঘণ্টা হচ্ছে শয়তানের বাঁশি। [60] [61]

وَحَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ أَيُّوبَ، وَقُتَيْبَةُ وَابْنُ حُجْرٍ قَالُوا حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ – يَعْنُونَ ابْنَ جَعْفَرٍ – عَنِ الْعَلاَءِ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ «الْجَرَسُ مَزَامِيرُ الشَّيْطَانِ».

বাংলা অনুবাদ: সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৮/ পোশাক ও সাজসজ্জা
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ২২. সফরে কুকুর ও ঘণ্টা রাখা মাকরূহ
৫৩৬৬। ইয়াহইয়া ইবনু আইয়ুব, কুতায়বা ও ইবনু হুজর (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঘন্টা শয়তানের বাঁশি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

ঘণ্টা শয়তানের বাঁশি

ওহির শব্দকে ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে তুলনা করা এবং ঘণ্টাকে শয়তানের বাদ্য বলা—দুটি বক্তব্যই মুহাম্মদের নামে বর্ণিত। একই পরিচিত শব্দের উপমা এক ক্ষেত্রে ওহির অভিজ্ঞতা বোঝায়, আরেক ক্ষেত্রে শয়তানের সঙ্গে যুক্ত হয়। ঘণ্টার নিন্দা তাঁর আরেক নির্দেশেও পাওয়া যায়: ঘণ্টা বা কুকুর সঙ্গে থাকা সফরসঙ্গীদের সঙ্গে ফেরেশতারা থাকেন না। [62]

حَدَّثَنَا أَبُو كَامِلٍ، فُضَيْلُ بْنُ حُسَيْنٍ الْجَحْدَرِيُّ حَدَّثَنَا بِشْرٌ – يَعْنِي ابْنَ مُفَضَّلٍ – حَدَّثَنَا سُهَيْلٌ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ «لاَ تَصْحَبُ الْمَلاَئِكَةُ رُفْقَةً فِيهَا كَلْبٌ وَلاَ جَرَسٌ».

বাংলা অনুবাদ: আবু কামিল ফুদাইল ইবনে হুসাইন আল-জাহদারি, বিশর ইবনে মুফাদ্দাল, সুহাইল ও তাঁর পিতার সূত্রে আবু হুরায়রা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ বলেছেন: যে সফরসঙ্গীদের মধ্যে কুকুর বা ঘণ্টা থাকে, ফেরেশতারা তাদের সঙ্গী হন না।

ঘণ্টার প্রতি এই বিরূপ বিধান এবং ওহির সঙ্গে তার শ্রবণগত তুলনা একই ধর্মীয় বর্ণনাসমষ্টির মধ্যে রয়েছে। ঘণ্টাধ্বনির মতো শব্দ থেকে বক্তব্য বোঝার প্রক্রিয়া নিয়েও ভাষ্যকারদের আলোচনা আছে। ইসলামকিউএ-তে উদ্ধৃত খাত্তাবির ব্যাখ্যায়, শব্দটি প্রথম শুনেই স্পষ্ট বোঝা যেত না; পরে বুঝে ও নিশ্চিত হয়ে তিনি তা ধারণ করতেন। [63]

يريد – والله أعلم – أنه صوت متدارِك يسمعه ولا يثبته عند أول ما يقرع سمعه حتى يتفهم ، ويستثبت ، فيتلقفه حينئذٍ ويعيه

বাংলা অনুবাদ: এর অর্থ—আল্লাহই ভালো জানেন—এটি এমন এক ধারাবাহিক শব্দ, যা তিনি শুনতেন; প্রথম কানে পৌঁছানোর মুহূর্তেই তা স্থিরভাবে ধারণ করতে পারতেন না। পরে বুঝতেন ও নিশ্চিত হতেন; তখন তা গ্রহণ ও মনে রাখতেন।

আবুল আব্বাস কুরতুবির ব্যাখ্যাতেও এই অবস্থায় বক্তব্য বোঝা ও মনে রাখার চেষ্টার উল্লেখ আছে। তাঁর ভাষায়, বিরক্তিকর ধারাবাহিক শব্দের মধ্যেই মুহাম্মদ তা বুঝতে ও সংরক্ষণ করতে চাইতেন; সঙ্গে মুখের রং বদলানো, ঘাম এবং জ্বরগ্রস্তের মতো অবস্থা দেখা দিত। [64]

وكان يشتد عليه أيضاً ؛ لأنه كان يريد أن يحفظه ويفهمه مع كونه صوتا متتابعا مزعجاً ، ولذلك كان يتغير لونه ، ويتفصد عرقه ، ويعتريه مثل حال المحموم

বাংলা অনুবাদ: তাঁর কষ্ট আরও বাড়ত, কারণ ধারাবাহিক বিরক্তিকর শব্দ হওয়া সত্ত্বেও তিনি তা মনে রাখতে ও বুঝতে চাইতেন। এ জন্য তাঁর মুখের রং বদলে যেত, ঘাম ঝরত এবং জ্বরগ্রস্ত ব্যক্তির মতো অবস্থা হতো।

ফলে অভিজ্ঞতার বর্ণনাটিতে শুধু শব্দের উপস্থিতি নয়, বোঝা ও মনে রাখার পর্যায়ও রয়েছে। অন্য কেউ কষ্ট, ঘাম বা শারীরিক ভার দেখলেও সেই বাহ্যিক লক্ষণ থেকে উচ্চারিত নির্দিষ্ট বাক্য বা শব্দের উৎস স্বাধীনভাবে শনাক্ত করতে পারে না। শব্দটি ঐশী, কোন ফেরেশতার এবং কোন বাক্যটি তার অর্থ—এই পরিচয়গুলো শেষ পর্যন্ত মুহাম্মদের নিজের বক্তব্যের মাধ্যমে অন্যরা জানতে পারছে।

ঘণ্টাকে শয়তানের বাদ্য বলা এবং ওহির শব্দকে ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে তুলনা করা পাশাপাশি রাখলে ব্যবহৃত চিত্রকল্পের অস্বস্তিকর দ্বৈততা ধরা পড়ে। একই ঘণ্টাধ্বনির শ্রবণ-চিত্র এক ক্ষেত্রে শয়তানের সঙ্গে যুক্ত ও নিন্দিত, আরেক ক্ষেত্রে ঐশী দাবির অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণিত। একই ধরনের ধ্বনির জন্য বিপরীত ধর্মীয় পরিচয় দেয়া হয়েছে। কেবল অভিজ্ঞতার তীব্রতা কোনো অতিপ্রাকৃত পরিচয়ের প্রমাণ নয়।


মানুষের রূপে ফেরেশতার আগমন

মুহাম্মদের বক্তব্য অনুযায়ী, ফেরেশতা কখনো মানুষের আকৃতি নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন এবং তিনি তা মনে রাখতেন। সুয়ূতি বুখারির এই বক্তব্যের পাশাপাশি আবু আওয়ানার বর্ণনার অতিরিক্ত বাক্যও উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে এই পদ্ধতিকে সবচেয়ে সহজ বলা হয়েছে। [65]

الثَّالِثَةُ: أَنْ يَأْتِيَهُ فِي صُورَةِ الرَّجُلِ فَيُكَلِّمَهُ كَمَا فِي الصَّحِيحِ: «وَأَحْيَانًا يَتَمَثَّلُ لِيَ الْمَلَكُ رَجُلًا فَيُكَلِّمُنِي فَأَعِي مَا يَقُولُ»، زَادَ أَبُو عَوَانَةَ فِي صَحِيحِهِ: «وَهُوَ أَهْوَنُهُ عَلَيَّ».

বাংলা অনুবাদ: তৃতীয় পদ্ধতি: তিনি মানুষের রূপে এসে তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন। সহিহ বর্ণনায় আছে: কখনো ফেরেশতা আমার জন্য একজন মানুষের আকৃতি ধারণ করে আমার সঙ্গে কথা বলেন; তিনি যা বলেন আমি তা মনে রাখি। আবু আওয়ানা তাঁর সহিহতে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন: আর এটিই আমার জন্য সবচেয়ে সহজ।

দিহইয়া আল-কালবির আকৃতিতে জিবরাইল আসার কথা বলা হয়েছে। আইনি এর ব্যাখ্যায় দিহইয়ার সৌন্দর্যকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন: তাঁর ভাষায়, দিহইয়া নিজের সময়ের সবচেয়ে সুদর্শন ব্যক্তি ছিলেন এবং নারীরা আকৃষ্ট হতে পারেন—এই আশঙ্কায় মুখ ঢেকে চলতেন। [66]

قلت: اختصاص تمثله بصورة دحية دون غيره من الصحابة لكونه أحسن أهل زمانه صورة ولهذا كان يمشي متلثما خوفا أن يفتتن به النساء.

বাংলা অনুবাদ: আমি বলি: অন্য সাহাবিদের পরিবর্তে বিশেষভাবে দিহইয়ার আকৃতি ধারণের কারণ হলো, তিনি তাঁর সময়ের সবচেয়ে সুদর্শন ব্যক্তি ছিলেন। এ জন্য নারীরা তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় তিনি মুখ ঢেকে চলতেন।

উম্মে সালামার বর্ণনায় এই শনাক্তকরণের নির্ভরতা পরিষ্কার। তিনি সামনে থাকা ব্যক্তিকে দিহইয়া বলেই ভেবেছিলেন; পরে মুহাম্মদের বক্তব্য শুনে জানতে পারেন জিব্রাইলের প্রসঙ্গ। দৃশ্যমান ব্যক্তিটি মানবাকৃতির; তাঁর ফেরেশতা-পরিচয় গ্রহণ করা হচ্ছে মুহাম্মদের বক্তব্যের ভিত্তিতে। [67]

قَالَتْ أُمُّ سَلَمَةَ ايْمُ اللَّهِ مَا حَسِبْتُهُ إِلاَّ إِيَّاهُ حَتَّى سَمِعْتُ خُطْبَةَ نَبِيِّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُخْبِرُ جِبْرِيلَ أَوْ كَمَا قَالَ

বাংলা অনুবাদ: উম্মে সালামা বললেন: আল্লাহর শপথ, আমি তাকে সেই ব্যক্তিই মনে করেছিলাম, যতক্ষণ না আল্লাহর নবীর ভাষণ শুনলাম, যাতে তিনি জিব্রাইলের কথা বলছিলেন—অথবা তিনি অনুরূপ কথা বলেছিলেন।

উম্মে সালামার দেখা এবং তাঁর পরবর্তী পরিচয়-গ্রহণ দুটি পর্যায়ে ঘটেছে। প্রথমে তিনি ব্যক্তিটিকে দিহইয়া মনে করেছেন। পরে মুহাম্মদের ভাষণ থেকে জিবরাইলের পরিচয় গ্রহণ করেছেন। মানবাকৃতির দর্শন ও ফেরেশতা হিসেবে শনাক্তকরণের মধ্যে মুহাম্মদের কর্তৃত্ব কাজ করছে। চেহারা মানুষের, কথোপকথন মানুষের মতো; অতিপ্রাকৃত পরিচয়ের নিশ্চয়তা আসছে মুহাম্মদের ঘোষণা থেকে। প্রত্যক্ষদর্শীর প্রথম ধারণা এবং পরে ধর্মীয়ভাবে গৃহীত পরিচয়ের এই পার্থক্য বর্ণনাটির মধ্যেই স্পষ্ট।

উমরের নামে সংরক্ষিত অপরিচিত লোকের প্রশ্নোত্তরের বর্ণনাতেও পরিচয় পরে প্রকাশিত হয়। সেখানে সবাই একজন সাদা পোশাক ও কালো চুলের মানুষকে দেখেন; তিনি ইসলাম, ঈমান, ইহসান ও কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। চলে যাওয়ার পরে মুহাম্মদ তাঁকে জিবরাইল বলে পরিচয় দেন। উমরের বর্ণিত প্রশ্নোত্তরটি হলো: [68]

بَيْنَمَا نَحْنُ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ذَاتَ يَوْمٍ إِذْ طَلَعَ عَلَيْنَا رَجُلٌ شَدِيدُ بَيَاضِ الثِّيَابِ شَدِيدُ سَوَادِ الشَّعَرِ لاَ يُرَى عَلَيْهِ أَثَرُ السَّفَرِ وَلاَ يَعْرِفُهُ مِنَّا أَحَدٌ حَتَّى جَلَسَ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَأَسْنَدَ رُكْبَتَيْهِ إِلَى رُكْبَتَيْهِ وَوَضَعَ كَفَّيْهِ عَلَى فَخِذَيْهِ وَقَالَ يَا مُحَمَّدُ أَخْبِرْنِي عَنِ الإِسْلاَمِ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «الإِسْلاَمُ أَنْ تَشْهَدَ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ وَتُقِيمَ الصَّلاَةَ وَتُؤْتِيَ الزَّكَاةَ وَتَصُومَ رَمَضَانَ وَتَحُجَّ الْبَيْتَ إِنِ اسْتَطَعْتَ إِلَيْهِ سَبِيلاً». قَالَ صَدَقْتَ. قَالَ فَعَجِبْنَا لَهُ يَسْأَلُهُ وَيُصَدِّقُهُ. قَالَ فَأَخْبِرْنِي عَنِ الإِيمَانِ. قَالَ «أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلاَئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ». قَالَ صَدَقْتَ. قَالَ فَأَخْبِرْنِي عَنِ الإِحْسَانِ. قَالَ «أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ». قَالَ فَأَخْبِرْنِي عَنِ السَّاعَةِ. قَالَ «مَا الْمَسْئُولُ عَنْهَا بِأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ». قَالَ فَأَخْبِرْنِي عَنْ أَمَارَتِهَا. قَالَ «أَنْ تَلِدَ الأَمَةُ رَبَّتَهَا وَأَنْ تَرَى الْحُفَاةَ الْعُرَاةَ الْعَالَةَ رِعَاءَ الشَّاءِ يَتَطَاوَلُونَ فِي الْبُنْيَانِ». قَالَ ثُمَّ انْطَلَقَ فَلَبِثْتُ مَلِيًّا ثُمَّ قَالَ لِي «يَا عُمَرُ أَتَدْرِي مَنِ السَّائِلُ». قُلْتُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ «فَإِنَّهُ جِبْرِيلُ أَتَاكُمْ يُعَلِّمُكُمْ دِينَكُمْ».

বাংলা অনুবাদ: একদিন আমরা রাসুলুল্লাহর কাছে বসেছিলাম। এমন সময় অত্যন্ত সাদা পোশাক ও অত্যন্ত কালো চুলের একজন লোক আমাদের সামনে এলেন। তাঁর মধ্যে সফরের কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল না এবং আমাদের কেউ তাঁকে চিনত না। তিনি নবীর কাছে বসলেন, নিজের দুই হাঁটু তাঁর দুই হাঁটুর সঙ্গে মিলিয়ে রাখলেন এবং নিজের দুই হাত তাঁর উরুর ওপর রাখলেন। তারপর বললেন, হে মুহাম্মদ, আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন। রাসুলুল্লাহ বললেন: ইসলাম হলো তুমি সাক্ষ্য দেবে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল; নামাজ প্রতিষ্ঠা করবে, জাকাত দেবে, রমজানের রোজা রাখবে এবং যাতায়াতের সামর্থ্য থাকলে কাবাগৃহে হজ করবে। লোকটি বললেন, আপনি সত্য বলেছেন। আমরা আশ্চর্য হলাম, তিনি নিজেই প্রশ্ন করছেন আবার নিজেই উত্তর সত্য বলে স্বীকার করছেন। এরপর বললেন, আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন। তিনি বললেন: তুমি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলগণ ও পরকালকে বিশ্বাস করবে এবং ভালো-মন্দসহ তাকদীর বিশ্বাস করবে। লোকটি বললেন, আপনি সত্য বলেছেন। তারপর বললেন, আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন। তিনি বললেন: এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, যেন তুমি তাঁকে দেখছ; তুমি তাঁকে না দেখলেও তিনি তোমাকে দেখছেন। লোকটি বললেন, আমাকে কিয়ামত সম্পর্কে বলুন। তিনি বললেন: যাঁকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে তিনি প্রশ্নকারীর চেয়ে বেশি জানেন না। লোকটি বললেন, তার লক্ষণ সম্পর্কে বলুন। তিনি বললেন: দাসী তার মালকিনকে জন্ম দেবে এবং তুমি খালি পা, বস্ত্রহীন, দরিদ্র মেষপালকদের উঁচু দালান নির্মাণে প্রতিযোগিতা করতে দেখবে। এরপর লোকটি চলে গেলেন। আমি বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করলাম। তারপর তিনি আমাকে বললেন: হে উমর, তুমি কি জানো প্রশ্নকারী কে ছিলেন? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বললেন: তিনি ছিলেন জিবরাইল; তোমাদের ধর্ম শেখাতে তোমাদের কাছে এসেছিলেন।

এই প্রশ্নোত্তরে উপস্থিত লোকেরা অতিথির পোশাক, চুল, বসার ভঙ্গি ও কথা শুনেছেন। তাঁর ফেরেশতা-পরিচয় জানানো হয়েছে চলে যাওয়ার পরে। উম্মে সালামার বিবরণে পরিচিত মানুষ বলে মনে হওয়া ব্যক্তি এবং উমরের বিবরণে অচেনা অতিথি—উভয়ের অতিপ্রাকৃত পরিচয় ঘোষণার ক্ষমতা মুহাম্মদের হাতে। প্রত্যক্ষদর্শীরা মানুষের আকৃতির সাক্ষ্য দিচ্ছেন; ফেরেশতা হিসেবে তার ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণ করছেন মুহাম্মদের বক্তব্য মেনে। উমরের বিস্ময় অতিথির প্রশ্ন করা এবং নিজেই উত্তর সত্য বলার কারণে; পরিচয়ের ঘোষণা এসেছে কথোপকথন সম্পন্ন হওয়ার পরে।

বর্ণনাসাক্ষীর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাফেরেশতা-পরিচয়ের ভিত্তি
উম্মে সালামার সামনে আগমনকথোপকথনকারী ব্যক্তিকে দিহইয়া মনে করাপরে মুহাম্মদের ভাষণে জিবরাইলের উল্লেখ
উমরের সামনে অপরিচিত অতিথিসাদা পোশাক, কালো চুল ও ধর্মীয় প্রশ্নোত্তরঅতিথি চলে গেলে মুহাম্মদের ঘোষণা
আয়েশার ঘণ্টাধ্বনির বর্ণনাশীতের মধ্যেও ঘাম ঝরতে দেখাশব্দ ও বার্তার পরিচয় সম্পর্কে মুহাম্মদের বক্তব্য

ইসলাম, ঈমান ও ইহসানের এই কথোপকথন হাদিসে ধর্মশিক্ষার বিবরণ হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে। মুসহাফে এর প্রশ্নোত্তরকে কোরআনের সূরা হিসেবে বসানো হয়নি। ফলে বর্ণনার ভেতরে জিবরাইলের উপস্থিতি, ধর্মীয় বক্তব্যের কর্তৃত্ব এবং কোনো বাক্যের কোরআন হিসেবে পরিচয়—এগুলো আলাদা ধাপে নির্ধারিত হয়েছে। বার্তার বাহককে ফেরেশতা বলার পরও নির্দিষ্ট কোন শব্দ কোরআন এবং কোনটি অন্য ধর্মীয় সংবাদ হিসেবে প্রচারিত হবে, সেই বাছাই ও পাঠ-পরিচয়ের কাজ রয়ে গেছে।


অন্তরে বক্তব্য সঞ্চার

ইসলামি বর্ণনায় মুহাম্মদের অন্তরে বক্তব্য সঞ্চারকেও ওহি বলা হয়েছে। কখনো আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি অন্তরে প্রেরণা, আবার কখনো জিবরাইলের মাধ্যমে অন্তরে বার্তা পৌঁছানোর কথা আসে। এই পদ্ধতিতে শ্রোতার সামনে দৃশ্যমান বক্তা বা উচ্চারিত শব্দের প্রয়োজন নেই। বার্তার ঐশী পরিচয় অন্যেরা জানতে পারেন মুহাম্মদের ঘোষণায়।

এই অন্তর্গত অভিজ্ঞতার সংজ্ঞা মুনাবির কথায় আরও স্পষ্ট। তিনি “আমার অন্তরে ঢেলে দিয়েছেন” ব্যাখ্যা করতে বলেছেন, না শুনে এবং না দেখে মনে, হৃদয়ে বা বুদ্ধিতে ওহি স্থাপন করা। অন্তরে বার্তা আসার এই বর্ণনায় শ্রোতার সামনে দৃশ্যমান কোনো বার্তাবাহক বা অন্যদের শোনার মতো ঘোষণা থাকে না। [69]

ألقى الوحي في خلَدي وبالي ، أو في نفسي ، أو قلبي ، أو عقلي ، من غير أن أسمعه ولا أراه .

বাংলা অনুবাদ: তিনি আমার মনে ও চিন্তায়, অথবা আমার সত্তায়, হৃদয়ে বা বুদ্ধিতে ওহী স্থাপন করেছেন—আমি কিছু না শুনে এবং না দেখেই।

অন্তরে উদয় হওয়া চিন্তাকে আল্লাহ বা জিবরাইলের বার্তা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন মুহাম্মদ নিজেই। অনুসারীদের কাছে বিষয়টি পৌঁছায় তাঁর ঘোষণার মাধ্যমে। তাঁর অন্তরের অভিজ্ঞতা অন্যের সামনে একইভাবে পুনরুৎপাদন বা পরীক্ষা করার কোনো প্রক্রিয়া এই বর্ণনায় নেই। চিন্তার অতিপ্রাকৃত পরিচয় মেনে নেওয়ার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় অভিজ্ঞতার দাবিদার ব্যক্তির বক্তব্য। ফলে বার্তার পবিত্রতা ও বার্তাবাহকের দাবি একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কোনো বক্তব্য অন্তরে এসেছে—এই দাবি এবং বক্তব্যটি আল্লাহর পাঠানো—এই দাবি একই প্রমাণ বহন করে না। দ্বিতীয় দাবিতে প্রথম অভিজ্ঞতার ওপর একটি অতিপ্রাকৃত উৎস আরোপ করা হচ্ছে।

অন্তরে বার্তা আসার উদাহরণে জীবিকা ও মৃত্যুর সংবাদ রয়েছে। ইসলামকিউএতে হাকিমের আল-মুস্তাদরাক থেকে আবু উমামার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে: জীবিকা পূর্ণ হওয়ার আগে কারও মৃত্যু হবে না—এই বক্তব্য রুহুল কুদুস অন্তরে ঢেলে দিয়েছেন। “ওহি” আর “মুসহাফে সংকলিত আয়াত”-এর পার্থক্য এখানে সরাসরি দেখা যায়। [70]

إِنَّ رُوحَ القُدُسِ نَفَثَ في رُوعي أَنّه لَنْ تَمُوتَ نَفْسٌ حَتَّى تَسْتكْمِلَ رِزْقَهَا فَاتَّقُوا اللهَ وَأَجْمِلُوا في الطَّلَبِ

বাংলা অনুবাদ: রূহুল কুদুস আমার অন্তরে ঢেলে দিয়েছেন যে কোনো প্রাণ তার জীবিকা পূর্ণ করার আগে মরবে না। অতএব আল্লাহকে ভয় করো এবং জীবিকা অন্বেষণে সংযত হও।

সুয়ূতিও ওহি আসার পদ্ধতি বর্ণনা করতে অন্তরে বক্তব্য সঞ্চারের কথা রেখেছেন। তাঁর শ্রেণিবিভাগে এই পদ্ধতি ফেরেশতার উপস্থিতির অন্য পদ্ধতির সঙ্গে মিলেও ঘটতে পারে। ফলে “অন্তরে সঞ্চার” মূলত বার্তা গ্রহণের ধরন বোঝাচ্ছে; ফেরেশতাকে দৃশ্যমান অবস্থায় দেখার দাবি প্রত্যেক ক্ষেত্রে এর শর্ত নয়। [71]

الثَّانِيةُ: أَنْ يَنْفُثَ فِي رَوْعِهِ الْكَلَامَ نَفْثًا كَمَا قَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “إِنَّ رُوحَ الَقُدُسِ نَفَثَ فِي رَوْعِي “. أَخْرَجَهُ الْحَاكِمُ. وَهَذَا قَدْ يَرْجِعُ إِلَى الْحَالَةِ الْأُولَى أَوِ الَّتِي بَعْدَهَا بِأَنْ يَأْتِيَهُ فِي إِحْدَى الْكَيْفِيَّتَيْنِ وَيَنْفُثَ فِي رَوْعِهِ.

বাংলা অনুবাদ: দ্বিতীয় পদ্ধতি: তাঁর অন্তরে বক্তব্য সঞ্চার করা। যেমন তিনি বলেছেন, “রুহুল কুদুস আমার অন্তরে সঞ্চার করেছেন।” হাকিম এটি বর্ণনা করেছেন। এটি প্রথম অবস্থা অথবা পরবর্তী অবস্থার অন্তর্ভুক্তও হতে পারে; অর্থাৎ ওই দুই পদ্ধতির কোনো একটিতে এসে তাঁর অন্তরে সঞ্চার করা।

জীবিকার এই বক্তব্য ধর্মীয় নির্দেশ হিসেবে হাদিসে সংরক্ষিত হয়েছে; মুসহাফে এটি কোনো সূরার আয়াত নয়। অতএব ধর্মীয় কর্তৃত্ব আর কোরআনের নির্দিষ্ট পাঠ হিসেবে স্বীকৃতি—দুটি পৃথক পরিচয়। কোনো বক্তব্যকে ওহি বলার পরও তাকে কী ভাষায় প্রচার করা হলো, কোরআন হিসেবে পড়া হলো কি না এবং কোন ধারায় সংরক্ষণ করা হলো, সেই ইতিহাস রয়েছে। অন্তরের অভিজ্ঞতা থেকে লিখিত ধর্মগ্রন্থ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ভাষায় প্রকাশ ও মানুষের মাধ্যমে পরিবহনের কাজ ঘটেছে।


আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন

ওহির আরেক পদ্ধতি হিসেবে আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনের বর্ণনা পাওয়া যায়। এখানে ফেরেশতার মুখে বার্তা শোনার পরিবর্তে আল্লাহর সম্বোধন শোনার দাবি রয়েছে। কোরআনে মুসার সঙ্গে আল্লাহর কথোপকথনের কথা সরাসরি বলা হয়েছে। [72]

وَرُسُلًا قَدْ قَصَصْنَاهُمْ عَلَيْكَ مِنْ قَبْلُ وَرُسُلًا لَمْ نَقْصُصْهُمْ عَلَيْكَ وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تَكْلِيمًا

বাংলা অনুবাদ: এবং এমন রাসুলদের পাঠিয়েছি, যাঁদের বিবরণ আগে তোমাকে বলেছি, আর এমন রাসুলদেরও, যাঁদের বিবরণ তোমাকে বলিনি। আর আল্লাহ মুসার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন।

আল্লাহর সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের তিনটি রূপ সূরা আশ-শুরায় এসেছে: ওহি, পর্দার আড়াল থেকে সম্বোধন এবং বার্তাবাহক প্রেরণ। পর্দার আড়াল থেকে সম্বোধনকে এখানে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফেরেশতার মধ্যস্থতা ছাড়াও ঐশী সম্বোধন এখানে স্বীকৃত। [73]

وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَن يُكَلِّمَهُ اللَّهُ إِلَّا وَحْيًا أَوْ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوحِيَ بِإِذْنِهِ مَا يَشَاءُ إِنَّهُ عَلِيٌّ حَكِيمٌ

বাংলা অনুবাদ: কোনো মানুষের জন্য এমন নয় যে আল্লাহ তার সঙ্গে কথা বলবেন, ওহী ছাড়া, অথবা পর্দার আড়াল থেকে ছাড়া, অথবা এমন বার্তাবাহক পাঠানো ছাড়া যে তাঁর অনুমতিতে তাঁর ইচ্ছামতো ওহী পৌঁছে দেবে। নিশ্চয় তিনি সর্বোচ্চ, প্রজ্ঞাময়।

মুহাম্মদের ক্ষেত্রে মিরাজের বর্ণনায় এই কথোপকথনের সঙ্গে নামাজের বিধান যুক্ত হয়েছে। বুখারির বর্ণনা অনুসারে প্রথমে উম্মতের ওপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ধার্য করা হয়। মুসা তা পালন করা সম্ভব হবে না বললে মুহাম্মদ ফিরে গিয়ে কমানোর আবেদন করেন; বারবার ফিরে যাওয়ার পর সংখ্যা পাঁচে এসে দাঁড়ায়। শেষের সম্বোধনে পাঁচকেই পঞ্চাশ বলা হয়েছে। [74]

فَفَرَضَ اللَّهُ عَلَى أُمَّتِي خَمْسِينَ صَلاَةً، فَرَجَعْتُ بِذَلِكَ حَتَّى مَرَرْتُ عَلَى مُوسَى فَقَالَ مَا فَرَضَ اللَّهُ لَكَ عَلَى أُمَّتِكَ قُلْتُ فَرَضَ خَمْسِينَ صَلاَةً. قَالَ فَارْجِعْ إِلَى رَبِّكَ، فَإِنَّ أُمَّتَكَ لاَ تُطِيقُ ذَلِكَ. فَرَاجَعْتُ فَوَضَعَ شَطْرَهَا، فَرَجَعْتُ إِلَى مُوسَى قُلْتُ وَضَعَ شَطْرَهَا. فَقَالَ رَاجِعْ رَبَّكَ، فَإِنَّ أُمَّتَكَ لاَ تُطِيقُ، فَرَاجَعْتُ فَوَضَعَ شَطْرَهَا، فَرَجَعْتُ إِلَيْهِ فَقَالَ ارْجِعْ إِلَى رَبِّكَ، فَإِنَّ أُمَّتَكَ لاَ تُطِيقُ ذَلِكَ، فَرَاجَعْتُهُ. فَقَالَ هِيَ خَمْسٌ وَهْىَ خَمْسُونَ، لاَ يُبَدَّلُ الْقَوْلُ لَدَىَّ. فَرَجَعْتُ إِلَى مُوسَى فَقَالَ رَاجِعْ رَبَّكَ. فَقُلْتُ اسْتَحْيَيْتُ مِنْ رَبِّي.

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ আমার উম্মতের ওপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করলেন। তা নিয়ে ফেরার পথে মুসার কাছে গেলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ তোমার উম্মতের ওপর কী ফরজ করেছেন? বললাম, পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ। তিনি বললেন, তোমার রবের কাছে ফিরে যাও; তোমার উম্মত তা পারবে না। আমি ফিরে গেলে তিনি তার অর্ধেক কমালেন। মুসার কাছে ফিরে বললাম, তিনি তার অর্ধেক কমিয়েছেন। মুসা বললেন, তোমার রবের কাছে ফিরে যাও; তোমার উম্মত তা পারবে না। আবার ফিরে গেলে তিনি তার অর্ধেক কমালেন। মুসার কাছে ফিরলে তিনি আবার বললেন, তোমার রবের কাছে ফিরে যাও; তোমার উম্মত তা পারবে না। আমি ফিরে গেলে তিনি বললেন, এগুলো পাঁচ, আর এগুলোই পঞ্চাশ; আমার কাছে কথা পরিবর্তিত হয় না। মুসার কাছে ফিরে গেলে তিনি বললেন, তোমার রবের কাছে ফিরে যাও। বললাম, আমার রবের কাছে আবার যেতে লজ্জা বোধ করছি।

এই বিবরণে বিধানের সংখ্যা পরিবর্তিত হচ্ছে আবেদন ও পুনরাবেদনের ধারায়। অনুসারীদের পালনীয় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে এমন একটি কথোপকথন জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যার সংবাদ তাঁদের কাছে পৌঁছায় মুহাম্মদের বক্তব্যে। ধর্মীয় কর্তব্য এখানে একজন ব্যক্তির বর্ণিত অতিপ্রাকৃত সাক্ষাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁর অনুসারীরা সেই সাক্ষাতে উপস্থিত থেকে পঞ্চাশ নির্ধারণ, কমানোর আবেদন বা পাঁচে নামানোর ঘোষণা শোনেননি। তাঁদের কাছে পৌঁছেছে ঘটনাটির বর্ণনা এবং তার ভিত্তিতে পালনীয় বিধান।

মিরাজে নামাজের এই কথোপকথন হাদিসে রয়েছে; মুসহাফে পুরো কথোপকথনটি কোরআনের আয়াত হিসেবে নেই। মুহাম্মদের জীবদ্দশায় কোরআন হিসেবে প্রচারিত পাঠের পরিচয়, অন্যান্য ধর্মীয় নির্দেশের প্রচার এবং পরে মুসহাফে পাঠ সংকলন—এই ধাপগুলোর প্রত্যেকটিতে মানুষের মাধ্যমে বাছাই, শনাক্তকরণ ও সংরক্ষণ ঘটেছে। বার্তার উৎস আল্লাহ বলে ঘোষণা করা সেই মানবীয় কাজগুলো মুছে দেয় না। একই ব্যক্তির মুখে আল্লাহর কথা হিসেবে বর্ণিত সব বক্তব্যও একই ধরনের লিখিত ধর্মগ্রন্থে স্থান পায়নি।


ফেরেশতাকে নিজস্ব রূপে দেখা

জিবরাইলের মাধ্যমে প্রেরিত ওহিকে ওহিয়ে মালাকি বলা হয়। ফেরেশতার মাধ্যমে বার্তা পৌঁছানোর বর্ণনায় কখনো আড়াল থেকে কথা শোনানো, কখনো সামনে উপস্থিত হয়ে কথা বলা, কখনো মানুষের আকৃতি এবং কখনো নিজস্ব আকৃতিতে আসার কথা রয়েছে। আয়েশার বর্ণিত সহিহ মুসলিমের হাদিসে জিবরাইলকে তাঁর সৃষ্টিগত আকৃতিতে দেখার সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দুই বলা হয়েছে।

আয়েশার এই বক্তব্য এসেছে মাসরুকের প্রশ্নের উত্তরে। মাসরুক সূরা আত-তাকভিরের ৮১:২৩ এবং সূরা আন-নাজমের ৫৩:১৩ আয়াতের প্রসঙ্গ তোলেন। আয়েশা জানান, এ বিষয়ে তিনি মুহাম্মদকে জিজ্ঞেস করেছিলেন এবং মুহাম্মদ জিবরাইলকে দেখার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। অর্থাৎ আয়াতের “দেখা” ক্রিয়াটির সঙ্গে জিবরাইলের পরিচয় যুক্ত হচ্ছে মুহাম্মদের নামে বর্ণিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে। [75]

إِنَّمَا هُوَ جِبْرِيلُ لَمْ أَرَهُ عَلَى صُورَتِهِ الَّتِي خُلِقَ عَلَيْهَا غَيْرَ هَاتَيْنِ الْمَرَّتَيْنِ رَأَيْتُهُ مُنْهَبِطًا مِنْ السَّمَاءِ سَادًّا عِظَمُ خَلْقِهِ مَا بَيْنَ السَّمَاءِ إِلَى الأَرْضِ

বাংলা অনুবাদ: তিনি জিব্রাইলই ছিলেন। যে আকৃতিতে তাঁকে সৃষ্টি করা হয়েছে, সে আকৃতিতে আমি তাঁকে এই দুবার ছাড়া দেখিনি। আমি তাঁকে আকাশ থেকে নামতে দেখেছি; তাঁর বিরাট দেহ আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থান ঢেকে রেখেছিল।

বুখারিতে ইবনে মাসউদের সূত্রে জিবরাইলের ছয়শ ডানার বর্ণনাও এসেছে। শাইবানি সূরা আন-নাজমের নৈকট্য ও ওহি পৌঁছানোর আয়াত সম্পর্কে যির ইবনে হুবাইশকে জিজ্ঞেস করলে তিনি ইবনে মাসউদের এই বিবরণ জানান। [76]

حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ، حَدَّثَنَا أَبُو عَوَانَةَ، حَدَّثَنَا أَبُو إِسْحَاقَ الشَّيْبَانِيُّ، قَالَ سَأَلْتُ زِرَّ بْنَ حُبَيْشٍ عَنْ قَوْلِ اللَّهِ، تَعَالَى {فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى * فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى}. قَالَ حَدَّثَنَا ابْنُ مَسْعُودٍ أَنَّهُ رَأَى جِبْرِيلَ لَهُ سِتُّمِائَةِ جَنَاحٍ.

বাংলা অনুবাদ: কুতাইবা, আবু আওয়ানা ও আবু ইসহাক আশ-শাইবানির সূত্রে বর্ণিত। শাইবানি বলেন, “তখন তিনি দুই ধনুক পরিমাণ অথবা আরও নিকটবর্তী হলেন; তারপর তাঁর বান্দার প্রতি যা ওহি করার তা করলেন”—আল্লাহর এই বাণী সম্পর্কে আমি যির ইবনে হুবাইশকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ইবনে মাসউদ আমাদের জানিয়েছেন, মুহাম্মদ জিবরাইলকে দেখেছিলেন; তাঁর ছয়শ ডানা ছিল।

বিশাল আকৃতির এই বিবরণ মুহাম্মদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তাঁর নিজের বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল। আয়েশা মুহাম্মদের কাছে শোনা অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন। ইবনে মাসউদের সূত্রে ফেরেশতার আকৃতির আরেক বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে। এসব বিবরণে অনুসারীরা মুহাম্মদের দর্শনের সংবাদ পরিবহন করছেন; একই দৃশ্য নিজেরা দেখেছেন বলে সাক্ষ্য দিচ্ছেন না। ফেরেশতার আকৃতি, পরিচয় ও বার্তা সম্পর্কে তাঁদের জানার পথ অভিজ্ঞতার দাবিদারের বক্তব্য এবং সেই বক্তব্যের বর্ণনাধারা।

ফেরেশতাকে দেখার দাবি এবং দেখা সত্তাটিকে আল্লাহর বার্তাবাহক হিসেবে শনাক্ত করা—এর মধ্যে পরিচয় নির্ধারণের একটি ধাপ রয়েছে। বিশাল দেহ বা ছয়শ ডানার বর্ণনা সেই পরিচয়ের ধর্মীয় ব্যাখ্যাসহ পরিবেশিত হয়েছে। কোরআনের বাণী প্রেরণের দাবিতে ফেরেশতার ভূমিকা যত কেন্দ্রীয়, সেই ভূমিকার পরিচয় নির্ধারণও ততখানি মুহাম্মদের বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল। তাঁর অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যাই অনুসারীদের কাছে বার্তার অতিপ্রাকৃত উৎসের নিশ্চয়তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই বক্তব্য পরে অন্য গ্রন্থে উদ্ধৃত হলে উদ্ধৃতির সংখ্যা বাড়ে; মূল দর্শনের স্বতন্ত্র প্রত্যক্ষদর্শীর সংখ্যা তাতে বাড়ে না।


স্বপ্নের মাধ্যমে নির্দেশ

স্বপ্নের মাধ্যমে নবীদের কাছে নির্দেশ আসার ধারণাও ইসলামি বর্ণনায় রয়েছে। ইবরাহিমের পুত্রকে জবাই করার স্বপ্ন এবং মুহাম্মদের মক্কায় প্রবেশের স্বপ্ন—দুটি ঘটনায় স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তব কাজের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। দ্বিতীয় ঘটনাটির ধারায় মক্কায় যাওয়ার যাত্রা ও হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রসঙ্গ আসে। (শরহে ফায়জুল কাবির : ২৪)। আয়েশার বর্ণনায় মুহাম্মদের ওহির সূচনাও ঘুমের মধ্যে সত্য স্বপ্ন দিয়ে; সেগুলো ভোরের আলোর মতো প্রকাশ পেত। [77]

কোরআন, স্বপ্নরূপে ওহী আসতো

স্বপ্নে ওহির সূচনার কথাটি বুখারির প্রথম দিকের দীর্ঘ বর্ণনার শুরুতেই আছে। আয়েশার ভাষায়, মুহাম্মদের ওহি শুরু হয়েছিল ঘুমের মধ্যে ভালো বা সত্য স্বপ্ন দিয়ে। বর্ণনাটি স্বপ্ন থেকে হিরায় ফেরেশতার আগমনের ঘটনার দিকে এগিয়েছে। [78]

أَوَّلُ مَا بُدِئَ بِهِ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مِنَ الْوَحْىِ الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ فِي النَّوْمِ، فَكَانَ لاَ يَرَى رُؤْيَا إِلاَّ جَاءَتْ مِثْلَ فَلَقِ الصُّبْحِ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর রাসুলের ওহীর সূচনা হয়েছিল ঘুমের মধ্যে ভালো স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন, তা ভোরের আলোর মতো প্রকাশ পেত।

স্বপ্নের বিবরণ অন্যেরা জানতে পারে স্বপ্নদ্রষ্টার মুখে। কোন স্বপ্ন কী ভাষায় প্রকাশিত হলো এবং পরে তার কোন অর্থ গ্রহণ করা হলো—দুই ক্ষেত্রেই স্বপ্নদ্রষ্টা ও ব্যাখ্যাকারীর ভূমিকা রয়েছে। স্বপ্নকে ওহি মেনে নেওয়া সেই ব্যক্তির সাক্ষ্যের ওপর নির্ভরতাকে দূর করে না। ব্যক্তিগত স্বপ্ন থেকে অন্য মানুষের জন্য ধর্মীয় কর্তব্য প্রতিষ্ঠিত হলে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা জনসমষ্টির ওপর কর্তৃত্ব লাভ করে। স্বপ্নের দাবিদার তখন নিজের অভিজ্ঞতার বিবরণ দেওয়ার পাশাপাশি অন্যের করণীয়ও নির্ধারণ করছেন।

ইবরাহিমের পুত্রকে জবাই করার স্বপ্নের প্রসঙ্গে উবাইদ ইবনে উমাইরের মন্তব্য উদ্ধৃত করে ইসলামকিউএ জানিয়েছে, নবীদের স্বপ্নকে ওহি ধরা হয়। মন্তব্যটি বুখারির ১৩৮ নম্বর হাদিসেও রয়েছে। ফলে স্বপ্নের ভিত্তিতে গুরুতর কাজ করার ধর্মীয় কর্তৃত্ব এই মতের মধ্যেই স্বীকৃত। [79] [80]

رُؤْيَا الْأَنْبِيَاءِ وَحْيٌ ثُمَّ قَرَأَ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ

বাংলা অনুবাদ: নবীদের স্বপ্ন ওহী। তারপর তিনি পাঠ করলেন: আমি স্বপ্নে দেখছি যে তোমাকে জবাই করছি।

সূরা আস-সাফফাতের বর্ণনায় ইবরাহিম নিজেই ছেলেকে স্বপ্নে জবাই করার কথা বলছেন। ছেলে উত্তরে সেই স্বপ্নকে পালনীয় নির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করছে। ইবনে কাসির এই পুত্রকে ইসমাইল হিসেবে শনাক্ত করেছেন। [81] [82]

فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ

বাংলা অনুবাদ: তারপর সে যখন তার সঙ্গে কাজ করার বয়সে পৌঁছাল, সে বলল, হে আমার পুত্র, আমি স্বপ্নে দেখছি যে তোমাকে জবাই করছি। এখন দেখো, তোমার মত কী। সে বলল, হে আমার পিতা, আপনাকে যে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে তা করুন। আল্লাহ চাইলে আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।

নিজের স্বপ্নকে অন্য একজনের জীবন বিষয়ে নির্দেশ বলে গ্রহণ করার নৈতিক সমস্যা গভীর। যে ব্যক্তি স্বপ্ন দেখেছেন, অভিজ্ঞতাটি তাঁর; কিন্তু বিপন্ন হচ্ছে অন্যের জীবন। “নবীর স্বপ্ন” নামটি এই প্রাণঘাতী কর্তৃত্বের উৎস। পুত্রের আনুগত্যকেও কাহিনিতে ধর্মীয় আদর্শে পরিণত করা হয়েছে। স্বপ্নের সত্যতা সম্পর্কে পিতার দৃঢ় বিশ্বাস ছেলের জীবনের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার নৈতিক প্রমাণ নয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে অন্যের দেহ ও জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই ধাপেই ধর্মীয় আনুগত্য প্রাণবিসর্জনের দাবিতে রূপ নেয়।

মুহাম্মদের মক্কায় প্রবেশের স্বপ্নের প্রসঙ্গ সূরা আল-ফাতহেও রয়েছে। আয়াতটিতে নিরাপদে মসজিদুল হারামে প্রবেশ, মাথা মুণ্ডন ও চুল ছোট করার কথা এসেছে। স্বপ্নকে সত্য ঘোষণার পাশাপাশি মানুষের অজানা বিষয় আল্লাহ জানেন—এই বক্তব্যও একই আয়াতে যুক্ত হয়েছে। [83]

لَقَدْ صَدَقَ اللَّهُ رَسُولَهُ الرُّؤْيَا بِالْحَقِّ لَتَدْخُلُنَّ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ إِنْ شَاءَ اللَّهُ آمِنِينَ مُحَلِّقِينَ رُءُوسَكُمْ وَمُقَصِّرِينَ لَا تَخَافُونَ فَعَلِمَ مَا لَمْ تَعْلَمُوا فَجَعَلَ مِنْ دُونِ ذَلِكَ فَتْحًا قَرِيبًا

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ তাঁর রাসুলের স্বপ্ন যথার্থভাবে সত্য করেছেন। আল্লাহ চাইলে তোমরা অবশ্যই নিরাপদে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে, মাথা মুণ্ডন করে ও চুল ছোট করে; তোমরা ভয় করবে না। তিনি এমন বিষয় জানতেন যা তোমরা জানতে না। তাই এর আগে তিনি একটি নিকটবর্তী বিজয় নির্ধারণ করেছেন।

হুদাইবিয়ায় উমর এই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তব ফলের অমিল নিয়ে মুহাম্মদকে প্রশ্ন করেন। তিনি স্মরণ করান, তাঁদের কাবাগৃহে গিয়ে তাওয়াফ করার কথা বলা হয়েছিল। মুহাম্মদের জবাব ছিল, সেই বছরই যাওয়ার কথা তিনি বলেছিলেন কি না। উমর বলেন, না। [84] [85]

قُلْتُ : أَوَلَيْسَ كُنْتَ تُحَدِّثُنَا أَنَّا سَنَأْتِي الْبَيْتَ فَنَطُوفُ بِهِ ؟ قَالَ : بَلَى ، فَأَخْبَرْتُكَ أَنَّا نَأْتِيهِ الْعَامَ ؟ قَالَ : قُلْتُ : لَا ، قَالَ : فَإِنَّكَ آتِيهِ وَمُطَوِّفٌ بِهِ

বাংলা অনুবাদ: আমি বললাম, আপনি কি আমাদের বলতেন না যে আমরা কাবাগৃহে যাব এবং তাওয়াফ করব? তিনি বললেন, হ্যাঁ; কিন্তু আমি কি তোমাকে বলেছিলাম যে আমরা এ বছরই সেখানে যাব? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তুমি অবশ্যই সেখানে যাবে এবং তাওয়াফ করবে।

এই ঘটনায় স্বপ্নের বিষয়বস্তু, অনুসারীদের প্রত্যাশিত সময় এবং ঘোষণার ব্যাখ্যা আলাদা হয়ে উঠেছে। উমর পূর্বঘোষণার ভিত্তিতে প্রশ্ন করছেন; মুহাম্মদ সময় নির্দিষ্ট করা হয়নি বলে জবাব দিচ্ছেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অর্থ নির্ধারণের ক্ষমতা এখানেও ঘোষণাকারীর হাতে রয়েছে। একই স্বপ্নের প্রতি বিশ্বাস থেকে যাত্রার প্রত্যাশা তৈরি হয়, আবার সেই ঘোষণার সময়সীমা ব্যাখ্যা করেই তাৎক্ষণিক প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার উত্তর দেওয়া হয়।

বর্ণিত অভিজ্ঞতাধর্মীয় বক্তব্য বা কর্তব্যসংরক্ষিত রূপ
অন্তরে রুহুল কুদুসের বার্তাজীবিকা পূর্ণ হওয়ার আগে মৃত্যু হবে না; সংযত অন্বেষণের নির্দেশহাদিসে সংরক্ষিত বক্তব্য
মিরাজে কথোপকথননামাজের সংখ্যা পঞ্চাশ থেকে পাঁচহাদিসে সংরক্ষিত কথোপকথন
ইবরাহিমের স্বপ্নপুত্রকে জবাইয়ের প্রস্তুতি ও আনুগত্যকোরআনে বর্ণিত ঘটনা
মুহাম্মদের মক্কায় প্রবেশের স্বপ্নমসজিদুল হারামে প্রবেশের ঘোষণাকোরআনের আয়াত এবং হুদাইবিয়ার হাদিস

অন্তরের অনুভূতি, দর্শন, কথোপকথন ও স্বপ্ন—এই অভিজ্ঞতাগুলো ধর্মীয় ভাষায় প্রকাশিত হওয়ার পর ভিন্ন ভিন্ন পথে সংরক্ষিত হয়েছে। অভিজ্ঞতার অতিপ্রাকৃত পরিচয় এবং নির্দিষ্ট বাক্যের কোরআন হিসেবে স্বীকৃতি তাই একই ঘোষণা নয়। স্বপ্নের অভিজ্ঞতা নির্দিষ্ট ভাষায় প্রকাশ, তার অর্থ নির্ধারণ এবং সেই প্রকাশকে ধর্মীয় কর্তৃত্ব দেওয়ার মধ্যে অভিজ্ঞতার দাবিদার ও তাঁর বক্তব্য গ্রহণকারী মানুষের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।


জিবরাইলের আগে ইসরাফিলের দায়িত্বের বর্ণনা ও তার পৃথক পাঠ

নবুয়তের শুরুর তিন বছর ইসরাফিলের সংযোগ এবং পরে জিবরাইলের মাধ্যমে কোরআন নাজিলের একটি বর্ণনা ইসলামি গ্রন্থে সংরক্ষিত রয়েছে। এতে নবুয়তের সূচনা, প্রাথমিক শিক্ষা এবং কোরআন অবতরণকে পৃথক পর্যায়ে রাখা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ইসরাফিল কিছু কথা ও বিষয় শেখাচ্ছেন; পরের পর্যায়ে জিবরাইল কোরআন নিয়ে আসছেন। দায়িত্ব পরিবর্তনের কারণ কিংবা প্রথম তিন বছরের শিক্ষার বিস্তারিত পাঠ এই খবরে দেওয়া হয়নি। ওহির সূচনার ইতিহাসে এখানে আরেক ফেরেশতার জন্য একটি স্বতন্ত্র সময় বরাদ্দ করা হয়েছে।

সালিহির সুবুলুল হুদা ওয়াল রাশাদে বিষয়টি একটি পৃথক অধ্যায়ের শিরোনাম। তিনি আহমদের ইতিহাসগ্রন্থ থেকে আমির আশ-শা’বীর নামে খবরটি উদ্ধৃত করেছেন। সুয়ূতির আল-ইতকানেও আহমদ, দাউদ ইবনে আবি হিন্দ ও শা’বীর সূত্রে একই বিবরণের উল্লেখ রয়েছে। সালিহির উদ্ধৃত পাঠে চল্লিশ বছরে নবুয়ত, তিন বছর ইসরাফিল এবং বিশ বছর জিবরাইলের মাধ্যমে কোরআন অবতরণের হিসাব একসঙ্গে এসেছে। [86] [87]

إن رسول الله صلى الله عليه وسلم نزلت عليه النبوة وهو ابن أربعين سنة ، فقرن بنبوته إسرافيل ثلاث سنين ، فكان يعلمه الكلمة والشيء ، ولم ينزل القرآن على لسانه ، فلما مضت ثلاث سنين قرن بنبوته جبريل ، فنزل القرآن على لسانه عشرين سنة ، عشرا بمكة وعشرا بالمدينة ، فمات وهو ابن ثلاث وستين سنة .

বাংলা অনুবাদ: রাসুলের বয়স চল্লিশ বছর হলে তাঁর ওপর নবুয়ত অবতীর্ণ হয়। তখন তাঁর নবুয়তের সঙ্গে ইসরাফিলকে তিন বছরের জন্য যুক্ত করা হয়। তিনি তাঁকে কোনো কথা ও কোনো বিষয় শেখাতেন; তাঁর জবানে কোরআন নাজিল হয়নি। তিন বছর পার হলে তাঁর নবুয়তের সঙ্গে জিব্রাইলকে যুক্ত করা হয়। তখন তাঁর জবানে বিশ বছর কোরআন নাজিল হয়—মক্কায় দশ বছর ও মদিনায় দশ বছর। তাঁর মৃত্যু হয় তেষট্টি বছর বয়সে।

খবরটি নবুয়তের মোট তেইশ বছরকে তিন ও বিশ—এই দুই ভাগে সাজিয়েছে। প্রথম তিন বছরে ফেরেশতার শিক্ষা রয়েছে, কিন্তু তাঁর জবানে কোরআন অবতরণ নেই; পরের বিশ বছরে কোরআন নাজিল হচ্ছে। ফলে নবুয়তের বয়স এবং কোরআন অবতরণের বয়স এখানে সমান নয়। চল্লিশ বছরে নবুয়ত শুরু হলেও এই হিসাব অনুসারে জিবরাইলের মাধ্যমে কোরআনের সূচনা তেতাল্লিশ বছরে। পরিচিত তেইশ বছরের অবতরণকাল থেকে এটি একটি বাস্তব বর্ণনাগত পার্থক্য। প্রথম তিন বছরকে বাদ দিলে সময়ের হিসাবই বদলে যায়। ফেরেশতার নামের পার্থক্য তাই পুরো কালপঞ্জির ওপর প্রভাব ফেলছে। একই তিন বছরকে নবুয়তের অংশ ধরা হলেও কোরআন অবতরণের অংশ ধরা হচ্ছে না। ওহি, নবুয়ত ও কোরআন—এই শব্দগুলোর প্রয়োগ এখানে সময় গণনার ফল নির্ধারণ করছে।

সালিহি সনদটিকে শা’বী পর্যন্ত সহিহ বলেছেন; শা’বী নবুয়তের শুরুর ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না। ইসলামকিউএতে উদ্ধৃত ইবনে কাসিরও একইভাবে “শা’বী পর্যন্ত” সনদ সহিহ বলেছেন। এই খবরের একাধিক গ্রন্থে উপস্থিতি একই শা’বী-সূত্রের পরবর্তী সংরক্ষণ; প্রতিটি গ্রন্থ আলাদা প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য যোগ করছে না। সংবাদটির ঐতিহাসিক উপস্থিতি এবং সংবাদে বর্ণিত ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য—এই দুইয়ের মধ্যে বর্ণনাধারার দূরত্ব রয়েছে। [88]

قال ابن كثير : فَهَذَا إِسْنَادٌ صَحِيحٌ إِلَى الشَّعْبِيِّ ، وَهُوَ يَقْتَضِي أَنَّ إِسْرَافِيلَ قُرِنَ مَعَهُ بَعْدَ الْأَرْبَعِينَ ثَلَاثَ سِنِينَ ثُمَّ جَاءَهُ جِبْرِيلُ

বাংলা অনুবাদ: ইবনে কাসির বলেন: এই সনদ শা’বী পর্যন্ত সহিহ। এর অর্থ দাঁড়ায়, চল্লিশ বছরের পরে তাঁর সঙ্গে ইসরাফিলকে তিন বছর যুক্ত করা হয়েছিল; তারপর জিবরাইল তাঁর কাছে আসেন।

ইসরাফিলের খবরটি শুধু ফেরেশতার নামের একটি বিচ্ছিন্ন উল্লেখ হয়ে থাকেনি; সময়ের ভিন্ন হিসাব মেলাতেও ব্যবহৃত হয়েছে। ইসলামকিউএ মক্কায় দশ বছর ও তেরো বছর অবস্থানের বিবরণ আলোচনা করতে ইবনে হাজরের ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করেছে। সেখানে প্রথম তিন বছরে মিকাইল অথবা ইসরাফিলের যোগাযোগ এবং পরে দশ বছর জিবরাইলের মাধ্যমে কোরআন নাজিলের সম্ভাবনা রাখা হয়েছে। ফেরেশতার পরিচয়ের বিকল্প এবং অবতরণের সময় গণনার পদ্ধতি একই ব্যাখ্যার মধ্যে এসেছে। [89]

أَوْ أَنَّهُ عَلَى رَأْس الْأَرْبَعِينَ قُرِنَ بِهِ مِيكَائِيل أَوْ إِسْرَافِيل ، فَكَانَ يُلْقِي إِلَيْهِ الْكَلِمَة أَوْ الشَّيْء مُدَّة ثَلَاث سِنِينَ ، كَمَا جَاءَ مِنْ وَجْه مُرْسَل , ثُمَّ قُرِنَ بِهِ جِبْرِيل فَكَانَ يَنْزِل عَلَيْهِ بِالْقُرْآنِ مُدَّة عَشْر سِنِينَ بِمَكَّة

বাংলা অনুবাদ: অথবা চল্লিশ বছরের শুরুতে তাঁর সঙ্গে মিকাইল বা ইসরাফিলকে যুক্ত করা হয়েছিল। তিনি তিন বছর তাঁর কাছে কোনো কথা বা বিষয় পৌঁছে দিতেন, যেমন একটি মুরসাল সূত্রে এসেছে। তারপর তাঁর সঙ্গে জিবরাইলকে যুক্ত করা হয়; তিনি মক্কায় দশ বছর তাঁর কাছে কোরআন নিয়ে অবতরণ করতেন।

আবু শামা আয়েশার জিবরাইল-সংক্রান্ত বিবরণের সঙ্গে ইসরাফিলের খবরটি মেলাতে আরেক ঘটনাক্রম দিয়েছেন: প্রথমে স্বপ্ন, তারপর হিরায় নির্জন অবস্থানের সময় ইসরাফিলের সংযোগ, শেষে জিবরাইলের আগমন। আয়েশার বিবরণে মাঝের পর্যায়টি নেই কেন, তার জন্য তিনি দুটি সম্ভাবনা রেখেছেন—আয়েশা হয় ঘটনা সংক্ষিপ্ত করেছেন, নয়তো ইসরাফিলের খবর জানতেন না। [90]

فحكت عائشة ما جرى له مع جبريل ولم تحك ما جرى له مع إسرافيل اختصارا للحديث ، أو لم تكن وقفت على قصة إسرافيل .

বাংলা অনুবাদ: তাই আয়েশা তাঁর সঙ্গে জিব্রাইলের যা ঘটেছিল তা বর্ণনা করেছেন; ইসরাফিলের সঙ্গে যা ঘটেছিল তা বর্ণনা করেননি—হয় বর্ণনা সংক্ষিপ্ত করার জন্য, অথবা তিনি ইসরাফিলের ঘটনাটি জানতে পারেননি।

আয়েশা নিজে এখানে বর্ণনা সংক্ষিপ্ত করার কথা বলছেন না; ইসরাফিল সম্পর্কে না জানার কথাও বলছেন না। এই দুটি কারণ আবু শামার প্রস্তাবিত ব্যাখ্যা। ভিন্ন খবরকে একই ধারাবাহিকতায় বসানোর জন্য অনুল্লিখিত একটি পর্যায় আয়েশার বিবরণের মধ্যে স্থাপন করা হচ্ছে। অতীত ঘটনার সংবাদ এবং সেই সংবাদের ফাঁক পূরণের পরবর্তী চেষ্টা এভাবেই পাশাপাশি সংরক্ষিত হয়েছে। কেবল সম্ভাবনা প্রস্তাব করলেই সেই ফাঁকে নতুন ঐতিহাসিক সাক্ষ্য তৈরি হয় না।

একই অধ্যায়ে ওয়াকিদি শা’বীর খবর প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বক্তব্য, জিবরাইল ছাড়া অন্য কোনো ফেরেশতা মুহাম্মদের নবুয়তের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। সালিহি এর পরেই “হাফিজ”-এর মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন: অস্বীকারকারীর কাছে অস্বীকারের প্রমাণ না থাকলে ইতিবাচক সংবাদকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ফলে এখানকার মতভেদ শুধু ফেরেশতার নাম নিয়ে নয়; কোন সংবাদকে কোন ভিত্তিতে গ্রহণ করা হবে, তা নিয়েও। [91]

وقد أنكر الواقدي رحمه الله تعالى خبر الشعبي وقال : لم يقرن به من الملائكة إلا جبريل . قال الحافظ : ولا يخفى ما فيه ، فإن المثبت مقدم على النافي إلا إن صحب النافي دليل نفيه فيقدم . انتهى .

বাংলা অনুবাদ: ওয়াকিদি শা’বীর খবর অস্বীকার করে বলেছেন: ফেরেশতাদের মধ্যে জিবরাইল ছাড়া কাউকে তাঁর সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। হাফিজ বলেন: এর সমস্যা স্পষ্ট; কারণ ইতিবাচক সংবাদদাতা অস্বীকারকারীর ওপর অগ্রাধিকার পান। তবে অস্বীকারকারীর সঙ্গে অস্বীকারের প্রমাণ থাকলে তাঁকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

সালিহি শেষ পর্যন্ত ওয়াকিদির বক্তব্যকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এর আগে তিনি এমন বর্ণনা এনেছেন, যেখানে মুহাম্মদের কাছে পরে আসা এক ফেরেশতা আগে কখনো পৃথিবীতে নামেননি বলে উল্লেখ রয়েছে। সেই ফেরেশতাকে ইসরাফিল হিসেবে শনাক্ত করার ব্যাখ্যা ব্যবহার করেই প্রথম তিন বছরের ইসরাফিল-সংযোগের খবর দুর্বল করা হয়েছে। এখানে প্রথম আগমনের সময় নির্ধারণ নির্ভর করছে আরেক হাদিসের নামহীন ফেরেশতার পরিচয় স্থির করার ওপর। মূল সংবাদে যে নাম নেই, ব্যাখ্যাকারীর দেওয়া সেই নাম পরের সিদ্ধান্তের ভিত্তি হচ্ছে।

শা’বীর খবর, আবু শামার সমন্বয়, ওয়াকিদির অস্বীকার এবং সালিহির নির্বাচন—এগুলো একই অধ্যায়ের মধ্যে আছে। নবুয়তের সূচনার একটি মসৃণ একক বিবরণের বদলে পাওয়া যাচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী ঘটনাক্রম ও সেগুলো মেলানোর চেষ্টা। কোনো ধারায় প্রথম তিন বছর আলাদা করা হচ্ছে, কোনো ধারায় সেই ফেরেশতার দায়িত্বই অস্বীকার করা হচ্ছে। পরবর্তী ব্যাখ্যা কোনটি গ্রহণ করল, তার ওপর নির্ভর করে শুরু হওয়ার সময়, বার্তাবাহকের পরিচয় এবং কোরআন অবতরণের হিসাব বদলে যাচ্ছে।


অন্য ফেরেশতার মাধ্যমে ফাতিহা ও বাকারার শেষ দুই আয়াতের সংবাদ

জিবরাইল মুহাম্মদের কাছে বসে থাকা অবস্থায় আরেক ফেরেশতার আগমনের বর্ণনা সহিহ মুসলিমে রয়েছে। ইবনে আব্বাসের নামে বর্ণিত এই খবরে ওপর থেকে একটি শব্দ শোনা, আকাশের দরজা খোলা এবং সেই দরজা দিয়ে ফেরেশতা নামার কথা এসেছে। জিবরাইল উপস্থিত থেকেও এখানে আরেক বার্তাবাহকের আগমন ঘোষণা করছেন। নতুন ফেরেশতা ফাতিহাতুল কিতাব ও বাকারার শেষ আয়াতগুলোকে দুটি নূর বলেছেন এবং সেগুলোর বিশেষ প্রাপ্তির সংবাদ দিয়েছেন। [92]

حَدَّثَنَا حَسَنُ بْنُ الرَّبِيعِ، وَأَحْمَدُ بْنُ جَوَّاسٍ الْحَنَفِيُّ، قَالاَ حَدَّثَنَا أَبُو الأَحْوَصِ، عَنْ عَمَّارِ بْنِ رُزَيْقٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عِيسَى، عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ بَيْنَمَا جِبْرِيلُ قَاعِدٌ عِنْدَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم سَمِعَ نَقِيضًا مِنْ فَوْقِهِ فَرَفَعَ رَأْسَهُ فَقَالَ هَذَا بَابٌ مِنَ السَّمَاءِ فُتِحَ الْيَوْمَ لَمْ يُفْتَحْ قَطُّ إِلاَّ الْيَوْمَ فَنَزَلَ مِنْهُ مَلَكٌ فَقَالَ هَذَا مَلَكٌ نَزَلَ إِلَى الأَرْضِ لَمْ يَنْزِلْ قَطُّ إِلاَّ الْيَوْمَ فَسَلَّمَ وَقَالَ أَبْشِرْ بِنُورَيْنِ أُوتِيتَهُمَا لَمْ يُؤْتَهُمَا نَبِيٌّ قَبْلَكَ فَاتِحَةُ الْكِتَابِ وَخَوَاتِيمُ سُورَةِ الْبَقَرَةِ لَنْ تَقْرَأَ بِحَرْفٍ مِنْهُمَا إِلاَّ أُعْطِيتَهُ

বাংলা অনুবাদ: হাসান ইবনে রাবি ও আহমদ ইবনে জাওয়াস আল-হানাফি, আবুল আহওয়াস, আম্মার ইবনে রুজাইক, আবদুল্লাহ ইবনে ইসা ও সাঈদ ইবনে জুবাইরের সূত্রে ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন: জিবরাইল নবীর কাছে বসে থাকা অবস্থায় ওপর থেকে একটি শব্দ শুনলেন। তিনি মাথা তুলে বললেন: এটি আকাশের একটি দরজা, যা আজ খোলা হয়েছে; আজ ছাড়া আগে কখনো খোলা হয়নি। সেখান থেকে এক ফেরেশতা নামলেন। তিনি বললেন: এই ফেরেশতা আজ ছাড়া আগে কখনো পৃথিবীতে নামেননি। তিনি সালাম দিয়ে বললেন: তোমাকে দেয়া দুটি আলোর সুসংবাদ গ্রহণ করো, যা তোমার আগে কোনো নবীকে দেয়া হয়নি—ফাতিহাতুল কিতাব ও সূরা বাকারার শেষ আয়াতগুলো। তুমি এগুলোর কোনো অক্ষর পাঠ করলে তার প্রাপ্য তোমাকে দেয়া হবে।

এই বর্ণনায় জিবরাইল ও নবাগত ফেরেশতা আলাদা দুটি চরিত্র। জিবরাইল আগমন সম্পর্কে জানাচ্ছেন, নবাগত ফেরেশতা সালাম দিয়ে কথা বলছেন। ফেরেশতার ব্যক্তিগত নাম হাদিসে দেওয়া হয়নি। তাঁর বক্তব্যে দুটি নূর ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে বলে ঘোষণা এবং পাঠের সঙ্গে প্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ধর্মীয় সংবাদ পৌঁছানোর কাজে জিবরাইল ছাড়া অন্য ফেরেশতার উপস্থিতি এখানে বর্ণনার প্রত্যক্ষ বিষয়বস্তু। কোরআনের নির্দিষ্ট অংশের মর্যাদা ঘোষণা করাও এই ফেরেশতার দায়িত্বের মধ্যে পড়ছে।

ফাতিহা কে নিয়ে এসেছিলেন, এই প্রশ্নে মুসলিমের বর্ণনাটি থেকেই একাধিক সিদ্ধান্ত তৈরি হয়েছে। কুরতুবি ইবনে আতিয়্যার বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন, কিছু আলেম এই হাদিসের ভিত্তিতে মনে করেছিলেন, জিবরাইল সূরা হামদ নিয়ে নামেননি। ইবনে আতিয়্যা সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলেন, জিবরাইল আগে এসে নতুন ফেরেশতা ও তাঁর সঙ্গে নামা বিষয় সম্পর্কে জানিয়েছেন; এই হিসেবে জিবরাইলও অবতরণে অংশ নিয়েছেন। [93] [94]

قَالَ ابْنُ عَطِيَّةَ: وَلَيْسَ كَمَا ظُنَّ، فَإِنَّ هَذَا الْحَدِيثَ يَدُلُّ عَلَى أَنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ تَقَدَّمَ الْمَلَكَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُعْلِمًا بِهِ وَبِمَا يَنْزِلُ مَعَهُ، وَعَلَى هَذَا يَكُونُ جِبْرِيلُ شَارَكَ فِي نُزُولِهَا، وَاللَّهُ أَعْلَمُ.

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আতিয়্যা বলেন: যেমন ধারণা করা হয়েছে, বিষয়টি তেমন নয়। কারণ এই হাদিস বোঝায়, জিবরাইল ওই ফেরেশতার আগে নবীর কাছে এসে তাঁর এবং তাঁর সঙ্গে যা অবতীর্ণ হচ্ছে সে সম্পর্কে জানিয়েছিলেন। এই হিসেবে জিবরাইলও এর অবতরণে অংশ নিয়েছেন। আল্লাহই ভালো জানেন।

কুরতুবি এই ব্যাখ্যার একটি অংশ সরাসরি অস্বীকার করেছেন: তাঁর মতে, হাদিসের প্রকাশ্য ভাষা থেকে জিবরাইল এসব বিষয়ে মুহাম্মদকে কিছু জানিয়েছেন বলে পাওয়া যায় না। এরপর তিনি সূরা আশ-শুআরার “রুহুল আমিন তা নিয়ে অবতরণ করেছেন” বক্তব্যকে সমগ্র কোরআনের জন্য প্রযোজ্য ধরে আলাদা সমন্বয় করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় জিবরাইল মক্কায় ফাতিহার পাঠ নিয়ে এসেছিলেন, আর অপর ফেরেশতা মদিনায় এসেছেন তার সওয়াবের সংবাদ নিয়ে। [95]

قُلْتُ: الظَّاهِرُ مِنَ الْحَدِيثِ يَدُلُّ عَلَى أَنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ لَمْ يُعْلِمِ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِشَيْءٍ مِنْ ذَلِكَ. وَقَدْ بَيَّنَّا أَنَّ نُزُولَهَا كَانَ بِمَكَّةَ، نَزَلَ بِهَا جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ، لِقَوْلِهِ تَعَالَى: “نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ” [الشعراء: ١٩٣] وَهَذَا يَقْتَضِي جَمِيعَ الْقُرْآنِ، فَيَكُونُ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ نَزَلَ بِتِلَاوَتِهَا بِمَكَّةَ، وَنَزَلَ الْمَلَكُ بِثَوَابِهَا بِالْمَدِينَةِ. وَاللَّهُ أَعْلَمُ.

বাংলা অনুবাদ: আমি বলি: হাদিসের প্রকাশ্য ভাষা বোঝায়, জিবরাইল নবীকে এসব বিষয়ে কিছু জানাননি। আমরা আগেই বলেছি, এর অবতরণ মক্কায় হয়েছিল; জিবরাইল তা নিয়ে অবতরণ করেছিলেন। কারণ আল্লাহ বলেছেন, “রুহুল আমিন তা নিয়ে অবতরণ করেছেন” [সূরা আশ-শুআরা, ২৬:১৯৩]; আর এটি সমগ্র কোরআনকে অন্তর্ভুক্ত করে। সেই হিসেবে জিবরাইল মক্কায় এর পাঠ নিয়ে অবতরণ করেছিলেন, আর ওই ফেরেশতা মদিনায় এর সওয়াবের সংবাদ নিয়ে অবতরণ করেছেন। আল্লাহই ভালো জানেন।

ইবনে আতিয়্যার ব্যাখ্যায় জিবরাইলের অংশগ্রহণ যোগ হচ্ছে পূর্বে জানিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। কুরতুবি সেই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে পাঠ ও সওয়াবের সংবাদকে আলাদা সময়ে বসাচ্ছেন। মুসলিমের উদ্ধৃত ঘটনাটিতে মক্কায় পাঠ ও মদিনায় সওয়াব নিয়ে দুই দফা আগমনের এই ঘটনাক্রম লেখা নেই। কুরতুবির পূর্বস্বীকৃত মক্কি অবতরণ এবং সমগ্র কোরআনের বাহক হিসেবে জিবরাইলের পরিচয় মিলিয়েই এই বিন্যাস তৈরি হয়েছে। ফলে মূল ঘটনার বিবরণ ছাড়াও ধর্মীয় মত রক্ষার প্রয়োজন বর্ণনার ব্যাখ্যা নির্ধারণ করছে।

ইসলামওয়েবের ৫৭৯০০ নম্বর ফতোয়াতেও পাঠ নিয়ে জিবরাইল এবং সওয়াব নিয়ে অন্য ফেরেশতার আগমনের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। ফতোয়াটি ইবনে আতিয়্যার বক্তব্য ও কুরতুবির আলোচনাকে একত্রে সংক্ষেপ করেছে। মূল তাফসিরে তাঁদের মধ্যে ব্যাখ্যার যে পার্থক্য আছে, তা ওই সারাংশে অনুপস্থিত। পুরোনো মতভেদের মধ্য থেকে একটি সমন্বিত সিদ্ধান্ত বেছে নেওয়ার পর সেটিই আবার পরবর্তী ধর্মীয় উত্তরে প্রচারিত হচ্ছে। [96]

ব্যাখ্যাফেরেশতার ভূমিকা নির্ধারণব্যাখ্যার ভিত্তি
ইবনে আতিয়্যার উদ্ধৃত কিছু আলেমফাতিহা অন্য ফেরেশতা নিয়ে এসেছেনমুসলিমের দুই নূরের বর্ণনা
ইবনে আতিয়্যাজিবরাইলও অবতরণে অংশ নিয়েছেননতুন ফেরেশতা ও সঙ্গে আসা বিষয় আগে জানানোর ব্যাখ্যা
কুরতুবিজিবরাইল পাঠ নিয়ে, অন্য ফেরেশতা সওয়াব নিয়ে এসেছেনমক্কি অবতরণ এবং সমগ্র কোরআনে রুহুল আমিনের ভূমিকা মিলিয়ে সমন্বয়

নামহীন ফেরেশতার পরিচয় নিয়েও ব্যাখ্যার আরেক স্তর আছে। সালিহির উদ্ধৃত আলোচনায় কয়েকজন আলেম তাঁকে ইসরাফিল বলেছেন। সেই শনাক্তকরণ মেনে নিলে “আগে কখনো পৃথিবীতে নামেননি” কথাটি প্রথম তিন বছর ইসরাফিলের যোগাযোগের খবরের সঙ্গে বিরোধ তৈরি করে। সালিহি এই যুক্তি ব্যবহার করে শেষে ওয়াকিদির মত গ্রহণ করেছেন। একই হাদিস এক জায়গায় ফাতিহার বাহক নির্ধারণে, আরেক জায়গায় নবুয়তের প্রথম তিন বছরের ফেরেশতা নির্ধারণে ব্যবহৃত হচ্ছে। [97]

قال جماعة من العلماء إن هذا الملك إسرافيل .

বাংলা অনুবাদ: একদল আলেম বলেছেন, এই ফেরেশতা ইসরাফিল।

বর্ণনাকোন ফেরেশতার ভূমিকাঠিক কী বলা হয়েছেযে সিদ্ধান্ত সরাসরি পাওয়া যায়
শা’বীর নামে সংরক্ষিত খবরপ্রথম তিন বছর ইসরাফিল; পরে জিব্রাইলইসরাফিল শিক্ষা দিতেন; তাঁর জবানে কোরআন নাজিল হয়নিওহী-সংক্রান্ত প্রাথমিক যোগাযোগ ও কোরআন নাজিল আলাদা করা হয়েছে
ওয়াকিদির বক্তব্যনবুয়তের সঙ্গে জিব্রাইলের সংযোগঅন্য কোনো ফেরেশতাকে যুক্ত করা হয়নিপূর্ববর্তী খবরের সঙ্গে বর্ণনাগত মতভেদ আছে
আবু শামার সমন্বয়স্বপ্ন, ইসরাফিল, তারপর জিব্রাইলআয়েশা সংক্ষিপ্ত করেছেন বা ঘটনা জানতেন না—এমন সম্ভাবনাএটি পরের ব্যাখ্যা, নতুন প্রত্যক্ষ বিবরণ নয়
মুসলিম ৮০৬জিব্রাইলের উপস্থিতিতে আরেক নামহীন ফেরেশতাফাতিহা ও বাকারার শেষ আয়াত নিয়ে সুসংবাদজিব্রাইল ছাড়া আরেক ফেরেশতার আগমন ও দুই নূরের সুসংবাদ

ফেরেশতার যোগাযোগ, শিক্ষা, সুসংবাদ এবং কোরআনের পাঠ অবতরণ—এই বর্ণনাগুলোতে দায়িত্ব এক ধরনের নয়। ইসরাফিলের জন্য নির্দিষ্ট তিন বছর রাখা হয়েছে এক খবরে; অন্য খবরে জিবরাইলের উপস্থিতিতে নতুন ফেরেশতা দুটি নূরের সংবাদ দিচ্ছেন। পরবর্তী আলেমরা কখনো যোগাযোগের পর্যায় আলাদা করেছেন, কখনো পাঠ ও সওয়াব ভাগ করেছেন, কখনো নামহীন ফেরেশতার পরিচয় স্থির করে আরেক সংবাদ বাতিল করেছেন। সংরক্ষিত ইতিহাসের মধ্যে তাই ঘটনার বর্ণনা, বর্ণনাগত বিরোধ এবং পরবর্তী মত নির্বাচন একসঙ্গে কাজ করেছে।


মুহাম্মদের আমলে লিখন, মুখস্থ ও কোরআন সংগ্রহ

কোরআন সংরক্ষণের ইতিহাসে মুহাম্মদের মুখে পাঠ, অনুসারীদের মুখস্থ করা, শিক্ষকের কাছে পাঠ শেখা এবং লেখকের হাতে আয়াত লিপিবদ্ধ হওয়া—একাধিক মানবীয় কাজ রয়েছে। শোনা বক্তব্য লিখে রাখা, একটি সূরা মুখস্থ করা, অন্যকে পাঠ শেখানো এবং সমগ্র পাঠ একত্র করা ভিন্ন দায়িত্ব। একই ব্যক্তি একাধিক দায়িত্ব পালন করলেও প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা সাক্ষ্য রয়েছে। পরবর্তী মুসহাফ তৈরির উপাদান এসেছে এই ব্যক্তিদের স্মৃতি, শিক্ষা ও লিখিত সংগ্রহ থেকে। কোরআনের ইতিহাসে তাঁদের ভূমিকা তাই আনুষঙ্গিক নয়; বাণীকে মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং টিকিয়ে রাখার বাস্তব মাধ্যম তাঁরাই।


ওহি লেখক, কোরআন পাঠক ও মুখস্থকারীদের পরিচয়

মুহাম্মদের আমলে কোরআন মুখস্থ ও লিখনের সঙ্গে যুক্ত বহু ব্যক্তির নাম ইসলামি গ্রন্থে পাওয়া যায়। এই তালিকাগুলোতে পরবর্তী খলিফা, পরিচিত পাঠক, নারী, ওহি লেখক এবং মুহাম্মদের অন্য কাজের লেখকেরাও রয়েছেন। “কোরআন সংরক্ষণকারী” পরিচয়ের নিচে তাঁদের একসঙ্গে রাখলে ব্যক্তিবিশেষের কাজের ধরন আড়াল হয়ে যায়। কে সরাসরি পাঠ শুনেছেন, কে লিখেছেন, কে শিক্ষা দিয়েছেন এবং কে পরে সংকলনের দায়িত্ব পেয়েছেন—সংরক্ষিত বর্ণনায় এই পার্থক্যগুলো স্পষ্ট। তালিকার দৈর্ঘ্য দিয়ে প্রত্যেকের সংরক্ষিত পাঠের পরিমাণ ও ভাষা নির্ধারিত হয় না।

ইসলামকিউএ ইবনুল কাইয়িমের যাদুল মাআদ থেকে মুহাম্মদের লেখকদের একটি তালিকা উদ্ধৃত করেছে। উদ্ধৃতির পরিচয়েই ওহি অথবা চিঠিপত্র লেখার কথা রয়েছে। জায়েদ ইবনে সাবিতকে এই কাজের সঙ্গে সবচেয়ে নিয়মিত ও বিশেষভাবে যুক্ত বলা হয়েছে। [98]

فقد ذكر أهل السيرة أسماء الصحابة الذين كانوا يكتبون الوحي أو الرسائل للرسول صلى الله عليه وسلم وهم : أبو بكر الصديق ، وعمر بن الخطاب ، وعثمان بن عفان ، وعلي بن أبي طالب ، والزبير بن العوام ، وعامر بن فهيرة ، وعمرو بن العاص ، وأبي بن كعب ، وعبد الله بن الأرقم ، وثابت بن قيس بن شماس ، وحنظلة بن الربيع الأسيدي ، والمغيرة بن شعبة ، وعبد الله بن رواحة ، وخالد بن الوليد ، وخالد بن سعيد بن العاص ، وقيل : إنه أول من كتب له ، ومعاوية ابن أبي سفيان ، وزيد بن ثابت – وكان ألزمهم لهذا الشأن وأخصهم به –

বাংলা অনুবাদ: জীবনীকারেরা সেই সাহাবিদের নাম উল্লেখ করেছেন, যাঁরা রাসুলের জন্য ওহি অথবা চিঠিপত্র লিখতেন। তাঁরা হলেন: আবু বকর সিদ্দিক, উমর ইবনুল খাত্তাব, উসমান ইবনে আফফান, আলী ইবনে আবি তালিব, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, আমির ইবনে ফুহাইরা, আমর ইবনুল আস, উবাই ইবনে কাব, আবদুল্লাহ ইবনুল আরকাম, সাবিত ইবনে কাইস ইবনে শাম্মাস, হানজালা ইবনুর রবি আল-উসাইদি, মুগিরা ইবনে শুবা, আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, খালিদ ইবনে সাঈদ ইবনুল আস—তাঁকেই প্রথম লেখক বলা হয়েছে—মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান এবং জায়েদ ইবনে সাবিত। জায়েদ এই কাজের সঙ্গে সবচেয়ে নিয়মিত ও বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন।

লেখকদের কাজের পৃথক পরিচয়ও একই উত্তরে রয়েছে। ইবনে হাজর কুদাইয়ের বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন, জায়েদ ওহি লেখার পাশাপাশি রাজাদের উদ্দেশে পত্র লিখতেন; যুবাইর ও জাহম লিখতেন সদকার সম্পদের হিসাব। অর্থাৎ মুহাম্মদের লেখক হওয়ার পরিচয়ের মধ্যেই ধর্মীয় পাঠ, কূটনৈতিক পত্র এবং সম্পদের নথি আলাদা হয়ে যাচ্ছে। [99]

كان زيد بن ثابت يكتب عنه للملوك ، مع ما كان يكتب من الوحي ، وكان الزبير وجهم يكتبان أموال الصدقات

বাংলা অনুবাদ: জায়েদ ইবনে সাবিত ওহি লেখার পাশাপাশি তাঁর পক্ষ থেকে রাজাদের উদ্দেশে পত্র লিখতেন। যুবাইর ও জাহম সদকার সম্পদের হিসাব লিখতেন।

ওহি লেখকদের তালিকায় চল্লিশজনের নাম পর্যন্ত গণনার কথাও পাওয়া যায়। সুবহি সালিহ তাঁর মাবাহিস ফি উলুমিল কোরআনে এই সংখ্যাকে ব্লাশেরের বিভিন্ন গ্রন্থের তথ্য তুলনা করে তৈরি হিসাব হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইসলামওয়েবের ৬৯৯০৪ নম্বর ফতোয়ায় তেরো, বিশের বেশি এবং ইবনে কাসিরের হিসাবে তেইশজনের কথা এসেছে। এই সংখ্যাগুলো ভিন্ন গ্রন্থ থেকে সংকলিত তালিকার হিসাব; ওহি লিখন, চিঠিপত্র ও অন্যান্য নথির দায়িত্বের পরিচয়ও ব্যক্তিভেদে আলাদা। [100] [101]

استطاع المستشرق بلاشير أن يبلغ بكتبة الوحي أربعين رجلا

বাংলা অনুবাদ: প্রাচ্যবিদ ব্লাশের ওহি লেখকদের সংখ্যা চল্লিশজনে পৌঁছাতে পেরেছেন।

ইবনুল কাইয়িমের উদ্ধৃত তালিকায় সতেরোজনের নাম আছে। কুদাইয়ের উদ্ধৃতিতে আবার জাহমের নাম এসেছে, যাঁর নাম ওই সতেরোজনের মধ্যে নেই। কাজের ধরন ও ব্যবহৃত সূত্র বদলালে তালিকার সদস্যও বদলাচ্ছে। এই ব্যক্তিদের প্রত্যেকের হাতে একই শব্দে শেষ পাঠের পূর্ণ মুসহাফ ছিল—এমন বিবরণ তালিকাগুলো দেয়নি। কে কতদিন লিখেছেন, কোন অংশ লিখেছেন এবং তাঁর লেখার কতটুকু পরে সংগ্রহ করা হয়েছে, সেই তথ্য ব্যক্তিভেদে নির্দিষ্ট। শুধু মোট সংখ্যা এই ইতিহাস প্রকাশ করে না।

জায়েদের ওহি লেখার পরিচয় বুখারির সংকলন-বিবরণে সরাসরি আছে। আবু বকর তাঁকে ডেকে পূর্বের এই কাজের কথা স্মরণ করিয়েই কোরআন খুঁজে সংগ্রহের দায়িত্ব দেন। জায়েদের বর্ণনায় সূরা তাওবার শেষ দুই আয়াত আবু খুযাইমা আনসারির কাছে পাওয়ার কথাও একই সঙ্গে এসেছে। [102]

حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، عَنْ يُونُسَ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، أَنَّ ابْنَ السَّبَّاقِ، قَالَ إِنَّ زَيْدَ بْنَ ثَابِتٍ قَالَ أَرْسَلَ إِلَىَّ أَبُو بَكْرٍ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ إِنَّكَ كُنْتَ تَكْتُبُ الْوَحْىَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَاتَّبِعِ الْقُرْآنَ. فَتَتَبَّعْتُ حَتَّى وَجَدْتُ آخِرَ سُورَةِ التَّوْبَةِ آيَتَيْنِ مَعَ أَبِي خُزَيْمَةَ الأَنْصَارِيِّ لَمْ أَجِدْهُمَا مَعَ أَحَدٍ غَيْرَهُ {لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ} إِلَى آخِرِهِ.

বাংলা অনুবাদ: ইয়াহইয়া ইবনে বুকাইর, লাইস, ইউনুস, ইবনে শিহাব ও ইবনুস সাব্বাকের সূত্রে জায়েদ ইবনে সাবিত বলেন: আবু বকর আমাকে ডেকে পাঠালেন। তিনি বললেন, তুমি রাসুলুল্লাহর জন্য ওহি লিখতে; সুতরাং কোরআন অনুসন্ধান করো। আমি অনুসন্ধান করতে থাকলাম, শেষ পর্যন্ত সূরা তাওবার শেষ দুই আয়াত আবু খুযাইমা আনসারির কাছে পেলাম। তাঁকে ছাড়া অন্য কারও কাছে ওই দুটি পাইনি। “তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে একজন রাসুল এসেছেন; তোমাদের কষ্ট তাঁর কাছে অসহনীয়”—শেষ পর্যন্ত।

এই বর্ণনায় অভিজ্ঞ ওহি লেখককেও নতুন করে অনুসন্ধান করতে হচ্ছে। তাঁর পেশাগত অভিজ্ঞতা সংগ্রহের যোগ্যতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে; অনুসন্ধানের প্রয়োজন তাতে শেষ হয়নি। মুহাম্মদের মুখে শোনা, জায়েদের হাতে লেখা এবং পরের সংগ্রহে পাওয়া—এই কাজগুলো আলাদা সময়ে ঘটেছে। জায়েদের লিখনের অভিজ্ঞতাকে আবু বকর নতুন সংগ্রহের কাজে লাগাচ্ছেন; সংরক্ষিত অংশ খোঁজার দায়িত্বও সেই লেখকের ওপরই পড়েছে।

লেখার পরে তা পড়ে শোনানো এবং বাদ পড়া অংশ ঠিক করার একটি বিবরণও জায়েদের নামে তাবারানি সংরক্ষণ করেছেন। এই খবরে মুহাম্মদের মুখে বলা, লেখকের হাতে লেখা, আবার পাঠ করে শোনানো এবং মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার পৃথক ধাপ রয়েছে। সনদের পর্যালোচনায় ইসলামকিউএ সংবাদটিকে দুর্বল বলেছে। [103] [104]

كُنْتُ أَكْتُبُ الْوَحْيَ لِرَسُولِ اللَّهِ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – ، وَكَانَ إِذَا نَزَلَ عَلَيْهِ أَخَذَتْهُ بُرَحَاءُ شَدِيدَةٌ وَعَرِقَ عَرَقًا شَدِيدًا مِثْلَ الْجُمَانِ ثُمَّ سُرِّيَ عَنْهُ ، فَكُنْتُ أَدْخُلُ عَلَيْهِ بِقِطْعَةِ الْقَتَبِ أَوْ كِسْرَةٍ فَأَكْتُبُ وَهُوَ يُمْلِي عَلَيَّ ، فَمَا أَفْرَغُ حَتَّى تَكَادَ رِجْلَيَّ تَنْكَسِرُ مِنْ ثِقَلِ الْقُرْآنِ حَتَّى أَقُولَ لَا أَمْشِي عَلَى رِجْلَيَّ أَبَدًا ، فَإِذَا فَرَغْتُ قَالَ : ” اقْرَأْهُ ” فَإِنْ كَانَ فِيهِ سَقْطٌ أَقَامَهُ ، ثُمَّ أَخْرُجُ بِهِ إِلَى النَّاسِ .

বাংলা অনুবাদ: আমি রাসুলুল্লাহর জন্য ওহি লিখতাম। তাঁর কাছে ওহি এলে তিনি তীব্র কষ্টে আক্রান্ত হতেন এবং মুক্তার মতো প্রচণ্ড ঘাম ঝরত। তারপর তাঁর অবস্থা স্বাভাবিক হতো। আমি জিনের কাঠের টুকরা বা তার ভাঙা অংশ নিয়ে তাঁর কাছে ঢুকতাম এবং তিনি বলে দিতেন, আমি লিখতাম। লেখা শেষ হওয়ার আগেই কোরআনের ভারে আমার দুই পা ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হতো; এমনকি বলতাম, আমি আর কখনো পায়ে হাঁটতে পারব না। লেখা শেষ করলে তিনি বলতেন, এটি পড়ো। এতে কোনো অংশ বাদ পড়লে তিনি তা ঠিক করে দিতেন। তারপর আমি তা নিয়ে মানুষের কাছে বের হতাম।

এই বর্ণনায় লেখকের কাজ সুস্পষ্ট: শ্রুত বক্তব্যকে লিখিত রূপ দেওয়া এবং তা পাঠ করে মিলিয়ে নেওয়া। বাদ পড়ার সম্ভাবনাও এই বিবরণের নিজস্ব ভাষায় স্বীকৃত। এখানে সংশোধনের উপায় হিসেবে আরেকবার মানুষের পড়া ও শোনার কথাই বলা হয়েছে।

কোরআন শেখানোর দায়িত্বে চারজনের নাম মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে বুখারিতে এসেছে: আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, সালিম, মুআয ও উবাই ইবনে কাব। সুয়ূতি আল-ইতকানের পাঠক ও বর্ণনাকারীদের অধ্যায়ও এই সংবাদ দিয়ে শুরু করেছেন। শিক্ষক হিসেবে নাম উল্লেখের এই ঘটনা মৌখিক শিক্ষার নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় দেয়। [105] [106]

حَدَّثَنَا حَفْصُ بْنُ عُمَرَ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ عَمْرٍو، عَنْ إِبْرَاهِيمَ، عَنْ مَسْرُوقٍ، ذَكَرَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَمْرٍو عَبْدَ اللَّهِ بْنَ مَسْعُودٍ فَقَالَ لاَ أَزَالُ أُحِبُّهُ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ “خُذُوا الْقُرْآنَ مِنْ أَرْبَعَةٍ مِنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ وَسَالِمٍ وَمُعَاذٍ وَأُبَىِّ بْنِ كَعْبٍ”.

বাংলা অনুবাদ: হাফস ইবনে উমর, শুবা, আমর, ইবরাহিম ও মাসরুকের সূত্রে বর্ণিত। আবদুল্লাহ ইবনে আমর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের কথা উল্লেখ করে বললেন: আমি তাঁকে ভালোবেসেই যাব। আমি নবীকে বলতে শুনেছি, চারজনের কাছ থেকে কোরআন শেখো: আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, সালিম, মুআয ও উবাই ইবনে কাব।

ইবনে মাসউদ নিজেও মুহাম্মদের মুখ থেকে সত্তরের বেশি সূরা শেখার কথা জনসমক্ষে বলেছেন। শাকিক ইবনে সালামার বর্ণনায় তাঁর এই বক্তব্য এবং সভায় তার বিরোধিতা না শোনার কথা সংরক্ষিত হয়েছে। তাঁর পাঠজ্ঞানের পরিচয় তাই শুধু পরবর্তী তালিকায় একটি নাম নয়; সরাসরি গ্রহণের পরিমাণ সম্পর্কে তাঁর নিজের বক্তব্যও আছে। [107]

حَدَّثَنَا عُمَرُ بْنُ حَفْصٍ، حَدَّثَنَا أَبِي، حَدَّثَنَا الأَعْمَشُ، حَدَّثَنَا شَقِيقُ بْنُ سَلَمَةَ، قَالَ خَطَبَنَا عَبْدُ اللَّهِ فَقَالَ وَاللَّهِ لَقَدْ أَخَذْتُ مِنْ فِي رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِضْعًا وَسَبْعِينَ سُورَةً، وَاللَّهِ لَقَدْ عَلِمَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنِّي مِنْ أَعْلَمِهِمْ بِكِتَابِ اللَّهِ وَمَا أَنَا بِخَيْرِهِمْ. قَالَ شَقِيقٌ فَجَلَسْتُ فِي الْحِلَقِ أَسْمَعُ مَا يَقُولُونَ فَمَا سَمِعْتُ رَادًّا يَقُولُ غَيْرَ ذَلِكَ.

বাংলা অনুবাদ: উমর ইবনে হাফস, তাঁর পিতা ও আমাশের সূত্রে শাকিক ইবনে সালামা বলেন: আবদুল্লাহ আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, আমি রাসুলুল্লাহর মুখ থেকে সত্তরের বেশি সূরা শিখেছি। আল্লাহর কসম, নবীর সাহাবিরা জানেন, আমি তাঁদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে সবচেয়ে জ্ঞানীদের একজন; যদিও আমি তাঁদের মধ্যে সর্বোত্তম নই। শাকিক বলেন, এরপর আমি বিভিন্ন বৈঠকে বসে তাঁদের কথা শুনলাম; এর বিপরীত বলে কাউকে তাঁর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করতে শুনিনি।

কোরআন মুখস্থ ও সংগ্রহের আলোচনায় যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের তালিকা আরও বড়। সুয়ূতি আবু উবাইদের কিতাবুল কিরাআতের তালিকা, অন্য সংগ্রাহকদের বিবরণ এবং উম্মে ওয়ারাকার সংবাদ একত্র করেছেন। সেখানে নামের পাশাপাশি কিছু ব্যক্তির কোরআন সম্পূর্ণ করার সময় সম্পর্কেও বক্তব্য রয়েছে। [108]

وَقَدْ ذَكَرَ أَبُو عُبَيْدٍ فِي كِتَابِ الْقِرَاءَاتِ الْقُرَّاءَ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَدَّ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ: الْخُلَفَاءَ الْأَرْبَعَةَ، وَطَلْحَةَ وَسَعْدًا، وَابْنَ مَسْعُودٍ، وَحُذَيْفَةَ وَسَالِمًا وَأَبَا هُرَيْرَةَ، وَعَبْدَ اللَّهِ بْنَ السَّائِبِ، وَالْعَبَادِلَةَ وَعَائِشَةَ وَحَفْصَةَ وَأُمَّ سَلَمَةَ. وَمِنَ الْأَنْصَارِ: عُبَادَةَ بْنَ الصَّامِتِ وَمُعَاذًا الَّذِي يُكَنَّى أَبَا حَلِيمَةَ، وَمُجَمِّعَ بْنَ جَارِيَةَ وَفُضَالَةَ بْنَ عُبَيْدٍ، وَمَسْلَمَةَ بْنَ مُخَلَّدٍ. وَصَرَّحَ بِأَنَّ بَعْضَهُمْ إِنَّمَا أَكْمَلَهُ بَعْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَا يَرِدُ عَلَى الْحَصْرِ الْمَذْكُورِ فِي حَدِيثِ أَنَسٍ، وَعَدَّ ابْنُ أَبِي دَاوُدَ مِنْهُمْ تَمِيمًا الدَّارِيَّ وَعُقْبَةَ بْنَ عَامِرٍ. وَمِمَّنْ جَمَعَهُ أَيْضًا أَبُو مُوسَى الْأَشْعَرِيُّ، ذَكَرَهُ أَبُو عَمْرٍو الدَّانِيُّ.

বাংলা অনুবাদ: আবু উবাইদ তাঁর কিতাবুল কিরাআতে নবীর সাহাবিদের মধ্যকার কোরআন পাঠকদের উল্লেখ করেছেন। মুহাজিরদের মধ্যে তিনি গণনা করেছেন: চার খলিফা, তালহা, সাদ, ইবনে মাসউদ, হুজাইফা, সালিম, আবু হুরায়রা, আবদুল্লাহ ইবনুস সাইব, আবদুল্লাহ নামের ব্যক্তিগণ, আয়েশা, হাফসা ও উম্মে সালামাকে। আনসারদের মধ্যে: উবাদা ইবনুস সামিত, আবু হালিমা নামে পরিচিত মুআয, মুজাম্মি ইবনে জারিয়া, ফাদালা ইবনে উবাইদ ও মাসলামা ইবনে মুখাল্লিদকে। তিনি স্পষ্ট করেছেন, তাঁদের কেউ কেউ নবীর পরেই এটি সম্পূর্ণ করেছেন; ফলে আনাসের হাদিসে উল্লিখিত সীমিত তালিকার সঙ্গে আপত্তি তৈরি হয় না। ইবনে আবি দাউদ তাঁদের মধ্যে তামিম আদ-দারি ও উকবা ইবনে আমিরকেও গণনা করেছেন। যাঁরা এটি সংগ্রহ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে আবু মুসা আশআরিও ছিলেন; আবু আমর আদ-দানি তাঁকে উল্লেখ করেছেন।

বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লিখিত নাম ও তাঁদের পরিচয় নিচের তালিকায় রয়েছে। নারী ও পুরুষের এই বিস্তৃত পরিসরে শিক্ষক, লিখনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং সংগ্রহ-সংক্রান্ত সংবাদের বর্ণনাকারী—সব ধরনের পরিচয় রয়েছে।

পরিচয়ের ধরনউল্লিখিত ব্যক্তিরা
চার খলিফাআবু বকর, উমর, উসমান ও আলী
পাঠক ও সংরক্ষণ-সংক্রান্ত তালিকায় উল্লিখিততালহা, সাদ, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, হুজাইফা ইবনে ইয়ামান, সালিম ও আবু হুরায়রা
পাঠ, লিখন ও বর্ণনায় উল্লিখিত অন্য ব্যক্তিরাইবনে উমর, ইবনে আব্বাস, আমর ইবনুল আস, আবদুল্লাহ ইবনে আমর, মুয়াবিয়া, ইবনে যুবাইর ও আবদুল্লাহ ইবনুস সাইব
নারী পাঠক ও সংগ্রাহকদের বিবরণেআয়েশা, হাফসা, উম্মে সালামা ও উম্মে ওয়ারাকা
শিক্ষক ও সংগ্রাহকদের বিবরণেউবাই ইবনে কাব, মুআয ইবনে জাবাল, আবু হালিমা মুআয, জায়েদ ইবনে সাবিত, আবু দারদা, মুজাম্মি ইবনে জারিয়া, মাসলামা ইবনে মুখাল্লিদ ও আবু জায়েদ
অন্য পাঠক এবং সংগ্রহের সংবাদদাতাআনাস ইবনে মালিক, উকবা ইবনে আমির, তামিম আদ-দারি ও আবু মুসা আশআরি

এই দীর্ঘ তালিকার মধ্যেই “কেউ কেউ নবীর পরে সম্পূর্ণ করেছেন” কথাটি আছে। ফলে তালিকার সব নামকে মুহাম্মদের জীবদ্দশার শেষ মুহূর্তে একই সম্পূর্ণ পাঠ মুখস্থ থাকা ব্যক্তিদের সংখ্যা হিসেবে ব্যবহার করলে উৎসের বক্তব্য বদলে যায়। ব্যক্তি কোনো সময়ে কোরআনের পাঠক হয়েছেন এবং মুহাম্মদের মৃত্যুর আগে শেষ পাঠ সম্পূর্ণ করেছিলেন—দুটি দাবির সময়সীমা আলাদা। পরবর্তী জীবনে সম্পূর্ণ করা ব্যক্তির নাম প্রথম সময়সীমায় বসিয়ে দিলে সংরক্ষণের পরিসর কৃত্রিমভাবে বড় দেখানো হয়।

কোরআন শেখানোর ক্ষেত্রে বিখ্যাত সাহাবিদের সাতজনের আরেক তালিকা সুয়ূতি যাহাবির তাবাকাতুল কুররা থেকে দিয়েছেন। এখানে উসমান, আলী, উবাই, জায়েদ, ইবনে মাসউদ, আবু দারদা ও আবু মুসার নাম আছে। এর সঙ্গে উবাইয়ের কাছে আবু হুরায়রা, ইবনে আব্বাস ও আবদুল্লাহ ইবনুস সাইবের পড়া এবং জায়েদের কাছেও ইবনে আব্বাসের শেখার কথা যুক্ত হয়েছে। [109]

الْمُشْتَهِرُونَ بِإِقْرَاءِ الْقُرْآنِ مِنَ الصَّحَابَةِ سَبْعَةٌ: عُثْمَانُ وَعَلِيٌّ وَأُبَيٌّ وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ وَابْنُ مَسْعُودٍ وَأَبُو الدَّرْدَاءِ وَأَبُو مُوسَى الْأَشْعَرِيُّ كَذَا ذَكَرَهُمُ الذَّهَبِيُّ فِي طَبَقَاتِ الْقُرَّاءِ.

বাংলা অনুবাদ: সাহাবিদের মধ্যে কোরআন শেখানোর জন্য প্রসিদ্ধ সাতজন হলেন: উসমান, আলী, উবাই, জায়েদ ইবনে সাবিত, ইবনে মাসউদ, আবু দারদা ও আবু মুসা আশআরি। যাহাবি তাঁর তাবাকাতুল কুররায় তাঁদের এভাবেই উল্লেখ করেছেন।

শিক্ষক থেকে শিক্ষার্থীর কাছে পাঠ যাওয়ার এই বিবরণে মানুষের মধ্যবর্তী ভূমিকা সরাসরি দৃশ্যমান। সবাই একই পরিমাণ পাঠ একই সময়ে মুহাম্মদের কাছ থেকে সরাসরি নেননি; একজন সাহাবি আরেকজনের কাছে পড়েছেন। সেই ব্যক্তিনির্ভর শিক্ষাধারা পরে ভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়েছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সরাসরি শ্রবণ এবং পরবর্তী সম্পূর্ণকরণ একসঙ্গে গণনা করে তাঁদের অভিজ্ঞতাকে একটিমাত্র অভিন্ন ঘটনা বানানো যায় না।

বর্ণিত পরিচয়যে কাজের সংবাদ পাওয়া যায়পাঠের ইতিহাসে প্রাসঙ্গিক তথ্য
জায়েদ: ওহি লেখকমুহাম্মদের জন্য লিখন; পরে সংগ্রহের দায়িত্বলিখনের অভিজ্ঞতার পরও নতুন অনুসন্ধান
ইবনে মাসউদ: সরাসরি শিক্ষার্থীমুহাম্মদের মুখে সত্তরের বেশি সূরা শেখাসরাসরি গ্রহণের পরিমাণ সম্পর্কে নিজস্ব বক্তব্য
উবাই ও জায়েদ: শিক্ষকঅন্যান্য সাহাবিকে পাঠ শেখানোসাহাবিদের মধ্যেও শিক্ষার মধ্যবর্তী ধাপ
দীর্ঘ পাঠকতালিকার কিছু সদস্যমুহাম্মদের পরে সম্পূর্ণ করাব্যক্তির নামের সঙ্গে সময়সীমা আলাদা করে নির্ধারণ

কোনো সাহাবি বহু অংশ মুখস্থ করেছেন, তাঁর নামে সংগ্রহের বিবরণ আছে, অথবা তিনি কোরআনের শিক্ষক ছিলেন—এই তথ্য দিয়ে হাজার হাজার মানুষের কাছে একই চূড়ান্ত পাঠের অক্ষরগত অভিন্ন জ্ঞান প্রমাণিত হয় না। নামের তালিকায় কার কাছে কী শব্দে কোন অংশ ছিল, তার পূর্ণ তুলনামূলক পাঠ নেই। পরের সংগ্রহে অংশ খুঁজে আনা এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে আয়াত পাওয়ার বর্ণনা সেই ব্যক্তিনির্ভরতারই প্রকাশ। মানুষের স্মৃতি, শিক্ষকের পাঠ এবং বিচ্ছিন্ন লিখন মিলিয়েই পরবর্তী সংকলনের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।


হাড়, চামড়া, খেজুরের ডাল ও বিচ্ছিন্ন লিখিত উপকরণ

মুহাম্মদের জীবদ্দশায় কোরআনের বিভিন্ন অংশ চামড়া, পাথর, খেজুরের ডাল, পশুর হাড় এবং অন্য লিখনসামগ্রীতে লেখা হতো। কোরআন সংগ্রহের হাদিসে এই উপকরণগুলোর নাম এসেছে সরাসরি অনুসন্ধানের বস্তু হিসেবে। সংগ্রাহককে সেসব লিখিত অংশের কাছে যেতে হয়েছে, কারণ উপকরণগুলো বিভিন্ন মানুষের কাছে ছিল। মুখস্থ পাঠের পাশাপাশি মানুষের হাতে থাকা পৃথক লেখাগুলোও সংগ্রাহকের প্রয়োজন হয়েছিল। ফলে কোরআনের পার্থিব সংরক্ষণে লেখক, লিখনসামগ্রী, উপকরণের অধিকারী এবং সেগুলো জড়ো করার উদ্যোগ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ব্যক্তির কাছে কোনো অংশের লিখিত অস্তিত্ব এবং সকল অংশকে একত্র করে একটি নির্দিষ্ট গ্রন্থ তৈরি করা—এই দুই কাজের মধ্যবর্তী ব্যবধানই পরবর্তী সংকলনের প্রয়োজন ব্যাখ্যা করে।

জায়েদ ইবনে সাবিতের নামে বুখারিতে সংরক্ষিত সংগ্রহবিবরণে খেজুরের ডাল, পাতলা পাথর ও মানুষের মুখস্থ পাঠ থেকে কোরআন খোঁজার কথা রয়েছে। জায়েদের অনুসন্ধানের ভিত্তি ছিল হাতে পাওয়া লিখিত অংশ এবং মানুষের স্মৃতিতে সংরক্ষিত পাঠ। এই দুটি উৎস মিলিয়ে সংগ্রহ গড়ে উঠেছে। [110]

فَتَتَبَّعْتُ الْقُرْآنَ أَجْمَعُهُ مِنَ الْعُسُبِ وَاللِّخَافِ وَصُدُورِ الرِّجَالِ

বাংলা অনুবাদ: আমি কোরআন অনুসন্ধান করতে লাগলাম; খেজুরের ডাল, পাতলা পাথর এবং মানুষের অন্তরে সংরক্ষিত পাঠ থেকে তা সংগ্রহ করছিলাম।

ইবনে হাজর ফাতহুল বারিতে এই বর্ণনার বিভিন্ন সূত্রে ব্যবহৃত উপকরণের নাম পাশাপাশি এনেছেন। এক বর্ণনায় নলজাতীয় কাণ্ড, খেজুরের ডাল ও গোড়ার আঁশযুক্ত অংশ; অন্যটিতে রিকা, অর্থাৎ চামড়া বা কাগজজাতীয় পাতার টুকরা; আরও একটিতে সরাসরি চামড়ার টুকরা এবং অন্যটিতে সহিফার উল্লেখ রয়েছে। রিকা একটি সাধারণ পরিচয়; তার মধ্যে চামড়া এবং কাগজজাতীয় পাতাও পড়তে পারে। উপকরণের নামভেদে একই সংগ্রহকাহিনিতে একাধিক ধরনের বস্তু এসেছে। সংগ্রহের পূর্ববর্তী লিখনের বস্তুগত বৈচিত্র্য এই বিবরণে স্পষ্ট। [111]

ووقع في رواية ابن عيينة عن ابن شهاب ” القصب والعسب والكرانيف وجرائد النخل ” ووقع في رواية شعيب ” من الرقاع ” جمع رقعة ، وقد تكون من جلد أو ورق أو كاغد ، وفي رواية عمار بن غزية ” وقطع الأديم ” وفي رواية ابن أبي داود من طريق أبي داود الطيالسي عن إبراهيم بن سعد ” والصحف ” .

বাংলা অনুবাদ: ইবনে উয়াইনার সূত্রে ইবনে শিহাবের বর্ণনায় এসেছে: “নলজাতীয় কাণ্ড, খেজুরের ডাল, খেজুরডালের গোড়ার অংশ এবং খেজুরের ডালপালা।” শুআইবের বর্ণনায় এসেছে: “রিকা থেকে”; এটি রুকআর বহুবচন, যা চামড়া, পাতা বা কাগজের হতে পারে। আম্মার ইবনে গাযিয়ার বর্ণনায় এসেছে: “চামড়ার টুকরা।” ইবনে আবি দাউদের কাছে আবু দাউদ তায়ালিসি হয়ে ইবরাহিম ইবনে সাদের বর্ণনায় এসেছে: “সহিফাসমূহ।”

হাড়ের ওপর লিখন সম্পর্কেও বর্ণনাগুলোতে কয়েক ধরনের বস্তুর পরিচয় পাওয়া যায়। একই ব্যাখ্যায় উট বা ভেড়ার কাঁধের হাড়, কাঁধের হাড়ের ভাঙা টুকরা এবং পাঁজরের হাড়ের উল্লেখ রয়েছে। আবার আকতাব শব্দে উটের পিঠে বসে চড়ার জন্য ব্যবহৃত কাঠের উপকরণ বোঝানো হয়েছে। কাঁধের হাড় শুকিয়ে তাতে লেখা হতো বলেও ইবনে হাজর জানিয়েছেন। অর্থাৎ লিখনসামগ্রী তৈরিতে মানুষের হাতে বস্তুর প্রস্তুতি ও ব্যবহারও এই বিবরণের অংশ। [112]

ووقع في رواية شعيب ” والأكتاف ” جمع كتف وهو العظم الذي للبعير أو الشاة ، كانوا إذا جف كتبوا فيه . وفي رواية عمارة بن غزية ” وكسر الأكتاف ” وفي رواية ابن مجمع عن ابن شهاب عند ابن أبي داود ” والأضلاع ” وعنده من وجه آخر ” والأقتاب ” بقاف ومثناة وآخره موحدة جمع قتب بفتحتين وهو الخشب الذي يوضع على ظهر البعير ليركب عليه

বাংলা অনুবাদ: শুআইবের বর্ণনায় এসেছে: “কাঁধের হাড়সমূহ।” এটি কাতিফের বহুবচন; উট বা ভেড়ার সেই হাড় শুকিয়ে গেলে তাঁরা তাতে লিখতেন। উমারা ইবনে গাযিয়ার বর্ণনায় এসেছে: “কাঁধের হাড়ের ভাঙা টুকরা।” ইবনে আবি দাউদের কাছে ইবনে মুজাম্মির সূত্রে ইবনে শিহাবের বর্ণনায় এসেছে: “পাঁজরের হাড়সমূহ।” তাঁর কাছেই অন্য সূত্রে এসেছে: “আকতাব”; শব্দটি কাফ, তা এবং শেষে বা দিয়ে গঠিত, কাতাবের বহুবচন। এটি সেই কাঠ, যা উটের পিঠে রাখা হয় তার ওপর বসে চড়ার জন্য।

উৎসে ব্যবহৃত শব্দবস্তুর পরিচয়বর্ণনায় পাওয়া ব্যবহার বা বৈশিষ্ট্য
উসুবখেজুরের ডালপাতার অংশ সরিয়ে চওড়া স্থানে লিখন
লিখাফপাতলা পাথর বা পাথরের ফলকলেখার উপযোগী চওড়া ও পাতলা পৃষ্ঠ
রিকাবিচ্ছিন্ন টুকরা বা পাতাচামড়া, পাতা বা কাগজের হতে পারে
কিতাউল আদিমচামড়ার টুকরাচামড়ার পরিচয় সরাসরি উল্লেখিত
আকতাফ ও কিসারুল আকতাফকাঁধের হাড় ও তার ভাঙা টুকরাউট বা ভেড়ার হাড় শুকিয়ে লিখন
আদলাপাঁজরের হাড়উপকরণের আরেকটি বর্ণনাভেদ
আকতাবউটের পিঠে বসানোর কাঠকাতাবের বহুবচন; সাধারণ হাড় নয়
কাসাব ও কারানিফনলজাতীয় কাণ্ড ও খেজুরডালের গোড়ার অংশইবনে উয়াইনার সূত্রের উপকরণতালিকা

ইসলামকিউএর কোরআন লিখন ও সংগ্রহবিষয়ক উত্তরেও মানুষের কাছে পৃথক আয়াত বা সূরা লেখার বিবরণ রয়েছে। সেখানে চামড়া ও পাতলা পাথরে “কিছু আয়াত বা সূরা” লেখার কথা বলা হয়েছে। এই বিবরণে ব্যক্তিগত লিখনের একক হিসেবে এসেছে পৃথক আয়াত বা সূরা। ব্যক্তির কাছে থাকা খণ্ডিত লিখনই পরবর্তী বৃহত্তর সংগ্রহের উপাদান হয়েছে। [113]

وقليل منهم كان يكتب بعض آيات أو سور على الجلود والحجارة الرقاق ونحو ذلك.

বাংলা অনুবাদ: তাঁদের অল্প কয়েকজন চামড়া, পাতলা পাথর ও অনুরূপ উপকরণে কিছু আয়াত বা সূরা লিখতেন।

এই বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে ব্যক্তিগত সংগ্রহের অসম্পূর্ণতার সম্পর্ক রয়েছে। কারও কাছে একটি বা কয়েকটি সূরা লেখা থাকা, কারও কাছে আরও বড় অংশ থাকা এবং কারও মুখস্থ পাঠ সম্পূর্ণ হওয়া একই অবস্থা নয়। লিখিত টুকরার অধিকারী এবং দক্ষ মুখস্থকারীও সব ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি নন। সংগ্রাহককে তাই বস্তু ও ব্যক্তির কাছে যেতে হয়েছে। কোনো লেখা পড়া, তার পাঠ শনাক্ত করা, অন্য সংরক্ষিত পাঠের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণ এবং বৃহত্তর সংগ্রহে যুক্ত করা—এসবই মানুষের সম্পাদিত কাজ। “লিখিত ছিল” কথাটির আড়ালে এই সংগ্রহশ্রম মুছে দিলে কোরআন সংকলনের ঘটনাই ব্যাখ্যাতীত হয়ে পড়ে।

বুখারির বাক্যে “অনুসন্ধান করলাম” ও “সংগ্রহ করছিলাম”—দুটি সক্রিয় কাজ রয়েছে। পূর্বে লেখা বস্তুগুলো সংগ্রাহকের হাতে আগে থেকেই একত্রে সাজানো ছিল, এমন বর্ণনা বাক্যটি দেয় না; বরং কোন কোন উপকরণ ও মানুষের কাছ থেকে তিনি নিয়েছেন, তার পরিচয় দেয়। তাঁর অনুসন্ধানের পরিণতিতে পৃথক অবস্থানে থাকা পাঠ একটি নতুন সংগৃহীত রূপ পায়। এই পরিবর্তন বাণীর উপাদানগত ধারক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের পরিবর্তন: ব্যক্তির কাছে থাকা অংশ থেকে খলিফার উদ্যোগে একত্রিত সংগ্রহ। কোরআনের সংকলন-ইতিহাসে মানুষের এই হস্তক্ষেপ প্রত্যক্ষ কাজের বিবরণ হিসেবেই উপস্থিত।


কারা সম্পূর্ণ কোরআন সংগ্রহ করেছিলেন: চারজন সংগ্রাহক ও অন্য বর্ণনার তালিকা

মুহাম্মদের জীবদ্দশায় সম্পূর্ণ কোরআন কারা সংগ্রহ করেছিলেন, সে বিষয়ে আনাস ইবনে মালিকের নামে চারজনের বর্ণনা রয়েছে। ইতিহাসগ্রন্থে আরও বহু সাহাবির নাম পাওয়া যায়। সংখ্যার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সময়, তালিকায় থাকা ব্যক্তির পরিচয় এবং “সংগ্রহ” শব্দের অর্থেও পার্থক্য রয়েছে। একই নামকে কখনো পাঠক, কখনো শিক্ষক, কখনো মুখস্থকারী এবং কখনো লিখিত সংগ্রাহক হিসেবে পাওয়া যায়। পাঠশিক্ষার পরিচয়, সম্পূর্ণ মুখস্থ করার পরিচয় এবং লিখিত সংগ্রহের পরিচয় পৃথক তথ্য। চারজনের বর্ণনায় “সংগ্রহ” এবং দীর্ঘ নামতালিকায় পাঠশিক্ষার সংবাদ একই পরিসরের তথ্য দিচ্ছে না।

বুখারির ৫০০৪ নম্বর বর্ণনায় আনাসের বক্তব্য অত্যন্ত সরাসরি: মুহাম্মদ মারা যাওয়ার সময় চারজন ছাড়া অন্য কেউ কোরআন সংগ্রহ করেননি। এই তালিকায় আবু দারদা, মুআয ইবনে জাবাল, জায়েদ ইবনে সাবিত ও আবু জায়েদের নাম রয়েছে। [114]

مَاتَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَ لَمْ يَجْمَعِ الْقُرْآنَ غَيْرُ أَرْبَعَةٍ أَبُو الدَّرْدَاءِ وَمُعَاذُ بْنُ جَبَلٍ وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ وَأَبُو زَيْدٍ

বাংলা অনুবাদ: নবী মারা গেলেন, অথচ চারজন ছাড়া কেউ কোরআন সংগ্রহ করেননি: আবু দারদা, মুআয ইবনে জাবাল, জায়েদ ইবনে সাবিত ও আবু জায়েদ।

একই গ্রন্থের ঠিক আগের বর্ণনায় কাতাদা আনাসকে জিজ্ঞেস করেন, মুহাম্মদের আমলে কারা কোরআন সংগ্রহ করেছিলেন। সেখানেও উত্তর চারজন; তাঁদের সবাই আনসার। কিন্তু এই তালিকায় আবু দারদার জায়গায় উবাই ইবনে কাবের নাম রয়েছে। [115]

قَالَ سَأَلْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ ـ رضى الله عنه ـ مَنْ جَمَعَ الْقُرْآنَ عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ أَرْبَعَةٌ كُلُّهُمْ مِنَ الأَنْصَارِ أُبَىُّ بْنُ كَعْبٍ وَمُعَاذُ بْنُ جَبَلٍ، وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ، وَأَبُو زَيْدٍ.

বাংলা অনুবাদ: তিনি বলেন: আমি আনাস ইবনে মালিককে জিজ্ঞেস করলাম, নবীর আমলে কারা কোরআন সংগ্রহ করেছিলেন? তিনি বললেন: চারজন; তাঁরা সবাই আনসার—উবাই ইবনে কাব, মুআয ইবনে জাবাল, জায়েদ ইবনে সাবিত এবং আবু জায়েদ।

বর্ণনা দুটিতে তিনজনের নাম এক, একজনের নাম আলাদা। সংখ্যা চার ধরে রাখলেও সদস্যের পরিচয়ে অমিল থেকে যায়। দুটি তালিকার সব নাম একসঙ্গে নিলে পাঁচজন হন; কিন্তু কোনো একটি বর্ণনাই পাঁচজন বলছে না। সংখ্যার মিল সদস্যের অমিল দূর করে না; সংক্ষিপ্ত বর্ণনার মধ্যেই আলাদা ব্যক্তিকে সংগ্রাহক হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে। আনাসের নামে প্রচলিত বক্তব্যের মধ্যেই সদস্যসংক্রান্ত পার্থক্য সংরক্ষিত আছে। আর ৫০০৪ নম্বরের “চারজন ছাড়া কেউ নয়” কথাটি সাধারণভাবে অন্য কারও সংগ্রহ না থাকার ভাষা; ৫০০৩ নম্বরে আবার চারজনের আনসার পরিচয় রয়েছে। বর্ণনার এই শব্দ ও সদস্যপার্থক্য পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীদেরও সমাধান করতে হয়েছে।

সুয়ূতির আল-ইতকানে মুহাম্মদ ইবনে কাব কুরাযির নামে পাঁচজন আনসারের আরেকটি তালিকা এসেছে। এতে মুআয, উবাই ও আবু দারদার পাশাপাশি উবাদা ইবনে সামিত এবং আবু আইয়ুব আনসারি রয়েছেন। অথচ বুখারির উভয় তালিকায় থাকা জায়েদ ও আবু জায়েদ এখানে নেই। [116]

وَأَخْرَجَ ابْنُ أَبِي دَاوُدَ بِسَنَدٍ حَسَنٍ : عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ كَعْبٍ الْقُرَظِيِّ ، قَالَ : جَمَعَ الْقُرْآنَ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – خَمْسَةٌ مِنَ الْأَنْصَارِ : مُعَاذُ بْنُ جَبَلٍ ، وَعُبَادَةُ بْنُ الصَّامِتِ ، وَأُبَيُّ بْنُ كَعْبٍ ، وَأَبُو الدَّرْدَاءِ ، وَأَبُو أَيُّوبَ الْأَنْصَارِيُّ .

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আবি দাউদ হাসান সনদে মুহাম্মদ ইবনে কাব কুরাযি থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমলে পাঁচজন আনসার কোরআন সংগ্রহ করেছিলেন—মুআয ইবনে জাবাল, উবাদা ইবনে সামিত, উবাই ইবনে কাব, আবু দারদা এবং আবু আইয়ুব আনসারি।

শাবির নামে সংরক্ষিত তালিকায় সংখ্যা ছয়। এর পরে মুজাম্মি ইবনে জারিয়ার নাম এসেছে, যাঁর দুই বা তিনটি সূরা বাকি ছিল বলা হয়েছে। এই শেষ বিবরণটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ: পরিচিত পাঠক হওয়া সত্ত্বেও কারও সংগ্রহ অসম্পূর্ণ থাকার কথাও একই সাহিত্য সংরক্ষণ করেছে। [117]

وَأَخْرَجَ هُوَ وَابْنُ أَبِي دَاوُدَ ، عَنِ الشَّعْبِيِّ ، قَالَ : جَمَعَ الْقُرْآنَ فِي عَهْدِ النَّبِيِّ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – سِتَّةٌ : أُبَيٌّ وَزَيْدٌ وَمُعَاذٌ وَأَبُو الدَّرْدَاءِ وَسَعِيدُ بْنُ عُبَيْدٍ وَأَبُو زَيْدٍ ، وَمُجَمِّعُ بْنُ جَارِيَةَ ، وَقَدْ أَخَذَهُ إِلَّا سُورَتَيْنِ أَوْ ثَلَاثَةً .

বাংলা অনুবাদ: তিনি এবং ইবনে আবি দাউদ শাবি থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমলে ছয়জন কোরআন সংগ্রহ করেছিলেন—উবাই, জায়েদ, মুআয, আবু দারদা, সাঈদ ইবনে উবাইদ ও আবু জায়েদ। আর মুজাম্মি ইবনে জারিয়া দুই বা তিনটি সূরা ছাড়া বাকি অংশ গ্রহণ করেছিলেন।

বর্ণনা বা সংকলিত সূত্রউল্লিখিত সংখ্যাতালিকা বা অতিরিক্ত পরিচয়
বুখারি ৫০০৩; আনাসের নামেচারজনউবাই, মুআয, জায়েদ ও আবু জায়েদ; সবাই আনসার
বুখারি ৫০০৪; আনাসের নামেচারজনআবু দারদা, মুআয, জায়েদ ও আবু জায়েদ
আল-ইতকানে কুরাযির নামেপাঁচজন আনসারমুআয, উবাদা, উবাই, আবু দারদা ও আবু আইয়ুব
আল-ইতকানে শাবির নামেছয়জন; পরে আরেকজনের অসম্পূর্ণ সংগ্রহউবাই, জায়েদ, মুআয, আবু দারদা, সাঈদ ইবনে উবাইদ ও আবু জায়েদ; মুজাম্মির দুই বা তিন সূরা বাকি

উভয় বর্ণনায় থাকা আবু জায়েদের ব্যক্তিগত পরিচয় নিয়েও আল-ইতকানে আলোচনা রয়েছে। তাঁর নাম হিসেবে সাদ ইবনে উবাইদের মত উল্লেখ করে তা খণ্ডনের যুক্তি দেওয়া হয়েছে। কায়স ইবনে আবি সাসাআর নামও সম্ভাবনা হিসেবে এসেছে। এর পরে ইবনে হাজর আনাসের সূত্রে আরেকটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে নাম কায়স ইবনুস সাকান এবং আনাসের সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তার পরিচয় রয়েছে। [118]

قَالَ : ثُمَّ وَجَدْتُ عَنِ ابْنِ أَبِي دَاوُدَ مَا رَفَعَ الْإِشْكَالَ ، فَإِنَّهُ رَوَى بِإِسْنَادٍ عَلَى شَرْطِ الْبُخَارِيِّ إِلَى ثُمَامَةَ ، عَنْ أَنَسٍ : أَنَّ أَبَا زَيْدٍ الَّذِي جَمَعَ الْقُرْآنَ اسْمُهُ قَيْسُ بْنُ السَّكَنِ . قَالَ : وَكَانَ رَجُلًا مِنَّا مِنْ بَنِي عَدِيِّ بْنِ النَّجَّارِ أَحَدَ عُمُومَتِي ، وَمَاتَ وَلَمْ يَدَعْ عَقِبًا ، وَنَحْنُ وَرِثْنَاهُ .

বাংলা অনুবাদ: তিনি বলেছেন: পরে ইবনে আবি দাউদের কাছে এমন বর্ণনা পেয়েছি, যা সমস্যাটি দূর করে। তিনি বুখারির শর্ত অনুযায়ী সনদে সুমামা হয়ে আনাস থেকে বর্ণনা করেছেন: কোরআন সংগ্রহকারী আবু জায়েদের নাম কায়স ইবনুস সাকান। তিনি বলেছেন: তিনি আমাদের বনি আদি ইবনুন নাজ্জার গোত্রের একজন এবং আমার চাচাদের একজন ছিলেন। তিনি কোনো বংশধর রেখে যাননি; আমরাই তাঁর উত্তরাধিকারী হয়েছিলাম।

এখানে সংগ্রাহকের পরিচয় প্রতিষ্ঠায় আত্মীয়তা ও উত্তরাধিকারের সংবাদ ব্যবহৃত হয়েছে। বুখারির সংক্ষিপ্ত তালিকার উপনাম থেকে পূর্ণ পরিচয়ে পৌঁছাতে অন্য সূত্রের সাহায্য নিতে হচ্ছে। নামতালিকা তাই ব্যক্তিবিশেষের বিস্তারিত সংরক্ষণ-ইতিহাসের বিকল্প নয়। কার কাছ থেকে তাঁর পাঠ শেখা হয়েছিল, তাঁর নিজের সংরক্ষিত লিখিত উপকরণ কী ছিল এবং পরের সংগ্রহে সেই উপকরণ কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল—এসবের উত্তর এই পরিচয়বিবরণে নেই। ব্যক্তির পরিচয় নির্ধারণ এবং তাঁর সংরক্ষিত পাঠের ইতিহাস প্রতিষ্ঠা পৃথক অনুসন্ধান।

“জমা” বা সংগ্রহ শব্দকে শুধু লিখিত মুসহাফ ধরে নিলে এক ধরনের ইতিহাস দাঁড়ায়; শুধু মুখস্থ সম্পূর্ণ করা ধরলে আরেক ধরনের। আল-ইতকানে বাকিল্লানির নামে আনাসের বর্ণনা সমন্বয়ের একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। একটিতে সকল অবতীর্ণ পাঠরীতি সংগ্রহ, অন্যটিতে রহিত ও বহাল উভয় পাঠ জানা, আরেকটিতে মধ্যস্থতাকারী ছাড়া সরাসরি মুহাম্মদের কাছ থেকে গ্রহণ বোঝানো হয়েছে। তাঁর ষষ্ঠ ব্যাখ্যায় সংগ্রহের অর্থ লিখন; সপ্তমটিতে সম্পূর্ণ মুখস্থ করার ঘোষণা। একই বক্তব্যের অর্থ নির্ধারণেই পরবর্তী ব্যাখ্যাগুলোর এত পার্থক্য। [119]

السَّادِسُ: الْمُرَادُ بِالْجَمْعِ الْكِتَابَةُ فَلَا يَنْفِي أَنْ يَكُونَ غَيْرُهُمْ جَمَعَهُ حِفْظًا عَنْ ظَهْرِ قَلْبِهِ وَأَمَّا هَؤُلَاءِ فَجَمَعُوهُ كِتَابَةً وَحَفِظُوهُ عَنْ ظَهْرِ قَلْبٍ. السَّابِعُ: الْمُرَادُ أَنَّ أَحَدًا لَمْ يُفْصِحْ بِأَنَّهُ جَمَعَهُ بِمَعْنَى أَكْمَلَ حِفْظَهُ فِي عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَّا أُولَئِكَ بِخِلَافِ غَيْرِهِمْ فَلَمْ يُفْصِحْ بِذَلِكَ لِأَنَّ أَحَدًا مِنْهُمْ لَمْ يُكْمِلْهُ إِلَّا عِنْدَ وَفَاةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ نَزَلَتْ آخَرُ آيَةٍ فَلَعَلَّ هَذِهِ الْآيَةَ الْأَخِيرَةَ وَمَا أَشْبَهَهَا مَا حَضَرَهَا إِلَّا أُولَئِكَ الْأَرْبَعَةُ مِمَّنْ جَمَعَ جَمِيعَ الْقُرْآنِ قَبْلَهَا وَإِنْ كَانَ قَدْ حَضَرَهَا مَنْ لَمْ يَجْمَعْ غَيْرَهَا الْجَمْعُ الْكَثِيرُ.

বাংলা অনুবাদ: ষষ্ঠ: সংগ্রহ বলতে লিখন বোঝানো হয়েছে। ফলে অন্যরা মুখস্থের মাধ্যমে তা সংগ্রহ করেছিলেন—এ সম্ভাবনা নাকচ হয় না। এই ব্যক্তিরা লিখেও সংগ্রহ করেছিলেন এবং অন্তরেও মুখস্থ করেছিলেন। সপ্তম: অর্থ হলো, ওই ব্যক্তিরা ছাড়া কেউ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমলে সম্পূর্ণ মুখস্থ করার অর্থে কোরআন সংগ্রহের কথা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেননি। অন্যরা তা ঘোষণা করেননি; কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর সময়ে শেষ আয়াত নাজিল হওয়ার আগে তাঁদের কারও সংগ্রহ সম্পূর্ণ হয়নি। সম্ভবত এই শেষ আয়াত ও অনুরূপ আয়াতের সময় আগে সম্পূর্ণ কোরআন সংগ্রহকারী ওই চারজন ছাড়া অন্যরা উপস্থিত ছিলেন না; যদিও আরও অনেক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন, যাঁরা কোরআনের বাকি অংশ সম্পূর্ণ সংগ্রহ করেননি।

ষষ্ঠ ব্যাখ্যার বিষয় লিখিত সংগ্রহের সঙ্গে মুখস্থ পাঠের সমন্বয়; সপ্তমটির বিষয় শেষ আয়াতের সময় উপস্থিতি এবং সম্পূর্ণতার ঘোষণা। সপ্তম ব্যাখ্যায় “সম্ভবত” বলে একটি পরিস্থিতি প্রস্তাব করা হয়েছে। আনাসের উদ্ধৃত বক্তব্যে শেষ আয়াতের সময় এই চারজনের একক উপস্থিতির বিবরণ নেই। ফলে ব্যাখ্যাকারীর প্রস্তাবিত পরিস্থিতি আর বর্ণিত ঘটনার সংবাদ এক হয়ে যায় না। একইভাবে রহিত পাঠসহ সংগ্রহের ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে সংগ্রহের পরিসর বর্তমান পঠিত মুসহাফের চেয়েও আলাদা হবে। ব্যাখ্যাগুলো নিজেদের মধ্যেই সংগ্রহের বিষয়বস্তু, পদ্ধতি ও সময়সীমা বদলে দেয়।

চারজনের সীমিত তালিকা এবং ইতিহাসগ্রন্থের দীর্ঘ নামতালিকা উভয়ই ইসলামি সাহিত্যে রয়েছে। সেগুলোর সদস্যসংখ্যা যোগ করলেই কার কাছে কোন শব্দে কতটুকু পাঠ ছিল, তার উত্তর পাওয়া যায় না। পৃথক ব্যক্তির পাঠ, ব্যক্তিগত লিখিত উপকরণ এবং পরবর্তী সংকলনের সঙ্গে সেগুলোর পূর্ণ তুলনামূলক সম্পর্ক এই তালিকাগুলোতে অনুল্লিখিত। তাই হাজার হাজার মানুষের কাছে শেষ পাঠ অক্ষরে অক্ষরে একই ছিল—এই নির্দিষ্ট দাবির প্রমাণ হিসেবে নামের সংখ্যা অকার্যকর। তালিকায় উপস্থিতি দিয়ে অভিন্নতার প্রমাণের অভাব পূরণ হয় না। কোরআনের সংগৃহীত রূপে পৌঁছাতে ব্যক্তির স্মৃতি, বিচ্ছিন্ন লেখা এবং পরবর্তী সংগ্রাহকের সিদ্ধান্ত নির্ধারক হয়ে উঠেছে।


জীবদ্দশার সংগ্রহ ও মৃত্যুর পরে একত্রিত গ্রন্থ তৈরির সিদ্ধান্ত

মুহাম্মদের জীবদ্দশায় আয়াত লেখা ও মুখস্থ করার চর্চা ছিল। তাঁর মৃত্যুর পরে একত্রিত গ্রন্থ প্রস্তুতের উদ্যোগ এসেছে পৃথক সিদ্ধান্ত হিসেবে। এই ব্যবধানের মধ্যে চলমান ওহি, পাঠ বা বিধান রহিত হওয়ার সম্ভাবনা, বিচ্ছিন্ন লিখিত উপকরণ এবং পাঠক হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। জীবদ্দশার কোনো পর্যায়ে একজন মানুষ যতটুকু পাঠ জানতেন এবং মৃত্যুর পরে যে পাঠসমষ্টি একত্র করা হলো, তার সময়সীমা এক নয়। শেষ পর্যায়ের পাঠ কারা গ্রহণ করলেন, কোন সংগ্রহে তা যুক্ত হলো, নামাজের তিলাওয়াতে কীভাবে তা ছড়াল এবং পরের সংগ্রাহকেরা কীভাবে তা পেলেন—এসব প্রশ্ন সংকলনের বিবরণের সঙ্গেই যুক্ত।

আনাস ইবনে মালিকের নামে মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, মুহাম্মদের মৃত্যুর আগে ওহি অবতরণ অব্যাহত ছিল এবং শেষ পর্যায়ে তার পরিমাণও বেশি ছিল। হাদিস একাডেমীর বাংলা অনুবাদে মৃত্যুর দিনের কথাও এসেছে। [120] [121] [122]

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫৬। তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৭৪১৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩০১৬
৭৪১৪-(২/৩০১৬) আমর ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু বুকায়র আন নাকিদ, হাসান ইবনু আলী আল হুলওয়ানী ও ’আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) ….. আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইন্তিকালের পূর্বে ও ইন্তিকাল পর্যন্ত আল্লাহ তা’আলা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর ধারাবাহিকভাবে ওয়াহী অবতীর্ণ করেন। যেদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেন সেদিনও তার প্রতি অনেক ওয়াহী অবতীর্ণ হয়। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৭২৪৩, ইসলামিক সেন্টার ৭২৯৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

কোরআন সংকলন 8

মুসলিমের আরবি বক্তব্যে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওহির ধারাবাহিকতা এবং মৃত্যুর সময়কার প্রাচুর্য একসঙ্গে রয়েছে। সেই বর্ণনার মূল ভাষা হলো: [123]

أَنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ تَابَعَ الْوَحْىَ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَبْلَ وَفَاتِهِ حَتَّى تُوُفِّيَ وَأَكْثَرُ مَا كَانَ الْوَحْىُ يَوْمَ تُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ তাঁর রাসুলের প্রতি মৃত্যুর আগে ওহী অব্যাহত রেখেছিলেন, তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত; আর রাসুলের মৃত্যুর সময়ে ওহী ছিল সবচেয়ে বেশি।

বুখারিতে একই আনাসের বর্ণনার শেষে রয়েছে, “এর পরে রাসুলের মৃত্যু হয়।” এখানে শেষ পর্যায়ের অবতরণ এবং তার পরের মৃত্যু ধারাবাহিকভাবে বলা হয়েছে। ফলে সংগ্রহের সময়সীমার সঙ্গে সম্পর্কিত সংবাদটি হলো জীবনের শেষ পর্যায়েও ওহি আসা অব্যাহত থাকা। [124]

أَنَّ اللَّهَ، تَعَالَى تَابَعَ عَلَى رَسُولِهِ صلى الله عليه وسلم قَبْلَ وَفَاتِهِ حَتَّى تَوَفَّاهُ أَكْثَرَ مَا كَانَ الْوَحْىُ، ثُمَّ تُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بَعْدُ.

বাংলা অনুবাদ: মৃত্যুর আগে আল্লাহ তাঁর রাসুলের প্রতি ধারাবাহিকভাবে ওহি পাঠিয়েছেন, তাঁকে মৃত্যু দেওয়া পর্যন্ত; তখন ওহি অবতরণের পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি। এর পরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যু হয়।

এই সময়কাল সম্পর্কে ইসলামকিউএর ব্যাখ্যায় “দিন” বলতে মুহাম্মদের জীবনের শেষ পর্যায় বোঝানো হয়েছে। এর ফলে সর্বশেষ একটি দিনের প্রতিটি ওহির তালিকার বদলে শেষ জীবনের অবতরণকাল সামনে আসে। [125]

بل المراد بذلك الزمان الذي توفيه رسول الله صلى الله عليه وسلم ، وهو آخر عمره الشريف

বাংলা অনুবাদ: বরং এর দ্বারা সেই সময়কাল বোঝানো হয়েছে, যে সময়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যু হয়; অর্থাৎ তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়।

কোরআন মুখস্থ করার দাবি তাই একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ঘোষিত পাঠের সঙ্গে সম্পর্কিত। নতুন পাঠ এলে পূর্বের সংগ্রহে তা যুক্ত হবে; কোনো পাঠ রহিত হলে বহাল পঠিত অংশের পরিসর বদলাবে। কয়েক বছর আগে সম্পূর্ণ মুখস্থ করার পরিচয় এবং শেষ পর্যন্ত বহাল সমগ্র পাঠের জ্ঞান এক তথ্য নয়। শেষ পর্যায়ের আয়াত কারা শুনেছেন, কারা লিখেছেন, অন্যদের কাছে কে পৌঁছেছেন এবং পরে কোন উপকরণে তা পাওয়া গেছে—এই ব্যক্তিনির্ভর ধাপগুলোই চূড়ান্ত সংগ্রহের বাস্তব ভিত্তি। মুখস্থকারীর নামের সংখ্যা দিয়ে সেই প্রত্যেক ধাপের ইতিহাস প্রতিষ্ঠিত হয় না।

মুহাম্মদের মৃত্যুর সময় একত্রিত মুসহাফ না থাকার বিষয়ে জায়েদ ইবনে সাবিতের বক্তব্য ইবনে হাজর উদ্ধৃত করেছেন। বিচ্ছিন্ন আয়াত লিখনের পরেও এক স্থানে গ্রন্থরূপে সংগ্রহের কাজ অবশিষ্ট ছিল। [126] [127]

যায়েদ ইবনে সাবেত (রা) বর্ণনা করেছেনঃ “নবীজী (সা) ইন্তেকাল করলেন এবং তখনও কোরআন শরীফ এক জায়গায় একত্র করা হয় নি।”

সুয়ূতিও দিরআকুলির ফাওয়ায়িদ থেকে জায়েদের এই বক্তব্য সনদের পরিচয়সহ এনেছেন। তাঁর উদ্ধৃত ভাষায় কোরআন কোনো একটি আধারে একত্র করা হয়নি। একই সংবাদ পরবর্তী দুই গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়ে একত্রিত সংগ্রহের অনুপস্থিতির বক্তব্যটি সংরক্ষণ করেছে। [128]

قُبِضَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَمْ يَكُنِ الْقُرْآنُ جُمِعَ فِي شَيْءٍ.
বাংলা অনুবাদ: নবীর মৃত্যু হলো, অথচ কোরআন কোনো একটি আধারে একত্র করা হয়নি।

সংকলন পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে খাত্তাবির ব্যাখ্যায় বিধান অথবা তিলাওয়াত রহিত হওয়ার অপেক্ষা এসেছে। সুয়ূতি এই ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করেছেন। এতে পাঠের পরিসরই পরিবর্তনযোগ্য ছিল: আগে পঠিত কোনো অংশ পরে বহাল না-ও থাকতে পারে। [129]

إِنَّمَا لَمْ يجمع الْقُرْآنَ فِي الْمُصْحَفِ لِمَا كَانَ يَتَرَقَّبُهُ مِنْ وُرُودِ نَاسِخٍ لِبَعْضِ أَحْكَامِهِ أَوْ تِلَاوَتِهِ

বাংলা অনুবাদ: কোরআনকে মুসহাফে একত্র করা হয়নি এ কারণে যে তিনি এর কোনো কোনো বিধান বা তিলাওয়াতের রহিতকারী আসার অপেক্ষায় ছিলেন।

বিধান রহিত হওয়া এবং তিলাওয়াত রহিত হওয়া দুই ধরনের পরিবর্তন। প্রথমটিতে আগের নির্দেশের কার্যকারিতা প্রত্যাহার হয়; দ্বিতীয়টিতে আগে কোরআন হিসেবে পঠিত ভাষ্য চূড়ান্ত পঠিত সংগ্রহের বাইরে যায়। খাত্তাবির ব্যাখ্যায় উভয় সম্ভাবনাই সংকলন স্থগিত থাকার সঙ্গে যুক্ত। ফলে মুহাম্মদের জীবনের প্রতিটি পর্যায়ের ঘোষিত পাঠসমষ্টি এক ও অপরিবর্তিত ছিল—এমন ছবি এই ব্যাখ্যার সঙ্গে মেলে না। সংগ্রহ সম্পূর্ণ করার জন্য অবতরণের সমাপ্তি এবং কোন পাঠ বহাল রইল, সেই সীমা নির্ধারণ পরস্পর সম্পর্কিত হয়ে পড়েছে।

সংরক্ষণ বা পরিবর্তনের স্তরবিবরণে পাওয়া অবস্থাএকত্রিত সংগ্রহের সঙ্গে সম্পর্ক
জীবদ্দশার মুখস্থ ও লিখনসময়ে সময়ে ঘোষিত পাঠ গ্রহণনতুন পাঠে সংগ্রহের পরিসর বাড়ে
বিধান রহিত হওয়াআগের নির্দেশের কার্যকারিতা প্রত্যাহারপঠিত ভাষ্য ও কার্যকর নির্দেশের অবস্থান আলাদা হতে পারে
তিলাওয়াত রহিত হওয়াআগে পঠিত অংশের পাঠ প্রত্যাহারচূড়ান্ত পঠিত সংগ্রহের অন্তর্ভুক্তি বদলায়
মৃত্যুর পরে গ্রন্থ প্রস্তুতবিচ্ছিন্ন উপকরণ ও মুখস্থ পাঠ থেকে সংগ্রহসমাপ্ত অবতরণের পরে পাঠ একত্রিত করার উদ্যোগ

গ্রন্থরূপে সংগ্রহের সিদ্ধান্তের বর্ণনায় আবু বকর ও জায়েদের প্রাথমিক আপত্তিও রয়েছে। মুহাম্মদ কাজটি করেননি—এটাই তাঁদের আপত্তির প্রকাশ্য কারণ। একটি হাদিসে কোরআন সংকলনের কথা শুনে আবূ বাকর উমারকে বলেন, এমন কাজ কিভাবে আপনি করবেন, যে কাজ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেননি? অর্থাৎ নবী মুহাম্মদ তার জীবদ্দশায় এই কাজটি করেননি [130] [131] [132]

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-৮: কুরআনের মর্যাদা
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ – কিরাআতের ভিন্নতা ও কুরআন সংকলন প্রসঙ্গে
২২২০-[১০] যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়ামামার যুদ্ধের পর পর খলীফাতুর রসূল আবূ বকর (রাঃ) আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি গেলাম। দেখলাম ’উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) তাঁর কাছে উপবিষ্ট। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ’উমার আমার কাছে এসে খবর দিলেন, ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক কুরআনের হাফেয শহীদ হয়ে গেছেন। আমার আশংকা হয়, বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধে এভাবে হাফেয শহীদ হতে থাকলে কুরআনের অনেক অংশ লোপ পেয়ে যাবে। তাই আমি সঙ্গত মনে করি যে, আপনি কুরআনকে মাসহাফ বা কিতাব আকারে একত্রিত করতে হুকুম দেবেন। আবূ বকর (রাঃ) বলেন, আমি ’উমারকে বললাম, এমন কাজ কিভাবে আপনি করবেন, যে কাজ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেননি? ’উমার(রাঃ) উত্তরে বললেন, আল্লাহর শপথ। এটা হবে একটা উত্তম কাজ। ’উমার(রাঃ) এভাবে আমাকে বার বার বলতে লাগলেন। অতঃপর আল্লাহ এ কাজের গুরুত্ব বুঝার জন্য আমার হৃদয় খুলে দিলেন এবং আমিও এ কাজ করা সঙ্গত মনে করলাম।
যায়দ (রাঃ) বলেন, আবূ বকর (রাঃ) আমাকে বললেন, তুমি একজন বুদ্ধিমান যুবক যার ব্যাপারে আমাদের কোন সন্দেহ সংশয় নেই। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওহীও তুমি লিখতে। তাই তুমিই কুরআনের আয়াতগুলো খোঁজ করো এবং এগুলো গ্রন্থাকারে (মাসহাফ) একত্র করো। যায়দ (রাঃ) বলেন, তারা যদি আমাকে পাহাড়সমূহের কোন একটিকে স্থানান্তরের দায়িত্ব অর্পণ করতেন তা-ও আমার জন্য কুরআন একত্র করার দায়িত্ব অপেক্ষা অধিক দুঃসাধ্য হত না। যায়দ (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, যে কাজ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেননি, এমন কাজ আপনারা কী করে করবেন? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! এটা বড়ই উত্তম কাজ। মোটকথা, এভাবে আবূ বকর (রাঃ) আমাকে বার বার বলতে লাগলেন।
সর্বশেষ আল্লাহ তা’আলা আমার হৃদয়কেও এ গুরুত্ব অনুধাবন করার জন্য খুলে দিলেন, যে কাজের জন্য আবূ বকর ও ’উমারের হৃদয়কে খুলে দিয়েছিলেন। অতএব খেজুরের ডালা, সাদা পাথর, পশুর হাড়, মানুষের (হাফেযদের) অন্তর ও স্মৃতি হতে আমি কুরআনের আয়াত সংগ্রহ করতে লাগলাম। সর্বশেষ আমি সূরা আত্ তাওবার শেষাংশ, ’লাকদ জা-আকুম রসূলুম মিন আনফুসিকুম’ হতে সূরার শেষ পর্যন্ত সংগ্রহ করলাম আবূ খুযায়মাহ্ আনসারীর কাছ থেকে। এ অংশ আমি তার ছাড়া আর কারো কাছে পাইনি। যায়দ (রাঃ) বলেন, এ লিখিত সহীফাহগুলো আবূ বকর (রাঃ) এর কাছে ছিল যে পর্যন্ত আল্লাহ তাকে মৃত্যু দেননি। তারপর ছিল ’উমার (রাঃ)-এর কাছে তাঁর জীবনকাল পর্যন্ত। তারপর তাঁর কন্যা হাফসা (রাঃ)-এর কাছে ছিল। (বুখারী)[1]
[1] সহীহ : বুখারী ৪৯৮৬, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২৩৭২, সহীহ ইবনু হিববান ৪৫০৬।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ)

কোরআন সংকলন 10
কোরআন সংকলন 12

আবু বকর ও জায়েদের বক্তব্যে একই প্রশ্ন দুবার উঠেছে। আবু বকর প্রথমে উমরকে প্রশ্ন করেছেন; পরে দায়িত্ব পেয়ে জায়েদ আবু বকরের কাছে প্রশ্ন তুলেছেন। উমরের উত্তর ছিল কাজটি উত্তম। বুখারির ভাষাতেও প্রস্তাব, আপত্তি এবং কাজটিকে ভালো বলে গ্রহণের কথোপকথন রয়েছে। [50]

قُلْتُ لِعُمَرَ كَيْفَ تَفْعَلُ شَيْئًا لَمْ يَفْعَلْهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ عُمَرُ هَذَا وَاللَّهِ خَيْرٌ

বাংলা অনুবাদ: আমি উমরকে বললাম: আল্লাহর রাসুল যে কাজ করেননি, তুমি সে কাজ করবে কীভাবে? উমর বললেন: আল্লাহর শপথ, এটি ভালো কাজ।

এই কথোপকথনে একটি চূড়ান্ত গ্রন্থ তৈরি করার পক্ষে মুহাম্মদের নির্দিষ্ট নির্দেশ উদ্ধৃত হয়নি। উমর জরুরি প্রয়োজনের মূল্যায়ন করে প্রস্তাব দিয়েছেন, আবু বকর প্রথমে অনীহা দেখিয়েছেন, পরে মত বদলে দায়িত্ব দিয়েছেন। জায়েদও প্রথমে একই আপত্তি তুলেছেন, পরে সম্মতি দিয়েছেন। তাঁদের “মন খুলে যাওয়া”কে আল্লাহর কাজ বলা হয়েছে; সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে আলোচনা, মতপরিবর্তন এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পণের মাধ্যমে। কী গ্রহণ করা হবে, কোন উপকরণ খুঁজতে হবে এবং কীভাবে তা যাচাই করে সংগৃহীত গ্রন্থের অংশ করা হবে—এই কাজগুলোও দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষের সিদ্ধান্তের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আসমানি সংরক্ষণের ধর্মীয় ব্যাখ্যার পাশাপাশি বর্ণনাটি সংকলনের কর্তৃত্বকে মানুষের এই নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের ওপর স্থাপন করেছে।

ব্যক্তি ও পর্যায়বর্ণিত অবস্থান বা কাজসিদ্ধান্ত এগোনোর ধাপ
উমরের প্রস্তাবপাঠকদের মৃত্যুতে বহু অংশ হারানোর আশঙ্কাকোরআন সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়ার সুপারিশ
আবু বকরের প্রথম প্রতিক্রিয়ামুহাম্মদ করেননি বলে আপত্তিউমরের পুনরাবৃত্ত আলোচনার পরে সম্মতি
জায়েদের প্রথম প্রতিক্রিয়াএকই কারণে আপত্তি; দায়িত্বের ভার স্বীকারআবু বকরের আলোচনার পরে গ্রহণ
জায়েদের কার্যক্রমলিখিত উপকরণ ও স্মৃতি থেকে অনুসন্ধানসংগৃহীত সহিফা খলিফার কাছে রাখা

জায়েদের কাছে এই দায়িত্বের ভার পাহাড় সরানোর চেয়েও বেশি মনে হয়েছিল। তাঁর বক্তব্যে কাজটির গুরুত্ব ব্যক্তিগত অনুভূতির ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে। একজন সংগ্রাহককে যা খুঁজে আনতে হবে এবং যে সংগ্রহ পরের প্রজন্ম গ্রহণ করবে, তার দায় একই ব্যক্তির কাজের ওপর এসে পড়েছে। [133]

فَوَاللَّهِ لَوْ كَلَّفُونِي نَقْلَ جَبَلٍ مِنَ الْجِبَالِ مَا كَانَ أَثْقَلَ عَلَىَّ مِمَّا أَمَرَنِي مِنْ جَمْعِ الْقُرْآنِ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর শপথ, তাঁরা যদি আমাকে কোনো একটি পাহাড় সরানোর দায়িত্ব দিতেন, কোরআন সংগ্রহের যে নির্দেশ আমাকে দিয়েছেন, তার চেয়ে সেই দায়িত্ব আমার কাছে বেশি ভারী হতো না।

আবু বকর দায়িত্ব দেওয়ার সময় জায়েদের বয়স, বুদ্ধি, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ওহি লেখার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। সংগ্রাহক নির্বাচনের যুক্তিও তাই ব্যক্তির যোগ্যতার মূল্যায়ন থেকে এসেছে। ধর্মীয় গ্রন্থের ভবিষ্যৎ লিখিত রূপ তৈরির কাজ একজন মানুষের কর্মদক্ষতা ও বিশ্বস্ততার ওপর অর্পণ করা হয়েছে। জায়েদ কেবল নিজের জানা পাঠের কথা বলে কাজ শেষ করেননি; দায়িত্ব পাওয়ার পরে অন্যের কাছে থাকা উপকরণও অনুসন্ধান করেছেন। কোন ব্যক্তি দায়িত্ব পাবেন এবং তিনি কী সংগ্রহ করে জমা দেবেন—এই দুটি ধাপ একত্রে পরবর্তী সহিফার ভিত্তি তৈরি করেছে।

ইবনে হাজর আবু বকরের এই উদ্যোগকে ইজতিহাদ, অর্থাৎ বিচারবিবেচনাভিত্তিক সিদ্ধান্ত বলেছেন। কাজটিকে যথার্থ ও কল্যাণমূলক বলার মধ্য দিয়েই তিনি সিদ্ধান্তের মানবীয় পদ্ধতির নাম নির্দিষ্ট করেছেন। [134]

والجواب أنه لم يفعل ذلك إلا بطريق الاجتهاد السائغ الناشئ عن النصح منه لله ولرسوله ولكتابه ولأئمة المسلمين وعامتهم

বাংলা অনুবাদ: উত্তর হলো, তিনি বৈধ ইজতিহাদের পথেই এই কাজ করেছেন; আল্লাহ, তাঁর রাসুল, তাঁর কিতাব, মুসলিমদের নেতা এবং সাধারণ মুসলিমদের প্রতি কল্যাণকামনা থেকে সেই বিচারবিবেচনার উদ্ভব হয়েছে।

আবু বকরের প্রথম আপত্তি ও জায়েদের আপত্তি একই নতুন কাজকে কেন্দ্র করে উঠেছে। উমরের প্রস্তাব গ্রহণের পরই কর্তৃত্বপ্রাপ্ত সংগ্রাহক নিয়োগের বর্ণনা এসেছে। পুরোনো লিখন ছিল সংগ্রহের উপাদান; খলিফার নির্দেশে সংগৃহীত সহিফা হলো সেই উপাদান থেকে তৈরি পরবর্তী ফল। গ্রন্থ তৈরির প্রয়োজন, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং কাজের সময় নির্ধারণে রাজনৈতিক নেতৃত্ব সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। বাণীর উৎস সম্পর্কে ধর্মীয় দাবি এই প্রশাসনিক কাজগুলোকে অদৃশ্য করে না।

ইবনে আবি দাউদের সূত্রে আলীর নামে বর্ণিত প্রশংসাতেও আবু বকরকে প্রথম কোরআন সংগ্রহকারী বলা হয়েছে। ইবনে হাজর এই বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। প্রশংসার ভিত্তিই এখানে নতুন উদ্যোগটির অগ্রাধিকার। [135]

سمعت عليا يقول : أعظم الناس في المصاحف أجرا أبو بكر ، رحمة الله على أبي بكر ، هو أول من جمع كتاب الله

বাংলা অনুবাদ: আমি আলীকে বলতে শুনেছি: মুসহাফের কাজে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পুরস্কারপ্রাপ্ত আবু বকর। আবু বকরের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক; তিনিই সর্বপ্রথম আল্লাহর কিতাব সংগ্রহ করেছেন।

মুহাম্মদের মৃত্যুর পরের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও শান্ত ও বিরোধহীন ছিল না। সাকিফায় নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ, উচ্চকণ্ঠ তর্ক এবং সাদ ইবনে উবাদার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার বিবরণ উমরের বক্তব্যে রয়েছে। এই ঘটনাক্রমে খলিফা নির্বাচনের দ্বন্দ্ব সরাসরি শারীরিক সংঘাতে পৌঁছেছে। [136] [137]

فَكَثُرَ اللَّغَطُ، وَارْتَفَعَتِ الأَصْوَاتُ حَتَّى فَرِقْتُ مِنَ الاِخْتِلاَفِ. فَقُلْتُ ابْسُطْ يَدَكَ يَا أَبَا بَكْرٍ. فَبَسَطَ يَدَهُ فَبَايَعْتُهُ، وَبَايَعَهُ الْمُهَاجِرُونَ، ثُمَّ بَايَعَتْهُ الأَنْصَارُ، وَنَزَوْنَا عَلَى سَعْدِ بْنِ عُبَادَةَ فَقَالَ قَائِلٌ مِنْهُمْ قَتَلْتُمْ سَعْدَ بْنَ عُبَادَةَ. فَقُلْتُ قَتَلَ اللَّهُ سَعْدَ بْنَ عُبَادَةَ.

বাংলা অনুবাদ: হট্টগোল বেড়ে গেল এবং কণ্ঠস্বর উঁচু হতে লাগল; আমি বিরোধের আশঙ্কা করলাম। তখন বললাম: আবু বকর, আপনার হাত বাড়ান। তিনি হাত বাড়ালে আমি তাঁর হাতে বায়আত করলাম; মুহাজিররাও বায়আত করলেন, তারপর আনসাররা করলেন। আমরা সাদ ইবনে উবাদার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। তাঁদের একজন বললেন: তোমরা সাদ ইবনে উবাদাকে হত্যা করেছ। আমি বললাম: আল্লাহ সাদ ইবনে উবাদাকে হত্যা করুন।

এই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, পরবর্তী যুদ্ধ এবং পাঠক হারানোর আশঙ্কার মধ্যেই কোরআনের লিখিত অংশ সংগ্রহের দায়িত্ব মানুষ বহন করেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পরে উপকরণ খোঁজা, ব্যক্তির কাছে পাঠ পাওয়া এবং সংগৃহীত সহিফা খলিফার কাছে রাখার সংবাদ এসেছে। এই কাজগুলোর মাধ্যমে সংরক্ষণকারী ব্যক্তি ও উপকরণ থেকে খলিফার হেফাজতে একটি নতুন সংগৃহীত রূপ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত গ্রন্থটির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নির্ভর করেছে কারা সিদ্ধান্ত নিলেন, কাকে দায়িত্ব দিলেন এবং কী সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করলেন তার ওপর। মুহাম্মদের জীবদ্দশার পাঠ ও মৃত্যুর পরের একত্রিত গ্রন্থের মধ্যবর্তী ইতিহাস মানুষের এই কাজগুলো দিয়েই গঠিত।


মুহাম্মদের আয়াত ভুলে যাওয়া এবং অন্যের তিলাওয়াতে স্মরণ ফিরে পাওয়া

কোরআনে আল্লাহ নিজেই মুহাম্মদকে পাঠ করানো এবং তাঁকে ভুলে যাওয়া থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিয়েছেন। এই প্রতিশ্রুতিতে আয়াত মনে থাকার নিশ্চয়তার উৎস মুহাম্মদের স্মৃতিচর্চা থেকে সরাসরি আল্লাহর পাঠদানে স্থাপিত হয়েছে। সূরা আলার ষষ্ঠ আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাঁকে পড়িয়ে দেবেন, ফলে তিনি ভুলবেন না। [138]

আমি তোমাকে পড়িয়ে দেব, যার ফলে তুমি ভুলে যাবে না।
— Taisirul Quran
অচিরেই আমি তোমাকে পাঠ করাব, ফলে তুমি বিস্মৃত হবেনা –
— Sheikh Mujibur Rahman
আমি তোমাকে পড়িয়ে দেব অতঃপর তুমি ভুলবে না।
— Rawai Al-bayan
শীঘ্রই আমরা আপনাকে পাঠ করাব, ফলে আপনি ভুলবেন না [১] ,
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এর পরের আয়াতেই আল্লাহ যা চান, তার ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। অর্থাৎ “ভুলবে না” ঘোষণার সঙ্গে ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনাটিও পাঠের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। কী মনে থাকবে এবং কী ভুলে যেতে হবে, উভয় অবস্থার ওপর একই ঐশী ইচ্ছার কর্তৃত্ব বসানো হয়েছে। [139]

إِلَّا مَا شَآءَ ٱللَّهُ ۚ إِنَّهُۥ يَعْلَمُ ٱلْجَهْرَ وَمَا يَخْفَىٰ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ যা চান তা ছাড়া। নিশ্চয় তিনি প্রকাশ্য বিষয় এবং যা গোপন থাকে তা জানেন।

এই ব্যতিক্রমের ফলে প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব স্মৃতির নির্ভুলতার সম্পর্ক বদলে যায়। মনে থাকলে তা আল্লাহর পাঠদানের ফল; ভুলে গেলে সেই ভুলও আল্লাহর ইচ্ছার আওতায় পড়ে। দুটি বিপরীত ফলকে একই ব্যাখ্যার মধ্যে গ্রহণ করলে বাস্তবে ভুলে যাওয়ার ঘটনা দিয়ে দাবিটিকে খণ্ডনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। অথচ মানুষের স্মৃতিতে কোনো আয়াত উপস্থিত ছিল কি না, অন্যের সাহায্যে তা মনে পড়েছে কি না এবং পাঠের সময় কোনো অংশ বাদ গেছে কি না—এসব স্বতন্ত্রভাবে বর্ণিত ঘটনা। ঐশী ইচ্ছার ব্যাখ্যা সেই ঘটনাগুলোর বাস্তবতা বদলায় না।

বুখারিতে আয়েশার নামে মুহাম্মদের অন্যের তিলাওয়াত শুনে আয়াত স্মরণ করার বিবরণ রয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুদ্রিত পাঠে একই ঘটনার শব্দভেদও দেখা যায়: একটিতে স্মরণ করানো, পরেরটিতে সূরা থেকে বাদ পড়া এবং অন্যটিতে ভুলে যাওয়ার ভাষা এসেছে। [140] [141]

قَالَتْ سَمِعَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم رَجُلاً يَقْرَأُ فِي الْمَسْجِدِ فَقَالَ ” يَرْحَمُهُ اللَّهُ لَقَدْ أَذْكَرَنِي كَذَا وَكَذَا آيَةً مِنْ سُورَةِ كَذَا ” .

বাংলা অনুবাদ: তিনি বলেছেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে মসজিদে পড়তে শুনলেন। তখন বললেন: আল্লাহ তার ওপর রহমত করুন; সে আমাকে অমুক সূরার অমুক অমুক আয়াত স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

মুহাম্মদ কোরআন ভুলে যেতেন

দোয়া অধ্যায়ের বর্ণনাতেও মসজিদে অন্য ব্যক্তির পাঠ শুনে নিজের বাদ পড়া আয়াত মনে হওয়ার কথা রয়েছে। মুহাম্মদ ওই ব্যক্তির জন্য রহমত চেয়েছেন, কারণ তাঁর পাঠ শুনে আয়াতগুলো মনে পড়েছে। [142] [143]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
অধ্যায়ঃ ৬৭/ দু’আ
পরিচ্ছেদঃ ২৬৩২. আল্লাহ তা’আলার বাণীঃ তুমি দু’আ করবে …. (৯ঃ ১০৩) আর যিনি নিজেকে বাদ দিয়ে কেবল নিজের ভাই এর জন্য দু’আ করেন। আবূ মূসা (রাঃ) বলেন, নাবী (সাঃ) দু‘আ করেন, ইয়া আল্লাহ! আপনি ‘উবায়দ আবূ আমিরকে মাফ করুন। হে আল্লাহ! আপনি ‘আবদুল্লাহ ইবনু কায়সের গুনাহ মাফ করে দিন।
৫৮৯৬। উসমান ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যাক্তিকে মসজিদে কুরআন তিলাওয়াত করতে বললেন। তখন তিনি বললেনঃ আল্লাহ তার উপর রহমত করুন। সে আমাকে অমুক অমুক আয়াত স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যা আমি অমুক অমুক সূরা থেকে ভুলে গিয়েছিলাম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
Narrated `Aisha:
The Prophet (ﷺ) heard a man reciting (the Qur’an) in the mosque. He said,” May Allah bestow His Mercy on him, as he made me remember such and-such Verse which I had missed in such-and-such Sura.“

বাংলা অনুবাদে “এক ব্যক্তিকে মসজিদে কুরআন তিলাওয়াত করতে বললেন” লেখা হয়েছে। এটি ভুল অনুবাদ। আরবির “সামিআ” অর্থ শুনলেন; সেখানে পড়তে নির্দেশ দেওয়ার কথা নেই। ভুল অনুবাদটি ঘটনার সূচনাই বদলে দিয়েছে: মুহাম্মদ পাঠ শুনেছেন এবং সেই শ্রবণ থেকে স্মৃতি ফিরে পেয়েছেন। [144]

سَمِعَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم رَجُلاً يَقْرَأُ فِي الْمَسْجِدِ

বাংলা অনুবাদ: নবী এক ব্যক্তিকে মসজিদে পাঠ করতে শুনলেন।

বুখারির ৫০৩৮ নম্বর বর্ণনায় ভুলে যাওয়ার ভাষা আরও সরাসরি। এখানে রাতের বেলায় একজনকে সূরা পড়তে শোনার পরে মুহাম্মদ বলেছেন, ওই ব্যক্তি এমন আয়াতগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যেগুলো তাঁকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। [145]

قَالَتْ سَمِعَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم رَجُلاً يَقْرَأُ فِي سُورَةٍ بِاللَّيْلِ فَقَالَ ” يَرْحَمُهُ اللَّهُ لَقَدْ أَذْكَرَنِي كَذَا وَكَذَا آيَةً كُنْتُ أُنْسِيتُهَا مِنْ سُورَةِ كَذَا وَكَذَا ” .

বাংলা অনুবাদ: তিনি বলেছেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে এক ব্যক্তিকে একটি সূরা পড়তে শুনলেন। তখন বললেন: আল্লাহ তার ওপর রহমত করুন; সে আমাকে অমুক সূরার অমুক অমুক আয়াত স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যেগুলো আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

মুসলিমের বর্ণনায়ও একই সম্পর্ক পাওয়া যায়: অন্যের পাঠ শোনা, পূর্বে ভুলে যাওয়া আয়াত স্মরণ হওয়া এবং পাঠকারীর জন্য রহমত চাওয়া। হিশাম তাঁর পিতা উরওয়ার মাধ্যমে আয়েশা থেকে এই বিবরণ দিয়েছেন। বুখারি ও মুসলিমের আলোচিত পাঠগুলো একই আয়েশা–উরওয়া–হিশাম বর্ণনাধারার বিভিন্ন রূপ। শব্দভেদ থাকলেও অন্য ব্যক্তির আবৃত্তি শোনা এবং তার সাহায্যে নিজের স্মরণ ফিরে পাওয়ার ঘটনাক্রম সবগুলোতে রয়েছে। [146]

قَالَتْ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَسْتَمِعُ قِرَاءَةَ رَجُلٍ فِي الْمَسْجِدِ. فَقَالَ ” رَحِمَهُ اللَّهُ لَقَدْ أَذْكَرَنِي آيَةً كُنْتُ أُنْسِيتُهَا ” .

বাংলা অনুবাদ: তিনি বলেছেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে এক ব্যক্তির পাঠ শুনছিলেন। তখন বললেন: আল্লাহ তার ওপর রহমত করুন; সে আমাকে এমন একটি আয়াত স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যা আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

এই স্মরণ ফিরে পাওয়ার মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতার একটি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত রয়েছে। মুহাম্মদের নিজের স্মৃতিতে তখন যে অংশটি উপস্থিত ছিল না, অন্য পাঠকের আবৃত্তি তা ফিরিয়ে দিয়েছে। পাঠদাতা এবং পাঠগ্রহীতার সম্পর্ক এখানে একমুখী থাকেনি; পূর্বে গ্রহণ করা পাঠ সংরক্ষণকারী ব্যক্তিও পরে মুহাম্মদের স্মরণ পুনরুদ্ধারের মাধ্যম হয়েছেন। তাঁর স্মৃতিকে সর্বক্ষণ অভ্রান্ত বলার সঙ্গে এই ঘটনা সরাসরি সাংঘর্ষিক। স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা ও দোয়া সেই বাহ্যিক সহায়তার স্বীকৃতি বহন করে।

বর্ণনার শব্দ বা বাক্যবাংলা অর্থঘটনায় যে অবস্থার পরিচয়
আযকারানিআমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেঅন্যের আবৃত্তিতে স্মরণ ফিরে পাওয়া
আসকাততুহা বা আসকাততুহুন্নাআমি তা বা সেগুলো বাদ দিয়েছিলামপাঠে কোনো অংশ বাদ পড়া
কুনতু উনসিতুহাআমাকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিলভুলে যাওয়ার ঘটনাকে নিষ্ক্রিয় বাচ্যে বলা
বুখারি ৫০৩৭, ৫০৩৭খ, ৫০৩৮ ও ৬৩৩৫একই বর্ণনাধারার একাধিক পাঠস্মরণ, বাদ পড়া ও বিস্মৃতির শব্দভেদ

নববিও আয়েশার এই বর্ণনা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুহাম্মদের ভুলে যাওয়ার ঘটনা স্বীকার করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় ইতিমধ্যে অনুসারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া বিষয়ে এমন বিস্মৃতি ঘটতে পারে। এই ধর্মীয় সীমা নির্ধারণের মধ্যেও মুহাম্মদের নিজের স্মৃতিতে পাঠ অনুপস্থিত থাকার ঘটনাটি বহাল রয়েছে। [147]

قوله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كُنْتُ أُنْسِيتُهَا دَلِيلٌ عَلَى جَوَازِ النِّسْيَانِ عَلَيْهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيمَا قَدْ بَلَّغَهُ إِلَى الْأُمَّةِ

বাংলা অনুবাদ: তাঁর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের “আমাকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল” বক্তব্যটি প্রমাণ করে যে, তিনি উম্মতের কাছে ইতিমধ্যে যা পৌঁছে দিয়েছেন, সে বিষয়ে তাঁর ভুলে যাওয়া ঘটতে পারে।

ইবনে কাসিরের তাফসিরে বাকারা ২:১০৬-এর ব্যাখ্যায়ও ভুলে যাওয়ার বর্ণনা রয়েছে। ইবনে আব্বাসের নামে তিনি এমন ওহির কথা এনেছেন, যা রাতে নাজিল হতো এবং দিনে ভুলে যাওয়া হতো। এখানে বিস্মৃতিকে আয়াত রহিত বা ভুলিয়ে দেওয়ার ব্যাখ্যার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। [148] [149]

وقال ابن أبي حاتم : حدثنا أبي ، حدثنا ابن نفيل ، حدثنا محمد بن الزبير الحراني ، عن الحجاج يعني الجزري عن عكرمة ، عن ابن عباس ، قال : كان مما ينزل على النبي صلى الله عليه وسلم الوحي بالليل وينساه بالنهار ، فأنزل الله ، عز وجل : ( ما ننسخ من آية أو ننسها نأت بخير منها أو مثلها )

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আবি হাতিম বলেছেন: আমার পিতা আমাকে বর্ণনা করেছেন; তিনি ইবনে নুফাইল থেকে, তিনি মুহাম্মদ ইবনুয যুবাইর হাররানি থেকে, তিনি হাজ্জাজ—অর্থাৎ জাযারি—থেকে, তিনি ইকরিমা থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি এমন ওহিও রাতে নাজিল হতো, যা তিনি দিনে ভুলে যেতেন। তখন আল্লাহ নাজিল করেন: “আমি কোনো আয়াত রহিত করলে অথবা ভুলিয়ে দিলে তার চেয়ে উত্তম অথবা তার সমতুল্য নিয়ে আসি।”

মুহাম্মদ ভুলে যেতেন আল্লাহর আয়াত

ইসলামকিউএর আলোচনায় উদ্ধৃত ইসমাইলির ব্যাখ্যায় বিস্মৃতির দুটি ধরন পৃথক করা হয়েছে। একটিতে মানবীয় স্মৃতিতে ভুলে যাওয়ার পরে স্মরণ ফিরে আসে; অন্যটিতে তিলাওয়াত রহিত করার উদ্দেশ্যে আল্লাহ পাঠটি অন্তর থেকে সরিয়ে দেন। দ্বিতীয় ব্যাখ্যার ভাষা সরাসরি পাঠ প্রত্যাহারের কথা বলছে। [150] [151]

والثاني : أن يرفعه الله عن قلبه على إرادة نسخ تلاوته ، وهو المشار إليه بالاستثناء في قوله تعالى : سنقرئك فلا تنسى إلا ما شاء الله

বাংলা অনুবাদ: দ্বিতীয়টি হলো, তিলাওয়াত রহিত করার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা তাঁর অন্তর থেকে সরিয়ে দেন। আল্লাহর “আমি তোমাকে পড়িয়ে দেব, ফলে তুমি ভুলবে না—আল্লাহ যা চান তা ছাড়া” বক্তব্যের ব্যতিক্রম দ্বারা এটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

স্মৃতি থেকে সাময়িক অনুপস্থিতি এবং তিলাওয়াতের প্রত্যাহার এই ব্যাখ্যায় আলাদা পরিণতি পেয়েছে। প্রথমটিতে অন্যের পাঠ শুনে পুরোনো আয়াত ফিরে আসছে; দ্বিতীয়টিতে আগে গ্রহণ করা পাঠই বহাল তিলাওয়াতের বাইরে যাচ্ছে। ফলে “ভুলে যাওয়া” শব্দকে সর্বক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট অর্থে বসালে সংরক্ষিত বিবরণগুলোর পার্থক্য হারিয়ে যায়। স্মৃতির ঘটনা, পাঠে বাদ পড়া এবং ধর্মীয়ভাবে প্রত্যাহার বলে ব্যাখ্যা করা—এই পৃথক অবস্থাগুলোর ওপরই পরবর্তী সংগ্রহের পরিসর নির্ভর করেছে।

নামাজে আয়াত বাদ পড়ার একটি বর্ণনায় শ্রোতার নিজের অনিশ্চয়তাও প্রকাশ পেয়েছে। মিসওয়ার ইবনে ইয়াযিদের নামে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে, মুহাম্মদ নামাজে কিছু অংশ পড়েননি। একজন বিষয়টি জানালে তিনি স্মরণ করিয়ে না দেওয়ার কারণ জানতে চান। শ্রোতা বলেছিলেন, তিনি আয়াতটি রহিত হয়েছে বলে ধারণা করেছিলেন। [152]

شَهِدْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقْرَأُ فِي الصَّلاَةِ فَتَرَكَ شَيْئًا لَمْ يَقْرَأْهُ فَقَالَ لَهُ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ تَرَكْتَ آيَةَ كَذَا وَكَذَا. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” هَلاَّ أَذْكَرْتَنِيهَا “. قَالَ سُلَيْمَانُ فِي حَدِيثِهِ قَالَ كُنْتُ أُرَاهَا نُسِخَتْ.

বাংলা অনুবাদ: আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নামাজে পড়তে দেখেছি। তিনি এমন কিছু অংশ ছেড়ে দিয়েছিলেন, যা পড়েননি। এক ব্যক্তি তাঁকে বললেন: আল্লাহর রাসুল, আপনি অমুক অমুক আয়াত ছেড়ে দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তুমি আমাকে তা স্মরণ করিয়ে দিলে না কেন? সুলাইমান তাঁর বর্ণনায় বলেছেন: ওই ব্যক্তি বলেছিলেন, আমি মনে করেছিলাম তা রহিত হয়েছে।

একই দৃশ্য—মুহাম্মদ একটি আয়াত পড়েননি—থেকে শ্রোতা রহিত হওয়ার ধারণা করেছেন, আর মুহাম্মদ স্মরণ করিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। পাঠ শোনা মানুষটির কাছে শুধু বাদ পড়া দৃশ্যমান ছিল; কেন বাদ পড়ল, তা বোঝার জন্য আলাদা ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়েছে। ভুলে যাওয়া ও রহিত হওয়ার মধ্যে এই অনিশ্চয়তা কেবল পরবর্তী তাত্ত্বিক সমস্যা হিসেবে আসেনি; নামাজের পাঠ নিয়ে কথোপকথনের মধ্যেই সংরক্ষিত আছে। কোন অংশ বহাল এবং কোন অংশ আর পড়তে হবে না, সেই সিদ্ধান্ত পাঠগ্রহীতার অনুমান ও প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িয়েছে।

মুহাম্মদ ভুলে যাওয়ার ঘটনাটি কী ভাষায় বলতে হবে, সে বিষয়েও নির্দেশ দিয়েছেন। “আমি ভুলে গেছি” বলার বদলে মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে—এই ভাষা ব্যবহারের কথা রয়েছে। তাতে নিজের স্মৃতির সক্রিয় দায় থেকে ঘটনাকে বাইরের কার্যকারণে সরিয়ে বলা হয়। [153] [154]

সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৭। কুরআনের মর্যাদাসমূহ ও এতদসংশ্লিষ্ট বিষয়
পরিচ্ছদঃ ১. কুরআন সংরক্ষণে যত্নবান হওয়ার নির্দেশ, অমুক আয়াত ভুল গিয়েছি বলার অপছন্দনীয়তা ও আমাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে বলার বৈধতা প্রসঙ্গে
১৭২৭-(২২৯/…) ইবনু নুমায়র এবং ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) (শব্দাবলী তার) …. শাকীক (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) বলেছেনঃ এই পবিত্র গ্রন্থের আবার কখনো বলেছেন এ কুরআনের রক্ষণাবেক্ষণ কর। কেননা মানুষের মন থেকে তা এক পা বাঁধা চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও (অধিক বেগে) পলায়নপর। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) আরো বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন তোমরা কেউ যেন এ কথা না বলে যে, আমি (কুরআন মাজীদের) অমুক অমুক আয়াত ভুলে গিয়েছি। বরং তার থেকে আয়াতগুলো বিস্মৃত হয়ে গিয়েছে (এরূপ বলা উত্তম)। (ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৭১২, ইসলামীক সেন্টার ১৭১৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

পরের বর্ণনায় শুধু একটি আয়াতের কথা নেই; সম্পূর্ণ কোনো সূরা ভুলে যাওয়ার কথাও এই নিষেধের অন্তর্ভুক্ত। কোন বিষয়টি স্মৃতি থেকে হারিয়েছে, তার পরিমাণ আলাদা হতে পারে, কিন্তু বলার অনুমোদিত ভাষা একই থাকে। [155] [156]

সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৭। কুরআনের মর্যাদাসমূহ ও এতদসংশ্লিষ্ট বিষয়
পরিচ্ছদঃ ১. কুরআন সংরক্ষণে যত্নবান হওয়ার নির্দেশ, অমুক আয়াত ভুল গিয়েছি বলার অপছন্দনীয়তা ও আমাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে বলার বৈধতা প্রসঙ্গে
১৭২৮-(২৩০/…) মুহাম্মাদ ইবনু হাতিম (রহঃ) ….. শাকীক ইবনু সালামাহ্ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদকে বলতে শুনেছি। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেনঃ কোন ব্যক্তির পক্ষে এরূপ কথা বলা খুবই খারাপ যে, সে অমুক অমুক সূরাহ বা অমুক অমুক আয়াত ভুলে গিয়েছে। বরং বলবে যে ঐগুলো (সূরাহ বা আয়াত) তাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। (ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৭১৩, ইসলামীক সেন্টার ১৭২০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

মূল আরবিতে “নাসিতু” বা “আমি ভুলেছি” বলাকে মন্দ বলা হয়েছে, আর তার বদলে “নুসসিয়া” বা “তাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে” বলা হয়েছে। ভুলে যাওয়ার বিষয়টি আয়াত ও সূরা উভয়ের ক্ষেত্রেই স্পষ্ট। [157]

بِئْسَمَا لِلرَّجُلِ أَنْ يَقُولَ نَسِيتُ سُورَةَ كَيْتَ وَكَيْتَ أَوْ نَسِيتُ آيَةَ كَيْتَ وَكَيْتَ بَلْ هُوَ نُسِّيَ

বাংলা অনুবাদ: একজন মানুষের জন্য এ কথা বলা খুবই মন্দ যে আমি অমুক অমুক সূরা বা অমুক অমুক আয়াত ভুলে গেছি; বরং তাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে।

এই ভাষাবদল স্মৃতির ব্যর্থতা মুছে ফেলে না। আয়াত মনে না থাকা, পরে অন্যের তিলাওয়াতে মনে পড়া এবং মনে রাখার জন্য অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া—সবগুলোই মানুষের স্মৃতির নির্ভরশীল অবস্থার প্রকাশ। সূরা আলার ব্যতিক্রমের সঙ্গে এই ভাষা মিলিয়ে বিস্মৃতির দায় আল্লাহর ইচ্ছার দিকে সরিয়ে দেওয়া যায়; তাতে যে আয়াত মুহাম্মদের মনে ছিল না, তা মনে ছিল হয়ে যায় না। শব্দের মধ্যে দায় স্থানান্তর এবং বাস্তবে তথ্য ধরে রাখার ক্ষমতা পৃথক বিষয়।

মুসলিমের আরেক বর্ণনায় কোরআন স্মৃতিতে ধরে রাখার সঙ্গে নিয়মিত তিলাওয়াতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পাঠকারী রাতে ও দিনে তা পড়লে স্মরণে থাকে, আর তা নিয়ে না দাঁড়ালে ভুলে যায়। [158]

وَإِذَا قَامَ صَاحِبُ الْقُرْآنِ فَقَرَأَهُ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ ذَكَرَهُ وَإِذَا لَمْ يَقُمْ بِهِ نَسِيَهُ

বাংলা অনুবাদ: কোরআনের অধিকারী যখন তা নিয়ে দাঁড়ায় এবং রাতে ও দিনে পাঠ করে, তখন তা স্মরণে রাখে; আর তা নিয়ে না দাঁড়ালে ভুলে যায়।

বর্ণিত অবস্থাযে মাধ্যমে পাঠ ফিরে আসে বা টিকে থাকেসংরক্ষণের বাস্তব নির্ভরতা
মুহাম্মদের ভুলে যাওয়া আয়াতঅন্য পাঠকের তিলাওয়াত শোনাঅন্য মানুষের সংরক্ষিত পাঠ
নামাজে আয়াত বাদ পড়াশ্রোতার স্মরণ করিয়ে দেওয়াবাদ পড়ার কারণ বুঝে সংশোধন
মুখস্থ পাঠ ধরে রাখারাত ও দিনে পুনরাবৃত্ত তিলাওয়াতনিয়মিত শ্রম ও চর্চা
“ভুলেছি” থেকে “ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে”ঘটনা বলার ভাষা পরিবর্তনস্মৃতির অনুপস্থিতি নিজে থেকে দূর হয় না

কোরআন স্মৃতিতে ধরে রাখার সঙ্গে নিয়মিত চর্চা, অন্যের সহায়তা এবং ভুল সংশোধনের প্রয়োজন জড়িত ছিল। আয়েশার বর্ণনায় মুহাম্মদ নিজেই অন্যের পাঠের সাহায্য নিয়েছেন; নামাজে বাদ পড়া আয়াতের বর্ণনায় অনুসারীর সংশোধনের প্রয়োজন এসেছে; পুনরাবৃত্তির নির্দেশে ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা স্বীকার করা হয়েছে। তাই একজন মানুষের স্মৃতিকে সর্বক্ষণ অভ্রান্ত ধরে সংরক্ষণের নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করা প্রমাণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ব্যক্তিগত স্মরণ, সামাজিক আবৃত্তি, পরস্পরকে সংশোধন এবং অব্যাহত অনুশীলনের মাধ্যমেই পাঠ ধরে রাখার প্রক্রিয়া চলেছে।


শত্রুপ্রদেশে কোরআন নিয়ে যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা

মুহাম্মদের জীবদ্দশায় কোরআনের লিখিত অংশ ছিল এবং সেই লিখিত উপকরণ বহনের ওপর বিধিনিষেধও ছিল। লেখাগুলো শত্রুর হাতে পড়ে যেতে পারে—এই আশঙ্কায় শত্রুদের ভূখণ্ডে কোরআন নিয়ে সফর করতে নিষেধ করা হয়েছিল। ফলে লিখন ও মুখস্থের পাশাপাশি কোরআনের সংরক্ষণে ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক নিরাপত্তা এবং লিখিত উপকরণের ওপর নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও জড়িয়ে ছিল। আবদুল্লাহ ইবনে উমরের সূত্রে বুখারিতে এই নিষেধাজ্ঞার সরাসরি বর্ণনা রয়েছে। [159] [160]

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم نَهَى أَنْ يُسَافَرَ بِالْقُرْآنِ إِلَى أَرْضِ الْعَدُوِّ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরআন নিয়ে শত্রুদের ভূখণ্ডে সফর করতে নিষেধ করেছেন।

বুখারির এই সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় নিষেধটি আছে; মুসলিমের একটি বর্ণনায় নিষেধের কারণও বলা হয়েছে। সেখানে “মাখাফাতা আন ইয়ানালাহুল আদুও”—শত্রু যাতে তার নাগাল না পায়, সেই আশঙ্কা—স্পষ্টভাবে যুক্ত আছে। নিষেধের লক্ষ্য এমন একটি লিখিত বস্তু, যা বহন করা যায় এবং অন্যের দখলে যেতে পারে। [161]

أَنَّهُ كَانَ يَنْهَى أَنْ يُسَافَرَ بِالْقُرْآنِ إِلَى أَرْضِ الْعَدُوِّ مَخَافَةَ أَنْ يَنَالَهُ الْعَدُوُّ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: তিনি কোরআন নিয়ে শত্রুদের ভূখণ্ডে সফর করতে নিষেধ করতেন, শত্রু তা হাতে পেয়ে যেতে পারে—এই আশঙ্কায়।

এখানে নিরাপত্তার ব্যবস্থা হিসেবে যাত্রার পথ ও বহনের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কোরআনের লিখিত উপকরণকে শত্রুর দখল থেকে বাঁচাতে অনুসারীদের নির্দিষ্ট আচরণ করতে হয়েছে। কোনো লেখার বিষয়বস্তুকে আল্লাহর বাণী বলা আর সেই লেখাটির বস্তুগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া এক বিষয় নয়। বর্ণিত নিষেধাজ্ঞায় পবিত্রতার দাবির সঙ্গে কাগজ বা অন্য লিখন-আধারের বাস্তব অসুরক্ষাও উপস্থিত আছে; মানুষের পাহারা ও ব্যবহারবিধিই তার সুরক্ষার কার্যকর উপায়।

মুসলিমের আরেক বর্ণনায় মুহাম্মদের নিজের বক্তব্য হিসেবে অনিরাপত্তার ভাষা এসেছে: “আমি নিরাপদ মনে করছি না।” একই বর্ণনায় আইয়ুবের একটি মন্তব্যও যুক্ত আছে। মন্তব্যটি বর্ণনাকারীর; মুহাম্মদের উক্তি শেষ হওয়ার পর তাঁর নামে আলাদাভাবে তা উল্লেখ করা হয়েছে। [162]

قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ لاَ تُسَافِرُوا بِالْقُرْآنِ فَإِنِّي لاَ آمَنُ أَنْ يَنَالَهُ الْعَدُوُّ ‏” ‏ ‏.‏ قَالَ أَيُّوبُ فَقَدْ نَالَهُ الْعَدُوُّ وَخَاصَمُوكُمْ بِهِ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা কোরআন নিয়ে সফর কোরো না; কারণ শত্রু তা হাতে পেয়ে যাবে না—এ বিষয়ে আমি নিরাপদ বোধ করছি না।” আইয়ুব বলেছেন: শত্রু তো তা হাতে পেয়েছে এবং তা দিয়ে তোমাদের সঙ্গে বিতর্ক করেছে।

বর্ণনাগুলোতে নিষেধ, তার কারণ এবং সংশ্লিষ্ট মন্তব্যের ভাষা একরকম নয়। বুখারি ও মুসলিমের মালিক-সূত্রের পাঠে সংক্ষিপ্ত নিষেধ আছে; লায়স-সূত্রে শত্রুর হাতে পড়ার ভয় আছে; আইয়ুব-সূত্রে প্রত্যক্ষ উক্তি এবং আইয়ুবের পৃথক মন্তব্য আছে। সবগুলো ইবনে উমর থেকে নাফির মাধ্যমে এসেছে। একই মূল বর্ণনার এই পাঠরূপগুলোতে বিধানের বক্তব্য ক্রমে স্পষ্ট হয়, বিশেষত লিখিত কোরআনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগটি।

বর্ণনাসংরক্ষিত ভাষানিষেধ ও আশঙ্কার বিষয়
বুখারি ২৯৯০; মুসলিম ১৮৬৯ককোরআন নিয়ে শত্রুপ্রদেশে সফর নিষিদ্ধলিখিত কোরআন বহনের বিধিনিষেধ
মুসলিম ১৮৬৯খশত্রু তা হাতে পেতে পারে—এই আশঙ্কালিখিত উপকরণের দখল হারানোর ভয়
মুসলিম ১৮৬৯গ: মুহাম্মদের উক্তিশত্রুর নাগাল থেকে নিরাপদ মনে করছেন নানিরাপত্তা নিশ্চিত নয় বলে যাত্রা বন্ধ
মুসলিম ১৮৬৯গ: আইয়ুবের মন্তব্যশত্রু তা পেয়েছে এবং বিতর্ক করেছেবর্ণনাকারীর পৃথক মন্তব্য

নববি এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখিত মুসহাফের মর্যাদাহানির আশঙ্কার কথা বলেছেন। তাঁর নির্বাচিত ব্যাখ্যায় নিরাপত্তার প্রশ্নটি সামরিক শক্তির সঙ্গেও যুক্ত: এমন মুসলিম বাহিনীর মধ্যে বহন করা হচ্ছে কি না, যারা প্রতিপক্ষের ওপর প্রাধান্য ধরে রাখতে পারে। অর্থাৎ অনুমতি ও নিষেধের প্রয়োগেও বাহিনীর বাস্তব সক্ষমতা বিবেচিত হয়েছে। [163] [164]

فِيهِ : النَّهْيُ عَنِ الْمُسَافَرَةِ بِالْمُصْحَفِ إِلَى أَرْضِ الْكُفَّارِ لِلْعِلَّةِ الْمَذْكُورَةِ فِي الْحَدِيثِ ، وَهِيَ خَوْفُ أَنْ يَنَالُوهُ فَيَنْتَهِكُوا حُرْمَتَهُ ، فَإِنْ أُمِنَتْ هَذِهِ الْعِلَّةُ بِأَنْ يَدْخُلَ فِي جَيْشِ الْمُسْلِمِينَ الظَّاهِرِينَ عَلَيْهِمْ فَلَا كَرَاهَةَ وَلَا مَنْعَ مِنْهُ حِينَئِذٍ لِعَدَمِ الْعِلَّةِ

বাংলা অনুবাদ: এতে হাদিসে উল্লিখিত কারণে কাফিরদের ভূখণ্ডে মুসহাফ নিয়ে সফরের নিষেধ রয়েছে। কারণটি হলো, তারা তা হাতে পেয়ে এর মর্যাদা লঙ্ঘন করতে পারে—এই ভয়। তাদের ওপর প্রাধান্যশীল মুসলিম বাহিনীর মধ্যে প্রবেশ করার মাধ্যমে যদি এই আশঙ্কা দূর হয়, তাহলে কারণটি অনুপস্থিত থাকায় সে অবস্থায় কোনো অপছন্দনীয়তা বা নিষেধ থাকবে না।

লিখিত কোরআন কার হাতে থাকবে, সেই নিয়ন্ত্রণ পরবর্তী ফিকহেও বহাল ছিল। ইসলামকিউএ অমুসলিমের মুসহাফ স্পর্শ ও হাতে পাওয়ার নিষেধের আলোচনায় এই হাদিস ব্যবহার করেছে এবং বাজির আল-মুনতাকা থেকে আরও কঠোর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে: কেউ কোরআন নিয়ে চিন্তা করার জন্য একটি মুসহাফ চাইলেও তাকে তা পাঠানো হবে না। [165]

وَلَوْ أَنَّ أَحَدًا مِنَ الْكُفَّارِ رَغِبَ أَنْ يُرْسَلَ إِلَيْهِ بِمُصْحَفٍ يَتَدَبَّرُهُ لَمْ يُرْسَلْ إِلَيْهِ بِهِ ؛ لِأَنَّهُ نَجِسٌ جُنُبٌ وَلَا يَجُوزُ لَهُ مَسُّ الْمُصْحَفِ

বাংলা অনুবাদ: কাফিরদের কেউ যদি একটি মুসহাফ নিয়ে চিন্তা করার জন্য সেটি তার কাছে পাঠানোর আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলেও তার কাছে তা পাঠানো হবে না; কারণ সে অপবিত্র ও জানাবাতগ্রস্ত এবং তার জন্য মুসহাফ স্পর্শ করা বৈধ নয়।

এই ব্যবস্থায় বাণীর প্রচার ও লিখিত উপকরণের হস্তান্তর আলাদা নিয়ন্ত্রণের অধীনে চলে। কোরআন শোনানো যায়, অথচ লিখিত মুসহাফের দখল দেওয়া নিষিদ্ধ হতে পারে। মুসহাফ তাই শুধু আবৃত্তির সহায়ক বস্তু নয়; কারা তা ধরতে পারবে, কোথায় নিয়ে যেতে পারবে এবং কে তার নিরাপত্তা বিচার করবে—এসব ক্ষমতারও বিষয়। শত্রুপ্রদেশে বহনের নিষেধাজ্ঞা সেই নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক দলিল: লিখিত পাঠের সুরক্ষা বাস্তবে মানুষের সিদ্ধান্ত, সামরিক অবস্থা ও দখল বজায় রাখার ওপর নির্ভর করেছে।


সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি ও কোরআন হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা

কোরআনের সংরক্ষণ-ঘোষণায় রক্ষাকারী হিসেবে আল্লাহ নিজেই উপস্থিত। নাজিলের কৃতিত্ব এবং সংরক্ষণের দায়িত্ব একই ঘোষণায় তাঁর ওপর আরোপিত হয়েছে। সূরা হিজরের নবম আয়াতের ভাষায় বিষয়টি একটি নিশ্চিত অঙ্গীকার হিসেবে এসেছে। [166]

আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।

এই নিশ্চয়তার পাশে সংগ্রহের বিবরণে রয়েছে উমরের বিপরীতধর্মী বাস্তব আশঙ্কা: যুদ্ধে কোরআনের পাঠকেরা মারা যেতে থাকলে কোরআনের অনেক অংশ চলে যাবে। তাঁর প্রস্তাবের ভিত্তি ছিল সম্ভাব্য ক্ষতি ঠেকানো। মানুষের জীবনের সঙ্গে পাঠের টিকে থাকা এমনভাবে যুক্ত ছিল যে একটি যুদ্ধের মৃত্যুসংবাদ সংগ্রহের পদ্ধতি বদলে দেওয়ার প্রয়োজন তৈরি করেছিল। সংরক্ষণের ইতিহাসে এই আশঙ্কা কোনো বাইরের সমালোচকের চাপানো ধারণা নয়; আবু বকরকে সংগ্রহে রাজি করানোর জন্য উমরের নিজের যুক্তি।

মুহাম্মদের সময়ে বিভিন্ন উপকরণ ও মানুষের স্মৃতিতে ছড়িয়ে থাকা পাঠকে একত্র করার কাজটি তাই জরুরি হয়ে ওঠে। উমরের আশঙ্কা ছিল, বিভিন্ন যুদ্ধে কোরআনের পাঠকদের মৃত্যু বাড়তে থাকলে কোরআনের বড় অংশ হারিয়ে যাবে। তিনি আবু বকরকে বারবার সংগ্রহের নির্দেশ দিতে বলেন। আবু বকরের প্রাথমিক আপত্তি ছিল, মুহাম্মদ যে কাজ করেননি তা তিনি কীভাবে করবেন। আল্লাহর সংরক্ষণের ঘোষণার পাশাপাশি বাস্তব উদ্যোগের প্রস্তাবক হিসেবে উমর এবং সিদ্ধান্তগ্রহীতা হিসেবে আবু বকরকে এই বর্ণনায় পাওয়া যায়। [130] [167]

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
অধ্যায়ঃ পর্ব-৮ঃ কুরআনের মর্যাদা
পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি
পরিচ্ছদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ – কিরাআতের ভিন্নতা ও কুরআন সংকলন প্রসঙ্গে
২২২০-(১০) যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়ামামার যুদ্ধের পর পর খলীফাতুর রসূল আবূ বাকর (রাঃ) আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি গেলাম। দেখলাম ‘উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) তাঁর কাছে উপবিষ্ট। আবূ বাকর (রাঃ) বললেন, ‘উমার আমার কাছে এসে খবর দিলেন, ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক কুরআনের হাফেয শহীদ হয়ে গেছেন। আমার আশংকা হয়, বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধে এভাবে হাফেয শহীদ হতে থাকলে কুরআনের অনেক অংশ লোপ পেয়ে যাবে। তাই আমি সঙ্গত মনে করি যে, আপনি কুরআনকে মাসহাফ বা কিতাব আকারে একত্রিত করতে হুকুম দেবেন। আবূ বাকর (রাঃ) বলেন, আমি ‘উমারকে বললাম, এমন কাজ কিভাবে আপনি করবেন, যে কাজ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেননি? ‘উমার (রাঃ) উত্তরে বললেন, আল্লাহর শপথ। এটা হবে একটা উত্তম কাজ। ‘উমার (রাঃ) এভাবে আমাকে বার বার বলতে লাগলেন। অতঃপর আল্লাহ এ কাজের গুরুত্ব বুঝার জন্য আমার হৃদয় খুলে দিলেন এবং আমিও এ কাজ করা সঙ্গত মনে করলাম।
…
(বুখারী)(1)
(1) সহীহ : বুখারী ৪৯৮৬, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২৩৭২, সহীহ ইবনু হিববান ৪৫০৬।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

একই ঘটনার বুখারি-অনুবাদে কাজটির আরেকটি দিক বিস্তৃতভাবে আছে: যায়েদকে পাঠ খুঁজতে হয়েছে, উপকরণ মিলিয়ে সংগ্রহ করতে হয়েছে এবং একটি দায়িত্বের ভার বহন করতে হয়েছে। এই শ্রমের বর্ণনাতেই তাঁর পাহাড় সরানোর সঙ্গে তুলনা, নির্দিষ্ট মানুষের কাছে আয়াত পাওয়ার কথা এবং ছড়িয়ে থাকা স্মৃতি ও লেখার ওপর নির্ভরতা উপস্থিত। [168]

৪৬২১ মূসা ইবন ইসমাঈল (র)
যুদ্ধে বহু লোক শহীদ হবার পর আবু বকর সিদ্দীক (রা) আমাকে ডেকে পাঠালেন। এ সময় উমর (রা)-ও তাঁর কাছে উপস্থিত ছিলেন। উমর (রা) আমার কাছে এসে বলেছেন, ইয়ামামার যুদ্ধে শাহাদাত প্রাপ্তদের মধ্যে কারীদের সংখ্যা অনেক। আমি আশংকা করছি, এমনিভাবে যদি কারীগণ শহীদ হয়ে যান, তাহলে কুরআন শরীফের বহু অংশ হারিয়ে যাবে। অতএব আমি মনে করি যে, আপনি কুরআন সংকলনের নির্দেশ দিন। উত্তরে আমি উমর (রা)-কে বললাম, যে কাজ আল্লাহর রাসূল করেন নি, সে কাজ তুমি কিভাবে করবে? উমর (রা) এর জবাবে বললেন, আল্লাহর কসম! এটা একটা উত্তম কাজ। উমর (রা) এ কথাটি আমার কাছে বার বার বলতে থাকলে অবশেষে আল্লাহ্ তা’আলা এ কাজের জন্য আমার বক্ষকে প্রশস্ত করে দিলেন এবং এ বিষয়ে উমর যা ভাল মনে করলেন আমিও তাই করলাম। যায়দ (রা) বলেন, আবু বকর সিদ্দীক (রা) আমাকে বললেন, তুমি একজন বুদ্ধিমান যুবক। তোমার ব্যাপারে আমার কোন সংশয় নেই। অধিকন্তু তুমি রাসূল-এর ওহীর লেখক ছিলে। সুতরাং তুমি কুরআন শরীফের অংশগুলোকে তালাশ করে একত্রিত কর। আল্লাহর শপথ! তারা যদি আমাকে একটি পাহাড় এক স্থান হতে অন্যত্র সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিত, তাহলেও তা আমার কাছে কুরআন সংকলনের নির্দেশের চাইতে কঠিন বলে মনে হত না। আমি বললাম, যে কাজ রাসূল করেননি, আপনারা সে কাজ কিভাবে করবেন? তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! এটা একটা কল্যাণকর কাজ। এ কথাটি আবু বকর সিদ্দীক (রা) আমার কাছে বার বার বলতে থাকেন, অবশেষে আল্লাহ্ পাক আমার বক্ষকে প্রশস্ত ও প্রসন্ন করে দিলেন সে কাজের জন্য, যে কাজের জন্য তিনি আবু বকর এবং উমর (রা)-এর বক্ষকে প্রশস্ত ও প্রসন্ন করে দিয়েছিলেন। এরপর আমি কুরআন অনুসন্ধান কাজে আত্মনিয়োগ করলাম এবং খেজুর পাতা, প্রস্তরখণ্ড ও মানুষের বক্ষ থেকে আমি তা সংগ্রহ করতে থাকলাম। এমনকি আমি সূরা তওবার শেষাংশ আবু খুযায়মা আনসারী (রা) থেকে সংগ্রহ করলাম। এ অংশটুকু তিনি ব্যতীত আর কারো কাছে আমি পাইনি। যায়দ ইব্‌ন সাবিত (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়ামামার
আয়াতগুলো হচ্ছে এইঃ তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের কাছে এক রাসূল এসেছে। তোমাদেরকে যা বিপন্ন করে তা তাঁর জন্য কষ্টদায়ক। সে তোমাদের মঙ্গলকামী, মু’মিনদের প্রতি সে দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু।

কোরআন বিলুপ্তির আশঙ্কা ও সংকলন

উমরের আশঙ্কার মূল বাক্যে পরিমাণও নির্দিষ্ট ধরনের: “কোরআনের অনেকটা।” সেখানে শুধু কোনো একটি ব্যক্তিগত কপি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বলা হয়নি। পাঠকদের মৃত্যু থেকে পাঠের বড় অংশ হারানোর দিকে যে সম্পর্ক তিনি স্থাপন করেছেন, সেটিই সংগ্রহের সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ। [169]

وَإِنِّي أَخْشَى أَنْ يَسْتَحِرَّ الْقَتْلُ بِالْقُرَّاءِ بِالْمَوَاطِنِ، فَيَذْهَبَ كَثِيرٌ مِنَ الْقُرْآنِ

বাংলা অনুবাদ: আমার আশঙ্কা, বিভিন্ন স্থানে কোরআনের পাঠকদের মধ্যে হত্যাকাণ্ড আরও বেড়ে যাবে; ফলে কোরআনের অনেকটা চলে যাবে।

একজন পাঠকের মৃত্যু অন্য পাঠক বা লিখিত সাক্ষ্যের সাহায্যে সামাল দেওয়া সম্ভব হতে পারে; উমরের বক্তব্যে আশঙ্কা ছিল বহু পাঠকের ধারাবাহিক মৃত্যু নিয়ে। এই পার্থক্য সংরক্ষণব্যবস্থার দুর্বল জায়গাটি স্পষ্ট করে: তথ্য বিভিন্ন মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে থাকলে তাঁদের একসঙ্গে হারানো তথ্য উদ্ধারের সুযোগও কমিয়ে দেয়। উমর তাই যুদ্ধক্ষেত্রের ক্ষয়ক্ষতির সংবাদ থেকে পাঠ সংগ্রহের প্রয়োজন টেনেছেন। যুদ্ধে লোকমৃত্যু এবং পাঠের ভবিষ্যৎ পরিসর তাঁর কাছে সরাসরি সম্পর্কিত ছিল।

সুয়ূতি, ইবনে আবি দাউদের সূত্রে হাসানের মাধ্যমে আরও একটি খবর রেখেছেন। তাতে উমর একটি আয়াতের খোঁজ করলে বলা হয়, সেটি এমন একজনের কাছে ছিল যিনি ইয়ামামায় নিহত হয়েছেন। নির্দিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যু এবং আয়াত খুঁজে পাওয়ার সমস্যাকে এই বিবরণ সরাসরি পাশাপাশি রেখেছে। [170] [171]

أَنَّ عُمَرَ سَأَلَ عَنْ آيَةٍ مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَقِيلَ: كَانَتْ مَعَ فُلَانٍ قُتِلَ يَوْمَ الْيَمَامَةِ فَقَالَ: إِنَّا لِلَّهِ! وَأَمَرَ بِجَمْعِ الْقُرْآنِ

বাংলা অনুবাদ: উমর আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াত সম্পর্কে জানতে চাইলে বলা হলো: সেটি অমুকের কাছে ছিল; তিনি ইয়ামামার দিনে নিহত হয়েছেন। তখন উমর বললেন: নিশ্চয় আমরা আল্লাহরই। এরপর তিনি কোরআন সংগ্রহের নির্দেশ দিলেন।

হাসানের মাধ্যমে সংরক্ষিত এই খবরের বর্ণনাসূত্রে উমরের সময় পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। খবরটির বিষয়বস্তু হলো একটি আয়াতের অবস্থান জানতে চাওয়া, মৃত ব্যক্তির উল্লেখ এবং তার পরে সংগ্রহের নির্দেশ। আয়াতটির শব্দ বা পরিচয় এখানে দেওয়া হয়নি। ফলে এই বিবরণে যে সমস্যাটি নির্দিষ্টভাবে ধরা পড়ে, তা হলো পাঠের অবস্থান ও তার বাহকের মৃত্যুর যোগসূত্র। বুখারির সাধারণ আশঙ্কার পাশে এই খবর আয়াত খোঁজার একটি পৃথক সংকটের চিত্র বহন করে।

সুয়ূতি উদ্ধৃত ইবনুত তীনের ব্যাখ্যাতেও আবু বকরের উদ্যোগের কারণ হিসেবে পাঠবাহকদের মৃত্যুর সঙ্গে কোরআনের কিছু অংশ চলে যাওয়ার আশঙ্কা এসেছে। এক জায়গায় সংকলিত না থাকার জন্যই এই ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল বলে সেখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। [172]

لْأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ مَجْمُوعًا فِي مَوْضِعٍ وَاحِدٍ فَجَمَعَهُ فِي صَحَائِفَ مُرَتِّبًا لِآيَاتِ سُوَرِهِ عَلَى مَا وَقَّفَهُمْ عَلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

বাংলা অনুবাদ: কারণ তা এক জায়গায় একত্রিত ছিল না। তাই তিনি তা সহিফাগুলোতে একত্র করেন, এর সূরাগুলোর আয়াতগুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের যেভাবে নির্দেশ করেছিলেন সেই অনুসারে সাজিয়ে।

আবু বকর ও উসমানের দুই উদ্যোগের কারণ এই ব্যাখ্যায় পৃথক। প্রথমটির পেছনে ছিল হারানোর ভয়; দ্বিতীয়টির পেছনে পাঠের বিভিন্ন রূপ নিয়ে বিরোধ। উসমানের সময় এই বিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে একদল অন্যদের পাঠকে ভুল বলছিল। [172]

وَجَمْعُ عُثْمَانَ كَانَ لَمَّا كَثُرَ الَاخْتِلَافُ فِي وُجُوهِ القراءة حتى قرؤوه بِلُغَاتِهِمْ عَلَى اتِّسَاعِ اللُّغَاتِ فَأَدَّى ذَلِكَ بَعْضَهُمِ إِلَى تَخْطِئَةِ بَعْضٍ

বাংলা অনুবাদ: উসমানের সংগ্রহ হয়েছিল যখন পাঠের বিভিন্ন রূপ নিয়ে মতভেদ বেড়ে যায়; তারা ভাষার বিস্তৃত সুযোগ অনুসারে নিজেদের ভাষায় পড়তে থাকে। এর ফলে কেউ কেউ অন্যদের পাঠকে ভুল বলতে থাকে।

প্রথম উদ্যোগে বিচ্ছিন্ন তথ্য একত্র করে ক্ষতির ঝুঁকি কমানো হয়েছে। পরের উদ্যোগে কোন লিখিত পাঠ চলবে, তার রাষ্ট্রীয় মানদণ্ড নির্ধারিত হয়েছে। উসমান অনুমোদিত মুসহাফ পাঠানোর পাশাপাশি অন্য সহিফা ও মুসহাফ পোড়ানোর নির্দেশ দেন। যে ইতিহাসে একটি পর্যায়ে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে লেখা সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেই ইতিহাসের আরেক পর্যায়ে অনুমোদনের বাইরে থাকা লেখা ধ্বংস করা হচ্ছে। [15]

وَأَمَرَ بِمَا سِوَاهُ مِنَ الْقُرْآنِ فِي كُلِّ صَحِيفَةٍ أَوْ مُصْحَفٍ أَنْ يُحْرَقَ

বাংলা অনুবাদ: তিনি এ ছাড়া প্রত্যেক সহিফা বা মুসহাফে থাকা কোরআন পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন।

পর্যায়সমস্যা হিসেবে যা উঠে এসেছেযে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল
মুহাম্মদের জীবদ্দশাক্রমাগত অবতরণ, মুখস্থ ও বিচ্ছিন্ন লিখনওহীর অংশগুলো আবৃত্তি ও পৃথক উপকরণে সংরক্ষণ
আবু বকরের সময়পাঠকদের মৃত্যুর সঙ্গে পাঠ হারানোর আশঙ্কাউমরের প্রস্তাবে জায়েদের সংগ্রহ
উসমানের সময়আঞ্চলিক ও ব্যক্তিগত পাঠ নিয়ে বিরোধঅনুমোদিত মুসহাফ প্রস্তুত, বিতরণ ও অন্যান্য কপি ধ্বংস
পরবর্তী লিখনরীতিএকই আকৃতির অক্ষর ও স্বর নির্ধারণের সমস্যানোকতা, হরকত ও অন্যান্য পাঠচিহ্নের সংযোজন ও পরিমার্জন

একটি গ্রন্থকে বাঁচানোর জন্য ছড়িয়ে থাকা উপকরণ সংগ্রহ করা এবং অনুমোদিত রূপ প্রতিষ্ঠা করতে অন্য লিখিত সাক্ষ্য ধ্বংস করা ভিন্ন কাজ। সংগ্রহ তথ্যকে এক জায়গায় আনে; ধ্বংস তথ্যের ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব সীমিত করে। দ্বিতীয় প্রক্রিয়ায় শাসকের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে কোন কপি মানুষের হাতে থাকবে এবং কোন কপি আর তুলনা করার জন্যও পাওয়া যাবে না। “সংরক্ষণ” শব্দটি দিয়ে দুটিকে এক করে ফেললে নির্বাচন ও বর্জনের এই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মুছে যায়।

কোরআন সংরক্ষণের বাস্তব বিবরণে উদ্যোগের প্রয়োজন সৃষ্টি হয়েছে ভয়, মৃত্যু ও বিরোধ থেকে। উমর ক্ষতির আশঙ্কা করেছেন; আবু বকর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন; যায়েদ উপকরণ ও পাঠ খুঁজেছেন; উসমান পরবর্তী সময়ে মানদণ্ড স্থির করেছেন। এই কাজগুলোর ফলকে আল্লাহর কৃতিত্ব হিসেবে ঘোষণা করলে কাজের ঐতিহাসিক কর্তা বদলে যায় না। সংকলনের সাফল্য মানুষের শ্রমের দলিল; সেই সাফল্যকে অলৌকিক নিশ্চয়তার প্রমাণ বানাতে গেলে মানুষের সিদ্ধান্তের যথার্থতাকেই আগে নিশ্চিত ধরে নিতে হয়। ধর্মীয় ঘোষণাকে তার নিজের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করলে যুক্তিটি বৃত্তাকার হয়ে পড়ে।


সাত আহরুফ ও অনুমোদিত পাঠভেদ: একাধিক পাঠের প্রাথমিক ইতিহাস

মুহাম্মদের সময়ে কোরআনের একাধিক পাঠ অনুমোদিত ছিল—সাত আহরুফের বর্ণনাগুলোর কেন্দ্রীয় বক্তব্য এটি। ভিন্নভাবে শেখা পাঠকে তাঁর কাছে উপস্থিত করা হলে তিনি একাধিক রূপকেই নাজিলকৃত বলে অনুমোদন করেছেন। সেই অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ছিল সহজ পদ্ধতিতে পড়ার নির্দেশ। ফলে সংরক্ষণের প্রাথমিক বিষয়বস্তুতেই পাঠের বিকল্প উপস্থিত ছিল; কেবল পরবর্তী নকলকারীর ভুল হিসেবে এই বহুত্বের উৎস চিহ্নিত করা যায় না। মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত নির্দেশেই ভিন্ন পাঠের বৈধতা দেওয়া হয়েছে। [173] [174] [175]

সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫৩/ ফাজায়ীলুল কুরআন
পরিচ্ছদঃ ২৩৯৯. কুরআন সাত উপ (আঞ্চলিক) ভাষায় নাযিল হয়েছে।
৪৬৩০। সাঈদ উব্‌ন উফায়র (রহঃ) … উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত।
… এবারও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এভাবেও কুরআন নাযিল করা হয়েছে। এ কুরআন সাত উপ (আঞ্চলিক) ভাষায় নাযিল করা হয়েছে। সুতরাং তোমাদের জন্য যা সহজতর, সে পদ্ধতিতেই তোমরা পাঠ কর।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

কোরআন সাত উপভাষায় নাজিল

পাঠের এই অনুমোদিত বহুত্ব এবং পরবর্তী রাষ্ট্রীয় মান নির্ধারণের মধ্যে কর্তৃত্বের পরিবর্তন রয়েছে। মুহাম্মদের বক্তব্যে পাঠকের জন্য বিকল্প রাখা হয়েছিল; উসমানের সিদ্ধান্তে লিখিত মুসহাফের মান ও তার বাইরে থাকা উপকরণের পরিণতি নির্ধারিত হয়। প্রথম ব্যবস্থার পরিসর এবং পরের ব্যবস্থার সীমা সমান ছিল ধরে নিলে পাঠের ইতিহাসের পরিবর্তনটিই অদৃশ্য হয়ে যায়। একই সঙ্গে “আহরুফ” কী বোঝায়, সেই প্রশ্নে মুসলিম ব্যাখ্যাকারীদের দীর্ঘ মতভেদ প্রাথমিক বহুত্বের সুনির্দিষ্ট রূপ শনাক্ত করার সমস্যাও প্রকাশ করে।

এই বিষয়ে [176] আরো জানতে নিচের ভিডিওটি দেখতে পারেন। Dr. Shabir Ally একজন প্রখ্যাত ইসলামী গবেষক। পুরো ভিডিওটি ইউটিউবে খুঁজলেই পেয়ে যাবেন, এখানে অংশবিশেষ দেয়া হচ্ছে- ভিডিও


সাত আহরুফের বর্ণনা, ভাষা ও উপভাষার ব্যাখ্যা

ইবনে আব্বাসের সূত্রে বুখারির বর্ণনায় প্রথমে এক হরফে শিক্ষা দেওয়া এবং পরে মুহাম্মদের অনুরোধে তার সংখ্যা বাড়ানোর কথা আছে। সাত রূপের অনুমতি শুরুতেই একসঙ্গে দেওয়া হয়েছিল—এমন বিবরণ এখানে নেই; অনুরোধ এবং বাড়তি অনুমোদনের ধারাবাহিকতা রয়েছে। [177] [178]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৩/ ফাজায়ীলুল কুরআন
পরিচ্ছেদঃ ২৩৯৯. কুরআন সাত উপ (আঞ্চলিক) ভাষায় নাযিল হয়েছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৬২৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৯৯১
৪৬২৯। সাঈদ ইবনু উফায়র (রহঃ) … ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জিবরীল(আলাইহিস সালাম) আমাকে একভাবে কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। এরপর আমি তাকে অন্যভাবে পাঠ করার জন্য অনুরোধ করতে লাগলাম এবং পুনঃ পুনঃ অন্যভাবে পাঠ করার জন্য অব্যাহতভাবে অনুরোধ করতে থাকলে তিনি আমার জন্য পাঠ পদ্ধতি বাড়িয়ে যেতে লাগলেন। অবশেষে তিনি সাত উপ (আঞ্চলিক) ভাষায় তিলাওয়াত করে সমাপ্ত করলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

মূল আরবিতে ব্যবহৃত শব্দ “হরফ” এবং তার বহুবচন “আহরুফ”। বাংলা অনুবাদে “উপ আঞ্চলিক ভাষা” বসানো হয়েছে; আরবি বাক্যে নির্দিষ্ট সাত গোত্র বা সাত ভাষার নাম দেওয়া নেই। বর্ণিত অনুরোধ এবং সংখ্যাবৃদ্ধির বক্তব্যটি হলো: [179]

أَقْرَأَنِي جِبْرِيلُ عَلَى حَرْفٍ فَرَاجَعْتُهُ، فَلَمْ أَزَلْ أَسْتَزِيدُهُ وَيَزِيدُنِي حَتَّى انْتَهَى إِلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ

বাংলা অনুবাদ: জিবরাইল আমাকে এক হরফে পড়িয়েছেন। আমি তাঁর কাছে পুনরায় অনুরোধ করেছি। আমি তাঁর কাছে আরও চাইতে থাকি এবং তিনি আমাকে বাড়িয়ে দিতে থাকেন, শেষ পর্যন্ত সাত আহরুফে পৌঁছান।

এই বিবরণে পাঠের অনুমোদিত পরিসর একটি থেকে সাতটিতে প্রসারিত হয়েছে। অনুরোধ, বাড়ানো এবং শেষ পর্যন্ত একটি সংখ্যায় পৌঁছানো—তিনটি ক্রিয়াই পরিবর্তনের কথা বলছে। বহুপাঠকে এখানে পাঠচ্যুতি বলা হয়নি; তার উৎস জিবরাইলের শিক্ষাদান এবং মুহাম্মদের অনুরোধের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে একাধিক রূপের উপস্থিতি নিজেই স্বীকৃত; বিতর্কের বিষয় হয়েছে সেই রূপগুলোর প্রকৃতি এবং পরে সেগুলোর কতটা টিকেছিল।

উবাই ইবনে কাবের সূত্রে মুসলিমের বর্ণনায় অনুমতি বাড়ানোর কারণ হিসেবে অনুসারীদের অক্ষমতা এসেছে। প্রথমে এক হরফ, পরে দুই এবং তিন হরফে পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রতিবার মুহাম্মদ বলেন, তাঁর উম্মত তা পারবে না। চতুর্থবারের বক্তব্যে সাত আহরুফের যেকোনোটিতে পড়াকে সঠিক বলা হয়েছে। [180]

ثُمَّ جَاءَهُ الرَّابِعَةَ فَقَالَ إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَقْرَأَ أُمَّتُكَ الْقُرْآنَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ فَأَيُّمَا حَرْفٍ قَرَءُوا عَلَيْهِ فَقَدْ أَصَابُوا

বাংলা অনুবাদ: পরে তিনি চতুর্থবার এলেন এবং বললেন: আল্লাহ আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছেন, আপনার উম্মত যেন কোরআন সাত আহরুফে পড়ে। তারা যে হরফেই পড়ুক, সঠিক পড়েছে।

একটি মাত্র পাঠরূপ অনুসরণের দাবি থেকে একাধিক রূপের অনুমতিতে যাওয়ার কারণ এই বর্ণনায় মানুষের সক্ষমতা। অনুসারীদের পক্ষে প্রথম নির্দেশ পালন কঠিন হওয়ায় অনুমতি প্রসারিত হয়েছে। একই কথার প্রতিবার পুনরাবৃত্তি পাঠের বিধানকে আলোচনার মাধ্যমে বদলানোর একটি ঘটনাক্রম তৈরি করে। শেষ অনুমোদনে একটি রূপকে আসল এবং অন্যগুলোকে ভুল বলা হয়নি; নির্বাচিত সাতটির মধ্যে যেকোনোটি গ্রহণযোগ্য হয়েছে। এই অনুমোদন পাঠের একরূপতার দাবি সরাসরি খণ্ডন করে।

তিরমিযির বর্ণনায় সহজ করার প্রয়োজনটি আরও নির্দিষ্ট সামাজিক পরিচয়ে এসেছে। নিরক্ষর জনগোষ্ঠী, বৃদ্ধা, বৃদ্ধ, বালক, বালিকা এবং কখনো বই না-পড়া মানুষের কথা মুহাম্মদ জিবরাইলের কাছে বলেছেন। তার উত্তরে সাত আহরুফে নাজিল হওয়ার ঘোষণা রয়েছে। [181]

لَقِيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم جِبْرِيلَ فَقَالَ ‏”‏ يَا جِبْرِيلُ إِنِّي بُعِثْتُ إِلَى أُمَّةٍ أُمِّيِّينَ مِنْهُمُ الْعَجُوزُ وَالشَّيْخُ الْكَبِيرُ وَالْغُلاَمُ وَالْجَارِيَةُ وَالرَّجُلُ الَّذِي لَمْ يَقْرَأْ كِتَابًا قَطُّ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ يَا مُحَمَّدُ إِنَّ الْقُرْآنَ أُنْزِلَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ

বাংলা অনুবাদ: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরাইলের সঙ্গে দেখা করে বললেন: “জিবরাইল, আমাকে এমন এক নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর কাছে পাঠানো হয়েছে, যাদের মধ্যে বৃদ্ধা, অতিবৃদ্ধ পুরুষ, বালক, বালিকা এবং এমন মানুষও আছে যে কখনো কোনো বই পড়েনি।” তিনি বললেন: মুহাম্মদ, কোরআন সাত আহরুফে নাজিল করা হয়েছে।

সহজীকরণের এই যুক্তি ভাষা ব্যবহারের বাস্তব বৈচিত্র্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। নতুন ধর্মীয় পাঠ শেখানোর জন্য জনগোষ্ঠীর বয়স, শিক্ষা ও পাঠদক্ষতাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। একটি অপরিবর্তনীয় শব্দমালা সবাইকে একইভাবে আয়ত্ত করানোর বদলে বিকল্প রূপ গ্রহণের ব্যবস্থা বর্ণিত হয়েছে। স্বয়ং বর্ণনাগুলো যেখানে পার্থক্যকে অনুমোদনের মধ্যে রাখছে, সেখানে শুধু মুখস্থ করার উপস্থিতি থেকে সবার মুখে অক্ষরে অক্ষরে একই পাঠের সিদ্ধান্ত আসে না। কী মুখস্থ করা হয়েছিল এবং কোন রূপ অনুমোদিত ছিল—এই প্রশ্নগুলো থেকেই যায়।

মুসলিমে ইবনে আব্বাসের একই বর্ণনার শেষে ইবনে শিহাবের একটি মন্তব্য আছে। তিনি যা শুনেছেন, তা হলো সাত আহরুফের ভিন্নতা হালাল-হারামের বিরোধ তৈরি করে না। মন্তব্যটি হাদিসের শেষে তাঁর নিজের নামে দেওয়া হয়েছে। [182]

قَالَ ابْنُ شِهَابٍ بَلَغَنِي أَنَّ تِلْكَ السَّبْعَةَ الأَحْرُفَ إِنَّمَا هِيَ فِي الأَمْرِ الَّذِي يَكُونُ وَاحِدًا لاَ يَخْتَلِفُ فِي حَلاَلٍ وَلاَ حَرَامٍ

বাংলা অনুবাদ: ইবনে শিহাব বলেছেন: আমার কাছে পৌঁছেছে যে ওই সাত আহরুফ একই বিষয় সম্পর্কে, যাতে হালাল ও হারামের কোনো ভিন্নতা হয় না।

হালাল-হারামের বিধান পরস্পরবিরোধী না হওয়া এবং ভাষার অক্ষরগত অভিন্নতা পৃথক বিষয়। দুটি বাক্য একই নির্দেশ দিতে পারে, অথচ শব্দ এক নাও হতে পারে। বিধান এক থাকার বক্তব্য তাই শব্দের ভিন্নতা বাতিল করে না। এই মন্তব্যে গ্রহণযোগ্য পার্থক্যের একটি সীমা চিহ্নিত হয়েছে: পাঠভেদ থাকবে, কিন্তু তার মাধ্যমে নিষিদ্ধকে বৈধ কিংবা বৈধকে নিষিদ্ধ করা হবে না। বিধিগত সামঞ্জস্য বজায় রেখেও পাঠের ভাষা পরিবর্তিত হতে পারে।

সাত আহরুফের সুনির্দিষ্ট অর্থ নিয়ে একটি অভিন্ন ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সুয়ূতি ইবনে হিব্বানের নামে পঁয়ত্রিশটি মতের কথা উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে পাঠের ভাষাগত রূপের পাশাপাশি আদেশ, নিষেধ, হালাল, হারাম, উপমা, সুস্পষ্ট ও অস্পষ্ট বক্তব্য—এমন বিষয়বিভাগ দিয়েও আহরুফ বোঝানোর মত সংরক্ষিত আছে। [183]

قَالَ ابْنُ حِبَّانَ. اخْتَلَفَ أَهْلُ الْعِلْمِ فِي مَعْنَى الْأَحْرُفِ السَّبْعَةِ عَلَى خَمْسَةٍ وَثَلَاثِينَ قَوْلًا

বাংলা অনুবাদ: ইবনে হিব্বান বলেছেন: সাত আহরুফের অর্থ নিয়ে জ্ঞানীদের মধ্যে পঁয়ত্রিশটি মত হয়েছে।

এই মতগুলো একই সংজ্ঞার সামান্য ভাষান্তর নয়। কোথাও আহরুফ দিয়ে ভাষা বোঝানো হচ্ছে, কোথাও একই অর্থের ভিন্ন শব্দ, কোথাও বক্তব্যের বিষয়গত শ্রেণি। সাতের সংখ্যা পুনরাবৃত্ত হলেও কী গণনা করা হচ্ছে, সে প্রশ্নের উত্তর বদলে যাচ্ছে। বহুপাঠের অনুমতি সম্পর্কে বর্ণনা সংরক্ষিত থাকার পরেও তার সাতটি বিভাগের সর্বস্বীকৃত পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে শুধু সাত সংখ্যাটি উল্লেখ করে একটি সম্পূর্ণ ও নির্দিষ্ট ভাষাগত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

আবু উবাইদের ব্যাখ্যায় সাত ভাষা একই শব্দের সাতটি বিকল্প নয়; বিভিন্ন ভাষার অংশ কোরআনের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে। সুয়ূতি তাঁর বক্তব্যে কুরাইশ, হুযাইল, হাওয়াযিন ও ইয়েমেনের ভাষার নাম উল্লেখ করেছেন। [184]

وَقَالَ أَبُو عُبَيْدٍ: لَيْسَ الْمُرَادُ أَنَّ كُلَّ كَلِمَةٍ تُقْرَأُ عَلَى سَبْعِ لُغَاتٍ بَلِ اللُّغَاتُ السَّبْعُ مُفَرَّقَةٌ فِيهِ فَبَعْضُهُ بِلُغَةِ قُرَيْشٍ وَبَعْضُهُ بِلُغَةِ هُذَيْلٍ وَبَعْضُهُ بِلُغَةِ هَوَازِنَ وَبَعْضُهُ بِلُغَةِ الْيَمَنِ وَغَيْرِهِمْ

বাংলা অনুবাদ: আবু উবাইদ বলেছেন: উদ্দেশ্য এই নয় যে প্রত্যেক শব্দ সাত ভাষায় পড়া হবে; বরং সাত ভাষা এর মধ্যে ছড়িয়ে আছে। এর কিছু কুরাইশের ভাষায়, কিছু হুযাইলের ভাষায়, কিছু হাওয়াযিনের ভাষায় এবং কিছু ইয়েমেনি ও অন্যদের ভাষায়।

বিভিন্ন ভাষার শব্দ একটি গ্রন্থের বিভিন্ন জায়গায় থাকা এবং একই জায়গায় বিকল্প শব্দ পড়ার অনুমতি দুটি আলাদা ব্যবস্থা। আবু উবাইদের সংজ্ঞায় প্রথমটি এসেছে। শব্দের বিকল্পের ব্যাখ্যায় দ্বিতীয়টি আসে। ফলে “সাত ভাষা” বলার পরেও ভাষাগত উপাদানের বৈচিত্র্য বোঝানো হচ্ছে, নাকি একই আয়াতের পাঠভেদ বোঝানো হচ্ছে—সেই পার্থক্য বজায় থাকে।

সুয়ূতি আরেকটি ব্যাখ্যায় একই বা নিকটার্থক বক্তব্যের জন্য ভিন্ন শব্দ ব্যবহারের উদাহরণ দিয়েছেন। এই মত সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা, ইবনে জারির ও ইবনে ওয়াহবের নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে পার্থক্য কেবল টান, স্বর বা উচ্চারণের ভঙ্গিতে সীমাবদ্ধ নয়; পৃথক শব্দ রয়েছে। [185]

أَنَّ الْمُرَادَ سَبْعَةُ أَوْجُهٍ مِنَ الْمَعَانِي الْمُتَّفِقَةِ بِأَلْفَاظٍ مُخْتَلِفَةٍ نَحْوَ أَقْبِلْ وَتَعَالَ وَهَلُمَّ وَعَجِّلْ وَأَسْرِعْ

বাংলা অনুবাদ: উদ্দেশ্য হলো একই অর্থের জন্য ভিন্ন শব্দের সাত রূপ; যেমন আকবিল, তাআল, হালুম্মা, আজ্জিল ও আসরি—এদিকে এসো, এসো, এগিয়ে এসো, তাড়াতাড়ি করো ও দ্রুত এসো।

এই উদাহরণে নির্দেশের সাধারণ উদ্দেশ্য কাছাকাছি থাকলেও শব্দগুলো এক নয়। একটি শব্দকে অন্য উচ্চারণে বলা এবং তার জায়গায় অন্য শব্দ ব্যবহার করার মধ্যে সরাসরি পার্থক্য আছে। একই অর্থ বহন করা তাই শব্দগত অপরিবর্তনীয়তার প্রমাণ নয়। বিপরীতভাবে, এই ব্যাখ্যায় মূলত স্বীকার করা হচ্ছে যে অর্থের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে একাধিক শব্দরূপ গ্রহণযোগ্য হতে পারে। “অর্থ একই” যুক্তিটি শব্দবদলের স্বীকারোক্তিকেই বহন করে।

আবু দাউদের বর্ণনায় আল্লাহর গুণবাচক শব্দের বিকল্পও আছে। উবাইয়ের সূত্রে বর্ণিত বক্তব্যে “সামিআন আলিমান” এবং “আজিজান হাকিমান” এসেছে; শাস্তির আয়াত রহমত দিয়ে বা রহমতের আয়াত শাস্তি দিয়ে শেষ না করার শর্তও দেওয়া হয়েছে। [186]

ثُمَّ قَالَ لَيْسَ مِنْهَا إِلاَّ شَافٍ كَافٍ إِنْ قُلْتَ سَمِيعًا عَلِيمًا عَزِيزًا حَكِيمًا مَا لَمْ تَخْتِمْ آيَةَ عَذَابٍ بِرَحْمَةٍ أَوْ آيَةَ رَحْمَةٍ بِعَذَابٍ

বাংলা অনুবাদ: পরে তিনি বললেন: এর প্রতিটিই আরোগ্যদায়ক ও যথেষ্ট; তুমি সামিআন আলিমান—সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ—অথবা আজিজান হাকিমান—পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়—বললেও, যতক্ষণ শাস্তির আয়াত রহমত দিয়ে কিংবা রহমতের আয়াত শাস্তি দিয়ে শেষ না করো।

শ্রবণ ও জ্ঞানের গুণবাচক শব্দ এবং ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার গুণবাচক শব্দ একই শব্দের উচ্চারণভেদ নয়। তাদের নির্দিষ্ট অর্থও অভিন্ন নয়। একই সত্তার ভিন্ন গুণ বোঝালেই ভাষাগত পার্থক্য দূর হয়ে যায় না। হাদিসের শর্তটি দেখায়, অর্থগত পরিসরের একটি সীমা ধরে বিকল্পকে গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ডে অর্থের সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে; প্রতিটি স্থানে একই অক্ষর অপরিহার্য ছিল—এমন ব্যবস্থা এই বর্ণনা প্রকাশ করে না।

আবুল ফজল রাজির নামে সুয়ূতি উদ্ধৃত আরেক শ্রেণিবিন্যাসে সাত ধরনের পার্থক্যের মধ্যে ব্যাকরণ, হ্রাস-সংযোজন এবং শব্দের স্থানবদলও আছে। ছয়টি বিভাগের পরে সপ্তম বিভাগে উচ্চারণগত রূপগুলো আলাদাভাবে রাখা হয়েছে। [187]

الْأَوَّلُ: اخْتِلَافُ الْأَسْمَاءِ مِنْ إِفْرَادٍ وَتَثْنِيَةٍ وَجَمْعٍ وتذكير وتأنيث. الثاني: اخْتِلَافُ تَصْرِيفِ الْأَفْعَالِ مِنْ مَاضٍ وَمُضَارِعٍ وَأَمْرٍ. الثَّالِثُ: وُجُوهُ الْإِعْرَابِ. الرَّابِعُ: النَّقْصُ وَالزِّيَادَةُ. الْخَامِسُ: التَّقْدِيمُ وَالتَّأْخِيرُ. السَّادِسُ: الْإِبْدَالُ.

বাংলা অনুবাদ: প্রথম: বিশেষ্যপদের একবচন, দ্বিবচন, বহুবচন এবং পুরুষবাচক ও স্ত্রীবাচকের পার্থক্য। দ্বিতীয়: ক্রিয়ার অতীত, বর্তমান-ভবিষ্যৎ ও আদেশরূপের পার্থক্য। তৃতীয়: বিভক্তির বিভিন্ন রূপ। চতুর্থ: হ্রাস ও সংযোজন। পঞ্চম: আগে-পরে স্থান পরিবর্তন। ষষ্ঠ: প্রতিস্থাপন।

এই শ্রেণিবিন্যাসে ধ্বনিগত ভঙ্গির পাশে ভাষার গঠনগত পার্থক্যও গণনা করা হয়েছে। একবচনের জায়গায় বহুবচন, ক্রিয়ার রূপবদল কিংবা কোনো উপাদানের উপস্থিতি-অনুপস্থিতি বাক্যের তথ্য ও গঠনের অংশ। শুধু আঞ্চলিক টান দিয়ে এসব বিভাগের পরিচয় দেওয়া যায় না। পৃথক বিভাগ হিসেবে এগুলো রাখার মধ্যেই উচ্চারণের ভঙ্গি এবং শব্দ-বাক্যের গঠনকে আলাদা করা হয়েছে। সাত আহরুফের ব্যাখ্যার ইতিহাস তাই শব্দগত ও গঠনগত পার্থক্যের আলোচনাও বহন করে।

বর্ণনা বা ব্যাখ্যাভিন্নতার উদাহরণপাঠের প্রকৃতি
ইবনে আব্বাসের বর্ণনাএক হরফ থেকে সাত আহরুফে অনুমতি বৃদ্ধিএকাধিক রূপের অনুমোদন
আবু উবাইদের ব্যাখ্যাবিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন গোত্রের ভাষার উপাদানগ্রন্থের মধ্যে ভাষাগত বৈচিত্র্য
সুয়ূতি উদ্ধৃত নিকটার্থক শব্দের ব্যাখ্যাআকবিল, তাআল, হালুম্মাকাছাকাছি নির্দেশে পৃথক শব্দ
আবু দাউদের বর্ণনাসামিআন আলিমান; আজিজান হাকিমানপৃথক গুণবাচক শব্দ
ইবনে শিহাবের মন্তব্যহালাল-হারামের বিরোধ না হওয়াবিধানগত সামঞ্জস্যের সীমা

ইবনে হাজরও সাত আহরুফের অর্থ হিসেবে প্রত্যেক শব্দ বা বাক্যের সাতটি পাঠ থাকার কথা বলেননি। তাঁর ব্যাখ্যায় কোনো একটি শব্দে পাঠরূপের সর্বোচ্চ সংখ্যা সাত পর্যন্ত পৌঁছানোর কথা আছে। ফলে সাত আহরুফের ঘোষণা থেকেই সাতটি পূর্ণাঙ্গ, সমান্তরাল কোরআনের তালিকা পাওয়া যায় না। [188]

أَيْ عَلَى سَبْعَةِ أَوْجُهٍ يَجُوزُ أَنْ يُقْرَأَ بِكُلِّ وَجْهٍ مِنْهَا ، وَلَيْسَ الْمُرَادُ أَنَّ كُلَّ كَلِمَةٍ وَلَا جُمْلَةٍ مِنْهُ تُقْرَأُ عَلَى سَبْعَةِ أَوْجُهٍ

বাংলা অনুবাদ: অর্থাৎ সাত রূপে, যার প্রত্যেক রূপে পড়া বৈধ। উদ্দেশ্য এই নয় যে এর প্রত্যেক শব্দ বা বাক্য সাতভাবে পড়া হবে।

এই ব্যাখ্যায় ভিন্নতার অবস্থান নির্দিষ্ট শব্দ বা পাঠস্থানে; পুরো গ্রন্থকে সাতটি গোত্রের সাতটি সম্পূর্ণ সংস্করণে ভাগ করা হয়নি। কোথাও বিকল্পের সংখ্যা দুই, কোথাও বেশি হতে পারে। প্রতিটি শব্দে সাত বিকল্প না থাকলেও একাধিক শব্দরূপের অনুমোদন বহাল থাকে। অনুমোদিত পার্থক্যের পরিসর নিয়ে ব্যাখ্যার ভিন্নতা তাই পাঠের একরূপতা প্রতিষ্ঠা করে না; কোন জায়গায় কী ধরনের বিকল্প ছিল, সেই অনুসন্ধানের প্রয়োজনই প্রকাশ করে।

পরবর্তী সাত কিরাআতও সাত আহরুফের সমার্থক নয়। ইবনে তাইমিয়্যা এই পার্থক্য স্পষ্ট করেছেন এবং সাত পাঠকের কিরাআত একত্র করার ক্ষেত্রে ইবনে মুজাহিদের ভূমিকা উল্লেখ করেছেন। নাজিলের সময়ের অনুমোদনের সংখ্যা এবং পরে নির্দিষ্ট পাঠকদের পরম্পরা নির্বাচনের সংখ্যা মিলে গেলেই তাদের পরিচয় এক হয়ে যায় না। [189]

أَنَّ الْأَحْرُفَ السَّبْعَةَ الَّتِي ذَكَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّ الْقُرْآنَ أُنْزِلَ عَلَيْهَا لَيْسَتْ هِيَ قِرَاءَاتِ الْقُرَّاءِ السَّبْعَةِ الْمَشْهُورَةَ

বাংলা অনুবাদ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সাত আহরুফে কোরআন নাজিল হওয়ার কথা বলেছেন, তা প্রসিদ্ধ সাত পাঠকের কিরাআত নয়।

পরিভাষাযা বোঝানো হচ্ছে
সাত আহরুফমুহাম্মদের নামে বর্ণিত একাধিক অনুমোদিত পাঠরূপ; সুনির্দিষ্ট অর্থ নিয়ে বহু মত
গোত্রীয় ভাষা বা উপভাষাআহরুফ ব্যাখ্যার একটি ভাষাগত মত; সব ব্যাখ্যার একমাত্র সংজ্ঞা নয়
সাত কিরাআতপরে নির্দিষ্ট সাত পাঠকের সঙ্গে যুক্ত নির্বাচিত পাঠপরম্পরা

ইসলামকিউএর ব্যাখ্যাতেও শব্দের পার্থক্য স্বীকার করা হয়েছে। তাদের নির্বাচিত সংজ্ঞায় সাত আহরুফ হলো পাঠের সাত রূপ, যার শব্দ আলাদা এবং অর্থ কখনো একই হতে পারে। [190]

أنها سبعة أوجه من القراءة تختلف باللفظ وقد تتفق بالمعنى

বাংলা অনুবাদ: এগুলো পাঠের সাত রূপ, যা শব্দে ভিন্ন এবং অর্থে একই হতে পারে।

সাত আহরুফের ইতিহাসে ভিন্ন শব্দ ও ভিন্ন পাঠের বৈধতা ধর্মীয় কর্তৃত্ব দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সহজ করার কারণ, অনুরোধের পরে অনুমতি বৃদ্ধি, নিকটার্থক শব্দের ব্যাখ্যা এবং গুণবাচক শব্দের বিকল্প—সবগুলোতেই ভাষাগত বহুত্ব রয়েছে। পরবর্তী লিখিত মানকে এই বহুত্বের সঙ্গে অক্ষরে অক্ষরে অভিন্ন ধরে নেওয়ার ভিত্তি নেই। কোন বিকল্প পড়া যেত, কোনটি লিখিত মানে স্থান পেল এবং কার সিদ্ধান্তে সেই সীমা বদলাল—এই ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়েই কোরআনের গৃহীত পাঠের পরিসর নির্ধারিত হয়েছে।


উমর ও হিশামের ভিন্ন পাঠ এবং উভয় পাঠের অনুমোদন

ভিন্ন কোরআন পাঠ শুনে উমরের প্রতিক্রিয়া শুধু বিস্ময় বা মৌখিক আপত্তিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। সূরা ফুরকান পড়ার সময় হিশাম ইবনে হাকিমকে আক্রমণ করার ইচ্ছা, নামাজ শেষে তাঁর গলায় কাপড় পেঁচিয়ে ধরা, মিথ্যাবাদী বলা এবং মুহাম্মদের কাছে টেনে নিয়ে যাওয়ার বিবরণ উমরের নিজের বক্তব্যেই রয়েছে। মুহাম্মদের কাছ থেকে শেখা নিজের পাঠকে তিনি অন্যের পাঠ বাতিল করার মানদণ্ড বানিয়েছিলেন। অথচ বিচার শেষে হিশামের পাঠও নাজিলকৃত বলে অনুমোদন পায়। [191]

৪৬২৬ সাঈদ ইব্‌ন উফায়র (র)
উমর ইবন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হিশাম ইবন হাকীম (রা)-কে রাসূল-এর জীবদ্দশায় সূরা ফুরকান তিলাওয়াত করতে শুনেছি এবং গভীর মনোযোগ সহকারে আমি তাঁর কিরাআত শুনেছি। তিনি বিভিন্নভাবে কিরাআত পাঠ করেছেন; অথচ রাসূল আমাকে এভাবে শিক্ষা দেননি। এ কারণে সালাতের মাঝে আমি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উদ্যত হয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু বড় কষ্টে নিজেকে সামলে নিলাম। তারপর সে সালাম ফিরালে আমি চাদর দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে ধরলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, তোমাকে এ সূরা যেভাবে পাঠ করতে শুনলাম, এভাবে তোমাকে কে শিক্ষা দিয়েছে? সে বলল, রাসূল -ই আমাকে এভাবে শিক্ষা দিয়েছেন। আমি বললাম, তুমি মিথ্যা বলছ। কারণ, তুমি যে পদ্ধতিতে পাঠ করেছ, এর থেকে ভিন্ন পদ্ধতিতে রাসূল আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন। এরপর আমি তাকে জোর করে টেনে রাসূল-এর কাছে নিয়ে গেলাম এবং বললাম, আপনি আমাকে সূরা ফুরকান যে পদ্ধতিতে পাঠ করতে শিখিয়েছেন এ লোককে আমি এর থেকে ভিন্ন পদ্ধতিতে তা পাঠ করতে শুনেছি। এ কথা শুনে রাসূল বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। হিশাম, তুমি পাঠ করে শোনাও। তারপর সে সেভাবেই পাঠ করে শোনাল, যেভাবে আমি তাকে পাঠ করতে শুনেছি। তখন আল্লাহর রাসূল বললেন, এভাবেই নাযিল করা হয়েছে। এরপর বললেন, হে উমর! তুমিও পড়। সুতরাং আমাকে তিনি যেভাবে শিক্ষা দিয়েছেন, সেভাবেই আমি পাঠ করলাম। এবারও রাসূল বললেন, এভাবেও কুরআন নাযিল করা করা হয়েছে। এ কুরআন সাত উপ (আঞ্চলিক) ভাষায় নাযিল করা হয়েছে। সুতরাং তোমাদের জন্য যা সহজতর, সে পদ্ধতিতেই তোমরা পাঠ কর।

কোরআন সংকলন 18

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আরেক অনলাইন নম্বরায়নে একই বর্ণনা ৪৬৩০ নম্বরে পাওয়া যায়। সেখানে উমরের অভিযোগ, হিশামের জবাব এবং দুই পাঠের অনুমোদন পূর্ণভাবে রয়েছে। হিশাম নিজের পাঠকে মুহাম্মদের শেখানো বলেছিলেন; উমর সেই দাবিই মিথ্যা বলেছিলেন। বিরোধটি তাই শুধু কণ্ঠস্বরের ভঙ্গি পছন্দ না হওয়ার ছিল না; কার শেখা পাঠের নবুয়তি অনুমোদন আছে, সেটি নিয়েই সংঘাত হয়েছিল। [173] [175]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৩/ ফাজায়ীলুল কুরআন
পরিচ্ছেদঃ ২৩৯৯. কুরআন সাত উপ (আঞ্চলিক) ভাষায় নাযিল হয়েছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৬৩০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৯৯২
৪৬৩০। সাঈদ উব্ন উফায়র (রহঃ) … উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হিশাম ইবনু হাকীম (রাঃ) কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় সূরা ফুরকান তিলাওয়াত করতে শুনেছি এবং গভীর মনোযোগ সহকারে আমি তার কিরাআত শুনেছি। তিনি বিভিন্নভাবে কিরাআত পাঠ করেছেন; অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এভাবে শিক্ষা দেননি। এ কারনে সালাত (নামায/নামাজ)-এর মাঝে আমি তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উদ্যত হয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু বড় কষ্টে নিজেকে সামলে নিলাম। তারপর সে সালাম ফিরালে আমি চাঁদর দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে ধরলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, তোমাকে এ সূরা যে ভাবে পাঠ করতে শুনলাম, এভাবে তোমাকে কে শিক্ষা দিয়েছে? সে বলল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই আমাকে এভাবে শিক্ষা দিয়েছেন। আমি বললাম, তুমি মিথ্যা বলছ। কারন, তুমি যে পদ্ধতিতে পাঠ করেছ, এর থেকে ভিন্ন পদ্ধতিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন।
এরপর আমি তাকে জোর করে টেনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে নিয়ে গেলাম এবং বললাম, আপনি আমাকে সূরা ফুরকান যে পদ্ধতেত পাঠ করতে শিখিয়েছেন এ লোককে আমি এর থেকে ভিন্ন পদ্ধতিতে তা পাঠ করতে শুনেছি। এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। হিশাম, তুমি পাঠ করে শোনাও। তারপর সে সেভাবেই পাঠ করে শোনাল, যেভাবে আমি তাকে পাঠ করতে শুনেছি। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এভাবেই নাযিল করা হয়েছে। এরপর বললেন, হে উমর! তুমিও পড়। সুতরাং আমাকে তিনি যেভাবে শিক্ষা দিয়েছেন, সেভাবেই আমি পাঠ করলাম। এবারও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এভাবেও কুরআন নাযিল করা হয়েছে। এ কুরআন সাত উপ (আঞ্চলিক) ভাষায় নাযিল করা হয়েছে। সুতরাং তোমাদের জন্য যা সহজতর, সে পদ্ধতিতেই তোমরা পাঠ কর।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)

উমরের বিচারের ভিত্তি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত শিক্ষালাভ: মুহাম্মদ তাঁকে যেভাবে শিখিয়েছেন, হিশাম সেভাবে পড়ছেন না। সেখান থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, হিশাম মুহাম্মদের কাছ থেকে শেখার দাবি করে মিথ্যা বলছেন। এই সিদ্ধান্তে নিজের জানা পাঠের বাইরে অনুমোদিত আরেকটি পাঠ থাকার সম্ভাবনাই স্বীকৃতি পায়নি। মুহাম্মদ পরে হিশামের পাঠ অনুমোদন করায় উমরের সেই অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হয়। হিশামের ওপর চাপ প্রয়োগের আগে অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

বুখারি একই ঘটনাকে বিরোধসংক্রান্ত অধ্যায়েও রেখেছেন। সেখানে উমরের বক্তব্যে নামাজের মধ্যে তাড়াহুড়া করে হস্তক্ষেপ করার ইচ্ছা এবং পরে রিদা ধরে নিয়ে যাওয়ার কথা আছে। একই ঘটনার এই গ্রন্থস্থান ও বর্ণনারূপে পাঠবিরোধের সঙ্গে জবরদস্তির যোগসূত্র বজায় রয়েছে। [192]

وَكِدْتُ أَنْ أَعْجَلَ عَلَيْهِ، ثُمَّ أَمْهَلْتُهُ حَتَّى انْصَرَفَ، ثُمَّ لَبَّبْتُهُ بِرِدَائِهِ فَجِئْتُ بِهِ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم

বাংলা অনুবাদ: আমি প্রায় তাঁর ওপর তাড়াহুড়া করে হস্তক্ষেপ করতে যাচ্ছিলাম। পরে তিনি শেষ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। এরপর তাঁর রিদা ঘাড়ের কাছে ধরে তাঁকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে এলাম।

“লাব্বাবতুহু বিরিদাইহি” কথাটির অর্থ নববি স্পষ্ট করেছেন: ঘাড়ের কাছে রিদার জড়ো করা অংশ ধরে তা দিয়ে টেনে আনা। ফলে ঘটনাটির শারীরিক দিক অনুবাদের কল্পিত সংযোজন নয়; ধ্রুপদী ব্যাখ্যাতেও ঘাড়ে ধরার সঙ্গে টেনে আনার সম্পর্ক রয়েছে। [193]

أَخَذْتُ بِمَجَامِعِ رِدَائِهِ فِي عُنُقِهِ وَجَرَرْتُهُ بِهِ

বাংলা অনুবাদ: আমি তাঁর ঘাড়ের কাছে রিদার জড়ো করা অংশ ধরেছি এবং তা দিয়ে তাঁকে টেনে এনেছি।

ভিন্ন পাঠকে অপরাধ ধরে শারীরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং পরে সেই পাঠই বৈধ বলে ঘোষিত হওয়া—দুটি ঘটনা একই বর্ণনার মধ্যে আছে। এখানে উমরের দৃঢ় বিশ্বাস নির্ভুল জ্ঞানের সমার্থক হয়নি। তাঁর নিজের শেখার স্মৃতি ঠিক থাকলেও অন্যের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তটি ভুল হয়েছে। একটি পাঠ জানা এবং অনুমোদিত সব পাঠ জানা পৃথক ক্ষমতা; উমরের আচরণে প্রথমটিকে দ্বিতীয়টির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করার ফল দেখা যায়।

মুসলিমের সংক্ষিপ্ত বর্ণনান্তরেও নামাজের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ার ইচ্ছার ভাষা আছে। উমর নামাজের মাঝখানে তা করেননি; সালাম পর্যন্ত নিজেকে সামলেছিলেন। অপেক্ষার পরে হিশামকে ধরে আনার কথাটি পূর্ণ বর্ণনায় রয়েছে। [194]

فَكِدْتُ أُسَاوِرُهُ فِي الصَّلاَةِ فَتَصَبَّرْتُ حَتَّى سَلَّمَ

বাংলা অনুবাদ: আমি প্রায় নামাজের মধ্যেই তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিলাম; পরে তিনি সালাম দেওয়া পর্যন্ত নিজেকে সামলালাম।

বুখারি ২৪১৯ ও মুসলিম ৮১৮ক-তে মালিকের মাধ্যমে এবং বুখারি ৪৯৯২ ও মুসলিম ৮১৮খ-তে অন্য শাখার মাধ্যমে উমরের এই একই ঘটনার বিবরণ এসেছে। বিবরণগুলোর সাধারণ স্তরে উরওয়া ও ইবনে শিহাব রয়েছেন। একাধিক গ্রন্থে থাকা একই ঘটনাতেই কখনো সংক্ষিপ্ত, কখনো বিস্তৃত ভাষা সংরক্ষিত হয়েছে। পাঠের পার্থক্য, হিশামকে ধরে আনা, মুহাম্মদের সামনে দুই পাঠ শোনানো এবং উভয়ের অনুমোদন—এই ধারাবাহিকতা সেগুলোতে বজায় আছে।

ঘটনার ধাপউমরের অবস্থান বা আচরণপরবর্তী ফল
হিশামের পাঠ শোনানিজের শেখা পাঠের সঙ্গে মিল পাননিপাঠভেদ শনাক্ত হয়
শিক্ষকের পরিচয় জানতে চাওয়াহিশামের মুহাম্মদের কাছে শেখার দাবি প্রত্যাখ্যানমিথ্যাবাদী বলে অভিযোগ
নামাজ শেষ হওয়ারিদা ধরে শারীরিক নিয়ন্ত্রণমুহাম্মদের কাছে নিয়ে যাওয়া
হিশামের পাঠ পরীক্ষাযে পাঠে আপত্তি, সেটিই শোনানো হয়মুহাম্মদের অনুমোদন
উমরের পাঠ পরীক্ষানিজের শেখা পাঠ শোনানএই পাঠও অনুমোদিত
শেষ নির্দেশএকাধিক নাজিলকৃত রূপের স্বীকৃতিসহজটি পড়ার অনুমতি

মুহাম্মদের প্রথম নির্দেশ ছিল হিশামকে ছেড়ে দেওয়া। এর পরে তিনি যে পাঠ শুনলেন, তা উমর আগে শুনে আপত্তি করেছিলেন সেই পাঠই। মুসলিমের বর্ণনায় হিশাম নিজের পাঠ বদলে উমরের মতো পড়েছেন—এমন ঘটনা নেই; শোনা পাঠটির অনুমোদন রয়েছে। পরে উমর পড়লে তাঁর পাঠও একইভাবে অনুমোদিত হয়। [195]

فَقَرَأَ الْقِرَاءَةَ الَّتِي سَمِعْتُهُ يَقْرَأُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ هَكَذَا أُنْزِلَتْ ‏”‏ ‏.‏ ثُمَّ قَالَ لِيَ ‏”‏ اقْرَأْ ‏”‏ ‏.‏ فَقَرَأْتُ فَقَالَ ‏”‏ هَكَذَا أُنْزِلَتْ

বাংলা অনুবাদ: তিনি সেই পাঠই পড়লেন, যা আমি তাঁকে পড়তে শুনেছিলাম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “এভাবেই নাজিল হয়েছে।” পরে আমাকে বললেন: “পড়ো।” আমি পড়লাম। তিনি বললেন: “এভাবেই নাজিল হয়েছে।”

ফলে হিশামের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের নিষ্পত্তি হলো তাঁর পড়া পাঠকে বাতিল না করেই। উমর ও হিশাম উভয়েই নিজেদের শেখা রূপে থাকলেন, আর উভয় রূপের ওপর নাজিল হওয়ার স্বীকৃতি দেওয়া হলো। এই ঘটনায় একটি অভিন্ন রূপ উদ্ধার করে ভুল পাঠ সংশোধনের বদলে অনুমোদিত পার্থক্য স্বীকার করা হয়েছে। মুহাম্মদের শিক্ষাদানকে একটিমাত্র সর্বব্যাপী অভিন্ন উচ্চারণে সীমাবদ্ধ ধরলে এই দ্বৈত অনুমোদন ব্যাখ্যাতীত থেকে যায়।

উমরকে হিশামকে ছেড়ে দিতে বলার ব্যাখ্যায় নববি শাস্তির ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার কথা বলেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় উমর পাঠের যতগুলো রূপ জানতেন, মুহাম্মদ তার চেয়ে বেশি বৈধ রূপ জানতেন। উমরের ব্যক্তিগত জ্ঞান এবং অন্যের পাঠ বিচার করার ক্ষমতার মধ্যে ব্যবধানটি এখানেও স্বীকৃত। [196]

وَأَمَّا أَمْرُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عُمَرَ بِإِرْسَالِهِ فَلِأَنَّهُ لَمْ يَثْبُتْ عِنْدَهُ مَا يَقْتَضِي تَعْزِيرَهُ وَلِأَنَّ عُمَرَ إِنَّمَا نَسَبَهُ إِلَى مُخَالَفَتِهِ فِي الْقِرَاءَةِ وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَعْلَمُ مِنْ جَوَازِ الْقِرَاءَةِ وَوُجُوهِهَا مَا لَا يَعْلَمُهُ عُمَرُ

বাংলা অনুবাদ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমরকে তাঁকে ছেড়ে দিতে বলেছেন, কারণ তাঁর কাছে এমন কিছু প্রতিষ্ঠিত হয়নি যা তাঁর শাস্তি দাবি করে। আর উমর শুধু পাঠে নিজের থেকে ভিন্ন হওয়ার অভিযোগ করেছিলেন; নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠের বৈধতা ও তার রূপ সম্পর্কে এমন বিষয় জানতেন, যা উমর জানতেন না।

উমর ও হিশামের গোত্রীয় পরিচয়ও এই ঘটনার ব্যাখ্যায় তাৎপর্যপূর্ণ। উমর ছিলেন মক্কার কুরাইশের আদি শাখার মানুষ। হিশাম ইবনু হাকীম, অর্থাৎ হিশাম ইবনু হাকীম ইবনু হিযাম ছিলেন কুরাইশের আসাদ শাখার মানুষ। দুজনকে আলাদা আঞ্চলিক গোত্রের ভাষাভাষী ধরে নেওয়ার ভিত্তি এখানে নেই। ইসলামকিউএও তাঁদের একই কুরাইশি পরিচয় থেকে শুধু ভিন্ন গোত্রের ভাষা দিয়ে আহরুফ ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়েছে। [190]

فلو كان اختلاف الأحرف اختلافاً في اللغات لما اختلف القرشيان

বাংলা অনুবাদ: আহরুফের পার্থক্য যদি ভাষার পার্থক্য হতো, তাহলে ওই দুই কুরাইশির মধ্যে পার্থক্য হতো না।

হিশামের পিতা হাকিম ইবনে হিযামের কাবার ভেতরে জন্মের সংবাদও জীবনীগ্রন্থে রয়েছে। মিজ্জি তাঁর জীবনীতে যুবাইর ইবনে বাক্কারের সূত্রে খবরটি উদ্ধৃত করেছেন। ফলে ওই জন্মের পরিচয়টি পিতা হাকিমের; পাঠবিরোধে উমরের হাতে আটক ব্যক্তি তাঁর ছেলে হিশাম। [197]

فولدت حكيم بن حزام في الكعبة على النطع

বাংলা অনুবাদ: তিনি কাবার মধ্যে বিছানো চামড়ার ওপর হাকিম ইবনে হিযামকে জন্ম দিলেন।

ইবনে জাজারিও সাত গোত্রের ভাষার তালিকা দেওয়ার ব্যাখ্যাগুলোতে একই সমস্যাটি চিহ্নিত করেছেন। তাঁর বক্তব্যে উমর ও হিশাম একই ভাষা ও একই গোত্রের মানুষ, অথচ সূরা ফুরকানের পাঠে তাঁদের বিরোধ হয়েছিল। কুরাইশি পরিচয়ের মধ্যেই যে পাঠভেদ ঘটছে, তা তাঁর যুক্তির কেন্দ্র। [198]

فإن عمر بن الخطاب وهشام بن حكيم اختلفا في قراءة سورة الفرقان كما ثبت في الصحيح وكلاهما قرشيان من لغة واحدة وقبيلة واحدة

বাংলা অনুবাদ: উমর ইবনে খাত্তাব ও হিশাম ইবনে হাকিম সূরা ফুরকানের পাঠ নিয়ে বিরোধ করেছেন, যেমন সহিহ বর্ণনায় প্রতিষ্ঠিত; অথচ দুজনই কুরাইশি, একই ভাষা ও একই গোত্রের মানুষ।

একই গোত্রীয় ভাষাপরিচয়ের দুই ব্যক্তিকে ভিন্নভাবে কোরআন শেখানো হয়েছিল—এই সমস্যাটি শুধু “আরবদের নানা উচ্চারণ ছিল” বললে মেটে না। উমর ও হিশামের পরিচয়, শেখার দাবি এবং বিরোধ একসঙ্গে নিলে ভিন্নতা তাঁদের নিজ নিজ গোত্রের ভাষায় ফিরে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে থাকে না। একই কুরাইশি পরিসরের মানুষ নিজেদের পাঠ মুহাম্মদের কাছ থেকে শেখা বলেছেন। দুজনের পাঠ শুনে মুহাম্মদ নিজেই তা অনুমোদন করেছেন। ফলে ব্যক্তির গোত্রপরিচয় থেকে তার শেখা একমাত্র কোরআন-পাঠ নির্ধারণ করা যায় না।

বিরোধের বিষয়টি তাফসির বা বিধান ছিল—এমন ব্যাখ্যাও ইবনে জাজারি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর মতে, সাহাবিদের বিরোধ হয়েছিল কোরআনের হরফ পড়া নিয়ে। অর্থবিষয়ক ব্যাখ্যার বিরোধ এবং উচ্চারিত পাঠের বিরোধকে তিনি আলাদা রেখেছেন। [199]

لم يختلفوا في تفسيره ولا أحكامه ، وإنما اختلفوا في قراءة حروفه

বাংলা অনুবাদ: তাঁরা এর তাফসির বা বিধান নিয়ে বিরোধ করেননি; বরং এর হরফ পড়া নিয়ে বিরোধ করেছেন।

মিশকাতের সংশ্লিষ্ট বর্ণনাতেও দুই ব্যক্তির পাঠের পরে পৃথকভাবে “এভাবেই নাজিল হয়েছে” বলা আছে। শেষ নির্দেশে সহজ পদ্ধতিতে পড়ার অনুমতি রয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে শেখা ভিন্ন রূপগুলোর বৈধতা এই অনুমোদনের মধ্যে একসঙ্গে রাখা হয়েছে। [200] [201]

كَذَلِكَ أُنْزِلَتْ، إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ أُنْزِلَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنْهُ

বাংলা অনুবাদ: এভাবেও তা নাজিল হয়েছে। এই কোরআন সাত আহরুফে নাজিল হয়েছে; অতএব তার মধ্য থেকে যা সহজ হয়, তা পাঠ করো।

কোরআন সংকলন 20
বিবেচ্য বিষয়বর্ণিত তথ্যএর তাৎপর্য
গোত্রীয় পরিচয়উমর ও হিশাম দুজনই কুরাইশিপার্থক্য শুধু আলাদা গোত্রের ভাষা দিয়ে শেষ হয় না
শেখার দাবিদুজনেই মুহাম্মদের কাছে শেখার কথা বলেছেনএকই শিক্ষকের নামে পৃথক পাঠ
পরীক্ষার পদ্ধতিদুজনকে নিজের শেখা পাঠ পড়তে বলা হয়েছেদুটি রূপই শোনা হয়েছে
মুহাম্মদের সিদ্ধান্তউভয়ের পরে নাজিল হওয়ার স্বীকৃতিহিশামের বিরুদ্ধে উমরের অভিযোগ বাতিল
শেষ অনুমতিযা সহজ হয়, তা পড়াএকাধিক গ্রহণযোগ্য বিকল্প

সহজ পাঠ বেছে নেওয়ার শেষ নির্দেশটি উমরের প্রাথমিক আচরণের বিপরীত ফল তৈরি করে। তিনি যে পার্থক্য বন্ধ করতে হিশামকে ধরে এনেছিলেন, সেই পার্থক্যের জন্যই অনুমতি দেওয়া হলো। উমরের নিজের পাঠ বাদ পড়েনি; অন্যের পাঠও তাঁর ব্যক্তিগত আপত্তির কারণে বাদ যায়নি। ব্যক্তিগত পাঠজ্ঞান দিয়ে অন্য পাঠকের ওপর বলপ্রয়োগের অসারতা এবং অনুমোদিত বিকল্পের অস্তিত্ব একই সঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে। [202]

إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ أُنْزِلَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ، فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنْهُ

বাংলা অনুবাদ: এই কোরআন সাত আহরুফে নাজিল হয়েছে; সুতরাং এর মধ্যে যা তোমাদের জন্য সহজ হয় তা পড়ো।

নবীর স্বীকৃত এই ভিন্নতা থেকে পরবর্তী রাষ্ট্রীয় মানদণ্ডে যাওয়ার সময় কর্তৃত্বের ধরন বদলেছে। উসমান বিরোধের ক্ষেত্রে কুরাইশের ভাষায় লিখতে বলেন এবং নির্ধারিত মুসহাফের বাইরে অন্য লিখিত সহিফা-মুসহাফ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। বুখারির বর্ণনায় ভাষা বাছাইয়ের নির্দেশটি সরাসরি তাঁর নামে রয়েছে। [15]

إِذَا اخْتَلَفْتُمْ أَنْتُمْ وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ فِي شَىْءٍ مِنَ الْقُرْآنِ فَاكْتُبُوهُ بِلِسَانِ قُرَيْشٍ فَإِنَّمَا نَزَلَ بِلِسَانِهِمْ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের সঙ্গে যায়েদ ইবনে সাবিতের কোরআনের কোনো বিষয়ে মতভেদ হলে তা কুরাইশের ভাষায় লিখবে; কারণ তা তাদের ভাষায় নাজিল হয়েছে।

উমর ও হিশামের ঘটনাতেই কুরাইশি পরিচয় দুই পাঠকে এক করে দেয়নি। তাই পরের সংগ্রহে কুরাইশি ভাষার মানদণ্ড ঘোষণা করাকে আগের সব পাঠের অভিন্নতার প্রমাণ বানানো যায় না। মুহাম্মদের সামনে দুই রূপ অনুমোদনের ঘটনা এবং খলিফার লিখিত মান নির্ধারণ পৃথক পর্যায়। প্রথম ঘটনায় ভিন্নতা রেখেই বিরোধ মিটেছে; পরের ব্যবস্থায় রাষ্ট্র কোন লিখিত রূপ টিকবে, তার সীমা স্থির করেছে। বহুপাঠের এই ইতিহাসকে “সবাই শুরু থেকেই একইভাবে পড়তেন” বললে বর্ণিত বিরোধ, উমরের ভুল অভিযোগ এবং দুই পাঠের স্বীকৃতি—সবকিছুই অস্বীকার করতে হয়।


উবাইয়ের পাঠে আপত্তি, তাঁর সংশয় ও মুহাম্মদের প্রতিক্রিয়া

উবাই ইবনে কাব ছিলেন মুহাম্মদের জীবদ্দশায় কোরআন আয়ত্তকারী প্রধান সাহাবিদের একজন। কোরআন শেখার জন্য মুহাম্মদ যে চারজনের নাম বলেছেন, তাঁদের মধ্যে উবাইও রয়েছেন। তাঁর পাঠজ্ঞান ও সংশয়ের ঘটনাকে তাই পাশাপাশি রাখলেই সমস্যাটির গভীরতা বোঝা যায়: কোরআনের স্বীকৃত শিক্ষকও অন্যের ভিন্ন পাঠ শুনে তার অনুমোদন শনাক্ত করতে পারেননি। একজন সাধারণ শ্রোতার বিভ্রান্তির চেয়ে তাঁর আপত্তির তাৎপর্য অনেক বেশি; পাঠ সম্পর্কে কর্তৃত্বশালী ব্যক্তির জ্ঞান এবং মুহাম্মদের অনুমোদিত পাঠের পরিসর এখানে এক জায়গায় মেলেনি। [203] [105]

خُذُوا الْقُرْآنَ مِنْ أَرْبَعَةٍ مِنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ وَسَالِمٍ وَمُعَاذٍ وَأُبَىِّ بْنِ كَعْبٍ

বাংলা অনুবাদ: চারজনের কাছ থেকে কোরআন শেখো: আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, সালিম, মুআয ও উবাই ইবনে কাব।

উবাইয়ের মর্যাদার সঙ্গে আল্লাহর নামে বিশেষ মনোনয়নের কথাও যুক্ত হয়েছে। আনাসের বর্ণনায় মুহাম্মদ তাঁকে বলেন, আল্লাহ তাঁকে উবাইয়ের কাছে সূরা বাইয়্যিনা পড়ে শোনাতে নির্দেশ দিয়েছেন। উবাই জানতে চান, আল্লাহ কি তাঁর নাম বলেছেন? মুহাম্মদ সম্মতি জানালে তিনি কেঁদে ফেলেন। ধর্মীয় কর্তৃত্বের এই বর্ণনা তাঁকে কোরআনের প্রান্তিক কোনো পাঠক রাখে না; নবীর নিজের বক্তব্যেই তিনি বিশেষভাবে নির্বাচিত শ্রোতা। সেই মানুষটির মধ্যে ভিন্ন পাঠের কারণে বিশ্বাসসংকট তৈরি হওয়ার খবরও একই হাদিসসাহিত্যে সংরক্ষিত। [204]

قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم لِأُبَيٍّ ‏ “‏ إِنَّ اللَّهَ أَمَرَنِي أَنْ أَقْرَأَ عَلَيْكَ ‏‏{‏لَمْ يَكُنِ الَّذِينَ كَفَرُوا‏}‏ ‏”‏‏.‏ قَالَ وَسَمَّانِي قَالَ ‏”‏ نَعَمْ ‏”‏ فَبَكَى

বাংলা অনুবাদ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাইকে বললেন: “আল্লাহ আমাকে তোমার কাছে ‘লাম ইয়াকুনিল্লাযীনা কাফারু’ পড়ে শোনাতে নির্দেশ দিয়েছেন।” তিনি বললেন: “তিনি কি আমার নাম বলেছেন?” তিনি বললেন: “হ্যাঁ।” তখন উবাই কেঁদে ফেললেন।

কোরআন সংকলন 22

নাসাঈর বর্ণনায় উবাই নিজের অস্বস্তির কারণটি স্পষ্ট করেছেন। তিনি একটি আয়াত পড়েন; আরেকজন সেই আয়াত তাঁর পাঠের চেয়ে ভিন্নভাবে পড়েন। উভয়েই নিজেদের শিক্ষক হিসেবে মুহাম্মদের নাম বলেন। মুখস্থ পাঠের সঙ্গে মুখস্থ পাঠের বিরোধ এখানে শিক্ষকের পরিচয় দিয়ে মেটে না, কারণ দুই পক্ষই একই উৎসের দাবি করছে। উবাইয়ের প্রশ্ন শুধু অন্যজন কোথা থেকে শিখেছেন তা নিয়ে ছিল না; একই শিক্ষকের কাছ থেকে শেখা আয়াতের দুটি রূপ কীভাবে একসঙ্গে গ্রহণযোগ্য হয়, সেই অসংগতি তাঁকে নাড়া দিয়েছে। [205]

مَا حَاكَ فِي صَدْرِي مُنْذُ أَسْلَمْتُ إِلاَّ أَنِّي قَرَأْتُ آيَةً وَقَرَأَهَا آخَرُ غَيْرَ قِرَاءَتِي فَقُلْتُ أَقْرَأَنِيهَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏.‏ وَقَالَ الآخَرُ أَقْرَأَنِيهَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم

বাংলা অনুবাদ: ইসলাম গ্রহণের পর আমার বুকে কোনো খটকা জাগেনি, এই ঘটনা ছাড়া: আমি একটি আয়াত পড়লাম, আরেকজন সেটি আমার পাঠের চেয়ে ভিন্নভাবে পড়লেন। আমি বললাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এটি শিখিয়েছেন। অন্যজনও বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এটি শিখিয়েছেন।

মুসলিমের বর্ণনায় মসজিদে আসা দুই ব্যক্তির ভিন্ন পাঠ, মুহাম্মদের কাছে যাওয়া এবং উভয়ের অনুমোদনের পরে উবাইয়ের অবিশ্বাসের ভাবের কথা আছে। তাঁর প্রতিক্রিয়ার স্থানটি তাৎপর্যপূর্ণ: অনুমোদন পাওয়ার পরেই সংকট তীব্র হয়েছে। যে সিদ্ধান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করার কথা, সেটিই তাঁর পূর্ববর্তী প্রত্যাশাকে ভেঙে দিয়েছে। [206]

فَأَمَرَهُمَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَرَءَا فَحَسَّنَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم شَأْنَهُمَا فَسُقِطَ فِي نَفْسِي مِنَ التَّكْذِيبِ وَلاَ إِذْ كُنْتُ فِي الْجَاهِلِيَّةِ

বাংলা অনুবাদ: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুজনকে পড়তে বললেন। তাঁরা পড়লেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয়ের পাঠের প্রশংসা করলেন। তখন আমার মনে এমন অবিশ্বাসের ভাব এল, যা জাহেলি অবস্থায় থাকাকালেও আসেনি।

নিজের পাঠের প্রতি আস্থা এখানে অন্যের পাঠের বিরুদ্ধে আপত্তি তৈরি করেছে। পরে উভয় পাঠের অনুমোদন সেই আস্থার ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এর মধ্যে জ্ঞানের একটি বাস্তব সমস্যা আছে: একজন পাঠক তাঁর শেখা কথাগুলো নিখুঁতভাবে মনে রাখতে পারেন, অথচ অন্য একটি বৈধ রূপ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকতে পারেন। তখন তাঁর নিজের স্মৃতি সঠিক হলেও অন্যের পাঠকে ভুল বলার সিদ্ধান্ত সঠিক হয় না। উবাইয়ের অভিজ্ঞতায় ব্যক্তিগত মুখস্থ জ্ঞান ও সমস্ত অনুমোদিত পাঠের জ্ঞান আলাদা হয়ে পড়েছে; প্রথমটির শক্তি দ্বিতীয়টির অভাব পূরণ করেনি।

আয়াতটির পরিচয় সম্পর্কেও নাসাঈর ভাষা নির্দিষ্ট: একজন একটি আয়াত পড়েছেন, অন্যজন সেই আয়াতই ভিন্নভাবে পড়েছেন। এখানে একই আয়াতের একাধিক রূপের অভিজ্ঞতা নথিভুক্ত হয়েছে, যা উবাইয়ের নিজের শেখা পাঠের একচ্ছত্রতার ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। একই আয়াতের পাঠ নিয়ে আপত্তি উঠেছে এবং একই শিক্ষকের নাম উল্লেখ হয়েছে। পাঠক যে রূপটি জানেন, সেটিই একমাত্র স্বীকৃত রূপ কি না—এই তথ্য তাঁর মুখস্থ স্মৃতির মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে থাকে না। সংরক্ষণের ক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতার সীমা জানার ক্ষমতার এই ফারাক উবাইয়ের মতো প্রধান শিক্ষকের ক্ষেত্রেও কার্যকর ছিল।

নববি “তাকযীব” শব্দটির বিষয়বস্তু হিসেবে সরাসরি নবুয়ত অস্বীকারের ভাব উল্লেখ করেছেন। তিনি এর কারণ হিসেবে শয়তানের কুমন্ত্রণার ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর ব্যাখ্যাতেও সংশয়ের বিষয় নবুয়তের সত্যতা পর্যন্ত পৌঁছেছে। [207]

مَعْنَاهُ وَسْوَسَ لِيَ الشَّيْطَانُ تَكْذِيبًا لِلنُّبُوَّةِ أَشَدَّ مِمَّا كُنْتُ عَلَيْهِ فِي الْجَاهِلِيَّةِ

বাংলা অনুবাদ: এর অর্থ: শয়তান আমার মনে নবুয়ত অস্বীকারের এমন কুমন্ত্রণা দিল, যা জাহেলি অবস্থায় আমার মধ্যে যা ছিল, তার চেয়েও তীব্র।

এই ব্যাখ্যা সংশয়ের কারণকে ধর্মীয় নৈতিকতার ভাষায় স্থানান্তর করেছে। দৃশ্যমান উপলক্ষ ছিল ভিন্ন পাঠের একসঙ্গে অনুমোদন; ব্যাখ্যায় সংশয়ের উৎস হয়ে ওঠে শয়তান। ফলে পাঠের সম্পর্কিত প্রশ্নটির সঙ্গে প্রশ্নকারীর মানসিক বিশুদ্ধতার বিচার যুক্ত হয়। একটি প্রশ্নের জন্য কাউকে ধর্মীয়ভাবে অস্বস্তিতে ফেলা এবং সেই প্রশ্নের যুক্তিগত জবাব দেওয়া পৃথক ব্যাপার। উবাইয়ের শেখা পাঠ, অন্যদের শেখা পাঠ এবং সেগুলোর অনুমোদনের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করলেই তাঁর সংশয়ের বোধগম্য কারণ পাওয়া যায়; মনের মধ্যে শয়তানের কার্যকলাপের দাবি সেই সম্পর্কের শব্দগত ব্যাখ্যা সরবরাহ করে না।

পাঠের অসামঞ্জস্য থেকে শিক্ষক ও ওহির দাবির প্রতি সংশয় তৈরি হওয়ার মধ্যে সরাসরি যুক্তিসংযোগ রয়েছে। একই ব্যক্তির শিক্ষা যদি ভিন্নভাবে ফিরে আসে, অনুসারীকে শিক্ষার পরিসর সম্পর্কে নতুন ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে হয়। উবাইয়ের প্রতিক্রিয়া সেই প্রয়োজনটিই প্রকাশ করে। তাঁর আগে থেকে জানা কোরআনের ধারণার মধ্যে অন্যদের পাঠের স্থান পরিষ্কার ছিল না। মুহাম্মদের অনুমোদন নতুন তথ্য দিলেও সেটি তাঁর কাছে তাৎক্ষণিক নিশ্চয়তা হয়ে ওঠেনি। ফলে অনুমোদনের ঘোষণা এবং তার বিশ্বাসযোগ্যতা গ্রহণ করা—দুটি পৃথক মানসিক ঘটনা হিসেবে ধরা পড়েছে।

ঘটনার ধাপউবাইয়ের অভিজ্ঞতাকর্তৃত্বের সমস্যা
ভিন্ন পাঠ শোনানিজের শেখা রূপের সঙ্গে অমিলপরিচিত পাঠ দিয়ে অন্য পাঠের বৈধতা নির্ধারণ
শিক্ষকের পরিচয়উভয় পক্ষ মুহাম্মদের শিক্ষা দাবি করেনএকই শিক্ষকের নাম বিরোধ মেটায় না
মুহাম্মদের সিদ্ধান্তভিন্ন পাঠগুলোর অনুমোদনআপত্তির ভিত্তি বদলে যায়
অনুমোদনের পরের প্রতিক্রিয়াঅবিশ্বাসের ভাবপাঠের প্রশ্ন বিশ্বাসের সংকটে পৌঁছায়
পরবর্তী প্রতিক্রিয়াবুকে আঘাত, ঘাম ও ভয়শারীরিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের উপস্থিতি
ব্যাখ্যাসাত আহরুফের অনুমতিবৈধ পাঠের পরিসর বহুবিধ হয়

উবাইয়ের এই অবস্থা দেখে মুহাম্মদ তাঁর বুকে আঘাত করেন। বর্ণনার পরবর্তী শব্দগুলো ঘামে ভিজে যাওয়া এবং আল্লাহকে দেখার মতো ভয় অনুভব করার কথা জানায়। উবাইয়ের নিজের অভিজ্ঞতার ভাষায় শারীরিক প্রতিক্রিয়া ও ধর্মীয় আতঙ্ক পাশাপাশি এসেছে। [208]

فَلَمَّا رَأَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَا قَدْ غَشِيَنِي ضَرَبَ فِي صَدْرِي فَفِضْتُ عَرَقًا وَكَأَنَّمَا أَنْظُرُ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فَرَقًا

বাংলা অনুবাদ: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আমার ওপর নেমে আসা অবস্থা দেখলেন, তিনি আমার বুকে আঘাত করলেন। আমি ঘামে ভিজে গেলাম; ভয়ে যেন মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর দিকে তাকিয়ে আছি বলে অনুভব করলাম।

বুকে আঘাত এবং ভয় কোনো পাঠের শব্দগত নির্ভুলতা যাচাইয়ের পদ্ধতি নয়। এগুলো অনুসারীর মানসিক অবস্থায় প্রভাব ফেলে; কোন পাঠে ঠিক কোন শব্দ ছিল এবং কেন ছিল, সেই তথ্য সরবরাহ করে না। এই ঘটনায় সংশয়ী অনুসারীর শরীর ও অনুভূতির ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্বের উপস্থিতি অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রশ্ন উঠেছে কোরআনের ভিন্ন রূপ নিয়ে, আর সংশয়ের মুহূর্তে প্রতিক্রিয়া হয়েছে শারীরিক আঘাত ও তীব্র ভয়ের অভিজ্ঞতা। সত্যতা নির্ধারণের যুক্তির সঙ্গে ভয় অনুভবের সম্পর্ক নেই; ভয় প্রশ্নকারীর অবস্থান বদলাতে পারে, প্রশ্নের তথ্যগত উত্তর হয়ে উঠতে পারে না।

এই প্রতিক্রিয়ার তাৎপর্য অনুসারীর অবস্থানেও রয়েছে। উবাই নিজের শেখার স্মৃতি নিয়ে মুহাম্মদের কাছে গিয়েছিলেন; সিদ্ধান্তের পরে তাঁর অভিজ্ঞতায় ভয় প্রবল হয়ে ওঠে। ধর্মীয় নেতৃত্বের সামনে এমন ভয় সংশয় প্রকাশের মূল্য বাড়িয়ে দেয়: প্রশ্ন তখন কেবল ভুল পাঠ চিহ্নিত করার বিষয় থাকে না, নবুয়তের প্রতি নিজের আনুগত্যের প্রশ্নও হয়ে যায়। এই সম্পর্কের মধ্যে স্বাধীন যাচাই ও আনুগত্যের চাপ সমান ক্ষমতাসম্পন্ন নয়। বিচারকের সিদ্ধান্তই যখন ধর্মীয় সত্যের ঘোষণা, সেই সিদ্ধান্তে সংশয় রাখা অনুসারীর জন্য একই সঙ্গে জ্ঞানগত এবং ধর্মীয় সংকট তৈরি করে।

এর পরে মুহাম্মদ এক হরফ থেকে অনুমতি বাড়ানোর কথা বলেন। ইসলামওয়েবের মুসলিম-পাঠে এক, দুই এবং তৃতীয়বার সাত আহরুফের অনুমতি রয়েছে; প্রতিবার সহজ করার আবেদনও আছে। অর্থাৎ বর্ণনার নিজস্ব কাঠামোতেই পাঠের অনুমতি প্রথম অবস্থায় স্থির থাকেনি। [209]

أرسل إلي أن اقرأ القرآن على حرف فرددت إليه أن هون على أمتي فرد إلي الثانية اقرأه على حرفين فرددت إليه أن هون على أمتي فرد إلي الثالثة اقرأه على سبعة أحرف

বাংলা অনুবাদ: আমার কাছে পাঠানো হলো: কোরআন এক হরফে পড়ো। আমি জবাব পাঠালাম: আমার উম্মতের জন্য সহজ করুন। দ্বিতীয়বার বলা হলো: দুই হরফে পড়ো। আমি জবাব পাঠালাম: আমার উম্মতের জন্য সহজ করুন। তৃতীয়বার বলা হলো: সাত আহরুফে পড়ো।

নাসাঈ ৯৪১-এ এই অনুমতির সঙ্গে জিবরাইল ও মিকাইলের কথোপকথন যুক্ত হয়েছে। সেখানে মিকাইল অনুমতি বাড়াতে বলেন এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিটি হরফকে যথেষ্ট বলা হয়। প্রথমে উবাই ও অপর পাঠকের শেখার দাবির স্বীকৃতি, পরে ফেরেশতাদের মাধ্যমে অনুমতি বিস্তারের ব্যাখ্যা—এই ক্রমে ভিন্ন পাঠের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। [210]

قَالَ مِيكَائِيلُ اسْتَزِدْهُ اسْتَزِدْهُ حَتَّى بَلَغَ سَبْعَةَ أَحْرُفٍ فَكُلُّ حَرْفٍ شَافٍ كَافٍ

বাংলা অনুবাদ: মিকাইল বললেন: তাঁর কাছে আরও চাও, আরও চাও। এভাবে সাত আহরুফ পর্যন্ত পৌঁছাল; প্রতিটি হরফই পরিতৃপ্তিদায়ক ও যথেষ্ট।

একটি পাঠের অনুমতি থেকে একাধিক পাঠের অনুমতিতে যাওয়া কোরআন পাঠের বিধানের পরিবর্তন। এর ফলে আগে ঘোষিত সীমার বাইরে নতুন গ্রহণযোগ্য রূপের স্থান তৈরি হয়। উবাইয়ের আপত্তি মেটানোর জন্যও একমাত্র পাঠ নির্বাচন করা হয়নি; গ্রহণযোগ্যতার পরিসর বাড়ানোর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থা একদিকে তাঁর আপত্তিকৃত পাঠগুলোকে স্বীকৃতি দেয়, অন্যদিকে কোরআনের অনুমোদিত রূপ সম্পর্কে তাঁর পূর্বজ্ঞান যে অসম্পূর্ণ ছিল, সেটিও প্রকাশ করে। ব্যক্তির স্মৃতি অপরিবর্তিত থাকলেও কোন রূপ ধর্মীয়ভাবে বৈধ—তার সীমা বদলাতে পারে।

মুসলিম ৮২১ক-তে উবাইয়ের সূত্রেই অনুমতি বিস্তারের আরেক বিবরণ আছে। বনি গিফারের জলাশয়ের কাছে জিবরাইলের আসার ঘটনাটিতে ধাপ চারটি: এক, দুই, তিন এবং সাত আহরুফ। শেষ সিদ্ধান্তে যেকোনো অনুমোদিত হরফে পড়াকে সঠিক বলা হয়েছে। পাঠের একাধিক রূপ এখানে সিদ্ধান্তের শেষ ফল। [180]

ثُمَّ جَاءَهُ الرَّابِعَةَ فَقَالَ إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَقْرَأَ أُمَّتُكَ الْقُرْآنَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ فَأَيُّمَا حَرْفٍ قَرَءُوا عَلَيْهِ فَقَدْ أَصَابُوا

বাংলা অনুবাদ: পরে তিনি চতুর্থবার এসে বললেন: আল্লাহ আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছেন, আপনার উম্মত যেন কোরআন সাত আহরুফে পড়ে। তারা যে হরফেই পড়ুক, সঠিক পাঠ করবে।

নববি অনুমতির ধাপসংখ্যার এই অমিল আলোচনা করেছেন এবং দুই বর্ণনার অর্থ মেলানোকে সমস্যাযুক্ত বলেছেন। তাঁর প্রস্তাবিত সমাধান হলো, প্রথম বর্ণনায় “তৃতীয়” দ্বারা শেষবার অর্থাৎ চতুর্থবার বোঝানো হয়েছে এবং কোনো কোনোবারের উল্লেখ বাদ পড়েছে। এটি তাঁর সমন্বয়মূলক ব্যাখ্যা; বর্ণিত ধাপগুলোতে অমিল থাকার তথ্যও তাঁর আলোচনায় স্পষ্ট রয়েছে। [211]

هَذَا مِمَّا يُشْكِلُ مَعْنَاهُ وَالْجَمْعُ بَيْنَ الرِّوَايَتَيْنِ

বাংলা অনুবাদ: এটি এমন একটি বিষয়, যার অর্থ এবং দুই বর্ণনার মধ্যে সমন্বয় করা সমস্যাযুক্ত।

মুসলিম ৮২০খ-তে একই ঘটনার আরেক সূত্র দেওয়ার পরে আগের বর্ণনার অনুরূপ বিবরণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ইসমাইল ইবনে আবি খালিদ ও আবদুল্লাহ ইবনে ঈসার সূত্র বজায় আছে। একই সংবাদ কীভাবে সংক্ষিপ্ত নির্দেশের মাধ্যমে পুনরায় নথিভুক্ত হয়েছে, এটি তার সরাসরি উদাহরণ। সংখ্যায় দুটি হাদিস-প্রবেশ থাকা এবং দুটি পৃথক ঘটনার খবর থাকা এক বিষয় নয়। [212]

وَاقْتَصَّ الْحَدِيثَ بِمِثْلِ حَدِيثِ ابْنِ نُمَيْرٍ

বাংলা অনুবাদ: তিনি ইবনে নুমাইরের হাদিসের অনুরূপভাবে ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন।

মসজিদের সংঘাতের বিবরণ, একটি আয়াতের ভিন্ন পাঠের সংক্ষিপ্ত বিবরণ এবং অনুমতি বৃদ্ধির বিবরণ—এগুলো ভিন্ন তথ্যের ওপর আলোকপাত করে। কোনো বিবরণে অনুসারীর মানসিক প্রতিক্রিয়া বিস্তারিত, কোনো বিবরণে একই শিক্ষকের কাছে শেখার দাবি সামনে এসেছে, আরেকটিতে অনুমতির ধাপ গণনা করা হয়েছে। এই পার্থক্যগুলো রেখে পাঠ করলে একই সঙ্গে ঘটনার সামাজিক চরিত্র এবং তা ব্যাখ্যা করার ধর্মীয় কাঠামো বোঝা যায়। পাঠে বিরোধের তথ্যকে শুধু অনুমতির শেষ বাক্যে সংকুচিত করলে উবাইয়ের আপত্তি, তাঁর বিশ্বাসে ধাক্কা এবং প্রতিক্রিয়ার শারীরিক দিক—সবকিছুর গুরুত্ব কমে যায়।

সূত্রবিবরণের কেন্দ্রসংরক্ষিত বৈশিষ্ট্য
মুসলিম ৮২০কমসজিদে ভিন্ন পাঠ ও উবাইয়ের প্রতিক্রিয়াদুই ব্যক্তির পাঠ, উভয়ের অনুমোদন, অবিশ্বাসের ভাব ও বুকে আঘাত
মুসলিম ৮২০খএকই বিবরণের আরেক সূত্রআগের বর্ণনার অনুরূপ বিবরণ বলে সংক্ষিপ্ত উল্লেখ
নাসাঈ ৯৪১এক আয়াতের ভিন্ন পাঠদুজনেরই মুহাম্মদের কাছে শেখার দাবি; জিবরাইল ও মিকাইলের আলোচনা
মুসলিম ৮২১কবনি গিফারের জলাশয়ে অনুমতিএক, দুই, তিন ও সাত আহরুফ; চারবার আসা
নববির ব্যাখ্যাঅমিলের ধর্মীয় সমন্বয়তৃতীয়কে শেষবার অর্থে ব্যাখ্যা এবং কিছু ধাপ বাদ পড়ার প্রস্তাব

ইসলামকিউএও সাত আহরুফের ব্যাখ্যায় শব্দগত ভিন্নতা স্বীকার করেছে। তাদের নির্বাচিত ব্যাখ্যায় এগুলো পাঠের সাতটি রূপ, যেগুলোর শব্দ আলাদা হতে পারে এবং অর্থ মিলতেও পারে। উবাইয়ের ঘটনাতে তাই মূল প্রশ্নের যথার্থ স্থান রয়েছে: একই ধর্মগ্রন্থের অনুমোদিত পাঠের মধ্যে পার্থক্য ছিল। শুধু মুখস্থকারীর সংখ্যা দিয়ে এই পার্থক্য মুছে যায় না। [213]

أنها سبعة أوجه من القراءة تختلف باللفظ وقد تتفق بالمعنى

বাংলা অনুবাদ: এগুলো পাঠের সাতটি রূপ, যেগুলো শব্দে ভিন্ন এবং অর্থে মিলতে পারে।

মুহাম্মদ একই সঙ্গে পাঠের শিক্ষক, ওহি পাওয়ার দাবিদার এবং বিরোধের চূড়ান্ত বিচারক। ফলে তাঁর অনুমোদন শিক্ষার উৎস সম্পর্কিত বিরোধ মেটায় তাঁর নিজের কর্তৃত্বে। ফেরেশতাদের সঙ্গে কথোপকথনের খবরও অনুসারীরা তাঁর কাছ থেকেই পান। এই বর্ণনাকাঠামোয় পাঠককে দুটি সম্পর্কিত দাবি গ্রহণ করতে হয়: তিনি ভিন্ন রূপ শিখিয়েছেন এবং সেই ভিন্নতার অনুমতিও আল্লাহ দিয়েছেন। ফেরেশতাদের অনুমতির পক্ষে বর্ণিত সমর্থনও মুহাম্মদের নিজের বক্তব্য; উবাইয়ের সামনে সেই কথোপকথনের বর্ণনাকারী ও বিরোধের বিচারক একই ব্যক্তি।

এই নির্ভরতার সামাজিক ফলও স্পষ্ট। কোরআনের একজন দক্ষ শিক্ষক নিজের পাঠ জানলেও নতুন বিরোধের নিষ্পত্তির জন্য ব্যক্তিগত নবুয়তি অনুমোদনের প্রয়োজন বোধ করেছেন। একটি অভিন্ন পাঠ সব পাঠকের মধ্যে আগে থেকেই সমানভাবে জানা থাকলে যাচাইয়ের কাজ হতো সেই অভিন্ন মানের সঙ্গে তুলনা। এখানে তুলনার ফলেই বিরোধ তৈরি হয়েছে; সমাধান এসেছে ভিন্নতাগুলোকে বৈধ বলার ঘোষণায়। ফলে সংরক্ষণ বলতে কোনটি বোঝানো হচ্ছে, তার ওপর দাবির অর্থ বদলে যায়: ব্যক্তির শেখা রূপ ধরে রাখা, অনুমোদিত সব রূপ জানা এবং পরে নির্ধারিত একটি রূপ অনুসরণ করা একই ঘটনা নয়।

উবাইয়ের সংশয়ের বিবরণ পাঠের বহুত্বকে প্রথম যুগের ভেতরেই স্থাপন করে। সেখানে দক্ষতা আছে, শিক্ষকের প্রত্যক্ষ পরিচয় আছে, নিজের শেখার দৃঢ় স্মৃতি আছে; তা সত্ত্বেও অন্য পাঠের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিরোধ আছে। এই অবস্থাকে প্রশ্নহীন অভিন্নতার ইতিহাস বানালে ঘটনাটির কারণ ও ফল দুটোই হারিয়ে যায়। অনুমোদিত ভিন্নতা ছিল বলেই আপত্তি উঠেছিল, এবং একাধিক রূপ স্বীকৃত হওয়ার কারণেই উবাইয়ের বিশ্বাসে ধাক্কা লেগেছিল। তাঁর মর্যাদার প্রশংসা, তাঁর সংশয় এবং সেই সংশয়ের প্রতি মুহাম্মদের প্রতিক্রিয়া—তিনটি তথ্য একত্রেই কোরআনের প্রাথমিক পাঠ-ইতিহাসের অস্বস্তিকর চিত্রটি দাঁড় করায়।


উমরের কাছে উবাইয়ের পাঠ অগ্রহণযোগ্য হওয়ার বর্ণনা

উমর উবাই ইবনে কাবকে তাঁদের সর্বোত্তম কোরআন-পাঠক বলেছেন; একই বক্তব্যে তাঁর পাঠের কিছু অংশ ছেড়ে দেওয়ার কথাও বলেছেন। উবাইয়ের অবস্থান ছিল উল্টো: মুহাম্মদের মুখ থেকে যা শুনেছেন, তা কোনো কিছুর বিনিময়ে ছাড়বেন না। কোরআনের একজন স্বীকৃত প্রধান শিক্ষকের প্রত্যক্ষভাবে শেখা পাঠও এভাবে গ্রহণ-বর্জনের দ্বন্দ্বে পড়েছে। ব্যক্তির মর্যাদার স্বীকৃতি তাঁর সমস্ত পাঠের স্বীকৃতি হয়ে ওঠেনি। শ্রেষ্ঠ পাঠক বলে প্রশংসা করা এবং তাঁর পাঠের অংশ বর্জন করা—দুটি কাজ একই সঙ্গে ঘটেছে। [214] [215]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৬৬/ আল-কুরআনের ফাযীলাতসমূহ
পরিচ্ছদঃ ৬৬/৮. নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যে সব সহাবী ক্বারী ছিলেন।
৫০০৫. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘উমার (রাঃ) বলেছেন, ‘আলী (রাঃ) আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম বিচারক এবং উবাই (রাঃ) আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম কারী। এতদ্সত্ত্বেও তিনি যা তিলাওয়াত করেছেন, আমরা তার কিছু অংশ বাদ দিই, অথচ তিনি বলছেন, আমি তা আল্লাহর রাসূলের যবান থেকে শুনেছি, কোন কিছুর বিনিময়ে আমি তা ত্যাগ করব না। আল্লাহ্ বলেছেন, ‘‘আমি কোন আয়াত রহিত করলে কিংবা ভুলিয়ে দিলে তা হতে উত্তম কিংবা তার মত কোন আয়াত এনে দিই।’’ ৪৪৮১) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৬৩৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৬৩৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

কোরআন সংকলন 24

উমরের বক্তব্যে কোরআনের পাঠ সম্পর্কে দুটি পৃথক দাবি পাশাপাশি রয়েছে। একটি দাবি উবাইয়ের দক্ষতা নিয়ে; অন্যটি তাঁর পাঠের কোন অংশ অনুসরণ করা হবে, তা নিয়ে। উবাই প্রত্যক্ষ শ্রবণকে ভিত্তি করেছেন, আর উমর নসখের আয়াত দিয়ে বর্জনের ধর্মীয় যুক্তি দিয়েছেন। ফলে মুহাম্মদের মুখে শোনা হয়েছে—এই পরিচয়ও কোনো পাঠ বহাল রাখার জন্য সর্বসম্মতভাবে যথেষ্ট ছিল না। নবীর কাছে শেখার দাবি এবং সেই পাঠ পরবর্তী চর্চায় ধরে রাখার সিদ্ধান্তের মধ্যে সংঘাত ছিল। [216]

أُبَىٌّ أَقْرَؤُنَا وَإِنَّا لَنَدَعُ مِنْ لَحَنِ أُبَىٍّ، وَأُبَىٌّ يَقُولُ أَخَذْتُهُ مِنْ فِي رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَلاَ أَتْرُكُهُ لِشَىْءٍ

বাংলা অনুবাদ: উবাই আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পাঠক; অথচ আমরা উবাইয়ের পাঠের কিছু অংশ ছেড়ে দিই। উবাই বলেন, আমি তা আল্লাহর রাসূলের মুখ থেকে নিয়েছি; কোনো কিছুর জন্যই তা ছাড়ব না।

বুখারির তাফসির অধ্যায়েও একই বক্তব্য এসেছে। সেখানে “উবাইয়ের কথা থেকে আমরা কিছু ছেড়ে দিই” বলা হয়েছে এবং আলীকে শ্রেষ্ঠ বিচারক বলার বাক্যটিও আছে। বর্জনের বিপরীতে উবাইয়ের অবস্থান একই: মুহাম্মদের কাছে শোনা কিছুই ছাড়বেন না। দুটি অধ্যায়ে বিষয়টির অবস্থানও তাৎপর্যপূর্ণ—একবার প্রধান কোরআন-পাঠকদের আলোচনায়, আরেকবার আয়াত রহিত করার কোরআনিক বক্তব্যের ব্যাখ্যায়। [217]

أَقْرَؤُنَا أُبَىٌّ، وَأَقْضَانَا عَلِيٌّ، وَإِنَّا لَنَدَعُ مِنْ قَوْلِ أُبَىٍّ، وَذَاكَ أَنَّ أُبَيًّا يَقُولُ لاَ أَدَعُ شَيْئًا سَمِعْتُهُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم

বাংলা অনুবাদ: আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পাঠক উবাই এবং শ্রেষ্ঠ বিচারক আলী। তবু আমরা উবাইয়ের কথার কিছু অংশ ছেড়ে দিই। কারণ উবাই বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে শোনা কোনো কিছুই আমি ছাড়ি না।

এই দুই স্থানে একই সংবাদ ভিন্ন অধ্যায়ে ব্যবহৃত হয়েছে। উভয়ের সূত্রে ইয়াহইয়া, সুফিয়ান, হাবিব ইবনে আবি সাবিত, সাঈদ ইবনে জুবাইর ও ইবনে আব্বাস রয়েছেন; ইবনে আব্বাস উমরের বক্তব্য জানিয়েছেন। ফলে বর্ণনার পুনরাবৃত্তি একই বিরোধের গুরুত্ব ও পরবর্তী ব্যবহার দেখায়। একটি ঘটনায় উবাইয়ের পাঠ বর্জনের খবর কোরআনের মর্যাদা বিষয়ক আলোচনা এবং নসখের ব্যাখ্যা—দুই জায়গাতেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

ইবনে হাজর “লাহন” শব্দটি এখানে ভাষা অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন এবং ইবনে খাল্লাদের বর্ণনায় উবাইয়ের পাঠের “অনেক” কিছু ছেড়ে দেওয়ার ভাষা উল্লেখ করেছেন। এতে বর্জনের বিষয়টি পাঠের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে। [218]

وَاللَّحْنُ اللُّغَةُ، وَفِي رِوَايَةِ ابْنِ خَلَّادٍ: وَإِنَّا لَنَتْرُكُ كَثِيرًا مِنْ قِرَاءَةِ أُبَيٍّ

বাংলা অনুবাদ: “লাহন” অর্থ ভাষা। ইবনে খাল্লাদের বর্ণনায় আছে: আমরা উবাইয়ের পাঠের অনেক কিছু ছেড়ে দিই।

উবাইয়ের প্রত্যক্ষভাবে শেখার দাবিটি উমরের বক্তব্যেই সংরক্ষিত হয়েছে। কোরআনের শ্রেষ্ঠ পাঠক কী যুক্তিতে পাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন, সেটিও তিনি বলেছেন। ফলে একই সংবাদে সংরক্ষণের দাবি ও বর্জনের সিদ্ধান্ত মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। নবীর মুখে শোনা শব্দ ধরে রাখা উবাইয়ের কাছে আনুগত্যের প্রকাশ; উমরের ব্যবহৃত নসখের যুক্তিতে সেই একই পাঠ ছেড়ে দেওয়ার ধর্মীয় ভিত্তি পাওয়া যায়। অনুসরণের নির্দেশ এখানে পরস্পরবিরোধী ব্যবহারিক ফল তৈরি করেছে।

বিষয়উবাইয়ের অবস্থানউমরের বক্তব্যে প্রতিফলিত অবস্থান
পাঠের উৎসমুহাম্মদের মুখ থেকে নেওয়াউবাইয়ের এই দাবিটি উল্লেখ করা হয়েছে
পাঠকের মর্যাদাপ্রধান কোরআন-শিক্ষকতাঁকেই শ্রেষ্ঠ পাঠক বলা হয়েছে
কোন পাঠ রাখা হবেশোনা পাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতিতাঁর পাঠের কিছু অংশ বর্জন
সিদ্ধান্তের ভিত্তিপ্রত্যক্ষ শ্রবণের নিশ্চয়তানসখ সম্পর্কে কোরআনিক বক্তব্য
সংরক্ষণের ব্যবহারিক ফলআগে শেখা পাঠ বহাল রাখাআগে পঠিত কিছু অংশ অনুসরণ না করা

প্রত্যক্ষ শ্রবণের ওপর উবাইয়ের আস্থার কারণও ইবনে হাজর ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, মুহাম্মদের কাছে নিজে শোনার ফলে উবাই নিশ্চিত জ্ঞান পেয়েছিলেন; অন্যের বিপরীত খবর সেই মাত্রার নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত তাঁর প্রত্যক্ষ জ্ঞানের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠত না। [219]

لِأَنَّهُ بِسَمَاعِهِ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ يَحْصُلُ لَهُ الْعِلْمُ الْقَطْعِيُّ بِهِ، فَإِذَا أَخْبَرَهُ غَيْرُهُ عَنْهُ بِخِلَافِهِ لَمْ يَنْتَهِضْ مُعَارِضًا لَهُ حَتَّى يَتَّصِلَ إِلَى دَرَجَةِ الْعِلْمِ الْقَطْعِيِّ

বাংলা অনুবাদ: কারণ রাসুলুল্লাহর কাছে নিজে শোনার ফলে এ বিষয়ে তাঁর নিশ্চিত জ্ঞান হয়। অন্য কেউ তাঁর সম্পর্কে এর বিপরীত খবর দিলে সেই খবর নিশ্চিত জ্ঞানের পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত তাঁর জ্ঞানের বিরোধী হিসেবে দাঁড়াতে পারে না।

এই ব্যাখ্যায় বিরোধটির জ্ঞানগত ভিত্তি স্পষ্ট। উবাই নিজের স্মৃতিতে থাকা শব্দের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিন্ত; সমস্যা হলো, সেই শব্দ পরেও পড়তে হবে কি না। প্রথম প্রশ্নের উত্তর তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় আছে। দ্বিতীয় প্রশ্ন নির্ভর করছে পাঠ প্রত্যাহারের খবর, সেই খবরের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং তা গ্রহণ করার সিদ্ধান্তের ওপর। কোরআন সংরক্ষণের ইতিহাসে তাই মুখস্থ করার ক্ষমতার সঙ্গে আরও একটি ক্ষমতা যুক্ত হয়: মুখস্থ থাকা কোন অংশ ধর্মীয়ভাবে বহাল এবং কোন অংশ বাদ, সেটি নির্ধারণের ক্ষমতা।

“আমি শুনেছি” এবং “আমরা ছেড়ে দিই”—এই দুই ধরনের ভাষা ব্যক্তিগত প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ও সম্মিলিত পাঠাচরণের পার্থক্যও দেখায়। উবাই নিজের শেখার অভিজ্ঞতা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন; উমর একদল মানুষের গ্রহণ-বর্জনের অবস্থান প্রকাশ করছেন। শ্রেষ্ঠ পাঠকের স্মৃতি থাকলেই তাঁর স্মৃতির সমস্ত উপাদান গ্রহণ করা হবে—এমন নিয়ম কার্যকর ছিল না। পাঠকসমাজের একটি অংশ তাঁর কিছু পাঠ থেকে সরে যেতে পারত। ফলে পরবর্তীকালে কোন পাঠ প্রচলিত হলো, তা জানার সঙ্গে কোন পাঠ আগে মুহাম্মদের কাছে শেখা হয়েছিল, তা জানার প্রশ্ন আলাদা হয়ে যায়।

উমরের ব্যবহৃত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে হাজর বলেছেন, উবাই হয়তো এমন কিছু পড়ছিলেন যার তিলাওয়াত রহিত হয়েছে এবং সেই রহিত হওয়ার খবর তাঁর কাছে পৌঁছেনি। এটি পাঠ বর্জনের পক্ষে উমরের যুক্তি কীভাবে বোঝানো হয়েছে, তার সরাসরি ব্যাখ্যা। [220]

هُوَ مَقُولُ عُمَرَ مُحْتَجًّا بِهِ عَلَى أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ وَمُشِيرًا إِلَى أَنَّهُ رُبَّمَا قَرَأَ مَا نُسِخَتْ تِلَاوَتُهُ لِكَوْنِهِ لَمْ يَبْلُغْهُ النَّسْخُ

বাংলা অনুবাদ: এটি উমরের বক্তব্য; তিনি উবাই ইবনে কাবের বিরুদ্ধে এটি দিয়ে যুক্তি দিচ্ছেন এবং ইঙ্গিত করছেন, উবাই হয়তো এমন কিছু পড়েছেন যার তিলাওয়াত রহিত হয়েছে, কারণ রহিত হওয়ার খবর তাঁর কাছে পৌঁছেনি।

এই ব্যাখ্যাও সকল প্রধান পাঠকের কাছে একই সময়ে একই তথ্য থাকার ধারণাকে ভেঙে দেয়। উবাইয়ের কাছে আগের পাঠের প্রত্যক্ষ জ্ঞান থাকতে পারে, অথচ তা প্রত্যাহারের খবর না-ও থাকতে পারে—ইবনে হাজরের ব্যাখ্যা এই অসম তথ্যপ্রবাহের ওপর দাঁড়িয়েছে। তখন পাঠ সম্পর্কে বিরোধ মুখস্থ জ্ঞানের দুর্বলতার কারণে হওয়া জরুরি নয়; কোন খবর পাওয়া গেছে এবং কোনটিকে আগের জ্ঞান বাতিল করার জন্য যথেষ্ট মনে করা হয়েছে, তার ওপরও বিরোধ দাঁড়ায়। একটি পাঠ কারও কাছে নির্ভরযোগ্য স্মৃতি, অন্যের কাছে পরিত্যাজ্য পুরোনো রূপ হয়ে থাকে।

বুখারির বর্ণনায় উমর বাকারা ২:১০৬ ব্যবহার করেছেন। আয়াতটি রহিত করা বা সরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে বিকল্প আনার ধারণা যুক্ত করে। উবাই নিজের শোনা পাঠ ধরে রাখতে চাইছেন; উমর এই নীতির মাধ্যমে আগে পঠিত কোনো অংশ পরে বহাল না থাকার ধর্মীয় সম্ভাবনা সামনে আনছেন। [221]

مَا نَنْسَخْ مِنْ آيَةٍ أَوْ نَنْسَأْهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِنْهَا أَوْ مِثْلِهَا

বাংলা অনুবাদ: আমরা কোনো আয়াত রহিত করলে বা তা বিলম্বিত রাখলে তার চেয়ে উত্তম অথবা তার অনুরূপ কিছু আনি।

এই দলিলের আরবি শব্দেও পাঠভেদ রয়েছে। বুখারির আলোচিত বর্ণনার হাদিসবিডিতে প্রকাশিত আরবিতে “আও নুনসিহা” আছে; এর অর্থ “অথবা তা ভুলিয়ে দিই”। অপর পাঠের “আও নানসাআহা” বিলম্বিত রাখার অর্থ বহন করে। ফলে একই আয়াত উদ্ধৃত করে নসখের ব্যাখ্যা দেওয়ার সময় তার আরবি রূপ ও অনুবাদের সম্পর্কও বদলে যায়। ভুলিয়ে দেওয়ার পাঠ এবং বিলম্বিত রাখার পাঠ—দুটির মধ্যে ভাবগত পার্থক্য রয়েছে। [222]

أَوْ نُنْسِهَا

বাংলা অনুবাদ: অথবা আমরা তা ভুলিয়ে দিই।

নসখের পক্ষে ব্যবহৃত দলিলের পাঠভেদ এবং উবাইয়ের পাঠ বর্জনের ঘটনা পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রকাশ করে। কোন শব্দ পড়া হচ্ছে তার ওপর আয়াতের ব্যাখ্যার একটি অংশ নির্ভর করে; আবার সেই আয়াতের ব্যাখ্যা ব্যবহার করেই অন্য পঠিত অংশ বর্জনের ধর্মীয় ভিত্তি তৈরি হয়। ফলে শব্দরূপ, তার অর্থ এবং পাঠ রাখার সিদ্ধান্ত পরস্পর যুক্ত। ধর্মীয় শ্রেণিবিভাগকে কেবল অপরিবর্তিত পাঠের ওপর বাইরের ব্যাখ্যা হিসেবে দেখলে এই সম্পর্ক ধরা পড়ে না। পাঠের রূপ নিজেই ব্যাখ্যায় প্রভাব ফেলে, আর ব্যাখ্যা নির্ধারণ করে কোন রূপ পরবর্তী চর্চায় অনুসরণ করা হবে।

সাধারণভাবে কোনো পাঠ রহিত হতে পারে—এই নীতি এবং একটি নির্দিষ্ট পাঠ সত্যিই রহিত হয়েছে—এই সিদ্ধান্তের জন্য পৃথক তথ্য লাগে। প্রথমটি সম্ভাবনার নীতি দেয়; দ্বিতীয়টির জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট পাঠের পরিচয় ও তার বহাল থাকার অবস্থার পরিবর্তনের প্রমাণ। উবাইয়ের প্রত্যক্ষ শ্রবণের যুক্তি এই দ্বিতীয় স্তরেই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি যেটি শুনেছেন তার উৎস জানেন এবং সেটি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। নসখের সাধারণ বিধান তাঁর সেই নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতাকে মুছে দেয় না; বিরোধ দাঁড়ায় সেই অভিজ্ঞতার পরে কী ঘটেছে এবং তার খবর কতটা নিশ্চিত, সেই প্রশ্নে।

ইসলামকিউএর নসখের সংজ্ঞায় বিধান ও তার শব্দরূপ উভয়ের অপসারণের কথা আছে। ফলে নসখ শব্দটির আওতায় কেবল কোনো আদেশের প্রয়োগ বদলানো নয়, পাঠ হিসেবে বাক্য বহাল না থাকাও আসে। কোরআনের পাঠের ইতিহাসের জন্য এই সংজ্ঞার দ্বিতীয় দিকটি সরাসরি প্রাসঙ্গিক। [223]

رفع حكم دليل شرعي، أو لفظه، بدليل من الكتاب أو السنة

বাংলা অনুবাদ: কিতাব বা সুন্নাহর দলিলের মাধ্যমে কোনো শরয়ি দলিলের বিধান অথবা তার শব্দরূপ তুলে দেওয়া।

তারা তিলাওয়াত ও বিধান উভয় রহিত হওয়া, শুধু তিলাওয়াত রহিত হওয়া এবং শুধু বিধান রহিত হওয়ার তিনটি শ্রেণি আলাদা করেছে। এর মধ্যে প্রথম দুটি শ্রেণিতে আগে কোরআন হিসেবে পঠিত শব্দ পরবর্তী পাঠে বহাল থাকে না। এই শ্রেণিবিন্যাসে শব্দসংরক্ষণ ও বিধানের স্থায়িত্ব পৃথকভাবে বিচার করা হয়। [224]

نسخ التلاوة دون الحكم

বাংলা অনুবাদ: বিধান রহিত না করে তিলাওয়াত রহিত করা।

নসখের শ্রেণিশব্দরূপের অবস্থাবিধানের অবস্থা
তিলাওয়াত ও বিধান উভয় রহিতআগে পঠিত বাক্য কোরআন হিসেবে বহাল থাকে নাবিধানও বহাল থাকে না
তিলাওয়াত রহিত, বিধান বহালআগে পঠিত বাক্য কোরআন হিসেবে বহাল থাকে নাবিধান অনুসরণ করা হয়
বিধান রহিত, তিলাওয়াত বহালবাক্য কোরআনের পাঠে থেকে যায়আগের বিধান কার্যকর থাকে না

এই পার্থক্যের ফলে “পাঠ রহিত” বলার মধ্যে শব্দগত পরিবর্তনের স্বীকৃতি নিহিত থাকে। কোনো বাক্য আগে পড়া হতো এবং পরে কোরআন হিসেবে পড়া হবে না—এটি পাঠের বহাল থাকার অবস্থার পরিবর্তন। তার ধর্মীয় নাম নসখ হলে পরিবর্তনের ধর্মীয় বৈধতা দাবি করা হয়; আগে-পরে পাঠের পরিসর যে বদলেছে, সেই তথ্য বাতিল হয় না। উবাইয়ের আপত্তির মুখে উমরের ব্যবহৃত যুক্তিও এই গ্রহণ-বর্জনের কাঠামোর মধ্যে পড়ে। ধর্মীয় ব্যাখ্যা পরিবর্তনকে অনুমোদিত বলে চিহ্নিত করে, পরিবর্তনের অস্তিত্ব মুছে দেয় না।

বদরুদ্দিন আইনি একই বক্তব্যের ব্যাখ্যায় আরও ব্যাপক মতভেদ চিহ্নিত করেছেন। তাঁর ভাষ্যে উবাই কোরআনের কোনো কিছু রহিত হওয়ার কথা মানতেন না এবং উমর নসখের আয়াত দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে তাঁর ব্যাখ্যায় বিরোধটি কোনো একটি খবর অজানা থাকার চেয়েও ব্যাপক হয়ে উঠেছে। [225]

وَكَانَ لَا يَقُولُ أُبَيٌّ بِنَسْخِ شَيْءٍ مِنَ الْقُرْآنِ، فَرَدَّ عُمَرُ – رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ – ذَلِكَ بِقَوْلِهِ، وَقَدْ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى مَا نَنْسَخْ مِنْ آيَةٍ

বাংলা অনুবাদ: উবাই কোরআনের কোনো কিছু রহিত হওয়ার কথা মানতেন না। উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আল্লাহর “আমরা কোনো আয়াত রহিত করলে” বক্তব্যটি উল্লেখ করে তা প্রত্যাখ্যান করেন।

ইবনে হাজর উবাইয়ের কাছে রহিত হওয়ার খবর না পৌঁছানোর সম্ভাবনা উল্লেখ করেছেন; আইনি নসখ সম্পর্কে তাঁর অবস্থানকেই মতভেদের কারণ করেছেন। দুই ব্যাখ্যায় অমিল আছে। উভয় ক্ষেত্রেই স্বীকৃত বাস্তব বিষয় হলো, উবাই শোনা পাঠ ধরে রাখতে চেয়েছেন এবং উমর তাঁর কিছু পাঠ বর্জনের কথা বলেছেন। পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীরা বিরোধের কারণ নির্ধারণ করছেন; তাঁদের ব্যাখ্যা উবাই ও উমরের মধ্যে পূর্ব থেকেই প্রশ্নহীন ঐকমত্যের সাক্ষ্য হয়ে যায় না। মতভেদকে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে মতভেদটি সংরক্ষিত থাকার কারণেই।

উবাইয়ের পরিচয় শুধু কণ্ঠস্থ পাঠের দক্ষতার মধ্যে সীমিত ছিল না। ইবনে আবদুল বার তাঁকে মুহাম্মদের ওহি লেখকদের একজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন; যায়েদের আগে এবং যায়েদের সঙ্গেও তিনি লিখতেন। ফলে গ্রহণ-বর্জনের এই দ্বন্দ্বে এমন একজনের পাঠ এসেছে, যিনি বাচনিক শিক্ষার পাশাপাশি ওহি লেখার কাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। [226]

وكان أبي بن كعب ممن كتب لرسول الله صلى الله عليه وسلم الوحي قبل زيد بن ثابت ومعه أيضا

বাংলা অনুবাদ: উবাই ইবনে কাব তাঁদের একজন ছিলেন, যাঁরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য ওহি লিখতেন; যায়েদ ইবনে সাবিতের আগে এবং তাঁর সঙ্গেও তিনি লিখতেন।

ইবনে আবদুল বারের একই জীবনীতে উমরের পাঠ বর্জনের বক্তব্যও পুনরায় এসেছে। সেখানে উবাইয়ের মর্যাদা ও তাঁর পাঠের কিছু বিষয় ছেড়ে দেওয়া একই বাক্যে রয়েছে। অর্থাৎ জীবনীতে সংরক্ষিত উবাইয়ের পরিচয়ের মধ্যেও এই বিরোধ স্থান পেয়েছে। তাঁর জ্ঞান ও অবদান স্বীকার করার সঙ্গে তাঁর সমস্ত পাঠ গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত এক করে দেখা হয়নি। [227]

أقضانا علي ، وأقرؤنا أبي ، وإنا لنترك أشياء من قراءة أبي

বাংলা অনুবাদ: আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক আলী এবং শ্রেষ্ঠ পাঠক উবাই; তবু আমরা উবাইয়ের পাঠের কিছু বিষয় ছেড়ে দিই।

লেখক হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং শ্রেষ্ঠ পাঠক হিসেবে স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও তাঁর কিছু পাঠ বর্জিত হয়েছে—এতে প্রাথমিক পাঠসমাজের ভেতরে কর্তৃত্বের স্তরগুলো প্রকাশ পায়। কেউ পাঠ জানেন, কেউ তা শেখান, কেউ তার উৎস সম্পর্কে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য দেন, আর কোন পাঠ আর অনুসরণ করা হবে না সেই সিদ্ধান্তে আরেক কর্তৃত্ব কাজ করে। এই ক্ষমতাগুলো একই ব্যক্তির মধ্যে সব সময় একত্র ছিল না। উবাইয়ের জ্ঞানকে প্রশংসা করা সম্ভব হয়েছে, আবার তাঁর নির্দিষ্ট পাঠ গ্রহণ না করাও সম্ভব হয়েছে।

এখানে স্মৃতিতে টিকে থাকা এবং প্রচলিত পাঠে টিকে থাকা আলাদা পরিণতি পেয়েছে। উবাইয়ের স্মৃতিতে কোনো অংশ থাকার খবর নিজেই সেই অংশ অনুসরণ করার নিশ্চয়তা দেয়নি। যাঁরা তা ছেড়ে দিচ্ছেন, তাঁদের কাছে বর্জনের যুক্তি ছিল; যিনি শুনেছেন, তাঁর কাছে ধরে রাখার যুক্তি ছিল। ফলে পাঠের পরবর্তী সীমা কেবল স্মৃতির স্বাভাবিক ধারাবাহিকতার ফল নয়, গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের ইতিহাসও। কোন পাঠের ধর্মীয় মর্যাদা বহাল থাকবে, তার বিচার স্মৃতিতে থাকা উপাদানের ওপর দ্বিতীয়বার ছাঁকনি প্রয়োগ করে।

মুহাম্মদের মুখে শোনা পাঠও পরে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছে। সরাসরি শেখা পাঠ বর্জিত হতে পারে এবং সেই বর্জনের পক্ষে নসখের আয়াত ব্যবহার করা যায়—এই বিবরণ একটি বাছাইয়ের প্রক্রিয়ার সাক্ষ্য। সমস্ত পঠিত শব্দ যুগে যুগে হুবহু বহাল থাকা এবং কিছু পঠিত শব্দ ধর্মীয় সিদ্ধান্তে বাদ পড়া পরস্পরবিরোধী ঐতিহাসিক দাবি। উমরের বক্তব্যে প্রথম যুগের শ্রেষ্ঠ পাঠকের স্মৃতি ও গ্রহণযোগ্য পাঠের পরিসর এক হয়নি; উবাইয়ের অস্বীকৃতি সেই ব্যবধানের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য হিসেবে রয়ে গেছে।


একাধিক অনুমোদিত পাঠ থেকে রাষ্ট্রনির্ধারিত পাঠের দিকে যাত্রা

মুহাম্মদের সামনে ভিন্ন পাঠের বিরোধ মিটেছিল একাধিক রূপকে নাজিলকৃত বলে স্বীকৃতি দিয়ে। উসমানের নির্দেশে বিরোধ সামলানোর পদ্ধতি বদলেছে: নির্দিষ্ট লিখনমান নির্ধারণ, সেই মানের মুসহাফ বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো এবং অন্য সহিফা-মুসহাফ পুড়িয়ে দেওয়ার আদেশ। প্রথম ব্যবস্থায় অনুমোদিত বিকল্পের মধ্যে সহজটি বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল; দ্বিতীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্র অনুমোদিত লিখিত পরিসর নির্ধারণ করেছে। বহুপাঠের বৈধতা এবং একটি রাষ্ট্রীয় মানের বাধ্যতামূলক অনুসরণ কোরআনের ইতিহাসের দুটি পৃথক পর্যায়। প্রথম পর্যায়ের শেষ নির্দেশটি বুখারিতে স্পষ্ট। [228]

إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ أُنْزِلَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنْهُ

বাংলা অনুবাদ: এই কোরআন সাত আহরুফে নাজিল হয়েছে; অতএব এর মধ্য থেকে যা সহজ হয়, তা পাঠ করো।

উসমানি উদ্যোগের উপলক্ষ হিসেবে আনাসের বর্ণনায় হুযাইফার উদ্বেগ এসেছে। আরমেনিয়া ও আজারবাইজানের অভিযানে শাম ও ইরাকের লোকদের পাঠভেদ তাঁকে আতঙ্কিত করে। তিনি উসমানকে ধর্মগ্রন্থ নিয়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আগে ব্যবস্থা নিতে বলেন। উদ্বেগটি পাঠভেদকে কেন্দ্র করে; পরবর্তী হস্তক্ষেপও সেই ভিন্নতার সামাজিক পরিণতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ। [229]

فَأَفْزَعَ حُذَيْفَةَ اخْتِلاَفُهُمْ فِي الْقِرَاءَةِ

বাংলা অনুবাদ: পাঠের বিষয়ে তাঁদের মতভেদ হুযাইফাকে আতঙ্কিত করেছিল।

এই বর্ণনায় উদ্যোগের ধারাবাহিকতা খলিফার নির্দেশেই এগিয়েছে। হুযাইফা উদ্বেগ জানান, উসমান হাফসার কাছে সহিফা চান, অনুলিপি তৈরির লোক নির্ধারণ করেন এবং মতভেদ হলে কোন ভাষায় লিখতে হবে তা স্থির করেন। এরপর কপি বিতরণ ও অন্য উপকরণ ধ্বংসের নির্দেশ আসে। প্রয়োজন শনাক্ত করা, দায়িত্ব দেওয়া এবং বর্জনের সীমা নির্ধারণ—সবগুলো প্রশাসনিক পদক্ষেপ একই প্রক্রিয়ার অংশ। বর্ণিত উদ্যোগের চালক হলো খলিফার সিদ্ধান্ত ও তার বাস্তবায়নকারী নিযুক্ত দল।

মতভেদের ক্ষেত্রে উসমানের নির্ধারিত মান ছিল কুরাইশের ভাষা। তিন কুরাইশি সদস্যের সঙ্গে যায়েদ ইবনে সাবিতের কোনো বিষয়ে মতভেদ হলে সেই ভাষায় লিখতে বলা হয়। ফলে সংগ্রহের কাজের মধ্যেও ভাষাগত বাছাইয়ের জন্য আগাম সিদ্ধান্ত ছিল। [230]

إِذَا اخْتَلَفْتُمْ أَنْتُمْ وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ فِي شَىْءٍ مِنَ الْقُرْآنِ فَاكْتُبُوهُ بِلِسَانِ قُرَيْشٍ فَإِنَّمَا نَزَلَ بِلِسَانِهِمْ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের সঙ্গে যায়েদ ইবনে সাবিতের কোরআনের কোনো বিষয়ে মতভেদ হলে তা কুরাইশের ভাষায় লিখবে; কারণ তা তাদের ভাষায় নাজিল হয়েছে।

পাঠভেদের বিচার এখানে আর শুধু কোনো ব্যক্তির নিজে শেখা রূপের ওপর নির্ভর করছে না। লিখিত মান নির্ধারণের সময় নির্দিষ্ট ভাষাগত অগ্রাধিকার কার্যকর হচ্ছে। উমর ও হিশামের ঘটনায় দুজনের পাঠ শুনে দুটিই অনুমোদিত হয়েছিল; উসমানের নির্দেশে মতভেদের মুখে একটি নির্দিষ্ট ভাষার দিকে সিদ্ধান্ত ঝুঁকবে। ফলে কর্তৃত্বের কেন্দ্রও বদলেছে। নিজের জন্য সহজ পাঠ বেছে নেওয়ার অনুমতির জায়গায় কোন রূপ লিখিত মানে স্থান পাবে, তার সীমা স্থির করছেন খলিফা।

মুসহাফ নকলের কাজের মধ্যে খুঁজে পাওয়া আয়াত যুক্ত করার বিবরণও বুখারিতে আছে। যায়েদ বলেছেন, আহযাবের একটি আয়াত তিনি তখন খুঁজে পাননি, যদিও মুহাম্মদকে সেটি পড়তে শুনতেন। পরে খুযাইমা ইবনে সাবিতের কাছে তা পাওয়া যায় এবং সূরায় যুক্ত করা হয়। ফলে নির্দিষ্ট লিখিত কপি তৈরির ইতিহাসের মধ্যেই অনুসন্ধান ও সংযুক্তির একটি ধাপ রয়েছে। ব্যক্তির শোনার স্মৃতি এবং প্রস্তুত হচ্ছে যে মুসহাফ, তার মধ্যে মিল স্থাপনের জন্য কাজ করতে হয়েছে। [231]

فَقَدْتُ آيَةً مِنَ الأَحْزَابِ حِينَ نَسَخْنَا الْمُصْحَفَ قَدْ كُنْتُ أَسْمَعُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقْرَأُ بِهَا فَالْتَمَسْنَاهَا فَوَجَدْنَاهَا مَعَ خُزَيْمَةَ بْنِ ثَابِتٍ الأَنْصَارِيِّ ‏‏{‏مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ‏}‏ فَأَلْحَقْنَاهَا فِي سُورَتِهَا فِي الْمُصْحَفِ

বাংলা অনুবাদ: আমরা মুসহাফ নকল করার সময় আহযাবের একটি আয়াত আমি খুঁজে পেলাম না, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পড়তে শুনতাম। আমরা সেটি খুঁজলাম এবং আনসারি খুযাইমা ইবনে সাবিতের কাছে পেলাম: “মুমিনদের মধ্যে এমন লোক আছে, যারা আল্লাহকে দেওয়া অঙ্গীকার সত্য করেছে।” তারপর মুসহাফে সেটি তার সূরায় যুক্ত করলাম।

এই বিবরণে নকল তৈরি, অনুপস্থিত অংশ শনাক্ত করা, অনুসন্ধান এবং সংযুক্তি ধারাবাহিক কাজ। পরবর্তী পাঠকের সামনে যে নির্ধারিত মুসহাফ হাজির হয়েছে, তার প্রস্তুতির ভেতরে এই যাচাই ও সম্পূরণের প্রক্রিয়া ছিল। ফলে প্রস্তুত কপির কর্তৃত্ব এবং কপি প্রস্তুতের সময়কার কাজ এক করে দেখা যায় না। একটি সম্পন্ন মুসহাফ পরে অনুলিপির আদর্শ হতে পারে; সেটি সম্পন্ন করার ইতিহাসে মানুষের স্মৃতি, অন্যের কাছে অনুসন্ধান এবং আয়াতের অবস্থান নির্ধারণে সংযুক্তির ভূমিকা রয়ে যায়।

নির্ধারিত কপি তৈরি ও বিতরণের সঙ্গে অন্য লিখিত উপকরণ ধ্বংসের আদেশ যুক্ত হয়েছিল। বুখারির ভাষায় নির্দেশটি কোরআন থাকা সহিফা ও মুসহাফ সম্পর্কেই। কোন উপকরণ রাষ্ট্রীয়ভাবে বিতরণ করা হবে এবং কোন উপকরণ রাখা হবে না—এই দুই সিদ্ধান্ত একসঙ্গে কার্যকর করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। [232]

وَأَرْسَلَ إِلَى كُلِّ أُفُقٍ بِمُصْحَفٍ مِمَّا نَسَخُوا وَأَمَرَ بِمَا سِوَاهُ مِنَ الْقُرْآنِ فِي كُلِّ صَحِيفَةٍ أَوْ مُصْحَفٍ أَنْ يُحْرَقَ

বাংলা অনুবাদ: তাঁরা যে কপিগুলো তৈরি করেছিলেন, তার একটি করে তিনি প্রতিটি অঞ্চলে পাঠালেন এবং তা ছাড়া কোরআনের অন্য যেসব সহিফা বা মুসহাফ ছিল, সেগুলো পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিলেন।

অঞ্চলে অঞ্চলে একটি অনুমোদিত কপি পাঠানো এবং অন্য কপি ধ্বংসের নির্দেশ পরস্পরকে শক্তিশালী করে। প্রথমটি ভবিষ্যতের পাঠক ও লেখকদের সামনে একটি কেন্দ্রীয় আদর্শ হাজির করে; দ্বিতীয়টি প্রতিদ্বন্দ্বী লিখিত আদর্শ টিকে থাকার সুযোগ সংকুচিত করে। এর ফলে বহুল প্রচারিত হওয়ার সুবিধা এবং বিকল্প দলিল অপসারণের ক্ষমতা একই রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের হাতে জমা হয়। শুধু বেশি কপি তৈরি করা হলে পুরোনো উপকরণ তুলনার জন্য থাকতে পারত; ধ্বংসের নির্দেশ সেই সম্পর্ক বদলে দেয়।

বিবেচ্য বিষয়আগের অনুমোদিত বহুপাঠউসমানের নির্ধারিত ব্যবস্থা
বিরোধের নিষ্পত্তিভিন্ন পাঠও নাজিলকৃত বলে অনুমোদনলিখনের জন্য নির্দিষ্ট ভাষাগত মান
পাঠকের সুযোগঅনুমোদিত রূপগুলোর মধ্যে সহজটি পড়াবিতরণ করা মুসহাফকে অনুসরণের কেন্দ্র করা
সিদ্ধান্তদাতামুহাম্মদের প্রত্যক্ষ অনুমোদনখলিফা ও তাঁর নিযুক্ত অনুলিপিকারীরা
লিখিত দলিলের ভবিষ্যৎপ্রত্যেক বিকল্প কপি ধ্বংসের নির্দেশ এই অনুমতিতে নেইবিতরণকৃত কপির বাইরে অন্য সহিফা-মুসহাফ পোড়ানোর আদেশ
ঐতিহাসিক ফলঅনুমোদিত ভিন্নতার স্বীকৃতিরাষ্ট্রীয় মানের প্রচার ও বিকল্প দলিল অপসারণের নীতি

ইবনুত তীনের ব্যাখ্যায় আবু বকরের সংগ্রহ ও উসমানের উদ্যোগের উদ্দেশ্যও আলাদা। প্রথমটিতে পাঠধারীদের মৃত্যুর সঙ্গে কোরআনের অংশ হারানোর ভয় ছিল; উসমানের ক্ষেত্রে সামনে এসেছে বিদ্যমান পাঠরূপ নিয়ে বিরোধ। একটিতে বিচ্ছিন্ন উপাদান একত্র করার প্রয়োজন, অন্যটিতে ভিন্নতার মধ্যে একটি মান প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন। এই পার্থক্য দুই উদ্যোগের সামাজিক কাজ আলাদা করে: উপাদান জমা করা এবং কোন রূপ অনুসরণ করতে হবে তা নিয়ন্ত্রণ করা এক প্রক্রিয়া নয়। [233]

وَجَمْعُ عُثْمَانَ كَانَ لَمَّا كَثُرَ الَاخْتِلَافُ فِي وُجُوهِ القراءة

বাংলা অনুবাদ: উসমানের সংগ্রহ হয়েছিল যখন পাঠের বিভিন্ন রূপ নিয়ে মতভেদ বেড়ে গিয়েছিল।

সুয়ূতি ইবনুত তীন প্রমুখের ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করে বলেছেন, উসমান আগের ভাষাগত ছাড়ের প্রয়োজন শেষ হয়েছে বলে মনে করেছিলেন। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে একটি ভাষায় সীমিত করার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এখানে পূর্বের ছাড়ের প্রয়োজন ছিল কি না এবং কখন তার প্রয়োজন শেষ হলো—দুটি প্রশ্নের উত্তর পরবর্তী খলিফার মূল্যায়নের হাতে গেছে। নবীর দেওয়া সুযোগের ব্যবহারিক পরিসর বদলে দেওয়ার যুক্তিও সেই প্রয়োজন নির্ধারণের মধ্যেই রাখা হয়েছে। [234]

وإن كان قد وسع قِرَاءَتِهِ بِلُغَةِ غَيْرِهِمْ رَفْعًا لِلْحَرَجِ وَالْمَشَقَّةِ فِي ابْتِدَاءِ الْأَمْرِ فَرَأَى أَنَّ الْحَاجَةَ إِلَى ذَلِكَ قَدِ انْتَهَتْ فَاقْتَصَرَ عَلَى لُغَةٍ وَاحِدَةٍ.

বাংলা অনুবাদ: শুরুর দিকে কষ্ট ও অসুবিধা দূর করতে অন্যদের ভাষায়ও তা পাঠের সুযোগ দেয়া হয়েছিল; তিনি মনে করলেন সেই প্রয়োজন শেষ হয়েছে, তাই একটি ভাষায় সীমিত করলেন।

এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী পাঠের অনুমতির পরিসর অপরিবর্তিত রাখা হয়নি। প্রথমে মানুষের অসুবিধার কারণে বিকল্প ছিল; পরে শাসক মনে করেছেন সেই অসুবিধা আর আগের মতো নেই, তাই বিকল্পের সীমা সংকুচিত হয়েছে। অনুমোদিত পাঠের বৈধতা এবং প্রশাসনের বিবেচনায় সেই পাঠের প্রয়োজন থাকা—দুটি আলাদা মানদণ্ড। প্রথমটির উৎস নবুয়তি অনুমোদন; দ্বিতীয়টি সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে শাসকের মূল্যায়ন। দ্বিতীয় মানদণ্ড দিয়ে প্রথমটির ব্যবহারিক সুযোগ সীমিত করার মধ্যেই রাজনৈতিক ক্ষমতার ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ইবনে কাইয়িমের ব্যাখ্যায় এক হরফে একত্র করার পাশাপাশি অন্যভাবে পড়তে নিষেধ করার কথাও রয়েছে। ইসলামওয়েব তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে: মতভেদ এড়ানোর জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং অন্য রূপে পাঠ থেকে মানুষকে বাধা দেওয়া হয়। [235]

وَرَأَوْا أَنَّ جَمْعَهُمْ عَلَى حَرْفٍ وَاحِدٍ أَسْلَمُ، وَأَبْعَدُ مِنْ وُقُوعِ الِاخْتِلَافِ، فَعَلُوا ذَلِكَ، وَمَنَعُوا النَّاسَ مِنَ الْقِرَاءَةِ بِغَيْرِهِ

বাংলা অনুবাদ: তাঁরা মনে করলেন, মানুষকে এক হরফে একত্র করা অধিক নিরাপদ এবং মতভেদ ঘটার আশঙ্কা থেকে দূরে রাখে। তাই তাঁরা তা করলেন এবং অন্য হরফে পড়তে মানুষকে নিষেধ করলেন।

ইবনে কাইয়িম এই সিদ্ধান্তকে এক গন্তব্যে যাওয়ার একাধিক রাস্তার মধ্যে একটি রাস্তায় সবাইকে চলতে বাধ্য করার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর উপমায় অন্য রাস্তাগুলো গন্তব্যে পৌঁছায়, তবু সমষ্টিগত স্বার্থের কারণে সেগুলো ব্যবহার করতে নিষেধ করা যায়। [236]

وَلَمْ يَكُنْ فِيهِ إِبْطَالٌ لِكَوْنِ تِلْكَ الطُّرُقِ مُوصِلَةً إِلَى الْمَقْصُودِ، وَإِنْ كَانَ فِيهِ نَهْيٌ عَنْ سُلُوكِهِ لِمَصْلَحَةِ الْأُمَّةِ

বাংলা অনুবাদ: এতে ওই রাস্তাগুলো গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা বাতিল করা হয় না, যদিও উম্মতের স্বার্থে সেগুলো দিয়ে চলতে নিষেধ করা হয়।

এই যুক্তির মধ্যে আগের বিকল্পের বৈধতা এবং পরের নিষেধাজ্ঞা একসঙ্গে আছে। রাষ্ট্র যে রূপ অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে, তার বাইরে থাকা সব রূপ শুরু থেকেই মিথ্যা ছিল—এমন সিদ্ধান্ত এই ব্যাখ্যা থেকে আসে না। বরং ব্যবহারিক ঐক্যের জন্য আগে বৈধ বিকল্পেও বাধা দেওয়ার ক্ষমতা স্বীকার করা হয়েছে। এর অর্থ, পাঠের সত্যতা সম্পর্কে আগের অনুমোদনের ওপর পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নতুন ব্যবহারিক সীমা বসাতে পারে। মতভেদ রোধের যুক্তি এখানে পাঠের ওপর নিয়ন্ত্রণের ধর্মীয় বৈধতা তৈরির কাজ করছে।

তাবারির নিজস্ব ব্যাখ্যায় এই পরিত্যাগের দীর্ঘমেয়াদি ফল আরও স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, শাসকের সিদ্ধান্ত মেনে অন্য ছয় আহরুফে পড়া ছেড়ে দেওয়ার ফলে সেগুলোর জ্ঞান ও চিহ্ন লুপ্ত হয়ে গেছে। তাঁর মতে, এই পরিত্যাগ আগের রূপগুলোর সত্যতা অস্বীকার করে করা হয়নি। [237]

حَتَّى دَرَسَتْ مِنَ الْأُمَّةِ مَعْرِفَتُهَا، وَتَعَفَّتْ آثَارُهَا، فَلَا سَبِيلَ لِأَحَدٍ الْيَوْمَ إِلَى الْقِرَاءَةِ بِهَا، لِدُثُورِهَا وَعُفُوِّ آثَارِهَا، وَتَتَابُعِ الْمُسْلِمِينَ عَلَى رَفْضِ الْقِرَاءَةِ بِهَا، مِنْ غَيْرِ جُحُودٍ مِنْهَا صِحَّتَهَا وَصِحَّةَ شَيْءٍ مِنْهَا

বাংলা অনুবাদ: অবশেষে উম্মতের মধ্যে সেগুলোর জ্ঞান লুপ্ত হয়ে যায় এবং সেগুলোর চিহ্ন মুছে যায়। আজ কারও পক্ষে সেগুলোতে পড়ার উপায় নেই, কারণ সেগুলো বিলুপ্ত হয়েছে, চিহ্ন মুছে গেছে এবং মুসলিমরা ধারাবাহিকভাবে সেগুলোতে পড়া বর্জন করেছে; সেগুলোর সত্যতা বা সেগুলোর কোনো কিছুর সত্যতা অস্বীকার করে তারা তা করেনি।

তাবারির ব্যাখ্যায় সংরক্ষণ ও পরিত্যাগের মধ্যে একটি সচেতন বাছাই কাজ করেছে। আগে অনুমোদিত ছিল, পরে ব্যবহার বন্ধ হয়েছে, তারপর সেই রূপগুলোর জ্ঞান বিলুপ্ত হয়েছে—এই তিনটি ধাপ তিনি একসঙ্গে রেখেছেন। ফলে শেষ পর্যন্ত কোনো পাঠের অনুপস্থিতি তার আগে কখনো বৈধভাবে না থাকার সমার্থক নয়। প্রচলন বন্ধ হওয়া ও জ্ঞান হারিয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফল হতে পারে। একটি রাষ্ট্রীয় মান প্রতিষ্ঠার সাফল্য তার বাইরে থাকা সব পূর্ববর্তী রূপের পূর্ণ সংরক্ষণের সাক্ষ্য হয় না।

তাবারি সিদ্ধান্তটির পক্ষে বাধ্যবাধকতা ও ছাড়ের পার্থক্য করেছেন। তাঁর মতে, সব আহরুফে পড়ার নির্দেশ বাধ্যতামূলক ছিল না; তা ছিল অনুমতি। এভাবে তিনি অনুমোদিত সব রূপ বহাল না রাখার ধর্মীয় বৈধতা ব্যাখ্যা করেছেন। [238]

إِنَّ أَمْرَهُ إِيَّاهُمْ بِذَلِكَ لَمْ يَكُنْ أَمْرَ إِيجَابٍ وَفَرْضٍ، وَإِنَّمَا كَانَ أَمْرَ إِبَاحَةٍ وَرُخْصَةٍ

বাংলা অনুবাদ: এ বিষয়ে তাঁর নির্দেশ বাধ্যবাধকতা ও ফরজের নির্দেশ ছিল না; তা ছিল অনুমতি ও ছাড়ের নির্দেশ।

একজন পাঠক অনুমোদিত একাধিক রূপের মধ্যে একটি বেছে নেবেন এবং শাসক সবাইকে একটি রূপে সীমাবদ্ধ করে অন্যগুলোর প্রচলন বন্ধ করবেন—এই দুই কাজের পরিসর আলাদা। প্রথম ক্ষেত্রে নির্বাচন ব্যক্তির পাঠাভ্যাস নির্ধারণ করে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সমগ্র সমাজে কোন বিকল্প শেখানো ও ব্যবহার করা যাবে, তার ওপর প্রভাব পড়ে। ব্যক্তিগত পছন্দের অনুমতি থেকে সমষ্টিগত বিকল্প অপসারণের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে তাই রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও সামাজিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত যুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে। বিকল্প থাকা এবং বিকল্পের ব্যবহার বন্ধ করার এই পার্থক্য সিদ্ধান্তটির প্রকৃতি নির্ধারণ করে।

ইসলামকিউএ উসমানি লিখনরূপের সঙ্গে পরবর্তী গ্রহণযোগ্য পাঠের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে বলেছে, লিখনরূপ যে পাঠ ধারণ করতে পেরেছে তা পড়া হয়েছে এবং যা ধারণ করতে পারেনি তা রহিত হয়েছে। তাদের ব্যাখ্যায় লিখিত কাঠামোই গ্রহণযোগ্যতার সীমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। [239]

فَمَا احْتَمَلَهُ جَاءَتْ بِهِ الْقِرَاءَةُ وَمَا لَمْ يَحْتَمِلْهُ نُسِخَ

বাংলা অনুবাদ: লিখনরূপ যা ধারণ করতে পেরেছে, পাঠে তা এসেছে; আর যা ধারণ করতে পারেনি, তা রহিত হয়েছে।

এই ব্যাখ্যায় লিখিত মানের বাইরেও সব রূপ সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য থেকে যায় না। নির্বাচিত লেখ্যরূপের সঙ্গে মেলার ক্ষমতা একটি শর্ত হয়ে ওঠে। ফলে লিখনমান নির্ধারণের সিদ্ধান্ত পাঠের ভবিষ্যৎ পরিসরেও প্রভাব ফেলে। মৌখিক শিক্ষা ও লিখিত দলিলের সম্পর্ক এখানে দ্বিমুখী: আগের পাঠ থেকে লেখা তৈরি হয়, আবার নির্ধারিত লেখা পরবর্তী পাঠের গ্রহণযোগ্যতা সীমিত করে। যে শব্দরূপ আগে শিক্ষকের কাছে শোনা হয়েছিল, সেটি পরবর্তী নির্দিষ্ট লিখনমানের মধ্যে স্থান পাবে কি না—এই প্রশ্নও তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রক্রিয়ার ধাপকী করা হচ্ছেপাঠের ইতিহাসে প্রভাব
ভিন্নতা নিয়ে উদ্বেগআঞ্চলিক পাঠসংঘাত খলিফার সামনে তোলাপাঠভেদ প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের বিষয় হয়
মান নির্ধারণমতভেদে কুরাইশি ভাষায় লিখতে নির্দেশলিখিত নির্বাচনের অগ্রাধিকার স্থির হয়
কপি বিতরণঅঞ্চলে অঞ্চলে অনুমোদিত মুসহাফ পাঠানোএকটি কেন্দ্রীয় মানের প্রচার
বিকল্প উপকরণ পোড়ানোর আদেশঅন্য সহিফা-মুসহাফ অপসারণের ব্যবস্থাবিকল্প লিখিত সাক্ষ্য ধ্বংসের ব্যবস্থা
অন্য পাঠের প্রচলন বন্ধশাস্ত্রকারদের ব্যাখ্যায় নিষেধ ও পরিত্যাগপ্রজন্মান্তরে বিকল্পের জ্ঞান হারানোর প্রক্রিয়া

কোনো দলিল নষ্ট হলে তার সঙ্গে টিকে থাকা দলিলের তুলনার সুযোগও নষ্ট হয়। পুরোনো কপিতে ঠিক কোথায় কোন পার্থক্য ছিল, তার প্রত্যক্ষ পরীক্ষা তখন কঠিন হয়ে পড়ে। পরবর্তী উদ্ধৃতি বা স্মৃতিতে কোনো কোনো পাঠের খবর থেকে যেতে পারে; মূল উপকরণ ধ্বংসের ফলে সেগুলো সম্পূর্ণ কপির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ আগের মতো থাকে না। একই সঙ্গে কোন পাঠ ব্যাপকভাবে নকল হবে এবং কোন উপকরণ বর্জিত হবে, সেই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের প্রমাণভাণ্ডারকেও প্রভাবিত করে।

এই কারণে টিকে থাকা পাঠের পরবর্তী ব্যাপক প্রচলনকে আগের সব পাঠের পূর্ণ অভিন্নতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যুক্তিগতভাবে অসঙ্গত। ব্যাপক প্রচলন কীভাবে তৈরি হয়েছে, সেটিও প্রমাণের অংশ। নির্দিষ্ট মানের কপি রাষ্ট্র বিতরণ করলে সেই মানের উপস্থিতি বাড়বে; অন্য কপি ধ্বংসের নির্দেশ দিলে বিকল্পের লিখিত উপস্থিতি কমবে। পরের যুগে একটি রূপের আধিপত্য পাওয়া এই নির্বাচনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেই আধিপত্য দিয়ে নির্বাচন ও বর্জনের আগের অবস্থাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভিন্ন ঘোষণা করা যায় না।

সাত আহরুফ, পরবর্তী সাত বা দশ কিরাআত এবং সাতটি স্বতন্ত্র গোত্রীয় ভাষা এক বিষয় নয়। উসমানের নির্ধারিত লিখনমানের ভেতরে কোন ভিন্নতা টিকেছে এবং তার বাইরে কোন রূপের প্রচলন বন্ধ হয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তরও এই পরিভাষাগুলো এক করে পাওয়া যায় না। বুখারির নির্দেশ লিখিত মান, বিতরণ ও ধ্বংসের কথা জানায়; তাবারি ও অন্য শাস্ত্রকারেরা তার সঙ্গে আগের অনুমতির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন। পরবর্তী পাঠপরম্পরার পরিচিত সংখ্যা দিয়ে এই প্রশাসনিক বাছাইয়ের ইতিহাস মুছে যায় না।

সহজ পাঠ বেছে নেওয়ার অনুমতি থেকে রাষ্ট্রনির্ধারিত সীমায় যাওয়ার পরিবর্তনটি তাই কোরআন সংকলনের কেন্দ্রীয় ঘটনা। এর মধ্যে পূর্ববর্তী পাঠের ব্যবহার, ভাষাগত অগ্রাধিকার, লিখিত আদর্শের প্রচার এবং বিকল্প দলিল অপসারণ একত্র হয়েছে। উসমানের পদক্ষেপকে শুধু সংরক্ষণ নাম দিলে এই গ্রহণ-বর্জন ও ক্ষমতার ভূমিকা আড়াল হয়। ধর্মীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার যুক্তি দেওয়া হয়েছে, আর সেই যুক্তির ভিত্তিতে কোন রূপ ব্যবহারযোগ্য থাকবে তার সীমাও বদলেছে। যে পাঠ শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পেয়েছে, তার ইতিহাসের মধ্যে আগের বিকল্পের অনুমোদন এবং পরবর্তী বিকল্প বর্জন—দুই ঘটনাই রয়েছে।


পঠিত আয়াতে নতুন শব্দ: মানুষের প্রশ্নের পরে পাঠ সংশোধন

কোরআনের প্রচলিত আয়াতের ভাষায় মানুষের বোঝাপড়ার সমস্যার পরে নতুন শব্দ যুক্ত হওয়ার বিবরণ রয়েছে। প্রথমে একটি নির্দেশ উচ্চারিত হয়েছে, মানুষ সেই নির্দেশ অনুসারে কাজ করেছে, তারপর তাদের আচরণের সঙ্গে উদ্দেশ্যগত অমিল দূর করতে আয়াতের ভেতর বাড়তি কথাও এসেছে। ফলে নির্দেশটির ইতিহাসে আগের পাঠ, সেই পাঠের প্রয়োগ এবং পরবর্তী সংযোজন—তিনটি ধাপ উপস্থিত। এই পরিবর্তনের ধর্মীয় নাম ওহি; ভাষাগত ফল হলো আয়াতের শব্দবৃদ্ধি। সংযোজনের আগে যে বাক্য মানুষ শুনেছিল এবং সংযোজনের পরে যে বাক্য কোরআনের অংশ হয়েছে, তাদের মধ্যে প্রত্যক্ষ শব্দগত পার্থক্য রয়েছে।


সাদা-কালো সুতো এবং পরে যুক্ত হওয়া “মিনাল ফাজর”

সূরা বাকারার ১৮৭ নম্বর আয়াতে পানাহার বন্ধ করার সময় বোঝাতে সাদা ও কালো সুতোর কথা এসেছে। সাহল ইবনে সাদের বর্ণনায় এই নির্দেশ প্রথমে “মিনাল ফাজর” ছাড়া নাজিল হয়েছিল। কিছু লোক সত্যিকারের সুতো ব্যবহার করার পরে “ভোরের” কথাটি আয়াতে যুক্ত হয়। সংযোজনটি তখনই প্রচলিত হয়ে যাওয়া একটি নির্দেশের ভাষা বদলেছে।


প্রথম পাঠ ও বাস্তব সুতো ব্যবহার

বুখারির তাফসির অধ্যায়ে সাহলের বর্ণনা প্রথম পাঠের অবস্থা সরাসরি জানায়। খাওয়া ও পান করার অনুমতি ছিল কালো সুতো থেকে সাদা সুতো আলাদা করে চেনা পর্যন্ত; তখন “ভোরের” কথাটি নাজিল হয়নি। প্রথম পাঠে কোন কথাটি অনুপস্থিত ছিল, সাহল সেটি আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন। আয়াতটির পরবর্তী প্রচলিত রূপে যে নির্দেশনাটি আছে, প্রথমে শ্রোতারা সেই বাড়তি কথাটি শোনেননি। [240]

وَأُنْزِلَتْ ‏{‏وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الأَسْوَدِ‏}‏ وَلَمْ يُنْزَلْ ‏{‏مِنَ الْفَجْرِ‏}‏

বাংলা অনুবাদ: “তোমরা খাও ও পান করো, যতক্ষণ না তোমাদের কাছে কালো সুতো থেকে সাদা সুতো পৃথক হয়ে প্রকাশিত হয়” নাজিল হয়েছিল; “ভোরের” কথাটি নাজিল হয়নি।

এই বাক্য শুনে কিছু লোক সাদা ও কালো সুতো পায়ে বেঁধেছিলেন। তাঁরা সুতো দুটি চোখে আলাদা করে দেখতে পাওয়া পর্যন্ত খাওয়া চালিয়ে যেতেন। আয়াতে ব্যবহৃত শব্দের পরিচিত অর্থকে তাঁরা নিজেদের পালনীয় কাজের মাপকাঠি করেছিলেন। এরপর নতুন বাক্যাংশ নাজিল হলে তাঁরা বুঝলেন, নির্দেশটি রাতের অন্ধকার ও দিনের আলো সম্পর্কে। বুখারির রোজা অধ্যায়ে সেই প্রয়োগ ও সংশোধনের ধারাবাহিক বিবরণ রয়েছে। [241]

فَكَانَ رِجَالٌ إِذَا أَرَادُوا الصَّوْمَ رَبَطَ أَحَدُهُمْ فِي رِجْلِهِ الْخَيْطَ الأَبْيَضَ وَالْخَيْطَ الأَسْوَدَ، وَلَمْ يَزَلْ يَأْكُلُ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَهُ رُؤْيَتُهُمَا، فَأَنْزَلَ اللَّهُ بَعْدُ ‏‏{‏مِنَ الْفَجْرِ‏}‏ فَعَلِمُوا أَنَّهُ إِنَّمَا يَعْنِي اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ

বাংলা অনুবাদ: কিছু লোক রোজা রাখতে চাইলে নিজের পায়ে সাদা সুতো ও কালো সুতো বেঁধে নিতেন। সুতো দুটিকে স্পষ্ট দেখতে পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা খেতে থাকতেন। তারপর আল্লাহ “ভোরের” কথাটি নাজিল করলেন। তখন তাঁরা বুঝলেন, এর দ্বারা রাত ও দিন বোঝানো হয়েছে।

আদী ইবনে হাতেমের বর্ণনায় একই শব্দের আক্ষরিক অর্থ গ্রহণের আরেকটি ঘটনা আছে। তিনি সাদা ও কালো দড়ি বালিশের নিচে রেখেছিলেন এবং রাতে তাদের পার্থক্য দেখার চেষ্টা করেছিলেন। সকালে মুহাম্মদকে জানালে তিনি রাতের অন্ধকার ও দিনের আলোর কথা বলেন। আদীর অভিজ্ঞতা নির্দেশের রূপক অর্থ বুঝতে সমস্যার প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত। [242]

عَمَدْتُ إِلَى عِقَالٍ أَسْوَدَ وَإِلَى عِقَالٍ أَبْيَضَ، فَجَعَلْتُهُمَا تَحْتَ وِسَادَتِي، فَجَعَلْتُ أَنْظُرُ فِي اللَّيْلِ، فَلاَ يَسْتَبِينُ لِي، فَغَدَوْتُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَذَكَرْتُ لَهُ ذَلِكَ فَقَالَ ‏”‏ إِنَّمَا ذَلِكَ سَوَادُ اللَّيْلِ وَبَيَاضُ النَّهَارِ ‏”

বাংলা অনুবাদ: আমি একটি কালো দড়ি ও একটি সাদা দড়ি নিয়ে আমার বালিশের নিচে রাখলাম। রাতে সেদিকে তাকাতে থাকলাম, কিন্তু আমার কাছে তাদের পার্থক্য স্পষ্ট হলো না। সকালে আল্লাহর রাসুলের কাছে গিয়ে বিষয়টি জানালাম। তিনি বললেন, “এটি হলো রাতের অন্ধকার ও দিনের আলো।”

ইবনে হাজার আদীর ইসলাম গ্রহণের সময় নবম অথবা দশম হিজরি বলেছেন; রোজা ফরজ হওয়ার সময় ছিল হিজরতের প্রথম দিকে। তাঁর ব্যাখ্যায় আদীর “যখন নাজিল হলো” কথার অর্থ আয়াতটি তাঁর কাছে পড়া হওয়া কিংবা নাজিল হওয়ার খবর তাঁর কাছে পৌঁছানো। ফলে আদীর ঘটনাটি সাহলের বর্ণিত প্রথম সংযোজনের ঘটনার পরে পড়ে। মাযহারীর উদ্ধৃতিতেও এই পৃথক সময়ক্রম রয়েছে। [243]

وَإِسْلَامَ عَدِيٍّ كَانَ فِي التَّاسِعَةِ أَوِ الْعَاشِرَةِ، كَمَا ذَكَرَهُ ابْنُ إِسْحَاقَ وَغَيْرُهُ مِنْ أَهْلِ الْمَغَازِي

বাংলা অনুবাদ: আদীর ইসলাম গ্রহণ ছিল নবম অথবা দশম বছরে, যেমন ইবনে ইসহাক ও মাগাজির অন্য লেখকেরা উল্লেখ করেছেন।

দুটি ঘটনার মিল হলো সুতোর আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ; তাদের সময় ও তাৎক্ষণিক প্রতিকার আলাদা। সাহলের বর্ণনায় প্রথমে বাক্যাংশ অনুপস্থিত, পরে আয়াতে সংযোজন; আদীর ক্ষেত্রে মুহাম্মদ মুখে অর্থ বুঝিয়েছেন। একটি ঘটনায় কোরআনের পাঠ বাড়ছে, অন্যটিতে ইতিমধ্যে প্রচলিত পাঠের অর্থ ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। একই শব্দ নিয়ে বিভ্রান্তি উভয় সময়েই ঘটেছে।


বুখারির সংযোজন-বিবরণ এবং তাফসিরে সময়ের হিসাব

বুখারির বর্ণনায় “পরে” নাজিল হওয়ার কথা আছে। মাযহারীর বাংলা তাফসিরে ব্যবধানটি আনুমানিক এক বছর বলা হয়েছে। সেখানে প্রথম বাক্যটি “মিনাল ফাজর” ছাড়া এবং পরবর্তী বাক্যটি এই শব্দসমষ্টিসহ নাজিল হওয়ার ব্যাখ্যাও রয়েছে। একই আলোচনায় ব্যাখ্যা বিলম্বিত হওয়ার সমস্যা, তাহাবীর রহিতকরণের মত এবং ভাষ্যকারের নিজের সমাধান এসেছে। [244]

শুভ্ররেখা স্পষ্টভাবে…’ এই আয়াতটি অবতীর্ণ হলো, তখন আমি একটি কালো এবং একটি শাদা সুতা বালিশের নিচে রেখে দিলাম। কিন্তু রাতে আমি সুতা দু’টির বর্ণনির্ণয় করতে পারলাম না। সকালে রসুল আকরম স. এর নিকট আমি বিষয়টি নিবেদন করলে তিনি বললেন, আয়াতে এ কথার দ্বারা রাতের অন্ধকার এবং দিনের আলোকে বুঝানো হয়েছে। বোখারী, মুসলিম। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি স. বললেন, তোমরা স্বল্পবুদ্ধি সম্পন্ন। এখানে বিষয়টি হচ্ছে, দিবসের আলো ও নিশীথের আঁধার।
হজরত সহল বিন সা’দ থেকে বর্ণিত হয়েছে- এই আয়াতটির সঙ্গে প্রথমে মিনাল ফাজরি কথাটি ছিলো না। তাই কতিপয় সাহাবী তাঁদের পায়ে শাদা ও কালো সুতা বেঁধে রাখতেন। সুতা দু’টি স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা পানাহার করতেন। তারপর যখন মিনাল ফাজরি বাক্যাংশটি অবতীর্ণ হয়ে মূল বাক্যের সঙ্গে সংযোজিত হলো, তখন সকলে বুঝতে পারলেন, এখানে কৃষ্ণরেখা ও শুভ্ররেখা কথা দু’টোর অর্থ হবে রাত ও দিন। বোখারী, মুসলিম। প্রশ্ন উঠতে পারে, বর্ণিত হাদিসানুযায়ী মিনাল ফাজরি কথাটি অবতীর্ণ হয়েছে কিছুদিন পরে। যদি তাই হয়, তবে বাক্যাংশের (মিনাল ফাজরি) এমতো সংযোজন ভাষাবিদগণের নিকট সুসঙ্গত বলে গৃহীত হয় না। এতে করে প্রমাণিত হয় যে, প্রয়োজনের সময় কথাটি মূল বাক্যের সঙ্গে সংযুক্ত অবস্থায় অবতীর্ণ হয়নি। আমি বলি, শাদা ও কালো রেখা বলতে দিন ও রাতকেই বুঝায়-এরকম ধারণা সুপ্রচলিত। কোনো বর্ণনাবিশ্লেষণের আবশ্যকীয়তা এখানে নেই। কতিপয় ব্যক্তি যদি স্বল্পবুদ্ধির কারণে ভিন্নতর অর্থ গ্রহণ করে তবে তা অবোধ্য বা দুর্বোধ্য বলে বিবেচিত হতে পারে না। তবে এটি একটি সমস্যা বটে। মানতে হবে বক্তব্যের পূর্ণ উন্মোচন এখানে ঘটেনি। তাই পরবর্তীতে মিনাল ফাজরি কথাটি সংযুক্ত করে বক্তব্যের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটানো হয়েছে। এতে করে স্বল্পবুদ্ধিজাত সমস্যা আর সৃষ্টি হবে না। বিষয়টি হবে তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট ও সহজ। বিষয়টিকে যদি দুর্বোধ্য বলে চিহ্নিত করা হয়ও, তবুও জটিলতার প্রশ্ন এখানে নেই। কারণ, বিধানদাতার (আল্লাহ্) প্রত্যাদেশের ধরণ দু’টি। একটি হচ্ছে, ওহীয়ে মাতলু। আরেকটি হচ্ছে, ওহীয়ে গায়ের মাতলু। কোরআন হচ্ছে, ওহীয়ে মাতলু আর হাদিসকে বলা হয় ওহীয়ে গায়ের মাতলু। ইতোপূর্বে বর্ণিত হজরত আদী বিন হাতেমের হাদিস (ওহীয়ে গায়ের মাতলু দ্বারা) বিষয়টির ধারণা স্পষ্ট করা হয়েছে।
তাহাবী বলেছেন, খাইতিল আবইয়াদ ও খাইতি আসওয়াদ দু’টি শব্দের অর্থই স্পষ্ট। ‘মিনাল ফাজরি’ কথাটি তার নাসেখ বা রহিতকারী। তাহাবীর সমর্থনে
রয়েছে হজরত হুজায়ফা বর্ণিত একটি হাদিস যেখানে বলা হয়েছে- আমরা মহানবী স. এর সঙ্গে এমন সময় সেহেরী করেছি, যখন দিনের আলো প্রস্ফুটিত ছিলো। শুধু সূর্য ওঠা বাকি ছিলো। হাদিসটি বর্ণনা করেছেন সাঈদ বিন মানসুর। এটা কোনো বিস্ময়ের ব্যাপার নয় যে, মিনাল ফাজরি অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে হজরত হুজায়ফা রসুল পাক স. এর সঙ্গে সেহেরী করেছেন। একথা মেনে নিলেও সমস্যা থেকে যায়। সেগুলো হচ্ছে- ১. ‘মিনাল ফাজরি’ কথাটি পূর্ণ বাক্য নয়। অথচ রহিতকারী বাক্যটি একটি পূর্ণ বাক্য হওয়াই যুক্তিগ্রাহ্য। ২. যদি ধরে নেয়া যায় মিনাল ফাজরি পরে অবতীর্ণ হয়েছে তবে তা পূর্ববর্তী বাক্যের সঙ্গে মিলিতরূপ নিলো কী করে? (মিলিত হলে তো একযোগেই অবতীর্ণ হতো)। সুতরাং সমস্যাটি এখানে এই যে, মিনাল ফাজরি কথাটি এখানে রহিতকারী নয় এবং মিলিতও নয়।
এই জটিলতার নিরসনে স্বয়ং ভাষ্যকার বলেছেন, বাক্যটি প্রথমে মিনাল ফাজরি ব্যতিরেকেই অবতীর্ণ হয়েছিলো। পুনরায় অবতীর্ণ হয়েছে মিনাল ফাজরি সহযোগে। তাই পরের মিনাল ফাজরি সংযুক্ত পূর্ণ বাক্যটি পূর্বের মিনাল ফাজরি বিহীন বাক্যটিকে রহিত করে দিয়েছে।
বিঃ দ্রঃ হজরত আদী বিন হাতেমের ঘটনাটি ঘটেছিলো পূর্ণ বাক্যটি অবতীর্ণ হওয়ার পর। তার কারণ হচ্ছে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন নবম হিজরীতে। আর রোজার বিধানাবলী অবতীর্ণ হয়েছে দ্বিতীয় হিজরীতে। আনুমানিক একবছর পর অবতীর্ণ হয়েছে মিনাল ফাজরি সংবলিত বাক্যটি। সুতরাং তিনি বালিশের নিচে সুতা রেখেছিলেন মিনাল ফাজরি এর মিন অব্যয়টির কারণগত অর্থ গ্রহণ করার জন্য। আল্লাহপাকই সমধিক জ্ঞাত।
বিঃ দ্রঃ ফজর পর্যন্ত স্ত্রীসম্ভোগ সিদ্ধ- একথা বুঝা যায়, ফজরের পরে গোসল করা যাবে এবং সূর্যোদয় ঘটার পর নাপাক অবস্থায় থাকলেও রোজা শুদ্ধ হবে। এটা ঐকমত্য। ‘অতঃপর নিশাগম পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর’- এ কথার মাধ্যমে রোজার শেষ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। হজরত ওমর বিন খাত্তাব কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, যখন সূর্য্য অস্তমিত হয়-দিন শেষে শুরু হয় রাতের অন্ধকার-তখন ইফতারের সময়। বোখারী। সুবহে সাদেক থেকে সূর্য্য অস্তমিত হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ্ ইবাদতের উদ্দেশ্যে পানাহার ও রতিকর্ম থেকে বিরত থাকার নাম রোজা। এখানে রোজার এই সংজ্ঞাটি স্পষ্টরূপে উদ্ধৃত হয়েছে। ‘সুম্মা আতিম্মু’ অর্থ অতঃপর (রোজা) পূর্ণ কর- একথার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, রোজার জন্য সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য (নিয়ত) থাকতে হবে। পূর্ণকরণ কার্য্যটি আমরে এখতেয়ারী (ইচ্ছামূলক কর্ম)। আর ইচ্ছামূলক কর্ম কখনও নিয়ত ছাড়া পূর্ণ হয় না। প্রতিটি ইবাদতের জন্য নিয়ত থাকা ফরজ। রোজাও ইবাদত। তাই রোজার নিয়তও ফরজ। আল্লাহ্পাক এরশাদ করেন ‘ওয়ামা উমিরু ইল্লালিয়া বুদুল্লাহা মুিিসনা লাহুদ্দিন (আর তাদেরকে এই নির্দেশই দেয়া হয়েছে শুধু তাঁর ইবাদত মনে করে তারা যেনো তাদের উপাসনা সম্পন্ন করে) রসুল স. বলেছেন প্রতিটি কর্মের ভিত্তি হচ্ছে নিয়ত। নিয়তের প্রতি নির্ভর করে কর্মফল। তাই কেউ যদি আল্লাহ্ ও তাঁর রসুলের জন্য হিজরত করে তবে সে তার নিয়তের প্রতিফল পাবে। পার্থিব উদ্দেশ্যে যে হিজরত করবে, পার্থিবতাই হবে তার অর্জন। আবার রমণী লাভের

কোরআন সংকলন 26
কোরআন সংকলন 28

ইবন আতিয়্যার আল-মুহাররারুল ওয়াজিয থেকেও দুই পর্যায়ের মধ্যে এক বছরের ব্যবধানের বর্ণনা উদ্ধৃত করেছে ইসলামকিউএ। উদ্ধৃতিতে এক রমজান থেকে আরেক রমজানের কথা এসেছে। বুখারির “পরে” এবং এই ভাষ্যে উদ্ধৃত সময়ের হিসাব—দুটির তথ্য আলাদা: প্রথমটি ধারাবাহিকতা জানায়, দ্বিতীয়টি সেই ব্যবধানের দৈর্ঘ্য সম্পর্কে বর্ণনা সংরক্ষণ করে। [245]

وروي أنه كان بين طرفي المدة عام ، قال القاضي أبو محمد: من رمضان إلى رمضان، تأخر البيان إلى وقت الحاجة

বাংলা অনুবাদ: বর্ণিত হয়েছে, সময়ের দুই প্রান্তের মধ্যে এক বছর ছিল। কাজি আবু মুহাম্মদ বলেছেন: এক রমজান থেকে আরেক রমজান; ব্যাখ্যা প্রয়োজনের সময় পর্যন্ত বিলম্বিত হয়েছিল।

পর্যায়লিখিত বাক্যাংশের অবস্থাবর্ণনায় ফল
আগের পাঠمِنَ الْفَجْرِ অনুপস্থিতকেউ বাস্তব সুতো বেঁধে পরীক্ষা করত
পরের পাঠمِنَ الْفَجْرِ যুক্তরাতের অন্ধকার ও দিনের আলোর অর্থ স্পষ্ট হলো
সময় সম্পর্কে সূত্রবুখারীতে পরে হওয়ার কথাবছরখানেকের নির্দিষ্ট হিসাব মূল তাফসিরের আলাদা বিবরণ

ইসলামকিউএ আয়াতের অর্থ নিয়ে পৃথক উত্তরে প্রথমে “মিনাল ফাজর” নাজিল না হওয়াকেই ভুল বোঝার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেই উত্তরে সাহলের বর্ণনা ও আদীর ঘটনা আলাদা করে দেওয়া হয়েছে এবং কিছু আলেমের এক বছরের হিসাবও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ পাঠের অসম্পূর্ণ নির্দেশনা থেকে ভুল প্রয়োগ এবং পরে বাড়তি শব্দে অর্থ স্পষ্ট হওয়ার ঘটনাক্রম তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যাতেও সরাসরি রয়েছে। [246]

أنزل الآية أولاً بدون قوله : )مِنَ الْفَجْرِ )

বাংলা অনুবাদ: আয়াতটি প্রথমে তাঁর “মিনাল ফাজর” কথাটি ছাড়া নাজিল করেছিলেন।

মাযহারীতে একই ভাষ্য একদিকে ভুল বোঝা লোকদের “স্বল্পবুদ্ধি” বলেছে, আবার স্বীকার করেছে, “বক্তব্যের পূর্ণ উন্মোচন এখানে ঘটেনি।” দ্বিতীয় বক্তব্যটি প্রথম নির্দেশের প্রকাশের ঘাটতি মেনে নেয়। নির্দেশের গ্রহীতা কিছু মানুষ তার আক্ষরিক অর্থ অনুযায়ী কাজ করেছিল; বাড়তি শব্দ যুক্ত হওয়ার পরে তারা ভিন্ন অর্থ বুঝেছিল। এখানে ভাষার কার্যকারিতার প্রশ্নটি প্রত্যক্ষ: পূর্বের বাক্য তাদের কাছে যে অর্থ পৌঁছেছিল, সংযোজনের পরে সেই অর্থ বদলেছে। “স্বল্পবুদ্ধি” বিশেষণটি মানুষের ওপর দায় চাপায়; আয়াতে নতুন শব্দ ঢোকানোর ঘটনাটি নির্দেশের ভাষায় হস্তক্ষেপের সাক্ষ্য দেয়।


শব্দসংযোজনের ফলে বদলে যাওয়া বক্তব্য

বর্তমান আয়াতে “মিনাল ফাজর” মূল বাক্যের ভেতরেই রয়েছে। শব্দসমষ্টিটি সাদা রেখাকে ভোরের আলোর সঙ্গে যুক্ত করে। “সুতো” শব্দ দিয়ে কোন দৃশ্য বোঝানো হয়েছে, বাড়তি কথাটি তার পরিচয় নির্দিষ্ট করে দেয়। ফলে পানাহার বন্ধ করার সময় নির্ধারণে বাক্যটির ব্যবহারিক নির্দেশনাও স্পষ্ট হয়। কোরআনের প্রচলিত পাঠে এই বিন্যাস রয়েছে। [247]

وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ۖ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ

বাংলা অনুবাদ: তোমরা খাও ও পান করো, যতক্ষণ না ভোরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারপর রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো।

পাঠের উপাদানআগের ও পরের পার্থক্যনির্দেশের ফল
প্রথমে বর্ণিত বাক্যকালো সুতো থেকে সাদা সুতোর পার্থক্য বোঝার কথাকিছু শ্রোতা বাস্তব সুতোকে মাপকাঠি করেছিলেন
পরবর্তী সংযোজনمِنَ الْفَجْرِ — “ভোরের”সাদা রেখার সঙ্গে ভোরের সম্পর্ক নির্দিষ্ট হলো
ব্যাখ্যার অবস্থানবাড়তি শব্দ আয়াতের বাক্যেই যুক্তপরবর্তী পঠিত বাক্যে আগের চেয়ে শব্দ বেশি
সাহলের বর্ণিত প্রতিক্রিয়াসংযোজনের পরে রাত ও দিনের অর্থ বোঝাআক্ষরিক প্রয়োগের জায়গায় সময়সংক্রান্ত অর্থ প্রতিষ্ঠিত হলো

আগে ও পরে আয়াতটির শব্দসংখ্যা সমান ছিল না। “মিন” ও “আল-ফাজর” যুক্ত হওয়ায় নির্দিষ্ট একটি পাঠ বড় হয়েছে। সংযোজনের ব্যাখ্যামূলক কাজও বর্ণনায় পরিষ্কার: সাদা ও কালো সুতোর পরিচিত বস্তুগত অর্থ থেকে শ্রোতার মনোযোগ রাত-দিনের পরিবর্তনের দিকে নেওয়া। মানবীয় ভুল বোঝাবুঝির পরে নির্দিষ্ট বাড়তি ভাষা এসেছে। সেই ভাষা পরবর্তী আবৃত্তির অংশ এবং কোরআনের আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফলে পরিবর্তনটি শুধু কারও ব্যক্তিগত উপলব্ধির মধ্যে সীমিত থাকেনি; উচ্চারিত বাক্যের গঠনেও স্থায়ী চিহ্ন রেখেছে।

তাহাবী ও দাউদীর ব্যাখ্যায় প্রথম নির্দেশ তার আপাত অর্থে কার্যকর ছিল; পরে “মিনাল ফাজর” দ্বারা তা রহিত হয়েছে। ইবনে হাজার এই মত ফাতহুল বারিতে সংরক্ষণ করেছেন। মাযহারীর দীর্ঘ উদ্ধৃতিতে পূর্ণ বাক্য পুনরায় নাজিল হয়ে আগের বাক্যকে রহিত করার ব্যাখ্যাও রয়েছে। এই ব্যাখ্যাগুলো আগের ও পরের নির্দেশের সম্পর্ক নির্ধারণ করছে। [248]

ثُمَّ نُسِخَ بَعْدَ ذَلِكَ بِقَوْلِهِ تَعَالَى : مِنَ الْفَجْرِ

বাংলা অনুবাদ: তারপর তা পরবর্তী সময়ে তাঁর “মিনাল ফাজর” কথার দ্বারা রহিত হয়েছে।

প্রথম বাক্য রহিত হয়ে বাড়তি শব্দসহ নতুন বাক্য কার্যকর হওয়ার মাযহারীর ব্যাখ্যায় বদলটি আরও স্পষ্ট। আগের বাক্যের জায়গায় কোন বাক্য কার্যকর থাকবে, সেটিই সেখানে নির্ধারিত হচ্ছে। সাহলের বর্ণনায় মানুষের আচরণ, সংযোজন এবং অর্থ উপলব্ধির যে ধারাবাহিকতা আছে, ভাষ্যকারেরা তার ধর্মতাত্ত্বিক শ্রেণিবিন্যাস করেছেন। ভাষ্যকারের শ্রেণিবিন্যাস ও হাদিসের ঘটনাবিবরণ পৃথক স্তরের তথ্য; উভয়ের মধ্যেই প্রথম পাঠ ও পরবর্তী পাঠের পার্থক্য উপস্থিত।

প্রত্যক্ষ শ্রোতার সুতো ব্যবহারের বিবরণ প্রথম নির্দেশের কার্যকর অস্পষ্টতা দেখায়। যারা নির্দেশ পালন করতে গিয়ে পায়ে সুতো বেঁধেছিল, তারা বাক্যটির ভাষা থেকেই সেই কাজের ধারণা পেয়েছিল। তাদের বোঝার সমস্যা দূর করতে যে শব্দ যোগ করা হলো, সেটি পরবর্তী কোরআনের পাঠে স্থান পেয়েছে। মাযহারীতে এই ভাষাগত সমস্যার দায় শ্রোতার বুদ্ধির ওপর চাপানো হয়েছে। অথচ অর্থ স্পষ্ট করতে শেষ পর্যন্ত আয়াতের বাক্যেই নতুন শব্দ ঢোকাতে হয়েছে। উসমানি সংকলনের আগেই প্রচলিত আয়াতের শব্দাবলিতে সংযোজনের এই ইতিহাস বিদ্যমান। আয়াতটির পাঠ আগে একরকম ছিল, মানুষের প্রয়োগে সমস্যা দেখা দেওয়ার পরে বাড়তি শব্দে তার নতুন রূপ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।


ইবনে উম্মে মাকতুমের প্রশ্নে নিসা ৪:৯৫-এর সংশোধন

সূরা নিসার ৯৫ নম্বর আয়াতে জিহাদে অংশগ্রহণকারী ও বসে থাকা মুমিনদের মর্যাদার তুলনা করা হয়েছে। আয়াতটির প্রথম ভাষ্যে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য ব্যতিক্রম ছিল না। অন্ধ সাহাবি আমর ইবন উম্মে মাকতুম নিজের অবস্থার কথা তুলে প্রশ্ন করার পরে “গাইরু উলিদ্দারার” যুক্ত হয়। মানুষের প্রশ্নের পরে শব্দসংযোজনের পাশাপাশি কাদের সম্পর্কে তুলনাটি প্রযোজ্য হবে, সেই সীমাও বদলেছে।


বুখারিতে প্রথম ভাষ্য, লিখনপ্রস্তুতি ও অন্ধ সাহাবির প্রশ্ন

বারা ইবনে আযিবের বর্ণনায় প্রথমে আয়াত নাজিল হয়, তারপর মুহাম্মদ যায়েদকে লেখার উপকরণ নিয়ে আসতে বলেন। নির্দেশ ছিল ঘোষিত বাক্যটি লিখে নেওয়ার। সেই সময় পেছনে থাকা অন্ধ সাহাবি নিজের অবস্থার কথা জানান। তাঁর প্রশ্নের পরে ব্যতিক্রমসংবলিত রূপ নাজিল হওয়ার কথা এসেছে। নির্দেশ উচ্চারণ, লিখিয়ে নেওয়া এবং প্রশ্নের পরে ভাষা সংশোধনের ধারাবাহিকতা একই বিবরণের মধ্যে রয়েছে। [249]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৬/ আল-কুরআনের ফাযীলাতসমূহ
পরিচ্ছেদঃ ৬৬/৪. নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাতিব (ওয়াহী লিখক)
৪৯৯০. বারাআ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, لَايَسْتَوِي الْقَاعِدُوْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ ….وَالْمُجَاهِدُوْنَ فِيْسَبِيْلِ اللهِ আয়াতটি অবতীর্ণ হলে নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যায়দকে আমার কাছে ডেকে আন এবং তাকে বল সে যেন কাষ্ঠখন্ড, দোয়াত এবং কাঁধের হাড় (রাবী বলেন- অথবা তিনি বলেছেন, কাঁধের হাড় এবং দোয়াত) নিয়ে আসে। এরপর তিনি বললেন, লিখ। এ সময় অন্ধ সাহাবী আমর ইবনু উম্মু মাকতূম (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে বসা ছিলেন। তিনি বললেন, আমি তো অন্ধ, আমার ব্যাপারে আপনার কী নির্দেশ? এ কথার প্রেক্ষিতে পূর্বোক্ত আয়াতের পরিবর্তে অবতীর্ণ হলঃ ’’সমান নয় সেসব মু’মিন যারা বিনা ওজরে ঘরে বসে থাকে এবং ঐসব মু’মিন যারা আল্লাহর পথে নিজেদের জানমাল দিয়ে জিহাদ করে’’- (সূরাহ আন-নিসা ৪/৯৫)। [২৮৩১] (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৬১৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৬২৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ বারা’আ ইবনু আযিব (রাঃ)

কোরআন সংকলন 30
কোরআন সংকলন 32

বুখারির আরবি বর্ণনায় অন্ধ ব্যক্তি সরাসরি নিজের জন্য নির্দেশ জানতে চেয়েছেন। এর পরেই “ফানাযালাত মাকানাহা”—তার জায়গায় নাজিল হলো—বলা হয়েছে। প্রথমে ঘোষিত বাক্যের জায়গায় বাড়তি শর্তযুক্ত রূপ এসেছে। আগের বাক্যে বসে থাকা মুমিনদের সাধারণ পরিচয় ছিল; পরের রূপে অক্ষমতার ব্যতিক্রম ঢুকেছে। প্রশ্নের বিষয় এবং নতুন শর্তের বিষয় একই: যুদ্ধ করার শারীরিক সামর্থ্য। [250]

قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَمَا تَأْمُرُنِي فَإِنِّي رَجُلٌ ضَرِيرُ الْبَصَرِ فَنَزَلَتْ مَكَانَهَا

বাংলা অনুবাদ: তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমার জন্য কী নির্দেশ দেন? আমি তো অন্ধ ব্যক্তি। তখন তার জায়গায় নাজিল হলো।

জিহাদ অধ্যায়ের আরেক বর্ণনায় যায়েদ কাঁধের হাড় নিয়ে এসে আয়াতটি লিখেছিলেন বলে স্পষ্ট ভাষা রয়েছে। তারপর ইবনে উম্মে মাকতুম নিজের অক্ষমতার কথা জানান, এবং ব্যতিক্রমযুক্ত বাক্য নাজিল হয়। এখানে ঘোষণার পরে লিপিবদ্ধ করার কাজও এগিয়েছে। আপত্তিটি উঠেছে এমন একটি বক্তব্য নিয়ে, যা তখনই কোরআন হিসেবে লেখা হয়েছে। [251]

لَمَّا نَزَلَتْ ‏{‏لاَ يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ‏}‏ دَعَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم زَيْدًا، فَجَاءَ بِكَتِفٍ فَكَتَبَهَا، وَشَكَا ابْنُ أُمِّ مَكْتُومٍ ضَرَارَتَهُ فَنَزَلَتْ ‏{‏لاَ يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ ‏}‏

বাংলা অনুবাদ: যখন “মুমিনদের মধ্যে যারা বসে থাকে, তারা সমান নয়” নাজিল হলো, আল্লাহর রাসুল যায়েদকে ডাকলেন। তিনি কাঁধের হাড় নিয়ে এসে সেটি লিখলেন। ইবনে উম্মে মাকতুম নিজের অক্ষমতার কথা জানালেন। তখন নাজিল হলো: “মুমিনদের মধ্যে যারা বসে থাকে, অক্ষম ব্যক্তিরা ব্যতীত, তারা সমান নয়।”

লেখার জন্য ব্যবহৃত কাঁধের হাড় ছিল বাক্য সংরক্ষণের পৃষ্ঠ। ফলে “ফাকাতাবাহা”—তিনি সেটি লিখলেন—কথাটি প্রথম রূপ লিপিবদ্ধ হওয়ার দাবি বহন করে। একই বিবরণে পরে শর্তযুক্ত রূপ এসেছে। এই দুই অবস্থার মাঝখানে অন্ধ ব্যক্তির আপত্তি রয়েছে। প্রথম লেখাটি ঘোষিত নির্দেশের লিখিত রূপ; পরবর্তী সংযোজন সেই লেখার ভাষাও বদলে দেয়। আয়াতের এই গঠনপ্রক্রিয়া মুহাম্মদের জীবদ্দশায় বর্ণিত, পরবর্তী খলিফাদের সংকলন শুরু হওয়ার আগেই।

বুখারিতে যায়েদের নিজের বর্ণনাতেও মুহাম্মদের মুখে বলে লেখানোর কাজ চলার সময় অন্ধ সাহাবির আগমনের কথা আছে। ফাতহুল বারিতে ইবনে হাজার “ইয়ুমিল্লুহা” শব্দের অর্থ লিখিয়ে দেওয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ বক্তব্যটির মৌখিক উচ্চারণ ও লিখিত রূপ তৈরির মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক ছিল। লেখককে যে বাক্য দেওয়া হচ্ছে, প্রশ্নের পরে সেই বাক্যেই ব্যতিক্রম ঢুকছে। [252]

قوله : ( وهو يملها ) بضم أوله وكسر الميم وتشديد اللام هو مثل يمليها ، يملي ويملل بمعنى

বাংলা অনুবাদ: তাঁর কথা “তখন তিনি তা লিখিয়ে দিচ্ছিলেন”—এর “ইয়ুমিল্লুহা” শব্দের প্রথম অক্ষরে পেশ, মিমে জের এবং লামে তাশদিদ; এটি “ইয়ুমলিহা”-র মতো। উভয় ক্রিয়াই একই অর্থে ব্যবহৃত হয়।

প্রথম বাক্যের তুলনাটি ব্যক্তিগত পছন্দে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকা ও শারীরিক অক্ষমতায় যেতে না পারার মধ্যে পার্থক্য করেনি। অন্ধ সাহাবির প্রশ্ন সেই সমস্যাটিই প্রকাশ করে। তাঁর অক্ষমতা যুদ্ধের উৎসাহ কম থাকার প্রমাণ নয়; দৃষ্টিশক্তি তাঁর নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও নয়। অথচ ব্যতিক্রম ছাড়া ঘোষিত তুলনায় তিনি অন্য বসে থাকা মুমিনদের সঙ্গে একই ভাষাগত শ্রেণিতে পড়ে যাচ্ছিলেন। ফলে সংশোধনটির সামাজিক তাৎপর্যও রয়েছে: অক্ষমতার জন্য কাউকে নিম্নতর মর্যাদার দলে রাখা হবে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মুখে।


নাসাঈর একাধিক বর্ণনায় একই ঘটনার ভিন্ন বিবরণ

নাসাঈর ৩১০০ নম্বর বর্ণনায় যায়েদের কাছে আয়াত বলে লেখানোর সময় ইবনে উম্মে মাকতুমের আগমনের কথা এসেছে। তিনি বলেন, সামর্থ্য থাকলে তিনিও জিহাদ করতেন। এই কথায় যুদ্ধের অনিচ্ছা ও অক্ষমতার পার্থক্য পরিষ্কার হয়। নিজের ধর্মীয় আগ্রহের পাশাপাশি শারীরিক বাধাটি তিনি তুলে ধরেন। তারপর ব্যতিক্রমসংবলিত কথাটি নাজিল হওয়ার বিবরণ রয়েছে। [253]

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَمْلَى عَلَيْهِ لاَ يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ‏.‏ قَالَ فَجَاءَهُ ابْنُ أُمِّ مَكْتُومٍ وَهُوَ يُمِلُّهَا عَلَىَّ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ لَوْ أَسْتَطِيعُ الْجِهَادَ لَجَاهَدْتُ ‏.‏ وَكَانَ رَجُلاً أَعْمَى فَأَنْزَلَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ صلى الله عليه وسلم وَفَخِذُهُ عَلَى فَخِذِي حَتَّى هَمَّتْ تَرُضُّ فَخِذِي ثُمَّ سُرِّيَ عَنْهُ فَأَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ ‏{‏ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ ‏}‏

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর রাসুল তাঁকে লিখিয়ে দিয়েছিলেন: “মুমিনদের মধ্যে যারা বসে থাকে এবং যারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তারা সমান নয়।” তিনি বলেন, ইবনে উম্মে মাকতুম তাঁর কাছে এলেন, তখন তিনি আমাকে সেটি লিখিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, জিহাদ করার সামর্থ্য থাকলে আমি অবশ্যই জিহাদ করতাম।” তিনি অন্ধ ব্যক্তি ছিলেন। তখন আল্লাহ তাঁর রাসুলের ওপর নাজিল করলেন; তাঁর উরু আমার উরুর ওপর ছিল, এমনকি আমার উরু ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলো। এরপর সেই অবস্থা কেটে গেল এবং আল্লাহ নাজিল করলেন: “অক্ষম ব্যক্তিরা ব্যতীত।”

৩১০১ নম্বর বর্ণনায় অন্ধ সাহাবির প্রশ্নের ভাষা হলো, “আমার জন্য কি অব্যাহতি রয়েছে?” তার আগে কাঁধের হাড় ও লেখার ফলক আনতে বলা হয়েছে এবং প্রথম বাক্য লেখা হয়েছে। অতএব তাঁর চাওয়া অব্যাহতি একটি ইতিমধ্যে ঘোষিত সাধারণ বক্তব্যের পরিসর থেকে নিজেকে পৃথক করার আবেদন। এর উত্তরে আয়াতের ভেতরই ব্যতিক্রমসংবলিত শব্দ এসেছে। [254]

قَالَ ‏”‏ ائْتُونِي بِالْكَتِفِ وَاللَّوْحِ ‏”‏ ‏.‏ فَكَتَبَ ‏{‏ لاَ يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ ‏}‏ وَعَمْرُو بْنُ أُمِّ مَكْتُومٍ خَلْفَهُ فَقَالَ هَلْ لِي رُخْصَةٌ فَنَزَلَتْ ‏{‏ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ ‏}‏

বাংলা অনুবাদ: তিনি বললেন, “আমার কাছে কাঁধের হাড় ও লেখার ফলক নিয়ে এসো।” তারপর লেখা হলো: “মুমিনদের মধ্যে যারা বসে থাকে, তারা সমান নয়।” আমর ইবনে উম্মে মাকতুম তাঁর পেছনে ছিলেন। তিনি বললেন, “আমার জন্য কি অব্যাহতি আছে?” তখন নাজিল হলো: “অক্ষম ব্যক্তিরা ব্যতীত।”

৩১০২ নম্বর বর্ণনায় প্রশ্নটি আরও সরাসরি: “আমি অন্ধ, আমার ক্ষেত্রে কী হবে?” এখানে ব্যতিক্রম নাজিল হওয়া পর্যন্ত তিনি সরে যাননি বলেও উল্লেখ আছে। প্রথম বক্তব্য, উপস্থিত ব্যক্তির প্রশ্ন এবং পরবর্তী সংযোজনের সময়গত নৈকট্য এই ভাষায় নির্দিষ্ট। একটি সাধারণ শ্রেণিবিভাগ তাঁর বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সংঘাতে আসার পরেই সেই শ্রেণির সীমা সংশোধিত হয়েছে। [255]

لَمَّا نَزَلَتْ ‏{‏ لاَ يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ ‏}‏ جَاءَ ابْنُ أُمِّ مَكْتُومٍ وَكَانَ أَعْمَى فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَكَيْفَ فِيَّ وَأَنَا أَعْمَى قَالَ فَمَا بَرِحَ حَتَّى نَزَلَتْ ‏{‏ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ ‏}‏

বাংলা অনুবাদ: যখন “মুমিনদের মধ্যে যারা বসে থাকে, তারা সমান নয়” নাজিল হলো, ইবনে উম্মে মাকতুম এলেন। তিনি অন্ধ ছিলেন। তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আমি অন্ধ, আমার ক্ষেত্রে কী হবে?” বর্ণনাকারী বলেন, “অক্ষম ব্যক্তিরা ব্যতীত” নাজিল হওয়া পর্যন্ত তিনি সরে যাননি।

নাসাঈর বর্ণনাপ্রশ্নের ভাষা ও পরিস্থিতিপরবর্তী ঘটনা
৩১০০; যায়েদ ইবনে সাবিতের বিবরণলেখানোর সময় আগমন; সামর্থ্য থাকলে জিহাদ করতেনওহি আসার বিবরণের পরে ব্যতিক্রম নাজিল
৩১০১; বারা ইবনে আযিবের বিবরণপ্রথম বাক্য লেখা; “আমার জন্য কি অব্যাহতি আছে?”“গাইরু উলিদ্দারার” নাজিল
৩১০২; বারা ইবনে আযিবের বিবরণ“আমি অন্ধ, আমার ক্ষেত্রে কী হবে?”তিনি সরে যাওয়ার আগেই ব্যতিক্রম নাজিল

৩১০০ নম্বর বর্ণনার পথ সাহল, মারওয়ান ও যায়েদের কাছে পৌঁছেছে; পরের দুটি আবু ইসহাকের মাধ্যমে বারার বিবরণ। একই ঘটনার এই পাঠগুলোতে প্রশ্নের বাক্য ও লেখার পরিস্থিতির বিবরণে পার্থক্য আছে। তাদের মিলের কেন্দ্র হলো: ব্যতিক্রমহীন প্রথম নির্দেশ, অন্ধ ব্যক্তির অক্ষমতার কথা জানানো এবং তারপর নতুন শব্দের আগমন। প্রশ্নটি নিজের মর্যাদা ও দায়িত্বসংক্রান্ত। তার উত্তরে যে ভাষা এসেছে, সেটিও সেই ব্যক্তিগত সমস্যাকে সাধারণ ব্যতিক্রমের ভাষায় ধরেছে।

তিনভাবে বর্ণিত প্রশ্নের বিষয়বস্তুর মধ্যে একটি সুস্পষ্ট যোগসূত্র রয়েছে। “রুখসা” শব্দে সাধারণ বক্তব্য থেকে অব্যাহতি চাওয়া হয়েছে; “আমি অন্ধ, আমার ক্ষেত্রে কী হবে” কথায় ব্যক্তির বাস্তব অবস্থা প্রয়োগের সামনে আনা হয়েছে; সামর্থ্য থাকলে জিহাদ করতেন বলে জানানোয় ইচ্ছা ও সক্ষমতার পার্থক্য প্রকাশ পেয়েছে। এই পার্থক্যগুলোই পরে যুক্ত শর্তের অর্থ নির্ধারণ করে। একজন মানুষের শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর ধর্মীয় আগ্রহের অভাব হিসেবে গণ্য হওয়ার সমস্যা তৈরি করেছিল। তিনি সেই সমস্যাটি নিজে চিহ্নিত করেছেন এবং কর্তৃত্বের সামনে তুলেছেন। ফলে সংশোধনের ঘটনাক্রমে প্রশ্নকারীর সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে: নিজের অবস্থা জানানোর মাধ্যমে তিনি ঘোষিত বাক্যের অপর্যাপ্ত শ্রেণিবিভাগ প্রকাশ করেছেন।

ইসলামকিউএ ঘটনাটিকে কারণ ঘটার সঙ্গে সঙ্গে আয়াত নাজিল হওয়ার উদাহরণ হিসেবে দিয়েছে। তাদের ব্যাখ্যায় একই সময় ও একই ঘটনার মধ্যেই সংযোজন এসেছে। ফলে প্রথম বাক্য এবং সংশোধিত বাক্যের মধ্যে ব্যবধানের পরিচয়ও নির্দিষ্ট: একজন উপস্থিত মানুষের প্রশ্নের পরপরই তার জন্য প্রাসঙ্গিক কথাটি পাঠে এসেছে। [256]

بل نزلت الآية في نفس الوقت والحادثة

বাংলা অনুবাদ: বরং আয়াতটি একই সময় ও একই ঘটনার মধ্যে নাজিল হয়েছিল।


লিখিত বাক্যে “গাইরু উলিদ্দারার” সংযোজন ও বিধানের পরিসর পরিবর্তন

আবু দাউদের বর্ণনায় সংযোজনের লিখিত অবস্থানও এসেছে। যায়েদ প্রথমে কাঁধের হাড়ে আয়াতটি লেখেন। ইবনে উম্মে মাকতুমের প্রশ্নের পরে মুহাম্মদ তাঁকে পড়ে শোনাতে বলেন। পড়ার মধ্যে “গাইরু উলিদ্দারার” বলে দেওয়া হয়, এবং যায়েদ তা যুক্ত করেন। তিনি সংযোজনের জায়গাটিকে কাঁধের হাড়ের একটি ফাটলের পাশে বলে স্মরণ করেছেন। ফলে পাঠের পরিবর্তনের সঙ্গে লেখার উপকরণে বাড়তি শব্দ বসানোর কাজও একই বিবরণে যুক্ত। [257]

فَقَالَ ‏:‏ ‏”‏ اقْرَأْ يَا زَيْدُ ‏”‏ ‏.‏ فَقَرَأْتُ ‏{‏ لاَ يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ ‏}‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏{‏ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ ‏}‏ الآيَةَ كُلَّهَا ‏.‏ قَالَ زَيْدٌ ‏:‏ فَأَنْزَلَهَا اللَّهُ وَحْدَهَا فَأَلْحَقْتُهَا، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَكَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَى مُلْحَقِهَا عِنْدَ صَدْعٍ فِي كَتِفٍ

বাংলা অনুবাদ: তিনি বললেন, “পড়ো, হে যায়েদ।” আমি পড়লাম: “মুমিনদের মধ্যে যারা বসে থাকে, তারা সমান নয়।” তখন আল্লাহর রাসুল বললেন: “অক্ষম ব্যক্তিরা ব্যতীত”—সম্পূর্ণ আয়াত। যায়েদ বলেন, আল্লাহ এই অংশটুকু আলাদাভাবে নাজিল করলেন, তাই আমি সেটি যুক্ত করলাম। যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ, যেন আমি কাঁধের হাড়ের ফাটলের পাশে সেটি যুক্ত করার জায়গাটি দেখতে পাচ্ছি।

“আমি সেটি যুক্ত করলাম” কথাটি লিখিত বাক্যের আগের অবস্থার সঙ্গে পরের অবস্থার সম্পর্ক জানায়। বাক্যটি প্রথমবার লেখার সময় বাড়তি শব্দ সেখানে ছিল না; পরে তা বসানো হয়েছে। নতুন শব্দটির ভাষাগত কাজও নির্দিষ্ট: বসে থাকা মুমিনদের সাধারণ শ্রেণির মধ্যে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য পৃথক অবস্থান তৈরি করা। বাড়তি কথাটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাদের সম্পর্কে মর্যাদার তুলনা হচ্ছে, তার সীমা সংকুচিত হয়। একই বাক্য আগের চেয়ে বেশি নির্দিষ্ট এবং শব্দসংখ্যায় বড় হয়ে ওঠে।

ইবনে কাসির প্রথম বাক্যকে শর্তহীন বলে ব্যাখ্যা করেছেন এবং দ্রুত ওহিতে ব্যতিক্রম যুক্ত হওয়ার পরে অন্ধত্ব, খোঁড়াত্ব ও অসুস্থতার মতো অক্ষমতার প্রসঙ্গ এনেছেন। এই ব্যাখ্যায় নতুন কথাটির সামাজিক পরিসর একজন প্রশ্নকারীর বাইরেও বিস্তৃত। ইবনে উম্মে মাকতুমের প্রশ্নের জবাবে ঘোষিত শব্দসমষ্টি একই ধরনের অক্ষম মানুষের জন্যও ব্যতিক্রমের ভাষা হয়েছে। [258]

فقوله [ تعالى ] ( لا يستوي القاعدون من المؤمنين ) كان مطلقا ، فلما نزل بوحي سريع : ( غير أولي الضرر ) صار ذلك مخرجا لذوي الأعذار المبيحة لترك الجهاد

বাংলা অনুবাদ: তাঁর “মুমিনদের মধ্যে যারা বসে থাকে, তারা সমান নয়” কথাটি শর্তহীন ছিল। তারপর দ্রুত ওহিতে “অক্ষম ব্যক্তিরা ব্যতীত” নাজিল হলে, জিহাদ থেকে বিরত থাকার অনুমোদিত কারণ যাঁদের রয়েছে, তাঁদের জন্য তা ব্যতিক্রমের বিধান হয়ে গেল।

বর্তমান আয়াতে অক্ষমতার ব্যতিক্রমটি “বসে থাকা মুমিন” কথার পরেই রয়েছে। এরপর সম্পদ ও প্রাণ দিয়ে জিহাদকারীদের কথা, তাদের বাড়তি মর্যাদা এবং প্রতিদানের ঘোষণা এসেছে। ফলে নতুন শর্তের অবস্থান পুরো তুলনার সঙ্গে যুক্ত। শারীরিক কারণে যিনি যেতে পারেন না এবং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যিনি বসে থাকেন, তাঁদের এক সাধারণ পরিচয়ের মধ্যে রাখার সমস্যাটি এই স্থানে ব্যতিক্রম বসিয়ে দূর করা হয়েছে। পুরস্কারের ভাষাও দেখায়, প্রশ্নকারীর উদ্বেগ ছিল নিজের ধর্মীয় মর্যাদা সম্পর্কে। [259]

لَّا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ ۚ فَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ عَلَى الْقَاعِدِينَ دَرَجَةً ۚ وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَىٰ ۚ وَفَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ عَلَى الْقَاعِدِينَ أَجْرًا عَظِيمًا

বাংলা অনুবাদ: মুমিনদের মধ্যে যারা বসে থাকে, অক্ষম ব্যক্তিরা ব্যতীত, এবং যারা নিজেদের সম্পদ ও প্রাণ দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তারা সমান নয়। সম্পদ ও প্রাণ দিয়ে জিহাদকারীদের আল্লাহ বসে থাকা ব্যক্তিদের ওপর এক ধাপ মর্যাদা দিয়েছেন। প্রত্যেকের জন্যই আল্লাহ উত্তম প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন; আর জিহাদকারীদের বসে থাকা ব্যক্তিদের ওপর মহান পুরস্কারে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।

বক্তব্যের স্তরপাঠে উপস্থিত উপাদানমানুষের অবস্থার শ্রেণিবিভাগ
প্রথম ভাষ্যবসে থাকা মুমিন এবং জিহাদকারীরা সমান নয়বসে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয়ে অক্ষমতার ব্যতিক্রম অনুল্লিখিত
উত্থাপিত প্রশ্নআমি অন্ধ; আমার জন্য কী নির্দেশ বা অব্যাহতি?অক্ষমতা ও স্বেচ্ছায় বিরত থাকার পার্থক্য প্রকাশিত
পরবর্তী সংযোজনغَيْرُ أُولِي الضَّرَرِঅক্ষম ব্যক্তিদের জন্য ব্যতিক্রম যুক্ত
লিখিত ফলযায়েদ নতুন কথাটি আগের লেখায় যুক্ত করেনব্যতিক্রমসহ রূপটি পঠিত বাক্যের অংশ হয়

শর্ত ছাড়া বসে থাকা মুমিনদের নিয়ে সাধারণ তুলনা এবং অক্ষম ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে করা তুলনার বক্তব্য এক নয়। প্রথম ভাষ্যের বিস্তৃত শ্রেণিতে প্রশ্নকারী নিজেকে খুঁজে পেয়েছিলেন; পরবর্তী শর্ত তাঁকে সেই সাধারণ শ্রেণিবিভাগের বাইরে বিশেষ অবস্থান দিয়েছে। এটি মর্যাদা ও পুরস্কারের প্রশ্নে বাস্তব অর্থবহনকারী সংশোধন। অক্ষমতা স্বেচ্ছায় কর্তব্য এড়ানোর সমার্থক নয়—একজন মানুষের প্রশ্ন সেই পার্থক্যকে পাঠে ঢুকিয়েছে। ধর্মীয় কর্তৃত্বের দেওয়া প্রথম বাক্যের ঘাটতি শনাক্ত করার কাজটি এখানে করেছেন সেই ব্যক্তি, যাঁর নিজের অবস্থাই বাক্যটিতে যথাযথভাবে ধরা হয়নি।

উচ্চারণ, লিখন ও প্রয়োগ—তিন জায়গাতেই সংযোজনটির ফল আছে। মুহাম্মদ বাড়তি কথাটি উচ্চারণ করেছেন, যায়েদ আগের লেখার সঙ্গে যুক্ত করেছেন এবং বসে থাকা মুমিনদের তুলনার আওতা বদলেছে। সংশোধনের পরে গৃহীত রূপের মধ্যে প্রশ্নের আগের পাঠের ইতিহাসও রয়েছে। পরবর্তী রূপটি ওহি হিসেবেই স্বীকৃত হয়েছে। সেই স্বীকৃত রূপে প্রথম ঘোষণার তুলনায় নতুন শব্দ রয়েছে এবং অক্ষম মানুষের জন্য স্পষ্ট ব্যতিক্রম আছে। কোরআনের অবতরণ-পর্বের এই ঘটনায় মানবীয় প্রশ্ন ও পাঠের পরিবর্তনের সম্পর্ক সরাসরি বর্ণিত।


ইবনে হিব্বানে “আমাদের কী অপরাধ” প্রশ্ন এবং আপত্তিকারীর ভয়

ইবনে হিব্বানের সংকলনে ফালাতান ইবনে আসিমের বর্ণনা প্রশ্নকারীর উদ্বেগের আরেকটি দিক প্রকাশ করে। প্রথম নির্দেশে বসে থাকা মুমিনদের সঙ্গে জিহাদকারীদের তুলনা করা হলে অন্ধ ব্যক্তি উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেন, “আমাদের কী অপরাধ?” নিজের অক্ষমতার জন্য নিম্নতর মর্যাদার দলে পড়ে যাওয়ার সমস্যাটি এই প্রশ্নে সরাসরি প্রকাশিত। তারপর আবার ওহি আসছে জানানো হলে তিনি ভয় পান, তাঁর বিষয়েই কিছু নাজিল হচ্ছে কি না। নিজের অবস্থার কথা বলার পরে আসন্ন ঘোষণার ফল নিয়ে তাঁকে আতঙ্কিত থাকতে হয়েছে। [260]

كُنَّا عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَأَنْزَلَ اللَّهُ عَلَيْهِ ، وَكَانَ إِذَا أُنْزِلَ عَلَيْهِ دَامَ بَصَرُهُ مَفْتُوحَةً عَيْنَاهُ ، وَفَرَغَ سَمْعُهُ وَقَلْبُهُ لِمَا يَأْتِيهِ مِنَ اللَّهِ ، قَالَ : فَكُنَّا نَعْرِفُ ذَلِكَ مِنْهُ ، فَقَالَ لِلْكَاتِبِ : اكْتُبْ لا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ، فَقَامَ الْأَعْمَى ، فَقَالَ : يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا ذَنْبُنَا ؟ فَأُنْزِلَ عَلَيْهِ ، فَقُلْنَا لِلْأَعْمَى : إِنَّهُ يُنَزَّلُ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَخَافَ أَنْ يُنَزَّلَ عَلَيْهِ شَيْءٌ مِنْ أَمْرِهِ ، فَبَقِيَ قَائِمًا ، وَيَقُولُ : أَعُوذُ بِغَضَبِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِلْكَاتِبِ : اكْتُبْ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ

বাংলা অনুবাদ: আমরা নবীর কাছে ছিলাম। তখন আল্লাহ তাঁর ওপর ওহি নাজিল করলেন। তাঁর ওপর নাজিল হলে তাঁর দৃষ্টি স্থির হয়ে যেত, চোখ খোলা থাকত এবং তাঁর শ্রবণ ও মন আল্লাহর পক্ষ থেকে যা আসত, তার জন্য নিবিষ্ট থাকত। তিনি বলেন, আমরা তাঁর মধ্যে সেই অবস্থা চিনতে পারতাম। তিনি লেখককে বললেন, “লেখো: মুমিনদের মধ্যে যারা বসে থাকে এবং আল্লাহর পথে জিহাদকারীরা সমান নয়।” তখন অন্ধ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের কী অপরাধ?” এরপর তাঁর ওপর নাজিল হলো। আমরা অন্ধ ব্যক্তিকে বললাম, “এখন নবীর ওপর নাজিল হচ্ছে।” তখন তিনি নিজের বিষয়ে কিছু নাজিল হতে পারে ভেবে ভয় পেলেন। তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন এবং বলতে থাকলেন, “আল্লাহর রাসুলের ক্রোধ থেকে আশ্রয় চাই।” তিনি বলেন, তখন নবী লেখককে বললেন, “লেখো: অক্ষম ব্যক্তিরা ব্যতীত।”

“আমাদের” শব্দটি প্রশ্নটিকে ব্যক্তিগত অসুবিধার বাইরেও নিয়ে যায়। অন্ধ ব্যক্তির অবস্থা একই ধরনের অক্ষম মানুষের সাধারণ সমস্যার প্রতিনিধিত্ব করছে। যুদ্ধে যেতে না পারার সঙ্গে ইচ্ছা করে বিরত থাকার পার্থক্য রয়েছে; প্রথম ঘোষণার ভাষায় সেই পার্থক্য অনুল্লিখিত ছিল। প্রশ্নকারীর অন্ধত্ব তাঁর নির্বাচিত অপরাধ নয়। অথচ তাঁকে এমন একটি তুলনার মুখে নিজের অবস্থান জানতে হয়েছে, যেখানে সক্ষমতা ও অক্ষমতার পার্থক্য ছাড়াই বসে থাকা ব্যক্তিদের একত্র করা হয়েছিল। তাঁর প্রশ্নের নৈতিক বিষয় হলো, নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অক্ষমতার জন্য মর্যাদা কমবে কেন।

বর্ণনায় ভয়টির নির্দিষ্ট কারণও আছে: তাঁর নিজের বিষয়ে কিছু নাজিল হতে পারে। অর্থাৎ প্রশ্নের পরে যে ঘোষণাটি আসবে, সেটি তাঁর জন্য কী ফল আনবে, তা তিনি জানতেন না। প্রশ্ন তোলার মুহূর্ত থেকে আত্মরক্ষার প্রার্থনা পর্যন্ত এই আচরণ ক্ষমতার অসম সম্পর্ক প্রকাশ করে। একদিকে মুহাম্মদ, যাঁর উচ্চারিত নতুন বাক্য ঐশী নির্দেশের মর্যাদা পাবে; অন্যদিকে অন্ধ অনুসারী, যাঁর নিজের অবস্থা কীভাবে সেই নির্দেশে ধরা হবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা তাঁর হাতে নেই। নিজের অক্ষমতার কথা জানানোর পরও তাঁকে সম্ভাব্য ক্রোধ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে হয়েছে।

ঘটনার পর্যায়বর্ণিত কথা বা আচরণপ্রশ্নকারীর অবস্থান
প্রথম ঘোষণার পরেঅন্ধ ব্যক্তি উঠে দাঁড়ানতুলনায় নিজের অবস্থার সমস্যা সামনে আনেন
নিজের অবস্থার প্রশ্ন“আমাদের কী অপরাধ?”অক্ষমতার জন্য মর্যাদার ক্ষতির ন্যায্যতা জানতে চান
আবার ওহি আসার সংবাদনিজের বিষয়ে কিছু নাজিল হওয়ার ভয়পরবর্তী ঘোষণার ফল নিয়ে অনিশ্চয়তা
অপেক্ষার সময়দাঁড়িয়ে থেকে ক্রোধ থেকে আশ্রয় প্রার্থনাআত্মপক্ষসমর্থনের সঙ্গে আত্মরক্ষার উদ্বেগ
শেষ নির্দেশলেখককে ব্যতিক্রমটি লিখতে বলা হয়প্রশ্নের পরে অক্ষম ব্যক্তিদের অবস্থান পাঠে যুক্ত হয়

প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত আয়াতে ব্যতিক্রম আনলেও প্রশ্নকারীর ভয়ের ঘটনাটি একই বিবরণের অংশ। তাঁর ন্যায্য উদ্বেগের সঙ্গে অপরাধের প্রশ্ন ও ক্রোধের আশঙ্কা জড়িয়ে গেছে। ধর্মীয় মর্যাদা সম্পর্কে একটি সাধারণ বক্তব্যে নিজের অক্ষমতার স্থান খুঁজতে গিয়ে তাঁকে কর্তৃত্বের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াও বিবেচনা করতে হয়েছে। ফলে নতুন শব্দ পাওয়ার ইতিহাসের মধ্যে শুধু ভাষা সংশোধন নেই; সেই সংশোধন চাওয়ার সামাজিক মূল্যও রয়েছে। অক্ষম ব্যক্তির সুরক্ষা প্রথম ঘোষণায় স্পষ্ট ছিল না, আর সুরক্ষার প্রশ্ন তুলতেই তাঁকে ভীত অবস্থায় অপেক্ষা করতে হয়েছে।

এই সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ঘোষণার ক্ষমতা। প্রশ্নকারী নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে পারেন, কিন্তু তাঁর বক্তব্যের ধর্মীয় ফল ঘোষণা করেন মুহাম্মদ এবং তা লেখেন নিযুক্ত লেখক। ব্যক্তির প্রয়োজন স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য এই কর্তৃত্বের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে গেছে। অন্ধ অনুসারীর অভিজ্ঞতা প্রাথমিক বাক্যের ঘাটতি প্রকাশ করেছে; সংশোধনের স্বীকৃত পরিচয় হয়েছে নতুন ওহি। মানবীয় আপত্তি ও ধর্মীয় অনুমোদনের এই পরপর অবস্থান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় প্রশ্নকারীর ভূমিকা এবং তার সীমা একসঙ্গেই দেখায়।

ইবনে হিব্বানের এই পরিচ্ছেদের শিরোনামে অক্ষম ব্যক্তিদের অব্যাহতিকে আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংকলকের দেওয়া শিরোনাম ঘটনাটির একটি ধর্মীয় মূল্যায়ন বহন করে: ব্যতিক্রমের স্বীকৃতি অনুগ্রহের পরিচয়। মূল বর্ণনায় সেই স্বীকৃতির আগে প্রশ্ন, নিজের বিষয়ে ঘোষণার ভয় এবং দাঁড়িয়ে অপেক্ষার বিবরণ রয়েছে। ফলে শিরোনামের অনুগ্রহের ভাষার পাশাপাশি প্রশ্নকারীর প্রয়োজন ও উদ্বেগের নির্দিষ্ট ইতিহাসও সংরক্ষিত আছে। [261]

ذِكْرُ مَا تَفَضَّلَ اللَّهُ جَلَّ وَعَلَا بِعُذْرِ أُولِي الضَّرَرِ عِنْدَ قُعُودِهِمْ عَنِ الْخُرُوجِ إِلَى الْجِهَادِ فِي سَبِيلِهِ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ তাঁর পথে জিহাদে বের না হয়ে বসে থাকা অক্ষম ব্যক্তিদের অব্যাহতি দিয়ে যে অনুগ্রহ করেছেন, তার বিবরণ।

যে অক্ষমতার ওপর ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ নেই, তার জন্য সক্ষম মানুষের সঙ্গে একই মানদণ্ডে মর্যাদা নির্ধারণ অন্যায্য। এই অন্যায্যতার সমাধান এখানে দয়ার ভাষায় চিহ্নিত হয়েছে। প্রশ্নকারীর ন্যায্য অবস্থান ঘোষণাকারীর অনুগ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। ফলে প্রথম বাক্যের অপর্যাপ্ততার দায় এবং পরে সমাধানের কৃতিত্ব বিপরীত দিকে যাচ্ছে: অভিজ্ঞতার সমস্যাটি তুলেছেন অন্ধ ব্যক্তি, ব্যতিক্রম দেওয়ার ধর্মীয় কৃতিত্ব পেয়েছেন বিধানদাতা। একই ঘটনাকে অধিকার ও ক্ষমতার সম্পর্ক হিসেবে বিচার করলে প্রশ্নকারীর ভূমিকা স্পষ্ট হয়।


ওহির সময় শারীরিক ভার ও দৃশ্যমান লক্ষণের বর্ণনা

নিসা ৪:৯৫-এর সংযোজনসংক্রান্ত বর্ণনায় ওহি আসার সময় মুহাম্মদের শারীরিক অবস্থার কথাও রয়েছে। ইবনে হিব্বানের বিবরণে দৃষ্টি স্থির থাকা, চোখ খোলা থাকা এবং আসন্ন বার্তার প্রতি মনোযোগের কথা আছে। যায়েদের বুখারি-বর্ণনায় তাঁর উরুর ওপর মুহাম্মদের উরু ভারী হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা এসেছে। এত ভার অনুভব করেছিলেন যে নিজের উরু ভেঙে যাওয়ার ভয় হয়েছিল বলে যায়েদ জানিয়েছেন। [262]

فَأَنْزَلَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ صلى الله عليه وسلم وَفَخِذُهُ عَلَى فَخِذِي، فَثَقُلَتْ عَلَىَّ حَتَّى خِفْتُ أَنْ تُرَضَّ فَخِذِي، ثُمَّ سُرِّيَ عَنْهُ، فَأَنْزَلَ اللَّهُ ‏{‏غَيْرَ أُولِي الضَّرَرِ‏}‏

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ তাঁর রাসুলের ওপর নাজিল করলেন। তাঁর উরু আমার উরুর ওপর ছিল। সেটি আমার ওপর এত ভারী হয়ে গেল যে আমার উরু ভেঙে যাওয়ার ভয় হলো। এরপর সেই অবস্থা কেটে গেল এবং আল্লাহ নাজিল করলেন: “অক্ষম ব্যক্তিরা ব্যতীত।”

আবু দাউদের বর্ণনায় ঘটনাটি দুই দফায় এসেছে। প্রথমে মুহাম্মদকে “সাকিনা” বা প্রশান্তির অবস্থা আচ্ছন্ন করে, তাঁর উরুর ভার অনুভূত হয় এবং সেই অবস্থা কেটে গেলে তিনি আয়াত লিখতে বলেন। এরপর অন্ধ ব্যক্তি প্রশ্ন করেন। ফলে এই বিবরণে প্রথম ভাষ্য ঘোষণা হওয়ার সঙ্গেও শারীরিক অবস্থার সম্পর্ক আছে। [263]

كُنْتُ إِلَى جَنْبِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَغَشِيَتْهُ السَّكِينَةُ فَوَقَعَتْ فَخِذُ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى فَخِذِي، فَمَا وَجَدْتُ ثِقَلَ شَىْءٍ أَثْقَلَ مِنْ فَخِذِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ثُمَّ سُرِّيَ عَنْهُ فَقَالَ ‏:‏ ‏” ‏ اكْتُبْ ‏”‏

বাংলা অনুবাদ: আমি আল্লাহর রাসুলের পাশে ছিলাম। তখন তাঁকে সাকিনা আচ্ছন্ন করল এবং তাঁর উরু আমার উরুর ওপর পড়ল। তাঁর উরুর চেয়ে ভারী কোনো কিছুর ভার আমি অনুভব করিনি। এরপর সেই অবস্থা কেটে গেলে তিনি বললেন, “লেখো।”

প্রশ্ন শেষ হওয়ার পরে দ্বিতীয়বার একই ধরনের অবস্থা ফিরে আসে। যায়েদ দ্বিতীয়বারের ভারকে প্রথমবারের ভারের মতো বলেছেন। তারপর মুহাম্মদ তাঁকে পড়তে বলেন এবং ব্যতিক্রমের শব্দটি দেওয়া হয়। দুই ভাষ্যের আগে একই ধরনের শারীরিক অবস্থার পুনরাবৃত্তি এই বর্ণনায় স্পষ্ট। [264]

فَلَمَّا قَضَى كَلاَمَهُ غَشِيَتْ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم السَّكِينَةُ فَوَقَعَتْ فَخِذُهُ عَلَى فَخِذِي وَوَجَدْتُ مِنْ ثِقَلِهَا فِي الْمَرَّةِ الثَّانِيَةِ كَمَا وَجَدْتُ فِي الْمَرَّةِ الأُولَى ثُمَّ سُرِّيَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ ‏:‏ ‏”‏ اقْرَأْ يَا زَيْدُ ‏”‏

বাংলা অনুবাদ: তিনি কথা শেষ করলে আল্লাহর রাসুলকে সাকিনা আচ্ছন্ন করল। তাঁর উরু আমার উরুর ওপর পড়ল। দ্বিতীয়বারও আমি সেই ভার অনুভব করলাম, যেমন প্রথমবার অনুভব করেছিলাম। এরপর সেই অবস্থা কেটে গেলে তিনি বললেন, “পড়ো, হে যায়েদ।”

বর্ণিত শারীরিক অভিজ্ঞতা এবং উচ্চারিত কথার ঐশী উৎস দুটি আলাদা দাবি। যায়েদ নিজের ওপর অনুভূত ভারের কথা বলেছেন; ফালাতান চোখ ও মনোযোগের পরিচিত লক্ষণ বর্ণনা করেছেন। এসব লক্ষণ থেকে একজন পর্যবেক্ষক ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারেন। সেখান থেকে বার্তাটি সর্বজ্ঞ স্রষ্টার কাছ থেকে এসেছে—এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে অতিরিক্ত প্রমাণ লাগে। দৃষ্টি স্থির হওয়া বা অন্যের উরুর ভার অনুভব করার মধ্যে বার্তার উৎসের পরিচয় অন্তর্ভুক্ত নেই। অনুভূতির তীব্রতা দিয়ে উচ্চারিত বক্তব্যের নির্ভুলতা নির্ধারিত হয় না।

বর্ণিত অভিজ্ঞতাবিবরণে যা পাওয়া যায়ঐশী উৎসের দাবির সঙ্গে সম্পর্ক
দৃষ্টি স্থির, চোখ খোলাউপস্থিত লোকেরা পরিচিত অবস্থা চিনতেনবাহ্যিক লক্ষণ বার্তার প্রেরকের পরিচয় দেয় না
উরুর প্রচণ্ড ভারযায়েদ নিজের অনুভূতি ও ভয়ের কথা বলেনভার অনুভব থেকে বক্তব্যের সর্বজ্ঞতা অনুসরণ করে না
প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় একই অবস্থাপ্রথম ভাষ্য ও সংশোধন—উভয়ের আগে ভারের বিবরণএকই লক্ষণ শব্দগত পার্থক্য দূর করে না
অবস্থা শেষে লিখননির্দেশমুহাম্মদ কী লিখতে হবে বলে দেননির্দেশের বিষয়বস্তু উচ্চারিত বাক্যেই পাওয়া যায়

প্রথম বাক্যে অক্ষমতার ব্যতিক্রম ছিল না; পরে তা যুক্ত হয়েছে। উভয় বাক্যের আগে একই ধরনের শারীরিক ভারের বিবরণ থাকায় সেই ভারকে বক্তব্যের পূর্ণতার পরীক্ষা বানালে প্রথম বাক্যের ঘাটতি ধরার কোনো ব্যবস্থা পাওয়া যায় না। প্রয়োজনীয় পার্থক্যটি ধরা পড়েছে একজন অন্ধ মানুষের প্রশ্নে। শারীরিক লক্ষণ প্রথম ঘোষণার অসুবিধা নির্দেশ করেনি; ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে সেটি সামনে এনেছেন। সংশোধনের বিষয়বস্তু এসেছে তাঁর প্রশ্নের সঙ্গে মিল রেখে। ফলে লক্ষণের নাটকীয়তার চেয়ে বক্তব্যের গঠন ও বদলের ধারাবাহিকতা এখানে সরাসরি প্রাসঙ্গিক।

মানুষের শরীরের অবস্থা নিয়ে দেওয়া বর্ণনায় অভিজ্ঞতা আছে; সর্বজ্ঞতা একটি জ্ঞানের দাবি। একটি থেকে অন্যটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না। কোনো বার্তার উৎসের সত্যতা বিচার করতে তার বক্তব্য, তথ্য ও যুক্তির সমর্থন দরকার। এখানে শারীরিক অভিজ্ঞতার বিবরণ প্রথম পাঠ, প্রশ্ন এবং পরবর্তী সংযোজনের সঙ্গে পাশাপাশি রয়েছে। শরীরের ভারের বিবরণসহ পুরো ঘটনাক্রমে পাঠের দুটি পর্যায় রয়েছে। প্রথম ঘোষণায় অনুল্লিখিত ব্যতিক্রমটি দ্বিতীয় দফায় যুক্ত হয়েছে; শারীরিক লক্ষণ বর্ণনা করা অবস্থাতেই সেই পরিবর্তনের কথাও জানানো হয়েছে।


সর্বজ্ঞতার দাবি ও আপত্তির পরে ব্যতিক্রম যোগ করার অসংগতি

কোরআনের নিজের ভাষায় স্রষ্টার জ্ঞান তাঁর সৃষ্টিকে অন্তর্ভুক্ত করে। সূরা মুলকে সৃষ্টিকারীর জানার প্রশ্নটি অলংকারমূলক নিশ্চয়তার ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে। তাবারির ব্যাখ্যাতেও সৃষ্টি ও সৃষ্টির কাজ তাঁর জ্ঞানের বাইরে থাকার ধারণা প্রত্যাখ্যাত। ফলে মানুষের শারীরিক অবস্থা ও সেই অবস্থার বাস্তব ফল সম্পর্কে আগাম জ্ঞান সর্বজ্ঞতার দাবির মধ্যেই পড়ে। [265]

أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ

বাংলা অনুবাদ: যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানবেন না? তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সবকিছুর খবর রাখেন।

ইবনে উম্মে মাকতুমের অন্ধত্ব একটি উপস্থিত বাস্তব অবস্থা। যুদ্ধ করার ইচ্ছা থাকলেও অন্ধত্ব সেই কাজে বাধা হতে পারে। এই পার্থক্য জানতে সর্বজ্ঞ বিধানদাতার কাছে নতুন তথ্য পৌঁছানোর প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়। অথচ প্রথম ঘোষণার ভাষায় প্রয়োজনীয় ব্যতিক্রম ছিল না। অন্ধ ব্যক্তি নিজের অবস্থার কথা জানানোর পরে সেই ব্যতিক্রম এসেছে। আগাম জ্ঞানের দাবি এবং কার্যকর বাক্যে সেই জানা তথ্যের ব্যবহার—এই দুইয়ের অসংগতি এখানেই। যে পার্থক্য প্রথমেই বক্তব্যে থাকা দরকার ছিল, সেটি পাঠে ঢুকেছে মানুষের প্রশ্নের পরে।

শর্তটির গুরুত্ব তার প্রয়োগে বোঝা যায়। বসে থাকা সব মুমিনকে নিয়ে সাধারণ তুলনা এবং অক্ষম ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে করা তুলনা একই বক্তব্য নয়। প্রথমটিতে অক্ষমতার কারণে বসে থাকা ব্যক্তির জন্য আলাদা অবস্থান নেই। পরেরটিতে সেই অবস্থান স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ফলে সংযোজিত শব্দ শুধু প্রকাশভঙ্গির বাড়তি সৌন্দর্য নয়; কার সম্পর্কে কী মূল্যায়ন করা হবে, তা বদলে দেয়। ধর্মীয় মর্যাদার সাধারণ শ্রেণিবিভাগে এই পরিবর্তন একটি অর্থগত সংশোধন। মানুষের নির্দিষ্ট আপত্তিই প্রয়োজনীয় সীমাটিকে উচ্চারিত ও লিখিত বাক্যের অংশ করেছে।

ইসলামকিউএ অবতরণের কারণ ব্যাখ্যা করতে ঘটনা ঘটার পরে সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোরআন নাজিল হওয়ার কথা বলেছে। প্রশ্ন, কথা ও কাজকে এই কারণের অন্তর্ভুক্ত করেছে। ইবনে উম্মে মাকতুমের ঘটনাকে একই সময়ে সংযোজন আসার উদাহরণ হিসেবেও উল্লেখ করেছে। এই ব্যাখ্যার স্বীকৃত কাঠামোর মধ্যেই মানবীয় উত্থাপন ও পরবর্তী ঘোষণার সম্পর্ক রয়েছে। [266]

أن يقع حدث فينزل قرآن بشأنه

বাংলা অনুবাদ: কোনো ঘটনা ঘটে এবং সেটিকে কেন্দ্র করে কোরআন নাজিল হয়।

এখানে মানুষের আইন সংশোধনের পরিচিত প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ মিল রয়েছে। প্রথমে একটি সাধারণ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশ যাঁর বাস্তব অবস্থাকে যথাযথভাবে ধরেনি, তিনি সমস্যা জানিয়েছেন। তারপর প্রয়োজনীয় ব্যতিক্রম যোগ করে বক্তব্যের পরিসর বদলানো হয়েছে। ভুল ধরা পড়ার পরে ভাষা সংশোধন করা সীমিত জ্ঞানের আইনপ্রণেতার স্বাভাবিক কাজ। সর্বজ্ঞ ও নির্ভুল উৎসের নামে ঘোষিত একই প্রক্রিয়ায় প্রথম বাক্যের অপর্যাপ্ততা আরও প্রকট হয়। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অভিজ্ঞতা নির্দেশের অসম্পূর্ণ শ্রেণিবিভাগের চেয়ে বেশি নির্দিষ্ট তথ্য সামনে এনেছে।

প্রথম ঘোষণার ধর্মীয় মর্যাদাও এই সমস্যার অংশ। সেটি তখনই লিখে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ফলে মানুষ যে বাক্যকে কোরআন হিসেবে গ্রহণ ও সংরক্ষণ করতে যাচ্ছে, তার মধ্যেই প্রয়োজনীয় শর্ত অনুপস্থিত ছিল। একজন উপস্থিত শ্রোতা সেই অবস্থায় প্রশ্ন করেছেন এবং পরে বাক্য বেড়েছে। সংশোধনের আগে ও পরে স্বীকৃতির একই কর্তৃত্ব কাজ করলেও দুটি বাক্যের ভাষা ও প্রয়োগের সীমা এক ছিল না। ধর্মীয় অনুমোদন প্রথম বাক্যের ঘাটতি নিজে শনাক্ত করেনি; সেই ঘাটতি প্রকাশের সামাজিক কাজটি করেছেন অন্ধ প্রশ্নকারী।

অক্ষমতার কারণে যুদ্ধে যেতে না পারা ব্যক্তির ন্যায্য অবস্থান তাঁর প্রশ্ন করার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করার কথা নয়। এই বর্ণিত সংশোধনে তাঁর প্রয়োজন তখনই স্পষ্ট স্বীকৃতি পেয়েছে, যখন তিনি নিজে আপত্তি জানিয়েছেন। এর নৈতিক সমস্যাটি গভীর: ঘোষণার প্রভাব যার ওপর পড়ছে, সংশোধনের উদ্যোগও তাকেই নিতে হয়েছে। ইবনে হিব্বানের বিবরণে সেই উদ্যোগের সঙ্গে ভয় জুড়ে আছে। নিজের অক্ষমতার জন্য কোন অপরাধ হয় জানতে চাওয়ার পরও তাঁকে ক্রোধের আশঙ্কায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। প্রশ্নকারীর প্রয়োজন ও প্রশ্নকারীর নিরাপত্তা—দুটিই কর্তৃত্বের পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

আয়াতটির ইতিহাসে শব্দসংযোজন ঘটেছে—এটি বর্ণনাগুলোর প্রত্যক্ষ বিষয়। প্রথম পাঠে “গাইরু উলিদ্দারার” ছিল না, পরে তা নাজিল ও সংযুক্ত হয়েছে। সুতরাং অবতরণের শুরু থেকে কোনো শব্দ কখনো বদলায়নি বা বাড়েনি—এই সর্বাত্মক দাবি মিথ্যা। পরবর্তী রূপের মান্যতা একটি সময়ের গৃহীত পাঠকে নির্দেশ করে। প্রথম ঘোষণার সঙ্গে তার শব্দগত পার্থক্য বর্ণনাতেই উপস্থিত: বাড়তি শর্তটি পরে এসেছে। বর্তমান পাঠের মধ্যেই আগের অনুল্লিখিত অবস্থার পরে সংযোজিত শর্ত রয়েছে। তার ইতিহাসে মানুষের প্রশ্নের দৃশ্যমান ভূমিকা আছে।

মুহাম্মদের কাছে উত্থাপিত মানুষের সমস্যার পরে কোরআনের বাক্য পূর্ণতর হয়েছে। অন্ধ ব্যক্তির অবস্থা প্রথমে সাধারণ শ্রেণিবিভাগের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল, পরে ব্যতিক্রম দিয়ে পৃথক করা হয়েছে। সেই বাড়তি শব্দ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে লেখায় বসেছে এবং পরবর্তী পঠিত রূপের অংশ হয়েছে। কাজটির ধর্মীয় পরিচয় ওহি; তার বাস্তব পদ্ধতিতে রয়েছে বক্তব্য, আপত্তি ও সংশোধন। সর্বজ্ঞ উৎসের দাবি দিয়ে প্রচারিত বাক্যের প্রয়োজনীয় ঘাটতি একজন অন্ধ মানুষ প্রকাশ করেছেন—এই ঘটনাক্রম কোরআনের মানবীয় পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত গঠনের সরাসরি নিদর্শন।


উমরের মত, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সামাজিক চাপে ওহি ও নির্দেশের পরিবর্তন

উমরের বক্তব্য ও হস্তক্ষেপের সঙ্গে কোরআনের অবতরণ এবং নির্দেশ পরিবর্তনের সম্পর্ক হাদিসে বারবার এসেছে। কোনো ঘটনায় তিনি প্রস্তাব করেছেন, পরে সেই প্রস্তাবের অনুরূপ আয়াত ঘোষিত হয়েছে; কোনো ঘটনায় মুহাম্মদের সিদ্ধান্তে আপত্তি জানানো বা প্রচলিত বিধান নিয়ে অসুবিধা প্রকাশের পরে নির্দেশ বদলেছে। প্রস্তাব, ব্যক্তিগত পছন্দ, পারিবারিক বিরোধ এবং সামাজিক চাপ এই ঘটনাগুলোর অংশ। ধর্মীয় সাহিত্যে এসব মিল উমরের বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ হিসেবে সংকলিত হয়েছে। সেই সংকলনেই মানুষের অবস্থান আগে এবং অনুরূপ ওহির ঘোষণা পরে আসার ধারাবাহিকতা সংরক্ষিত আছে।


“মুওয়াফাকাতে উমর”: জিহ্বায় সত্য, মুহাদ্দাস ও উমরের মতের অনুরূপ ওহির বর্ণনা

রেডিও-টেলিভিশনের অনুরোধের আসরে শ্রোতার পছন্দ আগে জানানো হয়, তারপর সঞ্চালক সেই অনুরোধ অনুযায়ী গান শোনান। উমরের প্রস্তাবের পরে আয়াত আসার বর্ণনাগুলোর মধ্যেও আগে চাওয়া এবং পরে অনুরূপ ঘোষণা হওয়ার সম্পর্ক আছে। “মুওয়াফাকাতে উমর” বলতে ধর্মীয় সাহিত্যে উমরের মতের সঙ্গে ওহির এই মিল বোঝানো হয়েছে। একটি মানুষের প্রস্তাবের পরে ধর্মীয় নির্দেশের আগমনকে তাঁর ফজিলত বলা হচ্ছে; একই ঘটনাক্রমে সেই ব্যক্তির মত ও অবস্থান কোরআনের ভাষা ও বিধানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে।

তিরমিজির বর্ণনায় প্রথমে মুহাম্মদের নামে বলা হয়েছে, আল্লাহ উমরের জিহ্বা ও হৃদয়ে সত্য রেখেছেন। এরপর ইবনে উমরের বক্তব্য এসেছে: কোনো ঘটনায় মানুষের সঙ্গে উমরও মত দিলে তাঁর কথার অনুরূপ কোরআন নাজিল হতো। প্রথমটি উমরের বিশেষ মর্যাদার ঘোষণা; দ্বিতীয়টি তাঁর মত এবং পরবর্তী পাঠের সম্পর্ক সম্পর্কে ইবনে উমরের সাধারণীকরণ। একই বিবরণে ব্যক্তির সত্যনির্দেশিত পরিচয় এবং তাঁর কথার অনুরূপ অবতরণের দাবি পাশাপাশি রাখা হয়েছে। [267]

«إِنَّ اللَّهَ جَعَلَ الْحَقَّ عَلَى لِسَانِ عُمَرَ وَقَلْبِهِ» وَقَالَ ابْنُ عُمَرَ مَا نَزَلَ بِالنَّاسِ أَمْرٌ قَطُّ فَقَالُوا فِيهِ وَقَالَ فِيهِ عُمَرُ أَوْ قَالَ ابْنُ الْخَطَّابِ فِيهِ شَكَّ خَارِجَةُ إِلاَّ نَزَلَ فِيهِ الْقُرْآنُ عَلَى نَحْوِ مَا قَالَ عُمَرُ

বাংলা অনুবাদ: “আল্লাহ উমরের জিহ্বা ও হৃদয়ে সত্য স্থাপন করেছেন।” ইবনে উমর বলেছেন, মানুষের মধ্যে কোনো বিষয় ঘটেছে এবং তারা সে বিষয়ে কথা বলেছে আর উমরও কথা বলেছেন—অথবা বলেছেন, ইবনুল খাত্তাব কথা বলেছেন; এ বিষয়ে খারিজার সন্দেহ ছিল—এমন হয়নি যে উমরের কথার অনুরূপ কোরআন নাজিল হয়নি।

এই বিন্যাসে উমরের মতামতের জন্য আগাম ধর্মীয় মর্যাদা তৈরি হয়। তাঁর কথা প্রথমে একজন মানুষের সামাজিক বিচার বা পছন্দ; বিশেষ সত্যের বাহক হিসেবে পরিচিত হওয়ার পরে সেই কথার সঙ্গে পরবর্তী আয়াতের মিল তাঁর অন্তর্দৃষ্টির প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষটির বক্তব্যকে ঐশী সত্যের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে তাঁর হস্তক্ষেপের কর্তৃত্বও বাড়ে। কোনো প্রস্তাব কীভাবে ধর্মীয় নির্দেশের অংশ হচ্ছে, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি প্রস্তাবকারীকে বিশেষভাবে সঠিক বলে প্রতিষ্ঠার কাজও একই বর্ণনায় চলছে।

বুখারিতে উমরকে “মুহাদ্দাস” হিসেবে উল্লেখ করার বর্ণনা আছে। সেখানে পূর্ববর্তী জাতিগুলোতে এমন ব্যক্তির উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে এবং মুহাম্মদের অনুসারীদের মধ্যে কেউ থাকলে উমর হবেন বলা হয়েছে। শব্দটির ব্যাখ্যার সঙ্গে অনুপ্রেরণার ধারণা যুক্ত। ফলে ওহির সঙ্গে মতের মিলকে যে ধর্মীয় মর্যাদার মধ্যে রাখা হচ্ছে, তার আরেকটি পরিভাষা পাওয়া যায়। [268]

لَقَدْ كَانَ فِيمَا قَبْلَكُمْ مِنَ الأُمَمِ مُحَدَّثُونَ، فَإِنْ يَكُ فِي أُمَّتِي أَحَدٌ فَإِنَّهُ عُمَرُ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোতে মুহাদ্দাস ব্যক্তিরা ছিলেন। আমার উম্মতে এমন কেউ থাকলে তিনি উমর।

বুখারির একই স্থানে সংরক্ষিত আরেক রূপে নবী না হয়েও যাঁদের সঙ্গে কথা বলা হতো, এমন ব্যক্তির কথা এসেছে। মুহাদ্দাস পরিচয়কে বিশেষ যোগাযোগের মর্যাদা দেওয়ার ভাষা এই রূপে আরও সরাসরি। উমরকে সেই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। [269]

لَقَدْ كَانَ فِيمَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ رِجَالٌ يُكَلَّمُونَ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَكُونُوا أَنْبِيَاءَ، فَإِنْ يَكُنْ مِنْ أُمَّتِي مِنْهُمْ أَحَدٌ فَعُمَرُ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের পূর্ববর্তী বনি ইসরাইলের মধ্যে এমন লোক ছিলেন, যাঁদের সঙ্গে কথা বলা হতো, অথচ তাঁরা নবী ছিলেন না। আমার উম্মতে তাঁদের মতো কেউ থাকলে তিনি উমর।

মুসলিমের সংকলনে একই ধরনের বক্তব্যের পরে ইবনে ওয়াহব “মুহাদ্দাস” শব্দের ব্যাখ্যা দিয়েছেন “মুলহাম”—অনুপ্রেরণাপ্রাপ্ত। এটি বর্ণনাকারীর ব্যাখ্যা হিসেবে আলাদাভাবে সংরক্ষিত। উমরের কথার ধর্মীয় তাৎপর্য নির্ধারণে এই ব্যাখ্যাও ব্যবহৃত হয়েছে। [270]

قَالَ ابْنُ وَهْبٍ تَفْسِيرُ مُحَدَّثُونَ مُلْهَمُونَ

বাংলা অনুবাদ: ইবনে ওয়াহব বলেছেন, মুহাদ্দাস শব্দের ব্যাখ্যা হলো অনুপ্রেরণাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা।

বর্ণিত পরিচয়দাবির বিষয়উমরের মতের ধর্মীয় অবস্থান
জিহ্বা ও হৃদয়ে সত্যব্যক্তির কথা ও উপলব্ধির বিশেষ মর্যাদামতামতকে সত্যের সঙ্গে যুক্ত করা
মুহাদ্দাসপূর্ববর্তী জাতিগুলোর অনুরূপ বিশেষ ব্যক্তিঅনুপ্রেরণাপ্রাপ্ত পরিচয়ের ব্যাখ্যা
মত ও ওহির মিলআগে উমরের বক্তব্য, পরে অনুরূপ ঘোষণাব্যক্তির প্রস্তাব অবতরণের ইতিহাসে স্থান পায়

বুখারির ব্যাখ্যাগ্রন্থ নসরুল বারীতে তিনটি মিলের আলোচনা রয়েছে। সেখানে প্রথমে উমরের মত, পরে অনুরূপ ওহি নাজিল হওয়ার ভাষা এসেছে। ভাষ্যকার এই মিলকে আগাম ইলহাম হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। মাকামে ইবরাহিম, পর্দা এবং নবীপত্নীদের বিষয়ে হুঁশিয়ারি—তিনটি ক্ষেত্রের পূর্ণ বিবরণ একই উদ্ধৃতিতে রয়েছে। [271]

১০. মুসাদ্দাদ র……… হযরত আনাস রা. সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর রা বলেছেন, তিনিটি ক্ষেত্রে আমার মতামত আল্লাহর ওহীর অনুরূপ হয়েছে (অর্থাৎ, পরবর্তীতে যে হুকুম অবতীর্ণ হবে আমার রায় পূর্বেই সেটির অনকূল হয়ে গেছে) অথবা (রাবীর সন্দেহ) তিনি বলেছেন, তিনটি বিষয়ে আমার মতামতের অনুকুলে আমার রব ওহী নাযিল করেছেন। (অর্থাৎ, এ তিনটি বিষয়ের হুকুম আল্লাহ তাআলা যেভাবে নির্ধারন করেছেন, সেহুকুম নাযিল করার পূর্বে সেভাবেই আমার অন্তরে ইলহাম হয়েছে, আমি তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট প্রকাশ করেছি।) তাহল, আমি বলেছিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি আপনি মাকামে ইবরাহীমকে নামাযের স্থান হিসাবে গ্রহণ করতেন )অর্থাৎ, তাওয়াফের পর)। এ বিষয়ে আল্লাহ্ তা’আলা আয়াত নাযিল করেন… )۱۲۵( وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصلّی “তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে নামাযের স্থান বানাও।”
তিনি আরো বলেন, আমি বলেছিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার নিকট নেককার বদকার সব লোকই যাতায়াত করতে থাকে। যদি আপনি উম্মুল মুমিনীনগনকে পরদার নির্দেশ দিতেন! তখন অবতীর্ণ হয় পরদার আয়াত। উমর রা. বলেন, আমি জানতে পেরেছিলাম যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কিছুসংখ্যক স্ত্রীর (হযরত আয়েশা ও হাফসা রা.-এর) প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন। তখন আমি তাদের (পবিত্র স্ত্রীগনের) কাছে উপস্থিত হই, এবং বলি যে, তোমরা এর থেকে বিরত হবে অথবা আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তোমাদের চেয়েও উত্তম স্ত্রী প্রদান করবেন। এরপর (পরবর্তীতে) আমি তাঁর কোন এক স্ত্রীর কাছে আসি, তখন তিনি বললেন, উমর! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীগণকে নসিহত করে থাকেন আর এখন তুমি তাদের উপদেশ দিতে আরম্ভ করেছ? (অর্থাৎ, হযরত উম্মে সালামা রা.-এর নিকট আসলে তিনি বলতে লাগলেন, উমর! তুমি নসীহত করতে এসেছ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কি এতটুকু জ্ঞান ও গুরুত্বারোপ নেই যে, তিনি স্ত্রীদের নসীহত করবেন!) অর্থাৎ, হযরত উম্মে সালামা রা. হযরত উমর রা. এর নসীহতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন যে, উমর! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো এতো নসীহত করেন না, যতটা তুমি করতে থাক!) পরিশেষে আল্লাহ্ তা’আলা নাযিল করেন: عَسَى رَبُّهُ إِنْ طَلْقَكُنَّ أَنْ يُبَدِّلَهُ أَزْوَاجًا خَيْرًا مِنْكُنَّ مُسْلِمَاتِ “নবী যদি তোমাদের সকলকে পরিত্যাগ করেন তবে তার রব সম্ভবত তোমাদের স্থলে তাঁকে দিবেন তোমাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী, যারা হবে আত্মসমর্পণকারী বাধ্যগত……..।” -৬৬:৫

নসরুল বারীর পরবর্তী আলোচনায় সংখ্যাটি তিনের বাইরে বাড়ানো হয়েছে। বদরের বন্দি ও জানাজার প্রসঙ্গের সঙ্গে বিশ বা একুশটি ক্ষেত্রের গণনার কথাও এসেছে। “আমার প্রভু আমার সমর্থন করেছেন”—এই অর্থ উল্লেখ করে ভাষ্যকার সম্বোধনের দিকটি আদবের কারণে উমর নিজের দিকে ফিরিয়েছেন বলে ব্যাখ্যা করেছেন। ধর্মীয় ব্যাখ্যার মধ্যেই মানুষের পূর্ববর্তী রায় ও পরবর্তী ঘোষণার সম্পর্ক স্পষ্ট রাখা হয়েছে। [271]

যেসব বিষয়ে হযরত উমর রা. এর অনুকুল ওহী এসেছে
এ হাদীসে উমর রা. এর অনুকুল ওহীর ক্ষেত্র তিনটি বর্ণিত হয়েছে। বস্তুত হযরত উমর রা. এর অনুকূল ওহীর ক্ষেত্র আরো বর্ণিত হয়েছে। যথা ১. বদর যুদ্ধবন্ধীদের সম্পর্কে মুক্তিপণ না নেয়ার রায়। এর উপর আয়াত নাযিল হয়েছে – …. مَا كَانَ لَنَبِي أَن يَكُونَ لَهُ أَسْرِي حَتَّى يُنْخِنَ فِي الْأَرْضِ
মুনাফিকদের জানাযা আদায়ে বারণ। এ সম্পর্কে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে- এوَلَاتُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُمْ مَاتَ أَ
২. -সূরা তাওবা। মোটকথা, কুরআন হাদীসে তালাশ করলে পাওয়া যায় যে, অনেক ক্ষেত্রেই উমর রা. এর সমর্থনে ওহী নাযিল হয়েছে।
আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী র.বলেন, উলামায়ে কেরাম উমর রা. এর মুয়াফাকাত গণনা করে ২০টির মত স্থান পেয়েছেন। -ফয়যুল বারী-৪/১৫৭
কেউ কেউ ২১টি ক্ষেত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন- আল্লামা সুযুতী র. তারীখুল খুলাফায় বর্ণনা করেছেন।
-বুখারীর হাশিয়া: পৃষ্ঠা ৫৮
ثلاث في وافقت : বুখারীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ কিরমানীতে আছে, এর অর্থ হল وافقتی ربی অর্থাৎ, আমার প্রভু তিন স্থানে
আমার সমর্থন করেছেন। কিন্তু আদবের প্রতি লক্ষ্য করে موافقت বা আনুকুল্যের অথবা সমর্থনের সম্বোধন করেছেন নিজের দিকে। হাশিয়ায়ে বুখারী: ৫৮।
) at a f وَقَالَ ابْنُ أَبِي مَرْيَمَ أَخْبَرَنَا يَحْيَى بْنُ أَيُّوبَ حَدَّثَنِي حُمَيْدٌ سَمِعْتُ أَنَا عَنْ عُمَرَ মুহাম্মদ ইবনে হাকাম ইবনে আবু মরিয়ম মিসরী) র. ইয়াহইয়া ইবনে আইয়ূব-হুমাইদ- আনাস রা. সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, উমর রা. আমার কাছে এরূপ বলেছেন।
ব্যাখ্যা: ইমাম বুখারী র. কিতাবুস সালাতের ৫৮ পৃষ্ঠায় আলোচনা করতে গিয়ে এ বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন। ا وَقَالَ ابْن أبي مريم الخ وابو عبد الله هو البخاري وقال أبو عبد الله

কোরআন সংকলন 34
কোরআন সংকলন 36

বুখারি ও মুসলিমের তিনটি মিলের তালিকাও পুরোপুরি এক নয়। বুখারি ৪০২-এ মাকামে ইবরাহিম, পর্দা এবং স্ত্রীদের বিষয়ে বলা কথার মিল রয়েছে। মুসলিমে মাকামে ইবরাহিম ও পর্দার পাশাপাশি বদরের বন্দিদের বিষয় এসেছে। ফলে “তিন” বলে উল্লেখ করা দুটি বিবরণে মোট চারটি পৃথক বিষয় পাওয়া যায়। [272]

وَافَقْتُ رَبِّي فِي ثَلاَثٍ فِي مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ وَفِي الْحِجَابِ وَفِي أُسَارَى بَدْرٍ

বাংলা অনুবাদ: তিন বিষয়ে আমার অভিমত আমার রবের সঙ্গে মিলে গেছে: মাকামে ইবরাহীম, পর্দা এবং বদরের বন্দীদের বিষয়ে।

বিষয়মানুষের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বক্তব্যধর্মীয় পাঠের সঙ্গে সম্পর্ক
মাকামে ইবরাহীমসালাতের স্থান করার প্রস্তাববুখারী ৪০২-এ বাকারা ২:১২৫-এর সঙ্গে যুক্ত
পর্দামুহাম্মদের স্ত্রীদের আড়াল করার অনুরোধবুখারী ৪০২-এ পর্দার আয়াতের সঙ্গে যুক্ত
স্ত্রীদের হুঁশিয়ারিতালাক হলে আরও ভালো স্ত্রী আসবেবুখারী ৪০২-এ তাহরীম ৬৬:৫-এর সঙ্গে যুক্ত
বদরের বন্দীবন্দীদের ব্যাপারে উমরের অবস্থানমুসলিম ২৩৯৯-এ আরেক মিল হিসেবে উল্লেখ

ওয়াহিদীর আসবাবুন নুযুলে এই মিলের তালিকায় সূরা মুমিনুনের ১৪ নম্বর আয়াতের শেষ কথাটিও এসেছে। বর্ণনায় উমর সৃষ্টির বিবরণ শুনে “স্রষ্টাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আল্লাহ কত বরকতময়” বলেন, পরে আয়াতের শেষেও সেই কথা নাজিল হয়। আগের তিনটি বিষয়ও এই বর্ণনায় পুনরায় রয়েছে। [273]

[23:14]
(So blessed be Allah, the Best of creators!) [23:14]. Ahmad ibn Muhammad ibn ‘Abd Allah al-Hafiz informed us> ‘Abd Allah ibn Muhammad ibn Hayyan> Muhammad ibn Sulayman> Ahmad ibn ‘Abd Allah ibn Suwayd ibn Manjuf> Abu Dawud> Hammad ibn Salamah> ‘Ali ibn Zayd ibn Jud’an> Anas ibn Malik who reported that ‘Umar ibn al-Khattab, may Allah be well pleased with him, said: “My words agreed with those of my Lord in four instances. I said: ‘O Messenger of Allah, why do we not pray behind the Maqam [were Abraham stood to pray]’, and Allah, exalted is He, revealed (… Take as your place of worship the place where Abraham stood (to pray)…) [2:125]. And I said: ‘O Messenger of Allah, why do you not put a curtain [to protect your wives from the gaze of men]?’ And so Allah, exalted is He, revealed: (And when ye ask of them (the wives of the Prophet) anything, ask it of them from behind a curtain…) [33:53]. I also said to the wives of the Prophet, Allah bless him and give him peace: “You had better take heed or Allah, glorious is He, will give the Prophet instead of you wives who are better than you’. And so Allah, exalted is He, revealed (It may happen that his Lord, if he divorce you, will give him in your stead wives better than you) [66:5]. And when the verse (Verily We created man from a product of wet earth) [23:12] up to His words (… and the produced it as another creation) [23:14] were revealed, I exclaimed: ‘So blessed be Allah, the Best of creators!’ and the end of the verse was revealed as: (So blessed be Allah, the Best of creators!)'”.

কোরআন সংকলন 38

সুয়ূতি তারিখুল খুলাফায় ইবনে আবি হাতিমের তাফসির থেকে উমরের এই উক্তির বিবরণ উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে শ্রোতার মুখে আগে কথাটি আসা এবং পরে আয়াত হিসেবে নাজিল হওয়ার ভাষা সরাসরি রয়েছে। এই বর্ণনাধারায় উমর আয়াতের শেষ বাক্যের অনুরূপ উক্তির বক্তা হিসেবেও বর্ণিত। [274]

فَلَمَّا نَزَلَتْ قُلْتُ أَنَا: فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ، فَنَزَلَتْ: فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ

বাংলা অনুবাদ: যখন তা নাজিল হলো, আমি বললাম, “স্রষ্টাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আল্লাহ কত বরকতময়!” তারপর নাজিল হলো: “স্রষ্টাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আল্লাহ কত বরকতময়!”

ইসলামকিউএ এই সম্পর্ককে উমরের ইচ্ছা ও আল্লাহর ইচ্ছার মিল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে এবং প্রস্তাব বা চাওয়ার অনুরূপ ওহি নাজিল হওয়ার কথাও বলেছে। অর্থাৎ মানুষের প্রস্তাব ও পরবর্তী ঘোষণার সম্পর্ক তাদের ব্যাখ্যাতেও রয়েছে; সেই সম্পর্কের ধর্মীয় মূল্যায়ন হয়েছে সৌভাগ্য ও অনুপ্রেরণা হিসেবে। [275]

وينزل الوحي على نحو ما يقترح أو يراد

বাংলা অনুবাদ: যেরকম প্রস্তাব করা হয় বা চাওয়া হয়, সেভাবেই ওহি নাজিল হয়।

এখানে মানুষের মতের অনুরূপ নির্দেশ আসার ঘটনা এবং সেই ঘটনার ঐশী ব্যাখ্যা দুটি পৃথক স্তরে রয়েছে। বর্ণনায় আগে প্রস্তাব, পরে অনুরূপ ঘোষণা। অনুপ্রেরণার ব্যাখ্যায় সেই মিলের কৃতিত্ব উমরের বিশেষ মর্যাদায় যুক্ত হয়েছে। এইভাবে মানুষের মতের সঙ্গে পাঠের সম্পর্কটাই তাঁর ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রস্তাবের পর কোরআনের নির্দেশ এসেছে—এই তথ্য মেনে নিয়ে মানুষের মত ও পরিস্থিতি থেকে পাঠের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার দাবি অসংগত। ঘটনাগুলোর ধর্মীয় নামকরণের মধ্যেও প্রস্তাবকারীর ভূমিকা অক্ষত থাকে।

লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত বাণীর ধারণায় আয়াতের কর্তৃত্ব মানুষের কথার ঊর্ধ্বে স্থাপন করা হয়। মুওয়াফাকাতের কাহিনিতে সেই বাণীর প্রকাশকাল ও নির্দিষ্ট বক্তব্যের সঙ্গে উমরের প্রস্তাব জুড়ে দেওয়া হয়েছে। মাকামকে নামাজের স্থান করার কথা, স্ত্রীদের আড়াল করার কথা অথবা তাঁদের বদলে ভালো স্ত্রী পাওয়ার কথা—প্রতিটি ক্ষেত্রে উমর আগে বলেন। যে বক্তব্য পরে কোরআনের মর্যাদা পাচ্ছে, তার আগের মানবীয় উচ্চারণও একই ইতিহাসের অংশ। উমরের প্রশংসার জন্য সংরক্ষিত দলিলেই কোরআনের ঘোষণার সঙ্গে মানুষের বক্তব্যের ধারাবাহিক যোগসূত্র পাওয়া যায়। আগে বলা মানুষের কথা এবং পরে নাজিল হয়েছে বলে ঘোষিত কথার এই সম্পর্ক পাঠের সামাজিক গঠনকেও প্রকাশ করে।

উমরের রায়কে আগে থেকেই সঠিক বলে চিহ্নিত করার মানদণ্ড হয়েছে পরে ঘোষিত আয়াত। আবার মানুষের সেই রায়কে ঐশী অনুপ্রেরণার ফল বলা হচ্ছে অনুরূপ আয়াত আসার ভিত্তিতে। প্রস্তাব ও ঘোষণার মিলের মধ্যে মানুষের বক্তব্য এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তের সংযোগ পাওয়া যায়। সেই বক্তব্যের ঐশী অনুপ্রেরণাপ্রাপ্ত পরিচয় এসেছে ধর্মীয় ব্যাখ্যা থেকে। এখানে একই ঘটনার দুটি ব্যবহার রয়েছে: উমরের প্রস্তাবের পরে অনুরূপ নির্দেশ আসার ইতিহাস সংরক্ষণ এবং সেই মিল দিয়ে তাঁর বিশেষ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। ফলে প্রস্তাবের মানবীয় উৎস দৃশ্যমান থেকেও তার কর্তৃত্বকে অতিপ্রাকৃত পরিচয়ে উন্নীত করা হয়েছে। মানুষের পছন্দ ধর্মীয় নির্দেশে প্রতিফলিত হওয়ার ঘটনাই তখন মানুষটির পবিত্র মর্যাদার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

উমরের ইচ্ছা এখানে ধর্মীয় নির্দেশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। নামাজের স্থান, নারীদের আড়াল, নবীপত্নীদের প্রতি হুঁশিয়ারি কিংবা বন্দিদের ভবিষ্যৎ—এসব বিষয়ে তাঁর অবস্থান ধর্মীয় ভাষা পেয়েছে বলে বর্ণিত। একই সঙ্গে মিলগুলোর সংকলন তাঁর মর্যাদা বাড়িয়েছে। ফলে সম্পর্কটি দুই দিকে কাজ করে: মানুষের প্রস্তাব নির্দেশের ভাষায় স্থান পায়, আর অনুরূপ নির্দেশ আসার ঘটনা মানুষটির বিশেষ সত্যনির্দেশিত পরিচয় প্রতিষ্ঠা করে। কোরআনের অবতরণকে ঘিরে মানবীয় মতামত ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের এই পারস্পরিক নির্মাণ সংকলিত বর্ণনাগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে।


মাকামে ইবরাহিমে নামাজের প্রস্তাব

মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান করার নির্দেশের আগে উমরের প্রস্তাবের কথা সহিহ বুখারিতে সরাসরি আছে। উমর মুহাম্মদকে বলেছিলেন, তাঁরা যদি মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করতেন। এরপর “তোমরা মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান করো”—এই আয়াত নাজিল হওয়ার কথা বলা হয়েছে। একজন অনুসারীর পছন্দ, নবীর কাছে সেই পছন্দের প্রকাশ এবং পরে অনুরূপ নির্দেশের ঘোষণা—ঘটনাক্রমটি এই তিন ধাপে সাজানো। উমর নিজেই এই মিলকে তাঁর মতের সঙ্গে প্রভুর সম্মতির উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। [276] [277] [278]

সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৮/ সালাত
‏পরিচ্ছদঃ ২৭৩। কিবলা সম্পর্কে বর্ণনা।
৩৯৩। আমার ইবনু ‘আওন (রহঃ) …. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘উমর (রাঃ) বলেছেনঃ তিনটি বিষয়ে আমার অভিমত আল্লাহর অহির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। আমি বলেছিলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা যদি মাকামে ইবরাহীম কে সালাতের স্থান বানাতে পারতাম! তখন এ আয়াত নাযিল হয়ঃ (وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى‏) “তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থান বানাও” (২ : ১২৫)
(দ্বিতীয়) পর্দার আয়াত, আমি বললামঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি যদি আপনার সহধর্মিনীগনকে পর্দার আদেশ করতেন! কেননা, সৎ ও অসৎ সবাই তাদের সাথে কথা বলে। তখন পর্দার আয়াত নাযিল হয়।
আর একবার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণীগণ অভিমান সহকারে তাঁর নিকট উপস্থিত হন। তখন আমি তাদেরকে বললামঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি তোমাদের তালাক দেয়, তাহলে তাঁর রব তাঁকে তোমাদের পরিবর্তে তোমাদের চাইতে উত্তম স্ত্রী দান করবেন। (৬৬ : ৫) তখন এ আয়াত নাযিল হয়।

(অপর সনদে ইবন আবু মারয়াম (রহঃ) …. আনাস (রাঃ) থেকে অনুরূপ বর্ণিত আছে।)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

কোরআন সংকলন 40

উমরের কথায় “আমরা যদি গ্রহণ করতাম” একটি ইচ্ছা ও প্রস্তাবের ভাষা। আয়াতে সেই একই কাজ “তোমরা গ্রহণ করো” হিসেবে নির্দেশের ভাষা পেয়েছে। প্রস্তাবের বিষয়, স্থান এবং কাঙ্ক্ষিত কাজ তিনটিই পরবর্তী ঘোষণায় রয়েছে। বুখারির আরবি বর্ণনায় “ফানাযালাত”—তারপর নাজিল হলো—শব্দের মাধ্যমে আগের বক্তব্যের সঙ্গে পরের আয়াতের যোগসূত্রও রাখা হয়েছে। ফলে উমরের মত কেবল আয়াত প্রকাশের পরে দেওয়া ব্যাখ্যা হিসেবে উপস্থিত হয়নি; বর্ণনাটিতে তাঁর প্রস্তাব আয়াত ঘোষণার আগের ঘটনা। [279]

فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ لَوِ اتَّخَذْنَا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى فَنَزَلَتْ ‏{‏وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى‏}‏

বাংলা অনুবাদ: আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা যদি মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করতাম! তারপর নাজিল হলো: “তোমরা মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো।”

এই পরিবর্তনে বক্তব্যের কর্তৃত্ব বদলে যায়। প্রথম অবস্থায় কথাটি উমরের একটি প্রস্তাব, যা গ্রহণ করার জন্য তিনি মুহাম্মদের কাছে আবেদন করছেন। পরের অবস্থায় সেই কাজ কোরআনের নির্দেশের মর্যাদা পায়। মানুষটি যে আচার দেখতে চেয়েছিলেন, তা তখন অনুসারীদের ধর্মীয় আচরণের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ব্যক্তিগত পছন্দের পক্ষে আর কেবল প্রস্তাবকারীর যুক্তি কাজ করছে না; তার সঙ্গে আল্লাহর আদেশের কর্তৃত্ব যুক্ত হয়েছে। একই কাজের এই দুই অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষমতার দিক থেকেও বড়।

বিবরণের ধাপসংরক্ষিত বক্তব্য বা কাজকর্তৃত্বের পরিবর্তন
প্রস্তাবউমর মুহাম্মদকে মাকামকে নামাজের স্থান করার কথা বলেনএকজন মানুষের পছন্দ ও পরামর্শ
আয়াতের ঘোষণা“তোমরা মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান করো”প্রস্তাবিত কাজ ঐশী নির্দেশের পরিচয় পায়
আচার পালনমুহাম্মদ আয়াত পড়ে মাকাম ও কাবার অবস্থান অনুযায়ী নামাজ পড়েননির্দেশের বাস্তব প্রয়োগ প্রতিষ্ঠিত হয়
পরবর্তী ব্যাখ্যাতাফসিরে ঘটনাটি আয়াতের অর্থ নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়প্রস্তাবের ইতিহাস ব্যাখ্যার দলিল হয়ে ওঠে

ইবনে আবি দাউদের আল-মাসাহিফে সংরক্ষিত একটি বর্ণনায় কথোপকথনটি আরও নির্দিষ্ট। সেখানে উমর প্রথমে জিজ্ঞেস করছেন, এটি কি তাঁদের পিতা ইবরাহিমের মাকাম? মুহাম্মদের সম্মতিসূচক উত্তরের পরে তিনি স্থানটিকে নামাজের জন্য গ্রহণের প্রস্তাব করছেন। এই রূপে একটি স্থানের পূর্বপরিচয় থেকে তার জন্য নতুন ধর্মীয় ব্যবহার চাওয়ার ধাপ দেখা যায়। উমরের প্রশ্নে ইবরাহিমের স্মৃতি, পরের কথায় সেই স্মৃতিকে নামাজের আচারে যুক্ত করার ইচ্ছা রয়েছে। [280]

قلت: يا رسول الله، هذا مقام أبينا إبراهيم ؟ قال: ” نعم “، فقلت: ألا نتخذه مصلى ؟ فأنزل الله تعالى: واتخذوا من مقام إبراهيم مصلى

বাংলা অনুবাদ: আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, এটি কি আমাদের পিতা ইবরাহিমের মাকাম? তিনি বললেন, “হ্যাঁ।” তখন আমি বললাম, আমরা কি এটিকে নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করব না? এরপর আল্লাহ নাজিল করলেন: “তোমরা মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো।”

ইবরাহিমের সঙ্গে স্থানের সম্পর্ক এবং সেখানে নির্দিষ্টভাবে নামাজ পড়ার নির্দেশ দুটি স্বতন্ত্র বিষয়। কথোপকথনে স্থানের পরিচয় আগে স্বীকৃত হয়েছে; সেই স্থানে নামাজের ব্যবস্থা করার অনুরোধ এসেছে পরে। পূর্বপরিচিত একটি স্মৃতিস্থানকে বিশেষ আচারের স্থান করার উদ্যোগ তাই উমরের বক্তব্যের মধ্যেই দৃশ্যমান। ইবরাহিমের নাম ব্যবহারের ফলে প্রস্তাবটি ধর্মীয় অতীতের সঙ্গে যুক্ত হয়, আর পরবর্তী আয়াতের ফলে তা বর্তমান অনুসারীদের জন্য নির্দেশের ভাষা পায়। অতীতের স্মৃতি, বর্তমান মানুষের প্রস্তাব এবং নতুন ঘোষণার কর্তৃত্ব একই ঘটনাপরম্পরায় যুক্ত হয়েছে।

কোরআনের বাক্যেও নির্দেশটি কাবাকে মানুষের ফিরে আসার স্থান ও নিরাপদ স্থান করার বক্তব্যের সঙ্গে রয়েছে। একই আয়াতে ইবরাহিম ও ইসমাইলকে তাওয়াফকারী, অবস্থানকারী এবং রুকু-সিজদাকারীদের জন্য ঘর পরিষ্কার রাখার নির্দেশ দেওয়ার কথা এসেছে। মাকামকে নামাজের স্থান করার বাক্য এই উপাসনাস্থল ও আচারকেন্দ্রিক বিবরণের মধ্যে বসানো হয়েছে। ফলে উমরের প্রস্তাবের সঙ্গে মিলে যাওয়া কাজটি কোরআনে বৃহত্তর পবিত্র স্থানের বর্ণনার অংশ হয়ে আছে। [281]

وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَأَمْنًا وَاتَّخِذُوا مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى ۖ وَعَهِدْنَا إِلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَن طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ

বাংলা অনুবাদ: আর যখন আমি ঘরটিকে মানুষের ফিরে আসার স্থান ও নিরাপদ স্থান করলাম; আর তোমরা মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো। আমি ইবরাহিম ও ইসমাইলকে নির্দেশ দিয়েছিলাম, তোমরা আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, সেখানে অবস্থানকারী এবং রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখো।

আয়াতের মধ্যে উমরের নাম নেই। প্রস্তাবকারীর পরিচয় ও ঘোষণার আগের ঘটনাটি পাওয়া যায় হাদিসে। কোরআনের নির্দেশ এবং হাদিসের অবতরণবিবরণ একত্রে রাখলে ধর্মীয় বাক্যের পেছনে মানুষের উচ্চারণও সামনে আসে। কোরআনের সংকলিত পাঠে যা সরাসরি আদেশ, অবতরণের বর্ণনায় তার আগে একজন মানুষের অনুরোধ রয়েছে। এই কারণে কেবল নির্দেশটির সংকলিত অবস্থান দিয়ে তার বিকাশের পুরো ইতিহাস পাওয়া যায় না; ধর্মীয় সাহিত্যের সংরক্ষিত ঘটনাক্রম সেই আদেশের মানবীয় পূর্বসূত্রও দেখায়।

মাকাম বলতে নির্দিষ্ট কোন স্থান বোঝানো হয়েছে, তার ব্যাখ্যাতেও এই বর্ণনাগুলো ব্যবহৃত হয়েছে। ইবনে আরাবি আহকামুল কোরআনে বিশেষ স্থান এবং প্রচলিত নামাজের অর্থ গ্রহণ করেছেন। তিনি যুক্তি হিসেবে উমরের প্রস্তাবের বিবরণ এবং মুহাম্মদের তাওয়াফের পরে সেখানে দুই রাকাত নামাজ পড়ার কথা পাশাপাশি এনেছেন। এতে একটি আয়াতের ধর্মীয় অর্থ নির্ধারণের জন্য প্রস্তাবের ইতিহাস ও পরবর্তী আচরণ দুটিই দলিল হয়েছে। [282]

ومن خصصه قال : معناه موضعا للصلاة المعهودة ; وهو الصحيح ; ثبت من كل طريق { أن عمر رضي الله عنه قال : وافقت ربي في ثلاث : قلت : يا رسول الله ; لو اتخذت من مقام إبراهيم مصلى فنزلت : واتخذوا من مقام إبراهيم مصلى }

বাংলা অনুবাদ: যিনি একে নির্দিষ্ট স্থানের অর্থে নিয়েছেন, তিনি বলেছেন: এর অর্থ পরিচিত নামাজ আদায়ের স্থান; আর এটিই সঠিক। বিভিন্ন বর্ণনাপথে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে উমর বলেছেন: তিনটি বিষয়ে আমার প্রভুর সঙ্গে আমার মিল হয়েছে। আমি বলেছিলাম, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি যদি মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করতেন! এরপর নাজিল হলো: “তোমরা মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো।”

জাবিরের দীর্ঘ হজবিবরণে মুহাম্মদের সেই আচারের বাস্তব চিত্র রয়েছে। তাওয়াফের পরে তিনি মাকামে ইবরাহিমের দিকে অগ্রসর হন, সংশ্লিষ্ট আয়াত পড়েন এবং মাকামকে নিজের ও কাবার মাঝখানে রাখেন। একই ধারাবাহিকতায় দুই রাকাতের পাঠের কথাও এসেছে। এখানে ধর্মীয় বাক্যের উচ্চারণ এবং দেহের অবস্থান একসঙ্গে নির্ধারিত হচ্ছে। কোথায় দাঁড়াতে হবে এবং মাকামের সঙ্গে নামাজের সম্পর্ক কী হবে, তার আচারগত প্রকাশ বর্ণনায় পাওয়া যায়। [283]

ثُمَّ نَفَذَ إِلَى مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ – عَلَيْهِ السَّلاَمُ – فَقَرَأَ ‏{‏ وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى‏}‏ فَجَعَلَ الْمَقَامَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْبَيْتِ فَكَانَ أَبِي يَقُولُ وَلاَ أَعْلَمُهُ ذَكَرَهُ إِلاَّ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَقْرَأُ فِي الرَّكْعَتَيْنِ ‏{‏ قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ‏}‏ وَ ‏{‏ قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ‏}‏

বাংলা অনুবাদ: তারপর তিনি মাকামে ইবরাহিমের দিকে অগ্রসর হয়ে পড়লেন, “তোমরা মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো।” তিনি মাকামকে নিজের ও ঘরের মাঝখানে রাখলেন। আমার পিতা বলতেন—আর আমার জানামতে তিনি নবীর কাছ থেকেই এটি উল্লেখ করেছেন—তিনি দুই রাকাতে “বলুন, তিনি আল্লাহ, এক” এবং “বলুন, হে অবিশ্বাসীরা” পড়তেন।

উমরের প্রস্তাব এবং জাবিরের হজবিবরণে আলাদা ধরনের তথ্য রয়েছে। প্রথমটিতে নির্দেশ ঘোষণার আগের অনুরোধের কথা আছে; দ্বিতীয়টিতে নির্দেশটির ব্যবহার রয়েছে। প্রথম ঘটনাকে পরে ঘোষিত আয়াতের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, আর দ্বিতীয় ঘটনায় আয়াত পড়ে কাজ করা হয়েছে। এই দুই বিবরণ একত্রে ধর্মীয় আচারের গঠন দেখায়: মানুষের কাঙ্ক্ষিত কাজ প্রথমে প্রস্তাবিত, পরে ওহির পরিচয়ে ঘোষিত, তারপর নবীর আচরণের মাধ্যমে অনুসরণযোগ্য রূপ পেয়েছে। ফলে উমরের মতের প্রভাব নামমাত্র একটি সম্মতির কথায় শেষ হয়নি; সেটি উপাসনার ব্যবহারিক বিন্যাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

আয়াতের পাঠভেদে নির্দেশের ভাষাও একটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। কুরতুবি নাফি ও ইবনে আমিরের খা অক্ষরে যবরের পাঠ উল্লেখ করেছেন, যেখানে বাক্যটি পূর্ববর্তী মানুষের কাজের বিবরণ। অধিকাংশ পাঠকের খা অক্ষরে যেরের পাঠে এটি আদেশ। একই লিখিত অক্ষরবিন্যাসে ক্রিয়ার এই পার্থক্য বাক্যের কাজ বদলে দেয়: এক পাঠে মানুষ কাজটি করেছে, অন্য পাঠে মানুষকে কাজটি করতে বলা হচ্ছে। [284]

قرأ نافع وابن عامر بفتح الخاء على جهة الخبر عمن اتخذه من متبعي إبراهيم

বাংলা অনুবাদ: নাফি ও ইবনে আমির খা অক্ষরে যবর দিয়ে পড়েছেন; ইবরাহিমের অনুসারীদের মধ্যে যারা সেটিকে নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করেছিল, তাদের সম্পর্কে বিবরণ হিসেবে।

পাঠক্রিয়ার ধরনবাক্যের অর্থগত ভূমিকা
وَاتَّخِذُوا — খা অক্ষরে যেরআদেশতোমরা নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো
وَاتَّخَذُوا — খা অক্ষরে যবরঅতীতকালের বিবরণতারা নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করেছিল
উমরের প্রস্তাবের বর্ণনাআগের অনুরোধ, পরের নির্দেশতাবারি আদেশের পাঠ গ্রহণে এই বর্ণনাকে দলিল করেছেন

তাবারি এই দুই পাঠ আলোচনা করে আদেশের পাঠকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং তার পক্ষে উমরের ঘটনাটিকে দলিল করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় উমরের প্রস্তাবের পরে আয়াত আসার বর্ণনা কেবল ব্যক্তির ফজিলতের উপকরণ হয়ে থাকেনি; কোরআনের ক্রিয়াটিকে কোন অর্থে গ্রহণ করা হবে, সেই সিদ্ধান্তেও তা ব্যবহার হয়েছে। পাঠের স্বরচিহ্ন, বাক্যের আদেশমূলক অর্থ এবং অবতরণের কাহিনি এখানে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। একটি মানুষের প্রস্তাবকে ঘিরে সংরক্ষিত বিবরণ কোরআনের অর্থ নির্ধারণেও কার্যকর হয়েছে। [285]

قال أبو جعفر: والصواب من القول والقراءة في ذلك عندنا: ” واتخذوا ” بكسر ” الخاء “, على تأويل الأمر باتخاذ مقام إبراهيم مصلى، للخبر الثابت عن رسول الله صلى الله عليه وسلم الذي ذكرناه آنفا

বাংলা অনুবাদ: আবু জাফর বলেছেন: এ বিষয়ে বক্তব্য ও পাঠের মধ্যে আমাদের মতে সঠিক হলো খা অক্ষরে যের দিয়ে “ওয়াত্তাখিযু” পড়া; অর্থাৎ মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান করার নির্দেশ। এর কারণ রাসুল সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত সেই বর্ণনা, যা আমরা একটু আগে উল্লেখ করেছি।

আদেশ ও অতীতকালের বিবরণের পার্থক্য অর্থের কেন্দ্রে পৌঁছায়। আদেশের পাঠে বক্তা শ্রোতাকে একটি কাজ করতে বলছেন। অতীতকালের পাঠে বক্তা অন্য মানুষের করা কাজ জানাচ্ছেন। একই জায়গায় এই দুই অর্থের উপস্থিতি পাঠ ও ব্যাখ্যার ইতিহাসের অংশ। তাবারির সিদ্ধান্তে উমরের অনুরোধের বর্ণনা দিয়ে আদেশমূলক অর্থকে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। ফলে সংকলিত বাক্যের অর্থ এবং হাদিসে সংরক্ষিত ঘটনাক্রমের মধ্যে নির্ভরতার সম্পর্ক আছে। একজন মানুষের অনুরোধের কাহিনি এভাবে কোরআনের আদেশমূলক পাঠ প্রতিষ্ঠার যুক্তি হয়ে উঠেছে।

উমরের ভূমিকা নিয়ে ইবনে কাসিরের তাফসিরে আরও একটি বিবরণ রয়েছে। তিনি বায়হাকির সূত্রে আয়েশার নামে বর্ণিত তথ্য উল্লেখ করেছেন: মুহাম্মদ ও আবু বকরের সময়ে মাকাম কাবার সঙ্গে লাগানো ছিল, পরে উমর সেটিকে দূরে সরান। এখানে স্থানটির ধর্মীয় পরিচয় বজায় রেখেই তার অবস্থান পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে। পবিত্র স্থানের বাস্তব বিন্যাস মানুষের সিদ্ধান্তে বদলেছে বলে বর্ণিত হয়েছে। উমরের নামাজের প্রস্তাবের পাশাপাশি এই বিবরণে স্থানটির পরবর্তী ব্যবস্থাপনার ইতিহাসও রয়েছে। [286]

أن المقام كان في زمان رسول الله صلى الله عليه وسلم وزمان أبي بكر ملتصقا بالبيت ، ثم أخره عمر بن الخطاب رضي الله عنه

বাংলা অনুবাদ: রাসুলের সময়ে এবং আবু বকরের সময়ে মাকাম ঘরের সঙ্গে লাগানো ছিল; পরে উমর ইবনুল খাত্তাব সেটিকে দূরে সরান।

একই আলোচনায় ইবনে হাজর স্থান পরিবর্তনের ব্যবহারিক কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। মাকাম আগের জায়গায় থাকলে তাওয়াফকারী অথবা নামাজিদের জন্য সংকীর্ণতা তৈরি হতো বলে উমর সেটিকে এমন স্থানে রাখেন যেখানে সেই অসুবিধা দূর হয়। ভাষ্যকার এই ব্যবস্থাপনার সঙ্গে উমরের আগের নামাজের প্রস্তাবের সম্পর্কও টেনেছেন। ফলে একই ব্যক্তিকে আচারটির প্রস্তাবক এবং পরে তার স্থানবিন্যাসের সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। [287]

وكان عمر رأى أن إبقاءه يلزم منه التضييق على الطائفين أو على المصلين فوضعه في مكان يرتفع به الحرج

বাংলা অনুবাদ: উমর মনে করেছিলেন, সেটিকে সেখানে রেখে দিলে তাওয়াফকারী অথবা নামাজিদের জন্য সংকীর্ণতা তৈরি হবে। তাই তিনি সেটিকে এমন স্থানে রাখেন যেখানে অসুবিধা দূর হয়।

প্রথম ঘটনাটিতে অনুরোধ ধর্মীয় নির্দেশের ভাষা পেয়েছে; পরের ঘটনাটিতে ধর্মীয় স্থান মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সরানো হয়েছে। এখানে প্রস্তাব, আচারের প্রতিষ্ঠা এবং ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত একসঙ্গে দেখা যায়। ইবনে হাজরের ব্যাখ্যায় ধর্মীয় মর্যাদা ও ব্যবহারিক সুবিধা পাশাপাশি কাজ করছে। পবিত্র নামের সঙ্গে যুক্ত স্থানের বাস্তব বিন্যাস মানুষের বিচার ও সিদ্ধান্তে পরিচালিত হচ্ছে। উমরের মত তাই কেবল স্মরণীয় একটি উক্তি হয়ে থাকে না; উপাসনার ভাষা ও উপাসনাস্থলের ব্যবস্থাপনা উভয়ের সঙ্গে তাঁর ভূমিকা জুড়ে যায়।

মিলের কাহিনি ব্যক্তির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, ইবনে হুবাইরার ব্যাখ্যায় সেটিও স্পষ্ট। ইসলামকিউএ আল-ইফসাহ থেকে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে। সেখানে উমরের এই ঘটনাগুলো উল্লেখ করার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শ্রোতাদের মনে তাঁর সম্পর্কে ভালো ধারণা তৈরি হওয়া এবং সত্য বক্তব্যে তাঁর সঙ্গে বিরোধ না করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ভাষ্যকারের ব্যাখ্যাতেই অনুরূপ ওহির কাহিনি অনুসারীদের আনুগত্য ও ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত। [288]

وهذه المعاني إنما ذكرها عمر عن نفسه قاصدًا بذلك- والعلم عند الله- لمعنيين: أحدهما، ليحسن ظن السامعين به لقوله: (فلا ينازعوه في حق يقوله) ؛ والآخرة أن يقتدي به المؤمنون لإيثاره الحق وقوله الصواب

বাংলা অনুবাদ: উমর নিজের সম্পর্কে এই বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন—আল্লাহই ভালো জানেন—দুটি উদ্দেশ্যে: প্রথমত, শ্রোতাদের মনে তাঁর সম্পর্কে ভালো ধারণা তৈরি করা, যাতে তিনি যে সত্য কথা বলেন তাতে তারা তাঁর সঙ্গে বিরোধ না করে; দ্বিতীয়ত, সত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া ও সঠিক কথা বলার কারণে মুমিনরা যেন তাঁকে অনুসরণ করে।

ইবনে হুবাইরার এই ব্যাখ্যা ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধির সামাজিক কাজটিকে প্রকাশ করে। উমরের পছন্দের সঙ্গে কোরআনের মিল তাঁর বক্তব্যকে বিশেষ সত্যের পরিচয় দেয়; সেই পরিচয় আবার অন্যদের কাছে তাঁর কথা গ্রহণের কারণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মানুষের মতের সঙ্গে ওহির সম্পর্ককে অলৌকিক মর্যাদায় উন্নীত করার ফলে প্রস্তাবকারীর কর্তৃত্বও শক্ত হয়। একই ঘটনার মধ্যে ধর্মীয় নির্দেশ এবং সেই নির্দেশের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা পরস্পরকে প্রতিষ্ঠা করছে। উমরের মুখের কথা পরবর্তী ঐশী ঘোষণার সঙ্গে মেলানোর কাহিনি তাই ক্ষমতা ও আনুগত্য তৈরির উপাদানও।

মাকামের ঘটনাটি কোরআনের নির্দেশ গড়ে ওঠার মানবীয় পরিসরকে সরাসরি সামনে আনে। স্থানের ধর্মীয় পরিচয় আগে আছে, উমরের নির্দিষ্ট ইচ্ছা তার সঙ্গে যুক্ত হয়, পরে সেই কাজ ওহির ভাষায় ঘোষিত হয় এবং আচারে প্রয়োগ করা হয়। মানুষের প্রস্তাবকে অনুসরণ করে ঘোষিত নির্দেশকে আবার সেই মানুষের বিশেষ সত্যজ্ঞান প্রমাণের ভিত্তি করা হয়েছে। এই বৃত্তে প্রস্তাবের উৎস দৃশ্যমান, অথচ তার কর্তৃত্ব মানুষের ঊর্ধ্বে স্থাপন করা হচ্ছে। কোরআনের এই নির্দেশের অবতরণবিবরণেই মানুষের পূর্ববর্তী প্রস্তাব এবং তার অনুরূপ ধর্মীয় ঘোষণা সংরক্ষিত আছে। ঐশী কর্তৃত্বের দাবির নিচে প্রস্তাবকারীর মানবীয় উদ্যোগ অক্ষত রয়ে গেছে।


পর্দার দাবি, সাওদাকে চিহ্নিত করা এবং বাইরে যাওয়ার অনুমতি: পৃথক ঘটনাক্রম

নবীপত্নীদের পর্দায় রাখার দাবি উমর বারবার মুহাম্মদের কাছে তুলেছিলেন। সেই দাবি বাস্তবায়নের জন্য সাওদাকে বাইরে দেখে নাম ধরে চিহ্নিত করার ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে। একজন নারীর স্বাভাবিক শারীরিক প্রয়োজনকে প্রকাশ্যে বিব্রত করার মাধ্যমে ধর্মীয় বিধানের জন্য চাপ তৈরি হয়েছে। পর্দার পরে একই ধরনের হস্তক্ষেপে সাওদা ফিরে অভিযোগ করলে প্রয়োজনের জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি ঘোষণা করা হয়। পর্দার আয়াত, পর্দার আগের দাবি এবং পর্দার পরের অনুমতির বর্ণনায় নারীদেহ ও চলাচলের ওপর পুরুষের কর্তৃত্ব প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত।

বুখারিতে উমরের বক্তব্য হিসেবে এসেছে, মুহাম্মদের কাছে ভালো ও মন্দ দুই ধরনের মানুষ আসে; তাই নবীপত্নীদের পর্দার নির্দেশ দিলে ভালো হতো। এর পরে পর্দার আয়াত নাজিল হওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবে বাইরের পুরুষদের উপস্থিতিকে কারণ দেখানো হচ্ছে, আর প্রস্তাবিত নিয়ন্ত্রণ বসছে স্ত্রীদের ওপর। দর্শনার্থীদের চরিত্র নিয়ে উমরের উদ্বেগ নারীদের আড়াল করার দাবিতে পরিণত হয়েছে। [289] [290]

সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫২/ তাফসীর
৪৪৩১। মুসাদ্দাদ (রহঃ) … উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার কাছে ভাল ও মন্দ লোক আসে। আপনি যদি উম্মাহাতুল মু’মিনীনদের ব্যাপারে পর্দার আদেশ দিতেন (তবে ভাল হত) তারপর আল্লাহ্ তা’আলা পর্দার আয়াত নাযিল করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এই বর্ণনাটি সূরা আহযাবের ৫৩ নম্বর আয়াতের পরিচ্ছেদে রাখা হয়েছে। আয়াতে মুহাম্মদের ঘরে প্রবেশ, খাবারের পরে চলে যাওয়া এবং তাঁর স্ত্রীদের কাছে কিছু চাইলে আড়ালের পেছন থেকে চাওয়ার নির্দেশ রয়েছে। ঘর, অতিথি এবং স্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগের নিয়ম একই ধর্মীয় ঘোষণায় যুক্ত হয়েছে। উমরের প্রস্তাবের বিবরণ সেই নির্দিষ্ট পারিবারিক পরিসরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। [289] [291]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ আল্লাহ্‌ তা’আলার বাণীঃ لا تدخلوا … عند الله عظيما হে মু’মিনগণ! তোমরা খাওয়ার জন্য খাবার প্রস্তুতির অপেক্ষা না করে নাবীর ঘরে তোমাদেরকে অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত প্রবেশ করবে না; তবে তোমাদেরকে ডাকা হলে তোমরা প্রবেশ করবে এবং খাওয়া শেষ হলে নিজেরাই চলে যাবে, কথাবার্তায় মাশগুল হয়ে পড়বে না। তোমাদের এ আচরণ অবশ্যই নাবীকে পীড়া দেয়। তিনি তোমাদেরকে উঠিয়ে দিতে সংকোচ বোধ করেন। কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচবোধ করেন না। তোমরা যখন তাঁর পত্নীদের নিকট হতে কোন কিছু চাইবে, তখন পর্দার অন্তরাল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্য এবং তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্র উপায়। আল্লাহর রসূলকে কষ্ট দেয়া এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পত্নীদেরকে বিবাহ করা তোমাদের কারও পক্ষে কখনও বৈধ নয়। এটা আল্লাহর কাছে সাংঘাতিক অপরাধ। বলা হয় إِنَاهُ খাদ্য পরিপাক হওয়া। এটা أَنَى يَأْنِيْ أَنَاةًথেকে গঠিত। لَعَلَّ السَّاعَةَ تَكُوْنُ قَرِيْبًا সম্ভবত ক্বিয়ামাত অতি নিকটবর্তী। যদি তুমি স্ত্রী লিঙ্গ হিসেবে ব্যবহার কর, তবে قَرِيْبَةً বলবে। আর যদি الصِّفَةَ না ধর ظَرْفًا বা بَدَلًا হিসেবে ব্যবহার কর তবে ‘তা’ নিয়ে যুক্ত করবে না। তেমনি এ শব্দটি একবচন, দ্বি-বচন, বহুবচন এবং নারী-পুরুষ সকল ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৪৩১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৭৯০
৪৪৩১। মুসাদ্দাদ (রহঃ) … উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার কাছে ভাল ও মন্দ লোক আসে। আপনি যদি উম্মাহাতুল মু’মিনীনদের ব্যাপারে পর্দার আদেশ দিতেন (তবে ভাল হত) তারপর আল্লাহ্ তা’আলা পর্দার আয়াত নাযিল করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)

আয়েশার বর্ণনায় নবীপত্নীরা প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারতে রাতের বেলা মানাসি নামের প্রশস্ত খোলা জায়গায় যেতেন। উমর তাঁদের পর্দায় রাখার দাবি করছিলেন, কিন্তু মুহাম্মদ তখন তা কার্যকর করেননি। এক রাতে দীর্ঘাঙ্গী সাওদা বের হলে উমর তাঁকে ডেকে চিনে ফেলার কথা বলেন। বর্ণনায় এই ডাকের উদ্দেশ্যও উল্লেখ করা হয়েছে: পর্দার বিধান নাজিল হওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। উমরের আগে জানানো দাবি এবং সাওদাকে চিহ্নিত করার কাজ এভাবে একই নিয়ন্ত্রণমূলক উদ্যোগের অংশ হয়ে আছে। [292] [293]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪০/ সালাম
পরিচ্ছেদঃ ৭. মানুষের প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য স্ত্রীলোকের বাইরে যাওয়ার বৈধতা
৫৪৮৪। আবদুল মালিক ইবনু শুআয়ব ইবনু লায়স (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীগণ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার সময় রাতের বেলা ’মানাসি’ এর দিকে বেরিয়ে যেতেন। الْمَنَاصِع (মানাসি) হল প্রশস্ত ময়দান। ওদিকে উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতেন, আপনার স্ত্রীগণের প্রতি পর্দা বিধান করুন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করেননি। কোন এক রাতে ইশার সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিনা সাওদা বিনত যাম’আ (রাঃ) বের হলেন। তিনি ছিলেন দীর্ঘাঙ্গী মহিলা। উমার (রাঃ) তাঁকে ডাক দিয়ে বললেন, হে সাওদা! আমরা তোমাকে চিনে ফেলেছি। পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার প্রতি প্রবল আকাঙ্ক্ষায় (তিনি এরূপ করলেন)। আয়িশা (রাঃ) বলেন, তখন আল্লাহর তাআলা পর্দা-বিধি নাযিল করলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

কোরআন সংকলন 42

বুখারির আরেক স্থানে উমরকে মজলিসে বসা অবস্থায় সাওদাকে দেখতে পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেখানেও তাঁর “আমি তোমাকে চিনেছি” বক্তব্যের সঙ্গে পর্দা নাজিলের আকাঙ্ক্ষা যুক্ত। সাওদার পরিচয় প্রকাশ করে উমর নিজের দাবির বাস্তব নমুনা তৈরি করছেন: আড়াল ছাড়া বের হলে নারীকে চেনা যাচ্ছে, অতএব তাঁকে আড়াল করার ব্যবস্থা চাওয়া হচ্ছে। নারীর ব্যক্তিগত প্রয়োজনের মুহূর্তটি পুরুষের কাঙ্ক্ষিত বিধান আদায়ের উপায় হয়ে উঠেছে। [294] [295]

فَقَالَ عَرَفْتُكِ يَا سَوْدَةُ‏.‏ حِرْصًا عَلَى أَنْ يُنْزَلَ الْحِجَابُ‏.‏ قَالَتْ فَأَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ آيَةَ الْحِجَابِ

বাংলা অনুবাদ: তিনি বললেন, হে সাওদা, আমি তোমাকে চিনেছি—পর্দার বিধান নাজিল হওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষায়। আয়েশা বলেন, এরপর আল্লাহ পর্দার আয়াত নাজিল করলেন।

এই চাপের লক্ষ্যবস্তু ছিল মুহাম্মদের পরিবারের একজন নারী। উমর পর্দার দাবি মুহাম্মদের কাছে তুলছেন, আবার বাইরে তাঁর স্ত্রীকে চিহ্নিত করে সেই দাবির চাপ ঘরের মধ্যে পৌঁছে দিচ্ছেন। ব্যক্তিগত জীবনে অস্বস্তি সৃষ্টি করে কাঙ্ক্ষিত ধর্মীয় সিদ্ধান্ত আদায়ের কৌশল এখানে দৃশ্যমান। সাওদার প্রয়োজন কিংবা স্বাচ্ছন্দ্য এই উদ্যোগের কেন্দ্র নয়; কেন্দ্র হলো নারীকে কতটা আড়াল করা হবে, সেই বিষয়ে উমরের পছন্দ। একজন অনুসারীর এই পছন্দ পরবর্তী ওহির ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ধর্মীয় কর্তৃত্ব পাচ্ছে।

জয়নব বিনতে জাহশের সঙ্গে মুহাম্মদের বিয়ের ভোজ নিয়েও পর্দার আয়াতের বিবরণ আছে। আনাস বলেছেন, খাওয়ার পরে কয়েকজন অতিথি বসে কথা বলছিলেন। মুহাম্মদ উঠে গেলেও তিনজন বসে থাকেন। পরে তাঁরা চলে গেলে আনাস খবর দেন; মুহাম্মদ ঘরে প্রবেশ করেন এবং আনাসও ঢুকতে চাইলে মাঝখানে পর্দা টেনে দেন। তারপর ঘরে প্রবেশসংক্রান্ত আয়াত নাজিল হওয়ার কথা এসেছে। এখানে আয়াতের তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি হিসেবে বিয়ের ঘরের অতিথিদের দীর্ঘ উপস্থিতি বর্ণিত হয়েছে। [296]

فَانْطَلَقْتُ فَجِئْتُ فَأَخْبَرْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُمْ قَدِ انْطَلَقُوا، فَجَاءَ حَتَّى دَخَلَ، فَذَهَبْتُ أَدْخُلُ فَأَلْقَى الْحِجَابَ بَيْنِي وَبَيْنَهُ فَأَنْزَلَ اللَّهُ ‏{‏يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لاَ تَدْخُلُوا بُيُوتَ النَّبِيِّ‏}‏ الآيَةَ

বাংলা অনুবাদ: আমি গিয়ে নবীকে জানালাম, তাঁরা চলে গেছেন। তিনি এসে ঘরে প্রবেশ করলেন। আমিও প্রবেশ করতে চাইলে তিনি আমার ও তাঁর মাঝখানে পর্দা টেনে দিলেন। তারপর আল্লাহ নাজিল করলেন, “হে বিশ্বাসীরা, তোমরা নবীর ঘরগুলোতে প্রবেশ করো না”—আয়াতটি।

উমরের আগের দাবি এবং ভোজের অতিথিদের ঘটনাটি অবতরণবিবরণে দুই ধরনের পরিস্থিতি ধরে রেখেছে। একটিতে স্ত্রীদের আড়াল করার জন্য আগাম প্রস্তাব ও চাপ আছে; অন্যটিতে মুহাম্মদের ঘরে অতিথিদের দীর্ঘ অবস্থান এবং পর্দা টেনে দেওয়ার দৃশ্য আছে। উভয় ক্ষেত্রেই নির্দেশের সঙ্গে নির্দিষ্ট মানুষ, ঘর ও পারিবারিক অসুবিধা জড়িত। ঘরে প্রবেশ এবং স্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলার নিয়ম এভাবেই এক ব্যক্তির পারিবারিক প্রয়োজনের পরিসর থেকে ঐশী নির্দেশের মর্যাদায় প্রকাশিত হয়েছে।

বর্ণনাঘটনার অবস্থানবর্ণিত ফল
উমরের পর্দার প্রস্তাব — বুখারি ৪৭৯০ভালো-মন্দ দর্শনার্থীদের আসার প্রসঙ্গপর্দার আয়াত নাজিল
সাওদাকে চিহ্নিত করা — বুখারি ৬২৪০, মুসলিম ২১৭০ঘপর্দা নাজিলের আকাঙ্ক্ষায় প্রকাশ্য ডাকপর্দার আয়াতের অবতরণের উল্লেখ
জয়নবের ভোজ — বুখারি ৪৭৯১খাওয়ার পরে অতিথিদের বসে থাকাঘরে প্রবেশ ও পর্দার আয়াতের উল্লেখ
পর্দার পর সাওদার অভিযোগ — বুখারি ৪৭৯৫পর্দা চালু হওয়ার পরেও বাইরে যাওয়া নিয়ে মন্তব্যপ্রয়োজনের জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি

সাওদার আরেক বর্ণনার শুরুতেই বলা হয়েছে, পর্দার বিধান চালু হওয়ার পরে তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে গিয়েছিলেন। তাঁর দেহাকৃতির কারণে পরিচিত মানুষের কাছে তাঁকে শনাক্ত করা সম্ভব ছিল। উমর তাঁকে দেখে বলেন, তাঁদের চোখ এড়িয়ে থাকা যাবে না; কীভাবে বাইরে যাচ্ছেন তা ভেবে দেখতে বলেন। এই মন্তব্যের পরে সাওদা ফিরে মুহাম্মদের কাছে অভিযোগ করেন। এখানে তাঁর বের হওয়ার ওপর চাপ পর্দা চালুর পরেও বহাল আছে; পরিচিত হয়ে পড়াটাই উমরের আপত্তির বিষয়। [297] [298] [299] [300]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ আল্লাহ্‌ তা’আলার বাণীঃ لا تدخلوا … عند الله عظيما হে মু’মিনগণ! তোমরা খাওয়ার জন্য খাবার প্রস্তুতির অপেক্ষা না করে নাবীর ঘরে তোমাদেরকে অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত প্রবেশ করবে না; তবে তোমাদেরকে ডাকা হলে তোমরা প্রবেশ করবে এবং খাওয়া শেষ হলে নিজেরাই চলে যাবে, কথাবার্তায় মাশগুল হয়ে পড়বে না। তোমাদের এ আচরণ অবশ্যই নাবীকে পীড়া দেয়। তিনি তোমাদেরকে উঠিয়ে দিতে সংকোচ বোধ করেন। কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচবোধ করেন না। তোমরা যখন তাঁর পত্নীদের নিকট হতে কোন কিছু চাইবে, তখন পর্দার অন্তরাল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্য এবং তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্র উপায়। আল্লাহর রসূলকে কষ্ট দেয়া এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পত্নীদেরকে বিবাহ করা তোমাদের কারও পক্ষে কখনও বৈধ নয়। এটা আল্লাহর কাছে সাংঘাতিক অপরাধ। বলা হয় إِنَاهُ খাদ্য পরিপাক হওয়া। এটা أَنَى يَأْنِيْ أَنَاةًথেকে গঠিত। لَعَلَّ السَّاعَةَ تَكُوْنُ قَرِيْبًا সম্ভবত ক্বিয়ামাত অতি নিকটবর্তী। যদি তুমি স্ত্রী লিঙ্গ হিসেবে ব্যবহার কর, তবে قَرِيْبَةً বলবে। আর যদি الصِّفَةَ না ধর ظَرْفًا বা بَدَلًا হিসেবে ব্যবহার কর তবে ‘তা’ নিয়ে যুক্ত করবে না। তেমনি এ শব্দটি একবচন, দ্বি-বচন, বহুবচন এবং নারী-পুরুষ সকল ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৪৩২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৭৯৫
৪৪৩২। যাকারিয়া ইবনু ইয়াহ্ইয়া (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পর সাওদা প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে যান। সাওদা এমন মোটা শরীরের অধিকারিণী ছিলেন যে, পরিচিত লোকদের থেকে তিনি নিজকে গোপন রাখতে পারতেন না। উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) তাঁকে দেখে বললেন, হে সাওদা! জেনে রাখ, আল্লাহর কসম, আমাদের দৃষ্টি থেকে গোপন থাকতে পারবে না। এখন দেখ তো, কেমন করে বাইরে যাবে? আয়িশা (রাঃ) বলেন, (এ কথা শুনে) সাওদা (রাঃ) ফিরে আসলেন। আর এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে রাতের খানা খাচ্ছিলেন। তাঁর হাতে ছিল টুকরা হাড়। সাওদা (রাঃ) ঘরে প্রবেশ করে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে গিয়েছিলাম। তখন উমর (রাঃ) আমাকে এমন এমন কথা বলেছে। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এ সময় আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর নিকট ওহী নাযিল করেন। ওহী অবতীর্ণ হওয়া শেষ হল, হাড় টুকরা তখনও তাঁর হাতেই ছিল, তিনি তা রাখেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই প্রয়োজনে তোমাদের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

সাওদা ফিরে আসার সময়ে মুহাম্মদ আয়েশার ঘরে রাতের খাবার খাচ্ছিলেন। তাঁর হাতে মাংসযুক্ত হাড় ছিল। অভিযোগ জানানোর পরে ওহি আসার কথা বলা হয়েছে; সেই অবস্থা শেষ হওয়ার সময়ও হাড়টি তাঁর হাতেই ছিল। তারপর নারীদের প্রয়োজনের জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি জানানো হয়। একটি সামাজিক হস্তক্ষেপ, নারীর ফিরে এসে অভিযোগ করা এবং তাৎক্ষণিক ধর্মীয় অনুমতির ঘোষণা একই ধারাবাহিকতায় আছে। অনুমতির প্রয়োজন তৈরি হয়েছে উমরের মন্তব্যে বাধাগ্রস্ত চলাচল থেকে। [301]

قَالَتْ فَأَوْحَى اللَّهُ إِلَيْهِ ثُمَّ رُفِعَ عَنْهُ وَإِنَّ الْعَرْقَ فِي يَدِهِ مَا وَضَعَهُ فَقَالَ ‏”‏ إِنَّهُ قَدْ أُذِنَ لَكُنَّ أَنْ تَخْرُجْنَ لِحَاجَتِكُنَّ ‏”‏

বাংলা অনুবাদ: আয়েশা বলেন, তখন আল্লাহ তাঁর কাছে ওহী পাঠালেন। ওহীর অবস্থা শেষ হলো; মাংসযুক্ত হাড়টি তখনও তাঁর হাতে ছিল, তা রাখেননি। তিনি বললেন, তোমাদের প্রয়োজনের জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে।

এই অনুমতির বর্ণনা হাদিসে ওহির পরে ঘোষিত নির্দেশ হিসেবে সংরক্ষিত। পর্দার আয়াত নাজিল হওয়া এবং পরে প্রয়োজনের জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি পাওয়া দুটি আলাদা ফল। প্রথম ধারায় উমরের আকাঙ্ক্ষা আড়াল বাড়ানোর দিকে; দ্বিতীয় ধারায় তাঁর হস্তক্ষেপের পরে সাওদার অভিযোগ বাইরে যাওয়ার অনুমতির প্রশ্ন সামনে আনে। একজন নারীর দেহ ও চলাচল নিয়ে পুরুষের আপত্তি থেকে নতুন ধর্মীয় সিদ্ধান্তের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। স্বাভাবিক শারীরিক প্রয়োজনও তখন কর্তৃপক্ষের অনুমতির ভাষায় নির্ধারিত হয়।

ঘটনাগুলোর আগে-পরে অবস্থান নিয়ে ইবনে হাজর আল-কিরমানির বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন: সাওদাকে চিহ্নিত করার ঘটনা দুবার ঘটে থাকতে পারে। এই সম্ভাবনা দিয়ে পর্দার আগের এবং পরের বিবরণ একত্রে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বর্ণনায় ঘটনার সময়ের এই পার্থক্য নিয়ে ভাষ্যকারের নিজস্ব ব্যাখ্যাও রয়েছে। [302]

قال : الكرماني : فإن قلت : وقع هنا أنه كان بعدما ضرب الحجاب ، وتقدم في الوضوء أنه كان قبل الحجاب ، فالجواب : لعله وقع مرتين

বাংলা অনুবাদ: আল-কিরমানি বলেছেন: এখানে ঘটনাটি পর্দা চালু হওয়ার পরে বলা হয়েছে, অথচ ওজুর অধ্যায়ে পর্দার আগে বলা হয়েছে—এর উত্তর হলো, সম্ভবত ঘটনাটি দুবার ঘটেছিল।

ইবনে হাজরের নিজের ব্যাখ্যায় উমর পর্দার আয়াত আসার পরে আরও এগিয়ে গিয়েছিলেন। স্ত্রীদের শরীর আবৃত থাকলেও তাঁদের অবয়ব যেন বাইরে দেখা না যায়, তিনি তা চাইছিলেন। পোশাকের আড়ালের দাবি এবার সম্পূর্ণ অদৃশ্য থাকার দাবিতে পরিণত হয়েছে। [303] [304]

ثم قصد بعد ذلك أن لا يبدين أشخاصهن أصلا ولو كن مستترات ، فبالغ في ذلك ، فمنع منه

বাংলা অনুবাদ: এরপর তিনি চাইলেন, তাঁরা আবৃত থাকলেও যেন তাঁদের অবয়ব একেবারেই প্রকাশ না করেন। তিনি এতে বাড়াবাড়ি করলেন; তাঁকে তা থেকে বিরত করা হলো।

আবুল আব্বাস কুরতুবি আল-মুফহিমে এই চেষ্টার ফলকে নারীদের অসুবিধা, কষ্ট এবং ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় উমরের উদ্দেশ্য ছিল তাঁরা যেন একেবারেই বাইরে না যান। তিনি এই অবস্থানকে বাড়াবাড়ি বলেছেন এবং সাওদা এতে কষ্ট পাওয়ার সঙ্গে বাইরে যাওয়ার অনুমতির সম্পর্ক দেখিয়েছেন। নারীকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার ক্ষতিকর পরিণাম ব্যাখ্যাগ্রন্থের ভাষাতেই স্বীকৃত হয়েছে। [305]

فإنه كان قصده: ألا يخرجن أصلا، فأفرط في ذلك فإنه مفض إلى الحرج والمشقة، والإضرار بهن، فإنهن محتاجات إلى الخروج؛ ولذلك قال النبي – صلى الله عليه وسلم – لما تأذت بذلك سودة : ( قد أذن لكن أن تخرجن لحاجتكن )

বাংলা অনুবাদ: তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তাঁরা যেন একেবারেই বাইরে না যান। তিনি এতে বাড়াবাড়ি করেছিলেন; কারণ তা তাঁদের অসুবিধা, কষ্ট ও ক্ষতির দিকে নিয়ে যায়, অথচ তাঁদের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তাই সাওদা এতে কষ্ট পেলে নবী বললেন, “তোমাদের প্রয়োজনের জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।”

নারীদের পোশাক ও বাইরে যাওয়া নিয়ে প্রকাশ্যে নাজেহাল করার পরিচিত ধরনটি এখানেও আছে। পুরুষ নিজেকে নারীর চলাচল বিচার করার অধিকারী ভাবছেন; নারী প্রয়োজন সারতে বেরোলেও তাঁর চেহারা বা অবয়ব শনাক্ত হওয়া নিয়ে মন্তব্য করছেন। সাওদার ক্ষেত্রে এই আচরণের সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত ধর্মীয় বিধান আদায়ের উদ্দেশ্যও যুক্ত ছিল। পোশাক নিয়ে নিয়ন্ত্রণের দাবি মিটলেও নজরদারি থামেনি; দাবি বেড়েছে অবয়ব আড়াল করা এবং বাইরে যাওয়াকে সংকুচিত করার দিকে। নারীকে চেনা যাচ্ছে কি না, সেটিই তখন চলাচলে নতুন বাধা তৈরির মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়।

সাওদার স্বাভাবিক প্রয়োজনকে বিব্রত করে উমর যে চাপ তৈরি করেছিলেন, তার জবাবও ধর্মীয় অনুমতির ভাষায় এসেছে। অভিযোগকারী নারীর চলাচলের প্রশ্নটি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে মিটছে না; নবীর কাছে যাওয়া, ওহির আগমন এবং অনুমতির ঘোষণার মধ্য দিয়ে মিটছে। এই ব্যবস্থায় পুরুষের হস্তক্ষেপ সমস্যার জন্ম দেয়, আর সেই সমস্যার সমাধানের কর্তৃত্বও ধর্মীয় নেতৃত্বের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। পর্দার দাবি ও বাইরে যাওয়ার অনুমতির ইতিহাসে নারীর শরীর বারবার অন্যের সিদ্ধান্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অসীম মহাবিশ্বের শাশ্বত বিধান হিসেবে প্রচারিত পাঠ ও নির্দেশের সঙ্গে একটি ছোট সমাজের ঘর, অতিথি, পুরুষের নজরদারি এবং নারীর শারীরিক প্রয়োজন এভাবে জড়িয়ে আছে। উমরের দাবি, সাওদাকে প্রকাশ্যে চিহ্নিত করা, জয়নবের ভোজে অতিথিদের বসে থাকা এবং সাওদার ফিরে অভিযোগ করা—প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সামাজিক পরিস্থিতির পরে ধর্মীয় নির্দেশের ঘোষণা এসেছে। মানুষের চাপ ও পারিবারিক সংকট সংরক্ষিত অবতরণবিবরণ এবং অনুমতি ঘোষণার ঘটনাক্রমে প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত।


নবীপত্নীদের প্রতি উমরের হুমকি ও তাহরিমের আয়াত

মুহাম্মদের স্ত্রীদের সঙ্গে বিরোধের ঘটনায় উমর তাঁদের তালাক ও প্রতিস্থাপনের ভয় দেখিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, মুহাম্মদ তাঁদের তালাক দিলে আল্লাহ তাঁর জন্য আরও ভালো স্ত্রী দিতে পারেন। সহিহ বুখারিতে এই কথা বলার পরে অনুরূপ আয়াত নাজিল হওয়ার বিবরণ আছে। একটি ঘরের দাম্পত্য বিরোধে অন্য একজন পুরুষের হুঁশিয়ারি পরবর্তী ধর্মীয় ঘোষণার ভাষা পেয়েছে। মুহাম্মদের স্বামীর কর্তৃত্ব, উমরের হস্তক্ষেপ এবং আল্লাহর নামে ঘোষিত প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা একই ঘটনাক্রমে স্ত্রীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

বুখারি ৪৯১৬-তে ঘটনাটি সংক্ষিপ্ত ও সরাসরি। উমরের বর্ণনায় মুহাম্মদের স্ত্রীরা ঈর্ষার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে একত্র হয়েছিলেন। উমর তখন তাঁদের উদ্দেশে আরও ভালো স্ত্রী পাওয়ার কথা বলেন; এরপর সেই আয়াত নাজিল হয়। যে বাক্য কোরআনে ধর্মীয় কর্তৃত্ব বহন করছে, বর্ণনাটিতে তার আগের বক্তা উমর। কথার বিষয় ও পরবর্তী আয়াতের ভাষাগত মিল দুটিই সেখানে স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত। [306]

اجْتَمَعَ نِسَاءُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فِي الْغَيْرَةِ عَلَيْهِ فَقُلْتُ لَهُنَّ عَسَى رَبُّهُ إِنْ طَلَّقَكُنَّ أَنْ يُبَدِّلَهُ أَزْوَاجًا خَيْرًا مِنْكُنَّ‏.‏ فَنَزَلَتْ هَذِهِ الآيَةُ

বাংলা অনুবাদ: নবীর স্ত্রীরা ঈর্ষার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে একত্র হয়েছিলেন। তখন আমি তাঁদের বললাম, “তিনি তোমাদের তালাক দিলে তাঁর প্রভু তাঁকে তোমাদের পরিবর্তে তোমাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী দিতে পারেন।” এরপর এই আয়াত নাজিল হলো।

তালাকের সম্ভাবনাকে এখানে শাস্তি ও ভয় দেখানোর উপায় করা হয়েছে। স্ত্রীদের জানানো হচ্ছে, তাঁদের জায়গা পূরণ করার জন্য আরও ভালো নারী পাওয়া যাবে, আর সেই প্রতিস্থাপনের পক্ষে আল্লাহর সমর্থন রয়েছে। ফলে দাম্পত্যে আপত্তি জানানো নারীরা একই সঙ্গে সম্পর্ক হারানোর ভয় এবং ধর্মীয়ভাবে নিম্নতর বলে চিহ্নিত হওয়ার চাপের মুখে পড়েন। “তোমাদের চেয়ে উত্তম” কথাটি বর্তমান স্ত্রীদের মূল্য কমিয়ে সম্ভাব্য নতুন স্ত্রীদের সামনে আনে। মানুষের মুখে বলা সেই তুলনাই পরে ঐশী ঘোষণার মর্যাদায় স্থাপিত হয়েছে।

বুখারির আরেক বর্ণনায় উমর স্ত্রীদের কাছে গিয়ে তাঁদের থামতে বলেন। তাঁর বক্তব্য, তাঁরা বিরত না হলে আল্লাহ মুহাম্মদকে তাঁদের চেয়ে ভালো স্ত্রী দেবেন। এক স্ত্রী এই হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেন এবং প্রশ্ন তোলেন, মুহাম্মদ নিজে স্ত্রীদের উপদেশ দিতে পারেন, সেখানে উমর কেন তাঁদের উপদেশ দিতে এসেছেন। একই বিবরণে উমরের চাপ এবং স্ত্রীর প্রত্যুত্তর পাশাপাশি রয়েছে। [307]

فَدَخَلْتُ عَلَيْهِنَّ قُلْتُ إِنِ انْتَهَيْتُنَّ أَوْ لَيُبَدِّلَنَّ اللَّهُ رَسُولَهُ صلى الله عليه وسلم خَيْرًا مِنْكُنَّ‏.‏ حَتَّى أَتَيْتُ إِحْدَى نِسَائِهِ، قَالَتْ يَا عُمَرُ، أَمَا فِي رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَا يَعِظُ نِسَاءَهُ حَتَّى تَعِظَهُنَّ أَنْتَ

বাংলা অনুবাদ: আমি তাঁদের কাছে গিয়ে বললাম, তোমরা বিরত হও, নইলে আল্লাহ তাঁর রাসুলকে তোমাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী দেবেন। শেষে আমি তাঁর এক স্ত্রীর কাছে গেলাম। তিনি বললেন, হে উমর, রাসুলের কি তাঁর স্ত্রীদের উপদেশ দেওয়ার সামর্থ্য নেই যে তুমিও তাঁদের উপদেশ দিচ্ছ?

এই আপত্তি উমরের দাবির সামাজিক চরিত্র প্রকাশ করে। তিনি স্বামী ও স্ত্রীর বিরোধের মধ্যে প্রবেশ করে নারীদের আনুগত্য দাবি করছেন। স্ত্রীর প্রশ্নে সেই অনধিকার হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আছে। বর্ণনায় নারী কেবল তিরস্কার গ্রহণের নীরব পাত্র হয়ে থাকেননি; উপদেশ দেওয়ার অধিকার নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। একদিকে উমর আল্লাহর নামে প্রতিস্থাপনের ভয় দেখাচ্ছেন, অন্যদিকে তাঁর মুখের ওপর সেই হস্তক্ষেপের প্রয়োজন ও বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে।

আয়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই নারীর পরিচয়ও বুখারিতে আছে। ইবনে আব্বাস উমরকে জিজ্ঞেস করেন, মুহাম্মদের বিরুদ্ধে পরস্পরকে সাহায্যকারী দুই স্ত্রী কারা ছিলেন। উমর আয়েশা ও হাফসার নাম বলেন। ফলে দুই নারীকে সম্বোধন করে তিরস্কারের সঙ্গে নির্দিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় যুক্ত হয়েছে। হাফসা আবার উমরের নিজের কন্যা; ধর্মীয় নেতৃত্বের ঘর এবং তাঁর নিজের পারিবারিক অবস্থান এই বিরোধে একসঙ্গে জড়িত। [308]

فَقُلْتُ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ مَنِ الْمَرْأَتَانِ اللَّتَانِ تَظَاهَرَتَا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَمَا أَتْمَمْتُ كَلاَمِي حَتَّى قَالَ عَائِشَةُ وَحَفْصَةُ

বাংলা অনুবাদ: আমি বললাম, হে বিশ্বাসীদের নেতা, রাসুলের বিরুদ্ধে পরস্পরকে সাহায্যকারী দুই নারী কারা? আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই তিনি বললেন, আয়েশা ও হাফসা।

সূরা তাহরিমের পঞ্চম আয়াতে তালাক দেওয়া হলে আরও ভালো স্ত্রী দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেই স্ত্রীদের গুণ হিসেবে আত্মসমর্পণ, বিশ্বাস, আনুগত্য, তওবা ও উপাসনার পরিচয় এসেছে। দাম্পত্য বিরোধের মধ্যে প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনার সঙ্গে ধর্মীয় গুণের তালিকাও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমান স্ত্রীদের বিরোধিতার বিপরীতে আদর্শ নতুন স্ত্রীদের পরিচয় তৈরি হচ্ছে; তাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণাও মুহাম্মদকে কেন্দ্র করেই সাজানো। [309]

عَسَىٰ رَبُّهُ إِن طَلَّقَكُنَّ أَن يُبْدِلَهُ أَزْوَاجًا خَيْرًا مِّنكُنَّ مُسْلِمَاتٍ مُّؤْمِنَاتٍ قَانِتَاتٍ تَائِبَاتٍ عَابِدَاتٍ سَائِحَاتٍ ثَيِّبَاتٍ وَأَبْكَارًا

বাংলা অনুবাদ: তিনি তোমাদের তালাক দিলে তাঁর প্রভু তাঁকে তোমাদের পরিবর্তে তোমাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী দিতে পারেন—যারা হবে আত্মসমর্পণকারী, বিশ্বাসী, আনুগত্যশীল, তওবাকারী, উপাসনাকারী, রোজাদার, অকুমারী ও কুমারী।

অবস্থানবক্তব্যস্ত্রীদের ওপর চাপ
উমরের হুঁশিয়ারিবিরত হও, নইলে আরও ভালো স্ত্রী দেওয়া হবেবর্তমান সম্পর্ক ও অবস্থান হারানোর ভয়
তাহরিম ৬৬:৫তালাক দিলে উত্তম স্ত্রী দেওয়ার সম্ভাবনাহুমকি ঐশী কর্তৃত্বের ভাষা পায়
নতুন স্ত্রীদের পরিচয়বিশ্বাসী, আনুগত্যশীল ও উপাসনাকারীস্ত্রীর গুণের সঙ্গে ধর্মীয় মানদণ্ড যুক্ত হয়
এক স্ত্রীর প্রত্যুত্তরমুহাম্মদ নিজে উপদেশ দিতে পারেনউমরের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আপত্তি

কুরতুবির তাফসিরে এই প্রতিস্থাপনের বক্তব্যকে স্ত্রীদের ভয় দেখানোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তালাকের শর্তে আরও ভালো স্ত্রী দেওয়ার ঘোষণা তাঁদের সতর্ক ও ভীত করার ভাষা হিসেবে ব্যাখ্যাত। সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে হুমকি এইভাবে ধর্মীয় শাসনের কাজও করছে। মুহাম্মদের সঙ্গে বিরোধে থাকা স্ত্রীদের সামনে তাঁদের অপসারণযোগ্য অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। [310]

ولكن أخبر عن قدرته ، على أنه إن طلقهن أبدله خيرا منهن تخويفا لهن

বাংলা অনুবাদ: কিন্তু তিনি নিজের ক্ষমতা জানিয়েছেন: মুহাম্মদ তাঁদের তালাক দিলে তিনি তাঁদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী দেবেন—তাঁদের ভয় দেখানোর জন্য।

কুরতুবি “তওবাকারী” শব্দের ব্যাখ্যায় আরেকটি মতও উল্লেখ করেছেন: মুহাম্মদের নির্দেশে ফিরে আসা এবং নিজেদের পছন্দের বিষয় ছেড়ে দেওয়া। স্ত্রীর উত্তম হওয়ার পরিচয়ের মধ্যে এই ব্যাখ্যায় নিজের ইচ্ছা ত্যাগের দাবি প্রবেশ করেছে। বিরোধের নিষ্পত্তি তখন নারীর পছন্দ বদলানো ও স্বামীর নির্দেশে ফিরে আসার সঙ্গে যুক্ত। ধর্মীয় গুণের তালিকা পারিবারিক আনুগত্যের নির্দিষ্ট অর্থ পাচ্ছে। [311]

تائبات أي من ذنوبهن ; قاله السدي . وقيل : راجعات إلى أمر رسول الله صلى الله عليه وسلم تاركات لمحاب أنفسهن

বাংলা অনুবাদ: তওবাকারী অর্থ নিজেদের পাপ থেকে তওবাকারী; সুদ্দি এ কথা বলেছেন। আরেক মতে: রাসুলের নির্দেশে ফিরে আসা এবং নিজেদের পছন্দের বিষয়গুলো ত্যাগকারী।

উমরের নিজের দাম্পত্য অভিজ্ঞতার কথাও এই বিরোধের বর্ণনায় আছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী কুরাইশ পুরুষেরা নারীদের ওপর প্রাধান্য রাখতেন; মদিনায় এসে তাঁরা এমন মানুষ দেখেন, যাদের ওপর নারীদের প্রাধান্য ছিল। তাঁদের স্ত্রীরা আনসার নারীদের আচরণ অনুসরণ করতে থাকেন। উমর নিজের স্ত্রীকে ধমক দিলে তিনি পাল্টা কথা বলেন, আর উমর সেই প্রত্যুত্তর মেনে নিতে আপত্তি করেন। স্ত্রীর কথা বলার অধিকার নিয়ে তাঁর অস্বস্তির পরিচয় এই বিবরণে পাওয়া যায়। [312]

وَكُنَّا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ نَغْلِبُ النِّسَاءَ، فَلَمَّا قَدِمْنَا عَلَى الأَنْصَارِ إِذَا هُمْ قَوْمٌ تَغْلِبُهُمْ نِسَاؤُهُمْ، فَطَفِقَ نِسَاؤُنَا يَأْخُذْنَ مِنْ أَدَبِ نِسَاءِ الأَنْصَارِ، فَصِحْتُ عَلَى امْرَأَتِي، فَرَاجَعَتْنِي، فَأَنْكَرْتُ أَنْ تُرَاجِعَنِي

বাংলা অনুবাদ: আমরা কুরাইশরা নারীদের ওপর প্রাধান্য রাখতাম। আনসারদের কাছে এসে দেখলাম, তাঁরা এমন এক জনগোষ্ঠী যাদের ওপর তাঁদের নারীদের প্রাধান্য রয়েছে। আমাদের নারীরা আনসার নারীদের আচরণ গ্রহণ করতে লাগলেন। আমি আমার স্ত্রীকে ধমক দিলাম; তিনি আমাকে পাল্টা কথা বললেন। তিনি আমাকে পাল্টা কথা বলবেন, এতে আমি আপত্তি করলাম।

নারীর প্রত্যুত্তরকে কর্তৃত্বের সমস্যা হিসেবে দেখার এই মনোভাব হাফসার ক্ষেত্রেও কাজ করেছে। উমরের কাছে মুহাম্মদকে পাল্টা কথা বলা এবং তাঁর অসন্তোষের কারণ হওয়া ভয়াবহ পরিণতির বিষয়। নিজের ঘরে স্ত্রীর কথার বিরোধিতা এবং মেয়ের স্বামীর ঘরে গিয়ে তাঁকে থামানোর চেষ্টা একই পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের ধারায় পড়ে। নারীর যুক্তি বা অভিযোগের বিষয়বস্তু থেকে মনোযোগ সরে গিয়ে তিনি পুরুষের বিরোধিতা করছেন কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

হাফসাকে উমর আয়েশার সঙ্গে নিজের অবস্থান না মেলাতেও সতর্ক করেছিলেন। তিনি আয়েশার সৌন্দর্য ও তাঁর প্রতি মুহাম্মদের ভালোবাসার কথা উল্লেখ করেন। এই সতর্কতায় স্ত্রীদের মধ্যকার অবস্থানগত অসমতাকে মেয়েকে নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। মুহাম্মদের কাছে কার গ্রহণযোগ্যতা বেশি, সেই তুলনা হাফসাকে বিরোধ থেকে নিবৃত্ত করার উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। [313]

دَخَلَ عَلَى حَفْصَةَ فَقَالَ يَا بُنَيَّةِ لاَ يَغُرَّنَّكِ هَذِهِ الَّتِي أَعْجَبَهَا حُسْنُهَا حُبُّ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِيَّاهَا ـ يُرِيدُ عَائِشَةَ ـ فَقَصَصْتُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَتَبَسَّمَ

বাংলা অনুবাদ: তিনি হাফসার কাছে গিয়ে বললেন, হে আমার মেয়ে, এই নারী যেন তোমাকে বিভ্রান্ত না করে, যার সৌন্দর্য এবং তাঁর প্রতি রাসুলের ভালোবাসা তাঁকে মুগ্ধ করেছে—তিনি আয়েশাকে বোঝাচ্ছিলেন। আমি রাসুলের কাছে কথাটি বললাম; তিনি হাসলেন।

উম্মে সালামার আপত্তি আরও সরাসরি। বুখারি ৪৯১৩-তে তিনি উমরকে বলেন, তিনি সব বিষয়ে নাক গলিয়ে এখন মুহাম্মদ ও তাঁর স্ত্রীদের মাঝেও ঢুকতে চাইছেন। উমর স্বীকার করেন, এই কথায় তাঁর ভেতরের কিছু তেজ ভেঙে যায়। স্ত্রীদের সঙ্গে বিরোধের আলোচনায় তাঁর হস্তক্ষেপকে সংশ্লিষ্ট নারী নিজেই অনধিকার প্রবেশ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। বর্ণনাটি সেই প্রত্যাখ্যানও সংরক্ষণ করেছে। [314]

فَقَالَتْ أُمُّ سَلَمَةَ عَجَبًا لَكَ يَا ابْنَ الْخَطَّابِ دَخَلْتَ فِي كُلِّ شَىْءٍ، حَتَّى تَبْتَغِي أَنْ تَدْخُلَ بَيْنَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَزْوَاجِهِ‏.‏ فَأَخَذَتْنِي وَاللَّهِ أَخْذًا كَسَرَتْنِي عَنْ بَعْضِ مَا كُنْتُ أَجِدُ

বাংলা অনুবাদ: উম্মে সালামা বললেন, আশ্চর্য তুমি, হে ইবনুল খাত্তাব! তুমি সব বিষয়ে ঢুকেছ; এখন রাসুল ও তাঁর স্ত্রীদের মাঝেও ঢুকতে চাইছ! আল্লাহর কসম, তিনি আমাকে এমনভাবে জবাব দিলেন যে আমার ভেতরের কিছু তেজ ভেঙে গেল।

মুসলিমের বর্ণনায় হাফসার প্রতি উমরের আনুগত্যের চাপ আরও তীব্র। মুহাম্মদ যেন তাঁকে মেয়ের পক্ষ নিতে আসা মানুষ মনে না করেন, তা জানাতে উমর বলেন, মুহাম্মদ আদেশ করলে তিনি নিজের মেয়ের গলাও কেটে দেবেন। শর্তযুক্ত হত্যার এই অঙ্গীকারে পিতার অবস্থান স্পষ্ট: মেয়ের জীবনও নবীর আদেশের অধীন। [315]

وَاللَّهِ لَئِنْ أَمَرَنِي رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِضَرْبِ عُنُقِهَا لأَضْرِبَنَّ عُنُقَهَا

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর কসম, রাসুল যদি আমাকে তাঁর গলা কাটার আদেশ দেন, আমি অবশ্যই তাঁর গলা কাটব।

এই ঘোষণায় পিতৃত্বের সুরক্ষা আনুগত্যের নিচে স্থান পেয়েছে। উমর মুহাম্মদের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করছেন মেয়ের বিরুদ্ধে চরম সহিংসতার প্রস্তুতি জানিয়ে। একটি দাম্পত্য বিরোধে স্ত্রীকে আরও ভালো স্ত্রী দিয়ে বদলে দেওয়ার হুমকির পাশাপাশি তাঁর পিতার মুখে মৃত্যুর শর্তযুক্ত অঙ্গীকারও উপস্থিত। নারীর ওপর চাপের পরিসর তাই স্বামী ও পিতার সম্মিলিত কর্তৃত্বে বিস্তৃত হচ্ছে; সম্পর্ক বজায় রাখার নিরাপত্তার সঙ্গে জীবনের নিরাপত্তাও আনুগত্যের ভাষায় বাঁধা পড়ছে।

হাফসার পারিবারিক পরিচয় তাঁকে দুই পুরুষের কর্তৃত্বের সংযোগস্থলে দাঁড় করিয়েছে। তিনি মুহাম্মদের স্ত্রী এবং উমরের কন্যা। স্বামীর সঙ্গে বিরোধে তাঁর পিতা স্বামীর পক্ষ নিচ্ছেন; নিজের মেয়ের দাবি বা অসন্তোষকে সামনে আনার বদলে তাঁর আনুগত্য নিশ্চিত করার ভাষা ব্যবহার করছেন। এই অবস্থানে মেয়ের প্রতি পিতার সম্পর্কও ধর্মীয় নেতৃত্বকে সমর্থনের উপায় হয়ে যায়। দাম্পত্যের বিরোধে বাবার হস্তক্ষেপ মেয়ের স্বাধীন অবস্থানকে আরও সংকুচিত করছে।

একই মুসলিম বর্ণনায় উমর মুহাম্মদকে আশ্বস্ত করেন, আল্লাহ, ফেরেশতারা, জিবরিল, মিকাইল, আবু বকর, তিনি নিজে এবং বিশ্বাসীরা তাঁর সঙ্গে আছেন। এরপর উমর নিজের কথাকে আল্লাহ সত্য বলে সমর্থন করবেন—এই আশার কথা বলেন। নিজের বক্তব্যের পক্ষে ওহির প্রত্যাশা তাঁর মুখেই বর্ণিত হয়েছে। [316]

وَقَلَّمَا تَكَلَّمْتُ وَأَحْمَدُ اللَّهَ بِكَلاَمٍ إِلاَّ رَجَوْتُ أَنْ يَكُونَ اللَّهُ يُصَدِّقُ قَوْلِي الَّذِي أَقُولُ

বাংলা অনুবাদ: আমি খুব কমই কোনো কথা বলেছি—আর আমি আল্লাহর প্রশংসা করি—যে কথা বলার পরে আশা করিনি, আল্লাহ আমার বলা কথাকে সত্য বলে সমর্থন করবেন।

তাহরিমের চতুর্থ আয়াতে দুই নারীকে তওবা করতে বলা হয়েছে এবং তাঁদের হৃদয় বিচ্যুত হওয়ার কথা এসেছে। তাঁরা মুহাম্মদের বিরুদ্ধে পরস্পরকে সাহায্য করলে আল্লাহ, জিবরিল, সৎ বিশ্বাসীরা এবং ফেরেশতারা তাঁর সহায়—এই ঘোষণা রয়েছে। একটি দাম্পত্য বিরোধে স্বামীর পক্ষে দৃশ্যমান অনুসারীদের সঙ্গে অতিপ্রাকৃত সহায়তার সমাবেশও ঘোষণা করা হচ্ছে। নারীদের বিরোধিতা তখন ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিশাল কাঠামোর বিপরীতে স্থাপন করা হয়। [317]

إِن تَتُوبَا إِلَى اللَّهِ فَقَدْ صَغَتْ قُلُوبُكُمَا ۖ وَإِن تَظَاهَرَا عَلَيْهِ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ مَوْلَاهُ وَجِبْرِيلُ وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ ۖ وَالْمَلَائِكَةُ بَعْدَ ذَٰلِكَ ظَهِيرٌ

বাংলা অনুবাদ: তোমরা দুজন আল্লাহর কাছে তওবা করলে—তোমাদের হৃদয় তো বিচ্যুত হয়েছে। আর তোমরা দুজন তাঁর বিরুদ্ধে পরস্পরকে সাহায্য করলে আল্লাহই তাঁর সহায়, আর জিবরিল ও সৎ বিশ্বাসীরাও; এর পরে ফেরেশতারাও সহায়।

দুই নারীর পারস্পরিক সহযোগিতার বিপরীতে এই সমর্থনের তালিকা ক্ষমতার চরম অসমতা তৈরি করে। স্বামীর পাশে মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা, জিবরিল, ফেরেশতা ও বিশ্বাসীদের সমাবেশ ঘোষণা করা হচ্ছে। স্ত্রীদের আপত্তি তখন কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্কের একটি মতবিরোধ থাকে না; সেটি এমন এক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দাঁড়ায় যার দাবি সর্বব্যাপী। অভিযোগের বিষয়বস্তুর ওপর যুক্তি দেওয়ার বদলে এই ভাষা বিরোধী পক্ষের সামনে আনুগত্যের চাপ বাড়ায়। ঈশ্বরের সমর্থনের ঘোষণা দাম্পত্যে এক পক্ষের ক্ষমতার সম্প্রসারণ হিসেবে কাজ করছে।

ইবনে আতিয়ার তাফসিরে উমরের বক্তব্যের সঙ্গে এই আয়াতগুলোর মিল স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি আল-মাহদাবির সূত্রে আয়াত উমরের জিহ্বায় উচ্চারিত হওয়ার বর্ণনা এবং স্ত্রীদের আরও ভালো স্ত্রী দিয়ে বদলে দেওয়ার কথার অনুরূপ অবতরণের তথ্য দিয়েছেন। মানুষের মুখে আগের বাক্য এবং পরে নাজিল হয়েছে বলে ঘোষিত বাক্যের সম্পর্ক তাফসিরেও সংরক্ষিত আছে। [318]

قال المهدوي: روي أن هذه الآية نزلت على لسان عمر رضي الله عنه، وكذا روي أن عمر بن الخطاب رضي الله عنه قال لزوجات النبي صلى الله عليه وسلم: “عسى ربه إن طلقكن أن يبدله أزواجا خيرا منكن”، فنزلت الآية على نحو قوله

বাংলা অনুবাদ: আল-মাহদাবি বলেছেন: বর্ণিত হয়েছে, এই আয়াত উমরের জিহ্বায় নাজিল হয়েছে। একইভাবে বর্ণিত হয়েছে, উমর ইবনুল খাত্তাব নবীর স্ত্রীদের বলেছিলেন, “তিনি তোমাদের তালাক দিলে তাঁর প্রভু তাঁকে তোমাদের পরিবর্তে উত্তম স্ত্রী দিতে পারেন।” এরপর তাঁর কথার অনুরূপ আয়াত নাজিল হলো।

ঘটনার উপাদানমানুষের অবস্থান বা বক্তব্যধর্মীয় কর্তৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক
দাম্পত্য বিরোধস্ত্রীদের আপত্তি ও পারস্পরিক সহযোগিতাতওবা ও হৃদয়ের বিচ্যুতির ভাষায় তিরস্কার
উমরের হস্তক্ষেপবিরত না হলে উত্তম স্ত্রী দিয়ে প্রতিস্থাপনঅনুরূপ বাক্য আয়াত হিসেবে ঘোষিত
হাফসার প্রতি চাপআদেশ পেলে মেয়ের গলা কাটার অঙ্গীকারব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপরে নবীর আদেশ
মুহাম্মদকে সমর্থনউমরের নিজের ও অন্যদের আনুগত্যের ঘোষণাআল্লাহ ও ফেরেশতাদের সহায়তার ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত
স্ত্রীর প্রতিবাদউম্মে সালামার অনধিকার হস্তক্ষেপের অভিযোগনারীর পাল্টা বক্তব্যও বর্ণনায় উপস্থিত

এই সম্পর্কের মধ্যে মানুষের বক্তব্য এবং তার ধর্মীয় মর্যাদা পাওয়ার ধাপ আলাদা করে দেখা যায়। উমর আগে স্ত্রীদের সতর্ক করেন; পরে অনুরূপ বাক্য আয়াত হিসেবে ঘোষিত হয়। ঘোষণার পরে আগের হুঁশিয়ারি তাঁর বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ফলে স্ত্রীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত বাক্য একই সঙ্গে প্রস্তাবকারীর কর্তৃত্ব বাড়ায়। দাম্পত্যে স্বামীর পক্ষ সমর্থন, নারীদের ভয় দেখানো এবং হস্তক্ষেপকারী পুরুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা একই ঘটনাপরম্পরায় পরস্পরকে শক্ত করছে।

উমরের বক্তব্য ও পরবর্তী আয়াতের মিল থেকে সরাসরি পাওয়া যায় মানুষের আগে বলা কথা এবং পরে তার অনুরূপ ধর্মীয় ঘোষণার সম্পর্ক। মিলটি নিজে অতিপ্রাকৃত যোগাযোগের প্রমাণ দেয় না। ঐশী অনুপ্রেরণার পরিচয় এই সম্পর্কের ধর্মীয় মূল্যায়ন। সেই মূল্যায়নে আগের হুঁশিয়ারির মানবীয় উৎস বিশেষ পবিত্র মর্যাদা পায়; যে ব্যক্তি স্ত্রীদের ভয় দেখাচ্ছেন, তিনিই পরবর্তী ঘোষণার সঙ্গে মিলের কারণে সত্যের বিশেষ বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। ক্ষমতা প্রয়োগের ভাষা এভাবে প্রস্তাবকারীর পবিত্র পরিচয় তৈরির উপাদানও হয়ে ওঠে।

উমরের মুখে স্ত্রীদের বদলে দেওয়ার কথা এবং পরে একই অর্থের আয়াতের উপস্থিতি মানুষের কথার সঙ্গে কোরআনের সম্পর্কের একটি সরাসরি দলিল। একটি পারিবারিক বিরোধে পুরুষের পক্ষ থেকে উচ্চারিত শর্তযুক্ত হুমকি শাশ্বত বাণীর মর্যাদা পেয়েছে বলে বর্ণিত। যে নারীরা বিরোধ করছিলেন, তাঁদের সামনে তখন কেবল স্বামী বা পিতার অসন্তোষ থাকে না; আল্লাহর তিরস্কার, সম্পর্ক হারানোর ভয় এবং অতিপ্রাকৃত সমর্থনের ঘোষণাও দাঁড়ায়। ধর্মীয় কর্তৃত্ব ব্যক্তিগত বিরোধের মধ্যে প্রবেশ করে এক পক্ষের ক্ষমতাকে এইভাবে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।


বদরের বন্দিদের মুক্তিপণ, উমরের হত্যার প্রস্তাব ও পরবর্তী তিরস্কার

বদরের বন্দিদের বিষয়ে উমর তাঁদের শিরশ্ছেদের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আবু বকর চেয়েছিলেন মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিতে; মুহাম্মদ প্রথমে সেই মতই পছন্দ করেন। মুসলিমের বর্ণনায় এর পরে মুহাম্মদ ও আবু বকরের কান্না, মুক্তিপণ গ্রহণের জন্য শাস্তির আশঙ্কা এবং কোরআনের তিরস্কার এসেছে। মানুষের পরামর্শ, নবীর পছন্দ, সিদ্ধান্তের পরে ধর্মীয় তিরস্কার এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ভোগের অনুমতি একই ঘটনাপরম্পরায় রয়েছে। বন্দিদের জীবন নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ওহির নির্দেশ ও ব্যক্তির ধর্মীয় মর্যাদার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

সহিহ মুসলিমের বিবরণে বদরে সত্তরজন নিহত এবং সত্তরজন বন্দি হওয়ার কথা আছে। বন্দিদের বিষয়ে মুহাম্মদ আবু বকর ও উমরের মত জানতে চান। আবু বকর তাঁদের আত্মীয়তার সম্পর্ক উল্লেখ করে মুক্তিপণের প্রস্তাব দেন। সেই অর্থ মুসলিমদের শক্তি বাড়াবে এবং বন্দিরা ভবিষ্যতে ইসলাম গ্রহণ করতে পারেন—এই দুটি প্রত্যাশাও তাঁর কথায় রয়েছে। প্রস্তাবটি আত্মীয়তা, অর্থনৈতিক লাভ এবং ভবিষ্যৎ ধর্মান্তরের সম্ভাবনাকে একত্র করেছে। [319]

فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ يَا نَبِيَّ اللَّهِ هُمْ بَنُو الْعَمِّ وَالْعَشِيرَةِ أَرَى أَنْ تَأْخُذَ مِنْهُمْ فِدْيَةً فَتَكُونُ لَنَا قُوَّةً عَلَى الْكُفَّارِ فَعَسَى اللَّهُ أَنْ يَهْدِيَهُمْ لِلإِسْلاَمِ

বাংলা অনুবাদ: আবু বকর বললেন, হে আল্লাহর নবী, তাঁরা আমাদের চাচাতো ভাই ও স্বজন। আমার মত হলো, আপনি তাঁদের কাছ থেকে মুক্তিপণ নিন; তা অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে আমাদের শক্তি হবে। আল্লাহ তাঁদের ইসলামের পথও দেখাতে পারেন।

উমর এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর দাবি ছিল, বন্দিদের হাতে তুলে দেওয়া হোক, যাতে তাঁদের গলা কাটা যায়। তিনি আলীর হাতে আকিলকে এবং নিজের হাতে নিজের এক আত্মীয়কে তুলে দেওয়ার কথাও বলেন। বন্দিদের পরিচয় হিসেবে তিনি তাঁদের অবিশ্বাসীদের নেতা ও প্রধান ব্যক্তি বলে উল্লেখ করেন। রাজনৈতিক-ধর্মীয় শত্রুর নেতৃত্ব ধ্বংসের উদ্দেশ্যে বন্দিদের হত্যা করার প্রস্তাব এখানে সরাসরি আছে। [320]

قُلْتُ لاَ وَاللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا أَرَى الَّذِي رَأَى أَبُو بَكْرٍ وَلَكِنِّي أَرَى أَنْ تُمَكِّنَّا فَنَضْرِبَ أَعْنَاقَهُمْ فَتُمَكِّنَ عَلِيًّا مِنْ عَقِيلٍ فَيَضْرِبَ عُنُقَهُ وَتُمَكِّنِّي مِنْ فُلاَنٍ – نَسِيبًا لِعُمَرَ – فَأَضْرِبَ عُنُقَهُ فَإِنَّ هَؤُلاَءِ أَئِمَّةُ الْكُفْرِ وَصَنَادِيدُهَا

বাংলা অনুবাদ: আমি বললাম, না, আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসুল, আবু বকর যে মত দিয়েছেন আমি তা মনে করি না। আমার মত হলো, আপনি তাঁদের আমাদের হাতে দিন, যেন আমরা তাঁদের গলা কাটতে পারি। আলীর হাতে আকিলকে দিন, যেন তিনি তাঁর গলা কাটেন; আমার হাতে অমুককে দিন—উমরের এক আত্মীয়—যেন আমি তাঁর গলা কাটি। কারণ এরাই অবিশ্বাসের নেতা ও প্রধান ব্যক্তি।

আত্মীয়দের নিজ হাতে হত্যার প্রস্তাব পারিবারিক সম্পর্কের ওপরে শিবিরগত আনুগত্য বসায়। আলীকে আকিলের এবং উমরকে তাঁর আত্মীয়ের হত্যাকারী করার ব্যবস্থায় রক্তের সম্পর্ক হত্যার বাধা হয়ে থাকে না। রাজনৈতিক-ধর্মীয় বিভাজনের পক্ষে সেই সম্পর্ক ভাঙার প্রকাশ্য কাজও তৈরি হয়। বন্দিদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আবু বকরের যুক্তিতে স্বজনপরিচয় জীবিত রাখার কারণ, আর উমরের প্রস্তাবে একই স্বজনপরিচয় নিজেদের হাতে হত্যা করার উদাহরণে পরিণত হয়েছে।

ব্যক্তিপ্রস্তাব বা সিদ্ধান্তবর্ণিত যুক্তি ও ফল
আবু বকরমুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়াআত্মীয়তা, অর্থ দিয়ে শক্তিবৃদ্ধি ও ইসলাম গ্রহণের আশা
উমরবন্দিদের শিরশ্ছেদঅবিশ্বাসী নেতৃত্বকে ধ্বংস করা; আত্মীয়দেরও নিজ হাতে হত্যা
মুহাম্মদআবু বকরের মত পছন্দ করাউমরের হত্যার প্রস্তাব তখন গৃহীত হয়নি
পরবর্তী বর্ণনামুক্তিপণ নিয়ে কান্না ও তিরস্কারসিদ্ধান্তের পরে শাস্তির আশঙ্কা ও আয়াতের ঘোষণা

মুহাম্মদ কোন মতটি পছন্দ করেছিলেন, বর্ণনায় তা দ্ব্যর্থহীন। তিনি আবু বকরের বক্তব্য পছন্দ করেন এবং উমরের বক্তব্য পছন্দ করেননি। ফলে মানুষের দুটি প্রস্তাবের মধ্যে নবীর নির্বাচন আগে ঘটেছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর্যায়ে ধর্মীয় নেতৃত্ব নিজেই মত বেছে নিচ্ছে; তার পরের ঘটনা হিসেবে তিরস্কার ও শাস্তির আশঙ্কার বিবরণ সংরক্ষিত হয়েছে। [321]

فَهَوِيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَا قَالَ أَبُو بَكْرٍ وَلَمْ يَهْوَ مَا قُلْتُ

বাংলা অনুবাদ: রাসুল আবু বকর যা বলেছিলেন তা পছন্দ করলেন; আমি যা বলেছিলাম তা পছন্দ করলেন না।

ইবনে কাসির আহমাদের সূত্রে আনাসের নামে একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে উমর দুবার বন্দিদের গলা কাটার কথা বলেন এবং মুহাম্মদ তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। পরে আবু বকর মুক্তিপণ নিয়ে ক্ষমা করার কথা বললে মুহাম্মদের মুখের দুঃখ দূর হওয়ার বিবরণ এসেছে। পরামর্শের এই রূপেও সিদ্ধান্তের সঙ্গে নেতার ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া যুক্ত। মুক্তিপণের প্রস্তাব তাঁর পছন্দের সঙ্গে মিলেছে বলে বর্ণিত হয়েছে। [322]

فقام أبو بكر الصديق – رضي الله عنه – فقال : يا رسول الله ، نرى أن تعفو عنهم ، وأن تقبل منهم الفداء . قال : فذهب عن وجه رسول الله – صلى الله عليه وسلم – ما كان فيه من الغم ، فعفا عنهم ، وقبل منهم الفداء

বাংলা অনুবাদ: আবু বকর উঠে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের মত হলো, আপনি তাঁদের ক্ষমা করুন এবং তাঁদের কাছ থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করুন। তিনি বলেন: তখন রাসুলের মুখে যে দুঃখ ছিল তা দূর হলো; তিনি তাঁদের ক্ষমা করলেন এবং তাঁদের কাছ থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করলেন।

পরদিন উমর এসে মুহাম্মদ ও আবু বকরকে কাঁদতে দেখেন। কারণ জানতে চাইলে মুহাম্মদ মুক্তিপণ নেওয়ার প্রস্তাবের কথা বলেন এবং তাঁদের শাস্তি নিকটবর্তী একটি গাছের চেয়েও কাছে দেখানো হয়েছে বলে জানান। এই দৃশ্যে আগের সিদ্ধান্তের পরে ভয়াবহ ধর্মীয় পরিণতি সামনে আনা হচ্ছে। মুক্তিপণের মাধ্যমে জীবন রক্ষার প্রস্তাব শাস্তির আশঙ্কার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, আর আগে প্রত্যাখ্যাত কঠোর অবস্থানটি নতুন মর্যাদা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। [323]

أَبْكِي لِلَّذِي عَرَضَ عَلَىَّ أَصْحَابُكَ مِنْ أَخْذِهِمُ الْفِدَاءَ لَقَدْ عُرِضَ عَلَىَّ عَذَابُهُمْ أَدْنَى مِنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ

বাংলা অনুবাদ: তোমার সঙ্গীরা মুক্তিপণ নেওয়ার যে প্রস্তাব আমার কাছে এনেছিল, তার জন্য আমি কাঁদছি। তাঁদের শাস্তি আমাকে এই গাছের চেয়েও কাছে দেখানো হয়েছে।

সূরা আনফালের ৬৭ নম্বর আয়াতে যথেষ্ট পরিমাণে শত্রুকে পর্যুদস্ত করার আগে বন্দি রাখাকে তিরস্কার করা হয়েছে। পার্থিব সম্পদের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে আল্লাহর পরকাল চাওয়ার কথা এসেছে। মুক্তিপণ বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত এই ভাষায় অর্থনৈতিক লাভকে নিচু অবস্থানে এবং কঠোর যুদ্ধনীতিকে ধর্মীয় লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। বন্দিদের জীবিত রাখার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিরস্কার যুদ্ধের ফল ও বন্দিত্বের নীতিকে ঐশী বিচারের বিষয় করে তোলে। [324]

مَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَن يَكُونَ لَهُ أَسْرَىٰ حَتَّىٰ يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ ۚ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

বাংলা অনুবাদ: ভূমিতে শত্রুকে পর্যুদস্ত না করা পর্যন্ত কোনো নবীর জন্য বন্দি রাখা সঙ্গত নয়। তোমরা পার্থিব সম্পদ চাও, আর আল্লাহ চান পরকাল। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

আয়াতের “ইসখান” শব্দকে জামাখশারি অধিক হত্যা ও তাতে কঠোরতার অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় অবিশ্বাসীদের মধ্যে হত্যা ছড়িয়ে তাঁদের শক্তি দুর্বল করা এবং দখল ও দমনের মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী করার পরে বন্দি নেওয়ার কথা রয়েছে। শত্রুকে পর্যুদস্ত করার শব্দের মধ্যে হত্যার ভূমিকা এই তাফসিরে স্পষ্ট। সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণনাশকে ধর্মীয় শক্তিবৃদ্ধির উপায় করা হয়েছে। [325]

يعني : حتى يذل الكفر ويضعفه بإشاعة القتل في أهله ، ويعز الإسلام ويقويه بالاستيلاء والقهر ، ثم الأسر بعد ذلك

বাংলা অনুবাদ: অর্থাৎ অবিশ্বাসীদের মধ্যে হত্যা ছড়িয়ে অবিশ্বাসকে হীন ও দুর্বল করা এবং দখল ও দমনের মাধ্যমে ইসলামকে মর্যাদা ও শক্তি দেওয়া পর্যন্ত; এরপর বন্দি গ্রহণ।

উমরের প্রস্তাব বন্দিদের সরাসরি শিরশ্ছেদ; আয়াতে পর্যাপ্তভাবে শত্রুকে পর্যুদস্ত করার আগে বন্দি সংগ্রহের নিন্দা। প্রথমটি বন্দিদের নিয়ে নির্দিষ্ট করণীয়ের দাবি, দ্বিতীয়টি বন্দি গ্রহণের সঙ্গে যুদ্ধের কঠোরতার শর্ত জুড়ে দেয়। উমরের মতের সঙ্গে মিলের বিবরণে এই কঠোর অবস্থান ধর্মীয় কৃতিত্ব পায়। একজন মানুষের সিদ্ধান্তের প্রস্তাব এবং পরে ঘোষিত যুদ্ধনীতির সম্পর্ক এভাবেই তাঁর বিশেষ সমর্থনপ্রাপ্ত পরিচয়ের অংশ হয়েছে।

বন্দি হয়ে যাওয়ার পরে মানুষকে গলা কেটে হত্যা করার প্রস্তাবে তাঁর জীবন বিজয়ীর সিদ্ধান্তের অধীন হয়ে যায়। আত্মীয়তা বা বন্দিত্বও নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে না। একই আলোচনায় হত্যা রাজনৈতিক নেতৃত্ব ধ্বংসের পথ এবং জীবিত রাখা অর্থ সংগ্রহের পথ হিসেবে উপস্থিত। মানুষের জীবনের মূল্য বিজয়ী শিবিরের সুবিধা দিয়ে নির্ধারিত হচ্ছে। পরবর্তী ধর্মীয় মূল্যায়ন সেই সুবিধার বিতর্ককে পার্থিব সম্পদ বনাম পরকালের ভাষায় নতুন কর্তৃত্ব দেয়।

পরের আয়াতে আগে থেকে আল্লাহর বিধান না থাকলে গ্রহণ করা সম্পদের জন্য কঠিন শাস্তি আসত বলে বলা হয়েছে। এখানে তিরস্কারের সঙ্গে শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার কথাও যুক্ত। আয়াতের বাক্যে পূর্ববর্তী বিধানের উল্লেখ আছে; সেই বিধানকে কেন্দ্র করে তাফসিরে গনিমতের অনুমতি এবং বদরের অংশগ্রহণকারীদের ক্ষমার ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে। মুক্তিপণের সিদ্ধান্ত ও তার ধর্মীয় পরিণতি একই ধারাবাহিকতায় আলোচনা হয়েছে। [326]

لَّوْلَا كِتَابٌ مِّنَ اللَّهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্ববর্তী বিধান না থাকলে তোমরা যা গ্রহণ করেছ তার জন্য তোমাদের কঠিন শাস্তি স্পর্শ করত।

তাবারি হাসান বসরির বক্তব্য হিসেবে একটি স্পষ্ট ঘটনাক্রম সংরক্ষণ করেছেন: নির্দেশ পাওয়ার আগে বদরের বন্দিদের কাছ থেকে মুক্তিপণ নেওয়া হয়েছিল; আল্লাহ তার নিন্দা করেন, পরে তা বৈধ করেন। এই ব্যাখ্যায় সিদ্ধান্ত, তিরস্কার ও অনুমোদনের পৃথক ধাপ রয়েছে। মানুষ আগে কাজ করেছে, ধর্মীয় মূল্যায়ন ও অনুমতি পরে এসেছে। পূর্বনির্ধারিত বিধানের ধারণার পাশাপাশি প্রকাশিত নির্দেশের এই সময়ক্রমও তাফসিরে অক্ষত আছে। [327]

إن الله كان مُطْعِم هذه الأمة الغنيمةَ, وإنهم أخذوا الفداء من أسارى بدر قبل أن يؤمروا به. قال: فعاب الله ذلك عليهم, ثم أحله الله

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ এই উম্মতকে গনিমত ভোগ করতে দেবেন; আর তাঁরা নির্দেশ পাওয়ার আগে বদরের বন্দিদের কাছ থেকে মুক্তিপণ নিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন: আল্লাহ এ জন্য তাঁদের নিন্দা করলেন, তারপর তা বৈধ করলেন।

পূর্ববর্তী বিধান বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তাবারি নিজের সিদ্ধান্তে একাধিক অর্থ গ্রহণ করেছেন। অজ্ঞতাবশত করা কাজের জন্য শাস্তি না দেওয়া, গনিমত বৈধ করা এবং বদরের অংশগ্রহণকারীদের ক্ষমা—এসবকে তিনি আগে থেকে লিখিত ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত বলেছেন। একই ঘটনার শাস্তির আশঙ্কা এবং শাস্তি থেকে অব্যাহতি ধর্মীয় ব্যাখ্যার মধ্যে পাশাপাশি স্থান পাচ্ছে। [328]

وكل هذه المعاني التي ذكرتها عمن ذكرت، مما قد سبق في كتاب الله أنه لا يؤاخذ بشيء منها هذه الأمة, وذلك: ما عملوا من عمل بجهالة, و إحلال الغنيمة، والمغفرة لأهل بدر, وكل ذلك مما كتب لهم

বাংলা অনুবাদ: আমি যাঁদের থেকে যেসব অর্থ উল্লেখ করেছি, সেগুলো সবই আল্লাহর পূর্ববর্তী কিতাবে রয়েছে—এই উম্মতকে এসবের জন্য পাকড়াও করা হবে না। অর্থাৎ অজ্ঞতাবশত করা কাজ, গনিমত বৈধ করা এবং বদরের অংশগ্রহণকারীদের ক্ষমা; এসবই তাঁদের জন্য লিখিত ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত।

এই ব্যাখ্যায় আগে থেকে লেখা বিধান এবং মানুষের কাছে নির্দেশ প্রকাশের সময় দুটি আলাদা স্তর। পূর্বলিখিত ব্যবস্থার ধারণায় বৈধতা ও ক্ষমা আগে থেকেই নির্ধারিত। প্রকাশিত ঘটনাক্রমে মানুষ পরামর্শ দিচ্ছে, নেতা একটি মত বেছে নিচ্ছেন, তারপর তিরস্কার ও অনুমোদনের ভাষা আসছে। অদৃশ্য পূর্বনির্ধারণের দাবি দিয়ে ঘটনাটি ধর্মীয় অর্থ পায়; ঘটনাটির দৃশ্যমান বর্ণনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তার মূল্যায়নের পর্যায়ক্রম সংরক্ষিত থাকে। মানুষের কাজ এবং পরের ঘোষণার সম্পর্ক এই সময়ক্রমের মধ্যে সরাসরি উপস্থিত।

আনফালের ৬৯ নম্বর আয়াতে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বৈধ ও উত্তম হিসেবে ভোগ করতে বলা হয়েছে। কঠিন শাস্তির আশঙ্কার পরেই সম্পদ গ্রহণের অনুমোদন এবং ক্ষমা ও দয়ার ঘোষণা এসেছে। ধর্মীয় বর্ণনায় এই সম্পদের বৈধতা তাই মানুষের সিদ্ধান্তের আগে কার্যকর স্পষ্ট নির্দেশ হিসেবে উপস্থিত হয়নি; সিদ্ধান্তের পরের মূল্যায়ন ও অনুমোদনের সঙ্গে এসেছে। অর্জিত অর্থ ভোগের অধিকারও নতুন ঘোষণার ভাষায় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। [329]

فَكُلُوا مِمَّا غَنِمْتُمْ حَلَالًا طَيِّبًا ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

বাংলা অনুবাদ: তোমরা যে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ পেয়েছ তা বৈধ ও উত্তম হিসেবে ভোগ করো এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।

ধাপসংরক্ষিত বিবরণনির্দেশ গঠনের সঙ্গে সম্পর্ক
বন্দিদের নিয়ে পরামর্শমুক্তিপণ ও হত্যার দুটি পৃথক প্রস্তাবসিদ্ধান্তের আগে মানুষের মতবিরোধ
মুহাম্মদের নির্বাচনআবু বকরের মত পছন্দএকটি প্রস্তাবকে কার্যকর নীতির জন্য বেছে নেওয়া
পরবর্তী তিরস্কারশাস্তির আশঙ্কা ও পার্থিব সম্পদের আকাঙ্ক্ষার নিন্দাআগের সিদ্ধান্তের পরে ধর্মীয় মূল্যায়ন
সম্পদ ভোগের অনুমতিযুদ্ধলব্ধ সম্পদ বৈধ ও উত্তমগৃহীত অর্থের ব্যবহারে অনুমোদন
উমরের মর্যাদাবদরের বন্দিদের বিষয়কে নিজের মতের সঙ্গে মিল হিসেবে উল্লেখআগের কঠোর অবস্থানের পক্ষে ধর্মীয় কৃতিত্ব

কুরতুবি ইবনে আব্বাসের নামে আরেকটি ব্যাখ্যা সংরক্ষণ করেছেন, যেখানে নীতির পরিবর্তন মুসলিমদের শক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। বদরের সময়ে তাঁদের সংখ্যা কম ছিল; সংখ্যা ও ক্ষমতা বাড়লে বন্দিদের অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেওয়া অথবা মুক্তিপণ নেওয়ার বক্তব্য আসে বলে সেখানে বলা হয়েছে। বন্দিনীতি এই ব্যাখ্যায় রাজনৈতিক-সামরিক শক্তির পরিমাণের সঙ্গে বদলাচ্ছে। ধর্মীয় নির্দেশের ইতিহাস ব্যাখ্যায় সমকালীন ক্ষমতা ও প্রয়োজন সরাসরি ব্যবহৃত হয়েছে। [330]

وقال ابن عباس رضي الله عنه : كان هذا يوم بدر والمسلمون يومئذ قليل ، فلما كثروا واشتد سلطانهم أنزل الله عز وجل بعد هذا في الأسارى : فإما منا بعد وإما فداء

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আব্বাস বলেছেন: এটি ছিল বদরের ঘটনা; সেদিন মুসলিমদের সংখ্যা কম ছিল। পরে তাঁদের সংখ্যা বাড়ল এবং ক্ষমতা শক্তিশালী হলো, তখন বন্দিদের বিষয়ে এর পরে আল্লাহ নাজিল করলেন: “এরপর হয় অনুগ্রহ করে মুক্তি, নয়তো মুক্তিপণ।”

বন্দিদের বিষয়ে ব্যক্তিগত অনুরোধে ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনাও মুহাম্মদের নামে বর্ণিত হয়েছে। বুখারিতে তিনি বলেন, মুতইম ইবনে আদি জীবিত থেকে বদরের বন্দিদের জন্য অনুরোধ করলে তিনি তাঁর জন্য তাঁদের ছেড়ে দিতেন। এটি সম্ভাব্য অনুরোধের ক্ষেত্রে তাঁর নিজের সিদ্ধান্তের ঘোষণা। বন্দিদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পরিসরে অর্থ, শত্রুর শক্তি এবং নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও অনুরোধের মূল্য—সবই বিবেচনার উপাদান হিসেবে উপস্থিত। [331]

لَوْ كَانَ الْمُطْعِمُ بْنُ عَدِيٍّ حَيًّا، ثُمَّ كَلَّمَنِي فِي هَؤُلاَءِ النَّتْنَى، لَتَرَكْتُهُمْ لَهُ

বাংলা অনুবাদ: মুতইম ইবনে আদি জীবিত থাকলে এবং এই দুর্গন্ধময় লোকগুলোর বিষয়ে আমাকে বললে আমি তাঁর জন্য তাঁদের ছেড়ে দিতাম।

এই সম্ভাব্য অনুরোধের ঘোষণায় বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রতিও সাড়া দিতে পারে। একজন ব্যক্তির অনুরোধে যাঁদের ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, অন্য আলোচনায় তাঁদের মতো বন্দিদেরই অর্থ আদায় বা হত্যার সিদ্ধান্তের মুখে রাখা হয়েছে। জীবিত থাকা ও মুক্তি পাওয়া বিজয়ী নেতার সিদ্ধান্ত এবং তাঁর কাছে করা আবেদনের ওপর নির্ভর করছে। ধর্মীয় কর্তৃত্বের সঙ্গে ব্যক্তির পছন্দ ও অনুরোধের মর্যাদা বন্দিদের জীবনের ওপর বাস্তব প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা বহন করছে।

উমর নিজের মতের সঙ্গে প্রভুর মিলের তিনটি ক্ষেত্রের মধ্যে বদরের বন্দিদের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। এই তালিকায় তাঁর হত্যার প্রস্তাবের ঘটনাটি বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদার অংশ হয়ে যায়। প্রথমে মুহাম্মদের অপছন্দ হওয়া কঠোর অবস্থান, পরে তিরস্কারের বিবরণ এবং শেষে উমরের বিশেষ সমর্থনপ্রাপ্ত পরিচয়—এই সম্পর্ক ধর্মীয় সাহিত্যের ভেতরেই সংরক্ষিত। সহিংস নীতির পক্ষ নেওয়া মানুষটির মর্যাদা প্রতিষ্ঠার উপকরণ হয়েছে। [332]

وَافَقْتُ رَبِّي فِي ثَلاَثٍ فِي مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ وَفِي الْحِجَابِ وَفِي أُسَارَى بَدْرٍ

বাংলা অনুবাদ: তিনটি ক্ষেত্রে আমার প্রভুর সঙ্গে আমার মত মিলে গেছে: মাকামে ইবরাহিম, পর্দা এবং বদরের বন্দিদের বিষয়ে।

এই ঘটনার ধর্মীয় মূল্যায়নে মানুষের জীবনের ওপর সহিংস সিদ্ধান্তকে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। হত্যার প্রস্তাব উমরের দৃঢ়তা ও মতের সঙ্গে ওহির মিলের পরিচয় পায়; মুক্তিপণের সিদ্ধান্তের পরে আসে কান্না ও শাস্তির ভয়। ফলে বেশি কঠোর হওয়া ধর্মীয়ভাবে সঠিক অবস্থানের কৃতিত্ব বহন করতে পারে। তাফসিরে হত্যা ছড়িয়ে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার ভাষা সেই মূল্যায়নের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও প্রকাশ করে। বন্দিদের জীবন এখানে বিজয়ী নেতৃত্বের ক্ষমতা, অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের দাবির অধীন।

কোরআনের নির্দেশ প্রকাশের সঙ্গে মানুষের সিদ্ধান্তের সম্পর্ক বদরের বিবরণে বহু ধাপে দেখা যায়। পরামর্শে দুটি মত আসে, মুহাম্মদ একটি বেছে নেন, পরে সেই সিদ্ধান্তকে ঘিরে তিরস্কার ও অনুমতির ঘোষণা আসে, আর অন্য মতের প্রবক্তা বিশেষ সমর্থনের কৃতিত্ব পান। শাশ্বত বিধানের পরিচয়ে সংরক্ষিত পাঠের সঙ্গে যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থ, ক্ষমতা, আত্মীয়তা ও নেতাদের পছন্দের এই যোগসূত্র অক্ষত রয়েছে। মানুষের বিতর্ক ও সিদ্ধান্তের পরেই নির্দিষ্ট ধর্মীয় মূল্যায়ন ঘোষিত হওয়ার ঘটনাক্রম সংকলিত উৎসগুলো সরাসরি ধরে রেখেছে।


উমরসহ সাহাবিদের বিধান ভঙ্গের পরে রোজার রাতে সহবাস ও পানাহারের অনুমতি

রমজানের রাতে সহবাস ও পানাহারের অনুমতি প্রথম থেকেই একই অবস্থায় বহাল ছিল না। আগের নিষেধ, সেই নিষেধের কারণে মানুষের ভোগান্তি, উমরসহ কয়েকজনের বিধান লঙ্ঘন এবং তার পরে নতুন ছাড়ের ঘোষণা—কোরআনের আয়াত ও তাফসিরে এই ধারাবাহিকতা সংরক্ষিত আছে। যে কাজ এক পর্যায়ে নিজের সঙ্গে খিয়ানত হিসেবে চিহ্নিত, পরবর্তী ঘোষণায় সেই কাজই বৈধ হয়েছে। সর্বজ্ঞ বিধানদাতার আইন বাস্তবে মানুষের ক্ষুধা, শ্রম, ঘুম ও যৌন আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংঘাতে পড়েছে; সংঘাতের পরে আইন মানুষের আচরণের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া হয়েছে।

বাকারার ১৮৭ নম্বর আয়াতে অতীত আচরণকে খিয়ানত বলা, ক্ষমা ঘোষণা এবং “এখন” থেকে সহবাসের অনুমতি একই সঙ্গে এসেছে। পুরোনো নিষেধ অমান্য করার পরিণতি শুধু ক্ষমা পাওয়ার মধ্যে শেষ হয়নি; নিষেধের সময়সীমাও বদলেছে। রাতের সহবাস বৈধ হয়েছে এবং ফজর স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত খাওয়াপানার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আয়াতটির চারটি বাংলা অনুবাদে এই আগের আচরণ, ক্ষমা ও নতুন অনুমতির সম্পর্ক প্রকাশ্য। [333]

তোমাদের জন্য রমাযানের রাতে তোমাদের বিবিগণের নিকট গমন করা জায়িয করা হয়েছে, তারা তোমাদের আচ্ছাদন আর তোমরা তাদের আচ্ছাদন। আল্লাহ জানতেন যে, তোমরা নিজেদের সঙ্গে প্রতারণা করছিলে। সুতরাং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করলেন এবং তোমাদের অব্যাহতি দিলেন। অতএব, এখন থেকে তোমরা তাদের সঙ্গে সহবাস করতে পার এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা কিছু বিধিবদ্ধ করেছেন তা লাভ কর এবং তোমরা আহার ও পান করতে থাক যে পর্যন্ত তোমাদের জন্য কালো রেখা হতে ঊষাকালের সাদা রেখা প্রকাশ না পায়। তৎপর রাতের আগমন পর্যন্ত রোযা পূর্ণ কর, আর মাসজিদে ই’তিকাফ অবস্থায় তাদের সাথে সহবাস করো না। এসব আল্লাহর আইন, কাজেই এগুলোর নিকটবর্তী হয়ো না। আল্লাহ মানবজাতির জন্য নিজের আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তারা মুত্তাকী হতে পারে।
— Taisirul Quran
রামাযানের রাতে আপন স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে, তারা তোমাদের জন্য এবং তোমরা তাদের জন্য আবরণ, তোমরা যে নিজেদের ক্ষতি করছিলে আল্লাহ তা জ্ঞাত আছেন, এ জন্য তিনি তোমাদের প্রতি প্রত্যাবৃত্ত হলেন এবং তোমাদের (ভার) লাঘব করে দিলেন; অতএব এক্ষণে তোমরা (রামাযানের রাতেও) তাদের সাথে মিলিত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিপিবদ্ধ করেছেন তা অনুসন্ধান কর এবং প্রত্যুষে কালো সূতা হতে সাদা সূতা প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত তোমরা আহার ও পান কর, অতঃপর রাত সমাগম পর্যন্ত তোমরা সিয়াম পূর্ণ কর; তোমরা মাসজিদে ই‘তিকাফ করার সময় (তোমাদের স্ত্রীদের সাথে) মিলিত হবেনা; এটিই আল্লাহর সীমা। অতএব তোমরা উহার নিকটেও যাবেনা; এভাবে আল্লাহ মানবমন্ডলীর জন্য তাঁর নিদর্শনসমূহ বিবৃত করেন, যেন তারা সংযত হয়।
— Sheikh Mujibur Rahman
সিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীদের নিকট গমন হালাল করা হয়েছে। তারা তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের জন্য পরিচ্ছদ। আল্লাহ জেনেছেন যে, তোমরা নিজদের সাথে খিয়ানত করছিলে। অতঃপর তিনি তোমাদের তাওবা কবূল করেছেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করেছেন। অতএব, এখন তোমরা তাদের সাথে মিলিত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিখে দিয়েছেন, তা অনুসন্ধান কর। আর আহার কর ও পান কর যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কাল রেখা থেকে স্পষ্ট হয়। অতঃপর রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর। আর তোমরা মাসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হয়ো না। এটা আল্লাহর সীমারেখা, সুতরাং তোমরা তার নিকটবর্তী হয়ো না। এভাবেই আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ মানুষের জন্য স্পষ্ট করেন যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে।
— Rawai Al-bayan
সিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রী-সম্ভোগ বৈধ করা হয়েছে [১]। তারা তোমাদের পোষাকস্বরূপ এবং তোমরাও তাদের পোষাকস্বরূপ। আল্লাহ্‌ জানেন যে, তোমরা নিজদের সাথে খিয়ানত করছিলে। সুতরাং তিনি তোমাদের তওবা কবুল করেছেন এবং তোমাদেরকে মার্জনা করেছেন। কাজেই এখন তোমরা তাদের সাথে সংগত হও এবং আল্লাহ্‌ যা তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন তা কামনা কর। আর তোমরা পানাহার কর যতক্ষণ রাতের কালোরেখা থেকে উষার সাদা রেখা স্পষ্টরূপে তোমাদের নিকট প্রকাশ না হয় [২]। তারপর রাতের আগমন পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর। আর তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত [৩] অবস্থায় তাদের সাথে সংগত হয়ো না। এগুলো আল্লাহ্‌র সীমারেখা। কাজেই এগুলোর নিকটবতী হয়ো না [৪]। এভাবে আল্লাহ্‌ তাঁর আয়াতসমূহ মানুষদের জন্য সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারে।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

আয়াতের “ফালআনা বাশিরুহুন্না”—অতএব এখন তাদের সঙ্গে মিলিত হও—বাক্যটি অনুমতির সূচনাকাল নির্দেশ করে। আগে ঘটে যাওয়া কাজের জন্য খিয়ানতের অভিযোগ এবং পরে একই কাজের অনুমতি দেওয়ার মধ্যে বিধানের পরিবর্তন রয়েছে। মানুষের একটি কাজ আগের নিয়মে অপরাধ, নতুন নিয়মে বৈধ দাম্পত্য আচরণ। কাজটির প্রকৃতি অপরিবর্তিত থেকেছে; বদলেছে বিধানদাতার ঘোষিত অনুমতি। ক্ষমার ভাষার মধ্যেই নতুন আইনের কার্যকারিতা শুরু হয়েছে।

জালালাইনের বাংলা অনুবাদে প্রথম যুগে ঈশার পরে পানাহার ও স্ত্রীসহবাস হারাম থাকার কথা স্পষ্ট। সেই বিধান রহিত করেই আয়াতটি নাজিল হয়েছে বলে সেখানে বলা হয়েছে। উমর ও অন্য কয়েকজনের নিষিদ্ধ সময়ে সহবাস এবং মুহাম্মদের কাছে তাঁদের ওজর পেশের কথাও একই ব্যাখ্যায় আছে। মানুষের নিয়মভঙ্গকে ঘিরেই নতুন অনুমতির ঘোষণার উপলক্ষ তৈরি হয়েছে। [334]

অনুবাদ:
১৮৭. সিয়ামের রাত্রে তোমাদের জন্য স্ত্রীদের সাথে বাধাহীন ব্যবহার সহবাস বৈধ করা হয়েছে ইসলামের প্রথম যুগে সিয়ামের সময় ইশার পরই খানা-পিনা ও স্ত্রীসম্ভোগ ছিল হারাম। উক্ত বিধান মানসূখ করে আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাজিল করেন।
তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ এ স্থানে পরস্পরকে পরিচ্ছদরূপে আখ্যায়িত করে পরস্পরের নিবিড় সম্পর্ক এবং একজন অন্যজনের প্রতি মুখাপেক্ষিতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল্লাহ জানতেন যে সিয়ামের রাত্রে স্ত্রীসম্ভোগ করে তোমরা নিজেদের সাথে প্রতারণা খেয়ানত করছিল। [নিষিদ্ধকালীন সময়ে) হযরত ওমর ও কতিপয় সাহাবীর তরফ হতে এ ধরনের কাজ সংঘটিত হয়েছিল। তাঁরা তখন রাসূলুল্লাহ-এর নিকট এ বিষয়ে ওজর পেশ করেন।
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, অতঃপর তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমা পরবশ হয়েছেন, তোমাদের তওবা কবুল করেছেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করেছেন। সুতরাং এখন তোমাদের জন্য যখন বৈধ করে দেওয়া হয়েছে তাদের সাথে সঙ্গত হও সহবাসে লিপ্ত হও এবং আল্লাহ যা তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন অর্থাৎ স্ত্রীসম্ভোগ বৈধ করা বা যে সন্তান তোমাদের তকদীরে রাখা হয়েছে তা কামনা কর, অনুসন্ধান কর।

কোরআন সংকলন 44

মাযহারীর অনুবাদে আগের অবস্থায় রাতেও স্ত্রীদের থেকে পৃথক থাকার বিধান এবং পরে অনুমতির কথা এসেছে। বিধান যে পর্যায়ক্রমে বদলেছে, ভাষ্যকার সেটিকে শরিয়ত অবতরণের ইতিহাসের অংশ হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়ম কঠোর হয়েছে, আবার রোজার রাতের ক্ষেত্রে আগের কঠোরতা শিথিল হয়েছে। এখানে পরিবর্তনের দিকটি মানুষের ভোগান্তি ও নিষেধ অমান্য করার ঘটনার সঙ্গে মিলে যায়। [335]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা
قَوْلُهُ أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ : বর্তমান বিধানের ন্যায় ইসলামের প্রথম দিকে এরূপ অনুমতি ছিল না। প্রথম দিকে সিয়ামরত অবস্থায় দিনের মতো রাতের বেলায়ও স্ত্রীদের থেকে পৃথক অবস্থানের নির্দেশ ছিল। মূলত ইসলামি শরিয়ত রাসূলুল্লাহ-এর হায়াতে জমন্বয়ে অবতীর্ণ হয়েছে এবং তাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন হয়েছে যে, প্রথম দিকে সহজ ও কোমল বিধান দেওয়া হয়েছে, পরে ধীরে ধীরে তা কঠোর ও শক্ত করা হয়েছে। যেমন- মদ খাওয়া প্রথমে শুধু অপছন্দনীয় হওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং অগ্রসর হতে

মাযহারীতে উমরের নিষেধ ভাঙা, মুহাম্মদের অসন্তোষ এবং অন্য কয়েকজনের একই কাজ করার স্বীকারোক্তির পরে আয়াত আসার বিবরণও রয়েছে। পরে সহবাসকে বৈধ করার পাশাপাশি সন্তান কামনা, আজল এবং ফজরের রেখার ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। রাতের সহবাসের বৈধতা এই আলোচনায় একটি নির্দিষ্ট ঘটনার পরে চালু হওয়া নতুন ব্যবস্থাই। [335]

করিনি। এরপর তিনি স্ত্রীগমন করলেন। ওদিকে হজরত কা’ব বিন মালেকও এরকম করলেন। সকালে বিষয়টি রসুলে করীম স. এর গোচরীভূত করা হলে এই
আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। বাগবী বলেছেন, ইসলামের প্রথম দিকে এশার নামাজের আগে যদি কেউ শুয়ে পড়তো তবে অবশিষ্ট রাতের জন্য পানাহার ও সহবাস নিষিদ্ধ হয়ে যেতো। হজরত ওমর একদিন এই নিষিদ্ধতা ভেঙে ফেললেন। পরদিন তিনি রসুল আকদাস স. এর নিকট ঘটনাটি জানালেন। তিনি স. বললেন, ওমর। তোমার পক্ষে এমতো আচরণ শোভনীয় হয়নি। তখন আরো কিছুসংখ্যক সাহানী দাঁড়িয়ে স্বীকার করলেন যে, এরকম ঘটনা আমাদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। তখনই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।
এরপরের বাক্যে এমর্মে সাক্ষ্য এসেছে, তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হয়ে তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুতরাং এখন থেকে রাতের যে কোনো অংশে সঙ্গত হওয়া বৈধ।
আল্লাহ্ যা তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন তা কামনা করো- একথার অর্থ, আল্লাহপাক তোমাদের ভাগ্যে যে সন্তান-সন্ততি নির্ধারণ করেছেন,
স্ত্রীসম্ভোগের মাধ্যমে সেই নির্ধারণের অন্বেষী হও। একথার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, সন্তান কামনাই স্ত্রীসম্ভোগের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। ইন্দ্রিয়ের চাহিদা পূরণই যেনো প্রধান উদ্দেশ্য না হয়। রসুলে আকদাস স. এরশাদ করেছেন, তোমরা এমন রমণীকে বিবাহবদ্ধ করো, যে তার স্বামীকে ভালোবাসে এবং অধিক সন্তান প্রসবের যোগ্যা হয়। কেনোনা তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে আমি অন্য নবীদের উম্মতের সংখ্যা অতিক্রম করার গর্ব অনুভব করবো। হজরত মা’কাল বিন
ইয়াসের থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আবু দাউদ ও নাসাঈ। আয়াতের এই
বাক্যটি দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় সহবাসের সময় আজল (স্ত্রী অঙ্গের বাইরে শুক্রপাত করা) মাকরূহ (অনভিপ্রেত)। বাক্যটির মাধ্যমে একথাও বোঝা যায় যে, যথাঅঙ্গের মাধ্যমে সম্ভোগ তৃষ্ণা চরিতার্থ করা মোবাহ্ (বৈধ)। বাগবী বলেছেন, হজরত মুআজ বিন জাবালের মতে ‘মা কাতাবাল্লাহু লাকুম’ বাক্যটির মর্ম লাইলাতুল কদর। আমি বলি, বাক্যটির বাকভঙ্গিমা অভিমতটিকে সমর্থন করে না। ‘আর তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ রাত্রির কৃষ্ণরেখা হইতে উষার শুভ্ররেখা
স্পষ্টরূপে তোমাদের নিকট প্রতিভাত না হয়’- এই বাক্যে উল্লেখিত ‘খাইতে আইয়াদ’ অর্থ দিবসের আলো এবং ‘খাইতি আসওয়াদ’ অর্থ রাত্রির কৃষ্ণতা। ফজরের সূচনায় পুবের আকাশে উত্তর দক্ষিণে প্রলম্বিত দীর্ঘ একটি রেখা পরিদৃষ্ট হয়। ওই রেখাকে নির্দেশ করতেই এখানে ‘খাইত’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। ‘খাইতিল আবইয়াদ’ ফজর (দিন) হলে ‘খাইতিল আসওয়াদ’ অর্থ রাত্রি হওয়া অবশ্যম্ভাবী হয়। ‘মিনাল ফাজরি’ বাক্যাংশটির মিন অব্যয়টি আংশিক অবস্থাকে প্রকাশ করে। আর ‘খাইতিল আবইয়াদ’ ফজরের অবস্থা প্রকাশক। এখানে ফজর অর্থ ফজরের কিয়দাংশ। ফজর প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত- এরকম কথা এখানে বলা

কোরআন সংকলন 46

ইবনে কাসিরের বাংলা অনুবাদে আগের নিষেধের সূচনাবিন্দু হিসেবে ঈশার নামাজ এবং ঘুম—দুটি ধরনের বিবরণ সংরক্ষিত। কোনো বর্ণনায় উমর নিজে ঘুমিয়ে ওঠার পরে সহবাস করেন; আরেকটিতে স্ত্রী ঘুমিয়েছেন বলে জানালে তিনি সেটিকে অজুহাত মনে করেন। দুই ক্ষেত্রেই নিষেধ অমান্য করার অভিযোগ, মুহাম্মদের কাছে বিষয়টি জানানো এবং পরে ছাড়ের আয়াত আসার সম্পর্ক আছে। [336]

عَلِمُ اللَّهُ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَخْتُنُونَ أَنْفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنْكُمْ তা’আলা অবগত আছেন যে, তোমরা নিজেদের ব্যাপারে খিয়ানত করিতেছিলে। অনন্তর তিনি তোমাদের তাওবা কবুল করিয়াছেন এবং তোমাদিগকে ক্ষমা করিয়াছেন।
হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে আলী ইন্ন তালহা বর্ণনা করেন: রমযান মাসে মুসলমানগণ যখন ইশার নামায সম্পন্ন করিত, তাহার পর হইতে পরবর্তী মাগরিব পর্যন্ত তাহাদের জন্য পানাহার ও স্ত্রীসংগম হারাম হইয়া যাইত। তথাপি তাহাদের কাহারও কাহারও ক্ষেত্রে রমযান মাসে উহার ব্যতিক্রম কার্য ঘটিয়া যায়। তাহাদের ভিতর হযরত উমর (রা)-ও ছিলেন। ফলে একদল লোক নবী করীম (সা)-এর দরবারে এই অভিযোগ উত্থাপন করে। তখন আল্লাহ তা’আলা অবকাশ দানের এই আয়াত নাযিল করেন।
হযরত আওফা মূসা ইব্‌ন্ন উকবা হইতে, তিনি কুরায়েব হইতে ও তিনি ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন:
মুসলমানগণ সিয়ামের এই আয়াত নাযিল হওয়ার আগে রাত্রিকালে পানাহার ও স্ত্রীগমন করিত। কিন্তু যখন ঘুমাইয়া পড়িত, তখন হইতে পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত তাহারা পানাহার ও স্ত্রী সহবাস করিত না। এতদসত্ত্বেও একদিন আমাদের নিকট সংবাদ পৌঁছিল যে, উমর ইবন খাত্তাব ঘুম হইতে জাগিয়া স্ত্রীগমন করিয়াছেন। ইত্যবসরে তিনি নবী করীম (সা)-এর দরবারে হাযির হইয়া আরয করিলেন- ‘আমি আমার কৃতকার্যের বিরুদ্ধে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের নিকট অভিযোগ করিতে আসিয়াছি।’ রাসূল (সা) প্রশ্ন করিলেন-তুমি কি করিয়াছ? তিনি জবাব দিলেন-‘আমি রোযা রাখার ইচ্ছা পোষণ করিয়াও ঘুম হইতে জাগিয়া স্ত্রীগমন করিয়াছি।’ রাসূল (সা) বলিলেন- ইহা তোমার জন্য শোভনীয় কাজ হয় নাই। অতঃপর আলোচ্য আয়াত নাযিল হয়।’
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে পর্যায়ক্রমে আতা ইব্‌ন্ন রুবাহ, কয়েস ইবন সা’দ ও সাঈদ ইব্‌ন আবূ উরওয়া বর্ণনা করেন:
এই আয়াত নাযিল হওয়ার আগে রমযানে মুসলমানগণ ইশার নামায শেষ করার পর নিদ্রা গেলে পরবর্তী সন্ধ্যা পর্যন্ত তাহাদের জন্য পানাহার ও স্ত্রী সংগম হারাম হইয়া যাইত। অতঃপর উমর ইব্‌ন খাত্তাব ইশার নামাযের পর স্ত্রী সংগম করেন এবং সুরাকা ইন্ন কয়েস আনসারী মাগরিবের নামাযের পর নিদ্রা কাতর হইয়া ঘুমাইয়া পড়েন এবং রাসূল (সা)-এর ইশার নামায পড়ানোর পূর্ব পর্যন্ত নিদ্রামগ্ন থাকেন। অতঃপর ইশার নামায পড়িয়া তিনি পানাহার করেন। পর দিন সকালে আসিয়া তাহারা রাসূল (সা)-এর খিদমতে এই সকল অবস্থা ব্যক্ত করেন। তখনই নাযিল হইল :
أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصَّيَامِ الرَّفَثُ إِلَى نِسَائِكُمْ …… ثُمَّ أَتِمُوا الصَّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ বস্তুত ইহা আল্লাহ তা’আলার বিরাট করুণা ও অনুগ্রহ বৈ নহে।
আবদুর রহমান ইব্‌ন আবু লায়লা হইতে যথাক্রমে হেসীন ইব্‌ন আবদুর রহমান ও হিশাম বর্ণনা করেন:
“একদিন উমর ইবন খাত্তাব (রা) দাঁড়াইয়া আরয করিলেন ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! বিগত রাত্রিতে আমি আমার স্ত্রীর কাছে সেই অভিলাষ ব্যক্ত করিয়াছিলাম, যাহা একটি পুরুষ নারীর

ইবনে কাসিরে উদ্ধৃত পরবর্তী বিবরণে স্ত্রীর ঘুমিয়ে পড়ার বক্তব্য উমর বিশ্বাস করেননি এবং সহবাস করেন। কাব ইবনে মালেকের একই রকম আচরণের কথাও রয়েছে। পরদিন বিষয়টি মুহাম্মদকে জানানো এবং তার পরে ক্ষমা ও অনুমতির আয়াত প্রকাশের কথা বলা হয়েছে। বিধানের প্রয়োগে ঘরের ভেতরের ঘটনা, স্বামী-স্ত্রীর বক্তব্য এবং ব্যক্তির নিজের স্বীকারোক্তি সরাসরি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। [336]

কাছে করিয়া থাকে। আমার স্ত্রী জানাইল, সে নিদ্রা গিয়াছিল। আমি উহাকে তাহার বাহানা ভাবিয়া তাহার সহিত সহবাস করিয়াছি।’ তখনই তাহার উপলক্ষে এই আয়াত নাযিল হইলঃ ثُمَّ أَتَمُّوا الصَّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ …. ইব্‌ন আবু লায়লা হইতে শু’বা ও আমর ইব্‌ন শু’বা পর্যায়ক্রমে অনুরূপ বর্ণনা প্রদান করেন। কা’ব ইব্‌ন আবদুল মালেক হইতে পর্যায়ক্রমে আবদুল্লাহ ইব্‌ন কা’ব বনু সালমার গোলাম মূসা ইব্‌ন্ন জুবায়ের, আবু লাহীআ, ইবনুল মুবারক সুয়ায়েদ, মুছান্না ও আবূ জা’ফর ইব্‌ন জারীর বর্ণনা করেন:
“রমযান মাসে লোকদের অবস্থা এই ছিল যে, যদি কেহ রোযা রাখিয়া রাত্রে ঘুমাইয়া পড়িত তাহা হইলে উহার পর হইতে তাহার জন্য পরবর্তী ইফতার পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস হারাম হইত। এক রাত্রে উমর ইবন খাত্তাব রাসূলুল্লাহর (সা) দরবার হইতে দেরীতে ঘরে ফিরেন। তখন তাহার স্ত্রী ঘুমাইতেছিলেন। তিনি তাহার কাছে কামনা চরিতার্থের অভিলাষ ব্যক্ত করিলে তাহার স্ত্রী বলিলেন, আমি তো নিদ্রা গিয়াছিলাম। তিনি উহা অবিশ্বাস করিলেন এবং তাহার সহিত সহবাস করিলেন। কা’ব ইব্‌ন মালেক বলেন-প্রত্যূষেই উমর ইবন খাত্তাব রাসূল (সা)-এর খিদমতে হাযির হন এবং তাঁহাকে এই অবস্থা বর্ণনা করেন। তখন আল্লাহ তা’আলা علِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَخْتَانُونَ أَنْفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنْكُمْ فَالْآنَ بَاشِرُوهُنَّ অর্থাৎ তোমরা যে নিজ ব্যাপারে খিয়ানত করিতেছিলে, তাহা আল্লাহ তা’আলা জানিয়াছেন। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তোমাদের তাওবা কবুল করিয়াছিলেন তাই এখন হইতে তোমরা স্ত্রীগমন কর।
অনুরূপভাবে মুজাহিদ, আতা, ইকরামা, কাতাদাহ প্রমুখ হযরত উমর (রা) ও সুরাকা ইব্‌ন কয়েস আনসারীর ঘটনাকে এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হিসাবে বর্ণনা করিয়াছেন। অতঃপর আল্লাহর রহম, অনুগ্রহ ও ভালবাসা স্বরূপ রমযানের সারা রাত্র স্ত্রী সহবাস করা, আহার করা ও পান করাকে আল্লাহ তা’আলা মুবাহ করিয়া দিয়াছেন।
وَابْتَغُوا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ উহা অন্বেষণ কর) আয়াতাংশের ব্যাখ্যা প্রসংগে আবূ হুরায়রা, ইব্‌ন আব্বাস, আনাস, কাজী শুরাইহ, মুজাহিদ, ইকরামা, সাঈদ ইন্ন জুবায়র, আতা, রবী ইব্‌ন আনাস, সুদ্দী, যায়দ ইব্‌ন আসলাম, হাকাম ইব্‌ন উতবা, মাকাতিল ইব্‌ন হাইয়ান, হাসান বসরী, যিহাক, ও কাতাদাহ (র) প্রমুখ সাহাবা ও তাবেঈন বলেনঃ ইহার অর্থ ‘সন্তান’।
আবদুর রহমান ইবন যায়দ ইবক্স আসলাম وَابْتَغُوا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ এর অর্থ ‘সহবাস’ করিয়াছেন। উমর ইবন মালেক আল বুকরী আবূ জাওযা হইতে ও তিনি হযরত ইব্‌ন আব্বাস )রা) হইতে وَأَبْتَغُوا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ এর অর্থ লাইলাতুল কদর করিয়াছেন। ইব্‌ন আবি হাতিম ও ইব্‌ন জারীরও অনুরূপ রিওয়ায়েত করিয়াছেন।
আবদুর রাযযাক বলেনঃ মুআম্মার আমাকে সংবাদ দান করিয়াছেন যে, কাতাদাহ وَابْتَغُوا الرُّحْصَةُ الَّتِي كَتَبَ اللهُ لَكُمْ يَقُولُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ তোমরা সেই অবকাশের অনুসন্ধান কর যাহা তোমাদের জন্য লিখিত হইয়া গেল। কেহ বলিয়াছেনঃ “যাহা কিছু তোমাদের জন্য হালাল করা হইয়াছে উহার অনুসন্ধান কর।”

কোরআন সংকলন 48
কোরআন সংকলন 50

আরবি তাফসিরেও উমরের নামসহ নিষেধ লঙ্ঘনের বক্তব্য রয়েছে। ইবনে আব্বাসের নামে উদ্ধৃত বিবরণে ঈশার পরে স্ত্রীসহবাস ও খাবার গ্রহণ করা কয়েকজন মুসলিমের অভিযোগের পরেই সংশ্লিষ্ট আয়াত নাজিলের কথা বলা হয়েছে। ইবনে কাসিরের আরবি পাঠে উমরের নাম এবং বিধান লঙ্ঘনের পরে আয়াত নাজিলের ক্রম একসঙ্গে সংরক্ষিত। [337]

ثُمَّ إِنَّ أُنَاسًا مِنَ الْمُسْلِمِينَ أَصَابُوا مِنَ النِّسَاءِ وَالطَّعَامِ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ بَعْدَ الْعِشَاءِ ، مِنْهُمْ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ ، فَشَكَوْا ذَلِكَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ، فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى : ( عَلِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَخْتَانُونَ أَنْفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنْكُمْ فَالْآنَ بَاشِرُوهُنَّ )

বাংলা অনুবাদ: এরপর কিছু মুসলিম রমজান মাসে ঈশার পরে স্ত্রীদের সঙ্গে মিলিত হন ও খাবার গ্রহণ করেন; তাঁদের মধ্যে উমর ইবনে খাত্তাবও ছিলেন। তাঁরা বিষয়টি আল্লাহর রাসূলের কাছে জানালে আল্লাহ নাজিল করেন: আল্লাহ জানতেন তোমরা নিজেদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছিলে; তিনি তোমাদের তওবা গ্রহণ ও ক্ষমা করেছেন; এখন তোমরা তাদের সঙ্গে মিলিত হও।

বুখারির সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় রমজানজুড়ে নারীদের কাছে না যাওয়া এবং কিছু পুরুষের নিজেদের সঙ্গে খিয়ানত করার পর আয়াত নাজিলের কথা এসেছে। আগের নিষেধের ব্যাপ্তি সম্পর্কে এই ভাষা তাফসিরের ঘুম বা ঈশা-পরবর্তী বিবরণ থেকে আলাদা। সংক্ষিপ্ত হাদিস এবং বিস্তৃত তাফসির উভয় ক্ষেত্রেই নিষেধ, তা অমান্য করা এবং পরে ক্ষমার ঘোষণার ক্রম রয়েছে। [338]

لَمَّا نَزَلَ صَوْمُ رَمَضَانَ كَانُوا لاَ يَقْرَبُونَ النِّسَاءَ رَمَضَانَ كُلَّهُ، وَكَانَ رِجَالٌ يَخُونُونَ أَنْفُسَهُمْ، فَأَنْزَلَ اللَّهُ ‏{‏عَلِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَخْتَانُونَ أَنْفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنْكُمْ‏}‏

বাংলা অনুবাদ: রমজানের রোজা নাজিল হলে তাঁরা পুরো রমজান নারীদের কাছে যেতেন না। কিছু পুরুষ নিজেদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছিল। তখন আল্লাহ নাজিল করেন: আল্লাহ জানতেন তোমরা নিজেদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছিলে; তিনি তোমাদের তওবা গ্রহণ ও ক্ষমা করেছেন।

পানাহারের দিকটির বাস্তব মূল্য বুখারির কায়েস ইবনে সিরমার ঘটনায় স্পষ্ট। সারা দিন শ্রমের পরে তিনি খাবারের অপেক্ষায় ঘুমিয়ে পড়েন। আগের নিয়ম অনুযায়ী তখন তাঁর পরের সন্ধ্যা পর্যন্ত না খেয়ে থাকার কথা। পরদিন দুপুরে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। ঘটনাটি মুহাম্মদের কাছে পৌঁছানোর পরে রাতের অনুমতির আয়াত আসে এবং লোকেরা অত্যন্ত আনন্দিত হন। ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে মানুষের শরীরের সংঘাত মূল বর্ণনার ঘটনাক্রমেই সংরক্ষিত। [339]

كَانَ أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم إِذَا كَانَ الرَّجُلُ صَائِمًا، فَحَضَرَ الإِفْطَارُ، فَنَامَ قَبْلَ أَنْ يُفْطِرَ لَمْ يَأْكُلْ لَيْلَتَهُ وَلاَ يَوْمَهُ، حَتَّى يُمْسِيَ، وَإِنَّ قَيْسَ بْنَ صِرْمَةَ الأَنْصَارِيَّ كَانَ صَائِمًا، فَلَمَّا حَضَرَ الإِفْطَارُ أَتَى امْرَأَتَهُ، فَقَالَ لَهَا أَعِنْدَكِ طَعَامٌ قَالَتْ لاَ وَلَكِنْ أَنْطَلِقُ، فَأَطْلُبُ لَكَ. وَكَانَ يَوْمَهُ يَعْمَلُ، فَغَلَبَتْهُ عَيْنَاهُ، فَجَاءَتْهُ امْرَأَتُهُ، فَلَمَّا رَأَتْهُ قَالَتْ خَيْبَةً لَكَ. فَلَمَّا انْتَصَفَ النَّهَارُ غُشِيَ عَلَيْهِ، فَذُكِرَ ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَنَزَلَتْ هَذِهِ الآيَةُ {أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَى نِسَائِكُمْ} فَفَرِحُوا بِهَا فَرَحًا شَدِيدًا، وَنَزَلَتْ {وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الأَسْوَدِ}.

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদের সঙ্গীদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি রোজা রাখলে ইফতারের সময় এসে যাওয়ার পর খাওয়ার আগে ঘুমিয়ে পড়লে সেই রাত ও পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত খেতেন না। কায়েস ইবনে সিরমা আনসারি রোজা রেখেছিলেন। ইফতারের সময় স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে খাবার আছে? তিনি বললেন, নেই; তবে আমি তোমার জন্য খুঁজতে যাচ্ছি। তিনি সারা দিন কাজ করেছিলেন, তাই ঘুমে তাঁর চোখ বুজে এল। স্ত্রী ফিরে এসে তাঁকে দেখে বললেন, তোমার দুর্ভাগ্য! পরদিন দুপুর হলে তিনি অচেতন হয়ে পড়লেন। বিষয়টি নবীকে জানানো হলে আয়াত নাজিল হলো: “রোজার রাতে তোমাদের স্ত্রীদের সঙ্গে সহবাস তোমাদের জন্য বৈধ করা হলো।” তাঁরা এতে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। আরও নাজিল হলো: “কালো রেখা থেকে সাদা রেখা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত খাও ও পান করো।”

বিবরণআগের নিয়ম বা আচরণপরের পরিবর্তন
বুখারি ১৯১৫ইফতারের আগে ঘুমালে পরের সন্ধ্যা পর্যন্ত না খাওয়া; শ্রমজীবীর অচেতন হওয়ারাতে খাওয়াপানার নতুন সুযোগে আনন্দ
বুখারি ৪৫০৮রমজানে সহবাসে বিরতি; কয়েকজনের খিয়ানতক্ষমা ও অনুমতির আয়াত
ইবনে কাসিরের উদ্ধৃত বিবরণঈশা বা ঘুমের পরে সহবাস ও পানাহারের নিষেধ অমান্য; উমরের নাম উল্লেখঅভিযোগের পরে সারা রাত ছাড়
বাকারা ২:১৮৭অতীতের খিয়ানত ও ক্ষমা“এখন” সহবাস এবং ফজর পর্যন্ত পানাহারের অনুমতি

মানুষের স্বাভাবিক চাহিদাকে নিষিদ্ধ করা, মানুষ সেই নিয়ম মানতে ব্যর্থ হওয়া এবং পরে নিষেধের পরিসর কমিয়ে দেওয়া—এটি সংশোধিত আইন প্রণয়নের পরিচিত কাঠামো। আগের নির্দেশের কার্যকারিতা বাস্তবে পরীক্ষা হয়েছে মানুষের শরীর ও সংসারের ওপর। একজন শ্রমজীবীর ক্ষুধায় অচেতন হওয়া এবং অন্যদের সহবাসের নিষেধ ভাঙা প্রকাশ্যে আসার পরে নিয়ম বদলেছে। মানুষের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সর্বজ্ঞ সত্তার নতুন করে জানার কিছু থাকার কথা নয়। তা সত্ত্বেও বিধান সংশোধনের প্রকাশ্য উপলক্ষ হিসেবে মানুষের ভোগান্তি ও লঙ্ঘনই সংরক্ষিত হয়েছে।

উমরের আচরণে আরও নির্দিষ্ট একটি অসংগতি রয়েছে। অন্য প্রসঙ্গে কঠোর ধর্মীয় আনুগত্য দাবি করা এই ব্যক্তির নিজের যৌন আকাঙ্ক্ষা পুরোনো নিষেধের মুখে থামেনি। তাঁর বক্তব্য জানানোর পরে নিষেধ বহাল রেখে শুধু ব্যক্তিকে ক্ষমা করার বিবরণে ঘটনাটি শেষ হয়নি; নিয়মই বদলেছে। ব্যক্তির আচরণ আইনের অনুসারী হওয়ার বদলে আইন ব্যক্তির আচরণকে গ্রহণ করার উপযোগী হয়েছে। তাফসিরে একাধিক ব্যক্তির একই আচরণের উল্লেখ এই পরিবর্তনের সামাজিক চাপও প্রকাশ করে।

স্ত্রীর ঘুমিয়ে পড়ার বক্তব্যকে অজুহাত ভাবার বর্ণনায় নিয়ন্ত্রণের আরেকটি স্তর আছে। স্ত্রী যে কারণে আগের বিধানের বাধা উল্লেখ করছেন, স্বামী নিজের ইচ্ছার অনুকূলে সেই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করছেন। পরের অনুমতি স্বামীর ইতিমধ্যে করে ফেলা কাজের সঙ্গে মিলে যায়। ঘুম, আকাঙ্ক্ষা, সন্দেহ এবং ধর্মীয় নিয়মের এই সংঘাতের মধ্যে নারীর বক্তব্য স্বামীর বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নতুন অনুমতিতে আগের কাজ খিয়ানত হিসেবে স্বীকৃত থেকেও ভবিষ্যতের জন্য একই কাজের বৈধ সময় বিস্তৃত হয়েছে।

এই পরিবর্তনকে তাফসিরে রহমত, অবকাশ ও অনুগ্রহ বলা হয়েছে। সেই ধর্মীয় মূল্যায়নের বিষয়ই হলো আগের বিধান বদলে মানুষের জন্য সুযোগ বাড়ানো। “এখন” শব্দটি বাদ দিয়ে শুধু চূড়ান্ত অনুমতি তুলে ধরলে আগের নিষেধ ও সংশোধনের ইতিহাস অদৃশ্য হয়ে যায়। আয়াতটি সেই ইতিহাস বহন করছে: মানুষের কাজ আগে, অভিযোগ ও ভোগান্তির বিবরণ তার সঙ্গে, তারপর ক্ষমা এবং নতুন নির্দেশ। বিধানদাতার অপরিবর্তিত জ্ঞানের দাবির পাশে পরিবর্তিত আদেশের এই মানবীয় উপলক্ষ সরাসরি দাঁড়িয়ে আছে।


ইবনে উবাইয়ের জানাজা: মুহাম্মদের সিদ্ধান্ত, উমরের আপত্তি ও পরবর্তী নিষেধাজ্ঞা

আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের জানাজায় মুহাম্মদ ও উমরের অবস্থান এক ছিল না। মুহাম্মদ তাঁর জানাজা পড়াতে দাঁড়ান, উমর আপত্তি করেন এবং তাঁর কাপড় ধরে বাধা দেন। মুহাম্মদ আগের আয়াতকে নিজের জন্য নির্বাচন করার সুযোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন এবং জানাজা পড়ান। পরে জানাজা ও কবরের পাশে দাঁড়ানোর বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আসে। নবীর সিদ্ধান্ত, সাহাবির সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং তার পরের আয়াতে সাহাবির অবস্থানের সঙ্গে মিল—ঘটনাটির এই ক্রম বুখারিতেই সংরক্ষিত। ধর্মীয় নির্দেশের প্রয়োগ এখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই সম্পূর্ণ নিষ্পন্ন বিষয় হিসেবে উপস্থিত হয়নি; মানুষের বিরোধ ও কার্যকর সিদ্ধান্তের পরে নতুন সীমা ঘোষিত হয়েছে।

বুখারি ৪৬৭০-এর আরবি বর্ণনাকারী ইবনে উমর। ইবনে উবাইয়ের ছেলে পিতার কাফনের জন্য মুহাম্মদের জামা চান এবং পরে তাঁর জানাজা পড়ানোর অনুরোধ করেন। মুহাম্মদ উভয় অনুরোধে সাড়া দেন। উমর কাপড় ধরে প্রশ্ন করেন, প্রভু নিষেধ করা সত্ত্বেও তিনি কেন জানাজা পড়াচ্ছেন। জবাবে মুহাম্মদ আগের আয়াতকে নির্বাচন করার সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। উমরের আপত্তি সত্ত্বেও জানাজা পড়ানো এবং তারপর নিষেধের আয়াত নাজিলের কথা আছে। [340]

لَمَّا تُوُفِّيَ عَبْدُ اللَّهِ جَاءَ ابْنُهُ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَسَأَلَهُ أَنْ يُعْطِيَهُ قَمِيصَهُ يُكَفِّنُ فِيهِ أَبَاهُ فَأَعْطَاهُ، ثُمَّ سَأَلَهُ أَنْ يُصَلِّيَ عَلَيْهِ، فَقَامَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لِيُصَلِّيَ فَقَامَ عُمَرُ فَأَخَذَ بِثَوْبِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ تُصَلِّي عَلَيْهِ وَقَدْ نَهَاكَ رَبُّكَ أَنْ تُصَلِّيَ عَلَيْهِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِنَّمَا خَيَّرَنِي اللَّهُ فَقَالَ {اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لاَ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِنْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً} وَسَأَزِيدُهُ عَلَى السَّبْعِينَ. قَالَ إِنَّهُ مُنَافِقٌ. قَالَ فَصَلَّى عَلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَنْزَلَ اللَّهُ {وَلاَ تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَدًا وَلاَ تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ}.

বাংলা অনুবাদ: আবদুল্লাহ মারা গেলে তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ রাসুলের কাছে এসে পিতাকে কাফন দেওয়ার জন্য তাঁর জামা চাইলেন। তিনি তা দিলেন। এরপর ছেলে তাঁর জানাজা পড়ানোর অনুরোধ করলেন। রাসুল জানাজা পড়াতে দাঁড়ালে উমর উঠে তাঁর কাপড় ধরলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার প্রভু নিষেধ করেছেন, তবু আপনি তাঁর জানাজা পড়াবেন? রাসুল বললেন, আল্লাহ আমাকে নির্বাচন করার সুযোগ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন: “তাদের জন্য ক্ষমা চাও অথবা ক্ষমা না চাও; তাদের জন্য সত্তরবার ক্ষমা চাইলেও…” আমি সত্তরের বেশিবার চাইব। উমর বললেন, সে মুনাফিক। বর্ণনাকারী বলেন: রাসুল তাঁর জানাজা পড়ালেন। এরপর আল্লাহ নাজিল করলেন: “তাদের কেউ মারা গেলে কখনো তার জানাজা পড়বে না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবে না।”

কাপড় ধরে বাধা দেওয়ার মধ্যে উমরের আপত্তির বাস্তব রূপ আছে। তিনি নিজের মত জানিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকেননি; নবীর শুরু করা কাজে শরীরী হস্তক্ষেপ করেছেন। মুহাম্মদের জবাবও নির্দিষ্ট: আল্লাহ তাঁকে সুযোগ দিয়েছেন এবং তিনি সেই সুযোগ প্রয়োগ করছেন। একই ধর্মীয় বক্তব্যের অর্থ নিয়ে দুজনের বিপরীত সিদ্ধান্ত তৈরি হয়েছে। একজন সেটিকে বাধা হিসেবে প্রয়োগ করছেন, অন্যজন সেটির ভেতরেই জানাজা পড়ানোর অবকাশ খুঁজছেন। ধর্মীয় বিধানের কার্যকারিতা এই মতবিরোধের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হচ্ছে।

তাওবার ৮০ নম্বর আয়াতের পূর্ণ ভাষায় ক্ষমা চাওয়া বা না-চাওয়া এবং সত্তরবার চাইলেও ক্ষমা না করার কথা রয়েছে। সেখানে অস্বীকৃতির কারণ হিসেবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি অবিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে। ক্ষমার ফলাফল সম্পর্কে এই বক্তব্যের সঙ্গে হাদিসে মুহাম্মদের সুযোগ পাওয়ার ব্যাখ্যা পাশাপাশি অবস্থান করছে। গ্রন্থের বাক্য এবং সেই গ্রন্থের ঘোষণাকারীর বর্ণিত প্রয়োগের মধ্যে ব্যাখ্যার টানাপোড়েন সরাসরি দেখা যায়। [341]

اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِن تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ۗ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ

বাংলা অনুবাদ: তাদের জন্য ক্ষমা চাও অথবা ক্ষমা না চাও; তুমি তাদের জন্য সত্তরবার ক্ষমা চাইলেও আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন না। কারণ তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অস্বীকার করেছে। আল্লাহ অবাধ্য সম্প্রদায়কে পথ দেখান না।

সত্তরবার বললে একাত্তরবারে ক্ষমা মিলবেই—এমন সিদ্ধান্ত সংখ্যাটির উল্লেখ থেকে অনুসরণ করে না। আয়াতের পরের বাক্য ক্ষমা না করার কারণ হিসেবে ব্যক্তিদের অবিশ্বাসের কথা বলে। ফলে বারসংখ্যা বাড়ানোর ভাবনার সঙ্গে ঘোষিত কারণের অসংগতি থাকে। ইবনে কাসির একটি ব্যাখ্যা হিসেবে লিখেছেন, আরবিতে সত্তর ব্যবহারের উদ্দেশ্য অতিশয়তা; তার বেশি হলে ফল উল্টে যাবে এমন সীমারেখা বোঝানো হয় না। সংখ্যাটিকে সরাসরি হিসাবের সীমা করা এবং ভাষার অতিশয়তা হিসেবে পড়ার মধ্যে পার্থক্যটি তাফসিরেও স্বীকৃত। [342]

وقد قيل : إن السبعين إنما ذكرت حسما لمادة الاستغفار لهم ؛ لأن العرب في أساليب كلامها تذكر السبعين في مبالغة كلامها ، ولا تريد التحديد بها ، ولا أن يكون ما زاد عليها بخلافها.

বাংলা অনুবাদ: একটি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: তাদের জন্য ক্ষমা চাওয়ার পথ বন্ধ করতেই সত্তরের উল্লেখ; কারণ আরবরা তাদের ভাষার রীতিতে অতিশয়তা বোঝাতে সত্তর বলে। তা দিয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যাসীমা বোঝায় না, কিংবা তার বেশি হলে বিপরীত ফল হবে—এমনও বোঝায় না।

উমরের নিজের নামে বুখারি ৪৬৭১-এর বর্ণনায় তাঁর আপত্তির ভাষা আরও বিস্তারিত। তিনি ইবনে উবাইয়ের অতীতের বক্তব্যগুলো গুনে গুনে মুহাম্মদের সামনে আনেন। মুহাম্মদ হাসেন এবং তাঁকে সরে যেতে বলেন। উমর বেশি বলতে থাকলে তিনি নিজের নির্বাচন করার সুযোগের কথা পুনরায় জানান। এখানে মুহাম্মদের উত্তর শর্তযুক্ত: সত্তরের বেশি চাইলে ক্ষমা হবে বলে জানলে তিনি আরও চাইতেন। এখানে আরও ক্ষমা চাওয়ার ইচ্ছাটি ক্ষমা পাওয়ার নিশ্চয়তা জানার শর্তের সঙ্গে যুক্ত। [343]

لَمَّا مَاتَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أُبَىٍّ ابْنُ سَلُولَ دُعِيَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لِيُصَلِّيَ عَلَيْهِ فَلَمَّا قَامَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَثَبْتُ إِلَيْهِ، فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَتُصَلِّي عَلَى ابْنِ أُبَىٍّ وَقَدْ قَالَ يَوْمَ كَذَا كَذَا وَكَذَا قَالَ أُعَدِّدُ عَلَيْهِ قَوْلَهُ، فَتَبَسَّمَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَقَالَ أَخِّرْ عَنِّي يَا عُمَرُ. فَلَمَّا أَكْثَرْتُ عَلَيْهِ قَالَ إِنِّي خُيِّرْتُ فَاخْتَرْتُ، لَوْ أَعْلَمُ أَنِّي إِنْ زِدْتُ عَلَى السَّبْعِينَ يُغْفَرْ لَهُ لَزِدْتُ عَلَيْهَا. قَالَ فَصَلَّى عَلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ثُمَّ انْصَرَفَ فَلَمْ يَمْكُثْ إِلاَّ يَسِيرًا حَتَّى نَزَلَتِ الآيَتَانِ مِنْ بَرَاءَةَ {وَلاَ تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَدًا} إِلَى قَوْلِهِ {وَهُمْ فَاسِقُونَ} قَالَ فَعَجِبْتُ بَعْدُ مِنْ جُرْأَتِي عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَاللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ.

বাংলা অনুবাদ: আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল মারা গেলে তাঁর জানাজা পড়ানোর জন্য রাসুলকে ডাকা হলো। রাসুল দাঁড়ালে আমি তাঁর দিকে এগিয়ে গিয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি ইবনে উবাইয়ের জানাজা পড়াবেন, অথচ সে অমুক দিনে অমুক অমুক কথা বলেছে? আমি তার কথাগুলো গুনে বলতে লাগলাম। রাসুল হেসে বললেন, উমর, আমার কাছ থেকে সরে যাও। আমি বেশি বলতে থাকলে তিনি বললেন, আমাকে নির্বাচন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, আমি নির্বাচন করেছি। সত্তরের বেশি ক্ষমা চাইলে তাকে ক্ষমা করা হবে বলে জানলে আমি তার বেশি চাইতাম। এরপর রাসুল তাঁর জানাজা পড়িয়ে চলে গেলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই বারাআতের দুটি আয়াত নাজিল হলো: “তাদের কেউ মারা গেলে কখনো তার জানাজা পড়বে না”—থেকে—“আর তারা অবাধ্য অবস্থায় মারা গেছে” পর্যন্ত। উমর বলেন: পরে রাসুলের সামনে নিজের সাহসিকতা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অধিক জানেন।

বর্ণনার ধাপমুহাম্মদের অবস্থানউমরের অবস্থান বা পরের পরিবর্তন
জানাজার অনুরোধজামা দেন ও জানাজা পড়াতে দাঁড়ানকাপড় ধরে বাধা ও মৃতের অতীত বক্তব্য স্মরণ করানো
আগের আয়াতের প্রয়োগ“আমাকে নির্বাচন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে”জানাজা না পড়ানোর দাবি
কার্যকর সিদ্ধান্তআপত্তির পরে জানাজা পড়ানপ্রাথমিক আপত্তি সেই সময়ে কার্যকর হয়নি
পরের ঘোষণাজানাজা ও কবরের পাশে দাঁড়ানোয় নিষেধআগের আপত্তির সঙ্গে নিষেধের মিল
উমরের স্মৃতিবিবরণঘটনার সময় হাসা ও সরে যেতে বলাপরে নিজের দুঃসাহস দেখে বিস্ময়ের কথা

“আমি নির্বাচন করেছি”—এই ঘোষণা সিদ্ধান্তের দায় ও কর্তৃত্ব মুহাম্মদের নিজের হাতে রাখে। উমরের আপত্তি উপেক্ষা করে কাজটি সম্পন্ন করার ক্ষমতাও তাঁর ছিল। কিন্তু তার পরে ঘোষিত আয়াতে ভবিষ্যতের জন্য একই ধরনের কাজের ওপর নিষেধ বসেছে। যে সিদ্ধান্ত তিনি ধর্মীয় অবকাশ প্রয়োগ করে নিলেন, পরে সেই অবকাশ সংকুচিত হয়ে গেল। মানুষের বিরোধের আগে থেকেই সকলের কাছে স্পষ্ট একটি অপরিবর্তিত নির্দেশ কাজ করছে—এমন ছবি এই বর্ণনা দেয় না; এখানে প্রকাশিত ঘটনাক্রমেই নতুন নিষেধের আগমন আছে।

তাওবার ৮৪ নম্বর আয়াতে শুধু ক্ষমা চাওয়ার ফল সম্পর্কে মন্তব্য নেই। জানাজা পড়া এবং কবরের পাশে দাঁড়ানো—দুটি প্রকাশ্য ধর্মীয় আচরণে নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এর সামাজিক ফল হলো, মৃত ব্যক্তিকে কোন ধর্মীয় পরিচয়ে গণ্য করা হবে এবং তাঁর মৃত্যুতে নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ থাকবে কি না, সেই সীমানা নির্ধারণ। বিরোধের বিষয়টি ব্যক্তিগত অপছন্দ থেকে সরে একটি গোষ্ঠীর জন্য সাধারণ আচরণবিধিতে পরিণত হয়েছে। [344]

وَلَا تُصَلِّ عَلَىٰ أَحَدٍ مِّنْهُم مَّاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَىٰ قَبْرِهِ ۖ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَمَاتُوا وَهُمْ فَاسِقُونَ

বাংলা অনুবাদ: তাদের কেউ মারা গেলে কখনো তার জানাজা পড়বে না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবে না। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অস্বীকার করেছে এবং অবাধ্য অবস্থায় মারা গেছে।

ইবনে কাসির এই নিষেধকে জানা মুনাফিকদের ক্ষেত্রে সাধারণ বিধান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যদিও অবতরণের উপলক্ষ ইবনে উবাইয়ের ঘটনা। অর্থাৎ একজন মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে বিরোধ থেকে যে ঘোষণা আসে, ভাষ্যকারের কাছে সেটি পরবর্তী বহু মৃত্যুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নীতি। নির্দিষ্ট ঘটনার পরে ঘোষিত বক্তব্য শাশ্বত ধর্মীয় নিয়মের পরিসর লাভ করছে। একটি সামাজিক ঘটনার প্রতিক্রিয়া কীভাবে সাধারণ বিধান হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে, সেই প্রক্রিয়া তাফসিরের ভাষাতেই আছে। [345]

أمر الله تعالى رسوله – صلى الله عليه وسلم – أن يبرأ من المنافقين ، وألا يصلي على أحد منهم إذا مات ، وألا يقوم على قبره ليستغفر له أو يدعو له ؛ لأنهم كفروا بالله ورسوله ، وماتوا عليه . وهذا حكم عام في كل من عرف نفاقه ، وإن كان سبب نزول الآية في عبد الله بن أبي ابن سلول رأس المنافقين.

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ তাঁর রাসুলকে মুনাফিকদের থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করতে, তাদের কেউ মারা গেলে তার জানাজা না পড়তে এবং ক্ষমা বা দোয়া চাওয়ার জন্য তার কবরের পাশে না দাঁড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন; কারণ তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অস্বীকার করেছে এবং সেই অবস্থায় মারা গেছে। এটি যার মুনাফিকি জানা গেছে তার ক্ষেত্রে সাধারণ বিধান, যদিও আয়াত নাজিলের উপলক্ষ মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুলের ঘটনা।

ঘটনার রাজনৈতিক মাত্রাও স্পষ্ট। উমর মৃত ব্যক্তির পুরোনো বক্তব্য সামনে এনে তাঁর জন্য ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। মুহাম্মদ ছেলের অনুরোধে সাড়া দিয়ে জানাজা পড়িয়েছিলেন। ব্যক্তির অতীত শত্রুতা, উত্তরাধিকারীর আবেদন এবং নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত একই মৃত্যুকে ঘিরে প্রতিযোগী ভূমিকা নিয়েছে। পরে কোরআনিক নিষেধ এই সিদ্ধান্তের পরিসর নির্দিষ্ট করে দেয়। ক্ষমা চাওয়া এখানে কেবল অদৃশ্য জগতের বিষয় থাকেনি; সমাজের সামনে কার মৃত্যুতে সম্মানিত অংশগ্রহণ থাকবে, সেই ক্ষমতারও অংশ হয়েছে।

উমরের পরে বিস্মিত হওয়ার বক্তব্য তাঁর হস্তক্ষেপের তীব্রতাও দেখায়। ঘটনাটি তাঁর নিজের স্মৃতিতেই সাধারণ নম্র পরামর্শের পর্যায়ে ছিল না। তিনি নবীর সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, বাধা দিয়েছেন এবং আপত্তি বাড়িয়েছেন। পরের আয়াতে তাঁর চাওয়া ফলের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। মুওয়াফাকাতের ধর্মীয় মর্যাদা এই ধরনের ঘটনার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে: মানবীয় বিরোধের এক পক্ষের অবস্থান পরে ঘোষিত বিধানের সমর্থন পায়। ফলে নবীর তখনকার পছন্দের বিপক্ষে দাঁড়ানো ব্যক্তি পরবর্তী ধর্মীয় মূল্যায়নে সঠিক অবস্থানের কৃতিত্ব পেতে পারেন।

বর্ণনার এই ক্রম অপরিবর্তিত নির্দেশের দাবিকে একটি নির্দিষ্ট সমস্যায় ফেলে। একই ঘোষণাকারী প্রথমে আগের আয়াতের ভিত্তিতে নিজের কাজের সুযোগ ঘোষণা করছেন; কাজটি সম্পন্ন হওয়ার পরে নতুন আয়াত সেই কাজের ভবিষ্যৎ পুনরাবৃত্তি নিষিদ্ধ করছে। বিতর্ক, নির্বাচন, কার্যকর সিদ্ধান্ত এবং পরে নিষেধ—সবই মানুষের সামাজিক কর্মকাণ্ডের সময়ক্রমে ঘটেছে। চূড়ান্ত মুসহাফে আগের ও পরের বক্তব্য পাশাপাশি সংরক্ষিত থাকলেও তাদের কার্যকর নির্দেশ একই থাকে না। ধর্মীয় পাঠের স্থায়িত্বের সঙ্গে বিধানের পরিবর্তনের এই পার্থক্য জানাজার ঘটনাতেই প্রত্যক্ষ।


স্ত্রী প্রহারে নিষেধ, উমরের অভিযোগ ও অনুমতি প্রদানের বর্ণনা

স্ত্রীদের প্রহার না করার নির্দেশ দেওয়ার পরে উমরের অভিযোগে সেই নির্দেশের অবস্থান বদলেছে—আবু দাউদের বর্ণনার ক্রমটি এতটাই সরাসরি। প্রথমে নিষেধ, তারপর নারীরা স্বামীদের সামনে দুঃসাহসী হয়ে উঠেছেন বলে উমরের অভিযোগ, এরপর প্রহারের অনুমতি। অনুমতির পরে বহু নারী স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে মুহাম্মদের পরিবারের কাছে আসেন। তখন প্রহারকারী স্বামীরা শ্রেষ্ঠ মানুষ নন বলে মন্তব্য করা হয়। নারীর নিরাপত্তা, পুরুষের কর্তৃত্ব এবং নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের এই টানাপোড়েনে ঘোষিত নিয়ম স্থির থাকেনি। পুরুষের অভিযোগের পরে প্রহারের দরজা খুলেছে; নারীর অভিযোগের পরে এসেছে প্রহারকারীদের নৈতিক নিন্দা।

আবু দাউদ ২১৪৬-এ ইয়াস ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবি জুবাবের নামে পুরো ঘটনাটি সংরক্ষিত। “আল্লাহর বান্দিদের প্রহার করো না”—এই নিষেধের পরেই উমরের আগমন এবং “ফারাখখাসা ফি দারবিহিন্না”—প্রহারের অনুমতি দেওয়ার ভাষা আছে। নারীদের পরের অভিযোগও একই বর্ণনার অংশ। নির্দেশ বদলের আগে ও পরের ঘটনা এক জায়গাতেই রয়েছে। [346]

قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لاَ تَضْرِبُوا إِمَاءَ اللَّهِ. فَجَاءَ عُمَرُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ ذَئِرْنَ النِّسَاءُ عَلَى أَزْوَاجِهِنَّ. فَرَخَّصَ فِي ضَرْبِهِنَّ فَأَطَافَ بِآلِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم نِسَاءٌ كَثِيرٌ يَشْكُونَ أَزْوَاجَهُنَّ فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم لَقَدْ طَافَ بِآلِ مُحَمَّدٍ نِسَاءٌ كَثِيرٌ يَشْكُونَ أَزْوَاجَهُنَّ لَيْسَ أُولَئِكَ بِخِيَارِكُمْ.

বাংলা অনুবাদ: রাসুল বললেন: আল্লাহর বান্দিদের প্রহার করো না। এরপর উমর রাসুলের কাছে এসে বললেন: নারীরা তাদের স্বামীদের সামনে দুঃসাহসী হয়ে উঠেছে। তখন তিনি তাদের প্রহার করার অনুমতি দিলেন। পরে বহু নারী নিজেদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে রাসুলের পরিবারের কাছে এলেন। নবী বললেন: মুহাম্মদের পরিবারের কাছে বহু নারী নিজেদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এসেছে। ওই পুরুষেরা তোমাদের শ্রেষ্ঠ লোক নয়।

উমরের বক্তব্যে সমস্যা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে স্বামীদের সামনে নারীদের দুঃসাহস। পুরুষের কর্তৃত্ব কমে যাওয়াকে সমস্যা হিসেবে পেশ করে সেই কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য শারীরিক শাস্তির অনুমতি আদায় করা হয়েছে। নারীদের আচরণের মূল্যায়ন এখানে অভিযোগকারী পুরুষের ভাষায় সংরক্ষিত। সেই মূল্যায়নের পরেই অনুমতি দেওয়ার ঘটনাটি ঘটে।

ইবনে মাজায় একই ঘটনার পাঠে নারীদের প্রহারের নির্দেশ দিতে উমরের অনুরোধ আরও স্পষ্ট। সেখানে অনুমতির পরে “তাঁদের প্রহার করা হলো” বলা হয়েছে। পরের সকালে সত্তরজন নারী প্রত্যেকে নিজের স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন বলে মুহাম্মদের মন্তব্য এসেছে। একই বর্ণনার এই রূপে অনুমতির বাস্তব প্রয়োগ এবং অভিযোগের ব্যাপ্তি একসঙ্গে সংরক্ষিত। নিষেধ পরিবর্তনের ফল নারীদের শরীর ও সংসারে পৌঁছেছিল। [347]

قَالَ النَّبِيُّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ لاَ تَضْرِبُوا إِمَاءَ اللَّهِ. فَجَاءَ عُمَرُ إِلَى النَّبِيِّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَدْ ذَئِرَ النِّسَاءُ عَلَى أَزْوَاجِهِنَّ فَأْمُرْ بِضَرْبِهِنَّ. فَضُرِبْنَ فَطَافَ بِآلِ مُحَمَّدٍ ـ صلى الله عليه وسلم ـ طَائِفُ نِسَاءٍ كَثِيرٍ فَلَمَّا أَصْبَحَ قَالَ لَقَدْ طَافَ اللَّيْلَةَ بِآلِ مُحَمَّدٍ سَبْعُونَ امْرَأَةً كُلُّ امْرَأَةٍ تَشْتَكِي زَوْجَهَا فَلاَ تَجِدُونَ أُولَئِكَ خِيَارَكُمْ.

বাংলা অনুবাদ: নবী বললেন: আল্লাহর বান্দিদের প্রহার করো না। উমর নবীর কাছে এসে বললেন: হে আল্লাহর রাসুল, নারীরা স্বামীদের সামনে দুঃসাহসী হয়ে উঠেছে; তাই তাঁদের প্রহার করার নির্দেশ দিন। ফলে তাঁদের প্রহার করা হলো। এরপর বহু নারী মুহাম্মদের পরিবারের কাছে এলেন। সকাল হলে তিনি বললেন: গত রাতে সত্তরজন নারী মুহাম্মদের পরিবারের কাছে এসেছে; প্রত্যেক নারী নিজের স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। ওই পুরুষদের তোমরা নিজেদের শ্রেষ্ঠ লোক পাবে না।

পর্যায়ঘোষণা বা আবেদনক্ষমতা ও আচরণে প্রভাব
প্রথম নির্দেশআল্লাহর বান্দিদের প্রহার করো নাপ্রহারে প্রকাশ্য বাধা
উমরের অভিযোগনারীরা স্বামীদের সামনে দুঃসাহসী হয়েছেপুরুষের কর্তৃত্বকে সমস্যার মানদণ্ড করা
পরের নির্দেশপ্রহারের অনুমতিশারীরিক শাস্তির সুযোগ তৈরি
নারীদের অভিযোগবহু নারী; ইবনে মাজার পাঠে সত্তরজনঅনুমতির পরে স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
শেষ মন্তব্যওই পুরুষেরা শ্রেষ্ঠ নয়প্রহারকারীদের নৈতিক নিন্দা

প্রথম ও শেষ বাক্যের আইনগত ভাষা এক নয়। “প্রহার করো না” একটি সরাসরি নিষেধ; “তারা শ্রেষ্ঠ নয়” প্রহারকারী ব্যক্তিদের নৈতিক মূল্যায়ন। নিষেধ প্রত্যাহারের পরে কোনো কাজ করা বৈধ থেকেও নিন্দিত বা কম উত্তম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আওনুল মাবুদের ফিকহি ব্যাখ্যায় সেই অবস্থানই আছে: বিবাহের অধিকার বাধাগ্রস্ত হলে প্রহারকে অনুমোদিত বলা হয়েছে, যদিও প্রহার গুরুতর হবে না বলে শর্ত রয়েছে। কাজেই শেষের নিন্দার সঙ্গে প্রহারের শর্তযুক্ত বৈধতা একসঙ্গেই টিকে থাকে। [348]

في شرح السنة : فيه من الفقه أن ضرب النساء في منع حقوق النكاح مباح إلا أنه يضرب ضربا غير مبرح

বাংলা অনুবাদ: শরহুস সুন্নাহয় আছে: এর ফিকহি বিধান হলো, বিবাহের অধিকার বাধাগ্রস্ত করলে নারীদের প্রহার করা অনুমোদিত; তবে প্রহার গুরুতর হবে না।

নারীরা প্রতিবাদ জানাতে নেতৃত্বের পরিবারের কাছে গিয়েছিলেন। তাঁদের সেই প্রকাশ্য অভিযোগ অনুমতির ফলকে সামনে এনেছে। অনুমতি কার্যকর হওয়ার পরে নারীদের অসন্তোষ সংরক্ষিত আছে। পুরুষের অভিযোগ একটি আচরণের দরজা খুলে দেয়, নারীর অভিযোগ সেই দরজা দিয়ে সংঘটিত কাজের বিরুদ্ধে নিন্দা আদায় করে। অভিযোগ দুটির ফল সমমাত্রার নয়। পুরুষ পান প্রহারের অনুমতি; নারী পান প্রহারকারীর বিরুদ্ধে নৈতিক অসন্তোষের ঘোষণা।

কোরআনের নিসা ৪:৩৪-এ নুশুজের আশঙ্কায় উপদেশ, শয্যায় পৃথক রাখা ও প্রহারের কথা আছে। আনুগত্য ফিরে এলে আর তাঁদের বিরুদ্ধে পথ না খোঁজার নির্দেশও আছে। এই কাঠামোয় স্বামীকে স্ত্রীর আচরণ মূল্যায়ন ও শাস্তি প্রয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কীভাবে কথা বলছেন বা স্বামীর কর্তৃত্ব মানছেন কি না, সেই পারিবারিক বিরোধ শারীরিক নিয়ন্ত্রণের বৈধ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। পুরুষের কর্তৃত্ব এবং নারীর আনুগত্য একই বিধানের দুই পাশ। [349]

الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ ۚ فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِّلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ ۚ وَاللَّاتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ ۖ فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ একদলকে অন্য দলের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন এবং পুরুষেরা নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে—এ কারণে পুরুষেরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক। সৎ নারীরা অনুগত এবং আল্লাহর সংরক্ষণের নির্দেশ অনুযায়ী অনুপস্থিতিতে রক্ষাকারী। যেসব নারীর অবাধ্যতার আশঙ্কা করো, তাদের উপদেশ দাও, শয্যায় পৃথক রাখো এবং প্রহার করো। তারা তোমাদের অনুগত হলে তাদের বিরুদ্ধে আর পথ খুঁজো না। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বোচ্চ, মহান।

ইবনে কাসির এই আয়াতের প্রহারকে উপদেশ ও শয্যায় বর্জনের পরে প্রয়োগযোগ্য শর্তযুক্ত ব্যবস্থা বলেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় “তোমাদের প্রহার করার অনুমতি রয়েছে” কথাটি আছে। ফলে শাস্তির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হলেও স্বামীর শারীরিক কর্তৃত্ব বজায় থাকে। স্ত্রীকে আঘাত করার ক্ষমতা এখানে স্বামীর হাতে একটি ধর্মীয়ভাবে অনুমোদিত উপকরণ। যে ব্যক্তি বিরোধের পক্ষ, সেই ব্যক্তিই শাস্তি প্রয়োগের পক্ষও। সমান সম্পর্কের পরিবর্তে আনুগত্য আদায়ের এই ক্ষমতাই ব্যবস্থাটির কেন্দ্র। [350]

وقوله : ( واضربوهن ) أي : إذا لم يرتدعن بالموعظة ولا بالهجران ، فلكم أن تضربوهن ضربا غير مبرح

বাংলা অনুবাদ: “তাদের প্রহার করো” কথার অর্থ: উপদেশ ও বর্জনের দ্বারা তারা নিবৃত্ত না হলে তোমাদের তাদের প্রহার করার অনুমতি রয়েছে; সেই প্রহার গুরুতর হবে না।

শর্তযুক্ত প্রহারও প্রহার। কোন মাত্রা গুরুতর হবে এবং কোন অবাধ্যতায় শাস্তি প্রয়োগযোগ্য হবে, সেই সিদ্ধান্তের পরিসর স্বামীর হাতে থাকলে নারীর দৈহিক নিরাপত্তা তাঁর মূল্যায়নের অধীন হয়। অনুমতির সঙ্গে কম আঘাতের শর্ত যুক্ত করা শারীরিক শাস্তির ক্ষমতা বিলোপ করে না। নারীদের অভিযোগের ঐতিহাসিক বর্ণনা সেই ক্ষমতার বাস্তব প্রয়োগও ধরে রেখেছে। নিয়মের শব্দে পরিমিতির দাবি এবং আক্রান্তদের অভিযোগ একই ধর্মীয় সাহিত্যে পাশাপাশি রয়েছে।

আধুনিক ইসলামকিউএ ফতোয়াতেও এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করা হয়নি। সেখানে নিষেধ এবং পরে প্রহারের অনুমতিকে ঘরের দুটি সামাজিক সমস্যা মোকাবিলার উপায় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একই আচরণের জন্য বিপরীত নির্দেশকে প্রয়োজনভিত্তিক ব্যবস্থাপনা বলা হচ্ছে। পুরুষের কর্তৃত্বের সমস্যা সমাধানে নারীর শরীরের ওপর আঘাতের অনুমতি দেওয়াকে সমাধান হিসেবে গ্রহণ করার মধ্যেই ফতোয়ার মূল্যবোধ প্রকাশ পায়। [351]

فانظري: كيف أن النبي صلى الله عليه وسلم كان يعالج بإذنه في الضرب، مشكلة اجتماعية في البيوت، كما عالج بنهيه عنه مشكلة أخرى !!

বাংলা অনুবাদ: দেখো, নবী কীভাবে প্রহারের অনুমতি দিয়ে ঘরের একটি সামাজিক সমস্যা মোকাবিলা করছিলেন, যেমন প্রহার নিষিদ্ধ করে আরেকটি সমস্যা মোকাবিলা করেছিলেন!

এই যুক্তিতে সামাজিক সমস্যা বলতে কার অভিজ্ঞতা বোঝানো হচ্ছে, তা সিদ্ধান্তমূলক। নারীর প্রহৃত হওয়ার অভিযোগ একটি সমস্যা; স্বামীর কথার সামনে নারী দুঃসাহসী হওয়াও আরেকটি সমস্যা। প্রথমটির প্রতিকারে প্রহার নিষিদ্ধ হয়, দ্বিতীয়টির প্রতিকারে সেই প্রহারই অনুমোদন পায়। আঘাত না খেয়ে নিজের অবস্থান জানাতে পারার সুযোগকে পুরুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর সমস্যা হিসেবে দেখলে নারীর নিরাপত্তা প্রয়োজনমতো সীমিত করার বস্তু হয়ে যায়। প্রহারকে ব্যবস্থাপনা বলা তার শারীরিক ও ক্ষমতাগত প্রকৃতি মুছে দেয় না।

বুখারির আরেকটি বক্তব্যে স্ত্রীকে দাসের মতো চাবুক মেরে দিনের শেষে তাঁর সঙ্গে সহবাস করতে নিষেধ করা হয়েছে। এই ভাষায় প্রহার ও দাম্পত্য যৌনসম্পর্কের অসংগতি স্বীকৃত। একই ব্যক্তির ওপর শাস্তি চালিয়ে আবার তাঁর কাছেই ঘনিষ্ঠতা চাওয়ার সম্পর্কটি প্রশ্নের মুখে আসে। দাসকে চাবুক মারার উপমা তৎকালীন শারীরিক শাস্তির পরিচিত মানদণ্ডও প্রকাশ করে। [352]

لاَ يَجْلِدُ أَحَدُكُمُ امْرَأَتَهُ جَلْدَ الْعَبْدِ، ثُمَّ يُجَامِعُهَا فِي آخِرِ الْيَوْمِ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের কেউ যেন নিজের স্ত্রীকে দাসের মতো চাবুক মেরে তারপর দিনের শেষে তার সঙ্গে সহবাস না করে।

এখানে আঘাতকারীর পছন্দ এবং আঘাতপ্রাপ্তের অভিযোগের মধ্যে নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত বদলেছে। উমর যে আচরণে নিষেধ প্রত্যাহার চেয়েছিলেন, অনুমতি পাওয়ার পরে সেটি বহু নারীর অভিযোগের কারণ হয়েছে। নিয়মের প্রথম ঘোষণা মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ও অপরিবর্তিত সিদ্ধান্ত হিসেবে স্থির থাকেনি। চাপের উৎস বদলালে নেতৃত্বের বক্তব্যও বদলেছে—প্রথমে নিষেধ, তারপর অনুমতি, পরে নিন্দা। মানবীয় ক্ষমতার টানাপোড়েন ধর্মীয় নির্দেশের এই ইতিহাসের ভেতরেই রয়েছে।

প্রহার থেকে বিরত থাকার নৈতিক প্রশংসা এবং প্রহার করার আইনগত অধিকার ভিন্ন ফল তৈরি করে। নৈতিক প্রশংসা অনুসরণ করবেন কি না, স্বামী তা বেছে নিতে পারেন; তাঁর প্রহারের ক্ষমতা স্ত্রীর সমান শাস্তি প্রয়োগের ক্ষমতায় রূপান্তরিত হয় না। ফলে পুরুষের সংযমের ওপর নারীর নিরাপত্তা নির্ভরশীল হয়ে থাকে। শাস্তি সহ্য করতে হবে কি না, সেই সিদ্ধান্তে আক্রান্ত নারী কর্তৃত্বশীল পক্ষ নন। ধর্মীয় অনুমোদন এই অসম সম্পর্কের ওপর অতিরিক্ত বৈধতা বসায়।


মুহাম্মদের দাম্পত্য সুবিধা ও আয়েশার “আপনার ইচ্ছা পূরণে” ওহি আসার মন্তব্য

মুহাম্মদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা এবং তাঁর নামে ঘোষিত ওহির সুবিধার সম্পর্ক নিয়ে আয়েশার মন্তব্য অত্যন্ত সরাসরি: তাঁর প্রভু তাঁর ইচ্ছা পূরণে দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছেন। মন্তব্যটি নারী সমর্পণ, কাকে কাছে রাখা হবে এবং কাকে দূরে রাখা হবে—এই দাম্পত্য সুবিধার ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত। গ্রন্থের ঘোষণাকারী নিজেই একটি বিশেষ বিধানের সুবিধাভোগী, আর তাঁর ঘরের একজন নারী সেই সুবিধাকে তাঁর ইচ্ছাপূরণের সঙ্গে মিলিয়েছেন। ধর্মীয় ঘোষণার ভেতরে ব্যক্তিগত স্বার্থের উপস্থিতি তাঁর নিকটতম পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যেই শনাক্ত হয়েছে।

মূল বুখারি-বর্ণনায় খাওলা বিনতে হাকিমের আত্মসমর্পণের প্রসঙ্গ আছে। আয়েশা নারীর নিজের সমর্পণ নিয়ে আপত্তি করেন; পরে কাকে আলাদা রাখবেন সেই স্বাধীনতা ঘোষিত হলে তাঁর তির্যক মন্তব্য আসে। আয়াত আসার আগে একটি পারিবারিক প্রতিক্রিয়া এবং আয়াত আসার পরে আরেকটি প্রতিক্রিয়া একই বর্ণনায় রয়েছে। [353] [354]

সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫৪/ বিয়ে-শাদী
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ২৪৫৫. কোন মহিলা কোন পুরুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে পারে কিনা ?
৪৭৪০। মুহাম্মাদ ইবনু সালাম (রহঃ) … হিশামের পিতা উরওয়া থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, যে সব মহিলা নিজেদেরকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট সমর্পণ করেছিলেন, খাওলা বিনতে হাকীম তাদেরই একজন ছিলেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, মহিলাদের কি লজ্জা হয় না যে, নিজেদের পরপুরুষের কাছে সমর্পণ করছে? কিন্তু যখন কুরআনের এ আয়াত অবতীর্ণ হল- “হে মুহাম্মাদ! তোমাকে অধিকার দেয়া হল যে নিজ স্ত্রীগণের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা আলাদা রাখতে পার।” আয়িশা (রাঃ) বলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার মনে হয়, আপনার রব আপনার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করার ত্বরিত ব্যবস্থা নিচ্ছেন। উক্ত হাদীসটি আবূ সাঈদ মুয়াদ্দিব, মুহাম্মাদ ইবনু বিশর এবং আবদাহ্ হিশাম থেকে আর হিশাম তার পিতা হতে একে অপরের চেয়ে কিছু বেশী-কমসহ আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

কোরআন সংকলন 52

বুখারি ৪৭৮৮-এ আয়েশার ঈর্ষা, নারীরা নিজেদের সমর্পণ করেন কীভাবে—এই প্রশ্ন, আয়াতের ঘোষণা এবং “হাওয়াক” মন্তব্য একটানা বর্ণিত। তাঁর আপত্তির বিষয়টি একটি বাস্তব দাম্পত্য সুবিধার সঙ্গে যুক্ত। স্ত্রীদের নিজেদের অবস্থান ও প্রাপ্যের প্রশ্নে মুহাম্মদের ইচ্ছাকে বিশেষ বৈধতা দেওয়ার ফল তিনি সরাসরি অনুভব করছিলেন। [355]

كُنْتُ أَغَارُ عَلَى اللاَّتِي وَهَبْنَ أَنْفُسَهُنَّ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَقُولُ أَتَهَبُ الْمَرْأَةُ نَفْسَهَا فَلَمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى {تُرْجِئُ مَنْ تَشَاءُ مِنْهُنَّ وَتُؤْوِي إِلَيْكَ مَنْ تَشَاءُ وَمَنِ ابْتَغَيْتَ مِمَّنْ عَزَلْتَ فَلاَ جُنَاحَ عَلَيْكَ} قُلْتُ مَا أُرَى رَبَّكَ إِلاَّ يُسَارِعُ فِي هَوَاكَ.

বাংলা অনুবাদ: যে নারীরা নিজেদের রাসুলের কাছে সমর্পণ করতেন, তাঁদের বিষয়ে আমি ঈর্ষান্বিত হতাম এবং বলতাম, কোনো নারী কি নিজেকে সমর্পণ করে? তারপর আল্লাহ নাজিল করলেন: “তুমি তাদের মধ্যে যাকে চাও পিছিয়ে রাখতে পারো এবং যাকে চাও নিজের কাছে রাখতে পারো; আর যাকে পৃথক রেখেছ তাকে আবার চাইলে তোমার কোনো দোষ নেই।” তখন আমি বললাম: আপনার রবকে তো আপনার ইচ্ছা পূরণে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে দেখি।

আহযাবের ৫০ নম্বর আয়াতে বিশেষ সুবিধার সীমানা আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। একজন বিশ্বাসী নারী নিজেকে নবীর কাছে সমর্পণ করলে এবং নবী তাঁকে বিয়ে করতে চাইলে তার অনুমতি “অন্য বিশ্বাসীদের বাদ দিয়ে তোমার জন্য বিশেষভাবে” বলা হয়েছে। সাধারণ বিশ্বাসীদের ওপর স্ত্রীদের বিষয়ে আরোপিত বিধানের কথাও একই আয়াতে রয়েছে। ফলে সাধারণ অনুসারী ও ঘোষণাকারীর জন্য বিধানের পার্থক্য পাঠের সরাসরি বক্তব্য। ব্যক্তির নিজের ওপর কষ্ট না থাকার উদ্দেশ্যও আয়াতের শেষাংশে আছে। [356]

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَحْلَلْنَا لَكَ أَزْوَاجَكَ اللَّاتِي آتَيْتَ أُجُورَهُنَّ وَمَا مَلَكَتْ يَمِينُكَ مِمَّا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَيْكَ وَبَنَاتِ عَمِّكَ وَبَنَاتِ عَمَّاتِكَ وَبَنَاتِ خَالِكَ وَبَنَاتِ خَالَاتِكَ اللَّاتِي هَاجَرْنَ مَعَكَ وَامْرَأَةً مُّؤْمِنَةً إِن وَهَبَتْ نَفْسَهَا لِلنَّبِيِّ إِنْ أَرَادَ النَّبِيُّ أَن يَسْتَنكِحَهَا خَالِصَةً لَّكَ مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ ۗ قَدْ عَلِمْنَا مَا فَرَضْنَا عَلَيْهِمْ فِي أَزْوَاجِهِمْ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ لِكَيْلَا يَكُونَ عَلَيْكَ حَرَجٌ ۗ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا

বাংলা অনুবাদ: হে নবী, আমরা তোমার জন্য বৈধ করেছি তোমার সেই স্ত্রীদের, যাদের মোহর তুমি দিয়েছ; আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তার মধ্যে তোমার অধিকারে থাকা দাসীদের; তোমার চাচা, ফুফু, মামা ও খালার সেই মেয়েদের, যারা তোমার সঙ্গে হিজরত করেছে; এবং এমন কোনো বিশ্বাসী নারীকে, যে নিজেকে নবীর কাছে সমর্পণ করে, যদি নবী তাকে বিয়ে করতে চান। এটি অন্য বিশ্বাসীদের বাদ দিয়ে বিশেষভাবে তোমার জন্য। তাদের স্ত্রী ও তাদের অধিকারে থাকা নারীদের বিষয়ে আমরা যা নির্ধারণ করেছি তা আমরা জানি; যাতে তোমার কোনো অসুবিধা না হয়। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।

ইবনে কাসির কাতাদার নামে এই বিশেষত্বকে অভিভাবক ও মোহর ছাড়াই সমর্পণের সুযোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এতে সুবিধাটির অর্থ নির্দিষ্ট: অন্য পুরুষের ক্ষেত্রে যে বিয়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, মুহাম্মদের জন্য সমর্পণকারী নারীর ক্ষেত্রে তা বিশেষভাবে শিথিল। নারীর আগ্রহের সঙ্গে পুরুষটির নিজের গ্রহণের ইচ্ছা যুক্ত হলে সেই ছাড় কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ধর্মীয় ঘোষণাকারীর ব্যক্তিগত গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান এখানে বৈধতার কেন্দ্রে আছে। [357]

ولهذا قال قتادة في قوله : ( خالصة لك من دون المؤمنين ) ، يقول : ليس لامرأة تهب نفسها لرجل بغير ولي ولا مهر إلا للنبي صلى الله عليه وسلم.

বাংলা অনুবাদ: এই কারণে “অন্য বিশ্বাসীদের বাদ দিয়ে তোমার জন্য বিশেষভাবে” কথার ব্যাখ্যায় কাতাদা বলেছেন: নবী ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের কাছে নারী অভিভাবক ও মোহর ছাড়া নিজেকে সমর্পণ করতে পারে না।

পরের আয়াতে কাকে পিছিয়ে রাখা হবে এবং কাকে কাছে নেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা এসেছে। আগে যাকে পৃথক রাখা হয়েছে তাকে আবার গ্রহণ করায় দোষ নেই বলা হয়েছে। স্ত্রীদের চোখ জুড়ানো, দুঃখ না পাওয়া এবং যা দেওয়া হবে তাতে সন্তুষ্ট থাকার সঙ্গে এই বিশেষ ক্ষমতাকে যুক্ত করা হয়েছে। সুবিধাভোগী পুরুষের ইচ্ছার পরিসর বাড়িয়ে নারীদের সন্তুষ্ট থাকার কারণ তৈরি করা হচ্ছে। কাকে কতটা দেওয়া হবে সেই সিদ্ধান্তের সমান অধিকার নারীদের হাতে বসানো হয়নি। [358]

تُرْجِي مَن تَشَاءُ مِنْهُنَّ وَتُؤْوِي إِلَيْكَ مَن تَشَاءُ ۖ وَمَنِ ابْتَغَيْتَ مِمَّنْ عَزَلْتَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكَ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَن تَقَرَّ أَعْيُنُهُنَّ وَلَا يَحْزَنَّ وَيَرْضَيْنَ بِمَا آتَيْتَهُنَّ كُلُّهُنَّ ۚ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا فِي قُلُوبِكُمْ ۚ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَلِيمًا

বাংলা অনুবাদ: তাদের মধ্যে যাকে চাও পিছিয়ে রাখতে পারো এবং যাকে চাও নিজের কাছে রাখতে পারো। যাকে পৃথক রেখেছ তাকে আবার চাইলে তোমার কোনো দোষ নেই। এটি তাদের সবার চোখ জুড়ানো, দুঃখ না পাওয়া এবং তুমি যা দাও তাতে সন্তুষ্ট হওয়ার অধিক নিকটবর্তী। তোমাদের অন্তরে যা আছে আল্লাহ তা জানেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল।

ইবনে কাসিরের একটি ব্যাখ্যায় আয়াতটি নিজেদের সমর্পণকারী নারীদের গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে যুক্ত। আরেকটিতে নিজের স্ত্রীদের পালা নির্ধারণে বাধ্যবাধকতা না থাকার কথা বলা হয়েছে। উভয় ব্যাখ্যায় সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা মুহাম্মদের ব্যক্তিগত পছন্দের হাতে। প্রথমটিতে গ্রহণ, প্রত্যাখ্যান ও পরে ফিরে আসার সুযোগ; দ্বিতীয়টিতে স্ত্রীদের কাছে থাকা ও সহবাসের পালা নিয়ে বিশেষ ছাড়। সাধারণ বিধির বাইরের এই সিদ্ধান্তক্ষমতাই আয়েশার মন্তব্যের বাস্তব বিষয়। [359]

لَا حَرَجَ عَلَيْكَ أَنْ تَتْرُكَ الْقَسْمَ لَهُنَّ ، فَتُقَدِّمَ مَنْ شِئْتَ ، وَتُؤَخِّرَ مَنْ شِئْتَ ، وَتُجَامِعَ مَنْ شِئْتَ ، وَتَتْرُكَ مَنْ شِئْتَ

বাংলা অনুবাদ: তাদের মধ্যে পালা বণ্টন ছেড়ে দিতে তোমার কোনো দোষ নেই; যাকে চাও আগে রাখবে, যাকে চাও পরে রাখবে, যার সঙ্গে চাও মিলিত হবে এবং যাকে চাও ছেড়ে রাখবে।

বাধ্যতামূলক পালা এবং ইচ্ছামতো পালা দেওয়া সমান অধিকার তৈরি করে না। প্রথম ক্ষেত্রে স্ত্রী তাঁর নির্দিষ্ট প্রাপ্যের দাবিদার; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সেই প্রাপ্য পুরুষের সিদ্ধান্তে নির্ভরশীল। পুরুষ সমানভাবে সময় দিলেও তা তাঁর পছন্দসই অনুগ্রহ হিসেবে দাঁড়ায়। ন্যায্য পাওনাকে ঐচ্ছিক উদারতায় রূপান্তর করলে কৃতজ্ঞতার দায়ও নারীর ওপর পড়ে। এই পরিবর্তন শুধু রাতের তালিকা বদলায় না; স্বামী-স্ত্রীর দরকষাকষির ক্ষমতার কাঠামো বদলায়।

ইবনে কাসিরের পরবর্তী ব্যাখ্যায় এই অনুগ্রহের সম্পর্ক সরাসরি বলা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে স্ত্রীদের পালা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা উঠে গেলে মুহাম্মদ যে সমানভাবে সময় দিচ্ছেন তা তাঁর নিজের ইচ্ছা। স্ত্রীরা সেটিকে তাঁর অনুগ্রহ হিসেবে স্বীকার করবেন। অধিকারের বদলে পুরুষের ঐচ্ছিক সদিচ্ছাকে প্রতিষ্ঠিত করার সামাজিক ফল এই ভাষ্যেই স্পষ্ট। [360]

أي : إذا علمن أن الله قد وضع عنك الحرج في القسم ، فإن شئت قسمت ، وإن شئت لم تقسم ، لا جناح عليك في أي ذلك فعلت ، ثم مع هذا أنت تقسم لهن اختيارا منك لا أنه على سبيل الوجوب ، فرحن بذلك واستبشرن به وحملن جميلك في ذلك ، واعترفن بمنتك عليهن في قسمك لهن وتسويتك بينهن وإنصافك لهن وعدلك فيهن.

বাংলা অনুবাদ: অর্থাৎ তারা যখন জানবে, আল্লাহ তোমার ওপর পালা বণ্টনের বাধা তুলে দিয়েছেন—ইচ্ছা করলে তুমি পালা দেবে, ইচ্ছা না করলে দেবে না; যেটিই করো তোমার দোষ নেই—তারপরও তুমি বাধ্য হয়ে নয়, নিজের ইচ্ছায় পালা দিচ্ছ, তখন তারা খুশি ও আনন্দিত হবে, তোমার এই সদাচরণ স্বীকার করবে এবং তাদের পালা দেওয়া, সমান রাখা, ন্যায় ও ইনসাফ করার ক্ষেত্রে তোমার অনুগ্রহ মেনে নেবে।

বুখারিতে আয়াতের পরে কোনো স্ত্রীর দিনে তাঁর অনুমতি চাওয়ার বর্ণনাও আছে। আয়েশাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি তাঁর হাতে হলে তিনি মুহাম্মদের ক্ষেত্রে অন্য কাউকে অগ্রাধিকার দিতে চান না। স্ত্রীর নিজের আকাঙ্ক্ষা এখানে মুহাম্মদের সঙ্গে সময় কাটানো। বিশেষ ছাড়ের ঘোষণার পরেও সেই আকাঙ্ক্ষা অদৃশ্য হয়নি। তাফসিরে যে খুশি ও কৃতজ্ঞতার ফল প্রত্যাশা করা হয়েছে, হাদিসে নারীর নিজের সময় ধরে রাখার ইচ্ছাও সংরক্ষিত রয়েছে। [361]

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَسْتَأْذِنُ فِي يَوْمِ الْمَرْأَةِ مِنَّا بَعْدَ أَنْ أُنْزِلَتْ هَذِهِ الآيَةُ {تُرْجِئُ مَنْ تَشَاءُ مِنْهُنَّ وَتُؤْوِي إِلَيْكَ مَنْ تَشَاءُ وَمَنِ ابْتَغَيْتَ مِمَّنْ عَزَلْتَ فَلاَ جُنَاحَ عَلَيْكَ}. فَقُلْتُ لَهَا مَا كُنْتِ تَقُولِينَ قَالَتْ كُنْتُ أَقُولُ لَهُ إِنْ كَانَ ذَاكَ إِلَىَّ فَإِنِّي لاَ أُرِيدُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنْ أُوثِرَ عَلَيْكَ أَحَدًا.

বাংলা অনুবাদ: “তুমি তাদের মধ্যে যাকে চাও পিছিয়ে রাখতে পারো এবং যাকে চাও কাছে রাখতে পারো; যাকে পৃথক রেখেছ তাকে আবার চাইলে তোমার দোষ নেই”—এই আয়াত নাজিলের পরে রাসুল আমাদের কোনো স্ত্রীর দিনে তাঁর অনুমতি চাইতেন। আমি আয়েশাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি তখন কী বলতেন? তিনি বললেন, আমি তাঁকে বলতাম: হে আল্লাহর রাসুল, বিষয়টি যদি আমার হাতে থাকে, তাহলে আপনাকে পাওয়ার বিষয়ে অন্য কাউকে আমি অগ্রাধিকার দিতে চাই না।

ফাতহুল বারিতে ওয়াহিদীর সূত্রে আরেকটি ব্যাখ্যায় স্ত্রীদের তালাকের আশঙ্কার সঙ্গে পালার সিদ্ধান্ত সমর্পণের সম্পর্ক আছে। পছন্দের সুযোগ দেওয়ার আয়াতের পরে কয়েকজন স্ত্রী তালাকের ভয় পান এবং পালা বণ্টনের বিষয় মুহাম্মদের হাতে ছেড়ে দেন বলে সেখানে বলা হয়েছে। একসঙ্গে সংসারে টিকে থাকার নিরাপত্তা এবং নিজের প্রাপ্য সময়ের ওপর দাবি একই সম্পর্কের ভেতরে দরকষাকষির বিষয় হয়েছে। [362]

وحكى الواحدي عن المفسرين أن هذه الآية نزلت عقب نزول آية التخيير ، وذلك أن التخيير لما وقع أشفق بعض الأزواج أن يطلقهن ففوضن أمر القسم إليه ، فأنزلت ترجي من تشاء الآية.

বাংলা অনুবাদ: ওয়াহিদী মুফাসসিরদের থেকে উল্লেখ করেছেন, পছন্দের সুযোগ দেওয়ার আয়াতের পরে এই আয়াত নাজিল হয়। পছন্দের সুযোগ দেওয়া হলে কয়েকজন স্ত্রী আশঙ্কা করেন যে তিনি তাঁদের তালাক দেবেন। তখন তাঁরা পালা বণ্টনের বিষয় তাঁর হাতে সমর্পণ করেন; এরপর “যাকে চাও পিছিয়ে রাখতে পারো” আয়াত নাজিল হয়।

সুবিধা বা বক্তব্যউৎসে নির্দিষ্ট বিষয়সম্পর্কে ফল
আহযাব ৩৩:৫০অন্য বিশ্বাসীদের বাদ দিয়ে ব্যক্তিবিশেষের জন্য বিশেষ অনুমতিসাধারণ অনুসারী ও ঘোষণাকারীর পৃথক অধিকার
আহযাব ৩৩:৫১পিছিয়ে রাখা, কাছে নেওয়া ও আবার গ্রহণের স্বাধীনতাগ্রহণকারী পুরুষের সিদ্ধান্তের পরিসর বৃদ্ধি
ইবনে কাসিরের পালার ব্যাখ্যাসমান পালার বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড়প্রাপ্য সময়কে ব্যক্তিগত অনুগ্রহে রূপান্তর
বুখারি ৪৭৮৯আয়েশা নিজের দিনে অন্য কাউকে অগ্রাধিকার দিতে চান নাস্ত্রীর নিজস্ব আকাঙ্ক্ষা ও সময়ের দাবি
আয়েশার “হাওয়াক” মন্তব্যমুহাম্মদের ইচ্ছাপূরণে দ্রুত ব্যবস্থাব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও ওহির সুবিধার প্রকাশ্য যোগ

আয়েশার মন্তব্যের কেন্দ্রীয় শব্দ “হাওয়া”—ইচ্ছা, অভিরুচি বা আকাঙ্ক্ষা। কাকে গ্রহণ করা হবে, কার সময় পিছিয়ে দেওয়া হবে, আবার কাকে কাছে আনা হবে—এসবই ব্যক্তির পছন্দের বিষয়। আয়াত সেই পছন্দের জন্য বিশেষ পরিসর তৈরি করেছে। ফলে তাঁর মন্তব্যের তীক্ষ্ণতা নির্দিষ্ট সুবিধার সঙ্গে মিলে যায়। তিনি ঘরের বাস্তব ক্ষমতার পরিবর্তন সম্পর্কে এমন ভাষায় কথা বলেছেন, যা ঘোষিত ব্যবস্থার সুবিধাভোগীকে সরাসরি চিহ্নিত করে। [363]

قُلْتُ مَا أُرَى رَبَّكَ إِلاَّ يُسَارِعُ فِي هَوَاكَ

বাংলা অনুবাদ: আমি বললাম, আপনার রবকে তো আপনার ইচ্ছা পূরণে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া ছাড়া আর কিছু করতে দেখি না।

ঘোষণাকারী নিজেই যখন বিশেষ নিয়মের সুবিধাভোগী, তখন ঘোষণার বৈধতার দাবিতে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়। তাঁর সাধারণ অনুসারীদের জন্য বাধ্যবাধকতা আছে, নিজের জন্য ছাড় আছে, এবং ছাড়ের কারণও তাঁর অসুবিধা দূর করা। নিজের স্বার্থকে দৈব অনুমোদন দেওয়ার পক্ষে প্রমাণ হিসেবে নিজের কাছেই প্রকাশিত বক্তব্য পেশ করা হচ্ছে। এই ব্যবস্থায় সুবিধাভোগীর দাবি এবং দাবির সত্যতার উৎস একই কেন্দ্রের মধ্যে থাকে। আয়েশার তির্যক মন্তব্য সেই কেন্দ্রের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে সামনে এনেছে।

নারীদের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করার যুক্তিটিও ক্ষমতার বণ্টনের সঙ্গে যুক্ত। একজন পুরুষকে তাঁদের প্রাপ্য বেছে দেওয়ার স্বাধীনতা দিয়ে সেই প্রাপ্যে সন্তুষ্ট থাকার কথা বলা হলে নারীর নিজস্ব দাবি দুর্বল হয়। পুরুষের ইচ্ছা তখন ধর্মীয় অনুমতিতে সুরক্ষিত, নারীর সন্তুষ্টি প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া। গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের বিশেষ সুবিধা এবং দাম্পত্য সময়ের ঐচ্ছিক বণ্টন একসঙ্গে ঘোষণাকারীর পক্ষে যায়। তাঁর স্ত্রীর নিজের মন্তব্যে এই সুবিধার সঙ্গে তাঁর ইচ্ছার মিল যে ধরা পড়েছে, তা ধর্মীয় সাহিত্যের সংরক্ষিত সমালোচনামূলক সাক্ষ্য।

বাণীকে সর্বজনীন ও শাশ্বত বলার সঙ্গে এমন ব্যক্তিনির্দিষ্ট সুবিধার সম্পর্কও প্রশ্নবিদ্ধ। নির্দিষ্ট একজন পুরুষের জীবনের নারী, গ্রহণের ইচ্ছা এবং স্ত্রীদের মধ্যে সময় বণ্টনকে কেন্দ্র করে একটি স্থায়ী গ্রন্থে বিশেষ বিধান স্থান পেয়েছে। সেই গ্রন্থে সাধারণ অনুসারীর সীমা ও ঘোষণাকারীর ছাড় আলাদা করা হয়েছে। ফলে গ্রন্থের আইন কেবল দূরবর্তী মহাজাগতিক ঘোষণা হয়ে থাকেনি; ঘোষণাকারীর সংসার ও ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা হিসেবেও কাজ করেছে। ঘরের প্রয়োজন এবং ওহির ভাষা একই ব্যবস্থায় বাঁধা।


সাহাবিদের নিজেদের পারিবারিক আচরণে নতুন আয়াত নাজিলের ভয়

নতুন ওহি ঘোষণার সম্ভাবনা সাহাবিদের নিজেদের ঘরের আচরণ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করত। ইবনে উমরের বর্ণনায় তাঁরা স্ত্রীদের সঙ্গে খোলামেলা কথাবার্তা এড়িয়ে চলতেন, কারণ তাঁদের বিষয়ে কোনো ঘোষণা নাজিল হয়ে যেতে পারে। মুহাম্মদের মৃত্যুর পরে সেই ভয় সরে গেলে তাঁরা আবার অবাধে কথা বলতে শুরু করেন। ঘোষণাকারীর জীবিত উপস্থিতি, নতুন নির্দেশের অনিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিগত আচরণে আত্মসংযম—তিনটির সম্পর্ক একই বর্ণনায় রয়েছে। ধর্মীয় কর্তৃত্ব শুধু কার্যকর নিষেধ দিয়ে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করেনি; নতুন নিষেধ বা নিন্দা আসার সম্ভাবনাও নিয়ন্ত্রণের উপায় হয়েছে।

বাংলা বুখারি-বর্ণনায় নিজেদের স্ত্রীদের সঙ্গে কথাবার্তা ও হাসিঠাট্টা থেকে দূরে থাকার কথা আছে। ভয়ের বিষয় তাঁদের নিয়ে নতুন ওহি নাজিল হওয়া। মৃত্যুর পরে আচরণ বদলে যাওয়ার কথাটি সেই ভয়কে একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির জীবিত উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করে। পারিবারিক পরিসরও নতুন ধর্মীয় ঘোষণার সম্ভাব্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। [364]

সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫৪/ বিয়ে-শাদী
পরিচ্ছদঃ ২৫০৫. নারীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করার ওসীয়ত
৪৮০৮। নুআয়ম (রহঃ) … ইবন উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় আমাদের স্ত্রীদের সাথে কথা-বার্তা ও হাসি-ঠাট্টা থেকে দূরে থাকতাম এই ভয়ে যে, এ বিষয়ে আমাদের সতর্ক করে কোন ওহী নাযিল হয়ে যায়। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তেকালের পর আমরা তাদের সাথে অবাধে কথা-বার্তা ও হাসি-ঠাট্টা করতাম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

কোরআন সংকলন 54

আরবি পাঠের “নিসায়িনা” শব্দে নিজেদের স্ত্রীদের উল্লেখ আছে। সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাবার্তা ও খোলামেলা আচরণও নতুন আয়াতের আশঙ্কায় সীমিত হয়ে যেত। “আমাদের বিষয়ে কিছু নাজিল হয়ে যাওয়ার ভয়ে” বাক্যটি ব্যক্তিগত আচরণ ও ঘোষিত ধর্মীয় নিন্দার যোগসূত্র প্রকাশ করে। যাঁর মুখ দিয়ে নতুন ঘোষণা আসে, তাঁর জীবিত থাকা আচরণের ওপর একটি অতিরিক্ত চাপ হিসেবে কাজ করছিল। [365]

كُنَّا نَتَّقِي الْكَلاَمَ وَالاِنْبِسَاطَ إِلَى نِسَائِنَا عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم هَيْبَةَ أَنْ يُنْزَلَ فِينَا شَىْءٌ فَلَمَّا تُوُفِّيَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم تَكَلَّمْنَا وَانْبَسَطْنَا

বাংলা অনুবাদ: নবীর সময়ে আমাদের বিষয়ে কিছু নাজিল হয়ে যাওয়ার ভয়ে আমরা নিজেদের স্ত্রীদের সঙ্গে কথাবার্তা ও খোলামেলা আচরণে সতর্ক থাকতাম। নবীর মৃত্যু হলে আমরা কথা বলতাম ও খোলামেলা হতাম।

ইবনে হাজর এই আশঙ্কার বিষয়কে কোরআন হিসেবে স্পষ্ট করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, সাহাবিরা মূলত অনুমোদিত আচরণও এড়িয়ে চলতেন, কারণ পরে তার বিষয়ে নিষেধ বা হারাম হওয়ার ঘোষণা আসতে পারে। মৃত্যুর পরে নতুন ঘোষণা আসার আশঙ্কা থেকে নিরাপদ হয়ে তাঁরা আবার সেই মূল অনুমতির ভিত্তিতে আচরণ করেছেন। ফলে জানা অপরাধের শাস্তি এড়ানো এবং এখনো নিষিদ্ধ না হওয়া আচরণ থেকে ভবিষ্যতের ভয়ে সরে থাকা—এ দুটি আলাদা নিয়ন্ত্রণপ্রক্রিয়া। এখানে দ্বিতীয়টিও সক্রিয় ছিল। [366]

قوله ( كنا نتقي ) أي نتجنب ، وقد بين سبب ذلك بقوله ” هيبة أن ينزل فينا شيء ” أي من القرآن ، ووقع صريحا في رواية ابن مهدي عن الثوري عند ابن ماجه . وقوله ” فلما توفي ” يشعر بأن الذي كانوا يتركونه كان من المباح ، لكن الذي يدخل تحت البراءة الأصلية ، فكانوا يخافون أن ينزل في ذلك منع أو تحريم ، وبعد الوفاة النبوية أمنوا ذلك ففعلوه تمسكا بالبراءة الأصلية.

বাংলা অনুবাদ: “আমরা সতর্ক থাকতাম” অর্থ এড়িয়ে চলতাম। এর কারণ তিনি বলেছেন: “আমাদের বিষয়ে কিছু নাজিল হয়ে যাওয়ার ভয়ে”—অর্থাৎ কোরআন থেকে কিছু। ইবনে মাজায় ইবনে মাহদির সূত্রে সাওরির বর্ণনায় বিষয়টি স্পষ্ট আছে। “তাঁর মৃত্যু হলে” কথাটি বোঝায়, তাঁরা যে আচরণ এড়িয়ে চলতেন তা মূল অনুমতির অন্তর্ভুক্ত বৈধ আচরণ ছিল। তাঁরা ভয় করতেন, সে বিষয়ে বাধা বা নিষেধ নাজিল হতে পারে। নবীর মৃত্যুর পরে তাঁরা সেই আশঙ্কা থেকে নিরাপদ হন এবং মূল অনুমতির ভিত্তিতে কাজটি করেন।

এই অবস্থায় মানুষ বর্তমান নিয়ম মেনে চলেও নিশ্চিন্ত থাকেন না। কারণ বর্তমানের অনুমোদিত আচরণ পরের ঘোষণার বিষয় হতে পারে। ব্যক্তিকে তাই শুধু ঘোষিত নিষেধের তালিকা জানতে হয় না; ঘোষণাকারীর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়েও সতর্ক থাকতে হয়। কী বললে নিজের ঘরের কথাই আয়াতের বিষয় হয়ে যাবে, সেই অনিশ্চয়তা আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি করে। সরাসরি নজরদারির প্রয়োজন কমে যায়, কারণ মানুষ নিজেই নিজের কথাবার্তা সীমিত করতে শুরু করেন। এই সামাজিক কার্যকারিতা ইবনে উমরের আগে ও পরের আচরণের বিবরণেই ধরা পড়ে।

প্রশ্ন করার ফলেও নতুন নিষেধ আসার সম্ভাবনা ধর্মীয় বক্তব্যে আছে। বুখারিতে যে ব্যক্তি আগে হারাম না থাকা কোনো বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করে সেটি হারাম হওয়ার কারণ হন, তাঁকে মুসলিমদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অপরাধী বলা হয়েছে। এখানে নিষেধের উপলক্ষ হিসেবে মানুষের প্রশ্ন সরাসরি কাজ করছে। শুধু নিজের আচরণের জন্য নয়, প্রশ্নের ফলে অন্যদের ওপর নতুন বাধা আসার দায়ও প্রশ্নকারীর ওপর চাপানো হচ্ছে। [367]

إِنَّ أَعْظَمَ الْمُسْلِمِينَ جُرْمًا مَنْ سَأَلَ عَنْ شَىْءٍ لَمْ يُحَرَّمْ، فَحُرِّمَ مِنْ أَجْلِ مَسْأَلَتِهِ

বাংলা অনুবাদ: মুসলিমদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অপরাধী সেই ব্যক্তি, যে এমন কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করল যা নিষিদ্ধ ছিল না, আর তার প্রশ্নের কারণেই তা নিষিদ্ধ হয়ে গেল।

এই অভিযোগ প্রশ্নকারীর সামাজিক অবস্থানকেও বদলায়। নতুন বাধা যিনি ঘোষণা করছেন, তার দায় তাঁর সিদ্ধান্তের প্রশ্ন হিসেবে সামনে না এসে প্রশ্নকারীর অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে মানুষ প্রশ্ন করে উত্তর জানার আগ্রহ থেকেও বিরত হতে পারেন, কারণ প্রশ্নটি সমষ্টির জন্য নতুন নিষেধের কারণ হয়ে উঠতে পারে। নিয়ম বাড়ার জন্য ঘোষণার পদ্ধতিকে প্রশ্ন না করে প্রশ্নকারীকে দায়ী করার এই ব্যবস্থা কর্তৃত্বকে সুরক্ষিত করে। প্রশ্নের সম্ভাব্য ফল নিয়ে আগাম ভয় সেই সুরক্ষার সামাজিক ভিত্তি।

মায়িদার ১০১ নম্বর আয়াতে এমন বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করতে নিষেধ করা হয়েছে, যা প্রকাশ পেলে প্রশ্নকারীদের খারাপ লাগবে। কোরআন নাজিলের সময় প্রশ্ন করলে তা প্রকাশিত হওয়ার কথা এবং ক্ষমার কথাও রয়েছে। নতুন প্রকাশের সময় মানুষের প্রশ্নের সঙ্গে বিধান ও তথ্যের সংযোগ আয়াতের ভাষাতেই উপস্থিত। জানার উদ্যোগ নিজেই অস্বস্তিকর প্রকাশের কারণ হতে পারে—এই বার্তা প্রশ্নের পরিসরে অতিরিক্ত সতর্কতা বসায়। [368]

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَسْأَلُوا عَنْ أَشْيَاءَ إِن تُبْدَ لَكُمْ تَسُؤْكُمْ وَإِن تَسْأَلُوا عَنْهَا حِينَ يُنَزَّلُ الْقُرْآنُ تُبْدَ لَكُمْ عَفَا اللَّهُ عَنْهَا ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ حَلِيمٌ

বাংলা অনুবাদ: হে বিশ্বাসীরা, এমন বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করো না, যা তোমাদের কাছে প্রকাশ করা হলে তোমাদের খারাপ লাগবে। কোরআন নাজিলের সময় সে বিষয়ে প্রশ্ন করলে তা তোমাদের কাছে প্রকাশ করা হবে। আল্লাহ সেসব ক্ষমা করেছেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহনশীল।

মুহাম্মদের সামনে প্রশ্নের পরিবেশে রাগ এবং তার পরে উমরের তওবার বক্তব্যও বুখারিতে আছে। অপছন্দের বিষয়ে বারবার প্রশ্ন করা হলে মুহাম্মদ রেগে যান। তিনি প্রশ্ন করতে বললে দুজন নিজেদের পিতার পরিচয় জানতে চান। তাঁর চেহারায় রাগের চিহ্ন দেখে উমর আল্লাহর কাছে তওবা করার কথা বলেন। নেতার প্রকাশ্য আবেগের প্রতিক্রিয়া ধর্মীয় ক্ষমা চাওয়ার আচরণে পরিণত হয়েছে। [369]

سُئِلَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَنْ أَشْيَاءَ كَرِهَهَا، فَلَمَّا أُكْثِرَ عَلَيْهِ غَضِبَ، ثُمَّ قَالَ لِلنَّاسِ سَلُونِي عَمَّا شِئْتُمْ. قَالَ رَجُلٌ مَنْ أَبِي قَالَ أَبُوكَ حُذَافَةُ. فَقَامَ آخَرُ فَقَالَ مَنْ أَبِي يَا رَسُولَ اللَّهِ فَقَالَ أَبُوكَ سَالِمٌ مَوْلَى شَيْبَةَ. فَلَمَّا رَأَى عُمَرُ مَا فِي وَجْهِهِ قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّا نَتُوبُ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ.

বাংলা অনুবাদ: নবীকে এমন কিছু বিষয়ে প্রশ্ন করা হলো যা তিনি অপছন্দ করেন। বেশি প্রশ্ন করা হলে তিনি রেগে যান। তারপর লোকদের বলেন: যা ইচ্ছা আমাকে জিজ্ঞেস করো। একজন বললেন, আমার পিতা কে? তিনি বললেন, তোমার পিতা হুজাফা। আরেকজন উঠে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমার পিতা কে? তিনি বললেন, তোমার পিতা শাইবার মুক্তদাস সালিম। উমর তাঁর চেহারার অবস্থা দেখে বললেন: হে আল্লাহর রাসুল, আমরা পরাক্রমশালী আল্লাহর কাছে তওবা করছি।

নেতার সামনে আচরণে ভুলের পরিণতি শুধু তাৎক্ষণিক তিরস্কারেও সীমিত ছিল না। হুজুরাতের ২ নম্বর আয়াতে তাঁর কণ্ঠের ওপরে কণ্ঠ তুললে অজান্তে সব কাজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার সতর্কতা আছে। সাধারণ সামাজিক সৌজন্যের প্রশ্নকে মানুষের ধর্মীয় কর্মের ফল এবং পরকালীন নিরাপত্তার সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। যাঁর সামনে কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণ করতে বলা হচ্ছে, তাঁর মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব তখন ঈমান ও আমলের ফলাফলের শর্ত হয়ে দাঁড়ায়। [370]

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَن تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ

বাংলা অনুবাদ: হে বিশ্বাসীরা, নবীর কণ্ঠের ওপরে নিজেদের কণ্ঠ তুলো না এবং নিজেদের মধ্যে যেমন উচ্চস্বরে কথা বলো, তাঁর সঙ্গে তেমন উচ্চস্বরে কথা বলো না; পাছে তোমাদের কাজ নষ্ট হয়ে যায়, অথচ তোমরা টেরও না পাও।

এই ভয়ের ব্যক্তিগত পরিণাম সাবিত ইবনে কায়েসের ঘটনায় স্পষ্ট। তিনি ঘরে মাথা নিচু করে বসেছিলেন এবং নিজের কাজ নষ্ট হয়ে নিজেকে জাহান্নামি মনে করছিলেন। কারণ তাঁর কণ্ঠ নবীর কণ্ঠের চেয়ে উঁচু হতো। পরে মুহাম্মদের পক্ষ থেকে জান্নাতের আশ্বাস পেলে তাঁর অবস্থা সম্পর্কে নতুন মূল্যায়ন আসে। শাস্তির ভয় এবং সেই ভয় থেকে অব্যাহতি—উভয়ের সিদ্ধান্ত ঘোষণাকারীর বক্তব্যের ওপর নির্ভর করছে। [371]

أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم افْتَقَدَ ثَابِتَ بْنَ قَيْسٍ، فَقَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَنَا أَعْلَمُ لَكَ عِلْمَهُ. فَأَتَاهُ فَوَجَدَهُ جَالِسًا فِي بَيْتِهِ مُنَكِّسًا رَأْسَهُ، فَقَالَ مَا شَأْنُكَ فَقَالَ شَرٌّ، كَانَ يَرْفَعُ صَوْتَهُ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ، وَهْوَ مِنْ أَهْلِ النَّارِ. فَأَتَى الرَّجُلُ فَأَخْبَرَهُ أَنَّهُ قَالَ كَذَا وَكَذَا. فَقَالَ مُوسَى بْنُ أَنَسٍ فَرَجَعَ الْمَرَّةَ الآخِرَةَ بِبِشَارَةٍ عَظِيمَةٍ، فَقَالَ اذْهَبْ إِلَيْهِ فَقُلْ لَهُ إِنَّكَ لَسْتَ مِنْ أَهْلِ النَّارِ، وَلَكِنْ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ.

বাংলা অনুবাদ: নবী সাবিত ইবনে কায়েসকে না দেখে তাঁর খোঁজ করলেন। একজন বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি তাঁর খবর এনে দিচ্ছি। তিনি গিয়ে দেখলেন, সাবিত নিজের ঘরে মাথা নিচু করে বসে আছেন। জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে? সাবিত নিজের বিষয়ে বললেন: মন্দ অবস্থা; সে নবীর কণ্ঠের ওপরে কণ্ঠ তুলত, তাই তার কাজ নষ্ট হয়ে গেছে এবং সে জাহান্নামিদের একজন। লোকটি ফিরে এসে তাঁর বক্তব্য জানালেন। মুসা ইবনে আনাস বলেন, পরে তিনি বিরাট সুসংবাদ নিয়ে ফিরে গেলেন। নবী বললেন: তার কাছে গিয়ে বলো, তুমি জাহান্নামিদের নও; তুমি জান্নাতিদের একজন।

ইবনে কাসির আয়াতের ব্যাখ্যায় মুহাম্মদের রাগ এবং আল্লাহর রাগের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তাঁর ভাষ্যে মুহাম্মদ রেগে গেলে আল্লাহও রেগে গিয়ে সেই ব্যক্তির কাজ নষ্ট করতে পারেন, অথচ ব্যক্তি তা জানতেও পারেন না। মানুষের আবেগের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াকে অদৃশ্য শাস্তির সঙ্গে যুক্ত করা হলে আচরণগত ভয় বহুগুণ বাড়ে। সামাজিক নেতা তখন নিজের সামনে কীভাবে কথা বলতে হবে সেই নির্দেশের পাশাপাশি পরকালীন নিরাপত্তার কেন্দ্রও হয়ে যান। [372]

أي : إنما نهيناكم عن رفع الصوت عنده خشية أن يغضب من ذلك ، فيغضب الله لغضبه ، فيحبط الله عمل من أغضبه وهو لا يدري

বাংলা অনুবাদ: অর্থাৎ তাঁর সামনে কণ্ঠস্বর উঁচু করতে তোমাদের নিষেধ করা হয়েছে এই আশঙ্কায় যে তিনি তাতে রেগে যাবেন; তাঁর রাগের কারণে আল্লাহও রেগে যাবেন এবং তাঁকে যে রাগিয়েছে তার কাজ আল্লাহ নষ্ট করে দেবেন, অথচ সে তা জানতেও পারবে না।

আশঙ্কার ক্ষেত্রউৎসে বর্ণিত পরিণতিআচরণে নিয়ন্ত্রণ
নিজের স্ত্রীর সঙ্গে কথাবার্তানিজেদের বিষয়ে নতুন কিছু নাজিল হওয়াখোলামেলা আচরণ এড়িয়ে চলা
অনুমোদিত বিষয়ে প্রশ্নপ্রশ্নের কারণে নতুন নিষেধপ্রশ্নকারীকে সমষ্টির ক্ষতির জন্য দায়ী করা
প্রকাশ পেলে কষ্ট হবে এমন তথ্যপ্রশ্ন করলে নাজিলের সময়ে প্রকাশজানার আগ্রহে সতর্কতা
নবীর সামনে উঁচু কণ্ঠকাজ নষ্ট ও পরকালীন শাস্তির ভয়কণ্ঠস্বর ও আচরণে আত্মসংযম
ঘোষণাকারীর মৃত্যুনিজেদের বিষয়ে নতুন ঘোষণার ভয় সরে যাওয়াআগের খোলামেলা কথাবার্তায় ফেরা

ইবনে উমরের বক্তব্যে মৃত্যুর পরের পরিবর্তনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন কোরআনিক ঘোষণা আসার আশঙ্কা যখন আর থাকে না, তখন আগের আচরণ ফিরে আসে। একই দাম্পত্য সম্পর্ক, একই ঘরের পরিসর, কিন্তু নতুন ওহির ভয় অনুপস্থিত। সেই কারণে মানুষের ব্যবহার বদলেছে। নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে নতুন বক্তব্য ঘোষিত হওয়ার সম্ভাবনা। তাঁর মৃত্যু সেই নির্দিষ্ট পথ বন্ধ করে দিয়েছে।

লাওহে মাহফুজে পূর্বলিখিত থাকার দাবি মানুষের কাছে ভবিষ্যতের ঘোষণাগুলো প্রকাশ করেনি। তাঁদের বাস্তব জীবনে নির্দেশের পরিসর তখনো খোলা ছিল। কিসে নতুন নিষেধ আসবে, কিসে তিরস্কার হবে, কোন প্রশ্নে অন্যদের ওপর নিয়ম বাড়বে—এসব নিয়ে তাঁরা চলমান অনিশ্চয়তায় ছিলেন। ধর্মতাত্ত্বিক পূর্বলিখনের ধারণার সঙ্গে সামাজিক জীবনের এই অজ্ঞাত ভবিষ্যৎ পাশাপাশি ছিল। সাহাবিদের আচরণের কারণ হিসেবে হাদিসে যে ভয়টি বর্ণিত, তা নতুন ঘোষণার এই বাস্তব সম্ভাবনার ভয়।

এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসের দাবি এবং ক্ষমতার কার্যকারিতা একসঙ্গে কাজ করে। ঘোষণাটিকে ঈশ্বরের বক্তব্য মনে করলে তার সম্ভাব্য নিন্দা মানুষের নিজের আচরণের ওপর আগাম বাধা তৈরি করে। এমনকি আগে থেকে স্পষ্টভাবে হারাম নয় এমন কাজও এড়িয়ে চলা নিরাপদ মনে হয়। ধর্মীয় কর্তৃত্বকে প্রতিবার সরাসরি নিষেধ দিতে হয় না; পরের আয়াতের আশঙ্কাই নিয়ন্ত্রণ ঘটাতে পারে। ইবনে উমরের স্মৃতিবর্ণনা সেই আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং তার মৃত্যুর পরে শিথিল হওয়ার সরাসরি সাক্ষ্য।


আবু হুরায়রাকে আঘাত করে সুসংবাদ প্রচার বন্ধ: নবীর নির্দেশে উমরের হস্তক্ষেপ

মুহাম্মদ আবু হুরায়রাকে একটি সুসংবাদ প্রচার করতে পাঠিয়েছিলেন। নিজের জুতা দিয়ে পাঠানো সেই বার্তার শর্ত ছিল হৃদয়ের নিশ্চয়তার সঙ্গে আল্লাহ ছাড়া উপাস্য নেই বলে সাক্ষ্য দেওয়া। আবু হুরায়রা প্রথমে উমরের মুখোমুখি হন। বার্তা শোনার পরে উমর তাঁর বুকে আঘাত করেন; তিনি নিতম্বের ওপর পড়ে যান। তাঁকে ফিরে যেতে বলা হয়। পরে মুহাম্মদের সামনে উমর নিজের যুক্তি জানান: লোকেরা শুধু এই সুসংবাদের ওপর নির্ভর করে বসে থাকতে পারে, তাই তাদের কাজ করতে দেওয়া হোক। মুহাম্মদ সেই কথায় সায় দেন। ঘোষিত নির্দেশের প্রচার একজন অনুসারীর হস্তক্ষেপে বন্ধ হওয়ার এই ঘটনাটি সহিহ মুসলিমে সংরক্ষিত।

বর্ণনার শুরুতে মুহাম্মদকে খুঁজে না পেয়ে সঙ্গীদের উদ্বেগ এবং আবু হুরায়রার একটি বাগানে গিয়ে তাঁকে পাওয়ার কথা আছে। মুহাম্মদ তাঁর নিজের জুতা আবু হুরায়রার হাতে দেন। ফলে বার্তাবাহক শুধু মৌখিক দাবি নিয়ে বের হননি; তাঁর সঙ্গে প্রেরকের দেওয়া পরিচয়ের চিহ্নও ছিল। প্রচারের জন্য কী বলতে হবে এবং কাকে বলতে হবে, সেই নির্দেশ স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়। [373]

فَقَالَ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ. وَأَعْطَانِي نَعْلَيْهِ قَالَ اذْهَبْ بِنَعْلَىَّ هَاتَيْنِ فَمَنْ لَقِيتَ مِنْ وَرَاءِ هَذَا الْحَائِطِ يَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ مُسْتَيْقِنًا بِهَا قَلْبُهُ فَبَشِّرْهُ بِالْجَنَّةِ.

বাংলা অনুবাদ: তিনি বললেন: হে আবু হুরায়রা। তিনি আমাকে তাঁর দুই জুতা দিয়ে বললেন: আমার এই দুই জুতা নিয়ে যাও। এই বাগানের বাইরে যার সঙ্গে দেখা হবে, সে যদি হৃদয়ের নিশ্চয়তার সঙ্গে সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তাহলে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।

সুসংবাদের শর্তে হৃদয়ের নিশ্চয়তার কথা আছে। বার্তাটি অনুসারীদের কাছে কীভাবে পৌঁছাবে, তার মাধ্যমও ঠিক করা হয়েছে। জুতা বহন করা প্রেরকের সঙ্গে দূতের সম্পর্কের একটি দৃশ্যমান নিদর্শন। এই অবস্থায় আবু হুরায়রা নিজের পছন্দে কোনো নতুন বিধান ঘোষণা করতে যাচ্ছিলেন না; তিনি সরাসরি দেওয়া আদেশ পালন করছিলেন। তাঁর পরের বাধা পাওয়া তাই বার্তাবাহকের কর্তব্যপালনের মাঝখানেই ঘটে।

উমর জুতার পরিচয় জানতে চাইলে আবু হুরায়রা প্রেরক ও বার্তা উভয়ের কথা জানান। তারপরই আঘাত আসে। বর্ণনায় আঘাতের স্থান, পড়ে যাওয়ার ফল, ফিরে যাওয়ার আদেশ এবং কান্নার অবস্থায় ফিরে আসা—সবই আছে। শারীরিক বলপ্রয়োগের মাধ্যমে একজন অনুমোদিত দূতের পথ আটকে দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় সংবাদ মানুষের কাছে পৌঁছানোর পথেও ক্ষমতার হস্তক্ষেপ ঘটেছে। [374]

فَكَانَ أَوَّلَ مَنْ لَقِيتُ عُمَرُ فَقَالَ مَا هَاتَانِ النَّعْلاَنِ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ. فَقُلْتُ هَاتَانِ نَعْلاَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بَعَثَنِي بِهِمَا مَنْ لَقِيتُ يَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ مُسْتَيْقِنًا بِهَا قَلْبُهُ بَشَّرْتُهُ بِالْجَنَّةِ. فَضَرَبَ عُمَرُ بِيَدِهِ بَيْنَ ثَدْيَىَّ فَخَرَرْتُ لاِسْتِي فَقَالَ ارْجِعْ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ فَرَجَعْتُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَجْهَشْتُ بُكَاءً وَرَكِبَنِي عُمَرُ فَإِذَا هُوَ عَلَى أَثَرِي.

বাংলা অনুবাদ: প্রথম যার সঙ্গে আমার দেখা হলো তিনি উমর। তিনি বললেন: আবু হুরায়রা, এই দুই জুতা কী? আমি বললাম: এগুলো রাসুলের জুতা। তিনি আমাকে এগুলো দিয়ে পাঠিয়েছেন, যার সঙ্গে দেখা হবে সে যদি হৃদয়ের নিশ্চয়তার সঙ্গে আল্লাহ ছাড়া উপাস্য নেই বলে সাক্ষ্য দেয়, তাহলে আমি তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দেব। তখন উমর আমার বুকের মাঝখানে হাত দিয়ে আঘাত করলেন। আমি নিতম্বের ওপর পড়ে গেলাম। তিনি বললেন: আবু হুরায়রা, ফিরে যাও। আমি রাসুলের কাছে ফিরে এসে কান্নায় ভেঙে পড়ার অবস্থায় পৌঁছালাম। উমরও আমার পিছু নিলেন; তিনি আমার পেছনেই ছিলেন।

বলা, শোনা, আঘাত করা এবং ফেরত পাঠানো—এখানে তথ্যের প্রবাহের সঙ্গে সহিংসতার যোগ নির্দিষ্ট। প্রচারের বিষয়বস্তু আগে জেনে নিয়েই উমর পথ বন্ধ করেছেন। আবু হুরায়রার ভূমিকা ছিল সুসংবাদ পৌঁছানো, উমরের ভূমিকা হয়েছে সেই প্রচার বন্ধ করে তাঁকে প্রেরকের কাছে ফেরত পাঠানো। বার্তা জানানোর কর্তৃত্ব থাকা এবং সেই কর্তৃত্ব বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারা এক বিষয় থাকেনি। প্রভাবশালী অনুসারীর শারীরিক ক্ষমতা দূতের কার্যক্রম থামিয়ে দিয়েছে।

মুহাম্মদ ফিরে আসার কারণ জানতে চাইলে আবু হুরায়রা আঘাত ও ফিরে যেতে বলার কথা জানান। মুহাম্মদ উমরকে প্রশ্ন করেন, তিনি কেন এমন করলেন। উমর প্রথমে নিশ্চিত হন যে আবু হুরায়রাকে এই সুসংবাদ দিতেই পাঠানো হয়েছিল। মুহাম্মদের “হ্যাঁ” উত্তরের পরে তিনি প্রচার না করার পক্ষে নিজের সামাজিক যুক্তি পেশ করেন। মানুষের কর্মপ্রেরণায় কী প্রভাব পড়বে, সেই বিবেচনা ঘোষিত আদেশের কার্যকারিতা বদলে দেয়। [375]

فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَا عُمَرُ مَا حَمَلَكَ عَلَى مَا فَعَلْتَ. قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي أَبَعَثْتَ أَبَا هُرَيْرَةَ بِنَعْلَيْكَ مَنْ لَقِيَ يَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ مُسْتَيْقِنًا بِهَا قَلْبُهُ بَشَّرَهُ بِالْجَنَّةِ. قَالَ نَعَمْ. قَالَ فَلاَ تَفْعَلْ فَإِنِّي أَخْشَى أَنْ يَتَّكِلَ النَّاسُ عَلَيْهَا فَخَلِّهِمْ يَعْمَلُونَ. قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَخَلِّهِمْ.

বাংলা অনুবাদ: রাসুল তাঁকে বললেন: উমর, কী কারণে তুমি এমন করলে? তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসুল, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গিত হোন; আপনি কি আবু হুরায়রাকে আপনার জুতা দিয়ে পাঠিয়েছিলেন, যাতে হৃদয়ের নিশ্চয়তার সঙ্গে আল্লাহ ছাড়া উপাস্য নেই বলে সাক্ষ্য দেওয়া কাউকে পেলে সে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়? তিনি বললেন: হ্যাঁ। উমর বললেন: তাহলে তা করবেন না। আমার আশঙ্কা, লোকেরা এর ওপরই নির্ভর করে থাকবে। তাদের কাজ করতে দিন। রাসুল বললেন: তাহলে তাদের ছেড়ে দাও।

ধাপসংরক্ষিত ঘটনাপ্রচারের ওপর ফল
আদেশজুতা দিয়ে আবু হুরায়রাকে সুসংবাদ জানাতে পাঠানোপ্রেরকের অনুমোদনসহ সংবাদ বহন
প্রথম সাক্ষাৎউমর বার্তার পরিচয় ও বিষয় জানেনবার্তাটি তাঁর সামনে পৌঁছায়
বলপ্রয়োগবুকে আঘাত, পড়ে যাওয়া ও ফিরে যেতে বলাপ্রচার কার্যক্রম থেমে যায়
প্রেরকের সামনে আলোচনামুহাম্মদ পাঠানোর কথা নিশ্চিত করেনআদেশের পরিচয় স্বীকৃত হয়
উমরের যুক্তিলোকে নির্ভর করে বসে থাকবে; তাদের কাজ করতে দেওয়া হোকঘোষিত প্রচার বন্ধের পক্ষে কর্মপ্রেরণার যুক্তি
পরের সিদ্ধান্তমুহাম্মদ সম্মতি দেনআগের প্রচার-নির্দেশ কার্যকর থাকে না

এই সিদ্ধান্তে সুসংবাদের সত্যতা এবং তা প্রচার করার নীতি পৃথক হয়ে যায়। মুহাম্মদ পাঠানোর কথা স্বীকার করেছেন। উমরের যুক্তি ছিল সেই বার্তা লোকের আচরণে কী প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ সত্য বলে গৃহীত কোনো ধর্মীয় সংবাদও সামাজিক ব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। অনুসারীদের কতটা আশ্বস্ত করা হবে এবং কতটা কর্মের চাপে রাখা হবে, সেই মূল্যায়নে বক্তব্যের প্রচার নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। ধর্মীয় তথ্যের প্রাপ্যতা এখানে নেতৃত্বের নীতিগত পছন্দের অধীন।

নওয়বী এই ঘটনা থেকে কিছু জ্ঞান প্রকাশ না করার অনুমতি এবং অনুসারীর পরামর্শে নেতার আগের নির্দেশ থেকে ফিরে আসার নীতি গ্রহণ করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় প্রত্যাহারের বিষয়টি স্পষ্ট। নেতা যে নির্দেশ দিয়েছেন, অনুসারী সেটির ভিন্ন সামাজিক ফল দেখালে নেতা সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেন। ধর্মীয় কর্তৃত্বের কার্যপ্রণালিতে পরামর্শ, সম্ভাব্য প্রভাবের হিসাব এবং আগের আদেশ প্রত্যাহার—এসব মানবীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপাদান হিসেবেই স্বীকৃত হয়েছে। [376]

وفيه جواز إمساك بعض العلوم التي لا حاجة إليها للمصلحة أو خوف المفسدة . وفيه إشارة بعض الأتباع على المتبوع بما يراه مصلحة ، وموافقة المتبوع له إذا رآه مصلحة ، ورجوعه عما أمر به بسببه.

বাংলা অনুবাদ: এতে কল্যাণের জন্য অথবা ক্ষতির আশঙ্কায় এমন কিছু জ্ঞান প্রকাশ না করার অনুমতি রয়েছে, যার প্রয়োজন নেই। এতে অনুসারীদের কারও পক্ষ থেকে নেতাকে নিজের বিবেচনায় কল্যাণকর পরামর্শ দেওয়া, নেতা সেটিকে কল্যাণকর মনে করলে তাতে সম্মতি দেওয়া এবং তার কারণে নিজের আগের নির্দেশ থেকে ফিরে আসার কথাও রয়েছে।

কোন জ্ঞান সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজন নেই, তা নির্ধারণের ক্ষমতাও এখানে কেন্দ্রীয়। জান্নাতের সংবাদ যাঁদের বিষয়ে, সেই বিশ্বাসীরা সেটি পাবেন কি না, তাঁদের আচরণ সম্পর্কে নেতাদের অনুমানের ওপর নির্ভর করছে। তাঁরা তথ্য জানলে অলস হয়ে যাবেন—এই ধারণা তথ্য আটকে রাখার যথেষ্ট কারণ হয়েছে। ফলে জ্ঞানের সত্যতা ছাড়াও প্রচারের দ্বিতীয় ছাঁকনি তৈরি হয়: শাসন ও অনুশাসনের সুবিধা। তথ্যের উপযোগিতা নেতৃত্বের চোখে বিচারিত হয়, তথ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত সাধারণ মানুষ সেই বাছাইয়ের নিয়ন্ত্রক থাকেন না।

আবু হুরায়রার আঘাত পাওয়ার ঘটনাটি এই ব্যবস্থার মূল্যও প্রকাশ করে। তিনি প্রাথমিক নির্দেশ পালন করতে গিয়ে শারীরিক আঘাত পান। পরে আলোচনা হয় মানুষের কর্মপ্রেরণা নিয়ে এবং তাঁর যাত্রা বন্ধ থাকে। দূতের ওপর বলপ্রয়োগই কার্যত বিষয়টিকে নতুন আলোচনায় নিয়ে আসে। অনুমোদিত আদেশ অনুসরণকারী ব্যক্তির নিরাপত্তার ওপর শক্তিশালী অনুসারীর সিদ্ধান্ত প্রাধান্য পেয়েছে। ধর্মীয় জ্ঞানের পরিবহন নিছক নিরপেক্ষ স্মৃতি ও বক্তব্যের যাত্রা হয়ে থাকেনি; তা ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে গেছে।

মুআজের নামে বুখারির বর্ণনাতেও একই ধরনের সংবাদ প্রচার বন্ধ রাখার ঘটনা আছে। হৃদয় থেকে সত্যভাবে আল্লাহ ও মুহাম্মদের প্রতি সাক্ষ্য দিলে আগুন থেকে রক্ষার কথা শুনে তিনি লোকদের জানাতে চান। মুহাম্মদ বলেন, তাহলে তারা এর ওপরই নির্ভর করে থাকবে। পরে মুআজ মৃত্যুর সময়ে পাপের আশঙ্কায় কথাটি জানান। তাৎক্ষণিক প্রচার বন্ধ রাখা এবং পরে না-জানানোর দায় অনুভব করা একই বর্ণনায় সংরক্ষিত। [377]

مَا مِنْ أَحَدٍ يَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ صِدْقًا مِنْ قَلْبِهِ إِلاَّ حَرَّمَهُ اللَّهُ عَلَى النَّارِ. قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَفَلاَ أُخْبِرُ بِهِ النَّاسَ فَيَسْتَبْشِرُوا قَالَ إِذًا يَتَّكِلُوا. وَأَخْبَرَ بِهَا مُعَاذٌ عِنْدَ مَوْتِهِ تَأَثُّمًا.

বাংলা অনুবাদ: যে ব্যক্তি নিজের অন্তর থেকে সত্যভাবে সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহ ছাড়া উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ তাকে আগুনের জন্য নিষিদ্ধ করেন। মুআজ বললেন: হে আল্লাহর রাসুল, আমি কি লোকদের কথাটি জানাব না, যাতে তারা আনন্দিত হয়? তিনি বললেন: তাহলে তারা এর ওপরই নির্ভর করে থাকবে। মুআজ মৃত্যুর সময়ে পাপের আশঙ্কায় কথাটি জানিয়েছিলেন।

মুআজের শেষ অবস্থান তথ্য আটকে রাখার মধ্যেকার দ্বন্দ্বও দেখায়। সংবাদ জানলে লোক অলস হতে পারে বলে একবার প্রচার বন্ধ হয়েছে; আবার না-জানানোর জন্য পাপের আশঙ্কায় পরে তা প্রকাশিত হয়েছে। ফলে অনুসারীদের কাছে কোন বাণী কখন পৌঁছাবে, তা শুধু ঘোষণার মুহূর্ত দিয়ে নির্ধারিত হচ্ছে না। যিনি মনে রেখেছেন তাঁর পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও দায়বোধও প্রচারের ইতিহাসের অংশ। একটি বক্তব্য জীবদ্দশায় সীমিত থাকতে পারে, পরে স্মৃতির মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে। বাণীর সামাজিক উপস্থিতির সময় তাই তার কথিত মূল উচ্চারণের সময়ের সমান নয়।

বুখারিতে আলীর একটি বক্তব্যেও শ্রোতার সামর্থ্য অনুযায়ী কথা বলার এবং আল্লাহ ও রাসুলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার আশঙ্কা এড়ানোর কথা রয়েছে। ধর্মীয় বক্তব্য প্রচারে বিষয়বস্তুর সত্যতার পাশাপাশি শ্রোতার প্রতিক্রিয়াকেও বাছাইয়ের মানদণ্ড করা হচ্ছে। কী বলা হবে, কতটা বলা হবে এবং কাকে বলা হবে—এই সিদ্ধান্তগুলো পরবর্তী ধর্মীয় জ্ঞানের পরিসর গঠনে ভূমিকা নেয়। [378]

وَقَالَ عَلِيٌّ حَدِّثُوا النَّاسَ، بِمَا يَعْرِفُونَ، أَتُحِبُّونَ أَنْ يُكَذَّبَ، اللَّهُ وَرَسُولُهُ؟

বাংলা অনুবাদ: আলী বলেছেন: মানুষের কাছে তারা যা বুঝতে পারে সেই কথাই বলো। তোমরা কি চাও যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হোক?

এই বক্তব্যের সঙ্গে আবু হুরায়রার ঘটনায় একটি সাধারণ কার্যপ্রণালি দেখা যায়: সংবাদ গ্রহণকারী সাধারণ মানুষের কাছে সমস্ত বক্তব্য সরাসরি উন্মুক্ত থাকে না। মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তি সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার মূল্যায়ন করেন এবং প্রচার সীমিত করেন। আবু হুরায়রার ক্ষেত্রে সেই সীমাবদ্ধতা বলপ্রয়োগ দিয়ে শুরু হয়েছে এবং পরে নেতৃত্বের অনুমোদন পেয়েছে। ফলে ধর্মীয় জ্ঞানের গঠন ও প্রচারে মধ্যস্থতাকারীর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। মৌখিকভাবে সংরক্ষিত বক্তব্যের ইতিহাস এই বাছাই ও নিয়ন্ত্রণের ইতিহাসও বহন করে।

ঘটনামানুষের আচরণ, আবেদন বা চাপঘোষণা ও ব্যবস্থায় ফল
রোজার রাতনিষেধ লঙ্ঘন, ক্ষুধা ও অভিযোগক্ষমা এবং রাতের সহবাস-পানাহারে নতুন অনুমতি
ইবনে উবাইয়ের জানাজামুহাম্মদের নির্বাচন ও উমরের আপত্তিজানাজার পরে ভবিষ্যতের জন্য নিষেধ
স্ত্রী প্রহারউমরের অভিযোগ; পরে নারীদের অভিযোগনিষেধ থেকে অনুমতি, তারপর প্রহারকারীর নিন্দা
দাম্পত্য বিশেষ সুবিধানারী সমর্পণ, গ্রহণের ইচ্ছা ও পালাব্যক্তিবিশেষের জন্য ছাড়; আয়েশার তির্যক মন্তব্য
নতুন আয়াতের ভয়ঘরের কথা ও আচরণ নিয়ে আশঙ্কাআত্মসংযম; মৃত্যুর পরে আশঙ্কার অবসান
সুসংবাদ প্রচারবার্তাবাহককে আঘাত ও কর্মপ্রেরণার যুক্তিআগের প্রচার-নির্দেশ থেকে ফিরে আসা

এগুলোর মধ্যে মানবীয় ভূমিকা কেবল বক্তব্য শুনে মুখস্থ করার মধ্যে সীমিত থাকেনি। কেউ প্রস্তাব দিয়েছেন, কেউ বাধা দিয়েছেন, কেউ বিধান ভেঙেছেন, কেউ অভিযোগ করেছেন, কেউ বার্তার প্রচার আটকে দিয়েছেন। পরবর্তী নির্দেশ, অনুমতি, নিষেধ, বিশেষ সুবিধা ও প্রচারের নীতি সেই কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত। ধর্মীয় গ্রন্থ ও হাদিসে সংরক্ষিত এই ঘটনাগুলো ঘোষণা তৈরির এবং ঘোষণার সামাজিক প্রয়োগের সক্রিয় মানবীয় ইতিহাস। নির্দেশের চূড়ান্ত রূপ হাতে থাকলেও সেই রূপে পৌঁছানোর বিরোধ ও পরিবর্তন উৎসের মধ্যে মুছে যায়নি।

আবু হুরায়রার ঘটনা এই ইতিহাসে বিশেষভাবে তীক্ষ্ণ, কারণ প্রেরক নিজের আদেশ দিয়েছেন এবং পরে অনুসারীর পরামর্শে সেই আদেশের প্রচার বন্ধ করেছেন। প্রথম আদেশের পরিচয় নিশ্চিত করেই পরিবর্তন গৃহীত হয়েছে। ধর্মীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে মানবীয় পরিণামের হিসাব, প্রভাবশালী ব্যক্তির মত এবং তথ্য নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন কাজ করেছে। অনুসারীর স্বতন্ত্র হস্তক্ষেপ ঘোষণাকারীর কার্যকর সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পেরেছে। ওহি ও নবীনির্দেশের চারপাশে গড়ে ওঠা এই ক্ষমতার সম্পর্ক পরবর্তী সংরক্ষণ ও সংকলনের কর্তৃত্বকে বোঝারও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।


ওহি লেখকদের ধর্মত্যাগ: শব্দবদলের অভিযোগ, প্রাণদণ্ড ও পুনর্বাসন

ওহি লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব পাওয়া মানে ঘোষিত বাণীর খুব কাছে অবস্থান করা। লেখক শুনতেন, লিখতেন এবং কখনো লেখা পড়ে শোনাতেন। সেই দায়িত্বে থাকা কারও ধর্মত্যাগ ও বাণীর উৎস সম্পর্কে আপত্তি তাই কোরআনের উৎপত্তির ইতিহাসে সরাসরি প্রাসঙ্গিক। ইসলামি বর্ণনাসাহিত্যে এমন দুই লেখকের খবর আছে: নামহীন এক খ্রিষ্টান ব্যক্তি এবং আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ। একজনের অভিযোগের পরে আসে কবর থেকে মৃতদেহ বেরিয়ে পড়ার কাহিনি; অন্যজনের ক্ষেত্রে শব্দ প্রতিস্থাপনের অভিযোগ, হত্যার নির্দেশ, উসমানের মধ্যস্থতা এবং পরবর্তী প্রশাসনিক উত্থানের বিবরণ। এখানে লেখার প্রক্রিয়া, ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

নামহীন খ্রিষ্টান লেখক: ধর্মত্যাগ ও মুহাম্মদের জ্ঞান সম্পর্কে তাঁর অভিযোগ

আনাস ইবনে মালিকের নামে সংরক্ষিত বুখারির বর্ণনায় একজন খ্রিষ্টান ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন, সুরা বাকারা ও আলে ইমরান পড়েন এবং মুহাম্মদের জন্য লিখতে শুরু করেন। পরে তিনি নিজের আগের ধর্মে ফিরে যান। বর্ণনাটি তাঁর নাম জানায় না; কিন্তু তাঁর শিক্ষা ও লেখকের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে। বাণী লিপিবদ্ধ করার কাজে যুক্ত এই ব্যক্তি সেই কাজ ছেড়ে বাণীর ঘোষণাকারীর জ্ঞান সম্পর্কে অভিযোগ তুলেছিলেন। তাঁর আপত্তির পটভূমি ছিল সহযোগী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা। অভিযোগটি হলো, মুহাম্মদ তাঁর লিখে দেওয়া বিষয়ের অতিরিক্ত কিছু জানতেন না। [379] [380]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬১/ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য
পরিচ্ছেদঃ ৬১/২৫. ইসলামে নুবুওয়াতের নিদর্শনাবলী।
৩৬১৭. আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক খ্রিস্টান ব্যক্তি মুসলিম হল এবং সূরা বাকারাহ ও সূরা আলে-ইমরান শিখে নিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য সে ওহী লিখত। অতঃপর সে আবার খ্রিস্টান হয়ে গেল। সে বলতে লাগল, আমি মুহাম্মাদ -কে যা লিখে দিতাম তার চেয়ে বেশি কিছু তিনি জানেন না। (নাউজুবিল্লাহ) কিছুদিন পর আল্লাহ্ তাকে মৃত্যু দিলেন। খ্রিস্টানরা তাকে দাফন করল। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল, কবরের মাটি তাকে বাইরে নিক্ষেপ করে দিয়েছে। এটা দেখে খ্রিস্টানরা বলতে লাগল- এটা মুহাম্মাদ এবং তাঁর সাহাবীদেরই কাজ। যেহেতু আমাদের এ সাথী তাদের হতে পালিয়ে এসেছিল। এ জন্যই তারা আমাদের সাথীকে কবর হতে উঠিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে। তাই যতদূর পারা যায় গভীর করে কবর খুঁড়ে তাকে আবার দাফন করল। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল, কবরের মাটি তাকে আবার বাইরে ফেলে দিয়েছে। এবারও তারা বলল, এটা মুহাম্মাদ ও তাঁর সাহাবীদের কান্ড। তাদের নিকট হতে পালিয়ে আসার কারণে তারা আমাদের সাথীকে কবর হতে উঠিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে। এবার আরো গভীর করে কবর খনন করে দাফন করল। পরদিন ভোরে দেখা গেল কবরের মাটি এবারও তাকে বাইরে নিক্ষেপ করেছে। তখন তারাও বুঝল, এটা মানুষের কাজ নয়। কাজেই তারা লাশটি ফেলে রাখল। (মুসলিম ৫০/৫০ হাঃ ২৭৮১, আহমাদ ১৩৩২৩) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৩৪৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৩৫৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

কোরআন সংকলন 56

অভিযোগের আরবি বাক্যে “আমি তাঁর জন্য যা লিখেছি” এবং “মুহাম্মদ জানেন না”—এই দুই অংশ মুখোমুখি দাঁড়ায়। এর মাধ্যমে লেখক নিজের ভূমিকা নিছক শ্রুতিলিখনের নিচে নামিয়ে রাখছেন না; তিনি ঘোষণাকারীর জ্ঞানের ওপর নিজের লিখিত কাজের প্রাধান্য দাবি করছেন। তাঁর বক্তব্যের আঘাত নবুয়তের কেন্দ্রেই: যে ব্যক্তি বাইরের উৎস থেকে বাণী পাওয়ার দাবি করছেন, তাঁর জ্ঞান যদি লেখকের দেওয়া কথার ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেই দাবির ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। বুখারি অভিযোগের এই বাক্যটি মুছে দেননি; তাঁর সংকলনেই তা রয়েছে। [381]

فَعَادَ نَصْرَانِيًّا فَكَانَ يَقُولُ مَا يَدْرِي مُحَمَّدٌ إِلاَّ مَا كَتَبْتُ لَهُ

বাংলা অনুবাদ: সে আবার খ্রিস্টান হয়ে গেল এবং বলতে লাগল, আমি তার জন্য যা লিখেছি, মুহাম্মদ তার বেশি কিছু জানে না।

বর্ণনাটির ঘটনাক্রমও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমে খ্রিষ্টান পরিচয়, পরে ইসলাম গ্রহণ ও দুটি বড় সুরা অধ্যয়ন, তারপর মুহাম্মদের লেখক হওয়া, তার পরে ধর্মত্যাগ এবং অভিযোগ। মাঝখানে ইসলামি শিক্ষায় অংশ নেওয়া এবং লেখার দায়িত্ব পালনের পর্যায় তাঁর পরবর্তী আপত্তিকে একটি নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার ভিত্তি দেয়। ধর্মে প্রবেশের সময় যাঁর শিক্ষা ও লেখার দক্ষতা কাজে লেগেছিল, ধর্ম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরে সেই একই ব্যক্তির অভিজ্ঞতা নবুয়তের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যের রূপ নেয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে এই ধরনের বিরোধিতা অস্বস্তিকর, কারণ আপত্তিকারী প্রতিষ্ঠানের কাজের ভেতরের একটি অবস্থান থেকে কথা বলছেন।

অভিযোগের পরে বর্ণনা তাঁর লেখা কোনো পাণ্ডুলিপি হাজির করে না। কোন বাক্য তিনি নিজে তৈরি করেছিলেন, কোন বাক্য মুহাম্মদ আগে বলেছিলেন, দুটির মধ্যে কোথায় মিল বা অমিল ছিল—তার কোনো তুলনা নেই। গল্পটি দ্রুত তাঁর মৃত্যু ও কবরের দিকে চলে যায়। লেখকের জ্ঞানের দাবি পরীক্ষা করার পরিবর্তে তাঁর মৃতদেহের ভয়াবহ পরিণতি কেন্দ্রীয় দৃশ্যে পরিণত হয়। এই বিন্যাসে ধর্মত্যাগীর বক্তব্যের বিচার তাঁর লিখিত কাজ দিয়ে হয় না; তাঁর দেহকে ঘিরে বর্ণিত শাস্তি দিয়ে তাঁর অবস্থানকে ধর্মীয়ভাবে পরাজিত দেখানো হয়। বাণীর উৎস সম্পর্কে একটি অভিযোগের উত্তরে অলৌকিক প্রতিহিংসার কাহিনি দাঁড় করানো হয়েছে।

বর্ণনায় লেখকের অবস্থাননির্দিষ্ট তথ্যঅভিযোগের তাৎপর্য
ধর্মে প্রবেশখ্রিষ্টান পরিচয় থেকে ইসলাম গ্রহণতিনি ইসলাম সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ বাইরের ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপিত নন
ধর্মীয় পাঠে অংশগ্রহণবাকারা ও আলে ইমরান পড়াঘোষিত বাণীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় বর্ণিত হয়েছে
লেখার দায়িত্বমুহাম্মদের জন্য লিখতেনঅভিযোগের পটভূমি হলো বাণী লিপিবদ্ধ করার কাজ
ধর্মত্যাগের পর বক্তব্যমুহাম্মদ তাঁর লিখে দেওয়া কথার বেশি জানতেন নাবাণীর উৎস ও ঘোষণাকারীর জ্ঞানের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ
কাহিনির সমাপ্তিমৃতদেহ কবরের বাইরে পাওয়ার পুনরাবৃত্তিঅভিযোগের পাঠগত পরীক্ষার জায়গায় শাস্তির দৃশ্য প্রধান হয়েছে

এই কাহিনির ভয় তৈরির ক্ষমতা অভিযোগটির বিষয়বস্তুর চেয়ে ভিন্ন পথে কাজ করে। ধর্মত্যাগীর শরীরকে মাটিও গ্রহণ করে না—এমন ছবি অনুসারীর কাছে ধর্ম থেকে বেরিয়ে যাওয়াকে আতঙ্কের বিষয় করে তোলে। বর্তমানে মারা যাওয়া ইসলামত্যাগী ও মুহাম্মদের সমালোচকদের সবার ক্ষেত্রে এমন পরিণতির কোনো সাধারণ নিয়ম দেখা যায় না। বর্ণনাটি নিজেও কোনো নিয়মিত যাচাইয়ের পদ্ধতি দেয় না; একটি বিশেষ পরিণতিকে নবুয়তের পক্ষে নিদর্শন করে। ফলে গল্পটির সামাজিক কাজ হলো ধর্মত্যাগের বিরুদ্ধে ভয় উৎপাদন করা, অথচ লেখকের অভিযোগে উত্থাপিত লেখক ও ঘোষণাকারীর সম্পর্কের প্রশ্নটি অমীমাংসিত থাকে।


বুখারি ও মুসলিমে লেখকের বক্তব্য এবং মৃতদেহের কাহিনির ভিন্ন রূপ

মুসলিমের সংকলনে একই আনাসের নামে বনি নাজ্জারের একজন লেখকের বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানেও বাকারা ও আলে ইমরান পড়া এবং মুহাম্মদের জন্য লেখার কথা আছে। ব্যক্তি পালিয়ে আহলে কিতাবের কাছে গেলে তারা তাঁকে গুরুত্ব দেয়, কারণ তিনি মুহাম্মদের লেখক ছিলেন। পরে তাঁর মৃত্যু এবং দেহ বারবার কবরের বাইরে পাওয়ার কাহিনি আসে। মুসলিমের এই পাঠে “মুহাম্মদ আমি যা লিখেছি তার বেশি জানেন না”—এই প্রত্যক্ষ অভিযোগের বাক্যটি নেই। এখানে পাঠের পার্থক্য নির্দিষ্ট: বুখারিতে অভিযোগ ও মৃতদেহের কাহিনি পাশাপাশি আছে; মুসলিমে লেখকের প্রস্থান, আহলে কিতাবের সম্মান এবং মৃতদেহের কাহিনি আছে। [382]

كَانَ مِنَّا رَجُلٌ مِنْ بَنِي النَّجَّارِ قَدْ قَرَأَ الْبَقَرَةَ وَآلَ عِمْرَانَ وَكَانَ يَكْتُبُ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَانْطَلَقَ هَارِبًا حَتَّى لَحِقَ بِأَهْلِ الْكِتَابِ قَالَ فَرَفَعُوهُ قَالُوا هَذَا قَدْ كَانَ يَكْتُبُ لِمُحَمَّدٍ فَأُعْجِبُوا بِهِ فَمَا لَبِثَ أَنْ قَصَمَ اللَّهُ عُنُقَهُ فِيهِمْ فَحَفَرُوا لَهُ فَوَارَوْهُ فَأَصْبَحَتِ الأَرْضُ قَدْ نَبَذَتْهُ عَلَى وَجْهِهَا ثُمَّ عَادُوا فَحَفَرُوا لَهُ فَوَارَوْهُ فَأَصْبَحَتِ الأَرْضُ قَدْ نَبَذَتْهُ عَلَى وَجْهِهَا ثُمَّ عَادُوا فَحَفَرُوا لَهُ فَوَارَوْهُ فَأَصْبَحَتِ الأَرْضُ قَدْ نَبَذَتْهُ عَلَى وَجْهِهَا فَتَرَكُوهُ مَنْبُوذًا ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আমাদের মধ্যকার বনি নাজ্জারের এক ব্যক্তি বাকারা ও আলে ইমরান পড়েছিলেন এবং আল্লাহর রাসুলের জন্য লিখতেন। তিনি পালিয়ে আহলে কিতাবের কাছে চলে গেলেন। তারা তাঁকে মর্যাদা দিল এবং বলল, এই ব্যক্তি মুহাম্মদের জন্য লিখতেন; তারা তাঁকে নিয়ে মুগ্ধ হলো। অল্পদিনের মধ্যেই আল্লাহ তাদের মধ্যে তাঁকে ধ্বংস করলেন। তারা তাঁর জন্য কবর খুঁড়ে তাঁকে ঢেকে দিল। সকালে দেখা গেল, মাটি তাঁকে নিজের ওপরে ফেলে দিয়েছে। তারা আবার কবর খুঁড়ে তাঁকে ঢেকে দিল; সকালে দেখা গেল, মাটি তাঁকে নিজের ওপরে ফেলে দিয়েছে। তারা আবার কবর খুঁড়ে তাঁকে ঢেকে দিল; সকালে দেখা গেল, মাটি তাঁকে নিজের ওপরে ফেলে দিয়েছে। তখন তারা তাঁকে বাইরে পড়ে থাকা অবস্থাতেই রেখে দিল।

আহলে কিতাবের কাছে তাঁর মর্যাদার কারণটিও লেখকের দায়িত্ব। মুসলিমের বয়ানে তাঁর পরিচিতি ছিল “মুহাম্মদের জন্য লিখতেন”—এটি। অর্থাৎ ইসলামি শিবির ছাড়ার পরেও তাঁর লেখক পরিচয় সামাজিক মূল্য হারায়নি; ভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছে সেটিই বিশেষ জ্ঞানের পরিচয় হয়ে উঠেছিল। এই জায়গাটি দুই বর্ণনার মিলকে আরও নির্দিষ্ট করে: ধর্মান্তর ও প্রত্যাবর্তনের ঘটনাটি লেখার কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বুখারির বক্তব্যে লেখক সেই কাজের ভিত্তিতে মুহাম্মদের জ্ঞানের বিরুদ্ধে কথা বলেন; মুসলিমের বক্তব্যে অপর সম্প্রদায় সেই কাজের কারণেই তাঁকে গুরুত্ব দেয়।

বুখারির কাহিনিতে মৃতদেহ কবরের বাইরে পাওয়ার পরে খ্রিষ্টানদের প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। তারা মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদের ওপর মৃতদেহ তুলে ফেলার অভিযোগ করে; পরে আরও গভীর কবর খুঁড়ে একই ফল পাওয়ার কথা বলা হয়। শেষে বর্ণনা জানায়, তারা বুঝেছিল এটি মানুষের কাজ নয়। বুখারির পাঠে তাই একটি ছোট বিতর্কের কাঠামো আছে: মানুষের কাজ হওয়ার অভিযোগ, গভীরতর কবর, পুনরাবৃত্ত ফল এবং অলৌকিক সিদ্ধান্ত। মুসলিমের পাঠ অনেক সংক্ষিপ্ত; সেখানে একইভাবে খ্রিষ্টানদের অভিযোগ ও প্রতিবারের বিস্তারিত বিতর্ক নেই। বর্ণনার বিস্তার, অভিযোগের উপস্থিতি এবং অলৌকিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর উপস্থাপনা—তিন ক্ষেত্রেই পার্থক্য রয়েছে।

তুলনার বিষয়বুখারি ৩৬১৭মুসলিম ২৭৮১
প্রাথমিক পরিচয়খ্রিষ্টান থেকে মুসলিম, পরে আবার খ্রিষ্টানআমাদের মধ্যকার বনি নাজ্জারের ব্যক্তি; পরে আহলে কিতাবের কাছে যাওয়া
শিক্ষা ও দায়িত্ববাকারা ও আলে ইমরান পড়া; মুহাম্মদের জন্য লেখাবাকারা ও আলে ইমরান পড়া; মুহাম্মদের জন্য লেখা
মুহাম্মদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বক্তব্য“আমি যা লিখেছি তার বেশি জানেন না”—বাক্যটি আছেএই বাক্যটি নেই
অপর সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়াদাফন ও মৃতদেহ বেরিয়ে আসার ব্যাখ্যা নিয়ে তাদের বক্তব্য আছেলেখক পরিচয়ের কারণে তাঁকে মর্যাদা ও প্রশংসা করার কথা আছে
মৃতদেহের বিবরণগভীরতর কবর এবং মানুষের কাজ হওয়ার অভিযোগসহ বিস্তৃত কাহিনিদাফন ও মাটি থেকে বাইরে পড়ে থাকার পুনরাবৃত্ত সংক্ষিপ্ত বিবরণ
বর্ণনার সূত্রআনাস ইবনে মালিকআনাস ইবনে মালিক

লুলু ওয়াল মারজানে একই প্রসঙ্গে যে পূর্ণ বাংলা বর্ণনাটি পাওয়া যায়, তাতে অভিযোগের বাক্যসহ বুখারির বিস্তৃত কাহিনি আছে এবং শেষে বুখারি ও মুসলিম উভয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংকলনটির উদ্ধৃতি নিচে সম্পূর্ণ রয়েছে। দুটি মূল সংকলনের আলাদা পাঠের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, সমান্তরাল সূত্রের নির্দেশ এবং প্রতিটি গ্রন্থে হুবহু একই বাক্য থাকা দুটি পৃথক বিষয়। [383]

আল-লুলু ওয়াল মারজান
৫০/ মুনাফিক ও তাদের হুকুম
পরিচ্ছেদঃ (মুনাফিক ও তাদের হুকুম)
১৭৭২. আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক খ্রিস্টান ব্যক্তি মুসলিম হল এবং সূরাহ বাকারাহ ও সূরাহ আলে-ইমরান শিখে নিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য সে ওহী লিখত। অতঃপর সে আবার খ্রিস্টান হয়ে গেল। সে বলতে লাগল, আমি মুহাম্মাদ-কে যা লিখে দিতাম তার চেয়ে বেশি কিছু তিনি জানেন না। (নাউজুবিল্লাহ) কিছুদিন পর আল্লাহ্ তাকে মৃত্যু দিলেন। খ্রিস্টানরা তাকে দাফন করল। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল, কবরের মাটি তাকে বাইরে নিক্ষেপ করে দিয়েছে। এটা দেখে খ্রিস্টানরা বলতে লাগল- এটা মুহাম্মাদ এবং তার সাহাবীদেরই কাজ। যেহেতু আমাদের এ সাথী তাদের হতে পালিয়ে এসেছিল। এ জন্যই তারা আমাদের সাথীকে কবর হতে উঠিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে। তাই যতদূর পারা যায় গভীর করে কবর খুঁড়ে তাকে আবার দাফন করল। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল, কবরের মাটি তাকে আবার বাইরে ফেলে দিয়েছে। এবারও তারা বলল, এটা মুহাম্মাদ ও তাঁর সাহাবীদের কাণ্ড। তাদের নিকট হতে পালিয়ে আসার কারণে তারা আমাদের সাথীকে কবর হতে উঠিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে। এবার আরো গভীর করে কবর খনন করে দাফন করল। পরদিন ভােরে দেখা গেল কবরের মাটি এবারও তাকে বাইরে নিক্ষেপ করেছে। তখন তারাও বুঝল, এটা মানুষের কাজ নয়। কাজেই তারা লাশটি ফেলে রাখল।
সহীহুল বুখারী, পর্ব ৬১ : মর্যাদা ও গুণাবলী, অধ্যায় ২৫, হাঃ ৩৬১৭; মুসলিম, পর্ব ৫০ : মুনাফিক ও তাদের হুকুম, অধ্যায়, হাঃ ২৭৮১
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

দুটি সংকলনের অস্তিত্ব একই ঘটনার দুই স্বাধীন প্রত্যক্ষদর্শী তৈরি করে না। উভয় বর্ণনাই আনাসের নামে সংরক্ষিত, যদিও তাঁর পরে বর্ণনার পথ ও ভাষা পৃথক হয়েছে। এই পার্থক্য থেকে বর্ণনার সংরক্ষণ ও প্রচারের ইতিহাস পাওয়া যায়। অভিযোগের বাক্য মুসলিমের এই পাঠে অনুপস্থিত—এটিও সেই ইতিহাসের একটি তথ্য। অনুপস্থিতির কারণ সম্পর্কে সংকলক নিজের কোনো বক্তব্য দেননি। বুখারির পাঠে অভিযোগটি স্পষ্ট এবং মৃতদেহের কাহিনিও স্পষ্ট; অভিযোগের ভাষাকে ধর্মীয়ভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে মুছে দিলে মূল হাদিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশই মুছে যায়।

উভয় পাঠের শেষের অলৌকিক দৃশ্য একই ধরনের যুক্তির কাজ করে: ধর্মত্যাগের পরে ভয়াবহ পরিণতি ঘটেছে, তাই ধর্মত্যাগীর অবস্থান পরাজিত। কিন্তু মৃত্যু, দাফন এবং কবরের বাইরে দেহ পাওয়ার বর্ণনা থেকে লেখার সময়ের বাক্যগুলোর উৎস নির্ধারিত হয় না। তাঁর লিখিত বিষয় এবং মুহাম্মদের ঘোষিত বিষয় মিলিয়ে দেখার প্রশ্ন সম্পূর্ণ আলাদা। “সহিহ” হাদিসশাস্ত্রের অভ্যন্তরীণ শ্রেণিবিভাগ; কোনো অলৌকিক ঘটনার স্বাধীন পর্যবেক্ষণ, কবরের নিরপেক্ষ পরীক্ষা কিংবা লেখকের অভিযোগের পাঠগত খণ্ডন এর দ্বারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয় না। এখানে বর্ণনার ধর্মীয় মর্যাদা অভিযোগের উত্তর হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে, অথচ অভিযোগের নির্দিষ্ট বিষয় পরীক্ষা করার উপকরণ বর্ণনাটিতে নেই।


কবর থেকে মৃতদেহ সরানোর অভিযোগ: আয়েশার বর্ণনায় মুহাম্মদের গোপন রাতের কবরস্থান-গমন

ধর্মত্যাগী খ্রিষ্টান ওহি-লেখকের মৃতদেহ বারবার কবরের বাইরে পাওয়া যাওয়ার ঘটনায় খ্রিষ্টানরা মুহাম্মদ ও তাঁর সাহাবিদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, লেখক তাঁদের দল ত্যাগ করে খ্রিষ্টানদের কাছে ফিরে আসায় মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরাই প্রতিশোধ হিসেবে মৃতদেহ কবর থেকে তুলে বাইরে ফেলে দিয়েছেন। বুখারির বর্ণনায় এই অভিযোগ একবার নয়, দুবার এসেছে। খ্রিষ্টানরা প্রথমবার আরও গভীর করে কবর খুঁড়েছিলেন, দ্বিতীয়বার আরও গভীরভাবে দাফন করেছিলেন। প্রতিবারই মৃতদেহ বাইরে পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কবরের কাছে রাতে কে এসেছিল, মৃতদেহ কীভাবে বাইরে এল অথবা সেখানে মানুষের কোনো হস্তক্ষেপ হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে কোনো প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানের বিবরণ নেই। পরিবর্তে কাহিনির সমাপ্তিতে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে, কবরের মাটিই অলৌকিকভাবে মৃতদেহ বাইরে নিক্ষেপ করেছিল। এভাবে মানুষের হস্তক্ষেপের একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগকে অলৌকিক ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। [384]

এই অভিযোগের সঙ্গে মুহাম্মদের রাতের চলাফেরা সম্পর্কে আয়েশার একটি স্বতন্ত্র প্রত্যক্ষ বর্ণনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আয়েশা জানিয়েছেন, তাঁর পালার রাতে মুহাম্মদ তাঁকে ঘুমন্ত মনে করে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চাদর নেন, জুতা পরেন এবং নিঃশব্দে দরজা খুলে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। আয়েশা গোপনে তাঁর পিছু নেন এবং দেখতে পান, মুহাম্মদ গভীর রাতে বাকির কবরস্থানে গিয়েছেন। সেখানে তিনি দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন এবং তিনবার হাত তোলেন। পরে ফিরে আসার সময় আয়েশাকে অনুসরণ করতে দেখে দ্রুত হাঁটতে ও দৌড়াতে শুরু করেন। আয়েশাও দৌড়ে আগে ঘরে ফিরে আসেন। মুহাম্মদ ঘরে এসে তাঁর হাঁপানোর কারণ জানতে চান। আয়েশা প্রথমে বিষয়টি গোপন রাখলেও মুহাম্মদ বলেন, তিনি নিজে না জানালে সর্বজ্ঞ আল্লাহ তাঁকে জানিয়ে দেবেন। আয়েশা অনুসরণের কথা স্বীকার করলে মুহাম্মদ তাঁর বুকে এমন আঘাত করেন, যাতে তিনি ব্যথা পান। [385] [386]

দুটি বর্ণনা পাশাপাশি রাখলে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। প্রথম ঘটনায় খ্রিষ্টানরা অভিযোগ করেছেন যে মুহাম্মদ ও তাঁর সাহাবিরা রাতের অন্ধকারে কবর থেকে মৃতদেহ বের করে ফেলছেন। দ্বিতীয় ঘটনায় মুহাম্মদের নিজের স্ত্রীর প্রত্যক্ষ বর্ণনায় তাঁর নিঃশব্দে রাতের বেলা কবরস্থানে যাওয়ার ঘটনা পাওয়া যায়। আয়েশাকে ঘুমন্ত রেখে বের হওয়া, অনুসরণ করতে দেখে দ্রুত ফিরে আসা, পরে জিজ্ঞাসাবাদ এবং অনুসরণের কথা স্বীকার করায় আঘাত—সবকিছুই তাঁর নিজের রাতের কবরস্থান-গমনের ঘটনাক্রমে সংরক্ষিত। অতএব খ্রিষ্টানদের অভিযোগে উত্থাপিত মানুষের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কোনো ভিত্তিহীন কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কবরস্থানে রাতের বেলা গোপনে যাতায়াতের বাস্তব নজির মুহাম্মদের জীবনসংক্রান্ত হাদিসেই রয়েছে। মৃতদেহ নিজে থেকে কবরের বাইরে উঠে এসেছিল, নাকি কেউ তাকে বাইরে ফেলেছিল—প্রথম ঘটনাটির এই মৌলিক প্রশ্ন অলৌকিক ব্যাখ্যা দিয়ে মীমাংসিত হয় না।

সূনান নাসাঈ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৭/ স্ত্রীর সাথে ব্যবহার
পরিচ্ছেদঃ ৪. আত্মাভিমান
৩৯৬৫. সুলায়মান ইবন দাউদ (রহঃ) … মুহাম্মদ ইবন কায়স (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়েশা (রাঃ) থেকে শুনেছি, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আমার ব্যাপারে কি তোমাদেরকে বর্ণনা করব না? আমরা বললাম, কেন করবেন না? তিনি বললেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার পালার রাতে (ইশার সালাত আদায়ের পর) ফিরে আসলেন। তারপর তার জুতা পায়ের দিকে রাখলেন, তাঁর চাদর রেখে দিলেন এবং তাঁর একটি লুঙ্গি বিছানার উপর বিছালেন।
তারপর তিনি মাত্র এতটুকু সময় অবস্থান করলেন যতক্ষণে তাঁর ধারণা হল যে, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। তারপর উঠে আস্তে করে জুতা পরলেন এবং আস্তে করে তার চাদর নিলেন। তারপর আস্তে করে দরজা খুললেন এবং বের হয়ে আস্তে দরজা চাপিয়ে দিলেন। আর আমি মাথার উপর দিয়ে কামিজটি পরিধান করলাম, ওড়না পরলাম এবং চাদরটি গায়ে আবৃত করলাম ও তার পিছনে চললাম, তিনি বাকীতে আসলেন এবং তিনবার হাত উঠালেন ও বহুক্ষণ দাঁড়ালেন, তারপর ফিরে আসছিলেন। আমিও ফিরে আসছিলাম। তিনি একটু তীব্রগতিতে চললেন, আমিও তীব্রগতিতে চললাম, তিনি দৌড়ালেন, আমিও দৌড়ালাম। তিনি পৌছে গেলেন, তবে আমি তার আগে পৌছে গেলাম।
ঘরে প্রবেশ করেই শুয়ে পড়লাম। তিনিও প্রবেশ করলেন এবং বললেনঃ হে আয়েশা! কি হয়েছে তোমার পেট যে ফুলে গেছে।
বর্ণনাকারী সুলায়মান বলেন, ইবন ওয়াহাব (رابية) এর পরিবর্তে (حشيا) দ্রুত চলার কারণে হাঁপিয়ে ওঠা শব্দটি বলেছেন বলে ধারণা করছি। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ঘটনা কি বল, নচেৎ আল্লাহ্ যিনি সূক্ষ্মদর্শী ও সম্যক পরিজ্ঞাত, তিনিই আমাকে খবর দিবেন।
আমি বললাম, আমার পিতামাতা আপনার প্রতি উৎসর্গ হোক এবং ঘটনাটির বর্ণনা দিলাম। রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে তুমিই সেই (ছায়ামূর্তি) যা আমি আমার সামনে দেখছিলাম? আমি বললাম, হ্যাঁ। আয়েশা (রাঃ) বললেন, এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বক্ষে একটি মুষ্ঠাঘাত করলেন যা আমাকে ব্যথা দিল। তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি কি ধারণা করেছ আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল তোমার উপর যুলুম করবে? আয়েশ্ম (রাঃ) বললেন, লোক যতই গোপন করুক না কেন, আল্লাহ্ তা নিশ্চিত জানেন।
রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ নিশ্চয়ই তুমি যখন আমাকে দেখছিলে তখন জিবরীল (আঃ) আমার কাছে এসেছিলেন। তুমি যে (শুয়ে যাওয়ায়) কাপড় খুলে ফেলেছ। তাই জিবরীল (আঃ) প্রবেশ করেননি। তোমার থেকে গোপন করে আমাকে ডাকলেন, আমিও তোমার থেকে গোপন করে উত্তর দিলাম। মনে করলাম, তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ। তোমাকে জাগিয়ে দেওয়াটা পছন্দ করলাম না এবং এ ভয়ও ছিল যে, (আমি চলে যাওয়ার কারণে) তুমি নিঃসঙ্গতা বােধ করবে। জিবরীল (আঃ) আমাকে নির্দেশ দিলে বাকীতে অবস্থানকারীদের কাছে যাই এবং তাদের রব্বের কাছে তাদের জন্য ক্ষমা চাই।
তাহক্বীকঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মুহাম্মদ ইবন কায়স (রহঃ)

কোরআন সংকলন 58
কোরআন সংকলন 60

ঘটনার শুরুতে আয়েশা যে বিষয়টি লক্ষ করেন, তা হলো মুহাম্মদের সতর্কভাবে বের হওয়া। তিনি চাদর নেন, জুতা পরেন, দরজা আস্তে খোলেন এবং আস্তে বন্ধ করেন। আয়েশাও পোশাক পরে পেছনে যান। এরপর দুজনের চলার গতির সমান্তরাল বিবরণ আছে: মুহাম্মদ দ্রুত হাঁটলে তিনিও দ্রুত হাঁটেন, মুহাম্মদ দৌড়ালে তিনিও দৌড়ান। এই বিস্তারিত চলাচল আয়েশার হাঁপিয়ে ফেরার কারণ তৈরি করে। পরবর্তী কথোপকথনে আয়েশা অনুসরণের কথা নিজেই স্বীকার করেছেন। এই স্বীকারোক্তির সঙ্গে রাতের চলাচলের বিস্তারিত বিবরণ মিলে যায়।

জিজ্ঞাসাবাদের মুহূর্তে আল্লাহর সর্বজ্ঞতার উল্লেখ ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভেতরে ধর্মীয় কর্তৃত্ব নিয়ে আসে। মুহাম্মদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বিকল্প হিসেবে আয়েশার সামনে দাঁড়ায় সর্বজ্ঞ আল্লাহর মাধ্যমে তাঁর কাছে তথ্য পৌঁছানোর কথা। স্ত্রীর গোপন কাজ স্বামীর কাছে গোপন থাকবে কি না, সেই ব্যক্তিগত প্রশ্নে আসমানি জ্ঞানের কর্তৃত্ব ব্যবহার করা হচ্ছে। একই কথোপকথনে মুহাম্মদ জানতে চান, সামনে যে ছায়ামূর্তি দেখেছিলেন সেটি আয়েশা ছিলেন কি না। আয়েশা সম্মতি জানান। এরপর তাঁর নিজের ভাষায় ব্যথার কথা আসে। [387] [388]

فَلَهَدَنِي فِي صَدْرِي لَهْدَةً أَوْجَعَتْنِي

বাংলা অনুবাদ: তিনি আমার বুকে এমনভাবে আঘাত করলেন যে তা আমাকে ব্যথা দিল।

আরবি বাক্যের শেষে “আওজাআতনি”—আমাকে ব্যথা দিয়েছিল—আয়েশার অভিজ্ঞতা সরাসরি জানায়। আঘাতের বিবরণের পরে মুহাম্মদ প্রশ্ন করেন, আয়েশা কি ভেবেছিলেন আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তাঁর ওপর অবিচার করবেন। এতে দাম্পত্য অনুযোগটি ধর্মীয় বিশ্বাসের ভাষায় পুনর্নির্ধারিত হয়। স্ত্রী অনুসরণ করেছেন; জবাবে শারীরিক ব্যথা এবং আল্লাহ ও রাসুলের ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে প্রশ্ন একই দৃশ্যের অংশ হয়ে ওঠে। নিজের পালার রাতে স্বামীর আচরণ সম্পর্কে স্ত্রীর সন্দেহ এখানে কেবল দুই ব্যক্তির মধ্যে সীমিত থাকে না; সেটি আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি তাঁর ধারণার প্রশ্নে উন্নীত হয়।

মুসলিমের পূর্ণ বিবরণে আয়েশা ফিরে এসে শোয়ার পর থেকে স্বীকারোক্তি, আঘাত এবং অবিচার সম্পর্কে প্রশ্ন পর্যন্ত কথোপকথন ধারাবাহিকভাবে পাওয়া যায়। সেখানে আঘাতটি মুহাম্মদের ব্যাখ্যার আগে এসেছে। ব্যথা পাওয়ার ঘটনাটি আয়েশার নিজের বর্ণনার একটি স্পষ্ট বাক্য হিসেবে সংরক্ষিত। [389]

فَسَبَقْتُهُ فَدَخَلْتُ فَلَيْسَ إِلاَّ أَنِ اضْطَجَعْتُ فَدَخَلَ فَقَالَ ‏”‏ مَا لَكِ يَا عَائِشُ حَشْيَا رَابِيَةً ‏”‏ ‏.‏ قَالَتْ قُلْتُ لاَ شَىْءَ ‏.‏ قَالَ ‏”‏ لَتُخْبِرِينِي أَوْ لَيُخْبِرَنِّي اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ ‏”‏ ‏.‏ قَالَتْ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي ‏.‏ فَأَخْبَرْتُهُ قَالَ ‏”‏ فَأَنْتِ السَّوَادُ الَّذِي رَأَيْتُ أَمَامِي ‏”‏ ‏.‏ قُلْتُ نَعَمْ ‏.‏ فَلَهَدَنِي فِي صَدْرِي لَهْدَةً أَوْجَعَتْنِي ثُمَّ قَالَ ‏”‏ أَظَنَنْتِ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ ‏”‏ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আমি তাঁর আগে পৌঁছে ঘরে ঢুকলাম। আমি কেবল শুয়েছি, এমন সময় তিনি ঢুকলেন এবং বললেন, আয়েশা, তোমার কী হয়েছে, তুমি এত হাঁপাচ্ছ কেন? আমি বললাম, কিছু হয়নি। তিনি বললেন, তুমি আমাকে জানাবে, নইলে সূক্ষ্মদর্শী ও সর্বজ্ঞ আমাকে জানিয়ে দেবেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক। এরপর আমি তাঁকে জানালাম। তিনি বললেন, তাহলে সামনে যে ছায়ামূর্তি দেখেছিলাম সেটি তুমি? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন তিনি আমার বুকে এমন আঘাত করলেন, যা আমাকে ব্যথা দিল। এরপর বললেন, তুমি কি মনে করেছিলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তোমার প্রতি অবিচার করবেন?

ঘটনার স্তরবর্ণনায় যা আছেক্ষমতার সম্পর্ক
রাতের প্রস্থানমুহাম্মদ নিঃশব্দে বের হন; আয়েশা অনুসরণ করেনদাম্পত্য আচরণ সম্পর্কে তথ্যের অসমতা
ফেরার পরে প্রশ্নআয়েশার হাঁপানো এবং অনুসরণের কথা জানতে চাওয়াস্বামীর সামনে স্ত্রীকে নিজের কাজের ব্যাখ্যা দিতে হয়
আসমানি জ্ঞানের উল্লেখআয়েশা না জানালে সর্বজ্ঞ আল্লাহ জানাবেনব্যক্তিগত জিজ্ঞাসাবাদে ধর্মীয় কর্তৃত্ব যুক্ত হয়
শারীরিক প্রতিক্রিয়াবুকে আঘাত; আয়েশার ব্যথা পাওয়াশরীরের ওপর ক্ষমতার প্রত্যক্ষ প্রয়োগ
ধর্মীয় প্রশ্নআল্লাহ ও রাসুল অবিচার করবেন বলে ভেবেছিলেন কি নাদাম্পত্য সন্দেহকে ধর্মীয় আনুগত্যের প্রশ্নে নিয়ে যাওয়া
বের হওয়ার ব্যাখ্যাজিবরাইলের নির্দেশে বাকির মৃতদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনাবর্ণনাটিতে গন্তব্য ও উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে

ঘর থেকে বের হওয়ার ব্যাখ্যায় মুহাম্মদ বলেন, জিবরাইল তাঁকে ডেকেছিলেন। আয়েশাকে ঘুমন্ত মনে হওয়ায় জাগাতে চাননি; ভয় পাওয়া ও একা বোধ করার আশঙ্কার কথাও বলেন। জিবরাইলের বার্তা ছিল বাকির লোকদের কাছে গিয়ে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। আয়েশা কবরস্থানে কী বলতে হবে জিজ্ঞেস করলে তাঁকে মৃত মুসলিমদের উদ্দেশে সালাম ও দোয়ার বাক্য শেখানো হয়। ঘটনার স্থান, কাজ এবং শেষের শিক্ষা তাই একই বর্ণনায় স্পষ্ট। এর বিষয় আয়েশার অনুসরণ, মুহাম্মদের প্রতিক্রিয়া এবং কবরস্থানে প্রার্থনা; নামহীন লেখকের পরিচয় বা তাঁর মৃতদেহ এই বর্ণনার অংশ নয়।

স্ত্রীর প্রতি ব্যথাদায়ক আঘাত এবং তার সঙ্গে ধর্মীয় কর্তৃত্বের সংযোগ নিজেই একটি গুরুতর বিষয়। মুহাম্মদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রশ্ন উঠলে এখানে তার জবাব শুধু ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে দেওয়া হয়নি; ব্যাখ্যার আগে শারীরিক বল প্রয়োগ ঘটেছে। এরপর অবিচার সম্পর্কে প্রশ্নে মুহাম্মদের অবস্থান আল্লাহর অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই কাঠামোয় স্ত্রীর সন্দেহের বিপরীতে স্বামীর শরীরী ক্ষমতা ও নবুয়তের মর্যাদা একত্রে কাজ করে। আয়েশার বিবরণে সংরক্ষিত ব্যথার বাক্যটি সেই সম্পর্কের প্রত্যক্ষ মানবিক মূল্য প্রকাশ করে।


আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহের ওহি লেখার অভিজ্ঞতা

আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহের ঘটনাটি নামহীন খ্রিষ্টান লেখকের ঘটনা থেকে স্বতন্ত্র। তিনি কুরাইশি, উসমানের দুধভাই এবং মুহাম্মদের লেখক ছিলেন। তাঁর ইসলাম ত্যাগ, মক্কায় আশ্রয়, মক্কা বিজয়ের দিনে হত্যার নির্দেশ এবং উসমানের মাধ্যমে প্রাণরক্ষার খবর হাদিস ও জীবনীতে আছে। তাফসির ও সিরাতের বিবরণে তাঁর লেখার সময় শব্দ পাল্টানো, পরিবর্তিত লেখা পড়ে শোনানো এবং মুহাম্মদের অনুমোদনের অভিযোগ যুক্ত হয়েছে। লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন, সেই দায়িত্ব থেকে উঠে আসা আপত্তি এবং আপত্তিকারীর ওপর হত্যার হুমকি—এই তিনটি বিষয় একই ব্যক্তির জীবনীতে এসে মিলেছে।

ব্যক্তি বা খবরপরিচয়দলিলের বিষয়
আগের পরিচ্ছেদের খ্রিস্টান লেখকবুখারীর বর্ণনায় নামহীন; মুসলিমে বনি নাজ্জারের ব্যক্তিঅভিযোগ, ধর্মত্যাগ ও মৃতদেহের কাহিনি
আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহকুরাইশি লেখক; উসমানের দুধভাইতাফসিরে শব্দবদলের কাহিনি; হাদিসে হত্যার হুমকি ও বায়াত
এক করে ফেলার ফলদুই জীবনী গুলিয়ে যায়এক ঘটনার তথ্য অন্য ব্যক্তির ওপর আরোপিত হয়

আবু দাউদের একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় তাঁর লেখকের দায়িত্ব, ধর্মত্যাগ এবং হত্যার নির্দেশ একই ধারায় রয়েছে। বর্ণনাটি ধর্মত্যাগকে “শয়তান তাঁকে পদস্খলিত করেছিল” বলে মূল্যায়ন করে। এটি বর্ণনাকারীর ধর্মীয় ব্যাখ্যা; এর মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট শব্দবদলের উদাহরণ দেওয়া হয়নি। এরপর মক্কা বিজয়ের দিনে তাঁকে হত্যার নির্দেশ এবং উসমানের আশ্রয় প্রার্থনায় নিরাপত্তা দেওয়ার কথা আসে। একই ব্যক্তির পরিচয় ও জীবনের এই ধারাবাহিকতা পরবর্তী বিস্তৃত তাফসিরি অভিযোগগুলোর পটভূমি। [390]

كَانَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ سَعْدِ بْنِ أَبِي سَرْحٍ يَكْتُبُ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَزَلَّهُ الشَّيْطَانُ فَلَحِقَ بِالْكُفَّارِ فَأَمَرَ بِهِ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنْ يُقْتَلَ يَوْمَ الْفَتْحِ فَاسْتَجَارَ لَهُ عُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ فَأَجَارَهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ আল্লাহর রাসুলের জন্য লিখতেন। শয়তান তাঁকে পদস্খলিত করল, ফলে তিনি কাফিরদের সঙ্গে যোগ দিলেন। আল্লাহর রাসুল মক্কা বিজয়ের দিনে তাঁকে হত্যার নির্দেশ দিলেন। উসমান ইবনে আফফান তাঁর জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করলেন; তখন আল্লাহর রাসুল তাঁকে আশ্রয় দিলেন।

এখানে অভিযোগের ইতিহাস এবং অভিযোগকারীর প্রতি ব্যবহারের ইতিহাস পরস্পরকে আলোকিত করে। হাদিসের সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় তাঁর চলে যাওয়াকে শয়তানের প্ররোচনা বলা হচ্ছে; তাফসিরের বিস্তৃত বর্ণনায় তাঁর নিজের মুখে সন্দেহের কারণ দেওয়া হয়েছে। প্রথম ভাষ্য ধর্মত্যাগকে নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে, দ্বিতীয় ভাষ্য লেখার অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর সন্দেহ জন্মানোর কাহিনি সংরক্ষণ করে। পরের জীবনে একই মানুষ আবার মুসলিম সমাজে ফিরে আসেন এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে ওঠেন। ফলে তাঁর জীবনীতে ধর্মীয় অভিযোগ, প্রাণদণ্ডের অধিকার এবং ক্ষমতার আশ্রয়ে পুনর্বাসন—সবগুলো স্তর উপস্থিত।

তাফসিরে মাযহারিতে গুণবাচক শব্দ প্রতিস্থাপনের বিবরণ

তাফসিরে মাযহারির বাংলা সংস্করণে আবদুল্লাহ ইবনে সাদের লেখার বিষয়ে যে বিবরণ আছে, সেখানে পরিবর্তনটি স্পষ্ট শব্দ প্রতিস্থাপন। মুহাম্মদ “সামিয়াম বাসিরান” বললে তিনি “আলিমান হাকিমান” লিখতেন; “আলিমান হাকিমান” বললে লিখতেন “গফুরার রহিমান”। শ্রবণ ও দর্শনের গুণবাচক শব্দের জায়গায় জ্ঞান ও প্রজ্ঞার গুণবাচক শব্দ, আবার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার জায়গায় ক্ষমা ও দয়ার গুণবাচক শব্দ বসানো হচ্ছে। প্রতিস্থাপনের ফলে আল্লাহ সম্পর্কে ব্যবহৃত শব্দযুগল বদলে যাচ্ছে। উদ্ধৃত বিবরণে এর পরে সুরা মুমিনুনের প্রশংসাবাক্য এবং সেই বাক্য লিখতে বলা হলে লেখকের সন্দেহের কথা আছে। [391]

বাগবী বলেছেন, এই বাক্যটি অবতীর্ণ হয়েছে আবদুল্লাহ্ বিন আবী সারাহ্ সম্পর্কে। আবদুল্লাহ্ ইসলাম গ্রহণ করলে রসুল স. তাকে কোরআন মজীদ লিপিবদ্ধ করার কাজে নিযুক্ত করলেন। কিন্তু সে বিশ্বাসভাজন ছিলো না। রসুল স. যখন বলতেন ‘সামিয়াম বাসিরান’। সে লিখতো আলীমান হাকিমান। আবার রসুল স. বলতেন, ‘আলীমান হাকিমান, ‘সে তখন লিখতো—’গফুরার রহীমান।’ একদিন অবতীর্ণ হলো ‘ওয়ালাকৃদ্ খলাকুনাল ইনসানা মিন সুলালাতিম মিন্‌তিন’ (আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকার উপাদান থেকে)। রসুল স. সদ্য অবতীর্ণ আয়াতটি লিখতে নির্দেশ দিলেন। মানব সৃষ্টি সম্পর্কিত এই আয়াতটি খুবই ভালো লাগলো আবদুল্লাহর। সে হঠাৎ বলে উঠলো—’ফা তাবারাকাল্লহু আহসানাল খলিকিন’ (আল্লাহ্পাক কতোইনা সুন্দর স্রষ্টা)। রসুল স. বললেন, এ বাক্যটিও লিপিবদ্ধ করো। এই আয়াতটিও সদ্য অবতীর্ণ। এ কথা শুনে আবদুল্লাহ ভাবলো আশ্চর্য! আমার উপরেও তাহলে প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়। এ রকম চিন্তার ফলে সে হয়ে গেলো ধর্মত্যাগী। মিশে গেলো মুশরিকদের দলে। হজরত ইকরামা, ইবনে জারীর এবং সুদ্দীও এই ঘটনাটির উল্লেখ করেছেন। যথাস্থানে এর বিবরণ দেয়া হবে।

কোরআন সংকলন 62
কোরআন সংকলন 64

এই বর্ণনার যুক্তিগত গুরুত্ব শব্দগুলোর ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতার মধ্যেই নিহিত। আল্লাহকে জ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়, ক্ষমাশীল কিংবা দয়ালু বলা ইসলামি বিশ্বাসে স্বীকৃত। কিন্তু কোনো বাক্যে কোন দুটি গুণ নির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছিল, সেটি পৃথক পাঠগত প্রশ্ন। একাধিক প্রশংসাসূচক শব্দ ধর্মতাত্ত্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলেই সেগুলো ঐ বাক্যের একই শব্দ হয়ে যায় না। “শ্রবণকারী ও দর্শনকারী” এবং “জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়” দুটি পৃথক বক্তব্য। প্রথমটি শ্রবণ ও দর্শনের ক্ষমতা বোঝায়, দ্বিতীয়টি জ্ঞান ও প্রজ্ঞা বোঝায়। একইভাবে ক্ষমা ও দয়ার বক্তব্যও আলাদা অর্থ বহন করে। নির্দিষ্ট বাণী হুবহু লিপিবদ্ধ হওয়ার দাবি শব্দের এই পার্থক্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বাগবীর তাফসিরেও একই দুই পর্যায়ের প্রতিস্থাপন সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানে প্রথমে “বলা হয়” ভাষায় আবদুল্লাহ ইবনে সাদের পরিচয় আসে, তারপর তাঁর লেখার সময়ে কোন শব্দের বদলে কোন শব্দ বসানো হতো তা বলা হয়। মাযহারির বাংলা উদ্ধৃতির সঙ্গে বাগবীর আরবি পাঠের এই মিল অভিযোগটির নির্দিষ্ট বিষয় শনাক্ত করে: গুণবাচক শব্দযুগলের প্রতিস্থাপন। [392]

وَكَانَ إِذْ أَمْلَى عَلَيْهِ: سَمِيعًا بَصِيرًا، كَتَبَ عَلِيمًا حَكِيمًا، وَإِذَا قَالَ: عَلِيمًا حَكِيمًا، كَتَبَ: غَفُورًا رَحِيمًا

বাংলা অনুবাদ: তাঁকে “শ্রবণকারী, দর্শনকারী” লিখতে বলা হলে সে “সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়” লিখত; “সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়” বলা হলে লিখত “ক্ষমাশীল, দয়ালু”।

নির্দেশিত শব্দযুগললেখকের লেখা শব্দযুগলবক্তব্যে পরিবর্তন
سَمِيعًا بَصِيرًا — শ্রবণকারী, দর্শনকারীعَلِيمًا حَكِيمًا — সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়শ্রবণ ও দর্শনের জায়গায় জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উল্লেখ
عَلِيمًا حَكِيمًا — সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়غَفُورًا رَحِيمًا — ক্ষমাশীল, দয়ালুজ্ঞান ও প্রজ্ঞার জায়গায় ক্ষমা ও দয়ার উল্লেখ

বাণীর উৎপত্তিতে শব্দ নির্ধারণের ক্ষমতা কার হাতে ছিল, এই অভিযোগ সেই প্রশ্ন তোলে। শ্রুতিলেখক স্বাধীনভাবে বিকল্প শব্দ বসালে এবং তা গ্রহণ করা হলে বাণী তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়ায় লেখকের সিদ্ধান্তের জায়গা থাকে। ফলে নির্দিষ্ট আসমানি শব্দের অবিকল অনুলিপি এবং মানুষের হাতে গ্রহণযোগ্য বিকল্প নির্ধারণ—এই দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়া সামনে আসে। অভিযোগে লেখক নিজের সন্দেহকে এই অভিজ্ঞতার ফল হিসেবে প্রকাশ করেছেন। সন্দেহের কারণ হিসেবে তাঁর অজ্ঞতা বা বাণী না শোনার কথা বলা হয়নি; লেখার কাজের মধ্যেই তাঁর আপত্তির উৎস স্থাপন করা হয়েছে।

মাযহারির উদ্ধৃতিতে লেখককে “নির্ভরযোগ্য ছিলো না” বলা আছে। এর পরেও সেই গ্রন্থ তাঁর বিষয়ে শব্দবদলের বিবরণ সংরক্ষণ করেছে। এই নেতিবাচক মূল্যায়ন অভিযোগকারীর ধর্মীয় চরিত্র সম্পর্কে গ্রন্থের অবস্থান জানায়; শব্দ প্রতিস্থাপনের বর্ণনা কী বলছে, সেই প্রশ্ন এর দ্বারা মুছে যায় না। তাফসিরকারের ভাষ্য একই সঙ্গে ধর্মত্যাগীকে নিন্দা করে এবং তাঁর সন্দেহের একটি নির্দিষ্ট কারণ তুলে ধরে। এই দুই স্তর পাশাপাশি থাকার ফলে ইসলামি স্মৃতির ভেতর থেকেই ওহি লেখার প্রক্রিয়া নিয়ে অস্বস্তিকর অভিযোগটি সামনে আসে।

বাগবী থেকে পরবর্তী মাযহারি পর্যন্ত এই কাহিনির উপস্থিতি তাফসিরি সাহিত্যে অভিযোগটির দীর্ঘ প্রচার দেখায়। গ্রন্থগুলোর পারস্পরিক নির্ভরতা এবং পুরোনো বর্ণনার পুনর্ব্যবহার এই ধারাবাহিকতার অংশ। একই উপকরণ পরবর্তী গ্রন্থে স্থান পাওয়ার মাধ্যমে অভিযোগটি ইসলামি শিক্ষার ভেতরেই টিকে থাকে। এর নির্দিষ্ট বিষয়ও অস্পষ্ট হয়ে যায়নি: কোন গুণবাচক শব্দের জায়গায় কোনটি লেখা হতো, সেই উদাহরণ সংরক্ষিত আছে। ধর্মত্যাগীর বিরুদ্ধে নিন্দার ভাষার মধ্যেও তাঁর সন্দেহের কারণ মুছে যায়নি; বাণীর শব্দ এবং তা লিখে নেওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে আপত্তি একই গ্রন্থে বহমান রয়েছে।


মুমিনুন ২৩:১৪-এর প্রশংসাবাক্য ও ওয়াহিদীর বর্ণনা

সুরা মুমিনুনের মানবসৃষ্টির বিবরণের শেষে রয়েছে “ফাতাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিকিন”—সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়। আয়াতের প্রচলিত পাঠে এটি সৃষ্টির বিবরণের সমাপ্তির প্রশংসাবাক্য। তাফসিরি কাহিনিতে আবদুল্লাহ ইবনে সাদ সৃষ্টির ধাপের বিবরণ শুনে বিস্মিত হয়ে এই কথাটি বলেন এবং মুহাম্মদ তাঁকে সেটিও লিখতে বলেন। কাহিনির সংকটটি মানুষের মুখে উচ্চারিত একটি বাক্যকে একই সঙ্গে অবতীর্ণ বাক্য বলে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘটনা নিয়ে। [393]

Then We made the sperm-drop into a clinging clot, and We made the clot into a lump [of flesh], and We made [from] the lump, bones, and We covered the bones with flesh; then We developed him into another creation. So blessed is Allāh, the best of creators.
— Saheeh International
পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি জমাট বাঁধা রক্তে, অতঃপর মাংসপিন্ডকে পরিণত করি হাড্ডিতে, অতঃপর হাড্ডিকে আবৃত করি মাংস দিয়ে, অতঃপর তাকে এক নতুন সৃষ্টিতে উন্নীত করি। কাজেই সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কতই না মহান!
— Taisirul Quran
পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি রক্তপিন্ডে, অতঃপর রক্তপিন্ডকে পরিণত করি মাংসপিন্ডে এবং মাংসপিন্ডকে পরিণত করি অস্থিপঞ্জরে; অতঃপর অস্থিপঞ্জরকে ঢেকে দিই মাংস দ্বারা; অবশেষে ওকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টি রূপে; অতএব নিপুণতম স্রষ্টা আল্লাহ কত কল্যাণময়!
— Sheikh Mujibur Rahman
তারপর শুক্রকে আমি ‘আলাকায় পরিণত করি। তারপর ‘আলাকাকে গোশতপিন্ডে পরিণত করি। তারপর গোশতপিন্ডকে হাড়ে পরিণত করি। তারপর হাড়কে গোশ্ত দিয়ে আবৃত করি। অতঃপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুলি। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়!
— Rawai Al-bayan

ওয়াহিদীর আসবাবুন নুযুলে ঘটনাটি আরও বিস্তারিতভাবে সংরক্ষিত আছে। ইসলামওয়েবের মূল পাঠে বলা হয়েছে, আবদুল্লাহ ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেছিলেন এবং একদিন মুহাম্মদ তাঁকে লেখার জন্য ডাকেন। “আমরা মানুষকে মৃত্তিকার নির্যাস থেকে সৃষ্টি করেছি” দিয়ে শুরু হওয়া অংশ বলা হয়; “তারপর আমরা তাকে অন্য এক সৃষ্টি হিসেবে গড়ে তুললাম” পর্যন্ত পৌঁছালে তিনি প্রশংসাবাক্যটি বলেন। মুহাম্মদ বলেন, তাঁর কাছে ঠিক এভাবেই অবতীর্ণ হয়েছে। কাহিনিটি তাঁর সন্দেহকে দুই সম্ভাবনায় প্রকাশ করে: মুহাম্মদ সত্য বলে থাকলে তাঁর কাছেও একই কথা এসেছে; মুহাম্মদ মিথ্যা বলে থাকলে তিনি নিজেও একই ধরনের কথা বলতে পেরেছেন। ওয়াহিদী শেষে এই বিবরণকে কালবীর রেওয়ায়েতে ইবনে আব্বাসের বক্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। [394]

نزلت في عبد الله بن سعد بن أبي سرح ، كان قد تكلم بالإسلام ، فدعاه رسول الله – صلى الله عليه وسلم – ذات يوم يكتب له شيئا ، فلما نزلت الآية التي في ” المؤمنون ” : ( ولقد خلقنا الإنسان من سلالة ) أملاها عليه ، فلما انتهى إلى قوله : ( ثم أنشأناه خلقا آخر ) عجب عبد الله في تفصيل خلق الإنسان ، فقال : تبارك الله أحسن الخالقين ، فقال رسول الله – صلى الله عليه وسلم – : ” هكذا أنزلت علي ” ، فشك عبد الله حينئذ ، وقال : لئن كان محمد صادقا لقد أوحي إلي كما أوحي إليه ، ولئن كان كذابا لقد قلت كما قال . وذلك قوله : ( ومن قال سأنزل مثل ما أنزل الله ) وارتد عن الإسلام ، وهذا قول ابن عباس في رواية الكلبي .

বাংলা অনুবাদ: এটি আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেছিলেন। একদিন আল্লাহর রাসুল তাঁকে কিছু লেখার জন্য ডাকলেন। মুমিনুন সুরার “আমরা মানুষকে এক নির্যাস থেকে সৃষ্টি করেছি” আয়াতটি অবতীর্ণ হলে তিনি তাঁকে তা বলে লিখতে দিলেন। “তারপর আমরা তাকে অন্য এক সৃষ্টি হিসেবে গড়ে তুললাম” পর্যন্ত পৌঁছালে আবদুল্লাহ মানবসৃষ্টির বিস্তারিত বিবরণে বিস্মিত হয়ে বললেন, “বরকতময় আল্লাহ, সর্বোত্তম স্রষ্টা।” আল্লাহর রাসুল বললেন, “আমার কাছে এভাবেই অবতীর্ণ হয়েছে।” তখন আবদুল্লাহ সন্দেহে পড়লেন এবং বললেন, মুহাম্মদ সত্যবাদী হলে তাঁর কাছে যেমন ওহি এসেছে, আমার কাছেও তেমন এসেছে; আর তিনি মিথ্যাবাদী হলে তিনি যা বলেছেন আমিও তেমন কথা বলেছি। এ সম্পর্কেই “যে বলে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার মতো আমিও অবতীর্ণ করব”—এই বক্তব্য। তিনি ইসলাম ত্যাগ করলেন। এটি কালবীর বর্ণনায় ইবনে আব্বাসের বক্তব্য।

কাহিনির ভেতরে লেখকের সন্দেহের একটি সুস্পষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো আছে। তিনি নিজের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণ জানেন; অন্যদিকে মুহাম্মদ সেই উচ্চারণের সঙ্গে আসমানি বাণীর অভিন্নতা ঘোষণা করছেন। একই বাক্যের জন্য দুটি উৎসের দাবি দাঁড়ায়: মানুষের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এবং বাইরে থেকে আগত ওহি। মুহাম্মদের ঘোষণাকে সত্য ধরলে লেখক নিজের উচ্চারণেরও ওহিগত মর্যাদা দাবি করেন; ঘোষণাটিকে মিথ্যা ধরলে মানুষের রচিত বাক্যকে ওহি হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্তে পৌঁছান। তাঁর আপত্তি তাই কেবল বিরাগ বা গালাগাল নয়; বাণীর উৎস চিহ্নিত করার মানদণ্ড সম্পর্কে যুক্তিগত আপত্তি হিসেবে কাহিনিতে স্থান পেয়েছে।

বাগবীর পাঠে এই স্থানে লেখার নির্দেশটি আরও স্পষ্ট: “এটি লেখো; এভাবেই অবতীর্ণ হয়েছে।” ফলে কাহিনিতে মানুষের মুখে প্রশংসাবাক্য আসা এবং সেই বাক্য লিখিত পাঠে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ পরপর ঘটেছে। মুহাম্মদের অনুমোদন এখানে বাক্যটিকে ওহির মর্যাদা দেওয়ার কার্যকর সিদ্ধান্ত। লেখক বাক্যটি বলার আগে বাইরে থেকে তার উৎস আলাদা করে চিহ্নিত করার কোনো দৃশ্য এই বিবরণে নেই। [395]

فلما نزلت : ” ولقد خلقنا الإنسان من سلالة من طين ” ( المؤمنون ، 12 ) أملاها عليه رسول الله صلى الله عليه وسلم فعجب عبد الله من تفصيل خلق الإنسان ، فقال : تبارك الله أحسن الخالقين ، فقال النبي صلى الله عليه وسلم : اكتبها فهكذا نزلت

বাংলা অনুবাদ: “আমরা মানুষকে মাটির নির্যাস থেকে সৃষ্টি করেছি”—এই অংশ অবতীর্ণ হলে আল্লাহর রাসুল তাঁকে তা বলে লিখতে দিলেন। আবদুল্লাহ মানবসৃষ্টির বিস্তারিত বিবরণে বিস্মিত হয়ে বললেন, “বরকতময় আল্লাহ, সর্বোত্তম স্রষ্টা।” নবী বললেন, “এটি লেখো; এভাবেই অবতীর্ণ হয়েছে।”

কাহিনির মুহূর্তকার ভূমিকাবাণীর উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন
সৃষ্টির বিবরণ বলামুহাম্মদ বলে দেন; আবদুল্লাহ লেখেনশ্রুতিলিখনের সম্পর্ক
প্রশংসাবাক্য উচ্চারণআবদুল্লাহ বিস্ময় প্রকাশ করেনমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বাক্য
ওহি হিসেবে স্বীকৃতিমুহাম্মদ একইভাবে অবতীর্ণ হওয়ার কথা বলেনবাক্যের ধর্মীয় মর্যাদা ঘোষণাকারী নির্ধারণ করেন
লিপিবদ্ধ করার নির্দেশবাগবীর পাঠে “এটি লেখো”উচ্চারিত বাক্য লিখিত বাণীর অংশ হয়
লেখকের প্রতিক্রিয়ানিজের বাক্য ও ঘোষিত ওহির সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহওহি শনাক্ত করার স্বাধীন মানদণ্ডের সংকট

ওয়াহিদীর গ্রন্থে বিবরণটির যে বর্ণনাপথ দেওয়া হয়েছে, তা সমকালীন লেখকের নিজের সংরক্ষিত দিনলিপি নয়; এটি পরবর্তী আসবাবুন নুযুল সাহিত্যে তাঁর নামে রক্ষিত অভিযোগের কাহিনি। সেই সংরক্ষিত কাহিনির বক্তব্য অত্যন্ত নির্দিষ্ট: লেখকের নিজের বলা বাক্যকে মুহাম্মদ ওহি বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং সেই স্বীকৃতিই লেখকের সন্দেহের কারণ হয়। পরবর্তী তাফসিরে ঘটনাটি পুনরাবৃত্ত হওয়া অভিযোগটির প্রচার ও গ্রহণের ইতিহাস দেখায়। শব্দবদলের বিবরণের সঙ্গে এটি মিলে বাণীর নির্দিষ্ট শব্দ এবং তার আসমানি উৎস নির্ধারণে ঘোষণাকারীর অনুমোদনের কেন্দ্রীয় ভূমিকা প্রকাশ করে।


তাবারিতে পরিবর্তিত লেখা পড়ে শোনানোর পর অনুমোদনের অভিযোগ

তাবারির তাফসিরে ইকরিমার নামে সংরক্ষিত বিবরণে অভিযোগটি আরও তীক্ষ্ণ। এখানে লেখক শুধু নির্দেশিত শব্দের পরিবর্তে অন্য শব্দ লিখছেন না; পরিবর্তিত লেখাটি মুহাম্মদের কাছে পড়ে শোনাচ্ছেন এবং “হ্যাঁ, একই”—এই অনুমোদন পাচ্ছেন। শ্রুতিলিখনের পরে যাচাইয়ের যে ধাপ নির্দিষ্ট শব্দ রক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা, অভিযোগে সেই ধাপেই বিকল্প শব্দ গ্রহণ করার কথা এসেছে। ফলে সমস্যাটি লেখকের অগোচর কোনো ভুলে সীমাবদ্ধ থাকে না; ঘোষণাকারীর সামনে বদলানো পাঠ উপস্থাপন ও গ্রহণের প্রশ্ন তৈরি হয়। [396]

” ومن قال سأنزل مثل ما أنزل الله “، نزلت في عبد الله بن سعد بن أبي سرح، أخي بني عامر بن لؤي، كان كتب للنبي صلى الله عليه وسلم، وكان فيما يملي ” عزيز حكيم “، فيكتب ” غفور رحيم “، فيغيره، ثم يقرأ عليه ” كذا وكذا “، لما حول، فيقول: ” نعم، سواء “. فرجع عن الإسلام ولحق بقريش وقال لهم: لقد كان ينزل عليه ” عزيز حكيم ” فأحوله، ثم أقرأ ما كتبت، فيقول: ” نعم سواء ” ! ثم رجع إلى الإسلام قبل فتح مكة، إذ نزل النبي صلى الله عليه وسلم بمر.

বাংলা অনুবাদ: “যে বলে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার মতো আমিও অবতীর্ণ করব”—এই অংশটি বনি আমির ইবনে লুআইয়ের আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি নবীর জন্য লিখেছিলেন। বলে দেওয়া কথার মধ্যে “পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” থাকত; তিনি লিখতেন “ক্ষমাশীল, দয়ালু”। তিনি তা পরিবর্তন করতেন, তারপর যা বদলেছিলেন তা এভাবে-সেভাবে পড়ে শোনাতেন। তিনি বলতেন, “হ্যাঁ, একই।” এরপর তিনি ইসলাম ছেড়ে কুরাইশদের সঙ্গে যোগ দিলেন এবং তাদের বললেন, তাঁর কাছে “পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” অবতীর্ণ হতো; আমি তা পাল্টে দিতাম, তারপর যা লিখেছি তা পড়ে শোনাতাম; তিনি বলতেন, “হ্যাঁ, একই!” পরে মক্কা বিজয়ের আগে, নবী মার্‌ নামক স্থানে অবস্থান করলে তিনি আবার ইসলামে ফিরে আসেন।

এখানে “একই” বলার ফল শব্দগত অভিন্নতা প্রতিষ্ঠা করা নয়; পরিবর্তিত শব্দকে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নেওয়া। “পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” এবং “ক্ষমাশীল, দয়ালু”—দুটি শব্দযুগল আল্লাহর পৃথক গুণ প্রকাশ করে। উভয় গুণ আল্লাহর জন্য মান্য হলেও কোনটি নির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছিল, সেই প্রশ্নে তাদের পার্থক্য থাকে। অভিযোগের ভাষ্য অনুযায়ী, শব্দের এই পার্থক্য অনুমোদনের প্রতিবন্ধক হয়নি। লেখক সেই অভিজ্ঞতাকেই কুরাইশদের সামনে তুলে ধরেন। ফলে তিনি শুধু ধর্মীয় দাবি প্রত্যাখ্যান করেননি; ঘোষিত বাণীর শব্দ নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পর্কেই আপত্তি জানিয়েছেন।

বর্ণনায় দুইবার একই অভিজ্ঞতা এসেছে—প্রথমে ঘটনার বিবরণে, পরে কুরাইশদের কাছে লেখকের বক্তব্যে। এই পুনরাবৃত্তি অভিযোগের গঠন স্পষ্ট করে: নির্দেশ, প্রতিস্থাপন, পড়ে শোনানো এবং অনুমোদন। তাবারিতে সংরক্ষিত কাহিনির ঘটনাক্রমেই এই ধাপগুলো পরপর এসেছে। লেখক দাবি করছেন, বদলানো পাঠ যাচাইয়ের মুখে টিকে গিয়েছিল। এই দাবির গুরুত্ব সেখানে যে, ধর্মীয় কর্তৃত্বের কাছে পাঠ পড়ে শোনানো হয়েছিল বলেই পাঠ শব্দে-শব্দে অপরিবর্তিত ছিল—এমন সিদ্ধান্তের ভেতরে অনুমোদন কী যাচাই করছিল, সেই প্রশ্ন রয়ে যায়।

সুদ্দীর নামে তাবারির পরের বর্ণনায় শব্দযুগলের রূপ কিছুটা ভিন্ন। সেখানে “শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ” থেকে “সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়” এবং আবার বিপরীত প্রতিস্থাপনের কথা আছে। কাহিনির এই অংশে লেখক নিজেই তুলনা করেন—মুহাম্মদ একটি শব্দযুগল বলেছেন, তিনি অন্যটি বলেছেন। তাঁর সন্দেহের প্রকাশও স্পষ্ট: মুহাম্মদের কাছে ওহি এলে তাঁর কাছেও এসেছে; আল্লাহ বাণী নামালে তিনিও অনুরূপ বাণী এনেছেন। [397]

نزلت في عبد الله بن سعد بن أبي سرح، أسلم، وكان يكتب للنبي صلى الله عليه وسلم، فكان إذا أملى عليه: ” سميعا عليما “، كتب هو: ” عليما حكيما “، وإذا قال: ” عليما حكيما ” كتب: ” سميعا عليما “، فشك وكفر، وقال: إن كان محمد يوحى إليه فقد أوحي إلي، وإن كان الله ينزله فقد أنزلت مثل ما أنزل الله ! قال محمد: ” سميعا عليما ” فقلت أنا: ” عليما حكيما ” ! فلحق بالمشركين

বাংলা অনুবাদ: এটি আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং নবীর জন্য লিখতেন। তাঁকে “শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ” বলে লিখতে দিলে তিনি “সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়” লিখতেন; “সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়” বললে লিখতেন “শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ”। এতে তিনি সন্দেহে পড়লেন এবং অবিশ্বাস করলেন। তিনি বললেন, মুহাম্মদের কাছে ওহি এলে আমার কাছেও ওহি এসেছে; আল্লাহ তা অবতীর্ণ করলে আমিও আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার অনুরূপ এনেছি! মুহাম্মদ বলেছেন, “শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ”, আমি বলেছি, “সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়”! এরপর তিনি মুশরিকদের সঙ্গে যোগ দিলেন।

বর্ণনাপ্রতিস্থাপনের উদাহরণবিশেষভাবে যে ধাপটি আছে
বাগবী ও মাযহারিশ্রবণকারী–দর্শনকারী → সর্বজ্ঞ–প্রজ্ঞাময়; সর্বজ্ঞ–প্রজ্ঞাময় → ক্ষমাশীল–দয়ালুভিন্ন গুণবাচক শব্দ লেখা এবং পরে প্রশংসাবাক্য নিয়ে সন্দেহ
তাবারি: ইকরিমার বর্ণনাপরাক্রমশালী–প্রজ্ঞাময় → ক্ষমাশীল–দয়ালুবদলানো লেখা পড়ে শোনানো; “হ্যাঁ, একই” অনুমোদন
তাবারি: সুদ্দীর বর্ণনাশ্রবণকারী–সর্বজ্ঞ ↔ সর্বজ্ঞ–প্রজ্ঞাময়লেখকের নিজের ভাষায় মূল ও পরিবর্তিত শব্দের তুলনা

বর্ণনাগুলোর শব্দযুগল এক নয়; তাদের সাধারণ অভিযোগ হলো নির্দিষ্ট বাণীর শব্দ মানুষের হাতে বদলানো এবং সেই বদল নিয়ে লেখকের সন্দেহ। তাবারির ইকরিমা-রূপে পড়ে শোনানোর পরে অনুমোদন এবং কুরাইশদের কাছে সেই অভিজ্ঞতা বলার ওপর জোর আছে। সুদ্দী-রূপে লেখক নিজের বলা শব্দ ও মুহাম্মদের বলা শব্দের তুলনা করেন। বাগবী ও মাযহারিতে প্রতিস্থাপনের সঙ্গে প্রশংসাবাক্যের কাহিনি যুক্ত। একেক রূপে একেক জায়গায় বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু লেখকের সন্দেহের কেন্দ্র একই থাকে: শব্দের বদল এবং ওহি বলে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যে সম্পর্ক। অভিযোগটি প্রচারের সময় এই দুই বিষয়ই বারবার স্থান পেয়েছে।

এই বর্ণনাগুলোতে লেখার কাজের মানবিক ধাপগুলো দৃশ্যমান: শুনে নেওয়া, শব্দ বেছে লেখা, লেখাটি পড়ে শোনানো এবং কর্তৃত্বের স্বীকৃতি পাওয়া। “ওহি” নামটি প্রক্রিয়ার ওপর বসানো হলেও লিপিবদ্ধ পাঠ গঠনের কাজ মানুষের হাত, শ্রবণ, স্মৃতি ও অনুমোদনের মধ্য দিয়েই ঘটছে। অভিযোগের ধার সেখানে যে, ধর্মীয় মর্যাদার ঘোষণা শব্দবদল শনাক্ত করার পরীক্ষা হিসেবে কাজ করেনি বলে লেখক দাবি করেছেন। তাই বাণীর আসমানি উৎস সম্পর্কে নিশ্চয়তার সঙ্গে তার লিপিবদ্ধ হওয়ার বাস্তব পদ্ধতির মধ্যে একটি মৌলিক টানাপোড়েন এই কাহিনিগুলো নিজেরাই সংরক্ষণ করেছে।


আনআম ৬:৯৩-এর সঙ্গে অভিযোগটির সম্পর্ক ও তাবারির নিজস্ব বক্তব্য

আনআম ৬:৯৩-এ আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনা, ওহি না পেয়েও ওহি পাওয়ার দাবি এবং আল্লাহর অবতীর্ণ বাণীর মতো বাণী আনার দাবিকে একসঙ্গে নিন্দা করা হয়েছে। আয়াতের পরের অংশে মৃত্যুযন্ত্রণা, ফেরেশতাদের হাত বাড়ানো এবং অপমানজনক শাস্তির দৃশ্য আছে। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বী বাণীর দাবি কেবল সাহিত্যিক বা জ্ঞানগত প্রতিযোগিতা হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি; সেটি আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও শাস্তিযোগ্য অহংকারের পরিচয় পেয়েছে। তাফসিরে আবদুল্লাহ ইবনে সাদের অভিযোগকে এই আয়াতের সঙ্গে যুক্ত করলে লেখকের পাঠগত আপত্তি ধর্মীয় অপরাধের ভাষায় স্থানান্তরিত হয়। [398]

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَىٰ عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ قَالَ أُوحِيَ إِلَيَّ وَلَمْ يُوحَ إِلَيْهِ شَيْءٌ وَمَن قَالَ سَأُنزِلُ مِثْلَ مَا أَنزَلَ اللَّهُ ۗ وَلَوْ تَرَىٰ إِذِ الظَّالِمُونَ فِي غَمَرَاتِ الْمَوْتِ وَالْمَلَائِكَةُ بَاسِطُو أَيْدِيهِمْ أَخْرِجُوا أَنفُسَكُمُ ۖ الْيَوْمَ تُجْزَوْنَ عَذَابَ الْهُونِ بِمَا كُنتُمْ تَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ غَيْرَ الْحَقِّ وَكُنتُمْ عَنْ آيَاتِهِ تَسْتَكْبِرُونَ

বাংলা অনুবাদ: যে আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনা করে, অথবা বলে “আমার কাছে ওহি এসেছে”, অথচ তার কাছে কিছুই ওহি করা হয়নি, এবং যে বলে “আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার মতো আমিও অবতীর্ণ করব”—তার চেয়ে বড় জালিম কে? তুমি যদি দেখতে, যখন জালিমরা মৃত্যুযন্ত্রণায় ডুবে থাকবে এবং ফেরেশতারা হাত বাড়িয়ে বলবে, “তোমাদের প্রাণ বের করো। আজ তোমাদের অপমানজনক শাস্তি দেওয়া হবে, কারণ তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে অসত্য বলতে এবং তাঁর আয়াতের প্রতি অহংকার দেখাতে।”

তাবারি এই আয়াতের অধীনে একাধিক ব্যাখ্যা এনেছেন। কোনো বর্ণনায় মুসায়লিমা, কোনো বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবনে সাদ, আবার কোনো বর্ণনায় আয়াতের ভিন্ন অংশে দুজনের নাম এসেছে। এরপর নিজের সিদ্ধান্ত জানাতে গিয়ে তাবারি আবদুল্লাহর নাম বাদ দেননি। বরং তিনি লিখেছেন, আবদুল্লাহ যে “মুহাম্মদের কথার মতো আমিও বলেছি” দাবি করেছিলেন, ইসলাম ত্যাগ করেছিলেন এবং মুশরিকদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন—এ বিষয়ে তাঁর মতে উম্মতের আলেমদের মধ্যে বিরোধ নেই। তাবারির ধর্মীয় সিদ্ধান্তে এই দাবিকে মিথ্যাচার বলা হয়েছে। তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্ত তাই অভিযোগের অস্তিত্ব অস্বীকার করে না; অভিযোগটি গ্রহণ করেই তার ওপর ধর্মীয় নিন্দা আরোপ করে। [399]

قال أبو جعفر: وأولى الأقوال في ذلك عندي بالصواب أن يقال: إن الله قال: ” ومن أظلم ممن افترى على الله كذبا أو قال أوحي إلي ولم يوح إليه شيء “، ولا تمانع بين علماء الأمة أن ابن أبي سرح كان ممن قال: ” إني قد قلت مثل ما قال محمد “، وأنه ارتد عن إسلامه ولحق بالمشركين، فكان لا شك بذلك من قيله مفتريا كذبا. وكذلك لا خلاف بين الجميع أن مسيلمة والعنسي الكذابين، ادعيا على الله كذبا أنه بعثهما نبيين، وقال كل واحد منهما إن الله أوحى إليه، وهو كاذب في قيله.

বাংলা অনুবাদ: আবু জাফর বলেন, এ বিষয়ে আমার কাছে সবচেয়ে সঠিক বক্তব্য হলো: আল্লাহ বলেছেন, “যে আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনা করে, অথবা বলে আমার কাছে ওহি এসেছে, অথচ তার কাছে কিছুই ওহি করা হয়নি—তার চেয়ে বড় জালিম কে?” উম্মতের আলেমদের মধ্যে এ নিয়ে বিরোধ নেই যে, ইবনে আবি সারহ তাঁদের একজন ছিলেন যিনি বলেছেন, “মুহাম্মদ যা বলেছেন তার মতো আমিও বলেছি”; তিনি ইসলাম ত্যাগ করে মুশরিকদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর এই বক্তব্যের দ্বারা তিনি নিঃসন্দেহে মিথ্যা রচনাকারী হয়েছিলেন। একইভাবে সবার মধ্যে এ বিষয়ে বিরোধ নেই যে, মুসায়লিমা ও আনসি নামের দুই মিথ্যাবাদী আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা দাবি করেছিলেন যে তিনি তাঁদের নবী করে পাঠিয়েছেন; তাঁদের প্রত্যেকে বলেছিলেন আল্লাহ তাঁর কাছে ওহি পাঠিয়েছেন, অথচ সে কথায় তাঁরা মিথ্যাবাদী ছিলেন।

“আলেমদের মধ্যে বিরোধ নেই”—এটি তাবারির নিজের ইতিহাসবোধ ও বিদ্যমান আলোচনার মূল্যায়ন। এর সঙ্গে তাঁর ধর্মীয় রায়ও যুক্ত: মুহাম্মদের মতো কথা বলার দাবিকে তিনি মিথ্যা বলেছেন। অভিযোগকারীর বক্তব্য, তাফসিরকারের বক্তব্যটি জানা আছে বলে দাবি এবং বক্তব্যের ওপর তাঁর ধর্মীয় বিচার—এই তিনটি স্তর একই অনুচ্ছেদে আছে। তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্তে আবদুল্লাহ, মুসায়লিমা ও আনসির দাবি একই সাধারণ নিন্দার আওতায় এসেছে। আবদুল্লাহর অভিযোগ সেখানে তাবারির নিজস্ব সিদ্ধান্তের একটি সক্রিয় উপাদান।

অবতরণের নির্দিষ্ট উপলক্ষ নিয়ে তাবারি একাধিক সম্ভাবনা রেখেছেন: কিছু ব্যক্তির কারণে, সবার কারণে অথবা আরবের সব মুশরিককে লক্ষ্য করে আয়াতটি অবতীর্ণ হয়ে থাকতে পারে। তাঁর এই আলোচনা আয়াতের প্রয়োগ কতটা বিস্তৃত, সেই প্রশ্নে। আবদুল্লাহর নামে সংরক্ষিত অভিযোগটি সেখানে হারিয়ে যায় না। বরং সাধারণ নিন্দার ভেতরে সেই অভিযোগকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। [400]

فإذ كان ذلك كذلك، فقد دخل في هذه الآية كل من كان مختلقا على الله كذبا، وقائلا في ذلك الزمان وفي غيره: ” أوحى الله إلي “، وهو في قيله كاذب، لم يوح الله إليه شيئا. فأما التنزيل، فإنه جائز أن يكون نزل بسبب بعضهم، وجائز أن يكون نزل بسبب جميعهم، وجائز أن يكون عني به جميع المشركين من العرب، إذ كان قائلو ذلك منهم، فلم يغيروه.

বাংলা অনুবাদ: এমন হলে এই আয়াতের মধ্যে প্রত্যেক সেই ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত হয়, যে আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনা করে এবং সে যুগে বা অন্য যুগে বলে “আল্লাহ আমার কাছে ওহি পাঠিয়েছেন”, অথচ সে কথায় সে মিথ্যাবাদী এবং আল্লাহ তার কাছে কিছুই ওহি পাঠাননি। অবতরণের বিষয়ে এটি কারও কারও কারণে অবতীর্ণ হয়ে থাকতে পারে, তাদের সবার কারণে অবতীর্ণ হয়ে থাকতে পারে, অথবা আরবের সব মুশরিককে উদ্দেশ করা হয়ে থাকতে পারে; কারণ এমন কথার বক্তারা তাদের মধ্যকারই ছিল, অথচ তারা তা বদলায়নি।

তাবারির আলোচনার স্তরনির্দিষ্ট বক্তব্যতার তাৎপর্য
সংরক্ষিত বর্ণনাআবদুল্লাহর শব্দবদল ও অনুরূপ বাণী বলার অভিযোগলেখক-সম্পর্কিত অভিযোগ তাফসিরের উপকরণের অংশ
অন্য সংরক্ষিত ব্যাখ্যামুসায়লিমা ও আনসির নবুয়তের দাবিআয়াত একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে
তাবারির নিজস্ব ঐতিহাসিক মূল্যায়নআবদুল্লাহর দাবি ও ধর্মত্যাগ নিয়ে আলেমদের মধ্যে বিরোধ নেই বলে তাঁর বক্তব্যতিনি আবদুল্লাহর কাহিনি বাদ দেননি
তাবারির ধর্মীয় বিচারদাবিগুলোকে আল্লাহর নামে মিথ্যাচার বলাঅভিযোগকে ধর্মীয় অপরাধের শ্রেণিতে স্থাপন
অবতরণের উপলক্ষব্যক্তিবিশেষ, একাধিক ব্যক্তি বা বৃহত্তর গোষ্ঠী—বিভিন্ন সম্ভাবনানির্দিষ্ট উপলক্ষ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সাধারণ নিন্দার বিস্তার পাশাপাশি আছে

ওয়াহিদী এই আয়াতের অধীনেই ইবনে ইসহাকের মাধ্যমে শারহাবিল ইবনে সাদের নামে আরেকটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এনেছেন। তাতে আবদুল্লাহর অনুরূপ বাণী আনার দাবি ও ধর্মত্যাগের পর সরাসরি উসমানের আশ্রয়ে যাওয়ার ঘটনা এসেছে। অভিযোগের স্মৃতি এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ের স্মৃতি এখানে একই বর্ণনার অংশ। [401]

عن محمد بن إسحاق قال : حدثني شرحبيل بن سعد قال : نزلت في عبد الله بن سعد بن سرح قال : سأنزل مثل ما أنزل الله ، وارتد عن الإسلام ، فلما دخل رسول الله – صلى الله عليه وسلم – مكة [ فر إلى عثمان وكان أخاه من الرضاعة فغيبه عنده ، حتى إذا اطمأن أهل مكة ] أتى به عثمان رسول الله – صلى الله عليه وسلم – فاستأمن له .

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক থেকে: তিনি বলেন, শারহাবিল ইবনে সাদ আমাকে জানিয়েছেন, এটি আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে সারহ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার মতো আমিও অবতীর্ণ করব, এবং ইসলাম ত্যাগ করেছিলেন। আল্লাহর রাসুল মক্কায় প্রবেশ করলে [তিনি উসমানের কাছে পালিয়ে যান; উসমান তাঁর দুধভাই ছিলেন। মক্কার মানুষ শান্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি তাঁকে নিজের কাছে লুকিয়ে রাখেন।] এরপর উসমান তাঁকে আল্লাহর রাসুলের কাছে এনে তাঁর জন্য নিরাপত্তা প্রার্থনা করেন।

লেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে আপত্তি থেকে ধর্মত্যাগ, তারপর আল্লাহর নামে মিথ্যাচারের অভিযোগ এবং শেষে প্রাণরক্ষার আবেদন—এই ধারায় বাণীর উৎসসংক্রান্ত প্রশ্ন রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশ্নে রূপ নেয়। একদিকে লেখক দাবি করছেন, একই ধরনের বাণী তিনি নিজেও বলতে পারেন; অন্যদিকে তাফসির সেই দাবিকে শাস্তিযোগ্য ঔদ্ধত্য বলে শ্রেণিবদ্ধ করছে। অভিযোগের ভাষা সংরক্ষিত থাকলেও তার নিষ্পত্তির ক্ষমতা অভিযোগকারীর হাতে নেই। তাঁর পরবর্তী নিরাপত্তা নির্ভর করছে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অনুমোদন এবং উসমানের মধ্যস্থতার ওপর।



মক্কা বিজয়ে হত্যার নির্দেশ, কাবার আশ্রয় ও সাধারণ নিরাপত্তার ব্যতিক্রম

মক্কা বিজয়ের বর্ণনায় সাধারণ নিরাপত্তার ঘোষণা এবং নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে হত্যার নির্দেশ পাশাপাশি আছে। ইবনে ইসহাকের বিবরণ উদ্ধৃত করে ইবনে কাসির জানিয়েছেন, যারা যুদ্ধ করবে তাদের ছাড়া কাউকে হত্যা না করার নির্দেশ ছিল, কিন্তু কয়েকজনকে নাম ধরে ব্যতিক্রম করা হয়। কাবার পর্দার নিচে পাওয়া গেলেও তাদের হত্যা করতে বলা হয়েছিল। আবদুল্লাহ ইবনে সাদ সেই ব্যতিক্রমী তালিকার একজন। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা পেলেও তাঁর জন্য নিরাপত্তা কার্যকর ছিল না; উসমানের আশ্রয় ও পরবর্তী মধ্যস্থতা তাঁর প্রাণরক্ষার পথ হয়। [402]

ইবন ইসহাক বলেন ঃ রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর সেনাধ্যক্ষদের নিকট থেকে এই মর্মে অংগীকার নিয়েছিলেন যে, তাঁরা তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসা লোকদের ব্যতীত অন্য কারও সংগে যুদ্ধে লিপ্ত হবেন না। তবে তিনি নাম উল্লেখ করে বিশেষ কিছু লোককে হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন। এমনকি যদি তাদেরকে কা’বার গিলাফের নীচেও পাওয়া যায় তবু। তাদের মধ্যে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সা’দ ইব্‌ন আবূ সারাহ্ ছিল অন্যতম। সে বাহ্যত : ইসলাম গ্রহণ করে ও ওহী লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু পরে সে মুরতাদ হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় প্রবেশ করে তাকে হত্যার ঘোষণা দিলে সে পালিয়ে উছমান (রা)-এর কাছে আশ্রয় নেয়। সে ছিল উছমানের দুধভাই। উছমান তাকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে নিয়ে আসেন । তিনি দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকার পর বললেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ উছমানের সাথে তার ফিরে যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) উপস্থিত সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন : তোমাদের মধ্যে এমন একজন সুবুদ্ধিসম্পন্ন লোকও কি ছিল না, যে আমার নীরব থাকা অবস্থায় তাকে হত্যা করে দিত। সাহাবীগণ বললেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি আমাদেরকে একটু ইংগিত দিলেন না কেন ? তিনি বললেন, ইংগিত দিয়ে কাউকে হত্যা করান নবীর জন্যে শোভনীয় নয় । অন্য একটি বর্ণনায় আছে- তিনি তখন বলেছিলেন : কোন নবী চোখের খিয়ানত করতে পারেন না।

কোরআন সংকলন 66

নাসাঈর বর্ণনায় ব্যতিক্রমের সংখ্যা এবং নির্দেশের ভাষা স্পষ্ট: চারজন পুরুষ ও দুজন নারী ছাড়া অন্যদের নিরাপত্তা দেওয়া হয়। চারজন পুরুষের মধ্যে ইকরিমা ইবনে আবি জাহল, আবদুল্লাহ ইবনে খাতাল, মিকইয়াস ইবনে সুবাবা এবং আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহের নাম আছে। “কাবার পর্দা ধরে থাকলেও হত্যা করো”—এই নির্দেশ ধর্মীয় আশ্রয়ের স্থানেও ব্যক্তিবিশেষের সুরক্ষা অকার্যকর করে। একই বর্ণনায় ইবনে খাতালকে কাবার পর্দা ধরে থাকা অবস্থায় পাওয়া এবং হত্যা করার কথাও আছে। ফলে তালিকাটি কেবল সম্ভাব্য শাস্তির ঘোষণা হিসেবে পড়ে থাকে না; এর একজনের ক্ষেত্রে কাবার আশ্রয় অতিক্রম করে হত্যার বাস্তবায়নও বর্ণিত হয়েছে। [403]

لَمَّا كَانَ يَوْمُ فَتْحِ مَكَّةَ أَمَّنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم النَّاسَ إِلاَّ أَرْبَعَةَ نَفَرٍ وَامْرَأَتَيْنِ وَقَالَ ‏ “‏ اقْتُلُوهُمْ وَإِنْ وَجَدْتُمُوهُمْ مُتَعَلِّقِينَ بِأَسْتَارِ الْكَعْبَةِ ‏”‏ ‏.‏ عِكْرِمَةُ بْنُ أَبِي جَهْلٍ وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ خَطَلٍ وَمِقْيَسُ بْنُ صُبَابَةَ وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ سَعْدِ بْنِ أَبِي السَّرْحِ فَأَمَّا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ خَطَلٍ فَأُدْرِكَ وَهُوَ مُتَعَلِّقٌ بِأَسْتَارِ الْكَعْبَةِ فَاسْتَبَقَ إِلَيْهِ سَعِيدُ بْنُ حُرَيْثٍ وَعَمَّارُ بْنُ يَاسِرٍ فَسَبَقَ سَعِيدٌ عَمَّارًا – وَكَانَ أَشَبَّ الرَّجُلَيْنِ – فَقَتَلَهُ

বাংলা অনুবাদ: মক্কা বিজয়ের দিনে আল্লাহর রাসুল চারজন পুরুষ ও দুজন নারী ছাড়া অন্যদের নিরাপত্তা দিলেন এবং বললেন, “কাবার পর্দা ধরে থাকা অবস্থায় পেলেও তাদের হত্যা করো।” তারা হলো ইকরিমা ইবনে আবি জাহল, আবদুল্লাহ ইবনে খাতাল, মিকইয়াস ইবনে সুবাবা এবং আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ। আবদুল্লাহ ইবনে খাতালকে কাবার পর্দা ধরে থাকা অবস্থায় পাওয়া গেল। সাঈদ ইবনে হুরাইস ও আম্মার ইবনে ইয়াসির তাঁর দিকে প্রতিযোগিতা করে এগোলেন। সাঈদ আম্মারের আগে পৌঁছালেন—তিনি দুজনের মধ্যে কম বয়সী ছিলেন—এবং তাঁকে হত্যা করলেন।

আবদুল্লাহ ইবনে সাদের ক্ষেত্রে বর্ণিত পথটি হলো আত্মগোপন। তিনি উসমানের কাছে লুকিয়ে থাকেন; উসমান পরে তাঁকে মুহাম্মদের সামনে নিয়ে আসেন। এই আচরণ প্রাণদণ্ডের নির্দেশের কার্যকারিতা প্রকাশ করে। যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে আসতে ভয় পাচ্ছেন, তাঁর নিরাপত্তা সাধারণ ঘোষণার ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে আশ্রয় দিতে হচ্ছে, অপেক্ষা করতে হচ্ছে এবং শাসনক্ষমতার কেন্দ্রের কাছে বিশেষ অনুমোদন চাইতে হচ্ছে। ধর্মত্যাগী লেখকের ভাগ্য তাই একটি সাধারণ নিরাপত্তাবিধির সমান প্রয়োগের অধীনে ছিল না; তাঁর নামের ওপর আরোপিত ব্যতিক্রম প্রত্যাহার করানোর ওপর নির্ভর করছিল।

নিরাপত্তার অবস্থাবর্ণিত ব্যবস্থাফল
মক্কার সাধারণ অধিবাসীবর্ণনা অনুযায়ী সাধারণ নিরাপত্তার ঘোষণাযুদ্ধ না করা মানুষের জন্য সামগ্রিক সুরক্ষা
নাম ধরে ব্যতিক্রম করা ব্যক্তিকাবার পর্দায় আশ্রয় নিলেও হত্যার নির্দেশসাধারণ নিরাপত্তা ও পবিত্র স্থানের আশ্রয় অতিক্রমকারী আদেশ
ইবনে খাতালকাবার পর্দা ধরে থাকা অবস্থায় পাওয়ানাসাঈর বর্ণনায় সেখানেই হত্যা
ইবনে আবি সারহউসমানের কাছে আত্মগোপন ও বিশেষ মধ্যস্থতাপ্রাণরক্ষার জন্য ব্যক্তিগত অনুমোদন প্রয়োজন হয়

মুহাম্মদের সঙ্গে আবদুল্লাহর বিরোধে যে বিষয়টি বারবার আসে, তা তাঁর লেখক পরিচয় ও ধর্মত্যাগের পরে করা অভিযোগ। ইবনে ইসহাকের নামে সংরক্ষিত আরেক বিবরণে হত্যার কারণ ব্যাখ্যা করতে সরাসরি বলা হয়েছে, তিনি কুরাইশদের কাছে নিজের ইচ্ছামতো মুহাম্মদের বাণী ঘুরিয়ে দেওয়ার দাবি করেছিলেন। সেখানে “সর্বজ্ঞ, সহনশীল” বলা হলে “পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” লেখার প্রস্তাব এবং “দুটিই একই”—এই জবাবের কাহিনি আছে। ইবনে তাইমিয়্যা এই বিবরণ আস-সারিমুল মাসলুলে উদ্ধৃত করেছেন। [404]

وإنما أمر بابن أبي سرح لأنه كان قد أسلم فكان يكتب لرسول الله صلى الله عليه وسلم الوحي فرجع مشركا ولحق بمكة فكان يقول: إني لأصرفه كيف شئت إنه ليأمرني أن أكتب له الشيء فأقول له: أو كذا أو كذا فيقول: نعم وذلك أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يقول ” عليم حليم ” فيقول له: أو أكتب ” عزيز حكيم ” فيقول رسول الله صلى الله عليه وسلم: ” كلاهما سواء “

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আবি সারহের বিষয়ে নির্দেশ দেওয়ার কারণ ছিল, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং আল্লাহর রাসুলের জন্য ওহি লিখতেন; পরে মুশরিক হয়ে মক্কায় ফিরে যান। তিনি বলতেন, আমি তাঁকে যেমন চাই তেমন ঘুরিয়ে দিই। তিনি আমাকে কিছু লেখার নির্দেশ দিলে আমি বলি, অথবা এভাবে, অথবা ওভাবে? তিনি বলেন, হ্যাঁ। আল্লাহর রাসুল “সর্বজ্ঞ, সহনশীল” বললে তিনি বলতেন, অথবা “পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” লিখব? আল্লাহর রাসুল বলতেন, “দুটিই একই।”

এই ব্যাখ্যায় নবুয়তের মর্যাদার বিরুদ্ধে অভিযোগকে প্রাণদণ্ডের কারণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বাণীর উৎস সম্পর্কে বিতর্ক তাই বিমূর্ত মতভেদে থেমে থাকে না। অভিযোগকারীকে হত্যার তালিকায় রাখা, তাঁর আশ্রয়ের প্রয়োজন তৈরি করা এবং পরে আনুগত্য গ্রহণের ক্ষমতা একই কর্তৃত্বের হাতে থাকে। এই অবস্থায় ধর্মে প্রত্যাবর্তনকে শুধু স্বতঃস্ফূর্ত মতপরিবর্তনের ভাষায় বর্ণনা করলে জীবনের ওপর ঝুলে থাকা নির্দেশটি অদৃশ্য হয়ে যায়। বর্ণিত পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকা এবং ক্ষমতাবানের অনুমোদন পাওয়া সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।


উসমানের মধ্যস্থতা, তিনবার বায়াত প্রত্যাখ্যান ও হত্যার প্রত্যাশা

উসমানের মধ্যস্থতার ঘটনাটিতে ব্যক্তিগত সম্পর্কের গুরুত্ব স্পষ্ট। আবদুল্লাহ তাঁর দুধভাই; তিনি তাঁকে লুকিয়ে রাখেন এবং নিজে নিয়ে গিয়ে বায়াত গ্রহণের অনুরোধ করেন। আবু দাউদের পূর্ণ বাংলা বর্ণনায় মুহাম্মদের তিনবার তাকানো ও প্রতিবার বায়াত গ্রহণে অস্বীকৃতি, তার পরে বায়াত গ্রহণ এবং উপস্থিতদের কাছে হত্যার প্রত্যাশা প্রকাশ—সবই আছে। এই ধারাবাহিকতায় প্রাণরক্ষা কেবল ফিরে আসার ঘোষণার স্বয়ংক্রিয় ফল হয় না। মধ্যস্থতা, অপেক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত মুহাম্মদের গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত লাগে। [405] [406]

সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৯/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ২১. ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার আগে, কোন বিধর্মী বন্দীকে হত্যা করা।
২৬৭৪. ’উসমান ইবন আবূ শায়বা (রহঃ) …. সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারজন ও দুইজন মহিলা ব্যতীত অন্যান্য সকলকে নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং তিনি তাদের নামও ঘোষণা করেন। আর ইবন আবূ সারাহ্ … এরপর হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রাবী সা’দ বলেনঃ ইবন আবূ সারাহ্ ’উছমান (রাঃ) এর নিকট আত্মগোপন করে থাকেন। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বায়াত গ্রহণের জন্য সকলকে আহ্বান জানান, তখন উছমান (রাঃ) তাকে সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং তাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে দাঁড় করে দেন এবং বলেনঃ হে আল্লাহর নবী! আপনি ’আবদুল্লাহকে বায়াত করান। তিনি তাঁর মাথা উঠান এবং তিনবার তার দিকে তাকান এবং প্রত্যেক বারই বায়াত করাতে অস্বীকার করেন।
তৃতীয় বারের পর তিনি তাকে বায়াত করান, পরে তিনি তাঁর সাহাবীদেরকে বলেনঃ তোমাদের মাঝে এমন কোন চালাক লোক কি ছিল না, যখন সে আমাকে দেখল যে, আমি তাকে বায়াত করাচ্ছি না, তখন কেন সে তাকে হত্যা করল না? তাঁরা (সাহাবীরা) বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা তো আপনার অন্তরের কথা বুঝতে পারিনি। আপনি (এ ব্যাপারে) চোখ দিয়ে কেন আমাদেরকে ইশারা করলেন না? তিনি বললেনঃ কোন নবীর জন্য এ উচিত নয় যে, সে চোরা দৃষ্টিতে তাকাবে।
আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেনঃ
আবদুল্লাহ্ ছিলেন ’উছমান (রাঃ) এর দুধ ভাই এবং ওয়ালীদ ইবন ’উকবা ছিলেন ’উছমান (রাঃ) এর বৈমাত্রেয় ভাই। উছমান (রাঃ) তাঁর শাসনামলে মদ্যপানের অভিযোগে তাকে শাস্তি দেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)

বায়াত গ্রহণে হাত গুটিয়ে রাখার অর্থ পরে মুহাম্মদ নিজেই জানিয়েছেন। বর্ণনায় এই প্রত্যাশা সম্পর্কে তাঁর নিজের বক্তব্য আছে। তিনি জানতে চেয়েছেন, তাঁর অস্বীকৃতি দেখে উপস্থিতদের মধ্যে কেউ কেন উঠে লোকটিকে হত্যা করেনি। অর্থাৎ গ্রহণের আগে বিরতিটি উপস্থিতদের জন্য হত্যার সুযোগ হয়ে উঠবে—এমন প্রত্যাশা তিনি প্রকাশ করেছেন। বায়াত গ্রহণের পরে বলা এই কথাই আগের অপেক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সরাসরি তথ্য দেয়। [407]

أَمَا كَانَ فِيكُمْ رَجُلٌ رَشِيدٌ يَقُومُ إِلَى هَذَا حَيْثُ رَآنِي كَفَفْتُ يَدِي عَنْ بَيْعَتِهِ فَيَقْتُلَهُ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের মধ্যে কি এমন কোনো সুবুদ্ধিসম্পন্ন লোক ছিল না, যে আমার বায়াত নিতে হাত গুটিয়ে রাখা দেখে উঠে গিয়ে তাকে হত্যা করত?

আবু দাউদের আরবি পাঠে তিনবার মাথা তুলে দেখা ও প্রত্যাখ্যানের ভাষা রয়েছে। এরপরই হত্যা না করার জন্য উপস্থিতদের প্রতি প্রশ্ন আসে। গ্রহণের শেষে ইতিবাচক ফল থাকলেও তার আগে ব্যক্তিটির সামনে কোন ঝুঁকি ছিল, তা এই ঘটনাক্রমে প্রকাশিত। তাঁকে হত্যা করা হলে উপস্থিতদের কেউ অনুমোদনবহির্ভূত কাজ করত—এমন নিন্দা এখানে নেই। উল্টো, কাজটি না হওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে। [408]

فَجَاءَ بِهِ حَتَّى أَوْقَفَهُ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ بَايِعْ عَبْدَ اللَّهِ ‏.‏ فَرَفَعَ رَأْسَهُ فَنَظَرَ إِلَيْهِ ثَلاَثًا كُلُّ ذَلِكَ يَأْبَى فَبَايَعَهُ بَعْدَ ثَلاَثٍ ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَى أَصْحَابِهِ فَقَالَ ‏”‏ أَمَا كَانَ فِيكُمْ رَجُلٌ رَشِيدٌ يَقُومُ إِلَى هَذَا حَيْثُ رَآنِي كَفَفْتُ يَدِي عَنْ بَيْعَتِهِ فَيَقْتُلَهُ ‏”‏

বাংলা অনুবাদ: তিনি তাঁকে এনে নবীর সামনে দাঁড় করালেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আবদুল্লাহর বায়াত গ্রহণ করুন। তিনি মাথা তুলে তিনবার তাঁর দিকে তাকালেন; প্রতিবারই অস্বীকার করলেন। তিনবারের পরে তাঁর বায়াত গ্রহণ করলেন। এরপর সঙ্গীদের দিকে ফিরে বললেন, “তোমাদের মধ্যে কি এমন কোনো সুবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিল না, যে আমাকে তাঁর বায়াত গ্রহণে হাত গুটিয়ে রাখতে দেখে উঠে তাঁকে হত্যা করত?”

ধাপবর্ণিত ঘটনাসিদ্ধান্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ
আত্মগোপনআবদুল্লাহ উসমানের কাছে লুকিয়ে থাকেনঘোষিত সাধারণ নিরাপত্তা তাঁর জন্য যথেষ্ট ছিল না
মধ্যস্থতাউসমান নিজে এনে বায়াত গ্রহণের অনুরোধ করেনপ্রভাবশালী আত্মীয়ের প্রবেশাধিকার কাজে লাগে
তিনবার অস্বীকৃতিমুহাম্মদ দেখে বায়াত নিতে অস্বীকার করেনপ্রাণরক্ষার অনুমোদন অপেক্ষমাণ থাকে
শেষ পর্যন্ত গ্রহণপরে বায়াত গ্রহণ করা হয়ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে নিরাপত্তার পরিবর্তন ঘটে
পরবর্তী বক্তব্যউপস্থিতদের কাছে হত্যা না করার কারণ জানতে চাওয়াঅপেক্ষার মধ্যে হত্যার প্রত্যাশা ছিল বলে প্রকাশ পায়

দুধভাইয়ের সম্পর্ক এখানে অলংকারমূলক পরিচয় নয়। উসমান আশ্রয় দিয়েছেন, প্রকাশ্যে উপস্থিত হয়েছেন এবং সরাসরি বায়াতের আবেদন জানিয়েছেন। এই তিনটি কাজের কারণেই আবদুল্লাহ হত্যা করার প্রকাশ্য নির্দেশের মধ্যেও আলোচনার সুযোগ পেয়েছেন। প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সম্পর্ক ও প্রভাব কীভাবে নিরাপত্তা তৈরি করতে পারে, ঘটনাটি তার একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ। একই ক্ষমতা আগে মৃত্যুর অনুমতি দিয়েছে, পরে গ্রহণের মাধ্যমে জীবনরক্ষা করেছে। ব্যক্তির জীবন স্বাধীন অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকার পরিবর্তে শাসকের সিদ্ধান্ত ও মধ্যস্থতাকারীর সফলতার ওপর নির্ভরশীল হয়েছে।

বর্ণনাটিতে আবদুল্লাহর নিজের লেখা পাশাপাশি রেখে অভিযোগের কোনো বিচার নেই। কোন শব্দ তিনি পাল্টেছিলেন, কোনটি মুহাম্মদ সংশোধন করেছিলেন, কোন পাণ্ডুলিপি সাক্ষ্য দেয়—এসব নিয়ে প্রশ্নোত্তরও নেই। বর্ণিত কার্যক্রম হলো প্রাণদণ্ডের নির্দেশ থাকা এক ব্যক্তিকে আনুগত্যের সম্পর্কে পুনরায় গ্রহণ করা হবে কি না। তাই বায়াত গ্রহণ তাঁর অভিযোগের পাঠগত খণ্ডন নয়; এটি তাঁর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থান বদলানোর একটি ঘটনা। ধর্মে ফিরে আসা এবং আগে বলা অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া এক ঘটনা নয়। এখানে সরাসরি যা নিষ্পন্ন হয়েছে, তা তাঁর নিরাপত্তা ও পুনরায় অন্তর্ভুক্তি।

ইসলাম গ্রহণের পটভূমিতে এমন প্রাণদণ্ডের হুমকি থাকলে সম্মতির স্বাধীনতা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একদিকে প্রকাশ্যে বেরোলে হত্যার অনুমতি, অন্যদিকে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য ধর্মীয় আনুগত্যের আবেদন—এই পরিস্থিতি ব্যক্তিকে বেঁচে থাকার স্বার্থে ফিরে আসার প্রবল চাপ দেয়। তাঁর অন্তরের পরিবর্তন সম্পর্কে অনুমান ছাড়াই এই চাপটি শনাক্ত করা যায়, কারণ হুমকি, আত্মগোপন, মধ্যস্থতা ও প্রত্যাখ্যান বর্ণনায় সরাসরি আছে। ক্ষমা পাওয়ার পরিণতি আগের জবরদস্তিমূলক পরিস্থিতিকে মুছে দেয় না; ক্ষমাটিই সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির কার্যকর পথ হয়ে দাঁড়ায়।


“চোখের খিয়ানত”, হত্যার মানত ও অপেক্ষার বিবরণ

“চোখের খিয়ানত” কথাটি হত্যার প্রত্যাশার ঠিক পরের সংলাপে এসেছে। উপস্থিত সঙ্গীরা বলেন, মুহাম্মদের মনে কী ছিল তাঁরা জানতেন না; তিনি চোখ দিয়ে ইশারা করলে তাঁরা বুঝতেন। মুহাম্মদ জবাব দেন, নবীর জন্য চোখের খিয়ানত থাকা শোভন নয়। এই সংলাপের কেন্দ্র হলো হত্যার অনুমতি কীভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। চোখের গোপন ইশারা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, অথচ একটু আগেই লোকটিকে হত্যা না করার জন্য প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ফলে নৈতিক অস্বীকৃতির বিষয়টি সংকীর্ণ: ইশারার গোপন পদ্ধতি। আশ্রয়প্রার্থী মানুষটিকে হত্যা করার প্রত্যাশা নিজেই সেই অস্বীকৃতির আওতায় আসেনি। [409]

فَقَالُوا مَا نَدْرِي يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا فِي نَفْسِكَ أَلاَّ أَوْمَأْتَ إِلَيْنَا بِعَيْنِكَ قَالَ ‏”‏ إِنَّهُ لاَ يَنْبَغِي لِنَبِيٍّ أَنْ تَكُونَ لَهُ خَائِنَةُ الأَعْيُنِ ‏”‏ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার মনে কী ছিল আমরা জানতাম না। আপনি চোখ দিয়ে আমাদের ইশারা করলেন না কেন? তিনি বললেন, “নবীর জন্য চোখের খিয়ানত থাকা শোভন নয়।”

কোন আচরণকে সুবুদ্ধির পরিচয় বলা হচ্ছে, সেটিও লক্ষণীয়। আগের প্রশ্নে “রশিদ” ব্যক্তির অভাবের কথা তুলে বলা হয়েছে, তিনি হাত গুটিয়ে রাখলে কেউ উঠে লোকটিকে হত্যা করল না কেন। অর্থাৎ পরিস্থিতি বুঝে অনুমোদিত সহিংসতা সম্পাদন করার উদ্যোগ এখানে কাঙ্ক্ষিত ছিল। সঙ্গীদের জবাবে উদ্যোগ না নেওয়ার কারণ হিসেবে অনুমতির অস্পষ্টতা এসেছে; হত্যার নৈতিক অগ্রহণযোগ্যতা আসেনি। কথোপকথনের শেষেও চোখের ইশারার পদ্ধতি নিয়ে বক্তব্য আছে। এই বিন্যাসে একজন মানুষের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্তের নৈতিক গুরুত্ব পেছনে পড়ে যায়, আর নেতার অভিপ্রায় বোঝার সঠিক পদ্ধতি সামনে আসে।

ইবনে তাইমিয়্যা ইবনে সাদের তাবাকাত থেকে সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িবের নামে আরও একটি বিবরণ উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে একজন আনসারি মানত করেছিলেন, ইবনে আবি সারহকে দেখলে হত্যা করবেন। উসমান সুপারিশ করছেন, আর আনসারি তলোয়ারের হাতল ধরে মুহাম্মদের ইশারার অপেক্ষা করছেন। শেষে মুহাম্মদ তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি মানত পূরণ করলেন না কেন। আনসারি জানান, ইশারার অপেক্ষায় ছিলেন। এরপর নবীর জন্য ইশারা না করার বক্তব্য আসে। এখানে অপেক্ষা ও হত্যার প্রত্যাশা মানত ও তলোয়ার নিয়ে একটি বিস্তৃত কাহিনির ভেতরে প্রকাশ পেয়েছে। [410]

وكان رجل من الأنصار قد نذر إن رأى ابن أبي سرح أن يقتله فجاء عثمان ـ وكان أخاه من الرضاعة ـ فشفع له إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم وقد أخذ الأنصاري بقائم السيف ينتظر النبي صلى الله عليه وسلم متى يومئ إليه أن يقتله فشفع له عثمان حتى تركه ثم قال رسول الله صلى الله عليه وسلم للأنصاري: ” هلا وفيت بنذرك ” فقال يا رسول الله وضعت يدي على قائم السيف أنتظر متى توميء فأقتله فقال النبي صلى الله عليه وسلم: ” ليس لنبي أن يومئ “

বাংলা অনুবাদ: একজন আনসারি মানত করেছিলেন, ইবনে আবি সারহকে দেখলে তাঁকে হত্যা করবেন। উসমান এলেন—তিনি তাঁর দুধভাই ছিলেন—এবং আল্লাহর রাসুলের কাছে তাঁর জন্য সুপারিশ করলেন। আনসারি তখন তলোয়ারের হাতল ধরে অপেক্ষা করছিলেন, নবী কখন তাঁকে হত্যার ইশারা দেবেন। উসমান সুপারিশ করতে থাকলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হলো। এরপর আল্লাহর রাসুল আনসারিকে বললেন, “তুমি তোমার মানত পূরণ করলে না কেন?” তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি তলোয়ারের হাতলে হাত রেখে অপেক্ষা করছিলাম, আপনি কখন ইশারা করবেন এবং আমি তাঁকে হত্যা করব। নবী বললেন, “নবীর জন্য ইশারা করা শোভন নয়।”

এই বর্ণনায় মানতের বিষয় একজন মানুষকে হত্যা করা। সেটি পূরণ না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং তলোয়ার প্রস্তুত রাখার বিবরণ ধর্মীয় অঙ্গীকারের সঙ্গে প্রাণঘাতী সহিংসতাকে যুক্ত করে। ব্যক্তিটি উসমানের সঙ্গে উপস্থিত হয়েছেন এবং নিরাপত্তা পাওয়ার চেষ্টা করছেন; সেই মুহূর্তেই তাঁকে হত্যা করার মানত কার্যকর করার প্রত্যাশা বর্ণিত হচ্ছে। আশ্রয় ও আনুগত্য চাওয়ার দৃশ্যের মধ্যে হত্যার সম্ভাবনা বজায় থাকে। তাঁর প্রাণরক্ষায় মধ্যস্থতাকারীর উপস্থিতি তাই কেবল আনুষ্ঠানিক শিষ্টাচার ছিল না; তাৎক্ষণিক শারীরিক বিপদের মধ্যে সক্রিয় সুরক্ষা তৈরির প্রচেষ্টা ছিল।

বর্ণিত উপাদানকথোপকথনে অবস্থাননৈতিক ফল
হাত গুটিয়ে রাখাবায়াত গ্রহণ স্থগিতপ্রত্যাশিত হত্যার সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা পরে প্রকাশিত
সঙ্গীদের অজ্ঞতামনের কথা বুঝতে না পারার জবাবআদেশের সংকেত স্পষ্ট ছিল না
চোখের ইশারাসঙ্গীদের প্রস্তাবিত সংকেতএটিকে নবীর মর্যাদার অনুপযোগী বলা হয়
তলোয়ারের হাতলমানতের বর্ণনায় প্রস্তুত আনসারিহত্যার প্রস্তুতি দৃশ্যমান
মানত পূরণের প্রশ্নলোকটিকে ছেড়ে দেওয়ার পরেহত্যা না হওয়ার জন্য আনসারিকে প্রশ্ন করা হয়

ধর্মীয় নেতৃত্বের মর্যাদা রক্ষার মানদণ্ড এবং মানুষের জীবনের নিরাপত্তার মানদণ্ড এখানে এক নয়। গোপন চোখের ইশারাকে খিয়ানত বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, কিন্তু বায়াত গ্রহণের আগে হত্যার প্রত্যাশা প্রকাশ করাকে একই নিন্দার ভাষায় আনা হয়নি। আশ্রয়প্রার্থীর জীবন বাঁচার নৈতিক প্রয়োজনের চেয়ে নবীর জন্য কোন যোগাযোগপদ্ধতি শোভন, সেটি শেষ বাক্যের গুরুত্ব পেয়েছে। এই অগ্রাধিকারের সমালোচনা উৎসে ব্যবহৃত শব্দের বাইরের একটি নৈতিক বিচার, যার ভিত্তি উৎসের মধ্যেই থাকা কথোপকথনের ক্রম ও হত্যার প্রত্যাশা।

ইবনে সাদের নামে সংরক্ষিত মানতের বিবরণ এবং আবু দাউদের বায়াতের বর্ণনার বিস্তার এক নয়। প্রথমটিতে নির্দিষ্ট আনসারির মানত ও তলোয়ারের প্রস্তুতি আছে; দ্বিতীয়টিতে সঙ্গীদের প্রতি সাধারণ প্রশ্ন এবং চোখের ইশারার সংলাপ আছে। পরবর্তী আইনগত আলোচনায় এই উপাদানগুলো পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়েছে। এর ফলে একটি বিশেষ ঘটনার বিবরণ থেকে বৃহত্তর নিয়ম তৈরির পথ খুলেছে: তওবা করতে আসা অভিযোগকারীকেও হত্যা করা কখন বৈধ—এই প্রশ্নে লেখকের ঘটনাটি দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।


ইবনে তাইমিয়্যার ব্যাখ্যা: তওবায় পাপ মোচন ও ব্যক্তিগত ক্ষমায় প্রাণরক্ষা

ইবনে তাইমিয়্যা ইবনে আবি সারহের ঘটনাকে তওবার পরেও হত্যার অনুমতি প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় সাধারণ ধর্মত্যাগ এবং মুহাম্মদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা অবমাননা এক ধরনের অপরাধ নয়। ইসলাম ও তওবা পাপ মোচন করতে পারে, কিন্তু মুহাম্মদের ব্যক্তিগত অধিকারের বিরুদ্ধে অপরাধে মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পেতে তাঁর ক্ষমা প্রয়োজন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, আবদুল্লাহর রক্ত রক্ষা করেছিল মুহাম্মদের ক্ষমা; শুধু ইসলাম গ্রহণ নয়। ফলে ধর্মে ফিরে আসা এবং হত্যার অনুমতি শেষ হওয়া তাঁর আইনগত নির্মাণে আলাদা ঘটনা। [411]

وهذا نص في أن مثل هذا المرتد الطاعن لا يجب قبول توبته بل يجوز قتله وإن جاء تائبا وإن تاب وقد قررنا هذا فيما مضى ـ وهنا ـ من وجوه أخرى أن الذي عصم دمه عفو رسول الله صلى الله عليه وسلم عنه لا مجرد إسلامه وأن بالإسلام والتوبة انمحى الإثم وبعفو رسول الله صلى الله عليه وسلم احتقن الدم والعفو بطل بموته صلى الله عليه وسلم وليس للأمة أن يعفوا عن حقه وامتناعه من بيعته حتى يقوم إليه بعض القوم فيقتله نص في جواز قتله وإن جاء تائبا

বাংলা অনুবাদ: এটি স্পষ্ট দলিল যে, এই ধরনের ধর্মত্যাগী ও আক্রমণাত্মক অভিযোগকারীর তওবা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক নয়; বরং সে তওবা করে এলেও, তওবা করলেও তাকে হত্যা করা বৈধ। আমরা আগে এবং এখানেও অন্য দিক থেকে প্রতিষ্ঠা করেছি যে, তার রক্ত রক্ষা করেছিল আল্লাহর রাসুলের ক্ষমা, শুধু তার ইসলাম গ্রহণ নয়। ইসলাম ও তওবার দ্বারা পাপ মুছে গেছে; আল্লাহর রাসুলের ক্ষমার দ্বারা রক্ত রক্ষা পেয়েছে। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে ক্ষমাদানের সুযোগ শেষ হয়েছে এবং উম্মতের তাঁর অধিকার ক্ষমা করার ক্ষমতা নেই। তাঁর বায়াত গ্রহণে বিরত থাকা, যাতে উপস্থিতদের কেউ উঠে তাকে হত্যা করে, তওবা করে এলেও তাকে হত্যার বৈধতার স্পষ্ট দলিল।

ইবনে তাইমিয়্যা বায়াত গ্রহণে বিলম্বকে হত্যার সুযোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর যুক্তির কেন্দ্র: ব্যক্তি মুসলিম হয়ে বা মুসলিম হতে চেয়ে উপস্থিত হওয়ার পরেও মুহাম্মদ তাঁকে গ্রহণে বিরত ছিলেন এবং অন্য কারও মাধ্যমে তাঁকে হত্যা করার প্রত্যাশা করেছিলেন। তিনি এই ঘটনাকে ধরে সিদ্ধান্তে পৌঁছান, অভিযোগকারীর ফিরে আসা মাত্রই তাঁর জীবন অক্ষত হয়ে যায় না। ধর্মীয় আইন প্রতিষ্ঠার জন্য একজন প্রভাবশালী ইসলামি আইনজ্ঞ এই হত্যার প্রত্যাশাকেই নিজের যুক্তির ভিত্তি করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় অপেক্ষা, প্রত্যাশা ও হত্যার অনুমতি একই ধারায় যুক্ত হয়েছে।

ইবনে তাইমিয়্যার ভাষায় তিনটি পৃথক পরিবর্তন আছে। ইসলাম গ্রহণ ধর্মীয় পরিচয় বদলায়। তওবা পাপের দায় মোচনের প্রশ্নে কার্যকর হয়। মুহাম্মদের ব্যক্তিগত ক্ষমা মৃত্যুর অনুমতি বন্ধ করে। এই ভাগে একজন ব্যক্তি আল্লাহর কাছে পাপমুক্ত হলেও মানুষের হাতে হত্যাযোগ্য থেকে যেতে পারেন—যতক্ষণ না বিশেষ ব্যক্তিগত অধিকার ক্ষমা করা হয়। ফলে পাপ মোচনের ধর্মীয় ধারণা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জীবনের নিরাপত্তায় রূপান্তরিত হয় না। ক্ষমতার অধিকারীর ক্ষমা ব্যক্তির জীবনরক্ষার নির্ধারক শর্ত হয়ে থাকে।

ইবনে তাইমিয়্যার পার্থক্যতাঁর ব্যাখ্যায় কার্যকারিতাযে সীমা রয়ে যায়
ইসলাম গ্রহণব্যক্তির ধর্মে প্রত্যাবর্তনশুধু এটুকুতে অভিযোগসংক্রান্ত হত্যার অনুমতি শেষ হয় না
তওবাপাপ মুছে যাওয়াপাপ মোচন ও প্রাণরক্ষা একই ফল নয়
মুহাম্মদের ক্ষমাব্যক্তির রক্ত রক্ষা পাওয়াপ্রাণরক্ষা ব্যক্তিগত ক্ষমার ওপর নির্ভর করে
মুহাম্মদের মৃত্যুতাঁর বিশেষ ক্ষমাদানের সুযোগ শেষউম্মত তাঁর অধিকার ক্ষমা করতে পারে না বলে ইবনে তাইমিয়্যার সিদ্ধান্ত
বায়াতের আগে অপেক্ষাতওবার পরেও হত্যার বৈধতার দৃষ্টান্তপরে ক্ষমাপ্রাপ্ত হওয়া আগের হত্যার সুযোগকে বাতিল করে না

তাঁর মৃত্যুর পরে উম্মত তাঁর অধিকার ক্ষমা করতে পারবে না—এই সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যাটিকে আরও কঠোর করে। জীবদ্দশার ঘটনাটিতে উসমানের মতো কেউ মধ্যস্থতা করতে পেরেছিলেন এবং মুহাম্মদ ক্ষমা করেছিলেন। ইবনে তাইমিয়্যা সেই ক্ষমাকে একটি বিশেষ ব্যক্তিগত অধিকার হিসেবে নির্ধারণ করে পরবর্তী সমাজের জন্য ক্ষমার পথ বন্ধ করেন। তখন আদর্শ হিসেবে সংরক্ষিত থাকে অপরাধ ও হত্যার অনুমতি, অথচ একই ঘটনার শেষের ব্যক্তিগত ক্ষমা সাধারণভাবে পুনরাবৃত্তিযোগ্য অধিকার হয় না। অতীতের একটি প্রাণরক্ষার ঘটনাই তাঁর যুক্তিতে পরবর্তী অনুরূপ অভিযোগকারীর প্রাণরক্ষা নিশ্চিত না করার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

এই আইনগত নির্মাণে বাণীর উৎস নিয়ে আপত্তির জবাব এবং আপত্তিকারীর শাস্তি সম্পূর্ণ অসম শক্তিতে দাঁড়ায়। লেখক যে অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, সেটি যাচাই করার জন্য তাঁর লেখা ও নির্দেশিত পাঠ তুলনা করার প্রয়োজন; কিন্তু ব্যক্তিগত অবমাননার শ্রেণি প্রয়োগ করে তাঁকে হত্যার যোগ্য ঘোষণা করা সেই যাচাই সম্পন্ন করে না। বরং বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে পরীক্ষা থেকে সিদ্ধান্ত সরে যায় বক্তার আনুগত্য, অপরাধ এবং ক্ষমা পাওয়ার প্রশ্নে। এর সামাজিক ফল হলো ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে অভিজ্ঞতাভিত্তিক অভিযোগ প্রকাশ করা জীবনসংকটের কারণ হয়ে ওঠা।

ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বক্তব্যকে ব্যক্তিগত অধিকারের ক্ষতি হিসেবে ধরে প্রাণদণ্ডের অধীনে আনা সমালোচনার মূল্যকে ভয়াবহভাবে বাড়িয়ে দেয়। অভিযোগ সত্য কি না, সেটি নির্ধারণের আগে অভিযোগকারীকে বেঁচে থাকার অনুমতি চাইতে হয়। তওবার ঘোষণাও যথেষ্ট নয়—ইবনে তাইমিয়্যার ব্যাখ্যায় এই অতিরিক্ত শর্ত সরাসরি আছে। ফলে ঘটনাটি কেবল অতীতের রূঢ় আচরণের স্মৃতি থাকে না; পরবর্তী ধর্মীয় আইনে মতপ্রকাশের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী দণ্ডের ন্যায্যতা তৈরির উপাদান হয়। এই ব্যবহারই লেখকের ঘটনা কোরআনের পাঠ-ইতিহাসের পাশাপাশি কর্তৃত্ব ও দমননীতির ইতিহাসেও কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা প্রকাশ করে।


ইসলামকিউএর পৃথক উত্তরে একই অভিযোগ ও হত্যার কারণের ভিন্ন ব্যবহার

ইসলামকিউএর ২২৮৬৭৫ নম্বর উত্তরে ইবনে আবি সারহের ওহি পরিবর্তনের বর্ণনাগুলোর সনদ আলোচনা করা হয়েছে। উত্তরটির সিদ্ধান্ত হলো, তিনি ওহি বিকৃত করতেন—এ বিষয়ে তারা সহিহ সনদ পায়নি। তাফসিরে কাহিনির প্রসিদ্ধি স্বীকার করেও হাদিসশাস্ত্রের নির্দিষ্ট মানদণ্ডে তার গ্রহণযোগ্যতা অস্বীকার করা হয়েছে। একই উত্তরে তাঁর ধর্মত্যাগ ও মুহাম্মদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা আছে এবং আগের ২১৭১৫৩ নম্বর উত্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। [412]

لم نقف على رواية صحيحة الإسناد أن عبد الله بن أبي سرح كان يحرّف الوحي

বাংলা অনুবাদ: আবদুল্লাহ ইবনে আবি সারহ ওহি বিকৃত করতেন—এ বিষয়ে আমরা সহিহ সনদের কোনো বর্ণনা পাইনি।

২১৭১৫৩ নম্বর উত্তরের আলোচ্য বিষয় হত্যার শাস্তি ও ক্ষমা। সেখানে ধর্মত্যাগ এবং মুহাম্মদের বিরুদ্ধে অপবাদকে দুই পৃথক কারণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় কারণ ব্যাখ্যা করতে বাণী নিজের ইচ্ছামতো বদলানোর অভিযোগসংক্রান্ত ইবনে ইসহাকের বিবরণ আনা হয়েছে। তওবার দ্বারা প্রথম দায় এবং মুহাম্মদের ব্যক্তিগত ক্ষমায় দ্বিতীয় দায় শেষ হওয়ার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। [413]

والقتل لهذا السبب حق للنبي عليه الصلاة والسلام ، يسقط بعفوه وصفحه

বাংলা অনুবাদ: এই কারণে হত্যার অধিকার নবীর; তাঁর ক্ষমা ও মার্জনায় সেটি বিলুপ্ত হয়।

উত্তরমূল প্রশ্নঅভিযোগটির ব্যবহার
২২৮৬৭৫শব্দবদলের কাহিনির সনদসহিহ সনদ পাওয়া যায়নি—এই মূল্যায়ন
২১৭১৫৩হত্যার শাস্তি ও ক্ষমামুহাম্মদের বিরুদ্ধে অপবাদের ব্যাখ্যায় একই ধরনের অভিযোগ ব্যবহার

২২৮৬৭৫ নম্বর উত্তরে ওয়াহিদী ও তাবারির বর্ণনাপথগুলোর মূল্যায়ন আছে; ২১৭১৫৩ নম্বরে ইবনে ইসহাকের বিবরণ দণ্ডব্যাখ্যার উপকরণ। পার্থক্যটি প্রমাণের ওজন ও কার্যকারিতায়: পাঠের পরিবর্তন বিচার করতে সনদগত আপত্তি প্রাধান্য পেয়েছে, আর হত্যার ব্যাখ্যায় সেই ধরনের অভিযোগ ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘনের উপাদান হয়েছে। অভিযোগের যথার্থতা এবং অভিযোগ করাকে শাস্তিযোগ্য অপবাদ বলা—এই দুই বিচার ভিন্ন ভিত্তিতে চলছে।

ইবনে ইসহাকের সংরক্ষিত ভাষ্যে লেখক নির্দিষ্ট শব্দ বদলানো ও অনুমোদনের দাবি করেন। ইবনে তাইমিয়্যার ব্যাখ্যায় সেই আক্রমণাত্মক বক্তব্য ব্যক্তিগত অধিকারের প্রশ্নে প্রাণদণ্ডের উপাদান হয়। এই দুটি প্রাচীন ভাষ্য পাশাপাশি রাখলে একটি মৌলিক সমস্যা স্পষ্ট: অভিযোগকে নবীর মর্যাদার ক্ষতি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করলেই অভিযোগের ঘটনাগত সত্যতা নির্ধারিত হয় না। একটি বক্তব্য কর্তৃত্বকে আঘাত করতে পারে এবং একই সঙ্গে তার সত্যতা পরীক্ষার প্রয়োজন থাকতে পারে। শাস্তির অধিকার ঘোষণা সেই পরীক্ষার কাজ করে না।

ধর্মীয় অভ্যন্তরীণ শ্রেণিবিভাগে কোনো বর্ণনার সনদ দুর্বল হলে তার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে; শুধু সেই শ্রেণি দিয়ে ঘটনাটি ঘটেনি বলে সিদ্ধান্ত তৈরি হয় না। প্রাচীন গ্রন্থে অভিযোগটির সংরক্ষণ, বিভিন্ন বর্ণনায় তার নির্দিষ্ট রূপ এবং পরবর্তী আইনগত আলোচনায় তার ব্যবহার পৃথক ঐতিহাসিক তথ্য। ইসলামি সাহিত্যে অভিযোগের এই উপস্থিতি এবং তার বিরুদ্ধে প্রাণদণ্ডের যুক্তি বাণী ও কর্তৃত্বের সম্পর্ক প্রকাশ করে। লেখকের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে যে প্রশ্ন উঠেছে, প্রাণদণ্ডের অনুমোদন তার কোনো উত্তর দেয় না।


পরবর্তী প্রশাসনিক উত্থান, মিসরের শাসন ও পুণ্যময় মৃত্যুর বিবরণ

যে ব্যক্তিকে মক্কা বিজয়ের দিনে হত্যার তালিকায় রাখা হয়েছিল, পরবর্তী মুসলিম ইতিহাসে তিনিই গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতি ও প্রশাসক হিসেবে স্থান পান। যাহাবির সিয়ারু আলামিন নুবালায় আবদুল্লাহ ইবনে সাদকে আমির, সেনাবাহিনীর নেতা, কুরাইশি এবং উসমানের দুধভাই হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। উসমানের অধীনে মিসরের শাসক হওয়ার কথাও আছে। জীবনীটির শুরুতেই তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক মর্যাদা প্রধান হয়ে উঠেছে; ধর্মত্যাগ ও প্রাণরক্ষার ঘটনা তার পরের অংশে এসেছে। ফলে একই জীবন ধর্মীয় অপরাধের স্মৃতি এবং শাসনক্ষমতার মর্যাদাপূর্ণ ইতিহাস—উভয় ধারায় সংরক্ষিত হয়েছে। [414]

عبد الله بن سعد ابن أبي سرح بن الحارث ، الأمير ، قائد الجيوش ، أبو يحيى القرشي العامري ، من عامر بن لؤي بن غالب . هو أخو عثمان من الرضاعة ، له صحبة ورواية حديث . روى عنه الهيثم بن شفي . ولي مصر لعثمان . وقيل : شهد صفين . والظاهر أنه اعتزل الفتنة ، وانزوى إلى الرملة .

বাংলা অনুবাদ: আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ ইবনে হারিস—আমির, সেনাবাহিনীর নেতা, আবু ইয়াহইয়া আল-কুরাইশি আল-আমিরি; তিনি আমির ইবনে লুআই ইবনে গালিবের বংশধর। তিনি উসমানের দুধভাই। তাঁর সাহচর্য ও হাদিস বর্ণনা রয়েছে। হাইসাম ইবনে শুফাই তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন। উসমানের জন্য তিনি মিসরের শাসনভার গ্রহণ করেন। বলা হয়েছে, তিনি সিফফিনে উপস্থিত ছিলেন। বাহ্যত তিনি গৃহবিবাদ থেকে সরে গিয়ে রামলায় নির্জনে অবস্থান করেছিলেন।

যাহাবি লাইসের সূত্রে উল্লেখ করেছেন, উমরের সময়ে আবদুল্লাহ মিসরের সাঈদ অঞ্চলের শাসক ছিলেন; পরে উসমান তাঁকে পুরো মিসরের দায়িত্ব দেন। একই বিবরণে তাঁর শাসন সম্পর্কে প্রশংসা এবং সামরিক অভিযানের খবর রয়েছে। আফ্রিকার অভিযান, জুরজিরের পরাজয় এবং যাতুস সাওয়ারির নৌযুদ্ধের উল্লেখ তাঁকে বিজেতার পরিচয় দেয়। ধর্মত্যাগী লেখক থেকে এই পর্যায়ের সামরিক-প্রশাসনিক ব্যক্তিতে উত্তরণ কেবল প্রাণে বেঁচে থাকার ঘটনা নয়; ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দায়িত্ব ও মর্যাদাসহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা। [415]

أبو صالح ، عن الليث قال : كان عبد الله بن سعد واليا لعمر على الصعيد ، ثم ولاه عثمان مصر كلها ، وكان محمودا . غزا إفريقية ، فقتل جرجير صاحبها . وبلغ السهم للفارس ثلاثة آلاف دينار ، وللراجل ألف دينار . ثم غزا ذات الصواري ، فلقوا ألف مركب للروم ، فقتلت الروم مقتلة لم يقتلوا مثلها قط . ثم غزوة الأساود .

বাংলা অনুবাদ: আবু সালিহ লাইস থেকে বর্ণনা করেন: আবদুল্লাহ ইবনে সাদ উমরের অধীনে সাঈদের শাসক ছিলেন। পরে উসমান তাঁকে পুরো মিসরের দায়িত্ব দেন এবং তিনি প্রশংসিত ছিলেন। তিনি আফ্রিকায় অভিযান চালিয়ে সেখানকার অধিপতি জুরজিরকে হত্যা করেন। অশ্বারোহীর ভাগে তিন হাজার দিনার এবং পদাতিকের ভাগে এক হাজার দিনার পড়ে। তারপর তিনি যাতুস সাওয়ারির অভিযান চালান। তারা রোমানদের এক হাজার নৌযানের মুখোমুখি হয়; রোমানরা এমনভাবে নিহত হয়, যেমন আগে কখনো হয়নি। তারপর ছিল কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে অভিযান।

রাজস্ব ও সামরিক প্রশাসনের বিভাজন নিয়ে যাহাবির সংরক্ষিত ওয়াকিদীর বর্ণনায় তাঁর উত্থানের একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিবরণ আছে। উসমান আমর ইবনুল আসকে রাজস্বের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নামাজ ও সৈন্যবাহিনীর দায়িত্বে রাখেন, আর ইবনে আবি সারহকে রাজস্বের দায়িত্ব দেন। দুজনের মধ্যে বিরোধ হয় এবং দুজনই উসমানের কাছে অভিযোগ করেন। শেষে আমরকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং দায়িত্ব ইবনে আবি সারহের হাতে একত্রিত হয়। এখানে দুধভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি খলিফার নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতাও দৃশ্যমান। [416]

الواقدي : حدثنا أسامة بن زيد ، عن يزيد بن أبي حبيب قال : كان عمرو بن العاص على مصر لعثمان ، فعزله عن الخراج وأقره على الصلاة والجند . واستعمل عبد الله بن أبي سرح على الخراج ، فتداعيا . فكتب ابن أبي سرح إلى عثمان : إن عمرا كسر الخراج علي . وكتب عمرو : إن ابن سعد كسر علي مكيدة الحرب . فعزل عمرا ، وأضاف الخراج إلى ابن أبي سرح .

বাংলা অনুবাদ: ওয়াকিদী বলেন: উসামা ইবনে জায়েদ আমাদের জানিয়েছেন, ইয়াজিদ ইবনে আবি হাবিব থেকে: উসমানের অধীনে আমর ইবনুল আস মিসরের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি তাঁকে রাজস্বের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নামাজ ও সৈন্যবাহিনীর দায়িত্বে বহাল রাখেন। আবদুল্লাহ ইবনে আবি সারহকে রাজস্বের দায়িত্ব দেন। তখন দুজনের বিরোধ হয়। ইবনে আবি সারহ উসমানকে লেখেন, আমর আমার রাজস্ব আদায় নষ্ট করেছেন। আমর লেখেন, ইবনে সাদ আমার যুদ্ধপরিকল্পনা নষ্ট করেছেন। তখন তিনি আমরকে সরিয়ে দেন এবং ইবনে আবি সারহের হাতে রাজস্বের দায়িত্বও যুক্ত করেন।

পুনর্বাসনের এই ইতিহাসে উসমান দুই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উপস্থিত। প্রথমে তিনি প্রাণরক্ষার মধ্যস্থতাকারী, পরে মিসরের শাসনভারদাতা খলিফা। আবদুল্লাহর অতীতের অভিযোগ থাকার পরেও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তাঁর জন্য উচ্চপদ বন্ধ থাকেনি। আনুগত্য পুনঃস্থাপিত হওয়ার পরে দক্ষতা, সম্পর্ক এবং শাসনকার্যে প্রয়োজনের ভিত্তিতে তাঁর অবস্থান বদলেছে—জীবনীতে বর্ণিত কাজগুলো থেকে এই প্রাতিষ্ঠানিক ফল স্পষ্ট। একসময় প্রাণঘাতী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত ধর্মত্যাগ তাঁর পরবর্তী জীবনের সব পরিচয় গ্রাস করেনি; প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ফিরে আসার পর তাঁকে ক্ষমতাসম্পন্ন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

পর্যায়সংরক্ষিত বিবরণসামাজিক অবস্থানের পরিবর্তন
ওহি লেখকমুহাম্মদের জন্য লেখার দায়িত্বঘোষিত বাণীর নিকটবর্তী সহযোগী
ধর্মত্যাগ ও অভিযোগমক্কায় প্রত্যাবর্তন; শব্দবদলের দাবিবিরোধী ও ধর্মীয় অভিযুক্ত
মক্কা বিজয়হত্যার নির্দেশ; উসমানের মধ্যস্থতাব্যতিক্রমী নিরাপত্তার আবেদনকারী
প্রত্যাবর্তনশেষ পর্যন্ত বায়াত গ্রহণমুসলিম সমাজে পুনঃঅন্তর্ভুক্তি
উমর ও উসমানের অধীনে দায়িত্বসাঈদ, পরে মিসরের প্রশাসন; সামরিক অভিযানউচ্চপদস্থ শাসক ও সেনানায়ক
পরবর্তী জীবনীতে মৃত্যুপ্রার্থনা ও ফজরের নামাজের মধ্যে মৃত্যুর কাহিনিপুণ্যময় পরিণতির স্মৃতি

মৃত্যুর বর্ণনায় এই মর্যাদার পরিবর্তন আরও তীব্র। যাহাবি ইয়াজিদ ইবনে আবি হাবিবের নামে সংরক্ষণ করেছেন, রামলায় মৃত্যুর কাছাকাছি অবস্থায় আবদুল্লাহ রাত থেকে ভোর হওয়ার খবর জানতে থাকেন। তাঁর প্রার্থনা ছিল শেষ কাজ যেন ফজরের নামাজ হয়। তিনি অজু করে নামাজ পড়েন; প্রথম রাকাতে ফাতিহা ও আদিয়াত, দ্বিতীয় রাকাতে ফাতিহা ও আরেকটি সুরা পড়েন। ডানে সালাম ফেরানোর পরে বাঁয়ে ফেরাতে গিয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। জীবনীকার শেষে তাঁর জন্য সন্তুষ্টির প্রার্থনা করেছেন। একই অনুচ্ছেদে মৃত্যুসাল নিয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে; যাহাবি আলির খেলাফতকালের মৃত্যুকে অধিক সঠিক বলেছেন। [417]

سعيد بن أبي أيوب : حدثني يزيد بن أبي حبيب ، قال : لما احتضر ابن أبي سرح وهو بالرملة ، وكان خرج إليها فارا من الفتنة ، فجعل يقول من الليل : آصبحتم ؟ فيقولون : لا . فلما كان عند الصبح ، قال : يا هشام ! إني لأجد برد الصبح فانظر . ثم قال : اللهم اجعل خاتمة عملي الصبح ، فتوضأ ، ثم صلى ، فقرأ في الأولى بأم القرآن والعاديات ، وفي الأخرى بأم القرآن وسورة وسلم عن يمينه ، وذهب يسلم عن يساره فقبض – رضي الله عنه . ومر أنه توفي سنة تسع وخمسين والأصح وفاته في خلافة علي رضي الله عنه .

বাংলা অনুবাদ: সাঈদ ইবনে আবি আইয়ুব বলেন, ইয়াজিদ ইবনে আবি হাবিব আমাকে জানিয়েছেন: ইবনে আবি সারহের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তিনি রামলায় ছিলেন; গৃহবিবাদ থেকে পালিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। রাত থেকে তিনি বলতে থাকেন, ভোর হয়েছে কি? তারা বলত, না। ভোরের কাছাকাছি হলে তিনি বলেন, হে হিশাম, আমি ভোরের শীতলতা অনুভব করছি, দেখে এসো। এরপর বলেন, হে আল্লাহ, আমার শেষ কাজ ফজরের নামাজ করো। তিনি অজু করলেন, তারপর নামাজ পড়লেন। প্রথম রাকাতে ফাতিহা ও আদিয়াত এবং দ্বিতীয় রাকাতে ফাতিহা ও একটি সুরা পড়লেন। ডানে সালাম ফেরালেন; বাঁয়ে সালাম ফেরাতে গেলে তাঁর প্রাণ নেওয়া হলো—আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন। আগে উল্লেখ হয়েছে, তিনি ঊনষাট হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন; অধিক সঠিক হলো, তাঁর মৃত্যু আলির খেলাফতকালে হয়েছিল—আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন।

নামহীন খ্রিষ্টান লেখকের কাহিনির সঙ্গে এই পরিণতি পাশাপাশি রাখলে ধর্মীয় স্মৃতির নির্বাচনী বিন্যাস স্পষ্ট হয়। সেখানে ধর্মত্যাগী লেখকের মৃতদেহ মাটি প্রত্যাখ্যান করে; এখানে ধর্মে ফিরে আসা লেখকের শেষ মুহূর্ত নামাজ ও প্রার্থনায় ঘেরা। একজনের অভিযোগের পরে ভয়াবহ মৃত্যুদৃশ্য, অন্যজনের অভিযোগ ও প্রাণদণ্ডের হুমকির পরে পুনর্বাসন এবং পুণ্যময় মৃত্যু। উভয় ক্ষেত্রে মৃত্যুর দৃশ্য ব্যক্তির ধর্মীয় অবস্থান মূল্যায়নের ভাষা বহন করে। তাঁর লেখা কোন বাক্য কীভাবে তৈরি হয়েছিল—সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তির জন্য মৃত্যুর এই দুই ছবি কোনো পাঠগত তুলনা দেয় না; তারা ব্যক্তির আনুগত্য ও পরিণতি সম্পর্কে ধর্মীয় অর্থ তৈরি করে।

আবদুল্লাহর পরবর্তী উচ্চপদ ও পুণ্যময় মৃত্যুর বিবরণ তাঁর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পুনর্বাসনের স্মৃতি বহন করে। আগের অভিযোগে নির্দিষ্ট শব্দ প্রতিস্থাপন ও অনুমোদনের যে প্রশ্ন ছিল, সেই প্রশ্ন তাঁর প্রশাসনিক সাফল্যের বিবরণেও আলাদা অবস্থানে থাকে। তাঁর জীবনীতে দেখা যায়, ধর্মীয় ক্ষমতা একই ব্যক্তিকে কখনো হত্যাযোগ্য বিরোধী, কখনো আনুগত্যে ফেরত আসা ক্ষমাপ্রাপ্ত ব্যক্তি, আবার কখনো রাষ্ট্রের বিশ্বস্ত শাসক হিসেবে স্থান দিতে পারে। এই পরিবর্তনে ব্যক্তির প্রাণ, পদ ও স্মৃতির ওপর প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমান।

ওহি লেখকদের এই দুটি জীবনী বাণীর ইতিহাসকে কেবল নিখুঁত শ্রুতিলিখনের ছবি হিসেবে আটকে রাখে না। এর ভেতরে লেখকের আপত্তি, শব্দ নির্বাচনের অভিযোগ, অনুমোদনের ভূমিকা, ধর্মত্যাগের ভয়, প্রাণরক্ষার মধ্যস্থতা এবং পুনর্বাসনের ক্ষমতা রয়েছে। পাঠের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা মানুষের বক্তব্য কখনো অলৌকিক শাস্তির কাহিনিতে ঢেকে যায়, কখনো প্রাণদণ্ডের অধিকারের অধীনে চলে যায়। তবু ইসলামি গ্রন্থগুলোতেই তাঁদের অভিযোগের ভাষা টিকে আছে। সেই ভাষা কোরআনের উৎপত্তি ও লিপিবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়ায় মানুষের ভূমিকা এবং সেই ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দমন করার রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে একসঙ্গে দৃশ্যমান করে।



শয়তানের আয়াত: উচ্চারণ, গ্রহণ ও পরে প্রত্যাহারের বর্ণনা

ওহি হিসেবে প্রচারিত বাণী প্রথম উচ্চারণ থেকেই নির্ভুল ছিল, নাকি প্রচারের পরে তার মধ্য থেকে কিছু অংশ সরিয়ে নির্দিষ্ট পাঠ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—গারানিকের বর্ণনাগুলো এই প্রশ্নকে সামনে আনে। সুরা নাজমের সঙ্গে মুসলিম ও মুশরিকদের সম্মিলিত সিজদার খবর হাদিসে আছে। তাফসিরের একাধিক বিবরণে সেই সমাবেশের সঙ্গে লাত, উজ্জা ও মানাতের প্রশংসা এবং তাদের সুপারিশের প্রত্যাশা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। একই বিবরণে পরে ওই বাক্যগুলোকে শয়তানের সংযোজন বলে প্রত্যাহারের কথা আসে। ফলে প্রথম প্রচার, শ্রোতাদের গ্রহণ এবং পরবর্তী সংশোধন—তিনটি পৃথক পর্যায় তৈরি হয়। “শয়তানের আয়াত” নামে পরিচিত এই কাহিনির কেন্দ্র সেই পরিবর্তন এবং বাণীর উৎস নির্ধারণের কর্তৃত্ব।

সূরা নাজমের পরে মুসলিম-মুশরিকদের একসঙ্গে সিজদা

বুখারিতে ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত বর্ণনাটি সংক্ষিপ্ত ও সরাসরি: মুহাম্মদ সুরা নাজমে সিজদা করেন এবং তাঁর সঙ্গে মুসলিম, মুশরিক, জিন ও মানুষ সিজদা করে। এখানে মুশরিকদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ স্পষ্ট। অনুসারীদের নিজস্ব ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে সীমিত থাকার পরিবর্তে একই পাঠ ও একই সিজদায় পরস্পরবিরোধী ধর্মীয় পরিচয়ের মানুষ যুক্ত হয়েছে। বর্ণনাটিতেই সিজদাকারীদের মুসলিম ও মুশরিক—দুটি পরিচয় নির্দিষ্ট করা আছে। [418] [419]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৬৫/ কুরআন মাজীদের তাফসীর
পরিচ্ছদঃ ৬৫/৫৩/৭. আল্লাহর বাণীঃ অতএব আল্লাহ্কে সাজদাহ্ কর এবং তাঁরই ‘ইবাদাত কর। (সূরাহ আন্-নাজম ৫৩/৬২)
৪৮৬২. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরাহ নাজমের মধ্যে সাজদাহ্ করলেন এবং তাঁর সঙ্গে মুসলিম, মুশরিক, জিন ও মানব সবাই সাজদাহ্ করল। আইয়ুব (রহ.)-এর সূত্রে ইব্রাহীম ইবনু তাহ্মান (রহ.) উপরোক্ত বর্ণনার অনুসরণ করেছেন; তবে ইবনু উলাইয়াহ (রহ.) আইয়ূব (রহ.)-এর সূত্রে ইবনু ‘আববাস (রাঃ)-এর কথা উল্লেখ করেননি। (১০৭১) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৪৯৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৪৯৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

কোরআন সংকলন 68

তিরমিজিতেও ইবনে আব্বাসের নামে একই মূল খবর সংরক্ষিত হয়েছে। তিরমিজির গ্রন্থে হাদিসের পরে সুরা নাজম ও মুফাসসাল সুরাগুলোর সিজদা নিয়ে আইনগত মতভেদের আলোচনা রয়েছে। সম্মিলিত সিজদার সংবাদ হাদিসের বিষয়; কোন সুরায় সিজদার বিধান আছে, তার আলোচনা সংকলকের পরবর্তী মন্তব্য। তাঁর আলোচনায় ঘটনার সংবাদ ও সিজদার আইনগত প্রশ্ন পাশাপাশি এসেছে। [420]

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
অধ্যায়ঃ ৪/ কিতাবুল জুমু’আ (জুমু’আর নামায)
পাবলিশারঃ হুসাইন আল-মাদানী
পরিচ্ছদঃ ৫১. সূরা আন-নাজমের সাজদাহ
৫৭৫। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরা নাজম-এ সাজদাহ করেছেন। মুসলিম, মুশরিক, জ্বিন ও মানুষ সবাই তার সাথে সাজদাহ করেছেন। -সহীহ। বুখারী, কিসসাতুল গারানীক— (১৮, ২৫, ৩১ পৃঃ), বুখারী।
আবু ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এ অনুচ্ছেদে ইবনু মাসউদ ও আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে। একদল বিদ্বানের মতে সূরা নাজম-এ সাজদাহ রয়েছে। একদল সাহাবা ও তাবিঈনের মতে মুফাসসাল সূরাসমূহে কোন সাজদাহ নেই। মালিক ইবনু আনাস এই মতের সমর্থক। কিন্তু প্রথম দলের মতই বেশি সহীহ। সুফিয়ান সাওরী, ইবনুল মুবারাক, শাফিঈ ও আহমাদ প্রথম মতের সমর্থক। (অর্থাৎ মুফাসসাল সূরায় সাজদাহ আছে)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

কোরআন সংকলন 70

মুশরিকদের অংশগ্রহণের গুরুত্ব তাদের নিজস্ব ধর্মীয় অবস্থানে। তাঁরা এমন দেবদেবীর পূজা করতেন, যাঁদের কর্তৃত্ব মুহাম্মদের একেশ্বরবাদী প্রচারের সঙ্গে সংঘাতে ছিল। এই অবস্থায় মুহাম্মদের আবৃত্তির শেষে তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে মুশরিকদের সিজদা করা একটি সামাজিক সমবেত প্রতিক্রিয়া। বর্ণনাটি শুধু কোনো ব্যক্তি দূর থেকে প্রভাবিত হয়ে মাথা নোয়ানোর ঘটনা বলে থেমে যায় না; প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্মীয় শিবিরের সম্মিলিত আচরণকে ধরে রাখে। পরে তাফসিরকারেরা সুরা হাজ্জের ব্যাখ্যায় এই আচরণের সঙ্গে দেবীদের প্রশংসাবাক্যকে যুক্ত করেছেন। সেই যোগসূত্রের উপাদান আলাদা তাফসিরি বর্ণনায় বিস্তারিত আছে।

ইবনে মাসউদের নামে আরেক বর্ণনায় সিজদা না করে হাতে মাটি তুলে নেওয়া এক ব্যক্তির কথা পাওয়া যায়। বুখারির এই রূপে তাঁর নাম উমাইয়া ইবনে খালাফ; ইবনে মাসউদ পরে তাঁকে অবিশ্বাসী অবস্থায় নিহত দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। সম্মিলিত সিজদার ভেতরেও তাই ব্যতিক্রমের একটি দৃশ্য সংরক্ষিত আছে। একই সঙ্গে “অবিশ্বাসী” পরিচয়টি ঘটনাটিকে সবার ইসলাম গ্রহণের সংবাদে রূপান্তরিত করে না। [421] [422]

أَوَّلُ سُورَةٍ أُنْزِلَتْ فِيهَا سَجْدَةٌ ‏{‏وَالنَّجْمِ‏}‏‏.‏ قَالَ فَسَجَدَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَسَجَدَ مَنْ خَلْفَهُ، إِلاَّ رَجُلاً رَأَيْتُهُ أَخَذَ كَفًّا مِنْ تُرَابٍ فَسَجَدَ عَلَيْهِ، فَرَأَيْتُهُ بَعْدَ ذَلِكَ قُتِلَ كَافِرًا، وَهْوَ أُمَيَّةُ بْنُ خَلَفٍ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: প্রথম যে সুরায় সিজদা অবতীর্ণ হয়েছিল তা হলো নাজম। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল সিজদা করলেন এবং তাঁর পেছনে থাকা লোকেরাও সিজদা করল। শুধু এক ব্যক্তিকে দেখলাম, তিনি একমুঠো মাটি নিয়ে তার ওপর সিজদা করলেন। পরে তাঁকে অবিশ্বাসী অবস্থায় নিহত দেখেছি। তিনি ছিলেন উমাইয়া ইবনে খালাফ।

বর্ণনামূল বিষয়বিশেষ তথ্য
বুখারি ৪৮৬২ ও ১০৭১; ইবনে আব্বাসমুহাম্মদের সঙ্গে মুসলিম ও মুশরিকদের সিজদাদুটি ধর্মীয় পরিচয় আলাদা করে উল্লেখ; জিন ও মানুষের কথাও আছে
তিরমিজি ৫৭৫; ইবনে আব্বাসএকই সম্মিলিত সিজদার খবরপরে সিজদার বিধান নিয়ে সংকলকের আলোচনা
বুখারি ৪৮৬৩; ইবনে মাসউদসমবেত সিজদা ও একজনের হাতে মাটি তুলে নেওয়াএই রূপে ব্যতিক্রমী ব্যক্তির নাম উমাইয়া ইবনে খালাফ
তাফসিরের গারানিক-বর্ণনাদেবীদের প্রশংসা শুনে মুশরিকদের সন্তুষ্টি ও সিজদাসম্মিলিত আচরণের কারণ হিসেবে বাক্যগুলোর কথা এসেছে

বুখারি ও তিরমিজির ইবনে আব্বাস-বর্ণনায় দেবীদের প্রশংসার বাক্য উদ্ধৃত নেই। সম্মিলিত সিজদার ঘটনাটি সেখানে সংরক্ষিত, আর প্রশংসাবাক্য ও প্রত্যাহারের বিস্তৃত বিবরণ তাফসিরে সংরক্ষিত। এই উৎসগত বিন্যাস থেকেই খবরটির দুটি অংশ সামনে আসে: প্রকাশ্য সমাবেশে ভিন্ন ধর্মের মানুষের একসঙ্গে সিজদা এবং সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত বাণীর পরিবর্তনসংক্রান্ত ব্যাখ্যা। প্রথম খবরের সংক্ষিপ্ততা দ্বিতীয় খবরের সব বিস্তারিত নিজের মধ্যে ধারণ করে না; তাফসিরি উপকরণ নিজস্ব ভাষা ও বর্ণনাপথ নিয়ে উপস্থিত হয়।

সম্মিলিত ধর্মীয় আচরণকে সকলের বিশ্বাস বদলে যাওয়ার সমার্থক করলে শ্রোতাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়। একই মুহূর্তে মাথা নোয়ানো ব্যক্তিরা একই ধর্মতাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কি না, সেটি তাঁদের নিজস্ব বক্তব্যের প্রশ্ন। তাবারির দীর্ঘ বর্ণনায় মুশরিকরা তাদের দেবীদের সুপারিশের স্বীকৃতি পাওয়ার কারণে সন্তুষ্ট হয়। সেখানে মুসলিমদের সিজদার কারণ নবীকে অনুসরণ করা, আর মুশরিকদের সিজদার কারণ তাদের উপাস্যদের মর্যাদা পাওয়া। একই বাহ্যিক আচরণের মধ্যে দুই পক্ষের ভিন্ন ধর্মীয় অর্থ বহাল থাকে।

এই সমাবেশের খবর দূরে পৌঁছালে বাহ্যিক ঐক্যকে পূর্ণ ধর্মীয় ঐক্য বলে বোঝার সুযোগও তৈরি হয়। গারানিকের কয়েকটি বর্ণনায় হাবশায় থাকা মুসলিমদের কাছে মক্কার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে বলে সংবাদ পৌঁছানোর কথা আছে। একসঙ্গে সিজদা করার সংবাদ এবং ধর্মান্তর সম্পর্কে তার ব্যাখ্যা তাই আলাদা। খবরটির সামাজিক ফলের মধ্যে উভয়টি কাজ করেছে: সমাবেশে তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টি এবং দূরে থাকা অনুসারীদের কাছে নিরাপত্তা ফিরে আসার প্রত্যাশা। বাণীর কোনো নির্দিষ্ট রূপ শোনা ও গ্রহণ করা মানুষের চলাচল ও রাজনৈতিক হিসাবেও প্রভাব ফেলেছে—তাফসিরের বিস্তৃত বিবরণে এই সম্পর্কটি স্পষ্ট।

সুরা নাজমের আবৃত্তি এখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। শ্রোতারা তা শুনেছে, প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং ঘটনার সংবাদ অন্যত্র পৌঁছেছে। ফলে পরবর্তী প্রত্যাহারের প্রশ্নও জনসমক্ষে প্রচারিত বাণী সম্পর্কে প্রশ্ন। উচ্চারণের পরে বহু মানুষের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল, পরে কয়েকটি বাক্য বাদ পড়ার সঙ্গে তার ইতিহাসও যুক্ত থাকে। মুশরিকদের সিজদা, তাদের সন্তুষ্টি এবং পরে বিরোধ ফিরে আসার বর্ণনাগুলো সেই পরিবর্তনের সামাজিক মাত্রা সংরক্ষণ করে।


জালালাইন, তাবারি ও ইবনে কাসিরে দেবীদের প্রশংসাবাক্যের বিবরণ

গারানিকের বিবরণে প্রশংসাবাক্যটি লাত, উজ্জা ও মানাতের নাম উচ্চারিত হওয়ার পরে এসেছে। এই তিনটি নাম সুরা নাজমের প্রচলিত পাঠেও আছে। ফলে দেবীদের নাম উল্লেখ করা এবং তাঁদের উচ্চ মর্যাদা ও সুপারিশের স্বীকৃতি দেওয়া দুটি ভিন্ন বক্তব্য। বিতর্কিত বাক্যগুলোর তাৎপর্য দ্বিতীয়টিতে: নামের পরে প্রশংসা যোগ হলে উল্লেখের ধর্মীয় অর্থ বদলে যায়। যাঁদের কর্তৃত্ব অস্বীকার করার জন্য নাম তোলা হচ্ছে, প্রশংসাবাক্য যুক্ত হলে তাঁরাই আল্লাহর কাছে সুপারিশকারী মর্যাদাবান সত্তা হয়ে ওঠেন। [423]

أَفَرَأَيْتُمُ اللَّاتَ وَالْعُزَّىٰ ۝ وَمَنَاةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَىٰ

বাংলা অনুবাদ: তোমরা কি লাত ও উজ্জা সম্পর্কে ভেবে দেখেছ এবং তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্পর্কে?

“গারানিক” শব্দের মধ্যে ঊর্ধ্বে ওঠা পাখির রূপক আছে। ইসলামকিউএ লিসানুল আরব থেকে ইবনে আনবারীর ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করেছে: উপাস্যরা আল্লাহর কাছে নিয়ে যায় ও সুপারিশ করে—এই বিশ্বাসে তাদের আকাশে ঊর্ধ্বগামী পাখির সঙ্গে তুলনা করা হতো। ফলে প্রশংসাবাক্যটি শুধু সৌন্দর্যবাচক বিশেষণ নয়; আকাশ, উচ্চ মর্যাদা এবং মধ্যস্থতার ধারণা একসঙ্গে প্রকাশ করে। [424]

الغرانيق: الذكور من الطير، واحدها غِرْنَوْق وغِرْنَيْق، سمي به لبياضه، وقيل هو الكُرْكيّ، وكانوا يزعمون أن الأصنام تقرّبهم من الله عز وجل، وتشفع لهم إليه، فشبهت بالطيور التي تعلو وترتفع في السماء

বাংলা অনুবাদ: গারানিক হলো পুরুষ পাখিরা; এর একবচন গিরনাওক ও গিরনাইক। সাদা রঙের কারণে এই নাম দেওয়া হয়েছে; বলা হয়েছে, এটি সারস। তারা মনে করত, মূর্তিগুলো তাদের আল্লাহর কাছে নিয়ে যায় এবং তাঁর কাছে তাদের জন্য সুপারিশ করে। তাই সেগুলোকে আকাশে উঁচুতে ওঠা পাখির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল।

জালালাইনের ব্যাখ্যায় মুহাম্মদ কুরাইশের একটি সমাবেশে সুরা নাজম পড়ছিলেন। দেবীদের নামের পরে তাঁর অজান্তে জিহ্বায় শয়তানের প্রক্ষেপণে প্রশংসাবাক্য উচ্চারিত হয়। মুশরিকরা তাতে আনন্দিত হয়। পরে জিবরাইল বিষয়টি জানান, মুহাম্মদ বিষণ্ন হন এবং হাজ্জের আয়াত দিয়ে তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়া হয়। এখানে প্রথম উচ্চারণ, শ্রোতাদের আনন্দ এবং পরে উৎস সম্পর্কে সংশোধিত ঘোষণা পরপর রয়েছে। এর সঙ্গে বাক্যগুলো পাঠ থেকে অপসারণ এবং আল্লাহর আয়াত সুপ্রতিষ্ঠিত করার ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছেন। [425]

৫২. আমি আপনার পূর্বে যে সকল রাসূল তিনি হলেন এমন নবী যাকে তাবলীগ করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। কিংবা নবী যাকে তাবলীগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়নি প্রেরণ করেছি, তাদের কেউ যখনই কিছু আকাঙ্ক্ষা করেছে পড়েছে/ পড়তে চেয়েছে, তখনই শয়তান তার আকাঙ্ক্ষায় কিছু প্রক্ষিপ্ত করেছে। তার পাঠে যা কুরআন নয় এমন কিছু। যাতে যাদের নিকট তাকে প্রেরণ করা হয়েছে তারা আনন্দিত হয়। একদা রাসূল কুরাইশদের কোনো এক মজলিসে সূরা নাজমের أَفَرَأَيْتُمُ اللَّاتَ وَالْعُزَّى وَمَنَاةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَى পাঠ করার পর শয়তানের প্রক্ষেপণে পবিত্র রসনা থেকে একথা বেরিয়ে পড়ে تِلْكَ الْغَرَانِيقُ الْعُلَى، وَإِنَّ شَفَاعَتَهُنَّ لَتُرْتَجَى এ সকল উচ্চ মর্যাদাবান দেবতা অবশ্যই এদের সুপারিশের আশা করা যায়। এতদ শ্রবণে কাফেররা খুবই আনন্দিত হয়।
অতঃপর হযরত জিবরীল (আ.) তাঁকে এ ব্যাপারে জানিয়ে দিলেন যে, শয়তান আপনার অজান্তে মুখে একথা উচ্চারিত করে দিয়েছে। ফলে তিনি খুবই বিষণ্ন হলেন। তখন তাঁকে পরবর্তী এই আয়াত দ্বারা সান্ত্বনা প্রদান করা হয়, যেন তিনি শান্ত হন। আল্লাহ তা বিদূরিত করেন রহিত করেন শয়তান যা প্রক্ষিপ্ত করে। অতঃপর আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। সুদৃঢ় করেন। আল্লাহ তা’আলা সর্বজ্ঞ শয়তানের প্রক্ষিপ্ত বিষয়ে যা উল্লেখ করা হলো। প্রজ্ঞাময় নিজের পক্ষ থেকে শয়তানকে ক্ষমতা দেওয়ার ক্ষেত্রে। তিনি যা ইচ্ছে তা-ই করেন।

কোরআন সংকলন 72
কোরআন সংকলন 74

জালালাইনের আরবি মূলেও উচ্চারণের স্থান অস্পষ্ট নয়: “তাঁর জিহ্বায়”, “তাঁর অজান্তে”—এই ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। একই ব্যাখ্যায় জিবরাইল পরে জানাচ্ছেন বলে প্রথম উচ্চারণের সময়ে মুহাম্মদ ও শ্রোতাদের কাছে ওই উৎসভেদ স্পষ্ট ছিল না। অবৈধ সংযোজন সম্পর্কে জ্ঞান ঘটনাটির পরের পর্যায়ে আসে। [426]

وقَدْ قَرَأَ النَّبِيّ ﷺ فِي سُورَة النَّجْم بِمَجْلِسٍ مِن قُرَيْش بَعْد: ﴿أفَرَأَيْتُمْ اللّاتَ والعُزّى ومَناة الثّالِثَة الأُخْرى﴾ بِإلْقاءِ الشَّيْطان عَلى لِسانه مِن غَيْر عِلْمه ﷺ بِهِ: تِلْكَ الغَرانِيق العُلا وإنَّ شَفاعَتهنَّ لَتُرْتَجى فَفَرِحُوا بِذَلِكَ ثُمَّ أخْبَرَهُ جِبْرِيل بِما ألْقاهُ الشَّيْطان عَلى لِسانه مِن ذَلِكَ فَحَزِنَ فَسُلِّيَ بِهَذِهِ الآيَة لِيَطْمَئِنّ

বাংলা অনুবাদ: নবী কুরাইশের একটি সমাবেশে সুরা নাজমে “তোমরা কি লাত, উজ্জা ও তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্পর্কে ভেবে দেখেছ”—এর পরে তাঁর অজান্তে তাঁর জিহ্বায় শয়তানের প্রক্ষেপণে পড়েছিলেন, “তারা সুউচ্চ গারানিক; তাদের সুপারিশ অবশ্যই প্রত্যাশিত।” এতে তারা আনন্দিত হয়েছিল। পরে জিবরাইল তাঁর জিহ্বায় শয়তানের প্রক্ষেপিত বিষয়টি তাঁকে জানান। এতে তিনি দুঃখিত হন; তাঁকে এই আয়াত দিয়ে সান্ত্বনা দেওয়া হয়, যাতে তিনি আশ্বস্ত হন।

তাবারিতে সাঈদ ইবনে যুবাইরের নামে সংরক্ষিত সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় প্রশংসাবাক্য ও সম্মিলিত সিজদার সংযোগ সরাসরি আছে। দেবীদের উল্লেখ ভালোভাবে হওয়ার কারণে মুশরিকদের প্রতিক্রিয়া বর্ণিত হয়েছে। তারপর তাঁরা মুহাম্মদের সঙ্গে সিজদা করে। অর্থাৎ কাহিনিটি শুধু একই দিনে দুটি অসংশ্লিষ্ট কাজ ঘটেছে বলে রাখেনি; প্রশংসাবাক্য শোনা এবং মুশরিকদের সন্তুষ্টির মধ্যে কারণগত সম্পর্ক দিয়েছে। [427]

فَقَالَ: تِلْكَ الْغَرَانِيقُ الْعُلَى، وَإِنَّ شَفَاعَتَهُنَّ لَتُرْتَجَى. فَسَجَدَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. فَقَالَ الْمُشْرِكُونَ: أَنَّهُ لَمْ يَذْكُرْ آلِهَتَكُمْ قَبْلَ الْيَوْمِ بِخَيْرٍ، فَسَجَدَ الْمُشْرِكُونَ مَعَهُ

বাংলা অনুবাদ: তিনি বললেন, তারা উচ্চ মর্যাদার গারানীক; তাদের সুপারিশ অবশ্যই আশা করা যায়। এরপর আল্লাহর রাসূল সিজদা করলেন। মুশরিকরা বলল, আজকের আগে সে তোমাদের দেবতাদের ভালোভাবে উল্লেখ করেনি। তখন মুশরিকরাও তাঁর সঙ্গে সিজদা করল।

ইবনে কাসিরের তাফসিরে এই ঘটনার একাধিক রূপ, হাবশায় সংবাদ পৌঁছানো, ফিরে আসা এবং বর্ণনাপথ সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন একত্রে রয়েছে। প্রথম দিকের বিবরণে শয়তান জিহ্বায় বাক্য ঢুকিয়েছে বলা হয়; পরে উদ্ধৃত ইবনে শিহাবের বিবরণে মুশরিকদের কানে শোনানো ও মুসলিমদের না শোনার একটি রূপ আছে। শেষে ইবনে কাসির এই দ্বিতীয় ধরনের ব্যাখ্যাকে পছন্দ করেছেন। ভিন্ন রূপ সংরক্ষণের পাশাপাশি তিনি নিজের ধর্মতাত্ত্বিক পছন্দও প্রকাশ করেছেন। [428] [429]

পর্যন্ত পৌঁছিলেন, তখন শয়তান তাহার মুখ দ্বারা ইহা উচ্চারিত করাইল:
تِلْكَ الْغَرَانِيقُ الْأُولَى وَإِنَّ شَفَاعَتَهُنَّ لَتُرْجَى
মুশরিকরা ইহা শ্রবণ করিয়া বলিতে লাগিল মুহাম্মদ (সা)-এর পূর্বে আমাদের উপাস্য কোন প্রশংসা করেন নাই, কিন্তু আজ তিনি আমাদের প্রশংসা করিয়াছেন। অতএব রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন সিজদা করিলেন তাহারা সেই সাথে সিজদা করিল। অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা এই আয়াত নাযিল করেন:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ وَلَا نَبِيٍّ إِلَّا إِذَا تَمَنَّى أَلْقَى الشَّيْطَانُ فِي أَمْنِيَّتِهِ فَيَنْسَخُ اللَّهُ مَا يُلْقِي الشَّيْطَانُ ثُمَّ يُحْكِمُ اللَّهُ آيَاتِهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ.
ইবন জরীর (র)
শু’বা (র) হইতে রিওয়ায়েতটি বর্ণনা করিয়াছেন। তবে ইহা ‘মুরসাল’। বায্যার (র) তাঁহার ‘মুসনাদ গ্রন্থে’ ইউসুফ ইব্‌ন হাম্মাদ (র) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম (সা) মক্কায় একবার সূরা ‘নাজম’ পাঠ করিলেন এবং أَفَرَأَيْتُمُ اللَّاتَ وَالْعُزَّى الخ পর্যন্ত পৌছলেন। অবশিষ্ট রেওয়ায়েতে পূর্ববর্তী হাদীসের বর্ণনা করিয়াছেন। অতঃপর বায্যার (র) বলেন, এই সনদ ব্যতীত অন্য কোন সনদে ইহা মুত্তাসিলরূপে বর্ণিত আছে বলিয়া আমাদের জানা নাই। শুধু উমাইয়া ইব্‌ন খালিদ (র) ইহাকে মুত্তাসিলরূপে বর্ণনা করিয়াছেন। তবে তিনি একজন প্রসিদ্ধ নির্ভরযোগ্য রাবী। তিনি কালবী (র)-এর সূত্রে আবূ সালিহ্ (র)-এর মাধ্যমে হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর মাধ্যমে বর্ণনা করিয়াছেন।
অতঃপর আবূ হাতিম (র) হাদীসটিকে আবুল আলীয়াহ ও সুদ্দী (র) হইতে মুরসালরূপে বর্ণনা করিয়াছেন। অনুরূপ ইবন জরীর (র) মুহাম্মদ ইব্‌ন কা’ব কুরাযী ও মুহাম্মদ ইব্‌ন কায়িস (র) হইতে মুরসালরূপে বর্ণনা করিয়াছেন।
কাতাদাহ (র) বলেন, নবী করীম (সা) মাকামে ইব্রাহীমের নিকট সালাত পড়িতেছিলেন, সালাতে তিনি তন্দ্রাগ্রস্ত হইলেন এবং এই সময় শয়তান তাঁহার মুখ দ্বারা وان شفاعتهن لترجي উচ্চারিত করাইল। মুশরিকরা উহা শ্রবণ করিল এবং মুখস্থ করিল। এবং ইহা প্রচার করিল যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মুখে ইহা উচ্চারিত হইয়াছে।
অতঃপর এই আয়াত অবতীর্ণ হইল:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ وَلَا نَبِيِّ الخ ইব্‌ন আবূ হাতিম (র) বলেন, মূসা ইব্‌ন আবূ মূসা কূফী (র) …. ইব্‌ন শিহাব (র) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সূরা ‘নাজম’ যখন অবতীর্ণ হইল, তখন মুশরিকরা বলিতে লাগিল যদি এই লোকটি (মুহাম্মদ (সা)) আমাদের উপাস্যদের আলোচনা একটু ভালভাবে করিত, তবে আমরা তাঁহাকে ও তাঁহার সাথী সঙ্গীকে গ্রহণ করিয়া লইতাম। কিন্তু ইয়াহুদী ও নাসারা এবং যাহারা তাহার ধর্মের বিরোধিতা করে তাহাদের সকলের তুলনায় সে আমাদের উপাস্যদের বেশী গালমন্দ বলে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁহার সাহাবীগণের প্রতি মুশরিকরা চরম অত্যাচার অবিচার চালাইতেছিল। এবং তাহাদের কুফর ও শিরকের কারণে রাসূলুল্লাহ্ (সা) চরমভাবে ব্যথিত হইতে ছিলেন। এবং তাহারা হিদায়েত লাভ করুক তিনি এই কামনা করিতেছিলেন। অতঃপর ‘সূরা নাজম’ অবতীর্ণ হইল এবং তিনি
أَفَرَأَيْتُمُ اللَّاتَ وَالْعُزَّى وَمَنَاةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَى أَلَكُمُ الذَّكَرُ وَلَهُ الْأُنْثَى
পাঠ করিলেন, তখন মুশরিকদের দেব দেবতাদের উল্লেখকালে শয়তান কয়টি কথা ঢুকাইয়া দিল। এবং উচ্চারিত হইল,
وَأَنَّهُنَّ لَهُنَّ الْغَرَانِيقُ الْعُلَى وَإِنَّ شَفَاعَتَهُنَّ لَتُرْجَى
ইহা ছিল শয়তানের মুখের ছন্দবদ্ধ কালাম। কিন্তু মক্কার প্রত্যেক মুশরিকদের অন্তরে বদ্ধমূল হইল এবং প্রত্যেকে ইহা মুখস্থ করিয়া ফেলিল। তাহারা বলিতে লাগিল মুহাম্মদ (সা) তাঁহার সাবেক ধর্মে প্রত্যাবর্তন করিয়াছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) সূরা ‘নাজম’-এর শেষে সিজদা করিলেন, তখন তাহার নিকট উপস্থিত মুসলমানগণ ও মুশরিক সকলেই সিজদায় অবনত হইল। কিন্তু অলীদ ইব্‌ন মুগীরা যেহেতু অত্যধিক বৃদ্ধ ছিল, এ কারণে সে সিজদা করিতে পারিল না। বরং এক মুষ্টি মাটি হাতে লইয়া উহা স্বীয় মাথায় লাগাইল। মুসলমানগণ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সহিত মুশরিকদের সিজদায় অবনত হইবার কারণে আশ্চর্যান্বিত হইয়াছিল। মুশরিকরা যেহেতু ইসলাম গ্রহণ করেন নাই, অতএব রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সহিত সিজদা করিবার কারণে মুসলমানদের আর বিস্ময়ের শেষ ছিল না। শয়তান মুশরিকদের কানে যে কথাটি ভরিয়া দিয়াছিল। বস্তুত মু’মিনগণ একবার শুনিতে পারেন নাই। কিন্তু মুশরিকরা উহা শুনিতে পাইয়া বড়ই খুশী হইয়াছিল, শয়তান তাহাদিগকে ইহাও বলিয়াছিল যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এই কালামে সূরার সহিত পাঠ করিয়াছেন, অতএব তাহারা সকলেই তাহাদের দেবতার সম্মানার্থে সিজদায় অবনত হইল। এই কথা অন্যান্য লোকের মধ্যেও ছড়াইয়া পড়িল, এমন কি সুদূর হাবশায় পৌছিয়া গেল এবং তথায় অবস্থিত মুসলমানগণও জানিতে পারিলেন। উসমান ইব্‌ মাজউন (রা) ও তাঁহার সাথী সঙ্গীগণ যখন এই সংবাদ জানিতে পারিলেন যে, মক্কার মুশরিকরা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে, তাঁহারা সকলেই রাসুলুল্লাহ (সা) এর সহিত সালাত পড়িয়াছে। অলীদ ইব্‌ন মুগীরা হাতে মাটি উঠাইয়া মাথায় লাগাইয়াছে। তাঁহারা এই কথা জানিতে পারিল যে, মক্কার মুসলমানগণ এখন নিরাপদে। তাঁহারা বড়ই আনন্দের উৎফুল্লের সাথে মক্কা প্রত্যাবর্তন করিলেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটিয়াছিল। শয়তান হকের সহিত যাহা কিছু বাতিল মিশ্রিত করিয়াছিল আল্লাহ্ উহা দূরীভূত করিয়াছিলেন এবং স্বীয় আয়াতকে অধিকতর মযবুত করিয়াছিলেন।
ইরশাদ হইল:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ وَلَا نَبِيٍّ إِلَّا إِذَا تَمَنَّى أَلْقَى الشَّيْطَانُ فِي أَمْنِيَّتِهِ فَيَنْسَخُ اللَّهُ مَا يُلْقِي الشَّيْطَانُ ثُمَّ يُحْكِمُ اللَّهُ آيَاتِهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ . ليَجْعَلَ مَا يُلْقِي الشَّيْطَانُ فِتْنَةً لِلَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَّرَضٌ وَالْقَاسِيَةِ قُلُوبُهُمْ وَإِنَّ الظَّالِمِينَ لَفِي شِقَاقٍ بَعِيدٍ .
উল্লেখিত আয়াত অবতীর্ণ হইবার পর যখন ইহা স্পষ্ট হইয়া গেল যেই ছন্দযুক্ত
কালাম আসলে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কালাম নহে বরং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কুরআন পাঠের মাঝে শয়তান উহা ঢুকাইয়া দিয়াছিল। তখন মুশরিকরা আরো অধিক শক্তি লইয়া মুসলমানদের বিরোধিতা করিতে লাগিল। তাহারা মুসলমানদের সহিত আরো কঠোর আচরণ করিতে লাগিল। এই রিওয়ায়েতটি মুরসাল। ইব্‌ন জরীর যুহরী (র) আবূ বকর ইব্‌ন আবদুর রহমান হারিস ইব্‌ন হিশাম (র) হইতেও অনুরূপ বর্ণিত হইয়াছে। হাফিয আবু বকর বায়হাকী (র) ‘দালাইলুন নবুওয়াত’ গ্রন্থে রিওয়ায়েতটি বর্ণনা করিয়াছেন। ঘটনাটি আবু ইসহাক (র) হইতে বর্ণিত। আমি (ইবন কাসীর) বলি মুহাম্মদ ইবন ইসহাকও অনুরূপ রিওয়ায়েত তাঁহার সীরাত গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেন। কিন্তু সকল রিওয়ায়েতে মুরসাল ও মুনকাতী’, আল্লামা বাগাভী (র) তাঁহার তাফসীরে সব কয়টি রিওয়ায়েতকেই হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) ও মুহাম্মদ ইব্‌ন কা’ব কুরাজীর কালাম হিসাবে বর্ণনা করিয়াছেন। অতঃপর আল্লামা বাগাভী (র) নিজেই এই প্রশ্ন উত্থাপন করিয়াছেন যে, আল্লাহ্ নিজেই যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মুহাফিয ও সংরক্ষণকারী সে ক্ষেত্রে এই রূপ ঘটনা ঘটিল কিভাবে? অতঃপর তিনি একাধিক উত্তর উদ্ধৃত করিয়াছেন। কিন্তু সর্বাপেক্ষা উত্তম উত্তর হইল, প্রকৃতপক্ষে تِلْكَ الْغُرَانِيقَ الْعُلَى الخ এই কথা শয়তান উচ্চারণ করিয়া মুশরিকদের কর্ণকুহরে ঢুকাইয়া ছিল। ফলে তাহারা ধারণা করিয়াছিল যে, ইহা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মুখে উচ্চারিত হইয়াছে। অথচ ইহা বাস্তবের বিপরীত ছিল। বস্তুত শয়তানের পক্ষ হইতে ছিল, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পক্ষ হইতে নহে।
ঘটনাটিকে সত্য মানিয়া মুতাকাল্লীমীনগণ উল্লেখিত প্রশ্নের একাধিক উত্তর দিয়াছেন। কাযী আয়ায (র) তাঁহার ‘শিফা’ নামক গ্রন্থে এই বিষয়ে আলোচনা করিয়াছেন।
মহান আল্লাহর বাণী:

কোরআন সংকলন 76
কোরআন সংকলন 78
কোরআন সংকলন 80

ইবনে কাসিরের সংরক্ষিত বিবরণে একই ঘটনাবিন্যাসের কয়েকটি ভিন্ন ব্যাখ্যা পাশাপাশি রয়েছে। প্রথমটিতে মুহাম্মদের জিহ্বায় প্রশংসাবাক্য আসে, মুশরিকরা শুনে আনন্দিত হয় এবং সিজদা করে। কাতাদার নামে অন্য রূপে তন্দ্রার উল্লেখ আছে। ইবনে শিহাবের দীর্ঘ রূপে মুশরিকদের শ্রবণ ও ধারণার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে; মুসলিমরা সেই বাক্য শোনেনি বলে বর্ণিত। শেষের ব্যাখ্যায় শয়তান কানে শব্দ পৌঁছালে শ্রোতারা তা মুহাম্মদের মুখের কথা ভেবেছে। উচ্চারণের উৎস সম্পর্কে এই রূপগুলো ভিন্ন উত্তর দেয়। একই সঙ্গে প্রতিটি রূপে এমন একটি বাক্য প্রচারিত বা প্রচারিত বলে গৃহীত হয়েছে, যা পরে ওহির অনুমোদিত পাঠ থেকে পৃথক করা হয়েছে।

উৎস বা বর্ণনার রূপপ্রশংসাবাক্য কীভাবে এসেছেগ্রহণ ও সংশোধনের বিবরণ
জালালাইনমুহাম্মদের অজান্তে তাঁর জিহ্বায় শয়তানের প্রক্ষেপণকুরাইশদের আনন্দ; পরে জিবরাইলের সংবাদ ও অপসারণ
তাবারিতে সাঈদ ইবনে যুবাইরসুরা পড়তে গিয়ে মুহাম্মদের প্রশংসাবাক্য উচ্চারণমুশরিকদের সন্তুষ্টি ও একসঙ্গে সিজদা
ইবনে কাসিরে সাঈদ ইবনে যুবাইরের বিবরণজিহ্বায় প্রশংসাবাক্য প্রক্ষেপণদেবীদের ভালো উল্লেখ শুনে সিজদা
কাতাদার নামে তন্দ্রার রূপমাকামে ইব্রাহিমে নামাজের সময় তন্দ্রামুশরিকদের মুখস্থ করা ও প্রচারের কথা
ইবনে শিহাবের বিস্তৃত রূপমুশরিকদের শ্রবণ ও ধারণার ওপর জোরমুসলিমদের না শোনা, মুশরিকদের আনন্দ এবং হাবশায় সংবাদ
ইবনে কাসিরের পছন্দের ব্যাখ্যাশয়তান শ্রোতাদের কানে শোনায়; তারা নবীর উচ্চারণ মনে করেনবীর মুখে উচ্চারণের দায় সরিয়ে শ্রবণের বিভ্রান্তিতে স্থাপন

তাবারিতে মুহাম্মদ ইবনে কাব ও মুহাম্মদ ইবনে কায়সের নামে আরেক বর্ণনায় মুশরিকদের বক্তব্য আরও স্পষ্ট। তারা আল্লাহর সৃষ্টি, জীবিকা ও জীবন-মৃত্যুর ক্ষমতা স্বীকার করে, কিন্তু তাদের দেবীদের সুপারিশের স্থান চায়। প্রশংসাবাক্যে সেই স্থান পাওয়ায় তারা মুহাম্মদের সঙ্গে থাকার কথা বলে। এই বিবরণে এক আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার এবং দেবীদের মধ্যস্থতা স্বীকার পরস্পরের বিকল্প নয়; মুশরিকরা দুটিকে একই ব্যবস্থায় রাখে। বিরোধের কেন্দ্র তাদের উপাস্যদের মর্যাদা। [430]

فرضوا بما تكلم به وقالوا: قد عرفنا أن الله يحيي ويميت، وهو الذي يخلق ويرزق، ولكن آلهتنا هذه تشفع لنا عنده، إذ جعلت لها نصيبا، فنحن معك

বাংলা অনুবাদ: তিনি যা বলেছিলেন তাতে তারা সন্তুষ্ট হলো এবং বলল, আমরা জানি আল্লাহ জীবন দেন ও মৃত্যু দেন, তিনিই সৃষ্টি করেন এবং জীবিকা দেন। কিন্তু আমাদের এই উপাস্যগুলো তাঁর কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করে। তুমি যেহেতু তাদের একটি অংশ দিয়েছ, আমরা তোমার সঙ্গে আছি।

আবুল আলিয়ার নামে তাবারির আরেক বর্ণনায় সামাজিক মর্যাদার শর্তও আছে। কুরাইশ নেতারা মুহাম্মদের সঙ্গীদের দাস, মুক্তদাস ও নিম্নমর্যাদার মানুষ হিসেবে উল্লেখ করে। দেবীদের ভালোভাবে উল্লেখ করলে তাঁরা তাঁর কাছে বসবেন এবং আরবের অভিজাতরা তা দেখে আরও আকৃষ্ট হবে—এই প্রস্তাব দেওয়া হয়। ফলে সমঝোতার প্রত্যাশা শুধু বিশ্বাসের ভাষায় নয়; অনুসারীদের শ্রেণিগত অবস্থান এবং ক্ষমতাবানদের স্বীকৃতির ভাষাতেও প্রকাশিত। [431]

قالت قريش لرسول الله صلى الله عليه وسلم: إنما جلساؤك عبد بني فلان ومولى بني فلان، فلو ذكرت آلهتنا بشيء جالسناك، فإنه يأتيك أشراف العرب فإذا رأوا جلساءك أشراف قومك كان أرغب لهم فيك

বাংলা অনুবাদ: কুরাইশ আল্লাহর রাসুলকে বলল, তোমার সঙ্গে যারা বসে তারা অমুক গোত্রের দাস আর অমুক গোত্রের মুক্তদাস। তুমি আমাদের উপাস্যদের সম্পর্কে কিছু বললে আমরা তোমার সঙ্গে বসতাম। আরবের অভিজাতরা তোমার কাছে আসে; তারা তোমার পাশে তোমার সম্প্রদায়ের অভিজাতদের বসে থাকতে দেখলে তোমার প্রতি আরও আগ্রহী হতো।

প্রস্তাবটির মধ্যে একটি প্রকাশ্য বিনিময়ের শর্ত আছে: উপাস্যদের মর্যাদা দিলে ক্ষমতাবানদের সমর্থন মিলবে। প্রশংসাবাক্যের রাজনৈতিক ফল সেই ঘোষিত শর্তের সঙ্গেই সম্পর্কিত। পরের প্রশংসা ও আনন্দকে সেই শর্তের পটভূমিতে রাখা হয়েছে। এতে বাণীর শব্দ কেবল বিমূর্ত বিশ্বাসের বিষয় থাকে না; কারা সমাবেশে থাকবে, কারা নেতৃত্বকে মেনে নেবে এবং কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা স্বীকৃত হবে—সেসবের সঙ্গেও জড়িয়ে যায়।

হাবশায় থাকা মুসলিমদের ফিরে আসার খবর এই সমঝোতার সামাজিক প্রভাবের আরেক স্তর। তাবারির ইবনে ইসহাক-সূত্রে মুহাম্মদ ইবনে কাবের বর্ণনায় কিছু মানুষ উঠে আসে, অন্যরা থেকে যায়। সংবাদটি ছিল কুরাইশ ইসলাম গ্রহণ করেছে। এর পরে জিবরাইলের আপত্তি, প্রত্যাহার এবং মুশরিকদের ক্ষোভের বিবরণ আছে। এখানে সংবাদ পৌঁছানো, মানুষ তা বিশ্বাস করে চলাচল করা এবং মক্কার রাজনৈতিক সম্পর্কের আবার পরিবর্তন—একটি ধারাবাহিকতা তৈরি করে। প্রকাশ্যে বলা বাক্যের প্রভাব সংশোধনের ঘোষণার আগেই বহু মানুষের আচরণে প্রবেশ করেছে।

বর্তমান নাজমের পাঠে দেবীদের নামের পর তাদের জন্য কোনো ঐশী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে—এমন দাবির বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য আছে। ৫৩:২৩-এ সেগুলোকে পূর্বপুরুষদের দেওয়া নাম বলা হয়েছে এবং আল্লাহর কোনো অনুমোদন নেই বলা হয়েছে। গারানিকের প্রশংসাবাক্যের সঙ্গে এই বক্তব্যের সম্পর্ক অর্থগত বিরোধের: একটিতে মধ্যস্থতার আশা, অন্যটিতে সেই মর্যাদার ভিত্তি অস্বীকার। তাই সংশোধনের কাহিনিতে শব্দের সামান্য ওঠানামা নয়, উপাস্যদের অবস্থান সম্পর্কে বিপরীত মূল্যায়ন সামনে আসে। [432]

إِنْ هِيَ إِلَّا أَسْمَاءٌ سَمَّيْتُمُوهَا أَنتُمْ وَآبَاؤُكُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ بِهَا مِن سُلْطَانٍ ۚ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَمَا تَهْوَى الْأَنفُسُ ۖ وَلَقَدْ جَاءَهُم مِّن رَّبِّهِمُ الْهُدَىٰ

বাংলা অনুবাদ: এগুলো কিছু নাম ছাড়া আর কিছু নয়, যা তোমরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষেরা রেখেছ; আল্লাহ এগুলোর পক্ষে কোনো দলিল অবতীর্ণ করেননি। তারা অনুমান এবং মনের কামনারই অনুসরণ করে। অথচ তাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে তাদের কাছে পথনির্দেশ এসেছে।

বর্ণনাগুলোতে একটি বাক্যের গ্রহণযোগ্যতা বদলানোর সঙ্গে তার উৎসের নামও বদলায়। সমাবেশে উচ্চারিত বা মুহাম্মদের পাঠ বলে গৃহীত বাক্যটি আগে সন্তুষ্টি ও ঐক্য আনে; পরে তাকে শয়তানের সংযোজন বলা হলে সেই ধর্মীয় মর্যাদা প্রত্যাহার হয়। তাবারির দীর্ঘ রূপে মুশরিকরা মুহাম্মদের অনুশোচনা ও পরিবর্তনের অভিযোগ তোলে। তাদের প্রতিক্রিয়ায়ও তারা যে পাঠগত উল্টে যাওয়া দেখেছে তা প্রকাশ পায়। প্রথম ঘোষণার রাজনৈতিক সুবিধা এবং পরের প্রত্যাহারের রাজনৈতিক মূল্য—উভয়টিই বর্ণনার অংশ।


হাজ্জ ২২:৫২–৫৩, শয়তানি সংযোজন ও পাঠ সংশোধনের ব্যাখ্যা

হাজ্জ ২২:৫২-এর বাক্যগঠন তিনটি কাজকে পরপর রাখে: শয়তানের প্রক্ষেপণ, আল্লাহর দ্বারা তার অপসারণ এবং আয়াত সুদৃঢ় করা। সংশোধন এখানে ঘটনার পরের কাজ। তাফসিরে “তামান্না” শব্দকে পাঠ করা অর্থে ব্যাখ্যা করলে প্রক্ষেপণের স্থান হয় নবীর আবৃত্তি; তারপর সেই পাঠের মধ্যে ঢুকে পড়া অংশ বাতিল করা হয়। জালালাইন ও তাবারি এই পাঠগত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আয়াতের সঙ্গে যুক্ত গারানিকের কাহিনিতে প্রক্ষেপিত অংশ এবং তাকে বাদ দেওয়ার ক্রম আছে। [433]

وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ وَلَا نَبِيٍّ إِلَّا إِذَا تَمَنَّىٰ أَلْقَى الشَّيْطَانُ فِي أُمْنِيَّتِهِ فَيَنسَخُ اللَّهُ مَا يُلْقِي الشَّيْطَانُ ثُمَّ يُحْكِمُ اللَّهُ آيَاتِهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

বাংলা অনুবাদ: তোমার আগে আমরা এমন কোনো রাসুল বা নবী পাঠাইনি, যিনি পাঠ করলে শয়তান তাঁর পাঠে কিছু প্রক্ষেপণ করেনি। এরপর আল্লাহ শয়তানের প্রক্ষেপিত বিষয় বাতিল করেন, তারপর আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ সুদৃঢ় করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

তাবারি “তামান্না”র ব্যাখ্যা হিসেবে আকাঙ্ক্ষা এবং পাঠ বা কথা বলার অর্থ উল্লেখ করেছেন। এরপর নিজের সিদ্ধান্তে পাঠের অর্থকে অধিক সংগত বলেছেন। তাঁর যুক্তি আয়াতের পরের অংশ: আল্লাহ তাঁর আয়াত সুদৃঢ় করেন বলা হলে বাতিল করা বিষয়টিও সেই পাঠের মধ্যে প্রক্ষেপিত বিষয়। এই সিদ্ধান্তে “প্রক্ষেপণ” কেবল নবীর অন্তরে ক্ষণিক চিন্তার নাম হয়ে থাকে না; উচ্চারিত বাণীর সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকে। তাবারি নিজেই সেই অর্থ ব্যাখ্যা করতে নবীর জিহ্বার উল্লেখ করেছেন। [434]

فتأويل الكلام إذن: وما أرسلنا من قبلك من رسول ولا نبي إلا إذا تلا كتاب الله، وقرأ، أو حدّث وتكلم، ألقى الشيطان في كتاب الله الذي تلاه وقرأه، أو في حديثه الذي حدث وتكلم ( فَيَنْسَخُ اللَّهُ مَا يُلْقِي الشَّيْطَانُ ) يقول تعالى: فيذهب الله ما يلقي الشيطان من ذلك على لسان نبيه ويبطله.

বাংলা অনুবাদ: তাহলে বক্তব্যের ব্যাখ্যা হলো: তোমার আগে আমরা এমন কোনো রাসুল বা নবী পাঠাইনি, যিনি আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত বা পাঠ করলে, অথবা কথা বললে, শয়তান তাঁর তিলাওয়াত ও পাঠ করা আল্লাহর কিতাবে কিংবা তাঁর কথায় কিছু প্রক্ষেপণ করেনি। “আল্লাহ শয়তানের প্রক্ষেপিত বিষয় বাতিল করেন”—অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর নবীর জিহ্বায় শয়তানের প্রক্ষেপিত বিষয় সরিয়ে দেন এবং তা বাতিল করেন।

তাবারি আয়াতের শব্দের সঙ্গে প্রক্ষেপণ ও অপসারণের সম্পর্ক নিজের ব্যাখ্যায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটি তাঁর উদ্ধৃত বর্ণনার পাশাপাশি তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্ত হিসেবেও রয়েছে। ফলে তাঁর তাফসিরে ঘটনাটি ইতিহাসের উপকরণ এবং আয়াত বোঝার উপকরণ—দুই ভূমিকায় ব্যবহৃত হয়েছে। গারানিকের বাক্যগুলো মুছে ফেলা এবং পরে আয়াত সুদৃঢ় করার ব্যাখ্যা তাঁর কাছে পাঠগত অর্থবহ।

“নাসখ” শব্দের অর্থও এই ক্রমের কেন্দ্রে আছে। ইবনে কাসির সংশ্লিষ্ট স্থানে ভাষাগত অর্থ হিসেবে অপসারণ ও তুলে নেওয়ার কথা বলেছেন। তখন “সংশোধিত” অবস্থায় উপনীত হওয়ার আগে একটি অপসারণযোগ্য অংশ থাকা কাহিনির অন্তর্গত শর্ত। নাসখ শব্দ ব্যবহার করলেই আগের উচ্চারণ ইতিহাস থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় না; শব্দটি বরং কোন কিছু সরিয়ে দেওয়ার কাজ চিহ্নিত করে। [435]

وقوله : ( فينسخ الله ما يلقي الشيطان ) ، حقيقة النسخ لغة : الإزالة والرفع . قال علي بن أبي طلحة ، عن ابن عباس : أي فيبطل الله سبحانه وتعالى ما ألقى الشيطان . وقال الضحاك : نسخ جبريل بأمر الله ما ألقى الشيطان ، وأحكم الله آياته .

বাংলা অনুবাদ: “আল্লাহ শয়তানের প্রক্ষেপিত বিষয় বাতিল করেন”—এখানে নাসখের ভাষাগত প্রকৃত অর্থ অপসারণ ও তুলে নেওয়া। আলি ইবনে আবি তালহা ইবনে আব্বাস থেকে বলেছেন, অর্থাৎ আল্লাহ শয়তানের প্রক্ষেপিত বিষয় বাতিল করেন। দাহহাক বলেছেন, আল্লাহর নির্দেশে জিবরাইল শয়তানের প্রক্ষেপিত বিষয় অপসারণ করেন এবং আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ সুদৃঢ় করেন।

আয়াতের শব্দ বা কাজতাফসিরে ব্যাখ্যাঘটনাক্রমে তার ভূমিকা
تَمَنَّى — তামান্নাজালালাইন ও তাবারির নির্বাচিত ব্যাখ্যায় পাঠ করাবাণী উচ্চারিত হওয়ার পর্যায়
أَلْقَى — প্রক্ষেপণ করাপাঠ বা বক্তব্যে কিছু ঢুকিয়ে দেওয়াঅনুমোদিত বলে গৃহীত বাণীর সঙ্গে ভিন্ন উপাদান মেশা
يَنسَخُ — বাতিল করাঅপসারণ ও তুলে নেওয়াআগের প্রক্ষেপিত অংশ বর্জন
يُحْكِمُ — সুদৃঢ় করাআয়াত স্থির ও প্রতিষ্ঠিত করাঅপসারণের পর অনুমোদিত পাঠ নির্ধারণ
فِتْنَة — পরীক্ষাশ্রোতাদের বিশ্বাস ও সন্দেহের পরীক্ষাপাঠের পরিবর্তনকে ধর্মীয় বাছাইয়ের ঘটনা হিসেবে মূল্যায়ন

পরের আয়াত ২২:৫৩ এই প্রক্ষেপণকে অন্তরে রোগ থাকা এবং কঠিন হৃদয়ের মানুষের পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত করে। তাবারির নিজস্ব ব্যাখ্যায় উদাহরণ হিসেবে গারানিকের বাক্যই আছে। তিনি “অন্তরের রোগ” ব্যাখ্যা করতে মুহাম্মদের সত্যবাদিতা ও তাঁর বক্তব্যের সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহের কথা বলেছেন। অর্থাৎ উৎস নিয়ে সমস্যার পরে শ্রোতার প্রতিক্রিয়াও ধর্মীয় মূল্যায়নের অধীনে আসে। একই ঘোষণার মধ্যে আগে গ্রহণ ও পরে বাতিলের ঘটনা থাকলে যে সংশয় জন্মায়, ব্যাখ্যায় সেই সংশয়কে বিশ্বাসের রোগ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার উপকরণ পাওয়া যায়। [436]

لِّيَجْعَلَ مَا يُلْقِي الشَّيْطَانُ فِتْنَةً لِّلَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ وَالْقَاسِيَةِ قُلُوبُهُمْ ۗ وَإِنَّ الظَّالِمِينَ لَفِي شِقَاقٍ بَعِيدٍ

বাংলা অনুবাদ: যাতে শয়তানের প্রক্ষেপিত বিষয়কে তিনি তাদের জন্য পরীক্ষা করেন, যাদের অন্তরে রোগ আছে এবং যাদের হৃদয় কঠিন। জালিমরা অবশ্যই সুদূর বিরোধে রয়েছে।

তাবারি এই পরীক্ষার ব্যাখ্যায় প্রক্ষেপিত কথার বিষয় ও সন্দেহের লক্ষ্য দুটোই নির্দিষ্ট করেছেন। গারানিকের বাক্য এবং মুহাম্মদের সত্যবাদিতা সম্পর্কে সংশয় একই অনুচ্ছেদে এসেছে। ফলে সন্দেহকে “রোগ” বলার সামাজিক কাজ সরাসরি বোঝা যায়: বাক্যের উৎস নিয়ে অনিশ্চয়তা ঘোষণাকারীর নির্ভরযোগ্যতা পরীক্ষা করার প্রশ্ন থেকে সরে শ্রোতার বিশ্বাসের সমস্যায় পরিণত হয়। [437]

يقول تعالى ذكره: فينسخ الله ما يلقي الشيطان، ثم يحكم الله آياته، كي يجعل ما يلقي الشيطان في أمنية نبيه من الباطل، كقول النبي صلى الله عليه وسلم: تلك الغرانيق العلى، وإن شفاعتهن لترتجى فتنة يقول: اختبارا يختبر به الذين في قلوبهم مرض من النفاق، وذلك الشك في صدق رسول الله صلى الله عليه وسلم وحقيقة ما يخبرهم به.

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর বক্তব্যের অর্থ: তিনি শয়তানের প্রক্ষেপিত বিষয় বাতিল করেন, তারপর নিজের আয়াত সুদৃঢ় করেন, যাতে নবীর পাঠে শয়তানের প্রক্ষেপিত অসত্য বিষয়—যেমন নবীর বলা “তারা সুউচ্চ গারানিক; তাদের সুপারিশ অবশ্যই প্রত্যাশিত”—একটি পরীক্ষা হয়। অর্থাৎ এর দ্বারা তিনি তাদের পরীক্ষা করেন, যাদের অন্তরে মুনাফিকির রোগ আছে; সেটি হলো আল্লাহর রাসুলের সত্যবাদিতা এবং তিনি যা জানান তার সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ।

২২:৫৪-এ বিপরীতে জ্ঞানপ্রাপ্তদের সত্য জানার, বিশ্বাস করার এবং অন্তর নত হওয়ার কথা আছে। এভাবে পরপর তিন আয়াতে একটি পূর্ণ ধর্মীয় ব্যাখ্যা দাঁড়ায়: প্রক্ষেপণ ঘটেছে, তা সরানো হয়েছে, এই পরিবর্তনে কেউ পরীক্ষায় পড়ে এবং অন্যেরা সত্য চিনে আরও আনুগত্যশীল হয়। সংশোধনকে শুধু পাঠ বদলানোর ঘটনা হিসেবে রেখে দেওয়া হয়নি; তার গ্রহণ ও অগ্রহণকে মানুষের ধর্মীয় মান নির্ধারণের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে। [438]

وَلِيَعْلَمَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ أَنَّهُ الْحَقُّ مِن رَّبِّكَ فَيُؤْمِنُوا بِهِ فَتُخْبِتَ لَهُ قُلُوبُهُمْ ۗ وَإِنَّ اللَّهَ لَهَادِ الَّذِينَ آمَنُوا إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ

বাংলা অনুবাদ: আর যাতে যাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তারা জানতে পারে, এটি তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে আসা সত্য; ফলে তারা এতে বিশ্বাস করে এবং তাদের অন্তর তার প্রতি নত হয়। আল্লাহ অবশ্যই বিশ্বাসীদের সরল পথের দিকে পরিচালিত করেন।

জালালাইনের ব্যাখ্যার শেষে আল্লাহর প্রজ্ঞার প্রসঙ্গে শয়তানকে এই ক্ষমতা দেওয়ার কথাও আছে। সুতরাং ওই ব্যাখ্যায় ঘটনাটি সর্বশক্তিমান সত্তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঘটে যাওয়া আকস্মিক ব্যাঘাত হিসেবে থাকছে না। শয়তানের প্রক্ষেপণ, তার অপসারণ এবং মানুষের পরীক্ষা একই ব্যবস্থার মধ্যে স্থান পায়। এর নৈতিক ফল কঠোর: শ্রোতা যে ঘোষণাকে আসমানি বলে গ্রহণ করেছে, তার মধ্যে বিভ্রান্তি ঢোকার সুযোগ থাকে, পরে সংশোধন আসে, আর সেই বিভ্রান্তির মুখে তার সংশয়কে আবার তারই রোগ বা কঠিন হৃদয়ের পরিচয় বলা হয়। [439]

﴿واللَّه عَلِيم﴾ بِإلْقاءِ الشَّيْطان ما ذُكِرَ ﴿حَكِيم﴾ فِي تَمْكِينه مِنهُ بِفِعْلِ ما يَشاء

বাংলা অনুবাদ: “আল্লাহ সর্বজ্ঞ”—শয়তানের উল্লিখিত প্রক্ষেপণ সম্পর্কে; “প্রজ্ঞাময়”—তিনি যা চান তা করার মাধ্যমে শয়তানকে এ বিষয়ে ক্ষমতা দেওয়ার ক্ষেত্রে।

এই পরীক্ষার কাঠামোয় তথ্য পাওয়ার অসমতা রয়েছে। ঘোষণাকারী প্রথমে একটি বাণী শোনাচ্ছেন, শ্রোতা তার উৎস সরাসরি পরীক্ষা করতে পারছেন না। পরে ঘোষণাকারীর কাছ থেকেই আসে আগের অংশের উৎস বদলে দেওয়ার বার্তা। শ্রোতার সংশয় তখন ঘটনাক্রমের একটি স্বাভাবিক ফল: যে মাধ্যমের কথায় তিনি প্রথমে বিশ্বাস করেছিলেন, সেই মাধ্যমই পরে নিজের আগের কথার একটি অংশকে অগ্রহণযোগ্য বলছে। সংশয়কে বিশ্বাসের রোগ বলে চিহ্নিত করলে মাধ্যমটির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের ভার প্রশ্নকারীর চরিত্রের ওপর ফিরে যায়।

গারানিকের ব্যাখ্যায় পাঠ সংশোধনের স্থান প্রথম প্রচারের পর্যায়ে। সুরা পাঠ, জনসমক্ষে বাক্য ছড়িয়ে পড়া এবং তার পরে বাক্য বর্জনের ঘটনাই এখানে বর্ণিত। পরবর্তী সংকলনের আগে অনুমোদিত পাঠে পৌঁছানোর এই পথের মধ্যে গ্রহণ ও বর্জন দুটো কাজ আছে। শেষের স্থিত পাঠের উপস্থিতি সেই আগের গতিশীল ইতিহাসের সঙ্গে সহাবস্থান করে। আয়াত সুদৃঢ় করার দাবি আসছে এমন এক ঘটনার ব্যাখ্যায়, যেখানে আগে অপসারণযোগ্য কিছু প্রচারিত হয়েছিল।


বর্ণনাধারার বিস্তার ও ইবনে হাজরের মূল্যায়ন

গারানিকের খবর একটি মাত্র পরবর্তী গ্রন্থে আটকে নেই। তাবারি সাঈদ ইবনে যুবাইর, আবুল আলিয়া, মুহাম্মদ ইবনে কাব, মুহাম্মদ ইবনে কায়স এবং আবু বকর ইবনে আবদুর রহমানের নামে বর্ণনা সংরক্ষণ করেছেন। ইবনে কাসির একই আলোচনায় ইবনে আবি হাতিম, বাজ্জার, তাবারি, ইবনে ইসহাক, মুসা ইবনে উকবা ও বায়হাকীর সংরক্ষিত উপকরণের উল্লেখ করেছেন। একাধিক গ্রন্থে একই উপকরণের পুনরাবৃত্তি আছে, আবার বর্ণনার উৎস ও ঘটনাবিন্যাসেও পার্থক্য আছে। খবরটির প্রচারের বিস্তার বোঝার জন্য এই দুই দিকই বাস্তব উপাদান।

সুয়ুতির লুবাবুন নুকুলে সাঈদ ইবনে যুবাইর পর্যন্ত পৌঁছানো একটি পথকে সহিহ বলা হয়েছে। বর্ণনার বিষয় সেখানে দেবীদের নামের পরে জিহ্বায় প্রশংসাবাক্য আসা এবং মুশরিকদের সিজদা। “সাঈদ ইবনে যুবাইর থেকে” বলা এবং সরাসরি ঘটনাটির সমকালীন প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য পাওয়া এক বিষয় নয়। সহিহ হিসেবে মূল্যায়িত পথটি কোন ব্যক্তির বক্তব্য পর্যন্ত পৌঁছেছে, উৎসের ভাষা সেটিও জানায়। এই সূত্রে তাবেয়ির নামে বর্ণনার উপস্থিতি এবং তাঁকে সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে দেখানো—দুটি পৃথক দাবি। [440]

أخرج ابن أبي حاتم وابن جرير وابن المنذر من طريق بسند صحيح عن سعيد بن جبير قال قرأ النبي – صلى الله عليه وسلم – بمكة والنجم فلما بلغ أفرأيتم اللات والعزى ومناة الثالثة الأخرى ألقى الشيطان على لسانه: تلك الغرانيق العلا وإن شفاعتهن لترتجى فقال المشركون ما ذكر آلهتنا بخير قبل اليوم فسجد وسجدوا فنزلت وما أرسلنا من قبلك من رسول ولا نبي الآية

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আবি হাতিম, ইবনে জারির ও ইবনে মুনজির সহিহ সনদে সাঈদ ইবনে যুবাইর থেকে বর্ণনা করেছেন: নবী মক্কায় নাজম পড়েন। “তোমরা কি লাত, উজ্জা ও তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্পর্কে ভেবে দেখেছ” পর্যন্ত পৌঁছালে শয়তান তাঁর জিহ্বায় প্রক্ষেপণ করে, “তারা সুউচ্চ গারানিক; তাদের সুপারিশ অবশ্যই প্রত্যাশিত।” মুশরিকরা বলে, আজকের আগে সে আমাদের উপাস্যদের ভালোভাবে উল্লেখ করেনি। তিনি সিজদা করেন, তারাও সিজদা করে। এরপর “তোমার আগে আমরা কোনো রাসুল বা নবী পাঠাইনি”—এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।

তাফসিরের বড় অংশের বর্ণনা তাবেয়িদের মাধ্যমে এসেছে। “মুরসাল” বা “মুনকাতি” বলা হলে বর্ণনার সংযোগ কোথাও অনুল্লিখিত বা বিচ্ছিন্ন রয়েছে—এই তথ্য পাওয়া যায়। সেই কারণেই ইবনে কাসির তাঁর দেখা পথগুলো সম্পর্কে আপত্তি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এই কাহিনি প্রাচীন তাফসির ও সিরাতের উপাদান হিসেবে ছিল এবং বহু ব্যাখ্যাকারী সেটি ব্যবহার করেছেন। সংযোগের ঘাটতি ও বর্ণনার ঐতিহাসিক উপস্থিতি ভিন্ন ধরনের তথ্য; প্রথমটির অস্তিত্ব দ্বিতীয়টিকে মুছে দেয় না।

সংরক্ষিত ধারাতাবারি ও সংশ্লিষ্ট আলোচনায় পরিচয়পুনরাবৃত্তি ও ভিন্নতার ধরন
সাঈদ ইবনে যুবাইরআবু বিশর ও শুবার মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত বর্ণনাতাবারি, ইবনে আবি হাতিম ও অন্য গ্রন্থে একই মূল পথ ব্যবহৃত
আবুল আলিয়াদাউদ ইবনে আবি হিন্দের মাধ্যমে বিবরণমুয়তামির ও হাম্মাদের মাধ্যমে দুটি পথ; অভিজাতদের সমর্থনের প্রস্তাব
আবু বকর ইবনে আবদুর রহমানইবনে শিহাবের মাধ্যমে তাবারির সংরক্ষণপ্রশংসাবাক্য, মুশরিকদের আনন্দ এবং পরে শয়তানের কথা বলা
মুহাম্মদ ইবনে কাব ও মুহাম্মদ ইবনে কায়সআবু মাশারের মাধ্যমে যৌথ বর্ণনা; ইবনে ইসহাকের পথেও ইবনে কাবসমঝোতা, সন্ধ্যার পর জিবরাইলের আপত্তি ও হাবশার সংবাদসহ বিস্তৃত রূপ
ইবনে শিহাবের দীর্ঘ রূপমুসা ইবনে উকবার সূত্রে ইবনে কাসিরে সংরক্ষিতশ্রোতাদের কানে পৌঁছানো এবং মুসলিমদের না শোনার ওপর জোর

ইবনে হাজর বর্ণনাপথের বহুত্ব এবং তাদের উৎসের ভিন্নতাকে ঘটনাটির একটি ভিত্তি থাকার পক্ষে নিয়েছেন। তাঁর এই যুক্তিতে শুধু গ্রন্থের সংখ্যা গোনা নেই; একই খবরের পথগুলো কোথা থেকে আসছে, সেই প্রশ্ন আছে। তাঁর বক্তব্যে বহুত্ব ও উৎসের ভিন্নতা—দুই মানদণ্ডই স্পষ্ট। গারানিকের বিষয়ে সংশয়ের পৃথক বিস্তারিত আলোচনাতেও এই বক্তব্য ও তার পরবর্তী পুনর্ব্যাখ্যা উদ্ধৃত আছে। [441] [442]

فَإِنَّ الطُّرُقَ إِذَا كَثُرَتْ وَتَبَايَنَتْ مَخَارِجُهَا دَلَّ ذَلِكَ عَلَى أَنَّ لَهَا أَصْلًا

বাংলা অনুবাদ: বর্ণনাপথ যখন বহু হয় এবং তাদের উৎস ভিন্ন হয়, তখন তা ঘটনাটির একটি ভিত্তি থাকার নির্দেশ করে।

ফাতহুল বারির মূল আলোচনায় ইবনে হাজর আগে কয়েকটি পথ উল্লেখ করে বলেন, তিনটি সনদ সহিহের শর্ত অনুযায়ী হলেও সেগুলো মুরসাল। তাঁর মূল্যায়নে একটি পথ আরেকটিকে সমর্থন করতে পারে। ফলে আবু বকর ইবনুল আরাবি ও কাজি ইয়াজের সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যানের ভাষা তিনি মানেননি। তাঁর নিজের অনুচ্ছেদে “ভিত্তি আছে” সিদ্ধান্ত এবং মুরসাল হওয়ার অবস্থাটি একসঙ্গে রয়েছে। [443]

وجميع ذلك لا يتمشى على القواعد ، فإن الطرق إذا كثرت وتباينت مخارجها دل ذلك على أن لها أصلا ، وقد ذكرت أن ثلاثة أسانيد منها على شرط الصحيح وهي مراسيل يحتج بمثلها من يحتج بالمرسل وكذا من لا يحتج به لاعتضاد بعضها ببعض

বাংলা অনুবাদ: এই সবকিছু নীতিগুলোর সঙ্গে সংগত হয় না। বর্ণনাপথ যখন বহু হয় এবং তাদের উৎস ভিন্ন হয়, তা তাদের একটি ভিত্তি থাকার নির্দেশ করে। আমি উল্লেখ করেছি, এগুলোর তিনটি সনদ সহিহের শর্ত অনুযায়ী। এগুলো মুরসাল; যাঁরা মুরসালকে প্রমাণ হিসেবে নেন তাঁরা এর অনুরূপ বর্ণনা গ্রহণ করেন, আর যাঁরা তা নেন না তাঁরাও একটি আরেকটিকে সমর্থন করার কারণে গ্রহণ করেন।

ভিত্তি স্বীকার করার পর ইবনে হাজর উচ্চারণের সরল অর্থ গ্রহণে ধর্মতাত্ত্বিক বাধা এনেছেন। মুহাম্মদ ইচ্ছাকৃতভাবে বা অসতর্কতায় একেশ্বরবাদের বিরোধী কোনো কথা কোরআনে যোগ করতে পারেন না—এর কারণ হিসেবে তাঁর অভ্রান্ততার কথা বলেছেন। তারপর বর্ণনার আপত্তিকর অংশকে পুনর্ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নির্ধারণ করেছেন। এখানে প্রমাণমূল্যায়নের দুটি পর্যায় আছে: বর্ণনাধারার ভিত্তিতে কাহিনির কোনো উৎস থাকা এবং অভ্রান্ততার পূর্বস্বীকৃত ধারণা অনুযায়ী সেই কাহিনির অর্থ সীমিত করা। দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটি প্রথমটির মতো বর্ণনাপথ গণনা থেকে আসেনি; নবীর বিষয়ে একটি ধর্মীয় পূর্বধারণা থেকে এসেছে। [444]

وإذا تقرر ذلك تعين تأويل ما وقع فيها مما يستنكر وهو قوله : ” ألقى الشيطان على لسانه : تلك الغرانيق العلى وإن شفاعتهن لترتجى ” فإن ذلك لا يجوز حمله على ظاهره لأنه يستحيل عليه – صلى الله عليه وسلم – أن يزيد في القرآن عمدا ما ليس منه ، وكذا سهوا إذا كان مغايرا لما جاء به من التوحيد لمكان عصمته

বাংলা অনুবাদ: এটি প্রতিষ্ঠিত হলে বর্ণনায় যে আপত্তিকর বিষয় এসেছে তার ব্যাখ্যা নির্ধারণ প্রয়োজন হয়; তা হলো, “শয়তান তাঁর জিহ্বায় প্রক্ষেপণ করেছিল: তারা সুউচ্চ গারানিক; তাদের সুপারিশ অবশ্যই প্রত্যাশিত।” একে বাহ্যিক অর্থে গ্রহণ করা যায় না; কারণ তাঁর পক্ষে ইচ্ছাকৃতভাবে কোরআনে এমন কিছু যোগ করা অসম্ভব, যা তার অংশ নয়। একইভাবে তিনি যে একেশ্বরবাদ এনেছেন তার বিরোধী কিছু অসতর্কতায় যোগ করাও অসম্ভব, তাঁর অভ্রান্ততার কারণে।

এই পুনর্ব্যাখ্যার একটি রূপে শয়তান মুহাম্মদের আবৃত্তির বিরতিতে তাঁর কণ্ঠের অনুকরণ করে বাক্যগুলো বলে। কাছের শ্রোতারা সেগুলো তাঁর কথা মনে করে প্রচার করে। ইবনে হাজর এটিকে উত্তম ব্যাখ্যা বলেছেন। এই রূপে বক্তব্যের কার্যকর উৎস বদলে যায়: আগে জিহ্বায় প্রক্ষেপিত হয়ে মুহাম্মদের বলা বাক্য, পরে বিরতিতে অন্য বক্তার অনুকরণ। ফলে কাহিনির অস্বস্তিকর অংশ দূর করতে ঘটনাটির মধ্যে নতুন শ্রবণব্যবস্থা ও কণ্ঠের অনুকরণের ব্যাখ্যা স্থান পেয়েছে। [445]

وقيل : كان النبي – صلى الله عليه وسلم – يرتل القرآن فارتصده الشيطان في سكتة من السكتات ونطق بتلك الكلمات محاكيا نغمته بحيث سمعه من دنا إليه فظنها من قوله وأشاعها . قال : وهذا أحسن الوجوه .

বাংলা অনুবাদ: বলা হয়েছে, নবী ধীরে ধীরে কোরআন পড়ছিলেন। শয়তান তাঁর কোনো এক বিরতির সুযোগ নিয়ে তাঁর সুর অনুকরণ করে ওই কথাগুলো বলে। কাছে থাকা লোক তা শুনে তাঁর কথা মনে করে এবং প্রচার করে। তিনি বলেন, ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে এটিই উত্তম।

উচ্চারণের উৎস বদলে দেওয়ার এই ব্যাখ্যাও শ্রোতাদের কাছে বাণী শনাক্ত করার সমস্যাটি রেখে দেয়। মুহাম্মদের কণ্ঠের অনুকরণ এমনভাবে করা গেল যে উপস্থিত মানুষ তাঁকেই বক্তা মনে করল—এই রূপে বিপদের জায়গা হয় জনসমক্ষে তাঁর নামে প্রচারিত বাণী। ফলে অভ্রান্ততা শুধু ঘোষণাকারীর জিহ্বায় সীমিত রাখলে শ্রোতার প্রাপ্ত পাঠের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত হয় না। শ্রোতা তাঁর নামে এমন কথা গ্রহণ করতে পারে, যার উৎস পরে পাল্টে দেওয়া হচ্ছে। উচ্চারণের দায় সরানোর ব্যাখ্যা এবং মানুষের হাতে পৌঁছানো বাণীর নির্ভুলতা একই নিশ্চয়তা নয়।

ইসলামকিউএর ১০৩৩০৪ নম্বর উত্তরও ঘটনাটির মূল ভিত্তি স্বীকারের মতকে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত বলেছে। একই উত্তরে সংশোধন ও অপসারণের মাধ্যমে অভ্রান্ততা রক্ষার ব্যাখ্যা আছে। অর্থাৎ ঘটনাটি গ্রহণ করলে নবুয়ত বিপন্ন হবে—এই কারণে সম্পূর্ণ অস্বীকারের বদলে তারা সংশোধিত চূড়ান্ত অবস্থাকে নির্ভুলতার মানদণ্ড করেছে। [446]

والخلاصة أن إثبات أصل القصة قول متجه، وهو أقرب إلى التحقيق العلمي إن شاء الله

বাংলা অনুবাদ: সিদ্ধান্ত হলো, কাহিনির মূল ভিত্তি স্বীকার করা একটি গ্রহণযোগ্য মত এবং তা গবেষণামূলক অনুসন্ধানের অধিক নিকটবর্তী, আল্লাহ চাইলে।

ইবনে কাসিরের বিচ্ছিন্ন বর্ণনাপথের আপত্তি, ইবনে হাজরের পারস্পরিক সমর্থনের যুক্তি এবং জালালাইনের পাঠসংক্রান্ত ব্যাখ্যা ইসলামি আলোচনার ভেতরেই আলাদা অবস্থান। এই পার্থক্য দেখায়, একটি মাত্র অভিন্ন মূল্যায়ন সব গ্রন্থে কার্যকর ছিল না। একই সঙ্গে ঘটনাটির অস্বীকৃতি সব সময় কেবল বর্ণনাপথের আলোচনায় সীমিত থাকেনি; নবীর অভ্রান্ততা এবং তাঁর মুখে কোন কথা আসতে পারে, সেই ধর্মতত্ত্বও সিদ্ধান্তে কাজ করেছে। ইতিহাসের ঘটনাকে পরীক্ষা করার আগে অভ্রান্ততা স্থির করে নিলে ভুল উচ্চারণের বর্ণনার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত আগেই নির্ধারিত হয়ে যায়। যে নির্ভুলতা সম্পর্কে প্রশ্ন উঠেছে, সেই নির্ভুলতাকেই প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

বহু গ্রন্থে সংরক্ষিত বর্ণনার প্রতিটি খুঁটিনাটি অভিন্ন নয়। সিজদার ব্যতিক্রমী ব্যক্তির নাম কোথাও উমাইয়া, কোথাও ওয়ালিদ, আবার আবুল আলিয়ার একটি রূপে সাঈদ এসেছে। শব্দের রূপেও “তাদের সুপারিশ প্রত্যাশিত” এবং “তাদের কাছ থেকে সুপারিশের আশা”—এ ধরনের পার্থক্য আছে। একই খবর সংরক্ষণের সময়ে বিবরণের কোন অংশ স্থির থেকেছে এবং কোন অংশ ভিন্ন হয়েছে, এই পার্থক্য তা জানায়। প্রশংসাবাক্য, সন্তুষ্টি, সমবেত সিজদা এবং পরের অপসারণের সংযোগ বিভিন্ন রূপে ফিরে আসে। নির্দিষ্ট নাম, বাক্যের রূপ এবং উচ্চারণের পদ্ধতিতে প্রতিটি ধারার নিজস্ব বিবরণ রয়েছে।

ইবনে হাজরের বক্তব্যের গুরুত্ব এই যে, তিনি মূল কাহিনির ভিত্তি অস্বীকারের বিরুদ্ধে বর্ণনাধারার সাক্ষ্য ব্যবহার করেছেন, তারপর ধর্মীয় নির্ভুলতা রক্ষার জন্য তার অর্থ পরিবর্তন করেছেন। এই দুই কাজের মধ্যে পদ্ধতিগত টানাপোড়েন আছে। প্রথমটি প্রশ্ন তোলে কী ধরনের খবর কোথায় সংরক্ষিত; দ্বিতীয়টি আগে স্থির করে কোন ধরনের ঘটনা নবীর ক্ষেত্রে সম্ভব। একটিতে বর্ণনা সিদ্ধান্তের উপাদান, অন্যটিতে পূর্বনির্ধারিত ধর্মতত্ত্ব বর্ণনার গ্রহণযোগ্য অর্থের সীমা। গারানিকের বিতর্কে এই সীমা আরোপের ইতিহাসও ঘটনার বর্ণনাধারার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।


একই ঘোষণাকারীর প্রথম প্রচার ও পরবর্তী প্রত্যাহারে ওহির উৎস নির্ধারণ

গারানিকের বর্ণনায় একই ঘোষণাকারীর মুখে প্রথমে একটি পাঠ আসে, পরে তার একটি অংশ প্রত্যাহার হয় এবং উৎসের পরিচয় বদলে যায়। প্রথম মুহূর্তে শ্রোতা বাক্যটিকে মুহাম্মদের আবৃত্তির অংশ হিসেবে গ্রহণ করে; পরের মুহূর্তে তাকে জানানো হয়, ওই অংশ আল্লাহর কাছ থেকে আসেনি। এই দুই ঘোষণার মধ্যে পার্থক্য শুধু শব্দ গ্রহণ বা বর্জনের নয়। কোন বাণী আসমানি এবং কোন বাণী শয়তানি, সেই সিদ্ধান্তও পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে নির্ভুলতার প্রশ্নে উচ্চারণের ইতিহাস এবং পরবর্তী অনুমোদিত অবস্থার মধ্যে একটি বাস্তব ব্যবধান তৈরি হয়।

তাবারিতে মুহাম্মদ ইবনে কাব ও মুহাম্মদ ইবনে কায়সের বর্ণনায় সন্ধ্যার পরে জিবরাইলের সঙ্গে পাঠ মিলিয়ে দেখার একটি দৃশ্য আছে। জিবরাইল দুই বাক্য নিয়ে বলেন, তিনি সেগুলো আনেননি। কাহিনিতে মুহাম্মদের প্রতিক্রিয়া আরও কঠোর: তিনি আল্লাহর নামে এমন কথা বলার বিষয়ে নিজের অপরাধের কথা বলেন, যা আল্লাহ বলেননি। এই বক্তব্যে নিজের আগে বলা পাঠের উৎস সম্পর্কে ভুল চিহ্নিত করার খবর আছে। সেটি সমাবেশের আগের কোনো সতর্কবার্তা নয়; প্রচার ও গ্রহণের পরে আসে। [447]

قالا فلما أمسى أتاه جبرائيل عليه السلام، فعرض عليه السورة; فلما بلغ الكلمتين اللتين ألقى الشيطان عليه قال: ما جئتك بهاتين، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: افْتَرَيْتُ عَلى الله، وَقُلْتُ عَلى الله ما لَمْ يَقُلْ

বাংলা অনুবাদ: তাঁরা দুজন বলেন, সন্ধ্যা হলে জিবরাইল তাঁর কাছে এলেন। তিনি তাঁকে সুরাটি পড়ে শোনালেন। শয়তানের প্রক্ষেপিত দুই বাক্যে পৌঁছালে তিনি বললেন, এই দুই বাক্য আমি তোমার কাছে আনিনি। তখন আল্লাহর রাসুল বললেন, আমি আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনা করেছি এবং আল্লাহ যা বলেননি তা তাঁর নামে বলেছি।

সমাবেশের শ্রোতারা প্রথমে যে নির্দেশক পেয়েছিল তা ছিল বক্তা এবং আবৃত্তির প্রসঙ্গ। মুহাম্মদ সুরা পড়ছেন—এই অবস্থায় তাঁর বলা বাক্যকে তারা সেই পাঠের অংশ বলে গ্রহণ করেছে। পরে প্রত্যাহারের সময়ে একই বক্তার কর্তৃত্ব তাদের নতুন অবস্থান গ্রহণের ভিত্তি হয়। জিবরাইলের সঙ্গে পাঠ মিলিয়ে দেখার দৃশ্য সমাবেশে প্রথম বাণী শোনার অভিজ্ঞতার বাইরে; ওই সাক্ষাতের খবর তাদের কাছে নতুন করে পৌঁছাতে হয়। ফলে প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানের মধ্যে শ্রোতার আস্থাই সংযোগ রক্ষা করে। বক্তার নির্ভুলতা প্রশ্নের মুখে পড়লে সেই আস্থা আবার বক্তার পরবর্তী ঘোষণার দ্বারাই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

পর্যায়বাণীর প্রচারিত অবস্থানশ্রোতার কাছে তার ভিত্তি
প্রথম আবৃত্তিদেবীদের মর্যাদা ও সুপারিশের প্রশংসাবাক্য পাঠের মধ্যে উপস্থিতমুহাম্মদের আবৃত্তি বা তাঁর আবৃত্তি বলে গৃহীত শব্দ
তাৎক্ষণিক গ্রহণমুশরিকদের সন্তুষ্টি এবং সম্মিলিত সিজদাসমাবেশে শোনা বক্তব্য ও তার ধর্মীয় অর্থ
পরে আপত্তির সংবাদজিবরাইল ওই দুই বাক্য আনেননি বলে জানানোসমাবেশের পরের সাক্ষাৎ সম্পর্কে নতুন বার্তা
প্রত্যাহারআগের অংশকে শয়তানের প্রক্ষেপণ বলে বাতিল করাএকই নবুয়তের কর্তৃত্বে উৎসের নতুন শ্রেণিবিভাগ
চূড়ান্ত অনুমোদনবাকি বা সংশোধিত পাঠকে আল্লাহর সুদৃঢ় আয়াত বলাপরবর্তী ঘোষণাকে নির্ধারক হিসেবে গ্রহণ

নাজমের শুরুর ঘোষণায় মুহাম্মদের কোরআন-পাঠকে প্রবৃত্তিজাত বলা হয়নি; তাকে ওহি বলা হয়েছে। তাবারির ব্যাখ্যায়ও এই বক্তব্য বিশেষভাবে কোরআন সম্পর্কে। গারানিকের কাহিনির সঙ্গে একই সুরার এই দাবি মুখোমুখি হলে সমস্যাটি আরও নির্দিষ্ট হয়: যে আবৃত্তি ওহি হিসেবে শুরু হয়েছিল, তার মধ্যে শোনা একটি অংশ পরে ভিন্ন উৎসের বলে চিহ্নিত হচ্ছে। শ্রোতা প্রথম মুহূর্তে বক্তার পাঠের মধ্যেই উৎসের নিশ্চয়তা খুঁজেছিল, অথচ কাহিনির পরের অংশ জানাচ্ছে সেই নিশ্চয়তা যথেষ্ট ছিল না। [448]

وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ ۝ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ

বাংলা অনুবাদ: তিনি প্রবৃত্তি থেকে বলেন না। এটি তো কেবল ওহি, যা প্রত্যাদেশ করা হয়।

ইবনে তাইমিয়্যার ব্যাখ্যায় নির্ভুলতার মানদণ্ড হলো শেষ পর্যন্ত ভুল স্থায়ীভাবে থেকে না যাওয়া। তাঁর ভাষায়, ওহি পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভুল স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে না; কিন্তু এমন কিছু ঘটতে পারে কি না, যা পরে আল্লাহ সংশোধন করেন, সেই প্রশ্নে মতভেদ আছে। অর্থাৎ “কখনো ভুল বাণী প্রচারিত হয়নি” এবং “ভুল প্রচারিত হলেও পরে তা থেকে যায়নি”—এ দুটি আলাদা নিশ্চয়তা। তাঁর আলোচনায় দ্বিতীয় নিশ্চয়তার জায়গা আছে। [449]

والعصمة فيما يبلغونه عن الله ثابتة فلا يستقر في ذلك خطأ باتفاق المسلمين . ولكن هل يصدر ما يستدركه الله فينسخ ما يلقي الشيطان ويحكم الله آياته ؟ هذا فيه قولان . والمأثور عن السلف يوافق القرآن بذلك .

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁরা যা পৌঁছে দেন সে বিষয়ে অভ্রান্ততা প্রতিষ্ঠিত; মুসলিমদের ঐকমত্য অনুযায়ী তাতে কোনো ভুল স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে না। কিন্তু এমন কিছু ঘটতে পারে কি না, যা আল্লাহ পরে সংশোধন করেন, শয়তানের প্রক্ষেপিত বিষয় বাতিল করেন এবং নিজের আয়াত সুদৃঢ় করেন—এই প্রশ্নে দুটি মত আছে। পূর্ববর্তীদের থেকে বর্ণিত বক্তব্য এ বিষয়ে কোরআনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

ভুল স্থায়ী না থাকার নিশ্চয়তা প্রচারের প্রতিটি মুহূর্তের নির্ভুলতার নিশ্চয়তার চেয়ে দুর্বল দাবি। কোনো বাক্য পরে সংশোধিত হলে প্রথমে সেটি শোনা মানুষ বাস্তবেই ভিন্ন অবস্থায় ছিল। সে তখন যে উৎসের দাবি শুনেছে, পরে তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। সংশোধনের ক্ষমতা এই ব্যবধান ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু ব্যবধানটিকে অনস্তিত্বে পরিণত করে না। প্রথম প্রচারের সময়ে মানুষ ভুল উৎসের নামে বাণী গ্রহণ করতে পারে—এই সম্ভাবনা মেনে নিয়েই পরে তা দূর করার ব্যবস্থা ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

ইবনে তাইমিয়্যা আরও বলেছেন, জনসমক্ষে শোনা কিছু হলেই অন্তরে রোগ থাকা মানুষদের পরীক্ষার কথা অর্থবহ হয়। নিছক অন্তরের গোপন চিন্তা দিয়ে তাঁর মতে ওই প্রকাশ্য বিভ্রান্তি ও পরীক্ষা ব্যাখ্যা হয় না। তাঁর এই বক্তব্য বাণী গ্রহণের সামাজিক স্থানটি নিশ্চিত করে: কথাটি মানুষের শ্রবণে এসেছে এবং প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ফলে পরে সংশোধন ঘটার কথা বললে সংশোধনের আগে গ্রহণের এই সময়টিকেও স্বীকার করতে হয়। [450]

وجعل ما ألقى الشيطان فتنة للذين في قلوبهم مرض والقاسية قلوبهم إنما يكون إذا كان ذلك ظاهرا يسمعه الناس لا باطنا في النفس والفتنة التي تحصل بهذا النوع من النسخ من جنس الفتنة التي تحصل بالنوع الآخر من النسخ .

বাংলা অনুবাদ: শয়তানের প্রক্ষেপিত বিষয় অন্তরে রোগ থাকা ও কঠিন হৃদয়ের মানুষের পরীক্ষা হওয়া তখনই সম্ভব, যখন বিষয়টি প্রকাশ্যে থাকে এবং মানুষ তা শুনতে পায়, শুধু অন্তরের গোপন বিষয় হয়ে থাকে না। এই ধরনের নাসখে যে পরীক্ষা ঘটে তা অন্য ধরনের নাসখে সংঘটিত পরীক্ষারই সমজাতীয়।

পরিবর্তনের ব্যাপারটি আরও স্পষ্ট তাঁর পরের যুক্তিতে। তিনি বলেন, প্রথমে কোনো আদেশ দিয়ে পরে বিপরীত আদেশ দেওয়া—দুটিই আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা—এবং পরে প্রথম বর্জিত কথাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নয় বলা এক রকম নয়। দ্বিতীয় ধরনের সংশোধনকে তিনি আরও বেশি সত্যবাদিতার পরিচয় হিসেবে মূল্যায়ন করেন। অর্থাৎ পুরোনো ঘোষণার উৎস ভুল বলা এবং তা প্রত্যাহার করা তাঁর কাছে নবুয়তের বিরুদ্ধে আপত্তি থেকে উল্টো সত্যবাদিতার নিদর্শনে রূপান্তরিত হয়। [451]

وهذا النوع أدل على صدق الرسول صلى الله عليه وسلم وبعده عن الهوى من ذلك النوع فإنه إذا كان يأمر بأمر ثم يأمر بخلافه وكلاهما من عند الله وهو مصدق في ذلك فإذا قال عن نفسه إن الثاني هو الذي من عند الله وهو الناسخ وإن ذلك المرفوع الذي نسخه الله ليس كذلك كان أدل على اعتماده للصدق وقوله الحق

বাংলা অনুবাদ: এই ধরনটি আগের ধরনের চেয়ে রাসুলের সত্যবাদিতা ও প্রবৃত্তি থেকে দূরে থাকার অধিক নির্দেশক। কারণ তিনি কোনো আদেশ দেওয়ার পরে তার বিপরীত আদেশ দেন এবং দুটিই আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়, আর এ বিষয়ে তাঁকে সত্যবাদী মানা হয়। এরপর যদি তিনি নিজের বিষয়ে বলেন, দ্বিতীয়টিই আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে এবং এটিই রহিতকারী, আর যে বর্জিত কথাকে আল্লাহ অপসারণ করেছেন তা তেমন নয়, তাহলে এটি তাঁর সত্যের ওপর নির্ভর করা ও সত্য কথা বলার অধিক নির্দেশক হয়।

এই যুক্তিতে সততার মূল্যায়নকে বাণীর উৎস নির্ধারণের স্থানে বসানো হয়েছে। কোনো ব্যক্তি নিজের ভুল স্বীকার করলে তার ব্যক্তিগত আচরণ সম্পর্কে একটি মূল্যায়ন পাওয়া যায়; সেই স্বীকারোক্তি থেকে নতুন বক্তব্যটি অমানবিক উৎস থেকে এসেছে—এই সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে না। প্রথম বক্তব্য ভুল ছিল বলে দ্বিতীয় বক্তব্যের বিষয়গত সত্যতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। দ্বিতীয় বক্তব্যের পক্ষে নিজের প্রমাণ লাগে। একই ব্যক্তির সংশোধনকে তাঁর আসমানি নির্ভুলতার প্রমাণ করা হলে মাধ্যমটির বিশ্বাসযোগ্যতা আবার মাধ্যমটির নিজের সিদ্ধান্তের ওপর দাঁড়ায়।

এখানে আলাদা দুটি প্রশ্ন একসঙ্গে গুলিয়ে যায়: মুহাম্মদ কি নিজের আগের অবস্থান বদলানোর কথা জানিয়েছেন, এবং তাঁর নতুন কথার উৎস সত্যিই আল্লাহ কি না। কাহিনির মধ্যে প্রথম প্রশ্নের উত্তর হিসেবে প্রত্যাহারের সংবাদ আছে। দ্বিতীয় প্রশ্নে ঘোষণাকারীর বাইরের স্বাধীন যাচাই বর্ণিত নেই। জিবরাইলের সংবাদও মানুষের কাছে পৌঁছায় সেই নবুয়তের দাবির ভেতর দিয়ে। ফলে পরের ঘোষণার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য আগের আস্থাই আবার ব্যবহার করতে হয়, যদিও আগের আস্থার মধ্যেই ভুল উৎসের বাণী গ্রহণের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এই বৃত্তটি সংশোধনকে নির্ভুলতার প্রমাণ বলার ফলে দূর হয় না।

শয়তানকে দায়ী করার ব্যাখ্যা প্রকাশ্য ব্যর্থতার দায়বণ্টনও বদলে দেয়। যে বক্তব্য মুহাম্মদের পাঠ হিসেবে মানুষ শুনেছে, তার অগ্রহণযোগ্য অংশের কারণ হয় শয়তান। একই সঙ্গে সংশোধনের কর্তৃত্ব মুহাম্মদের কাছেই থাকে। বর্ণনাটির এই কার্যকারিতা স্পষ্ট: ভুল উৎসের কথা উচ্চারিত হওয়ার সংবাদ নবুয়তের কেন্দ্রকে বিলুপ্ত করে না; কেন্দ্রটি তার নিজের বাণীর ভেতর থেকে কোন অংশ বাদ যাবে তা ঘোষণা করার অধিকার ধরে রাখে। মানুষের কাছে বাণীর সীমা নির্ধারণের ক্ষমতা তাই একই নেতৃত্বের হাতে থাকে, যার প্রথম প্রচার সম্পর্কে প্রশ্ন উঠেছে।

মুশরিকদের তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টি ও পরে বিরোধ ফিরে আসার খবর এই কর্তৃত্বকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান করে। দেবীদের মধ্যস্থতার মর্যাদা থাকলে তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি স্বীকৃত স্থান তৈরি হয়; তা প্রত্যাহার হলে সেই স্থানও হারায়। বাণীর পরিবর্তন তাই কেবল আবৃত্তির শব্দসংশোধন নয়। এটি কোন উপাস্য গ্রহণযোগ্য, কোন দলের বিশ্বাস বৈধ এবং কার সঙ্গে সমঝোতা সম্ভব—এই সম্পর্কগুলোকেও পাল্টায়। গারানিকের বর্ণনায় উচ্চারণের বিষয়বস্তু এবং ক্ষমতার সম্পর্ক একই সঙ্গে বদলেছে।

কোরআন সংকলনের আগের ইতিহাসে এই কাহিনির গুরুত্ব হলো অনুমোদিত পাঠ গঠনের মধ্যে বর্জনের উপস্থিতি। প্রথমে শোনা সব বাক্য শেষ পর্যন্ত সমান মর্যাদায় রক্ষিত থাকে না; পরে কোন অংশ ঐশী এবং কোন অংশ অঐশী বলা হবে, তা নতুন ঘোষণায় নির্ধারিত হয়। এ ক্ষেত্রে পরিবর্তনের ধর্মীয় নাম নাসখ বা শয়তানি প্রক্ষেপণ অপসারণ, কিন্তু মানবসমাজে তার দৃশ্যমান রূপ হলো আগে প্রচারিত কথার প্রত্যাহার এবং নতুন সীমা প্রতিষ্ঠা। চূড়ান্ত পাঠকে স্থির বলা এবং তার পূর্ববর্তী প্রচারকে সর্বাংশে অপরিবর্তিত বলা তাই একই ঐতিহাসিক দাবি নয়।

গারানিকের ঘটনাবিন্যাস বাণীর নির্ভুলতার দাবিকে একটি কঠিন পরীক্ষায় ফেলে। প্রথম উচ্চারণ, জনসমক্ষে গ্রহণ, বিপরীত উৎস শনাক্ত করার পরের বার্তা এবং বর্জন—প্রতিটি পর্যায়ের অস্তিত্ব ইসলামি ব্যাখ্যার ভেতরেই সংরক্ষিত। শেষে সংশোধন ঘটেছে বলা প্রথম প্রচারের সমস্যার উত্তর সম্পূর্ণ করে না। শ্রোতাকে এখনও একই ঘোষণাকারীর দুই ভিন্ন অবস্থানের মধ্যে পরেরটিকে মেনে নিতে হয়। বর্ণিত ঘটনাক্রমে স্পষ্ট রয়েছে বাণীর পরিবর্তন ও তার অনুমোদনের কর্তৃত্ব; আসমানি উৎসের স্বাধীন যাচাই সেই কর্তৃত্বের বাইরে প্রতিষ্ঠিত হয় না।


শেষ অবতরণ, দ্বীনের পূর্ণতা ও মুহাম্মদের মৃত্যুশয্যা

কোরআনের অবতরণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি নতুন সমস্যা সামনে আসে: শেষ পর্যন্ত কোন পাঠ পৌঁছেছিল, কারা তা গ্রহণ করেছিলেন এবং ঘোষণাকারীর অনুপস্থিতিতে সেই পাঠের পরিসর নির্ধারণ করবেন কারা? শেষ আয়াত ও শেষ সূরা সম্পর্কে সাহাবিদের বক্তব্য এক নয়। দ্বীন পূর্ণ হওয়ার ঘোষণার পরেও নতুন বিধান অবতরণের খবর রয়েছে। শেষ অসুস্থতায় ভবিষ্যৎ পথভ্রষ্টতা ঠেকানোর জন্য লিখিত নির্দেশ দেওয়ার উদ্যোগ ঘরের বিরোধে বন্ধ হয়ে যায়। মৃত্যুর পরের সংগ্রাহকেরা তাই শুধু উচ্চারিত বাক্য খুঁজে পাননি; তাঁদের সামনে ছিল অবতরণের সমাপ্তি, নির্দেশের শেষ অবস্থা এবং সংরক্ষিত স্মৃতির পরস্পরভিন্ন পরিচয়ও।

এই সময়ের সংকটের মধ্যে তিনটি পৃথক প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। প্রথমটি কালানুক্রমের: কোন বক্তব্য সবার শেষে এসেছে? দ্বিতীয়টি কর্তব্যের: শেষ সময়ে মুহাম্মদ কী নির্দেশ দিতে চেয়েছিলেন এবং উপস্থিত লোকেরা কী করেছেন? তৃতীয়টি দলিলের: তাঁর মৃত্যুর পরে কোন লেখা ও স্মৃতির সাহায্যে বক্তব্যগুলোর সীমা নির্ধারিত হয়েছে? একটি আয়াতে ধর্ম পূর্ণ হওয়ার ঘোষণা থাকলেই এই তিন প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে পাওয়া যায় না। সমাপ্তির ধর্মীয় ঘোষণা এবং সমাপ্তির প্রত্যেকটি ঘটনার নথি আলাদা জিনিস।


শেষ অবতীর্ণ আয়াত সম্পর্কে পরস্পরভিন্ন বর্ণনা

শেষ অবতীর্ণ আয়াতের পরিচয় নিয়ে ইসলামি সাহিত্যে একাধিক সরাসরি দাবি রয়েছে। ইবনে আব্বাসের নামে সুদের আয়াত, অন্য বর্ণনায় বাকারার ২৮১ নম্বর আয়াত, বারা ইবনে আযিবের নামে কালালার আয়াত এবং উবাই ইবনে কাবের নামে তাওবার শেষাংশের কথা পাওয়া যায়। প্রত্যেক দাবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জ্ঞান ও বর্ণনাপথ যুক্ত। সবগুলোকে একই অনির্দিষ্ট “শেষের দিকের” পরিচয়ে নামিয়ে দিলে মূল বক্তব্যের পার্থক্য বোঝা যায় না। কোনো বর্ণনায় নিঃশর্ত সর্বশেষ বলা হয়েছে, কোনো রূপে শেষের দিকের বলা হয়েছে, আবার কোনো বক্তব্যকে পরে বিষয়ভিত্তিক শেষ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

যুরকানির আলোচনায় মতভেদের একটি মৌলিক কারণ স্বীকার করা হয়েছে: এই নির্দিষ্ট শেষত্বের দাবিগুলোর মধ্যে মুহাম্মদের নিজের নামে নিশ্চিত ঘোষণা নেই। ইসলামওয়েব তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে। শেষ আয়াত নির্ধারণের জন্য পরবর্তী বর্ণনাকারীরা যা জানতেন ও যেভাবে তা বিচার করতেন, সেটিই এখানে প্রধান উপকরণ। [452]

اختلف العلماء في تعيين آخر ما نزل من القرآن على الإطلاق، واستند كل منهم إلى آثار ليس فيها حديث مرفوع إلى النبي

বাংলা অনুবাদ: নিঃশর্তভাবে কোরআনের সর্বশেষ অবতরণ নির্ধারণে আলেমরা মতভেদ করেছেন। প্রত্যেকে এমন কিছু বর্ণনার ওপর নির্ভর করেছেন, যেগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে নবীর নিজের বক্তব্য হিসেবে বর্ণিত হাদিস নেই।

বাকিল্লানিও বলেছেন, প্রত্যেকে এক ধরনের বিচারবিবেচনা ও প্রবল ধারণা অনুসারে বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যায় কেউ সর্বশেষ যে আয়াত শুনেছেন, সেটিকেই শেষ বলেছেন; অন্য কেউ তাঁর অনুপস্থিতিতে পরে অবতীর্ণ আরেকটি আয়াত শুনে থাকতে পারেন। সুয়ূতি এই ব্যাখ্যা সংরক্ষণ করেছেন। [453]

هذه الأقوال ليس فيها شيء مرفوع إلى النبي صلى الله عليه وسلم، وكل قاله بضرب من الاجتهاد وغلبة الظن، ويحتمل أن كلا منهم أخبر عن آخر ما سمعه من النبي صلى الله عليه وسلم في اليوم الذي مات فيه أو قبل مرضه بقليل، وغيره سمع منه بعد ذلك وإن لم يسمعه هو.

বাংলা অনুবাদ: এই বক্তব্যগুলোর কোনোটিই নবীর নিজের বক্তব্য হিসেবে বর্ণিত নয়। প্রত্যেকে এক ধরনের বিচারবিবেচনা ও প্রবল ধারণা অনুসারে বলেছেন। এমন হতে পারে, প্রত্যেকে নবীর মৃত্যুর দিনে অথবা অসুস্থতার কিছু আগে তাঁর কাছে সর্বশেষ যা শুনেছেন, তার খবর দিয়েছেন; অন্য ব্যক্তি তার পরেও তাঁর কাছে কিছু শুনেছেন, যদিও প্রথম ব্যক্তি তা শোনেননি।

এই ব্যাখ্যায় সাহাবিদের স্মৃতি অভিন্ন সময়সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। কারও শেষ শ্রবণ এবং সমগ্র অবতরণের শেষ ঘটনা এক হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। ফলে “আমি শেষ শুনেছি” থেকে “এর পরে আর কিছু আসেনি” সিদ্ধান্তে যাওয়ার জন্য নিজের অভিজ্ঞতার বাইরে অন্যদের পাওয়া তথ্যও জানতে হয়। বাকিল্লানির প্রস্তাবিত সমাধান মতভেদের সম্ভাব্য কারণ দেখায়; শেষ ঘটনাটির নির্দিষ্ট পরিচয় উদ্ধার করে না। বর্ণনাকারীদের মধ্যে সমন্বয়ের পথ পাওয়া এবং একটি নির্দিষ্ট শেষ আয়াতের নিশ্চিত ইতিহাস পাওয়া ভিন্ন ফল।

শেষত্বের দাবিবর্ণিত পাঠ বা বিষয়দাবির পরিসর নির্ধারণের সমস্যা
ইবনে আব্বাস: সুদের আয়াতবুখারি ৪৫৪৪; সুদ-সংক্রান্ত পাঠহাদিসে আয়াতের নম্বর নেই; ব্যাখ্যায় ২:২৭৮ ও সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ যুক্ত
ইবনে আব্বাস ও অন্যদের নামে ২:২৮১প্রত্যাবর্তন, বিচার ও কর্মফলমৃত্যুর আগের ব্যবধানের বর্ণনা এক নয়
বারা ইবনে আযিব: কালালানিসা ৪:১৭৬মুসলিমে নিঃশর্ত শেষ; পরে উত্তরাধিকার বিষয়ে শেষ হিসেবে ব্যাখ্যা
উবাই ইবনে কাব: তাওবার শেষাংশতাওবা ৯:১২৮–১২৯গ্রন্থের শেষ অবতরণ ও সূরার শেষাংশের অবতরণ পৃথক দাবি
ইবনে শিহাবের নামে ঋণের আয়াতওবাকারা ২:২৮২একই সঙ্গে একটি বৃহত্তর আয়াতসমষ্টি নাজিল হওয়ার ব্যাখ্যা

শেষ অবতরণের পরিচয় নসখের আলোচনায়ও কার্যকর। পরের নির্দেশ আগের নির্দেশের অবস্থান বদলাতে পারে বলে কোনটি আগে এবং কোনটি পরে, তার ওপর প্রয়োগের ফল নির্ভর করে। শুধু মুসহাফে পাতার ক্রম দেখলে সেই ইতিহাস জানা যায় না। বাকারার একটি আয়াত নাজিলের সময় নিসা বা তাওবার পরে হতে পারে; সংকলিত গ্রন্থে আগে থাকলেও অবতরণে পরে হতে পারে। শেষত্ব নিয়ে মতভেদ তাই ধর্মীয় স্মৃতির একটি বিচ্ছিন্ন তারিখভুল নয়; বিধানের চূড়ান্ত অবস্থা ও সংকলিত বিন্যাসের সম্পর্কের প্রশ্ন।


রিবার আয়াত

ইবনে আব্বাসের নামে বুখারিতে বলা হয়েছে, নবীর ওপর সর্বশেষ নাজিল হয়েছিল সুদের আয়াত। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে “আয়াতুর রিবা” নামটি আছে; আলাদা করে আয়াতের নম্বর বা পুরো পাঠ নেই। বুখারি বর্ণনাটি রেখেছেন “তোমরা সেই দিনকে ভয় করো, যেদিন আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে”—বাকারা ২:২৮১-এর পরিচ্ছেদে। হাদিসের বাক্য এবং সংকলকের দেওয়া পরিচ্ছেদের অবস্থান মিলিয়ে সুদ-সংক্রান্ত আয়াতসমষ্টির সঙ্গে এই শেষত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। [454]

آخِرُ آيَةٍ نَزَلَتْ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم آيَةُ الرِّبَا

বাংলা অনুবাদ: নবীর ওপর নাজিল হওয়া সর্বশেষ আয়াত ছিল সুদের আয়াত।

সুয়ূতি “আয়াতুর রিবা” ব্যাখ্যা করতে বাকারার ২৭৮ নম্বর আয়াত উল্লেখ করেছেন। এখানে সুদের অবশিষ্ট পাওনা ছেড়ে দেওয়ার সরাসরি নির্দেশ রয়েছে। [455]

‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা মুমিন হও’

উমরের নামে সংরক্ষিত আরেক বক্তব্যে অবতরণের শেষত্বের সঙ্গে ব্যাখ্যা না-পাওয়ার কথা যুক্ত। তাঁর ভাষ্যে মুহাম্মদ আয়াতটির ব্যাখ্যা করার আগে মারা গেছেন। বাংলায় প্রকাশিত সুদবিষয়ক সংকলনেও বক্তব্যটি রয়েছে। [456] [457]

আল কুরআনের সর্বশেষ যা নাযিল হয়েছে, তা হলো ‘রিবা’র আয়াত। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা ব্যাখ্যা করার পূর্বেই পরলোকগত হন। অতএব তোমরা সুদ ও সন্দেহ পরিত্যাগ করো।’
( তাফসীরে তাবারী, খণ্ডঃ ৬, পৃঃ ৩৮ )

আবু সাঈদ খুদরির সূত্রে উমরের খুতবার একটি বাংলা উদ্ধৃতিতেও একই বিষয় এসেছে। [458]

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘উমর (রা.) আমাদের উদ্দেশ্য করে খুতবা দিলেন, অতঃপর তিনি বললেন: নিশ্চয় সর্বশেষ নাযিল হওয়া কুরআন হলো ‘রিবা’র আয়াত।’
(সূয়ুতী, আল ইতকান, খণ্ড:৬, পৃ:৩৫)
এছাড়া শায়খ মাহমুদ শাকের বলেছেন যে হাদীসটি বিশুদ্ধ সনদের (দ্র: তাফসীরে তাবারী, খণ্ডঃ ৬, পৃঃ ৩৯)

কোরআন সংকলন 82

সুয়ূতির সংরক্ষিত আরবি পাঠে এই খুতবার রূপটি “মিন আখিরিল কুরআন”—কোরআনের শেষের দিকের অবতরণগুলোর একটি। “মিন” শব্দটি রেখে অনুবাদ করলে নির্দিষ্ট একমাত্র সর্বশেষ হওয়ার দাবি পাওয়া যায় না। একই সুদ-সংক্রান্ত বক্তব্যের এক রূপে সর্বশেষ এবং অন্য রূপে শেষের দিকের পরিচয় রয়েছে। [459]

وعند ابن مردويه: عن أبي سعيد الخدري، قال: خطبنا عمر فقال: إن من آخر القرآن نزولا آية الربا.

বাংলা অনুবাদ: ইবনে মারদাওয়াইহের কাছে আবু সাঈদ খুদরি থেকে আছে। তিনি বলেন, উমর আমাদের সামনে খুতবা দিয়ে বললেন, কোরআনের শেষের দিকে নাজিল হওয়া বিষয়গুলোর মধ্যে সুদের আয়াত রয়েছে।

ইবনে মাজাহর বর্ণনায় “সর্বশেষ” কথার সঙ্গে “আমাদের জন্য ব্যাখ্যা করেননি” সরাসরি এসেছে। তার পরের নির্দেশ সুদ ও সন্দেহজনক বিষয় উভয়ই ছেড়ে দেওয়ার। [460]

إِنَّ آخِرَ مَا نَزَلَتْ آيَةُ الرِّبَا وَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ قُبِضَ وَلَمْ يُفَسِّرْهَا لَنَا فَدَعُوا الرِّبَا وَالرِّيبَةَ

বাংলা অনুবাদ: নিশ্চয় সর্বশেষ নাজিল হয়েছিল সুদের আয়াত। আর আল্লাহর রাসুল আমাদের জন্য তার ব্যাখ্যা করার আগেই মারা গেছেন। অতএব সুদ ও সন্দেহজনক বিষয় পরিত্যাগ করো।

এখানে বাণী পাওয়া ও বাণীর প্রয়োগ সম্পর্কে নিশ্চয়তা আলাদা হয়েছে। আয়াতের উপস্থিতি স্বীকার করেও উমরের নামে ব্যাখ্যার অপূর্ণতা বলা হচ্ছে। সংশয়ের জায়গাটি মেটাতে দেওয়া হচ্ছে সতর্কতার নিয়ম: সুদের সঙ্গে সন্দেহজনক ক্ষেত্রও পরিত্যাগ। পরবর্তী আইনজ্ঞকে তখন শুধু একটি বাক্য উদ্ধৃত করলেই চলে না; কোন লেনদেন সেই বাক্যের আওতায় পড়বে, তার সীমা নির্ধারণ করতে হয়। অবতরণের সমাপ্তি নিজে ব্যাখ্যাগত সমস্ত প্রশ্নের সমাপ্তি ঘটায়নি।

সুদের আয়াতের পরিসর নিয়ে সুয়ূতি ও ইবনে হাজর ভিন্ন সম্পর্ক প্রস্তাব করেছেন। সুয়ূতির মতে সুদের আয়াত, ২:২৮১ ও ঋণের আয়াত একই প্রসঙ্গের হওয়ায় একসঙ্গে নাজিল হয়ে থাকতে পারে; প্রত্যেকে তার একটি অংশকে শেষ বলেছেন। ইবনে হাজর ২:২৮১-কে সুদবিষয়ক আয়াতগুলোর সমাপ্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এগুলো অনির্দিষ্ট নামের সঙ্গে নির্দিষ্ট পাঠ মেলানোর ব্যাখ্যা। হাদিসে অনুপস্থিত আয়াতসংখ্যা ও অবতরণপর্বের সীমা ভাষ্যকারেরা এই পদ্ধতিতে নির্ধারণ করেছেন। [461]

قلت: ولا منافاة عندي بين هذه الروايات في آية الربا، واتقوا يوما، وآية الدين؛ لأن الظاهر أنها نزلت دفعة واحدة كترتيبها في المصحف، ولأنها في قصة واحدة فأخبر كل عن بعض ما نزل بأنه آخر، وذلك صحيح.

বাংলা অনুবাদ: আমি বলি, সুদের আয়াত, “সেই দিনকে ভয় করো” এবং ঋণের আয়াতের এসব বর্ণনার মধ্যে আমার মতে বিরোধ নেই। কারণ প্রকাশ্যত মনে হয়, মুসহাফের ক্রমের মতো এগুলো একসঙ্গে নাজিল হয়েছে এবং একই প্রসঙ্গের; তাই প্রত্যেকে অবতীর্ণ অংশের কোনো একটি সম্পর্কে শেষ বলে জানিয়েছেন, আর সেটি সঠিক।

সুয়ূতি এখানে “প্রকাশ্যত মনে হয়” বলেছেন। তাঁর সিদ্ধান্তের ভিত্তি বিষয়গত সম্পর্ক ও মুসহাফের ক্রম। একটি অনুচ্ছেদ অর্থের দিক থেকে সংবদ্ধ হওয়া থেকে সেই অনুচ্ছেদের সব বাক্য একই সময়ে নাজিল হওয়ার তথ্য সরাসরি পাওয়া যায় না। সংকলনের বিন্যাসকে অবতরণের সময়ের সঙ্গে মেলাতে এই অতিরিক্ত অনুমান লাগে। শেষত্বের বর্ণনাগুলোকে একই আয়াতসমষ্টির মধ্যে রাখলে বিরোধের একটি সম্ভাব্য সমাধান পাওয়া যায়; নির্দিষ্ট কোন বাক্য সবার শেষে বলা হয়েছিল, তা তখনও আলাদা প্রশ্ন থেকে যায়।


বাকারা ২:২৮১ এবং মৃত্যুর আগে সময়ের ভিন্ন হিসাব

বাকারার ২৮১ নম্বর আয়াতকে শেষ অবতরণ বলার মতটি একাধিক তাফসিরি সংকলনে রয়েছে। আয়াতের বিষয় আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া এবং প্রত্যেকের কর্মফল সম্পূর্ণ পাওয়া। বিধানের কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের বদলে মৃত্যু ও বিচারের সাধারণ সতর্কতা থাকায় পরবর্তী ভাষ্যকারেরা একে সমাপ্তির উপযুক্ত বাক্য হিসেবেও মূল্যায়ন করেছেন। [462]

তোমরা সেদিনের ভয় কর, যেদিন তোমাদেরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেয়া হবে। অতঃপর প্রত্যেক লোককে তার কৃতকর্মের বিনিময় দেয়া হবে এবং তারা কিছুমাত্র অত্যাচারিত হবে না।
— Taisirul Quran
আর তোমরা সেই দিনের ভয় কর যেদিন তোমরা আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে, তখন যে যা অর্জন করেছে তা সম্পূর্ণ রূপে প্রদত্ত হবে এবং তারা অত্যাচারিত হবেনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর তোমরা সে দিনের ভয় কর, যে দিন তোমাদেরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেয়া হবে। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে সে যা উপার্জন করেছে, তা পুরোপুরি দেয়া হবে। আর তাদের যুলম করা হবে না।
— Rawai Al-bayan
আর তোমরা সেই দিনের তাকওয়া অবলম্বন কর যেদিন তোমাদেরকে আল্লাহ্‌র দিকে ফিরিয়ে নেয়া হবে। তারপর প্রত্যেককে সে যা অর্জন করেছে তা পুরোপুরি প্রদান করা হবে। আর তাদের যুলুম করা হবে না [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

ইবনে আব্বাসের নামে এই শেষত্বের বক্তব্য নাসাঈ, ইবনে জারির ও পরবর্তী তাফসিরে উদ্ধৃত হয়েছে। আবু বকর যাকারিয়ার তাফসিরেও মতটি উল্লেখ রয়েছে। [463] [464] [465]

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আল কুরানের সর্বশেষ যা নাযিল হয়েছে, তা হলো وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ (নাসাঈ; বায়হাকী, )

কোরআন সংকলন 84

একই আয়াতের জন্য সংরক্ষিত সময়ের হিসাব তীব্রভাবে আলাদা। সুয়ূতি ফারইয়াবির সূত্রে কালবি, ইবনে সালিহ ও ইবনে আব্বাসের নামে যে রূপ এনেছেন, তাতে অবতরণ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একাশি দিন। [466]

وَكَانَ بَيْنَ نُزُولِهَا وَبَيْنَ مَوْتِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَحَدٌ وَثَمَانُونَ يَوْمًا.

বাংলা অনুবাদ: এর অবতরণ ও নবীর মৃত্যুর মধ্যে ছিল একাশি দিন।

এর পরের বর্ণনায় সাঈদ ইবনে জুবাইরের নামে নয় রাত জীবিত থাকার কথা আছে। একই পৃষ্ঠায় সেই মৃত্যুর জন্য রবিউল আউয়ালের দুটি রাত পার হওয়ার হিসাবও এসেছে। [467]

وَعَاشَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعْدَ نُزُولِ هَذِهِ الْآيَةِ تِسْعَ لَيَالٍ

বাংলা অনুবাদ: এই আয়াত নাজিলের পরে নবী নয় রাত জীবিত ছিলেন।

প্রথম হিসাব প্রায় তিন মাসের একটি সময়সীমা তৈরি করে; দ্বিতীয়টি তৈরি করে এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময়। পার্থক্যটি সাত বা আট দিনের সামান্য গণনাভেদ নয়। নয় রাতের মধ্যে বার্তা প্রচার ও শেখানোর সুযোগ একরকম; একাশি দিনের মধ্যে তা আরেকরকম। চূড়ান্ত বক্তব্য কতদিন অনুসারীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল, কারা তা শুনতে পারতেন এবং অন্য নতুন নির্দেশের জন্য কতটা সময় খোলা ছিল—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সংখ্যাভেদের সঙ্গে বদলায়।

সূত্রে সংরক্ষিত পরিচয়মৃত্যুর আগের সময়কালপঞ্জির ফল
ফারইয়াবির সূত্রে ইবনে আব্বাস; আল-ইতকানএকাশি দিনশেষ আয়াতের পরে প্রায় তিন মাস জীবিত থাকা
ইবনে আবি হাতিমের সূত্রে সাঈদ ইবনে জুবাইর; আল-ইতকাননয় রাতশেষ অবতরণ অসুস্থতার খুব কাছাকাছি স্থাপিত হয়
ইবনে কাসিরে মায়িদার পূর্ণতার আয়াতের আলোচনাআরাফার দিনের পরে একাশি দিন—একটি সংরক্ষিত হিসাবএকই সংখ্যা অন্য আয়াতের সময়বিবরণেও ব্যবহৃত
গ্রন্থে পাশাপাশি থাকা বিবরণএকটি অভিন্ন সময় নেইশেষ আয়াতের পরিচয় এবং তার তারিখ পৃথকভাবে পরীক্ষা করতে হয়

ইবনে কাসির মায়িদা ৫:৩-এর ব্যাখ্যায় ইবনে জুরাইজ প্রমুখের নামে আরাফার দিনের পরে একাশি দিন বেঁচে থাকার হিসাবও রেখেছেন। ফলে একাশি সংখ্যাটি শুধু বাকারার ২৮১-এর সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে না। আলাদা অবতরণবিবরণে একই মৃত্যুব্যবধান ব্যবহৃত হয়েছে। [468]

قال ابن جريج وغير واحد: مات رسول الله صلى الله عليه وسلم بعد يوم عرفة بأحد وثمانين يوما.

বাংলা অনুবাদ: ইবনে জুরাইজ ও আরও কয়েকজন বলেছেন, আরাফার দিনের একাশি দিন পরে আল্লাহর রাসুল মৃত্যুবরণ করেন।

একাশি দিনের একটি হিসাব বাকারার আয়াতের অবতরণের সঙ্গে যুক্ত, অন্যটি আরাফার দিনের সঙ্গে। দুটি পৃথক বর্ণনার একই সংখ্যার পাশে সাঈদ ইবনে জুবাইরের নয় রাতের হিসাবও সংরক্ষিত। ফলে শেষ অবতরণ নির্ধারণের সমস্যার সঙ্গে শেষ জীবনের তারিখ নির্ধারণের সমস্যাও যুক্ত হয়েছে। কোন সংবাদকে ভিত্তি ধরে শেষ জীবনের ঘটনাপঞ্জি তৈরি করা হবে, তার ওপর আয়াতটির সময় ও প্রচারের সুযোগ সম্পর্কে ধারণা বদলে যায়। সংখ্যাগুলো পাশাপাশি সংরক্ষিত আছে; একটি অভিন্ন কালপঞ্জিতে তাদের অবস্থান স্থির করতে পরবর্তী নির্বাচন লাগে।

যুরকানি ২:২৮১-এর শেষত্ব পছন্দ করার যুক্তিতে আয়াতের মৃত্যু ও বিচারের ভাষাকে সমাপ্তির উপযুক্ত বলেছেন। এটি একটি সাহিত্যিক ও ধর্মীয় মূল্যায়ন: শেষ কথার মতো শোনায় বলে শেষ হওয়ার মতকে সমর্থন করা। সেই মূল্যায়নের পাশে নির্দিষ্ট সময়ের বর্ণনাও ব্যবহার করেছেন তিনি। অর্থের উপযোগিতা এবং ঘটনার তারিখ একই ধরনের প্রমাণ নয়। একটি আয়াত সমাপ্তির সঙ্গে মানানসই হতে পারে, অথচ সেটি যে সবার শেষে উচ্চারিত হয়েছিল, তার ইতিহাস জানতে তখনও বর্ণনার ওপর নির্ভর করতে হয়।

নয় রাত ও একাশি দিনের মতভেদ একটি পরিচিত আয়াতের অস্তিত্ব নিয়ে নয়; শেষত্বের স্মৃতি কতটা সুনির্দিষ্ট, তা নিয়ে। এই পার্থক্য সংকলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শেষ মুহূর্তের অবস্থাকে শনাক্ত করার দাবি ব্যক্তিবিশেষের পাওয়া সংবাদ থেকে তৈরি হয়েছে। শেষত্বের নিশ্চিত পরিচয় নিয়ে যে অভিন্ন জ্ঞান প্রচার করা হয়, এখানে তার জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী স্মৃতি ও পরবর্তী অগ্রাধিকার নির্ধারণ।


কালালার আয়াত: নিসা ৪:১৭৬

বারা ইবনে আযিবের নামে সহিহ মুসলিমে কালালার আয়াতকে কোরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত বলা হয়েছে। কালালা হলো সন্তান ও পিতাহীন মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারসংক্রান্ত অবস্থা; মাতা না থাকা এই সংজ্ঞার আবশ্যক শর্ত নয়। বাংলা অনুবাদের কয়েকটি রূপে পিতা-মাতা উভয়ের অনুপস্থিতি বসানো হয়েছে। অনুবাদের সেই অতিরিক্ত শর্ত এবং উত্তরাধিকারশাস্ত্রে ব্যবহৃত সংজ্ঞা এক নয়। আয়াতের চারটি প্রচলিত বাংলা অনুবাদে পার্থক্যটি দৃশ্যমান। [469]

লোকেরা তোমার কাছে ফাতাওয়া জিজ্ঞেস করছে; বল, আল্লাহ তোমাদেরকে পিতা-মাতাহীন নিঃসন্তান ব্যক্তি সম্পর্কে ফাতাওয়া দিচ্ছেন, কোন ব্যক্তি মারা গেলে তার যদি সন্তান না থাকে আর তার একটি বোন থাকে, তবে রেখে যাওয়া সম্পত্তির অর্ধেক সে পাবে, আর সে (মৃত নারী) যদি সন্তানহীনা হয় তবে তার ভাই তার উত্তরাধিকারী হবে, আর দু’ বোন থাকলে তারা তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির দু’-তৃতীয়াংশ পাবে, আর যদি ভাই ও বোন দু’ই থাকে, তবে পুরুষ পাবে দু’জন নারীর সমান। আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যাতে তোমরা বিভ্রান্তিতে পতিত না হও। আল্লাহ যাবতীয় ব্যাপারে পূর্ণরূপে অবহিত।
— Taisirul Quran
তারা তোমাদের নিকট ব্যবস্থা প্রার্থনা করছে, তুমি বলঃ আল্লাহ তোমাদেরকে পিতা-পুত্রহীন সম্বন্ধে ব্যবস্থা দান করেছেন। যদি কোন ব্যক্তি নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যায় এবং তার ভগ্নী থাকে তাহলে সে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি হতে অর্ধাংশ পাবে; এবং যদি কোন নারীর সন্তান না থাকে তাহলে তার ভাইই তদীয় উত্তরাধিকারী হবে; কিন্তু যদি দুই ভগ্নী থাকে তাহলে তাদের উভয়ের জন্য পরিত্যক্ত বিষয়ের দুই তৃতীয়াংশ এবং যদি তার ভাই ভগ্নী-পুরুষ ও নারীগণ থাকে তাহলে পুরুষ দুই নারীর তুল্য অংশ পাবে; আল্লাহ তোমাদের জন্য বর্ণনা করছেন যেন তোমরা বিভ্রান্ত না হও, এবং আল্লাহ সর্ব বিষয়ে মহাজ্ঞানী।
— Sheikh Mujibur Rahman
তারা তোমার কাছে সমাধান চায়। বল, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে সমাধান দিচ্ছেন ‘কালালা’* সম্পর্কে। কোন ব্যক্তি যদি মারা যায় এমন অবস্থায় যে, তার কোন সন্তান নেই এবং তার এক বোন রয়েছে, তবে সে যা রেখে গিয়েছে বোনের জন্য তার অর্ধেক, আর সে (মহিলা)যদি সন্তানহীনা হয় তবে তার ভাই তার উত্তরাধিকারী হবে। কিন্তু যদি তারা (বোনেরা) দু’জন হয়, তবে সে যা রেখে গিয়েছে তাদের জন্য তার দুই তৃতীয়াংশ। আর যদি তারা কয়েক ভাই বোন পুরুষ ও নারী হয়, তবে পুরুষের জন্য দুই নারীর অংশের সমান হবে’। আল্লাহ তোমাদেরকে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, যাতে তোমরা পথভ্রষ্ট না হও এবং আল্লাহ প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে সর্বজ্ঞ’। * যার পিতা মাতা জীবিত নেই এবং যে সন্তানহীন তাকে ‘কালালা’ বলা হয়।
— Rawai Al-bayan
লোকেরা আপনার কাছে ব্যবস্থা জানতে চায় [১]। বলুন, ‘পিতা-মাতাহীন নিঃসন্তান ব্যক্তি সম্বন্ধে তোমাদেরকে আল্লাহ ব্যবস্থা জানাচ্ছেন, কোনো পুরুষ মারা গেলে সে যদি সন্তানহীন হয় এবং তার এক বোন থাকে [২] তবে তার জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির অর্ধেক। আর সে (মহিলা) যদি সন্তানহীনা হয় তবে তার ভাই তার উত্তরাধিকারী হবে। অতঃপর যদি দুই বোন থাকে তবে তাদের জন্য তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির তিন ভাগের দু’ভাগ। আর যদি ভাই-বোন উভয়ে থাকে তবে এক পুরুষের অংশ দুই নারীর অংশের সমান। তোমরা পথভ্রষ্ট হবে –এ আশংকায় আল্লাহ তোমাদেরকে পরিষ্কারভাবে জানাচ্ছেন এবং আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সবিশেষ অবগত [৩]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

ইবনে কাসির অধিকাংশ আলেমের সংজ্ঞা হিসেবে সন্তান ও পিতা না-থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। এই সংজ্ঞায় “ওয়ালিদ” পিতাকে বোঝায়; পিতা-মাতা উভয়কে বোঝানো দ্বিবচন এখানে নেই। [470]

وَقَدْ تَقَدَّمَ الْكَلَامُ عَلَى الْكَلَالَةِ وَاشْتِقَاقِهَا، وَأَنَّهَا مَأْخُوذَةٌ مِنَ الْإِكْلِيلِ الَّذِي يُحِيطُ بِالرَّأْسِ مِنْ جَوَانِبِهِ؛ وَلِهَذَا فَسَّرَهَا أَكْثَرُ الْعُلَمَاءِ: بِمَنْ يَمُوتُ وَلَيْسَ لَهُ وَلَدٌ وَلَا وَالِدٌ.

বাংলা অনুবাদ: কালালা ও শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে আগেই আলোচনা হয়েছে। এটি মাথার চারদিকে ঘিরে থাকা মুকুটের নাম থেকে এসেছে। সে কারণে অধিকাংশ আলেম এর ব্যাখ্যা করেছেন এমন ব্যক্তি হিসেবে, যে মারা গেছে এবং যার সন্তান ও পিতা নেই।

মুসলিমের বর্ণনায় বারা “কোরআনের সর্বশেষ যে আয়াত” বলেছেন। এই বাক্যে শেষত্বকে উত্তরাধিকারের বিষয়ে সীমাবদ্ধ করার কোনো শব্দ নেই। [471]

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
২৪। ফারায়িয (উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান)
পরিচ্ছেদঃ ৩. কালালাহ সম্পর্কিত আয়াতই সর্বশেষ নাযিলকৃত আয়াত
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৪০৪৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬১৮
৪০৪৪-(১০/১৬১৮) আলী ইবনু খাশরাম (রহঃ) …. বারা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কুরআনের সর্বশেষ যে আয়াত নাযিল হয় তা হলো يَسْتَفْتُونَكَ قُلِ اللَّهُ يُفْتِيكُمْ فِي الْكَلاَلَةِ‏ তারা আপনার কাছে জানতে চায়, আপনি বলুন, আল্লাহ তা’আলা কালালার ব্যাপারে সমাধান দিচ্ছেন। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪০০৭, ইসলামিক সেন্টার ৪০০৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ বারা’আ ইবনু আযিব (রাঃ)

আবু বকর যাকারিয়ার তাফসিরে একই সঙ্গে শেষ সূরা হিসেবে বারাআত এবং শেষ আয়াত হিসেবে কালালার পরিচয় দেওয়া হয়েছে। [472]

বারা’ ইবনে আযেব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেনঃ সবশেষে নাযিলকৃত সূরা হল সূরা বারাআত (তাওবাহ)। আর সবশেষে নাযিলকৃত আয়াত হল এই আয়াত। [বুখারীঃ ৪৩৬৪, ৪৬০৫, ৪৬৫৬, মুসলিমঃ ১৬১৮]

কোরআন সংকলন 86

মূল আরবিতে নিঃশর্ত শেষত্বের ভাষা সরাসরি রয়েছে। [473]

آخِرُ آيَةٍ أُنْزِلَتْ مِنَ الْقُرْآنِ ‏‏{‏ يَسْتَفْتُونَكَ قُلِ اللَّهُ يُفْتِيكُمْ فِي الْكَلاَلَةِ‏}‏

বাংলা অনুবাদ: কোরআনের সর্বশেষ নাজিল হওয়া আয়াত হলো: তারা তোমার কাছে ফতোয়া চায়; বলো, কালালা সম্পর্কে আল্লাহ তোমাদের ফতোয়া দিচ্ছেন।

এই অবস্থায় সুদের আয়াত এবং কালালার আয়াত দুটিকে একমাত্র সর্বশেষ ধরে নেওয়া যায় না। একটি নির্দিষ্ট সময়ক্রমে দুটির অবস্থান একসঙ্গে শেষ হতে হলে একই অবতরণপর্বে আসার তথ্য প্রয়োজন, অথবা শেষত্বের অর্থ ভিন্নভাবে সীমিত করতে হয়। সুয়ূতির আলোচনায় কালালাকে ফরায়েজ বা উত্তরাধিকার বিষয়ে শেষ বলে সীমিত করা হয়েছে। সংক্ষিপ্ত হাদিসের সর্বশেষ পরিচয়ের সঙ্গে এই বিষয়গত সীমাটি পরবর্তী ব্যাখ্যার ধাপে যুক্ত হয়েছে।

বারার আরেক বুখারি-পাঠে শেষ সম্পূর্ণ সূরা হিসেবে বারাআত এবং নিসার শেষাংশের কথা আছে। সেখানে সম্পূর্ণ হওয়ার ভাষা সরাসরি ব্যবহৃত হয়েছে। [474]

آخر سورة نزلت كاملة براءة، وآخر سورة نزلت خاتمة سورة النساء: يستفتونك قل الله يفتيكم في الكلالة.

বাংলা অনুবাদ: সর্বশেষ সম্পূর্ণ নাজিল হওয়া সূরা বারাআত; আর সর্বশেষ নাজিল হওয়া অংশ নিসা সূরার শেষাংশ: তারা তোমার কাছে ফতোয়া চায়; বলো, কালালা সম্পর্কে আল্লাহ তোমাদের ফতোয়া দিচ্ছেন।

মুসহাফে নিসার শেষ আয়াত হওয়া এবং সমগ্র অবতরণের শেষ আয়াত হওয়া দুটি আলাদা পরিচয়। প্রথমটি এখন হাতে থাকা সূরার ভেতরে অবস্থান জানায়। দ্বিতীয়টি মুহাম্মদের জীবনের সব অবতরণপর্বের সঙ্গে তার সময়গত সম্পর্ক জানায়। বারার বক্তব্যে এই দ্বিতীয় দাবি আছে। পরবর্তী ভাষ্যকার যখন একে উত্তরাধিকার বিষয়ে সীমিত করেন, তখন তিনি গ্রন্থের অবস্থান থেকে সময় উদ্ধার করছেন না; ভিন্ন বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে শেষত্বের পরিসর বদলে দিচ্ছেন।

কালালার বিধান বুঝতে উমরের সমস্যার খবরও মুসলিমে সংরক্ষিত। তিনি বলেছেন, অন্য কোনো বিষয়ে মুহাম্মদকে এতবার প্রশ্ন করেননি এবং অন্য কোনো বিষয়ে মুহাম্মদ তাঁর সঙ্গে এত কঠোরও হননি। নিসার শেষের “গ্রীষ্মের আয়াত” তাঁর জন্য যথেষ্ট কি না, মুহাম্মদ সে প্রশ্ন করেছেন। [475]

إِنِّي لاَ أَدَعُ بَعْدِي شَيْئًا أَهَمَّ عِنْدِي مِنَ الْكَلاَلَةِ مَا رَاجَعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي شَىْءٍ مَا رَاجَعْتُهُ فِي الْكَلاَلَةِ وَمَا أَغْلَظَ لِي فِي شَىْءٍ مَا أَغْلَظَ لِي فِيهِ حَتَّى طَعَنَ بِإِصْبَعِهِ فِي صَدْرِي وَقَالَ «يَا عُمَرُ أَلاَ تَكْفِيكَ آيَةُ الصَّيْفِ الَّتِي فِي آخِرِ سُورَةِ النِّسَاءِ».

বাংলা অনুবাদ: আমি আমার পরে কালালার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় রেখে যাচ্ছি না। কালালা নিয়ে আল্লাহর রাসুলের কাছে যতবার ফিরে প্রশ্ন করেছি, অন্য কোনো বিষয়ে ততবার করিনি। আর কোনো বিষয়ে তিনি আমার সঙ্গে এত কঠোর হননি; এমনকি আমার বুকে আঙুল দিয়ে বলেছিলেন, হে উমর, নিসা সূরার শেষের গ্রীষ্মের আয়াতটি কি তোমার জন্য যথেষ্ট নয়?

সর্বশেষ হিসেবে বর্ণিত নির্দেশটি উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও উমর তার প্রয়োগ সম্পর্কে আরও ব্যাখ্যা খুঁজেছেন। আয়াত জানা এবং উত্তরাধিকারের একটি সমস্যায় তার অর্থ ও সীমা নির্ধারণ করা তাঁর কাছে অভিন্ন অভিজ্ঞতা ছিল না। মৃত্যুর পরে এই ব্যাখ্যা-অনুসন্ধান চলবে ঘোষণাকারীর সরাসরি জবাব ছাড়াই। শেষত্বের পরিচয় তাই শুধু সময়ের তথ্য নয়; কোন ব্যাখ্যা আর সরাসরি পাওয়া যাবে না, সেই সীমার সঙ্গেও যুক্ত।


তাওবার শেষ দুই আয়াত

উবাই ইবনে কাবের নামে তাওবার শেষাংশকে সর্বশেষ অবতরণ বলার বর্ণনাও আছে। শেষাংশের পরিচয় দিতে “লাকাদ জাআকুম রাসুলুন মিন আনফুসিকুম” উদ্ধৃত হয়েছে। এটি ১২৮ নম্বর আয়াতের শুরু; তার পরে ১২৯ নম্বর আয়াত রয়েছে। শেষ দুই আয়াতের আলোচনা শুধু প্রথম বাক্যের নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করা হলে ১২৮-কেই সূরাটির শেষ আয়াত মনে করার ভুল তৈরি হতে পারে। [476]

‘নিশ্চয়ই তোমাদের নিজদের মধ্য থেকে তোমাদের নিকট একজন রাসূল এসেছেন, তা তার জন্য কষ্টদায়ক যা তোমাদেরকে পীড়া দেয়। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, পরম দয়ালু’ (সূরা আত-তাওবা:১২৮)। (বর্ণনায় হাকেম)

যুরকানির আলোচনায় এই মত অষ্টম মত হিসেবে রয়েছে; হাকিম ও ইবনে মারদাওয়াইহের সূত্রে উবাইয়ের বর্ণনার পরিচয় দেওয়া হয়েছে। [477]

أن آخر ما نزل هو خاتمة سورة براءة

বাংলা অনুবাদ: সর্বশেষ নাজিল হয়েছে সূরা বারাআতের শেষাংশ।

সুয়ূতির সংকলনে উবাইয়ের বক্তব্যের আরেক রূপে স্পষ্টভাবে “এই দুই আয়াত” বলা হয়েছে। সেখানে কোরআনের আল্লাহর কাছে সর্বশেষ অবস্থানের ভাষা আছে। [478]

وأخرج ابن مردويه عن أبي أيضا قال: آخر القرآن عهدا بالله هاتان الآيتان: لقد جاءكم رسول من أنفسكم.

বাংলা অনুবাদ: ইবনে মারদাওয়াইহ উবাই থেকেও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, কোরআনের মধ্যে আল্লাহর কাছে সর্বশেষ ছিল এই দুই আয়াত: “তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে একজন রাসুল এসেছেন।”

এই শেষাংশ সংগ্রহের ইতিহাসেও বিশেষভাবে এসেছে। যায়েদ আবু বকরের উদ্যোগে অনুসন্ধানের সময়ে আবু খুযাইমা আনসারির কাছে তাওবার শেষাংশ পাওয়ার কথা বলেছেন। বুখারিতে অনুসন্ধানের শেষ প্রাপ্তি হিসেবে এই অংশের উল্লেখ এবং উবাইয়ের নামে সর্বশেষ অবতরণ হিসেবে তার পরিচয় আলাদা তথ্য। একটি আয়াত কখন পাওয়া গেল এবং কখন অবতীর্ণ হয়েছিল, তার প্রমাণ এক নয়। সংগ্রহের সময় শেষে পাওয়া বলেই অবতরণেও শেষে এসেছিল—এমন সময়ক্রম তৈরি হয় না। [479]

حتى وجدت آخر سورة التوبة مع أبي خزيمة الأنصاري لم أجدها مع أحد غيره: لقد جاءكم رسول من أنفسكم عزيز عليه ما عنتم، حتى خاتمة براءة.

বাংলা অনুবাদ: শেষ পর্যন্ত তাওবা সূরার শেষাংশ আবু খুযাইমা আনসারির কাছে পেলাম; তাঁকে ছাড়া অন্য কারও কাছে তা পাইনি: “তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে একজন রাসুল এসেছেন, তোমাদের কষ্ট তাঁর কাছে অসহনীয়”—বারাআতের শেষ পর্যন্ত।

শেষাংশকে শুধু তাওবার ভেতরের সর্বশেষ অবতরণ বলে ধরেছেন যুরকানি। তাঁর ব্যাখ্যায় গ্রন্থের সর্বশেষ নয়, সূরার সর্বশেষ অংশ বোঝানো হচ্ছে। এই সীমা যুক্ত হলে সুদ ও কালালার দাবির সঙ্গে সরাসরি বিরোধ এড়ানো যায়। কিন্তু তখন উবাইয়ের নামে সংরক্ষিত বাণীর শেষত্বের ব্যাপক ভাষা একটি বিশেষ সূরার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। কোন বক্তব্যের শেষত্বকে আসল সর্বশেষ এবং কোনটিকে বিষয়ভিত্তিক সর্বশেষ ধরা হবে, সেই ক্ষমতা পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীর হাতে থাকে।

শেষ অবতরণের খবরগুলো এভাবে ভিন্ন তথ্যের ইতিহাসও বহন করে। একজন বিষয়টির নাম বলেছেন, আরেকজন পুরো বাক্য শনাক্ত করেছেন, কেউ সম্পূর্ণ সূরার কথা বলেছেন, কেউ সূরার শেষাংশ বলেছেন। বর্তমান মুসহাফে সবগুলো পাঠ পাওয়া গেলেও কোন ক্রমে শেষ পর্যায়টি সম্পন্ন হয়েছিল, তার একক নথি পাওয়া যায় না। যে কথিত শেষ সীমা দিয়ে পরবর্তী সংগ্রাহকের কাজ শুরু হওয়ার কথা, সেই সীমার পরিচয়ই সংরক্ষিত সাহিত্যে একাধিক।


শেষ অবতীর্ণ সূরা সম্পর্কে পৃথক বর্ণনা

সর্বশেষ সূরার পরিচয় নিয়ে মতভেদ আয়াতের মতভেদের চেয়েও বিস্তৃত। আয়েশার নামে মায়িদা, ইবনে আব্বাসের নামে নাসর এবং বারা ইবনে আযিবের নামে বারাআত বা তাওবার কথা আছে। সূরা সম্পূর্ণভাবে একসঙ্গে নাজিল হওয়া, বিচ্ছিন্নভাবে নাজিল হয়ে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ হওয়া এবং বিশেষ ধরনের বিধানে সর্বশেষ হওয়া ভিন্ন ঘটনা। কোনো সংবাদের মধ্যে এই সীমা স্পষ্টভাবে থাকে; কোনো সীমা পরবর্তী ব্যাখ্যায় বসানো হয়। ফলে তিনটি সূরার নামকে একটি নির্ভুল শেষ সূরার তিনটি সমার্থক পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

বারার বুখারি-বর্ণনায় বারাআতের জন্য “কামিলাতান”—সম্পূর্ণভাবে—শব্দ আছে। মুসলিমে ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় নাসরের জন্য “নাযালাত জামিআন”—সমগ্রভাবে নাজিল—আছে। অতএব শুধু একটি শেষ সম্পূর্ণ সূরা, অন্যটি শেষ আংশিক সূরা বলে দুটিকে আলাদা করলে এই দুই মূল পাঠের নির্দিষ্ট ভাষা ধরা পড়ে না। শেষত্ব ও সম্পূর্ণতা দুই বর্ণনাতেই এসেছে। সেই অবস্থায় কোন সাক্ষী কোন ধরনের সম্পূর্ণতা বোঝাচ্ছেন, তা নিয়ে পরবর্তী ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়।

বর্ণনাকারীসূরার পরিচয়উৎসের নির্দিষ্ট ভাষা ও ব্যবহার
বারা ইবনে আযিববারাআত বা তাওবাবুখারি ৪৩৬৪-এ শেষ সম্পূর্ণ সূরা
আয়েশামায়িদাআহমদের বর্ণনায় শেষ সূরা; তার হালাল-হারাম অনুসরণের নির্দেশ
ইবনে আব্বাসনাসরমুসলিম ৩০২৪ক-তে সমগ্রভাবে নাজিল হওয়া শেষ সূরা
পরবর্তী সমন্বয়বিষয় বা রূপ অনুসারে পৃথক শেষত্বকোথাও হালাল-হারাম, কোথাও যুদ্ধবিধান, কোথাও সম্পূর্ণ সূরার সীমা

ইসলামকিউএ এই তিন পরিচয়ই রেখেছে এবং বায়হাকির সমন্বয় উদ্ধৃত করেছে: প্রত্যেকে নিজের জানা অনুযায়ী উত্তর দিয়েছেন। এই ব্যাখ্যায় শেষত্বের দাবির উৎস একটি সর্বজনবিদিত সমাপ্তি-ঘোষণা থেকে সরে ব্যক্তিবিশেষের পাওয়া সংবাদে স্থাপিত হয়। [480]

قال البيهقي رحمه الله: يجمع بين هذه الاختلافات بأن كل واحد أجاب بما عنده.

বাংলা অনুবাদ: বায়হাকি বলেছেন, এই মতভেদগুলোর মধ্যে সমন্বয় হয় এভাবে যে, প্রত্যেকে নিজের কাছে যা জানা ছিল, তা অনুসারে উত্তর দিয়েছেন।

নিজের জানা অনুসারে উত্তর দেওয়া মানুষের স্মৃতিনির্ভর ইতিহাসের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু একই বক্তব্যকে সবার জন্য নির্ভুল চূড়ান্ত সীমা হিসেবে ব্যবহার করলে সমস্যা হয়। সেই সীমা প্রতিষ্ঠা করতে কার জ্ঞান কোন সময় পর্যন্ত পৌঁছেছিল, কার বক্তব্য অন্যের বক্তব্যকে ছাড়িয়ে যায় এবং কেন—এই সম্পর্ক নির্ধারণ করতে হয়। সমগ্র সূরা পাওয়ার দাবির পাশেও তাই পরবর্তী গবেষক ও ভাষ্যকারের নির্বাচন কার্যকর হয়ে আছে।


সূরা মায়িদার পক্ষে আয়েশার বর্ণনা

জুবাইর ইবনে নুফাইর আয়েশার কাছে গেলে তিনি মায়িদা পড়েন কি না জিজ্ঞেস করেন। উত্তরে সম্মতি পেয়ে আয়েশা একে শেষ নাজিল হওয়া সূরা বলেন এবং এর হালাল ও হারাম অনুসরণের নির্দেশ দেন। আহমদের এই বর্ণনা ইসলামকিউএ উদ্ধৃত করেছে। আয়েশার বক্তব্যে শেষত্ব একটি ব্যবহারিক কর্তৃত্বের ভিত্তি: পরের বিধান হিসেবে এই সূরার অনুমতি ও নিষেধ মানতে হবে। [481]

عن جبير بن نفير قال: دخلت على عائشة فقالت: هل تقرأ سورة المائدة؟ قال: قلت: نعم، قالت: فإنها آخر سورة نزلت فما وجدتم فيها من حلال فاستحلوه وما وجدتم فيها من حرام فحرموه وسألتها عن خلق رسول الله صلى الله عليه وسلم فقالت القرآن.

বাংলা অনুবাদ: জুবাইর ইবনে নুফাইর বলেন, আমি আয়েশার কাছে গেলে তিনি বললেন, তুমি কি মায়িদা সূরা পড়ো? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, এটি সর্বশেষ নাজিল হওয়া সূরা। তাই এতে যা হালাল পাও, হালাল গণ্য করো এবং যা হারাম পাও, হারাম গণ্য করো। আমি তাঁকে আল্লাহর রাসুলের চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, কোরআন।

যুরকানির আলোচনায় মায়িদার শেষত্বের মতকে হালাল-হারামের ক্ষেত্রে শেষ বলে সীমিত করা হয়েছে। এই ব্যাখ্যায় সূরাটির বিধান পরে রহিত হয়নি বলার সঙ্গে শেষত্বকে যুক্ত করা হয়। [482]

أن آخر ما نزل سورة المائدة

বাংলা অনুবাদ: সর্বশেষ নাজিল হয়েছে সূরা মায়িদা।

আয়েশা শেষ সূরা বলার সঙ্গে হালাল-হারামের নির্দেশ দিয়েছেন বলে তাঁর বক্তব্যের আইনগত উদ্দেশ্য স্পষ্ট। কিন্তু “শেষ নাজিল হওয়া সূরা” বাক্য এবং “শেষ হালাল-হারামের সূরা” বাক্য সমান তথ্য দেয় না। প্রথমটি সব সূরার সঙ্গে সময়গত তুলনা করে; দ্বিতীয়টি একটি বিশেষ ধরনের বিধানের সঙ্গে তুলনা করে। বিষয়গত সীমা যুক্ত হলে দাবির পরিসর ছোট হয়। সমন্বয়ের এই পদ্ধতিতে একটি কথাকে বাতিল না করেও অন্য দাবির সঙ্গে পাশাপাশি রাখা যায়, কিন্তু সেই নতুন সীমা নির্ধারণের কাজ করেন ব্যাখ্যাকারী।

মায়িদা একটি দীর্ঘ সূরা; এর মধ্যে খাদ্যবিধান, উপাসনা, চুক্তি, শাস্তি এবং অন্যান্য ধর্মীয় সম্পর্কের আলোচনা রয়েছে। সূরার প্রতিটি অংশ একই দিনে এসেছে—আয়েশার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে এমন দিনভিত্তিক বিবরণ নেই। মায়িদার মধ্যবর্তী ৩ নম্বর আয়াতের একটি অংশ আরাফার দিনে নাজিল হওয়ার বর্ণনা আবার আলাদা। একটি সূরার ধর্মীয় কর্তৃত্ব, তার পূর্ণ হওয়ার সময় এবং তার বিভিন্ন আয়াতের ঘোষণার সময়কে এক রেখায় বসালে এই পৃথক তথ্যগুলো হারিয়ে যায়।

শেষ সূরা হিসেবে মায়িদার পরিচয়ের সঙ্গে বিধানের অপরিবর্তিত থাকার ধারণা যুক্ত হওয়ার কারণও এখানে স্পষ্ট। শেষ বিধান কার্যকর হলে তার পরে নতুন রহিতকারী না আসার প্রত্যাশা তৈরি হয়। সেই প্রত্যাশার ওপর আইনগত সিদ্ধান্ত দাঁড়ায়। কিন্তু বারাআত ও নাসরের স্বতন্ত্র শেষত্বের সংবাদ তখনও বহাল থাকে। ফলে কোন পর্যায়ের শেষত্ব দিয়ে আইনগত স্থায়িত্ব নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট না করলে শেষ হওয়ার শব্দটি নিজের চেয়ে বেশি কাজ করতে শুরু করে।

এই মতের মূল্য তাই শুধু শেষ সূরার আরেক নাম পাওয়ায় নয়। আয়েশার কাছে শেষত্বের তথ্যটি পাঠককে কীভাবে হালাল-হারাম গ্রহণ করতে হবে, সেই নির্দেশের সঙ্গে যুক্ত। অবতরণের কালক্রম এভাবে ধর্মীয় আইন প্রয়োগের কর্তৃত্ব তৈরি করে। কোন সূরার পরে আর সংশোধন আসেনি—এই সিদ্ধান্ত পরবর্তী সমাজে কোন বিধান প্রশ্নহীনভাবে বহাল ধরা হবে, তার ওপর প্রভাব ফেলে।


শেষ সম্পূর্ণ সূরা হিসেবে নাসর

মুসলিমে ইবনে আব্বাস উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহকে জিজ্ঞেস করেন, সমগ্রভাবে নাজিল হওয়া শেষ সূরা তিনি জানেন কি না। উত্তরে নাসরের নাম বলা হলে তিনি সঠিক বলে স্বীকার করেন। সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তরে শেষত্বের সঙ্গে সম্পূর্ণতার শর্তটি মূল ভাষাতেই রয়েছে। [483]

قال لي ابن عباس: تعلم ـ وقال هارون تدري ـ آخر سورة نزلت من القرآن نزلت جميعا؟ قلت: نعم، إذا جاء نصر الله والفتح، قال: صدقت. وفي رواية ابن أبي شيبة: تعلم أي سورة، ولم يقل: آخر.

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আব্বাস আমাকে বললেন, তুমি জানো কি—হারুনের বর্ণনায় “তাদরি” বা “জানো” শব্দটি আছে—কোরআনের সমগ্রভাবে নাজিল হওয়া শেষ সূরা কোনটি? আমি বললাম, হ্যাঁ—“যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে।” তিনি বললেন, ঠিক বলেছ। ইবনে আবি শাইবার বর্ণনায় আছে, “কোন সূরা জানো?” সেখানে “শেষ” বলা হয়নি।

মুসলিম একই স্থানে বর্ণনান্তরের শব্দপার্থক্যও রেখেছেন: ইবনে আবি শাইবার রূপে “শেষ” নেই। একটি ক্ষুদ্র শব্দের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি খবরটির কাজ বদলে দেয়। “কোন সূরা সমগ্রভাবে নাজিল হয়েছিল” প্রশ্ন একটি তথ্য চায়; “সর্বশেষ কোন সূরা সমগ্রভাবে নাজিল হয়েছিল” প্রশ্ন তার সঙ্গে পুরো অবতরণকালকে তুলনার মধ্যে আনে। মূল সূত্রে সংরক্ষিত এই পার্থক্য শেষত্বের দাবিটি ঠিক কোন ভাষার ওপর দাঁড়ায়, তা শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

নাসরের সঙ্গে মুহাম্মদের মৃত্যুর পূর্বাভাসের সম্পর্কও ইবনে আব্বাসের নামে বুখারিতে আছে। উমর তাঁকে বদরে অংশগ্রহণকারী প্রবীণদের সঙ্গে বসাতেন। অন্যদের আপত্তির পরে সূরাটির অর্থ জানতে চাইলে কেউ বিজয়ের সময় প্রশংসা ও ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ বলেন। ইবনে আব্বাস এর মধ্যে মৃত্যুর সংবাদ শনাক্ত করেন। উমর তাঁর ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত হন। [484]

فقال لي: أكذاك تقول يا ابن عباس؟ فقلت: لا. قال: فما تقول؟ قلت: هو أجل رسول الله صلى الله عليه وسلم أعلمه له، قال: إذا جاء نصر الله والفتح، وذلك علامة أجلك، فسبح بحمد ربك واستغفره إنه كان توابا. فقال عمر: ما أعلم منها إلا ما تقول.

বাংলা অনুবাদ: তিনি আমাকে বললেন, ইবনে আব্বাস, তুমিও কি তাই বলো? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তাহলে কী বলো? আমি বললাম, এটি আল্লাহর রাসুলের মৃত্যুর সময়ের সংবাদ, যা তাঁকে জানানো হয়েছে। “যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে”—সেটি আপনার মৃত্যুর সময়ের লক্ষণ; “তখন আপনার রবের প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চান; তিনি তওবা গ্রহণকারী।” উমর বললেন, তুমি যা বলেছ, এর অন্য কোনো অর্থ আমিও জানি না।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। মুসলিমের বর্ণনা সূরার অবতরণসম্পর্কিত তথ্য দেয়; বুখারির ঘটনাটি সূরার অর্থ নিয়ে ব্যাখ্যার প্রতিযোগিতা দেখায়। প্রথমটির বিষয় শেষ সূরা, দ্বিতীয়টির বিষয় মৃত্যুর ইঙ্গিত। মৃত্যুর ইঙ্গিতের ব্যাখ্যা গ্রহণ করলেই ওই সূরার পরে কোনো পৃথক আয়াত আসেনি—এমন সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় না। একটি পূর্ণ সূরা শেষ হতে পারে, তারপরও আগে শুরু হওয়া অন্য সূরায় নতুন আয়াত যুক্ত হতে পারে। এই সম্ভাবনাটিই শেষ পূর্ণ সূরা এবং শেষ আয়াত আলাদা করে জানার প্রয়োজন তৈরি করে।

উমরের সভায় ইবনে আব্বাসের অবস্থান প্রতিষ্ঠার ঘটনাটিও তাৎপর্যপূর্ণ। অন্য প্রবীণদের সামনে তাঁর বিশেষ জ্ঞানের মূল্য দেখাতে একটি সূরার আভ্যন্তরীণ সংকেত বোঝার ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়েছে। সবাই একই পাঠ জানলেও সবাই একই অর্থ শনাক্ত করেননি। ফলে সূরাটির সংরক্ষণ এবং তার সমাপ্তিসংকেত বোঝা সমানভাবে বণ্টিত ছিল না। নির্দিষ্ট পাঠের উপস্থিতির ওপর আবার বিশেষ ব্যাখ্যাজ্ঞানের মর্যাদা গড়ে উঠেছে।

নাসরের শেষত্ব, মায়িদার আইনগত কর্তৃত্ব এবং বারাআতের সম্পূর্ণতার সংবাদ একত্রে শেষ অবতরণের বহুমাত্রিক স্মৃতি প্রকাশ করে। পরবর্তী সমন্বয় এই স্মৃতিগুলোর জন্য আলাদা ঘর তৈরি করেছে। শেষ সূরা নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত নামের উত্তর দিলে সেই ঘরগুলোর পার্থক্য আড়াল থাকে; মূল বর্ণনাগুলোতে ফিরে গেলে শেষ জীবনের পাঠ ও তার ব্যাখ্যা নিয়ে অসম জ্ঞানের ইতিহাস সামনে আসে।


দ্বীন পূর্ণ হওয়ার আয়াত, আরাফার দিন এবং উমরের কান্নার বিবরণ

মায়িদার ৩ নম্বর আয়াতে ধর্ম পূর্ণ করা, অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করা এবং ইসলামকে ধর্ম হিসেবে মনোনীত করার ঘোষণা আছে। এই ঘোষণা আয়াতটির মাঝের অংশে; আগে খাদ্যসংক্রান্ত নিষেধ এবং পরে অনাহারের ব্যতিক্রম রয়েছে। পূর্ণতার উক্তিকে শেষ আয়াতের নিশ্চিত পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করলে তার পরে অবতীর্ণ সুদ, ঋণ ও কালালার বর্ণনাগুলোর সঙ্গে সংঘাত তৈরি হয়। কোন অর্থে ধর্ম পূর্ণ হলো এবং তার পরেও নতুন বিধানের সংবাদ কেন আছে—প্রশ্নটি প্রাচীন উলুমুল কোরআনের আলোচনাতেও তোলা হয়েছে। [485]

আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। অতএব যে ব্যক্তি তীব্র ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ে; কিন্তু কোন গোনাহর প্রতি প্রবণতা না থাকে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা ক্ষমাশীল।

একই ঘোষণার অন্য তিনটি বাংলা অনুবাদেও পূর্ণতা ও সম্পূর্ণতার ভাষা রয়েছে। ক্রিয়াগুলো ইতিমধ্যে সম্পন্ন কাজের ঘোষণা দেয়। [485]

আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দীন হিসাবে মনোনীত করলাম।
— Sheikh Mujibur Rahman
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিআমত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে।
— Rawai Al-bayan
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম [১৪], আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দীন হিসেবে পছন্দ করলাম [১৫]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

আয়াতটির সময় ও স্থান সম্পর্কে উমরের বক্তব্য বুখারিতে সংরক্ষিত। একজন ইহুদি বলেন, এমন আয়াত তাঁদের কাছে নাজিল হলে দিনটিকে উৎসব করতেন। উমর জবাবে আরাফায় শুক্রবারে মুহাম্মদের দাঁড়িয়ে থাকার সময়টির কথা জানান। তাঁর উত্তরে একটি নির্দিষ্ট আয়াতের নির্দিষ্ট অবতরণমুহূর্তের স্মৃতি আছে। [486]

أن رجلا من اليهود قال له: يا أمير المؤمنين، آية في كتابكم تقرءونها لو علينا معشر اليهود نزلت لاتخذنا ذلك اليوم عيدا. قال: أي آية؟ قال: اليوم أكملت لكم دينكم وأتممت عليكم نعمتي ورضيت لكم الإسلام دينا. قال عمر: قد عرفنا ذلك اليوم والمكان الذي نزلت فيه على النبي صلى الله عليه وسلم وهو قائم بعرفة يوم جمعة.

বাংলা অনুবাদ: একজন ইহুদি তাঁকে বললেন, হে বিশ্বাসীদের নেতা, তোমাদের কিতাবে এমন একটি আয়াত আছে যা তোমরা পড়ো; সেটি আমাদের ইহুদিদের ওপর নাজিল হলে আমরা সেই দিনকে উৎসব করতাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কোন আয়াত? লোকটি বলল, “আজ তোমাদের ধর্ম পূর্ণ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের ধর্ম হিসেবে মনোনীত করলাম।” উমর বললেন, নবীর ওপর যেদিন ও যে স্থানে তা নাজিল হয়েছিল, তা আমরা জানি। তিনি শুক্রবার আরাফায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।

উমরের এই বর্ণনায় শেষ আয়াত হিসেবে পরিচয় নেই। আছে দিন, স্থান এবং আয়াতের বিশেষ মর্যাদা। শেষত্বের সিদ্ধান্তটি আয়াতের পূর্ণতার ভাষা থেকে টানতে হয়। সেখানেই সমস্যা: ধর্মের পূর্ণতা এবং অবতরণপ্রক্রিয়ার সমাপ্তি এক অর্থে ধরা হলে পরবর্তী নতুন বিধান সেই সমাপ্তির পরে এসে পড়ে। দুটিকে আলাদা অর্থ দিলে পূর্ণতার আয়াত দিয়ে সর্বশেষ অবতরণ নির্ধারণ করা যায় না।

সুয়ূতি এই সমস্যাকে “মুশকিল” বলেছেন। তাঁর উদ্ধৃত সুদ্দীর মতে পূর্ণতার আয়াতের পরে হালাল-হারামের নতুন বিধান আসেনি; কিন্তু অন্যদিকে সুদ, ঋণ ও কালালার আয়াত পরে আসার খবর রয়েছে। বিরোধের উভয় তথ্যই তিনি পাশাপাশি রেখেছেন। [487]

من المشكل على ما تقدم قوله تعالى: اليوم أكملت لكم دينكم [المائدة: 3]، فإنها نزلت بعرفة عام حجة الوداع، وظاهرها إكمال الفرائض والأحكام قبلها، وقد صرح بذلك جماعة منهم السدي، فقال: لم ينزل بعدها حلال ولا حرام، مع أنه وارد في آية الربا والدين والكلالة أنها نزلت بعد ذلك.

বাংলা অনুবাদ: আগের আলোচনার সঙ্গে সমস্যাযুক্ত হলো আল্লাহর “আজ তোমাদের ধর্ম পূর্ণ করলাম” বক্তব্য [মায়িদা: ৩]। এটি বিদায় হজের বছরে আরাফায় নাজিল হয়েছিল। এর প্রকাশ্য অর্থ হলো এর আগেই ফরজ ও বিধানগুলো পূর্ণ হয়েছে। সুদ্দিসহ কয়েকজন তা স্পষ্ট বলেছেন: এর পরে কোনো হালাল বা হারাম নাজিল হয়নি। অথচ সুদ, ঋণ ও কালালার আয়াত সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে এগুলো তার পরে নাজিল হয়েছে।

ইবনে কাসিরের তাফসিরেও সুদ্দীর একই সিদ্ধান্ত আছে। তিনি বলেছেন, আরাফায় এই আয়াত নাজিল হয়; এর পরে আর হালাল-হারাম নাজিল হয়নি। অন্য শেষত্বের বর্ণনায় আবার নতুন আইনগত বক্তব্য রয়েছে। ফলে সমস্যাটি কেবল একটি সাধারণ উপদেশ পরে এসেছে কি না, তা নিয়ে নয়। অধিকার, অর্থনৈতিক লেনদেন ও উত্তরাধিকার নির্ধারণকারী নির্দেশগুলোর সময়ও এর সঙ্গে যুক্ত।

তাবারি এই সম্পর্ক মেলাতে পূর্ণতার অর্থকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক-ধর্মীয় অবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছেন বলে সুয়ূতি জানিয়েছেন। তাঁর নির্বাচিত ব্যাখ্যায় মক্কার পবিত্র স্থানে মুসলিমদের প্রতিষ্ঠা এবং মুশরিকদের অপসারণের ফলে মুশরিকদের সঙ্গে মিশে হজ করার আগের অবস্থা শেষ হওয়াকে পূর্ণতার প্রকাশ ধরা হয়েছে। [488]

الأولى أن يتأول على أنه أكمل لهم دينهم بإقرارهم بالبلد الحرام وإجلاء المشركين عنه، حتى حجه المسلمون لا يخالطهم المشركون.

বাংলা অনুবাদ: অধিকতর উপযুক্ত হলো এভাবে ব্যাখ্যা করা যে, পবিত্র নগরে তাঁদের প্রতিষ্ঠা এবং সেখান থেকে মুশরিকদের অপসারণের মাধ্যমে তাঁদের ধর্ম পূর্ণ করা হয়েছে; ফলে মুসলিমরা এমনভাবে হজ করেছেন যে মুশরিকরা তাঁদের সঙ্গে মেশেনি।

এই ব্যাখ্যায় পূর্ণতা সমস্ত ভবিষ্যৎ আইন বন্ধ হওয়ার ঘোষণা হয়ে থাকে না; একটি উপাসনাস্থলের ওপর মুসলিমদের একক অধিকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হয়। সমস্যার সমাধান করতে পূর্ণতার পরিসর নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ধর্ম পূর্ণ হওয়ার মহৎ ঘোষণার অর্থ তখন বাস্তব ক্ষমতা, প্রবেশাধিকার এবং মুশরিকদের অপসারণের ঘটনায় প্রকাশিত। পরবর্তী অবতরণকে জায়গা দিতে ভাষ্যকার ধর্মের পূর্ণতা এবং সব বিধানের প্রকাশ শেষ হওয়াকে পৃথক করেছেন।

পূর্ণতার ঘোষণায় উমরের কান্নার আরেক খবর ইবনে কাসির সংরক্ষণ করেছেন। হারুন ইবনে আনতারার পিতার নামে বর্ণিত এই খবরে আগে ধর্মে বৃদ্ধি এবং পূর্ণ হওয়ার পরে হ্রাসের আশঙ্কা রয়েছে। পূর্ণতার সংবাদে আনন্দের বদলে ক্ষয়ের উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। [489]

ইবন জারীর (র)…… হারূন ইব্‌ন আনতারার পিতা হইতে বর্ণনা করেন যে, হারুন ইবন আনতারার পিতা বলেন: اَلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ এই আয়াতটি হজ্জে আরাফাতের দিন যখন অবতীর্ণ হইল, হযরত উমর (রা) কাঁদিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, তুমি কাঁদিতেছ কেন? তিনি বলিলেন, আমরা এই দীন সম্পর্কে আরো বেশি আশা করিয়াছিলাম। কিন্তু যখন উহা পূর্ণাঙ্গতা লাভ করিয়াছে, তখন তো আর ইহার চেয়ে বেশি আশা করা যায় না; বরং ক্রমান্বয়ে ইহার অবনতিই আশা করা যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) তখন বলিলেন, তুমি ঠিক বলিয়াছ।’-
এই হাদীসটির সমর্থনে অন্য আর একটি হাদীস আসিয়াছে। হাদীসটি এই: ইসলাম অপরিচিতের বেশে যাত্রা করিয়াছিল, আবার সত্বর সে অপরিচিত হইয়া প্রত্যাবর্তন করিবে। তাই সুসংবাদ সেই অপরিচিত সংখ্যক লোকদের জন্য।

কোরআন সংকলন 88

আরবি বিবরণে কান্নার কারণ হিসেবে “কোনো কিছু পূর্ণ হওয়ার পরে হ্রাস ছাড়া থাকেনি” বলা হয়েছে। মুহাম্মদের নামে জবাব “সাদাকতা”—সত্য বলেছ। [490]

لَمَّا نَزَلَتْ ( الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ ) وَذَلِكَ يَوْمَ الْحَجِّ الْأَكْبَرِ ، بَكَى عُمَرُ فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” مَا يُبْكِيكَ؟ ” قَالَ : أَبْكَانِي أَنَّا كُنَّا فِي زِيَادَةٍ مِنْ دِينِنَا ، فَأَمَّا إِذْ أَكْمَلَ فَإِنَّهُ لَمْ يَكْمُلْ شَيْءٌ إِلَّا نَقَصَ . فَقَالَ : ” صَدَقْتَ ” .

বাংলা অনুবাদ: “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম পূর্ণ করলাম” নাজিল হলে, বড় হজের দিনে উমর কাঁদলেন। নবী তাঁকে বললেন, কী তোমাকে কাঁদাচ্ছে? তিনি বললেন, আমরা আমাদের ধর্মে বৃদ্ধির মধ্যে ছিলাম; এখন যখন তা পূর্ণ হলো, কোনো কিছু পূর্ণ হওয়ার পর হ্রাস ছাড়া থাকেনি—এই কথাই আমাকে কাঁদিয়েছে। তিনি বললেন, তুমি সত্য বলেছ।

এখানে পূর্ণতাকে ইতিহাসের একটি সর্বোচ্চ অবস্থান হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যার পরে অবনতি প্রত্যাশিত। এটি আরাফার দিন ও শুক্রবারের বুখারি-বর্ণনা থেকে আলাদা বর্ণনাপথের খবর। দিন-স্থানের স্মৃতি এবং কান্নার ব্যাখ্যা একটি অভিন্ন ঘটনার একই স্তরের স্বাধীন সাক্ষ্য নয়। তাফসিরে কান্নার খবরটি দিয়ে পূর্ণতার পরের বিচ্ছেদ ও ক্ষয়ের একটি ধর্মীয় অর্থ তৈরি হয়েছে। ইবনে কাসির এর সমর্থনে ইসলাম অপরিচিত অবস্থায় শুরু হয়ে আবার অপরিচিত অবস্থায় ফিরে যাওয়ার হাদিসও এনেছেন।

পূর্ণতার অর্থ বা ব্যবহারসংরক্ষিত বক্তব্যপরবর্তী সময় সম্পর্কে ফল
সব ফরজ ও বিধান শেষসুদ্দীর মতে পরে হালাল-হারাম আসেনিপরে সুদ, ঋণ ও কালালার খবরের সঙ্গে সমস্যা
পবিত্র স্থানে একক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠাতাবারির নির্বাচিত ব্যাখ্যায় মুশরিকদের অপসারণপূর্ণতার পরেও অন্য বিধান প্রকাশের অবকাশ থাকে
সর্বোচ্চ অবস্থার পরে অবনতিউমরের কান্নার তাফসিরি খবরে বৃদ্ধি থেকে হ্রাসপূর্ণতা স্থায়ী সামাজিক উন্নতির নিশ্চয়তা নয়
একটি আয়াতের নির্দিষ্ট অবতরণবুখারিতে শুক্রবার ও আরাফার পরিচয়সেই পরিচয় একাই সমগ্র অবতরণের শেষত্ব বলে না

এই ব্যাখ্যাগুলোর কার্যকারিতা আলাদা। সুদ্দীর বক্তব্যে সব হালাল-হারামের সমাপ্তি, তাবারির নির্বাচিত অর্থে একটি উপাসনাস্থলে মুসলিমদের একক প্রতিষ্ঠা এবং উমরের কান্নার খবরে ভবিষ্যৎ ক্ষয়ের আশঙ্কা প্রধান। পূর্ণতার একই ঘোষণাকে ঘিরে আইন, রাজনৈতিক আধিপত্য ও ধর্মীয় অবনতির তিন ভিন্ন অর্থ তৈরি হয়েছে। প্রথম অর্থের সামনে পরবর্তী বিধান আসার সমস্যা রয়েছে; দ্বিতীয়টি পূর্ণতার পরিসর সংকুচিত করে; তৃতীয়টি পূর্ণ হওয়ার সংবাদেই আসন্ন হ্রাসের পূর্বাভাস খুঁজে পায়।

পূর্ণতার ঘোষণার পরের প্রশ্ন তাই খুব নির্দিষ্ট: তার পরেও কোন আইনগত কথা এসেছে এবং সেই কথার আগমনে কার্যকর নিয়ম কীভাবে পূর্ণ হয়েছে? সুদ ও কালালাকে পরে আসা মেনে নিয়ে সব আইন আগেই সম্পূর্ণভাবে জানানো হয়েছিল বলা যায় না। তখন পূর্ণতা বলতে অন্য একটি সীমা নির্ধারণ করতে হয়। সেই সীমা নির্ধারণের প্রয়োজনটিই দেখায়, প্রচলিত এক বাক্যের নিশ্চয়তার চেয়ে শেষ অবতরণের ইতিহাস অনেক বেশি ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্তের ওপর দাঁড়িয়েছে।


মৃত্যুর দিন পর্যন্ত ওহি আসার বর্ণনা ও শেষ বার্তাগুলোর পাঠের প্রশ্ন

আনাস ইবনে মালিকের নামে সংরক্ষিত বর্ণনায় মুহাম্মদের মৃত্যুর আগে ওহি অব্যাহত থাকা এবং শেষ সময়ে তার প্রাচুর্যের কথা রয়েছে। এই সংবাদ শেষ অবতরণের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি জীবনের সমাপ্তির কাছাকাছি সময়েও নির্দেশ আসার প্রক্রিয়াকে সক্রিয় রাখে। কোনো একটি আগে প্রচারিত সংগ্রহকে শেষ ধরে নেওয়ার বদলে শেষ পর্যায়ে নতুন কী এসেছে, সেই প্রশ্ন তখন জরুরি হয়ে ওঠে। [120] [121]

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫৬। তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৭৪১৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩০১৬
৭৪১৪-(২/৩০১৬) আমর ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু বুকায়র আন নাকিদ, হাসান ইবনু আলী আল হুলওয়ানী ও ’আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) ….. আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইন্তিকালের পূর্বে ও ইন্তিকাল পর্যন্ত আল্লাহ তা’আলা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর ধারাবাহিকভাবে ওয়াহী অবতীর্ণ করেন। যেদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেন সেদিনও তার প্রতি অনেক ওয়াহী অবতীর্ণ হয়। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৭২৪৩, ইসলামিক সেন্টার ৭২৯৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

কোরআন সংকলন 8
কোরআন সংকলন 8

মুসলিমের মূল আরবিতে “কাবলা ওয়াফাতিহি”—তাঁর মৃত্যুর আগে—এবং “হাত্তা তুউফফিয়া”—মৃত্যু পর্যন্ত—রয়েছে। শেষের অংশে “ইয়াওমা তুউফফিয়া” কথাটি বাংলা অনুবাদে মৃত্যুর নির্দিষ্ট দিন হিসেবে এসেছে। [491]

أَنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ تَابَعَ الْوَحْىَ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَبْلَ وَفَاتِهِ حَتَّى تُوُفِّيَ وَأَكْثَرُ مَا كَانَ الْوَحْىُ يَوْمَ تُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ তাঁর রাসূলের মৃত্যুর আগে থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ওহী পাঠিয়েছেন; আল্লাহর রাসূলের মৃত্যুর দিন ওহীর প্রাচুর্য ছিল।

বুখারির সমান্তরাল বর্ণনার শেষে “তারপর এর পরে রাসুলের মৃত্যু হয়” বাক্য আছে। একই আনাস–যুহরি ধারার এই রূপ শেষ পর্যায়ের সময়কাল এবং তার পরের মৃত্যুকে ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করে। [492]

أن الله تعالى تابع على رسوله صلى الله عليه وسلم قبل وفاته حتى توفاه أكثر ما كان الوحي، ثم توفي رسول الله صلى الله عليه وسلم بعد.

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ তাঁর রাসুলের মৃত্যুর আগে তাঁর প্রতি ওহি অব্যাহত রেখেছিলেন; মৃত্যুর সময়কার পর্যায়ে ওহির পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি। তারপর এর পরে আল্লাহর রাসুলের মৃত্যু হয়।

ইবনে হাজর এই ভাষায় মৃত্যুর কাছাকাছি সময়কাল বুঝেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় মক্কা বিজয়ের পরে প্রতিনিধিদলের আগমন ও বিধান সম্পর্কে প্রশ্ন বেড়ে যাওয়ায় অবতরণও বেড়েছিল। জীবনাবসানের সময়কে একটি শেষ পর্যায় হিসেবে পড়ার সঙ্গে তিনি সামাজিক পরিস্থিতির নির্দিষ্ট সম্পর্ক দেখিয়েছেন। [493]

قوله: إن الله تابع على رسوله الوحي قبل وفاته، أي أكثر إنزاله قرب وفاته صلى الله عليه وسلم، والسر في ذلك أن الوفود بعد فتح مكة كثروا وكثر سؤالهم عن الأحكام فكثر النزول بسبب ذلك.

বাংলা অনুবাদ: “আল্লাহ তাঁর রাসুলের মৃত্যুর আগে তাঁর প্রতি ওহি অব্যাহত রেখেছিলেন”—অর্থাৎ তাঁর মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে বেশি নাজিল করেছেন। এর কারণ হলো মক্কা বিজয়ের পরে প্রতিনিধিদল বেড়েছিল এবং বিধান সম্পর্কে তাদের প্রশ্নও বেড়েছিল; সে কারণে অবতরণও বেড়েছিল।

এই ব্যাখ্যায় নতুন অবতরণ মানুষের জিজ্ঞাসা ও বৃহত্তর রাজনৈতিক সম্প্রসারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। বহু গোষ্ঠী নতুন ধর্মীয় ব্যবস্থায় প্রবেশ করছে, তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চাইছে এবং সেই প্রয়োজনের সঙ্গে ধর্মীয় ঘোষণা বাড়ছে। শেষ জীবনের প্রাচুর্য তখন নিছক একটি সংখ্যাগত দাবি থাকে না; অনুসারীসমাজের বিস্তার ও নিয়মের চাহিদার উত্তর হয়ে ওঠে। ফলে শেষ অবস্থার পরিচয় পেতে এই সময়ের কার্যকর নির্দেশগুলো শনাক্ত করাও প্রয়োজন হয়।

ইবনে হাজর “যে সময়ে তাঁর মৃত্যু ঘটেছে” অর্থে বাক্যটি ব্যাখ্যা করেছেন। ইসলামকিউএও মৃত্যুর নির্দিষ্ট দিনের বদলে শেষ জীবনের এই সময়গত অর্থ গ্রহণ করেছে। বাংলা অনুবাদের একটি দিনের ছবি এবং ভাষ্যকারের একটি সময়পর্বের ছবি তাই পৃথক। [494]

قوله: حتى توفاه أكثر ما كان الوحي، أي الزمان الذي وقعت فيه وفاته، كان نزول الوحي فيه أكثر من غيره من الأزمنة.

বাংলা অনুবাদ: “মৃত্যুর সময়ে ওহি ছিল সবচেয়ে বেশি”—অর্থাৎ যে সময়পর্বে তাঁর মৃত্যু ঘটেছে, সেই সময়ে অন্য সময়ের তুলনায় ওহি অবতরণের পরিমাণ বেশি ছিল।

কোরআন হিসেবে প্রচারিত পাঠ এবং অন্যান্য ওহিগত নির্দেশের পার্থক্যও এখানে প্রাসঙ্গিক। হাদিসের ব্যবহৃত শব্দ ওহি। কোনো নির্দেশ কোরআনের আয়াত হয়েছে, কোনোটি হাদিসে ধর্মীয় নির্দেশ হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে। এই সাধারণ সংবাদ শেষ পর্যায়ের প্রতিটি বার্তার পৃথক পাঠ, প্রাপক বা লিখিত উপকরণের তালিকা দেয় না। সেই বিস্তারিত জানতে নির্দিষ্ট আয়াতের অবতরণ ও নির্দিষ্ট নির্দেশের বর্ণনায় যেতে হয়। শেষত্বের ভিন্ন দাবি এবং শেষ সময়ে ওহির প্রাচুর্য একই কারণে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত: চূড়ান্ত সীমা নির্ধারণের জন্য শুধু সময়ের একটি সাধারণ পরিচয় যথেষ্ট তথ্য সরবরাহ করে না।

সংরক্ষিত তথ্যযে বিষয়টি নির্দিষ্ট হয়আরও যে তথ্য দরকার
আনাসের সাধারণ সংবাদজীবনের শেষ পর্যায়েও অবতরণ চলছিলনির্দিষ্ট বার্তার পরিচয় ও বিষয়বস্তু
মুসলিমের “ইয়াওমা তুউফফিয়া”মৃত্যুর সময়ের সঙ্গে প্রাচুর্যের যোগনির্দিষ্ট দিন ও বিস্তৃত সময়ের ভাষাগত সম্পর্ক
বুখারির “তারপর এর পরে মৃত্যু”শেষ পর্যায়ের পরে মৃত্যুর ধারাবাহিকতাকোন বার্তা ওই পর্যায়ের একেবারে শেষে এসেছিল
ইবনে হাজরের ব্যাখ্যাপ্রতিনিধিদল ও বিধানসংক্রান্ত প্রশ্নের বৃদ্ধিপ্রতিটি ঘোষণার নিজস্ব কালক্রম ও পরিবহনের সংবাদ

একজন সাহাবি কয়েক বছর আগে যতটুকু পাঠ পেয়েছেন, শেষ সময়ে নতুন পাঠ আসলে তাঁর সেই সংগ্রহের পরিসর বাড়তে পারে। নতুন বিধান এলে আগের প্রয়োগের অবস্থা বদলাতে পারে। ফলে একটি সময়ে কোরআন আয়ত্ত করার পরিচয় এবং অবতরণ বন্ধ হওয়ার পরে বহাল সমস্ত পাঠ জানার পরিচয়ের মধ্যে সময়গত ব্যবধান থাকে। শেষ অবতরণের খবর কে পেয়েছেন এবং কীভাবে তা অন্যদের কাছে পৌঁছেছে, চূড়ান্ত সংগ্রহের ইতিহাসে এই ধাপগুলো নির্ধারক।

শেষ আয়াত নিয়ে মতভেদ এই সাধারণ সময়বিবরণের জায়গা নিতে পারে না; সাধারণ সময়বিবরণও ভিন্ন শেষত্বের দাবির নিষ্পত্তি করে না। দুটি আলাদা তথ্যস্তর কাজ করছে: শেষ পর্যায়ে অবতরণ সক্রিয় ছিল এবং সেই সক্রিয়তার শেষ প্রান্ত নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ভিন্ন পরিচয় দিয়েছেন। সংকলনের সময় কাজটি তাই আগের লেখা কেবল বাঁধাই করে দেওয়ার মধ্যে শেষ হয় না। কোন পাঠ সর্বশেষ অবস্থার অন্তর্ভুক্ত, তার পরিচয়ও বিভিন্ন সাক্ষ্যের সাহায্যে স্থির করতে হয়।

এই সময়েই লিখিত নির্দেশ দেওয়ার একটি নির্দিষ্ট উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার সংবাদ রয়েছে। একদিকে নতুন ঘোষণা আসার পরিসর শেষ জীবন পর্যন্ত খোলা; অন্যদিকে ভবিষ্যতের জন্য একটি নির্দিষ্ট লিখিত বক্তব্য তৈরি করার অনুরোধ কার্যকর হয়নি। এই দুটি খবরের মিলনস্থল হলো শেষ মুহূর্তের প্রেরণ ও গ্রহণের বাস্তব ব্যবস্থা। বার্তা আসার দাবি, বার্তা লেখা এবং পরের মানুষের হাতে সেই লেখা পৌঁছানো—তিনটি কাজ একই সঙ্গে নিশ্চিত হয়নি।


কাগজ-কলমের অনুরোধ, “কিতাবুল্লাহ যথেষ্ট” এবং উমরের বাধা

মৃত্যুশয্যায় মুহাম্মদ এমন একটি লিখিত নির্দেশ দিতে চেয়েছিলেন যার পরে অনুসারীরা পথভ্রষ্ট হবে না। উমর রোগযন্ত্রণা প্রবল হওয়ার কথা বলেন এবং আল্লাহর কিতাবকে যথেষ্ট ঘোষণা করেন। উপস্থিতদের একাংশ উপকরণ দিতে চান, অন্য অংশ উমরের অবস্থান গ্রহণ করেন। বিরোধ ও শোরগোল বাড়লে মুহাম্মদ তাঁদের উঠে যেতে বলেন। এই ঘটনাক্রমে লেখার অনুরোধকারী এবং লেখাটির প্রয়োজন অস্বীকারকারী আলাদা ব্যক্তি। মুহাম্মদ নিজের পরবর্তী অনুসারীদের জন্য লিখিত বক্তব্য চাইছেন; উমর তাঁর কাছে থাকা বক্তব্যকেই যথেষ্ট ঘোষণা করে উদ্যোগটি থামানোর পক্ষ নিচ্ছেন।

ইসলামের আনুগত্যের নির্দেশে রাসুলের কর্তৃত্ব আল্লাহর কর্তৃত্বের সঙ্গে যুক্ত। সূরা জিনে আল্লাহ ও রাসুলকে অমান্য করার পরিণতি জাহান্নাম বলা হয়েছে। এই ধর্মীয় মানদণ্ডে মুহাম্মদের নির্দেশ কোনো সাধারণ মানুষের অনুরোধের সমান নয়। [495]

আল্লাহর বাণী পৌঁছানো ও তাঁর পায়গাম প্রচার করাই আমার কাজ। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে অমান্য করে, তার জন্য আছে জাহান্নামের আগুন; তাতে তারা চিরকাল থাকবে।
Taisirul Quran
কেবল আল্লাহর বাণী পৌঁছানো এবং তা প্রচার করাই আমার কাজ। যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে।
Sheikh Mujibur Rahman
কেবল আল্লাহর বাণী ও তাঁর রিসালাত পৌঁছানোই দায়িত্ব। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে, তার জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাতে তারা চিরস্থায়ী হবে।
Rawai Al-bayan
‘শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকে পৌঁছানো এবং তাঁর রিসালতের বাণী প্রচারই আমার দায়িত্ব। আর যে-কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে তার জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে (১)।’
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

কোরআনের পাশে মুহাম্মদের নির্দেশের পৃথক কর্তৃত্ব হাদিসের ভাষাতেও আছে। মিকদামের নামে বর্ণিত বক্তব্যে কোরআন ও তার সঙ্গে অনুরূপ কর্তৃত্ব পাওয়ার ঘোষণা এবং কেবল কোরআনের হালাল-হারামের ওপর নির্ভর করার মানসিকতার নিন্দা রয়েছে। [496]

হাদীস সম্ভার
১৩/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ সুন্নাহ পালনের গুরুত্ব ও তার কিছু আদব প্রসঙ্গে
(১৪৯৯) মিকদাম বিন মা’দিকারিব বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শোন! আমাকে কুরআন দান করা হয়েছে এবং তারই সাথে তারই মতো (সুন্নাহ) দান করা হয়েছে। শোন! সম্ভবতঃ নিজ গদিতে বসে থাকা কোন পরিতৃপ্ত লোক বলবে, ‘তোমরা এই কুরআনের অনুসরণ কর; তাতে যা হালাল পাও, তাই হালাল মনে কর এবং তাতে যা হারাম পাও, তাই হারাম মনে কর। সতর্ক হও! আল্লাহর রসূল যা হারাম করেন, তাও আল্লাহর হারাম করার মতোই।
(আবূ দাঊদ ৪৬০৬, ইবনে মাজাহ ১২, দারেমী ৫৮৬, মিশকাত ১৬৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মিকদাম (রাঃ)

এই নির্দেশের সঙ্গে শেষ অসুস্থতার “কিতাবুল্লাহ যথেষ্ট” অবস্থানটি পাশাপাশি রাখলে কর্তৃত্বের একটি সরাসরি সংঘাত তৈরি হয়। একই ধর্মীয় ব্যবস্থায় মুহাম্মদের বক্তব্য কোরআনের বাইরে বাধ্যতামূলক বিধান দিতে পারে; অথচ মুহাম্মদ নিজে লিখতে চাইলে বিদ্যমান কিতাব দিয়ে সেই লেখার প্রয়োজন শেষ বলে ঘোষণা করা হচ্ছে। অতিরিক্ত নির্দেশ প্রয়োজন কি না, সেই বিষয়ে মুহাম্মদ ও উমরের সিদ্ধান্ত তখন এক নয়। নবী নিজে যে প্রয়োজন চিহ্নিত করছেন, অনুসারী সেটিকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন।

অসুস্থ অবস্থায়ও মুহাম্মদের নির্দেশ অমান্য করার বিরুদ্ধে আরেকটি নির্দিষ্ট ঘটনা বুখারিতে আছে। তাঁর আপত্তি সত্ত্বেও মুখে ওষুধ ঢেলে দেওয়া হয়েছিল। উপস্থিত লোকেরা তাঁর আপত্তিকে রোগীর ওষুধের প্রতি সাধারণ বিরক্তি ধরে নিয়েছিলেন। সুস্থবোধ করার পরে তিনি তাঁদের নিজের নিষেধ স্মরণ করিয়ে দেন এবং আব্বাস ছাড়া সংশ্লিষ্ট সবাইকে একইভাবে ওষুধ খাওয়ানোর নির্দেশ দেন। [497] [498]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৪/ মাগাযী [যুদ্ধ]
পরিচ্ছেদঃ ৬৪/৮৪. নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রোগ ও তাঁর ওফাত।
৪৪৫৮. ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রোগাক্রান্ত অবস্থায় তাঁর মুখে ঔষধ ঢেলে দিলাম। তিনি ইশারায় আমাদেরকে তাঁর মুখে ঔষধ ঢালতে নিষেধ করলেন। আমরা বললাম, এটা ঔষধের প্রতি রোগীদের স্বাভাবিক বিরক্তিবোধ। যখন তিনি সুস্থবোধ করলেন তখন তিনি বললেন, আমি কি তোমাদের ওষুধ সেবন করাতে নিষেধ করিনি? আমরা বললাম, আমরা মনে করেছিলাম এটা ঔষধের প্রতি রোগীর সাধারণ বিরক্তিভাব। তখন তিনি বললেন, ‘আব্বাস ব্যতীত বাড়ির প্রত্যেকের মুখে ঔষধ ঢাল তা আমি দেখি।[1] কেননা সে তোমাদের মাঝে উপস্থিত নেই। এ হাদীস ইবনু আবূ যিনাদ ……. ‘আয়িশাহ (রাঃ) থেকে এবং তিনি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। [৫৭১২, ৬৮৮৬, ৬৮৯৭; মুসলিম ৩৯/২৭, হাঃ ২২১৩, আহমাদ ২৪৩১৭] (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪১০১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪১০৪)
[1] প্রথমতঃ এখানে অতি সামান্য ব্যাপারেও কিসাসের বৈধতা প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয়তঃ নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুস্থ ও অসুস্থ সর্বাবস্থাতেই তার নির্দেশ পালনের অপরিহার্যতা সমভাবে প্রযোজ্য।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

কোরআন সংকলন 94

মুদ্রিত টীকার বক্তব্যে অসুস্থ ও সুস্থ দুই অবস্থাতেই নির্দেশ মানার অপরিহার্যতা বলা হয়েছে। একই টীকায় ব্যবহৃত ধারণাটি কিসাস—প্রতিফলমূলক শাস্তি। [499]

৯৮ প্রথমতঃ এখানে অতি সামান্য ব্যাপারেও কিসাসের বৈধতা প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয়তঃ নাবী (স)-এর সুস্থ ও অসুস্থ সর্বাবস্থাতেই তার নির্দেশ পালনের অপরিহার্যতা সমভাবে প্রযোজ্য।

ওষুধের ঘটনায় অন্যরা নিজের চিকিৎসাবোধ দিয়ে তাঁর নিষেধ অমান্য করেছিলেন। মুহাম্মদ পরে সেই মূল্যায়ন মেনে নেননি; নিজের নিষেধ কার্যকর থাকা স্বীকার করিয়েছেন এবং প্রতিফলমূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন। ফলে অসুস্থতা তাঁর নির্দেশের কর্তৃত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে তুলে নেয়—এমন নিয়ম ওই ঘটনায় কাজ করছে না। শেষ লেখার অনুরোধে রোগযন্ত্রণা তুলে ধরার বিষয়টি এই একই ধর্মীয় মানদণ্ডের সামনে অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। রোগীর অবস্থা বিচার করার ব্যবহারিক ক্ষমতা এবং রাসুলের নির্দেশ অমান্য করার ধর্মীয় অধিকার এক জিনিস নয়।

সহজ দরসে ইবনে মাজাহর ব্যাখ্যায় মুহাম্মদের ধর্মীয় বক্তব্য, কাজ ও সমর্থনকে ওহিনির্ভর বলে সুন্নাহর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আল্লাহর নামে পরিবর্তন করতে না-পারা এবং প্রেরিত নির্দেশ অনুসরণ করার ধারণা ব্যবহার করেই এই কর্তৃত্ব ব্যাখ্যা করা হয়েছে। [500]

কুরআনে কারীমে আল্লাহ পাক বলেন-
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى ، إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى
“তিনি (রাসূলুল্লাহ) প্রবৃত্তির তাড়নায় কোনো কথা বলেন না। তিনি যা কিছু
বলেন, তা তো কেবলই অহী।”
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে-
قُلْ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أُبَدِّلَهُ مِنْ تِلْقَاءِ نَفْسِي إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا بِمَا يُوحَى إِلَى
“আমার কোনো সাধ্য নেই যে, আমার পক্ষ থেকে কোনো কিছু পরিবর্তন করে দিব। আমি তো কেবল তা-ই অনুসরণ করি, যা আমার প্রতি আদেশ করা হয়।” মোটকথা, রাসূলুল্লাহ যা কিছু বলেন, করেন বা সমর্থন করেন, সবই অহী নির্ভর আর এ সবের সমষ্টিই হল সুন্নত। আমাদেরকে কুরআনে আল্লাহ পাক রাসূলের ইত্তিবা করার আদেশ দিয়েছেন অর্থাৎ তাঁর সুন্নতের অনুসরণের আদেশ দিয়েছেন। সুতরাং সুন্নত আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে উম্মতের জন্য حجت তথা শরঈ প্রমাণ সাব্যস্ত হল।

কোরআন সংকলন 96

এই ব্যাখ্যায় নির্ভরযোগ্য ধর্মীয় নির্দেশের উৎস হিসেবে মুহাম্মদকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তারপর তাঁর নিজের মুখের লিখন-অনুরোধে বাধা দেওয়া হলে প্রশ্নটি শুধু পারিবারিক বিশৃঙ্খলা থাকে না। তাঁর নির্দেশ কখন পালনযোগ্য এবং কখন প্রয়োজনহীন—এই সীমা নির্ধারণের ক্ষমতা তাঁর সামনে থাকা অনুসারীরাও ব্যবহার করেছেন। আনুগত্যের চূড়ান্ত কর্তৃত্বের নিচে বাস্তবে একটি মানবীয় বাছাই কাজ করছে: প্রেরক কী বলতে চান তার পাশাপাশি প্রাপক কী গ্রহণ করতে দেবেন, তাও ফল নির্ধারণ করছে।

বুখারির ইলম অধ্যায়ের পূর্ণ বাংলা বর্ণনায় মুহাম্মদের অনুরোধ, উমরের জবাব এবং ইবনে আব্বাসের বিপর্যয়বোধ পরপর রয়েছে। [501] [502] [501] [503]

সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩/ ইলম বা জ্ঞান
পরিচ্ছেদঃ ৮১। ইলম লিপিবদ্ধ করা
১১৫। ইয়াহইয়া ইবনু সুলায়মান (রহঃ) … ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রোগ যখন বেড়ে গেল তখন তিনি বললেনঃ আমার কাছে কাগজ কলম নিয়ে এস, আমি তোমাদের এমন কিছু লিখে দিব যাতে পরবর্তীতে তোমরা ভ্রান্ত না হও। ‘উমর (রাঃ) বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রোগ যন্ত্রণা প্রবল হয়ে গেছে (এমতাবস্থায় কিছু বলতে বা লিখতে তাঁর কষ্ট হবে)। আর আমাদের কাছে তো আল্লাহর কিতাব রয়েছে, যা আমাদের জন্য যথেষ্ট। এতে সাহাবীগণের মধ্য মতবিরোধ দেখা দিল এবং শোরগোল বেড়ে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা আমার কাছ থেকে উঠে যাও। আমার কাছে ঝগড়া-বিবাদ করা উচিত নয়। এ পর্যন্ত বর্ণনা করে ইবনু আব্বাস (রাঃ) (যেখানে বসে হাদীস বর্ণনা করছিলেন সেখান থেকে) এ কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন যে, ‘হায় বিপদ, সাংঘাতিক বিপদ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর লেখনীর মধ্যে যা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

কোরআন সংকলন 98

অনুরোধের মূল আরবি বাক্যে ভবিষ্যৎ পথভ্রষ্টতা ঠেকানোর উদ্দেশ্য স্পষ্ট। অনুসারীদের পরবর্তী দিকনির্দেশনার সঙ্গে লেখাটির প্রয়োজন জুড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত লেখার লক্ষ্য মুহাম্মদ নিজেই ঘোষণা করেছেন। [504]

ائْتُونِي بِكِتَابٍ أَكْتُبُ لَكُمْ كِتَابًا لاَ تَضِلُّوا بَعْدَهُ

বাংলা অনুবাদ: আমার কাছে লেখার উপকরণ আনো; আমি তোমাদের এমন একটি লেখা লিখে দেব, যার পরে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না।

উমরের জবাবে দুটি বিষয় পাশাপাশি আছে: মুহাম্মদ রোগে কাতর এবং বিদ্যমান কিতাব যথেষ্ট। প্রথমটি তাঁর শারীরিক অবস্থার মূল্যায়ন; দ্বিতীয়টি প্রস্তাবিত লেখার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত। অসুস্থতার বর্ণনা থেকে কিতাবের যথেষ্টতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুসরণ করে না। উমর নিজেই এই দুই বক্তব্যকে এক আপত্তির মধ্যে এনেছেন। [505]

قَالَ عُمَرُ إِنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم غَلَبَهُ الْوَجَعُ وَعِنْدَنَا كِتَابُ اللَّهِ حَسْبُنَا فَاخْتَلَفُوا وَكَثُرَ اللَّغَطُ

বাংলা অনুবাদ: উমর বললেন, নবীকে রোগযন্ত্রণা প্রবলভাবে আচ্ছন্ন করেছে; আমাদের কাছে আল্লাহর কিতাব আছে, সেটিই আমাদের জন্য যথেষ্ট। এরপর তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ হলো এবং শোরগোল বেড়ে গেল।

বক্তব্য বা কাজমুহাম্মদের অবস্থানউমরের অবস্থানে তার পরিণতি
লিখনের প্রয়োজনভবিষ্যৎ পথভ্রষ্টতা ঠেকাতে লেখা দেবেনকিতাব আছে বলে বাড়তি লেখার প্রয়োজন প্রত্যাখ্যান
অসুস্থতাঅসুস্থ অবস্থাতেই অনুরোধ করছেনরোগযন্ত্রণা আপত্তির কারণ হিসেবে সামনে আনা
করণীয়উপকরণ এনে লিখন সম্পন্ন করাউপস্থিতদের একাংশ উপকরণ না-দেওয়ার পক্ষে যায়
শেষ ফলবিরোধের পরে উপস্থিতদের উঠে যেতে বলেনপ্রস্তাবিত লেখা তৈরি হয় না

এই বিরোধে কিতাবের উপস্থিতি অস্বীকার করা হয়নি। বিতর্ক ছিল কিতাবের পাশে নতুন লিখিত নির্দেশের প্রয়োজন নিয়ে। মুহাম্মদ যে ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে লিখতে চাইছেন, উপস্থিত লোকেরা সেই ভবিষ্যৎ রক্ষার উপায় সম্পর্কে তাঁর সঙ্গে একমত নন। ফলে “কিতাব যথেষ্ট” এখানে নিরপেক্ষ একটি তথ্যবাক্য হয়ে থাকে না; লেখার উদ্যোগ বন্ধ করার পক্ষে কার্যকর বক্তব্য হয়। ধর্মগ্রন্থের মর্যাদা ব্যবহার করে সেই ধর্মগ্রন্থের ঘোষণাকারীরই পরবর্তী লিখিত বক্তব্যের পথ রুদ্ধ হয়।

যিনি ওহির পরিচয় দিতেন, যাঁর ব্যাখ্যা ছাড়া বহু বিধানের প্রয়োগ নির্ধারিত হতো না, মৃত্যুর সময়ে তাঁর কথাও ঘরের সমর্থন ও বিরোধের মধ্যে আটকে গেছে। এটি কর্তৃত্বের বাস্তব সীমা প্রকাশ করে। অনুসারীদের প্রয়োজনীয় বস্তু এনে দেওয়া এবং ঝগড়া থামানোর ওপর লেখার কাজ নির্ভর করেছিল। সেই সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। প্রস্তাবিত লেখার ধর্মীয় গুরুত্ব যত বড়ই বলা হোক, তার বস্তুগত প্রস্তুতি ও সম্পাদন উপস্থিত মানুষের আচরণ অতিক্রম করতে পারেনি।

এখানে না-পাওয়ার বিষয়টি নির্দিষ্ট। লেখা প্রস্তুত হয়ে পরে হারিয়ে গেছে—এমন কোনো ধাপ বর্ণনায় নেই। প্রস্তুত করতে চাওয়া লেখাটিই বিরোধের কারণে তৈরি হয়নি। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তার অনুপস্থিতি নকলের ভুল বা পাতা নষ্ট হওয়ার ফল নয়; মূল লিখনপর্ব বন্ধ হওয়ার ফল। সেই অনুপস্থিত দলিলের ইতিহাস শুরু হয়েছে ঘোষণাকারীর জীবিত অবস্থায়, তাঁর অনুসারীদের বিরোধের মধ্যে।


ঘরের বিরোধ, ইবনে আব্বাসের বিপর্যয়বোধ ও না-লেখা নির্দেশ

মৃত্যুশয্যার ঘরে উপস্থিত লোকেরা একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি। বুখারির রোগী-সংক্রান্ত অধ্যায়ের বর্ণনায় এক দল কাগজ এগিয়ে দিতে বলছেন, যাতে মুহাম্মদ তাঁর প্রতিশ্রুত নির্দেশটি লিখতে পারেন। অন্য দল উমরের কথা সমর্থন করছেন। এখানে বিরোধের দুই পক্ষের আচরণ সংরক্ষিত আছে: এক পক্ষ অনুরোধ কার্যকর করতে চেয়েছিল, অন্য পক্ষ অতিরিক্ত লেখার প্রয়োজন অস্বীকার করেছিল। শেষ পর্যন্ত লেখার পক্ষের মানুষদের উপস্থিতিও কাজটি সম্পন্ন করতে পারেনি। ঘরের বাদানুবাদই কার্যকর ফল নির্ধারণ করেছে। [506] [507]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭৫/ রুগী
পরিচ্ছেদঃ ৭৫/১৭. তোমরা আমার কাছ থেকে উঠে যাও, রোগীর এ কথা বলা।
৫৬৬৯. ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তিকালের সময় আগত হল, তখন ঘরের মধ্যে অনেক মানুষের জমায়েত ছিল। যাঁদের মধ্যে ’উমার ইবনু খত্তাব-ও ছিলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (রোগ কাতর অবস্থায়) বললেনঃ লও, আমি তোমাদের জন্য কিছু লিখে দেব, যাতে পরবর্তীতে তোমরা পথভ্রষ্ট না হও। তখন ’উমার (রাঃ) বললেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর রোগ যন্ত্রণা তীব্র হয়ে উঠেছে, আর তোমাদের কাছে কুরআন মাওজুদ। আর আল্লাহর কিতাবই আমাদের জন্য যথেষ্ট। এ সময়ে আহলে বাইতের মধ্যে মতানৈক্যের সৃষ্টি হল। তাঁরা বাদানুবাদে প্রবৃত্ত হলেন, তন্মধ্যে কেউ কেউ বলতে লাগলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে কাগজ পৌঁছে দাও এবং তিনি তোমাদের জন্য কিছু লিখে দেবেন, যাতে পরবর্তীতে তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট না হও। আবার তাদের মধ্যে ’উমার (রাঃ) যা বললেন, তা বলে যেতে লাগলেন। এভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে তাঁদের বাকবিতণ্ডা ও মতভেদ বেড়ে চলল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা উঠে যাও।
’উবাইদুল্লাহ (রহঃ) বলেনঃ
ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বলতেন, বড় মুসীবত হল লোকজনের সেই মতভেদ ও তর্ক-বিতর্ক, যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সেই লিখে দেয়ার মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। [১১৪] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫২৫৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫১৫৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

কোরআন সংকলন 100
কোরআন সংকলন 102

বর্ণনার শেষে ইবনে আব্বাসের মূল্যায়ন আলাদা করে আছে। তাঁর ভাষায় ঘটনাটি “বড় বিপর্যয়”। দুঃখের বস্তু নির্দিষ্ট: মতভেদ ও তর্কের কারণে মুহাম্মদ লিখে দিতে পারেননি। ঘরের মধ্যে কিতাবের যথেষ্টতার দাবি উঠেছিল, কিন্তু সেই দাবির ফলে যে লিখিত ব্যাখ্যা পাওয়া গেল না, ইবনে আব্বাস সেটিকেই ক্ষতি মনে করেছেন। উমরের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি তাই সংরক্ষিত আছে আরেক সাহাবির তীব্র নেতিবাচক মূল্যায়ন। একই ঘটনার দুই অবস্থানকে অভিন্ন সন্তুষ্টির স্মৃতি বানানো হলে এই বিরোধ এবং তার ফল সম্পর্কে ইবনে আব্বাসের কথাই মুছে যায়।

মুসলিমের বর্ণনায় বৃহস্পতিবারের স্মৃতি বলতে গিয়ে ইবনে আব্বাসের কান্নার কথাও রয়েছে। সাঈদ ইবনে জুবাইর তাঁর কাছ থেকে ঘটনাটি শুনছেন। চোখের পানি নুড়িপাথর ভিজিয়ে দেওয়ার বর্ণনা এই স্মৃতির তীব্রতা প্রকাশ করে। বিরোধের খবরের সঙ্গে মুহাম্মদের কথার সুসংলগ্নতা নিয়েও উপস্থিতদের একটি প্রশ্ন সংরক্ষিত হয়েছে। [508]

قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ يَوْمُ الْخَمِيسِ وَمَا يَوْمُ الْخَمِيسِ ثُمَّ بَكَى حَتَّى بَلَّ دَمْعُهُ الْحَصَى. فَقُلْتُ يَا ابْنَ عَبَّاسٍ وَمَا يَوْمُ الْخَمِيسِ قَالَ اشْتَدَّ بِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَجَعُهُ. فَقَالَ «ائْتُونِي أَكْتُبْ لَكُمْ كِتَابًا لاَ تَضِلُّوا بَعْدِي». فَتَنَازَعُوا وَمَا يَنْبَغِي عِنْدَ نَبِيٍّ تَنَازُعٌ. وَقَالُوا مَا شَأْنُهُ أَهَجَرَ اسْتَفْهِمُوهُ.

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আব্বাস বললেন, বৃহস্পতিবার! কী সেই বৃহস্পতিবার! তারপর তিনি কাঁদলেন, এমনকি তাঁর চোখের পানি নুড়িপাথর ভিজিয়ে দিল। আমি বললাম, হে ইবনে আব্বাস, বৃহস্পতিবারের কী ঘটনা? তিনি বললেন, আল্লাহর রাসুলের রোগযন্ত্রণা বেড়ে গিয়েছিল। তিনি বললেন, আমার কাছে আসো, তোমাদের জন্য এমন একটি লেখা লিখে দেব যার পরে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। তখন তারা বিরোধে জড়িয়ে পড়ল; নবীর কাছে বিরোধ করা সমীচীন নয়। তারা বলল, তাঁর কী হয়েছে? তিনি কি অসংলগ্ন কথা বলছেন? তাঁর কাছে জিজ্ঞেস করে বোঝো।

এই বর্ণনায় “আহাজারা” প্রশ্নটি “তারা বলল” আকারে এসেছে। উমরের নামসহ সংরক্ষিত বক্তব্য হলো রোগযন্ত্রণা প্রবল হওয়া এবং কিতাব যথেষ্ট হওয়ার ঘোষণা; আর এই বর্ণনায় উপস্থিতদের অনির্দিষ্ট অংশের মুখে এসেছে কথার সংলগ্নতা সম্পর্কে প্রশ্ন। দুটি বাক্যের বক্তা-পরিচয়ের মাত্রা আলাদা। একত্রে এগুলো দেখায়, ঘরের সংকট লেখার উপকরণ আনতে দেরি হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মুহাম্মদের অনুরোধ মানা হবে কি না এবং সেই অবস্থায় তাঁর কথা কীভাবে গ্রহণ করা হবে, তা নিয়েও বিচার চলছিল।

সাঈদ ইবনে জুবাইরের কাছে ঘটনাটি বলতে থাকা ইবনে আব্বাসের কান্না এবং মুহাম্মদের ঘরে তখনকার ঝগড়া পৃথক সময়ের বিবরণ। পরবর্তী সময়ে তাঁর স্মরণ ও মূল্যায়ন বর্ণনার অংশ হয়েছে। এই পার্থক্যের কারণে বক্তব্যটির গুরুত্ব আরও নির্দিষ্ট হয়: ঘটনার পরে বিষয়টি চিন্তা করেও তিনি না-পাওয়া লেখার ক্ষতিকে বড় বিপর্যয় মনে করেছেন। মুহাম্মদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সেই আক্ষেপ মুছে যায়নি; পরবর্তী প্রজন্মকে বর্ণনা দেওয়ার সময়ও তা তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল।

বর্ণনায় সংরক্ষিত অবস্থানবিষয়বস্তুফল বা মূল্যায়ন
কাগজ এগিয়ে দেওয়ার পক্ষমুহাম্মদ লিখে দিলে পরবর্তী পথভ্রষ্টতা ঠেকবেঅনুরোধ বাস্তবায়নের চেষ্টা
উমরের কথা সমর্থনকারী পক্ষরোগযন্ত্রণা প্রবল; আল্লাহর কিতাব যথেষ্টলিখনের প্রয়োজন প্রত্যাখ্যান
ঘরের বিরোধদুই পক্ষের বাদানুবাদ ও শোরগোলমুহাম্মদ উপস্থিতদের উঠে যেতে বলেন
ইবনে আব্বাসের পরবর্তী মন্তব্যবিরোধ তাঁর ও লেখার মধ্যে বাধা হয়েছিলনা-পাওয়াকে বড় বিপর্যয় হিসেবে স্মরণ

পরবর্তী ভাষ্যকারদের আলোচনায় এই ঘটনার তাৎপর্য নিয়ে আরও একটি বিরোধ তৈরি হয়েছে। ইবনে বাত্তালের নামে উদ্ধৃত ব্যাখ্যায় কোরআনকে যথেষ্ট মনে করার জন্য উমরকে ইবনে আব্বাসের চেয়ে অধিক ফকিহ বলা হয়েছে। ইবনে হাজার সেই মূল্যায়নের ভাষা গ্রহণ করেননি। তাঁর ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাসের আক্ষেপ ছিল অনুমান করে বিধান বের করার বদলে স্পষ্ট লিখিত বক্তব্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার জন্য। [509]

وَأَمَّا ابْنُ عَبَّاسٍ فَلَا يُقَالُ فِي حَقِّهِ لَمْ يَكْتَفِ بِالْقُرْآنِ مَعَ كَوْنِهِ حَبْرَ الْقُرْآنِ وَأَعْلَمَ النَّاسِ بِتَفْسِيرِهِ وَتَأْوِيلِهِ، وَلَكِنَّهُ أَسِفَ عَلَى مَا فَاتَهُ مِنَ الْبَيَانِ بِالتَّنْصِيصِ عَلَيْهِ لِكَوْنِهِ أَوْلَى مِنَ الِاسْتِنْبَاطِ، وَاللَّهُ أَعْلَمُ.

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আব্বাস সম্পর্কে বলা যায় না যে তিনি কোরআনকে যথেষ্ট মনে করেননি, অথচ তিনি কোরআনের পণ্ডিত এবং তার তাফসির ও ব্যাখ্যা সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানী। বরং স্পষ্ট বক্তব্যের মাধ্যমে যে ব্যাখ্যা পাওয়া থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন, তার জন্য তিনি দুঃখ করেছেন; কারণ তা অনুমান করে সিদ্ধান্ত বের করার চেয়ে অগ্রগণ্য। আল্লাহ অধিক জানেন।

লিখিত নির্দিষ্টতা ও পরবর্তী ব্যাখ্যার স্বাধীনতার এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নির্দেশের নির্দিষ্ট শব্দ পাওয়া গেলে পরবর্তী ব্যাখ্যাকারী সেই শব্দের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। নির্দিষ্ট দলিল না-থাকলে বিষয়টি নিয়ে অনুমান, নির্বাচিত অনুরূপ ঘটনা এবং মতবাদনির্ভর সিদ্ধান্তের জায়গা বাড়ে। ইবনে আব্বাস যে বঞ্চনার কথা বলেছেন, সেটি এই নির্দিষ্টতার বঞ্চনা। তাঁর আক্ষেপকে কোরআনের অবমূল্যায়ন বলে বদলে দিলে অনুপস্থিত লিখিত বক্তব্যের প্রশ্নটিই আড়াল হয়ে যায়।

নববির ব্যাখ্যায় উমরের আপত্তির পক্ষে আরও স্পষ্ট যুক্তি পাওয়া যায়। ইবনে হাজার তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন: নতুন নির্দেশ লেখা হলে মানুষ তা পালন করতে অক্ষম হয়ে শাস্তির যোগ্য হতে পারে এবং আলেমদের ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এগুলো ঘটনার পরের ব্যাখ্যাকারীর যুক্তি; মূল বর্ণনায় উমরের নিজের মুখে এই বিস্তারিত উদ্দেশ্য নেই। [510]

وَقَالَ النَّوَوِيُّ: اتَّفَقَ قَوْلُ الْعُلَمَاءِ عَلَى أَنَّ قَوْلَ عُمَرَ «حَسْبُنَا كِتَابُ اللَّهِ» مِنْ قُوَّةِ فِقْهِهِ وَدَقِيقِ نَظَرِهِ، لِأَنَّهُ خَشِيَ أَنْ يَكْتُبَ أُمُورًا رُبَّمَا عَجَزُوا عَنْهَا فَاسْتَحَقُّوا الْعُقُوبَةَ لِكَوْنِهَا مَنْصُوصَةً، وَأَرَادَ أَنْ لَا يَنْسَدَّ بَابُ الِاجْتِهَادِ عَلَى الْعُلَمَاءِ.

বাংলা অনুবাদ: নববি বলেছেন: আলেমদের বক্তব্য এই যে, উমরের “আমাদের জন্য আল্লাহর কিতাব যথেষ্ট” কথাটি তাঁর শক্তিশালী ফিকহজ্ঞান ও সূক্ষ্ম বিচারবোধের পরিচয়। কারণ তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, এমন কিছু বিষয় লিখে দেওয়া হতে পারে যা পালনে তারা অক্ষম হবে এবং বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে লিখিত থাকায় শাস্তির যোগ্য হবে। তিনি আরও চেয়েছিলেন, আলেমদের জন্য ইজতিহাদের দরজা যেন বন্ধ না হয়।

এই যুক্তির বিন্যাসে এক কঠিন অসংগতি আছে। মুহাম্মদ লেখাটিকে পথভ্রষ্টতা ঠেকানোর উপায় বলেছেন; নববির ব্যাখ্যা সেই লেখাটিকেই সম্ভাব্য অক্ষমতা, শাস্তি এবং আলেমদের সিদ্ধান্তের পরিসর সংকুচিত হওয়ার কারণ বানাচ্ছে। অনুসারীর কল্যাণ বিচার করতে গিয়ে ব্যাখ্যাটি নবীর ঘোষিত উদ্দেশ্যের ওপর অনুসারীর আশঙ্কাকে প্রাধান্য দেয়। বিধান স্পষ্ট হলে পালন না-করার দায় তৈরি হবে—এই যুক্তি দিয়ে বিধান জানার পথ বন্ধ করাকে প্রশংসনীয় বানানো হচ্ছে। জ্ঞানের অভাব তখন সমস্যা না-থেকে দায় এড়ানোর সুবিধা হয়ে দাঁড়ায়।

ইবনে আব্বাসের দুঃখ এবং নববির এই মূল্যায়ন দুই বিপরীত পরিণতিকে গুরুত্ব দেয়। প্রথমটিতে হারানো নির্দিষ্ট নির্দেশের ক্ষতি মুখ্য; দ্বিতীয়টিতে সম্ভাব্য বিধানের বাধ্যবাধকতা এড়ানো ও পরবর্তী ব্যাখ্যার সুযোগ রক্ষা মুখ্য। না-লেখা বক্তব্যের বিষয়বস্তু পরের কোনো ভাষ্যকার উদ্ধার করতে পারেননি। তাঁদের হাতে ছিল ঘটনার বিবরণ এবং তার ফলকে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন। সেই ব্যাখ্যার মধ্যে ধর্মীয় কর্তৃত্ব, অনুসারীর বিবেচনা এবং পরবর্তী আলেমের ক্ষমতা—তিনটির সম্পর্ক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।


শেষ তিন নির্দেশের বর্ণনা এবং অনির্দিষ্ট থেকে যাওয়া তৃতীয় নির্দেশ

বৃহস্পতিবারের ঘটনার একটি বর্ণনায় লেখার উদ্যোগ বন্ধ হওয়ার পরে মুহাম্মদের তিনটি মৌখিক নির্দেশের কথা আছে। আরব উপদ্বীপ থেকে মুশরিকদের বের করে দেওয়া এবং আগত প্রতিনিধিদলকে তাঁর মতো উপঢৌকন দেওয়ার নির্দেশ দুটি স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত। তৃতীয় নির্দেশের জায়গায় বর্ণনা এসে থেমে যায়: সেটি বলা হয়নি, অথবা বলা হলেও বর্ণনাকারী ভুলে গেছেন। ফলে “তিনটি” সংখ্যাটি টিকে আছে, কিন্তু তিনটির পূর্ণ বিষয়বস্তু টেকেনি। [511] [512]

قَالَ «دَعُونِي فَالَّذِي أَنَا فِيهِ خَيْرٌ مِمَّا تَدْعُونِي إِلَيْهِ». وَأَوْصَاهُمْ بِثَلاَثٍ قَالَ «أَخْرِجُوا الْمُشْرِكِينَ مِنْ جَزِيرَةِ الْعَرَبِ، وَأَجِيزُوا الْوَفْدَ بِنَحْوِ مَا كُنْتُ أُجِيزُهُمْ». وَسَكَتَ عَنِ الثَّالِثَةِ، أَوْ قَالَ فَنَسِيتُهَا.

বাংলা অনুবাদ: তিনি বললেন, আমাকে ছেড়ে দাও; তোমরা আমাকে যে দিকে ডাকছ, তার চেয়ে আমি যে অবস্থায় আছি তা উত্তম। তিনি তাঁদের তিনটি বিষয়ে নির্দেশ দিলেন। বললেন, আরব উপদ্বীপ থেকে মুশরিকদের বের করে দাও এবং আগত প্রতিনিধিদের আমি যেভাবে উপঢৌকন দিতাম সেভাবে দাও। তৃতীয়টির বিষয়ে তিনি নীরব রইলেন; অথবা বললেন, আমি তা ভুলে গেছি।

তৃতীয়টির জায়গায় সংরক্ষিত ছোট বাক্যটি নিজেই সংবহনের অসম্পূর্ণতার চিহ্ন। একটি নির্দেশের বিষয়বস্তু পাওয়া যায়নি, আর না-পাওয়ার কারণ সম্পর্কেও দ্বিধা রয়ে গেছে। [513]

وَسَكَتَ عَنِ الثَّالِثَةِ، أَوْ قَالَ فَنَسِيتُهَا

বাংলা অনুবাদ: তৃতীয়টির বিষয়ে তিনি নীরব রইলেন; অথবা বললেন, আমি তা ভুলে গেছি।

এই দ্বিধার কর্তা কে, তা ফাতহুল বারিতে বিস্তারিত করা হয়েছে। ইবনে হাজার মুসনাদুল হুমাইদি ও আবু নুআইমের সূত্রে সুফিয়ান ইবনে উয়াইনার বর্ণনা এনেছেন। সেখানে সুলায়মান বলছেন, সাঈদ ইবনে জুবাইর তৃতীয়টি বলেছিলেন আর তিনি ভুলে গেছেন, নাকি সাঈদ সেটি নিয়ে নীরব ছিলেন—তা তাঁর জানা নেই। অর্থাৎ সন্দেহটি বর্ণনা পরের স্তরে পৌঁছানোর সময়ে তৈরি হয়েছে। [514]

وَفِي مُسْنَدِ الْحُمَيْدِيِّ وَمِنْ طَرِيقِهِ أَبُو نُعَيْمٍ فِي الْمُسْتَخْرَجِ: قَالَ سُفْيَانُ: قَالَ سُلَيْمَانُ أَيْ ابْنُ أَبِي مُسْلِمٍ: لَا أَدْرِي أَذَكَرَ سَعِيدُ بْنُ جُبَيْرٍ الثَّالِثَةَ فَنَسِيتُهَا أَوْ سَكَتَ عَنْهَا.

বাংলা অনুবাদ: মুসনাদুল হুমাইদিতে এবং তাঁর সূত্রে আবু নুআইমের মুস্তাখরাজে আছে: সুফিয়ান বলেছেন, সুলায়মান অর্থাৎ ইবনে আবি মুসলিম বলেছেন, আমি জানি না, সাঈদ ইবনে জুবাইর তৃতীয়টি উল্লেখ করেছিলেন আর আমি তা ভুলে গেছি, নাকি তিনি সেটি সম্পর্কে নীরব ছিলেন।

এই ব্যাখ্যায় ঘাটতিটির অবস্থান মুহাম্মদের কথা বহনকারী পরবর্তী মানুষের স্মৃতি ও বর্ণনার মধ্যে। সুলায়মান নিজের স্মরণ এবং সাঈদের বর্ণনার পূর্ণতা সম্পর্কে দ্বিধায় আছেন। বক্তব্যের উৎস পর্যন্ত সংবাদ পৌঁছানোর দাবি বজায় থাকলেও নির্দিষ্ট একটি নির্দেশের শব্দ ও বিষয়বস্তু এই ধারায় আর পাওয়া যাচ্ছে না। সূত্রশৃঙ্খল থাকা এবং প্রতিটি বক্তব্য সম্পূর্ণ থাকা তাই পৃথক ঘটনা। শৃঙ্খলের পরিচয় জানা থাকলেও বক্তব্যের একটি স্থান অনির্দিষ্ট থাকতে পারে। সহিহ হিসেবে সংকলিত বর্ণনার ভেতরেই এই ঘাটতি পাঠযোগ্য অবস্থায় রয়ে গেছে।

নির্দেশের স্থানবর্ণনায় যা সংরক্ষিতসংরক্ষণের অবস্থা
প্রথম নির্দেশআরব উপদ্বীপ থেকে মুশরিকদের বের করে দেওয়াবিষয়বস্তু স্পষ্ট
দ্বিতীয় নির্দেশআগত প্রতিনিধিদের মুহাম্মদের রীতির কাছাকাছি উপঢৌকন দেওয়াবিষয়বস্তু স্পষ্ট
তৃতীয় নির্দেশনীরব থাকা অথবা ভুলে যাওয়ার কথাবিষয়বস্তু অনির্দিষ্ট
পরবর্তী ভাষ্যসুলায়মানের দ্বিধা: সাঈদ বলেছিলেন কি না, অথবা নিজে ভুলেছেন কি নাঘাটতির উৎস সম্পর্কেও অনিশ্চয়তা

প্রথম নির্দেশের রাজনৈতিক তাৎপর্য তীব্র। কোন বিশ্বাসের মানুষ আরব উপদ্বীপে থাকবে, তা নিয়ে বহিষ্কারের নীতি বলা হয়েছে। দ্বিতীয়টি শাসকের কাছে আসা প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আচরণ ও সম্পদ দেওয়ার রীতি নিয়ে। শেষ অসুস্থতার মৌখিক উপদেশগুলো ব্যক্তিগত সান্ত্বনায় সীমিত ছিল না; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, ভূখণ্ডে ধর্মীয় উপস্থিতি এবং কূটনৈতিক আচরণের প্রশ্নও ছিল। তৃতীয়টির বিষয়বস্তু অনুপস্থিত থাকায় এই নির্দেশসমষ্টির একটি অংশের বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রও ওই বর্ণনা থেকে নির্ধারণ করা যাচ্ছে না।

পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীরা সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্য কয়েকটি সম্ভাবনা তুলেছেন। ফাতহুল বারিতে দাউদি ও ইবনে তিনের নামে কোরআন-সম্পর্কিত নির্দেশ, মুহাল্লাবের নামে উসামার বাহিনী পাঠানো এবং ইয়াজের নামে কবরকে উপাস্য না-বানানো কিংবা নামাজ ও মালিকানাধীন দাসদাসী সম্পর্কে নির্দেশের সম্ভাবনা এসেছে। এই প্রস্তাবগুলোর বিষয় আলাদা; একটি শব্দের বিকল্প বানান নিয়ে মতভেদ নয়। [515]

قَالَ الدَّاوُدِيُّ: الثَّالِثَةُ الْوَصِيَّةُ بِالْقُرْآنِ، وَبِهِ جَزَمَ ابْنُ التِّينِ. وَقَالَ الْمُهَلَّبُ: بَلْ هُوَ تَجْهِيزُ جَيْشِ أُسَامَةَ، وَقَوَّاهُ ابْنُ بَطَّالٍ بِأَنَّ الصَّحَابَةَ لَمَّا اخْتَلَفُوا عَلَى أَبِي بَكْرٍ فِي تَنْفِيذِ جَيْشِ أُسَامَةَ قَالَ لَهُمْ أَبُو بَكْرٍ: إِنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم عَهِدَ بِذَلِكَ عِنْدَ مَوْتِهِ.

বাংলা অনুবাদ: দাউদি বলেছেন, তৃতীয়টি হলো কোরআন সম্পর্কে নির্দেশ। ইবনে তিনও তা নিশ্চিত করে বলেছেন। মুহাল্লাব বলেছেন, বরং তা উসামার বাহিনী প্রস্তুত করা। ইবনে বাত্তাল এ কথার সমর্থনে বলেছেন, উসামার বাহিনী পাঠানো নিয়ে সাহাবিরা আবু বকরের সঙ্গে মতভেদ করলে আবু বকর তাঁদের বলেছিলেন, নবী মৃত্যুর সময়ে সে বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

ইয়াজের প্রস্তাবে আবার ভিন্ন বিষয় পাওয়া যায়। একটি ক্ষেত্রে কবরপূজা-সংক্রান্ত নিষেধ, আরেকটিতে নামাজ ও দাসদাসীর কথা এসেছে। এগুলো অন্য বর্ণনায় পাওয়া শেষ নির্দেশের সঙ্গে তুলনা করে তৃতীয়টির পরিচয় অনুমান করার চেষ্টা। [516]

وَقَالَ عِيَاضٌ: يَحْتَمِلُ أَنْ تَكُونَ هِيَ قَوْلَهُ: «وَلَا تَتَّخِذُوا قَبْرِي وَثَنًا» فَإِنَّهَا ثَبَتَتْ فِي الْمُوَطَّأِ مَقْرُونَةً بِالْأَمْرِ بِإِخْرَاجِ الْيَهُودِ، وَيَحْتَمِلُ أَنْ يَكُونَ مَا وَقَعَ فِي حَدِيثِ أَنَسٍ أَنَّهَا قَوْلُهُ: «الصَّلَاةَ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ».

বাংলা অনুবাদ: ইয়াজ বলেছেন, সম্ভবত সেটি তাঁর এই কথা: আমার কবরকে উপাস্য বানিয়ো না। কারণ মুওয়াত্তায় তা ইহুদিদের বের করে দেওয়ার নির্দেশের সঙ্গে এসেছে। আবার আনাসের হাদিসে যে কথা এসেছে, সেটিও হতে পারে: নামাজ এবং তোমাদের মালিকানাধীন দাসদাসীর বিষয়।

ব্যাখ্যাকারীর প্রস্তাবসম্ভাব্য বিষয়প্রস্তাবের ভিত্তি বা ধরন
দাউদি ও ইবনে তিনকোরআন সম্পর্কে নির্দেশহারানো তৃতীয়টির সঙ্গে কোরআনবিষয়ক উপদেশের পরিচয় স্থাপন
মুহাল্লাব; সমর্থনে ইবনে বাত্তালউসামার বাহিনী পাঠানোঅন্য ঘটনার শেষ নির্দেশের সঙ্গে সংযোগ
ইয়াজের একটি সম্ভাবনাকবরকে উপাস্য না-বানানোমুওয়াত্তার অন্য নির্দেশসমষ্টির সঙ্গে তুলনা
ইয়াজের আরেকটি সম্ভাবনানামাজ ও মালিকানাধীন দাসদাসীআনাসের অন্য বর্ণনার সঙ্গে তুলনা

কোরআন, সামরিক অভিযান, কবর এবং দাসদাসী—এই চার ধরনের প্রস্তাবের ব্যবধান অনেক। একটি থেকে অন্যটি স্বতঃসিদ্ধভাবে নির্ণয় করা যায় না। কোনো পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীর পছন্দ বেছে নিলেই সুলায়মানের সংরক্ষিত সংশয় দূর হয় না। নির্দিষ্ট বর্ণনাপথে তৃতীয় নির্দেশের বিষয়বস্তু নেই; অন্য বর্ণনার পরিচিত উপদেশের সঙ্গে মিলিয়ে তার সম্ভাব্য পরিচয় প্রস্তাব করা হয়েছে। সেই প্রস্তাবের জ্ঞানগত অবস্থান প্রত্যক্ষভাবে সংরক্ষিত প্রথম দুটি নির্দেশের সমান নয়।

লিখতে চাওয়া বক্তব্য এবং এই তিনটি মৌখিক নির্দেশের মধ্যেও পার্থক্য আছে। লেখার জন্য যে দলিল চাওয়া হয়েছিল, তার নির্দিষ্ট পাঠ তৈরি হয়নি। মৌখিক নির্দেশের ক্ষেত্রে বক্তব্যের সংখ্যা এবং দুটি বিষয় সংরক্ষিত আছে, কিন্তু তৃতীয়টির পূর্ণতা নেই। প্রথম ঘটনায় সম্পাদন আটকে গেছে; দ্বিতীয় ঘটনায় সংবহন অসম্পূর্ণ হয়েছে। মৃত্যুর পর অনুসারীদের হাতে পৌঁছানো ধর্মীয় নির্দেশের ইতিহাসে এই দুই ধরনের ঘাটতির কার্যপদ্ধতি আলাদা এবং দুটিই একই শেষ অসুস্থতার বর্ণনাগুচ্ছে দৃশ্যমান।


খায়বারের বিষ, মৃত্যুযন্ত্রণা এবং “ওয়াতীন–আবহার” বর্ণনার সম্পর্ক

মুহাম্মদের শেষ অসুস্থতার বিবরণে খায়বারের বিষের কথা ফিরে এসেছে। আয়েশার কাছে বলা তাঁর বক্তব্যে আগের বিষমিশ্রিত খাদ্যের যন্ত্রণা এবং বর্তমান মৃত্যুযন্ত্রণার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। এই সম্পর্ক বর্ণনাকারীর বাইরে থেকে বসানো ব্যাখ্যা নয়; হাদিসে তা মুহাম্মদের নিজের বক্তব্য হিসেবে সংরক্ষিত। একই ধর্মীয় সাহিত্যে কোরআনের সত্যতার পক্ষে আল্লাহর নামে কথা বানালে প্রাণনালি কেটে দেওয়ার হুমকি রয়েছে। শেষ অসুস্থতার বর্ণনা এবং সেই হুমকির ভাষা পাশাপাশি রাখলে তীব্র বিদ্রূপাত্মক সাদৃশ্য তৈরি হয়।

সূরা হাক্কায় কোরআনকে বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছ থেকে অবতীর্ণ বলা হয়েছে। তার পরেই মুহাম্মদ আল্লাহর নামে কথা রচনা করলে তাঁকে শক্তভাবে ধরা ও “ওয়াতীন” কেটে দেওয়ার ঘোষণা রয়েছে। এখানে বক্তৃতার সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য সম্ভাব্য কঠোর শাস্তির ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। [517]

এটা (কোরআন) বিশ্বপালনকর্তার কাছ থেকে অবতীর্ণ।
সে (মুহাম্মদ) যদি আমার নামে কোন কথা রচনা করত,
তবে আমি তার দক্ষিণ হস্ত ধরে ফেলতাম,
অতঃপর কেটে দিতাম তার গ্রীবা/প্রধান ধমনী।
তোমাদের কেউ তাকে রক্ষা করতে পারতে না।

ইবনে কাসিরের তাফসিরে ইবনে আব্বাসের নামে “ওয়াতীন”কে হৃদযন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত নালি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইকরিমা, সাঈদ ইবনে জুবাইর, কাতাদা ও অন্যদের কাছেও অনুরূপ ব্যাখ্যার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। ফলে শব্দটির তাৎপর্য প্রাণধারণের কেন্দ্রীয় অঙ্গের সঙ্গে সংযোগ ছিন্ন করার। [518]

قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: وَهُوَ نِيَاطُ الْقَلْبِ، وَهُوَ الْعِرْقُ الَّذِي الْقَلْبُ مُعَلَّقٌ فِيهِ. وَكَذَا قَالَ عِكْرِمَةُ وَسَعِيدُ بْنُ جُبَيْرٍ وَالْحَكَمُ وَقَتَادَةُ وَالضَّحَّاكُ وَمُسْلِمٌ الْبَطِينُ وَأَبُو صَخْرٍ حُمَيْدُ بْنُ زِيَادٍ.

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আব্বাস বলেছেন, এটি হৃদযন্ত্রের বন্ধনী; সেই রক্তনালি যার সঙ্গে হৃদযন্ত্র ঝুলে থাকে। ইকরিমা, সাঈদ ইবনে জুবাইর, হাকাম, কাতাদা, দাহহাক, মুসলিম আল-বাতিন ও আবু সাখর হুমাইদ ইবনে যিয়াদও অনুরূপ কথা বলেছেন।

আবু দাউদের একটি বর্ণনায় উম্মু মুবাশশির শেষ অসুস্থতার সময়ে মুহাম্মদকে তাঁর রোগের কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। তিনি নিজের ছেলের ক্ষেত্রে খায়বারের বিষমিশ্রিত বকরির কথাই সন্দেহ করছেন। মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত জবাবেও একই কারণ এসেছে এবং তার সঙ্গে “আবহার” ছিন্ন হওয়ার কথা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। [519] [520]

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ৩৪/ রক্তমূল্য
পরিচ্ছেদঃ ৬. কাউকে বিষ খাইয়ে হত্যা করলে কি তাকেও হত্যা করা হবে?
৪৫১৩। ইবনু কা‘ব ইবনু মালিক (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মৃত্যুরোগে আক্রান্ত ছিলেন তখন উম্মু মুবাশশির (রাঃ) তাঁকে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আপনার রোগ সম্পর্কে কি ভাবছেন? আর আমি আমার ছেলের রোগ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন নই সেই বিষ মেশানো বকরীর গোশত ব্যতীত যা সে খায়বারে আপনার সঙ্গে খেয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমিও ঐ বিষ ছাড়া আমার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন নই। এ মুহূর্তে তা আমার প্রধান ধমনি কেটে দিচ্ছে।(1)
সনদ সহীহ।
(1). আবূ দাঊদ এটি এককভাবে বর্ণনা করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ্ ইবনু কা‘ব ইবনু মালিক (রহঃ)

এই কথোপকথনে অতীতের খাবার, সেই খাবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকজনের মৃত্যু এবং মুহাম্মদের শেষ রোগ একই ব্যাখ্যার অধীনে এসেছে। উম্মু মুবাশশির নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কারণ সন্দেহ করছেন; মুহাম্মদও সেই কারণের কথা বলছেন। বর্ণনার ধর্মীয় গুরুত্ব এখানেই: শেষ অসুস্থতার যন্ত্রণা ব্যাখ্যা করতে তাঁর নামে এমন কোনো অক্ষত শরীরের কথা সংরক্ষিত হয়নি যা বিষের ক্ষতি অতিক্রম করে ছিল। তাঁর বক্তব্যে খাদ্যটির যন্ত্রণা রয়ে গেছে এবং তখন তা প্রাণঘাতী তীব্রতায় অনুভূত হচ্ছে।

আবু দাউদের আগের হাদিসে বিষপ্রয়োগের ঘটনাটি আরও বিস্তৃত। মুহাম্মদ ও সঙ্গীরা খাদ্য খান; পরে বিষযুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়; বিশর ইবনুল বারা মারা যান। বিষপ্রয়োগকারী নারীর জবাবে একটি পরীক্ষার যুক্তিও আছে: তিনি নবী হলে বিষে ক্ষতি হবে না, আর বাদশাহ হলে মানুষ তাঁর হাত থেকে মুক্তি পাবে। এটি ওই নারীর নিজের বক্তব্য হিসেবে বর্ণিত। তারপর শেষ অসুস্থতায় মুহাম্মদের বিষের যন্ত্রণা ও আবহার কাটার কথাও একই প্রতিবেদনে এসেছে। [521] [522]

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ৩৪/ রক্তমূল্য
পরিচ্ছেদঃ ৬. কাউকে বিষ খাইয়ে হত্যা করলে কি তাকেও হত্যা করা হবে?
৪৫১২। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিয়া গ্রহণ করতেন কিন্তু সাদাকাহ গ্রহণ করতেন না। বর্ণনাকারী বলেন, খায়বারের এক ইয়াহুদী মহিলা একটি ভুনা বকরীতে বিষ মিশিয়ে তাঁকে হাদিয়া দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা আহার করেন এবং লোকজনও আহার করে। তিনি বললেনঃ তোমরা তোমাদের হাত গুটিয়ে নাও। কারণ এটি আমাকে অবহিত করা হয়েছে যে, এটি বিষযুক্ত। (বিষক্রিয়ার ফলে) বিশর ইবনুল বারাআত ইবনু মা‘রূর আল-আনসারী (রাঃ) মারা যান। তিনি ইয়াহুদী মহিলাকে ডেকে এনে প্রশ্ন করেনঃ তুমি যা করলে তা করতে তোমাকে কিসে প্ররোচিত করেছে?
সে বললো, আপনি যদি সত্যি নবী হয়ে থাকেন তাহলে আমি যা করেছি তাতে আপনার ক্ষতি হবে না। আর যদি আপনি বাদশাহ হয়ে থাকেন তাহলে আমি আপনার থেকে মানুষকে শান্তি দিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিলে পরে তাকে হত্যা করা হলো। অতঃপর তিনি যে ব্যথায় আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন সেই সম্পর্কে বলেনঃ আমি সর্বদা সেই লোকমার ব্যথা অনুভব করছি যা আমি খায়বারে খেয়েছিলাম। এই সময়ে তা আমার প্রধান ধমনি কেটে দিয়েছে।(1)
হাসান সহীহ।
(1). বুখারী, আহমাদ।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

খাদ্য বিষযুক্ত হওয়ার সংবাদ এখানে খাওয়ার আগের প্রতিরোধ হিসেবে আসেনি। বর্ণিত ঘটনাক্রমে আহার হয়ে গেছে, তারপর হাত গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ এসেছে। ফলে খাদ্যের বিষাক্ততা সম্পর্কে বিশেষ সংবাদ পাওয়ার দাবি এবং বিষ শরীরে প্রবেশ করা ঠেকাতে পারার ক্ষমতা আলাদা অবস্থায় আছে। বর্ণনাটি নিজের মধ্যেই বিষের ক্ষতি বহন করছে: একজন সঙ্গীর মৃত্যু এবং মুহাম্মদের দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা। নারীর প্রস্তাবিত নবীত্ব-পরীক্ষার আশ্বাসও পরবর্তী রোগবিবরণের সঙ্গে মেলে না; ক্ষতিমুক্ত থাকার শর্তের বিপরীতে মুহাম্মদের নিজের নামে ক্ষতি অনুভব করার বক্তব্য রয়েছে।

বুখারিতে আয়েশার সূত্রে একই ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়। বাংলা মুদ্রিত পাঠে খায়বারের খাদ্যের যন্ত্রণা এবং বিষক্রিয়ায় প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়ার কথা আছে। [523] [524]

সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫১/ মাগাযী (যুদ্ধাভিযান)
পরিচ্ছদঃ ২২৪৭. নাবী (সাঃ) এর রোগ ও তাঁর ওফাত। মহান আল্লাহর বাণীঃ আপনিতো মরণশীল এবং তারাও মরণশীল। এরপর কিয়ামত দিবসে তোমরা পরস্পর তোমাদের প্রতিপালকের সম্মুখে বাক-বিতন্ডা করবে (৩৯ঃ ৩০,৩১) ইউনুস (রহঃ) যুহরী ও উরওয়া (রহঃ) সুত্রে বলেন, আয়শা (রাঃ) বলেছেন, নবী (সাঃ) যে রোগে ইন্তিকাল করেন সে সময় তিনি বলতেন, হে আয়শা! আমি খায়বারে (বিষযুক্ত) যে খাদ্য ভক্ষণ করেছিলাম, আমি সর্বদা তার যন্ত্রণা অনুভব করছি। আর এখন সেই সময় আগত, যখন সে বিষক্রিয়ার আমার প্রাণবায়ু বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে

মুহাম্মদের বিষে মৃত্যু
বিষক্রিয়ায় মুহাম্মদের মৃত্যু

আরবি বাক্যে “মিন যালিকাস সাম্ম”—সেই বিষের কারণে—কথাটি স্পষ্ট। “আবহার” ছিন্ন হওয়ার অনুভূতির সঙ্গে বিষের যোগ মুহাম্মদের উক্তির ভেতরেই রয়েছে। [525]

يَا عَائِشَةُ مَا أَزَالُ أَجِدُ أَلَمَ الطَّعَامِ الَّذِي أَكَلْتُ بِخَيْبَرَ، فَهَذَا أَوَانُ وَجَدْتُ انْقِطَاعَ أَبْهَرِي مِنْ ذَلِكَ السَّمِّ

বাংলা অনুবাদ: হে আয়েশা, খায়বারে যে খাবার খেয়েছিলাম তার যন্ত্রণা আমি এখনও পাই; এখন সেই বিষের কারণে আমার আবহার ছিন্ন হওয়ার অনুভূতি হচ্ছে।

ফাতহুল বারিতে “আবহার” শব্দের ব্যাখ্যায় ভাষাবিদদের বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে। এটিকে পিঠের ভেতরের দিকে থাকা হৃদযন্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত এমন একটি রক্তনালি বলা হয়েছে, যা ছিন্ন হলে মানুষ মারা যায়। এই ব্যাখ্যা হাদিসের শব্দটিকে প্রাণঘাতী আঘাতের অর্থেই স্থাপন করে। [526]

قَالَ أَهْلُ اللُّغَةِ: الْأَبْهَرُ عِرْقٌ مُسْتَبْطِنٌ بِالظَّهْرِ مُتَّصِلٌ بِالْقَلْبِ إِذَا انْقَطَعَ مَاتَ صَاحِبُهُ.

বাংলা অনুবাদ: ভাষাবিদরা বলেছেন, আবহার হলো পিঠের অভ্যন্তরে অবস্থিত হৃদযন্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত একটি রক্তনালি; সেটি ছিন্ন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মারা যায়।

তুলনার বিষয়কোরআন ও তাফসিরের বক্তব্যহাদিস ও ভাষ্যের বক্তব্য
মূল শব্দহাক্কাহ ৬৯:৪৬-এ ওয়াতীনবুখারি ৪৪২৮-এ আবহার
ব্যাখ্যায় অঙ্গের পরিচয়ইবনে কাসির: হৃদযন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত নালিফাতহুল বারি: হৃদযন্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত অভ্যন্তরীণ রক্তনালি
ছিন্ন হওয়ার তাৎপর্যআল্লাহর নামে কথা রচনার ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী শাস্তির হুমকিবিষের কারণে মুহাম্মদের অনুভূত প্রাণঘাতী যন্ত্রণা
বক্তব্যের ধরনশর্তযুক্ত ধর্মীয় ঘোষণাঅসুস্থ ব্যক্তির নিজের যন্ত্রণার কারণ ও অনুভূতির বর্ণনা

শব্দ দুটি ভিন্ন, কিন্তু ব্যাখ্যার অর্থক্ষেত্র বিচ্ছিন্ন নয়। দুটিই হৃদযন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত প্রাণধারণের গুরুত্বপূর্ণ নালি ছিন্ন হওয়ার চিত্র বহন করছে। এক জায়গায় সেটি সম্ভাব্য শাস্তির ভাষা, অন্য জায়গায় ঘোষণাকারীর নিজের শেষ যন্ত্রণার ভাষা। কোরআনের হুমকি শুনে যে ভয়াবহ পরিণতির ছবি তৈরি হয়, হাদিসে মুহাম্মদ নিজের অবস্থার জন্য তার খুব কাছাকাছি ছবি ব্যবহার করছেন। ধর্মীয় দাবির সত্যতা প্রতিষ্ঠায় ব্যবহৃত দেহগত বিপর্যয়ের ভাষা ঘোষণাকারীর মৃত্যুশয্যাতেই ফিরে এসেছে।

দুটি বক্তব্যের মধ্যে সম্পর্কটি অর্থ ও চিত্রকল্পের। হাক্কার বাক্যে নির্দিষ্ট শর্তে আল্লাহর শাস্তির ঘোষণা আছে; বুখারির বাক্যে বিষের যন্ত্রণাকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মৃত্যুশয্যার উক্তি অনুভূতি ও কারণ-সম্পর্কে মুহাম্মদের বক্তব্য সংরক্ষণ করে। সেই উক্তি তাঁর দেহের ময়নাতদন্তের বিবরণ নয়। এই পৃথক পরিচয় রেখেই তুলনাটি কঠোর: সত্যতার পক্ষে উচ্চারিত প্রাণনালি কাটার হুমকি এবং নিজের বিষযন্ত্রণার বিবরণ একই ধরনের শারীরিক ধ্বংসের ভাষায় প্রকাশিত।

মৃত্যুযন্ত্রণার তীব্রতার খবর শুধু বিষ-সংক্রান্ত উক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। আনাসের বর্ণনায় ফাতিমা তাঁর বাবার কষ্ট দেখে আক্ষেপ করছেন। মুহাম্মদের জবাবে সেই দিন পার হলে আর কষ্ট থাকবে না এবং মৃত্যু কাউকে ছেড়ে যায় না—এই বক্তব্য এসেছে। কষ্টটির বাস্তবতা স্বীকার করেই ভবিষ্যতে তার সমাপ্তির কথা বলা হচ্ছে। [527] [528]

সুনানে ইবনে মাজাহ
অধ্যায়ঃ ৬/ জানাযা
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
পরিচ্ছদঃ ৬/৬৫. নাবী ﷺ -এর ইনতিকাল ও তাঁর কাফন-দাফন।
৩/১৬২৯। আনাস ইবনু মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মৃত্যু যন্ত্রণা তীব্রভাবে অনুভব করেন, তখন ফাতেমাহ (রাঃ) বলেন, হায় আমার আব্বার কত কষ্ট। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আজকের দিনের পরে তোমার আব্বার আর কোন কষ্ট থাকবে না। তোমার আব্বার নিকট এমন জিনিস উপস্থিত হয়েছে, যা কিয়ামাত পর্যন্ত কাউকে ছাড়বে না।
সহীহুল বুখারী ৪৪৬২, আহমাদ ১৬০২৬, সহীহাহ ১৬৩৮, মুখতাসার শামাযিল ৩৩৪, বুখারী শেষ বাক্য বাদ দিয়ে। তাহকীক আলবানীঃ হাসান সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

ফাতিমা ও মৃত্যুশয্যায় মুহাম্মদ
ফাতিমা ও মৃত্যুশয্যায় মুহাম্মদ

তিরমিজির বর্ণনায় আয়েশা নিজের দেখা মৃত্যুযন্ত্রণার সঙ্গে পরের অভিজ্ঞতার সম্পর্ক জানিয়েছেন। মুহাম্মদের মৃত্যুর কষ্ট দেখার পর কারও সহজ মৃত্যু দেখে তাঁর আর ঈর্ষা হয় না। এটি কাছের মানুষের স্মৃতিতে রয়ে যাওয়া তীব্র দুঃখ ও অসহায়তার বিবরণ। [529] [530]

সূনান তিরমিজী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ১০/ কাফন-দাফন
পরিচ্ছদঃ মৃত্যুর সময় কষ্ট হওয়া।
৯৮১. হাসান ইবনুস সাববাহ আল-বাগদাদী (রহঃ) …… আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, মৃত্যুর সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যে কষ্ট হতে দেখেছি এরপর কারো মৃত্যুর সময় আসান হতে দেখতে আমার আর কোন ঈর্ষা হয় না। – মুখতাসার শামাইল মুহাম্মাদিয়া ৩২৫, বুখারি, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ৯৭৯ (আল মাদানী প্রকাশনী)
রাবী বলেন, আমি এই হাদিস সম্পর্কে আবূ যুরআ (রহঃ) কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বলেছিলাম, রাবী আব্দুর রাহমান ইবনুল আলা কে? তিনি বললেন, ইনি হলেন আলা ইবনুল লাজলাজ। তাঁকে এইরূপেই আমরা জানি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

মুহাম্মদের মৃত্যু যন্ত্রণা

এই দুটি বর্ণনায় মৃত্যুকে দূরের কোনো ধর্মতাত্ত্বিক সংজ্ঞা হিসেবে পাওয়া যায় না। মেয়ে তাঁর বাবার যন্ত্রণা দেখছেন; স্ত্রী সেই কষ্টের স্মৃতি দিয়ে অন্য মৃত্যুর স্বস্তিকে বিচার করছেন। দেহের দুর্বলতা, সহায়তার প্রয়োজন এবং প্রিয়জনের আক্ষেপ একই সময়ে উপস্থিত। মুহাম্মদের কর্তৃত্বপূর্ণ বক্তব্যের শেষ পর্যায়ও এই শারীরিক অবস্থার মধ্যেই ঘটেছে। উপদেশ দিতে চাওয়া ব্যক্তি এবং মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর ব্যক্তি একই মানুষ; দুটি আলাদা, পরস্পরবিচ্ছিন্ন চরিত্র নয়।

বুখারির আরেক বর্ণনায় আয়েশা পানি দিয়ে মুখ মোছা এবং মৃত্যুর যন্ত্রণা স্বীকার করার কথা বলেছেন। সেই উক্তিতে মৃত্যুর যন্ত্রণাকে সরাসরি মেনে নেওয়া হয়েছে। [531]

لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، إِنَّ لِلْمَوْتِ سَكَرَاتٍ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ ছাড়া উপাস্য নেই; মৃত্যুর অবশ্যই যন্ত্রণা আছে।

বিষের পরিচয় দেওয়া, ওষুধের আপত্তি জানানো, লিখিত নির্দেশ চাইতে থাকা এবং মৃত্যুযন্ত্রণা স্বীকার করা—এই শেষ সময়ের ঘটনাগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন কাজ দেখা যায়। শরীর কষ্ট পাচ্ছে, আশপাশের মানুষ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, কথা বলা হচ্ছে এবং সেই কথার কিছু অংশ পরে বর্ণিত হচ্ছে। ঘোষণাকারীর মুখ থেকে কোন বাক্য কখন বেরিয়েছে এবং কার কাছে কীভাবে পৌঁছেছে, সেই প্রশ্নগুলো তাঁর শেষ অসুস্থতার পরিবেশ থেকে আলাদা নয়। ব্যক্তিগত সেবা ও সাক্ষ্যদানের জায়গাটি একই ঘরের মানুষের হাতে ছিল।

এই বিবরণে বিষের যন্ত্রণা তাঁর অনুসারীদের বিশ্বাস দিয়ে মুছে যায়নি। খায়বারের খাদ্যের ক্ষতি তিনি নিজের ভাষায় স্মরণ করেছেন; ঘরের মানুষ তা শুনে পরের প্রজন্মকে জানিয়েছেন। কোরআনের হুমকি ও হাদিসের শেষ অসুস্থতা পাশাপাশি পড়লে ধর্মীয় গৌরবের আড়াল থেকে একজন বিষযন্ত্রণাক্লিষ্ট মানুষের শরীর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই শরীরের মৃত্যু ওহির নতুন দাবির প্রবাহ থামিয়ে দেয়; এরপর তাঁর বাক্যের পরিচয় নির্ভর করে জীবিত সাক্ষীদের বক্তব্য এবং তাঁদের কাছে থাকা লেখার ওপর।


শেষ অসুস্থতা থেকে মৃত্যুর পরে পাঠ সংগ্রহের দায়িত্বে পরিবর্তন

মুহাম্মদের মৃত্যু কোরআনের ইতিহাসে কর্তৃত্বের একটি বাস্তব পরিবর্তন ঘটায়। জীবিত অবস্থায় কোনো বাক্য তাঁর কাছে আবার শোনা, আয়াতের পরিচয় জিজ্ঞেস করা কিংবা প্রয়োগের ব্যাখ্যা চাওয়ার সুযোগ ছিল। মৃত্যুর পরে সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর পাওয়ার পথ বন্ধ হয়। তখন বাক্যটি কে শুনেছেন, কার কাছে লেখা আছে এবং অন্য সাক্ষ্যের সঙ্গে তা মেলে কি না—এই ধরনের অনুসন্ধান সামনে আসে। ঘোষণাকারীর পরিচয় দেওয়ার কাজ এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে অন্যের সাক্ষ্য যাচাই করার কাজ পদ্ধতিগতভাবে আলাদা।

বুখারিতে তালহা ইবনে মুসাররিফ ও আবদুল্লাহ ইবনে আবি আওফার একটি সংলাপে শেষ নির্দেশের পরিচয় নিয়ে এই পার্থক্যের আরেক দিক পাওয়া যায়। নবী ওসিয়ত করেছিলেন কি না জিজ্ঞেস করলে প্রথমে “না” বলা হয়; পরে কিতাবুল্লাহ সম্পর্কে ওসিয়তের কথা বলা হয়। একই সংলাপে নির্দিষ্ট ওসিয়ত থাকার প্রশ্ন এবং কিতাব অনুসরণের সাধারণ নির্দেশ আলাদা স্তরে এসেছে। [532]

قَالَ سَأَلْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ أَبِي أَوْفَى ـ رضى الله عنهما ـ هَلْ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم أَوْصَى فَقَالَ لاَ. فَقُلْتُ كَيْفَ كُتِبَ عَلَى النَّاسِ الْوَصِيَّةُ أَوْ أُمِرُوا بِالْوَصِيَّةِ قَالَ أَوْصَى بِكِتَابِ اللَّهِ.

বাংলা অনুবাদ: তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আবি আওফাকে জিজ্ঞেস করলাম, নবী কি ওসিয়ত করেছিলেন? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, তাহলে মানুষের ওপর ওসিয়ত করা কীভাবে বিধিবদ্ধ হলো, অথবা তাদের ওসিয়ত করতে নির্দেশ দেওয়া হলো? তিনি বললেন, তিনি আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে ওসিয়ত করেছিলেন।

কিতাব অনুসরণের নির্দেশ থেকে সেই কিতাবের প্রতিটি অংশ এক জায়গায় কোন বিন্যাসে পাওয়া যাবে, তার আলাদা দলিল পাওয়া যায় না। আনুগত্যের বিষয়বস্তু হিসেবে কিতাবের নাম থাকা এবং সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় সব লিখিত উপাদান একত্র থাকা ভিন্ন অবস্থা। প্রথমটি একটি কর্তব্য জানায়; দ্বিতীয়টির জন্য লেখার সন্ধান, সাক্ষ্য, মিলিয়ে দেখা এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা লাগে। ওসিয়তের সাধারণ ভাষা পরবর্তী সংগ্রাহকের ব্যবহারিক কাজ নিজে সম্পন্ন করে দেয়নি।

আবু বকরের সময়ে যায়েদের কাছে দেওয়া দায়িত্বের ভাষায় এই পরিবর্তন স্পষ্ট। বুখারির বর্ণনায় তাঁকে মুহাম্মদের জন্য ওহি লিখতেন বলে শনাক্ত করা হচ্ছে; সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এখন কোরআন অনুসন্ধান করে একত্র করার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগে ঘোষণাকারীর বক্তব্য লিখতেন, পরে বিভিন্ন স্থানে থাকা বক্তব্য খুঁজে সংগ্রহ করবেন। [533]

إِنَّكَ رَجُلٌ شَابٌّ عَاقِلٌ لاَ نَتَّهِمُكَ، وَقَدْ كُنْتَ تَكْتُبُ الْوَحْىَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَتَتَبَّعِ الْقُرْآنَ فَاجْمَعْهُ.

বাংলা অনুবাদ: তুমি একজন তরুণ ও বুদ্ধিমান মানুষ; আমরা তোমাকে সন্দেহ করি না। তুমি আল্লাহর রাসুলের জন্য ওহি লিখতে। সুতরাং কোরআন অনুসন্ধান করে তা একত্র করো।

বিশ্বাসযোগ্যতা, বিচারবুদ্ধি এবং আগের লিখনের অভিজ্ঞতা—এই তিন গুণ দিয়ে সংগ্রাহক নির্বাচন করা হয়েছে। এর প্রত্যেকটি মানুষের কাজের যোগ্যতা সম্পর্কে মূল্যায়ন। পাঠ সংগ্রহের কাজে কাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা ঠিক করছেন রাজনৈতিক নেতৃত্ব; দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি উপলব্ধ উপকরণ ও স্মৃতির মধ্যে অনুসন্ধান করছেন। ব্যক্তিগতভাবে কোনো আয়াত জানা এবং দায়িত্ব নিয়ে তার সংগ্রহযোগ্য সাক্ষ্য খোঁজার কাজও তখন পৃথক হয়। একটি পরিচিত ধর্মীয় বাক্যকে সংগ্রহে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য গ্রহণের নিয়ম প্রয়োজন হয়ে ওঠে।

অবস্থাপ্রধান কাজকর্তৃত্বের ব্যবহারিক রূপ
মুহাম্মদের জীবদ্দশাবক্তব্য শোনা, লেখা ও তাঁর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়াঘোষণাকারীর সরাসরি বক্তব্য
শেষ অসুস্থতাসেবা, নির্দেশ গ্রহণ এবং কথার সাক্ষ্য বহনঘরের মানুষ ও শ্রোতাদের অংশগ্রহণ
মৃত্যুর পরেসংরক্ষিত লেখা ও স্মৃতি খুঁজে একত্র করানেতৃত্বের দায়িত্ব প্রদান ও সংগ্রাহকের যাচাই
সংগ্রহের ফলউপাদান একটি সংরক্ষণব্যবস্থায় আনাকাদের সাক্ষ্য ও কোন লেখা গ্রহণ করা হলো তার ওপর নির্ভরতা

এই পরিবর্তনে শেষত্বের প্রশ্নও নতুন অর্থ পায়। শেষ অবতীর্ণ আয়াত সম্পর্কে সাহাবিদের জ্ঞান এক নয়; আবার কোনো লিখিত অংশ সংগ্রহে শেষে পাওয়া গেলেও সেটি অবতরণে শেষ ছিল কি না, তা আলাদা করে জানতে হয়। সংগ্রাহক যে ক্রমে উপাদান পান, সেই ক্রম মুহাম্মদের ঘোষণার ক্রম নয়। স্মৃতিতে থাকা শেষ শ্রবণ, গ্রন্থে থাকা শেষ অবস্থান এবং অনুসন্ধানে পাওয়া শেষ লিখিত অংশ—এই তিন কালানুক্রমের মধ্যে কোনোটি অন্যটির বিকল্প নয়।

মৃত্যুশয্যার না-লেখা নির্দেশ সেই সংগ্রহের হাতে পূর্ণাঙ্গ দলিল হিসেবে আসতে পারেনি। কাগজে ওঠার আগেই যে বক্তব্যের প্রকাশ আটকে গেছে, তার হুবহু পাঠ পরে অন্য লেখার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার উপায় তৈরি হয়নি। মৌখিক তিন নির্দেশের অনির্দিষ্ট তৃতীয়টিও একইভাবে সম্পূর্ণ শব্দসহ এই বর্ণনাপথে পৌঁছায়নি। সংগ্রহকারীর দক্ষতা আগে থেকেই অনুপস্থিত কোনো বক্তব্যের মূল পাঠ সৃষ্টি করতে পারে না। তাঁর কাজের পরিসর নির্ধারিত হয় আসলে কী উপাদান তাঁর কাছে পৌঁছেছে, তা দিয়ে।

ফলে মৃত্যুর পর কোরআনের সংগ্রহ একটি প্রস্তুত পাণ্ডুলিপি হাতে নিয়ে কেবল স্থানান্তর করার বিবরণ হিসেবে আসে না। যায়েদকে অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে, আর সেই অনুসন্ধানকে তিনি গুরুদায়িত্ব হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ছড়িয়ে থাকা উপাদান পাওয়া, শনাক্ত করা ও সংরক্ষণে আনার প্রয়োজন ছিল বলেই নতুন উদ্যোগ নিতে হয়েছে। আগের লিখনের অস্তিত্ব সংগ্রহের প্রয়োজন দূর করেনি; বরং সেই লিখন ছড়িয়ে থাকায় তার অবস্থান ও সাক্ষ্য একত্র করা একটি আলাদা কাজ হয়েছে।

নবীর জীবন্ত উপস্থিতির জায়গায় এখন সাক্ষ্য ও সংরক্ষিত উপকরণের ওপর নির্ভরতা স্থায়ী হয়। কোনো মতভেদ দেখা দিলে একই ব্যক্তির কাছে ফিরে গিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত শোনার সুযোগ আর নেই। জীবিতদের বক্তব্য, তাঁদের হাতে থাকা লেখা এবং নেতৃত্বের গৃহীত পদ্ধতিই তখন সিদ্ধান্তের উপকরণ। কোরআনের অবতরণ শেষ হওয়া ধর্মীয় পরিসরে সমাপ্তি; সেই বক্তব্যগুলোকে একটি নির্দিষ্ট সংগ্রহে রূপ দেওয়ার ইতিহাসে তা নতুন কাজের সূচনা। আবু বকরের উদ্যোগে যায়েদের দায়িত্ব গ্রহণ সেই নতুন পর্যায়ের নির্দিষ্ট দৃষ্টান্ত।


আবু বকরের সংকলন: পাঠকের মৃত্যু, সাক্ষ্য ও বিচ্ছিন্ন উপকরণের অনুসন্ধান

আবু বকরের সময়ে কোরআন সংগ্রহের উদ্যোগ শুরু হয় যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠকদের মৃত্যুর পরে। উমর আশঙ্কা করেন, অন্য যুদ্ধেও একইভাবে পাঠক মারা গেলে কোরআনের অনেক অংশ চলে যাবে। সেই ভয় থেকে তিনি আবু বকরকে সংগ্রহের নির্দেশ দিতে বলেন। আবু বকর প্রথমে মুহাম্মদ কাজটি করেননি বলে আপত্তি তোলেন; পরে প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং যায়েদ ইবনে সাবিতকে দায়িত্ব দেন। ছড়িয়ে থাকা লিখিত উপকরণ ও মানুষের স্মৃতি অনুসন্ধান করে যে সহিফাগুলো তৈরি হয়, সেগুলো পরবর্তী উসমানি উদ্যোগেরও একটি প্রধান উৎস হয়ে ওঠে।

সংকলনের এই ইতিহাসে সিদ্ধান্ত, উপকরণ ও গ্রহণের নিয়ম তিনটি আলাদা স্তরে কাজ করেছে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আলোচনায়; উপকরণ এসেছে বিভিন্ন মানুষের কাছে থাকা লেখা ও মুখস্থ পাঠ থেকে; আর কোন উপকরণ গৃহীত হবে তা নির্ভর করেছে সাক্ষ্য ও যাচাইয়ের পদ্ধতির ওপর। সংগ্রহে প্রবেশের আগেই কোনো বক্তব্যকে শনাক্ত করা, তার উৎস পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে আরেকজনের সমর্থন খোঁজার কাজ ছিল। সেই প্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট বিবরণেই কোরআনের রাষ্ট্রীয় সংগ্রহ গড়ে ওঠার বাস্তব রূপ পাওয়া যায়।


ইয়ামামার যুদ্ধ এবং কোরআন হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা

বুখারিতে যায়েদের বর্ণনা শুরু হয়েছে ইয়ামামার নিহতদের খবরের পরে আবু বকরের তলব দিয়ে। তিনি এসে দেখেন, উমর সেখানে বসে আছেন। যুদ্ধের ফল কেবল শাসনের নিরাপত্তা বা সৈন্যসংখ্যার সমস্যা তৈরি করেনি; ধর্মগ্রন্থের পাঠ বহনকারী মানুষদের মৃত্যুও তখন জরুরি বিষয় হয়ে উঠেছে। উমর সেই সমস্যার নাম দিয়েছেন “কোরআনের অনেক অংশ চলে যাওয়া”। তাঁর উদ্বেগের বস্তু শুধু দক্ষ আবৃত্তিকার কমে যাওয়া নয়; যাঁদের মৃত্যু হচ্ছে তাঁদের সঙ্গে সংরক্ষিত পাঠের সম্পর্কও তিনি সামনে এনেছেন। [534]

أَرْسَلَ إِلَىَّ أَبُو بَكْرٍ مَقْتَلَ أَهْلِ الْيَمَامَةِ فَإِذَا عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ عِنْدَهُ قَالَ أَبُو بَكْرٍ ـ رضى الله عنه ـ إِنَّ عُمَرَ أَتَانِي فَقَالَ إِنَّ الْقَتْلَ قَدِ اسْتَحَرَّ يَوْمَ الْيَمَامَةِ بِقُرَّاءِ الْقُرْآنِ وَإِنِّي أَخْشَى أَنْ يَسْتَحِرَّ الْقَتْلُ بِالْقُرَّاءِ بِالْمَوَاطِنِ، فَيَذْهَبَ كَثِيرٌ مِنَ الْقُرْآنِ وَإِنِّي أَرَى أَنْ تَأْمُرَ بِجَمْعِ الْقُرْآنِ.

বাংলা অনুবাদ: ইয়ামামার লোকদের নিহত হওয়ার পরে আবু বকর আমাকে ডেকে পাঠালেন। গিয়ে দেখি, উমর ইবনুল খাত্তাব তাঁর কাছে রয়েছেন। আবু বকর বললেন, উমর আমার কাছে এসে বলেছেন, ইয়ামামার দিনে কোরআনের পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আমি ভয় করছি, অন্য যুদ্ধক্ষেত্রেও পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক মৃত্যু ঘটবে; ফলে কোরআনের অনেক অংশ চলে যাবে। তাই আমার মত হলো, আপনি কোরআন একত্র করার নির্দেশ দিন।

ইয়ামামায় আবু বকরের পাঠানো বাহিনী মুসায়লিমার অনুসারীদের বিরুদ্ধে লড়েছিল। ইবনে হাজার ঘটনাটির ব্যাখ্যায় মুহাম্মদের মৃত্যুর পরে মুসায়লিমার শক্তিবৃদ্ধি এবং খালিদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে বাহিনী পাঠানোর কথা উল্লেখ করেছেন। ফলে সংগ্রহের সূচনাকারী সংকটটি মুহাম্মদের জীবদ্দশার কোনো শান্তিপূর্ণ লেখালেখির সভা থেকে আসেনি; তাঁর মৃত্যুর পরের সশস্ত্র সংঘর্ষ থেকে এসেছে। যুদ্ধের প্রয়োজন এবং পাঠরক্ষার প্রয়োজন তখন একই প্রশাসনের সামনে দাঁড়িয়েছে। [535]

وَكَانَ مِنْ شَأْنِهَا أَنَّ مُسَيْلِمَةَ ادَّعَى النُّبُوَّةَ وَقَوِيَ أَمْرُهُ بَعْدَ مَوْتِ النَّبِيِّ ـ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ـ بِارْتِدَادِ كَثِيرٍ مِنَ الْعَرَبِ، فَجَهَّزَ إِلَيْهِ أَبُو بَكْرٍ الصِّدِّيقُ خَالِدَ بْنَ الْوَلِيدِ فِي جَمْعٍ كَثِيرٍ مِنَ الصَّحَابَةِ فَحَارَبُوهُ أَشَدَّ مُحَارَبَةٍ.

বাংলা অনুবাদ: ঘটনার পটভূমি ছিল এই যে, মুসায়লিমা নবীত্ব দাবি করেছিল এবং নবীর মৃত্যুর পরে বহু আরবের ধর্মত্যাগের ফলে তার শক্তি বেড়েছিল। আবু বকর সিদ্দিক তার বিরুদ্ধে খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে অনেক সাহাবির বাহিনীসহ পাঠান। তাঁরা তার সঙ্গে কঠিন যুদ্ধ করেন।

পাঠক নিহত হলে পাঠ হারানোর আশঙ্কায় একটি নির্দিষ্ট নির্ভরতা স্বীকার করা হচ্ছে। জীবিত পাঠকদের কাছে থাকা জ্ঞান অন্য কোথাও সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য হলে তাঁদের মৃত্যুকে গ্রন্থের বড় অংশ হারানোর কারণ হিসেবে দেখানোর প্রয়োজন হতো না। উমরের প্রস্তাবে মানুষের জীবন এবং পাঠের প্রাপ্যতা একই কার্যকারণসূত্রে বাঁধা। ভবিষ্যৎ যুদ্ধের ক্ষতি কমানোর উপায় হিসেবে তিনি নতুন একটি সংগ্রহ চান। স্মৃতিবাহকের মৃত্যুর ঝুঁকি মোকাবিলা করতে লেখাগুলো ও পাঠগুলো একত্র করার প্রয়োজন তৈরি হয়।

“কুররা” পরিচয়ের ভেতরেও সবার জ্ঞান অভিন্ন ছিল কি না, ইবনে হাজার সে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় নিহতদের সমষ্টি মিলিয়ে কোরআন সংগ্রহ করে থাকতে পারেন; প্রত্যেক ব্যক্তি পুরো কোরআন সংগ্রহ করেছিলেন—এমন অর্থ আবশ্যক নয়। একটি গোষ্ঠীর সামগ্রিক জ্ঞান এবং তার প্রত্যেক সদস্যের সম্পূর্ণ জ্ঞান এখানে পৃথক সম্ভাবনা হিসেবে এসেছে। [536]

وَهَذَا يَدُلُّ عَلَى أَنَّ كَثِيرًا مِمَّنْ قُتِلَ فِي وَقْعَةِ الْيَمَامَةِ كَانَ قَدْ حَفِظَ الْقُرْآنَ، لَكِنْ يُمْكِنُ أَنْ يَكُونَ الْمُرَادُ أَنَّ مَجْمُوعَهُمْ جَمَعَهُ لَا أَنَّ كُلَّ فَرْدٍ جَمَعَهُ.

বাংলা অনুবাদ: এটি বোঝায়, ইয়ামামার যুদ্ধে নিহতদের অনেকে কোরআন মুখস্থ করেছিলেন। কিন্তু এমন অর্থও হতে পারে যে তাঁদের সমষ্টি তা সংগ্রহ করেছিলেন, প্রত্যেক ব্যক্তি সম্পূর্ণটা সংগ্রহ করেছিলেন এমন নয়।

এই পার্থক্য ঝুঁকির ধরন বদলে দেয়। একটি বড় গোষ্ঠীর প্রত্যেকের কাছে একই পূর্ণ পাঠ থাকলে কয়েকজন মারা যাওয়ার পরেও অন্যদের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন সহজ হয়। পৃথক মানুষের কাছে পৃথক অংশ, পৃথক লিখিত উপকরণ বা সরাসরি শ্রবণের পৃথক সাক্ষ্য থাকলে একজনের মৃত্যু বিশেষ কোনো অংশের দলিলপ্রাপ্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সংগ্রহের তাগিদ তখন কেবল পাঠকের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয় থাকে না; বিচ্ছিন্নভাবে থাকা জ্ঞান ও উপকরণের অবস্থান শনাক্ত করার জরুরি প্রয়োজন হয়।

ঘটনাক্রমউৎসে সংরক্ষিত তথ্যসংরক্ষণের সমস্যাটি কোথায়
ইয়ামামার যুদ্ধকোরআনের পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক মৃত্যুপাঠ বহনকারী মানুষ হারিয়ে যাচ্ছেন
ভবিষ্যৎ যুদ্ধের আশঙ্কাঅন্য যুদ্ধক্ষেত্রেও একই ক্ষতি হতে পারেএখনো জীবিত উৎসের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়
উমরের চিহ্নিত পরিণতিকোরআনের অনেক অংশ চলে যাবেমানুষের মৃত্যুর সঙ্গে পাঠের প্রাপ্যতা যুক্ত
প্রস্তাবিত ব্যবস্থাকোরআন একত্র করার নির্দেশবিচ্ছিন্ন উপকরণকে নতুন সংরক্ষণব্যবস্থায় আনা

সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা এখানে আগের ব্যবস্থার একটি সীমা প্রকাশ করে। পাঠ মুখে শেখানো হচ্ছিল এবং বিভিন্ন স্থানে লেখা ছিল, কিন্তু সেই বণ্টিত অবস্থাকে যুদ্ধের ধারাবাহিক ক্ষতির মুখে যথেষ্ট মনে করা হয়নি। আবু বকরের প্রশাসনকে তাই এমন একটি কাজ নিতে হয়েছে যার প্রয়োজন পাঠকদের মৃত্যু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য নতুন ব্যবস্থা নেওয়া মানে আগের অবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানো।

হাদিসের আশঙ্কাটি ভবিষ্যৎ পরিণতির ভাষায় বলা। “আমি ভয় করছি” থেকে “একত্র করার নির্দেশ দিন”—এই দুটি বাক্যের মধ্যে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের যুক্তি আছে। কোন আয়াতের কতখানি তখন বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল তার তালিকা এই বক্তব্যে নেই; আছে সামনে আরও ক্ষতি হওয়ার নির্দিষ্ট ভয়। সেই ভয়কে ধর্মীয় আস্থা দিয়ে অকার্যকর ঘোষণা করেননি উমর। তিনি আশঙ্কাটিকে কাজের কারণ করেছেন এবং আবু বকরকে বিদ্যমান ব্যবস্থা বদলাতে বলেছেন।

যুদ্ধজয়ের সংবাদে ধর্মগ্রন্থ হারানোর ভয় দেখা দেওয়া ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে। ভূখণ্ড ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব রক্ষার জন্য ব্যবহৃত বাহিনীর ক্ষতি পাঠরক্ষার ভিতও দুর্বল করছিল। শাসনের বিস্তার এবং ধর্মীয় স্মৃতির সংরক্ষণ একে অন্যের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমান গতিতে এগোয়নি। সামরিক প্রয়োজনেই মূল্যবান পাঠক যুদ্ধক্ষেত্রে গেছেন, আর তাঁদের মৃত্যুই নতুন লিখিত সংগ্রহকে জরুরি করেছে।


উমরের প্রস্তাব, আবু বকরের প্রাথমিক আপত্তি ও মুহাম্মদ না-করা কাজের অনুমোদন

উমরের প্রস্তাব শুনেই আবু বকর সংগ্রহ শুরু করেননি। তাঁর প্রথম আপত্তি ছিল কাজটির ধর্মীয় নজির নিয়ে: মুহাম্মদ যে কাজ করেননি, তাঁরা তা করবেন কীভাবে? এই প্রশ্নের মধ্যে সংগ্রহের নতুনত্ব স্বীকার করা আছে। আয়াত লেখা বা মনে রাখার পরিচিত কাজ থেকে একত্রিত সংগ্রহ প্রস্তুতের প্রস্তাবকে তিনি আলাদা করেই বিচার করছেন। তাঁর কাছে শুধু উপযোগিতা থাকলেই বিষয়টি প্রথমে নিষ্পত্তি হয়নি; নবীর কাজের সঙ্গে এর সম্পর্কও নির্ধারণ করতে হয়েছে। [537]

قُلْتُ لِعُمَرَ كَيْفَ تَفْعَلُ شَيْئًا لَمْ يَفْعَلْهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ عُمَرُ هَذَا وَاللَّهِ خَيْرٌ. فَلَمْ يَزَلْ عُمَرُ يُرَاجِعُنِي حَتَّى شَرَحَ اللَّهُ صَدْرِي لِذَلِكَ، وَرَأَيْتُ فِي ذَلِكَ الَّذِي رَأَى عُمَرُ.

বাংলা অনুবাদ: আমি উমরকে বললাম, আল্লাহর রাসুল যা করেননি, এমন কাজ তুমি কীভাবে করবে? উমর বললেন, আল্লাহর শপথ, এটি কল্যাণকর। উমর আমাকে বারবার বলতে থাকলেন, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ এ বিষয়ে আমার অন্তর খুলে দিলেন এবং উমর এতে যা দেখেছিলেন, আমিও তা দেখলাম।

উমরের জবাবে কোনো নির্দিষ্ট পূর্বনির্দেশ উদ্ধৃত হয়নি। তিনি বলেন, কাজটি কল্যাণকর। তারপর পুনঃপুন আলোচনার ফলে আবু বকরের সিদ্ধান্ত বদলায়। নিজের মতপরিবর্তনকে আবু বকর আল্লাহর অন্তর খুলে দেওয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন; সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর দৃশ্যমান ঘটনাক্রম হলো প্রস্তাব, আপত্তি, তাগিদ এবং সম্মতি। এভাবে ব্যবহারিক প্রয়োজনের বিচার এমন একটি নতুন কাজের অনুমোদন দেয়, যার অনুপস্থিত নববি নজির প্রথমে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

যায়েদকেও দায়িত্ব দেওয়ার পরে একই আপত্তি পুনরায় উঠেছে। তিনি জানতে চান, মুহাম্মদ না-করা কাজ তাঁরা কীভাবে করবেন। আবু বকর তখন উমরের আগের অবস্থান গ্রহণ করে কল্যাণের যুক্তি দেন এবং যায়েদকে বোঝাতে থাকেন। একই প্রস্তাব নিয়ে দুই পর্যায়ে আপত্তি ওঠা দেখায়, উদ্যোগটি সকলের কাছে আগে থেকে নির্ধারিত একটি নির্দেশের সরল বাস্তবায়ন ছিল না। দায়িত্ব গ্রহণের আগে সংগ্রাহককেও সিদ্ধান্তটির গ্রহণযোগ্যতা মেনে নিতে হয়েছে। [538]

قُلْتُ كَيْفَ تَفْعَلُونَ شَيْئًا لَمْ يَفْعَلْهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ هُوَ وَاللَّهِ خَيْرٌ فَلَمْ يَزَلْ أَبُو بَكْرٍ يُرَاجِعُنِي حَتَّى شَرَحَ اللَّهُ صَدْرِي لِلَّذِي شَرَحَ لَهُ صَدْرَ أَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ.

বাংলা অনুবাদ: আমি বললাম, আল্লাহর রাসুল যা করেননি, এমন কাজ আপনারা কীভাবে করবেন? তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ, এটি কল্যাণকর। আবু বকর আমাকে বারবার বলতে থাকলেন, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ আমার অন্তরও সে বিষয়ে খুলে দিলেন, যে বিষয়ে আবু বকর ও উমরের অন্তর খুলে দিয়েছিলেন।

আবু বকর যে প্রশ্ন উমরকে করেছিলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি পরে সেটিই তাঁকে করছেন। অনুমোদন তাই একটি ধারাবাহিক সামাজিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে। উমরের প্রস্তাবকে গ্রহণ করার পরে আবু বকর আর শুধু বিচারাধীন প্রস্তাবের শ্রোতা নন; তিনি তার বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ। যায়েদের আপত্তির মুখে কাজটির পক্ষে যুক্তি দেওয়ার দায়িত্বও তাঁর হয়েছে। ধর্মগ্রন্থের সংগ্রহ এভাবে একাধিক ব্যক্তির বিবেচনা ও সম্মতির মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পরিণত হয়।

পর্যায়আপত্তি বা প্রস্তাবপরবর্তী পরিবর্তন
উমর আবু বকরকে বলেনপাঠ হারানোর ভয় থেকে সংগ্রহের নির্দেশের প্রস্তাবসংরক্ষণের নতুন ব্যবস্থা আলোচনায় আসে
আবু বকরের প্রথম প্রতিক্রিয়ামুহাম্মদ কাজটি করেননিনজিরের প্রশ্নে উদ্যোগ থেমে থাকে
উমরের অব্যাহত তাগিদকাজটি কল্যাণকরআবু বকর সম্মত হন
যায়েদের প্রতিক্রিয়াএকই নজির-সংক্রান্ত আপত্তিআবু বকরের তাগিদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন

ইবনে বাত্তাল এই ইতস্তত করার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন নবীর চেয়ে বেশি ধর্মরক্ষার উদ্যোগ নেওয়ার অবস্থানে নিজেদের বসাতে অনীহা দিয়ে। উমর তাঁদের ভবিষ্যৎ ক্ষতির সম্ভাবনা বোঝালে তাঁরা তাঁর সিদ্ধান্তে ফেরেন। ইবনে হাজার এই ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করেছেন। [539]

إِنَّمَا نَفَرَ أَبُو بَكْرٍ أَوَّلًا ثُمَّ زَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ ثَانِيًا لِأَنَّهُمَا لَمْ يَجِدَا رَسُولَ اللَّهِ ـ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ـ فَعَلَهُ، فَكَرِهَا أَنْ يُحِلَّا أَنْفُسَهُمَا مَحَلَّ مَنْ يَزِيدُ احْتِيَاطُهُ لِلدِّينِ عَلَى احْتِيَاطِ الرَّسُولِ فَلَمَّا نَبَّهَهُمَا عُمَرُ عَلَى فَائِدَةِ ذَلِكَ وَأَنَّهُ خَشْيَةَ أَنْ يَتَغَيَّرَ الْحَالُ فِي الْمُسْتَقْبَلِ إِذَا لَمْ يُجْمَعِ الْقُرْآنُ فَيَصِيرُ إِلَى حَالَةِ الْخَفَاءِ بَعْدَ الشُّهْرَةِ، رَجَعَا إِلَيْهِ.

বাংলা অনুবাদ: প্রথমে আবু বকর, পরে যায়েদ ইবনে সাবিত আপত্তি করেছিলেন, কারণ তাঁরা আল্লাহর রাসুলকে কাজটি করতে দেখেননি। তাঁরা নিজেদের এমন ব্যক্তির অবস্থানে বসাতে চাননি, যার ধর্মরক্ষার সতর্কতা রাসুলের সতর্কতার চেয়ে বেশি। উমর যখন তাঁদের কাজটির উপকারিতা এবং কোরআন একত্র না-করলে ভবিষ্যতে অবস্থা বদলে গিয়ে পরিচিত থাকার পরে তা অজ্ঞাত হয়ে পড়ার আশঙ্কা বোঝালেন, তখন তাঁরা তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।

এই ব্যাখ্যায় অতীতের অনুসরণ এবং ভবিষ্যতের ক্ষতি ঠেকানো দুই ধরনের প্রয়োজন হিসেবে উপস্থিত। প্রথমটি বিদ্যমান নজিরের দিকে তাকায়, দ্বিতীয়টি নজির না-থাকা নতুন পরিস্থিতির দিকে। গ্রন্থরক্ষার জন্য তাঁরা দ্বিতীয় প্রয়োজন অনুসারে কাজ নিয়েছেন। তখন ধর্মীয় চর্চার অনুমোদন কেবল মুহাম্মদের আগে করা কাজের অনুলিপি হয়ে থাকে না; নতুন প্রয়োজন সম্পর্কে অনুসারীদের মূল্যায়নও কাজের সীমা নির্ধারণ করে। পরবর্তী আইনতত্ত্ব সেই সিদ্ধান্তকে গ্রহণযোগ্য ইজতিহাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করে।

আধুনিক ইসলামকিউএ একই উদ্যোগকে বিদআত না-বলে সুন্নাহ বলেছে এবং এর ভিত্তি হিসেবে খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাহ অনুসরণের সাধারণ নির্দেশ ব্যবহার করেছে। এখানে আবু বকরের কাজের অনুমোদন খলিফার সিদ্ধান্তের মর্যাদার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। [540]

وأما ما ذكرت من جمع أبي بكر للقرآن فليس ببدعة بل هو سنة

বাংলা অনুবাদ: আবু বকরের কোরআন সংগ্রহ সম্পর্কে যা উল্লেখ করেছ, সেটি বিদআত নয়; বরং সুন্নাহ।

বুখারির ঘটনাক্রম এবং পরের এই শ্রেণিবিভাগ ভিন্ন ধরনের তথ্য দেয়। ঘটনাক্রম জানায় কেন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ও কারা মতবদল করেছিলেন; শ্রেণিবিভাগ জানায় পরবর্তী ধর্মীয় কর্তৃত্ব কাজটিকে কী মর্যাদা দিয়েছে। পরে সুন্নাহ বলা হওয়ার ফলে প্রথম আপত্তি, আলোচনার প্রয়োজন কিংবা কল্যাণবোধের ভূমিকা মুছে যায় না। বরং খলিফার নতুন সিদ্ধান্ত কীভাবে ধর্মীয় অনুসরণের মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারে, তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায়।

সংগ্রহের ইতিহাসে আবু বকর ও উমরের ভূমিকা তাই নিছক প্রস্তুত নির্দেশ বহন করার মধ্যে শেষ হয় না। তাঁরা প্রয়োজন চিহ্নিত করেছেন, মুহাম্মদের না-করা কাজের বৈধতা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তগুলোর কোনোটি আগে থেকেই সাজানো সহিফার নিজের পাতা থেকে বের হয়ে আসেনি। শাসনক্ষমতার অধিকারীরা নতুন ব্যবস্থার প্রয়োজন ও কর্তব্য নির্ধারণ করার পরেই সেই ব্যবস্থার লিখিত ফল তৈরি হয়েছে।


যায়েদকে দায়িত্ব দেওয়া এবং সংগ্রহের উপকরণ

সংগ্রহের জন্য যায়েদ ইবনে সাবিতকে বেছে নেওয়ার কারণ আবু বকরের বক্তব্যেই আছে। তিনি তরুণ, বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন ও সন্দেহমুক্ত ব্যক্তি; আগে মুহাম্মদের জন্য ওহি লিখতেন। দায়িত্ব দেওয়ার ভাষা “অনুসন্ধান করো এবং একত্র করো”। এর মধ্যে কাজটির দুটি অংশ রয়েছে: আগে উপকরণের অবস্থান খুঁজে বের করতে হবে, তারপর সেগুলো একটি সংগ্রহে আনতে হবে। আগের লেখক হিসেবে পরিচয় তাঁকে দায়িত্বের যোগ্য করেছে, কিন্তু তাঁর হাতে আগে থেকেই একত্রিত চূড়ান্ত গ্রন্থ থাকলে যে অনুসন্ধান প্রয়োজন হতো না, দায়িত্বের ভাষায় সেই অনুসন্ধানই স্পষ্টভাবে চাওয়া হয়েছে। [541]

إِنَّكَ رَجُلٌ شَابٌّ عَاقِلٌ لاَ نَتَّهِمُكَ، وَقَدْ كُنْتَ تَكْتُبُ الْوَحْىَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَتَتَبَّعِ الْقُرْآنَ فَاجْمَعْهُ.

বাংলা অনুবাদ: তুমি একজন তরুণ ও বুদ্ধিমান মানুষ; আমরা তোমাকে সন্দেহ করি না। তুমি আল্লাহর রাসুলের জন্য ওহি লিখতে। সুতরাং কোরআন অনুসন্ধান করে তা একত্র করো।

ইবনে হাজার এই যোগ্যতাগুলোকে চারটি পৃথক বৈশিষ্ট্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তারুণ্য কাজের শক্তি, বিচারবুদ্ধি বিষয় আয়ত্ত করার ক্ষমতা, সন্দেহমুক্ততা আস্থা এবং ওহি লেখার অভিজ্ঞতা পূর্বপরিচিত দক্ষতা দেয়। তাঁর ব্যাখ্যা কার্যত একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত সংগ্রাহকের প্রয়োজনীয় গুণের তালিকা। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির নির্বাচন কীভাবে করা হয়েছিল, তা জানা যায় এই মূল্যায়ন থেকে। [542]

ذَكَرَ لَهُ أَرْبَعَ صِفَاتٍ مُقْتَضِيَةٍ خُصُوصِيَّتَهُ بِذَلِكَ: كَوْنُهُ شَابًّا فَيَكُونُ أَنْشَطَ لِمَا يُطْلَبُ مِنْهُ، وَكَوْنُهُ عَاقِلًا فَيَكُونُ أَوْعَى لَهُ، وَكَوْنُهُ لَا يُتَّهَمُ فَتَرْكَنُ النَّفْسُ إِلَيْهِ، وَكَوْنُهُ كَانَ يَكْتُبُ الْوَحْيَ فَيَكُونُ أَكْثَرَ مُمَارَسَةً لَهُ.

বাংলা অনুবাদ: তাঁর চারটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে, যা এই দায়িত্বের জন্য তাঁর বিশেষ উপযুক্ততা বোঝায়: তিনি তরুণ, ফলে চাওয়া কাজের জন্য অধিক সক্রিয় হবেন; বুদ্ধিমান, ফলে বিষয়টি ভালোভাবে আয়ত্ত করবেন; তাঁকে সন্দেহ করা হয় না, ফলে তাঁর ওপর আস্থা রাখা যায়; এবং আগে ওহি লিখতেন, ফলে এ কাজে তাঁর অভিজ্ঞতা বেশি।

যায়েদ নিজের ওপর কাজটির ভার বোঝাতে পাহাড় সরানোর তুলনা করেছেন। এটি তাঁর অনুভূত দায়ের বর্ণনা। শুধু পরিচিত কিছু বাক্য সুন্দর করে লিখে দেওয়ার সামান্য কাজ হিসেবে দায়িত্বটি তিনি দেখেননি। সংগ্রহের পূর্ণতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং ভুল হলে তার পরিণতি নিয়ে দায়িত্ববোধই তাঁর উক্তিতে তীব্র হয়ে উঠেছে। [543]

فَوَاللَّهِ لَوْ كَلَّفُونِي نَقْلَ جَبَلٍ مِنَ الْجِبَالِ مَا كَانَ أَثْقَلَ عَلَىَّ مِمَّا أَمَرَنِي مِنْ جَمْعِ الْقُرْآنِ.

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর শপথ, তাঁরা আমাকে কোনো পাহাড় সরানোর দায়িত্ব দিলেও তা আমার কাছে কোরআন একত্র করার এই দায়িত্বের চেয়ে ভারী হতো না।

অনুসন্ধানের উপকরণ সম্পর্কে বুখারির দুটি রূপে কিছু শব্দপার্থক্য আছে। একটি রূপে খেজুরের ডাঁটা, পাতলা পাথর ও মানুষের বুকের কথা আছে। আরেক রূপে লেখার টুকরা, কাঁধের হাড়, খেজুরের ডাঁটা ও মানুষের বুক এসেছে। এই বিবরণে লিখিত বস্তু এবং জীবিত মানুষের স্মৃতি দুটিই উপাদান হিসেবে উপস্থিত। যায়েদকে শুধু একটি পূর্বপ্রস্তুত গ্রন্থের কপি করতে বলা হয়নি; তিনি বিভিন্ন ধরনের উপকরণ অনুসরণ করেছেন। [544] [545]

فَقُمْتُ فَتَتَبَّعْتُ الْقُرْآنَ أَجْمَعُهُ مِنَ الرِّقَاعِ وَالأَكْتَافِ وَالْعُسُبِ وَصُدُورِ الرِّجَالِ

বাংলা অনুবাদ: আমি উঠে কাজে লাগলাম এবং লেখার টুকরা, কাঁধের হাড়, খেজুরের ডাঁটা ও মানুষের স্মৃতি থেকে কোরআন অনুসন্ধান করে একত্র করতে থাকলাম।

এই বস্তুগুলোর নামের ব্যাখ্যা সুয়ূতি সংকলন করেছেন। খেজুরের ডাঁটার প্রশস্ত অংশে লেখা হতো; “লিখাফ” বলতে পাতলা পাথর বোঝানো হয়েছে; “রিকাআ” চামড়া, লেখার উপযোগী পাতলা আবরণ বা কাগজের টুকরা হতে পারে। কাঁধের হাড় শুকিয়ে তাতে লেখার কথাও আছে। বিভিন্ন বস্তুর উল্লেখ থেকে এক ধরনের অভিন্ন পাতা, একই মাপের খাতা বা একই ব্যক্তির সংরক্ষণাগারের ছবি পাওয়া যায় না। বরং লেখার ভৌত উপকরণও বিচিত্র ছিল। [546]

وَاللِّخَافُ بِكَسْرِ اللَّامِ وَبِخَاءٍ مُعْجَمَةٍ خَفِيفَةٍ آخِرُهُ فَاءٌ: جَمْعُ لَخْفَةٍ بِفَتْحِ اللَّامِ وَسُكُونِ الْخَاءِ وَهِيَ الْحِجَارَةُ الدِّقَاقُ، وَقَالَ الْخَطَّابِيُّ: صَفَائِحُ الْحِجَارَةِ. وَالرِّقَاعُ: جَمْعُ رُقْعَةٍ وَقَدْ تَكُونُ من جلد أو رق أَوْ كَاغِدٍ وَالْأَكْتَافُ جَمَعَ كَتِفٍ وَهُوَ الْعَظْمُ الَّذِي لِلْبَعِيرِ أَوِ الشَّاةِ كَانُوا إِذَا جَفَّ كَتَبُوا عليه.

বাংলা অনুবাদ: লিখাফ হলো লাখফা শব্দের বহুবচন; এর অর্থ পাতলা পাথর। খাত্তাবি বলেছেন, পাথরের পাত। রিকাআ হলো রুকআ শব্দের বহুবচন; তা চামড়া, পার্চমেন্ট বা কাগজের হতে পারে। আকতাফ হলো কাতিফের বহুবচন, অর্থাৎ উট বা ভেড়ার কাঁধের হাড়; শুকিয়ে গেলে তাঁরা তাতে লিখতেন।

উপকরণের নামবর্ণিত পরিচয়সংগ্রহে প্রয়োজনীয় কাজ
উসুবখেজুরের ডাঁটা বা তার প্রশস্ত অংশবিচ্ছিন্ন লেখার অবস্থান খুঁজে সংগ্রহ করা
লিখাফপাতলা পাথর বা পাথরের পাতলিখিত পাঠ শনাক্ত ও অন্য উপকরণের সঙ্গে মেলানো
রিকাআচামড়া, পার্চমেন্ট বা কাগজের টুকরাপৃথক ব্যক্তির কাছে থাকা লেখার টুকরা একত্র করা
আকতাফউট বা ভেড়ার কাঁধের হাড়অভিন্ন পাতা নয় এমন বস্তুর লেখা উদ্ধার করা
মানুষের বুকমুখস্থ ও শ্রুত পাঠজীবিত ব্যক্তির কাছ থেকে পাঠ ও সাক্ষ্য নেওয়া

লেখা ও স্মৃতি পাশাপাশি থাকার কারণে সংগ্রহে এক ধরনের উপকরণ অন্যটির কাজ পুরোপুরি করে দিতে পারেনি। স্মৃতি কোনো অংশ মনে করিয়ে দিতে পারে, আর লেখা তার শব্দ ধরে রাখতে পারে; কিন্তু লেখাটি কোথা থেকে এসেছে এবং মুখস্থকারীর শেখার উৎস কী, সে প্রশ্ন দুটির ওপরেই থাকে। ফলে লিখিত বস্তু পাওয়া এবং সেটিকে গ্রহণযোগ্য কোরআনি উপাদান বলে চেনা একই কাজ নয়। উপকরণগুলোর ভৌত অস্তিত্বের পরে তাদের পরিচয় যাচাইয়ের ধাপ দরকার হয়।

উদ্ধৃত বর্ণনার ভাষায় “একত্র করা” একটি ফল, যার আগে আছে “অনুসন্ধান”। শব্দ দুটি বাদ দিয়ে শুধু প্রস্তুত গ্রন্থের উপস্থিতি কল্পনা করলে দায়িত্বের সবচেয়ে শ্রমসাধ্য অংশ অদৃশ্য হয়। খেজুরের ডাঁটা, পাথর বা হাড় কোনো সম্পূর্ণ গ্রন্থের বাঁধাই করা পৃষ্ঠা নয়; বিভিন্ন স্থানে রাখা এসব বস্তুকে একই সংরক্ষণব্যবস্থায় আনার জন্য নির্দিষ্ট মানুষের কাছে পৌঁছাতে হয়েছে।

আবু বকরের বিশ্বাস যায়েদকে নিয়োগের ভিত্তি দিয়েছে। সেই বিশ্বাস প্রতিটি পাওয়া লেখার পরিচয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারণ করেনি। ব্যক্তির সততা এবং তাঁর কাজের পদ্ধতি পৃথক বিষয়। একজন বিশ্বস্ত সংগ্রাহককেও উপকরণ চাইতে, শুনতে, মিলিয়ে দেখতে এবং গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বুখারির ঘটনাক্রমে যোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচন করার পরেই এই অনুসন্ধান শুরু হয়; যোগ্যতা অনুসন্ধানের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি।


দুই সাক্ষীর শর্ত, মুখস্থ পাঠ ও লিখিত দলিলের ব্যবহার

কোনো লিখিত টুকরা পাওয়া গেলেই তা সংগ্রহে ঢুকে যেত—সংকলনবিষয়ক বর্ণনাগুলো এমন পদ্ধতি দেয় না। সুয়ূতি ইবনে আবি দাউদের সূত্রে ইয়াহইয়া ইবনে আবদুর রহমান ইবনে হাতিবের নামে একটি সংবাদ এনেছেন। সেখানে মুহাম্মদের কাছ থেকে কোরআনের কোনো অংশ গ্রহণকারীদের তা নিয়ে আসতে বলা হয় এবং দুই সাক্ষী ছাড়া কিছু গ্রহণ না-করার কথা আছে। উৎস থেকে সংগ্রহে প্রবেশের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্যতার শর্ত কাজ করছে। [547]

وَكَانَ لَا يَقْبَلُ مِنْ أحد شيئا حتى يشهد به شَهِيدَانِ

বাংলা অনুবাদ: তিনি কারও কাছ থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করতেন না, যতক্ষণ না তার পক্ষে দুজন সাক্ষ্য দিতেন।

একই খবরে সহিফা, ফলক ও খেজুরের ডাঁটায় লেখার কথা রয়েছে। ফলে সাক্ষ্য চাওয়া হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থায়, যেখানে বস্তুগত লেখাও উপস্থিত। সাক্ষীর প্রয়োজন লেখার অনুপস্থিতির সমার্থক নয়; পাওয়া লেখার পরিচয় ও প্রামাণিকতা নিয়েও সাক্ষ্যের দরকার হতে পারে। সুয়ূতি এই বিবরণ থেকে লিখিত উপকরণের পাশাপাশি প্রত্যক্ষ শ্রবণকারীর সমর্থনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। [548]

وَأَخْرَجَ ابْنُ أَبِي دَاوُدَ مِنْ طَرِيقِ يَحْيَى بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ حَاطِبٍ قَالَ: قَدِمَ عُمَرُ فَقَالَ: مَنْ كَانَ تَلَقَّى مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَيْئًا مِنَ الْقُرْآنِ فَلْيَأْتِ بِهِ وَكَانُوا يَكْتُبُونَ ذَلِكَ فِي الصُّحُفِ وَالْأَلْوَاحِ وَالْعُسُبِ وَكَانَ لَا يَقْبَلُ مِنْ أحد شيئا حتى يشهد به شَهِيدَانِ

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আবি দাউদ ইয়াহইয়া ইবনে আবদুর রহমান ইবনে হাতিবের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, উমর এসে বললেন, যে আল্লাহর রাসুলের কাছ থেকে কোরআনের কোনো অংশ গ্রহণ করেছে, সে যেন তা নিয়ে আসে। তাঁরা তা সহিফা, ফলক ও খেজুরের ডাঁটায় লিখতেন। দুজন সাক্ষ্য না-দেওয়া পর্যন্ত তিনি কারও কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করতেন না।

আরেকটি সংবাদে আবু বকর উমর ও যায়েদকে মসজিদের দরজায় বসতে বলেছেন। কেউ আল্লাহর কিতাবের কোনো অংশের পক্ষে দুই সাক্ষী আনলে তা লিখতে বলা হয়েছে। এই সংবাদ উরওয়া ইবনে যুবাইরের নামে এসেছে। সুয়ূতি বর্ণনাপথের ব্যক্তিদের বিশ্বস্ত বলার পাশাপাশি ধারার বিচ্ছিন্নতাও উল্লেখ করেছেন। সংবাদটি পরবর্তী প্রজন্মে সংরক্ষিত সংগ্রহপদ্ধতির একটি বিবরণ; ঘটনাস্থলের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষ্যতালিকা এর সঙ্গে নেই। [549]

وَأَخْرَجَ ابْنُ أَبِي دَاوُدَ أَيْضًا مِنْ طَرِيقِ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ عَنْ أَبِيهِ أَنَّ أَبَا بَكْرٍ قَالَ لِعُمَرَ وَلِزَيْدٍ: اقْعُدَا عَلَى بَابِ الْمَسْجِدِ فَمَنْ جَاءَكُمَا بِشَاهِدَيْنِ عَلَى شَيْءٍ مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَاكْتُبَاهُ. رِجَالُهُ ثِقَاتٌ مَعَ انْقِطَاعِهِ.

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আবি দাউদ হিশাম ইবনে উরওয়া, তাঁর পিতার সূত্রেও বর্ণনা করেছেন, আবু বকর উমর ও যায়েদকে বলেছিলেন, মসজিদের দরজায় বসো; যে তোমাদের কাছে আল্লাহর কিতাবের কোনো অংশের পক্ষে দুই সাক্ষী নিয়ে আসবে, তা লিখে নাও। এর বর্ণনাকারীরা বিশ্বস্ত, যদিও বর্ণনাপথ বিচ্ছিন্ন।

এই বিবরণে সাক্ষ্য শর্তের অংশ; কিন্তু “দুই সাক্ষী” ঠিক কীসের সাক্ষ্য দেবেন, তা নিয়ে পরের ব্যাখ্যায় একাধিক অর্থ পাওয়া যায়। ইবনে হাজার মুখস্থ পাঠ ও লিখিত দলিলকেই দুই সাক্ষ্য হিসেবে ধরার সম্ভাবনা তুলেছেন। আরেক ব্যাখ্যায় দুজন মানুষ সাক্ষ্য দেবেন যে লেখাটি মুহাম্মদের সামনে তৈরি হয়েছিল। তৃতীয়টিতে সাক্ষ্য হবে পাঠটি অনুমোদিত অবতরণরূপগুলোর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়ে। একই শব্দবন্ধ থেকে গ্রহণপদ্ধতির ভিন্ন রূপ তৈরি হচ্ছে। [550]

وَكَأَنَّ الْمُرَادَ بِالشَّاهِدَيْنِ الْحِفْظُ وَالْكِتَابُ، أَوِ الْمُرَادُ أَنَّهُمَا يَشْهَدَانِ عَلَى أَنَّ ذَلِكَ الْمَكْتُوبَ كُتِبَ بَيْنَ يَدَيْ رَسُولِ اللَّهِ ـ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ـ أَوِ الْمُرَادُ أَنَّهُمَا يَشْهَدَانِ عَلَى أَنَّ ذَلِكَ مِنَ الْوُجُوهِ الَّتِي نَزَلَ بِهَا الْقُرْآنُ.

বাংলা অনুবাদ: সম্ভবত দুই সাক্ষী বলতে মুখস্থ পাঠ ও লিখিত দলিল বোঝানো হয়েছে। অথবা উদ্দেশ্য হলো, তাঁরা দুজন সাক্ষ্য দেবেন যে লেখাটি আল্লাহর রাসুলের সামনে লেখা হয়েছিল। অথবা তাঁরা সাক্ষ্য দেবেন যে পাঠটি কোরআনের অবতীর্ণ রূপগুলোর অন্তর্ভুক্ত।

ব্যাখ্যাদুই সাক্ষ্যের পরিচয়যা যাচাই করা হচ্ছে
মুখস্থ ও লিখনএকটি স্মৃতিতে থাকা পাঠ, অন্যটি লিখিত দলিলশব্দের মিল ও দুই ধরনের উপকরণের সমর্থন
দুজন প্রত্যক্ষ সাক্ষীদুজন মানুষ লেখার ঘটনাটি জানেনমুহাম্মদের সামনে লেখাটি তৈরি হয়েছিল কি না
অনুমোদিত পাঠের সাক্ষ্যদুজন মানুষ পাঠরূপের স্বীকৃতির সাক্ষ্য দেনকোন রূপটি অবতীর্ণ পাঠের অন্তর্ভুক্ত
সুয়ূতির অতিরিক্ত সম্ভাবনামৃত্যুর বছরের উপস্থাপনা সম্পর্কে সাক্ষ্যশেষ পর্যায়ের পঠিত অবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক

শেষ ব্যাখ্যাটির পাশে সুয়ূতি নিজের আরেকটি সম্ভাবনা রেখেছেন: সাক্ষ্য হবে পাঠটি মুহাম্মদের মৃত্যুর বছরে তাঁর কাছে উপস্থাপিত হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে। এই প্রস্তাবে শুধু উৎসের পরিচয় নয়, পাঠের সময়গত অবস্থাও গ্রহণের মানদণ্ড হয়ে ওঠে। কোনো বাক্য আগে কোরআন হিসেবে প্রচারিত হয়েছিল কি না এবং শেষ সময়ে সেটি বহাল ছিল কি না—দুটি প্রশ্ন তখন আলাদা করে উপস্থিত। [551]

قُلْتُ: أَوِ الْمُرَادُ أَنَّهُمَا يَشْهَدَانِ عَلَى أَنَّ ذَلِكَ مِمَّا عُرِضَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَامَ وَفَاتِهِ كَمَا يُؤْخَذُ مِمَّا تَقَدَّمَ آخِرُ النَّوْعِ السَّادِسَ عَشَرَ.

বাংলা অনুবাদ: আমি বলি, অথবা উদ্দেশ্য হলো, তাঁরা সাক্ষ্য দেবেন যে সেটি নবীর মৃত্যুর বছরে তাঁর কাছে উপস্থাপিত বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্ত; আগের ষোড়শ প্রকারের শেষের আলোচনা থেকে যেমন বোঝা যায়।

এই চার অর্থের পরীক্ষা এক নয়। মুখস্থ ও লিখিত শব্দ মিলে গেলেও লেখাটি কখন তৈরি হয়েছে তা আলাদা করে জানতে হতে পারে। দুজন লেখা তৈরির সাক্ষী হলেও সেই পাঠ পরে রহিত হয়েছিল কি না, সেটি সময়সংক্রান্ত আরেক প্রশ্ন। আবার কোনো পাঠ অনুমোদিত রূপের অন্তর্ভুক্ত বলার জন্য তার ভিন্ন শব্দ বা উচ্চারণের স্বীকৃতির পরিচয় দরকার। “দুই সাক্ষী ছিল” বাক্য দিয়ে এই সব ধরনের যাচাই একই সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছিল বলে ধরে নিলে উৎসে থাকা ব্যাখ্যাগত পার্থক্য হারিয়ে যায়।

আবু শামা লিখিত উপকরণের প্রয়োজনের সঙ্গে পাঠভেদের সম্পর্কও যুক্ত করেছেন। ইসলামকিউএ তাঁর আল-মুরশিদুল ওয়াজিজ থেকে উদ্ধৃত করেছে যে, তাঁরা কেবল নিজের স্মৃতি থেকে লিখতে চাননি, কারণ সাত আহরুফের অনুমতির ফলে তাঁদের পাঠ ভিন্ন ছিল। এখানে লেখা বেছে নেওয়ার প্রয়োজন স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার মধ্যে সীমিত নেই; ভিন্নভাবে শেখা পাঠের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনও আছে। [552]

إنما كان قصدهم أن ينقلوا من عين المكتوب بين يدي النبي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ولم يكتبوا من حفظهم؛ لأن قراءتهم كانت مختلفة، لِما أبيح لهم من قراءة القرآن على سبعة أحرف

বাংলা অনুবাদ: তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল নবীর সামনে লেখা মূল উপকরণ থেকেই নকল করা। তাঁরা নিজেদের স্মৃতি থেকে লেখেননি; কারণ সাত আহরুফে কোরআন পড়ার অনুমতি থাকায় তাঁদের পাঠ ভিন্ন ছিল।

এই ব্যাখ্যায় পরিচিত পাঠক হলেই তাঁর প্রতিটি শব্দ সংগ্রহের অভিন্ন রূপ হিসেবে গৃহীত হয় না। একজন একভাবে শিখে থাকতে পারেন, অন্যজন আরেকভাবে। ফলে লেখা, শ্রবণ, অনুমোদন এবং শেষ অবস্থার পরিচয় মেলানোর মধ্যে সংগ্রাহকের বিচার প্রয়োজন হয়। গ্রহণের পদ্ধতি যতই সতর্ক বলে বর্ণিত হোক, সতর্কতার বিষয়টি মানুষের কাজেরই গুণ: কাকে জিজ্ঞেস করা হলো, কী দলিল পাওয়া গেল এবং কোন শর্ত পূরণ হয়েছে বলে গণ্য করা হলো।

লায়স ইবনে সাদের নামে সুয়ূতি যে সংগ্রহবিবরণ এনেছেন, সেখানে সাক্ষ্যের শর্তের সঙ্গে রজমের আয়াত না-লেখার কথাও আছে। ওই সংবাদে উমর একা আসায় তাঁর আনা রজমের আয়াত লেখা হয়নি বলে বলা হয়েছে। সংগ্রহের ঘটনার বহু পরে লায়সের নামে সংরক্ষিত এই বক্তব্য একটি নির্দিষ্ট বর্জনের কারণ সাক্ষীর ঘাটতিতে স্থাপন করে। [553]

وَإِنَّ عُمَرَ أَتَى بِآيَةِ الرَّجْمِ فَلَمْ يَكْتُبْهَا لْأَنَّهُ كَانَ وَحْدَهُ.

বাংলা অনুবাদ: উমর রজমের আয়াত নিয়ে এসেছিলেন; কিন্তু তিনি একা ছিলেন বলে তা লেখা হয়নি।

এখানে গ্রহণের শর্ত বিষয়বস্তু ও বক্তার মর্যাদার ওপরেও কার্যকর হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। উমর ক্ষমতাবান সাহাবি হলেও এক ব্যক্তির বক্তব্য যথেষ্ট গণ্য হয়নি। একই সংগ্রহসাহিত্যে তাওবার শেষাংশ একজনের কাছে পাওয়ার খবর আবার গ্রহণের প্রসঙ্গে এসেছে। এই দুই পরিস্থিতির সম্পর্ক মেলাতে তাই সাক্ষ্য বলতে কী বোঝানো হচ্ছে এবং ব্যক্তির পাশাপাশি আর কী সমর্থন ছিল—এসব প্রশ্ন জরুরি হয়ে ওঠে। লায়সের সংক্ষিপ্ত সংবাদকে বুখারির পূর্ণ বর্ণনার একই স্তরের সরাসরি ঘটনাসাক্ষ্য ধরে নিলে তাদের ভিন্ন উৎস ও ভাষার পরিচয় মুছে যায়।

গ্রহণের ধাপযাচাইয়ের প্রশ্নমানদণ্ডের প্রভাব
উপকরণ উপস্থিত করাকার কাছে কী লেখা বা মুখস্থ আছে?অনুসন্ধানের পরিসর নির্ধারিত হয়
উৎস শনাক্ত করাকার কাছে বা কোথা থেকে পাঠ শেখা হয়েছে?বক্তব্যের প্রত্যক্ষতা বিচার করা হয়
সাক্ষ্য নেওয়াকতজন বা কী ধরনের সমর্থন আছে?গ্রহণের যোগ্যতা নির্ধারিত হয়
চূড়ান্ত অবস্থা বিচারপাঠটি বহাল ও অনুমোদিত কি না?কোন অংশ সংগ্রহে থাকবে তার সীমা তৈরি হয়

সাক্ষ্যপ্রক্রিয়ার গুরুত্ব তাই দ্বিমুখী। একটি দাবি গ্রহণের আগে সমর্থন খোঁজার চেষ্টা আছে; একই সঙ্গে সেই শর্ত পূরণ করতে না-পারা বক্তব্যের জন্য সংগ্রহে প্রবেশের বাধাও আছে। চূড়ান্ত সংগ্রহের পরিসর জানতে হলে শুধু পাওয়া লেখার সংখ্যা নয়, গ্রহণযোগ্য বলে চিহ্নিত করার নিয়মও জানতে হয়। নিয়মটি কে প্রয়োগ করেছেন এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কী সাক্ষ্য পেয়েছেন, সেই তথ্য ছাড়া “সব পাওয়া হয়েছিল” একটি ফলাফলের দাবি হয়ে থাকে; প্রতিটি গ্রহণের দৃশ্যমান দলিল হয়ে ওঠে না।


আবু খুজাইমার কাছে তাওবার শেষ দুই আয়াত পাওয়ার বর্ণনা

যায়েদের অনুসন্ধানের সবচেয়ে নির্দিষ্ট সীমা পাওয়া যায় তাওবার শেষাংশের ঘটনায়। তাঁর বক্তব্যে আবু খুজাইমা আনসারির কাছে অংশটি পাওয়া এবং অন্য কারও কাছে না-পাওয়া পাশাপাশি রয়েছে। এই দুটি তথ্যের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ: সংগ্রহটি শুধু আগে থেকে থাকা সব উপকরণের যান্ত্রিক যোগফল ছিল না; নির্দিষ্ট একটি অংশের জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন হয়েছিল। অনুসন্ধানের ফল সেই ব্যক্তির কাছে থাকা উৎসের ওপর নির্ভর করেছে। [554] [555]

এমনকি আমি সূরা তওবার শেষাংশ আবূ খুযায়মা আনসারী (রাঃ) থেকে সংগ্রহ করলাম। এ অংশটুকু তিনি ব্যতীত আর কারো কাছে আমি পাইনি। আয়াতগুলো হচ্ছে এইঃ তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের কাছে এক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসেছে। তোমাদেরকে যা বিপন্ন করে তা তাঁর জন্য কষ্টদায়ক। সে তোমাদের মঙ্গলকামী, মু’মিনদের প্রতি সে দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। এরপর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তুমি বলো, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই। আমি তাঁরই উপর নির্ভর করি করি এবং তিনি মহান আরশের অধিপতি (১২৮-১২৯)।

কোরআন সংকলন 109

বুখারির কাতিব-সংক্রান্ত অধ্যায়ে ঘটনাটির সংক্ষিপ্ত রূপে “দুই আয়াত” স্পষ্টভাবে আছে। বাংলা অনুবাদেও ১২৮–১২৯ নম্বর আয়াতের বিষয়বস্তু দেওয়া হয়েছে। “শেষাংশ” শব্দটিকে একটি আয়াতে সীমিত করলে এই বর্ণনার নির্দিষ্ট সংখ্যাটি হারিয়ে যায়। [556]

সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫৩/ ফাজায়ীলুল কুরআন
পরিচ্ছদঃ ২৩৯৮. নবী (সাঃ) এর কাতিব
৪৬২৩। ইয়াহ্‌ইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) … যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বকর (রাঃ) আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওহী লিখতে। সুতরাং তুমি কুরআনের আয়াতগুলো অনুসন্ধান কর। এরপর আমি অনুসন্ধান করলাম। শেষ পর্যায়ে সূরা তওবার শেষ দু’টো আয়াত আমি আবূ খুযায়মা আনসারী (রাঃ) এর কাছে পেলাম। তিনি ব্যতীত আর কারো কাছে আমি এর সন্ধান পায়নি। আয়াত দু’টো হচ্ছে এইঃ “তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের কাছে এক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসেছে। তোমাদের যা বিপন্ন করে তা তাঁর জন্য কষ্টদায়ক। সে তোমাদের মঙ্গলকামী, মু’মিনদের প্রতি সে দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। তারপর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তুমি বলবে, আমার জন্য আল্লাহ্‌ই যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ্ নেই। আমি তাঁরই ওপর নির্ভর করি এবং তিনি মহাআরশের অধিপতি”। (৯: ১২৮-১২৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এই সংক্ষিপ্ত আরবি রূপেও অন্য কারও কাছে না-পাওয়ার বাক্য বহাল রয়েছে। দীর্ঘ সংগ্রহবিবরণের বাইরে একই ঘটনাটি আলাদা পরিচ্ছেদে উদ্ধৃত হলেও যায়েদের অনুসন্ধানের এই নির্দিষ্টতা বাদ যায়নি। [557]

فَتَتَبَّعْتُ حَتَّى وَجَدْتُ آخِرَ سُورَةِ التَّوْبَةِ آيَتَيْنِ مَعَ أَبِي خُزَيْمَةَ الأَنْصَارِيِّ لَمْ أَجِدْهُمَا مَعَ أَحَدٍ غَيْرَهُ

বাংলা অনুবাদ: আমি অনুসন্ধান করতে থাকলাম, শেষ পর্যন্ত তাওবা সূরার শেষের দুই আয়াত আবু খুজাইমা আনসারির কাছে পেলাম। তাঁকে ছাড়া অন্য কারও কাছে আয়াত দুটি পাইনি।

ইবনে হাজার “পাইনি” কথাটিকে লিখিতভাবে না-পাওয়া অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর সিদ্ধান্তে যায়েদ মুখস্থ জ্ঞান থাকলেই লিখিত অনুসন্ধান বন্ধ করতেন না। এই ব্যাখ্যায় নির্দিষ্ট উৎসটির গুরুত্ব কমে না; গুরুত্বের ধরন নির্দিষ্ট হয়। স্মৃতিতে বা শ্রবণে পাঠ থাকা সত্ত্বেও সংগ্রহের জন্য চাওয়া লিখিত উপকরণটি ওই ব্যক্তির কাছে পাওয়া গেছে। [558]

قَوْلُهُ: لَمْ أَجِدْهَا مَعَ أَحَدٍ غَيْرِهِ، أَيْ مَكْتُوبَةً، لِمَا تَقَدَّمَ مِنْ أَنَّهُ كَانَ لَا يَكْتَفِي بِالْحِفْظِ دُونَ الْكِتَابَةِ.

বাংলা অনুবাদ: “তাঁকে ছাড়া অন্য কারও কাছে পাইনি” কথার অর্থ লিখিতভাবে পাইনি; কারণ আগে বলা হয়েছে, লিখিত উপকরণ ছাড়া তিনি শুধু মুখস্থের ওপর সন্তুষ্ট থাকতেন না।

হাদিসের বাক্যে “মাকতুবা” বা লিখিত শব্দটি নেই; লিখিত অনুসন্ধানের নিয়মের সঙ্গে মেলাতে ইবনে হাজার সেটি ব্যাখ্যায় যুক্ত করেছেন। এর ফলে দুটি স্তর দেখা যায়। যায়েদ অনুসন্ধানের ফল জানিয়েছেন; পরবর্তী ভাষ্যকার গ্রহণপদ্ধতি ও অন্য তথ্যের সাহায্যে সেই ফলের পরিসর নির্ধারণ করেছেন। ব্যাখ্যাটি গ্রহণ করলে প্রশ্ন হয়, কাঙ্ক্ষিত লিখিত উপকরণ আর কার কাছে ছিল এবং কেন সংগ্রহকারীর অনুসন্ধানে তা পাওয়া গেল না। লিখন থাকা এবং সংগ্রহকারীর পক্ষে সেই লিখন উদ্ধার করা এক ঘটনা নয়।

লিখিত উপকরণকে শর্ত হিসেবে নেওয়ার মধ্যে একটি বাস্তব দুর্বলতা রয়ে যায়: একটি পরিচিত পাঠের জন্য গ্রহণযোগ্য লেখা অল্প মানুষের কাছে থাকতে পারে। বহু মানুষের ধর্মীয় অনুশীলন একটি নির্দিষ্ট দলিলের বহু অনুলিপি থাকার নিশ্চয়তা দেয় না। মুখস্থকারীর সঙ্গে লিখিত উপকরণের মালিকের সম্পর্কও অভিন্ন নয়। যায়েদ নিজের হাতে প্রতিটি আয়াতের আগের লেখা রাখতে পারলে এ অনুসন্ধানের প্রয়োজন থাকত না; তাঁর দায়িত্বের মধ্যেই অন্যের কাছে থাকা উপাদান চাইতে হয়েছে।

প্রশ্নবর্ণনা বা ব্যাখ্যায় পাওয়া উত্তরযে নির্ভরতা স্পষ্ট হয়
কোন অংশ পাওয়া যায়?তাওবা ৯:১২৮–১২৯সূরার নির্দিষ্ট শেষাংশের পরিচয়
কার কাছে পাওয়া যায়?বুখারির নির্বাচিত রূপে আবু খুজাইমা আনসারিব্যক্তিবিশেষের কাছে থাকা উৎস
অন্যদের কাছে অনুসন্ধানের ফল কী?যায়েদ বলেন, অন্য কারও কাছে পাননিপাওয়া উপকরণের পরিসর সীমিত
ইবনে হাজার কীভাবে ব্যাখ্যা করেন?লিখিতভাবে অন্যের কাছে পাওয়া যায়নিগ্রহণযোগ্য লিখনকে পৃথক শর্ত ধরা হয়

ব্যক্তির পরিচয় নিয়েও বর্ণনান্তর রয়েছে। ইবনে হাজার দেখিয়েছেন, কোনো রূপে আবু খুজাইমা, কোনো রূপে খুজাইমা এবং কোনো রূপে দুটির মধ্যে সংশয় এসেছে। তাঁর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত পরিচয় তাওবার ঘটনায় আবু খুজাইমা এবং আহযাবের ঘটনায় খুজাইমা। অতএব নামে মিল থাকলেও দুই ঘটনার ব্যক্তিকে এক করে নিলে বর্ণনার নিজস্ব পার্থক্য নষ্ট হয়। [559]

فَمِنْ قَائِلٍ «مَعَ خُزَيْمَةَ» وَمِنْ قَائِلٍ «مَعَ أَبِي خُزَيْمَةَ» وَمِنْ شَاكٍّ فِيهِ يَقُولُ «خُزَيْمَةُ أَوْ أَبِي خُزَيْمَةَ» وَالْأَرْجَحُ أَنَّ الَّذِي وُجِدَ مَعَهُ آخِرُ سُورَةِ التَّوْبَةِ أَبُو خُزَيْمَةَ بِالْكُنْيَةِ، وَالَّذِي وُجِدَ مَعَهُ الْآيَةُ مِنَ الْأَحْزَابِ خُزَيْمَةُ.

বাংলা অনুবাদ: কেউ বলেছেন, খুজাইমার কাছে; কেউ বলেছেন, আবু খুজাইমার কাছে; কেউ সংশয় করে বলেছেন, খুজাইমা অথবা আবু খুজাইমা। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মত হলো, তাওবার শেষাংশ যাঁর কাছে পাওয়া গিয়েছিল, তিনি আবু খুজাইমা উপনামে পরিচিত; আর আহযাবের আয়াত যাঁর কাছে পাওয়া গিয়েছিল, তিনি খুজাইমা।

খুজাইমা ইবনে সাবিতের একজনের সাক্ষ্যকে দুজনের সমান গণ্য করার প্রসঙ্গ আহযাবের বর্ণনায় এসেছে। তাওবার ঘটনায় শুধু “আবু খুজাইমা” নাম দেখে একই সাক্ষ্যমর্যাদা প্রয়োগ করলে ব্যক্তির পরিচয় নির্ধারণের ধাপটি বাদ পড়ে। লায়সের নামে তাওবার সঙ্গে খুজাইমা ও দুই সাক্ষ্যের মর্যাদা যুক্ত করার ভিন্ন খবরও রয়েছে। এই বর্ণনান্তরগুলো সংগ্রহপদ্ধতির পরবর্তী ব্যাখ্যায় প্রভাব ফেলেছে; একটি নিয়মের ব্যতিক্রমকে কোন ঘটনায় প্রয়োগ করা হবে, তা নামের পরিচয়ের ওপরও নির্ভর করছে।

তাওবার শেষাংশ সম্পর্কে আরেক সংবাদের অংশ ইবনে হাজার ইবনে আবি দাউদের সূত্রে উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে হারিস ইবনে খুজাইমা আয়াত দুটি এনে শোনার সাক্ষ্য দেন, আর উমরও শোনার কথা স্বীকার করেন। এই রূপে নির্দিষ্ট ব্যক্তির আনা পাঠের সঙ্গে আরেক ব্যক্তির শ্রবণসমর্থন আছে। [560]

أَتَى الْحَارِثُ بْنُ خُزَيْمَةَ بِهَاتَيْنِ الْآيَتَيْنِ، مِنْ آخِرِ سُورَةِ بَرَاءَةَ فَقَالَ: أَشْهَدُ أَنِّي سَمِعْتُهُمَا مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ـ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ـ وَوَعَيْتُهُمَا، فَقَالَ عُمَرُ: وَأَنَا أَشْهَدُ لَقَدْ سَمِعْتُهُمَا.

বাংলা অনুবাদ: হারিস ইবনে খুজাইমা বারাআত সূরার শেষের আয়াত দুটি এনে বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহর রাসুলের কাছে তা শুনেছি এবং মনে রেখেছি। উমর বললেন, আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি, আমি আয়াত দুটি শুনেছি।

এই রূপটিকে ইবনে হাজার বুখারির প্রতিবেদনের সঙ্গে মেলাতে শর্তযুক্ত সম্ভাবনা তুলেছেন—প্রথম লিখনের সময়ে পাওয়া এবং পরে আরেকজনের আসা, অথবা আবু খুজাইমার নামই হারিস হওয়া। সমন্বয়ের প্রয়োজনটি তৈরি হয়েছে সংরক্ষিত বিবরণের ব্যক্তিনাম ও ঘটনাক্রমের পার্থক্য থেকে। পরবর্তী ভাষ্যে পাওয়া বাড়তি সাক্ষ্য বুখারির সংক্ষিপ্ত বাক্যের মধ্যেই আগে থেকে লেখা ছিল না; অন্য বর্ণনা এনে তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে।

দীর্ঘ ও সংক্ষিপ্ত বুখারি-পাঠ দুটিই যায়েদের বক্তব্যের ধারায় এসেছে; বহু পরিচ্ছেদে প্রকাশিত হওয়ার কারণে এগুলো বহু স্বাধীন প্রত্যক্ষদর্শীর অনুসন্ধান হয়ে যায় না। বুখারির ৪৯৮৬ নম্বরে ইব্রাহিম ইবনে সাদের পথ এবং ৪৯৮৯ নম্বরে ইউনুসের পথ যুহরি, ইবনুস সাব্বাক ও যায়েদের কাছে মিলিত হয়েছে। সংরক্ষিত শব্দের একাধিক রূপ পাওয়া যায়, কিন্তু অনুসন্ধানের মূল কর্তা একই ব্যক্তি। তাঁর পাওয়া ও না-পাওয়ার নির্দিষ্ট বিবরণই এই ঘটনার কেন্দ্রে থাকে।


আবু বকর থেকে উমর এবং উমর থেকে হাফসার কাছে সহিফা

সংগ্রহ শেষ হওয়ার পরে সহিফাগুলো কার কাছে ছিল, বুখারির বর্ণনা তার একটি সরল ক্রম দিয়েছে। আবু বকরের মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর কাছে, তারপর উমরের জীবদ্দশায় তাঁর কাছে এবং পরে উমরের কন্যা হাফসার কাছে ছিল। এই পরিচয় শুধু মালিকের নামের তালিকা নয়; সংরক্ষিত সংগ্রহের ব্যবহারিক নিয়ন্ত্রণ কোথায় ছিল, তার তথ্য। পরবর্তী সংগ্রাহককে পাঠের পাশাপাশি সেই উপকরণে প্রবেশের পথও খুঁজতে হয়েছে। [561]

فَكَانَتِ الصُّحُفُ عِنْدَ أَبِي بَكْرٍ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللَّهُ ثُمَّ عِنْدَ عُمَرَ حَيَاتَهُ ثُمَّ عِنْدَ حَفْصَةَ بِنْتِ عُمَرَ ـ رضى الله عنه ـ.

বাংলা অনুবাদ: সহিফাগুলো আবু বকরের মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর কাছে ছিল। তারপর উমরের জীবদ্দশায় তাঁর কাছে এবং পরে উমরের কন্যা হাফসার কাছে ছিল।

প্রথম দুই সংরক্ষক রাষ্ট্রের খলিফা, তৃতীয় সংরক্ষক আগের খলিফার কন্যা এবং মুহাম্মদের স্ত্রী। উমরের পরে সংগ্রহটি নতুন খলিফার কাছে সরাসরি যাওয়ার বদলে হাফসার কাছে থেকে যায়। ইবনে হাজার এর কারণ হিসেবে হাফসাকে উমরের ওসিয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বলেছেন। সে ব্যাখ্যায় পারিবারিক হেফাজত এবং পরবর্তী রাষ্ট্রীয় ব্যবহারের মধ্যে নির্দিষ্ট সংযোগ তৈরি হয়। [562]

وَإِنَّمَا كَانَ ذَلِكَ عِنْدَ حَفْصَةَ لِأَنَّهَا كَانَتْ وَصِيَّةَ عُمَرَ، فَاسْتَمَرَّ مَا كَانَ عِنْدَهُ عِنْدَهَا حَتَّى طَلَبَهُ مِنْهَا مَنْ لَهُ طَلَبُ ذَلِكَ.

বাংলা অনুবাদ: সহিফাগুলো হাফসার কাছে ছিল, কারণ তিনি উমরের ওসিয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। উমরের কাছে যা ছিল, তা তাঁর কাছেই থেকে যায়; পরে তা চাওয়ার অধিকারী ব্যক্তি তাঁর কাছে সেটি চান।

সংরক্ষক বা ব্যবহারকারীবর্ণিত অবস্থানপরবর্তী ধাপ
আবু বকরসংগ্রহের উদ্যোগদাতা খলিফার কাছে সহিফামৃত্যুর পরে উমরের কাছে যায়
উমরদ্বিতীয় খলিফার জীবদ্দশায় হেফাজতপরে কন্যা হাফসার কাছে থাকে
হাফসাউমরের পরিবারের হেফাজতে মূল সহিফাউসমান নকলের জন্য চান
উসমানের নিযুক্ত লেখকেরাধার নেওয়া সহিফা থেকে মুসহাফে নকলনকলের পরে সহিফা হাফসাকে ফেরত দেওয়া হয়

উসমান হাফসার কাছে সহিফা চাওয়ার সময় ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তাঁর বার্তায় “সহিফা পাঠাও, আমরা তা মুসহাফগুলোতে নকল করব, তারপর তোমাকে ফিরিয়ে দেব”—এই ভাষা আছে। ফলে উৎস-উপকরণ নেওয়া এবং নতুন কপি প্রস্তুত করার ধাপ আলাদা করে বর্ণিত হয়েছে। নতুন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের জন্য আগের সংগ্রহের গুরুত্ব এখানেই সরাসরি দেখা যায়। [563]

فَأَرْسَلَ عُثْمَانُ إِلَى حَفْصَةَ أَنْ أَرْسِلِي إِلَيْنَا بِالصُّحُفِ نَنْسَخُهَا فِي الْمَصَاحِفِ ثُمَّ نَرُدُّهَا إِلَيْكِ فَأَرْسَلَتْ بِهَا حَفْصَةُ إِلَى عُثْمَانَ.

বাংলা অনুবাদ: উসমান হাফসার কাছে বার্তা পাঠালেন, সহিফাগুলো আমাদের কাছে পাঠাও; আমরা সেগুলো মুসহাফগুলোতে নকল করব, তারপর তোমাকে ফিরিয়ে দেব। হাফসা সেগুলো উসমানের কাছে পাঠালেন।

নকলের পরে ফিরিয়ে দেওয়ার তথ্যও একই বর্ণনায় রয়েছে। নতুন মুসহাফ প্রস্তুতের পরেও মূল সহিফাগুলো পৃথক বস্তু হিসেবে হাফসার কাছে ছিল। ধার নেওয়া, নকল করা এবং ফেরত দেওয়া—প্রতিটি ধাপ নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে। উৎস-সহিফার পরবর্তী পরিণতির আগে এই ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি রয়েছে। [232]

حَتَّى إِذَا نَسَخُوا الصُّحُفَ فِي الْمَصَاحِفِ رَدَّ عُثْمَانُ الصُّحُفَ إِلَى حَفْصَةَ

বাংলা অনুবাদ: যখন তাঁরা সহিফাগুলো মুসহাফে নকল করা শেষ করলেন, উসমান সহিফাগুলো হাফসার কাছে ফিরিয়ে দিলেন।

বাংলা তারিখে ইসলামের সংকলনবিবরণে আবু বকর, উমর, উসমান ও পরবর্তী মারওয়ানের কাজ এক দীর্ঘ ধারায় বর্ণিত হয়েছে। এতে লিখিতভাবে ছড়িয়ে থাকা উপকরণ একত্র করা, সংরক্ষক বদলানো এবং পরের ধ্বংস—তিন ধরনের ঘটনা এসেছে। [564] [565]

কুরআন মজীদের সংকলন
কুরআন মজীদ বর্তমানে যেভাবে বিন্যস্ত আছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় হাফেজদের স্মৃতিতেও সেভাবেই সংরক্ষিত ছিল। তবে লিখিতভাবে একটি গ্রন্থে ছিল না বরং বিভিন্ন ছোট ছোট পুস্তিকাকারে সংরক্ষিত ছিল। ইয়ামামার যুদ্ধে বিপুল সংখ্যক কুরআনের হাফেজ শাহাদাত লাভ করলে হযরত উমর (রা) নবী (স) যেভাবে কুরআন মজীদ বিন্যস্ত করেছিলেন সেইভাবে একটি মাত্র গ্রন্থাকারে বিন্যস্ত করে সংরক্ষণের জন্য প্রস্তাব দেন। হযরত আবু বকর (রা) প্রথমে কিছু আপত্তি করলেও পরে তাঁর সাথে ঐকমত্য পোষণ করেন এবং কাতেৰে অহী হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা) এ কাজের জন্য আদিষ্ট হন। তিনি অতীব যত্ন সহকারে ছোট ছোট সহীফাসমূহ একত্র করে তার সাথে কুরআন মজীদকে একটি বিন্যস্ত গ্রন্থের আকারে সংকলিত ও লিপিবদ্ধ করেন। হযরত আবু বকর (রা)-এর ইনতিকালের পর উক্ত মাসহাফ হযরত উমরের কাছে সংরক্ষিত ছিল। হযরত উসমান (রা) খলিফা হওয়ার পর তার একাধিক কপি প্রস্তুত করিয়ে অন্যান্য শহরে প্রেরণ করেন। আমীর মুয়াবিয়ার শাসনযুগে মদীনার গভর্ণর মারওয়ান হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা)-এর নিকট থেকে হযরত আবু বকর (রা)-এর প্রস্তুতকৃত মাসহাফ নিয়ে ধ্বংস করে ফেলে। ১
মোদ্দা কথা, হযরত আবু বকর (রা)-এর ঈমানী শক্তি এবং সৎ ও দৃঢ় সংকল্পের ফলে এক বছরের মধ্যে সমস্ত অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা অবদমিত হয় এবং

(১) ফাতহুল বারী, ৯ম খন্ড, পৃষ্ঠা—১৭

কোরআন সংকলন 111

এই ধারায় দুটি ভিন্ন ক্ষমতা কাজ করে। কারও কাছে সহিফা থাকা মানে তিনি তার ব্যবহারিক হেফাজত করছেন; নতুন রাষ্ট্রীয় কপি তৈরি করার সিদ্ধান্ত আবার শাসকের হাতে। হাফসার কাছে থাকা উপকরণ উসমান চেয়েছেন, তিনি পাঠিয়েছেন, এবং কাজ শেষে তা ফেরত এসেছে। ফলে গ্রন্থের প্রভাব বিস্তারকারী রাষ্ট্রীয় প্রকল্পও নির্দিষ্ট একজন সংরক্ষকের হাতে থাকা উৎসের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে চলেছে।

মূল সহিফা এবং তার নকল দুটোই হাতে থাকলে পরের কপির সঙ্গে উৎস মিলিয়ে দেখার একটি সরাসরি সুযোগ থাকে। উৎস আর না-থাকলে সেই তুলনার জায়গায় নকল তৈরির বিবরণ ও সংবহনের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। আবু বকরের সংগ্রহের পরবর্তী ইতিহাসে তাই হেফাজতের ক্রম বিশেষ মূল্যবান: কোন বস্তু থেকে কোনটি নকল করা হয়েছে এবং কোন পর্যায় পর্যন্ত আগের বস্তুটি আলাদা ছিল, তা শনাক্ত করার সূত্র পাওয়া যায়।

আবু বকরের সময়ে তাৎক্ষণিক বিপদ ছিল পাঠকদের মৃত্যু। তাঁর তৈরি সংগ্রহ আবার পরে নিজেই একটি নির্দিষ্ট হেফাজতে থাকা উৎসে পরিণত হয়। প্রথম উদ্যোগের ফল দ্বিতীয় উদ্যোগের ভিত্তি হয়েছে। যাঁদের লেখা একত্র করা হয়েছিল তাঁদের অবস্থান বদলে এখন প্রশ্ন হয়, একত্রিত সহিফায় প্রবেশাধিকার কার হাতে। বিচ্ছিন্ন উৎস থেকে কেন্দ্রীভূত সংরক্ষণে যাওয়ার সঙ্গে পাঠের ব্যবহারিক নিয়ন্ত্রণও নতুনভাবে বিন্যস্ত হয়।


সংগ্রহের পদ্ধতি, গ্রহণের মানদণ্ড ও চূড়ান্ত পাঠের মানবীয় নির্বাচন

আবু বকরের সংগ্রহে কোন পাঠ থাকবে, সেই সিদ্ধান্তে দুটি প্রশ্ন একসঙ্গে কাজ করে: পাওয়া বক্তব্যটি কোরআন হিসেবে প্রচারিত হয়েছিল কি না এবং সংগ্রহের সময়ে তা বহাল পাঠ হিসেবে গ্রহণযোগ্য কি না। এর সঙ্গে আছে উৎসের প্রত্যক্ষতা, লিখনের পরিচয় ও সাক্ষ্যের শর্ত। ফলে যে-কোনো পুরোনো ধর্মীয় বাক্য খুঁজে পেলেই তা সংগ্রহের অংশ হয়ে যায় না। “কোরআন হিসেবে একসময় শোনা” এবং “এই সংগ্রহে স্থান পাওয়ার যোগ্য” হওয়ার মধ্যে নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ব্যবধান আছে।

তকি উসমানির উলুমুল কুরআনে আবু বকরের সংগ্রহের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য একত্রে দেওয়া হয়েছে। আয়াতের বিন্যাস, সূরার পৃথক সংরক্ষণ, সাত হরফ, লিখনরীতি এবং রহিত না-হওয়া পাঠের নির্বাচন—এই বিষয়গুলো সেখানে আলাদা বৈশিষ্ট্য হিসেবে এসেছে।

মূল বক্তব্য
(১) এই কপিতে কুরআনের আয়াতগুলো নবী কারীম (সা)-এর নির্দেশিত তারতীব বা ধারাবাহিকতা অনুযায়ী বিন্যস্ত ছিল; কিন্তু সূরাগুলোর ধারাবাহিকভাবে সাজানো ছিল না। প্রত্যেকটি সূরা পৃথক পৃথক করে লিখা হয়েছিল।
(২) এই কপিতে পবিত্র কুরআনুল কারীমের সাত হরফই বিদ্যমান ছিল ।
(৩) এই কপিগুলো হায়রী লিপির অনুকরণে লিপিবদ্ধ করা হয়নি ।
(৪) এই কপিতে শুধু ওই সকল আয়াতগুলো সংকলন করা হয়েছিল যেগুলোর তেলাওয়াত রহিত হয়েছিল না ।
(৫) এই কপি লিপিবদ্ধ করার উদ্দেশ্য ছিল, যেন গোটা উম্মতের সামগ্রিক সত্যায়নের সাথে একটি কপি বিন্যস্ত হয়ে যায়। তাহলে প্রয়োজনের সময় সবাই এর শরণাপন্ন হতে পারবে ।
কোরআন সংকলন 113

একই গ্রন্থে এই সংগ্রহ আবু বকর থেকে উমর ও হাফসার কাছে থাকা এবং পরে মারওয়ানের হাতে ধ্বংস হওয়ার বিবরণও আছে। সেখানে উসমানের প্রস্তুত সংগ্রহের সঙ্গে আগের কপির লিখন ও বিন্যাসের সম্পর্ককে পরবর্তী অপসারণের কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। [566] [567] [568]

হযরত আবু বকর সিদ্দিক কর্তৃক সংকলিত এই কপিটি তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর নিকটই সংরক্ষিত ছিল। তাঁর ইন্তেকালের পর হযরত ওমর তা সংরক্ষণ করেন। তাঁর শাহাদাতের পর তাঁর ওসীয়ত অনুযায়ী সেগুলোকে উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা-এর নিকট সোপর্দ করে দেওয়া হয়।২৭৪ অতঃপর মারওয়ান ইবনে হিশাম তার শাসনামলে হযরত হাফসা-এর কাছ থেকে এগুলো তলব করলে তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত হযরত হাফসা-এর ইন্তেকালের পর মারওয়ান তা চেয়ে নেয় এবং সেগুলোকে এ চিন্তা থেকেই আগুনে পুড়িয়ে দেন যে, তখন হযরত উসমান কর্তৃক সূরার তারতীব অনুসারে লিখন পদ্ধতিসহ সংকলিত কুরআনুল কারীমের সর্বসম্মত বিশুদ্ধতম কপি প্রস্তুত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল । যার অনুসরণ করা সবার জন্য আবশ্যক ছিল এবং তখন আর এমন কোনো কপি অবশিষ্ট থাকা সমীচীন ছিল না, যা বর্তমান প্রচলিত কপিটির রুসমেখত ও তারতীবের বর খেলাফ হয় । ২৭৫ 

কোরআন সংকলন 115

এই ঘটনায় ব্যক্তিটি মারওয়ান ইবনে হাকাম; উদ্ধৃত বাংলা বিবরণের “মারওয়ান ইবনে হিশাম” নামটি ভুল। ইবনে কাসিরের আলোচনায় ইবনে হাকাম নামটি স্পষ্ট এবং হাফসার জীবদ্দশায় চেয়ে না-পাওয়া ও মৃত্যুর পরে উপকরণ নেওয়ার পৃথক পর্যায়ও আছে। [569]

ثُمَّ إِنَّ عُثْمَانَ رَدَّ الصُّحُفَ إِلَى حَفْصَةَ، فَلَمْ تَزَلْ عِنْدَهَا حَتَّى أَرْسَلَ إِلَيْهَا مَرْوَانُ بْنُ الْحَكَمِ يَطْلُبُهَا فَلَمْ تُعْطِهِ حَتَّى مَاتَتْ، فَأَخَذَهَا مِنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ فَحَرَقَهَا لِئَلَّا يَكُونَ فِيهَا شَيْءٌ يُخَالِفُ الْمَصَاحِفَ الَّتِي نَفَّذَهَا عُثْمَانُ إِلَى الْآفَاقِ

বাংলা অনুবাদ: উসমান সহিফাগুলো হাফসাকে ফিরিয়ে দেন। সেগুলো তাঁর কাছেই ছিল। পরে মারওয়ান ইবনে হাকাম তা চেয়ে তাঁর কাছে বার্তা পাঠান, কিন্তু তিনি মৃত্যুর আগে তা দেননি। এরপর মারওয়ান আবদুল্লাহ ইবনে উমরের কাছ থেকে তা নিয়ে পুড়িয়ে দেন, যাতে উসমানের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো মুসহাফগুলোর সঙ্গে ভিন্ন কোনো কিছু তাতে না থাকে।

রহিত না-হওয়া পাঠ বাছাইয়ের কথাটি সংগ্রহের পরিসর নির্ধারণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অংশ আগে বলা হয়েছিল, লেখা হয়েছিল বা কেউ মনে রেখেছিলেন—এই তথ্যগুলো তার বহাল থাকার সিদ্ধান্তের সমান নয়। রহিত হিসেবে গণ্য করা হলে সেই অংশ বাদ দেওয়ার ধর্মীয় ভিত্তি তৈরি হয়। ফলে কপি প্রস্তুত হওয়ার আগে পাঠের ধর্মীয় অবস্থার বিচারও সম্পন্ন করতে হয়। প্রাপ্য পুরোনো উপকরণের সবকিছু নির্বিচারে নেওয়া এবং বহাল বলে চিহ্নিত উপকরণ নেওয়া আলাদা প্রক্রিয়া।

সাত হরফ থাকার দাবিও নির্দিষ্টভাবে বোঝা দরকার। এখানে পরবর্তী যুগে নামবদ্ধ সাত কিরাআতের কথা বলা হয়নি; অবতরণ ও অনুমোদিত পাঠরূপসংক্রান্ত সাত আহরুফের কথা বলা হয়েছে। অনুমোদিত একাধিক রূপের পরিচয় স্বীকার করা হলে “সংগ্রহ” শব্দ থেকেই প্রতিটি শ্রোতার কাছে একমাত্র অভিন্ন শব্দরূপ থাকার তথ্য পাওয়া যায় না। আগের আবু শামার ব্যাখ্যায় ভিন্ন পাঠের কারণেই মূল লিখনের দিকে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন বলা হয়েছে। এই সংগ্রহের সঙ্গে পরের রাষ্ট্রীয় মান্য পাঠের সম্পর্ক তাই কেবল একটি বইয়ের অনুলিপি গণনার বিষয় নয়।

আয়াতের বিন্যাস এবং সূরার ক্রম নিয়েও বিবরণগুলোর ভাষা এক নয়। তকি উসমানির উদ্ধৃত বৈশিষ্ট্যে সূরাগুলো পৃথকভাবে লেখা এবং সূরাক্রম না-সাজানোর কথা আছে। ইবনে হাজার সংগ্রহ অধ্যায়ের শুরুতে বিচ্ছিন্ন পাঠ সহিফায় নেওয়া এবং পরে সহিফা মুসহাফে একত্র করার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেখানে সূরাক্রমের কথাও আছে। দুটি আলোচনার পরিসর ও পর্যায় নির্ধারণ না-করে একটিকে অপরটির অভিন্ন বিবরণ বললে কাজের ধাপগুলোর পার্থক্য মুছে যায়। [570]

الْمُرَادُ بِالْجَمْعِ هُنَا جَمْعٌ مَخْصُوصٌ، وَهُوَ جَمْعُ مُتَفَرِّقِهِ فِي صُحُفٍ، ثُمَّ جَمْعُ تِلْكَ الصُّحُفِ فِي مُصْحَفٍ وَاحِدٍ مُرَتَّبِ السُّوَرِ.

বাংলা অনুবাদ: এখানে সংগ্রহ বলতে একটি নির্দিষ্ট ধরনের সংগ্রহ বোঝানো হয়েছে: ছড়িয়ে থাকা পাঠ সহিফায় একত্র করা, তারপর সেই সহিফাগুলো সূরার ক্রমে সাজানো একটি মুসহাফে একত্র করা।

লিখনরীতির পরিচয়ও একইভাবে একটি আলাদা প্রশ্ন। উদ্ধৃত বৈশিষ্ট্যে হায়রী লিপির কথা রয়েছে, কিন্তু বুখারির সংক্ষিপ্ত সংগ্রহবিবরণ কোনো পূর্ণ বর্ণতালিকা বা প্রতিটি আয়াতের লিখনরূপ দেয় না। কোন উপকরণ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে তার খবর এবং সেই উপকরণের সব অক্ষরের তুলনামূলক নকশা আলাদা ধরনের দলিল। সংগ্রহের ইতিহাসকে পরবর্তী নির্দিষ্ট লিখনরীতির অক্ষরে অক্ষরে অভিন্নতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতে হলে এই মধ্যবর্তী পরিচয়গুলোও প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

নির্বাচনের বিষয়সংগ্রাহকের সামনে প্রশ্নসিদ্ধান্তের ফল
উৎসবক্তব্য কোথা থেকে এসেছে?গ্রহণযোগ্য সূত্রের সীমা নির্ধারণ
সমর্থনলিখন, স্মৃতি ও সাক্ষ্য কতটুকু মেলে?কোন উপকরণ গ্রহণ করা হবে তা স্থির করা
বহাল থাকাপাঠটি রহিত হয়েছে বলে গণ্য কি না?আগে প্রচারিত অংশের অন্তর্ভুক্তি বা বর্জন
পাঠরূপকোন ভিন্ন রূপ অনুমোদিত বলে গৃহীত?সংগ্রহে কোন শব্দ বা রূপ থাকবে তার পরিসর
বিন্যাসআয়াত ও সূরার সম্পর্ক কীভাবে নির্ধারিত?গ্রন্থের দৃশ্যমান গঠন ও পরবর্তী ব্যবহার

সংরক্ষণের ধর্মীয় প্রতিশ্রুতিকে এই প্রতিটি গ্রহণের দলিল হিসেবে ব্যবহার করার একটি স্পষ্ট উদাহরণ ইসলামওয়েবের ৬৪৫০২ নম্বর উত্তরে পাওয়া যায়। অন্য সাহাবির কাছে আরও কোনো আয়াত থাকার সম্ভাবনা কীভাবে অস্বীকার করা হয়—এই প্রশ্নের উত্তরে সাইটটি কোরআন রক্ষার আল্লাহর প্রতিশ্রুতিকে প্রমাণ হিসেবে এনেছে। [571]

وأما نفي إمكانية وجود غيرهما عند أحد من الصحابة فإنه يدل له أن القرآن تعهد الله بحفظه

বাংলা অনুবাদ: অন্য কোনো সাহাবির কাছে ওই দুটির বাইরে আরও কিছু থাকার সম্ভাবনা অস্বীকারের পক্ষে প্রমাণ হলো, আল্লাহ কোরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন।

এটি একটি বৃত্তাকার যুক্তি। যে সংগ্রহের পূর্ণতা পরীক্ষা করা হচ্ছে, সেই সংগ্রহের একটি বক্তব্যকে সত্য ধরে নিয়ে তার পূর্ণতাই আবার প্রমাণ করা হচ্ছে। এখানে স্বাধীন প্রমাণ হিসেবে কোনো অতিরিক্ত তালিকা, সব সাহাবির সংগ্রহের পূর্ণ তুলনা বা প্রতিটি বর্জনের নথি দেওয়া হয়নি। ধর্মগ্রন্থের নিজস্ব নিশ্চয়তা এবং সেই নিশ্চয়তার ঐতিহাসিক বাস্তবায়ন একই বস্তু ধরে নেওয়াই সিদ্ধান্তটির ভিত্তি। কোনো গ্রন্থের নিজের সংরক্ষণ-দাবি থেকে সেই গ্রন্থের সংগ্রহপ্রক্রিয়ার প্রতিটি কাজ নির্ভুল হয়েছিল—এই সিদ্ধান্ত সরাসরি অনুসরণ করে না।

প্রতিশ্রুতি সত্য বলে বিশ্বাস করা এবং গ্রহণপ্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট প্রমাণ দেখানো ভিন্ন কাজ। বুখারির বর্ণনা উমরের ভয়, আবু বকরের মতবদল, যায়েদের অনুসন্ধান এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে উপকরণ পাওয়ার ঘটনা জানায়। এগুলোকে নিজেদের শর্তে পরীক্ষা করলে সংগ্রহের প্রয়োজন, শ্রম ও সীমা বোঝা যায়। পরে ধর্মীয় নিশ্চয়তা বসিয়ে সব অনুসন্ধান আগেই নিষ্পত্তি করে ফেললে ঘটনাগুলো থেকে নতুন কিছু যাচাই করার সুযোগ থাকে না; ফলাফলটি অনুসন্ধানের আগেই ধরে নেওয়া হয়।

আবু বকরের উদ্যোগে পাওয়া ফল তাই একই সঙ্গে সংরক্ষণ এবং নির্বাচন। ছড়িয়ে থাকা উপাদানকে একত্রে রাখা হয়েছে; আবার কোনটিকে বহাল, প্রমাণিত ও গ্রহণযোগ্য পাঠ ধরা হবে, সেই সিদ্ধান্তও প্রয়োগ করা হয়েছে। এই নির্বাচন গ্রন্থের অন্তর্ভুক্তির সীমানা তৈরি করে। তার দায়িত্ব নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা নিয়েছেন, আর প্রস্তুত সহিফাগুলো নির্দিষ্ট হেফাজতে থেকেছে। পরের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ সেই ফল ব্যবহার করেছে; অন্য সাহাবিদের নিজস্ব সংগ্রহের সঙ্গে তার সম্পর্কও এই কেন্দ্রীয় সংগ্রহের ইতিহাস থেকে পৃথকভাবে অনুসন্ধানযোগ্য।


আলী ও অন্য সাহাবিদের মুসহাফ: বিকল্প সংকলনের ইতিহাস

কোরআনের সংকলন নিয়ে ইসলামের ভেতরেই একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইতিহাস সংরক্ষিত হয়েছে। আবু বকরের উদ্যোগ, যায়েদের সংগ্রহ ও উসমানের অনুমোদিত মুসহাফের পাশাপাশি আছে আলীর পৃথক সংগ্রহ, উবাইয়ের মুসহাফ, ইবনে মাসউদের মুসহাফ এবং আয়েশা ও হাফসার ব্যক্তিগত অনুলিপির বিবরণ। এসব বর্ণনায় বিরোধ কখনো সূরার বিন্যাসে, কখনো নির্দিষ্ট শব্দের উপস্থিতিতে, কখনো পূর্ণ পাঠ ও তার জ্ঞানের মালিকানা নিয়ে। একটি সংকলন শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পেয়েছে বলেই তার আগে ও পাশাপাশি থাকা সব সংগ্রহ অভিন্ন হয়ে যায় না। গৃহীত পাঠের ইতিহাসে নির্বাচন, অনুমোদন ও বর্জনের প্রশ্নগুলো ব্যক্তিগত সংগ্রহগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক থেকেই উঠে আসে।

সুন্নি ও শিয়া ধর্মীয় সাহিত্যে এই সম্পর্কের ব্যাখ্যাও এক নয়। কোনো বর্ণনায় আলী আবু বকরকে প্রথম সংকলক হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন এবং উসমানের কাজ সমর্থন করছেন; অন্য বর্ণনায় পূর্ণ কোরআনের একমাত্র সংকলক আলী ও পরবর্তী ইমামরা, আর সাধারণ মানুষের হাতে থাকা গ্রন্থের বাইরে পূর্ণতার উত্তরাধিকার তাঁদের কাছে রয়ে গেছে। এখানে পাঠের দাবির সঙ্গে নেতৃত্বের দাবিও জড়িত। কাকে প্রথম সংকলক বলা হবে, কোন সংগ্রহকে পূর্ণ বলা হবে এবং কার হাতে আল্লাহর কথার নির্ভুল অর্থ থাকবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দুই ধরনের ধর্মীয় কর্তৃত্বকে প্রতিষ্ঠা করে।


একই সময়ে ব্যক্তিগত সংগ্রহ ও পৃথক পাঠপরম্পরার উপস্থিতি

মুহাম্মদের জীবদ্দশায় কোরআন শিক্ষার একাধিক স্বীকৃত কেন্দ্র ছিল। সহিহ বুখারিতে চার ব্যক্তির কাছ থেকে কোরআন গ্রহণের নির্দেশের বর্ণনা রয়েছে: আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, সালিম, মুআয ইবনে জাবাল ও উবাই ইবনে কাব। এখানে শিক্ষক নির্বাচনের মানদণ্ড ব্যক্তি ও তাঁর পাঠজ্ঞান; পরবর্তী কোনো কেন্দ্রীয় সংকলন কমিটির তালিকা এখানে দেওয়া হয়নি। ধর্মগ্রন্থের সংক্রমণ শুরু থেকেই একাধিক মানুষের স্মৃতি, শিক্ষা ও উচ্চারণের মাধ্যমে চলেছে। ফলে তাঁদের ব্যক্তিগত পাঠ ও পরবর্তী গৃহীত মুসহাফের সম্পর্ক একটি বাস্তব ঐতিহাসিক প্রশ্ন। [572]

خُذُوا الْقُرْآنَ مِنْ أَرْبَعَةٍ، مِنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ، وَسَالِمٍ، وَمُعَاذٍ، وَأُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ.

বাংলা অনুবাদ: চার ব্যক্তির কাছ থেকে কোরআন গ্রহণ করো: আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, সালিম, মুআয ও উবাই ইবনে কাব।

ব্যক্তিগত লিখিত সংগ্রহের একটি স্পষ্ট উদাহরণ আয়েশার মুসহাফ। তাঁর মুক্ত দাস আবু ইউনুসকে তিনি নিজের জন্য একটি মুসহাফ লিখতে বলেন এবং সূরা বাকারার একটি নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছালে তাঁকে জানাতে নির্দেশ দেন। লেখক সেই স্থানে পৌঁছালে আয়েশা পাঠ বলে দেন। তাঁর বলে দেওয়া বাক্যে “মধ্যবর্তী নামাজ”-এর পরে “এবং আসরের নামাজ” কথাটিও আছে। তিনি কথাটিকে নিজের ব্যাখ্যা বলে পরিচয় দেননি; মুহাম্মদের কাছ থেকে শোনার কথা বলেছেন। অনুলিপি প্রস্তুতের কাজ, নির্দিষ্ট স্থানে থামার নির্দেশ, নিজে পাঠ বলে দেওয়া এবং নবীর কাছ থেকে শোনার দাবি—চারটি বিষয় একই ঘটনায় উপস্থিত। [573]

عَنْ أَبِي يُونُسَ مَوْلَى عَائِشَةَ أَنَّهُ قَالَ أَمَرَتْنِي عَائِشَةُ أَنْ أَكْتُبَ لَهَا مُصْحَفًا وَقَالَتْ إِذَا بَلَغْتَ هَذِهِ الآيَةَ فَآذِنِّي حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى فَلَمَّا بَلَغْتُهَا آذَنْتُهَا فَأَمْلَتْ عَلَىَّ حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَصَلَاةِ الْعَصْرِ وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ قَالَتْ عَائِشَةُ سَمِعْتُهَا مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم.

বাংলা অনুবাদ: আয়েশার মুক্ত দাস আবু ইউনুস বলেন: আয়েশা আমাকে তাঁর জন্য একটি মুসহাফ লিখতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, এই আয়াতে পৌঁছালে আমাকে জানাবে: “নামাজগুলো ও মধ্যবর্তী নামাজের যত্ন নাও।” আমি সেখানে পৌঁছে তাঁকে জানালাম। তখন তিনি আমাকে লিখতে বলে দিলেন: “নামাজগুলো, মধ্যবর্তী নামাজ এবং আসরের নামাজের যত্ন নাও, আর আল্লাহর জন্য বিনীতভাবে দাঁড়াও।” আয়েশা বলেন: আমি এটি আল্লাহর রাসুলের কাছ থেকে শুনেছি।

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫/ মসজিদ ও সালাতের স্থান
পরিচ্ছেদঃ ৩৬. যারা বলেন, মধ্যবর্তী সালাত আসরের সালাত, তাদের প্রমান
১৩০৩। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া তামীমী (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ)-এর আযাদকৃত গোলাম আবূ ইউনুস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আয়িশা (রাঃ) আমাকে তার জন্য কুরআন শরীফের একটি কপি লিখে দিতে আদেশ করলেন। এবং বললেন, যখন তুমি আয়াত, “যখন তুমি তোমার সালাতের প্রতি যত্নবান হবে বিশেষত মধ্যবতীঁ সালাতের” (বাকারাঃ ২৩৮) এ আয়াতে পৌছবে তখন আমাকে জানাবে। তিনি বলেন আমি উক্ত আয়াতে পৌছলে তাঁকে অবহিত করলাম, এবং তিনি আমাকে দিয়ে লিখালেনঃ তোমরা সালাতের প্রতি যত্নবান হবে, বিশেষত মধ্যবতীঁ সালাত ও আসরের সালাত এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে তোমরা বিনীত ভাবে দাঁড়াবে।” (বাকারাঃ ২৩৮) (এরপর) আয়িশা (রাঃ) বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এরুপ শুনেছি।
باب الدَّلِيلِ لِمَنْ قَالَ الصَّلاَةُ الْوُسْطَى هِيَ صَلاَةُ الْعَصْرِ ‏ وَحَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ يَحْيَى التَّمِيمِيُّ، قَالَ قَرَأْتُ عَلَى مَالِكٍ عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ، عَنِ الْقَعْقَاعِ بْنِ حَكِيمٍ، عَنْ أَبِي يُونُسَ، مَوْلَى عَائِشَةَ أَنَّهُ قَالَ أَمَرَتْنِي عَائِشَةُ أَنْ أَكْتُبَ لَهَا مُصْحَفًا وَقَالَتْ إِذَا بَلَغْتَ هَذِهِ الآيَةَ فَآذِنِّي ‏(‏ حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلاَةِ الْوُسْطَى‏)‏ فَلَمَّا بَلَغْتُهَا آذَنْتُهَا فَأَمْلَتْ عَلَىَّ حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلاَةِ الْوُسْطَى وَصَلاَةِ الْعَصْرِ ‏.‏ وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ ‏.‏ قَالَتْ عَائِشَةُ سَمِعْتُهَا مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏.‏ وحدثنا يحيى بن يحيى التميمي، قال قرات على مالك عن زيد بن اسلم، عن القعقاع بن حكيم، عن ابي يونس، مولى عاىشة انه قال امرتني عاىشة ان اكتب لها مصحفا وقالت اذا بلغت هذه الاية فاذني ‏(‏ حافظوا على الصلوات والصلاة الوسطى‏)‏ فلما بلغتها اذنتها فاملت على حافظوا على الصلوات والصلاة الوسطى وصلاة العصر ‏.‏ وقوموا لله قانتين ‏.‏ قالت عاىشة سمعتها من رسول الله صلى الله عليه وسلم
‏.‏ হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

বর্তমান সূরা বাকারার ২৩৮ নম্বর আয়াতে “ওয়া সালাতিল আসর” শব্দগুলো নেই। ইবনে কাসির আয়াতটির তাফসিরে মুসলিমের আয়েশা-সংক্রান্ত বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন; একই সঙ্গে মালিকের সূত্রে হাফসার অনুলিপি লিখতে থাকা আমর ইবনে রাফির ঘটনাও এনেছেন। হাফসাও নির্দিষ্ট আয়াতে পৌঁছালে তাঁকে জানাতে বলেন এবং একই অতিরিক্ত শব্দসহ পাঠ লিখিয়ে দেন। এর ফলে সমস্যাটি কোনো একজন অনুলিপিকারের অসাবধানতার গল্প থাকে না; পৃথক দুই ব্যক্তিগত সংগ্রহ সম্পর্কে একই ধরনের নির্দেশ সংরক্ষিত হয়েছে। [574]

وَقَدْ رَوَى الْإِمَامُ مَالِكٌ أَيْضًا، عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ عَنْ عَمْرِو بْنِ رَافِعٍ قَالَ: كُنْتُ أَكْتُبُ مُصْحَفًا لِحَفْصَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَتْ: إِذَا بَلَغْتَ هَذِهِ الْآيَةَ: حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى فَآذِنِّي فَلَمَّا بَلَغْتُهَا آذَنْتُهَا. فَأَمْلَتْ عَلَيَّ: حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَصَلَاةِ الْعَصْرِ وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ.

বাংলা অনুবাদ: ইমাম মালিকও যায়েদ ইবনে আসলামের সূত্রে আমর ইবনে রাফি থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমি নবীর স্ত্রী হাফসার জন্য একটি মুসহাফ লিখছিলাম। তিনি বললেন, “নামাজগুলো ও মধ্যবর্তী নামাজের যত্ন নাও”—এই আয়াতে পৌঁছালে আমাকে জানাবে। সেখানে পৌঁছে আমি তাঁকে জানালাম। তখন তিনি আমাকে লিখতে বলে দিলেন: “নামাজগুলো, মধ্যবর্তী নামাজ এবং আসরের নামাজের যত্ন নাও, আর আল্লাহর জন্য বিনীতভাবে দাঁড়াও।”

ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত তাফসীরে ইবনে কাসীরে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে [575]

কোরআন সংকলন 117
কোরআন সংকলন 119
কোরআন সংকলন 121
পাঠ বা সংগ্রহসংশ্লিষ্ট শব্দবর্ণনায় অবস্থান
প্রচলিত সূরা বাকারা ২:২৩৮وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَىٰ وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَমধ্যবর্তী নামাজের পর সরাসরি আল্লাহর জন্য বিনীতভাবে দাঁড়ানোর নির্দেশ।
আয়েশার লিখিয়ে দেওয়া পাঠوَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَصَلَاةِ الْعَصْرِ وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَমধ্যবর্তী নামাজের পরে “এবং আসরের নামাজ”; নবীর কাছ থেকে শোনার দাবি।
হাফসার লিখিয়ে দেওয়া পাঠوَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَصَلَاةِ الْعَصْرِ وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَব্যক্তিগত মুসহাফের নির্দিষ্ট স্থানে একই অতিরিক্ত পদ লিখিয়ে দেওয়ার বিবরণ।

শব্দগুলোর উপস্থিতি বক্তব্যের গঠনেও প্রভাব ফেলে। “মধ্যবর্তী নামাজ, অর্থাৎ আসরের নামাজ” এবং “মধ্যবর্তী নামাজ ও আসরের নামাজ”—এই দুই বাক্যের সম্পর্ক এক নয়। প্রথমটিতে দ্বিতীয় পদ প্রথমটির পরিচয় দেয়; দ্বিতীয়টিতে সংযোজক অব্যয় দুটি পদকে যুক্ত করে। ইবনে কাসির একই আলোচনায় আয়েশার মুসহাফ সম্পর্কে “ওয়া হিয়া সালাতুল আসর”—“আর তা হচ্ছে আসরের নামাজ”—পাঠের আরেকটি বর্ণনাও উদ্ধৃত করেছেন। ফলে নথিভুক্ত পার্থক্যটি শুধু বানানের নয়; সংযোজন, ব্যাখ্যা এবং বাক্যের ভেতর দুই পদের সম্পর্ক নিয়েও। ব্যক্তিগত মুসহাফের বর্ণনা পরীক্ষা করতে নির্দিষ্ট শব্দের এই পার্থক্যই মূল উপাদান। [576]

وَقَالَ ابْنُ جَرِيرٍ: حَدَّثَنِي الْمُثَنَّى، حَدَّثَنَا الْحَجَّاجُ، حَدَّثَنَا حَمَّادٌ، عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: كَانَ فِي مُصْحَفِ عَائِشَةَ: حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَهِيَ صَلَاةُ الْعَصْرِ.

বাংলা অনুবাদ: ইবনে জারির বলেন: মুসান্না আমাদের বর্ণনা করেছেন, হাজ্জাজ আমাদের বর্ণনা করেছেন, হাম্মাদ আমাদের বর্ণনা করেছেন, হিশাম ইবনে উরওয়া তাঁর পিতা থেকে বলেছেন: আয়েশার মুসহাফে ছিল, “নামাজগুলো ও মধ্যবর্তী নামাজের যত্ন নাও; আর তা হচ্ছে আসরের নামাজ।”

সূরার অন্তর্ভুক্তি নিয়েও ব্যক্তিগত সংগ্রহের ভিন্ন বিবরণ রয়েছে। সুয়ুতি আবু উবাইদের সূত্রে ইবনে সিরিনের একটি খবর উদ্ধৃত করেছেন: উবাই তাঁর মুসহাফে ফাতিহা, দুই আশ্রয়প্রার্থনামূলক সূরা এবং “আল্লাহুম্মা ইন্না নাসতাঈনুকা” ও “আল্লাহুম্মা ইয়্যাকা নাবুদু” লিখেছিলেন; ইবনে মাসউদ সেগুলো লেখেননি; উসমান উল্লিখিতগুলোর মধ্যে ফাতিহা ও দুই আশ্রয়প্রার্থনামূলক সূরা লিখেছেন। এই সংবাদে তিন ব্যক্তির সংগ্রহের বিষয়বস্তু পাশাপাশি তুলনা করা হয়েছে। পরবর্তী গৃহীত সীমানা কীভাবে নির্দিষ্ট হয়েছে, তার অনুসন্ধানে এই তুলনা সরাসরি প্রাসঙ্গিক। [577]

أَخْرَجَ أَبُو عُبَيْدٍ عَنِ ابْنِ سِيرِينَ قَالَ كَتَبَ أُبَيُّ بْنُ كَعْبٍ فِي مُصْحَفِهِ فَاتِحَةَ الْكِتَابِ وَالْمُعَوِّذَتَيْنِ وَاللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ وَاللَّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَتَرَكَهُنَّ ابْنُ مَسْعُودٍ وَكَتَبَ عُثْمَانُ مِنْهُنَّ فَاتِحَةَ الْكِتَابِ وَالْمُعَوِّذَتَيْنِ.

বাংলা অনুবাদ: আবু উবাইদ ইবনে সিরিন থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: উবাই ইবনে কাব তাঁর মুসহাফে ফাতিহাতুল কিতাব, দুই মুআওয়িযা এবং “আল্লাহুম্মা ইন্না নাসতাঈনুকা” ও “আল্লাহুম্মা ইয়্যাকা নাবুদু” লিখেছিলেন। ইবনে মাসউদ এগুলো বাদ রেখেছিলেন। উসমান এগুলোর মধ্যে ফাতিহাতুল কিতাব ও দুই মুআওয়িযা লিখেছেন।

সুয়ুতি একই ধারার আলোচনায় উবাইয়ের মুসহাফে কুনুতের দুটি পাঠ লিখিত থাকার সংবাদও রেখেছেন। তাঁর উদ্ধৃতিতে একই রচনার ব্যবহার নামাজের কুনুত হিসেবেও আছে, আবার ব্যক্তিগত মুসহাফে তার অবস্থানও আছে। ধর্মীয় পাঠ, প্রার্থনা ও গ্রন্থভুক্তির সীমানা নির্ধারণের প্রশ্নটি এখানেই তৈরি হয়। উবাইয়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহের বর্ণিত বিষয়বস্তু এবং উসমানের মুসহাফের বিষয়বস্তু এক তালিকা নয়। গৃহীত সংকলনের সীমানাকে অনাদি ও প্রশ্নাতীত ধরে নিলে এই পার্থক্যের ইতিহাস অদৃশ্য হয়ে যায়। [578]

وَأَخْرَجَ مُحَمَّدُ بْنُ نَصْرٍ الْمَرْوَزِيُّ فِي كِتَابِ الصَّلَاةِ عَنْ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ أَنَّهُ كَانَ يَقْنُتُ بِالسُّورَتَيْنِ فَذَكَرَهُمَا وَأَنَّهُ كَانَ يَكْتُبْهُمَا فِي مُصْحَفِهِ.

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদ ইবনে নাসর আল-মারওয়াযি তাঁর কিতাবুস সালাতে উবাই ইবনে কাব থেকে বর্ণনা করেছেন যে তিনি দুটি সূরা দিয়ে কুনুত পড়তেন। তিনি সে দুটির উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, উবাই সেগুলো তাঁর মুসহাফে লিখতেন।

কোরআন শিক্ষার বহুসংখ্যক শিক্ষক, ব্যক্তিগত অনুলিপি প্রস্তুতের প্রত্যক্ষ বিবরণ এবং সংগ্রহের ভিন্ন বিষয়বস্তুর খবর—তিনটি তথ্য মিলিয়ে কেন্দ্রীয় সংকলনের আগের জগৎটি বোঝা যায়। সেখানে ব্যক্তি তাঁর শোনা পাঠের ভিত্তিতে লেখককে নির্দেশ দিচ্ছেন, অন্য ব্যক্তি আলাদা কিছু সংরক্ষণ করছেন, আর পরবর্তী অনুমোদিত সংগ্রহ নির্দিষ্ট কিছু অন্তর্ভুক্ত করছে। লিখিত গ্রন্থের কর্তৃত্ব তখনও ব্যক্তিগত স্মৃতি ও শিক্ষকের দাবির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। পরবর্তী রাষ্ট্রীয় অনুমোদন সেই বিভিন্ন দাবির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট পাঠসীমাকে প্রাধান্য দিয়েছে।


আলীর সংগ্রহ ও অবতরণক্রমে বিন্যাসের দাবি

আলীর কোরআন সংগ্রহের কাহিনি শুধু শিয়া গ্রন্থে সীমাবদ্ধ নয়। সুন্নি কোরআনবিদ্যার গ্রন্থেও মুহাম্মদের মৃত্যুর পর তাঁর নিজস্ব সংগ্রহ ও বিন্যাসের খবর আছে। সুয়ুতি ইবনে আবি দাউদের সূত্রে ইবনে সিরিনের একটি বর্ণনা এনেছেন, যেখানে আলী বলেন, কোরআন সংগ্রহ না করা পর্যন্ত জুমার নামাজ ছাড়া আর কোনো কাজে চাদর গায়ে না দেওয়ার শপথ করেছিলেন। এই বর্ণনায় উদ্যোগটি মুহাম্মদের মৃত্যুর পরের; আলী ব্যক্তিগতভাবে কাজটি শেষ করেন। [579]

لَكِنْ أَخْرَجَ أَيْضًا مِنْ طَرِيقِ ابْنِ سِيرِينَ قَالَ: قَالَ عَلِيٌّ: لَمَّا مَاتَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ آلَيْتُ أَلَّا آخُذَ عَلَيَّ رِدَائِي إِلَّا لِصَلَاةِ جُمْعَةٍ حَتَّى أَجْمَعَ الْقُرْآنَ. فَجَمَعَهُ.

বাংলা অনুবাদ: কিন্তু তিনি ইবনে সিরিনের পথেও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আলী বলেছেন: আল্লাহর রাসুল মারা গেলে আমি শপথ করেছিলাম যে কোরআন সংগ্রহ না করা পর্যন্ত জুমার নামাজ ছাড়া চাদর গায়ে নেব না। এরপর তিনি তা সংগ্রহ করেন।

ইবনে হাজার এই নির্দিষ্ট সনদে বিচ্ছিন্নতা দেখিয়ে বর্ণনাটিকে দুর্বল বলেছেন এবং সেটি গ্রহণ করলেও “সংগ্রহ” বলতে মুখস্থ করা বোঝার প্রস্তাব দিয়েছেন। সুয়ুতি সেখানেই আলোচনা শেষ করেননি; তিনি ইবনুদ দুরাইসের সূত্রে আরেকটি পথ এনেছেন এবং পরে লিখিত মুসহাফের কথাও উল্লেখ করেছেন। একই শব্দের সম্ভাব্য অর্থ হিসেবে মুখস্থ করা আলোচিত হলেও পরবর্তী সংবাদগুলোতে রচনা, বিন্যাস ও বই অনুসন্ধানের ভাষা রয়েছে। ব্যক্তিগত সংগ্রহের ইতিহাসে সেই লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলোও উপস্থিত। [580]

قَالَ ابْنُ حَجَرٍ: هَذَا الْأَثَرُ ضَعِيفٌ لَانْقِطَاعِهِ وَبِتَقْدِيرِ صِحَّتِهِ فَمُرَادُهُ بِجَمْعِهِ حِفْظُهُ فِي صَدْرِهِ وَمَا تَقَدَّمَ مِنْ رِوَايَةِ عَبْدِ خَيْرٍ عَنْهُ أَصَحُّ فَهُوَ الْمُعْتَمَدُ.

বাংলা অনুবাদ: ইবনে হাজার বলেন: বর্ণনাটি সনদের বিচ্ছিন্নতার কারণে দুর্বল। এটি সহিহ ধরে নিলেও এখানে তাঁর সংগ্রহ বলতে অন্তরে সংরক্ষণ বোঝানো হয়েছে। আবদে খায়েরের সূত্রে তাঁর যে বর্ণনা আগে এসেছে, সেটি অধিক সহিহ; সুতরাং সেটিই নির্ভরযোগ্য হিসেবে গৃহীত।

আলীর সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্থ থাকার বিষয়েও ইসলামওয়েবের একটি আলোচনায় ভিন্ন মত স্বীকার করা হয়েছে। সেখানে চার খলিফার সবার মুখস্থ থাকার মত উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করার মতো প্রতিষ্ঠিত বক্তব্য নেই; আছে আলেমদের বিচার ও অনুমান। এরপর তাঁদের জ্ঞান ও নবীর নৈকট্যের মর্যাদার সঙ্গে সবার পুরো কোরআন মুখস্থ থাকা সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় মর্যাদার সঙ্গে একটি গুণ মানানসই হওয়া এবং তিনি বাস্তবে সেই গুণের অধিকারী ছিলেন—এই দুই সিদ্ধান্তের প্রমাণ এক নয়। মর্যাদার প্রত্যাশা দিয়ে অনিশ্চিত সংবাদ নিশ্চিত হয় না। [581]

وَالْخِلَافُ فِيهَا ثَابِتٌ كَمَا رَأَيْتَ، وَلَيْسَ فِيهَا نُصُوصٌ ثَابِتَةٌ تَقْطَعُ فِي الْأَمْرِ غَيْرَ أَنَّهَا اجْتِهَادَاتٌ وَاسْتِنْبَاطَاتٌ مِنَ الْعُلَمَاءِ.

বাংলা অনুবাদ: এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে, যেমন তুমি দেখেছ। এখানে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করার মতো প্রতিষ্ঠিত বক্তব্য নেই; এগুলো আলেমদের বিচার ও অনুমান।

সুয়ুতির উদ্ধৃত ইকরিমার বর্ণনায় ঘটনাটি আবু বকরের বাইআতের পরের সময়ের সঙ্গে যুক্ত। আলী ঘরে অবস্থান করলে আবু বকরকে বলা হয়, তিনি তাঁর বাইআত অপছন্দ করেছেন। আলী তা অস্বীকার করে নিজের সংগ্রহের কাজের কথা বলেন। বর্ণনায় তাঁর বক্তব্যের মধ্যে “আমি আল্লাহর কিতাবে বৃদ্ধি করা হচ্ছে দেখেছি” কথাটিও আছে। এখানে সংগ্রহের উদ্যোগের সঙ্গে পাঠের পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ সরাসরি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বাক্যটি একটি সংরক্ষিত বর্ণনার বক্তব্য; এর মাধ্যমে আলীর মুখে যে উদ্বেগ আরোপিত হয়েছে, তা সংগ্রহের সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক ইতিহাসের সঙ্গে মেলে না। [582]

لَمَّا كَانَ بَعْدَ بَيْعَةِ أَبِي بَكْرٍ قَعَدَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ فِي بَيْتِهِ فَقِيلَ لِأَبِي بَكْرٍ: قَدْ كَرِهَ بَيْعَتَكَ فَأَرْسَلَ إِلَيْهِ فَقَالَ: أَكَرِهْتَ بَيْعَتِي؟ قَالَ: لَا وَاللَّهِ، قَالَ: مَا أَقْعَدَكَ عَنِّي قَالَ: رَأَيْتُ كِتَابَ اللَّهِ يُزَادُ فِيهِ فَحَدَّثْتُ نَفْسِي أَلَّا أَلْبَسَ رِدَائِي إِلَّا لِصَلَاةٍ حَتَّى أَجْمَعَهُ قَالَ لَهُ أَبُو بَكْرٍ: فَإِنَّكَ نِعْمَ مَا رَأَيْتَ.

বাংলা অনুবাদ: আবু বকরের বাইআতের পরে আলী ইবনে আবি তালিব তাঁর ঘরে অবস্থান করেন। আবু বকরকে বলা হয়: তিনি আপনার বাইআত অপছন্দ করেছেন। তখন তিনি তাঁর কাছে সংবাদ পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করেন: তুমি কি আমার বাইআত অপছন্দ করেছ? আলী বলেন: না, আল্লাহর শপথ। তিনি বলেন: আমার কাছ থেকে তোমাকে কী বসিয়ে রেখেছে? আলী বলেন: আমি আল্লাহর কিতাবে বৃদ্ধি করা হচ্ছে দেখেছি। তাই মনে করেছি, এটি সংগ্রহ না করা পর্যন্ত নামাজ ছাড়া চাদর পরব না। আবু বকর তাঁকে বলেন: তুমি উত্তম সিদ্ধান্তই নিয়েছ।

ইকরিমার সঙ্গে ইবনে সিরিনের কথোপকথনে সংগ্রহটির বিন্যাস সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে: অবতরণের ক্রমে আগে নাজিল হওয়া অংশ আগে রেখে কি সেটি সাজানো হয়েছিল? উত্তরে সেই বিন্যাসকে এমন অসাধারণ কাজ বলা হয়, যা মানুষ ও জিন একত্র হয়েও করতে পারবে না। এভাবে আলীর সংগ্রহের বৈশিষ্ট্য কেবল একই বর্ণমালায় একই বাক্য পুনরায় লিখে রাখা থাকে না; অবতরণের ক্রম নির্ধারণও বিশেষ জ্ঞানের বিষয় হয়ে ওঠে। কোন নির্দেশ আগে এসেছে, কোনটি পরে এসেছে এবং কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এসেছে—এই ক্রম পাল্টালে ধর্মীয় বিধানের ধারাবাহিকতা বোঝার উপায়ও পাল্টায়। [583]

قَالَ مُحَمَّدٌ: فَقُلْتُ لِعِكْرِمَةَ: أَلِّفُوهُ كَمَا أُنْزِلَ الْأَوَّلُ فَالْأَوَّلُ قَالَ: لَوِ اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يُؤَلِّفُوهُ ذَلِكَ التَّأْلِيفَ مَا اسْتَطَاعُوا.

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদ বলেন: আমি ইকরিমাকে জিজ্ঞেস করলাম, তাঁরা কি অবতরণের ক্রমে প্রথমটি আগে রেখে এটি বিন্যস্ত করেছিলেন? তিনি বলেন: মানুষ ও জিন একত্র হয়েও যদি সেই বিন্যাস করতে চাইত, তারা পারত না।

শিয়া সাহিত্যেও এই সংগ্রহকে অবতরণক্রমে সাজানো প্রথম ও পূর্ণাঙ্গ সংকলন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মুহাম্মদ হাদি মারিফার আলোচনায় ইবনে শহর আশুবের মানাকিব থেকে উদ্ধৃত খবরে মুহাম্মদের মৃত্যুর ছয় মাস পরে আলীর সংগ্রহ সম্পন্ন হওয়ার কথা আছে। একই আলোচনায় ইবনুন নাদিমের নামে তিন দিনের কথাও উদ্ধৃত হয়েছে। সময়ের এই দুই বিবরণ পৃথক; ছয় মাসের দাবিটি নির্দিষ্ট বর্ণনাপরম্পরার দাবি। [584]

ذَكَرَ الشِّيرَازِيُّ فِي نُزُولِ الْقُرْآنِ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: ضَمَّنَ اللَّهُ مُحَمَّدًا أَنْ يَجْمَعَ الْقُرْآنَ بَعْدَهُ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ عَلَيْهِ السَّلَامُ قَالَ: فَجَمَعَ اللَّهُ الْقُرْآنَ فِي قَلْبِ عَلِيٍّ، وَجَمَعَهُ عَلِيٌّ بَعْدَ مَوْتِ رَسُولِ اللَّهِ بِسِتَّةِ أَشْهُرٍ.

বাংলা অনুবাদ: শিরাজি নুযুলুল কোরআনে ইবনে আব্বাস থেকে উল্লেখ করেছেন: আল্লাহ মুহাম্মদকে নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন যে তাঁর পরে আলী ইবনে আবি তালিব কোরআন সংগ্রহ করবেন। তিনি বলেন: আল্লাহ আলীর অন্তরে কোরআন একত্র করেন; আর আলী রাসুলের মৃত্যুর ছয় মাস পরে তা সংগ্রহ করেন।

বিন্যাসের সঙ্গে ব্যাখ্যা ও বিধানের সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হয় সুয়ুতির উদ্ধৃত আরেকটি সংবাদে। ইবনে আশতার সূত্রে বলা হয়েছে, আলী তাঁর মুসহাফে নাসিখ ও মানসুখ লিখেছিলেন। একই স্থানে ইবনে সিরিনের সেই বই খোঁজার এবং মদিনায় চিঠি পাঠিয়েও না পাওয়ার কথা আছে। ফলে আলীর নামে বর্ণিত সংগ্রহের বিষয়ে খবর প্রচলিত ছিল, কিন্তু এই অনুসন্ধানকারীর হাতে সংগ্রহটি পৌঁছায়নি। বর্ণিত বই এবং পরবর্তী লেখকের কাছে বাস্তবে পাওয়া বইয়ের ব্যবধান সংবাদটির মধ্যেই ধরা আছে। [585]

وَأَخْرَجَهُ ابْنُ أَشْتَةَ فِي الْمَصَاحِفِ مِنْ وَجْهٍ آخَرَ عَنِ ابْنِ سِيرِينَ وَفِيهِ أَنَّهُ كَتَبَ فِي مُصْحَفِهِ النَّاسِخَ وَالْمَنْسُوخَ وَأَنَّ ابْنَ سِيرِينَ قَالَ: فَطَلَبْتُ ذَلِكَ الْكِتَابَ وَكَتَبْتُ فِيهِ إِلَى الْمَدِينَةِ فَلَمْ أَقْدِرْ عَلَيْهِ.

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আশতা আল-মাসাহিফে ইবনে সিরিনের অন্য একটি সূত্রে এটি বর্ণনা করেছেন। তাতে আছে যে তিনি তাঁর মুসহাফে নাসিখ ও মানসুখ লিখেছিলেন। ইবনে সিরিন বলেন: আমি সেই বই খুঁজেছি এবং সেটির বিষয়ে মদিনায় চিঠি লিখেছি, কিন্তু তা পাইনি।

তাফসিরুস সাফিতে উদ্ধৃত আল-ইহতিজাজের বর্ণনায় আলীর নামে পেশ করা পূর্ণ সংগ্রহের আরও বিস্তারিত ছবি রয়েছে। সেখানে অবতীর্ণ পাঠের সঙ্গে তাবিল, সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থবোধক অংশ এবং নাসিখ–মানসুখের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে; একটি অক্ষর, এমনকি আলিফ বা লামও বাদ না পড়ার দাবি এসেছে। পূর্ণতা এখানে শুধু সূরার তালিকা নয়; পাঠ ও তার ব্যাখ্যাগত বিভাজনসহ সবকিছু ধারণ করার দাবি। পরবর্তী মুসহাফের যথার্থতার বিরুদ্ধে এই বিকল্পের নির্ভুলতাকেই মানদণ্ড বানানো হয়েছে। [586]

مُشْتَمِلًا عَلَى التَّأْوِيلِ وَالتَّنْزِيلِ وَالْمُحْكَمِ وَالْمُتَشَابِهِ وَالنَّاسِخِ وَالْمَنْسُوخِ لَمْ يَسْقُطْ مِنْهُ حَرْفٌ.

বাংলা অনুবাদ: তাবিল ও অবতীর্ণ পাঠ, সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থবোধক অংশ এবং নাসিখ ও মানসুখসমেত; এর একটি অক্ষরও বাদ পড়েনি।

বর্ণিত বৈশিষ্ট্যসূত্রে ব্যবহৃত বক্তব্যপাঠের ইতিহাসে তাৎপর্য
ব্যক্তিগত সংগ্রহমুহাম্মদের মৃত্যুর পরে আলীর সংগ্রহে আত্মনিয়োগকেন্দ্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি আলাদা সংগ্রহের স্মৃতি।
অবতরণক্রমআগে অবতীর্ণ অংশ আগে রেখে বিন্যাসের প্রশ্নবর্তমান সূরাক্রমের বাইরে আরেক বিন্যাসের ধারণা।
নাসিখ–মানসুখনিজ মুসহাফে নাসিখ ও মানসুখ লেখার খবরসংগ্রহের সঙ্গে বিধানের ক্রম ও ব্যাখ্যার যোগ।
ছয় মাসইবনে শহর আশুবের উদ্ধৃত নির্দিষ্ট সংবাদসংগ্রহ সম্পন্ন হওয়ার একটি বর্ণিত সময়; পাশাপাশি তিন দিনের ভিন্ন সংবাদও আছে।
বই খুঁজে না পাওয়াইবনে সিরিনের মদিনায় চিঠি ও ব্যর্থ অনুসন্ধানপরবর্তী সংবাদদাতার কাছে সরাসরি পাঠ মিলিয়ে দেখার উপকরণের অনুপস্থিতি।

অবতরণক্রমের দাবি গ্রন্থের বিন্যাসে মানুষের ভূমিকার প্রশ্নকে সামনে আনে। একই আয়াতসমষ্টি ভিন্ন ক্রমে সাজালে প্রথম ও শেষের সম্পর্ক, ধারাবাহিক বক্তব্যের ছাপ এবং বিধানের পরিবর্তনের দৃশ্যমানতা ভিন্ন হয়। নাসিখ–মানসুখের বিবরণ যুক্ত থাকলে কোন নির্দেশ কার্যকর আর কোনটি অকার্যকর হয়েছে, সেই সিদ্ধান্তও অনুলিপির সঙ্গে উপস্থিত থাকে। আলীর সংগ্রহের বর্ণিত মূল্য তাই তাঁর নিজের হাতের লেখা হওয়ার মধ্যে সীমিত নয়; ওহির ধারাবাহিকতা ও তার ব্যাখ্যার ওপর বিশেষ অধিকারও এর সঙ্গে যুক্ত। এমন একটি সংগ্রহের স্মৃতি প্রচলিত থাকা মানে গৃহীত মুসহাফের বিন্যাসের বাইরেও ধর্মীয়ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বিকল্প বিন্যাসের ধারণা বিদ্যমান ছিল।


আলীর সংগ্রহ প্রত্যাখ্যান ও সংকলনের কর্তৃত্ব নিয়ে ভিন্ন বর্ণনা

আল-কাফির একটি বর্ণনায় আলীর সংগ্রহ জনসমক্ষে পেশ করা ও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঘটনা পাওয়া যায়। ঘটনাটির সূত্রপাত জাফর সাদিকের সামনে ভিন্নভাবে কোরআন পাঠ করার প্রসঙ্গ থেকে। তিনি সেই পাঠ থামিয়ে মানুষের প্রচলিত পাঠ অনুসরণ করতে বলেন; এই নির্দেশের মেয়াদ কায়েমের উত্থান পর্যন্ত। এরপর বলা হয়, কায়েম আলীর লিখিত মুসহাফ বের করবেন। বর্ণনায় অতীতের প্রত্যাখ্যান, বর্তমানের পাঠাভ্যাস এবং ভবিষ্যতের পুনঃপ্রকাশ—এই তিন সময়কে একটি ধারার মধ্যে যুক্ত করা হয়েছে। [587] [588]

আবূ আবদিল্লাহ (জাফর সাদিক) বললেন: “… যতক্ষণ না কায়েম বা মাহদীর উত্থান ঘটবে, যখন সে কায়েম বা মাহদীর উত্থান হবে, তখন আল্লাহর কিতাবকে তার সীমারেখায় রেখে পাঠ করা হবে; আর তিনি কোরআনের ঐ কপিটি বের করবেন, যা আলী(আ) লিপিবদ্ধ করেছিলেন।

সম্পূর্ণ বর্ণনায় বলা হয়েছে, আলী তাঁর সংগ্রহ শেষ করে মানুষকে তা দেন এবং মুহাম্মদের ওপর যেভাবে নাজিল হয়েছে সেভাবেই সংগ্রহ করার দাবি করেন। প্রত্যুত্তরে উপস্থিত ব্যক্তিরা নিজেদের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ মুসহাফ থাকার কথা বলে তাঁরটি অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করেন। আলী তখন শপথ করে জানান, সেদিনের পরে তারা আর সেটি দেখবে না। পূর্ণতার দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দাবিই এখানে সরাসরি আছে: আলী নিজের সংগ্রহকে অবতীর্ণ কিতাব হিসেবে পেশ করছেন; অপর পক্ষ নিজেদের মুসহাফকেই যথেষ্ট বলছে। [589]

قَالَ قَرَأَ رَجُلٌ عَلَى أَبِي عَبْدِ الله (عَلَيهِ السَّلام) وَأَنَا أَسْتَمِعُ حُرُوفاً مِنَ الْقُرْآنِ لَيْسَ عَلَى مَا يَقْرَأُهَا النَّاسُ فَقَالَ أَبُو عَبْدِ الله (عَلَيهِ السَّلام) كُفَّ عَنْ هَذِهِ الْقِرَاءَةِ اقْرَأْ كَمَا يَقْرَأُ النَّاسُ حَتَّى يَقُومَ الْقَائِمُ (عجل الله تعالى فرجه الشريف) فَإِذَا قَامَ الْقَائِمُ (عجل الله تعالى فرجه الشريف) قَرَأَ كِتَابَ الله عَزَّ وَجَلَّ عَلَى حَدِّهِ وَأَخْرَجَ الْمُصْحَفَ الَّذِي كَتَبَهُ عَلِيٌّ (عَلَيهِ السَّلام) وَقَالَ أَخْرَجَهُ عَلِيٌّ (عَلَيهِ السَّلام) إِلَى النَّاسِ حِينَ فَرَغَ مِنْهُ وَكَتَبَهُ فَقَالَ لَهُمْ هَذَا كِتَابُ الله عَزَّ وَجَلَّ كَمَا أَنْزَلَهُ الله عَلَى مُحَمَّدٍ (صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وآلِه) وَقَدْ جَمَعْتُهُ مِنَ اللَّوْحَيْنِ فَقَالُوا هُوَ ذَا عِنْدَنَا مُصْحَفٌ جَامِعٌ فِيهِ الْقُرْآنُ لا حَاجَةَ لَنَا فِيهِ فَقَالَ أَمَا وَالله مَا تَرَوْنَهُ بَعْدَ يَوْمِكُمْ هَذَا أَبَداً إِنَّمَا كَانَ عَلَيَّ أَنْ أُخْبِرَكُمْ حِينَ جَمَعْتُهُ لِتَقْرَءُوهُ.

বাংলা অনুবাদ: তিনি বলেন: একজন ব্যক্তি আবু আবদিল্লাহর সামনে কোরআনের এমন কিছু পাঠ পড়লেন, যা মানুষের প্রচলিত পাঠের মতো নয়; আমি শুনছিলাম। আবু আবদিল্লাহ বললেন: এই পাঠ বন্ধ করো। কায়েমের উত্থান পর্যন্ত মানুষ যেভাবে পড়ে সেভাবে পড়ো। কায়েমের উত্থান হলে তিনি আল্লাহর কিতাব যথাযথভাবে পড়বেন এবং আলীর লেখা মুসহাফ বের করবেন। তিনি আরও বলেন: আলী সেটি লেখা ও সংগ্রহ শেষ করে মানুষের সামনে পেশ করেছিলেন। তিনি তাদের বলেছিলেন: এটি আল্লাহর কিতাব, আল্লাহ মুহাম্মদের ওপর যেভাবে নাজিল করেছেন; দুই ফলক থেকে আমি এটি সংগ্রহ করেছি। তারা বলল: আমাদের কাছে কোরআনসমেত একটি পূর্ণাঙ্গ মুসহাফ রয়েছে; এটির আমাদের প্রয়োজন নেই। আলী বললেন: আল্লাহর শপথ, আজকের পর তোমরা আর এটি দেখতে পাবে না। আমি সংগ্রহ করার পরে তোমাদের জানিয়ে দেওয়া আমার দায়িত্ব ছিল, যাতে তোমরা তা পড়তে পারো।

এই বর্ণনায় প্রত্যাখ্যানকারীদের পরিচয় “তারা” হিসেবে এসেছে; উসমানের নাম দেওয়া হয়নি। এর রাজনৈতিক কাঠামোতে জনসমক্ষে একটি সংগ্রহের উপস্থাপন এবং তার গ্রহণযোগ্যতা অস্বীকারের কথা আছে। মুহাম্মদ হাদি মারিফার উদ্ধৃত মানাকিবের অন্য বিবরণে ঘটনাটি আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক: মসজিদে সমবেত লোকদের সামনে আলী বই রাখেন, আর “দ্বিতীয় ব্যক্তি” তাঁর সংগ্রহ ও তাঁর প্রয়োজন অস্বীকার করেন। আলীর সংগ্রহ প্রত্যাখ্যানের এই কাহিনিগুলোতে ব্যক্তির পরিচয় ও ঘটনার ভাষা ভিন্ন। [590]

فَقَامَ إِلَيْهِ الثَّانِي وَقَالَ لَهُ: إِنْ يَكُنْ عِنْدَكَ قُرْآنٌ فَعِنْدَنَا مِثْلُهُ، فَلَا حَاجَةَ لَنَا فِيكُمَا. فَحَمَلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ الْكِتَابَ وَعَادَ بِهِ بَعْدَ أَنْ أَلْزَمَهُمُ الْحُجَّةَ.

বাংলা অনুবাদ: তখন দ্বিতীয় ব্যক্তি উঠে তাঁকে বললেন: তোমার কাছে কোরআন থাকলে আমাদের কাছেও তার মতো রয়েছে; তোমাদের দুজনের আমাদের প্রয়োজন নেই। এরপর তিনি তাদের সামনে যুক্তি প্রতিষ্ঠা করে বইটি তুলে নিয়ে ফিরে গেলেন।

এই প্রত্যাখ্যানের সামাজিক অর্থও নির্দিষ্ট। কোরআনের একটি বিকল্প সংগ্রহ গ্রহণ করলে তার সংগ্রাহকের জ্ঞান ও নেতৃত্বের দাবিও গুরুত্ব পেত। মানাকিবের বর্ণনায় বই এবং নবীর পরিবারকে পাশাপাশি পেশ করা হয়েছে; প্রত্যাখ্যানের উত্তরে “তোমাদের দুজন” কথাটি সেই যোগটিকেই প্রকাশ করে। গ্রন্থের গ্রহণযোগ্যতা এবং সংগ্রাহকের গ্রহণযোগ্যতা একসঙ্গে অস্বীকার করা হচ্ছে। ফলে সংগ্রহের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে একই কাহিনির ভেতর জড়িয়ে গেছে।

সুন্নি সংকলনসাহিত্যে আলীর নামে সংরক্ষিত অন্য বর্ণনা আবু বকরকে প্রথম সংকলক হিসেবে সামনে আনে। সুয়ুতি আবদে খায়েরের সূত্রে আলীর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন: মুসহাফের কাজে সবচেয়ে বেশি সওয়াব আবু বকরের; তিনিই প্রথম আল্লাহর কিতাব সংগ্রহ করেছেন। সুয়ুতি এই সূত্রকে হাসান বলেছেন। এখানে আলীর নিজের বিকল্প সংগ্রহের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার বদলে আবু বকরের উদ্যোগের অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। একই ব্যক্তির নামে সংরক্ষিত বক্তব্য দিয়ে সংকলনের প্রথমত্বের ভিন্ন দাবি বৈধতা পাচ্ছে। [591]

وَأَخْرَجَ ابْنُ أَبِي دَاوُدَ فِي الْمَصَاحِفِ بِسَنَدٍ حَسَنٍ عَنْ عَبْدِ خَيْرٍ قَالَ: سَمِعْتُ عَلِيًّا يَقُولُ: أَعْظَمُ النَّاسِ فِي الْمَصَاحِفِ أَجْرًا أَبُو بَكْرٍ رَحْمَةُ اللَّهِ عَلَى أَبِي بَكْرٍ! هُوَ أَوَّلُ مَنْ جَمَعَ كِتَابَ اللَّهِ.

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আবি দাউদ আল-মাসাহিফে হাসান সনদে আবদে খায়ের থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমি আলীকে বলতে শুনেছি, মুসহাফের কাজে মানুষের মধ্যে আবু বকরের সওয়াব সবচেয়ে বেশি। আল্লাহ আবু বকরের প্রতি দয়া করুন! তিনিই প্রথম আল্লাহর কিতাব সংগ্রহ করেছেন।

উসমানের সংকলন সম্পর্কেও আলীর সমর্থনের একটি দীর্ঘ বিবরণ আছে। ইসলামকিউএ ইবনে আবি দাউদের আল-মাসাহিফ থেকে তা উদ্ধৃত করেছে। সেখানে আলী বলেন, মুসহাফ ও তা পোড়ানোর ব্যাপারে উসমানের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করা যাবে না; কাজটি তাঁদের সবার পরামর্শেই হয়েছিল। ভিন্ন পাঠের অনুসারীরা নিজেদের পাঠকে শ্রেষ্ঠ বলছিলেন, তাই একটি মুসহাফে মানুষকে একত্র করার প্রস্তাব ওঠে। বর্ণনার শেষে আলীর ঘোষণা এসেছে, দায়িত্ব পেলে তিনিও একই কাজ করতেন। [592]

يَا أَيُّهَا النَّاسُ لَا تَغْلُوا فِي عُثْمَانَ وَلَا تَقُولُوا لَهُ إِلَّا خَيْرًا فِي الْمَصَاحِفِ وَإِحْرَاقِ الْمَصَاحِفِ، فَوَاللَّهِ مَا فَعَلَ الَّذِي فَعَلَ فِي الْمَصَاحِفِ إِلَّا عَنْ مَلَإٍ مِنَّا جَمِيعًا، فَقَالَ: مَا تَقُولُونَ فِي هَذِهِ الْقِرَاءَةِ؟ فَقَدْ بَلَغَنِي أَنَّ بَعْضَهُمْ يَقُولُ: إِنَّ قِرَاءَتِي خَيْرٌ مِنْ قِرَاءَتِكَ، وَهَذَا يَكَادُ أَنْ يَكُونَ كُفْرًا، قُلْنَا: فَمَا تَرَى؟ قَالَ: نَرَى أَنْ نَجْمَعَ النَّاسَ عَلَى مُصْحَفٍ وَاحِدٍ، فَلَا تَكُونَ فُرْقَةٌ، وَلَا يَكُونُ اخْتِلَافٌ، قُلْنَا: فَنِعْمَ مَا رَأَيْتَ قَالَ: فَقِيلَ: أَيُّ النَّاسِ أَفْصَحُ، وَأَيُّ النَّاسِ أَقْرَأُ؟ قَالُوا: أَفْصَحُ النَّاسِ سَعِيدُ بْنُ الْعَاصِ، وَأَقْرَؤُهُمْ زَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ، فَقَالَ: لِيَكْتُبْ أَحَدُهُمَا وَيُمِلَّ الْآخَرُ فَفَعَلَا وَجَمَعَ النَّاسَ عَلَى مُصْحَفٍ. قَالَ عَلِيٌّ: وَاللَّهِ لَوْ وَلِيتُ لَفَعَلْتُ مِثْلَ الَّذِي فَعَلَ.

বাংলা অনুবাদ: হে মানুষ, উসমান সম্পর্কে বাড়াবাড়ি কোরো না। মুসহাফ ও মুসহাফ পোড়ানোর ব্যাপারে তাঁর সম্পর্কে ভালো কথাই বলো। আল্লাহর শপথ, মুসহাফ সম্পর্কে তিনি যা করেছেন, আমাদের সবার পরামর্শ নিয়েই করেছেন। তিনি বললেন: এই পাঠ সম্পর্কে তোমাদের মত কী? আমার কাছে সংবাদ এসেছে, কেউ কেউ বলছে, আমার পাঠ তোমার পাঠের চেয়ে ভালো; এটি প্রায় কুফরের পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। আমরা বললাম: আপনার মত কী? তিনি বললেন: আমাদের মত হচ্ছে, মানুষকে একটি মুসহাফের ওপর একত্র করব; তাহলে বিভক্তি ও মতভেদ থাকবে না। আমরা বললাম: আপনি উত্তম সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। তারপর জিজ্ঞেস করা হলো: কে সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী এবং কে সবচেয়ে ভালো পাঠক? তারা বলল: সাঈদ ইবনুল আস সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী এবং যায়েদ ইবনে সাবিত সবচেয়ে ভালো পাঠক। তিনি বললেন: একজন লিখবে এবং অন্যজন বলে দেবে। তাঁরা তা করলেন এবং তিনি মানুষকে একটি মুসহাফে একত্র করলেন। আলী বলেন: আল্লাহর শপথ, দায়িত্ব আমার হাতে এলে আমিও তাঁর মতোই করতাম।

বর্ণনার ধারাআলীর অবস্থানকর্তৃত্বের ফল
আল-কাফির প্রত্যাখ্যানের ঘটনানিজের সংগ্রহ পেশ করেন; অন্যরা অপ্রয়োজনীয় বললে সরিয়ে নেনপূর্ণ সংগ্রহ জনসমাজের বাইরে, পরবর্তী কায়েমের কাছে।
আবদে খায়েরের সূত্রে সংবাদআবু বকরকে প্রথম সংগ্রাহক ও সর্বাধিক সওয়াবের অধিকারী বলেনআবু বকরের উদ্যোগের প্রথমত্ব ও মর্যাদা।
উসমানের কাজের সমর্থনের সংবাদসম্মিলিত পরামর্শের কথা বলেন এবং একই কাজ করার ঘোষণা দেনএক মুসহাফে একত্র করা ও অন্য মুসহাফ পোড়ানোর অনুমোদন।

ধর্মীয় ঐকমত্যের দাবি এই ভিন্ন আখ্যানগুলোর অবস্থান নির্ধারণ করেই তৈরি হয়। আল-কাফির বর্ণনা গ্রহণ করলে পূর্ণ সংগ্রহের প্রকাশ্য স্বীকৃতি ব্যর্থ হয়েছে এবং তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে সরেছে। উসমানের সমর্থনে আলীর বর্ণনা গ্রহণ করলে এক পাঠে একত্র করা ও অন্য অনুলিপি ধ্বংস করা তাঁর অনুমোদনও পেয়েছে। আলী উভয় ধারায় কেন্দ্রীয় সাক্ষী: একটিতে বিকল্প পূর্ণতার অধিকারী, অন্যটিতে রাষ্ট্রীয় সংকলনের সমর্থক। তাঁর নামের ধর্মীয় মর্যাদা দুই বিপরীত কর্তৃত্বের দাবিতেই কার্যকর হয়েছে।


আল-কাফিতে সতেরো হাজার আয়াতের বর্ণনা

আল-কাফির কিতাবু ফাদলিল কোরআনের নবাদের অধ্যায়ে একটি অত্যন্ত বড় সংখ্যাগত দাবি রয়েছে: জিব্রাইল মুহাম্মদের কাছে যে কোরআন এনেছিলেন, তাতে সতেরো হাজার আয়াত ছিল। বর্ণনাটি জাফর সাদিকের বক্তব্য হিসেবে এসেছে। এখানে কোনো মানুষের পরবর্তী তাফসিরগ্রন্থের আয়তন গণনা করা হয়নি; বাক্যটির বিষয় হচ্ছে জিব্রাইলের আনা কোরআন। নাজিল হওয়া পাঠের পরিমাণ সম্পর্কেই সংখ্যাটি বলা হয়েছে। [593] [594]

আবূ আবদিল্লাহ(আ) (জাফর সাদিক) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নিশ্চয় জিবরাঈল আ. যে কুরআন মুহাম্মাদ(ﷺ) এর নিকট নিয়ে এসেছে, তাতে আয়াত সংখ্যা সতের হাজার।

বর্ণনার মূল আরবিতে “সাবআতা আশারা আলফা আয়াতিন”—সতেরো হাজার আয়াত—স্পষ্টভাবে লেখা আছে। উন্মুক্ত পাঠে আলী ইবনুল হাকাম, হিশাম ইবনে সালিম ও আবু আবদিল্লাহর বর্ণনাক্রম দেওয়া হয়েছে। একই পাতায় মজলিসির মিরআতুল উকুল ১২/৫২৫-এর মূল্যায়ন “মুওয়াসসাক” হিসেবে দেখানো হয়েছে। এটি শিয়া হাদিসবিচারের একটি অভ্যন্তরীণ গ্রহণযোগ্যতার শ্রেণি; বর্ণনাটি ওই ধারার আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে, তার নির্দিষ্ট পরিচায়ক। [595] [596]

إِنَّ الْقُرْآنَ الَّذِي جَاءَ بِهِ جَبْرَئِيلُ (عَلَيهِ السَّلام) إِلَى مُحَمَّدٍ (صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وآلِه) سَبْعَةَ عَشَرَ أَلْفَ آيَةٍ.

বাংলা অনুবাদ: জিব্রাইল মুহাম্মদের কাছে যে কোরআন নিয়ে এসেছিলেন, তাতে সতেরো হাজার আয়াত ছিল।

প্রচলিত আয়াতগণনার সঙ্গে এই সংখ্যার ব্যবধান অনেক বড়। সুয়ুতি দানির বক্তব্য উদ্ধৃত করে ছয় হাজার আয়াতের পর অতিরিক্ত সংখ্যার মতভেদ উল্লেখ করেছেন: দুইশ চার, দুইশ চৌদ্দ, দুইশ উনিশ, দুইশ পঁচিশ ও দুইশ ছত্রিশ। অর্থাৎ আলোচিত গণনাগুলো ছয় হাজারের আশপাশে; সতেরো হাজার সেই তালিকার আরেকটি কাছাকাছি সংখ্যা নয়। আল-কাফির দাবি এবং দানির উল্লেখ করা গণনাগুলোর মধ্যে দশ হাজারের বেশি সংখ্যাগত ব্যবধান থাকে। [597]

قَالَ الدَّانِيُّ: أَجْمَعُوا عَلَى أَنَّ عَدَدَ آيَاتِ الْقُرْآنِ سِتَّةُ آلَافِ آيَةٍ ثُمَّ اخْتَلَفُوا فِيمَا زَادَ عَلَى ذَلِكَ فَمِنْهُمْ مَنْ لَمْ يَزِدْ وَمِنْهُمْ مَنْ قَالَ: وَمِائَتَا آيَةٍ وَأَرْبَعُ آيَاتٍ وَقِيلَ: وَأَرْبَعَ عَشْرَةَ وَقِيلَ: وَتِسْعَ عَشْرَةَ وَقِيلَ: وَخَمْسٌ وَعِشْرُونَ وَقِيلَ: وَسِتٌّ وَثَلَاثُونَ.

বাংলা অনুবাদ: দানি বলেন: কোরআনের আয়াতসংখ্যা ছয় হাজার—এ বিষয়ে তাঁরা একমত হয়েছেন। এরপর এর অতিরিক্ত সংখ্যা নিয়ে মতভেদ করেছেন। কেউ অতিরিক্ত গণনা করেননি; কেউ বলেছেন আরও দুইশ চার আয়াত; আবার দুইশ চৌদ্দ, দুইশ উনিশ, দুইশ পঁচিশ ও দুইশ ছত্রিশও বলা হয়েছে।

আয়াতের সীমানা কোথায় ধরা হচ্ছে এবং কোন কোন বাক্য গ্রন্থে উপস্থিত—এই দুই প্রশ্নে প্রয়োজনীয় তথ্য ভিন্ন। কোনো একটানা বক্তব্যকে এক আয়াতের বদলে দুই আয়াত গণনা করলে সংখ্যা বাড়ে, কিন্তু শব্দ বাড়ে না। সতেরো হাজারের সংবাদটি তার দাবিকৃত মোট পরিমাণ জানায়; নির্দিষ্ট অতিরিক্ত বাক্য বা সূরার তালিকা দেয় না। শব্দগত অপসারণের অভিযোগ আসে নুরি ও কাশানির মতো লেখকের স্পষ্ট বক্তব্য এবং তাঁদের উদ্ধৃত নির্দিষ্ট পাঠভেদের বিবরণ থেকে। সংখ্যার বিরাট অমিল ও শব্দের পরিবর্তনের দাবি একই আলোচনায় যুক্ত হলেও প্রত্যেকটির নিজস্ব দলিল রয়েছে।

প্রশ্নউপস্থিত দলিলদলিলের বক্তব্য
নাজিল হওয়া কোরআনের বর্ণিত আয়তনআল-কাফি ২/৩/১৪/২৮জিব্রাইলের আনা কোরআনে সতেরো হাজার আয়াত।
প্রচলিত গণনাপরম্পরার পরিসরআল-ইতকানে দানির উদ্ধৃতিছয় হাজার এবং তার ওপর কয়েকশ আয়াতের ভিন্ন গণনা।
শব্দগত পরিবর্তনের দাবিনুরির চতুর্থ যুক্তি এবং কাশানির ষষ্ঠ ভূমিকাবিন্যাসের পাশাপাশি শব্দ, সংযোজন ও অপসারণের অভিযোগ।
বর্ণনাটির ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতাআল-কাফির পাতায় উদ্ধৃত মজলিসির মূল্যায়নমুওয়াসসাক; পরবর্তী আলোচনায় কোরআনের পূর্ণতার প্রশ্নে ব্যবহৃত।

নুরির ফসলুল খিতাবে উদ্ধৃত মজলিসির ভাষ্য বর্ণনাটির পরবর্তী গুরুত্ব আরও পরিষ্কার করে। সেখানে তিনি এই খবর ও বহু সহিহ খবরকে কোরআনের হ্রাস ও পরিবর্তনের স্পষ্ট বক্তব্য বলেছেন। তাঁর যুক্তি হলো, এ ধরনের সব খবর বর্জন করলে সামগ্রিকভাবেই খবরের ওপর আস্থা উঠে যায়; ইমামতও খবর দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ যে বর্ণনাপদ্ধতি দিয়ে ইমামদের ধর্মীয় ক্ষমতা প্রমাণ করা হচ্ছে, সেই পদ্ধতির পরিবর্তন-সংক্রান্ত সংবাদগুলো একসঙ্গে বাতিল করলে নিজের কর্তৃত্বের ভিত্তিও সমস্যায় পড়ে। [598]

وَلَا يَخْفَى أَنَّ هَذَا الْخَبَرَ وَكَثِيرٍ مِنَ الْأَخْبَارِ الصَّحِيحَةِ صَرِيحَةٌ فِي نَقْصِ الْقُرْآنِ وَتَغْيِيرِهِ، وَعِنْدِي أَنَّ الْأَخْبَارَ فِي هَذَا الْبَابِ مُتَوَاتِرَةٌ مَعْنًى، وَطَرْحُ جَمِيعِهَا يُوجِبُ رَفْعَ الِاعْتِمَادِ عَنِ الْأَخْبَارِ رَأْسًا، بَلْ ظَنِّي أَنَّ الْأَخْبَارَ فِي هَذَا الْبَابِ لَا يَقْصُرُ عَنْ أَخْبَارِ الْإِمَامَةِ، فَكَيْفَ يُثْبِتُونَهَا بِالْخَبَرِ؟

বাংলা অনুবাদ: এই খবর এবং বহু সহিহ খবর কোরআনের হ্রাস ও পরিবর্তনের বিষয়ে স্পষ্ট। আমার মতে, এই অধ্যায়ের খবরগুলো অর্থগতভাবে মুতাওয়াতির। সেগুলোর সব বর্জন করা খবরের ওপর আস্থা সম্পূর্ণ তুলে দেয়। বরং আমার ধারণা, এ বিষয়ে খবরের পরিমাণ ইমামতের খবরগুলোর চেয়ে কম নয়; তাহলে তাঁরা খবর দিয়ে ইমামত প্রতিষ্ঠা করেন কীভাবে?

মজলিসির যুক্তিতে একটি ধর্মীয় সিদ্ধান্তকে রক্ষা করতে গিয়ে অন্য ধর্মীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তি অস্বীকার করার সমস্যা ধরা পড়ে। ইমামত প্রতিষ্ঠার বর্ণনা গ্রহণ করা অথচ একই ভাণ্ডারের পাঠ পরিবর্তনের সব খবর একসঙ্গে ফেলে দেওয়া—এই নির্বাচনের জন্য স্বতন্ত্র কারণ প্রয়োজন। কেবল পছন্দের সিদ্ধান্তের সঙ্গে মেলে বলে কোনো সংবাদ গ্রহণ আর অস্বস্তিকর বলে অন্যটি বাদ দিলে মানদণ্ডটি ফলাফলের অধীন হয়ে যায়। তাঁর ভাষ্যে এই অসংগতি স্বীকারের চাপ রয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর যুক্তি খবরের ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতাকে কেন্দ্র করে; প্রত্যেক বর্ণিত অতিরিক্ত আয়াতের লিখিত অনুলিপি সেখানে প্রদর্শিত হয়নি।

সতেরো হাজারের বক্তব্যের গুরুত্ব তাই শুধু একটি বড় সংখ্যা হিসেবে নয়। এটি এমন একটি কেন্দ্রীয় হাদিসসংকলনে সংরক্ষিত, যেখানে অন্য অধ্যায়ে পূর্ণ কোরআনের অধিকার আলী ও ইমামদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। বড় আয়তনের দাবি, পূর্ণ সংগ্রহের বিশেষ অধিকার এবং ভবিষ্যতে সেই সংগ্রহ প্রকাশের ঘোষণা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত একটি ধর্মীয় কাঠামো তৈরি করে। সাধারণ পাঠকের হাতে থাকা গ্রন্থের বাইরে আরও পূর্ণ ও অধিক কর্তৃত্বপূর্ণ পাঠের ধারণা এই কাঠামোর অংশ।


নুরি তাবারসি, কাশানি ও শিয়া সাহিত্যে পাঠবিষয়ক দাবি

নুরি তাবারসির ফসলুল খিতাবে আলীর পৃথক কোরআনকে পাঠ পরিবর্তনের পক্ষে একটি স্বতন্ত্র যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। লেখকের পূর্ণ নাম হুসাইন ইবনে মুহাম্মদ তাকি আন-নুরি আত-তাবারসি। তাঁর বক্তব্যে আলীর সংগ্রহ মুহাম্মদের মৃত্যুর পরে তৈরি, জনসমক্ষে পেশ করা, প্রত্যাখ্যাত হওয়া এবং এরপর বংশানুক্রমে ইমামদের কাছে সংরক্ষিত থাকার কাহিনি আছে। সংগ্রহটি শুধু অন্য ক্রমে সাজানো ছিল—দাবিটি সেখানে এতটুকুতে থেমে থাকেনি। তিনি শব্দ এবং বৃদ্ধি–হ্রাসের দিক থেকেও পার্থক্যের কথা বলেছেন। [599] [600]

আমীরুল মুমিনীনের হযরত আলী(রা) এর কাছে একটি বিশেষ কুরআন ছিল, যা তিনি রাসূলুল্লাহ(ﷺ) ইন্তিকালের পর নিজেই সংকলন করেন এবং তা জনসমক্ষে পেশ করেন; কিন্তু তারা তা উপেক্ষা করে। অতঃপর তিনি তা তাদের দৃষ্টি থেকে গোপন করে রাখেন; আর তা ছিল তার সন্তান তথা বংশধরের নিকট সংরক্ষিত, ইমামত তথা নেতৃত্বের সকল বৈশিষ্ট্য ও নবুয়তের ভাণ্ডারের মত যার উত্তরাধিকারী হয় এক ইমাম থেকে অপর ইমাম। আর তা প্রমাণ (মাহদী) এর নিকট সংরক্ষিত রয়েছে। “আল্লাহ আল্লাহ দ্রুত তাকে মুক্ত করে দিন”- তিনি তখন তা জনসমক্ষে প্রকাশ করবেন এবং তাদেরকে তা পাঠ করার নির্দেশ দিবেন; আর তা সংকলন, সূরা ও আয়াতসমূহের ধারাবাহিকতার দিক থেকে বিদ্যমান এই কুরআনের বিপরীত; এমনকি শব্দসমূহও কম-বেশি করার দৃষ্টিকোণ থেকে তার বিপরীত। আর যেখানে সত্য আলী’র সাথে; আর আলী সত্যের সাথে, সেখানে বিদ্যমান কুরআনের মধ্যে উভয়দিক থেকেই পরিবর্তন রয়েছে; আর এটাই উদ্দেশ্য।

নুরির বাক্যে পরিবর্তনের দুটি ক্ষেত্র পাশাপাশি আছে। প্রথমটি সংকলন ও সূরা–আয়াতের বিন্যাস; দ্বিতীয়টি শব্দ ও বৃদ্ধি–হ্রাস। অর্থাৎ প্রথম ক্ষেত্রে একই উপাদানের অবস্থান বদলাতে পারে, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে পাঠের বিষয়বস্তুতেই তফাত ঘটে। তিনি আলী সত্যের সঙ্গে আছেন—এই পূর্বস্বীকৃতি থেকে বিদ্যমান কোরআনে পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। ফলে তাঁর সিদ্ধান্তে ধর্মীয় কর্তৃত্বের পূর্বধারণা সরাসরি কাজ করছে। আলীর নামে প্রচলিত সংগ্রহের প্রত্যেকটি শব্দের তুলনামূলক তালিকা দেওয়ার বদলে তাঁর ব্যক্তিগত নির্ভুলতাকে পার্থক্যের বিচারক বানানো হয়েছে। [601]

وَيَأْمُرُهُمْ بِقِرَاءَتِهِ وَهُوَ مُخَالِفٌ لِهَذَا الْقُرْآنِ الْمَوْجُودِ مِنْ حَيْثُ التَّأْلِيفِ وَتَرْتِيبِ السُّوَرِ وَالْآيَاتِ بَلِ الْكَلِمَاتِ أَيْضًا وَمِنْ جِهَةِ الزِّيَادَةِ وَالنَّقِيصَةِ وَحَيْثُ أَنَّ الْحَقَّ مَعَ عَلِيٍّ عَلَيْهِ السَّلَامُ وَعَلِيٌّ مَعَ الْحَقِّ فَفِي الْقُرْآنِ الْمَوْجُودِ تَغْيِيرٌ مِنْ جِهَتَيْنِ وَهُوَ الْمَطْلُوبُ.

বাংলা অনুবাদ: তিনি তাদের এটি পড়ার নির্দেশ দেবেন। সংকলন, সূরা ও আয়াতের বিন্যাস, এমনকি শব্দ এবং বৃদ্ধি–হ্রাসের দিক থেকেও এটি বিদ্যমান কোরআনের থেকে ভিন্ন। যেহেতু সত্য আলীর সঙ্গে এবং আলী সত্যের সঙ্গে, সেহেতু বিদ্যমান কোরআনে দুই দিক থেকে পরিবর্তন ঘটেছে; এটিই প্রতিষ্ঠা করা উদ্দেশ্য।

নিজের যুক্তির জন্য কী প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন, সেটিও নুরি স্পষ্ট করেছেন: অতিরিক্ত অংশগুলো সত্যিকার কোরআনের অংশ, কুদসি হাদিস বা তাফসির নয়। এখানে তিনি ব্যাখ্যামূলক টীকা ও অবতীর্ণ মূল পাঠের মধ্যে সীমানা টেনেছেন এবং অভিযোগটি মূল পাঠের ক্ষেত্রেই রেখেছেন। এই ভাষার পরে তাঁর দাবিকে নিছক তাফসিরের বাড়তি তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করলে বক্তব্যের অর্থ বদলে যায়। তাঁর দাবি হচ্ছে, আলীর সংগ্রহে থাকা অতিরিক্ত উপাদানের অন্তত একটি অংশ সেই কোরআন, যা প্রকাশ্য মুসহাফে নেই। [602]

وُجُودُ الزِّيَادَةِ فِيهِ وَأَنَّهَا مِنْ أَعْيَانِ الْمُنَزَّلِ إِعْجَازًا، أَيْ نَفْسِ الْقُرْآنِ حَقِيقَةً لَا مِنَ الْأَحَادِيثِ الْقُدْسِيَّةِ وَلَا مِنَ التَّفْسِيرِ وَالتَّأْوِيلِ.

বাংলা অনুবাদ: তাতে অতিরিক্ত অংশের উপস্থিতি এবং সেই অংশগুলো অলৌকিক নিদর্শন হিসেবে অবতীর্ণ মূল উপাদানের অন্তর্ভুক্ত হওয়া; অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে স্বয়ং কোরআন হওয়া, কুদসি হাদিস কিংবা তাফসির ও তাবিলের অন্তর্ভুক্ত হওয়া নয়।

মুহসিন ফয়য আল-কাশানির তাফসিরুস সাফির ষষ্ঠ ভূমিকাতেও পূর্ণতা ও পরিবর্তনের প্রশ্ন সরাসরি আলোচিত হয়েছে। আহলে বাইতের সূত্রে বর্ণিত খবরগুলো থেকে তিনি যে সারাংশ টেনেছেন, তাতে প্রচলিত কোরআন সম্পূর্ণ অবতীর্ণ পাঠের সমান নয়, তার কিছু অংশ পরিবর্তিত এবং অনেক কিছু অপসারিত—এই তিন দাবি আছে। আলীর নাম বহু স্থান থেকে বাদ পড়ার কথাও তিনি বলেছেন। কাশানির নিজের সারাংশের ভাষা অত্যন্ত স্পষ্ট। [603] [604]

أَقُولُ: الْمُسْتَفَادُ مِنْ جَمِيعِ هَذِهِ الْأَخْبَارِ وَغَيْرِهَا مِنَ الرِّوَايَاتِ مِنْ طَرِيقِ أَهْلِ الْبَيْتِ عَلَيْهِمُ السَّلَامُ إِنَّ الْقُرْآنَ الَّذِي بَيْنَ أَظْهُرِنَا لَيْسَ بِتَمَامِهِ كَمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ بَلْ مِنْهُ مَا هُوَ خِلَافُ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَمِنْهُ مَا هُوَ مُغَيَّرٌ مُحَرَّفٌ وَإِنَّهُ قَدْ حُذِفَ عَنْهُ أَشْيَاءُ كَثِيرَةٌ مِنْهَا اسْمُ عَلِيٍّ عَلَيْهِ السَّلَامُ فِي كَثِيرٍ مِنَ الْمَوَاضِعِ وَمِنْهَا غَيْرُ ذَلِكَ وَأَنَّهُ لَيْسَ أَيْضًا عَلَى التَّرْتِيبِ الْمَرْضِيِّ عِنْدَ اللَّهِ وَعِنْدَ رَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ.

বাংলা অনুবাদ: আমি বলছি: এসব খবর এবং আহলে বাইতের সূত্রে আসা অন্যান্য বর্ণনা থেকে পাওয়া বক্তব্য হচ্ছে, আমাদের মধ্যে প্রচলিত কোরআন মুহাম্মদের ওপর অবতীর্ণ কোরআনের সম্পূর্ণ রূপ নয়। বরং এর কিছু অংশ আল্লাহর অবতীর্ণ পাঠের বিপরীত; কিছু অংশ পরিবর্তিত ও বিকৃত। তা থেকে বহু বিষয় বাদ দেওয়া হয়েছে; এর মধ্যে অনেক স্থানে আলীর নাম রয়েছে, আরও অন্যান্য বিষয়ও রয়েছে। এটি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পছন্দসই বিন্যাসেও নেই।

একই ভূমিকায় কাশানি আলী ইবনে ইবরাহিমের তাফসির থেকে নির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়েছেন। সূরা আলে ইমরানের “তোমরা সর্বোত্তম উম্মত” পাঠের জায়গায় “সর্বোত্তম ইমামগণ” পাঠের দাবি তার একটি। এখানে আরবি “উম্মাহ” বদলে “আইম্মাহ”—ইমাম শব্দের বহুবচন—হয়েছে। পরিবর্তনে প্রশংসার প্রাপক সাধারণ সম্প্রদায় থেকে নির্দিষ্ট নেতৃত্বে সরে যায়। ফলে পার্থক্যটি শুধু উচ্চারণের সূক্ষ্মতা নয়; ধর্মীয় মর্যাদা কাদের জন্য নির্ধারিত, সেই প্রশ্নে সরাসরি প্রভাব ফেলে। [605]

فَقَالَ أَبُو عَبْدِ اللَّهِ عَلَيْهِ السَّلَامُ لِقَارِئِ هَذِهِ الْآيَةِ: خَيْرَ أُمَّةٍ تَقْتُلُونَ أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْحُسَيْنَ بْنَ عَلِيٍّ عَلَيْهِمَا السَّلَامُ فَقِيلَ لَهُ كَيْفَ نَزَلَتْ يَا بْنَ رَسُولِ اللَّهِ فَقَالَ إِنَّمَا نَزَلَتْ خَيْرَ أَئِمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ.

বাংলা অনুবাদ: আবু আবদিল্লাহ এই আয়াতের পাঠককে বললেন: সর্বোত্তম উম্মত, অথচ তোমরা আমিরুল মুমিনিন ও হুসাইন ইবনে আলীকে হত্যা করো! তাঁকে বলা হলো: হে রাসুলের পুত্র, তাহলে কীভাবে নাজিল হয়েছিল? তিনি বললেন: নাজিল হয়েছিল, “মানুষের জন্য বের করা সর্বোত্তম ইমামগণ।”

আরেক উদাহরণে সূরা ফুরকানের “আমাদের মুত্তাকিদের ইমাম করো” বদলে “আমাদের জন্য মুত্তাকিদের মধ্য থেকে একজন ইমাম নির্ধারণ করো” পাঠ দেওয়া হয়েছে। প্রথম বাক্যে প্রার্থনাকারীরা নেতৃত্ব চাইছেন; দ্বিতীয়টিতে তাঁরা নিজেদের জন্য নেতা চাইছেন। একই আলোচনায় সূরা নিসা ও মায়েদার আয়াতে “আলী সম্পর্কে” পদ এবং মুহাম্মদের পরিবারের অধিকার-সংক্রান্ত অতিরিক্ত শব্দ থাকার দাবিও এসেছে। এতে কিছু পরিবর্তন নতুন শব্দ সংযোজনের, কিছু পরিবর্তন শব্দের সম্পর্ক ও বাক্যের গঠন বদলানোর। [606]

فَقَالَ أَبُو عَبْدِ اللَّهِ عَلَيْهِ السَّلَامُ لَقَدْ سَأَلُوا اللَّهَ عَظِيمًا أَنْ يَجْعَلَهُمْ لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا فَقِيلَ لَهُ يَا بْنَ رَسُولِ اللَّهِ كَيْفَ نَزَلَتْ فَقَالَ إِنَّمَا نَزَلَتْ وَاجْعَلْ لَنَا مِنَ الْمُتَّقِينَ إِمَامًا.

বাংলা অনুবাদ: আবু আবদিল্লাহ বললেন: আল্লাহ তাঁদের মুত্তাকিদের ইমাম করবেন—এই প্রার্থনায় তাঁরা বড় কিছু চেয়েছেন। তাঁকে বলা হলো: হে রাসুলের পুত্র, কীভাবে নাজিল হয়েছিল? তিনি বললেন: নাজিল হয়েছিল, “আমাদের জন্য মুত্তাকিদের মধ্য থেকে একজন ইমাম নির্ধারণ করো।”

সংশ্লিষ্ট স্থানকাশানির ভূমিকায় উদ্ধৃত বিকল্প শব্দবর্ণিত পরিবর্তনের বিষয়
আলে ইমরান ৩:১১০خَيْرَ أَئِمَّةٍ — সর্বোত্তম ইমামগণউম্মতের বদলে ইমামদের প্রশংসা।
ফুরকান ২৫:৭৪وَاجْعَلْ لَنَا مِنَ الْمُتَّقِينَ إِمَامًاনিজেদের নেতা হওয়ার প্রার্থনা থেকে নিজেদের জন্য নেতা চাওয়া।
নিসা ৪:১৬৬بِمَا أَنْزَلَ إِلَيْكَ فِي عَلِيٍّঅবতীর্ণ বিষয়ের সঙ্গে আলীর নামের সুস্পষ্ট যোগ।
মায়েদা ৫:৬৭بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ فِي عَلِيٍّপ্রচার করার নির্দেশের বিষয় আলী সম্পর্কে বলে নির্দিষ্ট করা।
শুআরা ২৬:২২৭ظَلَمُوا آلَ مُحَمَّدٍ حَقَّهُمْঅত্যাচারের সাধারণ উল্লেখের সঙ্গে মুহাম্মদের পরিবারের অধিকার যুক্ত করা।

আলীর নাম এবং পরিবারের অধিকার যে প্রকাশ্য আয়াতের বাইরে অতিরিক্ত পাঠ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে, তার উদাহরণগুলো একই অনুচ্ছেদে রয়েছে। নেতৃত্বের বিরোধে এই বাড়তি শব্দগুলোর কার্যকারিতা স্পষ্ট: কোরআনের অস্পষ্ট বা সাধারণ বক্তব্যকে একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও বংশের দাবির পক্ষে সরাসরি বক্তব্যে রূপ দেওয়া হয়। এরপর প্রচলিত মুসহাফে সেই নাম নেই—এই অনুপস্থিতিই নাম অপসারণের অভিযোগে ব্যবহৃত হয়। অভিযোগটির সত্যতা নির্ধারণে বর্ণিত পাঠের সাক্ষ্য প্রয়োজন; বংশের ধর্মীয় অধিকার আগে মেনে নিয়ে তার অনুপস্থিত উল্লেখকে মুছে ফেলার প্রমাণ বানালে সিদ্ধান্তটি নিজের পূর্বধারণার ওপর দাঁড়ায়। [607]

وَأَمَّا مَا هُوَ مَحْذُوفٌ عَنْهُ فَهُوَ قَوْلُهُ لَكِنِ اللَّهُ يَشْهَدُ بِمَا أَنْزَلَ إِلَيْكَ فِي عَلِيٍّ كَذَا أُنْزِلَتْ أَنْزَلَهُ بِعِلْمِهِ وَالْمَلَائِكَةُ يَشْهَدُونَ، وَقَوْلُهُ: يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ فِي عَلِيٍّ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ.

বাংলা অনুবাদ: যা বাদ দেওয়া হয়েছে, তার উদাহরণ হলো তাঁর বক্তব্য: “কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দেন তোমার কাছে আলী সম্পর্কে যা নাজিল করেছেন”—এভাবেই নাজিল হয়েছিল—“তিনি তা তাঁর জ্ঞানে নাজিল করেছেন এবং ফেরেশতারাও সাক্ষ্য দেন।” আর তাঁর বক্তব্য: “হে রাসুল, আলী সম্পর্কে তোমার রবের কাছ থেকে যা তোমার কাছে নাজিল হয়েছে তা পৌঁছে দাও; তা না করলে তুমি তাঁর বার্তা পৌঁছালে না।”

কাশানি নিজের আলোচনার মধ্যেই এই সব দাবির ফল নিয়ে একটি তীব্র সমস্যা তুলেছেন: প্রত্যেক আয়াতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকলে কোরআন আর নির্ভরযোগ্য দলিল থাকে কীভাবে, এবং বর্ণনাকে কোরআনের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করার নির্দেশের অর্থই বা কী থাকে? সমস্যাটি তাঁর নিজের ভাষায় এসেছে। পরিবর্তনের সংবাদ দিয়ে গ্রন্থের নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে, আবার সেই গ্রন্থ দিয়ে সংবাদ যাচাই করতে বলা হচ্ছে। যাচাইয়ের মানদণ্ড এবং যাচাইযোগ্য বর্ণনা পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। [608]

وَأَيْضًا قَدِ اسْتَفَاضَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ وَالْأَئِمَّةِ عَلَيْهِمُ السَّلَامُ حَدِيثُ عَرْضِ الْخَبَرِ الْمَرْوِيِّ عَلَى كِتَابِ اللَّهِ لِيُعْلَمَ صِحَّتُهُ بِمُوَافَقَتِهِ لَهُ وَفَسَادُهُ بِمُخَالَفَتِهِ فَإِذَا كَانَ الْقُرْآنُ الَّذِي بِأَيْدِينَا مُحَرَّفًا فَمَا فَائِدَةُ الْعَرْضِ مَعَ أَنَّ خَبَرَ التَّحْرِيفِ مُخَالِفٌ لِكِتَابِ اللَّهِ مُكَذِّبٌ لَهُ فَيَجِبُ رَدُّهُ وَالْحُكْمُ بِفَسَادِهِ أَوْ تَأْوِيلِهِ.

বাংলা অনুবাদ: নবী ও ইমামদের থেকে বর্ণনাকে আল্লাহর কিতাবের সামনে পেশ করার খবর ব্যাপকভাবে এসেছে, যাতে তার সঙ্গে মিললে শুদ্ধতা এবং বিরোধ হলে ত্রুটি জানা যায়। আমাদের হাতে থাকা কোরআনই যদি বিকৃত হয়, তাহলে তার সামনে পেশ করার উপকার কী? তদুপরি পরিবর্তনের সংবাদ আল্লাহর কিতাবের বিরোধী ও তাকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী; ফলে সেটি বর্জন করা, ত্রুটিপূর্ণ বলা অথবা তার ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

এই সমস্যার উত্তরে কাশানি একাধিক সম্ভাবনা দিয়েছেন। তাঁর একটি প্রস্তাব হচ্ছে, পরিবর্তন এমন বিষয়ে ঘটতে পারে যাতে মূল উদ্দেশ্যের বড় ক্ষতি হয়নি—আলী, মুহাম্মদের পরিবার ও মুনাফিকদের নাম বাদ যাওয়া কিংবা কিছু আয়াত গোপন থাকার পরেও বাকি অংশ থেকে উপকার পাওয়া যায়। তিনি সঙ্গে বলেছেন, ওসিরা হারানো বিষয়ের ঘাটতি পূরণ করতেন। আরেক প্রস্তাবে কিছু অতিরিক্ত অংশকে মূল আয়াতের বদলে তাফসির ও ব্যাখ্যা বলা হয়েছে। প্রথম প্রস্তাবে প্রকৃত অপসারণ মেনে নিয়ে ধর্মীয় কার্যকারিতা বজায় রাখা হচ্ছে; দ্বিতীয়টিতে কিছু দাবির ক্ষেত্রে অপসারণের বিষয়বস্তুই পুনর্ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। [609]

إِنْ صَحَّتْ هَذِهِ الْأَخْبَارُ فَلَعَلَّ التَّغْيِيرَ إِنَّمَا وَقَعَ فِيمَا لَا يُخِلُّ بِالْمَقْصُودِ كَثِيرَ إِخْلَالٍ كَحَذْفِ اسْمِ عَلِيٍّ وَآلِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِمْ، وَحَذْفِ أَسْمَاءِ الْمُنَافِقِينَ عَلَيْهِمْ لَعَائِنُ اللَّهِ فَإِنَّ الِانْتِفَاعَ بِعُمُومِ اللَّفْظِ بَاقٍ وَكَحَذْفِ بَعْضِ الْآيَاتِ وَكَتْمَانِهِ فَإِنَّ الِانْتِفَاعَ بِالْبَاقِي بَاقٍ مَعَ أَنَّ الْأَوْصِيَاءَ كَانُوا يَتَدَارَكُونَ مَا فَاتَنَا مِنْهُ مِنْ هَذَا الْقَبِيلِ.

বাংলা অনুবাদ: এই খবরগুলো শুদ্ধ হলে পরিবর্তন হয়তো এমন ক্ষেত্রে ঘটেছে, যাতে উদ্দেশ্য বড়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; যেমন আলী ও মুহাম্মদের পরিবারের নাম এবং মুনাফিকদের নাম বাদ দেওয়া। কেননা সাধারণ শব্দের উপকারিতা বজায় থাকে। একইভাবে কিছু আয়াত বাদ দেওয়া ও গোপন করা হলেও বাকি অংশের উপকারিতা বজায় থাকে। তদুপরি এ ধরনের বিষয়ে আমাদের যা হাতছাড়া হয়েছে, ওসিরা তার ঘাটতি পূরণ করতেন।

উপকার পাওয়া এবং অবিকৃত থাকা দুটি আলাদা দাবি। অসম্পূর্ণ গ্রন্থ থেকেও উপকার পাওয়া সম্ভব; তাই অবশিষ্ট অংশের কার্যকারিতা স্বীকার করলে পূর্ণতা নিজে থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় না। কাশানির প্রথম প্রস্তাব কার্যকারিতা রক্ষা করে, সম্পূর্ণ শব্দগত অভিন্নতা নয়। তাঁর দ্বিতীয় প্রস্তাবে “কিছু” অতিরিক্ত অংশকে ব্যাখ্যা বলা হয়েছে। তার মাধ্যমে সব পাঠভেদ এক অর্থে পরিণত হয়নি; তাঁর নিজের আলোচনায় প্রকৃত আয়াত অপসারণ এবং ব্যাখ্যাগত পরিবর্তন—দুটি সম্ভাবনাই রয়ে গেছে। [610]

وَلَا يَبْعُدُ أَيْضًا أَنْ يُقَالَ أَنَّ بَعْضَ الْمَحْذُوفَاتِ كَانَ مِنْ قَبِيلِ التَّفْسِيرِ وَالْبَيَانِ وَلَمْ يَكُنْ مِنْ أَجْزَاءِ الْقُرْآنِ فَيَكُونُ التَّبْدِيلُ مِنْ حَيْثُ الْمَعْنَى أَيْ حَرَّفُوهُ وَغَيَّرُوهُ فِي تَفْسِيرِهِ وَتَأْوِيلِهِ أَعْنِي حَمَلُوهُ عَلَى خِلَافِ مَا هُوَ بِهِ فَمَعْنَى قَوْلِهِمْ عَلَيْهِمُ السَّلَامُ كَذَا نَزَلَتْ أَنَّ الْمُرَادَ بِهِ ذَلِكَ لَا أَنَّهَا نَزَلَتْ مَعَ هَذِهِ الزِّيَادَةِ فِي لَفْظِهَا فَحُذِفَ مِنْهَا ذَلِكَ اللَّفْظُ.

বাংলা অনুবাদ: এ কথাও বলা অসম্ভব নয় যে বাদ পড়া কিছু বিষয় তাফসির ও ব্যাখ্যার অন্তর্ভুক্ত ছিল, কোরআনের অংশ ছিল না। সে ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়েছে অর্থের দিক থেকে; অর্থাৎ তারা তার তাফসির ও তাবিল বদলে প্রকৃত অর্থের বিপরীতে নিয়েছে। তখন তাঁদের “এভাবে নাজিল হয়েছে” কথার অর্থ হবে, এর উদ্দেশ্য ছিল ওই অর্থ; এমন নয় যে বাড়তি শব্দসহ আয়াত নাজিল হয়েছিল এবং পরে সেই শব্দ বাদ দেওয়া হয়েছে।

নুরি ও কাশানির যুক্তি তাই একই জায়গায় শেষ হয় না। নুরি নিজের চতুর্থ যুক্তিতে বাড়তি অংশকে প্রকৃত কোরআন বলে তাফসির থেকে আলাদা করেছেন। কাশানি স্পষ্ট পরিবর্তনের দাবিগুলো উদ্ধৃত করে পরে কিছু ক্ষেত্রে মূল পাঠের অপসারণ এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যাখ্যাগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা দিয়েছেন। দুজনের লেখাতেই প্রচলিত মুসহাফ, আলীর সংগ্রহ ও ইমামদের বিশেষ অধিকারের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের নিজস্ব বক্তব্য ধর্মগ্রন্থের সংরক্ষণ নিয়ে ইসলামের অভ্যন্তরীণ বিতর্কের দলিল; একটিমাত্র নির্বিরোধ পূর্ণতার ধারণা দিয়ে সেই সাহিত্যকে বর্ণনা করা যায় না।


সুন্নি–শিয়া সংকলনবিরোধ, ইমামের কর্তৃত্ব ও গৃহীত মুসহাফ

সুন্নি–শিয়া সংকলনবিরোধের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হচ্ছে, ওহির সম্পূর্ণ পাঠ ও চূড়ান্ত ব্যাখ্যার কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে। সুন্নি সংকলনের প্রধান বর্ণনায় আবু বকর, উমর, যায়েদ, হাফসা ও উসমানের উদ্যোগ এবং তাঁদের মধ্যে হস্তান্তর গুরুত্বপূর্ণ। আল-কাফির কিতাবুল হুজ্জাহর আলোচিত অধ্যায়ে পূর্ণ সংকলন ও পূর্ণ জ্ঞান আলী এবং তাঁর পরবর্তী ইমামদের জন্য নির্দিষ্ট। অধ্যায়টির বিষয়বস্তুর মধ্যেই এই বিশেষ অধিকারের ঘোষণা আছে। সাধারণ সংকলকের দাবি অস্বীকার এবং নির্দিষ্ট বংশধারার সংগ্রহের নির্ভুলতা প্রতিষ্ঠা একই বক্তব্যে যুক্ত হয়েছে। [611]

জাবের থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি আবূ জাফর(আ) -কে বলতে শুনেছি, মানুষের মধ্যে মিথ্যাবাদী ছাড়া কেউ দাবি করতে পারে না যে, আল্লাহ যেভাবে কোরআন নাযিল করেছেন, সে তা পরিপূর্ণভাবে সেভাবে সংকলন করেছে; বরং আলী ইবন আবি তালিব ও তার পরবর্তী ইমামগণই আল্লাহ যেভাবে তা নাযিল করেছেন, ঠিক সেভাবে সংকলন ও সংরক্ষণ করেছেন।

আবু জাফরের নামে বর্ণিত কথাটির আরবিতে “মিথ্যাবাদী” শব্দটি সরাসরি ব্যবহৃত হয়েছে। যেভাবে নাজিল হয়েছিল সেভাবে পুরো কোরআন সংগ্রহের দাবি অন্যদের জন্য অস্বীকার করা হয়েছে। এর ফলে পূর্ণতার সংজ্ঞাটিই ইমামদের একচ্ছত্র অধিকারের সঙ্গে বাঁধা পড়ে। প্রকাশ্য মুসহাফ প্রস্তুতকারী বা অন্য কোনো সংগ্রাহক নিজের কাজকে একই অর্থে পূর্ণ বলতে পারছেন না। এটি ধর্মীয় জ্ঞানের এমন একটি স্তরবিন্যাস, যেখানে সাধারণ মানুষের নাগালের পাঠের ওপর একটি বিশেষ উত্তরাধিকারী গোষ্ঠীর দাবি প্রাধান্য পায়। [611]

مَا ادَّعَى أَحَدٌ مِنَ النَّاسِ أَنَّهُ جَمَعَ الْقُرْآنَ كُلَّهُ كَمَا أُنْزِلَ إِلا كَذَّابٌ وَمَا جَمَعَهُ وَحَفِظَهُ كَمَا نَزَّلَهُ الله تَعَالَى إِلا عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ (عَلَيْهِ السَّلام) وَالائِمَّةُ مِنْ بَعْدِهِ (عَلَيْهم السَّلام )

বাংলা অনুবাদ: মানুষের মধ্যে যে-ই দাবি করে যে সে সম্পূর্ণ কোরআন যেভাবে নাজিল হয়েছে সেভাবে সংগ্রহ করেছে, সে মিথ্যাবাদী। আল্লাহ যেভাবে নাজিল করেছেন, সেভাবে তা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেছেন শুধু আলী ইবনে আবি তালিব এবং তাঁর পরবর্তী ইমামরা।

একই অধ্যায়ের পরের বর্ণনায় কোরআনের সমস্ত প্রকাশ্য ও অন্তর্নিহিত বিষয় নিজের কাছে থাকার দাবি শুধু ওসিদের জন্য রাখা হয়েছে। পূর্ণ সংগ্রহের দাবির পাশাপাশি এখানে পূর্ণ অর্থের অধিকারও নির্দিষ্ট। গ্রন্থ পড়তে পারা এবং গ্রন্থের সব অর্থ জানা এক ক্ষমতা নয়; এই বর্ণনায় দ্বিতীয় ক্ষমতাটি সাধারণ পাঠকের বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে লিখিত গ্রন্থের উপস্থিতি থাকলেও ব্যাখ্যার সর্বশেষ কর্তৃত্ব নির্দিষ্ট ধর্মীয় উত্তরাধিকারের কাছে থেকে যায়। [612]

مَا يَسْتَطِيعُ أَحَدٌ أَنْ يَدَّعِيَ أَنَّ عِنْدَهُ جَمِيعَ الْقُرْآنِ كُلِّهِ ظَاهِرَهُ وَبَاطِنَهُ غَيْرُ الْأَوْصِيَاءِ.

বাংলা অনুবাদ: ওসিরা ছাড়া কেউ দাবি করতে পারে না যে তার কাছে কোরআনের সমস্ত প্রকাশ্য ও অন্তর্নিহিত বিষয় রয়েছে।

এই বিশেষ অধিকার ব্যবহারিক পাঠের ক্ষেত্রে একটি দ্বিস্তর তৈরি করে। আল-কাফির কায়েম-সংক্রান্ত বর্ণনায় ভিন্ন পাঠ বন্ধ করে মানুষের প্রচলিত পাঠ অনুসরণ করার নির্দেশ আছে। ভবিষ্যতে যথাযথ পাঠ প্রকাশের ঘোষণা বর্তমান পাঠাভ্যাসকে সঙ্গে সঙ্গে বদলে দেয়নি; তার পরিবর্তে বর্তমানের জন্য এক বিধান এবং ভবিষ্যতের জন্য অন্য প্রত্যাশা রাখা হয়েছে। যে ইমাম ভিন্ন পূর্ণতার অধিকারী বলে বিবেচিত, তিনিই আপাতত প্রচলিত পাঠ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতিও দিচ্ছেন। উভয় সিদ্ধান্তের বৈধতা একই কর্তৃত্বের ওপর নির্ভরশীল। [613]

كُفَّ عَنْ هَذِهِ الْقِرَاءَةِ اقْرَأْ كَمَا يَقْرَأُ النَّاسُ حَتَّى يَقُومَ الْقَائِمُ.

বাংলা অনুবাদ: এই পাঠ বন্ধ করো; কায়েমের উত্থান পর্যন্ত মানুষ যেভাবে পড়ে সেভাবে পড়ো।

শিয়া সাহিত্যের ভেতরেও এই বিষয়টি নিয়ে একটিমাত্র সিদ্ধান্ত নেই। কাশানি তাঁর ষষ্ঠ ভূমিকায় সাদুকের আল-ইতিকাদাত থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে মানুষের হাতে দুই মলাটের মধ্যে থাকা কোরআনই অবতীর্ণ কোরআন, তার চেয়ে বেশি নয়। সাদুকের নামে উদ্ধৃত বক্তব্যে এর বিপরীত বিশ্বাস তাঁর ওপর আরোপকারীকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে। অর্থাৎ একই বৃহত্তর ধর্মীয় ধারায় একদিকে প্রকাশ্য সংকলনের বাইরে পূর্ণতার দাবি, অন্যদিকে প্রকাশ্য সংকলনের চেয়ে বেশি কিছু থাকার বিশ্বাস অস্বীকার—দুটি সুস্পষ্ট অবস্থান সংরক্ষিত। [614]

اعْتِقَادُنَا أَنَّ الْقُرْآنَ الَّذِي أَنْزَلَهُ اللَّهُ عَلَى نَبِيِّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ هُوَ مَا بَيْنَ الدَّفَّتَيْنِ وَمَا فِي أَيْدِي النَّاسِ لَيْسَ بِأَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ، قَالَ: وَمَنْ نَسَبَ إِلَيْنَا: إِنَّا نَقُولُ إِنَّهُ أَكْثَرُ مِنْ ذَلِكَ فَهُوَ كَاذِبٌ.

বাংলা অনুবাদ: আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে, আল্লাহ তাঁর নবীর ওপর যে কোরআন নাজিল করেছেন, তা দুই মলাটের মধ্যে এবং মানুষের হাতে যা আছে সেটিই; এর চেয়ে বেশি নয়। তিনি বলেন: যে আমাদের ওপর এ কথা আরোপ করবে যে আমরা একে এর চেয়ে বেশি বলি, সে মিথ্যাবাদী।

তুসির আত-তিবয়ান থেকেও কাশানি ভিন্ন একটি অবস্থান উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে অতিরিক্ত অংশের দাবি অগ্রহণযোগ্য এবং হ্রাসের ধারণাও নিজের ধর্মীয় ধারার সঠিক মতের সঙ্গে অসংগত বলা হয়েছে। বহু আয়াত কমে যাওয়া ও স্থানান্তরের খবরের অস্তিত্ব স্বীকার করেও তুসি সেগুলোকে জ্ঞান প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট মনে করেননি এবং ব্যাখ্যার সম্ভাবনা রেখেছেন। এখানে মতবিরোধ শুধু বর্ণনা আছে কি নেই তা নিয়ে নয়; কোনো বর্ণনা বৃহত্তর ধর্মীয় নিশ্চয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো প্রমাণ কি না, তা নিয়েও। [615]

غَيْرَ أَنَّهُ رُوِيَتْ رِوَايَاتٌ كَثِيرَةٌ مِنْ جِهَةِ الْخَاصَّةِ وَالْعَامَّةِ بِنُقْصَانِ كَثِيرٍ مِنْ آيِ الْقُرْآنِ وَنَقْلِ شَيْءٍ مِنْهُ مِنْ مَوْضِعٍ إِلَى مَوْضِعٍ طَرِيقُهَا الْآحَادُ الَّتِي لَا يَتَوَجَّبُ عِلْمًا فَالْأَوْلَى الْإِعْرَاضُ عَنْهَا وَتَرْكُ التَّشَاغُلِ بِهَا لِأَنَّهُ يُمْكِنُ تَأْوِيلُهَا.

বাংলা অনুবাদ: যদিও বিশেষ সম্প্রদায় ও সাধারণ সম্প্রদায়ের সূত্রে কোরআনের বহু আয়াতের হ্রাস এবং কিছু অংশ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরানোর বহু বর্ণনা এসেছে, সেগুলোর পথ একক সংবাদ, যা নিশ্চিত জ্ঞান প্রতিষ্ঠা করে না। তাই সেগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা ও তা নিয়ে ব্যস্ত না হওয়া শ্রেয়, কেননা সেগুলোর ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

এই বিতর্কে কাশানি কেবল পূর্বসূরিদের মত সাজিয়ে থামেননি। বিপুল আগ্রহ ও কঠোর তত্ত্বাবধানের কারণে পাঠ অপরিবর্তিত থাকার যুক্তির উত্তরে তিনি প্রস্তাব করেছেন, পরিবর্তন ঘটলে তা দেশদেশান্তরে বিস্তার ও বর্তমান অবস্থায় স্থিত হওয়ার আগেই ঘটেছে; কঠোর সংরক্ষণ তার পরের। এর যুক্তিগত ফল স্পষ্ট: কোনো পাঠ একটি নির্দিষ্ট সময় থেকে যত্নে সংরক্ষিত হওয়া এবং তার আগের সব পর্যায়েও অপরিবর্তিত থাকা পৃথক ঐতিহাসিক দাবি। পরবর্তী সংরক্ষণের প্রমাণ দিয়ে আগের প্রতিটি নির্বাচন ও বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই হয়ে যায় না। [616]

وَالتَّغْيِيرُ فِيهِ إِنْ وَقَعَ فَإِنَّمَا وَقَعَ قَبْلَ انْتِشَارِهِ فِي الْبُلْدَانِ وَاسْتِقْرَارِهِ عَلَى مَا هُوَ عَلَيْهِ الْآنَ. وَالضَّبْطُ الشَّدِيدُ إِنَّمَا كَانَ بَعْدَ ذَلِكَ فَلَا تَنَافِيَ بَيْنَهُمَا.

বাংলা অনুবাদ: এতে পরিবর্তন ঘটে থাকলে তা দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়া ও বর্তমান অবস্থায় স্থিত হওয়ার আগে ঘটেছে। কঠোর তত্ত্বাবধান হয়েছে তার পরে। তাই এ দুটির মধ্যে বিরোধ নেই।

কাশানির উদ্ধৃতিতে তাবারসি নামে দুই পূর্ববর্তী লেখকের পৃথক অবস্থানও এসেছে। আল-ইহতিজাজের আহমদ ইবনে আবি তালিব তাবারসিকে তিনি পরিবর্তনের বর্ণনা বহনকারী ধারায় রেখেছেন। মাজমাউল বয়ানের আবু আলী তাবারসির উদ্ধৃতিতে হ্রাসের ধারণার বিপরীত অবস্থান পাওয়া যায়। ফসলুল খিতাবের নুরি তাবারসি আবার পৃথক লেখক। নামের মিল দিয়ে তাঁদের বক্তব্য এক করে ফেললে কার যুক্তি ও কোন গ্রন্থের অবস্থান আলোচনা হচ্ছে তা বদলে যায়। [617]

وَكَذَلِكَ الشَّيْخُ أَحْمَدُ بْنُ أَبِي طَالِبٍ الطَّبَرْسِيُّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ فَإِنَّهُ أَيْضًا نَسَجَ عَلَى مِنْوَالِهِمَا فِي كِتَابِ الِاحْتِجَاجِ. وَأَمَّا الشَّيْخُ أَبُو عَلِيٍّ الطَّبَرْسِيُّ فَإِنَّهُ قَالَ فِي مَجْمَعِ الْبَيَانِ: أَمَّا الزِّيَادَةُ فِيهِ فَمُجْمَعٌ عَلَى بُطْلَانِهِ وَأَمَّا النُّقْصَانُ فِيهِ فَقَدْ رَوَى جَمَاعَةٌ مِنْ أَصْحَابِنَا وَقَوْمٌ مِنْ حَشْوِيَّةِ الْعَامَّةِ أَنَّ فِي الْقُرْآنِ تَغْيِيرًا وَنُقْصَانًا وَالصَّحِيحُ مِنْ مَذْهَبِ أَصْحَابِنَا خِلَافُهُ.

বাংলা অনুবাদ: একইভাবে শায়খ আহমদ ইবনে আবি তালিব তাবারসিও আল-ইহতিজাজে তাঁদের দুজনের পথ অনুসরণ করেছেন। আর শায়খ আবু আলী তাবারসি মাজমাউল বয়ানে বলেছেন: এতে সংযোজনের দাবি যে বাতিল, সে বিষয়ে ঐকমত্য আছে। হ্রাসের বিষয়ে আমাদের সহচরদের একটি দল এবং সাধারণ সম্প্রদায়ের হাশবিয়াদের কেউ কেউ কোরআনে পরিবর্তন ও হ্রাসের বর্ণনা দিয়েছে; আমাদের সহচরদের সঠিক মত তার বিপরীত।

লেখক বা সংকলনআলোচিত অবস্থানপাঠ ও কর্তৃত্বের সম্পর্ক
আল-কাফির কিতাবুল হুজ্জাহপূর্ণ সংগ্রহ এবং সমস্ত প্রকাশ্য–অন্তর্নিহিত জ্ঞানের অধিকার ইমামদেরধর্মীয় উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে পূর্ণতার বিশেষ অধিকার।
সাদুকের আল-ইতিকাদাত; কাশানির উদ্ধৃতিমানুষের হাতে থাকা গ্রন্থের চেয়ে অবতীর্ণ কোরআন বেশি নয়প্রকাশ্য মুসহাফের পূর্ণতা স্বীকার।
তুসির আত-তিবয়ান; কাশানির উদ্ধৃতিহ্রাসের খবর আছে, কিন্তু সেগুলো নিশ্চিত জ্ঞান প্রতিষ্ঠা করে নাবর্ণনা গ্রহণের মানদণ্ড নিয়ে মতবিরোধ।
আহমদ ইবনে আবি তালিব তাবারসি, আল-ইহতিজাজকাশানির আলোচনায় পরিবর্তনের বর্ণনা বহনকারী ধারার লেখকএই লেখক নুরি তাবারসি নন।
আবু আলী তাবারসি, মাজমাউল বয়ানহ্রাসের ধারণার বিপরীত অবস্থানকে সঠিক মত বলেছেনএকই নামের অন্য লেখকের সঙ্গে অবস্থান এক নয়।
হুসাইন নুরি তাবারসি, ফসলুল খিতাবআলীর সংগ্রহে বিন্যাস ও প্রকৃত পাঠের অতিরিক্ত উপাদানের দাবিপ্রচলিত মুসহাফের বাইরের পূর্ণতাকে ইমামদের উত্তরাধিকারে স্থাপন।

কুলায়নির ব্যক্তিগত বিশ্বাস সম্পর্কে কাশানির মন্তব্যও একটি নির্দিষ্ট অনুমান। তাঁর যুক্তি হচ্ছে, কুলায়নি আল-কাফিতে পরিবর্তন ও হ্রাসের খবর এনেছেন, সেগুলোর ত্রুটি আলোচনা করেননি এবং ভূমিকায় নিজের বর্ণনার ওপর আস্থার কথা বলেছেন; তাই তাঁর বিশ্বাসও সে রকম ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। বর্ণনা সংরক্ষণ করা এবং সংকলকের নিজের মত সরাসরি লেখা—দুটি পৃথক ধরনের সাক্ষ্য। কাশানি প্রথমটি থেকে দ্বিতীয়টির সিদ্ধান্ত টেনেছেন। আল-কাফিতে খবরগুলোর উপস্থিতি প্রত্যক্ষ তথ্য; সব খবরের প্রতি কুলায়নির ব্যক্তিগত অবস্থানের ব্যাখ্যা কাশানির সিদ্ধান্ত। [618]

فَالظَّاهِرُ مِنْ ثِقَةِ الْإِسْلَامِ مُحَمَّدِ بْنِ يَعْقُوبَ الْكُلَيْنِيِّ طَابَ ثَرَاهُ أَنَّهُ كَانَ يَعْتَقِدُ التَّحْرِيفَ وَالنُّقْصَانَ فِي الْقُرْآنِ لِأَنَّهُ كَانَ رَوَى رِوَايَاتٍ فِي هَذَا الْمَعْنَى فِي كِتَابِهِ الْكَافِي وَلمْ يَتَعَرَّضْ لِقَدْحٍ فِيهَا مَعَ أَنَّهُ ذَكَرَ فِي أَوَّلِ الْكِتَابِ أَنَّهُ كَانَ يَثِقُ بِمَا رَوَاهُ فِيهِ.

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নি সম্পর্কে প্রতীয়মান হয় যে তিনি কোরআনের পরিবর্তন ও হ্রাসে বিশ্বাস করতেন। কারণ তিনি আল-কাফিতে এই অর্থের বর্ণনা এনেছেন, সেগুলোর সমালোচনা করেননি এবং গ্রন্থের শুরুতে বলেছেন যে এতে যা বর্ণনা করেছেন তার ওপর তিনি আস্থা রাখেন।

পূর্ণ পাঠ সাধারণ মানুষের হাতে না থাকলেও ধর্মীয় কর্তৃত্ব বহাল রাখার যুক্তিটি কাশানির শেষ মন্তব্যে আরও স্পষ্ট। তাঁর প্রস্তাবে প্রত্যেক যুগে পূর্ণ কোরআন তার অধিকারীদের কাছে এবং প্রয়োজনীয় অংশ সাধারণ মানুষের কাছে থাকাই যথেষ্ট। অদৃশ্য ইমামের সঙ্গে অপ্রাপ্য পূর্ণ পাঠের তুলনাও তিনি করেছেন। পরের বাক্যে অনুপস্থিতির সময়ে ইমামদের বক্তব্যে পারদর্শী ব্যক্তির প্রতিনিধিত্বের কথা আছে। এভাবে পূর্ণ গ্রন্থের অপ্রাপ্যতা কর্তৃত্বকে দুর্বল করার বদলে ইমাম ও তাঁর প্রতিনিধির ওপর নির্ভরতার ভিত্তি হয়ে ওঠে। [619]

أَقُولُ: يَكْفِي فِي وُجُودِهِ فِي كُلِّ عَصْرٍ وُجُودُهُ جَمِيعًا كَمَا أَنْزَلَهُ اللَّهُ مَحْفُوظًا عِنْدَ أَهْلِهِ وَوُجُودُ مَا احْتَجْنَا إِلَيْهِ مِنْهُ عِنْدَنَا وَإِنْ لَمْ نَقْدِرْ عَلَى الْبَاقِي كَمَا أَنَّ الْإِمَامَ عَلَيْهِ السَّلَامُ كَذَلِكَ فَإِنَّ الثَّقَلَيْنِ سِيَّانِ فِي ذَلِكَ.

বাংলা অনুবাদ: আমি বলছি: প্রত্যেক যুগে এর অস্তিত্বের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে আল্লাহ যেভাবে নাজিল করেছেন সেভাবে এর সম্পূর্ণ রূপ তার অধিকারীদের কাছে সংরক্ষিত থাকবে, আর আমাদের প্রয়োজনীয় অংশ আমাদের কাছে থাকবে—যদিও বাকি অংশে আমাদের প্রবেশাধিকার না থাকে। ইমামের অবস্থাও সে রকম; এ বিষয়ে দুই মূল্যবান উত্তরাধিকারের অবস্থা একই।

এই কাঠামোয় পূর্ণতার দাবিটি জনসমক্ষে তুলনা করার সুযোগের বাইরে চলে যায়। সাধারণ মানুষ যে পাঠ হাতে পান, সেটি তাঁরা দেখতে ও পড়তে পারেন; গোপন পূর্ণতার দাবি মেনে নিতে হয় উত্তরাধিকারী কর্তৃপক্ষের কথায়। অতিরিক্ত পাঠ সামনে না থাকায় শব্দে শব্দে তুলনা স্থগিত থাকে ভবিষ্যৎ প্রকাশের জন্য। বর্তমানের বিশ্বাস ও আনুগত্যের দাবি কার্যকর থাকে, কিন্তু সেই দাবির সম্পূর্ণ পাঠগত ভিত্তি প্রত্যেকের পরীক্ষার জন্য উন্মুক্ত হয় না। আলীর নামে বর্ণিত পূর্ণ সংগ্রহের সামাজিক ক্ষমতা এখানেই: অপ্রাপ্য গ্রন্থও একটি উপস্থিত কর্তৃত্ব নির্মাণ করে।

প্রাথমিক আরবি গ্রন্থগুলোর উন্মুক্ত পাঠে এই বিভিন্ন অবস্থান সরাসরি পাওয়া যায়। আল-কাফি, তাফসিরুস সাফি ও ফসলুল খিতাবের বক্তব্যের বদলে কোনো প্রতিপক্ষের সারাংশকে একমাত্র পরিচয় বানালে এই অভ্যন্তরীণ বিরোধ আড়াল হয়। আলীর সংগ্রহ, সাধারণ মানুষের মুসহাফ, ইমামদের পূর্ণ জ্ঞান এবং রাষ্ট্রীয় অনুমোদনের সম্পর্ক একেক লেখক একেকভাবে নির্ধারণ করেছেন। গৃহীত মুসহাফের ইতিহাসে তাই পাঠের সীমানার সঙ্গে ক্ষমতার সীমানাও রয়েছে: কার সংগ্রহ প্রচলিত হবে, কার পাঠ স্থগিত থাকবে এবং কার দাবিকে পূর্ণতার শেষ কথা হিসেবে মানতে হবে।


উসমানের সংকলন: রাষ্ট্রীয় মান্য পাঠ নির্ধারণের প্রক্রিয়া

উসমানের সংকলন কোরআনের ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় মান্যতা নির্ধারণের একটি সুস্পষ্ট পর্যায়। কোন উপকরণকে ভিত্তি করা হবে, কারা নতুন অনুলিপি প্রস্তুত করবেন, মতভেদে কার ভাষা অগ্রাধিকার পাবে এবং কোন কপি প্রদেশগুলোর জন্য আদর্শ হবে—এসব বিষয়ে খলিফার নির্দেশ কার্যকর হয়েছে। ব্যক্তিগত পাঠ ও স্থানীয় শিক্ষকতার ওপর নির্ভরশীল পরম্পরার মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় লিখিত মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেই মানদণ্ডের সঙ্গে অন্য সংগ্রহের সম্পর্কও বদলে গেছে: আগে কোনো শিক্ষকের মর্যাদা ও তাঁর কাছ থেকে শেখা পাঠ অনুসরণের কারণ হতে পারত; নতুন ব্যবস্থায় অনুমোদিত মুসহাফের সঙ্গে সামঞ্জস্য একটি নির্ধারক শর্ত হয়ে দাঁড়ায়।

এই উদ্যোগের ভেতরে নকল প্রস্তুত, ভাষা নির্বাচন, সাক্ষ্য অনুসন্ধান ও অনুমোদনের পৃথক কাজ ছিল। হাফসার সহিফা সংগ্রহটির ভিত্তি হয়েছে; সেই ভিত্তি ব্যবহার করেও মতভেদ নিষ্পত্তি এবং একটি আয়াত নতুন করে খুঁজে সংযুক্ত করার প্রয়োজনের কথা বর্ণনায় আছে। কাজ শেষ হওয়ার পরে অঞ্চলগুলোতে অনুমোদিত মুসহাফ পাঠানো হয়েছে। ফলে গৃহীত পাঠের কর্তৃত্ব শুধু তার শব্দের ধর্মীয় পরিচয় থেকে আসেনি; নির্বাচিত সংগ্রহ, নিযুক্ত ব্যক্তি এবং কেন্দ্র থেকে পাঠানো কপির প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও তার প্রচলন নির্ধারণ করেছে।


আর্মেনিয়া–আজারবাইজানের অভিযানে পাঠবিরোধ ও হুযাইফার সতর্কতা

উসমানের উদ্যোগের প্রধান বর্ণনাটি আনাস ইবনে মালিকের সূত্রে এসেছে। আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের অভিযানে শাম ও ইরাকের লোকদের একত্র হওয়ার সময়ে হুযাইফা তাঁদের পাঠবিরোধে আতঙ্কিত হন। তিনি বিষয়টি খলিফার কাছে নিয়ে গিয়ে ধর্মগ্রন্থ নিয়ে ইহুদি–খ্রিষ্টানদের মতো বিভক্ত হওয়ার আগে ব্যবস্থা নিতে বলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল একটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ বিভাজন নিয়ে। এর প্রতিকারে স্থানীয় শিক্ষক বা পাঠকদের নিজেদের মধ্যে বিষয়টি মীমাংসা করতে বলা হয়নি; কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ নতুন মান্য মুসহাফ প্রস্তুতের উদ্যোগ নিয়েছে। [620] [621]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৩/ ফাজায়ীলুল কুরআন
পরিচ্ছেদঃ কুরআন সংকলন
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৬২৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৯৮৭ – ৪৯৮৮
৪৬২৬। মূসা (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) একবার উসমান (রাঃ) এর কাছে এলেন। এ সময় তিনি আরমিনিয়া ও আযারবাইজান বিজয়ের ব্যাপারে সিরীয় ও ইরাকী যোদ্ধাদের জন্য রণ-প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কুরআন পাঠে তাঁদের মতবিরোধ হুযায়ফাকে ভীষণ চিন্তিত করল। সুতরাং তিনি উসমান (রাঃ) কে বললেন, হে আমীরুল মু’মিনীন! কিতাব সম্পর্কে ইহুদী ও নাসারাদের মত মত পার্থক্যে লিপ্ত হবার পূর্বে এই উম্মতকে রক্ষা করুন। তারপর উসমান (রাঃ) হাফসা (রাঃ) এর কাছে জনৈক ব্যক্তিকে এ বলে পাঠালেন যে, আপনার কাছে সংরক্ষিত কুরআনের সহীফাসমূহ আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন, যাতে আমরা সেগুলোকে পরিপূর্ণ মাসহাফসমূহে লিপিবদ্ধ করতে পারি। এরপর আমরা তা আপনার কাছে ফিরিয়ে দেব।
হাফসা (রাঃ) তখন সেগুলো উসমান (রাঃ) এর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। এরপর উসমান (রাঃ) যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ), আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র (রাঃ), সাঈদ ইবনু আস (রাঃ) এবং আবদুর রহমান ইবনু হারিস ইবনু হিশাম (রাঃ) কে নির্দেশ দিলেন। তাঁরা মাসহাফে তা লিপিবদ্ধ করলেন। এ সময় উসমান (রাঃ) তিনজন কুরাইশী ব্যক্তিকে বললেন, কুরআনের কোন বিষয়ে যদি যায়দ ইবনু সাবিতের সঙ্গে তোমাদের মতপার্থক্য দেখা দেয়, তাহলে তোমরা তা কুরাইশদের ভাষায় লিপিবদ্ধ করবে। কারণ, কুরআন তাদের ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং তাঁরা তাই করলেন। যখন মূল লিপিগুলো থেকে কয়েকটি পরিপূর্ণ গ্রন্থ লিপিবদ্ধ হয়ে গেল, তখন উসমান (রাঃ) মূল লিপিগুলো হাফসা (রাঃ) এর কাছে ফিরিয়ে দিলেন। তারপর তিনি কুরআনের লিখিত মাসহাফ সমূহের এক একখানা মাসহাফ এক এক প্রদেশে পাঠিয়ে দিলেন এবং এতদভিন্ন আলাদা আলাদা বা একত্রে সন্নিবেশিত কুরআনের যে কপিসমূহ রয়েছে তা জ্বালিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন।
ইবনু শিহাব (রহঃ) খারিজা ইবনু যায়দ ইবনু সাবিতের মাধ্যমে যায়দ ইবনু সাবিত থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমরা যখন গ্রন্থকারে কুরআন লিপিবদ্ধ করছিলাম তখন সূরা আহযাবের একটি আয়াত আমার থেকে হারিয়ে যায়; অথচ আমি তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে পাঠ করতে শুনেছি। তাই আমরা অনুসন্ধান করতে লাগলাম। অবশেষে আমরা তা খুযায়মা ইবনু সাবিত আনসারী (রাঃ) এর কাছে পেলাম। আয়াতটি হচ্ছে এইঃ “মু’মিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সঙ্গে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, তাদের কেউ কেউ শাহাদত বরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে। তাঁরা তাদের অঙ্গীকারে কোন পরিবর্তন করেনি”। (৩৩: ২৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

সামরিক অভিযানে বিভিন্ন অঞ্চলের পাঠক একত্র হওয়া মতভেদের প্রকাশ ঘটিয়েছে। প্রত্যেক অঞ্চল নিজের পরিচিত শিক্ষকের পাঠ সঙ্গে এনেছিল। ইবনে হাজার উমারা ইবনে গাযিয়্যার সূত্রে একটি বিস্তৃত বিবরণ উদ্ধৃত করেছেন: শামের লোকেরা উবাই ইবনে কাবের পাঠে এমন কিছু পড়ছিল, যা ইরাকিরা শোনেনি; ইরাকিরা ইবনে মাসউদের পাঠে এমন কিছু পড়ছিল, যা শামিরা শোনেনি। সেই বিবরণে একে অপরকে কাফের বলার কথাও আছে। মতভেদের বিষয় কেবল কার কণ্ঠ সুন্দর বা কে বেশি সাবলীল, তা ছিল না; শোনা পাঠের পরিচয় ও ধর্মীয় বৈধতাই বিরোধের বিষয় হয়ে উঠেছিল। [622]

فَإِذَا أَهْلُ الشَّامِ يَقْرَءُونَ بِقِرَاءَةِ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ فَيَأْتُونَ بِمَا لَمْ يَسْمَعْ أَهْلُ الْعِرَاقِ، وَإِذَا أَهْلُ الْعِرَاقِ يَقْرَءُونَ بِقِرَاءَةِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ فَيَأْتُونَ بِمَا لَمْ يَسْمَعْ أَهْلُ الشَّامِ، فَيُكَفِّرُ بَعْضُهُمْ بَعْضًا.

বাংলা অনুবাদ: শামের লোকেরা উবাই ইবনে কাবের পাঠে এমন কিছু পড়ছিল, যা ইরাকের লোকেরা শোনেনি; আর ইরাকের লোকেরা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের পাঠে এমন কিছু পড়ছিল, যা শামের লোকেরা শোনেনি। ফলে তারা পরস্পরকে কাফের বলছিল।

এই উদ্যোগের সময় নির্ধারণে ইবনে হাজার আর্মেনিয়ার অভিযান এবং উসমানের খুতবা-সংক্রান্ত বিবরণ মিলিয়েছেন। তিনি ঘটনাটিকে ২৫ হিজরিতে রেখেছেন; আরও নির্দিষ্ট আলোচনায় ২৪ হিজরির শেষ ও ২৫ হিজরির শুরুর কথা বলেছেন। তাঁর সময়নির্ণয়ে শাসনের কেন্দ্র থেকে নতুন বিজিত এলাকার পাঠবিরোধ পর্যন্ত ঘটনাগুলো সংযুক্ত হয়েছে। কোরআনের এই মান নির্ধারণ তখন মুহাম্মদের মৃত্যুর পরবর্তী সম্প্রসারিত রাষ্ট্রের মধ্যে ঘটছে; পরিবর্তিত প্রশাসনিক পরিসরেই পূর্ববর্তী স্থানীয় পাঠসমাজগুলো পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছে। [623]

فَيَكُونُ ذَلِكَ فِي أَوَاخِرِ سَنَةِ أَرْبَعٍ وَعِشْرِينَ وَأَوَائِلِ سَنَةِ خَمْسٍ وَعِشْرِينَ وَهُوَ الْوَقْتُ الَّذِي ذَكَرَ أَهْلُ التَّارِيخِ أَنَّ أَرْمِينِيَّةَ فُتِحَتْ فِيهِ.

বাংলা অনুবাদ: তাহলে তা হবে ২৪ হিজরির শেষ ও ২৫ হিজরির শুরুতে; ইতিহাসলেখকদের উল্লেখ অনুযায়ী ওই সময়েই আর্মেনিয়া বিজিত হয়েছিল।

এই সমস্যার সংবাদ শুধু সীমান্তের সৈন্যদের নিয়ে নয়। সুয়ুতি ইবনে আশতার সূত্রে আবু কিলাবার বর্ণনায় শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যেও বিরোধ ও সংঘর্ষের কথা এনেছেন। সেখানে উসমান বলেন, তাঁর কাছেই যদি এমন অবস্থা হয়, দূরের লোকদের অবস্থা আরও খারাপ হবে। এরপর “মানুষের জন্য একটি ইমাম লিখে দাও”—অর্থাৎ অনুসরণযোগ্য আদর্শ গ্রন্থ প্রস্তুতের নির্দেশ আসে। “ইমাম” শব্দটি এখানে একটি লিখিত মানদণ্ডের অবস্থান বোঝায়, যার সাহায্যে পরবর্তী অনুলিপি ও পাঠ বিচার করা হবে। [624]

اخْتَلَفُوا فِي الْقِرَاءَةِ عَلَى عَهْدِ عُثْمَانَ حَتَّى اقْتَتَلَ الْغِلْمَانُ وَالْمُعَلِّمُونَ فَبَلَغَ ذَلِكَ عُثْمَانَ بْنَ عَفَّانَ فَقَالَ: عِنْدِي تُكَذِّبُونَ بِهِ وَتَلْحَنُونَ فِيهِ فَمَنْ نَأَى عَنِّي كَانَ أَشَدَّ تَكْذِيبًا وَأَكْثَرَ لَحْنًا. يَا أَصْحَابَ مُحَمَّدٍ اجْتَمِعُوا فَاكْتُبُوا لِلنَّاسِ إِمَامًا.

বাংলা অনুবাদ: উসমানের আমলে তারা পাঠ নিয়ে মতভেদ করল; এমনকি ছাত্র ও শিক্ষকরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ল। সংবাদ উসমান ইবনে আফফানের কাছে পৌঁছালে তিনি বললেন: আমার কাছেই তোমরা এটি নিয়ে পরস্পরকে মিথ্যা বলছ এবং ভুল পড়ছ! যারা আমার থেকে দূরে, তারা আরও বেশি অস্বীকার ও ভুল করবে। হে মুহাম্মদের সাহাবিরা, একত্র হও এবং মানুষের জন্য একটি আদর্শ গ্রন্থ লিখে দাও।

বিরোধের ক্ষেত্রবর্ণিত অবস্থাকেন্দ্রীয় উদ্যোগে প্রভাব
যৌথ সামরিক অভিযানশাম ও ইরাকের পাঠকদের পারস্পরিক অপরিচিত পাঠস্থানীয় বিরোধ খলিফার কাছে একটি সাম্রাজ্যব্যাপী সমস্যায় পরিণত হয়।
শিক্ষক ও ছাত্রশিক্ষাপরম্পরার বিরোধ সংঘর্ষ পর্যন্ত পৌঁছানোর সংবাদভিন্ন শিক্ষকের পাঠের ওপর একটি লিখিত আদর্শ প্রতিষ্ঠার দাবি আসে।
ধর্মীয় পরিচয়কোনো কোনো বিবরণে পরস্পরকে কাফের বলাপাঠের পার্থক্য আনুগত্য ও বিশ্বাসের সীমানা নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়।
প্রতিকারের কর্তৃপক্ষহুযাইফার উসমানের কাছে আবেদনসমাধানের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় শাসকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।

এই সূত্রগুলোতে সংকলনের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে বিদ্যমান বিরোধ দিয়ে। পরবর্তী একরূপতার ছবি থেকে শুরু করলে সেই প্রয়োজনের কারণই হারিয়ে যায়। বিভিন্ন পাঠের মধ্যে সংঘাত ছিল বলেই একটি আদর্শ মুসহাফের রাজনৈতিক প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। গৃহীত পাঠকে অনুসরণ করানোর ক্ষমতাসম্পন্ন শাসক তখন পাঠসংক্রান্ত বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তিকারী হয়েছেন। কেন্দ্রীয় সংকলন ভিন্ন পরম্পরার ওপর একটি অনুমোদিত মানদণ্ড বসিয়েছে। পরবর্তী একরূপতার উৎসে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের নির্দিষ্ট ঘটনা রয়েছে।


হাফসার সহিফা ধার নেওয়া এবং আবু বকরের সংগ্রহের ব্যবহার

নতুন মুসহাফ প্রস্তুতের ভিত্তি হিসেবে উসমান হাফসার কাছে থাকা সহিফা নির্বাচন করেন। এর ফলে আবু বকরের উদ্যোগে তৈরি সংগ্রহটি পরবর্তী রাষ্ট্রীয় সংকলনের প্রামাণ্য উপকরণে পরিণত হয়। ইবনে হাজার ইউনুসের সূত্রে বর্ণনাটি উদ্ধৃত করেছেন আরও নির্দিষ্ট ভাষায়: আবু বকর যায়েদকে যে সহিফা সংগ্রহ করতে বলেছিলেন, সেটি বের করে তা থেকে মুসহাফ নকল করা হয়। নতুন উদ্যোগের সঙ্গে আগের উদ্যোগের সম্পর্ক এখানে অনুমানের বিষয় নয়; বর্ণনাতেই সংগ্রহটির পরিচয় দেওয়া হয়েছে। [625]

فَاسْتَخْرَجَ الصَّحِيفَةَ الَّتِي كَانَ أَبُو بَكْرٍ أَمَرَ زَيْدًا بِجَمْعِهَا فَنَسَخَ مِنْهَا مَصَاحِفَ فَبَعَثَ بِهَا إِلَى الْآفَاقِ.

বাংলা অনুবাদ: আবু বকর যায়েদকে যে সহিফা সংগ্রহ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেটি বের করে তিনি তা থেকে কয়েকটি মুসহাফ নকল করেন এবং সেগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠান।

হাফসার হেফাজতে থাকা উপকরণ হাতে নেওয়া এবং সেটির স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নেওয়া একই ঘটনা হয়নি। বুখারির বিবরণে ধার নেওয়ার অনুরোধের সঙ্গে ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আছে; কাজ শেষ হলে তা ফেরতও দেওয়া হয়। ইবনে হাজার মালিকের সূত্রে আরও একটি বর্ণনা এনেছেন, যেখানে হাফসার প্রাথমিক অস্বীকৃতি এবং উসমানের ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকারের কথা রয়েছে। এই বিবরণে খলিফার উদ্যোগও হাফসার হেফাজতে থাকা পুরোনো সংগ্রহটির কাছে গিয়ে তার ব্যবহার নিশ্চিত করছে। পুরোনো সহিফা ও নতুন অনুমোদিত অনুলিপি তখন পৃথক উপকরণ হিসেবেই থেকে যায়। [626]

فَأَرْسَلَ عُثْمَانُ إِلَى حَفْصَةَ فَطَلَبَهَا فَأَبَتْ حَتَّى عَاهَدَهَا لَيَرُدَّنَّهَا إِلَيْهَا، فَنَسَخَ مِنْهَا ثُمَّ رَدَّهَا.

বাংলা অনুবাদ: উসমান হাফসার কাছে লোক পাঠিয়ে সেটি চাইলেন। তিনি অস্বীকার করলেন, যতক্ষণ না উসমান তাঁকে সেটি অবশ্যই ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করলেন। তারপর তিনি তা থেকে অনুলিপি তৈরি করে সেটি ফেরত দিলেন।

সহিফা থেকে মুসহাফে নকলের বর্ণনায় গ্রন্থের বিন্যাসের প্রশ্নও এসেছে। ইবনে হাজার সহিফাকে আবু বকরের সময়ে সংগৃহীত পৃথক পাতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন; তাঁর ব্যাখ্যায় প্রত্যেক সূরার আয়াত সাজানো থাকলেও সূরাগুলো একটির পরে আরেকটি গ্রন্থাকারে সাজানো ছিল না। পরে সূরাগুলো পরপর বিন্যস্ত করে মুসহাফ তৈরি হয়। এটি সহিফা ও মুসহাফের পার্থক্য সম্পর্কে ভাষ্যকারের ব্যাখ্যা। এর মাধ্যমে তিনি সংগ্রহের দ্বিতীয় পর্যায়ে একই উপাদান গ্রন্থাকারে বিন্যস্ত করার একটি কাজ চিহ্নিত করেছেন। [627]

وَالْفَرْقُ بَيْنَ الصُّحُفِ وَالْمُصْحَفِ أَنَّ الصُّحُفَ الْأَوْرَاقُ الْمُجَرَّدَةُ الَّتِي جُمِعَ فِيهَا الْقُرْآنُ فِي عَهْدِ أَبِي بَكْرٍ، وكانت سور مفرقة كُلُّ سُورَةٍ مُرَتَّبَةٌ بِآيَاتِهَا عَلَى حِدَةٍ لَكِنْ لَمْ يُرَتَّبْ بَعْضُهَا إِثْرَ بَعْضٍ، فَلَمَّا نُسِخَتْ وَرُتِّبَ بَعْضُهَا إِثْرَ بَعْضٍ صَارَتْ مُصْحَفًا.

বাংলা অনুবাদ: সহিফা ও মুসহাফের পার্থক্য হচ্ছে, সহিফা সেই পৃথক পাতা, যাতে আবু বকরের সময়ে কোরআন সংগ্রহ করা হয়েছিল। সূরাগুলো পৃথক ছিল; প্রত্যেক সূরার আয়াত আলাদাভাবে সাজানো ছিল, কিন্তু সূরাগুলো পরপর সাজানো ছিল না। পরে সেগুলো নকল করে একটির পর আরেকটি সাজানো হলে তা মুসহাফে পরিণত হয়।

উপকরণ বা কাজকার্যকর ভূমিকাকর্তৃত্বের পরিবর্তন
হাফসার সহিফানতুন অনুলিপির নির্বাচিত ভিত্তিআগের সংগ্রহ পরবর্তী অনুমোদনের প্রাথমিক দলিল হয়।
নিযুক্ত লেখকদের প্রস্তুত মুসহাফপাঠ ও লিখিত রূপ নির্ধারণ করে নতুন কপি তৈরিপুরোনো উপকরণের ব্যবহার একটি নির্দেশিত সম্পাদনা ও অনুলিপি প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে।
সহিফা ফেরতব্যবহৃত পুরোনো উপকরণ হাফসার হেফাজতে ফিরে যায়ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত নথি এবং প্রচারের জন্য অনুমোদিত গ্রন্থ পৃথক থাকে।
আঞ্চলিক মুসহাফকেন্দ্র থেকে পাঠানো অনুসরণযোগ্য কপিদলিলের উৎসের সঙ্গে খলিফার অনুমোদন যুক্ত হয়ে প্রদেশে মান্যতা তৈরি করে।

এই ব্যবস্থায় নতুন গ্রন্থের বংশপরিচয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে একটি নির্দিষ্ট পূর্ববর্তী সংগ্রহের মাধ্যমে। একই সময়ে অন্য সাহাবির ব্যক্তিগত মুসহাফকে সেই ভূমিকা দেওয়া হয়নি। কোনো সংগ্রহের বয়স, কোনো পাঠকের খ্যাতি বা নবীর কাছ থেকে তাঁর দীর্ঘ শিক্ষা নিজে থেকে কেন্দ্রীয় আদর্শ হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করেনি। কোন উপকরণ থেকে রাষ্ট্রের অনুমোদিত কপি তৈরি হবে, সেই নির্বাচনটিও সংকলনের ইতিহাসের অংশ। হাফসার সহিফা তাই শুধু তথ্যের ভাণ্ডার নয়; আগের খলিফার সংগ্রহ ও পরের খলিফার অনুমোদিত পাঠের মধ্যে বৈধতার সংযোগ।

“পুরোনো নথি ব্যবহার করা হয়েছে” কথাটি প্রক্রিয়ার সূচনা ব্যাখ্যা করে; নতুন সংকলনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের বিবরণ তার মধ্যে থাকে না। উপকরণ নেওয়ার পরে লেখক নির্বাচন, ভাষার অগ্রাধিকার, অনুলিপির যাচাই এবং প্রচারের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। উৎসের পরিচয় ও নতুন মুসহাফের অনুমোদন দুটি পৃথক ধাপ। একটির প্রামাণ্যতা অন্যটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকাকে মুছে দেয় না।


যায়েদ ও তিন কুরাইশির সংকলন-কমিটি

বুখারির বর্ণনায় উসমান যে চার ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিয়েছেন, তাঁদের নাম নির্দিষ্ট: যায়েদ ইবনে সাবিত, আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর, সাঈদ ইবনুল আস এবং আবদুর রহমান ইবনুল হারিস ইবনে হিশাম। দায়িত্ব দেওয়ার ক্রিয়াটি উসমানের; কাজে প্রবেশের অনুমোদনও তাঁর নির্দেশে। তাঁদের মধ্যে যায়েদ আনসারি এবং অন্য তিনজন কুরাইশি। ইবনে হাজার তিন কুরাইশির বংশপরিচয়ও আলাদা করে উল্লেখ করেছেন। কমিটির গঠন এবং মতভেদে কোন সদস্যদের ভাষা প্রাধান্য পাবে—এই দুটি বিষয় পরে একই নির্দেশে যুক্ত হয়েছে। [628]

يَعْنِي سَعِيدًا وَعَبْدَ اللَّهِ وَعَبْدَ الرَّحْمَنِ، لِأَنَّ سَعِيدًا أُمَوِيٌّ وَعَبْدَ اللَّهِ أَسَدِيٌّ وَعَبْدَ الرَّحْمَنِ مَخْزُومِيٌّ وَكُلُّهَا مِنْ بُطُونِ قُرَيْشٍ.

বাংলা অনুবাদ: সাঈদ, আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমানকে বোঝানো হয়েছে। কেননা সাঈদ উমাইয়া বংশের, আবদুল্লাহ আসাদ বংশের এবং আবদুর রহমান মাখযুম বংশের; সবগুলোই কুরাইশের শাখা।

সদস্যবর্ণনায় পরিচয়কমিটির কাঠামোয় অবস্থান
যায়েদ ইবনে সাবিতআনসারি; আগের সহিফা সংগ্রহেও তাঁর ভূমিকা ছিলপূর্ববর্তী সংগ্রহের কাজের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ এবং লেখকের দায়িত্ব।
আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরকুরাইশের আসাদ শাখাভাষাবিরোধে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত তিন সদস্যের একজন।
সাঈদ ইবনুল আসকুরাইশের উমাইয়া শাখাঅন্য বিবরণে বিশুদ্ধভাষী বলে পাঠ বলে দেওয়ার দায়িত্বের উল্লেখ।
আবদুর রহমান ইবনুল হারিস ইবনে হিশামকুরাইশের মাখযুম শাখাভাষাবিরোধে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত তিন সদস্যের একজন।

কমিটির ভেতর কাজের বিভাজনেরও একটি বিবরণ আছে। মুসআব ইবনে সাদের সূত্রে ইবনে হাজার উদ্ধৃত করেছেন, উসমান জিজ্ঞেস করেন কে সবচেয়ে ভালো লেখেন; উত্তরে যায়েদের নাম আসে। পরে সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষীর প্রশ্নে সাঈদের নাম এলে উসমান সাঈদকে বলে দিতে এবং যায়েদকে লিখতে বলেন। এই বিবরণে লেখার দক্ষতা ও ভাষার দক্ষতা দুটি আলাদা যোগ্যতা। লিখিত পাঠ তৈরি হচ্ছে একজনের উচ্চারণ ও অন্যজনের লিপিবদ্ধকরণের মধ্য দিয়ে, আর দায়িত্ববণ্টন করছেন খলিফা। [629]

فَقَالَ عُثْمَانُ: مَنْ أَكْتَبُ النَّاسِ؟ قَالُوا: كَاتِبُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ. قَالَ: فَأَيُّ النَّاسِ أَعْرَبُ، وَفِي رِوَايَةٍ أَفْصَحُ؟ قَالُوا: سَعِيدُ بْنُ الْعَاصِ، قَالَ عُثْمَانُ: فَلْيُمْلِ سَعِيدٌ وَلْيَكْتُبْ زَيْدٌ.

বাংলা অনুবাদ: উসমান বললেন: মানুষের মধ্যে সবচেয়ে ভালো লেখেন কে? তারা বলল: আল্লাহর রাসুলের লেখক যায়েদ ইবনে সাবিত। তিনি বললেন: আরবি ভাষায় সবচেয়ে দক্ষ কে? অন্য বর্ণনায় রয়েছে: সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী কে? তারা বলল: সাঈদ ইবনুল আস। উসমান বললেন: সাঈদ বলে দেবেন এবং যায়েদ লিখবেন।

চারজনের নামের পাশাপাশি বারোজনকে একত্র করার আরেকটি সংবাদও সংরক্ষিত হয়েছে। সুয়ুতি ইবনে আবি দাউদের সূত্রে কাসির ইবনে আফলাহর বর্ণনা এনেছেন: কুরাইশ ও আনসার থেকে বারোজনকে জড়ো করা হয়; উমরের ঘরের সংরক্ষিত বাক্স আনা হয়; উসমান তাঁদের কাজের খোঁজ রাখতেন; কোনো বিষয় নিয়ে বিরোধ হলে তা স্থগিত রাখা হতো। বুখারির চারজনের তালিকা এবং এই বারোজনের সংবাদ সহযোগিতার পরিসর সম্পর্কে পৃথক তথ্য দেয়। দ্বিতীয় সংবাদে সব বারোজনের নাম নেই; কার্যপ্রণালি সম্পর্কে অতিরিক্ত বিবরণ রয়েছে। [630]

لَمَّا أَرَادَ عُثْمَانُ أَنْ يَكْتُبَ الْمَصَاحِفَ جَمَعَ لَهُ اثْنَيْ عَشَرَ رَجُلًا مِنْ قُرَيْشٍ وَالْأَنْصَارِ فَبَعَثُوا إِلَى الرَّبْعَةِ الَّتِي فِي بَيْتِ عُمَرَ فَجِيءَ بِهَا وَكَانَ عُثْمَانُ يَتَعَاهَدُهُمْ فَكَانُوا إِذَا تَدَارَءُوا فِي شَيْءٍ أَخَّرُوهُ.

বাংলা অনুবাদ: উসমান মুসহাফগুলো লিখতে চাইলে তাঁর জন্য কুরাইশ ও আনসার থেকে বারোজনকে একত্র করা হয়। তাঁরা উমরের ঘরে থাকা বাক্সটি আনতে পাঠালেন; সেটি আনা হলো। উসমান তাঁদের কাজের খোঁজ রাখতেন। কোনো বিষয়ে তাঁদের বিরোধ হলে তাঁরা সেটি স্থগিত রাখতেন।

বিরোধ হলে স্থগিত রাখার পরে কী করা হতো, সে বিষয়ে ইবনে সিরিন নিজের ধারণা জানিয়েছেন। তাঁর ধারণা ছিল, শেষবার নবীর কাছে কোরআন পেশ করার ঘটনার সবচেয়ে নিকটবর্তী জ্ঞান যাঁর আছে, তাঁর বক্তব্য দেখা হতো। সুয়ুতি এই মন্তব্যে “আমি ধারণা করেছি” কথাটি রেখেছেন। ফলে কাজ স্থগিত করার সংবাদ এবং তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইবনে সিরিনের ব্যাখ্যা এক ধরনের সাক্ষ্য নয়। প্রথমটি কর্মপ্রণালির বর্ণনা; দ্বিতীয়টি পরবর্তী ব্যাখ্যামূলক অনুমান। [631]

قَالَ مُحَمَّدٌ: فَظَنَنْتُ أَنَّمَا كَانُوا يُؤَخِّرُونَهُ لِيَنْظُرُوا أَحْدَثَهُمْ عَهْدًا بِالْعَرْضَةِ الْأَخِيرَةِ فَيَكْتُبُونَهُ عَلَى قَوْلِهِ.

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদ বলেন: আমার ধারণা হয়েছে, তাঁরা বিষয়টি স্থগিত রাখতেন শেষবার কোরআন পেশ করার বিষয়ে কার জ্ঞান সবচেয়ে সাম্প্রতিক তা দেখার জন্য, যাতে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী সেটি লেখা যায়।


মতবিরোধে কুরাইশি ভাষায় লেখার নির্দেশ

মতভেদ নিষ্পত্তির জন্য উসমানের নির্দেশে একটি ভাষাকে আগেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তিন কুরাইশি ও যায়েদের মধ্যে কোরআনের কোনো বিষয়ে বিরোধ হলে কুরাইশের ভাষায় লিখতে হবে, কারণ কোরআন তাঁদের ভাষায় নাজিল হয়েছে—এটাই বুখারির বর্ণিত নির্দেশ। সদস্যসংখ্যার সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে এখানে নির্দিষ্ট ভাষাগত পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ: সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে কুরাইশি হওয়ার সঙ্গে ওহির ভাষার সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। ফলে যায়েদ লেখার কাজে যত গুরুত্বপূর্ণই হোন, ভাষার বিরোধে তাঁর নিজস্ব রূপ চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়। [632]

إِذَا اخْتَلَفْتُمْ أَنْتُمْ وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ فِي شَىْءٍ مِنَ الْقُرْآنِ فَاكْتُبُوهُ بِلِسَانِ قُرَيْشٍ فَإِنَّمَا نَزَلَ بِلِسَانِهِمْ.

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের ও যায়েদ ইবনে সাবিতের মধ্যে কোরআনের কোনো বিষয়ে মতভেদ হলে তা কুরাইশের ভাষায় লিখবে; কেননা তা তাঁদের ভাষায় নাজিল হয়েছে।

ইবনে হাজার শুআইবের বর্ণনায় নির্দেশটির আরেক ভাষা উল্লেখ করেছেন: “কোরআনের আরবির কোনো বিষয়ে” বিরোধ। এখানে লিখিত রূপ স্থির করার সঙ্গে উচ্চারণ ও আরবি ভাষার ব্যবহার সম্পর্কিত। একটি অক্ষর কীভাবে লেখা হবে, শব্দের শেষে কোন রূপ থাকবে এবং কোন ভাষাভ্যাস অনুসরণ করা হবে—এসব সিদ্ধান্ত লিখিত মুসহাফের দৃশ্যমান রূপ নির্ধারণ করে। অনুমোদিত লেখায় সেগুলো প্রতিষ্ঠিত হলে পরবর্তী অনুলিপিকারদের জন্য ওই রূপই আদর্শ হয়ে ওঠে। [633]

فِي رِوَايَةِ شُعَيْبٍ: فِي عَرَبِيَّةٍ مِنْ عَرَبِيَّةِ الْقُرْآنِ.

বাংলা অনুবাদ: শুআইবের বর্ণনায় রয়েছে: কোরআনের আরবির কোনো বিষয়ে।

ইবনুত তিনের নামে সংরক্ষিত ব্যাখ্যা এই নির্বাচনকে আরও বিস্তৃত ভাষাগত সংকোচন হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তাঁর ব্যাখ্যায় পাঠের বহুরূপতা পরস্পরকে ভুল বলার কারণ হলে উসমান বিভিন্ন ভাষার মধ্যে কুরাইশের ভাষায় সীমাবদ্ধ করেন। পূর্বে অন্য ভাষার রূপে পড়ার অনুমতি কষ্ট দূর করার জন্য ছিল; সেই প্রয়োজন শেষ হয়েছে বলে তিনি মনে করেছিলেন। এই ব্যাখ্যায় ভাষার বিস্তার অনুমোদিত থাকার পরে তা সীমিত করার সিদ্ধান্ত এসেছে মানুষের প্রয়োজন সম্পর্কে শাসকের মূল্যায়ন থেকে। [634]

وَجَمْعُ عُثْمَانَ كَانَ لَمَّا كَثُرَ الِاخْتِلَافُ فِي وُجُوهِ الْقِرَاءَةِ حَتَّى قَرَءُوهُ بِلُغَاتِهِمْ عَلَى اتِّسَاعِ اللُّغَاتِ فَأَدَّى ذَلِكَ بَعْضَهُمْ إِلَى تَخْطِئَةِ بَعْضٍ فَخَشِيَ مِنْ تَفَاقُمِ الْأَمْرِ فِي ذَلِكَ فَنَسَخَ تِلْكَ الصُّحُفَ فِي مُصْحَفٍ وَاحِدٍ مُرَتَّبًا لِسُوَرِهِ وَاقْتَصَرَ مِنْ سَائِرِ اللُّغَاتِ عَلَى لُغَةِ قُرَيْشٍ مُحْتَجًّا بِأَنَّهُ نَزَلَ بِلُغَتِهِمْ وَإِنْ كَانَ قَدْ وُسِّعَ فِي قِرَاءَتِهِ بِلُغَةِ غَيْرِهِمْ رَفْعًا لِلْحَرَجِ وَالْمَشَقَّةِ فِي ابْتِدَاءِ الْأَمْرِ فَرَأَى أَنَّ الْحَاجَةَ إِلَى ذَلِكَ قَدِ انْتَهَتْ فَاقْتَصَرَ عَلَى لُغَةٍ وَاحِدَةٍ.

বাংলা অনুবাদ: উসমানের সংকলন ঘটে যখন পাঠের রূপ নিয়ে মতভেদ বেড়ে যায়। ভাষার বিস্তৃতির কারণে লোকেরা নিজেদের ভাষায় পড়তে থাকে এবং একে অন্যকে ভুল বলতে থাকে। বিষয়টি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি ওই সহিফাগুলো সূরার ক্রমে একটি মুসহাফে নকল করেন এবং সব ভাষার মধ্যে কুরাইশের ভাষায় সীমাবদ্ধ করেন; কারণ হিসেবে বলেন, তা তাঁদের ভাষায় নাজিল হয়েছে। যদিও শুরুর সময়ে কষ্ট ও অসুবিধা দূর করার জন্য অন্যদের ভাষায় পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, তিনি মনে করেন সেই প্রয়োজন শেষ হয়েছে; তাই একটি ভাষায় সীমাবদ্ধ করেন।

নির্দেশের বিষয়বর্ণিত মানদণ্ডকার্যকর ফল
যায়েদ ও তিন কুরাইশির মতভেদকুরাইশের ভাষায় লেখাযায়েদের ভিন্ন রূপের ওপর কুরাইশি রূপের পূর্বনির্ধারিত অগ্রাধিকার।
অগ্রাধিকারের কারণকোরআন কুরাইশের ভাষায় নাজিল হওয়ার দাবিভাষাগত পছন্দ ধর্মীয় বৈধতা পায়।
ইবনুত তিনের ব্যাখ্যায় বহুরূপতাপ্রাথমিক সুবিধার প্রয়োজন শেষ হয়েছে বলে সিদ্ধান্তপূর্বে অনুমোদিত বিস্তারের পরিসর সংকুচিত করার ব্যাখ্যা।
লিখিত অনুলিপির প্রচলননির্ধারিত রূপই প্রদেশে পাঠানোকেন্দ্রের নির্বাচিত ভাষার রূপ পরবর্তী অনুলিপির মান হয়।

ভাষার শ্রেষ্ঠত্বের দাবি এবং ভাষাকে মান্য করার ক্ষমতা এখানে পরস্পরকে শক্তিশালী করেছে। কুরাইশি রূপকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ সিদ্ধান্তের ধর্মীয় কারণ ঘোষণা করে; খলিফার ক্ষমতা সেই সিদ্ধান্তকে অনুসরণযোগ্য আদেশে পরিণত করে। কোনো ভাষার রূপ আগে পড়া হতো বলেই সেটি নতুন লিখিত মানের সমান স্থান পায়নি। অনুমোদিত রূপ নির্ধারিত হওয়ার সঙ্গে অন্য রূপের অবস্থান বদলেছে। ফলে পাঠের ইতিহাসে ভাষাগত বৈচিত্র্য থেকে মান্য রূপে পৌঁছানোর পথটি প্রশাসনিক নির্বাচন ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার যৌথ ফল।


“তাবুত” শব্দ নিয়ে মতভেদ ও ভাষা নির্বাচনের দৃষ্টান্ত

কমিটির ভাষাবিরোধের একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টান্ত “তাবুত” শব্দ। তিরমিযির সংকলিত বর্ণনায় যুহরি জানিয়েছেন, কুরাইশি সদস্যরা “তাবুত” এবং যায়েদ “তাবুহ” বলেছিলেন। বিষয়টি উসমানের কাছে তোলা হলে তিনি “তাবুত” লিখতে বলেন। যে নীতিতে কুরাইশি ভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল, এখানে সেই নীতি একটি নির্দিষ্ট শব্দের লিখিত রূপে প্রয়োগ হয়েছে। সিদ্ধান্তের ধাপ তিনটি: সদস্যদের পৃথক পছন্দ, খলিফার কাছে বিরোধ উত্থাপন এবং খলিফার নির্দেশে একটি রূপ নির্বাচন। [635]

فَاخْتَلَفُوا يَوْمَئِذٍ فِي التَّابُوتِ وَالتَّابُوهِ فَقَالَ الْقُرَشِيُّونَ التَّابُوتُ وَقَالَ زَيْدٌ التَّابُوهُ فَرُفِعَ اخْتِلاَفُهُمْ إِلَى عُثْمَانَ فَقَالَ اكْتُبُوهُ التَّابُوتُ فَإِنَّهُ نَزَلَ بِلِسَانِ قُرَيْشٍ

বাংলা অনুবাদ: সেদিন তাঁদের মধ্যে “তাবুত” ও “তাবুহ” নিয়ে মতভেদ হলো। কুরাইশিরা বললেন “তাবুত”, আর জায়েদ বললেন “তাবুহ”। বিরোধটি উসমানের কাছে তোলা হলে তিনি বললেন: “তাবুত” লিখো; কারণ তা কুরাইশের ভাষায় নাজিল হয়েছে।

এই ঘটনায় নির্বাচনের বিষয় শব্দের শেষ ব্যঞ্জন ও তার লেখ্য রূপ। ইসলামকিউএ-তে মুসায়িদ আত-তায়্যারের ব্যাখ্যা উদ্ধৃত হয়েছে: কুরাইশিরা শেষের তা উচ্চারণ ও বিরামেও বজায় রাখতেন, আর আনসারদের ব্যবহারে আবদ্ধ তা ও বিরামে হা-র রূপ আসত। উচ্চারণের স্থানীয় অভ্যাস থেকে বানানের পার্থক্য কীভাবে তৈরি হতে পারে, ওই ব্যাখ্যা তার একটি নির্দিষ্ট ধরন দিয়েছে। দুই রূপের মধ্যে কোনটি গ্রন্থে থাকবে, সেই সিদ্ধান্তটি ভাষার প্রচলন নিজে নেয়নি; খলিফার নির্দেশ নিয়েছে। [636]

فَدَلَّ عَلَى أَنَّ الْقُرَشِيِّينَ يَفْتَحُونَ التَّاءَ، وَيَقِفُونَ عَلَيْهَا بِالتَّاءِ، وَالْأَنْصَارَ يَرْبِطُونَ التَّاءَ، وَيَقِفُونَ عَلَيْهَا بِالْهَاءِ.

বাংলা অনুবাদ: এতে বোঝা যায়, কুরাইশিরা তা-কে উন্মুক্ত রাখেন এবং বিরামেও তা উচ্চারণ করেন; আনসাররা তা-কে আবদ্ধ করেন এবং বিরামে হা উচ্চারণ করেন।

পক্ষ বা ধাপবর্ণিত রূপ বা সিদ্ধান্তমান্য লেখায় অবস্থান
যায়েদ ইবনে সাবিতالتابوه — তাবুহবিরোধে তাঁর প্রস্তাবিত রূপ রাখা হয়নি।
কুরাইশি সদস্যরাالتابوت — তাবুততাঁদের প্রস্তাবিত রূপ নির্বাচিত হয়।
উসমানের নির্দেশاكتبوه التابوت — তাবুত লিখোমতভেদের একটি পক্ষ রাষ্ট্রীয় অনুমোদন পায়।
ঘোষিত কারণকুরাইশের ভাষায় অবতীর্ণ হওয়ার দাবিনির্বাচিত রূপের ধর্মীয় যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

যায়েদ আগের সংগ্রহের লেখক এবং নতুন কাজের কেন্দ্রীয় সদস্য হয়েও নিজের পছন্দ কার্যকর করতে পারেননি। অপর তিন সদস্যের ভাষার রূপ শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়েছে এবং তা সমর্থনে খলিফা অবতরণের ভাষার কথা বলেছেন। লিখিত মানদণ্ড তৈরি হওয়ার আগে উপস্থিত দুটি প্রস্তাবের মধ্যে একটি রাখা হয়েছে। পরবর্তী অনুলিপিতে নির্বাচিত রূপটি দেখা গেলে তার পূর্ববর্তী নির্বাচনের ঘটনাটি সেই অক্ষরের মধ্যে নিজে থেকে দৃশ্যমান থাকে না; বর্ণনাই সেই সিদ্ধান্তের ইতিহাস বহন করে।

তিরমিযির দীর্ঘ সংকলিত বিবরণে আনাসের ঘটনা, যায়েদের আয়াত অনুসন্ধান এবং যুহরির নিজস্ব সংযোজন পাশাপাশি রয়েছে। ইবনে হাজার আল-খতিবের বক্তব্য উদ্ধৃত করে “তাবুত” প্রসঙ্গটি যুহরির মুরসাল বর্ণনা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর ফলে সংবাদটির স্তর নির্দিষ্ট হয়: কমিটির সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনের প্রত্যক্ষ বিবরণ হিসেবে যুহরি নিজে উপস্থিতির দাবি করেননি। তিরমিযির সংকলনে একটি দীর্ঘ পাঠের মধ্যে থাকা প্রতিটি অংশের বর্ণনাপথও অভিন্ন নয়। [637]

قَالَ الْخَطِيبُ: وَإِنَّمَا رَوَاهَا ابْنُ شِهَابٍ مُرْسَلَةً.

বাংলা অনুবাদ: আল-খতিব বলেন: ইবনে শিহাব এটি মুরসালভাবে বর্ণনা করেছেন।


নকলের সময় আহযাব ৩৩:২৩ অনুপস্থিত পাওয়া এবং খুজাইমার সাক্ষ্য

উসমানের মুসহাফ নকলের সময়ে যায়েদ সূরা আহযাবের একটি আয়াত খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি নিজেই বলছেন, মুহাম্মদকে আয়াতটি পড়তে শুনেছিলেন। ফলে তাঁর স্মৃতিতে পাঠটির উপস্থিতি এবং সংগ্রহের কাজে সেটি খুঁজে পাওয়ার প্রয়োজন একসঙ্গে ছিল। অনুসন্ধানে তিনি খুজাইমা ইবনে সাবিতের কাছে তা পান। বুখারির জিহাদ অধ্যায়ের বর্ণনায় এই ব্যক্তির বিশেষ পরিচয়ও আছে: মুহাম্মদ তাঁর সাক্ষ্যকে দুই ব্যক্তির সাক্ষ্যের সমান করেছিলেন। [638] [639]

نَسَخْتُ الصُّحُفَ فِي الْمَصَاحِفِ، فَفَقَدْتُ آيَةً مِنْ سُورَةِ الأَحْزَابِ، كُنْتُ أَسْمَعُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقْرَأُ بِهَا، فَلَمْ أَجِدْهَا إِلَّا مَعَ خُزَيْمَةَ بْنِ ثَابِتٍ الأَنْصَارِيِّ الَّذِي جَعَلَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم شَهَادَتَهُ شَهَادَةَ رَجُلَيْنِ، وَهْوَ قَوْلُهُ {مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ}

বাংলা অনুবাদ: সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ১৭৫৩. মু’মিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সংগে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে দেখিয়েছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোন পরিবর্তন করেনি। (৩৩ঃ ২৩)
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ২৬১২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৮০৭
২৬১২। আবূল ইয়ামান ও ইসমাঈল (রহঃ) … যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি কুরআনের আয়াতসমূহ একত্রিত করতে একটি মুসহাফে লিপিবদ্ধ করলাম, তখন সুরা আহযাবের একটি আয়াত পেলাম না। যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে পড়তে শুনেছি। একমাত্র খুযাইমা আনসারী (রাঃ)-এর কাছে পেলাম। যার সাক্ষ্যকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’ব্যক্তির সাক্ষ্যের সমান সাব্যস্ত করেছিলেন। সে আয়াতটি হলঃمِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে কৃত তাদের ওয়াদা পূরণ করেছেন। (৩৩ঃ ২৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ)

কোরআন সংকলন অধ্যায়ের বর্ণনায় সময়টি আরও নির্দিষ্ট: “যখন আমরা মুসহাফ নকল করছিলাম।” সেখানে অনুসন্ধান ও খুজাইমার কাছে পাওয়ার পরে সূরাটিতে আয়াত যুক্ত করার কথাও রয়েছে। অর্থাৎ বর্ণনায় কাজটি একটি প্রস্তুত মূলের অক্ষর অক্ষর অনুসরণ করে শেষ করা যায়নি; স্মৃতি দিয়ে অনুপস্থিতি শনাক্ত, বাইরে অনুসন্ধান এবং পাওয়া অংশ সংযুক্ত করার ধাপ এসেছে। নকল তৈরির মধ্যেও যাচাই ও সংযোজনের একটি ঘটনা ঘটেছে। [640]

فَأَلْحَقْنَاهَا فِي سُورَتِهَا فِي الْمُصْحَفِ.

বাংলা অনুবাদ: এরপর আমরা মুসহাফে তার সূরার মধ্যে আয়াতটি সংযুক্ত করলাম।

হাফসার সহিফা ব্যবহার করার বিবরণের সঙ্গে এই অনুসন্ধানের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ইবনে হাজার খবরটির বাহ্যিক অর্থ থেকে বলেছেন, আবু বকরের আমলে নকল করা সহিফায় আহযাবের আয়াতটি যায়েদ পাননি, পরে খুজাইমার কাছে পেয়েছেন। এটি ভাষ্যকারের নিজের পর্যবেক্ষণ। এর ফলে পূর্ববর্তী সংগ্রহকে ভিত্তি করা এবং সেই ভিত্তি থেকে নকলের সময়ে একটি অংশের অনুপস্থিতি ধরা পড়া—দুটি তথ্য একই ইতিহাসে উপস্থিত হয়। পুরোনো সংগ্রহের পরিচয় জানা থাকলেও তার প্রত্যেক অংশের অবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না। [641]

وَظَاهِرُ حَدِيثِ زَيْدِ بْنِ ثَابِتٍ هَذَا أَنَّهُ فَقَدَ آيَةَ الْأَحْزَابِ مِنَ الصُّحُفِ الَّتِي كَانَ نَسَخَهَا فِي خِلَافَةِ أَبِي بَكْرٍ حَتَّى وَجَدَهَا مَعَ خُزَيْمَةَ بْنِ ثَابِتٍ.

বাংলা অনুবাদ: যায়েদ ইবনে সাবিতের এই হাদিসের বাহ্যিক অর্থ হচ্ছে, আবু বকরের খিলাফতে তিনি যে সহিফা নকল করেছিলেন, সেখানে আহযাবের আয়াতটি পাননি; পরে তা খুজাইমা ইবনে সাবিতের কাছে পান।

এই ঘটনায় স্মৃতি ও সংগ্রহযোগ্য সাক্ষ্যের ভূমিকা আলাদা। যায়েদের জানা পাঠ তাঁকে একটি ঘাটতি শনাক্ত করতে সাহায্য করেছে; খুজাইমার কাছে পাওয়া অংশ সেই অনুসন্ধান সম্পন্ন করেছে। শুধু কারও স্মৃতিতে কোনো বাক্য থাকা এবং সেটি অনুমোদিত সংকলনে যুক্ত করা একই ধাপ হয়নি। এ কারণে খুজাইমার উপস্থিতি ঘটনাটির কার্যকর অংশ। যিনি কী অনুপস্থিত তা শনাক্ত করতে পারেন, তাঁর স্মৃতি গুরুত্বপূর্ণ; যাঁর কাছে সেই অনুপস্থিত অংশ পাওয়া যায়, তাঁর সংরক্ষিত উপকরণও গুরুত্বপূর্ণ। গ্রন্থের পূর্ণতা এই পৃথক উপাদানগুলোর মিলনের ওপর নির্ভর করেছে।

সাক্ষ্যের স্তরবর্ণনায় উপস্থিত উপাদানকাজের ভূমিকা
যায়েদের স্মৃতিমুহাম্মদকে আয়াতটি পড়তে শোনার কথাকোন অংশ অনুপস্থিত তা শনাক্ত করা।
অনুসন্ধানে পাওয়া অংশখুজাইমা ইবনে সাবিতের কাছে আয়াতটি পাওয়াসন্ধানরত সংগ্রাহককে প্রয়োজনীয় পাঠ সরবরাহ করা।
ব্যক্তিগত সাক্ষ্যমর্যাদাখুজাইমার সাক্ষ্য দুই ব্যক্তির সমানপাওয়া ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতার বিশেষ ধর্মীয় পরিচয়।
সম্পাদনার ফলআয়াতটি সূরার মধ্যে যুক্ত করাঅনুসন্ধানের ফল অনুমোদিত গ্রন্থে প্রবেশ করা।

খুজাইমার দুই সাক্ষ্যের মর্যাদার পেছনে আবু দাউদে একটি পৃথক ঘটনা রয়েছে। মুহাম্মদের ঘোড়া কেনা নিয়ে এক বেদুইনের সঙ্গে বিরোধ হলে বেদুইন সাক্ষী চান। খুজাইমা মুহাম্মদের পক্ষে সাক্ষ্য দেন। কিসের ভিত্তিতে সাক্ষ্য দিচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি নবীকে সত্যবাদী হিসেবে বিশ্বাস করার কথা বলেন। এরপর তাঁর সাক্ষ্য দুই ব্যক্তির সমান করা হয়। বর্ণনায় সাক্ষ্যের কারণ হিসেবে লেনদেন দেখার বিবরণের বদলে ব্যক্তির সত্যবাদিতার প্রতি আস্থা পেশ করা হয়েছে। [642]

فَطَفِقَ الأَعْرَابِيُّ يَقُولُ هَلُمَّ شَهِيدًا. فَقَالَ خُزَيْمَةُ بْنُ ثَابِتٍ أَنَا أَشْهَدُ أَنَّكَ قَدْ بَايَعْتَهُ. فَأَقْبَلَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَلَى خُزَيْمَةَ فَقَالَ بِمَ تَشْهَدُ. فَقَالَ بِتَصْدِيقِكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ. فَجَعَلَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم شَهَادَةَ خُزَيْمَةَ بِشَهَادَةِ رَجُلَيْنِ.

বাংলা অনুবাদ: বেদুইন বলতে থাকলেন: সাক্ষী নিয়ে এসো। খুজাইমা ইবনে সাবিত বললেন: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি তাঁর সঙ্গে কেনাবেচা করেছেন। নবী খুজাইমার দিকে ফিরে বললেন: কিসের ভিত্তিতে সাক্ষ্য দিচ্ছ? তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসুল, আপনাকে সত্যবাদী বিশ্বাস করার ভিত্তিতে। এরপর আল্লাহর রাসুল খুজাইমার সাক্ষ্য দুই ব্যক্তির সাক্ষ্যের সমান করলেন।

এটি সাক্ষ্য গ্রহণের এমন একটি ধর্মীয় কাঠামো, যেখানে সংখ্যার পাশাপাশি ব্যক্তির বিশেষ মর্যাদাও কার্যকর। এক ব্যক্তিকে দুই ব্যক্তির সমান ধরা হচ্ছে তাঁর জন্য দেওয়া অনুমোদনের কারণে। আহযাবের আয়াত পাওয়ার বর্ণনায় সেই পরিচয় সংযুক্ত হওয়ায় সংগ্রহের কাজ ও এই ধর্মীয় বিশেষাধিকার পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সাধারণ সাক্ষ্যের সংখ্যা এবং বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তির সাক্ষ্যের ওজন তখন একই হিসাবে পড়ে না। গ্রন্থসংকলনের দলিল বিচারেও ব্যক্তিগত মর্যাদা একটি প্রাসঙ্গিক উপাদান হয়ে ওঠে।

অনুপস্থিত অংশটি শনাক্ত করার জন্য যায়েদের স্মৃতি প্রয়োজন হয়েছে, আর তা খুঁজে পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছাতে হয়েছে। কোনো পাঠ নিজে থেকে সংগ্রহে হাজির হয়নি; মানুষ তার অনুপস্থিতি বুঝেছে এবং আরেক মানুষের কাছে পাওয়া পাঠ দিয়ে তা পূরণ করেছে। স্মৃতির সতর্কতা, প্রয়োজনীয় উপকরণ সংরক্ষিত থাকা এবং সেই উপকরণের অধিকারীর কাছে পৌঁছানো—এই তিনটি শর্ত এখানে সংগ্রহের ফল নির্ধারণ করেছে।


আবু খুজাইমা ও খুজাইমা: তাওবা ও আহযাবের দুটি পৃথক সংগ্রহঘটনা

তাওবার শেষাংশ এবং আহযাবের আয়াত অনুসন্ধান একই সংকলনঘটনা নয়। প্রথমটির প্রধান বর্ণনা আবু বকরের উদ্যোগে যায়েদের সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত; দ্বিতীয়টি উসমানের মুসহাফ নকল করার সময়ের। আয়াতও পৃথক: তাওবা ৯:১২৮–১২৯ এবং আহযাব ৩৩:২৩। বুখারির এই বর্ণনাবিন্যাসে প্রথম ঘটনায় আবু খুজাইমা আনসারি, দ্বিতীয় ঘটনায় খুজাইমা ইবনে সাবিতের নাম এসেছে। সময়, সূরা ও ব্যক্তির পরিচয় আলাদা হওয়ায় এক ঘটনার অতিরিক্ত বিবরণ অন্যটিতে বসালে সংকলনের পদ্ধতির ইতিহাসও বদলে যায়। [643]

وَالصَّحِيحُ مَا فِي الصَّحِيحِ وَأَنَّ الَّذِي فَقَدَهُ فِي خِلَافَةِ أَبِي بَكْرٍ الْآيَتَانِ مِنْ آخِرِ بَرَاءَةَ وَأَمَّا الَّتِي فِي الْأَحْزَابِ فَفَقَدَهَا لَمَّا كَتَبَ الْمُصْحَفَ فِي خِلَافَةِ عُثْمَانَ.

বাংলা অনুবাদ: সহিহ বুখারিতে যা আছে সেটিই সঠিক: আবু বকরের খিলাফতে তিনি যা পাননি, তা ছিল বারাআতের শেষের দুটি আয়াত; আর আহযাবের আয়াতটি পাননি উসমানের খিলাফতে মুসহাফ লেখার সময়।

ঘটনাপাওয়া অংশবর্ণনায় উল্লিখিত ব্যক্তিপ্রক্রিয়ার তাৎপর্য
আবু বকরের সংগ্রহতওবা ৯:১২৮–১২৯আবু খুযাইমা আনসারীজায়েদের অনুসন্ধানে একটি নির্দিষ্ট উৎসের ওপর নির্ভরতা
উসমানের মুসহাফে নকলআহযাব ৩৩:২৩খুযাইমা ইবনে সাবিতনিজের স্মৃতিতে থাকা অংশের উপকরণ খুঁজতে হয়েছে
দুই সাক্ষ্যের মর্যাদাআহযাবের খবরের ব্যক্তিবিশেষের পরিচয়খুযাইমা ইবনে সাবিতএক ব্যক্তির সাক্ষ্যের বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদা প্রাসঙ্গিক হয়েছে

দুই ব্যক্তির নামের সাদৃশ্যের সঙ্গে সংক্রমিত বর্ণনায় নামের অস্থিরতাও আছে। ইবনে হাজার তাওবার ঘটনার বর্ণনাগুলোতে “খুজাইমা”, “আবু খুজাইমা” এবং “খুজাইমা অথবা আবু খুজাইমা”—তিন ধরনের পাঠ উল্লেখ করেছেন। তাঁর বিবেচনায় তাওবার ক্ষেত্রে আবু খুজাইমা এবং আহযাবের ক্ষেত্রে খুজাইমা অগ্রাধিকারযোগ্য পরিচয়। তিনি এই পরিচয় নির্ধারণ করেছেন বর্ণনাগুলোর তুলনা করে। ফলে ব্যক্তির পরিচয় যে প্রতিটি পথে একভাবে অপরিবর্তিত থেকেছে, এমন অবস্থা সূত্রে নেই। [644]

فَمِنْ قَائِلٍ مَعَ خُزَيْمَةَ وَمِنْ قَائِلٍ مَعَ أَبِي خُزَيْمَةَ وَمِنْ شَاكٍّ فِيهِ يَقُولُ خُزَيْمَةُ أَوْ أَبِي خُزَيْمَةَ وَالْأَرْجَحُ أَنَّ الَّذِي وُجِدَ مَعَهُ آخِرُ سُورَةِ التَّوْبَةِ أَبُو خُزَيْمَةَ بِالْكُنْيَةِ وَالَّذِي وُجِدَ مَعَهُ الْآيَةُ مِنَ الْأَحْزَابِ خُزَيْمَةُ.

বাংলা অনুবাদ: কেউ বলেছেন খুজাইমার কাছে, কেউ বলেছেন আবু খুজাইমার কাছে; কেউ সংশয় রেখে বলেছেন খুজাইমা অথবা আবু খুজাইমা। অগ্রাধিকারযোগ্য হলো, তাওবার শেষাংশ যাঁর কাছে পাওয়া গিয়েছিল তিনি উপনামে পরিচিত আবু খুজাইমা; আর আহযাবের আয়াত যাঁর কাছে পাওয়া গিয়েছিল তিনি খুজাইমা।

তিরমিযি ৩১০৪-এ সংকলিত যায়েদের আহযাব-সংক্রান্ত অংশেও নাম নিয়ে সংশয়ের ভাষা রয়েছে: খুজাইমা ইবনে সাবিত অথবা আবু খুজাইমা। সেখানে সংশয় আয়াতটি কোন সূরার, তা নিয়ে নয়; পাওয়া ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে। বুখারির পৃথক বর্ণনা ও ভাষ্যকারের তুলনামূলক সিদ্ধান্ত এই সংশয় নিরসনের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এর ফলে দুই ঘটনার পরিচয় নির্ধারণ একটি পরবর্তী পাঠতুলনার কাজ হিসেবেও দৃশ্যমান হয়। [645]

فَالْتَمَسْتُهَا فَوَجَدْتُهَا مَعَ خُزَيْمَةَ بْنِ ثَابِتٍ أَوْ أَبِي خُزَيْمَةَ فَأَلْحَقْتُهَا فِي سُورَتِهَا.

বাংলা অনুবাদ: আমি সেটি খুঁজলাম এবং খুজাইমা ইবনে সাবিত অথবা আবু খুজাইমার কাছে পেলাম। এরপর সেটি তার সূরায় সংযুক্ত করলাম।

এই নামভেদ সাক্ষ্যসংখ্যার ব্যাখ্যাতেও প্রভাব ফেলে। আহযাবের বর্ণনায় খুজাইমা ইবনে সাবিতের দুই ব্যক্তির সমান সাক্ষ্যমর্যাদা স্পষ্টভাবে উল্লেখিত। তাওবার প্রধান বর্ণনায় আবু খুজাইমার কাছে পাওয়ার কথা আছে। একই মর্যাদা প্রথম ব্যক্তির ওপরও বসিয়ে দিলে তাওবার গ্রহণপ্রক্রিয়ার জন্য অতিরিক্ত একটি কারণ তৈরি হয়। দুই নাম ও দুই সময় পৃথক রাখলে কোন ঘটনায় সরাসরি কী বলা হয়েছে, সেটিও পৃথক থাকে। প্রত্যেক ঘটনার সাক্ষ্য গ্রহণের ব্যাখ্যা তার নিজস্ব বর্ণিত উপাদান থেকেই আসে।

বর্ণনার সনদ বিন্যাসে ঘটনা মিশে যাওয়ার কথাও ইবনে হাজার আলোচনা করেছেন। তাঁর নির্দিষ্ট বিন্যাসে আবু বকর ও উমরের সঙ্গে যায়েদের কাহিনি উবাইদ ইবনুস সাব্বাকের সূত্রে, হুযাইফার উসমানের কাছে যাওয়ার কাহিনি আনাসের সূত্রে এবং আহযাবের অনুসন্ধান খারিজা ইবনে যায়েদের মাধ্যমে তাঁর পিতার সূত্রে এসেছে। অন্য কোনো রূপে একাধিক ঘটনা এক সনদে ঢুকে গেলে আল-খতিব সেটিকে সংমিশ্রণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ঘটনাগুলোর উৎসপথ পৃথক করার এই কাজ ইতিহাসের সময়ক্রম নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ। [646]

وَبَيَّنَ الْخَطِيبُ فِي الْمُدْرَجِ أَنَّ ذَلِكَ وَهْمٌ مِنْهُ وَأَنَّهُ أَدْرَجَ بَعْضَ الْأَسَانِيدِ عَلَى بَعْضٍ.

বাংলা অনুবাদ: আল-খতিব আল-মুদরাজে ব্যাখ্যা করেছেন, এটি তাঁর ভুল এবং তিনি কিছু সনদ অন্য সনদের সঙ্গে ঢুকিয়ে দিয়েছেন।

এই তুলনায় দুটি পৃথক নির্ভরতা ধরা পড়ে। তাওবার শেষাংশ সংগ্রহে একটি নির্দিষ্ট উৎসের সন্ধান প্রয়োজন হয়েছিল; আহযাবের ক্ষেত্রে নিজের জানা আয়াত নকলের সময়ে খুঁজে বের করতে হয়েছিল। প্রত্যেক ঘটনায় সংগ্রাহকের সামনে থাকা উপকরণ এবং ব্যক্তি বিশেষের কাছে সংরক্ষিত পাঠের মিলন প্রয়োজন হয়েছে। সেই অনুসন্ধানের খবর বহনকারী পরবর্তী বর্ণনাগুলোতেও ব্যক্তির নাম ও সময়ক্রম নিয়ে তুলনা করতে হচ্ছে। পাঠ সংগ্রহের ইতিহাস তাই মূল উপকরণ সংগ্রহ এবং সেই সংগ্রহের স্মৃতি সংরক্ষণ—দুই স্তরেই মানুষের কাজের ওপর নির্ভরশীল।


কপির সংখ্যা, অঞ্চলগুলোতে প্রেরণ ও কেন্দ্রীয় অনুমোদন

অনুমোদিত অনুলিপি প্রস্তুতের পর সেগুলো প্রদেশগুলোতে পাঠানো হয়। বুখারির বর্ণনায় “প্রত্যেক অঞ্চলে” পাঠানোর কথা আছে; ইবনে হাজার শুআইবের বর্ণনায় “মুসলিমদের প্রত্যেক সামরিক দলে” একটি করে মুসহাফ পাঠানোর ভাষা উল্লেখ করেছেন। ফলে প্রচারব্যবস্থা ভূখণ্ড ও সামরিক সংগঠন উভয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল। নতুন মান্য পাঠ পৌঁছানোর মাধ্যম ছিল কেন্দ্র থেকে পাঠানো নির্দিষ্ট বস্তু—একটি অনুমোদিত মুসহাফ—যার সঙ্গে স্থানীয় সংগ্রহের তুলনা ও সংশোধনের সম্পর্ক তৈরি হয়। [647]

فِي رِوَايَةِ شُعَيْبٍ: فَأَرْسَلَ إِلَى كُلِّ جُنْدٍ مِنْ أَجْنَادِ الْمُسْلِمِينَ بِمُصْحَفٍ.

বাংলা অনুবাদ: শুআইবের বর্ণনায় রয়েছে: তিনি মুসলিমদের প্রত্যেক সামরিক দলের কাছে একটি মুসহাফ পাঠালেন।

কপির সঠিক সংখ্যা নিয়ে সূত্রগুলো একমত নয়। ইবনে আবি দাউদ হামযা আয-যাইয়াতের বক্তব্য এনেছেন, উসমান চারটি মুসহাফ লিখেছিলেন। তার একটি কুফায় মুরাদ গোত্রের এক ব্যক্তির কাছে ছিল এবং হামযা সেটির ভিত্তিতে নিজের মুসহাফ লিখেছিলেন বলে জানান। এই বিবরণে কেবল পাঠানোর সংখ্যা নয়; কেন্দ্রীয় কপি থেকে পরবর্তী স্থানীয় অনুলিপি তৈরির একটি ধারাও বর্ণিত। প্রামাণ্য কপির প্রভাব তার নিজস্ব পাতায় সীমিত থাকেনি; তা থেকে আরও অনুলিপি উৎপন্ন হয়েছে। [648]

كَتَبَ عُثْمَانُ أَرْبَعَةَ مَصَاحِفَ، فَبَعَثَ بِمُصْحَفٍ مِنْهَا إِلَى الْكُوفَةِ، فَوُضِعَ عِنْدَ رَجُلٍ مِنْ مُرَادٍ، فَبَقِيَ حَتَّى كَتَبْتُ مُصْحَفِي عَلَيْهِ.

বাংলা অনুবাদ: উসমান চারটি মুসহাফ লিখেছিলেন। তার একটি কুফায় পাঠান; সেটি মুরাদ গোত্রের এক ব্যক্তির কাছে রাখা হয়। তা সেখানে ছিল, এমনকি আমি তার ভিত্তিতে আমার মুসহাফ লিখেছি।

একই গ্রন্থে আবু হাতিম সিজিস্তানির বক্তব্যে সাতটি মুসহাফের কথা আছে। সেখানে মক্কা, শাম, ইয়েমেন, বাহরাইন, বসরা ও কুফায় একটি করে এবং মদিনায় একটি রেখে দেওয়ার তালিকা পাওয়া যায়। চার ও সাতের এই সংবাদ একই সংকলনেই পাশাপাশি সংরক্ষিত। সুয়ুতি ও ইবনে হাজার আবার পাঁচটিকে প্রসিদ্ধ মত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কপির সংখ্যা তাই শুধু পরবর্তী কোনো আধুনিক গবেষকের প্রশ্ন নয়; প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সংকলনবিদ্যার মধ্যেই মতভেদটি নথিভুক্ত। [649]

لَمَّا كَتَبَ عُثْمَانُ الْمَصَاحِفَ حِينَ جَمَعَ الْقُرْآنَ، كَتَبَ سَبْعَةَ مَصَاحِفَ، فَبَعَثَ وَاحِدًا إِلَى مَكَّةَ، وَآخَرَ إِلَى الشَّامِ، وَآخَرَ إِلَى الْيَمَنِ، وَآخَرَ إِلَى الْبَحْرَيْنِ، وَآخَرَ إِلَى الْبَصْرَةِ، وَآخَرَ إِلَى الْكُوفَةِ، وَحَبَسَ بِالْمَدِينَةِ وَاحِدًا.

বাংলা অনুবাদ: উসমান কোরআন সংগ্রহের সময় মুসহাফগুলো লিখলে সাতটি মুসহাফ লেখেন। একটি মক্কায়, আরেকটি শামে, আরেকটি ইয়েমেনে, আরেকটি বাহরাইনে, আরেকটি বসরায় এবং আরেকটি কুফায় পাঠান; একটি মদিনায় রেখে দেন।

দানি চারটির মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ইসলামকিউএ তাঁর আল-মুকনি থেকে পূর্ণ বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে: অধিকাংশ আলেমের মতে চারটি; তিনটি কুফা, বসরা ও শামে পাঠানো হয় এবং একটি উসমান নিজের কাছে রাখেন। সাতের বিকল্প তালিকাও তিনি উল্লেখ করেছেন, কিন্তু প্রথমটিকে অধিক সঠিক বলেছেন। এখানে কপির সংখ্যা গ্রহণের একটি পরবর্তী বিচার আছে; সব বর্ণনার তথ্য এক তালিকায় নির্বিরোধভাবে মিলে যায়নি। [650]

أَكْثَرُ الْعُلَمَاءِ عَلَى أَنَّ عُثْمَانَ بْنَ عَفَّانَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ لَمَّا كَتَبَ الْمُصْحَفَ جَعَلَهُ عَلَى أَرْبَعِ نُسَخٍ، وَبَعَثَ إِلَى كُلِّ نَاحِيَةٍ مِنَ النَّوَاحِي بِوَاحِدَةٍ مِنْهُنَّ، فَوَجَّهَ إِلَى الْكُوفَةِ إِحْدَاهُنَّ، وَإِلَى الْبَصْرَةِ أُخْرَى، وَإِلَى الشَّامِ الثَّالِثَةَ، وَأَمْسَكَ عِنْدَ نَفْسِهِ وَاحِدَةً، وَقَدْ قِيلَ: إِنَّهُ جَعَلَهُ سَبْعَ نُسَخٍ، وَوَجَّهَ مِنْ ذَلِكَ أَيْضًا نُسْخَةً إِلَى مَكَّةَ، وَنُسْخَةً إِلَى الْيَمَنِ، وَنُسْخَةً إِلَى الْبَحْرَيْنِ، وَالْأَوَّلُ أَصَحُّ، وَعَلَيْهِ الْأَئِمَّةُ.

বাংলা অনুবাদ: অধিকাংশ আলেমের মত হলো, উসমান ইবনে আফফান মুসহাফ লিখে চারটি অনুলিপি করেন এবং প্রত্যেক অঞ্চলে একটি পাঠান। একটি কুফায়, আরেকটি বসরায় এবং তৃতীয়টি শামে পাঠান; একটি নিজের কাছে রাখেন। আরও বলা হয়েছে, তিনি সাতটি অনুলিপি করেন এবং অতিরিক্ত একটি মক্কায়, একটি ইয়েমেনে ও একটি বাহরাইনে পাঠান। প্রথম মতটিই অধিক সঠিক এবং ইমামরা সেটিই গ্রহণ করেছেন।

আধুনিক আলোচনায় ছয়টির একটি তালিকাও প্রাধান্য পেয়েছে। ইসলামকিউএ ২৫২৮৫২-এ উসমানের ব্যক্তিগত কপি, মদিনার সাধারণ কপি এবং মক্কা, কুফা, বসরা ও শামের কপিসহ ছয়টির মত গ্রহণ করা হয়েছে। এই হিসাবে উসমানের নিজের কপি এবং মদিনার সাধারণ কপি পৃথক। গণনার সঙ্গে কোন কপিকে আলাদা ধরা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও যুক্ত। [651]

وَالصَّحِيحُ أَنَّهَا سِتَّةٌ.

বাংলা অনুবাদ: সঠিক মত হলো, সেগুলো ছয়টি।

বর্ণিত সংখ্যাসূত্র বা মতবর্ণিত বৈশিষ্ট্য
চারহামযা আয-যাইয়াতের সংবাদ; দানির অগ্রাধিকারদানি কুফা, বসরা, শাম এবং উসমানের কাছে একটি রাখার কথা বলেছেন।
পাঁচইবনে হাজার ও সুয়ুতির উল্লেখে প্রসিদ্ধ মতচার ও সাতের সংবাদের পাশে আরেকটি প্রচলিত সংখ্যা।
ছয়ইসলামকিউএ ২৫২৮৫২-এর গৃহীত তালিকাউসমানের ব্যক্তিগত ও মদিনার সাধারণ কপি আলাদাভাবে গণনা করা হয়।
সাতআবু হাতিম সিজিস্তানির সংবাদমক্কা, শাম, ইয়েমেন, বাহরাইন, বসরা, কুফা ও মদিনা।

পাঁচটির মত সম্পর্কে ইবনে হাজারের ভাষা সরাসরি “প্রসিদ্ধ”। চার ও সাতের সংবাদ উদ্ধৃত করার পাশেই তিনি এই মত উল্লেখ করেছেন। কপির প্রচলিত সংখ্যা ও নিজের উদ্ধৃত বর্ণনাগুলোর পৃথক সংখ্যা একই আলোচনায় থেকে গেছে। [652]

وَاخْتَلَفُوا فِي عِدَّةِ الْمَصَاحِفِ الَّتِي أَرْسَلَ بِهَا عُثْمَانُ إِلَى الْآفَاقِ، فَالْمَشْهُورُ أَنَّهَا خَمْسَةٌ.

বাংলা অনুবাদ: উসমান বিভিন্ন অঞ্চলে যতগুলো মুসহাফ পাঠিয়েছিলেন তার সংখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে; প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে পাঁচটি।

কুফার কপি পাঠানোর সময় নিয়েও ইবনে হাজার একটি পৃথক সংবাদ এনেছেন। ইব্রাহিম নাখাঈকে এক শামি ব্যক্তি বলেছিলেন, তাঁদের ও বসরার মুসহাফ কুফার মুসহাফের চেয়ে বেশি নির্ভুল; কারণ কুফার বিরোধের সংবাদ পেয়ে সেখানকার কপি পর্যালোচনার আগেই পাঠানো হয়েছিল। এটি নিজের অঞ্চলের কপির শ্রেষ্ঠত্বের পক্ষে ওই ব্যক্তির দেওয়া কারণ। অনুমোদিত মুসহাফের মধ্যেও প্রস্তুতি ও পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়ে আঞ্চলিক তুলনা ও বিতর্ক সংরক্ষিত হয়েছে। [653]

قَالَ لِي رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الشَّامِ مُصْحَفُنَا وَمُصْحَفُ أَهْلِ الْبَصْرَةِ أَضْبَطُ مِنْ مُصْحَفِ أَهْلِ الْكُوفَةِ قُلْتُ لِمَ قَالَ لِأَنَّ عُثْمَانَ بَعَثَ إِلَى الْكُوفَةِ لَمَّا بَلَغَهُ مِنِ اخْتِلَافِهِمْ بِمُصْحَفٍ قَبْلَ أَنْ يُعْرَضَ وَبَقِيَ مُصْحَفُنَا وَمُصْحَفُ أَهْلِ الْبَصْرَةِ حَتَّى عُرِضَا.

বাংলা অনুবাদ: শামের এক ব্যক্তি আমাকে বললেন: আমাদের মুসহাফ এবং বসরার লোকদের মুসহাফ কুফার মুসহাফের চেয়ে বেশি নির্ভুল। আমি বললাম: কেন? তিনি বললেন: তাঁদের মতভেদের সংবাদ পেয়ে উসমান কুফায় পর্যালোচনার আগেই একটি মুসহাফ পাঠিয়েছিলেন; আমাদের ও বসরার মুসহাফ পর্যালোচনা শেষ হওয়া পর্যন্ত রাখা হয়েছিল।

কেন্দ্রীয় কপির সঙ্গে স্থানীয় মুসহাফ মিলিয়ে নেওয়ার নির্দেশের সংবাদও পাওয়া যায়। ইবনে আবি দাউদের একটি বর্ণনায় আবু মুসা, হুযাইফা ও ইবনে মাসউদের উপস্থিতিতে উসমানের পাঠানো মুসহাফ থাকার কথা আছে; তাঁদের নিজস্ব মুসহাফকে সেটির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ওই বর্ণনায় আবু মুসা তাঁর নিজের মুসহাফে অতিরিক্ত কিছু থাকলে তা বাদ না দিতে এবং কম থাকলে লিখে নিতে বলেন। কেন্দ্রীয় নির্দেশ ও স্থানীয় সংগ্রহ রক্ষার অবস্থান একই ঘটনায় পাশাপাশি রয়েছে। [654]

فَإِذَا عِنْدَهُمْ مُصْحَفٌ أَرْسَلَ بِهِ عُثْمَانُ وَأَمَرَهُمْ أَنْ يُقِيمُوا مَصَاحِفَهُمْ عَلَيْهِ. فَقَالَ أَبُو مُوسَى مَا وَجَدْتُمْ فِي مُصْحَفِي هَذَا مِنْ زِيَادَةٍ فَلَا تُنْقِصُوهَا وَمَا وَجَدْتُمْ مِنْ نُقْصَانٍ فَاكْتُبُوهُ.

বাংলা অনুবাদ: দেখলাম, তাঁদের কাছে উসমানের পাঠানো একটি মুসহাফ রয়েছে; তিনি তাঁদের নিজেদের মুসহাফগুলো সেটির সঙ্গে মিলিয়ে নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। আবু মুসা বললেন: আমার এই মুসহাফে অতিরিক্ত যা পাবে তা বাদ দিয়ো না, আর যা কম পাবে তা লিখে নিয়ো।

এই ব্যবস্থায় অনুলিপির বংশধারা তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রের অনুমোদিত কপি থেকে স্থানীয় কপি, স্থানীয় কপি থেকে আরও অনুলিপি—এই ধারায় একই মান বিস্তার লাভ করে। ফলে পরবর্তী বহু কপির মিল একটি অনুমোদিত মূলের সফল প্রচারের ফলও হতে পারে। কতগুলো অনুলিপি আছে এবং সেগুলো কতটি স্বতন্ত্র প্রাথমিক উৎসের সাক্ষ্য বহন করে, এই দুটি সংখ্যা এক নয়। অনুমোদিত কপি থেকে তৈরি বহু অনুলিপি সেই অনুমোদনের বিস্তার দেখায়; তার আগের প্রত্যেক বিকল্প পাঠের স্বাধীন সমর্থন তারা বহন করে না।


যে পাঠ লিখিত মানদণ্ড হলো এবং যে পাঠগুলো বাদ পড়ল

উসমানের উদ্যোগের ফল ছিল পাঠ গ্রহণের পরিসর পরিবর্তন। একাধিক শিক্ষক ও ব্যক্তিগত সংগ্রহের ওপর প্রতিষ্ঠিত পাঠগুলো একটি রাষ্ট্রীয় অনুমোদনের অধীন হলো। হারিস মুহাসিবির নামে সুয়ুতি যে ব্যাখ্যা রেখেছেন, সেখানে কথাটি সরাসরি আছে: উসমান উপস্থিত মুহাজির ও আনসারদের সঙ্গে নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষকে একটি রূপে পড়তে বাধ্য করেন; তার আগে মুসহাফগুলোতে অনুমোদিত সাত হরফের বিভিন্ন পাঠ ছিল। এই ব্যাখ্যায় পুরোনো বৈধ বহুরূপতা এবং পরবর্তী মান্যতার সংকোচন উভয়ই স্বীকৃত। [655]

إِنَّمَا حَمَلَ عُثْمَانُ النَّاسَ عَلَى الْقِرَاءَةِ بِوَجْهٍ وَاحِدٍ عَلَى اخْتِيَارٍ وَقَعَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ مَنْ شَهِدَهُ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ لَمَّا خَشِيَ الْفِتْنَةَ عِنْدَ اخْتِلَافِ أَهْلِ الْعِرَاقِ وَالشَّامِ فِي حُرُوفِ الْقِرَاءَاتِ فَأَمَّا قَبْلَ ذَلِكَ فَقَدْ كَانَتِ الْمَصَاحِفُ بِوُجُوهٍ مِنَ الْقِرَاءَاتِ الْمُطْلَقَاتِ عَلَى الْحُرُوفِ السَّبْعَةِ الَّتِي أُنْزِلَ بِهَا الْقُرْآنُ.

বাংলা অনুবাদ: ইরাক ও শামের লোকদের পাঠবিরোধ থেকে সংঘাতের আশঙ্কা করে উসমান তাঁর সঙ্গে উপস্থিত মুহাজির ও আনসারদের সঙ্গে নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষকে একটি রূপে পড়তে বাধ্য করেন। তার আগে মুসহাফগুলোতে কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার সাত হরফের অনুমোদিত বিভিন্ন পাঠ ছিল।

বাকিল্লানির ব্যাখ্যায় নির্বাচনের অন্য একটি শ্রেণিবিন্যাস পাওয়া যায়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী উসমানের উদ্দেশ্য পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত নবী-উৎসারিত পাঠে মানুষকে একত্র করা এবং অন্যগুলো বাতিল করা। একই সঙ্গে ব্যাখ্যা যেন অবতীর্ণ পাঠের সঙ্গে এবং রহিত তিলাওয়াত যেন গৃহীত পাঠের সঙ্গে মিশে না থাকে, সে কথাও এসেছে। এই ভাষায় সংকলন একটি বাছাইয়ের কাজ: কোনটি অবতীর্ণ মূল, কোনটি ব্যাখ্যা, কোনটি অব্যাহত পাঠ এবং কোনটি রহিত—এসব পরিচয় নির্ধারণ করে গ্রন্থের সীমানা স্থির করা হচ্ছে। [656]

وَإِنَّمَا قَصَدَ جَمْعَهُمْ عَلَى الْقِرَاءَاتِ الثَّابِتَةِ الْمَعْرُوفَةِ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَإِلْغَاءَ مَا لَيْسَ كَذَلِكَ وَأَخْذِهِمْ بِمُصْحَفٍ لَا تَقْدِيمَ فِيهِ وَلَا تَأْخِيرَ وَلَا تَأْوِيلَ أُثْبِتَ مَعَ تَنْزِيلٍ وَلَا مَنْسُوخٌ تِلَاوَتُهُ كُتِبَ مَعَ مُثْبَتٍ رَسْمُهُ وَمَفْرُوضٍ قِرَاءَتُهُ وَحِفْظُهُ خَشْيَةَ دُخُولِ الْفَسَادِ وَالشُّبْهَةِ عَلَى مَنْ يَأْتِي بَعْدُ.

বাংলা অনুবাদ: তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নবী থেকে আসা প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত পাঠগুলোতে তাঁদের একত্র করা এবং যা সে রকম নয় তা বাতিল করা; তাঁদের এমন একটি মুসহাফ অনুসরণ করানো, যাতে আগে-পরে করা নেই, অবতীর্ণ পাঠের সঙ্গে ব্যাখ্যা লেখা নেই এবং যার লিখিত রূপ বহাল ও পাঠ ও সংরক্ষণ নির্ধারিত, তার সঙ্গে রহিত তিলাওয়াত লেখা নেই—যাতে পরবর্তী মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও সংশয় প্রবেশ না করে।

“বাতিল” শ্রেণিটি সংকলকের সিদ্ধান্তের ফল। কোনো পাঠকে ব্যাখ্যা বলা, রহিত বলা বা অপ্রতিষ্ঠিত বলা হলে সেটি গৃহীত মুসহাফের বাইরে পড়ে। এই শ্রেণিগুলোর প্রত্যেকটির ধর্মীয় যুক্তি থাকতে পারে; লিখিত ফল হচ্ছে তার গ্রন্থভুক্তির অধিকার হারানো। ব্যক্তিগত সংগ্রহে কোনো অংশের উপস্থিতি আর কেন্দ্রীয় গ্রন্থে তার অনুমোদিত উপস্থিতি এক অবস্থান থাকে না। এই পরিবর্তন কোরআনের প্রকাশ্য সীমানা নির্ধারণ করেছে—কোন কথাকে তার অন্তর্ভুক্ত ধরে অনুলিপি করা হবে এবং কোন কথাকে আর সেই মর্যাদায় লেখা হবে না।

বাছাইয়ের ক্ষেত্রব্যাখ্যাকারীদের বর্ণিত সিদ্ধান্তগ্রন্থের ওপর ফল
ভাষার ভিন্ন রূপইবনুত তিন ও মুহাসিবির ব্যাখ্যায় একটি মান্য রূপে সীমাবদ্ধকরণপূর্বে ব্যবহৃত সব রূপ একই প্রকাশ্য মর্যাদায় থাকে না।
মূল পাঠ ও ব্যাখ্যাবাকিল্লানির ব্যাখ্যায় তাফসিরকে অবতীর্ণ মূলের সঙ্গে না রাখাগ্রন্থভুক্ত বক্তব্যের সীমানা নির্ধারিত হয়।
রহিত ও বহাল তিলাওয়াতরহিত বলে বিবেচিত অংশ বহাল পাঠের সঙ্গে না লেখানাজিল হওয়া বলে বর্ণিত সব বক্তব্য মুসহাফে থাকার অধিকার পায় না।
অনুমোদিত লিখিত কপিকেন্দ্র থেকে নির্দিষ্ট মুসহাফ পাঠানোপরবর্তী অনুলিপির জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক মান তৈরি হয়।

অনুমোদিত মুসহাফগুলোর মধ্যেও কিছু লিখিত পার্থক্য সংরক্ষিত থাকার কথা কোরআনবিদ্যার গ্রন্থে আছে। ইসলামকিউএ-তে উদ্ধৃত সুয়ুতির বক্তব্যে এমন পাঠভেদের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর সবগুলো এক লিখিত রূপে ধারণ করা যায় না; সেগুলো নিজ নিজ পাঠ অনুযায়ী লেখা হয়েছে। তাঁর উদাহরণে “আওসা/ওয়াসসা”, “তার নিচ দিয়ে/তার নিচ থেকে” এবং সর্বনামের উপস্থিতি–অনুপস্থিতির মতো পার্থক্য আছে। ফলে রাষ্ট্রীয় অনুমোদন একটি সীমার মধ্যে একাধিক রূপও গ্রহণ করেছে। [657]

وَأَمَّا الْقِرَاءَاتُ الْمُخْتَلِفَةُ الْمَشْهُورَةُ بِزِيَادَةٍ لَا يَحْتَمِلُهَا الرَّسْمُ وَنَحْوِهَا نَحْوُ أَوْصَى وَوَصَّى وَتَجْرِي تَحْتَها وَمِنْ تَحْتِها وَسَيَقُولُونَ اللهُ وَلِلَّهِ وَمَا عَمِلَتْ أَيْدِيهِمْ وَمَا عَمِلَتْهُ فَكِتَابَتُهُ عَلَى نَحْوِ قِرَاءَتِهِ وَكُلُّ ذَلِكَ وُجِدَ فِي مَصَاحِفِ الْإِمَامِ.

বাংলা অনুবাদ: লিখিত রূপে ধারণ করা যায় না এমন অতিরিক্ত অংশযুক্ত প্রসিদ্ধ ভিন্ন পাঠগুলোর ক্ষেত্রে—যেমন “আওসা” ও “ওয়াসসা”, “তাজরি তাহতিহা” ও “মিন তাহতিহা”, “সায়াকুলুনাল্লাহু” ও “লিল্লাহি”, “মা আমিলাত আইদিহিম” ও “মা আমিলাতহু”—লেখা হবে নিজ নিজ পাঠ অনুযায়ী। এগুলোর সবই আদর্শ মুসহাফগুলোতে পাওয়া গেছে।

সূরা হাদিদের ২৪ নম্বর আয়াতে “হুয়া” শব্দটির উপস্থিতি এই ধরনের একটি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত। ইসলামকিউএ-তে উদ্ধৃত আবু উবাইদের বক্তব্যে ইরাকের মুসহাফে মদিনা ও শামের তুলনায় “হুয়া” অতিরিক্ত থাকার কথা আছে। এখানে পার্থক্যের একক একটি সম্পূর্ণ সর্বনাম। কোনোটিতে শব্দটি রয়েছে, কোনোটিতে নেই; অনুমোদিত আঞ্চলিক মুসহাফগুলোর বিবরণেই এই তফাত পাওয়া যাচ্ছে। [658]

فَإِنَّ أَهْلَ الْعِرَاقِ زَادُوا عَلَى ذَيْنَكَ الْمِصْرَيْنِ يَعْنِي الْمَدِينَةَ وَالشَّامَ: هُوَ.

বাংলা অনুবাদ: ইরাকের লোকদের পাঠে ওই দুই নগর—অর্থাৎ মদিনা ও শামের—তুলনায় “হুয়া” অতিরিক্ত রয়েছে।

সূত্রে বর্ণিত রূপপার্থক্যের এককঅনুমোদিত পাঠের বৈশিষ্ট্য
أوصى / وصّىঅতিরিক্ত আলিফ ও ভিন্ন ক্রিয়ারূপসব ভিন্নতা একটি অভিন্ন ব্যঞ্জনকাঠামোয় ধারণ করা হয়নি।
تجري تحتها / تجري من تحتهامن পদটির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতিএকটি সম্পূর্ণ অব্যয় লেখা বা না-লেখার পার্থক্য।
ما عملت أيديهم / ما عملتهবাক্যগঠন ও যুক্ত সর্বনামের ভিন্নতালিখিত পাঠে রূপগত পার্থক্য সংরক্ষিত।
হাদিদ ৫৭:২৪-এ هو থাকা বা না-থাকাএকটি সম্পূর্ণ সর্বনামআঞ্চলিক মুসহাফের বর্ণনায় শব্দের উপস্থিতি–অনুপস্থিতি।

পরবর্তী পাঠ গ্রহণের নিয়মেও “একটি উসমানি মুসহাফের সঙ্গে মিল” শর্তটি গুরুত্বপূর্ণ। ইবনুল জাযারি আল-মুনজিদে আরবি ভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্য, উসমানি মুসহাফগুলোর কোনো একটির সঙ্গে অন্তত সম্ভাব্য মিল এবং মুতাওয়াতির সংক্রমণের কথা বলেছেন। এখানে গৃহীত লিখিত ভিত্তি হিসেবে একটি নির্দিষ্ট অনুমোদিত মুসহাফ-সমষ্টি কাজ করছে। কোনো পাঠ স্বতন্ত্রভাবে নবীর নামে প্রচলিত হলেই তার পরবর্তী গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত হয়নি; নির্দিষ্ট শর্তের মধ্যে তার স্থান নির্ধারিত হয়েছে। [659]

كُلُّ قِرَاءَةٍ وَافَقَتِ الْعَرَبِيَّةَ مُطْلَقًا وَوَافَقَتْ أَحَدَ الْمَصَاحِفِ الْعُثْمَانِيَّةِ وَلَوْ تَقْدِيرًا وَتَوَاتَرَ نَقْلُهَا هَذِهِ الْقِرَاءَةُ الْمُتَوَاتِرَةُ الْمَقْطُوعُ بِهَا.

বাংলা অনুবাদ: যে পাঠ আরবি ভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, উসমানি মুসহাফগুলোর কোনো একটির সঙ্গে অন্তত সম্ভাব্যভাবে মেলে এবং যার সংক্রমণ মুতাওয়াতির—সেই পাঠই নিশ্চিত মুতাওয়াতির পাঠ।

শেষবার নবীর কাছে কোরআন পেশ করার বিষয়টিকেও ইবনুল জাযারি একটি বিস্তৃত ব্যাখ্যার মধ্যে রেখেছেন। আন-নাশরে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সাহাবিরা শেষ পেশে স্থিত পাঠের সঙ্গে এমন প্রতিষ্ঠিত ও অরহিত পাঠও লিখেছিলেন, যা সেই পেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তাঁর যুক্তি হলো, শুধু শেষ পেশের পাঠ থাকলে মুসহাফগুলোর মধ্যে বাড়তি–কমতির পার্থক্য থাকত না। অর্থাৎ গৃহীত সংগ্রহের পরিসর সম্পর্কে তাঁর ব্যাখ্যাটি একটিমাত্র শেষ পেশের অনুলিপির ধারণার চেয়ে বিস্তৃত। [660]

لَا إِشْكَالَ أَنَّ الصَّحَابَةَ كَتَبُوا فِي هَذِهِ الْمَصَاحِفِ مَا تَحَقَّقُوا أَنَّهُ قُرْآنٌ وَمَا عَلِمُوهُ اسْتَقَرَّ فِي الْعَرْضَةِ الْأَخِيرَةِ وَمَا تَحَقَّقُوا صِحَّتَهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِمَّا لَمْ يُنْسَخْ وَإِنْ لَمْ تَكُنْ دَاخِلَةً فِي الْعَرْضَةِ الْأَخِيرَةِ وَلِذَلِكَ اخْتَلَفَتِ الْمَصَاحِفُ بَعْضَ اخْتِلَافٍ إِذْ لَوْ كَانَتِ الْعَرْضَةُ الْأَخِيرَةُ فَقَطْ لَمْ تَخْتَلِفِ الْمَصَاحِفُ بِزِيَادَةٍ وَنَقْصٍ وَغَيْرِ ذَلِكَ وَتَرَكُوا مَا سِوَى ذَلِكَ.

বাংলা অনুবাদ: সাহাবিরা এই মুসহাফগুলোতে যা নিশ্চিতভাবে কোরআন বলে জেনেছেন, যা শেষ পেশে স্থিত হয়েছে বলে জেনেছেন এবং নবী থেকে শুদ্ধভাবে প্রতিষ্ঠিত অরহিত পাঠ লিখেছেন—শেষেরগুলো শেষ পেশের অন্তর্ভুক্ত না হলেও। এ কারণেই মুসহাফগুলোর মধ্যে কিছু পার্থক্য হয়েছে। শুধু শেষ পেশের পাঠ হলে বৃদ্ধি, হ্রাস ও অন্যান্য বিষয়ে মুসহাফগুলো ভিন্ন হতো না। তাঁরা এর বাইরের বিষয়গুলো বাদ দিয়েছেন।

এই বর্ণনা ও ব্যাখ্যাগুলোতে গৃহীত পাঠ তৈরি হওয়ার কয়েকটি স্তর স্পষ্ট: উপকরণ বেছে নেওয়া, কর্তৃত্বপ্রাপ্ত লেখক নিয়োগ, ভাষার অগ্রাধিকার স্থির করা, অনুপস্থিত অংশের সাক্ষ্য খোঁজা এবং নির্দিষ্ট লিখিত রূপকে অনুমোদন দেওয়া। অনুমোদিত পরিসরের ভেতরে কিছু পার্থক্য রাখা হয়েছে; তার বাইরে থাকা সংগ্রহগুলোর সমান মর্যাদা স্বীকার করা হয়নি। কোরআনের মান্য পাঠের ইতিহাসে এই নির্বাচন বাস্তব পরিবর্তন এনেছে—কোন রূপ লেখা হবে, কোন কপি অনুসরণ করা হবে এবং কোন পূর্বপরিচিত পাঠ আর প্রকাশ্য গ্রন্থের মানদণ্ড হবে না।


বিকল্প মুসহাফ ধ্বংস, সাহাবিদের প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক সংঘাত

উসমানি মুসহাফের প্রতিষ্ঠা শুধু কয়েকটি নকল প্রস্তুত ও বিতরণের ঘটনা ছিল না। তার সঙ্গে যুক্ত ছিল অন্য লিখিত কোরআন সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ, নিজের শেখা পাঠ রক্ষায় ইবনে মাসউদের প্রতিরোধ এবং পরবর্তী শাসকের হাতে উৎস-সহিফার ধ্বংস। কোন পাঠ সংরক্ষিত থাকবে, কোন লিখিত সাক্ষ্য আর থাকবে না এবং কোন শিক্ষকের কর্তৃত্ব রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের সামনে অকার্যকর হয়ে পড়বে—এই প্রশ্নগুলো একই প্রক্রিয়ার অংশ। একটি অনুমোদিত মুসহাফ তৈরি করে অন্য সব মুসহাফের পাশাপাশি রেখে দেওয়া এবং অন্যগুলো ধ্বংস করে সেই মুসহাফ প্রতিষ্ঠা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজ। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে কর্তৃপক্ষ পাঠ নির্বাচন করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের তুলনামূলক যাচাইয়ের উপকরণও নিয়ন্ত্রণ করে।

এই ইতিহাসে কর্তৃত্বের বিরোধ প্রকাশ্য। একদিকে খলিফার অনুমোদিত লিখিত মানদণ্ড, অন্যদিকে মুহাম্মদের মুখ থেকে শিক্ষা নেওয়ার ভিত্তিতে একজন প্রধান কোরআনশিক্ষকের দাবি। হাফসার মৃত্যুর পরে তাঁর কাছে থাকা সহিফা ধ্বংস করার ঘটনায় বিরোধের সম্ভাবনাকেই পুরোনো দলিল নিশ্চিহ্ন করার কারণ বলা হয়েছে। উসমানের শেষ সময়ের রাজনৈতিক সংঘাতেও কিতাবুল্লাহ বদলানোর অভিযোগ উঠে এসেছে। ধর্মগ্রন্থের সংরক্ষণ, শাসকের সিদ্ধান্ত এবং বিরোধী কণ্ঠ দমনের প্রশ্ন তাই পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়; কোরআনের লিখিত ইতিহাসের ভেতরেই এই ক্ষমতার সম্পর্ক দৃশ্যমান।


অন্য সহিফা ও মুসহাফ পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ

বুখারীর সংকলন-বিবরণে উসমানের নির্দেশের লক্ষ্যবস্তু স্পষ্ট: অনুমোদিত মুসহাফের বাইরে অন্য সহিফা ও মুসহাফে থাকা কোরআন। একটি সহিফা বলতে বিচ্ছিন্ন লিখিত পাতা বোঝাতে পারে; মুসহাফ বলতে একত্র করা লিখিত সংকলন। নির্দেশে দুটি শব্দই ব্যবহৃত হওয়ায় এর পরিধি কেবল একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির সম্পূর্ণ বইয়ে সীমিত থাকে না। ব্যক্তির হাতে থাকা ছোট লিখিত অংশ এবং বৃহত্তর সংকলন—উভয় ধরনের দলিলই অপসারণের আওতায় আসে। [661]

وَأَمَرَ بِمَا سِوَاهُ مِنَ الْقُرْآنِ فِي كُلِّ صَحِيفَةٍ أَوْ مُصْحَفٍ أَنْ يُحْرَقَ

বাংলা অনুবাদ: এ ছাড়া কোরআন যে কোনো সহিফা বা মুসহাফে ছিল, তা পুড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন।

এই নির্দেশের ঐতিহাসিক ফল বুঝতে হলে লক্ষ্যবস্তুটির পরিচয়ই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বর্ণনাকারী ওই উপকরণকে “কোরআন” বলেছেন। উসমানের আদেশের পরিচয়ও কোনো অজ্ঞাত ব্যক্তির গুজব হিসেবে আসেনি; খলিফার নকল প্রস্তুত ও প্রদেশে পাঠানোর একই বিবরণের অংশ হিসেবে এসেছে। একই কর্তৃপক্ষ একদিকে নতুন নকল বিতরণ করছেন, অন্যদিকে আগের উপকরণ ধ্বংসের নির্দেশ দিচ্ছেন। ফলে সংকলন এবং বর্জন এখানে এক নীতির দুটি কার্যক্রম। সংকলনের কৃতিত্ব গ্রহণ করে বর্জনের দায় মুছে দিলে বর্ণনার অর্ধেক ইতিহাস বাদ পড়ে যায়।

ইবনে হাজর “পোড়ানো” ও “ছিঁড়ে ফেলা”—দুই ধরনের পাঠের উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও কয়েকটি বর্ণনা একত্র করেছেন, যেখানে মুছে দেওয়া, আগুনে পোড়ানো এবং বিশেষভাবে ইরাকে মুসহাফ পোড়ানোর কথা আছে। শুয়াইবের সূত্রে ইবনে আবি দাউদ ও তাবারানীর বর্ণনায় ধ্বংসের মানদণ্ডও সরাসরি বলা হয়েছে: প্রেরিত মুসহাফের সঙ্গে যে মুসহাফ মিলবে না, তা পুড়িয়ে দিতে হবে। [662]

وأمرهم أن يحرقوا كل مصحف يخالف المصحف الذي أرسل به، قال: فذلك زمان حرقت المصاحف بالعراق بالنار

বাংলা অনুবাদ: তিনি তাঁদের নির্দেশ দিলেন, তাঁর পাঠানো মুসহাফের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ প্রত্যেক মুসহাফ পুড়িয়ে দিতে। বর্ণনাকারী বলেন, সেটিই সেই সময়, যখন ইরাকে মুসহাফগুলো আগুনে পোড়ানো হয়েছিল।

এখানে একটি সংকলনকে অন্য সব সংকলনের মাপকাঠি করা হয়েছে। তুলনায় অমিল পাওয়া গেলে উভয় পাঠের সাক্ষ্য পাশাপাশি সংরক্ষণের নির্দেশ নেই; অমিল সংকলনটিই ধ্বংসের নির্দেশ আছে। অর্থাৎ পার্থক্য প্রকাশ পাওয়ার পর তার ফল হয়েছে এক পক্ষের লিখিত সাক্ষ্যের বিলোপ। “বিরোধপূর্ণ” মুসহাফ শব্দটি এই বাছাইয়ের কার্যকর সীমা প্রকাশ করে। মান্যতা নির্ধারিত হয়েছে রাষ্ট্রপ্রেরিত নকলের সঙ্গে সঙ্গতির ভিত্তিতে। পূর্ববর্তী কোনো পাঠকের শিক্ষার ধারাবাহিকতা সেই পরীক্ষায় স্বয়ংক্রিয় অব্যাহতি দেয়নি।

আবু কিলাবার সূত্রে উদ্ধৃত আরেক বর্ণনায় কেন্দ্র ও প্রদেশের সম্পর্ক আরও পরিষ্কার। উসমান নিজে কী করেছেন জানিয়ে অন্যদেরও তাঁদের হাতে থাকা উপকরণ মুছে ফেলতে বলেছেন। খলিফার ব্যক্তিগত সংগ্রহের পরিবর্তন এভাবে প্রাদেশিক পাঠসংস্কৃতির ওপর কার্যকর সাধারণ আদেশে রূপ নিয়েছে। [663]

فلما فرغ عثمان من المصحف كتب إلى أهل الأمصار: إني قد صنعت كذا وكذا ومحوت ما عندي، فامحوا ما عندكم

বাংলা অনুবাদ: উসমান মুসহাফের কাজ শেষ করে বিভিন্ন নগরের অধিবাসীদের লিখলেন: আমি এই এই কাজ করেছি এবং আমার কাছে যা ছিল মুছে ফেলেছি; তোমাদের কাছে যা আছে, তোমরাও তা মুছে ফেলো।

বর্ণনার ভাষাআদেশের পরিধিপাঠের ইতিহাসে তাৎপর্য
অন্য সহিফা বা মুসহাফে থাকা কোরআন ধ্বংসবিচ্ছিন্ন লিখিত পাতা ও সংকলিত বইবর্জনের আওতা কেবল একটি ব্যক্তিগত মুসহাফে সীমাবদ্ধ ছিল না।
প্রেরিত মুসহাফের বিরোধপূর্ণ প্রত্যেক মুসহাফ পোড়ানোকেন্দ্রীয় নকলের সঙ্গে অমিল দলিলরাষ্ট্রীয় মুসহাফ তুলনার চূড়ান্ত মানদণ্ড হয়ে ওঠে।
আমার কাছে যা ছিল মুছে ফেলেছি; তোমরাও মুছে ফেলোকেন্দ্র থেকে বিভিন্ন নগরে নির্দেশএকই বর্জননীতি অন্য অঞ্চলেও কার্যকর করার উদ্যোগ ছিল।
হাফসার সহিফা তাঁকে ফেরত দেওয়াউৎস-সহিফার সাময়িক ব্যতিক্রমউসমানের নির্দেশের সময় এই দলিলটি ধ্বংস হয়নি; পরবর্তী ধ্বংসের ঘটনা পৃথক।

হাফসার সহিফা এই সাধারণ ধ্বংসপ্রক্রিয়ার মধ্যে তখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম ছিল। ইবনে হাজর “অন্যগুলো” কথাটির ব্যাখ্যায় উসমানের প্রস্তুত নকল, সেখান থেকে নেওয়া নকল এবং হাফসাকে ফেরত দেওয়া সহিফাকে আলাদা করেছেন। ফলে বিকল্প মুসহাফ ধ্বংস এবং উৎস-সহিফার পরবর্তী ধ্বংস একই সময়ে সম্পন্ন হয়নি। প্রথম পর্যায়ে খলিফা অনুমোদিত নকলের বাইরের লিখিত পাঠ অপসারণ করেন; আরেক পর্যায়ে মদিনার শাসক সেই উৎসের ওপরও হাত বাড়ান, যেটি নকল প্রস্তুতির ভিত্তি বলে স্বীকৃত ছিল। [664]

أي بما سوى المصحف الذي استكتبه والمصاحف التي نقلت منه وسوى الصحف التي كانت عند حفصة وردها إليها

বাংলা অনুবাদ: অর্থাৎ তিনি যে মুসহাফ লিখিয়েছিলেন, তা থেকে নেওয়া মুসহাফগুলো এবং হাফসার কাছে থাকা ও তাঁকে ফেরত দেওয়া সহিফাগুলো ছাড়া অন্যগুলো।

পোড়ানো, ছেঁড়া বা ধুয়ে লেখা মুছে দেওয়ার পদ্ধতিগত পার্থক্যে প্রত্যেক বর্ণনার নিজস্ব ভাষা আছে। কিন্তু পদ্ধতিগুলোর অভিন্ন ফল হলো লিখিত সাক্ষ্যটির পাঠযোগ্যতা নষ্ট করা। অগ্নিকাণ্ডে দুর্ঘটনাবশত কোনো বই হারানো এবং রাষ্ট্রীয় নির্দেশে অমিল বই সরিয়ে দেওয়া এক ঘটনা নয়। প্রথমটিতে অনিচ্ছাকৃত ক্ষতি ঘটে; দ্বিতীয়টিতে ভবিষ্যতে কোন দলিল ব্যবহার করা যাবে, তা সচেতনভাবে নির্ধারিত হয়। এই নির্দেশ ধর্মগ্রন্থের ইতিহাসে বাছাই করা স্মৃতি প্রতিষ্ঠার একটি প্রত্যক্ষ উদাহরণ: অনুমোদিত পাঠ প্রচারিত হলো, তার সঙ্গে তুলনাযোগ্য বিরোধপূর্ণ দলিল ধ্বংসের মুখে পড়ল।


সাত আহরুফ থেকে একটিতে সীমাবদ্ধ করার ব্যাখ্যা ও বর্জিত পাঠের প্রশ্ন

সাত আহরুফের অনুমোদন এবং উসমানের নির্বাচিত পাঠে সীমাবদ্ধতা—এই দুই অবস্থার মধ্যে একটি মৌলিক পরিবর্তন আছে। প্রথম অবস্থায় একাধিক পাঠের বৈধতা মুহাম্মদের অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত; দ্বিতীয় অবস্থায় সাধারণ ব্যবহারের লিখিত সীমা খলিফার নির্বাচনের অধীন। তাবারী তাঁর তাফসিরের ভূমিকায় পরিবর্তনটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ছয় আহরুফ পরিত্যাগের কথা বলেছেন। তাঁর আলোচনায় বর্জিত পাঠগুলোকে প্রথম থেকেই জাল বা মানুষের বানানো বলে বাদ দেওয়া হয়নি। প্রশ্নটি উঠেছে এমন পাঠ নিয়ে, যেগুলোকে অবতীর্ণ এবং নবী-অনুমোদিত বলেই তিনি স্বীকার করেন। [665]

فإن قال: فما بال الأحرف الأخر الستة غير موجودة، إن كان الأمر في ذلك على ما وصفت، وقد أقرأهن رسول الله صلى الله عليه وسلم أصحابه، وأمر بالقراءة بهن، وأنزلهن الله من عنده على نبيه صلى الله عليه وسلم؟ أنسخت فرفعت، فما الدلالة على نسخها ورفعها؟ أم نسيتهن الأمة، فذلك تضييع ما قد أمروا بحفظه؟ أم ما القصة في ذلك؟

বাংলা অনুবাদ: যদি কেউ বলেন: বিষয়টি আপনার বর্ণনার মতো হলে অন্য ছয় আহরুফ এখন নেই কেন? অথচ রাসূল তাঁর সাহাবিদের সেগুলো শিখিয়েছেন, সেগুলো পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন এবং আল্লাহ তাঁর নবীর কাছে সেগুলো অবতীর্ণ করেছেন। সেগুলো কি রহিত করে তুলে নেওয়া হয়েছে? তাহলে রহিত ও তুলে নেওয়ার প্রমাণ কী? নাকি উম্মত সেগুলো ভুলে গেছে? তা হলে তো যে বিষয় সংরক্ষণের নির্দেশ ছিল তা নষ্ট করা হয়েছে। আসলে ঘটনাটি কী?

তাবারীর এই প্রশ্নের ভেতরেই হারিয়ে যাওয়া পাঠের মর্যাদা নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। তিনি যে সমস্যার উত্তর দিচ্ছেন, সেটি “কিছু ভুল বই ফেলে দেওয়া হয়েছিল”—এতটুকু নয়। তাঁর নিজের প্রশ্নে ছয় আহরুফের সঙ্গে আল্লাহর অবতরণ এবং মুহাম্মদের শিক্ষা জড়িত। তাই এগুলো আর সংরক্ষিত না থাকার ব্যাখ্যাও তাঁকে দিতে হয়েছে। তিনি ওহি দ্বারা সেগুলো রহিত হওয়ার প্রমাণ পেশ করেননি; বরং সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতার ব্যাখ্যা বদলে বলেছেন, সাতটির যেকোনো একটিকে ধরে রাখার সুযোগ ছিল।

শপথ ভঙ্গের কাফফারায় একাধিক বিকল্পের মধ্যে যেকোনো একটি পালনের উদাহরণ দিয়ে তাবারী তাঁর যুক্তি গড়েছেন। তাঁর মতে, উম্মতকে কোরআন সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হলেও সাত আহরুফের প্রত্যেকটি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক ছিল না। এই ব্যাখ্যায় একটি পাঠ বজায় রেখে অন্য ছয়টির চর্চা ছেড়ে দেওয়াকে তিনি বৈধ করেছেন। বর্জনটি তাঁর বক্তব্যের সরাসরি অংশ। [666]

قيل له: لم تنسخ فترفع، ولا ضيعتها الأمة وهي مأمورة بحفظها. ولكن الأمة أمرت بحفظ القرآن، وخيرت في قراءته وحفظه بأي تلك الأحرف السبعة شاءت.

বাংলা অনুবাদ: তাঁকে বলা হবে: সেগুলো রহিত করে তুলে নেওয়া হয়নি; আবার উম্মত সেগুলো সংরক্ষণে আদিষ্ট থাকা অবস্থায় নষ্টও করেনি। বরং উম্মতকে কোরআন সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং ওই সাত আহরুফের যেটি ইচ্ছা সে অনুযায়ী পাঠ ও সংরক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

এর পরেই তাবারী লিখেছেন, উম্মত এক হরফে পাঠ করার এবং অবশিষ্ট ছয় আহরুফের পাঠ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তাঁর ব্যাখ্যায় “রহিত হয়নি” এবং “পাঠ ছেড়ে দেওয়া হয়েছে”—দুটি বক্তব্য পাশাপাশি আছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে বর্জনের দায়িত্ব সরাসরি নতুন ওহির ওপর পড়ছে না; মানুষ নিজেদের সামষ্টিক প্রয়োজনের ব্যাখ্যায় কোন অনুমোদিত পাঠের চর্চা চালাবে, সে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। নবীর অনুমোদন সব বিকল্পের দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহার নিশ্চিত করেনি। পরবর্তী কর্তৃত্ব সেই ব্যবহারের পরিসর সংকুচিত করেছে।

উসমানের কাজ সম্পর্কে তাবারীর ভাষা আরও স্পষ্ট: তিনি মানুষকে এক মুসহাফ ও এক হরফে একত্র করেন এবং অন্য মুসহাফ ছিঁড়ে ফেলেন। যাঁর কাছে বিরোধপূর্ণ মুসহাফ ছিল, তাঁকেও তা ছিঁড়ে ফেলতে বলেন। তারপর তাবারী ছয় আহরুফের জ্ঞান ও চিহ্ন বিলুপ্ত হওয়ার কথা বলেছেন। [667] [620]

وجمعهم على مصحف واحد، وحرف واحد، وخرق ما عدا المصحف الذي جمعهم عليه. وعزم على كل من كان عنده مصحف مخالف المصحف الذي جمعهم عليه، أن يخرقه. فاستوسقت له الأمة على ذلك بالطاعة ورأت أن فيما فعل من ذلك الرشد والهداية، فتركت القراءة بالأحرف الستة التي عزم عليها إمامها العادل في تركها، طاعة منها له، ونظرا منها لأنفسها ولمن بعدها من سائر أهل ملتها، حتى درست من الأمة معرفتها، وتعفت آثارها، فلا سبيل لأحد اليوم إلى القراءة بها، لدثورها وعفو آثارها، وتتابع المسلمين على رفض القراءة بها، من غير جحود منها صحتها وصحة شيء منها ولكن نظرا منها لأنفسها ولسائر أهل دينها.

বাংলা অনুবাদ: তিনি তাঁদের এক মুসহাফ ও এক হরফে একত্র করলেন এবং যে মুসহাফে তাঁদের একত্র করেছিলেন সেটি ছাড়া অন্যগুলো ছিঁড়ে ফেললেন। যাঁর কাছে সেই মান্য মুসহাফের বিরোধপূর্ণ মুসহাফ ছিল, তাঁকেও তা ছিঁড়ে ফেলার নির্দেশ দিলেন। উম্মত আনুগত্যের সঙ্গে তাঁর সিদ্ধান্তে একত্র হলো এবং তাঁর কাজে সঠিক পথ ও হেদায়েত দেখল। তারা সেই ছয় আহরুফের পাঠ ছেড়ে দিল, যা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত তাদের ন্যায়বান নেতা নিয়েছিলেন; তাঁর আনুগত্যে এবং নিজেদের ও পরবর্তী স্বধর্মীদের স্বার্থ বিবেচনায়। অবশেষে উম্মতের মধ্যে সেগুলোর জ্ঞান বিলুপ্ত হলো এবং সেগুলোর চিহ্ন মুছে গেল। আজ আর কারও পক্ষে সেগুলো পাঠের উপায় নেই, কারণ সেগুলো লুপ্ত হয়েছে, চিহ্ন মুছে গেছে এবং মুসলিমরা ধারাবাহিকভাবে সেগুলোর পাঠ বর্জন করেছে। তারা সেগুলোর সত্যতা বা কোনো অংশের সত্যতা অস্বীকার করেনি; নিজেদের ও স্বধর্মীদের স্বার্থ বিবেচনায় এই কাজ করেছে।

“সেগুলোর সত্যতা অস্বীকার না করেই”—এই স্বীকারোক্তি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাবারী বর্জিত সব পাঠকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে উসমানের কাজ ব্যাখ্যা করছেন না। তিনি বৈধ বলে স্বীকৃত পাঠের মধ্য থেকেই সামাজিক প্রয়োজনের যুক্তিতে নির্বাচন ও বর্জনের অনুমোদন দিচ্ছেন। তাঁর মূল্যায়নে কাজটি কল্যাণকর। কিন্তু কল্যাণকর হওয়ার মূল্যায়ন এবং কোন উপকরণ হারিয়েছে তার তথ্য এক জিনিস নয়। কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে ন্যায্য বলা গেলেও সেই সিদ্ধান্তে বিলুপ্ত হওয়া পাঠ আবার সংরক্ষিত হয়ে যায় না।

তাবারীর পরের বাক্যে নির্বাচনের কর্তৃপক্ষও নামহীন থাকে না। বর্তমান পাঠকে তিনি সেই এক হরফ বলেছেন, যা মুসলিমদের নেতা তাঁদের জন্য বেছে নিয়েছিলেন। এই ভাষায় নির্বাচক মানুষ এবং নির্বাচন-পরবর্তী প্রচলন—উভয়ই আছে। আল্লাহর অবতীর্ণ বিকল্প থেকে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের নির্বাচিত রূপে উত্তরণটি তাঁর নিজের বর্ণনার অংশ। [668]

فلا قراءة للمسلمين اليوم إلا بالحرف الواحد الذي اختاره لهم إمامهم الشفيق الناصح، دون ما عداه من الأحرف الستة الباقية.

বাংলা অনুবাদ: আজ মুসলিমদের পাঠ কেবল সেই এক হরফেই, যা তাঁদের মমতাশীল ও কল্যাণকামী নেতা তাঁদের জন্য নির্বাচন করেছিলেন; অবশিষ্ট অন্য ছয় আহরুফে নয়।

তাবারীর বক্তব্যবর্জনের ব্যাখ্যাসংরক্ষণের দাবির সঙ্গে সম্পর্ক
ছয় আহরুফ রহিত করে তুলে নেওয়া হয়নি।সেগুলোর অনুপস্থিতিকে তিনি নতুন ওহি দ্বারা রহিতকরণ বলেননি।পরবর্তী ব্যবহার সীমিত করার সিদ্ধান্ত মানবীয় কর্তৃত্বের আলোচনায় আসে।
সত্যতা অস্বীকার না করেই ছয়টির পাঠ ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।বর্জিত পাঠকে আগে থেকেই জাল ধরে নেওয়া হয়নি।অনুমোদিত বৈচিত্র্যের সবটুকু পরবর্তী চর্চায় টেকেনি।
সেগুলোর জ্ঞান ও চিহ্ন লুপ্ত হয়েছে।বর্জনকে তিনি বাস্তব ও দীর্ঘস্থায়ী ফলসহ বর্ণনা করেছেন।হারানো পাঠের পূর্ণ তুলনা আর তাঁর সময়েও সম্ভব ছিল না।
বর্তমান এক হরফ নেতা নির্বাচন করেছেন।প্রচলিত পাঠের সীমা নির্ধারণে শাসকের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।একটি রূপের পরবর্তী প্রতিষ্ঠা নির্বাচন-পূর্ব সমস্ত রূপের সমান সংরক্ষণের প্রমাণ নয়।

তাবারীর “এক হরফ” ব্যাখ্যা একটি নির্দিষ্ট প্রাচীন ব্যাখ্যা; “আহরুফ” শব্দের ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মত আছে। তাঁর বক্তব্যে ছয়টি সম্পূর্ণ আলাদা কোরআন, প্রত্যেকটিতে পৃথক পূর্ণ বিষয়বস্তু, এমন কোনো তালিকা নেই। তাঁর বক্তব্যের আঘাত অন্য জায়গায়: তিনি নবী-অনুমোদিত পাঠের বৈচিত্র্য স্বীকার করেও তার বড় অংশের ব্যবহার ও জ্ঞান বিলুপ্ত হওয়াকে বৈধতা দিয়েছেন। ফলে “আহরুফের ব্যাখ্যায় মতভেদ” বললে তাঁর নির্দিষ্ট স্বীকারোক্তি বাতিল হয় না। তাঁর নিজের ব্যাখ্যার মধ্যেই সব অনুমোদিত পাঠ অবিকল টিকে থাকার ধারণা ভেঙে পড়ে।


ইবনে মাসউদের শিক্ষকতা, নিজের পাঠের কর্তৃত্ব এবং যায়েদের নিয়োগে আপত্তি

উসমানের মুসহাফনীতির বিরোধিতাকারী ইবনে মাসউদ কোনো অনভিজ্ঞ নকলনবিশ ছিলেন না। কোরআন শিক্ষার জন্য মুহাম্মদ যাঁদের নাম উল্লেখ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে তাঁর নাম ছিল। বুখারীর বর্ণনায় চারজনের মধ্যে তাঁকেই প্রথমে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তাঁর আপত্তি এমন একজনের আপত্তি, যাঁর পাঠশিক্ষার যোগ্যতা ইসলামি বর্ণনাতেই নবীর অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত। এই স্বীকৃতি এবং পরে রাষ্ট্রীয় সংকলনের কাজে তাঁর বাদ পড়ার মধ্যে কর্তৃত্বের প্রকট সংঘাত আছে। [669] [670]

সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছদঃ ২১০৬. আবু হুযায়ফা (রাঃ) এর মাওলা (আযাদকৃত গোলাম) সালিম (রাঃ) এর মর্যাদা
৩৪৮৭। সুলায়মান ইবনু হারব (রহঃ) … মাসরূক (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) এর মজলিসে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) এর আলোচনা হলে তিনি বললেন, আমি এই ব্যক্তিকে ঐদিন থেকে অত্যন্ত ভালবাসি যেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তোমরা চার ব্যক্তি থেকে কুরআন শিক্ষা কর, ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ’—সর্বপ্রথম তাঁর নাম উল্লেখ করলেন— আবূ হুযায়ফা (রাঃ)-এর আযাদকৃত গোলাম সালিম, উবাই ইবনু কা’ব (রাঃ) ও মু‘আয ইবনু জাবাল (রাঃ) থেকে। শেষোক্ত দু’জনের মধ্যে কার নাম আগে উল্লেখ করছিলেন শুধু এ কথাটুকু আমার স্মরণ নেই।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

ইবনে মাসউদের তিলাওয়াত মুহাম্মদ নিজেও শুনেছেন। সূরা নিসা শুনে তাঁর চোখে পানি আসার বর্ণনা কেবল ব্যক্তিগত স্নেহের ঘটনা নয়; সেখানে ইবনে মাসউদ সরাসরি নবীর সামনে কোরআন পাঠ করছেন এবং নবী তা শুনতে চাইছেন। এই ধরনের বিবরণ তাঁকে কোরআনের মৌখিক পাঠের প্রান্তিক অনুসারী হিসেবে দেখায় না। নবীর জীবদ্দশায় স্বীকৃত পাঠক এবং পরবর্তী রাষ্ট্রের নির্বাচিত লিখিত কর্তৃপক্ষের সম্পর্কের প্রশ্নটি তাই তাঁর ক্ষেত্রে বিশেষ তীব্র হয়। [671]

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
অধ্যায়ঃ পর্ব-৮ঃ কুরআনের মর্যাদা
পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি
পরিচ্ছদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ – (কুরআন অধ্যয়ন ও তিলাওয়াতের আদব)
২১৯৫-(৯) ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস্‘ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারে বসে আমাকে বললেন, তুমি আমার সামনে কুরআন পড়ো (আমি তোমার কুরআন পড়া শুনব)। (তাঁর কথা শুনে) আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আপনার সামনে আমি কুরআন পড়ব? অথচ এ কুরআন আপনার ওপর অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ কুরআন আমি অন্যের মুখে শুনতে পছন্দ করি। অতঃপর আমি সূরা আন্ নিসা পড়তে শুরু করলাম। আমি ‘‘তখন কেমন হবে আমি যখন প্রত্যেক উম্মাতের বিরুদ্ধে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং আপনাকেও সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত করব এদের বিরুদ্ধে’’ এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এখন বন্ধ করো। এ সময় আমি তাঁর দিকে তাকালাম। দেখলাম তাঁর দু’ চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। (বুখারী, মুসলিম)(1)
(1) সহীহ : বুখারী ৫০৫০, মুসলিম ৮০০, আবূ দাঊদ ৩৬৬৮, তিরমিযী ৩০২৫, ইবনু আবী শায়বাহ্ ৩০৩০৩, আহমাদ ৩৬০৬, মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৮৪৬০, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২১০৫৭, শু‘আবূল ঈমান ৯৮৯২।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

ইবনে মাসউদ নিজেও নিজের কোরআনজ্ঞান সম্পর্কে অত্যন্ত দৃঢ় দাবি করেছেন। তাঁর দাবির পরিধি শুধু মুখস্থ শব্দে সীমিত নয়; কোন সূরা কোথায় এবং কোন আয়াত কোন প্রসঙ্গে নাজিল হয়েছে, সে জ্ঞানও তিনি দাবি করেছেন। বুখারীর সংরক্ষিত এই বক্তব্যে কোরআন পাঠের পাশাপাশি অবতরণের স্মৃতির কর্তৃত্বও সামনে আসে। [672] [673] [674]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৬৬/ আল-কুরআনের ফাযীলাতসমূহ
পরিচ্ছদঃ ৬৬/৮. নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যে সব সহাবী ক্বারী ছিলেন।
৫০০২. মাসরূক (রহ.) হতে বর্ণিত। ‘আবদুল্লাহ্ (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! যিনি ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই, আল্লাহর কিতাবের অবতীর্ণ প্রতিটি সূরাহ সম্পর্কেই আমি জানি যে, তা কোথায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং প্রতিটি আয়াত সম্পর্কেই আমি জানি যে, তা কোন্ ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। আমি যদি জানতাম যে, কোন ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে আমার চেয়ে অধিক জ্ঞাত এবং সেখানে উট পৌঁছতে পারে, তাহলে সওয়ার হয়ে সেখানে পৌঁছে যেতাম। (মুসলিম ৪৪/২২, হাঃ ২৪৬৩) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৬৩১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৬৩৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

কোরআন সংকলন 123

বুখারীর আরেক বর্ণনায় তাঁর সরাসরি শেখা সূরার সংখ্যাও এসেছে। তিনি বলেছেন, সত্তরের বেশি সূরা মুহাম্মদের মুখ থেকে নিয়েছেন। একই বক্তব্যে নিজের জ্ঞান ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বকে আলাদা করেছেন: কিতাব সম্পর্কে অধিক জ্ঞানী হওয়ার দাবি করেছেন, সবার চেয়ে উত্তম হওয়ার দাবি করেননি। শাকীক জানান, উপস্থিত মজলিসগুলোতে তিনি এই জ্ঞানের দাবির বিরোধিতা শোনেননি। [675]

خَطَبَنَا عَبْدُ اللَّهِ فَقَالَ وَاللَّهِ لَقَدْ أَخَذْتُ مِنْ فِي رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِضْعًا وَسَبْعِينَ سُورَةً، وَاللَّهِ لَقَدْ عَلِمَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنِّي مِنْ أَعْلَمِهِمْ بِكِتَابِ اللَّهِ وَمَا أَنَا بِخَيْرِهِمْ‏.‏ قَالَ شَقِيقٌ فَجَلَسْتُ فِي الْحِلَقِ أَسْمَعُ مَا يَقُولُونَ فَمَا سَمِعْتُ رَادًّا يَقُولُ غَيْرَ ذَلِكَ

বাংলা অনুবাদ: আবদুল্লাহ আমাদের সামনে বক্তৃতা করে বললেন: আল্লাহর শপথ, আমি রাসূলের মুখ থেকে সত্তরের বেশি সূরা নিয়েছি। আল্লাহর শপথ, নবীর সাহাবিরা জানেন যে আমি তাঁদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে অধিক জ্ঞানীদের একজন; যদিও আমি তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নই। শাকীক বলেন: তারপর আমি মজলিসগুলোতে বসে তাঁদের কথা শুনলাম; এর বিপরীত বলে কাউকে তাঁর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করতে শুনিনি।

এই পটভূমিতেই তিরমিজীতে সংরক্ষিত তাঁর আপত্তির ভাষা অর্থবহ হয়। মুসহাফ লেখার কাজ থেকে তাঁকে সরিয়ে এমন একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যিনি তাঁর ইসলাম গ্রহণের সময়ে জন্মাননি—এই তুলনা টেনে তিনি নিজের অগ্রাধিকার দাবি করেছেন। কথাটি সরাসরি যায়েদকে লক্ষ্য করে বলা। বয়সের তুলনার মধ্যে আসল প্রশ্ন হলো, নবীর কাছ থেকে দীর্ঘকাল সরাসরি শিক্ষা নেওয়া ব্যক্তির কর্তৃত্ব সংকলক নির্বাচনে কতটা কার্যকর ছিল। তাঁর নিজের বক্তব্যে সেই যোগ্যতা উপেক্ষিত হওয়ার অভিযোগ আছে। [676] [677] [676] [678] [679]

যুহরী (র) বলেনঃ ইবায়দুল্লাহ্‌ ইবনে আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে উতবা বলেছেন যে, হযরত আবদুল্লাহ্‌ ইবনে মাসঊদ (রা) মুসহাফ নকলের দায়িত্ব যায়েদ ইবনে ছাবিতকে দেওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছেনঃ “হে মুসলিম সম্প্রদায়!” কুরআনের মুসহাফ লিপিবদ্ধ করার কাজে আমাকে দূরে রাখা হয়েছে আর এর দায়িত্ব বহন করেছে এমন এক ব্যক্তি যে আল্লাহ্‌র শপথ আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করি তখন সে ছিল এক কাফিরের ঔরসে। (এই কথা বলে তিনি যায়েদ ইবনে ছাবিতের দিকে ইঙ্গিত করেছেন)। আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে মাসঊদ (রা) বলেছেনঃ হে ইরাকবাসী! তোমাদের কাছে যে মুসহাফগুলো রয়েছে সেগুলো লুকিয়ে রাখ।

এখানে আপত্তি দুটো স্তরে কাজ করছে। একটি হলো দায়িত্ব বণ্টন: তাঁকে সংকলনের কাজ থেকে দূরে রাখা হয়েছে। অন্যটি হলো পাঠের কর্তৃত্ব: তাঁর নিজের শেখা পাঠকে কেন অন্যের প্রস্তুত পাঠের অধীন করা হবে। দুটি স্তরকে শুধু ব্যক্তিগত অভিমানে নামিয়ে আনলে বক্তব্যের বিষয়বস্তু বাদ পড়ে যায়। ইবনে মাসউদ তাঁর পুরোনো ইসলাম গ্রহণ, নবীর সঙ্গে সরাসরি শিক্ষা এবং দীর্ঘ পাঠ-অভিজ্ঞতা—এই তিনটি ভিত্তিতে দাবি তুলেছেন। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত সেসব দাবি মান্য মুসহাফ নির্ধারণের চূড়ান্ত শর্ত হিসেবে গ্রহণ করেনি।

ইবন সা‘দের সংরক্ষিত বক্তৃতায় পাঠের প্রতি তাঁর অনুরাগ এবং যায়েদের পাঠের সঙ্গে তুলনাটি আরও বিস্তৃতভাবে এসেছে। বর্ণনাটিতে মুসহাফ নিয়ে আদেশ জারির পর তিনি গোপন রাখার প্রসঙ্গ তোলেন, তারপর নিজের পছন্দের পাঠ ও সরাসরি শেখার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করেন। কুফার শ্রোতাদের কাছে এই বক্তব্য ছিল কোরআনের একজন প্রতিষ্ঠিত শিক্ষকের প্রকাশ্য অবস্থান। [680]

خطبنا عبد الله بن مسعود حين أمر في المصاحف بما أمر، قال: فذكر الغلول فقال: إنه من يغل يأت بما غل يوم القيامة، فغلوا المصاحف، فلأن أقرأ على قراءة من أحب أحب إلي من أن أقرأ على قراءة زيد بن ثابت، فوالذي لا إله غيره لقد أخذت من في رسول الله صلى الله عليه وسلم بضعا وسبعين سورة، وزيد بن ثابت غلام له ذؤابتان يلعب مع الغلمان، ثم قال: والذي لا إله غيره لو أعلم أحدا أعلم بكتاب الله مني تبلغه الإبل لأتيته. قال: ثم ذهب عبد الله. قال: فقال شقيق فقعدت في الحلق وفيهم أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم وغيرهم فما سمعت أحدا رد عليه ما قال.

বাংলা অনুবাদ: মুসহাফগুলোর ব্যাপারে আদেশ জারি হওয়ার পরে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ আমাদের সামনে বক্তৃতা করলেন। তিনি গোপন রেখে দেওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বললেন: যে ব্যক্তি কিছু গোপন রেখে দেবে, কিয়ামতের দিন তা নিয়েই উপস্থিত হবে; সুতরাং মুসহাফগুলো গোপন রাখো। আমি যাঁকে ভালোবাসি, তাঁর পাঠ অনুসারে পাঠ করা যায়েদ ইবনে সাবিতের পাঠ অনুসারে পাঠ করার চেয়ে আমার কাছে বেশি প্রিয়। সেই সত্তার শপথ, যিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, আমি রাসূলের মুখ থেকে সত্তরের বেশি সূরা নিয়েছি, যখন যায়েদ ইবনে সাবিত দুই কেশগুচ্ছওয়ালা এক বালক, অন্য বালকদের সঙ্গে খেলত। তারপর তিনি বললেন: সেই সত্তার শপথ, যিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, আমি যদি জানতাম আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি জ্ঞানী কোনো ব্যক্তি আছেন এবং সেখানে উট পৌঁছতে পারে, তাহলে তাঁর কাছে যেতাম। তারপর আবদুল্লাহ চলে গেলেন। শাকীক বলেন: আমি বিভিন্ন মজলিসে বসলাম; সেখানে রাসূলের সাহাবি ও অন্যরা ছিলেন। তাঁর বক্তব্য কেউ প্রত্যাখ্যান করেছেন, এমন কথা শুনিনি।

ইবনে মাসউদের বক্তব্যে “পাঠ” শব্দের ব্যবহার কেন্দ্রীয়। তিনি শুধু নিজের পদ দাবি করেননি; কোন পাঠ অনুসরণ করবেন, সে প্রশ্ন তুলেছেন। নবীর কাছ থেকে সরাসরি নেওয়া শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় লেখার সিদ্ধান্ত তাঁর কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভিন্ন কর্তৃত্ব ছিল না। একদিকে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদেশে ব্যবহারযোগ্য লিখিত মান স্থির করছে, অন্যদিকে একজন প্রবীণ শিক্ষক সেই মান গ্রহণের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাখ্যান করছেন। এই বিরোধে কোরআনের শব্দের সঙ্গে শিক্ষকের ব্যক্তিগত স্মৃতি, তাঁর শিষ্যসমাজ এবং তাঁর মুসহাফের ভবিষ্যৎ একসঙ্গে যুক্ত।

ইবনে মাসউদের কর্তৃত্বের ভিত্তিসূত্রে সংরক্ষিত বক্তব্য বা ঘটনারাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংঘাত
মুহাম্মদের অনুমোদিত শিক্ষকচারজন কোরআনশিক্ষকের মধ্যে তাঁর নাম উল্লেখ।স্বীকৃত শিক্ষক হওয়া তাঁকে সংকলনের প্রধান দায়িত্ব নিশ্চিত করেনি।
সরাসরি তিলাওয়াত ও শিক্ষামুহাম্মদ তাঁর তিলাওয়াত শুনেছেন; তিনি সত্তরের বেশি সূরা সরাসরি শেখার দাবি করেছেন।নিজের শেখা পাঠ ছেড়ে যায়েদের প্রস্তুত মান অনুসরণের প্রশ্ন তুলেছেন।
অবতরণের পরিস্থিতি সম্পর্কে জ্ঞানপ্রতিটি সূরা ও আয়াতের স্থান বা প্রসঙ্গ জানার দাবি।সংকলক নির্বাচনে তাঁর এই জ্ঞান চূড়ান্ত প্রাধান্য পায়নি।
কুফায় প্রতিষ্ঠিত পাঠের ধারাবাহিকতামুসহাফ সংক্রান্ত আদেশের পরে প্রকাশ্য বক্তৃতা।তাঁর পাঠ ও মুসহাফকে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের অধীন করার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে।

সরাসরি ওহির যুগের পাঠক এবং পরবর্তী সংকলকের মধ্যে এই সংঘাত “সবার অভিন্ন স্বতঃস্ফূর্ত স্বীকৃতি”র ছবি নস্যাৎ করে। বিরোধী ব্যক্তিটিকে সরিয়ে দিলে ঐকমত্যের বর্ণনা সহজ হয়, কিন্তু বর্ণনাগুলোতে তিনি উপস্থিত আছেন। তাঁর যোগ্যতার সাক্ষ্য এবং তাঁর আপত্তির সাক্ষ্য একই ইসলামি সংরক্ষণব্যবস্থার ভেতরে পাওয়া যায়। যে ঐতিহ্য তাঁর কাছে কোরআন শেখার নির্দেশ সংরক্ষণ করেছে, সেই ঐতিহ্যই রাষ্ট্রীয় পাঠনীতির বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদও সংরক্ষণ করেছে। এই দ্বন্দ্বকে মুছে দিয়েই কেবল নির্বাচনহীন, বিরোধহীন সংকলনের গল্প তৈরি করা সম্ভব।


ইবনে মাসউদের মুসহাফ গোপন রাখার আহ্বান ও রাষ্ট্রীয় একীকরণের বিরোধিতা

ইবনে মাসউদের প্রতিবাদ বক্তৃতায় অসন্তোষ প্রকাশ করেই থেমে থাকেনি। তিরমিজীর বর্ণনায় তিনি ইরাকবাসীকে তাঁদের কাছে থাকা মুসহাফ গোপন রাখতে বলেছেন। কোনো দলিল কেন্দ্রীয় নির্দেশে সংগ্রহ ও ধ্বংস করার উদ্যোগের মুখে সেই দলিল লুকিয়ে রাখার আহ্বান কার্যত আদেশ অমান্যের আহ্বান। এর রাজনৈতিক তাৎপর্যও সরাসরি: নিজের ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভিত্তিতে তিনি শিষ্যসমাজকে শাসকের নির্বাচিত মুসহাফনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বলছেন। [681] [682] [683] [684]

وَلِذَلِكَ قَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْعُودٍ يَا أَهْلَ الْعِرَاقِ اكْتُمُوا الْمَصَاحِفَ الَّتِي عِنْدَكُمْ وَغُلُّوهَا فَإِنَّ اللَّهَ يَقُولُ ‏:‏ ‏‏وَمَنْ يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَالْقُوا اللَّهَ بِالْمَصَاحِفِ ‏.‏ قَالَ الزُّهْرِيُّ فَبَلَغَنِي أَنَّ ذَلِكَ كَرِهَهُ مِنْ مَقَالَةِ ابْنِ مَسْعُودٍ رِجَالٌ مِنْ أَفَاضِلِ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم

বাংলা অনুবাদ: এ কারণেই আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বললেন: হে ইরাকবাসী, তোমাদের কাছে যে মুসহাফগুলো আছে সেগুলো গোপন করো এবং লুকিয়ে রাখো। আল্লাহ বলেন: যে ব্যক্তি কিছু গোপনে আত্মসাৎ করবে, কিয়ামতের দিন সে তা নিয়ে উপস্থিত হবে। অতএব তোমরা মুসহাফগুলো নিয়েই আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করো। যুহরী বলেন: আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে, ইবনে মাসউদের এই বক্তব্য নবীর বিশিষ্ট সাহাবিদের কয়েকজন অপছন্দ করেছিলেন।

কোরআন সংকলন 125
কোরআন সংকলন 127

ইবনে মাসউদ গোপন রাখার কাজটিকে নৈতিক লজ্জায় পরিণত হতে দেননি। কোরআনের ৩:১৬১ আয়াতে আত্মসাৎ করা বস্তু নিয়ে কিয়ামতে উপস্থিত হওয়ার যে সতর্কতা আছে, সেটিকেই তিনি মুসহাফ রক্ষার আহ্বানে ব্যবহার করেছেন: মুসহাফ নিয়েই আল্লাহর সামনে যাও। এই ব্যবহারে রাষ্ট্রের কাছে জমা না দেওয়া বই ধর্মীয় অপরাধের বোঝা হয়ে ওঠার বদলে নিজের হাতে শেখা কোরআন আঁকড়ে থাকার চিহ্ন হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক আনুগত্যের দাবি এবং ধর্মীয় সংরক্ষণের দাবি এখানে একই দিকে কাজ করছে না। তিনি দ্বিতীয়টিকে সামনে এনে প্রথমটি অমান্য করার পথ দেখিয়েছেন।

ইবনে আবি দাউদের কিতাবুল মাসাহিফে একই বিরোধ একাধিক সূত্রে সংরক্ষিত আছে। একটি বর্ণনায় মুসহাফ নিয়ে আদেশ তাঁর কাছে অপ্রিয় হওয়ার পর নিজের হাতে মুসহাফ গোপন রাখার নির্দেশ এবং নবীর মুখ থেকে নেওয়া পাঠ ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্ন পাশাপাশি এসেছে। সেখানে নিজের শিক্ষাকে রক্ষার ভাষা অত্যন্ত সরাসরি। [685] [686] [687]

আমি সরাসরি আল্লাহ্‌র রাসূল (সাঃ) থেকে সত্তর সূরা পেয়েছি যখন যায়েদ বিন সাবেত তখনও একজন বাচ্চা মানুষ ছিল—এখন আমি কি ত্যাগ করব যেটা আমি আল্লাহ্‌র রাসূল থেকে সরাসরি পেয়েছি?”

আরেক বর্ণনায় হুযাইফা ও ইবনে মাসউদের মুখোমুখি বাক্যবিনিময় এসেছে। হুযাইফা কুফা ও বসরার পৃথক পাঠ-পরিচয় দূর করতে খলিফার কাছে যাওয়ার সংকল্প জানান; ইবনে মাসউদ তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখান। এই বিবরণে মতপার্থক্য কয়েকজন পরবর্তী নকলকারীর ভুল নিয়ে নয়। পরিচিত প্রধান পাঠকদের অনুসরণকারী আঞ্চলিক সমাজগুলোর লিখিত ও মৌখিক ধারাবাহিকতাই আলোচনার বিষয়। [688]

قال حذيفة: يقول أهل الكوفة: قراءة عبد الله، ويقول أهل البصرة: قراءة أبي موسى، والله لئن قدمت على أمير المؤمنين لأمرته أن يغرقها، قال: فقال عبد الله: أما والله لئن فعلت ليغرقنك الله في غير ماء.

বাংলা অনুবাদ: হুযাইফা বললেন: কুফাবাসী বলে আবদুল্লাহর পাঠ, আর বসরাবাসী বলে আবু মুসার পাঠ। আল্লাহর শপথ, আমি আমিরুল মুমিনিনের কাছে গেলে তাঁকে এগুলো ডুবিয়ে দেওয়ার কথা বলব। বর্ণনাকারী বলেন: আবদুল্লাহ বললেন, আল্লাহর শপথ, তুমি তা করলে আল্লাহ তোমাকে পানি ছাড়াই ডুবিয়ে দেবেন।

“আবদুল্লাহর পাঠ” ও “আবু মুসার পাঠ”—এই নামগুলো সেই সময়ের পাঠশিক্ষার সামাজিক পরিচয়। একজন শিক্ষক কেবল একটি বইয়ের মালিক নন; তাঁর কাছে শিক্ষা নেওয়া মানুষ, তাঁর শেখানো উচ্চারণ ও শব্দ এবং তাঁর নকলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি পরম্পরা আছে। সেই পরম্পরার বই ডুবিয়ে বা মুছে দেওয়ার প্রস্তাব তাঁর শিক্ষার ওপরও হস্তক্ষেপ। ইবনে মাসউদের প্রতিক্রিয়া দেখায়, কেন্দ্রীয় একীকরণকে সবাই নিজের শেখা পাঠের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা হিসেবে গ্রহণ করেননি। পরিচিত শিক্ষকের কর্তৃত্বকে খলিফার নির্বাচিত মানের অধীন করার মধ্যে প্রতিরোধের বাস্তব কারণ ছিল।

বাংলায় প্রকাশিত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও তাঁর ফিকাহ গ্রন্থেও তাঁর মুসহাফ সমর্পণে অস্বীকৃতি, তাঁর শিক্ষাগত অগ্রাধিকার এবং উসমানের দূতদের সঙ্গে বিরোধের বর্ণনা রয়েছে। গ্রন্থটি ইবনে মাসউদের অবস্থানকে যুক্তিসংগত বলেছে এবং শেষে একটি সমঝোতা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেছে। [689]

রাসুলুল্লাহ (সা)-এর যুগে যে সব সাহাবায়ে কিরাম কুরআন সংকলন করেছিলেন হযরত ইবনে মাসউদ (রঃ) ছিলেন তাঁদের অন্যতম। কুরআন পাকের অধিকাংশ আয়াতই তিনি সরাসরি মহানবী (সা)-এর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং এ নিয়ে তিনি গর্ববোধ করতেন। নিঃসন্দেহে তাঁর এ ফখর যথার্থ’ ছিল। অগণিত শিষ্য তাঁর সংকলিত কুরআন পাকের পাঠ নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আলকামা, আসওয়াদ ‘মাসরুক জরুর ইবনে হুবাইশ, যায়দ বিন আবি ওহাব, আবু আমর শায়বানী ও আবু আব্দির রহমান আচ্ছালামীর নাম উল্লেখযোগ্য। হযরত ওসমান (রা) স্বীয় খিলাফত কালে লক্ষ্য করলেন যে, নানা পদ্ধতিতে সংকলিত কুরআন পাকের বিভিন্ন কপি পাঠ করে মানুষের মাঝে বিশৃঙ্খলার সুর হচ্ছে, অতএব অনতিবিলম্বে এর একটা বিহিত ব্যবস্থা করা প্রয়োজন; তাই তিনি পরামর্শ ক্রমে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, হযরত আবু বকর (রা) ও উমর ফারুক (রা) সম্মিলিতভাবে কুরআন পাকের যে সংকলন তৈরী করেছিলেন দেশের বিভিন্ন প্রদেশে তাই প্রচার করা হবে এবং অবশিষ্ট সংকলন সমূহকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হবে। হযরত ইবনে মাসউদ (রা) এই ব্যাপারে খলিফার সাথে একমত হতে পারেননি। সুতরাং হুযুর আকরাম (সা)-এর যুগে তিনি নিজ হাতে কুরআনের যে সংকলন তৈরী করেছিলেন তা খলিফার হস্তে সমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। এমনকি হযরত উসমান (রা)-এর প্রেরিত দূতদের সাথেও তিনি পুরোপুরি সৌজন্যতা রক্ষা করতে পারেন নি। এতে হযরত উসমান (রা)-এর মনে ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত এ সবের একটা রফা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, হযরত ইবনে মাসউদের এই অস্বীকৃতি জ্ঞাপন একেবারেই অযৌক্তিক ছিল না। কেননা তাঁর নিজস্ব সংকলিত কুরআনের কপিটি রাসুলে করীম (সা)-এর জীবদ্দশায়ই রচিত হয়েছিল। আর হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) স্বীয় খিলাফত কালে যে কুরআন পাকের সংকলনটি তৈরী করেছিলেন তাতে হযরত যায়দ বিন সাবিত (রা)-এর ভূমিকাই ছিল প্রধান। হযরত ইবনে মাসউদ (রা) রাসুল (সা)-এর সাহচর্যে যখন কুরআন পাকের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন হযরত যায়দ বিন সাবিত (রা) তখন নিতান্তই ছোট সমবয়সীদের সাথে খেলাধুলায় দিন গুজরান করতেন। ১ হযরত ইবনে মাসউদ (রা)-এর কুরআনী ইলুমে যে গভীরতা ছিল অন্য কারুরই তা ছিল না। এ কথা পূর্বে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী উলামায়ে কিরাম তাঁর সম্পর্কে’ বলেন
من كبار اصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم ومتقدمه وسادات فقهائهم –
হযরত ইবনে মাসউদ (রঃ) তো ছিলেন বয়ঃপ্রবীণ ও প্রাথমিক যুগের সাহাবাদেরই একজন। তিনি ছিলেন ফকীহ ও আইনজ্ঞ সাহাবাদের অন্যতম প্রধান। কুরআনে তাঁর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে খোদ রাসুলুল্লাহ (সা) ইরশাদ
করেন, من اراد ان يسمع القرآن غضا كما انزل فليقرأ على قراءة ابن ام عبد
যে ব্যক্তি শুদ্ধ ও সাবলীল ভাবে কুরআন পাককে অবিকল রূপে পাঠ করতে চায় সে যেন ইবনে উম্মে আব্দ এর তিলাওয়াতের অনুসরণ করে।
এই নববী সনদ প্রাপ্তির পর গৌরব উদ্ভাসিত ইবনে মাসউদ (রা)-এর উপরোক্ত মতানৈক্যকে কিছুতেই দূষণীয় ভাবা যায় না বরং যথার্থ ও যুক্তিযুক্তই ছিল। তিনি নির্দ্বিধায় আমীরুল মু’মিনীন এর নির্দেশ কেন নতশীরে মেনে নেননি এ অভিযোগ নিতান্তই অমূলক হবে। এতে তাঁর মর্যাদার এতটুকুও হানি হবে না। তিনি ইলম ও জ্ঞানের যে উত্তুঙ্গ চূড়ায় সমাসীন ছিলেন তাতে খলীফার নির্দেশ পালনের ভবিষ্যত ফলাফল সম্পর্কে গভীর চিন্তা করা তাঁর জন্য বাঞ্ছনীয় ছিল।

কোরআন সংকলন 129
কোরআন সংকলন 131

পরবর্তী গ্রহণের বিবরণ দিয়ে প্রাথমিক বিরোধের ইতিহাস মুছে যায় না। ইবনে আবি দাউদ তাঁর গ্রন্থে “ইবনে মাসউদের সন্তুষ্টি” শিরোনামেও একটি বর্ণনা রেখেছেন। সেখানে ভীত হয়ে তাঁর কাছে আসা লোকদের সামনে তিনি সাত আহরুফে কোরআন অবতরণের কথা বলেন। [690]

عن فلفلة الجعفي، قال: فزعت فيمن فزع إلى عبد الله في المصاحف، فدخلنا عليه، فقال رجل من القوم: إنا لم نأتك زائرين، ولكنا جئنا حين راعنا هذا الخبر، فقال: إن القرآن أنزل على نبيكم من سبعة أبواب على سبعة أحرف، أو حروف، وإن الكتاب قبلكم كان ينزل، أو نزل من باب واحد على حرف واحد

বাংলা অনুবাদ: ফুলফুলা আল-জু‘ফী বলেন: মুসহাফের বিষয়ে যাঁরা উদ্বিগ্ন হয়ে আবদুল্লাহর কাছে গিয়েছিলেন, আমিও তাঁদের সঙ্গে গেলাম। আমরা তাঁর কাছে প্রবেশ করলে একজন বললেন: আমরা নিছক সাক্ষাৎ করতে আসিনি; এই সংবাদ আমাদের আতঙ্কিত করায় এসেছি। তিনি বললেন: তোমাদের নবীর কাছে কোরআন সাত দরজা দিয়ে সাত আহরুফে অবতীর্ণ হয়েছে; আর তোমাদের আগের কিতাব এক দরজা দিয়ে এক হরফে অবতীর্ণ হতো বা হয়েছিল।

বর্ণনার বক্তব্য সাত আহরুফের অনুমোদন। এতে নিজের মুসহাফ আগুনে দেওয়ার ঘোষণা, নির্দিষ্ট কোনো পাঠ ভুল স্বীকার অথবা আগের গোপন রাখার নির্দেশ প্রত্যাহারের বাক্য নেই। গ্রন্থকারের অধ্যায়-শিরোনাম তাঁর ব্যাখ্যা প্রকাশ করে; উদ্ধৃত কথার নিজস্ব তথ্য হলো ইবনে মাসউদ উদ্বিগ্ন শ্রোতাদের বহুপাঠের অনুমোদনের কথা বলেছেন। ফলে তাঁর শেষ অবস্থানের আলোচনা এবং তাঁর প্রথম প্রতিবাদের সাক্ষ্যকে এক করে ফেললে সময়ের পার্থক্যও মুছে যায়। প্রথমে রাষ্ট্রীয় নির্দেশে আপত্তি ও প্রতিরোধ ছিল—এটি সংশ্লিষ্ট বর্ণনাগুলোর প্রকাশ্য বিষয়বস্তু।

প্রতিক্রিয়াসূত্রে পাওয়া কর্ম বা বক্তব্যকর্তৃত্বের বিরোধে অর্থ
সংকলনে বাদ পড়ার প্রতিবাদদায়িত্ব থেকে সরিয়ে যায়েদকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ।শিক্ষাগত অগ্রাধিকার বনাম রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বণ্টন।
মুসহাফ গোপন রাখার আহ্বানইরাকবাসীকে নিজেদের মুসহাফ লুকিয়ে রাখতে বলা।ধ্বংসনীতির বাস্তব প্রয়োগ ঠেকানোর আহ্বান।
কোরআনের আয়াত প্রয়োগমুসহাফ নিয়েই কিয়ামতে উপস্থিত হওয়ার ভাষা।রাজনৈতিক নির্দেশ অমান্যের পক্ষে ধর্মীয় বৈধতা নির্মাণ।
অন্য বিশিষ্ট সাহাবিদের প্রতিক্রিয়াযুহরীর কাছে তাঁর বক্তব্য অপছন্দ করার সংবাদ।শীর্ষ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষদের মধ্যেও এক অবস্থান ছিল না।
সন্তুষ্টি শিরোনামের বর্ণনাউদ্বিগ্ন শ্রোতাদের সাত আহরুফে অবতরণের কথা বলা।অধ্যায়-শিরোনামের ব্যাখ্যা ও বর্ণনার নির্দিষ্ট শব্দের পরিধি পৃথক।

যুহরীর কাছে অন্য সাহাবিদের অসন্তোষের সংবাদ আসা এবং শাকীকের নির্দিষ্ট মজলিসে বিরোধিতা না শোনার বিবরণ ভিন্ন সমাবেশ ও প্রতিক্রিয়ার সাক্ষ্য। কোনোটিই প্রত্যেক ব্যক্তির ভোটের তালিকা নয়। কিন্তু উভয় বিবরণেই ইবনে মাসউদের প্রকাশ্য অবস্থান আছে এবং তাঁর বক্তব্য শোনা ও মূল্যায়ন করার একটি সমাজ আছে। খলিফার নির্দেশের বাস্তবতা যেমন স্পষ্ট, তেমনি সেই নির্দেশের বিরুদ্ধে কোরআনের একজন প্রধান শিক্ষকের প্রতিরোধও স্পষ্ট। ঐকমত্যের নামে এই প্রতিরোধ লোপ করলে ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বদলে যায়।


হাফসার মৃত্যুর পরে মারওয়ানের সহিফা সংগ্রহ ও ধ্বংস

হাফসার কাছে থাকা সহিফার গুরুত্ব ছিল তার উৎস-দলিলের পরিচয়ে। আবু বকরের আমলে প্রস্তুত সংগ্রহ উমরের পরে তাঁর কাছে ছিল; উসমান নকল প্রস্তুতির জন্য সেটি নিয়ে আবার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে অন্য মুসহাফ ধ্বংসের পরও এমন একটি লিখিত সংগ্রহ রয়ে যায়, যার পরিচয় উসমানি নকলের আগের পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। নকলের সঠিকতা সম্পর্কে যে দাবি করা হচ্ছিল, তার সঙ্গে তুলনার জন্য এই দলিলটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সরকারি নকল প্রচলিত হওয়ার পরও এর পৃথক হেফাজত ছিল। হাফসার মৃত্যুর পরে সেই হেফাজত ভাঙে।

ইবনে হাজর আবু উবাইদ ও ইবনে আবি দাউদের সূত্রে সালিম ইবনে আবদুল্লাহর বিবরণ উদ্ধৃত করেছেন। মদিনার শাসক থাকাকালে মারওয়ান সহিফাগুলো চাইতেন; হাফসা দিতে অস্বীকৃতি জানাতেন। তাঁর মৃত্যুর পর দাফন থেকে ফিরে আসার সময় মারওয়ান আবদুল্লাহ ইবনে উমরের কাছে জোর নির্দেশ পাঠিয়ে সেগুলো নিয়ে নেন। বর্ণনায় সহিফা ছিঁড়ে ফেলার পরে মারওয়ানের নিজের ব্যাখ্যাও আছে। [691] [564] [565]

كان مروان يرسل إلى حفصة – يعني حين كان أمير المدينة من جهة معاوية – يسألها الصحف التي كتب منها القرآن فتأبى أن تعطيه، قال سالم: فلما توفيت حفصة ورجعنا من دفنها أرسل مروان بالعزيمة إلى عبد الله بن عمر ليرسلن إليه تلك الصحف، فأرسل بها إليه عبد الله بن عمر، فأمر بها مروان فشققت وقال: إنما فعلت هذا لأني خشيت إن طال بالناس زمان أن يرتاب في شأن هذه الصحف مرتاب.

বাংলা অনুবাদ: মারওয়ান—অর্থাৎ মুয়াবিয়ার পক্ষ থেকে মদিনার শাসক থাকাকালে—হাফসার কাছে লোক পাঠিয়ে সেই সহিফাগুলো চাইতেন, যেগুলো থেকে কোরআন লেখা হয়েছিল; কিন্তু তিনি সেগুলো দিতে অস্বীকার করতেন। সালিম বলেন: হাফসা মারা গেলে এবং আমরা তাঁকে দাফন করে ফিরে এলে মারওয়ান আবদুল্লাহ ইবনে উমরকে দৃঢ় নির্দেশ পাঠালেন, তিনি যেন অবশ্যই সেই সহিফাগুলো পাঠিয়ে দেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমর সেগুলো পাঠালেন। মারওয়ানের নির্দেশে সেগুলো ছিঁড়ে ফেলা হলো। তিনি বললেন: আমি এ কাজ করেছি শুধু এই আশঙ্কায় যে, দীর্ঘকাল পরে এই সহিফাগুলো সম্পর্কে কোনো সংশয়কারী সংশয় তুলতে পারে।

হাফসার প্রত্যাখ্যানকে গুরুত্বহীন বলা যায় না। সহিফা তাঁর কাছে থাকা অবস্থায় মারওয়ানের চাওয়া পূরণ হয়নি। তাঁর মৃত্যুর পরে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যায়: যিনি নিজে দিতে অস্বীকার করেছিলেন, তিনি আর নেই; তাঁর ভাইকে নির্দেশ পাঠিয়ে দলিল নেওয়া হয়। ব্যক্তিগত হেফাজত এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার সম্পর্ক এখানে ঘটনাটির ভেতরেই আছে। উৎস-দলিল ধ্বংসের সিদ্ধান্ত হাফসার ছিল না; তাঁর অস্বীকৃতি অতিক্রম করে পরবর্তী শাসক সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন।

ইসলামকিউএতেও ফাতহুল বারীর সূত্রে ঘটনাটি উদ্ধৃত হয়েছে। সেখানে উসমানের নকলের সঙ্গে কোনো বিষয়ে অমিল থাকার আশঙ্কায় সহিফা ছিঁড়ে ফেলার কথা এসেছে। “অমিল নিয়ে আশঙ্কা” এই সংস্করণের নিজস্ব ভাষা; সালিমের অন্য বিবরণে আছে দীর্ঘকাল পরে সংশয় ওঠার ভয়। উভয় ভাষ্যেই ধ্বংসের সঙ্গে ভবিষ্যতের বিরোধের আশঙ্কা যুক্ত। [692]

فَلَمَّا تُوُفِّيَتْ حَفْصَةُ، أَرْسَلَ مَرْوَانُ إِلَى عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ سَاعَةَ رَجَعُوا مِنْ جَنَازَةِ حَفْصَةَ، بِعَزِيمَةٍ: لَيُرْسِلَنَّهَا، فَأَرْسَلَ بِهَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ إِلَى مَرْوَانَ، فَمَزَّقَهَا؛ مَخَافَةَ أَنْ يَكُونَ فِي شَيْءٍ مِنْ ذَلِكَ خِلَافٌ لِمَا نَسَخَ عُثْمَانُ

বাংলা অনুবাদ: হাফসার মৃত্যু হলে, তাঁর জানাজা থেকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে মারওয়ান আবদুল্লাহ ইবনে উমরকে দৃঢ় নির্দেশ পাঠালেন: তাঁকে অবশ্যই সেগুলো পাঠাতে হবে। আবদুল্লাহ ইবনে উমর মারওয়ানকে সেগুলো পাঠালেন। উসমান যা নকল করিয়েছিলেন তার সঙ্গে কোনো বিষয়ে পার্থক্য থাকার আশঙ্কায় মারওয়ান সেগুলো ছিঁড়ে ফেললেন।

এই কারণটি দলিলের রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করে। উসমানি নকল প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেও আগের লিখিত সংগ্রহ ভিন্ন পাঠের অভিযোগ বা সংশয়ের অবলম্বন হতে পারত। সেটি রেখে খোলা তুলনার মাধ্যমে আশঙ্কার নিষ্পত্তি করা হয়নি। দলিলটিই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পার্থক্য বাস্তবে কী ছিল, কতখানি ছিল এবং আদৌ কোন বিষয়ে ছিল—এসবের বদলে বর্ণনায় যে বিষয়টি সরাসরি আছে, তা হলো পুরোনো সহিফা সামনে রেখে ভবিষ্যতে প্রশ্ন ওঠার সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনা বন্ধ করার উপায় হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে ধ্বংস।

ইবনে হাজরের আলোচনায় ধ্বংসের পদ্ধতি নিয়ে একাধিক শব্দ পাওয়া যায়। শুয়াইবের বর্ণনায় ছিঁড়ে ফেলা, ইউনুসের বর্ণনায় ছিঁড়ে পুড়িয়ে দেওয়া এবং অন্য বিবরণে ধুয়ে লেখা মুছে দেওয়ার কথা এসেছে। ইবনে হাজর এগুলো মিলিয়ে সম্ভাব্য একটি ক্রমও প্রস্তাব করেছেন। তাঁর মিলিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব ব্যাখ্যাকারীর অনুমান; সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বর্ণনার নির্দিষ্ট শব্দ আলাদাই আছে। [693]

قلت: قد أخرجه ابن أبي داود من طريق يونس بن يزيد عن ابن شهاب نحوه وفيه: فلما كان مروان أمير المدينة أرسل إلى حفصة يسألها الصحف، فمنعته إياها، قال: فحدثني سالم بن عبد الله قال: لما توفيت حفصة، فذكره وقال فيه: فشققها وحرقها.

বাংলা অনুবাদ: আমি বলি: ইবনে আবি দাউদ ইউনুস ইবনে ইয়াযীদের সূত্রে ইবনে শিহাব থেকে অনুরূপ বিবরণ এনেছেন। তাতে আছে: মারওয়ান মদিনার শাসক হলে হাফসার কাছে সহিফা চেয়ে লোক পাঠান; তিনি সেগুলো তাঁকে দেননি। বর্ণনাকারী বলেন: সালিম ইবনে আবদুল্লাহ আমাকে বলেছেন, হাফসা মারা গেলে—তারপর ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন এবং তাতে বলেছেন: তিনি সেগুলো ছিঁড়ে ফেললেন ও পুড়িয়ে দিলেন।

পর্যায়সহিফার অবস্থাকর্তৃত্বের ব্যবহার
উসমানের নকল প্রস্তুতির পরেউৎস-সহিফা হাফসার কাছে ফেরত যায়।রাষ্ট্রীয় নকলের পাশাপাশি আগের সংগ্রহ পৃথক হেফাজতে থাকে।
হাফসার জীবদ্দশায় মারওয়ানের দাবিহাফসা সহিফা দিতে অস্বীকার করেন।শাসকের ইচ্ছা তখনও দলিল হস্তান্তরে সফল হয়নি।
হাফসার মৃত্যুর পরেআবদুল্লাহ ইবনে উমরের কাছে জোর নির্দেশে দলিল চাওয়া হয়।মৃত্যুর পরে আগের হেফাজতের বাধা অতিক্রম করা হয়।
সহিফা পাওয়ার পরেছেঁড়া, পোড়ানো বা মুছে ফেলার ভাষায় ধ্বংসের বিবরণ।স্বাধীন তুলনার সম্ভাব্য উৎস অপসারিত হয়।
মারওয়ানের বর্ণিত কারণভবিষ্যতে সংশয় বা নকলের সঙ্গে অমিল নিয়ে বিরোধের ভয়।প্রশ্নের অবলম্বন সরিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত পাঠের কর্তৃত্ব সুরক্ষিত হয়।

উসমানের সময় নকলের অনুমোদন এবং মারওয়ানের সময় উৎসের বিলোপ দুটি আলাদা সিদ্ধান্ত। প্রথমটিতে নির্দিষ্ট নকল সরকারি মানদণ্ড হয়েছে; দ্বিতীয়টিতে তার সঙ্গে তুলনাযোগ্য পুরোনো দলিলও আর ব্যবহারের সুযোগ পায়নি। এই দ্বিতীয় সিদ্ধান্তের সামাজিক কাজ ছিল প্রতিষ্ঠিত মানদণ্ডের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য প্রশ্নের একটি অবলম্বন সরিয়ে দেওয়া। মারওয়ানের বর্ণিত আশঙ্কা ও তাঁর বেছে নেওয়া পদ্ধতির সম্পর্ক থেকেই এই ফল অনুসরণ করে। তাঁর জন্য সহিফার ঐতিহাসিক মূল্য অপেক্ষা ভবিষ্যতের মতভেদ ঠেকানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

উৎস-সহিফা রাখতে হাফসার অস্বীকৃতি এবং তা ধ্বংস করতে মারওয়ানের তৎপরতা সংরক্ষণ সম্পর্কে একই মনোভাবের প্রকাশ নয়। একজনের হাতে দলিলটি টিকে ছিল; অন্যজনের নির্দেশে তা আর রইল না। আবু বকরের সংগ্রহকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার পর সেই সংগ্রহের উপাদান ধ্বংস করায় এক কঠিন অসংগতি তৈরি হয়: সংগ্রহের কর্তৃত্ব ব্যবহার করা হচ্ছে, কিন্তু তার স্বতন্ত্র সাক্ষ্য বজায় রাখা হচ্ছে না। পরবর্তী প্রজন্মকে অনুমোদিত নকলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, সেই নকলের কথিত উৎস হাতে নিয়ে মিলিয়ে দেখার সুযোগ ছাড়াই।


“কিতাব বদলানোর” অভিযোগ, উসমানবিরোধী সংঘাত ও তাঁর হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা

মুসহাফ ধ্বংসের নীতি এবং উসমানবিরোধী রাজনৈতিক ক্ষোভের যোগসূত্র প্রাচীন গ্রন্থেই পাওয়া যায়। ইবনে আবি দাউদের কিতাবুল মাসাহিফে জুহফায় অবস্থানকারী মিসরীয়দের অভিযোগের বিবরণ আছে। সেখানে “আল্লাহর কিতাব মুছে দেওয়া”র অভিযোগের সঙ্গে স্বজন নিয়োগ, সংরক্ষিত চারণভূমি, মারওয়ানকে অর্থ দেওয়া এবং সাহাবিদের সঙ্গে আচরণের অভিযোগ পাশাপাশি এসেছে। কোরআন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এই বিবরণে শাসনের বৃহত্তর বিরোধ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বিরোধীদের অভিযোগসমষ্টির একটি নির্দিষ্ট অংশ। [694]

فقال: ما الذي نقمتم؟ قالوا: نقمنا أنه محا كتاب الله عز وجل، وحمى الحمى، واستعمل أقرباءه، وأعطى مروان مائتي ألف، وتناول أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم. فرد عليهم عثمان رضي الله عنه: أما القرآن فمن عند الله، إنما نهيتكم لأني خفت عليكم الاختلاف، فاقرءوا على أي حرف شئتم، وأما الحمى فوالله ما حميته لإبلي، ولا غنمي، وإنما حميته لإبل الصدقة وتصلح وتكون أكثر ثمنا للمسلمين، وأما قولكم: إني أعطيت مروان مائتي ألف، فهذا بيت مالهم فليستعملوا عليه من أحبوا، وأما قولكم: تناول أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم، فإنما أنا بشر أغضب وأرضى، فمن ادعى قبلي حقا أو مظلمة فهذا أنا، فإن شاء قود، وإن شاء عفو، وإن شاء أرضى، فرضي الناس واصطلحوا ودخلوا المدينة، وكتب بذلك إلى أهل البصرة وأهل الكوفة، فمن لم يستطع أن يجيء فليوكل وكيلا.

বাংলা অনুবাদ: তিনি জিজ্ঞেস করলেন: তোমাদের অভিযোগ কী? তারা বলল: আমাদের অভিযোগ, তিনি আল্লাহর কিতাব মুছে দিয়েছেন, চারণভূমি সংরক্ষিত করেছেন, আত্মীয়দের নিয়োগ দিয়েছেন, মারওয়ানকে দুই লাখ দিয়েছেন এবং নবীর সাহাবিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন। উসমান তাদের জবাবে বললেন: কোরআন আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে। আমি তোমাদের নিষেধ করেছি শুধু তোমাদের মধ্যে মতভেদের আশঙ্কায়; তোমরা যে হরফে ইচ্ছা পাঠ করো। আর চারণভূমি, আল্লাহর শপথ, আমার উট বা ভেড়ার জন্য সংরক্ষিত করিনি; সদকার উটের জন্য করেছি, যাতে সেগুলো ভালো হয় ও মুসলিমদের জন্য বেশি মূল্য পাওয়া যায়। তোমরা বলেছ, আমি মারওয়ানকে দুই লাখ দিয়েছি; এই তো তাদের বায়তুল মাল, তারা যাকে ইচ্ছা এর দায়িত্ব দিক। আর নবীর সাহাবিদের সঙ্গে আচরণ সম্পর্কে তোমাদের অভিযোগের বিষয়ে বলছি: আমি মানুষ, রাগ ও সন্তোষ দুটিই আমার হয়। কেউ আমার বিরুদ্ধে অধিকার বা জুলুমের দাবি করলে আমি উপস্থিত; সে প্রতিশোধ নিতে পারে, ক্ষমা করতে পারে অথবা আমার কাছ থেকে সন্তোষজনক প্রতিকার নিতে পারে। এরপর লোকেরা সন্তুষ্ট হলো, সন্ধি করল এবং মদিনায় প্রবেশ করল। বসরা ও কুফাবাসীকেও এ কথা লিখে জানানো হলো; যে আসতে পারবে না, সে যেন প্রতিনিধি নিয়োগ করে।

এই বর্ণনায় কিতাব মুছে দেওয়ার অভিযোগের জবাবে উসমান মতভেদ ঠেকানোর উদ্দেশ্যের কথা বলেছেন। ফলে বিরোধটি নিছক “কোন বই কেমন করে সম্মানের সঙ্গে নষ্ট করা হয়” সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না। কী অধিকারবলে পাঠের চর্চা সীমিত করা হয়েছিল, সেই প্রশ্নও শাসকের বৈধতার আলোচনায় এসেছে। অভিযোগে অর্থ ও নিয়োগের বিষয় থাকার অর্থ ধর্মগ্রন্থের প্রসঙ্গ অনুপস্থিত নয়; বরং একই শাসকের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও ধর্মীয় আপত্তি একত্র হয়েছিল।

ইবনে কাসীরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ায় হত্যাকাণ্ডের বিবরণে আরও তীব্র ভাষা পাওয়া যায়। ইবনে আসাকিরের সূত্রে তিনি মুহাম্মদ ইবনে আবু বকরের মুখে উসমানের প্রতি “আল্লাহর কিতাব বদলেছ” অভিযোগটি রেখেছেন। মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর প্রথম খলিফা আবু বকরের পুত্র। এই কথোপকথনে তিনি আনুগত্যের বদলে খলিফার ধর্মীয় কর্তৃত্বকেই চ্যালেঞ্জ করছেন। উসমানের জবাবে কিতাবকে তাঁদের মধ্যকার ফয়সালার ভিত্তি হিসেবে সামনে আনা হয়েছে। [695] [696] [697] [698]

فَقَالَ: غَيَّرْتَ كِتَابَ اللَّهِ، فَقَالَ: كِتَابُ اللَّهِ بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ

বাংলা অনুবাদ: তিনি বললেন, তুমি আল্লাহর কিতাব বদলেছ। উসমান বললেন, আল্লাহর কিতাবই আমার ও তোমাদের মধ্যে ফয়সালাকারী।

অভিযোগের শব্দ এবং অভিযোগকারী যে রাজনৈতিক মুহূর্তে কথাটি বলছেন, দুটোই তাৎপর্যপূর্ণ। “কিতাব বদলানো” একটি গুরুতর ধর্মীয় অভিযোগ; উদ্ধৃত কথোপকথনে কোন আয়াতের কোন শব্দ পাল্টানোর তালিকা দেওয়া হয়নি। তার রাজনৈতিক কাজ পরিষ্কার: খলিফাকে ধর্মগ্রন্থের বিশ্বস্ত অভিভাবক হিসেবে স্বীকার না করে তাঁকেই কিতাবের বিরুদ্ধে বিচ্যুতির জন্য অভিযুক্ত করা হচ্ছে। ইবনে মাসউদের মুসহাফ-সংক্রান্ত প্রত্যক্ষ প্রতিরোধ এবং মিসরীয়দের “মুছে দেওয়া”র অভিযোগের পাশে এই ভাষা রাখলে কোরআনের কর্তৃত্ব নিয়ে বাস্তব বিরোধের বিস্তৃত ক্ষেত্র পাওয়া যায়।

খলিফার শেষ সময়ের দাবি-দাওয়ার বিবরণে পদত্যাগ, কিসাস এবং হত্যা—তিনটি সম্ভাবনা এসেছে। উসমান খিলাফতকে আল্লাহর পরানো পোশাক বলে তা ত্যাগে অস্বীকৃতি জানান। এখানে রাষ্ট্রীয় পদটির পক্ষে তাঁর যুক্তিও ধর্মীয়। বিরোধীরা তাঁকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করাচ্ছে; তিনি নিজের পদ ধরে রাখাকে ঐশী অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত করছেন। ইবনে কাসীর খলীফা ইবনে খাইয়াতের সূত্রে যে বিবরণ দিয়েছেন, তা হলো: [699] [700]

উসমান (রা)-এর হত্যার বিবরণ
খলীফা ইব্‌ন খাইয়াত ওয়াসসাব সূত্রে বর্ণনা করেন: উসমান (রা) আশতারকে তাঁর জন্য ডেকে আনতে আমাকে পাঠান। তিনি বললেন, ‘লোকেরা কি চায়’? তিনি বললেনঃ ‘তিনটার যে কোন একটা মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নেই। তিনি জানতে চাইলেন: সে তিনটি বিষয় কি? (আশতার) বললেন: তারা আপনাকে ইখতিয়ার দিচ্ছে যে, আপনি দায়িত্ব ত্যাগ করে তাদের হাতে ন্যস্ত করুন। আপনি ঘোষণা করুন: ব্যাপারটা তোমাদের, তোমরা যাকে ইচ্ছা বাছাই করে নিতে পার। আপনি নিজেকেও পেশ করতে পারেন কিসাস তথা প্রতিশোধের জন্য। অন্যথায় লোকেরা আপনার সঙ্গে লড়াই করবে। তখন তিনি বললেন, তারা যে নেতৃত্ব তাদের হাতে ন্যস্ত করার কথা বলছে, তাতো আমি করবো না। কারণ, আল্লাহ্ তা’আলা
আমাকে যে পোশাক পরিধান করিয়েছেন, আমি তা খুলে ফেলতে পারি না। আর তাদের জন্য আমি নিজের থেকে কিসাস গ্রহণ করার ব্যাপারে আল্লাহর কসম করে বলছি: যদি তোমরা আমাকে হত্যা করো তবে আমার পরে আর পরস্পরকে ভালবাসতে পারবে না, সকলে মিলে একসঙ্গে নামায আদায় করতে পারবে না। আর সকলে এক সঙ্গে দুশমনের সঙ্গে লড়াই করতেও সক্ষম হবে না।’
বর্ণনাকারী বলেন, নেকড়ের মতো খর্বাকৃতির জনৈক ব্যক্তি দরজা দিয়ে উকি মেরে ফিরে যায়। ১৩ জন লোক সঙ্গে নিয়ে হযরত আবু বকর তনয় মুহাম্মদ আগমন করে তাঁর দাড়ি ধরে টানেন, যার ফলে আমি তাঁর মাড়ীর দাঁতের শব্দ শুনতে পাই। তিনি (মুহাম্মদ) বললেন, মু’আবিয়া তোমার কোন কাজে আসেনি, ইব্‌ন আমিরও তোমার কাজে লাগেনি আর না তোমার কাজে লেগেছে তোমার পত্রাদি। খলীফা বললেন: ‘ভাতিজা, আমার দাড়ি ছাড়।’ বর্ণনাকারী বলেন, আমি দেখতে পেলাম, তিনি চক্ষু দ্বারা ইশারায় উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে একজনের সাহায্য চাইলেন। লোকটি তীরের ভারী ফলা নিয়ে এগিয়ে এসে তাঁর মস্তকে আঘাত করে।
আমি বললাম, তারপর কি হলো? বললেন, একে একে সকলে হামলা চালিয়ে তাঁকে হত্যা করে। ১

কোরআন সংকলন 133

এই বিবরণে মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর সঙ্গীদের নিয়ে প্রবেশ করছেন এবং উসমানের দাড়ি ধরে তাঁকে অপমান করছেন। হত্যায় কার সরাসরি আঘাত ছিল, সে বিষয়ে ইবনে কাসীর পরপর ভিন্ন বর্ণনা সংরক্ষণ করেছেন। সাইফ ইবনে উমরের সূত্রের বিবরণে মুহাম্মদ প্রথমে আক্রমণে উদ্যত হলেও পরে সরে যান; ইবনে আসাকিরের সূত্রে কিতাব বদলানোর অভিযোগসহ তাঁর উপস্থিতির বর্ণনা আছে। এই বিবরণগুলোর বক্তব্য ও ইবনে কাসীরের নিজের নির্বাচিত সিদ্ধান্ত একই সঙ্গে নিম্নরূপ: [701]

সাইফ ইবন উমর তামীমী (র) ঈস ইন্ন কাসিম সূত্রের উসামা ইব্‌ন যায়দ-এর আযাদকৃত দাসী খানসা সূত্রে- [আর এ খানসা উসমান (রা)-এর স্ত্রী নাইলা বিনত ফারাফিসার সঙ্গে থাকতেন। বর্ণনা করেন: (হামলার সময়) তিনি গৃহে ছিলেন। এ সময় মুহাম্মদ ইব্‌ন আবু বকর (রা) গৃহে প্রবেশ করে সঙ্গে থাকা তীরের ভারী ফলা দিয়ে তাঁর গলায় আঘাত করতে উদ্যত হলে উসমান (রা) বলেন: ‘ভাতিজা, থাম, শপথ আল্লাহ্! তুমি এমন স্থানে হাত দিয়েছ, যেখানে তোমার পিতাও হাত দিতেন না।’ তিনি লজ্জিত হয়ে দাড়ি ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে দাঁড়ান। গৃহের লোকজন তাঁর মুখোমুখি হয় এবং দীর্ঘ বাদ-প্রতিবাদ হয়। লোকজন জয়ী হয় এবং তারা গৃহে প্রবেশ করে এবং মুহাম্মদ ইব্‌ন আবু বকর গৃহ থেকে বের হয়ে চলে যান। এরপর এক ব্যক্তি তাঁর নিকট আগমন করে, যার হাতে ছিল খেজুরের ডাল। লোকদের অগ্রভাগে থেকে সে উসমান (রা)-এর মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় এবং ডাল দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাঁকে রক্তাক্ত করে দেয়। রক্তের ছিটা কুরআন মজীদে পতিত হয়ে তা রঞ্জিত করে দেয়। তারপর তারা তরবারি দ্বারা তার উপর আঘাত হানে। অপর এক ব্যক্তি অগ্রসর হয়ে তাঁর বুকে তরবারি দ্বারা আঘাত হানে। স্ত্রী নাইলা বিন্ত ফারাফিসা আলকালবিয়াও আহত হয়ে চিৎকার করে খলীফার গায়ের উপর পড়ে যায়। তিনি চিৎকার করে বলতে থাকেন: হে শায়বার কন্যা! তবে কি আমীরুল মু’মিনীনকে হত্যা করা হবে? এই বলে তিনি তলোয়ার হাতে নিলে লোকটি তার হাতে আঘাত করে (তারীখে তাবারী এবং তারীখুল কামিল-এর বর্ণনা মতে নাইলার হাতের আঙ্গুল কাটা যায়) সন্ত্রাসীরা গৃহের আসবাবপত্রও লুটপাট করে। এ সময় জনৈক ব্যক্তি উসমান (রা)-এর নিকট দিয়ে অতিক্রমকালে কুরআন মজীদের উপর মস্তক রাখা অবস্থায় দেখতে পেয়ে তাতে পদাঘাত করত বলে:
‘আজকের দিনের মতো এমন সুন্দর কোন কাফির-এর মুখমণ্ডল আমি আর দেখিনি, আর আজকের দিনের মতো এমন সম্মানজনক কোন কাফিরের শয্যাও আমি আর দেখিনি।’ বর্ণনাকারী বলেন: আল্লাহর কসম, সন্ত্রাসীরা গৃহে কোন কিছুই রেখে যায়নি, এমনকি তারা
পানির পেয়ালা পর্যন্ত নিয়ে যায়।
আর হাফিজ ইব্‌ন আসাকির বর্ণনা করেন যে, উসমান (রা) দৃঢ়তা সহকারে গৃহের সকল সদস্যকে বের করে দিলে তাঁর পরিবার ছাড়া সেখানে আর কেউ ছিল না। এ সময় সন্ত্রাসীরা দেয়াল টপকে এবং দরজায় আগুন দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। এদের মধ্যে কোন সাহাবী
ছিলেন না; এমনকি সাহাবীর কোন সন্তানও ছিলেন না। সাহাবীর সন্তানদের মধ্যে কেবল মুহাম্মদ ইব্‌ন আবূ বকর (রা) ছিলেন। এদের মধ্যে কেউ অগ্রসর হয়ে তাঁকে প্রহার করলে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান। নারীরা চিৎকার জুড়ে দেয়। তখন তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে গৃহত্যাগ করে। এ সময় খলীফা নিহত হয়েছেন মনে করে মুহাম্মদ ইব্‌ন আবূ বকর গৃহে প্রবেশ করেন। যখন তিনি দেখতে পেলেন যে, খলীফার জ্ঞান ফিরেছে তখন তিনি বললেন:
হে বোকা বৃদ্ধ! তুমি কোন্ ধর্মের অনুসারী? তিনি জবাব দেন, ‘আমি ইসলামের অনুসারী; তবে আমি বোকা বুড়ো নই; বরং আমি আমীরুল মু’মিনীন’। ইব্‌ন আবূ বকর বললেন: ‘তুমি কিতাবুল্লাহয় পরিবর্তন সাধন করেছ।’ খলীফা বললেন: ‘আল্লাহর কিতাবই আমার ও তোমাদের মধ্যে ফয়সালাকারী।’ ইব্‌ন আবু বকর এগিয়ে যান এবং বলেন:
‘কিয়ামতের দিন আমরা যদি বলি- “হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা আমাদের নেতা-কর্তাদের আনুগত্য করেছিলাম আর তারা আমাদেরকে বিভ্রান্ত করেছে” তবে আমাদের কথা গৃহীত হবে না। (সূরা আহযাব ৩৩: ৬৭ আয়াত)। এই বলে তিনি খলীফাকে টানা-হেঁচড়া করে ঘরের দরজা পর্যন্ত নিয়ে আসেন। তখন খলীফা বলছিলেন:
‘হে ভাতিজা! তোমার পিতা আমার দাড়ি ধরতে পারতেন না!’ মিসরীয়দের মধ্যে কিনদা গোত্রের জনৈক ব্যক্তি আগমন করে, যার ডাকনাম ছিল ‘গাধা’। আর তার কুনিযাত বা উপনাম ছিল আবূ রোমান। কাতাদার মতে লোকটির নাম ছিল রোমান, অন্যদের মতে সে ছিল নীলচোখা ও লালচে-সোনালি চুলের। কেউ কেউ বলেন, লোকটির নাম ছিল সুদান ইব্‌ন রোমান আল-মুরাদী। ইবন উমর সূত্রে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি খলীফা উসমান (রা)-কে হত্যা করেছে, তার নাম ছিল, আসওয়াদ ইব্‌ন হুমরান। সে বর্শা দ্বারা তাঁকে আঘাত হানে, তার হাতে উন্মুক্ত তরবারিও ছিল। তিনি বলেন, লোকটি পুনঃ আগমন করে তাঁর বুকে বর্শা বিদ্ধ করে এবং তরবারির ধার তাঁর পেটে স্থাপন করে তাঁর জীবন লীলা সাঙ্গ করে দেয়। স্ত্রী নাইলা নিকটে ছিলেন। তিনি এগিয়ে এসে বাধা দান করলে তাঁর হাতের আঙ্গুল কাটা যায়। একথাও বর্ণিত আছে যে, মুহাম্মদ ইব্‌ন আবু বকর তীরের ফলা নিক্ষেপ করলে তা খলীফার গলায় বিদ্ধ হয়। সঠিক কথা এই যে, হত্যাকারী ছিল অন্য কেউ; মুহাম্মদ ইব্‌ন আবূ বকর নন। ‘তুমি এমন এক ব্যক্তির দাড়ি ধরেছ, তোমার পিতা যাকে সম্মান করতেন।’ খলীফা একথা বললে তিনি লজ্জিত হয়ে ফিরে যান। এরপর তিনি মুখ ঢেকে দূরে সরে যান। অবশ্য এতেও তাঁর কোন কল্যাণ হয়নি। আল্লাহর অভিপ্রায় সুনিশ্চিত। আর এটা আল্লাহর কিতাবে লিপিবদ্ধ ছিল।

উসমান হত্যাকাণ্ড
উসমান হত্যা
কোরআন সংকলন 137
কোরআন সংকলন 139

ইবনে কাসীরের সংগৃহীত বিবরণে হত্যাকারীর নাম, আঘাতের ধরন এবং মুহাম্মদ ইবনে আবু বকরের ভূমিকা নিয়ে ভিন্নতা রয়েছে। তাঁর নিজের পছন্দের সিদ্ধান্ত হলো, চূড়ান্ত হত্যাকারী মুহাম্মদ নন। একই গ্রন্থে তাঁকে হামলাকারী হিসেবে দেখানো আরেক বিবরণও রাখা হয়েছে, যার সম্পর্কে গ্রন্থকার “অত্যন্ত অপরিচিত” ও “অসংগতি আছে” বলেছেন। তাঁর নির্বাচিত সিদ্ধান্ত আর তাঁর সংকলিত সব কাহিনি এক করে দিলে গ্রন্থটির অভ্যন্তরীণ পার্থক্য হারিয়ে যায়। রাজনৈতিক সংঘাতে মুহাম্মদের উপস্থিতি, অভিযোগের ভাষা এবং সরাসরি হত্যার দায়—তিনটি পৃথক বিষয় হিসেবেই বর্ণিত হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পত্রের ঘটনাও ধর্মীয় ভাষা ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সম্পর্ক দেখায়। ইবনে কাসীরের বিবরণে মিসরের শাসকের কাছে পাঠানো পত্রে বিরোধীদের হত্যা, শূলে চড়ানো এবং হাত-পা কাটার নির্দেশ ছিল। তিনি পত্রটি মারওয়ানের লেখা বলে বর্ণনা করেন এবং এর পক্ষে সূরা মায়িদার ৩৩ নম্বর আয়াত প্রয়োগের কথা উল্লেখ করেন। উসমান নিজে ওই পত্র লেখার বা জানার কথা অস্বীকার করেন। সংশ্লিষ্ট বর্ণনায় অভিযোগের এই পর্যায়টি আছে: [702]

অপর এক আনসারী ব্যক্তি তাঁর কাছে গেলে তাকেও ঠিক একই কথা বলেন। এরপর মুহাম্মদ ইব্‌ন আবূ বকর প্রবেশ করলে তাকে বললেন: তুমি আমার হন্তা। তিনি বললেন: ‘হে অথর্ব বৃদ্ধ, তুমি কেমন করে জানলে?’ খলীফা বললেন:
‘জন্মের সপ্তম দিনে তাহনীক আর দু’আর জন্য তোমাকে রাসূলুল্লাহ্-এর খেদমতে হাযির করা হলে তুমি রাসূলুল্লাহ্ -এর কোলে পায়খানা করেছিলে। রাবী বলেন: এরপর তাঁর বুকে চড়ে দাড়ি ধরে এবং হাতের তীরের ফলা উসমান (রা)-এর বুকে বিদ্ধ করে। এই বর্ণনা অত্যন্ত অপরিচিত এবং এতে অসংগতি রয়েছে। একাধিক সূত্রে একথা প্রমাণিত হয়েছে যে, তাঁর দেহের রক্তের ছিঁটা মহান আল্লাহর
বাণী:
فَسَيَكْفِيكَهُمُ اللَّهُ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
তাদের বিরুদ্ধে আপনার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট হবেন। আর তিনি মহা শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী (সূরা বাকারা ২: আয়াত ১৩৭)। এ আয়াতের উপর পতিত হয়। একথাও বর্ণিত আছে যে, ঘাতক যখন উসমান (রা)-এর নিকটে পৌঁছে তখন তিনি কুরআন মজীদ তিলাওয়াত করতে করতে এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছেন। আর এটা অসম্ভব নয়, কারণ তিনি তখন কুরআন মজীদ তিলাওয়াত করছিলেন।
ইবনু আসাকির বর্ণনা করেন যে, উসমান (রা) আহত হয়ে বলেন: বিসমিল্লাহ, তাওয়াক্কালতু আল্লাহ্। রক্ত প্রবাহিত হলে বলেন: সুবহানাল্লাহিল আযীম। ইবন জারীর তাবারী তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে বিভিন্ন সনদে উল্লেখ করেন যে, মিসরীয়রা মিসরের শাসনকর্তার নামে প্রেরিত পত্রবাহক নিকট দেখতে পেলো, এপত্রে তাদের কতককে হত্যা করা, কতককে শূলীবিদ্ধ করা এবং কতকের হাত-পা কেটে দেয়ার নির্দেশ ছিল। আর মারওয়ান ইবনুল হাকাম উসমান (রা)-এর যবানীতে এ পত্র লিখে এবং এ সম্পর্কে যুক্তি হিসাবে কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াত উপস্থাপন করা হয়:
إِنَّمَا جَزَاؤُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِّنْ خِلافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ
যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়ায়, এটাই তাদের শাস্তি যে তাদেরকে হত্যা করা হবে, শূলীবিদ্ধ করা হবে অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হস্তপদ কর্তন করা হবে অথবা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। দুনিয়াতে এটাই তাদের লাঞ্ছনা, অবমাননা, আর আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি (সূরা মায়িদা ৫; আয়াত ৩৩)।
মারওয়ান ইবনুল হাকামের মতে যারা উসমান (রা)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে, তারা সকলেই পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। নিঃসন্দেহে তারা এমনই ছিল; কিন্তু উসমান (রা)-কে অবহিত না করে তাঁর পক্ষ থেকে এমন পত্র লেখা তার পক্ষে উচিত হয়নি। আর তাঁর লেখা ও মোহর জাল করে এবং তাঁর দাসকে তাঁর উটের ওপর পাঠিয়ে, উসমান ও মিসরীয়দের মধ্যে মুহাম্মদ ইবনে আবু বকরকে মিসরের শাসক করার বিষয়ে সন্ধি হওয়ার পরে, তার সম্পূর্ণ বিপরীত নির্দেশ পাঠানোও তাঁর উচিত হয়নি। এই পত্রে আগের চুক্তির বিপরীত কথা দেখে মিসরীয়রা এটিকে উসমানের পত্র মনে করে গুরুতর ক্ষুব্ধ হয়। তারা নিজেদের মধ্যে থাকা অনিষ্টসহ মদিনায় ফিরে আসে এবং সাহাবিদের সামনে পত্রটি দেখাতে থাকে। অন্য লোকেরাও তাদের সাহায্য করে; এমনকি কোনো কোনো সাহাবি মনে করেন, এটি উসমানের নির্দেশেই হয়েছে। প্রধান সাহাবিদের একদল ও মিসরীয়দের উপস্থিতিতে পত্রটির বিষয়ে উসমানকে প্রশ্ন করা হলে তিনি মহান আল্লাহর শপথ করে বলেন, তিনি এই পত্র লেখেননি, কাউকে লিখতে বলেননি এবং এ বিষয়ে কিছু জানেন না। তারা বলল, এতে তো আপনার মোহর রয়েছে। তিনি বললেন, মানুষের লেখা ও মোহর জাল করা হতে পারে। তারা বলল, এটি তো আপনার দাসের কাছে, আপনার উটের ওপর পাওয়া গেছে। তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানতাম না। তারা প্রত্যেক জবাবের পরে বলল, আপনি লিখে থাকলে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন; আর আপনি না লিখে থাকলে, আপনার অজান্তে আপনার নামে লেখা হয়েছে—তাহলে আপনি অক্ষম। আপনার বিশ্বাসঘাতকতা অথবা অক্ষমতা, যেটিই হোক, আপনার মতো ব্যক্তি খিলাফতের উপযুক্ত নন।

কোরআন সংকলন 141

এই বিবরণে একই কোরআন রাজনৈতিক আনুগত্য ও রাজনৈতিক শাস্তির দুই দিকেই ব্যবহৃত হয়েছে। বিরোধীরা কিতাবকে সামনে এনে শাসককে অভিযুক্ত করছে; মারওয়ানের পত্রের ব্যাখ্যায় বিরোধীদের “পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী” ধরে শরীরচ্ছেদের বিধান প্রয়োগ করা হচ্ছে। শাসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং শাসকের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য দণ্ড—উভয় ক্ষেত্রেই ধর্মগ্রন্থ বৈধতার ভাষা সরবরাহ করছে। ফলে কোরআনকে ঘিরে ক্ষমতার প্রশ্ন শুধু তার নকলের বানান বা পাঠচিহ্নের প্রশ্ন নয়; কার ব্যাখ্যা শাসনের নির্দেশ হবে এবং কাকে তার শাস্তি ভোগ করতে হবে, সেই প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত।

ইবনে কাসীর পত্রের অভিযোগ খণ্ডন করতে গিয়ে আরও বলেছেন, উসমান নিজে পত্র লিখে থাকলেও বিদ্রোহীদের শক্তি দূর করার কল্যাণ দেখেই তা করতে পারতেন। এটি গ্রন্থকারের নৈতিক-রাজনৈতিক মূল্যায়ন। তাঁর বর্ণিত সম্ভাব্য শাস্তি হত্যা, শূলে চড়ানো ও অঙ্গচ্ছেদ; আর সেই শাস্তির পক্ষে কল্যাণের যুক্তি শাসকের পক্ষে প্রয়োগ করা হচ্ছে। ভয়াবহ দণ্ডকে অনুমোদনের এই যুক্তি ধর্মীয় ইতিহাসকারের পক্ষপাতও প্রকাশ করে: শাসকের কঠোর দণ্ডের সম্ভাবনাকে উম্মতের স্বার্থে বৈধ করা হচ্ছে, অথচ বিরোধীদের অভিযোগকে শুরু থেকেই অন্যায় বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। [703]

وهذا الذي قالوا باطل على كل تقدير، فإنه لو فرض أنه كتب الكتاب – وهو لم يكتبه في نفس الأمر – لا يضره ذلك؛ لأنه قد يكون رأى ذلك مصلحة للأمة في إزالة شوكة هؤلاء البغاة الخارجين على الإمام

বাংলা অনুবাদ: তারা যা বলেছে তা সব অবস্থাতেই বাতিল। কারণ ধরা যাক তিনি পত্রটি লিখেছিলেন—যদিও বাস্তবে তিনি তা লেখেননি—তাতেও তাঁর কোনো ক্ষতি হয় না; কেননা শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী এই বিদ্রোহীদের শক্তি দূর করায় তিনি উম্মতের কল্যাণ দেখতে পারেন।

বিবরণের বিষয়সূত্রে সংরক্ষিত তথ্যসংঘাতের প্রকৃতি
মুসহাফ নিয়ে বিরোধকিতাবুল মাসাহিফে “আল্লাহর কিতাব মুছে দেওয়া”র অভিযোগ।ধর্মগ্রন্থ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ক্ষোভের অংশ হয়েছে।
কিতাব বদলানোর অভিযোগইবনে আসাকিরের সূত্রে মুহাম্মদ ইবনে আবু বকরের বক্তব্য।খলিফার ধর্মীয় বৈধতা প্রত্যাখ্যানের ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে।
পদত্যাগের দাবিখিলাফত ছেড়ে দেওয়া, কিসাস বা যুদ্ধের বিকল্প।শাসনক্ষমতার জবাবদিহি নিয়ে সরাসরি সংঘাত।
হত্যার নির্দিষ্ট দায়একাধিক বর্ণনায় ব্যক্তির নাম ও ভূমিকার ভিন্নতা।একই সংকলিত ইতিহাসে পরস্পর ভিন্ন ঘটনাক্রম সংরক্ষিত আছে।
পত্র ও শাস্তির অভিযোগহত্যা, শূলবিদ্ধকরণ ও অঙ্গচ্ছেদের নির্দেশের বিবরণ।কোরআনের বিধানের সাহায্যে বিরোধীদের দমন করার বৈধতা দাবি করা হয়েছে।
ধর্মীয় ইতিহাসকারের মূল্যায়নইবনে কাসীর শাসকের সম্ভাব্য কঠোর পত্রকেও কল্যাণের যুক্তিতে সমর্থন করেছেন।ঘটনাবর্ণনার ভেতরে ইতিহাসকারের রাজনৈতিক পক্ষও উপস্থিত।

মৃত্যুর পর উসমানের লাশ দাফন নিয়েও সংঘাতের বর্ণনা আছে। ইবনে কাসীর হত্যার তারিখ, বয়স, দাফনে বিলম্ব, জানাজার ইমাম এবং দাফনস্থল নিয়ে প্রচলিত ভিন্ন বিবরণগুলো একত্র করেছেন। প্রসিদ্ধ মত হিসেবে তিনি ৩৫ হিজরির ১৮ জিলহজ উল্লেখ করেন। পরবর্তী অংশে দাফনে বাধা ও মৃতদেহে আঘাতের বিবরণও রয়েছে। শাসকের কর্তৃত্বের পতন কতদূর গিয়েছিল, এই বর্ণনাগুলোতে তার ভয়াবহ ছবি পাওয়া যায়। [699] [704]

প্রসিদ্ধ মতে তাঁর গৃহে অবরোধের মেয়াদ ছিল চল্লিশ দিন। কেউ বলেছেন চল্লিশ দিনের কিছু বেশি, আর শা‘বী বলেছেন বাইশ রাত। প্রসিদ্ধ মতে তিনি ১৮ জিলহজ শুক্রবার নিহত হন। কেউ বলেছেন তাশরিকের দিনগুলোর মধ্যে। আবার কারো কারো মতে, ইয়াওমুন নাহর তথা কুরবানীর দিন তিনি নিহত হন। ঐতিহাসিক ইব্‌ন আসাকির এ বর্ণনা করে নিচের কবিতা দ্বারা তার প্রমাণ উপস্থাপন করেন:
ضحوا بأشمط عنوان السجود به * يقطع الليل تسبيحاً وقرآنا
‘তারা চাশতের সময় হত্যা করেছে সাদা-কালো চুলের অধিকারী ব্যক্তিকে, যার কপালে ছিল সাজদার চিহ্ন, যিনি দিনরাত অতিবাহিত করতেন তাস্বীহ পাঠ আর কুরআন মজীদ তিলাওয়াতে।
আমি বলি, প্রথমোক্ত মতটিই অধিক প্রসিদ্ধ। আবার কারো কারো মতে ৩৫ হিজরীর ১৮ যিলহজ্জ শুক্রবার তিনি নিহত হন। এ উক্তি বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ। ভিন্নমতে ৩৬ হিজরীতে তিনি নিহত হন। অবশ্য মুসআব আয-যুবাইরী এবং একটা দল এ উক্তিকে গরীব তথা অপরিচিত বলে উল্লেখ করেছেন। ফলে তাঁর খিলাফতের মুদ্দত ছিল ১২ দিন কম ১২ বৎসর। কারণ ২৪ হিজরী সালে মুহররম মাসের সূচনায় তাঁর হাতে বায়য়াত করা হয়।
আর তাঁর বযস ৮২ বছর অতিক্রম করে। সালিহ ইবন্ কায়সান বলেন: ৮২ বছর কয়েক মাস বয়সে তাঁর ওফাত হয়। কারো কারো মতে ৮৪ বছর বয়সে। আর কাতাদা বলেন: ওফাতকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বা ৯০ বছর। তার অপর এক বর্ণনামতে ৮৬ বছর বয়সে তাঁর ওফাত হয়। হিশাম ইবনুল কালবী সূত্রে বর্ণিত: তিনি ৭৫ বছর বয়সে ওফাত পান। তবে এ উক্তি অতিমাত্রায় গরীব তথা অপরিচিত। আর এর চাইতেও গরীব হলো মাশাইখ সূত্রে বর্ণিত সাইফ ইবন্ উমরের উক্তি। আর তাঁরা হলেন মুহাম্মদ, তালহা, আবু উসমান এবং আবু হারিসা। এঁরা বলেন: উসমান (রা) ৬৩ বছর বয়সে নিহত হন।
অবশ্য তাঁর কবরের স্থানের ব্যাপারে কোন মতবিরোধ নেই যে, ‘জান্নাতুল বাকী’র পূর্ব প্রান্তে ‘হাশ্ কাওকাব’ নামক স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়েছে। বনু উমাইয়‍্যাদের শাসনামলে তাঁর কবরে একটা বিরাট স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে যা এখনো (গ্রন্থকারের যুগ পর্যন্ত) বর্তমান আছে। ইমাম মালিক (রা) বলেন: আমি জানতে পেরেছি উসমান (রা) হাশ্ কাওকাব-এ কবর স্থান দিয়ে গমনকালে একদা বলেছিলেন- একজন নেককার ব্যক্তিকে এ স্থানে দাফন করা হবে।
ইবন্ জারীর তাবারী উল্লেখ করেছেন নিহত হওয়ার পর উসমান (রা)-এর লাশ তিনদিন দাফন-কাফন হীন অবস্থায় পড়ে থাকে। আমি বলি, মনে হয়, আলী (রা)-এর বায়’আতের ব্যাপারে ব্যস্ত থাকায় লোকেরা তাঁর দিকে মনোযোগ দিতে পারেনি। বায়’আতের কাজ সম্পন্ন হলে তবে সে দিকে মনোযোগ দেয়। কারো কারো মতে, দু’রাত পড়ে থাকে, আবার অন্যদের মতে সে রাতেই তাঁকে দাফন করা হয়। বিদ্রোহীদের ভয়ে গোপনে মাগরিব এবং এশার মধ্যবর্তী সময়ে তাঁকে দাফন করা হয়। আবার কারও মতে, এ বিষয়ে তাদের কয়েকজন নেতার অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। সাহাবীগণের একটা ক্ষুদ্র দল তাঁর লাশ নিয়ে গমন করেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন হাকীম ইবন্ হিসাম, হয়াইতিব ইবন্ আব্দুল উয্যা, আবুল জাহাম ইবন্ হুযাইফা, নিয়ার ইবন্ মাকরাম আসলামী, জুবাইর ইবন্ মুতইম, যাইদ ইবন্ সাবিত, কা’ব ইবন্ মালিক, তালহা ও যুবাইর, আলী ইবন্ আবূ তালিব, তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে কিছু লোক এবং কয়েকজন নারী, যাঁদের মধ্যে ছিলেন তাঁর দু’জন স্ত্রী নাইলা এবং উম্মুল বানীন বিন্ত উয়াইনা ইবন্ হিসন
এবং দু’জন শিশু। এটাই ওয়াকিদী এবং সাইফ ইবন্ উমর তামীমীর উক্তির সারবস্তু। এছাড়া তাঁর খাদিম-সেবকদের একটা দল গোসল-কাফনের পর তাঁর মৃতদেহ গৃহের দরজা পর্যন্ত বহন করে আনে। কারো কারো মতে তাঁকে গোসল এবং কাফন পরানো হয়নি। তবে প্রথমোক্ত মতটি বিশুদ্ধ। জুবাইর ইবন মুতইম তাঁর জানাযার ইমামতি করেন।
কেউ কেউ বলেন, যুবাইর ইবনুল আওয়াম আবার কারো মতে হাকীম ইব্‌ন হিসাম, বা মারওয়ান ইবনুল হাকাম এবং ভিন্নমতে মিসওয়ার ইবন্ মাখরামা তাঁর জানাযার নামাযে
ইমামতি করেন। কোন কোন খারিজী তাঁর লাশ দাফনের বিরোধিতা করে লাশে প্রস্তর নিক্ষেপ করে খাটিয়া থেকে ফেলে দিতে চায়। তারা ইহুদীদের কবরস্থান ‘দাইর সাল‘’-এ তাঁর লাশ দাফন করতে দৃঢ় সংকল্প ছিল। আলী (রা)-এর কাছে এ খবর পৌঁছালে তিনি তাদের বারণ করতে লোক পাঠান। হাকীম ইবন্ হিসাম, মারওয়ান ইবনুল হাকাম, মিসওয়ার ইবন্ মাখরামা, আবু জাহাম ইব্‌ন হুযাইফা, নিয়ার ইবন্ মাকরাম এবং জুবাইর ইবন্ মুতইম প্রমুখ তাঁর লাশ বহন করেন।
ওয়াকিদী উল্লেখ করেন যে, জানাযার স্থলে নামাযের জন্য লাশ রাখা হলে কতিপয় আনসার বাধা দিতে চাইলে আবূ জাহাম ইবন্ হুযাইফা বলেন, লাশ দাফন করতে দাও, কারণ, আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা তাঁর প্রতি সালাত পাঠ করেছেন। এরপর তারা বলে, জান্নাতুল বাকীতে তাঁর লাশ দাফন করা যাবে না; বরং দেয়ালের বাইরে তাঁর লাশ দাফন কর। তাই বাকী-এর পূর্ব দিকে খেজুর গাছের নিচে তাঁর লাশ দাফন করা হয়।
ওয়াকিদী উল্লেখ করেন যে, উসমান (রা)-এর লাশ জানাযার নামায পড়ার জন্য খাটিয়ায় রাখা হলে উমাইর ইবন্ দাবি তাঁর লাশের উপর হামলা চালায় এবং তাঁর পাঁজরের একটি হাড় ভেঙ্গে ফেলে। সে বলল: আপনি কি দাবিকে আটক রাখেননি, যার ফলে কারাগারে তার মৃত্যু হয়েছে? পরবর্তীকালে হাজ্জাজ
ইব্‌ন ইউসুফ এই উমাইর ইবন্ দাবিকে হত্যা করে। আর ইমাম বুখারী তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে মূসা ইবন্ ইসমাঈল ….. মুহাম্মদ ইবন্ সীরীন সূতে উল্লেখ করেন যে, আমি কা’বা শরীফ তাওয়াফ করছিলাম, এমন সময় এক ব্যক্তি বলছিল:
اللهم اغفر لي وما اظن ان تغفر لي — হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন; যদিও আমার মনে হয় না আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি বললাম: হে আল্লাহর বান্দা, আপনি যা বলছেন এমন কথা কাউকে বলতে শুনিনি। লোকটি বলল: আমি আল্লাহর কাছে অঙ্গীকার করেছিলাম, উসমানের মুখে চড় মারার সুযোগ পেলে অবশ্যই মারব। তিনি নিহত হয়ে ঘরের ভেতরে খাটিয়ার ওপর থাকাকালে লোকেরা এসে তাঁর জানাজা পড়ছিল। আমিও নামাজ পড়ার ভান করে প্রবেশ করলাম। নির্জন সুযোগ পেয়ে তাঁর মুখের কাপড় তুলে চড় মারলাম, তারপর আবার ঢেকে দিলাম। আমার ডান হাত শুকিয়ে গেছে। ইবনে সীরীন বলেন: আমি তার হাতটি কাঠের মতো শুকনো দেখেছি।

কোরআন সংকলন 143
কোরআন সংকলন 145

হত্যার পরে দাফনের বিরোধিতা, জানাজায় বাধা এবং লাশে আঘাতের এই বিবরণগুলো উসমানকে ঘিরে ক্ষোভের গভীরতা প্রকাশ করে। একই ইতিহাসে তাঁর পক্ষে দাফনে অংশ নেওয়া লোক এবং দাফনে বাধাদানকারী লোক—দুই পক্ষই আছে। খিলাফতের পদ, প্রাথমিক মুসলিম সমাজের মর্যাদা এবং কোরআন সংকলনের কৃতিত্ব শেষ পর্যন্ত তাঁকে রাজনৈতিক সংঘাতের ঊর্ধ্বে রাখেনি। তাঁর মৃত্যু একটি আদর্শ নির্বিরোধ সমাজের শান্তিপূর্ণ উত্তরাধিকারের ছবি নয়; রাষ্ট্রের কেন্দ্রেই কর্তৃত্ব, সম্পদ, ধর্মীয় বৈধতা ও প্রতিশোধের ভয়াবহ ভাঙনের ছবি।

কোরআনের মান্য পাঠ প্রতিষ্ঠার ঘটনাকে এই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। মুসহাফের সীমা নির্ধারণকারী খলিফার সিদ্ধান্ত প্রাচীন শিক্ষকের প্রতিরোধের মুখে পড়েছিল; তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগেও কিতাবের প্রসঙ্গ এসেছিল; শেষ সময়ের কথোপকথনে সেই কিতাবই আনুগত্য প্রত্যাখ্যানের ভাষা হয়েছিল। ফলে উসমানি মুসহাফের পরবর্তী প্রতিষ্ঠা অতীতের বিরোধ অনুপস্থিত থাকার ফল নয়। বিরোধ ছিল, ক্ষমতার প্রয়োগ ছিল এবং সেই বিরোধের মধ্য দিয়েই একটি লিখিত মানদণ্ড টিকে গেছে।


বিকল্প লিখিত দলিল ধ্বংসের ফলে পাঠের ইতিহাস যাচাইয়ের ক্ষতি

বিকল্প মুসহাফ ধ্বংসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হলো প্রাথমিক পাঠের স্বাধীন লিখিত সাক্ষ্য কমে যাওয়া। একটি প্রাচীন মুসহাফ কেবল শব্দের তালিকা নয়; সেটি কোন পরিবেশে ব্যবহৃত হতো, তার বিন্যাস কী ছিল, কোথায় সংশোধন বা সংযোজন ছিল এবং অন্য কোনো পাঠের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন—এসব অনুসন্ধানেরও উপকরণ। অমিল মুসহাফ নষ্ট করার নীতি কার্যকর হলে ভবিষ্যতের ইতিহাসে যে দলিলগুলো টিকে থাকে, সেগুলো আগের বৈচিত্র্যের নিরপেক্ষ নমুনা হয় না। টিকে থাকার সম্ভাবনাই আগে থেকে নির্দিষ্ট মানদণ্ডের অনুকূলে বদলে দেওয়া হয়।

এই ক্ষতির দুটি আলাদা মাত্রা আছে। ইবনে মাসউদের মতো শিক্ষকের মুসহাফ নষ্ট হলে স্বতন্ত্র পাঠপরম্পরার সাক্ষ্য কমে। হাফসার সহিফা নষ্ট হলে অনুমোদিত নকলের সঙ্গে তার ঘোষিত উৎস মেলানোর সুযোগ কমে। প্রথমটি সমান্তরাল সাক্ষ্য হারানোর সমস্যা; দ্বিতীয়টি উৎস ও নকলের সম্পর্ক যাচাইয়ের সমস্যা। উভয় ক্ষেত্রেই পরবর্তী বর্ণনা মূল্যবান থাকে, কিন্তু হারানো বইয়ের সব বৈশিষ্ট্য সেই বর্ণনায় ফিরে আসে না। কোনো বর্ণনা একটি আয়াতের পাঠ জানাতে পারে; সংশ্লিষ্ট মুসহাফের পুরো বিন্যাস, পার্শ্বলিখন ও সংশোধনের স্তর স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানায় না।

যাচাইয়ের প্রশ্নমূল দলিল থাকলে পাওয়া যেত যে উপকরণদলিল ধ্বংসের ফল
দুটি মুসহাফে ঠিক কোথায় অমিল ছিল?উভয় বইয়ের পাঠ পাশাপাশি মিলিয়ে দেখার সুযোগ।বিচ্ছিন্ন উদ্ধৃতি ও বর্ণনাকারীর নির্বাচিত উদাহরণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে।
পাঠভেদ মূল লেখায় ছিল, নাকি পার্শ্বটীকায়?পাতায় অবস্থান, হাতের লেখা ও সংশোধনের চিহ্ন।পরবর্তী বিবরণের একটি বাক্য দিয়ে লিখিত অবস্থান পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়।
অনুমোদিত নকলের সঙ্গে উৎস-সহিফার সম্পর্ক কী?ঘোষিত উৎস এবং প্রস্তুত নকলের সরাসরি তুলনা।উৎস ধ্বংস হলে অভিন্নতার বিবরণ পরীক্ষা করার প্রধান উপকরণ হারায়।
কোন পাঠ কত দূর প্রচলিত ছিল?বিভিন্ন অঞ্চল ও শিক্ষকসমাজের পৃথক লিখিত সাক্ষ্য।ধ্বংসপ্রাপ্ত ধারার ব্যবহারিক পরিসর মাপা কঠিন হয়।
একটি মান্য রূপ কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো?নির্বাচনের আগের ও পরের দলিলের ধারাবাহিকতা।ফল হিসেবে পাওয়া ঐক্য দিয়ে নির্বাচন-পূর্ব অবস্থা সরাসরি মাপা যায় না।

পরবর্তী কালের একটি পাঠে ব্যাপক মিল থাকার দুটি ভিন্ন ঐতিহাসিক উৎস থাকতে পারে: আগের সব সাক্ষ্যও মিলত, অথবা এক পর্যায়ে অমিল সাক্ষ্য সরিয়ে দিয়ে নির্দিষ্ট মানদণ্ড বিস্তৃত করা হয়েছিল। উসমানের ক্ষেত্রে ধ্বংসাদেশের বর্ণনা দ্বিতীয় প্রক্রিয়ার প্রত্যক্ষ তথ্য দেয়। তাই পরের মিল থেকে আগের সর্বাঙ্গীণ মিলের সিদ্ধান্ত নিজে থেকে অনুসরণ করে না। রাষ্ট্রপ্রেরিত নকলের প্রচার ও বিরোধপূর্ণ মুসহাফের বিলোপ—এই দুটি ঘটনা পরবর্তী লিখিত পরিবেশ কীভাবে তৈরি হয়েছে, তার ব্যাখ্যার অংশ।

ইবনে হাজরের আলোচনায় সংরক্ষিত শুয়াইবের বর্ণনায় “প্রেরিত মুসহাফের বিরোধপূর্ণ” বইকেই ধ্বংসের লক্ষ্য বলা হয়েছে। এই মানদণ্ডে ইতিহাসের দলিল বাছাই হলে অমিলের সাক্ষ্য থাকার সম্ভাবনা কমে যায়। নির্দিষ্ট পাঠটি ভুল কি সঠিক—সেই ধর্মীয় বিচার থেকে পৃথকভাবে এই বাছাইয়ের তথ্যগত ফল আছে: যে দলিল বিরোধ দেখাতে পারত, সেটিই হারানোর মুখে পড়েছে। দলিলের অনুপস্থিতি তখন কেবল তার আগে না থাকার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। যে নীতি তার অনুপস্থিতি তৈরি করতে পারে, তারই প্রত্যক্ষ বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে।

ধ্বংসের ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ইবন বাত্তাল পবিত্র লেখা পুড়িয়ে ফেলার অনুমতি এবং লেখাকে পদদলিত হওয়া থেকে রক্ষার কথা বলেছেন। ইবনে হাজর এই ব্যাখ্যা সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর কথায় কাজটি সম্মান প্রদর্শনের পদ্ধতি হিসেবে মূল্যায়িত হয়েছে। [705]

قال ابن بطال: في هذا الحديث جواز تحريق الكتب التي فيها اسم الله بالنار وأن ذلك إكرام لها وصون عن وطئها بالأقدام.

বাংলা অনুবাদ: ইবন বাত্তাল বলেছেন: এই হাদিসে আল্লাহর নাম রয়েছে এমন বই আগুনে পোড়ানোর অনুমতি আছে; তা ওই লেখার প্রতি সম্মান এবং সেটিকে পায়ের নিচে পদদলিত হওয়া থেকে রক্ষা করা।

লেখাটিকে অসম্মান থেকে রক্ষা করার জন্য কী পদ্ধতিতে নষ্ট করা হলো এবং কোন লেখাটি আর থাকবে না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো—এই দুটি প্রশ্ন আলাদা। প্রথমটি ধ্বংসের আচরণগত রীতি, দ্বিতীয়টি পাঠের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ ব্যবহার। আগুনে পুড়িয়ে সম্মান দেখানোর ব্যাখ্যা কোনো দলিলের পাঠ উদ্ধার করে না; কোন মানদণ্ডে দলিলটি বর্জিত হলো, সেই প্রশ্নেরও নিষ্পত্তি করে না। অমিল মুসহাফকে ধ্বংসের লক্ষ্য বানানোর তথ্য তাই পোড়ানোর ফিকহি অনুমতির আলোচনায় হারিয়ে যায় না। ঐতিহাসিক ক্ষতি ঘটেছে দলিলের পাঠযোগ্যতা ও স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বিলোপে।

তাবারীর ছয় আহরুফের জ্ঞান লুপ্ত হওয়ার বিবরণ এই ক্ষতির আরেক দিক দেখায়। তাঁর কাছে বর্জিত পাঠের অনুপস্থিতি সাময়িক বিচ্ছিন্নতা নয়; তিনি বলেছেন, আর সেগুলো পাঠের পথ নেই। এই দাবি তাঁর সাত আহরুফ-বিষয়ক ব্যাখ্যার অন্তর্গত। সেখানে অবতীর্ণ বলে স্বীকৃত বৈচিত্র্যের ব্যবহার বন্ধ হওয়া এবং তার জ্ঞান হারানো একই ধারাবাহিকতার অংশ। একটি রূপ ধরে রেখে বাকিগুলো বর্জনের ধর্মীয় বৈধতা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বর্জনের পরে সব রূপের পূর্ণ তথ্য টিকে থাকার কথা বলা হয়নি।

লিখিত দলিল না থাকলে পরবর্তী লেখকেরা পুরোনো পাঠ সংরক্ষণ করতে পারেন উদ্ধৃতি, স্মৃতি বা আগের গ্রন্থের সাহায্যে। সেই উদ্ধৃতির ঐতিহাসিক মূল্য আছে; তবে একটি বর্ণনা পরপর কয়েকটি গ্রন্থে উদ্ধৃত হলে নতুন কয়েকজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী তৈরি হয় না। ইবনে আবি দাউদের বর্ণনা ইবনে হাজর তুলে ধরেছেন এবং সেখান থেকে ইসলামকিউএ উদ্ধৃতি দিয়েছে—এই ধারায় একই সংবাদের পরবর্তী গ্রহণ ও প্রচার দেখা যায়। মূল মুসহাফের বিকল্প হিসেবে বহু স্বতন্ত্র বই হাতে পাওয়া যায় না। গ্রন্থের সংখ্যার সঙ্গে স্বতন্ত্র উৎসের সংখ্যা এক করে ফেললে হারানো প্রমাণের পরিমাণও ভুলভাবে আড়াল হয়ে যায়।

ইবনে মাসউদের প্রতিরোধ এই কারণে শুধু একজন ব্যক্তির মর্যাদার প্রশ্ন নয়। তাঁর মুসহাফ বাঁচানোর আহ্বান একই সঙ্গে এমন একটি লিখিত সাক্ষ্য রক্ষার আহ্বান, যেটি রাষ্ট্রীয় মানদণ্ডের বাইরে ছিল। তাঁকে নবীর অনুমোদিত শিক্ষক মান্য করা এবং তাঁর রক্ষার দাবিকে গুরুত্বহীন ভাবার মধ্যে টানাপোড়েন আছে। রাষ্ট্রের হাতে তাঁর শিক্ষার চূড়ান্ত বিচার দেওয়ার অর্থ নবীর মুখ থেকে শেখা স্মৃতির ওপর পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দেওয়া। ব্যক্তির কর্তৃত্ব থেকে রাষ্ট্রীয় মানে এই উত্তরণই মুসহাফের ইতিহাসকে রাজনৈতিক করে তোলে।

সংকলন, বাছাই ও ধ্বংসের ফল একসঙ্গে কাজ করেছে। অনুমোদিত নকলের অস্তিত্ব বাড়ানো হয়েছে, বিকল্প লিখিত সাক্ষ্য কমানো হয়েছে এবং পরে উৎস-সহিফাও অপসারিত হয়েছে। এতে গঠিত ঐক্য বাস্তব; তার নির্মাণপ্রক্রিয়াও বাস্তব। ইতিহাসের ক্ষতিটি হলো, সেই ঐক্য প্রতিষ্ঠার আগের সব দলিল পাশাপাশি রেখে এখন আর পরীক্ষা করা যায় না। যেসব বই ধরে তুলনা করা যেত, তাদের একটি অংশ ধ্বংস করার নির্দেশ ইসলামি সূত্রেই সংরক্ষিত। পরবর্তী মান্যতা সেই নির্দেশের ইতিহাস মুছে দেয় না এবং তার ফলে হারানো সাক্ষ্যও ফিরিয়ে দেয় না।


গৃহীত মুসহাফের সীমানা: সূরা, আয়াত, বিন্যাস ও বিসমিল্লাহ

একটি ধর্মগ্রন্থের সীমানা নির্ধারিত হয় শুধু তার পাতায় লেখা বাক্য দিয়ে নয়; কোন রচনাগুলো গ্রন্থটির অন্তর্ভুক্ত, কোথায় একটি আয়াত শেষ হচ্ছে, কোন সূরার পরে কোন সূরা বসছে এবং সূচনায় লেখা বাক্যটি মূল পাঠের অংশ হিসেবে গণ্য হচ্ছে কি না—এসব সিদ্ধান্ত মিলিয়েই তার গৃহীত রূপ তৈরি হয়। কোরআনের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তগুলোর ইতিহাসে সাহাবিদের মুসহাফ, আঞ্চলিক গণনাপদ্ধতি, সংকলকের অনুমান এবং পরবর্তী আলেমদের পরস্পরবিরোধী মত সংরক্ষিত আছে। বর্তমান মুসহাফের পরিচিত চেহারাটি সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত একটি মান্য রূপ। তার প্রতিষ্ঠিত অবস্থানকে অতীতের সর্বসম্মত অবস্থান হিসেবে দেখালে পূর্ববর্তী বিরোধগুলো ইতিহাস থেকে মুছে যায়।

সূরার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ইবনে মাসউদের অবস্থান, উবাইয়ের মুসহাফে অতিরিক্ত দুটি রচনার উল্লেখ, আনফাল–তাওবার সম্পর্ক নিয়ে উসমানের ব্যাখ্যা এবং বিসমিল্লাহর মর্যাদা নিয়ে ফকিহদের বিরোধ—প্রত্যেকটি গ্রন্থের ভিন্ন একটি সীমানাকে প্রকাশ করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আয়াতের শেষবিন্দু, সূরার নাম, মক্কি–মাদানি পরিচয় এবং খণ্ডে বিভক্ত করার বিভিন্ন রীতি। এসব ক্ষেত্রে মানুষের নির্বাচন ও ব্যাখ্যা সরাসরি দৃশ্যমান। কাগজে কোনো বাক্য লিখে রাখা, সেটিকে সূরার আয়াত হিসেবে গ্রহণ করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সেই গ্রহণকে বাধ্যতামূলক করে তোলা—এগুলো পৃথক ক্ষমতা ও পৃথক সিদ্ধান্ত।


আয়াত গণনার বিভিন্ন পদ্ধতি ও সংখ্যার মতভেদ

কোরআনের সংরক্ষণ সম্পর্কে বহুল ব্যবহৃত ঘোষণাটি সূরা হিজরে রয়েছে। সেখানে সংরক্ষণের অঙ্গীকার আছে; আয়াতের মোট সংখ্যা, প্রতিটি আয়াতের শেষসীমা কিংবা কোন আঞ্চলিক গণনা অনুসরণ করতে হবে, তার তালিকা নেই। ঘোষণাটির ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং বাস্তবে প্রচলিত গণনার ইতিহাস এক জিনিস নয়। আয়াত গণনার গ্রন্থগুলো খুললেই সেই ইতিহাসে একাধিক সংখ্যা পাওয়া যায়। [706]

আমি স্বয়ং এ উপদেশগ্রন্থ অবতরণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।

তাফসীরে ইবনে কাসীরের ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংস্করণে আয়াতের সংখ্যা সম্পর্কে সাতটি মত পাশাপাশি রাখা হয়েছে: ৬০০০, ৬২০৪, ৬২১৪, ৬২১৯, ৬২২৫, ৬২২৬ ও ৬২৩৬। একই আলোচনায় শব্দ ও অক্ষরের সংখ্যার ভিন্ন হিসাবও রয়েছে। অর্থাৎ সূরার সংখ্যা নির্দিষ্টভাবে গ্রহণ করা হলেও তার ভেতরের আয়াত, শব্দ ও অক্ষরের হিসাব সম্পর্কে একটি মাত্র অখণ্ড পরিসংখ্যান উত্তরাধিকারসূত্রে চলে আসেনি। গ্রন্থটির সম্পূর্ণ বক্তব্য হলো: [707]

কুরআন মজীদের আয়াতের সংখ্যা সর্বসম্মতভাবে অন্যুন ছয় হাজার। তবে উহার সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের ভিতর মতভেদ রহিয়াছে। কেহ বলেন, ছয় হাজার। কেহ বলেন, ছয় হাজার দুইশত চারিটি। কেহ বলেন, ছয় হাজার দুইশত চৌদ্দটি। কেহ বলেন, ছয় হাজার দুইশত ঊনিশটি। কেহ বলেন, ছয় হাজার দুইশত পঁচিশটি। কেহ বলেন, ছয় হাজার দুইশত ছাব্বিশটি। আবার কেহ বলেন, ছয় হাজার দুইশত ছত্রিশটি।
আবূ আমর আদ্দানী স্বীয় গ্রন্থ ‘আল-বয়ান’ এ উপরোক্ত তথ্য প্রদান করিয়াছেন।
আতা ইবন ইয়াসার হইতে ফযল ইব্‌ন শাযান কর্তৃক বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী কুরআন মজীদের শব্দ সংখ্যা হইতেছে সাতাত্তর হাজার চারিশত ঊনচল্লিশ।
মুজাহিদ হইতে আবদুল্লাহ্ ইবন কাছীরের বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী কুরআন মজীদের অক্ষরের সংখ্যা হইতেছে তিন লক্ষ একুশ হাজার একশত আশি। ফযল ইব্‌ন আতা ইবন ইয়াসারের মতে উহার সংখ্যা হইতেছে তিন লক্ষ তেইশ হাজার পনের।

কোরআনের সর্বমোট আয়াত সংখ্যা

দানির নামে উদ্ধৃত আয়াতসংখ্যার মতগুলো সুয়ূতির আলোচনার সূত্রে ইসলামওয়েবেও পাওয়া যায়। সেখানে ছয় হাজারের ওপর অতিরিক্ত কত আয়াত গণনা করা হবে, তা নিয়ে মতভেদ স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছে। “ছয় হাজারে একমত” কথাটির অর্থ ন্যূনতম ছয় হাজার স্বীকার করা; সবাই ছয় হাজারেই গণনা শেষ করেছেন, এমন অর্থ ওই উদ্ধৃতির পরবর্তী বাক্যগুলোতেই বাতিল হয়ে যায়। [708]

أَجْمَعُوا عَلَى أَنَّ عَدَدَ آيَاتِ الْقُرْآنِ سِتَّةُ آلَافِ آيَةٍ ثُمَّ اخْتَلَفُوا فِيمَا زَادَ عَلَى ذَلِكَ فَمِنْهُمْ مَنْ لَمْ يَزِدْ وَمِنْهُمْ مَنْ قَالَ: وَمِائَتَا آيَةٍ وَأَرْبَعُ آيَاتٍ، وَقِيلَ: وَأَرْبَعَ عَشْرَةَ، وَقِيلَ: وَتِسْعَ عَشْرَةَ، وَقِيلَ: وَخَمْسٌ وَعِشْرُونَ، وَقِيلَ: وَسِتٌّ وَثَلَاثُونَ.

বাংলা অনুবাদ: তাঁরা একমত হয়েছেন যে কোরআনের আয়াত ছয় হাজার; তারপর এর বেশি নিয়ে মতভেদ করেছেন। কেউ এর বেশি বলেননি; কেউ বলেছেন আরও দুইশ চার; বলা হয়েছে দুইশ চৌদ্দ, দুইশ ঊনিশ, দুইশ পঁচিশ এবং দুইশ ছত্রিশ।

দানির নামে উদ্ধৃত সংখ্যাগণনার অবস্থান
৬০০০সর্বনিম্ন ছয় হাজার বলে উল্লেখিত মত
৬২০৪ছয় হাজারের সঙ্গে দুইশ চার যোগ
৬২১৪ছয় হাজারের সঙ্গে দুইশ চৌদ্দ যোগ
৬২১৯ছয় হাজারের সঙ্গে দুইশ ঊনিশ যোগ
৬২২৫ছয় হাজারের সঙ্গে দুইশ পঁচিশ যোগ
৬২৩৬ছয় হাজারের সঙ্গে দুইশ ছত্রিশ যোগ

ইবনে কাসীরের পূর্ণ উদ্ধৃতিতে ৬২২৬-ও রয়েছে। যরকাশির আল-বুরহানে একই ধরনের তালিকার সঙ্গে উবাইয়ের নামে ৬২১৮, হুমাইদের নামে ৬২১২ এবং রাশিদের নামে ৬২০৪ সংখ্যাও দেওয়া হয়েছে। আতার নামে সেখানে ৬১৭৭ লেখা আছে। এই পৃথক বর্ণনাগুলো দেখায়, গণনার ইতিহাসকে কেবল আজকের বহুল ব্যবহৃত একটি মোট দিয়ে প্রতিস্থাপন করলে প্রাচীন গ্রন্থের তথ্য বাদ পড়ে যায়। যরকাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামসহ লিখেছেন: [709]

وعدد آياته في قول علي – رضي الله عنه – ستة آلاف ومائتان ، وستة وثلاثون ، وفي قول أبي : ” ستة آلاف ومئتان وثمان عشرة . وعطاء : ستة آلاف ومائة وسبع وسبعون . وحميد : ستة آلاف ومائتان واثنتا عشرة . وراشد : ” ستة آلاف ومائتان وأربع ” .

বাংলা অনুবাদ: আলীর মত অনুযায়ী এর আয়াতসংখ্যা ছয় হাজার দুইশ ছত্রিশ; উবাইয়ের মত অনুযায়ী ছয় হাজার দুইশ আঠারো; আতার মতে ছয় হাজার একশ সাতাত্তর; হুমাইদের মতে ছয় হাজার দুইশ বারো; এবং রাশিদের মতে ছয় হাজার দুইশ চার।

৬২১৬, ৬২৫০, ৬৬৬৬, ৬২২১ ও ৬৩৪৮ সংখ্যাগুলোর কোনোটি ইবনে কাসীরের উপরের উদ্ধৃতিতে নেই। তাঁর এই উদ্ধৃতির সাতটি মোট এবং যরকাশির নামযুক্ত গণনাকারীদের হিসাব আলাদা করে শনাক্ত করা যায়। গণনাকারীর নাম ও আয়াতসীমার বিবরণ সংশ্লিষ্ট সংখ্যার ভিত্তি প্রকাশ করে; কেবল একটি মোট সংখ্যা সেই পদ্ধতির পরিচয় দেয় না। তাফসীরে জালালাইনের ভূমিকার সংখ্যা ও বিভাগসংক্রান্ত বিবরণ এবং এ কে এম এনামুল হকের সংকলন-ইতিহাসের সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠাও আয়াত, অক্ষর ও বিভাগের হিসাবের আলোচনার অংশ।

আয়াতসংখ্যা ও বিভাগসংক্রান্ত বাংলা গ্রন্থগুলোর সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠাগুলো: তাফসীরে জালালাইন, জালালুদ্দিন মহল্লী ও জালালুদ্দিন সুয়ূতি, ইসলামিয়া কুতুবখানা, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯; এবং কোরআন হাদিস সংকলনের ইতিহাস, এ কে এম এনামুল হক, পৃষ্ঠা ৬৯।

কোরআনের সুরা, রুকূ, মক্কী, মাদানী আয়াত
কোরআনের আয়াত শব্দ অক্ষর সংখ্যা

আয়াতের বিভাজন নিয়ে বিরোধের নির্দিষ্ট উদাহরণ ইসলামওয়েবের একই উত্তরে ফিরোজাবাদীর বক্তব্য থেকে দেওয়া হয়েছে। সূরা সাদের শুরু ও শেষের কাছাকাছি একই শব্দসমষ্টির মধ্যে আলাদা জায়গায় আয়াতের সীমা ধরা হয়েছে। কুফাবাসী, বসরাবাসী এবং অন্য অঞ্চলের গণনাকারীরা কোন অংশটিকে একটি স্বতন্ত্র আয়াত বলছেন, সেই প্রশ্নে পৃথক উত্তর দিয়েছেন। ফিরোজাবাদীর উদ্ধৃত বক্তব্যের প্রথম উদাহরণটি হলো: [710]

مثال ذلك أَنَّ قرّاءَ الكوفة عدُّوا قوله: والقرآن ذِي الذكر ـ آية، والباقون لم يعدّوها آية، وقراء الكوفة عدّوا، قَالَ فالحق والحق أَقُولُ ـ آية والباقون لم يعدّوها، بل جعلوا آخر الآية: فِي عِزَّةٍ وَشِقَاقٍ، و: لأَمْلأَنَّ جَهَنَّمَ مِنكَ وَمِمَّن تَبِعَكَ مِنْهُمْ أَجْمَعِينَ ـ وهكذا عدّ أَهل مكَّة والمدينة والكوفة والشَّام آخر الآية والشياطين كُلَّ بَنَّآءٍ وَغَوَّاصٍ ـ وأَهل البصرة جعلوا آخرها: وَآخَرِينَ مُقَرَّنِينَ فِي الأصفاد ـ

বাংলা অনুবাদ: এর উদাহরণ হলো, কুফার পাঠকেরা “ওয়াল কুরআনি যিয যিকর” অংশটিকে আয়াত গণনা করেছেন; অন্যরা তা করেননি। কুফার পাঠকেরা “কালা ফাল হাক্কু ওয়াল হাক্কা আকুল” অংশটিকেও আয়াত গণনা করেছেন; অন্যরা তা করেননি। তাঁরা বরং প্রথমটির আয়াতের শেষ ধরেছেন “ফি ইযযাতিন ওয়া শিকাক” এবং দ্বিতীয়টির শেষ ধরেছেন “লা-আমলাআন্না জাহান্নামা মিনকা ওয়া মিম্মান তাবিআকা মিনহুম আজমাঈন” পর্যন্ত। একইভাবে মক্কা, মদিনা, কুফা ও শামের গণনাকারীরা “ওয়াশ শায়াতিনা কুল্লা বান্নাইন ওয়া গাওয়াস” পর্যন্ত আয়াতের শেষ ধরেছেন; বসরার গণনাকারীরা শেষ ধরেছেন “ওয়া আখারিনা মুকাররানিনা ফিল আসফাদ” পর্যন্ত।

সূরা সাদের অংশএক গণনার সীমাঅন্য গণনার সীমা
শুরুর “সাদ। ওয়াল কুরআনি যিয যিকর”কুফি গণনায় স্বতন্ত্র আয়াতঅন্য গণনায় “বালিল্লাযিনা কাফারু ফি ইযযাতিন ওয়া শিকাক” পর্যন্ত যুক্ত
“কালা ফাল হাক্কু ওয়াল হাক্কা আকুল”কুফি গণনায় স্বতন্ত্র আয়াতঅন্য গণনায় “লা-আমলাআন্না জাহান্নামা…” অংশের সঙ্গে যুক্ত
“ওয়াশ শায়াতিনা কুল্লা বান্নাইন ওয়া গাওয়াস”মক্কা, মদিনা, কুফা ও শামের গণনায় স্বতন্ত্র আয়াতবসরার গণনায় “ওয়া আখারিনা মুকাররানিনা ফিল আসফাদ” পর্যন্ত যুক্ত

এই উদাহরণগুলোতে পরিবর্তনটি আয়াতের শেষসীমায়: একই ধারাবাহিক বাক্যের কোথায় একটি গণনাযোগ্য একক শেষ হবে, তা অঞ্চলভেদে বদলেছে। ফলে আয়াতের সংখ্যা থেকে সরাসরি হারানো শব্দের সংখ্যা বের হয় না। আয়াতসীমার এই পৃথক রীতিগুলো স্বীকৃত গণনাপরম্পরায় জায়গা পেয়েছে। প্রতিটি আয়াতকে অবিকল একই জায়গায় শেষ হওয়া, সর্বত্র একই নম্বরের একটি চিরস্থির একক হিসেবে কল্পনা করলে সেই কল্পনার সঙ্গে গণনাশাস্ত্রের নথিবদ্ধ ইতিহাসের সংঘাত হয়। একটি অঞ্চলে আলাদা আয়াত হিসেবে স্বীকৃত অংশ অন্য অঞ্চলে বৃহত্তর আয়াতের অংশ হয়েছে।

শব্দ ও অক্ষরের গণনাতেও একাধিক ফল পাওয়া গেছে। যরকাশি এক জায়গায় আতা ইবন ইয়াসারের সূত্রে ৭৭৪৩৭ শব্দ এবং মুজাহিদের সূত্রে ৩২১০০০ অক্ষরের কথা লিখেছেন; হাজ্জাজের উদ্যোগে গণনার আরেক বর্ণনায় ৩৪০৭৪০ অক্ষর এসেছে। একই অধ্যায়ে আবার ৭৭৪৩৯ শব্দ ও ৩২৩০১৫ অক্ষরের হিসাবও উদ্ধৃত হয়েছে। গণনাকারী, লিখিত বানান, উচ্চারিত অক্ষর এবং শব্দ আলাদা করার মাপকাঠি বদলালে এই হিসাবের ফলও বদলায়। শব্দগণনার কারণ সম্পর্কে তাঁর সরাসরি বক্তব্য: [711]

وسبب الاختلاف في الكلمة أن الكلمة لها حقيقة ومجاز ، ولفظ ورسم ، واعتبار كل منها جائز ، وكل من العلماء اعتبر أحد الجوائز .

বাংলা অনুবাদ: শব্দের ক্ষেত্রে মতভেদের কারণ হলো, শব্দের প্রকৃত ও রূপক ব্যবহার আছে, উচ্চারিত রূপ ও লিখিত রূপ আছে; এগুলোর প্রত্যেকটিকে বিবেচনা করা সম্ভব। প্রত্যেক আলেম সম্ভাব্য বিবেচনাগুলোর কোনো একটিকে গ্রহণ করেছেন।

হিসাবের বিষয়ইবনে কাসীরের বাংলা উদ্ধৃতিতেআল-বুরহানে উদ্ধৃত অন্য হিসাব
শব্দ৭৭৪৩৯আতা ইবন ইয়াসারের সূত্রে ৭৭৪৩৭; অন্য গণনার বর্ণনায় ৭৭৪৩৯
অক্ষর৩২১১৮০ এবং ৩২৩০১৫মুজাহিদের সূত্রে ৩২১০০০; অন্য বিবরণে ৩২৩০১৫ ও ৩৪০৭৪০
একক নির্ধারণআয়াত, শব্দ ও অক্ষর আলাদা হিসাবউচ্চারণ, লিখিত রূপ ও শব্দের সংজ্ঞা অনুযায়ী গণনার ভিত্তি পৃথক

প্রচলিত মুসহাফের আয়াতসংখ্যা তাই একটি নির্দিষ্ট গণনাপরম্পরার ফল। সংখ্যাটির বহুল ব্যবহার তার ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের অস্তিত্ব বিলোপ করে না। একই সঙ্গে আয়াতের সীমা নির্ধারণ, শব্দের লিখিত রূপ এবং কোনো রচনাকে কোরআনের অন্তর্ভুক্ত করা—এই সিদ্ধান্তগুলোর প্রমাণও ভিন্ন। প্রথমটির দলিল আঞ্চলিক গণনা, দ্বিতীয়টির দলিল বানান ও অক্ষরসংক্রান্ত হিসাব, তৃতীয়টির দলিল মুসহাফে কোনো সূরা গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের বর্ণনা। কোরআনের গৃহীত রূপ গঠনের ইতিহাসে এই প্রতিটি স্তরেই মানুষের সংজ্ঞা ও নির্বাচন কাজ করেছে।


১১২, ১১৪ ও ১১৬ সূরার বর্ণনা; ইবনে মাসউদের মুসহাফে নাস–ফালাকের অবস্থান

কোনো বাক্যকে দুটি আয়াতে ভাগ করা এবং দুটি সম্পূর্ণ রচনাকে কোরআনের অংশ হিসেবে গ্রহণ না করা সম্পূর্ণ ভিন্ন সিদ্ধান্ত। ইবনে মাসউদের মুসহাফ সম্পর্কে বর্ণনাগুলো দ্বিতীয় প্রশ্নটিকে সামনে আনে। সেখানে বিরোধটি সূরা ফালাক ও সূরা নাসের আয়াতের নম্বর নিয়ে নয়; ওই দুটি রচনা আদৌ কোরআনের অন্তর্ভুক্ত কি না, তা নিয়ে। সুয়ূতি এক জায়গায় ইবনে মাসউদের মুসহাফে ১১২ সূরা এবং উবাইয়ের মুসহাফে ১১৬ সূরার উল্লেখ করেছেন। উসমানি মুসহাফে গৃহীত ১১৪-এর পাশাপাশি এই সংখ্যাগুলোর অস্তিত্ব একটি পূর্ববর্তী নির্বাচনের ইতিহাস প্রকাশ করে। [712]

وَفِي مُصْحَفِ ابْنِ مَسْعُودٍ مِائَةٌ وَاثْنَتَا عَشْرَةَ سُورَةٍ لِأَنَّهُ لَمْ يَكْتُبِ الْمُعَوِّذَتَيْنِ وَفِي مُصْحَفِ أُبَيٍّ سِتَّ عَشْرَةَ لِأَنَّهُ كَتَبَ فِي آخِرِهِ سُورَتَيِ الْحَفْدِ وَالْخُلْعِ.

বাংলা অনুবাদ: ইবনে মাসউদের মুসহাফে একশ বারোটি সূরা ছিল; কারণ তিনি মুয়াওয়িযাতাইন লেখেননি। উবাইয়ের মুসহাফে [একশ] ষোলোটি ছিল; কারণ তিনি তার শেষে হাফদ ও খাল্‌আ নামে দুটি সূরা লিখেছিলেন।

উৎসে উল্লিখিত সংখ্যাকোন মুসহাফ বা মতের সঙ্গে সম্পর্কিতপার্থক্যের নির্দিষ্ট বিষয়
১১২সুয়ূতির বর্ণনায় ইবনে মাসউদের মুসহাফফালাক ও নাস লেখা হয়নি
১১৪উসমানি মুসহাফের গৃহীত সূরাতালিকাফাতিহা, ফালাক ও নাস অন্তর্ভুক্ত; হাফদ ও খাল্‌আ অন্তর্ভুক্ত নয়
১১৬সুয়ূতির বর্ণনায় উবাইয়ের মুসহাফশেষে হাফদ ও খাল্‌আ নামে অতিরিক্ত দুটি রচনা
১১৩আনফাল ও বারাআতকে এক সূরা গণনার মতউপরের অন্তর্ভুক্তি-বিরোধ থেকে আলাদা; দুটি পরিচিত অংশের মধ্যবর্তী সীমানা নিয়ে প্রশ্ন

“উবাইয়ের মুসহাফে ১১৬” বক্তব্যটি তাঁর নামে সংরক্ষিত একটি প্রাচীন মুসহাফ-বর্ণনা; সুয়ূতির কাছে উবাইয়ের নিজের হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি উপস্থিত থাকার দাবি নয়। বর্ণনাটির তাৎপর্য হলো, পরবর্তী ইসলামী সংকলনকারীরা একটি অতিরিক্ত রচনাযুক্ত মুসহাফের স্মৃতি সংরক্ষণ করেছেন। হাফদ ও খাল্‌আর পাঠকে পরবর্তী মুসহাফে কোরআনের সূরা হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। সেই বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং ফালাক–নাস গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত মিলিয়েই ১১৪ সূরার গৃহীত সীমানাটি দাঁড়িয়েছে। কোনো রচনা মুসহাফে লেখা ছিল বলেই প্রত্যেক লেখক সেটিকে একই মর্যাদা দিয়েছেন—এমন তথ্য এই সংক্ষিপ্ত সংখ্যাবিবরণে নেই; ইবনে মাসউদের ক্ষেত্রে তার চেয়ে স্পষ্ট ভাষার আলাদা বর্ণনা রয়েছে।

বুখারির বর্ণনায় যির ইবন হুবাইশ উবাইকে ইবনে মাসউদের বক্তব্যের কথা জিজ্ঞেস করেন। সেখানে আপত্তির বিষয়টি “এমন এমন কথা” বলে অনির্দিষ্ট রাখা হয়েছে। উবাই নিজের গ্রহণযোগ্য পাঠের ভিত্তি হিসেবে মুহাম্মদের বক্তব্য উল্লেখ করেন। হাদিসের মূল কথোপকথনটি হলো: [713]

سَأَلْتُ أُبَىَّ بْنَ كَعْبٍ قُلْتُ يَا أَبَا الْمُنْذِرِ إِنَّ أَخَاكَ ابْنَ مَسْعُودٍ يَقُولُ كَذَا وَكَذَا‏.‏ فَقَالَ أُبَىٌّ سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ لِي قِيلَ لِي‏.‏ فَقُلْتُ، قَالَ فَنَحْنُ نَقُولُ كَمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আমি উবাই ইবন কা’বকে জিজ্ঞেস করলাম। বললাম, “হে আবুল মুনযির, আপনার ভাই ইবনে মাসউদ এমন এমন কথা বলেন।” উবাই বললেন, “আমি আল্লাহর রাসুলকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছেন, ‘আমাকে বলা হয়েছে, তাই আমি বলেছি।’” উবাই বললেন, “অতএব আল্লাহর রাসুল যেমন বলেছেন, আমরাও তেমনই বলি।”

বুখারির এই সংক্ষিপ্ত ভাষার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইবনে হাজর অন্যান্য বর্ণনার স্পষ্ট বক্তব্য এনেছেন। তাঁর উদ্ধৃতিতে ইবনে মাসউদ শুধু নিজের মুসহাফে সূরা দুটি না-লিখে থামেননি; মুসহাফ থেকে সেগুলো ঘষে মুছে দিতেন এবং বলতেন, এগুলো আল্লাহর কিতাবের অন্তর্ভুক্ত নয়। “লেখেননি” কথার সঙ্গে “কোরআনের অংশ নয় বলেছেন” কথার ঐতিহাসিক ও যুক্তিগত ব্যবধান বড়। প্রথমটি কপির অসম্পূর্ণতার সঙ্গে মিলতে পারে; দ্বিতীয়টি গ্রন্থের অন্তর্ভুক্তির প্রকাশ্য প্রত্যাখ্যান। ফাতহুল বারিতে সংশ্লিষ্ট বর্ণনাটি রয়েছে: [714]

وأخرج أحمد عن أبي بكر بن عياش عن عاصم بلفظ ” إن عبد الله يقول في المعوذتين ” وهذا أيضا فيه إبهام ، وقد أخرجه عبد الله بن أحمد في زيادات المسند والطبراني وابن مردويه من طريق الأعمش عن أبي إسحاق عن عبد الرحمن بن يزيد النخعي قال : ” كان عبد الله بن مسعود يحك المعوذتين من مصاحفه ويقول إنهما ليستا من كتاب الله .

বাংলা অনুবাদ: আহমদ আবু বকর ইবন আইয়াশের মাধ্যমে আসিম থেকে বর্ণনা করেছেন: “আবদুল্লাহ মুয়াওয়িযাতাইন সম্পর্কে বলেন”—এখানেও বক্তব্য অনির্দিষ্ট। আবদুল্লাহ ইবন আহমদ তাঁর মুসনাদের সংযোজনে, তাবারানি ও ইবন মারদুইয়া আ’মাশ, আবু ইসহাক ও আবদুর রহমান ইবন ইয়াযিদ আন-নাখাঈর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: “আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ নিজের মুসহাফগুলো থেকে মুয়াওয়িযাতাইন ঘষে মুছে দিতেন এবং বলতেন, এগুলো আল্লাহর কিতাবের অন্তর্ভুক্ত নয়।”

ইবনে হাজর “এমন এমন কথা” দিয়ে বক্তব্য আড়াল করার সম্ভাবনাও আলোচনা করেছেন। প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল সংক্ষেপটি বুখারির; পরে সুফিয়ানের অন্য বর্ণনা মিলিয়ে তিনি দেখেন, সুফিয়ান কখনো বক্তব্য স্পষ্ট করে বলেছেন, কখনো অনির্দিষ্ট রেখেছেন। ফলে অনির্দিষ্ট ভাষাটি শুধু বুখারির একক সম্পাদনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রতিষ্ঠিত হয় যে, একই ঘটনার স্পষ্ট ও অস্পষ্ট ভাষার পৃথক সঞ্চালন ছিল এবং ব্যাখ্যাকারীর কাছে স্পষ্ট ভাষার বর্ণনাও পৌঁছেছিল। তাই শুধু বুখারির “এমন এমন” ধরে বিরোধের বিষয়বস্তু অনির্ণেয় বলে শেষ করে দিলে ফাতহুল বারিতে উদ্ধৃত বাকি তথ্য চাপা পড়ে।

নববী, ইবন হাযম ও ফখরুদ্দিন রাযীর মতো লেখক ইবনে মাসউদের নামে এই বক্তব্যকে অস্বীকার করেছেন। ইবনে হাজর সেই অস্বীকারকে প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ করেননি। তিনি বর্ণনাকে সহিহ বলেছেন এবং সর্বযুগে সর্বসম্মতির দাবি আর পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠিত ঐকমত্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করেছেন। তাঁর ভাষা: [715]

والطعن في الروايات الصحيحة بغير مستند لا يقبل ، بل الرواية صحيحة والتأويل محتمل ، والإجماع الذي نقله إن أراد شموله لكل عصر فهو مخدوش ، وإن أراد استقراره فهو مقبول .

বাংলা অনুবাদ: প্রমাণ ছাড়া সহিহ বর্ণনাগুলোর বিরুদ্ধে আপত্তি গ্রহণযোগ্য নয়। বরং বর্ণনাটি সহিহ এবং ব্যাখ্যার সম্ভাবনা রয়েছে। আর তিনি যে ঐকমত্যের কথা বলেছেন, তার দ্বারা যদি প্রত্যেক যুগকে অন্তর্ভুক্ত করা বোঝান, তাহলে তা প্রশ্নবিদ্ধ; আর যদি পরবর্তী সময়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া বোঝান, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য।

মওদূদীও তাঁর তাফসীরে এই বর্ণনাগুলো অস্বীকার করার পদ্ধতি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বাকিল্লানী ও ইয়াযের ব্যাখ্যা—ইবনে মাসউদ সূরা দুটির কোরআনি মর্যাদা অস্বীকার করেননি, শুধু লিখতে অস্বীকার করেছেন—সঠিক মনে করেননি। তাঁর নিজের ধর্মরক্ষামূলক উদ্দেশ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি বর্ণনার স্পষ্ট বক্তব্যটি মেনে নিয়েছেন। তাফহীমুল কোরআনের সংশ্লিষ্ট আলোচনা সম্পূর্ণরূপে হলো: [716]

এ সূরা দু’টি কুরআনের অংশ কিনা
এ সূরা দু’টির বিষয়বস্তুও মূল বক্তব্য অনুধাবন করার জন্য ওপরের আলোচনাটুকুই যথেষ্ট। তবুও হাদীস ও তাফসীর গ্রন্থগুলোয় এদের সম্পর্কে এমন তিনটি বিষয়ের আলোচনা এসেছে যা মনে সংশয় ও সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে, তাই আমরা সে ব্যাপারটিও পরিষ্কার করে দিতে চাই। এর মধ্যে সর্বপ্রথম যে বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায় সেটি হচ্ছে, এ সূরা দু’টির কুরআনের অংশ হবার ব্যাপারটি কি চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অথবা এর মধ্যে কোন প্রকার সংশয়ের অবকাশ আছে? এ প্রশ্ন দেখা দেবার কারণ হচ্ছে এই যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের মতো উন্নত মর্যাদা সম্পন্ন সাহাবী থেকে বিভিন্ন রেওয়ায়াতে একথা উদ্ধৃত হয়েছে যে, তিনি এ সূরা দু’টিকে কুরআনের সূরা বলে মানতেন না এবং নিজের পাণ্ডুলিপিতে তিনি এ দু’টি সূরা সংযোজিত করেননি। ইমাম আহমাদ, বাযযার, তাবারানী, ইবনে মারদুইয়া, আবু ইয়ালা, আবদুল্লাহ ইবনে আহমাদ ইবনে হাম্বল, হুমাইদী, আবু নু’আইম, ইবনে হিবান প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ বিভিন্ন সূত্রে এবং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে সহীহ সনদের মাধ্যমে একথা হযরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে উদ্ধৃত করেছেন। এ হাদীসগুলোতে কেবল একথাই বলা হয়নি যে, তিনি এই সূরা দু’টিকে কুরআনের পাণ্ডুলিপি থেকে বাদ দিতেন বরং এই সাথে একথাও বলা হয়েছে যে, তিনি বলতেনঃ “কুরআনের সাথে এমন জিনিস মিশিয়ে ফেলো না যা কুরআনের অংশ নয়। এ সূরা দু’টি কুরআনের অন্তর্ভুক্ত নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এর মাধ্যমে একটি হুকুম দেয়া হয়েছিল। তাঁকে বলা হয়েছিল, এ শব্দগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও।” কোন কোন রেওয়ায়াতে আরো বাড়তি বলা হয়েছে যে, তিনি নামাযে এ সূরা দু’টি পড়তেন না।
এ রেওয়ায়াতগুলোর কারণে ইসলাম বিরোধীরা কুরআনের বিরুদ্ধে সন্দেহ সৃষ্টির এবং (নাউযুবিল্লাহ) কুরআন যে বিকৃতিমুক্ত নয় একথা বলার সুযোগ পেয়ে গেছে। বরং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের (রা) মতো বড় সাহাবী যখন এই মত পোষণ করছেন যে, কুরআনের এ দু’টি সূরা বাইর থেকে তাতে সংযোজিত হয়েছে তখন না জানি তার মধ্যে আরো কত কি পরিবর্তন-পরিবর্ধন করা হয়েছে। এ ধরনের সংশয় ও সন্দেহ সৃষ্টির সুযোগ তারা সহজেই পেয়ে গেছে। কুরআনকে এ ধরনের দোষারোপ মুক্ত করার জন্য কাযী আবু বকর বাকেল্লানী ও কাযী ইয়ায ইবনে মাসউদের বক্তব্যের একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তারা বলেছেন, ইবনে মাসউদ সূরা ফালাক ও সূরা নাসের কুরআনের অংশ হবার ব্যাপারটি অস্বীকার করতেন না বরং তিনি শুধু এ সূরা দু’টিকে কুরআনের পাতায় লিখে রাখতে অস্বীকার করতেন। কারণ তাঁর মতে কুরআনের পাতায় শুধুমাত্র তাই লিখে রাখা উচিত যা লিখার অনুমতি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের এ জবাব ও ব্যাখ্যা সঠিক নয়। কারণ ইবনে মাসউদ (রা) এ সূরা দু’টির কুরআনের সূরা হওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন, একথা নির্ভরযোগ্য সনদের মাধ্যমে প্রমাণিত। ইমাম নববী, ইমাম ইবনে হাযম, ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী প্রমুখ অন্য কতিপয় মনীষী ইবনে মাসউদ যে এ ধরনের কোন কথা বলেছেন, একথাটিকেই সরাসরি মিথ্যা ও বাতিল গণ্য করেছেন। কিন্তু নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সত্যকে সনদ ছাড়াই রদ করে দেয়া কোন সুস্থ জ্ঞানসম্মত পদ্ধতি নয়।

এখানে পরবর্তী ঐকমত্যকে আগের সর্বসম্মতির বিকল্প বানানো যায় না। উসমানি সূরাতালিকা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ফালাক ও নাসকে কোরআনের অংশ হিসেবে স্বীকার করা সামাজিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব পেয়েছে। ইবনে মাসউদের নামে সংরক্ষিত অবস্থান সেই প্রতিষ্ঠার আগের বা তার সমান্তরাল বিরোধের সাক্ষ্য বহন করে। তাঁর আপত্তিকে ভুল বলা একটি পরবর্তী ধর্মীয় মূল্যায়ন; তিনি আপত্তি করেছিলেন কি না, সেটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন। একটি মূল্যায়ন দিয়ে অন্য প্রশ্নের নথি মুছে ফেলা যুক্তিগতভাবে অসঙ্গত।

ইবনে মাসউদের মুসহাফ নিয়ে সুয়ূতির পরবর্তী বাক্যে ইবন সিরিনের সূত্রে আরেকটি বর্ণনাও আছে। সেখানে ফাতিহা, মুয়াওয়িযাতাইন ও দুটি দোয়ার মধ্যে উবাই কী লিখেছিলেন, ইবনে মাসউদ কী বাদ দিয়েছিলেন এবং উসমান কোনগুলো লিখেছিলেন, তা তুলনা করা হয়েছে। এই বর্ণনাকে ১১২ সংখ্যার বাক্যের সঙ্গে যান্ত্রিকভাবে যোগ করলে সমস্যা হয়: ১১৪ থেকে তিনটি সূরা বাদ দিলে ১১২ হয় না। সুয়ূতি এখানে একই ধরনের তথ্যের একাধিক বর্ণনা সংকলন করেছেন; প্রতিটি বর্ণনার মুসহাফ-বিবরণ অভিন্ন নয়। তাঁর উদ্ধৃত কথাগুলো: [717]

أَخْرَجَ أَبُو عُبَيْدٍ عَنِ ابْنِ سِيرِينَ قَالَ كَتَبَ أُبَيُّ بْنُ كَعْبٍ فِي مُصْحَفِهِ فَاتِحَةَ الْكِتَابِ وَالْمُعَوِّذَتَيْنِ وَاللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ وَاللَّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَتَرَكَهُنَّ ابْنُ مَسْعُودٍ وَكَتَبَ عُثْمَانُ مِنْهُنَّ فَاتِحَةَ الْكِتَابِ وَالْمُعَوِّذَتَيْنِ.

বাংলা অনুবাদ: আবু উবাইদ ইবন সিরিন থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: উবাই ইবন কা’ব তাঁর মুসহাফে ফাতিহাতুল কিতাব, মুয়াওয়িযাতাইন, “আল্লাহুম্মা ইন্না নাস্তাঈনুকা” এবং “আল্লাহুম্মা ইয়্যাকা না’বুদু” লিখেছিলেন; ইবনে মাসউদ এগুলো বাদ দিয়েছিলেন; আর উসমান এগুলোর মধ্যে ফাতিহাতুল কিতাব ও মুয়াওয়িযাতাইন লিখেছিলেন।

গৃহীত মুসহাফের তালিকা তাই গ্রন্থটির সীমানা সম্পর্কে সব প্রাথমিক বর্ণনাকে একসঙ্গে ধরে রাখেনি। কিছু রচনা গৃহীত হয়েছে, কিছু হয়নি; একই রচনার অন্তর্ভুক্তি সম্পর্কে ভিন্ন অবস্থানও পরবর্তী গ্রন্থে থেকে গেছে। ১১৪-এর বর্তমান প্রাধান্য একটি ঐতিহাসিক ফল। সেই ফলের অস্তিত্বকে ব্যবহার করে ১১২ ও ১১৬-এর বর্ণনা, কিংবা ফালাক–নাস প্রত্যাখ্যানের স্পষ্ট ভাষা, অনুপস্থিত বলে দেখানো যায় না। গ্রন্থের ভেতর ও বাইরের সীমারেখা নির্ধারণে মানুষের গ্রহণ-বর্জন এখানে সরাসরি নথিবদ্ধ।


বর্তমান সূরাক্রম, অবতরণক্রম এবং বিন্যাস নির্ধারণের কর্তৃত্ব

বর্তমান মুসহাফের সূচিপত্র কোরআনের অবতরণের কালপঞ্জি নয়। ফাতিহার পরে বাকারা, তারপর আলে ইমরান ও নিসা রাখা হয়েছে; দীর্ঘ মাদানি সূরার পরে বহু মক্কি সূরা এসেছে। এই বিন্যাসে পড়লে ধর্মীয় বক্তব্যগুলোর কালানুক্রমিক বিকাশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দৃশ্যমান হয় না। কোন বক্তব্য আগে এসেছে, কোন বিধান পরে বদলেছে, কোন সংঘাতের পর কোন নির্দেশ যুক্ত হয়েছে—এসব জানার জন্য সূচিপত্রের বাইরে অবতরণসংক্রান্ত বর্ণনা, সীরাত ও নাসিখ–মানসুখের আলোচনা প্রয়োজন হয়। একটি গৃহীত পাঠক্রম এবং একটি ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম ভিন্ন উদ্দেশ্যে কাজ করে।

আয়েশার কাছে আসা এক ইরাকি ব্যক্তি তাঁর মুসহাফের ক্রম অনুসারে নিজের কোরআন সাজাতে চেয়েছিলেন। আয়েশা প্রথমে প্রশ্ন করেন, কোনটি আগে পড়া হলো তাতে তাঁর কী ক্ষতি। এরপর তিনি অবতরণের ধারায় পরিবর্তিত ধর্মীয় বক্তব্যের কথা বলেন: শুরুতে জান্নাত–জাহান্নামের বিবরণ, পরে হালাল–হারাম; প্রথমেই মদ ও যৌনাচারের নিষেধ এলে মানুষ তা অস্বীকার করত। শেষে তিনি নিজের মুসহাফ বের করে সূরাগুলোর আয়াত বলে দেন। বুখারির সম্পূর্ণ কথোপকথনটি হলো: [718]

إِنِّي عِنْدَ عَائِشَةَ أُمِّ الْمُؤْمِنِينَ ـ رضى الله عنها ـ إِذْ جَاءَهَا عِرَاقِيٌّ فَقَالَ أَىُّ الْكَفَنِ خَيْرٌ قَالَتْ وَيْحَكَ وَمَا يَضُرُّكَ قَالَ يَا أُمَّ الْمُؤْمِنِينَ أَرِينِي مُصْحَفَكِ‏.‏ قَالَتْ لِمَ قَالَ لَعَلِّي أُوَلِّفُ الْقُرْآنَ عَلَيْهِ فَإِنَّهُ يُقْرَأُ غَيْرَ مُؤَلَّفٍ‏.‏ قَالَتْ وَمَا يَضُرُّكَ أَيَّهُ قَرَأْتَ قَبْلُ، إِنَّمَا نَزَلَ أَوَّلَ مَا نَزَلَ مِنْهُ سُورَةٌ مِنَ الْمُفَصَّلِ فِيهَا ذِكْرُ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ حَتَّى إِذَا ثَابَ النَّاسُ إِلَى الإِسْلاَمِ نَزَلَ الْحَلاَلُ وَالْحَرَامُ، وَلَوْ نَزَلَ أَوَّلَ شَىْءٍ لاَ تَشْرَبُوا الْخَمْرَ‏.‏ لَقَالُوا لاَ نَدَعُ الْخَمْرَ أَبَدًا‏.‏ وَلَوْ نَزَلَ‏.‏ لاَ تَزْنُوا‏.‏ لَقَالُوا لاَ نَدَعُ الزِّنَا أَبَدًا‏.‏ لَقَدْ نَزَلَ بِمَكَّةَ عَلَى مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم وَإِنِّي لَجَارِيَةٌ أَلْعَبُ ‏‏{‏بَلِ السَّاعَةُ مَوْعِدُهُمْ وَالسَّاعَةُ أَدْهَى وَأَمَرُّ‏}‏ وَمَا نَزَلَتْ سُورَةُ الْبَقَرَةِ وَالنِّسَاءِ إِلاَّ وَأَنَا عِنْدَهُ‏.‏ قَالَ فَأَخْرَجَتْ لَهُ الْمُصْحَفَ فَأَمْلَتْ عَلَيْهِ آىَ السُّوَرِ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আমি আয়েশা উম্মুল মুমিনিনের কাছে ছিলাম। এক ইরাকি এসে জিজ্ঞেস করল, “কোন কাফন উত্তম?” তিনি বললেন, “তোমার কী হয়েছে! এতে তোমার কী ক্ষতি?” সে বলল, “হে উম্মুল মুমিনিন, আপনার মুসহাফটি আমাকে দেখান।” তিনি বললেন, “কেন?” সে বলল, “আমি হয়তো এর অনুসারে কোরআন সাজিয়ে নিতে পারব; কারণ তা বিন্যাস অনুসরণ না করেই পড়া হয়।” তিনি বললেন, “কোনটি আগে পড়লে তাতে তোমার কী ক্ষতি? প্রথমে যে সূরাগুলো নাজিল হয়েছিল, তার মধ্যে মুফাসসালের একটি সূরা ছিল; তাতে জান্নাত ও জাহান্নামের উল্লেখ ছিল। মানুষ ইসলামের দিকে ফিরে আসার পরে হালাল ও হারামের বিধান নাজিল হয়েছে। প্রথমেই যদি নাজিল হতো, ‘মদ পান করো না’, তারা বলত, ‘আমরা কখনো মদ ছাড়ব না।’ প্রথমেই যদি নাজিল হতো, ‘ব্যভিচার করো না’, তারা বলত, ‘আমরা কখনো ব্যভিচার ছাড়ব না।’ মক্কায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ‘বরং কিয়ামতই তাদের নির্ধারিত সময়; আর কিয়ামত অধিক ভয়ংকর ও অধিক তিক্ত’ নাজিল হয়েছিল; তখন আমি খেলাধুলা করা একটি বালিকা। বাকারা ও নিসা তখনই নাজিল হয়েছে, যখন আমি তাঁর কাছে ছিলাম।” বর্ণনাকারী বলেন: তারপর তিনি ওই ব্যক্তির জন্য মুসহাফ বের করলেন এবং সূরাগুলোর আয়াত বলে দিলেন।

এই বর্ণনায় কোরআনের বক্তব্য প্রচারের সামাজিক পদ্ধতিও আয়েশা সরাসরি ব্যাখ্যা করেছেন। মানুষের গ্রহণক্ষমতা ও আচরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিধান এসেছে—তিনি সেটিই বলেছেন। আজকের সূচিপত্রে প্রথম দিকেই বাকারা ও নিসার মতো বিধানসমৃদ্ধ সূরা রয়েছে; আয়েশার বর্ণিত প্রথম পর্যায় সেখানে বইয়ের শুরু হিসেবে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে বর্তমান বিন্যাস থেকে অবতরণের ইতিহাস পড়তে গেলে সময়ের ভিন্ন স্তর পাশাপাশি ও আগে-পরে মিশে যায়। সেই বিন্যাসের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পাওয়া এবং সেটি অবতরণক্রমের প্রতিলিপি হওয়া সম্পূর্ণ পৃথক দাবি।

ক্রমের ধরনকিসের ধারাবাহিকতাউৎসে দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য
বর্তমান মুসহাফের সূরাক্রমগ্রন্থে সূরার আগে-পরে অবস্থানফাতিহা, বাকারা, আলে ইমরান, নিসা—এই গৃহীত ধারাবাহিকতা
অবতরণক্রমবক্তব্য বা সূরা নাজিল হওয়ার সময়আয়েশার বিবরণে প্রাথমিক আখিরাতের বক্তব্যের পরে বিধান; একই সূরার অংশও পৃথক সময়ে নাজিল হতে পারে
নির্দিষ্ট নামাজের পাঠক্রমএকটি পাঠের ঘটনায় কোন সূরা আগে পড়া হয়েছেহুযাইফার বর্ণনায় বাকারা, নিসা, তারপর আলে ইমরান
একটি সূরার ভেতরে আয়াতক্রমএকই সূরায় বাক্যগুলোর স্থানউসমানের বর্ণনায় লেখকদের নির্দিষ্ট সূরায় আয়াত রাখার নির্দেশ

হুযাইফার বর্ণনায় মুহাম্মদ এক রাতে বাকারা পড়ার পরে নিসা, তারপর আলে ইমরান পড়েন। বর্তমান মুসহাফে আলে ইমরান নিসার আগে। মুসলিমে সংরক্ষিত পাঠের ঘটনাটি তাই আজকের সূচিপত্রের একই ধারায় চলে না। বর্ণনাটিতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে পড়া, আয়াতের অর্থ অনুযায়ী প্রার্থনা করা এবং দীর্ঘ রুকু–সিজদার বিবরণও রয়েছে। তার পূর্ণ মূল বক্তব্য: [719]

صَلَّيْتُ مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم ذَاتَ لَيْلَةٍ فَافْتَتَحَ الْبَقَرَةَ فَقُلْتُ يَرْكَعُ عِنْدَ الْمِائَةِ ‏.‏ ثُمَّ مَضَى فَقُلْتُ يُصَلِّي بِهَا فِي رَكْعَةٍ فَمَضَى فَقُلْتُ يَرْكَعُ بِهَا ‏.‏ ثُمَّ افْتَتَحَ النِّسَاءَ فَقَرَأَهَا ثُمَّ افْتَتَحَ آلَ عِمْرَانَ فَقَرَأَهَا يَقْرَأُ مُتَرَسِّلاً إِذَا مَرَّ بِآيَةٍ فِيهَا تَسْبِيحٌ سَبَّحَ وَإِذَا مَرَّ بِسُؤَالٍ سَأَلَ وَإِذَا مَرَّ بِتَعَوُّذٍ تَعَوَّذَ ثُمَّ رَكَعَ فَجَعَلَ يَقُولُ ‏”‏ سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ ‏”‏ ‏.‏ فَكَانَ رُكُوعُهُ نَحْوًا مِنْ قِيَامِهِ ثُمَّ قَالَ ‏”‏ سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ ‏”‏ ‏.‏ ثُمَّ قَامَ طَوِيلاً قَرِيبًا مِمَّا رَكَعَ ثُمَّ سَجَدَ فَقَالَ ‏”‏ سُبْحَانَ رَبِّيَ الأَعْلَى ‏”‏ ‏.‏ فَكَانَ سُجُودُهُ قَرِيبًا مِنْ قِيَامِهِ ‏.‏ قَالَ وَفِي حَدِيثِ جَرِيرٍ مِنَ الزِّيَادَةِ فَقَالَ ‏”‏ سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ”‏ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আমি এক রাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে নামাজ পড়লাম। তিনি বাকারা শুরু করলেন। আমি ভাবলাম, একশ আয়াতে রুকু করবেন। তিনি পড়তে থাকলেন। আমি ভাবলাম, পুরো সূরা দিয়ে একটি রাকাত পড়বেন। তিনি এগিয়ে চললেন; আমি ভাবলাম, এটি শেষ করে রুকু করবেন। তারপর তিনি নিসা শুরু করে তা পড়লেন; তারপর আলে ইমরান শুরু করে তা পড়লেন। তিনি ধীরে স্পষ্টভাবে পড়ছিলেন। তাসবিহের আয়াত এলে তাসবিহ করতেন, প্রার্থনার বিষয় এলে চাইতেন এবং আশ্রয় চাওয়ার বিষয় এলে আশ্রয় চাইতেন। তারপর রুকু করে বলতে লাগলেন, “আমার মহান রব পবিত্র।” তাঁর রুকু প্রায় তাঁর দাঁড়ানোর সমান ছিল। তারপর বললেন, “যে আল্লাহর প্রশংসা করে, আল্লাহ তার কথা শোনেন।” তারপর দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলেন, প্রায় রুকুর সমান। এরপর সিজদা করে বললেন, “আমার সর্বোচ্চ রব পবিত্র।” তাঁর সিজদাও প্রায় তাঁর দাঁড়ানোর সমান ছিল। জারিরের বর্ণনায় অতিরিক্ত রয়েছে: তিনি বললেন, “যে আল্লাহর প্রশংসা করে, আল্লাহ তার কথা শোনেন। হে আমাদের রব, সকল প্রশংসা তোমার।”

এই হাদিসে একটি নামাজের পাঠক্রম পাওয়া যায়। মুসহাফের সব সূরার স্থায়ী অবস্থান নির্ধারণের ঘোষণা এতে নেই। এর প্রত্যক্ষ তথ্য হলো, মুহাম্মদের বর্ণিত পাঠে নিসা আলে ইমরানের আগে এসেছে। সূরার মধ্যে পাঠের আগে-পরে চলাচল এবং সূরার ভেতরের আয়াত উল্টে পড়া এক ধরনের কাজ নয়। পরবর্তী ফিকহে এ দুটিকে আলাদা করা হয়েছে। গ্রন্থের সূচিপত্রের কর্তৃত্ব নামাজের প্রতিটি ঘটনায় একই ক্রমে প্রয়োগ করা হয়েছে—এমন ধারণার সঙ্গে এই পাঠবিবরণ মেলে না।

সূরার ক্রম নির্ধারণের কর্তৃত্ব নিয়েও প্রাচীন আলেমদের একক মত ছিল না। সুয়ূতি কাজী আবু বকর বাকিল্লানীর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন: মুহাম্মদ নিজে সূরাগুলো সাজিয়েছেন—এমন সম্ভাবনার পাশাপাশি পরবর্তী উম্মতের ওপর কাজটি ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনাও আছে; দ্বিতীয় সম্ভাবনাকেই তিনি অধিক নিকটবর্তী বলেছেন। বর্তমান সূচিপত্রের কর্তৃত্বের প্রশ্নে এই মত সরাসরি মানুষের পরবর্তী সিদ্ধান্তকে স্থান দেয়। [720]

وَأَنَّهُ يُمْكِنُ أَنْ يَكُونَ الرَّسُولُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدْ رَتَّبَ سُوَرَهُ وَأَنْ يَكُونَ قَدْ وَكَلَ ذَلِكَ إِلَى الْأُمَّةِ بَعْدَهُ وَلَمْ يَتَوَلَّ ذَلِكَ بِنَفْسِهِ قَالَ: وَهَذَا الثَّانِي أَقْرَبُ.

বাংলা অনুবাদ: এমন হতে পারে যে রাসুল এর সূরাগুলো বিন্যস্ত করেছেন; আবার এমনও হতে পারে যে তাঁর পরের উম্মতের ওপর তা ছেড়ে দিয়েছেন, নিজে কাজটি করেননি। তিনি বলেন: এই দ্বিতীয় সম্ভাবনাই বেশি নিকটবর্তী।

বাকিল্লানীর এই বক্তব্যে “আয়াতের বিন্যাস” এবং “সূরার বিন্যাস” এক করে দেওয়া হয়নি। একই আলোচনায় তিনি আয়াতের নির্ধারিত অবস্থানের ওপর জোর দেন, তারপর সূরাক্রমের কাজটি পরবর্তী সমাজের ওপর ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা গ্রহণ করেন। ফলে আয়াত স্থাপনের কোনো বর্ণনা থেকে সমস্ত সূরার বর্তমান ক্রমও একইভাবে চূড়ান্ত হয়েছিল বলে সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে না। একটি সূরার ভেতরের নির্দেশ আর ১১৪ সূরার সম্পূর্ণ সূচিপত্র প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশের পরিসর পৃথক।

সুয়ূতি একই স্থানে বাগাভীর ভিন্ন অবস্থানও সংকলন করেছেন। বাগাভী সাহাবিদের কাজকে পূর্বনির্ধারিত পাঠ একত্র করার কাজ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। বাকিল্লানীর পছন্দের ব্যাখ্যায় সূরাক্রম নির্ধারণের কাজ পরবর্তী সমাজের হাতে থাকে; বাগাভীর ব্যাখ্যায় সংকলক আগে নির্ধারিত ক্রম অনুসরণ করেন। দুটি ব্যাখ্যায় কর্তৃত্বের অবস্থান পৃথক। উসমানের নিজের নামে বর্ণিত আনফাল–তাওবার ব্যাখ্যায় নির্দিষ্ট দুটি সূরা পাশাপাশি রাখার কারণ হিসেবে তাঁর নিজের অনুমানের কথা এসেছে।

সূরার বর্তমান ক্রম ও সেই ক্রম নির্ধারণের প্রশ্নে আবু বকর যাকারিয়ার আলোচনার ভিডিও:

গ্রন্থের গৃহীত বিন্যাস তার পাঠককে একটি নির্দিষ্ট ধারায় প্রবেশ করায়। সেই ধারায় দীর্ঘ বিধানমূলক সূরা সামনে আসে, বহু প্রাথমিক মক্কি বক্তব্য পরে থাকে এবং বাস্তব অবতরণের সময়ক্রম বইয়ের ক্রমের সঙ্গে মিলে যায় না। বিন্যাসের এই ক্ষমতা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও কাজ করে: পাশাপাশি রাখা বক্তব্যের মধ্যে সম্পর্ক খোঁজা হয়, আগের সূরা থেকে পরের সূরায় বিষয়গত সেতু নির্মিত হয়। অথচ ক্রম নির্ধারণের কর্তৃত্বই যখন আলেমদের মধ্যে বিতর্কিত, তখন সেই ক্রম থেকে নির্মিত প্রতিটি সম্পর্ককেও অবতরণের সরাসরি পরিকল্পনা বলা যায় না। গৃহীত সূচিপত্র একটি কার্যকর ধর্মীয় বিন্যাস; তার সর্বাংশকে একটিমাত্র অবিতর্কিত প্রাথমিক নির্দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি সূত্রগুলো প্রতিষ্ঠা করে না।


সূরার নাম, একই সূরার একাধিক নাম, মক্কি–মাদানি পরিচয় ও পরবর্তী বিভাগ

মুসহাফে সূরার উপরে লেখা নাম, মক্কি–মাদানি পরিচয় ও আয়াতসংখ্যা পাঠকে চেনার একটি কাঠামো তৈরি করে। এসব পরিচয়ের উৎসও এক ধরনের নয়। কোনো নাম হাদিসে মুহাম্মদের ব্যবহারে পাওয়া যায়, কোনোটি সাহাবি বা পরবর্তী আলেমের ভাষায় এসেছে, কোনোটি সূরার প্রথম শব্দ বা বিষয় থেকে গঠিত হয়েছে। একটি সূরার একাধিক নাম থাকার ফলে নির্দিষ্ট একটি মুদ্রিত শিরোনামকে সেই সূরার একমাত্র আদি পরিচয় হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। ফাতিহা এই নামবৈচিত্র্যের সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি।

আবু দাউদের বর্ণনায় একই সূরাকে উম্মুল কোরআন, উম্মুল কিতাব ও সাবউল মাসানি বলা হয়েছে। নামের বহুত্ব এখানে পরবর্তী অভিধানের উদ্ভাবনমাত্র নয়; হাদিসের ভাষাতেই একাধিক পরিচয় পাশাপাশি রয়েছে। [721]

الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ أُمُّ الْقُرْآنِ وَأُمُّ الْكِتَابِ وَالسَّبْعُ الْمَثَانِي

বাংলা অনুবাদ: “আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামিন” হলো উম্মুল কোরআন, উম্মুল কিতাব এবং পুনরাবৃত্ত সাত আয়াত।

ফাতিহার নামগুলো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাযী “আল-ওয়াফিয়া” নামের ব্যবহার সুফিয়ান ইবন উয়াইনার নামে উল্লেখ করেছেন। কুরতুবিও এই নামের ব্যাখ্যায় সূরাটিকে দুই রাকাতে অর্ধেক করে ভাগ না করার ফিকহি যুক্তি এনেছেন। অর্থাৎ নামটির ব্যবহার ও ব্যাখ্যার মধ্যে একজন পরবর্তী আলেম এবং একটি নামাজসংক্রান্ত বিধানের সম্পর্ক নথিবদ্ধ আছে। রাযীর কথাগুলো: [722]

الاسم الخامس : الوافية ، كان سفيان بن عيينة يسميها بهذا الاسم ، قال الثعلبي : وتفسيرها أنها لا تقبل التنصيف ، ألا ترى أن كل سورة من القرآن لو قرئ نصفها في ركعة والنصف الثاني في ركعة أخرى لجاز ، وهذا التنصيف غير جائز في هذه السورة .

বাংলা অনুবাদ: পঞ্চম নাম: আল-ওয়াফিয়া। সুফিয়ান ইবন উয়াইনা একে এই নামে ডাকতেন। সা’লাবী বলেন: এর ব্যাখ্যা হলো, এটিকে দুই ভাগ করা যায় না। কোরআনের অন্য কোনো সূরার অর্ধেক এক রাকাতে এবং বাকি অর্ধেক অন্য রাকাতে পড়লে তা বৈধ হয়; কিন্তু এই সূরাকে এভাবে দুই ভাগ করা বৈধ নয়।

ফাতিহার নামনামের অর্থ বা ব্যাখ্যাউৎসে ব্যবহারের ধরন
ফাতিহাতুল কিতাবগ্রন্থের সূচনা; মুসহাফে, শিক্ষায় ও নামাজের পাঠে শুরুতে ব্যবহৃতরাযী ও কুরতুবির ব্যাখ্যা; হাদিসেও এই পরিচয় ব্যবহৃত
আস-সাবউল মাসানিপুনরাবৃত্ত সাত আয়াত; নামাজে বারবার পাঠের সঙ্গে সম্পর্কিতআবু দাউদ ১৪৫৭; বুখারি ৪৪৭৪-এর বক্তব্যও কুরতুবি উদ্ধৃত করেছেন
উম্মুল কোরআনকোরআনের মূল; সমগ্র গ্রন্থের উদ্দেশ্যসমূহ এতে আছে—এমন ব্যাখ্যাআবু দাউদের হাদিসে ব্যবহৃত; তাফসীরে অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে
উম্মুল কিতাবকিতাবের মূল বা প্রধান অংশআবু দাউদের হাদিসে ব্যবহৃত; কুরতুবি এই নামের ব্যবহার নিয়েও বিরোধ উল্লেখ করেছেন
আল-কোরআনুল আযিমমহান কোরআনবুখারি ৪৪৭৪-এ ফাতিহা প্রসঙ্গে এই অভিব্যক্তি; কুরতুবির নামের তালিকাতেও রয়েছে
ফাতিহাতুল কোরআনকোরআনের সূচনাফাতিহাতুল কিতাবের সমার্থক পরিচয়; একই সূরার আরেক ভাষাগত নাম
আল-ওয়াফিয়াসম্পূর্ণ; সূরার পূর্ণ পাঠ ও তার ভাগ না করার ব্যাখ্যাসুফিয়ান ইবন উয়াইনার ব্যবহার; রাযী ও কুরতুবির উদ্ধৃতি
আল-কাফিয়াযথেষ্ট; অন্য সূরার বদলে এর পাঠের যথেষ্টতা এবং এর বদলে অন্য পাঠের অযথেষ্টতার ব্যাখ্যাকুরতুবি ইয়াহইয়া ইবন আবি কাসীরের বক্তব্য উল্লেখ করেছেন
আল-আসাসভিত্তি; কোরআনের ভিত্তি ফাতিহাকুরতুবি শা’বীর মাধ্যমে ইবনে আব্বাসের নামে একটি দীর্ঘ বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন
আশ-শাফিয়া বা আশ-শিফাআরোগ্যদাত্রী বা আরোগ্যবিষের আরোগ্য হিসেবে ফাতিহার বর্ণনা রাযী ও কুরতুবি উদ্ধৃত করেছেন; সাপ–বিচ্ছুর বিষের প্রসঙ্গ এই আরোগ্যধারণার সঙ্গে যুক্ত
সূরাতুল হামদপ্রশংসার সূরা; শুরুতে “আলহামদ” শব্দের ব্যবহারশুরুতে ব্যবহৃত শব্দ অনুসারে পরিচয়; রাযী ও কুরতুবির তালিকা
আস-সালাহনামাজ“আমি নামাজকে আমার ও আমার বান্দার মধ্যে ভাগ করেছি”—এই হাদিসে ফাতিহার পাঠকে বোঝানোর ব্যাখ্যা
আর-রুকইয়াঝাড়ফুঁক বা মন্ত্রপাঠফাতিহা দিয়ে ঝাড়ফুঁকের ঘটনায় “কীভাবে জানলে এটি রুকইয়া?”—এই বক্তব্য থেকে নামের ব্যবহার

কুরতুবির নামসংক্রান্ত আলোচনায় “উম্মুল কিতাব” ও “উম্মুল কোরআন” ব্যবহার করা নিয়ে আনাস, হাসান ও ইবন সিরিনের আপত্তিও এসেছে। তাঁর নিজের রায় সেই আপত্তির বিরুদ্ধে; কিন্তু আপত্তির অস্তিত্ব তিনি বাদ দেননি। নামের ব্যবহার নিয়েও প্রাথমিক ব্যক্তিদের অবস্থান এক ছিল না। তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যটি হলো: [723]

( الرابع ) : أم الكتاب ، وفي هذا الاسم خلاف ، جوزه الجمهور ، وكرهه أنس والحسن وابن سيرين . قال الحسن : أم الكتاب الحلال والحرام ، قال الله تعالى : آيات محكمات هن أم الكتاب وأخر متشابهات . وقال أنس وابن سيرين : أم الكتاب اسم اللوح المحفوظ . قال الله تعالى : وإنه في أم الكتاب .

বাংলা অনুবাদ: চতুর্থ: উম্মুল কিতাব। এই নাম নিয়ে মতভেদ আছে। অধিকাংশ ব্যক্তি এর ব্যবহার অনুমোদন করেছেন; আনাস, হাসান ও ইবন সিরিন তা অপছন্দ করেছেন। হাসান বলেছেন, উম্মুল কিতাব হলো হালাল ও হারাম; আল্লাহ বলেছেন, “সুস্পষ্ট আয়াতগুলোই কিতাবের মূল, আর অন্যগুলো সাদৃশ্যপূর্ণ।” আনাস ও ইবন সিরিন বলেছেন, উম্মুল কিতাব লাওহে মাহফুযের নাম; আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয় তা উম্মুল কিতাবে রয়েছে।”

এই নামগুলো একই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়নি। “আর-রুকইয়া”র পেছনে একটি ঝাড়ফুঁকের ঘটনা, “আস-সালাহ”র পেছনে প্রার্থনার একটি হাদিস, “আল-ওয়াফিয়া”র পেছনে সুফিয়ানের ব্যবহার এবং “আল-আসাস”র পেছনে ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত ব্যাখ্যা রয়েছে। কোনো ঘটনায় একটি বিশেষণ ব্যবহার করা এবং সমস্ত সূরার একটি আনুষ্ঠানিক নামতালিকা ঘোষণা করা পৃথক কাজ। রাযী ও কুরতুবির তালিকাগুলোও এক রকম নয়: তাঁরা প্রচলিত নাম সংগ্রহ করেছেন এবং সেগুলোর অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন। বর্তমান মুদ্রিত শিরোনাম সেই বহুস্বরের মধ্যে নির্বাচিত একটি পরিচয় বহন করে।

মক্কি–মাদানি পরিচয়ের ক্ষেত্রেও প্রথমে সংজ্ঞার ভিন্নতা আছে। সুয়ূতি তিনটি পরিভাষাগত রীতি লিখেছেন। সবচেয়ে প্রচলিত রীতিতে হিজরতের আগের অবতরণ মক্কি, পরেরটি মাদানি; স্থান মক্কা হলেও হিজরতের পরে হলে তা মাদানি হতে পারে। অন্য রীতিতে স্থানকে ভিত্তি করা হয়েছে; তৃতীয় রীতিতে কাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, সেটি ভিত্তি। বহুল ব্যবহৃত সংজ্ঞাটি তাঁর ভাষায়: [724]

أَشْهَرُهَا: أَنَّ الْمَكِّيَّ مَا نَزَلَ قَبْلَ الْهِجْرَةِ وَالْمَدَنِيَّ مَا نَزَلَ بَعْدَهَا سَوَاءٌ نَزَلَ بِمَكَّةَ أَمْ بِالْمَدِينَةِ عَامَ الْفَتْحِ أَوْ عَامَ حِجَّةِ الْوَدَاعِ أَمْ بِسَفَرٍ مِنَ الْأَسْفَارِ.

বাংলা অনুবাদ: এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো: হিজরতের আগে যা নাজিল হয়েছে তা মক্কি, আর পরে যা নাজিল হয়েছে তা মাদানি; তা মক্কায়, মদিনায়, বিজয়ের বছরে, বিদায় হজের বছরে অথবা কোনো সফরে নাজিল হয়ে থাকুক।

মক্কি–মাদানি নির্ধারণের রীতিভিত্তিফলে যে পার্থক্য হয়
হিজরতকেন্দ্রিকঅবতরণের সময়হিজরতের পরে মক্কায় নাজিল হওয়া অংশও মাদানি
স্থানকেন্দ্রিকমক্কা বা মদিনায় অবতরণসফরে অন্যত্র নাজিল হওয়া অংশ দুই বিভাগের বাইরেও থাকে
সম্বোধনকেন্দ্রিকমক্কা বা মদিনার অধিবাসীদের উদ্দেশে বক্তব্যবাস্তব অবতরণস্থানের বদলে বক্তব্যের শ্রোতা পরিচয় নির্ধারণ করে

এই পরিচয় জানার কর্তৃত্বও আলাদা। বাকিল্লানীর বক্তব্যে মক্কি–মাদানি জানার জন্য সাহাবি ও তাবেঈদের স্মৃতির ওপর নির্ভর করার কথা এসেছে। নবীর কাছ থেকে এই শ্রেণিবিভাগের নির্দেশমূলক ঘোষণা পাওয়া যায়নি—এ কথাও তিনি বলেছেন। ফলে মুসহাফে সূরার শিরোনামের পাশে মক্কি বা মাদানি লেখা থাকা নিজে নতুন কোনো অবতীর্ণ আয়াত নয়; সেটি অবতরণ-ইতিহাস সম্পর্কে সংগৃহীত তথ্যের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। সুয়ূতি তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন: [725]

قَالَ الْقَاضِي أَبُو بَكْرٍ فِي الِانْتِصَارِ: إِنَّمَا يَرْجِعُ فِي مَعْرِفَةِ الْمَكِّيِّ وَالْمَدَنِيِّ إِلَى حِفْظِ الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ وَلَمْ يَرِدْ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي ذَلِكَ قَوْلٌ لِأَنَّهُ لَمْ يُؤْمَرْ بِهِ وَلَمْ يَجْعَلِ اللَّهُ عِلْمَ ذَلِكَ مِنْ فَرَائِضِ الْأُمَّةِ وَإِنْ وَجَبَ فِي بَعْضِهِ عَلَى أَهْلِ الْعِلْمِ مَعْرِفَةُ تَارِيخِ النَّاسِخِ وَالْمَنْسُوخِ فَقَدْ يُعْرَفُ ذَلِكَ بِغَيْرِ نَصِّ الرَّسُولِ انْتَهَى.

বাংলা অনুবাদ: কাজী আবু বকর আল-ইনতিসারে বলেছেন: মক্কি–মাদানি জানার জন্য সাহাবি ও তাবেঈদের স্মৃতির ওপরই নির্ভর করতে হয়। এ বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোনো বক্তব্য আসেনি; কারণ তাঁকে এটির নির্দেশ দেওয়া হয়নি, আর আল্লাহ এই জ্ঞানকে উম্মতের অবশ্যকর্তব্যও করেননি। যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে নাসিখ–মানসুখের সময় জানা আলেমদের জন্য আবশ্যক হয়, তা রাসুলের সরাসরি বক্তব্য ছাড়াও জানা যেতে পারে। বক্তব্য সমাপ্ত।

ফাতিহা সম্পর্কে কুরতুবি ইবনে আব্বাস, কাতাদা ও আবুল আলিয়ার নামে মক্কি এবং আবু হুরায়রা, মুজাহিদ, আতা ইবন ইয়াসার ও যুহরির নামে মাদানি মত উল্লেখ করেছেন। অর্ধেক মক্কায় ও অর্ধেক মদিনায় নাজিল হওয়ার কথাও তাঁর সংকলনে আছে। তিনি নিজে মক্কি মতটি গ্রহণ করেন। তাঁর গ্রহণ একটি ব্যাখ্যাগত সিদ্ধান্ত; সংকলিত অন্য বর্ণনাগুলোর অনুপস্থিতি নয়। একটি সূরার নামের পাশে মক্কি লিখে দিলে এই বহুস্তরীয় বিরোধটি এক শব্দের আড়ালে চলে যায়। [726]

الثانية : اختلفوا أهي مكية أم مدنية ؟ فقال ابن عباس وقتادة وأبو العالية الرياحي – واسمه رفيع – وغيرهم : هي مكية . وقال أبو هريرة ومجاهد وعطاء بن يسار والزهري وغيرهم : هي مدنية . ويقال : نزل نصفها بمكة ، ونصفها بالمدينة . حكاه أبو الليث نصر بن محمد بن إبراهيم السمرقندي في تفسيره . والأول أصح لقوله تعالى : ولقد آتيناك سبعا من المثاني والقرآن العظيم والحجر مكية بإجماع . ولا خلاف أن فرض الصلاة كان بمكة .

বাংলা অনুবাদ: দ্বিতীয়: এটি মক্কি না মাদানি—এ বিষয়ে তাঁদের মতভেদ হয়েছে। ইবনে আব্বাস, কাতাদা, আবুল আলিয়া আর-রিয়াহি—যাঁর নাম রুফাই—ও অন্যরা বলেছেন, এটি মক্কি। আবু হুরায়রা, মুজাহিদ, আতা ইবন ইয়াসার, যুহরি ও অন্যরা বলেছেন, এটি মাদানি। এমনও বলা হয়, অর্ধেক মক্কায় এবং অর্ধেক মদিনায় নাজিল হয়েছে। আবুল লাইস নাসর ইবন মুহাম্মদ ইবন ইবরাহিম আস-সামারকান্দি তাঁর তাফসীরে এটি উল্লেখ করেছেন। প্রথম মতটি অধিক সঠিক; কারণ আল্লাহ বলেছেন, “আমি তোমাকে পুনরাবৃত্ত সাতটি এবং মহান কোরআন দিয়েছি।” হিজর সর্বসম্মতভাবে মক্কি; আর নামাজ মক্কায় ফরজ হয়েছিল, এতে মতভেদ নেই।

পারা, হিযব ও রুকুর মতো পাঠবিভাগেও মানুষের ব্যবহারিক পরিকল্পনা কাজ করেছে। আজকের ত্রিশ পারা ও ষাট হিযব দীর্ঘ গ্রন্থকে নির্দিষ্ট সময়ে পড়ার সুবিধা দেয়। সম্পূর্ণ সূরা ধরে ভাগ করা এবং অক্ষরের পরিমাণ ধরে প্রায় সমান খণ্ডে ভাগ করা ভিন্ন পদ্ধতি। ইবন তাইমিয়া হাজ্জাজের যুগ ও তার পরবর্তী সময়ে অক্ষরভিত্তিক নতুন ভাগ ছড়িয়ে পড়ার কথা লিখেছেন। ইসলামকিউএ তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে: [727]

قد علم أن أول ما جُزِّئَ القرآن بالحروف تجزئةَ ثمانية وعشرين ، وثلاثين ، وستين ، هذه التي تكون رؤوس الأجزاء والأحزاب في أثناء السورة ، وأثناء القصة ونحو ذلك ، كان في زمن الحجاج وما بعده ، وروي أن الحجاج أمر بذلك ، ومن العراق فشا ذلك ، ولم يكن أهل المدينة يعرفون ذلك .

বাংলা অনুবাদ: জানা যায়, অক্ষর ধরে কোরআনকে আটাশ, ত্রিশ ও ষাট ভাগে প্রথম বিভক্ত করার এই পদ্ধতি—যাতে অংশ ও হিযবের শুরু সূরার মাঝখানে, ঘটনার মাঝখানে এবং এ ধরনের জায়গায় পড়ে—হাজ্জাজের যুগে ও তার পরে হয়েছে। বর্ণিত আছে, হাজ্জাজ এটির নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইরাক থেকে তা ছড়িয়ে পড়ে; মদিনার অধিবাসীরা তা জানতেন না।

যরকাশির বর্ণনায় অক্ষরগণনা করে কোরআনের অর্ধেক, এক-তৃতীয়াংশ, এক-সপ্তমাংশ ও এক-চতুর্থাংশ নির্ধারণের চেষ্টাও আছে। গণনাকারীরা কখনো একটি শব্দের নির্দিষ্ট অক্ষর পর্যন্ত সীমা টেনেছেন। অর্থাৎ ভাগের রেখা সূরার স্বাভাবিক শেষের সঙ্গে সব সময় মেলেনি। পরে পারার শিরোনাম, হিযবের চিহ্ন বা রুকুর চিহ্ন পাতার পরিচিত অংশ হয়ে গেছে। সূরার মূল পাঠ, সূরার নাম, অবতরণের শ্রেণি এবং পড়ার সুবিধার্থে তৈরি বিভাগ—এই স্তরগুলো মিলিয়ে আধুনিক মুসহাফের ব্যবহারিক কাঠামো দাঁড়িয়েছে। পাতায় তাদের একসঙ্গে দেখা যাওয়ার পেছনে এক উৎস বা এক সময়ের ইতিহাস নেই।


আনফাল ও তাওবা: পৃথক সূরা, সংযুক্ত বিন্যাস ও উসমানের ব্যাখ্যা

আনফাল ও তাওবার মাঝখানে বিসমিল্লাহ নেই। বর্তমান মুসহাফে তারা আলাদা নামে পাশাপাশি রয়েছে: প্রথমটি অষ্টম, দ্বিতীয়টি নবম সূরা। এই পরিচিত ব্যবস্থার পেছনে উসমানের নামে সংরক্ষিত ব্যাখ্যাটি সংকলকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি স্পষ্ট বিবরণ দেয়। সেখানে ইবনে আব্বাস তিনটি সম্পর্কিত প্রশ্ন করেছেন: দুটি সূরা কেন পাশাপাশি রাখা হলো, কেন মাঝখানে বিসমিল্লাহ লেখা হলো না এবং কেন সেগুলোকে সাত দীর্ঘ সূরার মধ্যে স্থান দেওয়া হলো। উত্তরের কেন্দ্রীয় বাক্য হলো উসমানের অনুমান: বিষয়গত সাদৃশ্য দেখে তিনি মনে করেছিলেন একটি অন্যটির অংশ।

তাফসীরে ইবনে কাসীরের বাংলা সংস্করণে ঘটনাটির দীর্ঘ বিবরণ রয়েছে। প্রশ্নকারী ইবনে আব্বাস; মুহাম্মদ ইবন বাশার তিরমিযীর বর্ণনাপথের একজন বর্ণনাকারী। তিরমিযীর মূল আরবি বর্ণনায় এই দুই ব্যক্তির অবস্থান আলাদা করে দেওয়া আছে। ইবনে কাসীরের অনূদিত বিবরণে ঘটনাটি এভাবে এসেছে: [728] [729]

ইমাম তিরমিযী (র) বিভিন্ন বর্ণনাকারীর বরাতে মুহাম্মদ ইব্‌ন বাশার (র) হইতে বর্ণনা
করেন যে, তিনি [ইবন আব্বাস] বলেন: একদা আমি উসমান (রা)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করিলাম, সূরা আনফাল যাহার আয়াতের সংখ্যা এক শতের নিম্নে এবং সূরা তাওবা যাহার আয়াতের সংখ্যা অন্যূন একশত -এই দুইটি সূরার মধ্যবর্তী স্থানে আপনারা ‘বিসমিল্লাহ্’ লিখেন নাই কেন? এতদ্ব্যতীত উক্ত সূরাদ্বয়কে আপনারা যে ‘দীর্ঘ সূরা সপ্তক )السبع الطول(‘-এর মধ্যে স্থাপন করিয়াছেন; উহার কারণ কি? উসমান (রা) বলিলেন: অনেক সময়ে এইরূপ ঘটিত যে, নবী করীম (সা)-এর প্রতি একটি সূরার অংশ বিশেষ নাযিল হইবার পর অন্য একটি সূরার অংশ বিশেষ নাযিল হইত। এইরূপ নবী করীম (সা)-এর উপর একটি সূরা নাযিল হওয়া শেষ হইবার পূর্বে অন্য একটি সূরার অংশ বিশেষ নাযিল হইত। এমতাবস্থায় কোন আয়াত নাযিল হইলে তিনি কোন ওয়াহী লেখক সাহাবীকে ডাকিয়া বলিতেন: ‘যে সূরায় এই এই বিষয় বর্ণিত হইয়াছে, এই আয়াতটিকে উহার মধ্যে (অমুক স্থানে) স্থাপন কর।’ সূরা-আনফাল হইতেছে মদীনায় অবতীর্ণ প্রথম সূরাসমূহের অন্যতম। পক্ষান্তরে, সূরা বারাআত (সূরা তাওবা) হইতেছে মদীনায় অবতীর্ণ শেষ সূরাসমূহের অন্যতম। কিন্তু, উভয় সূরায় বর্ণিত ঘটনা ও কাহিনী প্রায় একরূপ। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমি ধারণা করিলাম: ‘সূরা বারাআত পৃথক কোন সূরা নহে; বরং উহা সূরা আনফাল-এর একটি অংশ।’ অথচ নবী করীম (সা) এ সম্বন্ধে কিছু বলিয়া যান নাই। উপরোক্ত কারণে আমি উহাদিগকে পরস্পর সন্নিহিত করিয়া স্থাপন করিয়াছি; কিন্তু উহাদের মধ্যবর্তী স্থানে (সূরা তাওবার প্রথমে) বিসমিল্লাহ্ লিখি নাই। তেমনি উপরোক্ত কারণে উভয় সূরা মিলিয়া দীর্ঘ সূরার আকার গ্রহণ করে বলিয়া উহাদিগকে ‘দীর্ঘ সূরা-সপ্তক’-এর মধ্যে স্থাপন করিয়াছি।
উক্ত রিওয়ায়েতকে ইমাম আহমদ, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম নাসাঈ, ইমাম ইব্‌ন হিব্বান এবং ইমাম হাকিম (র) বর্ণনা করিয়াছেন। ইমাম হাকিম (র) উক্ত রিওয়ায়েত সম্বন্ধে মন্তব্য করিয়াছেন: ‘উহার সনদ সহীহ্; তবে ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম উহাকে বর্ণনা করেন নাই।’

সুরা তওবা স্বতন্ত্র সুরা নয়
সুরা তওবা কি স্বতন্ত্র সুরা

আবু দাউদেও ইবনে আব্বাসের প্রশ্ন এবং উসমানের উত্তর রয়েছে। এই বর্ণনায় “সাবউত তিওয়াল” বলতে সাত দীর্ঘ সূরার গুচ্ছ বোঝানো হয়েছে। আনফালকে মাসানির এবং বারাআতকে মিইনের অন্তর্ভুক্ত করে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—অর্থাৎ দৈর্ঘ্যভিত্তিক দুই শ্রেণির রচনাকে কেন এক গুচ্ছে আনা হলো। মূল আরবি ও বাংলা অনুবাদের পূর্ণ বক্তব্য: [730] [731]

قَالَ سَمِعْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ ، قَالَ قُلْتُ لِعُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ مَا حَمَلَكُمْ أَنْ عَمَدْتُمْ، إِلَى بَرَاءَةَ وَهِيَ مِنَ الْمِئِينَ وَإِلَى الأَنْفَالِ وَهِيَ مِنَ الْمَثَانِي فَجَعَلْتُمُوهُمَا فِي السَّبْعِ الطُّوَلِ وَلَمْ تَكْتُبُوا بَيْنَهُمَا سَطْرَ ‏{‏ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ‏}‏ قَالَ عُثْمَانُ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم مِمَّا يَنْزِلُ عَلَيْهِ الآيَاتُ فَيَدْعُو بَعْضَ مَنْ كَانَ يَكْتُبُ لَهُ وَيَقُولُ لَهُ ‏”‏ ضَعْ هَذِهِ الآيَةَ فِي السُّورَةِ الَّتِي يُذْكَرُ فِيهَا كَذَا وَكَذَا ‏”‏ ‏.‏ وَتَنْزِلُ عَلَيْهِ الآيَةُ وَالآيَتَانِ فَيَقُولُ مِثْلَ ذَلِكَ وَكَانَتِ الأَنْفَالُ مِنْ أَوَّلِ مَا أُنْزِلَ عَلَيْهِ بِالْمَدِينَةِ وَكَانَتْ بَرَاءَةُ مِنْ آخِرِ مَا نَزَلَ مِنَ الْقُرْآنِ وَكَانَتْ قِصَّتُهَا شَبِيهَةً بِقِصَّتِهَا فَظَنَنْتُ أَنَّهَا مِنْهَا فَمِنْ هُنَاكَ وَضَعْتُهُمَا فِي السَّبْعِ الطُّوَلِ وَلَمْ أَكْتُبْ بَيْنَهُمَا سَطْرَ ‏{‏ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ‏}‏ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: ৭৮৬। আমর ইব্‌ন আওন ইব্‌ন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হযরত উছমান (রা)-কে জিজ্ঞেস করি যে, আপনারা সূরা বারাআত-কে সূরা আনফালের সঙ্গে রেখে আল-কুরআনের সাবউত তিওয়াল (সাতটি দীর্ঘ সূরা)-এর মধ্যে কিরূপে পরিগণিত করেন এবং উভয় সূরার মধ্যস্থলে বিস্মিল্লাহির রহমানির রাহীম কেন লিখেন নাই? অথচ বারাআত সূরাটি মিইন-এর অন্তর্ভুক্ত (অর্থাৎ যাতে ১০০-র অধিক আয়াত আছে এবং বারাআতে ১২৯ আয়াত আছে)। অপরপক্ষে সূরা আনফাল মাছানীর অন্তর্ভুক্ত (কেননা এতে ১০০-এর কম অর্থাৎ ৭৫ টি আয়াত আছে)।
উছমান (রা) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের উপর যখনই কোন আয়াত নাযিল হত, তখন তিনি ওহী লেখক সাহাবীদের ডেকে বলতেনঃ এই আয়াত অমুক সূরার অমুক স্থানে সন্নিবেশিত কর যার মধ্যে এই এই বিষয় আলোচিত হয়েছে। অতঃপর তাঁর উপর যখন একটি বা দুটি আয়াত নাযিল হত, তখনও তিনি ঐরূপ বলতেন। [অনুবাদকের টীকা ১]
সুরা আল্-আনফাল নবী করীম (স)-এর উপর মদীনায় আসার পরপরই নাযিলকৃত সুরাসমূহের অন্যতম এবং সুরা বারাআত অবতীর্ণ হয় কুরআন নাযিলের সমাপ্তিকালে। কিন্তু সূরা আনফালে বর্ণিত ঘটনাবলীর সঙ্গে সূরা বারাআতে বর্ণিত ঘটনাবলীর সাদৃশ্য রয়েছে। কাজেই আমি মনে
মনে স্থির করি যে, এটি সূরা আনফালের অন্তর্ভুক্ত। এজন্য আমি দুটি সূরাকে একত্রে
সাবউত-তিওয়াল-এর অন্তর্ভুক্ত করেছি এবং এ কারণেই এই দুইটি সূরার মাঝখানে বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম লিপিবদ্ধ করিনি- (তিরমিযী)।

১। প্রকাশ থাকে যে, আল-কুরআনের কোন্ আয়াত কোন্ সূরার কোন্ স্থানে সন্নিবেশিত হবে- তাও ওহী দ্বারা নির্ধারিত হত। (অনুবাদক)

উসমানের ব্যাখ্যায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধাপগুলো সুস্পষ্ট। আনফাল মদিনায় নাজিল হওয়া প্রথম দিকের সূরাগুলোর একটি, বারাআত শেষ দিকের; কিন্তু তাদের আলোচ্য বিষয় কাছাকাছি। এই বিষয়গত মিল থেকে তিনি একটির সঙ্গে অন্যটির সম্পর্ক অনুমান করেন। তারপর সেই অনুমানের ভিত্তিতে তাদের পাশাপাশি রাখেন এবং মাঝখানে বিসমিল্লাহ লেখেন না। এখানে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তটির জন্য উদ্ধৃত ভিত্তি একটি তুলনা ও তার ফল হিসেবে গঠিত ধারণা। সাধারণভাবে আয়াত স্থাপনের নির্দেশের বর্ণনা দিয়ে শুরু হলেও এই বিশেষ বিন্যাসের ব্যাখ্যা এসে থামে সংকলকের নিজের বিচারে।

ইবনে আব্বাসের প্রশ্ন বা উসমানের বক্তব্যবর্ণনায় প্রদত্ত ভিত্তিমুসহাফে তার ফল
আনফাল ও বারাআত পাশাপাশি কেনদুটি রচনার বিষয়বস্তুর সাদৃশ্যঅষ্টম ও নবম স্থানে সংলগ্ন অবস্থান
উসমানের সম্পর্ক-নির্ধারণ“আমি ধারণা করলাম, এটি তারই অংশ”দুটি অংশের মধ্যে বিশেষ সংযোগ ধরে বিন্যাস
মাঝখানে বিসমিল্লাহ নেই কেনউসমান এই সম্পর্ক ধরে বিসমিল্লাহ লিখেননিসূরার শুরু চিহ্নিত করার প্রচলিত বাক্যটি অনুপস্থিত
সাত দীর্ঘ সূরার গুচ্ছে রাখা কেনউসমান এই দুটি অংশ একসঙ্গে ওই গুচ্ছে রেখেছেনদৈর্ঘ্যভিত্তিক শ্রেণিবিভাগেও তাদের যৌথ ব্যবহার

তিরমিযীর বর্ণনায় আরও স্পষ্ট আছে: মুহাম্মদ মারা গেলেন, কিন্তু এটি অন্যটির অংশ কি না, তা তাঁদের কাছে স্পষ্ট করে যাননি। অনিশ্চিত অবস্থার পর সংকলক যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন, সেটিই পরবর্তী মুসহাফের পরিচিত বৈশিষ্ট্য হয়েছে। “আমি ধারণা করলাম” বাক্যটি সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে তাঁর নিজের বিচারকে চিহ্নিত করে। নবীর মৃত্যুর পর সম্পর্কটি অনির্দিষ্ট থেকে যাওয়া এবং সেই অবস্থায় উসমানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা—এই ধারাবাহিকতায় অনুমানটি কার্যকর সংকলন-সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে।

এই বর্ণনা বহু গ্রন্থে পাওয়া গেলেও প্রতিটি বইকে স্বাধীন সাক্ষী গণনা করা যায় না। তিরমিযী এটিকে হাসান বলেছেন এবং আওফ, ইয়াযিদ আল-ফারসি ও ইবনে আব্বাসের বর্ণনাপথের কথা নির্দিষ্ট করেছেন। আবু দাউদের একই ঘটনার বর্ণনার পাশে আলবানির দাঈফ মূল্যায়ন রয়েছে; ইবনে কাসীরের উদ্ধৃতিতে হাকিমের সহিহ মূল্যায়নও আছে। হাদিসশাস্ত্রের এই ভিন্ন রায় ঘটনাটির বর্ণনাপরম্পরা ও পরবর্তী গ্রহণের তথ্য। বর্ণনার ঐতিহাসিক তাৎপর্য তার নির্দিষ্ট বক্তব্যে: সংকলকের অনুমানকে মুসহাফের দৃশ্যমান বিন্যাসের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

আনফাল ও বারাআতকে এক সূরা গণনা করার মতও সুয়ূতির সংকলনে রয়েছে। সেখানে স্বীকৃত ১১৪ সূরার পাশাপাশি ১১৩-এর মত রাখা হয়েছে। সংখ্যার এই পরিবর্তনে পরিচিত দুটি রচনার মধ্যবর্তী বিভাগটি সরে যায়; একটি নতুন গণনাযোগ্য একক তৈরি হয়। সুয়ূতির বক্তব্য: [732]

أَمَّا سُوَرِهِ فَمِائَةٌ وَأَرْبَعَ عَشْرَةَ سُورَةٍ بِإِجْمَاعِ مَنْ يُعْتَدُّ بِهِ وَقِيلَ وَثَلَاثَ عشرة بجعل الأنفال وبراءة سُورَةً وَاحِدَةً

বাংলা অনুবাদ: এর সূরার সংখ্যা গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের ঐকমত্য অনুসারে ১১৪; আর আনফাল ও বারাআতকে এক সূরা ধরে ১১৩-ও বলা হয়েছে।

এক সূরা না দুই সূরা—প্রশ্নটি পরবর্তী তাবেঈদের কাছেও উত্থাপিত হয়েছে। আবু রাওকের নামে এক সূরা বলার বর্ণনা এবং হাসানের নামে দুই সূরা বলার উত্তর একই আলোচনায় আছে। হাসানকে সরাসরি জিজ্ঞেস করার বর্ণনাটি হলো: [733]

وَأَخْرَجَ عَنْ أَبِي رَجَاءٍ قَالَ سَأَلْتُ الْحَسَنَ عَنِ الأنفال وبراءة: سُورَتَانِ أَمْ سُورَةٌ؟ قَالَ: سُورَتَانِ. وَنُقِلَ مِثْلُ قَوْلِ أَبِي رَوْقٍ عَنْ مُجَاهِدٍ وَأَخْرَجَهُ ابْنُ أَبِي حَاتِمٍ عَنْ سُفْيَانَ.

বাংলা অনুবাদ: ইবন আশতা আবু রাজা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমি হাসানকে আনফাল ও বারাআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, “এগুলো দুটি সূরা, না একটি সূরা?” তিনি বললেন, “দুটি সূরা।”

সুয়ূতি নিজে এক সূরা গণনার মতের বিরোধিতা করে মুহাম্মদের ভাষায় দুটির পৃথক নাম থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর বিচার তাই পৃথক সূরা গণনার পক্ষে। একই গ্রন্থে বিরোধী মত ও তার সমালোচনা সংরক্ষিত থাকায় বিতর্কের প্রকৃত বিষয়ও স্পষ্ট হয়: রচনাগুলোর নাম, পারস্পরিক সম্পর্ক, মাঝখানের চিহ্ন এবং মোট সূরাগণনা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ১১৩-এর উল্লেখে দুটি পরিচিত অংশকে এক না দুই সূরা ধরা হবে, সেই সীমানা বদলেছে। একটি সূরার সম্পূর্ণ পাঠ বিলোপের উল্লেখ ওই বাক্যে নেই।

আনফাল–তাওবার ঘটনা সংকলনকাজকে নিছক নকল করার কাজে সীমাবদ্ধ রাখে না। সংকলককে রচনার সম্পর্ক নির্ধারণ করতে হয়েছে, একটি বিভাজক বাক্য লেখা বা না-লেখার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে এবং বৃহত্তর সূরাগুচ্ছে স্থান নির্ধারণ করতে হয়েছে। উসমানের নামে সংরক্ষিত উত্তর এসব সিদ্ধান্তের পেছনে তাঁর উপলব্ধি ও অনুমানকে প্রকাশ করে। সেই সিদ্ধান্ত পরে মান্য রূপ লাভ করেছে। গৃহীত রূপের এই প্রক্রিয়াগত ইতিহাসকে বাদ দিলে গ্রন্থটির বিন্যাসের ওপর মানুষের কর্তৃত্বের সবচেয়ে স্পষ্ট দলিলগুলোর একটি বাদ পড়ে।


বিসমিল্লাহ আয়াত কি না: সূরা, পাঠ ও মাজহাবভেদে বিরোধ

“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বাক্যটি সূরা নামলের ভেতরে সুলাইমানের চিঠির অংশ হিসেবে রয়েছে। এই অবস্থানের স্বীকৃতি এবং প্রতিটি সূরার শুরুতে লেখা একই বাক্যের মর্যাদা আলাদা প্রশ্ন। নামলের ভেতরে বাক্যটি যে স্থানে আছে, সেখানে এটি আয়াতের বক্তব্যের মধ্যে সরাসরি যুক্ত। সংশ্লিষ্ট পূর্ণ আয়াতটি হলো: [734]

إِنَّهُ مِن سُلَيْمَانَ وَإِنَّهُ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

বাংলা অনুবাদ: এটি সুলাইমানের পক্ষ থেকে এসেছে এবং এটি পরম করুণাময়, দয়ালু আল্লাহর নামে।

কুরতুবি সূরার শুরুতে বিসমিল্লাহর আয়াতগত মর্যাদা নিয়ে তিনটি অবস্থান উল্লেখ করেছেন। মালিকের মতে এটি ফাতিহা বা অন্য কোনো সূরার আয়াত নয়; আবদুল্লাহ ইবন মুবারকের মতে প্রত্যেক সূরার আয়াত; শাফেয়ির মতে ফাতিহার আয়াত, কিন্তু অন্য সূরা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য এক রকম নয়। কুরতুবির উদ্ধৃতির শেষ বাক্যেই নামলের ভেতরের অবস্থান সম্পর্কে ঐকমত্য আলাদা করে বলা হয়েছে। তাঁর পূর্ণ অনুচ্ছেদটি: [735]

( الأول ) ليست بآية من الفاتحة ولا غيرها ; وهو قول مالك . ( الثاني ) أنها آية من كل سورة ; وهو قول عبد الله بن المبارك . ( الثالث ) قال الشافعي : هي آية في الفاتحة ; وتردد قوله في سائر السور ; فمرة قال : هي آية من كل سورة ، ومرة قال : ليست بآية إلا في الفاتحة وحدها . ولا خلاف بينهم في أنها آية من القرآن في سورة النمل .

বাংলা অনুবাদ: প্রথম মত: এটি ফাতিহা বা অন্য কোনো সূরার আয়াত নয়; এটি মালিকের মত। দ্বিতীয় মত: এটি প্রত্যেক সূরার একটি আয়াত; এটি আবদুল্লাহ ইবন মুবারকের মত। তৃতীয় মত: শাফেয়ি বলেছেন, এটি ফাতিহার একটি আয়াত। অন্যান্য সূরা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে: একবার বলেছেন, এটি প্রত্যেক সূরার আয়াত; আরেকবার বলেছেন, ফাতিহা ছাড়া অন্য সূরার আয়াত নয়। নামল সূরার মধ্যে এটি কোরআনের আয়াত হওয়ার বিষয়ে তাঁদের মধ্যে মতভেদ নেই।

মত বা গৃহীত অবস্থানফাতিহার শুরুতে মর্যাদাঅন্য সূরার শুরুতে মর্যাদা
কুরতুবির উদ্ধৃত মালিকের মতফাতিহার আয়াত নয়অন্য সূরার আয়াতও নয়; নামলের ভেতরের পাঠ স্বীকৃত
আবদুল্লাহ ইবন মুবারকের মতফাতিহার আয়াতসূরার সূচনায় আয়াত হিসেবে স্বীকৃত
শাফেয়ির মতফাতিহার পূর্ণ আয়াতঅন্যান্য সূরা নিয়ে দুটি বক্তব্য: প্রত্যেকটির আয়াত অথবা শুধু ফাতিহার আয়াত
ইসলামকিউএতে উদ্ধৃত স্থায়ী ফতোয়া কমিটির সিদ্ধান্তফাতিহার সাত আয়াতের অংশ নয়তাওবা ছাড়া সূরার শুরুতে স্বতন্ত্র আয়াত; সংশ্লিষ্ট সূরার অংশ নয়
নামলের ভেতরে ২৭:৩০ফাতিহার গণনার প্রশ্ন নয়কোরআনের আয়াতের অংশ হিসেবে স্বীকৃত

স্বতন্ত্র আয়াতের অবস্থানটি আলাদা করে তাৎপর্যপূর্ণ। এতে বাক্যটি কোরআনের অংশ হিসেবে গৃহীত, কিন্তু যে সূরার সামনে লেখা আছে তার অংশ নয়। স্থায়ী ফতোয়া কমিটির এই সিদ্ধান্ত ইসলামকিউএ উদ্ধৃত করেছে। তাদের বক্তব্যের প্রাসঙ্গিক ধারাবাহিক অংশ: [736]

البسملة آية مستقلة في أول كل سورة

বাংলা অনুবাদ: বিসমিল্লাহ প্রতিটি সূরার শুরুতে স্বতন্ত্র একটি আয়াত।

এই সিদ্ধান্তে তিনটি পরিচয় একসঙ্গে রয়েছে: বাক্যটি কোরআন, বাক্যটি একটি আয়াত, কিন্তু বাক্যটি তার পরবর্তী সূরার আয়াত নয়। মালিকের নামে উদ্ধৃত অবস্থানে সূচনাপাঠটি সূরার আয়াতের মর্যাদা পায় না; শাফেয়ির অবস্থানে ফাতিহার অন্তর্গত একটি আয়াত হয়। ফলে মুসহাফে একই দৃশ্যমান বাক্য থাকার পরেও তার গ্রন্থগত পরিচয় সম্পর্কে পৃথক ধর্মীয় উত্তর তৈরি হয়েছে। পাতায় বাক্যটির উপস্থিতি সেই বিরোধ মেটায়নি।

ইসলামকিউএর ফাতিহা-সংক্রান্ত আলোচনায় হানাফি, মালিকি ও হাম্বলি মাজহাবের প্রধান অবস্থান হিসেবে বিসমিল্লাহকে ফাতিহার অংশ না-ধরার কথা আছে; শাফেয়ি মাজহাবে তা ফাতিহার পূর্ণ আয়াত। একই উত্তরে নববীর আল-মাজমুউ থেকে শাফেয়ি অবস্থান সরাসরি উদ্ধৃত হয়েছে। [737]

فمذهبنا أن بسم الله الرحمن الرحيم آية كاملة من أول الفاتحة، بلا خلاف

বাংলা অনুবাদ: আমাদের মাজহাব হলো, “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” ফাতিহার শুরুতে একটি পূর্ণ আয়াত; এ বিষয়ে [আমাদের মাজহাবে] মতভেদ নেই।

নববীর “মতভেদ নেই” তাঁর নিজের মাজহাবের অবস্থান বর্ণনা করছে। অন্য মাজহাবের মত সেই একই আলোচনায় তার বিপরীতে রয়েছে। একটি গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ নিশ্চয়তা এবং সমগ্র মুসলিম পরম্পরার ঐকমত্যের পরিসর তাই এক নয়। বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের সিদ্ধান্তের পক্ষে হাদিস ও সাহাবিদের বক্তব্য ব্যবহার করেছে। কোন বর্ণনা গ্রহণ করা হবে এবং তার পাঠ থেকে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সেই ব্যাখ্যাগত কাজের ফল হিসেবে পরস্পরবিরোধী সীমানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কুরতুবির আলোচনায় ইবনুল আরাবির যুক্তি আরও সরাসরি: বিসমিল্লাহ কোরআনের অংশ কি না তা নিয়ে মানুষের মতভেদ থাকাই তাঁর কাছে সেটি কোরআন না-হওয়ার জন্য যথেষ্ট; কারণ কোরআন নিয়ে মতভেদ হয় না। তিনি লিখেছেন: [738]

قال ابن العربي : ويكفيك أنها ليست من القرآن اختلاف الناس فيها ، والقرآن لا يختلف فيه .

বাংলা অনুবাদ: ইবনুল আরাবি বলেছেন: এটি যে কোরআনের অন্তর্ভুক্ত নয়, তার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে মানুষ এটি নিয়ে মতভেদ করেছে; আর কোরআন নিয়ে মতভেদ হয় না।

এই যুক্তিতে বিতর্কের বিষয়কে আগে নির্ধারিত একটি ধর্মতাত্ত্বিক নিয়মের সাহায্যে বাদ দেওয়া হচ্ছে। “কোরআন নিয়ে মতভেদ হয় না” নীতিটি সত্য ধরে নেওয়ার পর, বাস্তবে যে অংশ নিয়ে মতভেদ পাওয়া গেল তাকে কোরআনের বাইরে রাখা হলো। এতে মতভেদের ইতিহাসের স্বাধীন পরীক্ষা হয় না; স্বীকৃত সংজ্ঞার সাহায্যে বিরোধপূর্ণ অংশকে সংজ্ঞার বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়। শাফেয়ি ও ইবন মুবারকের মতো যারা একই বাক্যকে আয়াত বলছেন, তাঁদের অবস্থানকে এই যুক্তি তথ্য হিসেবে ব্যাখ্যা করে না। তাঁদের বক্তব্যের অস্তিত্বই ওই সর্বজনীন নিয়মের সামনে বাস্তব প্রশ্ন তৈরি করে।

এর ব্যবহারিক ফল নামাজেও পড়েছে। কুরতুবি মালিকের প্রসিদ্ধ অবস্থান হিসেবে ফরজ নামাজে বিসমিল্লাহ না-পড়া এবং নফলে পড়ার অনুমতির কথা লিখেছেন। অন্যদিকে আবু হানিফা, সাওরি ও আহমদের সঙ্গে সম্পর্কিত গোপনে পড়ার অবস্থানও দিয়েছেন। কোন বাক্য সূরার আয়াত, কোনটি আলাদা সূচনাপাঠ এবং কোনটি নামাজে কীভাবে পড়তে হবে—এসব সিদ্ধান্ত পরস্পর সম্পর্কিত হলেও এক নয়। গোপনে পাঠের রীতি এবং বিসমিল্লাহকে আয়াত না-ধরার রীতি পৃথক অবস্থান হিসেবে ওই একই আলোচনায় নথিবদ্ধ রয়েছে।

গ্রন্থের সীমানা নির্ধারণের বিরোধটি এখানেই দৃশ্যমান: মুসহাফের একই পঙ্‌ক্তিকে একজন ফাতিহার প্রথম আয়াত, আরেকজন সূরার বাইরের স্বতন্ত্র আয়াত, আরেকজন সূচনার বাক্য হিসেবে দেখছেন। পাণ্ডুলিপিতে উপস্থিতি সেই মতভেদ মুছে দেয়নি। কোন রূপ ধর্মীয়ভাবে বাধ্যতামূলক হবে, তা নির্ধারিত হয়েছে পাঠপরম্পরা, হাদিসের গ্রহণ, ফিকহি কর্তৃত্ব ও তাফসীরের ব্যাখ্যার মাধ্যমে। দৃশ্যমান অক্ষরের সঙ্গে গ্রন্থগত স্বীকৃতির এই ব্যবধান কোরআনের সংকলন-ইতিহাসের একটি মৌলিক সমস্যা।


ফাতিহা ও কাউসারের বর্ণনায় বিসমিল্লাহ; তাওবার শুরুতে অনুপস্থিতি

ফাতিহাকে সাত আয়াত গণনা করা হলেও সেই সাতটি আয়াতের মধ্যে বিসমিল্লাহ থাকবে কি না, তা নিয়ে পৃথক বিন্যাস রয়েছে। বিসমিল্লাহকে প্রথম আয়াত ধরলে শেষের “সিরাতাল্লাযিনা…” থেকে “ওয়ালাদ্দাল্লিন” পর্যন্ত এক আয়াত হয়। বিসমিল্লাহ বাদ দিলে ওই শেষ অংশের মধ্যে আরেকটি সীমা টেনে সাত পূরণ করা হয়। একই মোট সংখ্যা এখানে একই আয়াতসীমার প্রমাণ নয়। তাফসীরে জালালাইনের বাংলা সংস্করণে দুটি পদ্ধতিই পাশাপাশি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। [739]

সূরা আল-ফাতিহা মক্কায় অবতীর্ণ। এতে সাতটি আয়াত
রয়েছে বিসমিল্লাহসহ। যদি তাসমিয়া ফাতিহার অংশ হয়, তখন صِرَاطَ الَّذِينَ হতে শেষ পর্যন্ত হবে সপ্তম আয়াত। আর যদি তাসমিয়া ফাতিহার অংশ না হয়ে থাকে, তবে সপ্তম আয়াত হবে غَيْرِ الْمغضوب হতে শেষ পর্যন্ত।

কোরআন সংকলন 152
ক্রমবিসমিল্লাহকে ফাতিহার আয়াত ধরলেবিসমিল্লাহকে ফাতিহার আয়াত না ধরলে
প্রথম আয়াতبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ — পরম করুণাময়, দয়ালু আল্লাহর নামেالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ — সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের রব আল্লাহর
দ্বিতীয় আয়াতالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ — সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের রব আল্লাহরالرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ — পরম করুণাময়, দয়ালু
তৃতীয় আয়াতالرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ — পরম করুণাময়, দয়ালুمَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ — বিচারদিনের মালিক
চতুর্থ আয়াতمَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ — বিচারদিনের মালিকإِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ — তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই সাহায্য চাই
পঞ্চম আয়াতإِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ — তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই সাহায্য চাইاهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ — আমাদের সরল পথে পরিচালিত করো
ষষ্ঠ আয়াতاهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ — আমাদের সরল পথে পরিচালিত করোصِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ — তাদের পথ, যাদের তুমি অনুগ্রহ করেছ
সপ্তম আয়াতصِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ — তাদের পথ, যাদের তুমি অনুগ্রহ করেছ; যারা ক্রোধের পাত্র বা পথভ্রষ্ট নয়غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ — যারা ক্রোধের পাত্র বা পথভ্রষ্ট নয়

সারণির দুই পাশে আয়াতের পরিচয় বদলেছে। একটি পদ্ধতির প্রথম আয়াত অন্যটির ফাতিহার গণনার বাইরে; একটি পদ্ধতির ষষ্ঠ আয়াত অন্যটির পঞ্চম; শেষের দুটি অংশ এক গণনায় যুক্ত, অন্য গণনায় পৃথক। সাত সংখ্যাটি অপরিবর্তিত রেখেও আয়াতের সীমা ও সূরার অংশ হিসেবে স্বীকৃত বাক্যের পরিসর বদলে যায়। ফাতিহার মতো দৈনন্দিন নামাজে ব্যবহৃত সূরাতেও এই বিরোধ পরবর্তী ফিকহি ও পাঠগত কর্তৃত্বের মাধ্যমে ভিন্নভাবে স্থির হয়েছে।

উম্মে সালামার বর্ণনায় মুহাম্মদের পাঠ বিসমিল্লাহ দিয়ে শুরু হওয়ার এবং আয়াত ধরে থেমে থেমে পড়ার বিবরণ আছে। আবু দাউদের এই বর্ণনা বিসমিল্লাহসহ পাঠের পক্ষে ব্যবহৃত দলিলগুলোর একটি। মূল বক্তব্যে “মালিক” পাঠ নিয়ে আহমদের মন্তব্যও যুক্ত আছে। [740]

أَنَّهَا ذَكَرَتْ – أَوْ كَلِمَةً غَيْرَهَا – قِرَاءَةَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏‏{‏ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ * الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ * الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ * مَلِكِ يَوْمِ الدِّينِ ‏}‏ يَقْطَعُ قِرَاءَتَهُ آيَةً آيَةً ‏.‏ قَالَ أَبُو دَاوُدَ سَمِعْتُ أَحْمَدَ يَقُولُ الْقِرَاءَةُ الْقَدِيمَةُ ‏‏{‏ مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ ‏}‏ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: তিনি উল্লেখ করেছেন—অথবা অনুরূপ কোনো শব্দ বলেছেন—আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাঠ: “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামিন। আর-রাহমানির রাহিম। বিচারদিনের রাজা।” তিনি আয়াত ধরে ধরে পাঠ পৃথক করতেন। আবু দাউদ বলেছেন: আমি আহমদকে বলতে শুনেছি, প্রাচীন পাঠ হলো “বিচারদিনের মালিক” (مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ)।

ফাতিহা নিয়ে অন্য বহুল ব্যবহৃত দলিলটি আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে নামাজকে ভাগ করার হাদিস। সেখানে কথোপকথন শুরু হয় “আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামিন” থেকে; বিসমিল্লাহর জন্য আলাদা উত্তর দেওয়া হয়নি। কুরতুবি এই ধারাবাহিকতাকে বিসমিল্লাহ ফাতিহার আয়াত না-হওয়ার পক্ষে ব্যবহার করেছেন। কথোপকথনের পাঠটি হলো: [741]

قال [ تعالى ] : ” قسمت الصلاة بيني وبين عبدي نصفين ولعبدي ما سأل فإذا قال العبد : ( الحمد لله رب العالمين ) قال الله تعالى حمدني عبدي وإذا قال : ( الرحمن الرحيم ) قال الله تعالى : أثنى علي عبدي وإذا قال : ( مالك يوم الدين ) قال مجدني عبدي – وقال مرة : فوض إلى عبدي – فإذا قال : ( إياك نعبد وإياك نستعين ) قال : هذا بيني وبين عبدي ، ولعبدي ما سأل ، فإذا قال : ( اهدنا الصراط المستقيم صراط الذين أنعمت عليهم غير المغضوب عليهم ولا الضالين ) قال : هذا لعبدي ولعبدي ما سأل .

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ বলেছেন: “আমি নামাজকে আমার ও আমার বান্দার মধ্যে দুই ভাগ করেছি; আমার বান্দা যা চাইবে, সে তা পাবে। বান্দা যখন বলে, ‘আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামিন’, আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে।’ যখন বলে, ‘আর-রাহমানির রাহিম’, আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দা আমার গুণকীর্তন করেছে।’ যখন বলে, ‘মালিকি ইয়াওমিদ্দিন’, আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দা আমার মহিমা ঘোষণা করেছে।’” আরেকবার বলেছেন, “আমার বান্দা আমার ওপর অর্পণ করেছে।” “যখন বলে, ‘ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাঈন’, আল্লাহ বলেন, ‘এটি আমার ও আমার বান্দার মধ্যে; আমার বান্দা যা চাইবে, সে তা পাবে।’ যখন বলে, ‘ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম, সিরাতাল্লাযিনা আনআমতা আলাইহিম, গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ্দাল্লিন’, আল্লাহ বলেন, ‘এটি আমার বান্দার জন্য; আমার বান্দা যা চাইবে, সে তা পাবে।’”

কাউসার নাজিলের বর্ণনায় বিসমিল্লাহ আরও সরাসরি সূরার ঘোষিত পাঠের সঙ্গে এসেছে। আনাসের বর্ণনা অনুযায়ী মুহাম্মদ বলেন, তাঁর ওপর সদ্য একটি সূরা নাজিল হয়েছে; তারপর বিসমিল্লাহসহ কাউসার পাঠ করেন। পরে কাউসারের অর্থ এবং কিয়ামতের দিনে তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে ঘটবে বলে বর্ণিত ঘটনার কথা বলেন। মুসলিমের সম্পূর্ণ বক্তব্য: [742]

قَالَ بَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ذَاتَ يَوْمٍ بَيْنَ أَظْهُرِنَا إِذْ أَغْفَى إِغْفَاءَةً ثُمَّ رَفَعَ رَأْسَهُ مُتَبَسِّمًا فَقُلْنَا مَا أَضْحَكَكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ ‏”‏ أُنْزِلَتْ عَلَىَّ آنِفًا سُورَةٌ ‏”‏ ‏.‏ فَقَرَأَ ‏”‏ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ‏‏{‏ إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ * فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ * إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الأَبْتَرُ‏}‏ ‏”‏ ‏.‏ ثُمَّ قَالَ ‏”‏ أَتَدْرُونَ مَا الْكَوْثَرُ ‏”‏ ‏.‏ فَقُلْنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ ‏.‏ قَالَ ‏”‏ فَإِنَّهُ نَهْرٌ وَعَدَنِيهِ رَبِّي عَزَّ وَجَلَّ عَلَيْهِ خَيْرٌ كَثِيرٌ هُوَ حَوْضٌ تَرِدُ عَلَيْهِ أُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ آنِيَتُهُ عَدَدُ النُّجُومِ فَيُخْتَلَجُ الْعَبْدُ مِنْهُمْ فَأَقُولُ رَبِّ إِنَّهُ مِنْ أُمَّتِي ‏.‏ فَيَقُولُ مَا تَدْرِي مَا أَحْدَثَتْ بَعْدَكَ ‏”‏ ‏.‏ زَادَ ابْنُ حُجْرٍ فِي حَدِيثِهِ بَيْنَ أَظْهُرِنَا فِي الْمَسْجِدِ ‏.‏ وَقَالَ ‏”‏ مَا أَحْدَثَ بَعْدَكَ ‏”‏ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আনাস বলেন: একদিন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মধ্যে ছিলেন। তিনি অল্প সময় তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেন; তারপর হাসিমুখে মাথা তুললেন। আমরা বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, কী আপনাকে হাসিয়েছে?” তিনি বললেন, “আমার ওপর এইমাত্র একটি সূরা নাজিল হয়েছে।” তারপর পড়লেন: “পরম করুণাময়, দয়ালু আল্লাহর নামে। নিশ্চয় আমরা তোমাকে কাউসার দিয়েছি। অতএব তোমার রবের জন্য নামাজ পড়ো এবং কোরবানি করো। নিশ্চয় তোমার শত্রুই নির্বংশ।” তারপর বললেন, “তোমরা কি জান কাউসার কী?” আমরা বললাম, “আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অধিক জানেন।” তিনি বললেন, “এটি একটি নদী, যা আমার রব আমার জন্য অঙ্গীকার করেছেন। তাতে অনেক কল্যাণ রয়েছে। এটি এমন একটি হাউয, যেখানে কিয়ামতের দিনে আমার উম্মত আসবে। তার পাত্রগুলোর সংখ্যা নক্ষত্রের সমান। তাদের মধ্য থেকে এক বান্দাকে সরিয়ে নেওয়া হবে। তখন আমি বলব, ‘হে রব, সে তো আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত।’ বলা হবে, ‘তুমি জান না, তোমার পরে সে কী নতুন কাজ করেছে।’” ইবন হুজর তাঁর বর্ণনায় “আমাদের মধ্যে মসজিদে” কথাটি যোগ করেছেন; আর বলেছেন, “তোমার পরে সে কী নতুন কাজ করেছে।”

কুরতুবি কাউসারের এই হাদিসকে ইবন মুবারক ও শাফেয়ির একটি মতের দলিল হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। সদ্য নাজিল হওয়া সূরা ঘোষণা করে বিসমিল্লাহসহ পাঠ করা এবং বিসমিল্লাহকে সূরার অভ্যন্তরীণ আয়াত হিসেবে গণনা করা—এই দুইয়ের সম্পর্কই তাদের ব্যাখ্যার বিষয়। বিপরীত অবস্থানে একই বিসমিল্লাহকে সূচনার আলাদা বাক্য বা স্বতন্ত্র আয়াত ধরা হয়েছে। অর্থাৎ বর্ণিত পাঠের শব্দে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নটি পরবর্তী ব্যাখ্যা ছাড়া মিটে যায়নি। কোন সীমায় সূরার নিজস্ব পাঠ শুরু হবে, তা নিয়েই বিরোধ রয়ে গেছে।

সূরার সীমানা চেনার চিহ্ন হিসেবে বিসমিল্লাহর ভূমিকা ইবনে আব্বাসের আরেক বর্ণনায় এসেছে। আবু দাউদের ৭৮৭ নম্বরে বারাআতের সম্পর্ক অনির্দিষ্ট থেকে যাওয়ার কথা এবং নামল নাজিলের আগে বিসমিল্লাহ না-লেখার বর্ণনা আছে; ৭৮৮ নম্বরে বিসমিল্লাহ নাজিল হলে সূরার বিভাজন চেনার কথা বলা হয়েছে। বাংলা সংস্করণের সংশ্লিষ্ট সম্পূর্ণ উদ্ধৃতিতে পরবর্তী অনুচ্ছেদের শিরোনাম এবং অনুবাদকের টীকাও রয়েছে: [730] [743]

৭৮৭। যিয়াদ ইব্‌ন আইউব- ইব্‌ন আব্বাস (রা) থেকে এই সূত্রেও পূর্বোক্ত হাদীছের অনুরূপ বর্ণিত আছে। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম আমাদের মধ্য হতে বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু তিনি সূরা বারাআত সূরা আনফালের অন্তর্ভুক্ত কি না- এ সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে কিছুই বলেননি।
ইমাম আবু দাউদ (রহ) বলেন, শাবী, আবু মালিক, কাতাদা ও ছাবেত বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের উপর সুরা নাম্ল অবতীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত (কোন সূরার প্রারম্ভে) বিস্মিল্লাহ লিখেন নি।১
۷۸۸- حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ وَأَحْمَدُ بْنُ مُحَمَّدٍ الْمَرْوَزِي وَابْنُ السَّرْحِ قَالُوا نَا سُفْيَانُ عَنْ عَمْرُو عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ قَالَ قُتَيْبَةُ فِيْهِ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَعْرِفُ فَصْلَ السُّورَةِ حَتَّى تَنْزِلَ عَلَيْهِ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيمِ وَهَذَا لَفْظُ ابْنِ السَّرْحِ –
৭৮৮। কুতায়বা ইব্‌ন সাঈদ ইব্‌ন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের উপর বিস্মিল্লাহির রহমানির রাহীম নাযিল না হওয়া পর্যন্ত কোনো সূরার সমাপ্তি বা বিভাজন চিনতে পারতেন না। হাদীছের এই পাঠ ইবনুস সারহ-এর।
۱۳۲ . بَابُ تَخْفِيفِ الصَّلوةَ لِلأَمْرِ يَحدُثُ
১৩২. অনুচ্ছেদঃ কোন অনিবার্য কারণ বশতঃ নামায সংক্ষিপ্ত করা
১। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, “বিসমিল্লাহ” সূরা নামল-এর আয়াত, অন্য কোন সূরার আয়াত নয়।

সুরা তওবা সুরা আনফালের অংশ
সুরা তওবায় বিসমিল্লাহ নেই

উদ্ধৃতির শেষের টীকা অনুবাদকের সিদ্ধান্ত: বিসমিল্লাহ শুধু নামলের আয়াত। কুরতুবির সংকলিত মতভেদে তার বিপরীতে ফাতিহা বা প্রত্যেক সূরার আয়াত বলার অবস্থানও রয়েছে। অনুবাদকের টীকা হাদিসের মূল বক্তার ঘোষণা হয়ে যায় না। হাদিসের “ফাসলুস সূরা” অংশটি সূরার সমাপ্তি বা বিভাজন চেনার বিষয়ে; নতুন বিসমিল্লাহ আগের সূরার সমাপ্তি ও পরেরটির শুরু আলাদা করে। ফলে এই বাক্যের মূল তথ্য একটি বিভাজক চিহ্নের কাজ, আর তা থেকে নির্দিষ্ট মাজহাবের আয়াতসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত একটি পরবর্তী ব্যাখ্যা।

কুরতুবি সূচনাবাক্য লেখার বিবর্তন নিয়েও শা’বী ও আ’মাশের নামে একটি বিবরণ এনেছেন। সেখানে প্রথমে “বিসমিকা আল্লাহুম্মা”, পরে “বিসমিল্লাহ”, তারপর “বিসমিল্লাহির রাহমান” এবং শেষে পূর্ণ “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” ব্যবহারের কথা রয়েছে। নির্দিষ্ট আয়াত নাজিল হওয়ার সঙ্গে লেখার রূপ বদলানোকে এই বর্ণনা যুক্ত করেছে। তাঁর সংকলিত ধারাবাহিক বিবরণ: [744]

الثالثة : روى الشعبي والأعمش أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يكتب ( باسمك اللهم ) حتى أمر أن يكتب ( بسم الله ) فكتبها ; فلما نزلت : قل ادعوا الله أو ادعوا الرحمن [ الإسراء : 110 ] كتب ( بسم الله الرحمن ) فلما نزلت : إنه من سليمان وإنه بسم الله الرحمن الرحيم [ النمل : 30 ] كتبها .

বাংলা অনুবাদ: শা’বী ও আ’মাশ বর্ণনা করেছেন: আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম “বিসমিকা আল্লাহুম্মা” লিখতেন। পরে “বিসমিল্লাহ” লেখার নির্দেশ হলে তিনি তা লিখলেন। “বলো, আল্লাহ বলে ডাকো অথবা রাহমান বলে ডাকো” নাজিল হলে “বিসমিল্লাহির রাহমান” লিখলেন। তারপর “এটি সুলাইমানের পক্ষ থেকে, এবং এটি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” নাজিল হলে তিনি পূর্ণ বাক্যটি লিখলেন।

তাওবার শুরুতে বিসমিল্লাহ না-থাকার জন্য সুয়ূতি আলীর নামে ভিন্ন ধরনের একটি ব্যাখ্যাও উদ্ধৃত করেছেন: বিসমিল্লাহ নিরাপত্তার ঘোষণা, আর বারাআত তরবারিসহ নাজিল হয়েছে। এটি উসমানের বিষয়গত সাদৃশ্য দেখে অনুমান করার ব্যাখ্যার সঙ্গে এক ধরনের যুক্তি নয়। একটি বক্তৃতার বিষয়বস্তু থেকে সূচনাবাক্য উপযুক্ত কি না তা ব্যাখ্যা করে, অন্যটি দুটি রচনার সম্পর্ক সম্পর্কে সংকলকের সিদ্ধান্ত বর্ণনা করে। আলীর নামে উদ্ধৃত বক্তব্যটি হলো: [745]

وَفِي الْمُسْتَدْرَكِ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ سَأَلْتُ عَلِيَّ بْنَ أَبِي طَالِبٍ: لِمَ لَمْ تُكْتَبْ فِي بَرَاءَةٌ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ؟ قَالَ: لأنها أمان وبراءة نُزِّلَتْ بِالسَّيْفِ.

বাংলা অনুবাদ: আল-মুস্তাদরাকে ইবনে আব্বাস থেকে রয়েছে। তিনি বলেন: আমি আলী ইবন আবি তালিবকে জিজ্ঞেস করলাম, “বারাআতে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম লেখা হলো না কেন?” তিনি বললেন, “কারণ এটি নিরাপত্তা; আর বারাআত তরবারিসহ নাজিল হয়েছে।”

একই অনুপস্থিত পঙ্‌ক্তির সঙ্গে তাই একাধিক ব্যাখ্যার ইতিহাস যুক্ত হয়েছে। উসমানের নামে অনুমান ও সংকলন-সিদ্ধান্ত, আলীর নামে নিরাপত্তা ও যুদ্ধের বিষয়গত ব্যাখ্যা, আর সূরার বিভাজক হিসেবে বিসমিল্লাহর বর্ণনা—এসব সূত্র ভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। বর্তমান মুসহাফে তাওবার সামনে বিসমিল্লাহ নেই; সেই দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যটি নির্দিষ্ট। কিন্তু তার কারণ, ফাতিহায় একই বাক্যের আয়াতগত পরিচয় এবং অন্য সূরার সামনে তার অবস্থান—এসব নির্ধারণে মানবীয় ব্যাখ্যার বিরোধ থেকে গেছে। গৃহীত মুসহাফ এক রূপে প্রচলিত হলেও তার প্রতিটি সীমারেখার পেছনে একক ও সর্বসম্মত ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।


রজমের আয়াত: উমরের ঘোষণা, মুসহাফে অনুপস্থিতি ও বহাল মৃত্যুদণ্ড

রজমের বর্ণনায় কোরআনের সংরক্ষণ ও ইসলামী দণ্ডবিধির মধ্যে একটি মৌলিক বিচ্ছেদ প্রকাশ পায়। উমর বলেছেন, পাথর মেরে হত্যার আয়াত নাজিল হয়েছিল, তাঁরা তা পড়েছিলেন এবং আয়ত্ত করেছিলেন। বর্তমান মুসহাফে সেই আয়াত নেই। অথচ একই বর্ণনাপরম্পরা শাস্তিটিকে আল্লাহর নাজিল করা ফরজ বলে বহাল রেখেছে। পাঠ হারিয়ে যাওয়ার পর আইন অকার্যকর হয়েছে—এমন পরিণতি এখানে ঘটেনি; গ্রন্থে পাঠের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও মানুষের জীবন নেওয়ার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে হাদিস, সাহাবির সাক্ষ্য ও পরবর্তী ফিকহের মাধ্যমে।

উমরের উদ্বেগও এই বিচ্ছেদকে কেন্দ্র করেই: পরবর্তী মানুষ কিতাব খুলে রজমের আয়াত পাবে না এবং শাস্তিটি অস্বীকার করবে। অন্য বর্ণনায় তিনি নিজে আয়াত লিখে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, কিন্তু মানুষ কিতাবে বৃদ্ধি করার অভিযোগ তুলবে বলে থেমেছেন। উবাইয়ের স্মৃতিতে একই পাঠ আহযাবের অন্তর্গত; তার বর্ণিত ভাষাও এক রকম নয়। আয়াতের আদি মর্যাদা, গ্রন্থে না-থাকার কারণ এবং অনুপস্থিত বাক্যের নামে বহাল মৃত্যুদণ্ড—এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সংকলন ও ধর্মীয় আইনের কর্তৃপক্ষদের সিদ্ধান্ত পাশাপাশি দৃশ্যমান হয়।


নাজিল, পাঠ ও সংরক্ষণের বিষয়ে উমরের ভাষণ

ইবনে আব্বাসের সূত্রে মুসলিমে সংরক্ষিত ভাষণে উমর মুহাম্মদের মিম্বরে বসে বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে রজমকে শুধু কোনো প্রচলিত বিচাররীতি বলা হয়নি; একে নাজিল হওয়া আয়াত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। “আমরা পাঠ করেছি”, “স্মরণ রেখেছি” এবং “হৃদয়ঙ্গম করেছি”—এই তিনটি ক্রিয়া পূর্বে পঠিত একটি বক্তব্যের পরিচয় বহন করে। তারপর তিনি মুহাম্মদের আমলে এবং তাঁর মৃত্যুর পরে সেই শাস্তি কার্যকর করার কথা বলেছেন। পূর্ণ হাদিসটি হলো: [746] [747] [748] [749]

يَقُولُ قَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ وَهُوَ جَالِسٌ عَلَى مِنْبَرِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِنَّ اللَّهَ قَدْ بَعَثَ مُحَمَّدًا صلى الله عليه وسلم بِالْحَقِّ وَأَنْزَلَ عَلَيْهِ الْكِتَابَ فَكَانَ مِمَّا أُنْزِلَ عَلَيْهِ آيَةُ الرَّجْمِ قَرَأْنَاهَا وَوَعَيْنَاهَا وَعَقَلْنَاهَا فَرَجَمَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَرَجَمْنَا بَعْدَهُ فَأَخْشَى إِنْ طَالَ بِالنَّاسِ زَمَانٌ أَنْ يَقُولَ قَائِلٌ مَا نَجِدُ الرَّجْمَ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَيَضِلُّوا بِتَرْكِ فَرِيضَةٍ أَنْزَلَهَا اللَّهُ وَإِنَّ الرَّجْمَ فِي كِتَابِ اللَّهِ حَقٌّ عَلَى مَنْ زَنَى إِذَا أَحْصَنَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ إِذَا قَامَتِ الْبَيِّنَةُ أَوْ كَانَ الْحَبَلُ أَوْ الاِعْتِرَافُ ‏.‏ L63: Reference | : Sahih Muslim 1691a L64: In-book reference | : Book 29, Hadith 21

বাংলা অনুবাদ: সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৩০। অপরাধের (নির্ধারিত) শাস্তি
পরিচ্ছদঃ ৪. ব্যভিচারের জন্য বিবাহিতকে রজম করা
৪৩১০-(১৫/১৬৯১) আবূ তাহির ও হারমালাহ্ ইবনু ইয়াহইয়াহ্ (রহঃ) ….. ‘আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, “উমর ইবনু খাত্তাব (রাযিঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মিম্বারের উপর বসা অবস্থায় বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সত্য দীনসহ পাঠিয়েছেন এবং তার উপর কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহর নাযিলকৃত বিষয়ের মধ্যে آيَةُ الرَّجْمِ (ব্যভিচারের জন্য পাথর নিক্ষেপের আয়াত) রয়েছে। তা আমরা পাঠ করেছি, স্মরণ রেখেছি এবং হৃদয়ঙ্গম করেছি। সুতরাং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যভিচারের জন্য রজম করার হুকুম বাস্তবায়ন করেছেন। তার পরবর্তী সময়ে আমরাও (ব্যভিচারের জন্য) রজমের হুকুম বাস্তবায়িত করেছি। আমি ভয় করছি যে, দীর্ঘদিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর কেউ এ কথা হয়তো বলবে যে, আমরা আল্লাহর কিতাবে (ব্যভিচারের শাস্তি) রজমের নির্দেশ পাই না। তখন আল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত এ ফরয কাজটি পরিত্যাগ করে তারা মানুষদেরকে পথভ্রষ্ট করে ফেলবে। নিশ্চয়ই আল্লাহর কিতাবে বিবাহিত নর-নারীর ব্যভিচারের শাস্তি رجم (পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা) এর হুকুম সাব্যস্ত। যখন সাক্ষ্য দ্বারা তা প্রমাণিত হয়, কিংবা গর্ভবতী হয়, অথবা সে নিজে স্বীকার করে।* (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪২৭১, ইসলামিক সেন্টার ৪২৭১)
* এ আয়াতটি তিলাওয়াত মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে কিন্তু আয়াতটির হুকুম এখনো বহাল রয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

হাদিসের পরে বাংলা সংস্করণে তিলাওয়াত রহিত এবং হুকুম বহাল থাকার টীকা দেওয়া হয়েছে। উমরের সরাসরি ভাষণের সঙ্গে এই টীকার বক্তা আলাদা। ভাষণে আছে পূর্বে নাজিল ও পঠিত হওয়ার দাবি, রজম কার্যকর করার খবর এবং ভবিষ্যতে কিতাবে না-পেয়ে শাস্তি বর্জনের আশঙ্কা। টীকায় সেই অবস্থার ধর্মতাত্ত্বিক শ্রেণিবিভাগ করা হয়েছে। আয়াতের অভ্যন্তরীণ শব্দ, কোন দিনে তার পাঠ প্রত্যাহার করা হলো কিংবা কে সেই প্রত্যাহারের নির্দেশ শুনেছিল—এই নির্দিষ্ট তথ্যগুলো উমরের উদ্ধৃত বক্তব্যে দেওয়া হয়নি।

উমরের ভাষণের তথ্যবর্ণিত বক্তব্যতার নির্দিষ্ট তাৎপর্য
নাজিলআল্লাহর নাজিলকৃত বিষয়ের মধ্যে রজমের আয়াত ছিলবক্তব্যটি পূর্ববর্তী কোরআনি পাঠ হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে
পাঠ ও ধারণআমরা তা পড়েছি, স্মরণ রেখেছি, হৃদয়ঙ্গম করেছিশুধু শাস্তির ধারণা নয়; পড়ার উপযোগী একটি পাঠের দাবি
প্রয়োগমুহাম্মদ রজম করেছেন; তাঁর পরে আমরাও করেছিপাঠের স্মৃতির সঙ্গে দণ্ড কার্যকরের পরম্পরা যুক্ত
অনুপস্থিতিকেউ বলবে, কিতাবে রজম পাওয়া যাচ্ছে নাপরবর্তী লিখিত কিতাব থেকে শাস্তির ভিত্তি যাচাইয়ের সংকট
বাধ্যতামূলকতারজম ত্যাগ করলে নাজিল করা ফরজ ত্যাগ করা হবেঅনুপস্থিত পাঠের বিধান বহাল রাখার দাবি

বুখারির দীর্ঘ বর্ণনায় এই ভাষণের সামাজিক ও রাজনৈতিক আয়োজনও আছে। উমর শেষ হজের সময় জনসমক্ষে কথা বলতে চেয়েছিলেন; আবদুর রহমান ইবন আওফ তাঁকে মদিনায় ফিরে বক্তব্য দিতে বলেন। যুক্তি ছিল, হজের ভিড়ে এমন লোকও আছে যারা বক্তব্য বুঝবে না এবং ভুলভাবে ছড়াবে। মদিনার জ্ঞানী ও অভিজাতদের উপস্থিতিতে বললে তা যথাস্থানে গৃহীত হবে। ভাষণটি তাই বিচ্ছিন্ন স্মৃতিচারণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি; প্রচারের শ্রোতা, স্থান ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পরিকল্পনার মধ্যে এসেছে। রজমের ঘোষণা সেই প্রকাশ্য বক্তব্যের অংশ।

মুসনাদে আহমদের বর্ণনায় মিম্বরে ওঠার পর উমর নিজের বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশও দেন। রজমের আয়াত সম্পর্কে তাঁর স্মৃতি পরবর্তী এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব শ্রোতাদের ওপর চাপানো হয়েছে। মূল বর্ণনার সংশ্লিষ্ট ধারাবাহিক অংশ: [750] [751]

فَلَمْ أَنْشَبْ أَنْ طَلَعَ عُمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ فَلَمَّا رَأَيْتُهُ قُلْتُ لَيَقُولَنَّ الْعَشِيَّةَ عَلَى هَذَا الْمِنْبَرِ مَقَالَةً مَا قَالَهَا عَلَيْهِ أَحَدٌ قَبْلَهُ قَالَ فَأَنْكَرَ سَعِيدُ بْنُ زَيْدٍ ذَلِكَ فَقَالَ مَا عَسَيْتَ أَنْ يَقُولَ مَا لَمْ يَقُلْ أَحَدٌ فَجَلَسَ عُمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَلَى الْمِنْبَرِ فَلَمَّا سَكَتَ الْمُؤَذِّنُ قَامَ فَأَثْنَى عَلَى اللَّهِ بِمَا هُوَ أَهْلُهُ ثُمَّ قَالَ أَمَّا بَعْدُ أَيُّهَا النَّاسُ فَإِنِّي قَائِلٌ مَقَالَةً قَدْ قُدِّرَ لِي أَنْ أَقُولَهَا لَا أَدْرِي لَعَلَّهَا بَيْنَ يَدَيْ أَجَلِي فَمَنْ وَعَاهَا وَعَقَلَهَا فَلْيُحَدِّثْ بِهَا حَيْثُ انْتَهَتْ بِهِ رَاحِلَتُهُ وَمَنْ لَمْ يَعِهَا فَلَا أُحِلُّ لَهُ أَنْ يَكْذِبَ عَلَيَّ إِنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى بَعَثَ مُحَمَّدًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْحَقِّ وَأَنْزَلَ عَلَيْهِ الْكِتَابَ وَكَانَ مِمَّا أَنْزَلَ عَلَيْهِ آيَةُ الرَّجْمِ فَقَرَأْنَاهَا وَوَعَيْنَاهَا وَرَجَمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَرَجَمْنَا بَعْدَهُ فَأَخْشَى إِنْ طَالَ بِالنَّاسِ زَمَانٌ أَنْ يَقُولَ قَائِلٌ لَا نَجِدُ آيَةَ الرَّجْمِ فِي كِتَابِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فَيَضِلُّوا بِتَرْكِ فَرِيضَةٍ قَدْ أَنْزَلَهَا اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ فَالرَّجْمُ فِي كِتَابِ اللَّهِ حَقٌّ عَلَى مَنْ زَنَى إِذَا أُحْصِنَ مِنْ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ إِذَا قَامَتْ الْبَيِّنَةُ أَوْ الْحَبَلُ أَوْ الِاعْتِرَافُ

বাংলা অনুবাদ: মুসনাদে আহমাদ
মুসনাদে উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) [উমারের বর্ণিত হাদীস]
পরিচ্ছেদঃ
৩৯১।
কিছুক্ষণ পরেই উমার (রাঃ) আবির্ভূত হলেন। আমি তাকে দেখেই বললাম, আজ সন্ধ্যায় উনি এমন এক ভাষণ দেবেন, যা তার আগে আর কেউ দেয়নি। সাঈদ ইবন যায়েদ এ কথা অস্বীকার করে বললেন, তিনি এমন কী বলবেন যা আর কেউ বলেনি? এরপর উমার (রাঃ) মিম্বারে বসলেন। মুয়াযযিনের আযান দেয়া শেষ হলে উমার দাঁড়ালেন এবং আল্লাহর যথোপযুক্ত প্রশংসা করলেন। তারপর বললেনঃ হে জনতা, আমি আজ এমন একটা কথা বলতে যাচ্ছি, যা বলা আমার জন্য নির্ধারিত হয়েছে। জানিনা, হয়তো আমার আয়ুষ্কালের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েই এটা বলতে পারছি। যারা আমার এ বক্তব্যকে মনে রাখবে ও বুঝবে, তারা যেন তাদের যাত্রার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত গিয়েও তা প্রচার করে। আর যে মনে রাখতে পারবে না ও বুঝবে না সে আমার নামে মিথ্যা প্রচার করুক -এটা আমি অনুমোদন করি না।
নিশ্চয় আল্লাহ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সত্যসহকারে পাঠিয়েছেন এবং তার ওপর কিতাব নাযিল করেছেন। তার ওপর যা কিছু নাযিল করেছেন, রজম সংক্রান্ত আয়াতও তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমরা তা পড়েছি ও বুঝেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও রজম করেছেন, তার পরে আমরাও করেছি। আমার আশঙ্কা হয় যে, দীর্ঘকাল অতিবাহিত হবার পর এক সময় লোকেরা বলতে পারে, আল্লাহর কিতাবে আমরা রজম সংক্রান্ত আয়াত পাই না। এভাবে আল্লাহর নাযিল করা একটা ফারয বর্জন করে তারা বিপথগামী হয়ে যাবে। বস্তুতঃ বিবাহিত নারী ও পুরুষ ব্যভিচার করলে তার ওপর রজম চালু করা আল্লাহর কিতাবের আওতাভুক্ত একটা অকাট্য সত্য বিধি, যখন তার ওপর সাক্ষ্য, স্বীকারোক্তি বা গর্ভধারণ পাওয়া যাবে।
[বুখারী, মুসলিম, ইবনু হিব্বান, মুসনাদে আহমাদ-১৫৪, ১৫৬, ২৪৯]
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

উমরের বক্তব্যে “আমরা” শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি নিজের একক স্বপ্ন বা ব্যক্তিগত অনুমানকে আয়াত বলছেন না; একটি পঠিত ও অনুশীলিত সামষ্টিক স্মৃতির দাবি করছেন। সেই দাবির সত্যতা নির্ভর করছে বর্ণনার ওপর, কিন্তু দাবিটির প্রকৃতি স্পষ্ট। এখানে পূর্বে গ্রন্থের পাঠ হিসেবে ব্যবহৃত কিছু এবং পরে কিতাবে খুঁজে না-পাওয়া কিছু পাশাপাশি এসেছে। মানুষ কিতাব থেকে মৃত্যুদণ্ডের ভিত্তি জানতে চাইলে তাদের প্রশ্নের জবাব হিসেবে তিনি মূলত পূর্ববর্তী প্রচলন ও সাক্ষ্যের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করছেন।

বুখারির ভাষণে রজমের পরেই পিতৃপরিচয় থেকে বিমুখ না-হওয়ার আরেকটি পূর্বপঠিত বাক্য এসেছে। তারপর অতিরিক্ত প্রশংসা নিষেধ এবং রাজনৈতিক বায়আতের প্রসঙ্গ এসেছে। একই বক্তৃতার মধ্যে নাজিলের স্মৃতি, ধর্মীয় আনুগত্য ও খলিফা নির্বাচনের কর্তৃত্ব পাশাপাশি ছিল। বুখারির ওই ধারাবাহিক অংশটি হলো: [752] [753]

إِنَّ اللَّهَ بَعَثَ مُحَمَّدًا صلى الله عليه وسلم بِالْحَقِّ وَأَنْزَلَ عَلَيْهِ الْكِتَابَ فَكَانَ مِمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ آيَةُ الرَّجْمِ، فَقَرَأْنَاهَا وَعَقَلْنَاهَا وَوَعَيْنَاهَا، رَجَمَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَرَجَمْنَا بَعْدَهُ، فَأَخْشَى إِنْ طَالَ بِالنَّاسِ زَمَانٌ أَنْ يَقُولَ قَائِلٌ وَاللَّهِ مَا نَجِدُ آيَةَ الرَّجْمِ فِي كِتَابِ اللَّهِ، فَيَضِلُّوا بِتَرْكِ فَرِيضَةٍ أَنْزَلَهَا اللَّهُ، وَالرَّجْمُ فِي كِتَابِ اللَّهِ حَقٌّ عَلَى مَنْ زَنَى إِذَا أُحْصِنَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ، إِذَا قَامَتِ الْبَيِّنَةُ أَوْ كَانَ الْحَبَلُ أَوْ الاِعْتِرَافُ، ثُمَّ إِنَّا كُنَّا نَقْرَأُ فِيمَا نَقْرَأُ مِنْ كِتَابِ اللَّهِ أَنْ لاَ تَرْغَبُوا عَنْ آبَائِكُمْ، فَإِنَّهُ كُفْرٌ بِكُمْ أَنْ تَرْغَبُوا عَنْ آبَائِكُمْ، أَوْ إِنَّ كُفْرًا بِكُمْ أَنْ تَرْغَبُوا عَنْ آبَائِكُمْ، أَلاَ ثُمَّ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏”‏ لاَ تُطْرُونِي كَمَا أُطْرِيَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ وَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ ‏”‏‏.‏ ثُمَّ إِنَّهُ بَلَغَنِي أَنَّ قَائِلاً مِنْكُمْ يَقُولُ وَاللَّهِ لَوْ مَاتَ عُمَرُ بَايَعْتُ فُلاَنًا‏.‏ فَلاَ يَغْتَرَّنَّ امْرُؤٌ أَنْ يَقُولَ إِنَّمَا كَانَتْ بَيْعَةُ أَبِي بَكْرٍ فَلْتَةً وَتَمَّتْ أَلاَ وَإِنَّهَا قَدْ كَانَتْ كَذَلِكَ وَلَكِنَّ اللَّهَ وَقَى شَرَّهَا، وَلَيْسَ مِنْكُمْ مَنْ تُقْطَعُ الأَعْنَاقُ إِلَيْهِ مِثْلُ أَبِي بَكْرٍ، مَنْ بَايَعَ رَجُلاً عَنْ غَيْرِ مَشُورَةٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ فَلاَ يُبَايَعُ هُوَ وَلاَ الَّذِي بَايَعَهُ تَغِرَّةً أَنْ يُقْتَلاَ، وَإِنَّهُ قَدْ كَانَ مِنْ خَبَرِنَا حِينَ تَوَفَّى اللَّهُ نَبِيَّهُ صلى الله عليه وسلم إِلاَّ أَنَّ الأَنْصَارَ خَالَفُونَا وَاجْتَمَعُوا بِأَسْرِهِمْ فِي سَقِيفَةِ بَنِي سَاعِدَةَ، وَخَالَفَ عَنَّا عَلِيٌّ وَالزُّبَيْرُ وَمَنْ مَعَهُمَا، وَاجْتَمَعَ الْمُهَاجِرُونَ إِلَى أَبِي بَكْرٍ

বাংলা অনুবাদ: নিশ্চয় আল্লাহ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন এবং তাঁর ওপর কিতাব নাজিল করেছেন। আল্লাহর নাজিল করা বিষয়ের মধ্যে রজমের আয়াত ছিল। আমরা তা পড়েছি, বুঝেছি ও আয়ত্ত করেছি। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রজম করেছেন এবং তাঁর পরে আমরাও করেছি। আমি আশঙ্কা করি, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলে কেউ বলবে, “আল্লাহর কসম, আমরা আল্লাহর কিতাবে রজমের আয়াত পাই না।” ফলে আল্লাহর নাজিল করা ফরজ ত্যাগ করে তারা পথভ্রষ্ট হবে। পুরুষ বা নারীর মধ্যে যে ব্যক্তি বিবাহিত হওয়ার পরে ব্যভিচার করে, তার ওপর আল্লাহর কিতাবে রজম সত্য; যখন সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, অথবা গর্ভধারণ অথবা স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়। আমরা আল্লাহর কিতাবের পাঠের মধ্যে এটিও পড়তাম: “তোমরা নিজেদের পিতাদের থেকে বিমুখ হয়ো না; নিজেদের পিতাদের থেকে বিমুখ হওয়া তোমাদের জন্য কুফরি।” অথবা বলেছেন, “নিশ্চয় নিজেদের পিতাদের থেকে বিমুখ হওয়া তোমাদের জন্য কুফরি।” জেনে রাখো, আল্লাহর রাসুল বলেছেন, “আমার অতিরিক্ত প্রশংসা করো না, যেমন ঈসা ইবন মরিয়ামের অতিরিক্ত প্রশংসা করা হয়েছে; বরং বলো, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল।” আমার কাছে পৌঁছেছে, তোমাদের একজন বলছে, “আল্লাহর কসম, উমর মারা গেলে আমি অমুকের হাতে বায়আত করব।” কেউ যেন এই বলে ধোঁকায় না পড়ে যে, আবু বকরের বায়আত আকস্মিক ঘটনা ছিল এবং সম্পন্ন হয়ে গেছে। জেনে রাখো, তা এমনই ছিল; কিন্তু আল্লাহ তার অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেছেন। তোমাদের মধ্যে আবু বকরের মতো এমন কেউ নেই, যার দিকে মানুষের ঘাড় প্রসারিত হয়। মুসলিমদের পরামর্শ ছাড়া কেউ কোনো ব্যক্তির হাতে বায়আত করলে, তার এবং যার হাতে বায়আত করেছে তার—কারও বায়আত অনুসরণ করা হবে না; উভয়ের নিহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের ঘটনাটি ছিল এই যে, আল্লাহ যখন তাঁর নবীকে মৃত্যু দিলেন, আনসাররা আমাদের থেকে পৃথক হয়ে সবাই বনি সাঈদার সাকিফায় একত্র হলেন। আলী, যুবাইর ও তাঁদের সঙ্গীরা আমাদের থেকে পৃথক ছিলেন; আর মুহাজিররা আবু বকরের কাছে একত্র হলেন।

এই দীর্ঘ বক্তব্যে রজমের পক্ষে যুক্তির ধাপ হলো: মুহাম্মদ সত্যসহ প্রেরিত, তাঁর ওপর কিতাব নাজিল হয়েছে, তার মধ্যে রজমের আয়াত ছিল, তা পাঠ ও প্রয়োগ করা হয়েছে; অতএব পরবর্তী প্রজন্মকে শাস্তিটি চালু রাখতে হবে। লিখিত মুসহাফে ওই নির্দিষ্ট পাঠের উপস্থিতি এই যুক্তির কার্যকর শর্ত হয়ে থাকেনি। বরং লিখিত পাঠ না-পেয়েও পূর্বসূরিদের বক্তব্য মেনে নেওয়াই আনুগত্যের মানদণ্ড হয়েছে। নাজিলের স্মৃতি এখানে অনুপস্থিত আয়াতের স্থলাভিষিক্ত একটি কর্তৃত্ব হিসেবে কাজ করে।


“মানুষ বৃদ্ধি বলবে” আশঙ্কা এবং আয়াত লিখে দেওয়ার ইচ্ছা

উমরের ভাষণের একটি বর্ণনায় তিনি নিজে আয়াত লিখে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তাঁর ঘোষিত প্রতিবন্ধক মানুষের সম্ভাব্য অভিযোগ: উমর আল্লাহর কিতাবে বৃদ্ধি করেছেন। এই বাক্যে খলিফার ব্যক্তিগত নিশ্চিতি ও একটি গ্রন্থে নতুন পাঠ লেখার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আলাদা হয়ে যায়। তিনি আয়াত নাজিল হওয়া ও পড়ার কথা নিশ্চিতভাবে বলছেন, আবার লিখে দিলে তা অনধিকার সংযোজন হিসেবে গণ্য হওয়ার আশঙ্কাও করছেন। আবু দাউদের পূর্ণ বর্ণনাটি এই দুই অবস্থাকে একই বক্তব্যে রেখেছে। [754] [755] [756]

أَنَّ عُمَرَ، – يَعْنِي ابْنَ الْخَطَّابِ – رضى الله عنه خَطَبَ فَقَالَ إِنَّ اللَّهَ بَعَثَ مُحَمَّدًا صلى الله عليه وسلم بِالْحَقِّ وَأَنْزَلَ عَلَيْهِ الْكِتَابَ فَكَانَ فِيمَا أَنْزَلَ عَلَيْهِ آيَةُ الرَّجْمِ فَقَرَأْنَاهَا وَوَعَيْنَاهَا وَرَجَمَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَرَجَمْنَا مِنْ بَعْدِهِ وَإِنِّي خَشِيتُ – إِنْ طَالَ بِالنَّاسِ الزَّمَانُ – أَنْ يَقُولَ قَائِلٌ مَا نَجِدُ آيَةَ الرَّجْمِ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَيَضِلُّوا بِتَرْكِ فَرِيضَةٍ أَنْزَلَهَا اللَّهُ تَعَالَى فَالرَّجْمُ حَقٌّ عَلَى مَنْ زَنَى مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ إِذَا كَانَ مُحْصَنًا إِذَا قَامَتِ الْبَيِّنَةُ أَوْ كَانَ حَمْلٌ أَوِ اعْتِرَافٌ وَايْمُ اللَّهِ لَوْلاَ أَنْ يَقُولَ النَّاسُ زَادَ عُمَرُ فِي كِتَابِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ لَكَتَبْتُهَا ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ অপরাধ ও তার শাস্তি
পাবলিশারঃ আল্লামা আলবানী একাডেমী
পরিচ্ছদঃ ২৩. রজম সম্পর্কে
৪৪১৮। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) তার ভাষণে বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সত্য দীনসহ পাঠিয়েছেন এবং তাঁর উপর কিতাব নাযিল করেছেন। আর তিনি তাঁর উপর যা নাযিল করেছেন, রজম সংক্রান্ত আয়াত তার অন্তর্ভুক্ত। আমরা তা পাঠ করেছি এবং সংরক্ষণ করেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজম করেছেন আর আমরাও তাঁর পরে রজম করেছি। তবে আমার আশঙ্কা হচ্ছে, কাল প্রবাহের দীর্ঘতায় কেউ হয় তো বলবে, আমরা তো আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবে রজমের আয়াত পাইনি।
ফলে তারা আল্লাহর নাযিলকৃত একটা ফরজ পরিত্যাগ করে পথভ্রষ্ট হবে।
জেনে রাখো বিবাহিত নারী-পুরুষ ব্যভিচারের অপরাধে দায়ী প্রমাণিত হলে অথবা অন্তঃসত্তা হলে অথবা স্বীকারোক্তি করলে তাদেরকে রজম করা অবধারিত। আল্লাহর কসম! লোকেরা যদি একথা না বলতো যে, উমার আল্লাহর কিতাবে কিছু বর্ধিত করেছেন। তাহলে আমি অবশ্যই এ আয়াত লিখে দিতাম।(1)
সহীহ।
(1). বুখারী, মুসলিম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এই বর্ণনায় “লিখতাম” ক্রিয়াটি একটি বাস্তব কাজের ইচ্ছা প্রকাশ করছে। মানুষের অভিযোগের সম্ভাবনা সেই কাজের শর্ত হিসেবে এসেছে। কিতাবে নেই বলে একটি বিধান অস্বীকার করার আশঙ্কা দূর করার জন্য উমরের প্রস্তাবিত উপায় ছিল আয়াতটি লিখে দেওয়া; অথচ তা লিখলে কিতাবের সীমানা অতিক্রম করার অভিযোগ উঠতে পারে। তাই সমস্যাটি শুধু তাঁর মনে আয়াত আছে কি না নয়। ব্যক্তিগত স্মৃতিকে কোন প্রক্রিয়ায় সমষ্টির মান্য কিতাবে রূপান্তর করা যায়, সেই কর্তৃত্ব এখানে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

আহমদের ৩৫২ নম্বর বর্ণনায় আপত্তিটি আরও প্রত্যক্ষ: কিছু লোক বলছে, আল্লাহর কিতাবে তো বেত্রাঘাতই আছে। এখানে ভবিষ্যতের কল্পিত আপত্তির পাশাপাশি সমকালীন বক্তব্যও বর্ণিত হয়েছে। উমরের জবাবের শেষে রয়েছে, অভিযোগের ভয় না-থাকলে তিনি পাঠটি যেভাবে নাজিল হয়েছিল সেভাবেই লিখে দিতেন। [757] [758]

قَالَ حَجَّ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ فَأَرَادَ أَنْ يَخْطُبَ النَّاسَ خُطْبَةً فَقَالَ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ عَوْفٍ إِنَّهُ قَدْ اجْتَمَعَ عِنْدَكَ رَعَاعُ النَّاسِ فَأَخِّرْ ذَلِكَ حَتَّى تَأْتِيَ الْمَدِينَةَ فَلَمَّا قَدِمَ الْمَدِينَةَ دَنَوْتُ مِنْهُ قَرِيبًا مِنْ الْمِنْبَرِ فَسَمِعْتُهُ يَقُولُ وَإِنَّ نَاسًا يَقُولُونَ مَا بَالُ الرَّجْمِ وَإِنَّمَا فِي كِتَابِ اللَّهِ الْجَلْدُ وَقَدْ رَجَمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَرَجَمْنَا بَعْدَهُ وَلَوْلَا أَنْ يَقُولُوا أَثْبَتَ فِي كِتَابِ اللَّهِ مَا لَيْسَ فِيهِ لَأَثْبَتُّهَا كَمَا أُنْزِلَتْ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: মুসনাদে আহমাদ
মুসনাদে উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) (উমারের বর্ণিত হাদীস)
পরিচ্ছেদঃ
৩৫২। আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রাঃ) বলেন, উমার (রাঃ) একবার হজ্জ করলেন। ঐ সময় তিনি জন সমক্ষে একটা ভাষণ দিতে চাইলেন। আবদুর রহমান ইবনে আওফ বললেন, আপনার নিকট উচ্ছৃঙ্খল জনতা উপস্থিত। এমতাবস্থায় আপনার ভাষণ দান মদীনায় আসা পর্যন্ত স্থগিত রাখুন। পরে তিনি যখন মদীনায় পৌঁছলেন, আমি তার নিকট মিম্বারের কাছেই উপস্থিত হলাম। শুনলাম, তিনি বলছেনঃ অনেকেই বলে থাকে, রজম আবার কী? আল্লাহর কিতাবে তো ব্যভিচারের শাস্তি হিসাবে কেবল বেত্ৰাঘাতেরই উল্লেখ রয়েছে। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজম (পাথর মেরে হত্যা) করেছেন এবং তার পরে আমরাও রজম করেছি। এমন আশঙ্কা যদি না থাকতো যে, মানুষ অভিযোগ তুলবে যে, উমার আল্লাহর কিতাবে এমন জিনিস সংযোজন করেছে, যা তাতে নেই, তাহলে আমি রজম সংক্রান্ত আয়াতটি যেভাবে নাযিল হয়েছে সেভাবে কুরআনে সংযোজন করতাম। (৩৯১ নং হাদীস দ্রষ্টব্য)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

“যেভাবে নাজিল হয়েছে” কথাটি অতীত পাঠকে আবার লিখিত করার দাবি বহন করে। উমর সেটিকে নিজের রচিত আইন হিসেবে উপস্থাপন করছেন না। কিন্তু পরবর্তী পাঠকের সামনে সেই ভাষা কোরআনের অংশ হিসেবে রাখা হয়নি। তাঁর বক্তব্যের ফলে একসঙ্গে দুটি তথ্য থাকে: তাঁর বর্ণনায় আয়াতটির আদি কোরআনি পরিচয়, এবং মুসহাফের মান্য অংশ হিসেবে সেটিকে লিখে দেওয়ার অমীমাংসিত বৈধতা। ঘোষিত নিশ্চিতি থাকলেও সেই নিশ্চিতি নিজে থেকেই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্তি ঘটায়নি।

মালিকের মুওয়াত্তার বর্ণনায় শেষ হজ থেকে ফেরার পরে উমরের বার্ধক্য ও শাসনভার নিয়ে প্রার্থনার কথা আছে। তারপর মদিনায় ভাষণ, রজমের প্রসঙ্গ এবং নিজের হাতে লিখে দেওয়ার ইচ্ছা এসেছে। বর্ণনাটি শেষে তাঁর মৃত্যুর সময় ও “শাইখ–শাইখা” শব্দের মালিকের ব্যাখ্যাও সংরক্ষণ করেছে। যরকানির শরহে উদ্ধৃত মুওয়াত্তার সম্পূর্ণ মতন: [759]

أَنَّهُ سَمِعَهُ يَقُولُ لَمَّا صَدَرَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ مِنْ مِنًى أَنَاخَ بِالْأَبْطَحِ ثُمَّ كَوَّمَ كَوْمَةً بَطْحَاءَ ثُمَّ طَرَحَ عَلَيْهَا رِدَاءَهُ وَاسْتَلْقَى ثُمَّ مَدَّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ فَقَالَ اللَّهُمَّ كَبِرَتْ سِنِّي وَضَعُفَتْ قُوَّتِي وَانْتَشَرَتْ رَعِيَّتِي فَاقْبِضْنِي إِلَيْكَ غَيْرَ مُضَيِّعٍ وَلَا مُفَرِّطٍ ثُمَّ قَدِمَ الْمَدِينَةَ فَخَطَبَ النَّاسَ فَقَالَ أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ سُنَّتْ لَكُمْ السُّنَنُ وَفُرِضَتْ لَكُمْ الْفَرَائِضُ وَتُرِكْتُمْ عَلَى الْوَاضِحَةِ إِلَّا أَنْ تَضِلُّوا بِالنَّاسِ يَمِينًا وَشِمَالًا وَضَرَبَ بِإِحْدَى يَدَيْهِ عَلَى الْأُخْرَى ثُمَّ قَالَ إِيَّاكُمْ أَنْ تَهْلِكُوا عَنْ آيَةِ الرَّجْمِ أَنْ يَقُولَ قَائِلٌ لَا نَجِدُ حَدَّيْنِ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَقَدْ رَجَمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَرَجَمْنَا وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْلَا أَنْ يَقُولَ النَّاسُ زَادَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ فِي كِتَابِ اللَّهِ تَعَالَى لَكَتَبْتُهَا الشَّيْخُ وَالشَّيْخَةُ فَارْجُمُوهُمَا أَلْبَتَّةَ فَإِنَّا قَدْ قَرَأْنَاهَا قَالَ مَالِكٌ قَالَ يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ قَالَ سَعِيدُ بْنُ الْمُسَيَّبِ فَمَا انْسَلَخَ ذُو الْحِجَّةِ حَتَّى قُتِلَ عُمَرُ رَحِمَهُ اللَّهُ قَالَ يَحْيَى سَمِعْت مَالِكًا يَقُولُ قَوْلُهُ الشَّيْخُ وَالشَّيْخَةُ يَعْنِي الثَّيِّبَ وَالثَّيِّبَةَ فَارْجُمُوهُمَا أَلْبَتَّةَ

বাংলা অনুবাদ: তিনি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িবকে বলতে শুনেছেন: উমর ইবনুল খাত্তাব মিনা থেকে ফেরার সময় আবতাহে উট বসালেন। ছোট পাথরের একটি স্তূপ তৈরি করে তার ওপর চাদর বিছিয়ে শুয়ে পড়লেন। তারপর আকাশের দিকে দুই হাত তুলে বললেন, “হে আল্লাহ, আমার বয়স বেড়েছে, শক্তি কমেছে এবং আমার শাসনাধীন মানুষ ছড়িয়ে পড়েছে। দায়িত্ব নষ্টকারী বা অবহেলাকারী হওয়া ছাড়াই আমাকে তোমার কাছে নিয়ে নাও।” তারপর তিনি মদিনায় এসে মানুষের সামনে ভাষণ দিলেন: “হে মানুষ, তোমাদের জন্য রীতি স্থির করা হয়েছে, ফরজ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং স্পষ্ট পথের ওপর রেখে দেওয়া হয়েছে; তোমরা মানুষকে ডানে-বাঁয়ে বিভ্রান্ত করে না-নিলে।” তিনি এক হাত অন্য হাতের ওপর মেরে বললেন, “রজমের আয়াতের ব্যাপারে ধ্বংস হওয়ার বিষয়ে সতর্ক হও—কেউ বলবে, আমরা আল্লাহর কিতাবে দুটি দণ্ড পাই না। আল্লাহর রাসুল রজম করেছেন এবং আমরাও করেছি। যার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ, মানুষ যদি না বলত, উমর ইবনুল খাত্তাব আল্লাহর কিতাবে বৃদ্ধি করেছেন, তাহলে আমি লিখে দিতাম: ‘বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা—তাদের অবশ্যই পাথর মেরে হত্যা করো।’ আমরা তা পড়েছি।” মালিক বলেন: ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ বলেছেন, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব বলেছেন, যিলহজ শেষ হওয়ার আগেই উমর নিহত হন; আল্লাহ তাঁর প্রতি দয়া করুন। ইয়াহইয়া বলেন: আমি মালিককে বলতে শুনেছি, “বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা” কথার অর্থ পূর্বে বৈবাহিক যৌনসম্পর্ক হয়েছে এমন পুরুষ ও নারী; তাদের অবশ্যই পাথর মেরে হত্যা করো।

এই মুওয়াত্তা-বর্ণনায় উমরের প্রার্থনা ও মৃত্যুর মধ্যে সময়ও নির্ধারিত হয়েছে। ফলে অভিযোগের আশঙ্কা তাঁর শাসনের শেষপর্বের সমস্যা হিসেবে উপস্থিত। প্রথম সংকলনের উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত একজন ব্যক্তি নিজের জীবনের শেষদিকে এমন একটি আয়াতের স্মৃতি দিচ্ছেন, যার লিখিত অন্তর্ভুক্তি তখনও তাঁর বক্তব্যে বিতর্কযোগ্য। “নাজিল হয়েছিল” বলা এবং “কিতাবে লেখা বৈধ হবে” নিশ্চিত করা একই স্তরের ক্ষমতা হিসেবে কাজ করেনি। তাঁর নিজের বিশ্বাস ও রাষ্ট্রের মান্য গ্রন্থে জনগণের স্বীকৃতি এখানে একত্র হয়নি।

তিরমিযীর বর্ণনার ভাষা আবার কিছুটা ভিন্ন। সেখানে শুধু “মানুষ বলবে” কথাটি নেই; উমর বলেন, আল্লাহর কিতাবে বৃদ্ধি করতে তিনি অপছন্দ করেন বলেই মুসহাফে লেখেননি। একই বক্তব্যে মুহাম্মদ, আবু বকর ও তাঁর নিজের রজম করার কথা এসেছে। তিরমিযী বর্ণনাটিকে হাসান সহিহ বলেছেন। [760]

قَالَ رَجَمَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَرَجَمَ أَبُو بَكْرٍ وَرَجَمْتُ وَلَوْلاَ أَنِّي أَكْرَهُ أَنْ أَزِيدَ فِي كِتَابِ اللَّهِ لَكَتَبْتُهُ فِي الْمُصْحَفِ فَإِنِّي قَدْ خَشِيتُ أَنْ تَجِيءَ أَقْوَامٌ فَلاَ يَجِدُونَهُ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَيَكْفُرُونَ بِهِ ‏ .‏ قَالَ وَفِي الْبَابِ عَنْ عَلِيٍّ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى حَدِيثُ عُمَرَ حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ وَرُوِيَ مِنْ غَيْرِ وَجْهٍ عَنْ عُمَرَ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: উমর বলেন: আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রজম করেছেন, আবু বকর রজম করেছেন এবং আমিও রজম করেছি। আল্লাহর কিতাবে বৃদ্ধি করতে অপছন্দ না-করলে আমি তা মুসহাফে লিখতাম। কারণ আমি আশঙ্কা করি, কিছু সম্প্রদায় আসবে যারা আল্লাহর কিতাবে তা না-পেয়ে অস্বীকার করবে। এই অধ্যায়ে আলীর বর্ণনাও আছে। আবু ঈসা বলেন: উমরের হাদিসটি হাসান সহিহ; উমর থেকে একাধিক সূত্রে এটি বর্ণিত হয়েছে।

বর্ণনালিখে না-দেওয়ার ভাষাবক্তব্যে যে দিকটি সামনে আসে
আবু দাউদ ৪৪১৮মানুষ বলবে, উমর আল্লাহর কিতাবে বৃদ্ধি করেছেনসম্ভাব্য সামাজিক অভিযোগ
আহমদ ৩৫২লোকেরা বলবে, কিতাবে যা নেই তা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছেবাইরের সংযোজন হিসেবে গণ্য হওয়ার ভয়
মুওয়াত্তা, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িবের বর্ণনামানুষ বৃদ্ধি না-বললে আমি লিখে দিতাম; আমরা তা পড়েছিপূর্বপঠিত পাঠকে পুনরায় লিখিত করার ইচ্ছা
তিরমিযী ১৪৩১কিতাবে বৃদ্ধি করতে অপছন্দ না-করলে মুসহাফে লিখতামবৃদ্ধি হিসেবে কাজটির পরিচয় সম্পর্কে নিজের আপত্তি

এই ভাষাগুলোকে এক করে দিলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হারিয়ে যায়। “মানুষ আমাকে বৃদ্ধি করার অভিযোগ করবে” সামাজিক প্রতিক্রিয়ার ভয়; “আমি বৃদ্ধি করতে অপছন্দ করি” বৃদ্ধি হিসেবে গণ্য কাজটির প্রতি নিজের অপছন্দ। উভয় বর্ণনাতেই আয়াতের অনুপস্থিতি এবং শাস্তি বর্জিত হওয়ার উদ্বেগ আছে। কিন্তু কেন তিনি লিখলেন না, তার প্রকাশভঙ্গি এক নয়। তাই সব সূত্রের বক্তব্যকে একই নিখুঁত বাক্যে পুনর্লিখন করলে বর্ণনাপরম্পরার ভেতরের এই পার্থক্য চাপা পড়ে।

বুখারির ৬৮৩০ নম্বর ও মুসলিমের ১৬৯১ নম্বর পূর্ণ বর্ণনায় মানুষের বৃদ্ধি বলার বাড়তি বাক্যটি নেই। আবু দাউদে বাক্যটি সংযুক্ত বর্ণনায় রয়েছে। ইসলামকিউএর ১১১৩৮২ নম্বর উত্তরে বুখারির আরেক অধ্যায়ে এই বক্তব্য মুআল্লাকভাবে থাকার বিষয়টিও আলাদা করা হয়েছে। “বুখারি ও মুসলিমে আছে” বলে সব শব্দকে অবিকল দুটির নামে চালালে বর্ণনার পরিচয় ভুল হয়। প্রত্যেক সূত্রে কোন বাক্য এসেছে, সেটিই পাঠের ইতিহাসের নির্দিষ্ট তথ্য।


উবাইয়ের আহযাব-বিবরণে রজমের পাঠ ও বাক্যশেষের ভিন্নতা

উমরের বাইরে উবাই ইবন কা’বের নামেও রজমকে পূর্বপঠিত কোরআন হিসেবে স্মরণ করার বর্ণনা রয়েছে। তাঁর বর্ণনায় পাঠটি একটি নির্দিষ্ট সূরার সঙ্গে যুক্ত: আহযাব। যির ইবন হুবাইশ তাঁকে সূরার আয়াতসংখ্যা তেহাত্তর বললে উবাই সূরাটিকে বাকারার সমকক্ষ হিসেবে স্মরণ করেন এবং তার মধ্যে রজমের বাক্য পড়ার কথা বলেন। ফলে বিষয়টি শুধু একটি শাস্তির বিচ্ছিন্ন স্মৃতি হিসেবে থাকে না; গৃহীত মুসহাফের একটি সূরার পূর্ববর্তী পরিসরের সঙ্গেও যুক্ত হয়। তাফসীরে ইবনে কাসীরের বাংলা সংস্করণে বর্ণনাটি আছে: [761]

ইমাম আহমদ (র) বলেন, খালফ্ ইব্‌ন হিশাম (র)…. যির (র) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার উবায় ইব্‌ন কা’ব (রা) আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, সূরা ‘আহযাব’-এর আয়াত কতটি ? আমি বলিলাম, তেহাত্তরটি। তিনি বলিলেন, চুপ কর । ইহা তো সূরা বাকারার সমকক্ষ এবং আমরা ইহার মধ্যে পাঠ করিতাম : الشيخ وَالشَّيْخَةُ إِذَا زَنَيَا فَارْجُمُوهُمَا الْبَتَّةَ نَكَالاً مِّنَ اللهِ وَاللهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ – —বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা যখন ব্যভিচার করে তাহাদিগকে প্রস্তরাঘাত করিয়া হত্যা কর। আল্লাহর পক্ষ হইতে ইহা শাস্তি । আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। ইমাম নাসায়ী ‘আসিম ইব্‌ন আবুন নজুদ হইতে ভিন্ন এক সূত্রে ইহা বর্ণনা করিয়াছেন । সূত্রটি ‘হাসান’। ইহা দ্বারা বুঝা যায় সূরাটিতে কুরআনের আরো অংশ ছিল। পরে উহা রহিত হইয়াছে। 

কোরআন সংকলন 156

এই বাংলা সংস্করণে আরবি বাক্যের সমাপ্তি “ওয়াল্লাহু আযীযুন হাকীম” এবং অনুবাদে “আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” রয়েছে। ইবনে কাসীরের অনলাইনে প্রকাশিত আরবি পাঠে একই বর্ণনার শেষে “ওয়াল্লাহু আলীমুন হাকীম”—অর্থাৎ “আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়”। পার্থক্যটি শুধু বাংলা প্রতিশব্দের নয়; আরবি গুণবাচক শব্দই পৃথক। অনলাইন আরবি পাঠে বর্ণনা ও ইবনে কাসীরের পরবর্তী মন্তব্যের সম্পূর্ণ সংশ্লিষ্ট অংশ: [762]

قال [ عبد الله بن ] الإمام أحمد : حدثنا خلف بن هشام ، حدثنا حماد بن زيد ، عن عاصم بن بهدلة ، عن زر قال : قال لي أبي بن كعب : كأين تقرأ سورة الأحزاب ؟ أو كأين تعدها ؟ قال : قلت : ثلاثا وسبعين آية : فقال : قط! لقد رأيتها وإنها لتعادل ” سورة البقرة ” ، ولقد قرأنا فيها : الشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما البتة نكالا من الله والله عليم حكيم ” . ورواه النسائي من وجه آخر ، عن عاصم – وهو ابن أبي النجود ، وهو ابن بهدلة – به . وهذا إسناد حسن ، وهو يقتضي أنه كان فيها قرآن ثم نسخ لفظه وحكمه أيضا ، والله أعلم .

বাংলা অনুবাদ: [ইমাম আহমদের পুত্র আবদুল্লাহ] বলেছেন: আমাদের খালফ ইবন হিশাম বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, আমাদের হাম্মাদ ইবন যায়েদ বর্ণনা করেছেন, আসিম ইবন বাহদালা থেকে, তিনি যির থেকে। যির বলেন: উবাই ইবন কা’ব আমাকে বললেন, “আহযাব কতটুকু পড়ো, অথবা এর আয়াত কত গণনা করো?” আমি বললাম, “তেহাত্তর আয়াত।” তিনি বললেন, “এতটুকুই! আমি একে দেখেছি, এটি সূরা বাকারার সমকক্ষ ছিল। আমরা এর মধ্যে পড়েছি: বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা ব্যভিচার করলে তাদের অবশ্যই পাথর মেরে হত্যা করো, আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি হিসেবে; আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” নাসাঈ অন্য একটি সূত্রে আসিম থেকে এটি বর্ণনা করেছেন; তিনি ইবন আবিন নাজুদ, আবার ইবন বাহদালাও। এটি হাসান সনদ। এ থেকে বোঝা যায়, এতে কোরআনের এমন অংশ ছিল যার পাঠ এবং বিধানও পরে রহিত হয়েছে। আল্লাহ অধিক জানেন।

“আহযাব বাকারার সমকক্ষ ছিল” উবাইয়ের স্মৃতিতে সূরার পূর্ববর্তী পরিসরের তুলনা। এই তুলনার মধ্যে রজমের বাক্যকে তিনি নির্দিষ্টভাবে উদাহরণ দিয়েছেন। বর্তমান সূরায় ওই বাক্য নেই; বর্ণিত পূর্বপাঠে ছিল। শুধু আয়াতের শেষসীমা অন্য জায়গায় টানার মাধ্যমে এই পার্থক্য তৈরি হয় না, কারণ এখানে একটি নির্দিষ্ট বাক্যের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির কথা এসেছে। ইবনে কাসীর সেই অতিরিক্ত কোরআনি অংশের ব্যাখ্যায় রহিত হওয়ার নীতি প্রয়োগ করেছেন; তাঁর মন্তব্যও বর্ণনার পরে সংরক্ষিত আছে।

নাসাঈর আস-সুনানুল কুবরায় উবাইয়ের কথোপকথনটি অন্য ভাষার রূপে আছে। সেখানে রজমের বাক্যের শেষ “আযীযুন হাকীম”; একই সঙ্গে “ইযা যানাইয়া”—ব্যভিচার করলে—অংশটি ওই সংক্ষিপ্ত পাঠে নেই। শাস্তির আলোচনা ও সূরার স্মৃতি একই থাকলেও উদ্ধৃত শব্দগুলো সর্বত্র অবিকল এক নয়। পূর্ণ মতন: [763]

زِرٍّ قَالَ : قَالَ أُبَيُّ بْنُ كَعْبٍ : كَمْ تَعُدُّونَ سُورَةَ الْأَحْزَابِ آيَةً قُلْنَا : ثَلَاثَةً وَسَبْعِينَ ، فَقَالَ أُبَيٌّ : كَانَتْ لَتَعْدِلُ سُورَةَ الْبَقَرَةِ أَوْ أَطْوَلَ ، وَلَقَدْ كَانَ فِيهَا آيَةُ الرَّجْمِ : الشَّيْخُ وَالشَّيْخَةُ فَارْجُمُوهُمَا الْبَتَّةَ نَكَالًا مِنَ اللهِ وَاللهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ .

বাংলা অনুবাদ: যির বলেন: উবাই ইবন কা’ব বললেন, “তোমরা আহযাবের আয়াত কত গণনা করো?” আমরা বললাম, “তেহাত্তর।” উবাই বললেন, “এটি বাকারার সমকক্ষ অথবা আরও দীর্ঘ ছিল। এর মধ্যে রজমের আয়াত ছিল: বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা—তাদের অবশ্যই পাথর মেরে হত্যা করো, আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি হিসেবে; আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”

হাকিমের আল-মুস্তাদরাকে আবার “ইযা যানাইয়া” এবং “আযীযুন হাকীম”—দুটি অংশই একসঙ্গে পাওয়া যায়। হাকিম সংশ্লিষ্ট বর্ণনার সনদকে সহিহ বলেছেন। এখানে তিনটি পাঠের মধ্যে পার্থক্য প্রত্যক্ষ: ইবনে কাসীরের অনলাইন পাঠে শর্তবাক্য ও “আলীম”, নাসাঈতে ওই শর্তবাক্য ছাড়াই “আযীয”, আর হাকিমে শর্তবাক্যসহ “আযীয”। হাকিমের পাঠের সংশ্লিষ্ট সম্পূর্ণ বাক্যগুলো: [764]

قَالَ : ” قَطُّ ” . قُلْتُ : قَطُّ . قَالَ : ” لَقَدْ رَأَيْتُهَا وَإِنَّهَا لَتَعْدِلُ الْبَقَرَةَ وَلَقَدْ قَرَأْنَا فِيمَا قَرَأْنَا فِيهَا : الشَّيْخُ وَالشَّيْخَةُ إِذَا زَنَيَا فَارْجُمُوهُمَا الْبَتَّةَ نَكَالًا مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ” . هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحُ الْإِسْنَادِ وَلَمْ يُخْرِجَاهُ .

বাংলা অনুবাদ: তিনি বললেন, “এতটুকুই!” আমি বললাম, “এতটুকুই।” তিনি বললেন, “আমি একে দেখেছি, এটি বাকারার সমকক্ষ ছিল। আমরা এতে যা পড়তাম তার মধ্যে পড়েছি: বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা ব্যভিচার করলে তাদের অবশ্যই পাথর মেরে হত্যা করো, আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি হিসেবে; আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” এটি সহিহ সনদের হাদিস; তাঁরা দুজন তা সংকলন করেননি।

সূত্ররজম-পাঠের শর্ত ও মধ্যাংশবাক্যের সমাপ্তি
ইবনে কাসীরের অনলাইন আরবি পাঠالشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما البتة نكالا من اللهوالله عليم حكيم — আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়
ইবনে কাসীরের উদ্ধৃত বাংলা সংস্করণবৃদ্ধ–বৃদ্ধার ব্যভিচারের শর্ত এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তিوالله عزيز حكيم — আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়
নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা ৭৩১২الشيخ والشيخة فارجموهما البتة نكالا من اللهوالله عزيز حكيم — “ইযা যানাইয়া” এই পাঠে নেই
হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ৮১৩২الشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما البتة نكالا من اللهوالله عزيز حكيم — শর্তবাক্যসহ “আযীয”
ইবন মাজাহ ২৫৫৩; উমরের বর্ণনাالشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما البتةএই উদ্ধৃতিতে আল্লাহর গুণবাচক সমাপ্তি দেওয়া হয়নি

ইবন মাজাহর বর্ণনায় উমর নিজের পড়া বাক্যটি সরাসরি উল্লেখ করেছেন। সেখানে “বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা ব্যভিচার করলে তাদের অবশ্যই পাথর মেরে হত্যা করো” পর্যন্ত পাঠ এসেছে। উমরের বক্তব্য, রজমের শর্ত এবং নবী ও তাঁর পরবর্তী প্রয়োগের বিবরণসহ পূর্ণ মতন হলো: [765]

قَالَ قَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ لَقَدْ خَشِيتُ أَنْ يَطُولَ، بِالنَّاسِ زَمَانٌ حَتَّى يَقُولَ قَائِلٌ مَا أَجِدُ الرَّجْمَ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَيَضِلُّوا بِتَرْكِ فَرِيضَةٍ مِنْ فَرَائِضِ اللَّهِ أَلاَ وَإِنَّ الرَّجْمَ حَقٌّ إِذَا أُحْصِنَ الرَّجُلُ وَقَامَتِ الْبَيِّنَةُ أَوْ كَانَ حَمْلٌ أَوِ اعْتِرَافٌ وَقَدْ قَرَأْتُهَا الشَّيْخُ وَالشَّيْخَةُ إِذَا زَنَيَا فَارْجُمُوهُمَا الْبَتَّةَ ‏.‏ رَجَمَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَرَجَمْنَا بَعْدَهُ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আব্বাস বলেন: উমর ইবনুল খাত্তাব বলেছেন, আমি আশঙ্কা করি মানুষের ওপর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হবে এবং কেউ বলবে, “আমি আল্লাহর কিতাবে রজম পাই না।” ফলে আল্লাহর ফরজগুলোর একটি ত্যাগ করে তারা পথভ্রষ্ট হবে। জেনে রাখো, রজম সত্য—যখন পুরুষ ইহসানের অবস্থায় থাকে এবং সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, অথবা গর্ভধারণ অথবা স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়। আমি এটি পড়েছি: “বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা ব্যভিচার করলে তাদের অবশ্যই পাথর মেরে হত্যা করো।” আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রজম করেছেন এবং তাঁর পরেও আমরা করেছি।

একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় শেষাংশ না-থাকা এবং একটি বর্ণনায় অন্য শব্দ থাকা একই ধরনের তথ্য নয়। ইবন মাজাহর উদ্ধৃতি ছোট জায়গায় শেষ হয়েছে; শুধু তা থেকে পূর্বপাঠের শেষও ওই জায়গাতেই ছিল বলে নির্ধারণ করা যায় না। কিন্তু “আলীম” ও “আযীয” যেখানে একই অবস্থানের সমাপ্তি হিসেবে দেওয়া হয়েছে, সেখানে একই শব্দের দুই পাঠ নেই; পৃথক দুটি গুণবাচক শব্দ রয়েছে। “সর্বজ্ঞ” জ্ঞানকে এবং “পরাক্রমশালী” ক্ষমতাকে চিহ্নিত করে। উভয়টি ধর্মতত্ত্বে গ্রহণযোগ্য বিশেষণ হওয়া তাদের অক্ষর ও অর্থকে অভিন্ন করে না।

এই বর্ণনাগুলো একই রকম একটি শাস্তির কথা বললেও অনুপস্থিত আয়াতের একটিমাত্র অবিকল শব্দরূপ প্রতিষ্ঠা করে না। পরবর্তী সংকলনকারীরা বিভিন্ন পরম্পরা ও সংস্করণে যে ভাষা পেয়েছেন, তা লিখেছেন। আইন একই রাখা সম্ভব হয়েছে; অথচ আইনটির পূর্ববর্তী কোরআনি বাক্য উদ্ধৃত করার সময় পাঠের ভিন্নতা থেকে গেছে। ফলে শাস্তির ধারাবাহিক প্রয়োগ এবং তার কথিত কোরআনি ভাষার ধারাবাহিক অভিন্নতা পৃথক ঐতিহাসিক প্রশ্ন। প্রথমটি দিয়ে দ্বিতীয়টি প্রমাণিত হয় না।

“শাইখ” ও “শাইখা”র আক্ষরিক অর্থ বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা। কিন্তু প্রচলিত রজমের যোগ্যতা বয়সের ওপর নির্ধারিত হয়নি; ইহসান, অর্থাৎ নির্দিষ্ট বৈধ দাম্পত্য ও যৌনসম্পর্কের শর্তের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। মুওয়াত্তার পরের মন্তব্যে মালিক এই শব্দকে সাইয়্যিব ও সাইয়্যিবা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যরকানি আরও স্পষ্ট বলেছেন, দুজন তরুণ হলেও ওই ব্যাখ্যায় অন্তর্ভুক্ত; প্রকৃত বার্ধক্য উদ্দেশ্য নয়। তাঁর বক্তব্য: [766]

( مالك : قوله الشيخ والشيخة يعني الثيب والثيبة ) أي المحصن والمحصنة ، وإن كانا شابين لا حقيقة الشيخ ، وهو من طعن في السن بدليل قوله : ( فارجموهما ألبتة ) فإن الرجم لا يختص بالشيخ والشيخة ، وإنما المدار على الإحصان لقوله صلى الله عليه وسلم لماعز : أحصنت ؟ قال : نعم .

বাংলা অনুবাদ: মালিকের কথা, “বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা” অর্থ সাইয়্যিব ও সাইয়্যিবা; অর্থাৎ মুহসান পুরুষ ও নারী, তারা তরুণ হলেও। প্রকৃত বৃদ্ধ—যার বয়স বেড়েছে—তা উদ্দেশ্য নয়। “তাদের অবশ্যই পাথর মেরে হত্যা করো” বক্তব্যের ভিত্তিতে রজম বৃদ্ধ ও বৃদ্ধার জন্য নির্দিষ্ট নয়; নির্ণায়ক ইহসান। কারণ তিনি মায়িযকে জিজ্ঞেস করেছেন, “তুমি কি ইহসানের অবস্থায় পৌঁছেছ?” তিনি বলেছেন, “হ্যাঁ।”

শব্দের আক্ষরিক অর্থ থেকে বিধানের লক্ষ্যগোষ্ঠী নির্ধারণের এই স্থানান্তরও পরবর্তী ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে। বর্ণিত পাঠে বয়সের শব্দ আছে; আইনে দাম্পত্য অবস্থার শর্ত কার্যকর। তাই কার ওপর পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড চালানো হবে, তার নির্ধারণও শুধু কথিত আয়াতের শব্দ থেকে সম্পূর্ণ হয় না। হাদিসের ঘটনা, খলিফার ব্যাখ্যা এবং ফিকহি সংজ্ঞা মিলে সেই বিধানের কার্যকর পরিসর তৈরি করেছে। গ্রন্থে অনুপস্থিত একটি বাক্যের ভাষা ও তার বাস্তব আইনি প্রয়োগের মধ্যে এই ব্যাখ্যাগত ব্যবধান রয়ে গেছে।


বর্তমান মুসহাফে পাঠ নেই, রজমের আইন বহাল

বর্তমান কোরআনের সূরা নূরে ব্যভিচারের জন্য একশ বেত্রাঘাতের নির্দেশ আছে। আয়াতটির দৃশ্যমান ভাষায় ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী বলা হয়েছে; বিবাহিতের জন্য আলাদা করে পাথর মেরে হত্যা এবং অবিবাহিতের জন্য বেত্রাঘাত—এই দ্বিবিভাগ সেখানে লেখা নেই। প্রচলিত ফিকহের রজমবিধি নির্ধারণে তাই এই আয়াতের বাইরের বর্ণনা কার্যকর ভূমিকা নেয়। সূরা নূরের পূর্ণ আয়াতটি: [767]

الزانية والزاني فاجلدوا كل واحد منهما مائة جلدة ولا تأخذكم بهما رأفة في دين الله إن كنتم تؤمنون بالله واليوم الآخر وليشهد عذابهما طائفة من المؤمنين

বাংলা অনুবাদ: ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী—প্রত্যেককে একশ বেত্রাঘাত করো। আল্লাহর বিধান কার্যকর করতে গিয়ে তাদের প্রতি মমতা যেন তোমাদের আচ্ছন্ন না-করে, যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষদিনে বিশ্বাস করো। মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।

উমরের বর্ণনাপরম্পরায় এই লিখিত শাস্তির সঙ্গে অনুপস্থিত রজম-পাঠের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এখানে আইনের কার্যকারিতা আর মুসহাফে পাঠের উপস্থিতি একই জায়গায় থাকে না। পূর্বে পাঠ করা হয়েছে বলে সাক্ষ্য দেওয়া, মুহাম্মদের প্রয়োগের কথা বলা এবং পরবর্তী শাসকদের প্রয়োগকে ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখানো—এই উপায়ে রজম বহাল থাকে। আল্লাহর কিতাব থেকে কেউ কেবল বিদ্যমান নির্দেশ জানতে চাইলে তাকে একটি অনুপস্থিত পাঠের স্মৃতি ও সেই স্মৃতির বাহকদের ওপর নির্ভর করতে হয়।

আবুল আব্বাস কুরতুবি উমরের বক্তব্যকে স্পষ্টভাবে পূর্বে পঠিত কোরআনের স্বীকৃতি বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি পাঠের কোরআনি পরিচয় রহিত এবং বিধান কার্যকর থাকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ইসলামকিউএ তাঁর আল-মুফহিম থেকে এ বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে। [768]

هذا نصٌّ من عمر رضى الله عنه على أنَّ هذا كان قرآنًا يُتلى . وفي آخره ما يدلُّ على أنَّه نُسخً كَونُها من القرآن ، وبقي حُكْمُها معمولاً به ، وهو الرَّجم

বাংলা অনুবাদ: এটি উমরের স্পষ্ট বক্তব্য যে, এটি কোরআন হিসেবে পঠিত হতো। এর শেষাংশে এমন ইঙ্গিত আছে যে, এর কোরআনের অংশ হওয়া রহিত হয়েছে; আর এর বিধান কার্যকর থেকে গেছে—সেটি রজম।

এই ব্যাখ্যার মধ্যে আগের পাঠ থেকে পরিবর্তন স্বীকার করা হচ্ছে। পূর্বে কোরআন হিসেবে পড়া একটি বাক্য পরে কোরআন হিসেবে পড়া হবে না; তার বিধান চলবে। পরিবর্তনের ধর্মীয় অনুমোদনকে এই ব্যাখ্যা বৈধতা দেয়। ফলে বিতর্কের বিষয় হলো পরিবর্তনটি কীভাবে ঘটেছে, কিসের ভিত্তিতে তাকে অনুমোদিত বলা হয়েছে এবং কেন পাঠের বদলে অন্য কর্তৃত্বের সাহায্যে মৃত্যুদণ্ড চালু রাখা হয়েছে। যে বাক্যটি আর পাঠের অংশ নয়, তার আইনি বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠা করতে গ্রন্থের বাইরের বর্ণনার প্রয়োজন হচ্ছে।

বুখারির একটি ছোট বর্ণনায় আলী এক নারীকে রজম করার পরে বলেছেন, তিনি তাকে আল্লাহর রাসুলের সুন্নত অনুসারে রজম করেছেন। মৃত্যুদণ্ডের সরাসরি ঘোষিত ভিত্তি এখানে সুন্নত। [769]

قَالَ سَمِعْتُ الشَّعْبِيَّ ، يُحَدِّثُ عَنْ عَلِيٍّ ، رضى الله عنه حِينَ رَجَمَ الْمَرْأَةَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَقَالَ قَدْ رَجَمْتُهَا بِسُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم‏.‏

বাংলা অনুবাদ: তিনি বলেন: আমি শা’বীকে আলী থেকে বর্ণনা করতে শুনেছি, যখন তিনি শুক্রবার এক নারীকে রজম করেন। তিনি বলেন, “আমি তাকে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত অনুসারে রজম করেছি।”

কোরআনে বিধানের লিখিত উপস্থিতি ও হাদিসে তার স্বীকৃতির এই সম্পর্ক নিয়ে প্রাচীন বিরোধও নথিবদ্ধ আছে। ইবনে হাজর বলেছেন, খারেজিদের একাংশ বা অধিকাংশ এবং কিছু মুতাজিলা রজম অস্বীকার করেছে। তিনি নাসাঈর যে বর্ণনা এনেছেন, সেখানে কিছু মানুষ কিতাবের বেত্রাঘাত দেখিয়ে রজমের প্রশ্ন তুলছে। তাই শুধু কোরআনে নেই বলে রজম না-মানার আপত্তির কাঠামো প্রাচীন হাদিসব্যাখ্যাতেই পাওয়া যায়। বুখারির বাংলা সংস্করণের সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যা ও সূত্রনির্দেশে বলা হয়েছে: [752] [770]

খারেজী এবং কিছু মু’তাযিলা সম্প্রদায় কোরআনে উল্লেখিত রজমের আয়াতকে অস্বীকার করে, যার তেলাওয়াত মানসুখ হলেও হুকুম অবশিষ্ট আছে। আয়াতটি হলঃ الشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما الية অথচ আয়াতটি কোরআনের অংশ এবং হুকুমটি অবশিষ্ট আছে এর অনেক প্রমাণ রয়েছে। )১) আব্দুর রাজ্জাক ও ইমাম ত্ববারী ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেন: উমর বলেন: سيجيء قوم يكذبون بالرجم
(২) সুনানে নাসাঈতে উবায়দুল্লাহ ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনু উতবার সূত্রে উমরের হাদিস: وإن ناسا يقولون ما بال الرجم وإنما في كتاب الله الجلد ألا قد رجم رسول الله صلى الله عليه وسلم
(৩) মুওয়াত্তা মালিকে সাঈদ বিন মুসাইয়িবের সূত্রে উমর থেকে বর্ণিত হাদিস: إياكم أن تهلكوا عن آية الرجم أن يقول قائل لا أجد حدين في كتاب الله فقد رجم
(৪) বুখারীতে বর্ণিত ৬৮১৯ নং হাদীসে ইয়াহুদী পুরুষ ও একজন মহিলার রজমের ঘটনা। মায়েয বিন মালিকের রজমের ঘটনা, হাদীস নং ৬৮১৪, ৬৮২৪।
বিবাহিত এবং অবিবাহিত পুরুষ-মহিলার যেনার হুকুম:
যিনাকার পুরুষ-মহিলা যদি বিবাহিত হয় তবে তাদের হুকুম হল শুধু রজম।
পক্ষান্তরে যেনাকার পুরুষ-মহিলা যদি অবিবাহিত হয় তবে তাদের হুকুম হল একশত বেত্রাঘাত ও এক বছর নির্বাসন। (ফাতহুল বারী)

কোরআন সংকলন 158

এই ব্যাখ্যার উল্লেখিত মায়িযের ঘটনাগুলো বুখারির ৬৮১৪ ও ৬৮২৪ নম্বরে আছে। প্রথমটিতে আসলাম গোত্রের একজনের চারবার স্বীকারোক্তি ও তার ওপর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা; দ্বিতীয়টিতে মায়িযের নাম, যৌনসংসর্গ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ প্রশ্ন এবং তার পরে রজমের নির্দেশ রয়েছে। এগুলো শাস্তির প্রয়োগসংক্রান্ত বর্ণনা। অনুপস্থিত আয়াতের প্রাচীন পাঠ, সেই পাঠ মুসহাফে রাখা না-হওয়া এবং শাস্তি বাস্তবে চালানো—এই তথ্যগুলোর উৎস এক নয়; বিচারিক ঘটনাগুলো প্রয়োগের দিকটি সংরক্ষণ করে।

লিখিত পাঠ ও প্রচলিত বিধানের সম্পর্কদলিলের ধরনকার্যকর ফল
সূরা নূর ২৪:২মুসহাফে বিদ্যমান আয়াতএকশ বেত্রাঘাতের স্পষ্ট নির্দেশ
উমরের ভাষণে রজমপূর্বে পঠিত আয়াতের স্মৃতি ও শাস্তি কার্যকরের বর্ণনামুসহাফে পাঠ না-থাকলেও রজমকে ফরজ বলা
আলীর ঘোষণানবীর সুন্নত অনুসরণের বক্তব্যপাথর মেরে হত্যার ভিত্তি হিসেবে সুন্নতের কর্তৃত্ব
পরবর্তী নাসিখ–মানসুখের ব্যাখ্যাপাঠ রহিত, বিধান বহাল শ্রেণিবিভাগকোরআন হিসেবে না-পড়েও শাস্তি কার্যকর রাখার অনুমোদন
কোরআনের লিখিত শাস্তিকে ভিত্তি করা আপত্তিকিতাবে রজমের অনুপস্থিতিহাদিস ও ফিকহের অতিরিক্ত কর্তৃত্ব গ্রহণের প্রশ্ন

ইহুদিদের রজমবিধি নিয়ে মুহাম্মদের প্রতিক্রিয়ার বর্ণনাও একই সমস্যায় গুরুত্বপূর্ণ। বারাআ ইবন আযিবের হাদিসে অভিযোগ হলো, অভিজাতদের ক্ষেত্রে শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা থেকে মুখ কালো করা ও বেত্রাঘাতের নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। মুহাম্মদ তাদের পুরোনো রজমবিধি পুনরুজ্জীবিত করেছেন বলে ঘোষণা করেন। এখানে বর্ণিত কাজটি শাস্তির প্রয়োগ পরিবর্তন; হাদিসে রজমের লিখিত বিধান তখনও তাদের কিতাবে আছে বলে বলা হয়েছে। আবু দাউদের পূর্ণ হাদিস: [771] [772]

قَالَ مُرَّ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِيَهُودِيٍّ مُحَمَّمٍ مَجْلُودٍ فَدَعَاهُمْ فَقَالَ ‏”‏ هَكَذَا تَجِدُونَ حَدَّ الزَّانِي ‏”‏ ‏.‏ فَقَالُوا نَعَمْ ‏.‏ فَدَعَا رَجُلاً مِنْ عُلَمَائِهِمْ قَالَ لَهُ ‏”‏ نَشَدْتُكَ بِاللَّهِ الَّذِي أَنْزَلَ التَّوْرَاةَ عَلَى مُوسَى هَكَذَا تَجِدُونَ حَدَّ الزَّانِي فِي كِتَابِكُمْ ‏”‏ ‏.‏ فَقَالَ اللَّهُمَّ لاَ وَلَوْلاَ أَنَّكَ نَشَدْتَنِي بِهَذَا لَمْ أُخْبِرْكَ نَجِدُ حَدَّ الزَّانِي فِي كِتَابِنَا الرَّجْمَ وَلَكِنَّهُ كَثُرَ فِي أَشْرَافِنَا فَكُنَّا إِذَا أَخَذْنَا الرَّجُلَ الشَّرِيفَ تَرَكْنَاهُ وَإِذَا أَخَذْنَا الرَّجُلَ الضَّعِيفَ أَقَمْنَا عَلَيْهِ الْحَدَّ فَقُلْنَا تَعَالَوْا فَنَجْتَمِعَ عَلَى شَىْءٍ نُقِيمُهُ عَلَى الشَّرِيفِ وَالْوَضِيعِ فَاجْتَمَعْنَا عَلَى التَّحْمِيمِ وَالْجَلْدِ وَتَرَكْنَا الرَّجْمَ ‏.‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ اللَّهُمَّ إِنِّي أَوَّلُ مَنْ أَحْيَا أَمْرَكَ إِذْ أَمَاتُوهُ ‏”‏ ‏.‏ فَأَمَرَ بِهِ فَرُجِمَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ ‏‏{‏ يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ لاَ يَحْزُنْكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ ‏}‏ إِلَى قَوْلِهِ ‏‏{‏ يَقُولُونَ إِنْ أُوتِيتُمْ هَذَا فَخُذُوهُ وَإِنْ لَمْ تُؤْتَوْهُ فَاحْذَرُوا ‏}‏ إِلَى قَوْلِهِ ‏‏{‏ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ‏}‏ فِي الْيَهُودِ إِلَى قَوْلِهِ ‏‏{‏ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ‏}‏ فِي الْيَهُودِ إِلَى قَوْلِهِ ‏‏{‏ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ‏}‏ قَالَ هِيَ فِي الْكُفَّارِ كُلُّهَا يَعْنِي هَذِهِ الآيَةَ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ অপরাধ ও তার শাস্তি
পাবলিশারঃ আল্লামা আলবানী একাডেমী
পরিচ্ছদঃ ২৬. দু’ ইয়াহুদীকে রজম করার ঘটনা
৪৪৪৮। আল-বারাআ ইবনু আযিব (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, বেত্রাঘাতকৃত জনৈক ইয়াহুদীর মুখমণ্ডল কালিমালিপ্ত করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তিনি তাদের ডেকে প্রশ্ন করলেনঃ তোমরা কি যেনাকারীর এরূপ শাস্তির হুকুম পেয়েছ? তারা বললো, হ্যাঁ। অতএব তিনি তাদের একজন আলিমকে ডেকে বললেনঃ তোমাকে সেই আল্লাহর কসম করে বলছি যিনি মূসা (আঃ)-এর উপর তাওরাত কিতাব নাযিল করেছেন! তোমাদের কিতাবে যেনাকারীদের এরূপ শাস্তির কথা উল্লেখ পেয়েছে কি? সে বললো, হে আল্লাহ! না। আপনি যদি এ বিষয়ে আমাকে আল্লাহর কসম না দিতেন, তাহলে আমি অবশ্যই আপনাকে বলতাম না।
আমরা আমাদের কিতাবে যেনাকারীর শাস্তি রজমের উল্লেখ পেয়েছি। কিন্তু আমাদের অভিজাত সমাজে যেনার বিস্তার ঘটলে আমরা কোনো মর্যাদাসম্পন্ন লোককে এ অপরাধে ধরতে পারলেও ছেড়ে দিতাম; তবে দুর্বলদের কাউকে পেলে তার উপর শাস্তি বাস্তবায়িত করতাম। অতঃপর আমরা সকলকে আহবান করে বললাম, চলুন, আমরা যেনার শাস্তির ব্যাপারে সকলে ঐকমত্যে পৌঁছে এমন একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হই, যাতে সকল শ্রেণীর লোকদের উপর তা বাস্তবায়িত করা যায়। অতঃপর আমরা এর শাস্তিস্বরূপ মুখমণ্ডল কালিমালিপ্ত করে অপমান করা এবং বেত্রাঘাত করাতে একমত হই এবং ‘রজম’ পরিত্যাগ করি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে আল্লাহ! আমিই প্রথম ব্যক্তি যে তোমার নির্দেশকে পুনর্জীবন দান করেছি, তারা একে প্রাণহীন করার পর। অতঃপর তাঁর নির্দেশে অপরাধীকে রজম করা হয়। অতঃপর মহান আল্লাহ ইয়াহুদীদের সম্পর্কে এ আয়াতগুলো নাযিল করেনঃ ‘‘হে রাসূল! তোমাকে যেন দুঃখ না দেয় যারা কুফরীর দিকে দ্রুত ধাবিত হয় … তারা বলে, তোমাদেরকে এরূপ বিধান দেয়া হলে তোমরা তা গ্রহণ করো অন্যথায় তোমরা বর্জন করো … আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই কাফির (ইয়াহুদীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে) … আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না তারাই যালিম (ইয়াহুদীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে) … আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না তারা পাপাচারী’’ (সূরা আল-মায়িদাহঃ ৪১-৪৭)। তিনি বলেন, এ আয়াতগুলো কাফির অবাধ্যদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে।(1)
সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

বুখারির আরেক বর্ণনায় লিখিত রজম-আয়াত আড়াল করার পদ্ধতিও এসেছে। পাঠকারী আয়াতটির ওপর হাত রেখে তার আগে ও পরে পড়ছিল; হাত সরালে আয়াত দেখা যায়। এই কাহিনিতে যাচাইয়ের উপায় ছিল কিতাব খুলে দৃশ্যমান শব্দ দেখানো। [773]

قَالَ أُتِيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِيَهُودِيٍّ وَيَهُودِيَّةٍ قَدْ أَحْدَثَا جَمِيعًا فَقَالَ لَهُمْ ‏”‏ مَا تَجِدُونَ فِي كِتَابِكُمْ ‏”‏‏.‏ قَالُوا إِنَّ أَحْبَارَنَا أَحْدَثُوا تَحْمِيمَ الْوَجْهِ وَالتَّجْبِيَةَ‏.‏ قَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ سَلاَمٍ ادْعُهُمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ بِالتَّوْرَاةِ‏.‏ فَأُتِيَ بِهَا فَوَضَعَ أَحَدُهُمْ يَدَهُ عَلَى آيَةِ الرَّجْمِ، وَجَعَلَ يَقْرَأُ مَا قَبْلَهَا وَمَا بَعْدَهَا فَقَالَ لَهُ ابْنُ سَلاَمٍ ارْفَعْ يَدَكَ‏.‏ فَإِذَا آيَةُ الرَّجْمِ تَحْتَ يَدِهِ، فَأَمَرَ بِهِمَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَرُجِمَا‏ .‏ قَالَ ابْنُ عُمَرَ فَرُجِمَا عِنْدَ الْبَلاَطِ، فَرَأَيْتُ الْيَهُودِيَّ أَجْنَأَ عَلَيْهَا‏.‏

বাংলা অনুবাদ: ইবনে উমর বলেন: আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এক ইহুদি পুরুষ ও এক ইহুদি নারীকে আনা হলো; তারা দুজনেই ব্যভিচার করেছিল। তিনি তাদের বললেন, “তোমাদের কিতাবে কী পাও?” তারা বলল, “আমাদের আলেমরা মুখ কালো করা এবং ঝুঁকিয়ে দেওয়ার শাস্তি চালু করেছেন।” আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, তাদের তাওরাত আনতে বলুন।” তা আনা হলে একজন রজমের আয়াতের ওপর হাত রেখে তার আগে ও পরে পড়তে লাগল। ইবন সালাম বললেন, “হাত সরাও।” দেখা গেল, হাতের নিচেই রজমের আয়াত। তখন আল্লাহর রাসুল তাদের দুজনকে রজম করার নির্দেশ দিলেন। ইবনে উমর বলেন: বালাতের কাছে তাদের রজম করা হলো; আমি দেখলাম, ইহুদি পুরুষটি নারীর ওপর ঝুঁকে পড়েছিল।

এই দুই বর্ণনার তুলনায় লিখিত বিধানের ভূমিকা স্পষ্ট। ইহুদিদের সম্পর্কে বর্ণিত ঘটনায় পুরোনো শাস্তি ফিরিয়ে আনার প্রমাণ হিসেবে কিতাবের পাঠ সামনে আনা হয়েছে। উমরের আশঙ্কায় পরবর্তী মুসলিম পাঠক নিজের কিতাব খুলে সেই ধরনের রজম-আয়াতই পাবে না। তখন তার জন্য যাচাইয়ের উপায় আয়াতের ওপর রাখা হাত সরানো নয়; অনুপস্থিত পাঠ সম্পর্কে বর্ণনাকারীদের দাবি মেনে নেওয়া। এক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান গ্রন্থপাঠ বিধান আড়াল করার অভিযোগকে যাচাইযোগ্য করে, অন্য ক্ষেত্রে অনুপস্থিত পাঠের বিধান কার্যকর রাখতে গ্রন্থের বাইরের কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করতে হয়।

মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতার নৈতিক গুরুত্বও সরাসরি। একটি মানুষকে পাথর মেরে হত্যা করার পরে ভুল সংশোধন করে তার জীবন ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। অথচ শাস্তিটির কথিত কোরআনি বাক্য মান্য গ্রন্থে নেই, তার উদ্ধৃত ভাষা একাধিক এবং পাঠ থেকে অপসারণের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ উমরের ভাষণে নেই। আইন বহাল রাখার নিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের সাক্ষ্য ও ব্যাখ্যা দিয়ে। যত কঠোর শাস্তি, তার প্রমাণ ও কর্তৃত্ব তত গভীর প্রশ্নের মুখে পড়ে; অনুপস্থিত পাঠকে ব্যাখ্যা দিয়ে বহাল মৃত্যুদণ্ডে রূপান্তর করা সেই প্রশ্ন দূর করে না।


সংযোজনের অভিযোগের ভয়, সংকলনের মানদণ্ড ও খলিফার কর্তৃত্ব

উমরের দুটি ক্ষমতার মধ্যে রজমের ঘটনায় একটি অসমতা দেখা যায়। তিনি শাসক হিসেবে রজম কার্যকর করেছেন বলে জানান; কিন্তু যে আয়াতের নামে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখছেন সেটি মুসহাফে লিখে দেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের অভিযোগের আশঙ্কা প্রকাশ করেন। একটি মানুষের জীবন নেওয়ার বিচারিক কর্তৃত্ব এবং একটি বাক্যকে গ্রন্থের মান্য পাঠে অন্তর্ভুক্ত করার কর্তৃত্ব তাই একইভাবে কার্যকর হয়নি। দণ্ডটি চলেছে, অথচ দণ্ডের কথিত কোরআনি বাক্য গ্রন্থের বাইরে থেকেছে। এই বিচ্ছেদ ধর্মীয় আইনকে শুধু মুসহাফের দৃশ্যমান পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি।

সংকলনের সাক্ষ্যসংক্রান্ত বিবরণে রজম গ্রহণ না-করার জন্য সাক্ষীর ঘাটতির কথা আছে। উমরের ভাষণে কারণ হিসেবে মানুষের বৃদ্ধি বলার আশঙ্কা এসেছে; পরবর্তী ব্যাখ্যায় আয়াতের তিলাওয়াত রহিত হওয়ার কথা এসেছে। এই পৃথক ব্যাখ্যাগুলো একই ফল—মুসহাফে পাঠ না-থাকা—ব্যাখ্যা করে, কিন্তু তাদের যুক্তি ও প্রমাণের মানদণ্ড আলাদা। সুয়ূতি যরকাশির আল-বুরহান থেকে উমরের বক্তব্যের একটি সমস্যাও উদ্ধৃত করেছেন: লিখতে চাওয়ার অর্থ কি লেখাটি তখনও বৈধ ছিল? একই আলোচনায় একক বর্ণনা দিয়ে কোরআন প্রতিষ্ঠা এবং বিধান প্রতিষ্ঠার মানদণ্ডের পার্থক্য এসেছে। পূর্ণ ধারাবাহিক আলোচনাটি হলো: [774] [775]

وقال في ” البرهان ” في قول عمر : ( لولا أن يقول الناس زاد عمر في كتاب الله لكتبتها ) – يعني آية الرجم – ظاهره أن كتابتها جائزة ، وإنما منعه قول الناس ، والجائز في نفسه قد يقوم من خارج ما يمنعه ، فإذا كانت جائزة لزم أن تكون ثابتة ; لأن هذا شأن المكتوب . وقد يقال : لو كانت التلاوة باقية لبادر عمر ، ولم يعرج على مقالة الناس ; لأن مقالة الناس لا تصلح مانعا . وبالجملة هذه الملازمة مشكلة ، ولعله كان يعتقد أنه خبر واحد ، والقرآن لا يثبت به ، وإن ثبت الحكم ، ومن هنا أنكر ابن ظفر في ( ” الينبوع ” ) عد هذا مما نسخ تلاوته قال ; لأن خبر الواحد لا يثبت القرآن . قال : وإنما هذا من المنسأ لا النسخ ، وهما مما يلتبسان ، والفرق بينهما أن المنسأ لفظه قد يعلم حكمه . انتهى . وقوله : ( لعله كان يعتقد أنه خبر واحد ) مردود ، فقد صح أنه تلقاها من النبي – صلى الله عليه وسلم – .

বাংলা অনুবাদ: আল-বুরহানে উমরের “মানুষ যদি না-বলত, উমর আল্লাহর কিতাবে বৃদ্ধি করেছেন, তাহলে আমি তা লিখতাম”—অর্থাৎ রজমের আয়াত—বক্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে: এর প্রকাশ্য অর্থ হলো, তা লেখা বৈধ ছিল; শুধু মানুষের কথা তাঁকে বাধা দিয়েছে। কোনো কাজ নিজে বৈধ হলেও বাইরের কোনো কারণ বাধা সৃষ্টি করতে পারে। লেখা বৈধ হলে পাঠটি বহাল ছিল বলেই ধরতে হয়; কারণ লিখিত হওয়ার বিষয়টি এমনই। আবার বলা যেতে পারে, তিলাওয়াত বহাল থাকলে উমর তা লিখতে উদ্যোগী হতেন এবং মানুষের কথায় থামতেন না; কারণ মানুষের কথা বাধা হওয়ার উপযুক্ত নয়। মোট কথা, এই অনিবার্য সম্পর্কটি সমস্যাপূর্ণ। সম্ভবত তিনি একে একক বর্ণনা মনে করেছিলেন; তা দিয়ে বিধান প্রতিষ্ঠিত হলেও কোরআন প্রতিষ্ঠিত হয় না। এ কারণেই ইবন যফর আল-ইয়ানবুতে একে তিলাওয়াত রহিত হওয়ার উদাহরণ হিসেবে গণনা করা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন: একক বর্ণনা দিয়ে কোরআন প্রতিষ্ঠিত হয় না। তিনি বলেন: বরং এটি মানসা বা পিছিয়ে রাখার অন্তর্ভুক্ত, নাসখ নয়; দুটি বিষয় একে অন্যের সঙ্গে মিশে যায়। পার্থক্য হলো, মানসার শব্দের বিধান জানা থাকতে পারে। বক্তব্য সমাপ্ত। “সম্ভবত তিনি একে একক বর্ণনা মনে করেছিলেন” কথাটি প্রত্যাখ্যাত; কারণ তিনি নবীর কাছ থেকে তা গ্রহণ করেছিলেন, এটি সহিহভাবে বর্ণিত হয়েছে।

এই আলোচনায় সমস্যাটি সুয়ূতি বা যরকাশির অজানা ছিল না। একদিকে পূর্বপঠিত আয়াতের দাবি, অন্যদিকে লিখে দেওয়ার ইচ্ছা, আবার রহিত হওয়ার নীতি—এসবের সম্পর্ক নিয়ে তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন। “আয়াতটি লিখতাম” বক্তব্যের স্বাভাবিক অর্থ গ্রহণ করলে লেখা থেকে সরে থাকার কারণ হিসেবে সামাজিক আশঙ্কা কার্যকর হয়। তিলাওয়াত ইতিমধ্যে রহিত এবং মুসহাফে লেখা অবৈধ ধরে নিলে, মানুষের আপত্তি না-থাকলে লিখে দেওয়ার ইচ্ছাটিই ব্যাখ্যার দাবি তোলে। ধর্মীয় নিষেধ সত্যিই নির্ধারক হলে লোকের সম্ভাব্য মন্তব্য তার বিকল্প নির্ধারক হয় না।

একক বর্ণনার আলোচনাটি কর্তৃত্বের আরেকটি সীমা প্রকাশ করে। যে সংবাদ দিয়ে মৃত্যুদণ্ডের বিধান প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, সেই সংবাদ কোরআনের পাঠ প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট কি না—এখানে পৃথক মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়েছে। ইবন যফরের আপত্তি ছিল, আগে কোরআন হিসেবে প্রতিষ্ঠাই যদি ওই প্রমাণ দিয়ে সম্পন্ন না-হয়, তাহলে পরে “কোরআনের পাঠ রহিত হয়েছে” বলার শ্রেণিবিভাগও সরলভাবে অনুসরণ করে না। আর উমর নিজে নবীর কাছে শুনেছেন বলা তাঁর ব্যক্তিগত প্রাপ্তির দাবি প্রতিষ্ঠা করে; পরবর্তী সমাজে কোন ভাষা কোরআনের মান্য পাঠ হবে, সেই সিদ্ধান্তের জন্য বর্ণনার গ্রহণ ও সংকলনের নিয়ম তবুও প্রয়োজন হয়েছে।

যরকানি এই সমস্যার সমাধানে উমরের কথার প্রকাশ্য অর্থ পরিহার করেছেন। তাঁর যুক্তি, উমরের মতো অতিরিক্ত ফিকহজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি রহিত পাঠ মুসহাফে লেখার বৈধতা দিতে পারেন না; সুতরাং তিনি শুধু রজম কার্যকর করার জন্য জোরালো ভাষা ব্যবহার করেছিলেন। এ ব্যাখ্যার নির্দিষ্ট ভাষা: [776]

والذي يظهر أنه ليس مراد عمر هذا الظاهر ، وإنما مراده المبالغة والحث على العمل بالرجم ; لأن معنى الآية باق وإن نسخ لفظها إذ لا يسع مثل عمر مع مزيد فقهه تجويز كتبها مع نسخ لفظها ، فلا إشكال وضمير كتبتها لآية الرجم ، وهي ( الشيخ والشيخة ) إذا زنيا ( فارجموهما ألبتة ) بهمزة قطع أي جزما ( قد قرأناها ) ثم نسخ لفظها وبقي حكمهما بدليل أنه صلى الله عليه وسلم رجم ورجمنا بعده فلم ينكر علينا .

বাংলা অনুবাদ: যা প্রতীয়মান হয় তা হলো, উমর এই প্রকাশ্য অর্থ উদ্দেশ্য করেননি; বরং তিনি অতিশয়োক্তি এবং রজম কার্যকর করার তাগিদ উদ্দেশ্য করেছেন। কারণ আয়াতের অর্থ বহাল, যদিও তার শব্দ রহিত। তাঁর মতো অধিক ফিকহজ্ঞানসম্পন্ন উমরের পক্ষে শব্দ রহিত হওয়ার পর তা লেখার বৈধতা দেওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং কোনো সমস্যা নেই। “আমি সেটি লিখতাম” বাক্যের সর্বনাম রজমের আয়াতকে নির্দেশ করে, সেটি “বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা ব্যভিচার করলে তাদের অবশ্যই পাথর মেরে হত্যা করো।” “অবশ্যই” অর্থ নিশ্চিতভাবে। “আমরা তা পড়েছি”—তারপর এর শব্দ রহিত হয়েছে এবং দুজনের বিধান বহাল থেকেছে। তার দলিল হলো, তিনি রজম করেছেন, আমরাও তাঁর পরে রজম করেছি এবং আমাদের বিরুদ্ধে আপত্তি করা হয়নি।

এই ব্যাখ্যার ভিত্তি উমরের বক্তব্যের ভাষায় নতুন কোনো প্রত্যাহার-নির্দেশ পাওয়া নয়; উমর কেমন ব্যক্তি ছিলেন এবং কী করতে পারেন বলে ব্যাখ্যাকারী বিশ্বাস করেন, সেই ধারণা। “তাঁর মতো জ্ঞানী ব্যক্তি এমন করতে পারেন না” ধরে নিয়ে “লিখতাম” কথাটির আক্ষরিক অর্থ বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে বর্ণিত ব্যক্তির ধর্মীয় মর্যাদা তাঁর বর্ণিত ইচ্ছার অর্থ নির্ধারণ করছে। যরকাশি যে সম্পর্কটিকে সমস্যাপূর্ণ বলেছিলেন, যরকানি সেটি দূর করতে বাক্যের উদ্দেশ্যকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এখানে পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীর ভূমিকা সরাসরি দৃশ্যমান।

ইসলামকিউএর ১১১৩৮২ নম্বর উত্তরেও মুসহাফে না-লেখার কারণ ব্যাখ্যা করতে সম্ভাবনার ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। উত্তরটি রহিত পাঠ আর কোরআনের অংশ নয় বলে সিদ্ধান্ত দেয়; তারপর “সম্ভবত” এটিই উমরের না-লেখার কারণ বলে উল্লেখ করে। সংশ্লিষ্ট বাক্যাংশ: [777]

ولعل هذا هو السبب الذي جعل عمر رضي الله عنه لا يكتبها في المصحف

বাংলা অনুবাদ: সম্ভবত এ কারণেই উমর তা মুসহাফে লেখেননি।

এই উত্তরদাতার সম্ভাব্য কারণ এবং উমরের সরাসরি ঘোষিত কারণ একই নয়। হাদিসে উমর মানুষের বৃদ্ধি বলার আশঙ্কা উল্লেখ করেছেন; উত্তরে রহিতকরণকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বসানো হয়েছে। অনুপস্থিত পাঠের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য ধর্মীয় ব্যাখ্যা তৈরি করা এবং সেই ব্যাখ্যাই উমরের কার্যকর কারণ ছিল বলে প্রতিষ্ঠা করা পৃথক কাজ। “সম্ভবত” শব্দটি দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটির অনিশ্চয়তা প্রকাশ করে। নিশ্চিত আয়াত-স্মৃতি, স্পষ্ট সামাজিক আশঙ্কা এবং পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীর সম্ভাব্য কারণকে এক করে দিলে উৎসগুলোর বক্তব্যের পরিসর বদলে যায়।

কাসির ইবনুস সালতের নামে সংরক্ষিত আরেক বর্ণনায় যায়েদ ইবন সাবিত ও সাঈদ ইবনুল আসের মুসহাফ লেখার প্রসঙ্গ আছে। সেখানে যায়েদ রজমের বাক্য শুনেছেন বলে জানান। তার সঙ্গে উমরের পূর্ববর্তী একটি কথোপকথনের স্মৃতি যুক্ত হয়েছে: নাজিলের সময় তিনি লিখবেন কি না জিজ্ঞেস করলে নবীর যেন তা অপছন্দ হয়েছিল। সুয়ূতি হাকিমের সূত্রে বর্ণনাটি এনেছেন। [778]

وأخرج الحاكم من طريق كثير بن الصلت ، قال : كان زيد بن ثابت وسعيد بن العاص يكتبان المصحف ، فمرا على هذه الآية فقال زيد : سمعت رسول الله – صلى الله عليه وسلم – يقول ( الشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما ألبتة ) ، فقال عمر : لما نزلت أتيت النبي – صلى الله عليه وسلم – فقلت : أكتبها ؟ فكأنه كره ذلك ، فقال عمر : ألا ترى أن الشيخ إذا زنى ولم يحصن جلد ، وأن الشاب إذا زنى وقد أحصن رجم .

বাংলা অনুবাদ: হাকিম কাসির ইবনুস সালতের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: যায়েদ ইবন সাবিত ও সাঈদ ইবনুল আস মুসহাফ লিখছিলেন। তাঁরা এই আয়াতের প্রসঙ্গে এলে যায়েদ বললেন, আমি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, “বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা ব্যভিচার করলে তাদের অবশ্যই পাথর মেরে হত্যা করো।” উমর বললেন: যখন তা নাজিল হয়েছিল, আমি নবীর কাছে গিয়ে বলেছিলাম, “আমি কি এটি লিখব?” তাঁর যেন তা অপছন্দ হয়েছিল। উমর বললেন: তুমি কি দেখ না, বৃদ্ধ ব্যভিচার করলে যদি ইহসানের অবস্থায় না-থাকে তাহলে বেত্রাঘাত করা হয়; আর তরুণ ব্যভিচার করলে ইহসানের অবস্থায় থাকলে রজম করা হয়।

এই বর্ণনা লিখনসংক্রান্ত আরেকটি ব্যাখ্যা দেয়: আয়াত নাজিলের সময় লেখার প্রস্তাবে আপাত অনাগ্রহ। “তাঁর যেন তা অপছন্দ হয়েছিল” একটি পর্যবেক্ষণমূলক ভাষা; সুস্পষ্ট নির্দেশ উদ্ধৃত করা হয়নি। অন্য বর্ণনায় একই উমর পরে লিখে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ফলে কোন সময়ে কোন ধরনের অনুমতি বা প্রতিবন্ধক কার্যকর ছিল, তা নির্ধারণে এই বর্ণনাগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়। একটি মাত্র অভিন্ন ঘটনা হিসেবে সব ভাষা জুড়ে দিলে সেই সময়গত ও বর্ণনাগত পার্থক্যগুলো হারিয়ে যায়।

উৎসে পাওয়া ব্যাখ্যাকোন প্রশ্নের উত্তর দেয়যে বিষয়টি আলাদা থাকে
সংগ্রহে সাক্ষ্যের শর্তকোন সংবাদ লিখিত সংকলনে গ্রহণ করা হবেস্মৃতি জানা এবং সংগ্রহের নির্দিষ্ট শর্তে সাক্ষ্য হাজির করা
উমরের মানুষের বৃদ্ধি বলার আশঙ্কাকেন তিনি নিজে লিখে দিতে থেমেছেনপাঠ নাজিল হওয়ার নিশ্চিতি ও নতুন অন্তর্ভুক্তির সামাজিক অনুমোদন
তিলাওয়াত রহিত, বিধান বহালঅনুপস্থিত পাঠের পরেও রজম কীভাবে বৈধ রাখা হয়পাঠের ধর্মীয় পরিচয় ও শাস্তির কার্যকর ক্ষমতা
যরকানির অতিশয়োক্তির ব্যাখ্যালিখতে চাওয়ার সঙ্গে রহিতকরণ কীভাবে মেলানো হয়মূল বাক্যের প্রকাশ্য অর্থ ও পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীর উদ্দেশ্য নির্ধারণ
লেখার প্রস্তাবে আপাত অপছন্দের বর্ণনানাজিলের সময় লিখন নিয়ে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিলপর্যবেক্ষকের ধারণা ও সুস্পষ্ট প্রত্যাহার-নির্দেশ

শাস্তি বহাল রাখার পক্ষে ব্যবহৃত ধর্মতত্ত্বে আনুগত্যের একটি কঠোর মূল্যবোধও আছে। সুয়ূতি সাহিবুল ফুনুনের নামে যে ব্যাখ্যা এনেছেন, সেখানে পাঠ তুলে নিয়েও বিধান রাখার উদ্দেশ্য হিসেবে নিশ্চিত প্রমাণের বিস্তারিত খোঁজ না-করে অনুমানের পথে প্রাণ সঁপে দেওয়ার আনুগত্য পরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। এটি ব্যাখ্যাকারীর প্রস্তাবিত উদ্দেশ্য; কোনো সংকলন-সভায় ঘোষিত প্রক্রিয়াগত সিদ্ধান্তের বিবরণ নয়। তাঁর বক্তব্য: [779]

وأجاب صاحب الفنون : بأن ذلك ليظهر به مقدار طاعة هذه الأمة في المسارعة إلى بذل النفوس بطريق الظن من غير استفصال لطلب طريق مقطوع به ، فيسرعون بأيسر شيء ، كما سارع الخليل إلى ذبح ولده بمنام ، والمنام أدنى طريق الوحي .

বাংলা অনুবাদ: সাহিবুল ফুনুন উত্তর দিয়েছেন: এর মাধ্যমে এই উম্মতের আনুগত্যের পরিমাণ প্রকাশ পায়—নিশ্চিত পথের অনুসন্ধানের জন্য বিস্তারিত প্রশ্ন না-করে অনুমানের পথে প্রাণ সঁপে দিতে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে। তারা অল্প ইঙ্গিতেই দ্রুত এগোয়, যেমন খলিল স্বপ্নের ভিত্তিতে নিজের সন্তানকে জবাই করতে এগিয়েছিলেন; আর স্বপ্ন ওহির নিম্নতম পথ।

এই মূল্যবোধে প্রমাণের অনিশ্চয়তা আনুগত্য থামানোর কারণ না-হয়ে আনুগত্য প্রদর্শনের সুযোগে পরিণত হয়। জীবনসংক্রান্ত বিধানের নৈতিক প্রশ্ন সেখানে আরও তীব্র: নিশ্চিত ভিত্তির অনুসন্ধানকে পিছিয়ে দিয়ে দ্রুত আত্মসমর্পণকে গুণ বলা হচ্ছে। রজমের মতো অপরিবর্তনীয় মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে এমন মানদণ্ড প্রমাণের প্রয়োজন কমায় এবং ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি নির্ভরতা বাড়ায়। বর্ণনার বাহক ও ব্যাখ্যাকারীই তখন ঠিক করেন, কোন অনুপস্থিত বক্তব্যের জন্য কতখানি জীবন-মৃত্যুর ক্ষমতা দাবি করা হবে।


দুধপানের আয়াত ও সহিফা খেয়ে ফেলার বর্ণনা

দুধপানের আয়াতের ইতিহাসে একই বিধানের সংখ্যা বদলেছে, কোরআন হিসেবে পাঠ করার সাক্ষ্য রয়ে গেছে, আর সেই পাঠ বর্তমান মুসহাফে নেই। আয়েশার বর্ণনায় প্রথমে দশবার, পরে পাঁচবার দুধপানের কথা নাজিল হয়েছিল। তাঁর আরেক বর্ণনায় রজম ও বয়স্কের দশবার দুধপানের লেখা একটি সহিফায় সংরক্ষিত ছিল; মুহাম্মদের মৃত্যু নিয়ে পরিবারের ব্যস্ততার মধ্যে পোষা প্রাণী সেটি খেয়ে ফেলে। পাঠের পরিবর্তন, লিখিত দলিলের ধ্বংস এবং বিবাহের বৈধতা নির্ধারণে সেই অনুপস্থিত পাঠের ব্যবহার—তিনটি ঘটনাই ইসলামি সংকলন ও ব্যাখ্যাগ্রন্থে স্থান পেয়েছে।

দশের পরিবর্তে পাঁচ নির্ধারণের পরও একটি অভিন্ন আইন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আয়েশার নামে পাঁচবারের পাশাপাশি দশবার দুধপান করানোর নির্দেশও বর্ণিত হয়েছে; হাফসার নামে পাওয়া যায় দশবারের নির্দেশ। মালিক বর্ণনাটি সংকলন করেছেন, কিন্তু নিজের আইনগত সিদ্ধান্তে পাঁচবারের বাধ্যতামূলক সীমা গ্রহণ করেননি। কোরআন হিসেবে কথিত একটি পাঠ মুসহাফের বাইরে থেকে কীভাবে আইনের দলিল হয় এবং একই দলিল থেকে কীভাবে পরস্পরবিরোধী বিধান তৈরি হয়, দুধপানের বিবরণে তার প্রত্যক্ষ নমুনা আছে।


দশবার দুধপান থেকে পাঁচবার দুধপানে বিধান পরিবর্তন

দুধপানজনিত আত্মীয়তার সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমান কোরআনের সূরা নিসার ২৩ নম্বর আয়াতে দুধমাতা ও দুধবোনকে বিবাহের নিষিদ্ধ সম্পর্কের মধ্যে রাখা হয়েছে। আয়াতের এই অংশে দশবার বা পাঁচবারের কোনো সংখ্যা নেই। ফলে দুধপানের সংখ্যা নিয়ে হাদিসে যে পরিবর্তনের কথা এসেছে, তা বর্তমান আয়াতের একটি শব্দের বিকল্প উচ্চারণ নয়; বিধান কার্যকর হওয়ার ন্যূনতম শর্তের পরিবর্তন। দুধপান কতবার ঘটলে দুজন মানুষের বিবাহ নিষিদ্ধ হবে, সেই প্রশ্নে সংখ্যাটি সরাসরি ফল নির্ধারণ করে। [780]

وَأُمَّهَاتُكُمُ اللَّاتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ مِنَ الرَّضَاعَةِ

বাংলা অনুবাদ: আর তোমাদের সেই মায়েরা, যাঁরা তোমাদের দুধপান করিয়েছেন, এবং দুধপানের সম্পর্কের বোনেরা।

সহিহ মুসলিমে আমরার সূত্রে আয়েশার একটি বক্তব্য সংকলিত হয়েছে: কোরআনে নির্ধারিত দশবার দুধপান নাজিল হয়েছিল, তারপর নির্ধারিত পাঁচবারও নাজিল হয়। এখানে দুবারই বিষয়টিকে অবতীর্ণ কোরআনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। পাঁচবারের সংখ্যা কোনো পরবর্তী ফকিহের অনুমান হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি। বাংলা হাদিস একাডেমী সংস্করণে এই বর্ণনাটির নম্বর ৩৪৯০; মুসলিমের আন্তর্জাতিক নম্বর ১৪৫২-এর দ্বিতীয় বর্ণনা। [781] [782] [783]

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْلَمَةَ الْقَعْنَبِيُّ ، حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ بِلاَلٍ ، عَنْ يَحْيَى، – وَهُوَ ابْنُ سَعِيدٍ – عَنْ عَمْرَةَ ، أَنَّهَا سَمِعَتْ عَائِشَةَ ، تَقُولُ – وَهْىَ تَذْكُرُ الَّذِي يُحَرِّمُ مِنَ الرَّضَاعَةِ – قَالَتْ عَمْرَةُ فَقَالَتْ عَائِشَةُ نَزَلَ فِي الْقُرْآنِ عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ ثُمَّ نَزَلَ أَيْضًا خَمْسٌ مَعْلُومَاتٌ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ১৮। দুধপান
পরিচ্ছেদঃ ৬. (কোন মহিলার দুধ) পাঁচ চুমুক খাওয়াতে হারাম সাব্যস্ত হওয়া প্রসঙ্গে
৩৪৯০-(২৫/…) আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামাহ্ আল কা’নাবী (রহঃ) ….. আমরাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি আয়িশাহ (রাযিঃ) কে বলতে শুনেছেন, যখন তিনি দুধপানের ঐ পরিমাণ সম্পর্কে আলোচনা করলেন যার দ্বারা হারাম সাব্যস্ত হয়। আমরাহ বললেন যে, আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেছিলেন, আল-কোরআনে নাযিল হয় عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ “নির্ধারিত দশবার দুধপানে”। অতঃপর নাযিল হয় خَمْسٌ مَعْلُومَاتٌ “নির্ধারিত পাঁচবার দুধপানে।” (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৪৬৩, ইসলামীক সেন্টার. ৩৪৬২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

“দশবার” থেকে “পাঁচবার” হওয়ার ফলে একই ঘটনার আইনগত পরিচয় বদলে যায়। কোনো শিশু যদি নির্দিষ্ট এক নারীর দুধ ছয়বার পান করে থাকে, দশবারের শর্তে সেই সংখ্যাটি বিবাহ নিষিদ্ধ করার জন্য অপর্যাপ্ত; পাঁচবারের শর্তে তা যথেষ্ট। সংখ্যার এই পরিবর্তন বিবাহ নিষেধের সীমা বদলায়। কোন সম্পর্ক নিষিদ্ধ হবে, কে কার সামনে আসতে পারবে এবং ভবিষ্যৎ বিবাহ বৈধ বলে গণ্য হবে কি না—সংখ্যার পরিবর্তন এসব প্রশ্নের উত্তর বদলে দেয়। ইসলামি বর্ণনায় এই পরিবর্তন ওহির মাধ্যমে অনুমোদিত হয়েছে। তার ফলে বিধানের অর্থ ও প্রয়োগও বদলেছে।

মুসলিম একই বক্তব্যের আরেকটি সনদও দিয়েছেন। আগের বর্ণনায় সুলায়মান ইবনে বিলাল, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ ও আমরা রয়েছেন; পরেরটিতে মুহাম্মদ ইবনুল মুসান্না ও আবদুল ওয়াহহাব হয়ে ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ ও আমরার কাছে ধারা মিলেছে। বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টারের সংস্করণে এই অনুসারী বর্ণনাটির নম্বর ৩৪৬৩। একই বক্তব্য সংকলনের এই একাধিক পথ আয়েশার নামে বক্তব্যটির প্রচারের সাক্ষ্য; বর্ণনাগুলো শেষ পর্যন্ত একই আমরার কাছে মিলেছে। [784] [785] [786]

(١٤٥٢) – وحَدَّثَنَاه مُحَمَّدُ بْنُ الْمُثَنَّى. حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَهَّابِ. قَالَ: سَمِعْتُ يَحْيَى بْنَ سَعِيدٍ قَالَ: أَخْبَرَتْنِي عَمْرَةُ؛ أَنَّهَا سَمِعَتْ عَائِشَةَ تَقُولُ. بِمِثْلِهِ.

বাংলা অনুবাদ: ৩৪৬৩। আমরাহ (রা) আয়েশাকে (রা) বলতে শুনেছেন—উপরের হাদিসের অনুরূপ। মুহাম্মদ ইবনুল মুসান্না বর্ণনা করেছেন, আবদুল ওয়াহহাব তাঁদের জানিয়েছেন; তিনি ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদকে বলতে শুনেছেন, আমরা তাঁকে জানিয়েছেন যে তিনি আয়েশাকে একই কথা বলতে শুনেছেন।

ইবনে মাজাহর আরেক বর্ণনায় আরও সরাসরি একটি শব্দ পাওয়া যায়: “সাকাতা”—বাদ পড়েছে বা ঝরে গেছে। সেখানে আয়েশার নামে বলা হয়েছে, আল্লাহ কোরআনের যে অংশ নাজিল করেছিলেন এবং পরে যা বাদ পড়েছে, তার মধ্যে দশবার বা নির্ধারিত পাঁচবার দুধপান ছাড়া বিবাহ নিষিদ্ধ না হওয়ার কথাটি ছিল। এই পাঠে “দশবার অথবা পাঁচবার” বলা হয়েছে; মুসলিমের ধারাবাহিক “দশ, অতঃপর পাঁচ” বাক্যের সঙ্গে তার শব্দবিন্যাস এক নয়। একই বিষয় হাদিসসংকলনে একাধিক বাক্যরূপে সংরক্ষিত হয়েছে। [787]

حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَارِثِ بْنُ عَبْدِ الصَّمَدِ بْنِ عَبْدِ الْوَارِثِ ، حَدَّثَنَا أَبِي ، حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ الْقَاسِمِ ، عَنْ أَبِيهِ ، عَنْ عَمْرَةَ ، عَنْ عَائِشَةَ ، أَنَّهَا قَالَتْ كَانَ فِيمَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنَ الْقُرْآنِ ثُمَّ سَقَطَ لاَ يُحَرِّمُ إِلاَّ عَشْرُ رَضَعَاتٍ أَوْ خَمْسٌ مَعْلُومَاتٌ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আবদুল ওয়ারিস ইবনে আবদুস সামাদ ইবনে আবদুল ওয়ারিস বর্ণনা করেছেন, তাঁর পিতা তাঁদের জানিয়েছেন; হাম্মাদ ইবনে সালামা তাঁদের জানিয়েছেন, আবদুর রহমান ইবনুল কাসিম থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে, তিনি আমরা থেকে, তিনি আয়েশা থেকে। আয়েশা বলেন: আল্লাহ কোরআনের যে অংশ নাজিল করেছিলেন, পরে যা বাদ পড়েছে, তার মধ্যে ছিল—দশবার দুধপান অথবা নির্ধারিত পাঁচবার ছাড়া বিবাহ নিষিদ্ধ হয় না।

“নাজিল হয়েছিল”, “তারপর নাজিল হয়েছিল” এবং “পরে বাদ পড়েছে”—এই ক্রিয়াগুলো পাঠের একটি পরিবর্তনশীল ইতিহাস নির্দেশ করে। বর্তমান মুসহাফে সূরা নিসার সাধারণ বিবাহ নিষেধের বাক্যটি আছে; এই সংখ্যাসংবলিত বক্তব্যগুলো সেখানে নেই। ফলে সাধারণ বিধান ও সংখ্যার নির্দিষ্ট শর্তের নথিগত অবস্থান আলাদা। সাধারণ বিধানটি সরাসরি মুসহাফে পড়া যায়; দশ ও পাঁচের ইতিহাস জানতে হয় হাদিস থেকে। কোনো পাঠ আগে কোরআন হিসেবে বর্ণিত এবং পরে মুসহাফে অনুপস্থিত থাকলে সেই অনুপস্থিতির ইতিহাস একটি স্বতন্ত্র তথ্য। “রহিত” তার ধর্মীয় শ্রেণিবিভাগ; আগে ও পরের পাঠসমষ্টি অভিন্ন করে দেওয়ার শব্দ নয়।

পাঠ বা বর্ণনাসংখ্যা ও বক্তব্যবিধান ও পাঠের পরিণতি
বর্তমান মুসহাফ, নিসা ৪:২৩দুধমাতা ও দুধবোনের সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ; এই অংশে সংখ্যা নেইদুধপানজনিত আত্মীয়তার সাধারণ নিষেধ বহাল
আয়েশার নামে মুসলিম ১৪৫২খপ্রথমে নির্ধারিত দশবার, পরে নির্ধারিত পাঁচবার নাজিলবিধানের সংখ্যাগত শর্ত পরিবর্তিত
আয়েশার নামে মুসলিম ১৪৫২কদশবারের পরিবর্তে পাঁচবার; মৃত্যুর সময়ও কোরআন হিসেবে পাঠপরবর্তী মুসহাফে অনুপস্থিত একটি পাঠের পূর্ববর্তী প্রচলনের সাক্ষ্য
ইবনে মাজাহ ১৯৪২কোরআন থেকে পরে বাদ পড়া অংশে দশবার অথবা পাঁচবারের উল্লেখবর্ণনার নিজস্ব শব্দেই বাদ পড়ার কথা আছে

সংখ্যার অর্ধেক হয়ে যাওয়ার সঙ্গে পাঠটির মর্যাদাও যুক্ত। আয়েশার বক্তব্যে দশবার ও পাঁচবার দুটিই নাজিল হওয়া কোরআনের ইতিহাসের অংশ। অথচ কোরআন খুলে এই পরিবর্তিত বাক্যদুটি পাশাপাশি বা একটির জায়গায় অন্যটি পাওয়া যায় না। একটি বিধান অন্যটির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার খবর এবং পূর্ববর্তী পাঠের পরিচয় হাদিসে টিকে আছে। মুসহাফে যে পাঠ শেষ পর্যন্ত রাখা হয়েছে, তার বাইরেও “কোরআন” নামে প্রচারিত বক্তব্যের স্মৃতি ইসলামি সূত্র নিজেই বহন করছে।


মুহাম্মদের মৃত্যুর সময়ও কোরআন হিসেবে পাঠ করার আয়েশার বক্তব্য

আয়েশার বক্তব্যের সবচেয়ে নির্দিষ্ট সময়চিহ্নটি মুহাম্মদের মৃত্যু। মুসলিমের প্রথম বর্ণনায় দশবার থেকে পাঁচবারে পরিবর্তনের পর বলা হয়েছে, মুহাম্মদের মৃত্যু হয়, অথচ সেগুলো তখন কোরআন হিসেবে পঠিত অংশের মধ্যে ছিল। বাক্যটি পাঁচবারের বিধানের পরিচয় দেওয়ার সঙ্গে তার তিলাওয়াতের অবস্থাও জানায়। “কোরআন হিসেবে পড়া” এবং শুধু একটি আইন জানা ভিন্ন বিষয়। আয়েশার নামে সংকলিত বাক্যে উভয় দিকই রয়েছে: পূর্ববর্তী দশবারের বিধান পরিবর্তিত হয়েছে এবং নতুন পাঁচবারের অংশের কোরআন হিসেবে পাঠ মৃত্যুর সময় পর্যন্ত চলেছে। [788] [789] [790]

حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ يَحْيَى ، قَالَ قَرَأْتُ عَلَى مَالِكٍ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي بَكْرٍ ، عَنْ عَمْرَةَ ، عَنْ عَائِشَةَ ، أَنَّهَا قَالَتْ كَانَ فِيمَا أُنْزِلَ مِنَ الْقُرْآنِ عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ يُحَرِّمْنَ ‏.‏ ثُمَّ نُسِخْنَ بِخَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ فَتُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَهُنَّ فِيمَا يُقْرَأُ مِنَ الْقُرْآنِ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ১৮/ দুধপান
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
৩৪৬৬। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোরআনে এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিলঃ عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ ‘দশবার দুধপানে হারাম সাবিত হয়।’ তারপর তা রহিত হয়ে যায় خَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ এর দ্বারা। (পাঁচবার পান দ্বারা হুরমত সাব্যস্ত হয়) তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেন অথচ ঐ আয়াতটি কুরআনের আয়াত হিসাবে তিলাওয়াত করা হত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

স্তন চোষা
বয়ষ্ক লোকের স্তন চোষা

বাক্যের “ওয়া হুন্না ফিমা ইউকরা মিনাল কোরআন” অংশে কোরআন হিসেবে পাঠের বিষয়টি স্পষ্ট। পাঁচবারের বিধানটি মৃত্যুর সময় কার্যকর ছিল—এই তথ্যের চেয়ে বাক্যটির বক্তব্য বিস্তৃত। একটি বিধান সমাজে কার্যকর থাকতে পারে, কিন্তু সেই বিধানের শব্দকে আর কোরআন হিসেবে না-ও পড়া হতে পারে। আয়েশার বর্ণনায় শব্দগুলোর কোরআন হিসেবে পড়া হওয়ার কথাই বলা হয়েছে। অতএব মৃত্যুর সময়ের প্রচলিত পাঠ এবং পরবর্তী মুসহাফে গৃহীত পাঠের মধ্যে একটি ব্যবধান এই সাক্ষ্যের অন্তর্গত। বর্তমানে পাঁচবারের সেই বাক্য মুসহাফে নেই।

মালিকের মুয়াত্তাতেও একই শেষ বাক্য আছে। সেখানে আমরা বিনতে আবদুর রহমান হয়ে আয়েশার বর্ণনাটি এসেছে। মুসলিমের প্রথম পথেও মালিক, আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর ও আমরা রয়েছেন। ফলে মুয়াত্তা ও মুসলিমে মুদ্রিত হওয়া দুটি আলাদা প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য নয়; একই বর্ণনাধারা দুটি সংকলনে স্থান পেয়েছে। এই সূত্রগত সম্পর্কের মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ধরা পড়ে: মৃত্যুর সময়ও পাঠ করার বাক্যটি পরবর্তী বাংলা লেখকের সংযোজন নয়; আরবি হাদিসপাঠেই বাক্যটি উপস্থিত। [791] [792]

وَحَدَّثَنِي عَنْ مَالِكٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي بَكْرِ بْنِ حَزْمٍ، عَنْ عَمْرَةَ بِنْتِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ عَائِشَةَ، زَوْجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهَا قَالَتْ كَانَ فِيمَا أُنْزِلَ مِنَ الْقُرْآنِ عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ يُحَرِّمْنَ ثُمَّ نُسِخْنَ بِخَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ فَتُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ فِيمَا يُقْرَأُ مِنَ الْقُرْآنِ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: মুয়াত্তা মালিক
৩০. সন্তানের দুধ পান করানোর বিধান সম্পর্কিত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ৩. দুধ পান করানোর বিবিধ বিষয়
রেওয়ায়ত ১৭. আমরাহ বিনত আবদির রহমান (রহঃ) হইতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পত্নী আয়েশা (রাঃ) বলিয়াছেনঃ কুরআনে যাহা অবতীর্ণ হইয়াছিল তাহাতে দশবার দুধ চোষার কথা নির্ধারিত ছিল, যাহা হারাম করিবে, তারপর উহা রহিত হইয়া যায় নির্ধারিত পাঁচবার দুগ্ধ চোষার (অবতীর্ণ হুকুমের) দ্বারা। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ওফাত হয় তখনও সেই পাঁচবার দুধ চোষার (হুকুমের অংশ) সম্মিলিত আয়াত তিলাওয়াত করা হইত।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ ইহার উপর আমল নাই। অর্থাৎ পাঁচবারের উপর আমল নাই। দুগ্ধ পান অল্প হউক বা বেশি হউক বিবাহ সম্পর্ক হারাম করিবে।
হাদিসের মানঃ তাহকীক অপেক্ষমাণ
বর্ণনাকারীঃ আমরাহ বিনতু আবদুর রহমান (রহঃ)

আবু দাউদের ২০৬২ এবং নাসায়ির ৩৩০৭ নম্বর হাদিসেও মৃত্যুর সময় কোরআন হিসেবে পড়ার বাক্যটি রয়েছে। এই দুটি সংকলনের সংশ্লিষ্ট পথও মালিক হয়ে একই আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর ও আমরার সূত্রে গেছে। গ্রন্থের সংখ্যা বাড়লেও এই নির্দিষ্ট বক্তব্যের মূল সূত্র বদলায়নি। সংকলনগুলোর মধ্যে কখনো “ওয়া হুন্না”, কখনো “ওয়া হিয়া”, মুয়াত্তার পাঠে “ওয়া হুয়া” এসেছে; প্রত্যেক ক্ষেত্রেই মৃত্যুর সময় কোরআন হিসেবে পঠিত থাকার তথ্যটি রাখা হয়েছে। এই বাক্যরূপগুলোর তুলনা পাঠটির প্রচলন ও ভাষাগত সংরক্ষণ সম্পর্কে তথ্য দেয়।

সংকলনপ্রধান বর্ণনাধারামৃত্যুর সময় পাঠের বক্তব্য
মুয়াত্তা মালিক, আরবি ১২৯৩মালিক → আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর → আমরা → আয়েশাওয়া হুয়া ফিমা ইউকরা মিনাল কোরআন
মুসলিম ১৪৫২কইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া → মালিক → একই ধারাওয়া হুন্না ফিমা ইউকরা মিনাল কোরআন
আবু দাউদ ২০৬২কানাবি → মালিক → একই ধারাওয়া হুন্না মিম্মা ইউকরা মিনাল কোরআন
নাসায়ি ৩৩০৭মালিকের একাধিক ছাত্র → মালিক → একই ধারাওয়া হিয়া মিম্মা ইউকরা মিনাল কোরআন

আবু দাউদের পূর্ণ বর্ণনায় পাঁচবারের পরেও “বিবাহ নিষিদ্ধ করে” কথাটি আছে। দশের জায়গায় পাঁচ বসার আইনগত ফল এবং মৃত্যুর সময় পাঠের বিবরণ একই হাদিসে পাশাপাশি রক্ষিত হয়েছে। [793] [794]

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْلَمَةَ الْقَعْنَبِيُّ ، عَنْ مَالِكٍ ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي بَكْرِ بْنِ مُحَمَّدِ بْنِ عَمْرِو بْنِ حَزْمٍ ، عَنْ عَمْرَةَ بِنْتِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ ، عَنْ عَائِشَةَ ، أَنَّهَا قَالَتْ كَانَ فِيمَا أَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ مِنَ الْقُرْآنِ عَشْرُ رَضَعَاتٍ يُحَرِّمْنَ ثُمَّ نُسِخْنَ بِخَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ يُحَرِّمْنَ فَتُوُفِّيَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَهُنَّ مِمَّا يُقْرَأُ مِنَ الْقُرْآنِ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আবদুল্লাহ ইবনে মাসলামা আল-কানাবি মালিক থেকে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আমর ইবনে হাজম থেকে, তিনি আমরা বিনতে আবদুর রহমান থেকে, তিনি আয়েশা থেকে বর্ণনা করেছেন। আয়েশা বলেন: আল্লাহ কোরআনের যে অংশ নাজিল করেছিলেন, তার মধ্যে দশবার দুধপান বিবাহ নিষিদ্ধ করত। পরে তা নির্ধারিত পাঁচবার দিয়ে রহিত করা হয়, যা বিবাহ নিষিদ্ধ করত। এরপর নবী মারা যান, অথচ এগুলো তখনও কোরআন হিসেবে পঠিত অংশের মধ্যে ছিল।

পরবর্তী ব্যাখ্যায় নববী এই অবস্থাকে রহিত হওয়ার সংবাদ বিলম্বে পৌঁছানোর ফল বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রহিত হওয়ার ঘটনা এত দেরিতে ঘটেছিল যে মুহাম্মদের মৃত্যুর সময় কিছু মানুষ পাঁচবারের অংশকে কোরআন হিসেবে পড়ছিলেন; পরে তাঁরা রহিত হওয়ার খবর পেয়ে পাঠ বন্ধ করেন। সিদ্দিক হাসান খানের আস-সিরাজুল ওয়াহহাজেও একই ব্যাখ্যা রয়েছে। আয়েশার বক্তব্যে মৃত্যুর সময়ের পাঠের সাক্ষ্য আছে; নববী ও সিদ্দিক হাসান খানের ব্যাখ্যায় সেই পাঠ বন্ধ হওয়ার জন্য আরও একটি সংবাদপ্রবাহ যুক্ত হয়েছে। [795] [796]

ومعناه أن النسخ بخمس رضعات تأخر إنزاله جدا حتى إنه صلى الله عليه وسلم توفي وبعض الناس يقرأ : خمس رضعات ويجعلها قرآنا متلوا لكونه لم يبلغه النسخ لقرب عهده فلما بلغهم النسخ بعد ذلك رجعوا عن ذلك وأجمعوا على أن هذا لا يتلى .

বাংলা অনুবাদ: এর অর্থ হলো, পাঁচবার দুধপানের ক্ষেত্রে রহিত হওয়ার বিষয়টি অবতীর্ণ হতে এত বিলম্ব হয়েছিল যে রাসুল মারা যান, অথচ কিছু মানুষ তখনও পাঁচবার দুধপানের অংশ পড়ছিলেন এবং একে তিলাওয়াতযোগ্য কোরআন বলে গণ্য করছিলেন। ঘটনাটি খুব সাম্প্রতিক হওয়ায় রহিত হওয়ার খবর তাঁদের কাছে পৌঁছেনি। পরে সেই খবর পৌঁছালে তাঁরা তা থেকে ফিরে আসেন এবং একমত হন যে এটি পাঠ করা হবে না।

এই ব্যাখ্যার সময়ক্রমে মুহাম্মদের মৃত্যু একটি বিভাজনরেখা। মৃত্যুর আগেই পাঠ তুলে নেওয়ার নির্দেশ এসেছে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু পাঠকদের একাংশ তা জানতেন না। মৃত্যুর পরে তাঁদের কাছে খবর পৌঁছালে পাঠ বন্ধ হয়েছে। অর্থাৎ একই সময়ে একজনের কাছে যে বাক্য কোরআন হিসেবে পাঠযোগ্য, অন্য তথ্য অনুসারে তা ততক্ষণে পাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। এই ব্যবধান শুধু মুখস্থ শক্তির নয়; কোন মুখস্থ বাক্যটির ধর্মীয় মর্যাদা এখন কী, সেই সংবাদ জানার ব্যবধান। একটি শব্দ স্মৃতিতে অক্ষত থেকেও কোরআন হিসেবে পড়ার অনুমোদন হারাতে পারে।

নববীর এই ব্যাখ্যায় রহিত করার ঘোষণার নির্দিষ্ট দিন, তার সরাসরি ঘোষক বা মৃত্যুর পরে সংবাদ বহনকারী ব্যক্তিদের নাম নেই। আয়েশার মূল বাক্যে যে সময়চিহ্নটি সরাসরি আছে, তা মৃত্যু; পাঠ তুলে নেওয়ার আগের ঘোষণা ও পরের সংবাদপ্রাপ্তির মধ্যবর্তী ঘটনাক্রম ব্যাখ্যাকারীর সংযোজিত বিন্যাস। ফলে “মৃত্যুর সময়ও পড়া হতো” কথাটি বর্ণনার সাক্ষ্য এবং “খবর না পাওয়ায় পড়া চলছিল” কথাটি পরবর্তী ব্যাখ্যা। এই দুই বাক্যের উৎস ও প্রমাণের ধরন আলাদা। দ্বিতীয়টির মাধ্যমে প্রথমটির অসুবিধা ব্যাখ্যা করা হয়েছে; প্রথম সাক্ষ্যটি তাতে মুছে যায়নি।

পর্যায়আয়েশার বর্ণনা বা ব্যাখ্যাকারীর বক্তব্যপাঠের অবস্থা
প্রথম নাজিলআয়েশার বর্ণনায় নির্ধারিত দশবারকোরআন হিসেবে পরিচিত বক্তব্য
পরবর্তী পরিবর্তনআয়েশার বর্ণনায় পাঁচবার দিয়ে দশবার রহিতসংখ্যা বদলে নতুন বিধান
মুহাম্মদের মৃত্যুআয়েশার বর্ণনায় তখনও কোরআন হিসেবে পাঠপাঠের ধারাবাহিকতার সরাসরি সময়চিহ্ন
খবর পৌঁছানো ও পাঠ বন্ধনববীর ব্যাখ্যায় মৃত্যুর পরে অজ্ঞাত পাঠকেরা সংবাদ পানসংবাদপ্রাপ্তির পরে ধর্মীয় পাঠের অবস্থান বদল
গৃহীত মুসহাফদশ ও পাঁচের নির্দিষ্ট বাক্য কোনোটিই নেইবর্ণিত পূর্ববর্তী পাঠ ও মুসহাফের পাঠসমষ্টি পৃথক

নববী দশবার ও পাঁচবারের জন্য দুটি ভিন্ন শ্রেণি ব্যবহার করেছেন। দশবারের ক্ষেত্রে পাঠ ও বিধান উভয়ই রহিত; পাঁচবারের ক্ষেত্রে পাঠ রহিত হলেও বিধান বহাল। বাংলা আল-আওনুল মাহমুদেও দুধপানের বর্ণনাগুলোর ব্যাখ্যা আলোচিত হয়েছে। সংখ্যার পরিবর্তনের পরে পাঁচবারের বাক্য মুসহাফে না থাকা এবং আইনে তার ব্যবহার চলা—এই দুই অবস্থাকে “তিলাওয়াত রহিত, বিধান বহাল” সূত্রে যুক্ত করা হয়েছে। [797] [798]

أحدها : ما نسخ حكمه وتلاوته كعشر رضعات ، والثاني : ما نسخت تلاوته دون حكمه كخمس رضعات

বাংলা অনুবাদ: একটি ধরন হলো, যার বিধান ও তিলাওয়াত উভয়ই রহিত হয়েছে, যেমন দশবার দুধপান। দ্বিতীয়টি হলো, যার বিধান রহিত হয়নি, তিলাওয়াত রহিত হয়েছে, যেমন পাঁচবার দুধপান।

কোরআন সংকলন 162

এই শ্রেণিবিন্যাসে “সংরক্ষিত” ও “অপরিবর্তিত” একই অর্থ বহন করে না। দশবারের বক্তব্য নাজিল হওয়ার পর তার সংখ্যা ও বিধান বদলেছে; পাঁচবারের বক্তব্যের তিলাওয়াতও পরে বাদ গেছে। ধর্মীয় ব্যাখ্যা এই পরিবর্তনকে বৈধ ওহিগত ব্যবস্থা বলে অনুমোদন দেয়। পাঠের ইতিহাসে তবু একটি অবতীর্ণ বক্তব্য থেকে আরেকটি বক্তব্যে যাওয়া এবং শেষে মুসহাফ থেকে সেই নির্দিষ্ট ভাষা বাদ পড়ার পর্যায়গুলো থেকে যায়। কোনো বাক্যের স্মৃতি হাদিসে সংরক্ষিত থাকা আর তাকে কোরআনের অঙ্গ হিসেবে মুসহাফে সংরক্ষণ করা ভিন্ন প্রক্রিয়া।


রজম ও দুধপানের লেখা, বিছানার নিচের সহিফা এবং পোষা প্রাণীর খেয়ে ফেলা

ইবনে মাজাহর ১৯৪৪ নম্বর বর্ণনায় রজম ও বয়স্কের দশবার দুধপানের বিষয় একটি লিখিত সহিফার সঙ্গে যুক্ত। আয়েশার নামে বলা হয়েছে, লেখাটি তাঁর খাটের নিচে ছিল। মুহাম্মদ মারা গেলে তাঁরা মৃত্যু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন; সেই সময়ে পোষা প্রাণী এসে সেটি খেয়ে ফেলে। এখানে বস্তু, অবস্থান, সময় ও ধ্বংসের কারণ প্রতিটিই নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। “সহিফা” লিখিত পাতার পরিচয়, “খাটের নিচে” তার সংরক্ষণের স্থান, আর খেয়ে ফেলা সেই বস্তুটি নষ্ট হওয়ার ঘটনা। [799] [800] [801]

حَدَّثَنَا أَبُو سَلَمَةَ، يَحْيَى بْنُ خَلَفٍ حَدَّثَنَا عَبْدُ الأَعْلَى ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِسْحَاقَ ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي بَكْرٍ ، عَنْ عَمْرَةَ ، عَنْ عَائِشَةَ ، ‏.‏ وَعَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ الْقَاسِمِ ، عَنْ أَبِيهِ ، عَنْ عَائِشَةَ ، قَالَتْ لَقَدْ نَزَلَتْ آيَةُ الرَّجْمِ وَرَضَاعَةُ الْكَبِيرِ عَشْرًا وَلَقَدْ كَانَ فِي صَحِيفَةٍ تَحْتَ سَرِيرِي فَلَمَّا مَاتَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ وَتَشَاغَلْنَا بِمَوْتِهِ دَخَلَ دَاجِنٌ فَأَكَلَهَا ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: পরিচ্ছেদঃ ৯/৩৬. বয়স্ক লোকে দুধ পান করলে।
২/১৯৪৪। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রজম সম্পর্কিত আয়াত এবং বয়স্ক লোকেরও দশ ঢোক দুধপান সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হয়েছিল, যা একটি সহীফায় (লিখিত) আমার খাটের নিচে সংরক্ষিত ছিল। যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেন এবং আমরা তাঁর ইন্তিকালে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লাম, তখন একটি ছাগল এসে তা খেয়ে ফেলে।
মাজাহ ১৯৪৪ সহীহ মুসলিম ১৪৫২, নাসায়ী ৩৩০৭, আবু দাউদ ২০৬২, মুয়াত্তা মালেক ১২৯৩, দারেমী ২২৫৩, তা’লীক ইবনু মাজাহ। তাহকীক আলবানীঃ হাসান। উক্ত হাদিসের রাবী মুহাম্মাদ বিন ইসহাক সম্পর্কে ইয়াহইয়া বিন মাঈন ও আজালী বলেন, তিনি সিকাহ। আহমাদ বিন হাম্বল বলেন, তিনি হাসানুল হাদিস। আলী ইবনুল মাদীনী বলেন, তিনি সালিহ। (তাহযীবুল কামালঃ রাবী নং ৫০৫৭, ২৪/৪০৫ নং পৃষ্ঠা)
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)

বয়ষ্ক লোকের দুধপান

বাংলা অনুবাদে প্রাণীটিকে ছাগল বলা হয়েছে। আরবি পাঠের “দাজিন” শব্দের অর্থ ঘরে পোষা প্রাণী; শাব্দিক পরিসর আরও বিস্তৃত। ইসলামওয়েবের ব্যাখ্যায় ভেড়া-ছাগলজাতীয় পোষা পশুর পাশাপাশি ঘরের সঙ্গে অভ্যস্ত পাখি ও অন্য প্রাণীর ক্ষেত্রেও শব্দটির ব্যবহার উল্লেখ আছে। বর্ণনার ঘটনাটি একটি গৃহপালিত প্রাণীর হাতে লিখিত পাতাটি নষ্ট হওয়ার বিবরণ। [802]

كل ما يألف البيوت من الطير وغيرها

বাংলা অনুবাদ: ঘরের সঙ্গে অভ্যস্ত পাখি ও অন্যান্য প্রাণী।

পাতার বিষয়বস্তুতে দশবার দুধপান আছে, পাঁচবার নেই। এই সংখ্যাটি মুসলিমের “দশ থেকে পাঁচ” ক্রমের প্রথম পর্যায়ের সঙ্গে মেলে। ফলে আগের সংখ্যার বক্তব্য লেখা অবস্থায় রয়ে যাওয়ার একটি চিত্র পাওয়া যায়। আইনগত কার্যকারিতা বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে সব ব্যক্তিগত লিখিত অনুলিপি ধ্বংস হয়ে যায়নি। একই ঘরে এমন একটি পাতার অস্তিত্বের বর্ণনা আছে, যার বিষয়কে হাদিসে নাজিল হওয়া পাঠ বলা হচ্ছে, কিন্তু যার শব্দ বর্তমান মুসহাফে পাওয়া যায় না। লিখিত উপকরণ টিকে থাকা, তার আইনগত ব্যবহার এবং মুসহাফে অন্তর্ভুক্তি—এই তিনটি অবস্থার পৃথক ইতিহাস রয়েছে।

মুসনাদে আহমাদের সমান্তরাল বিবরণে মুহাম্মদের মৃত্যুর বদলে তাঁর অসুস্থ হয়ে পড়ার সময় বলা হয়েছে। সেখানে পাতাটি ঘরের একটি খাটের নিচে ছিল; অসুস্থতা নিয়ে ব্যস্ততার মধ্যে তাঁদের একটি ছোট পোষা প্রাণী সেটি খেয়ে ফেলে। এই পাঠেও রজম ও বয়স্কের দশবার দুধপানের কথা আছে। দুই বর্ণনার সাধারণ কেন্দ্র একই: আয়েশার ঘরে লেখা, খাটের নিচে সংরক্ষণ, পরিবারের মনোযোগ অন্যদিকে থাকা এবং প্রাণীর খেয়ে ফেলা। [803]

حَدَّثَنَا يَعْقُوبُ قَالَ حَدَّثَنَا أَبِي عَنِ ابْنِ إِسْحَاقَ قَالَ حَدَّثَنِي عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أَبِي بَكْرِ بْنِ مُحَمَّدِ بْنِ عَمْرِو بْنِ حَزْمٍ عَنْ عَمْرَةَ بِنْتِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ عَنْ عَائِشَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَتْ لَقَدْ أُنْزِلَتْ آيَةُ الرَّجْمِ وَرَضَعَاتُ الْكَبِيرِ عَشْرًا فَكَانَتْ فِي وَرَقَةٍ تَحْتَ سَرِيرٍ فِي بَيْتِي فَلَمَّا اشْتَكَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَشَاغَلْنَا بِأَمْرِهِ وَدَخَلَتْ دُوَيْبَةٌ لَنَا فَأَكَلَتْهَا

বাংলা অনুবাদ: ইয়াকুব বর্ণনা করেছেন, তাঁর পিতা তাঁকে জানিয়েছেন, ইবনে ইসহাক থেকে। ইবনে ইসহাক বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আমর ইবনে হাজম আমাকে জানিয়েছেন, আমরা বিনতে আবদুর রহমান থেকে, তিনি নবীর স্ত্রী আয়েশা থেকে। আয়েশা বলেন: রজমের আয়াত ও বয়স্কের দশবার দুধপানের বিষয় নাজিল হয়েছিল। তা আমার ঘরে একটি খাটের নিচে একটি পাতায় ছিল। রাসুল অসুস্থ হলে আমরা তাঁর বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। তখন আমাদের একটি ছোট প্রাণী ঢুকে সেটি খেয়ে ফেলে।

বিবরণের দিকইবনে মাজাহ ১৯৪৪আহমাদের সমান্তরাল বর্ণনা
লেখার বিষয়রজমের আয়াত ও বয়স্কের দশবার দুধপানরজমের আয়াত ও বয়স্কের দশবার দুধপান
লিখিত উপকরণসহিফাওয়ারাকা বা পাতা
অবস্থানআমার খাটের নিচেআমার ঘরে একটি খাটের নিচে
ব্যস্ততার উপলক্ষমুহাম্মদের মৃত্যুমুহাম্মদের অসুস্থতা
প্রাণীর পরিচয়দাজিন বা পোষা প্রাণীআমাদের একটি ছোট প্রাণী
পরিণতিপাতাটি খেয়ে ফেলাপাতাটি খেয়ে ফেলা

ইবনে মাজাহর সনদে মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকের মাধ্যমে দুটি পথ দেওয়া হয়েছে: একটি আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর থেকে আমরা হয়ে আয়েশা; অন্যটি আবদুর রহমান ইবনুল কাসিম থেকে তাঁর পিতা কাসিম হয়ে আয়েশা। এই দুটি পথই উপরের স্তরে ইবনে ইসহাকের কাছে মিলেছে। আহমাদের বর্ণনায় ইবনে ইসহাক “আমাকে জানিয়েছেন” বলে আবদুল্লাহর কাছ থেকে শোনার ভাষা ব্যবহার করেছেন। প্রাণীর ঘটনার গ্রন্থভেদে উপস্থিতির পাশাপাশি বর্ণনাগুলোর এই পরস্পরনির্ভরতাও রয়েছে। একই মধ্যবর্তী বর্ণনাকারীর পাঠ একাধিক গ্রন্থে ছাপা হওয়া ঘটনাটির সমসংখ্যক স্বাধীন উৎস তৈরি করে না।

এই হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ইসলামি পরিমণ্ডলে ভিন্ন সিদ্ধান্ত আছে। মূল বাংলা সংস্করণে আলবানীর “হাসান” মূল্যায়ন দেওয়া হয়েছে এবং ইবনে ইসহাক সম্পর্কে কয়েকজন সমালোচকের ইতিবাচক মন্তব্যও সংরক্ষিত আছে। ইবনে হাযম আল-মুহাল্লায় সহিফা খেয়ে ফেলার বর্ণনাটি উদ্ধৃত করে একে সহিহ বলেছেন। ফলে ঘটনাটিকে গ্রহণ করার নজির ধ্রুপদি ইসলামি সাহিত্যেই রয়েছে। [804]

قَالَ أَبُو مُحَمَّدٍ : وَهَذَا حَدِيثٌ صَحِيحٌ

বাংলা অনুবাদ: আবু মুহাম্মদ বলেন: এটি একটি সহিহ হাদিস।

ইসলামকিউএ ১৭৫৩৫৫ নম্বর উত্তরে প্রাণী খেয়ে ফেলার অতিরিক্ত অংশটি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের কারণ হলো, মালিক ও ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদের বর্ণনায় ঘটনাটি নেই, আর ইবনে ইসহাকের পাঠে আছে। এই পার্থক্যকে তারা অগ্রহণযোগ্য অতিরিক্ত বর্ণনা হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। [805]

قصة ضعيفة لا تثبت

বাংলা অনুবাদ: দুর্বল ঘটনা, যা প্রতিষ্ঠিত নয়।

এই মতভেদে প্রাণীর ঘটনাসংবলিত বিশেষ পাঠটির মূল্যায়ন বদলেছে। মুসলিমে দশ থেকে পাঁচে পরিবর্তন এবং মৃত্যুর সময়ও কোরআন হিসেবে পাঠের বিবরণ নিজ নিজ স্থানে থেকে যায়। ইসলামকিউএর আলোচনাতেও মালিকের সেই বর্ণনা গ্রহণ করে প্রাণীর অতিরিক্ত ঘটনাটি বাদ দেওয়া হয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট দলিলগুলোর পরিণতি ভিন্ন: একটি শাখায় লিখিত পাতা নষ্ট হওয়ার বর্ণনা আছে; অন্য শাখায় নাজিল হওয়া সংখ্যাসংবলিত পাঠের পরিবর্তন ও পাঠচ্যুতির ইতিহাস আছে। সহিফার ঘটনার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিরোধের সঙ্গে এই পূর্ববর্তী পাঠগুলোর বর্তমান মুসহাফে অনুপস্থিতির তথ্যকে এক করে ফেলা যায় না।

ইবনে হাযমের ব্যাখ্যা আরও নির্দিষ্ট। তিনি সহিফার ধ্বংস মেনে নিয়ে বলেন, এর শব্দ আগেই রহিত হয়েছিল; সে জন্য সেই পাতার প্রয়োজন ছিল না। দুধপানের আয়াত সম্পর্কেও তিনি একই সিদ্ধান্ত দেন। তাঁর মতে, বিষয়টি মানুষের মুখস্থ ছিল বলে কোরআনে অন্তর্ভুক্ত রাখার নির্দেশ থাকলে পাতাটি খাওয়া তা পুনরায় লিখতে বাধা হতো না। লিখিত পাতার শারীরিক ধ্বংস ও কোরআনের অঙ্গ হিসেবে পাঠের মর্যাদা এই যুক্তিতে পৃথক। [806]

فَصَحَّ نَسْخُ لَفْظِهَا وَبَقِيَتْ الصَّحِيفَةُ الَّتِي كُتِبَتْ فِيهَا – كَمَا قَالَتْ عَائِشَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا – فَأَكَلَهَا الدَّاجِنُ ، وَلَا حَاجَةَ بِأَحَدٍ إلَيْهَا . وَهَكَذَا الْقَوْلُ فِي آيَةِ الرَّضَاعَةِ وَلَا فَرْقَ . وَبُرْهَانُ هَذَا : أَنَّهُمْ قَدْ حَفِظُوهَا كَمَا أَوْرَدْنَا ، فَلَوْ كَانَتْ مُثْبَتَةً فِي الْقُرْآنِ لَمَا مَنَعَ أَكْلُ الدَّاجِنِ لِلصَّحِيفَةِ مِنْ إثْبَاتِهَا فِي الْقُرْآنِ مِنْ حِفْظِهِمْ – وَبِاَللَّهِ تَعَالَى التَّوْفِيقُ .

বাংলা অনুবাদ: তাহলে এর শব্দের রহিত হওয়া প্রতিষ্ঠিত হলো; আর আয়েশার কথা অনুযায়ী, যে সহিফায় তা লেখা ছিল সেটি রয়ে গিয়েছিল। পোষা প্রাণী সেটি খেয়ে ফেলে; কারও তার প্রয়োজন ছিল না। দুধপানের আয়াত সম্পর্কেও একই কথা, কোনো পার্থক্য নেই। এর প্রমাণ হলো, আমাদের বর্ণিত বিবরণ অনুযায়ী তাঁরা তা মুখস্থ রেখেছিলেন। এটি কোরআনে বহাল থাকলে সহিফাটি পোষা প্রাণীর খেয়ে ফেলা তাঁদের মুখস্থ থেকে সেটি কোরআনে লিখতে বাধা দিত না। আল্লাহর পক্ষ থেকেই তৌফিক।

ইবনে হাযম তাঁর পরবর্তী যুক্তিতে ঘোষণা করেন, মুহাম্মদকে কোনো আয়াত পৌঁছে দিতে বলা হলে তিনি তা পৌঁছে দিতেন; পৌঁছে দিলে তা সংরক্ষিত থাকত। তারপর তিনি না-পৌঁছানো, ভুলিয়ে দেওয়া অথবা মুসহাফে লেখার নির্দেশ না-থাকা—এসব অবস্থাকে নিশ্চিত রহিত হওয়ার মধ্যে রাখেন। অনুপস্থিতির সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগুলোকে এখানে ধর্মীয় কর্তৃত্বের মাধ্যমে একই অনুমোদিত শ্রেণিতে নিয়ে আসা হয়েছে। [807]

فَصَحَّ أَنَّ الْآيَاتِ الَّتِي ذَهَبَتْ لَوْ أُمِرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِتَبْلِيغِهَا لَبَلَّغَهَا ، وَلَوْ بَلَّغَهَا لَحُفِظَتْ ، وَلَوْ حُفِظَتْ مَا ضَرَّهَا مَوْتُهُ ، كَمَا لَمْ يَضُرَّ مَوْتُهُ – عَلَيْهِ السَّلَامُ – كُلَّ مَا بَلَّغَ فَقَطْ مِنْ الْقُرْآنِ ، وَإِنْ كَانَ عَلَيْهِ السَّلَامُ لَمْ يُبَلِّغْ ، أَوْ بَلَّغَهُ فَأُنْسِيه هُوَ وَالنَّاسُ ، أَوْ لَمْ يَنْسَوْهُ ، لَكِنْ لَمْ يَأْمُرْ – عَلَيْهِ السَّلَامُ – أَنْ يُكْتَبَ فِي الْقُرْآنِ فَهُوَ مَنْسُوخٌ بِيَقِينٍ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ تَعَالَى ، لَا يَحِلُّ أَنْ يُضَافَ إلَى الْقُرْآنِ .

বাংলা অনুবাদ: তাহলে প্রতিষ্ঠিত হলো, যেসব আয়াত চলে গেছে, আল্লাহর রাসুলকে সেগুলো পৌঁছে দিতে নির্দেশ দেওয়া হলে তিনি পৌঁছে দিতেন; পৌঁছে দিলে সেগুলো সংরক্ষিত হতো। সংরক্ষিত থাকলে তাঁর মৃত্যু সেগুলোর ক্ষতি করত না, যেমন তাঁর মৃত্যু কোরআনের সেই অংশের ক্ষতি করেনি, যা তিনি পৌঁছে দিয়েছিলেন। আর তিনি যদি পৌঁছে না দিয়ে থাকেন, অথবা পৌঁছে দেওয়ার পরে তাঁকে ও অন্য মানুষকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে, অথবা তাঁরা না ভুলে থাকলেও তিনি সেটি কোরআনে লিখতে নির্দেশ না দিয়ে থাকেন, তাহলে তা নিশ্চিতভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহিত। কোরআনে তা যুক্ত করা বৈধ নয়।

ইবনে হাযমের এই যুক্তির সিদ্ধান্ত মুখস্থ থাকার তথ্য থেকে একা বের হয় না। মুখস্থ কোনো বাক্যকে মুসহাফে রাখা হবে কি না, সে বিষয়ে আলাদা সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। তাঁর ব্যাখ্যায় বর্তমান মুসহাফে বাক্যটি নেই এবং সংরক্ষণ ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা ধর্মীয়ভাবে অগ্রহণযোগ্য; তাই অনুপস্থিত পাঠকে রহিত বলে শ্রেণিবদ্ধ করা হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে কোনো বাক্য অনুপস্থিত থাকলে অনুপস্থিতিটিই তার প্রত্যাহারের প্রমাণে পরিণত হয়। অথচ প্রত্যাহারের ঘটনাটির নিজস্ব তারিখ, ঘোষণার বর্ণনা ও সংক্রমণের ইতিহাস অনুপস্থিতির তথ্য থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায় না।

খাটের নিচের সহিফার বিবরণে সংরক্ষণের দৈনন্দিন পদ্ধতিও ধরা পড়ে। একটি গুরুত্বপূর্ণ লিখিত দলিল ঘরের অন্য জিনিসের মতোই মানুষের মনোযোগ, নিরাপদ স্থান এবং বাইরের ক্ষতি থেকে সুরক্ষার ওপর নির্ভর করছিল। পরিবারের সংকটে সেই সুরক্ষা ব্যর্থ হয়েছে বলে বর্ণনা করা হয়েছে। পাতার বিষয়কে ঐশী বলা হলেও তার বাহক ছিল নষ্ট হওয়ার উপযোগী বস্তু। ধর্মীয় মর্যাদা সেই বস্তুটিকে প্রাণীর নাগালের বাইরে রাখেনি। বর্ণনাটির গ্রহণকারী ইবনে হাযমও বস্তুটি অক্ষত থাকার দাবি করেননি; তার প্রয়োজন শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

সহিফা নষ্ট হওয়ার বিবরণ তাই লিখিত উপকরণের দুর্বলতা এবং অনুপস্থিত পাঠ সম্পর্কে পরবর্তী ব্যাখ্যার দুটি পৃথক স্তর সামনে আনে। প্রথম স্তরে একটি পাতা ধ্বংস হয়; দ্বিতীয় স্তরে ব্যাখ্যাকারী তার বিষয়বস্তু আর মুসহাফে রাখার প্রয়োজন নেই বলে সিদ্ধান্ত দেন। বর্তমান কোরআনে রজম ও নির্দিষ্ট দশবার বা পাঁচবার দুধপানের বাক্য নেই, কিন্তু সেই অনুপস্থিত শব্দের পরিচয় হাদিস ও ফিকহে রয়ে গেছে। শব্দগুলোকে মানুষ স্মরণ করেছে, উদ্ধৃত করেছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিধানের ভিত্তি করেছে; মুসহাফে স্থান দেওয়ার অনুমোদন তার পরেও আলাদা থেকেছে।


পাঠ তুলে নেওয়ার সংবাদ, দুধপানের সংখ্যা ও পরবর্তী আইনগত মতভেদ

দুধপানের সংখ্যা নিয়ে বর্ণিত পরিবর্তনের একটি বাস্তব প্রয়োগ সাহলা ও সালিমের ঘটনায় পাওয়া যায়। আবু হুযাইফা সালিমকে পালকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। পালকসন্তানকে জন্মদাতা পিতার নামে ডাকার নির্দেশ আসার পরে সাহলা তাঁর ঘরে সালিমের প্রবেশের প্রশ্নটি মুহাম্মদের কাছে তোলেন। আবু দাউদের দীর্ঘ বর্ণনায় এরপর দুধপান করানো, পাঁচবারের সংখ্যা, আয়েশার সাধারণ প্রয়োগ এবং অন্য স্ত্রীদের আপত্তি একই ধারায় সংকলিত হয়েছে। একটি বিধানের ব্যাখ্যা নারীর ঘরে কার প্রবেশাধিকার তৈরি করবে, এই ঘটনাটি তার নির্দিষ্ট উদাহরণ। [808] [809]

حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ صَالِحٍ ، حَدَّثَنَا عَنْبَسَةُ ، حَدَّثَنِي يُونُسُ ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ ، حَدَّثَنِي عُرْوَةُ بْنُ الزُّبَيْرِ ، عَنْ عَائِشَةَ ، زَوْجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَأُمِّ سَلَمَةَ أَنَّ أَبَا حُذَيْفَةَ بْنَ عُتْبَةَ بْنِ رَبِيعَةَ بْنِ عَبْدِ شَمْسٍ كَانَ تَبَنَّى سَالِمًا وَأَنْكَحَهُ ابْنَةَ أَخِيهِ هِنْدَ بِنْتَ الْوَلِيدِ بْنِ عُتْبَةَ بْنِ رَبِيعَةَ وَهُوَ مَوْلًى لاِمْرَأَةٍ مِنَ الأَنْصَارِ كَمَا تَبَنَّى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم زَيْدًا وَكَانَ مَنْ تَبَنَّى رَجُلاً فِي الْجَاهِلِيَّةِ دَعَاهُ النَّاسُ إِلَيْهِ وَوُرِّثَ مِيرَاثَهُ حَتَّى أَنْزَلَ اللَّهُ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى فِي ذَلِكَ ‏‏{‏ ادْعُوهُمْ لآبَائِهِمْ ‏}‏ إِلَى قَوْلِهِ ‏‏{‏ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ وَمَوَالِيكُمْ ‏}‏ فَرُدُّوا إِلَى آبَائِهِمْ فَمَنْ لَمْ يُعْلَمْ لَهُ أَبٌ كَانَ مَوْلًى وَأَخًا فِي الدِّينِ فَجَاءَتْ سَهْلَةُ بِنْتُ سُهَيْلِ بْنِ عَمْرٍو الْقُرَشِيِّ ثُمَّ الْعَامِرِيِّ – وَهِيَ امْرَأَةُ أَبِي حُذَيْفَةَ – فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّا كُنَّا نَرَى سَالِمًا وَلَدًا وَكَانَ يَأْوِي مَعِي وَمَعَ أَبِي حُذَيْفَةَ فِي بَيْتٍ وَاحِدٍ وَيَرَانِي فُضْلاً وَقَدْ أَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ فِيهِمْ مَا قَدْ عَلِمْتَ فَكَيْفَ تَرَى فِيهِ فَقَالَ لَهَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ أَرْضِعِيهِ ‏”‏ ‏.‏ فَأَرْضَعَتْهُ خَمْسَ رَضَعَاتٍ فَكَانَ بِمَنْزِلَةِ وَلَدِهَا مِنَ الرَّضَاعَةِ فَبِذَلِكَ كَانَتْ عَائِشَةُ – رضى الله عنها – تَأْمُرُ بَنَاتِ أَخَوَاتِهَا وَبَنَاتِ إِخْوَتِهَا أَنْ يُرْضِعْنَ مَنْ أَحَبَّتْ عَائِشَةُ أَنْ يَرَاهَا وَيَدْخُلَ عَلَيْهَا وَإِنْ كَانَ كَبِيرًا خَمْسَ رَضَعَاتٍ ثُمَّ يَدْخُلَ عَلَيْهَا وَأَبَتْ أُمُّ سَلَمَةَ وَسَائِرُ أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنْ يُدْخِلْنَ عَلَيْهِنَّ بِتِلْكَ الرَّضَاعَةِ أَحَدًا مِنَ النَّاسِ حَتَّى يَرْضَعَ فِي الْمَهْدِ وَقُلْنَ لِعَائِشَةَ وَاللَّهِ مَا نَدْرِي لَعَلَّهَا كَانَتْ رُخْصَةً مِنَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم لِسَالِمٍ دُونَ النَّاسِ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আহমদ ইবনে সালিহ বর্ণনা করেছেন, আনবাসা তাঁদের জানিয়েছেন; ইউনুস তাঁকে জানিয়েছেন, ইবনে শিহাব থেকে। ইবনে শিহাব বলেন, উরওয়া ইবনুয যুবাইর আমাকে জানিয়েছেন, নবীর স্ত্রী আয়েশা ও উম্মে সালামা থেকে। আবু হুযাইফা ইবনে উতবা ইবনে রাবিয়া ইবনে আবদে শামস সালিমকে পালকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর ভাইয়ের মেয়ে হিন্দ বিনতে ওয়ালিদ ইবনে উতবা ইবনে রাবিয়ার সঙ্গে তাঁর বিয়ে দিয়েছিলেন। সালিম ছিলেন আনসারদের এক নারীর মুক্তদাস। এভাবে রাসুলও যায়িদকে পালকপুত্র করেছিলেন। জাহিলিয়াতের যুগে কেউ কাউকে পালকপুত্র গ্রহণ করলে মানুষ তাকে সেই ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত করে ডাকত এবং তাকে তাঁর উত্তরাধিকারী করা হতো। অবশেষে আল্লাহ এ বিষয়ে নাজিল করেন, “তাদের পিতাদের নামে তাদের ডাকো”—থেকে “তারা তোমাদের ধর্মীয় ভাই ও মুক্তদাস” পর্যন্ত। তখন তাদের নিজ নিজ পিতার সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়; যার পিতার পরিচয় জানা যায়নি, সে মুক্তদাস ও ধর্মীয় ভাই হিসেবে গণ্য হয়। এরপর আবু হুযাইফার স্ত্রী সাহলা বিনতে সুহাইল ইবনে আমর আল-কুরাশি, অতঃপর আল-আমিরি এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা সালিমকে ছেলে বলে গণ্য করতাম। সে আমার ও আবু হুযাইফার সঙ্গে একই ঘরে থাকত এবং আমাকে ঘরোয়া পোশাকে দেখত। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, তা আপনি জানেন। তার বিষয়ে আপনার মত কী? নবী তাঁকে বললেন, “তাকে দুধপান করাও।” তিনি তাকে পাঁচবার দুধপান করালেন; ফলে সে দুধপানের সম্পর্কে তাঁর ছেলের অবস্থায় হলো। এ ঘটনার ভিত্তিতে আয়েশা তাঁর বোনদের মেয়ে ও ভাইদের মেয়েদের নির্দেশ দিতেন, যে ব্যক্তিকে আয়েশা তাঁর সামনে আসতে ও তাঁর কাছে প্রবেশ করতে দিতে চাইতেন, সে বয়স্ক হলেও তাকে পাঁচবার দুধপান করাতে; এরপর সে তাঁর কাছে প্রবেশ করত। উম্মে সালামা ও নবীর অন্য স্ত্রীরা এই দুধপানের কারণে কাউকে তাঁদের কাছে প্রবেশ করতে দিতে অস্বীকৃতি জানান, যতক্ষণ না সে দোলনার বয়সে দুধপান করে। তাঁরা আয়েশাকে বলেন, আল্লাহর শপথ, আমরা জানি না; হয়তো নবীর পক্ষ থেকে এটি অন্যদের বাদ দিয়ে শুধু সালিমের জন্য বিশেষ অনুমতি ছিল।

কোরআন সংকলন 165

এই পূর্ণ বর্ণনায় মুহাম্মদের সরাসরি নির্দেশ “তাকে দুধপান করাও”; তারপর বর্ণনাকারী পাঁচবার দুধপান করানোর ঘটনা জানান। আয়েশা একই ঘটনার ব্যবহার প্রসারিত করেছেন: যাঁদের নিজের সামনে প্রবেশ করতে দিতে চাইতেন, তাঁদের তাঁর ভাই-বোনের মেয়েদের দিয়ে পাঁচবার দুধপান করানোর নির্দেশ দিয়েছেন। অন্য স্ত্রীদের অবস্থান ছিল বিপরীত। তাঁরা শিশুকালের দুধপানকে প্রাসঙ্গিক বলেছেন এবং সালিমের ঘটনাটিকে বিশেষ অনুমতি হিসেবে বুঝেছেন। ফলে একই নবীর পরিবারের মধ্যে একটি আদেশের প্রয়োগসীমা নিয়েই বিরোধ তৈরি হয়েছে। সাধারণ বিধান বনাম বিশেষ অনুমতির এই পার্থক্য বাস্তবে মানুষের মেলামেশার অধিকার বদলে দিয়েছে।

আয়েশার নিজের নামে পাঁচবারে দশবার রহিত হওয়ার বক্তব্য প্রচারিত হলেও মুয়াত্তায় তাঁর দশবার দুধপান করানোর নির্দেশও সংকলিত হয়েছে। নাফি সালিম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উমরের কাছ থেকে বর্ণনা করেন, আয়েশা তাঁকে শিশুকালে নিজের বোন উম্মে কুলসুমের কাছে পাঠিয়ে দশবার দুধপান করাতে বলেছিলেন, যাতে তিনি আয়েশার কাছে প্রবেশ করতে পারেন। তিনবার করানোর পর উম্মে কুলসুম অসুস্থ হয়ে পড়েন। সালিমের বক্তব্য অনুযায়ী দশবার পূর্ণ না হওয়ায় তিনি আয়েশার কাছে প্রবেশ করতেন না। [810]

وَحَدَّثَنِي عَنْ مَالِكٍ، عَنْ نَافِعٍ، أَنَّ سَالِمَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، أَخْبَرَهُ أَنَّ عَائِشَةَ أُمَّ الْمُؤْمِنِينَ أَرْسَلَتْ بِهِ وَهُوَ يَرْضَعُ إِلَى أُخْتِهَا أُمِّ كُلْثُومٍ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ الصِّدِّيقِ فَقَالَتْ أَرْضِعِيهِ عَشْرَ رَضَعَاتٍ حَتَّى يَدْخُلَ عَلَىَّ ‏.‏ قَالَ سَالِمٌ فَأَرْضَعَتْنِي أُمُّ كُلْثُومٍ ثَلاَثَ رَضَعَاتٍ ثُمَّ مَرِضَتْ فَلَمْ تُرْضِعْنِي غَيْرَ ثَلاَثِ رَضَعَاتٍ فَلَمْ أَكُنْ أَدْخُلُ عَلَى عَائِشَةَ مِنْ أَجْلِ أَنَّ أُمَّ كُلْثُومٍ لَمْ تُتِمَّ لِي عَشْرَ رَضَعَاتٍ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: মালিক নাফি থেকে বর্ণনা করেছেন, সালিম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উমর তাঁকে জানিয়েছেন: আয়েশা তাঁকে দুধপানের বয়সে তাঁর বোন উম্মে কুলসুম বিনতে আবু বকর সিদ্দিকের কাছে পাঠান এবং বলেন, “তাকে দশবার দুধপান করাও, যাতে সে আমার কাছে প্রবেশ করতে পারে।” সালিম বলেন: উম্মে কুলসুম আমাকে তিনবার দুধপান করান, তারপর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে তিনি আমাকে তিনবারের বেশি দুধপান করাননি। উম্মে কুলসুম আমার জন্য দশবার পূর্ণ না করায় আমি আয়েশার কাছে প্রবেশ করতাম না।

এই সালিম আবদুল্লাহ ইবনে উমরের পুত্র; সাহলার ঘটনায় উল্লিখিত আবু হুযাইফার মুক্তদাস সালিম পৃথক ব্যক্তি। মুয়াত্তার এই বিবরণে বয়সও নির্দিষ্ট: তিনি তখন দুধপানকারী শিশু। তাই সংখ্যার বিষয়টিকে বয়স্ক ব্যক্তির দুধপানের সঙ্গে এক করে পড়লে বর্ণনার বিষয় বদলে যায়। এখানে শিশুকালীন দশবার দুধপান করিয়ে ভবিষ্যৎ প্রবেশাধিকার তৈরির নির্দেশ রয়েছে। আয়েশার নামে সংরক্ষিত বিধান ও অনুশীলনের দলিলগুলোতে পাঁচবারের পাশাপাশি দশবারও উপস্থিত।

হাফসার ক্ষেত্রেও দশবারের নির্দেশ পাওয়া যায়। মুয়াত্তায় সাফিয়্যা বিনতে আবু উবাইদের নামে বর্ণিত হয়েছে, হাফসা আসিম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সাদকে নিজের বোন ফাতিমা বিনতে উমরের কাছে পাঠিয়ে দশবার দুধপান করান, যাতে সে তাঁর কাছে প্রবেশ করতে পারে। বর্ণনাটি স্পষ্টভাবে তাকে ছোট দুধপানকারী শিশু বলেছে। হাফসার নামে বর্ণিত এই নির্দেশেও সংখ্যাটি দশ। [811]

وَحَدَّثَنِي عَنْ مَالِكٍ، عَنْ نَافِعٍ، أَنَّ صَفِيَّةَ بِنْتَ أَبِي عُبَيْدٍ، أَخْبَرَتْهُ أَنَّ حَفْصَةَ أُمَّ الْمُؤْمِنِينَ أَرْسَلَتْ بِعَاصِمِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ سَعْدٍ إِلَى أُخْتِهَا فَاطِمَةَ بِنْتِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ تُرْضِعُهُ عَشْرَ رَضَعَاتٍ لِيَدْخُلَ عَلَيْهَا وَهُوَ صَغِيرٌ يَرْضَعُ فَفَعَلَتْ فَكَانَ يَدْخُلُ عَلَيْهَا ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: মালিক নাফি থেকে বর্ণনা করেছেন, সাফিয়্যা বিনতে আবু উবাইদ তাঁকে জানিয়েছেন: মুমিনদের মা হাফসা আসিম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সাদকে তাঁর বোন ফাতিমা বিনতে উমর ইবনুল খাত্তাবের কাছে পাঠান, যাতে তিনি তাকে দশবার দুধপান করান এবং সে তাঁর কাছে প্রবেশ করতে পারে। তখন সে ছোট দুধপানকারী শিশু ছিল। ফাতিমা তা করেন; এরপর সে হাফসার কাছে প্রবেশ করত।

মালিক নিজে অল্প ও বেশি উভয় দুধপানেই বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়ার মত দিয়েছেন, যদি তা দুই বছরের মধ্যে ঘটে। দুই বছরের পরে একই পরিমাণকে তিনি সাধারণ খাবারের পর্যায়ে রেখেছেন। ফলে আয়েশার দশ থেকে পাঁচে পরিবর্তনের বর্ণনা সংকলন করা এবং পাঁচকে আইনগত বাধ্যতামূলক সীমা গ্রহণ করা তাঁর ক্ষেত্রে এক হয়নি। একই সংকলনে একটি বর্ণনার উপস্থিতি তার সব শর্তকে সংকলকের গৃহীত আইন বানিয়ে দেয় না। মালিকের আইনগত সিদ্ধান্তে সংখ্যা নির্ধারণের পরিবর্তে বয়স ও দুধপানের ঘটনা মুখ্য হয়েছে। [812]

وَحَدَّثَنِي عَنْ مَالِكٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، أَنَّهُ كَانَ يَقُولُ الرَّضَاعَةُ قَلِيلُهَا وَكَثِيرُهَا تُحَرِّمُ وَالرَّضَاعَةُ مِنْ قِبَلِ الرِّجَالِ تُحَرِّمُ ‏.‏ قَالَ يَحْيَى وَسَمِعْتُ مَالِكًا يَقُولُ الرَّضَاعَةُ قَلِيلُهَا وَكَثِيرُهَا إِذَا كَانَ فِي الْحَوْلَيْنِ تُحَرِّمُ فَأَمَّا مَا كَانَ بَعْدَ الْحَوْلَيْنِ فَإِنَّ قَلِيلَهُ وَكَثِيرَهُ لاَ يُحَرِّمُ شَيْئًا وَإِنَّمَا هُوَ بِمَنْزِلَةِ الطَّعَامِ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: মালিক ইবনে শিহাব থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলতেন: দুধপান অল্প হোক বা বেশি হোক, বিবাহ নিষিদ্ধ করে; পুরুষের দিক থেকেও দুধপানের সম্পর্ক বিবাহ নিষিদ্ধ করে। ইয়াহইয়া বলেন: আমি মালিককে বলতে শুনেছি, দুই বছরের মধ্যে হলে অল্প ও বেশি উভয় দুধপান বিবাহ নিষিদ্ধ করে। দুই বছরের পরে হলে অল্প বা বেশি কোনোটিই কোনো সম্পর্ক নিষিদ্ধ করে না; তা শুধু খাবারের মতো।

অল্প দুধপানে নিষেধাজ্ঞা প্রতিষ্ঠার বিপরীতে মুসলিমে উম্মুল ফজলের একটি বর্ণনা আছে। এক ব্যক্তি প্রথম স্ত্রীর পাশাপাশি আরেক নারীকে বিয়ে করার পর প্রথম স্ত্রী দাবি করেন, তিনি নতুন স্ত্রীকে এক বা দুবার দুধপান করিয়েছিলেন। মুহাম্মদের কাছে প্রশ্ন উঠলে তিনি বলেন, একবার বা দুবার দুধপানে নিষেধাজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত হয় না। একটি সংখ্যাগত বক্তব্যের ফলে বিদ্যমান বিবাহ টিকে থাকবে কি না, এই ঘটনায় তা সরাসরি নির্ধারিত হয়েছে। [813]

حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ يَحْيَى ، وَعَمْرٌو النَّاقِدُ ، وَإِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ ، كُلُّهُمْ عَنِ الْمُعْتَمِرِ ، – وَاللَّفْظُ لِيَحْيَى – أَخْبَرَنَا الْمُعْتَمِرُ بْنُ سُلَيْمَانَ، عَنْ أَيُّوبَ ، يُحَدِّثُ عَنْ أَبِي الْخَلِيلِ ، عَنْ عَبْدِ، اللَّهِ بْنِ الْحَارِثِ عَنْ أُمِّ الْفَضْلِ ، قَالَتْ دَخَلَ أَعْرَابِيٌّ عَلَى نَبِيِّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ فِي بَيْتِي فَقَالَ يَا نَبِيَّ اللَّهِ إِنِّي كَانَتْ لِي امْرَأَةٌ فَتَزَوَّجْتُ عَلَيْهَا أُخْرَى فَزَعَمَتِ امْرَأَتِي الأُولَى أَنَّهَا أَرْضَعَتِ امْرَأَتِي الْحُدْثَى رَضْعَةً أَوْ رَضْعَتَيْنِ ‏.‏ فَقَالَ نَبِيُّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ لاَ تُحَرِّمُ الإِمْلاَجَةُ وَالإِمْلاَجَتَانِ ‏” ‏ ‏.‏ قَالَ عَمْرٌو فِي رِوَايَتِهِ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الْحَارِثِ بْنِ نَوْفَلٍ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া, আমর আন-নাকিদ ও ইসহাক ইবনে ইবরাহিম মুতামির থেকে বর্ণনা করেছেন; ভাষা ইয়াহইয়ার। মুতামির ইবনে সুলায়মান তাঁদের জানিয়েছেন, আইয়ুব থেকে, তিনি আবুল খলিল থেকে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস থেকে, তিনি উম্মুল ফজল থেকে। উম্মুল ফজল বলেন: নবী আমার ঘরে থাকা অবস্থায় এক বেদুইন এসে বলল, হে আল্লাহর নবী, আমার একজন স্ত্রী ছিল; তার ওপর আমি আরেকজনকে বিয়ে করেছি। আমার প্রথম স্ত্রী দাবি করেছে, সে আমার নতুন স্ত্রীকে একবার বা দুবার দুধপান করিয়েছে। নবী বললেন, “একবার এবং দুবার দুধপানে বিবাহ নিষিদ্ধ হয় না।” আমরের বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস ইবনে নওফলের নাম রয়েছে।

পরবর্তী ফিকহে এই দলিলগুলো থেকে এক, তিন ও পাঁচ—বিভিন্ন সীমা নির্ধারিত হয়েছে। ইবনে জাওযি আহমদ ইবনে হাম্বলের নামে তিনটি মত বর্ণনা করেছেন। প্রথমটি একবার; আবু হানিফা ও মালিকও কোরআনের সাধারণ নিষেধের ভিত্তিতে এই মত নিয়েছেন। দ্বিতীয়টি তিনবার; এর ভিত্তি একবার ও দুবারে নিষেধ না হওয়ার হাদিস। তৃতীয়টি পাঁচবার; এর ভিত্তি আয়েশার বর্ণনা। এই বিভাজনে পার্থক্য শুধু সংখ্যায় নয়, কোন দলিল অন্য দলিলকে নির্দিষ্ট করবে, সেই সিদ্ধান্তেও। [814]

قلت: أما مقدار ما يحرم من الرضاع فعن أحمد بن حنبل – رحمه الله – فيه ثلاث روايات: إحداهن: رضعة واحدة ، وبه قال أبو حنيفة ومالك أخذا بظاهر القرآن في قوله: وأخواتكم من الرضاعة ، وتركا لذلك الحديث . والثانية: ثلاث ، لقول النبي صلى الله عليه وسلم: ” لا تحرم المصة والمصتان ” . والثالثة: خمس لما روينا في حديث عائشة

বাংলা অনুবাদ: আমি বলি: দুধপানের যে পরিমাণ বিবাহ নিষিদ্ধ করে, সে বিষয়ে আহমদ ইবনে হাম্বলের নামে তিনটি বর্ণনা আছে। একটি হলো একবার দুধপান। আবু হানিফা ও মালিকও এ মত দিয়েছেন; তাঁরা কোরআনের “আর দুধপানের সম্পর্কের তোমাদের বোনেরা” কথাটির প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করেছেন এবং সে জন্য ওই হাদিসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেননি। দ্বিতীয়টি তিনবার, নবীর “একবার ও দুবার দুধপানে বিবাহ নিষিদ্ধ হয় না” বক্তব্যের কারণে। তৃতীয়টি পাঁচবার, আয়েশার বর্ণিত হাদিসের কারণে।

আইনগত অবস্থানব্যবহৃত দলিল বা যুক্তিসংখ্যার ফল
মালিক ও আবু হানিফার মতকোরআনে দুধপানের সম্পর্কের সাধারণ নিষেধঅল্প দুধপানেও নিষেধ; পাঁচবার পূর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক নয়
তিনবারের মতএকবার ও দুবার নিষিদ্ধ করে না—এই হাদিসের সংখ্যাগত তাৎপর্যতিনবার থেকে নিষেধ প্রতিষ্ঠা
শাফিয়ি ও তাঁর অনুসারীদের পাঁচবারের মতআয়েশার দশ থেকে পাঁচে পরিবর্তনের বর্ণনাপাঁচবারের কমে নিষেধ প্রতিষ্ঠিত নয়
আহমদের নামে ইবনে জাওযির সংকলিত মতগুলোভিন্ন দলিলকে প্রাধান্য দেওয়ার তিন বর্ণনাএকবার, তিনবার ও পাঁচবার—তিনটি সিদ্ধান্ত

দুই বছরের মধ্যে নিশ্চিত চারবার দুধপানের একটি ঘটনা এই বিরোধের বাস্তব ফল বোঝায়। মালিকের সংখ্যাগত নিয়মে দুধপানজনিত নিষেধ সৃষ্টি হয়; শাফিয়ির পাঁচবারের নিয়মে শুধু ওই চারবারের ভিত্তিতে নিষেধ সৃষ্টি হয় না। নিষেধ তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট দুধমাতা, দুধবোন ও অন্য সম্পর্কের বিবাহ আটকে যায়। একই জানা ঘটনাকে দুই পদ্ধতি দুই রকম আইনগত পরিচয় দেয়। একটি ধর্মীয় বাক্যের পাঠগত অবস্থান নিয়ে সিদ্ধান্ত তাই মানুষের পারিবারিক জীবনে সরাসরি কর্তৃত্ব বিস্তার করে।

নববী এই বিরোধের উৎস আরও খোলাখুলিভাবে সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর উদ্ধৃত মালিকি আপত্তি হলো, আয়েশা বিষয়টিকে কোরআন হিসেবে বর্ণনা করেছেন; কিন্তু কোরআন একক বর্ণনায় প্রতিষ্ঠিত হয় না। আবার সেটিকে কোরআন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা না গেলে একই বর্ণনাকে নবীর সাধারণ সংবাদ বলে ব্যবহার করার প্রশ্নও ওঠে। এখানে সাক্ষ্যের অস্তিত্বের সঙ্গে সাক্ষ্যটির আইনগত শ্রেণি নিয়ে বিরোধ যুক্ত হয়েছে। একই বাক্যকে কোরআন, একক সংবাদ অথবা রহিত পাঠের স্মৃতি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করলে তার গ্রহণযোগ্যতা ও কর্তৃত্বের ফল আলাদা হয়। [815]

واعترض أصحاب مالك على الشافعية بأن حديث عائشة هذا لا يحتج به عندكم وعند محققي الأصوليين لأن القرآن لا يثبت بخبر الواحد ، وإذا لم يثبت قرآنا لم يثبت بخبر الواحد عن النبي صلى الله عليه وسلم لأن خبر الواحد إذا توجه إليه قادح وقف عن العمل به وهذا إذا لم يجئ إلا بآحاد مع أن العادة مجيئه متواترا توجب ريبة ، والله أعلم .

বাংলা অনুবাদ: মালিকের অনুসারীরা শাফিয়িদের বিরুদ্ধে আপত্তি করেছেন যে আয়েশার এই হাদিস তোমাদের এবং উসুলের বিশ্লেষক আলেমদের কাছেও দলিল হতে পারে না; কারণ একক বর্ণনা দিয়ে কোরআন প্রতিষ্ঠিত হয় না। যখন এটি কোরআন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো না, তখন একক বর্ণনায় নবীর সংবাদ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হলো না। কারণ কোনো একক বর্ণনার বিরুদ্ধে ত্রুটি দেখা দিলে তার ভিত্তিতে আমল স্থগিত থাকে। আর যে বিষয় সাধারণত বহুলসংক্রমিত হওয়ার কথা, সেটি শুধু একক সূত্রে আসা সন্দেহের কারণ হয়। আল্লাহই ভালো জানেন।

ইবনে জাওযি আরও একটি ব্যাখ্যা সংরক্ষণ করেছেন: মৃত্যুর সময় কোরআন হিসেবে পাঠের কথাটিকে কেউ কেউ বর্তমান সূরা নিসার সাধারণ দুধপান-নিষেধের আয়াতের দিকে ফিরিয়েছেন। তাঁদের যুক্তি, পাঁচবারের নির্দিষ্ট পাঠ মৃত্যুর পরেও কোরআন হিসেবে বহাল থাকলে মুসহাফের মতো তা-ও সংক্রমিত হওয়ার কথা ছিল। এখানে গৃহীত মুসহাফের বর্তমান সীমা থেকেই আগের বর্ণনার অর্থ নির্ধারণ করা হচ্ছে। আয়েশার বাক্যে নির্দিষ্ট পাঁচবারের উল্লেখ থাকলেও ব্যাখ্যায় তার পাঠযোগ্য অবস্থানকে সাধারণ দুধপানের আয়াতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। [816]

وتأولوا قولها: وهي مما يقرأ من القرآن أن الإشارة إلى قوله: وأخواتكم من الرضاعة ، وقالوا: لو كان يقرأ بعد وفاة رسول الله صلى الله عليه وسلم ، لنقل إلينا نقل المصحف ، ولو كان بقي من القرآن شيء لم ينقل لجاز أن يكون ما لم ينقل ناسخا لما نقل ، فذلك محال .

বাংলা অনুবাদ: তাঁরা আয়েশার “এটি কোরআন হিসেবে পঠিত অংশের মধ্যে ছিল” কথাটি এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে ইঙ্গিতটি “আর দুধপানের সম্পর্কের তোমাদের বোনেরা” কথার প্রতি। তাঁরা বলেছেন: রাসুলের মৃত্যুর পরে তা পাঠ করা হলে মুসহাফের মতোই আমাদের কাছে সংক্রমিত হতো। কোরআনের কোনো অংশ বহাল থেকেও সংক্রমিত না হয়ে থাকলে যা সংক্রমিত হয়নি তা সংক্রমিত অংশের রহিতকারী হওয়ার সুযোগ থাকত; তাই তা অসম্ভব।

এই যুক্তিতে সংক্রমণ সম্পূর্ণ ছিল—এই সিদ্ধান্তটিই পূর্বশর্ত। নির্দিষ্ট পাঠটি বর্তমান মুসহাফে নেই বলে তার বহাল থাকার সম্ভাবনা বাতিল করা হয়েছে; তারপর সেই বাতিল সিদ্ধান্ত দিয়ে মৃত্যুর সময় পাঠের সাক্ষ্যটির অর্থ বদলানো হয়েছে। এটি মুসহাফের সম্পূর্ণতা ধরে নিয়ে বর্ণনাকে তার সঙ্গে মানানসই করার পদ্ধতি। স্বাধীনভাবে পাঠটি কখন প্রত্যাহার করা হয়েছিল, কে সেই ঘোষণা বহন করেছিলেন এবং কীভাবে তার সংবাদ প্রচারিত হয়েছিল—এসব ঘটনার প্রমাণ এই যুক্তির ভেতর থেকে পাওয়া যায় না। ধর্মীয় নিশ্চয়তা ও ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ এখানে একই ধরনের প্রমাণ নয়।

দুধপানের দলিলসমষ্টিতে তাই পরিবর্তনের একাধিক নির্দিষ্ট রূপ আছে: নাজিল হওয়া বক্তব্যে দশের পরিবর্তে পাঁচ, মৃত্যুর সময় পর্যন্ত পাঁচবারের অংশের কোরআন হিসেবে পাঠ, ব্যক্তিগত সহিফা নষ্ট হওয়ার বিবরণ এবং মুসহাফের বাইরে থাকা পাঠের ভিত্তিতে আইন নির্ধারণ। এরপর একই নথি থেকে সংখ্যার ও প্রয়োগের ভিন্ন সিদ্ধান্ত হয়েছে। একটি পাঠকে “কোরআন” বলে স্মরণ করার ক্ষমতা, সেটিকে মুসহাফে অন্তর্ভুক্ত করার অনুমোদন এবং তাকে বিবাহের আইন হিসেবে কার্যকর করার কর্তৃত্ব পৃথক হাতে ও পৃথক শর্তে কাজ করেছে। সম্পূর্ণ ইতিহাসটিকে “একই পাঠ, একই বিধান, একই প্রয়োগ” বলে বর্ণনা করা এই দলিলগুলোর সঙ্গে অসঙ্গত।


হারানো আয়াত ও অনুপস্থিত সূরা সম্পর্কে সাহাবিদের সাক্ষ্য

কোরআনের প্রাথমিক পাঠসমাজের স্মৃতিতে এমন সূরা ও বাক্যের উল্লেখ আছে, যেগুলো বর্তমান মুসহাফে নেই। কোনো বর্ণনায় দুটি পূর্ণ রচনার পাঠ সংরক্ষিত, কোনো বর্ণনায় একটি দীর্ঘ সূরার কেবল কয়েকটি বাক্য মনে আছে। কোথাও একটি সূরার পূর্ববর্তী পরিসরের সঙ্গে পরের পাঠের সংখ্যাগত ব্যবধান বলা হয়েছে; কোথাও কোরআন হিসেবে পড়া একটি বাক্য পরে তুলে নেওয়ার কথা এসেছে। এই সাক্ষ্যগুলোর বিষয় শুধু উচ্চারণের ভিন্নতা নয়। গ্রন্থের ভেতরে কোন রচনা থাকবে, একটি সূরা কতটা দীর্ঘ হবে এবং আগে কোরআন হিসেবে পরিচিত কোন বাক্য আর পাঠ করা হবে না—পার্থক্যগুলো সেই স্তরে পৌঁছেছে।

উবাই, আবু মুসা, আয়েশা, হুযাইফা, আনাস ও ইবনে উমরের নামে সংরক্ষিত বিবরণগুলো পরবর্তী হাদিস, তাফসির ও কোরআনবিষয়ক গ্রন্থে টিকে আছে। তাঁদের বক্তব্যে পূর্ববর্তী পাঠের স্মৃতি এবং গৃহীত মুসহাফের পরিসর সব ক্ষেত্রে এক নয়। ব্যাখ্যাকারীরা এই ব্যবধানকে নসখ, ভুলিয়ে দেওয়া অথবা তিলাওয়াতের মর্যাদা প্রত্যাহার হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন। সেই শ্রেণিবিভাগের মধ্যেও আগের পঠিত বিষয়বস্তু থেকে পরের গৃহীত সংগ্রহে পরিবর্তনের ইতিহাস সংরক্ষিত হয়েছে।


উবাইয়ের মুসহাফে খাল্‌ ও হাফ্‌দ এবং বর্তমান মুসহাফের বাইরে দুটি সূরা

উবাইয়ের নামে সংরক্ষিত মুসহাফের বিবরণে “খাল্‌” ও “হাফ্‌দ” নামে দুটি রচনা রয়েছে। এদের সূচনা যথাক্রমে “আল্লাহুম্মা ইন্না নাসতাঈনুকা” এবং “আল্লাহুম্মা ইয়্যাকা নাবুদু”। মুসহাফের সংখ্যাগত তুলনায় এই দুই রচনার উল্লেখের পাশাপাশি সুয়ূতি এদের পূর্ণ পাঠ ও নামাজে ব্যবহারের বিবরণও সংকলন করেছেন। ফলে দুটি নামের আড়ালে কী বিষয়বস্তু ছিল, তা অজ্ঞাত নয়। সাহায্য ও ক্ষমা প্রার্থনা, আল্লাহর আনুগত্য, অবাধ্যদের সঙ্গে বিচ্ছেদ এবং শাস্তির ভয়—এই বক্তব্যগুলোতে রচনাদুটির ধর্মীয় চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে। [817] [818] [819]

اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ وَنُثْنِي عَلَيْكَ الْخَيْرَ وَلَا نَكْفُرُكَ ونخلع ونترك من يفجرك. وفيه: اللهم اياك نَعْبُدُ وَلَكَ نُصَلِّي وَنَسْجُدُ وَإِلَيْكَ نَسْعَى وَنَحْفِدُ نَخْشَى عَذَابَكَ وَنَرْجُو رَحْمَتَكَ إِنَّ عَذَابَكَ بِالْكُفَّارِ مُلْحَقٌ.

বাংলা অনুবাদ: হে আল্লাহ, আমরা শুধু আপনার কাছেই সাহায্য চাই, শুধু আপনার কাছেই ক্ষমা চাই, আপনার গুণগান করি, আপনার অকৃতজ্ঞ হই না, আর যারা আপনার অবাধ্য তাদের থেকে আলাদা ও বিচ্ছিন্ন হই। এতে আরও আছে: হে আল্লাহ, আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি, শুধু আপনার নিকট প্রার্থনা করি, শুধু আপনার প্রতি নত হই, সিজদা করি, আপনার দিকে ধাবিত হই। আর আমরা আপনার কঠিন শাস্তিকে ভয় করি, আপনার দয়ার আশা রাখি। নিশ্চয়ই আপনার শাস্তি অবিশ্বাসীদের ওপর পতিত হবে। [820]

প্রথম রচনাটির “নাখলাউ”—আমরা বিচ্ছিন্ন হই—শব্দের সঙ্গে খাল্‌ নামের এবং দ্বিতীয়টির “নাহফিদু”—আমরা দ্রুত এগিয়ে যাই—শব্দের সঙ্গে হাফ্‌দ নামের সম্পর্ক রয়েছে। দুটিতে একইভাবে আল্লাহকে সম্বোধন করা হলেও বিষয়বস্তুর গতি পৃথক। প্রথমটিতে সাহায্য, ক্ষমা, প্রশংসা ও সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা; দ্বিতীয়টিতে উপাসনা, নামাজ, সিজদা, আনুগত্যে অগ্রসর হওয়া এবং রহমত ও শাস্তির প্রত্যাশা। পৃথক সূচনা ও পৃথক সমাপ্তির এই কাঠামোই বর্ণনাগুলোতে দুটি রচনা হিসেবে এদের পরিচয় বহন করছে।

সুয়ূতি মুহাম্মদ ইবনে নাসর আল-মারওয়াযির কিতাবুস সালাতের সূত্রে উবাইয়ের বিষয়ে একসঙ্গে দুটি তথ্য দিয়েছেন: তিনি ওই দুই রচনা দিয়ে কুনুত পড়তেন এবং নিজের মুসহাফে সেগুলো লিখতেন। নামাজে ব্যবহৃত হওয়া ও মুসহাফে স্থান পাওয়া এখানে পাশাপাশি রয়েছে। রচনাদুটি শুধু পরবর্তী কোনো প্রার্থনার বইয়ে সংরক্ষিত ছিল—বিবরণটির পরিসর তার চেয়ে বিস্তৃত। [821]

وَأَخْرَجَ مُحَمَّدُ بْنُ نَصْرٍ الْمَرْوَزِيُّ فِي كِتَابِ الصَّلَاةِ عَنْ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ أَنَّهُ كَانَ يَقْنُتُ بِالسُّورَتَيْنِ فَذَكَرَهُمَا وَأَنَّهُ كَانَ يَكْتُبْهُمَا فِي مُصْحَفِهِ.

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদ ইবনে নাসর আল-মারওয়াযি কিতাবুস সালাতে উবাই ইবনে কাব থেকে বর্ণনা করেছেন যে তিনি ওই দুই সূরা দিয়ে কুনুত পড়তেন। তারপর তিনি রচনাদুটি উল্লেখ করেছেন এবং জানিয়েছেন, উবাই নিজের মুসহাফে সেগুলো লিখতেন।

একই আলোচনায় উমরের নামাজের বিবরণও আছে। বায়হাকির সূত্রে সুয়ূতি বর্ণনা করেছেন, উমর রুকুর পরে কুনুতে প্রথম প্রার্থনার আগে বিসমিল্লাহ পড়েছেন; দ্বিতীয়টির আগেও নতুন করে বিসমিল্লাহ এসেছে। একটি দীর্ঘ প্রার্থনার মাঝখানে সাধারণ বাক্যবিরতির বদলে প্রতিটি রচনার সূচনায় আলাদা বিসমিল্লাহ দেওয়া হয়েছে। এই পৃথক সূচনার কারণ সম্পর্কে ইবনে জুরাইজের বক্তব্যও সুয়ূতি সংরক্ষণ করেছেন। [822] [823]

وَأَخْرَجَ الْبَيْهَقِيُّ مِنْ طَرِيقِ سُفْيَانَ الثَّوْرِيِّ عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ عَنْ عَطَاءٍ عَنْ عُبَيْدِ بْنِ عُمَيْرٍ أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ قَنَتَ بَعْدَ الرُّكُوعِ فَقَالَ: بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ وَنُثْنِي عَلَيْكَ ولا نكفرك ونخلع ونترك من يفجرك. بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ اللَّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَلَكَ نُصَلِّي وَنَسْجُدُ وَإِلَيْكَ نَسْعَى وَنَحْفِدُ نَرْجُو رَحْمَتَكَ وَنَخْشَى نِقْمَتَكَ إِنَّ عَذَابَكَ بِالْكَافِرِينَ مُلْحَقٌ.

বাংলা অনুবাদ: বায়হাকি সুফিয়ান আস-সাওরি থেকে, তিনি ইবনে জুরাইজ থেকে, তিনি আতা থেকে, তিনি উবাইদ ইবনে উমাইর থেকে বর্ণনা করেছেন যে উমর ইবনুল খাত্তাব রুকুর পরে কুনুত পড়ে বলেন: পরম দয়ালু, অতি দয়াময় আল্লাহর নামে। হে আল্লাহ, আমরা আপনার সাহায্য ও ক্ষমা চাই, আপনার প্রশংসা করি, আপনার অকৃতজ্ঞ হই না এবং যে আপনার অবাধ্য হয় তাকে বর্জন করি ও তার সঙ্গে বিচ্ছেদ করি। পরম দয়ালু, অতি দয়াময় আল্লাহর নামে। হে আল্লাহ, আমরা আপনারই উপাসনা করি, আপনার জন্য নামাজ পড়ি ও সিজদা করি, আপনার দিকে এগিয়ে যাই ও দ্রুত অগ্রসর হই। আমরা আপনার রহমতের আশা করি ও আপনার শাস্তিকে ভয় করি। আপনার শাস্তি অবিশ্বাসীদের ওপর পতিত হবে।

ইবনে জুরাইজের ব্যাখ্যায় বিসমিল্লাহর এই ব্যবহার মুসহাফের বিন্যাসের সঙ্গে যুক্ত। কিছু সাহাবির মুসহাফে রচনাদুটি সূরা হিসেবে ছিল বলেই দুই সূচনায় বিসমিল্লাহ এসেছে বলে তিনি জানিয়েছেন। অর্থাৎ ব্যক্তিগত মুসহাফে কী লেখা ছিল এবং নামাজে তার কোন কাঠামো ব্যবহৃত হতো, বর্ণনার মধ্যে তার যোগসূত্র রয়েছে। [824]

قَالَ ابْنُ جُرَيْجٍ: حِكْمَةُ الْبَسْمَلَةِ أَنَّهُمَا سُورَتَانِ فِي مُصْحَفِ بَعْضِ الصَّحَابَةِ.

বাংলা অনুবাদ: ইবনে জুরাইজ বলেন: বিসমিল্লাহ বলার তাৎপর্য হলো, কিছু সাহাবির মুসহাফে এ দুটি সূরা ছিল।

রচনাদুটির শিক্ষাদানের একটি রাজনৈতিক কথোপকথনও সুয়ূতি উদ্ধৃত করেছেন। আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান আবদুল্লাহ ইবনে যুরাইর আল-গাফিকির আলীপ্রীতি নিয়ে কটাক্ষ করলে তিনি নিজের কোরআনশিক্ষার পরিচয় দেন। তাঁর বক্তব্যে আলী তাঁকে দুটি সূরা শিখিয়েছিলেন এবং আলী সেগুলো মুহাম্মদের কাছ থেকে শিখেছিলেন। এখানে পূর্ণ পাঠদুটিকে শুধু প্রার্থনা হিসেবে উচ্চারণের খবর নেই; শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কোরআন শেখার দাবির ভেতরে রচনাদুটি স্থান পেয়েছে। [825]

وَأَخْرَجَ الطَّبَرَانِيُّ فِي الدُّعَاءِ مِنْ طَرِيقِ عَبَّادِ بْنِ يَعْقُوبَ الْأَسَدِيِّ عَنْ يَحْيَى بْنِ يَعْلَى الْأَسْلَمِيِّ عَنِ ابْنِ لَهِيعَةَ عَنِ ابْنِ هُبَيْرَةَ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ زُرَيْرٍ الْغَافِقِيِّ قَالَ: قَالَ لِي عَبْدُ الْمَلِكِ بْنُ مَرْوَانَ: لَقَدْ عَلِمْتُ مَا حَمَلَكَ عَلَى حُبِّ أَبِي تُرَابٍ إِلَّا أَنَّكَ أَعْرَابِيٌّ جَافٌّ فَقُلْتُ: وَاللَّهِ لَقَدْ جَمَعْتُ الْقُرْآنَ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَجْتَمِعَ أَبَوَاكَ وَلَقَدْ عَلَّمَنِي مِنْهُ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ سُورَتَيْنِ عَلَّمَهُمَا إِيَّاهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا عَلِمْتَهُمَا أَنْتَ وَلَا أَبُوكَ: اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ وَنُثْنِي عَلَيْكَ وَلَا نُكْفُرُكَ وَنَخْلَعُ وَنَتْرُكُ مَنْ يَفْجُرُكَ. اللَّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَلَكَ نُصَلِّي وَنَسْجُدُ وَإِلَيْكَ نَسْعَى وَنَحْفِدُ نَرْجُو رَحْمَتَكَ وَنَخْشَى عَذَابَكَ إِنَّ عَذَابَكَ بِالْكُفَّارِ مُلْحَقٌ.

বাংলা অনুবাদ: তাবারানি কিতাবুদ দুআয় আব্বাদ ইবনে ইয়াকুব আল-আসাদি থেকে, তিনি ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ালা আল-আসলামি থেকে, তিনি ইবনে লাহিয়া থেকে, তিনি ইবনে হুবাইরা থেকে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে যুরাইর আল-গাফিকি থেকে বর্ণনা করেছেন। আবদুল্লাহ বলেন: আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান আমাকে বললেন, “আমি জানি, আবু তুরাবের প্রতি তোমার ভালোবাসার কারণ কেবল এই যে তুমি রুক্ষ বেদুইন।” আমি বললাম, “আল্লাহর শপথ, তোমার বাবা-মা একত্র হওয়ার আগেই আমি কোরআন সংগ্রহ করেছি। আলী ইবনে আবু তালিব আমাকে তার মধ্যে এমন দুটি সূরা শিখিয়েছেন, যা আল্লাহর রাসুল তাঁকে শিখিয়েছিলেন; তুমি বা তোমার পিতা সেগুলো জানোনি: হে আল্লাহ, আমরা আপনার সাহায্য ও ক্ষমা চাই, আপনার প্রশংসা করি, আপনার অকৃতজ্ঞ হই না এবং যে আপনার অবাধ্য হয় তাকে বর্জন করি ও তার সঙ্গে বিচ্ছেদ করি। হে আল্লাহ, আমরা আপনারই উপাসনা করি, আপনার জন্য নামাজ পড়ি ও সিজদা করি, আপনার দিকে এগিয়ে যাই ও দ্রুত অগ্রসর হই। আমরা আপনার রহমতের আশা করি এবং আপনার শাস্তিকে ভয় করি। নিশ্চয়ই আপনার শাস্তি অবিশ্বাসীদের ওপর পতিত হবে।”

এই বর্ণনার দাবি আলীর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রাপ্তি; এর সনদে ইবনে লাহিয়ার পথ রয়েছে। উবাইয়ের কুনুত, উমরের নামাজ এবং আবদুল্লাহ ইবনে যুরাইরের কথোপকথনের প্রতিবেদনগুলো পৃথক পরিবেশের বিবরণ বহন করে। সুয়ূতি সেগুলো একত্র করে দেখিয়েছেন, একই রচনা বিভিন্ন পাঠপরম্পরা ও ধর্মীয় আচারের মধ্যে পরিচিত ছিল। সব বিবরণ একই ধরনের প্রমাণ নয়: একটি নামাজের অনুশীলনের, একটি মুসহাফে লিখনের, আরেকটি শিক্ষাদানের দাবির। তাদের বিষয়বস্তু পরস্পর সম্পর্কিত হলেও ঘটনা ও বর্ণনাকারীর পরিচয় আলাদা।

সুয়ূতির সংরক্ষিত বিবরণরচনাদুটির পরিচয়যে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়
উবাই সম্পর্কে ইবনে নাসরের খবরকুনুতে ব্যবহৃত দুটি সূরাএকই রচনার নামাজে পাঠ এবং মুসহাফে লিখন
উমরের কুনুতপ্রত্যেকটির আগে পৃথক বিসমিল্লাহধর্মীয় পাঠে দুটি স্বতন্ত্র সূচনার ব্যবহার
ইবনে জুরাইজের ব্যাখ্যাকিছু সাহাবির মুসহাফে দুটি সূরাবিসমিল্লাহ ও মুসহাফের বিন্যাসের সম্পর্ক
আবদুল্লাহ ইবনে যুরাইরের বক্তব্যআলীর কাছে শেখা দুটি সূরাকোরআনশিক্ষার দাবির মধ্যে রচনাদুটির অবস্থান
উসমানি মুসহাফের গৃহীত তালিকাখাল্‌ ও হাফ্‌দ নেইপূর্ববর্তী মুসহাফ-বিবরণ ও গৃহীত সংগ্রহের সীমার ব্যবধান

ফাতিহার সঙ্গে এই দুই প্রার্থনার রূপগত মিলও রয়েছে। ফাতিহায় উপাসক সাহায্য ও পথনির্দেশ চায়; খাল্‌ ও হাফ্‌দেও উপাসক আল্লাহর সাহায্য, ক্ষমা ও রহমত চায়। প্রার্থনার ভাষা কোনো রচনাকে নিজে থেকেই কোরআনের বাইরে স্থাপন করে না, কারণ ফাতিহা সেই ভাষাতেই কোরআনের অংশ। কোন রচনার ধর্মীয় মর্যাদা কী হবে, তা নির্ধারিত হয়েছে স্বীকৃত পাঠপরম্পরা ও গৃহীত সংকলনের মাধ্যমে। খাল্‌ ও হাফ্‌দ প্রার্থনা হিসেবে টিকে আছে; উবাইয়ের মুসহাফ-সংক্রান্ত বিবরণে এদের যে অবস্থান বলা হয়েছে, বর্তমান মুসহাফে তা নেই।

সুয়ূতির উদ্ধৃত ইবনে মুনাদির বক্তব্যে এই পার্থক্যের ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও স্পষ্ট: রচনাদুটির লিখিত কোরআন হিসেবে মর্যাদা তুলে নেওয়া হয়েছে, অথচ মানুষের হৃদয়ে মুখস্থ পাঠ রয়ে গেছে। বর্তমান মুসহাফের বাইরে থাকা এবং মুখস্থ স্মৃতিতে বেঁচে থাকা—দুটি অবস্থাই এই ব্যাখ্যার অংশ। [826]

ومما رُفع رسمُه من القرآن ولم يُرفع من القلوب حفظه سورتا القنوت في الوتر وتُسمَّى سورتي الخلع والحفد

বাংলা অনুবাদ: কোরআন থেকে যার লিখিত পাঠ তুলে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু হৃদয় থেকে যার মুখস্থ পাঠ তুলে নেওয়া হয়নি, তার মধ্যে রয়েছে বিতরের কুনুতের দুটি সূরা; এদের খাল্‌ ও হাফ্‌দ নামে অভিহিত করা হয়।

মুখস্থ থাকা সত্ত্বেও মুসহাফে রাখা হয়নি—ইবনে মুনাদির শ্রেণিবিন্যাসের কেন্দ্র এই ঘটনা। একটি রচনা মানুষের স্মৃতিতে টিকে থাকা তার কোরআনিক মর্যাদা বহাল থাকার নিশ্চয়তা দেয়নি। নির্দিষ্ট সংকলনে গৃহীত হওয়ার অনুমোদনই রচনাটিকে সূরা হিসেবে পাঠের মর্যাদা দিয়েছে অথবা সেই মর্যাদার বাইরে রেখেছে। ফলে এই ইতিহাসে সংরক্ষণ কেবল শব্দ স্মরণ রাখার কাজ নয়; স্মরণে থাকা কোন শব্দকে কোরআন বলে পড়া হবে, সেই সীমা নির্ধারণের কাজও।


আবু মুসার স্মরণে তাওবার মতো দীর্ঘ ও কঠোর একটি সূরা

আবু মুসা আল-আশআরির বিবরণে একটি দীর্ঘ সূরা ছিল, যার দৈর্ঘ্য ও কঠোরতার সঙ্গে বারাআত বা তাওবার তুলনা করা হয়েছে। তিনি সেটির প্রায় সবটাই ভুলে যাওয়ার কথা বলেছেন এবং মনে থাকা অংশ হিসেবে মানুষের সম্পদলোভ সম্পর্কে কয়েকটি বাক্য উদ্ধৃত করেছেন। এই স্মৃতিচারণ বসরার কোরআনপাঠকদের উদ্দেশে বলা বক্তব্যের মধ্যে এসেছে। হাদিসের শুরুতেই তিনশ পাঠকের উপস্থিতির উল্লেখ আছে; তাঁদের কোরআন পাঠ চালিয়ে যেতে বলার পর আবু মুসা নিজের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাওয়া দুটি সূরার কথা জানিয়েছেন। সহিহ মুসলিমের পূর্ণ বর্ণনাটি হলো: [827] [828] [829]

حَدَّثَنِي سُوَيْدُ بْنُ سَعِيدٍ ، حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ مُسْهِرٍ ، عَنْ دَاوُدَ ، عَنْ أَبِي حَرْبِ بْنِ أَبِي، الأَسْوَدِ عَنْ أَبِيهِ ، قَالَ بَعَثَ أَبُو مُوسَى الأَشْعَرِيُّ إِلَى قُرَّاءِ أَهْلِ الْبَصْرَةِ فَدَخَلَ عَلَيْهِ ثَلاَثُمِائَةِ رَجُلٍ قَدْ قَرَءُوا الْقُرْآنَ فَقَالَ أَنْتُمْ خِيَارُ أَهْلِ الْبَصْرَةِ وَقُرَّاؤُهُمْ فَاتْلُوهُ وَلاَ يَطُولَنَّ عَلَيْكُمُ الأَمَدُ فَتَقْسُوَ قُلُوبُكُمْ كَمَا قَسَتْ قُلُوبُ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ وَإِنَّا كُنَّا نَقْرَأُ سُورَةً كُنَّا نُشَبِّهُهَا فِي الطُّولِ وَالشِّدَّةِ بِبَرَاءَةَ فَأُنْسِيتُهَا غَيْرَ أَنِّي قَدْ حَفِظْتُ مِنْهَا لَوْ كَانَ لاِبْنِ آدَمَ وَادِيَانِ مِنْ مَالٍ لاَبْتَغَى وَادِيًا ثَالِثًا وَلاَ يَمْلأُ جَوْفَ ابْنِ آدَمَ إِلاَّ التُّرَابُ ‏.‏ وَكُنَّا نَقْرَأُ سُورَةً كُنَّا نُشَبِّهُهَا بِإِحْدَى الْمُسَبِّحَاتِ فَأُنْسِيتُهَا غَيْرَ أَنِّي حَفِظْتُ مِنْهَا ‏{‏ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لاَ تَفْعَلُونَ‏}‏ فَتُكْتَبُ شَهَادَةً فِي أَعْنَاقِكُمْ فَتُسْأَلُونَ عَنْهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ১৩। যাকাত
পরিচ্ছেদঃ ৩৯. আদাম সন্তানের সম্পদের দুটি উপত্যকা থাকলেও তবু সে তৃতীয়টি অনুসন্ধান করবে
২৩০৯-(১১৯/১০৫০) সুওয়াইদ ইবনু সাঈদ (রহঃ) ….. আবূল আসওয়াদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ মূসা আল আশ’আরী (রাযীঃ) একবার বাসরার কারীদেরকে (কোরআনপাঠকদের) ডেকে পাঠালেন। অতঃপর কোরআন পাঠ করেছেন এমন তিনশ ব্যক্তি তাঁর কাছে এলেন। তিনি (তাদের উদ্দেশে) বললেন, আপনারা বাসরার মধ্যে উত্তম লোক এবং সেখানকার কারী। সুতরাং আপনারা অনবরত কুরআন পাঠ করতে থাকুন। অলসতায় দীর্ঘ সময় যেন কেটে না যায়। তাহলে আপনাদের অন্তর কঠিন হয়ে যেতে পারে যেমন আপনাদের পূর্ববর্তী একদল লোকের অন্তর কঠিন হয়ে গিয়েছিল। আমরা একটি সূরা পাঠ করতাম যা দীর্ঘ এবং কঠোর ভীতি প্রদর্শনের দিক থেকে সূরা বারাআতের সমতুল্য। পরে আমাকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে তার এতটুকু মনে রেখেছি- “যদি কোনো আদাম সন্তান দুই উপত্যকা সম্পদের মালিক হয়ে যায় তাহলে সে তৃতীয় আর একটি উপত্যকা ভর্তি সম্পদ পেতে চাইবে। মাটি ছাড়া আর কোনো কিছুতেই আদাম সন্তানের পেট ভরে না।” আমরা আরও একটি সূরা পাঠ করতাম যা মুসাব্বিহাত (গুণগানপূর্ণ) সূরাগুলোর কোনো একটির মতো। সেটিও আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, শুধু তা থেকে এ আয়াতটি মনে আছে– “হে ঈমানদারগণ! তোমরা কেন এমন কথা বল যা কর না”- (সূরা সফ ৬১ঃ ২)। আর যে কথা তোমরা শুধু মুখে আওড়াও অথচ করো না তা তোমাদের ঘাড়ে সাক্ষী হিসেবে লিখে রাখা হয়। কিয়ামাতের দিন তোমাদেরকে এ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২২৮৭, ইসলামিক সেন্টার ২২৮৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ), অধ্যায় ১৩/যাকাত, পরিচ্ছেদ ৩১: পার্থিব সম্পদের প্রতি লোভ করা অপছন্দনীয়; হাদিস ২২৯০।

কোরআন সংকলন 167

বর্ণনার গোড়ার ঘটনাটি আবু মুসাকে বসরায় পাঠানো নয়; তিনি বসরার কোরআনপাঠকদের ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা ইতিমধ্যে কোরআন পাঠ করেছেন—এই পরিচয় নিয়েই সমাবেশে উপস্থিত হন। সম্বোধনের বিষয় ছিল কোরআনের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক এবং দীর্ঘ অবহেলায় অন্তর কঠিন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। সেই উপদেশের ভেতরে নিজের ভুলে যাওয়া সূরার স্মৃতি উল্লেখ করায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবধান প্রকাশিত হয়: কোরআন পাঠের কর্তৃত্ব বহনকারী একজন সাহাবিও তাঁর পূর্ববর্তী সমগ্র পাঠ তখন আর পুনরুদ্ধার করতে পারছেন না। তাঁর বর্ণনায় মুখস্থ পাঠের ধারাবাহিকতা নিখুঁত স্মৃতির নিশ্চয়তা হিসেবে উপস্থিত হয়নি।

“আমরা পড়তাম” এবং “আমি ভুলে গেছি”—দুটি বাক্যে কর্তা বদলেছে। প্রথমটি পূর্ববর্তী সমষ্টিগত পাঠের দাবি; দ্বিতীয়টি বক্তার বর্তমান স্মৃতির অবস্থা। ওই তিনশ উপস্থিত ব্যক্তি সবাই একই সূরা মনে রেখেছিলেন বা সবাই একই সঙ্গে তা হারিয়েছিলেন—এমন কোনো সংলাপ বর্ণিত হয়নি। আবু মুসার নিজের বক্তব্যই এখানে সংরক্ষিত সাক্ষ্য। সেই সাক্ষ্যের নির্দিষ্ট দাবি হলো, তাঁর পরিচিত কোরআনপাঠে আগে এমন একটি সূরা ছিল, যার স্মৃতি বর্তমান অবস্থায় কয়েকটি বাক্যে সীমিত হয়ে এসেছে। সূরার পূর্ণ পাঠ হাদিসেও নেই; তার পূর্ববর্তী দৈর্ঘ্যের পরিচয় আছে এবং একটি অবশিষ্ট অনুচ্ছেদ আছে।

দৈর্ঘ্য ও কঠোরতার তুলনা একই তথ্য নয়। দৈর্ঘ্য সূরাটির পরিসর বোঝায়; কঠোরতা তার সতর্কবাণী বা তিরস্কারের সুর বোঝায়। আবু মুসা একই সূরার নামে অন্য উচ্চারণ দেওয়ার কথা বলেননি। তিনি বারাআতের সঙ্গে তুলনাযোগ্য আরেকটি সূরা পাঠের কথা বলেছেন। ফলে এখানে সমস্যাটি একটি শব্দের স্বরচিহ্ন কিংবা একই বাক্যের দুটি উচ্চারণে সীমিত থাকে না। দীর্ঘ একটি স্বতন্ত্র রচনার অধিকাংশ বিষয়বস্তু আর স্মরণে না থাকা এবং বর্তমান মুসহাফে তার ওই পরিচয়ে স্থান না পাওয়া—এই দুই তথ্য পাঠের বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রশ্ন তৈরি করে।

আবু উবাইদের ফাদায়িলুল কোরআনে আবু মুসার নামে সংরক্ষিত আরেকটি বর্ণনায় একই ধরনের সূরার পরিচয় পাওয়া যায়। সেখানে ভুলে যাওয়ার বদলে সূরাটি “তুলে নেওয়া হয়েছে” বলা হয়েছে। মনে থাকা অংশের শুরুতে এমন একটি বাক্যও আছে, যা সহিহ মুসলিমের এই বর্ণনায় নেই: আল্লাহ এমন লোকদের দিয়ে ধর্মকে শক্তিশালী করবেন, যাদের নিজেদের কোনো অংশ নেই। এরপর সম্পদের দুই উপত্যকা ও তৃতীয়টির আকাঙ্ক্ষার বাক্য এসেছে। [830]

حَدَّثَنَا حَجَّاجٌ، عَنْ حَمَّادِ بْنِ سَلَمَةَ، عَنْ عَلِيِّ بْنِ زَيْدٍ، عَنْ أَبِي حَرْبِ بْنِ أَبِي الْأَسْوَدِ، عَنْ أَبِي مُوسَى الْأَشْعَرِيِّ، قَالَ: ” نَزَلَتْ سُورَةٌ نَحْوَ بَرَاءَةَ، ثُمَّ رُفِعَتْ، وَحُفِظَ مِنْهَا (إِنَّ اللَّهَ سَيُؤَيِّدُ هَذَا الدِّينَ بِأَقْوَامٍ لَا خَلَاقَ لَهُمْ. وَلَوْ أَنَّ لِابنِ آدَمَ وَادِيَيْنِ مِنْ مَالٍ لَتَمَنَّى وَادِيًا ثَالِثًا. وَلَا يَمْلَأُ جَوْفَ ابْنِ آدَمَ إِلَّا التُّرَابُ. وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ تَابَ)

বাংলা অনুবাদ: হাজ্জাজ আমাদের বর্ণনা করেছেন, হাম্মাদ ইবনে সালামা থেকে, তিনি আলী ইবনে যায়দ থেকে, তিনি আবু হারব ইবনে আবুল আসওয়াদ থেকে, তিনি আবু মুসা আল-আশআরি থেকে। আবু মুসা বলেন: বারাআতের মতো একটি সূরা নাজিল হয়েছিল; পরে তা তুলে নেওয়া হয়। তার মধ্যে এতটুকু সংরক্ষিত ছিল: “নিশ্চয়ই আল্লাহ এই ধর্মকে এমন লোকদের দ্বারা শক্তিশালী করবেন, যাদের কোনো অংশ নেই। আদমসন্তানের যদি সম্পদের দুটি উপত্যকা থাকত, তবে সে তৃতীয় আরেকটি উপত্যকা কামনা করত। মাটি ছাড়া কিছুই আদমসন্তানের পেট পূর্ণ করে না। আর যে তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করেন।”

বিবরণের নির্দিষ্ট দিকসহিহ মুসলিম ১০৫০আবু উবাইদের সংরক্ষিত পাঠ
পূর্ববর্তী সূরার পরিচয়দৈর্ঘ্য ও কঠোরতায় বারাআতের মতোবারাআতের মতো নাজিল হওয়া একটি সূরা
পরবর্তী অবস্থাবক্তাকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছেসূরাটি তুলে নেওয়া হয়েছে
মনে থাকা বিষয়দুই উপত্যকার সম্পদ, তৃতীয়টির আকাঙ্ক্ষা, মাটি দিয়ে পেট পূর্ণ হওয়াওই বিষয়গুলোর সঙ্গে ধর্মকে শক্তিশালী করা ও তওবা গ্রহণের বাক্য
যা অনুপস্থিতসূরার বাকি পূর্ণ পাঠসূরার বাকি পূর্ণ পাঠ

দুই সংগ্রহে আবু মুসার নাম থাকলেও একই সাহাবির নামে আসা প্রতিবেদনকে দুই স্বাধীন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য হিসেবে গোনা যায় না। সংরক্ষিত পাঠগুলোর নিজস্ব মূল্য অন্য জায়গায়: একটিতে স্মৃতিহানির ভাষা, অন্যটিতে প্রত্যাহারের ভাষা এবং উদ্ধৃত অংশে বাড়তি বাক্য রয়েছে। সূরার অবশিষ্ট পাঠ সম্পর্কেও তাই একটি একরূপ, পূর্ণাঙ্গ প্রতিলিপি পাওয়া যাচ্ছে না। আবু উবাইদ যে বাড়তি বাক্যটি রেখেছেন, মুসলিমের বর্ণনায় তা নেই; মুসলিমের বর্ণনায় থাকা দ্বিতীয় সূরার স্মৃতি আবার এখানে উল্লিখিত হয়নি। সংগ্রহদুটির বয়ান পাশাপাশি রাখলে পূর্ববর্তী পাঠের স্মৃতি কীভাবে খণ্ডিত অবস্থায় সংরক্ষিত হয়েছে, তা ধরা পড়ে।

ইসলামওয়েবের আলোচনায় সুয়ূতির আদ-দীবাজ থেকে এই সূরার ঘটনাকে সেই ধরনের নসখের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে, যেখানে সংরক্ষণের পর মানুষের স্মৃতি থেকেও পাঠ মুছে দেওয়া হয়। এটি আবু মুসার বক্তব্যের পরবর্তী ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা। সাক্ষ্যে সূরাটি আগে পঠিত এবং পরে ভুলে যাওয়া; ব্যাখ্যায় সেই অনুপস্থিতিকে আল্লাহর কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণের এই ধর্মীয় নামকরণ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী পাঠের ব্যবধান বিলোপ করে না। বরং কোনো এক কালের কোরআনপাঠের পুরো পরিসর পরের গৃহীত মুসহাফে বহাল নেই—ব্যাখ্যাটির ভিতরেই সেই পরিবর্তন স্বীকৃত। [831]

فكان الله ينسيه الناس بعد أن حفظوه

বাংলা অনুবাদ: মানুষ তা মুখস্থ করার পর আল্লাহ তাদের তা ভুলিয়ে দিতেন।


আবু মুসার স্মরণে মুসাব্বিহাতের মতো আরেকটি সূরা

আবু মুসার দ্বিতীয় স্মৃতিটি আলাদা একটি সূরা নিয়ে। তাঁর ভাষায়, সেটিকে মুসাব্বিহাতের কোনো একটির মতো মনে করা হতো। মুসাব্বিহাত এমন সূরাগুলোর পরিচয়বাহী নাম, যেগুলো আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণার ভাষা দিয়ে শুরু হয়। একটি নির্দিষ্ট সূরার নাম বলার বদলে তিনি পরিচিত একটি শ্রেণির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তারপর জানিয়েছেন, এটিও তাঁকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে; কেবল কয়েকটি বাক্য মনে আছে। প্রথম স্মৃতিতে যেমন বারাআতের তুলনা ছিল, এখানে তেমনি পরিচিত পাঠের সাহায্যে হারিয়ে যাওয়া সূরাটির ধরন শনাক্ত করা হয়েছে। অবশিষ্ট বাক্যগুলো বক্তব্য ও কাজের অসংগতি এবং তার জন্য পরবর্তী জবাবদিহি সম্পর্কে।

এই স্মৃতির প্রথম বাক্য বর্তমান সূরা সফের দ্বিতীয় আয়াতের সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু মনে থাকা পরবর্তী বাক্য বর্তমান মুসহাফে তার পরের আয়াত নয়। সূরা সফের বর্তমান পাঠে দ্বিতীয় আয়াতটি হলো: [832]

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ

বাংলা অনুবাদ: হে বিশ্বাসীরা, তোমরা যা করো না, তা কেন বলো?

বর্তমান মুসহাফে এর পরের আয়াতে একই আচরণের প্রতি আল্লাহর তীব্র অসন্তোষের ঘোষণা রয়েছে। সেখানে গলায় সাক্ষ্য লেখা ও কিয়ামতের দিন সেই সাক্ষ্য সম্পর্কে প্রশ্নের ভাষা নেই। তৃতীয় আয়াতের পাঠ: [833]

كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ

বাংলা অনুবাদ: তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত ঘৃণিত।

আবু মুসার স্মৃতিতে একই প্রারম্ভের পরে বলা হয়েছিল: তা তোমাদের গলায় সাক্ষ্য হিসেবে লিখে রাখা হবে এবং কিয়ামতের দিন তোমাদের সে সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। বর্তমান দ্বিতীয় আয়াতের সঙ্গে শুরুর অংশ মিলে যাওয়ায় তাঁর গোটা স্মৃতিকে বর্তমান সূরা সফের অবিকল পাঠ বলা যায় না। মিলটি একটি বাক্যে; পরবর্তী ভাষায় ব্যবধান রয়েছে। সেই ব্যবধান আয়াতের নম্বর বসানোর কারণে তৈরি হয়নি। এক জায়গায় আল্লাহর ঘৃণার ঘোষণা, অন্য জায়গায় সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ হওয়া ও বিচারদিনের জিজ্ঞাসাবাদের কথা—দুটি আলাদা বাক্যবিন্যাস সংরক্ষিত হয়েছে।

পাঠের অবস্থানবর্তমান সূরা সফআবু মুসার স্মরণে থাকা অংশ
প্রথম বাক্যতোমরা যা করো না, তা কেন বলো?তোমরা যা করো না, তা কেন বলো?
পরের বক্তব্যযা করো না তা বলা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত ঘৃণিতগলায় সাক্ষ্য লেখা এবং কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসাবাদ
রচনার পরিচয়মুসহাফে সংরক্ষিত সূরা সফমুসাব্বিহাতের একটির মতো পূর্বে পঠিত একটি সূরা
পূর্ণ পাঠের অবস্থাবর্তমান মুসহাফে পূর্ণ সূরা রয়েছেবক্তার স্মৃতিতে কেবল উদ্ধৃত অংশ রয়েছে

কুরতুবি এই বর্ণনা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইবনুল আরাবির বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে বর্তমান সূরা সফে থাকা প্রথম বাক্যের শব্দ ও অর্থ উভয়টি প্রতিষ্ঠিত বলা হয়েছে; সাক্ষ্য ও জিজ্ঞাসাবাদের পরের বাক্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, তার অর্থ ধর্মে প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ ব্যাখ্যার মধ্যেই হুবহু শব্দের উপস্থিতি এবং অর্থগত সামঞ্জস্যকে আলাদা করা হয়েছে। প্রথমটির ক্ষেত্রে শব্দ ও অর্থ, দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে কেবল অর্থ—এই পার্থক্য ব্যাখ্যাকারীর নিজের ভাষাতেই রয়েছে। [834]

قال ابن العربي : وهذا كله ثابت في الدين . أما قوله تعالى : يا أيها الذين آمنوا لم تقولون ما لا تفعلون فثابت في الدين لفظا ومعنى في هذه السورة . وأما قوله : ” شهادة في أعناقكم فتسألون عنها يوم القيامة ” فمعنى ثابت في الدين ; فإن من التزم شيئا لزمه شرعا .

বাংলা অনুবাদ: ইবনুল আরাবি বলেন: এগুলো সবই ধর্মে প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহর বাণী “হে বিশ্বাসীরা, তোমরা যা করো না, তা কেন বলো?”—এটি এই সূরায় শব্দ ও অর্থ উভয় দিক থেকে প্রতিষ্ঠিত। আর “তোমাদের গলায় সাক্ষ্য, অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমাদের সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে”—এর অর্থ ধর্মে প্রতিষ্ঠিত; কারণ কেউ কোনো বিষয় নিজের জন্য আবশ্যক করে নিলে শরিয়তের বিচারে তা তার ওপর আবশ্যক হয়ে যায়।

অর্থের মিল একটি ধারণার ধারাবাহিকতা দেখায়; তা হারানো বাক্যটির অক্ষরসমষ্টি মুসহাফে উপস্থিত করে না। প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও জবাবদিহির শিক্ষা ধর্মে অন্য জায়গায় থাকলেও আবু মুসার উদ্ধৃত ওই বাক্য বর্তমান সূরা সফের তৃতীয় আয়াত হয়ে যায় না। একই অর্থ বহু ভিন্ন বাক্যে প্রকাশ করা সম্ভব। অথচ কোরআনের শব্দগত সংরক্ষণের দাবির বিষয় নির্দিষ্ট বাক্য, তার ক্রম ও তার গ্রন্থগত অবস্থান। ইবনুল আরাবির ব্যাখ্যা তাই যে ধরনের ধারাবাহিকতা দেখায় তা অর্থের; আবু মুসার স্মৃতির পুরো ভাষা বর্তমান মুসহাফে সংরক্ষিত থাকার সাক্ষ্য সেটি দেয় না।

দুটি স্মৃতির তুলনায় প্রথম সূরার দৈর্ঘ্য সম্পর্কে নির্দিষ্ট তুলনা পাওয়া যায়; দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে একটি সূরাগোষ্ঠীর নাম পাওয়া যায়। দ্বিতীয় সূরার মোট আয়াতসংখ্যা, কোন বাক্যের পরে কতটা অংশ ছিল কিংবা সূরা সফের সঙ্গে তার সম্পূর্ণ সম্পর্ক—বর্ণনায় এসবের হিসাব নেই। যা স্পষ্টভাবে আছে তা হলো পূর্বে একটি সূরা পাঠের দাবি, পরে সেটি ভুলে যাওয়া এবং স্মৃতিতে রয়ে যাওয়া একটি পরিচিত সূচনার সঙ্গে বর্তমান মুসহাফের বাইরে থাকা বাক্যের সংযোগ। ওই সংযোগের পূর্ণ প্রাচীন রচনা আর উদ্ধৃত হয়নি। ফলে বর্তমান পাঠ থেকে তার আগের সমস্ত পরিসর পুনর্গঠন করা সম্ভব হয় না; হাদিসটি নিজেই খণ্ডিত স্মৃতির দলিল হয়ে থাকে।

একই সাহাবির বিবরণে দুই পৃথক সূরার অধিকাংশ হারিয়ে যাওয়ার কথা থাকায় বিষয়টি বিচ্ছিন্ন একটি শব্দ স্মরণ করতে না পারার ঘটনা নয়। প্রথমটিতে সম্পদলোভের বক্তব্য, দ্বিতীয়টিতে কথা ও কাজের অসংগতির বিচার—দুটি আলাদা বিষয়বস্তুর অবশিষ্ট অংশ রয়েছে। বর্তমান মুসহাফের স্থির সীমানা দিয়ে এই পূর্ববর্তী পাঠসমাজের সমস্ত স্মৃতি মাপা যায় না। স্মৃতিগুলো এমন একটি অতিরিক্ত পাঠপরিসরের দাবি বহন করে, যার পূর্ণ রচনা পাওয়া যাচ্ছে না এবং যার কিছু বাক্য ধর্মীয় বর্ণনার মধ্যে মুসহাফের বাইরেই টিকে আছে।


আহযাবের আকার: উবাইয়ের বাকারার সঙ্গে তুলনা ও আয়েশার দুইশ আয়াতের বর্ণনা

সূরা আহযাবের পূর্ববর্তী আকার সম্পর্কে উবাই ও আয়েশার নামে দুটি ভিন্ন তুলনা সংরক্ষিত হয়েছে। উবাইয়ের বিবরণে আহযাব বাকারার সমান বা তার চেয়েও দীর্ঘ ছিল; আয়েশার নামে বর্ণনায় মুহাম্মদের সময়ে দুইশ আয়াত পড়ার কথা আছে। বর্তমান মুসহাফে আহযাবের আয়াতসংখ্যা তিয়াত্তর। উবাইয়ের সঙ্গে যির ইবনে হুবাইশের কথোপকথন ও সেখানে উদ্ধৃত রজমের বাক্যের পূর্ণ পাঠ রজমের আয়াতের আলোচনায় রয়েছে। সেই সাক্ষ্য আহযাবের বড় একটি পূর্ববর্তী পরিসরের দাবি বহন করে। আয়েশার নামে খবরটি একই সূরা সম্পর্কে অন্য বক্তার নামে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার দাবি যোগ করে।

আবু উবাইদ থেকে সুয়ূতির উদ্ধৃত বর্ণনায় ইবনে আবু মারইয়াম, ইবনে লাহিয়া, আবুল আসওয়াদ ও উরওয়া ইবনে যুবাইরের মাধ্যমে আয়েশার বক্তব্য এসেছে। তাঁর বক্তব্যে প্রথমে মুহাম্মদের যুগের পাঠ এবং পরে উসমানের মুসহাফ লিখনের সময়কার প্রাপ্ত অংশকে পাশাপাশি রাখা হয়েছে। [835] [836]

وَقَالَ: حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي مَرْيَمَ عَنِ ابْنِ لَهِيعَةَ عَنْ أَبِي الْأَسْوَدِ عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الزُّبَيْرِ عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ كَانَتْ سُورَةُ الْأَحْزَابِ تُقْرَأُ فِي زَمَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِائَتَيْ آيَةٍ فَلَمَّا كَتَبَ عُثْمَانُ الْمَصَاحِفَ لَمْ يُقَدَّرْ مِنْهَا إِلَّا عَلَى مَا هُوَ الْآنَ.

বাংলা অনুবাদ: আবু উবাইদ বলেন: ইবনে আবু মারইয়াম আমাদের বর্ণনা করেছেন, ইবনে লাহিয়া থেকে, তিনি আবুল আসওয়াদ থেকে, তিনি উরওয়া ইবনে যুবাইর থেকে, তিনি আয়েশা থেকে। আয়েশা বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে সূরা আহযাবের দুইশটি আয়াত তেলাওয়াত করা হতো। কিন্তু কুরআন সংকলন করার সময় উসমান কেবলমাত্র যা বর্তমান কোরআনে বিদ্যমান তা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

এখানে “দুইশ” এবং “বর্তমানে যা আছে”—দুটি ভিন্ন পরিসর। দুইশ থেকে তিয়াত্তর বাদ দিলে সংখ্যার ব্যবধান একশ সাতাশ। এই অঙ্ক বর্ণনাটিতে দাবি করা পূর্ববর্তী আয়াতসংখ্যা ও বর্তমান গণনার ব্যবধান দেখায়। বর্ণনা অনুপস্থিত প্রত্যেক আয়াতের শব্দ, অবস্থান ও পৃথক অপসারণের তালিকা দেয়নি। ফলে একশ সাতাশটি নির্দিষ্ট বাক্যের পূর্ণ পাঠ এই সংখ্যার হিসাব থেকে উদ্ধার হয় না। যা পাওয়া যায় তা হলো, আয়েশার নামে এমন একটি স্মৃতি সংরক্ষিত ছিল, যেখানে মুহাম্মদের সময়ে পরিচিত আহযাব এবং উসমানের সময় প্রাপ্ত আহযাবের আয়তন এক নয়।

সাক্ষ্য বা পাঠআহযাবের পরিসর সম্পর্কে বক্তব্যতুলনার ধরন
বর্তমান মুসহাফতিয়াত্তর আয়াতবর্তমান গণনা
উবাইয়ের নামে যিরের বর্ণনাবাকারার সমান বা তার চেয়ে দীর্ঘঅন্য একটি দীর্ঘ সূরার সঙ্গে তুলনা
আয়েশার নামে উরওয়ার বর্ণনামুহাম্মদের সময়ে দুইশ আয়াত পড়া হতোপূর্ববর্তী পাঠের জন্য সরাসরি আয়াতসংখ্যা
আয়েশার বর্ণনায় উসমানের সময়বর্তমানে যা আছে তার বেশি পাওয়া যায়নিসংগ্রহের সময়ে প্রাপ্ত পরিসর

দুটি প্রতিবেদনকে একই মাপের বিবৃতি বানালে তাদের প্রকৃত পার্থক্য হারায়। বাকারার সঙ্গে তুলনা আর দুইশ আয়াতের সংখ্যা অভিন্ন দাবি নয়। এগুলো একই প্রাচীন আহযাবের হুবহু এক দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করে না। তাদের মিল অন্য জায়গায়: উভয় বর্ণনাতেই তিয়াত্তর আয়াতের বর্তমান সূরার চেয়ে বড় একটি পূর্ববর্তী পাঠের কথা আছে। একটি তুলনামূলক স্মৃতি, অন্যটি সংখ্যাসহ স্মৃতি। এই মিল দিয়ে পরিসরহ্রাসের দাবির উপস্থিতি বোঝা যায়; দুটিকে জুড়ে একটি কাল্পনিক পূর্ণ প্রাচীন সূরা তৈরি করা যায় না।

কুরতুবিও আবু উবাইদের এই একই বর্ণনাপথ উদ্ধৃত করেছেন। তাঁর তাফসিরে বর্ণনাটির পরে আবু বকরের ব্যাখ্যা এসেছে: আয়েশার কথার অর্থ, বর্তমানে থাকা অংশের অতিরিক্ত আহযাবের পাঠ আল্লাহ নিজের কাছে তুলে নিয়েছেন। একই বর্ণনা আবু উবাইদ, সুয়ূতি ও কুরতুবিতে পাওয়া মানে তিনজন পৃথক সাহাবির সাক্ষ্য নয়; একই খবরের গ্রন্থগত গ্রহণ ও ব্যাখ্যার ইতিহাস। সেই ব্যাখ্যায় অতিরিক্ত পূর্ববর্তী পাঠের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়নি, তাকে তুলে নেওয়ার ধর্মীয় ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। [837]

قال أبو بكر : فمعنى هذا من قول أم المؤمنين عائشة : أن الله تعالى رفع إليه من سورة الأحزاب ما يزيد على ما عندنا .

বাংলা অনুবাদ: আবু বকর বলেন: উম্মুল মুমিনিন আয়েশার এই বক্তব্যের অর্থ হলো, সূরা আহযাবে আমাদের কাছে যা আছে তার অতিরিক্ত অংশ আল্লাহ নিজের কাছে তুলে নিয়েছেন।

ইসলামকিউএর ১৭৮২০৯ নম্বর উত্তরে দুইশ আয়াতের এই প্রশ্নের পরে “সঠিক শব্দরূপ” হিসেবে উবাইয়ের বাকারার সঙ্গে তুলনার বর্ণনা আনা হয়েছে। সেখানে উত্তরটির নির্দিষ্ট সংযোগবাক্য হলো: [838]

وأما اللفظ الصحيح

বাংলা অনুবাদ: আর সঠিক শব্দরূপ হলো।

কিন্তু আয়েশার দুইশ আয়াত এবং উবাইয়ের বাকারার সঙ্গে তুলনা দুটি পৃথক বর্ণনা। দ্বিতীয়টি উদ্ধৃত করলেই প্রথমটির বক্তা, সনদ ও সংখ্যা সংশোধিত হয়ে যায় না। উবাইয়ের খবরের সঙ্গে আয়েশার খবরের সম্পর্ক তুলনার; একজনের কথাকে অন্যজনের বক্তব্যের “সঠিক শব্দরূপ” বানানোর নয়। উত্তরটি বড় পূর্ববর্তী আহযাবের আরেকটি খবর গ্রহণ করছে, অথচ দুইশ আয়াতের নির্দিষ্ট বর্ণনাটির জায়গায় সেটি বসাচ্ছে। ফলে পরিসর বড় ছিল—এই অভিন্ন বিষয় বহাল থাকলেও আয়েশার বক্তব্যের স্বতন্ত্র পরিচয় সেখানে আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।

আয়েশার নামে সংরক্ষিত বাক্যটির বিশেষ তাৎপর্য উসমানের মুসহাফ প্রস্তুতের উল্লেখে। আগে পাঠ করা হতো কতখানি এবং পরে পাওয়া গেল কতখানি—সংকলনের সঙ্গে যুক্ত এই তুলনা গ্রন্থের ইতিহাসের কেন্দ্রে পড়ে। কোনো সংকলন আগে প্রচলিত সমস্ত উপাদান অবিকল বহন করেছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য এই ধরনের সাক্ষ্য প্রাসঙ্গিক। পরবর্তী ধর্মীয় ব্যাখ্যা অনুপস্থিতিকে অনুমোদিত নসখ হিসেবে গ্রহণ করেছে; বর্ণনার ভাষায় পূর্ববর্তী বৃহত্তর সূরা ও গৃহীত ক্ষুদ্রতর পাঠের ব্যবধান তবু থেকে গেছে। সংগ্রহে যা আছে এবং আগে পাঠের দাবি করা সমস্ত বিষয়বস্তু এখানে সমার্থক নয়।


হুযাইফার বক্তব্যে তাওবার বর্তমান অংশ ও পূর্ববর্তী পরিসর

হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান ছিলেন মুহাম্মদের সাহাবি এবং সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া একজন পরিচিত ব্যক্তি; তাঁর মৃত্যু ৩৬ হিজরিতে। উসমানি পাঠ নির্ধারণের বিবরণে আঞ্চলিক পাঠবিরোধ নিয়ে তাঁর উদ্বেগের কথা এসেছে। একই ব্যক্তির নামে তাওবার পরিসর সম্পর্কেও একটি বক্তব্য সংরক্ষিত আছে। সেখানে সূরাটিকে “আযাবের সূরা” বলা হয়েছে এবং বর্তমানে পঠিত অংশকে পূর্বে পঠিত বিষয়ের এক-চতুর্থাংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে তাঁর নামে বর্ণিত ভূমিকার একদিকে পাঠের ঐক্য প্রতিষ্ঠার দাবি, অন্যদিকে পূর্ববর্তী বৃহত্তর পাঠের স্মৃতি রয়েছে।

হায়সামী মাজমাউয যাওয়াইদে তাবারানির আল-মুজামুল আওসাতের সূত্রে এই খবরটি এনেছেন। বর্ণনার পরে তিনি এর বর্ণনাকারীদের বিশ্বস্ত বলেছেন। সুয়ূতির আল-ইতকানেও এই বক্তব্যের উল্লেখ রয়েছে। হায়সামীর সংরক্ষিত পূর্ণ বিবরণ: [839] [840]

عن حذيفة قال : التي تسمون سورة التوبة هي سورة العذاب ، وما يقرؤون منها مما كنا نقرأ إلا ربعها . رواه الطبراني في الأوسط ، ورجاله ثقات .

বাংলা অনুবাদ: হুযাইফা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: তোমরা যাকে সূরা তাওবা বলো, তা আযাবের সূরা। আমরা আগে এর যা পাঠ করতাম, তার এক-চতুর্থাংশ ছাড়া তারা পড়ে না। হায়সামী বলেন: তাবারানি আল-আওসাতে এটি বর্ণনা করেছেন এবং এর বর্ণনাকারীরা বিশ্বস্ত।

কোরআন সংকলন 169

বাক্যটির বিষয় তাওবার অন্য নামমাত্র নয়। “তোমরা যাকে তাওবা বলো”—এই সম্বোধনে পরিচিত একটি নির্দিষ্ট সূরাকে চিহ্নিত করে তারপর তার বর্তমান পাঠের পরিমাণ সম্পর্কে বলা হয়েছে। “আমরা পড়তাম” এবং “তারা পড়ে”—এই দুই কালগত অবস্থানের মধ্যে এক-চতুর্থাংশের তুলনা এসেছে। অতীতের পঠিত বিষয়বস্তুর তুলনায় পরের পাঠের পরিসর কম—বর্ণিত বক্তব্যটির পরিমাণগত অর্থ এটি। নামের ভিন্নতা সেই তুলনা ব্যাখ্যা করে না; বক্তব্যে নামের পরে আলাদা করে পরিসরের দাবিই করা হয়েছে।

এটি আয়াতগণনার সাধারণ পার্থক্যের চেয়ে ভিন্ন। একই সমস্ত বাক্য রেখে কোথায় একটি আয়াত শেষ এবং পরেরটি শুরু হবে, সে বিষয়ে দুই গণনাপদ্ধতির মতভেদ থাকতে পারে। হুযাইফার নামে বক্তব্যটি সেই সীমারেখা গণনার কথা বলেনি। আগে যা পড়া হতো, তার কতটা এখন পড়া হয়—তুলনার বিষয় সেই পাঠ্যবস্তু। আবার “এক-চতুর্থাংশ” কথাটি মোট পরিসরের অনুপাত; অনুপস্থিত প্রত্যেক আয়াতের সংখ্যা বা দৈর্ঘ্যের তালিকা নয়। বর্তমান আয়াতসংখ্যাকে চার দিয়ে গুণ করে সেখান থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক হারানো আয়াতের পূর্ণ হিসাব তৈরি করলে মূল বর্ণনায় অনুল্লিখিত একটি গণনা যোগ হয়।

বর্ণনার শব্দ বা পরিচয়নির্দিষ্ট অর্থযে প্রশ্নের উত্তর এতে নেই
“তোমরা যাকে তাওবা বলো”একটি পরিচিত নির্দিষ্ট সূরাতার অন্য প্রতিটি প্রাচীন নামের তালিকা
“আমরা যা পড়তাম”বক্তার দাবি করা পূর্ববর্তী পাঠপরিসরআগের সম্পূর্ণ শব্দপাঠ
“এক-চতুর্থাংশ”বর্তমান ও পূর্ববর্তী পরিসরের অনুপাতঅনুপস্থিত প্রত্যেক আয়াতের সংখ্যা ও দৈর্ঘ্য
“বর্ণনাকারীরা বিশ্বস্ত”হায়সামীর সনদসংক্রান্ত মূল্যায়নসমস্ত পণ্ডিতের অভিন্ন ঐতিহাসিক রায়

আবু মুসার প্রথম স্মৃতির সঙ্গে এই খবরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। আবু মুসা অন্য একটি সূরাকে বারাআতের মতো বলেছিলেন; হুযাইফার নামে এখানে বারাআত বা তাওবা নিজেকেই পূর্বে বৃহত্তর বলা হয়েছে। প্রথমটিতে তুলনাযোগ্য অন্য রচনা, দ্বিতীয়টিতে একই নামাঙ্কিত সূরার পরিসরহ্রাসের দাবি। দুটিকে একই হারানো সূরার দুটি খবর হিসেবে উপস্থাপন করলে সাক্ষ্যের বিষয় বদলে যায়। তাদের পৃথক রাখলে দেখা যায়, সংরক্ষিত ঐতিহ্যে কেবল মুসহাফের বাইরে অন্য সূরার স্মৃতিই নেই; গৃহীত সূরার পূর্ববর্তী বৃহত্তর আকারের দাবিও রয়েছে।

হায়সামীর মন্তব্যে ব্যবহৃত “বর্ণনাকারীরা বিশ্বস্ত” একটি নির্দিষ্ট হাদিসশাস্ত্রীয় মূল্যায়ন। এটি তাঁর কাছে বর্ণনাপথের ব্যক্তিদের গ্রহণযোগ্যতা জানায়। ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হিসেবে খবরটির বিষয়বস্তু হলো, হুযাইফার নামে একটি বৃহত্তর তাওবার স্মৃতি লিখিত সংগ্রহে স্থান পেয়েছিল। সুয়ূতির নসখবিষয়ক আলোচনাতেও সেই ধরনের খবরের উপস্থিতি পরবর্তী পণ্ডিতদের কাছে এর পরিচিতি দেখায়। একই প্রতিবেদনের পুনরুদ্ধৃতি নতুন প্রত্যক্ষদর্শী তৈরি করে না, কিন্তু প্রতিবেদনটিকে আধুনিক কোনো সমালোচকের উদ্ভাবন বলার সুযোগও থাকে না। সংরক্ষিত মুসলিম গ্রন্থের মধ্যেই বর্তমান সূরার বাইরের অতিরিক্ত পাঠপরিসরের এই দাবি রয়েছে।

এক-চতুর্থাংশের বক্তব্য গ্রহণ করলে পূর্ববর্তী বৃহত্তর পাঠ থেকে পরে বহাল থাকা অংশে বড় ধরনের হ্রাস স্বীকার করতে হয়। তার ধর্মীয় অনুমোদন কী ছিল, সেটি আলাদা ব্যাখ্যার প্রশ্ন। অনুপাতের অর্থ বদলে ফেলে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী পরিসরকে একই করা যায় না। হুযাইফার নামে খবরটি পূর্ণ হারানো পাঠ উদ্ধার করে না; তার গুরুত্ব হলো, বর্তমান সূরার সীমানাকে পূর্ববর্তী সমস্ত পাঠের অবিকল সীমানা হিসেবে গ্রহণ করতে এটি সরাসরি বাধা দেয়।


বীরে মাউনার নিহতদের সম্পর্কে কোরআন হিসেবে পঠিত ও পরে সরানো বাক্য

বীরে মাউনার নিহতদের সম্পর্কে আনাসের বর্ণনায় একটি বাক্যের পূর্ববর্তী পরিচয় আরও সরাসরি এসেছে: তাঁদের বিষয়ে কোরআন নাজিল হয়েছিল, সাহাবিরা তা পড়েছিলেন এবং পরে তা রহিত বা তুলে নেওয়া হয়েছিল। বাক্যটির বক্তব্য নিহতদের পক্ষ থেকে তাদের সম্প্রদায়ের কাছে সংবাদ পৌঁছানো—তারা তাদের রবের সাক্ষাৎ পেয়েছে এবং পারস্পরিক সন্তুষ্টি লাভ করেছে। বর্তমান মুসহাফে বাক্যটি নেই। সহিহ বুখারিতে ঘটনার একাধিক বর্ণনায় তার পাঠ ও প্রত্যাহারের খবর সংরক্ষিত হয়েছে। এসব বর্ণনায় ঘটনাবিবরণের পরিমাণ এবং কয়েকটি শব্দ ভিন্ন হলেও আগে কোরআন হিসেবে পাঠ ও পরে সেই পাঠ প্রত্যাহারের দাবি স্পষ্ট রয়েছে।

বুখারির ২৮০১ নম্বর বর্ণনায় দূতদলের ওপর হামলা, আনাসের মামার নিহত হওয়া, জিবরাইলের সংবাদ এবং তারপর পঠিত বাক্যের বিবরণ এসেছে। ঘটনাক্রমসহ সম্পূর্ণ বর্ণনাটি হলো: [841] [842]

حَدَّثَنَا حَفْصُ بْنُ عُمَرَ الْحَوْضِيُّ ، حَدَّثَنَا هَمَّامٌ ، عَنْ إِسْحَاقَ ، عَنْ أَنَسٍ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ بَعَثَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم أَقْوَامًا مِنْ بَنِي سُلَيْمٍ إِلَى بَنِي عَامِرٍ فِي سَبْعِينَ، فَلَمَّا قَدِمُوا، قَالَ لَهُمْ خَالِي أَتَقَدَّمُكُمْ، فَإِنْ أَمَّنُونِي حَتَّى أُبَلِّغَهُمْ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَإِلاَّ كُنْتُمْ مِنِّي قَرِيبًا‏.‏ فَتَقَدَّمَ، فَأَمَّنُوهُ، فَبَيْنَمَا يُحَدِّثُهُمْ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم إِذْ أَوْمَئُوا إِلَى رَجُلٍ مِنْهُمْ، فَطَعَنَهُ فَأَنْفَذَهُ فَقَالَ اللَّهُ أَكْبَرُ، فُزْتُ وَرَبِّ الْكَعْبَةِ‏.‏ ثُمَّ مَالُوا عَلَى بَقِيَّةِ أَصْحَابِهِ فَقَتَلُوهُمْ، إِلاَّ رَجُلاً أَعْرَجَ صَعِدَ الْجَبَلَ‏.‏ قَالَ هَمَّامٌ فَأُرَاهُ آخَرَ مَعَهُ، فَأَخْبَرَ جِبْرِيلُ ـ عَلَيْهِ السَّلاَمُ ـ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُمْ قَدْ لَقُوا رَبَّهُمْ، فَرَضِيَ عَنْهُمْ وَأَرْضَاهُمْ، فَكُنَّا نَقْرَأُ أَنْ بَلِّغُوا قَوْمَنَا أَنْ قَدْ لَقِينَا رَبَّنَا فَرَضِيَ عَنَّا وَأَرْضَانَا‏.‏ ثُمَّ نُسِخَ بَعْدُ، فَدَعَا عَلَيْهِمْ أَرْبَعِينَ صَبَاحًا، عَلَى رِعْلٍ وَذَكْوَانَ وَبَنِي لِحْيَانَ وَبَنِي عُصَيَّةَ الَّذِينَ عَصَوُا اللَّهَ وَرَسُولَهُ صلى الله عليه وسلم‏.‏

বাংলা অনুবাদ: সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ১৭৫০. যে আল্লাহ‌র রাস্তায় আহত হলো কিংবা বর্শা বিদ্ধ হল
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ২৬০৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৮০১
২৬০৭। হাফস ইবনু উমর (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু সুলায়মের সত্তর জন লোকের একটি দলকে বানু আমিরের কাছে পাঠান। দলটি সেখানে পৌঁছালে আমার মামা (হারাম ইবনু মিলহান) তাদেরকে বললেন, আমি সবার আগে বানু আমিরের কাছে যাব। যদি তারা আমাকে নিরাপত্তা দেয় আর আমি তাদের কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী পৌঁছাতে পারি, (তবে তো ভাল) অন্যথায় তোমরা আমার কাছেই থাকবে। তারপর তিনি এগিয়ে গেলেন। কাফিররা তাঁকে নিরাপত্তা দিল, কিন্তু তিনি যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী শোনাতে লাগলেন, সেই সময় আমির গোত্রীয়রা এক ব্যক্তিকে ইঙ্গিত করল। আর সেই ব্যক্তি তাঁকে বর্শাঘাত করল এবং তা শরীর ভেদ করে বের হয়ে গেল। তখন তিনি বললেন আল্লাহু আকবর, কাবার রবের কসম! আমি সফলকাম হয়েছি। তারপরে কাফিররা তাঁর অন্যান্য সঙ্গীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং সকলকে শহীদ করল, কিন্তু একজন খোঁড়া ব্যক্তি বেঁচে গেলেন, তিনি পাহাড়ে আরোহণ করেছিলেন।
হাম্মাম (রহঃ) অতিরিক্ত উল্লেখ করেন, আমার মনে হয় তাঁর সাথে অন্য একজন ছিলেন। তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে খবর দিলেন, প্রেরিত দলটি তাদের রবের সাথে মিলিত হয়েছে। তিনি (রব) তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাদের সন্তুষ্ট করেছেন। (রাবী বলেন) আমরা এই আয়াতটি পাঠ করতাম, আমাদের কওমকে জানিয়ে দাও যে, আমরা আমাদের রবের সাথে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমাদেরও সন্তুষ্ট করেছেন। পরে এ আয়াতটি মানসুখ হয়ে যায়। তারপর আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি অবাধ্যতার দরুন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্রমাগত চল্লিশ দিন রি’ল, যাকওয়ান, বানু লিহয়ান ও বানু উসায়্যার বিরুদ্ধে দু’আ করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

এই বর্ণনায় নিহত ব্যক্তির উক্তি, জিবরাইলের দেওয়া খবর এবং সাহাবিদের পাঠ করা বাক্য পরপর এসেছে। ফলে সব কথাকে এক ধরনের উদ্ধৃতি বানানো যায় না। “কাবার রবের শপথ, আমি সফল হয়েছি” নিহত ব্যক্তির বক্তব্য। রবের সন্তুষ্টির খবর জিবরাইলের মাধ্যমে পৌঁছানোর বর্ণনা। আর “আমাদের সম্প্রদায়কে জানিয়ে দাও”—এই অংশটির পরে আনাসের বক্তব্যে পাঠ করা ও রহিত হওয়ার তথ্য রয়েছে। আলাদা বক্তা ও আলাদা অবস্থান বজায় রাখলে কোরআনপাঠের দাবিটি কোথায় এসেছে, তা নির্দিষ্টভাবে ধরা পড়ে।

২৮১৪ নম্বর বর্ণনায় ঘটনাটি তুলনামূলক সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয়েছে, কিন্তু বাক্যটির পরিচয় আরও প্রত্যক্ষ। সেখানে “কোরআন নাজিল হয়েছিল”, “আমরা তা পড়েছি” এবং “পরে তা রহিত হয়েছে”—এই ধারাবাহিকতা আনাসের নামে রয়েছে। [843] [844]

حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ ، قَالَ حَدَّثَنِي مَالِكٌ ، عَنْ إِسْحَاقَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي طَلْحَةَ ، عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ دَعَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى الَّذِينَ قَتَلُوا أَصْحَابَ بِئْرِ مَعُونَةَ ثَلاَثِينَ غَدَاةً، عَلَى رِعْلٍ وَذَكْوَانَ وَعُصَيَّةَ عَصَتِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ، قَالَ أَنَسٌ أُنْزِلَ فِي الَّذِينَ قُتِلُوا بِبِئْرِ مَعُونَةَ قُرْآنٌ قَرَأْنَاهُ ثُمَّ نُسِخَ بَعْدُ بَلِّغُوا قَوْمَنَا أَنْ قَدْ لَقِينَا رَبَّنَا فَرَضِيَ عَنَّا وَرَضِينَا عَنْهُ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ১৭৬০. আল্লাহ তা’আলার এ বাণী যাদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, তাদের মর্যাদাঃ যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদের কখনো মৃত মনে করো না, বরং তারা জীবিত …. আল্লাহ মুমিনগণের শ্রমফল নষ্ট করে দেন না। (আলে ‘ইমরান : ৩:১৬৯ – ১৭১)
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ২৬১৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৮১৪
২৬১৯। ইসমাইল ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যারা বীরে মাউনায় শরিক সাহাবীদের শহীদ করেছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই রি’ল ও যাকওয়ানের বিরুদ্ধে ত্রিশ দিন পর্যন্ত ফজরে দুয়া করেছিলেন এবং উসাইয়্যা গোত্রের বিরুদ্ধেও যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। আনাস (রাঃ) বলেন, বী’রে মাউনার কাছে শহীদ সাহাবীদের সম্পর্কে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছিল, যা আমরা পাঠ করেছি। পরে তা মানসুখ হয়ে যায়। (আয়াতটি হলঃ)
بَلِّغُوا قَوْمَنَا أَنْ قَدْ لَقِينَا رَبَّنَا فَرَضِيَ عَنَّا وَرَضِينَا عَنْهُ‏
অর্থঃ তোমরা আমাদের কওমের কাছে এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দাও যে, আমরা আমাদের রবের সাক্ষাৎ লাভ করেছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং আমরাও তার প্রতি সন্তুষ্ট।”

হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

মাগাযি অধ্যায়ের ৪০৯০ নম্বর হাদিসে দলের পরিচয় ও তাদের দৈনন্দিন কাজও এসেছে। তারা দিনে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করত এবং রাতে নামাজ পড়ত; আনাস তাদের তখনকার পরিচয় হিসেবে “কারি” নাম উল্লেখ করেছেন। গোত্রগুলোর সাহায্যপ্রার্থনা, সত্তরজন আনসার পাঠানো এবং বীরে মাউনাতে হত্যার পর মুহাম্মদের কুনুতের বর্ণনার মধ্যে পঠিত বাক্যটির খবর রয়েছে। [845] [846]

حَدَّثَنِي عَبْدُ الأَعْلَى بْنُ حَمَّادٍ ، حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ زُرَيْعٍ ، حَدَّثَنَا سَعِيدٌ ، عَنْ قَتَادَةَ ، عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ـ رضى الله عنه ـ أَنَّ رِعْلاً، وَذَكْوَانَ وَعُصَيَّةَ وَبَنِي لَحْيَانَ اسْتَمَدُّوا رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى عَدُوٍّ، فَأَمَدَّهُمْ بِسَبْعِينَ مِنَ الأَنْصَارِ، كُنَّا نُسَمِّيهِمُ الْقُرَّاءَ فِي زَمَانِهِمْ، كَانُوا يَحْتَطِبُونَ بِالنَّهَارِ وَيُصَلُّونَ بِاللَّيْلِ، حَتَّى كَانُوا بِبِئْرِ مَعُونَةَ قَتَلُوهُمْ، وَغَدَرُوا بِهِمْ، فَبَلَغَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم ، فَقَنَتَ شَهْرًا يَدْعُو فِي الصُّبْحِ عَلَى أَحْيَاءٍ مِنْ أَحْيَاءِ الْعَرَبِ، عَلَى رِعْلٍ وَذَكْوَانَ وَعُصَيَّةَ وَبَنِي لَحْيَانَ ‏.‏ قَالَ أَنَسٌ فَقَرَأْنَا فِيهِمْ قُرْآنًا ثُمِّ إِنَّ ذَلِكَ رُفِعَ بَلِّغُوا عَنَّا قَوْمَنَا، أَنَّا لَقِينَا رَبَّنَا، فَرَضِيَ عَنَّا وَأَرْضَانَا‏.‏ وَعَنْ قَتَادَةَ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ حَدَّثَهُ أَنَّ نَبِيَّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَنَتَ شَهْرًا فِي صَلاَةِ الصُّبْحِ يَدْعُو عَلَى أَحْيَاءٍ مِنْ أَحْيَاءِ الْعَرَبِ، عَلَى رِعْلٍ وَذَكْوَانَ وَعُصَيَّةَ وَبَنِي لَحْيَانَ‏.‏ زَادَ خَلِيفَةُ حَدَّثَنَا ابْنُ زُرَيْعٍ ، حَدَّثَنَا سَعِيدٌ ، عَنْ قَتَادَةَ ، حَدَّثَنَا أَنَسٌ ، أَنَّ أُولَئِكَ السَّبْعِينَ، مِنَ الأَنْصَارِ قُتِلُوا بِبِئْرِ مَعُونَةَ، قُرْآنًا كِتَابًا‏.‏ نَحْوَهُ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫১/ মাগাযী (যুদ্ধাভিযান)
পরিচ্ছেদঃ ২১৯২. রাজী, রিল, যাক্‌ওয়ান, বিরে মাউনার যুদ্ধ এবং আযাল, কারাহ, আসিম ইব্‌ন সাবিত, খুবায়ব (রা) ও তার সঙ্গীদের ঘটনা। ইব্‌ন ইসহাক (র) বলেন, আসিম ইব্‌ন উমর (রা) বর্ণনা করেছেন যে, রাজীর যুদ্ধ উহুদের যুদ্ধের পর সংঘটিত হয়েছিল
৩৭৯০। আবদুল আলা ইবনে হাম্মাদ বর্ণনা করেন, ইয়াজিদ ইবনে যুরাই থেকে, তিনি সাঈদ থেকে, তিনি কাতাদা থেকে, তিনি আনাস ইবনে মালিক থেকে। আনাস বলেন: রিল, যাকওয়ান, উসাইয়্যা ও বনু লিহইয়ান একটি শত্রুর বিরুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সাহায্য চেয়েছিল। তিনি তাদের কাছে আনসারদের মধ্য থেকে সত্তরজন পাঠান। আমরা তখন তাঁদের কারি বলতাম। তাঁরা দিনে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতেন এবং রাতে নামাজ পড়তেন। তাঁরা বীরে মাউনাতে পৌঁছালে ওই লোকেরা বিশ্বাসঘাতকতা করে তাঁদের হত্যা করে। এ সংবাদ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে পৌঁছালে তিনি এক মাস পর্যন্ত ফজরের সালাতে আরবের কতিপয় গোত্র তথা রিল, যাক্‌ওয়ান, উসায়্যা এবং বনূ লিহইয়ানের প্রতি বদদোয়া করে কুনূত পাঠ করেন। আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, তাদের সম্পর্কিত কিছু আয়াত আমরা পাঠ করতাম। অবশ্য পরে এর তিলাওয়াত রহিত হয়ে যায়।
একটি আয়াত ছিল- بَلِّغُوا عَنَّا قَوْمَنَا، أَنَّا لَقِينَا رَبَّنَا، فَرَضِيَ عَنَّا وَأَرْضَانَا‏ “আমাদের কওমের লোকদের জানিয়ে দাও। আমরা আমাদের প্রভুর সান্নিধ্যে পৌঁছে গিয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমাদেরকেও সন্তুষ্ট করেছেন।
কাতাদা (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি তাঁকে বলেছেন, আল্লাহর নাবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মাস পর্যন্ত ফজরের সালাতে আরবের কতিপয় গোত্র- তথা রি’ল, যাকওয়ান, উসায়্যা এবং বনূ লিহইয়ানের প্রতি বদদোয়া করে কুনূত পাঠ করেছেন।
(ইমাম বুখারী (রহঃ)-এর উস্তাদ) খলীফা (রহঃ) এতটুকু অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, ইবনু যুরায় (রহঃ) সাঈদ ও কাতাদা (রহঃ) এর মাধ্যমে আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁরা ৭০ জন সকলেই ছিলেন আনসার। তাঁদেরকে বি’রে মাউনা নামক স্থানে শহীদ করা হয়েছিল। (ইমাম বুখারী(রহঃ) ) বলেন, এখানে قُرْآن শব্দটি কিতাব বা অনুরূপ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

কোরআন সংকলন 171

তিনটি নম্বরের হাদিসই আনাসের নামে বর্ণিত। তাদের পৃথক বর্ণনাপথ ও সংকলনস্থল রয়েছে, কিন্তু সেজন্য তিনজন আলাদা প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে যায় না। একই সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থেকে বাদ পড়া কিছু তথ্য দীর্ঘ বর্ণনায় সংরক্ষিত আছে। ২৮০১-এ আনাসের মামার ঘটনা ও চল্লিশ সকাল বদদোয়ার কথা, ২৮১৪-এ ত্রিশ সকাল, ৪০৯০-এ এক মাস এবং সত্তর আনসারের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনটির স্বতন্ত্র বিষয়বস্তু বজায় রাখলে ঘটনাবর্ণনার পার্থক্য এবং কোরআনপাঠসংক্রান্ত অভিন্ন কেন্দ্র—দুটিই দৃশ্যমান থাকে।

হাদিসস্বতন্ত্র ঘটনাবিবরণপাঠের পরবর্তী অবস্থার ভাষা
বুখারি ২৮০১বানু সুলাইম থেকে বানু আমিরের দিকে দল পাঠানো; আনাসের মামার ঘটনা; চল্লিশ সকাল বদদোয়া“পরে তা রহিত হয়েছে”
বুখারি ২৮১৪বীরে মাউনার নিহতদের উল্লেখ; ত্রিশ সকাল বদদোয়া“কোরআন নাজিল হয়েছিল, আমরা পড়েছি; পরে রহিত হয়েছে”
বুখারি ৪০৯০সাহায্যপ্রার্থনা, সত্তর আনসার, কারিদের কাজ ও এক মাস কুনুত“আমরা তাদের সম্পর্কে কোরআন পড়েছি; পরে তা তুলে নেওয়া হয়”

বাক্যের শেষাংশেও একটি পাঠভেদ আছে। ২৮০১ ও ৪০৯০-এ আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাঁদের সন্তুষ্ট করেছেন—“আরদানা”—এই রূপ রয়েছে। ২৮১৪-এ আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তাঁরা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট—“রাদিনা আনহু”—এই রূপ এসেছে। উভয়টির ধর্মীয় বক্তব্য ঘনিষ্ঠ, কিন্তু শব্দ ও ব্যাকরণগত কর্তা এক নয়। বর্তমান মুসহাফের বাইরে হাদিসে বেঁচে থাকা বাক্যটিরও একটি মাত্র অবিকল রূপ সব বর্ণনায় সংরক্ষিত হয়নি। বর্ণনাকারীদের পাঠে অনুপস্থিত বাক্যের খবরের পাশাপাশি তার নিজস্ব ভাষাগত ভিন্নতাও টিকে আছে।

পর্যায়বর্ণনার বক্তব্যগ্রন্থের পরিসরের সঙ্গে সম্পর্ক
অবতরণনিহতদের সম্পর্কে কোরআন নাজিল হয়েছেবাক্যটিকে বর্ণনার ভেতরেই কোরআন বলা হয়েছে
পাঠআনাসের ভাষায় “আমরা পড়েছি”এটি শুধু অপ্রচারিত কোনো খসড়ার বিবরণ নয়; পূর্ববর্তী সমষ্টিগত পাঠের দাবি
প্রত্যাহারপরে রহিত বা তুলে নেওয়া হয়েছেসব পূর্বপঠিত বাক্য বর্তমান মুসহাফে বহাল নেই
পরবর্তী সংরক্ষণহাদিসে বাক্যটির পাঠ ও ইতিহাস উদ্ধৃত হয়েছেগ্রন্থের বাইরে পূর্ববর্তী কোরআনপাঠের স্মৃতি বেঁচে আছে

প্রথম ও শেষ অবস্থার ব্যবধান নির্দিষ্ট। আগে এই বাক্য পড়া হয়েছে বলে আনাসের নামের বর্ণনা দাবি করছে; পরে সেটি কোরআনের পঠিত অংশ হিসেবে বহাল নেই। রহিত হওয়ার ব্যাখ্যা ওই পরিবর্তনকে ধর্মীয় বৈধতা দেয়। এতে ঘটনাটির কালগত রূপ বদলায় না: আগে ছিল, পরে আর সেই স্থানে ও মর্যাদায় নেই। “কোরআন” শব্দটি এখানে এমন একটি পূর্ববর্তী পাঠ্যবস্তুর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, যা বর্তমান মুসহাফ খুলে পাওয়া যায় না। গ্রন্থের ইতিহাসে কোন কালে কোরআন বলা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত মুসহাফে কোন পাঠ গৃহীত হয়েছে—এই দুই প্রশ্নের উত্তর তাই সব ক্ষেত্রে অভিন্ন হয় না।

বীরে মাউনার বাক্যটি আবু মুসার দীর্ঘ সূরার চেয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য দেয়। সেখানে প্রায় সম্পূর্ণ সূরা ভুলে যাওয়ার স্মৃতি; এখানে একটি নির্দিষ্ট বাক্য এবং তার ঘটনা জানা আছে। বাক্যটি হারিয়ে গিয়ে অজ্ঞাত হয়নি। তার শব্দ বর্ণনাগুলোতে উদ্ধৃত হয়েছে, কিন্তু কোরআন হিসেবে পাঠের ধারাবাহিকতা প্রত্যাহৃত হয়েছে বলে ওই বর্ণনাগুলোই জানাচ্ছে। অর্থাৎ অনুপস্থিতি সবসময় কারও আর মনে না থাকার ফল হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি। কখনো স্মরণ ও উদ্ধৃতি বহাল থেকেও গ্রন্থগত অন্তর্ভুক্তি শেষ হয়েছে। পাঠ সংরক্ষিত থাকা এবং সেই পাঠ কোরআনের গৃহীত অংশ থাকা—এখানে দুটি পৃথক অবস্থা।


স্মরণে থাকা অংশ, ভুলে যাওয়া অবশিষ্ট এবং হাদিসে বেঁচে থাকা পাঠ

আবু মুসার স্মৃতিতে সম্পদের দুই উপত্যকা ও তৃতীয়টির আকাঙ্ক্ষার বাক্য ছিল। একই বিষয় অন্য হাদিসে মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবেও এসেছে। কোথাও তা কোরআন হিসেবে পরিচিত পূর্ববর্তী সূরার অংশ; কোথাও সাহাবির নিজের ভাষায় অনিশ্চয়তা রয়েছে, কথাটি নাজিল হয়েছিল, নাকি মুহাম্মদ সাধারণ বক্তব্য হিসেবে বলতেন। তাই শুধু বাক্যের অর্থ পরিচিত থাকলেই তার গ্রন্থগত মর্যাদার একটি অবিচ্ছিন্ন ইতিহাস পাওয়া যায় না। নির্দিষ্ট বর্ণনায় বক্তা একে কী বলেছেন এবং কোন প্রেক্ষাপটে উদ্ধৃত করেছেন, সেই পরিচয়গুলো আলাদা।

সহিহ মুসলিমে আনাসের সূত্রে সম্পদলোভের বক্তব্য প্রথমে মুহাম্মদের উক্তি হিসেবে এসেছে। পূর্ণ বর্ণনায় দুই উপত্যকার সম্পদ, তৃতীয়টির চাহিদা, মাটি দিয়ে মানুষের পেট পূর্ণ হওয়া এবং তওবা গ্রহণের কথা রয়েছে। [847]

حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ يَحْيَى ، وَسَعِيدُ بْنُ مَنْصُورٍ ، وَقُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ ، قَالَ يَحْيَى أَخْبَرَنَا وَقَالَ الآخَرَانِ، حَدَّثَنَا أَبُو عَوَانَةَ ، عَنْ قَتَادَةَ ، عَنْ أَنَسٍ ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ لَوْ كَانَ لاِبْنِ آدَمَ وَادِيَانِ مِنْ مَالٍ لاَبْتَغَى وَادِيًا ثَالِثًا وَلاَ يَمْلأُ جَوْفَ ابْنِ آدَمَ إِلاَّ التُّرَابُ وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ تَابَ ‏” ‏ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া, সাঈদ ইবনে মানসুর ও কুতাইবা ইবনে সাঈদ আমাদের বর্ণনা করেছেন। ইয়াহইয়া বলেছেন “আমাদের সংবাদ দিয়েছেন”, অন্য দুজন বলেছেন “আমাদের বর্ণনা করেছেন”—আবু আওয়ানা, কাতাদা থেকে, তিনি আনাস থেকে। আনাস বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আদমসন্তানের যদি সম্পদের দুটি উপত্যকা থাকে, তবে সে তৃতীয় আরেকটি উপত্যকা চাইবে। মাটি ছাড়া কিছুই আদমসন্তানের পেট পূর্ণ করে না। যে তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করেন।

পরের বর্ণনাপথে আনাসের অনিশ্চয়তার কথাও রয়েছে। মুসলিম পুরো বক্তব্য আবার না লিখে আগের আবু আওয়ানার বর্ণনার অনুরূপ হিসেবে নির্দেশ করেছেন, কিন্তু কোরআন হিসেবে তার পরিচয় সম্পর্কে অতিরিক্ত কথাটি রেখেছেন। [848]

وَحَدَّثَنَا ابْنُ الْمُثَنَّى ، وَابْنُ، بَشَّارٍ قَالَ ابْنُ الْمُثَنَّى حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرٍ ، أَخْبَرَنَا شُعْبَةُ ، قَالَ سَمِعْتُ قَتَادَةَ ، يُحَدِّثُ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ – فَلاَ أَدْرِي أَشَىْءٌ أُنْزِلَ أَمْ شَىْءٌ كَانَ يَقُولُهُ – بِمِثْلِ حَدِيثِ أَبِي عَوَانَةَ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: ইবনুল মুসান্না ও ইবনে বাশশার আমাদের বর্ণনা করেছেন। ইবনুল মুসান্না বলেন, মুহাম্মদ ইবনে জাফর আমাদের বর্ণনা করেছেন; শুবা আমাদের সংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি কাতাদাকে আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণনা করতে শুনেছি। আনাস বলেন: আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি—কিন্তু আমি জানি না, এটি নাজিল হওয়া কোনো বিষয়, নাকি তিনি এমনিই বলতেন—আবু আওয়ানার হাদিসের অনুরূপ।

ইবনে আব্বাসের বর্ণনাতেও একই ধরনের প্রশ্ন টিকে আছে। এখানে শুরুতে এক উপত্যকা পরিমাণ সম্পদ ও তার মতো আরও সম্পদ কামনার কথা আছে। শেষে ইবনে আব্বাসের নামে বক্তব্যটি কোরআনের অংশ কি না, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা এসেছে। মুসলিম শেষ কথাটির বর্ণনাকারী উল্লেখেও একটি পার্থক্য সংরক্ষণ করেছেন। [849]

وَحَدَّثَنِي زُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ ، وَهَارُونُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ ، قَالاَ حَدَّثَنَا حَجَّاجُ بْنُ مُحَمَّدٍ ، عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ ، قَالَ سَمِعْتُ عَطَاءً ، يَقُولُ سَمِعْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ ، يَقُولُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏”‏ لَوْ أَنَّ لاِبْنِ آدَمَ مِلْءَ وَادٍ مَالاً لأَحَبَّ أَنْ يَكُونَ إِلَيْهِ مِثْلُهُ وَلاَ يَمْلأُ نَفْسَ ابْنِ آدَمَ إِلاَّ التُّرَابُ وَاللَّهُ يَتُوبُ عَلَى مَنْ تَابَ ‏” ‏ ‏.‏ قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ فَلاَ أَدْرِي أَمِنَ الْقُرْآنِ هُوَ أَمْ لاَ ‏.‏ وَفِي رِوَايَةِ زُهَيْرٍ قَالَ فَلاَ أَدْرِي أَمِنَ الْقُرْآنِ ‏.‏ لَمْ يَذْكُرِ ابْنَ عَبَّاسٍ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: যুহাইর ইবনে হারব ও হারুন ইবনে আবদুল্লাহ আমার কাছে বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেন, হাজ্জাজ ইবনে মুহাম্মদ আমাদের বর্ণনা করেছেন, ইবনে জুরাইজ থেকে। তিনি বলেন, আমি আতাকে বলতে শুনেছি: আমি ইবনে আব্বাসকে বলতে শুনেছি, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: আদমসন্তানের যদি এক উপত্যকা ভর্তি সম্পদ থাকে, তবে সে তার সঙ্গে সমপরিমাণ আরও সম্পদ চাইবে। মাটি ছাড়া কিছুই আদমসন্তানের মন পূর্ণ করে না। আর যে তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করেন। ইবনে আব্বাস বলেন: আমি জানি না, এটি কোরআনের অন্তর্ভুক্ত কি না। যুহাইরের বর্ণনায় রয়েছে: তিনি বলেন, আমি জানি না, এটি কোরআনের অন্তর্ভুক্ত কি না; সেখানে ইবনে আব্বাসের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

তিরমিজিতে উবাইয়ের সূত্রে আরেকটি দীর্ঘতর পাঠবিবরণ আছে। মুহাম্মদ তাঁকে আল্লাহর আদেশে কোরআন পড়ে শোনানোর কথা বলেন। এরপর “লাম ইয়াকুনিল্লাযিনা কাফারু” পাঠের মধ্যে বর্তমান মুসহাফের বাইরে থাকা ধর্মসম্পর্কিত একটি বাক্য এসেছে। তারপর আলাদাভাবে “তাঁকে পড়ে শোনালেন” বলে সম্পদের উপত্যকার বাক্য উদ্ধৃত হয়েছে। বর্ণনার এই ক্রমে উভয় বক্তব্যই পাঠের পরিবেশে রয়েছে। [850]

حَدَّثَنَا مَحْمُودُ بْنُ غَيْلاَنَ ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو دَاوُدَ ، قَالَ أَخْبَرَنَا شُعْبَةُ ، عَنْ عَاصِمٍ ، قَالَ سَمِعْتُ زِرَّ بْنَ حُبَيْشٍ ، يُحَدِّثُ عَنْ أُبَىِّ بْنِ كَعْبٍ ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ لَهُ ‏ “‏ إِنَّ اللَّهَ أَمَرَنِي أَنْ أَقْرَأَ عَلَيْكَ الْقُرْآنَ ‏”‏ ‏.‏ فَقَرَأَ عَلَيْهِ ‏:‏ ‏‏(‏ لمْ يَكُنِ الَّذِينَ كَفَرُوا ‏)‏ وَفِيهَا ‏”‏ إِنَّ ذَاتَ الدِّينِ عِنْدَ اللَّهِ الْحَنِيفِيَّةُ الْمُسْلِمَةُ لاَ الْيَهُودِيَّةُ وَلاَ النَّصْرَانِيَّةُ وَلاَ الْمَجُوسِيَّةُ مَنْ يَعْمَلْ خَيْرًا فَلَنْ يُكْفَرَهُ ‏”‏ ‏.‏ وَقَرَأَ عَلَيْهِ ‏”‏ لَوْ أَنَّ لاِبْنِ آدَمَ وَادِيًا مِنْ مَالٍ لاَبْتَغَى إِلَيْهِ ثَانِيًا وَلَوْ كَانَ لَهُ ثَانِيًا لاَبْتَغَى إِلَيْهِ ثَالِثًا وَلاَ يَمْلأُ جَوْفَ ابْنِ آدَمَ إِلاَّ التُّرَابُ وَيَتُوبُ اللهُ عَلَى مَنْ تَابَ ‏” ‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ ‏.‏ وَقَدْ رُوِيَ مِنْ غَيْرِ هَذَا الْوَجْهِ رَوَاهُ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبْزَى عَنْ أَبِيهِ عَنْ أُبَىِّ بْنِ كَعْبٍ رضى الله عنه أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ لَهُ ‏”‏ إِنَّ اللَّهَ أَمَرَنِي أَنْ أَقْرَأَ عَلَيْكَ الْقُرْآنَ ‏”‏ ‏.‏ وَقَدْ رَوَاهُ قَتَادَةُ عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ لأُبَىِّ بْنِ كَعْبٍ ‏”‏ إِنَّ اللَّهَ أَمَرَنِي أَنْ أَقْرَأَ عَلَيْكَ الْقُرْآنَ ‏”‏ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: মাহমুদ ইবনে গাইলান আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আবু দাউদ আমাদের বর্ণনা করেছেন; শুবা আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, আসিম থেকে। তিনি বলেন, আমি যির ইবনে হুবাইশকে উবাই ইবনে কাব থেকে বর্ণনা করতে শুনেছি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেন: “আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন তোমাকে কোরআন পড়ে শোনাই।” এরপর তিনি তাঁকে “লাম ইয়াকুনিল্লাযিনা কাফারু” পড়ে শোনান। তাতে ছিল: “নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে ধর্মের প্রকৃতি হলো আত্মসমর্পণকারী একনিষ্ঠতা; ইহুদি ধর্ম, খ্রিষ্টধর্ম কিংবা অগ্নিপূজার ধর্ম নয়। যে সৎকর্ম করবে, তার প্রতিদান অস্বীকার করা হবে না।” তিনি তাঁকে আরও পড়ে শোনান: “আদমসন্তানের যদি এক উপত্যকা সম্পদ থাকে, তবে সে তার সঙ্গে দ্বিতীয়টি চাইবে; তার দ্বিতীয়টি থাকলে তৃতীয়টি চাইবে। মাটি ছাড়া কিছুই আদমসন্তানের পেট পূর্ণ করে না। আর যে তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করেন।” আবু ঈসা বলেন: এটি হাসান সহিহ হাদিস। এটি অন্য পথেও বর্ণিত হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আবযা তাঁর পিতা থেকে, তিনি উবাই ইবনে কাব থেকে বর্ণনা করেছেন যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেন: “আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন তোমাকে কোরআন পড়ে শোনাই।” কাতাদাও আনাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাই ইবনে কাবকে বলেন: “আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন তোমাকে কোরআন পড়ে শোনাই।”

সংরক্ষিত বর্ণনাবাক্যের পরিচয় বা অবস্থানস্মৃতি ও শ্রেণিবিভাগের অবস্থা
মুসলিম ১০৫০আবু মুসার পূর্বে পঠিত দীর্ঘ সূরার অবশিষ্টসূরার বাকি অংশ ভুলে যাওয়ার দাবি
মুসলিম ১০৪৮ক–খমুহাম্মদের উক্তি; পরে আনাসের অনিশ্চয়তানাজিল হওয়া বিষয়, নাকি সাধারণ উক্তি—স্মৃতিতে প্রশ্ন
মুসলিম ১০৪৯মুহাম্মদের বক্তব্য ও কোরআন কি না সেই প্রশ্নএক উপত্যকার ভাষা এবং শেষ মন্তব্যের আরোপে ভিন্নতা
তিরমিজি ৩৮৯৮উবাইকে কোরআন পাঠের ঘটনায় উদ্ধৃতএক থেকে দুই, দুই থেকে তিন উপত্যকার ক্রম

এই বর্ণনাগুলোর মিল মানুষের সম্পদলোভের বিষয়বস্তুতে। পার্থক্য রয়েছে শুরুর পরিমাণে, বাক্যের বিস্তারে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে তার পরিচয়ে। একই বক্তব্যকে মুহাম্মদের মুখে শোনা এবং তা কোরআনের অংশ হিসেবে চেনা দুটি আলাদা স্মৃতি। আনাস ও ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত অনিশ্চয়তা সেই সীমারেখা সব ক্ষেত্রে স্মৃতিতে সুস্পষ্ট ছিল—এমন ধারণার সঙ্গে মেলে না। আবু মুসার বক্তব্যে একটি পরিচয় দৃঢ়, অন্য বর্ণনায় একই বিষয়বস্তুর মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। হাদিসসংকলন এই অসামঞ্জস্য পুরোপুরি মুছে দেয়নি; তা পাশাপাশি রেখে দিয়েছে।

ইসলামকিউএর আলোচনায় কাজি ইয়াদের ইকমালুল মুআল্লিম থেকে একটি ব্যাখ্যা উদ্ধৃত হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে রহিত পাঠ সম্পর্কে সাহাবিদের কিছু উদ্ধৃতি মূল অলৌকিক রচনার হুবহু ভাষায় নয়, অর্থ ও কিছু শব্দের ভিত্তিতে এসেছে। এতে সংরক্ষিত বাক্যগুলো ও কোরআনের রচনাশৈলীর ব্যবধানকেও তিনি ব্যাখ্যার অংশ করেছেন। [851]

ثم تأمل ما يذكره الصحابة مما نسخ من ذلك، فإنما أَتَوْا به على المعنى، وبعض اللفظ؛ لا على نص المعجز. وسياق نظم القرآن يشهد لما ذكروه من ذلك، وبُعْدِه عن نظم القرآن وبلاغته

বাংলা অনুবাদ: তারপর সাহাবিরা এগুলোর মধ্যে যা রহিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন, তা বিবেচনা করো। তাঁরা সেগুলো অর্থ ও কিছু শব্দের ভিত্তিতে এনেছেন; অলৌকিক মূল পাঠের অবিকল ভাষায় নয়। কোরআনের রচনাবিন্যাসও তাঁদের এই উল্লেখ এবং তার সঙ্গে কোরআনের বিন্যাস ও বাগ্মিতার দূরত্বের সাক্ষ্য দেয়।

এই ব্যাখ্যায় হাদিসে থাকা অবশিষ্ট বাক্যকেও হারানো মূল পাঠের অবিকল প্রতিলিপি হিসেবে ধরা হয়নি। আগের একটি রচনা, তার পরবর্তী স্মৃতি এবং সেই স্মৃতির বর্ণিত শব্দ—তিন স্তরের মধ্যে ব্যবধান স্বীকার করা হয়েছে। এর ফল গুরুতর: অবশিষ্ট উদ্ধৃতি দিয়ে পূর্ণ পূর্ববর্তী সূরা উদ্ধার তো সম্ভব নয়ই, উদ্ধৃত অংশটিও সব ক্ষেত্রে মূল শব্দের নিশ্চয়তা বহন করছে না বলে ব্যাখ্যাকারী মনে করছেন। ধর্মীয় ঐতিহ্য কেবল কিছু পূর্ববর্তী পাঠ বাদ যাওয়ার কথা রাখেনি; সেই পাঠের স্মৃতি অর্থানুসারে উদ্ধৃত হওয়ার ব্যাখ্যাও রেখেছে।

গ্রন্থের বাইরে থাকা এই স্মৃতিগুলোর বিপরীতে গৃহীত মুসহাফের মর্যাদা ছিল বাধ্যতামূলক। আবু উবাইদ একই অধ্যায়ের শেষে উসমানের সংকলিত পাঠ অস্বীকারের জন্য ধর্মত্যাগীর বিধান প্রয়োগের কথা বলেছেন। প্রথমে ফিরে আসার আহ্বান; অস্বীকার বজায় রাখলে হত্যা। এখানে মুসহাফের সীমানা নিছক গ্রন্থতালিকার প্রশ্নে সীমিত থাকে না; গ্রহণযোগ্যতার সীমা প্রাণদণ্ডের বিধানের সঙ্গেও যুক্ত হয়। [852]

وَالَّذِي أَلَّفَهُ عُثْمَانُ، هُوَ الَّذِي بَيْنَ ظَهْرِي الْمُسْلِمِينَ الْيَوْمَ، وَهُوَ الَّذِي يُحْكَمُ عَلَى مَنْ أَنْكَرَ مِنْهُ شَيْئًا مِثْلَمَا يُحْكَمُ عَلَى الْمُرْتَدِّ مِنَ الِاسْتِتَابَةِ، فَإِنْ أَبَى فَالْقَتْلُ.

বাংলা অনুবাদ: উসমান যা সংকলন করেছেন, আজ মুসলিমদের মধ্যে বিদ্যমান সেটিই। এর কোনো কিছু যে অস্বীকার করবে, তার ব্যাপারে ধর্মত্যাগীর মতো ফিরে আসার আহ্বানের বিধান প্রয়োগ করা হবে; সে অস্বীকার করলে হত্যা।

পুরোনো অতিরিক্ত পাঠের খবর বর্ণনা হিসেবে উদ্ধৃত করা এবং গৃহীত পাঠের কোনো অংশ অস্বীকার করা এই কাঠামোয় এক সামাজিক মর্যাদা পায়নি। পূর্ববর্তী অনুপস্থিত অংশের খবরকে নসখের অধীনে স্থান দেওয়া সম্ভব হয়েছে; গৃহীত সংকলনের বিরুদ্ধে অস্বীকৃতিকে শাস্তিযোগ্য ধর্মত্যাগ হিসেবে ধরা হয়েছে। আবু উবাইদের বিধানটি সেই কর্তৃত্বের সরাসরি ভাষ্য। এর ফলে যে সীমানা প্রতিষ্ঠিত হয় তা শুধু স্মৃতির ওপর নির্ভরশীল নয়; স্বীকৃত পাঠের সঙ্গে আনুগত্য এবং অস্বীকৃতির সঙ্গে দণ্ড জুড়ে দেওয়া হয়েছে। গ্রন্থের নির্বাচিত সীমানা রক্ষায় ধর্মীয় কর্তৃত্বের সঙ্গে বলপ্রয়োগের অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে।


ইবনে উমরের বক্তব্য: “কোরআনের অনেক অংশ চলে গেছে”

আবদুল্লাহ ইবনে উমর ছিলেন উমরের পুত্র এবং হাদিস ও ফিকহের পরিচিত সাহাবি। সুয়ূতি তাদরিবুর রাবিতে তাঁর বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা দুই হাজার ছয়শ ত্রিশ উল্লেখ করেছেন। এই পরিচয় কোরআন সম্পর্কে তাঁর নামে সংরক্ষিত বক্তব্যটির অবস্থান বুঝতে প্রাসঙ্গিক: এটি প্রাথমিক মুসলিম পাঠসমাজের বাইরের কোনো সমালোচকের মন্তব্য নয়; ঐতিহ্যের নিজের স্বীকৃত বর্ণনাকারীর নামে সংরক্ষিত একটি ঘোষণা। [853]

( ثم ) عبد الله ( ابن عمر ) روى ألفي حديث وستمائة وثلاثين حديثا .

বাংলা অনুবাদ: এরপর আবদুল্লাহ ইবনে উমর; তিনি দুই হাজার ছয়শ ত্রিশটি হাদিস বর্ণনা করেছেন।

সহিহ মুসলিমে তাঁর স্বপ্নের ঘটনা হাফসার মাধ্যমে মুহাম্মদের কাছে পৌঁছানোর পর মুহাম্মদ তাঁর প্রশংসা করেছেন এবং রাতের নামাজের প্রসঙ্গ এনেছেন। সালিমের পরবর্তী মন্তব্যে ইবনে উমরের রাতের অনুশীলনের কথাও আছে। প্রশংসা ও তার পরের মন্তব্যের পাঠ: [854] [855]

فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ نِعْمَ الرَّجُلُ عَبْدُ اللَّهِ لَوْ كَانَ يُصَلِّي مِنَ اللَّيْلِ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ سَالِمٌ فَكَانَ عَبْدُ اللَّهِ بَعْدَ ذَلِكَ لاَ يَنَامُ مِنَ اللَّيْلِ إِلاَّ قَلِيلاً ‏ .‏

বাংলা অনুবাদ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “আবদুল্লাহ কত ভালো মানুষ, যদি সে রাতে নামাজ পড়ত!” সালিম বলেন: এরপর আবদুল্লাহ রাতে অল্পই ঘুমাতেন।

কোরআন সংকলন 173
কোরআন সংকলন 175

আবু উবাইদের ফাদায়িলুল কোরআনে ইসমাইল ইবনে ইব্রাহিম, আইয়ুব ও নাফির মাধ্যমে ইবনে উমরের একটি বক্তব্য এসেছে। সুয়ূতিও তা আল-ইতকানে রেখেছেন। বক্তব্যের শুরুতেই “আমি পুরো কোরআন নিয়েছি” বলার ওপর আপত্তি, মাঝখানে তার কারণ এবং শেষে বিকল্প বক্তব্যের ভাষা রয়েছে। ফলে শুধু শেষের “যা পাওয়া গেছে তা নিয়েছি” বাক্যটি নয়, তার আগে বহু কোরআন চলে যাওয়ার ঘোষণাটিও একই যুক্তির অংশ। [856] [857] [858]

حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، عَنْ أَيُّوبَ، عَنْ نَافِعٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ: ” لَا يَقُولَنَّ أَحَدُكُمْ قَدْ أَخَذْتُ الْقُرْآنَ كُلَّهُ وَمَا يُدْرِيهِ مَا كُلَّهُ؟ قَدْ ذَهَبَ مِنْهُ قُرْآنٌ كَثِيرٌ، وَلَكِنْ لِيَقُلْ: قَدْ أَخَذْتُ مِنْهُ مَا ظَهَرَ مِنْهُ “

বাংলা অনুবাদ: ইসমাইল ইবনে ইব্রাহিম আমাদের বর্ণনা করেছেন, আইয়ুব থেকে, তিনি নাফি থেকে, তিনি ইবনে উমর থেকে। তিনি বলেন: তোমাদের কেউ যেন না বলে, “আমি পুরো কোরআন নিয়েছি।” সে কী করে জানবে, তার সবটুকু কী? তার অনেক কোরআন তো চলে গেছে। বরং সে বলুক, “এর যা প্রকাশিতভাবে পাওয়া গেছে, তা আমি নিয়েছি।”

কোরআন সংকলন 177
কোরআন সংকলন 179

বাক্যটির যুক্তিগত গঠন সরাসরি। প্রথমে সম্পূর্ণতা অর্জনের একটি দাবি নিষেধ করা হয়েছে। তার কারণ হিসেবে বক্তা নিজের সীমিত বোধশক্তির কথা বলেননি; বলেছেন, বহু কোরআন চলে গেছে। তারপর যে বিকল্প বক্তব্য অনুমোদন করেছেন, তা হলো প্রাপ্ত অংশ গ্রহণের ঘোষণা। সবকিছু নিয়েছি এবং যা পাওয়া গেছে তা নিয়েছি—দুটির পার্থক্য কেবল বিনয়ী শব্দচয়ন নয়। প্রথমটিতে সমগ্রের দাবি, দ্বিতীয়টিতে প্রাপ্যতার সীমা। মাঝের কারণটি সেই সীমার বিষয় নির্ধারণ করছে: পূর্ববর্তী পাঠের একটি বড় অংশ আর প্রাপ্ত সংগ্রহে নেই।

আবু উবাইদ খবরটিকে “নাজিল হওয়ার পরে কোরআনের যা তুলে নেওয়া হয়েছে এবং মুসহাফগুলোতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি” শীর্ষক অধ্যায়ে রেখেছেন। এই বিন্যাস তাঁর নিজের শ্রেণিবিভাগের দলিল। ইবনে উমরের বাক্যে “নসখ” শব্দ নেই; সংকলক অনুপস্থিত পূর্ববর্তী পাঠের অন্য খবরগুলোর সঙ্গে সেটিকে সাজিয়েছেন। সাহাবির উক্তি এবং গ্রন্থকারের ব্যাখ্যার এই ভিন্ন অবস্থান বজায় রাখলে দুটি তথ্য পাওয়া যায়: ইবনে উমরের নামে প্রাপ্ত সমগ্রের দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং আবু উবাইদ সেটিকে পূর্ববর্তী কোরআনপাঠ তুলে নেওয়ার বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। [859]

بَابُ مَا رُفِعَ مِنَ الْقُرْآنِ بَعْدَ نُزُولِهِ وَلَمْ يُثْبَتُ فِي الْمَصَاحِفِ

বাংলা অনুবাদ: কোরআনের যা নাজিল হওয়ার পরে তুলে নেওয়া হয়েছে এবং মুসহাফগুলোতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সে-সম্পর্কিত অধ্যায়।

ইবনে উমরের বক্তব্যের ধাপউদ্ধৃত দাবির বিষয়তার ফল
“পুরো কোরআন নিয়েছি” বলা নিষেধসম্পূর্ণ সংগ্রহ অর্জনের দাবিপ্রাপ্ত অংশ ও সমগ্রকে এক করা প্রশ্নবিদ্ধ
“সে কী করে জানবে তার সবটুকু কী?”সম্পূর্ণতার মাপকাঠিবর্তমান প্রাপ্ত পাঠ দিয়েই আগের সমগ্র নির্ধারণের অসুবিধা
“অনেক কোরআন চলে গেছে”পূর্ববর্তী পাঠের অনুপস্থিতিদাবিকৃত সীমাবদ্ধতার নির্দিষ্ট কারণ
“যা পাওয়া গেছে তা নিয়েছি”প্রাপ্যতার মধ্যে সংগ্রহসমগ্র অর্জনের বদলে পাওয়া অংশ গ্রহণের ঘোষণা

ইসলামওয়েব এই বক্তব্যের উত্তরে নসখের ব্যাখ্যা দিয়েছে এবং সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতির আওতা থেকে রহিত পাঠকে বাদ দিয়েছে। উত্তরটির নির্দিষ্ট বক্তব্য: [860]

ولكن المنسوخ ليس مما تعهد الله بحفظه

বাংলা অনুবাদ: কিন্তু রহিত অংশ আল্লাহ যা সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার অন্তর্ভুক্ত নয়।

এই ব্যাখ্যায় “সংরক্ষিত কোরআন” বলতে পূর্বে কোনো সময়ে কোরআন হিসেবে পঠিত সবকিছুকে বোঝানো হচ্ছে না। নসখ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ অংশ বাদ দেওয়ার পর যে সংগ্রহ বহাল থাকে, সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি তার ওপর প্রয়োগ করা হচ্ছে। ফলে একটি শ্রেণির পাঠ সরে যাওয়ার কথা এবং অন্য শ্রেণির সংরক্ষণের দাবি পাশাপাশি রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু সেই অর্থে সংরক্ষিত থাকার বক্তব্য দিয়ে সব পূর্ববর্তী পাঠের অপরিবর্তিত উপস্থিতি প্রমাণ হয় না। কারণ অনুপস্থিত পূর্ববর্তী পাঠ আগেই দাবির আওতা থেকে বাদ পড়েছে। সংজ্ঞার এই সংকোচন এবং ইতিহাসে কোনো বিয়োজন না হওয়া একই কথা নয়।

ইবনে উমরের নামে বক্তব্যটি সেই প্রাপ্তি ও সমগ্রের ব্যবধানকে প্রকাশ্য ভাষা দিয়েছে। আবু মুসার খণ্ডিত স্মৃতি, আহযাবের বৃহত্তর পরিসরের খবর অথবা কোরআন হিসেবে পঠিত বীরে মাউনার বাক্য—এসবের নির্দিষ্ট বিষয় আলাদা, কিন্তু গৃহীত মুসহাফের পরিসরকে পূর্ববর্তী সমস্ত পাঠের স্বয়ংসম্পূর্ণ তালিকা ধরে নেওয়ার ভিত্তি তারা দেয় না। ইবনে উমরের ঘোষণায় এ সমস্যা শুধু একটি সূরার ক্ষেত্রে সীমিত থাকেনি; পুরো কোরআন নিয়েছি—এই সর্বগ্রাসী দাবিটিই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ঐতিহ্যের ভেতরেই প্রাপ্ত সংগ্রহের সীমা স্বীকার করে কথা বলার নির্দেশ সংরক্ষিত হয়েছে।


মুসহাফে লিখনত্রুটির বর্ণনা: উসমান, আয়েশা ও ইবনে আব্বাস

উসমানি মুসহাফের ইতিহাসে শুধু কোন সূরা বা আয়াত অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সেই প্রশ্নই ছিল না। গৃহীত পাঠের ভেতরে কোনো শব্দ ভুল লেখা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রাচীন মুসলিম গ্রন্থে বক্তব্য সংরক্ষিত আছে। উসমানের নামে মুসহাফে “লাহন” দেখার কথা, আয়েশার নামে লেখকদের ভুলের অভিযোগ এবং ইবনে আব্বাসের নামে নির্দিষ্ট শব্দ বদলে পড়ার বিবরণ পাওয়া যায়। কোনো বর্ণনায় লিখিত রূপ ও মুখের পাঠের ব্যবধান এসেছে; কোনো বর্ণনায় ভিন্ন শব্দকে সঠিক বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। গ্রন্থের সীমানা নির্ধারণের পর তার ভেতরের শব্দরূপও যে আলোচনার বাইরে ছিল না, এই খবরগুলো তার সাক্ষ্য বহন করে।

পরবর্তী ভাষ্যকারেরা এসব বক্তব্যকে একভাবে গ্রহণ করেননি। কেউ বর্ণনাপথ প্রত্যাখ্যান করেছেন, কেউ “লাহন”কে ভাষাভেদ বলেছেন, কেউ লেখার প্রচলিত রীতি ও উচ্চারণের পার্থক্য দেখিয়েছেন। আয়েশার “ভুল” কথাটিকে সাত আহরুফের মধ্যে অপেক্ষাকৃত উপযুক্ত রূপ নির্বাচন না করার অর্থেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অভিযোগ ও ব্যাখ্যার মধ্যে এই ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ: আগে কী বলা হয়েছে এবং পরে সেই কথার অর্থ কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, উভয়ের নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে।


উসমানের “লাহন” বক্তব্য: ত্রুটি, আরবদের জিহ্বা ও সংশোধনের প্রশ্ন

ইবনে আবি দাউদের কিতাবুল মাসাহিফে উসমানের নামে বর্ণিত একটি খবরে মুসহাফ প্রস্তুত হওয়ার পরে তাঁকে তা দেখানোর ঘটনা আছে। তিনি কাজটির প্রশংসা করেন, তারপর কিছু “লাহন” দেখার কথা বলেন এবং জানান, আরবরা তাদের জিহ্বা দিয়ে তা ঠিক করে নেবে। কথাটির বিষয় লিখিত মুসহাফ; প্রত্যাশিত সংশোধনের মাধ্যম মানুষের উচ্চারণ। ফলে বর্ণনার নিজের কাঠামোয় কাগজে থাকা রূপ ও মুখে উচ্চারিত পাঠের মধ্যে একটি নির্ভরতার সম্পর্ক রয়েছে। [861]

حدثنا عبد الله، قال: حدثنا المؤمل بن هشام ، حدثنا إسماعيل ، عن الحارث بن عبد الرحمن ، عن عبد الأعلى بن عبد الله بن عامر القرشي ، قال: لما فرغ من المصحف أتي به عثمان فنظر فيه، فقال: ” قد أحسنتم، وأجملتم، أرى فيه شيئا من لحن ستقيمه العرب بألسنتها “

বাংলা অনুবাদ: আবদুল্লাহ আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, মুআম্মাল ইবনে হিশাম আমাদের বর্ণনা করেছেন; ইসমাইল আমাদের বর্ণনা করেছেন, হারিস ইবনে আবদুর রহমান থেকে, তিনি আবদুল আলা ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আমির আল-কুরাশি থেকে। তিনি বলেন: মুসহাফের কাজ শেষ হলে তা উসমানের কাছে আনা হয়। তিনি তা দেখে বলেন: তোমরা ভালো ও সুন্দর কাজ করেছ। আমি এতে কিছু লাহন দেখছি; আরবরা তাদের জিহ্বা দিয়ে তা ঠিক করে নেবে।

সুয়ূতি আবু উবাইদের সূত্রে ইকরিমার নামে আরেকটি বিবরণ রেখেছেন। সেখানে শুধু ভবিষ্যতে আরবরা সংশোধন করবে বলা হয়নি; লিখিত রূপগুলো পরিবর্তন না করার কথাও এসেছে। শেষে লেখক ও মুখে বলে দেওয়া ব্যক্তির গোত্রপরিচয় ভিন্ন হলে এসব রূপ পাওয়া যেত না—এমন মন্তব্য রয়েছে। এই বিবরণ মানুষের লিখন ও মুখে বলে দেওয়ার কাজের সঙ্গে সমস্যাটিকে যুক্ত করেছে। [862]

وَقَالَ: حَدَّثَنَا حَجَّاجٌ عَنْ هَارُونَ بْنِ مُوسَى أَخْبَرَنِي الزُّبَيْرُ بْنُ الْخِرِّيتِ عَنْ عِكْرِمَةَ قَالَ: لَمَّا كُتِبَتِ الْمَصَاحِفُ عُرِضَتْ عَلَى عُثْمَانَ فَوَجَدَ فِيهَا حُرُوفًا مِنَ اللَّحْنِ فَقَالَ: لَا تُغَيِّرُوهَا فَإِنَّ الْعَرَبَ سَتُغَيِّرُهَا – أَوْ قَالَ: سَتُعْرِبُهَا بِأَلْسِنَتِهَا لَوْ كَانَ الْكَاتِبُ مِنْ ثَقِيفٍ وَالْمُمْلِي مِنْ هُذَيْلٍ لَمْ تُوجَدْ فِيهِ هَذِهِ الْحُرُوفُ.

বাংলা অনুবাদ: তিনি বলেন: হাজ্জাজ আমাদের বর্ণনা করেছেন, হারুন ইবনে মুসা থেকে। যুবাইর ইবনুল খিররিত আমাকে জানিয়েছেন, ইকরিমা থেকে। তিনি বলেন: মুসহাফগুলো লেখা হলে উসমানকে দেখানো হয়। তিনি তাতে লাহনের কিছু রূপ পান এবং বলেন: এগুলো পরিবর্তন করো না; আরবরা তাদের জিহ্বা দিয়ে এগুলো পরিবর্তন করবে—অথবা তিনি বলেছেন, শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করবে। লেখক সাকিফের এবং মুখে বলে দেওয়া ব্যক্তি হুযাইলের হলে এই রূপগুলো তাতে পাওয়া যেত না।

দ্বিতীয় বিবরণের “অথবা তিনি বলেছেন” অংশটি বর্ণনাকারীর সংরক্ষিত শব্দগত অনিশ্চয়তা। “পরিবর্তন করবে” এবং “শুদ্ধ উচ্চারণ করবে”—দুটি ভাষার একটি বলা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনটি জানিয়েছে। তার আগের পরিবর্তন না করার নির্দেশ এবং পরের লেখক–লিপিকার সম্পর্কিত মন্তব্য একই ঘটনার অংশ। সুয়ূতি এই খবরের পরে ইবনুল আনবারি ও ইবনে আশতার সংগ্রহে অনুরূপ বর্ণনার উল্লেখও করেছেন। একই খবর কয়েকটি বইয়ে সংরক্ষিত হওয়ার অর্থ এখানে তার গ্রহণ ও পুনরুদ্ধৃতির ইতিহাস; স্বতন্ত্র কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর অভিন্ন সাক্ষ্য নয়।

তাফসিরে মাযহারির বাংলা অনুবাদে এই আলোচনার সঙ্গে হালাল–হারাম বদলে না যাওয়ার কথাও রয়েছে। ওই অনুবাদের সম্পূর্ণ অনুচ্ছেদে প্রথমে আয়েশা, আবান ও উসমানের নামে অভিযোগ এসেছে; পরে তাফসিরকার নিজে সেই মন্তব্যকে অসমীচীন বলে মুসহাফের বিশুদ্ধতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। উদ্ধৃতির শেষের এই মূল্যায়নও তাফসিরকারের বক্তব্যের অংশ। [863]

সালাত কায়েম করা বা নামাজ প্রতিষ্ঠার কথা আয়াতে বলা হয়েছে এভাবে-আল মুকিমিনাস্ সলাহ্ (যারা সালাত কায়েম করে)। বাগবীর বর্ণনায় রয়েছে, হজরত আয়েশা এবং হজরত আবান বিন ওসমান বলেছেন, কথাটি লিখতে হতো এভাবে-আল মুকিমুনাস্ সলাহ (যারা সালাত প্রতিষ্ঠাকারী)। সুরা মায়িদার মধ্যেও এ রকম ভুল রয়েছে। যেমন একস্থানে ‘সাবিউন’ লেখা হয়েছে। অথচ শব্দটি লেখা উচিত ছিলো ‘সাবেইন।’ আরেকস্থানে লেখা হয়েছে ‘হাজানি’- যার শুদ্ধ লিখিত রূপ ‘হাজাইনি।’ হজরত ওসমান বলেছেন, কোরআনে এ রকম কিছু কিছু ভুল উচ্চারণের শব্দ লিপিবদ্ধ রয়েছে যেগুলোকে আরববাসীরা পাঠ করার সময় সঠিকভাবে উচ্চারণ করে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, আপনি শব্দগুলোকে শুদ্ধরূপে লেখার ব্যবস্থা করেননি কেনো? উত্তরে হজরত ওসমান বলেছিলেন, এভাবেই থাকতে দাও। এর মাধ্যমে হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করা হয়নি। প্রকৃত কথা এই যে, এ রকম মন্তব্য অসমীচীন। ঐকমত্যসম্মত মত এই যে, কোরআনে যা কিছু লিপিবদ্ধ রয়েছে তা ঐকমত্যসম্মতভাবেই বিশুদ্ধ। অবশ্য সেগুলোর ব্যাখ্যার বিভিন্ন রূপ থাকতে পারে। কোরআন ব্যাখ্যাকারগণ বিভিন্নভাবে সেগুলোকে ব্যাখ্যা করেছেন।

কোরআন সংকলন 181
কোরআনে ভুল নিয়ে উসমানের স্বীকৃতি

এই উদ্ধৃতিতে “এতে হালাল হারাম হয়নি” কথাটির যুক্তি শব্দগত নির্ভুলতার প্রশ্ন থেকে আলাদা। কোনো লিখিত ভুল আইনগত ফল বদলেছে কি না, তা ভুলের প্রভাবের প্রশ্ন। অক্ষর ও শব্দ অবিকল আছে কি না, তা পাঠের প্রশ্ন। প্রথম প্রশ্নে প্রভাব সীমিত হলেও দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ভুল হয়ে যায় না। মাযহারির আলোচনায় যে আপত্তি ও তার পরের প্রত্যাখ্যান পাশাপাশি আছে, তা দেখায়—এ ধরনের খবর ধর্মীয় সাহিত্যের ভেতরেই এমন একটি সমস্যার সৃষ্টি করেছিল, যার মোকাবিলায় পরবর্তী ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়েছে।

কিতাবুল মাসাহিফের সংকলক নিজে “লাহন”কে ভাষা অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর কারণ হলো, আরবদের সব ভাষায় অগ্রহণযোগ্য ভুল থাকলে উসমান তা মানুষের পড়ার জন্য পাঠাতে পারতেন না। এটি বর্ণনার পরে সংকলকের দেওয়া ব্যাখ্যা; উসমানের উদ্ধৃত বাক্যের ভেতরে সেই যুক্তিটি নেই। [864]

قال أبو بكر بن أبي داود: هذا عندي يعني بلغتها، وإلا لو كان فيه لحن لا يجوز في كلام العرب جميعا لما استجاز أن يبعث به إلى قوم يقرءونه

বাংলা অনুবাদ: আবু বকর ইবনে আবি দাউদ বলেন: আমার কাছে এর অর্থ হলো, তাদের ভাষা দিয়ে। অন্যথায় আরবদের সমস্ত ভাষায় অগ্রহণযোগ্য কোনো লাহন এতে থাকলে, তিনি তা মানুষের পড়ার জন্য পাঠানো অনুমোদন করতেন না।

বর্ণনার শব্দ ও ব্যাখ্যার ভিত্তি পৃথক রাখলে প্রশ্নটি স্পষ্ট হয়। উসমানের নামে খবরটি লিখিত মুসহাফে দেখা একটি বিষয়কে মানুষের জিহ্বার ওপর ছেড়ে দিয়েছে। সংকলক উসমানের পক্ষে কী গ্রহণযোগ্য হতে পারে, সেই ধারণা থেকে “লাহন”-এর অর্থ নির্ধারণ করেছেন। এই পদ্ধতিতে তাঁর সম্মানিত অবস্থান ব্যাখ্যার একটি পূর্বধারণা হিসেবে কাজ করছে। মুসহাফ লিখনের ঘটনাটি কতটা নির্ভুল ছিল, সেই প্রশ্নের স্বাধীন উত্তর কেবল তাঁর মর্যাদা থেকে বের হয় না। আরবদের মুখের পাঠের প্রয়োজনের যে তথ্য বর্ণনায় আছে, তা লিখিত চিহ্নকে একাই সম্পূর্ণ পাঠের নিশ্চয়তা দেওয়ার ক্ষমতা দেয়নি।


আয়েশার “লেখকেরা ভুল করেছে” বক্তব্য ও তার সংরক্ষিত সূত্র

আয়েশার নামে বর্ণিত অভিযোগে ভুলের দায় আরও নির্দিষ্ট: “এটি লেখকদের কাজ; তারা লেখায় ভুল করেছে।” উরওয়া তিনটি আয়াতের নির্দিষ্ট রূপ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। উত্তরে ওই রূপগুলোর জন্য লেখকদের দায়ী করার কথা এসেছে। বিষয়টি কোনো অজ্ঞাত মুসহাফ সম্পর্কে অস্পষ্ট মন্তব্য নয়; নিসা, মায়িদা ও ত্বহার নির্দিষ্ট শব্দরূপ প্রশ্নের অংশ। ইবনে আবি দাউদের সংরক্ষিত পূর্ণ বর্ণনায় প্রশ্ন ও উত্তর উভয়ই আছে। [865]

حدثنا عبد الله، قال: حدثنا عمر بن عبد الله الأودي ، حدثنا أبو معاوية ، عن هشام بن عروة ، عن أبيه ، قال: سألت عائشة عن لحن القرآن إن هذان لساحران ، وعن قوله: والمقيمين الصلاة والمؤتون الزكاة وعن قوله: والذين هادوا والصابئون فقالت: ” يا ابن أختي، هذا عمل الكتاب أخطئوا في الكتاب “

বাংলা অনুবাদ: আবদুল্লাহ আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, উমর ইবনে আবদুল্লাহ আল-আওদি আমাদের বর্ণনা করেছেন; আবু মুআবিয়া আমাদের বর্ণনা করেছেন, হিশাম ইবনে উরওয়া থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে। তিনি বলেন: আমি আয়েশাকে কোরআনের লাহন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি—“ইন হাযানি লাসাহিরান”, “ওয়াল মুকিমিনাস সালাতা ওয়াল মুতুনায যাকাতা” এবং “ওয়াল্লাযিনা হাদু ওয়াস সাবিউন” সম্পর্কে। তিনি বলেন: হে আমার বোনের ছেলে, এটি লেখকদের কাজ; তারা লেখায় ভুল করেছে।

সুয়ূতি একই হিশাম–উরওয়া ধারার খবর আবু উবাইদের সূত্রে উদ্ধৃত করে এর সনদকে বুখারি ও মুসলিমের শর্তে সহিহ বলেছেন। তাঁর উদ্ধৃতিতে উরওয়াকে সম্বোধনের রূপ “হে আমার ভাইয়ের ছেলে”; ইবনে আবি দাউদের উদ্ধৃতিতে “হে আমার বোনের ছেলে”। সম্বোধনের এই ভিন্নতা একই মূল অভিযোগের দুই সংরক্ষিত রূপে পাওয়া যায়। সুয়ূতির নির্দিষ্ট সনদমূল্যায়ন হলো: [866]

هَذَا إِسْنَادٌ صَحِيحٌ عَلَى شَرْطِ الشَّيْخَيْنِ.

বাংলা অনুবাদ: এটি বুখারি ও মুসলিমের শর্তে সহিহ সনদ।

এখানে একই বর্ণনাপথের একাধিক গ্রন্থগত উপস্থিতি এবং তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পণ্ডিতের সিদ্ধান্ত—দুটি তথ্য রয়েছে। আবু উবাইদ, তাবারি ও ইবনে আবি দাউদে হিশাম ইবনে উরওয়া–উরওয়ার পথের খবর পাওয়া যায়। এগুলো একই বর্ণনাধারার একাধিক গ্রন্থগত সংরক্ষণ। সুয়ূতির সহিহ মূল্যায়ন এবং পরের প্রত্যাখ্যানের মধ্যে বাস্তব মতভেদ রয়েছে। তাঁর গ্রহণের পরেও প্রশ্ন থাকে, তিনি বক্তব্যটির অর্থ কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন; সনদ গ্রহণ এবং আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ সবসময় এক সিদ্ধান্ত হয়নি।

ইসলামকিউএ এই বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে সুয়ূতির সনদমূল্যায়নের কথা স্বীকার করেছে। তাদের যুক্তিতে আয়েশা মুহাম্মদের মুখে একই ব্যাকরণগত রূপ শুনেও তা লেখকদের ভুল ভাবতেন—এটি অত্যন্ত অসম্ভাব্য; সেই বিষয়গত আপত্তির পরে হিশামের ইরাকি বর্ণনায় সম্ভাব্য ভুলকে কারণ হিসেবে আনা হয়েছে। প্রত্যাখ্যানের ঘোষিত কেন্দ্রটি হলো: [867]

نردها ههنا لما في المتن من نكارة ظاهرة

বাংলা অনুবাদ: বর্ণনার বক্তব্যে প্রকাশ্য আপত্তিকর অসংগতি থাকার কারণে এখানে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি।

এই মূল্যায়ন খবরটির অর্থ মেনে নিয়ে সেই ঘটনা অস্বীকার করছে; ইবনে আশতার ব্যাখ্যা আবার খবরটি রেখে “ভুল”-এর অর্থ বদলেছে। ফলে পরবর্তী ঐতিহ্যের ভেতরেই দুটি ভিন্ন কৌশল রয়েছে। প্রথমটিতে বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য বলে বর্ণনা বাতিল, দ্বিতীয়টিতে বর্ণনা গ্রহণ করে ভুলকে অপেক্ষাকৃত উত্তম পাঠ নির্বাচনের ব্যর্থতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। উভয়ের আলোচনার বিষয় আয়েশার নামে একই আপত্তি। প্রাচীন সূত্রে অভিযোগটির স্পষ্ট ভাষা আছে; পরবর্তী গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ডে সেটির অবস্থান নিয়ে বিরোধও আছে।


আয়েশার চিহ্নিত তিনটি উদাহরণ

উরওয়ার প্রশ্নে তিনটি উদাহরণ একসঙ্গে এসেছে। নিসায় “মুকিমিন” রূপটি আশপাশের বহুবচন বিশেষ্যের সঙ্গে এক বিভক্তিতে নেই; মায়িদায় “সাবিউন” শব্দটি বাক্যের শুরুতে থাকা “ইন্না”-র সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্ন তুলেছে; ত্বহায় “ইন্” বা “ইন্না” এবং দ্বিবচন “হাযানি” বা “হাযাইনি”—পাঠভেদ অনুযায়ী বিশ্লেষণ বদলায়। এগুলোকে একটি অস্পষ্ট “ভুল উচ্চারণ” বলে এক করে দিলে নির্দিষ্ট সমস্যাগুলো বোঝা যায় না। কোথাও বিভক্তির প্রকাশ অক্ষরে, কোথাও অব্যয়ের উচ্চারণও বাক্যের গঠন নির্ধারণ করছে।

স্থানআলোচিত রূপঅন্য রূপ বা ব্যাখ্যার কেন্দ্র
নিসা ৪:১৬২وَالْمُقِيمِينَ الصَّلَاةَমুকিমিনের বদলে মুকিমুন; অথবা মুকিমিনের জন্য পৃথক ব্যাকরণগত সম্পর্ক
মায়িদা ৫:৬৯وَالصَّابِئُونَসাবিউনের বদলে সাবিইন; অথবা নতুন বাক্য ও উহ্য বিধেয়
ত্বহা ২০:৬৩إِنْ هَذَانِ / إِنَّ هَذَانِ / إِنَّ هَذَيْنِইন্ ও ইন্নার পার্থক্য; দ্বিবচনের বিভক্তি এবং ভাষাভেদ

নিসা ৪:১৬২ — “ওয়াল মুকিমিন”

নিসা ৪:১৬২-এ “রাসিখুন”, “মুমিনুন”, “মুতুন” এবং “মুমিনুন” রূপগুলোর মধ্যে “মুকিমিন” এসেছে। নিয়মিত সম্বন্ধ ধরে একই পদের ধারাবাহিকতা প্রত্যাশা করলে “মুকিমুন” রূপটির প্রশ্ন ওঠে। বর্তমান আয়াতের পুরো বাক্য হলো: [868]

لَّٰكِنِ الرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ مِنْهُمْ وَالْمُؤْمِنُونَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ ۚ وَالْمُقِيمِينَ الصَّلَاةَ ۚ وَالْمُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَالْمُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أُولَٰئِكَ سَنُؤْتِيهِمْ أَجْرًا عَظِيمًا

বাংলা অনুবাদ: কিন্তু তাদের মধ্যে জ্ঞানে দৃঢ় ব্যক্তিরা এবং বিশ্বাসীরা তোমার প্রতি যা নাজিল হয়েছে ও তোমার আগে যা নাজিল হয়েছে তাতে বিশ্বাস করে। আর নামাজ প্রতিষ্ঠাকারীরা, যাকাতদানকারীরা এবং আল্লাহ ও শেষদিনে বিশ্বাসীরা—এদের আমরা মহাপুরস্কার দেব।

তাবারি এই রূপের ব্যাখ্যায় একাধিক অবস্থান দিয়েছেন। এক অবস্থানে কপিকরের ভুল এবং “মুকিমুন” পাঠের কথা আছে। আরেক অবস্থানে প্রশংসা প্রকাশের জন্য বাক্যের ধারাবাহিক বিভক্তি বদলে “মুকিমিন” বলা হয়েছে। কুরতুবি সিবাওয়াইহের এই দ্বিতীয় ব্যাখ্যাকে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বলেছেন। তাঁর ভাষায় এটি প্রশংসা বা সম্মান প্রকাশের জন্য কর্মকারকের রূপ; অর্থের মধ্যে “আমি বিশেষভাবে বোঝাচ্ছি” ধরনের একটি উহ্য ক্রিয়া ধরা হয়। [869]

واختلف في نصبه على أقوال ستة ؛ أصحها قول سيبويه بأنه نصب على المدح ؛ أي وأعني المقيمين ؛ قال سيبويه : هذا باب ما ينتصب على التعظيم ؛ ومن ذلك والمقيمين الصلاة

বাংলা অনুবাদ: এর কর্মকারক রূপ নিয়ে ছয়টি মত রয়েছে। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হলো সিবাওয়াইহের বক্তব্য: এটি প্রশংসার জন্য কর্মকারক হয়েছে; অর্থাৎ “আর আমি বিশেষভাবে নামাজ প্রতিষ্ঠাকারীদের বোঝাচ্ছি।” সিবাওয়াইহ বলেন: এটি সম্মান প্রকাশের জন্য কর্মকারক হওয়ার অধ্যায়; “ওয়াল মুকিমিনাস সালাত” তার একটি উদাহরণ।

তাবারি একই ব্যাখ্যাকে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। তিনি “মুকিমিন”-কে আগের “মা” শব্দের সঙ্গে যুক্ত করে সম্বন্ধকারকে নিয়েছেন এবং নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী বলতে ফেরেশতাদের বোঝানোকে বেছে নিয়েছেন। কুরতুবির ব্যাখ্যায় প্রশংসিত মানুষের মধ্যেই পদটি থাকে; তাবারির নির্বাচিত অর্থে তা বিশ্বাসের বিষয় হিসেবে ফেরেশতাদের দিকে যায়। একই লিখিত শব্দ অপরিবর্তিত রেখেও তার ব্যাকরণগত ভূমিকা ও নির্দেশিত ব্যক্তি বদলে যাচ্ছে। ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে তাই কেবল নামের পার্থক্য নেই; বাক্যটি কী বলছে, তার গঠনও বদলায়।

আয়েশা ও আবানের নামে কপিকরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এই বিকল্প ব্যাকরণমূলক ব্যাখ্যার সঙ্গে এক কথা নয়। একটি লিখনের ঘটনাকে ভুল বলে চিহ্নিত করে; অন্যটি প্রতিষ্ঠিত রূপের জন্য ভিন্ন বাক্যগঠন নির্ধারণ করে। পরবর্তী ভাষ্যকারের বিশ্লেষণ বর্তমান রূপকে একটি গ্রহণযোগ্য আরবি অর্থ দেয়। সেটি আয়েশা বা আবান নিজের বক্তব্যে কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, তার সরাসরি সাক্ষ্য হয়ে যায় না। নির্দিষ্ট অভিযোগ এবং তার পরের ব্যাখ্যা আলাদা সূত্রে ও আলাদা সময়ে দাঁড়িয়ে আছে।


মায়িদা ৫:৬৯ — “ওয়াস সাবিউন”

মায়িদা ৫:৬৯-এ “সাবিউন” কর্তৃকারকের বহুবচন রূপ। “ইন্না”-র পরে একই ব্যাকরণগত ধারায় যুক্ত হলে “সাবিইন” প্রত্যাশিত—মাযহারির উদ্ধৃত আলোচনায় অভিযোগটির এই রূপ এসেছে। বর্তমান আয়াতে শব্দটি যেভাবে আছে, পূর্ণ পাঠটি হলো: [870]

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالصَّابِئُونَ وَالنَّصَارَىٰ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ

বাংলা অনুবাদ: যারা বিশ্বাস করেছে, যারা ইহুদি হয়েছে, সাবিইরা ও খ্রিষ্টানরা—যে আল্লাহ ও শেষদিনে বিশ্বাস করেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।

কুরতুবি এখানে খলিল ও সিবাওয়াইহের ব্যাখ্যা দিয়েছেন: বাক্যের অংশকে আগে–পরে ধরে “সাবিউন” আলাদা কর্তা এবং তার বিধেয় উহ্য। অর্থ দাঁড়ায়, আগে উল্লেখিতদের মধ্যে বিশ্বাস ও সৎকর্মের শর্ত পূরণকারীদের ভয় নেই; সাবিই ও খ্রিষ্টানদের ক্ষেত্রেও তেমন। ফলে শব্দটি আগের ধারার সরাসরি অনুগামী না হয়ে আলাদা একটি বাক্যের অংশ হিসেবে বিশ্লেষিত হয়। [871]

وقال الخليل وسيبويه : الرفع محمول على التقديم والتأخير ; والتقدير : إن الذين آمنوا والذين هادوا من آمن بالله واليوم الآخر وعمل صالحا فلا خوف عليهم ولا هم يحزنون والصابئون والنصارى كذلك

বাংলা অনুবাদ: খলিল ও সিবাওয়াইহ বলেন: কর্তৃকারক রূপটি আগে–পরে বিন্যাস ধরে ব্যাখ্যাত। নিহিত বিন্যাস হলো: যারা বিশ্বাস করেছে এবং যারা ইহুদি হয়েছে, তাদের মধ্যে যে আল্লাহ ও শেষদিনে বিশ্বাস করে এবং সৎকর্ম করে, তাদের ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না; সাবিই ও খ্রিষ্টানদের ক্ষেত্রেও তেমন।

একই আলোচনায় “হাদু” ক্রিয়ার কর্তার সঙ্গে শব্দটি যুক্ত করার মতও আছে। কুরতুবি যে নাহহাসের বক্তব্য এনেছেন, তাতে এই ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে অর্থগত আপত্তি রয়েছে: এতে সাবিইরা ইহুদি ধর্মে প্রবেশ করেছে—এমন অর্থ তৈরি হয়। অর্থাৎ একটি ব্যাকরণগত সম্ভাবনা প্রস্তাবিত হলেই তা সব ব্যাখ্যাকারীর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। শব্দের বিভক্তি নির্ধারণের সঙ্গে তার বাক্যগত সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্ক থেকে তৈরি অর্থও বিচার করা হয়েছে। ব্যাখ্যার এই মতভেদ ধর্মীয় গ্রন্থের শব্দকে কেন্দ্র করে পরবর্তী মানবিক বিশ্লেষণের বিস্তার দেখায়।

এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অভিযোগ ছিল “সাবিউন” না “সাবিইন”—কোন রূপ লেখা হবে। পরের ব্যাখ্যা “সাবিউন” রেখে তার জন্য পৃথক বাক্য নির্ধারণ করেছে। ফলে দুটি অবস্থানের পার্থক্য দৃশ্যমান: একটিতে শব্দরূপ বদলানোর দাবি, অন্যটিতে শব্দরূপ ধরে বাক্যের অন্তর্নিহিত বিন্যাস বদলে বোঝানো। আয়েশার সংরক্ষিত উত্তরে লেখকদের ভুলের অভিযোগ রয়েছে; এই ব্যাকরণগত পুনর্বিন্যাস তাঁর উত্তরের অংশ নয়। এটি ভাষ্যকারদের পরবর্তী বিশ্লেষণ।


ত্বহা ২০:৬৩ — “ইন হাযানি”

ত্বহা ২০:৬৩-এর ক্ষেত্রে অব্যয়টির উচ্চারণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বহুল মুদ্রিত পাঠে “ইন্” হালকা নুনে; অন্য স্বীকৃত পাঠে “ইন্না” ভারী নুনে এসেছে। আবার আবু আমরের পাঠে ভারী “ইন্না”-র পরে “হাযাইনি” রয়েছে। ফলে শুধু “হাযানি” শব্দটি দেখিয়ে সব পাঠে একই ব্যাকরণগত গঠন আরোপ করলে পাঠের প্রকৃত ভিন্নতা বাদ পড়ে। আয়াতের বর্তমান রূপ হলো: [872]

قَالُوا إِنْ هَٰذَانِ لَسَاحِرَانِ يُرِيدَانِ أَن يُخْرِجَاكُم مِّنْ أَرْضِكُم بِسِحْرِهِمَا وَيَذْهَبَا بِطَرِيقَتِكُمُ الْمُثْلَىٰ

বাংলা অনুবাদ: তারা বলল: এ দুজন অবশ্যই জাদুকর। তারা তাদের জাদুর সাহায্যে তোমাদের নিজেদের ভূমি থেকে বের করে দিতে এবং তোমাদের উৎকৃষ্ট রীতিনীতি বিলুপ্ত করতে চায়।

বাগাভি তিনটি পাঠের পরিচয় পৃথক করে দিয়েছেন। ইবনে কাসির ও হাফসের পাঠে হালকা “ইন্”; আবু আমরের পাঠে ভারী “ইন্না” এবং “হাযাইনি”; অন্যদের পাঠে ভারী “ইন্না” এবং “হাযানি”। শেষ রূপটির ব্যাখ্যার আলোচনাতেই তিনি হিশাম–উরওয়ার মাধ্যমে আয়েশার নামে কপিকরের ভুলের কথা এনেছেন। [873]

قرأ ابن كثير وحفص : ( إن ) بتخفيف النون ، ( هذان ) أي : ما هذان إلا ساحران ، كقوله : وإن نظنك لمن الكاذبين ( الشعراء : 186 ) ، أي : ما نظنك إلا من الكاذبين ، ويشدد ابن كثير النون من ” هذان ” . وقرأ أبو عمرو ” إن ” بتشديد النون ” هذين ” بالياء على الأصل . وقرأ الآخرون : ” إن ” بتشديد النون ، ” هذان ” بالألف ، واختلفوا فيه : فروى هشام بن عروة ، عن أبيه ، عن عائشة : أنه خطئ من الكاتب .

বাংলা অনুবাদ: ইবনে কাসির ও হাফস “ইন্” হালকা নুনে এবং “হাযানি” পড়েছেন; অর্থাৎ এ দুজন জাদুকর ছাড়া আর কিছু নয়। যেমন “ওয়া ইন নাযুন্নুকা লামিনাল কাযিবিন”—অর্থাৎ আমরা তোমাকে মিথ্যাবাদীদের একজন ছাড়া আর কিছু মনে করি না। ইবনে কাসির “হাযানি”-র নুন ভারী করেন। আবু আমর “ইন্না” ভারী নুনে এবং “হাযাইনি” ইয়া দিয়ে মূল নিয়ম অনুযায়ী পড়েছেন। অন্যরা “ইন্না” ভারী নুনে এবং “হাযানি” আলিফ দিয়ে পড়েছেন; এ বিষয়ে তাঁদের মতভেদ হয়েছে। হিশাম ইবনে উরওয়া তাঁর পিতার মাধ্যমে আয়েশা থেকে বর্ণনা করেছেন যে এটি কপিকরের ভুল।

পাঠের পরিচয়আরবি রূপবিশ্লেষণের নির্দিষ্ট বিষয়
হালকা নুনের পাঠإِنْ هَذَانِ لَسَاحِرَانِইন্-কে ভারী ইন্নার অভিন্ন কার্যসম্পন্ন ধরে নেওয়া হয় না
আবু আমরের পাঠإِنَّ هَذَيْنِ لَسَاحِرَانِভারী ইন্নার পরে দ্বিবচনের হাযাইনি রূপ
ভারী নুন ও আলিফের পাঠإِنَّ هَذَانِ لَسَاحِرَانِইন্নার পরে হাযানি থাকার জন্য ভাষাভেদসহ পৃথক ব্যাখ্যা

বাগাভি ভারী “ইন্না” এবং “হাযানি” রূপের জন্য হারিস ইবনে কাবসহ কয়েকটি গোত্রের ভাষার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেখানে দ্বিবচনকে কর্তৃকারক, কর্মকারক ও সম্বন্ধকারক—সব অবস্থায় আলিফে রাখার কথা বলা হয়েছে। যেমন দুই ব্যক্তি এলো, দুই ব্যক্তিকে দেখলাম এবং দুই ব্যক্তির পাশ দিয়ে গেলাম—তিন জায়গায় একই শেষরূপ। এই ব্যাখ্যা প্রচলিত আরবির অন্য রীতির সাহায্যে রূপটিকে বিশ্লেষণ করে। আবু আমরের পাঠ আবার পৃথক শব্দরূপ ব্যবহার করেছে। দুই ধরনের সমাধান তাই এক নয়: একটি ভাষাভেদের ভিত্তিতে আলিফের রূপ রাখে, অন্যটি ইয়া-যুক্ত দ্বিবচন পড়ে।

অভিযোগের যথার্থ পরিচয় এখানেই। আয়েশার নামে একটি পাঠরূপকে ভুল বলার কথা আছে; পাশাপাশি কিরাআতের সাহিত্যে একাধিক রূপ বাস্তবে সংরক্ষিত। স্বীকৃত পাঠগুলো এখানে একই অব্যয় ও একই বিভক্তির জোড়া ব্যবহার করেনি। একটি রূপের ব্যাকরণগত প্রশ্ন অন্য রূপে একইভাবে উপস্থিত নয়। তাঁদের সংরক্ষিত উপাদানেই ভিন্ন উচ্চারণ, ভিন্ন বিভক্তি এবং নির্দিষ্ট রূপের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাশাপাশি রয়েছে।


আবান ইবনে উসমানের বর্ণনায় “ওয়াল মুকিমিন” লেখার ঘটনাক্রম

আবান ইবনে উসমানের নামে খবরটি নিসার “মুকিমিন” রূপের জন্য একটি লিখনঘটনা বর্ণনা করে। প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছিলেন, আগে ও পরে কর্তৃকারকের রূপ থাকা সত্ত্বেও মাঝখানে এই শব্দ কর্মকারকে কেন লেখা হয়েছে। আবানের উত্তর লেখার সময়কার একটি প্রশ্নোত্তর: লেখক আগের অংশ লিখে জানতে চাইলেন, এরপর কী লিখবেন; তাঁকে “মুকিমিনাস সালাত” লিখতে বলা হলে তিনি তাই লেখেন। কিতাবুল মাসাহিফে খবরটির পূর্ণ রূপ হলো: [874]

حدثنا عبد الله، قال: حدثنا إسحاق بن وهب ، حدثنا يزيد ، قال: أخبرنا حماد ، عن الزبير أبي خالد ، قال: قلت لأبان بن عثمان : ” كيف صارت: لكن الراسخون في العلم منهم والمؤمنون يؤمنون بما أنزل إليك وما أنزل من قبلك والمقيمين الصلاة والمؤتون الزكاة ما بين يديها وما خلفها رفع، وهي نصب ؟ قال: ” من قبل الكتاب، كتب ما قبلها، ثم قال: ما أكتب ؟ قال اكتب المقيمين الصلاة، فكتب ما قيل له “

বাংলা অনুবাদ: আবদুল্লাহ আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ইসহাক ইবনে ওয়াহব আমাদের বর্ণনা করেছেন; ইয়াজিদ আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হাম্মাদ আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, যুবাইর আবু খালিদ থেকে। তিনি বলেন: আমি আবান ইবনে উসমানকে বললাম, “কিন্তু তাদের মধ্যে জ্ঞানে দৃঢ় ব্যক্তিরা ও বিশ্বাসীরা তোমার প্রতি এবং তোমার আগে যা নাজিল হয়েছে তাতে বিশ্বাস করে; আর নামাজ প্রতিষ্ঠাকারীদের এবং যাকাতদানকারীরা”—এখানে আগের ও পরের অংশ কর্তৃকারকে, অথচ এই শব্দ কর্মকারকে হলো কীভাবে? তিনি বলেন: লেখকদের কারণে। লেখক আগের অংশ লিখলেন, তারপর বললেন, আমি কী লিখব? বলা হলো, “মুকিমিনাস সালাত” লেখো। তাঁকে যা বলা হয়েছিল, তিনি তাই লেখেন।

তাবারিও হাম্মাদ ইবনে সালামা ও যুবাইরের মাধ্যমে আবানের এই উত্তর সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর সংকলনের ১০৮৩৭ নম্বর বর্ণনায় একই লিখনপর্ব ও একই নির্দেশের কথা আছে। তাবারির পথের ওপরের বর্ণনাকারীরা ভিন্ন হলেও হাম্মাদ–যুবাইর–আবানের মূল ধারায় খবরটি মিলেছে। গ্রন্থ দুটি তাই একই ঘটনার দুটি সংরক্ষণ দেখায়; ঘটনাস্থলে দুজন স্বাধীন সাক্ষী উপস্থিত ছিলেন—এমন নতুন তথ্য দেয় না। কুরতুবি পরে ঘটনাটির সারাংশ এনেছেন এবং তার বিরুদ্ধেও মূল্যায়ন উদ্ধৃত করেছেন।

ঘটনাটিতে লেখক নিজে একটি ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ করে রূপ বেছে নিচ্ছেন বলে বর্ণিত হয়নি। তিনি সামনে থাকা লিখনকাজে পরবর্তী পাঠ জানতে চেয়েছেন এবং শোনা নির্দেশ লিখেছেন। কে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাঁর নিজের উৎস কী ছিল কিংবা এই কথোপকথনের পরে আর কে তা পরীক্ষা করেছিলেন—খবরটি সেই নামগুলো দেয়নি। এটি নির্দিষ্ট একটি লিখিত রূপের ব্যাখ্যা হিসেবে একটি মানবিক প্রক্রিয়ার কথা রাখে। পাঠ কোথা থেকে কাগজে এলো, তার গল্পে প্রশ্ন করা, মুখে বলা এবং লিখে রাখা—তিনটি পৃথক কাজ রয়েছে।

কুরতুবির উদ্ধৃত কুশাইরি এ ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন, কারণ সংকলনকারীরা ভাষায় আদর্শস্থানীয় ছিলেন; তাঁরা অনবতীর্ণ কিছু কোরআনে ঢোকাবেন বলে মনে করা যায় না। তাঁর আপত্তির সরাসরি ভাষা: [875]

قال القشيري : وهذا المسلك باطل ؛ لأن الذين جمعوا الكتاب كانوا قدوة في اللغة ، فلا يظن بهم أنهم يدرجون في القرآن ما لم ينزل .

বাংলা অনুবাদ: কুশাইরি বলেন: এই পথ বাতিল; কারণ যাঁরা গ্রন্থটি সংকলন করেছেন, তাঁরা ভাষায় আদর্শস্থানীয় ছিলেন। তাঁদের সম্পর্কে মনে করা যায় না যে তাঁরা কোরআনে এমন কিছু প্রবেশ করাবেন, যা নাজিল হয়নি।

এই আপত্তিতে সংকলনকারীদের মর্যাদা ও যোগ্যতা থেকে ঘটনার সম্ভাবনা বিচার করা হয়েছে। একজন ভাষাবিদ বা সম্মানিত লেখক ভুল করতে পারেন কি না, তা তাঁর সামাজিক মর্যাদা দিয়ে নিষ্পত্তি হয় না। কুশাইরির বক্তব্য আবানের নামে সংরক্ষিত প্রশ্নোত্তরের বিকল্প কোনো প্রত্যক্ষ ঘটনাবিবরণও দেয় না। ফলে এখানে একটি প্রক্রিয়াগত খবরের বিরুদ্ধে একটি মর্যাদাভিত্তিক আপত্তি দাঁড়িয়ে আছে। সংকলকদের যোগ্যতা নিয়ে বিশ্বাস এবং নির্দিষ্ট লিখনের বর্ণনা এক ধরনের প্রমাণ নয়।


ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত লিখনত্রুটি ও বিকল্প পাঠ

ইবনে আব্বাস কোরআনের ব্যাখ্যায় স্বীকৃত প্রাচীন কর্তৃপক্ষদের একজন। বুখারিতে তাঁর জন্য মুহাম্মদের ধর্মজ্ঞান চেয়ে প্রার্থনার বর্ণনা আছে। এই মর্যাদার পাশাপাশি তাঁর নামে এমন পাঠও সংরক্ষিত হয়েছে, যেখানে প্রচলিত মুসহাফের নির্দিষ্ট শব্দকে কপিকরের ভুল বলে অন্য রূপ দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় কর্তৃত্বের স্বীকৃতি এবং লিখিত পাঠের সমালোচনা একই ব্যক্তির নামে ঐতিহ্যের মধ্যে স্থান পেয়েছে। বুখারির বর্ণনাটি হলো: [876]

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُحَمَّدٍ ، قَالَ حَدَّثَنَا هَاشِمُ بْنُ الْقَاسِمِ ، قَالَ حَدَّثَنَا وَرْقَاءُ ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي يَزِيدَ ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم دَخَلَ الْخَلاَءَ، فَوَضَعْتُ لَهُ وَضُوءًا قَالَ ‏”‏ مَنْ وَضَعَ هَذَا ‏”‏‏.‏ فَأُخْبِرَ فَقَالَ ‏”‏ اللَّهُمَّ فَقِّهْهُ فِي الدِّينِ ‏”‏‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হাশিম ইবনুল কাসিম আমাদের বর্ণনা করেছেন; ওয়ারকা আমাদের বর্ণনা করেছেন, উবাইদুল্লাহ ইবনে আবু ইয়াযিদ থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস থেকে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শৌচাগারে গেলে আমি তাঁর জন্য অজুর পানি রাখি। তিনি জিজ্ঞেস করেন, এটি কে রেখেছে? তাঁকে জানানো হলে তিনি বলেন: হে আল্লাহ, তাকে ধর্মের গভীর জ্ঞান দাও।

নুর, রা’দ ও ইসরার আয়াত সম্পর্কে তাঁর নামে থাকা খবরগুলো একই ধরনের নয়। একটিতে অনুমতি চাওয়ার ভিন্ন ক্রিয়া, একটিতে জানা বা স্পষ্ট হওয়ার ভিন্ন শব্দ, একটিতে নির্দেশ দেওয়ার ক্রিয়া এবং একটিতে নুরের উপমার নির্দেশিত ব্যক্তি নিয়ে বক্তব্য আছে। কোনো সূত্রে পূর্ণ বর্ণনাপথসহ ভুলের অভিযোগ, কোনো সূত্রে ভিন্ন পাঠ ও তার ব্যাখ্যা—উৎসের এই নিজস্ব পরিচয়গুলো আলাদা। পরবর্তী গ্রহণযোগ্য পাঠের সঙ্গে না মেলাই তাদের একমাত্র বৈশিষ্ট্য নয়; কয়েকটি বর্ণনায় লেখকের কাজকে সরাসরি সমস্যার কারণ বলা হয়েছে।


নুর ২৪:২৭ — অনুমতি চাওয়া ও “তাসতানিসু”

নুর ২৪:২৭-এ বর্তমান পাঠ “হাত্তা তাসতানিসু ওয়া তুসাল্লিমু”—অন্যের ঘরে প্রবেশের আগে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া ও সালামের কথা বলে। ইবনে আব্বাসের নামে বর্ণিত রূপে “তাসতানিসু”-র বদলে “তাসতাজিনু”, অর্থাৎ অনুমতি চাওয়ার সরাসরি ক্রিয়া এসেছে। তাফসিরে ইবনে কাসিরের উদ্ধৃত অংশে এই ভিন্ন পাঠের সঙ্গে লেখকের ভুলের অভিযোগও আছে। [877] [878] [879]

وقال ابن جرير : حدثنا ابن بشار ، حدثنا محمد بن جعفر ، حدثنا شعبة ، عن أبي بشر ، عن سعيد بن جبير ، عن ابن عباس في هذه الآية : ( لا تدخلوا بيوتا غير بيوتكم حتى تستأنسوا وتسلموا ) قال : إنما هي خطأ من الكاتب ، ” حتى تستأذنوا وتسلموا ” . وهكذا رواه هشيم ، عن أبي بشر – وهو جعفر بن إياس – به . وروى معاذ بن سليمان ، عن جعفر بن إياس ، عن سعيد ، عن ابن عباس ، بمثله ، وزاد : وكان ابن عباس يقرأ : ” حتى تستأذنوا وتسلموا ” ، وكان يقرأ على قراءة أبي بن كعب رضي الله عنه . وهذا غريب جدا عن ابن عباس . وقال هشيم أخبرنا مغيرة ، عن إبراهيم قال : في مصحف ابن مسعود : ” حتى تسلموا على أهلها وتستأذنوا ” . وهذا أيضا رواية عن ابن عباس ، وهو اختيار ابن جرير . وقد قال الإمام أحمد : حدثنا روح ، حدثنا ابن جريج ، أخبرني عمرو بن أبي سفيان : أن عمرو بن أبي صفوان أخبره ، أن كلدة بن الحنبل أخبره ، أن صفوان بن أمية بعثه في الفتح بلبأ وجداية وضغابيس ، والنبي صلى الله عليه وسلم بأعلى الوادي . قال : فدخلت عليه ولم أسلم ولم أستأذن . فقال النبي صلى الله عليه وسلم : ” ارجع فقل : السلام عليكم ، أأدخل؟ ” وذلك بعدما أسلم صفوان .

বাংলা অনুবাদ: ইবন জারির বলেন: ইবন বাশশার আমাদের বর্ণনা করেছেন; মুহাম্মদ ইবনে জাফর আমাদের বর্ণনা করেছেন; শুবা আমাদের বর্ণনা করেছেন, আবু বিশর থেকে, তিনি সাঈদ ইবনে যুবাইর থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস থেকে। এই আয়াত—“তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য ঘরে প্রবেশ করো না, যতক্ষণ না তাসতানিসু ও সালাম দাও”—সম্পর্কে তিনি বলেন: এটি কপিকরের ভুল; হবে “যতক্ষণ না তোমরা অনুমতি চাও ও সালাম দাও।” হুশাইমও আবু বিশর, অর্থাৎ জাফর ইবনে ইয়াসের মাধ্যমে একইভাবে বর্ণনা করেছেন। মুআয ইবনে সুলাইমান, জাফর ইবনে ইয়াস, সাঈদ ও ইবনে আব্বাসের মাধ্যমে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন এবং আরও বলেছেন: ইবনে আব্বাস “হাত্তা তাসতাজিনু ওয়া তুসাল্লিমু” পড়তেন; তিনি উবাই ইবনে কাবের পাঠ অনুসারে পড়তেন। ইবনে আব্বাস থেকে এটি অত্যন্ত গরিব বর্ণনা। হুশাইম বলেন: মুগিরা আমাদের জানিয়েছেন, ইবরাহিম থেকে। তিনি বলেন: ইবনে মাসউদের মুসহাফে ছিল “যতক্ষণ না তোমরা তার বাসিন্দাদের সালাম দাও ও অনুমতি চাও।” ইবনে আব্বাস থেকেও এই রূপ বর্ণিত এবং এটি ইবন জারিরের পছন্দ। ইমাম আহমদ বলেন: রাওহ আমাদের বর্ণনা করেছেন; ইবনে জুরাইজ আমাদের বর্ণনা করেছেন। আমর ইবনে আবু সুফিয়ান আমাকে জানিয়েছেন যে আমর ইবনে আবু সাফওয়ান তাঁকে জানিয়েছেন, কালদা ইবনুল হাম্বল তাঁকে জানিয়েছেন: মক্কা বিজয়ের সময়ে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া তাঁকে শালদুধ, হরিণশাবক ও দাগাবিস দিয়ে পাঠান। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন উপত্যকার ওপরের দিকে ছিলেন। তিনি বলেন: আমি তাঁর কাছে প্রবেশ করি, কিন্তু সালাম দিইনি এবং অনুমতিও চাইনি। নবী বলেন: ফিরে যাও, তারপর বলো, “আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক; আমি কি প্রবেশ করতে পারি?” এটি সাফওয়ানের ইসলাম গ্রহণের পরের ঘটনা।

কোরআন সংকলন 184

উদ্ধৃতির প্রথম অংশে ইবনে আব্বাসের নামে পাঠ ও ভুলের অভিযোগ, তারপর একই ধারার অন্য বর্ণনা, এরপর ইবনে কাসিরের নিজের “অত্যন্ত গরিব” মূল্যায়ন এসেছে। তার পরের অংশে ইবনে মাসউদের মুসহাফের শব্দক্রম এবং প্রবেশের আগে সালাম–অনুমতির আচরণ আছে। এই বিভিন্ন স্তরকে এক ব্যক্তির একটানা বক্তব্য বানালে সূত্রের পরিচয় বদলে যায়। ইবনে কাসির প্রতিবেদনটি সংরক্ষণ করেছেন এবং তার অস্বাভাবিকতা সম্পর্কেও মন্তব্য করেছেন; তাঁর মন্তব্যটি বর্ণিত অভিযোগের জায়গায় বসানো যায় না।

তাবারির সরাসরি সংগ্রহে একটি অতিরিক্ত রূপে “কিন্তু লেখকের কাছ থেকে তা পড়ে গেছে” কথাও আছে। অন্য পথে ইবনে আব্বাসের “তাসতাজিনু” পাঠকে উবাইয়ের পাঠের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। পূর্ণ বর্ণনাদুটি হলো: [880]

حدثنا ابن المثنى، قال: ثنا وهب بن جرير، قال: ثنا شعبة، عن أبي بشر، عن سعيد بن جُبير، بمثله. غير أنه قال: إنما هي حتى تستأذنوا، ولكنها سقط من الكاتب. حدثنا أبو كريب، قال: ثنا ابن عطية، قال: ثنا معاذ بن سليمان، عن جعفر بن إياس، عن سعيد، عن ابن عباس ( حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا ) قال: أخطأ الكاتب، وكان ابن عباس يقرأ ” حَتَّى تَسْتَأْذِنُوا وَتُسَلِّمُوا ” وكان يقرؤها على قراءة أُبيّ بن كعب.

বাংলা অনুবাদ: ইবনুল মুসান্না আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ওয়াহব ইবনে জারির আমাদের বর্ণনা করেছেন; শুবা আমাদের বর্ণনা করেছেন, আবু বিশর থেকে, তিনি সাঈদ ইবনে যুবাইর থেকে—আগের বর্ণনার অনুরূপ। তবে তিনি বলেছেন: আসলে তা “হাত্তা তাসতাজিনু”, কিন্তু লেখকের কাছ থেকে সেটি পড়ে গেছে। আবু কুরাইব আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ইবনে আতিয়্যা আমাদের বর্ণনা করেছেন; মুআয ইবনে সুলাইমান আমাদের বর্ণনা করেছেন, জাফর ইবনে ইয়াস থেকে, তিনি সাঈদ থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস থেকে। “হাত্তা তাসতানিসু ওয়া তুসাল্লিমু আলা আহলিহা” সম্পর্কে তিনি বলেন: লেখক ভুল করেছেন। ইবনে আব্বাস “হাত্তা তাসতাজিনু ওয়া তুসাল্লিমু” পড়তেন এবং উবাই ইবনে কাবের পাঠ অনুসারে পড়তেন।

পাঠের অবস্থানশব্দ বা বিন্যাসবিরোধের প্রকৃতি
বর্তমান মুসহাফحَتَّىٰ تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُواতাসতানিসূ—পরিচিতি বা অনুমতির অর্থে ব্যাখ্যাত
ইবনে আব্বাসের নামে বর্ণিত পাঠحَتَّى تَسْتَأْذِنُوا وَتُسَلِّمُواতাসতাজিনূ—অনুমতি চাওয়ার সরাসরি শব্দ
ইবনে মাসউদের মুসহাফ সম্পর্কে তাবারীর উদ্ধৃতিحَتَّى تُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا وَتَسْتَأْذِنُواসালাম ও অনুমতির শব্দক্রমও আলাদা

শব্দদুটির অর্থ ঘনিষ্ঠভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হলেও অক্ষরসমষ্টি এক নয়। “তাসতানিসু”-তে পরিচিত হওয়া বা উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার মূল এবং “তাসতাজিনু”-তে অনুমতি চাওয়ার মূল রয়েছে। ইবনে মাসউদের মুসহাফের বর্ণনায় আবার সালাম দেওয়ার অংশ আগে এবং অনুমতি চাওয়ার অংশ পরে। ফলে এখানে একদিকে ক্রিয়ার পরিবর্তন, অন্যদিকে শব্দক্রমের পরিবর্তন—দুই ধরনের পার্থক্য সংরক্ষিত। পরের পরিচিত পাঠে যে অর্থ বোঝানো হয়, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এই লিখিত পার্থক্য মুছে দেয় না।

ভুলের অভিযোগটি ব্যাখ্যাকারীর অনুমান হিসেবে তৈরি হয়নি; বর্ণনার ভাষাতেই “লেখক ভুল করেছেন” আছে। একই আবু বিশর–সাঈদ ধারায় কয়েকটি পথ মিলেছে বলে গ্রন্থের সংখ্যা দিয়ে সাক্ষী বাড়ে না। কিন্তু অভিযোগকে কেবল পরবর্তী সমালোচকের কল্পনা বলাও ভুল। তাবারি সেই খবর সংরক্ষণ করেছেন; ইবনে কাসির তা উদ্ধৃত করেছেন; সুয়ূতি কোরআনের লিখনসংক্রান্ত আপত্তির অন্য বর্ণনার পাশে স্থান দিয়েছেন। একটি বর্তমান শব্দের বিপরীতে অন্য শব্দ এবং তার সঙ্গে কপিকরকে দায়ী করার এই সমন্বয় মুসলিম উৎসের নিজের বিষয়বস্তু।


রা’দ ১৩:৩১ — “ইয়াইআস” ও “ইয়াতাবাইয়্যান”

রা’দ ১৩:৩১-এর “আফালাম ইয়াইআসিল্লাযিনা আমানু” অংশের বিপরীতে ইবনে আব্বাসের নামে “আফালাম ইয়াতাবাইয়্যানিল্লাযিনা আমানু” পাঠ পাওয়া যায়। প্রথমটির মূল ক্রিয়া ইয়াস; দ্বিতীয়টি তাবাইয়্যান—স্পষ্ট হওয়া বা বুঝতে পারা। কুরতুবি আলী ও ইবনে আব্বাস উভয়ের পাঠ হিসেবে দ্বিতীয় রূপের উল্লেখ করেছেন। তাঁর আলোচনায় প্রচলিত “ইয়াইআস” শব্দকে কিছু গোত্রের ভাষায় জানা অর্থে ব্যাখ্যাও রয়েছে। শব্দ আলাদা থাকা এবং ওই স্থানে কাছাকাছি অর্থে ব্যাখ্যাত হওয়া—দুটিই সেখানে আছে।

সুয়ূতি ইবনুল আনবারির সূত্রে ইকরিমা থেকে ইবনে আব্বাসের একটি কথোপকথন উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে ভিন্ন পাঠ শোনার পর মুসহাফের শব্দের কথা বলা হলে তিনি লেখকের ঘুমঘুম অবস্থায় লিখে ফেলার ধারণা প্রকাশ করেন। পুরো বর্ণনাটি হলো: [881]

وما أخرجه ابن الأنبا ري مِنْ طَرِيقِ عِكْرِمَةَ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّهُ قَرَأَ ” أَفَلَمْ يَتَبَيَّنِ الَّذِينَ آمَنُوا أَنْ لَوْ يَشَاءُ اللَّهُ لَهَدَى النَّاسَ جَمِيعًا ” فَقِيلَ لَهُ: إِنَّهَا فِي الْمُصْحَفِ: {أَفَلَمْ يَيْأَسِ} فَقَالَ: أَظُنُّ الْكَاتِبَ كَتَبَهَا وَهُوَ نَاعِسٌ.

বাংলা অনুবাদ: ইবনুল আনবারি ইকরিমার মাধ্যমে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে তিনি পড়েছেন: “যারা বিশ্বাস করেছে, তাদের কাছে কি স্পষ্ট হয়নি যে আল্লাহ চাইলে সব মানুষকে পথ দেখাতেন?” তাঁকে বলা হলো, মুসহাফে তো রয়েছে “আফালাম ইয়াইআস”। তিনি বলেন: আমার ধারণা, লেখক ঘুমঘুম অবস্থায় তা লিখেছেন।

ইবনে আব্বাসের নামে এখানে দুটি স্তর রয়েছে। ভিন্ন রূপে পড়ার খবরটি একটি কার্যকলাপ; লেখক তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন—এটি সেই পার্থক্যের জন্য তাঁর প্রকাশিত ধারণা। তন্দ্রার বিষয়টি তাঁর প্রকাশিত অনুমান; ভিন্ন পাঠের খবরের সঙ্গে এই অনুমানের স্বতন্ত্র অবস্থান রয়েছে। বর্ণনায় লেখকের নাম, কোন লিখনসভায় ঘটনাটি ঘটেছে কিংবা কীভাবে তিনি তন্দ্রার খবর জানলেন—এসব নেই। তাঁর নামে সংরক্ষিত আপত্তির গুরুত্ব এর চেয়ে নির্দিষ্ট: মুসহাফের লেখা ও তাঁর নিজের পড়া এক না হওয়ায় তিনি লিখনপ্রক্রিয়াকেই দায়ী করার সম্ভাবনা তুলেছেন।

কুরতুবি এই অভিযোগের পাশাপাশি ইবনুল আনবারির প্রত্যাখ্যানও রেখেছেন। তাঁর যুক্তিতে মুজাহিদ ও সাঈদ ইবনে যুবাইরের মাধ্যমে ইবনে আব্বাসের কাছ থেকেই মুসহাফের প্রচলিত রূপ বর্ণিত হয়েছে। তাই তাঁর নামে অন্য রূপ পড়ার কথা এবং লেখকের বিরুদ্ধে ওই মন্তব্যকে তিনি গ্রহণ করেননি। আবার বিকল্প শব্দের পাঠের পরিচয় কুরতুবির আগের বাক্যেই রয়েছে: [882]

وقرأ علي وابن عباس : ” أفلم يتبين الذين آمنوا ” من البيان .

বাংলা অনুবাদ: আলী ও ইবনে আব্বাস “আফালাম ইয়াতাবাইয়্যানিল্লাযিনা আমানু” পড়েছেন; এটি স্পষ্ট হওয়ার অর্থে বয়ান শব্দমূল থেকে।

প্রচলিত শব্দকে “জানা” অর্থে নেওয়া এবং তার জায়গায় “ইয়াতাবাইয়্যান” পড়া একই পাঠ্যক্রিয়া নয়। অর্থ কাছাকাছি এলে আয়াতের বক্তব্যের একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়; কিন্তু ইবনে আব্বাসের নামে কথোপকথনে যে অন্য অক্ষরসমষ্টি এসেছে, তা বর্তমান শব্দ হয়ে যায় না। সুয়ূতির সংরক্ষিত রূপে পার্থক্যটির জন্য লেখকের অবস্থা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। কুরতুবির আলোচনায় বিকল্প পাঠ স্বীকৃত পরিচয় পেয়েছে, অথচ তার সঙ্গে যুক্ত অভিযোগ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। পাঠ এবং পাঠের উৎপত্তি ব্যাখ্যার ইতিহাস এখানে আলাদা স্তরে চলেছে।


ইসরা ১৭:২৩ — “ক্বাদা” ও “ওয়াস্‌সা”

ইসরা ১৭:২৩-এ বর্তমান শব্দ “ওয়া ক্বাদা রাব্বুকা”; এর বিপরীতে “ওয়া ওয়াস্‌সা রাব্বুকা” পাঠের বিবরণ রয়েছে। প্রথম ক্রিয়াকে নির্দেশ বা ফয়সালা করা অর্থে ব্যাখ্যা করা হয়; দ্বিতীয়টি নির্দেশ দেওয়া বা অসিয়ত করার ভাষা। সুয়ূতির উদ্ধৃত বর্ণনায় কেবল দ্বিতীয় রূপের অর্থ বলা হয়নি। ওয়াও ও সাদ একত্র লেগে যাওয়ার কারণে অন্য লিখিত রূপ তৈরি হওয়ার অভিযোগ এসেছে। ফলে এটি দুটি সমার্থক শব্দের তাফসিরে সীমিত প্রতিবেদন নয়; অক্ষরের বিন্যাস সম্পর্কে একটি দাবি। [883]

وَمَا أَخْرَجَهُ سَعِيدُ بْنُ مَنْصُورٍ مِنْ طَرِيقِ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّهُ كَانَ يَقُولُ فِي قَوْلِهِ تَعَالَى: {وَقَضَى رَبُّكَ} : إِنَّمَا هِيَ ” وَوَصَّى رَبُّكَ ” الْتَزَقَتِ الْوَاوُ بِالصَّادِ.

বাংলা অনুবাদ: সাঈদ ইবনে মানসুর সাঈদ ইবনে যুবাইরের মাধ্যমে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে আল্লাহর “ওয়া ক্বাদা রাব্বুকা” বাণী সম্পর্কে তিনি বলতেন: আসলে তা “ওয়া ওয়াস্‌সা রাব্বুকা”; ওয়াও সাদের সঙ্গে লেগে গেছে।

তাবারির সংগ্রহে ইবনে আব্বাসের দেওয়া একটি মুসহাফের কথাও আছে, যার পাঠকে উবাই ইবনে কাবের পাঠ বলা হয়েছে। বর্ণনায় ইয়াহইয়া নিজে নুসাইরের কাছে ওই মুসহাফ দেখেছেন বলে জানিয়েছেন এবং তাতে “ওয়া ওয়াস্‌সা রাব্বুকা” ছিল বলেছেন। এই খবরের বিষয় কেবল মুখের অর্থব্যাখ্যা নয়; একটি লিখিত সংগ্রহে ভিন্ন শব্দ দেখার দাবি। [884]

حدثنا أبو كريب، قال: ثنا يحيى بن عيسى، قال: ثنا نصير بن أبي الأشعث ، قال: ثني ابن حبيب بن أبي ثابت، عن أبيه، قال: أعطاني ابن عباس مصحفا، فقال: هذا على قراءة أبيّ بن كعب، قال أبو كريب: قال يحيى: رأيت المصحف عند نصير فيه: (وَوَصَّى رَبُّكَ) يعني: وقضى ربك.

বাংলা অনুবাদ: আবু কুরাইব আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ইয়াহইয়া ইবনে ঈসা আমাদের বর্ণনা করেছেন; নুসাইর ইবনে আবুল আশআস আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হাবিব ইবনে আবু সাবিতের পুত্র তাঁর পিতা থেকে আমাকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: ইবনে আব্বাস আমাকে একটি মুসহাফ দিয়ে বললেন, এটি উবাই ইবনে কাবের পাঠ অনুসারে। আবু কুরাইব বলেন, ইয়াহইয়া বলেছেন: আমি নুসাইরের কাছে মুসহাফটি দেখেছি; তাতে ছিল “ওয়া ওয়াস্‌সা রাব্বুকা”—অর্থাৎ বর্তমান “ওয়া ক্বাদা রাব্বুকা”-র স্থানে।

কুরতুবি ইবনে আব্বাসের নামে আরও একটি যুক্তি রেখেছেন: এটি যদি অবধারিত ফয়সালার অর্থে হতো, কেউ আল্লাহর অবাধ্য হতে পারত না। ওই যুক্তি “ক্বাদা”-র অর্থ কী হবে, সে বিষয়ে ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্ন। পরে কুরতুবি “ক্বাদা”-র একাধিক অর্থ দেখিয়ে নির্দেশের অর্থ গ্রহণ করেছেন। তার আগে আবু হাতিমের একটি প্রত্যাখ্যানও সংরক্ষণ করেছেন, যেখানে এ বক্তব্য মেনে নিলে ধর্মদ্রোহীরা মুসহাফের বিরুদ্ধে আক্রমণের সুযোগ পাবে—এই কারণ প্রকাশ করা হয়েছে। [885]

ثم أبى أبو حاتم أن يكون ابن عباس قال ذلك . وقال : لو قلنا هذا لطعن الزنادقة في مصحفنا

বাংলা অনুবাদ: তারপর আবু হাতিম ইবনে আব্বাস এমন কথা বলেছেন বলে মানতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন: আমরা এ কথা বললে ধর্মদ্রোহীরা আমাদের মুসহাফের বিরুদ্ধে আক্রমণ করত।

প্রত্যাখ্যানের এই কারণ তথ্যের চেয়ে বক্তব্যের সম্ভাব্য ধর্মীয় ফল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। কোনো খবর বিরোধীদের কাজে লাগতে পারে—এটি খবরটি ঘটেনি এমন স্বাধীন প্রমাণ নয়। একইভাবে “ক্বাদা”-কে নির্দেশ অর্থে ব্যাখ্যা করলে বাক্যের ধর্মতাত্ত্বিক সমস্যা মেটানো সম্ভব হলেও “ওয়াস্‌সা” লেখা মুসহাফের বর্ণনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যায় না। একটি বিষয় অর্থ, অন্যটি সংরক্ষিত শব্দ। তাবারির লিখিত মুসহাফের খবর ও সুয়ূতির অক্ষর লেগে যাওয়ার অভিযোগ সেই দ্বিতীয় বিষয় সম্পর্কেও সরাসরি দাবি বহন করে।


নুর ২৪:৩৫ — “নুরিহি” ও মুমিনের নুরের পাঠ

নুর ২৪:৩৫-এর “মাসালু নুরিহি”—তাঁর নুরের উপমা—অংশটির বিপরীতে ইবনে আব্বাসের নামে “মাসালু নুরিল মুমিন”—মুমিনের নুরের উপমা—রূপ পাওয়া যায়। ইবনে আবু হাতিমের তাফসিরের ১৪৫৬০ নম্বর বর্ণনায় এটিকে লেখকের ভুল বলা হয়েছে। সেখানে উপমাটি আল্লাহর নিজের নুর সম্পর্কে হলে তার অনুপযুক্ততা নিয়ে একটি ব্যাখ্যাও রয়েছে। অর্থাৎ ভিন্ন শব্দের প্রস্তাবের সঙ্গে বক্তার ধর্মতাত্ত্বিক কারণ যুক্ত আছে। [886]

حَدَّثَنا عَلِيُّ بْنُ الحُسَيْنِ، ثَنا نَصْرُ بْنُ عَلِيٍّ، أخْبَرَنِي أبِي، عَنْ شِبْلِ بْنِ عَبّادٍ، عَنْ قَيْسِ بْنِ سَعْدٍ، عَنْ عَطاءٍ، عَنِ ابْنِ عَبّاسٍ: ﴿اللَّهُ نُورُ السَّماواتِ والأرْضِ مَثَلُ نُورِهِ﴾ قالَ: ”هي خَطَأٌ مِنَ الكاتِبِ، هو أعْظَمُ مِن أنْ يَكُونَ نُورُهُ مِثْلَ نُورِ المِشْكاةِ قالَ: مَثَلُ نُورِ المُؤْمِنِ كَمِشْكاةٍ“

বাংলা অনুবাদ: আলী ইবনুল হুসাইন আমাদের বর্ণনা করেছেন; নাসর ইবনে আলী আমাদের বর্ণনা করেছেন। আমার পিতা আমাকে জানিয়েছেন, শিবল ইবনে আব্বাদ থেকে, তিনি কাইস ইবনে সাদ থেকে, তিনি আতা থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস থেকে। “আল্লাহ আসমানসমূহ ও পৃথিবীর নুর; তাঁর নুরের উপমা” সম্পর্কে তিনি বলেন: এটি লেখকের ভুল। তাঁর নুর মিশকাতের নুরের মতো হওয়ার চেয়ে তিনি মহান। তিনি বলেন: হবে “মুমিনের নুরের উপমা মিশকাতের মতো”।

এখানে “নুরিহি” সর্বনামের জায়গায় “নুরিল মুমিন” প্রকাশ্য বিশেষ্যবন্ধ এসেছে। সর্বনামটি কাকে নির্দেশ করে, তা তাফসিরে ব্যাখ্যা করা এক বিষয়; সর্বনামের বদলে বিশেষ্যবন্ধ পাঠের দাবি আরেক বিষয়। বর্ণনার ভাষা দ্বিতীয় রূপটিকে শুধু অর্থব্যাখ্যা হিসেবে থামায়নি, লেখকের ভুলের অভিযোগও করেছে। ভুলের অভিযোগটি তাই বর্ণনার স্বতন্ত্র বক্তব্য; মুমিনের নুর নিয়ে অর্থব্যাখ্যার অতিরিক্ত আরেকটি দাবি এটি বহন করে।

তাবারির সংগ্রহে উবাইয়ের নামে “যে তাঁর ওপর বিশ্বাস করেছে তার নুর” রূপে পড়ার কথাও আছে। তাঁর বিবরণে প্রথমে আল্লাহ নিজের নুরের উল্লেখ করেছেন, তারপর মুমিনের নুরের উপমা—এই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। পূর্ণ খবরটি হলো: [887]

حدثنا القاسم، قال: ثنا الحسين، قال: ثني حجاج، عن أبي جعفر الرازي، عن أبي العالية، عن أُبيّ بن كعب ( اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالأرْضِ مَثَلُ نُورِهِ ) قال: بدأ بنور نفسه فذكره، ثم قال: ( مَثَلُ نُورِهِ ) يقول: مثل نور من آمن به، قال: وكذلك كان يقرأ أُبيّ، قال: هو عبد جعل الله القرآن والإيمان في صدره.

বাংলা অনুবাদ: কাসিম আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হুসাইন আমাদের বর্ণনা করেছেন; হাজ্জাজ আমাকে বর্ণনা করেছেন, আবু জাফর আর-রাযি থেকে, তিনি আবুল আলিয়া থেকে, তিনি উবাই ইবনে কাব থেকে। “আল্লাহ আসমানসমূহ ও পৃথিবীর নুর; তাঁর নুরের উপমা”—সম্পর্কে তিনি বলেন: তিনি প্রথমে নিজের নুর উল্লেখ করেছেন; তারপর বলেছেন, “তাঁর নুরের উপমা”, অর্থাৎ যে তাঁর ওপর বিশ্বাস করেছে তার নুরের উপমা। তিনি বলেন, উবাই এভাবেও পড়তেন। তিনি বলেন: এটি এমন বান্দা, যার বুকে আল্লাহ কোরআন ও ইমান স্থাপন করেছেন।

সংরক্ষিত রূপনির্দেশিত বিষয়সূত্রে তার পরিচয়
مَثَلُ نُورِهِতাঁর নুরের উপমাবর্তমান মুসহাফের সর্বনামযুক্ত রূপ
مَثَلُ نُورِ الْمُؤْمِنِমুমিনের নুরের উপমাইবনে আব্বাসের নামে লেখকের ভুলের অভিযোগের সঙ্গে প্রস্তাবিত রূপ
مَثَلُ نُورِ مَنْ آمَنَ بِهِযে তাঁর ওপর বিশ্বাস করেছে তার নুরের উপমাতাবারিতে উবাইয়ের নামে পাঠ ও ব্যাখ্যার বিবরণ

উবাইয়ের বর্ণনায় পাঠ ও অর্থব্যাখ্যার সংযোগ আছে; ইবনে আবু হাতিমের বর্ণনায় একটি রূপের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ আছে। এই দুই খবরের বিষয় ঘনিষ্ঠ হলেও বাক্যের প্রকৃতি এক নয়। ইবনে আব্বাসের নামে বিবরণে কেন বিকল্প রূপ গ্রহণ করা হচ্ছে, তার যুক্তি প্রকাশ করা হয়েছে: উপমার বিষয় মুমিনের নুর। এই যুক্তি সঠিক কি না এবং তাঁর নামে অভিযোগটি কীভাবে এসেছে, তা পৃথক প্রশ্ন। সংরক্ষিত খবরটি প্রমাণ করে যে গ্রন্থের সর্বনাম, তার নির্দেশিত ব্যক্তি এবং তার জায়গায় প্রকাশ্য বিশেষ্য পড়া নিয়েও ঐতিহ্যের ভেতরে নির্দিষ্ট আপত্তি ছিল।


সুয়ূতি, ইবনে আশতা ও অন্য ভাষ্যকারদের ব্যাকরণগত ও আহরুফভিত্তিক ব্যাখ্যা

সুয়ূতি লিখনত্রুটির খবরগুলো সংকলন করার পর এগুলোকে অত্যন্ত সমস্যাপূর্ণ বলেছেন। তাঁর আলোচনায় সাহাবিদের ভাষাজ্ঞান, মুহাম্মদের কাছ থেকে পাঠ গ্রহণ, সম্মিলিতভাবে ভুলে একমত হওয়ার অসম্ভাব্যতা এবং পরবর্তী অবিচ্ছিন্ন পাঠ—এসবের ভিত্তিতে খবরগুলোর আক্ষরিক অর্থের বিরুদ্ধে আপত্তি এসেছে। উসমানের নামে বর্ণনার সনদ সম্পর্কেও তিনি দুর্বলতা, অস্থিরতা ও বিচ্ছিন্নতার কথা উল্লেখ করেছেন। আয়েশার বর্ণনা সম্পর্কে তাঁর সিদ্ধান্ত আলাদা: সেটির সনদ তিনি সহিহ বলেছেন। সব খবরকে এক সনদমূল্যায়নের অধীনে রাখেননি।

এই পার্থক্য তাঁর শেষের মন্তব্যে স্পষ্ট। উসমানের বর্ণনা সম্পর্কে দেওয়া ব্যাখ্যাগুলো আয়েশার প্রশ্নোত্তরের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না বলে তিনি জানিয়েছেন। বিশেষত আয়েশার বর্ণনাকে সনদ দুর্বল বলে বাদ দেওয়া এবং কয়েকটি সাধারণ লিখনচিহ্নের প্রশ্ন হিসেবে ব্যাখ্যা করা—দুটিকেই তিনি অপ্রযোজ্য বলেছেন। [888]

وبعد فهذه الأجوبة لا يصلح منها شيء عن حديث عائشة : أما الجواب بالتضعيف فلأن إسناده صحيح كما ترى . وأما الجواب بالرمز وما بعده فلأن سؤال عروة عن الأحرف المذكور لا يطابقه .

বাংলা অনুবাদ: এরপরও এই উত্তরগুলোর কোনোটি আয়েশার হাদিসের জন্য প্রযোজ্য নয়। দুর্বল বলার উত্তরটি প্রযোজ্য নয়, কারণ এর সনদ সহিহ, যেমন তুমি দেখতে পাচ্ছ। আর সংকেত ও তার পরবর্তী ব্যাখ্যাগুলোও প্রযোজ্য নয়, কারণ উরওয়ার উল্লিখিত রূপগুলো সম্পর্কে প্রশ্ন তার সঙ্গে মেলে না।

ইবনে আশতার ব্যাখ্যায় “তারা ভুল করেছে” কথাটির অর্থ নির্ধারিত হয়েছে সাত আহরুফের মধ্যে অপেক্ষাকৃত উপযুক্ত রূপ নির্বাচনের ভিত্তিতে। অর্থাৎ লেখা রূপ কোরআনের বাইরে নয়; মানুষের সবাইকে যে রূপে একত্র করা বেশি উপযুক্ত ছিল, তা বেছে নেওয়ায় ভুল হয়েছে। এই ব্যাখ্যা আয়েশার নামে খবরটি রাখে, কিন্তু ভুলের প্রকৃতিকে অগ্রহণযোগ্য পাঠ থেকে অপেক্ষাকৃত উত্তম নির্বাচন না করার মধ্যে সরিয়ে আনে। সুয়ূতি যে ভাষায় এটি উদ্ধৃত করেছেন, তা হলো: [889]

فقد أجاب عنه ابن أشته وتبعه ابن جبارة في ” شرح الرائية ” بأن معنى قولها : ( أخطئوا ) أي : في اختيار الأولى من الأحرف السبعة لجمع الناس عليه ، لا أن الذي كتبوا من ذلك خطأ لا يجوز . قال : والدليل على ذلك أن ما لا يجوز مردود بإجماع وإن طالت مدة وقوعه .

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আশতা এর উত্তর দিয়েছেন এবং শারহুর রাইয়িয়ায় ইবনে জাবারা তাঁকে অনুসরণ করেছেন: তাঁর “তারা ভুল করেছে” কথার অর্থ, সাত আহরুফের মধ্যে মানুষকে একত্র করার জন্য যেটি বেশি উপযুক্ত ছিল, তা নির্বাচন করতে ভুল করেছে; তারা যা লিখেছে তা অগ্রহণযোগ্য ভুল—এমন অর্থ নয়। তিনি বলেন: এর প্রমাণ হলো, যা অগ্রহণযোগ্য তা ঐকমত্যে প্রত্যাখ্যাত, যত দীর্ঘকাল তা বহাল থাকুক।

এই ব্যাখ্যার শেষের যুক্তিতে গৃহীত অবস্থাই ভুলের সীমা নির্ধারণ করেছে। অগ্রহণযোগ্য ভুল হলে তা ঐকমত্যে বাতিল হতো; যেহেতু পাঠটি গৃহীত, তাই “ভুল” কথার অর্থ অগ্রহণযোগ্য ভুল হতে পারে না। এটি বর্তমান গ্রহণযোগ্যতাকে পূর্বধারণা হিসেবে রেখে প্রাচীন অভিযোগের অর্থ নির্ধারণের পদ্ধতি। আয়েশার সংরক্ষিত উত্তরে সাত আহরুফের মধ্যে উত্তমটি নির্বাচন না করার কথাটি নেই। সেটি ইবনে আশতার ব্যাখ্যাগত সংযোজন। তাঁর ব্যাখ্যা এবং সাহাবির নামে সংরক্ষিত বাক্যকে এক ভাষ্য হিসেবে মিশিয়ে দিলে পরবর্তী অর্থনির্ধারণের কাজ আড়াল হয়ে যায়।

একই আলোচনায় ইবনুল আনবারি লিখিত রূপের ভুল মৌখিকভাবে ঠিক করে নেওয়ার ব্যাখ্যাও প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর যুক্তিতে লেখা উচ্চারণের নির্দেশক; লেখায় ভুল রেখে দেওয়া অর্থবহ হতে পারে না। সুয়ূতি তাঁর এই আপত্তিও সংরক্ষণ করেছেন। [890]

لِأَنَّ الْخَطَّ مُنْبِئٌ عَنِ النُّطْقِ فَمَنْ لَحَنَ فِي كَتْبِهِ فَهُوَ لَاحِنٌ فِي نُطْقِهِ

বাংলা অনুবাদ: কারণ লেখা উচ্চারণের নির্দেশক। যে লেখায় ভুল করে, সে উচ্চারণেও ভুল করে।

ইবনুল আনবারির বক্তব্য সমর্থন করতে এরপর আবু উবাইদের একটি সংশোধনের খবর উদ্ধৃত হয়েছে। হানি আল-বারবারির নামে বর্ণনায় উসমানের উপস্থিতিতে মুসহাফ যাচাইয়ের সময় একটি ভেড়ার কাঁধের হাড় উবাইয়ের কাছে পাঠানোর কথা আছে। সেখানে লেখা তিনটি রূপ তিনি কালি দিয়ে মুছে বা অক্ষর যোগ করে বদলেছেন। ত্রুটি রেখে দেওয়ার অভিযোগের বিরুদ্ধে এই খবর আনা হলেও খবরটির নিজের বিষয়বস্তু সংশোধনের প্রক্রিয়া: আগে লেখা ছিল এক রূপ, পরীক্ষার পরে অন্য রূপ হয়েছে। [891] [892]

ثُمَّ أَيَّدَ ذَلِكَ بِمَا أَخْرَجَهُ أَبُو عُبَيْدٍ قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ مَهْدِيٍّ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مُبَارَكٍ حَدَّثَنَا أَبُو وَائِلٍ – شَيْخٌ مِنْ أَهْلِ الْيَمَنِ – عَنْ هَانِئٍ الْبَرْبَرِيِّ مَوْلَى عُثْمَانَ قَالَ: كُنْتُ عِنْدَ عُثْمَانَ وَهُمْ يَعْرِضُونَ الْمَصَاحِفَ فَأَرْسَلَنِي بِكَتِفِ شَاةٍ إِلَى أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ فِيهَا {لَمْ يَتَسَن} وفيها {لا تَبْدِيل للخَلْق} وفيها {فَأَمْهِل الكافِرين} قَالَ: فَدَعَا بِالدَّوَاةِ فَمَحَا أَحَدَ اللَّامَيْنِ فَكَتَبَ: {لَخَلْقِ اللَّهِ} وَمَحَى {فَأَمْهِل} وَكَتَبَ {فَمَهِّلِ} وَكَتَبَ {لَمْ يَتَسَنَّهْ} أَلْحَقَ فِيهَا الْهَاءَ.

বাংলা অনুবাদ: এরপর তিনি আবু উবাইদের বর্ণিত খবর দিয়ে তা সমর্থন করেন। আবু উবাইদ বলেন: আবদুর রহমান ইবনে মাহদি আমাদের বর্ণনা করেছেন, আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক থেকে। ইয়েমেনের একজন প্রবীণ আবু ওয়াইল আমাদের বর্ণনা করেছেন, উসমানের মাওলা হানি আল-বারবারি থেকে। তিনি বলেন: আমি উসমানের কাছে ছিলাম, তাঁরা মুসহাফ যাচাই করছিলেন। তিনি আমাকে ভেড়ার কাঁধের একটি হাড় দিয়ে উবাই ইবনে কাবের কাছে পাঠান। তাতে ছিল “লাম ইয়াতাসান”, “লা তাবদিলা লিলখালক” এবং “ফাআমহিলিল কাফিরিন”। তিনি কালির পাত্র আনিয়ে দুটি লামের একটি মুছে “লিখালকিল্লাহ” লিখলেন; “ফাআমহিল” মুছে “ফামাহহিল” লিখলেন; আর “লাম ইয়াতাসান্নাহ” লিখে সেখানে হা যোগ করলেন।

বর্ণনায় আগে থাকা রূপসংশোধনের পরে লেখা রূপবর্ণিত কাজ
لَمْ يَتَسَنلَمْ يَتَسَنَّهْশেষে হা যোগ করা
لَا تَبْدِيل لِلْخَلْقلَا تَبْدِيل لِخَلْقِ اللَّهِদুটি লামের একটি মুছে উল্লিখিত রূপ লেখা
فَأَمْهِل الْكَافِرِينَفَمَهِّلِ الْكَافِرِينَআগের ক্রিয়ার রূপ মুছে অন্য রূপ লেখা

এই খবরের ব্যবহার বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এক ব্যাখ্যায় মুসহাফে দেখা বিষয় আরবদের জিহ্বায় ঠিক হওয়ার কথা; ইবনুল আনবারির সমর্থিত খবরে হাতে লেখা অংশ সরাসরি সম্পাদনা করা হচ্ছে। “লাহন” শব্দের অর্থ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও দ্বিতীয় বিবরণে কাজের ধরন অস্পষ্ট নয়: মুছে ফেলা, অন্য রূপ লেখা এবং একটি অক্ষর যুক্ত করা। এর মাধ্যমে উবাইকে পাঠ যাচাই ও সংশোধনের কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে। লেখার প্রথম অবস্থা এবং যাচাইয়ের পরের অবস্থা অভিন্ন ছিল—এমন বর্ণনা এটি নয়।

ধর্মীয় ভাষ্যকার এই সংশোধনকে নির্ভুলতা প্রতিষ্ঠার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। একই ঘটনা গ্রন্থের তৈরির ইতিহাসে মানবিক সম্পাদনার সাক্ষ্যও বহন করে। পরীক্ষার পরে পাঠ সঠিক হয়েছে—এই দাবি এবং প্রথমবার লেখা প্রতিটি রূপ কখনো বদলাতে হয়নি—এই দাবি পৃথক। উবাইয়ের সংশোধনের প্রতিবেদনে প্রথম দাবিটির পক্ষে যুক্তি আনা হয়েছে, দ্বিতীয় দাবিটির ইতিহাস পাওয়া যায় না। কাজটি সংকলনের কোন নির্দিষ্ট পর্যায়ে ঘটেছিল, সেই প্রশ্নের বাইরে গিয়েও বর্ণিত সংশোধনের ধরন দৃশ্যমান: লিখিত উপাদানকে পরীক্ষা করে স্বীকৃত রূপে স্থির করা হয়েছে।


ত্রুটি শনাক্তের বর্ণনা, প্রচলিত পাঠ ও পরবর্তী ব্যাখ্যার সংঘাত

লিখনত্রুটির বর্ণনাগুলোয় অভিযোগের মাত্রা এক নয়। উসমানের নামে মুসহাফে “লাহন” দেখার কথা আছে; আয়েশার নামে লেখকদের ভুলের সরাসরি ঘোষণা আছে; আবানের নামে লেখার সময়কার প্রশ্নোত্তর আছে; ইবনে আব্বাসের নামে নির্দিষ্ট শব্দের বিকল্প ও তার কারণ আছে। এগুলোর সঙ্গে পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীর অবস্থানও এক নয়। কোনো খবরের সনদ গ্রহণ করে অর্থ পাল্টানো হয়েছে, কোনো খবরের বিষয়বস্তু অগ্রহণযোগ্য বলে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, কোনো ক্ষেত্রে বর্তমান শব্দ রেখে নতুন ব্যাকরণগত সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।

অবস্থানযে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়কোন তথ্য অপরিবর্তিত থাকে
লেখকের ভুলের অভিযোগভিন্ন লিখিত রূপ কেন এসেছেসাহাবিদের নামে বর্তমান রূপের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট আপত্তি সংরক্ষিত
ভাষাভেদের ব্যাখ্যাএকটি রূপ কোন আরবি রীতিতে গ্রহণযোগ্যআলাদা ভাষাগত বিশ্লেষণের প্রয়োজন এবং পাঠরূপের ভিন্নতা
সাত আহরুফের মধ্যে নির্বাচনের ব্যাখ্যা“ভুল” কথাটির গ্রহণযোগ্য অর্থ কীগৃহীত রূপ নির্ধারণে নির্বাচনের স্বীকৃতি
ব্যাকরণগত নতুন সম্পর্কবর্তমান শব্দের বিভক্তি কীভাবে ব্যাখ্যাতএকই শব্দের নির্দেশিত ব্যক্তি ও বাক্যগঠন নিয়ে মতভেদ
হাতে সংশোধনের বিবরণপরীক্ষায় পাওয়া লিখিত রূপ কীভাবে বদলানো হয়েছেমোছা, নতুন করে লেখা ও অক্ষর যোগের ঘটনা

ব্যাকরণসঙ্গত বাক্য এবং অপরিবর্তিতভাবে সংরক্ষিত বাক্য দুটি ভিন্ন দাবি। একটি বাক্য ভাষার কোনো গ্রহণযোগ্য রীতিতে ব্যাখ্যাত হতে পারে, অথচ তার পাশে অন্য পাঠের ইতিহাসও থাকতে পারে। লিখনের ইতিহাসে প্রাসঙ্গিক তথ্য হলো, কোন রূপ পড়া হয়েছে, কোন রূপ লেখা হয়েছে, কার নামে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে এবং গৃহীত অবস্থায় পৌঁছাতে কী ধরনের নির্বাচন বা সংশোধনের বিবরণ রয়েছে। এসব তথ্য বর্তমান বাক্যকে ব্যাকরণসম্মত বলার একটি সিদ্ধান্তের মধ্যে শেষ হয়ে যায় না।

মাযহারির শেষে বিশুদ্ধতার ঐকমত্য, কুশাইরির কাছে সংকলকদের ভাষাগত মর্যাদা, ইবনে আশতার কাছে অগ্রহণযোগ্য ভুল ঐকমত্যে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার নীতি এবং আবু হাতিমের কাছে মুসহাফের বিরুদ্ধে আক্রমণের আশঙ্কা—এই কারণগুলো ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় কর্তৃত্বকে রক্ষার ভূমিকা পালন করেছে। তাদের পাশাপাশি সংরক্ষিত উৎসে সেই কর্তৃপক্ষদের নামেই আপত্তি ও সংশোধনের বিবরণ টিকে আছে। পরবর্তী প্রতিষ্ঠিত অবস্থার সঙ্গে না মেলায় পুরোনো বক্তব্যের অর্থ পুনর্নির্ধারণ করা এই ইতিহাসের একটি বাস্তব অংশ।

সবচেয়ে প্রত্যক্ষ সম্পাদনার বিবরণে ভাষ্যকারের নিজের সমর্থিত উবাইয়ের খবরটি রয়েছে। সেখানে একটি অক্ষর যুক্ত হয়েছে, একটি লাম মুছে দেওয়া হয়েছে এবং একটি ক্রিয়ার রূপ মুছে অন্য রূপ লেখা হয়েছে। এসব কাজ গ্রন্থের শত্রুর হাতে ঘটেছে বলে ওই প্রতিবেদন বলেনি; স্বীকৃত সাহাবির মাধ্যমে যাচাইয়ের কাজ হিসেবেই এসেছে। এই বিবরণ কোরআন লিখনের ইতিহাসকে মানুষের কাজের বাইরে রাখে না। অনুমোদিত পাঠ প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ লিখেছে, পরীক্ষা করেছে, রূপ বেছে নিয়েছে এবং সংশোধন করেছে—সংরক্ষিত মুসলিম সূত্রেই সেই প্রক্রিয়ার সুনির্দিষ্ট চিত্র রয়েছে।


সাহাবিদের পাঠ ও সরকারি আঞ্চলিক কপিতে শব্দের পার্থক্য

কোরআনের পাঠভেদের ইতিহাসে সাহাবিদের নামে সংরক্ষিত পাঠ এবং উসমানি আঞ্চলিক মুসহাফের পার্থক্য দুটি স্বতন্ত্র স্তর। প্রথমটিতে কোনো সাহাবির পাঠে অতিরিক্ত বাক্যাংশ, বিকল্প শব্দ, পরিবর্তিত শব্দক্রম অথবা গৃহীত পাঠের কোনো অংশের অনুপস্থিতি পাওয়া যায়। দ্বিতীয়টিতে একই উসমানি সংকলনের অন্তর্ভুক্ত বলে পরিচিত আঞ্চলিক কপিগুলোর মধ্যেই অক্ষর ও সম্পূর্ণ শব্দের উপস্থিতি–অনুপস্থিতির বিবরণ রয়েছে। একটি স্তরে কোনো ব্যক্তি তাঁর শোনা পাঠ আঁকড়ে ধরছেন; আরেকটি স্তরে একাধিক লিখিত রূপ আঞ্চলিক মান্যতা পাচ্ছে। এই পার্থক্যগুলোর সঙ্গে নামাজের পরিচয়, কাফফারার শর্ত, সাহাবিদের মর্যাদা এবং কাহিনির ব্যাখ্যার মতো বিষয়ও জড়িত।

সংরক্ষণ বলতে কোনো ধর্মীয় বক্তব্যের স্থায়িত্ব বোঝানো এবং প্রতিটি শব্দ ও অক্ষরের অভিন্নতা দাবি করা এক কথা নয়। কোনো বাক্যের দুটি রূপে কাছাকাছি বক্তব্য প্রকাশ পেলেও তাদের শব্দসংখ্যা, বাক্যবিন্যাস বা লিখিত গঠন আলাদা থাকতে পারে। আবার একটি অতিরিক্ত শব্দ থেকেই ধর্মীয় বিধানের নতুন শর্ত তৈরি হতে পারে। সাহাবিদের পাঠসংক্রান্ত বর্ণনা ও আঞ্চলিক মুসহাফের বিবরণে এই উভয় ধরনের পার্থক্যই উপস্থিত। ফলে পাঠের ইতিহাসে বিষয়বস্তুর মিলের পাশাপাশি কোন শব্দ কোথায় ছিল, কে কোন রূপ পড়তেন এবং কোন রূপ মুসহাফে স্থান পেয়েছে—এসবেরও নির্দিষ্ট উত্তর রয়েছে।


শুআরা ২৬:২১৪-এ ইবনে আব্বাসের অতিরিক্ত বাক্যাংশ

সূরা শুআরার ২১৪ নম্বর আয়াতের গৃহীত পাঠে মুহাম্মাদকে তাঁর নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখানে আয়াতটি একটি সংক্ষিপ্ত নির্দেশেই শেষ হয়েছে; এরপর কোনো নির্দিষ্ট নিষ্ঠাবান গোষ্ঠীর কথা নেই। চারটি বাংলা অনুবাদেও এই একই সীমানা স্পষ্ট। [893]

وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ

বাংলা অনুবাদ: আর তুমি সতর্ক কর তোমার নিকটাত্মীয় স্বজনদের
— Taisirul Quran
তোমার নিকটতম আত্মীয়বর্গকে সতর্ক করে দাও।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর তুমি তোমার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক কর।
— Rawai Al-bayan
আর আপনার নিকটস্থ জ্ঞাতি-গোষ্ঠীকে সতর্ক করুন।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

সহিহ মুসলিমে ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত বিবরণে এই আয়াতের সঙ্গে আরও একটি বাক্যাংশ রয়েছে: “ওয়া রাহতাকা মিনহুমুল মুখলাসীন”—এবং তাদের মধ্য থেকে তোমার নির্বাচিত বা নিষ্ঠাবান সম্প্রদায়কে। বর্ণনাটি সরাসরি “যখন এই আয়াত নাজিল হলো” বলে শুরু হয়েছে এবং তারপর ওই অতিরিক্ত অংশসহ মুহাম্মাদের সাফা পর্বতে ওঠার ঘটনা বর্ণনা করেছে। অর্থাৎ অতিরিক্ত কথাগুলো ঘটনাটির ব্যাখ্যা হিসেবে অনেক পরে যুক্ত কোনো স্বতন্ত্র মন্তব্যের আকারে নেই; নাজিল হওয়া বক্তব্যের বিবরণের মধ্যেই রয়েছে। [894] [895] [896]

وَحَدَّثَنَا أَبُو كُرَيْبٍ، مُحَمَّدُ بْنُ الْعَلاَءِ حَدَّثَنَا أَبُو أُسَامَةَ ، عَنِ الأَعْمَشِ ، عَنْ عَمْرِو بْنِ مُرَّةَ ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ، قَالَ لَمَّا نَزَلَتْ هَذِهِ الآيَةُ ‏‏{‏ وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الأَقْرَبِينَ‏}‏ وَرَهْطَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ ‏.‏ خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حَتَّى صَعِدَ الصَّفَا فَهَتَفَ ‏”‏ يَا صَبَاحَاهْ ‏”‏ ‏.‏ فَقَالُوا مَنْ هَذَا الَّذِي يَهْتِفُ قَالُوا مُحَمَّدٌ ‏.‏ فَاجْتَمَعُوا إِلَيْهِ فَقَالَ ‏”‏ يَا بَنِي فُلاَنٍ يَا بَنِي فُلاَنٍ يَا بَنِي فُلاَنٍ يَا بَنِي عَبْدِ مَنَافٍ يَا بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ ‏”‏ فَاجْتَمَعُوا إِلَيْهِ فَقَالَ ‏”‏ أَرَأَيْتَكُمْ لَوْ أَخْبَرْتُكُمْ أَنَّ خَيْلاً تَخْرُجُ بِسَفْحِ هَذَا الْجَبَلِ أَكُنْتُمْ مُصَدِّقِيَّ ‏”‏ ‏.‏ قَالُوا مَا جَرَّبْنَا عَلَيْكَ كَذِبًا ‏.‏ قَالَ ‏”‏ فَإِنِّي نَذِيرٌ لَكُمْ بَيْنَ يَدَىْ عَذَابٍ شَدِيدٍ ‏” ‏ ‏.‏ قَالَ فَقَالَ أَبُو لَهَبٍ تَبًّا لَكَ أَمَا جَمَعْتَنَا إِلاَّ لِهَذَا ثُمَّ قَامَ فَنَزَلَتْ هَذِهِ السُّورَةُ تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَقَدْ تَبَّ ‏.‏ كَذَا قَرَأَ الأَعْمَشُ إِلَى آخِرِ السُّورَةِ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৮২. কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী জাহান্নামী; সে কোন শাফায়াত পাবে না এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী বান্দার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্কও তার উপকারে আসবে না
৪০২। আবূ কুরায়ব মুহাম্মাদ ইবনু আ’লা (রহঃ) আমাদের বর্ণনা করেছেন। আবূ উসামা তাঁকে বর্ণনা করেছেন; তিনি আ’মাশ থেকে, তিনি আমর ইবনু মুররা থেকে, তিনি সাঈদ ইবনু যুবায়র থেকে, তিনি ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবনু আব্বাস বলেন, যখন এই মর্মে আয়াত নাযিল হয় (অর্থ) “তোমার নিকটাত্মীয়বর্গকে সতর্ক করে দাও, (২৬ঃ ২১৪)। এবং তাদের মধ্য থেকে তোমার নিষ্ঠাবান সম্প্রদায়কেও।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে এলেন এবং সাফা পর্বতে উঠে উচ্চস্বরে ডাক দিলেনঃ হায়, মন্দ প্রভাত! সকলে বলাবলি করতে লাগল, কে এই ব্যক্তি যে ডাক দিচ্ছে? লোকেরা বলল, মুহাম্মাদ। তারপর সবাই তাঁর কাছে উপস্থিত হল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে অমুকের বংশধর! হে অমুকের বংশধর! হে অমুকের বংশধর! হে আবদ মানাফের বংশধর! হে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর! এতে সবাই তাঁর কাছে সমবেত হল।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেনঃ দেখ যদি আমি তোমাদের এই সংবাদ দেই যে, এই পর্বতের পাদদেশে শত্রু সৈন্য এসে পড়েছে, তবে কি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে? তারা উত্তর করল, তোমাকে কখনো মিথ্যা বলতে তো আমরা দেখিনি। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি তোমাদের সতর্ক করছি সামনের কঠোর আযাব সম্পর্কে। বর্ণনাকারী বলেন, আবূ লাহাব তখন এই বলে উঠে গেল “ধ্বংস হও, তুমি এ জন্যই কি আমাদের একত্র করেছিলে?” তখন এই সূরা অবতীর্ণ হয়ঃ ধ্বংস আবূ লাহাবের দুই হাত এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও সূরার শেষ পর্যন্ত। (১১১ঃ ১-৫)। অবশ্য বর্ণনাকারী আ’মাশ وَتَبَّ-এর স্থলে وَقَدْ تَبَّ পাঠ করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

কোরআন সংকলন 186

এখানে পাঠের পার্থক্যটি সম্পূর্ণ বাক্যাংশের। “নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করো” কথাটির পরে আরেকটি গোষ্ঠীকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অতিরিক্ত অংশে আত্মীয়তার সাধারণ পরিচয়ের সঙ্গে নির্বাচিত বা নিষ্ঠাবান হওয়ার বিশেষণ যুক্ত হয়। শব্দগুলো বাদ দিলে সেই বিশেষ চিহ্নিতকরণও পাঠ থেকে বাদ যায়। একই নির্দেশের আওতায় ওই গোষ্ঠী আগে থেকেই পড়ে কি না, সেটি অর্থের ব্যাখ্যার প্রশ্ন; বাক্যাংশটি লিখিত কোরআনে আছে কি না, সেটি আলাদা, সরাসরি যাচাইযোগ্য প্রশ্ন। বর্তমান আয়াত এবং মুসলিমের বর্ণিত নাজিলের ভাষ্য এই দ্বিতীয় প্রশ্নে ভিন্ন পাঠ দেয়।

পাঠের অবস্থানসংরক্ষিত শব্দপার্থক্যের প্রকৃতি
শুআরা ২৬:২১৪-এর গৃহীত আয়াতوَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَনিকটাত্মীয়দের সতর্ক করার নির্দেশে আয়াত শেষ
মুসলিমে ইবনে আব্বাসের বর্ণিত নাজিলের ভাষ্যএর সঙ্গে وَرَهْطَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَতাদের মধ্যকার একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর উল্লেখসহ অতিরিক্ত বাক্যাংশ

নববি এই বাড়তি অংশের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একে প্রথমে নাজিল হওয়া এবং পরে তিলাওয়াত রহিত হওয়া কোরআন হিসেবে বুঝেছেন। বাগাবির তাফসিরের অনলাইন সংস্করণের সম্পাদকীয় টীকায় তাঁর শরহে সহিহ মুসলিম থেকে এই ব্যাখ্যা উদ্ধৃত রয়েছে। নববির বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, তিনি অতিরিক্ত বাক্যাংশের উপস্থিতি অস্বীকার করে সমস্যাটি সরিয়ে দেননি; এর পূর্ববর্তী কোরআনিক অবস্থান স্বীকার করেই পরবর্তী অনুপস্থিতির ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। [897]

فظاهر هذه العبارة أن قوله: ورهطك منهم المخلصين، كان قرآنا أنزل ثم نسخت تلاوته

বাংলা অনুবাদ: এই বক্তব্যের বাহ্যিক অর্থ হলো, “এবং তাদের মধ্য থেকে তোমার নির্বাচিত সম্প্রদায়কে”—এই কথাটি নাজিল হওয়া কোরআন ছিল; পরে এর তিলাওয়াত রহিত করা হয়েছে।

নববির এই ব্যাখ্যায় একটি পূর্ববর্তী পাঠ এবং তার পরবর্তী অপসারণ—দুই অবস্থাই স্বীকৃত। “তিলাওয়াত রহিত” নামটি ওই পরিবর্তনের অনুমোদন বা ধর্মীয় ব্যাখ্যা দেয়; আগের পাঠে থাকা কথাগুলো পরের মুসহাফেও আছে—এমন তথ্য দেয় না। এখানে কোনো পরবর্তী সমালোচক নিজের পক্ষ থেকে হারানো শব্দ বানিয়ে দিচ্ছেন না। সহিহ মুসলিম বাড়তি কথাগুলো সংরক্ষণ করেছে, আর তার প্রভাবশালী ব্যাখ্যাকার নিজেই সেগুলোকে পূর্বে নাজিল হওয়া পাঠ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। নির্দিষ্ট বাক্যাংশের উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতির মধ্যে যে পাঠগত ব্যবধান, তা এই দুই সূত্রের মধ্যেই দৃশ্যমান।

একই হাদিসের শেষেও পাঠসংক্রান্ত আরেকটি নির্দিষ্ট তথ্য আছে। সূরা লাহাবের প্রথম আয়াতের প্রচলিত “ওয়া তাব্বা”-র জায়গায় আ’মাশ “ওয়া কাদ তাব্বা” পড়তেন বলে বর্ণনাটি জানিয়েছে। মূল আলোচ্য শুআরার অতিরিক্ত বাক্যাংশ হলেও শেষের এই মন্তব্য দেখায়, হাদিসের বর্ণনাকারীরা কখনো ঘটনাবিবরণের পাশাপাশি তাঁদের ব্যবহৃত বা পরিচিত ভিন্ন কোরআনপাঠও চিহ্নিত করতেন। শুআরার ক্ষেত্রে গোটা বাক্যাংশ এবং লাহাবের এই উল্লেখে একটি বাড়তি অব্যয়—দুটির দৈর্ঘ্য আলাদা, কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই গৃহীত আয়াতের সঙ্গে শব্দগত পার্থক্য রয়েছে।


কাহফ ১৮:৭৯–৮০-এ নৌকার অবস্থান, নৌকার গুণ ও বালকের পরিচয়ের ভিন্ন পাঠ

মুসা ও খিজিরের কাহিনিতে ইবনে আব্বাসের পাঠের সঙ্গে গৃহীত কোরআনের তিনটি লক্ষণীয় পার্থক্য রয়েছে। প্রথমটি রাজার অবস্থান নির্দেশক শব্দে, দ্বিতীয়টি রাজা যে নৌকাগুলো কেড়ে নিচ্ছিলেন সেগুলোর বিশেষণে, তৃতীয়টি নিহত বালকের ধর্মীয় পরিচয়ে। এই পার্থক্যগুলো একই কাহিনির ঘটনাবিন্যাস ও ব্যাখ্যার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বর্তমান আয়াতে নৌকার মালিকদের অসহায়ত্ব এবং বালকের বাবা-মায়ের বিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে; ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত পাঠে এর সঙ্গে আরও নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। [898] [899]

أَمَّا السَّفِينَةُ فَكَانَتْ لِمَسَاكِينَ يَعْمَلُونَ فِي الْبَحْرِ فَأَرَدتُّ أَنْ أَعِيبَهَا وَكَانَ وَرَاءَهُم مَّلِكٌ يَأْخُذُ كُلَّ سَفِينَةٍ غَصْبًا

وَأَمَّا الْغُلَامُ فَكَانَ أَبَوَاهُ مُؤْمِنَيْنِ فَخَشِينَا أَن يُرْهِقَهُمَا طُغْيَانًا وَكُفْرًا

বাংলা অনুবাদ: নৌকাটি ছিল কয়েকজন দরিদ্র মানুষের, যারা সমুদ্রে কাজ করত। আমি সেটিকে ত্রুটিযুক্ত করতে চেয়েছিলাম; তাদের পেছনে ছিল এক রাজা, যে প্রতিটি নৌকা জোর করে কেড়ে নিত।

আর বালকটির বাবা-মা ছিল মুমিন। তাই আমরা আশঙ্কা করলাম, সে অবাধ্যতা ও কুফরির দ্বারা তাদের বিপর্যস্ত করবে।

বুখারির দীর্ঘ বর্ণনাটির শেষে সাঈদ ইবনে যুবাইর স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ইবনে আব্বাস সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো কীভাবে পড়তেন। মূল কাহিনিটি উবাই ইবনে কাবের মাধ্যমে মুহাম্মাদের নামে বর্ণিত; শেষে ইবনে আব্বাসের পাঠ সম্পর্কে সাঈদের পৃথক মন্তব্য যুক্ত রয়েছে। ফলে কাহিনির মূল বর্ণনা এবং একজন সাহাবির ব্যবহৃত কোরআনপাঠ—বর্ণনাকারী নিজেই দুটিকে শনাক্ত করেছেন। [900] [901]

حَدَّثَنَا الْحُمَيْدِيُّ ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ ، حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ دِينَارٍ ، قَالَ أَخْبَرَنِي سَعِيدُ بْنُ جُبَيْرٍ ، قَالَ قُلْتُ لاِبْنِ عَبَّاسٍ إِنَّ نَوْفًا الْبَكَالِيَّ يَزْعُمُ أَنَّ مُوسَى صَاحِبَ الْخَضِرِ لَيْسَ هُوَ مُوسَى صَاحِبَ بَنِي إِسْرَائِيلَ‏.‏ فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ كَذَبَ عَدُوُّ اللَّهِ حَدَّثَنِي أُبَىُّ بْنُ كَعْبٍ أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏”‏ إِنَّ مُوسَى قَامَ خَطِيبًا فِي بَنِي إِسْرَائِيلَ فَسُئِلَ أَىُّ النَّاسِ أَعْلَمُ فَقَالَ أَنَا فَعَتَبَ اللَّهُ عَلَيْهِ، إِذْ لَمْ يَرُدَّ الْعِلْمَ إِلَيْهِ فَأَوْحَى اللَّهُ إِلَيْهِ إِنَّ لِي عَبْدًا بِمَجْمَعِ الْبَحْرَيْنِ، هُوَ أَعْلَمُ مِنْكَ قَالَ مُوسَى يَا رَبِّ فَكَيْفَ لِي بِهِ قَالَ تَأْخُذُ مَعَكَ حُوتًا فَتَجْعَلُهُ فِي مِكْتَلٍ، فَحَيْثُمَا فَقَدْتَ الْحُوتَ فَهْوَ ثَمَّ، فَأَخَذَ حُوتًا فَجَعَلَهُ فِي مِكْتَلٍ ثُمَّ انْطَلَقَ، وَانْطَلَقَ مَعَهُ بِفَتَاهُ يُوشَعَ بْنِ نُونٍ، حَتَّى إِذَا أَتَيَا الصَّخْرَةَ وَضَعَا رُءُوسَهُمَا فَنَامَا، وَاضْطَرَبَ الْحُوتُ فِي الْمِكْتَلِ، فَخَرَجَ مِنْهُ، فَسَقَطَ فِي الْبَحْرِ فَاتَّخَذَ سَبِيلَهُ فِي الْبَحْرِ سَرَبًا، وَأَمْسَكَ اللَّهُ عَنِ الْحُوتِ جِرْيَةَ الْمَاءِ فَصَارَ عَلَيْهِ مِثْلَ الطَّاقِ فَلَمَّا اسْتَيْقَظَ، نَسِيَ صَاحِبُهُ أَنْ يُخْبِرَهُ بِالْحُوتِ، فَانْطَلَقَا بَقِيَّةَ يَوْمِهِمَا وَلَيْلَتَهُمَا، حَتَّى إِذَا كَانَ مِنَ الْغَدِ قَالَ مُوسَى لِفَتَاهُ آتِنَا غَدَاءَنَا لَقَدْ لَقِينَا مِنْ سَفَرِنَا هَذَا نَصَبًا قَالَ وَلَمْ يَجِدْ مُوسَى النَّصَبَ حَتَّى جَاوَزَ الْمَكَانَ الَّذِي أَمَرَ اللَّهُ بِهِ فَقَالَ لَهُ فَتَاهُ أَرَأَيْتَ إِذْ أَوَيْنَا إِلَى الصَّخْرَةِ فَإِنِّي نَسِيتُ الْحُوتَ وَمَا أَنْسَانِيهِ إِلاَّ الشَّيْطَانُ أَنْ أَذْكُرَهُ، وَاتَّخَذَ سَبِيلَهُ فِي الْبَحْرِ عَجَبًا قَالَ فَكَانَ لِلْحُوتِ سَرَبًا وَلِمُوسَى وَلِفَتَاهُ عَجَبًا فَقَالَ مُوسَى ذَلِكَ مَا كُنَّا نَبْغِي فَارْتَدَّا عَلَى آثَارِهِمَا قَصَصًا قَالَ رَجَعَا يَقُصَّانِ آثَارَهُمَا حَتَّى انْتَهَيَا إِلَى الصَّخْرَةِ، فَإِذَا رَجُلٌ مُسَجًّى ثَوْبًا، فَسَلَّمَ عَلَيْهِ مُوسَى‏.‏ فَقَالَ الْخَضِرُ وَأَنَّى بِأَرْضِكَ السَّلاَمُ قَالَ أَنَا مُوسَى‏.‏ قَالَ مُوسَى بَنِي إِسْرَائِيلَ قَالَ نَعَمْ أَتَيْتُكَ لِتُعَلِّمَنِي مِمَّا عُلِّمْتَ رَشَدًا‏.‏ قَالَ إِنَّكَ لَنْ تَسْتَطِيعَ مَعِي صَبْرًا، يَا مُوسَى إِنِّي عَلَى عِلْمٍ مِنْ عِلْمِ اللَّهِ عَلَّمَنِيهِ لاَ تَعْلَمُهُ أَنْتَ وَأَنْتَ عَلَى عِلْمٍ مِنْ عِلْمِ اللَّهِ عَلَّمَكَ اللَّهُ لاَ أَعْلَمُهُ‏.‏ فَقَالَ مُوسَى سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ صَابِرًا، وَلاَ أَعْصِي لَكَ أَمْرًا‏.‏ فَقَالَ لَهُ الْخَضِرُ، فَإِنِ اتَّبَعْتَنِي فَلاَ تَسْأَلْنِي عَنْ شَىْءٍ حَتَّى أُحْدِثَ لَكَ مِنْهُ ذِكْرًا، فَانْطَلَقَا يَمْشِيَانِ عَلَى سَاحِلِ الْبَحْرِ، فَمَرَّتْ سَفِينَةٌ فَكَلَّمُوهُمْ أَنْ يَحْمِلُوهُمْ، فَعَرَفُوا الْخَضِرَ، فَحَمَلُوهُ بِغَيْرِ نَوْلٍ فَلَمَّا رَكِبَا فِي السَّفِينَةِ، لَمْ يَفْجَأْ إِلاَّ وَالْخَضِرُ قَدْ قَلَعَ لَوْحًا مِنْ أَلْوَاحِ السَّفِينَةِ بِالْقَدُومِ‏.‏ فَقَالَ لَهُ مُوسَى قَوْمٌ حَمَلُونَا بِغَيْرِ نَوْلٍ، عَمَدْتَ إِلَى سَفِينَتِهِمْ فَخَرَقْتَهَا لِتُغْرِقَ أَهْلَهَا لَقَدْ جِئْتَ شَيْئًا إِمْرًا‏.‏ قَالَ أَلَمْ أَقُلْ إِنَّكَ لَنْ تَسْتَطِيعَ مَعِي صَبْرًا‏.‏ قَالَ لاَ تُؤَاخِذْنِي بِمَا نَسِيتُ وَلاَ تُرْهِقْنِي مِنْ أَمْرِي عُسْرًا ‏”‏‏.‏ قَالَ وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ وَكَانَتِ الأُولَى مِنْ مُوسَى نِسْيَانًا قَالَ وَجَاءَ عُصْفُورٌ فَوَقَعَ عَلَى حَرْفِ السَّفِينَةِ فَنَقَرَ فِي الْبَحْرِ نَقْرَةً، فَقَالَ لَهُ الْخَضِرُ مَا عِلْمِي وَعِلْمُكَ مِنْ عِلْمِ اللَّهِ إِلاَّ مِثْلُ مَا نَقَصَ هَذَا الْعُصْفُورُ مِنْ هَذَا الْبَحْرِ ثُمَّ خَرَجَا مِنَ السَّفِينَةِ، فَبَيْنَا هُمَا يَمْشِيَانِ عَلَى السَّاحِلِ، إِذْ أَبْصَرَ الْخَضِرُ غُلاَمًا يَلْعَبُ مَعَ الْغِلْمَانِ، فَأَخَذَ الْخَضِرُ رَأْسَهُ بِيَدِهِ فَاقْتَلَعَهُ بِيَدِهِ فَقَتَلَهُ‏.‏ فَقَالَ لَهُ مُوسَى أَقَتَلْتَ نَفْسًا زَاكِيَةً بِغَيْرِ نَفْسٍ لَقَدْ جِئْتَ شَيْئًا نُكْرًا‏.‏ قَالَ أَلَمْ أَقُلْ لَكَ إِنَّكَ لَنْ تَسْتَطِيعَ مَعِي صَبْرًا قَالَ وَهَذَا أَشَدُّ مِنَ الأُولَى، قَالَ إِنْ سَأَلْتُكَ عَنْ شَىْءٍ بَعْدَهَا فَلاَ تُصَاحِبْنِي قَدْ بَلَغْتَ مِنْ لَدُنِّي عُذْرًا فَانْطَلَقَا حَتَّى إِذَا أَتَيَا أَهْلَ قَرْيَةٍ اسْتَطْعَمَا أَهْلَهَا فَأَبَوْا أَنْ يُضَيِّفُوهُمَا فَوَجَدَا فِيهَا جِدَارًا يُرِيدُ أَنْ يَنْقَضَّ ـ قَالَ مَائِلٌ ـ فَقَامَ الْخَضِرُ فَأَقَامَهُ بِيَدِهِ فَقَالَ مُوسَى قَوْمٌ أَتَيْنَاهُمْ فَلَمْ يُطْعِمُونَا، وَلَمْ يُضَيِّفُونَا، لَوْ شِئْتَ لاَتَّخَذْتَ عَلَيْهِ أَجْرًا‏.‏ قَالَ ‏‏{‏هَذَا فِرَاقُ بَيْنِي وَبَيْنِكَ‏}‏ إِلَى قَوْلِهِ ‏‏{‏ذَلِكَ تَأْوِيلُ مَا لَمْ تَسْطِعْ عَلَيْهِ صَبْرًا‏}‏‏.‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ وَدِدْنَا أَنَّ مُوسَى كَانَ صَبَرَ حَتَّى يَقُصَّ اللَّهُ عَلَيْنَا مِنْ خَبَرِهِمَا ‏” ‏‏.‏ قَالَ سَعِيدُ بْنُ جُبَيْرٍ فَكَانَ ابْنُ عَبَّاسٍ يَقْرَأُ وَكَانَ أَمَامَهُمْ مَلِكٌ يَأْخُذُ كُلَّ سَفِينَةٍ صَالِحَةٍ غَصْبًا، وَكَانَ يَقْرَأُ وَأَمَّا الْغُلاَمُ فَكَانَ كَافِرًا وَكَانَ أَبَوَاهُ مُؤْمِنَيْنِ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৫/ কুরআন মাজীদের তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ ৬৫/১৮/২. পরিচ্ছেদ নাই।
(وَإِذْ قَالَ مُوْسٰى لِفَتَاهُ لَا أَبْرَحُ حَتّٰىٓ أَبْلُغَ مَجْمَعَ الْبَحْرَيْنِ أَوْ أَمْضِيَ حُقُبًا) زَمَانًا وَجَمْعُهُ أَحْقَابٌ.
আল্লাহ্ তা’আলার বাণীঃ স্মরণ কর, যখন মূসা স্বীয় যুবক সঙ্গীকে বলেছিলেনঃ আমি অবিরত চলতে থাকব যে পর্যন্ত না দুই সাগরের মিলনস্থলে পৌঁছি, অথবা এভাবে আমি দীর্ঘকাল চলতে থাকব। (সূরাহ কাহাফ ১৮/৬০)
حُقُبًا অর্থ যুগ, তার বহুবচন أَحْقَابٌ।
৪৭২৫। হুমাইদী আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি সুফিয়ান থেকে, তিনি আমর ইবনু দীনার থেকে বর্ণনা করেছেন। আমর বলেন, সাঈদ ইবনু যুবায়র আমাকে জানিয়েছেন। সা’ঈদ ইবনু যুবায়র (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু ’আব্বাসকে বললাম, নওফ আল-বাক্কালীর ধারণা, খাযিরের সাথী মূসা, তিনি বনী ইসরাঈলের নবী মূসা (আঃ) ছিলেন না। ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বললেন, আল্লাহর দুশমন[1] মিথ্যা কথা বলেছে। [ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বলেন] উবাই ইবনু কা’আব (রাঃ) আমাকে বলেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, মূসা (আঃ) একবার বনী ইসরাঈলের সম্মুখে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হলো, কোন ব্যক্তি সবচেয়ে জ্ঞানী? তিনি বললেন, আমি। এতে আল্লাহ্ তাঁর ওপর অসন্তুষ্ট হলেন। কেননা এ জ্ঞানের ব্যাপারটিকে তিনি আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত করেননি। আল্লাহ্ তাঁর প্রতি ওয়াহী পাঠালেন, দু-সমুদ্রের সংযোগস্থলে আমার এক বান্দা রয়েছে, সে তোমার চেয়ে বেশি জ্ঞানী। মূসা (আঃ) বললেন, ইয়া রব, আমি কীভাবে তাঁর সাক্ষাৎ পেতে পারি? আল্লাহ্ বললেন, তোমার সঙ্গে একটি মাছ নাও এবং সেটা থলের মধ্যে রাখ, যেখানে মাছটি হারিয়ে যাবে সেখানেই। তারপর তিনি একটি মাছ নিলেন এবং সেটাকে থলের মধ্যে রাখলেন। অতঃপর রওনা দিলেন। আর সঙ্গে চললেন তাঁর খাদেম ’ইউশা’ ইবনু নূন।
তাঁরা যখন সমুদ্রের ধারে একটি বড় পাথরের কাছে এসে হাজির হলেন, তখন তারা উভয়েই তার ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। এ সময় মাছটি থলের ভিতর লাফিয়ে উঠল এবং থলে থেকে বের হয়ে সমুদ্রে চলে গেল। ’’মাছটি সুড়ঙ্গের মত পথ করে সমুদ্রে নেমে গেল।’’ আর মাছটি যেখান দিয়ে চলে গিয়েছিল, আল্লাহ্ সেখান থেকে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দিলেন এবং সেখানে একটি সুড়ঙ্গের মত হয়ে গেল। যখন তিনি জাগ্রত হলেন, তাঁর সাথী তাঁকে মাছটির সংবাদ দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। সেদিনের বাকি সময় ও পরবর্তী রাত তাঁরা চললেন। যখন ভোর হল, মূসা (আঃ) তাঁর খাদিমকে বললেন ’আমাদের সকালের আহার আন, আমরা তো আমাদের এ সফরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।’’ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ্ যে স্থানের[2] নির্দেশ করেছিলেন, সে স্থান অতিক্রম করার পূর্বে মূসা (আঃ) ক্লান্ত হননি। তখন তাঁর খাদিম তাঁকে বলল, ’’আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, আমরা যখন শিলাখণ্ডে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। শয়তানই এ কথা বলতে আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। মাছটি বিস্ময়করভাবে নিজের পথ করে সমুদ্রে নেমে গেল।’’
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মাছটি তার পথ করে সমুদ্রে নেমে গিয়েছিল এবং মূসা (আঃ) ও তাঁর খাদেমকে তা আশ্চর্যান্বিত করে দিয়েছিল। মূসা (আঃ) বললেনঃ ’’আমরা তো সে স্থানটিরই খোঁজ করছিলাম। তারপর তাঁরা নিজেদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে চলল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তারা উভয়ে তাঁদের পদচিহ্ন ধরে সে শিলাখণ্ডের কাছে ফিরে আসলেন। সেখানে এক ব্যক্তিকে কাপড়ে জড়ানো অবস্থায় পেলেন। মূসা (আঃ) তাকে সালাম দিলেন। খাযির (আঃ) বললেন, তোমাদের এ স্থলে ’সালাম’ আসলো কোত্থেকে? তিনি বললেন, আমি মূসা। খাযির (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন, বনী ইসরাঈলের মূসা? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি আপনার কাছে এসেছি এ জন্য যে, সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে তা থেকে আমাকে শিক্ষা দিবেন। তিনি বললেন, তুমি কিছুতেই আমার সঙ্গে ধৈর্যধারণ করতে পারবে না।’’ হে মূসা! আল্লাহর জ্ঞান থেকে আমাকে এমন কিছু জ্ঞান দান করা হয়েছে যা তুমি জান না আর তোমাকে আল্লাহ্ তাঁর জ্ঞান থেকে যে জ্ঞান দান করেছেন, তা আমি জানি না।
মূসা (আঃ) বললেন, ’’ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আপনার কোন আদেশ আমি অমান্য করব না।’’ তখন খাযির (আঃ) তাঁকে বললেন, ’’আচ্ছা, তুমি যদি আমার অনুসরণ করই, তবে কোন বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবে না, যতক্ষণ আমি তোমাকে সে সম্পর্কে না বলি। তারপর উভয়ে চললেন।’’ তাঁরা সমুদ্রের পাড় ধরে চলতে লাগলেন, তখন একটি নৌকা যাচ্ছিল। তাঁরা তাদের নৌকায় উঠিয়ে নেয়ার ব্যাপারে নৌকার চালকদের সঙ্গে আলাপ করলেন। তারা খাযির (আঃ)-কে চিনে ফেলল। তাই তাদেরকে বিনা পারিশ্রমিকে নৌকায় উঠিয়ে নিল। ’’যখন তাঁরা উভয়ে নৌকায় উঠলেন’’ খাযির (আঃ) কুড়াল দিয়ে নৌকার একটি তক্তা খুলে ফেললেন। মূসা (আঃ) তাঁকে বললেন, এ লোকেরা তো বিনা মজুরিতে আমাদের বহন করছে, অথচ আপনি এদের নৌকাটি নষ্ট করছেন। আপনি নৌকাটি ছিদ্র করে ফেললেন, যাতে আরোহীরা ডুবে যায়। আপনি তো এক অন্যায় কাজ করলেন, (খাযির বললেন) আমি কি বলিনি যে, তুমি আমার সঙ্গে কিছুতেই ধৈর্যধারণ করতে পারবে না। মূসা বললেন, আমার ভুলের জন্য আমাকে অপরাধী করবেন না ও আমার ব্যাপারে অতিরিক্ত কঠোরতা করবেন না।’’
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মূসা (আঃ)-এর প্রথম এ অপরাধটি ভুল করে হয়েছিল। তিনি বললেন, এরপরে একটি চড়ুই পাখি এসে নৌকার পার্শ্বে বসে ঠোঁট দিয়ে সমুদ্রে এক ঠোকর মারল। খাযির (আঃ) মূসা (আঃ)-কে বললেন, এ সমুদ্র হতে চড়ুই পাখিটি যতটুকু পানি ঠোঁটে নিল, আমার ও তোমার জ্ঞান আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় ততটুকু। তারপর তাঁরা নৌকা থেকে নেমে সমুদ্রের পাড় ধরে চলতে লাগলেন। এমতাবস্থায় খাযির (আঃ) একটি বালককে অন্য বালকদের সঙ্গে খেলতে দেখলেন। খাযির (আঃ) হাত দিয়ে ছেলেটির মাথা ধরে তা টেনে উপড়ে ফেললেন এবং তাকে হত্যা করলেন। মূসা (আঃ) খাযির (আঃ)-কে বললেন, ’’আপনি কি প্রাণের বদলা ব্যতিরেকেই নিষ্পাপ একটি প্রাণকে হত্যা করলেন? আপনি তো চরম এক অন্যায় কাজ করলেন। তিনি বললেন, আমি কি তোমাকে বলিনি যে, তুমি আমার সঙ্গে কিছুতেই ধৈর্যধারণ করে থাকতে পারবে না।’’
নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ অভিযোগটি ছিল প্রথমটির অপেক্ষাও মারাত্মক। [মূসা (আঃ) বললেন] এরপর যদি আমি আপনাকে কোন ব্যাপারে প্রশ্ন করি তবে আপনি আমাকে সঙ্গে রাখবেন না; আপনার কাছে আমার ওজর-আপত্তি চূড়ান্তে পৌঁছেছে। তারপর উভয়ে চলতে লাগলেন। শেষে তারা এক বসতির কাছে পৌঁছে তার বাসিন্দাদের কাছে খাদ্য চাইলেন। কিন্তু তারা তাদের আতিথেয়তা করতে অস্বীকৃতি জানাল। তারপর সেখানে তারা এক পতনোন্মুখ দেয়াল দেখতে পেলেন। বর্ণনাকারী বলেন, সেটি ঝুঁকে পড়েছিল। খাযির (আঃ) নিজ হাতে সেটি সোজা করে দিলেন। মূসা (আঃ) বললেন, এ লোকদের কাছে আমরা এলাম, তারা আমাদের খাদ্য দিল না এবং আমাদের আতিথেয়তাও করল না। ’’আপনি তো ইচ্ছা করলে এর জন্য পারিশ্রমিক নিতে পারতেন। তিনি বললেন, এখানেই তোমার এবং আমার মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটল। …..যে বিষয়ে তুমি ধৈর্যধারণ করতে পারনি, এ তার ব্যাখ্যা।’’
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার মনের বাসনা যে, যদি মূসা (আঃ) আর একটু ধৈর্যধারণ করতেন, তাহলে আল্লাহ্ তাঁদের আরও ঘটনা আমাদের জানাতেন। সা’ঈদ ইবনু যুবায়র (রাঃ) বলেন, ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) এভাবে এ আয়াত পাঠ করতেন- وَكَانَ أَمَامَهُمْ مَلِكٌ يَأْخُذُ كُلَّ سَفِينَةٍ صَالِحَةٍ غَصْبًا
নিচের আয়াতটি এভাবে পাঠ করলেন- وَأَمَّا الْغُلَامُ فَكَانَ كَافِرًا وَكَانَ أَبَوَاهُ مُؤْمِنَيْنِ
ইবনে আব্বাস পড়তেন: তাদের সামনে এক রাজা ছিল, যে প্রতিটি ত্রুটিমুক্ত নৌকা জোর করে নিয়ে যেত। আর পড়তেন: বালকটি ছিল কাফির এবং তার পিতা-মাতা ছিলেন মুমিন।
[৭৪] (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৩৬৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৩৬৬)
[1] নওফ আল-বাককালী- সে একজন মুসলিম। ইবনু আব্বাস তাকে আল্লাহর দুশমন বলেছেন রাগান্বিত অবস্থায়।
[2] স্থানঃ যেখানে মাছটি হারিয়ে যাবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা‘ঈদ ইবনু যুবায়র (রহঃ)

কোরআন সংকলন 188
স্থানগৃহীত আয়াতের শব্দইবনে আব্বাসের বর্ণিত পাঠদৃশ্যমান পার্থক্য
কাহফ ১৮:৭৯وَكَانَ وَرَاءَهُمْ مَلِكٌوَكَانَ أَمَامَهُمْ مَلِكٌওয়ারাআহুমের বদলে আমামাহুম: পেছনে/সামনে নির্দেশক শব্দের বদল
কাহফ ১৮:৭৯كُلَّ سَفِينَةٍكُلَّ سَفِينَةٍ صَالِحَةٍত্রুটিমুক্ত বা ভালো নৌকা—বিশেষণ সংযোজন
কাহফ ১৮:৮০فَكَانَ أَبَوَاهُ مُؤْمِنَيْنِفَكَانَ كَافِرًا وَكَانَ أَبَوَاهُ مُؤْمِنَيْنِবালকের ধর্মীয় পরিচয় সরাসরি যোগ

প্রথম পার্থক্যে গৃহীত পাঠের “ওয়ারাআহুম”-এর জায়গায় “আমামাহুম” রয়েছে। “ওয়ারা” শব্দটি প্রসঙ্গভেদে সামনে বা পেছনের কোনো অদৃশ্য অবস্থান বোঝাতে ব্যবহৃত হয় বলে তাফসিরে আলোচনা আছে; “আমাম” সরাসরি সামনে নির্দেশ করে। তাবারি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সামনে অবস্থানের পাঠ ও অর্থের আলোচনা করেছেন। অর্থ ব্যাখ্যার মাধ্যমে উভয় রূপে সামনে অবস্থান বোঝানো সম্ভব হলেও ইবনে আব্বাসের পাঠে সেই অর্থ প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত শব্দটিই আলাদা। একটি শব্দের অর্থের বিস্তার এবং তার জায়গায় অন্য একটি শব্দ পড়া—লিখিত পাঠের ইতিহাসে এরা দুটি ভিন্ন ঘটনা। [902]

وقوله: ( وَكَانَ وَرَاءَهُمْ مَلِكٌ ) وكان أمامهم وقُدّامهم ملك.

বাংলা অনুবাদ: আর তাঁর কথা, “তাদের ওয়ারায় ছিল এক রাজা”—অর্থাৎ তাদের সামনে, তাদের অগ্রভাগে ছিল এক রাজা।

দ্বিতীয় পার্থক্যটি কাহিনির যুক্তিতে আরও প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। গৃহীত পাঠে রাজা “প্রতিটি নৌকা” কেড়ে নিতেন। ভিন্ন পাঠে তিনি “প্রতিটি ভালো বা ত্রুটিমুক্ত নৌকা” কেড়ে নিতেন। ভালো নৌকাই যদি তাঁর লক্ষ্য হয়, তাহলে তক্তা খুলে নৌকাকে ত্রুটিযুক্ত করার কাজটি নৌকাটি বাঁচানোর কৌশল হিসেবে সরাসরি বোধগম্য হয়। “সালিহা” বিশেষণটি ছাড়া এই ব্যাখ্যা ঘটনাপ্রবাহ ও খিজিরের কাজ থেকে উদ্ধার করতে হয়; বিশেষণটি থাকলে রাজার বাছাইয়ের শর্ত বাক্যেই ঘোষণা করা হয়। ফলে বাড়তি শব্দটি অলংকার নয়, জবরদখলের সীমা নির্ধারণকারী তথ্য।

তৃতীয় পার্থক্যে বালকের নিজের কুফরির কথা সরাসরি যোগ হয়েছে। গৃহীত ৮০ নম্বর আয়াত শুরু হয় বালকের বাবা-মা মুমিন ছিল—এই তথ্য দিয়ে, তারপর তাদের ওপর ভবিষ্যৎ অবাধ্যতা ও কুফরির আশঙ্কা আসে। ইবনে আব্বাসের পাঠে এর আগে রয়েছে “বালকটি কাফির ছিল”। বর্তমান পাঠে বাবা-মায়ের বিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ বিপদের আশঙ্কা যেখানে মুখ্য, বিকল্প পাঠ সেখানে বালকের নিজের ধর্মীয় পরিচয়ও স্থির করে দেয়। শিশুহত্যার কাহিনিতে এই বাড়তি পরিচয়ের ব্যাখ্যাগত গুরুত্ব প্রবল: নিহত ব্যক্তির নৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থান সম্পর্কে পাঠটি একটি স্পষ্ট ঘোষণা বহন করে।

বর্ণনাটির ভাষা “ইবনে আব্বাস এর অর্থ এভাবে করতেন” নয়; সাঈদ বলেছেন, তিনি এভাবে “পড়তেন”। পরবর্তী কিরাত ও তাফসিরের আলোচনায় এমন পাঠকে ব্যাখ্যামূলক, শায বা রহিত বলা হলে তা তার পরবর্তী শ্রেণিবিন্যাস। বুখারিতে সংরক্ষিত সাক্ষ্যের ভাষা এবং পরবর্তী অনুমোদনের সীমানা এক বিষয় নয়। এখানে একজন প্রভাবশালী সাহাবির নামে এমন পাঠ সংরক্ষিত আছে, যাতে একই সঙ্গে শব্দ প্রতিস্থাপন, বিশেষণ সংযোজন এবং একটি সম্পূর্ণ ধর্মীয় পরিচয়সূচক বাক্যাংশ পাওয়া যায়। তিন ক্ষেত্রেই কাহিনির অর্থ বা তার ব্যাখ্যা আরও নির্দিষ্ট হয়েছে; তিন ক্ষেত্রেই গৃহীত মুসহাফের শব্দের সঙ্গে পার্থক্য রয়েছে।


নুর ২৪:২৭-এ ইবনে মাসউদের শব্দক্রম

নুর ২৪:২৭-এ গৃহে প্রবেশের আগে অভিবাদন ও অনুমতি গ্রহণের নির্দেশ কীভাবে সাজানো হবে, ইবনে মাসউদের নামে বর্ণিত মুসহাফে তার পৃথক শব্দক্রম পাওয়া যায়। গৃহীত পাঠে আগে “হাত্তা তাসতানিসু”, তারপর “ওয়া তুসাল্লিমু আলা আহলিহা”—বাড়ির লোকদের সালাম করার কথা। ইবনে মাসউদের নামে সংরক্ষিত রূপে আগে সালাম, পরে “ওয়া তাসতা’যিনু”—অনুমতি চাওয়ার কথা এসেছে। ফলে একই আয়াতে দুটি পরিবর্তন একসঙ্গে দেখা যায়: ক্রিয়ার বদল এবং নির্দেশের ক্রমবদল।

তাবারি এই রূপটিকে ইবরাহিমের সূত্রে সরাসরি “ইবনে মাসউদের মুসহাফে” থাকা পাঠ বলেছেন। পরের বর্ণনাতেই ইবনে আব্বাসের পাঠেও একই ক্রম পাওয়া যায়, সঙ্গে প্রচলিত “তাসতানিসু” শব্দটিকে লেখকদের ভুল বলে অভিহিত করা হয়েছে। ইবনে কাসিরে সংরক্ষিত লেখকের ভুলসংক্রান্ত দীর্ঘ আলোচনাটি নুর ২৪:২৭ — অনুমতি চাওয়া ও “তাসতানিসু” উপপরিচ্ছেদে রয়েছে। তাবারির এই দুটি পরপর বর্ণনায় মুসহাফের ভাষা ও শব্দক্রম দুটিই শনাক্ত করা যায়। [903]

حدثنا القاسم، قال: ثنا الحسين، قال: ثني هشيم، قال: أخبرنا مغيرة، عن إبراهيم، قال: في مصحف ابن مسعود: ” حَتَّى تُسَلِّمُوا على أهْلِها وَتَسْتَأْذِنُوا “.

قال: ثنا هشيم، قال: أخبرنا جعفر بن إياس، عن سعيد، عن ابن عباس أنه كان يقرؤها: ” يأيُّها الَّذِينَ آمَنُوا لا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حتى تُسَلِّمُوا عَلى أهْلِها وتَسْتَأْذِنوا ” قال: وإنما تستأنسوا وهم من الكتاب.

বাংলা অনুবাদ: কাসিম আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হুসাইন আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হুশাইম আমাকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, মুগিরা আমাদের জানিয়েছেন, ইবরাহিম থেকে। ইবরাহিম বলেন: ইবনে মাসউদের মুসহাফে ছিল, “যতক্ষণ না তোমরা তার বাসিন্দাদের সালাম করবে এবং অনুমতি চাইবে।”

তিনি বলেন, হুশাইম আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, জাফর ইবনে ইয়াস আমাদের জানিয়েছেন, সাঈদ থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস থেকে: ইবনে আব্বাস এভাবে পড়তেন, “হে মুমিনরা, তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য ঘরে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না তার বাসিন্দাদের সালাম করবে এবং অনুমতি চাইবে।” তিনি বলেন, “তাসতানিসু” লেখকদের ভুল।

পাঠপ্রথম নির্দেশপরের নির্দেশশব্দ ও বিন্যাস
গৃহীত নুর ২৪:২৭حَتَّى تَسْتَأْنِسُواوَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَاতাসতানিসু আগে; সালাম পরে
তাবারিতে ইবনে মাসউদের মুসহাফের বিবরণحَتَّى تُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَاوَتَسْتَأْذِنُواসালাম আগে; অনুমতি চাওয়া পরে
পরবর্তী বর্ণনায় ইবনে আব্বাসের পাঠحَتَّى تُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَاوَتَسْتَأْذِنُواএকই ক্রম; প্রচলিত ক্রিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি আপত্তি

“তাসতানিসু” শব্দকে অনুমতি চাওয়া, উপস্থিতি জানানো বা বাসিন্দাদের সম্মতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার অর্থে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু “তাসতা’যিনু” অনুমতি চাওয়ার সরাসরি ক্রিয়া। তাবারির বর্ণিত রূপে সেই সরাসরি ক্রিয়াটিই রয়েছে এবং তার আগে সালাম দেওয়ার নির্দেশ স্থাপিত হয়েছে। গৃহে প্রবেশের শিষ্টাচারের ব্যাখ্যায় সালাম ও অনুমতির সম্পর্ক তাই পাঠটির বাস্তব বিষয়বস্তু। একই সামাজিক বিধান কাছাকাছিভাবে প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও আয়াতের ক্রিয়া ও বাক্যাংশের অবস্থান বদলে যাচ্ছে। ধর্মীয় নির্দেশের মোটামুটি মিল এখানে শব্দের অভিন্নতা প্রতিষ্ঠা করে না।

মুসহাফের নামে সংরক্ষিত পাঠটির বিশেষ গুরুত্ব এর বস্তুগত উল্লেখে। তাবারি শুধু কোনো বক্তার তাৎক্ষণিক অর্থবর্ণনা উদ্ধৃত করেননি; “ফি মুসহাফি ইবনি মাসউদ”—ইবনে মাসউদের মুসহাফে—কথাটি ব্যবহার করেছেন। ওই সাক্ষ্য অনুযায়ী বিকল্প ক্রমটি লিখিত পাঠের পরিচয়ে প্রচলিত ছিল। পরের ইবনে আব্বাস-বর্ণনায় প্রচলিত শব্দের বিরুদ্ধে অভিযোগও রয়েছে। ফলে একটি সূত্র লিখিত বিকল্পের খবর দেয়, আরেকটি একই রূপকে সরাসরি পাঠ হিসেবে উপস্থাপন করে। এই দুই বক্তব্যের পরবর্তী ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তাদের সংরক্ষিত ভাষায় বিকল্প পাঠের চরিত্র সুস্পষ্ট।

ইবরাহিমের নামে মুসহাফের বিবরণ এবং সাঈদের মাধ্যমে ইবনে আব্বাসের পাঠ—তাবারি আলাদা সনদে লিপিবদ্ধ করেছেন। একই বক্তব্য পরে অন্য তাফসিরে উদ্ধৃত হলে তা নতুন একটি মুসহাফের স্বাধীন সাক্ষ্য হয়ে যায় না; তবে তাবারির মূল বিবরণে যে দুটি পৃথক সূত্রের দাবি রয়েছে, সেগুলিও এক করে ফেলা যায় না। পাঠের নির্দিষ্ট ফল হলো: গৃহীত শব্দক্রমের পাশাপাশি সালামকে আগে এনে অনুমতি চাওয়াকে পরে রাখার একটি লিখিত বিকল্পের ঐতিহ্য রয়েছে।


বাকারা ২:২৩৮-এর তিন পাঠ: মধ্যবর্তী নামাজ, আসরের নামাজ ও উভয়ের উল্লেখ

বাকারা ২:২৩৮-এ গৃহীত পাঠে সব নামাজ এবং বিশেষভাবে “আস-সালাতুল উসতা”—মধ্যবর্তী নামাজ—রক্ষা করার নির্দেশ রয়েছে। সহিহ মুসলিমের দুটি পৃথক বর্ণনা পাশাপাশি রাখলে এই জায়গায় তিনটি শব্দরূপ পাওয়া যায়। একটি রূপে শুধু মধ্যবর্তী নামাজের বিশেষ উল্লেখ আছে; আরেকটিতে তার জায়গায় আসরের নামাজ; তৃতীয়টিতে মধ্যবর্তী নামাজ এবং আসরের নামাজ দুটিই রয়েছে। তৃতীয় রূপটির ক্ষেত্রে আয়েশা নিজের মুসহাফ লেখানোর সময় বাড়তি কথাগুলো লিখিয়ে দিয়েছেন এবং মুহাম্মাদের কাছ থেকে শুনেছেন বলে জানিয়েছেন।

বারা ইবনে আযিবের বর্ণনায় প্রথমে নাজিল হওয়া রূপটি ছিল “হাফিযু আলাস সালাওয়াতি ওয়া সালাতিল আসর”—নামাজগুলো এবং আসরের নামাজ রক্ষা করো। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা কিছুদিন সেটি পড়েছেন; তারপর আল্লাহ সেটি রহিত করেছেন এবং “আসরের নামাজ”-এর জায়গায় “মধ্যবর্তী নামাজ” এসেছে। মুসলিম পরবর্তী সূত্রেও “নবির সঙ্গে কিছু সময় পড়েছি” কথাটি সংরক্ষণ করেছেন। এখানে শব্দ প্রতিস্থাপনের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অবস্থা বর্ণনার মধ্যেই আলাদা করা হয়েছে। [904]

حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ الْحَنْظَلِيُّ ، أَخْبَرَنَا يَحْيَى بْنُ آدَمَ ، حَدَّثَنَا الْفُضَيْلُ بْنُ مَرْزُوقٍ ، عَنْ شَقِيقِ بْنِ عُقْبَةَ ، عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ ، قَالَ نَزَلَتْ هَذِهِ الآيَةُ حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَصَلاَةِ الْعَصْرِ ‏.‏ فَقَرَأْنَاهَا مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ نَسَخَهَا اللَّهُ فَنَزَلَتْ ‏‏{‏ حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلاَةِ الْوُسْطَى‏}‏ فَقَالَ رَجُلٌ كَانَ جَالِسًا عِنْدَ شَقِيقٍ لَهُ هِيَ إِذًا صَلاَةُ الْعَصْرِ ‏.‏ فَقَالَ الْبَرَاءُ قَدْ أَخْبَرْتُكَ كَيْفَ نَزَلَتْ وَكَيْفَ نَسَخَهَا اللَّهُ ‏.‏ وَاللَّهُ أَعْلَمُ ‏.‏

قَالَ مُسْلِمٌ وَرَوَاهُ الأَشْجَعِيُّ عَنْ سُفْيَانَ الثَّوْرِيِّ ، عَنِ الأَسْوَدِ بْنِ قَيْسٍ ، عَنْ شَقِيقِ بْنِ عُقْبَةَ ، عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ ، قَالَ قَرَأْنَاهَا مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم زَمَانًا ‏.‏ بِمِثْلِ حَدِيثِ فُضَيْلِ بْنِ مَرْزُوقٍ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: ইসহাক ইবনে ইবরাহিম হানযালি আমাদের বর্ণনা করেছেন। ইয়াহইয়া ইবনে আদম আমাদের জানিয়েছেন। ফুদাইল ইবনে মারযুক আমাদের বর্ণনা করেছেন, শাকিক ইবনে উকবা থেকে, তিনি বারা ইবনে আযিব থেকে। বারা বলেন: এই আয়াত নাজিল হয়েছিল, “নামাজগুলো এবং আসরের নামাজ রক্ষা করো।” আল্লাহ যত দিন চেয়েছেন, আমরা তা পড়েছি। তারপর আল্লাহ তা রহিত করলেন এবং নাজিল হলো, “নামাজগুলো এবং মধ্যবর্তী নামাজ রক্ষা করো।” শাকিকের কাছে বসা এক ব্যক্তি তাঁকে বললেন, তাহলে সেটি আসরের নামাজই। বারা বললেন, কীভাবে নাজিল হয়েছে এবং কীভাবে আল্লাহ তা রহিত করেছেন, তা আমি তোমাকে জানিয়েছি। আল্লাহই ভালো জানেন।

মুসলিম বলেন: আশজাঈও এটি সুফিয়ান সাওরির সূত্রে বর্ণনা করেছেন; তিনি আসওয়াদ ইবনে কায়স থেকে, তিনি শাকিক ইবনে উকবা থেকে, তিনি বারা ইবনে আযিব থেকে। বারা বলেন, আমরা নবির সঙ্গে কিছু সময় এই পাঠ পড়েছি। ফুদাইল ইবনে মারযুকের হাদিসের অনুরূপ।

বারার ভাষ্যে একটি নির্দিষ্ট নামাজের নাম বদলে তুলনামূলক একটি পরিচয় এসেছে। “আসর” একটি পরিচিত নাম; “মধ্যবর্তী” পরিচয়টি কোন নামাজকে নির্দেশ করে, তা নির্ধারণ করতে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়। ওই বর্ণনার শ্রোতা তাই সঙ্গে সঙ্গে মধ্যবর্তী নামাজকে আসর বলে সিদ্ধান্ত টেনেছিলেন। বারা উত্তরে আবার নাজিল হওয়া ও রহিত হওয়ার ঘটনাই উল্লেখ করেছেন। তাঁর উত্তর আগের ও পরের শব্দরূপের পার্থক্য মুছে দেয় না; তিনি যে ইতিহাসের খবর দিচ্ছেন, তার বিষয়ই হলো একটি শব্দগুচ্ছের পরিবর্তে আরেকটি শব্দগুচ্ছের নাজিল হওয়া।

আয়েশা ও হাফসার মুসহাফে “মধ্যবর্তী নামাজ” এবং “আসরের নামাজ” একসঙ্গে লিখিয়ে দেওয়ার সংরক্ষিত বিবরণ তৃতীয় একটি রূপ দেয়। বারার বর্ণনায় আসরের উল্লেখ বদলে মধ্যবর্তী নামাজ এসেছে; তাঁদের মুসহাফের বিবরণে দুই উল্লেখই পাশাপাশি রয়েছে। এই দুটি ঘটনার ফল তাই আলাদা। প্রথমটিতে একটি পরিচয়ের জায়গায় অন্য পরিচয় স্থাপিত হয়েছে, আর দ্বিতীয়টিতে অতিরিক্ত পরিচয় সংযোজকসহ লেখা হয়েছে। আয়েশার মুহাম্মাদের কাছ থেকে শোনার দাবি এই যৌথ রূপটিরও নবিসূত্রে প্রাপ্ত পাঠ হওয়ার দাবি প্রতিষ্ঠা করে।

সূত্রে সংরক্ষিত রূপবিশেষভাবে উল্লেখিত নামাজপাঠের শব্দগত অবস্থা
গৃহীত বাকারা ২:২৩৮: وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَىমধ্যবর্তী নামাজআসর নামটি আলাদাভাবে নেই
বারার পূর্ববর্তী পাঠ: وَصَلَاةِ الْعَصْرِআসরের নামাজমধ্যবর্তী নামাজের জায়গায় আসরের নাম
আয়েশার লিখিয়ে দেওয়া পাঠ: وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَصَلَاةِ الْعَصْرِমধ্যবর্তী নামাজ এবং আসরের নামাজদুটি উল্লেখই আছে; মাঝে সংযোজক ওয়াও

“মধ্যবর্তী নামাজ বলতে আসর বোঝায়”—এটি একটি ব্যাখ্যাগত সিদ্ধান্ত। আয়েশার উদ্ধৃত পাঠের লিখিত গঠন আরও নির্দিষ্ট: সেখানে প্রথম উল্লেখের পরে সংযোজক “ওয়াও” দিয়ে দ্বিতীয় উল্লেখ যুক্ত হয়েছে। একই নামাজকে দুটি পরিচয়ে জোর দেওয়া হয়েছে কি না, অথবা নামাজদুটি পৃথক—এসবের আলোচনা ওই ভাষার ব্যাখ্যা নিয়ে। মূল শব্দগত তথ্য হলো, গৃহীত পাঠে “ওয়া সালাতিল আসর” নেই এবং আয়েশার লিখিয়ে দেওয়া পাঠে আছে। সেই বাড়তি অংশকে অর্থের ব্যাখ্যা বলে গ্রহণ করলেও তাঁর বর্ণনায় সেটি মুসহাফে লিখিয়ে দেওয়ার ঘটনা এবং মুহাম্মাদের কাছ থেকে শোনার দাবি রয়ে যায়।

এই তিনটি রূপকে একসঙ্গে রাখলে পাঠের পরিবর্তন ও পাঠের বহুত্বের পার্থক্যও ধরা পড়ে। বারার বর্ণনা নিজেই আগে–পরে দুটি পাঠের ইতিহাস ঘোষণা করছে। আয়েশার বর্ণনা ব্যক্তিগত মুসহাফে দুই উল্লেখ একসঙ্গে লেখানোর সাক্ষ্য দিচ্ছে। তিনটিকে একটি অভিন্ন বাক্য ধরে নিলে প্রথম বর্ণনার প্রতিস্থাপন এবং দ্বিতীয় বর্ণনার সংযোজন—উভয় তথ্যই হারিয়ে যায়। নামাজ আদায়ের মূল নির্দেশ তিন রূপেই বজায় আছে; কিন্তু কোন নামাজের নাম ঠিক কোন ভাষায় আলাদা করে উচ্চারিত হবে, সেই প্রশ্নে পাঠ এক নয়।


লায়ল ৯২:৩-এ আবু দারদা–ইবনে মাসউদের পাঠ এবং প্রচলিত অংশ পড়তে অস্বীকৃতি

সূরা লায়লের তৃতীয় আয়াতের গৃহীত পাঠ হলো “ওয়া মা খালাকায যাকারা ওয়াল উনসা”—আর যিনি পুরুষ ও নারী সৃষ্টি করেছেন, তাঁর শপথ। বুখারিতে আবু দারদা ও ইবনে মাসউদের পাঠপরম্পরার যে সাক্ষাৎ বর্ণিত হয়েছে, সেখানে আয়াতের রূপ “ওয়ায যাকারি ওয়াল উনসা”—পুরুষ ও নারীর শপথ। “ওয়া মা খালাকা” অংশটি ওই পাঠে নেই। এই অনুপস্থিতি নিয়ে আবু দারদার অবস্থানও দ্ব্যর্থহীন: অন্যরা তাঁকে বাড়তি অংশসহ পড়াতে চাইছিল, কিন্তু তিনি তাঁদের অনুসরণ করবেন না বলে শপথ করেছেন।

ঘটনাটি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের সঙ্গী বা শিষ্যদের আবু দারদার কাছে আসার সূত্রে বর্ণিত। আবু দারদা প্রথমে তাঁদের মধ্যে কারা আবদুল্লাহর পাঠ অনুসরণ করেন এবং কে তা ভালোভাবে ধারণ করেছেন, তা জানতে চান। আলকামার দিকে নির্দেশ করা হলে তিনি নির্দিষ্ট সূরার পাঠ জিজ্ঞেস করেন। আলকামা যে রূপটি বলেন, আবু দারদা সেটির সমর্থনে মুহাম্মাদকে সরাসরি শোনার সাক্ষ্য দেন। এরপর গৃহীত দীর্ঘতর রূপ পড়ার চাপের বিরুদ্ধে নিজের অস্বীকৃতি ঘোষণা করেন। [905]

حَدَّثَنَا عُمَرُ ، حَدَّثَنَا أَبِي ، حَدَّثَنَا الأَعْمَشُ ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ ، قَالَ قَدِمَ أَصْحَابُ عَبْدِ اللَّهِ عَلَى أَبِي الدَّرْدَاءِ فَطَلَبَهُمْ فَوَجَدَهُمْ فَقَالَ أَيُّكُمْ يَقْرَأُ عَلَى قِرَاءَةِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ كُلُّنَا‏.‏ قَالَ فَأَيُّكُمْ يَحْفَظُ وَأَشَارُوا إِلَى عَلْقَمَةَ ‏.‏ قَالَ كَيْفَ سَمِعْتَهُ يَقْرَأُ ‏‏{‏وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشَى‏}‏‏.‏ قَالَ عَلْقَمَةُ ‏{‏وَالذَّكَرِ وَالأُنْثَى‏}‏‏.‏ قَالَ أَشْهَدُ أَنِّي سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقْرَأُ هَكَذَا، وَهَؤُلاَءِ يُرِيدُونِي عَلَى أَنْ أَقْرَأَ ‏‏{‏وَمَا خَلَقَ الذَّكَرَ وَالأُنْثَى‏}‏ وَاللَّهِ لاَ أُتَابِعُهُمْ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: উমর আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমার বাবা আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আ’মাশ আমাদের বর্ণনা করেছেন, ইবরাহিম থেকে। ইবরাহিম বলেন: আবদুল্লাহর সঙ্গীরা আবু দারদার কাছে এলেন। তিনি তাঁদের খুঁজে বের করলেন এবং বললেন, তোমাদের মধ্যে কারা আবদুল্লাহর পাঠ অনুযায়ী পড়ে? তাঁরা বললেন, আমরা সবাই। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে কে তা সংরক্ষণ করেছে? তাঁরা আলকামার দিকে ইশারা করলেন। তিনি বললেন, “ওয়াল লাইলি ইযা ইয়াগশা” তাঁকে কীভাবে পড়তে শুনেছ? আলকামা বললেন, “ওয়ায যাকারি ওয়াল উনসা”—পুরুষ ও নারীর শপথ। আবু দারদা বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে নবিকে এভাবেই পড়তে শুনেছি। আর এরা আমাকে “ওয়া মা খালাকায যাকারা ওয়াল উনসা”—যিনি পুরুষ ও নারী সৃষ্টি করেছেন—পড়তে বাধ্য করতে চায়। আল্লাহর শপথ, আমি তাদের অনুসরণ করব না।

পাঠআরবি রূপবাক্যের প্রত্যক্ষ বিষয়
গৃহীত লায়ল ৯২:৩وَمَا خَلَقَ الذَّكَرَ وَالْأُنْثَىপুরুষ ও নারীর সৃষ্টিকর্তা; “মা” সম্পর্কে প্রচলিত বিকল্প ব্যাখ্যায় সৃষ্টির কাজ
আলকামার বর্ণিত ইবনে মাসউদের পাঠ; আবু দারদার সমর্থিত রূপوَالذَّكَرِ وَالْأُنْثَىসরাসরি পুরুষ ও নারী
আবু দারদার ঘোষিত অবস্থানوَاللَّهِ لَا أُتَابِعُهُمْদীর্ঘতর রূপ গ্রহণে শপথসহ অস্বীকৃতি

এই পার্থক্যে শপথের বাক্যের বিষয় বদলে যায়। গৃহীত রূপে সৃষ্টির ক্রিয়া উপস্থিত; ছোট রূপে পুরুষ ও নারীই সরাসরি শপথের বিষয়। দীর্ঘতর রূপের “মা” দিয়ে সৃষ্টিকর্তা বোঝানো হবে, নাকি সৃষ্টির কাজ, তা নিয়ে ভাষাগত ব্যাখ্যার জায়গা আছে। ছোট রূপে ওই অব্যয় ও ক্রিয়া দুটিই অনুপস্থিত। ফলে উভয় পাঠের ধর্মীয় অর্থ কাছাকাছি করে ব্যাখ্যা করা হলেও তাদের বাক্যগঠন অভিন্ন হয় না। একটি ক্রিয়াসহ শব্দগুচ্ছের থাকা বা না-থাকা উচ্চারণের টান কিংবা স্বরাঘাতের পার্থক্যের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের পাঠভেদ।

আবু দারদার প্রতিক্রিয়া এই বর্ণনার সবচেয়ে তীক্ষ্ণ অংশ। তিনি একই পাঠের দুটি সমানভাবে গ্রহণযোগ্য রূপের মধ্যে নিজের পছন্দ জানাননি। তাঁকে যে রূপে পড়তে বলা হচ্ছিল, সেটি গ্রহণ করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং নিজের রূপটির পক্ষে মুহাম্মাদের কণ্ঠে শোনার দাবি করেছেন। আলকামা সেই একই রূপ ইবনে মাসউদের কাছ থেকে শুনেছেন বলে জানিয়েছেন। বর্ণনাটি তাই দুটি সাহাবিকেন্দ্রিক পাঠসূত্রের মিল এবং তাঁদের পরিচিত পরিবেশে ভিন্ন একটি রূপ গ্রহণের চাপ—দুটির খবরই দেয়।

আবু দারদার বক্তব্যে পাঠের কর্তৃত্বের ভিত্তি হলো নিজের শ্রবণস্মৃতি। তাঁকে দীর্ঘতর রূপে পড়াতে চাওয়া লোকদের সঙ্গে বিরোধে তিনি নিজের পাঠকে মুহাম্মাদের পাঠ বলে প্রতিষ্ঠা করেছেন। গৃহীত মুসহাফে দীর্ঘতর রূপটির অবস্থান এবং এই সাহাবির মুখে তার প্রত্যাখ্যান—দুটি তথ্য একসঙ্গেই সংরক্ষিত রয়েছে। পরবর্তী মান্যতা এখানে পূর্ববর্তী সর্বসম্মতির সাক্ষ্য দেয় না। বুখারির সংরক্ষিত দৃশ্যটিতে গ্রহণযোগ্য শব্দ নির্ধারণ নিয়ে স্পষ্ট মতবিরোধ ও সেই মতবিরোধে অটল থাকার শপথ আছে।


তাওবা ৯:১০০-এর “ওয়াও” নিয়ে উমর, যায়েদ ও উবাইয়ের বিরোধ

তাওবার ১০০ নম্বর আয়াতে মুহাজির, আনসার এবং তাঁদের সৎভাবে অনুসরণকারীদের কথা রয়েছে। তাবারিতে সংরক্ষিত এক বর্ণনায় উমর এই আয়াতের “ওয়াল্লাযিনা”—এবং যারা—অংশের “ওয়াও” ছাড়া পড়েছিলেন এবং “আনসার” শব্দের বিভক্তিও গৃহীত রূপ থেকে আলাদা করেছিলেন। যায়েদ ইবনে সাবিত তাঁকে সংযোজকসহ পাঠটি জানান। উমর নিজের রূপটি আবার বললে যায়েদ “আমিরুল মুমিনিন ভালো জানেন” বলে সরে যান। পরে উবাই ইবনে কাবকে ডাকা হলে তিনি যায়েদের বলা সংযোজকসহ রূপটিই জানান এবং উমর তাঁকে অনুসরণ করার কথা বলেন। [906]

17118- حدثني به أحمد بن يوسف قال، حدثنا القاسم قال، حدثنا حجاج, عن هارون, عن حبيب بن الشهيد, وعن ابن عامر الأنصاري: أن عمر بن الخطاب قرأ: (وَالسَّابِقُونَ الأوَّلُونَ مِنَ المُهَاجِرِينَ وَالأنْصَارُ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ)، فرفع ” الأنصار ” ولم يلحق الواو في ” الذين “, فقال له زيد بن ثابت ” والذين اتبعوهم بإحسان “, فقال عمر: ” الذين اتبعوهم بإحسان “، فقال زيد: أمير المؤمنين أعلم! فقال عمر: ائتوني بأبيّ بن كعب. فأتاه، فسأله عن ذلك, فقال أبي: (والذين اتبعوهم بإحسان)، فقال عمر: إذًا نتابع أبَيًّا.

বাংলা অনুবাদ: ১৭১১৮—আহমদ ইবনে ইউসুফ আমাকে এটি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, কাসিম আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হাজ্জাজ আমাদের বর্ণনা করেছেন, হারুন থেকে, তিনি হাবিব ইবনে শহিদ থেকে এবং ইবনে আমির আনসারি থেকে: উমর ইবনুল খাত্তাব পড়েছিলেন, “ওয়াস সাবিকুনাল আওয়ালুনা মিনাল মুহাজিরিনা ওয়াল আনসারুল্লাযিনাত তাবাঊহুম বি ইহসান।” তিনি “আনসার” শব্দে রফ বা পেশ দিয়েছিলেন এবং “আল্লাযিনা”-র আগে ওয়াও যুক্ত করেননি। যায়েদ ইবনে সাবিত তাঁকে বললেন, “ওয়াল্লাযিনাত তাবাঊহুম বি ইহসান”—এবং যারা সৎভাবে তাঁদের অনুসরণ করেছে। উমর বললেন, “আল্লাযিনাত তাবাঊহুম বি ইহসান”—যারা সৎভাবে তাঁদের অনুসরণ করেছে। যায়েদ বললেন, আমিরুল মুমিনিন ভালো জানেন। উমর বললেন, আমার কাছে উবাই ইবনে কাবকে নিয়ে এসো।

উবাই তাঁর কাছে এলেন। তিনি তাঁকে বিষয়টি জিজ্ঞেস করলেন। উবাই বললেন, “ওয়াল্লাযিনাত তাবাঊহুম বি ইহসান।” উমর বললেন, তাহলে আমরা উবাইকে অনুসরণ করব।

বিষয়উমরের নামে বর্ণিত রূপযায়েদ ও উবাইয়ের সমর্থিত গৃহীত রূপ
আনসার শব্দের বিভক্তিوَالْأَنْصَارُ — পেশসহوَالْأَنْصَارِ — জেরসহ
অনুসরণকারীদের পরিচয়ের আগে সংযোজকالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ — শুরুতে ওয়াও নেইوَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ — শুরুতে ওয়াও আছে
বাক্যাংশের সম্পর্কআনসার শব্দের সঙ্গে অনুসরণকারীদের পরিচয় যুক্তমুহাজির ও আনসারের অগ্রগামীদের পরে অনুসরণকারীরা স্বতন্ত্রভাবে যুক্ত
বর্ণনার শেষ সিদ্ধান্তউমর প্রথমে নিজের রূপ পুনরুচ্চারণ করেনউবাইয়ের সাক্ষ্যের পরে তাঁর পাঠ অনুসরণ করেন

এখানে একটি অক্ষরের উপস্থিতির সঙ্গে বাক্যে কারা পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে স্থান পাচ্ছেন, সেই প্রশ্ন যুক্ত। গৃহীত পাঠে “মিনাল মুহাজিরিনা ওয়াল আনসার”—মুহাজির ও আনসারদের মধ্যকার—কথাটি উভয় গোষ্ঠীর অগ্রগামীদের নির্দেশ করে। এরপর “এবং যারা সৎভাবে তাঁদের অনুসরণ করেছে” বলে আরেকটি গোষ্ঠী যুক্ত হয়। উমরের নামে বর্ণিত বিভক্তি ও সংযোজকবিহীন রূপে এই সম্পর্ক বদলে যায়। ফলে বিরোধটিকে কেবল অক্ষরসংখ্যার ক্ষুদ্র পার্থক্য বলে দেখলে বাক্যে সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানের পরিবর্তনটি বাদ পড়ে যায়।

একই আয়াত নিয়ে মুহাম্মাদ ইবনে কাবের সূত্রে তাবারির আরেক বর্ণনায় মর্যাদার প্রশ্নটি সরাসরি উচ্চারিত হয়েছে। একজনকে আয়াতটি পড়তে শুনে উমর তাকে উবাইয়ের কাছে নিয়ে যান এবং উবাই নিজে মুহাম্মাদের কাছ থেকে এই পাঠ শুনেছেন কি না, তা জিজ্ঞেস করেন। উবাই হ্যাঁ বলার পরে উমর জানান, তিনি ভেবেছিলেন তাঁদের এমন উচ্চতায় তোলা হয়েছে, যেখানে পরবর্তীদের কেউ পৌঁছাতে পারবে না। উত্তরে উবাই পরবর্তী মুমিনদের স্বীকৃতির পক্ষে আরও তিনটি আয়াত উদ্ধৃত করেন। [907]

17117- حدثنا أبو كريب قال, حدثنا الحسن بن عطية قال، حدثنا أبو معشر, عن محمد بن كعب القرظي قال: مرّ عمر بن الخطاب برجل يقرأ: (والسابقون الأولون من المهاجرين والأنصار)، حتى بلغ: (ورضوا عنه)، قال: وأخذ عمر بيده فقال: من أقرأك هذا؟ قال: أبي بن كعب ! فقال: لا تفارقني حتى أذهب بك إليه ! فلما جاءه قال عمر: أنت أقرأت هذا هذه الآية هكذا؟ قال: نعم! قال: أنت سمعتها من رسول الله صلى الله عليه وسلم؟ قال: نعم! قال: لقد كنت أظن أنّا رُفِعنا رَفْعة لا يبلغها أحدٌ بعدنا! فقال أبيّ: بلى، تصديق هذه الآية في أول سورة الجمعة: وَآخَرِينَ مِنْهُمْ لَمَّا يَلْحَقُوا بِهِمْ ، إلى: وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ ، وفي سورة الحشر: وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالإِيمَانِ ، وفي الأنفال: وَالَّذِينَ آمَنُوا مِنْ بَعْدُ وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا مَعَكُمْ فَأُولَئِكَ مِنْكُمْ ، إلى آخر الآية.

বাংলা অনুবাদ: ১৭১১৭—আবু কুরাইব আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হাসান ইবনে আতিয়্যা আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আবু মা’শার আমাদের বর্ণনা করেছেন, মুহাম্মাদ ইবনে কাব কুরাযি থেকে। তিনি বলেন: উমর ইবনুল খাত্তাব এক ব্যক্তিকে এই আয়াত পড়তে পড়তে অতিক্রম করলেন, “মুহাজির ও আনসারদের অগ্রবর্তী প্রথম ব্যক্তিরা”—পড়তে পড়তে সে “এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট” পর্যন্ত পৌঁছাল। উমর তার হাত ধরে বললেন, তোমাকে এভাবে কে পড়িয়েছে? সে বলল, উবাই ইবনে কাব। উমর বললেন, তাঁর কাছে তোমাকে নিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তুমি আমার কাছ থেকে আলাদা হবে না। তাঁর কাছে এসে উমর বললেন, তুমি কি এই ব্যক্তিকে আয়াতটি এভাবেই পড়িয়েছ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। উমর বললেন, তুমি কি নিজে আল্লাহর রাসুলের কাছ থেকে শুনেছ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। উমর বললেন, আমি তো ভেবেছিলাম আমাদের এমন উচ্চ মর্যাদায় তোলা হয়েছে, যেখানে আমাদের পরে আর কেউ পৌঁছাতে পারবে না। উবাই বললেন, অবশ্যই; এই আয়াতের সমর্থন জুমা সূরার শুরুতে আছে: “আর তাদের মধ্যকার অন্যদের জন্যও, যারা এখনো তাদের সঙ্গে যোগ দেয়নি”—“আর তিনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” পর্যন্ত। হাশর সূরায় আছে: “আর যারা তাদের পরে এসেছে, তারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের এবং ঈমানে অগ্রবর্তী আমাদের ভাইদের ক্ষমা করো।” আনফালে আছে: “আর যারা পরে বিশ্বাস করেছে, হিজরত করেছে এবং তোমাদের সঙ্গে জিহাদ করেছে, তারাও তোমাদের অন্তর্ভুক্ত”—আয়াতের শেষ পর্যন্ত।

এই বর্ণনায় শব্দের বিরোধ এবং অগ্রবর্তীদের একচ্ছত্র মর্যাদার ধারণা পাশাপাশি উপস্থিত। উমরের বিস্ময় কেবল একটি ধ্বনি সম্পর্কে ছিল—এমন ছবি বর্ণনাটি দেয় না; তাঁর নিজের ঘোষিত ধারণাই পরবর্তীদের মর্যাদা অর্জনের সম্ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত। উবাইও উত্তরে উচ্চারণের নিয়ম শেখাননি। তিনি পরবর্তী মুমিনদের স্থান আছে—এই অর্থ প্রতিষ্ঠা করতে অন্য আয়াত এনেছেন। ফলে পাঠের সংযোজক নিয়ে বিরোধটি ধর্মীয় সমাজে কারা প্রতিশ্রুত পুরস্কার ও স্বীকৃতির অন্তর্ভুক্ত, সেই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত ছিল।

যায়েদের “আমিরুল মুমিনিন ভালো জানেন” কথাটিও ঘটনাটির রাজনৈতিক মাত্রা প্রকাশ করে। আয়াতের নির্দিষ্ট শব্দ জানিয়ে আপত্তি তোলার পর তিনি খলিফার জ্ঞানের প্রতি আনুগত্যসূচক বাক্য বলেছেন। তারপর উবাইয়ের সাক্ষ্য চাওয়া হয়েছে এবং শেষ সিদ্ধান্ত তাঁর পাঠের পক্ষে গেছে। অর্থাৎ বর্ণিত প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত স্মৃতি, ধর্মীয় পাঠজ্ঞানের কর্তৃত্ব এবং শাসকের অবস্থান একই আলোচনায় কাজ করছে। নির্ধারিত পাঠ নিয়ে মতবিরোধ নিষ্পত্তির এই দৃশ্যে মানবিক সাক্ষ্য ও পারস্পরিক সংশোধনই দৃশ্যমান পদ্ধতি।

তাবারি নিজের সিদ্ধান্তে “আনসার” শব্দের জের এবং “ওয়াল্লাযিনা”-র ওয়াও গ্রহণ করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় অনুসরণকারীরা মুহাজির ও আনসারদের থেকে আলাদা গোষ্ঠী; আর সংযোজকসহ রূপটি মুসলিমদের মুসহাফগুলোতে রয়েছে। এই পরবর্তী মান্য অবস্থান উমরের নামে সংরক্ষিত ভিন্ন পাঠের বিপরীতে দাঁড়ায়। একই ১০০ নম্বর আয়াতে আঞ্চলিক কপির আরেক পার্থক্য রয়েছে “তাজরি তাহতাহা” ও “তাজরি মিন তাহতিহা”-য়; সেটি অন্য স্থানের শব্দভেদ। উমর–উবাইয়ের এই বিরোধের বিষয় ছিল তার আগের গোষ্ঠীবাচক অংশের ওয়াও ও বিভক্তি। [908]

قال أبو جعفر: والقراءة التي لا أستجيز غيرها، الخفضُ في (الأنْصَارِ), لإجماع الحجة من القرأة عليه, وأن السابق كان من الفريقين جميعًا، من المهاجرين والأنصار، وإنما قصد الخبر عن السابق من الفريقين، دون الخبر عن الجميع = وإلحاق ” الواو ” في ” الذين اتبعوهم بإحسان “, (8) لأن ذلك كذلك في مصاحف المسلمين جميعًا, على أن ” التابعين بإحسان “، غير ” المهاجرين والأنصار “، وأما ” السابقون “، فإنهم مرفوعون بالعائد من ذكرهم في قوله: (رضي الله عنهم ورضوا عنه).

বাংলা অনুবাদ: আবু জাফর বলেন: যে পাঠ ছাড়া অন্যটি আমি অনুমোদন করি না তা হলো “আনসার” শব্দে জের দেওয়া; কারণ প্রামাণ্য পাঠকারীরা এ বিষয়ে একমত এবং অগ্রগামীরা মুহাজির ও আনসার—উভয় গোষ্ঠী থেকেই ছিলেন। এখানে উভয় গোষ্ঠীর অগ্রগামীদের সংবাদ দেওয়া উদ্দেশ্য, সবাই সম্পর্কে সংবাদ দেওয়া নয়। আর “যারা সৎভাবে তাঁদের অনুসরণ করেছে”-র আগে ওয়াও যুক্ত করা; কারণ মুসলিমদের সব মুসহাফে এভাবেই আছে এবং সৎভাবে অনুসরণকারীরা মুহাজির ও আনসার থেকে আলাদা। “আস-সাবিকুন” শব্দটি রফ অবস্থায় আছে “আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তাঁরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট” কথায় তাঁদের প্রতি ফিরে আসা সর্বনামের কারণে।


মায়িদা ৫:৮৯-এ “মুতাতাবিআত” এবং কাফফারার রোজা পরপর রাখার বিধান

মায়িদা ৫:৮৯-এ শপথভঙ্গের কাফফারা হিসেবে খাবার দেওয়া, পোশাক দেওয়া বা দাসমুক্তির বিকল্পের পরে অসামর্থ্যের ক্ষেত্রে তিন দিন রোজার নির্দেশ রয়েছে। গৃহীত পাঠে রোজার দিনসংখ্যা তিন; দিনগুলো অবশ্যই পরপর হতে হবে—এমন কোনো বিশেষণ সেখানে নেই। ইবনে মাসউদের নামে সংরক্ষিত পাঠে এই জায়গায় রয়েছে “মুতাতাবিআত”—পরপর। একটি শব্দ যোগ হওয়ায় তিনটি রোজা আদায়ের নির্দেশের সঙ্গে ধারাবাহিকতার বাধ্যতামূলক শর্তও তৈরি হয়। তাই এই পাঠভেদের প্রভাব সরাসরি বিধানের প্রয়োগে পৌঁছেছে।

কুরতুবি আয়াতটির ব্যাখ্যায় ইবনে মাসউদের এই বাড়তি পাঠ এবং তা থেকে ধারাবাহিক রোজার শর্ত গ্রহণকারী ফকিহদের মত স্পষ্টভাবে নথিবদ্ধ করেছেন। আবু হানিফা ও সুফিয়ান সাওরি এবং শাফিঈর একটি মত এই পাঠের ভিত্তিতে অবাধ নির্দেশকে সীমিত করে। মালিক ও শাফিঈর অন্য মত বিচ্ছিন্নভাবে রোজা রাখাকে যথেষ্ট মনে করে, কারণ তাদের হিসাবে ধারাবাহিকতা বাধ্যতামূলক করার গ্রহণযোগ্য দলিল নেই। একই আয়াতের পাঠভেদ এখানে দুই ধরনের বাস্তব বিধানের ভিত্তি হয়েছে। [909]

الثانية والأربعون : قوله تعالى : فصيام ثلاثة أيام قرأها ابن مسعود ( متتابعات ) فيقيد بها المطلق ; وبه قال أبو حنيفة والثوري ، وهو أحد قولي الشافعي واختاره المزني قياسا على الصوم في كفارة الظهار ، واعتبارا بقراءة عبد الله ، وقال مالك والشافعي في قوله الآخر : يجزئه التفريق ; لأن التتابع صفة لا تجب إلا بنص أو قياس على منصوص وقد عدما .

বাংলা অনুবাদ: বিয়াল্লিশতম আলোচনা: আল্লাহর বাণী, “তাহলে তিন দিন রোজা।” ইবনে মাসউদ এতে “মুতাতাবিআত”—পরপর—পড়েছেন। এর দ্বারা অবাধ নির্দেশকে সীমিত করা হয়। আবু হানিফা ও সাওরি এই মত নিয়েছেন। শাফিঈর দুটি মতের একটি এটি; মুযানিও এটি বেছে নিয়েছেন। যিহারের কাফফারার রোজার সঙ্গে তুলনা এবং আবদুল্লাহর পাঠ বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত। মালিক এবং শাফিঈ তাঁর অন্য মতে বলেছেন, বিচ্ছিন্নভাবে রোজা রাখলেও যথেষ্ট; কারণ ধারাবাহিকতা এমন একটি শর্ত, যা কেবল সুস্পষ্ট দলিল অথবা সুস্পষ্ট দলিলযুক্ত বিষয়ের সঙ্গে তুলনার মাধ্যমে বাধ্যতামূলক হয়, আর এখানে দুটিই অনুপস্থিত।

পাঠ বা ব্যাখ্যাতিন দিনের রোজার ভাষাবিধানগত ফল
গৃহীত মায়িদা ৫:৮৯فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍতিন দিন রোজার নির্দেশ; ধারাবাহিকতার বিশেষণ নেই
ইবনে মাসউদের নামে সংরক্ষিত পাঠفَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ مُتَتَابِعَاتٍতিন দিন পরপর রোজার শর্ত
অতিরিক্ত পাঠকে দলিল হিসেবে গ্রহণমুতাতাবিআত বিধানকে সীমিত করেবিরতি দিয়ে তিন দিন পূর্ণ করা যথেষ্ট নয়
বিচ্ছিন্ন রোজাকে যথেষ্ট বলা মতগৃহীত পাঠের অবাধ নির্দেশ বহালতিন দিনের মধ্যে বিরতি থাকলেও কাফফারা আদায় হয়

দিনসংখ্যা এবং দিনগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক দুটি স্বতন্ত্র শর্ত। “তিন দিন” পূর্ণ করতে এক দিন পরপর রোজা রাখা সম্ভব; “পরপর তিন দিন” পূর্ণ করতে সেই ব্যবধান চলে না। কুরতুবির আলোচনায় “মুতাতাবিআত” শব্দটি এই অতিরিক্ত বিধান আরোপ করছে বলেই মতবিরোধ হয়েছে। অতিরিক্ত পাঠ কেবল আয়াতের আগে থেকেই অনিবার্য কোনো অর্থের পুনরুক্তি হলে বিচ্ছিন্ন রোজার বৈধতা নিয়ে এই পার্থক্য তৈরি হতো না। সংরক্ষিত তর্কের বিষয়ই হলো, গৃহীত মুসহাফে অনুপস্থিত বিশেষণ কতখানি আইনগত কর্তৃত্ব বহন করবে।

এই শব্দের অপসারণ সম্পর্কে আরেক ধরনের ব্যাখ্যাও সংরক্ষিত আছে। ইসলামকিউএ আয়েশার নামে বর্ণিত “পরপর” শব্দটি পড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে ইবনে হাজর হাইতামির বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে। হাইতামি সেটিকে নাসখ বা রহিত হওয়ার প্রকাশ্য ইঙ্গিত বলেছেন এবং একই বর্ণনা থেকে ধারাবাহিকতা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। [910]

صح عن عائشة رضي الله عنها : ( كان فيما أنزل ثلاثة أيام متتابعات فسقطت متتابعات ) ، وهو ظاهر في النسخ ، خلافًا لمن جعله ظاهرًا في وجوب التتابع الذي اختاره كثيرون ، وأطالوا في الاستدلال له بما أطال الأولون في رده

বাংলা অনুবাদ: আয়েশা থেকে নির্ভরযোগ্যভাবে বর্ণিত হয়েছে: “নাজিল হওয়া কথার মধ্যে ছিল ‘তিন দিন পরপর’; পরে ‘পরপর’ কথাটি পড়ে যায়।” এটি রহিত হওয়ার প্রকাশ্য ইঙ্গিত; যারা একে ধারাবাহিকতা বাধ্যতামূলক হওয়ার প্রকাশ্য ইঙ্গিত করেছেন, তাঁদের বক্তব্যের বিপরীত। অনেকেই সেই বাধ্যতামূলকতার মত বেছে নিয়েছেন এবং তার পক্ষে দীর্ঘ যুক্তি দিয়েছেন; প্রথম পক্ষও সেগুলোর প্রত্যাখ্যানে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন।

এখানে অনুপস্থিত শব্দটির ধর্মীয় মর্যাদা নিয়ে দুটি আলাদা সিদ্ধান্ত দেখা যায়। কোনো ফকিহ সেটিকে গৃহীত কোরআনের বাইরে থেকেও ব্যবহারযোগ্য বিধানগত দলিল হিসেবে নিয়েছেন। আরেক ব্যাখ্যায় শব্দটির অপসারণই তার বাধ্যতামূলক শক্তি বিলোপের পক্ষে ব্যবহৃত হয়েছে। উভয় আলোচনার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট একটি পাঠগত পার্থক্য রয়েছে: গৃহীত আয়াতে শব্দটি নেই, সংশ্লিষ্ট সাহাবির পাঠে আছে। ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের পরবর্তী বিচার ওই পার্থক্যের ফল কী হবে তা ঠিক করছে।

একটি শব্দের এই ইতিহাস “একই অর্থ, শুধু ভিন্ন পাঠভঙ্গি” ধারণার সীমা দেখিয়ে দেয়। এক পক্ষের হিসাবে যে তিনটি রোজা যথেষ্ট, অন্য পক্ষের হিসাবে সেগুলো পরপর না হলে অপর্যাপ্ত। সাধারণ অনুসারীর ধর্মীয় দায় সম্পন্ন হয়েছে কি না—তার উত্তরও তাই বদলে যায়। কোরআনের বাইরে চিহ্নিত কোনো সাহাবি-পাঠকে বিধান প্রণয়নে কার্যকর রাখা হলে গৃহীত গ্রন্থের সীমানা এবং ধর্মীয় আইনের উপাদানের সীমানা আলাদা হয়ে দাঁড়ায়। “মুতাতাবিআত” সেই ব্যবধানের একটি নির্দিষ্ট, আইনগত ফলযুক্ত উদাহরণ।


উসমানি আঞ্চলিক কপিতে সম্পূর্ণ শব্দ বা অক্ষর উপস্থিতি–অনুপস্থিতির বিবরণ

উসমানের অনুমোদিত আঞ্চলিক কপিগুলোর মধ্যেও লিখিত পার্থক্যের বিবরণ রয়েছে। আবু আমর দানির “আল-মুকনি ফি রসমি মাসাহিফিল আমসার” গ্রন্থে এ জন্য স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদ আছে। পরিচ্ছেদের নামেই হিজাজ, ইরাক ও শামের মুসহাফগুলোকে মূল মুসহাফ থেকে অনুলিখিত বলা হয়েছে এবং তাদের পার্থক্যকে “যিয়াদা” ও “নুকসান”—বৃদ্ধি ও হ্রাস—হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকারি মান্যতার ভেতরেও একাধিক লিখিত রূপ থাকার তথ্যটি তাই গ্রন্থটির নিজস্ব বিষয়বস্তু। [911]

باب ذكر ما اختلفت فيه مصاحف أهل الحجاز والعراق والشام المنتسخة من الإمام بالزيادة والنقصان

বাংলা অনুবাদ: মূল মুসহাফ থেকে অনুলিখিত হিজাজ, ইরাক ও শামের অধিবাসীদের মুসহাফগুলোর মধ্যে বৃদ্ধি ও হ্রাসের যে পার্থক্য রয়েছে, তার বিবরণবিষয়ক পরিচ্ছেদ।

দানি শুরুতেই জানিয়েছেন, বিষয়গুলো তিনি একাধিক শিক্ষকের কাছ থেকে শুনেছেন। তাঁর প্রথম উদাহরণগুলোর একটি বাকারা ২:১১৬: শামের কপিতে “কালুত্তাখাযাল্লাহু ওয়ালাদা”—তারা বলেছে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন; অন্য কপিগুলোতে এর শুরুতে ওয়াওসহ “ওয়া কালু”। এটি স্বরচিহ্ন বসানোর পার্থক্য নয়; সংযোজক অক্ষরটি কোনো কপিতে লেখা আছে এবং কোনো কপিতে নেই। বিবরণের ভাষাও ঠিক সেই উপস্থিতি–অনুপস্থিতিই নির্দিষ্ট করেছে। [912]

وهذا الباب سمعناه من غير واحد من شيوخنا من ذلك في البقرة في مصاحف أهل الشام ” قالوا اتخّذ الله ولداً ” بغير واو قبل ” قالوا ” وفي سائر المصاحف ” وقالوا ” بالواو

বাংলা অনুবাদ: এই পরিচ্ছেদের বিষয় আমরা আমাদের একাধিক শিক্ষকের কাছ থেকে শুনেছি। এর একটি হলো বাকারা সূরায় শামের অধিবাসীদের মুসহাফে “কালুত্তাখাযাল্লাহু ওয়ালাদা”—“কালু”-র আগে ওয়াও ছাড়া; আর অন্য সব মুসহাফে “ওয়া কালু”—ওয়াওসহ।

মায়িদা ৫:৫৩-তেও আঞ্চলিকভাবে একই ধরনের সংযোজকভেদ পাওয়া যায়। দানির হিসাবে মদিনা, মক্কা ও শামের কপিতে “ইয়াকুলুল্লাযিনা আমানু”; কুফা, বসরা ও ইরাকের অন্য কপিতে “ওয়া ইয়াকুল”। অঞ্চলগুলোর নাম এবং কোন অক্ষর কোথায় আছে—দুটিই গ্রন্থে নির্দিষ্ট। ফলে “একই রসমের ওপর কেবল আলাদা স্বরচিহ্ন” দিয়ে এই সব পার্থক্য ব্যাখ্যা করা যায় না। স্বরচিহ্ন না থাকলেও ওয়াও লেখা ও না-লেখার পার্থক্য লিখিত গঠনে থাকে। [913]

وفي مصاحف أهل المدينة ومكة والشام ” يقول الذين ءامنوا ” بغير واو قبل ” يقول ” وفي مصاحف أهل الكوفة والبصرة وسائر العراق ” ويقول ” بالواو

বাংলা অনুবাদ: মদিনা, মক্কা ও শামের অধিবাসীদের মুসহাফে “ইয়াকুলুল্লাযিনা আমানু”—“ইয়াকুল”-এর আগে ওয়াও ছাড়া। আর কুফা, বসরা এবং ইরাকের অন্য অধিবাসীদের মুসহাফে “ওয়া ইয়াকুল”—ওয়াওসহ।

কিছু উদাহরণে অক্ষরের উপস্থিতি ক্রিয়ার রূপ বা সর্বনামের নির্দেশও বদলে দেয়। ইসরা ১৭:৯৩-এ “কালা” অর্থ সে বলল, আর “কুল” অর্থ বলো। কাহফ ১৮:৩৬-এ “মিনহুমা” দুটি বস্তুকে নির্দেশ করে, “মিনহা” একটি স্ত্রীলিঙ্গবাচক বস্তুকে। দানি প্রথম ক্ষেত্রে আলিফ এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে একটি অতিরিক্ত মিম চিহ্নিত করেছেন। তাঁর বিবরণে এগুলো একই শব্দের অলংকারমূলক বানান নয়; যথাক্রমে বিবৃত ক্রিয়া ও আদেশ, এবং দ্বিবচন ও একবচনের পার্থক্য। [914]

وفي سبحان في مصاحف أهل مكة والشام ” قال سبحان ربي هل كنت ” بألف وفي سائر المصاحف ” قل ” بغير ألف وفي الكهف في مصاحف أهل المدينة ومكة والشام ” خيرا منهما منقلبا ” بزيادة ميم بعد الهاء على التثنية وفي سائر مصاحف أهل العراق ” منها ” بغير ميم على التوحيد

বাংলা অনুবাদ: সুবহান তথা ইসরা সূরায় মক্কা ও শামের অধিবাসীদের মুসহাফে “কালা সুবহানা রাব্বি হাল কুনতু”—আলিফসহ। অন্য সব মুসহাফে “কুল”—আলিফ ছাড়া। কাহফ সূরায় মদিনা, মক্কা ও শামের অধিবাসীদের মুসহাফে “খাইরাম মিনহুমা মুনকালাবা”—দ্বিবচন বোঝাতে হা-এর পরে একটি অতিরিক্ত মিমসহ। আর ইরাকের অধিবাসীদের অন্য মুসহাফে “মিনহা”—একবচন বোঝাতে মিম ছাড়া।

স্থানএকটি আঞ্চলিক রূপঅন্য আঞ্চলিক রূপপার্থক্য
বাকারা ২:১১৬শাম: قَالُوا اتَّخَذَ اللَّهُ وَلَدًاঅন্য কপি: وَقَالُواশুরুতে ওয়াও নেই/আছে
মায়িদা ৫:৫৩মদিনা, মক্কা, শাম: يَقُولُ الَّذِينَ آمَنُواকুফা, বসরা ও অন্য ইরাকি কপি: وَيَقُولُশুরুতে ওয়াও নেই/আছে
তাওবা ৯:১০৭মদিনা, শাম: الَّذِينَ اتَّخَذُوا مَسْجِدًا ضِرَارًاঅন্য কপি: وَالَّذِينَশুরুতে ওয়াও নেই/আছে
ইসরা ১৭:৯৩মক্কা, শাম: قَالَ سُبْحَانَ رَبِّيঅন্য কপি: قُلْ سُبْحَانَ رَبِّيআলিফ আছে/নেই; সে বলল/বলো
কাহফ ১৮:৩৬মদিনা, মক্কা, শাম: خَيْرًا مِنْهُمَا مُنْقَلَبًاইরাকি কপি: خَيْرًا مِنْهَا مُنْقَلَبًاমিম আছে/নেই; দুটি থেকে/একটি থেকে
আম্বিয়া ২১:৩০মক্কা: أَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُواঅন্য কপি: أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُواহামযা ও লামের মাঝে ওয়াও নেই/আছে

এই পার্থক্যগুলোর পরিসরও এক রকম নয়। সংযোজক যোগ বা বিয়োগ বাক্যকে আগের বক্তব্যের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা হচ্ছে, তা বদলায়। “কালা” ও “কুল” ঘটনার বর্ণনা এবং কাউকে বলার নির্দেশের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে। “মিনহুমা” ও “মিনহা” নির্দেশিত বস্তুর সংখ্যা বদলায়। কাহফের দুই বাগানের কাহিনিতে ওই সর্বনামের দ্বিবচন ও একবচন তাই অর্থবাহী ব্যাকরণগত ভেদ। একেক জায়গায় প্রভাব একেক মাত্রার হলেও কপিগুলোর অক্ষরগত অভিন্নতার প্রশ্নে প্রতিটি উদাহরণ নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম।

সরকারি মুসহাফের এই একাধিক রূপ পাঠের অনুমোদনকে একটি আঞ্চলিক ভিত্তিও দেয়। কোনো রূপ মদিনা বা শামের কপির সঙ্গে মেলে, আরেকটি কুফা বা বসরার কপির সঙ্গে। দানির তালিকায় গৃহীত পরিসরের বাইরের ব্যক্তিগত পাঠের কথা এবং সরকারি আঞ্চলিক রূপের কথা আলাদা বিষয় হিসেবে ধরা পড়ে। সরকারি সংগ্রহের মান্যতার অর্থ এখানে একটি অভিন্ন অক্ষরমালার অনুলিপি মাত্র নয়; নির্দিষ্ট জায়গায় একাধিক লিখিত রূপ সেই মান্য পরিসরের ভেতরেই আছে।


আলে ইমরান ৩:১৩৩, হাদিদ ৫৭:২৪, শামস ৯১:১৫ ও তাওবা ৯:১০০-এর তুলনামূলক পাঠ

আলে ইমরান ৩:১৩৩-এ সংযোজক ওয়াও: গৃহীত বহুল ব্যবহৃত পাঠে আয়াতটি শুরু হয় “ওয়া সারিউ”—এবং দ্রুত এগিয়ে যাও। মদিনা ও শামের কপিতে শুরুর ওয়াও ছাড়া “সারিউ” থাকার কথা কুরতুবি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। নাফি ও ইবনে আমিরের পাঠও তিনি সেই আঞ্চলিক রূপের সঙ্গে মিলিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে কপির লিখিত গঠন এবং পাঠকারের অনুসৃত রূপ একই আলোচনায় রয়েছে। [915]

الأولى : قوله تعالى : وسارعوا قرأ نافع وابن عامر ” سارعوا ” بغير واو ; وكذلك هي في مصاحف أهل المدينة وأهل الشام . وقرأ باقي السبعة وسارعوا .

বাংলা অনুবাদ: প্রথম আলোচনা: আল্লাহর বাণী “ওয়া সারিউ”। নাফি ও ইবনে আমির “সারিউ” পড়েছেন, ওয়াও ছাড়া। মদিনা ও শামের অধিবাসীদের মুসহাফেও এভাবেই আছে। সাত পাঠকারের অন্যরা “ওয়া সারিউ” পড়েছেন।

ওয়াওসহ রূপে নির্দেশটি আগের বাক্যের সঙ্গে সংযোজকের মাধ্যমে যুক্ত হয়; ওয়াও ছাড়া রূপে নির্দেশটি সরাসরি শুরু হয়। কুরতুবি আবু আলির ব্যাখ্যায় দুটি রূপের বাক্যসংযোগের পার্থক্যও এনেছেন: একটিতে স্পষ্ট সংযোজক আছে, অন্যটিতে বক্তব্যের সম্পর্ক থেকেই সংযোগ বোঝা যায়। উভয় রূপে ক্ষমার দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ আছে, কিন্তু লিখিত বাক্যের শুরু একই নয়। কপিতে ওয়াও থাকার সাক্ষ্য এবং না-থাকার সাক্ষ্য এই অক্ষরভেদকে নির্দিষ্ট অঞ্চল পর্যন্ত চিহ্নিত করে।

হাদিদ ৫৭:২৪-এ সম্পূর্ণ “হুয়া” শব্দ: এই আয়াতের এক রূপে রয়েছে “ফা ইন্নাল্লাহা হুয়াল গানিয়্যুল হামিদ”—নিশ্চয়ই আল্লাহ, তিনিই অভাবমুক্ত, প্রশংসিত। অন্য রূপে “হুয়া” নেই: “ফা ইন্নাল্লাহাল গানিয়্যুল হামিদ”। “দলিলুল হাইরান আলা মাওরিদিয যামআন”-এ দানির “আল-মুকনি” থেকে উদ্ধৃত বিবরণে মদিনা ও শামের কপিতে শব্দটি না-থাকা এবং অন্য কপিতে থাকার কথা স্পষ্ট। পার্থক্যটি এখানে স্বতন্ত্র সর্বনাম, একটি সম্পূর্ণ শব্দের। [916]

وَالْمَوْضِعُ الرَّابِعَ عَشَرَ: “هُوَ” مِنْ قَوْلِهِ تَعَالَى فِي السُّورَةِ الْمَذْكُورَةِ: وَمَنْ يَتَوَلَّ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ ، قَالَ فِي “الْمُقْنِعِ”: وَفِيهَا أَيْ: فِي “الْحَدِيدِ” فِي مَصَاحِفِ أَهْلِ الْمَدِينَةِ وَالشَّامِ : “فَإِنَّ اللَّهَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ” بِغَيْرِ “هُوَ”، وَفِي سَائِرِ الْمَصَاحِفِ: هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ ، بِزِيَادَةِ هُوَ.

বাংলা অনুবাদ: চতুর্দশ স্থান: উল্লিখিত সূরায় আল্লাহর বাণী, “আর যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, নিশ্চয়ই আল্লাহ, তিনিই অভাবমুক্ত, প্রশংসিত”—এর “হুয়া”। “আল-মুকনি”-তে বলা হয়েছে: এতে, অর্থাৎ হাদিদ সূরায়, মদিনা ও শামের অধিবাসীদের মুসহাফে “ফা ইন্নাল্লাহাল গানিয়্যুল হামিদ”—“হুয়া” ছাড়া; অন্য সব মুসহাফে “হুয়াল গানিয়্যুল হামিদ”—অতিরিক্ত “হুয়া”সহ।

ইবনে আবি দাউদের “কিতাবুল মাসাহিফ”-এও মদিনার রূপটির বিপরীতে কুফা ও বসরার রূপে “হুয়া” থাকার বিবরণ রয়েছে। এই তালিকায় মদিনার রূপটির পরিচয় দেওয়া হয়েছে “হুয়া ছাড়া” কথাটি দিয়ে। কুফা ও বসরার রূপটিতে সর্বনামটি স্পষ্টভাবে লিখে দেখানো হয়েছে। দানির তালিকার মতো এই আগের মুসহাফবিষয়ক গ্রন্থেও পার্থক্যটি সম্পূর্ণ শব্দের উপস্থিতি–অনুপস্থিতির পরিচয়ে সংরক্ষিত হয়েছে। [917]

الْحَدِيدُ أَهْلُ الْمَدِينَةِ ” وَمَنْ يَتَوَلَّ فَإِنَّ اللَّهَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ ” بِغَيْرِ هُوَ، وَأَهْلُ الْكُوفَةِ وَأَهْلُ الْبَصْرَةِ: ” فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ “

বাংলা অনুবাদ: হাদিদ সূরায় মদিনার অধিবাসীদের পাঠ: “ওয়া মান ইয়াতাওয়াল্লা ফা ইন্নাল্লাহাল গানিয়্যুল হামিদ”—“হুয়া” ছাড়া। আর কুফা ও বসরার অধিবাসীদের পাঠ: “ফা ইন্নাল্লাহা হুয়াল গানিয়্যুল হামিদ”।

“হুয়া” উপস্থিত থাকলে সেটিকে পৃথকীকরণ ও জোর দেওয়ার সর্বনাম, অথবা স্বতন্ত্র উদ্দেশ্যপদ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কুরতুবি উভয় ব্যাকরণগত সম্ভাবনাই উল্লেখ করেছেন। শব্দটি না-থাকলে “আল্লাহ” ও তাঁর গুণের মধ্যে ওই আলাদা সর্বনাম থাকে না। আল্লাহর অভাবমুক্ত ও প্রশংসিত হওয়ার বক্তব্য উভয় রূপেই প্রকাশিত হয়; অতিরিক্ত সর্বনাম বাক্যের জোর ও গঠন নির্ধারণ করে। এই উদাহরণে শব্দসংখ্যার পার্থক্য সরাসরি গণনাযোগ্য: কোনো রূপে “হুয়া” কোরআনের অংশ হিসেবে পাঠ করা হচ্ছে, অন্য রূপে করা হচ্ছে না।

শামস ৯১:১৫-এ ফা ও ওয়াও: এক রূপ “ফালা ইয়াখাফু উকবাহা”, অন্য রূপ “ওয়ালা ইয়াখাফু উকবাহা”। দানির বিবরণ উদ্ধৃত করে “দলিলুল হাইরান” মদিনা ও শামের কপিতে ফা এবং অন্য কপিতে ওয়াও থাকার কথা জানিয়েছে। এখানে একই স্থানে দুটি আলাদা ব্যঞ্জনবর্ণের একটি বেছে নেওয়া হয়েছে। এই দুই অক্ষরের পার্থক্য আরবির স্বরচিহ্নের ব্যবধান নয়; তারা দুটি আলাদা সংযোজক। [918]

وَالْمَوْضِعُ السَّابِعَ عَشَرَ: فَلَا يَخَافُ مِنْ قَوْلِهِ تَعَالَى: “فَلَا يَخَافُ عُقْبَاهَا” قَالَ فِي “الْمُقْنِعِ”: وَفِي “الشَّمْسِ” فِي مَصَاحِفِ أَهْلِ الْمَدِينَةِ وَالشَّامِ: “فَلَا يَخَافُ” بِالْفَاءِ وَفِي سَائِرِ الْمَصَاحِفِ: وَلا يَخَافُ بِالْوَاوِ اه.

বাংলা অনুবাদ: সপ্তদশ স্থান: আল্লাহর বাণী “ফালা ইয়াখাফু উকবাহা”-র “ফালা ইয়াখাফু”। “আল-মুকনি”-তে বলা হয়েছে: শামস সূরায় মদিনা ও শামের অধিবাসীদের মুসহাফে “ফালা ইয়াখাফু”—ফা দিয়ে; অন্য সব মুসহাফে “ওয়ালা ইয়াখাফু”—ওয়াও দিয়ে। উদ্ধৃতি শেষ।

এই জায়গায় সংযোজকের ভেদ ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে। কুরতুবি নাফি ও ইবনে আমিরের ফা-পাঠকে আল্লাহর দিকে কর্তা ফেরানোর অর্থের সঙ্গে যুক্ত করেছেন: আল্লাহ তাদের ধ্বংসের পরিণামকে ভয় করেন না। অন্যদের ওয়াও-পাঠকে তিনি সেই ব্যাখ্যার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেছেন, যেখানে উটনী হত্যাকারী ব্যক্তি নিজের কাজের পরিণামকে ভয় করেনি। একই জায়গায় আল্লাহ, হত্যাকারী এবং সালিহ—বিভিন্ন কর্তাবিষয়ক ব্যাখ্যা তাঁর তাফসিরে আছে। ফলে কেবল একটি অক্ষরের বদল হলেও বাক্যের সম্পর্ক এবং কর্তা নির্ধারণের আলোচনায় তার প্রভাব পড়েছে। [919]

وقرأ نافع وابن عامر ( فلا ) بالفاء ، وهو الأجود ; لأنه يرجع إلى المعنى الأول أي فلا يخاف الله عاقبة إهلاكهم . والباقون بالواو ، وهي أشبه بالمعنى الثاني أي ولا يخاف الكافر عاقبة ما صنع . وروى ابن وهب وابن القاسم عن مالك قالا : أخرج إلينا مالك مصحفا لجده ، وزعم أنه كتبه في أيام عثمان بن عفان حين كتب المصاحف ، وفيه : ولا يخاف بالواو . وكذا هي في مصاحف أهل مكة والعراقيين بالواو ، واختاره أبو عبيد وأبو حاتم ، اتباعا لمصحفهم .

বাংলা অনুবাদ: নাফি ও ইবনে আমির ফা দিয়ে “ফালা” পড়েছেন। এটিই বেশি উত্তম; কারণ এটি প্রথম অর্থের দিকে ফিরে যায়—আল্লাহ তাদের ধ্বংস করার পরিণামকে ভয় করেন না। অন্যরা ওয়াও দিয়ে পড়েছেন; এটি দ্বিতীয় অর্থের সঙ্গে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ—কাফির ব্যক্তি নিজের কাজের পরিণামকে ভয় করে না। ইবনে ওয়াহব ও ইবনে কাসিম মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন; তাঁরা বলেন: মালিক আমাদের সামনে তাঁর দাদার একটি মুসহাফ বের করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, উসমান ইবনে আফফানের আমলে যখন মুসহাফগুলো লেখা হয়েছিল, তখন তাঁর দাদা সেটি লিখেছিলেন। তাতে ওয়াও দিয়ে “ওয়ালা ইয়াখাফু” ছিল। মক্কার অধিবাসীদের ও ইরাকিদের মুসহাফেও ওয়াও দিয়ে এভাবেই আছে। আবু উবাইদ ও আবু হাতিম তাঁদের মুসহাফ অনুসরণ করে সেটিই বেছে নিয়েছেন।

মালিকের দাদার মুসহাফের বিবরণটি অঞ্চলভিত্তিক সাধারণ তালিকার পাশাপাশি ব্যক্তিগত কপির নির্দিষ্ট দাবি সংরক্ষণ করে। মালিক কপিটি সামনে বের করেছেন এবং তার লেখার সময় উসমানের আমল বলে জানিয়েছেন—কুরতুবির উদ্ধৃত খবরের গঠন এমনই। আর শেষে আবু উবাইদ ও আবু হাতিমের পছন্দকে তাঁদের মুসহাফ অনুসরণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কোন কপিতে কোন অক্ষর আছে, সেই বস্তুগত পাঠের পরিচয় এখানে পাঠ বাছাইয়ের যুক্তি হিসেবেও কাজ করছে।

তাওবা ৯:১০০-এ সম্পূর্ণ “মিন” শব্দ: দানির তালিকায় মক্কার কপিতে “তাজরি মিন তাহতিহাল আনহার”—নদীগুলো তার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয়—রূপটি রয়েছে। অন্য কপিতে “মিন” নেই। এটি একই আয়াতের “ওয়াল্লাযিনা” নিয়ে উমর–উবাইয়ের বিরোধ থেকে আলাদা স্থানের পার্থক্য। একটি আয়াতেই ভিন্ন ধরনের দুটি আলোচ্য স্থান রয়েছে: প্রথমটি সাহাবির পাঠ ও গোষ্ঠীর মর্যাদা নিয়ে, দ্বিতীয়টি আঞ্চলিক মুসহাফে একটি অব্যয়ের উপস্থিতি নিয়ে। [920]

وفيها في مصاحف أهل مكة ” تجري من تحتها الانهر ” بعد رأس المائة بزيادة ” من ” وفي سائر المصاحف بغير ” من “

বাংলা অনুবাদ: এই সূরায় একশ আয়াতের সীমানার পরে মক্কার অধিবাসীদের মুসহাফে “তাজরি মিন তাহতিহাল আনহার”—অতিরিক্ত “মিন”সহ। অন্য সব মুসহাফে “মিন” ছাড়া।

আয়াতএকটি আঞ্চলিক রূপঅন্য আঞ্চলিক রূপপার্থক্যের ধরন
আলে ইমরান ৩:১৩৩মদিনা ও শাম: سَارِعُواঅন্য কপি: وَسَارِعُواসংযোজক ওয়াও অনুপস্থিত/উপস্থিত
হাদিদ ৫৭:২৪মদিনা ও শাম: فَإِنَّ اللَّهَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُঅন্য কপি: فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُসম্পূর্ণ হুয়া শব্দ অনুপস্থিত/উপস্থিত
শামস ৯১:১৫মদিনা ও শাম: فَلَا يَخَافُ عُقْبَاهَاঅন্য কপি: وَلَا يَخَافُ عُقْبَاهَاফা/ওয়াও প্রতিস্থাপন
তাওবা ৯:১০০মক্কা: تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُঅন্য কপি: تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُসম্পূর্ণ মিন শব্দ উপস্থিত/অনুপস্থিত

হাদিদের “হুয়া” এবং তাওবার “মিন”—দুটি উদাহরণেই সম্পূর্ণ একটি শব্দের ব্যবধান রয়েছে। আলে ইমরানে সংযোজক নেই অথবা আছে; শামসে একটি সংযোজকের জায়গায় অন্যটি। ফলে আঞ্চলিক পার্থক্যকে সর্বত্র উচ্চারণের সামান্য ভেদ বলা তথ্যগতভাবে ভুল। অক্ষরের লিখিত উপস্থিতি, শব্দের অন্তর্ভুক্তি এবং বাক্যের সংযোগ—সবগুলো স্তরেই নির্দিষ্ট পার্থক্য নথিভুক্ত হয়েছে। পার্থক্যগুলোর দৈর্ঘ্য কম হলেও তাদের অস্তিত্ব মুছে যায় না; অক্ষরে অক্ষরে অভিন্নতার দাবি একটি বাড়তি শব্দ বা একটি ভিন্ন অক্ষরেই খণ্ডিত হয়।

উসমানি মান্যতার আওতায় এই রূপগুলো গৃহীত হওয়া দেখায়, মান্য পাঠের পরিসর একাধিক লিখিত রূপ ধারণ করেছে। একই সঙ্গে সাহাবিদের এমন পাঠও সংরক্ষিত আছে, যা সেই গৃহীত পরিসরে স্থান পায়নি। কোথাও নাজিল হওয়া বাক্যাংশ পরে নেই, কোথাও একটি সাহাবি-পাঠে ক্রিয়া ও শব্দক্রম আলাদা, কোথাও ব্যক্তিগত মুসহাফে বাড়তি নামাজের উল্লেখ, কোথাও সরকারি আঞ্চলিক কপিতেই বাড়তি শব্দ রয়েছে। গ্রন্থের কর্তৃত্ব বহাল থাকার ধর্মীয় দাবি এবং তার প্রতিটি শব্দ সর্বত্র অভিন্ন থাকার দাবি ভিন্ন। বুখারি, মুসলিম, তাবারি এবং মুসহাফবিষয়ক গ্রন্থগুলোর সংরক্ষিত তথ্য দ্বিতীয় দাবিটির সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে দাঁড়ায়।


নুকতা, স্বরচিহ্ন ও হাজ্জাজের সংশোধনসংক্রান্ত বর্ণনা

কোরআনের লিখিত রূপ উসমানের সংকলনের পরেও এক অবস্থায় স্থির থাকেনি। অক্ষর আলাদা করার নুকতা, স্বর বোঝানোর চিহ্ন, তানবিন, শাদ্দা ও মাদ্দা—বিভিন্ন সময়ে লিখিত পাতায় যুক্ত হয়েছে। প্রথম দিকে স্বর বোঝাতে যে বিন্দু ব্যবহার করা হতো, পরবর্তী স্বরচিহ্ন তারও পরিবর্তিত রূপ। কোন অক্ষর পড়তে হবে, কোন স্বরে পড়তে হবে এবং কোথায় শব্দের দ্বিত্ব বা দীর্ঘতা থাকবে—এসব নির্দেশ দৃশ্যমান করার জন্য মানুষের তৈরি চিহ্নপদ্ধতি বিকশিত হয়েছে। ধর্মগ্রন্থের পাঠকে নির্দিষ্ট করার এই কাজের সঙ্গে ব্যাকরণবিদ, পাঠবিশারদ, অনুলিপিকার ও শাসকের ভূমিকা জড়িত।

এই ইতিহাসে চিহ্ন সংযোজন এবং শব্দ সংশোধনের বর্ণনা পৃথক ধরনের পরিবর্তনের খবর দেয়। নুকতা দিয়ে একই অবয়বের বর্ণ আলাদা করা যায়; স্বরচিহ্ন দিয়ে একই বর্ণের ব্যাকরণগত রূপ নির্দিষ্ট করা যায়। আবার হাজ্জাজের নামে সংরক্ষিত প্রতিবেদনে পূর্ণ শব্দ প্রতিস্থাপন, অক্ষর যোগ এবং কাহিনির শব্দ বদলের কথা রয়েছে। লিপির উন্নয়ন, পাঠ নির্ধারণ ও রাজনৈতিক উদ্যোগের এই ধারাবাহিকতায় কোন কাজ কার নামে বর্ণিত হয়েছে এবং তার ফল কোন কোন পাঠে রয়েছে, তার নির্দিষ্ট দলিল পাওয়া যায়।


প্রাথমিক লিখনরূপ ও পরবর্তী পাঠ-সহায়ক চিহ্নের পার্থক্য

আরবি অক্ষরের মূল অবয়ব, অক্ষরভেদকারী নুকতা এবং স্বরচিহ্ন তিনটি আলাদা কাজ করে। একই বর্ণদেহে নুকতার অবস্থান বদলে বর্ণের পরিচয় বদলাতে পারে। স্বরচিহ্ন আবার বর্ণটির স্বর, শব্দের ব্যাকরণগত অবস্থা ও বাক্যে তার সম্পর্ক নির্দেশ করে। বর্তমানে একসঙ্গে মুদ্রিত হওয়ায় এই স্তরগুলোকে একই সময়ের ব্যবস্থা বলে মনে হতে পারে; সংরক্ষিত ইসলামি বিবরণে তাদের পৃথক উৎপত্তি ও বিকাশের কথা রয়েছে। নুকতা ও হরকত যোগ করার কাজটি উসমানি লিখনরূপের ওপর পরবর্তী হস্তক্ষেপ হিসেবেই সেখানে আলোচিত হয়েছে।

ইবনে তাইমিয়া তাঁর ব্যাখ্যায় বলেছেন, সাহাবিরা মুসহাফে নুকতা ও স্বরচিহ্ন দিতেন না। তিনি একই সঙ্গে একটি শব্দে ইয়া ও তা দিয়ে দুই পাঠের উদাহরণ দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন, একটি দিয়ে এমনভাবে নির্দিষ্ট করা হয়নি, যাতে অন্যটি পড়তে বাধা হয়। তাঁর বক্তব্যে চিহ্নহীনতার সঙ্গে পাঠের একাধিক সম্ভাবনার সম্পর্ক সরাসরি স্বীকৃত। ইসলামকিউএ তাঁর “মাজমূউল ফাতাওয়া” থেকে এই সম্পূর্ণ বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে। [921]

لم يكن الصحابة ينقطون المصاحف ويشكلونها حيث كانوا عربا لا يلحنون ، فلم يحتاجوا إلى تقييدها بالنقط ، وكان في اللفظ الواحد قراءتان يقرأ بالياء والتاء مثل يعملون ، وتعملون ، فلم يقيدوه بأحدهما ليمنعوه من الأخرى .

বাংলা অনুবাদ: সাহাবিরা মুসহাফে নুকতা ও স্বরচিহ্ন দিতেন না। তাঁরা আরব ছিলেন, ভাষাগত ভুল করতেন না; তাই নুকতা দিয়ে তা নির্দিষ্ট করার প্রয়োজন তাঁদের হয়নি। একই শব্দে দুটি পাঠ থাকত; ইয়া ও তা দিয়ে পড়া হতো, যেমন “ইয়ামালুন” এবং “তামালুন”। তাঁরা একটিকে এমনভাবে নির্দিষ্ট করেননি, যাতে অন্যটি পড়তে বাধা হয়।

এখানে “ইয়ামালুন”—তারা করে—এবং “তামালুন”—তোমরা করো—পার্থক্যটি ব্যাকরণগত ব্যক্তির। মূল অক্ষরদেহে প্রথম বর্ণের নুকতা নির্দিষ্ট না থাকলে দুটি পাঠকে সেই লিখন ধারণ করতে পারে। কোন রূপে চিহ্ন বসানো হচ্ছে, তা নির্ধারণের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের চোখে একটি নির্দিষ্ট শব্দরূপ স্থির হয়। এই কাজ শুধু লেখাকে সুন্দর করা নয়; কার কাজের কথা বাক্যে বলা হচ্ছে, তার নির্দেশও দৃশ্যমান করে। চিহ্ন সংযোজনের ভাষাগত প্রভাব তাই অক্ষর শনাক্তকরণ থেকে অর্থ বোঝা পর্যন্ত বিস্তৃত।

চিহ্ন বা স্তরকাজপরিবর্তনের প্রকৃতি
অক্ষরের মূল কাঠামোশব্দের মৌলিক লিখিত অবয়বলিখনরীতি ও বানানের মান
অক্ষরভেদকারী নোকতাএকই অবয়বের বর্ণগুলো আলাদা করাবর্ণ শনাক্ত করার নির্দেশ যোগ
স্বরচিহ্ন ও তানবিনউচ্চারণ ও ব্যাকরণগত রূপ নির্ধারণলিখিত পাঠকে নির্দিষ্ট উচ্চারণে বেঁধে দেয়া
শাদ্দা, মাদ্দা ও অন্যান্য চিহ্নদ্বিত্ব, দীর্ঘতা ও পাঠপদ্ধতি দেখানোপরে গড়ে ওঠা নির্দেশপদ্ধতির বিস্তার

দানির “আল-মুহকাম ফি নাকতিল মাসাহিফ”-এ ইয়াহইয়া ইবনে আবি কাসিরের নামে সংরক্ষিত বিবরণে প্রথমে ইয়া ও তা-তে নুকতা দেওয়ার কথা এসেছে। তার পরে আয়াতের শেষভাগে বিন্দু এবং পরে সূচনাসূচক ও সমাপ্তিসূচক চিহ্ন যোগ করার কথা বলা হয়েছে। এই বিবরণ লিখিত পাতার একাধিক স্তরের সংযোজনকে ধারাবাহিক কাজ হিসেবে উপস্থাপন করে। [922]

حدثنا فارس بن أحمد بن موسى المقرئ ، قال : ثنا أحمد بن محمد ، قال : حدثنا أحمد بن محمد بن عثمان ، قال : حدثنا الفضل بن شاذان ، قال : حدثنا محمد بن عيسى ، قال : حدثنا إبراهيم بن موسى ، قال : أخبرنا الوليد بن مسلم ، قال : حدثنا الأوزاعي ، قال : سمعت يحيى بن أبي كثير يقول : كان القرآن مجردا في المصاحف ، فأول ما أحدثوا فيه النقط على الياء والتاء ، وقالوا : لا بأس به ، هو نور له . ثم أحدثوا فيها نقطا عند منتهى الآي ، ثم أحدثوا الفواتح والخواتم .

বাংলা অনুবাদ: ফারিস ইবনে আহমদ ইবনে মুসা মুকরি আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে উসমান থেকে, তিনি ফাদল ইবনে শাযান থেকে, তিনি মুহাম্মাদ ইবনে ঈসা থেকে, তিনি ইবরাহিম ইবনে মুসা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ওয়ালিদ ইবনে মুসলিম আমাদের জানিয়েছেন; তিনি বলেন, আওযাঈ আমাদের বর্ণনা করেছেন। আওযাঈ বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবনে আবি কাসিরকে বলতে শুনেছি: মুসহাফগুলোতে কোরআন চিহ্নমুক্ত ছিল। প্রথম যে নতুন জিনিস তারা এতে যুক্ত করল তা হলো ইয়া ও তা-তে নুকতা। তারা বলল, এতে সমস্যা নেই; এটি এর জন্য আলো। তারপর তারা আয়াতের শেষভাগে বিন্দু যুক্ত করল; তারপর সূচনা ও সমাপ্তির চিহ্ন যুক্ত করল।

এই সংযোজনগুলোর প্রয়োজন সৃষ্টি হয়েছিল লিখিত রূপ থেকে পাঠ উদ্ধার করার সমস্যার মধ্যে। মুখস্থ জানা পাঠক কোনো শব্দ চিহ্ন ছাড়াও চিনতে পারেন; নতুন শিক্ষার্থী একই অবয়বে ভুল বর্ণ বা স্বর বসাতে পারেন। ফলে পাঠজ্ঞানের একটি অংশ আগে পাঠকারীর স্মৃতি ও শিক্ষকের মুখে ছিল, পরে তার নির্দেশ পাতায় স্থাপন করা হয়। চিহ্নের এই সংযোজন গ্রন্থের ব্যবহার বদলায়: নির্দিষ্ট পাঠ জানার জন্য যতটুকু মৌখিক সহায়তার প্রয়োজন ছিল, তার কিছু অংশ লিখিত নির্দেশ বহন করতে থাকে।

লিখিত পাতায় কোন উপাদান পরে যুক্ত হয়েছে, সেটি তার ধর্মীয় অনুমোদনের প্রশ্ন থেকে আলাদা তথ্য। নুকতা ও স্বরচিহ্ন ব্যবহার উপকারী বলে অনুমোদিত হলেও সেগুলো মুহাম্মাদের যুগ থেকেই বর্তমান আকৃতিতে ছিল—এমন ইতিহাস তৈরি হয় না। অক্ষরের মূল কাঠামো, বর্ণভেদকারী বিন্দু এবং পরবর্তী উচ্চারণনির্দেশকে এক করে শুরু থেকে একই দৃশ্যমান রূপের দাবি করলে সংযোজনের এই পরিচিত ধারাবাহিকতাই মুছে যায়। বর্তমান মুসহাফের লিখিত নির্দেশপদ্ধতির একটি বড় অংশ পরবর্তী মানুষের কাজের ফল।


ব্যঞ্জনবর্ণের নুকতা, নাসর ও ইয়াহইয়া: প্রবর্তনের পৃথক বর্ণনা

একই আকৃতির বর্ণ আলাদা করার জন্য বিন্দু বসানোর কাজকে বলা হয় ইজাম। আরবির বা, তা ও ছা; জিম, হা ও খা; দাল ও যাল; রা ও যা—এসব বর্ণের পরিচয় নির্ধারণে নুকতার ভূমিকা রয়েছে। যুক্ত অবস্থায় আরও কয়েকটি বর্ণের মূল অবয়ব কাছাকাছি হয়। কোথায় কয়টি বিন্দু বসবে, তা নির্দিষ্ট করা তাই বর্ণ চেনার নিয়ম স্থাপন করা। এই নিয়ম পাতায় না-থাকলে শব্দের পরিচয় উদ্ধার করতে পরিচিত ভাষা, প্রসঙ্গ ও শেখা পাঠের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়।

মুসহাফে প্রথম কে নুকতা দেওয়া শুরু করেছিলেন, সে বিষয়ে দানি নিজেই বর্ণনাভেদ জানিয়েছেন। “কিতাবুন নাকত”-এ আবুল আসওয়াদ আদ-দুআলির সূচনার বিবরণের পাশাপাশি ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামারের নাম রয়েছে। ইবনে সিরিনের কাছে তাঁর নুকতা দেওয়া একটি মুসহাফ ছিল বলেও সেখানে বলা হয়েছে। একই নামে পরিচিত কাজের ভেতর স্বরনির্দেশ ও অক্ষরভেদ—দুই ধরনের বিন্দুর ব্যবহার থাকায় ব্যক্তিদের নামে সংরক্ষিত ভূমিকাগুলোও নির্দিষ্ট বিবরণ অনুযায়ী আলাদা হয়। [923]

اختلفت الرواية لدينا فيمن ابتدأ بنقط المصاحف من التابعين فروينا أن المبتدئ بذلك كان أبا الأسود الدؤلي . وروينا أن ابن سيرين كان عنده مصحف نقطه يحيى بن يعمر وأن يحيى أول من نقطها

বাংলা অনুবাদ: তাবেয়িদের মধ্যে কে মুসহাফে নুকতা দেওয়া শুরু করেছিলেন, তা নিয়ে আমাদের কাছে বর্ণনা ভিন্ন হয়েছে। আমাদের কাছে বর্ণিত হয়েছে যে এর সূচনাকারী ছিলেন আবুল আসওয়াদ আদ-দুআলি। আমাদের কাছে এ-ও বর্ণিত হয়েছে যে ইবনে সিরিনের কাছে একটি মুসহাফ ছিল, যাতে ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামার নুকতা দিয়েছিলেন এবং ইয়াহইয়াই প্রথম এতে নুকতা দিয়েছিলেন।

“আল-মুহকাম”-এ ইয়াহইয়ার নামে প্রথম নুকতা দেওয়ার দাবি আরও সরাসরি সূত্রে এসেছে। দানি হারুন ইবনে মুসার বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন: প্রথম মুসহাফে নুকতা দিয়েছেন ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামার। এই পরিচয়টি কোনো বর্তমান মুদ্রকের অনুমান নয়; নুকতা-সংক্রান্ত প্রাচীন আলোচনার মধ্যেই তাঁর নামে কাজটির সূচনার খবর সংরক্ষিত রয়েছে। [924]

أخبرنا عبد بن أحمد بن محمد في كتابه ، قال : نا أحمد بن عبدان ، قال : نا محمد بن سهل ، قال : نا محمد بن إسماعيل ، قال : قال حسين بن الوليد ، عن هارون بن موسى : أول من نقط المصحف يحيى بن يعمر .

বাংলা অনুবাদ: আবদ ইবনে আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ তাঁর পত্রে আমাদের জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আহমদ ইবনে আবদান আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে সাহল আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাইল আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হুসাইন ইবনে ওয়ালিদ হারুন ইবনে মুসা থেকে বলেছেন: প্রথম মুসহাফে নুকতা দিয়েছেন ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামার।

নাসর ইবনে আসিম লাইসির নামেও একই ধরনের সূচনার দাবি পাওয়া যায়। তাঁর পাঠশিক্ষার পরম্পরা উল্লেখ করে দানির সংরক্ষিত বর্ণনায় শুধু নুকতা নয়, প্রতি পাঁচ ও দশ আয়াতের চিহ্ন দেওয়ার কথাও আছে। ফলে তাঁর সঙ্গে যুক্ত কাজটির পরিসর বর্ণের পরিচয় থেকে পাঠের পর্বচিহ্ন পর্যন্ত বিস্তৃত। [925]

أخبرنا خلف بن إبراهيم بن محمد المقرئ في الإجازة ، قال : نا محمد بن عبد الله الأصبهاني ، قال أخبرت عن أبي بكر محمد بن محمد بن الفضل التستري ، قال : نا محمد بن سهل بن عبد الجبار ، قال : نا أبو حاتم ، قال : قرأ يعقوب على سلام أبي المنذر ، وقرأ سلام على أبي عمرو ، وقرأ أبو عمرو على عبد الله بن أبي إسحاق الحضرمي ، وعلى نصر بن عاصم الليثي ، ونصر أول من نقط المصاحف ، وعشرها ، وخمسها .

বাংলা অনুবাদ: খালাফ ইবনে ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদ মুকরি ইজাযার মাধ্যমে আমাদের জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইসফাহানি আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমাকে আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ফাদল তুস্তারি থেকে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে সাহল ইবনে আবদুল জাব্বার আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আবু হাতিম আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ইয়াকুব সালাম আবুল মুনযিরের কাছে পড়েছেন; সালাম আবু আমরের কাছে পড়েছেন; আবু আমর আবদুল্লাহ ইবনে আবি ইসহাক হাদরামি এবং নাসর ইবনে আসিম লাইসির কাছে পড়েছেন। নাসরই প্রথম মুসহাফে নুকতা দিয়েছেন এবং দশ ও পাঁচ আয়াতের চিহ্ন দিয়েছেন।

ব্যক্তিসংরক্ষিত বিবরণের ভূমিকাকাজটির নির্দিষ্ট পরিচয়
আবুল আসওয়াদ আদ-দুআলিকিতাবুন নাকতে সূচনাকারীর একটি বর্ণনা; মুহকামে মুখের স্বর দেখে বিন্দু বসানোর পদ্ধতিস্বর ও তানবিনের নির্দেশ
ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামারপ্রথম নুকতা দেওয়ার দাবি; ইবনে সিরিনের মুসহাফে নুকতা দেওয়ার বিবরণমুসহাফে নুকতা প্রয়োগ
নাসর ইবনে আসিম লাইসিপ্রথম নুকতা এবং পাঁচ–দশ আয়াতের চিহ্ন দেওয়ার দাবিবর্ণ ও পাঠপর্ব চিহ্নিতকরণের কাজ
খলিল ইবনে আহমদপরবর্তী চিহ্ন উদ্ভাবন, বিন্যাস ও পদ্ধতি লিখে সংকলনস্বরচিহ্ন, হামজা ও অন্যান্য নির্দেশের বিকাশ

দানি এই বিবরণগুলোর সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সম্ভাবনা জানিয়েছেন যে ইয়াহইয়া ও নাসর বসরায় মানুষের জন্য প্রথম নুকতার কাজ প্রচলন করেছিলেন এবং আবুল আসওয়াদের কাছ থেকে তা নিয়েছিলেন। আবুল আসওয়াদের কাজকে তিনি হরকত ও তানবিনে সীমিত করে উল্লেখ করেছেন; খলিলের সঙ্গে যুক্ত করেছেন হামজা, দ্বিত্ব এবং সূক্ষ্ম উচ্চারণের নির্দেশ। এটি দানির নিজস্ব ব্যাখ্যা: পৃথক নামের বর্ণনাগুলোকে তিনি একটি ধারাবাহিক শিক্ষাপরম্পরায় সাজিয়েছেন। [926]

قال أبو عمرو : يحتمل أن يكون يحيى ونصر أول من نقطاها للناس بالبصرة ، وأخذا ذلك عن أبي الأسود ؛ إذ كان السابق إلى ذلك ، والمبتدئ به ، وهو الذي جعل الحركات والتنوين لا غير ، على ما تقدم في الخبر عنه . ثم جعل الخليل بن أحمد الهمز والتشديد والروم والإشمام . وقفا الناس في ذلك أثرهما ، واتبعوا فيه سنتهما . وانتشر ذلك في سائر البلدان ، وظهر العمل به في كل عصر وأوان ، والحمد لله على كل حال .

বাংলা অনুবাদ: আবু আমর বলেন: সম্ভব যে ইয়াহইয়া ও নাসর বসরায় মানুষের জন্য প্রথম মুসহাফে নুকতা দিয়েছেন এবং আবুল আসওয়াদের কাছ থেকে তা নিয়েছেন। কারণ তিনিই এতে অগ্রবর্তী ও সূচনাকারী ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে আগের খবরে যেমন এসেছে, তিনি কেবল হরকত ও তানবিন নির্ধারণ করেছিলেন। তারপর খলিল ইবনে আহমদ হামজা, তাশদিদ, রাওম ও ইশমামের নির্দেশ তৈরি করেন। মানুষ এই দুজনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এবং তাঁদের পদ্ধতি গ্রহণ করে। তা অন্য সব দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রত্যেক যুগে এর চর্চা প্রকাশ পায়। সব অবস্থায় আল্লাহর প্রশংসা।

এখানে কাজটির বিস্তারই মূল বিষয়: একজনের পদ্ধতি অন্যজন নিয়েছেন, তার সঙ্গে নতুন চিহ্ন যুক্ত হয়েছে এবং অঞ্চল পেরিয়ে প্রচলন ঘটেছে। “প্রথম” ব্যক্তির একাধিক পরিচয় থাকার পাশাপাশি বিভিন্ন রকম নুকতা ও চিহ্নের কাজও রয়েছে। মুসহাফের বর্তমান নির্দেশপদ্ধতি তাই এক ব্যক্তির হাতে একবারে সম্পন্ন একটি অপরিবর্তিত বিন্যাস হিসেবে এই বিবরণে উপস্থিত নয়। বর্ণ শনাক্ত করা, স্বর স্থির করা এবং পাঠপর্ব চেনানোর পদ্ধতি একাধিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।


হরকত ও স্বরচিহ্ন: আবুল আসওয়াদের পদ্ধতি ও খলিলের সঙ্গে যুক্ত পরবর্তী রূপ

যবর, যের ও পেশ দিয়ে পরিচিত বর্তমান স্বরচিহ্নের আগে স্বর বোঝাতেও বিন্দু ব্যবহার করা হতো। আবুল আসওয়াদের নামে সংরক্ষিত পদ্ধতিতে অক্ষরের ওপরে বিন্দু ফাতহা, নিচে বিন্দু কাসরা এবং সামনে বা পাশে বিন্দু দম্মা নির্দেশ করে। তানবিনের জন্য দুটি বিন্দু ব্যবহৃত হয়। মূল অক্ষরের কালির সঙ্গে চিহ্নের কালি আলাদা রাখাও পদ্ধতিটির অংশ। ফলে বর্তমান স্বরচিহ্ন শুধু আগে চিহ্নহীন পাতায় যোগ হয়নি; প্রথম সংযোজিত বিন্দুপদ্ধতিও পরে নতুন আকৃতি পেয়েছে।

আবুল আসওয়াদের ভাষাবিদ্যার সূচনার অন্য বিবরণে আলীর নির্দেশের কথা রয়েছে। যাহাবির “সিয়ারু আলামিন নুবালা”-তে ভাষাগত ভুল শুনে আলী তাঁকে ব্যাকরণ বিষয়ে কিছু তৈরি করতে বলেছিলেন বলে বর্ণিত হয়েছে। ব্যাকরণের এই উদ্যোগ এবং মুসহাফে স্বরচিহ্ন প্রয়োগের পদ্ধতি পৃথক কাজ হিসেবে উল্লিখিত হলেও উভয় ক্ষেত্রে ভাষার ভুল সংশোধনের প্রয়োজন সামনে এসেছে। [927]

وقد أمره علي -رضي الله عنه- بوضع شيء في النحو لما سمع اللحن .

বাংলা অনুবাদ: ভাষাগত ভুল শোনার পরে আলী তাঁকে ব্যাকরণ বিষয়ে কিছু তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

দানির বর্ণিত আবুল আসওয়াদ–যিয়াদের ঘটনায় প্রশাসনিক তাগিদ ও অর্থ বদলে যাওয়ার ভয় একসঙ্গে রয়েছে। আবুল আসওয়াদ প্রথমে যিয়াদের অনুরোধ গ্রহণ করেননি। এরপর যিয়াদ একজনকে ইচ্ছাকৃত ভুল পাঠ শোনাতে বলেন। তাওবা ৯:৩-এ “রাসুলুহু”-র বদলে “রাসুলিহি” পড়ায় রাসুলের সঙ্গে সম্পর্কের অর্থ উল্টে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। এই ঘটনার পরে আবুল আসওয়াদ লোক বেছে নিয়ে স্বরচিহ্ন বসানোর কাজে সম্মত হন বলে বর্ণিত হয়েছে। [928]

وذلك ما حدثناه محمد بن أحمد بن علي البغدادي ، قال : ثنا محمد بن القاسم الأنباري ، قال : ثنا أبي ، قال : حدثنا أبو عكرمة ، قال : قال العتبي : كتب معاوية – رضي الله عنه – إلى زياد يطلب عبيد الله ابنه ، فلما قدم عليه كلمه ، فوجده يلحن ، فرده إلى زياد ، وكتب إليه كتابا يلومه فيه ، ويقول : أمثل عبيد الله يضيع ؟ ! فبعث زياد إلى أبي الأسود ، فقال : يا أبا الأسود ، إن هذه الحمراء قد كثرت ، وأفسدت من ألسن العرب ؛ فلو وضعت شيئا يصلح به الناس كلامهم ، ويعربون به كتاب الله تعالى ؟ فأبى ذلك أبو الأسود ، وكره إجابة زياد إلى ما سأل . فوجه زياد رجلا ، فقال له : اقعد في طريق أبي الأسود ، فإذا مر بك ، فاقرأ شيئا من القرآن ، وتعمد اللحن فيه . ففعل ذلك . فلما مر به أبو الأسود ، رفع الرجل صوته ، فقال : أَنَّ اللَّهَ بَرِيءٌ مِنَ الْمُشْرِكِينَ وَرَسُولِهِ . فاستعظم ذلك أبو الأسود ، وقال : عز وجه الله أن يبرأ من رسوله . ثم رجع من فوره إلى زياد ، فقال : يا هذا ، قد أجبتك إلى ما سألت ، ورأيت أن أبدأ بإعراب القرآن ، فابعث إلي ثلاثين رجلا . فأحضرهم زياد ، فاختار منهم أبو الأسود عشرة ، ثم لم يزل يختار منهم ، حتى اختار رجلا من عبد القيس ، فقال : خذ المصحف ، وصبغا يخالف لون المداد ، فإذا فتحت شفتي فانقط واحدة فوق الحرف ، وإذا ضممتهما فاجعل النقطة إلى جانب الحرف ، وإذا كسرتهما فاجعل النقطة في أسفله ، فإن أتبعت شيئا من هذه الحركات غنة فانقط نقطتين . فابتدأ بالمصحف حتى أتى على آخره ، ثم وضع المختصر المنسوب إليه بعد ذلك .

বাংলা অনুবাদ: এটি আমাদের কাছে মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ ইবনে আলী বাগদাদি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনুল কাসিম আনবারি আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমার বাবা আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আবু ইকরিমা আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, উতবি বলেছেন: মুয়াবিয়া যিয়াদকে তাঁর ছেলে উবাইদুল্লাহকে পাঠাতে লিখলেন। সে এসে তাঁর সঙ্গে কথা বললে তিনি তার ভাষায় ভুল পেলেন। তিনি তাকে যিয়াদের কাছে ফিরিয়ে দিলেন এবং ভর্ৎসনা করে লিখলেন, উবাইদুল্লাহর মতো কাউকে কি এভাবে অবহেলা করা হয়! যিয়াদ তখন আবুল আসওয়াদকে ডেকে বললেন, এই অনারবরা অনেক হয়েছে এবং আরবদের ভাষা নষ্ট করেছে। তুমি এমন কিছু তৈরি করলে ভালো হতো, যার মাধ্যমে মানুষ নিজেদের কথা শুদ্ধ করতে এবং আল্লাহর কিতাবের ইরাব নির্ধারণ করতে পারে। আবুল আসওয়াদ এতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং যিয়াদের অনুরোধ গ্রহণ করতে চাইলেন না।

যিয়াদ তখন একজনকে পাঠিয়ে বললেন, আবুল আসওয়াদের চলার পথে বসো। তিনি পাশ দিয়ে গেলে কোরআনের কিছু অংশ পড়বে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ভাষাগত ভুল করবে। সে তা-ই করল। আবুল আসওয়াদ পাশ দিয়ে গেলে লোকটি উঁচু স্বরে পড়ল, “আন্নাল্লাহা বারিউম মিনাল মুশরিকিনা ওয়া রাসুলিহি”—আল্লাহ মুশরিকদের এবং তাঁর রাসুলের দায়মুক্ত। আবুল আসওয়াদ বিষয়টিকে গুরুতর মনে করে বললেন, আল্লাহর মহিমা তাঁর রাসুল থেকে দায়মুক্ত হওয়ার ঊর্ধ্বে।

তিনি সঙ্গে সঙ্গে যিয়াদের কাছে ফিরে বললেন, তোমার অনুরোধ আমি গ্রহণ করলাম। প্রথমে কোরআনের ইরাব নির্ধারণ করব বলে স্থির করেছি। আমার কাছে ত্রিশজন লোক পাঠাও। যিয়াদ তাঁদের উপস্থিত করলেন। আবুল আসওয়াদ তাঁদের মধ্য থেকে দশজন বাছলেন; তারপর বাছতে বাছতে আবদুল কায়স গোত্রের একজনকে নির্বাচন করলেন। তাঁকে বললেন, মুসহাফ এবং মূল কালির থেকে আলাদা রঙ নাও। আমি ঠোঁট খুললে অক্ষরের ওপরে একটি বিন্দু দেবে। ঠোঁট গোল করলে অক্ষরের পাশে একটি বিন্দু দেবে। কাসরার স্বরে উচ্চারণ করলে অক্ষরের নিচে বিন্দু দেবে। এই স্বরগুলোর কোনো একটির পরে নাসিক্যধ্বনি উচ্চারণ করলে দুটি বিন্দু দেবে। তিনি মুসহাফের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই কাজ করলেন; তারপর তাঁর নামে পরিচিত সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ রচনা করলেন।

এই পদ্ধতিতে লেখক পাঠকারীর মুখের উচ্চারণ পর্যবেক্ষণ করছেন। বিন্দুর অবস্থান স্থির হচ্ছে সেই উচ্চারণ অনুযায়ী। প্রথমে লোক বাছাই, তারপর ভিন্ন রঙের কালি নির্বাচন এবং প্রতিটি স্বরের জন্য আলাদা স্থান নির্ধারণ—কাজটি পরিকল্পিত একটি লিখনব্যবস্থা। একটি স্বরের ভুলে বাক্যের অর্থ বদলে যেতে পারে, তাই স্বরকে দৃশ্যমান করাই এর উদ্দেশ্য। লিপির ওপর এই নির্দেশ আরোপকে নিছক সৌন্দর্যবর্ধন বলা তার ভাষাগত কার্যকারিতাকে অস্বীকার করা।

ইবনে তাইমিয়া একই বিন্দুপদ্ধতি থেকে চিহ্নের পরবর্তী পরিবর্তনের ধারাও বর্ণনা করেছেন। লাল বিন্দু, সেই বিন্দুকে দীর্ঘ করা, দ্বিত্ব ও দীর্ঘতার জন্য শব্দের অংশ লেখা এবং পরে তার সংক্ষিপ্ত রূপ তৈরি—তাঁর বিবরণে এই ধারাবাহিকতা রয়েছে। [921]

ثم إنه في زمن التابعين لما حدث اللحن صار بعض التابعين يشكل المصاحف وينقطها ، وكانوا يعملون ذلك بالحمرة ، ويعملون الفتح بنقطة حمراء فوق الحرف ، والكسرة بنقطة حمراء تحته ، والضمة بنقطة حمراء أمامه ، ثم مدوا النقطة الحمراء ، وصاروا يعملون الشدة بقولك ” شد ” ويعملون المدة بقولك ” مد ” ، وجعلوا علامة الهمزة تشبه العين ؛ لأن الهمزة أخت العين ، ثم خففوا ذلك وصارت علامة الشدة مثل رأس السين ، وعلامة المدة مختصرة ، كما يختصر أهل الديوان ألفاظ العدد وغير ذلك ، كما يختصر المحدثون أخبرنا وحدثنا فيكتبون أول اللفظ وآخره على شكل ( أنا ) وعلى شكل ( ثنا )

বাংলা অনুবাদ: তারপর তাবেয়িদের যুগে ভাষাগত ভুল দেখা দিলে তাঁদের কেউ কেউ মুসহাফে স্বরচিহ্ন ও নুকতা দিতে শুরু করেন। তাঁরা তা লাল রঙে করতেন। অক্ষরের ওপরে লাল বিন্দু দিয়ে ফাতহা, নিচে লাল বিন্দু দিয়ে কাসরা এবং সামনে লাল বিন্দু দিয়ে দম্মা নির্দেশ করতেন। তারপর লাল বিন্দুকে দীর্ঘ করলেন। দ্বিত্ব বোঝাতে “শাদ” এবং দীর্ঘতা বোঝাতে “মাদ” লিখতে লাগলেন। হামজার চিহ্নকে আইনের মতো করলেন, কারণ হামজা আইনের কাছাকাছি ধ্বনি। পরে তা সংক্ষিপ্ত করলেন; দ্বিত্বের চিহ্ন হলো সিনের মাথার মতো এবং দীর্ঘতার চিহ্নও সংক্ষিপ্ত হলো। যেমন দপ্তরের লোকেরা সংখ্যার শব্দ ও অন্য বিষয় সংক্ষিপ্ত করেন এবং হাদিসবিশারদেরা “আখবারানা” ও “হাদ্দাসানা” সংক্ষিপ্ত করে শব্দের শুরু ও শেষ নিয়ে “আনা” ও “সানা” আকৃতিতে লেখেন।

খলিল ইবনে আহমদের সঙ্গে যুক্ত পরবর্তী পদ্ধতিতে বিন্দুর জায়গায় বর্ণের ক্ষুদ্র আকৃতি এসেছে। দানি মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াযিদ মুবররিদের নামে সংরক্ষিত বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন: পেশ ছোট ওয়াও, যের অক্ষরের নিচে ইয়া এবং যবর ওপরের দিকে শোয়ানো আলিফের রূপ। অর্থাৎ উচ্চারণ নির্দেশের জন্য বর্ণের আকৃতি থেকে নতুন সংকেত তৈরি করা হয়েছে। [929]

وقال أبو الحسن بن كيسان : قال محمد بن يزيد : الشكل الذي في الكتب من عمل الخليل ، وهو مأخوذ من صور الحروف ؛ فالضمة واو صغيرة الصورة في أعلى الحرف ؛ لئلا تلتبس بالواو المكتوبة ، والكسرة ياء تحت الحرف ، والفتحة ألف مبطوحة فوق الحرف .

বাংলা অনুবাদ: আবুল হাসান ইবনে কায়সান বলেছেন: মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াযিদ বলেছেন, বইগুলোতে ব্যবহৃত স্বরচিহ্ন খলিলের কাজ এবং সেগুলো বর্ণের আকৃতি থেকে নেওয়া। দম্মা অক্ষরের ওপর ছোট আকৃতির ওয়াও, যাতে লিখিত পূর্ণ ওয়াওয়ের সঙ্গে গুলিয়ে না যায়। কাসরা অক্ষরের নিচে ইয়া এবং ফাতহা অক্ষরের ওপরে শোয়ানো আলিফ।

উচ্চারণের নির্দেশআবুল আসওয়াদের নামে বর্ণিত পদ্ধতিখলিল বা পরবর্তী বিকাশের রূপ
ফাতহা বা যবরঅক্ষরের ওপর একটি বিন্দুওপরে শোয়ানো ছোট আলিফের আকৃতি
কাসরা বা যেরঅক্ষরের নিচে একটি বিন্দুনিচে ইয়ার আকৃতি থেকে নেওয়া চিহ্ন
দম্মা বা পেশঅক্ষরের সামনে বা পাশে একটি বিন্দুওপরে ছোট ওয়াওয়ের আকৃতি
তানবিনসংশ্লিষ্ট স্বরের স্থানে দুটি বিন্দুস্বরচিহ্নের দ্বিত্ব দিয়ে নির্দেশ
শাদ্দাপরে দ্বিত্বের আলাদা নির্দেশের বিকাশশাদ শব্দ থেকে সংক্ষিপ্ত সিনের মাথার আকৃতি
মাদ্দাপরে দীর্ঘতার আলাদা নির্দেশের বিকাশমাদ শব্দের সংক্ষিপ্ত নির্দেশ

অঞ্চল ও কপিভেদেও বিন্দুর অবস্থানের নিয়ম এক ছিল না। ইবনে আশতা মক্কার পাঠবিশারদ ইসমাইল আল-কিস্তের মুসহাফে দম্মার বিন্দু ওপরে এবং ফাতহার বিন্দু সামনে দেখেছেন বলে দানি জানিয়েছেন। এটি প্রচলিত নিয়মের বিপরীত অবস্থান। ফলে কোনো পুরোনো কপির বিন্দু দেখেই বর্তমান চিহ্নপদ্ধতির অর্থ বসালে তার পাঠ ভুলভাবে উদ্ধার হতে পারে। বিন্দুর আকৃতির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পদ্ধতির নিয়মও পাঠ নির্ধারণের অংশ। [930]

قال ابن أشته : رأيت في مصحف إسماعيل القسط ، إمام أهل مكة – الضمة فوق الحرف ، والفتحة قدام الحرف ، ضد ما عليه الناس .

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আশতা বলেন: মক্কার ইমাম ইসমাইল আল-কিস্তের মুসহাফে দেখেছি, দম্মা অক্ষরের ওপরে এবং ফাতহা অক্ষরের সামনে—মানুষের প্রচলিত পদ্ধতির বিপরীত।


চিহ্ন সংযোজনের পৃষ্ঠপোষকতা, পাঠের নিয়ন্ত্রণ ও লিখিত মান নির্ধারণ

নুকতা ও স্বরচিহ্নের কাজ পাঠবিদ্যার পাশাপাশি প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতাও পেয়েছে। যিয়াদের অনুরোধ, লোক নির্বাচন এবং সামগ্রী প্রস্তুতির বিবরণে শাসকের উদ্যোগ সরাসরি আছে। আবদুল মালিকের আমলে হাজ্জাজকে এই কাজ দেখার নির্দেশ এবং নাসর ইবনে আসিম ও ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামারকে দায়িত্ব দেওয়ার বিবরণ জারকানির “মানাহিলুল ইরফান” থেকে ইসলামকিউএ উদ্ধৃত করেছে। সেখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগ থেকে সরকারি বিস্তারের একটি সম্পর্কও প্রস্তাব করা হয়েছে। [931]

فأمر الحجاج أن يُعنى بهذا الأمر الجلل

বাংলা অনুবাদ: তখন তিনি হাজ্জাজকে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে মনোযোগ দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।

শিক্ষকতা থেকে উত্থিত হাজ্জাজের নিজের পাঠে ভুল ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ইবনে জাওযির “আল-মুনতাযাম”-এ রয়েছে। ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামার তাঁর পড়ায় বিভক্তির ভুল দেখানোর পরে হাজ্জাজ তাঁকে খুরাসানে নির্বাসিত করেন বলে সেখানে বর্ণিত হয়েছে। পাঠ সংশোধনের পৃষ্ঠপোষক শাসকের নিজের উচ্চারণ সংশোধন করতে গেলে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া আসতে পারত, এই বিবরণ তার নির্দিষ্ট দৃষ্টান্ত। [932]

قال ليحيى بن يعمر: أتجدني ألحن ، قال: الأمير أفصح من ذلك ، قال: عزمت عليك لتخبرني ، قال: نعم: ومساكن ترضونها أحب إليكم بالرفع وأحب منصوب ، قال: لا تسمعني ألحن بعدها فنفاه إلى خراسان . وكان الحجاج أول أيامه معلما ، وكان يقرأ في كل ليلة ربع القرآن . وسمع الحديث وأسنده ، وليس بأهل أن يروى عنه .

বাংলা অনুবাদ: তিনি ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামারকে বললেন, আমার ভাষায় ভুল পাও কি? ইয়াহইয়া বললেন, আমির তার চেয়ে বেশি শুদ্ধভাষী। তিনি বললেন, তোমাকে অবশ্যই জানাতে হবে। ইয়াহইয়া বললেন, হ্যাঁ; “ওয়া মাসাকিনা তারদাওনাহা আহাব্বু ইলাইকুম”-এ আপনি “আহাব্বু” পেশ দিয়ে পড়েছেন; অথচ “আহাব্বা” হবে যবর দিয়ে। তিনি বললেন, এরপর তুমি আর আমাকে ভুল পড়তে শুনবে না। তারপর তাঁকে খুরাসানে নির্বাসিত করলেন। হাজ্জাজ প্রথম জীবনে শিক্ষক ছিলেন এবং প্রতি রাতে কোরআনের এক-চতুর্থাংশ পড়তেন। তিনি হাদিস শুনেছেন ও সনদে বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তিনি এমন ব্যক্তি নন যাঁর কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করা যায়।

শাসকের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি পদ্ধতি বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়; পাঠবিশারদ তার প্রয়োগের নিয়ম নির্ধারণ করেন। শিক্ষক কোন রূপে পড়ছেন এবং অনুলিপিকার সেই রূপে কোথায় চিহ্ন বসাচ্ছেন, এই সম্পর্কটি দানির আরেক বর্ণনায় সরাসরি ধরা পড়েছে। কিসাইয়ের কাছে উপস্থিত থেকে খালাফ ইবনে হিশাম দেখেছেন, কিসাই মানুষকে পড়ে শোনাচ্ছেন এবং তারা তাঁর পাঠ অনুযায়ী নিজেদের মুসহাফে নুকতা দিচ্ছে। অর্থাৎ চিহ্ন বসানোর কাজটি নির্দিষ্ট পাঠপরম্পরা অনুসরণের একটি দৃশ্যমান পদ্ধতি। [933]

حدثنا محمد بن علي الكاتب ، قال : نا أبو بكر بن مجاهد قال : قال خلف يعني ابن هشام البزار : كنت أحضر بين يدي الكسائي وهو يقرأ على الناس ، وينقطون مصاحفهم بقراءته عليهم .

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মাদ ইবনে আলী কাতিব আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আবু বকর ইবনে মুজাহিদ আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, খালাফ—অর্থাৎ ইবনে হিশাম বাযযার—বলেছেন: আমি কিসাইয়ের সামনে উপস্থিত থাকতাম। তিনি মানুষকে পড়ে শোনাতেন এবং তারা তাঁর ওই পাঠ অনুযায়ী নিজেদের মুসহাফে নুকতা দিত।

এই পদ্ধতিতে লিখিত রূপ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি অনিবার্য উচ্চারণ বের হচ্ছে না। আগে নির্দিষ্ট শিক্ষকের পাঠ অনুসরণ করা হচ্ছে; তারপর সেই উচ্চারণ মুসহাফে চিহ্নিত হচ্ছে। শিক্ষক, পাঠপরম্পরা এবং চিহ্নদাতার সিদ্ধান্ত তাই একই পাতায় স্থায়ী রূপ পাচ্ছে। একটি চিহ্নযুক্ত কপি হাতে নিলে পাঠক সেই নির্ধারিত পাঠের নির্দেশ দেখেন। একই মূল অক্ষরদেহে অন্য কোনো অনুমোদিত পাঠ থাকলেও তা ওই কপির চিহ্নে দৃশ্যমান নাও হতে পারে।

চিহ্ন যোগ করা শুরু থেকেই নির্বিরোধে গ্রহণ করা হয়নি। দানি বিরোধিতাকারীদের নামে স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদ রেখেছেন। সেখানে ইবনে উমরের নুকতা অপছন্দ করার বর্ণনা এবং ইবনে মাসউদের নামে “কোরআনকে চিহ্নমুক্ত রাখো, অন্য কিছু মেশাবে না” বক্তব্য রয়েছে। নবির অনুসৃত লিখনরূপের ওপর পরবর্তী মানুষের নতুন নির্দেশ বসানো গ্রহণযোগ্য কি না—মূল দ্বন্দ্বটি এই আপত্তির মধ্যেই প্রকাশিত। [934]

حدثنا خلف بن إبراهيم ، قال : نا أحمد بن محمد المكي ، قال : نا علي بن عبد العزيز ، قال : نا القاسم بن سلام ، قال : نا إسحاق الأزرق ، عن سفيان ، عن سلمة بن كهيل ، عن أبي الزعراء ، عن عبد الله قال : جردوا القرآن ، ولا تخلطوه بشيء .

বাংলা অনুবাদ: খালাফ ইবনে ইবরাহিম আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ মক্কি আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আলী ইবনে আবদুল আযিয আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, কাসিম ইবনে সাল্লাম আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ইসহাক আযরাক আমাদের বর্ণনা করেছেন, সুফিয়ান থেকে, তিনি সালামা ইবনে কুহাইল থেকে, তিনি আবুয যা’রা থেকে, তিনি আবদুল্লাহ থেকে। আবদুল্লাহ বলেন: কোরআনকে অন্য উপাদানমুক্ত রাখো এবং তার সঙ্গে কোনো কিছু মেশাবে না।

পরের অনুমোদনের মধ্যেও ব্যবহারভেদে পার্থক্য ছিল। দানি মালিকের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, ছোট মুসহাফে এ কাজ করতে তিনি আপত্তি দেখেন না, কিন্তু প্রধান মুসহাফে করেন। অন্য বর্ণনায় হাসান বসরি লাল রঙে নুকতা দেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। ফলে শিক্ষার সুবিধা, সংযোজনের রঙ এবং কপির ধরন অনুযায়ী গ্রহণযোগ্যতার সীমানা নির্ধারিত হয়েছে। সব কপিকে শুরু থেকেই একইভাবে চিহ্নিত করার কোনো একক, নির্বিরোধ নির্দেশ এই আলোচনায় নেই। [935]

قال ابن وهب : وقال لي مالك : أما هذه المصاحف الصغار فلا أرى بأسا ، وأما الأمهات فلا .

বাংলা অনুবাদ: ইবনে ওয়াহব বলেন: মালিক আমাকে বলেছেন, এই ছোট মুসহাফগুলোর ক্ষেত্রে আমি আপত্তি দেখি না; কিন্তু প্রধান মুসহাফগুলোর ক্ষেত্রে অনুমোদন করি না।

দানি রঙের ব্যবহার নিয়েও কঠোর নিয়ম দিয়েছেন। তাঁর হিসাবে মদিনার চিহ্নদাতারা হরকত ও অন্যান্য নির্দেশে লাল, হামজায় হলুদ ব্যবহার করতেন; ইরাকিরা মূলত লাল ব্যবহার করতেন। এক মুসহাফে বিভিন্ন পাঠকে আলাদা রঙে তুলে ধরার পদ্ধতিকে তিনি অপছন্দ করেছেন এবং “রসমের তীব্র পরিবর্তন” বলেছেন। অনুমোদন ও আপত্তির এই বিচার থেকে বোঝা যায়, পাতায় কোন নির্দেশ থাকবে এবং কতগুলো পাঠ সেখানে একসঙ্গে দেখানো যাবে, তাও পাঠ নিয়ন্ত্রণের বিষয় ছিল। [936]

قال أبو عمرو : وأكره من ذلك ، وأقبح منه : ما استعمله ناس من القراء ، وجهلة من النقاط ، من جمع قراءات شتى ، وحروف مختلفة ، في مصحف واحد ، وجعلهم لكل قراءة وحرف لونا من الألوان المخالفة للسواد ، كالحمرة والخضرة والصفرة واللازورد ، وتنبيههم على ذلك في أول المصحف ، ودلالتهم عليه هناك ؛ لكي تعرف القراءات ، وتميز الحروف . إذ ذلك من أعظم التخليط ، وأشد التغيير للمرسوم .

বাংলা অনুবাদ: আবু আমর বলেন: তার চেয়েও বেশি অপছন্দনীয় এবং কুৎসিত হলো কিছু পাঠকারী ও অজ্ঞ চিহ্নদাতার এই চর্চা: এক মুসহাফে বিভিন্ন পাঠ ও ভিন্ন বর্ণ একত্র করা; প্রত্যেক পাঠ ও বর্ণের জন্য মূল কালো কালি থেকে আলাদা রঙ—যেমন লাল, সবুজ, হলুদ ও নীল—নির্ধারণ করা; মুসহাফের শুরুতে সে সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া, যাতে পাঠগুলো চেনা এবং বর্ণগুলো আলাদা করা যায়। কারণ এটি সবচেয়ে বড় ধরনের মিশ্রণ এবং লিখিত রসমের সবচেয়ে তীব্র পরিবর্তনের অন্তর্ভুক্ত।

রঙ দিয়ে পাঠের মর্যাদাও চিহ্নিত করা হতো। দানি কুফা ও বসরার কিছু চর্চায় শায পাঠ সবুজে এবং অন্য ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ পাঠ সবুজে, পরিত্যক্ত পাঠ লালে দেখানোর কথা বলেছেন। একই রঙ ভিন্ন পদ্ধতিতে ভিন্ন মর্যাদার পাঠ বোঝাতে পারত। তিনি এটিকে মিশ্রণ ও পরিবর্তন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। পাঠের কোন রূপ সামনে থাকবে এবং কোনটি আলাদা মর্যাদায় চিহ্নিত হবে, তা নির্ধারণও লিখিত পাতার ওপর কর্তৃত্ব প্রয়োগের অংশ। [937]

وطوائف من أهل الكوفة والبصرة قد يدخلون الحروف الشواذ في المصاحف وينقطونها بالخضرة ، وربما جعلوا الخضرة للقراءة المشهورة الصحيحة ، وجعلوا الحمرة للقراءة الشاذة المتروكة ، وذلك تخليط وتغيير ، وقد كره ذلك جماعة من العلماء .

বাংলা অনুবাদ: কুফা ও বসরার কিছু গোষ্ঠী মুসহাফে শায পাঠ অন্তর্ভুক্ত করে এবং সবুজ রঙে চিহ্ন দেয়। কখনো তারা প্রসিদ্ধ ও শুদ্ধ পাঠের জন্য সবুজ এবং শায ও পরিত্যক্ত পাঠের জন্য লাল ব্যবহার করে। এটি মিশ্রণ ও পরিবর্তন; একদল আলেম তা অপছন্দ করেছেন।


ইবনে আবি দাউদের গ্রন্থে হাজ্জাজের এগারো স্থানে পরিবর্তনের বর্ণনা

ইবনে আবি দাউদের “কিতাবুল মাসাহিফ”-এ হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের নামে উসমানের মুসহাফে “এগারো হরফ” পরিবর্তনের একটি প্রতিবেদন রয়েছে। “হরফ” এখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে কেবল একটি বর্ণ বোঝায় না; তালিকায় পূর্ণ শব্দ, ক্রিয়াপদ ও বাক্যাংশও আছে। একই প্রতিবেদনে একটি অক্ষর যোগের সঙ্গে বিধানসূচক শব্দ বদল এবং দুটি কাহিনির হুমকির ভাষা বিনিময়ের খবর এসেছে। ফলে প্রতিবেদনটি যে পরিবর্তনগুলোর দাবি করে, তার পরিসর সাধারণ স্বরচিহ্ন বসানোর চেয়ে বিস্তৃত।

বর্ণনার শুরুতে ইবনে আবি দাউদ তাঁর পিতার নথিতে অনামা একজন বর্ণনাকারীর উল্লেখ এবং পরে পিতার কাছে তাঁর নাম জেনে নেওয়ার ঘটনাও জানিয়েছেন। এরপর আব্বাদ ইবনে সুহাইব ও আওফ ইবনে আবি জামিলার সূত্রে হাজ্জাজের পরিবর্তনগুলোর বিবরণ দিয়েছেন। এই নথিবদ্ধ ভাষ্যে কোথায় কী ছিল এবং বদলে কী করা হয়েছে, তা আলাদা করে লেখা আছে। [938]

قال أبو بكر : كان في كتاب أبي : حدثنا رجل، فسألت أبي: من هو ؟ فقال: حدثنا عباد بن صهيب ، عن عوف بن أبي جميلة ،أن الحجاج بن يوسف ، غير في مصحف عثمان أحد عشر حرفا، قال: كانت في البقرة ” ” لم يتسن وانظر ” فغيرها ” لم يتسنه ” بالهاء، وكانت في المائدة ” شريعة ومنهاجا ” فغيره شرعة ومنهاجا ، وكانت في يونس ” هو الذي ينشركم ” فغيره يسيركم ، وكانت في يوسف ” أنا آتيكم بتأويله ” فغيرها ” أنا أنبئكم بتأويله “، وكانت في المؤمنين ” سيقولون لله لله ” ثلاثتهن، فجعل الأخريين ” الله الله “، وكان في الشعراء في قصة نوح ” من المخرجين “، وفي قصة لوط ” من المرجومين “، فغير قصة نوح من المرجومين ، وقصة لوط من المخرجين ، وكانت في الزخرف : 32 نحن قسمنا بينهم معايشهم ، فغيّرها ” مَعِيشَتَهُم ” . وكانت في الذين كفروا ” من ماء غير يسن ” فغيرها من ماء غير آسن ، وكانت في الحديد ” فالذين آمنوا منكم واتقوا لهم أجر كبير ” فغيرها ” منكم وأنفقوا “، وكانت في إذا الشمس كورت ” وما هو على الغيب بظنين ” فغيرها بضنين “

বাংলা অনুবাদ: আবু বকর বলেন: আমার পিতার বইয়ে ছিল, “এক ব্যক্তি আমাদের বর্ণনা করেছেন।” আমি পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি কে? তিনি বললেন, আব্বাদ ইবনে সুহাইব আমাদের বর্ণনা করেছেন, আওফ ইবনে আবি জামিলা থেকে: হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ উসমানের মুসহাফে এগারোটি হরফ পরিবর্তন করেছিলেন। তিনি বলেন: বাকারায় ছিল “লাম ইয়াতাসান ওয়ানযুর”; তিনি হা যোগ করে “লাম ইয়াতাসান্নাহ” করেন। মায়িদায় ছিল “শারিআতান ওয়া মিনহাজা”; তিনি তা বদলে “শিরআতান ওয়া মিনহাজা” করেন। ইউনুসে ছিল “হুয়াল্লাযি ইয়ানশুরুকুম”; তিনি তা বদলে “ইউসাইয়িরুকুম” করেন। ইউসুফে ছিল “আনা আতিকুম বি তা’বিলিহি”; তিনি তা বদলে “আনা উনাব্বিউকুম বি তা’বিলিহি” করেন। মুমিনুনে তিনটি জায়গায় “সায়াকুলুনা লিল্লাহ”—লিল্লাহ—ছিল; তিনি শেষের দুটিকে “আল্লাহ, আল্লাহ” করেন। শুআরায় নুহের ঘটনায় ছিল “মিনাল মুখরাজিন” এবং লুতের ঘটনায় ছিল “মিনাল মারজুমিন”; তিনি নুহের ঘটনায় “মিনাল মারজুমিন” এবং লুতের ঘটনায় “মিনাল মুখরাজিন” করেন।

যুখরুফে ছিল “নাহনু কাসামনা বাইনাহুম মা’আইশাহুম”; তিনি তা বদলে “মা’ঈশাতাহুম” করেন। “আল্লাযিনা কাফারু” তথা মুহাম্মাদ সূরায় পানির বর্ণনায় “من ماء غير يسن” ছিল; তিনি তা বদলে “মিন মায়িন গাইরি আসিন” করেন। হাদিদে ছিল “ফাল্লাযিনা আমানু মিনকুম ওয়াত্তাকাও লাহুম আজরুন কাবির”; তিনি “মিনকুম ওয়া আনফাকু” করেন। “ইযাশ শামসু কুউইরাত” সূরায় ছিল “ওয়া মা হুয়া আলাল গাইবি বি-যানিন”—যোয়া (ظ) দিয়ে; তিনি তা বদলে “বি-দানিন”—দোয়াদ (ض) দিয়ে—করেন।

স্থানপ্রতিবেদনে পূর্ববর্তী রূপহাজ্জাজের নামে বর্ণিত পরিবর্তিত রূপশব্দগত ফল
বাকারা ২:২৫৯لَمْ يَتَسَنَّلَمْ يَتَسَنَّهْশব্দের শেষে হা যুক্ত
মায়িদা ৫:৪৮شَرِيعَةً وَمِنْهَاجًاشِرْعَةً وَمِنْهَاجًاশারিআহ থেকে শিরআহ; ইয়ার উপস্থিতি বদল
ইউনুস ১০:২২هُوَ الَّذِي يَنْشُرُكُمْهُوَ الَّذِي يُسَيِّرُكُمْছড়িয়ে দেওয়া থেকে চলাচল করানো
ইউসুফ ১২:৪৫أَنَا آتِيكُمْ بِتَأْوِيلِهِأَنَا أُنَبِّئُكُمْ بِتَأْوِيلِهِব্যাখ্যা এনে দেওয়া থেকে ব্যাখ্যা জানানো
মুমিনুন ২৩:৮৭ ও ৮৯শেষ দুই উত্তরেও لِلَّهِশেষ দুই উত্তরে اللَّهُলামের উপস্থিতি বদল; “আল্লাহর” থেকে “আল্লাহ”
শুআরা ২৬:১১৬, নুহের কাহিনিمِنَ الْمُخْرَجِينَمِنَ الْمَرْجُومِينَবিতাড়িতদের একজন থেকে পাথর মেরে হত্যার শিকারদের একজন
শুআরা ২৬:১৬৭, লুতের কাহিনিمِنَ الْمَرْجُومِينَمِنَ الْمُخْرَجِينَপাথর মেরে হত্যার শিকারদের একজন থেকে বিতাড়িতদের একজন
যুখরুফ ৪৩:৩২مَعَايِشَهُمْمَعِيشَتَهُمْজীবিকার বহুবচন থেকে একবচন
মুহাম্মাদ ৪৭:১৫من ماء غير يسنمِنْ مَاءٍ غَيْرِ آسِنٍলিখিত ইয়ার জায়গায় হামজাযুক্ত আলিফের রূপ
হাদিদ ৫৭:৭آمَنُوا مِنْكُمْ وَاتَّقَوْاآمَنُوا مِنْكُمْ وَأَنْفَقُواবিশ্বাস ও তাকওয়ার উল্লেখ থেকে বিশ্বাস ও ব্যয় করার উল্লেখ
তাকভির ৮১:২৪وَمَا هُوَ عَلَى الْغَيْبِ بِظَنِينٍوَمَا هُوَ عَلَى الْغَيْبِ بِضَنِينٍঅভিযুক্ত বা সন্দেহভাজন নয় থেকে কৃপণ বা জ্ঞান গোপনকারী নয়

মুমিনুনের শেষ দুটি উত্তরের বদল প্রতিবেদনে একসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে। নুহ ও লুতের ঘটনার পরিবর্তন দুটি পৃথক স্থানের। এই তালিকা তাই একটি অক্ষর এগারোবার পাল্টানোর বিবরণ নয়। হাদিদের “ওয়াত্তাকাও” ও “ওয়া আনফাকু” আলাদা কাজ নির্দেশ করে; শুআরার দুটি শব্দ ভিন্ন ধরনের শাস্তি বা হুমকি বোঝায়; যুখরুফের শব্দে একবচন–বহুবচন বদলায়। সংশোধনের আরোপটি অর্থবাহী শব্দরূপ পর্যন্ত বিস্তৃত।

শুআরার উদাহরণে পার্থক্যটি বিশেষভাবে তীক্ষ্ণ। কাউকে দেশ বা জনপদ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি এবং পাথর মেরে হত্যার হুমকি এক বিষয় নয়। বর্ণিত পরিবর্তনে নুহের কাহিনির জন্য এক শব্দ এবং লুতের কাহিনির জন্য অন্য শব্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। কাহিনির ফল একই রেখে কেবল পাঠের গতি বা সুর ঠিক করার কথা এখানে নেই; চরিত্রগুলোর মুখে উচ্চারিত হুমকির ভাষাই বদলানোর দাবি রয়েছে।

হাদিদের উদাহরণেও নির্দিষ্ট ধর্মীয় কাজের বদল ঘটছে। “ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে” এবং “ঈমান এনেছে এবং ব্যয় করেছে”—দুটি বাক্যাংশে দ্বিতীয় শর্ত এক নয়। সাধারণ সংযম বা আল্লাহভীতির জায়গায় অর্থ ব্যয়ের কাজ নির্দিষ্ট হয়েছে। কাহিনির শব্দ, সর্বনামের বিভক্তি এবং বিধানসংক্রান্ত ক্রিয়া—সব ধরনের বিষয় একই পরিবর্তনের প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে। একে সামগ্রিকভাবে নুকতা বা হরকত যোগ করার খবর বলে পরিচয় দিলে বর্ণনার অধিকাংশ উপাদানের চরিত্র বদলে যায়।

ইবনে আবি দাউদের গ্রন্থে এই আরোপের সংরক্ষণ এবং প্রতিটি পরিবর্তনের বাস্তব প্রয়োগের বিস্তার আলাদা ঐতিহাসিক তথ্য। প্রতিবেদনে “উসমানের মুসহাফে” পরিবর্তনের কথা আছে। কোন কোন আঞ্চলিক কপিতে তার ফল গিয়েছিল এবং প্রতিদ্বন্দ্বী পাঠ কতখানি বহাল ছিল, সেই তথ্য সংশ্লিষ্ট পাঠগুলোর নিজস্ব সাক্ষ্যে পাওয়া যায়। তালিকাটি হাজ্জাজের নামে কী দাবি করা হয়েছে তার পূর্ণ বিবরণ দেয়; পাশাপাশি সংরক্ষিত কিরাতগুলো ওই দাবির নির্দিষ্ট ফলের সঙ্গে তুলনা করার উপাদান দেয়।


ইউনুস ১০:২২ — “ইউসাইয়িরুকুম” ও “ইয়ানশুরুকুম”

ইউনুসের ২২ নম্বর আয়াতে “ইউসাইয়িরুকুম” এবং “ইয়ানশুরুকুম” দুটি পৃথক ক্রিয়াপদ। প্রথমটির অর্থ চলাচল করানো বা পরিভ্রমণ করানো; দ্বিতীয়টির অর্থ ছড়িয়ে দেওয়া বা বিস্তার করা। শুধু স্বরের পার্থক্য দিয়ে একটি থেকে অন্যটি হয় না। নুকতার অবস্থান, বর্ণের পরিচয় এবং ক্রিয়ার গঠন আলাদা। উভয় পাঠেই মানুষের স্থল ও সমুদ্রে যাতায়াতের প্রসঙ্গ আছে; কিন্তু এই কাজ বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দটি এক নয়।

তাফসিরে জালালাইন আয়াতটির শুরুতেই দুটি পাঠ উল্লেখ করেছে। তারপর নৌযাত্রা, অনুকূল বাতাস, ঝড়, পরিবেষ্টিত হওয়ার ভয় এবং বিপদ থেকে মুক্তির জন্য একনিষ্ঠ প্রার্থনার ব্যাখ্যা দিয়েছে। সম্পূর্ণ ব্যাখ্যার মধ্যেই বিকল্প ক্রিয়াপদটির পরিচয় আছে। [939] [940]

﴿هُوَ ٱلَّذِی یُسَیِّرُكُمۡ﴾ وَفِي قِرَاءَة {یَنشُرُكُمۡ} ﴿فِی ٱلۡبَرِّ وَٱلۡبَحۡرِۖ حَتَّىٰۤ إِذَا كُنتُمۡ فِی ٱلۡفُلۡكِ﴾ السُّفُن ﴿وَجَرَیۡنَ بِهِم﴾ فِيهِ الْتِفَات عَنْ الْخِطَاب ﴿بِرِیحࣲ طَیِّبَةࣲ﴾ لَيِّنَة ﴿وَفَرِحُوا۟ بِهَا جَاۤءَتۡهَا رِیحٌ عَاصِفࣱ﴾ شَدِيدَة الْهُبُوب تَكْسِر كُلّ شَيْء ﴿وَجَاۤءَهُمُ ٱلۡمَوۡجُ مِن كُلِّ مَكَانࣲ وَظَنُّوۤا۟ أَنَّهُمۡ أُحِیطَ بِهِمۡ﴾ أَيْ أُهْلِكُوا ﴿دَعَوُا۟ ٱللَّهَ مُخۡلِصِینَ لَهُ ٱلدِّینَ﴾ الدُّعَاء ﴿لَىِٕنۡ﴾ لَام قَسَم ﴿أَنجَیۡتَنَا مِنۡ هَـٰذِهِۦ﴾ الْأَهْوَال ﴿لَنَكُونَنَّ مِنَ ٱلشَّـٰكِرِینَ ٢٢﴾ الْمُوَحِّدِينَ

বাংলা অনুবাদ: ২২. তিনিই তোমাদেরকে জলে-স্থলে পরিভ্রমণ করান। অপর এক পাঠে “ইয়ানশুরুকুম” রয়েছে, অর্থ তোমাদের ছড়িয়ে দেন। “আর তোমরা যখন নৌকায় থাকো”—“ফুলক” অর্থ নৌকাসমূহ। “এবং এগুলো তাদের নিয়ে অনুকূল বাতাসে চলতে থাকে”—এখানে দ্বিতীয় পুরুষ থেকে তৃতীয় পুরুষে রূপান্তর ঘটেছে। “তাইয়িবা” অর্থ কোমল, সুখকর বাতাস। “এবং তাতে তারা আনন্দিত হয়; হঠাৎ তার ওপর ঝোড়ো বাতাস এসে পড়ে”—“আসিফ” অর্থ প্রচণ্ড বেগে প্রবাহিত ঝঞ্ঝাবায়ু, যা সবকিছু ভেঙেচুরে ফেলে। “আর সব দিক থেকে তাদের ওপর ঢেউ এসে পড়ে এবং তারা মনে করে, তারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েছে”—অর্থাৎ ধ্বংস হয়ে যাবে। “তখন তারা দীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য বিশুদ্ধ করে তাঁকে ডাকে”—এখানে দীন অর্থ দোয়া। “তুমি যদি এই বিভীষিকা থেকে আমাদের উদ্ধার করো, তবে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হব”—অর্থাৎ একত্ববাদীদের অন্তর্ভুক্ত হব। “লাঈন”-এর লাম শপথব্যঞ্জক।

কোরআন সংকলন 190

কুরতুবি সাধারণ পাঠ হিসেবে “ইউসাইয়িরুকুম” এবং ইবনে আমিরের পাঠ হিসেবে নুন ও শিন দিয়ে “ইয়ানশুরুকুম” নির্দিষ্ট করেছেন। দ্বিতীয় শব্দটির ব্যাখ্যায় তিনি “ইয়াবুসসুকুম ওয়া ইউফাররিকুকুম”—তোমাদের ছড়িয়ে দেন ও বিচ্ছিন্নভাবে বিস্তার করেন—বলেছেন। ফলে বর্ণের পার্থক্যের পাশাপাশি ক্রিয়াপদের অর্থের পার্থক্যও তাফসিরে পরিষ্কারভাবে সংরক্ষিত। [941]

يسيركم قراءة العامة . ابن عامر ” ينشركم ” بالنون والشين ، أي يبثكم ويفرقكم .

বাংলা অনুবাদ: সাধারণ পাঠ “ইউসাইয়িরুকুম”। ইবনে আমিরের পাঠ “ইয়ানশুরুকুম”—নুন ও শিন দিয়ে; অর্থাৎ তোমাদের ছড়িয়ে দেন ও বিচ্ছিন্নভাবে বিস্তার করেন।

বিষয়ইউসাইয়িরুকুমইয়ানশুরুকুম
আরবি ক্রিয়াপদيُسَيِّرُكُمْيَنْشُرُكُمْ
মূল অর্থতোমাদের চলাচল বা পরিভ্রমণ করানতোমাদের ছড়িয়ে দেন বা বিস্তার করেন
বর্ণগত পার্থক্যসিন ও ইয়ার রূপ; দ্বিত্বসহ ক্রিয়াগঠননুন ও শিনের রূপ; পৃথক ক্রিয়ামূল
কুরতুবির পাঠপরিচয়সাধারণ পাঠইবনে আমিরের পাঠ
কাহিনির সঙ্গে সম্পর্কস্থল ও সমুদ্রে মানুষের যাতায়াত করানোস্থল ও সমুদ্রে মানুষের বিস্তার ঘটানো

দানির আঞ্চলিক কপির বিবরণে শামের মুসহাফে নুন ও শিনযুক্ত রূপটি থাকার কথা রয়েছে, অন্য কপিতে সিন ও ইয়াযুক্ত রূপ। এই সাক্ষ্য একটি পাঠকারীর নামের বাইরে ভিন্ন লিখিত কপির পরিচয়ও দেয়। হাজ্জাজের নামে পরিবর্তনের আরোপে এই একই স্থান রয়েছে: “ইয়ানশুরুকুম” থেকে “ইউসাইয়িরুকুম”। আঞ্চলিক মুসহাফের বিবরণে আবার “ইয়ানশুরুকুম” শামের রূপ হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে। [942] [943]

وفي يونس في مصاحف أهل الشام ” وهو الذي ينشركم في البر والبحر ” بالنون والشين وفي سائر المصاحف ” يسيّركم ” بالسين والياء

বাংলা অনুবাদ: ইউনুস সূরায় শামের অধিবাসীদের মুসহাফে “ওয়া হুয়াল্লাযি ইয়ানশুরুকুম ফিল বাররি ওয়াল বাহর”—নুন ও শিন দিয়ে। অন্য সব মুসহাফে “ইউসাইয়িরুকুম”—সিন ও ইয়া দিয়ে।

এই দুটি ক্রিয়ার পার্থক্য একই অবয়বের ওপর চিহ্ন বসিয়ে একটি পাঠকে স্পষ্ট করার ক্ষমতাও দেখায়। একটি কপিতে যে নুকতা ও দ্বিত্বচিহ্ন বসানো হয়েছে, পাঠকের সামনে সেই শব্দটি নির্দিষ্ট হবে। অন্য রূপে চিহ্ন দিলে আলাদা ক্রিয়া দৃশ্যমান হবে। এই অর্থে চিহ্ন পাঠের একটি ব্যাখ্যা বহন করে: কোথায় কোন বর্ণ এবং কোন ক্রিয়ার গঠন গ্রহণ করা হচ্ছে, তা পাতায় স্থির করে।

লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত এক নির্দিষ্ট শব্দরূপের দাবির সামনে এই দুটি গৃহীত ক্রিয়া একটি প্রত্যক্ষ প্রশ্ন রাখে: সেই নির্দিষ্ট রূপ “ইউসাইয়িরুকুম”, না “ইয়ানশুরুকুম”? উভয় রূপকে অনুমোদিত বলা তাদের বর্ণগত পার্থক্য স্বীকার করেই বহুত্বের অনুমোদন। এক্ষেত্রে বর্ণ ও অর্থ আলাদা থাকা সত্ত্বেও দুটি রূপ পাঠপরম্পরায় মর্যাদা পেয়েছে। ফলে “অনুমোদিত সব পাঠে প্রতিটি শব্দের প্রতিটি অক্ষর একই”—এই দাবি মিথ্যা।

একটি রূপ পরে বেশি ছাপা বা প্রচারিত হলে অন্য রূপের সাক্ষ্য ইতিহাস থেকে অপসারিত হয় না। জালালাইন ক্রিয়াদুটি পাশাপাশি রেখেছে, কুরতুবি পাঠকারীর নাম ও অর্থ জানিয়েছে এবং দানি আঞ্চলিক কপির পার্থক্য নথিবদ্ধ করেছেন। এই স্বতন্ত্র পরিচয়গুলো একই পাঠভেদের বিভিন্ন দিক ধরে রাখে। হাজ্জাজের নামে আরোপের সঙ্গে সেই বিস্তৃত পাঠসাক্ষ্যের সম্পর্কও তাই শুধু একটি পরিবর্তিত কপির গল্পে সীমিত নয়।


আনফাল ৮:৩৯ — “ইয়া’মালুন” ও “তা’মালুন”

আনফাল ৮:৩৯-এর শেষ অংশে “ইয়ামালুন” ও “তামালুন”-এর পার্থক্য বাক্যে কাদের কাজের কথা বলা হচ্ছে, তা বদলে দেয়। “ইয়া” দিয়ে “ইয়ামালুন” অর্থ তারা যা করে; “তা” দিয়ে “তামালুন” অর্থ তোমরা যা করো। আরবি ক্রিয়াপদের এই প্রথম বর্ণ শুধু ধ্বনির সাজ নয়; তা ব্যাকরণগত ব্যক্তি নির্ধারণ করে। একই আয়াতে এক রূপে অন্যদের কাজের দিকে নির্দেশ, অন্য রূপে সম্বোধিত ব্যক্তিদের কাজের দিকে নির্দেশ আসে।

আয়াতটির বহুল প্রচলিত রূপে শেষাংশ “ফা ইন্নাল্লাহা বিমা ইয়ামালুনা বাসির”—আল্লাহ তারা যা করে তার সম্যক দ্রষ্টা। যুদ্ধ, বিরত হওয়া এবং পরবর্তী আচরণের প্রসঙ্গে এই শেষ বাক্যের নির্দেশিত পক্ষ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। [944]

وَقَـٰتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌۭ وَيَكُونَ ٱلدِّينُ كُلُّهُۥ لِلَّهِ ۚ فَإِنِ ٱنتَهَوْا۟ فَإِنَّ ٱللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ بَصِيرٌۭ

বাংলা অনুবাদ: তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না ফিতনা দূর হয় এবং দীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য হয়। অতঃপর তারা বিরত হলে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তারা যা করে তার সম্যক দ্রষ্টা।

বাংলা উচ্চারণ: ওয়া কা-তিলূ হুম্ হাত্তা-লা-তাকূনা ফিত্নাতুঁও অইয়াকূনাদ্ দীনু কুল্লুহূ লিল্লা-হি ফাইনিন্তাহাও ফাইন্নাল্লা-হা বিমা-ইয়া’মালূনা বাসির

তাফসিরে মাযহারী “ইয়ামালুন”-এর পাঠে বিরত হওয়া প্রতিপক্ষের কাজের সঙ্গে শেষ বাক্যের সম্পর্ক দেখিয়েছে। “তামালুন”-এর পাঠে সেই সম্পর্ক মুসলমানদের কাজের দিকে ফেরে। ব্যাখ্যাকার তখন জিম্মিদের প্রতি আচরণ, তাদের ওপর অত্যাচার না-করা এবং কাজের প্রতিফলের প্রশ্ন এনেছেন। অর্থাৎ পাঠভেদ থেকে বাস্তব আচরণ ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার পৃথক দিক তৈরি হয়েছে। [945]

আলোচ্য বাক্যটির উদ্দেশ্য এ রকমও হতে পারে যে—এবং যদি তারা বিরত হয়, হয়ে যায় মুসলমান অথবা জিম্মি (জিযিয়া কর প্রদাতা), তবে জেনে রেখো, আল্লাহতায়ালা তাদের আমলের সম্যক দ্রষ্টা। এমতাবস্থায় তোমরা আর যুদ্ধ কোরো না। আল্লাহ্পাক স্বয়ং ইসলাম অথবা কুফরের কারণে পুরস্কার অথবা শাস্তি প্রদান করবেন।
ক্বারী ইয়াকুব এখানে উল্লেখিত ইয়ামালুন (তারা করে) শব্দটিকে পড়তেন তা’মালুন (তোমরা করো)। তাঁর উচ্চারণটিকে গ্রহণ করলে ‘আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা’ কথাটি সম্পৃক্ত হবে মুসলমানদের আমলের সঙ্গে। তখন অর্থ দাঁড়াবে এ রকম, হে মুসলিমবৃন্দ! তোমরা তোমাদের মুসলিম ভ্রাতৃবৃন্দের সঙ্গে যেরূপ আচরণ করো সেরূপ আচরণ করো জিম্মিদের সঙ্গে। যেহেতু তারা জিযিয়া দিয়ে তোমাদের পূর্ণ আনুগত্য স্বীকার করেছে, সেহেতু তোমরা আর তাদের প্রতি কোনো অত্যাচার কোরো না। অবশেষে তোমাদের ও তাদের আমলের যথা বিনিময় প্রদান করা হবে। তোমাদেরকে দেয়া হবে পুরস্কার এবং তাদেরকে দেয়া হবে শাস্তি।
কতিপয় সাহাবীর বর্ণনাসূত্রে সাফওয়ান বিন সালিম উল্লেখ করেছেন, রসুল স. বলেছেন, ভালো করে শুনে নাও, যে লোক জিম্মিদের প্রতি অত্যাচার করবে, তাদের প্রাপ্য পুরোপুরি পূরণ করবে না, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কিছু গ্রহণ করবে অথবা তাদের উপর সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা অর্পণ করবে, কিয়ামতের দিন আমি তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবো। আবু দাউদ। এই হাদিসের আলোকে ‘যদি তারা বিরত হয়’ কথাটির উদ্দেশ্য হবে দু’টি। একটি হচ্ছে যদি তারা অবিশ্বাস থেকে বিরত হয়। অপরটি হচ্ছে যদি তারা জিযিয়া প্রদান করে যুদ্ধ থেকে বিরত হয়।
আল্লামা বায়যাবী বলেছেন, ‘ইয়ামালুন’ এর স্থলে ‘তা’মালুন’ উচ্চারণ করলে অর্থ হবে এ রকম- হে মুসলমানেরা! তোমরা জেহাদ করছো, ইসলামের প্রতি মানুষকে আহ্বান জানাচ্ছো, মানুষকে কুফরির অন্ধকার থেকে ইমানের দিকে আসতে বলছো তোমাদের এ সকল আমলকে আল্লাহতায়ালা দেখছেন। এ সকল আমলের জন্য তিনি তোমাদেরকে উপযুক্ত প্রতিফল প্রদান করবেন। বায়যাবীর এই ব্যাখ্যাটিকে গ্রহণ করলে বলতে হয়, বিষয়টিকে ছেড়ে দিতে হবে তকদিরের উপর। অর্থাৎ মুসলমানেরা কেবল ইসলামের প্রতি আহ্বান জানিয়েই ক্ষান্ত থাকবে। যার তকদিরে ইমান রয়েছে সে ইমান গ্রহণ করবে, আর যার তকদিরে ইমান নেই সে ইমানহীন অবস্থাতেই থেকে যাবে। আল্লাহতায়ালা সকল কিছুর সম্যক দ্রষ্টা। তাই তাঁর অধিকারেই সম্পূর্ণ ছেড়ে দিতে হবে পুরস্কার ও তিরস্কার প্রদানের বিষয়টি।

কোরআন সংকলন 192

মাযহারির উদ্ধৃতির মধ্যে দুটি পৃথক ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথমটিতে “তোমরা যা করো” কথাটি মুসলমানদের জিম্মিদের প্রতি আচরণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। দ্বিতীয়টিতে বায়যাবির নামে ব্যাখ্যায় মুসলমানদের জিহাদ, ইসলামের আহ্বান ও মানুষকে ঈমানের দিকে ডাকার কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই দুই ব্যাখ্যার মধ্যেও নির্দিষ্ট কাজের পরিচয় আলাদা; উভয়টির ভিত্তিতে দ্বিতীয় পুরুষের সম্বোধন রয়েছে। ফলে পরিবর্তিত প্রথম বর্ণ ব্যাখ্যাকারকে অন্য একটি কর্তার কাজ নিয়ে বক্তব্য গড়ার সুযোগ দেয়।

ইবনে আশুর পরম্পরাটির পরিচয় আরও নির্দিষ্ট করেছেন। অধিকাংশ পাঠকারীর রূপ ইয়া দিয়ে; ইয়াকুবের সূত্রে রুয়াইসের রূপ সম্বোধনের তা দিয়ে। ইয়াকুবের নামে সব বর্ণনাপরম্পরাকে নির্বিশেষে একই রূপে দেখানোর বদলে তাঁর কোন বর্ণনাকারীর সূত্রে তা এসেছে, সেই পরিচয় এখানে পাওয়া যায়। [946]

وقَرَأ الجُمْهُورُ: يَعْمَلُونَ – بِياءِ الغائِبِ – وقَرَأهُ رُوَيْسٌ عَنْ يَعْقُوبَ بِتاءِ الخِطابِ.

বাংলা অনুবাদ: অধিকাংশ পড়েছেন “ইয়ামালুন”—তৃতীয় পুরুষের ইয়া দিয়ে; আর ইয়াকুবের সূত্রে রুয়াইস পড়েছেন সম্বোধনের তা দিয়ে।

পাঠসর্বনামের ধরনঅর্থের পার্থক্য
يَعْمَلُونَ — ইয়ামালুনতৃতীয় পুরুষ বহুবচনতারা যা করে
تَعْمَلُونَ — তামালুনদ্বিতীয় পুরুষ বহুবচনতোমরা যা করো

ইবনে তাইমিয়ার সাধারণ উদাহরণে ইয়া ও তা-র জন্য একই অক্ষরদেহ খোলা রাখার কথা আছে; আনফালের এই স্থান সেই ধরনের ভেদের একটি নির্দিষ্ট আয়াতভিত্তিক উদাহরণ। নুকতা বসিয়ে প্রথম বর্ণকে ইয়া বা তা হিসেবে দৃশ্যমান করলে বাক্যে নির্দেশিত ব্যক্তিও নির্দিষ্ট হয়। একই বর্ণকাঠামোর সামর্থ্য এবং নির্দিষ্ট চিহ্নযুক্ত পাঠ এক জিনিস নয়। প্রথমটি দুটি রূপ ধারণ করতে পারে; দ্বিতীয়টি পাঠককে তার চিহ্ন অনুযায়ী একটি রূপ পড়ার নির্দেশ দেয়।

এই আয়াতে প্রতিপক্ষের বিরত হওয়ার পরে কী ঘটছে এবং কাদের কাজ আল্লাহ দেখছেন, শেষ বাক্যটি সেই সম্পর্ক স্থাপন করে। “তারা” থাকলে তৃতীয় পক্ষের কাজ আলোচ্য হয়; “তোমরা” থাকলে শ্রোতাদের নিজেদের কাজ। ব্যাখ্যাকারদের আলোচনায় সেই পার্থক্য ধরে আচরণের দায় ও প্রতিফল নির্ধারিত হয়েছে। বর্ণভেদের অর্থবাহী ফল তাই শুধু অভিধানের একটি আলাদা শব্দার্থে সীমিত নয়; গোটা বক্তব্যের দিকে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিচয়েও পৌঁছায়।

আনফালের এই পাঠভেদ হাজ্জাজের এগারো পরিবর্তনের উদ্ধৃত তালিকায় নেই। এর নিজস্ব সাক্ষ্য ইয়াকুব–রুয়াইসের পাঠপরম্পরা এবং তাফসিরে সংরক্ষিত ব্যাখ্যা। নুকতা ও চিহ্নের ভাষাগত কার্যকারিতা এখানে প্রত্যক্ষ: প্রথম বর্ণের পরিচয় স্থির করার সঙ্গে সম্বোধনও স্থির হয়। একাধিক পাঠের অনুমোদন স্বীকার করা এবং সব পাঠের বর্ণ ও সর্বনাম অভিন্ন বলে দাবি করা পরস্পরবিরোধী অবস্থান। এই নির্দিষ্ট আয়াতেই “তারা” ও “তোমরা”—দুটি রূপ সংরক্ষিত রয়েছে।


হাজ্জাজের নামে আরোপিত পরিবর্তন, স্বতন্ত্র পাঠসাক্ষ্য ও পরবর্তী মূল্যায়ন

হাজ্জাজের নামে সংরক্ষিত এগারো পরিবর্তনের প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট শব্দগুলোর পৃথক পাঠসাক্ষ্য একই উৎসনির্ভর তথ্য নয়। একটি প্রতিবেদন নির্দিষ্ট শাসককে পরিবর্তনকারী হিসেবে চিহ্নিত করে; অন্য দলিলগুলো কোন শব্দরূপ কোন পাঠকারীর পরম্পরা বা আঞ্চলিক মুসহাফে ছিল, তার খবর দেয়। একই শব্দের দুটি রূপ সংরক্ষিত হওয়ার সাক্ষ্য এবং একটি রূপের নির্দিষ্ট প্রবর্তক সম্পর্কে সাক্ষ্য তাই পৃথক। দুটি রূপের উপস্থিতি প্রমাণিত হলেই নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রবর্তক হওয়ার দাবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না।

ইসলামকিউএ হাজ্জাজের এগারো পরিবর্তনের বর্ণনাকে অত্যন্ত দুর্বল অথবা জাল বলেছে। তাদের সনদসমালোচনার কেন্দ্র আব্বাদ ইবনে সুহাইব, যাঁকে হাদিসবিশারদদের একাংশ মাতরুক বা পরিত্যক্ত বর্ণনাকারী বলেছেন। এটি ওই বিশেষ প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে তাদের রায়। [947]

وهذه الرواية ضعيفة جدّاً أو موضوعة

বাংলা অনুবাদ: এই বর্ণনাটি অত্যন্ত দুর্বল অথবা জাল।

প্রতিবেদনটির বিষয়বস্তুর সঙ্গে বর্তমান পাঠগুলোর সম্পর্ক পরীক্ষা করলে একক ফল পাওয়া যায় না। তালিকায় মুমিনুনের শেষ দুটি উত্তরে “লিল্লাহ” বদলে “আল্লাহ” করার দাবি আছে। বাগাবি সাধারণ পাঠে “লিল্লাহ” এবং বসরার পাঠে “আল্লাহ” থাকার কথা জানিয়েছেন। ফলে এই স্থানে দুটি রূপই সংরক্ষিত হয়েছে। তালিকার পরিবর্তিত রূপকে সব প্রচলিত কপির একমাত্র রূপ হিসেবে দেখালে সাধারণ “লিল্লাহ” পাঠটির অস্তিত্বই ব্যাখ্যাতীত হয়ে পড়ে। [948]

( سيقولون لله ) قرأ العامة ” لله ” ومثله ما بعده ، فجعلوا الجواب على المعنى ، كقول القائل للرجل : من مولاك؟ فيقول : لفلان ، أي أنا لفلان وهو مولاي . وقرأ أهل البصرة فيهما ” الله ” وكذلك هو في مصحف أهل البصرة

বাংলা অনুবাদ: “সায়াকুলুনা লিল্লাহ”—সাধারণ পাঠকারীরা “লিল্লাহ” পড়েছেন; এর পরের স্থানটিও একই রকম। তাঁরা উত্তরের অর্থ অনুসরণ করেছেন। যেমন কাউকে জিজ্ঞেস করা হলো, তোমার প্রভু কে? সে বলল, অমুকের; অর্থাৎ আমি অমুকের অধীন এবং তিনি আমার প্রভু। বসরার অধিবাসীরা দুটি স্থানে “আল্লাহ” পড়েছেন; বসরার অধিবাসীদের মুসহাফেও এভাবেই আছে।

তাকভির ৮১:২৪-এও তালিকার পূর্ববর্তী “বি-যানিন” এবং পরিবর্তিত “বি-দানিন”—দুটি রূপই কিরাতে রয়েছে। কুরতুবি যোয়া (ظ) দিয়ে রূপটি ইবনে কাসির, আবু আমর ও কিসাইয়ের পাঠ হিসেবে উল্লেখ করেছেন; অন্যদের রূপ দোয়াদ (ض) দিয়ে। তিনি প্রথমটির অর্থ অভিযুক্ত বা সন্দেহভাজন এবং দ্বিতীয়টির অর্থ কৃপণ বলেছেন। গ্রহণযোগ্য পাঠের ইতিহাসেই এই দুই অর্থবাহী রূপ বহাল রয়েছে। [949]

وقرأ الباقون بضنين بالضاد : أي ببخيل من ضننت بالشيء أضن ضنا [ فهو ] ضنين . فروى ابن أبي نجيح عن مجاهد قال : لا يضن عليكم بما يعلم ، بل يعلم الخلق كلام الله وأحكامه .

বাংলা অনুবাদ: অন্যরা দোয়াদ দিয়ে “বি-দানিন” পড়েছেন; অর্থ কৃপণ। এটি “দানিনতু বিশ শাই”—কোনো কিছু দিতে কৃপণতা করলাম—থেকে এসেছে; যে তা করে সে দানিন। ইবনে আবি নাজিহ মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেছেন: তিনি যা জানেন, তা তোমাদের দিতে কৃপণতা করেন না; বরং সৃষ্টিকে আল্লাহর কথা ও বিধান শেখান।

স্থানহাজ্জাজের প্রতিবেদনের দাবিস্বতন্ত্রভাবে সংরক্ষিত পাঠসাক্ষ্যঐতিহাসিক সম্পর্ক
ইউনুস ১০:২২ইয়ানশুরুকুম থেকে ইউসাইয়িরুকুমইবনে আমির ও শামের রূপে ইয়ানশুরুকুম; অন্য রূপে ইউসাইয়িরুকুমপরিবর্তনের আরোপের পাশাপাশি আঞ্চলিক ভিন্ন রূপ বহাল
মুমিনুন ২৩:৮৭ ও ৮৯শেষ দুটি লিল্লাহকে আল্লাহ করাসাধারণ পাঠে লিল্লাহ; বসরার রূপে আল্লাহপ্রতিবেদনের ফল সব প্রচলিত পাঠে এক হয়নি
তাকভির ৮১:২৪বি-যানিন থেকে বি-দানিনযোয়া ও দোয়াদ—দুটি রূপ পৃথক পাঠকারীর নামে সংরক্ষিতপূর্ববর্তী বলা রূপও গৃহীত পাঠের বাইরে যায়নি
বাকারা ২:২৫৯শেষে হা যোগ করাউবাইয়ের সংশোধনের পৃথক বর্ণনাতেও হা যোগের খবর আছেএকই লিখিত রূপের সংশোধন ভিন্ন ব্যক্তি ও সময়ের নামে বর্ণিত
আনফাল ৮:৩৯এগারো স্থানের তালিকায় নেইইয়া ও তা-র ভেদ ইয়াকুব–রুয়াইসের পরম্পরায় সংরক্ষিতএই পাঠভেদের সাক্ষ্য হাজ্জাজের তালিকা থেকে পৃথক

বাকারা ২:২৫৯-এর হা যোগ করার ঘটনাটি উবাইয়ের তিনটি সংশোধনের বর্ণনাতেও রয়েছে। সেটি উসমানের আমলে মুসহাফ দেখার ঘটনার ভাষ্যে এসেছে; হাজ্জাজের তালিকায়ও একই স্থানে হা যোগের আরোপ আছে। একই সংশোধনের জন্য এই দুটি পৃথক ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিবরণকে এক ঘটনার দুটি সমসাময়িক সাক্ষ্য বলা যায় না। প্রত্যেক বর্ণনার ব্যক্তি, সময় এবং কপির পরিচয় তার নিজস্ব খবরের অংশ। এই জায়গায় প্রবর্তকের পরিচয় নির্ধারণের প্রশ্নটি লিখিত রূপের উপস্থিতির প্রশ্নের চেয়ে জটিলতর।

প্রতিবেদনটি হাজ্জাজের নামে নির্দিষ্ট পাঠ সংশোধনের আরোপ হিসেবে সাহিত্যে সংরক্ষিত হয়েছে। তার পাশে থাকা অন্য উৎসে বিভিন্ন রূপের গ্রহণ, আঞ্চলিক কপিতে বহাল থাকা এবং পাঠকারীদের পছন্দের খবর রয়েছে। এই বহুত্বের ওপর একটি মাত্র সম্পূর্ণ ও সর্বব্যাপী পরিবর্তনের গল্প চাপিয়ে দিলে উৎসগুলোর পার্থক্য হারিয়ে যায়। একইভাবে প্রতিবেদনের সনদ নিয়ে আপত্তি দেখিয়ে জালালাইন, কুরতুবি, বাগাবি বা দানির স্বতন্ত্র পাঠসাক্ষ্যও বাতিল করা যায় না। সেই উৎসগুলো নিজেরাই শব্দভেদ ও তার অর্থ জানিয়েছে।

সনদসমালোচনার বাইরে ইসলামকিউএর প্রত্যাখ্যানে এমন যুক্তিও আছে যে সব দেশের কপি ও সব মানুষের মুখস্থ পাঠ একসঙ্গে বদলানো সম্ভব ছিল না। উদ্ধৃত প্রতিবেদনের ভাষা একটি মুসহাফে সংশোধনের আরোপ করে; সব আঞ্চলিক রূপ ও সব মুখস্থ পাঠ সফলভাবে নিশ্চিহ্ন করার আলাদা বিবরণ দেয় না। তাফসিরে পূর্ববর্তী ও পরিবর্তিত বলা রূপ দুটিই বহাল থাকার তথ্যও একক সর্বব্যাপী প্রতিস্থাপনের ধারণা থেকে আলাদা ফল দেখায়। একটি কপিতে সংশোধন, সরকারি বাছাই এবং সর্বত্র অন্য সব রূপ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া—এই কাজগুলোর প্রমাণ এক নয়।

নুকতা ও হরকতের ক্ষেত্রে পরবর্তী কাজের নথি আরও প্রত্যক্ষভাবে পদ্ধতি বর্ণনা করে: ভিন্ন রঙের কালি, মুখের স্বর দেখে বিন্দু বসানো, শিক্ষকের পাঠ ধরে কপি চিহ্নিত করা এবং চিহ্নের আকৃতি বদলানো। চিহ্ন ব্যবহারের অনুমোদন ও আপত্তি নিয়েও পৃথক মত সংরক্ষিত আছে। এই কাজগুলো মানুষের পরিকল্পনা, ভাষাগত বিচার এবং পাঠশিক্ষার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তী কালে সেগুলো ধর্মীয় মর্যাদা পেয়েছে বলে তাদের মানবিক প্রবর্তনের ইতিহাস বিলুপ্ত হয় না।

উসমানের সংকলন লিখিত কোরআনের পরিবর্তনের শেষ সীমা ছিল—এমন দাবি এসব দলিলের সঙ্গে অসঙ্গত। তার পরে দৃশ্যমান পাঠনির্দেশের বিস্তার ঘটেছে, আগের চিহ্ন নতুন আকৃতি পেয়েছে এবং শব্দ সংশোধনের প্রতিবেদনও সংরক্ষিত হয়েছে। কোন শব্দরূপ কোথায় প্রচলিত, কোনটিকে চিহ্ন দিয়ে নির্দিষ্ট করা হবে এবং কোন পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য—এসব বিষয়ে পরবর্তী মানুষের সিদ্ধান্ত কার্যকর ছিল। সংরক্ষণের নামে যে ধর্মীয় মূল্যায়নই দেওয়া হোক, লিখিত কোরআনের এই সংস্কার ও পাঠ নির্ধারণের ইতিহাস অস্বীকার করা যায় না।


নাসেখ–মানসুখ: পাঠ ও আইন রহিত করার ধর্মতত্ত্ব

নাসেখ–মানসুখের ধর্মতত্ত্ব কোরআনের ইতিহাসে পরিবর্তনকে ধর্মীয় বৈধতা দেয়। কোনো বিধান জারি হওয়ার পরে তা প্রত্যাহার করা, কোনো পাঠ মুসহাফ থেকে বাদ থাকা এবং বাদ পড়া পাঠের বিধান বহাল রাখা—এসবের জন্য পৃথক শ্রেণি তৈরি হয়েছে। ফলে নাজিল হওয়া সমস্ত বক্তব্য, বর্তমানে পাঠ করা সমস্ত আয়াত এবং কার্যকর বলে স্বীকৃত সমস্ত আইন এক অভিন্ন সংগ্রহ নয়। সংকলিত গ্রন্থের সীমানার সঙ্গে এই ধর্মতত্ত্বের সম্পর্ক সরাসরি: কোনটি পড়তে হবে, কোনটি আর পড়া যাবে না এবং কোন নির্দেশের অধীনে মানুষের বিচার হবে, সেসব নির্ধারণে নসখের সিদ্ধান্ত কার্যকর। পরিবর্তনকে আল্লাহর অনুমোদিত কাজ বলার মধ্যে সেই পরিবর্তনের স্বীকারোক্তিও রয়েছে।


নসখ, নাসেখ ও মানসুখের অর্থ এবং কোরআনিক ভিত্তি

আরবি نسخ শব্দ থেকে নসখ, নাসেখ ও মানসুখ—এই তিনটি পরিভাষা এসেছে। নসখ কাজ বা প্রক্রিয়ার নাম; নাসেখ সেই কাজের কর্তা বা রহিতকারী দলিল; মানসুখ রহিত হওয়া পাঠ বা বিধান। ব্যাকরণের ভাষায় ناسخ কর্তৃবাচক এবং منسوخ কর্মবাচক রূপ। একই ধাতুর সাধারণ অর্থের মধ্যে অপসারণ, বদল, স্থানান্তর ও অনুলিপি করার ব্যবহার আছে। ধর্মীয় বিধান রহিত করার পরিভাষায় পরবর্তী দলিলের ফলে আগের নির্দেশের কার্যকারিতা উঠে যাওয়াই মূল বিষয়। সুয়ূতি শব্দটির ব্যবহার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অপসারণের পাশাপাশি প্রতিস্থাপন ও স্থানান্তরের কথাও উল্লেখ করেছেন। [950]

يَرِدُ النَّسْخُ بِمَعْنَى الْإِزَالَةِ

বাংলা অনুবাদ: নসখ অপসারণ অর্থে ব্যবহৃত হয়।

পরিভাষাশব্দের ভূমিকাধর্মতাত্ত্বিক অর্থনির্ধারণের বিষয়
নসখরহিতকরণের কাজআগের পাঠ বা বিধানের মর্যাদা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়াকী উঠিয়ে নেওয়া হলো এবং কখন
নাসেখরহিতকারীযে পরবর্তী দলিলের ভিত্তিতে আগের অবস্থার অবসান ঘটেছেকোন দলিলটি পরে এসেছে
মানসুখরহিত বিষয়যে পাঠ বা বিধান আগের মর্যাদায় বহাল নেইপাঠ, আইন, না উভয়টি রহিত
মুহকামএই আলোচনায় অরহিত বিধানযার কার্যকারিতা রহিত হয়েছে বলে গ্রহণ করা হয়নিকোন নির্দেশ কার্যকর রয়েছে

ইসলামকিউএর সংজ্ঞায় নসখের আওতা শুধু আইন পর্যন্ত সীমিত নেই; শরিয়তি দলিলের বিধান অথবা তার শব্দরূপ তুলে নেওয়া—দুটিই সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। রহিতকারী দলিল হিসেবে কোরআন ও সুন্নাহ উভয়ের উল্লেখও সেখানে রয়েছে। ফলে “নসখ” বলার সঙ্গে সঙ্গেই শুধু একটি আয়াতের নতুন ব্যাখ্যা বোঝায় না। কোনো ক্ষেত্রে আদেশটি কার্যকর থাকছে না; অন্য ক্ষেত্রে বাক্যটির কোরআন হিসেবে তিলাওয়াতের মর্যাদাই আর থাকছে না। শব্দের সংরক্ষণ এবং আইনের সংরক্ষণ তাই আলাদা প্রশ্ন হয়ে ওঠে। [951]

رفع حكم دليل شرعي، أو لفظه، بدليل من الكتاب أو السنة.

বাংলা অনুবাদ: কোরআন বা সুন্নাহর দলিলের মাধ্যমে কোনো শরিয়তি দলিলের বিধান অথবা তার শব্দরূপ তুলে নেওয়া।

কোরআনের একাধিক আয়াতে আল্লাহর সুন্নত বা রীতিতে পরিবর্তন না হওয়ার ঘোষণা রয়েছে। ইসরা ১৭:৭৭-এ পূর্ববর্তী রসুলদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রীতির কথা বলা হয়েছে; ফাতির ৩৫:৪৩-এ পূর্ববর্তীদের পরিণতি ও কুচক্রান্তের ফল আলোচ্য। এসব ঘোষণায় ঐশী কর্তৃত্বের ধারাবাহিকতার ভাষা আছে। সেই একই ধর্মগ্রন্থে আয়াত রহিত ও প্রতিস্থাপনের ঘোষণাও স্থান পেয়েছে। একদিকে আল্লাহর রীতির স্থায়িত্ব, অন্যদিকে নির্দিষ্ট নির্দেশের পরিবর্তন—ধর্মীয় ব্যবস্থার এই দুটি বৈশিষ্ট্য পাশাপাশি রয়েছে। ইসরা সূরার বক্তব্যটি হলো: [952]

তোমার পূর্বে আমি আমার যে সব রসূল পাঠিয়েছিলাম তাদের ক্ষেত্রে এটাই ছিল নিয়ম আর তুমি আমার নিয়মের কোন পরিবর্তন দেখতে পাবে না।
— Taisirul Quran
আমার রাসূলদের মধ্যে তোমার পূর্বে যাদেরকে আমি পাঠিয়েছিলাম তাদের ক্ষেত্রেও ছিল এরূপ নিয়ম এবং তুমি আমার নিয়মের কোন পরিবর্তন দেখতে পাবেনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
তাদের নিয়ম অনুসারে যাদেরকে আমি আমার রাসূলদের মধ্যে তোমার পূর্বে পাঠিয়েছিলাম এবং তুমি আমার নিয়মে কোন পরিবর্তন পাবে না।
— Rawai Al-bayan
আমাদের রাসুলদের মধ্যে আপনার আগে যাদেরকে পাঠিয়েছিলাম তাদের ক্ষেত্রেও ছিল এরূপ নিয়ম এবং আপনি আমাদের নিওমের কোনো পরিবর্তন পাবেন না [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

ফাতহ সূরায় অতীতে চলে আসা আল্লাহর বিধান বা রীতিতে পরিবর্তন না হওয়ার ঘোষণা আরও একবার এসেছে। এখানে স্থায়িত্বের দাবিটি ঐশী সুন্নতের ভাষায় প্রকাশিত: [953]

(এটাই) আল্লাহর বিধান, অতীতেও তাই হয়েছে, তুমি আল্লাহর বিধানে কক্ষনো কোন পরিবর্তন পাবে না।
— Taisirul Quran
ইহাই আল্লাহর বিধান, প্রাচীনকাল হতে চলে আসছে; তুমি আল্লাহর এই বিধানে কোন পরিবর্তন পাবেনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
তোমাদের পূর্বে যারা গত হয়েছে তাদের ব্যাপারে এটি আল্লাহর নিয়ম; আর তুমি আল্লাহর নিয়মে কোন পরিবর্তন পাবে না।
— Rawai Al-bayan
এটাই আল্লাহ্‌র বিধান—পূর্ব থেকেই যা চলে আসছে, আপনি আল্লাহর বিধানে কোনো পরিবর্তন পাবেন না।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

ফাতির সূরায় একই ঘোষণার সঙ্গে পরিবর্তন ও ব্যতিক্রম—উভয়টি অস্বীকার করা হয়েছে। উদ্ধৃত অনুবাদগুলোতে “বিধান”, “পদ্ধতি” ও “নিয়ম” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে; আরবি শব্দটি সুন্নত। পূর্ববর্তীদের ওপর প্রযোজ্য রীতির ধারাবাহিকতা এই বক্তব্যের বিষয়: [954]

যমীনে উদ্ধত আচরণ আর কু-চক্রান্ত। কু-চক্রান্ত তাকেই ঘিরে ধরবে যে তা করবে। তাহলে তারা কি তাদের পূর্ববর্তীদের উপর (আল্লাহর পক্ষ হতে) যে বিধান প্রয়োগ করা হয়েছে তারই অপেক্ষা করছে? তুমি আল্লাহর বিধানে কক্ষনো কোন পরিবর্তন পাবে না। তুমি আল্লাহর বিধানে কক্ষনো কোন ব্যতিক্রম পাবে না।
— Taisirul Quran
পৃথিবীতে ঔদ্ধত্য প্রকাশ এবং কূট ষড়যন্ত্রের কারণে। কূট ষড়যন্ত্র ওর উদ্যোক্তাদেরকেই পরিবেষ্টন করে। তাহলে কি তারা প্রতীক্ষা করছে পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রযুক্ত বিধানের? কিন্তু তুমি আল্লাহর বিধানের কখনও কোন পরিবর্তন পাবেনা এবং আল্লাহর বিধানের কোন ব্যতিক্রমও দেখবেনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
যমীনে উদ্ধত আচরণ ও কূটচক্রান্তের কারণে। কিন্তু কূটচক্রান্ত কেবল তার ধারককেই পরিবেষ্টন করবে। তবে কি তারা পূর্ববর্তীদের (উপর আল্লাহর) বিধানের অপেক্ষা করছে? কিন্তু তুমি আল্লাহর বিধানের কখনই কোন পরিবর্তন পাবে না এবং তুমি আল্লাহর বিধানের কখনই কোন ব্যতিক্রমও দেখতে পাবে না।
— Rawai Al-bayan
যমীনে ঔদ্ধ্যত প্রকাশ এবং কুট ষড়যন্ত্রের কারণে [১]। আর কুট ষড়যন্ত্র তার উদ্যোক্তাদেরকেই পরিবেষ্টন করবে। তবে কি এরা প্রতিক্ষা করছে পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রযুক্ত পদ্ধতির [২]? কিন্তু আপনি আল্লাহর পদ্ধতিতে কখনো কোনো পরিবর্তন পাবেন না এবং আল্লাহর পদ্ধতির কোনো ব্যতিক্রমও লক্ষ্য করবেন না।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

বাকারা ২:১০৬-এ বক্তব্যের ধরন বদলে যায়। সেখানে কোনো আয়াত রহিত করা অথবা ভুলিয়ে দেওয়ার পরে তার চেয়ে উত্তম কিংবা অনুরূপ আয়াত আনার কথা বলা হয়েছে। আয়াতটির যুক্তি আল্লাহর ক্ষমতার ওপর দাঁড়ানো: যিনি ক্ষমতাবান, তিনি আগের অবস্থার অবসান ঘটিয়ে অন্য অবস্থা আনতে পারেন। “উত্তম” ও “অনুরূপ”—উভয় সম্ভাবনার উল্লেখ আছে; প্রতিটি রহিতকরণে আগের চেয়ে কঠোর নির্দেশ আসবে, এমন কোনো শর্ত এখানে নেই। পরিবর্তন করার ক্ষমতাই ধর্মীয় অনুমোদনের ভিত্তি হয়েছে। [955]

আমি কোন আয়াত রহিত করলে কিংবা ভুলিয়ে দিলে, তাত্থেকে উত্তম কিংবা তারই মত আয়াত নিয়ে আসি, তুমি কি জান না যে, আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর উপর ক্ষমতাবান।
— Taisirul Quran
আমি কোন আয়াতের হুকুম রহিত করলে কিংবা আয়াতটিকে বিস্মৃত করিয়ে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা তদনুরূপ আয়াত আনয়ন করি। তুমি কি জাননা যে, আল্লাহ সর্ব বিষয়ের উপরই ক্ষমতাবান?
— Sheikh Mujibur Rahman
আমি যে আয়াত রহিত করি কিংবা ভুলিয়ে দেই, তার চেয়ে উত্তম কিংবা তার মত আনয়ন করি। তুমি কি জান না যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।
— Rawai Al-bayan
আমরা কোনো আয়াত রহিত করলে বা ভুলিয়ে দিলে তা থেকে উত্তম অথবা তার সমান কোনো আয়াত এনে দেই [১] আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহ্‌ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

নাহল ১৬:১০১-এ একটি আয়াতের স্থানে আরেকটি আয়াত আনার কথা আরও সরাসরি বলা হয়েছে। একই আয়াতে সেই পরিবর্তন উপলক্ষে মুহাম্মদকে মিথ্যা রচনাকারী বলার অভিযোগও লিপিবদ্ধ। অর্থাৎ পরিবর্তন নিয়ে আপত্তির উপস্থিতি কোরআনের নিজস্ব বক্তব্যেই আছে। অভিযোগের উত্তরে আল্লাহ কী নাজিল করেন তা ভালো জানেন এবং অভিযোগকারীদের অধিকাংশ জানে না—এই কর্তৃত্বমূলক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আয়াত বদলের ঘটনা অস্বীকার করে উত্তরটি গঠিত হয়নি; বদলের ওপর ঐশী জ্ঞানের অনুমোদন বসানো হয়েছে। [956]

আমি যখন এক আয়াতের বদলে অন্য আয়াত নাযিল করি- আর আল্লাহ ভালভাবেই জানেন, যা তিনি নাযিল করেন– তখন এই লোকেরা বলে, ‘তুমি তো মিথ্যা রচনাকারী।’ প্রকৃত ব্যাপার এই যে, এ সম্পর্কে তাদের অধিকাংশেরই কোন জ্ঞান নেই।
— Taisirul Quran
আমি যখন এক আয়াতের পরিবর্তে অন্য এক আয়াত উপস্থিত করি, আর আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেন তা তিনিই ভাল জানেন, তখন তারা বলেঃ তুমিতো শুধু মিথ্যা উদ্ভাবনকারী, কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানেনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর যখন আমি একটি আয়াতের স্থানে পরিবর্তন করে আরেকটি আয়াত দেই- আল্লাহ ভাল জানেন সে সম্পর্কে, যা তিনি নাযিল করেন– তখন তারা বলে, তুমি তো কেবল মিথ্যা রটনাকারী; রবং তাদের অধিকাংশই জানে না।
— Rawai Al-bayan
আর যখন আমরা এক আয়াতের স্থান পরিবর্তন করে অন্য আয়াত দেই— আর আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন যা তিনি নাযিল করবেন সে সম্পর্কে— , তখন তারা বলে, ‘আপনি তো শুধু মিথ্যা রটনাকারী’, বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এই ঘোষণাগুলোর ফলে কোরআনের ভেতরেই নির্দিষ্ট নির্দেশের মেয়াদ ও মর্যাদা পরিবর্তনের দরজা খোলা থাকে। একটি বাক্য আগে অনুসরণীয় ছিল, পরে আর সেইভাবে অনুসরণীয় নয়—নসখের আইনি ফল এই। আবার কোনো বাক্য আগে কোরআন হিসেবে পড়া হতো, পরে আর পড়ার অনুমতি নেই—পাঠ রহিত করার ফল সেই পর্যায়ের। উভয় অবস্থায় “নাজিল হয়েছিল” এবং “এখন বহাল আছে” এক অর্থ বহন করে না। বর্তমান মুসহাফকে কেন্দ্র করে তৈরি অপরিবর্তনীয়তার দাবি যদি প্রকাশের পূর্ববর্তী সব পর্যায়কেও নিজের মধ্যে টেনে নেয়, তবে নসখের স্বীকৃত অস্তিত্বই সেই দাবির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।

ধর্মীয় শিক্ষায় নাসেখ–মানসুখ কতখানি স্বীকৃত একটি বিষয়, তার সমকালীন উদাহরণ হিসেবে আবু বকর যাকারিয়ার বক্তব্য রয়েছে:

একই বিষয়ে শায়েখ আহমদুল্লাহর বক্তব্যেও নাসেখ–মানসুখ আলোচিত হয়েছে:

নসখের মাধ্যমে পুরোনো নির্দেশের কার্যকারিতা তুলে নেওয়া ধর্মীয় আনুগত্যেরই অংশ হয়ে যায়। আগে যে কাজটি নির্দেশ পালনের পরিচয় ছিল, পরের নির্দেশের পরে সেই একই কাজ পুরোনো বিধান অনুসরণের পরিচয় হতে পারে। ফলে ধর্মীয় ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেও তার সব নির্দেশ অপরিবর্তিত থাকে না। এখানে কর্তৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং বক্তব্যের অপরিবর্তনীয়তা পৃথক: একই কর্তৃপক্ষ ধারাবাহিকভাবে পরস্পরভিন্ন নির্দেশ দিতে পারে। সেই কর্তৃপক্ষকে আল্লাহ হিসেবে মানা বদলের ধর্মীয় ব্যাখ্যা দেয়; এক পর্যায়ের নির্দেশ অন্য পর্যায়ে বদলে যাওয়ার ঘটনাটিকে বিলুপ্ত করে না।


পাঠ ও বিধান উভয় রহিত; পাঠ রহিত–বিধান বহাল; পাঠ বহাল–বিধান রহিত

নাসেখ–মানসুখের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিভাজনটি পাঠ ও বিধানের সম্পর্ক নিয়ে। তিলাওয়াত হচ্ছে কোনো বাক্য কোরআন হিসেবে পড়ার স্বীকৃত মর্যাদা; হুকুম হচ্ছে সেই বক্তব্য থেকে নির্ধারিত নির্দেশ বা আইন। নসখের তিন ভাগে এই দুটি মর্যাদাকে পৃথক করা হয়েছে। সুয়ূতি প্রথম প্রকারের সংজ্ঞাতেই তিলাওয়াত ও বিধান একসঙ্গে রহিত হওয়ার কথা বলেছেন। এতে কোরআন হিসেবে পূর্বে স্বীকৃত কোনো বক্তব্যের শব্দরূপ এবং তার আইনি নির্দেশ দুটোই প্রত্যাহারের ধারণা পাওয়া যায়। [957]

النَّسْخُ فِي الْقُرْآنِ عَلَى ثَلَاثَةِ أَضْرُبٍ: أَحَدُهَا: مَا نُسِخَ تِلَاوَتُهُ وَحُكْمُهُ مَعًا

বাংলা অনুবাদ: কোরআনে নসখ তিন প্রকার। প্রথমটি হলো, যার তিলাওয়াত ও বিধান একসঙ্গে রহিত হয়েছে।

নসখের ধরনপাঠের মর্যাদাবিধানের মর্যাদাগ্রন্থে আলোচিত দৃষ্টান্তফলে যে পার্থক্য তৈরি হয়
তিলাওয়াত ও বিধান উভয় রহিতকোরআন হিসেবে তিলাওয়াত বহাল নেইআগের বিধানও কার্যকর নেইদশবার দুধপানের বর্ণনাপূর্বে নাজিল হওয়া বক্তব্য বর্তমান পাঠ ও বর্তমান আইন—উভয় ক্ষেত্রের বাইরে
তিলাওয়াত রহিত, বিধান বহালমুসহাফে কোরআন হিসেবে নেইআইন কার্যকর রাখা হয়রজমসংক্রান্ত পাঠবর্তমান আয়াত হিসেবে অনুপস্থিত বক্তব্যের সঙ্গে শাস্তির বৈধতা যুক্ত
তিলাওয়াত বহাল, বিধান রহিতআয়াত কোরআন হিসেবে পড়া হয়পুরোনো নির্দেশ কার্যকর ধরা হয় নাবাকারা ২:২৪০-এর বিধান সম্পর্কে নসখের সিদ্ধান্ত; মুজাদালা ৫৮:১২-এর সদকামুদ্রিত বাক্যের উপস্থিতি থেকেই কার্যকর আইন নির্ধারিত হয় না

প্রথম ধরনের ক্ষেত্রে পাঠের অপসারণ ও বিধানের প্রত্যাহার একই ঘটনার দুটি দিক। দশবার দুধপানের বিবরণে নির্দিষ্ট সংখ্যাটিকে প্রতিষ্ঠাকারী বাক্য আর কোরআনের পাঠে নেই; দশবারের সেই শর্তও পরবর্তী বিধান হিসেবে বহাল রাখা হয় না। দুধপানের আয়াতসংক্রান্ত বর্ণনায় দশ থেকে পাঁচে যাওয়ার ঘটনাক্রম, মুহাম্মদের মৃত্যুর সময়কার পাঠ এবং পরবর্তী ফিকহি বিরোধ রয়েছে। নসখের শ্রেণিবিভাগ সেই বর্ণনাকে একটি ধর্মতাত্ত্বিক পরিচয় দেয়: আগে কোরআন হিসেবে বিবেচিত অংশ পরে পাঠ ও আইন—উভয় ক্ষেত্র থেকে সরানো হয়েছে। শ্রেণির নামের মধ্যে অপসারণটি স্পষ্টভাবে স্বীকৃত।

দ্বিতীয় ধরনটি আরও গভীর বিচ্ছেদ তৈরি করে। এখানে কোনো বাক্যের কোরআন হিসেবে পড়ার মর্যাদা বাতিল, অথচ তার সঙ্গে যুক্ত আইন বহাল। রজম এই শ্রেণির প্রচলিত উদাহরণ। রজমের আয়াত সম্পর্কে উমরের ঘোষণা ও পরবর্তী আইনশাস্ত্রের আলোচনায় একদিকে আয়াত মুসহাফে অনুপস্থিত, অন্যদিকে পাথর মেরে হত্যার শাস্তি কার্যকর রাখার বক্তব্য আছে। নসখের এই ধারণায় পাঠ বাদ পড়লেও শাস্তি উঠে যায় না। একটি প্রাণদণ্ডের ধর্মীয় বৈধতা তখন বর্তমান আয়াতের উপস্থিতির বদলে হাদিস, সাহাবির সাক্ষ্য এবং ফকিহদের স্বীকৃতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।

ইসলামকিউএও তিলাওয়াত রহিত অথচ বিধান বহাল থাকার ধরনটি স্পষ্টভাবে স্বীকার করে এবং রজমের উদাহরণ দেয়। অর্থাৎ পাঠ–বিধানের বিচ্ছেদ শুধু পুরোনো গ্রন্থের পরিত্যক্ত ধারণা হিসেবে রয়ে যায়নি; সমকালীন ধর্মীয় উত্তরের মধ্যেও তা ব্যবহৃত হচ্ছে। যে পাঠ আর কোরআন হিসেবে পড়া হয় না, তার বিধান রয়ে যাওয়াকে স্বাভাবিক নসখের একটি শ্রেণি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। [958]

نسخ التلاوة دون الحكم ، كنسخ آية رجم الزاني والزانية .

বাংলা অনুবাদ: বিধান বহাল রেখে তিলাওয়াত রহিত করা; যেমন ব্যভিচারী পুরুষ ও নারীর রজমের আয়াত রহিত করা।

তৃতীয় ধরনের ক্ষেত্রে বিপরীত দৃশ্য দেখা যায়। বাক্যটি মুসহাফে আছে, তিলাওয়াতও করা হয়, কিন্তু তার নির্দেশ আগের মর্যাদায় কার্যকর নয়। সুয়ূতি এটিকে বিধান রহিত অথচ তিলাওয়াত বহাল থাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ফলে মুসহাফে লেখা থাকা, মুখস্থ করা এবং নামাজে পড়ার যোগ্য হওয়া—এসবের সঙ্গে কোনো নির্দেশের বর্তমান আইনি বাধ্যবাধকতা অবিচ্ছেদ্য নয়। পাঠের ধর্মীয় মর্যাদা রক্ষা করে তার নির্দেশের কার্যকারিতা প্রত্যাহার করা সম্ভব বলে এই ব্যবস্থা মেনে নেয়। [959]

الضَّرْبُ الثَّانِي: مَا نُسِخَ حُكْمُهُ دُونَ تِلَاوَتِهِ

বাংলা অনুবাদ: দ্বিতীয় প্রকার: যার তিলাওয়াত বহাল রেখে বিধান রহিত করা হয়েছে।

উসমান ও ইবনুয যুবায়রের কথোপকথনে এই তৃতীয় ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ পাওয়া যায়। ইবনুয যুবায়র একটি আয়াত অন্য আয়াত দিয়ে রহিত হয়েছে বলে উল্লেখ করে সেটি লেখা বা রেখে দেওয়ার কারণ জানতে চান। উসমানের উত্তর ছিল, তিনি কোনো কিছু তার স্থান থেকে সরাবেন না। বুখারির প্রচলিত নম্বর ৪৫৩০-এ ঘটনাটি বাকারা ২:২৪০-এর সঙ্গে যুক্ত; ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংস্করণে উদ্ধৃত নম্বর ৪১৭৪। পূর্ণ বর্ণনাটি হলো: [960] [961]

সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫২/ তাফসীর
হাদিস নাম্বার: ৪১৭৪
৪১৭৪। উমাইয়া (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি উসমান ইবনু ‘আফফান (রাঃ) কে উক্ত আয়াত সম্পর্কে বললাম যে, এ আয়াত তো অন্য আয়াত দ্বারা মানসুখ (রহিত) হয়ে গেছে। অতএব উক্ত আয়াত আপনি মুসহাফে লিখেছেন (অথবা রাবী বলেন) কেন বর্জন করছেন না, তখন তিনি (উসমান(রাঃ) ) বললেন, হে ভাতিজা আমি মুসহাফের স্থান থেকে কোন জিনিস পরিবর্তন করব না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

কথোপকথনটির কেন্দ্রবিন্দুতে লেখা রাখার সিদ্ধান্ত রয়েছে। ইবনুয যুবায়রের উত্থাপিত নসখের প্রশ্নের উত্তরে আয়াতটি বর্তমান নির্দেশ হিসেবে বহাল আছে—এমন ঘোষণা উদ্ধৃত বর্ণনায় নেই; উসমান অবস্থান অপরিবর্তিত রাখার কথা বলেছেন। তাই মুসহাফে কোনো নির্দেশের উপস্থিতি এবং সেই নির্দেশের কার্যকারিতা এক সিদ্ধান্ত নয়। সংকলক পাঠ রেখে দিতে পারেন, অথচ ধর্মীয় ব্যাখ্যায় তার পুরোনো নির্দেশ আর কার্যকর থাকে না। লিখিত গ্রন্থের একই পাতায় একাধিক পর্যায়ের বিধান থাকা এই ব্যবস্থার একটি স্বীকৃত ফল।

তিলাওয়াতের মর্যাদাও নিছক অক্ষরের অস্তিত্ব নয়। রজমের কথিত বাক্য হাদিস বা ফিকহের বইয়ে উদ্ধৃত হতে পারে; তাই তার শব্দ কোথাও লেখা নেই—এমন অর্থ হয় না। রহিত তিলাওয়াতের বক্তব্য হলো, সেটিকে বর্তমান কোরআনের আয়াত হিসেবে পড়া হয় না। একইভাবে বিধান রহিত হওয়া মানে সংশ্লিষ্ট বাক্যটি মুদ্রণ থেকে মুছে গেছে, এমন নয়। শব্দরূপ, কোরআন হিসেবে স্বীকৃতি এবং আইনি প্রয়োগ—এই তিনটি স্তরে পৃথক সিদ্ধান্ত কাজ করে। নসখের তিন ভাগকে শুধু কাগজে কিছু মুছে দেওয়া বা না দেওয়ার মধ্যে সীমিত করলে এই ক্ষমতার কাঠামো ধরা পড়ে না।

পাঠ রেখে আইন বাতিল করার ক্ষেত্রে ব্যাখ্যাকারী আয়াতের শব্দ অক্ষুণ্ণ রেখেই তার প্রয়োগ বন্ধ করেন। পাঠ বাদ দিয়ে আইন রাখার ক্ষেত্রে মুসহাফের বাইরের বর্ণনার ওপর দাঁড়িয়ে বাধ্যবাধকতা চালু রাখেন। দুই ক্ষেত্রেই বর্তমান মুসহাফের দৃশ্যমান বাক্য একা পূর্ণ আইন দেয় না। এর সঙ্গে বর্ণিত ঘটনাক্রম, কোন বক্তব্য পরে এসেছে সেই সিদ্ধান্ত এবং ফকিহদের গ্রহণ করা ব্যাখ্যা যোগ করতে হয়। কোরআনের ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্বের দাবির নিচে এভাবেই মানুষের নির্ধারণ করা কার্যকর পাঠ ও কার্যকর আইনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

এই তিন শ্রেণি পরিবর্তনের তিনটি স্বতন্ত্র ফল প্রকাশ করে। প্রথমটিতে পুরোনো পাঠ ও আইন—দুটিরই অবসান; দ্বিতীয়টিতে গ্রন্থের আয়াত হিসেবে অনুপস্থিতির মধ্যেও আইনের স্থায়িত্ব; তৃতীয়টিতে আয়াত হিসেবে স্থায়িত্বের মধ্যেও আইনের অবসান। সুতরাং এক পর্যায়ে নাজিল হওয়া প্রতিটি পাঠ বর্তমান মুসহাফে আছে এবং বর্তমানে তিলাওয়াত করা প্রতিটি নির্দেশ একইভাবে কার্যকর—এই দুই ধারণার কোনোটিই নসখের স্বীকৃত শ্রেণিবিভাগের সঙ্গে মেলে না। ধর্মীয় ভাষায় “রহিত” বলা পরিবর্তনটিকে অনুমোদিত করে; পাঠ ও বিধানের অবস্থার এই বদলকে অপরিবর্তনীয়তায় রূপান্তর করে না।


আয়াত ভুলিয়ে দেওয়া, তুলে নেওয়া ও বিকল্প আয়াত আনার ব্যাখ্যা

বাকারা ২:১০৬-এর “ভুলিয়ে দেওয়া” শব্দটি নসখের সঙ্গে স্মৃতি ও পাঠের সম্পর্ক তৈরি করে। কোনো ব্যক্তি মুখস্থ অংশ ভুলে গেলে সেটি তার স্মৃতির ঘটনা; গোটা সম্প্রদায়ের জন্য কোনো বাক্যের কোরআন হিসেবে মর্যাদা উঠে গেলে সেটি গ্রন্থের সীমানার পরিবর্তন। ধর্মীয় ভাষ্যে কখনো এই দুটি ঘটনাকে একই ঐশী সিদ্ধান্তের অধীনে আনা হয়েছে। তখন কোনো পাঠ স্মৃতিতে না থাকার ঘটনাটিই অনুমোদিত অপসারণ হিসেবে ব্যাখ্যা পায়। স্মৃতিভ্রংশ, পাঠ পরিত্যাগ এবং বিধান বদল—কোন জায়গায় কোনটি ঘটেছে, তার ওপর ধর্মীয় সিদ্ধান্তের বিষয়ও বদলে যায়।

ইবনে কাসীর বাকারা ২:১০৬-এর ব্যাখ্যায় তাবারির বক্তব্য উদ্ধৃত করে নসখের ফল অত্যন্ত সরাসরি ভাষায় প্রকাশ করেছেন। হালালকে হারাম, হারামকে হালাল এবং অনুমোদিতকে নিষিদ্ধ করার কথা সেখানে আছে। অর্থাৎ এক পর্যায়ে যে কাজের অনুমতি ছিল, অন্য পর্যায়ে তা নিষেধের বিষয় হতে পারে। মানুষের করণীয় ও অকরণীয়ের শ্রেণিই বদলে যায়; শুধু কোনো শব্দের উচ্চারণভেদ দিয়ে এই পরিবর্তন ব্যাখ্যা করা যায় না। [962]

وَذَلِكَ أَنْ يُحَوَّلَ الْحَلَالُ حَرَامًا وَالْحَرَامُ حَلَالًا وَالْمُبَاحُ مَحْظُورًا ، وَالْمَحْظُورُ مُبَاحًا

বাংলা অনুবাদ: তা হলো হালালকে হারাম, হারামকে হালাল, অনুমোদিতকে নিষিদ্ধ এবং নিষিদ্ধকে অনুমোদিত করে দেয়া।

একই আয়াতের তাফসিরে হাসান বসরীর নামে এমন বক্তব্যও সংকলিত হয়েছে যে নবীকে কোরআন পড়ানো হয়েছিল, পরে তিনি তা ভুলে যান। ইবনে কাসীর এটি তাবারির সূত্রে এনেছেন। এখানে ভুলে যাওয়ার ঘটনাটি কোরআনের শিক্ষা লাভের পরবর্তী ঘটনা হিসেবে উপস্থাপিত; নসখের আলোচনায় সেই ভুলে যাওয়ার ধর্মীয় ব্যাখ্যা খোঁজা হচ্ছে। [963]

إِنَّ نَبِيَّكُمْ صلى الله عليه وسلم أُقْرِئَ قُرْآنًا ثُمَّ نَسِيَهُ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের নবীকে কোরআন পড়ানো হয়েছিল, পরে তিনি তা ভুলে গিয়েছিলেন।

তাবারির সংকলনে ভুলে যাওয়ার পাশাপাশি পাঠ তুলে নেওয়া, আগের অবস্থায় রেখে দেওয়া এবং পিছিয়ে দেওয়ার ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়। উবাইদ ইবন উমাইরের নামে “নুনসিহা”-র ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, “তোমাদের কাছ থেকে তা তুলে নিই।” তাফসিরের এই ভাষায় স্মৃতির ঘটনা একটি সামষ্টিক পাঠ-অপসারণের ব্যাখ্যা পেয়েছে। [964]

نرفعها من عندكم .

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের কাছ থেকে তা তুলে নিই।

পাঠ বা ব্যাখ্যাতাবারির সংকলনে প্রকাশিত অর্থযে অবস্থার কথা বোঝায়
নুনসিহা—বিস্মরণের ব্যাখ্যানবীকে শেখানো পাঠ ভুলিয়ে দেওয়া; পাঠ তুলে নেওয়ার বক্তব্যও উদ্ধৃতআগের শিক্ষিত বা পঠিত অংশের অনুপস্থিতি
নুনসিহা—ত্যাগ বা রেখে দেওয়ার ব্যাখ্যারহিত না করে আগের অবস্থায় রাখাযে অংশের বিধান বদলানো হচ্ছে না
নানসা’হা—বিলম্বের পাঠপিছিয়ে দেওয়া বা স্থগিত রাখাসময়ের সঙ্গে কোনো নির্দেশ বা প্রকাশের সম্পর্ক
নসখআয়াতের বিধান পরিবর্তন ও প্রতিস্থাপনআগের বিধানের বদলে পরবর্তী অবস্থা

এই ব্যাখ্যাগুলোর পার্থক্য অর্থবহ। ভুলিয়ে দেওয়ার ব্যাখ্যায় আগের পাঠ অনুপস্থিত; অপরিবর্তিত রেখে দেওয়ার ব্যাখ্যায় পুরোনো অংশ বহাল; বিলম্বের ব্যাখ্যায় সময়ের সম্পর্ক সামনে আসে। একই আয়াতের একটি শব্দ কী বোঝায়, সেই সিদ্ধান্ত থেকেই কোরআনের সংরক্ষণ সম্পর্কে ভিন্ন ধরনের বিবরণ তৈরি হয়। অতীতের একটি অনুপস্থিত পাঠের কারণ নির্ধারণ করতে তাই আয়াতের অস্তিত্বের পাশাপাশি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নির্বাচনও কাজ করে। ভুলে যাওয়া বলা এবং ঐশী নির্দেশে ভুলিয়ে দেওয়া বলা দুটি আলাদা দাবি; দ্বিতীয়টির মধ্যে ঘটনার কারণ সম্পর্কে একটি ধর্মীয় সিদ্ধান্ত যুক্ত হয়েছে।

আ‘লা ৮৭:৬–৭-এ না ভোলার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে “আল্লাহ যা চান তা ছাড়া” শর্তটি আছে। ইবনে কাসীর একটি ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে এই ব্যতিক্রমকে নসখের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তার অর্থ, আল্লাহ যে পাঠ তুলে নিতে চান, সেই পাঠ ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি রয়েছে। না ভোলার ঘোষণার মধ্যেই নির্বাচিত অংশ তুলে নেওয়ার ব্যতিক্রম এইভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। [965]

لا تنسى ما نقرئك إلا ما شاء الله رفعه ; فلا عليك أن تتركه .

বাংলা অনুবাদ: আমরা তোমাকে যা পড়াই তা তুমি ভুলবে না, আল্লাহ যা তুলে নিতে চান তা ছাড়া; সুতরাং সেটি ছেড়ে দেওয়ায় তোমার কোনো অসুবিধা নেই।

এই ব্যবস্থায় কোনো অংশ শেখানো এবং সেই অংশ পরিত্যাগের অনুমোদন একই উৎসের সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। পাঠক বা অনুসারীর জন্য সমস্যা হলো, শিখে রাখা বাক্যের কোনটি ধরে রাখবেন এবং কোনটি ছেড়ে দেবেন, তা শুধু নিজের মুখস্থ স্মৃতি থেকে নির্ধারিত হয় না। কাউকে কোনো বাক্য শেখানোর স্মৃতি থাকতে পারে, অথচ পরবর্তী ধর্মীয় সিদ্ধান্তে সেই বাক্য আর তিলাওয়াতের অংশ নয়। আবার কারও কাছে পাঠ উঠে যাওয়ার খবর পৌঁছেছে বলে মনে হতে পারে, অন্য অনুসারী আগের শিক্ষা আঁকড়ে থাকতে পারেন। কর্তৃত্বের প্রশ্নটি তখন পাঠ জানা থেকে পাঠের বর্তমান অনুমোদিত মর্যাদা জানার দিকে সরে যায়।

বিকল্প আয়াতকে “উত্তম” বলার ব্যাখ্যাতেও প্রয়োগের গুরুত্ব আছে। ইবনে কাসীর মানুষের উপকার ও বিধানের দিক থেকে এই উত্তম হওয়ার অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন; ইবন আব্বাসের নামে অধিক উপকারী ও সহজ হওয়ার কথাও এনেছেন। ফলে আগের ও পরের নির্দেশের মধ্যে তুলনার মাপকাঠি হিসেবে মানুষের ওপর বিধানের ফলকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই তুলনা নিজেই দুটি পর্যায়ের অস্তিত্ব ধরে নেয়। একই নির্দেশ একই অর্থে চিরকাল বহাল থাকলে আগেরটির বদলে অন্য নির্দেশ আনার উপকার নিয়ে এমন ব্যাখ্যার প্রয়োজন তৈরি হতো না।

ধর্মতত্ত্ব পরিবর্তনের অনুমোদন ব্যাখ্যা করতে পারে; নির্দিষ্ট পরিবর্তনের সময় ও পদ্ধতির আলাদা সাক্ষ্যও প্রয়োজন হয়। “আল্লাহ ইচ্ছা করলে কোনো আয়াত ভুলিয়ে দিতে পারেন”—এটি একটি ক্ষমতাসংক্রান্ত বিশ্বাস। “অমুক বাক্য অমুক সময়ে সেই কারণে বাদ গেছে”—এটি একটি নির্দিষ্ট অতীত ঘটনা সম্পর্কে বক্তব্য। সাধারণ ক্ষমতার দাবি থেকে নির্দিষ্ট ঘটনার বিস্তারিত নিজে থেকে বেরিয়ে আসে না। কোনো পাঠের পূর্ববর্তী অস্তিত্বের সাক্ষ্য, শেষবার পড়ার খবর এবং পরিত্যাগের নির্দেশের খবর পৃথক দলিল হতে পারে। শুধু পরের মুসহাফে বাক্যটি না থাকা দিয়ে তার অপসারণের সম্পূর্ণ ঘটনাক্রম পাওয়া যায় না।

অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে রহিতকরণকে ব্যবহার করার প্রমাণগত সমস্যাটি এখানেই। সংকলিত মুসহাফে কোনো বাক্য নেই বলে সেটি রহিত হয়েছিল বলে ধরে নেওয়া, তারপর রহিত হয়েছিল বলেই তার অনুপস্থিতিকে সম্পূর্ণ সংরক্ষণের প্রমাণ বানানো—এতে একই অনুপস্থিতি সিদ্ধান্তের ভিত্তি ও সিদ্ধান্তের সমর্থন উভয় ভূমিকা নেয়। অপসারণের পৃথক সাক্ষ্য অনুপস্থিত থাকলে এই যুক্তি বৃত্তের মধ্যে ঘোরে। বর্ণনায় পাঠের হারিয়ে যাওয়ার সংবাদ থাকা এবং তার পেছনে ঐশী নির্দেশের নিশ্চিত ইতিহাস থাকা এক বিষয় নয়। নসখের শ্রেণি দেওয়া মাত্রই সেই দ্বিতীয় ধরনের ইতিহাস পাওয়া যায় না।

মুহাম্মদের মৃত্যুর পরে কেউ রহিত হওয়ার কথা জানতে পারেন—এই ব্যাখ্যার ভেতরেও প্রকাশের সময় এবং খবর পৌঁছানোর সময় পৃথক হয়ে যায়। ফলে নবীর জীবদ্দশার শেষ মুহূর্তে কোনো ব্যক্তির মুখে একটি বাক্য থাকা এবং চূড়ান্ত বলে গৃহীত মুসহাফে সেটি অনুপস্থিত থাকা ধর্মীয় ভাষ্যে একসঙ্গে রাখা সম্ভব হয়। পাঁচবার দুধপানের বর্ণনার পরবর্তী ব্যাখ্যায় এই পার্থক্যটি ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফল হলো, পরবর্তী ভাষ্যকারকে শুধু পাঠ নয়, কে কখন রহিত হওয়ার সংবাদ পেয়েছিলেন সেই বণ্টনও পুনর্গঠন করতে হয়। সংরক্ষণের সিদ্ধান্তে এভাবে পরবর্তী ব্যাখ্যার অবদান বাড়ে।

নসখের এই ধর্মতত্ত্বে পরিবর্তন নিছক বাইরের কারও হস্তক্ষেপের বিষয় নয়; পরিবর্তন স্বয়ং ধর্মীয় অনুমোদনের একটি স্বীকৃত কাজ। নির্দেশ দেওয়া, নির্দেশ ফিরিয়ে নেওয়া এবং আগের পাঠ ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি—সবই ঐশী কর্তৃত্বের অংশ হিসেবে স্থান পেয়েছে। তাই পাঠের ইতিহাসে রহিতকরণকে সামনে আনার ফল হলো একটি স্বীকারোক্তি: একসময় কোরআনের অংশ হিসেবে পরিচিত সব বক্তব্য বর্তমান পাঠের সমান সীমানার মধ্যে ছিল না। পার্থক্যটিকে ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য করার জন্য “ভুলিয়ে দেওয়া”, “তুলে নেওয়া” ও “প্রতিস্থাপন”—এই ভাষাগুলো কার্যকর হয়েছে।


পাঁচশ, বিশ ও আরও সীমিত হিসাব: শাহ ওয়ালিউল্লাহ ও অন্য আলেমদের মতভেদ

মানসুখ আয়াতের সংখ্যা নিয়ে মতভেদ শুধু গণনার ভুল থেকে তৈরি হয়নি। “নসখ” শব্দে কী কী অন্তর্ভুক্ত হবে, সেই সিদ্ধান্ত বদলালে গোনা আয়াতের সংখ্যাও বদলে যায়। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী আল-ফাওযুল কবীর ফি উসূলিত তাফসীর গ্রন্থে পূর্ববর্তীদের ব্যাপক ব্যবহার এবং পরবর্তী উসুলবিদদের সীমিত ব্যবহারের পার্থক্য দেখিয়েছেন। প্রথম ব্যবহারে আইন সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের বাইরেও সাধারণ বক্তব্যকে সীমিত করা, কোনো শর্তের তাৎপর্য নির্ধারণ করা এবং আগের প্রথার অবসান ঘটানো অন্তর্ভুক্ত হতো। তাঁর বর্ণনায় পাঁচশ আয়াতের হিসাব এই বিস্তৃত ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত। [966] [967]

فَاتَّسَعَ بَابُ النَّسْخِ عِنْدَهُمْ، وَكَثُرَ جَوَلَانُ الْعَقْلِ هُنَالِكَ، وَاتَّسَعَتْ دَائِرَةُ الِاخْتِلَافِ، وَلِهَذَا بَلَغَ عَدَدُ الْآيَاتِ الْمَنْسُوخَةِ خَمْسَمِائَةٍ

বাংলা অনুবাদ: তাঁদের কাছে নসখের ক্ষেত্র বিস্তৃত হলো; সেখানে বিচার-বিশ্লেষণের চলাচল বাড়ল এবং মতভেদের পরিধি প্রসারিত হলো। এ কারণেই মানসুখ আয়াতের সংখ্যা পাঁচশতে পৌঁছেছিল।

পাঁচশের হিসাবে একই ধরনের পাঁচশ আইন মুসহাফ থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল—এমন কোনো একক ঘটনা বর্ণিত হচ্ছে না। এখানে বিভিন্ন প্রকৃতির পরিবর্তন একই নামের অধীনে গণনা হয়েছে। কোনো স্থানে নির্দেশের কার্যকারিতা শেষ, কোনো স্থানে সাধারণ কথার আওতা সংকুচিত, কোনো স্থানে আগের রীতি বাদ। ফলে সংখ্যাটি ব্যাখ্যা করতে নসখের গৃহীত অর্থ ও আলোচনার একক দুটিই প্রয়োজন। একই সঙ্গে এই বিস্তৃতি দেখায়, প্রাথমিক বক্তব্যকে পরবর্তী বক্তব্য দিয়ে বদলানো বা সীমিত করার প্রশ্ন তাফসিরের বড় ক্ষেত্রজুড়ে উপস্থিত ছিল। পরবর্তী পরিভাষা দিয়ে তার নাম বদলে দিলেও আগের ও পরের বক্তব্যের সম্পর্ক নির্ধারণের কাজটি থেকে যায়।

ব্যবহারের ধরনদুটি বক্তব্যের সম্পর্কপুরোনো ব্যবহারে নসখের আওতাসংকীর্ণ সংজ্ঞায় অবস্থান
বিধান প্রত্যাহারপরবর্তী নির্দেশে আগের বাধ্যবাধকতার অবসানঅন্তর্ভুক্তনসখ হিসেবে গণনার প্রধান ক্ষেত্র
সাধারণ বক্তব্যের ক্ষেত্র সীমিতআগে বিস্তৃত বলে বোঝা ক্ষেত্রের কিছু অংশ বাদঅন্তর্ভুক্ত হতে পারেবিশেষীকরণ বা তাখসিস হিসেবে আলাদা
বক্তব্যের সীমা বা শর্ত নির্ধারণকোথায়, কার জন্য বা কী শর্তে বক্তব্য প্রযোজ্য তা নির্দিষ্টবিস্তৃত ব্যবহারটির অন্তর্গতব্যাখ্যা, শর্তনির্ধারণ বা সীমিতকরণ হিসেবে পৃথক
আগের প্রথা বা শরিয়তের অবসানআগের চলমান ব্যবস্থা বদলে নতুন নির্দেশঅন্তর্ভুক্তকোরআনের একটি আয়াত দিয়ে আরেকটি রহিত করার হিসাব থেকে পৃথক হতে পারে

শাহ ওয়ালিউল্লাহর আলোচনায় সুয়ূতির সীমিত হিসাব প্রায় বিশটি আয়াতের। সেখানে একুশটি আয়াত উত্থাপিত হওয়ার পর দুটি ক্ষেত্রে নসখ গ্রহণ না করায় উনিশটির হিসাবও এসেছে। দেহলভী পর্যালোচনার শেষে নিজের নির্ধারণে পাঁচটি আয়াতে নসখ অনিবার্য বলে রাখেন। আরবি সংস্করণের চূড়ান্ত বাক্যটি তাঁর সিদ্ধান্তের পরিধি স্পষ্ট করে: [968]

ما حررته لا يتعين النسخ إلا في خمس آيات.

বাংলা অনুবাদ: আমার পর্যালোচনা অনুযায়ী পাঁচটি আয়াত ছাড়া অন্য কোথাও নসখ অনিবার্যভাবে নির্ধারিত হয় না।

হিসাবহিসাবের ভিত্তিসংখ্যাটির অর্থ
পাঁচশদেহলভীর বর্ণিত পূর্ববর্তীদের বিস্তৃত নসখ-ব্যবহারএকই নামে আইন প্রত্যাহারসহ একাধিক ধরনের ব্যাখ্যাগত পরিবর্তন
প্রায় বিশ; আলোচনায় একুশ থেকে উনিশসুয়ূতির নির্বাচিত আয়াতসমূহ ও কিছু ক্ষেত্রে অরহিত রাখার সিদ্ধান্তসীমিত সংজ্ঞা প্রয়োগের পরেও কয়েকটি আয়াতের মর্যাদায় মতভেদ
পাঁচদেহলভীর আরও সংকীর্ণ পর্যালোচনার চূড়ান্ত ফলনসখের প্রয়োজন অনিবার্য বলে তিনি যতগুলো রাখেন
আরও সীমিত সংখ্যামুসাঈদ আত-তাইয়ারের আলোচনায় উল্লিখিত কিছু আধুনিক পর্যালোচনাব্যাখ্যা ও সমন্বয়ের সুযোগ বাড়িয়ে নসখের সংখ্যা আরও কমানো

ইসলামওয়েবে সংরক্ষিত পাঠব্যাখ্যায় মুসাঈদ আত-তাইয়ার দেহলভীর পাঁচটির হিসাব এবং কিছু আধুনিক লেখকের আরও সীমিত হিসাবের কথা উল্লেখ করেছেন। একই আলোচনায় তিনি ফিকহের গ্রন্থ ও বাস্তব বিচারব্যবস্থায় এই আয়াতগুলো কীভাবে ব্যবহৃত হয়, সেই প্রশ্ন তুলেছেন। এতে সংখ্যা নির্ধারণ এবং আইন প্রয়োগের মধ্যে দূরত্বও সামনে আসে। কোনো তাফসিরের তালিকায় একটি আয়াত মানসুখ হিসেবে গণ্য হওয়া এবং সমস্ত ফকিহের বাস্তব প্রয়োগে তা অচল থাকা এক অভিন্ন সিদ্ধান্ত নয়। সংখ্যা-তালিকার বাইরে ব্যাখ্যাগত কর্তৃত্বের আরেকটি স্তর এখানে কাজ করে।

সুয়ূতির নসখ-বিষয়ক আলোচনায় সীমারেখা নিয়ে সরাসরি আপত্তিও রয়েছে। বক্তব্যের মধ্যে নির্দিষ্ট সময়সীমা আগে থেকেই থাকলে তার মেয়াদ শেষ হওয়াকে মক্কী নসখ হিসেবে ধরেননি। আবার একটি বিধান বিশেষ কারণের সঙ্গে বাঁধা থাকলে কারণের পরিবর্তনে অন্য বিধান কার্যকর হওয়ার ব্যাপারকে চূড়ান্ত রহিতকরণ থেকে পৃথক করা হয়েছে। মক্কীর ভাষায়, মেয়াদযুক্ত নির্দেশে মেয়াদ শেষ হওয়া নসখ নয়। [969]

وَالْمُؤَجَّلُ بِأَجَلٍ لَا نَسْخَ فِيهِ.

বাংলা অনুবাদ: নির্দিষ্ট মেয়াদে বাঁধা বিষয়ের ক্ষেত্রে নসখ নেই।

এই বিভাজন সংখ্যার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। কোনো নির্দেশ স্থায়ীভাবে শেষ হয়েছে বলে ধরলে একটি মানসুখ আয়াত যোগ হয়। একই নির্দেশ নির্দিষ্ট অবস্থার জন্য ছিল এবং সেই অবস্থা ফিরে এলে আবার প্রযোজ্য হবে বলে ধরলে সেটিকে স্থায়ীভাবে মানসুখ বলা হয় না। শব্দ একই, ধর্মগ্রন্থের আয়াতও একই; বদলে যায় ব্যাখ্যাকারীর নির্ধারণ করা প্রয়োগের সম্পর্ক। ফলে “কত আয়াত মানসুখ” প্রশ্নের উত্তরে আয়াতের সংখ্যা গণনার আগে নির্দেশের স্থায়িত্ব সম্পর্কে তাত্ত্বিক রায় দেওয়া হয়ে যাচ্ছে।

পাঁচশ থেকে পাঁচে নামার এই ইতিহাস কোনো নতুন মুসহাফে চারশ পঁচানব্বইটি আয়াত ফেরত ঢোকানোর ইতিহাস নয়। এটি মূলত বিধান ও বক্তব্যের সম্পর্ক শ্রেণিবদ্ধ করার ইতিহাস। কোন পরিবর্তনকে নসখ বলা হবে, কোনটিকে ব্যাখ্যা বা বিশেষীকরণ বলা হবে এবং কোনটিকে অবস্থাভেদে কার্যকর নির্দেশ বলা হবে—এসব সিদ্ধান্তে সংখ্যার ব্যবধান গড়ে ওঠে। পাঠ মুছে যাওয়ার সংখ্যা, আইন রহিত হওয়ার সংখ্যা এবং বিস্তৃত ব্যাখ্যাগত সংশোধনের সংখ্যা এক করে ব্যবহার করলে তিন ধরনের হিসাব মিশে যায়। এই পৃথকত্বই কোরআনসংক্রান্ত প্রমাণের প্রকৃত বিষয় নির্দিষ্ট করে।

সংকীর্ণ সংজ্ঞায় সংখ্যা কমে গেলেও একটি মৌলিক সমস্যা থেকে যায়: কোন আয়াতকে কোন শ্রেণিতে রাখতে হবে, সে বিষয়ে ঐতিহ্যের সব ব্যাখ্যাকারী এক সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি। একজনের কাছে পরের বক্তব্য আগের আইন তুলে দেয়; আরেকজনের কাছে তা কেবল সীমা নির্ধারণ করে। প্রথম সিদ্ধান্তে অনুসারীর জন্য আগের নির্দেশের বাধ্যবাধকতা শেষ; দ্বিতীয় সিদ্ধান্তে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের মধ্যে তা বহাল। সংখ্যাগত মতভেদ তাই শুধু গবেষণাগারের পরিসংখ্যান নয়—কোন ধর্মীয় আদেশ মানতে হবে, তার বাস্তব পার্থক্যও তৈরি করতে পারে।

শাহ ওয়ালিউল্লাহর গ্রন্থের বাংলা সংস্করণের প্রাসঙ্গিক পাতাগুলোতে বিস্তৃত অর্থ, আয়াতসংখ্যা এবং উদাহরণসমূহের আলোচনা রয়েছে:

কোরআন সংকলন 194
কোরআন সংকলন 196
কোরআন সংকলন 198
কোরআন সংকলন 200
কোরআন সংকলন 202
কোরআন সংকলন 204
কোরআন সংকলন 206
কোরআন সংকলন 208
কোরআন সংকলন 210
কোরআন সংকলন 212
কোরআন সংকলন 214

সংরক্ষিত বাক্যের পাঠ অভিন্ন থাকলেও তার আইনি মর্যাদা নিয়ে উনিশ, পাঁচ কিংবা আরও সীমিত হিসাব তৈরি হতে পারে। এর অর্থ, মুদ্রিত অক্ষর দেখেই কোন নির্দেশ রহিত হয়েছে তার সব উত্তর পাওয়া যায় না। রহিতকরণের তালিকা ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে জন্ম নেওয়া কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ সূচি হিসেবে এখানে হাজির নেই; ভাষ্যকারেরা বিভিন্ন সংজ্ঞা ও প্রমাণের ভিত্তিতে তালিকা নির্ধারণ করেছেন। ঐশী বক্তব্যের চূড়ান্ত মর্যাদা ঘোষণা করার এই কাজের মধ্যে মানুষের নির্বাচন, যুক্তি ও মতভেদের ভূমিকা প্রকাশ্য।


সূরার ৩০–৩৬–৬–৪২ বিভাগ এবং সুয়ূতির উদ্ধৃত ভিন্ন সংখ্যা

নাসেখ–মানসুখের প্রভাবকে সূরার হিসাবে প্রকাশ করার একটি বিভাগ হলো ৩০–৩৬–৬–৪২। এই বিভাগে রহিতকারী ও রহিত—দুই ধরনের আয়াত থাকা সূরা, শুধু রহিত আয়াত থাকা সূরা, শুধু রহিতকারী আয়াত থাকা সূরা এবং কোনোটিই না থাকা সূরা পৃথক করা হয়। হিসাবটির অর্থ সূরাভিত্তিক বিস্তৃতি; একটি শ্রেণির সব সূরার প্রতিটি আয়াত রহিত—এমন অর্থ এতে নেই। একটি সূরায় একটি মানসুখ আয়াত আছে বলে ধরা হলেও পুরো সূরাটি সংশ্লিষ্ট শ্রেণিতে গণনা হয়।

বিভাগ৩০–৩৬–৬–৪২ হিসাবে সূরার সংখ্যাএই বিভাগে প্রকাশিত বক্তব্য
নাসেখ ও মানসুখ উভয় আছে৩০এসব সূরায় বিধান রহিতকারী আয়াতও আছে, পাশাপাশি আগের রহিত বিধানসংক্রান্ত আয়াতও আছে।
শুধু মানসুখ আছে৩৬এসব সূরায় রহিত আয়াত আছে। রহিতকারী আয়াত অন্য সূরায় থাকতে পারে; প্রতিটি রহিত পাঠের বদলে বর্তমান মুসহাফে আরেকটি পাঠ থাকা এই শ্রেণিবিভাগের শর্ত নয়।
শুধু নাসেখ আছে৬এসব সূরার রহিতকারী আয়াতের সঙ্গে অন্য সূরার রহিত বিধানের সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
নাসেখ বা মানসুখ কোনোটিই নেই৪২এই হিসাব অনুযায়ী এসব সূরা নাসেখ–মানসুখের অন্তর্ভুক্ত নয়।
মোট১১৪বিভাগটি পূর্ণ সূরা-সংখ্যাকে চার ভাগে সাজায়।

সুয়ূতির আল-ইতকানে উদ্ধৃত সংখ্যাগুলো আলাদা। “কেউ কেউ বলেছেন” বলে তিনি যে বিভাগটি এনেছেন, সেখানে নাসেখ ও মানসুখ উভয় থাকা সূরা পঁচিশটি বলা হয়েছে। এই বাচনভঙ্গিতে একটি পূর্ববর্তী শ্রেণিবিভাগ সংকলিত হচ্ছে; সুয়ূতির নিজের চূড়ান্ত সর্বসম্মত তালিকা হিসেবে তা ঘোষিত হয়নি। তাঁর উদ্ধৃত বিভাগে অন্য তিনটি শ্রেণির সংখ্যাও পাওয়া যায়। [970]

وَقِسْمٌ فِيهِ النَّاسِخُ وَالْمَنْسُوخُ وَهِيَ خَمْسَةٌ وَعِشْرُونَ

বাংলা অনুবাদ: আর একটি ভাগে নাসেখ ও মানসুখ উভয়ই আছে; তা পঁচিশটি।

পরের পাতায় শুধু মানসুখ থাকা সূরার সংখ্যা অবশিষ্ট চল্লিশটি বলা হয়েছে। এর পরেই সুয়ূতি উদ্ধৃত বিভাগটির বিষয়ে আপত্তির কথা যোগ করেছেন। তাঁর এই মন্তব্য বিভাগটিকে নির্ভুল, প্রশ্নাতীত তালিকা হিসেবে গ্রহণের ভিত্তি দেয় না; গ্রন্থকার নিজেই তাতে বিচারযোগ্য সমস্যা রেখেছেন। [971]

وَقِسْمٌ فِيهِ الْمَنْسُوخُ فَقَطْ وَهُوَ الْأَرْبَعُونَ الْبَاقِيَةُ كَذَا قَالَ وَفِيهِ نَظَرٌ يُعْرَفُ مِمَّا سَيَأْتِي

বাংলা অনুবাদ: আর এক ভাগে শুধু মানসুখ আছে; তা অবশিষ্ট চল্লিশটি। তিনি এভাবে বলেছেন; এতে আপত্তি আছে, যা পরের আলোচনা থেকে জানা যাবে।

সূরার শ্রেণি৩০–৩৬–৬–৪২ বিভাগআল-ইতকানে উদ্ধৃত সংখ্যাহিসাবের পার্থক্য
নাসেখ ও মানসুখ উভয় আছে৩০২৫প্রথম হিসাব পাঁচটি বেশি
শুধু মানসুখ আছে৩৬৪০প্রথম হিসাব চারটি কম
শুধু নাসেখ আছে৬৬এই শ্রেণিতে সংখ্যা সমান
কোনোটিই নেই৪২৪৩প্রথম হিসাব একটি কম
চারটি সংখ্যা যোগ করলে১১৪১১৪যোগফল এক হলেও শ্রেণির বণ্টন আলাদা

দুটি সারির যোগফলই ১১৪ হওয়ায় কোন সূরা কোথায় যাবে সেই প্রশ্ন মেটে না। মোট সংখ্যা জানা এবং প্রতিটি সূরার মর্যাদা জানা পৃথক কাজ। একটি সূরায় নসখ আছে কি না, তা বদলে গেলে সেটি “কোনোটিই নেই” শ্রেণি থেকে অন্য শ্রেণিতে যায়। আবার কোনো আয়াতকে রহিতকারী বলা হবে কি না, তার ওপর একটি সূরা “শুধু মানসুখ” থেকে “উভয় আছে” শ্রেণিতে যেতে পারে। ফলে মোট ১১৪ অক্ষুণ্ণ রেখেও সূরার আইনি পরিচয় সম্পর্কে বিরোধ বহাল থাকে। একটি গাণিতিকভাবে পূর্ণ টেবিল নিজে থেকে একটি প্রমাণিত ধর্মতাত্ত্বিক মানচিত্র হয়ে যায় না।

আল-ইতকানের একই উদ্ধৃত তালিকায় আরও একটি নির্দিষ্ট অসংগতি আছে। নাসেখ ও মানসুখ উভয় থাকা সূরার সংখ্যা বলা হয়েছে পঁচিশ; কিন্তু নামগুলো গুনলে বিশটি পাওয়া যায়। বাকারা এবং তার পরের তিনটি সূরা মিলিয়ে চারটি; নূর ও তার পরের দুটি মিলিয়ে তিনটি; বাকি সরাসরি উল্লেখ করা নামগুলো যোগ করলে মোট বিশ। সংখ্যার ঘোষণার সঙ্গে নামের তালিকার এই অমিল উদ্ধৃত পাঠটির ভেতরেই বিদ্যমান।

আল-ইতকানের তালিকায় উল্লেখসংশ্লিষ্ট সূরার নামগণনায় সংখ্যা
বাকারা ও পরের তিনটিবাকারা, আলে ইমরান, নিসা, মায়িদা৪
হজহজ১
নূর ও তার পরের দুটিনূর, ফুরকান, শুআরা৩
পরবর্তী পৃথক নামগুলোআহযাব, সাবা, মুমিন, শূরা, যারিয়াত, তূর, ওয়াকিআ, মুজাদালা, মুযযাম্মিল, মুদ্দাসসির, তাকবির, আসর১২
নামের তালিকার মোটউদ্ধৃত নামগুলো সরাসরি গণনা২০
গদ্যে ঘোষিত মোট“পঁচিশটি”২৫

এখানে পঁচিশের ঘোষণাকে বিশ করে দিলে ঘোষিত চার বিভাগের যোগফল আর ১১৪ থাকে না; ১০৯ হয়। আবার যোগফল ১১৪ রাখার জন্য নিজের পক্ষ থেকে পাঁচটি সূরার নাম যোগ করলে তা উদ্ধৃত উৎসের তালিকা থাকে না। এই অবস্থায় ঘোষিত সংখ্যা ও দেওয়া নাম দুটো তথ্যই পাশাপাশি থাকে: গদ্যে পঁচিশ, নামের হিসাবে বিশ। সুয়ূতির আপত্তির মন্তব্যকে শুধু এই গণনাগত অমিলের ব্যাখ্যা বলে নির্দিষ্ট করার মতো কথা উদ্ধৃত স্থানে নেই। তাঁর সাধারণ আপত্তি এবং দৃশ্যমান গণনাগত অমিল দুটি পৃথক তথ্য।

একই শ্রেণির নামের অধীনে ভিন্ন ধরনের ধর্মীয় সিদ্ধান্তও ঢুকে পড়ে। “শুধু নাসেখ” থাকা মানে সংশ্লিষ্ট সূরায় রহিতকারী নির্দেশ শনাক্ত করা হয়েছে; কিন্তু সেই শনাক্তকরণ কোন আয়াতের কোন পূর্ববর্তী বিধানের বিরুদ্ধে কাজ করছে, তা সংখ্যার ঘরে লেখা নেই। “শুধু মানসুখ” থাকা মানে সংশ্লিষ্ট আয়াত বর্তমান গ্রন্থে পড়া হলেও তার আইনি মর্যাদা সম্পর্কে আলাদা রায় রয়েছে। একটি সূরাকে এইভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা তার সব শব্দে বদল ঘটেছে বলে দাবি করা নয়; এটি তার ভেতরের নির্দেশগুলোর ঐতিহাসিক ও আইনি সম্পর্ক সম্পর্কে সিদ্ধান্ত।

৩০–৩৬–৬–৪২ বিভাগে প্রথম তিন শ্রেণিতে মোট বাহাত্তরটি সূরা পড়ে; আল-ইতকানের ঘোষিত ২৫–৪০–৬–৪৩ বিভাগে একাত্তরটি। এই যোগফলগুলো সংশ্লিষ্ট শ্রেণিবিভাগের ফল। এগুলো থেকে বাহাত্তর বা একাত্তরটি সূরা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত, কিংবা তাদের প্রত্যেকটি আয়াত বদলে গেছে—এমন সিদ্ধান্ত বেরোয় না। প্রকৃত তাৎপর্য হলো, রহিতকরণ সম্পর্কে যাঁরা এই বিভাগগুলো তৈরি করেছেন, তাঁরা কোরআনের বড় অংশজুড়ে কোনো না কোনো নাসেখ–মানসুখ সম্পর্ক চিহ্নিত করেছেন। সেই সম্পর্কের প্রকৃতি ও নির্ভরযোগ্যতা প্রত্যেক ক্ষেত্রে আলাদা দলিলের বিষয়।

এই সংখ্যাতালিকা কোরআনের বিষয়বস্তু সম্পর্কে পরবর্তী ব্যাখ্যার প্রভাব প্রকাশ করে। সূরা একই অবস্থানে আছে; শব্দও পাঠ করা হচ্ছে; তবু কোনো নির্দেশ কার্যকর কি না, তার জন্য আলাদা বর্ণনা ও ব্যাখ্যা প্রয়োজন হচ্ছে। একটি তালিকার সঙ্গে অন্যটির অমিল সেই সিদ্ধান্তগুলোর মতভেদ দেখায়। গৃহীত মুসহাফের সংখ্যা স্থির থাকলেও মুসহাফের ভেতরের বিধানগুলোর শ্রেণি ও কার্যকারিতা নিয়ে একক স্থির হিসাব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। “অপরিবর্তিত গ্রন্থ” কথাটির আড়ালে এই পরিবর্তিত আইনি অবস্থাগুলো ঢেকে যায়।


কোন পাঠ কোরআন, কোন বিধান কার্যকর: পরবর্তী ভাষ্যকারের নির্ধারণক্ষমতা

কোনো আয়াত নাজিল হওয়ার পরে রহিত হয়েছিল কি না, সেই খবর নিজে থেকে প্রতিটি আয়াতের গায়ে লেখা নেই। নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে কোন বক্তব্য আগে, কোনটি পরে, কোন বর্ণনা গ্রহণযোগ্য এবং দুটি নির্দেশকে একই সঙ্গে কার্যকর রাখা সম্ভব কি না—এসব নির্ধারণ করতে হয়। ধর্মীয় আইনে এই নির্ধারণের গুরুত্ব বিপুল। একটি আয়াত মানসুখ ঘোষণা করলে তার আগের বাধ্যবাধকতা শেষ হতে পারে; রহিত নয় বলে গ্রহণ করলে সেই বাধ্যবাধকতা বহাল থাকে। ফলে রহিতকরণ চেনার পদ্ধতি কোনো প্রান্তিক পরিভাষাগত বিষয় নয়; অনুসারীর ওপর কোন আদেশ কার্যকর হবে, তার দরজা।

ইবনুল হাসসারের বক্তব্য উদ্ধৃত করে সুয়ূতি নসখ নির্ধারণে স্পষ্ট বর্ণনা ও ইতিহাসের ওপর নির্ভরতার কথা বলেছেন। নবীর বক্তব্য অথবা কোনো সাহাবির নির্দিষ্ট ঘোষণা, বিরোধের প্রকৃতি এবং পূর্বাপর সময় নির্ধারণ—এসব তাঁর আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। সাধারণ তাফসিরকারের মত কিংবা সুস্পষ্ট বর্ণনা ছাড়া মুজতাহিদের সিদ্ধান্তকে যথেষ্ট না বলার বক্তব্যও সেখানে রয়েছে। কারণ নসখের সিদ্ধান্তে আগে প্রতিষ্ঠিত একটি বিধান তুলে নিয়ে অন্য অবস্থান প্রতিষ্ঠিত হয়। [972]

فالمعتمد فيه النقل والتاريخ دون الرأي والاجتهاد.

বাংলা অনুবাদ: এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হলো বর্ণনা ও ইতিহাস, ব্যক্তিগত মত ও ইজতিহাদ নয়।

এই নীতির প্রয়োগেও নির্বাচন থেকে যায়। একটি বর্ণনায় “রহিত” শব্দ থাকলে সেটি পূর্ববর্তীদের বিস্তৃত অর্থে বলা, না পরের সংকীর্ণ অর্থে বলা—তা নির্ধারণ করতে হয়। বর্ণনাটি কোনো বাস্তব প্রত্যাহারের সংবাদ দিচ্ছে, না আয়াতের অর্থ সম্পর্কে বর্ণনাকারীর সিদ্ধান্ত—এ দুটির পার্থক্যও প্রাসঙ্গিক হয়। আবার কোন নির্দেশের সঙ্গে কোন নির্দেশের সরাসরি বিরোধ আছে, সেটিও ব্যাখ্যার সিদ্ধান্ত। ফলে ব্যক্তিগত মতের বদলে বর্ণনা ও ইতিহাসকে ভিত্তি বললেও বর্ণনা নির্বাচন, অর্থ নির্ধারণ ও কালানুক্রম স্থির করার দায়িত্ব মানুষের হাতেই থাকে।

গাযালীর আল-মুস্তাসফায় সাহাবির নসখসংক্রান্ত বক্তব্য কতখানি গ্রহণ করা হবে, তা নিয়ে একাধিক অবস্থান সংকলিত হয়েছে। কাজির নামে উদ্ধৃত একটি অবস্থানে বলা হয়েছে, সাহাবি কোন দলিলকে নাসেখ মনে করেছেন তা জানালে সেই দলিল বিচার করা হবে; কেবল তাঁর সিদ্ধান্ত অন্ধভাবে অনুসরণ করা হবে না। এই উদ্ধৃত অবস্থানটির ভাষায় পরবর্তী বিচারকের নির্ধারণক্ষমতা প্রকাশ্য: [973]

بل الصحيح أنه إن ذكر الناسخ تأملنا فيه وقضينا برأينا

বাংলা অনুবাদ: বরং সঠিক হলো, তিনি নাসেখ দলিলটি উল্লেখ করলে আমরা তা বিচার করব এবং আমাদের বিবেচনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেব।

গাযালী ওই অবস্থান উদ্ধৃত করার পরে নিজের অধিক গ্রহণযোগ্য মত হিসেবে সাহাবির বক্তব্য গ্রহণের পক্ষে যান—যেভাবে কোনো আদেশ বা নিষেধের সংবাদ গ্রহণ করা হয়। কাজির উদ্ধৃত দলিল পুনর্বিবেচনার নীতি এবং গাযালীর অগ্রগণ্য গ্রহণনীতি একই আলোচনায় পৃথক অবস্থান হিসেবে আছে। সাহাবির বক্তব্যকে প্রত্যক্ষ সংবাদের মর্যাদা দেওয়ার প্রশ্নে এই পার্থক্য তৈরি হয়েছে। গাযালীর নিজের সিদ্ধান্তের বাক্যটি হলো: [974]

والأصح عندنا أن نقبل كقول الصحابي أمر بكذا ونهى عن كذا

বাংলা অনুবাদ: আমাদের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য হলো তা গ্রহণ করা, যেমন সাহাবির এই বক্তব্য গ্রহণ করা হয় যে অমুক কাজের আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং অমুক কাজ নিষেধ করা হয়েছে।

এখানে মতভেদটি একই সাক্ষ্যের প্রমাণমূল্য নিয়ে। একজন সাহাবি “অমুক আয়াত রহিত” বলেছেন—এই বাক্যকে কেউ প্রত্যক্ষ সংবাদের মর্যাদা দেন, কেউ তার মধ্যে ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা থাকার সম্ভাবনা ধরেন। প্রথম পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ ছোট; দ্বিতীয় পদ্ধতিতে কোন দলিল দিয়ে রহিত হয়েছে তার বাড়তি বিচার চলে। ফলে কোরআনের একটি আয়াতের বর্তমান মর্যাদা নির্ধারণ করতে গিয়ে সাহাবির কর্তৃত্ব সম্পর্কে পরবর্তী উসুলবিদদের মতও কার্যকর হয়ে ওঠে। ঐশী বিধানের অবস্থা নির্ধারণে এই মানবীয় পদ্ধতিগত বিরোধের বাস্তব ফল আছে।

রহিতকারী দলিল কোন ধরনের হতে পারে, তা নিয়েও আল-ইতকানে মতভেদ সংকলিত হয়েছে। একটি মতে কোরআন কেবল কোরআন দিয়েই রহিত হবে; আরেক মতে সুন্নাহ দিয়েও হতে পারে, কারণ সেটিকেও আল্লাহর কাছ থেকে আসা হিসেবে গণ্য করা হয়। এই পার্থক্যে কোরআনের বাইরের কোন বর্ণনা কোরআনিক বিধানের কার্যকারিতা শেষ করতে পারবে, সেই প্রশ্নটি নির্ধারিত হয়। সুয়ূতির উদ্ধৃত দুই অবস্থানের প্রথমটির সংক্ষিপ্ত ভাষা: [975]

لَا يُنْسَخُ الْقُرْآنُ إِلَّا بِقُرْآنٍ

বাংলা অনুবাদ: কোরআন কেবল কোরআন দিয়েই রহিত হয়।

বিপরীত অবস্থানে সুন্নাহকেও রহিতকারী প্রমাণের আওতায় রাখা হয়েছে। একটি আয়াতের বদলে অন্য আয়াত খোঁজা এবং একটি হাদিসকে আয়াতের বিধান প্রত্যাহারের প্রমাণ করা—এই দুটি পদ্ধতিতে দলিলের সীমানা ভিন্ন। একই বর্তমান মুসহাফ সামনে রেখেও কার্যকর আইনের সিদ্ধান্ত তাই ভিন্ন পথে যেতে পারে। সুয়ূতি অপর অবস্থানটি এভাবে লিখেছেন: [976]

بَلْ يُنْسَخُ الْقُرْآنُ بِالسُّنَّةِ لِأَنَّهَا أَيْضًا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ

বাংলা অনুবাদ: বরং কোরআন সুন্নাহ দিয়েও রহিত হয়, কারণ সেটিও আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে।

মুসহাফের বিন্যাস থেকেও প্রকাশের কালানুক্রম সব ক্ষেত্রে সরাসরি পাওয়া যায় না। সুয়ূতি ইদ্দতের আয়াত এবং আহযাবের “এর পরে তোমার জন্য নারী বৈধ নয়” বক্তব্যের ক্ষেত্রে রহিতকারী আয়াত গ্রন্থের বিন্যাসে আগে থাকার আলোচনাটি এনেছেন। অর্থাৎ পড়ার ক্রম এবং ধর্মীয় বিচারে পরে নাজিল হওয়ার ক্রমকে পৃথক করতে হয়। আগের পাতার আয়াত পরের পাতার আয়াতকে রহিত করেছে বলে কোনো মত গ্রহণ করলে শুধু পৃষ্ঠা উল্টে চলা দিয়ে কার্যকর আইন নির্ধারণ সম্ভব হয় না। [977]

آيَةِ الْعِدَّةِ فِي الْبَقَرَةِ وَقَوْلِهِ: {لَا يَحِلُّ لَكَ النِّسَاءُ}

বাংলা অনুবাদ: বাকারায় ইদ্দতের আয়াত এবং তাঁর এই বক্তব্য: “তোমার জন্য নারীরা বৈধ নয়।”

নির্ধারণের স্তরভাষ্যকার বা ফকিহকে যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়সিদ্ধান্তটির ফল
পূর্ববর্তী পাঠের পরিচয়উদ্ধৃত বাক্যটি কোরআন হিসেবে পঠিত হয়েছিল, না অন্য ধরনের বক্তব্যবর্তমান মুসহাফের বাইরের কথার পূর্ববর্তী ধর্মীয় মর্যাদা নির্ধারিত হয়
রহিত হওয়ার সাক্ষ্যস্পষ্ট সংবাদ আছে, না বর্ণনাকারীর ব্যাখ্যা আছেপাঠ বা আইন পরিত্যাগের ভিত্তি স্থির হয়
কালানুক্রমকোন দলিল প্রকাশে আগে এবং কোনটি পরেকোনটিকে রহিতকারী বলা যাবে তা নির্ধারিত হয়
বক্তব্যের সম্পর্কপূর্ণ প্রত্যাহার, বিশেষীকরণ, ব্যাখ্যা, না অবস্থাভেদে প্রয়োগআগের নির্দেশ সম্পূর্ণ অচল হবে, না সীমার মধ্যে বহাল থাকবে
দলিলের ক্ষমতাকোরআনের বাইরের বর্ণনা কতখানি রহিতকারী প্রমাণকার্যকর আইন নির্ধারণে মুসহাফের বাইরের উৎসের ভূমিকা স্থির হয়
পাঠ ও বিধানের পৃথক মর্যাদাতিলাওয়াত, বিধান, না উভয়টি রহিতকোনটি পড়া হবে এবং কোনটির অধীনে বিচার হবে তা পৃথক হয়

নসখের স্বীকৃত ধর্মতাত্ত্বিক সময়সীমা নবীর জীবদ্দশা। ইসলামওয়েবের আলোচনায় জাসসাসের আল-ফুসূল থেকে উদ্ধৃত হয়েছে যে নবীর মৃত্যুর পরে নসখ হয় না। পরবর্তী আলেমের নির্ধারণক্ষমতা এই কাঠামোয় পূর্ববর্তী রহিতকরণ শনাক্ত ও প্রতিষ্ঠা করার ক্ষমতা। কোন অতীত প্রত্যাহারের দাবি গ্রহণ করা হবে, তার ওপর বর্তমান আইনি নির্দেশ নির্ভর করে। [978]

النسخ لا يصح إلا من طريق التوقيف, ولا يصح بعد وفاة الرسول عليه الصلاة والسلام.

বাংলা অনুবাদ: নসখ কেবল প্রামাণ্য ধর্মীয় নির্দেশের পথেই প্রতিষ্ঠিত হয়; রসুলের মৃত্যুর পরে তা সংঘটিত হয় না।

পূর্ববর্তী ঘটনা শনাক্ত করার এই ক্ষমতারও বর্তমান ফল আছে। কোনো নিষেধ নবীর যুগে রহিত হয়েছিল বলে একটি ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে এখন সেটি আর অনুসরণীয় হয় না। অন্য ব্যাখ্যায় রহিত হওয়ার দাবি অগ্রাহ্য করলে নিষেধটি বহাল থাকে। রহিতকরণের ঘোষণাকে নবীর যুগের মধ্যেই রাখা হচ্ছে, অথচ সেই অতীত সম্পর্কে ভিন্ন সিদ্ধান্তের ফলে বর্তমানের কার্যকর নির্দেশও আলাদা হয়ে যায়। পরবর্তী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব তাই অতীতের বিবরণ গ্রহণের মধ্য দিয়েই বর্তমান জীবন ও আইন পর্যন্ত পৌঁছায়।

ধর্মীয় আনুগত্যের দাবি এই নির্ধারণক্ষমতাকে সামাজিক গুরুত্ব দেয়। সাধারণ অনুসারী একটি নির্দেশ পড়েই তার সব পর্যায়ের ইতিহাস জানেন না; তাঁর কাছে পৌঁছানো তাফসির ও ফতোয়ার সিদ্ধান্ত অনুসারে নির্দেশটি কার্যকর বা অকার্যকর হয়। একই বাক্যের ওপর দাঁড়িয়ে অনুসরণ করতে বলা এবং অনুসরণ বন্ধ করতে বলা—দুটিই সম্ভব হয়, যদি কোনটিকে মানসুখ ধরা হচ্ছে সে রায় বদলায়। ভাষ্যকারের ভূমিকা তখন কেবল শব্দের অর্থ বুঝিয়ে দেওয়া পর্যন্ত থাকে না; কোন বক্তব্যের হাতে বর্তমানে আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে, সেই সীমানাও তিনি নির্ধারণ করেন।

কোরআনের স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধানদানের দাবি এ জায়গায় মানুষের ব্যাখ্যাগত প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। গ্রন্থে কোনো আয়াত আছে—এ তথ্য তার বর্তমান আইনি কার্যকারিতার পুরো উত্তর নয়। গ্রন্থে নেই—এ তথ্যও পূর্বে কোরআন হিসেবে বিবেচিত কোনো বাক্যের বিধান কার্যকর রাখা হবে কি না তার পুরো উত্তর নয়। নসখের পদ্ধতি, সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং কালানুক্রম নিয়ে পরবর্তী আলেমদের সিদ্ধান্ত এই ফাঁক পূরণ করে। ঐশী কর্তৃত্বের নামে কার্যকর হওয়া আইনে মানবীয় বিচার তাই বাইরের অনুষঙ্গ হিসেবে নয়, নির্ধারক কাঠামোর অংশ হিসেবে উপস্থিত।

কোরআন, হাদিস ও তাফসিরের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর সংকলন সংশয় ডটকমের রেফারেন্স আর্কাইভেও রয়েছে। নাসেখ–মানসুখের স্বীকৃত শ্রেণি ও মতভেদ একসঙ্গে যে ইতিহাস প্রকাশ করে, তাতে পূর্বে নাজিল হওয়া পাঠ, চূড়ান্ত তিলাওয়াত এবং কার্যকর আইন পৃথক সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে। ধর্মতত্ত্ব এই সীমানা বদলকে অনুমোদন দিয়েছে; ভাষ্যকারেরা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তার অবস্থান নির্ধারণ করেছেন। ফলে কোরআনের ইতিহাসে সমস্ত পর্যায়ের পাঠ ও আইন সমানভাবে অপরিবর্তিত ছিল—এই দাবি নসখের স্বীকৃত ব্যবস্থার সঙ্গেই অসংগত।


কোরআনের ভেতর বিধান পরিবর্তনের বিস্তারিত দৃষ্টান্ত

কোরআনের ভেতর বিধান পরিবর্তন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রেই ঘটেছে। স্বামীর মৃত্যুর পরে নারীর অপেক্ষাকাল ও সম্পত্তিগত সুবিধা, মদ্যপানের অনুমতি ও নিষেধ, মুহাম্মদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপের আগে অর্থদান এবং মুহাজির নারীদের ফেরত পাঠানোর নিয়ম—প্রতিটি ক্ষেত্রে আগে ও পরের সিদ্ধান্তের সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। ক্ষমা ও উপেক্ষার নির্দেশকে যুদ্ধের আয়াত দিয়ে রহিত বলার মতও ইসলামি আইনশাস্ত্রে সংকলিত আছে। এসব সিদ্ধান্তে কোনো আয়াতের শব্দ মুসহাফে থেকে গেলেও তার পূর্ববর্তী প্রয়োগ বদলে যায়। একই গ্রন্থে একাধিক পর্যায়ের বক্তব্য রয়ে যাওয়ায় কার্যকর আইন নির্ধারণে অবতরণের ক্রম, হাদিস ও তাফসিরের রায় প্রয়োজন হয়।


বিধবার এক বছরের ব্যবস্থা ও চার মাস দশ দিন: তাফসিরি নসখ-মত এবং ইবনে যুবাইর–উসমানের কথোপকথন

বিধবার প্রসঙ্গে বাকারা সূরায় এক বছর এবং চার মাস দশ দিন—দুটি সময়সীমা আছে। একটির সঙ্গে স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের না করে এক বছর পর্যন্ত সুবিধা দেওয়ার অসিয়ত যুক্ত; অন্যটিতে স্বামীর মৃত্যুর পরে নারীর অপেক্ষার নির্দেশ সরাসরি আছে। নসখের প্রচলিত ব্যাখ্যায় এক বছরের ব্যবস্থা থেকে চার মাস দশ দিনের বিধানে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর সঙ্গে ভরণপোষণ, বাসস্থান এবং উত্তরাধিকার—আরও কয়েকটি অধিকার জড়িয়ে আছে। অপেক্ষার বাধ্যবাধকতা, থাকার অধিকার এবং সম্পত্তি থেকে প্রাপ্য—তিনটি পৃথক বিষয়ে পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট পরিধি নির্ধারিত হয়। বাকারা ২:২৪০-এর পূর্ণ বক্তব্য: [979]

وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْنَ مِنكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا وَصِيَّةً لِّأَزْوَاجِهِم مَّتَاعًا إِلَى الْحَوْلِ غَيْرَ إِخْرَاجٍ ۚ فَإِنْ خَرَجْنَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِي مَا فَعَلْنَ فِي أَنفُسِهِنَّ مِن مَّعْرُوفٍ ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের মধ্যে যারা মারা যায় এবং স্ত্রী রেখে যায়, তাদের স্ত্রীদের জন্য বাড়ি থেকে বের না করে এক বছর পর্যন্ত ভোগসুবিধার অসিয়ত রয়েছে। তবে তারা বেরিয়ে গেলে নিজেদের বিষয়ে সংগতভাবে যা করে, তাতে তোমাদের কোনো দোষ নেই। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান।

বাকারা ২:২৩৪-এ চার মাস দশ দিন অপেক্ষার নির্দেশ পাওয়া যায়। আয়াতটি মুসহাফে এক বছরের বক্তব্যের আগে রয়েছে। অর্থাৎ পড়ার ক্রমে প্রথমে পাওয়া যায় চার মাস দশ দিন, পরে এক বছরের ব্যবস্থা; নসখের প্রধান ব্যাখ্যায় প্রকাশের ক্রমটি এর বিপরীত বলে নির্ধারিত হয়। গ্রন্থের অবস্থান এবং কোন বিধান পরে কার্যকর হয়েছে—এই দুটি হিসাব এখানে এক পথে চলে না। [980]

وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْنَ مِنكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا ۖ فَإِذَا بَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا فَعَلْنَ فِي أَنفُسِهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۗ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের মধ্যে যারা মারা যায় এবং স্ত্রী রেখে যায়, তাদের স্ত্রীরা নিজেদের চার মাস দশ দিন অপেক্ষায় রাখবে। তাদের নির্ধারিত সময় শেষ হলে নিজেদের বিষয়ে সংগতভাবে যা করে, তাতে তোমাদের কোনো দোষ নেই। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে অবগত।

ইবনে কাসীরের তাফসিরে অধিকাংশের মত হিসেবে বলা হয়েছে, ২:২৪০ আয়াতটি তার আগে থাকা চার মাস দশ দিনের আয়াত দিয়ে রহিত। তাঁর সংকলনে ইবন আব্বাসের নামে এক বছর স্বামীর বাড়িতে ইদ্দত পালন ও মৃত স্বামীর সম্পদ থেকে ব্যয়ের বিবরণও আছে। এই ব্যাখ্যায় অপেক্ষার মেয়াদ এবং সেই সময়ের বাসস্থান–ব্যয়ের ব্যবস্থা একই পূর্ববর্তী অবস্থার অংশ। পরে অপেক্ষার মেয়াদ ও উত্তরাধিকারের বিধান দিয়ে সেই অবস্থার অবসান ব্যাখ্যা করা হয়। [981]

قال الأكثرون : هذه الآية منسوخة بالتي قبلها

বাংলা অনুবাদ: অধিকাংশ বলেছেন: এই আয়াতটি তার আগে থাকা আয়াত দিয়ে রহিত।

বিষয়এক বছরের ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যাপরবর্তী বলে গৃহীত অবস্থাপরিবর্তনের ক্ষেত্র
অপেক্ষার সময়নসখের প্রধান ব্যাখ্যায় এক বছর ইদ্দতের কথা বলা হয়েছেচার মাস দশ দিনের নির্দেশনারী কত দিন অপেক্ষা করবেন
ভরণপোষণমৃত স্বামীর সম্পদ থেকে ব্যয়ের ব্যবস্থাউত্তরাধিকারের নির্দিষ্ট অংশের সঙ্গে পুরোনো ব্যবস্থার সম্পর্ক নির্ধারণসম্পত্তি থেকে কী প্রাপ্য হবে
বাসস্থানবাড়ি থেকে বের না করা ও এক বছর পর্যন্ত সুবিধাবাসস্থান কত দিন বহাল থাকবে, তা নিয়ে পৃথক ফিকহি সিদ্ধান্তথাকার অধিকার ও থাকার বাধ্যবাধকতা
আয়াতের পাঠ২:২৪০ মুসহাফে রয়ে যায়রহিতকরণের ব্যাখ্যার পরেও তিলাওয়াত বহালশব্দ রেখে আইনি মর্যাদা পরিবর্তন

ইবনুয যুবায়র উসমানের কাছে এই আয়াত লেখা বা রেখে দেওয়ার কারণ জানতে চেয়েছিলেন। তাঁর প্রশ্নের ভিত্তি ছিল অন্য আয়াত দিয়ে এর বিধান রহিত হওয়া। উসমানের উত্তর, তিনি কোনো কিছু তার স্থান থেকে সরাবেন না। বুখারির এই পূর্ণ বর্ণনা পাঠ বহাল রেখে বিধান রহিত করার সঙ্গে যুক্ত। কথোপকথনটির ফল অত্যন্ত স্পষ্ট: রহিত বলে আলোচিত আয়াতও সংকলিত মুসহাফে রাখা হয়েছে। ফলে পৃষ্ঠায় থাকা বাক্য এবং বর্তমানে অনুসরণীয় নির্দেশের সীমানা এক নয়।

একই বিষয় সম্পর্কে বুখারির পরের বর্ণনায় মুজাহিদের পৃথক ব্যাখ্যা আছে। সেখানে চার মাস দশ দিনের বাধ্যতামূলক অপেক্ষার সঙ্গে বাকি সাত মাস বিশ রাতের ঐচ্ছিক বাসস্থান যোগ করে বছর পূর্ণ করার কথা বলা হয়। নারী চাইলে ওই অতিরিক্ত সময়ে থাকবেন, চাইলে বেরিয়ে যাবেন। এই ব্যাখ্যায় এক বছরকে একই অর্থে বাধ্যতামূলক ইদ্দত করা হচ্ছে না। বসবাসের অধিকার এবং অপেক্ষার বাধ্যবাধকতা পৃথক করা হয়েছে। [982]

جَعَلَ اللَّهُ لَهَا تَمَامَ السَّنَةِ سَبْعَةَ أَشْهُرٍ وَعِشْرِينَ لَيْلَةً وَصِيَّةً، إِنْ شَاءَتْ سَكَنَتْ فِي وَصِيَّتِهَا، وَإِنْ شَاءَتْ خَرَجَتْ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ তার জন্য অসিয়ত হিসেবে বছর পূর্ণ করার বাকি সাত মাস বিশ রাত নির্ধারণ করেছেন। সে চাইলে তার অসিয়ত অনুযায়ী বাস করবে, আর চাইলে বেরিয়ে যাবে।

এই ব্যাখ্যার পরেই আতার বক্তব্যে উত্তরাধিকারের বিধান এসে বাসস্থানের ব্যবস্থা রহিত করার কথা পাওয়া যায়। ফলে ভিন্ন ব্যাখ্যায়ও পরিবর্তনের প্রশ্নটি পুরোপুরি সরে যায় না; কোন অধিকার বা বাধ্যবাধকতা বদলেছে, সেই চিহ্নিতকরণ বদলায়। এক বছরের বাধ্যতামূলক অপেক্ষা রহিত হওয়া, অতিরিক্ত সময়ে ঐচ্ছিক বাসস্থানের অধিকার এবং উত্তরাধিকার দিয়ে ব্যয়ের ব্যবস্থা বদলানো—এগুলো আইনগতভাবে আলাদা সিদ্ধান্ত। নারী কত দিন বিয়ে করতে পারবেন না এবং কত দিন মৃত স্বামীর বাড়িতে থাকার সুবিধা পাবেন, এই দুই প্রশ্নের ফলও এক নয়।

ব্যাখ্যার ধারাযে সম্পর্ক নির্ধারিত হয়বিধবার ওপর বাস্তব প্রভাব
এক বছরের ইদ্দত রহিত হওয়ার ব্যাখ্যাআগের দীর্ঘ অপেক্ষার জায়গায় চার মাস দশ দিনঅপেক্ষার বাধ্যতামূলক মেয়াদ কমে
মুজাহিদের ঐচ্ছিক বাসস্থানের ব্যাখ্যাবাধ্যতামূলক অপেক্ষা ও বছরের অবশিষ্ট সময়ের সুবিধা পৃথকঅতিরিক্ত সময়ে থাকার সিদ্ধান্ত নারীর ইচ্ছার ওপর
আতার উত্তরাধিকারসংক্রান্ত ব্যাখ্যাউত্তরাধিকারের বিধানের সঙ্গে আগের বাসস্থানের ব্যবস্থার অবসান যুক্তবাসস্থান ও সম্পত্তির প্রাপ্য নতুনভাবে নির্ধারিত

একটি আয়াতের শব্দ অক্ষত থাকলেও তার ওপর দাঁড়িয়ে বিধবার জীবনের একাধিক অংশ নতুনভাবে নির্ধারিত হচ্ছে। কোন ব্যাখ্যায় সময় কমছে, কোনটিতে বাসস্থানের অধিকার থাকছে এবং কোনটিতে পুরোনো ব্যয়ের ব্যবস্থা উঠে যাচ্ছে, তা তাফসির ও ফিকহের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। “এক বছর” শব্দটি মুসহাফে থাকা সত্ত্বেও এক বছরের সমস্ত ব্যবস্থা বর্তমান আইন হিসেবে বহাল নেই। চার মাস দশ দিনের অপেক্ষার পাশাপাশি বাসস্থান ও সম্পত্তির প্রাপ্য নির্ধারণে আরও আয়াত এবং সেগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনকারী ব্যাখ্যা ব্যবহার করা হয়।

এই দৃষ্টান্তে পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান বিষয় হলো পুরোনো বাক্য মুছে না দিয়েও তার পূর্ববর্তী কর্তৃত্ব প্রত্যাহার করা। বিধবা নারীকে ঘিরে অপেক্ষা, বাসস্থান ও সম্পত্তির যে ব্যবস্থা তাফসিরে পূর্ববর্তী বলে চিহ্নিত, পরবর্তী বিধানের অধীনে তার অবস্থা বদলে যায়। ঐশী আদেশের পরিচয় আগের ব্যবস্থাকে স্থায়ী রাখেনি; আরেক ঐশী আদেশের ব্যাখ্যা দিয়েই তার কার্যকারিতা শেষ করা হয়েছে। নারীকে একই গ্রন্থের দুটি সময়সীমা পড়তে হয়, কিন্তু তাঁর জন্য বাধ্যতামূলক সময় একটিই নির্ধারিত হয়। সেই নির্বাচন ও সম্পত্তিগত ব্যবস্থার সীমা স্থির করতে গ্রন্থের বাইরের বর্ণনা ও ব্যাখ্যাগত সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকে।


মদের বিধানের পর্যায়: নাহল, বাকারা, নিসা ও মায়িদা

মদের বিধানে পরিবর্তন বর্ণনা থেকে নেতিবাচক মূল্যায়ন, নির্দিষ্ট সময়ে নিষেধ এবং শেষে সর্বাত্মক বর্জনের নির্দেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। কোরআনের বর্তমান মুসহাফে এই ভিন্ন পর্যায়ের বক্তব্যগুলো পাশাপাশি রয়ে গেছে। কোনটি আগে এবং কোনটির পরে নিষেধাজ্ঞা চূড়ান্ত হয়েছে, তা অবতরণসংক্রান্ত বর্ণনা ও তাফসির থেকে নির্ধারিত হয়। এই পর্যায়গুলোর মধ্যে অনুসারীদের পানাহার, নামাজে উপস্থিতি এবং ধর্মীয় অপরাধের সীমানা নতুনভাবে নির্ধারিত হয়েছে। একই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জীবনে অনুমতির পর্যায় এবং নিষেধের পর্যায় পৃথক সময়ের বাস্তবতা হিসেবে বর্ণিত।

নাহল ১৬:৬৭-এ খেজুর ও আঙুর থেকে নেশাজাতীয় পানীয় এবং উত্তম জীবিকা গ্রহণের কথা এসেছে। মানুষের ব্যবহৃত ফল ও পানীয়ের প্রসঙ্গে বাক্যটি আছে। বাংলা অনুবাদগুলোতে “মদ”, “মাদক” ও “নেশাজাতীয় পানীয়” অর্থের উপস্থিতি স্পষ্ট: [983]

আর খেজুর ও আঙ্গুর ফল থেকে তোমরা মদ ও উত্তম খাদ্য প্রস্তুত কর, জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।
— Taisirul Quran
আর খেজুর গাছের ফল ও আঙ্গুর হতে তোমরা মাদক ও উত্তম খাদ্য গ্রহণ করে থাক, এতে অবশ্যই বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে নিদর্শন।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর তোমরা খেজুর গাছের ফল ও আঙ্গুর থেকে মাদক* ও উত্তম রিয্ক গ্রহণ কর। নিশ্চয় এতে এমন কওমের জন্য নিদর্শন রয়েছে, যারা বুঝে। * ইমাম তাবারী বলেন, আয়াতটি মাদক নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে।
— Rawai Al-bayan
আর খেজুর গাছের ফল ও আঙ্গুর হতে তোমরা মাদক ও উত্তম খাদ্য গ্রহণ করে থাক [১]; নিশ্চয় এতে বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে নিদর্শন [২]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
And from the fruits of the palm trees and grapevines you take intoxicant and good provision.1 Indeed in that is a sign for a people who reason.
— Saheeh International

ইবনে কাসীর এই আয়াতকে নিষিদ্ধ হওয়ার আগের নেশাজাতীয় পানীয়ের প্রসঙ্গেই ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর সিদ্ধান্তে এখানে পরবর্তী নিষেধের আগে শরিয়তসম্মত অনুমতির প্রমাণ আছে। মদপানের বর্তমান নিষেধের আগে ধর্মীয়ভাবে অনুমোদিত পান করার একটি পর্যায় তাই তাঁর তাফসিরে স্বীকৃত। একই পানীয় এক পর্যায়ে অনুমোদিত, পরে নিষিদ্ধ—এই আইনি পরিবর্তন ইবনে কাসীরের ভাষাতেই সরাসরি পাওয়া যায়। [984]

دل على إباحته شرعا قبل تحريمه

বাংলা অনুবাদ: এটি হারাম করার আগে শরিয়তসম্মতভাবে তা অনুমোদিত থাকার প্রমাণ দেয়।

বাকারা ২:২১৯-এ মদ ও জুয়া সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরে পাপ ও উপকার—উভয়ের উল্লেখ আছে; পাপ উপকারের চেয়ে বড় বলা হয়েছে। মূল্যায়নের দিক থেকে এটি আগের বর্ণনার চেয়ে কঠোর। এখানে পানীয় ও জুয়ার উপকারের উপস্থিতি স্বীকার করেই তাদের ক্ষতিকর ধর্মীয় মূল্যায়ন সামনে আনা হয়। মানুষের প্রশ্ন এবং তার উত্তরে নতুন বক্তব্যের সম্পর্কও আয়াতের শুরুতেই প্রকাশিত। [985]

তোমাকে লোকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। বল, ‘ঐ দু’টোতে আছে ভয়ঙ্কর গুনাহ এবং মানুষের জন্য উপকারও কিন্তু এ দু’টোর পাপ এ দু’টোর উপকার অপেক্ষা অধিক’। তোমাকে জিজ্ঞেস করছে, কী তারা ব্যয় করবে? বল, ‘যা উদ্বৃত্ত’। এভাবে আল্লাহ তোমাদের প্রতি আদেশাবলী বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করছেন, যাতে তোমরা চিন্তা কর ।
— Taisirul Quran
মাদক দ্রব্য ও জুয়া খেলা সম্বন্ধে তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করছে। তুমি বলঃ এ দু’টোর মধ্যে গুরুতর পাপ রয়েছে এবং কোন কোন লোকের (কিছু) উপকার আছে, কিন্তু ও দু’টোর লাভ অপেক্ষা পাপই গুরুতর; তারা তোমাকে (আরও) জিজ্ঞেস করছে, তারা কি (পরিমাণ) ব্যয় করবে? তুমি বলঃ যা তোমাদের উদ্বৃত্ত; এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য নিদর্শনাবলী ব্যক্ত করেন যেন তোমরা চিন্তা-ভাবনা কর।
— Sheikh Mujibur Rahman
তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বল, এ দু’টোয় রয়েছে বড় পাপ ও মানুষের জন্য উপকার। আর তার পাপ তার উপকারিতার চেয়ে অধিক বড়। আর তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তারা কী ব্যয় করবে। বল, ‘যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত’। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা চিন্তা কর।
— Rawai Al-bayan
লোকেরা আপনাকে মদ [১] ও জুয়া [২] সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, ‘দু’টোর মধ্যেই আছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য উপকারও ; আর এ দু’টোর পাপ উপকারের চেয়ে অনেক বড়’। আর তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করে কি তারা ব্যয় করবে ? বলুন, যা উদ্বৃত্ত [৩]। এভাবে আল্লাহ্‌ তাঁর আয়াতসমূহ তোমাদের জন্য সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তোমরা চিন্তা কর।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
They ask you about wine1 and gambling. Say, “In them is great sin and [yet, some] benefit for people. But their sin is greater than their benefit.” And they ask you what they should spend. Say, “The excess [beyond needs].” Thus Allah makes clear to you the verses [of revelation] that you might give thought
— Saheeh International

এর পরে নিসা ৪:৪৩-এ মাতাল অবস্থায় নামাজের কাছে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। নিষেধের সীমাটি নির্দিষ্ট: এমন অবস্থায় নামাজ নয়, যখন নিজের উচ্চারিত কথাই বোঝা যাচ্ছে না। সেই পর্যায়ে নামাজের সময়ের বাইরেও মদপান চলার বিবরণ ইসলামকিউএ স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছে। অর্থাৎ একটি অন্তর্বর্তী সময় ছিল, যখন মাতাল হয়ে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ, অথচ সব সময়ের মদপান বন্ধ করার চূড়ান্ত নিষেধ তখনো আসেনি। [986]

وكانوا يشربونها في غير أوقات الصلاة ، ثم نزل بعد ذلك التحريم النهائي والقطعي للخمر .

বাংলা অনুবাদ: তাঁরা নামাজের সময় ছাড়া অন্য সময়ে তা পান করতেন। এর পরে মদের চূড়ান্ত ও নিশ্চিত নিষেধাজ্ঞা নাজিল হয়।

মায়িদা ৫:৯০–৯১-এ নির্দেশের পরিধি আরও বিস্তৃত। মদ ও জুয়াকে শয়তানের কাজের অন্তর্ভুক্ত করে বর্জনের আদেশ দেওয়া হয়। পরের আয়াতে শত্রুতা, বিদ্বেষ এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজে বাধার প্রসঙ্গ আছে। আগের আয়াতে শুধু মাতাল অবস্থায় নামাজের নিষেধ ছিল; এখানে মদ বর্জনের ব্যাপক নির্দেশ এসেছে। দুটি আয়াতের পূর্ণ অনুবাদ: [987]

5:90
হে বিশ্বাসীগণ! মদ, জুয়া আর মূর্তি ও ভাগ্য নির্ধারক তীর ঘৃণিত শয়তানী কাজ, তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সাফল্যমণ্ডিত হতে পার।
— Taisirul Quran
হে মু’মিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি ইত্যাদি এবং লটারীর তীর, এ সব গর্হিত বিষয়, শাইতানী কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়। সুতরাং এ থেকে সম্পূর্ণ রূপে দূরে থাক, যেন তোমাদের কল্যাণ হয়।
— Sheikh Mujibur Rahman
হে মুমিনগণ, নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদী ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তো নাপাক শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।
— Rawai Al-bayan
হে মুমিনগণ! মদ [১], জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণয় করার শর [২] তো কেবল ঘৃণার বস্তু, শয়তানের কাজ। কাজেই তোমরা সেগুলোকে বর্জন কর –যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার [৩]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
O you who have believed, indeed, intoxicants, gambling, [sacrificing on] stone altars [to other than Allah], and divining arrows are but defilement from the work of Satan, so avoid1 it that you may be successful.
— Saheeh International
5:91
মদ আর জুয়ার মাধ্যমে শয়তান তো চায় তোমাদের মাঝে শত্রুতা আর বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে, আল্লাহর স্মরণ আর নামায থেকে তোমাদেরকে বাধা দিতে। কাজেই তোমরা কি এসব থেকে বিরত থাকবে?
— Taisirul Quran
শাইতানতো এটাই চায় যে, মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা সৃষ্টি হোক এবং আল্লাহর স্মরণ হতে ও সালাত হতে তোমাদেরকে বিরত রাখে। সুতরাং এখনো কি তোমরা নিবৃত্ত হবেনা?
— Sheikh Mujibur Rahman
শয়তান শুধু মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করতে চায়। আর (চায়) আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদের বাধা দিতে। অতএব, তোমরা কি বিরত হবে না?
— Rawai Al-bayan
শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে ও সালাতে বাধা দিতে। তবে কি তোমরা বিরত হবে না [১]?
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
Satan only wants to cause between you animosity and hatred through intoxicants and gambling and to avert you from the remembrance of Allah and from prayer. So will you not desist?
— Saheeh International

পর্যায়আয়াতবক্তব্যের ধরনতখনকার বিধানের অবস্থা
ফল ও পানীয়ের বর্ণনানাহল ১৬:৬৭খেজুর ও আঙুর থেকে মাদক ও উত্তম জীবিকা গ্রহণইবনে কাসীরের ব্যাখ্যায় পরবর্তী নিষেধের আগে অনুমতি
পাপ–উপকারের মূল্যায়নবাকারা ২:২১৯উপকার আছে, পাপ তার চেয়ে বড়পানীয় সম্পর্কে নেতিবাচক মূল্যায়ন জোরদার
নামাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিষেধনিসা ৪:৪৩মাতাল অবস্থায় নামাজের কাছে না যাওয়ানামাজের সময়ের বাইরের পান করার পর্যায় তখনো রয়েছে
ব্যাপক বর্জনের নির্দেশমায়িদা ৫:৯০–৯১শয়তানি কাজ হিসেবে বর্জন; শত্রুতা ও নামাজে বাধার উল্লেখপরবর্তী ফিকহে গৃহীত মদপানের নিষেধ

এই ধারাবাহিকতায় অনুসারীর কর্তব্যও বদলে যায়। অনুমতির পর্যায়ে যে পান করা নিষেধ লঙ্ঘন ছিল না, পরবর্তী নির্দেশের পরে সেটিই নিষেধের আওতায় পড়ে। মাঝের পর্যায়ে পান করার সময় ও নামাজে উপস্থিতির অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শেষ পর্যায়ে শুধু নামাজের সময় এড়িয়ে চলা দিয়ে মদপানকে অনুমোদিত রাখা যায় না। এই পরিবর্তনের কারণেই পুরোনো আয়াতের বাক্য একা নিয়ে বর্তমান ধর্মীয় বিধান নির্ধারণ করা হয় না; কোন নির্দেশ পরে এসেছে, সেই সিদ্ধান্ত প্রাধান্য পায়।

আবু দাউদে উমরের নামে সংকলিত বর্ণনায় এই ধারাবাহিকতার সঙ্গে বারবার স্পষ্ট নির্দেশ চাওয়ার ঘটনাও আছে। বাকারার আয়াত শোনার পরে তিনি আবার ব্যাখ্যা চান; নিসার আয়াত শোনার পরেও একই আবেদন করেন; মায়িদার শেষ নির্দেশের পরে বিরত হওয়ার কথা বলেন। বর্ণনাটি মানুষের আবেদন এবং পরবর্তী বক্তব্যের মধ্যে সময়ক্রম সংরক্ষণ করে। তাঁর আবেদনের ভাষা ছিল: [988]

اللَّهُمَّ بَيِّنْ لَنَا فِي الْخَمْرِ بَيَانًا شِفَاءً

বাংলা অনুবাদ: হে আল্লাহ, মদ সম্পর্কে আমাদের জন্য সন্তোষজনক ও সুস্পষ্ট বক্তব্য দাও।

উমরের এই বর্ণনায় তিন পর্যায়ের আয়াতের পাশাপাশি নামাজের সময় মাতাল ব্যক্তিকে কাছে আসতে না দেওয়ার ঘোষণার কথাও আছে। নিসার নির্দেশটি দৈনন্দিন প্রার্থনার ব্যবস্থায় প্রয়োগ করা হয়েছিল বলে সেখানে বলা হয়। মদের বিধান তাই শুধু লিখিত নীতিবাক্যের পরিবর্তন নয়; নামাজে কে প্রবেশ করতে পারবেন এবং কোন অবস্থায় পারবেন, সেই ব্যবহারিক সীমাও বদলাচ্ছিল। শেষের বর্জনাদেশ আবার সেই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার বাইরে আরও বিস্তৃত নিষেধ তৈরি করে।

মদের বিধানের এই ক্রমপরিবর্তন নিয়ে মিজানুর রহমান আজহারীর আলোচনা রয়েছে:

“ধাপে ধাপে নিষেধ” কথাটির মধ্যেই বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন নির্দেশের স্বীকারোক্তি আছে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একই নিষেধ একইভাবে বহাল থাকলে আলাদা পর্যায় বলে নির্ধারণের বিষয় থাকত না। মানুষের অভ্যাস বদলানোর সুবিধা এই ধারাবাহিকতার ধর্মীয় ব্যাখ্যা হতে পারে; কিন্তু সেই ব্যাখ্যায় পূর্ববর্তী অনুমতি, সীমিত নিষেধ এবং শেষের বর্জন তিনটি একই আদেশ হয়ে যায় না। পরিবর্তনকে উপকারী বলা এবং পরিবর্তন অস্বীকার করা পৃথক দাবি। মদের ক্ষেত্রে ইসলামি ব্যাখ্যা প্রথম দাবিটিই ব্যবহার করে।

কোরআনের সংকলিত পাঠের সঙ্গে এই ইতিহাসের সম্পর্কও সরাসরি। নাহলের বাক্য সরানো হয়নি; বাকারার পাপ–উপকারের মূল্যায়নও আছে; নিসার মাতাল অবস্থার নিষেধও আছে; মায়িদার শেষ নির্দেশও আছে। শব্দগুলো এক গ্রন্থে রক্ষা পেয়েছে, অথচ অনুসারীর জন্য কোন পর্যায় বর্তমান আইন হবে তা সমানভাবে খোলা রাখা হয়নি। কার্যকর বিধান বেছে নিতে হয়েছে পরবর্তী অবতরণ ও ব্যাখ্যার সিদ্ধান্ত দিয়ে। ফলে মুসহাফের পাঠ একত্রে থাকা আইনের সমস্ত পর্যায় অপরিবর্তিত থাকার প্রমাণ নয়।


আলীর মদ্যপ অবস্থায় পাঠের গোলমাল ও নামাজের নিষেধাজ্ঞার পটভূমি

নিসা ৪:৪৩-এর মাতাল অবস্থায় নামাজের নিষেধের সঙ্গে আলীর ইমামতি ও ভুল পাঠের ঘটনাটি হাদিসে যুক্ত আছে। ঘটনাটি একটি নির্দিষ্ট সামাজিক পরিবেশ দেখায়: সাহাবিরা দাওয়াতে মদ পান করেছেন; নামাজের সময় উপস্থিত হয়েছে; পান করা ব্যক্তিই ইমাম হয়েছেন; তাঁর পাঠে গোলমাল ঘটেছে; এরপর মাতাল অবস্থায় নামাজের কাছে না যাওয়ার নির্দেশ এসেছে। এখানে নতুন বিধানের আগে কী ঘটছিল, তার বিবরণ আছে। দাওয়াতে পান করার সামাজিক অভ্যাস থেকে নামাজে মাতাল অবস্থার নিষেধ পর্যন্ত বিধানের পরিবর্তন এই ঘটনাক্রমে একটি নির্দিষ্ট উপলক্ষ পেয়েছে।

আবু দাউদের বর্ণনায় একজন আনসারি আলী ও আবদুর রহমান ইবন আউফকে দাওয়াত দিয়ে মদ পান করান। স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সেটি মদ হারাম হওয়ার আগে। মাগরিবের নামাজে আলী সূরা কাফিরুন পড়তে গিয়ে গুলিয়ে ফেলেন। সেই ঘটনার পরে সংশ্লিষ্ট আয়াত নাজিল হওয়ার কথা আসে। আলী মাগরিবের ইমামতি করেছেন এবং সূরা কাফিরুনে গোলমাল করেছেন—বর্ণনার নির্দিষ্ট ভাষা: [989] [990]

أَنَّ رَجُلاً، مِنَ الأَنْصَارِ دَعَاهُ وَعَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ عَوْفٍ فَسَقَاهُمَا قَبْلَ أَنْ تُحَرَّمَ الْخَمْرُ فَأَمَّهُمْ عَلِيٌّ فِي الْمَغْرِبِ فَقَرَأَ ‏{‏ قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ ‏}‏ فَخَلَطَ فِيهَا فَنَزَلَتْ ‏{‏ لاَ تَقْرَبُوا الصَّلاَةَ وَأَنْتُمْ سُكَارَى حَتَّى تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ ‏}‏

বাংলা অনুবাদ: সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
২১/ পানীয় দ্রব্য
পরিচ্ছেদঃ ১. মদ হারাম হওয়ার বর্ণনা
৩৬৭১। আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। একদা আনসার গোত্রের এক লোক তাকে ও আব্দুর রাহমান ইবনু আওফ (রাঃ)-কে দা‘ওয়াত করে উভয়কে মদ পান করালেন তা হারাম হওয়ার পূর্বে। অতঃপর মাগরিবের সালাতে আলী (রাঃ) তাদের ইমামতি করলেন। তিনি সূরা ‘‘কুল ইয়া আয়্যুহাল কাফিরূন’’ পাঠ করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। অতঃপর এ আয়াত অবতীর্ণ হলোঃ ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন মাতাল অবস্থায় থাকো তখন সালাতের কাছেও যেও না। সালাত তখনই পড়বে, যখন তোমরা কি বলছো তা সঠিকরূপে বুঝতে পারো।’’ (সূরা আন-নিসাঃ ৪৩)[1]
সহীহ।
[1]. তিরমিযী। ইমাম তিরমিযী বলেনঃ এই হাদীসটি হাসান গারীব।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আলী ইবনু আবী তালিব (রাঃ)

বর্ণনাটির “হারাম হওয়ার আগে” কথাটি একটি নির্দিষ্ট সময়গত পার্থক্য প্রতিষ্ঠা করে। এতে সাহাবিদের মদপানের উপস্থিতি এবং পরবর্তী নিষেধ—দুটি পর্যায় একই সূত্রে পাওয়া যায়। আলীকে ইমাম করা হয়েছিল বলে নামাজে তাঁর পাঠ অন্যরাও শুনছিলেন। কণ্ঠে পড়া পাঠ সেই অবস্থায় নির্ভুল থাকেনি; সংশোধিত বিধান নামাজে উপস্থিতির জন্য বোধশক্তির শর্ত সামনে আনে। ব্যক্তির মুখে কোরআন থাকা এবং যেকোনো অবস্থায় সেই ব্যক্তির উচ্চারিত পাঠ নির্ভুল থাকা এক নয়—এই ঘটনাটি তার একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ।

তিরমিযীর বর্ণনায় ভুল পাঠের ভাষা আরও বিস্তারিত। এখানে আবদুর রহমান ইবন আউফ খাবার ও মদের আয়োজন করেছেন বলে বলা হয়। আলীর নামে উদ্ধৃত বক্তব্যে “আমরা তোমরা যার উপাসনা কর তার উপাসনা করি”—এমন বাক্য এসেছে। সূরা কাফিরুনের প্রত্যাখ্যানের বক্তব্যের মধ্যে বিপরীত অর্থের বাক্য ঢুকে পড়ার বিবরণ এটি। তিরমিযী নিজের মন্তব্যে বর্ণনাটিকে “হাসান সহিহ গারীব” বলেছেন। [991]

فَقَدَّمُونِي فَقَرَأْتُ ‏:‏ ‏‏(‏ قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ ‏)‏ لاَ أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ وَنَحْنُ نَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ

বাংলা অনুবাদ: তাঁরা আমাকে সামনে দিলেন। আমি পড়লাম: “বলো, হে কাফিররা! তোমরা যার উপাসনা কর আমি তার উপাসনা করি না; আর আমরা তোমরা যার উপাসনা কর তার উপাসনা করি।”

বিষয়আবু দাউদ ৩৬৭১তিরমিযী ৩০২৬
আয়োজনের বিবরণএকজন আনসারি আলী ও আবদুর রহমানকে দাওয়াত দেনআবদুর রহমান খাবার তৈরি করে মদ পান করান
অবস্থামদ হারাম হওয়ার আগের পান করামদ তাঁদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল
ইমামতিমাগরিবে আলী ইমাম হনআলীকে সামনে দেওয়া হয়
পাঠের গোলমালসূরা কাফিরুনে গুলিয়ে ফেলার সাধারণ বিবরণউপাসনাসংক্রান্ত বিপরীতার্থক বাক্যের নির্দিষ্ট উদ্ধৃতি
পরবর্তী নির্দেশমাতাল অবস্থায় নামাজের কাছে না যাওয়াএকই আয়াত নাজিল হওয়ার বিবরণ

দুই সংকলনে ঘটনাটির বিবরণ থাকলেও সেগুলোকে দুটি স্বাধীন প্রত্যক্ষদর্শীর পৃথক ঘটনা বলা যায় না। আলী থেকে আবু আবদুর রহমান আস-সুলামী ও আতা ইবন আস-সায়িবের সূত্র দুই ধারাতেই রয়েছে। আয়োজনকারীর পরিচয় ও ভুলের বিশদের মতো ক্ষেত্রে পাঠভেদ আছে; একই সঙ্গে মদপান, ইমামতি, ভুল পড়া ও পরবর্তী আয়াত—এই মূল ধারাটি উভয় বর্ণনায় উপস্থিত। সূত্রের এই সম্পর্ক ঘটনাটির পরবর্তী সংকলন ও বিবরণ সংরক্ষণের ধরনও প্রকাশ করে।

এই ঘটনায় নাজিল হয়েছে বলে বর্ণিত নিসা ৪:৪৩-এর পূর্ণ আয়াতে নামাজ, পবিত্রতা ও তায়াম্মুমের আরও নির্দেশও আছে। মাতাল অবস্থার নিষেধে শর্তটি হলো নিজের কথার অর্থ বোঝা। আয়াতের সম্পূর্ণ অনুবাদগুলো: [992]

হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সলাতের নিকটবর্তী হয়ো না যতক্ষণ না তোমরা যা বল, তা বুঝতে পার এবং অপবিত্র অবস্থায়ও (সলাতের কাছে যেও না) গোসল না করা পর্যন্ত (মসজিদে) পথ অতিক্রম করা ব্যতীত; এবং যদি তোমরা পীড়িত হও কিংবা সফরে থাক; অথবা তোমাদের কেউ শৌচস্থান হতে আসে অথবা তোমরা স্ত্রী সঙ্গম করে থাক, অতঃপর পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম কর, আর তা দিয়ে তোমাদের মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় মাসহ কর; আল্লাহ নিশ্চয়ই পাপ মোচনকারী, ক্ষমাশীল।
— Taisirul Quran
হে মু’মিনগণ! নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাতের কাছেও যেওনা, যখন নিজের উচ্চারিত বাক্যের অর্থ নিজেই বুঝতে সক্ষম নও – এ অবস্থায় অথবা গোসল যরুরী হলে তা সমাপ্ত না করে সালাতের জন্য দণ্ডায়মান হয়োনা। কিন্তু মুসাফির অবস্থার কথা স্বতন্ত্র। যদি তোমরা পীড়িত হও, কিংবা প্রবাসে অবস্থান কর অথবা তোমাদের মধ্যে কেহ পায়খানা হতে প্রত্যাগত হয় কিংবা রমণী স্পর্শ করে এবং পানি না পাওয়া যায় তাহলে বিশুদ্ধ মাটির অন্বেষণ কর, তদ্বারা তোমাদের মুখমণ্ডল ও হস্তসমূহ মুছে ফেল; নিশ্চয়ই আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল।
— Sheikh Mujibur Rahman
হে মুমিনগণ, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তোমরা সালাতের নিকটবর্তী হয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা বুঝতে পার যা তোমরা বল এবং অপবিত্র অবস্থায়ও না, যতক্ষণ না তোমরা গোসল কর, তবে যদি তোমরা পথ অতিক্রমকারী হও*। আর যদি তোমরা অসুস্থ হও বা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ প্রস্রাব-পায়খানা থেকে আসে কিংবা তোমরা স্ত্রী সম্ভোগ কর, তবে যদি পানি না পাও তাহলে পবিত্র মাটিতে তায়াম্মুম কর** । সুতরাং তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ কর। নিশ্চয় আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল। * তাহলে তার কথা ভিন্ন, সে গোসল না করেও শুধু তায়াম্মুম করে নামায পড়তে পারবে। কেউ কেউ বলেছেন, এখানে সালাত অর্থ সালাত আদায়স্থল। তাহলে অর্থ হবে, তোমরা অপবিত্র অবস্থায় সালাত আদায়স্থল তথা মসজিদে যেতে পারবে না। তবে পথ অতিক্রমের উদ্দেশ্যে যাওয়া যাবে। (যুবদাতুত-তাফসীর)।
— Rawai Al-bayan
হে মুমিনগণ! নেশাগ্রস্ত অবস্থায় [১] তোমরা সালাতের নিকটবর্তী হয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা যা বল তা বুঝতে পার [২] এবং যদি তোমরা মুসাফির না হও তবে অপবিত্র অবস্থাতেও নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা গোসল কর [৩]। আর যদি তোমরা পীড়িত হও অথবা সফরে থাক বা তোমাদের কেউ শৌচস্থান থেকে আসে অথবা তোমরা নারী সম্ভোগ কর এবং পানি না পাও তবে পবিত্র মাটির দ্বারা তায়াম্মুম কর [৪]। সুতরাং মাসেহ কর তোমরা তোমাদের চেহারা ও হাত, নিশ্চয় আল্লাহ পাপ মোচনকারী, ক্ষমাশীল।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
O you who have believed, do not approach prayer while you are intoxicated until you know what you are saying1 or in a state of janābah,2 except those passing through [a place of prayer], until you have washed [your whole body]. And if you are ill or on a journey or one of you comes from the place of relieving himself or you have contacted women [i.e., had sexual intercourse] and find no water, then seek clean earth and wipe over your faces and your hands [with it]. Indeed, Allah is ever Pardoning3 and Forgiving.
— Saheeh International

নিষেধের ভাষায় সমস্যার কেন্দ্র উচ্চারিত কথার বোধগম্যতা। নামাজে কী বলা হচ্ছে, তা না বোঝার অবস্থাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আবু দাউদ ও তিরমিযীর বর্ণনায় সেই সমস্যার একটি নির্দিষ্ট উপলক্ষ দেখানো হয়। বিধানটি তাই তখনকার পান করার বাস্তবতা ধরে নিয়েই নামাজের জন্য সীমা নির্ধারণ করে। পরবর্তী সর্বাত্মক নিষেধ আসার আগের সময়টিতে এই সীমাই অনুসারীর দৈনন্দিন আচরণ নিয়ন্ত্রণ করছিল।

তিরমিযীর উদ্ধৃত ভুল বাক্যে অর্থের পরিবর্তনটি তীব্র। সূরা কাফিরুনে উপাসনার ক্ষেত্রে পৃথক অবস্থান ঘোষণার মধ্যে “আমরা তোমরা যার উপাসনা কর তার উপাসনা করি” বাক্যটি ঢুকে গেছে। মাতাল ইমামের উচ্চারণে ধর্মীয় পরিচয়ের পার্থক্যসূচক বক্তব্যই উল্টে যাচ্ছে। এর পরে নামাজে উপস্থিতির জন্য নিজের কথা বুঝতে পারার শর্ত দেওয়া হয়। পাঠের নির্ভুলতা রক্ষার বিষয়টি এই বিবরণে ব্যক্তির অবস্থা ও প্রার্থনার নিয়মের সঙ্গে বাঁধা; শুধু মুখস্থ থাকার পরিচয় সেই নির্ভুলতা নিশ্চিত করেনি।

ঘটনার বর্ণনায় কোরআনিক নির্দেশ বাস্তব অভিজ্ঞতার পরেই আসে। মদপানের পর নামাজে ভুল, তার পরে মাতাল অবস্থায় নামাজের নিষেধ—এই ক্রমের মধ্যে বিধান বাস্তব সমস্যার উত্তর হিসেবে কাজ করছে। একই ধরনের সম্পর্ক আরও কয়েকটি অবতরণ-বিবরণেও আছে: প্রশ্ন, অসুবিধা বা বিরোধ সামনে আসার পরে নতুন বক্তব্য দেওয়া হয়। আলীর ঘটনাটিতে সেই সম্পর্কের ক্ষেত্র হলো সাহাবিদের সামাজিক পানাহার ও সামষ্টিক নামাজ। সর্বজ্ঞ বিধানের পূর্বনির্ধারিত ব্যবস্থা হিসেবে যে গ্রন্থকে উপস্থাপন করা হয়, তার প্রকাশিত নিয়মে এই উপলক্ষনির্ভর পরিবর্তনের ইতিহাসও রয়েছে।


মুহাম্মদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপের আগে সদকা: বাধ্যবাধকতা ও প্রত্যাহার

মুহাম্মদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপের আগে সদকা দেওয়ার নির্দেশ এবং সেই বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার—দুটি পরপর আয়াতে রয়েছে। প্রথমে অর্থদানের শর্ত আরোপ করা হয়েছে; পরের আয়াতে সেই অর্থদান করতে অনুসারীদের সংকোচ ও তা না করার কথা তুলে নির্দেশের অবস্থা বদলানো হয়েছে। এখানে পরিবর্তনের বিষয় কথার অস্পষ্ট অর্থ স্পষ্ট করা নয়। ব্যক্তিগত আলাপের আগে যে কাজটি করতে বলা হয়েছিল, পরে সেটি আর একই বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে থাকছে না।

মুজাদালা ৫৮:১২-এ বিশ্বাসীদের উদ্দেশে ব্যক্তিগত আলাপের আগে সদকা দেওয়ার নির্দেশ আছে। সেই কাজকে তাদের জন্য উত্তম ও অধিক পবিত্র বলা হয়েছে। যাদের দেওয়ার মতো কিছু নেই, তাদের ছাড়ও একই আয়াতে রয়েছে। ফলে শর্তটি সামর্থ্যবানদের জন্য; অর্থহীন ব্যক্তির অবস্থা আয়াতেই পৃথক করা হয়েছে। পূর্ণ বক্তব্যটি হলো: [993]

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَاجَيْتُمُ الرَّسُولَ فَقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيْ نَجْوَاكُمْ صَدَقَةً ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَأَطْهَرُ ۚ فَإِن لَّمْ تَجِدُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

বাংলা অনুবাদ: হে বিশ্বাসীরা, তোমরা রসুলের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ করতে চাইলে তোমাদের সেই আলাপের আগে সদকা দাও। সেটি তোমাদের জন্য উত্তম ও অধিক পবিত্র। তবে তোমরা কিছু না পেলে আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।

পরের আয়াতেই প্রশ্ন করা হয়েছে, ব্যক্তিগত আলাপের আগে সদকা দিতে তারা শঙ্কিত হয়েছিল কি না। তারা তা করেনি এবং আল্লাহ তাদের প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হয়েছেন—এই বক্তব্যের পরে নামাজ, জাকাত ও আনুগত্যের নির্দেশ আসে। সদকা দেওয়ার প্রথম শর্তের জায়গায় এই পরবর্তী নির্দেশ প্রকাশিত হয়েছে: [994]

أَأَشْفَقْتُمْ أَن تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيْ نَجْوَاكُمْ صَدَقَاتٍ ۚ فَإِذْ لَمْ تَفْعَلُوا وَتَابَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ فَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ ۚ وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের ব্যক্তিগত আলাপের আগে সদকা দিতে তোমরা কি শঙ্কিত হলে? যখন তোমরা তা করলে না এবং আল্লাহ তোমাদের প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হলেন, তখন নামাজ প্রতিষ্ঠা কর, জাকাত দাও এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য কর। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে অবগত।

ইবনে কাসীর পরের আয়াতের ব্যাখ্যায় সরাসরি বলেছেন, এর বাধ্যবাধকতা তাদের ওপর থেকে রহিত করা হয়েছে। তাঁর ব্যাখ্যায় প্রথমে অর্থদান বাধ্যতামূলক হওয়া এবং পরে সেই বাধ্যবাধকতা উঠে যাওয়ার দুটি পর্যায় আছে। ব্যক্তিগত আলাপের সঙ্গে যুক্ত বিশেষ শর্তটি প্রত্যাহৃত হচ্ছে; সদকা দেওয়ার সাধারণ কাজটি নিষিদ্ধ হচ্ছে না। [995]

فَنَسَخَ وُجُوبَ ذَلِكَ عَنْهُمْ

বাংলা অনুবাদ: এরপর তাঁদের ওপর থেকে এর বাধ্যবাধকতা রহিত করলেন।

অবস্থামুজাদালা ৫৮:১২মুজাদালা ৫৮:১৩ ও তাফসিরে তার ফল
ব্যক্তিগত আলাপের পূর্বশর্তআগে সদকা দেওয়ার নির্দেশইবনে কাসীরের ব্যাখ্যায় বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার
সামর্থ্যহীন ব্যক্তিদেওয়ার মতো কিছু না থাকলে ক্ষমার উল্লেখআগের অর্থদানের শর্ত বহাল রাখা হয় না
কাজটির মূল্যায়নউত্তম ও অধিক পবিত্রশর্ত পালন না করা ও পরে অবকাশের কথা
পরবর্তী করণীয়আলাপের সঙ্গে বিশেষ সদকা যুক্তনামাজ, জাকাত ও আনুগত্যের নির্দেশ
মুসহাফে অবস্থাপ্রথম নির্দেশ লেখা থাকেপরের নির্দেশও তার পরেই লেখা থাকে

তিরমিযীতে আলীর নামে একটি বর্ণনায় এই শর্তের অর্থের পরিমাণ নিয়ে কথোপকথন পাওয়া যায়। মুহাম্মদ এক দিনারের প্রস্তাব করেন; আলী জানান, তারা তা বহন করতে পারবে না। অর্ধ দিনারের ক্ষেত্রেও একই উত্তর আসে। এরপর আলী যবের একটি দানার ওজনের প্রস্তাব দেন। বর্ণনার শেষে পরবর্তী আয়াত এবং আলীর মাধ্যমে উম্মতের ওপর লঘু করা হয়েছে—এমন বক্তব্য আছে। তিরমিযী একে হাসান গারীব বলেছেন; সংযুক্ত দারুসসালাম মূল্যায়নে এটি দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত। কথোপকথনের সংশ্লিষ্ট অংশ: [996]

مَا تَرَى دِينَارًا ‏”‏ ‏.‏ قُلْتُ لاَ يُطِيقُونَهُ ‏.‏ قَالَ ‏”‏ فَنِصْفُ دِينَارٍ ‏”‏ ‏.‏ قُلْتُ لاَ يُطِيقُونَهُ ‏.‏ قَالَ ‏”‏ فَكَمْ ‏”‏ ‏.‏ قُلْتُ شَعِيرَةٌ

বাংলা অনুবাদ: “এক দিনার সম্পর্কে তোমার কী মত?” আমি বললাম, “তারা তা বহন করতে পারবে না।” তিনি বললেন, “তাহলে অর্ধ দিনার?” আমি বললাম, “তারা তা-ও বহন করতে পারবে না।” তিনি বললেন, “তাহলে কত?” আমি বললাম, “একটি যবদানার ওজন।”

এই বর্ণনায় অর্থের পরিমাণ নির্ধারণে অনুসারীদের সামর্থ্য সম্পর্কে আলোচনা আছে। প্রথম প্রস্তাবের বিপরীতে অক্ষমতার কথা বলা হয়; দ্বিতীয় প্রস্তাবেও একই সমস্যা থাকে; পরে অতি ক্ষুদ্র পরিমাণের কথা আসে। বিধান প্রয়োগের বাস্তব সমস্যা তাই শুধু অর্থ দেওয়ার নৈতিক উপকারের প্রশ্নে সীমিত নেই। কতটুকু অর্থ চাওয়া হবে এবং সেই শর্ত মানতে মানুষ পারবে কি না—এই প্রশাসনিক প্রশ্নও ধর্মীয় বর্ণনায় স্থান পেয়েছে।

শর্তটি কত সময় বহাল ছিল, সে বিষয়েও একক বর্ণনা নেই। কুরতুবী দশ রাত, এক রাত এবং দিনের অল্প সময়—তিন ধরনের হিসাব সংকলন করেছেন। ইবন আব্বাস ও কাতাদার নামে স্বল্প সময়ের বর্ণনা আছে; মুকাতিল ইবন হাইয়্যানের নামে দশ রাতের কথা এসেছে। দ্রুত প্রত্যাহারের বর্ণনাগুলো একই সময়কাল দেয় না, কিন্তু একটি শর্ত আরোপ ও পরে তার অবসান—এই কাঠামো প্রত্যেকটিতেই আছে। [997]

قال مقاتل بن حيان : إنما كان ذلك عشر ليال ثم نسخ .

বাংলা অনুবাদ: মুকাতিল ইবন হাইয়্যান বলেছেন: তা মাত্র দশ রাত ছিল, তারপর রহিত করা হয়।

কুরতুবীর সংকলনে বর্ণনাকারীশর্ত বহাল থাকার বর্ণিত সময়বিবরণের তাৎপর্য
মুকাতিল ইবন হাইয়্যানদশ রাতঅল্প সময়ের মধ্যে নির্দেশ প্রত্যাহার
কালবীএক রাতআরও সংক্ষিপ্ত ব্যবধানের বিবরণ
ইবন আব্বাস ও কাতাদাদিনের অল্প এক সময়দ্রুত রহিত হওয়ার বিবরণ

কে এই শর্ত পালন করেছিলেন, তা নিয়েও সংকলিত বক্তব্যে বিরোধ আছে। ইবনে কাসীর আলী ছাড়া আর কেউ পালন করেননি—এমন বর্ণনা এনেছেন। কুরতুবী আলীর সেই বর্ণনা দুর্বল বলেছেন এবং “তোমরা তা করলে না” কথার ভিত্তিতে কেউ সদকা করেনি—এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আয়াতের ভাষা, বর্ণিত ব্যক্তিগত কাজ এবং তাফসিরকারের সিদ্ধান্ত—এখানে তিনটি স্তর দেখা যায়। প্রত্যাহারের আগে নিয়মটির প্রয়োগ কতখানি হয়েছিল, সে প্রশ্নে পরবর্তী ব্যাখ্যারও ভূমিকা আছে।

অর্থদানকে “উত্তম ও অধিক পবিত্র” বলার সঙ্গে এই অল্পস্থায়ী শর্তের সম্পর্ক বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কাজটির পবিত্রতার মূল্যায়ন প্রথমেই দেওয়া হয়েছে; পরে একই কাজের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে কোনো কাজকে কল্যাণকর বলা এবং সেটিকে নির্দিষ্ট সুযোগের পূর্বশর্ত হিসেবে বাধ্যতামূলক রাখা এক সিদ্ধান্ত নয়। পরের আয়াত অনুসারীদের তা না করার অবস্থার সঙ্গে নতুন অবকাশকে যুক্ত করে। আদেশ, অনুসারীদের আচরণ এবং শর্তের অবসান—এই তিনটি পর্ব একই সংকলিত পাঠে আছে।

মুহাম্মদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে পৌঁছানোর নিয়মে অর্থদানের শর্ত বসানো ও সরিয়ে নেওয়া তাঁর সামাজিক কর্তৃত্বের ব্যবহারিক ক্ষেত্রকেও বদলেছে। প্রথম ব্যবস্থায় সামর্থ্যবান অনুসারীর ব্যক্তিগত আলাপের আগে নির্দিষ্ট কাজ করতে হয়; পরে সেই পূর্বশর্ত থাকে না। ধর্মীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণের একটি নিয়ম এইভাবে ঐশী নির্দেশের ভাষায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তী ঐশী নির্দেশের ভাষায় প্রত্যাহৃত হয়। বিধান পরিবর্তনের সবচেয়ে সন্নিকট ও দৃশ্যমান উদাহরণগুলোর একটি তাই একই সূরার পরপর এই দুটি আয়াত।


মুহাজির নারীদের পরীক্ষার বিধান ও নসখের আলোচনায় তার অবস্থান

মুহাজির নারীদের প্রসঙ্গে মুমতাহিনা ৬০:১০ আয়াতে একসঙ্গে কয়েকটি বিধান এসেছে: বিশ্বাস পরীক্ষা, বিশ্বাসী বলে গৃহীত নারীদের অমুসলিমদের কাছে ফেরত না দেওয়া, আগের বৈবাহিক সম্পর্কের অবস্থা এবং দেওয়া মোহর ফেরত পাওয়ার দাবি। হুদাইবিয়ার চুক্তিতে ফিরে পাঠানোর শর্তের সঙ্গে এই আয়াতের সম্পর্ক তাফসিরে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে বিশ্বাস পরীক্ষা নারীর পরিচয় যাচাই করে, প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত তাঁর আশ্রয় নির্ধারণ করে, আর মোহরের হিসাব আগের স্বামীর আর্থিক দাবি নিষ্পত্তি করে। নসখের আলোচনায় এই ভিন্ন বিধানগুলো পৃথকভাবে চিহ্নিত হয়েছে।

আয়াতের শুরুতে নারীদের পরীক্ষা করার এবং বিশ্বাসী হিসেবে গৃহীত হলে ফেরত না দেওয়ার নির্দেশ আছে। ধর্মীয় পরিচয় যাচাইয়ের এই কাজের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে আশ্রয় দেওয়া ও পূর্ববর্তী গোষ্ঠীর দাবি প্রত্যাখ্যানের সম্পর্ক রয়েছে। আয়াতের সংশ্লিষ্ট বক্তব্য: [998]

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا جَاءَكُمُ الْمُؤْمِنَاتُ مُهَاجِرَاتٍ فَامْتَحِنُوهُنَّ ۖ اللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيمَانِهِنَّ ۖ فَإِنْ عَلِمْتُمُوهُنَّ مُؤْمِنَاتٍ فَلَا تَرْجِعُوهُنَّ إِلَى الْكُفَّارِ

বাংলা অনুবাদ: হে বিশ্বাসীরা, বিশ্বাসী নারীরা তোমাদের কাছে হিজরত করে এলে তাদের পরীক্ষা কর। আল্লাহ তাদের বিশ্বাস সম্পর্কে অধিক জানেন। তোমরা তাদের বিশ্বাসী বলে জানলে তাদের কাফিরদের কাছে ফেরত দিয়ো না।

বাংলা জালালাইন সংস্করণের প্রাসঙ্গিক আলোচনায় নতুন বিকল্প বিধান ছাড়া আগের বিধান রহিত হওয়ার উদাহরণ হিসেবে মুহাজির নারীদের পরীক্ষার কথা দেওয়া হয়েছে। একই টীকায় এক বছরের ইদ্দত থেকে চার মাস দশ দিনের পরিবর্তন, ইহুদিদের আপত্তি সম্পর্কে তাফসিরের বর্ণনা, কেরাত ও শব্দমূলের ব্যাখ্যাও আছে। সম্পূর্ণ আলোচনাটি হলো: [999]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা
শানে নুযূল : ইহুদিরা তাওরাতকে ‘নসখ’-এর অযোগ্য মনে করত। তারা কুরআনেরও অনেক বিধান রহিত হওয়ার ব্যাপারে আপত্তি করেছে। ভর্ৎসনা করে বলেছে মুহাম্মদ তার অনুসারীদেরকে একবার এক হুকুম প্রদান করে আবার তা থেকে বারণ করে। এ ধরনের কথা বলে ইহুদিরা মুসলমানদের অন্তরে এ সন্দেহ সৃষ্টির পাঁয়তারা করত যে, তোমরা তো বল—আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে আমাদের উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তার সবটুকুই ‘খায়ের’ বা কল্যাণকর। যদি তাই হয়, তাহলে তা রহিত হওয়ার অর্থ কি? যদি প্রথম হুকুমটি ভালো হয়ে থাকে, তাহলে দ্বিতীয়টি খারাপ হবে। আর দ্বিতীয়টি ভালো হলে প্রথমটি খারাপ হবে। অথচ আল্লাহ তা‘আলার ওহী এবং হুকুম খারাপ হওয়া অসম্ভব। তাদের এহেন বক্তব্য খণ্ডন করার জন্য আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন, আসমান জমিনের রাজত্ব একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার হাতে। তিনি যা ভালো মনে করেন, যে সময় যে বিধান তাঁর হিকমত অনুযায়ী হয়, তা-ই প্রয়োগ করেন এবং পূর্বের কোনো বিধান রহিতও করেন। এটি তার কুদরতের বহিঃপ্রকাশ। —[তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন : আল্লামা ইদরীস কান্ধলভী (র.) খ. ১, পৃ. ১৯৬]
إِزَالَةُ الْحُكْمِ : অর্থাৎ শব্দসহ মানসুখ হবে না; বরং শুধু বিধানটি মানসুখ হবে। তেলাওয়াত বাকি থাকবে। এটি قَوْلُهُ أَوَّلًا وَصِيَّةً لِأَزْوَاجِهِمْ مَتَاعًا إِلَى الْحَوْلِ-এর দ্বিতীয় সূরত। একে نَسْخُ الْحُكْمِ دُونَ التِّلَاوَةِ বলা হয়। যেমন—এটির তেলাওয়াত বাকি আছে; কিন্তু বিধান রহিত হয়ে গেছে।
نَسْخٌ : দু’প্রকার : কুরআনে কারীমে নসখ দু’রকম হয়েছে—
১. একটি মানসুখ হুকুমের স্থলে অন্য বিধান নাজিল করা। যেমন—এক বছরের ইদ্দত রহিত করে চার মাস দশ দিনের বিধান দেওয়া হয়েছে।
২. প্রথম বিধান রহিত করে আর কোনো নতুন বিধান না দেওয়া। যেমন প্রথম দিকে মুহাজির নারীকে পরীক্ষা করার বিধান ছিল। পরবর্তীতে তা রহিত করা হয়েছে।
ফায়দা : যদি মুফাসসির (র.) وَفِي قِرَاءَةٍ بِضَمِّ النُّونِ وَكَسْرِ السِّينِ-এর স্থলে وَفِي قِرَاءَةٍ بِلَا هَمْزٍ বলতেন, তাহলে বক্তব্যটি অধিকতর সুস্পষ্ট হতো। কেননা মুফাসসির (র.)-এর ইবারতে অপর একটি কেরাতেরও সম্ভাবনা রয়েছে, যা অশুদ্ধ। আর তা হলো نَنْسَهَا। এই সূরতটি শব্দ ও অর্থ উভয় দিক থেকেই অসঠিক। শব্দগতভাবে এ জন্য যে, এই কেরাতটি বর্ণিত নেই। আর অর্থগতভাবে অসঠিক এ জন্য যে, আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে نِسْيَانٌ তথা ভুলে যাওয়ার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে না। —[জামালাইন খ. ১, পৃ. ১৯৭]
قَوْلُهُ مِنَ النِّسْيَانِ : মুফাসসির (র.) যদি مِنَ النِّسْيَانِ না বলে مِنَ الْإِنْسَاءِ বলতেন, তাহলে ভালো হতো। কেননা শব্দটি رُبَاعِيٌّ এবং তা إِنْسَاءٌ মাসদার থেকে নির্গত; نِسْيَانٌ থেকে নয়। সুতরাং বলা হবে نِسْيَانٌ মূলবর্ণ থেকে নির্গত। —[হাশিয়ায়ে জামাল খ. ১, পৃ. ১৩৭]
نَأْمُرْكَ أَوْ جِبْرِيلَ : উভয়ের মাঝে تَلَازُمٌ-এর সম্পর্ক। হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে নসখের হুকুম দেওয়া মানে নবীজীকেই হুকুম দেওয়া। আর নবীজীকে হুকুম দেওয়া মানে হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে হুকুম দেওয়া।
خَيْرٍ مِنْهَا قَوْلُهُ أَنْفَعَ لِلْعِبَادِ : বান্দাদের জন্য অধিকতর উপকারী। এর দ্বারা এ দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আয়াতে বর্ণিত خَيْرِيَّتٌ বা উত্তম হওয়াটা বান্দাদের উপকারের ভিত্তিতে। এ ভিত্তিতে নয় যে, কুরআনের কোনো আয়াত অপর আয়াতের তুলনায় উত্তম। কেননা আল্লাহ তা‘আলার কালাম পুরোটাই কল্যাণ। —[হাশিয়ায়ে জালালাইন, পৃ. ১৬]

কোরআন সংকলন 216

এই টীকার “পরীক্ষার বিধান রহিত” কথাটির পাশে কুরতুবীর আলোচনায় নসখের বিষয় আরও নির্দিষ্ট। তাঁর সংকলনে নারীদের ফেরত দেওয়ার চুক্তিগত শর্তের অবসানকে নসখ বলা হয়েছে। একদল আলেমের মতে নারীদের ফেরত দেওয়ার শর্ত চুক্তিতে সরাসরি ছিল; আয়াত তা তুলে দিয়েছে। আরেক দলের মতে চুক্তির সাধারণ ভাষার বাইরে নারীদের পৃথক করা হয়েছে। প্রথম ব্যাখ্যায় প্রত্যাহার, দ্বিতীয়টিতে সাধারণ শর্তের পরিসর সীমিতকরণ—দুটি ভিন্ন বিচার আছে। [1000]

فنسخ الله ردهن من العقد ومنع منه

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ চুক্তি থেকে তাদের ফেরত দেওয়ার শর্ত রহিত করেছেন এবং তা নিষেধ করেছেন।

পরীক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কেও কুরতুবী একাধিক বিবরণ এনেছেন। কোনো বর্ণনায় শপথ করে নিশ্চিত করার কথা আছে যে নারী স্বামীর প্রতি বিরাগ, অন্য দেশের আকর্ষণ বা কোনো পুরুষের প্রতি প্রেমের কারণে আসেননি। কোনো বর্ণনায় বিশ্বাসের ঘোষণা; আয়েশার বর্ণনায় মুমতাহিনা ৬০:১২-এর বায়আতের শর্তের মাধ্যমে পরীক্ষার কথা আছে। ফলে পরীক্ষা একটি ধর্মীয় পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া, আর ফেরত পাঠানো একটি চুক্তিগত ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। একই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হলেও দুটি কাজের উদ্দেশ্য ও ফল আলাদা।

বুখারিতে আয়েশার নামে সংকলিত বর্ণনাতেও হিজরত করে আসা নারীদের পরীক্ষার কথা আছে। সেখানে পরীক্ষাকে ৬০:১২-এর বায়আতের শর্তের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। পরীক্ষার ভিত্তি হিসেবে বায়আতের আয়াত ব্যবহারের কথাটি বর্ণনায় রয়েছে: [1001]

كَانَ يَمْتَحِنُ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِ مِنَ الْمُؤْمِنَاتِ بِهَذِهِ الآيَةِ

বাংলা অনুবাদ: তাঁর কাছে হিজরত করে আসা বিশ্বাসী নারীদের তিনি এই আয়াতের মাধ্যমে পরীক্ষা করতেন।

একই আয়াতে “তারা তাদের জন্য বৈধ নয়, তারাও এদের জন্য বৈধ নয়”—এই ঘোষণার মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্কের নতুন সীমা এসেছে। ইবনে কাসীরের ব্যাখ্যায় এই আয়াত মুসলিম নারীদের মুশরিক পুরুষদের জন্য নিষিদ্ধ করেছে; ইসলামের প্রথম পর্যায়ে এমন বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। ধর্মীয় পরিচয়ের পরিবর্তন এখানে বিবাহের বৈধতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। পরীক্ষা, আশ্রয় ও বৈবাহিক বিধান একই রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

বিধানের অংশযে বিষয় নিয়ন্ত্রণ করছেনসখ ও পরিবর্তনের আলোচনায় তার অবস্থান
নারীর বিশ্বাস পরীক্ষাহিজরতের উদ্দেশ্য ও গ্রহণযোগ্য ধর্মীয় পরিচয়বাংলা টীকায় রহিতের উদাহরণ; অন্য উদ্ধৃত সূত্রে পরীক্ষার পদ্ধতি ও প্রয়োগ বর্ণিত
বিশ্বাসী নারীকে ফেরত না দেওয়াহুদাইবিয়ার চুক্তির অধীনে প্রত্যর্পণকুরতুবীর আলোচনায় নারীদের ফেরত দেওয়ার শর্ত রহিত বা সাধারণ শর্ত থেকে পৃথক
অমুসলিম স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কবিবাহ ও দাম্পত্যের ধর্মীয় বৈধতাইবনে কাসীরের ব্যাখ্যায় পূর্ববর্তী অনুমতির পরে নতুন নিষেধ
আগের মোহর ফেরত দেওয়াআর্থিক দাবি ও চুক্তির প্রতিদানকুরতুবীর আলোচনায় পৃথক নসখ-মত
নিজেদের ব্যয় ফেরত চাওয়াঅপর গোষ্ঠীর সঙ্গে পারস্পরিক সম্পত্তিগত হিসাবচুক্তির সময় ও নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত বিধান

কুরতুবীর সপ্তম আলোচ্য বিষয়ে রহিত হওয়ার আরেকটি নির্দিষ্ট মত পাওয়া যায়: আগের অমুসলিম স্বামীকে মোহর ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা। তিনি শাফেয়ীর দুটি মতের একটি হিসেবে এই বিধান রহিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তাই এখানে নসখের দাবি শুধু বিশ্বাস পরীক্ষা নিয়ে নয়; আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও আলাদা করে আলোচিত হয়েছে। [1002]

وللشافعي في هذه الآية قولان : أحدهما : أن هذا منسوخ .

বাংলা অনুবাদ: এই আয়াত সম্পর্কে শাফেয়ীর দুটি মত আছে; তার একটি হলো, এই বিধান রহিত।

বাংলা টীকায় পরীক্ষার বিধান উঠে যাওয়ার উদাহরণে কোন আয়াত বা বর্ণনাকে রহিতকারী ধরা হয়েছে, তা দেওয়া নেই। কুরতুবীর আলোচনায় ফেরত পাঠানোর শর্ত এবং মোহর ফেরত দেওয়ার বিধান আলাদা করে চিহ্নিত আছে; বুখারিতে বিশ্বাস পরীক্ষা করার বিবরণ আছে। পরীক্ষা রহিত হওয়ার নির্দিষ্ট দাবিটির প্রমাণ এই টীকায় অনুপস্থিত। প্রত্যর্পণ ও মোহর ফেরত দেওয়ার বিধান সম্পর্কে কুরতুবীর সংকলিত নসখ-মত দিয়ে পরীক্ষার বিধান রহিত হওয়ার সেই ঘাটতি পূরণ হয় না; দুটি আলাদা কাজের জন্য আলাদা নির্দেশ রয়েছে।

এই আয়াতে ধর্মীয় আইন ও রাজনৈতিক চুক্তির সম্পর্ক বিশেষভাবে দৃশ্যমান। চুক্তির শর্ত অনুসারে যাকে ফেরত দেওয়ার প্রশ্ন উঠেছিল, নতুন ধর্মীয় নির্দেশে তাকে ফেরত না দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে। নারীকে বিশ্বাসী বলে স্বীকৃতি দিলে পূর্ববর্তী গোষ্ঠীর দাবি অগ্রাহ্য হয়; একই সঙ্গে আর্থিক হিসাবের ব্যবস্থা নির্ধারিত হয়। ব্যক্তির বিবাহ, গোষ্ঠীগত আনুগত্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রত্যর্পণ—এই তিনটি ক্ষেত্রের ওপর আয়াতের বক্তব্য কার্যকর হচ্ছে। পরিবর্তনের প্রকৃতি তাই কেবল একটি বিমূর্ত নৈতিক ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

চুক্তির পুরোনো শর্ত বহাল থাকলে বিশ্বাসী নারীকে আগের পক্ষের হাতে ফেরত দেওয়ার প্রশ্ন থাকত; পরের নির্দেশে তাঁকে ফেরত দেওয়া নিষিদ্ধ হয়। আবার মোহর ফেরতের বিধান বহাল থাকা ও রহিত হওয়ার দুই মতে আশ্রয়দাতা পক্ষের আর্থিক দায়ও ভিন্ন হয়। ব্যক্তির গন্তব্য ও অর্থপ্রদানের বাধ্যবাধকতা—উভয়ের ক্ষেত্রে ধর্মীয় সিদ্ধান্ত বাস্তব ফল তৈরি করছে। কোরআনের আয়াতকে ব্যবহার করে পূর্ববর্তী চুক্তির পরিসর বদলানো এবং পরে সেই আয়াতেরই আর্থিক বিধান রহিত বলার সিদ্ধান্ত তাই কর্তৃত্বের দুটি পৃথক প্রয়োগ।


ক্ষমা ও উপেক্ষার নির্দেশ থেকে যুদ্ধের বিধান: জাসসাসে সংরক্ষিত নসখ-মত

ক্ষমা, উপেক্ষা ও দাওয়াতের নির্দেশ থেকে যুদ্ধের বিধানে যাওয়ার নসখ-মত রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একই সম্প্রদায়ের প্রতি এক পর্যায়ে ছেড়ে দেওয়া ও সহ্য করার নির্দেশ কার্যকর বলা হয়; পরের পর্যায়ে যুদ্ধের আদেশকে রহিতকারী বলে গ্রহণ করা হয়। এই সিদ্ধান্তে পরিবর্তিত হয় প্রতিপক্ষের সঙ্গে কী আচরণ করা ধর্মীয় কর্তব্য। তাই নসখের এখানে কেবল আচারসংক্রান্ত ফল নেই; বলপ্রয়োগ, যুদ্ধ এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের অধীনতা নির্ধারণের ফলও রয়েছে।

বাকারা ২:১০৯-এ ক্ষমা ও উপেক্ষা করার নির্দেশের সঙ্গে “আল্লাহ তাঁর নির্দেশ না আনা পর্যন্ত” শর্তটি আছে। প্রথম নির্দেশের ভাষাতেই একটি পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষা রাখা হয়েছে। কোন বক্তব্য এসে সেই অবস্থার অবসান ঘটিয়েছে, তাফসিরে সেই সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয়। মূল বাক্যাংশটি হলো: [1003]

فَاعْفُوا وَاصْفَحُوا حَتَّىٰ يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ তাঁর নির্দেশ না আনা পর্যন্ত তোমরা ক্ষমা কর ও উপেক্ষা কর।

জাসসাসের আহকামুল কোরআনে মাআমার থেকে কাতাদার বক্তব্য সংকলিত হয়েছে যে এই আয়াতকে “মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা কর” বক্তব্যটি রহিত করেছে। রহিতকারী হিসেবে এখানে তাওবা ৯:৫-এর অংশ ব্যবহার করা হচ্ছে। ক্ষমা করার নির্দেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার ধর্মীয় পরিচয় এই ব্যাখ্যায় যুদ্ধ ও হত্যার নির্দেশের সঙ্গে যুক্ত। [1004]

نسختها فاقتلوا المشركين حيث وجدتموهم

বাংলা অনুবাদ: এটিকে রহিত করেছে: “মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা কর।”

একই আলোচনায় ইবন আব্বাসের নামে আরও কয়েকটি আয়াতের ক্ষেত্রে ক্ষমা ও কর্তৃত্ব প্রয়োগ না করার বক্তব্য রহিত হওয়ার মত আছে। জাসসাস যে সূত্রে এটি এনেছেন, সেটি আবু উবাইদ হয়ে আলী ইবন আবি তালহার মাধ্যমে ইবন আব্বাসের নামে বর্ণিত। সেখানে ৯:৫ এবং ৯:২৯—উভয় আয়াত রহিতকারী হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। “এই সবকিছু রহিত” কথাটি একটি বিস্তৃত নসখ-মতের ভাষা: [1005]

نسخ هذا كله قوله تعالى : فاقتلوا المشركين حيث وجدتموهم

বাংলা অনুবাদ: এই সবকিছু রহিত করেছে তাঁর এই বক্তব্য: “মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা কর।”

জাসসাসের সংকলনে উত্থাপিত আয়াতআগের বক্তব্যের বিষয়বর্ণিত নসখ-মতের ফল
বাকারা ২:১০৯ক্ষমা ও উপেক্ষাযুদ্ধের নির্দেশকে আগের ব্যবস্থার অবসান হিসেবে ধরা
গাশিয়া ৮৮:২২তুমি তাদের ওপর কর্তৃত্ব প্রয়োগকারী নওকর্তৃত্ব প্রয়োগ না করার বক্তব্যকে একই নসখ-মতের আওতায় আনা
কাফ ৫০:৪৫তুমি তাদের ওপর জবরদস্তিকারী নওআগের পরিসরের অবসান হিসেবে যুদ্ধের বিধান ব্যবহার
মায়িদা ৫:১৩তাদের ক্ষমা কর ও উপেক্ষা করক্ষমার নির্দেশের কার্যকারিতা প্রত্যাহার বলে নির্ধারণ
জাসিয়া ৪৫:১৪বিশ্বাসীদের ক্ষমা করার নির্দেশবিরত থাকা থেকে পরবর্তী বলপ্রয়োগের দিকে আইনি অবস্থান বদল

ইবনে কাসীরও বাকারা ২:১০৯-এর ব্যাখ্যায় ইবন আব্বাসের নামে ৯:৫ ও ৯:২৯ দিয়ে ক্ষমার নির্দেশ রহিত হওয়ার বক্তব্য এনেছেন। এই সম্পর্কটি সেখানে স্পষ্টভাবে মুশরিকদের ক্ষমা করার আগের অবস্থার অবসান হিসেবে ব্যাখ্যাত। জাসসাস ও ইবনে কাসীরের সংকলনে একই সূত্র-পরম্পরার বক্তব্য থাকা একটি মতের পরবর্তী গ্রহণ ও প্রচার দেখায়। সূত্রটির পরবর্তী দুই সংকলনে উপস্থিতি তার প্রচার ও গ্রহণের ইতিহাসের অংশ; মূল বর্ণনার সূত্র হিসেবে এখানে একই পরম্পরা রয়েছে। [1006]

فنسخ هذا عفوه عن المشركين .

বাংলা অনুবাদ: এর মাধ্যমে মুশরিকদের ক্ষমা করার তাঁর পূর্ববর্তী অবস্থা রহিত হলো।

রহিতকারী হিসেবে ব্যবহৃত তাওবা ৯:৫-এ নির্ধারিত মাস পার হওয়ার পরে হত্যা, আটক, অবরোধ এবং পথে অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ আছে। তওবা, নামাজ ও জাকাতের শর্তে পথ ছেড়ে দেওয়ার কথাও একই আয়াতে রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিপক্ষের জীবন, চলাচল ও ধর্মীয় আনুগত্যের ওপর বলপ্রয়োগের সম্পর্ক প্রকাশ্য। আয়াতের সংশ্লিষ্ট পূর্ণ নির্দেশাংশ: [1007]

فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدتُّمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَاحْصُرُوهُمْ وَاقْعُدُوا لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ ۚ فَإِن تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

বাংলা অনুবাদ: মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা কর, তাদের আটক কর, অবরোধ কর এবং তাদের জন্য প্রত্যেক ঘাঁটিতে অবস্থান নাও। তারা তওবা করলে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করলে এবং জাকাত দিলে তাদের পথ ছেড়ে দাও। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।

তাওবা ৯:২৯-এ কিতাবপ্রাপ্তদের একটি শ্রেণির বিরুদ্ধে যুদ্ধের নির্দেশের শেষে জিজিয়া দেওয়া এবং অধীন থাকার শর্ত আছে। জাসসাসে উদ্ধৃত নসখ-মতে এই আয়াতও আগের ক্ষমা ও বিরত থাকার নির্দেশের স্থলে ব্যবহৃত। এখানে যুদ্ধের সমাপ্তির শর্ত হিসেবে ধর্মীয়–রাজনৈতিক বশ্যতা স্থাপন করা হচ্ছে। আয়াতের শেষ বাক্যাংশ: [1008]

حَتَّىٰ يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَن يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ

বাংলা অনুবাদ: যতক্ষণ না তারা অধীন অবস্থায় স্বহস্তে জিজিয়া দেয়।

যুদ্ধ, চুক্তি ও নিরাপত্তার বিধান একই সূরায় পৃথক শর্তে সাজানো আছে। তাওবা ৯:৪-এ চুক্তি ভাঙেনি ও প্রতিপক্ষকে সাহায্য করেনি এমন পক্ষের সঙ্গে মেয়াদ পর্যন্ত চুক্তি পূর্ণ করার নির্দেশ আছে। ৯:৬-এ আশ্রয়প্রার্থী মুশরিককে আশ্রয় দিয়ে কোরআনের বক্তব্য শোনানো এবং পরে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। যুদ্ধের আইন প্রয়োগে ব্যক্তির অবস্থান ও চুক্তিগত মর্যাদার এই আলাদা শ্রেণিগুলো কাজ করে। [1009] [1010]

وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّىٰ يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ أَبْلِغْهُ مَأْمَنَهُ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَعْلَمُونَ

বাংলা অনুবাদ: মুশরিকদের কেউ তোমার কাছে আশ্রয় চাইলে তাকে আশ্রয় দাও, যাতে সে আল্লাহর বক্তব্য শুনতে পায়। পরে তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দাও। কারণ তারা এমন এক সম্প্রদায় যারা জানে না।

নসখের সিদ্ধান্ত এই শর্তভিত্তিক যুদ্ধব্যবস্থাকে আগের ক্ষমা ও বিরত থাকার নির্দেশের তুলনায় পরবর্তী কার্যকর অবস্থান দেয়। কোন পক্ষের সঙ্গে কী আচরণ করা হবে, তা নির্ধারণে পরবর্তী যুদ্ধের নির্দেশ, তার চুক্তিগত ব্যতিক্রম এবং আশ্রয়ের বিধান একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়। ধর্মীয় সম্পর্কের পাশাপাশি প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, চুক্তির মেয়াদ এবং আর্থিক অধীনতার ব্যবস্থা এই প্রয়োগ নির্ধারণ করে।

সুয়ূতি ইবনুল আরবীর একটি আরও বিস্তৃত মত উদ্ধৃত করেছেন: কাফিরদের ক্ষমা, ছেড়ে দেওয়া ও তাদের থেকে বিরত থাকার বক্তব্যগুলো তরবারির আয়াত দিয়ে রহিত। সেই উদ্ধৃতিতে ১২৪টি আয়াত রহিত হওয়ার হিসাবও রয়েছে। সুয়ূতি এর পরে পূর্ববর্তী আলোচনার আপত্তির দিকে ইঙ্গিত রেখেছেন। এত বিস্তৃত দাবি ইসলামি গ্রন্থে কোন ভাষায় সংকলিত হয়েছে, তার নির্দিষ্ট নমুনা এটি: [1011]

كُلُّ مَا فِي الْقُرْآنِ مِنَ الصَّفْحِ عَنِ الْكُفَّارِ وَالتَّوَلِّي وَالْإِعْرَاضِ وَالْكَفِّ عَنْهُمْ فَهُوَ مَنْسُوخٌ بِآيَةِ السَّيْفِ

বাংলা অনুবাদ: কোরআনে কাফিরদের ক্ষমা করা, তাদের ছেড়ে দেওয়া, উপেক্ষা করা এবং তাদের থেকে বিরত থাকার যেসব বক্তব্য আছে, সেগুলো তরবারির আয়াত দিয়ে রহিত।

ইবনুল আরবীর ওই উদ্ধৃতির শেষেই আরও একটি সিদ্ধান্ত আছে: একই আয়াতের শেষ অংশ তার প্রথম অংশ রহিত করেছে। প্রথম অংশে হত্যা ও আটকের নির্দেশ, শেষ অংশে তওবা, নামাজ ও জাকাতের শর্তে পথ ছেড়ে দেওয়ার কথা রয়েছে। তাঁর এই ব্যবহারে একটি আয়াত দিয়ে বহু পূর্ববর্তী নির্দেশ রহিত করার পাশাপাশি একই আয়াতের ভেতরে বলপ্রয়োগ থামানোর শর্তকেও নসখ বলা হচ্ছে। নসখের পরিধি নির্ধারণে ব্যাখ্যাকারীর সিদ্ধান্ত কত বিস্তৃত হতে পারে, তার নির্দিষ্ট উদাহরণ এটি। উদ্ধৃতির শেষ বাক্য: [1012]

ثُمَّ نَسَخَ آخِرُهَا أَوَّلَهَا

বাংলা অনুবাদ: তারপর তার শেষ অংশ তার প্রথম অংশ রহিত করেছে।

একটি পরবর্তী আয়াত দিয়ে এতগুলো পূর্ববর্তী বক্তব্যের কার্যকারিতা শেষ করার সিদ্ধান্ত আইনগত ক্ষমতার বড় পরিবর্তন ঘটায়। ক্ষমা ও বিরত থাকার ভাষা গ্রন্থে পড়া যেতে থাকে, অথচ ব্যবহারিক নির্দেশ নির্ধারণে যুদ্ধের আয়াতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কোন আয়াত উদ্ধৃত হচ্ছে তার পাশাপাশি কোন আয়াতকে মানসুখ ধরা হচ্ছে, সেটিই তখন সিদ্ধান্তের নিয়ামক। একই গ্রন্থ থেকে বাহ্যত ভিন্ন নীতির প্রয়োগ তৈরি হওয়ার পেছনে এই নসখ-বিচার কার্যকর।

জাসসাসে সংকলিত এই মতগুলোর রাজনৈতিক ফল হলো পূর্ববর্তী সংযমের বিধান থেকে অনুমোদিত ও বাধ্যতামূলক বলপ্রয়োগের দিকে যাত্রা। ক্ষমা, চুক্তি, যুদ্ধ এবং জিজিয়ার অধীনতা একই ধর্মীয় কর্তৃত্বের পৃথক পর্যায় ও পৃথক ব্যবস্থায় রূপ নেয়। অনুসারীর কাছে পরিবর্তিত বিধান মেনে চলাই আনুগত্য; প্রতিপক্ষের কাছে তার ফল হতে পারে যুদ্ধ, অবরোধ অথবা অধীনতা। বিধানের পরিবর্তন এখানে মানুষের শরীর, সম্পদ ও স্বাধীনতার ওপর প্রয়োগযোগ্য শক্তির পরিবর্তন।


ডাক্তারের ওষুধ বদলের উপমা এবং সর্বজ্ঞ বিধানদাতার দাবির অসংগতি

বিধান পরিবর্তনের পক্ষে চিকিৎসকের ওষুধ বদলানোর উপমা বাংলা তাফসিরের আলোচনাতেই আছে। রোগী ও রোগের অবস্থা বদলালে চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র বদলান; সেই পরিবর্তনের সঙ্গে ধর্মীয় বিধান পরিবর্তনের সাদৃশ্য স্থাপন করা হয়। এই উপমার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তি শুরুতেই রয়েছে: বিধান একই থাকেনি। তাকে উপকারী ও যুক্তিসংগত পরিবর্তন হিসেবে গ্রহণ করতে বলা হচ্ছে। প্রশ্নটি তখন পরিবর্তন ঘটেছে কি না থেকে পরিবর্তনের কারণ ও বৈধতার দিকে সরে যায়।

বাংলা জালালাইন সংস্করণের সংশ্লিষ্ট আলোচনায় রোগী ও রোগের পরিবর্তনের সঙ্গে ব্যবস্থাপত্রের পরিবর্তনকে তুলনা করা হয়েছে। চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনকে বিধানের পরিবর্তনের উদাহরণ হিসেবে ব্যবহারের ভাষাটি হলো: [1013] [1014]

যেমন—বিজ্ঞ চিকিৎসকের ঔষধের ব্যবস্থাপত্রসমূহের মধ্যে রোগী ও রোগের পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবর্তন হয়ে থাকে।

কোরআন সংকলন 218

আরবি উসুলের গ্রন্থেও একই ধরনের উপমা আছে। তূফীর শরহু মুখতাসারির রওদায় রোগীর খাবারের পরিমাণ, ধরন ও সময় পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। চিকিৎসক আজ যে জিনিস নিষেধ করেন, কাল সেটিই করতে বলতে পারেন—এটি দিয়ে সময়ভেদে উপকারের পরিবর্তন এবং শরিয়তি বিধানের পরিবর্তনের অনুমোদন বোঝানো হচ্ছে। বিধান পরিবর্তনকে যুক্তিগতভাবে সম্ভব ও সময়ভেদে উপকারী দেখানোর জন্য পুরোনো উসুলের যুক্তিতেও এই উপমা ব্যবহৃত হয়েছে। [1015]

حتى إن الطبيب ينهاه اليوم عما يأمره به غدا

বাংলা অনুবাদ: এমনকি চিকিৎসক আজ তাকে যে কাজ নিষেধ করেন, কাল সেই কাজই করতে বলেন।

চিকিৎসার সিদ্ধান্তের উপযোগিতা নির্ভর করে রোগীর অবস্থা এবং সিদ্ধান্তের ফলে কী ঘটছে, তার ওপর। চিকিৎসক মানুষের দেহ সম্পর্কে সীমিত তথ্য পান, পরীক্ষা করেন, আগের ধারণা সংশোধন করেন এবং প্রয়োজনমতো পরিকল্পনা বদলান। রোগের অবস্থাও সময়ের সঙ্গে বদলায়। তাঁর সিদ্ধান্তের পক্ষে তাই উপযোগিতার নির্দিষ্ট সাক্ষ্য থাকতে হয়। কোনো ব্যবস্থাপত্র বদলেছে বলেই বদলটি যথার্থ—এমন নিয়ম চিকিৎসার যুক্তি দেয় না; আগের ও পরের অবস্থার প্রমাণ এবং ফলের সম্পর্ক দেখাতে হয়।

সর্বজ্ঞ বিধানদাতার দাবিতে তথ্যের অবস্থান আলাদা। ভবিষ্যতে কোন নারী বিধবা হবেন, অনুসারীরা কোন শর্ত মানতে অসুবিধায় পড়বেন অথবা পান করার পরে নামাজে কী ঘটবে—এসবই আগে থেকে জানা থাকার কথা। সেই দাবির অধীনে পরিবর্তিত নির্দেশের প্রয়োজনও পূর্বজ্ঞান থেকে বাদ থাকে না। ফলে পরে সংশোধন এসেছে বলেই প্রথমে সর্বজ্ঞ পরিকল্পনা ছিল, এই সিদ্ধান্ত প্রমাণিত হয় না। পরিকল্পনার পক্ষে স্বতন্ত্র সাক্ষ্যের জায়গায় পরিকল্পনার বিশ্বাসটিকেই আবার বসানো হলে যুক্তি একই দাবির কাছে ফিরে আসে।

বিচারের বিষয়চিকিৎসকের সিদ্ধান্তসর্বজ্ঞ বিধানদাতার দাবি সম্পর্কে যে প্রশ্ন থাকে
তথ্যের পরিধিসীমিত তথ্য সংগ্রহ ও নতুন ফলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তপরবর্তী পরিস্থিতি আগে থেকেই জানা থাকার কথা
রোগ বা সমাজের পরিবর্তনবদলে যাওয়া অবস্থার সঙ্গে উপযোগিতা বিচারসেই পরিবর্তনের শর্ত প্রথম নির্দেশে কীভাবে প্রকাশিত
আগের সিদ্ধান্তের সংশোধনআগের ধারণা বা প্রয়োগের সমস্যা পরীক্ষা করা যায়পরের নির্দেশ কেন প্রয়োজন হলো, তার স্বাধীন সাক্ষ্য কী
উপকারের দাবিরোগীর অবস্থা ও ফল দিয়ে মূল্যায়ননির্দেশদাতার কর্তৃত্বের বাইরে উপকারের প্রমাণ কী
কর্তব্যের সময়সীমানির্ধারিত সময় বা অবস্থাভিত্তিক পরিকল্পনা থাকতে পারেপূর্বঘোষিত মেয়াদ আর পরবর্তী প্রত্যাহারকে কীভাবে পৃথক করা হয়েছে

সময়সীমা আগে ঘোষণা করা এবং নতুন নির্দেশ এসে আগের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়ার পার্থক্য কোরআনের দৃষ্টান্তগুলোতেই আছে। বাকারা ২:১০৯-এর ক্ষমার নির্দেশে পরবর্তী আদেশ আসা পর্যন্ত অপেক্ষার ভাষা রয়েছে। মুজাদালা ৫৮:১২-এর সদকার নির্দেশে সামর্থ্যহীনদের ছাড় আছে, কিন্তু নির্দিষ্ট সংখ্যক দিন পরে সামর্থ্যবানদেরও শর্ত উঠে যাবে—এমন মেয়াদ সেখানে নেই। পরের আয়াতেই তাদের সদকা না করা এবং শর্ত প্রত্যাহারের কথা আসে। দুটি নির্দেশের সময়গত কাঠামো তাই এক ধরনের নয়।

বিধবার ক্ষেত্রেও “এক বছরের ব্যবস্থা” এবং “চার মাস দশ দিন” দুটি আলাদা বাক্যে আছে। প্রথম বক্তব্য নিজে থেকেই নিজের পরের পরিবর্তনের সমস্ত বিবরণ দেয় না। কবে কোনটি এসেছে এবং কোন অধিকার তুলে নেওয়া হয়েছে, তা তাফসিরের বর্ণনা দিয়ে স্থির করতে হয়। একজন মানুষের জন্য এই পরিবর্তিত ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার বাস্তব সমস্যা থাকে: তিনি যে নির্দেশ পেয়েছেন, তা কত দিন চলবে এবং আরেক নির্দেশ আসার পরে কোন অংশ ছেড়ে দেবেন। সর্বজ্ঞতার দাবি তাঁর কাছে সেই তথ্যের ঘাটতি আপনাআপনি পূরণ করে না।

ইবনে কাসীর “তার চেয়ে উত্তম” কথার ব্যাখ্যায় বিধান ও অনুসারীর উপকারের দিকটি সামনে এনেছেন। ইবন আব্বাসের নামে অধিক উপকারী ও সহজ হওয়ার বক্তব্য আছে। এখানে পরিবর্তনের পক্ষে ব্যবহৃত মানদণ্ড মানবজীবনে তার ফল; সব নির্দেশের অক্ষরগত অপরিবর্তনীয়তা নয়। তাফসিরের সংক্ষিপ্ত ভাষা: [1016] [1017]

خير لكم في المنفعة ، وأرفق بكم .

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের উপকারের দিক থেকে অধিক ভালো এবং তোমাদের জন্য অধিক সহজ।

ইবনে কাসীরের বাংলা সংস্করণের সংশ্লিষ্ট আলোচনার পূর্ণ পাতাগুলো:

কোরআন সংকলন 220
কোরআন সংকলন 222
কোরআন সংকলন 224
কোরআন সংকলন 226
কোরআন সংকলন 228

অধিক উপকারের ব্যাখ্যাও প্রত্যেক পরিবর্তনের নির্দিষ্ট কারণ সরবরাহ করে না। বিধবার অপেক্ষাকাল কমা, ব্যক্তিগত আলাপের আগে সদকার শর্ত উঠে যাওয়া এবং যুদ্ধের আদেশ কার্যকর হওয়া—এসবের সুবিধা, চাপ ও ক্ষতি একই মানুষের ওপর একইভাবে পড়ে না। কোনো ব্যবস্থায় অনুসারীর ওপর চাপ কমতে পারে; অন্য ব্যবস্থায় প্রতিপক্ষের ওপর বলপ্রয়োগ বাড়ে। সব পরিবর্তনকে এক শব্দে “কল্যাণ” বললে কার জন্য কোন ফল ঘটেছে, সেই বিষয়টি অনির্দিষ্ট থাকে। প্রতিটি সিদ্ধান্তের বাস্তব পরিণতি পৃথক বিচার দাবি করে।

বিধানদাতার জবাবদিহির অবস্থান কোরআনে পৃথকভাবে নির্ধারিত। আনবিয়া ২১:২৩-এ নির্দেশদাতা ও অধীনদের এই অসম সম্পর্কটি সরাসরি বলা হয়েছে: [1018]

لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ

বাংলা অনুবাদ: তিনি যা করেন সে বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হয় না; তাদেরই প্রশ্ন করা হয়।

জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকার ঘোষণা কোনো পরিবর্তনের উপযোগিতার প্রমাণ নয়। এটি কর্তৃত্বের অবস্থান নির্ধারণ করে: নির্দেশদাতা প্রশ্নের অধীন নন, অনুসারীরা অধীন। প্রথম নির্দেশ কেন দেওয়া হলো, পরে তা কেন বদলাল এবং পরিবর্তনের ক্ষতি বা সুবিধা কার ওপর পড়ল—এই প্রশ্নগুলোর স্থলে প্রশ্ন করার অধিকার অস্বীকার করা হচ্ছে। বিশ্বাসের ব্যবস্থায় এই ঘোষণা আনুগত্য দাবি করতে পারে; কোনো বিধানের পক্ষে স্বাধীন যুক্তির ঘাটতি পূরণ করে না।

মদের ক্ষেত্রে মানুষের অভ্যাস ও নামাজে পাঠের গোলমাল, সদকার ক্ষেত্রে অনুসারীদের অর্থদানে সংকোচ এবং বিধবার ক্ষেত্রে অপেক্ষা ও সম্পত্তির ব্যবস্থা—প্রতিটি দৃষ্টান্তের নিজস্ব উপলক্ষ ও পরিণতি রয়েছে। চিকিৎসকের উপমা এই ভিন্ন ঘটনাগুলোর জন্য একটি সাধারণ অনুমোদন হাজির করে। অথচ একটি উপমার সঙ্গে মিল থাকলেই কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশের ঐশী উৎস, সর্বজ্ঞ পরিকল্পনা কিংবা সর্বোত্তম ফল প্রতিষ্ঠিত হয় না। সেই তিনটি দাবির জন্য ভিন্ন প্রমাণ প্রয়োজন।

চিকিৎসকের উপমায় সময়ভেদে উপকারের সম্ভাবনাকে সামনে রাখা হয়; নির্দিষ্ট পরিবর্তনের যথার্থতার বিচার সেই সম্ভাবনার পরেও বাকি থাকে। ধর্মীয় নির্দেশের ক্ষেত্রে অনুসারীকে আগের আদেশ মানতে বলা হয়েছে, পরে সেই আদেশের কার্যকারিতা শেষ হওয়ার সিদ্ধান্তও মানতে হয়েছে। প্রথমটির মূল্যায়ন “উত্তম”, দ্বিতীয়টির পরিচয় “অবকাশ” বা “রহিতকরণ”—দুটি ঘোষণাই একই কর্তৃত্ব থেকে এসেছে। মানুষের প্রশ্ন ও অসুবিধার পরে প্রকাশিত এই নতুন নিয়মগুলোর পক্ষে কর্তৃত্বের স্বীকৃতি রয়েছে; ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রের উপমা দিয়ে তাদের সর্বজ্ঞ উৎস ও অনিবার্য কল্যাণের স্বতন্ত্র প্রমাণ পাওয়া যায় না।


কোরআন নাকি হাদিস: পাঠ রেখে আইন বদলানোর কার্যকর কর্তৃত্ব

কোরআনের আয়াত মুসহাফে থাকা এবং সেই আয়াতের ভাষা অনুযায়ী আইন কার্যকর হওয়া পৃথক বিষয়। হাদিস ও উসুলে ফিকহের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে, আয়াতের নির্দেশ কাদের জন্য, কোন শর্তে প্রযোজ্য এবং কোন পরবর্তী বিধানের অধীনে তার আগের প্রয়োগ বন্ধ হবে। এর বাইরে সুন্নাহকে কোরআনে অনুল্লিখিত নিষেধাজ্ঞা ও শাস্তি দেওয়ার স্বতন্ত্র ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। ফলে একটি আয়াতের শব্দ না পাল্টিয়েও তার ব্যবহারিক ফল বদলে যেতে পারে। কোন বর্ণনাকে মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে গ্রহণ করা হবে এবং কোন নিয়মে তা আয়াতের ওপর প্রয়োগ করা হবে—আইন নির্ধারণের এই দুটি স্তরেই বর্ণনাকারী, সংকলক ও আইনজ্ঞের সিদ্ধান্ত কার্যকর।


সুন্নাহকে দ্বিতীয় ওহি ও সমান বাধ্যতামূলক উৎস ঘোষণার ভিত্তি

সুন্নাহকে দ্বিতীয় ওহি ঘোষণা করার মাধ্যমে কোরআনের বাইরে আরেকটি বাধ্যতামূলক বিধানভাণ্ডার প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই দাবিতে মুহাম্মদের ধর্মীয় নির্দেশ শুধু একজন মানুষের পরামর্শ নয়; কোরআনের মতোই আল্লাহর কাছ থেকে আসা নির্দেশ। পার্থক্য রাখা হয় পাঠের পরিচয়ে: একটির শব্দ মুসহাফের অংশ, অন্যটির বক্তব্য হাদিসে সংরক্ষিত। আইন মানার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টির জন্য সেই পার্থক্য কোনো সাধারণ ঐচ্ছিক মর্যাদা তৈরি করে না। সুন্নাহ নামের উৎস এবং ফিকহে কোনো কাজকে “সুন্নত” বলে সুপারিশকৃত আমলের শ্রেণিতে রাখার ব্যবহারও এক বিষয় নয়। সুন্নাহ নামের উৎস থেকেই ফরজ, হারাম এবং দণ্ডের বিধান প্রতিষ্ঠা করা হয়।

আবু দাউদে মিকদাম ইবনে মাদিকারিবের নামে সংকলিত বর্ণনায় কিতাবের সঙ্গে তার অনুরূপ আরেকটি বিষয় পাওয়ার ঘোষণা আছে। একই বক্তব্যে শুধু কোরআনে পাওয়া হালাল–হারামের ওপর নির্ভর করার অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে গৃহপালিত গাধা, শিকারি জন্তু এবং অন্যের সম্পত্তি সম্পর্কে নিষেধ দেওয়া হয়েছে। অতিথি আপ্যায়ন না করলে তার সমপরিমাণ আদায় করার অধিকারও এসেছে। অতিরিক্ত উৎসের দাবি এবং সেই উৎস থেকে আলাদা বিধান দেওয়ার কাজ একই বর্ণনায় পাশাপাশি রয়েছে। বর্ণনার বক্তব্য: [1019]

أَلاَ إِنِّي أُوتِيتُ الْكِتَابَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ أَلاَ يُوشِكُ رَجُلٌ شَبْعَانُ عَلَى أَرِيكَتِهِ يَقُولُ عَلَيْكُمْ بِهَذَا الْقُرْآنِ فَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَلاَلٍ فَأَحِلُّوهُ وَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَرَامٍ فَحَرِّمُوهُ أَلاَ لاَ يَحِلُّ لَكُمْ لَحْمُ الْحِمَارِ الأَهْلِيِّ وَلاَ كُلُّ ذِي نَابٍ مِنَ السَّبُعِ وَلاَ لُقَطَةُ مُعَاهِدٍ إِلاَّ أَنْ يَسْتَغْنِيَ عَنْهَا صَاحِبُهَا وَمَنْ نَزَلَ بِقَوْمٍ فَعَلَيْهِمْ أَنْ يَقْرُوهُ فَإِنْ لَمْ يَقْرُوهُ فَلَهُ أَنْ يُعْقِبَهُمْ بِمِثْلِ قِرَاهُ

বাংলা অনুবাদ: শোনো, আমাকে কিতাব দেওয়া হয়েছে এবং তার সঙ্গে তার অনুরূপও দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এমন কোনো পেটভরা লোক তার আসনে বসে বলবে: তোমরা এই কোরআন আঁকড়ে ধর; এতে যা হালাল পাও তা হালাল মনে কর, আর যা হারাম পাও তা হারাম মনে কর। শোনো, তোমাদের জন্য গৃহপালিত গাধার মাংস, শিকারি জন্তুদের প্রত্যেক দাঁতওয়ালা জন্তু এবং চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তির হারানো বস্তু বৈধ নয়—শেষের ক্ষেত্রে তার মালিক সেটির প্রয়োজন ত্যাগ করলে ভিন্ন কথা। যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের কাছে অতিথি হয়, তাদের তাকে আপ্যায়ন করতে হবে। তারা আপ্যায়ন না করলে সে তার আপ্যায়নের সমপরিমাণ তাদের কাছ থেকে আদায় করতে পারবে।

এই ভাষায় কোরআনের তালিকাকেই শেষ সীমা হিসেবে গ্রহণ করা নিষিদ্ধ হচ্ছে। অনুসারীকে কোরআন ছাড়াও এমন বিধান মানতে হবে, যার পক্ষে প্রমাণ হিসেবে মুহাম্মদের অতিরিক্ত প্রাপ্তির দাবি হাজির করা হয়েছে। এখানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উপায়টিও তাৎপর্যপূর্ণ: দ্বিতীয় উৎসের অস্তিত্বের ঘোষণা দ্বিতীয় উৎসেরই একটি বর্ণনা থেকে আসে। বর্ণনাটি সত্যিই মুহাম্মদের বক্তব্য কি না, সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তি আবার ওই বর্ণনার সংরক্ষণ ও গ্রহণযোগ্যতার ওপর নির্ভর করে। অতিরিক্ত বিধান মানার বাধ্যবাধকতা এবং সেই বিধান বহনকারী বর্ণনার সত্যতা—দুটি দাবি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

ইবন বাযের ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করে ইসলামকিউএ সরাসরি একে “দ্বিতীয় ওহি” বলেছে। তাঁর আলোচনায় নামাজ, জাকাত, রোজা, হজ এবং মানুষের ধর্মীয় ও পার্থিব প্রয়োজনের বিভিন্ন নির্দেশ এই উৎসের অন্তর্ভুক্ত। অর্থ আল্লাহর কাছ থেকে এবং প্রকাশ মুহাম্মদের বক্তব্যে—এই ব্যাখ্যা সুন্নাহর জন্য কোরআনের বাইরে ঐশী মর্যাদা তৈরি করে। ব্যবহৃত নির্দিষ্ট ভাষা: [1020]

فالسنة وحي ثان أوحاه الله إليه لإكمال الرسالة وتمام البلاغ

বাংলা অনুবাদ: সুন্নাহ হলো দ্বিতীয় ওহি, যা আল্লাহ তাঁর কাছে বার্তা পূর্ণ করা এবং সম্পূর্ণভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছেন।

খতিব বাগদাদির আল-কিফায়ার শুরুর অধ্যায়ের নামেই কোরআন ও রসুলের সুন্নাহর বিধানকে কাজের বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে সমান করার কথা রয়েছে। অধ্যায়টির শিরোনাম আইনগত সমতার জায়গাটি নির্দিষ্ট করে দেয়: পাঠের দৈর্ঘ্য বা তিলাওয়াতের সওয়াব নয়, কাজ করতে বাধ্য হওয়া। শিরোনামের শেষাংশ: [1021]

في وجوب العمل ولزوم التكليف

বাংলা অনুবাদ: আমল করা বাধ্যতামূলক হওয়া এবং বিধানের দায়বদ্ধতা অপরিহার্য হওয়ার ক্ষেত্রে।

কর্তৃত্বের দাবিযে মর্যাদা তৈরি হয়অনুসারীর ওপর ফল
কোরআন ওহিমুসহাফের আয়াত ঐশী নির্দেশআয়াতের প্রযোজ্য বিধান মানা বাধ্যতামূলক
সুন্নাহ দ্বিতীয় ওহিমুসহাফের বাইরের নির্দেশও ঐশী বলে গৃহীতহাদিসে প্রতিষ্ঠিত অতিরিক্ত বিধানও মানতে হবে
কাজের বাধ্যবাধকতায় সমতাএক উৎসে অনুপস্থিতি অন্য উৎসের বিধান বাতিল করে নাকোরআনে নেই—এই তথ্য দিয়ে সুন্নাহর নিষেধ এড়ানো যায় না
পরবর্তী সংরক্ষণ ও যাচাইকোন বর্ণনা সুন্নাহ, তা মানুষের বিচারসাপেক্ষঐশী নির্দেশের ব্যবহারিক তালিকা নির্ধারণে সংকলক ও বিশারদের ভূমিকা

দ্বিতীয় ওহির ধারণা ধর্মীয় আইনের পরিসর বাড়ানোর সরাসরি ব্যবস্থা। কোরআনে কোনো নিষেধের নাম না থাকলেও হাদিসের মাধ্যমে সেটি ধর্মীয় অপরাধের পরিচয় পেতে পারে। কোরআনে কোনো আচারের পূর্ণ পদ্ধতি না থাকলেও হাদিসের মাধ্যমে তার বাধ্যতামূলক রূপ স্থির হতে পারে। ফলে মুসহাফের নির্দিষ্ট আকার দিয়ে মুসলমানের সমস্ত করণীয় ও অকরণীয়ের আকার নির্ধারিত হয় না। একটি বন্ধ গ্রন্থের পাশে আরেক বর্ণনাভিত্তিক বিধানভাণ্ডার কার্যকর থাকে।

মুহাম্মদের জীবিত অবস্থায় তাঁর কাছে কোনো নির্দেশের সত্যতা জানতে যাওয়ার সুযোগ এবং বহু পরে তাঁর নামে সংকলিত বর্ণনা গ্রহণ করার পদ্ধতি এক নয়। পরবর্তী সমাজে বর্ণনার বাহক, ধারাবাহিকতা, গ্রহণযোগ্যতা ও অর্থ নির্ধারণের কাজ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। সুন্নাহকে ওহি বলা এই মধ্যবর্তী কাজগুলো সম্পাদন করে দেয় না। আলেমদের হাতে যে বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হয়, সেই বর্ণনাই অনুসারীর কাছে আল্লাহর অতিরিক্ত আদেশ বহন করে। ধর্মীয় দায়বদ্ধতার দাবি তাই বাস্তবে মানুষের যাচাই ও নির্বাচনের মাধ্যমে প্রযোজ্য হয়।

এই ব্যবস্থায় কোরআনের বাইরের নির্দেশের সীমা নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা। আল্লাহর নামে কী নিষিদ্ধ হবে, কোন কাজ না করলে ইবাদত অগ্রহণযোগ্য হবে এবং কোথায় শাস্তি দাবি করা হবে—এসবের পরিসর বাড়ানোর পথ দ্বিতীয় ওহির ঘোষণা খুলে দিয়েছে। গ্রন্থের প্রথমত্ব বজায় রেখেই গ্রন্থে অনুল্লিখিত বিধানকে সমান বাধ্যতামূলক করা সম্ভব হয়েছে। কোরআন মুসহাফে সংরক্ষিত ঐশী পাঠের বিশেষ মর্যাদা পেলেও মুসলমানের জীবন নিয়ন্ত্রণকারী আদেশের একমাত্র উৎস হয়ে থাকেনি।


“সুন্নাহ কোরআনের বিচারক”: দারিমি, মাকহুল ও উসুলের বক্তব্য

“সুন্নাহ কোরআনের বিচারক”—এই উক্তি বাণীর অর্থ নির্ধারণের একটি অসম সম্পর্ক প্রকাশ করে। একদিকে কোরআনকে আদেশের উৎস হিসেবে মানা হয়; অন্যদিকে তার অর্থ ও প্রয়োগের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সুন্নাহর কাছে যেতে হয়। কোনো আয়াতে একাধিক অর্থের সম্ভাবনা থাকলে কোনটি গ্রহণযোগ্য, সাধারণ ভাষার মধ্যে কারা বাদ পড়বে এবং একটি শর্তহীন নির্দেশের সঙ্গে কী শর্ত যুক্ত হবে—এই সিদ্ধান্তে সুন্নাহ নির্ধারক। কোরআনের অক্ষর একই থাকলেও এই নির্ধারণ তার অনুসারীর ওপর প্রযোজ্য আদেশ বদলে দেয়।

দারিমির সংকলনে ইয়াহইয়া ইবনে আবি কাসীরের বক্তব্যটি মুহাম্মদের হাদিস হিসেবে নয়, ইয়াহইয়ার নিজের উক্তি হিসেবে এসেছে। আওযায়ির সূত্রে সংরক্ষিত এই ভাষা শুধু প্রথম অংশে থামেনি; কোরআন সুন্নাহর বিচারক নয়—দ্বিতীয় অংশে সেই সম্পর্কের বিপরীত দিকও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বক্তব্যটি হলো: [1022]

السُّنَّةُ قَاضِيَةٌ عَلَى الْقُرْآنِ وَلَيْسَ الْقُرْآنُ بِقَاضٍ عَلَى السُّنَّةِ

বাংলা অনুবাদ: সুন্নাহ কোরআনের বিচারক; কোরআন সুন্নাহর বিচারক নয়।

মাকহুলের নামে সংকলিত উক্তিতে নির্ভরতার দিকটি আরও সরাসরি এসেছে: কোরআনের সুন্নাহকে প্রয়োজন বেশি। ইসলামকিউএ খতিব বাগদাদির আল-কিফায়ার সূত্রে এই কথাটি উদ্ধৃত করেছে। সেখানে সুন্নাহর ভূমিকা হিসেবে কোরআনের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য ব্যাখ্যা, সাধারণ বক্তব্য বিশেষায়িত করা, শর্তহীন বক্তব্য সীমিত করা এবং নাসেখ–মানসুখ চিহ্নিত করার কথা রয়েছে। মাকহুলের নির্দিষ্ট বাক্য: [1023]

القرآن أحوج إلى السنة من السنة إلى القرآن

বাংলা অনুবাদ: সুন্নাহর কোরআনকে যত প্রয়োজন, তার চেয়ে কোরআনের সুন্নাহকে প্রয়োজন বেশি।

এই নির্ভরতার আইনগত ফল কোনো অলংকারিক উপমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আয়াতের অনুমোদিত অর্থ বাইরের বর্ণনা দিয়ে নির্ধারিত হলে ওই বর্ণনা গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত আয়াতের প্রয়োগেও পৌঁছে যায়। কেউ একই আয়াত পড়ছেন, কিন্তু হাদিসের ভিত্তিতে একটি শ্রেণি বাদ দিচ্ছেন; অন্য কেউ সেই বর্ণনা গ্রহণ করছেন না বলে শ্রেণিটিকে বাদ দিচ্ছেন না। লেখা আয়াতটি অপরিবর্তিত থাকার পরেও কার্যকর আইনের দুই রূপ তৈরি হয়। অর্থ নির্ধারণ তাই নিছক শব্দার্থের আলোচনা নয়; তা অধিকার, বাধ্যবাধকতা ও দণ্ডের সীমানা নির্ধারণের কাজ।

ইসলামওয়েব এই “বিচারক” কথাটিকে কোরআনের ব্যাখ্যা করা ও উদ্দেশ্য প্রকাশ করার অর্থে ব্যাখ্যা করেছে। একই উত্তরে আহমদ ইবনে হাম্বলের নামে শব্দটি ব্যবহারে অনাগ্রহও সংরক্ষিত: তিনি “বিচারক” বলার সাহস করেন না, বরং ব্যাখ্যা ও স্পষ্ট করার কথা বলেন। উক্তিটির ভাষা নিয়ে এই পৃথক অবস্থান নিজেই প্রাচীন আলোচনার অংশ। আহমদের নামে বক্তব্য: [1024]

ما أجسر على هذا أن أقوله، ولكن أقول: إن السنة تفسر الكتاب وتبينه

বাংলা অনুবাদ: এ কথা বলার সাহস আমি করি না। আমি বরং বলি: সুন্নাহ কিতাবের ব্যাখ্যা করে এবং তাকে স্পষ্ট করে।

সংরক্ষিত বক্তব্যকথার কেন্দ্রপ্রয়োগের প্রশ্ন
ইয়াহইয়া: সুন্নাহ বিচারক, কোরআন নয়অর্থ নির্ধারণের অগ্রাধিকারআয়াত ও গ্রহণযোগ্য বর্ণনার সম্পর্ক কার নির্দেশে স্থির হবে
মাকহুল: কোরআনের প্রয়োজন বেশিব্যাখ্যার জন্য অসম নির্ভরতাকোরআনের ভাষা থেকে সম্পূর্ণ বিধানে পৌঁছাতে কোন উৎস অপরিহার্য
আহমদ: ব্যাখ্যা ও স্পষ্টকরণসম্পর্কের পরিচয় দিতে আলাদা শব্দব্যাখ্যায় নির্ধারিত সীমা কীভাবে অনুসারীর জন্য বাধ্যতামূলক হয়
আইনজ্ঞের কার্যকর সিদ্ধান্তবর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা ও অর্থ প্রয়োগকারা আয়াতের আওতায় থাকবেন এবং কারা বাদ পড়বেন

ব্যাখ্যা ও কর্তৃত্বের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। একটি বাক্যের একাধিক সম্ভাবনার মধ্যে অনুমোদিত অর্থ স্থির করা মানে অন্য সম্ভাবনাগুলোকে আইন হিসেবে অগ্রহণযোগ্য করা। একইভাবে একটি সাধারণ নির্দেশের মধ্যে নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম স্বীকৃত হলে সেই ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সাধারণ নির্দেশ আর আগের মতো কার্যকর থাকে না। “ব্যাখ্যা” নামের কাজটির ভেতরেই এই বাছাই ও সীমা নির্ধারণ রয়েছে। ফলে সুন্নাহ ব্যাখ্যা করছে—এই সংজ্ঞা তার ব্যবহারিক নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াটিই চিহ্নিত করে।

উক্তির দ্বিতীয় অংশে বিচারকের আসনটি বিপরীত দিকে অস্বীকৃত হওয়া আরও তাৎপর্যপূর্ণ। গৃহীত সুন্নাহর কোনো অতিরিক্ত নিয়ম কোরআনে শব্দে শব্দে নেই বলে তা বাতিল করার সুযোগ এই কাঠামো দেয় না। কোরআনের আনুগত্যের সাধারণ আদেশের অধীনে সুন্নাহর স্বতন্ত্র নির্দেশ স্থান পায়। আবার সেই নির্দেশ দিয়ে আয়াতের সীমা নির্ধারিত হয়। অতিরিক্ত বিধানের অনুমোদন এবং আয়াতের অর্থ নির্ধারণ—দুটি পথেই সুন্নাহর ওপর নির্ভরতা কার্যকর থাকে।

ইয়াহইয়া ও মাকহুলের নামে দুটি পৃথক উক্তি সংরক্ষিত; আহমদের নামে আছে সম্পর্কটির নামকরণ নিয়ে মন্তব্য। পরবর্তী সংকলক ও ফতোয়ার লেখকেরা সেগুলো উদ্ধৃত করে একটি কার্যকর পদ্ধতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। উক্তির প্রচার, তার ব্যাখ্যা এবং আইনের ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ—এই তিনটি স্তর মিলেই এর প্রভাব গড়ে উঠেছে। একটি উক্তি বহু গ্রন্থে পুনঃসংকলিত হয়ে শাস্ত্রীয় পরিভাষার অংশ হয়েছে; আর সেই পরিভাষার বাস্তব তাৎপর্য নির্ধারিত হয়েছে কোন দলিলের সীমা কোন দলিল দিয়ে স্থির করা হচ্ছে, তার মাধ্যমে।

কোরআনের প্রথমত্ব স্বীকার করেও এই পদ্ধতি অনুসারীকে বর্ণনাভাণ্ডারের সামনে নির্ভরশীল রাখে। আয়াত হাতে থাকাই যথেষ্ট জ্ঞান হিসেবে গৃহীত হয় না; তার ওপর প্রযোজ্য সুন্নাহ এবং সে সুন্নাহর শাস্ত্রীয় ব্যবহার জানতে হয়। যাঁরা সেই ব্যবহার জানেন বলে স্বীকৃত, তাঁদের সিদ্ধান্তই সাধারণ অনুসারীর কাছে আয়াতের কার্যকর অর্থ হয়ে পৌঁছায়। কোরআনের বিচারক হিসেবে সুন্নাহর পরিচয় এইভাবে পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীর কর্তৃত্বকেও বহন করে।


নামাজ, জাকাত ও হজের বিধানে কোরআনের বাইরের নির্ধারণ

কোরআনে নামাজ প্রতিষ্ঠা, জাকাত দেওয়া এবং হজের নির্দেশ রয়েছে। প্রচলিত ফিকহে গ্রহণযোগ্য ইবাদত হওয়ার জন্য যে বিস্তারিত রূপ মানতে হয়, তার সমস্ত তথ্য ওই নির্দেশগুলোর বাক্যে নেই। কোন নামাজে কত রাকাত, কোন সম্পদ কত পরিমাণ হলে কত জাকাত এবং হজের পৃথক আচারের নির্দিষ্ট সংখ্যা ও পদ্ধতি—এসবের জন্য সুন্নাহ ও সংরক্ষিত আমলের কাছে যেতে হয়। ফলে একটি সাধারণ আদেশ পালন করা হয়েছে কি না, সেই সিদ্ধান্তও তার বাইরের বিস্তারিত বিধানের অধীন হয়ে যায়।

খতিব বাগদাদির সূত্রে ইমরান ইবনে হুসাইনের নামে সংকলিত বক্তব্যে এই প্রয়োজনকে সরাসরি যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কেবল কোরআন থেকে বক্তব্য চাওয়া এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কোরআনে তিনি জোহর–আসর চার রাকাত, মাগরিব তিন রাকাত এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক তাওয়াফ কোথায় পাবেন। আলোচনাটির রাকাতসংখ্যাসংক্রান্ত অংশ: [1025]

أكنت تجد فيه صلاة الظهر أربعا ، وصلاة العصر أربعا ، والمغرب ثلاثا , تقرأ في اثنتين

বাংলা অনুবাদ: তুমি কি তাতে জোহরের নামাজ চার রাকাত, আসরের নামাজ চার রাকাত এবং মাগরিব তিন রাকাত—যার দুই রাকাতে পাঠ করা হয়—পেতে?

বুখারিতে মালিক ইবনে হুওয়াইরিসের বর্ণনায় মুহাম্মদের কাছে তরুণদের বিশ দিন থাকার এবং পরে নিজেদের পরিবারের কাছে ফিরে শিক্ষা দেওয়ার নির্দেশ আছে। নামাজের পদ্ধতি সেখানে প্রত্যক্ষ আচরণ থেকে শেখার বিষয়। কোরআনের একটি আয়াতের পূর্ণ লিখিত বিবরণ পড়ে কাজটি নির্ধারণের বদলে অনুসরণযোগ্য ব্যক্তির কাজকে আদর্শ করা হয়েছে। নির্দেশের নির্দিষ্ট বাক্য: [1026]

وَصَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي

বাংলা অনুবাদ: তোমরা আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখেছ, সেভাবে নামাজ পড়।

দেখে শেখা আমল পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছায় শিক্ষকতা ও বর্ণনার মাধ্যমে। পরে মতভেদ হলে কোন আচরণটি ওই অনুসরণযোগ্য পদ্ধতি, তা নিয়ে হাদিস ও ফিকহ ব্যবহৃত হয়। হাত বাঁধার স্থান, পাঠের ধরন বা ইমামের পেছনে পাঠের মতো বিষয়ে কোনো পদ্ধতির সমর্থনে নির্দিষ্ট বর্ণনা গ্রহণের সঙ্গে তার ধর্মীয় মর্যাদা যুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে কোরআনের সাধারণ নামাজের আদেশ থেকে একটি বিশেষ নামাজকে বৈধ, পূর্ণ বা ত্রুটিপূর্ণ ঘোষণার জন্য আরও একাধিক বিচার দরকার হয়।

জাকাতের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা আর্থিক হিসাব পর্যন্ত পৌঁছায়। বুখারিতে আনাসকে বাহরাইনে পাঠানোর সময় আবু বকরের দেওয়া একটি পত্র সংকলিত আছে। তাতে উট, চারণভূমিতে পালিত ভেড়া–ছাগল এবং রুপার জাকাতের নির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায়। পত্রটি মুহাম্মদের নির্ধারিত এবং আল্লাহর আদেশকৃত সদকার বিধান হিসেবে পরিচিত। ভেড়া–ছাগলের প্রথম সীমাটি: [1027]

وَفِي صَدَقَةِ الْغَنَمِ فِي سَائِمَتِهَا إِذَا كَانَتْ أَرْبَعِينَ إِلَى عِشْرِينَ وَمِائَةٍ شَاةٌ

বাংলা অনুবাদ: চারণভূমিতে পালিত ভেড়া–ছাগল চল্লিশ থেকে একশ বিশটি হলে সদকা হিসেবে একটি দিতে হবে।

বুখারি ১৪৫৪-এর পত্রে সম্পদবর্ণিত পরিমাণপ্রদেয় অংশ
চারণভূমিতে পালিত ভেড়া–ছাগল৪০–১২০টিএকটি
একই শ্রেণির পশু১২০-এর বেশি থেকে ২০০টিদুটি
একই শ্রেণির পশু২০০-এর বেশি থেকে ৩০০টিতিনটি
একই শ্রেণির পশু৩০০-এর বেশিপ্রতি একশতে একটি
রুপাপত্রে উল্লিখিত জাকাতযোগ্য রুপাচল্লিশ ভাগের এক ভাগ

এই হিসাবের প্রভাব কেবল আয়াতের অস্পষ্ট শব্দের অভিধানগত অর্থ দেওয়ার মধ্যে নেই। কার সম্পদ থেকে কিছু আদায় করা হবে, কার কাছ থেকে আদায় করা হবে না এবং কতটুকু দাবি করা হবে—প্রতিটি সীমা ব্যক্তির ওপর সরাসরি আর্থিক দায় তৈরি করে। কোরআনের “জাকাত দাও” নির্দেশের পাশে এই পরিমাণগুলো না জানলে একই নির্দেশের বাস্তব দাবি নির্ধারিত হয় না। হাদিসে সংরক্ষিত পত্রই এখানে আদায়ের কার্যকর ছক সরবরাহ করছে।

হজের আচারের ক্ষেত্রেও মুহাম্মদের কাজকে শেখার আদর্শ করার নির্দেশ পাওয়া যায়। মুসলিমে জাবিরের বর্ণনায় কোরবানির দিনে বাহনে থেকে কঙ্কর নিক্ষেপের সময় হজের পদ্ধতি শিখে নিতে বলা হয়েছে। পরবর্তী বছরে তিনি আর হজ করবেন কি না জানেন না—এই কথার সঙ্গে প্রত্যক্ষ শিক্ষা গ্রহণের গুরুত্ব যুক্ত হয়েছে। বর্ণনার বক্তব্য: [1028]

لِتَأْخُذُوا مَنَاسِكَكُمْ فَإِنِّي لاَ أَدْرِي لَعَلِّي لاَ أَحُجُّ بَعْدَ حَجَّتِي هَذِهِ

বাংলা অনুবাদ: তোমরা তোমাদের হজের পদ্ধতি শিখে নাও। কারণ আমি জানি না, আমার এই হজের পরে হয়তো আর হজ করব না।

এই তিন ক্ষেত্রে কর্তৃত্বের কাজের ধরনও পৃথক। নামাজে অনুসরণযোগ্য আচরণ আদর্শ; জাকাতে সংরক্ষিত হিসাবপত্র আর্থিক সীমা নির্ধারণ করছে; হজে নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান শেখার জন্য প্রত্যক্ষ পদ্ধতি নির্দেশিত। পরে প্রতিটি ক্ষেত্রেই কোন বর্ণনা প্রমাণিত এবং কোন কাজ আবশ্যক, সেই সিদ্ধান্ত ফিকহের অধীনে আসে। দৈনন্দিন প্রার্থনা, সম্পত্তি এবং তীর্থযাত্রা—ধর্মজীবনের তিনটি প্রধান ক্ষেত্র তাই মুসহাফের বাইরের বিস্তারিত নিয়ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

কোরআন ও হাদিসের এই নির্ভরতার সম্পর্ক নিয়ে প্রচলিত ধর্মীয় বক্তব্যের একটি নমুনা:

সাধারণ নির্দেশের পাশে বিস্তারিত বিধান অপরিহার্য করার ফলে ব্যাখ্যার অধিকার অনুসারীর দৈনন্দিন জীবনে স্থায়ী প্রভাব পায়। ব্যক্তি নামাজ পড়েছেন, কিন্তু তাঁর আমল নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করেনি বলে অগ্রহণযোগ্য হতে পারে; অর্থ দিয়েছেন, কিন্তু স্বীকৃত হিসাব অনুযায়ী যথেষ্ট দেননি বলে দায় বাকি থাকতে পারে। কোন শর্ত অপরিহার্য, কোন ঘাটতি ক্ষমাযোগ্য এবং কোন কাজ নতুন করে করতে হবে—এই সিদ্ধান্তের ক্ষমতা সাধারণ আয়াতের বাইরের বিধানভাণ্ডার ও তার ব্যাখ্যাকারীদের হাতে রয়েছে।

প্রচলিত ইবাদতের বিস্তারিত রূপ এইভাবে দুই স্তরে বাধ্যতামূলক হয়: কোরআনের আদেশ কাজটি করার দায় তৈরি করে, আর সুন্নাহ ও ফিকহ কাজটি গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্ত স্থির করে। দ্বিতীয় স্তরটি ছাড়া প্রথম স্তরের আদেশ পালন হয়েছে কি না, সেই স্বীকৃতি পাওয়া যায় না। ধর্মীয় জীবনে কর্তৃত্বের গভীরতা এখানেই—অনুসারী কেবল আদেশ মানতে বাধ্য নন, আদেশ মানার গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি সম্পর্কে পরবর্তী সিদ্ধান্তও মানতে বাধ্য হন।


ব্যাখ্যা, বিশেষায়ন ও শর্তারোপের মাধ্যমে আয়াতের প্রয়োগ বদলানো

কোরআনের বিধানের প্রয়োগ বদলানোর জন্য আয়াত মুছে ফেলা আবশ্যক নয়। একটি আয়াতের আওতা ছোট করা, তার সঙ্গে নতুন শর্ত যুক্ত করা অথবা সংক্ষিপ্ত নির্দেশের গ্রহণযোগ্য রূপ নির্ধারণ করেও অনুসারীর করণীয় বদলে যায়। উসুলে ফিকহে এই কাজগুলোর জন্য পৃথক নাম রয়েছে। মুজমালের বয়ান বলতে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের বিস্তারিত ব্যাখ্যা, তাখসিস বলতে সাধারণ নির্দেশের পরিসর থেকে কিছু বিষয় বাদ দেওয়া এবং তাকয়িদ বলতে শর্তহীন বক্তব্যকে নির্দিষ্ট সীমার অধীনে আনা বোঝানো হয়। প্রতিটি পদ্ধতির ফল আইন প্রয়োগে ধরা পড়ে।

বিশেষায়নের ক্ষেত্রে পরিবর্তিত হয় কার ওপর মূল নির্দেশটি কার্যকর হবে। মায়িদা ৫:৩৮-এ নারী ও পুরুষ চোরের হাত কাটার নির্দেশ রয়েছে। বুখারিতে আয়েশার বর্ণনায় শাস্তির জন্য সম্পদের ন্যূনতম মূল্য এক-চতুর্থাংশ দিনার বলা হয়েছে। এই শর্ত গৃহীত হলে শুধু চুরি সংঘটিত হওয়াই ওই শাস্তি কার্যকর করার জন্য যথেষ্ট থাকে না; চুরিকৃত সম্পদের মূল্যও যাচাই করতে হয়। হাদিসের নির্দিষ্ট নির্দেশ: [1029]

تُقْطَعُ الْيَدُ فِي رُبُعِ دِينَارٍ فَصَاعِدًا

বাংলা অনুবাদ: এক-চতুর্থাংশ দিনার বা তার বেশি মূল্যের জন্য হাত কাটা হবে।

এখানে মূল্যসীমার নিচে থাকা ব্যক্তি এবং মূল্যসীমার ওপরে থাকা ব্যক্তির ওপর একই আয়াতের ফল এক হচ্ছে না। একজনের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ প্রমাণিত হলেও নির্দিষ্ট অঙ্গচ্ছেদ কার্যকর হবে না; অন্যজনের ক্ষেত্রে অর্থের পরিমাণসহ অন্য শর্তের প্রশ্ন উঠবে। বর্ণনা দিয়ে শ্রেণি আলাদা করার এই কাজেই আয়াতের সাধারণ ভাষার অধীনে থাকা মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। কত সম্পদ চুরি হলে এমন শাস্তি দেওয়া হবে—একটি অতিরিক্ত সংখ্যাগত তথ্য আইন প্রয়োগের দ্বাররক্ষক হয়ে দাঁড়ায়।

বিবাহের ক্ষেত্রে নিসা ৪:২৪-এ নিষিদ্ধ নারীদের তালিকার বাইরের নারীদের অনুমোদনের সাধারণ ভাষা আছে। বুখারির বর্ণনায় একজন নারী ও তাঁর ফুফু অথবা একজন নারী ও তাঁর খালাকে একই পুরুষের বিবাহে একত্র করা নিষিদ্ধ। নিসার তালিকায় দুই বোনকে একত্র করার নিষেধের পাশে এই নতুন সম্পর্কগুলো হাদিসের মাধ্যমে যুক্ত হয়। ফলে কোনো নারী নিজে ওই পুরুষের জন্য নিষিদ্ধ সম্পর্কের সদস্য না হলেও তাঁর আত্মীয়ার সঙ্গে একত্র বিবাহের অবস্থায় নিষেধ কার্যকর হয়। [1030] [1031]

لاَ يُجْمَعُ بَيْنَ الْمَرْأَةِ وَعَمَّتِهَا، وَلاَ بَيْنَ الْمَرْأَةِ وَخَالَتِهَا

বাংলা অনুবাদ: একজন নারী ও তাঁর ফুফুকে এবং একজন নারী ও তাঁর খালাকে একত্র বিবাহে রাখা যাবে না।

পদ্ধতিযা নির্ধারিত হয়আইনগত ফলের ধরন
সংক্ষিপ্ত নির্দেশের ব্যাখ্যাকাজটি কীভাবে সম্পাদিত হবেকোন পদ্ধতিকে আদেশ পালন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে
সাধারণ বক্তব্যের বিশেষায়নবৃহত্তর শ্রেণির কোন সদস্য বাদ পড়বেসংশ্লিষ্ট সদস্যের ক্ষেত্রে সাধারণ বিধান কার্যকর হবে না
শর্তহীন বক্তব্যের সীমা নির্ধারণকোন অতিরিক্ত শর্তে কাজ গ্রহণযোগ্য হবেশর্ত পূরণ না হলে অনুমতি বা কাজের বৈধতা বদলাবে
পরবর্তী নির্দেশে রহিতকরণআগের বিধানের কার্যকাল শেষ হয়েছে কি নাএক সময়ে করণীয় কাজ পরের সময়ে আর বাধ্যতামূলক থাকবে না

পবিত্র অবস্থায় তাওয়াফের প্রশ্নে গাজালির আল-মুস্তাসফা একই ধরনের কর্তৃত্বের আরও সূক্ষ্ম ব্যবহার দেখায়। কোরআনে প্রাচীন ঘরের তাওয়াফের আদেশ আছে; সেখানে সেই বাক্যে পবিত্রতার শর্ত উল্লেখ নেই। গাজালি তাওয়াফকে নামাজের সঙ্গে তুলনাকারী বর্ণনা ব্যবহার করে শর্ত নির্ধারণের আলোচনা করেছেন। তাঁর বিবরণে শাফেয়ি ও আবু হানিফার ফলও এক নয়: শাফেয়ির অবস্থানে পবিত্রতা ছাড়া কাজটি যথেষ্ট হয় না; আবু হানিফার অবস্থানে অতিরিক্ত বর্ণনা পবিত্রতার দায় তৈরি করে, কিন্তু তাওয়াফের মূল সম্পাদনকে একইভাবে বাতিল করে না। [1032]

فأخرج خبر الواحد أحد القسمين من لفظ القرآن فهو نقصان من النص لا زيادة عليه

বাংলা অনুবাদ: একক বর্ণনা কোরআনের ভাষার অন্তর্ভুক্ত দুই অবস্থার একটিকে বের করে দিয়েছে; তাই এটি নস থেকে কমানো, তার ওপর যোগ করা নয়।

গাজালির বাক্যে ফলটি অস্পষ্ট নেই: আয়াতের ভাষার আওতায় বিবেচিত দুটি অবস্থার একটি বাদ দেওয়া হয়েছে। পরের ব্যাখ্যায় যদি বলা হয় আয়াত গোড়া থেকেই শুধু কাজটির মূল আদেশ দিয়েছে, বিস্তারিত শর্ত অন্যত্র রাখার জন্য ছেড়েছে, তাহলে এই বাদ দেওয়ার পরিচয় হয় ব্যাখ্যা বা বিশেষায়ন। আর যদি সাধারণ পরিসর নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত ধরা হয়, সেই পরিসর তুলে নেওয়াকে রহিতকরণ হিসেবে বিচার করার প্রশ্ন আসে। একই ব্যবহারিক শর্তকে কোন শাস্ত্রীয় নামে গ্রহণ করা হবে, তা মূল বক্তব্যের পরিসর সম্পর্কে আরেকটি ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করছে।

এই পার্থক্যের বাস্তব মূল্য রয়েছে। তাওয়াফ করা ব্যক্তি নিজেকে আদেশ পালনকারী মনে করতে পারেন, অথচ এক মতে পবিত্রতার শর্ত না থাকায় তাঁর কাজ যথেষ্ট হয়নি বলে রায় হবে। অন্য মতে অতিরিক্ত দায় থাকা সত্ত্বেও মূল কাজ সম্পাদিত হিসেবে গণ্য হতে পারে। একই কোরআনিক নির্দেশ ও সংশ্লিষ্ট বর্ণনা থেকে দুই রকম ফল নির্ধারণে আইনজ্ঞের প্রমাণতত্ত্ব কাজ করছে। ফলে আয়াতের শব্দের স্থায়িত্ব ব্যক্তি কী অর্জন করেছেন, সেই স্বীকৃতির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে না।

ব্যাখ্যার এই ক্ষমতা সাধারণ অনুসারীর হাত থেকে চূড়ান্ত অর্থ নির্ধারণের অধিকারও সরিয়ে নেয়। আয়াত পড়ে তিনি কাজের একটি পরিসর বুঝেছেন, কিন্তু সেই পরিসরের ওপর আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত বর্ণনা ও আইনগত নিয়ম প্রযোজ্য বলে ধরা হয়। তাঁর ব্যক্তিগত পাঠের তুলনায় অনুমোদিত বিশেষায়ন প্রাধান্য পায়। এই প্রাধান্য নির্ধারণে ব্যবহৃত ভাষা ধর্মীয় হলেও ফলটি অত্যন্ত বাস্তব: কার বিয়ে অনুমোদিত, কার সম্পদ থেকে কী আদায় হবে এবং কোন কাজ করলে আদেশ পালন সম্পূর্ণ হবে।

তাখসিস ও তাকয়িদ আয়াতের অক্ষর রক্ষা করেই তার প্রয়োগের পরিসর নিয়ন্ত্রণ করে। তাই গ্রন্থের পৃষ্ঠার অপরিবর্তিত চেহারা দিয়ে তার কার্যকর আইনি ইতিহাস বোঝা যায় না। কোনো শব্দ মুছে যায়নি, অথচ আয়াত থেকে প্রথমে অন্তর্ভুক্ত মনে হওয়া একটি শ্রেণি আর অন্তর্ভুক্ত নেই; কোনো বাক্য বদলায়নি, অথচ আগে অনুল্লিখিত শর্ত ছাড়া কাজ গ্রহণযোগ্য নয়। এই স্তরেই হাদিস ও আইনজ্ঞের সিদ্ধান্ত লিখিত আয়াতের ওপর প্রয়োগযোগ্য সীমা আরোপ করে।


খবরে আহাদ দিয়ে সাধারণ আয়াতের পরিসর সংকুচিত করা

খবরে আহাদ দিয়ে কোরআনের সাধারণ বক্তব্য বিশেষায়িত করার অনুমোদন প্রমাণের নিশ্চয়তা এবং আইন প্রয়োগের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে। কোরআনের বর্ণিত সর্বজনীন প্রচারকে মুতাওয়াতির বলা হয়; বিপরীতে তাওয়াতুরের শর্ত পূরণ না করা বর্ণনা আহাদের অন্তর্ভুক্ত। আহাদ মানেই সব সময়ে কেবল একজনের মুখে শোনা বক্তব্য নয়। এর মধ্যে মাশহুর, আজিজ ও গরিব—বর্ণনাকারীর সংখ্যাগত পৃথক অবস্থাও রয়েছে। কোনো বর্ণনা কত পথে এসেছে এবং সেটিকে গ্রহণযোগ্য বলা হয়েছে কি না—এই দুটি বিচারও এক নয়।

ইসলামওয়েবের পরিভাষাগত আলোচনায় আহাদের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তাওয়াতুরের শর্ত পূরণ না করার ভিত্তিতে। একই আলোচনায় আহাদের তিন ভাগ এবং গ্রহণযোগ্য–অগ্রহণযোগ্য উভয় অবস্থার উল্লেখ আছে। ফলে সংখ্যাগত বিস্তারের শ্রেণি এবং গ্রহণযোগ্যতার রায় পৃথকভাবে কাজ করে। সংজ্ঞার বাক্যটি হলো: [1033]

أما القسم الثاني وهو حديث الآحاد فهو: ما لم يجمع شروط المتواتر

বাংলা অনুবাদ: দ্বিতীয় বিভাগ, অর্থাৎ আহাদ হাদিস হলো: যা মুতাওয়াতিরের শর্তগুলো পূরণ করেনি।

সাধারণ আয়াতের কোনো একটি সদস্যকে এই ধরনের বর্ণনা দিয়ে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে সর্বজনীন ভাষা এবং নির্দিষ্ট খবরের মধ্যে সম্পর্ক স্থির করতে হয়। ইবন নাজ্জারের শরহুল কাওকাবিল মুনিরের সূত্রে ইসলামকিউএ সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুমোদন এবং ইবন মুফলিহের সূত্রে হানাফিদের শর্ত উল্লেখ করেছে: সাধারণ বক্তব্য আগে স্বীকৃত দলিল দিয়ে বিশেষায়িত হয়ে থাকলে একক বর্ণনা দিয়ে আরও বিশেষায়ন গ্রহণ করা হয়। [1034]

إن كان خص بدليل مجمع عليه جاز

বাংলা অনুবাদ: তা যদি ঐকমত্যপ্রাপ্ত কোনো দলিল দিয়ে বিশেষায়িত হয়ে থাকে, তাহলে বৈধ।

এই পার্থক্য মূল নির্দেশের নিশ্চিত পরিসর নিয়ে। একটি সাধারণ শব্দের প্রতিটি সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা কতখানি নিশ্চিত, আর বিশেষ বর্ণনাটি কোন সদস্যকে বাদ দেওয়ার জন্য কতখানি গ্রহণযোগ্য—দুটি প্রশ্নের উত্তর বদলালে আইনের ফলও বদলায়। ফলে শুধু আয়াত আছে কি না, সেই প্রশ্নে বিচার শেষ হয় না। আয়াতের সাধারণতা আগে সংকুচিত হয়েছে কি না এবং তা কোন দলিলে হয়েছে—পরবর্তী সিদ্ধান্তে এই পূর্ববর্তী ব্যাখ্যার ইতিহাসও প্রয়োজন হয়।

উত্তরাধিকারে ধর্মীয় পরিচয়ের বিধান একটি নির্দিষ্ট ফল দেখায়। নিসা ৪:১১-এ সন্তানদের অংশ নির্ধারণে পুত্র ও কন্যার সম্পর্ক এসেছে। বুখারিতে উসামা ইবনে যায়েদের নামে বর্ণিত নির্দেশে মুসলমান ও অমুসলিমের মধ্যে উত্তরাধিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই নিয়মের অধীনে আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকলেও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে একজন সম্পত্তি থেকে বাদ পড়ে যেতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বর্ণনা: [1035]

لاَ يَرِثُ الْمُسْلِمُ الْكَافِرَ، وَلاَ الْكَافِرُ الْمُسْلِمَ

বাংলা অনুবাদ: মুসলমান কাফিরের উত্তরাধিকারী হবে না এবং কাফিরও মুসলমানের উত্তরাধিকারী হবে না।

সিদ্ধান্তের স্তরযে বিষয় নির্ধারিত হয়সম্পত্তির ওপর প্রভাব
আত্মীয়তার কোরআনিক পরিচয়সন্তান, পিতা–মাতা ও অন্য আত্মীয়ের অংশউত্তরাধিকারের সাধারণ দাবির ভিত্তি
ধর্মীয় পরিচয়ের বর্ণিত শর্তউত্তরাধিকারদাতা ও গ্রহীতার ধর্মের সম্পর্কআত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও কিছু ক্ষেত্রে অংশ থেকে বর্জন
খবরের গ্রহণযোগ্যতাএই বর্ণনা আইন প্রতিষ্ঠার জন্য গ্রহণ করা হবে কি নাঅতিরিক্ত বর্জন কার্যকর হওয়ার ভিত্তি
আয়াত ও খবরের সম্পর্কবিশেষ বর্ণনা সাধারণ ভাষার পরিসর কীভাবে নির্ধারণ করবেকার প্রাপ্য অংশ থাকবে, কার থাকবে না

নিসার আয়াতের শব্দে নতুন কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের বাক্য ঢোকানো হয়নি। তবু উত্তরাধিকারের কার্যকর তালিকায় সেই পরিচয় একটি নির্ধারক শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তি কার সন্তান, সেটি প্রমাণ করার পরেও তাঁর সম্পত্তিগত দাবি শেষ পর্যন্ত স্বীকৃত হবে কি না, তা নির্ধারণে আরেকটি উৎস ব্যবহৃত হচ্ছে। সাধারণ ভাষা থেকে বর্জনের ফল এখানে বিমূর্ত নয়; পরিবারের সম্পদ বণ্টনে কারও প্রাপ্য শূন্য হয়ে যাওয়ার প্রশ্ন।

কোনো বর্ণনাকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে মানার পরে তাকে সাধারণ বক্তব্যের ব্যাখ্যাকারী বলা হলে তার তুলনামূলক কম বিস্তৃত বর্ণনাপথ আইন প্রয়োগের বাধা হয়ে থাকে না। প্রমাণের সংখ্যা এবং অর্থের নির্দিষ্টতা তখন ভিন্নভাবে মূল্যায়িত হয়। একটি বৃহত্তর প্রচারিত বাক্যের সাধারণ ভাষার ওপর কম বিস্তৃত পথে সংরক্ষিত নির্দিষ্ট বাক্যকে প্রাধান্য দেওয়ার শাস্ত্রীয় পদ্ধতি তৈরি হয়। এতে কোরআনের প্রচারগত নিশ্চয়তা স্বীকার করেও তার প্রতিটি সদস্যের ওপর প্রয়োগ দ্বিতীয় উৎসের অধীনে রাখা যায়।

বিশেষায়নের এই ক্ষমতার সঙ্গে আলেমদের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষমতা যুক্ত হয়ে ফল আরও বিস্তৃত করে। বর্ণনার মান নিয়ে মতভেদ থাকলে আয়াতের কোন পরিসর গ্রহণযোগ্য হবে, সে প্রশ্নেও ভিন্নতা আসতে পারে। আবার বর্ণনাটি গ্রহণ করেও কেউ সেটিকে মূল বিধানের ব্যাখ্যা, কেউ অতিরিক্ত দায় এবং কেউ অন্য পরিস্থিতির নির্দেশ মনে করতে পারেন। কার্যকর আইন তাই কেবল বর্ণনা আছে বলেই তৈরি হয় না; বর্ণনার গ্রহণ ও তার সঙ্গে আয়াতের সম্পর্ক স্থাপন—দুটি সিদ্ধান্তেই তৈরি হয়।

খবরে আহাদের প্রামাণ্যতা নিয়ে এই আলোচনা মুসলমানের অধিকার ও দায়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। সম্পত্তির অংশ হারানো, বিশেষ শর্ত ছাড়া ইবাদত অগ্রহণযোগ্য হওয়া কিংবা বিবাহের অনুমতি সংকুচিত হওয়া—প্রতিটি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খবরকে কতখানি ক্ষমতা দেওয়া হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ। গ্রন্থের সাধারণ ভাষার তুলনায় নির্দিষ্ট বর্ণনার প্রাধান্য অনুমোদন করার মধ্যেই সেই ক্ষমতার পথ খোলা হয়েছে। পরে সাধারণ অনুসারী যে ফলকে কোরআনের বিধান হিসেবে জানেন, তার মধ্যে এই প্রমাণতাত্ত্বিক নির্বাচনও অন্তর্ভুক্ত থাকে।


সুন্নাহ দিয়ে কোরআন রহিত করার মতভেদ ও জাসসাসের অবস্থান

সুন্নাহ দিয়ে কোরআনের বিধান রহিত করার প্রশ্নে সরাসরি একটি উৎসের নির্দেশের জায়গায় অন্য উৎসের নির্দেশ কার্যকর করার ক্ষমতা আলোচিত হয়। কোরআনের কোনো বক্তব্য প্রথম পর্যায়ে বাধ্যতামূলক ছিল, পরে সুন্নাহ সেই বাধ্যবাধকতার অবসান ঘটিয়েছে—এটি গ্রহণ করলে পরবর্তী আইন জানার জন্য মুসহাফের বাইরে যেতে হয়। আয়াতের শব্দ গ্রন্থে থাকতে পারে, অথচ অনুসারীকে জানানো হয় যে তার আগের হুকুম আর বর্তমান কর্তব্য নয়। এই পদ্ধতির বৈধতা নিয়েই উসুলবিদদের মধ্যে একাধিক অবস্থান সংরক্ষিত আছে।

জাসসাস বাকারা ২:১০৬-এর “তার চেয়ে উত্তম অথবা অনুরূপ” কথাকে সুন্নাহ দিয়ে কোরআন রহিত করার বিরুদ্ধে ব্যবহার করেননি। তাঁর ব্যাখ্যায় উত্তম হওয়ার বিচার পাঠের ভাষাগত গুণে নয়, মানুষের জন্য সহজতা বা উপকারে। সেই বিকল্প সুন্নাহর মাধ্যমেও আসতে পারে। তাই আয়াতটিকে তিনি নিষেধের তুলনায় অনুমোদনের পক্ষে বেশি স্পষ্ট বলেছেন। [1036]

فدلالة هذه الآية على جواز نسخ القرآن بالسنة أظهر من دلالتها على امتناع جوازه بها

বাংলা অনুবাদ: এই আয়াত সুন্নাহ দিয়ে কোরআন রহিত করা নিষিদ্ধ হওয়ার চেয়ে তা বৈধ হওয়ার পক্ষেই অধিক স্পষ্ট প্রমাণ দেয়।

আহকামুল কোরআন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৪, সুন্নাহ দ্বারা কোরআনের বিধান রহিত করার আলোচনা

এই যুক্তিতে বিকল্প নির্দেশের উৎস হিসেবে নতুন কোরআনিক আয়াত অপরিহার্য থাকে না। আল্লাহর পক্ষ থেকে অধিক উপকারী নির্দেশ এসেছে—এই ধর্মীয় মূল্যায়ন হাদিসে পাওয়া বিধানের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়। ফলে মুসহাফে পুরোনো আয়াতের উপস্থিতি তার বিধান বহাল থাকার চূড়ান্ত প্রমাণ হতে পারে না। পরবর্তী সুন্নাহর পরিচয় ও সময়ক্রম প্রমাণিত বলে গৃহীত হলে পুরোনো করণীয়ের কার্যকাল শেষ বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া যায়।

আল-বাহরুল মুহিতে যরকাশি মুতাওয়াতির সুন্নাহ দিয়ে কোরআন রহিত হওয়ার অনুমোদন ও সংঘটনকে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই আলোচনায় শাফেয়ির গ্রন্থগুলোর সাধারণ অবস্থান হিসেবে নিষেধের কথাও আছে। ফলে “সুন্নাহ” এবং “কোরআন” শব্দ দুটি বলেই ফল নির্ধারিত হয় না; সুন্নাহর প্রমাণগত ধরন ও আইনজ্ঞের উসুলগত অবস্থানও নির্ধারক। সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্পর্কে তাঁর বাক্য: [1037]

وإن كانت متواترة فاختلفوا فيه ، فالجمهور على جوازه ووقوعه

বাংলা অনুবাদ: সুন্নাহ মুতাওয়াতির হলে এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে; সংখ্যাগরিষ্ঠ এর বৈধতা ও বাস্তবে সংঘটন স্বীকার করেন।

শাফেয়ির বক্তব্যে সুন্নাহকে কিতাবের অনুগামী ও ব্যাখ্যাকারী বলা হয়েছে। যরকাশির আলোচনায় তাঁর আল-রিসালা থেকে এই নীতিও উদ্ধৃত আছে যে সুন্নাহ কিতাবের রহিতকারী হয় না। অর্থাৎ ক্ষমতার সীমা নির্ধারণে একই শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যের ভেতরেই ভিন্ন দাবি রয়েছে। উদ্ধৃত অবস্থান: [1038]

وأن السنة لا تكون ناسخة للكتاب

বাংলা অনুবাদ: সুন্নাহ কিতাবের রহিতকারী হয় না।

উসুলগত অবস্থানসুন্নাহর যে ধরন নিয়ে কথাফল
জাসসাসের অনুমোদনশরিয়তি প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য সুন্নাহউত্তম বিকল্প বিধান মুসহাফের বাইরেও আসতে পারে
যরকাশির উল্লেখিত সংখ্যাগরিষ্ঠ মতমুতাওয়াতির সুন্নাহকোরআনিক বিধান রহিত করা বৈধ ও সংঘটিত
শাফেয়ির সাধারণ নিষেধমূলক অবস্থানকিতাবের সঙ্গে সুন্নাহর সম্পর্কসুন্নাহ ব্যাখ্যা করবে; কিতাবের রহিতকারী হবে না
আহাদ দিয়ে নসখের সীমিত অনুমোদনপরে আসা প্রমাণিত গ্রহণযোগ্য একক বর্ণনাকিছু আলেমের মতে এই পথেও আগের বিধান রহিত হতে পারে

মতভেদের আরেক প্রান্তে শানকিতি পরবর্তী হওয়া প্রমাণিত সহিহ আহাদ দিয়েও মুতাওয়াতির বিধান রহিত করা সম্ভব বলেছেন। ইসলামকিউএ তাঁর এই সিদ্ধান্ত উদ্ধৃত করেছে। সুন্নাহর নির্দিষ্ট বর্ণনাপথকে কতখানি ক্ষমতা দেওয়া হবে, তাঁর এই রায় সেই সীমা আরও বাড়ায়। সিদ্ধান্তের সংক্ষিপ্ত ভাষা: [1039]

جواز نسخ المتواتر بالآحاد الصحيحة الثابت تأخرها عنه

বাংলা অনুবাদ: যে সহিহ আহাদ পরে এসেছে বলে প্রমাণিত, তা দিয়ে মুতাওয়াতির রহিত করা বৈধ।

এখানে “পরে” শব্দটির বড় ভূমিকা রয়েছে। কোনো নির্দেশ পূর্ববর্তী হলে অনুসারীর প্রথম কর্তব্য নির্ধারণ করে; সেটি পরবর্তী বলে স্থির হলে আগের কর্তব্য সরিয়ে দেওয়ার দাবি করতে পারে। ফলে একই বক্তব্যের ধর্মীয় ফল তার কালানুক্রমের বিচারেও নির্ভরশীল। এই সময়ক্রম আয়াতের বর্তমান অবস্থান থেকে সব সময় পাওয়া যায় না; অবতরণ-বিবরণ, ঘটনার তারিখ ও বর্ণনাসূত্র থেকে নির্ধারণ করতে হয়। কালানুক্রমের কর্তৃত্বও তাই হাদিস ও তার ব্যাখ্যাকারীদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।

সুন্নাহ দিয়ে নসখের অনুমোদন এবং বিশেষায়নের অনুমোদন এক পরিভাষা নয়। প্রথমটিতে আগের বিধানের কার্যকাল শেষ হওয়ার দাবি; দ্বিতীয়টিতে মূল বিধান বহাল রেখে তার কিছু ক্ষেত্র বের করে দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য এই দুই পথ কখনো কাছাকাছি ফল আনতে পারে: যে আয়াত প্রথমে তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য মনে হচ্ছিল, পরে আর তাঁর ওপর প্রয়োগ করা হয় না। আবার কোনো ক্ষেত্রে পুরো ব্যবস্থার অবসান ও একটি ব্যতিক্রমের মধ্যে বড় পার্থক্য থাকে। আইনজ্ঞের নির্ধারিত শ্রেণিই সেই ফলের ব্যাপ্তি স্থির করে।

নসখ স্বীকার বা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত তাই কার্যকর কর্তৃত্বের মাত্রা বদলায়। এক মতে হাদিস আগের আয়াতের বিধান সরাসরি সরাতে পারে; অন্য মতে একই সমস্যার সমাধান কোরআনের আরেক আয়াত, বিশেষায়ন অথবা ব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। এই পদ্ধতিগুলো নির্ধারণে যেসব আলেমের মত গ্রহণ করা হয়, তাঁরা কার্যত ঠিক করেন কোন নির্দেশ মানা এখন আনুগত্য এবং কোন পুরোনো নির্দেশ আঁকড়ে থাকা ভুল প্রয়োগ। আল্লাহর আদেশের বর্তমান তালিকা মানুষ সেই নির্ধারিত পদ্ধতির মাধ্যমেই জানতে পারেন।

জাসসাসের অনুমোদনের তাৎপর্য এখানেই গভীর। কোরআনকে ঐশী বাণী হিসেবে স্বীকার করার পরেও তিনি মুসহাফের ভাষার বাইরে এমন একটি পথ স্বীকার করেন, যা সেই বাণীর পূর্ববর্তী আইনগত কার্যকারিতা শেষ করতে পারে। এই ক্ষমতা কেবল অতিরিক্ত তথ্য সরবরাহের নয়; অনুসারীর আগের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহারের। কোন বক্তব্য তখন কেবল পঠিত আয়াত এবং কোন বক্তব্য বর্তমান কার্যকর আদেশ—এই পার্থক্য মুসহাফ ও তার বাইরের বর্ণনার সম্পর্ক বিচার করেই প্রতিষ্ঠিত হয়।


অসিয়ত: বাকারা ২:১৮০ এবং “উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই”

বাকারা ২:১৮০-এ সম্পদ রেখে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া ব্যক্তির জন্য পিতা–মাতা ও নিকটাত্মীয়দের অসিয়ত করার নির্দেশ আছে। “তোমাদের ওপর নির্ধারিত হয়েছে” এবং “মুত্তাকিদের ওপর কর্তব্য”—আয়াতের এই ভাষা কাজটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পরে উত্তরাধিকারের নির্দিষ্ট অংশ এবং “উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই” বর্ণনার সঙ্গে এই নির্দেশের সম্পর্ক স্থির করতে হয়েছে। ফলে সম্পত্তির সুবিধাভোগী কারা হবেন, তা আয়াতের আত্মীয়তার পরিচয় দেখে এক ধাপে নির্ধারিত হয় না। তাঁরা উত্তরাধিকারী কি না, সেই শ্রেণিবিভাগও সিদ্ধান্তে কাজ করে। আয়াতের পূর্ণ বক্তব্য: [1040]

كُتِبَ عَلَيْكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ إِن تَرَكَ خَيْرًا الْوَصِيَّةُ لِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ بِالْمَعْرُوفِ ۖ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হলে, সে সম্পদ রেখে গেলে পিতা–মাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য ন্যায়সংগত অসিয়ত করা তোমাদের ওপর নির্ধারিত হয়েছে; এটি মুত্তাকিদের ওপর কর্তব্য।

নিসা ৪:১১-এ উত্তরাধিকারের ভাগ দেওয়ার সঙ্গে অসিয়ত ও ঋণের কথা একই বাক্যে আছে। অর্থাৎ উত্তরাধিকার ও অসিয়ত দুটি ব্যবস্থার অস্তিত্ব আয়াতে স্বীকৃত। কোন প্রাপকের জন্য অসিয়ত কার্যকর থাকবে, সেই বাছাইয়ের অতিরিক্ত প্রশ্নটি শুধু “উত্তরাধিকার এসেছে” কথাটি বলেই নিষ্পত্তি হয় না। বণ্টনের সঙ্গে যুক্ত নির্দিষ্ট বাক্যাংশ: [1041]

مِن بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ

বাংলা অনুবাদ: তার করা অসিয়ত অথবা ঋণ পরিশোধের পরে।

আবু দাউদে আবু উমামার নামে সংকলিত বক্তব্যে উত্তরাধিকারীর অসিয়ত সরাসরি নিষিদ্ধ হয়েছে। আগে আল্লাহ প্রত্যেক অধিকারীকে তাঁর প্রাপ্য দিয়েছেন বলে ঘোষণা, তার পরে “অতএব” অর্থের সংযোগে নিষেধটি এসেছে। এই সংক্ষিপ্ত নির্দেশই উত্তরাধিকার পাওয়া ব্যক্তি ও অসিয়তের সুবিধাভোগীর মধ্যে নতুন সীমা নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়। বর্ণনাটি: [1042]

إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَعْطَى كُلَّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ فَلاَ وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ প্রত্যেক অধিকারীকে তাঁর প্রাপ্য অধিকার দিয়েছেন; অতএব কোনো উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই।

এই নিয়ম প্রয়োগে মৃত ব্যক্তির পিতা বা মাতা আয়াতে নাম থাকা সত্ত্বেও শুধু সেই পরিচয়ে অসিয়তের অতিরিক্ত সুবিধা দাবি করতে পারেন না। তাঁরা উত্তরাধিকারী হলে হাদিসের নিষেধ তাঁদের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়। অন্য আত্মীয় উত্তরাধিকারী না হলে তাঁর অবস্থান ভিন্ন হতে পারে। একই “নিকটাত্মীয়” পরিচয়ের ভেতরে উত্তরাধিকারী ও অনুত্তরাধিকারীকে পৃথক করার মাধ্যমে অসিয়তের আয়াতের কার্যকর পরিসর বদলে যায়।

ইবনে কাসীর একদিকে উত্তরাধিকারের আয়াত দিয়ে আগের বাধ্যবাধকতা রহিত হওয়ার ব্যাখ্যা সংকলন করেছেন; অন্যদিকে উত্তরাধিকারী নয় এমন আত্মীয়ের জন্য আগের নির্দেশ বহাল থাকার মতও এনেছেন। তাঁর আলোচনায় পরবর্তী পরিভাষায় কিছু মতকে পূর্ণ রহিতকরণের বদলে সাধারণ বক্তব্যের কিছু সদস্য বাদ দেওয়ার ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁর ব্যবহৃত বাক্য: [1043]

لأن آية الميراث إنما رفعت حكم بعض أفراد ما دل عليه عموم آية الوصاية

বাংলা অনুবাদ: কারণ উত্তরাধিকারের আয়াত অসিয়তের আয়াতের সাধারণ ভাষায় অন্তর্ভুক্ত কিছু সদস্যের বিধানই তুলে দিয়েছে।

ব্যাখ্যাদলিলগুলোর সম্পর্কউত্তরাধিকারী আত্মীয়ের ক্ষেত্রে ফল
উত্তরাধিকারের আয়াত দিয়ে রহিতকরণপরবর্তী নির্দিষ্ট অংশ আগের অসিয়তের দায়ের স্থান নিয়েছেআগের আয়াতের ভিত্তিতে অতিরিক্ত অসিয়ত বাধ্যতামূলক নয়
হাদিস দিয়ে রহিতকরণ“উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই” আগের নির্দেশ সরিয়েছেবর্ণিত নিষেধ অনুসারে তাঁর জন্য অসিয়তের সীমা নির্ধারিত
বিশেষায়ননিকটাত্মীয়দের সাধারণ শ্রেণি থেকে উত্তরাধিকারীকে বাদ দেওয়া হয়েছেঅনুত্তরাধিকারীর অবস্থান পৃথক রেখে তাঁর ক্ষেত্রে আগের সাধারণ নির্দেশ সংকুচিত

যরকাশির সংকলনে ইবন ফুরাকের সূত্রে আবুল হাসান আশআরির নামে এমন মতও আছে যে উত্তরাধিকারের আয়াত ও অসিয়ত একসঙ্গে মানা সম্ভব, তাই রহিতকারী হিসেবে হাদিসটিকেই ধরতে হবে। এই ব্যাখ্যার তাৎপর্য হলো, দুই কোরআনিক ব্যবস্থার সহাবস্থানকে যুক্তিগতভাবে অসম্ভব বলা হচ্ছে না। নির্দিষ্ট নিষেধ কোথা থেকে এসেছে, সে প্রশ্নে হাদিসকে সিদ্ধান্তমূলক ধরা হচ্ছে। ফলে একই কার্যকর আইন প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি নিয়েও আলেমদের ভিন্নতা থাকে। সহাবস্থান সম্পর্কে তাঁর যুক্তি: [1044]

لأنه يمكن أن يجمع بينهما

বাংলা অনুবাদ: কারণ দুটিকে একসঙ্গে গ্রহণ করা সম্ভব।

অন্য উত্তরাধিকারীদের সম্মতিতে অসিয়ত কার্যকর করার বিধান এই সম্পর্কের আরও একটি স্তর। জাসসাস উত্তরাধিকারীরা অনুমোদন দিলে অসিয়ত কার্যকর হওয়ার আলোচনা করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় “অসিয়ত নেই” কথার শর্ত হলো, অন্য উত্তরাধিকারীরা তা অনুমোদন করেননি। একটি অতিরিক্ত বর্ণিত ব্যতিক্রমের সাহায্যে মূল নিষেধের পরিসরও আবার নির্ধারিত হয়েছে। [1045]

وفيه بيان أن الأخبار الواردة بأن لا وصية لوارث من غير ذكر إجازة الورثة هي محمولة على أن الورثة لم يجيزوها

বাংলা অনুবাদ: এতে স্পষ্ট হয়, উত্তরাধিকারীদের অনুমোদনের উল্লেখ ছাড়া যেসব বর্ণনায় “উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই” এসেছে, সেগুলো উত্তরাধিকারীরা অনুমোদন করেননি—এই অবস্থার ওপর প্রযোজ্য।

কাসানি এই অনুমোদনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, নিষেধটি অন্য উত্তরাধিকারীদের অধিকারের জন্য; অনুমোদন দিলে সেই বাধা থাকে না। অর্থাৎ অসিয়ত ও উত্তরাধিকারের সহাবস্থান নিজের মধ্যেই অসম্ভব নয়। কার্যকারিতার সীমা সম্পত্তির অন্য দাবিদারদের অধিকার ও সম্মতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের সংশ্লিষ্ট অংশ: [1046]

لأن امتناع الجواز كان لحقهم لما يلحقهم من الأذى والوحشة بإيثار البعض ، ولا يوجد ذلك عند الإجازة

বাংলা অনুবাদ: কারণ বৈধতা রোধ করা হয়েছিল তাঁদের অধিকারের জন্য—কাউকে অগ্রাধিকার দিলে তাঁদের কষ্ট ও বিরাগ হয়; অনুমোদন দিলে সেটি থাকে না।

এর বাস্তব ফল অত্যন্ত নির্দিষ্ট। কোনো অসিয়ত একজন উত্তরাধিকারীর সুবিধা বাড়াচ্ছে; অন্যরা সম্মতি দিলে এক আইনি ফল, আপত্তি করলে আরেক ফল। গ্রন্থের অসিয়তের নির্দেশ, উত্তরাধিকারের নির্দিষ্ট অংশ, হাদিসের নিষেধ এবং অনুমোদনের শর্ত—এই সবকিছু মিলিয়েই শেষ সিদ্ধান্ত হয়। মৃত ব্যক্তির ইচ্ছা বা আয়াতে আত্মীয়ের নাম থাকা একা চূড়ান্ত নয়। প্রাপকের পরিচয় ও অন্য দাবিদারদের অনুমোদন সম্পত্তির ওপর তাঁর অধিকার নির্ধারণ করে।

অসিয়তের এই দৃষ্টান্তে হাদিসের ক্ষমতা দ্বিগুণ: প্রথমে কোরআনের সাধারণ নির্দেশের মধ্যে উত্তরাধিকারীকে বাদ দেয়; পরে ফিকহ নিষেধটির কার্যকারিতা নির্ধারণ করে অন্যদের সম্মতির মাধ্যমে। কোনো আয়াত মুছে ফেলার প্রয়োজন হয়নি, অথচ সম্পদের একটি দাবির পথ বদলে গেছে। আল্লাহর নামে ঘোষিত আইনের ব্যবহারিক রূপ এখানে কয়েকটি লিখিত ও বর্ণিত বক্তব্যের ওপর মানবীয় সম্পর্ক স্থাপনের ফল।


খাদ্য: আনআম ৬:১৪৫-এর তালিকার বাইরে হাদিসে নতুন নিষেধাজ্ঞা

আনআম ৬:১৪৫-এর খাদ্যতালিকা কেবল নিষিদ্ধ কয়েকটি বস্তুর উদাহরণ নয়। আয়াতের ভাষায় আগে নিষিদ্ধ কিছু না পাওয়ার ঘোষণা, তারপর “ছাড়া” অর্থে ব্যতিক্রম রয়েছে। মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত, শূকরের মাংস এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা বস্তু ওই ঘোষিত পরিসরে এসেছে। একই সঙ্গে অনিবার্য অবস্থায় খাওয়ার অবকাশও রাখা হয়েছে। আয়াতের পূর্ণ বক্তব্য: [1047]

قُل لَّا أَجِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا عَلَىٰ طَاعِمٍ يَطْعَمُهُ إِلَّا أَن يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَّسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنزِيرٍ فَإِنَّهُ رِجْسٌ أَوْ فِسْقًا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ ۚ فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَإِنَّ رَبَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

বাংলা অনুবাদ: বলো, আমার কাছে যে ওহি এসেছে তাতে কোনো ভক্ষণকারীর খাওয়ার জন্য নিষিদ্ধ কিছু পাই না, তবে মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত, শূকরের মাংস—কারণ তা অপবিত্র—অথবা অবাধ্যতার বস্তু হিসেবে আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা বস্তু ছাড়া। কেউ বাধ্য হলে, অবাধ্যতা বা সীমালঙ্ঘনের উদ্দেশ্য ছাড়া খেলে, তোমার প্রতিপালক ক্ষমাশীল, দয়ালু।

এই তালিকায় গৃহপালিত গাধা, দাঁতওয়ালা শিকারি পশু বা নখরওয়ালা পাখির নাম নেই। পরবর্তী হাদিসভিত্তিক বিধানে এসবের নিষেধ এসেছে। ফলে খাবারের একটি কার্যকর নিষেধতালিকা জানতে শুধু আয়াতের উল্লিখিত শ্রেণিগুলো চেনাই যথেষ্ট হয় না; মুসহাফের বাইরের নিষেধও জানতে হয়। “আমার কাছে যে ওহি এসেছে” কথার সঙ্গে সুন্নাহকে দ্বিতীয় ওহি করার ধারণা যুক্ত হলে অতিরিক্ত বিধানের এই পথ বৈধতা পায়।

বুখারিতে জাবিরের বর্ণনায় খাইবারের দিনে গাধার মাংসে নিষেধ এবং ঘোড়ার মাংসে অনুমতির কথা আছে। একটি প্রাণীর ক্ষেত্রে নিষেধ ও অন্যটির ক্ষেত্রে ছাড় একই বক্তব্যে সংরক্ষিত। খাদ্যের শ্রেণিগুলোকে আলাদা করে নতুন বিধান দেওয়ার নির্দিষ্ট দৃষ্টান্ত এটি। [1048]

نَهَى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ خَيْبَرَ عَنْ لُحُومِ الْحُمُرِ، وَرَخَّصَ فِي لُحُومِ الْخَيْلِ

বাংলা অনুবাদ: খাইবারের দিনে নবী গাধার মাংস নিষেধ করেছেন এবং ঘোড়ার মাংসের অনুমতি দিয়েছেন।

মুসলিমে ইবন আব্বাসের নামে সংকলিত আরেক বর্ণনায় দাঁতওয়ালা শিকারি পশুর পাশাপাশি নখরওয়ালা পাখিও নিষেধের অন্তর্ভুক্ত। এটি শূকর বা মৃত প্রাণীর অর্থ ব্যাখ্যা করার বাক্য নয়; নতুন প্রাণীগোষ্ঠীর ওপর নিষেধ আরোপের বক্তব্য। কোন খাদ্য খাওয়া বৈধ, তার ব্যবহারিক সীমা কোরআনিক তালিকার বাইরেও বিস্তৃত হচ্ছে। [1049]

نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ كُلِّ ذِي نَابٍ مِنَ السِّبَاعِ وَعَنْ كُلِّ ذِي مِخْلَبٍ مِنَ الطَّيْرِ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর রসুল দাঁতওয়ালা প্রত্যেক শিকারি পশু এবং নখরওয়ালা প্রত্যেক পাখি নিষেধ করেছেন।

খাদ্যের শ্রেণিআনআম ৬:১৪৫-এ অবস্থাহাদিস ও ব্যাখ্যার স্তর
মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত, শূকরের মাংসসরাসরি তালিকায় রয়েছেনিষিদ্ধ শ্রেণির পরিচয় আয়াতেই আছে
আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গআয়াতে উল্লেখিতউৎসর্গের ধর্মীয় পরিচয় নিষেধের ভিত্তি
গৃহপালিত গাধাওই তালিকায় নাম নেইখাইবারের নিষেধের বর্ণনা ব্যবহৃত
দাঁতওয়ালা শিকারি পশু ও নখরওয়ালা পাখিওই তালিকায় নামে অন্তর্ভুক্ত নয়মুসলিমের বর্ণনায় অতিরিক্ত নিষিদ্ধ শ্রেণি
ঘোড়াওই তালিকায় নাম নেইখাইবারের বর্ণনায় অনুমতি আলাদাভাবে বলা হয়েছে

বুখারির আরেকটি বর্ণনায় নিষেধের খবর এবং আয়াতের তালিকার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে সাহাবি-পর্যায়ের ভিন্ন প্রতিক্রিয়াও পাওয়া যায়। জাবির ইবনে যায়েদকে গৃহপালিত গাধার নিষেধের কথা বলা হলে তিনি হাকাম ইবনে আমর আল-গিফারির সেই বক্তব্যের উল্লেখ করেন; পাশাপাশি ইবন আব্বাস তা মানেননি বলে আনআমের আয়াত পড়ার কথা জানান। বর্ণনার শেষাংশ: [1050]

وَلَكِنْ أَبَى ذَاكَ الْبَحْرُ ابْنُ عَبَّاسٍ وَقَرَأَ ‏‏{‏قُلْ لاَ أَجِدُ فِيمَا أُوحِيَ إِلَىَّ مُحَرَّمًا‏}‏

বাংলা অনুবাদ: কিন্তু সেই জ্ঞানসমুদ্র ইবন আব্বাস তা মানেননি এবং পড়েছেন: “বলো, আমার কাছে যে ওহি এসেছে তাতে নিষিদ্ধ কিছু পাই না।”

এখানে তালিকার ভাষা শুধু পরবর্তী আইনজ্ঞের আলোচ্য হয়নি; নিষেধের সংবাদের বিপরীতে আয়াত পাঠ করার একটি প্রাচীন বিবরণও সংরক্ষিত। কার কাছে কোন সংবাদ পৌঁছেছে এবং তিনি আয়াতের সঙ্গে তার সম্পর্ক কীভাবে বিচার করেছেন, তার প্রভাব খাদ্যবিধানে পড়েছে। ইবন আব্বাসের নামে সংরক্ষিত এই প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তী নিষেধ প্রতিষ্ঠাকারী বর্ণনাগুলো একই পাঠসমাজের ভিন্ন অবস্থান বহন করে। নিষেধতালিকার কার্যকর আকার গড়ে উঠেছে সেই ভিন্ন অবস্থানগুলোর মধ্য থেকে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে।

ইবনে কাসীরের ব্যাখ্যায় পরবর্তী নিষেধের আয়াত ও হাদিসকে এই আয়াতের উপলব্ধ পরিসর তুলে দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, কেউ তাকে নসখ বলেন, আর পরবর্তী বহু আলেম মূল অনুমোদিত অবস্থা অপসারণ বলে আলাদা নামে বিচার করেন। মতভেদটি নিষেধের নতুন পরিসর এসেছে কি না থেকে তার শাস্ত্রীয় পরিচয় কী, সেই জায়গায় পৌঁছায়। তাঁর বাক্য: [1051]

ومن الناس من يسمي ذلك نسخا ، والأكثرون من المتأخرين لا يسمونه نسخا

বাংলা অনুবাদ: কেউ কেউ একে নসখ বলেন; পরবর্তী অধিকাংশ আলেম একে নসখ বলেন না।

পরিভাষার এই পার্থক্যের মধ্যেও অনুসারীর সামনে একই ব্যবহারিক প্রশ্ন থাকে: আজ কোন খাবার খাওয়া নিষিদ্ধ? একটি সময়ের ওহিতে নিষিদ্ধ কিছু না পাওয়ার ঘোষণা পরবর্তী সব নিষেধের পূর্ণ তালিকা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। নতুন নির্দেশের সময়ক্রম এবং তার গ্রহণযোগ্যতা জানতে হচ্ছে। ফলে খাদ্যবিধানের ক্ষেত্রে সংশোধিত তালিকার একটি অংশ কোরআনের আয়াতে, অন্য অংশ হাদিসে সংরক্ষিত।

নতুন প্রাণীগোষ্ঠী নিষিদ্ধ করা আগের শব্দের উচ্চারণ বা বানান সংশোধন নয়। মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের ওপর অতিরিক্ত ধর্মীয় সীমা আরোপ। কোন মাংস খাওয়া নিষেধ লঙ্ঘন হবে, সেই সীমানা হাদিসে বাড়তে পারে—এই অধিকার স্বীকার করেই প্রচলিত আইন গঠিত হয়েছে। কোরআনের সীমিত ঘোষণার সামনে শেষ পর্যন্ত পরবর্তী বর্ণিত বিধানও বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়; কার্যকর হালাল–হারাম নির্ধারণে সেই অতিরিক্ত উৎসকে বাদ দেওয়া যায় না।


রজম: নুরের বেত্রাঘাতের বিধানে নতুন শ্রেণি ও মৃত্যুদণ্ড

নুর ২৪:২-এ ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারীর প্রত্যেককে একশ বেত্রাঘাতের নির্দেশ রয়েছে। আয়াতের ওই বাক্যে বিবাহিত ও অবিবাহিতের আলাদা শ্রেণি লেখা নেই। প্রচলিত ফিকহে সেই সাধারণ ভাষার প্রয়োগ সীমিত করা হয়েছে; নির্দিষ্ট শর্তে মুহসান হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তির জন্য রজম বা পাথর মেরে হত্যার বিধান কার্যকর হয়। একই অপরাধের ক্ষেত্রে শরীরে আঘাতের শাস্তি এবং জীবন শেষ করে দেওয়ার শাস্তির বিভাজন তাই মুসহাফের ওই বাক্য পড়েই পাওয়া যায় না। শ্রেণি নির্ধারণে হাদিস ও তার আইনগত ব্যাখ্যা প্রয়োজন হয়।

কুরতুবী নুরের আয়াত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একশ বেত্রাঘাতকে প্রাপ্তবয়স্ক স্বাধীন বকর নারী–পুরুষের বিধান হিসেবে নির্দিষ্ট করেছেন। “বকর” ও “মুহসান” ফিকহি পরিচয়; মুহসানের পরিচয়ের সঙ্গে বৈধ দাম্পত্যে সহবাসসহ আরও শর্ত যুক্ত থাকে। তাঁর সংকলিত প্রধান অবস্থানে স্বাধীন মুহসান ব্যক্তির জন্য বেত্রাঘাতের পরিবর্তে রজম রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বাক্য: [1052]

وأما المحصن من الأحرار فعليه الرجم دون الجلد

বাংলা অনুবাদ: স্বাধীন ব্যক্তিদের মধ্যে মুহসানের জন্য বেত্রাঘাত ছাড়াই রজম রয়েছে।

এখানে আয়াতের নির্দেশকে শুধু সহজ ভাষায় পুনরুক্ত করা হয়নি। আয়াতের সাধারণ অপরাধী-পরিচয়ের ভেতরে আরেকটি শ্রেণি তৈরি করে তার জন্য ভিন্ন দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। বেত্রাঘাতের নির্দেশ পৃষ্ঠায় রয়ে যায়; কিন্তু মুহসান ব্যক্তির ওপর সেই নির্দেশ প্রয়োগের বদলে মৃত্যুদণ্ড দাবি করা হয়। কোন পরিচয়ের কারণে একটি মানুষ বেঁচে থেকে শারীরিক শাস্তি পাবেন এবং কোন পরিচয়ে তাঁর জীবন নেওয়া হবে, সেই পার্থক্য অতিরিক্ত বিধান ও সংজ্ঞার ওপর দাঁড়ায়।

কুরতুবীর একই আলোচনায় আরেক মতও আছে: একশ বেত্রাঘাত দেওয়ার পরে রজম করা হবে। তিনি ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ, হাসান বসরি এবং আলীর আমলের সঙ্গে এই অবস্থানের সম্পর্ক উল্লেখ করেছেন। এই মতে সুন্নাহ আগের শাস্তি সরায় না, বরং তার সঙ্গে আরও শাস্তি যোগ করে। তাঁর সংক্ষিপ্ত বাক্য: [1053]

ومن قال بالجلد مع الرجم قال : السنة جاءت بزيادة حكم فيقام مع الجلد

বাংলা অনুবাদ: যাঁরা বেত্রাঘাতের সঙ্গে রজম বলেন, তাঁরা বলেছেন: সুন্নাহ অতিরিক্ত বিধান এনেছে, তাই বেত্রাঘাতের সঙ্গে সেটিও কার্যকর হবে।

ফিকহি শ্রেণি বা মতবেত্রাঘাতের সঙ্গে সম্পর্ককার্যকর শাস্তির ফল
স্বাধীন প্রাপ্তবয়স্ক বকরনুরের আয়াতের নির্দিষ্ট প্রয়োগ হিসেবে গৃহীতএকশ বেত্রাঘাত; নির্বাসন নিয়ে পৃথক মতভেদ
মুহসান সম্পর্কে প্রধান মতবেত্রাঘাতের বদলে রজমমৃত্যুদণ্ড
মুহসান সম্পর্কে সম্মিলিত দণ্ডের মতকোরআনিক বেত্রাঘাতের সঙ্গে অতিরিক্ত বিধানএকশ বেত্রাঘাতের পরে মৃত্যুদণ্ড
দাসী সম্পর্কে উল্লিখিত কোরআনিক অর্ধদণ্ডনিসা ৪:২৫-এর অন্য শ্রেণি ব্যবহারপঞ্চাশ বেত্রাঘাত; স্বাধীনতার পরিচয়ে দণ্ডের পার্থক্য

প্রথম দুই মতের পার্থক্য নামমাত্র নয়। একটি মতে বেত্রাঘাত আর কার্যকর হচ্ছে না; অন্য মতে সেটি বহাল রেখে হত্যাও যুক্ত হচ্ছে। অতিরিক্ত বর্ণনা কোন কাজ করছে—আয়াতের একটি শ্রেণি আলাদা করছে, আগের শাস্তি সরাচ্ছে, না তার সঙ্গে নতুন শাস্তি বসাচ্ছে—এই ব্যাখ্যা দণ্ডিত মানুষের শরীরে সরাসরি বাস্তবায়িত হয়। একই মুসহাফের সামনে দাঁড়িয়েও শাস্তির সংখ্যা ও ধরন সম্পর্কে পৃথক ফল পাওয়া যায়।

সায়রাফির বক্তব্য উদ্ধৃত করে যরকাশি এমন একটি ব্যাখ্যাও সংরক্ষণ করেছেন, যেখানে রজমকে কোরআনিক বেত্রাঘাতের নসখ নামে বিচার করার বদলে সুন্নাহর মাধ্যমে উদ্দেশ্য প্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সুন্নাহর জন্য নির্ধারিত ভূমিকাটি তাঁর ভাষায় ব্যাখ্যা ও উদ্দেশ্যের সংবাদ দেওয়া। এই পরিচয়ের অধীনেই আয়াতের কোন অংশ কার ক্ষেত্রে কার্যকর, তা স্থির করা হচ্ছে। [1054]

فحظ السنة البيان والإخبار عن المراد

বাংলা অনুবাদ: সুন্নাহর ভূমিকা হলো ব্যাখ্যা দেওয়া এবং উদ্দেশ্য কী, তার সংবাদ দেওয়া।

“উদ্দেশ্য” নির্ধারণের এই ক্ষমতাই মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠিন ফল সৃষ্টি করে। প্রকাশিত বাক্যে যে শাস্তি আছে, তা সবার জন্য উদ্দেশ্য নয়—এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে একটি শ্রেণির জন্য অন্য শাস্তি বসানোর পথ তৈরি হয়। কোরআনের সাধারণ বাক্যের পাশে সেই শ্রেণিবিভাগ লিখিত না থাকলেও পরবর্তী ধর্মীয় আইন সেটিকে বাধ্যতামূলক করে। ব্যক্তির বিরুদ্ধে কেবল অপরাধের প্রমাণ নয়, তাঁকে কোন শ্রেণিতে রাখা হবে—তাও তখন জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়।

রজমের ক্ষেত্রে মুসহাফে অনুপস্থিত একটি সাবেক আয়াতের দাবিও রয়েছে। উমরের ঘোষণা ও অনুপস্থিত রজম-পাঠের বর্ণনা সেই দাবির দলিল বহন করে। নুরের আয়াতের প্রয়োগ নির্ধারণে এই অনুপস্থিত পাঠের সংবাদ ও মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত আমল একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়। ফলে শুধু উপস্থিত আয়াতের অর্থ ব্যাখ্যাই নয়, অনুপস্থিত ঐশী বক্তব্যের আইনগত কার্যকারিতাও সিদ্ধান্তে প্রবেশ করে।

এই অবস্থায় ধর্মীয় উৎসের স্তরবিন্যাস মানুষের জীবন নেওয়ার ক্ষমতার স্তরবিন্যাসে পরিণত হয়। আয়াতে পড়া একটি দণ্ডের বাইরে আরেক দণ্ড গ্রহণ করা হবে কি না, কোন বর্ণনা তা প্রমাণ করে এবং কোন ব্যাখ্যায় আগের দণ্ড বহাল বা অকার্যকর হবে—সবকিছু স্থির করতে হয়। রজমকে ধর্মীয়ভাবে বৈধ ঘোষণা করা এই প্রশ্নগুলো বিলুপ্ত করে না; বরং যে মানুষগুলোর ওপর সেই অপরিবর্তনীয় দণ্ড কার্যকর হবে, তাঁদের জীবনের মূল্য ওই প্রমাণ ও ব্যাখ্যার রায়ের অধীন করে।

নুরের বেত্রাঘাতের ভাষা অপরিবর্তিত রেখে রজম প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্তে তাই সুন্নাহর ক্ষমতার ব্যাপ্তি স্পষ্ট। তার কাজ শুধু আচার সম্পাদনের পদ্ধতি পূর্ণ করা নয়। অতিরিক্ত বিধান এবং তার শাস্ত্রীয় সম্পর্ক নির্ধারণের মাধ্যমে শাস্তির প্রকৃতি বদলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। “আয়াত গ্রন্থে আছে” এবং “আয়াতে লেখা শাস্তিই চূড়ান্ত”—এই দুই অবস্থার ব্যবধান এখানে মানুষের প্রাণ দিয়ে পরিমাপ করা হয়।


ধর্মত্যাগ: কোরআনের বক্তব্যের বাইরে হাদিসে পার্থিব দণ্ড

ধর্মত্যাগের ক্ষেত্রে কোরআনের বক্তব্য ও হাদিসভিত্তিক পার্থিব দণ্ডের সম্পর্ক ব্যক্তির বিশ্বাস পরিবর্তনের অধিকারকে সরাসরি আক্রান্ত করে। বাকারা ২:২১৭-এ ধর্মত্যাগ করে অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুর ফল বলা হয়েছে; নিসা ৪:১৩৭-এ বিশ্বাস–অবিশ্বাসে একাধিকবার যাতায়াতের কথা আছে। এসব বক্তব্যের পাশে প্রচলিত আইনে ধর্মত্যাগীর মৃত্যুদণ্ড এসেছে হাদিসের মাধ্যমে। ধর্মীয় অপরাধের বিচার এবং পৃথিবীতে তার জন্য মানুষের জীবন নেওয়ার অধিকার—এই দুটি সিদ্ধান্তের মধ্যে অতিরিক্ত উৎসটি সেতু তৈরি করেছে।

বাকারা ২:২১৭-এ ধর্মত্যাগের পরিণতি হিসেবে দুনিয়া ও আখিরাতে আমল ব্যর্থ হওয়া এবং জাহান্নামের কথা রয়েছে। অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুর শর্ত যুক্ত হয়েছে; এই বাক্য কোনো বিচারককে ধর্মত্যাগীকে হত্যা করার নির্দিষ্ট নির্দেশ দেয় না। সংশ্লিষ্ট অংশ: [1055]

وَمَن يَرْتَدِدْ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُولَٰئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۖ وَأُولَٰئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের মধ্যে যে নিজের ধর্ম থেকে ফিরে যাবে এবং কাফির অবস্থায় মারা যাবে, তাদের কাজ দুনিয়া ও আখিরাতে ব্যর্থ হবে। তারাই আগুনের অধিবাসী; তারা তাতে স্থায়ী থাকবে।

নিসা ৪:১৩৭-এর ধারাটি আরও ভিন্ন: বিশ্বাস, অবিশ্বাস, আবার বিশ্বাস, আবার অবিশ্বাস এবং শেষে অবিশ্বাসে অগ্রসর হওয়া। আয়াতের ভাষায় এই একাধিক অবস্থান্তরের কথা বলা হয়েছে; পরিণতি হিসেবে ক্ষমা ও পথপ্রাপ্তি না হওয়ার ঘোষণা আছে। বিশ্বাস পরিবর্তনের এই বিবরণের বাক্যে প্রথম প্রস্থানেই রাষ্ট্রীয় মৃত্যুদণ্ডের আদেশ লেখা নেই। [1056]

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا ثُمَّ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا ثُمَّ ازْدَادُوا كُفْرًا لَّمْ يَكُنِ اللَّهُ لِيَغْفِرَ لَهُمْ وَلَا لِيَهْدِيَهُمْ سَبِيلًا

বাংলা অনুবাদ: যারা বিশ্বাস করল, পরে অবিশ্বাস করল, আবার বিশ্বাস করল, আবার অবিশ্বাস করল এবং এরপর অবিশ্বাসে আরও অগ্রসর হলো—আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন না এবং তাদের পথও দেখাবেন না।

পার্থিব হত্যার সংক্ষিপ্ত নির্দেশটি বুখারিতে ইবন আব্বাসের বক্তব্যের মধ্যে পাওয়া যায়। আলীর আগুনে শাস্তি দেওয়ার খবরের প্রতিক্রিয়ায় তিনি হত্যার পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি করেন, কিন্তু মুহাম্মদের নির্দেশের ভিত্তিতে তাঁদের হত্যা করার কথাই বলেন। মূল দণ্ডের পক্ষে ব্যবহৃত বাক্য: [1057]

مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ

বাংলা অনুবাদ: যে তার ধর্ম পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা করো।

এই সূত্রে আপত্তি শাস্তির আগুন ব্যবহারে; ধর্ম পরিবর্তনকারীর জীবন নেওয়ার অধিকার বহাল রাখা হয়েছে। ফলে কোনো বর্ণনায় সহিংস পদ্ধতির বিরোধ থাকলেও তার অর্থ মৃত্যুদণ্ডের বিরোধ হয়ে যায় না। বিভিন্ন নির্দেশের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণ করে কোন পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য হত্যার পদ্ধতি, সেই ফল পাওয়া যায়। ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তন পৃথিবীতে তাঁর জীবন শেষ করার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বাকারা ২:২৫৬-এর “ধর্মে জবরদস্তি নেই” কথাকে এই দণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে ইসলামকিউএ আয়াতটির পরিসর সংকুচিত করেছে। তাদের ব্যাখ্যায় যে আগে ইসলাম গ্রহণ করেনি, তাকে প্রবেশ করানোর জবরদস্তি নিষিদ্ধ; প্রবেশের পরে বের হতে চাওয়া ব্যক্তি সেই অবকাশের অন্তর্ভুক্ত নয়। ইবন আশুরের বক্তব্যে এই ব্যবস্থাকে ইসলামেই থেকে যাওয়ার জন্য জবরদস্তি বলা হয়েছে। নির্দিষ্ট স্বীকারোক্তিটি: [1058]

وَأَمَّا هَذَا فَهُوَ مِنِ الْإِكْرَاهِ عَلَى الْبَقَاءِ فِي الْإِسْلَام

বাংলা অনুবাদ: এটি হলো ইসলামে থেকে যাওয়ার জন্য জবরদস্তি।

ব্যক্তির অবস্থাউদ্ধৃত শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় অবস্থানস্বাধীনতার ওপর ফল
ইসলামে প্রবেশ করেনিইসলামকিউএর সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যায় প্রবেশ করানোর জবরদস্তির বাইরেপ্রবেশ না করার অবকাশ
ইসলাম গ্রহণের পরে বের হতে চায়ধর্মত্যাগীর দণ্ডের অধীনপ্রাণের ভয় ও ধর্মে ফেরার চাপ
জন্মসূত্রে মুসলমান হিসেবে গণ্যপিতা–মাতার ধর্মীয় পরিচয় তার ওপর আরোপিতনিজে আগে স্বাধীনভাবে বেছে না নিলেও পরে ধর্মত্যাগের প্রশ্ন
হানাফি আলোচনায় ধর্মত্যাগী নারীসাধারণ অবস্থায় হত্যা নয়, বন্দিত্ব ও ধর্মে ফেরানোর বাধ্যবাধকতাদণ্ডের ধরন বদলায়; মুক্তভাবে বের হওয়ার অধিকার আসে না

ইবন আশুর এই দণ্ডের পক্ষে এমন সামাজিক কাজও উল্লেখ করেছেন: কেউ ধর্ম ছেড়ে গেলে অন্যদেরও বের হওয়ার পথ খুলতে পারে; মৃত্যুর ভয় সেই প্রবণতা ঠেকায়। অর্থাৎ ধর্মীয় গোষ্ঠীর সদস্যসংখ্যা ও আনুগত্য ধরে রাখার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যার মধ্যেই প্রকাশিত। স্বাধীনভাবে বিশ্বাসের সত্যতা বিচার করে সম্পর্ক শেষ করার সিদ্ধান্তকে এখানে গোষ্ঠীর জন্য ক্ষতিকর কাজ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দণ্ডের মাধ্যমে সেই প্রস্থানের মূল্য মানুষের জীবনের সমান করে দেওয়া হয়।

জন্মসূত্রে মুসলমানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠোর। ইসলামকিউএ জানিয়েছে, মুসলমান পিতা–মাতার সন্তান তাঁদের অনুসারী হিসেবে মুসলমান গণ্য হয়; সাবালক হওয়ার পরে ধর্ম ত্যাগের প্রশ্নও তাদের আলোচনায় ধর্মত্যাগের বিধানের অধীনে আসে। এখানে কোনো প্রাপ্তবয়স্কের আগে স্বাধীনভাবে ধর্ম বেছে নেওয়া বাধ্যতামূলক পূর্বশর্ত নয়। জন্মের সঙ্গে পাওয়া পরিচয় পরবর্তী বিশ্বাসের ওপর দায় তৈরি করে। তাদের ব্যবহৃত সংক্ষিপ্ত বাক্য: [1059]

أطفال المسلمين تبع لوالديهم المسلمين

বাংলা অনুবাদ: মুসলমানদের সন্তানেরা তাদের মুসলমান পিতা–মাতার অনুসারী।

নারীর দণ্ড নিয়ে হানাফি অবস্থানে ইবনে হুমামের ফাতহুল কাদির ভিন্ন ফল দেখায়। সেখানে নারীকে সাধারণভাবে হত্যার বদলে মুসলমান হওয়া অথবা মৃত্যু পর্যন্ত বন্দী রাখার কথা রয়েছে। পুরুষের যুদ্ধসক্ষমতা ও নারীর অবস্থান সম্পর্কে তাঁদের ধারণা দিয়ে এই শ্রেণিভেদ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকৃত যুদ্ধের নির্দিষ্ট ঘটনাকে সবার একমাত্র শর্ত করা হয়নি; লিঙ্গভিত্তিক সক্ষমতার ধারণা দিয়ে দণ্ডের শ্রেণি স্থির করা হয়েছে। গ্রন্থের বক্তব্য: [1060]

وأما المرتدة فلا تقتل ولكن تحبس أبدا حتى تسلم أو تموت

বাংলা অনুবাদ: ধর্মত্যাগী নারীকে হত্যা করা হবে না; বরং সে ইসলাম গ্রহণ করা অথবা মারা যাওয়া পর্যন্ত চিরস্থায়ীভাবে বন্দী থাকবে।

বন্দিত্বের এই ব্যবস্থা ধর্মীয় স্বাধীনতা দেয় না। একজন নারী তাঁর বিশ্বাসের পরিবর্তন প্রকাশ করেছেন বলে তাঁকে আটক রাখা হবে, এবং সেই আটক শেষ করার শর্ত হিসেবে আবার ইসলাম গ্রহণকে বসানো হচ্ছে। একই আলোচনায় ধর্মে ফেরানোর জন্য প্রহারসংক্রান্ত মতও সংরক্ষিত আছে। হত্যার বদলে বন্দিত্বের পরিচয় বদলালেও ব্যক্তির বিবেকের ওপর বলপ্রয়োগের প্রকৃতি বহাল থাকে। বিশ্বাসের সত্যতা সম্পর্কে তাঁর সিদ্ধান্তকে আইনগতভাবে অসহনীয় ঘোষণা করা হয়।

ধর্মত্যাগের দৃষ্টান্তে সুন্নাহভিত্তিক আইন কোরআনের কিছু ধর্মীয় পরিণতির পাশে পৃথিবীতে প্রয়োগযোগ্য একটি অতিরিক্ত দণ্ড প্রতিষ্ঠা করেছে। এরপর আইনজ্ঞরা ব্যক্তির পরিচয়, সাবালকত্ব, লিঙ্গ ও প্রত্যাবর্তনের অবস্থার ভিত্তিতে তার প্রয়োগ নির্ধারণ করেছেন। “জবরদস্তি নেই” বাক্যটি গ্রন্থে থেকে গেছে, অথচ ধর্ম থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে জবরদস্তিকে ব্যাখ্যাকারীরাই স্বীকার ও অনুমোদন করেছেন। পাঠের উপস্থিতি আর ব্যক্তির কার্যকর অধিকার যে এক নয়, এই ঘটনা তার নির্মম দৃষ্টান্ত।


মুসহাফে অনুপস্থিত সাবেক পাঠ ও বিধানের ভাণ্ডার হিসেবে হাদিস

হাদিসের কর্তৃত্ব বর্তমান কোরআনিক আয়াতের অর্থ নির্ধারণেই সীমাবদ্ধ নয়। কোনো বাক্য একসময় কোরআন ছিল, পরে তার পাঠ উঠে গেছে, অথচ তার বিধান কার্যকর রয়েছে—এই সম্পূর্ণ ইতিহাসও বর্ণনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন হাদিস একই সঙ্গে অতীতের পাঠের সাক্ষ্য এবং বর্তমান আইনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। মুসহাফে অনুপস্থিত একটি নির্দেশকে ঐশী আইন হিসেবে বহাল রাখার জন্য অনুসারীকে সেই অনুপস্থিত নির্দেশের সংবাদদাতাদের ওপর নির্ভর করতে হয়। গ্রন্থে বাক্যটি না থাকলেও আইনগত বাধ্যবাধকতা তাঁদের বর্ণনার মধ্য দিয়ে উপস্থিত থাকে।

রজমের ক্ষেত্রে উমরের ভাষণে নাজিল হওয়া, পাঠ করা, বোঝা এবং শাস্তি প্রয়োগ করার পৃথক দাবি রয়েছে। পাঠের অনুপস্থিতির পাশে বহাল মৃত্যুদণ্ড সেই দাবির আইনগত ফল। বর্তমান মুসহাফ খুলে শাস্তিটির কথিত সাবেক আয়াত পাওয়া যায় না; সেটি আগে ছিল বলে জানার পথ উমরের নামে সংরক্ষিত সংবাদ। আদালত যখন এই অনুপস্থিত পাঠের বিধান কার্যকর করে, তখন মুসহাফে দৃশ্যমান কোনো বাক্য থেকে সেই বিধান উদ্ধার করছে না। অনুপস্থিত বাক্য সম্পর্কে গৃহীত বর্ণনা এবং তার আইনগত ব্যাখ্যাকে কার্যকর করছে।

দুধপানের ক্ষেত্রে সংবাদটি আরও কয়েকটি সিদ্ধান্ত একসঙ্গে বহন করে। দশবার থেকে পাঁচবারে পরিবর্তন, মুহাম্মদের মৃত্যুর সময়ও কোরআন হিসেবে পাঠ হওয়ার বক্তব্য এবং পাঠ সরিয়ে নেওয়া ও বিধান বহাল থাকার পরবর্তী ব্যাখ্যা একই ইতিহাসের ভিন্ন স্তর। দুধমায়ের সঙ্গে বিবাহ নিষেধের সাধারণ বিধান থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক দুধপানের শর্ত আপনা-আপনি পাওয়া যায় না। সেই সংখ্যা গ্রহণ করা হবে কি না এবং গ্রহণ করলে বিবাহের সম্পর্ক কোথায় নিষিদ্ধ হবে—এগুলো বর্ণনা ও ফিকহি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। হাদিসে সংরক্ষিত অতীতের পাঠ এভাবে বর্তমান পরিবারের বৈধতার প্রশ্নে কাজ করে।

বর্ণিত সাবেক পাঠবর্তমান মুসহাফের সঙ্গে সম্পর্কবর্ণনার মাধ্যমে বহন করা দাবিআইনগত ফল
রজমের পাঠপ্রচলিত মুসহাফে নেইআগে নাজিল ও পঠিত হয়েছিল; শাস্তি প্রয়োগ করা হয়েছিলপাঠের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও রজম বহাল রাখার ভিত্তি
দশবার ও পাঁচবার দুধপানের পাঠসংখ্যাসংবলিত ওই বাক্যগুলো মুসহাফে নেইদশের পরিবর্তে পাঁচ; শেষ পর্যায়ের পাঠ সম্পর্কে আয়েশার সংবাদনির্দিষ্ট সংখ্যার ভিত্তিতে দুধসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মত
বীরে মাউনার নিহতদের সম্পর্কে পাঠবর্তমান মুসহাফে নেইকোরআন হিসেবে পাঠ এবং পরে তুলে নেওয়ার সংবাদরজমের মতো বহাল দণ্ডের দাবি নেই; অতীতের পাঠের সংবাদ
আবু মুসার স্মরণে অনুপস্থিত সূরার অংশস্মরণে থাকা বাক্য বর্তমান সূরারূপে নেইএকসময় পাঠ করা এবং অবশিষ্টাংশ ভুলে যাওয়ার বিবরণঅনুপস্থিত পাঠের পরিসর সম্পর্কে বর্ণনামূলক সাক্ষ্য

এই দৃষ্টান্তগুলোতে অনুপস্থিতি একটি অভিন্ন ঘটনা হলেও তার সঙ্গে যুক্ত দাবি অভিন্ন নয়। বীরে মাউনার বাক্যের সংবাদে পূর্বে পাঠ ও পরে অপসারণের কথা রয়েছে; তা দিয়ে রজমের মতো কোনো বহাল শাস্তি নির্ধারণ করা হয় না। আবু মুসার স্মৃতিবিবরণে আবার ভুলে যাওয়া এবং কিছু অংশ মনে থাকার বিষয়টি মুখ্য। কাজেই সাবেক পাঠের সংবাদ থেকে বর্তমান আইন পাওয়ার জন্য আরও একটি স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত প্রয়োজন: ওই পাঠের হুকুম এখনো বহাল কি না। যে বর্ণনা অতীতের শব্দ জানায়, সেই বর্ণনা অথবা তার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যাই পরবর্তী সময়ে বিধানের মেয়াদও নির্ধারণ করে।

বর্ণনা থেকে আইন গ্রহণের পেছনে নিশ্চিত জ্ঞান ও বাধ্যতামূলক করণীয়কে আলাদা করার নীতিও কাজ করে। নববি সহিহ মুসলিমের ভূমিকায় বিশ্বস্ত একক সংবাদ সম্পর্কে সংখ্যাগরিষ্ঠের অবস্থান উল্লেখ করেছেন: তা শরিয়তি দলিল এবং অনুসরণ আবশ্যক, কিন্তু নিজে নিশ্চিত জ্ঞান দেয় না। তাঁর ব্যবহৃত “যন্ন” সম্ভাবনাপ্রবণ জ্ঞানকে বোঝায়; এখানে তা নিশ্চিত জ্ঞানের বিপরীতে এসেছে। উদ্ধৃত অবস্থান: [1061]

أَنَّ خَبَرَ الْوَاحِدِ الثِّقَةِ حُجَّةٌ مِنْ حُجَجِ الشَّرْعِ يَلْزَمُ الْعَمَلُ بِهَا ، وَيُفِيدُ الظَّنَّ وَلَا يُفِيدُ الْعِلْمَ

বাংলা অনুবাদ: বিশ্বস্ত ব্যক্তির একক সংবাদ শরিয়তের দলিলগুলোর একটি; তা অনুযায়ী কাজ করা আবশ্যক। তা সম্ভাব্য জ্ঞান দেয়, নিশ্চিত জ্ঞান দেয় না।

এই নীতিতে কোনো বিধান কার্যকর করার জন্য প্রতিটি বর্ণনার নিশ্চিত ঐতিহাসিক সত্যতা প্রতিষ্ঠা করা পূর্বশর্ত থাকে না। গ্রহণযোগ্যতার নির্ধারিত মান পূরণ করলেই বর্ণনা করণীয়ের ভিত্তি হতে পারে। ফলে কোনো সংবাদকে আমলের দলিল বলা এবং তার মাধ্যমে অতীতের প্রতিটি বিবরণকে সন্দেহাতীত ইতিহাস বলা দুটি পৃথক দাবি। প্রথমটির অনুমোদন দিয়ে দ্বিতীয়টির নিশ্চয়তা তৈরি হয় না। ধর্মীয় বিধান মানার বাধ্যবাধকতা এই ব্যবস্থায় সংবাদটির জ্ঞানগত অনিশ্চয়তা দূর না করেও প্রতিষ্ঠা করা যায়।

সাবেক কোরআনিক পাঠের দাবিতে এর প্রভাব বিশেষভাবে গভীর। একটি বর্ণনা গ্রহণের ফলে অনুসারী একই সঙ্গে বিশ্বাস করতে পারেন যে বাক্যটি একসময় আল্লাহর বাণী ছিল এবং তার অনুপস্থিত বিধান এখনো তাঁর ওপর বাধ্যতামূলক। বর্ণনাটি বাদ দিলে ওই নির্দিষ্ট বাক্যের ঐশী অতীত ও বহাল আইনের মধ্যে সংযোগটিও হারায়। পরবর্তী ফিকহগ্রন্থে সংবাদটি যতবার উদ্ধৃত হোক, একই সংবাদ পুনরুৎপাদন নিজে নতুন মুসহাফসাক্ষ্য তৈরি করে না। তার বিস্তৃত গ্রহণপরম্পরা তৈরি হয়; মূল পাঠসংবাদের উৎস আলাদাভাবে শনাক্তই থাকে।

মুসহাফের সীমানা আর ধর্মীয় আইনের সীমানা এখানে স্পষ্টভাবে পৃথক হয়ে যায়। কোরআন হিসেবে এখন যা তিলাওয়াত করা হয়, তার বাইরেও সাবেক কোরআনের নামে আইন বহাল থাকতে পারে। পাঠ রহিত কিন্তু বিধান বহাল শ্রেণিটি এই অবস্থাকে শাস্ত্রীয় পরিচয় দেয়। অনুসারীকে তখন শুধু সংরক্ষিত মুসহাফ মানতে বলা হচ্ছে না; মুসহাফে অনুপস্থিত একটি ঐশী নির্দেশ সম্পর্কে গৃহীত ঐতিহাসিক বর্ণনাও মানতে হচ্ছে। অনুপস্থিতি সেই নির্দেশের কর্তৃত্বের অবসান ঘটায় না; তাকে বহন করার দায়িত্ব মুসহাফ থেকে বর্ণনার ভাণ্ডারে স্থানান্তরিত হয়।

রজমের মৃত্যুদণ্ড কিংবা দুধসম্পর্কে বিবাহের নিষেধের মতো ফলের ক্ষেত্রে এই স্থানান্তর মানুষের জীবন ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক নির্ধারণ করে। অতীতের পাঠ সম্পর্কে কাদের স্মৃতি গ্রহণ করা হয়েছে, সেই স্মৃতির কোন অংশ আইন হিসেবে রাখা হয়েছে এবং কোন পরিবর্তনকে পাঠের অবসান বলা হয়েছে—এসব সিদ্ধান্ত বাস্তব ক্ষমতা বহন করে। দৃশ্যমান গ্রন্থে অনুপস্থিত বাক্যের নামে বর্তমান মানুষকে বাধ্য করার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয় সংবাদ, গ্রহণপরম্পরা এবং আইনজ্ঞের রায়ের সম্মিলিত কর্তৃত্বে।


হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলেমদের রায় ও আয়াতের কার্যকর অর্থ

হাদিসকে আয়াতের ব্যাখ্যা, বিশেষায়ন কিংবা অতিরিক্ত বিধানের ভিত্তি করা হলে কোন হাদিস গ্রহণযোগ্য, সেই সিদ্ধান্ত সরাসরি আইনের দরজা নিয়ন্ত্রণ করে। কোনো বর্ণনা গ্রহণ করলে একটি শর্ত ধর্মীয় কর্তব্যে ঢুকে যায়; সেটি অগ্রহণযোগ্য মনে করলে সেই শর্তের দলিল বাদ পড়ে। তাই “সহিহ” বা “দুর্বল” তকমা কেবল গ্রন্থের পাশে লেখা মূল্যায়ন নয়। ওই মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে মানুষের ইবাদত শুদ্ধ কি না, অতিরিক্ত কাজ বাধ্যতামূলক কি না এবং কোনো নিষেধের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও বদলায়।

ইসলামকিউএ হাদিসের সহিহ–দুর্বল নির্ধারণকে সরাসরি ইজতিহাদের অধীন বলেছে। তাদের ব্যাখ্যায় বর্ণনাকারীর অবস্থা, বর্ণনাপথ, সহায়ক সূত্র এবং ত্রুটি চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে আলেমদের তথ্য ও মূল্যায়ন পৃথক হতে পারে। একই তথ্য পেয়েও তাঁরা ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন। নিজেরাই যে নীতি স্বীকার করেছে, তা হলো: [1062]

تصحيح الحديث وتضعيفه خاضع للاجتهاد

বাংলা অনুবাদ: হাদিসকে সহিহ ও দুর্বল নির্ধারণ করা ইজতিহাদের অধীন।

অজুতে আল্লাহর নাম উচ্চারণের বিধান একটি পরিষ্কার দৃষ্টান্ত। মায়িদা ৫:৬-এ মুখ ও হাত ধোয়া, মাথা মাসেহ এবং পায়ের নির্দেশ রয়েছে। এর সঙ্গে নাম উচ্চারণকে আবশ্যক শর্ত করা হবে কি না, তা নির্ধারণে আলাদা হাদিস ব্যবহৃত হয়েছে। আবু দাউদের বর্ণনায় নাম উচ্চারণ ছাড়া অজু নেই বলা হয়েছে; একই বাক্যের শুরুতে অজু ছাড়া নামাজ নেই। এই নিষেধসূচক ভাষা গ্রহণ ও ব্যাখ্যার ফলেই একটি অতিরিক্ত শর্ত নামাজের গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। [1063]

لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لاَ وُضُوءَ لَهُ وَلاَ وُضُوءَ لِمَنْ لَمْ يَذْكُرِ اسْمَ اللَّهِ تَعَالَى عَلَيْهِ

বাংলা অনুবাদ: যার অজু নেই, তার নামাজ নেই; আর যে অজুর সময় আল্লাহ তাআলার নাম উচ্চারণ করেনি, তার অজু নেই।

তিরমিযী একই বিষয়ের হাদিসের পরে আহমদ ইবনে হাম্বলের মূল্যায়ন সংরক্ষণ করেছেন। তিনি এ বিষয়ে ভালো সনদসম্পন্ন কোনো হাদিস জানেন না বলেছেন। এই বক্তব্য ঐ নির্দেশের সংরক্ষণপথ নিয়ে আপত্তি; বক্তব্যটি মানলে অজুর নতুন আবশ্যক শর্ত প্রতিষ্ঠার প্রমাণও প্রশ্নের মুখে পড়ে। [1064]

لاَ أَعْلَمُ فِي هَذَا الْبَابِ حَدِيثًا لَهُ إِسْنَادٌ جَيِّدٌ

বাংলা অনুবাদ: এই বিষয়ে ভালো সনদসম্পন্ন কোনো হাদিস আমার জানা নেই।

একই তিরমিযী-আলোচনায় ইসহাকের আইনগত সিদ্ধান্তও রয়েছে। তাঁর মতে ইচ্ছাকৃতভাবে নাম উচ্চারণ ছেড়ে দিলে অজু আবার করতে হবে; ভুলে গেলে অথবা কোনো ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ছেড়ে দিলে তা যথেষ্ট হবে। অর্থাৎ নাম উচ্চারণের অবস্থার সঙ্গে ইচ্ছা, বিস্মৃতি ও ব্যাখ্যার কারণও যোগ হয়ে অজুর গ্রহণযোগ্যতার শ্রেণি তৈরি হচ্ছে। [1065]

إِنْ تَرَكَ التَّسْمِيَةَ عَامِدًا أَعَادَ الْوُضُوءَ وَإِنْ كَانَ نَاسِيًا أَوْ مُتَأَوِّلاً أَجْزَأَهُ

বাংলা অনুবাদ: ইচ্ছাকৃতভাবে নাম উচ্চারণ ছেড়ে দিলে সে অজু আবার করবে; আর ভুলে গেলে অথবা কোনো ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ছেড়ে দিলে তার অজু যথেষ্ট হবে।

মূল্যায়ন বা ব্যাখ্যাসূত্রে সংরক্ষিত অবস্থানঅজুর বিধানের সঙ্গে সম্পর্ক
আহমদের সনদমূল্যায়নএই বিষয়ে ভালো সনদসম্পন্ন হাদিস জানেন নানাম উচ্চারণের আবশ্যকতার দলিল নিয়ে সংশয়
আলবানির মূল্যায়নসুন্নাহ ডট কমে আবু দাউদ ১০১-এর পাশে তাঁর রায়: সহিহএকই বিষয়ের নির্দেশ গ্রহণযোগ্য হওয়ার পক্ষে পরবর্তী মূল্যায়ন
ইসহাকের আইনগত সিদ্ধান্তইচ্ছাকৃত বর্জনে পুনরায় অজু; বিস্মৃতি বা ব্যাখ্যায় যথেষ্টব্যক্তির মানসিক অবস্থা অনুসারে ফল পৃথক
অনাবশ্যক মনে করা অবস্থাননাম উচ্চারণ সুন্নত; অজু শুদ্ধ হওয়ার অপরিহার্য শর্ত নয়নাম উচ্চারণ না করলেও অজু বহাল
বাক্যের ভিন্ন অর্থ“অজু নেই” অর্থ পূর্ণাঙ্গ অজু নেইআক্ষরিক বাতিলের বদলে পূর্ণতার অভাব

ইসলামকিউএর অজুবিষয়ক আলোচনায় আবু হানিফা, মালিক, শাফেয়ি এবং আহমদের একটি বর্ণিত মতকে অনাবশ্যকতার পক্ষে রাখা হয়েছে। আহমদের অন্য অবস্থান হিসেবে আবশ্যকতার কথাও সেখানে রয়েছে। অনাবশ্যকতার পক্ষে দুটি আলাদা পথ উল্লেখ করা হয়েছে: হাদিসটিকে দুর্বল মনে করা, অথবা গ্রহণ করলেও “অজু নেই” কথাকে পূর্ণাঙ্গ অজু না থাকার অর্থে নেওয়া। ফলে গ্রহণযোগ্যতার সিদ্ধান্ত এবং বাক্যের অর্থ নির্ধারণ পৃথকভাবে ফল বদলায়। দ্বিতীয় পথের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য: [1066]

لا وضوء كامل . وليس معناه لا وضوء صحيح

বাংলা অনুবাদ: পূর্ণাঙ্গ অজু নেই; এর অর্থ শুদ্ধ অজু নেই নয়।

এই পার্থক্য অনুসারীর দৈনন্দিন আচরণে বাস্তব প্রভাব ফেলে। একইভাবে অঙ্গ ধোয়া দুই ব্যক্তির একজন কোনো নির্দিষ্ট আলেমের সিদ্ধান্তে শুদ্ধ অজু করেছেন, আরেকজন অন্য সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত শর্ত পূরণ করেননি বলে আবার অজু করতে বাধ্য হতে পারেন। কোরআনের মুদ্রিত বাক্য তাঁদের জন্য আলাদা হয়নি। অতিরিক্ত বর্ণনাকে গ্রহণের রায় এবং তার নিষেধসূচক ভাষা কতখানি শক্ত করে প্রয়োগ করা হবে—সেই সিদ্ধান্ত আলাদা হয়েছে। ধর্মীয় কর্তব্যের ব্যবহারিক মানচিত্রে আলেমদের এই বিচার প্রবেশ করেছে।

মতভেদের মুখে সাধারণ অনুসারীর করণীয় সম্পর্কেও ইসলামকিউএ একটি কর্তৃত্বের পথ নির্ধারণ করেছে। তার মতে যিনি বিচার করার যোগ্য, তিনি একটি মূল্যায়ন বেছে নেবেন; অযোগ্য ব্যক্তি বেশি জ্ঞানী ও ধার্মিক মনে করা হাদিসবিশেষজ্ঞের অনুসরণ করবেন। সেই বিশেষজ্ঞের কাছে হাদিসটি সহিহ হলে এবং তাতে বিধান থাকলে তাঁকে তা পালন করতে হবে। দুর্বল বিবেচনায় কাজ ছেড়ে দেওয়ার অবকাশও একই নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত। অনুসরণের শর্তটি: [1067]

وإن كان غير مؤهل فواجبه التقليد

বাংলা অনুবাদ: আর সে যোগ্য না হলে তার কর্তব্য অনুসরণ করা।

এই ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ সরাসরি মূল ঘটনার সত্যতা স্থির করেন না। তিনি প্রথমে বিশেষজ্ঞ বেছে নেন, তারপর সেই বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নের মাধ্যমে খবরটি গ্রহণ বা বর্জন করেন। বিশেষজ্ঞ নির্বাচনেও তাঁর নিজের তথ্য, সামাজিক পরিবেশ ও পরিচিতির সীমা কাজ করে। ফলে প্রত্যক্ষ ঐশী আদেশ হিসেবে পালন করা করণীয় পর্যন্ত পৌঁছানোর পথে একাধিক মানবীয় নির্বাচন রয়েছে। বর্ণনাকারীর মূল্যায়ন, বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা, বাক্যের ব্যাখ্যা এবং অনুসারীর বিশেষজ্ঞ নির্বাচন—প্রতিটি স্তর ফল নির্ধারণে অংশ নেয়।

সহিহ–দুর্বল শ্রেণি ইসলামি হাদিসশাস্ত্রের অভ্যন্তরীণ গ্রহণযোগ্যতার রায়। সেই রায়কে অব্যর্থ ঐতিহাসিক সত্যতার সমার্থক করলে আলেমদের ঘোষিত ইজতিহাদি পার্থক্য মুছে যায়। আবার তাঁদের পার্থক্য বাস্তব আইন সৃষ্টি করে: কোনো শর্ত আদৌ ধর্মীয় কর্তব্য হবে কি না, অথবা তা উপেক্ষা করলে ইবাদত বাতিল হবে কি না, সেই ফলও বদলায়। কোরআনের স্থির ভাষার সঙ্গে বাধ্যতামূলক আচরণের তালিকা মেলানোর সময়ে এই পরিবর্তনশীল মানবীয় বিচারকে বাদ দেওয়া যায় না।


“বিরোধ অসম্ভব” ঘোষণা, বিশেষায়ন ও সমন্বয়ের শাস্ত্রীয় পদ্ধতি

কোরআন ও হাদিসের সম্পর্ক নির্ধারণে “প্রকৃত বিরোধ নেই” ঘোষণাটি অনেক শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার সূচনাতেই বসানো হয়। এখানে বিরোধের অনুপস্থিতি কেবল নির্দিষ্ট দুটি বক্তব্য পরীক্ষা করার পর পাওয়া ফল নয়; গ্রহণযোগ্য ঐশী বক্তব্য পরস্পরবিরোধী হতে পারে না—এই বিশ্বাস থেকেই ব্যাখ্যার সীমা নির্ধারিত হয়। কোনো দ্বন্দ্ব দেখা দিলে অনুসন্ধানের লক্ষ্য হয় দ্বন্দ্বটি মেটানোর পথ পাওয়া। ফলে একটি বক্তব্যের সঙ্গে অন্যটির সংঘর্ষকে স্বীকার করার সম্ভাবনা শুরুতেই সংকুচিত হয়; সংঘর্ষের দায় বক্তব্য থেকে ব্যাখ্যাকারীর জ্ঞান বা বোঝার সীমায় স্থানান্তরিত হয়।

ইসলামকিউএ শাতিবির আল-ইতিসাম থেকে এমন নির্দেশ উদ্ধৃত করেছে যে আপাত পার্থক্য দেখা দিলেও আগে পার্থক্যের অনুপস্থিতিতে বিশ্বাস করতে হবে, কারণ আল্লাহ তা নেই বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন। একই উদ্ধৃতিতে ব্যবহারিক বিধানের প্রশ্ন থাকলে সমাধান খুঁজতে থাকা, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত অনুসন্ধান চালানোর কথাও রয়েছে। আগে বিশ্বাস, পরে সমাধান অনুসন্ধান—ক্রমটি তাঁর বক্তব্যেই নির্দিষ্ট। [1068]

فواجب عليه أن يعتقد انتفاء الاختلاف، لأن الله تعالى قد شهد له أن لا اختلاف فيه

বাংলা অনুবাদ: তার জন্য কর্তব্য হলো পার্থক্যের অনুপস্থিতিতে বিশ্বাস করা; কারণ আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে এতে কোনো পার্থক্য নেই।

এই নির্দেশে অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব একটি খোলা ফল হিসেবে দাঁড়ায় না। গবেষক সমাধান পাননি মানে তাঁর অনুসন্ধান অসম্পূর্ণ; সেটি গ্রহণযোগ্য বক্তব্যের প্রকৃত অসংগতি হিসেবে গণ্য হয় না। অনুসন্ধানের সময়সীমা মৃত্যু পর্যন্ত বাড়ানো গেলেও মৌলিক সিদ্ধান্তটি পরিবর্তনের অধীন রাখা হয়নি। যে সিদ্ধান্তের পক্ষে অনুসন্ধান চলছে, সেটিই অনুসন্ধানের শুরুতে কর্তব্য হিসেবে স্বীকৃত। এই বিন্যাসে প্রমাণ বিচার এবং পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাস সংরক্ষণের কাজ পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

ইবনুল কাইয়িমও সব দিক থেকে স্পষ্টভাবে বিরোধী এবং একটির মাধ্যমে অন্যটি রহিত নয়—এমন দুটি সহিহ হাদিসের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন। তাঁর উদ্ধৃত বক্তব্যে সমস্যার কারণ হিসেবে বর্ণনার পরিচয় অথবা উদ্দেশ্য বোঝার সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করা হয়েছে। বক্তব্যের পারস্পরিক অসংগতির বদলে সংগ্রাহক ও ব্যাখ্যাকারীর ঘাটতি সমস্যার স্থান দখল করেছে। [1069]

وأما حديثان صحيحان صريحان متناقضان من كل وجه، ليس أحدهما ناسخا للآخر، فهذا لا يوجد أصلا

বাংলা অনুবাদ: সব দিক থেকে পরস্পরবিরোধী দুটি সহিহ ও সুস্পষ্ট হাদিস, যার একটি অন্যটিকে রহিত করে না—এমন কিছু আদৌ নেই।

বিরোধ মেটানোর পদ্ধতিগুলো প্রত্যেকটি আলাদা আইনগত কাজ করে। একটি সাধারণ নির্দেশের কিছু ক্ষেত্র বাদ দিলে বাকি অংশ বহাল থাকে। দুটি বক্তব্যকে ভিন্ন পরিস্থিতির বলে নির্ধারণ করলে উভয়ের প্রয়োগক্ষেত্র আলাদা হয়। একটিকে পরবর্তী বলে রহিতকারী ধরলে আগের নির্দেশের কার্যকাল শেষ হয়। আর কোনো বর্ণনাকে অগ্রাধিকার দিলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তে অন্যটির সরাসরি প্রয়োগ স্থগিত হতে পারে। এগুলো একই শব্দের বিকল্প নাম নয়; কার ওপর কোন দায় থাকবে, তা ভিন্নভাবে নির্ধারণের উপায়।

পদ্ধতিব্যাখ্যার কাজকার্যকর বিধানে ফলযে তথ্য বা সিদ্ধান্ত প্রয়োজন
বিশেষায়নসাধারণ বক্তব্যের কিছু সদস্য বাদ দেওয়ামূল বিধান কিছু ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য থাকেকোন নির্দিষ্ট দলিল কোন সদস্যকে বাদ দিচ্ছে
পরিস্থিতি পৃথক করাদুটি নির্দেশকে ভিন্ন অবস্থার সঙ্গে যুক্ত করাদুটি বিধান আলাদা ক্ষেত্রে বহালওই অবস্থাভেদ বর্ণনা বা ভাষায় প্রতিষ্ঠিত কি না
নসখআগের নির্দেশের কার্যকাল শেষ নির্ধারণপরবর্তী নির্দেশ বর্তমান কর্তব্য হয়সময়ক্রম ও রহিতকরণের প্রমাণ
অগ্রাধিকার নির্ধারণপ্রমাণের মান বা অর্থের ভিত্তিতে একটি দলিল গ্রহণবিরোধপূর্ণ প্রয়োগে নির্বাচিত নির্দেশ কার্যকরগ্রহণযোগ্যতার মান ও অগ্রাধিকারের কারণ
সিদ্ধান্ত স্থগিতবর্তমানে নিষ্পত্তি না করাসংশ্লিষ্ট গবেষকের রায় অনির্ধারিত থাকেঅতিরিক্ত তথ্য বা গ্রহণযোগ্য সমাধানের অপেক্ষা

অসিয়তের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিগত নির্বাচনের স্পষ্ট ফল রয়েছে। উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত না রাখাকে কেউ পরবর্তী কোরআনিক বিধানের রহিতকরণ, কেউ হাদিসের রহিতকরণ এবং কেউ সাধারণ নির্দেশের বিশেষায়ন বলেছেন। সুবিধাভোগীর অতিরিক্ত অসিয়ত না পাওয়ার ফল কাছাকাছি হতে পারে, কিন্তু কোন উৎস সেই ফল ঘটিয়েছে, তার ব্যাখ্যা পৃথক। এই উৎসনির্ধারণ ভবিষ্যৎ বিতর্কেও কাজ করে: একই নিয়মকে নজির ধরে হাদিস কতখানি ক্ষমতা পাবে, তার সীমা নির্ধারণ করা হয়। একটি নির্দিষ্ট রায়ের পেছনে তাই বৃহত্তর কর্তৃত্বের নীতিও গড়ে ওঠে।

রজমের ক্ষেত্রে সাধারণ বেত্রাঘাতের আয়াত থেকে মুহসানকে পৃথক করা এবং তাঁর জন্য নতুন মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ একসঙ্গে কাজ করে। শুধু “সমন্বয়” শব্দটি বললে এই বাস্তব ফল ধরা পড়ে না। একজন মানুষের ক্ষেত্রে আয়াতের প্রকাশ্য বেত্রাঘাতের জায়গায় অথবা তার সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড যুক্ত হচ্ছে। কোন শ্রেণির ব্যক্তি কোন শাস্তি পাবেন, তা অতিরিক্ত সংবাদ ও তার শ্রেণিবিন্যাসে নির্ধারিত। ব্যাখ্যার পরিভাষা ব্যবহার করলেও আইনগত কঠোরতা কমে না; পরিভাষাটি সেই কঠোর ফল পর্যন্ত পৌঁছানোর পদ্ধতি জানায়।

সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখার ক্ষেত্রেও পূর্ববিশ্বাসের প্রভাব থাকে। ইসলামকিউএর উল্লিখিত আলোচনায় এই স্থগিত অবস্থা কোনো কোনো আলেমের সাময়িক জ্ঞানগত সীমা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে; অন্যের কাছে সমাধান থাকতে পারে। সেখানে অনির্ধারিত থাকা মানে বিরোধের সম্ভাবনা গ্রহণ করা নয়। অসংগতি নেই—এই নিশ্চয়তার অধীনেই সমাধান এখনো জানা নেই বলা হচ্ছে। ফলে অমীমাংসিত তথ্যের অবস্থাও মৌলিক বিশ্বাসের বাইরে যেতে পারে না।

বিশেষায়ন প্রতিষ্ঠা করতে সাধারণ বক্তব্যের সঙ্গে নির্দিষ্ট ব্যতিক্রমটির সম্পর্ক প্রমাণ করতে হয়। পুরোনো নির্দেশের বদলে নতুন নির্দেশ কার্যকর করার দাবিতেও সংশ্লিষ্ট সময়ক্রম ও পরিবর্তনের দলিল প্রয়োজন। প্রতিটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেই সম্পর্ক আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। বিরোধ থাকা অসম্ভব—এই সিদ্ধান্ত নিজে কোন বক্তব্য আগে, কোনটি পরে অথবা কোন ব্যক্তি ব্যতিক্রম, তা জানায় না। ওই তথ্য ছাড়া শুধু অভিন্ন ঐশী উৎসের দাবি থেকে প্রয়োজনমতো সময়ভেদ বা ব্যক্তিভেদ বানিয়ে নেওয়া হলে ব্যাখ্যার ফল প্রমাণের চেয়ে এগিয়ে যায়। সমাধান ঘোষণার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পর্কটি আলাদাভাবেই প্রতিষ্ঠিত হতে হয়।

“বিরোধ নেই” ঘোষণাকে পরীক্ষার অযোগ্য পূর্বশর্ত করলে ব্যাখ্যার ব্যর্থতাও ঘোষণাটিকে স্পর্শ করতে পারে না। সমাধান পাওয়া গেলে তা ঐক্যের প্রমাণ, না পাওয়া গেলে ব্যাখ্যাকারীর অপারগতা—এই বিন্যাসে বিপরীত ফল গ্রহণের কোনো পথ খোলা থাকে না। তখন অনুসন্ধানটি গ্রহণযোগ্য বক্তব্যগুলো সত্যিই একসঙ্গে মানা যায় কি না, তার নিরপেক্ষ পরীক্ষা থাকে না; আগে স্বীকৃত ঐক্য কীভাবে বজায় রাখা যায়, তার অনুসন্ধান হয়ে দাঁড়ায়।

এর আইনগত মূল্য দিতে হয় অনুসারীকে। সমন্বয়ের ফল তাঁর ক্ষেত্রে সম্পত্তির অংশ সংকোচন, অনুমোদিত খাদ্যের তালিকা ছোট হওয়া, ইবাদতের অতিরিক্ত শর্ত অথবা কঠোর দণ্ড হয়ে আসতে পারে। একাধিক বর্ণনার সম্পর্ক নির্ধারণকারী আইনজ্ঞ যে পথ বেছে নেন, সেই পথই তাঁর করণীয়ের ভাষা হয়। বিরোধ মেটানোর শাস্ত্রীয় ক্ষমতা তাই কেবল গ্রন্থগুলোর সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা নয়; কোন মানুষের ওপর কোন বিধান কার্যকর হবে, সেই বাস্তব সিদ্ধান্তের ক্ষমতাও।


আনুষ্ঠানিক মর্যাদা ও কার্যকর আইনপ্রণয়নের কর্তৃত্ব

কোনো উৎসকে মর্যাদার তালিকায় প্রথমে রাখা এবং প্রতিটি কার্যকর আইন নির্ধারণে তাকেই শেষ সিদ্ধান্তদাতা করা এক বিষয় নয়। কোরআনের আনুষ্ঠানিক শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা রেখেও সুন্নাহকে এমন ক্ষমতা দেওয়া যায়, যার মাধ্যমে আয়াতের প্রয়োগক্ষেত্র সংকুচিত হবে, নতুন শর্ত যুক্ত হবে কিংবা মুসহাফের বাইরে নতুন বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠিত হবে। তখন প্রথম উৎসের ভাষা অপরিবর্তিত থাকলেও তার অনুসারীকে কী করতে হবে, তা দ্বিতীয় উৎস ও তার ব্যাখ্যার সাহায্যে নির্ধারিত হয়। মর্যাদার ঘোষণার পাশে কর্তৃত্বের এই ব্যবহারিক বিন্যাস আলাদাভাবে কাজ করে।

ইসলামওয়েবে সংরক্ষিত সুন্নাহর প্রামাণ্যতা-বিষয়ক গ্রন্থাংশে “কোরআন, তারপর সুন্নাহ” ক্রমকে উল্লেখ ও মর্যাদার ক্রম বলা হয়েছে। সেই ক্রম থেকে সুন্নাহর উৎসগত ক্ষমতা পিছিয়ে আছে বলে সিদ্ধান্ত নিতে নিষেধ করা হয়েছে। অর্থাৎ একটি উৎস পরে উচ্চারিত হওয়াই তার নির্দেশকে কম বাধ্যতামূলক করে না। সংশ্লিষ্ট বক্তব্য: [1070]

فإن هـذا الترتيب ترتيب في الذكر والشرف، ولا يؤخذ بمعنى أن السنة متأخرة في مصدريتها عن القرآن الكريم

বাংলা অনুবাদ: এই ক্রম উল্লেখ ও মর্যাদার ক্রম; এর অর্থ এই নেওয়া যাবে না যে উৎস হিসেবে সুন্নাহ কোরআনের পরে পড়ে আছে।

সুন্নাহর স্বতন্ত্র আইনপ্রণয়নক্ষমতার সংজ্ঞা এই অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে। শামেলায় সংরক্ষিত উসুলগ্রন্থে কোরআনের বিধানের সমর্থন, ব্যাখ্যা এবং স্বতন্ত্র অতিরিক্ত বিধানকে পৃথক শ্রেণি করা হয়েছে। স্বতন্ত্র সুন্নাহ এমন কিছুকে আবশ্যক বা নিষিদ্ধ করে, যার আবশ্যকতা বা নিষেধ কোরআন নির্ধারণ করেনি। এখানে “ব্যাখ্যা” শব্দের সীমার বাইরে নতুন দায় সৃষ্টির ক্ষমতা সরাসরি স্বীকার করা হচ্ছে। [1071]

وهي التي تكون موجبة لحكم سكت القرآن عن إيجابه، أو محرمة لما سكت عن تحريمه

বাংলা অনুবাদ: তা এমন বিধানকে আবশ্যক করে, যার আবশ্যকতা সম্পর্কে কোরআন নীরব থেকেছে; অথবা এমন কিছুকে নিষিদ্ধ করে, যার নিষেধ সম্পর্কে কোরআন নীরব থেকেছে।

এই স্বীকৃতিতে কোরআনের নীরবতা ব্যক্তির অব্যাহতির নিশ্চয়তা থাকে না। কোনো কাজের ওপর আয়াতে নিষেধ পাওয়া না গেলেও স্বতন্ত্র সুন্নাহর ভিত্তিতে তা নিষিদ্ধ হতে পারে। একইভাবে আয়াতে কোনো নির্দিষ্ট শর্ত লেখা না থাকলেও সেই শর্ত ধর্মীয় দায়ে ঢুকতে পারে। অনুসারীকে তখন গ্রন্থের অনুমোদন বা নীরবতার পাশাপাশি অন্য উৎসে নিষেধ এসেছে কি না, সেটিও জানতে হয়। সম্পূর্ণ কর্তব্যের তালিকা কোনো একটি মুসহাফের দৃশ্যমান বক্তব্যের মধ্যে সীমিত থাকে না।

শাতিবি আনুষ্ঠানিক সম্পর্কটি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আল-মুওয়াফাকাতে তিনি কিতাবের মর্যাদা আগে রেখে সুন্নাহকে ব্যাখ্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন; “বিচারক” কথার অর্থ তাঁর কাছে কিতাবের ওপর অগ্রাধিকার নয়। সংক্ষিপ্তভাবে তাঁর ব্যাখ্যা: [1072]

فمعنى كون السنة قاضية على الكتاب أنها مبينة له

বাংলা অনুবাদ: সুন্নাহ কিতাবের বিচারক হওয়ার অর্থ হলো, তা কিতাবের ব্যাখ্যাকারী।

এই অবস্থানেও ব্যাখ্যার ক্ষমতার বাস্তব ব্যাপ্তি বড়। কোন সাধারণ বক্তব্যের কোন অংশ কার্যকর হবে, কোন শর্তে একটি কাজ গ্রহণযোগ্য হবে এবং কোন শ্রেণি পুরোনো নির্দেশ থেকে বাদ পড়বে—এসবের উত্তর ব্যাখ্যা থেকেই আসে। তাই “ব্যাখ্যাকারী” পরিচয়টি ক্ষমতার অভাব বোঝায় না। গ্রন্থের আনুষ্ঠানিক মর্যাদা রক্ষা করে সেই মর্যাদাসম্পন্ন গ্রন্থের কার্যকর অর্থ নির্ধারণের দায়িত্ব অন্য উৎসের ওপর রাখা হচ্ছে। অনুসারীর ওপর প্রয়োগ হয় দায়িত্বটির ফল, শুধু মর্যাদার ঘোষণা নয়।

কর্তৃত্বের কাজযেখানে সিদ্ধান্ত তৈরি হয়বাস্তব ফল
বিধানের প্রাথমিক ভাষাকোরআনের সংরক্ষিত আয়াতসাধারণ নির্দেশ, নিষেধ ও নির্দিষ্ট অংশের বক্তব্য
ব্যতিক্রম ও অতিরিক্ত শর্তগৃহীত সুন্নাহ এবং আয়াতের সঙ্গে তার সম্পর্কআয়াতের কোন ক্ষেত্র কার্যকর থাকবে, তার সীমা
স্বতন্ত্র নতুন বিধানকোরআনে অনুল্লিখিত বিষয় সম্পর্কে গৃহীত সুন্নাহনতুন বাধ্যবাধকতা বা নিষেধ
সাবেক অনুপস্থিত পাঠের পরিচয়সাহাবিদের নামে সংরক্ষিত সংবাদমুসহাফে অনুপস্থিত ঐশী নির্দেশ ও বহাল আইনের দাবি
বর্ণনার গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যানহাদিসবিশারদের মূল্যায়নকোন খবর আইন প্রতিষ্ঠায় ব্যবহার করা যাবে
বর্তমান বিধান নির্ধারণআইনজ্ঞের বিশেষায়ন, সময়ক্রম ও সমন্বয়ের বিচারঅনুসারীর জন্য চূড়ান্ত কার্যকর দায়

এই বিন্যাসে উৎসের ক্ষমতা ও তার ব্যবহারকারীর ক্ষমতা পরস্পর যুক্ত। হাদিসের নামে স্বীকৃত কোনো নির্দেশ নিজে সাধারণ মানুষের কাছে সব সময়ে এক অর্থে উপস্থিত হয় না। প্রথমে সেটি শনাক্ত ও মূল্যায়িত হয়, পরে তার ভাষা আয়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়। ভিন্ন মূল্যায়ন বা ভিন্ন সম্পর্ক নির্ধারণে কার্যকর ফল আলাদা হতে পারে। এই মানবীয় সিদ্ধান্তগুলো বাদ দিয়ে শুধু “আল্লাহর আইন” বলা হলে আইনের নির্দিষ্ট রূপ তৈরির বাস্তব প্রক্রিয়াটি আড়ালে পড়ে যায়।

স্থির পাঠ এবং পরিবর্তনশীল আইনগত ফলের পার্থক্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আয়াতের অক্ষর মুদ্রিত অবস্থায় আগের মতোই থাকতে পারে, অথচ কোনো মানুষের ওপর সেই আয়াত থেকে পাওয়া প্রথম নির্দেশ আর প্রয়োগ করা হয় না। কখনো বিশেষায়নে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে, কখনো পরবর্তী বিধানে আগের দায় শেষ হয়েছে, কখনো অতিরিক্ত শর্ত পূরণ না করায় তাঁর কাজ অগ্রহণযোগ্য হয়েছে। এই প্রতিটি পরিবর্তন আইনগত; এর প্রমাণও আইনগত দলিল ও প্রয়োগের মধ্যে রয়েছে। অক্ষর অপরিবর্তিত থাকা সেই পরিবর্তনগুলোকে শূন্য করে না।

হাদিস ও কোরআনের সম্পর্ক তাই শুধু একই নির্দেশ দুইভাবে উচ্চারিত হওয়ার সম্পর্ক নয়। এক উৎস অন্যটির নীরবতা পূরণ করে, সাধারণ ভাষা সংকুচিত করে, সাবেক পাঠের সংবাদ দেয় এবং কিছু শাস্ত্রীয় অবস্থানে আগের বিধান রহিত করার ক্ষমতাও বহন করে। এই কাজগুলোর সঙ্গে হাদিস গ্রহণকারী ও আইন নির্ধারণকারী মানুষের বিচার যুক্ত। ফল হিসেবে কোরআনের নামে পালিত বিধানের একটি অংশ মুসহাফের বাইরে সংরক্ষিত সংবাদ এবং তার ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়।

আনুষ্ঠানিক সর্বোচ্চ মর্যাদার ঘোষণা দিয়ে এই নির্ভরতা মুছে যায় না। কার সম্পত্তি যাবে, কোন বিবাহ নিষিদ্ধ হবে, কার ইবাদত গ্রহণযোগ্য বলা হবে এবং কার ওপর কোন দণ্ড চাপবে—সেই প্রশ্নে শেষ কার্যকর উত্তর নির্ধারিত হয় গৃহীত উৎসগুলোর সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে। গ্রন্থের পবিত্রতা দাবি করার ক্ষমতার পাশাপাশি তার নামে মানুষকে বাধ্য করার ক্ষমতাও এখানে কাজ করে। সেই বাধ্যতামূলক ফলের দায় বহন করে নির্দিষ্ট বর্ণনা, নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এবং সেগুলোকে আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠাকারী প্রতিষ্ঠান।


উমরের খিলাফতে বিধান ও ধর্মীয় প্রথার পুনর্নির্ধারণ

মুহাম্মদের মৃত্যুর পরে ধর্মীয় বিধানের ব্যবহারিক রূপ নির্ধারণে খলিফার সিদ্ধান্ত বড় শক্তি হয়ে ওঠে। উমরের আমলে কোনো প্রচলিত কাজ নিষিদ্ধ হয়, কোনো সম্পত্তির দাবি নতুন হিসাবে বণ্টিত হয়, কোনো ইবাদত সংগঠিত ব্যবস্থায় রূপ নেয়। এসব পরিবর্তন মানুষের বিবাহ, দাসত্ব, উত্তরাধিকার ও উপাসনার ওপর সরাসরি কার্যকর হয়েছিল। মুসহাফের আয়াতের পাশে শাসকের নির্দেশ এবং তার পরবর্তী ফিকহি গ্রহণও মুসলমানের করণীয় নির্ধারণ করেছে। সংরক্ষিত বর্ণনাগুলোতে এই পরিবর্তনের কারণ, প্রতিবাদ ও ভিন্ন সিদ্ধান্তের চিহ্নও রয়ে গেছে।


মুতআ: নবী ও আবু বকরের যুগের প্রচলন, নিষেধের ভিন্ন বর্ণনা ও উমরের নির্দেশ

মুতআ হলো নির্ধারিত মেয়াদের বিবাহ, যার অনুমতি, নিষেধ এবং পুনরায় অনুমতির ইতিহাস নিয়ে ইসলামি বর্ণনাগুলোতে পৃথক বক্তব্য রয়েছে। জাবিরের নামে সংরক্ষিত সংবাদে মুহাম্মদ ও আবু বকরের আমলে এর প্রচলন এবং উমরের সময়ে তার বন্ধ হওয়ার কথা আছে। অন্য বর্ণনায় মুহাম্মদের জীবদ্দশাতেই নিষেধ আরোপের দাবি রয়েছে। এই ভিন্ন বিবরণগুলোর সঙ্গে পরবর্তী আইন যে সময়ক্রম তৈরি করেছে, সেখানে উমরের ঘোষণাও একটি কার্যকর মোড়: তাঁর আমলে নিষেধ মানানোর সঙ্গে শাস্তির হুমকি যুক্ত হয়েছে।

সহিহ মুসলিমে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ বলেছেন, কয়েক দিনের মুতআর বিনিময়ে অল্প খেজুর ও আটা দেওয়া হতো। তিনি সময়সীমা হিসেবে মুহাম্মদের যুগ এবং আবু বকরের যুগ উল্লেখ করে আমর ইবনে হুরাইসের ঘটনার সূত্রে উমরের নিষেধ পর্যন্ত পৌঁছেছেন। বর্ণনার মূল বক্তব্য: [1073]

كُنَّا نَسْتَمْتِعُ بِالْقُبْضَةِ مِنَ التَّمْرِ وَالدَّقِيقِ الأَيَّامَ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَبِي بَكْرٍ حَتَّى نَهَى عَنْهُ عُمَرُ فِي شَأْنِ عَمْرِو بْنِ حُرَيْثٍ

বাংলা অনুবাদ: আমরা আল্লাহর রসুল ও আবু বকরের সময়ে একমুঠো খেজুর ও আটার বিনিময়ে কয়েক দিনের জন্য মুতআ করতাম; আমর ইবনে হুরাইসের ঘটনায় উমর তা নিষেধ করা পর্যন্ত।

এই স্মৃতিবিবরণে অনুমতির যুগ থেকে নিষেধের যুগে যাওয়ার সীমা একজন খলিফার সিদ্ধান্ত দিয়ে চিহ্নিত। একই ব্যক্তির আরেক বর্ণনায় নারীসংক্রান্ত মুতআ ও হজের তামাত্তু একসঙ্গে এসেছে। ইবনে আব্বাস ও ইবনে যুবাইরের বিরোধের সংবাদ শুনে জাবির মুহাম্মদের সঙ্গে উভয়টি পালন এবং পরে উমরের নিষেধে বিরত হওয়ার কথা বলেন। [1074]

كُنْتُ عِنْدَ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ فَأَتَاهُ آتٍ فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ وَابْنُ الزُّبَيْرِ اخْتَلَفَا فِي الْمُتْعَتَيْنِ فَقَالَ جَابِرٌ فَعَلْنَاهُمَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ثُمَّ نَهَانَا عَنْهُمَا عُمَرُ فَلَمْ نَعُدْ لَهُمَا

বাংলা অনুবাদ: আমি জাবির ইবনে আবদুল্লাহর কাছে ছিলাম। একজন এসে বলল, ইবনে আব্বাস ও ইবনে যুবাইর দুই মুতআ নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। জাবির বললেন, আমরা আল্লাহর রসুলের সঙ্গে উভয়টি করেছি। পরে উমর আমাদের উভয়টি নিষেধ করেছেন; এরপর আমরা আর সেগুলো করিনি।

জাবিরের বক্তব্যে নিষেধের ব্যবহারিক ফলও রয়েছে: “আমরা আর করিনি।” এটি শুধু উমরের ব্যক্তিগত অপছন্দের সংবাদ নয়; অনুসারীদের আচরণ বন্ধ হওয়ার বিবরণ। অনুমোদিত বা প্রচলিত একটি সম্পর্কের পরে নিষেধ কার্যকর হলে যাঁরা আগে সেই রীতিতে চলেছেন, তাঁদের বর্তমান সম্পর্কের অবস্থাও বদলে যায়। শাসকের আদেশ এখানে ব্যক্তিগত মতের সীমা অতিক্রম করে সামাজিক আচরণের নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়।

নিষেধের অন্য সময়সীমা আলীর নামে বর্ণিত খাইবারের সংবাদে পাওয়া যায়। সেখানে নারীসংক্রান্ত মুতআ এবং গৃহপালিত গাধার মাংস খাওয়ার নিষেধ একই বাক্যে মুহাম্মদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। [1075]

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَنْ مُتْعَةِ النِّسَاءِ يَوْمَ خَيْبَرَ وَعَنْ أَكْلِ لُحُومِ الْحُمُرِ الإِنْسِيَّةِ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর রসুল খাইবারের দিনে নারীদের মুতআ এবং গৃহপালিত গাধার মাংস খাওয়া নিষেধ করেছেন।

সাবরা জুহানির বর্ণনায় আবার অনুমতি দেওয়ার পরে কিয়ামত পর্যন্ত নিষিদ্ধ করার ঘোষণা রয়েছে। সেই সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক ছেড়ে দিতে এবং নারীদের দেওয়া সম্পদ ফেরত না নিতে বলা হয়েছে। অনুমতি থেকে নিষেধে যাওয়ার ফলে সম্পর্ক কীভাবে শেষ হবে, তার নির্দেশও এই বর্ণনায় আছে। [1076]

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي قَدْ كُنْتُ أَذِنْتُ لَكُمْ فِي الاِسْتِمْتَاعِ مِنَ النِّسَاءِ وَإِنَّ اللَّهَ قَدْ حَرَّمَ ذَلِكَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ فَمَنْ كَانَ عِنْدَهُ مِنْهُنَّ شَىْءٌ فَلْيُخَلِّ سَبِيلَهُ وَلاَ تَأْخُذُوا مِمَّا آتَيْتُمُوهُنَّ شَيْئًا

বাংলা অনুবাদ: হে মানুষেরা, আমি তোমাদের নারীদের সঙ্গে মুতআর অনুমতি দিয়েছিলাম। আল্লাহ এখন তা কিয়ামত পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছেন। তোমাদের কারও সঙ্গে এমন নারী থাকলে সে তাকে ছেড়ে দিক। তোমরা তাদের যা দিয়েছ, তার কিছুই ফেরত নিয়ো না।

সংরক্ষিত বিবরণঅনুমতি বা নিষেধের সময়বর্ণনার নির্দিষ্ট ফল
জাবির, মুসলিম ১৪০৫ঘমুহাম্মদ ও আবু বকরের যুগ থেকে উমরের নিষেধ পর্যন্ত প্রচলনআমর ইবনে হুরাইসের ঘটনায় নিষেধকে শেষ সীমা করা
জাবির, মুসলিম ১৪০৫ঙমুহাম্মদের সঙ্গে পালন; পরে উমরের নিষেধঅনুসারীদের বিরত হওয়া
আলী, মুসলিম ১৪০৭কখাইবারের দিনে মুহাম্মদের নিষেধনিষেধের পূর্ববর্তী একটি সময়সীমা
সাবরা, মুসলিম ১৪০৬ঘআগের অনুমতির পরে কিয়ামত পর্যন্ত নিষেধচলমান সম্পর্ক শেষ এবং দেওয়া সম্পদ ফেরত না নেওয়া
পরবর্তী সময়ক্রমের ব্যাখ্যাঅনুমতি, নিষেধ, পুনরায় অনুমতি, চূড়ান্ত নিষেধএকাধিক বর্ণনাকে পরপর আইন পরিবর্তনের ইতিহাসে বসানো

যারকানির মোয়াত্তা-ব্যাখ্যায় নববির নির্বাচিত অবস্থান উদ্ধৃত হয়েছে: অনুমতি ও নিষেধ দুইবার ঘটেছিল। তাঁর বিন্যাসে খাইবারের আগে অনুমতি, খাইবারে নিষেধ, মক্কা বিজয়ের সময়ে পুনরায় অনুমতি এবং কয়েক দিন পরে স্থায়ী নিষেধ আসে। একই আলোচনায় খাইবারের তারিখ কোন নিষেধের সঙ্গে যুক্ত, তা নিয়েও পূর্ববর্তী আলেমদের মতভেদ সংরক্ষিত। নববির অবস্থানের নির্দিষ্ট বাক্য: [1077]

الصواب المختار أن التحريم والإباحة كانا مرتين

বাংলা অনুবাদ: নির্বাচিত সঠিক অবস্থান হলো, নিষেধ ও অনুমতি দুইবার ঘটেছিল।

এই বিন্যাসে পরবর্তী আইনজ্ঞ একাধিক সংবাদকে ইতিহাসের পৃথক পর্যায়ে বসিয়ে নিষেধের ধারাবাহিকতা নির্মাণ করেন। খাইবারের নিষেধকে চূড়ান্ত ধরলে পরবর্তী অনুমতির বিবরণ ব্যাখ্যা করতে হয়; পরবর্তী স্থায়ী নিষেধ গ্রহণ করলে আবু বকর ও উমরের শুরুর সময় পর্যন্ত জাবিরের প্রচলনের বিবরণ ব্যাখ্যা করতে হয়। যারকানির আলোচনায় শেষের ঘটনাকে নিষেধের সংবাদ না পৌঁছানোর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই ব্যাখ্যায়ও কার্যকর যোগাযোগের ব্যবধান থাকে: এক গোষ্ঠীর অনুসরণে থাকা প্রথা বন্ধ হওয়ার জন্য পরে শাসকের ঘোষণার প্রয়োজন হয়েছে।

উমরের ঘোষণায় শাস্তির মাত্রা মুসলিমের আরেক বর্ণনায় সরাসরি এসেছে। হজ–উমরা সম্পন্ন করার নির্দেশের পরে তিনি নির্দিষ্ট মেয়াদের বিবাহে পাওয়া ব্যক্তিকে পাথর মেরে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। বক্তব্যের শেষাংশ: [1078]

وَأَبِتُّوا نِكَاحَ هَذِهِ النِّسَاءِ فَلَنْ أُوتَى بِرَجُلٍ نَكَحَ امْرَأَةً إِلَى أَجَلٍ إِلاَّ رَجَمْتُهُ بِالْحِجَارَةِ

বাংলা অনুবাদ: এই নারীদের সঙ্গে বিবাহ স্থায়ী করো। আমার কাছে এমন কোনো পুরুষকে আনা হলে, যে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কোনো নারীকে বিবাহ করেছে, আমি তাকে পাথর মেরে হত্যা করব।

অল্প খাদ্য বা অর্থের বিনিময়ে কয়েক দিনের যে সম্পর্কের প্রচলন জাবির উল্লেখ করেছেন, সেই সম্পর্ক উমরের ঘোষণায় প্রাণঘাতী শাস্তির বিষয় হয়ে উঠেছে। অনুমতি ও নিষেধের তারিখ নিয়ে পরে যত সময়ক্রমই নির্মিত হোক, খলিফার এই হুমকির ব্যবহারিক ক্ষমতা পৃথক: তিনি কোন সম্পর্ক দণ্ডযোগ্য হিসেবে রাষ্ট্রের সামনে আসবে, তা ঘোষণা করছেন। ধর্মীয় বিধানের সংবাদ, সেই সংবাদের সামাজিক বিস্তার এবং শাস্তি দিয়ে অনুসরণ করানোর ক্ষমতা এখানে একই ইতিহাসের তিনটি স্তর।

মুতআর দৃষ্টান্তে তাই প্রচলিত সম্পর্কের বৈধতা সময়ের সঙ্গে বদলানোর বর্ণনা এবং খলিফার সিদ্ধান্তে সেই বদল কার্যকর হওয়ার সংবাদ পাশাপাশি রয়েছে। পরবর্তী সুন্নি বিধানে নিষেধের ভিত্তি মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত বর্ণনায় স্থাপিত হয়েছে; জাবিরের স্মৃতিতে তাঁদের আচরণ বন্ধ হওয়ার মুহূর্তটি উমরের আমলে। আইনের ঘোষিত উৎস এবং সমাজে তার প্রয়োগের ইতিহাস এইভাবে পৃথক সময়ে অবস্থান করে। উমরের কর্তৃত্ব সেই ব্যবধান পূরণ করেছে শাসকের নিষেধ ও দণ্ডের ভাষায়।


হজে তামাত্তু: কিতাব ও নবীর আমলের বিপরীতে খলিফার নিষেধ

হজে তামাত্তুতে একই সফরে আগে উমরা সম্পন্ন করে ইহরাম থেকে বের হওয়া এবং পরে হজের জন্য পুনরায় ইহরাম নেওয়া হয়। মাঝের অবকাশে ইহরামের নিষেধগুলো আর থাকে না। এই অনুমোদিত ব্যবধান এবং সেখানে দাম্পত্য সম্পর্কের অবকাশ উমরের আপত্তির কেন্দ্রে এসেছে। হজ ও উমরার সম্পর্ক তাই শুধু আচার পালনের ক্রমের প্রশ্ন ছিল না; তীর্থযাত্রার সময়ে মানুষের শরীর ও ব্যক্তিগত জীবনের ওপর কতখানি সংযম চাপানো হবে, সেই প্রশ্নও ছিল।

বাকারা ২:১৯৬-এ হজের সঙ্গে উমরা করে সুবিধা নেওয়ার বিধান এবং তার সঙ্গে হাদির ব্যবস্থা রয়েছে। ইবনে কাসীরের ব্যাখ্যায় আয়াতের সাধারণ তামাত্তু-ব্যবহার কিরানকেও ধরতে পারে; নির্দিষ্ট ফিকহি ব্যবহারে উমরা শেষ করে পরে হজে প্রবেশের পদ্ধতি বোঝানো হয়। আয়াতের সংশ্লিষ্ট বাক্য: [1079]

فَمَن تَمَتَّعَ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ

বাংলা অনুবাদ: যে হজ পর্যন্ত উমরার সুবিধা গ্রহণ করে, সে সহজলভ্য হাদি দেবে।

ইমরান ইবনে হুসাইনের বর্ণনায় অনুমতির ভিত্তি তিনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে: কিতাবে আয়াত নাজিল হয়েছে, মুহাম্মদের সঙ্গে কাজটি পালন করা হয়েছে, এবং তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত নিষেধ আসেনি। তার পরে একজন নিজের মত বলেছেন—এই মন্তব্যে পরবর্তী সিদ্ধান্তকে আগের ওহি ও আমল থেকে আলাদা করা হয়েছে। [1080]

أُنْزِلَتْ آيَةُ الْمُتْعَةِ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَفَعَلْنَاهَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم، وَلَمْ يُنْزَلْ قُرْآنٌ يُحَرِّمُهُ، وَلَمْ يَنْهَ عَنْهَا حَتَّى مَاتَ قَالَ رَجُلٌ بِرَأْيِهِ مَا شَاءَ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর কিতাবে মুতআর আয়াত নাজিল হয়েছিল। আমরা আল্লাহর রসুলের সঙ্গে তা পালন করেছি। তা নিষিদ্ধ করে কোনো কোরআন নাজিল হয়নি এবং তিনি মৃত্যু পর্যন্ত তা নিষেধ করেননি। পরে একজন নিজের মত অনুযায়ী যা চেয়েছেন বলেছেন।

ইবনে কাসীর এই বর্ণনা উদ্ধৃত করে উক্ত ব্যক্তির সঙ্গে উমরের পরিচয় যুক্ত করেছেন এবং তাঁর তামাত্তু নিষেধের কথাও উল্লেখ করেছেন। এই পরিচয় ধরে আয়াতের অনুমতি, নবী-যুগের পালন এবং খলিফার আপত্তির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সম্পর্ক তৈরি হয়। এখানে “মুতআ” হজের পদ্ধতির নাম; নারীসংক্রান্ত মেয়াদি বিবাহের প্রশ্ন থেকে এর বিষয় ও বিধান পৃথক। একই শব্দ দিয়ে দুই প্রথাকে উল্লেখ করার ফলে উভয়ের নিষেধ একসঙ্গে আসলেও তাদের কোরআনিক ভিত্তি ও পরবর্তী গ্রহণ এক হয়ে যায় না।

আবু মুসার বর্ণনায় মুহাম্মদের সরাসরি নির্দেশ এবং উমরের ভিন্ন প্রয়োগ একই ধারায় পাওয়া যায়। মুহাম্মদ তাঁর সঙ্গে হাদি আছে কি না জিজ্ঞেস করে, না থাকায় তাওয়াফ ও সাঈ শেষে ইহরাম থেকে বের হতে বলেন। উমরের বক্তব্যে আবার হজ–উমরা পূর্ণ করার আয়াত এবং মুহাম্মদের হাদি জবাই পর্যন্ত ইহরামে থাকার আমল সামনে আসে। [1081]

بَعَثَنِي النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِلَى قَوْمٍ بِالْيَمَنِ فَجِئْتُ وَهْوَ بِالْبَطْحَاءِ فَقَالَ بِمَا أَهْلَلْتَ قُلْتُ أَهْلَلْتُ كَإِهْلاَلِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ هَلْ مَعَكَ مِنْ هَدْىٍ قُلْتُ لاَ فَأَمَرَنِي فَطُفْتُ بِالْبَيْتِ وَبِالصَّفَا وَالْمَرْوَةِ ثُمَّ أَمَرَنِي فَأَحْلَلْتُ فَأَتَيْتُ امْرَأَةً مِنْ قَوْمِي فَمَشَطَتْنِي، أَوْ غَسَلَتْ رَأْسِي، فَقَدِمَ عُمَرُ رضى الله عنه فَقَالَ إِنْ نَأْخُذْ بِكِتَابِ اللَّهِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُنَا بِالتَّمَامِ قَالَ اللَّهُ وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ وَإِنْ نَأْخُذْ بِسُنَّةِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَإِنَّهُ لَمْ يَحِلَّ حَتَّى نَحَرَ الْهَدْىَ

বাংলা অনুবাদ: নবী আমাকে ইয়েমেনের একটি জনগোষ্ঠীর কাছে পাঠিয়েছিলেন। ফিরে এসে তাঁকে বাতহায় পেলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কিসের ইহরাম নিয়েছ?” বললাম, “নবীর ইহরামের মতো ইহরাম নিয়েছি।” তিনি বললেন, “তোমার সঙ্গে হাদি আছে?” বললাম, “না।” তিনি আমাকে নির্দেশ দিলেন; আমি কাবার তাওয়াফ এবং সাফা–মারওয়ার সাঈ করলাম। পরে তাঁর নির্দেশে ইহরাম ছাড়লাম। নিজের গোত্রের এক নারীর কাছে গেলে তিনি আমার চুল আঁচড়ে দিলেন অথবা মাথা ধুয়ে দিলেন। পরে উমর এসে বললেন, “আল্লাহর কিতাব গ্রহণ করলে তা আমাদের পূর্ণ করতে নির্দেশ দেয়; আল্লাহ বলেছেন, হজ ও উমরা পূর্ণ করো। আর নবীর সুন্নাহ গ্রহণ করলে তিনি হাদি জবাইয়ের আগে ইহরাম ছাড়েননি।”

এই একই বর্ণনায় হাদি সঙ্গে না থাকা আবু মুসা ও হাদি বহনকারী মুহাম্মদের অবস্থা ভিন্ন। উমরের যুক্তিতে মুহাম্মদের নিজের অবস্থান থেকে একটি সাধারণ পদ্ধতি নির্ধারিত হচ্ছে; আবু মুসার ক্ষেত্রে দেওয়া ভিন্ন নির্দেশটিও বর্ণনায় থেকে গেছে। ফলে কোন আমল কাদের জন্য প্রযোজ্য, সেই বাছাইয়ের মধ্যেই খলিফার নির্ধারণ কাজ করে। “কিতাব ও সুন্নাহ” উচ্চারণ করলেই ব্যবহারিক ফল এক হয়ে যায় না; কোন শর্তকে সিদ্ধান্তমূলক ধরা হচ্ছে, তা ফল বদলায়।

মুসলিমে আবু মুসার আরেক বর্ণনায় এই ভিন্ন সিদ্ধান্তের ব্যক্তিগত কারণ আরও সরাসরি বলা হয়েছে। একজন তাঁকে ফতোয়া দেওয়ার গতি কমাতে বলেন, কারণ খলিফা হজের আচার সম্পর্কে কী নতুন ব্যবস্থা করেছেন, তিনি জানেন না। পরে উমর মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদের কাজটি করার কথা জানেন বলেই স্বীকার করে নিজের অপছন্দের কারণ জানান। [1082]

أَنَّهُ كَانَ يُفْتِي بِالْمُتْعَةِ فَقَالَ لَهُ رَجُلٌ رُوَيْدَكَ بِبَعْضِ فُتْيَاكَ فَإِنَّكَ لاَ تَدْرِي مَا أَحْدَثَ أَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ فِي النُّسُكِ بَعْدُ حَتَّى لَقِيَهُ بَعْدُ فَسَأَلَهُ فَقَالَ عُمَرُ قَدْ عَلِمْتُ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَدْ فَعَلَهُ وَأَصْحَابُهُ وَلَكِنْ كَرِهْتُ أَنْ يَظَلُّوا مُعْرِسِينَ بِهِنَّ فِي الأَرَاكِ ثُمَّ يَرُوحُونَ فِي الْحَجِّ تَقْطُرُ رُءُوسُهُمْ

বাংলা অনুবাদ: তিনি মুতআর পক্ষে ফতোয়া দিতেন। একজন তাঁকে বলল, “আপনার কিছু ফতোয়ার বিষয়ে ধীরে চলুন; আমিরুল মুমিনিন হজের আচারে পরে কী ব্যবস্থা করেছেন, তা আপনি জানেন না।” পরে তাঁর সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞেস করলেন। উমর বললেন, “আমি জানি, নবী ও তাঁর সঙ্গীরা তা করেছেন। আমি অপছন্দ করেছি যে তারা আরাকগাছের মধ্যে স্ত্রীদের সঙ্গে সহবাসে সময় কাটাবে, তারপর মাথা থেকে পানি ঝরতে ঝরতে হজে যাবে।”

দলিল বা বক্তব্যপ্রতিষ্ঠিত তথ্যকর্তৃত্বের সংঘাত
বাকারা ২:১৯৬উমরার পর হজের সুবিধা এবং হাদির বিধানঅনুমোদিত পদ্ধতির ওপর পরবর্তী নিয়ন্ত্রণ
ইমরানের সাক্ষ্যনবীর সঙ্গে পালন; মৃত্যু পর্যন্ত নিষেধ নেইপরবর্তী ব্যক্তিগত মতকে পৃথক করা
আবু মুসার নবী-যুগের ঘটনাহাদি না থাকায় তাঁকে ইহরাম ছাড়তে নির্দেশএক ব্যক্তির বিশেষ অবস্থা থেকে অন্য সবার নিয়ম নির্ধারণের সমস্যা
উমরের স্বীকৃত কারণআগের পালন জানা সত্ত্বেও মাঝের দাম্পত্য অবকাশ অপছন্দঅনুমোদিত অবকাশে শাসকের সংযম আরোপ
ইবনে উমরের প্রতিক্রিয়াপিতার নির্দেশের তুলনায় মুহাম্মদের আমলকে বেছে নেওয়াখলিফার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পরিবার থেকেই আপত্তি

ইবনে উমরের বক্তব্যে এই সংঘাত পরিষ্কার প্রশ্নের রূপ নিয়েছে। এক সিরীয় তাঁর পিতা নিষেধ করেছেন বললে তিনি মুহাম্মদের আমল অনুসরণ এবং পিতার আদেশ অনুসরণের মধ্যে সরাসরি নির্বাচন হাজির করেন। বর্ণনাটি তিরমিযী নিজেই হাসান–সহিহ বলেছেন। [1083]

هِيَ حَلاَلٌ فَقَالَ الشَّامِيُّ إِنَّ أَبَاكَ قَدْ نَهَى عَنْهَا فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ أَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ أَبِي نَهَى عَنْهَا وَصَنَعَهَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَأَمْرَ أَبِي نَتَّبِعُ أَمْ أَمْرَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ الرَّجُلُ بَلْ أَمْرَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ لَقَدْ صَنَعَهَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم

বাংলা অনুবাদ: “এটি হালাল।” সিরীয় বলল, “আপনার পিতা তো তা নিষেধ করেছেন।” আবদুল্লাহ ইবনে উমর বললেন, “বলো তো, আমার পিতা নিষেধ করে থাকেন এবং আল্লাহর রসুল তা করে থাকেন, তাহলে আমরা আমার পিতার আদেশ অনুসরণ করব, না আল্লাহর রসুলের আদেশ?” লোকটি বলল, “আল্লাহর রসুলের আদেশ।” তিনি বললেন, “আল্লাহর রসুল তা করেছেন।”

ইবনে কাসীর উমরের নিষেধকে চূড়ান্ত হারাম ঘোষণার বদলে হজ ও উমরার জন্য মানুষের যাতায়াত বাড়ানোর উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় মক্কায় পৃথকভাবে আসার প্রবাহ বজায় রাখা প্রশাসনিক বিবেচনা। এই ব্যাখ্যাও আগের অনুমতি বদলে নতুন ধর্মীয় সীমা ঘোষণার সামাজিক কাজটিকে দৃশ্যমান করে: একটি অনুমোদিত পদ্ধতির বদলে আরেক পদ্ধতিকে শাসক উৎসাহিত ও কার্যকর করছেন। তাঁর উল্লেখিত উদ্দেশ্য: [1084]

إنما كان ينهى عنها ليكثر قصد الناس للبيت حاجين ومعتمرين

বাংলা অনুবাদ: তিনি তা নিষেধ করতেন, যাতে মানুষ হজকারী ও উমরাকারী হিসেবে বেশি করে কাবার উদ্দেশ্যে আসে।

উমরের নিজের বর্ণিত যৌন অবকাশের অপছন্দ এবং ভাষ্যকারের উল্লেখিত যাতায়াত বৃদ্ধির উদ্দেশ্য দুটি পৃথক বিবরণ। উভয় অবস্থাতেই পূর্বে অনুসৃত পদ্ধতির ওপর পরে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন থাকে। আবু মুসার কাছে আসা সতর্কবার্তায় খলিফার নতুন ব্যবস্থার খবর ফতোয়া নিয়ন্ত্রণের কারণ হয়েছে। একজন সাহাবির মুহাম্মদের কাছ থেকে শেখা আমল যথেষ্ট থাকেনি; বর্তমান শাসকের সিদ্ধান্তও তাঁকে জানতে হয়েছে।

হজের তামাত্তু নিয়ে ইবনে উমরের আপত্তি দেখায়, খলিফার সিদ্ধান্ত সব সাহাবির কাছে একভাবে বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠেনি। একই সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক পছন্দ, ধর্মীয় নির্দেশ এবং নবীর আমলের বিরোধ—এই ভিন্ন পরিচয়ে বিচার করা হয়েছে। হজের অনুমোদিত রূপের ওপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ এবং সেই হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আগের আমল ধরে রাখার চেষ্টা একই সূত্রভাণ্ডারে উপস্থিত। কোরআনের আয়াত অপরিবর্তিত থাকলেও কোন পদ্ধতি পালন করতে দেওয়া হবে, সেই প্রশ্নে শাসকের ক্ষমতা মানুষের ধর্মীয় আচরণে প্রবেশ করেছে।


উত্তরাধিকারের আউল: নির্দিষ্ট অংশে অনুপাতিক কাটছাঁট ও ইবনে আব্বাসের আপত্তি

আউল এমন পদ্ধতি, যার মাধ্যমে নির্ধারিত উত্তরাধিকার-অংশগুলোর যোগফল সম্পত্তির চেয়ে বেশি হলে প্রত্যেকের অংশ অনুপাতে কমানো হয়। মৃত ব্যক্তির মোট সম্পত্তি এক, অথচ অংশের দাবি কখনো একের বেশি। তখন কাউকেই ঘোষিত ভগ্নাংশ পুরো দেওয়া হয় না; সবাইকে একটি নতুন হর দিয়ে হিসাব করা অংশ দেওয়া হয়। কোরআনের সংখ্যাগুলো পৃষ্ঠায় অপরিবর্তিত থাকে, কিন্তু সম্পত্তির ওপর সেগুলোর প্রকৃত পরিমাণ বদলে যায়। এই বণ্টনপদ্ধতি উমরের আমলে চালু হওয়ার বর্ণনা এবং এর বিরুদ্ধে ইবনে আব্বাসের আপত্তি ইসলামি উত্তরাধিকারশাস্ত্রেই সংরক্ষিত।

সমস্যার সহজ উদাহরণে একজন নারী রেখে গেছেন স্বামী ও দুই সহোদরা বোন; সন্তান বা পিতা নেই এবং এই শ্রেণির উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার অন্য শর্ত পূর্ণ। নিসা ৪:১২ অনুসারে সন্তানহীন স্ত্রীর স্বামী অর্ধেকের দাবিদার; নিসা ৪:১৭৬ অনুসারে দুই বোনের যৌথ অংশ দুই-তৃতীয়াংশ। যোগফল ১/২ + ২/৩ = ৭/৬। ছয় ভাগ সম্পত্তি থেকে সাত ভাগের দাবি সম্পূর্ণ দেওয়া যায় না। বোনদের অংশ সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোরআনিক বাক্য: [1085]

فَإِن كَانَتَا اثْنَتَيْنِ فَلَهُمَا الثُّلُثَانِ مِمَّا تَرَكَ

বাংলা অনুবাদ: তারা দুই বোন হলে, সে যা রেখে গেছে তার দুই-তৃতীয়াংশ তাদের দুজনের।

উত্তরাধিকারীঘোষিত ভগ্নাংশছয় ভাগে দাবিআউলের পরে প্রকৃত অংশ
স্বামী১/২৩/৬৩/৭
দুই বোন একত্রে২/৩৪/৬৪/৭
মোট৭/৬সম্পত্তির ৬ ভাগের বিপরীতে দাবি ৭ ভাগ৭/৭

এখানে আউল করার অর্থ স্বামীর অর্ধেককে তিন-সপ্তমাংশ এবং বোনদের দুই-তৃতীয়াংশকে চার-সপ্তমাংশে নামিয়ে আনা। প্রাপকদের পরস্পরের অনুপাত ৩:৪ রাখা হচ্ছে, কিন্তু প্রত্যেকের সম্পত্তিগত অংশ কমছে। হর ছয় থেকে সাত করা কেবল লেখার সুবিধা নয়; অর্ধেক ও তিন-সপ্তমাংশ এক পরিমাণ সম্পদ নয়। দুই-তৃতীয়াংশ এবং চার-সপ্তমাংশও এক নয়। হিসাবের পদ্ধতি বদলানোর সঙ্গে সম্পত্তির অধিকার বদলে গেছে।

কারাফির আয-যাখিরায় ইবন ইউনুসের সূত্রে উমরের সামনে এই সমস্যার উদ্ভব ও তাঁর সিদ্ধান্তের বিবরণ রয়েছে। বর্ণনায় উমর জানেন না কিতাব কাকে আগে দিয়েছে, কাকে পরে; তাই নিজের মত হিসেবে সবার অংশে ঘাটতি প্রবেশ করানোর পথ বেছে নেন। সিদ্ধান্তের সূচনা: [1086]

لا أدري من قدمه الكتاب فأقدمه ، ولا أخره فأؤخره ولكن قد رأيت رأيا فإن يكن صوابا فمن الله عز وجل ، وإن يكن خطأ فمن عمر

বাংলা অনুবাদ: কিতাব কাকে আগে দিয়েছে, যাতে তাকে আগে রাখি, আর কাকে পরে দিয়েছে, যাতে তাকে পরে রাখি—তা আমি জানি না। আমি একটি মত গ্রহণ করেছি; তা সঠিক হলে আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর ভুল হলে উমরের পক্ষ থেকে।

এই বিবরণে সিদ্ধান্তটি নতুন আয়াত বা মুহাম্মদের সরাসরি নির্দেশ হিসেবে পেশ করা হয়নি। সমস্যার সামনে একটি মত নির্বাচন করা হয়েছে। একই গ্রন্থে আব্বাসের পরামর্শ, আউল দিয়ে রায় এবং ইবনে আব্বাসের ভিন্ন পথও আছে। পরামর্শদাতার পরিচয় ও প্রথম ঘটনার গঠন নিয়ে অন্য সূত্রে ভিন্ন বিবরণ রয়েছে; আউল-রায়কে উমরের আমলের সঙ্গে যুক্ত করার ধারাটি সেগুলোতেও পাওয়া যায়। ফলে একটি নির্দিষ্ট বৈঠকের সব খুঁটিনাটির অভিন্নতা ছাড়াও শাস্ত্রীয় স্মৃতিতে শাসকের সিদ্ধান্ত ও নতুন বণ্টনপদ্ধতির সম্পর্ক দৃশ্যমান।

ইসলামকিউএও একই গাণিতিক সমস্যার উত্তরে প্রত্যেককে সম্পূর্ণ অংশ দিতে না পারার কথা স্বীকার করেছে। তাদের উদাহরণে স্ত্রী, পিতা, মাতা এবং তিন কন্যার দাবি ২৪ ভাগের জায়গায় ২৭ ভাগ। সমাধান হিসেবে তারা ওই ২৭-কে নতুন হর করেছে। স্বীকারোক্তিটি সংক্ষিপ্ত ও পরিষ্কার: [1087]

فلا يمكن أن يعطى كل وارث سهمه كاملاً لأن التركة لن تكفي

বাংলা অনুবাদ: প্রত্যেক উত্তরাধিকারীকে তার সম্পূর্ণ অংশ দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ সম্পত্তি যথেষ্ট হবে না।

স্ত্রী, পিতা–মাতা ও কন্যাদের উদাহরণমূল নির্ধারিত দাবি২৪-ভাগে দাবিআউলের পরে অংশনিট সম্পত্তি ২৭,০০০ টাকা হলে প্রাপ্তি
স্ত্রী১/৮৩/২৪৩/২৭ = ১/৯৩,০০০ টাকা
পিতা১/৬৪/২৪৪/২৭৪,০০০ টাকা
মাতা১/৬৪/২৪৪/২৭৪,০০০ টাকা
দুই বা ততোধিক কন্যা একত্রে২/৩১৬/২৪১৬/২৭১৬,০০০ টাকা
মোট১/৮ + ১/৬ + ১/৬ + ২/৩২৭/২৪২৭/২৭২৭,০০০ টাকা

দুই কন্যার জন্যও দুই-তৃতীয়াংশ গ্রহণের প্রচলিত সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতে ইবনে কাসীর বোনদের আয়াত ও মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত বণ্টনের নজির ব্যবহার করেছেন। এই ফিকহি বণ্টনে দুই অথবা তিন কন্যা থাকলে উপরের যৌথ দাবি একই থাকে। নিট সম্পত্তি বলতে ঋণ ও কার্যকর অসিয়তের মতো পূর্ববর্তী দায় মেটানোর পরে বণ্টনযোগ্য অংশ বোঝানো হচ্ছে। সেই পূর্ববর্তী দায় মেটানোর পরে অবশিষ্ট সম্পত্তির ওপর দাবির যোগফলও ২৭/২৪ হয়। দুই কন্যার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাঁর নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা: [1088]

وإنما استفيد كون الثلثين للبنتين من حكم الأختين في الآية الأخيرة

বাংলা অনুবাদ: দুই কন্যার জন্য দুই-তৃতীয়াংশ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে শেষের আয়াতে দুই বোনের বিধান থেকে।

২৭,০০০ টাকার উদাহরণে আউল ছাড়া স্ত্রী এক-অষ্টমাংশ হিসেবে ৩,৩৭৫ টাকা, পিতা ও মাতা প্রত্যেকে ৪,৫০০ টাকা এবং কন্যারা যৌথভাবে ১৮,০০০ টাকা দাবি করবেন। মোট ৩০,৩৭৫ টাকা। সম্পত্তি থেকে অতিরিক্ত ৩,৩৭৫ টাকা সৃষ্টি হয় না। আউলে এই অক্ষমতা দূর করা হয় দাবির টাকা কমিয়ে, আগের ভগ্নাংশগুলো হুবহু কার্যকর করে নয়। স্ত্রীর এক-অষ্টমাংশ শেষ পর্যন্ত এক-নবমাংশ হয়; বাকি প্রত্যেকের অংশও একই অনুপাতে কমে।

ইবনে আব্বাসের বিকল্প পদ্ধতিতে ঘাটতি সবার ওপর সমান অনুপাতে চাপানো হয় না। যাঁদের জন্য এক নির্ধারিত ভাগ থেকে অন্য নির্ধারিত ভাগে নামার নিয়ম আছে, তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়; কন্যা ও বোনের মতো যাঁরা অন্য অবস্থায় অবশিষ্টাংশ পান, তাঁদের অংশে ঘাটতি যায়। বায়হাকির সংকলিত সংলাপে তিনি ঈশ্বরের গণনার সঙ্গে অতিরিক্ত ভগ্নাংশের দাবি মেলাতে আপত্তি করেছেন। বর্ণনার প্রশ্নটি: [1089]

تَرَوْنَ الَّذِي أَحْصَى رَمْلَ عَالِجٍ عَدَدًا لَمْ يُحْصِ فِي مَالٍ نِصْفًا وَنِصْفًا وَثُلُثًا إِذَا ذَهَبَ نِصْفٌ وَنِصْفٌ فَأَيْنَ مَوْضِعُ الثُّلُثِ

বাংলা অনুবাদ: তোমরা কি মনে করো, যিনি আলিজের বালুকণার সংখ্যা গণনা করেছেন, তিনি একটি সম্পত্তিতে অর্ধেক, অর্ধেক ও এক-তৃতীয়াংশের হিসাব করতে পারেননি? অর্ধেক ও অর্ধেকেই সম্পত্তি শেষ হয়ে গেলে এক-তৃতীয়াংশের জায়গা কোথায়?

স্বামী, মাতা ও এক সহোদরা বোনের ক্ষেত্রে এই ভিন্নতার সরাসরি ফল দেখা যায়। অর্ধেক, এক-তৃতীয়াংশ ও অর্ধেকের মোট দাবি ৮/৬। আউলে তা ৩/৮, ২/৮ ও ৩/৮ হয়। ইবনে আব্বাসের অগ্রাধিকারভিত্তিক অবস্থানে স্বামীর অর্ধেক ও মাতার এক-তৃতীয়াংশ রেখে বোনকে অবশিষ্ট এক-ষষ্ঠাংশ দেওয়া হয়। ইবনে কুদামা এই মতভেদ সংরক্ষণ করে ঘাটতি কার অংশে পড়বে, তা ব্যাখ্যা করেছেন। আউলের তাঁর সংজ্ঞা: [1090]

ومعنى العول أن تزدحم فروض لا يتسع المال لها كهذه المسألة، فيدخل النقص عليهم كلهم ويقسم المال بينهم على قدر فروضهم

বাংলা অনুবাদ: আউলের অর্থ হলো, এমনভাবে নির্ধারিত অংশগুলো একত্র হওয়া যে সম্পত্তি সেগুলোর জন্য যথেষ্ট নয়; তখন সবার অংশে ঘাটতি প্রবেশ করে এবং তাদের নির্ধারিত অংশের অনুপাতে সম্পত্তি ভাগ করা হয়।

স্বামী, মাতা ও এক বোনআউলের পদ্ধতিইবনে আব্বাসের অগ্রাধিকারভিত্তিক পদ্ধতি
স্বামী৩/৮১/২
মাতা২/৮ = ১/৪১/৩
সহোদরা বোন৩/৮অবশিষ্ট ১/৬
ঘাটতির স্থানসবার অংশে অনুপাতেবোনের অংশে

দুই পদ্ধতিতেই সীমিত সম্পত্তি বণ্টনের একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে; সিদ্ধান্তটি কার দাবি কতখানি কমাবে, সেখানে বড় পার্থক্য। একটি পরিবারে বোন তিন-অষ্টমাংশ পাবেন, না এক-ষষ্ঠাংশ—এটি শব্দের তর্ক নয়। ধর্মীয় ব্যাখ্যার নামে তাঁর হাতে যাওয়া সম্পদের পরিমাণ বদলে যাচ্ছে। সবার অংশে ঘাটতি দেওয়াকে ন্যায্য বলা এবং অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অন্যের অংশ রক্ষা করাকে ন্যায্য বলা পরস্পরবিরোধী বণ্টননীতি। আয়াতের সংখ্যা থেকে কোন নীতি গ্রহণ করতে হবে, তা স্থির করতেই পরবর্তী বিচার প্রয়োজন হয়েছে।

বায়হাকির একই বর্ণনায় উমরের সামনে এই মত না জানানোর কারণ হিসেবেও ক্ষমতার উপস্থিতি রয়েছে। প্রশ্নের উত্তরে ইবনে আব্বাস উমরকে ভয় করার কথা বলেছেন। সংলাপের সংশ্লিষ্ট অংশ: [1091]

فقال له زفر : فما منعك أن تشير بهذا الرأي على عمر ؟ فقال : هبته والله

বাংলা অনুবাদ: যুফার তাঁকে বললেন, “উমরকে এই মতের পরামর্শ দিতে আপনাকে কী বাধা দিয়েছিল?” তিনি বললেন, “আল্লাহর কসম, আমি তাঁকে ভয় করতাম।”

এই সংলাপের মধ্যে খলিফার আমলে কোনো আপত্তি প্রকাশ না পাওয়া এবং আন্তরিক মতৈক্য থাকা এক হয়ে যায় না। বর্ণনাটি অন্তত এমন একটি স্মৃতি সংরক্ষণ করেছে, যেখানে শাসকের ব্যক্তিত্ব ভিন্নমত প্রকাশে বাধা। পরবর্তী সময়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের গ্রহণ এই পূর্ববর্তী নীরবতার অর্থ আবার নির্ধারণ করেছে। সাহাবিদের রায়ের ভিত্তিতে আইন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাই নীরবতা, ভয়, পরবর্তী আপত্তি ও সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রহণ—সবগুলোর সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আউল সম্পত্তির অতিরিক্ত দাবি সামলানোর কার্যকর মানবীয় গণনাপদ্ধতি। তার সফলতা হলো সীমিত সম্পত্তিকে নতুন অনুপাতে পুরো বণ্টন করতে পারা। সেই সফলতা আগের ভগ্নাংশগুলো অপরিবর্তিত পরিমাণে দেওয়া সম্ভব ছিল—এমন প্রমাণ নয়। বরং পদ্ধতিটির প্রয়োজন ও সংজ্ঞা নিজেরাই আগের দাবিগুলো একসঙ্গে পূরণ করতে অক্ষমতা প্রকাশ করে। সর্বজ্ঞ বিধানদাতার নিখুঁত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বণ্টনব্যবস্থার দাবির সামনে এই ঘাটতি বাস্তব: আইন চালাতে নতুন বণ্টননীতি স্থির করতে হয়েছে। উমরের আমলের সেই সিদ্ধান্ত পরবর্তী সুন্নি উত্তরাধিকারবিধির অংশ হয়েছে, আর মুসহাফে পুরোনো ভগ্নাংশগুলো রয়ে গেছে আগের ভাষাতেই।


উম্মু ওয়ালাদ বিক্রি: নবী-যুগের প্রথা ও উমরের নিষেধাজ্ঞা

উম্মু ওয়ালাদ সেই দাসী নারী, যিনি তাঁর মালিকের সন্তান প্রসব করেছেন। এই পরিচয়ে মাতৃত্ব এবং মালিকানা একই ব্যক্তির ওপর একসঙ্গে বর্তায়: সন্তানটি মালিকের, আর সন্তানের মাও তাঁর মালিকানাধীন। তাঁকে বিক্রি করা যাবে কি না, মালিকের জীবদ্দশায় তাঁর অবস্থা কী এবং মালিক মারা গেলে তিনি মুক্ত হবেন কি না—এসব নিয়ে ইসলামি বর্ণনা ও ফিকহে পৃথক সিদ্ধান্ত রয়েছে। উমরের নিষেধ এই বিক্রয়ক্ষমতার ওপর একটি নতুন সীমা হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে। তার আগে বিক্রি হওয়ার সংবাদ মুহাম্মদ ও আবু বকরের আমল পর্যন্ত পৌঁছায়।

আবু দাউদে জাবিরের বর্ণনা সরাসরি তিন পর্ব উল্লেখ করে: মুহাম্মদের যুগে বিক্রি, আবু বকরের যুগে বিক্রি এবং উমরের নিষেধে বন্ধ হওয়া। এতে বিক্রয়যোগ্যতার পরিবর্তনকে নির্দিষ্ট শাসনপর্ব দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। [1092]

بِعْنَا أُمَّهَاتِ الأَوْلاَدِ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَبِي بَكْرٍ فَلَمَّا كَانَ عُمَرُ نَهَانَا فَانْتَهَيْنَا

বাংলা অনুবাদ: আমরা আল্লাহর রসুল ও আবু বকরের যুগে উম্মু ওয়ালাদদের বিক্রি করেছি। উমরের আমল এলে তিনি আমাদের নিষেধ করেন; তখন আমরা বিরত হই।

ইবনে মাজার জাবির-বর্ণনায় বিক্রির তালিকায় উপপত্নী দাসী এবং মালিকের সন্তানের মা—দুই পরিচয় পাশাপাশি আছে। তাঁরা নিজেদের কাজকে দূষণীয় মনে করতেন না এবং মুহাম্মদ তাঁদের মধ্যে জীবিত ছিলেন—এই কথাও রয়েছে। উম্মু ওয়ালাদ বিক্রির ইতিহাস এখানে কেবল অজ্ঞাত কোনো পরবর্তী সমাজের ঘটনা হয়ে থাকে না। [1093]

كُنَّا نَبِيعُ سَرَارِينَا وَأُمَّهَاتِ أَوْلاَدِنَا وَالنَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فِينَا حَىٌّ لاَ نَرَى بِذَلِكَ بَأْسًا

বাংলা অনুবাদ: আমরা আমাদের উপপত্নী দাসী ও নিজেদের সন্তানের মায়েদের বিক্রি করতাম; নবী তখন আমাদের মধ্যে জীবিত ছিলেন। আমরা এতে কোনো দোষ দেখতাম না।

আবু দাউদের বর্ণনাপথে আতা ও কাইস এবং ইবনে মাজার বর্ণনাপথে আবু যুবাইর ও ইবনে জুরাইজ রয়েছেন; উভয়ের মূল সংবাদদাতা জাবির। তাঁর নামে বিক্রির যে স্মৃতি প্রচারিত হয়েছে, তাতে মাতৃত্ব বিক্রয়যোগ্যতা রোধ করেনি। একজন মানুষ ওই পুরুষের সন্তান জন্ম দিয়েছেন, অথচ সেই পুরুষই তাঁকে সম্পত্তির মতো অন্যের কাছে হস্তান্তর করতে পারছেন। উমরের নিষেধের ফলে এই বিক্রয়ক্ষমতার সীমা বদলায়।

মোয়াত্তায় উমরের নামে যে বিধান সংরক্ষিত, তা বিক্রি, উপহার এবং উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তর বন্ধ করে। মালিকের জীবদ্দশার ভোগক্ষমতা বহাল রেখে তাঁর মৃত্যুর পরে নারীটি মুক্ত হবেন বলা হয়েছে। অর্থাৎ নিষেধের নির্দিষ্ট সীমা ও মুক্তির সময় একই বক্তব্যে নির্ধারিত। [1094]

أَيُّمَا وَلِيدَةٍ وَلَدَتْ مِنْ سَيِّدِهَا فَإِنَّهُ لاَ يَبِيعُهَا وَلاَ يَهَبُهَا وَلاَ يُوَرِّثُهَا وَهُوَ يَسْتَمْتِعُ بِهَا فَإِذَا مَاتَ فَهِيَ حُرَّةٌ

বাংলা অনুবাদ: যে দাসী তার মালিকের সন্তান প্রসব করেছে, মালিক তাকে বিক্রি করবে না, উপহার দেবে না এবং উত্তরাধিকারসূত্রে রেখে যাবে না। সে তাকে ভোগ করতে পারবে; মালিক মারা গেলে সে স্বাধীন হবে।

বিধানের স্তরনারীর ওপর মালিকের ক্ষমতাস্বাধীনতার অবস্থা
জাবিরের বর্ণিত আগের প্রচলনউম্মু ওয়ালাদ বিক্রি করা হতোমাতৃত্ব বিক্রয় রোধ করেনি
মোয়াত্তায় উমরের বিধানবিক্রি ও উপহার নিষিদ্ধসন্তান জন্মের সঙ্গে তাৎক্ষণিক পূর্ণ স্বাধীনতা নয়
মালিকের জীবদ্দশাভোগক্ষমতা বহালনারী মালিকানার সম্পর্কের বাইরে যান না
মালিকের মৃত্যুউত্তরাধিকারীর সম্পত্তি হিসেবে হস্তান্তর নয়বর্ণিত বিধানে স্বাধীনতা
আলীর পরবর্তী মত হিসেবে সংরক্ষিত বিবরণআবার বিক্রির অনুমতির দিকে রায়আগের সিদ্ধান্তের স্থায়িত্ব নিয়ে মতভেদ

এখানে নিষিদ্ধ হয়েছে একজনের হাত থেকে আরেকজনের হাতে ওই নারীকে হস্তান্তরের কিছু পথ। মালিক জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁর যৌন ভোগের অধিকার প্রত্যাহার করা হয়নি। নিজের সন্তানের মা হওয়াও নারীটিকে স্বাধীনভাবে সম্পর্ক ছেড়ে যাওয়ার অধিকার দেয়নি। তাঁর মুক্তির সময় আরেকজন মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে বাঁধা। মাতৃত্ব, যৌন অধিকার এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার এই অসম বিন্যাসের কেন্দ্রে নারীকে স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে নয়, বিশেষ অবস্থার মালিকানাধীন মানুষ হিসেবে রাখা হয়েছে।

ইবনুল মুনযিরের আল-আওসাতে এই কাঠামো আরও স্পষ্ট। তাঁর সংকলিত যুক্তিতে উম্মু ওয়ালাদ বিবাহিত স্ত্রী নন, যতক্ষণ আলাদা করে বিবাহ না হয়; যৌন সম্পর্কের বৈধতা সেখানে মালিকানার ভিত্তিতে নির্ধারিত। বিক্রির পক্ষে যুক্তি দিতে এই মালিকানাই ব্যবহার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বাক্য: [1095]

فإذا لم تكن زوجة وجاز وطؤها بملك اليمين وجب أن يكون لسيدها بيعها

বাংলা অনুবাদ: সে স্ত্রী না হলে এবং মালিকানার ভিত্তিতে তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম বৈধ হলে, মালিকের তাকে বিক্রি করার অধিকারও থাকা উচিত।

এই যুক্তির নির্মমতা তার সঙ্গতিতেই ধরা পড়ে। যৌন ব্যবহার বৈধ করার জন্য যে মালিকানা গ্রহণ করা হয়েছে, একই মালিকানা বিক্রির ক্ষমতার ভিত্তি হিসেবেও হাজির হচ্ছে। নারীর স্বাধীন সম্মতি বা সম্পর্ক ত্যাগের অধিকার এই যুক্তির নির্ধারক শর্ত নয়; মালিক কিসের অধিকারী, সেটিই নির্ধারক। বিক্রি বন্ধ করার রায় সেই ক্ষমতার একটি দিক সংকুচিত করে, কিন্তু যৌন মালিকানার মূল সম্পর্কটি অক্ষত রাখে। ফলে বিক্রিনিষেধ ও মানুষের ওপর মালিকানা বিলোপ দুটি সম্পূর্ণ পৃথক পরিবর্তন।

আল-আওসাতে ইবনে আব্বাসের নামে উম্মু ওয়ালাদকে উট বা ভেড়ার সঙ্গে তুলনা করার উক্তিও আছে। এটি সম্পত্তির শ্রেণিতে মানুষকে স্থাপন করার ভাষা। উদ্ধৃত উক্তি: [1096]

والله ما هي إلا بمنزلة بعيرك أو شاتك

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর কসম, সে তোমার উট অথবা ভেড়ার মতোই।

একজন নারী সন্তানের মা হওয়ার পরেও পশুর সম্পত্তিগত অবস্থানের সঙ্গে তুলিত হচ্ছেন। তাঁর মাতৃত্ব ও স্বতন্ত্র ইচ্ছার তুলনায় মালিকের হস্তান্তরক্ষমতা এই বক্তব্যে নির্ধারক। মানুষকে কেনাবেচার বস্তু করা, তার যৌনজীবনকে অন্যের মালিকানার অধীন রাখা এবং মাতৃত্ব সত্ত্বেও স্বাধীনতার জন্য মালিকের মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করানো—বিধানগুলোর বাস্তব বিষয়বস্তু এগুলোই। ধর্মীয় অনুমোদন এই অধীনতাকে ব্যক্তিস্বাধীনতায় রূপান্তর করে না।

আলীর নামে সংরক্ষিত এক বিবরণে উমরের সঙ্গে প্রথমে একমত হওয়া এবং পরে নিজের শাসনকালে বিক্রির পক্ষে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা এসেছে। একই সংকলনে পুরোনো সিদ্ধান্তে বিচার চালিয়ে যেতে বলার সংবাদও রয়েছে। মত পরিবর্তন এবং তা সর্বত্র কার্যকর করার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত তাই এক সময়ের একই ঘটনা হিসেবে ধরা যায় না। ভিন্ন মতটি তাঁর সঙ্গে স্পষ্টভাবে যুক্ত করা হয়েছে এই বাক্যে: [1097]

فقضى به عمر حياته وعثمان من بعده ، فلما وليت أنا رأيت أن أبيعها

বাংলা অনুবাদ: উমর তাঁর জীবদ্দশায় সে অনুযায়ী রায় দেন এবং তাঁর পরে উসমানও। পরে আমি শাসনভার পেয়ে তাকে বিক্রির মত গ্রহণ করি।

এই বর্ণনাগুলোতে আইনপ্রণয়নের একটি চলমান ইতিহাস পাওয়া যায়। আগের প্রচলন, উমরের নিষেধ, উসমানের সময়ে অনুসরণ এবং আলীর নামে ভিন্ন রায়ের স্মৃতি একই বিষয়কে ঘিরে সংরক্ষিত। পরে কোনো মত প্রাধান্য পেয়েছে বলেই পূর্ববর্তী মতভেদ বিলীন হয়ে যায় না। নারীর বিক্রয়যোগ্যতা একটি নির্দিষ্ট রাজত্বের সিদ্ধান্ত থেকে পরবর্তী ফিকহের নীতিতে রূপ নিতে পারে; সেই পথের মধ্যেই বিরোধ ও পরিবর্তনও ছিল।

উম্মু ওয়ালাদের ক্ষেত্রে দুই স্তরের সমালোচনা পাশাপাশি দাঁড়ায়। প্রথমত, নবী-যুগে ও আবু বকরের আমলে প্রচলিত বিক্রি বন্ধ করতে পরবর্তী খলিফার নিষেধের ভূমিকা বর্ণিত হয়েছে; ধর্মীয় বিধানের ব্যবহারিক সীমা শাসনপর্বে বদলেছে। দ্বিতীয়ত, সেই নিষেধও নারীর পূর্ণ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেনি। আইন পরিবর্তনের পরেও সন্তানের মা আরেকজনের ভোগাধীন থেকে গেছেন। নবী-যুগের প্রথা এবং খলিফার সংশোধিত বিধান উভয়ই মানুষকে মালিকানার শ্রেণিতে রেখেছে; মতভেদটি সেই মালিকানার কতখানি হস্তান্তর করা যাবে, তা নিয়ে।


প্রাপ্তবয়স্কের দুধপান: সালিম, আয়েশা, অন্য নবীপত্নী ও উমরের পৃথক অবস্থান

দুধপান থেকে আত্মীয়তার সম্পর্ক সৃষ্টি হলে বিবাহের নিষেধ ও ঘরে প্রবেশের অনুমতিও বদলায়। প্রাপ্তবয়স্কের দুধপানে সেই সম্পর্ক তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে মুহাম্মদের নামে বর্ণিত নির্দেশ, আয়েশার গ্রহণ, অন্য নবীপত্নীদের ব্যাখ্যা এবং উমরের রায়ে পৃথক ফল পাওয়া যায়। কোনো ব্যক্তির শরীরে দুধ প্রবেশের একই ঘটনা কখনো আত্মীয়তার আইনি ভিত্তি, কখনো বিধানগতভাবে অকার্যকর খাদ্যগ্রহণ হিসেবে বিচার করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত মানুষের বিবাহ, যৌন সম্পর্ক ও পারিবারিক চলাচলে সরাসরি প্রয়োগ হয়েছে।

শিশুর দুধপানের সাধারণ সময়সীমা বাকারা ২:২৩৩-এ দুই পূর্ণ বছর। কুরতুবী এই আয়াত থেকে দুধসম্পর্কের কার্যকর সময়সীমা নির্ধারণের মতগুলো সংকলন করেছেন এবং উমরকেও শিশু-পর্যায়ের সীমার পক্ষে উল্লেখ করেছেন। তাঁর আলোচনায় দুই বছরের সঙ্গে কিছু অতিরিক্ত সময় গ্রহণের ভিন্ন মতও রয়েছে। মূল আয়াতের ভাষা: [1098]

والوالدات يرضعن أولادهن حولين كاملين لمن أراد أن يتم الرضاعة

বাংলা অনুবাদ: মায়েরা তাদের সন্তানদের দুই পূর্ণ বছর দুধপান করাবে—যে দুধপান সম্পূর্ণ করতে চায়, তার জন্য।

সালিমের ঘটনায় প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে দুধপান করানোর নির্দেশ সংরক্ষিত হয়েছে। সাহলা তাঁর ঘরে সালিমের প্রবেশে আবু হুযাইফার মুখে অসন্তোষ দেখার কথা জানান। মুহাম্মদ দুধপান করাতে বললে সালিম বড় মানুষ—এই আপত্তিও তিনি সরাসরি তোলেন। মুসলিমের বর্ণনায় মুহাম্মদ বয়সের বিষয়টি জানেন বলেই জানান। মূল কথোপকথন: [1099]

جَاءَتْ سَهْلَةُ بِنْتُ سُهَيْلٍ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أَرَى فِي وَجْهِ أَبِي حُذَيْفَةَ مِنْ دُخُولِ سَالِمٍ وَهُوَ حَلِيفُهُ فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم أَرْضِعِيهِ قَالَتْ وَكَيْفَ أُرْضِعُهُ وَهُوَ رَجُلٌ كَبِيرٌ فَتَبَسَّمَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَقَالَ قَدْ عَلِمْتُ أَنَّهُ رَجُلٌ كَبِيرٌ زَادَ عَمْرٌو فِي حَدِيثِهِ وَكَانَ قَدْ شَهِدَ بَدْرًا وَفِي رِوَايَةِ ابْنِ أَبِي عُمَرَ فَضَحِكَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم

বাংলা অনুবাদ: সাহলা বিনতে সুহাইল নবীর কাছে এসে বললেন, “আল্লাহর রসুল, সালিমের প্রবেশের কারণে আবু হুযাইফার মুখে আমি অসন্তোষ দেখতে পাই; সালিম তাঁর মিত্র।” নবী বললেন, “তাকে দুধপান করাও।” তিনি বললেন, “সে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ; আমি তাকে কীভাবে দুধপান করাব?” আল্লাহর রসুল মুচকি হেসে বললেন, “আমি জানি যে সে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ।” আমর তাঁর বর্ণনায় যোগ করেছেন, সালিম বদরে অংশ নিয়েছিলেন। ইবনে আবি উমরের বর্ণনায় আছে, আল্লাহর রসুল হেসেছিলেন।

এই কথোপকথনের মূল সমস্যা শিশুর পুষ্টি নয়; প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ঘরে আসা এবং সেই আসা নিয়ে স্বামীর অসন্তোষ। দুধপানকে পারিবারিক প্রবেশাধিকারের একটি নতুন সম্পর্ক সৃষ্টির উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে শারীরিক বয়সের প্রশ্নটি স্পষ্টভাবে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও একটি নির্দিষ্ট ঘটনায় বয়সকে বাধা করা হয়নি। পরবর্তী আইনজ্ঞের সামনে তখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, এই ঘটনাটি অন্য প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রেও একই ফল দেবে কি না।

আয়েশা এই নির্দেশকে অন্যের প্রবেশের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করেছেন বলে আবু দাউদের পূর্ণ বর্ণনায় পাওয়া যায়। সেখানে তাঁর ভাগনি ও ভাইঝিদের মাধ্যমে দুধপানের ব্যবস্থা এবং অন্য নবীপত্নীদের অস্বীকৃতি পাশাপাশি সংরক্ষিত। এই প্রয়োগে সালিমের ঘটনাটি শুধু অতীতের একজনের ঘটনা থাকে না; অন্য ব্যক্তির জন্যও ঘরে প্রবেশের বৈধতা তৈরির নজির হয়। কোন ব্যক্তিকে পরিবারের ঘনিষ্ঠ প্রবেশাধিকার দেওয়া যাবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা এই বর্ণনার সাধারণীকরণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

মুসলিমে উম্মে সালামার সূত্রে অন্য নবীপত্নীদের অবস্থান হলো, তাঁরা বিষয়টিকে সালিমের জন্য বিশেষ ছাড় মনে করেন এবং সেই দুধপানের ভিত্তিতে অন্য কাউকে প্রবেশ করতে দেন না। বিশেষত্বের সিদ্ধান্তটি তাঁদের নিজেদের ব্যাখ্যার ভাষায় এসেছে। [1100]

أَبَى سَائِرُ أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنْ يُدْخِلْنَ عَلَيْهِنَّ أَحَدًا بِتِلْكَ الرَّضَاعَةِ وَقُلْنَ لِعَائِشَةَ وَاللَّهِ مَا نَرَى هَذَا إِلاَّ رُخْصَةً أَرْخَصَهَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لِسَالِمٍ خَاصَّةً فَمَا هُوَ بِدَاخِلٍ عَلَيْنَا أَحَدٌ بِهَذِهِ الرَّضَاعَةِ وَلاَ رَائِينَا

বাংলা অনুবাদ: নবীর অন্য স্ত্রীরা ওই দুধপানের ভিত্তিতে কাউকে নিজেদের কাছে প্রবেশ করতে দিতে অস্বীকার করেন। তাঁরা আয়েশাকে বলেন, “আল্লাহর কসম, আমরা একে আল্লাহর রসুলের পক্ষ থেকে শুধু সালিমকে দেওয়া বিশেষ ছাড়ই মনে করি। এই দুধপানের ভিত্তিতে কেউ আমাদের কাছে প্রবেশ করবে না এবং আমাদের দেখবেও না।”

ঘটনা গ্রহণ করেও তার পরিসর নিয়ে মতভেদ হয়েছে। আয়েশার প্রয়োগে অন্য ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত; অন্য স্ত্রীরা ব্যক্তিবিশেষের ছাড় বলে সীমা টেনেছেন। তাঁরা একই গৃহজগতের ঘনিষ্ঠ সাক্ষ্য ও ব্যাখ্যার ধারক হয়েও একই ব্যবহারিক ফল গ্রহণ করেননি। ফলে নবী-সংলগ্নতার পরিচয় নিজে পরবর্তী আইনগত মতভেদ দূর করেনি। ঘটনা থেকে সাধারণ নিয়মে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি পৃথক বিচার হিসেবেই রয়ে গেছে।

উমরের কাছে আসা দাসী-সংক্রান্ত ঘটনাটি এই মতভেদের আরেক বাস্তব প্রয়োগ। একজন ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক থাকা দাসীকে স্ত্রী দুধপান করিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। স্ত্রীর বক্তব্যে দুধপানের ঘটনাটি স্বামীর সামনে হাজির হয়। উমরের রায়ে সেই দুধপান যৌন সম্পর্কের বাধা হয়নি; স্ত্রীকে ব্যথা দেওয়ার আদেশের সঙ্গে দাসীর কাছে যাওয়ার অনুমতি এসেছে। মোয়াত্তার পূর্ণ ঘটনাটি: [1101]

جَاءَ رَجُلٌ إِلَى عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ وَأَنَا مَعَهُ عِنْدَ دَارِ الْقَضَاءِ يَسْأَلُهُ عَنْ رَضَاعَةِ الْكَبِيرِ فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ فَقَالَ إِنِّي كَانَتْ لِي وَلِيدَةٌ وَكُنْتُ أَطَؤُهَا فَعَمَدَتِ امْرَأَتِي إِلَيْهَا فَأَرْضَعَتْهَا فَدَخَلْتُ عَلَيْهَا فَقَالَتْ دُونَكَ فَقَدْ وَاللَّهِ أَرْضَعْتُهَا فَقَالَ عُمَرُ أَوْجِعْهَا وَأْتِ جَارِيتَكَ فَإِنَّمَا الرَّضَاعَةُ رَضَاعَةُ الصَّغِيرِ

বাংলা অনুবাদ: এক ব্যক্তি দারুল কাজার কাছে আবদুল্লাহ ইবনে উমরের কাছে প্রাপ্তবয়স্কের দুধপান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে এলেন; আমি তখন তাঁর সঙ্গে ছিলাম। আবদুল্লাহ ইবনে উমর বললেন, এক ব্যক্তি উমর ইবনুল খাত্তাবের কাছে এসে বলেছিল, “আমার এক দাসী ছিল এবং আমি তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম করতাম। আমার স্ত্রী তার কাছে গিয়ে তাকে দুধপান করিয়েছে। পরে স্ত্রীর কাছে গেলে সে বলল, ‘নাও, আল্লাহর কসম, আমি তাকে দুধপান করিয়েছি।’” উমর বললেন, “তাকে ব্যথা দাও এবং তোমার দাসীর কাছে যাও। কার্যকর দুধপান তো শিশুর দুধপান।”

অবস্থান বা ঘটনাদুধপানের বয়স ও পরিসরআইনগত ফল
সাহলা–সালিমের ঘটনাপ্রাপ্তবয়স্ক সালিমঘরে প্রবেশের জন্য দুধসম্পর্কের ব্যবস্থা
আয়েশার প্রয়োগসালিম ছাড়াও অন্যের জন্য নজির ব্যবহারদুধপানের মাধ্যমে প্রবেশাধিকার
অন্য নবীপত্নীদের সিদ্ধান্তসালিমের বিশেষ ছাড়অন্য প্রাপ্তবয়স্কের প্রবেশে অনুমতি নয়
উমরের কাছে দাসীর ঘটনাপ্রাপ্তবয়স্ক দাসীকে দুধপানমালিকের যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ হয়নি
ইবনে মাসউদের বক্তব্যদুই বছরের মধ্যে দুধপানপ্রাপ্তবয়স্কের দুধপান দিয়ে দাম্পত্য নিষিদ্ধ নয়

স্ত্রীর পদক্ষেপের সম্ভাব্য ফল ছিল দাসীকে নিজের দুধের মেয়ে হিসেবে স্বামীর যৌন পরিসর থেকে বের করা। উমরের সিদ্ধান্তে সেই ফল বাতিল হয়েছে। এর সঙ্গে স্ত্রীকে ব্যথা দেওয়ার ভাষা যুক্ত হওয়ায় রায়টি শুধু বয়সের শুষ্ক সংজ্ঞা হয়ে থাকেনি; পুরুষের যৌন মালিকানা পুনর্বহালের সঙ্গে শাস্তিমূলক কর্তৃত্বও এসেছে। দাসীর নিজের ইচ্ছা এই সংলাপের সিদ্ধান্তের ভিত্তি নয়। তাঁকে ঘিরে স্ত্রী, মালিক ও শাসকের অবস্থান নির্ধারিত হচ্ছে, কিন্তু তাঁর স্বাধীন সম্মতির অধিকার নির্ধারণ করা হচ্ছে না।

ইবনে হুমামের ফাতহুল কাদিরে উমরের ঘটনাটি উদ্ধৃত হওয়ার পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কের দুধপানের বিপরীতে নসখের ব্যাখ্যাও রয়েছে। সেখানে আগের বিধান পরে একাধিক বর্ণনার মাধ্যমে রহিত হয়েছে বলা হয়েছে। অন্য নবীপত্নীদের বিশেষ ছাড়ের ব্যাখ্যা এবং এই রহিতকরণের ব্যাখ্যায় পরিসর বন্ধ করার পদ্ধতি আলাদা: একটিতে শুরু থেকেই সালিমের বিশেষত্ব, অন্যটিতে আগে থাকা বিধানের পরবর্তী অবসান। ইবনে হুমামের বক্তব্যের সূচনা: [1102]

والجواب أن هذا كان ثم نسخ بآثار كثيرة

বাংলা অনুবাদ: এর উত্তর হলো, এটি আগে ছিল; পরে একাধিক বর্ণনার মাধ্যমে রহিত হয়েছে।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক দুধপান করলেও তার আত্মীয়তার ফল কোন পথে বন্ধ হবে, তা এই ব্যাখ্যাগুলো নির্ধারণ করে। খলিফার একটি ব্যক্তিগত বিরোধের রায়ও পরবর্তী সাধারণ বিধানের পক্ষে উপাদান হতে পারে। ঘটনা, তার সময়সীমা এবং সাধারণ নিয়মের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করেই পরবর্তী ফিকহ সিদ্ধান্ত দেয়; দুধ শরীরে প্রবেশের তথ্য একা সেই আইনি ফল নির্ধারণ করে না।

মোয়াত্তার পরের বর্ণনায় একজন স্বামীর নিজের স্ত্রীর দুধ পান করার ঘটনায় আবু মুসা ও ইবনে মাসউদের ভিন্ন সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়। আবু মুসা সম্পর্ক নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করলে ইবনে মাসউদ দুধসম্পর্ককে দুই বছরের মধ্যে সীমিত করেন। এরপর আবু মুসা তাঁর উপস্থিতিতে অন্যদের নিজের কাছে প্রশ্ন না করতে বলেন। [1103]

أَنَّ رَجُلاً سَأَلَ أَبَا مُوسَى الأَشْعَرِيَّ فَقَالَ إِنِّي مَصِصْتُ عَنِ امْرَأَتِي مِنْ ثَدْيِهَا لَبَنًا فَذَهَبَ فِي بَطْنِي فَقَالَ أَبُو مُوسَى لاَ أُرَاهَا إِلاَّ قَدْ حَرُمَتْ عَلَيْكَ فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْعُودٍ انْظُرْ مَاذَا تُفْتِي بِهِ الرَّجُلَ فَقَالَ أَبُو مُوسَى فَمَاذَا تَقُولُ أَنْتَ فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْعُودٍ لاَ رَضَاعَةَ إِلاَّ مَا كَانَ فِي الْحَوْلَيْنِ فَقَالَ أَبُو مُوسَى لاَ تَسْأَلُونِي عَنْ شَىْءٍ مَا كَانَ هَذَا الْحَبْرُ بَيْنَ أَظْهُرِكُمْ

বাংলা অনুবাদ: এক ব্যক্তি আবু মুসা আশআরিকে বলল, “আমি আমার স্ত্রীর স্তন থেকে কিছু দুধ চুষে পান করেছি এবং তা আমার পেটে গেছে।” আবু মুসা বললেন, “আমার মনে হয় সে তোমার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে গেছে।” আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বললেন, “লোকটিকে কী ফতোয়া দিচ্ছ, দেখো।” আবু মুসা বললেন, “তুমি কী বলো?” ইবনে মাসউদ বললেন, “দুই বছরের মধ্যে যা হয়, তা ছাড়া কোনো কার্যকর দুধসম্পর্ক নেই।” আবু মুসা বললেন, “এই জ্ঞানী ব্যক্তি তোমাদের মধ্যে থাকা পর্যন্ত আমাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস কোরো না।”

এই ভিন্ন সিদ্ধান্তে একই দাম্পত্যকে নিষিদ্ধ অথবা বহাল ঘোষণা করার ক্ষমতা ফতোয়াদাতার হাতে পৌঁছায়। কোন বয়সের দুধপান গণ্য, বিশেষ ঘটনার ছাড় কতদূর বিস্তৃত এবং একটি নজিরের সাধারণ প্রয়োগ হবে কি না—প্রতিটি সিদ্ধান্ত ঘরের সম্পর্ক বদলে দিতে পারে। উমরের রায় সেই নির্ধারণের একটি প্রভাবশালী পথ; আয়েশার প্রয়োগ ও অন্য স্ত্রীর সীমা অন্য পথ। আইনগত ঐক্য দাবি করা হলেও সংরক্ষিত ঘটনাগুলোতে এমন পৃথক কর্তৃত্ব ও পরস্পরবিরোধী ব্যবহারিক ফল রয়ে গেছে।


তারাবির সংগঠিত জামাত ও “উত্তম বিদআত”

রমজানের রাতের নামাজকে এক ইমামের অধীনে নিয়মিত জামাতে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে উমরের ভূমিকা বুখারির বর্ণনায় স্পষ্ট। তাঁর সামনে মানুষ একা অথবা ছোট দলে নামাজ পড়ছিলেন। তিনি একটি ক্বারির অধীনে সবাইকে জড়ো করার সিদ্ধান্ত নেন এবং পরে ব্যবস্থাটিকে “উত্তম বিদআত” বলেন। ব্যক্তিগত ও বিচ্ছিন্ন আমলকে একটি অনুমোদিত সামষ্টিক ব্যবস্থায় রূপ দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত পরবর্তী মুসলিম ধর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথা হয়ে ওঠে।

মুহাম্মদের আমলে কয়েক রাত জামাতে রাতের নামাজ পড়ার সংবাদও রয়েছে। আয়েশার বর্ণনায় তিনি অনুসারীদের সংখ্যা বাড়ার পরে বের হননি এবং সকালে জানিয়েছেন, নামাজটি বাধ্যতামূলক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই তাঁকে বিরত রেখেছে। ঘটনার পূর্ণ বক্তব্য: [1104]

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم صَلَّى ذَاتَ لَيْلَةٍ فِي الْمَسْجِدِ فَصَلَّى بِصَلاَتِهِ نَاسٌ، ثُمَّ صَلَّى مِنَ الْقَابِلَةِ فَكَثُرَ النَّاسُ، ثُمَّ اجْتَمَعُوا مِنَ اللَّيْلَةِ الثَّالِثَةِ أَوِ الرَّابِعَةِ، فَلَمْ يَخْرُجْ إِلَيْهِمْ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم، فَلَمَّا أَصْبَحَ قَالَ قَدْ رَأَيْتُ الَّذِي صَنَعْتُمْ وَلَمْ يَمْنَعْنِي مِنَ الْخُرُوجِ إِلَيْكُمْ إِلاَّ أَنِّي خَشِيتُ أَنْ تُفْرَضَ عَلَيْكُمْ وَذَلِكَ فِي رَمَضَانَ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর রসুল এক রাতে মসজিদে নামাজ পড়লেন এবং কিছু মানুষ তাঁর সঙ্গে নামাজ পড়ল। পরের রাতেও তিনি পড়লেন; তখন মানুষের সংখ্যা বাড়ল। তৃতীয় অথবা চতুর্থ রাতে তাঁরা একত্র হলে আল্লাহর রসুল তাঁদের কাছে বের হলেন না। সকালে তিনি বললেন, “তোমরা যা করেছ, তা আমি দেখেছি। শুধু এই আশঙ্কা আমাকে তোমাদের কাছে বের হতে বাধা দিয়েছে যে, এটি তোমাদের ওপর বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হবে।” ঘটনাটি রমজানে হয়েছিল।

বুখারির আরেক বর্ণনায় ইবনে শিহাব মুহাম্মদের মৃত্যু, আবু বকরের খিলাফত এবং উমরের খিলাফতের প্রথম ভাগ পর্যন্ত আগের অবস্থা চলার কথা বলেছেন। পরের বর্ণনার বিচ্ছিন্ন ছোট দলগুলোর ছবি সেই অবস্থার বাস্তব রূপও দেখায়। সময়সীমাটি: [1105]

فَتُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَالأَمْرُ عَلَى ذَلِكَ، ثُمَّ كَانَ الأَمْرُ عَلَى ذَلِكَ فِي خِلاَفَةِ أَبِي بَكْرٍ وَصَدْرًا مِنْ خِلاَفَةِ عُمَرَ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর রসুলের মৃত্যু পর্যন্ত অবস্থা তেমনই ছিল। আবু বকরের খিলাফত এবং উমরের খিলাফতের প্রথম ভাগেও অবস্থা তেমন ছিল।

উমরের সঙ্গে মসজিদে যাওয়া আবদুর রহমান ইবনে আবদ আল-কারির বিবরণে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন একসঙ্গে পাওয়া যায়। একদিকে ছড়িয়ে থাকা নামাজিরা, অন্যদিকে এক ক্বারির পেছনে তাঁদের সমাবেশ—এই রূপান্তর তাঁর চোখের সামনেই ঘটেছে। [1106]

خَرَجْتُ مَعَ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رضى الله عنه لَيْلَةً فِي رَمَضَانَ، إِلَى الْمَسْجِدِ، فَإِذَا النَّاسُ أَوْزَاعٌ مُتَفَرِّقُونَ يُصَلِّي الرَّجُلُ لِنَفْسِهِ، وَيُصَلِّي الرَّجُلُ فَيُصَلِّي بِصَلاَتِهِ الرَّهْطُ فَقَالَ عُمَرُ إِنِّي أَرَى لَوْ جَمَعْتُ هَؤُلاَءِ عَلَى قَارِئٍ وَاحِدٍ لَكَانَ أَمْثَلَ ثُمَّ عَزَمَ فَجَمَعَهُمْ عَلَى أُبَىِّ بْنِ كَعْبٍ، ثُمَّ خَرَجْتُ مَعَهُ لَيْلَةً أُخْرَى، وَالنَّاسُ يُصَلُّونَ بِصَلاَةِ قَارِئِهِمْ، قَالَ عُمَرُ نِعْمَ الْبِدْعَةُ هَذِهِ، وَالَّتِي يَنَامُونَ عَنْهَا أَفْضَلُ مِنَ الَّتِي يَقُومُونَ يُرِيدُ آخِرَ اللَّيْلِ، وَكَانَ النَّاسُ يَقُومُونَ أَوَّلَهُ

বাংলা অনুবাদ: রমজানের এক রাতে আমি উমর ইবনুল খাত্তাবের সঙ্গে মসজিদে গেলাম। মানুষ বিচ্ছিন্ন দলে ছিল: কেউ একা নামাজ পড়ছিল, কেউ পড়ছিল এবং কয়েকজন তার সঙ্গে নামাজ পড়ছিল। উমর বললেন, “আমার মনে হয়, এদের একজন ক্বারির পেছনে একত্র করলে আরও ভালো হবে।” পরে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁদের উবাই ইবনে কাবের পেছনে একত্র করলেন। আরেক রাতে তাঁর সঙ্গে বের হয়ে দেখি, মানুষ নিজেদের ক্বারির সঙ্গে নামাজ পড়ছে। উমর বললেন, “কী চমৎকার এই বিদআত! তারা যে সময়ে ঘুমিয়ে থাকে, সেই সময়ের নামাজ তাদের এখনকার নামাজের চেয়ে উত্তম।” তিনি রাতের শেষভাগ বোঝাচ্ছিলেন; মানুষ রাতের প্রথমভাগে নামাজ পড়ছিল।

বর্ণনায় পরিবর্তনের বিষয় হলো সংগঠন: বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ও ছোট দলীয় আমলকে একজন নির্দিষ্ট ইমামের অধীনে আনা। নামাজের পূর্ববর্তী নজির থাকা এবং নিয়মিত এই কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার সূচনা দুটি আলাদা তথ্য। উমরের সিদ্ধান্ত একই ধর্মীয় কাজকে আরও দৃশ্যমান ও পুনরাবৃত্ত সামষ্টিক আকার দেয়। এর ফলে কে নেতৃত্ব দেবেন, কোন সময়ে মানুষ জমা হবেন এবং কেমন পদ্ধতিতে অনুষ্ঠান চলবে—এসবও অনুমোদিত ব্যবস্থার অংশ হয়ে যায়।

এই ব্যবস্থাকে শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণের প্রশ্নে অন্য একটি নবী-বক্তব্যও প্রাসঙ্গিক ছিল। যায়েদ ইবনে সাবিতের বর্ণনায় রমজানে লোকজন তাঁর সঙ্গে নামাজ পড়লে মুহাম্মদ পরে তাঁদের ঘরে পড়তে বলেন। সেখানে ফরজ নামাজ ছাড়া ঘরের নামাজকে উত্তম বলা হয়েছে। বক্তব্যটি: [1107]

فَصَلُّوا أَيُّهَا النَّاسُ فِي بُيُوتِكُمْ، فَإِنَّ أَفْضَلَ الصَّلاَةِ صَلاَةُ الْمَرْءِ فِي بَيْتِهِ إِلاَّ الْمَكْتُوبَةَ

বাংলা অনুবাদ: হে মানুষেরা, তোমরা নিজেদের ঘরে নামাজ পড়। কারণ ফরজ নামাজ ছাড়া মানুষের উত্তম নামাজ হলো তার ঘরের নামাজ।

ইবনে হাজারের ফাতহুল বারিতে উমরের সংগঠনের পক্ষে বাধ্যতামূলক হওয়ার আশঙ্কা মৃত্যুপরবর্তী সময়ে আর নেই—এই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সমাবেশে ঐক্য ও অনেকের বেশি উৎসাহের যুক্তিও এসেছে। একই সঙ্গে মালিকের একটি মত, আবু ইউসুফ এবং কিছু শাফেয়ির অবস্থান হিসেবে ঘরের নামাজকে উত্তম মনে করার কথা সংরক্ষিত। ফলে সংগঠিত জামাতের ব্যাপক গ্রহণের পাশেও শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি সম্পর্কে পূর্ববর্তী বিরোধের ইতিহাস রয়েছে। সংকলিত ভিন্ন অবস্থান: [1108]

وعن مالك في إحدى الروايتين وأبي يوسف وبعض الشافعية : الصلاة في البيوت أفضل

বাংলা অনুবাদ: মালিকের একটি বর্ণিত মত, আবু ইউসুফ এবং কিছু শাফেয়ির মতে ঘরে নামাজ পড়া উত্তম।

পর্যায় বা বক্তব্যপ্রথার রূপযে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হয়েছে
মুহাম্মদের কয়েক রাতলোকজন তাঁর পেছনে পড়েছে; পরে তিনি বের হননিআগের ঘটনার কোন অংশ অনুসরণীয়
আবু বকর ও উমরের শুরুর অবস্থাআগের বিচ্ছিন্ন অবস্থা বহালসমস্ত আমলকে একই সংগঠনে আনা হবে কি না
উমরের সংগঠনউবাইয়ের অধীনে কেন্দ্রীয় জামাতইমাম ও সামষ্টিক পদ্ধতি নির্ধারণ
ঘরে নামাজের বক্তব্যফরজ ছাড়া গৃহে প্রার্থনাকে উত্তম বলাকোন পরিস্থিতিতে এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রযোজ্য
পরবর্তী ফিকহজামাত বা গৃহের শ্রেষ্ঠত্বে ভিন্ন রায়বর্ণনাগুলোর সম্পর্ক ও অনুসরণের মানদণ্ড

“উত্তম বিদআত” কথাটির সঙ্গে নতুন বিষয় সম্পর্কে কঠোর নবী-বক্তব্যের সম্পর্কও ব্যাখ্যার বিষয় হয়েছে। মুসলিমে জাবিরের বর্ণিত খুতবায় কিতাব ও মুহাম্মদের পথকে উত্তম বলার পরে নতুন বিষয়কে মন্দ এবং প্রত্যেক বিদআতকে পথভ্রষ্টতা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অংশ: [1109]

فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ وَخَيْرُ الْهُدَى هُدَى مُحَمَّدٍ وَشَرُّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ

বাংলা অনুবাদ: উত্তম বক্তব্য হলো আল্লাহর কিতাব, উত্তম পথ হলো মুহাম্মদের পথ; মন্দ বিষয় হলো নতুন প্রবর্তিত বিষয়গুলো, আর প্রত্যেক বিদআত পথভ্রষ্টতা।

ইবনে হাজার উমরের উক্তির ব্যাখ্যায় বিদআতের মূল অর্থ আগের দৃষ্টান্ত ছাড়া নতুন কিছু করা বলেছেন। তারপর শরিয়তে গ্রহণযোগ্য কোনো বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হলে ভালো, অগ্রহণযোগ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হলে মন্দ এবং অন্য ক্ষেত্রে অনুমোদিত—এই ভাগ করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে একই নতুনত্বের ওপর একাধিক আইনগত মূল্যায়ন সম্ভব। নির্দিষ্ট বাক্য: [1110]

والتحقيق أنها إن كانت مما تندرج تحت مستحسن في الشرع فهي حسنة ، وإن كان مما تندرج تحت مستقبح في الشرع فهي مستقبحة ، وإلا فهي من قسم المباح

বাংলা অনুবাদ: নির্ণয় হলো, শরিয়তে ভালো হিসেবে গৃহীত কিছুর অন্তর্ভুক্ত হলে তা ভালো; মন্দ হিসেবে গৃহীত কিছুর অন্তর্ভুক্ত হলে তা মন্দ; অন্যথায় তা অনুমোদিত বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত।

এই শ্রেণিবিভাগে একটি সার্বজনীন নিষেধসূচক শব্দের প্রয়োগ পরে নির্ধারিত হয় অন্য মানদণ্ড দিয়ে। কোন নতুন ব্যবস্থা আগের বৈধ আমলের সম্প্রসারণ এবং কোনটি নিন্দিত নতুনত্ব—তার রায় আলেমকে দিতে হয়। উমরের “উত্তম” মূল্যায়নও পরবর্তী ব্যবস্থার বৈধতার আলোচনায় প্রমাণের ভূমিকা পায়। ফলে নতুন কিছু না করার সাধারণ স্লোগান থেকে বৈধ ও অবৈধ প্রথার সম্পূর্ণ তালিকা পাওয়া যায় না; অনুমোদিত ব্যক্তিত্বের সিদ্ধান্ত এবং আইনজ্ঞের শ্রেণিবিভাগও তালিকাটি তৈরি করে।

সংগঠনের পাশাপাশি রাকাতসংখ্যার বিবরণও একাধিক রূপে সংরক্ষিত। মোয়াত্তায় সায়িব ইবনে ইয়াজিদের সূত্রে উমরের নির্দেশে উবাই ও তামিম দারির এগারো রাকাত পড়ানোর কথা আছে। দীর্ঘ পাঠের কারণে লাঠিতে ভর দেওয়া এবং ফজরের আলো ফুটতে থাকা পর্যন্ত থাকার বিবরণও একই সঙ্গে এসেছে। [1111]

أَمَرَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ أُبَىَّ بْنَ كَعْبٍ وَتَمِيمًا الدَّارِيَّ أَنْ يَقُومَا لِلنَّاسِ بِإِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً قَالَ وَقَدْ كَانَ الْقَارِئُ يَقْرَأُ بِالْمِئِينَ حَتَّى كُنَّا نَعْتَمِدُ عَلَى الْعِصِيِّ مِنْ طُولِ الْقِيَامِ وَمَا كُنَّا نَنْصَرِفُ إِلاَّ فِي فُرُوعِ الْفَجْرِ

বাংলা অনুবাদ: উমর ইবনুল খাত্তাব উবাই ইবনে কাব ও তামিম দারিকে মানুষের জন্য এগারো রাকাত পড়াতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ক্বারি মিয়ীন শ্রেণির দীর্ঘ সূরা পড়তেন; দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে আমরা লাঠিতে ভর দিতাম। ফজরের আলো ফুটতে থাকা ছাড়া আমরা ফিরতাম না।

পরের বর্ণনায় ইয়াজিদ ইবনে রুমানের নামে উমরের যুগে তেইশ রাকাতের প্রচলন এসেছে। গ্রন্থে পাশাপাশি থাকা এই দুটি সংবাদ আলাদা বর্ণনাপথে আলাদা সংখ্যা বহন করে। [1112]

كَانَ النَّاسُ يَقُومُونَ فِي زَمَانِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ فِي رَمَضَانَ بِثَلاَثٍ وَعِشْرِينَ رَكْعَةً

বাংলা অনুবাদ: মানুষ উমর ইবনুল খাত্তাবের সময়ে রমজানে তেইশ রাকাত নামাজ পড়ত।

ইবনে হাজার এগারো, তেরো, একুশ এবং তেইশের বর্ণনা নিয়ে সময় ও পরিস্থিতিভেদ, পাঠের দীর্ঘতা এবং বিতরের গণনা ব্যবহার করে সম্পর্ক স্থাপনের সম্ভাবনা উল্লেখ করেছেন। এই পর্যায়ে প্রচলিত আচারটির নির্দিষ্ট আকার আর একটিমাত্র বর্ণনার সরল অনুলিপি থাকে না। ইমাম নির্ধারণ, পাঠের দৈর্ঘ্য, সময় এবং সংখ্যার ভিন্ন সংবাদ থেকে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়। পরবর্তী সমাজ সেই নির্বাচিত পদ্ধতিকে ধর্মীয় অভ্যাস হিসেবে পায়।

তারাবির এই ইতিহাসে শাসকের উদ্যোগ উপাসনার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ তৈরি করেছে। উমর কোনো নতুন কোরআনিক আয়াত যোগ করেননি; তিনি একটি পূর্বপরিচিত আমলের সংগঠন বদলেছেন এবং নিজের সিদ্ধান্তকে উত্তম বলেছেন। এরপর ভাষ্যকারেরা তার মর্যাদা, নবী-আমলের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বিদআতের সংজ্ঞায় অবস্থান নির্ধারণ করেছেন। মানুষের সিদ্ধান্ত থেকে সামাজিক প্রথা এবং প্রথা থেকে অনুমোদিত ধর্মীয় পরিচয়—এই পরিবর্তনের পথ বর্ণনার মধ্যেই দৃশ্যমান।


খলিফার সিদ্ধান্ত, কোরআনিক বিধানের প্রয়োগ ও পরবর্তী ফিকহের কর্তৃত্ব

খলিফার সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার তুলনায় বড় ক্ষমতা বহন করে, কারণ তার সঙ্গে বিচার, নিষেধ কার্যকর করা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সামর্থ্য যুক্ত থাকে। একই ব্যক্তি কোনো কাজ অপছন্দ করতে পারেন; শাসক হিসেবে তিনি সেটি বন্ধ করার নির্দেশও দিতে পারেন। প্রথমটি তাঁর নিজের আচরণে সীমিত, দ্বিতীয়টি অন্যের আচরণের ওপর বাধা। উমরের নামে সংরক্ষিত সিদ্ধান্তগুলোতে এই পার্থক্য মানুষের দাম্পত্য, সম্পত্তি, দাসত্ব ও উপাসনার পদ্ধতিতে বাস্তব ফল দিয়েছে।

খলিফাদের প্রথা অনুসরণের ধর্মীয় অনুমোদন আবু দাউদে ইরবাদের নামে বর্ণিত উপদেশে রয়েছে। মতভেদের সময়ে মুহাম্মদের সুন্নাহর সঙ্গে হিদায়াতপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরতে বলা হয়েছে। একই উপদেশে আনুগত্য এবং নতুন প্রবর্তিত বিষয় এড়িয়ে চলার নির্দেশও আছে। ফলে উত্তরসূরিদের অনুমোদিত প্রথাকে পরবর্তী অনুসরণের উৎস করার ভাষা বর্ণনার মধ্যেই উপস্থিত। [1113]

أُوصِيكُمْ بِتَقْوَى اللَّهِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَإِنْ عَبْدًا حَبَشِيًّا فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِي فَسَيَرَى اخْتِلاَفًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ

বাংলা অনুবাদ: আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করা এবং শুনে আনুগত্য করার উপদেশ দিচ্ছি, এমনকি একজন আবিসিনীয় দাস হলেও। আমার পরে তোমাদের মধ্যে যে বেঁচে থাকবে, সে অনেক মতভেদ দেখবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাহ এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত সঠিক পথের খলিফাদের সুন্নাহ অনুসরণ করবে। তা আঁকড়ে ধরবে এবং মাড়ির দাঁত দিয়ে ধরে রাখবে। নতুন প্রবর্তিত বিষয় থেকে সাবধান থাকবে; প্রত্যেক নতুন প্রবর্তিত বিষয় বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআত পথভ্রষ্টতা।

এই অনুমোদনে উত্তরসূরির কাজ নিজেই ধর্মীয় নজিরের মর্যাদা পেতে পারে। পরে সেই কাজের পক্ষে যুক্তি দিতে শুধু আগের সরাসরি নির্দেশ নয়, অনুমোদিত খলিফার সিদ্ধান্তও হাজির করা হয়। কোন কাজ খলিফার অনুসরণযোগ্য সুন্নাহ এবং কোনটি তাঁর ব্যক্তিগত বিচার—এই শ্রেণিবিভাগ তখন গুরুত্বপূর্ণ। শাসক কোনো ব্যবস্থার সূচনা করেছেন বলে তার ঐতিহাসিক পরিচয় পাওয়া যায়; ধর্মীয়ভাবে তার স্থায়ী বাধ্যবাধকতা কতখানি, সেই সিদ্ধান্ত গড়তে আরও ব্যাখ্যা যুক্ত হয়।

আনুগত্যের সীমাও বুখারির বর্ণনায় নির্দিষ্ট হয়েছে। একজন সেনাপতির আগুনে প্রবেশের নির্দেশের ঘটনায় অন্যায় কাজে আনুগত্য অস্বীকার করে ভালো কাজে আনুগত্যের কথা বলা হয়েছে। আদেশদাতার ক্ষমতাই তাঁর প্রত্যেক আদেশের যথার্থতার সম্পূর্ণ মানদণ্ড নয়—বর্ণিত নীতির বিষয়বস্তু এটি। [1114]

لاَ طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةٍ، إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ

বাংলা অনুবাদ: অন্যায় কাজে কোনো আনুগত্য নেই; আনুগত্য কেবল ভালো কাজে।

এই দুটি নীতি একসঙ্গে প্রয়োগ করলে শাসকের নির্দেশের বিষয়বস্তুও বিচার করতে হয়। কোনটি অনুসরণযোগ্য খলিফা-প্রথা এবং কোনটি আগের নির্দেশের সঙ্গে অসংগত সিদ্ধান্ত, তা নির্ধারণের কাজ বাকি থাকে। ইবনে উমর তামাত্তুর ক্ষেত্রে পিতার সিদ্ধান্তের বদলে মুহাম্মদের আমল বেছে নিয়েছেন। আউলে ইবনে আব্বাসের পদ্ধতি উমরের পদ্ধতি থেকে আলাদা। উম্মু ওয়ালাদের ক্ষেত্রে আলীর নামে পরবর্তী ভিন্ন মত রয়েছে। অনুমোদিত সাহাবি-পরিচয় ও রাজনৈতিক পদ থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে এই বিরোধগুলো ঘটেছে।

সিদ্ধান্তের কাজবিধানের যে স্তর বদলায়সম্পর্কিত ঘটনা
নিষেধ কার্যকর করাআগে অনুসৃত সম্পর্কের বিরুদ্ধে শাস্তিযোগ্যতামুতআ
অনুষ্ঠানের পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণঅনুমোদিত অবকাশের ব্যবহার ও সফরের বিন্যাসহজের তামাত্তু
নতুন বণ্টননীতি গ্রহণমূল ভগ্নাংশ থেকে প্রকৃত প্রাপ্য সম্পদের পরিমাণআউল
মালিকানার ক্ষমতা সীমিত করাবিক্রি, উপহার, উত্তরাধিকার ও মুক্তির সময়উম্মু ওয়ালাদ
আত্মীয়তার শর্ত স্থির করাঘরে প্রবেশ ও যৌন সম্পর্কের বৈধতাপ্রাপ্তবয়স্কের দুধপান
সামষ্টিক ইবাদত সংগঠিত করাএক ইমাম, সমবেত পদ্ধতি ও অনুমোদিত প্রথাতারাবির জামাত

এসবের পদ্ধতিগত পরিচয় অভিন্ন নয়। কোনো ক্ষেত্রে আগে থেকেই নিষেধ আসার সংবাদ গ্রহণ করে শাসক তা মানিয়েছেন বলে ব্যাখ্যা রয়েছে; কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অপছন্দ প্রকাশিত; কোনো ক্ষেত্রে অমিল ভাগ সামলাতে নতুন অনুপাত নেওয়া হয়েছে। আবার একই নামাজের প্রাতিষ্ঠানিক বিন্যাস বদলানোর ঘটনা রয়েছে। পরিবর্তনের ক্ষেত্র ও পদ্ধতি শনাক্ত করলে ধর্মীয় আইনের বাস্তব ইতিহাস পাওয়া যায়। “একই শরিয়ত” নামের অধীনে রাখা সিদ্ধান্তগুলোর কাজ মানুষের জীবনে পৃথকভাবে ধরা পড়ে।

নসখের আনুষ্ঠানিক সীমা এই ইতিহাসের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে। ইসলামওয়েব জাসসাসের আল-ফুসুলসহ উসুলগ্রন্থের সূত্রে মুহাম্মদের মৃত্যুর পরে নসখ না হওয়ার নীতি উল্লেখ করেছে। সেখানে নতুন রহিতকারী দাবি করতে কিতাব বা সুন্নাহর প্রমাণ প্রয়োজন; পরবর্তী ঐকমত্য নিজে নতুন নসখের উৎস নয়। জাসসাসের উদ্ধৃত বক্তব্য: [1115]

النسخ لا يصح إلا من طريق التوقيف, ولا يصح بعد وفاة الرسول عليه الصلاة والسلام

বাংলা অনুবাদ: নসখ কেবল নির্ধারিত ঐশী নির্দেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়; রসুলের মৃত্যুর পরে তা প্রতিষ্ঠিত হয় না।

এই নীতির মধ্যে খলিফার সিদ্ধান্তকে নতুন ঐশী অবতরণ বলা হয় না। তার বৈধতার ভিত্তি খুঁজতে হয় আগের নির্দেশের অর্থ, গ্রহণযোগ্য সংবাদ, তুলনা অথবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষমতার মধ্যে। বাস্তবে তাঁর রায় পূর্ববর্তী ব্যবস্থার ফল বদলালে সেই পরিবর্তনকে কোন শ্রেণিতে গ্রহণ করা হবে, তা নিয়ে ব্যাখ্যা তৈরি হয়। অতএব “নসখ” শব্দ প্রয়োগের সীমা থাকলেও বিধানের ফল নির্ধারণে পরবর্তী মানবীয় সিদ্ধান্তের ইতিহাস শেষ হয়ে যায় না।

আউলে নির্দিষ্ট ভগ্নাংশকে তুলনামূলক দাবির অনুপাতে প্রয়োগ করা হয়। উম্মু ওয়ালাদের ক্ষেত্রে মালিকানার কিছু ক্ষমতা বন্ধ করা হয়। তারাবিতে ছড়িয়ে থাকা আমলকে একই সংগঠনে আনা হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে শাসক ও আইনজ্ঞের সিদ্ধান্তের সাহায্যে আগের ভাষা বা প্রথা নতুন কার্যকর রূপ পায়। নামকরণে ব্যাখ্যা, প্রয়োগ বা সংগঠন বলা হলেও নতুন রূপের বাস্তব প্রভাব সম্পদ, স্বাধীনতা ও দৈনন্দিন ধর্মীয় জীবনে পড়ে।

পরবর্তী ফিকহে গ্রহণের সময় এই সিদ্ধান্তগুলোর শক্তি আরও বাড়তে পারে। একটি নির্দিষ্ট সময়ে নেওয়া রায় বারবার অনুসৃত হলে তা প্রচলিত বিধানের পরিচয় পায়; পরবর্তী প্রজন্ম তার সূচনাকারী বিরোধের সঙ্গে আর সরাসরি পরিচিত থাকে না। উমরের আমলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠের পরবর্তী গ্রহণ যুক্ত হলে তার সামাজিক স্থায়িত্ব তৈরি হয়। সংরক্ষিত বিরোধের সংবাদগুলো সেই স্থায়িত্বের ভেতরে পূর্ববর্তী নির্বাচনের চিহ্ন রেখে দেয়। ফলে দীর্ঘদিন পালন হওয়া এবং শুরু থেকেই মতভেদহীনভাবে ঐশী নির্ধারণ থাকা দুটি আলাদা ঐতিহাসিক দাবি।

ক্ষমতার ভূমিকা এই জায়গায় শুধু ব্যাখ্যার অনুমোদন নয়। শাস্তির হুমকি কোনো সম্পর্ক বন্ধ করতে পারে; খলিফার নতুন নির্দেশের সংবাদ ফতোয়া থামাতে পারে; তাঁর ব্যক্তিত্ব ভিন্নমত প্রকাশে ভয় তৈরি করতে পারে; তাঁর নিযুক্ত ইমাম মানুষের নিয়মিত আমল সংগঠিত করতে পারেন। এই কাজগুলোর প্রত্যেকটির সাক্ষ্য সংশ্লিষ্ট বর্ণনায় আছে। কোন সিদ্ধান্ত সমাজের সাধারণ নিয়ম হয়ে উঠবে, তা নির্ধারণে এই প্রয়োগক্ষমতার ভূমিকা ছিল।

কোরআনের বিধান মানুষের মধ্যে কার্যকর হওয়ার সময়ে তাই তার পাশে নির্দিষ্ট মানুষের রায়ও কর্তৃত্ব পেয়েছে। আইন গ্রন্থে কী লেখা আছে—এই প্রশ্নের সঙ্গে কে তার প্রয়োগ স্থির করছেন, বিরোধী মত কতখানি প্রকাশিত হচ্ছে এবং শাসক কোন রায় মানাচ্ছেন—এই প্রশ্নগুলোও যুক্ত। উমরের আমলের ঘটনাগুলোতে ধর্মীয় আদর্শের বাস্তব রূপ এই বিচার ও প্রয়োগের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে। অপরিবর্তনীয় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধানের দাবির বিপরীতে সংরক্ষিত ইতিহাসে পাওয়া যায় সিদ্ধান্ত, পরিবর্তন, বিরোধ এবং পরে একটি পথের প্রাধান্য।


কোরআনের বক্তা কে: বক্তব্য, সম্বোধন ও ব্যাকরণিক পুরুষ

কোন বাক্যকে কোরআনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটি প্রশ্ন: সেই বাক্যের ভেতরে কে কথা বলছে? মুসহাফে আল্লাহর আদেশের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে মানুষের প্রার্থনা, নবীর সতর্কবাণী, অতীতের মানুষের উক্তি এবং আল্লাহকে তৃতীয় পুরুষে উল্লেখ করে বক্তব্য রয়েছে। আবার একই আয়াতের মধ্যে “তিনি” থেকে “আমরা”, কিংবা সৃষ্টিকর্মের ঘোষণা থেকে “আমি তাঁর পক্ষ থেকে সতর্ককারী”—এই পরিবর্তনও ঘটেছে। ফলে সংকলিত গ্রন্থের ধর্মীয় পরিচয় এবং তার প্রতিটি বাক্যের বক্তার পরিচয় এক করে দেখলে পাঠের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলো মুছে যায়। কোরআনের শব্দাবলি কার রচিত বলে দাবি করা হচ্ছে, বাক্যের “আমি” কাকে নির্দেশ করছে এবং আবৃত্তিকারী কার কণ্ঠে কথা বলছেন—প্রতিটি প্রশ্নের আলাদা উত্তর রয়েছে।

উসমানি মুসহাফের স্বীকৃত পাঠ শুধু কিছু শব্দের সমষ্টি নয়; কোন উক্তি কার, কোন নির্দেশ প্রকাশ্য আর কোন নির্দেশ উহ্য, কোন সর্বনামের পূর্বপদ কী—এসবও তার অর্থ নির্ধারণ করে। অক্ষর অপরিবর্তিত রেখেও উহ্য “বলুন” ধরে নিলে একটি বাক্য নবীর বক্তব্য হয়ে যায়। আবার “বলো” নির্দেশ যোগ না করেই প্রার্থনার বাক্য উপাসকের মুখে স্থাপন করা হয়। এই অর্থ নির্ধারণে তাফসির ও অনুবাদ যে কর্তৃত্ব প্রয়োগ করেছে, তা কোরআনের সরাসরি, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য হওয়ার দাবিকে পরীক্ষার মুখে দাঁড় করায়।


আল্লাহর সরাসরি বাণীর দাবি ও বক্তা নির্ধারণের প্রশ্ন

কোরআন আল্লাহর সরাসরি বাণী—এই দাবির বিষয়বস্তু অত্যন্ত নির্দিষ্ট। এখানে শুধু আল্লাহ কোনো ধারণা দিয়েছেন এবং মুহাম্মদ নিজের ভাষায় তা প্রকাশ করেছেন, এমন দাবি করা হয় না; নির্দিষ্ট আরবি শব্দ ও বাক্যও আল্লাহর বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ইসলামকিউএ এই অবস্থান ব্যক্ত করতে গিয়ে কোরআনের শব্দ, অক্ষর ও অর্থ—সবই আল্লাহর বাণী বলে উল্লেখ করেছে। অতএব শব্দ নির্বাচনের দায়িত্ব, বাক্যের গঠন এবং বক্তব্যের বিন্যাসও এই দাবির অন্তর্ভুক্ত। [1116]

وَالْقُرْآنُ الْكَرِيمُ كَلَامُ اللَّهِ تَعَالَى: أَلْفَاظُهُ وَحُرُوفُهُ وَمَعَانِيهِ؛ مِنْهُ بَدَأَ، وَإِلَيْهِ يَعُودُ

বাংলা অনুবাদ: আর মহান কোরআন আল্লাহ তাআলার বাণী: এর শব্দাবলি, অক্ষরসমূহ ও অর্থসমূহ; তাঁর কাছ থেকেই এর সূচনা এবং তাঁর কাছেই তা ফিরে যাবে।

কোরআনের নিজস্ব বক্তব্যেও ঐশী উৎসের ঘোষণা ও নবীর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ পাশাপাশি এসেছে। সূরা হাক্কাহতে কবি ও গণকের বক্তব্য হিসেবে কোরআনকে প্রত্যাখ্যান করে একে বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছ থেকে অবতীর্ণ বলা হয়েছে। মুহাম্মদ নিজের কোনো কথা আল্লাহর নামে চালালে তাঁকে ধরে প্রাণসংহার করার ঘোষণাও একই ধারায় রয়েছে। নিজের বক্তব্যকে আল্লাহর নামে প্রচারের জন্য এই পাঠ যে পরিণতি ঘোষণা করে, তা অত্যন্ত কঠোর। [1117]

وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَاعِرٍ ۚ قَلِيلًا مَّا تُؤْمِنُونَ
وَلَا بِقَوْلِ كَاهِنٍ ۚ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ
تَنزِيلٌ مِّن رَّبِّ الْعَالَمِينَ
وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيلِ
لَأَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ
ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ
فَمَا مِنكُم مِّنْ أَحَدٍ عَنْهُ حَاجِزِينَ

বাংলা অনুবাদ: এবং এটা কোন কবির কালাম নয়; তোমরা কমই বিশ্বাস কর।
এবং এটা কোন অতীন্দ্রিয়বাদীর কথা নয়; তোমরা কমই অনুধাবন কর।
এটা বিশ্বপালনকর্তার কাছ থেকে অবতীর্ণ।
সে যদি আমার নামে কোন কথা রচনা করত,
তবে আমি তার দক্ষিণ হস্ত ধরে ফেলতাম,
অতঃপর কেটে দিতাম তার প্রধান ধমনি।

তোমাদের কেউ তাকে রক্ষা করতে পারতে না।

এই ঘোষণার ঠিক আগে, ৬৯:৪০ আয়াতে, কোরআনকে আবার একজন সম্মানিত রাসুলের বাণী বলা হয়েছে। বাংলা অনুবাদে এর তাৎপর্য নির্ধারণ করতে গিয়ে কোনো অনুবাদক “বাণী” রেখেছেন, কেউ “বাহিত বার্তা”, কেউ বন্ধনীতে জিব্রাইলের পরিচয় যুক্ত করেছেন। ফলে আরবির একই বাক্য বাংলা পাঠকের কাছে পৌঁছাচ্ছে বক্তা ও বাহকের সম্পর্ক সম্পর্কে আগে থেকে গৃহীত ব্যাখ্যাসহ। [1118]

إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ

বাংলা অনুবাদ: যে, অবশ্যই এ কুরআন এক মহা সম্মানিত রসূল [জিবরীল (আঃ)]-এর (বহন করে আনা) বাণী।
— Taisirul Quran
নিশ্চয়ই এই কুরআন এক সম্মানিত রাসূলের বাহিত বার্তা।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয়ই এটি এক সম্মানিত রাসূলের বাণী।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় এ কুরআন এক সম্মানিত রাসূলের (বাহিত) বাণী [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

ইবন কাসির হাক্কাহর এই রাসুলকে মুহাম্মদ হিসেবে শনাক্ত করেছেন এবং বাণী তাঁর সঙ্গে যুক্ত করার অর্থ করেছেন পৌঁছে দেওয়া। পাশাপাশি সূরা তাকভিরের সম্মানিত রাসুলকে তিনি জিব্রাইল বলেছেন। একই “সম্মানিত রাসুলের বাণী” কথাটি দুই স্থানে দুই রাসুলের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হচ্ছে। এই পার্থক্য নির্ধারণে আশপাশের বর্ণনা ব্যবহার করছেন ভাষ্যকার; শুধু “রাসুলের বাণী” বাক্যাংশ একা ব্যক্তির পরিচয় স্থির করে না। [1119]

يعني : محمدا أضافه إليه على معنى التبليغ ; لأن الرسول من شأنه أن يبلغ عن المرسل ; ولهذا أضافه في سورة التكوير إلى الرسول الملكي : ( إنه لقول رسول كريم ذي قوة عند ذي العرش مكين مطاع ثم أمين ) وهذا جبريل ، عليه السلام .

বাংলা অনুবাদ: অর্থাৎ মুহাম্মদকে বোঝানো হয়েছে। পৌঁছে দেওয়ার অর্থে বাণীটি তাঁর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; কারণ রাসুলের কাজ প্রেরকের পক্ষ থেকে পৌঁছে দেওয়া। এ জন্য সূরা তাকভিরে তা ফেরেশতা রাসুলের সঙ্গে যুক্ত করে বলা হয়েছে: “নিশ্চয়ই এটি সম্মানিত রাসুলের বাণী, শক্তির অধিকারী, আরশের অধিপতির কাছে মর্যাদাবান, সেখানে মান্যবর, বিশ্বস্ত।” এখানে জিব্রাইলকে বোঝানো হয়েছে।

এখানে বাণীর উৎপত্তি ও বাণী পৌঁছে দেওয়ার পার্থক্য ধর্মীয় ব্যাখ্যার মধ্যেই স্বীকৃত। আল্লাহকে মূল উৎস, জিব্রাইলকে বাহক এবং মুহাম্মদকে প্রচারক বলা হচ্ছে। কিন্তু বাক্যের ভেতরে “আমি” উচ্চারণকারী চরিত্রের পরিচয় আরও একটি পৃথক বিষয়। একজন লেখক অন্যের প্রার্থনা লিখতে পারেন; সেখানে প্রার্থনার “আমরা” লেখকের নিজের উপাসক হওয়ার ঘোষণা হয়ে যায় না। আবার সেই বাক্য পাঠ করলেই আবৃত্তিকারী তার সব ঘটনার কর্তা হয়ে যান না। এই পৃথক অবস্থানগুলো কোরআনের বিভিন্ন বাক্যে আলাদাভাবে শনাক্ত করতে হয়।

অবস্থাননির্দিষ্ট প্রশ্নকোরআনের উদাহরণে প্রাসঙ্গিক পার্থক্য
বাণীর কথিত উৎসনির্দিষ্ট আরবি শব্দ কার কাছ থেকে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে?ধর্মীয় দাবি অনুযায়ী আল্লাহ শব্দ ও অর্থের উৎস।
বার্তাবাহককার মাধ্যমে বক্তব্য অন্যের কাছে পৌঁছেছে?জিব্রাইল ও মুহাম্মদের ওপর পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে।
বাক্যের অভ্যন্তরীণ বক্তা“আমি”, “আমরা”, “আমাদের প্রতিপালক” কাকে নির্দেশ করছে?প্রার্থনাকারী, স্রষ্টা ও সতর্ককারী—প্রসঙ্গভেদে পরিচয় বদলায়।
আবৃত্তিকারীলিখিত বাক্যটি এখন কে উচ্চারণ করছেন?নামাজে একই ব্যক্তি কখনো প্রার্থনা করছেন, কখনো অন্য বক্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করছেন।

শব্দের উৎস সম্পর্কে সুয়ূতির আলোচনা এই দাবিকে আরও স্পষ্ট করে। জুওয়াইনীর নামে তিনি দুই ধরনের বার্তার পার্থক্য তুলে ধরেছেন। এক ধরনের বার্তায় দূত অর্থ বুঝে অন্য ভাষায় বক্তব্য পৌঁছাতে পারেন। অন্য ধরনের বার্তায় রাজা যেমন একটি লিখিত পত্র বিশ্বস্ত দূতের হাতে দিয়ে হুবহু পড়ে শোনাতে বলেন, তেমনি একটি শব্দ বা একটি অক্ষরও বদলানো যায় না। দ্বিতীয় ধরনটিকেই সুয়ূতি কোরআনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করেছেন। [1120]

وَقِسْمٌ آخَرُ قَالَ اللَّهُ لجبريل: اقرأ على النبي صلى الله عليه وسلم هَذَا الْكِتَابَ فَنَزَلَ جِبْرِيلُ بِكَلِمَةٍ مِنَ اللَّهِ مِنْ غَيْرِ تَغْيِيرٍ كَمَا يَكْتُبُ الْمَلِكُ كِتَابًا وَيُسَلِّمُهُ إِلَى أَمِينٍ، وَيَقُولُ اقْرَأْهُ عَلَى فُلَانٍ فَهُوَ لَا يُغَيِّرُ مِنْهُ كَلِمَةً وَلَا حَرْفًا.

বাংলা অনুবাদ: আরেক প্রকার হচ্ছে: আল্লাহ জিব্রাইলকে বললেন, নবীর কাছে এই কিতাব পাঠ করো। তখন জিব্রাইল আল্লাহর বাণী কোনো পরিবর্তন ছাড়াই নিয়ে নেমে এলেন। যেমন কোনো রাজা একটি চিঠি লিখে বিশ্বস্ত ব্যক্তির হাতে দিয়ে বলেন, এটি অমুককে পড়ে শোনাও; তখন তিনি এর একটি শব্দ বা একটি অক্ষরও পরিবর্তন করেন না।

এই উপমায় বাহক নিজের ভাষায় বাক্য তৈরি করার স্বাধীনতা পান না। ফলে কোথাও উপাসকের প্রার্থনা, কোথাও নবীর ব্যক্তিগত সতর্কবাণীর ভঙ্গি এবং কোথাও স্রষ্টার ঘোষণা থাকলে, প্রতিটি রূপই আল্লাহ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন—এই অতিরিক্ত দাবিও মেনে নিতে হয়। তখন “সবই আল্লাহর বাণী” পরিচয়টি বাক্যের প্রতিটি “আমি” সরাসরি আল্লাহকে নির্দেশ করে বলে প্রমাণ দেয় না। এটি পাঠের উৎপত্তি সম্পর্কে একটি ধর্মীয় ঘোষণা; বাক্যের বক্তা শনাক্ত করার কাজ পৃথকভাবে করতে হচ্ছে।

হাক্কাহর শাস্তির ঘোষণা এই ব্যবধান দূর করার স্বাধীন ঐতিহাসিক সাক্ষ্যও নয়। গ্রন্থের ভেতরেই বলা হচ্ছে এটি আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে, এবং এর নামে কথা বানালে নবীকে শাস্তি দেওয়া হতো। সেই শাস্তির হুমকি সত্য—এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আগে একই গ্রন্থের ঐশী সত্যতা গ্রহণ করতে হয়। কোনো বক্তব্য নিজের কর্তৃত্ব ঘোষণা করলেই তার উৎপত্তির প্রমাণ সম্পন্ন হয় না। “এটি আল্লাহর বাণী” এবং “এটি রাসুলের বাণী”—দুই বাক্যকে নির্দিষ্ট তাফসিরের মাধ্যমে সম্পর্কিত করা হচ্ছে; সেই তাফসির নিজে প্রত্যক্ষ অবতরণ দেখার স্বাধীন সাক্ষ্যে পরিণত হয় না।

বক্তার পরিচয় তাই কেবল অলংকারের বিষয় নয়। “আমি সৃষ্টি করেছি” কথায় যে কর্তৃত্ব দাবি করা হয়, “আমি তাঁর পক্ষ থেকে সতর্ককারী” কথায় সেই কর্তৃত্বের প্রতিনিধি নিজের অবস্থান জানান। “আমাদের সরল পথে চালাও” কথায় বক্তা আবার সাহায্যপ্রার্থী। সংকলিত পাঠে এই অবস্থানগুলোর সীমারেখা কোথাও প্রকাশ্য, কোথাও ব্যাখ্যানির্ভর। একটি রাষ্ট্রীয়ভাবে গৃহীত মুসহাফে বাক্যগুলো স্থান পেয়েছে—এই ঐতিহাসিক ঘটনা তাদের অভ্যন্তরীণ বক্তার পার্থক্য মুছে দেয় না; বরং কোন বাক্যকে কোন পরিচয়ে গ্রহণ করা হয়েছে, সেই প্রশ্নকে আরও নির্দিষ্ট করে।


ফাতিহা ও নিসায় প্রার্থনা, নির্দেশ ও তৃতীয় পুরুষে আল্লাহর উল্লেখ

ফাতিহার প্রার্থনায় বক্তা ও সম্বোধিত সত্তার সম্পর্ক সরাসরি ধরা পড়ে। শুরুতে আল্লাহর নাম, তাঁর প্রশংসা ও গুণাবলি বর্ণনা করা হয়েছে। তারপর “আমরা আপনারই ইবাদত করছি” বলে যাঁর প্রশংসা করা হচ্ছিল, তাঁকেই সরাসরি সম্বোধন করা হয়েছে। সাহায্য, পথনির্দেশ ও অনুগ্রহ চাওয়ার অবস্থানে আছে উপাসকসমষ্টি। “আমাদের” শব্দের অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিরা পথনির্দেশের প্রয়োজন অনুভব করছেন; আল্লাহ সেই প্রার্থনার প্রাপক।

মূল বক্তব্য
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)।
আল্লাহরই জন্য সমস্ত প্রশংসা, যিনি বিশ্বজগতের রাব্ব।
যিনি পরম দয়ালু, অতিশয় করুণাময়।
যিনি বিচার দিনের মালিক।
আমরা আপনারই ইবাদাত করছি এবং আপনারই নিকট সাহায্য চাচ্ছি।
আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করুন।
তাদের পথ, যাদের আপনি অনুগ্রহ করেছেন। তাদের পথে নয়, যাদের প্রতি আপনার গযব বর্ষিত হয়েছে, তাদের পথও নয় যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। ( সূরা ফাতিহা )

সহিহ মুসলিমে ফাতিহার এই দুই পক্ষকে স্পষ্টভাবে আলাদা করা হয়েছে। সেখানে বান্দা ফাতিহার বাক্য বলছেন এবং আল্লাহ তার উত্তর দিচ্ছেন। “আমরা তোমারই ইবাদত করি” বলার পরে আল্লাহ বলেন, এটি তাঁর ও বান্দার মধ্যকার বিষয়। “আমাদের সরল পথে চালাও” বলার পরে উত্তর আসে, এটি বান্দার জন্য। অর্থাৎ প্রার্থনার কণ্ঠকে উপাসকের কণ্ঠ হিসেবে শনাক্ত করা ইসলামী সূত্রের বাইরের কোনো আরোপ নয়; বর্ণনার নিজের কাঠামোতেই উপাসক এবং তাঁর উপাস্য পৃথক বক্তা। [1121]

قَالَ اللَّهُ تَعَالَى قَسَمْتُ الصَّلاَةَ بَيْنِي وَبَيْنَ عَبْدِي نِصْفَيْنِ وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ فَإِذَا قَالَ الْعَبْدُ ‏‏{‏ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ‏}‏ ‏.‏ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى حَمِدَنِي عَبْدِي وَإِذَا قَالَ ‏‏{‏ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ‏}‏ ‏.‏ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى أَثْنَى عَلَىَّ عَبْدِي ‏.‏ وَإِذَا قَالَ ‏‏{‏ مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ‏}‏ ‏.‏ قَالَ مَجَّدَنِي عَبْدِي – وَقَالَ مَرَّةً فَوَّضَ إِلَىَّ عَبْدِي – فَإِذَا قَالَ ‏‏{‏ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ‏}‏ ‏.‏ قَالَ هَذَا بَيْنِي وَبَيْنَ عَبْدِي وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ ‏.‏ فَإِذَا قَالَ ‏‏{‏ اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ * صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلاَ الضَّالِّينَ‏}‏ ‏.‏ قَالَ هَذَا لِعَبْدِي وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ তাআলা বলেছেন: আমি সালাতকে আমার ও আমার বান্দার মধ্যে দুই ভাগে ভাগ করেছি; আমার বান্দার জন্য রয়েছে সে যা চেয়েছে। বান্দা যখন বলে, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক”, আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে।” যখন সে বলে, “পরম করুণাময়, অতিশয় দয়ালু”, আল্লাহ বলেন, “আমার বান্দা আমার গুণকীর্তন করেছে।” যখন সে বলে, “বিচারদিনের মালিক”, আল্লাহ বলেন, “আমার বান্দা আমার মহিমা ঘোষণা করেছে”—আর একবার বলেছেন, “আমার বান্দা আমার ওপর বিষয়টি সোপর্দ করেছে।” যখন সে বলে, “আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই সাহায্য চাই”, আল্লাহ বলেন, “এটি আমার ও আমার বান্দার মধ্যে; আর আমার বান্দার জন্য রয়েছে সে যা চেয়েছে।” যখন সে বলে, “আমাদের সরল পথে চালাও; তাদের পথে, যাদের তুমি অনুগ্রহ করেছ; তাদের পথে নয়, যারা ক্রোধের পাত্র হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট”, তিনি বলেন, “এটি আমার বান্দার জন্য; আর আমার বান্দার জন্য রয়েছে সে যা চেয়েছে।”

ফাতিহার “তিনি” থেকে “তুমি”তে পরিবর্তন এবং “আমরা”র পরিচয়—এই দুটি আলাদা বৈশিষ্ট্য। আল্লাহকে প্রথমে তৃতীয় পুরুষে বর্ণনা করে পরে সরাসরি সম্বোধন করলেও প্রার্থনাকারী একই উপাসক থাকেন। কুরতুবি “ইয়্যাকা নাবুদু”তে পরোক্ষ উল্লেখ থেকে সরাসরি সম্বোধনে ফেরার কথা বলেছেন। তাঁর বর্ণনায় সূরার পূর্ববর্তী অংশ আল্লাহ সম্পর্কে সংবাদ ও তাঁর প্রশংসা। [1122]

قوله تعالى : إياك نعبد رجع من الغيبة إلى الخطاب على التلوين ; لأن من أول السورة إلى هاهنا خبرا عن الله تعالى وثناء عليه

বাংলা অনুবাদ: “আমরা তোমারই ইবাদত করি”—এখানে বর্ণনার ভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে পরোক্ষ উল্লেখ থেকে সরাসরি সম্বোধনে ফেরা হয়েছে; কারণ সূরার শুরু থেকে এ পর্যন্ত আল্লাহ সম্পর্কে সংবাদ ও তাঁর প্রশংসা ছিল।

তাবারি ফাতিহার ব্যাখ্যায় আরও নির্দিষ্ট একটি পদক্ষেপ নিয়েছেন। আল্লাহর প্রশংসা ও আল্লাহর কাছে উপাসনার অঙ্গীকারকে একই সূরার মধ্যে রাখার ব্যাখ্যায় তিনি “তোমরা বলো” নির্দেশ ধরে নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী আল্লাহ বান্দাদের এই বাক্যগুলো বলতে শিখিয়েছেন; সেই নির্দেশের শব্দ আলাদা করে উচ্চারিত না হলেও পরের কথার অর্থ থেকে তা বোঝা যায়। [1123]

قيل: بل ذلك كله كلام الله جل ثناؤه، ولكنه جلّ ذكره حَمِد نفسه وأثنى عليها بما هو له أهلٌ، ثم علَّم ذلك عباده، وفرض عليهم تلاوته، اختبارًا منه لهم وابتلاءً، فقال لهم قولوا: (الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ)، وقولوا: إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ . فقوله إِيَّاكَ نَعْبُدُ مما علمهم جلّ ذكره أن يقولوه ويَدينُوا له بمعناه، وذلك موصول بقوله: (الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ)، وكأنه قال: قولوا هذا وهذا.

বাংলা অনুবাদ: উত্তর: বরং এর সবই আল্লাহর বাণী। কিন্তু তিনি নিজের প্রশংসা করেছেন এবং নিজের উপযুক্ত গুণকীর্তন করেছেন; তারপর তা তাঁর বান্দাদের শিখিয়েছেন এবং তাদের পরীক্ষা করার জন্য এর আবৃত্তি বাধ্যতামূলক করেছেন। তিনি তাদের বলেছেন, তোমরা বলো, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক”; এবং বলো, “আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই সাহায্য চাই।” “আমরা তোমারই ইবাদত করি” কথাটি তিনি বান্দাদের বলতে এবং এর অর্থ অনুযায়ী তাঁর আনুগত্য করতে শিখিয়েছেন। এটি “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক” কথার সঙ্গে যুক্ত; যেন তিনি বলেছেন, তোমরা এই কথাও বলো, ওই কথাও বলো।

তাবারির ব্যাখ্যায় “তোমরা বলো” একটি প্রয়োজনীয় সংযোগ। এই নির্দেশ ধরেই আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া পাঠ এবং মানুষের পক্ষ থেকে উচ্চারিত প্রার্থনার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করা হচ্ছে। মুসহাফে থাকা শব্দ এবং সেসব শব্দের আগে ব্যাখ্যায় ধরে নেওয়া নির্দেশের সীমারেখা এখানে দৃশ্যমান। প্রার্থনাকারীর পরিচয় নির্ধারণে এই সংযোগ ব্যবহার করা যায়; কিন্তু পরে নির্ধারিত সংযোগকে হুবহু মুসহাফের লিখিত শব্দ হিসেবে উপস্থাপন করলে পাঠ ও ভাষ্যের পার্থক্য নষ্ট হয়।

করিম ও রহিমের একটি ভাষাগত তুলনায় এই অবস্থান বোঝা যায়। করিম তাঁর ছেলে রহিমকে খাবার খেতে বললে আদেশের বক্তা পিতা এবং সম্বোধিত ব্যক্তি ছেলে। আবার ছেলে যদি পিতার নাম ধরে প্রশংসা করে তাঁর কাছে টাকা বা খেলার অনুমতি চায়, সেই বাক্যের ভেতরে সাহায্যপ্রার্থী অবস্থানটি ছেলের। বাক্যটি কে লিখে দিলেন এবং বাক্যের ভেতরে কে চাইছেন—দুটি পৃথক সম্পর্ক।

লেখকের রচিত ভাষাগত উদাহরণবাক্যের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক
হে রহিম, বেশি করে পুষ্টিকর খাবার খাও, যা তোমার শরীরের জন্য ভাল।পিতা ছেলেকে খাবার খেতে বলছেন।
হে রহিম, বেশি করে পুষ্টিকর খাবার খাও, যা আমি তোমার জন্য নিয়ে আসি। নিশ্চয়ই আমি উত্তম খাবার বাজার থেকে কিনে আনি।পিতা নিজের বাজার থেকে খাবার আনার কাজের উল্লেখ করছেন।

একই তুলনাকে প্রার্থনার ভঙ্গিতে সাজালে বাক্যের সম্বোধন ও চাহিদা বদলে যায়। নিচের কথাগুলো এই তুলনার জন্য রচিত; এখানে টাকা চাওয়া, খেলার অনুমতি চাওয়া এবং প্রশংসা না করা ব্যক্তিদের প্রতি ক্রোধ কামনার ভাষা রয়েছে। সেই চাওয়ার “আমরা” পিতাকে নির্দেশ করে না।

লেখকের রচিত তুলনা: পিতাকে উদ্দেশ্য করে সন্তানের প্রার্থনা
শুরু করছি বাজার থেকে উত্তম খাবার নিয়ে আসা পিতা করিমের নামে
সম্মানিত পিতা করিমই উত্তম খাবার বাজার করে আনেন
যিনি অত্যন্ত দয়ালু, খুবই উদার
বাজারের তাজা সবজি আর মাছ উনিই সবচেয়ে ভাল চেনেন
আমরা আপনার কাছ থেকেই স্কুল টিফিনের টাকা পাই
আমরা আপনার কাছ থেকেই স্কুলের বেতনের টাকা চাই
হে পিতা, আমাদেরকে বিকাল বেলা ফুটবল খেলতে দিন
আর যারা আপনার খাবার খেয়ে আপনার তোষামোদি করে না,
আপনার মাথা আর পিঠ টিপে দেয় না,
তাদের ওপর গযব নাজিল করুন।

নিসার উদাহরণগুলোতে প্রার্থনার পরিবর্তে নির্দেশ ও বিবরণ রয়েছে। ৪:১-এ মানুষকে তাদের পালনকর্তাকে ভয় করতে বলা হয়েছে এবং সৃষ্টিকর্তাকে “যিনি” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ৪:১৪-তে আল্লাহ ও রাসুলের অবাধ্যতার পরিণতি বর্ণিত হয়েছে। ৪:৩২-এ মানুষের মধ্যে আল্লাহর দেওয়া পার্থক্য এবং তাঁর কাছে অনুগ্রহ চাওয়ার নির্দেশ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আল্লাহকে নাম ধরে অথবা তৃতীয় পুরুষে উল্লেখ করা এবং আল্লাহকে প্রথম পুরুষে বসিয়ে বক্তব্য লেখা—দুই রূপে শব্দ ও ক্রিয়ার গঠন আলাদা হয়।

আয়াতের বাংলা ভাষ্যআল্লাহকে প্রথম পুরুষে বসিয়ে লেখকের রচিত তুলনা
হে মানবসমাজ, তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন। [1124]হে মানবসমাজ, তোমরা তোমাদের পালনকর্তা অর্থাৎ আমাকে ভয় কর, আমি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছি ও আমি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছি।
যে কেউ আল্লাহ ও রাসুলের অবাধ্যতা করে ও তার সীমা অতিক্রম করে তিনি তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন। [1125]যে কেউ আমার এবং আমার রাসুলের অবাধ্যতা করে ও তার সীমা অতিক্রম করে, আমি তাকে আগুনে প্রবেশ করাবো।
আর তোমরা আকাঙ্ক্ষা করো না এমন বিষয়ে যাতে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের একের ওপর অন্যের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। পুরুষ যা অর্জন করে সেটা তার অংশ, নারী যা অর্জন করে সেটা তার অংশ। আর আল্লাহর কাছে অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত। [1126]আর তোমরা আকাঙ্ক্ষা করো না এমন বিষয়ে যাতে আমি তোমাদের একের ওপর অন্যের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। পুরুষ যা অর্জন করে সেটা তার অংশ, নারী যা অর্জন করে সেটা তার অংশ। আর আমার কাছে অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আমি সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত।

নিসা ৪:১-এর সম্পূর্ণ আয়াতে একইভাবে “তোমাদের পালনকর্তা”, “যিনি সৃষ্টি করেছেন”, “আল্লাহকে ভয় করো” এবং “আল্লাহ তোমাদের ওপর পর্যবেক্ষক”—এই নাম ও সর্বনামের বিন্যাস রয়েছে। সৃষ্টি, সম্পর্ক ও নৈতিক নির্দেশের কর্তৃত্বকে এক সত্তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, আর শ্রোতাদের সরাসরি বহুবচনে সম্বোধন করা হয়েছে। [1127]

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا

বাংলা অনুবাদ: হে মানুষ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন, তা থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের দুজন থেকে বহু পুরুষ ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে একে অন্যের কাছে দাবি করো; এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক সম্পর্কে সতর্ক থাকো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর পর্যবেক্ষক।

৪:১৪-তে “আল্লাহ ও তাঁর রাসুল” এবং শাস্তি দেওয়ার ক্রিয়ার সম্পর্কও একই কাঠামোতে এসেছে। আল্লাহর নির্দেশ ও রাসুলের আনুগত্যকে একসঙ্গে বেঁধে অবাধ্যতার জন্য চিরস্থায়ী শাস্তি ঘোষণা করা হচ্ছে। এই বাক্য ধর্মীয় কর্তৃত্বের সম্পর্ক প্রকাশ করে; তার সর্বনামও সেই সম্পর্কের অংশ। [1128]

وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَتَعَدَّ حُدُودَهُ يُدْخِلْهُ نَارًا خَالِدًا فِيهَا وَلَهُ عَذَابٌ مُّهِينٌ

বাংলা অনুবাদ: যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্যতা করে এবং তাঁর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে, তিনি তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।

৪:৩২-এ “আল্লাহর কাছে অনুগ্রহ চাও” নির্দেশটিও সম্বোধিত মানুষের কাজ নির্দিষ্ট করে। আরবিতে আল্লাহকে প্রথম পুরুষে “আমার কাছে” বলা হয়নি; নাম ধরেই উল্লেখ করা হয়েছে। “আল্লাহর কাছে”কে “আমার কাছে” লিখলে একই সত্তাকে বোঝানো যেতে পারে, কিন্তু বাক্যটির বাচনভঙ্গি এবং শব্দ বদলে যায়। [1129]

وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ ۚ لِّلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبُوا ۖ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبْنَ ۚ وَاسْأَلُوا اللَّهَ مِن فَضْلِهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ তোমাদের কাউকে অন্যের ওপর যে প্রাধান্য দিয়েছেন, তোমরা তার আকাঙ্ক্ষা করো না। পুরুষদের জন্য রয়েছে তারা যা অর্জন করেছে তার অংশ, এবং নারীদের জন্য রয়েছে তারা যা অর্জন করেছে তার অংশ। আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়ে জ্ঞাত।

এই তুলনাগুলোতে দুটি ভিন্ন ঘটনা রয়েছে। ফাতিহায় উপাসক নিজের প্রয়োজন জানিয়ে আল্লাহকে সম্বোধন করছেন। নিসার উদাহরণে আল্লাহকে তৃতীয় পুরুষে উল্লেখ করে মানুষের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। প্রথমটিতে প্রার্থনার ভেতরের বক্তার অবস্থান পরিষ্কার; দ্বিতীয়টিতে তৃতীয় পুরুষের ব্যবহার বক্তার সঙ্গে উল্লিখিত সত্তার দূরত্ব তৈরি করে, কিন্তু বক্তার পরিচয় স্থির করতে আরও প্রসঙ্গ প্রয়োজন। ধর্মীয় উৎসের ঘোষণা সেই প্রয়োজন মেটায় একটি বিশ্বাসের মাধ্যমে; তাফসির মেটায় বাক্যের উহ্য সম্পর্ক নির্ধারণ করে। লিখিত পাঠ, ব্যাখ্যার সংযোগ এবং উৎপত্তি সম্পর্কে বিশ্বাস—এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে মিশিয়ে দিলে কোরআনের ভাষা নিজের পরিচয় যতটা স্পষ্ট করে, তার চেয়ে বেশি স্পষ্ট বলে দাবি করা হয়।


যারিয়াত ৫১:৪৭–৫১-এ সৃষ্টিকর্ম ও মুহাম্মদের বক্তব্য

যারিয়াতের ৪৭–৫১ আয়াতে পরিবর্তনটি শুধু আল্লাহকে “তিনি” বলা এবং পরে “আমরা” বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রথমে আকাশ নির্মাণ, পৃথিবী বিছিয়ে দেওয়া এবং জোড়ায় সৃষ্টি করার কাজের ঘোষণা রয়েছে। তারপর একই ধারায় এমন একজন “আমি” সামনে আসেন, যিনি আল্লাহর দিকে যেতে বলেন এবং নিজেকে “তাঁর পক্ষ থেকে” সতর্ককারী হিসেবে পরিচয় দেন। সৃষ্টিকর্মের কর্তা এবং প্রেরকের পক্ষ থেকে সতর্ককারী—বাক্যের এই দুই অবস্থান আলাদা। পূর্ববর্তী নূহের সম্প্রদায়ের বর্ণনাসহ সম্পূর্ণ ধারাটি হলো: [1130]

وَقَوْمَ نُوحٍ مِّن قَبْلُ ۖ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَاسِقِينَ
وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ
وَالْأَرْضَ فَرَشْنَاهَا فَنِعْمَ الْمَاهِدُونَ
وَمِن كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
فَفِرُّوا إِلَى اللَّهِ ۖ إِنِّي لَكُم مِّنْهُ نَذِيرٌ مُّبِينٌ
وَلَا تَجْعَلُوا مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ ۖ إِنِّي لَكُم مِّنْهُ نَذِيرٌ مُّبِينٌ

বাংলা অনুবাদ: ৪৬। আর ইতঃপূর্বে নূহের কওমকেও (আমি ধ্বংস করে দিয়েছিলাম)। নিশ্চয় তারা ছিল ফাসিক কওম।
৪৭। আর আমি শক্তি দ্বারা আকাশ নির্মাণ করেছি এবং নিশ্চয় আমি শক্তিশালী।
৪৮। আর আমি যমীনকে বিছিয়ে দিয়েছি। আমি কতইনা সুন্দর বিছানা প্রস্তুতকারী!
৪৯। আর প্রত্যেক বস্তু থেকে আমি জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি। আশা করা যায়, তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে।
৫০। অতএব তোমরা আল্লাহর দিকে ধাবিত হও। আমি তো তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য এক স্পষ্ট সতর্ককারী।
৫১। আর তোমরা আল্লাহর সাথে কোন ইলাহ নির্ধারণ করো না; আমি তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য এক স্পষ্ট সতর্ককারী।

বাংলা উদ্ধৃতিতে সৃষ্টিকর্মের জন্য “আমি” থাকলেও আরবিতে এখানে বহুবচন রয়েছে। “বানাইনাহা”—আমরা তা নির্মাণ করেছি; “ফারাশনাহা”—আমরা তা বিছিয়েছি; “খালাকনা”—আমরা সৃষ্টি করেছি। পরের দুই আয়াতে “ইন্নি”—নিশ্চয় আমি, এবং “মিনহু”—তাঁর পক্ষ থেকে। ফলে একদিকে সংখ্যা বদলেছে; অন্যদিকে সতর্ককারী নিজের কর্তৃত্বের উৎসকে নিজের বাইরে তৃতীয় পুরুষে উল্লেখ করেছেন। “আমরা সৃষ্টি করেছি” থেকে “আমি তাঁর পক্ষ থেকে সতর্ককারী”—এই স্থানান্তর অনুবাদের একবচন “আমি” দিয়ে পড়লে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর আড়াল হয়ে যায়।

আয়াতআরবি পদ বা বক্তব্যব্যাকরণিক অবস্থান ও কাজ
৫১:৪৭بَنَيْنَاهَا / إِنَّاআমরা নির্মাণ করেছি / নিশ্চয় আমরা; আকাশের স্রষ্টার ঘোষণা।
৫১:৪৮فَرَشْنَاهَاআমরা পৃথিবী বিছিয়েছি; সৃষ্টিকর্মের একই কণ্ঠ।
৫১:৪৯خَلَقْنَاআমরা জোড়ায় সৃষ্টি করেছি; একই বহুবচন।
৫১:৫০إِنِّي لَكُمْ مِنْهُ نَذِيرٌআমি তোমাদের জন্য তাঁর পক্ষ থেকে সতর্ককারী; প্রেরিত ব্যক্তির আত্মপরিচয়।
৫১:৫১إِنِّي لَكُمْ مِنْهُ نَذِيرٌএকই আত্মপরিচয়; আল্লাহর সঙ্গে অন্য উপাস্য স্থাপনের নিষেধের পর এসেছে।

৪৭ নম্বর আয়াতের “বিআইদিন” পদটিও স্বতন্ত্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ এখানে শক্তি দ্বারা। ইবন কাসির ইবন আব্বাস, মুজাহিদ, কাতাদা ও অন্যদের নামে এই অর্থ উল্লেখ করেছেন। “হাতসমূহ” লিখলে শক্তির শব্দকে হাতের বহুবচন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বক্তার সংখ্যা নির্ধারণের মতো শব্দের অর্থ নির্ধারণেও আরবি পাঠকে অনুবাদের ওপর অগ্রাধিকার দিতে হয়। [1131]

( والسماء بنيناها ) أي : جعلناها سقفا [ محفوظا ] رفيعا ) بأيد ) أي : بقوة . قاله ابن عباس ، ومجاهد ، وقتادة ، والثوري ، وغير واحد

বাংলা অনুবাদ: “আর আকাশ আমরা নির্মাণ করেছি”—অর্থাৎ তাকে উঁচু ও সুরক্ষিত ছাদ করেছি। “বিআইদিন”—অর্থাৎ শক্তি দ্বারা। ইবন আব্বাস, মুজাহিদ, কাতাদা, সাওরি এবং আরও অনেকে এ কথা বলেছেন।

ইবন আশুর ৫০ নম্বর আয়াতের শুরুতে প্রকাশিত নেই এমন একটি বলার নির্দেশ ধরে নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “ফা” দিয়ে যুক্ত বাক্যটি উহ্য বলার ক্রিয়ার উক্তি; পূর্ণরূপ “অতএব বলো, তোমরা পালাও”। অর্থাৎ কোরআনের মুদ্রিত বাক্যে থাকা “অতএব তোমরা আল্লাহর দিকে ধাবিত হও”কে তিনি নবীকে বলার জন্য দেওয়া একটি উক্তি হিসেবে শনাক্ত করেছেন। [1132]

فالجُمْلَةُ المُفَرَّعَةُ بِالفاءِ مَقُولُ قَوْلٍ مَحْذُوفٍ والتَّقْدِيرِ: فَقُلْ فِرُّوا

বাংলা অনুবাদ: “ফা” দিয়ে যুক্ত বাক্যটি একটি উহ্য বলার ক্রিয়ার উক্তি; এর পূর্ণরূপ: অতএব বলো, তোমরা পালাও।

ইবন আশুর এই সিদ্ধান্তের কারণও জানিয়েছেন। “আমি তাঁর পক্ষ থেকে সতর্ককারী” কথাটি তাঁর কাছে বক্তা নির্ধারণের সংকেত। শুধু পূর্ববর্তী সৃষ্টিকর্মের “আমরা” ধরে সামনে এগোলে এই আত্মপরিচয়ের সম্পর্ক পরিষ্কার থাকে না। তাই তিনি উহ্য “বলো” ধরে সতর্কবাণীকে রাসুলের উচ্চারণের মধ্যে স্থাপন করেছেন। [1133]

دَلَّ عَلَيْهِ قَوْلُهُ ”﴿إنِّي لَكم مِنهُ نَذِيرٌ مُبِينٌ﴾“ فَإنَّهُ كَلامٌ لا يَصْدُرُ إلّا مِن قائِلٍ ولا يَسْتَقِيمُ أنْ يَكُونَ كَلامَ مُبَلِّغٍ. وحَذْفُ القَوْلِ كَثِيرُ الوُرُودِ في القُرْآنِ وهو مِن ضُرُوبِ إيجازِهِ، فالفاءُ مِنَ الكَلامِ الَّذِي يَقُولُهُ الرَّسُولُ ﷺ، ومُفادُها التَّفْرِيعُ عَلى ما تَقَرَّرَ مِمّا تَقَدَّمَ.

বাংলা অনুবাদ: এর প্রমাণ তাঁর এই কথা: “নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য তাঁর পক্ষ থেকে স্পষ্ট সতর্ককারী।” কারণ এটি এমন বক্তব্য, যা একজন বক্তার কাছ থেকেই আসে; শুধু পৌঁছে দেওয়া ব্যক্তির বক্তব্য হিসেবে তা সঙ্গত হয় না। কোরআনে বলার ক্রিয়া উহ্য রাখা বহুবার ঘটেছে এবং এটি তার সংক্ষেপ প্রকাশের একটি ধরন। অতএব “ফা” রাসুল যে বক্তব্য বলেন, তার অংশ; এর তাৎপর্য পূর্ববর্তী আলোচনায় প্রতিষ্ঠিত বিষয়ের ওপর পরবর্তী কথা যুক্ত করা।

এখানে তাফসিরের কাজটি দৃশ্যমান: আয়াতের শব্দে নেই এমন একটি নির্দেশ ধরে, তার পরের বাক্যের বক্তা নির্ধারণ করা হচ্ছে। সতর্কবাণীতে নবীর প্রথম পুরুষকে রাখা হচ্ছে, আর তার আগে আল্লাহর নির্দেশ উহ্য ধরা হচ্ছে। এই ব্যাখ্যায় “আমি”কে আল্লাহ হিসেবে পড়া হচ্ছে না। নবীর নিজের পরিচয়ের ভাষা কোরআনের অক্ষরে সংরক্ষিত, এবং সেই ভাষাকে আল্লাহর নির্দেশিত উক্তি বানানোর সংযোগ ব্যাখ্যা থেকে আসছে।

বাচনভঙ্গির পার্থক্যকে পাশাপাশি ধরলে শব্দ পরিবর্তনের পরিমাণও স্পষ্ট হয়। একটি ধারায় আল্লাহকে প্রথম পুরুষে রেখে নবীর পরিচয় তৃতীয় পুরুষে লেখা যায়; অন্য ধারায় সৃষ্টিকর্মের বিবরণ তৃতীয় পুরুষে রেখে নবী নিজের কথা বলতে পারেন। নিচের দুটি রূপ লেখকের রচিত ভাষাগত তুলনা। এগুলোতে বাক্যের অবস্থান একটানা রাখার জন্য সর্বনাম ও ক্রিয়া বদলানো হয়েছে।

লেখকের তুলনা: স্রষ্টার প্রথম পুরুষ রেখে রচিত রূপলেখকের তুলনা: সৃষ্টিকর্ম তৃতীয় পুরুষে রেখে রচিত রূপ
৪৬। আর ইতঃপূর্বে নূহের কওমকেও আমি ধ্বংস করে দিয়েছিলাম। নিশ্চয় তারা ছিল ফাসিক কওম।
৪৭। আর আমি শক্তি দ্বারা আকাশ নির্মাণ করেছি এবং নিশ্চয় আমি শক্তিশালী।
৪৮। আর আমি যমীনকে বিছিয়ে দিয়েছি। আমি কতইনা সুন্দর বিছানা প্রস্তুতকারী!
৪৯। আর প্রত্যেক বস্তু থেকে আমি জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি। যারা বুদ্ধিমান, তারা উপদেশ গ্রহণ করবে।
৫০। অতএব তোমরা আমার দিকে ধাবিত হও। মুহাম্মদ তো আমার পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য এক স্পষ্ট সতর্ককারী।
৫১। আর তোমরা আমার সাথে কোন ইলাহ নির্ধারণ করো না; মুহাম্মদ তো আমার পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য এক স্পষ্ট সতর্ককারী।
৪৬। আর ইতঃপূর্বে নূহের কওমকেও আল্লাহ ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। নিশ্চয় তারা ছিল ফাসিক কওম।
৪৭। আর আল্লাহ শক্তি দ্বারা আকাশ নির্মাণ করেছেন এবং নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিশালী।
৪৮। আর আল্লাহ যমীনকে বিছিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ কতইনা সুন্দর বিছানা প্রস্তুতকারী!
৪৯। আর প্রত্যেক বস্তু থেকে আল্লাহ জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। যারা জ্ঞানী, তারা উপদেশ গ্রহণ করবে।
৫০। অতএব তোমরা আল্লাহর দিকে ধাবিত হও। আমি (মুহাম্মদ) তো তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য এক স্পষ্ট সতর্ককারী।
৫১। আর তোমরা আল্লাহর সাথে কোন ইলাহ নির্ধারণ করো না; আমি (মুহাম্মদ) তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য এক স্পষ্ট সতর্ককারী।

এই তুলনায় প্রথম পুরুষকে ধরে রাখতে গিয়ে সতর্ককারীর পরিচয় বদলাতে হয়েছে; দ্বিতীয় রূপে সতর্ককারীর “আমি” রাখতে গিয়ে সৃষ্টিকর্মের ক্রিয়াগুলো বদলেছে। আর মুসহাফের পাঠে দুই ধরনের অবস্থান পাশাপাশি রয়েছে। ইবন আশুর সেখানে শব্দ বদলাননি; তিনি উহ্য বলার নির্দেশ অনুমান করেছেন। ফলে শব্দ অপরিবর্তিত রাখার দাবি এবং বাক্যের পূর্ণ অর্থ অনুধাবনের জন্য ব্যাখ্যায় অতিরিক্ত সম্পর্ক স্থাপন—দুটি কাজ একই সঙ্গে চলছে।

সৃষ্টিকর্মের পর হঠাৎ একজন দূতের আত্মপরিচয় উপস্থিত হওয়া গ্রন্থটির বক্তব্যের বিন্যাস সম্পর্কে একটি বাস্তব প্রশ্ন তোলে। “ইন্নি” কার, “মিনহু” কাকে নির্দেশ করছে এবং কোথা থেকে নবীর বক্তব্য শুরু হলো—উত্তরগুলো কেবল প্রথম পুরুষের উচ্চারণ দেখে পাওয়া যায় না। ইবন আশুরের নির্ধারিত উহ্য নির্দেশ গ্রহণ করলে একটি নির্দিষ্ট পাঠ তৈরি হয়। ঐশী উৎসের দাবিটিও সেই ব্যাখ্যাত পাঠের ওপর বসানো হয়। প্রকাশিত বাক্যের বাইরে এই ব্যাখ্যাগত সংযোগের প্রয়োজন থাকায় প্রতিটি উক্তির উৎস ও কণ্ঠ একদম সরাসরি ঘোষণা করা আছে—এমন দাবি পাঠের বাস্তব গঠনের সঙ্গে মেলে না।


ইসরা ১৭:১-এ আল্লাহর প্রশংসা ও বক্তার অবস্থান

ইসরার প্রথম আয়াতে একটি বাক্যের মধ্যেই পরোক্ষ উল্লেখ ও প্রথম পুরুষ পাশাপাশি রয়েছে। শুরুতে “সুবহানাল্লাজি”—সেই সত্তা পবিত্র, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে নিয়ে গেছেন। মাঝখানে মসজিদুল আকসার চারপাশের বিষয়ে “আমরা বরকত দিয়েছি” এবং “আমাদের নিদর্শন” এসেছে। শেষে আবার “তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা”। ফলে আয়াতের বর্ণনা শুরু হয়েছে কারও মহিমা ঘোষণার মাধ্যমে, তারপর সেই সত্তার কাজ প্রথম পুরুষে বলা হয়েছে এবং শেষে আবার তাঁর পরিচয় তৃতীয় পুরুষে এসেছে। [1134] [1135]

سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ

বাংলা অনুবাদ: পবিত্র ও মহীয়ান তিনি যিনি তাঁর বান্দাহকে রাতের বেলা ভ্রমণ করিয়েছেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার চারপাশকে আমি কল্যাণময় করেছি। তাকে আমার নিদর্শনাবলী দেখানোর জন্য, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
— Taisirul Quran
পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মাসজিদুল হারাম হতে মাসজিদুল আকসায়, যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বারাকাতময়, তাকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য; তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
— Sheikh Mujibur Rahman
পবিত্র মহান সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে নিয়ে গিয়েছেন আল মাসজিদুল হারাম থেকে আল মাসজিদুল আকসা* পর্যন্ত, যার আশপাশে আমি বরকত দিয়েছি, যেন আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। * ফিলিস্তীনে অবস্থিত বাইতুল মাকদিস, যা মুসলমানদের প্রথম কিবলা ছিল।
— Rawai Al-bayan
পবিত্র মহিমাময় তিনি [১], যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করালেন [২], আল-মসজিদুল হারাম [৩] থেকে আল-মসজিদুল আকসা পর্যন্ত [৪], যার আশপাশে আমরা দিয়েছি বরকত, যেন আমরা তাকে আমাদের নিদর্শন দেখাতে পারি [৫]; তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা [৬]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

বাংলা অনুবাদে মাঝখানের বহুবচনকে কোথাও “আমি”, কোথাও “আমরা” করা হয়েছে। “বারাকনা”, “লিনুরিয়াহু” এবং “আয়াতিনা” তিন ক্ষেত্রেই আরবি রূপে প্রথম পুরুষ বহুবচন রয়েছে। “আসরা বিআবদিহি”তে আবার নিজের উল্লেখ “তাঁর বান্দা” হিসেবে এসেছে। এই পার্থক্যগুলো কেবল “সবই আল্লাহর কথা” বলে পুনরুচ্চারণ করলে ব্যাখ্যা করা হয় না; বাক্যের ভেতরে উল্লেখের দিক কীভাবে বদলেছে, তা আলাদা করে ধরতে হয়।

আয়াতের অংশবাক্যে প্রকাশিত অবস্থানকাজ ও সম্পর্ক
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِযিনি তাঁর বান্দাকে নিয়ে গেছেন, তাঁর পবিত্রতা ঘোষণাআল্লাহকে পরোক্ষভাবে উল্লেখ; বান্দাকে তাঁর সঙ্গে যুক্ত করা।
الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُযার চারপাশে আমরা বরকত দিয়েছিপ্রথম পুরুষ বহুবচনে বরকত দেওয়ার ঘোষণা।
لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَاতাঁকে আমাদের কিছু নিদর্শন দেখানোর জন্যসেই একই বহুবচনে উদ্দেশ্য ও নিদর্শনের মালিকানা প্রকাশ।
إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُনিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টাআবার তৃতীয় পুরুষের উল্লেখ।

আল-বায়ান ফাউন্ডেশনের মুদ্রিত অনুবাদে আয়াতটির উপস্থাপন নিচের ছবিতে রয়েছে। অনুবাদে ব্যবহৃত “আমি” বা “তিনি” পাঠকের কাছে বাক্যের ভেতরের সম্পর্ক কীভাবে হাজির করে, এই তুলনায় তা দেখা যায়।

মুদ্রিত অনুবাদের সূত্র: আল কুরআনুল কারীম, সরল অর্থানুবাদ, আল-বায়ান ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৫৫৮।

কোরআন সংকলন 231

হাফেজ মুনির উদ্দিন আহমদের অনুবাদেও একই আয়াতের বাক্যগঠন মিলিয়ে দেখা যায়। আল্লাহকে নাম বা তৃতীয় পুরুষে উল্লেখ এবং প্রথম পুরুষে কাজের ঘোষণা—দুই রূপের সংযোগ অনুবাদের মধ্যেও বজায় আছে।

মুদ্রিত অনুবাদের সূত্র: কোরআন শরীফ, সহজ সরল বাংলা অনুবাদ, হাফেজ মুনির উদ্দিন আহমদ, আল কোরআন একাডেমী লন্ডন, পৃষ্ঠা ২৭৯।

কোরআন সংকলন 233

শাওকানি এই পরিবর্তনকে সরাসরি শনাক্ত করেছেন। “আসরা”র পরে “বারাকনা” আসাকে তিনি তৃতীয় পুরুষ থেকে প্রথম পুরুষে প্রত্যাবর্তন বলেছেন। আরবি অলংকারশাস্ত্রে এই পরিবর্তন ইলতিফাত নামে পরিচিত। অর্থাৎ সর্বনামের ভঙ্গি বদলানোর ঘটনাটি ভাষ্যকারের কাছেও স্পষ্ট; তাঁর ব্যাখ্যা ঘটনাটিকে ভাষার স্বীকৃত বর্ণনাশৈলীর মধ্যে স্থাপন করছে। [1136]

وفي ( باركنا ) بعد قوله ( أسرى ) التفات من الغيبة إلى التكلم .

বাংলা অনুবাদ: “আসরা” বলার পরে “বারাকনা”-তে তৃতীয় পুরুষ থেকে প্রথম পুরুষে পরিবর্তন ঘটেছে।

আয়াতের শুরুতে “সুবহান” শব্দের ব্যাকরণিক বিশ্লেষণেও উহ্য ক্রিয়ার উপস্থিতি ধরে নেওয়া হয়েছে। কুরতুবি সিবাওয়াইহের নামে বলেছেন, এখানে একই অর্থের একটি ক্রিয়া উহ্য রয়েছে; পূর্ণ অর্থ “আমি আল্লাহকে পবিত্র ঘোষণা করছি”। ফলে যে মহিমা ঘোষণার শব্দ দিয়ে আয়াত শুরু হয়েছে, তার পূর্ণ বাক্য গঠন করতেও ব্যাখ্যাকারী অপ্রকাশিত অংশ নির্ধারণ করছেন। [1137]

والعامل فيه على مذهب سيبويه الفعل الذي من معناه لا من لفظه ، إذ لم يجر من لفظه فعل ، وذلك مثل قعد القرفصاء ، واشتمل الصماء ; فالتقدير عنده : أنزه الله تنزيها ; فوقع ( سبحان الله ) مكان قولك تنزيها .

বাংলা অনুবাদ: সিবাওয়াইহের মত অনুযায়ী এর কার্যকর ক্রিয়াটি তার অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত, একই শব্দমূলের প্রকাশিত ক্রিয়া নয়; কারণ এর শব্দরূপ থেকে এমন ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়নি। এটি “কুয়ুদ আল-কুরফুসা” ও “ইশতিমাল আস-সাম্মা”র মতো প্রয়োগ। তাঁর কাছে পূর্ণ অর্থ: আমি আল্লাহকে সম্পূর্ণ পবিত্র ঘোষণা করছি। অতএব “সুবহানাল্লাহ” তোমার “পবিত্র ঘোষণা করছি” কথার স্থানে এসেছে।

ইলতিফাতের ব্যাখ্যা এবং উহ্য ক্রিয়ার ব্যাখ্যা দুই ধরনের কাজ করে। প্রথমটি প্রকাশিত সর্বনামের পরিবর্তনের নাম দেয়; দ্বিতীয়টি প্রকাশিত নেই এমন ক্রিয়া ধরে সম্পূর্ণ বাক্য তৈরি করে। একটির অস্তিত্ব থেকে অন্যটির ফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। আয়াতের শব্দে “তিনি”, “আমরা” ও “আমাদের” আছে; শাওকানি তাদের মধ্যে একই আল্লাহর কাজের সম্পর্ক নির্ধারণ করেছেন। কুরতুবি আবার মহিমা ঘোষণার ক্রিয়ার পূর্ণ রূপ নির্ধারণ করেছেন। একই একটি আয়াত অর্থের দিক থেকে কীভাবে সংযুক্ত হবে, তার পেছনে এই ভাষ্যগত সিদ্ধান্তগুলো কাজ করছে।

আয়াতে মুহাম্মদের অবস্থান “তাঁর বান্দা” হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে; রাতে নিয়ে যাওয়ার কর্তা আল্লাহ। তারপর প্রথম পুরুষের বহুবচনে যাত্রার উদ্দেশ্য বলা হয়েছে: তাঁকে আমাদের কিছু নিদর্শন দেখানো। ফলে ঘটনার বিবরণ শুধু একজন মানুষের ভ্রমণের দাবি হিসেবে রাখা হয়নি; সেটিকে আল্লাহর সম্পাদিত কাজ এবং মুহাম্মদের জন্য নির্বাচিত অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আল্লাহর পবিত্রতা দিয়ে শুরু হওয়া বাক্য একই সঙ্গে নবীর সঙ্গে তাঁর বিশেষ সম্পর্কও প্রতিষ্ঠা করছে। সর্বনামের বিন্যাস সেই ধর্মীয় মর্যাদা নির্মাণের অংশ।

ইসরার উদাহরণে আল্লাহ সম্পর্কে তৃতীয় পুরুষ এবং আল্লাহর নিজের প্রথম পুরুষ একই বাক্যে ব্যবহার করা হয়েছে—এই পাঠগত তথ্য স্পষ্ট। এর সঙ্গে তাফসিরে দেওয়া ইলতিফাতের পরিচয়ও স্পষ্ট। কিন্তু “অলংকার” নামকরণ আর ঐশী উৎপত্তির প্রমাণ সমার্থক নয়। প্রথমটি ভাষার বর্ণনা; দ্বিতীয়টি গ্রন্থের উৎস সম্পর্কে দাবি। একটি মানবীয় ভাষায় প্রচলিত বর্ণনাভঙ্গি কোনো রচনায় উপস্থিত থাকলে সেই রচনার অতিমানবীয় উৎস প্রতিষ্ঠিত হয় না। ধর্মীয় বিশ্বাস এখানে ভাষার ঘটনাকে গ্রহণ করার কাঠামো দিয়েছে; সেই কাঠামোকে ভাষার বাইরে থেকে পাওয়া স্বাধীন প্রমাণ বলে চালানো হলে যুক্তির ধাপ বাদ পড়ে যায়।


হুদ ১১:১–২-এ গ্রন্থ ও “তাঁর পক্ষ থেকে” সতর্ককারী

হুদের শুরুতে গ্রন্থটির পরিচয় দেওয়ার পরেই এমন একজন বক্তা উপস্থিত হন, যিনি নিজেকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা বলে পরিচয় দেন। প্রথম আয়াতে গ্রন্থের আয়াতগুলো সুদৃঢ় ও বিস্তারিতভাবে বর্ণিত এবং প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ সত্তার কাছ থেকে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উপাসনা করতে নিষেধ করার পর “আমি তোমাদের জন্য তাঁর পক্ষ থেকে” বলা হয়েছে। এখানে “আমি” ও “তিনি” একই সম্পর্কের দুই দিক: একজন প্রেরিত, অন্যজন প্রেরক। [1138]

الر ۚ كِتَابٌ أُحْكِمَتْ آيَاتُهُ ثُمَّ فُصِّلَتْ مِن لَّدُنْ حَكِيمٍ خَبِيرٍ
أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ ۚ إِنَّنِي لَكُم مِّنْهُ نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ

বাংলা অনুবাদ: ১
আলিফ, লাম, রা; এটা এমন একটা গ্রন্থ, এর আয়াতগুলো সুদৃঢ়, অতঃপর সবিস্তারে ব্যাখ্যাকৃত মহাজ্ঞানী, সর্বজ্ঞের নিকট হতে।
— Taisirul Quran
আলিফ লাম রা। এটি (কুরআন) এমন কিতাব যার আয়াতগুলি (প্রমাণাদি দ্বারা) মাযবূত করা হয়েছে। অতঃপর বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে; প্রজ্ঞাময়ের (আল্লাহর) পক্ষ হতে।
— Sheikh Mujibur Rahman
আলিফ-লাম-রা। এটি কিতাব যার আয়াতসমূহ সুস্থিত করা হয়েছে, অতঃপর বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে প্রজ্ঞাময়, সবিশেষ অবহিত সত্তার পক্ষ থেকে।
— Rawai Al-bayan
আলিফ–লাম-রা, এ কিতাব, যার আয়াতসমূহ সুস্পষ্ট [১], সুবিন্যস্ত ও পরে বিশদভাবে বিবৃত [২] প্রজ্ঞাময়, সবিশেষ অবহিত সত্তার কাছ থেকে [৩];
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
২
(এটা শিক্ষা দেয়) যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ‘ইবাদাত করবে না, আমি অবশ্যই তাঁর পক্ষ হতে তোমাদের জন্য ভয় প্রদর্শনকারী ও সুসংবাদদাতা।
— Taisirul Quran
এ (উদ্দেশে) যে, আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদাত করনা; আমি (নাবী) তাঁর (আল্লাহর) পক্ষ হতে তোমাদেরকে সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা।
— Sheikh Mujibur Rahman
(এ মর্মে) যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত করো না। নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য তাঁর পক্ষ থেকে সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা।
— Rawai Al-bayan
যে, তোমরা আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্যের ইবাদাত করো না [১], নিশ্চয় আমি তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা [২]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

আরবিতে প্রথম আয়াতের “মিন লাদুন হাকিমিন খাবির” গ্রন্থের উৎসকে প্রজ্ঞাময়, অবহিত সত্তার সঙ্গে যুক্ত করছে। দ্বিতীয় আয়াতের “ইন্নানি লাকুম মিনহু” বলছে, আমি তোমাদের জন্য তাঁর পক্ষ থেকে। সর্বনামের সম্পর্ক অনুসারে সতর্ককারী নিজেকে সেই উৎসের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। আল্লাহ নিজেই নিজের কাছ থেকে এসে সতর্ক করছেন—এমন সরল প্রথম পুরুষের পাঠ এখানে পাওয়া যাচ্ছে না; বাক্যের “আমি” একজন প্রেরিত ব্যক্তির অবস্থানে রয়েছে।

ইবন আশুর এই সম্পর্কের ব্যাখ্যায় “মিনহু”কে উৎসবাচক বলেছেন এবং স্পষ্ট করেছেন, আমি আল্লাহর কাছ থেকে এসে তোমাদের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা। অর্থাৎ পাঠের “আমি”কে তিনি সেই ব্যক্তি হিসেবে শনাক্ত করেছেন, যার বক্তব্য আল্লাহর পক্ষ থেকে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে। [1139]

أَيْ إِنِّي نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لَكُمْ جَائِيًا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ

বাংলা অনুবাদ: অর্থাৎ আমি আল্লাহর কাছ থেকে এসে তোমাদের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা।

হুদের এই দুই আয়াতের বাংলা অনুবাদেও ব্যাখ্যার প্রবেশ দেখা যায়। শেখ মুজিবুর রহমানের অনুবাদে “আমি”র পরে “নাবী” এবং “তাঁর”র পরে “আল্লাহ” বন্ধনীতে বসানো হয়েছে। আরবি আয়াতে এই দুই ব্যাখ্যামূলক পরিচয় আলাদা শব্দ হিসেবে নেই। অনুবাদক পাঠকের জন্য সর্বনামের পরিচয় নির্দিষ্ট করেছেন। অন্য অনুবাদগুলোতে বন্ধনী না থাকলেও একই “আমি” ও “তাঁর” সম্পর্ককে বাক্যের অর্থ থেকে নির্ধারণ করতে হচ্ছে। ফলে অনুবাদে কেবল শব্দ বদলানো হচ্ছে না; কে কথা বলছেন এবং কার পক্ষ থেকে বলছেন, সেই সিদ্ধান্তও পাঠকের সামনে স্থাপন করা হচ্ছে।

পাঠের নির্দিষ্ট অংশউল্লেখিত সম্পর্কভাষ্যে নির্ধারিত পরিচয়
কিতাব, যার আয়াতগুলো সুদৃঢ় ও বিস্তারিতএকটি গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য ও উৎসের ঘোষণাগ্রন্থটি আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে বলে দাবি।
مِن لَّدُنْ حَكِيمٍ خَبِيرٍপ্রজ্ঞাময় ও অবহিত সত্তার কাছ থেকেইবন কাসিরের ব্যাখ্যায় আল্লাহ।
إِنَّنِي لَكُمْআমি তোমাদের জন্যসতর্কবাণী প্রদানকারী প্রেরিত ব্যক্তির অবস্থান।
مِنْهُতাঁর পক্ষ থেকেইবন আশুরের ব্যাখ্যায় আল্লাহর কাছ থেকে।
نَذِيرٌ وَبَشِيرٌসতর্ককারী ও সুসংবাদদাতাশাস্তির ভয় ও পুরস্কারের আশার মাধ্যমে শ্রোতাকে সম্বোধন।

ইবন কাসির প্রথম আয়াত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শব্দে সুদৃঢ় এবং অর্থে বিস্তারিত হওয়ার কথা বলেছেন। তারপর “প্রজ্ঞাময়, অবহিত সত্তার কাছ থেকে” কথাটির অর্থ আল্লাহর কাছ থেকে বলে নির্দিষ্ট করেছেন। সুতরাং আয়াতে গ্রন্থের যে গুণবর্ণনা আছে, তাফসির সেটিকে আল্লাহর কথা ও বিধানের গুণ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। [1140]

( أحكمت آياته ثم فصلت ) أي : هي محكمة في لفظها ، مفصلة في معناها ، فهو كامل صورة ومعنى . هذا معنى ما روي عن مجاهد ، وقتادة ، واختاره ابن جرير .
وقوله : ( من لدن حكيم خبير ) أي : من عند الله الحكيم في أقواله ، وأحكامه ، الخبير بعواقب الأمور .

বাংলা অনুবাদ: “যার আয়াতগুলো সুদৃঢ় করা হয়েছে, তারপর বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে”—অর্থাৎ এর শব্দ সুদৃঢ়, এর অর্থ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যাত; ফলে এটি রূপ ও অর্থে পূর্ণাঙ্গ। মুজাহিদ ও কাতাদা থেকে বর্ণিত ব্যাখ্যার অর্থ এটাই, এবং ইবন জারির এটি গ্রহণ করেছেন। আর “প্রজ্ঞাময়, অবহিত সত্তার কাছ থেকে”—অর্থাৎ আল্লাহর কাছ থেকে, যিনি তাঁর বক্তব্য ও বিধানে প্রজ্ঞাময় এবং বিষয়সমূহের পরিণতি সম্পর্কে অবহিত।

এই গুণবর্ণনার মধ্যে হঠাৎ সতর্ককারীর আত্মপরিচয় বসার ঘটনাটিকে ইবন আশুর একটি মধ্যবর্তী বাক্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, এটি আল্লাহ ছাড়া অন্যের উপাসনা না করার নির্দেশ এবং প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশের মাঝখানে রয়েছে। এর কাজ অবাধ্যতার ব্যাপারে সতর্ক করা এবং আনুগত্যে উৎসাহ দেওয়া। ফলে গ্রন্থের সূচনায় শুধু বিধান নয়, বিধান প্রচারকারীর নিজস্ব অবস্থানও স্থাপিত হয়েছে। [1141]

وَجُمْلَةُ إِنَّنِي لَكُمْ مِنْهُ نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ مُعْتَرِضَةٌ بَيْنَ جُمْلَةِ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ وَجُمْلَةِ وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ الْآيَةَ ، وَهُوَ اعْتِرَاضٌ لِلتَّحْذِيرِ مِنْ مُخَالَفَةِ النَّهْيِ وَالتَّحْرِيضِ عَلَى امْتِثَالِهِ .

বাংলা অনুবাদ: “নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য তাঁর পক্ষ থেকে সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা”—এই বাক্যটি “তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও উপাসনা করো না” এবং “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা চাও” আয়াতের বাক্যের মাঝখানে অবস্থিত। এটি নিষেধ অমান্য করা সম্পর্কে সতর্ক করা এবং তা পালন করতে উৎসাহ দেওয়ার জন্য মধ্যবর্তী বাক্য।

একই ধরনের সতর্ককারীর পরিচয় কোরআনের অন্য স্থানে সরাসরি “সে বলল” নির্দেশনাসহ এসেছে। নূহের সূরায় প্রেরণের কথা বলার পর স্পষ্ট “কালা”—তিনি বললেন—দিয়ে নূহের আত্মপরিচয় শুরু করা হয়েছে। সেখানে “আমি তোমাদের জন্য স্পষ্ট সতর্ককারী”র বক্তাকে শনাক্ত করার চিহ্ন আয়াতের শব্দেই প্রকাশিত। [1142]

قَالَ يَا قَوْمِ إِنِّي لَكُمْ نَذِيرٌ مُّبِينٌ

বাংলা অনুবাদ: তিনি বললেন: হে আমার সম্প্রদায়, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য স্পষ্ট সতর্ককারী।

হুদ ১১:২-এ এই নির্দিষ্ট আত্মপরিচয়ের আগে প্রকাশ্য “বলুন” বা “তিনি বললেন” নেই। সতর্ককারীর ভূমিকা এবং “তাঁর পক্ষ থেকে” সম্পর্কের ভিত্তিতে তার বক্তা নির্ধারণ করা হচ্ছে। নূহের ক্ষেত্রে বক্তার প্রবেশচিহ্ন প্রকাশিত; হুদের ক্ষেত্রে একই ধরনের পরিচয় প্রসঙ্গ ও তাফসিরের মাধ্যমে স্থির হচ্ছে। সংকলিত গ্রন্থের মধ্যে উক্তি উপস্থাপনের পদ্ধতি যে সর্বত্র একই নয়, এই তুলনা তা দেখায়।

নবীর এই আত্মপরিচয় অনুসারীদের কাছেও নির্দিষ্ট দাবি বহন করে: তাঁর সতর্কবাণী ব্যক্তিগত অনুমান হিসেবে নয়, আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে বলে গ্রহণ করতে হবে। সেই দাবি মেনে নিলে বক্তার মানবীয় অবস্থান থেকে ঘোষিত বক্তব্য ঐশী কর্তৃত্ব পায়। কিন্তু “আমি তাঁর পক্ষ থেকে” বলা নিজেই সেই সম্পর্কের প্রমাণ নয়; এটি সম্পর্কটি দাবি করার ভাষা। গ্রন্থের শুরুতে নিজের উৎসের প্রশংসা এবং সঙ্গে প্রেরিত ব্যক্তির আত্মপরিচয় স্থাপন—দুটি মিলিয়ে কর্তৃত্বের একটি বদ্ধ কাঠামো তৈরি হয়। উৎসকে গ্রন্থের নিজের ঘোষণা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, আর ঘোষণাকারীর সত্যতা একই উৎসের নামে দাবি করা হচ্ছে।

কোন সতর্কবাণীকে নবীর সাধারণ প্রচার হিসেবে এবং কোনটিকে অবতীর্ণ কোরআনের নির্দিষ্ট শব্দ হিসেবে গ্রহণ করা হলো, তার সিদ্ধান্ত সংকলন ও স্বীকৃতির ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। “আমি”র ব্যাকরণিক পরিচয় সে সিদ্ধান্তের বিকল্প নয়। হুদের এই পাঠে নবীর কণ্ঠ সংরক্ষিত হয়েছে এবং তাকে ওহির মর্যাদা দেওয়া হয়েছে—এটাই নির্দিষ্ট ঘটনা। সেই মর্যাদার গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষা করতে গেলে গ্রন্থের আত্মঘোষণা ছাড়াও তার প্রচার, সংরক্ষণ ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে।


কাউসার, নাহল, মুজাদিলা, বাকারা ও শুরার উদাহরণ

কাউসারে দাতার ঘোষণা। কাউসারের প্রথম আয়াতে দাতা ও প্রাপকের সম্পর্ক প্রথম পুরুষের বহুবচন এবং দ্বিতীয় পুরুষের সর্বনাম দিয়ে প্রকাশিত। “ইন্না আতায়নাকাল কাউসার”—নিশ্চয়ই আমরা তোমাকে কাউসার দিয়েছি। দানের ঘোষণাটি আল্লাহর অবস্থান থেকে করা হয়েছে, আর সম্বোধিত প্রাপক মুহাম্মদ। বাংলা অনুবাদের কয়েকটিতে বহুবচনের জায়গায় “আমি” এসেছে; জাকারিয়ার অনুবাদে “আমরা” রাখা হয়েছে। [1143]

إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ

বাংলা অনুবাদ: আমি তোমাকে (হাওযে) কাওসার দান করেছি।
— Taisirul Quran
আমি অবশ্যই তোমাকে কাওছার দান করেছি,
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় আমি তোমাকে আল-কাউসার দান করেছি।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় আমরা আপনাকে কাউছার [১] দান করেছি।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

কাউসার আবৃত্তির সময় মুসল্লি নিজে মুহাম্মদকে কাউসার দেওয়ার দাবি করেন না; তিনি দাতার অবস্থান থেকে উচ্চারিত একটি ঘোষণা উদ্ধৃত করেন। ফাতিহার ক্ষেত্রে আবার একই মুসল্লি প্রার্থনার “আমরা”র মধ্যে নিজের অবস্থান গ্রহণ করেন। ফলে নামাজে ব্যবহৃত একই গ্রন্থের বাক্য দুইভাবে কাজ করে: কোথাও প্রার্থনা হিসেবে, কোথাও অন্য বক্তার বক্তব্যের আবৃত্তি হিসেবে। এই পার্থক্য শুধু আবৃত্তিকারীর কণ্ঠ শুনে শনাক্ত করা যায় না; বাক্যের ভূমিকা সম্পর্কে গৃহীত ব্যাখ্যা তার ব্যবহার নির্ধারণ করে। উপাসনার জন্য নির্বাচিত শব্দ এবং উপাসক নিজে যে দাবি করছেন—দুটি সর্বত্র এক নয়।

নাহলে আল্লাহর নামে শপথ। নাহলের ৬৩ নম্বর আয়াত শুরু হয়েছে “তাল্লাহি”—আল্লাহর শপথ—দিয়ে। এরপর রয়েছে “লাকাদ আরসালনা”—আমরা অবশ্যই পাঠিয়েছিলাম। শপথের সত্তা নাম ধরে উল্লিখিত, আর প্রেরণের দাবি প্রথম পুরুষের বহুবচনে। শয়তান অতীতের সম্প্রদায়গুলোর কাজ শোভন করেছিল এবং তারাই বেদনাদায়ক শাস্তি পাবে—এই বক্তব্য সেই শপথের মাধ্যমে জোর দেওয়া হয়েছে। [1144]

تَاللَّهِ لَقَدْ أَرْسَلْنَا إِلَىٰ أُمَمٍ مِّن قَبْلِكَ فَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ فَهُوَ وَلِيُّهُمُ الْيَوْمَ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর কসম! তোমার পূর্বে আমি বহু জাতির কাছে রসূল পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু শয়ত্বান তাদের কাছে তাদের কার্যকলাপকে শোভনীয় করে দিয়েছিল, আর আজ সে-ই তাদের অভিভাবক, তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি।
— Taisirul Quran
শপথ আল্লাহর! আমি তোমার পূর্বেও বহু জাতির নিকট রাসূল প্রেরণ করেছি; কিন্তু শাইতান ঐ সব জাতির কার্যকলাপ তাদের দৃষ্টিতে শোভন করেছিল; সুতরাং সে’ই আজ তাদের অভিভাবক এবং তাদেরই জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
— Sheikh Mujibur Rahman
আল্লাহর শপথ, আমি তোমার পূর্বে বহু জাতির নিকট রাসূল প্রেরণ করেছি। অতঃপর শয়তান তাদের জন্য তাদের কর্মকে শোভিত করেছে। তাই আজ সে তাদের অভিভাবক। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।
— Rawai Al-bayan
শপথ আল্লাহ্‌র! আমরা আপনার আগেও বহু জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি; কিন্তু শয়তান ঐসব জাতির কার্যকলাপ তাদের দৃষ্টিতে শোভন করেছিল; কাজেই সে –ই আজ [১] তাদের অভিভাবক আর তাদেরই জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

আল-বায়ানের মুদ্রিত অনুবাদে আল্লাহর শপথ এবং প্রথম পুরুষে বার্তাবাহক পাঠানোর বক্তব্য পাশাপাশি রয়েছে। আরবির “আরসালনা” অনুবাদে একবচন “আমি” হয়েছে; এই অনুবাদও বাক্যের সংখ্যা সম্পর্কে একটি নির্বাচন করেছে।

মুদ্রিত অনুবাদের সূত্র: আল কুরআনুল কারীম, সরল অর্থানুবাদ, আল-বায়ান ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ২৮৮।

কোরআন সংকলন 235

শপথ শ্রোতার কাছে একটি বক্তব্যের নিশ্চয়তা বাড়ানোর ভাষাগত উপায়। এখানে আল্লাহর নামেই অতীতের রাসুল প্রেরণের কথা সত্য বলে জোর দেওয়া হয়েছে, আর সেই প্রেরকও ধর্মীয় ব্যাখ্যায় আল্লাহ। ফলে শপথের কর্তৃত্ব এবং ঘোষণার উৎস একই সত্তায় স্থাপিত। এটি বক্তব্যের জোর বাড়ায়; স্বতন্ত্র সাক্ষীর সংখ্যা বাড়ায় না। আল্লাহর নামে শপথ করা আছে—এই তথ্য থেকে শপথের বিষয়বস্তু সত্য প্রমাণ করতে গেলে আগে গ্রন্থটির সেই আল্লাহর বক্তব্য হওয়ার দাবি গ্রহণ করতে হয়। নিজের ঘোষিত পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের বক্তব্যের নিশ্চয়তা দেওয়ার সীমা এখানেই।

মুজাদিলায় তৃতীয় পুরুষে পুরস্কারের বিবরণ। মুজাদিলার ২২ নম্বর আয়াতের শেষাংশে জান্নাতে প্রবেশ করানো, স্থায়ী বসবাস, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং “আল্লাহর দল” সফল হওয়ার কথা রয়েছে। সর্বনাম ও নামের সম্পর্ক তৃতীয় পুরুষে নির্মিত: তিনি তাদের প্রবেশ করাবেন, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট, তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। [1145]

وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا ۚ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ۚ أُولَٰئِكَ حِزْبُ اللَّهِ ۚ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

বাংলা অনুবাদ: তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।

একই বক্তব্যকে আল্লাহর একটানা প্রথম পুরুষে লিখলে “তিনি”র স্থানে “আমি”, “আল্লাহর” স্থানে “আমার” এবং ক্রিয়ার রূপ বদলে যায়। নিচের ডান পাশের বাক্যগুলো এই পার্থক্য দেখানোর জন্য লেখকের রচিত তুলনা। বাম পাশের পাঠে আল্লাহর নাম বারবার ব্যবহার করে পুরস্কারপ্রাপ্ত গোষ্ঠীকে তাঁর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; ডান পাশের তুলনায় একই সম্পর্ক সরাসরি আত্মঘোষণার রূপ পেয়েছে।

কোরআনে যেভাবে আছেলেখকের রচিত তুলনা: প্রথম পুরুষে একই সম্পর্ক
তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।আমি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবো, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আমি(আল্লাহ) তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আমার (আল্লাহর) প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আমার (আল্লাহর) দল। জেনে রাখ, আমার (আল্লাহর) দলই সফলকাম হবে।

এই আয়াতের পুরস্কারের ভাষার একটি সামাজিক কাজও রয়েছে: গোষ্ঠীটির পরিচয় “আল্লাহর দল” হিসেবে নির্ধারণ এবং তার সাফল্যকে আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে যুক্ত করা। “তারা তাঁর দল” এবং “তারা আমার দল”—উভয় রূপেই আনুগত্য ও সাফল্যের একই সম্পর্ক প্রচারিত হতে পারে, কিন্তু শব্দে বক্তার অবস্থান সমানভাবে প্রকাশিত হয় না। নাম ধরে ঘোষণা, প্রথম পুরুষে অঙ্গীকার এবং অনুসারীর পক্ষ থেকে সেই ঘোষণা আবৃত্তি—প্রতিটি ধাপে কর্তৃত্ব পৌঁছানোর পদ্ধতি আলাদা।

বাকারায় সংবাদ থেকে প্রার্থনায় প্রবেশ। বাকারার ২৮৬ নম্বর আয়াতের শুরুতে আল্লাহ কারও ওপর সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব আরোপ করেন না বলে সংবাদ দেওয়া হয়েছে। তারপর একই আয়াত “হে আমাদের পালনকর্তা” বলে আবেদনকারীর কণ্ঠে চলে যায়। ভুল ও বিস্মৃতির দায় থেকে অব্যাহতি, পূর্ববর্তীদের মতো ভারী দায়িত্ব না দেওয়া, অসহনীয় বোঝা না দেওয়া, ক্ষমা, দয়া এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে সাহায্য চাওয়া হয়েছে। [1146]

لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ۚ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ ۗ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا ۚ رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا ۚ رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ ۖ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا ۚ أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না, সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার উপর বর্তায় যা সে করে। হে আমাদের পালনকর্তা, যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদেরকে অপরাধী করো না। হে আমাদের পালনকর্তা! এবং আমাদের উপর এমন দায়িত্ব অর্পণ করো না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর অর্পণ করেছ, হে আমাদের প্রভূ! এবং আমাদের দ্বারা ঐ বোঝা বহন করিও না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নাই। আমাদের পাপ মোচন কর। আমাদেরকে ক্ষমা কর এবং আমাদের প্রতি দয়া কর। তুমিই আমাদের প্রভু। সুতরাং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য কর।

এই আয়াতে প্রার্থনার প্রবেশচিহ্ন “রাব্বানা”—আমাদের প্রতিপালক। এর আগের বাক্যে আল্লাহ সম্পর্কে বলা হচ্ছিল; এর পরের বাক্যগুলোতে আল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে। যিনি দায়িত্ব আরোপ করেন এবং যাঁর কাছে দায়িত্বের ভার লাঘব চাওয়া হয়, তিনি একই উপাস্য; কিন্তু দায়ভোগী আবেদনকারীরা ভিন্ন। একই বাক্যধারায় সংবাদবাচক ঘোষণা থেকে অনুনয়ের ভাষায় প্রবেশের কারণে পাঠের কণ্ঠ বদলেছে। এই পরিবর্তন অনুবাদের কারণে তৈরি হয়নি; আরবির “আমাদের প্রতিপালক”, “আমাদের ধরো না”, “আমাদের ক্ষমা করো”তেই তা উপস্থিত।

শুরুর সামর্থ্যবিষয়ক ঘোষণা এবং পরের অসহনীয় বোঝা থেকে রক্ষার আবেদন অর্থের একটি টানাপোড়েনও তৈরি করে। ইবন কাসিরের ব্যাখ্যায় পরের বোঝার মধ্যে দায়িত্বের সঙ্গে বিপদ ও পরীক্ষাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফলে প্রথম অংশের দায়িত্ব এবং পরের অংশের প্রার্থনার বিষয় কীভাবে আলাদা বা বিস্তৃত হবে, সেটিও ভাষ্য নির্ধারণ করছে। প্রার্থনা ও নিশ্চয়তার সম্পর্ক স্থাপন করতে পাঠের বাইরে এই ব্যাখ্যা প্রয়োজন হচ্ছে। [1147]

وقوله : ( ربنا ولا تحملنا ما لا طاقة لنا به ) أي : من التكليف والمصائب والبلاء ، لا تبتلينا بما لا قبل لنا به .

বাংলা অনুবাদ: আর “হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের ওপর এমন কিছু চাপিয়ে দিও না যা বহনের শক্তি আমাদের নেই”—অর্থাৎ দায়িত্ব, বিপদ ও পরীক্ষা থেকে; আমাদের এমন কিছুর পরীক্ষায় ফেলো না, যা মোকাবিলা করার সামর্থ্য আমাদের নেই।

শুরায় “আমার প্রতিপালক”। শুরার ১০ নম্বর আয়াতে মানুষের মতভেদের ফয়সালা আল্লাহর কাছে বলে উল্লেখের পর বলা হয়েছে: সেই আল্লাহ আমার প্রতিপালক, তাঁর ওপর আমি নির্ভর করেছি এবং তাঁর দিকেই ফিরি। এখানে বক্তা নিজের প্রতিপালকের পরিচয় দিচ্ছেন। “আমার প্রতিপালক” বলা ব্যক্তি এবং সেই প্রতিপালকের অবস্থান পৃথক। [1148] [1149]

وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِن شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ ۚ ذَٰلِكُمُ اللَّهُ رَبِّي عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ

বাংলা অনুবাদ: তোমরা যে সব বিষয়ে মতভেদ কর তার মীমাংসা আল্লাহর উপর সোপর্দ। সেই আল্লাহই আমার প্রতিপালক, আমি তাঁর উপরই নির্ভর করি, আর তাঁরই অভিমুখী হই।
— Taisirul Quran
তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ কর না কেন, ওর মীমাংসাতো আল্লাহরই নিকট। বলঃ তিনিই আল্লাহ! আমার রাব্ব। আমি নির্ভর করি তাঁর উপর এবং আমি তাঁরই অভিমুখী!
— Sheikh Mujibur Rahman
আর যে কোন বিষয়েই তোমরা মতবিরোধ কর, তার ফয়সালা আল্লাহর কাছে; তিনিই আল্লাহ, আমার রব; তাঁরই উপর আমি তাওয়াক্কুল করেছি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী হই।
— Rawai Al-bayan
আর তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ করো না কেন-–তার ফয়সালা তো আল্লাহরই কাছে। তিনিই আল্লাহ্ — আমার রব; তাঁরই উপর আমি নির্ভর করেছি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী হই।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এই আয়াতের শেখ মুজিবুর রহমানের অনুবাদে “বলঃ” যুক্ত হয়েছে। কিন্তু আরবিতে আয়াতের শুরু বা “সেই আল্লাহ আমার প্রতিপালক”র আগে প্রকাশ্য “কুল” নেই। অনুবাদে শব্দটি বসিয়ে বক্তাকে নবী এবং বক্তব্যটিকে তাঁর জন্য দেওয়া নির্দেশিত উক্তি হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ সংযোজন অনুবাদের মধ্যে একটি ব্যাখ্যার কাজ করছে; পাঠকের চোখে তা সরাসরি বক্তব্য শুরুর নির্দেশ হয়ে উঠছে।

তাবারি একই সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছেন নবীকে তাঁর শ্রোতাদের বলতে নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে। তাঁর তাফসিরে আল্লাহ নবীকে বলছেন, এই বৈশিষ্ট্যের সত্তাই আমার প্রতিপালক; তাঁর ওপর আমি নিজের বিষয় সোপর্দ করেছি এবং তাঁর কাছেই পাপ থেকে ফিরে আসি। ফলে বাক্যের প্রথম পুরুষকে প্রেরিত ব্যক্তির কণ্ঠে বসানোর সিদ্ধান্ত ভাষ্যেই স্পষ্ট করা হয়েছে। [1150]

وقوله: ( ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبِّي عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ ) يقول لنبيه صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّم: قل لهؤلاء المشركين بالله هذا الذي هذه الصفات صفاته ربي, لا آلهتكم التي تدعون من دونه, التي لا تقدر على شيء ( عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ ) في أموري, وإليه فوضت أسبابي, وبه وثقت ( وَإِلَيْهِ أُنِيبُ ) يقول: وإليه أرجع في أموري وأتوب من ذنوبي.

বাংলা অনুবাদ: আর তাঁর কথা: “সেই আল্লাহ আমার প্রতিপালক, তাঁর ওপর আমি নির্ভর করেছি”—তিনি তাঁর নবীকে বলছেন: আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থাপনকারীদের বলো, যাঁর এসব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তিনিই আমার প্রতিপালক; তোমরা তাঁকে বাদ দিয়ে যে উপাস্যদের ডাকো, যারা কোনো কিছুর ক্ষমতা রাখে না, তারা নয়। “তাঁর ওপর আমি নির্ভর করেছি”—আমার বিষয়সমূহে; তাঁর কাছেই আমার উপায়সমূহ সোপর্দ করেছি এবং তাঁর ওপর আস্থা রেখেছি। “তাঁর দিকেই আমি ফিরি”—অর্থাৎ আমার বিষয়সমূহে তাঁর কাছেই ফিরে যাই এবং আমার পাপ থেকে তওবা করি।

পাঠের ভূমিকা অনুযায়ী আবৃত্তিকারীর অবস্থানও তাই বদলায়। প্রার্থনায় তিনি নিজের চাহিদা প্রকাশ করতে পারেন; দানের ঘোষণায় তিনি দাতা হয়ে যান না; প্রেরিত ব্যক্তির আত্মপরিচয়ে তিনি সেই ব্যক্তির কথা উদ্ধৃত করেন। একই আরবি প্রথম পুরুষ দেখে এই ভূমিকা এক করে ফেললে পাঠের ভেতরের সম্পর্ক নষ্ট হয়।

পাঠের ধরনবাক্যের ভেতরে বক্তার অবস্থানআবৃত্তিকারীর সঙ্গে সম্পর্ক
ফাতিহার প্রার্থনাউপাসক আল্লাহর কাছে চাইছেনআবৃত্তিকারী নিজেকে প্রার্থনাকারীর অবস্থানে বসাতে পারেন
কাউসারে দানের ঘোষণাদাতা প্রাপককে দানের কথা বলছেনআবৃত্তিকারী ঘোষণাটি উদ্ধৃত করছেন; নিজে দাতা হয়ে যাচ্ছেন না
হুদের সতর্কবাণীপ্রেরিত ব্যক্তি প্রেরকের পক্ষ থেকে বলছেনআবৃত্তিকারী নবীর কণ্ঠে স্থাপিত বাক্য উদ্ধৃত করছেন
নিজের সম্পর্কে তৃতীয় পুরুষে উল্লেখসত্তাকে নাম বা “তিনি” দিয়ে উল্লেখবক্তা শনাক্ত করতে বাক্যের প্রসঙ্গ ও ব্যাখ্যা প্রয়োজন

এই ভিন্ন ভূমিকার মধ্যেও ইসলামী উলূমুল কোরআন অর্থ ধরে নিজের ভাষায় কোরআন পড়ার স্বাধীনতা দেয় না। সুয়ূতির আলোচনায় সুন্নাহ অর্থ অনুযায়ী বর্ণনার অনুমতি এবং কোরআন নির্দিষ্ট শব্দে পাঠ করার বাধ্যবাধকতার পার্থক্য স্পষ্ট। জিব্রাইল কোরআন শব্দ ধরে পৌঁছে দিয়েছেন—এটাই সেখানে কারণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। [1120]

وَمِنْ هُنَا جَازَ رِوَايَةُ السُّنَّةِ بِالْمَعْنَى لِأَنَّ جِبْرِيلَ أَدَّاهُ بِالْمَعْنَى وَلَمْ تَجُزِ الْقِرَاءَةُ بِالْمَعْنَى لِأَنَّ جِبْرِيلَ أَدَّاهُ بِاللَّفْظِ

বাংলা অনুবাদ: এ কারণেই সুন্নাহ অর্থ অনুসারে বর্ণনা করা বৈধ হয়েছে, যেহেতু জিব্রাইল তা অর্থ অনুসারে পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু কোরআন অর্থ অনুসারে পাঠ করা বৈধ হয়নি, যেহেতু জিব্রাইল তা নির্দিষ্ট শব্দে পৌঁছে দিয়েছেন।

ফলে একটি কঠোর বৈপরীত্য তৈরি হয়: উপাসককে নির্দিষ্ট শব্দ অপরিবর্তিত রাখতে হবে, কিন্তু সেই শব্দে কার কণ্ঠ এবং কোথায় উহ্য “বলুন” আছে, তা নির্ধারণে ভাষ্যকারের ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে হয়। ধর্মীয় ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট অক্ষরের পবিত্রতা কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠিত, অথচ বাক্যের বক্তা ও উক্তির সীমারেখা সর্বত্র প্রকাশিত নেই। অনুবাদকের বন্ধনী, তাফসিরকারের উহ্য নির্দেশ এবং নামাজে পাঠের রীতি মিলেই এই বহু কণ্ঠের গ্রন্থকে একক ঐশী বাণী হিসেবে কার্যকর রাখছে। এখানে মানবীয় ব্যাখ্যা প্রান্তিক টীকা নয়; কাকে কোন কথা বলতে দেওয়া হয়েছে, সেই অর্থের সংযোগ স্থাপনে তা সক্রিয়।


আনআমে “আমি–আমরা” এবং একই ধারায় ভাষার পরিবর্তন

আনআমের ৯৭–৯৯ আয়াতে পরপর তিনটি বর্ণনা শুরু হয়েছে “ওয়া হুয়াল্লাজি”—আর তিনিই সেই সত্তা, যিনি—দিয়ে। নক্ষত্রের মাধ্যমে পথ চেনা, এক সত্তা থেকে মানুষের সৃষ্টি এবং আকাশ থেকে পানি নামিয়ে উদ্ভিদ উৎপন্ন করা এই ধারার বিষয়। প্রতিটি বর্ণনায় তৃতীয় পুরুষে কাজের উল্লেখের পর প্রথম পুরুষ বহুবচনে নিদর্শন ব্যাখ্যা বা উদ্ভিদ উৎপন্ন করার ঘোষণা এসেছে। বাংলা অনুবাদে বহুবচনকে “আমি” করা হওয়ায় পাঠে পরিবর্তনটি “তিনি–আমি” হিসেবে দেখা যায়; আরবিতে তা “তিনি–আমরা”।

৯৭ নম্বর আয়াতে নক্ষত্র স্থাপনের কাজ তৃতীয় পুরুষে উল্লেখের পর নিদর্শন বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করার ঘোষণা প্রথম পুরুষে এসেছে। “তিনি করেছেন” এবং “আমরা ব্যাখ্যা করেছি”—দুটি রূপ একই আয়াতের মধ্যে পাশাপাশি রয়েছে। [1151]

وَهُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ النُّجُومَ لِتَهْتَدُوا بِهَا فِي ظُلُمَاتِ الْبَرِّ وَالْبَحْرِ ۗ قَدْ فَصَّلْنَا الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ

বাংলা অনুবাদ: তিনিই তোমাদের জন্য নক্ষত্রপুঞ্জ সৃজন করেছেন যাতে তোমরা স্থল ও জলের অন্ধকারে পথ প্রাপ্ত হও। নিশ্চয় যারা জ্ঞানী তাদের জন্যে আমি নির্দেশনাবলি বিস্তারিত বর্ণনা করে দিয়েছি।

৯৮ নম্বর আয়াতে একই বিন্যাস আবার দেখা যায়। এক সত্তা থেকে মানুষের সৃষ্টি করার কর্তা “তিনি”; শেষে নিদর্শন বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করার “আমরা” রয়েছে। একই বিষয়কে বর্ণনা ও আত্মঘোষণার দুই অবস্থান থেকে প্রকাশ করা হচ্ছে। [1152]

وَهُوَ الَّذِي أَنشَأَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ فَمُسْتَقَرٌّ وَمُسْتَوْدَعٌ ۗ قَدْ فَصَّلْنَا الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَفْقَهُونَ

বাংলা অনুবাদ: তিনিই তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন। অনন্তর একটি হচ্ছে তোমাদের স্থায়ী ঠিকানা ও একটি হচ্ছে গচ্ছিত স্থল। নিশ্চয় আমি প্রমাণাদি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি তাদের জন্যে, যারা চিন্তা করে।

৯৯ নম্বর আয়াতে আকাশ থেকে পানি নামানোর কর্তা প্রথমে তৃতীয় পুরুষে এসেছে। তারপর সেই পানি দিয়ে উদ্ভিদ বের করা এবং সবুজ ফসল থেকে শস্যদানা উৎপন্ন করার কাজ প্রথম পুরুষে বলা হয়েছে। পরিবর্তনটি ঘটছে একই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার বিবরণের মধ্যে। [1153]

وَهُوَ الَّذِي أَنزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجْنَا بِهِ نَبَاتَ كُلِّ شَيْءٍ فَأَخْرَجْنَا مِنْهُ خَضِرًا نُّخْرِجُ مِنْهُ حَبًّا مُّتَرَاكِبًا وَمِنَ النَّخْلِ مِن طَلْعِهَا قِنْوَانٌ دَانِيَةٌ وَجَنَّاتٍ مِّنْ أَعْنَابٍ وَالزَّيْتُونَ وَالرُّمَّانَ مُشْتَبِهًا وَغَيْرَ مُتَشَابِهٍ ۗ انظُرُوا إِلَىٰ ثَمَرِهِ إِذَا أَثْمَرَ وَيَنْعِهِ ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكُمْ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ

বাংলা অনুবাদ: তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন অতঃপর আমি এর দ্বারা সর্বপ্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি, অতঃপর আমি এ থেকে সবুজ ফসল নির্গত করেছি, যা থেকে স্তরে স্তরে সাজানো শস্যদানা উৎপন্ন করি। খেজুরের কাঁদি থেকে গুচ্ছ বের করি, যা নুয়ে থাকে এবং আঙ্গুরের বাগান, যয়তুন, আনার পরস্পর সাদৃশ্যযুক্ত এবং সাদৃশ্যহীন। বিভিন্ন গাছের ফলের প্রতি লক্ষ্য কর যখন সেগুলো ফলন্ত হয় এবং তার পরিপক্কতার প্রতি লক্ষ্য কর। নিশ্চয় এগুলোতে নিদর্শন রয়েছে ঈমানদারদের জন্যে।

মুদ্রিত বাংলা অনুবাদেও পানি বর্ষণের ক্ষেত্রে “তিনিই” এবং উদ্ভিদ উৎপন্ন করার ক্ষেত্রে “আমি” রয়েছে। আরবির বহুবচন অনুবাদে একবচন হওয়া এবং তৃতীয় পুরুষ থেকে প্রথম পুরুষে পরিবর্তন—দুটি পৃথক সিদ্ধান্ত এই উপস্থাপনায় একত্র হয়েছে।

মুদ্রিত অনুবাদের সূত্র: আল কুরআনুল কারীম, সরল অর্থানুবাদ, আল-বায়ান ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ১৫৬।

কোরআন সংকলন 237
আয়াততৃতীয় পুরুষে সূচনাপ্রথম পুরুষে পরবর্তী অংশ
৬:৯৭وَهُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ النُّجُومَ — তিনিই তোমাদের জন্য নক্ষত্র স্থাপন করেছেনقَدْ فَصَّلْنَا الْآيَاتِ — আমরা নিদর্শনগুলো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছি।
৬:৯৮وَهُوَ الَّذِي أَنشَأَكُم — তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেনقَدْ فَصَّلْنَا الْآيَاتِ — আমরা নিদর্শনগুলো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছি।
৬:৯৯وَهُوَ الَّذِي أَنزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً — তিনিই আকাশ থেকে পানি নামিয়েছেনفَأَخْرَجْنَا / نُّخْرِجُ — তারপর আমরা উৎপন্ন করেছি / আমরা বের করি।

প্রথম দুই আয়াতকে একটানা তৃতীয় পুরুষে লিখলে শেষের “আমি বিস্তারিত বর্ণনা করেছি” বদলে “তিনি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন” হয়। নিচের ডান পাশের বাক্যগুলো লেখকের রচিত সেই তুলনা; বাম পাশে মূল বাংলা ভাষ্য রয়েছে। তুলনাটি শব্দের ভঙ্গি কীভাবে বদলায় তা দেখায়।

যেমনটি কোরআনে আছেলেখকের রচিত তুলনা: তৃতীয় পুরুষ একটানা রাখলে
তিনিই তোমাদের জন্য নক্ষত্রপুঞ্জ সৃজন করেছেন যাতে তোমরা স্থল ও জলের অন্ধকারে পথ প্রাপ্ত হও। নিশ্চয় যারা জ্ঞানী তাদের জন্যে আমি নির্দেশনাবলি বিস্তারিত বর্ণনা করে দিয়েছি।তিনিই তোমাদের জন্য নক্ষত্রপুঞ্জ সৃজন করেছেন যাতে তোমরা স্থল ও জলের অন্ধকারে পথ প্রাপ্ত হও। নিশ্চয় যারা জ্ঞানী তাদের জন্যে তিনি নির্দেশনাবলি বিস্তারিত বর্ণনা করে দিয়েছেন।
তিনিই তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন। অনন্তর একটি হচ্ছে তোমাদের স্থায়ী ঠিকানা ও একটি হচ্ছে গচ্ছিত স্থল। নিশ্চয় আমি প্রমাণাদি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি তাদের জন্যে, যারা চিন্তা করে।তিনিই তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন। অনন্তর একটি হচ্ছে তোমাদের স্থায়ী ঠিকানা ও একটি হচ্ছে গচ্ছিত স্থল। নিশ্চয় তিনি প্রমাণাদি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন তাদের জন্যে, যারা চিন্তা করে।

এই তিনটি আয়াতে কাজের কর্তা সম্পর্কে তাফসিরের প্রচলিত পাঠে একই আল্লাহকে বোঝানো হয়। তৃতীয় পুরুষে তাঁর কাজ বর্ণনা এবং প্রথম পুরুষে তাঁর আত্মঘোষণার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা হয়। কিন্তু আনআমেই আরও একটি পরিবর্তন রয়েছে, যেখানে কেবল একই সত্তার উল্লেখের ভঙ্গি বদলানোর চেয়ে বেশি কিছু ঘটছে। সেখানে একজন নিজেকে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করছেন; তারপর নিদর্শন ব্যাখ্যার “আমরা” ফিরে আসছে; তারপর সেই ব্যক্তিকেই তাঁর প্রতিপালকের নির্দেশ অনুসরণ করতে বলা হচ্ছে।

১০৪ থেকে ১০৬ আয়াতের এই ধারায় বক্তার কাজ ও সম্বোধিত ব্যক্তির অবস্থান পরপর বদলেছে। ১০৪-এ “আমি তোমাদের ওপর রক্ষক নই”, ১০৫-এ “আমরা নিদর্শনসমূহ নানাভাবে ব্যাখ্যা করি”, এবং ১০৬-এ “তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমার প্রতি যা ওহি করা হয়েছে, তা অনুসরণ করো” রয়েছে। [1154] [1155] [1156]

قَدْ جَاءَكُم بَصَائِرُ مِن رَّبِّكُمْ ۖ فَمَنْ أَبْصَرَ فَلِنَفْسِهِ ۖ وَمَنْ عَمِيَ فَعَلَيْهَا ۚ وَمَا أَنَا عَلَيْكُم بِحَفِيظٍ
وَكَذَٰلِكَ نُصَرِّفُ الْآيَاتِ وَلِيَقُولُوا دَرَسْتَ وَلِنُبَيِّنَهُ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ
اتَّبِعْ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ۖ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমাদের কাছে অন্তর্দৃষ্টির উপকরণ এসেছে। যে দেখে, তা তার নিজের জন্য; আর যে অন্ধ থাকে, তার দায় তার ওপরই। আমি তোমাদের ওপর রক্ষক নই।
এভাবেই আমরা নিদর্শনগুলো নানাভাবে ব্যাখ্যা করি, এবং তারা যেন বলে, “তুমি পড়াশোনা করেছ”; আর আমরা যেন তা জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের জন্য স্পষ্ট করে দিই।
তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমার প্রতি যা ওহি করা হয়েছে, তা অনুসরণ করো। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আর অংশীদার স্থাপনকারীদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও।

ইবন কাসির ১০৪ নম্বর আয়াতের “আমি”কে শুধু বক্তব্য পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় হেদায়েত দেওয়ার ক্ষমতা আল্লাহর, আর বক্তা মানুষের ওপর পর্যবেক্ষক নন। ফলে ১০৪-এর আত্মপরিচয়কে ১০৫-এর নিদর্শন ব্যাখ্যা করা “আমরা”র সঙ্গে এক করে পড়লে বক্তার কাজের পার্থক্য মুছে যায়। [1157]

( وما أنا عليكم بحفيظ ) أي : بحافظ ولا رقيب ، بل أنا مبلغ والله يهدي من يشاء ويضل من يشاء .

বাংলা অনুবাদ: “আমি তোমাদের ওপর রক্ষক নই”—অর্থাৎ সংরক্ষক বা পর্যবেক্ষক নই; বরং আমি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি। আর আল্লাহ যাকে চান হেদায়েত দেন এবং যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন।

আয়াতবক্তা বা সম্বোধিতের ভূমিকাপ্রকাশিত নির্দেশ বা উক্তি
৬:১০৪বাণী পৌঁছে দেওয়া ব্যক্তির প্রথম পুরুষনিজেকে শ্রোতাদের রক্ষক হওয়ার দায়িত্ব থেকে পৃথক করছেন।
৬:১০৫নিদর্শন ব্যাখ্যা করা প্রথম পুরুষ বহুবচন“আমরা” ব্যাখ্যা করছি; নবীকে উদ্দেশ্য করে বলা অভিযোগও উদ্ধৃত হয়েছে।
৬:১০৬প্রতিপালকের কাছ থেকে ওহি পাওয়া ব্যক্তিকে সম্বোধনতিনি নির্দেশের প্রাপক; তাঁকে অনুসরণ ও মুখ ফিরিয়ে নিতে আদেশ করা হয়েছে।

ইসলামওয়েবের “কোরআনে বলার ক্রিয়া উহ্য রাখা” আলোচনাতেও আনআম ৬:১০৪-কে এ ধরনের উদাহরণ হিসেবে রাখা হয়েছে। সেখানে শুরুতে “বলো, হে মুহাম্মদ” ধরে বাক্যটির সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। ইবন আশুরের নামে আলোচনাটিতে বলার ক্রিয়া উহ্য রাখার ব্যাপক ব্যবহার সম্পর্কে এই মন্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে। [1158]

وحذف القول كثير الورود في القرآن

বাংলা অনুবাদ: কোরআনে বলার ক্রিয়া উহ্য রাখার ব্যবহার অনেক।

একই আলোচনায় উহ্য অংশ নির্ধারণের শর্তও রয়েছে: প্রকাশিত কথায় তার সংকেত থাকতে হবে। ইবন আশুরের নামে উদ্ধৃত এই শর্ত অনুসারে ব্যাখ্যাকারী বাক্যের প্রসঙ্গ থেকে অপ্রকাশিত নির্দেশ শনাক্ত করেন। অর্থাৎ একটি শব্দ লিখিতভাবে অনুপস্থিত থাকলেও তার সম্পর্ক অর্থের মধ্যে ধরে নেওয়া হচ্ছে। [1159]

وحذف القول كثير في القرآن، إذا دلت عليه قرينة الكلام

বাংলা অনুবাদ: কোরআনে বলার ক্রিয়া উহ্য রাখা অনেক ঘটে, যখন বক্তব্যের প্রসঙ্গগত সংকেত তার নির্দেশ দেয়।

৯৭–৯৯-এর “তিনি–আমরা” পরিবর্তন এবং ১০৪–১০৬-এর প্রতিনিধি, ঘোষণাকারী ও সম্বোধিতের পরিবর্তন তাই এক ধরনের ঘটনা নয়। প্রথম ধারায় একই সত্তার কাজ বর্ণনার ভঙ্গি বদলেছে বলে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। দ্বিতীয় ধারায় বক্তব্য পৌঁছে দেওয়া ব্যক্তি নিজের সীমা জানিয়েছেন এবং পরের আয়াতে নিজেই নির্দেশের প্রাপক হয়েছেন। শুধু সর্বনাম নয়, ক্রিয়ার দায়িত্ব, কর্তৃত্বের সম্পর্ক ও নির্দেশের দিক থেকেও এই পার্থক্য ধরা পড়ে।

সংকলিত পাঠে উক্তির শুরু ও শেষ প্রতিবার আলাদা চিহ্ন দিয়ে দেওয়া নেই। কোন প্রথম পুরুষ আল্লাহর এবং কোন প্রথম পুরুষ নবীর, কোথায় শ্রোতা সাধারণ মানুষ এবং কোথায় সম্বোধিত ব্যক্তি মুহাম্মদ—এসব সম্পর্ক তাফসিরে নির্ধারণ করতে হয়েছে। এই নির্ধারণের সামাজিক ফলও স্পষ্ট: নবীর নিজের সীমা জানানো বাক্য, আল্লাহর কাজের ঘোষণা এবং নবীকে দেওয়া নির্দেশ একই পবিত্র পাঠের সমমর্যাদার অংশ হয়ে প্রচারিত হয়। ধর্মীয় ঐক্য এখানে ব্যাকরণিক একরূপতার ওপর দাঁড়িয়ে নেই; নানা ভূমিকায় থাকা উক্তিকে এক ঐশী উৎসে যুক্ত করার বিশ্বাস ও ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।


মুমতাহিনায় আশা ও সম্ভাবনার ভাষা: সর্বজ্ঞতার দাবির সঙ্গে সম্পর্ক

মুমতাহিনার ৭ নম্বর আয়াতে শত্রুতার সম্পর্ক বন্ধুত্বে রূপান্তরিত হওয়ার কথা “আসা” দিয়ে বলা হয়েছে। বাংলা অনুবাদগুলোতে শব্দটির জন্য “সম্ভবত”, “সম্ভবতঃ” এবং “আশা করা যায়” এসেছে; ইংরেজি অনুবাদে “Perhaps”। একই বাক্যে আল্লাহকে সর্বশক্তিমান, ক্ষমাশীল ও দয়ালু বলাও রয়েছে। অর্থাৎ সম্ভাবনার ভাষায় নিজেরই ভবিষ্যৎ কাজ উল্লেখের সঙ্গে ক্ষমতার নিশ্চয়তা পাশাপাশি স্থাপন করা হয়েছে। [1160]

۞ عَسَى اللَّهُ أَن يَجْعَلَ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ الَّذِينَ عَادَيْتُم مِّنْهُم مَّوَدَّةً ۚ وَاللَّهُ قَدِيرٌ ۚ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

বাংলা অনুবাদ: সম্ভবত আল্লাহ তোমাদের মধ্যে আর তাদের মধ্যেকার যাদেরকে তোমরা শত্রু বানিয়ে নিয়েছ তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দিবেন (তাদের মুসলিম হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে)। আল্লাহ বড়ই শক্তিমান, আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, অতীব দয়ালু।
— Taisirul Quran
যাদের সাথে তোমাদের শত্রুতা রয়েছে সম্ভবতঃ আল্লাহ তাদের ও তোমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দিবেন; আল্লাহ সর্বশক্তিমান, পরম দয়ালু।
— Sheikh Mujibur Rahman
যাদের সাথে তোমরা শত্রুতা করছ, আশা করা যায় আল্লাহ তোমাদের ও তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন। আর আল্লাহ সর্ব শক্তিমান এবং আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
— Rawai Al-bayan
যাদের সাথে তোমাদের শত্রুতা রয়েছে সম্ভবত আল্লাহ তাদের ও তোমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন [১] এবং আল্লাহ্‌ ক্ষমতাবান। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
Perhaps Allah will put, between you and those to whom you have been enemies among them, affection. And Allah is competent,1 and Allah is Forgiving and Merciful.
— Saheeh International

মানুষের সাধারণ ভাষায় “সম্ভবত” ও “আশা করি” ব্যবহার করার একটি পরিচিত কারণ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা। কেউ দুপুরে ইলিশ মাছ খাওয়ার আশা করতে পারেন, কারণ ঘরে ইলিশ রান্না হয়েছে। তবু তাঁর খাওয়া নিশ্চিত নয়; খাওয়ার আগে মাছটি বেড়াল খেয়ে ফেললে সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে না। রান্না হওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাবনা তৈরি করেছে, কিন্তু ভবিষ্যতের সব ঘটনার ওপর বক্তার জ্ঞান ও নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই তিনি নিশ্চয়তার পরিবর্তে প্রত্যাশার ভাষা ব্যবহার করেন।

আল্লাহকে সর্বজ্ঞ এবং ভবিষ্যতের নির্ধারক হিসেবে গ্রহণ করলে একই ভাষার অর্থ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। তিনি পরে কী করবেন এবং তার ফল কী হবে, সবই আগে থেকে জানেন—এই ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে “সম্ভবত আল্লাহ বন্ধুত্ব সৃষ্টি করবেন” বাক্যের সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়। আয়াতের কথিত উৎসকে আল্লাহ ধরে নিলে বক্তব্যের মধ্যে আল্লাহ নিজের ভবিষ্যৎ কাজকে সম্ভাবনার ভঙ্গিতে উল্লেখ করছেন। আর বাক্যের কণ্ঠকে মানবীয় প্রত্যাশার অবস্থান থেকে ধরলে অনিশ্চয়তার ভাষা সহজবোধ্য থাকে, কিন্তু সেই অবস্থান আবার আল্লাহর নিজের সর্বজ্ঞ আত্মঘোষণা থেকে পৃথক হয়।

আল্লাহর পূর্বজ্ঞান ও নির্ধারিত তাকদিরের দাবির বিস্তারিত সম্পর্ক রয়েছে তাকদীর আলোচনায়। এই পূর্বজ্ঞান নিশ্চিত ধরে নেওয়ার পর সম্ভাবনাবাচক শব্দের অর্থ আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হচ্ছে। সমস্যা শুধু শব্দের বাংলা প্রতিশব্দে নয়; শব্দটি কার জ্ঞান, কার প্রত্যাশা এবং কোন ভবিষ্যৎ কাজের কথা প্রকাশ করছে, সেই সম্পর্কেও।

ইসলামওয়েব “আসা” ও “লাআল্লা”র ব্যাখ্যায় আল-লুবাব থেকে একটি সরাসরি যুক্তি উদ্ধৃত করেছে। সেখানে মুফাসসিরদের ঐকমত্যের দাবি করে বলা হয়েছে, আল্লাহর ক্ষেত্রে “আসা” নিশ্চিত অর্থে হবে। কারণ কাউকে আশা দেখিয়ে পরে বঞ্চিত করা লজ্জাকর, আর আল্লাহ তার ঊর্ধ্বে। [1161]

اتفق المفسرون على أن كلمة عسى من الله واجب: لأنه لفظ يفيد الإطماع، ومن أطمع إنساناً في شيء ثم حرمه كان عاراً والله تعالى أكرم من أن يطمع واحداً في شيء ثم لا يعطيه.

বাংলা অনুবাদ: মুফাসসিরগণ একমত হয়েছেন যে আল্লাহর ক্ষেত্রে “আসা” নিশ্চিত অর্থ বহন করে। কারণ এটি আশা জাগানোর শব্দ। যে ব্যক্তি কাউকে কোনো কিছুর আশা দেখিয়ে পরে বঞ্চিত করে, তা তার জন্য লজ্জাকর; আর আল্লাহ কাউকে কোনো কিছুর আশা দেখিয়ে তা না দেয়ার ঊর্ধ্বে।

এই যুক্তির ভিত্তি অভিধানগত অর্থের বাইরে। প্রথমে আল্লাহ সম্পর্কে একটি নৈতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে: তিনি কাউকে আশা দেখিয়ে বঞ্চিত করবেন না। তারপর সেই সিদ্ধান্তের সাহায্যে আশাবাচক শব্দের নির্দিষ্ট ব্যবহারকে নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি হিসেবে পড়া হচ্ছে। “আসা”র মধ্যে আলাদা করে নিশ্চয়তার নতুন অক্ষর যুক্ত হয়নি; বক্তা সম্পর্কে পূর্বগৃহীত বিশ্বাস শব্দের অর্থ নির্বাচনের মানদণ্ড হয়েছে। যাঁর বক্তব্য যাচাই হচ্ছে, তাঁর পরিপূর্ণতার ধারণাকেই সেই বক্তব্যের অর্থ নির্ধারণের বিচারক করা হয়েছে।

অর্থের এই নির্বাচনকে আল্লাহর সর্বজ্ঞতার স্বতন্ত্র ভাষাগত প্রমাণ হিসেবে ফেরত ব্যবহার করলে যুক্তি বৃত্তাকারে ঘোরে। আগে তাঁর পরিপূর্ণতা ধরে সম্ভাবনাকে নিশ্চয়তা করা হলো; পরে সেই ব্যাখ্যাত নিশ্চয়তা দেখিয়ে তাঁর বক্তব্য সম্পূর্ণ নিশ্চিত বলে প্রতিষ্ঠা করা হলো। শুরুতে গ্রহণ করা বিশ্বাসই শেষে ফল হিসেবে ফিরে আসে। শব্দের ব্যবহার এবং সেই ব্যবহারের ধর্মীয় ব্যাখ্যা পৃথক রাখলে এই নির্ভরতা স্পষ্ট থাকে।

মুমতাহিনার আয়াতের ক্ষেত্রে তাবারি ভবিষ্যৎ বন্ধুত্বকে কুরাইশের বিরোধীদের অনেকের ইসলাম গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় তাঁরা পরে বন্ধু ও একই পক্ষের মানুষ হয়েছেন। অর্থাৎ তিনি আয়াতটির পরবর্তী বাস্তবায়নের একটি নির্দিষ্ট পরিচয় দিয়েছেন। [1162]

يقول تعالى ذكره: عسى الله أيها المؤمنون أن يجعل بينكم وبين الذين عاديتم من أعدائي من مشركي قريش مودّة، ففعل الله ذلك بهم، بأن أسلم كثير منهم، فصاروا لهم أولياء وأحزابًا.

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ বলছেন: হে বিশ্বাসীরা, আল্লাহ হয়তো তোমাদের ও আমার শত্রু কুরাইশের অংশীদার স্থাপনকারীদের মধ্যে, যাদের সঙ্গে তোমরা শত্রুতা করেছ, ভালোবাসা সৃষ্টি করবেন। তিনি তাদের ক্ষেত্রে তা করেছেন; তাদের অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং তারা তাদের বন্ধু ও একই পক্ষের মানুষ হয়েছে।

তাবারির এই ব্যাখ্যায় বন্ধুত্বের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শর্তও নির্দিষ্ট: বিরোধীরা ইসলাম গ্রহণ করে একই পক্ষের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। সম্ভাবনার ঘোষণা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে মিলিয়ে একটি ফল হিসেবে পড়া হচ্ছে। সেই ফল ঘটেছে বলে সম্ভাবনাবাচক শব্দের ব্যবহার মুছে যায় না; বরং ভাষ্যকার দেখাচ্ছেন কোন ঘটনার সঙ্গে ঘোষণাটিকে মিলিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিরোধীদের অবস্থান বদলকে আল্লাহর ক্ষমা ও দয়ার ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে।

সব আশাবাচক বাক্যকে শর্তহীন নিশ্চয়তা হিসেবে ধরার ক্ষেত্রেও ধ্রুপদি ব্যাখ্যায় পার্থক্য আছে। তাহরিম ৬৬:৫-এ মুহাম্মদের স্ত্রীদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, তিনি তাঁদের তালাক দিলে তাঁর প্রতিপালক তাঁদের পরিবর্তে আরও ভালো স্ত্রী দিতে পারেন। এখানে “আসা”র সঙ্গে প্রকাশ্য “যদি” শর্ত যুক্ত। কুরতুবি এ আয়াত সম্পর্কে দুটি মত উল্লেখ করেছেন: কেউ একে সাধারণ নিশ্চয়তার নিয়মের ব্যতিক্রম বলেছেন; কেউ নিশ্চিত বলেছেন, কিন্তু তালাকের শর্তে আবদ্ধ করেছেন। [1163]

ثم قيل : كل ” عسى ” في القرآن واجب ; إلا هذا . وقيل : هو واجب ، ولكن الله عز وجل علقه بشرط وهو التطليق ولم يطلقهن .

বাংলা অনুবাদ: তারপর বলা হয়েছে: কোরআনের সব “আসা” নিশ্চিত, এটি ছাড়া। আবার বলা হয়েছে: এটিও নিশ্চিত; কিন্তু আল্লাহ একে একটি শর্তের সঙ্গে যুক্ত করেছেন, সেটি হলো তালাক দেওয়া, আর তিনি তাঁদের তালাক দেননি।

একই আয়াতে কুরতুবি এই শর্তযুক্ত বক্তব্যের কাজ স্ত্রীদের ভয় দেখানো হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় আল্লাহ জানতেন যে মুহাম্মদ তাঁদের তালাক দেবেন না; তবু নিজের ক্ষমতার কথা জানিয়েছেন যে তালাক দিলে তাঁদের পরিবর্তে ভালো স্ত্রী দেবেন। ফলে ভবিষ্যৎ বিষয়ে এই বাক্যকে তিনি একটি নিঃশর্ত ঘটনার পূর্বাভাস হিসেবে পড়েননি; শর্তযুক্ত ক্ষমতা ও ভয়ের ঘোষণা হিসেবে পড়েছেন। [1164]

والله كان عالما بأنه كان لا يطلقهن ، ولكن أخبر عن قدرته ، على أنه إن طلقهن أبدله خيرا منهن تخويفا لهن .

বাংলা অনুবাদ: আর আল্লাহ জানতেন যে তিনি তাঁদের তালাক দেবেন না। কিন্তু তাঁদের ভয় দেখানোর জন্য তিনি নিজের ক্ষমতার কথা জানিয়েছেন: তিনি তাঁদের তালাক দিলে তাঁদের পরিবর্তে আরও ভালো স্ত্রী দেবেন।

“লাআল্লা”র ব্যবহারেও ব্যাখ্যার নির্বাচন দেখা যায়। ত্বহা ২০:৪৪-এ মুসা ও হারুনকে ফেরাউনের সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলতে বলা হয়েছে, “হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।” এই বাক্যে বক্তা নির্দেশ দিচ্ছেন, আর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াটি অন্য একজন মানুষের। [1165]

فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَىٰ

বাংলা অনুবাদ: তোমরা দুজন তার সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলো; হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।

তাবারি এই “লাআল্লা”র জন্য দুটি ব্যাখ্যা রেখেছেন। একটিতে প্রশ্নের অর্থ: দেখো, সে উপদেশ নেয় বা ভয় করে কি না। অন্যটিতে উদ্দেশ্যবাচক অর্থ: তাকে ডাকো ও উপদেশ দাও, যেন সে উপদেশ গ্রহণ করে বা ভয় করে। দ্বিতীয় অর্থের সঙ্গে সাধারণ ভাষার “কাজ করো, যেন পারিশ্রমিক পাও” উদাহরণও তিনি দিয়েছেন। ফলে অর্থ নির্ধারণে প্রত্যাশা, প্রশ্ন ও উদ্দেশ্যের মধ্যে নির্বাচন হচ্ছে। [1166]

وقال آخرون: معنى لعلّ هاهنا كي. ووجَّهوا معنى الكلام إلى اذْهَبَا إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى فادعواه وعظاه ليتذكر أو يخشى، كما يقول القائل: اعمل عملك لعلك تأخذ أجرك، بمعنى: لتأخذ أجرك، وافرغ من عملك لعلنا نتغدَّى، بمعنى: لنتغدى، أو حتى نتغدى، ولكلا هذين القولين وجه حسن، ومذهب صحيح.

বাংলা অনুবাদ: অন্যরা বলেছেন: এখানে “লাআল্লা”র অর্থ “যেন”। তাঁরা বক্তব্যের অর্থ করেছেন: তোমরা ফেরাউনের কাছে যাও, সে সীমালঙ্ঘন করেছে; তাকে ডাকো ও উপদেশ দাও, যেন সে উপদেশ নেয় বা ভয় করে। যেমন কেউ বলে, তোমার কাজ করো, হয়তো তুমি পারিশ্রমিক পাবে—অর্থাৎ যেন পারিশ্রমিক পাও; এবং কাজ শেষ করো, হয়তো আমরা দুপুরের খাবার খাব—অর্থাৎ যেন আমরা খাই অথবা আমাদের খাওয়া পর্যন্ত। এই দুই বক্তব্যেরই সুন্দর ব্যাখ্যা ও গ্রহণযোগ্য পথ রয়েছে।

পাঠআশা বা সম্ভাবনার ভাষাসূত্রে নির্ধারিত সম্পর্ক
মুমতাহিনা ৬০:৭আল্লাহ শত্রুদের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করতে পারেনতাবারি পরবর্তী ইসলাম গ্রহণ ও একই পক্ষে আসাকে বাস্তবায়ন বলেছেন।
তাহরিম ৬৬:৫তালাক দিলে প্রতিপালক আরও ভালো স্ত্রী দিতে পারেনকুরতুবির আলোচনায় ব্যতিক্রম অথবা তালাকের শর্তে নিশ্চয়তা; স্ত্রীদের ভয় প্রদর্শন।
ত্বহা ২০:৪৪ফেরাউন উপদেশ নিতে বা ভয় করতে পারেতাবারির আলোচনায় প্রশ্নমূলক অথবা উদ্দেশ্যবাচক অর্থ।
আল-লুবাবের সাধারণ ব্যাখ্যাআল্লাহর “আসা”কে নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি করাআল্লাহ আশা দেখিয়ে বঞ্চিত করবেন না—এই পূর্বগৃহীত ধারণা থেকে সিদ্ধান্ত।

একই ধরনের শব্দকে ব্যাখ্যা করতে কোথাও পরবর্তী ইতিহাস, কোথাও বাক্যের শর্ত, কোথাও উদ্দেশ্য এবং কোথাও আল্লাহর চরিত্র সম্পর্কে বিশ্বাস ব্যবহার করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তগুলোর উৎস তাই সমান নয়। শর্ত আয়াতের প্রকাশিত বাক্যে থাকতে পারে; কোনো ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে বাস্তবায়ন শনাক্ত করা ভাষ্যকারের কাজ; আর আল্লাহ বঞ্চিত করবেন না বলে নিশ্চয়তার সিদ্ধান্ত ধর্মতাত্ত্বিক অনুমান। এসব স্তর মিশিয়ে শুধু “আল্লাহ বলেছেন, তাই এখানে সম্ভাবনার অর্থও নিশ্চয়তা” বললে ব্যাখ্যার ভিত্তি আড়াল হয়।

সর্বজ্ঞতা ও পূর্বনির্ধারণের দাবি সত্য ধরে নিয়ে ভাষার প্রতিটি অনিশ্চিত রূপকে তার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর পদ্ধতি স্বাধীন যাচাইয়ের পদ্ধতি নয়। তখন বিশ্বাস প্রশ্নের অধীন থাকে না; শব্দের অর্থই বিশ্বাসের অধীন হয়ে পড়ে। মুমতাহিনার আয়াতের বাংলা “সম্ভবত” এবং ইংরেজি “Perhaps” এই জায়গাটি প্রকাশ করে: সাধারণ সম্ভাবনার শব্দ অনুবাদে রাখা হয়েছে, অথচ তাফসিরে তাকে নিশ্চয়তা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। আল্লাহর বক্তব্য বলে প্রতিষ্ঠিত পাঠ এবং সেই পাঠের অর্থ নিয়ন্ত্রণকারী মানবীয় ব্যাখ্যার মধ্যকার ব্যবধান এখানে সরাসরি দৃশ্যমান।


বাণীর অভ্যন্তরীণ অসংগতি ও হাদিসের সঙ্গে সংঘাত

কোরআনের বক্তব্য এবং হাদিসে সংরক্ষিত ঘোষণার মধ্যে অসংগতি শুধু শব্দ বা উচ্চারণের পার্থক্যে সীমিত নয়। কী খাবার থাকবে, কার অপরাধের জন্য কার শাস্তি হবে, জান্নাতে প্রবেশের ভিত্তি কী এবং সৃষ্টির সময় কত—এসব নির্দিষ্ট বিষয়েও পাঠগুলোকে একসঙ্গে রাখতে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়েছে। কোথাও “এটি ছাড়া আর কিছু নেই” বাক্যের পরিসর ছোট করা হয়েছে, কোথাও অন্যের ওপর পাপ চাপানোর অর্থকে নিজের পাপের সমপরিমাণ বোঝায় বদলানো হয়েছে, কোথাও একটি হাদিসের বক্তব্য অপর বর্ণনার আলোকে সংশোধিত হয়েছে। ফলে স্বীকৃত গ্রন্থে একটি বক্তব্য থাকা এবং সেই বক্তব্যের গ্রহণযোগ্য অর্থ নির্ধারিত থাকা এক ঘটনা নয়।

মৌখিক প্রচারের প্রক্রিয়ায় মানুষের স্মৃতি ও অন্যের আবৃত্তির ওপর নির্ভরতার বর্ণনা রয়েছে। মুহাম্মদের ভুলে যাওয়া আয়াত অন্যের তিলাওয়াতে মনে পড়ার পূর্ণ বুখারি-বর্ণনা রয়েছে মুহাম্মদের আয়াত ভুলে যাওয়া এবং অন্যের তিলাওয়াতে স্মরণ ফিরে পাওয়ার আলোচনায়। স্মরণ ও পুনঃস্মরণের এই মানবীয় প্রক্রিয়া সংকলনের উপকরণগত বাস্তবতার অংশ। নির্দিষ্ট একটি অসংগতির উৎপত্তি স্মৃতিভ্রংশ থেকেই হয়েছে—এমন ইতিহাস স্থির করতে সেই ঘটনার নিজস্ব প্রমাণ লাগে। অসংগত বক্তব্য, বর্ণনাকারীর সংশোধন এবং পরবর্তী ভাষ্যকারের অর্থ পরিবর্তন এখানে নিজেদের সূত্রেই উপস্থিত।


জাহান্নামের “একমাত্র” খাদ্য: দারি, গিসলিন ও যাক্কুম

গাশিয়াহর ৬ নম্বর আয়াতে জাহান্নামিদের জন্য দারি ছাড়া অন্য খাবার না থাকার ঘোষণা রয়েছে। আরবির “লায়সা লাহুম তাআমুন ইল্লা মিন দারিইন” একটি সীমাবদ্ধতামূলক বাক্য: নির্দিষ্ট খাবারটির বাইরে অন্য খাদ্য অস্বীকার করা হয়েছে। পাঁচটি বাংলা ভাষ্যেই এই সীমার ভাষা রয়েছে—“আর কোনো খাবার”, “অন্য কোনো খাবার” কিংবা “ব্যতীত খাদ্য নেই”। [1167]

لَّيْسَ لَهُمْ طَعَامٌ إِلَّا مِن ضَرِيعٍ

বাংলা অনুবাদ: তাদেরকে খাদ্য হিসাবে শিবরিক নামীয় নোংরা ও দুর্গন্ধময় তৃণলতা যা শুকিয়ে গেলে বিষাক্ত হয়ে যায় তা ব্যতীত অন্য কোন খাবার দেয়া হবে না।
— Bengali Mokhtasar
কাঁটাযুক্ত শুকনো ঘাস ছাড়া তাদের জন্য আর কোন খাদ্য থাকবে না।
— Taisirul Quran
তাদের জন্য বিষাক্ত কন্টক ব্যতীত খাদ্য নেই –
— Sheikh Mujibur Rahman
তাদের জন্য কাঁটাবিশিষ্ট গুল্ম ছাড়া কোন খাদ্য থাকবে না।
— Rawai Al-bayan
তাদের জন্য খাদ্য থাকবে না কাঁটাযুক্ত গুল্ম ছাড়া [১] ,
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

হাক্কাহর ৩৬ নম্বর আয়াতে একই ধরনের ব্যতিক্রমী গঠন দিয়ে ভিন্ন খাদ্য উল্লেখ করা হয়েছে: গিসলিন ছাড়া খাবার নেই। বাংলা ভাষ্যে একে পুঁজ, ক্ষতনিঃসৃত স্রাব কিংবা জাহান্নামিদের শরীর থেকে নিঃসৃত তরল বলা হয়েছে। গাশিয়াহর শুকনো কাঁটাযুক্ত উদ্ভিদ এবং এখানে শরীরনিঃসৃত পুঁজের পরিচয় এক নয়। [1168]

وَلَا طَعَامٌ إِلَّا مِنْ غِسْلِينٍ

বাংলা অনুবাদ: তার খাবারের জন্য জাহান্নামীদের শরীরের পুঁজ ব্যতীত অন্য কোন খাদ্য থাকবে না।
— Bengali Mokhtasar
ক্ষত হতে পড়া পুঁজ ছাড়া কোন খাদ্য নেই,
— Taisirul Quran
এবং কোন খাদ্য থাকবেনা, ক্ষতনিঃসৃত স্রাব ব্যতীত।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর ক্ষত-নিঃসৃত পুঁজ ছাড়া কোন খাদ্য থাকবে না,
— Rawai Al-bayan
আর কোনো খাদ্য থাকবে না ক্ষত নিঃসৃত স্রাব ছাড়া,
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

সাফফাতে আবার যাক্কুম নামের গাছের কথা রয়েছে। জান্নাতের আপ্যায়নের বিপরীতে এই গাছের উল্লেখ করা হয়েছে এবং কয়েক আয়াত পরে বলা হয়েছে, জাহান্নামিরা তা থেকে খেয়ে পেট পূর্ণ করবে। এখানে খাদ্যবস্তুর অস্তিত্বের সঙ্গে খাওয়ার কাজটিও স্পষ্টভাবে ঘোষিত। [1169]

أَذَٰلِكَ خَيْرٌ نُّزُلًا أَمْ شَجَرَةُ الزَّقُّومِ

বাংলা অনুবাদ: উপরোল্লিখিত এই স্থায়ী নিয়ামত যা আল্লাহ সেসব বান্দার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করেছেন যাদেরকে তিনি তাঁর আনুগত্যের জন্য খাঁটি করেছেন তা সম্মান ও অবস্থানের ক্ষেত্রে উত্তম, না কি ‘যাক্কুম’ নামক কুরআনের অভিশপ্ত বৃক্ষ যা কাফিরদের খাদ্য। যা না পুষ্ট করে, না ক্ষুধা নিবারণ করে?!
— Bengali Mokhtasar
আপ্যায়ন হিসেবে এটা উত্তম, না, (জাহান্নামের) জাক্কুম গাছ?
— Taisirul Quran
আপ্যায়নের জন্য কি এটাই শ্রেষ্ঠ, না কি যাক্কুম বৃক্ষ?
— Sheikh Mujibur Rahman
আপ্যায়নের জন্য এগুলো উত্তম না যাক্কূম* বৃক্ষ? * অতি তিক্ত স্বাদযুক্ত জাহান্নামের এক গাছ।
— Rawai Al-bayan
আপ্যায়নের জন্য কি এটাই শ্রেয়, না যাক্কুম গাছ?
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

যাক্কুমকে শুধু দেখানো হবে—এমন বর্ণনা নয়; তার ফল ভক্ষণ ও তা দিয়ে উদর পূর্ণ করার বক্তব্যও রয়েছে। [1170]

فَإِنَّهُمْ لَآكِلُونَ مِنْهَا فَمَالِئُونَ مِنْهَا الْبُطُونَ

বাংলা অনুবাদ: কাফিররা এর তিতা ও বিস্বাদ ফল ভক্ষণ করবে এবং তা দিয়ে তাদের খালি উদর পূর্ণ করবে।
— Bengali Mokhtasar
জাহান্নামের অধিবাসীরা তাত্থেকে খাবে আর তা দিয়ে পেট পূর্ণ করবে।
— Taisirul Quran
ওটা হতে তারা আহার করবে এবং উদর পূর্ণ করবে ওটা দ্বারা।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় তারা তা থেকে খাবে এবং তা দিয়ে পেট ভর্তি করবে।
— Rawai Al-bayan
তারা তো এটা থেকে খাবে এবং উদর পূর্ণ করবে এটা দিয়ে [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

একাধিক খাদ্যের উল্লেখ এবং প্রতিটি আলোচনায় খাদ্যের সীমা স্থাপন ভিন্ন বিষয়। “সেখানে তিন রকম খাবার থাকবে” বললে তিনটির সহাবস্থান সরাসরি বলা হয়। “এটি ছাড়া খাবার নেই” বললে সেই বাক্যের সম্বোধিতদের জন্য বিকল্প বাদ যায়। গাশিয়াহতে বহুবচনে “তাদের”, হাক্কাহতে পূর্ববর্তী অবিশ্বাসী ব্যক্তির প্রসঙ্গে একবচনে বর্ণনা, আর সাফফাতে যাক্কুম ভক্ষণকারী গোষ্ঠী রয়েছে। ফলে মিল স্থাপনের জন্য কোন বর্ণনা কাদের ওপর প্রযোজ্য, সেই পরিসর নির্ধারণ করতে হচ্ছে।

সূত্রখাদ্যের পরিচয়সীমা বা ভক্ষণের ঘোষণা
গাশিয়াহ ৮৮:৬দারি; কাঁটাযুক্ত উদ্ভিদ হিসেবে ব্যাখ্যাতএটি ছাড়া তাদের খাবার নেই।
হাক্কাহ ৬৯:৩৬গিসলিন; ক্ষতনিঃসৃত স্রাব হিসেবে ব্যাখ্যাতএটি ছাড়া খাবার নেই।
সাফফাত ৩৭:৬২, ৬৬যাক্কুম গাছতা থেকে খাবে এবং তা দিয়ে উদর পূর্ণ করবে।
কোরআন সংকলন 239

ইসলামওয়েবের আলোচনাও দারি ও গিসলিনকে একই বস্তুর দুটি নাম হিসেবে গ্রহণ করেনি। তাদের নির্বাচিত অর্থ অনুযায়ী এগুলো আলাদা বস্তু। দুটি “ছাড়া আর খাদ্য নেই” ঘোষণাকে পাশাপাশি রাখার পর ভিন্ন খাদ্যের সমস্যাটি তাই তাদের ব্যাখ্যাতেও স্বীকৃত হয়েছে। [1171]

يتبين أنهما ليسا شيئاً واحداً، وأنهما ليسا اسمين لمسمى واحد، بل هما شيئان مختلفان

বাংলা অনুবাদ: স্পষ্ট হয় যে দুটো একই জিনিস নয় এবং একই বস্তুর দুটি নামও নয়; বরং তারা দুটি ভিন্ন জিনিস।

কুরতুবি গাশিয়াহর তাফসিরে সমন্বয়ের জন্য খাদ্যগুলোকে জাহান্নামের ভিন্ন স্তরের বাসিন্দাদের মধ্যে ভাগ করেছেন। তাঁর উদ্ধৃত কালবির বক্তব্যে দারি এক স্তরে এবং যাক্কুম অন্য স্তরে। একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন অবস্থায় বক্তব্যগুলো প্রযোজ্য হওয়ার সম্ভাবনাও তিনি রেখেছেন। অর্থাৎ একই স্থান, একই গোষ্ঠী ও একই অবস্থার জন্য সব সীমা একসঙ্গে রেখে দেওয়া হয়নি; সমন্বয় করতে স্থান বা অবস্থার পরিসর বদলানো হয়েছে। [1172]

ووجه الجمع أن النار دركات فمنهم من طعامه الزقوم ، ومنهم من طعامه الغسلين ، ومنهم من طعامه الضريع ، ومنهم من شرابه الحميم ، ومنهم من شرابه الصديد . قال الكلبي : الضريع في درجة ليس فيها غيره ، والزقوم في درجة أخرى . ويجوز أن تحمل الآيتان على حالتين كما قال : يطوفون بينها وبين حميم آن .

বাংলা অনুবাদ: সমন্বয়ের পদ্ধতি হলো, আগুনের বিভিন্ন স্তর রয়েছে। কারও খাবার যাক্কুম, কারও গিসলিন, কারও দারি; কারও পানীয় ফুটন্ত পানি, কারও ক্ষতনিঃসৃত তরল। কালবি বলেছেন: দারি এমন এক স্তরে, যেখানে তা ছাড়া অন্য কিছু নেই; যাক্কুম অন্য স্তরে। দুটি আয়াতকে দুটি অবস্থার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে; যেমন বলা হয়েছে, তারা এর এবং ফুটন্ত পানির মধ্যে ঘুরতে থাকবে।

জাহান্নামের স্তর বা দরজা একাধিক—এই সাধারণ ধারণা থেকে নির্দিষ্ট খাদ্যের নির্দিষ্ট বণ্টন নিজে নিজে পাওয়া যায় না। কোন অপরাধী কেবল দারি খাবে, কে কেবল গিসলিন পাবে এবং কার জন্য যাক্কুম—এই সীমাগুলো আলোচ্য আয়াতগুলো একসঙ্গে মানচিত্রের মতো নির্ধারণ করেনি। কুরতুবির সমন্বয় সেই অপ্রকাশিত বণ্টন যোগ করে। আয়াতগুলোর ঘোষিত সীমাকে রক্ষা করার দায়িত্ব তাই ভাষ্যকারের নির্ধারিত গোষ্ঠী, স্থান বা অবস্থাভেদের ওপর পড়ে।

ইসলামওয়েব আরেকটি ব্যাখ্যাও উল্লেখ করেছে: দারি বা গিসলিন প্রকৃত খাদ্যই নয়; ফলে এগুলো ছাড়া খাবার নেই বলার উদ্দেশ্য আসলে কোনো উপযোগী খাদ্য নেই বলা। সেখানে “রোদ ছাড়া ছায়া নেই” ধরনের অতিশয়োক্তির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এই পাঠে “খাদ্য” শব্দের সাধারণ অর্থের পরিসর বদলানো হয়। প্রথম ব্যাখ্যা ভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে খাদ্য ভাগ করে; দ্বিতীয়টি খাদ্য বলার অর্থকে অলংকারে স্থানান্তর করে। দুটিই গ্রন্থের বাইরে দাঁড়িয়ে ভাষ্যকারের দেওয়া সমন্বয়-পদ্ধতি।

ব্যাখ্যাকারীর পদ্ধতিযে বিষয় আলাদা করা হচ্ছেবাক্যগুলোর ওপর ফল
কুরতুবির স্তরবিভাগভিন্ন স্তরের শাস্তিপ্রাপ্তরাপ্রত্যেক “একমাত্র” খাদ্য পৃথক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
দুটি অবস্থার ব্যাখ্যাএকই ব্যক্তির ভিন্ন অবস্থা বা পর্যায়সীমার প্রয়োগের সময় বা পরিস্থিতি বদলায়।
ইসলামওয়েবে উদ্ধৃত অলংকারমূলক পাঠখাদ্যের নাম ও উপযোগী খাদ্যখাদ্য থাকা সত্ত্বেও “খাদ্য নেই”কে অতিশয়োক্তি করা হয়।

ইবন কাসির সাফফাত ৩৭:৬৬ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যাক্কুম খাওয়ার কারণ হিসেবে সেটি এবং তার মতো বস্তু ছাড়া আর কিছু না পাওয়ার কথা বলেছেন; সঙ্গে দারির আয়াতও যুক্ত করেছেন। এখানে ব্যাখ্যা শুধু আলাদা স্তরের মানচিত্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি; খাদ্যের অর্থকে একই ধরনের যন্ত্রণাদায়ক বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে। [1173]

فإنهم ليضطرون إلى الأكل منها ، لأنهم لا يجدون إلا إياها ، وما في معناها ، كما قال [ تعالى ] : ( ليس لهم طعام إلا من ضريع . لا يسمن ولا يغني من جوع )

বাংলা অনুবাদ: তারা তা খেতে বাধ্য হবে; কারণ সেটি এবং তার সমজাতীয় বস্তু ছাড়া কিছু পাবে না। যেমন বলা হয়েছে: “দারি ছাড়া তাদের খাদ্য নেই; তা পুষ্ট করে না এবং ক্ষুধাও দূর করে না।”

একই সমস্যা সামলাতে স্তরভেদ, অবস্থাভেদ ও অলংকারমূলক খাদ্যহীনতার মতো একাধিক পদ্ধতি পাওয়া যাচ্ছে। তাদের সাধারণ উদ্দেশ্য ঘোষণাগুলোকে একসঙ্গে রাখা; কিন্তু প্রতিটি পদ্ধতি একই অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করে না। “একমাত্র” শব্দের কার্যকর পরিসর কোথায় শেষ হবে, তা মুসহাফের শব্দ অপরিবর্তিত রেখেই তাফসিরে বদলে নির্ধারিত হচ্ছে। এই ব্যাখ্যাগত কর্তৃত্ব বাদ দিয়ে আয়াতগুলোকে একই ধরনের সরল খাদ্যতালিকা হিসেবে হাজির করলে পাঠে থাকা সীমা ও পার্থক্য দুটোই আড়াল হয়।


কেউ অন্যের পাপ বহন করবে না এবং অন্যের পাপের বোঝা বহনের বক্তব্য

ব্যক্তিগত দায়ের নীতিটি কোরআনে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় এসেছে: কোনো ভারবহনকারী অন্যের ভার বহন করবে না। আনআম ৬:১৬৪-এ এই ঘোষণার সঙ্গে প্রত্যেক ব্যক্তির অর্জিত কাজ তার নিজের ওপর বর্তানোর কথাও রয়েছে। ফলে অপরাধ, দায় এবং বিচারের মধ্যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক একটি সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। যে কাজ করেছে, তার দায় তার; অন্য কাউকে সেই কাজের দণ্ডভোগী করার অনুমতি এই সাধারণ ঘোষণায় নেই। [1174]

قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ أَبْغِي رَبًّا وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيْءٍ ۚ وَلَا تَكْسِبُ كُلُّ نَفْسٍ إِلَّا عَلَيْهَا ۚ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ ۚ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّكُم مَّرْجِعُكُمْ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ

বাংলা অনুবাদ: আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য প্রতিপালক তালাশ করব? (অথচ প্রকৃতপক্ষে) তিনিই সব কিছুর প্রতিপালক। প্রত্যেক ব্যক্তি যা অর্জন করে তার জন্য সে নিজেই দায়ী হবে। কোন ভারবহনকারীই অন্যের গুনাহের ভার বহন করবে না। অবশেষে তোমাদের প্রত্যাবর্তন স্থল তোমাদের প্রতিপালকের নিকটেই, তখন তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন যে সকল বিষয়ে তোমরা মতভেদে লিপ্ত ছিলে (সে সব বিষয়ে প্রকৃত সত্য কোনটি)।
— Taisirul Quran
তুমি জিজ্ঞেস করঃ আমি কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য রবের সন্ধান করব? অথচ তিনিই হচ্ছেন প্রতিটি বস্তুর রাব্ব! প্রত্যেক ব্যক্তিই স্বীয় কৃতকর্মের জন্য দায়ী হবে, কেহ কারও কোন বোঝা বহন করবেনা, পরিশেষে তোমাদের রবের নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে, অতঃপর তিনি তোমরা যে বিষয়ে মতবিরোধ করেছিলে সে বিষয়ের মূল তত্ত্ব তোমাদেরকে অবহিত করবেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
বল, ‘আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন রব অনুসন্ধান করব’ অথচ তিনি সব কিছুর রব’? আর প্রতিটি ব্যক্তি যা অর্জন করে, তা শুধু তারই উপর বর্তায় আর কোন ভারবহনকারী অন্যের ভার বহন করবে না। অতঃপর তোমাদের রবের নিকটই তোমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল। সুতরাং তিনি তোমাদেরকে সেই সংবাদ দেবেন, যাতে তোমরা মতবিরোধ করতে।
— Rawai Al-bayan
বলুন, ‘আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্যকে রব খুঁজব? অথচ তিনিই সব কিছুর রব। ’প্রত্যেকে নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী এবং কেউ অন্য কারো ভার গ্রহণ করবে না। তারপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন তোমাদের রবের দিকেই , অতঃপর যে বিষয়ে তোমরা মতভেদ করতে, তা তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
[1174]

ইসরার ১৫ নম্বর আয়াতেও অন্যের বোঝা বহন না করার ঘোষণা রয়েছে। সঙ্গে রয়েছে রাসুল পাঠানোর আগে শাস্তি না দেওয়ার বক্তব্য। ব্যক্তিগত দায় এবং সতর্ক করার পূর্বশর্ত এখানে পাশাপাশি রাখা হয়েছে। শাস্তি দেওয়ার আগে অপরাধ ও দায় প্রতিষ্ঠার যে নীতি এই পাঠ প্রকাশ করে, পরে অন্যের কাজের জন্য দণ্ডভোগের বর্ণনা যাচাই করার ক্ষেত্রে তার সরাসরি গুরুত্ব রয়েছে। [1175]

وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ ۗ وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبْعَثَ رَسُولًا

বাংলা অনুবাদ: কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না। আমি ‘আযাব দেই না যতক্ষণ একজন রসূল না পাঠাই।
— Taisirul Quran
এবং কেহ অন্য কারও ভার বহন করবেনা; আমি রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কেহকেও শাস্তি দিইনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর কোন বহনকারী অপরের (পাপের) বোঝা বহন করবে না। আর রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত আমি আযাবদাতা নই।
— Rawai Al-bayan
আর কোনো বহনকারী অন্য কারো ভার বহন করবে না [২]। আর আমরা রাসুল না পাঠানো পর্যন্ত শাস্তি প্রদানকারী নই [৩]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
[1175]

আনকাবুত ২৯:১৩-তে আবার নিজেদের বোঝার সঙ্গে আরও বোঝা বহনের ঘোষণা পাওয়া যায়। এই আয়াতের বাংলা অনুবাদগুলোতে “নিজেদের বোঝার সাথে আরও বোঝা” সরাসরি বলা হয়েছে। ব্যক্তিগত দায়ের ঘোষণার পাশে এই অতিরিক্ত বোঝার উৎস শনাক্ত করাই মূল প্রশ্ন। [1176]

وَلَيَحْمِلُنَّ أَثْقَالَهُمْ وَأَثْقَالًا مَّعَ أَثْقَالِهِمْ ۖ وَلَيُسْأَلُنَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَمَّا كَانُوا يَفْتَرُونَ

বাংলা অনুবাদ: তারা অবশ্য অবশ্যই তাদের নিজেদের পাপের বোঝা বহন করবে, নিজেদের বোঝার সাথে আরো বোঝা, আর তারা যে সব মিথ্যে উদ্ভাবন করত সে সম্পর্কে ক্বিয়ামত দিবসে তারা অবশ্য অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে।
— Taisirul Quran
এবং তারা নিজেদের বোঝা বহন করবে এবং নিজেদের বোঝার সাথে আরও বোঝা; এবং তারা যে মিথ্যা উদ্ভাবন করে সেই সম্পর্কে কিয়ামাত দিবসে অবশ্যই তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর অবশ্যই তারা বহন করবে তাদের বোঝা এবং তাদের বোঝার সাথে আরো কিছু বোঝা। আর তারা কিয়ামতের দিন অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে সে সম্পর্কে, যা তারা মিথ্যা বানাত।
— Rawai Al-bayan
তারা তো বহন করবে নিজেদের ভার এবং নিজেদের বোঝার সাথে আরো কিছু বোঝা [১]; আর তারা যে মিথ্যা রটনা করত সে সম্পর্কে কিয়ামতের দিন অবশ্যই তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
[1176]

নাহল ১৬:২৫-এ অতিরিক্ত বোঝার সম্পর্ক আরও নির্দিষ্ট: যাদের পথভ্রষ্ট করা হয়েছে, তাদের পাপের বোঝাও বহন করতে হবে। নিজের পাপ পুরোটা বহনের সঙ্গে অন্যদের পাপের একটি অংশের সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। ফলে শুধু প্রত্যক্ষ কাজ নয়, অন্যের বিশ্বাস ও আচরণে প্রভাব বিস্তারের দায়ও এই বিচারের কাঠামোয় যুক্ত হয়েছে। [1177]

لِيَحْمِلُوا أَوْزَارَهُمْ كَامِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۙ وَمِنْ أَوْزَارِ الَّذِينَ يُضِلُّونَهُم بِغَيْرِ عِلْمٍ ۗ أَلَا سَاءَ مَا يَزِرُونَ

বাংলা অনুবাদ: যার ফলে ক্বিয়ামাত দিবসে তারা বহন করবে নিজেদের পাপের বোঝা পূর্ণ মাত্রায়, আর (আংশিক) তাদেরও পাপের বোঝা যাদেরকে তারা গুমরাহ করেছে নিজেদের অজ্ঞতার কারণে। হায়, তারা যা বহন করবে তা কতই না নিকৃষ্ট!
— Taisirul Quran
ফলে কিয়ামাত দিবসে তারা বহন করবে তাদের পাপভার পূর্ণমাত্রায় এবং পাপভার তাদেরও যাদেরকে তারা অজ্ঞতা বশতঃ বিভ্রান্ত করেছে; হায়! তারা যা বহন করবে তা কতই না নিকৃষ্ট!
— Sheikh Mujibur Rahman
এতে করে তারা কিয়ামতের দিনে নিজদের পাপের বোঝা পুরোটাই বহন করবে এবং তাদের পাপের বোঝাও যাদেরকে তারা অজ্ঞতা হেতু পথভ্রষ্ট করে। তারা যা বহন করবে, তা কতই না নিকৃষ্ট!
— Rawai Al-bayan
ফলে কিয়ামতের দিন তারা বহন করবে তাদের পাপের বোঝা পূর্ণ মাত্রায় এবং তাদেরও পাপের বোঝা যাদেরকে তারা অজ্ঞতাবশত বিভ্রান্ত করেছে [১]। দেখুন, তারা যা বহন করবে তা কত নিকৃষ্ট !
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
[1177]

আনকাবুতের আগের আয়াতটিতে এমন লোকদের কথাও রয়েছে, যারা অনুসারীদের নিজেদের পথে আসতে বলে তাদের পাপ বহন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেখানে প্রতিশ্রুতিটি মিথ্যা বলা হয়েছে। অন্য ব্যক্তির পাপ নিজের ঘাড়ে নিয়ে তাকে দায়মুক্ত করার দাবিকে ১২ নম্বর আয়াত প্রত্যাখ্যান করছে; পরের আয়াতে বিভ্রান্তকারী নেতাদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা ঘোষণা করা হচ্ছে। দায়মুক্ত করার নামে পাপ গ্রহণ এবং বিভ্রান্ত করার জন্য নতুন দায়—পাঠের এই ধারায় দুটো ভিন্ন সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। [1178]

وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلَّذِينَ آمَنُوا اتَّبِعُوا سَبِيلَنَا وَلْنَحْمِلْ خَطَايَاكُمْ وَمَا هُم بِحَامِلِينَ مِنْ خَطَايَاهُم مِّن شَيْءٍ ۖ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ

বাংলা অনুবাদ: অবিশ্বাসীরা বিশ্বাসীদের বলে, তোমরা আমাদের পথ অনুসরণ করো, আর আমরা তোমাদের পাপ বহন করব। অথচ তারা তাদের পাপের কিছুই বহন করবে না। নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।

ইবন কাসির এই অতিরিক্ত দায়কে বিভ্রান্ত করার নিজের কাজের দায় হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় বিভ্রান্ত অনুসারীর পাপ কমে যায় না এবং তার বোঝা নেতা নিজের ওপর নিয়ে তাকে দায়মুক্ত করেন না। নেতার নিজের পথভ্রষ্টতা এবং অন্যকে পথভ্রষ্ট করা—দুই কাজের জন্য দুই ধরনের দায় তৈরি হয়। [1179]

فإن الدعاة عليهم إثم ضلالهم في أنفسهم ، وإثم آخر بسبب ما أضلوا من أضلوا من غير أن ينقص من أوزار أولئك ، ولا يحملوا عنهم شيئا

বাংলা অনুবাদ: কারণ আহ্বানকারীদের ওপর নিজেদের পথভ্রষ্টতার পাপ রয়েছে এবং তারা যাদের পথভ্রষ্ট করেছে, তাদের পথভ্রষ্ট করার কারণে আরও একটি পাপ রয়েছে। এতে ওই ব্যক্তিদের পাপের বোঝা কমে না এবং আহ্বানকারীরা তাদের বদলে কোনো বোঝা বহন করে না।

সহিহ মুসলিমের আহ্বান ও অনুসরণের বর্ণনাতেও এই কাঠামো রয়েছে। সৎপথের আহ্বানকারী অনুসারীদের সমপরিমাণ পুরস্কার এবং ভ্রান্তপথের আহ্বানকারী সমপরিমাণ পাপ পাবে; অনুসারীদের হিসাব কমবে না। এখানে কোনো সীমিত পাপের ভাণ্ডার একজনের কাছ থেকে সরিয়ে অন্যজনের ওপর রাখা হয়নি। প্রভাব বিস্তারের জন্য আলাদা হিসাব তৈরি করা হয়েছে। [1180]

مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا وَمَنْ دَعَا إِلَى ضَلاَلَةٍ كَانَ عَلَيْهِ مِنَ الإِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ تَبِعَهُ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ آثَامِهِمْ شَيْئًا

বাংলা অনুবাদ: যে সৎপথের দিকে আহ্বান করে, সে তার অনুসারীদের পুরস্কারের সমপরিমাণ পুরস্কার পাবে; এতে তাদের পুরস্কারের কিছুই কমবে না। আর যে ভ্রান্তপথের দিকে আহ্বান করে, তার ওপর তার অনুসারীদের পাপের সমপরিমাণ পাপ থাকবে; এতে তাদের পাপের কিছুই কমবে না।

সম্পর্কযার নিজের কাজ বিচার্যদায়ভোগীর ওপর ফল
নিজে অপরাধ করাসেই ব্যক্তিনিজের কাজের জন্য নিজের দায়।
অন্যকে অপরাধে প্ররোচিত করাপ্ররোচনাদাতা এবং কাজটি করা ব্যক্তিদুজনের নিজের ভূমিকার জন্য পৃথক দায়; কাজটি করা ব্যক্তি দায়মুক্ত হয় না।
অন্যের পাপ নিজের ওপর নিয়ে তাকে মুক্ত করাঅপরাধী বদলে দায়গ্রহণকারীআনকাবুত ২৯:১২-তে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি মিথ্যা বলা হয়েছে।
একজনকে ক্ষমা করে তার পাপ অন্য ধর্মের ব্যক্তির ওপর রাখাক্ষমাপ্রাপ্ত ব্যক্তির পাপ অন্যের নামে স্থাপনএখানে নতুন ব্যক্তির নিজের ভূমিকা কী, সেই প্রশ্ন তৈরি হয়।

এই পার্থক্য পরবর্তী হাদিসের সমালোচনাকে আরও নির্দিষ্ট করে। অন্যকে অপরাধে উৎসাহ দেওয়ার দায় এবং কোনো মুসলিমকে ক্ষমা করে তার পাপ ইহুদি বা খ্রিষ্টানের ওপর চাপানো একই নৈতিক ঘটনা নয়। প্রথম ক্ষেত্রে অন্যের অপরাধ ঘটাতে ব্যক্তির নিজের অংশগ্রহণ আছে; দ্বিতীয় কাঠামোয় একজনের মুক্তির সঙ্গে আরেকজনের দণ্ডকে জুড়ে দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট ব্যক্তির অংশগ্রহণের প্রমাণ ছাড়া কেবল ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে তাকে অন্যের পাপের বাহক বানালে ব্যক্তিগত দায়ের সাধারণ ঘোষণার সঙ্গে সরাসরি সংঘাত তৈরি হয়।

প্রভাব বিস্তারের দায়ের মধ্যেও ধর্মতাত্ত্বিক একটি মানদণ্ড কাজ করছে। কোন আহ্বান “সৎপথ” এবং কোনটি “ভ্রান্তপথ”, তা নির্ধারণের ক্ষমতা ধর্মীয় কর্তৃত্বের হাতে থাকলে মতপ্রচার ও অনুসরণের ওপর অনির্দিষ্ট অতিরিক্ত পাপের হিসাব আরোপ করা যায়। নিজের মত গ্রহণকে পুরস্কারের এবং ভিন্ন মতের প্রসারকে পাপের শৃঙ্খলে বাঁধার সামাজিক ফল আছে। কিন্তু সেই বিশ্বাসভিত্তিক হিসাবও একজনের অপরাধ মুছে অন্য ধর্মের অচিহ্নিত ব্যক্তির ওপর চাপানোর যুক্তি সরবরাহ করে না। পরের বর্ণনায় এই পৃথক সমস্যাটিই সামনে আসে।


মুসলিমের পাপ ইহুদি–খ্রিষ্টানের ওপর দেওয়ার বর্ণনা

সহিহ মুসলিমের আবু মুসার নামে বর্ণিত হাদিসে পাহাড়সম পাপ নিয়ে আসা মুসলিমদের ক্ষমা করার পরে সেই পাপ ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ওপর রাখার কথা রয়েছে। এখানে অন্যকে অপরাধে প্ররোচিত করার ঘটনা বলা হয়নি। বাক্যের প্রথম বিষয় মুসলিমদের পাপ, পরের ঘটনা সেই পাপ ক্ষমা করা, এবং পরের ক্রিয়া তার ইহুদি–খ্রিষ্টানদের ওপর স্থাপন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বাংলা প্রকাশনায় বর্ণনাটি ৬৭৫৮ নম্বরে এবং প্রচলিত আন্তর্জাতিক নম্বরায়ণে মুসলিম ২৭৬৭-এর অন্তর্ভুক্ত। [1181] [1182]

يَجِيءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ نَاسٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ بِذُنُوبٍ أَمْثَالِ الْجِبَالِ فَيَغْفِرُهَا اللَّهُ لَهُمْ وَيَضَعُهَا عَلَى الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى ‏”‏ ‏.‏ فِيمَا أَحْسِبُ أَنَا ‏.‏ قَالَ أَبُو رَوْحٍ لاَ أَدْرِي مِمَّنِ الشَّكُّ ‏.‏ قَالَ أَبُو بُرْدَةَ فَحَدَّثْتُ بِهِ عُمَرَ بْنَ عَبْدِ الْعَزِيزِ فَقَالَ أَبُوكَ حَدَّثَكَ هَذَا عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قُلْتُ نَعَمْ

বাংলা অনুবাদ: সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫১/ তাওবা
পরিচ্ছেদঃ ৮. হত্যাকারীর তাওবা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য; যদিও সে বহু হত্যা করে থাকে
৬৭৫৮। মুহাম্মদ ইবনু আমর ইবনু আব্বাদ ইবনু জাবালা ইবনু আবূ রাওয়াদ (রহঃ) … আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিছুসংখ্যক মুসলিম পাহাড় সমান গুনাহ নিয়ে কিয়ামতের ময়দানে আসবে এবং আল্লাহ তাআলা তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। আর তা ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের উপর চড়িয়ে দিবেন। আমার মনে হয় এ রূপই বর্ণনাকারী হাদীসের শেষোক্ত কথাটি সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। রাবী আবূ রাওহ (রহঃ) বলেন, কার পক্ষ থেকে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে, তা আমার জানা নেই। আবূ বুরদা (রহঃ) বলেন, এ হাদীসটি আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয (রহঃ) এর নিকট বর্ণনা করার পর তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার পিতা এ হাদীসটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সরাসরি (শুনে) তোমার নিকট বর্ণনা করেছে কি? আমি বললাম, হ্যাঁ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ মূসা আল- আশ’আরী (রাঃ)
[1181]

বর্ণনায় সন্দেহের কথাটিও সংরক্ষিত আছে। “আমার ধারণা” জাতীয় শব্দের পরে আবু রাওহ বলেছেন, কার কাছ থেকে সন্দেহটি এসেছে তা তিনি জানেন না। তারপর আবু বুরদার কাছে উমর ইবন আবদুল আজিজের জিজ্ঞাসার বিবরণ রয়েছে: তাঁর পিতা কি নবীর কাছ থেকে এই কথা বর্ণনা করেছেন? এই প্রশ্নোত্তর দেখায়, কথাটির উৎস নিয়েই বর্ণনার ভেতরে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা আছে। ফলে সংরক্ষিত পাঠে পাপ স্থানান্তরের বক্তব্যের পাশাপাশি বর্ণনাকারীর দ্বিধা ও উৎস যাচাইয়ের ঘটনাও একই সঙ্গে আছে।

একই অধ্যায়ের অন্য বর্ণনায় মুসলিমকে মুক্ত করার সঙ্গে অন্য ধর্মের ব্যক্তির নরকে যাওয়াকে সরাসরি বিনিময়-সম্পর্কে রাখা হয়েছে। আল্লাহ প্রত্যেক মুসলিমকে একজন ইহুদি অথবা খ্রিষ্টান দেবেন এবং বলবেন, এ তোমার আগুন থেকে মুক্তির বিনিময়—এই ভাষা সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে। [1183]

إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ دَفَعَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلَى كُلِّ مُسْلِمٍ يَهُودِيًّا أَوْ نَصْرَانِيًّا فَيَقُولُ هَذَا فَكَاكُكَ مِنَ النَّارِ

বাংলা অনুবাদ: কিয়ামতের দিন আল্লাহ প্রত্যেক মুসলিমের কাছে একজন ইহুদি অথবা খ্রিষ্টান দেবেন এবং বলবেন: এ তোমার আগুন থেকে মুক্তির বিনিময়।

ধর্মীয় পরিচয়ের এই বিন্যাস স্পষ্ট। যাকে আগুন থেকে মুক্ত করা হচ্ছে, তার পরিচয় মুসলিম; যাকে মুক্তির বিনিময় হিসেবে হাজির করা হচ্ছে, তার পরিচয় ইহুদি অথবা খ্রিষ্টান। উদ্ধৃত বাক্যে বিনিময়-ব্যক্তিটি কোন মুসলিমকে কী অপরাধে প্ররোচিত করেছিল, তার কোনো ঘটনা নেই। একই পরিণতির কাঠামোয় এক সম্প্রদায়ের মুক্তি এবং অন্য সম্প্রদায়ের দণ্ডকে যুক্ত করা হয়েছে। ব্যক্তিগত অপরাধের বিচারের পরিবর্তে ধর্মীয় গোষ্ঠীর পরিচয় এই নাট্যবিন্যাসের কেন্দ্রে এসেছে।

নববি “তাদের ওপর তা রাখবেন” কথাটির অর্থ সরাসরি গ্রহণ করেননি। তাঁর ব্যাখ্যায় ইহুদি–খ্রিষ্টানদের ওপর মুসলিমদের পাপ নয়, তাদের নিজেদের অবিশ্বাস ও পাপের কারণে সমপরিমাণ বোঝা থাকবে। এই অর্থ গ্রহণের কারণ তিনি নিজেই জানিয়েছেন: কোরআন বলেছে, কোনো ভারবহনকারী অন্যের ভার বহন করবে না। তাই তাঁর ভাষায় এই ব্যাখ্যা “অপরিহার্য”। [1184]

ولا بد من هذا التأويل لقوله تعالى : ولا تزر وازرة وزر أخرى وقوله : ( ويضعها ) مجاز والمراد : يضع عليهم مثلها بذنوبهم كما ذكرناه

বাংলা অনুবাদ: “কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না”—আল্লাহর এই কথার কারণে এই ব্যাখ্যা অপরিহার্য। আর “তাদের ওপর তা চাপিয়ে দেবেন” কথাটি রূপক; উদ্দেশ্য হলো, তাদের নিজেদের পাপের কারণে তাদের ওপর সমপরিমাণ বোঝা রাখা, যেমন আমরা উল্লেখ করেছি।

অর্থের পরিবর্তনটি নির্দিষ্ট। হাদিসের সর্বনাম ক্ষমা করা মুসলিমদের পাপের দিকে ফিরে যায়; নববির ভাষ্যে সেই পাপের স্থানে “তাদের নিজেদের পাপের কারণে সমপরিমাণ” বসে। প্রথমে পাপের পরিচয় এক, ব্যাখ্যায় পরিচয় আরেক। কোরআনের সাধারণ নীতি রক্ষার জন্য একটি সরাসরি ক্রিয়াকে রূপক বলা হচ্ছে। ভাষ্যকার স্বীকৃত দুটি সূত্রের মধ্যে কোনটির সাধারণ নীতি অক্ষুণ্ণ থাকবে এবং কোনটির আক্ষরিক অর্থ বদলাবে, সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বর্ণনার ভাষানববির ব্যাখ্যায় অর্থসম্পর্কের পরিবর্তন
মুসলিমরা পাহাড়সম পাপ নিয়ে আসেমুসলিমদের পাপ ক্ষমা হয়ক্ষমাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রথম পরিচয় অক্ষুণ্ণ।
সেই পাপ ইহুদি–খ্রিষ্টানদের ওপর রাখা হয়তাদের নিজের পাপের কারণে সমপরিমাণ বোঝা থাকেপাপ স্থানান্তরকে সমপরিমাণ নিজস্ব দায় হিসেবে পড়া।
“রাখবেন” একটি সরাসরি ক্রিয়াক্রিয়াটি রূপকপ্রকাশিত ক্রিয়ার অর্থ সীমিত করা।
অন্যের ভার বহন না করার কোরআনিক নীতিএই ব্যাখ্যার বাধ্যতামূলক ভিত্তিএক সূত্রের সাধারণ ঘোষণা দিয়ে অন্য সূত্রের বক্তব্য পুনর্নির্ধারণ।

নববি আরও একটি সম্ভাবনা রেখেছেন: অন্য ধর্মের ব্যক্তিরা পাপগুলোর প্রচলন করেছিল, মুসলিমদের ক্ষমা করা হলেও প্রচলনকারীরা তার সমপরিমাণ দায় বহন করবে। এখানে পাপ প্রচলনের একটি কার্যকারণ যোগ করা হয়েছে। এই কার্যকারণ গ্রহণ করলে নীতিটি প্ররোচনাদাতার দায়ের আলোচনার কাছাকাছি হয়; কিন্তু সেই প্ররোচনার ঘটনা মুসলিমের মুক্তির বিনিময়ে ইহুদি বা খ্রিষ্টান দেওয়ার সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় উল্লেখিত নয়। [1185]

ويحتمل أن يكون المراد آثاما كان للكفار سبب فيها ، بأن سنوها فتسقط عن المسلمين بعفو الله تعالى ، ويوضع على الكفار مثلها ، لكونهم سنوها ، ومن سن سنة سيئة كان عليه مثل وزر كل من يعمل بها .

বাংলা অনুবাদ: এ অর্থও হতে পারে যে, উদ্দেশ্য এমন পাপ, যেগুলোর ক্ষেত্রে অবিশ্বাসীরা কারণ হয়েছিল—সেগুলো প্রচলন করার মাধ্যমে। আল্লাহর ক্ষমায় মুসলিমদের থেকে তা দূর হয় এবং অবিশ্বাসীদের ওপর সমপরিমাণ রাখা হয়, কারণ তারা তা প্রচলন করেছিল। আর যে মন্দ রীতি চালু করে, তার ওপর সেই অনুযায়ী কাজ করা প্রত্যেকের পাপের সমপরিমাণ থাকে।

এই দ্বিতীয় পাঠে “ইহুদি অথবা খ্রিষ্টান” পরিচয়ের সঙ্গে নির্দিষ্ট পাপপ্রচলনকারীর ভূমিকাও যুক্ত করতে হয়। অর্থাৎ ধর্মীয় পরিচয় একা যথেষ্ট নয়; কার নিজের কোন কাজের জন্য দায় তৈরি হলো, সেটি নতুন করে স্থাপন করতে হচ্ছে। নববির “সম্ভব” শব্দ এই সংযোগের ব্যাখ্যাগত অবস্থানও প্রকাশ করে। হাদিসে সংরক্ষিত ঘটনাবিবরণ এবং তার নৈতিক সামঞ্জস্য রক্ষার জন্য অনুমিত কার্যকারণ আলাদা স্তরে রয়েছে।

কোনো মুসলিমের ক্ষমা নিজেই নৈতিকভাবে অন্য ব্যক্তির অতিরিক্ত শাস্তির কারণ হতে পারে না। ক্ষমা অপরাধীর দায় মওকুফ করে; অন্যের অপরাধ প্রমাণ করে না। মুক্তির বিনিময় হিসেবে অন্য ধর্মের মানুষকে হাজির করার চিত্রে মানবজীবন ও দণ্ডকে ধর্মীয় পরিচয়ের বিনিময়মূল্যে নামিয়ে আনা হয়। এই চিত্র ইহুদি ও খ্রিষ্টানকে ব্যক্তিগত কাজসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখানোর বদলে মুসলিমের মুক্তির উপকরণে পরিণত করে। পাঠের এই গোষ্ঠীকেন্দ্রিক নির্মাণই নৈতিক সমস্যার কেন্দ্র।

তাফসির ও শারহের ভূমিকা এখানে শুধু কঠিন শব্দের অর্থ বলা নয়। ব্যক্তিগত দায়ের নীতি এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে দণ্ডের বিনিময়ের ভাষা একসঙ্গে রাখার জন্য নতুন সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। নববি এই প্রয়োজন আড়াল করেননি; তাঁর “এই ব্যাখ্যা অপরিহার্য” মন্তব্য স্পষ্ট করে যে গ্রন্থের স্বীকৃত মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে তার বাক্যের কার্যকর অর্থ পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে।


পরিবারের কান্নায় মৃতের শাস্তি এবং আয়েশার কোরআনিক আপত্তি

মৃতের জন্য আত্মীয়ের বিলাপের কারণে মৃত ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার বর্ণনায় দায়ের প্রশ্নটি আরও সরাসরি। কান্না করছে জীবিত পরিবার, কিন্তু বর্ণিত শাস্তি পাচ্ছে মৃত ব্যক্তি। সাদের অসুস্থতার ঘটনায় মুহাম্মদের নিজের কান্না এবং অন্যদের কান্নার পরেই অশ্রু ও হৃদয়ের শোকের সঙ্গে জিহ্বার ব্যবহারের পার্থক্য করা হয়েছে। তারপর মৃত ব্যক্তির ওপর পরিবারের বিলাপের ফল আরোপের বক্তব্য এসেছে। মিশকাতের বাংলা প্রকাশনায় এই বর্ণনার পূর্ণ পাঠ এবং বুখারি–মুসলিমসহ সূত্রগুলো রয়েছে। [1186] [1187]

اشْتَكَى سَعْدُ بْنُ عُبَادَةَ شَكْوَى لَهُ فَأَتَاهُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَعُودُهُ مَعَ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ وَسَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ وَعَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ ـ رضى الله عنهم ـ فَلَمَّا دَخَلَ عَلَيْهِ فَوَجَدَهُ فِي غَاشِيَةِ أَهْلِهِ فَقَالَ ‏”‏ قَدْ قَضَى ‏”‏‏.‏ قَالُوا لاَ يَا رَسُولَ اللَّهِ‏.‏ فَبَكَى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَلَمَّا رَأَى الْقَوْمُ بُكَاءَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم بَكَوْا فَقَالَ ‏”‏ أَلاَ تَسْمَعُونَ إِنَّ اللَّهَ لاَ يُعَذِّبُ بِدَمْعِ الْعَيْنِ، وَلاَ بِحُزْنِ الْقَلْبِ، وَلَكِنْ يُعَذِّبُ بِهَذَا ـ وَأَشَارَ إِلَى لِسَانِهِ ـ أَوْ يَرْحَمُ وَإِنَّ الْمَيِّتَ يُعَذَّبُ بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ

বাংলা অনুবাদ: মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-৫: জানাযা
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ – মৃত ব্যক্তির জন্য কাঁদা
১৭২৪-[৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সা’দ ইবনু ’উবাদাহ্ খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে দেখতে গেলেন। তাঁর সাথে ছিলেন ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ, সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্বক্বাস ও ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ। তিনি ওখানে প্রবেশ করে সা’দ ইবনু ’উবাদাহকে বেহুঁশ অবস্থায় পেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, সে কি মারা গেছে? সাহাবী জবাব দিলেন, জ্বী না, হে আল্লাহর রসূল! তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁদতে লাগলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কাঁদতে দেখে সাহাবীগণও কাঁদতে লাগলেন। এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সাবধান তোমরা শুনে রাখো অশ্রু বিসর্জন ও মনের শোকের কারণে আল্লাহ তা’আলা কাউকে শাস্তি দেবেন না। তিনি তার মুখের দিকে ইশারা করে বললেন, অবশ্য আল্লাহ এজন্য ’আযাবও দেন আবার রহমতও করেন। আর মৃতকে তার পরিবার-পরিজনের বিলাপের কারণে ’আযাব দেয়া হয়। (বুখারী, মুসলিম)[1]
[1] সহীহ : বুখারী ১৩০৪, মুসলিম ৯২৪, শারহুস্ সুন্নাহ্ ১৫২৯, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৭১৫২, সহীহ আল জামি‘ আস্ সগীর ২৬৪৭।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

শুধু চোখের পানি এবং শোককে শাস্তির কারণ করা হয়নি—এই পার্থক্য উদ্ধৃত বর্ণনাতেই আছে। কিন্তু পরিবারের নির্দিষ্ট উচ্চারণ বা বিলাপের কারণে মৃতের দণ্ডের প্রশ্ন তাতে শেষ হয় না। মৃত ব্যক্তি সেই বিলাপে অংশ নিতে পারছেন না এবং জীবিতদের আচরণ নিয়ন্ত্রণও করতে পারছেন না। কারও নিজের নির্দেশ বা উৎসাহ দেওয়ার ঘটনা প্রমাণিত হলে তাঁর নিজস্ব কাজের দায় আলাদা বিষয়; উদ্ধৃত সাধারণ বাক্যে সেই শর্ত উচ্চারিত নেই। কাজ এবং দণ্ডভোগীর বিচ্ছেদটি তাই থেকেই যায়।

এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে আয়েশা কোরআন ব্যবহার করেছেন। বুখারির বর্ণনায় উমর মারা যাওয়ার পরে ইবন আব্বাস তাঁর সামনে কথাটি তুললে আয়েশা বলেন, মুহাম্মদ বিশ্বাসী ব্যক্তিকে পরিবারের কান্নার কারণে আল্লাহ শাস্তি দেন—এ কথা বলেননি। তাঁর বর্ণিত বিকল্প কথায় অবিশ্বাসীর শাস্তি বৃদ্ধির উল্লেখ আছে। এরপর আয়েশা সরাসরি “কোনো ভারবহনকারী অন্যের ভার বহন করবে না” আয়াত উদ্ধৃত করেন। [1188]

قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ ـ رضى الله عنهما فَلَمَّا مَاتَ عُمَرُ ـ رضى الله عنه ـ ذَكَرْتُ ذَلِكَ لِعَائِشَةَ ـ رضى الله عنها ـ فَقَالَتْ رَحِمَ اللَّهُ عُمَرَ، وَاللَّهِ مَا حَدَّثَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِنَّ اللَّهَ لَيُعَذِّبُ الْمُؤْمِنَ بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ‏.‏ وَلَكِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏”‏ إِنَّ اللَّهَ لَيَزِيدُ الْكَافِرَ عَذَابًا بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ ‏”‏‏.‏ وَقَالَتْ حَسْبُكُمُ الْقُرْآنُ ‏‏{‏وَلاَ تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى‏}‏‏.‏ قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ ـ رضى الله عنهما ـ عِنْدَ ذَلِكَ وَاللَّهُ هُوَ أَضْحَكَ وَأَبْكَى‏.‏ قَالَ ابْنُ أَبِي مُلَيْكَةَ وَاللَّهِ مَا قَالَ ابْنُ عُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ شَيْئًا

বাংলা অনুবাদ: ইবন আব্বাস বলেন: উমর মারা যাওয়ার পরে আমি আয়েশার কাছে কথাটি উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন: আল্লাহ উমরের প্রতি দয়া করুন। আল্লাহর শপথ, আল্লাহর রাসুল বলেননি যে আল্লাহ বিশ্বাসী ব্যক্তিকে তার পরিবারের কান্নার কারণে শাস্তি দেন। বরং আল্লাহর রাসুল বলেছেন: আল্লাহ অবিশ্বাসীর শাস্তি তার পরিবারের কান্নার কারণে বাড়িয়ে দেন। তিনি আরও বললেন: তোমাদের জন্য কোরআনই যথেষ্ট—“কোনো ভারবহনকারী অন্যের ভার বহন করবে না।” ইবন আব্বাস তখন বললেন: আল্লাহই হাসান এবং কাঁদান। ইবন আবি মুলায়কা বলেন: আল্লাহর শপথ, ইবন উমর কিছুই বললেন না।

এখানে একজন পরবর্তী সমালোচক হাদিসকে কোরআনের বিরুদ্ধে দাঁড় করাননি; স্বীকৃত সাহাবি আয়েশাই বর্ণিত কথার যথার্থতা অস্বীকার করে আয়াতকে মানদণ্ড করেছেন। একই নবীর নামে প্রচারিত বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রাথমিক অনুসারীদের মধ্যেই মতভেদ আছে। “উমর বলেছেন” বা “ইবন উমর বর্ণনা করেছেন”—এই পরিচয় আয়েশার কাছে বক্তব্যকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখেনি। কোরআনের সাধারণ নীতির সঙ্গে সংঘাত তাঁর আপত্তির প্রকাশিত ভিত্তি।

বুখারির পরের বর্ণনায় আয়েশার নামে আরেকভাবে ঘটনার কথা এসেছে। সেখানে এক ইহুদি নারীর মৃতদেহের পাশে তার পরিবার কাঁদছিল এবং নারীটি কবরে শাস্তি পাচ্ছিল—এই দুটি ঘটনা একসঙ্গে বলা হয়েছে। আরবিতে এখানে পরিবার কাঁদছে “এবং” সে শাস্তি পাচ্ছে; পরিবারের কান্নাকে শাস্তির কারণ হিসেবে স্থাপন করা হয়নি। [1189]

إِنَّمَا مَرَّ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى يَهُودِيَّةٍ يَبْكِي عَلَيْهَا أَهْلُهَا فَقَالَ ‏”‏ إِنَّهُمْ لَيَبْكُونَ عَلَيْهَا، وَإِنَّهَا لَتُعَذَّبُ فِي قَبْرِهَا

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর রাসুল এমন এক ইহুদি নারীর পাশ দিয়ে গিয়েছিলেন, যার জন্য তার পরিবার কাঁদছিল। তিনি বলেছিলেন: তারা তার জন্য কাঁদছে, আর সে তার কবরে শাস্তি পাচ্ছে।

মুসলিমের বর্ণনায় আয়েশা ইবন উমরের বক্তব্যকে ভুল স্মরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর দেওয়া অর্থে মৃত ব্যক্তি নিজের অপরাধে শাস্তি পাচ্ছে, আর সেই সময় পরিবার কাঁদছে। “কারণে” এবং “একই সময়ে”—এই দুই সম্পর্কের পার্থক্যই বক্তব্যের নৈতিক অর্থ বদলে দেয়। প্রথমটিতে জীবিতের কাজ মৃতের শাস্তির কারণ; দ্বিতীয়টিতে পৃথক দুটি ঘটনা পাশাপাশি ঘটছে। [1190]

قَالَ ذُكِرَ عِنْدَ عَائِشَةَ أَنَّ ابْنَ عُمَرَ، يَرْفَعُ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ إِنَّ الْمَيِّتَ يُعَذَّبُ فِي قَبْرِهِ بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ ‏”‏ ‏.‏ فَقَالَتْ وَهَلَ إِنَّمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ إِنَّهُ لَيُعَذَّبُ بِخَطِيئَتِهِ أَوْ بِذَنْبِهِ وَإِنَّ أَهْلَهُ لَيَبْكُونَ عَلَيْهِ الآنَ

বাংলা অনুবাদ: তিনি বলেন: আয়েশার কাছে উল্লেখ করা হলো যে ইবন উমর নবীর নামে বলেন, মৃত ব্যক্তিকে তার কবরে পরিবারের কান্নার কারণে শাস্তি দেওয়া হয়। তিনি বললেন: তিনি ভুল করেছেন। আল্লাহর রাসুল শুধু বলেছিলেন: তাকে তার নিজের ভুল বা পাপের কারণে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, আর তার পরিবার এখন তার জন্য কাঁদছে।

বর্ণনাকান্না ও শাস্তির সম্পর্কদায়ের ওপর প্রভাব
বুখারি ১৩০৪-এর সাধারণ বক্তব্যপরিবারের বিলাপের কারণে মৃতের শাস্তিজীবিতের কাজের ফল মৃতের ওপর পড়ে।
বুখারি ১২৮৮-এ আয়েশার সংশোধনবিশ্বাসীর ক্ষেত্রে অস্বীকৃতি; অবিশ্বাসীর শাস্তি বৃদ্ধির কথাকোরআনের আয়াত দিয়ে সাধারণ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান; বিকল্পটিতেও অবিশ্বাসীর ওপর কান্নার ফল রয়ে যায়।
বুখারি ১২৮৯পরিবার কাঁদছে এবং নারীটি শাস্তি পাচ্ছেসরাসরি কারণের বদলে পাশাপাশি ঘটনার বিবরণ।
মুসলিম ৯৩২কমৃতের নিজের অপরাধে শাস্তি; পরিবার তখন কাঁদছেব্যক্তিগত দায়ের সম্পর্ক স্পষ্ট; পূর্ববর্তী বর্ণনার ভুল শনাক্ত।

এই পাঠভেদকে সামান্য ভাষার পার্থক্য হিসেবে ছোট করা যায় না। একটি অব্যয় বা ঘটনাসংযোগ বদলালেই কার কাজের জন্য কার শাস্তি, সেই নীতিই বদলে যায়। আয়েশার নামে সংরক্ষিত কথাগুলোও এক রূপে নেই: একটি পাঠ অবিশ্বাসীর শাস্তি বৃদ্ধির কথা বলে, অন্যটি নিজের অপরাধের শাস্তির সঙ্গে সমসাময়িক কান্নার কথা বলে। অবিশ্বাসী ব্যক্তির শাস্তি অন্যের কান্নায় বাড়ানো হলেও ব্যক্তিগত দায়ের প্রশ্নটি নৈতিকভাবে থেকে যায়; শুধু ব্যক্তির ধর্ম বদলানো কাজ ও দণ্ডের বিচ্ছেদ দূর করে না।

বর্ণনার সামাজিক প্রভাব শোক পালনের নিয়ন্ত্রণেও পৌঁছেছে। বুখারি ১৩০৪-এর শেষের বর্ণনাকারীর মন্তব্যে উমরের লাঠি, পাথর ও মাটি দিয়ে এই আচরণ দমন করার কথা আছে। এটি সাদের শয্যার পাশে উমরের উপস্থিতির নতুন ঘটনা হিসেবে বলা হয়নি; একই বর্ণনার শেষে তাঁর আচরণ সম্পর্কে যুক্ত মন্তব্য। [1191]

وَكَانَ عُمَرُ ـ رضى الله عنه ـ يَضْرِبُ فِيهِ بِالْعَصَا، وَيَرْمِي بِالْحِجَارَةِ وَيَحْثِي بِالتُّرَابِ

বাংলা অনুবাদ: উমর এ বিষয়ে লাঠি দিয়ে মারতেন, পাথর ছুড়তেন এবং মাটি নিক্ষেপ করতেন।

মৃতের শাস্তির ভয় তখন জীবিত শোকাহতদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অপরাধের সাধারণ নীতি নিয়ে বিতর্ক একই সঙ্গে ধর্মীয় ক্ষমতার বাস্তব প্রয়োগের প্রশ্ন। একদিকে বর্ণনাকারীরা নবীর নামে শাস্তির ঘোষণা সংরক্ষণ করছেন, অন্যদিকে আয়েশা সেই বক্তব্য সংশোধন করতে কোরআন ও ঘটনার আলাদা স্মৃতি হাজির করছেন। ধর্মীয় কর্তৃত্বের এই সংঘাত হাদিস সংকলনের নিজের ভেতরেই রয়ে গেছে।


জীবন্ত পোঁতা শিশু ও মায়ের শাস্তির বর্ণনা

জীবন্ত পোঁতা শিশুর শাস্তির প্রশ্নে ভুক্তভোগী এবং অপরাধীকে একই পরিণতির মধ্যে রাখার বর্ণনা রয়েছে। আবু দাউদের সংক্ষিপ্ত বাক্যে “ওয়াইদাহ” ও “মাওউদাহ”—জীবন্ত পুঁতে ফেলা নারী এবং জীবন্ত পোঁতা শিশু—উভয়কে আগুনে বলা হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত বাংলা পাঠে প্রথম ব্যক্তিকে “মা” বলা হয়েছে। সেই বাংলা পাঠের পূর্ণ প্রকাশনা-পরিচয়, হাদিস নম্বর, বর্ণনাকারী ও মানের উল্লেখ নিচে রয়েছে।

প্রকাশিত বাংলা পাঠ: সুনান আবু দাউদ
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৮. মুশরিকদের সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে।
৪৬৪২. ইব্‌রাহীম ইবন মূসা (রহঃ) ….. আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জীবন্ত প্রোথিত কন্যা এবং তার মা- উভয়ই জাহান্নামী।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ শা‘বী (রহঃ)
[1192]

আরবির “ওয়াইদাহ” শব্দে মাতৃত্ব নয়, পুঁতে ফেলার কাজটির কর্তা চিহ্নিত হয়। ফলে শব্দটির সরাসরি অর্থ পুঁতে ফেলা নারী; শুধু “মা” লেখা কাজের সম্পর্কের জায়গায় আত্মীয়তার পরিচয় বসায়। দীর্ঘ বর্ণনার নির্দিষ্ট ঘটনায় সেই নারী মা ছিলেন, কিন্তু সংক্ষিপ্ত শব্দটির অর্থ এবং ঘটনাটির পরিচয় এক করে দিলে অপরাধের কাজটি আড়াল হয়। আবু দাউদের আরবি বাক্যটি হলো: [1193]

الْوَائِدَةُ وَالْمَوْءُودَةُ فِي النَّارِ

বাংলা অনুবাদ: যে নারী জীবন্ত পুঁতে ফেলেছে এবং জীবন্ত পোঁতা শিশুটি—উভয়েই আগুনে।

সংক্ষিপ্ত বর্ণনার বিপরীতে তাকভিরের ৮–৯ আয়াতে জীবন্ত পোঁতা শিশুটিকে জিজ্ঞাসা করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যার শিকার শিশুর অপরাধহীনতা এবং হত্যাকারীর দায়ের প্রশ্ন এই ভাষায় সামনে আসে। একই নির্যাতনের ভুক্তভোগীকে পরে হত্যাকারীর সঙ্গে নরকের দণ্ডে যুক্ত করা হলে দায়ের নৈতিক বিন্যাস উল্টে যায়। [1194] [1195]

وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ
بِأَيِّ ذَنبٍ قُتِلَتْ

বাংলা অনুবাদ: আর যখন জীবন্ত পোঁতা শিশুকে জিজ্ঞাসা করা হবে—কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?

ইবন কাসিরের তাফসিরে প্রশ্নটিকে হত্যাকারীর প্রতি হুমকি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে: নির্যাতিতকেই যখন তার অপরাধের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে, নির্যাতনকারীর পরিণতি কী হবে। এই ব্যাখ্যায়ও শিশু ও হত্যাকারীর অবস্থান বিপরীত। যে কাজের জন্য শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রশ্ন উঠছে, তার দায় শিশুর নিজের ওপর প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি। হত্যাকারীর শাস্তির পাশাপাশি সেই শিশুরও নরকবাস ন্যায়সঙ্গত করার জন্য অতিরিক্ত কোনো দায় প্রতিষ্ঠা করতেই হয়।

ইসলামকিউএ মুসনাদ আহমদের একটি দীর্ঘ বর্ণনা উদ্ধৃত করেছে। সেখানে সালামাহ ইবন ইয়াজিদ ও তাঁর ভাই তাঁদের মা মুলায়কার ভালো কাজের উপকার হবে কি না জানতে চান। তারপর জানান, তাঁদের মা জাহেলি যুগে তাঁদের এক বোনকে জীবন্ত পুঁতেছিলেন। উত্তরে হত্যাকারী ও নিহত শিশুর নরকে থাকার একই বক্তব্য আসে; ইসলামে পৌঁছে ক্ষমা পাওয়ার ব্যতিক্রমটি শুধু পুঁতে ফেলা নারীর জন্য বলা হয়েছে। [1196]

انْطَلَقْتُ أَنَا وَأَخِي إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: قُلْنَا : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، إِنَّ أُمَّنَا مُلَيْكَةَ كَانَتْ تَصِلُ الرَّحِمَ ، وَتَقْرِي الضَّيْفَ ، وَتَفْعَلُ وَتَفْعَلُ ، هَلَكَتْ فِي الْجَاهِلِيَّةِ ، فَهَلْ ذَلِكَ نَافِعُهَا شَيْئًا؟ قَالَ : لَا قُلْنَا: فَإِنَّهَا كَانَتْ وَأَدَتْ أُخْتًا لَنَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ فَهَلْ ذَلِكَ نَافِعُهَا شَيْئًا؟ قَالَ: (الْوَائِدَةُ وَالْمَوْءُودَةُ فِي النَّارِ إِلَّا أَنْ تُدْرِكَ الْوَائِدَةُ الْإِسْلَامَ فَيَعْفُوَ اللَّهُ عَنْهَا

বাংলা অনুবাদ: আমি ও আমার ভাই আল্লাহর রাসুলের কাছে গেলাম। আমরা বললাম: হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের মা মুলায়কা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতেন, অতিথিকে আপ্যায়ন করতেন এবং আরও অনেক ভালো কাজ করতেন। তিনি জাহেলি যুগে মারা গেছেন; এগুলো কি তাঁর কোনো উপকার করবে? তিনি বললেন: না। আমরা বললাম: তিনি জাহেলি যুগে আমাদের এক বোনকে জীবন্ত পুঁতেছিলেন; এতে কি তার কোনো উপকার হবে? তিনি বললেন: যে নারী জীবন্ত পুঁতেছে এবং জীবন্ত পোঁতা শিশুটি আগুনে; তবে পুঁতে ফেলা নারী ইসলাম পেয়ে গেলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করতে পারেন।

এই দীর্ঘ ঘটনায় মায়ের পরিচয় নির্দিষ্ট এবং তাঁর নিজের অপরাধও নির্দিষ্ট: তিনি কন্যাটিকে জীবন্ত পুঁতেছেন। শিশুটির ক্ষেত্রে এমন কোনো নিজের কাজের বিবরণ নেই। একই বাক্যে হত্যাকারীর জন্য পরে ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে ক্ষমার পথ রাখা হয়েছে, কিন্তু নিহত শিশুটি সেই সুযোগ পাওয়ার আগেই প্রাণ হারিয়েছে। অপরাধীকে বেঁচে থাকলে ধর্মান্তরের সুযোগ দেওয়া এবং তার হাতে নিহত শিশুকে আগুনে রাখা—এই বণ্টনের নিষ্ঠুরতা একটি সাধারণ নৈতিক প্রশ্ন। শিশুর মৃত্যু তাকে ধর্মীয় আনুগত্য প্রকাশের ভবিষ্যৎ সুযোগ থেকেই বঞ্চিত করেছে।

আবু দাউদের এই পথকে আলবানি সহিহ বলেছেন; ইসলামকিউএ সেটিকে দুর্বল বলে দীর্ঘ ঘটনার ভিন্ন পথের আলোচনা করেছে। সূত্রগুলোর এই মান-নির্ধারণ একই নয়। দীর্ঘ বর্ণনাটিকেও ইসলামকিউএ বাদ দেয়নি; তার নির্দিষ্ট ঘটনাকে সামনে রেখেই অর্থ সীমিত করেছে। ফলে এখানে একটি সনদের মান উল্লেখ করে সমস্যাটি শেষ করা হচ্ছে না; সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত পাঠ এবং তাদের গ্রহণ করা ব্যাখ্যা—সবই ধর্মীয় সূত্রে উপস্থিত।

ইবন আবদিল বার এই হাদিসকে সাধারণ সব জীবন্ত পোঁতা শিশুর বিধান হিসেবে পড়ার পরিবর্তে প্রশ্ন করা হয়েছিল এমন নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে উত্তর হিসেবে ধরেছেন। কারণ হিসেবে তিনি অন্য বর্ণনাগুলোর সঙ্গে বিরোধের কথাও উল্লেখ করেছেন। ইসলামকিউএ তাঁর এই বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে। [1197]

وهو حديث صحيح من جهة الإسناد إلا أنه محتمل أن يكون خرج على جواب السائل في عين مقصودة ، فكانت الإشارة إليها والله أعلم ، وهذا أولى ما حمل عليه هذا الحديث لمعارضة الآثار له ، وعلى هذا يصح معناه ، والله المستعان

বাংলা অনুবাদ: এটি সনদের দিক থেকে সহিহ হাদিস। তবে এমন সম্ভাবনা আছে যে প্রশ্নকারীর উদ্দেশ্য করা নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে উত্তরে কথাটি বলা হয়েছিল; ফলে ইঙ্গিতটি তাদের দিকেই ছিল। আল্লাহ ভালো জানেন। অন্য বর্ণনাগুলোর সঙ্গে বিরোধের কারণে হাদিসটিকে এই অর্থে গ্রহণ করাই অগ্রাধিকারযোগ্য; এভাবে এর অর্থ সঙ্গত হয়। আল্লাহর সাহায্য কাম্য।

এই ব্যাখ্যায় সাধারণ ঘোষণার পরিসর ছোট করা হয়, কিন্তু নির্দিষ্ট শিশুটির শাস্তির প্রশ্ন দূর হয় না। সব শিশুকে নরকে বলা এবং একজন শিশুকে নরকে বলা সংখ্যাগতভাবে আলাদা; নিজের অপরাধ ছাড়াই একটি শিশুকে দণ্ড দেওয়ার নৈতিক সমস্যাটি একটি ঘটনার ক্ষেত্রেও সম্পূর্ণ থাকে। “বিশেষ ঘটনা” পরিচয় সেই শিশুর নিজের অপরাধের বিবরণ সরবরাহ করে না। ব্যাখ্যা এখানে সাধারণ ধর্মীয় বিধানের সংকট কমায়, অথচ ভুক্তভোগী ব্যক্তিটির ন্যায়বিচারের প্রশ্ন অমীমাংসিত রাখে।

ইবন কাসির একই তাফসিরে ইবন আব্বাসের নামে বিপরীত বক্তব্যও রেখেছেন: মুশরিকদের শিশুরা জান্নাতে, আর তারা আগুনে—এ কথা বলা মিথ্যা। সেখানে তাকভিরের এই আয়াতকেই ভিত্তি করা হয়েছে। একই তাফসিরে জীবন্ত পোঁতা শিশুর আগুনে থাকার বর্ণনা এবং শিশুর অপরাধহীনতা থেকে তার জান্নাতের সিদ্ধান্ত—দুটি অবস্থানই সংরক্ষিত। [1198]

قال ابن عباس أطفال المشركين في الجنة فمن زعم أنهم في النار فقد كذب يقول الله عز وجل ( وإذا الموءودة سئلت بأي ذنب قتلت ) قال ابن عباس هي المدفونة

বাংলা অনুবাদ: ইবন আব্বাস বলেছেন: মুশরিকদের শিশুরা জান্নাতে। যে দাবি করে তারা আগুনে, সে মিথ্যা বলেছে। আল্লাহ বলেছেন: “আর যখন জীবন্ত পোঁতা শিশুকে জিজ্ঞাসা করা হবে—কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?” ইবন আব্বাস বলেন: এটি পুঁতে রাখা শিশুটি।

বুখারির আরেক বর্ণনায় মুশরিকদের সন্তানদের বিষয়ে প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তাদের ভবিষ্যৎ কাজ সম্পর্কে বেশি জানেন বলা হয়েছে। এখানে তাদের প্রত্যেককে একসঙ্গে নরকবাসী ঘোষণা করা হয়নি। বর্ণিত উত্তর নির্দিষ্ট পরিণতি জানিয়ে দেওয়ার বদলে জ্ঞানকে আল্লাহর কাছে রেখেছে। [1199]

سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ أَوْلاَدِ الْمُشْرِكِينَ فَقَالَ ‏”‏ اللَّهُ إِذْ خَلَقَهُمْ أَعْلَمُ بِمَا كَانُوا عَامِلِينَ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর রাসুলকে মুশরিকদের সন্তানদের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলো। তিনি বললেন: আল্লাহ যখন তাদের সৃষ্টি করেছেন, তারা কী কাজ করত সে সম্পর্কে তিনিই বেশি জানেন।

সূত্র বা ব্যাখ্যাশিশুর পরিণতি সম্পর্কে বক্তব্যদায় ও ব্যাখ্যার প্রশ্ন
আবু দাউদ ৪৭১৭; আহমদের দীর্ঘ ঘটনাহত্যাকারী নারী ও নিহত শিশু আগুনেশিশুর নিজের কোন কাজের জন্য দণ্ড, তা ঘটনাটিতে নেই।
তাকভির ৮১:৮–৯শিশুকে কোন অপরাধে হত্যা করা হয়েছে, সেই প্রশ্নহত্যাকারীর দায় এবং ভুক্তভোগীর অবস্থান সামনে আসে।
ইবন আবদিল বারের সীমিত প্রয়োগনির্দিষ্ট ঘটনার নারী ও শিশুসাধারণ বিধানের পরিসর কমে; নির্দিষ্ট শিশুর শাস্তির নৈতিক প্রশ্ন থাকে।
ইবন আব্বাসের নামে সংরক্ষিত মন্তব্যমুশরিকদের শিশুরা জান্নাতেএকই আয়াত দিয়ে নরকের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান।
বুখারি ১৩৮৩তারা কী করত আল্লাহ বেশি জানেনব্যাপক একরূপ পরিণতির ঘোষণা অনুপস্থিত।

শিশুকে তার পিতামাতার ধর্মের পরিচয়ে বিচার করা ব্যক্তিগত দায়ের বিকল্প নয়। একটি শিশু নিজের ওপর আরোপিত ধর্মীয় পরিচয় বেছে নেয়নি, আর জীবন্ত পোঁতা শিশুটি ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচন করার সুযোগও পায়নি। হত্যার শিকার হওয়ার পরে তাকে আরও শাস্তি দেওয়া ভুক্তভোগীর ওপর দ্বিতীয় দণ্ড আরোপের ধারণা। সূত্রগুলোর মধ্যে ভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং সেগুলো সামলাতে বিশেষ ঘটনার ব্যাখ্যা—এই উভয় তথ্য সামনে রাখলেই বোঝা যায়, কেবল পবিত্রতার স্বীকৃতি থেকে দণ্ডের ন্যায়সংগততা পাওয়া যায় না।


কাজের বিনিময়ে জান্নাত ও কাজ দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ না করার হাদিস

কোরআনে জান্নাতে প্রবেশের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক বারবার স্থাপন করা হয়েছে। নাহল ১৬:৩২-এ ফেরেশতারা পবিত্র অবস্থায় মৃত্যু হওয়া ব্যক্তিদের অভিবাদন জানিয়ে বলে, তোমরা যে কাজ করতে তার কারণে জান্নাতে প্রবেশ করো। এখানে প্রবেশের নির্দেশের সঙ্গে অতীতের কাজ সরাসরি যুক্ত। [1200]

الَّذِينَ تَتَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ طَيِّبِينَ ۙ يَقُولُونَ سَلَامٌ عَلَيْكُمُ ادْخُلُوا الْجَنَّةَ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ

বাংলা অনুবাদ: ফেরেশতারা যাদের পবিত্র অবস্থায় মৃত্যু ঘটায়, তারা বলে: তোমাদের ওপর শান্তি; তোমরা যে কাজ করতে, তার কারণে জান্নাতে প্রবেশ করো।

যুখরুফ ৪৩:৭২-এ একই সম্পর্ক উত্তরাধিকার লাভের ভাষায় এসেছে: এই জান্নাত তোমাদের কাজের কারণে দেওয়া হয়েছে। ফলে পুরস্কারপ্রাপ্তির ঘোষণায় কাজের উল্লেখ একটি প্রকাশিত ভিত্তি। [1201]

وَتِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِي أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ

বাংলা অনুবাদ: আর এই জান্নাত, তোমরা যে কাজ করতে তার কারণে তোমাদের এর উত্তরাধিকারী করা হয়েছে।

আরাফ ৭:৪৩-এ আল্লাহর দেওয়া পথনির্দেশের প্রশংসা এবং কাজের কারণে জান্নাতের উত্তরাধিকার—দুটি বক্তব্য একই আয়াতে রয়েছে। শুরুতে জান্নাতবাসীরা বলেন, আল্লাহ পথ না দেখালে তাঁরা পথ পেতেন না; শেষে তাঁদের কাজের ভিত্তিতে জান্নাত লাভের ঘোষণা আসে। এই আয়াতের মধ্যেই পূর্বদত্ত পথনির্দেশ এবং মানুষের কাজের পরিণতি পাশাপাশি রাখা হয়েছে। [1202]

وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِم مِّنْ غِلٍّ تَجْرِي مِن تَحْتِهِمُ الْأَنْهَارُ ۖ وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي هَدَانَا لِهَٰذَا وَمَا كُنَّا لِنَهْتَدِيَ لَوْلَا أَنْ هَدَانَا اللَّهُ ۖ لَقَدْ جَاءَتْ رُسُلُ رَبِّنَا بِالْحَقِّ ۖ وَنُودُوا أَن تِلْكُمُ الْجَنَّةُ أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ

বাংলা অনুবাদ: আমরা তাদের অন্তর থেকে বিদ্বেষ দূর করব; তাদের নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত হবে। তারা বলবে: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের এখানে পৌঁছার পথ দেখিয়েছেন; আল্লাহ পথ না দেখালে আমরা পথ পেতাম না। আমাদের প্রতিপালকের রাসুলরা সত্য নিয়ে এসেছিলেন। তাদের ডেকে বলা হবে: এই জান্নাত, তোমরা যে কাজ করতে তার কারণে তোমাদের এর উত্তরাধিকারী করা হয়েছে।

বুখারির হাদিসে আবার বলা হয়েছে, কারও কাজ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে না। মুহাম্মদ নিজেকেও এর বাইরে রাখেননি; তাঁর জন্যও আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ার প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে। একই বর্ণনায় সঠিকভাবে ও যথাসাধ্য কাজ করার নির্দেশও রয়েছে। ফলে কাজ পরিত্যাগের আদেশ নয়, কাজের বিনিময়ে প্রবেশের অধিকার সম্পর্কে একটি অস্বীকৃতি সামনে আসে। [1203]

لَنْ يُدْخِلَ أَحَدًا عَمَلُهُ الْجَنَّةَ ‏”‏‏.‏ قَالُوا وَلاَ أَنْتَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ ‏”‏ لاَ، وَلاَ أَنَا إِلاَّ أَنْ يَتَغَمَّدَنِي اللَّهُ بِفَضْلٍ وَرَحْمَةٍ فَسَدِّدُوا وَقَارِبُوا وَلاَ يَتَمَنَّيَنَّ أَحَدُكُمُ الْمَوْتَ إِمَّا مُحْسِنًا فَلَعَلَّهُ أَنْ يَزْدَادَ خَيْرًا، وَإِمَّا مُسِيئًا فَلَعَلَّهُ أَنْ يَسْتَعْتِبَ

বাংলা অনুবাদ: কারও কাজ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে না। তারা বলল: আপনাকেও নয়, হে আল্লাহর রাসুল? তিনি বললেন: না, আমাকেও নয়; যদি না আল্লাহ আমাকে অনুগ্রহ ও দয়া দিয়ে আচ্ছাদিত করেন। অতএব সঠিকভাবে ও কাছাকাছি পৌঁছার চেষ্টা করে কাজ করো। তোমাদের কেউ মৃত্যু কামনা করবে না: সে ভালো কাজকারী হলে হয়তো আরও ভালো কাজ বাড়াতে পারবে; আর মন্দ কাজকারী হলে হয়তো সংশোধনের সুযোগ পাবে।

প্রবেশ এবং কাজের সম্পর্ক এক পাঠে প্রতিষ্ঠিত, অন্য পাঠে নাকচ করা হয়েছে—এই প্রকাশিত পার্থক্য মেলাতে ভাষ্যকাররা ভিন্ন অর্থ নির্ধারণ করেছেন। ইবন বাত্তালের ব্যাখ্যায় হাদিসের বিষয় জান্নাতে মূল প্রবেশ, আর আয়াতের বিষয় জান্নাতের ভেতর মর্যাদার স্তর। ইসলামকিউএ তাঁর এই ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করেছে। এতে আয়াতের “জান্নাত দেওয়া হয়েছে” বক্তব্যকে ভেতরের স্তর প্রাপ্তির দিকে নেওয়া হয়েছে। [1204]

أخبر النبي صلى الله عليه وسلم في الحديث أنه لا يستحق أحد دخول الجنة بعمله ، وإنما يدخلها العباد برحمة الله ، وأخبر الله تعالى في الآية أن الجنة تُنال المنازل فيها بالأعمال ، ومعلوم أن درجات العباد فيها متباينة على قدر تباين أعمالهم ، فمعنى الآية في ارتفاع الدرجات وانخفاضها والنعيم فيها ، ومعنى الحديث في الدخول في الجنة والخلود فيها ، فلا تعارض بين شيءٍ من ذلك .

বাংলা অনুবাদ: নবী হাদিসে জানিয়েছেন, কেউ নিজের কাজ দিয়ে জান্নাতে প্রবেশের অধিকারী হয় না; বান্দারা শুধু আল্লাহর দয়ায় তাতে প্রবেশ করে। আর আল্লাহ আয়াতে জানিয়েছেন, জান্নাতের ভেতরের অবস্থানগুলো কাজের মাধ্যমে পাওয়া যায়। সেখানে বান্দাদের স্তর কাজের পার্থক্য অনুযায়ী ভিন্ন—এটি জানা কথা। ফলে আয়াতের অর্থ স্তরের উচ্চতা, নিম্নতা ও সেখানকার নিয়ামত সম্পর্কে; হাদিসের অর্থ জান্নাতে প্রবেশ ও তাতে স্থায়ী হওয়া সম্পর্কে। এ দুটির মধ্যে তাই বিরোধ নেই।

নাহলের আয়াতে সরাসরি “প্রবেশ করো” শব্দ রয়েছে। সেই প্রকাশিত শব্দের সঙ্গে ইবন বাত্তালের প্রবেশ বনাম স্তরের বিভাজন যুক্ত করলে বোঝা যায়, সমন্বয়টি শুধু একই শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ বেছে নেওয়া নয়; কোন বক্তব্য কোন পুরস্কারের ধাপে প্রযোজ্য হবে, তার নতুন সীমা নির্ধারণ। প্রবেশের ঘোষণাকে স্তরের প্রসঙ্গে নিতে এবং হাদিসকে মূল প্রবেশে রাখতে দুটি পাঠের কাজ আলাদা করে দেওয়া হচ্ছে।

ইবন তাইমিয়্যা আরেক পদ্ধতি নিয়েছেন। তাঁর কাছে আয়াতের “বি” কারণ বোঝায়, আর হাদিসে অস্বীকৃত “বি” বিনিময়মূল্য বোঝায়। অর্থাৎ কাজ প্রবেশের কারণ, কিন্তু জান্নাত কেনার যথেষ্ট মূল্য নয়। একই অব্যয়ের দুই ব্যবহার নির্ধারণ করে তিনি কথাগুলো একসঙ্গে রেখেছেন। [1205]

فهذه باء السبب ، أي : بسبب أعمالكم ، والذي نفاه النبي صلى الله عليه وسلم : باء المقابلة ، كما يقال : اشتريت هذا بهذا ، أي : ليس العمل عوضاً وثمناً كافياً في دخول الجنة ، بل لا بد من عفو الله ، وفضله ، ورحمته ، فبعفوه : يمحو السيئات ، وبرحمته : يأتي بالخيرات ، وبفضله : يضاعف البركات .

বাংলা অনুবাদ: এটি কারণবাচক “বা”; অর্থাৎ তোমাদের কাজের কারণে। আর নবী যে “বা” অস্বীকার করেছেন, তা বিনিময়বাচক; যেমন বলা হয়, এটি দিয়ে ওটি কিনেছি। অর্থাৎ কাজ জান্নাতে প্রবেশের যথেষ্ট বিনিময় ও মূল্য নয়; বরং আল্লাহর ক্ষমা, অনুগ্রহ ও দয়া প্রয়োজন। তাঁর ক্ষমায় মন্দ কাজ মুছে যায়, তাঁর দয়ায় ভালো কাজ আসে এবং তাঁর অনুগ্রহে বরকত বহুগুণ হয়।

এই পাঠে কাজের কারণ হওয়া এবং যথেষ্ট মূল্য হওয়াকে পৃথক করা হয়েছে। কিন্তু “কারণ” ও “মূল্য”র এই কারিগরি বিভাজন দুটি মূল বাক্যে আলাদা ব্যাখ্যামূলক শব্দ হিসেবে লেখা নেই; একই “বি”র অর্থ প্রসঙ্গ ও সামঞ্জস্যের উদ্দেশ্যে নির্বাচিত হয়েছে। ইবন বাত্তাল যেখানে পুরস্কারের ধাপ ভাগ করেন, ইবন তাইমিয়্যা সেখানে কাজ ও পুরস্কারের সম্পর্ক ভাগ করেন। পদ্ধতি দুটি এক নয়।

ইবন হাজার আরও একটি সমন্বয় জানিয়েছেন: কাজ তখনই প্রবেশের জন্য কার্যকর হবে, যখন তা গ্রহণযোগ্য হবে; আর গ্রহণ করা আল্লাহর হাতে এবং তাঁর দয়ার মাধ্যমে হয়। ইসলামওয়েব তাঁর বক্তব্যটি উদ্ধৃত করেছে। এই ব্যাখ্যায় কাজের সঙ্গে তার গ্রহণের একটি পৃথক শর্ত সামনে আসে। [1206]

يظهر لي في الجمع بين الآية والحديث جواب آخر وهو أن يحمل الحديث على أن العمل من حيث هو عمل لا يستفيد به العامل دخول الجنة ما لم يكن مقبولا وإذا كان كذلك فأمر القبول إلى الله تعالى وإنما يحصل برحمة الله لمن يقبل منه وعلى هذا فمعنى قوله : {ادْخُلُوا الْجَنَّةَ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ} أي تعملونه من العمل المقبول.

বাংলা অনুবাদ: আয়াত ও হাদিসের সমন্বয়ে আমার কাছে আরেকটি উত্তর প্রকাশিত হয়: হাদিসকে এ অর্থে নেওয়া যায় যে, কাজ শুধু কাজ হওয়া দিয়ে কর্মকারী জান্নাতে প্রবেশের সুবিধা পায় না, যতক্ষণ তা গ্রহণযোগ্য না হয়। তা হলে গ্রহণের বিষয়টি আল্লাহর হাতে, আর যাঁর কাছ থেকে তিনি গ্রহণ করেন, তা শুধু তাঁর দয়ায় ঘটে। এ অনুসারে “তোমরা যে কাজ করতে তার কারণে জান্নাতে প্রবেশ করো”র অর্থ, তোমরা যে গ্রহণযোগ্য কাজ করতে।

ভাষ্যকারসমন্বয়ের পদ্ধতিঅর্থ নির্ধারণের অতিরিক্ত বিভাজন
ইবন বাত্তালপ্রবেশ বনাম জান্নাতের ভেতরের স্তরহাদিস মূল প্রবেশে, আয়াত মর্যাদার স্তরে প্রযোজ্য।
ইবন তাইমিয়্যাকারণ বনাম পর্যাপ্ত বিনিময়মূল্যকাজ কারণ; কাজ নিজে যথেষ্ট মূল্য নয়।
ইবন হাজারকাজ বনাম গৃহীত কাজকাজের ফল পেতে আল্লাহর গ্রহণের পৃথক শর্ত।

এই ব্যাখ্যাগুলোর ফল ধর্মীয় কর্তৃত্বের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। আয়াতের পুরস্কারের ঘোষণা থেকে কর্মকারী নিজের কাজের ভিত্তিতে ফল দাবি করার সরল অধিকার পায় না; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুগ্রহ, গ্রহণ বা স্তর নির্ধারণের অধীনে থাকে। বিশ্বাসীকে কাজ করতেই বলা হচ্ছে, অথচ কাজ সম্পন্ন করা এবং পুরস্কার নিশ্চিত হওয়া আলাদা করে দেওয়া হচ্ছে। এই কাঠামোয় ঘোষিত প্রতিফলের অর্থ নিয়ন্ত্রণ করেন ভাষ্যকার, আর চূড়ান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকে সেই আল্লাহর হাতে, যাঁর হয়ে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতিটি প্রচার করে।

একটি বক্তব্যকে অন্যটির পাশে রেখে পড়ার ফলে এই ব্যাখ্যাগত সিদ্ধান্তগুলো স্পষ্ট হয়। জান্নাতে প্রবেশের প্রকাশিত কাজ-সম্পর্ক এবং কাজ দিয়ে প্রবেশ না হওয়ার ঘোষণাকে এক অর্থে পড়া হচ্ছে না; তাদের শব্দের পরিসর, পুরস্কারের ধাপ অথবা গ্রহণের শর্ত বদলে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই স্বীকৃত সূত্রসমষ্টির অর্থ নির্ধারণে ভাষ্যকারদের এই বড় ভূমিকা পুরস্কারের সাধারণ ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবে ব্যবহৃত ধর্মতত্ত্বের ব্যবধান দেখায়।


ছয় দিনে সৃষ্টি ও মুসলিমের সাত দিনের সৃষ্টি-বিবরণ

কোরআনের সৃষ্টিবিবরণে ছয় দিনের সময়সীমা বহুবার এসেছে। আরাফ ৭:৫৪-এ আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির জন্য ছয় দিন বলা হয়েছে; এরপর আরশের ওপর অধিষ্ঠান, দিন–রাত এবং সূর্য–চাঁদ–নক্ষত্রের প্রসঙ্গ রয়েছে। সৃষ্টি ও আদেশের একচ্ছত্র অধিকারও একই আয়াতে আল্লাহর বলে ঘোষণা করা হয়েছে। [1207]

إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ يُغْشِي اللَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهُ حَثِيثًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتٍ بِأَمْرِهِ ۗ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ ۗ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ

বাংলা অনুবাদ: নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, যিনি আকাশসমূহ ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর আরশের ওপর অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তিনি রাত দিয়ে দিনকে ঢেকে দেন, যা দ্রুত তার অনুসরণ করে। সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্র তাঁর আদেশের অধীন। জেনে রাখো, সৃষ্টি ও আদেশ তাঁরই। বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ বরকতময়।

কাফ ৫০:৩৮-এ আকাশ, পৃথিবী এবং এদের মধ্যবর্তী সব কিছুর জন্যও একই ছয় দিন বলা হয়েছে। সঙ্গে ক্লান্তি না লাগার ঘোষণা রয়েছে। ফলে ছয় দিন শুধু কোনো একটি বস্তু তৈরির বিচ্ছিন্ন সময় হিসেবে নয়, বিস্তৃত সৃষ্টিকর্মের সময়সীমা হিসেবে উপস্থাপিত। [1208]

وَلَقَدْ خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَمَا مَسَّنَا مِن لُّغُوبٍ

বাংলা অনুবাদ: আমরা আকাশসমূহ, পৃথিবী এবং এদের মধ্যবর্তী সব কিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছি; আর আমাদের কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করেনি।

সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রার নামে সংরক্ষিত বিবরণে মাটি থেকে আদমের সৃষ্টি পর্যন্ত শনিবার থেকে শুক্রবারের দিনগুলো পরপর এসেছে। সেখানে আকাশ সৃষ্টির আলাদা তালিকা নেই; পৃথিবীর মাটি, পাহাড়, গাছ, অপছন্দনীয় বিষয়, আলো, জীবজন্তু এবং আদমের সৃষ্টি দিন ধরে বলা হয়েছে। বর্ণনাটি নিজের উৎস বোঝাতে মুহাম্মদের হাত ধরার ঘটনাও উল্লেখ করে। [1209]

قَالَ أَخَذَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِيَدِي فَقَالَ ‏”‏ خَلَقَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ التُّرْبَةَ يَوْمَ السَّبْتِ وَخَلَقَ فِيهَا الْجِبَالَ يَوْمَ الأَحَدِ وَخَلَقَ الشَّجَرَ يَوْمَ الاِثْنَيْنِ وَخَلَقَ الْمَكْرُوهَ يَوْمَ الثُّلاَثَاءِ وَخَلَقَ النُّورَ يَوْمَ الأَرْبِعَاءِ وَبَثَّ فِيهَا الدَّوَابَّ يَوْمَ الْخَمِيسِ وَخَلَقَ آدَمَ عَلَيْهِ السَّلاَمُ بَعْدَ الْعَصْرِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فِي آخِرِ الْخَلْقِ وَفِي آخِرِ سَاعَةٍ مِنْ سَاعَاتِ الْجُمُعَةِ فِيمَا بَيْنَ الْعَصْرِ إِلَى اللَّيْلِ

বাংলা অনুবাদ: তিনি বলেন: আল্লাহর রাসুল আমার হাত ধরে বললেন: আল্লাহ শনিবার মাটি সৃষ্টি করেছেন; রবিবার তাতে পাহাড় সৃষ্টি করেছেন; সোমবার গাছ সৃষ্টি করেছেন; মঙ্গলবার অপছন্দনীয় বস্তু সৃষ্টি করেছেন; বুধবার আলো সৃষ্টি করেছেন; বৃহস্পতিবার তাতে জীবজন্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন; এবং শুক্রবার আসরের পরে আদমকে সৃষ্টি করেছেন—সৃষ্টির শেষে, শুক্রবারের শেষ সময়ের এক সময়ে, আসর থেকে রাতের মধ্যবর্তী সময়ে।

সপ্তাহের দিনমুসলিমের বর্ণনায় সৃষ্ট বিষয়
শনিবারমাটি
রবিবারপাহাড়
সোমবারগাছ
মঙ্গলবারঅপছন্দনীয় বস্তু
বুধবারআলো
বৃহস্পতিবারজীবজন্তু
শুক্রবারআসরের পরে আদম

শনিবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত দিন সাতটি। কোরআনের আকাশ–পৃথিবী–মধ্যবর্তী সব কিছুর ছয় দিনের ঘোষণার পাশে পৃথিবীর বস্তু ও জীবনের এই সাত দিনের ক্রম রাখলে সৃষ্টিকালের হিসাব এবং পরিসরের পার্থক্য সামনে আসে। হাদিসের পাঠে শুধু “সাত দিন” শব্দটি খোঁজার প্রয়োজন নেই; পরপর উল্লিখিত দিনগুলোই সংখ্যাটি নির্ধারণ করে। আকাশের বিবরণ অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও পৃথিবী ও তার সৃষ্টির তালিকা মোট ছয় দিনের সীমা ছাড়িয়েছে—ধ্রুপদি সমালোচকেরাও এই জায়গাটিই ধরেছেন।

ইবন কাসির আলি ইবন মাদিনি, বুখারি ও বায়হাকিসহ কয়েকজনের সমালোচনা উল্লেখ করেছেন। তাঁর উদ্ধৃত বুখারির সিদ্ধান্তে কথাটিকে কাব আল-আহবার থেকে বর্ণনা করাই অধিক সঠিক। ইবন কাসিরের ব্যাখ্যায় বর্ণনাকারীর ভুলে কাবের বক্তব্য নবীর নামে উঠেছে এবং “তিনি আমার হাত ধরলেন” অংশ দিয়ে সেই সম্পর্ক আরও জোর দেওয়া হয়েছে। ইসলামওয়েব তাঁর এই আলোচনা উদ্ধৃত করেছে। [1210]

اختلف فيه على ابن جريج، وقد تكلم في هذا الحديث علي بن المديني، والبخاري، والبيهقي وغيرهم من الحفاظ، قال البخاري في (التاريخ): وقال بعضهم عن كعب وهو أصح. يعني أن هذا الحديث مما سمعه أبو هريرة وتلقاه من كعب الأحبار، فإنهما كان يصطحبان ويتجالسان للحديث، فهذا يحدثه عن صحفه وهذا يحدثه بما يصدقه عن النبي صلى الله عليه وسلم، فكان هذا الحديث مما تلقاه أبو هريرة عن كعب عن صحفه، فوهم بعض الرواة فجعله مرفوعا إلى النبي صلى الله عليه وسلم، وأكد رفعه بقوله: أخذ رسول الله صلى الله عليه و سلم بيدي. ثم في متنه غرابة شديدة فمن ذلك أنه ليس فيه ذكر خلق السموات، وفيه ذكر خلق الأرض وما فيها في سبعة أيام، وهذا خلاف القرآن؛ لأن الأرض خلقت في أربعة أيام ثم خلقت السماوات في يومين .. اهـ.

বাংলা অনুবাদ: ইবন জুরাইজের কাছ থেকে এর বর্ণনায় মতভেদ হয়েছে। আলি ইবন মাদিনি, বুখারি, বায়হাকি এবং অন্য হাফিজরা হাদিসটি নিয়ে সমালোচনা করেছেন। বুখারি তাঁর ইতিহাসে বলেছেন: কেউ কেউ এটি কাব থেকে বলেছেন, আর সেটিই অধিক সঠিক। অর্থাৎ আবু হুরায়রা কাব আল-আহবারের কাছ থেকে এটি শুনেছিলেন ও গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা একসঙ্গে থাকতেন এবং হাদিস আলোচনায় বসতেন; একজন তাঁর পুস্তিকা থেকে বলতেন, অন্যজন নবীর কাছ থেকে তার সমর্থক কথা বলতেন। এই হাদিসটি আবু হুরায়রা কাবের পুস্তিকা থেকে গ্রহণ করেছিলেন; কোনো বর্ণনাকারী ভুল করে সেটিকে নবীর নামে বর্ণনা করেছেন এবং “আল্লাহর রাসুল আমার হাত ধরলেন” বলে নবীর সঙ্গে যুক্ত করার কথাটি জোর দিয়েছেন। তারপর এর মূল বক্তব্যেও প্রবল অস্বাভাবিকতা রয়েছে: এতে আকাশ সৃষ্টির উল্লেখ নেই, অথচ পৃথিবী ও তার মধ্যে থাকা বস্তু সাত দিনে সৃষ্টির কথা আছে। এটি কোরআনের বিপরীত; কারণ পৃথিবী চার দিনে এবং তারপর আকাশসমূহ দুই দিনে সৃষ্টি হয়েছে।

এ সমালোচনার বিষয় শুধু দিন গণনা নয়, কথার উৎস নির্ধারণও। মুসলিম যে কথাকে নবীর বক্তব্য হিসেবে সংকলিত করেছেন, বুখারির উদ্ধৃত মত এবং ইবন কাসিরের বিশ্লেষণ তাকে অন্য ব্যক্তির পুস্তকীয় উপাদান হিসেবে শনাক্ত করছে। হাত ধরার ব্যক্তিগত স্মৃতির মতো দৃশ্যমান বিবরণও সেই উৎস-সংশয় দূর করতে পারেনি। অর্থাৎ বর্ণনার মধ্যে প্রত্যক্ষতার জোরালো দাবি থাকা এবং সেই দাবি ঐতিহাসিকভাবে সঠিক হওয়া এক নয়।

ইবন তাইমিয়্যাও শনিবার থেকে শুক্রবারের ক্রমকে সাত দিন হিসেবে গণনা করে কোরআনের সঙ্গে বিরোধের কথা বলেছেন। তাঁর আলোচনায় বর্ণনাকারীর ভুল শনাক্ত করার অন্য কারণও উল্লেখ আছে; শুধু বাইরে থেকে সংখ্যা নিয়ে আপত্তির ঘটনাই এখানে নেই। [1211]

ولو كان أول الخلق يوم السبت وآخره يوم الجمعة لكان قد خلق في الأيام السبعة، وهو خلاف ما أخبر به القرآن

বাংলা অনুবাদ: সৃষ্টির শুরু শনিবার এবং শেষ শুক্রবার হলে সৃষ্টি সাত দিনে সম্পন্ন হতো; এটি কোরআন যা জানিয়েছে তার বিপরীত।

এই হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও আলেমদের সিদ্ধান্ত এক হয়নি। ইসলামওয়েবের আরেক ফতোয়ায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, আলবানি হাদিসটি সহিহ বলেছেন এবং যাঁরা দুর্বল বলেছেন তাঁদের জবাব দিয়েছেন। ফলে “সহিহ মুসলিমে আছে” এবং “সব সমালোচক গ্রহণ করেছেন”—দুটি দাবি এক করা যায় না; আবার সমালোচনার অস্তিত্বকে সর্বসম্মত প্রত্যাখ্যানও বলা যায় না। গ্রহণ ও বর্জনের এই মতভেদ সূত্রেই নথিভুক্ত। [1212]

ورد على من ضعف حديث خلق الله التربة يوم السبت

বাংলা অনুবাদ: আর “আল্লাহ শনিবার মাটি সৃষ্টি করেছেন” হাদিসটিকে যাঁরা দুর্বল বলেছেন, তাঁদের জবাব দিয়েছেন।

এই বিরোধে ছয় দিনের কোরআনিক ঘোষণাকে একটি যাচাইয়ের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। হাদিসের সনদ ও মর্যাদার পাশাপাশি তার বিষয়বস্তুর সময়ক্রম পরীক্ষা করা হয়েছে। ফলে স্বীকৃত সংকলনের নাম নিজে সব বিবরণকে একরূপ ও অসংশয় করে দেয়নি। কোনটিকে নবীর বক্তব্য, কোনটিকে পূর্ববর্তী পুস্তকীয় তথ্য এবং কোনটিকে বর্ণনাকারীর ভুল বলা হবে—সেই সিদ্ধান্তও পরবর্তী জ্ঞানচর্চায় নির্ধারিত হয়েছে।

ধর্মীয় সূত্রসমষ্টি এক নির্ভুল উৎস থেকে এসেছে বলে দাবি করার পরে এই উৎস নির্ধারণের কাজের প্রয়োজন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একজন সংকলক গ্রহণ করেছেন, আরেকজন বর্ণনার মূল উৎস নিয়ে আপত্তি তুলেছেন, পরবর্তী ভাষ্যকার কোরআনের সঙ্গে বিরোধ দেখিয়ে সেই আপত্তি সমর্থন করেছেন, এবং আরও পরের সমালোচক আবার হাদিসটিকেই গ্রহণ করেছেন। গ্রন্থগুলোর কর্তৃত্ব বাস্তবে এই মানবীয় নির্বাচন ও মতভেদের মধ্য দিয়ে কাজ করেছে। সৃষ্টিকালের সাত দিনের পাঠটি তাই শুধু অঙ্কের অসামঞ্জস্য নয়; ধর্মীয় সত্য হিসেবে প্রচারিত কথার উৎস ও স্বীকৃতি কতখানি বিচারনির্ভর, তারও একটি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত।


মেরাজে পঞ্চাশ থেকে পাঁচ নামাজ: পূর্বজ্ঞান, পরামর্শ ও নির্দেশ পরিবর্তন

মেরাজে নামাজের সংখ্যা নির্ধারণের বর্ণনায় প্রথম নির্দেশ, মানুষের সামর্থ্য সম্পর্কে পরামর্শ এবং পরে নির্দেশ কমানোর একটি ধারাবাহিক ঘটনা রয়েছে। সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় প্রথমে প্রতি দিন ও রাতে পঞ্চাশ নামাজ ফরজ করা হয়। মুসা তাঁর বনি ইসরাইল-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলেন, মুহাম্মদের অনুসারীরা তা পারবে না। তাঁর পরামর্শে মুহাম্মদ ফিরে গিয়ে কমানোর আবেদন করেন। একই সম্পর্ক একাধিকবার ঘটে এবং শেষে সংখ্যা পাঁচ হয়। [1213]

فَأَوْحَى اللَّهُ إِلَىَّ مَا أَوْحَى فَفَرَضَ عَلَىَّ خَمْسِينَ صَلاَةً فِي كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ فَنَزَلْتُ إِلَى مُوسَى صلى الله عليه وسلم فَقَالَ مَا فَرَضَ رَبُّكَ عَلَى أُمَّتِكَ قُلْتُ خَمْسِينَ صَلاَةً ‏.‏ قَالَ ارْجِعْ إِلَى رَبِّكَ فَاسْأَلْهُ التَّخْفِيفَ فَإِنَّ أُمَّتَكَ لاَ يُطِيقُونَ ذَلِكَ فَإِنِّي قَدْ بَلَوْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَخَبَرْتُهُمْ ‏.‏ قَالَ فَرَجَعْتُ إِلَى رَبِّي فَقُلْتُ يَا رَبِّ خَفِّفْ عَلَى أُمَّتِي ‏.‏ فَحَطَّ عَنِّي خَمْسًا فَرَجَعْتُ إِلَى مُوسَى فَقُلْتُ حَطَّ عَنِّي خَمْسًا ‏.‏ قَالَ إِنَّ أُمَّتَكَ لاَ يُطِيقُونَ ذَلِكَ فَارْجِعْ إِلَى رَبِّكَ فَاسْأَلْهُ التَّخْفِيفَ ‏.‏ – قَالَ – فَلَمْ أَزَلْ أَرْجِعُ بَيْنَ رَبِّي تَبَارَكَ وَتَعَالَى وَبَيْنَ مُوسَى – عَلَيْهِ السَّلاَمُ – حَتَّى قَالَ يَا مُحَمَّدُ إِنَّهُنَّ خَمْسُ صَلَوَاتٍ كُلَّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ لِكُلِّ صَلاَةٍ عَشْرٌ فَذَلِكَ خَمْسُونَ صَلاَةً ‏.‏ وَمَنْ هَمَّ بِحَسَنَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كُتِبَتْ لَهُ حَسَنَةً فَإِنْ عَمِلَهَا كُتِبَتْ لَهُ عَشْرًا وَمَنْ هَمَّ بِسَيِّئَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا لَمْ تُكْتَبْ شَيْئًا فَإِنْ عَمِلَهَا كُتِبَتْ سَيِّئَةً وَاحِدَةً – قَالَ – فَنَزَلْتُ حَتَّى انْتَهَيْتُ إِلَى مُوسَى صلى الله عليه وسلم فَأَخْبَرْتُهُ فَقَالَ ارْجِعْ إِلَى رَبِّكَ فَاسْأَلْهُ التَّخْفِيفَ ‏.‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقُلْتُ قَدْ رَجَعْتُ إِلَى رَبِّي حَتَّى اسْتَحْيَيْتُ مِنْهُ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ আমার প্রতি যা ওহি করার তা করলেন এবং প্রতি দিন ও রাতে আমার ওপর পঞ্চাশ নামাজ ফরজ করলেন। আমি মুসার কাছে নেমে এলাম। তিনি বললেন: তোমার প্রতিপালক তোমার অনুসারীদের ওপর কী ফরজ করেছেন? আমি বললাম: পঞ্চাশ নামাজ। তিনি বললেন: তোমার প্রতিপালকের কাছে ফিরে যাও এবং কমাতে বলো; তোমার অনুসারীরা তা পারবে না। আমি বনি ইসরাইলকে পরীক্ষা করে তাদের অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। আমি আমার প্রতিপালকের কাছে ফিরে গিয়ে বললাম: হে আমার প্রতিপালক, আমার অনুসারীদের জন্য কমিয়ে দিন। তিনি আমার জন্য পাঁচ কমালেন। আমি মুসার কাছে ফিরে এসে বললাম: তিনি আমার জন্য পাঁচ কমিয়েছেন। তিনি বললেন: তোমার অনুসারীরা তা পারবে না; তোমার প্রতিপালকের কাছে ফিরে গিয়ে কমাতে বলো। এভাবে আমি আমার প্রতিপালক এবং মুসার মধ্যে ফিরে যেতে থাকলাম, যতক্ষণ না তিনি বললেন: হে মুহাম্মদ, প্রতি দিন ও রাতে এগুলো পাঁচ নামাজ; প্রত্যেক নামাজের জন্য দশ, ফলে তা পঞ্চাশ নামাজ। যে ভালো কাজের সংকল্প করে কিন্তু করে না, তার জন্য একটি ভালো কাজ লেখা হয়; করে ফেললে দশ লেখা হয়। আর যে মন্দ কাজের সংকল্প করে কিন্তু করে না, তার জন্য কিছু লেখা হয় না; করে ফেললে একটি মন্দ কাজ লেখা হয়। আমি নেমে মুসার কাছে পৌঁছে তাঁকে জানালাম। তিনি বললেন: তোমার প্রতিপালকের কাছে ফিরে গিয়ে কমাতে বলো। আল্লাহর রাসুল বললেন: আমি বললাম, আমি আমার প্রতিপালকের কাছে এতবার ফিরেছি যে তাঁর কাছে লজ্জা পেয়েছি।

এই কাহিনির কার্যকারণ নির্দিষ্ট। বিধান আসে আল্লাহর কাছ থেকে; অনুসারীদের সামর্থ্য নিয়ে বাস্তব আপত্তি আসে মুসার অভিজ্ঞতা থেকে; আবেদন বহন করেন মুহাম্মদ; কমানোর সিদ্ধান্ত আবার আল্লাহ দেন। প্রথম পঞ্চাশ নামাজের নির্দেশের পরে যে পরামর্শের মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটে, তা কোনো নতুন মানবীয় পরিস্থিতির উদ্ভব নয়। একই রাতের মধ্যে একই অনুসারীদের সামর্থ্য সম্পর্কে আলোচনা চলছে। বিধানের প্রাপকসমাজ বদলায়নি; আলোচনায় তাদের সামর্থ্যের সীমা নতুনভাবে সামনে আনা হয়েছে।

পর্যায়ঘটনাটিতে কার্যকর ভূমিকাপরের ফল
প্রথম নির্দেশআল্লাহ প্রতি দিন ও রাতে পঞ্চাশ নামাজ নির্ধারণ করেনমুহাম্মদ সেই নির্দেশ নিয়ে নামেন।
সামর্থ্যের আপত্তিমুসা নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলে অক্ষমতার পূর্বাভাস দেনমুহাম্মদ ফিরে গিয়ে কমানোর আবেদন করেন।
পুনর্বিবেচনাআল্লাহ সংখ্যা কমান; মুসা আবারও আবেদন করতে বলেনফিরে যাওয়া ও কমানোর প্রক্রিয়া চলতে থাকে।
পাঁচ নামাজের পর্যায়আল্লাহ পাঁচটিকে পুরস্কারে পঞ্চাশ বলেনমুসা পাঁচের ক্ষেত্রেও আরও কমানোর পরামর্শ দেন।
আবেদন বন্ধমুহাম্মদ লজ্জার কথা জানানপাঁচের পরে আর আবেদন করেন না।

পাঁচে এসে থামার বর্ণিত কারণ অনুসারীদের সামর্থ্য সম্পর্কে নতুন পরীক্ষা নয়; মুহাম্মদের লজ্জা। মুসা তখনও আরও কমানোর কথা বলেছেন। ফলে এই গল্পের নিজের ভেতরে “পাঁচই মানুষের পক্ষে সম্ভব সর্বনিম্ন বা নির্ভুলভাবে নির্ধারিত সংখ্যা”—এমন পরিমাপ উপস্থিত নেই। সমাপ্তি ঘটেছে আবেদনের সীমায়, সামর্থ্যের নতুন তথ্য দিয়ে নয়। প্রথম সংখ্যা ও শেষ সংখ্যার মধ্যে তাই পরামর্শ, অনুরোধ এবং ব্যক্তিগত সংকোচের ভূমিকা স্পষ্টভাবে রাখা হয়েছে।

বুখারি ৩৪৯-এর নামাজ কমানোর পূর্ণ প্রাসঙ্গিক বর্ণনা রয়েছে ওহি পাওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতির আলোচনায়। সেখানে কমানোর পর্যায়ে “শাতরাহা” শব্দ এসেছে; শব্দটি অংশ বা অর্ধাংশের অর্থে ব্যবহৃত হয়। মুসলিমের প্রথম পর্যায়ের স্পষ্ট “পাঁচ কমানো”র ভাষার সঙ্গে এর প্রকাশ এক নয়। বুখারির বর্ণনার সমাপ্তিতে পঞ্চাশ থেকে পাঁচ হওয়ার পরে বক্তব্য অপরিবর্তিত থাকার এই ঘোষণা এসেছে: [1214]

هِيَ خَمْسٌ وَهْىَ خَمْسُونَ، لاَ يُبَدَّلُ الْقَوْلُ لَدَىَّ

বাংলা অনুবাদ: এটি পাঁচ এবং এটিই পঞ্চাশ; আমার কাছে বক্তব্য বদলানো হয় না।

কাজের সংখ্যা এবং পুরস্কারের সংখ্যা এখানে পৃথক। পাঁচটি নামাজের প্রতিটির জন্য দশগুণ পুরস্কার বললে মোট পুরস্কার পঞ্চাশ হয়; এতে বাস্তবে সম্পাদন করতে বলা কাজের সংখ্যা পাঁচই থাকে। প্রথম নির্দেশের পঞ্চাশটি কাজ এবং শেষ নির্দেশের পাঁচটি কাজের পার্থক্য পঁয়তাল্লিশ—দৈনিক চাহিদা নব্বই শতাংশ কমেছে। পুরস্কার অপরিবর্তিত বলা এই কর্তব্যসংখ্যার বাস্তব পরিবর্তন মুছে দেয় না।

বিষয়প্রথম ঘোষণাশেষ ঘোষণা
প্রতিদিন সম্পাদনীয় নামাজপঞ্চাশপাঁচ
কর্তব্যের সংখ্যার পরিবর্তনপঞ্চাশ থেকে শুরুপঁয়তাল্লিশ কম; প্রথম সংখ্যার দশ ভাগের এক ভাগ
পুরস্কারের হিসাবপঞ্চাশ নামাজের প্রাথমিক নির্দেশপাঁচটির প্রতিটির জন্য দশ; মোট পঞ্চাশ
সমাপ্তির ভাষাসংখ্যা কমানোর আবেদন চলছিল“আমার কাছে বক্তব্য বদলানো হয় না” ঘোষণা

সর্বজ্ঞ বিধানদাতার দাবির সঙ্গে প্রথমে সামর্থ্যের অতিরিক্ত সংখ্যা নির্ধারণ এবং পরে অভিজ্ঞতাভিত্তিক পরামর্শে তা কমানোর সম্পর্ক একটি মূল প্রশ্ন। মানুষের সামর্থ্যসীমার সঙ্গে দায়িত্বের সম্পর্ক রয়েছে বাকারা ২:২৮৬-এর পূর্ণ পাঠের আলোচনায়। মেরাজের গল্পে মুসাই বারবার সেই সীমার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। অনুসারীদের সামর্থ্য সম্পর্কে আগে থেকেই সম্পূর্ণ জ্ঞান থাকলে শুরুতে এত বড় সংখ্যা এবং পরে ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের এই প্রক্রিয়া কেন প্রয়োজন হলো—কাহিনির ঘোষিত প্রজ্ঞা ও কার্যপদ্ধতির মধ্যে টানাপোড়েন সেখানেই।

খাত্তাবির নামে উদ্ধৃত ব্যাখ্যায় পুনরায় আবেদন ঘটেছে বলেই প্রথম নির্দেশকে চূড়ান্তভাবে বাধ্যতামূলক ছিল না বলে ধরা হয়েছে। ইসলামওয়েব মিরকাতের মাধ্যমে তাঁর এই বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে। বর্ণনায় “ফরজ করেছেন” বলা হলেও ব্যাখ্যায় সেই ফরজের বাধ্যতামূলকতার মাত্রা পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। [1215]

فَصُدُورُ الْمُرَاجِعَةِ دَلِيلٌ عَلَى أَنَّ ذَلِكَ غَيْرُ وَاجِبٍ قَطْعًا، لِأَنَّ مَا كَانَ وَاجِبًا قَطْعًا لَا يَقْبَلُ التَّخْفِيفَ.

বাংলা অনুবাদ: পুনরায় আবেদন করার ঘটনাই প্রমাণ যে সেটি চূড়ান্তভাবে বাধ্যতামূলক ছিল না; কারণ যা চূড়ান্তভাবে বাধ্যতামূলক, তা কমানো গ্রহণ করে না।

এই যুক্তিতে ঘটনার ফল থেকেই আগের নির্দেশের প্রকৃতি নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম নির্দেশ কতখানি বাধ্যতামূলক ছিল, তার স্বাধীন ঘোষণার পরিবর্তে পরের আবেদন ও হ্রাসকে তার প্রমাণ করা হচ্ছে। পরে কী ঘটেছে, তা দিয়ে আগে কী বোঝানো হয়েছিল নির্ধারণের এই পদ্ধতি প্রাথমিক “ফরজ” শব্দটিকে নিজের সাধারণ শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে দেয় না। গল্পের সামঞ্জস্য রক্ষার জন্য শব্দের কার্যকর পরিসর বদলানো হয়েছে।

মিরকাতের পরের আলোচনায় আবার বলা হয়েছে, পুনরায় আবেদন করা সন্তুষ্টি ও আত্মসমর্পণের বিরোধী নয়; রোগ–বিপদ দূর করা, রিজিক বা বিজয় চাওয়ার দোয়ার মতোই এ আবেদন। এই ব্যাখ্যার বিষয় প্রথম নির্দেশের বাধ্যতামূলকতার মাত্রা নয়, আবেদন করার আনুগত্যগত বৈধতা। ফলে সমন্বয়ের যুক্তির কেন্দ্রও বদলে গেছে। [1216]

ولا يخفى أن المراجعة غير نافية للرضا والتسليم وإلا لما رَضِيَ بِهَا مُوسَى وَنَبِيُّنَا عَلَيْهِمَا أَفْضَلُ الصَّلَاةِ وَأَكْمَلُ التَّسْلِيمِ، وَتَوْضِيحُهُ؛ أَنَّ سُؤَالَ الْعَافِيَةِ وَدَفْعِ الْبَلَاءِ وَطَلَبَ الرِّزْقِ وَدُعَاءَ النَّصْرِ عَلَى الْأَعْدَاءِ، وَأَمْثَالَ ذَلِكَ كَمَا صَدَرَ مِنَ الْأَنْبِيَاءِ وَالْأَوْلِيَاءِ لَا يُنَافِي الرِّضَا بِالْقَضَاءِ أَبَدًا، وَلَا التَّسْلِيمَ لِمَا فِي الْأَزَلِ أَبَدًا.

বাংলা অনুবাদ: পুনরায় আবেদন করা সন্তুষ্টি ও আত্মসমর্পণ নাকচ করে না; তা হলে মুসা ও আমাদের নবী এতে সম্মত হতেন না—তাঁদের ওপর উত্তম রহমত ও পরিপূর্ণ শান্তি বর্ষিত হোক। এর ব্যাখ্যা হলো: সুস্থতা চাওয়া, বিপদ দূর করার আবেদন, রিজিক চাওয়া এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে বিজয়ের দোয়া—নবী ও ওলিদের কাছ থেকে এ ধরনের যেসব কাজ এসেছে, সেগুলো কখনো নির্ধারিত ফয়সালায় সন্তুষ্টি এবং অনাদি নির্ধারণের প্রতি আত্মসমর্পণের বিরোধিতা করে না।

আবেদন আনুগত্যের মধ্যে করা যায়—এ সিদ্ধান্ত প্রথমে পঞ্চাশটি কর্তব্য কেন নির্ধারিত হলো, তার আলাদা উত্তর নয়। একই অনুসারীদের একই সামর্থ্যের জন্য শেষে পাঁচ যথেষ্ট এবং পুরস্কার পঞ্চাশ হতে পারলে শুরু থেকেই সেই ব্যবস্থাটি দেওয়ার প্রশ্ন থাকে। গল্পটি বরং অনুগ্রহকে এক বড় বোঝা থেকে ক্রমে ছাড় দেওয়ার আকারে প্রকাশ করে। প্রথমে উচ্চ কর্তব্য স্থাপন, তারপর মধ্যস্থতা, তারপর ছাড়—এই ধারাই শেষের পাঁচটিকে পাওয়া দয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

এই নির্মাণে মুসার অভিজ্ঞতা, মুহাম্মদের অনুসারীদের জন্য আবেদন এবং আল্লাহর ছাড়—তিনটি ভূমিকা একসঙ্গে মর্যাদা পায়। কিন্তু কর্তব্যের পরিবর্তনকে পুরস্কারের অপরিবর্তনের ভাষায় ঢেকে ফেললে কার্যকর বিধানের ইতিহাস হারিয়ে যায়। একই বর্ণনায় সংখ্যার বড় পরিবর্তন এবং “বক্তব্য বদলায় না” ঘোষণা পাশাপাশি রয়েছে; ধর্মীয় ভাষ্য তাদের সম্পর্ক স্থাপন করতে কাজ, পুরস্কার, বাধ্যতামূলকতা ও আনুগত্যকে আলাদা অর্থে ভাগ করেছে। পবিত্র ঘোষণার স্বীকৃতি সেই পরিবর্তনকে বাতিল করে না; পরিবর্তনের ব্যাখ্যা কে নির্ধারণ করছে, সেই কর্তৃত্বের প্রশ্নকেই সামনে আনে।


শাশ্বত বাণী, লাওহে মাহফুজ ও পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনার দাবি

কোরআনের পার্থিব ইতিহাসে লেখক, আবৃত্তিকার, সংগ্রাহক ও শাসকেরা দৃশ্যমান। তাঁদের হাতেই কোনো পাঠ লেখা হয়েছে, কোনো পাঠের অনুমোদন এসেছে, কোনো নকল বাতিল হয়েছে এবং কোনো বিধানের কার্যকারিতা বদলেছে। শাশ্বত বাণী ও পূর্বলিখিত পরিকল্পনার ধর্মতত্ত্ব এই ইতিহাসের ওপর আরেকটি দাবি বসায়: মানুষের কাছে প্রকাশ পাওয়ার বহু আগে বাণী ও ঘটনাপ্রবাহ আল্লাহর কাছে নির্ধারিত ছিল। এখানে মুখোমুখি হয় বাণীর উৎপত্তি, বাণীর পূর্বলিখন এবং মানুষের কাছে তার পরিবর্তনশীল উপস্থিতি। একটি অদৃশ্য উৎসকে অপরিবর্তনীয় বললেই দৃশ্যমান পাঠের প্রতিটি পর্যায় অভিন্ন হয়ে যায় না।

এই ধর্মতত্ত্বের রাজনৈতিক মূল্যও ছিল। কোরআন সৃষ্ট কি না, এই প্রশ্নের উত্তর একসময় বিচারকের চাকরি, আলেমের শিক্ষাদানের অধিকার এবং মানুষের জীবন নির্ধারণ করেছে। আবার সমগ্র ঘটনাপ্রবাহকে আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা বললে মানুষের আপত্তি, সংশোধনের অনুরোধ, অবিশ্বাস এবং পাঠ বাছাইয়ের সিদ্ধান্তও সেই পরিকল্পনার মধ্যে পড়ে। পূর্বপরিকল্পনা দিয়ে পরিবর্তন ব্যাখ্যা করা যায়; ঘটেছে এমন পরিবর্তনকে অঘটিত করে দেওয়া যায় না।


কোরআন সৃষ্ট নাকি অনাদি গুণ: মতভেদ ও মিহনা

কোরআনকে “আল্লাহর বাণী” বলা এবং সেই বাণীর অস্তিত্ব কী ধরনের, তা নির্ধারণ করা দুটি পৃথক সিদ্ধান্ত। মুতাযিলি মত অনুযায়ী আল্লাহ বাণী সৃষ্টি করেন; সেই অর্থে কোরআন তাঁর সৃষ্ট বাণী। অসৃষ্ট কালামের মত অনুযায়ী বাণী তাঁর গুণ, সৃষ্ট জগতের কোনো বস্তু নয়। আবার অসৃষ্ট কালামের প্রবক্তাদের মধ্যেও অনাদি গুণ, নির্দিষ্ট সময়ে কথন এবং মানুষের মুখে উচ্চারিত আরবি বাক্যের সম্পর্ক নিয়ে মতভেদ রয়েছে। “আল্লাহর বাণী” এই সাধারণ পরিচয়ের নিচে বাণীর প্রকৃতি সম্পর্কে পরস্পরভিন্ন তত্ত্ব অবস্থান করছে। ইবনে আবি আল-ইয চার মাযহাবসহ সুন্নিদের ঐকমত্যের দাবি করার পরই পরবর্তী আলেমদের এসব মতভেদের কথা স্বীকার করেছেন। [1217]

وَبِالْجُمْلَةِ، فَأَهْلُ السُّنَّةِ كُلُّهُمْ، مِنْ أَهْلِ الْمَذَاهِبِ الْأَرْبَعَةِ وَغَيْرِهِمْ مِنَ السَّلَفِ وَالْخَلَفِ، مُتَّفِقُونَ عَلَى أَنَّ كَلَامَ اللَّهِ غَيْرُ مَخْلُوقٍ. وَلَكِنْ بَعْدَ ذَلِكَ تَنَازَعَ الْمُتَأَخِّرُونَ فِي أَنَّ كَلَامَ اللَّهِ هَلْ هُوَ مَعْنًى وَاحِدٌ قَائِمٌ بِالذَّاتِ، أَوْ أَنَّهُ حُرُوفٌ وَأَصْوَاتٌ تَكَلَّمَ اللَّهُ بِهَا بَعْدَ أَنْ لَمْ يَكُنْ مُتَكَلِّمًا، أَوْ أَنَّهُ لَمْ يَزَلْ مُتَكَلِّمًا إِذَا شَاءَ وَمَتَى شَاءَ وَكَيْفَ شَاءَ وَأَنَّ نَوْعَ الْكَلَامِ قَدِيمٌ.

বাংলা অনুবাদ: মোটকথা, চার মাযহাব ও অন্য ধারার পূর্বসূরি ও পরবর্তী সুন্নিরা সবাই একমত যে আল্লাহর কালাম অসৃষ্ট। কিন্তু এরপর পরবর্তীরা মতবিরোধ করেছেন: আল্লাহর কালাম কি সত্তায় প্রতিষ্ঠিত এক অর্থ, নাকি এমন অক্ষর ও ধ্বনি যার মাধ্যমে তিনি আগে কথা না বলে পরে কথা বলেছেন, নাকি তিনি যখন চান, যেভাবে চান কথা বলে এসেছেন এবং কালামের ধরন অনাদি।

এই ঐকমত্যের দাবির বিষয় “অসৃষ্ট কালাম”; তার ব্যাখ্যায় ঐকমত্য নেই। একই শব্দের নিচে একদল অনাদি অর্থ বোঝান, আরেক দল ইচ্ছানুযায়ী নির্দিষ্ট কথন বোঝান। ইবনে নাজ্জার আল-ফুতুহি মুতাযিলাদের সৃষ্ট বাণীর মত এবং আশআরিদের অনাদি কালামের ব্যাখ্যা আলোচনা করেছেন। তাঁর বিবরণে আশআরিদের অনাদি কালাম সত্তায় প্রতিষ্ঠিত অর্থ; ধারাবাহিক অক্ষর অনাদি নয়, কারণ একটি অক্ষর আরেকটির পরে আসে। ফলে “অনাদি” কথাটিকে কাগজে পাশাপাশি লেখা আরবি অক্ষরের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেওয়ার বদলে এই মতবাদ অর্থ ও তার প্রকাশের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে। [1218]

فالحروف ليست قديمة ; لأنها متعاقبة ، وما كان مسبوقا بغيره ومفقودا حين التلفظ بغيره لم يكن قديما ، والكلام القديم معنى قائم بالذات لا يتعدد ولا يتجزأ ، بل هو معنى واحد إن عبر عنه بالعربية : فقرآن ، أو بالعبرانية : فتوراة مثلا

বাংলা অনুবাদ: অক্ষরগুলো অনাদি নয়; কারণ সেগুলো ক্রমান্বয়ে আসে। যা অন্য কিছুর পরে আসে এবং অন্যটি উচ্চারণের সময় অনুপস্থিত থাকে, তা অনাদি নয়। অনাদি কালাম সত্তায় প্রতিষ্ঠিত একটি অর্থ, যা বহুগুণিত বা বিভক্ত হয় না। সেটি এক অর্থ: আরবিতে প্রকাশিত হলে কোরআন, আর হিব্রুতে প্রকাশিত হলে, যেমন, তাওরাত।

আসারি ব্যাখ্যাতেও “অসৃষ্ট” শব্দটি প্রতিটি নির্দিষ্ট বাক্য অনাদিকাল থেকে একইভাবে উচ্চারিত হয়ে আছে—এই অর্থ বহন করে না। ইসলামকিউএ-র ৫৮৮০৩০ নম্বর উত্তরে কালামের ধরনকে অনাদি এবং পৃথক কথনকে সময়ে সংঘটিত বলা হয়েছে। সেখানে অনাদি কথনক্ষমতা ও ইচ্ছামতো নির্দিষ্ট সময়ে কথা বলার পার্থক্য টানা হয়েছে। এতে ঈশ্বরের গুণ, নির্দিষ্ট বাণী এবং লিখিত অনুলিপির বয়স এক হয় না। [1219]

كلام الله تعالى قديم النوع، وحادث الآحاد

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর কালামের ধরন অনাদি, আর তার পৃথক কথনগুলো সময়ে সংঘটিত।

কাগজ, কালি ও কণ্ঠস্বরকে সৃষ্টি বলে লিখিত ও উচ্চারিত কোরআনকে অসৃষ্ট বলার ব্যাখ্যাটি হাফেয আল-হাকামি বিস্তৃতভাবে দিয়েছেন। মানুষের পাঁচটি কাজ—লেখা, পড়া, মনে রাখা, শোনা ও দেখা—এখানে সৃষ্ট; এসব কাজের মাধ্যমে উপস্থিত বাণীকে তিনি অসৃষ্ট বলেছেন। তাঁর বক্তব্যে কোরআনের অক্ষর ও অর্থ উভয়ই আল্লাহর কালামের অন্তর্ভুক্ত। [1220] [1221]

القرآن كلام الله عز وجل حقيقة حروفه ومعانيه، ليس كلامه الحروف دون المعاني، ولا المعاني دون الحروف، تكلم الله به قولا وأنزله على نبيه وحيا، وآمن به المؤمنون حقا، فهو وإن خط بالبنان وتلي باللسان وحفظ بالجنان وسمع بالآذان وأبصرته العينان لا يخرجه ذلك عن كونه كلام الرحمن، فالأنامل والمداد والأقلام والأوراق مخلوقة، والمكتوب بها غير مخلوق والألسن والأصوات مخلوقة، والمتلو بها على اختلافها غير مخلوق، والصدور مخلوقة والمحفوظ فيها غير مخلوق، والأسماع مخلوقة والمسموع غير مخلوق

বাংলা অনুবাদ: শায়খ হাফেয আল-হাকামি বলেন:
কোরআন প্রকৃত অর্থেই আল্লাহর কালাম বা বাণী। অক্ষর-সমূহ এবং তার অর্থ উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। এ নয় যে, আল্লাহর কালাম বলতে শুধু কুরআনের শব্দগুলোকে বোঝায়। এমনিভাবে শব্দ ছাড়া শুধু অর্থগুলোর নাম আল্লাহর কালাম নয়। আল্লাহ তা’আলা কুরআনের মাধ্যমে কথা বলেছেন এবং তাঁর নবির উপর অহি আকারে তা নাযিল করেছেন। মুমিনগণ তা বিশ্বাস করেছে।
সুতরাং আঙুলের মাধ্যমে কোরআন লেখা, জবানের মাধ্যমে তা তেলাওয়াত করা, অন্তরের মাধ্যমে তা মুখস্থ করা, কান দিয়ে শুনা এবং চোখ দিয়ে দেখলেই তা আল্লাহর কালাম থেকে বের হয়ে যায় না। আঙুল, কালি, কলম এবং কাগজ এগুলোর সবই আল্লাহর সৃষ্টি । কিন্তু এ সব দিয়ে যা লেখা হয়েছে তা সৃষ্টি নয়। ঠিক তেমনি জবান এবং আওয়াজ আল্লাহর সৃষ্টি। কিন্তু জবান দিয়ে যা তেলাওয়াত করা হচ্ছে তা মাখলুক তথা সৃষ্টি নয়। বক্ষসমূহ আল্লাহর সৃষ্টি, কিন্তু তাতে যে কোরআন সংরক্ষিত আছে, তা মাখলুক নয়। কান-সমূহ আল্লাহর সৃষ্টি কিন্তু কান দিয়ে কোরআন আমরা শুনছি, তা মাখলুক নয়।

বুখারির খালকু আফআলিল ইবাদ থেকেও একই পার্থক্য উদ্ধৃত হয়েছে। মানুষের নড়াচড়া, আওয়াজ ও লেখার কাজ সৃষ্টি; মুসহাফে লেখা ও অন্তরে ধারণ করা কোরআন অসৃষ্ট। এই সংজ্ঞায় একটি মুসহাফ পোড়ানো সম্ভব, কিন্তু অসৃষ্ট কালাম পোড়ানো নয়। ফলে পোড়ানো নকলের অস্তিত্ব, তাতে কী লেখা ছিল এবং কেন সেটি সরানো হয়েছিল—এসব প্রশ্ন সেই নকলের পার্থিব ইতিহাসেই থেকে যায়। অসৃষ্ট বাণীর পরিচয় দিয়ে নষ্ট করে ফেলা লিখিত সাক্ষ্যের বিষয়বস্তু উদ্ধার করা যায় না। [1222] [1223] [1224]

حَرَكَاتُهُمْ وَأَصْوَاتُهُمْ وَاكْتِسَابُهُمْ وَكِتَابَتُهُمْ مَخْلُوقَةٌ ، فَأَمَّا الْقُرْآنُ الْمَتْلُوُّ الْمُبَيَّنُ الْمُثْبَتُ فِي الْمُصْحَفِ الْمَسْطُورُ الْمَكْتُوبُ الْمُوعَى فِي الْقُلُوبِ فَهُوَ كَلاَمُ اللهِ لَيْسَ بِخَلْقٍ

বাংলা অনুবাদ: তাদের নড়াচড়া, কণ্ঠস্বর, উপার্জন ও লেখার কাজ সৃষ্ট। কিন্তু যে কোরআন আবৃত্ত, প্রকাশিত, মুসহাফে স্থাপিত, পঙ্‌ক্তিবদ্ধ, লিখিত এবং অন্তরে ধারণ করা আছে, তা আল্লাহর বাণী; সৃষ্টি নয়।

অসৃষ্ট কালামের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয় বেঁধে দিলে মতভেদ আর নিছক ধারণার বিরোধ থাকে না। হারব আল-কিরমানি কোরআনকে সৃষ্টি বলা ব্যক্তিকে “জাহমি-কাফির” বলেছেন। এমনকি “আল্লাহর কালাম” বলে সৃষ্ট–অসৃষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত না দেওয়াকেও আরও কাফির ও নিকৃষ্ট বলেছেন। এখানে নীরবতাও নিরাপদ অবস্থান নয়: নির্দিষ্ট মতের পক্ষে স্পষ্ট আনুগত্য দাবি করা হচ্ছে। [1225]

والقرآن كلام الله تكلم به ليس بمخلوق، فمن زعم أن القرآن مخلوق فهو جهمي كافر. ومن زعم أن القرآن كلام الله ووقف، ولم يقل: ليس بمخلوق، فهو أكفر من الأول وأخبث قولًا.

বাংলা অনুবাদ: হারব আল-কিরমানি বলেন,
কোরআন আল্লাহর কালাম (বাণী); মাখলুক বা সৃষ্ট নয়। যে ব্যক্তি মনে করে যে, কোরআন আল্লাহর মাখলুক (সৃষ্ট) সে জাহমী-কাফির। আর যে ব্যক্তি কোরআন আল্লাহর কালাম বলে চুপ থাকে- মাখলুক না কি মাখলুক নয় সে ব্যাপারে কোন মন্তব্য করে না-সে ১ম ব্যক্তির থেকেও নিকৃষ্ট।

মিহনার সময় রাষ্ট্র উল্টো সিদ্ধান্তে আনুগত্য চেয়েছিল। ইবনে কাছির ২১৮ হিজরির ঘটনাবলিতে লিখেছেন, মামুন বাগদাদের প্রতিনিধি ইসহাক ইবনে ইবরাহিমকে বিচারক ও হাদিসবিদদের কোরআন সৃষ্ট বলার বিষয়ে পরীক্ষা করার নির্দেশ দেন। শাস্তির ধরনও ছিল নির্দিষ্ট: চাকরি থেকে অপসারণ, রাষ্ট্রীয় ভাতা বন্ধ, ফতোয়া দেওয়া নিষিদ্ধ এবং হাদিস বর্ণনা বন্ধ করে দেওয়া। যে মতকে রাষ্ট্র সত্য ঘোষণা করেছে, তার সঙ্গে একমত না হলে জীবিকা ও জনসমক্ষে কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। [1226]

لأنهم كانوا يعزلون من لا يجيب عن وظائفه ، وإن كان له رزق على بيت المال قطع ، وإن كان مفتيا منع من الإفتاء ، وإن كان شيخ حديث ردع عن الإسماع والأداء

বাংলা অনুবাদ: কারণ যারা উত্তর দিতে সম্মত হতো না, তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হতো। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ভাতা থাকলে তা বন্ধ করা হতো। মুফতি হলে ফতোয়া দেওয়া বন্ধ করা হতো; হাদিসের শিক্ষক হলে শোনানো ও বর্ণনা করা থেকে বিরত রাখা হতো।

আহমদ ইবনে হাম্বলের ওপর বলপ্রয়োগের বিবরণে এই আনুগত্য পরীক্ষার শারীরিক রূপ পাওয়া যায়। ইবনে কাছিরের সংরক্ষিত বর্ণনায় মুতাসিমের সামনে একের পর এক জল্লাদ তাঁকে চাবুক মারছে; প্রহারে তিনি বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। একই বিবরণে মুক্তির দিন ২২১ হিজরির ২৫ রমজান বলা হয়েছে। কোরআনের প্রকৃতি সম্পর্কে একটি উত্তর আদায় করতে মানুষের দেহকে শাস্তির লক্ষ্য বানানো হয়েছে। ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তির জায়গায় তখন কাজ করছে কারাগার, শিকল ও জল্লাদের শক্তি। [1227]

فجعل أحدهم يضربني سوطين ويقول له – يعني المعتصم -: شد قطع الله يديك، ويجئ الآخر فيضربني سوطين ثم الآخر كذلك، فضربوني أسواطا فأغمي علي وذهب عقلي مرارا

বাংলা অনুবাদ: তাদের একজন আমাকে দুটি চাবুক মারত; তিনি—অর্থাৎ মুতাসিম—তাকে বলতেন, জোরে মারো, আল্লাহ তোমার দুই হাত কাটুন। তারপর আরেকজন এসে দুটি চাবুক মারত, এরপর আরেকজনও তেমন করত। তারা আমাকে কয়েক ঘা মারল; আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম এবং বারবার চেতনা হারালাম।

আল-ওয়াসিকের আমলে আহমদ ইবনে নসর আল-খুযায়ীর হত্যা আরও স্পষ্ট দৃষ্টান্ত। মিযযির তাহযীবুল কামালে খতিব বাগদাদির বক্তব্যে কোরআনকে সৃষ্টি বলতে অস্বীকার করাকে তাঁর হত্যার কারণ বলা হয়েছে। জীবনীতে রাজনৈতিক সংগঠন ও বিদ্রোহের প্রস্তুতির কথাও আছে। বন্দি হিসেবে হাজির করার পর ওয়াসিক সেই প্রসঙ্গ সরিয়ে সরাসরি কোরআন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন; পরে আল্লাহকে দেখার বিশ্বাস নিয়েও প্রশ্ন ওঠে এবং তাঁর রক্ত হালাল ঘোষণা করা হয়। রাজনৈতিক দমন ও ধর্মীয় মতের পরীক্ষা একই বিচারপর্বে মিশে গেছে। [1228]

وكان قتله في خلافة الواثق لامتناعه عن القول بخلق القرآن .

বাংলা অনুবাদ: আল-ওয়াসিকের খিলাফতে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল কোরআনকে সৃষ্টি বলতে অস্বীকার করার কারণে।

এই ব্যবস্থার পরিণতি শুধু একজনের মৃত্যু নয়। রাষ্ট্র কোন উত্তর শুনতে চায়, তা অন্য আলেম ও সাধারণ মানুষের কাছেও প্রকাশ পায়। আনুগত্য জীবনরক্ষার শর্ত হয়ে উঠলে প্রকাশ্য ঐকমত্য থেকে স্বাধীন বিশ্বাসের পরিমাণ মাপা যায় না। ইবনে কাছিরের মিহনার বিবরণে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্মতি জানানোর কথা রয়েছে। আবার মুতাওয়াক্কিলের আমলে মিহনা তুলে দিয়ে কোরআন সৃষ্ট বলার আলোচনা বন্ধ করার নির্দেশ প্রচারিত হওয়ার কথাও তিনি লিখেছেন। ক্ষমতার অভিমুখ বদলেছে; ধর্মতাত্ত্বিক মতের প্রকাশের শর্তও বদলেছে। [1229]

ورفع المحنة عن الناس، وكتب إلى الآفاق لا يتكلم أحد في القول بخلق القرآن

বাংলা অনুবাদ: তিনি মানুষের ওপর থেকে মিহনা তুলে দেন এবং বিভিন্ন অঞ্চলে লিখে পাঠান, কেউ যেন কোরআন সৃষ্ট বলার বিষয়ে কথা না বলে।

অসৃষ্ট কালামের পক্ষেও মত না বদলালে হত্যার বিধান উচ্চারিত হয়েছে। হাকামির আ‘লামুস সুন্নাতিল মানশুরাহতে আল্লাহর কোনো গুণকে সৃষ্ট বলা ব্যক্তিকে কাফির ও মুরতাদ বলে ইসলামে ফিরতে বলার নির্দেশ আছে; ফিরে না এলে হত্যার কথা বলা হয়েছে। ইবনে তাইমিয়াও পূর্বসূরিদের নামে একই অবস্থান উল্লেখ করেছেন। এখানে বিরোধীর বিরুদ্ধে শুধু তাত্ত্বিক খণ্ডন হচ্ছে না; তার বেঁচে থাকার অধিকার প্রত্যাহারের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। [1230] [1231]

بل اشتهر عن أئمة السلف تكفير من قال‏:‏ القرآن مخلوق، وأنه يستتاب، فإن تاب وإلا قتل، كما ذكروا ذلك عن مالك بن أنس وغيره‏.‏

বাংলা অনুবাদ: বরং পূর্বসূরি ইমামদের থেকে এ কথা প্রসিদ্ধ হয়েছে যে, যে ব্যক্তি বলে কোরআন সৃষ্টি, তাকে কাফের বলা হবে এবং তাকে তওবা করতে বলা হবে। সে তওবা করলে ভালো; না করলে তাকে হত্যা করা হবে। মালিক ইবনে আনাস ও অন্যদের থেকেও তাঁরা তা উল্লেখ করেছেন।

মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের বিশ্বাসবিবৃতিতেও কোরআনকে অবতীর্ণ ও অসৃষ্ট কালাম বলা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে আল্লাহ বাস্তব অর্থে কথা বলেছেন এবং সেই বাণী মুহাম্মদের ওপর অবতীর্ণ করেছেন। একই বিশ্বাসবিবৃতির আলোচনায় নাম ও গুণ অস্বীকারকে অবিশ্বাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে “বাণী” একটি নিরপেক্ষ পরিচয় হয়ে থাকে না; তার প্রকৃতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়। [1232]

وأعتقد أن القرآن كلام اللَّه، منزل غير مخلوق، منه بدأ وإليه يعود، وأنه تكلم به حقيقة، وأنزله على عبده ورسوله، وأمينه على وحيه وسفيره بينه وبين عباده، نبينا محمد صَلَّى اللَّه عليه وسَلَّم.

বাংলা অনুবাদ: আমি বিশ্বাস করি, কোরআন আল্লাহর বাণী; অবতীর্ণ, অসৃষ্ট। তাঁর কাছ থেকেই এর সূচনা এবং তাঁর কাছেই এটি ফিরে যাবে। তিনি বাস্তব অর্থেই এর মাধ্যমে কথা বলেছেন এবং তা অবতীর্ণ করেছেন তাঁর বান্দা, রাসুল, ওহির আমানতদার এবং তাঁর ও বান্দাদের মধ্যকার দূত আমাদের নবী মুহাম্মদের ওপর।

বিরোধের ক্ষেত্রনথিভুক্ত অবস্থান বা ব্যবস্থামানুষের ওপর কার্যকর ফল
বাণীর প্রকৃতিসৃষ্ট বাণী, অনাদি কালাম এবং ইচ্ছানুযায়ী নির্দিষ্ট কথনের ভিন্ন ব্যাখ্যাএকটি সাধারণ ধর্মীয় নামের নিচে পরস্পরভিন্ন তত্ত্ব
মামুনের পরীক্ষাবিচারক ও হাদিসবিদদের নির্দিষ্ট উত্তর দিতে বাধ্য করাচাকরি, ভাতা, ফতোয়া ও শিক্ষাদানের অধিকার নিয়ন্ত্রণ
মুতাসিমের আমলআহমদের ওপর চাবুকের প্রহারবিশ্বাসের ঘোষণা আদায়ে শারীরিক নির্যাতন
ওয়াসিকের আমলআহমদ ইবনে নসরকে জিজ্ঞাসাবাদ ও হত্যারাজনৈতিক বন্দিত্বের মধ্যে ধর্মীয় মতের ভিত্তিতে প্রাণদণ্ড
অসৃষ্ট মতের শাস্তিবিধানসৃষ্ট বলার মত ত্যাগ না করলে হত্যার অনুমোদনবিপরীত মতের ব্যক্তির জীবনও ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধীন

ইবনে তাইমিয়ার দৃঢ় বক্তব্য কিংবা তাঁর পরবর্তী অনুসারীদের জোরালো ঘোষণায় এই বিরোধ মুছে যায় না। মতবাদের সামাজিক প্রাধান্য তৈরিতে ব্যাখ্যা, শিক্ষা, দলীয় পরিচয় ও বলপ্রয়োগ—সবই কাজ করেছে। কোনো মত অনুসরণকারী বেশি হওয়া তার প্রতিদ্বন্দ্বী মত বরাবর অনুপস্থিত থাকার প্রমাণ নয়। আর কোরআনকে অসৃষ্ট ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত থেকে নির্দিষ্ট মুসহাফের প্রতিটি শব্দের ঐতিহাসিক সত্যতা অনুসরণ করে না। অনাদি গুণের স্বীকৃতি আর মানুষের হাতে তৈরি অনুলিপির পাঠ যাচাই সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়; প্রথমটির জন্য কাউকে হত্যা করলেও দ্বিতীয়টির একটি হারানো অক্ষর ফিরে আসে না।


লাওহে মাহফুজ, অবস্থান ও পূর্বলিখিত কোরআনের ধারণা

লাওহে মাহফুজের ধারণায় কোরআনের আগে থেকেই লিখিত একটি আসমানি অবস্থান রয়েছে। পৃথিবীতে মুহাম্মদের মুখে উচ্চারণ, লেখকের হাতে লিপিবদ্ধ হওয়া এবং পরে মুসহাফে সংকলিত হওয়া—এসবের আগেই বাণী আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত। ফলে কোনো শব্দ কোন পরিস্থিতিতে মানুষের কাছে এসেছে, তার পাশাপাশি আরেকটি দাবি তৈরি হয়: সেই শব্দ পূর্বলিখিত আধারে আগে থেকেই ছিল। এই আধারের পরিচয়, অবস্থান ও গঠনের বিবরণ কোরআনের সংক্ষিপ্ত ঘোষণা থেকে শুরু করে তাফসিরের বিস্তৃত বর্ণনা পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। এসব বিবরণের নির্দিষ্টতা এবং পৃথিবীর পাঠের সঙ্গে তার সম্পর্ক এক প্রশ্ন নয়।

“লাওহ” শব্দের মূল অর্থ লেখার উপযোগী প্রশস্ত পৃষ্ঠ বা ফলক। ইসলামকিউএ-তে ইবনে মানযুরের লিসানুল আরব থেকে কাঠের প্রশস্ত পৃষ্ঠের সংজ্ঞা এবং আযহারির কাঠ ও কাঁধের হাড়ে লেখার উদাহরণ উদ্ধৃত হয়েছে। একই অভিধানভিত্তিক আলোচনায় লাওহে মাহফুজকে আল্লাহর ইচ্ছাসমূহের সংরক্ষণাগার বলা হয়েছে। সাধারণ লেখার ফলকের নাম এখানে বিশ্বপরিকল্পনার অদৃশ্য লিখিত আধারের নাম হয়ে উঠেছে। [1233]

اللوح : كل صفيحة عريضة من صفائح الخشب

বাংলা অনুবাদ: ইবনে মানযুর: কাঠের প্রশস্ত যেকোনো পৃষ্ঠকে লাওহ বলে।

আযহারির সংজ্ঞায় উপকরণের চেয়ে লেখার পৃষ্ঠ হওয়াটিই কেন্দ্রীয়। কাঠ ছাড়াও কাঁধের হাড়ে লেখা হলে সেটিকেও লাওহ বলা হয়। ফলে “লাওহ” শব্দ থেকে তার অলৌকিক উপাদান, দৈর্ঘ্য বা মহাবিশ্বের কোথায় অবস্থান—এসব তথ্য পাওয়া যায় না; সেগুলো পৃথক বর্ণনার বিষয়। [1234]

اللوح صفيحة من صفائح الخشب والكتف إذا كتب عليها سميت لوحا

বাংলা অনুবাদ: আযহারি: লাওহ কাঠের একটি পৃষ্ঠ; কাঁধের হাড়ের ওপর লেখা হলে সেটিকেও লাওহ বলা হয়।

কোরআনের বুরুজ সূরায় বাণীকে মহিমান্বিত কোরআন এবং সংরক্ষিত ফলকে অবস্থিত বলা হয়েছে। দুই আয়াতের এই সংক্ষিপ্ত ঘোষণায় কোরআনের মর্যাদা ও লিখিত সংরক্ষণের দাবি একসঙ্গে এসেছে। এখানে ফলকের উপাদান, মাপ কিংবা কোনো নির্দিষ্ট ফেরেশতার দেহে তার অবস্থানের বিবরণ নেই। [1235] [1236]

بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَّجِيدٌ
فِي لَوْحٍ مَّحْفُوظٍ

বাংলা অনুবাদ: বরং এটি মহিমান্বিত কোরআন, সংরক্ষিত ফলকে অবস্থিত।

ইবনে কাছির “সংরক্ষিত ফলক” ব্যাখ্যা করতে ঊর্ধ্বজগতের উচ্চ পরিষদে সংরক্ষিত থাকার কথা বলেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় বৃদ্ধি, হ্রাস, বিকৃতি ও বদল—সবই সংরক্ষণের বিপরীত। অর্থাৎ ঘোষণার পরিসর শুধু কোনো বস্তু টিকে থাকা নয়; সেই বস্তুর মধ্যে থাকা বাণীর পরিমাণ ও রূপও সুরক্ষিত থাকার দাবি। [1237]

( في لوح محفوظ ) أي هو في الملأ الأعلى محفوظ من الزيادة والنقص والتحريف والتبديل

বাংলা অনুবাদ: “সংরক্ষিত ফলকে”—অর্থাৎ তা ঊর্ধ্বজগতের উচ্চ পরিষদে বৃদ্ধি, হ্রাস, বিকৃতি ও পরিবর্তন থেকে সংরক্ষিত।

যুখরুফ ৪৩:৪-এ কোরআনকে আল্লাহর কাছে “উম্মুল কিতাবে” উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বলা হয়েছে। তাবারির ব্যাখ্যায় এটি সেই মূল গ্রন্থ, যা থেকে এই গ্রন্থ নকল করা হয়েছে। তাঁর সংরক্ষিত ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় কলম সৃষ্টি করে সৃষ্টির পরিকল্পনা লেখার নির্দেশ এবং মূল গ্রন্থ থেকে কোরআন নকল হওয়ার কথা একই বিবরণে আছে। ফলে পার্থিব কোরআনের সঙ্গে আগের লিখিত আধারের সম্পর্ককে তাফসিরে সরাসরি মূল ও নকলের সম্পর্ক হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে। [1238]

حدثني يعقوب, قال: ثنا ابن علية, عن هشام الدستوائي, عن القاسم بن أبي بزة, قال: ثنا عروة بن عامر, أنه سمع ابن عباس يقول: أول ما خلق الله القلم, فأمره أن يكتب ما يريد أن يخلق, قال: والكتاب عنده, قال: ( وَإِنَّهُ فِي أُمِّ الْكِتَابِ لَدَيْنَا لَعَلِيٌّ حَكِيمٌ ). يعني القرآن في أمّ الكتاب الذي عند الله منه نسخ.

বাংলা অনুবাদ: ইয়াকুব আমাকে বলেছেন: ইবনে উলাইয়্যা আমাদের বলেছেন, হিশাম আদ-দাস্তুওয়াই থেকে, কাসিম ইবনে আবি বাযযা থেকে; তিনি বলেছেন, উরওয়া ইবনে আমির আমাদের জানিয়েছেন যে তিনি ইবনে আব্বাসকে বলতে শুনেছেন: আল্লাহ প্রথমে কলম সৃষ্টি করেন এবং তাকে যা সৃষ্টি করতে চান তা লিখতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, গ্রন্থটি তাঁর কাছেই রয়েছে। এরপর “এটি আমাদের কাছে উম্মুল কিতাবে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, প্রজ্ঞাপূর্ণ”—অর্থাৎ কোরআন তাঁর কাছে থাকা উম্মুল কিতাবে রয়েছে; তা থেকেই এটি নকল করা হয়েছে।

ওয়াকিয়া ৫৬:৭৮-এর ভাষা “কিতাবিন মাকনুন”—সুরক্ষিত বা আড়াল করা গ্রন্থ। তাবারি এর ব্যাখ্যায় আল্লাহর কাছে ধুলাবালি ও অন্য ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত গ্রন্থের কথা বলেছেন; তাঁর উদ্ধৃত ব্যাখ্যাগুলোর একাধিকটিতে আসমানের কিতাবের পরিচয় রয়েছে। বুরুজের “লাওহ”, যুখরুফের “উম্মুল কিতাব” এবং ওয়াকিয়ার “কিতাবিন মাকনুন” তাফসিরে পারস্পরিক সম্পর্ক পায়; আয়াতগুলোর প্রত্যেকটিতে একই পূর্ণ বর্ণনা পুনরুক্ত হয়নি। [1239]

وقوله: ( فِي كِتَابٍ مَكْنُونٍ ) يقول تعالى ذكره: هو في كتاب مصون عند الله لا يمسه شيء من أذى من غبار ولا غيره.

বাংলা অনুবাদ: “সুরক্ষিত গ্রন্থে”—আল্লাহর কাছে এমন এক সুরক্ষিত গ্রন্থে, যাকে ধুলাবালি কিংবা অন্য কোনো ক্ষতি স্পর্শ করে না।

উৎসের ভাষাব্যাখ্যায় যে পরিচয় পাওয়া যায়দাবির নির্দিষ্ট বিষয়
বুরুজ: লাওহে মাহফুজসংরক্ষিত ফলকে মহিমান্বিত কোরআনলিখিত সংরক্ষণ
যুখরুফ: উম্মুল কিতাবতাবারির ব্যাখ্যায় নকলের আগের মূল গ্রন্থমূল ও অনুলিপির সম্পর্ক
ওয়াকিয়া: কিতাবিন মাকনুনআল্লাহর কাছে সুরক্ষিত গ্রন্থ; আসমানের কিতাবের ব্যাখ্যাও সংরক্ষিতবহিরাগত ক্ষতি ও অনধিকার প্রবেশ থেকে সুরক্ষা
ইবনে কাছিরের ব্যাখ্যাঊর্ধ্বজগতে বৃদ্ধি, হ্রাস, বিকৃতি ও বদল থেকে সংরক্ষণবাণীর পরিমাণ ও রূপের অক্ষুণ্ণতা

ইবনুল কাইয়্যেম এই সুরক্ষাকে শব্দ ও অর্থ উভয়ের ওপর বিস্তৃত করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় শয়তানের পক্ষে কোরআন নিয়ে অবতীর্ণ হওয়া সম্ভব নয়, কারণ তার অবস্থানস্থল শয়তানের নাগালের বাইরে। একই সঙ্গে কোরআনের ভেতরে কিছু বাড়ানো বা কমানোও শয়তানের ক্ষমতার বাইরে বলে দাবি করা হয়েছে। এরপর তিনি অক্ষর মুখস্থ রাখা এবং অর্থ বিকৃতি থেকে রক্ষাকারী মানুষের কথাও বলেছেন। আসমানি আধারের সুরক্ষার সঙ্গে পার্থিব সংরক্ষণকারীদের কাজকে এখানে একটি ধারাবাহিক রক্ষাব্যবস্থা হিসেবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। [1240]

فالله سبحانه حفظ محله ، وحفظه من الزيادة والنقصان والتبديل ، وحفظ معانيه من التحريف كما حفظ ألفاظه من التبديل ، وأقام له مَن يحفظ حروفه مِن الزيادة والنقصان ، ومعانيه مِن التحريف والتغيير .
বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ এর অবস্থানস্থলকে রক্ষা করেছেন; একে বৃদ্ধি, হ্রাস ও বদল থেকে রক্ষা করেছেন। এর শব্দসমূহকে বদল থেকে যেমন রক্ষা করেছেন, তেমনি অর্থসমূহকেও বিকৃতি থেকে রক্ষা করেছেন। এর অক্ষরসমূহকে বৃদ্ধি ও হ্রাস থেকে এবং অর্থসমূহকে বিকৃতি ও পরিবর্তন থেকে রক্ষাকারীদের নিয়োজিত করেছেন।

ফলকের অবস্থান সম্পর্কে তাফসিরের বিবরণ আরও নির্দিষ্ট, কিন্তু একরকম নয়। তাবারি আনাস ইবনে মালিকের নামে একটি বর্ণনা সংরক্ষণ করেছেন, যাতে লাওহে মাহফুজকে ইসরাফিলের কপালে বলা হয়েছে। ইবনে কাছিরও একই বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। আর নাক্কাশের নামে সংরক্ষিত আরেক বিবরণে ইসরাফিল প্রথম সিজদা করায় তাঁকে লাওহে মাহফুজের দায়িত্ব দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে। কপালে ফলক থাকা এবং ফলকের দায়িত্ব পাওয়া দুটি আলাদা বিবরণ; প্রথমটির ভাষায় অবস্থান, দ্বিতীয়টিতে দায়িত্ব ও পুরস্কারের সম্পর্ক বলা হচ্ছে। [1241] [1242]

إن اللوح المحفوظ الذي ذكر الله، ( بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَجِيدٌ * فِي لَوْحٍ مَحْفُوظٍ ) في جَبْهَة إسرافيل.

বাংলা অনুবাদ: আনাস ইবনে মালিকের নামে বর্ণিত: আল্লাহ যে লাওহে মাহফুজের কথা বলেছেন—“বরং এটি মহিমান্বিত কোরআন, সংরক্ষিত ফলকে”—তা ইসরাফিলের কপালে।

ইবনে কাছিরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ার নাক্কাশ-সংক্রান্ত উদ্ধৃতিটি ইসলামকিউএ-র আলোচনায় এভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। এখানে ইসরাফিলকে ফলকের দায়িত্ব দেওয়ার কারণ হিসেবে তাঁর প্রথম সিজদার কথা বলা হয়েছে। [1243]

وَذَكَرَ مُحَمَّدُ بْنُ الْحَسَنِ النَّقَّاشُ: أَنَّ إِسْرَافِيلَ أَوَّلُ مَنْ سَجَدَ مِنَ الْمَلَائِكَةِ ، فَجُوزِيَ بِوِلَايَةِ اللَّوْحِ الْمَحْفُوظِ.

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদ ইবনে হাসান আন-নাক্কাশ উল্লেখ করেছেন: ফেরেশতাদের মধ্যে ইসরাফিল প্রথম সিজদা করেছিলেন; তাই তাঁকে লাওহে মাহফুজের দায়িত্ব দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়।

ইসরাফিলের কপালে কোরআন লেখা, কপালে ফলক থাকা এবং প্রথম সিজদার পুরস্কার হিসেবে ফলকের দায়িত্ব পাওয়া—এই বিবরণগুলোর সূত্রও পৃথক। ইসলামকিউএ-র ২৭৬৭৫৪ নম্বর উত্তরে উমর ইবনে আবদুল আযিয, আবদুল আযিয ইবনে হিলাল এবং দামরা ইবনে রাবিয়ার নামে প্রচলিত কথাগুলো আলাদা করে আলোচনা করা হয়েছে। সংকলিত বিবরণগুলোর কিছু নবীর নামে, কিছু আনাসের নামে এবং কিছু পরবর্তী বর্ণনাকারীর বক্তব্য; এগুলো একই পর্যায়ের সাক্ষ্য নয়। ফলে তাবারি ও ইবনে কাছিরে একটি বক্তব্য পুনরায় পাওয়া গেলেই দুটি স্বাধীন প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য তৈরি হয় না—একই বর্ণনার পুনঃসংরক্ষণও হতে পারে।

সবুজ মণি দিয়ে তৈরি ফলকের বর্ণনাও ইসলামকিউএ-র ৭০০২ নম্বর উত্তরে উল্লেখিত। ওই উত্তরেই ইসরাফিলের কপাল ও সবুজ মণির বিবরণকে অপ্রতিষ্ঠিত বলা হয়েছে। এগুলোকে রূপক বলে ধরে নেওয়ার ভিত্তিও সেখানে দেওয়া হয়নি; উৎসে এগুলো অদৃশ্য জগতের নির্দিষ্ট অবস্থান ও গঠনসংক্রান্ত বর্ণনা হিসেবেই আলোচিত। সংরক্ষিত ফলকের ধারণায় একমত হওয়া এবং তার দৈহিক বিবরণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা তাই আলাদা অবস্থা। [1244]

أن اللوح المحفوظ في جبهة ” إسرافيل ” ، أو أنه مخلوق من زبرجدة خضراء ، وغير ذلك فهو مما لم يثبت

বাংলা অনুবাদ: লাওহে মাহফুজ ইসরাফিলের কপালে কিংবা সবুজ মণি দিয়ে সৃষ্ট—এ ধরনের যা এসেছে, তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

ফলককে সুরক্ষিত ঘোষণা করার সঙ্গে পৃথিবীর কোনো নির্দিষ্ট মুসহাফের অভিন্নতা দেখানোর মধ্যবর্তী দলিলটি কোথায়? লাওহে মাহফুজের কোনো স্বাধীনভাবে পরীক্ষাযোগ্য প্রতিলিপি উপস্থাপিত হয় না। ফলে পৃথিবীর দুটি পাঠের পার্থক্য পাওয়া গেলে কোনটি সেই ফলকের সঙ্গে হুবহু মেলে, তা ফলক দেখিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না। তখন আবার ফিরে আসতে হয় মানুষের সাক্ষ্য, সংকলকের সিদ্ধান্ত, পাঠপরম্পরা এবং সংরক্ষিত নকলের কাছে। যাদের কাজ যাচাইয়ের প্রশ্ন উঠেছে, তাদের সিদ্ধান্তকেই অদৃশ্য মূলের সঙ্গে অভিন্নতার নিশ্চয়তা বানালে যাচাইয়ের আলাদা ভিত্তি পাওয়া যায় না।

ইবনুল কাইয়্যেমের সংরক্ষণবিবরণে শব্দ ও অর্থ—দুটিরই অভিন্নতা গুরুত্বপূর্ণ। একটি শব্দ বাদ গেলেও যদি বলা হয় অর্থ অটুট, তাহলে সেটি তাঁর উভয় স্তরের রক্ষার দাবির সমান নয়। আবার শব্দ থেকে গেলেও তার কার্যকর অর্থ ও বিধান বদলালে শব্দের উপস্থিতি একা অর্থের অপরিবর্তন দেখায় না। আসমানের আধার সম্পর্কে সর্বাত্মক সুরক্ষার ঘোষণা যত বিস্তৃত, পৃথিবীর পাঠের সঙ্গে সেই ঘোষণার অভিন্নতা প্রতিষ্ঠার দায়ও তত বিস্তৃত। অদৃশ্য আধারের মর্যাদা দিয়ে দৃশ্যমান পার্থক্যের হিসাব মুছে দেওয়া যায় না।


পঞ্চাশ হাজার বছর আগে তাকদির লিখন ও ওহির পূর্বনির্ধারণ

তাকদিরের পূর্বলিখনের হাদিসে মানুষের জন্মের আগের কোনো অস্পষ্ট সময়ের কথা নয়, আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগের নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আমরের বর্ণনায় তখন আল্লাহর আরশ পানির ওপর ছিল। এই বিবরণে সৃষ্টির ভাগ্যলিপি লেখা, আকাশ-পৃথিবী সৃষ্টি এবং পরে মানুষের জীবনযাপন পৃথক পর্যায়। ফলে কোনো মানুষের প্রশ্নের পর ওহি আসা বা কোনো ঘটনার পরে বিধান বদলানোর ঘটনাকে এই বিশ্বাসের মধ্যে স্থাপন করলে প্রশ্ন, ঘটনা ও পরবর্তী উত্তর—সবই পূর্বনির্ধারিত ধারার অংশ হয়। [1245] [1246] [1247] [1248]

حَدَّثَنِي أَبُو الطَّاهِرِ، أَحْمَدُ بْنُ عَمْرِو بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ سَرْحٍ حَدَّثَنَا ابْنُ، وَهْبٍ أَخْبَرَنِي أَبُو هَانِئٍ الْخَوْلاَنِيُّ ، عَنْ أَبِي عَبْدِ الرَّحْمَنِ الْحُبُلِيِّ ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو، بْنِ الْعَاصِ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏”‏ كَتَبَ اللَّهُ مَقَادِيرَ الْخَلاَئِقِ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ بِخَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ – قَالَ – وَعَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ ‏” ‏ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ২. আদম (আঃ) ও মুসা (আঃ) এর বিতর্ক
৬৫০৭। আবূ তাহির আহমাদ ইবনু আমর ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু সারহ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেনঃ আল্লাহ তাআলা সমগ্র সৃষ্টির ভাগ্যলিপি আসমান ও যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, সে সময় আল্লাহর আরশ পানির উপরে ছিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ)

অন্য বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর আগে সৃষ্টিকুলের ভাগ্য লিখেছেন। তিনি বলেন, তখন তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল।

তাকদীর আসমান ও যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে লিখিত

“পঞ্চাশ হাজার বছর” এখানে আকাশ-পৃথিবীর সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত; একই হাদিসে আরশ ও পানির উপস্থিতিও বলা হয়েছে। অনাদি গুণের তত্ত্বের সঙ্গে এই লিখনের সময় এক নয়। অনাদি জ্ঞানের শুরু নেই বলে দাবি করা হয়; ভাগ্যলিপি লেখার জন্য হাদিসে একটি আপেক্ষিক সময় নির্ধারিত। আবার মুহাম্মদের জীবনে নির্দিষ্ট বাক্য প্রকাশ পাওয়ার সময় তারও অনেক পরে। অনাদি জ্ঞান, পূর্বলিখিত নথি এবং ইতিহাসে ওহির প্রকাশ—এই তিন অবস্থানকে এক সময়ের ঘটনা বানালে বর্ণনার নিজের সময়ক্রমই হারিয়ে যায়।

উবাদা ইবনে সামিতের নামে আবু দাউদের বর্ণনায় কলমকে কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ের নির্ধারিত পরিমাণ লিখতে আদেশ দেওয়া হয়। এখানে নির্দেশের ব্যাপ্তি “প্রতিটি বিষয়”; শুধু জন্ম-মৃত্যুর তারিখ বা প্রাকৃতিক ঘটনার তালিকা নয়। ওহি আসা, কোনো ব্যক্তির প্রশ্ন করা, একটি শাসনব্যবস্থার সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্তের ফল—সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত দাবি করলে সেগুলোর মধ্যেকার পরিবর্তনও সেই ব্যাপ্তির মধ্যে পড়ে। [1249]

إِنَّ أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ فَقَالَ لَهُ اكْتُبْ ‏.‏ قَالَ رَبِّ وَمَاذَا أَكْتُبُ قَالَ اكْتُبْ مَقَادِيرَ كُلِّ شَىْءٍ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ প্রথমে কলম সৃষ্টি করে তাকে বললেন, লেখো। সে বলল, হে প্রভু, কী লিখব? তিনি বললেন, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ের তাকদির লেখো।

হাদিদ ৫৭:২২-এ পৃথিবীতে ও মানুষের নিজের ওপর আপতিত বিপদ সৃষ্টির আগেই কিতাবে থাকার কথা বলা হয়েছে। ঘটনাটি মানুষের কাছে নতুন হতে পারে; ঘোষিত লিখিত পরিকল্পনার কাছে সেটি অজানা নয়। ফলে নতুন পরিস্থিতির মুখে ওহির উত্তর উপস্থিত হওয়ার বিবরণ এবং সেই পরিস্থিতি আগে থেকেই জানা ও লেখা থাকার দাবি একত্রে ধরলে, পরিস্থিতি ও প্রতিক্রিয়া উভয়ের পূর্বনির্ধারণ পাওয়া যায়। ঘটনাক্রমে পরে আসা এবং জ্ঞানে পরে আসা এখানে ভিন্ন অর্থ। [1250]

مَا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِّن قَبْلِ أَن نَّبْرَأَهَا ۚ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ

বাংলা অনুবাদ: পৃথিবীতে কিংবা তোমাদের নিজেদের ওপর এমন কোনো বিপদ আসে না, যা আমরা তা সৃষ্টি করার আগে একটি কিতাবে নেই। নিশ্চয়ই তা আল্লাহর জন্য সহজ।

হজ ২২:৭০-এ আকাশ ও পৃথিবীর বিষয়সমূহ জানা এবং কিতাবে থাকার কথা একসঙ্গে বলা হয়েছে। তাবারি আবদা ইবনে আবি লুবাবার নামে একটি ব্যাখ্যা সংরক্ষণ করেছেন: আল্লাহ কী সৃষ্টি করবেন এবং সৃষ্টি কী কাজ করবে, তা জেনে তারপর লিখেছেন। এই ব্যাখ্যায় মানুষের কাজও লিখনের বিষয়। মানুষের প্রশ্ন, বিরোধিতা বা সিদ্ধান্তকে পূর্বলিখনের বাইরে স্বাধীন কোনো অজানা উপাদান করে রাখার সুযোগ এই সর্বব্যাপী দাবিতে নেই। [1251]

علم الله ما هو خالق وما الخلق عاملون, ثم كتبه

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ জানতেন তিনি কী সৃষ্টি করবেন এবং সৃষ্টি কী কাজ করবে; তারপর তিনি তা লিখেছেন।

পর্যায়বিশ্বাসে তার অবস্থানপার্থিব ঘটনার সঙ্গে সম্পর্ক
অনাদি জ্ঞানআল্লাহর জ্ঞানের কোনো সূচনা নেইভবিষ্যতের ঘটনা তাঁর কাছে পরে এসে অজানা থেকে জানা হয় না
পঞ্চাশ হাজার বছর আগের লিখনআকাশ-পৃথিবী সৃষ্টির আগেই সৃষ্টিকুলের ভাগ্যলিপিপরবর্তী ঘটনার লিখিত পূর্বনির্ধারণের দাবি
কিয়ামত পর্যন্ত কলমের লিখনপ্রতিটি বিষয়ের তাকদির লেখার নির্দেশমানুষের কাজ ও প্রতিক্রিয়াসহ ব্যাপক পূর্বপরিকল্পনা
মুহাম্মদের জীবনে ওহির প্রকাশনির্দিষ্ট ঘটনার সময়ে নির্দিষ্ট বক্তব্য মানুষের কাছে আসেপ্রাপকের কাছে প্রথম প্রকাশ; পূর্বজ্ঞান বা পূর্বলিখনের প্রথম মুহূর্ত নয়
মুসহাফের সংকলনমানুষের সংগ্রহ, সাক্ষ্যগ্রহণ ও অনুমোদনের কাজসংকলনের বাস্তব পদ্ধতি তখনও স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের বিষয়

এই দাবির ফল শুধু “আল্লাহ আগেই জানতেন” বাক্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি সর্বজ্ঞ দর্শকের পূর্বজ্ঞান এবং জগতের ঘটনা নির্ধারণকারী কর্তৃপক্ষের লিখিত পরিকল্পনা একই ধারণা নয়। পূর্বজ্ঞান কোনো কাজের খবর দিতে পারে; তাকদিরের শক্তিশালী ধর্মতত্ত্বে কী ঘটবে, কীভাবে ঘটবে এবং মানুষের ইচ্ছা কোন ফল দেবে—এসবই আল্লাহর ইচ্ছার অধীন। তাই কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় মানুষের প্রতিক্রিয়া এবং পরে আসা ওহির মধ্যে সম্পর্ক দেখানো হলে পূর্বলিখনের দাবিকে সেই সম্পর্কসহই কার্যকর হতে হয়। মানুষের প্রশ্নটিও নির্ধারিত, প্রশ্নের পরে পাওয়া সংযোজনটিও নির্ধারিত—এই রূপে ব্যাখ্যা দাঁড়ায়। প্রশ্ন ও সংযোজনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক তাতে বিলুপ্ত হয় না।

উদাহরণ হিসেবে কোনো আদেশ প্রথমে একটি সাধারণ শ্রেণিকে উদ্দেশ্য করে এসেছে এবং পরে একটি ব্যতিক্রম যোগ হয়েছে—এই ঘটনাক্রম পূর্বলিখিত হওয়া সম্ভব বলে দাবি করা যায়। কিন্তু তখন পরিকল্পনার বিষয় একটি অপরিবর্তিত কার্যকর বাক্য নয়; প্রথম আদেশ, মানুষের প্রতিক্রিয়া, ব্যতিক্রম সংযোজন এবং সংশোধিত প্রয়োগ—সমগ্র ধারাটি। আগে থেকেই নির্ধারিত একটি পরিবর্তনকে অপরিবর্তন বলা শব্দের অর্থ বদলানো। পরিকল্পনা অভিন্ন থাকতে পারে, অথচ সেই পরিকল্পনার মধ্যে মানুষের কাছে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পাঠ বা আইন কার্যকর হতে পারে।

পূর্বনির্ধারণের সময়সীমা মানুষের কাছে বিধান প্রকাশের বিলম্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলে। যে ব্যতিক্রমের প্রয়োজন আগে থেকেই জানা ও লেখা, সেটি প্রথম নির্দেশেই প্রকাশ না করে আপত্তির পরে জানানো হলে আপত্তিটি প্রকাশপ্রক্রিয়ার কার্যকর অংশ হয়ে থাকে। এই অবস্থায় মানুষের প্রশ্নকে অপ্রয়োজনীয় বলা যায় না: বর্ণিত ঘটনাক্রমে সেই প্রশ্নের পরেই ব্যতিক্রম প্রকাশিত হয়েছে। বর্ণিত ক্রমে আগে প্রকাশিত বক্তব্য, মানবিক প্রতিক্রিয়া এবং পরে আসা সংযোজন পরস্পর যুক্ত। পূর্বলিখনের মতবাদ গ্রহণ করলে এই প্রকাশক্রমও আগে থেকে নির্ধারিত বলতে হয়।


আদম–ইবলিস, আবু লাহাব ও স্বাধীন সিদ্ধান্তের সমস্যা

আদম ও মুসার বিতর্কের হাদিসে অপরাধ, পরিণতি এবং পূর্বনির্ধারণ সরাসরি মুখোমুখি। মুসা আদমকে পিতা হিসেবে দায়ী করেন: তাঁর কারণে বংশধরেরা জান্নাত থেকে বেরিয়েছে। আদম উত্তর দেন, তাঁর সৃষ্টির চল্লিশ বছর আগেই আল্লাহ যে বিষয় নির্ধারণ করেছেন, তার জন্য তাঁকে তিরস্কার করা হচ্ছে কেন। বর্ণনায় মুহাম্মদ আদমের যুক্তিকে জয়ী বলেছেন। এই সিদ্ধান্তে পূর্বনির্ধারণ কেবল ভবিষ্যতের খবর নয়; তিরস্কারের জবাব দেওয়ার কার্যকর যুক্তিও হয়ে উঠেছে। [1252] [1253] [1254]

حَدَّثَنِي مُحَمَّدُ بْنُ حَاتِمٍ ، وَإِبْرَاهِيمُ بْنُ دِينَارِ ، وَابْنُ أَبِي عُمَرَ الْمَكِّيُّ ، وَأَحْمَدُ بْنُ عَبْدَةَ، الضَّبِّيُّ جَمِيعًا عَنِ ابْنِ عُيَيْنَةَ ، – وَاللَّفْظُ لاِبْنِ حَاتِمٍ وَابْنِ دِينَارٍ – قَالاَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ بْنُ، عُيَيْنَةَ عَنْ عَمْرٍو ، عَنْ طَاوُسٍ ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ ، يَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ احْتَجَّ آدَمُ وَمُوسَى فَقَالَ مُوسَى يَا آدَمُ أَنْتَ أَبُونَا خَيَّبْتَنَا وَأَخْرَجْتَنَا مِنَ الْجَنَّةِ فَقَالَ لَهُ آدَمُ أَنْتَ مُوسَى اصْطَفَاكَ اللَّهُ بِكَلاَمِهِ وَخَطَّ لَكَ بِيَدِهِ أَتَلُومُنِي عَلَى أَمْرٍ قَدَّرَهُ اللَّهُ عَلَىَّ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَنِي بِأَرْبَعِينَ سَنَةً ‏”‏ ‏.‏ فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ فَحَجَّ آدَمُ مُوسَى فَحَجَّ آدَمُ مُوسَى ‏” ‏ ‏.‏ وَفِي حَدِيثِ ابْنِ أَبِي عُمَرَ وَابْنِ عَبْدَةَ قَالَ أَحَدُهُمَا خَطَّ ‏.‏ وَقَالَ الآخَرُ كَتَبَ لَكَ التَّوْرَاةَ بِيَدِهِ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ২. আদম (আঃ) ও মুসা (আঃ) এর বিতর্ক
৬৫০১। মুহাম্মাদ ইবনু হাতিম, ইবরাহীম ইবনু দীনার, ইবনু আবূ উমর মাক্কী ও আহমাদ ইবনু আবদ দাব্বিয়্যু ও তাঊস (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আদম (আলাইহিস সালাম) ও মূসা (আলাইহিস সালাম) এর মধ্যে বিতর্ক হয়। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, হে আদম! আপনি আমাদের পিতা, আপনি আমাদের বঞ্চিত করেছেন এবং জান্নাত থেকে আমাদের বের করে দিয়েছেন। তখন আদম (আলাইহিস সালাম) তাঁকে বললেন, আপনি তো মূসা। আল্লাহ তা’আলা আপনার সঙ্গে কথা বলে আপনাকে মনোনীত (সম্মানিত) করেছেন এবং আপনার জন্য তার হাতে লিখে (কিতাব তাওরাত) দিয়েছেন। আপনি কি এমন বিষয়ে আমাকে তিরস্কার করছেন যা আমার সৃষ্টির চল্লিশ বছর পূর্বে আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করে রেখেছেন।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
আদম (আলাইহিস সালাম) মূসা (আলাইহিস সালাম) এর উপর তর্কে বিজয়ী হলেন।
আর ইবনু আবূ উমর ও ইবনু আবাদাহ বর্ণিত হাদীসে তাদের একজন বলেছেন,خَطَّ অন্যজন বলেছেন,كَتَبَ তিনি তার হাতে তোমার জন্য তাওরাত লিপিবদ্ধ করে দিয়েছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সহিহ মুসলিম আদম ও মুসার বিতর্ক 
হাদিস নম্বর ৬৫০১
সহিহ মুসলিম আদম ও মুসার বিতর্ক 
হাদিস নম্বর ৬৫০১

চল্লিশ বছরের ব্যবধান আদমের কাজের পরে দেওয়া অজুহাতের সময় নয়; তাঁর সৃষ্টির আগের নির্ধারণের সময়। আদম জন্ম নেওয়ার আগেই ঘটনাটি নির্দিষ্ট থাকলে তার দায় বণ্টনের প্রশ্নও তাঁর জন্মের আগের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হয়। মুসার অভিযোগে বংশধরদের ক্ষতি আছে; আদমের জবাবে আছে সেই পরিণতির পূর্বলিখন। বর্ণনার ভেতরে পূর্বনির্ধারণকে তিরস্কার খণ্ডনের কারণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। তাই শুধু আদমের সিদ্ধান্তটি আলাদা করে ধরে পরিকল্পনাকারীর ভূমিকাকে শূন্য বলা যায় না।

কোরআনের সৃষ্টিকাহিনিতেও মানুষকে পৃথিবীতে স্থাপনের ঘোষণা নিষিদ্ধ গাছের ঘটনার আগে আসে। বাকারা ২:৩০-এ আল্লাহ ফেরেশতাদের বলেন, তিনি পৃথিবীতে খলিফা স্থাপন করবেন। পরে গাছের নিকট যাওয়ার নিষেধ ও তা লঙ্ঘনের ঘটনা আসে। পৃথিবীতে মানবজীবন প্রতিষ্ঠা তাই কাহিনির শুরুতেই ঘোষিত উদ্দেশ্য। নির্বাসনের ঘটনা পূর্বঘোষিত পার্থিব মানবজীবনের ধারার ভেতরে কাজ করে। [1255]

وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً ۖ قَالُوا أَتَجْعَلُ فِيهَا مَن يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ ۖ قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ

বাংলা অনুবাদ: স্মরণ করো, তোমার প্রভু ফেরেশতাদের বলেছিলেন, আমি পৃথিবীতে খলিফা স্থাপন করব। তারা বলেছিল, আপনি কি সেখানে এমন কাউকে স্থাপন করবেন, যে সেখানে বিপর্যয় ঘটাবে ও রক্তপাত করবে, অথচ আমরা আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করি এবং আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করি? তিনি বললেন, আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না।

আদমের নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়া, ইবলিসের প্ররোচনা এবং পৃথিবীতে নামিয়ে দেওয়া—সবই যদি অভ্রান্ত পূর্বলিখনে নির্ধারিত হয়, তাহলে এই নির্দিষ্ট ঘটনাক্রমে তাদের বিপরীত ফল বাস্তবায়িত হয় না। ইবলিস সিজদা করলে পরবর্তী শত্রুতার বর্ণিত ধারাটি একই রূপে চলত না; আদম ফল না খেলে অপরাধের পরে নির্বাসনের সেই ধারাও হুবহু থাকত না। পুরো ধারাটি আগে থেকেই অপরিবর্তনীয় হলে পরিকল্পনার মধ্যকার এই অবাধ্যতাও পরিকল্পনার বাইরে কোনো আকস্মিক ব্যাঘাত নয়। যে পরিকল্পনায় ওহি, নবী ও উদ্ধার অন্তর্ভুক্ত, তাতেই প্রলোভন, লঙ্ঘন ও নির্বাসনের ভূমিকাও নির্ধারিত।

ইবলিসের বক্তব্যে এই সম্পর্ক আরও খোলামেলা। হিজর ১৫:৩৯-এ সে আল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলে, তাঁকে পথভ্রষ্ট করার কারণে সে পৃথিবীতে মানুষকে প্রলুব্ধ করবে এবং পথভ্রষ্ট করবে। কোরআনের বয়ানে এটি ইবলিসের নিজের উক্তি। এই উক্তিতে প্রলুব্ধকারীর কাজের ঘোষণার সঙ্গে তার নিজের পথভ্রষ্টতার উৎস সম্পর্কেও একটি অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ কাহিনির প্রতিপক্ষও নিজের ভূমিকার ব্যাখ্যায় ঊর্ধ্বতন নির্ধারণকে সামনে আনছে। [1256]

قَالَ رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ

বাংলা অনুবাদ: সে বলল, হে আমার প্রভু, আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন বলে আমি অবশ্যই পৃথিবীতে তাদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলব এবং তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করব।

আবু লাহাবের ক্ষেত্রে পূর্বলিখন ও ব্যক্তির চূড়ান্ত পরিণতির সম্পর্ক একটি নামযুক্ত উদাহরণ পায়। সূরা লাহাব কেবল সাধারণভাবে অবিশ্বাসীর শাস্তির কথা বলে না; আবু লাহাবের নাম এবং তার আগুনে প্রবেশের ভবিষ্যৎ ঘোষণা করে। তাবারি “সে অগ্নিশিখাময় আগুনে প্রবেশ করবে” কথাটির বিষয় হিসেবেও আবু লাহাবের পরিচয় নির্দিষ্ট করেছেন। ফলে পূর্বলিখিত ও অভ্রান্ত কোরআনের বিশ্বাস অনুযায়ী এই ব্যক্তির চূড়ান্ত পরিণতি তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের আগেই নির্দিষ্ট সত্য। [1257]

سَيَصْلَىٰ نَارًا ذَاتَ لَهَبٍ

বাংলা অনুবাদ: সে অগ্নিশিখাময় আগুনে প্রবেশ করবে।

এই ঘোষণার অবতরণ-পরিস্থিতি ব্যক্তিগত বিরোধের সঙ্গে যুক্ত। ইবনে কাছির বুখারির বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন: মুহাম্মদ লোকজন জড়ো করে আসন্ন কঠোর শাস্তির সতর্কবার্তা দিলে আবু লাহাব তাঁকে ধ্বংসের অভিশাপ দেয়; তার পরে “তাব্বাত ইয়াদা আবি লাহাব” অবতীর্ণ হয়। মানুষের দিক থেকে ঘটনাক্রমে প্রথমে সতর্কবার্তা, তারপর পাল্টা অভিশাপ, তারপর তার নামে সূরা। আর পূর্বলিখনের তত্ত্বে এই অভিশাপ এবং তার জবাবে আসা সূরা—দুটিই সেই আগের নির্ধারিত ধারার অন্তর্ভুক্ত। [1258]

فقال أبو لهب : ألهذا جمعتنا ؟ تبا لك

বাংলা অনুবাদ: তখন আবু লাহাব বলল, এ জন্যই কি আমাদের জড়ো করেছ? তোমার ধ্বংস হোক। তখন আল্লাহ “ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত, এবং সে ধ্বংস হয়েছে”—সূরার শেষ পর্যন্ত অবতীর্ণ করলেন।

অভ্রান্ত পূর্বঘোষণা স্থির রেখে আবু লাহাবের বিপরীত চূড়ান্ত পরিণতি ঘটানো যায় না। যদি তার ভবিষ্যৎ এমনভাবে বদলায় যে ঘোষিত পরিণতি আর ঘটে না, তাহলে পূর্বঘোষণা মিথ্যা হবে। আর পূর্বঘোষণার সত্যতা অপরিবর্তনীয় হলে সেই বিপরীত পরিণতি ঘটবে না। এই যুক্তির কেন্দ্র মানুষের সম্পূর্ণ জীবনশেষে ঘোষিত ফলের বিপরীত ফল বাস্তবায়নের সুযোগ। একটি পথ বেছে নেওয়ার অনুভূতি এবং পূর্বনির্ধারিত শেষ ফলকে সত্যিই বদলাতে পারা একই স্বাধীনতা নয়।

আবু বকর ও আবু লাহাবের অবস্থান অদলবদলের একটি কাল্পনিক তুলনায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়। আবু বকরের বন্ধুত্ব ও আবু লাহাবের বিরোধিতা যদি জন্মের আগেই অভ্রান্ত পরিকল্পনায় নির্দিষ্ট থাকে, তাহলে দুই ব্যক্তির বিপরীত চূড়ান্ত অবস্থান সেই একই পরিকল্পনা অপরিবর্তিত রেখে সম্ভব নয়। তাদের নামযুক্ত বক্তব্যও তখন একইভাবে থাকবে না। তুলনাটির “ধ্বংস হোক আবু বকরের হস্তদ্বয়” বাক্যটি কল্পিত; বিপরীত ফল ঘটলে পূর্বলিখিত নামযুক্ত বক্তব্যের কী হতো, সেই যুক্তিগত পার্থক্য দেখায়।

কাল্পনিক তুলনার অবস্থাবাণী ও পরিকল্পনায় তার ফলস্বাধীনতার সমস্যাটি যেখানে
আবু লাহাবের পূর্বঘোষিত চূড়ান্ত পরিণতি ঘটেনামযুক্ত পূর্বঘোষণা সত্য থাকেবিপরীত শেষ ফল বাস্তবে ঘটেনি
আবু লাহাবের চূড়ান্ত পরিণতি ঘোষণার বিপরীত হয়একই পূর্বঘোষণা তখন সত্য থাকে নাঅভ্রান্ত ঘোষণা ও বিপরীত ফল একসঙ্গে রাখা যায় না
আবু বকর ও আবু লাহাবের নির্ধারিত অবস্থান সম্পূর্ণ অদলবদল হয়নামযুক্ত পূর্বলিখনও ভিন্ন হতে হয়; “ধ্বংস হোক আবু বকরের হস্তদ্বয়” কেবল সেই কাল্পনিক বদলের উদাহরণএকই অপরিবর্তনীয় পরিকল্পনা রেখে চূড়ান্ত অবস্থান অদলবদল হয় না

মানুষের ইচ্ছার ওপর আল্লাহর ইচ্ছার কর্তৃত্ব কোরআনেও বলা হয়েছে। তাকভির ৮১:২৮-এ সরল পথে চলতে ইচ্ছুক ব্যক্তির কথা আছে; পরের আয়াতে মানুষের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার অধীন করা হয়েছে। দুই বক্তব্য পাশাপাশি থাকলে ব্যক্তির ইচ্ছা আছে, কিন্তু সেই ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছা থেকে স্বাধীন চূড়ান্ত নির্ধারক নয়। স্বাধীন সিদ্ধান্তের প্রশ্ন তাই ইচ্ছার অনুভূতি আছে কি না, তার চেয়ে গভীর: আল্লাহ বিপরীতটি না চাইলে মানুষ নিজের ইচ্ছায় সেটি ঘটাতে পারে কি না। [1259] [1260]

لِمَن شَاءَ مِنكُمْ أَن يَسْتَقِيمَ
وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের মধ্যে যে সরল পথে চলতে চায়, তার জন্য। আর জগতসমূহের প্রভু আল্লাহ না চাইলে তোমরা ইচ্ছা করতে পারো না।

কাহফ ১৮:১৭-এ হেদায়াত ও পথভ্রষ্টতার পরিণতিও আল্লাহর কাজের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার জন্য পথপ্রদর্শক ও সাহায্যকারী না পাওয়ার বক্তব্য ব্যক্তির ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে আরও তীব্র করে। ব্যক্তিকে বিশ্বাসের নির্দেশ দেওয়া এবং তাকে বিশ্বাসের পথে পৌঁছানোর নিয়ন্ত্রণ অন্য কর্তৃপক্ষের হাতে থাকা—এই দুই অবস্থান একই নৈতিক সমস্যার অংশ। [1261] [1262]

مَن يَهْدِ اللَّهُ فَهُوَ الْمُهْتَدِ ۖ وَمَن يُضْلِلْ فَلَن تَجِدَ لَهُ وَلِيًّا مُّرْشِدًا

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ যাকে সৎপথে চালান, সেই সৎপথপ্রাপ্ত এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, আপনি কখনও তার জন্যে পথপ্রদর্শনকারী ও সাহায্যকারী পাবেন না।

আরাফ ৭:১৭৮-এ একই সম্পর্ক সংক্ষেপে পুনরায় বলা হয়েছে। এখানে পথপ্রাপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত দুই পক্ষের পরিচয় আল্লাহর হেদায়াত ও পথভ্রষ্ট করার সঙ্গে নির্ধারিত। নির্দিষ্ট কারও শাস্তিকে তার সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র সিদ্ধান্তের ফল বললে এই ঊর্ধ্বতন কার্যকর নিয়ন্ত্রণের দায় বাদ পড়ে যায়। [1263] [1264]

مَن يَهْدِ اللَّهُ فَهُوَ الْمُهْتَدِي ۖ وَمَن يُضْلِلْ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ

বাংলা অনুবাদ: যাকে আল্লাহ পথ দেখাবেন, সেই পথপ্রাপ্ত হবে। আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করবেন, সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।

আবু লাহাবের সমস্যাটি পরবর্তী শাস্ত্রীয় আলোচনাতেও উপস্থিত। যাবিদির ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকিনে সামর্থ্যের দিক থেকে কোনো কাজ সম্ভব হওয়া এবং আল্লাহর জ্ঞান ও ঘোষণার বিপরীতে তার বাস্তবে না ঘটার মধ্যে পার্থক্য টানা হয়েছে। ওই আলোচনা সরাসরি স্বীকার করে, আল্লাহ যা ঘটবে না বলে জানেন ও জানান, তা ঘটবে না। ফলে শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাকে স্বাধীনতার মানদণ্ড করলে একটি উত্তর পাওয়া যায়; অভ্রান্ত নির্ধারণ অক্ষুণ্ণ রেখে বিপরীত ফল ঘটানোর ক্ষমতা চাইলে সমস্যাটি থেকে যায়। [1265]

ثم ما علم الله تعالى وأخبر أنه لا يقع، لا يقع قطعا، كاجتماع الضدين

বাংলা অনুবাদ: তারপর আল্লাহ যা জানেন ও জানান যে ঘটবে না, তা নিশ্চিতভাবেই ঘটে না—দুই বিপরীত বিষয়ের একত্র হওয়ার মতো।

আদম, ইবলিস ও আবু লাহাবের ঘটনাগুলোতে ব্যক্তি বেছে নেয়, কাজ করে এবং ফল ভোগ করে; কিন্তু ঘোষিত সামগ্রিক পরিকল্পনার বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণ করে না। একটি সর্বব্যাপী পরিকল্পনার মধ্যে অবাধ্যতার ভূমিকা অপরিহার্যভাবে নির্দিষ্ট রেখে সেই অবাধ্য ব্যক্তিকেই সমগ্র দায়ের একমাত্র উৎস বানানো অন্যায্য। ফলের বিপরীত সম্ভাবনা বন্ধ করে তারপর সেই ফল বেছে নেওয়ার জন্য অনন্ত শাস্তি দেওয়া হলে বিচারক একই সঙ্গে ঘটনার সর্বশেষ নির্ধারক এবং শাস্তিদাতা হয়ে ওঠেন। এই নৈতিক আপত্তি বাণীর দাবিকৃত উৎসের পাশাপাশি সেই বাণীতে ঘোষিত দায়বণ্টনকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে।


পূর্বলিখিত পরিকল্পনায় মানুষের আপত্তি, শব্দসংযোজন ও সংশোধনের অবস্থান

পূর্বলিখিত কোরআনের সঙ্গে নসখের সম্পর্ক নিয়ে তাবারির সংরক্ষিত একটি ব্যাখ্যা বিশেষভাবে স্পষ্ট। রা’দ ১৩:৩৯-এ আল্লাহ যা চান মুছে দেন, যা চান বহাল রাখেন এবং তাঁর কাছে উম্মুল কিতাব রয়েছে বলা হয়েছে। এই ভাষায় মোছা ও বহাল রাখা দুটিই কার্যকর ক্রিয়া। কোনো নথিতে মুছে দেওয়া ও বহাল রাখার তালিকা আগে থেকে থাকলেও ওই তালিকার বাস্তবায়নে পরিবর্তন ঘটে। একটি চূড়ান্ত পরিকল্পনা এবং সেই পরিকল্পনার বিভিন্ন পর্যায়ের কার্যকর নির্দেশ একই বস্তু নয়। [1266]

يَمْحُو اللَّهُ مَا يَشَاءُ وَيُثْبِتُ ۖ وَعِندَهُ أُمُّ الْكِتَابِ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ যা চান মুছে দেন এবং বহাল রাখেন; আর তাঁর কাছেই রয়েছে মূল গ্রন্থ।

তাবারি আয়াতটির একাধিক ব্যাখ্যা সংরক্ষণ করেছেন। তার মধ্যে ইবনে আব্বাসের নামে একটি ব্যাখ্যায় কোরআনের নাসেখ–মানসুখ, বদলানো ও বহাল রাখা অংশ—সবই উম্মুল কিতাবে থাকার কথা বলা হয়েছে। এটি পূর্বপরিকল্পনার সঙ্গে পরিবর্তনের সম্পর্কের সরাসরি শাস্ত্রীয় উদাহরণ। ওই ব্যাখ্যায় আগের ও পরের বিধান একই পরিকল্পনার অংশ; তাই পরেরটির উপস্থিতি আগেরটির কার্যকারিতা বদলানোর ঘটনাকে বাতিল করে না। [1267]

من القرآن . يقول: يبدل الله ما يشاء فينسخه, ويثبت ما يشاء فلا يبدله(وعنده أم الكتاب) ، يقول: وجملة ذلك عنده في أمّ الكتاب، الناسخ والمنسوخ, وما يبدل وما يثبت, كلُّ ذلك في كتاب .

বাংলা অনুবাদ: কোরআন থেকে। অর্থাৎ আল্লাহ যা চান বদলে রহিত করেন, আর যা চান বহাল রাখেন, বদলান না। “তাঁর কাছেই রয়েছে মূল গ্রন্থ”—অর্থাৎ এর সমগ্রটি তাঁর কাছে উম্মুল কিতাবে রয়েছে: নাসেখ ও মানসুখ, যা বদলানো হয় এবং যা বহাল রাখা হয়—সবই একটি গ্রন্থে রয়েছে।

এই ব্যাখ্যায় পূর্বলিখনের বিষয় কেবল বর্তমানে প্রচলিত চূড়ান্ত পাঠ নয়; রহিত ও বহাল উভয় পর্যায়ের বিষয়বস্তু। কোনো আয়াত মানুষের কাছে প্রথমে পঠিত হলো, পরে তার পাঠ বা বিধান সরানো হলো—সেই ঘটনাক্রমও আগে থেকে নির্ধারিত হতে পারে। তাতে মানুষের কাছে আগের ও পরের অবস্থার পার্থক্য থাকে। “আল্লাহর কাছে সবই লেখা ছিল” এবং “মানুষের কাছে সব সময়ে একই পাঠ ছিল”—প্রথম বাক্য থেকে দ্বিতীয়টি আসে না। বরং উদ্ধৃত ব্যাখ্যায় পরিবর্তনের একাধিক পর্যায়কে মূল গ্রন্থের মধ্যে স্থান দেওয়া হয়েছে।

ইবনে উম্মে মাকতুমের প্রশ্নের বর্ণনায় এই পার্থক্য নির্দিষ্ট শব্দে ধরা পড়ে। নিসা ৪:৯৫-এ তাঁর প্রশ্নের পরে “গাইরু উলিদ্-দারার” যুক্ত হওয়ার ঘটনাক্রমে প্রথম ঘোষিত তুলনা, অন্ধ ব্যক্তির অসুবিধার কথা জানানো এবং ব্যতিক্রমসংবলিত পরবর্তী পাঠ রয়েছে। পূর্বলিখনের তত্ত্ব মানলে প্রথম ঘোষণা ও প্রশ্নের পাশাপাশি ব্যতিক্রমের সংযোজনও আগে থেকে নির্ধারিত। কিন্তু শ্রোতা ও লেখকের কাছে প্রথমে যা দেওয়া হয়েছিল এবং পরে যা দেওয়া হয়েছে, তা হুবহু এক নয়। নতুন বাক্যাংশ বাদ দিয়ে আগের অবস্থাকে পরের অবস্থার সমান দেখানো যায় না।

এখানে মানুষের অভিজ্ঞতা প্রকাশের ভূমিকাটিও দৃশ্যমান। একটি সাধারণ বক্তব্য কারও শারীরিক অবস্থার সমস্যাটি প্রকাশ করে না; সেই ব্যক্তি সমস্যাটি জানানোর পরে বিশেষ ব্যতিক্রমটি আসে। সর্বজ্ঞ পরিকল্পনায় এই প্রশ্ন আগে থেকে থাকা দাবি করা হলে প্রশ্নকারীর ভূমিকা পরিকল্পনার অংশ হয়। প্রশ্নটি অকার্যকর হয়ে যায় না। বর্ণনায় উত্তরটি তাঁর প্রশ্নের পরে প্রকাশিত; মানুষের আপত্তি ও নতুন শব্দের মধ্যে যে ক্রম রয়েছে, সেই ক্রমেই ধর্মীয় বাণী তাঁর নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান দিচ্ছে। সাধারণ নির্দেশের প্রথম প্রকাশে অনুপস্থিত ব্যতিক্রম পরে যোগ হওয়ার এই বাস্তব সম্পর্কটিই পাঠ পরিবর্তনের বিষয়।

উমরের বক্তব্যের অনুরূপ ওহির বর্ণনাগুলোতে মানুষের প্রস্তাব ও পরবর্তী অনুমোদনের আরেক রূপ পাওয়া যায়। মাকামে ইবরাহিমে নামাজের প্রস্তাব, নবীপত্নীদের বিষয়ে উমরের বক্তব্য এবং ইবনে উবাইয়ের জানাজায় তাঁর আপত্তি—এই ঘটনাগুলোর আলোচ্য সম্পর্ক একই ধরনের: মানুষের একটি নির্দিষ্ট মত আগে এসেছে, পরে ধর্মীয় নির্দেশ তার সঙ্গে মিলেছে। সবকিছু পূর্বনির্ধারিত বললে উমরের মতও আল্লাহর পরিকল্পনায় পড়ে। কিন্তু ওহির পার্থিব প্রকাশে একজন প্রভাবশালী মানুষের মত আগে উচ্চারিত হওয়ার তথ্য তাতে মুছে যায় না।

এই সম্পর্কের সামাজিক ফল নির্দিষ্ট। মানুষের বক্তব্যের সঙ্গে ওহির মিল সেই ব্যক্তির অবস্থানকে বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদা দেয়; আবার সেই বর্ণনাই বাণী প্রকাশের সঙ্গে মানুষের মতের যোগসূত্র সংরক্ষণ করে। পূর্বলিখনের বিশ্বাস যোগ করলে এই সামাজিক কার্যকারিতাও পরিকল্পিত বলে গণ্য হয়। একটি ব্যক্তিগত প্রস্তাব কোন পর্যায়ে বাধ্যতামূলক নির্দেশের মর্যাদা পেল, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও মানবসমাজের ঘটনাক্রমেই রয়েছে। প্রস্তাবের আগেই অদৃশ্য নথিতে অনুমোদন লেখা ছিল—এই বিশ্বাস প্রস্তাবকারীকে পার্থিব ঘটনাক্রম থেকে সরিয়ে দেয় না।

সংরক্ষিত ঘটনার ধরনমানুষের দৃশ্যমান ভূমিকাপূর্বলিখন মানলে যা অন্তর্ভুক্ত হয়মানুষের কাছে যে পরিবর্তন ঘটে
নিসা ৪:৯৫-এর ব্যতিক্রমইবনে উম্মে মাকতুম নিজের অক্ষমতার কথা জানানপ্রথম বক্তব্য, প্রশ্ন ও পরবর্তী সংযোজননতুন বাক্যাংশে সাধারণ তুলনার সীমা নির্দিষ্ট হয়
উমরের মতের অনুরূপ নির্দেশপ্রস্তাব, আপত্তি বা হুমকি আগে উচ্চারিত হয়মানুষের মত এবং তার সঙ্গে মেলা ওহিমানুষের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিত বিষয় ধর্মীয় আদেশের মর্যাদা পায়
ওহি লেখার সময়ে বিকল্প শব্দের বর্ণনালেখক কোনো শব্দ লেখেন বা প্রস্তাব করেনলেখকের কাজ ও তার অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যানশব্দ নির্ধারণের মুহূর্তে মানুষের উপস্থিতি থাকে
উসমানের সংকলনকমিটি, সাক্ষ্য, ভাষাগত সিদ্ধান্ত ও প্রচারের ব্যবস্থাসংকলন ও প্রতিদ্বন্দ্বী নকল অপসারণের সমগ্র ঘটনাএকটি অনুমোদিত লিখিত মান অন্য পাঠের ওপর কর্তৃত্ব পায়
নাসেখ–মানসুখপাঠকারী ও বিধান পালনকারীরা নতুন নির্দেশ গ্রহণ করেনআগের ও পরের উভয় নির্দেশপঠিত বিষয় কিংবা কার্যকর আইন আগের অবস্থায় থাকে না

ওহি লেখার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনে সাদের নামে সংরক্ষিত বর্ণনাগুলোতেও শব্দ নির্ধারণের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেন্দ্রীয়। বর্ণনায় লেখকের প্রস্তাব বা পরিবর্তন গ্রহণ করা হলে গ্রহণের সিদ্ধান্তটি অর্থবহ; প্রত্যাখ্যাত হলে প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্তটিও অর্থবহ। বর্ণিত ঘটনাক্রমে মানুষের শব্দ নির্বাচন থাকলে “পরিকল্পিত ছিল” বলা সেই নির্বাচনের উপস্থিতি অস্বীকার করে না।

উসমানের সংকলনের ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারণের যুক্তি আরও বিস্তৃত সমস্যায় পড়ে। রাষ্ট্রীয় মান্য পাঠ নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় একটি কমিটি কাজ করেছে, ভাষাগত বিরোধে একটি নীতি প্রয়োগ হয়েছে এবং আঞ্চলিক প্রচারের জন্য নকল পাঠানো হয়েছে। বিকল্প লিখিত দলিল ধ্বংসের সিদ্ধান্ত পরবর্তী তুলনার উপকরণও কমিয়েছে। এগুলো পরিকল্পিত ছিল বলে মানলে মানুষ কীভাবে কাজগুলো করেছে, তার ইতিহাস অক্ষুণ্ণ থাকে। পূর্বনির্ধারণের দাবি কমিটির সদস্যদের বদলে সরাসরি আসমানি ফলককে সম্পাদকের আসনে বসানোর দলিল নয়।

সমস্ত ঘটনা নির্ধারিত হওয়ার সাধারণ নিয়ম থেকে শুধু বিজয়ী সিদ্ধান্তকে বিশেষ দৈব অনুমোদন দেওয়া যায় না। একই নিয়মে প্রতিদ্বন্দ্বী পাঠের উপস্থিতি, সাহাবির আপত্তি এবং সরকারি কপির বিরুদ্ধে প্রতিরোধও নির্ধারিত। একটি নকল বহাল থাকল বলে সেটি মূলের সঙ্গে অভিন্ন—এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে অতিরিক্ত প্রমাণ লাগে। যে নিয়ম অনুমোদিত নকল ও ধ্বংসপ্রাপ্ত নকল উভয়ের ইতিহাসকে সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করে, সেটি একা তাদের মধ্যকার পাঠগত সত্যতা বাছাই করতে পারে না। ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং মূলের সঙ্গে অভিন্ন থাকা আলাদা বৈশিষ্ট্য।

অপরিবর্তিত থাকার তিনটি ভিন্ন দাবি এখানে পৃথক ফল দেয়। আল্লাহর জ্ঞান অপরিবর্তিত—এটি জ্ঞান সম্পর্কে দাবি। উম্মুল কিতাবে পুরো ধারাটি আগে থেকে আছে—এটি পরিকল্পনার সম্পূর্ণতা সম্পর্কে দাবি। মানুষের কাছে সব সময়ে একই পাঠ ও বিধান কার্যকর ছিল—এটি ইতিহাস সম্পর্কে দাবি। প্রথম দুটি মানলেও তৃতীয়টি তাদের যৌক্তিক ফল নয়। তাবারির উদ্ধৃত ব্যাখ্যায় নাসেখ ও মানসুখ একত্রে মূল গ্রন্থে থাকার অর্থই হলো একটি সম্পূর্ণ পরিকল্পনায় বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন কার্যকর অবস্থা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

পাঠের ইতিহাসে তাই দুটি সময়ের বিষয়বস্তু তুলনা করে পরিবর্তন শনাক্ত হয়। কোনো শব্দ আগে অনুপস্থিত এবং পরে উপস্থিত হলে সংযোজনের ঘটনা রয়েছে। আগে পঠিত কোনো অংশ পরে পঠিত না হলে পাঠের পরিসর বদলেছে। একই বাক্য পঠিত থেকেও তার বিধান অকার্যকর হলে আইনের অবস্থা বদলেছে। পূর্বলিখিত পরিকল্পনা এসব পার্থক্যের ধর্মীয় ব্যাখ্যা হতে পারে; পার্থক্য না ঘটার প্রমাণ হতে পারে না। “অনুমোদিত”, “পূর্বনির্ধারিত” ও “অপরিবর্তিত”—তিনটি শব্দ একই অর্থ বহন করে না।

বাস্তব পৃথিবীতে কোরআনের প্রথম লিখনের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত বাস্তব দলিলের কাছেই ফিরে আসে। লেখক, উপকরণ ও প্রথম লিখিত সংরক্ষণের বিবরণ যে জগতে অবস্থিত, সেই জগতেই সংগ্রহ, যাচাই, নকল, বর্জন ও সংশোধন হয়েছে। আসমানি ফলকের দাবি এই কাজগুলোর জন্য আলাদা প্রমাণ সরবরাহ করে না। মানুষের হাতে সম্পাদিত কাজের ব্যাখ্যায় আল্লাহর পরিকল্পনা বসানো যায়; সেই পরিকল্পনার নাম নিয়ে মানুষের কাজটিকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায় না।


অপরিবর্তনীয়তার ঘোষণা এবং সংকলন–সংশোধনের সম্মিলিত হিসাব

কোনো গ্রন্থের অপরিবর্তনীয়তার ঘোষণা এবং সেই গ্রন্থের সংকলনের ইতিহাস দুটি পৃথক সাক্ষ্য। প্রথমটি গ্রন্থ নিজের সম্পর্কে কী বলছে, দ্বিতীয়টি গ্রন্থের উপাদান সংগ্রহ, পাঠ নির্বাচন, অনুলিপি প্রস্তুত ও প্রতিদ্বন্দ্বী নথি অপসারণের সময় কী ঘটেছে। কোরআনের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান বিশেষভাবে তীক্ষ্ণ। সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি ইসলামি সূত্রেই রয়েছে পূর্বে পঠিত অংশের অনুপস্থিতি, একাধিক পাঠের অনুমোদন, কোনো কোনো পাঠ গ্রহণে সাহাবিদের অস্বীকৃতি এবং রাষ্ট্রীয় আদেশে অন্য মুসহাফ ধ্বংসের বিবরণ। পরবর্তী কালে একটি পাঠকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়ার মাধ্যমে এসব ঘটনার নাম বদলানো যায়; ঘটনাগুলোর সংঘটন মুছে যায় না। অনুমোদিত পরিবর্তনও পরিবর্তন। কোনো পাঠ বাদ দেওয়াকে বৈধ বলা এবং সেই পাঠ কখনো ছিল না বলা এক বক্তব্য নয়।

এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে একটি কর্তৃত্বের সম্পর্ক: কোন শব্দ কোরআন, কোন পাঠ রহিত, কোন সাক্ষী নির্ভরযোগ্য এবং কোন লিখিত নথি বহাল থাকবে—প্রতিটি স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী মানুষ ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। গৃহীত মুসহাফ সেই সিদ্ধান্তগুলোর ফল। তাকে সিদ্ধান্তের আগের সমস্ত পাঠের সঙ্গে অভিন্ন ঘোষণা করলে সংকলনের ইতিহাসই সেই দাবির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়। আবার কেবল পরবর্তী অনুমোদিত পাঠকে সংরক্ষিত বলে সংজ্ঞায়িত করলে সংরক্ষণের দাবির পরিসর বদলে যায়: তখন যা নির্বাচিত হয়েছে তার স্থায়িত্বের কথা বলা হচ্ছে, অবতরণ থেকে নির্বাচন পর্যন্ত সব পাঠ অপরিবর্তিত থাকার কথা বলা হচ্ছে না।


আনআম ৬:১১৫, কাহফ ১৮:২৭ ও বাণী বদলাতে না-পারার ঘোষণা

আনআম ৬:১১৫-এ আল্লাহর বাণীর সত্যতা, ন্যায়সংগততা এবং তা বদলানোর অক্ষমতার ঘোষণা একই বাক্যে এসেছে। আয়াতের ভাষা চূড়ান্ত: বাণী পূর্ণ হয়েছে, তার পরিবর্তনকারী নেই। “পূর্ণ”, “সত্য”, “ন্যায়” এবং “পরিবর্তনকারী নেই”—এসব শব্দ একটি নির্ভুল কর্তৃত্বের ধারণা নির্মাণ করে। সেই কর্তৃত্বের নামে প্রচারিত মুসহাফের পাঠ কীভাবে নির্বাচিত হলো, এই প্রশ্নের উত্তর আয়াতের আত্মঘোষণা থেকে পাওয়া যায় না। আয়াত নিজের মর্যাদা ঘোষণা করছে; সংকলন-কমিটির কাজের নির্ভুলতা কোনো স্বতন্ত্র দলিল দিয়ে প্রতিষ্ঠা করছে না। [1268]

وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا ۚ لَّا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ ۚ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

বাংলা অনুবাদ: আপনার প্রতিপালকের বাক্য পূর্ণ সত্য ও সুষম। তাঁর বাক্যের কোন পরিবর্তনকারী নেই। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।

ইবনে কাসীরের ব্যাখ্যায় “সত্য” সংবাদসংক্রান্ত এবং “ন্যায়” বিধানসংক্রান্ত। তিনি কাতাদার বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন: আল্লাহ যা বলেছেন তাতে সত্য এবং যা বিধান দিয়েছেন তাতে ন্যায়। এই ব্যাখ্যায় মূল দাবি বক্তব্যের সত্যতা ও নির্দেশের ন্যায্যতা। কোনো অনুলিপির প্রতিটি অক্ষর অন্য সব অনুলিপির সঙ্গে অভিন্ন—এটি আলাদা ঐতিহাসিক দাবি, যার জন্য অনুলিপি ও পাঠসাক্ষ্য লাগে। [1269]

قال قتادة : صدقا فيما قال ، وعدلا فيما حكم .

বাংলা অনুবাদ: কাতাদা বলেছেন: তিনি যা বলেছেন তাতে সত্য, আর যা বিধান দিয়েছেন তাতে ন্যায়।

একই তাফসিরে “তাঁর বাণী বদলানোর কেউ নেই” কথাটিকে ইবনে কাসীর এমন সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যার বিরুদ্ধে দুনিয়া বা আখিরাতে কেউ কার্যকর প্রত্যাদেশ দিতে পারে না। এখানে বাণীর অপরিবর্তনীয়তা বিচারক্ষমতার চূড়ান্ততার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ঐশী সিদ্ধান্তের চূড়ান্ততা থেকে নির্দিষ্ট মানবীয় সংগ্রহের প্রতিটি নির্বাচন নির্ভুল হওয়ার সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে না। একটি নির্দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় মর্যাদা এবং সেই নির্দেশের লিখিত বাহকের পাঠগত ইতিহাস এক জিনিস নয়। [1270] [1271]

( لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ ) أَيْ: لَيْسَ أَحَدٌ يُعَقِّبُ حُكْمَهُ تَعَالَى لَا فِي الدُّنْيَا وَلَا فِي الْآخِرَةِ

বাংলা অনুবাদ: “তাঁর বাণী বদলানোর কেউ নেই”—অর্থাৎ দুনিয়া বা আখিরাতে তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কেউ ফেরত সিদ্ধান্ত দিতে পারে না।

কোরআন সংকলন 244

ইউনুস ১০:৬৪-এ অপরিবর্তনীয়তার ভাষা এসেছে সুসংবাদের প্রসঙ্গে। পার্থিব জীবন ও পরকালের সুসংবাদ দেওয়ার পর বলা হচ্ছে, আল্লাহর কথার পরিবর্তন হয় না। এখানে অপরিবর্তিত থাকার বিষয় হলো ঘোষিত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। একটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ না হওয়া এবং তার বিবরণ বহনকারী সব ঐতিহাসিক নথি শব্দে শব্দে অভিন্ন থাকা ভিন্ন ঘটনা। প্রচারিত সিদ্ধান্তে যখন এই দুটিকে একই করে দেওয়া হয়, তখন প্রতিশ্রুতির ধর্মতাত্ত্বিক নিশ্চয়তাকে নথির ইতিহাসের বদলি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। [1272]

لَهُمُ الْبُشْرَىٰ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۚ لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

বাংলা অনুবাদ: তাদের জন্য সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পরকালীন জীবনে। আল্লাহর কথার কখনো হের-ফের হয় না। এটাই হল মহা সফলতা।

ইবনে কাসীরও এই আয়াতে অপরিবর্তনীয় কথাকে নির্দিষ্টভাবে “এই প্রতিশ্রুতি” বলেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় প্রতিশ্রুতি বদলাবে না, ব্যর্থ হবে না, পরিবর্তিত হবে না; তা অবশ্যই ঘটবে। প্রতিশ্রুতির নিশ্চয়তা এখানে তাফসিরের প্রত্যক্ষ বক্তব্য। [1273]

هذا الوعد لا يبدل ولا يخلف ولا يغير ، بل هو مقرر مثبت كائن لا محالة

বাংলা অনুবাদ: এই প্রতিশ্রুতি বদলানো হবে না, ব্যর্থ হবে না এবং পরিবর্তিত হবে না; বরং তা নির্ধারিত, প্রতিষ্ঠিত এবং অবশ্যম্ভাবী।

আনআম ৬:৩৪-এ একই ঘোষণা এসেছে পূর্ববর্তী নবীদের অস্বীকৃতি, নির্যাতন সহ্য করা এবং শেষ পর্যন্ত সাহায্য পাওয়ার বিবরণে। “আল্লাহর বাণী কেউ পরিবর্তন করতে পারে না” বাক্যটি সেখানে সাহায্যের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সংযুক্ত। ধর্মীয় আশ্বাসকে মুসহাফের সব কপির পাঠগত অভিন্নতার প্রমাণে পরিণত করলে বক্তব্যের বিষয় পাল্টে যায়। আয়াতের ঘোষিত সাহায্য এবং যায়েদের হাতে সংগৃহীত উপাদানের পূর্ণতা পৃথকভাবে যাচাইযোগ্য দুটি প্রশ্ন। [1274]

وَلَقَدْ كُذِّبَتْ رُسُلٌ مِّن قَبْلِكَ فَصَبَرُوا عَلَىٰ مَا كُذِّبُوا وَأُوذُوا حَتَّىٰ أَتَاهُمْ نَصْرُنَا ۚ وَلَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ ۚ وَلَقَدْ جَاءَكَ مِن نَّبَإِ الْمُرْسَلِينَ

বাংলা অনুবাদ: আপনার পূর্ববর্তী অনেক পয়গম্বরকে মিথ্যা বলা হয়েছে। তাঁরা এতে ছবর করেছেন। তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছে পর্যন্ত তারা নির্যাতিত হয়েছেন। আল্লাহর বানী কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। আপনার কাছে পয়গম্বরদের কিছু কাহিনী পৌঁছেছে।

আনআমের এই ব্যাখ্যার মুদ্রিত বাংলা সূত্রেও আল্লাহর বাণী এবং তাঁর প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ রয়েছে। সংরক্ষণের দাবির আলোচনায় উদ্ধৃত পৃষ্ঠাটি সেই বক্তব্যের নথি হিসেবে প্রাসঙ্গিক। [1275] [1276]

التي كتبها بالنصر في الدنيا والآخرة لعباده المؤمنين

বাংলা অনুবাদ: মুমিন বান্দাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে বিজয়ের যে বাণী তিনি লিখে রেখেছেন।

কোরআন সংকলন 246

কাহফ ১৮:২৭-এ পাঠের বিষয়টি আরও প্রত্যক্ষ। মুহাম্মদকে তাঁর প্রতিপালকের কিতাব থেকে যা ওহি করা হয়েছে তা পাঠ করতে বলা হচ্ছে; তারপরই বলা হচ্ছে, তাঁর বাণী বদলানোর কেউ নেই। এখানে কিতাব পাঠের নির্দেশ এবং অপরিবর্তনীয়তার ঘোষণা পাশাপাশি। ফলে কোরআনের পাঠের ঐশী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় এই আয়াত সরাসরি ব্যবহৃত হয়। [1277]

وَاتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِن كِتَابِ رَبِّكَ ۖ لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ وَلَن تَجِدَ مِن دُونِهِ مُلْتَحَدًا

বাংলা অনুবাদ: তোমার প্রতিপালকের কিতাব থেকে তোমার কাছে যা ওহি করা হয়েছে তা পাঠ করো। তাঁর বাণীর পরিবর্তনকারী কেউ নেই এবং তাঁকে ছাড়া তুমি কোনো আশ্রয় পাবে না।

ইবনে কাসীর এই বাক্যাংশে পরিবর্তন, বিকৃতি এবং অন্য অর্থে নিয়ে যাওয়ার নিষেধাত্মক ঘোষণা একত্র করেছেন। তাঁর ব্যবহৃত শব্দগুলো শুধু মুদ্রণরীতির কথা বলে না; বাণীর ওপর হস্তক্ষেপের অক্ষমতার ব্যাপক ধারণা দেয়। সেই ব্যাপক দাবির সামনে সাহাবিদের ভিন্ন পাঠ, লিখনত্রুটির অভিযোগ এবং পূর্বে কোরআন হিসেবে পঠিত অথচ গৃহীত মুসহাফে অনুপস্থিত অংশের সাক্ষ্য বাস্তব সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। [1278]

( لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ ) أَيْ: لَا مُغَيِّرَ لَهَا وَلَا مُحَرِّفَ وَلَا مُؤَوِّلَ

বাংলা অনুবাদ: “তাঁর বাণী বদলানোর কেউ নেই”—অর্থাৎ তা পরিবর্তনকারী, বিকৃতকারী বা অন্য অর্থে নিয়ে যাওয়ার কেউ নেই।

হিজর ১৫:৯-এ সংরক্ষণের ঘোষণাটি সবচেয়ে স্পষ্ট: যিনি জিকর নাজিল করেছেন, তিনিই তার সংরক্ষক। বাংলা অনুবাদগুলোতেও এই নিশ্চয়তা অক্ষুণ্ণ: “অবশ্যই”, “আমিই”, “সংরক্ষক”, “হেফাযতকারী”—সবগুলোতে রক্ষার দায়িত্ব ঐশী বক্তার। পাঠক বা খলিফার দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল একটি সাধারণ প্রতিশ্রুতি হিসেবে আয়াতটি উপস্থাপিত হয়নি। [1279] [166]

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ

বাংলা অনুবাদ: নিশ্চয় আমিই কুরআন নাযিল করেছি আর অবশ্যই আমি তার সংরক্ষক।
— Taisirul Quran
আমিই জিকর (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই উহার সংরক্ষক।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় আমি কুরআন* নাযিল করেছি, আর আমিই তার হেফাযতকারী। * الذكر দ্বারা উদ্দেশ্য কুরআন।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় আমরাই কুরআন নাযিল করেছি এবং আমরা অবশ্যই তার সংরক্ষক [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।

ইবনে কাসীরের তাফসিরে এই রক্ষার বিষয়টিও নির্দিষ্ট: কোরআনকে পরিবর্তন ও বদল থেকে রক্ষা করা। ফলে “সংরক্ষণ” শব্দটির সঙ্গে কেবল পরবর্তী কোনো গৃহীত সংস্করণের জনপ্রিয়তা বা রাষ্ট্রীয় সাফল্য সমার্থক নয়। কোনো সংস্করণ রাষ্ট্রীয় শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া তার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস জানায়; তার পূর্ববর্তী পাঠে কিছুই যোগ-বিয়োগ হয়নি, এমন নিশ্চয়তা দেয় না। [1280]

ثم قرر تعالى أنه هو الذي أنزل الذكر ، وهو القرآن ، وهو الحافظ له من التغيير والتبديل .

বাংলা অনুবাদ: এরপর তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন যে তিনিই জিকর নাজিল করেছেন, আর তা হলো কোরআন; এবং তিনিই একে পরিবর্তন ও বদল থেকে রক্ষাকারী।

ঘোষণার ক্ষেত্রসংশ্লিষ্ট বক্তব্যসংকলনের ইতিহাসে আলাদা যে প্রশ্নটি থাকে
সংবাদের সত্যতা ও বিধানের ন্যায়আনআম ৬:১১৫; ইবনে কাসীরের ব্যাখ্যাকোন মানবীয় অনুলিপি সেই বক্তব্যের কতটুকু বহন করছে?
প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নইউনুস ১০:৬৪ ও আনআম ৬:৩৪প্রতিশ্রুতি বহনকারী নথিগুলোর শব্দ কি অভিন্ন?
ওহিকৃত কিতাবের পাঠকাহফ ১৮:২৭একাধিক বর্ণিত পাঠের মধ্যে কোনটি মুসহাফে থাকবে?
নাজিলকৃত জিকরের সংরক্ষণহিজর ১৫:৯পূর্বে পঠিত অথচ পরে অনুপস্থিত অংশের অবস্থান কী?
পরিবর্তন ও বদল থেকে রক্ষাহিজর ১৫:৯-এর ইবনে কাসীরের তাফসিরপাঠ নির্বাচন ও বর্জনের ঘটনাগুলোর সঙ্গে এই নিশ্চয়তার সম্পর্ক কী?

ধর্মীয় কর্তৃত্ব নিজেকে চূড়ান্ত ঘোষণা করলেই তার মানবীয় বহনপ্রক্রিয়া অভ্রান্ত হয়ে যায় না। প্রতিশ্রুতি, নির্দেশ, পাঠ ও অনুলিপির প্রশ্নগুলোকে এক করে দিলে প্রমাণের জায়গায় বিশ্বাস বসে। বিশেষত “অবতীর্ণ সমস্ত পাঠ কখনো বদলায়নি” এবং “যে পাঠকে চূড়ান্ত বলে গ্রহণ করা হয়েছে সেটিই সংরক্ষিত”—এই দুই দাবির মধ্যে বড় ফারাক। প্রথম দাবিতে পূর্ববর্তী সব পাঠের ধারাবাহিক উপস্থিতি দরকার; দ্বিতীয় দাবিতে নির্বাচনের পরে যা টিকে আছে তাকেই মানদণ্ড করা হচ্ছে। বাদ পড়া অংশকে পরে রহিত ঘোষণা করলে প্রথম দাবির সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। তখন পরিবর্তনের জন্য ধর্মীয় অনুমোদন দেওয়া হয়।


মুছে ফেলা যায় না এমন কিতাবের বর্ণনা ও পাঠ বিলুপ্তির সাক্ষ্য

সহিহ মুসলিমে ইয়াদ ইবনে হিমারের বর্ণনায় কিতাবের অক্ষয়তার দাবি একটি শক্তিশালী উপমার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। মুহাম্মদের প্রতি আল্লাহর বক্তব্য হিসেবে বলা হচ্ছে, তাঁর ওপর এমন কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে, যা পানি ধুয়ে নিতে পারে না; তিনি তা নিদ্রিত ও জাগ্রত অবস্থায় পাঠ করবেন। সাধারণ লিখিত বস্তু পানিতে নষ্ট হয়, কিন্তু এই কিতাব সেই বিপদের ঊর্ধ্বে—বর্ণনাটি এই বিশেষত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বাংলা পাঠে বাক্যটি ভবিষ্যৎ কালে এসেছে; আরবি “ওয়া আনযালতু” অতীত কালের—“আমি অবতীর্ণ করেছি”। [1281] [1282]

وَأَنْزَلْتُ عَلَيْكَ كِتَابًا لاَ يَغْسِلُهُ الْمَاءُ تَقْرَؤُهُ نَائِمًا وَيَقْظَانَ

বাংলা অনুবাদ: ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্ধৃত পাঠ:
আমি আপনার ওপর এমন কিতাব অবতীর্ণ করব, যাকে পানি ধুয়ে নিতে পারবে না।

আরবি বাক্যের অনুবাদ:
আমি তোমার ওপর এমন কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাকে পানি ধুয়ে নিতে পারে না; তুমি তা নিদ্রিত ও জাগ্রত অবস্থায় পাঠ করো।

খাত্তাবি এই উপমার অর্থ করেছেন অন্তরে সংরক্ষণ। কাগজে লেখা ধুয়ে গেলেও তা মানুষের বুক থেকে চলে যাবে না এবং হৃদয়ের মুখস্থ মুছে যাবে না। ফলে তাঁর ব্যাখ্যা কিতাবের কোনো একটি কাগজ অমর থাকবে, এমন বক্তব্য নয়; লিখিত বাহক নষ্ট হলেও পাঠ হারাবে না—এমন দাবি। দাবিটির ভারও সেখানেই: এক বা একাধিক নথির ধ্বংসের পরও সমষ্টিগত স্মৃতিতে সংশ্লিষ্ট পাঠের পুনরুদ্ধারযোগ্য উপস্থিতি থাকতে হবে। [1283]

يريد أن القرآن وإن محي رسمه بالماء وغسل لم يذهب عن الصدور، ولم ينسخ حفظه من القلوب

বাংলা অনুবাদ: এর অর্থ হলো, কোরআনের লিখিত রূপ পানি দিয়ে মুছে ও ধুয়ে ফেলা হলেও তা মানুষের বুক থেকে চলে যাবে না এবং হৃদয়ের মুখস্থ বিলুপ্ত হবে না।

নববির ব্যাখ্যাও একই জায়গায় আরও স্পষ্ট: এটি বুকে সংরক্ষিত; এর বিলুপ্তি ঘটবে না, বরং যুগের পর যুগ থাকবে। এই নিশ্চয়তা ব্যক্তিগত কোনো পাঠকের স্বাভাবিক স্মৃতিশক্তির প্রশংসার চেয়ে অনেক বড়। সমষ্টিগতভাবে পাঠ বিলুপ্ত না হওয়ার দাবি এতে রয়েছে। সেই দাবির সঙ্গে পূর্বে পাঠ করা সূরার অধিকাংশ ভুলে যাওয়ার সাক্ষ্যের সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয়। [1284]

مَحْفُوظٌ فِي الصُّدُورِ ، لَا يَتَطَرَّقُ إِلَيْهِ الذَّهَابُ ، بَلْ يَبْقَى عَلَى مَرِّ الْأَزْمَانِ .

বাংলা অনুবাদ: এটি মানুষের বুকে সংরক্ষিত; এর বিলুপ্তির কোনো পথ নেই, বরং যুগের পর যুগ তা থেকে যাবে।

স্মৃতি ও নথির এই দ্বৈত রক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তিন রকম ঘটনা যুক্ত। মুহাম্মদের কোনো আয়াত ভুলে গিয়ে অন্যের পাঠে মনে পড়া একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিবিচ্যুতির ঘটনা; সেখানে অন্যের স্মৃতি কার্যকর ছিল। কোনো লিখিত সহিফা নষ্ট হওয়াও প্রথমত একটি নথির ক্ষতি। কিন্তু আবু মুসা যখন পূর্বে পঠিত দীর্ঘ সূরার অল্প কয়েকটি বাক্য স্মরণে থাকার কথা বলেন, তখন সাক্ষ্যের বিষয় হয়ে ওঠে একটি বিস্তৃত পাঠের হারানো স্মৃতি। একইভাবে উমরের রজম-সংক্রান্ত বক্তব্যে পাঠের স্মৃতি ও আইনের প্রয়োগ রয়েছে, অথচ গৃহীত মুসহাফে সেই আয়াত নেই। প্রতিটি ঘটনায় অনুপস্থিতির স্থান আলাদা; সবগুলোকে “কাগজ তো নষ্ট হতেই পারে” বলে শেষ করা যায় না।

অবস্থাদলিলে উপস্থিত বিষয়সংরক্ষণের দাবির সঙ্গে সম্পর্কপূর্ণ সূত্রসহ আলোচনা
ব্যক্তিগত বিস্মৃতি, অন্যের মাধ্যমে স্মরণএকজনের মনে না থাকা পাঠ অন্যজন পাঠ করছেনস্মৃতির পারস্পরিক সহায়তার ঘটনা; ব্যক্তির স্মৃতি অভ্রান্ত নয়মুহাম্মদের আয়াত ভুলে যাওয়া এবং অন্যের তিলাওয়াতে স্মরণ ফিরে পাওয়া
একটি লিখিত পত্র নষ্ট হওয়াআয়েশার সহিফা ও পোষা প্রাণীর বিবরণনির্দিষ্ট নথির ক্ষতি; সেই পত্রের সব পাঠ অন্য কোথায় ছিল, তা আলাদা তথ্যরজম ও দুধপানের লেখা, বিছানার নিচের সহিফা এবং পোষা প্রাণীর খেয়ে ফেলা
পূর্বে পঠিত দীর্ঘ অংশের অল্পটুকু মনে থাকাআবু মুসার দুটি সূরার স্মৃতিবিবরণ“বুক থেকে চলে যাবে না” ব্যাখ্যার সামনে পাঠ-স্মৃতি হারানোর সাক্ষ্যআবু মুসার স্মরণে তাওবার মতো দীর্ঘ ও কঠোর একটি সূরা; আবু মুসার স্মরণে মুসাব্বিহাতের মতো আরেকটি সূরা
অবতরণ ও পাঠের স্মৃতি আছে, মুসহাফে আয়াত নেইরজম নিয়ে উমরের ভাষণস্মৃতিতে সাক্ষ্য টিকে থাকা ও মুসহাফে পাঠ টিকে থাকা এক ঘটনা নয়নাজিল, পাঠ ও সংরক্ষণের বিষয়ে উমরের ভাষণ; বর্তমান মুসহাফে পাঠ নেই, রজমের আইন বহাল
সংখ্যা বদলানো, মৃত্যুর সময়ও পাঠের বিবরণদশবার ও পাঁচবার দুধপান নিয়ে আয়েশার বক্তব্যকোন পর্যায়ে কোন পাঠের সমাপ্তি ঘটেছে, সেই প্রশ্নটি থেকে যায়দশবার দুধপান থেকে পাঁচবার দুধপানে বিধান পরিবর্তন; মুহাম্মদের মৃত্যুর সময়ও কোরআন হিসেবে পাঠ করার আয়েশার বক্তব্য
অনেক অংশ চলে যাওয়ার বিস্তৃত বক্তব্যইবনে উমরের নামে সংরক্ষিত সতর্কতাবর্তমানে যতটুকু আছে, তাকে পূর্বের সমগ্র পাঠের সমার্থক ধরে নেওয়ার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যইবনে উমরের বক্তব্য: “কোরআনের অনেক অংশ চলে গেছে”

আবু মুসার বিবরণে তিনি পূর্বে যে সূরা পড়তেন তার আকার ও প্রকৃতির স্মৃতি রেখেছেন, কিন্তু পূর্ণ পাঠ ধরে রাখতে পারেননি। আয়েশার দুধপানের বর্ণনায় মৃত্যুকাল পর্যন্ত পাঠ চলার উল্লেখ রয়েছে। উমরের রজম-বিবরণে অবতরণ, পাঠ ও আমলের দাবি আছে। এসব সাক্ষ্যের শক্তি তাদের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুতে: কোনোটি দীর্ঘ পাঠের বিস্মৃতি, কোনোটি মুসহাফে অনুপস্থিতি, কোনোটি আইনের টিকে থাকা। “সংরক্ষণ” শব্দ দিয়ে সবগুলোর ওপর একটি অভিন্ন অক্ষয়তার ছাপ বসালে এই তথ্যগত পার্থক্য মুছে যায়। অথচ খাত্তাবি ও নববির ব্যাখ্যায় স্মৃতিতে বিলুপ্তি না ঘটার কথাই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।

এখানেই “পাঠ রহিত” শ্রেণিটির কার্যকর ভূমিকা। কোনো অংশ একসময় কোরআন ছিল, পরে কোরআনের পাঠ হিসেবে আর নেই—এই অবস্থাকে ধর্মতত্ত্ব একটি অনুমোদিত অপসারণের নাম দেয়। ফলে পূর্বের উপস্থিতি ও পরের অনুপস্থিতি স্বীকার করেও ধর্মীয় নির্ভুলতার ঘোষণা বহাল রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু অনুমোদনের এই সিদ্ধান্ত ইতিহাসের তথ্য পাল্টায় না। একসময় পঠিত পাঠের পরিসর এবং গৃহীত মুসহাফের পরিসর তখন অভিন্ন থাকে না। অক্ষয়তার অর্থ যদি কেবল “যা শেষ পর্যন্ত বহাল রাখা হয়েছে তা অক্ষয়”, তবে বাদ পড়ার সম্ভাবনা আগেই সংজ্ঞার মধ্যে ঢুকে গেছে। এটি সমস্ত অবতীর্ণ বাক্য অবিলুপ্ত থাকার নিশ্চয়তার চেয়ে সংকীর্ণ দাবি।

একটি গ্রন্থের বর্তমান উপস্থিতি তার প্রত্যেক পূর্ববর্তী উপাদানের উপস্থিতির প্রমাণ নয়। বর্তমান মুসহাফ আছে, মুখস্থকারীও আছেন—এই দুটি সত্য থেকে উমর, আয়েশা বা আবু মুসার বর্ণিত প্রতিটি পূর্বপাঠ বর্তমান মুসহাফে আছে বলে সিদ্ধান্ত আসে না। নির্দিষ্ট অনুপস্থিতির সাক্ষ্যকে বর্তমান গ্রন্থের সাধারণ অস্তিত্ব দিয়ে খণ্ডন করা যুক্তিগত ভুল। অক্ষয়তার দাবির পরীক্ষা ঘটে ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে সূত্র বলছে একটি পাঠ ছিল এবং বর্তমান গৃহীত সংগ্রহে সেটি নেই।


ঈশ্বর দিয়ে গ্রন্থ, গ্রন্থ দিয়ে ঈশ্বর: বাইবেল–কোরআনের চক্রাকার প্রমাণ

গ্রন্থ ঈশ্বরের বাণী, কারণ গ্রন্থে তাই লেখা আছে; আর গ্রন্থের বক্তব্য সত্য, কারণ ঈশ্বর মিথ্যা বলেন না—এই প্রমাণে যে সিদ্ধান্তটি প্রতিষ্ঠা করার কথা, সেটিই আগেই ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। গ্রন্থের দাবির বাইরে ঈশ্বরের পরিচয়, সেই ঈশ্বরের সঙ্গে গ্রন্থটির সম্পর্ক এবং বর্তমান পাঠের যথার্থতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। একটি অপ্রমাণিত পরিচয় দিয়ে আরেকটি অপ্রমাণিত পরিচয়কে সমর্থন করা হচ্ছে। একই দুই দাবি পরস্পরের দিকে ফেরত পাঠালে যুক্তির পরিধি বাড়ে, প্রমাণ বাড়ে না।

বাইবেল নিয়ে এই সমস্যার একটি পরিচিত ভিত্তি ২ তীমথিয় ৩:১৬-এর অনুপ্রেরণার দাবি। কিং জেমস অনুবাদে বলা হয়েছে, সমস্ত শাস্ত্র ঈশ্বরের প্রেরণায় দেওয়া এবং শিক্ষা, তিরস্কার, সংশোধন ও ন্যায়পরায়ণতার অনুশাসনের উপযোগী। এটি শাস্ত্রের মর্যাদা সম্পর্কে শাস্ত্রের একটি বক্তব্য। বাক্যটি নিজে থেকে বর্তমান বাইবেলের প্রতিটি বইয়ের সীমানা, প্রতিটি অনুলিপির পাঠ এবং প্রতিটি পরবর্তী সম্পাদনার ঐশী অনুমোদন প্রতিষ্ঠা করে না। ঐশী প্রেরণার দাবি থেকে নির্দিষ্ট সংস্করণের অভ্রান্ততায় পৌঁছাতে মাঝখানে আরও কয়েকটি সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। [1285]

All scripture is given by inspiration of God, and is profitable for doctrine, for reproof, for correction, for instruction in righteousness:

বাংলা অনুবাদ: সমস্ত শাস্ত্র ঈশ্বরের প্রেরণায় দেওয়া হয়েছে এবং তা শিক্ষা, তিরস্কার, সংশোধন ও ন্যায়পরায়ণতার অনুশাসনের জন্য উপকারী।

কোরআনের সংরক্ষণসংক্রান্ত আয়াতকে কোরআনের নির্ভুল সংরক্ষণের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করলেও একই নির্ভরতা তৈরি হয়। “আল্লাহ রক্ষা করেছেন” সিদ্ধান্তের প্রমাণ হিসেবে “আল্লাহ বলেছেন তিনি রক্ষা করবেন” পেশ করা হয়; কিন্তু উক্তিটি যে আল্লাহর, যে তার বর্তমান শব্দ যথাযথ এবং যে তার প্রয়োগ বর্তমান মুসহাফের সমগ্র পাঠে হচ্ছে—এসবই তখন প্রতিষ্ঠার অপেক্ষায় থাকা দাবির অংশ। সন্দেহযুক্ত নথির একটি বাক্যকে নথিটির সব বাক্যের নির্ভুলতার নিশ্চয়তা বানালে নথি নিজের বিচারক হয়ে যায়। বাইবেলের আত্মঘোষণায় এই পদ্ধতি অগ্রহণযোগ্য হলে কোরআনের আত্মঘোষণায়ও তার একই দুর্বলতা থাকে।

প্রমাণের ধাপযে ভিত্তির ওপর ধাপটি দাঁড়ায়যে প্রশ্নটির উত্তর বাকি থাকে
ঈশ্বরের বক্তব্য সত্যঈশ্বর সত্যবাদী ও নির্ভুলএই নির্দিষ্ট বক্তব্যটি সত্যিই তাঁর বক্তব্য কি না
গ্রন্থটি ঈশ্বরের বক্তব্যগ্রন্থের নিজের পরিচয় ও বর্ণনাকারীদের সাক্ষ্যআত্মপরিচয়ের যথার্থতা এবং সাক্ষ্যের নির্ভরযোগ্যতা
বর্তমান পাঠই সেই বক্তব্যঅবিচ্ছিন্ন ও যথাযথ সংবহনের দাবিসংগ্রহ, বাছাই ও ভিন্ন পাঠের মধ্যে কী ঘটেছিল
কোনো পাঠ হারায়নিবর্তমান পাঠের সংরক্ষণের ঘোষণাপূর্বে পঠিত অনুপস্থিত অংশের সাক্ষ্য কীভাবে ব্যাখ্যাত হচ্ছে
অনুপস্থিত অংশ থাকার দরকার ছিল নারহিত হওয়ার পরবর্তী শ্রেণিবিন্যাসপ্রতিটি নির্দিষ্ট অপসারণের অনুমোদন কোথায় প্রতিষ্ঠিত

এই চক্রে একটি বাড়তি সুবিধা তৈরি হয় যখন বিরুদ্ধ সাক্ষ্যকেও একই গ্রন্থের কথার মাধ্যমে অগ্রিম বাতিল করা হয়। কোনো বর্ণনা সংরক্ষণের ঘোষণার সঙ্গে না মিললে বর্ণনাটি অগ্রহণযোগ্য বলে দেওয়া হলো; পরে অবশিষ্ট বর্ণনাগুলো দেখিয়ে বলা হলো, ইতিহাসে কোনো সমস্যা নেই। এমন বাছাইয়ের ফলে প্রস্তুত হওয়া সংগ্রহে সমস্যার অনুপস্থিতি স্বাধীন আবিষ্কার নয়। সমস্যাযুক্ত তথ্য সরিয়ে দেওয়ার পদ্ধতির ফল সেটি। প্রত্যাখ্যানের কারণ যদি নির্দিষ্ট বর্ণনার উৎস, কাল, বক্তব্য বা পারস্পরিক নির্ভরতা হয়, তবে তা বর্ণনাটির নিজস্ব পরীক্ষার অংশ; কিন্তু “ঘটতে পারে না, কারণ ঘটেনি বলা আছে”—এতে সিদ্ধান্তটিই পরীক্ষার নিয়ম হয়ে যায়।

অপরিবর্তনীয়তার দাবি সর্বাত্মক হলে তার বিরুদ্ধে প্রমাণের ধরনও নির্দিষ্ট। “কখনো কোনো শব্দ বদলায়নি” দাবির জন্য একটি প্রতিষ্ঠিত শব্দগত পার্থক্যই বিরুদ্ধ উদাহরণ। গোটা গ্রন্থের কত শতাংশ বদলেছে, তার হিসাব আগে পাওয়া এই বিরুদ্ধ উদাহরণের শর্ত নয়। আবার “কোনো লিখনচিহ্ন পরে যোগ হয়নি” দাবির পরীক্ষা নুকতা ও হরকতের ইতিহাসে হয়, আর “কোনো বিধানের প্রয়োগ বদলায়নি” দাবির পরীক্ষা হয় আইনগত সিদ্ধান্তে। দাবির বিষয় বদলালে পরীক্ষার বস্তু বদলায়। এই তিন ক্ষেত্রকে একত্রে অস্পষ্ট “অবিকৃত” শব্দে ঢেকে দিলে এক ক্ষেত্রের প্রশ্নের জবাবে অন্য ক্ষেত্রের তথ্য হাজির করার সুযোগ তৈরি হয়।

দাবিসংশ্লিষ্ট বিরুদ্ধ প্রমাণের ধরনযে অন্য তথ্য দিয়ে প্রশ্নটির নিষ্পত্তি হয় না
সবসময় একটিই শব্দরূপ ছিলএকই স্থানে ভিন্ন শব্দ বা শব্দের উপস্থিতি–অনুপস্থিতিএকই ঈশ্বরে বিশ্বাস বা একই সামগ্রিক ধর্মমত
বর্তমান লিখনরূপ শুরু থেকেই ছিলপরে চিহ্ন যোগ ও লিখনপদ্ধতি নির্দিষ্ট করার ইতিহাসপরবর্তী চিহ্ন পাঠ শেখাতে কার্যকর হয়েছিল—এই মূল্যায়ন
পূর্বে পঠিত সব আয়াত মুসহাফে আছেপূর্বপাঠের প্রত্যক্ষ দাবি এবং বর্তমান অনুপস্থিতিগ্রন্থের বাকি অংশ বহু মানুষের মুখস্থ থাকা
শাস্ত্রের বিধান অপরিবর্তিতভাবে কার্যকরএকই বিধানের প্রত্যাহার বা নতুন সীমা ও শর্তপুরোনো আয়াতের অক্ষর এখনো মুদ্রিত থাকা
অনুমোদিত পাঠই একমাত্র ঐতিহাসিক পাঠপূর্বে অন্য পাঠ পড়া ও অনুমোদনের বিবরণপরবর্তী যুগে একটি নির্বাচিত পাঠের প্রাধান্য

কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায় তার গ্রন্থের পরিবর্তনকে ঈশ্বরের পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত মনে করতে পারে। এতে ঐ সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের সঙ্গে পরিবর্তনের সামঞ্জস্য তৈরি হয়। পরিবর্তন ঘটেনি—এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত তৈরি হয় না। বাইবেলের সংকলন, কোরআনের সংকলন কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় গ্রন্থের ক্ষেত্রে “ঈশ্বর অনুমোদন করেছেন” একই ধরনের অতিরিক্ত বিশ্বাস। মানুষের হাতে নির্বাচন ও বিন্যাসের তথ্যটি অপরিবর্তিত থাকে। এক ধর্মের ক্ষেত্রে মানবীয় সম্পাদনা দেখিয়ে গ্রন্থের ঐশী কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করা এবং নিজের ধর্মের একই ধরনের সম্পাদনাকে কেবল অনুমোদনের দাবি দিয়ে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা দ্বৈত মানদণ্ড।

একটি দাবির প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস এবং দাবিটির স্বাধীন প্রমাণ দুই ভিন্ন বিষয়। বর্ণনাকারী নিজের গ্রন্থকে সত্য মনে করতেন—এ তথ্য তাঁর বিশ্বাস প্রমাণ করে; গ্রন্থের প্রতিটি ঐতিহাসিক দাবি প্রমাণ করে না। মুখস্থকারী কোরআন রক্ষার উদ্দেশ্যে কাজ করেছিলেন—এ বক্তব্য তাঁর লক্ষ্য জানায়; তাঁর স্মৃতি ও বাছাইয়ে ভুলের সম্ভাবনা শূন্য করে না। সংকলক ধর্মীয় দায়িত্ববোধে অন্য মুসহাফ পোড়ালেন—এটি ধ্বংসের নৈতিক বা ধর্মীয় ব্যাখ্যা হতে পারে; ধ্বংস হওয়া নথি গৃহীত নথির সঙ্গে সর্বাংশে অভিন্ন ছিল, তার সাক্ষ্য নয়। কারণের জায়গায় ফল, বিশ্বাসের জায়গায় প্রমাণ এবং অনুমোদনের জায়গায় অভিন্নতা বসালেই চক্রটি পূর্ণ হয়।


কোরআন দিয়ে হাদিসের অনুমোদন এবং হাদিস দিয়ে কোরআনের অর্থ ও সীমানা নির্ধারণ

কোরআনের সংকলনের ইতিহাসের বড় অংশই জানা যায় কোরআনের বাইরের বর্ণনা থেকে। আবু বকরের নির্দেশ, যায়েদের উপকরণ খোঁজা, হাফসার সহিফা, উসমানের কমিটি এবং অন্য মুসহাফ পোড়ানোর নির্দেশ বর্তমান কোরআনের ধারাবাহিক আত্মবৃত্তান্ত নয়। হাদিস ও ইতিহাসের গ্রন্থ এসব ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে। ফলে “কোরআন সংরক্ষিত, কারণ হাদিসে তার সংকলন যথাযথ হওয়ার বিবরণ আছে”—এই দাবিতে হাদিসের নির্ভরযোগ্যতা একটি বড় ভিত্তি। আবার হাদিসের বাধ্যতামূলক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় কোরআনের রাসুল-আনুগত্যের আয়াত ব্যবহৃত হয়। ধর্মীয় অনুমোদন ও ঐতিহাসিক সাক্ষ্য একই ব্যবস্থার মধ্যে পরস্পরকে বৈধতা দেয়।

ইবনে হাযম সংরক্ষণের ঘোষণায় “জিকর”-এর আওতায় কোরআন ও সুন্নাহ দুটিকেই এনেছেন। ইসলামওয়েব তাঁর আল-ইহকাম থেকে এই বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে। এই ব্যাখ্যায় কোরআন ব্যাখ্যাকারী সুন্নাহও ঐশী অবতরণের অন্তর্ভুক্ত এবং সংরক্ষণের ধর্মতাত্ত্বিক নিশ্চয়তা পায়। অর্থাৎ যে হাদিস দিয়ে কোরআনের ব্যাখ্যা নির্ধারিত হচ্ছে, সেই হাদিসের সুরক্ষাও কোরআনের সংরক্ষণ-ঘোষণা থেকে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। [1286]

الذكر: اسم واقع على كل ما أنزل الله على نبيه صلى الله عليه وسلم من قرآن أو من سنة وحي يبين بها القرآن,

বাংলা অনুবাদ: “জিকর” নামটি আল্লাহ তাঁর নবীর ওপর যা অবতীর্ণ করেছেন তার সবকিছুর ওপর প্রযোজ্য—কোরআন হোক অথবা কোরআন ব্যাখ্যাকারী ওহিরূপ সুন্নাহ হোক।

ইবনে হাযমের পরবর্তী যুক্তিতে নামাজ, জাকাত ও হজের মতো সংক্ষিপ্ত কোরআনিক নির্দেশ বোঝার জন্য নবীর ব্যাখ্যার প্রয়োজনকে সেই ব্যাখ্যা সংরক্ষিত থাকার নিশ্চয়তার ভিত্তি করা হয়েছে। ব্যাখ্যা নির্ভুলভাবে সংরক্ষিত না হলে কোরআনের উপকারিতা ও বহু বাধ্যতামূলক বিধান কার্যকর থাকবে না—এটি তাঁর নির্ভরতার যুক্তি। কিন্তু কোনো ধর্মীয় ব্যবস্থা চালু রাখতে একটি উৎসের প্রয়োজন থাকা এবং সেই উৎসের প্রতিটি নির্দিষ্ট বিবরণ যথাযথভাবে পৌঁছানো ভিন্ন প্রস্তাব। প্রয়োজনীয়তার ঘোষণায় অতীতের নির্দিষ্ট সংবহনঘটনার নির্ভুলতা প্রমাণিত হয় না। [1287]

فإذا كان بيانه عليه السلام لذلك المجمل غير محفوظ ولا مضمون سلامته مما ليس منه، فقد بطل الانتفاع بنص القرآن فبطلت أكثر الشرائع المفترضة علينا.

বাংলা অনুবাদ: সেই সংক্ষিপ্ত নির্দেশগুলোর বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা যদি সংরক্ষিত না থাকে এবং তার মধ্যে বাইরের কিছু ঢুকে পড়া থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তবে কোরআনের পাঠ থেকে উপকার পাওয়াই বাতিল হয়ে যায়; ফলে আমাদের ওপর বাধ্যতামূলক করা অধিকাংশ বিধান বাতিল হয়ে যায়।

নবীর নির্দেশ মানার বিধান থেকে যে কোনো পরবর্তী বর্ণনাকারীর নামে প্রচলিত বাক্যের যথার্থতা সরাসরি প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রথম প্রশ্নটি কর্তৃত্বের: নির্দেশটি সত্যিই নবীর হলে অনুসারীর ওপর তার দাবি কী? দ্বিতীয় প্রশ্নটি সংবহনের: নির্দিষ্ট বাক্যটি সত্যিই তাঁর বক্তব্য কি না? এই দ্বিতীয় প্রশ্নেই বর্ণনাকারী, সংকলনের সময়, ভিন্ন পাঠ ও পরস্পরবিরোধী সাক্ষ্যের প্রয়োজন হয়। প্রথমটির ধর্মীয় অনুমোদনকে দ্বিতীয়টির ঐতিহাসিক প্রমাণ বানালে অনুমোদিত কর্তৃত্বের নামে অনিরীক্ষিত বাক্যও নিশ্চয়তা পেয়ে যায়।

নির্ভরতার দিককোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়প্রমাণের স্বতন্ত্র কাজ
কোরআন থেকে হাদিসের কর্তৃত্বরাসুলের আনুগত্য বাধ্যতামূলকনির্দিষ্ট হাদিসটি সত্যিই রাসুলের বক্তব্য কি না নির্ধারণ
হাদিস থেকে কোরআনের সংগ্রহবৃত্তান্তকারা সংগ্রহ করলেন, কীভাবে করলেনবিবরণের কাল, সংযোগ, পারস্পরিক নির্ভরতা ও বক্তব্য পরীক্ষা
হাদিস থেকে সাবেক পাঠের পরিচয়একটি বাক্য পূর্বে আয়াত হিসেবে পড়া হতোসেই পরিচয়ের সাক্ষ্য এবং পরবর্তী অনুপস্থিতির কারণ পৃথকভাবে নির্ধারণ
হাদিস থেকে রহিত হওয়ার সিদ্ধান্তকোনো পাঠ বা বিধান আর কার্যকর নয়রহিত হওয়ার নির্দিষ্ট খবর ও তার সময় নির্ধারণ
সংরক্ষণ-আয়াত থেকে হাদিসের সুরক্ষাব্যাখ্যাকারী সুন্নাহও সুরক্ষিতবিশেষ বিশেষ বর্ণনার সঠিকতা সম্পর্কে অনুপস্থিত তথ্য পূরণ হয় না

এই দ্বিমুখী কর্তৃত্ব সবচেয়ে কার্যকর হয় মুসহাফে অনুপস্থিত পাঠের ক্ষেত্রে। বর্তমান কোরআনে নেই এমন একটি বাক্যকে পূর্বে কোরআন ছিল বলে চেনায় হাদিস। পরে সেটি কেন নেই, তার উত্তরে পাঠ রহিত হওয়ার ব্যাখ্যাও আসে হাদিস ও উসুল থেকে। রজমের ক্ষেত্রে আয়াত নেই, আইন আছে; দুধপানের ক্ষেত্রে সংখ্যার পরিবর্তন ও মৃত্যুকালে পাঠের বিবরণ আছে; অন্য ক্ষেত্রে পূর্বে পড়া বাক্য এখন কোরআনের অংশ নয়। এসব শ্রেণি নির্ধারণের ক্ষমতা বর্তমান মুসহাফের লিখিত শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কোন অনুপস্থিতি অনুমোদিত এবং কোন ভিন্ন পাঠ অগ্রহণযোগ্য, তা নির্ধারণ করে বাইরের সাক্ষ্য ও তার ভাষ্য। মুসহাফে অনুপস্থিত সাবেক পাঠ ও বিধানের বিস্তারিত আলোচনা এই নির্ভরতার নির্দিষ্ট ঘটনাগুলো দেখায়।

সাক্ষ্য হিসেবে হাদিস ব্যবহার করা এবং হাদিসকে অগ্রিম ভুলের ঊর্ধ্বে স্থাপন করার মধ্যে মৌলিক ফারাক রয়েছে। প্রথমটিতে একই সূত্রের অনুকূল ও অস্বস্তিকর তথ্য দুটিই বিবেচ্য। দ্বিতীয়টিতে ব্যবস্থার ঘোষিত নির্ভুলতা রক্ষার জন্য বর্ণনার অর্থ ও মর্যাদা সাজানো হয়। আবু বকরের সংগ্রহের বিবরণকে ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করলে সেই বিবরণে পাঠ হারানোর আশঙ্কা ও বিচ্ছিন্ন উপকরণ অনুসন্ধানের ঘটনাও সাক্ষ্য। উসমানের নকলের বিবরণ গ্রহণ করলে তার সঙ্গে যুক্ত অন্য মুসহাফ পোড়ানোর নির্দেশও একই বিবরণের অংশ। শেষ ফলের প্রশংসা রেখে মধ্যবর্তী সংকট বাদ দেওয়া উৎসের পূর্ণ বক্তব্য নয়।

এই ব্যবস্থায় কোরআনের অক্ষর অপরিবর্তিত থাকলেও কার্যকর ধর্মীয় অর্থের বড় অংশ হাদিস ও ভাষ্যকারের হাতে থাকে। সাধারণ নির্দেশের পরিসর সংকুচিত করা, নতুন শর্ত আরোপ, ব্যতিক্রম নির্ধারণ এবং কোন আইন বহাল থাকবে তা ঘোষণা—এসব সিদ্ধান্ত পাঠের বাইরের কর্তৃত্ব ব্যবহার করে। কোরআন–হাদিসের আইনগত কর্তৃত্বের বিস্তারিত আলোচনা অনুযায়ী অসিয়ত, খাদ্য, রজম ও ধর্মত্যাগের ক্ষেত্রে এই ক্ষমতার বাস্তব প্রয়োগ রয়েছে। অতএব মুদ্রিত আয়াতের উপস্থিতিকে অপরিবর্তিত ধর্মীয় ব্যবস্থার সম্পূর্ণ প্রমাণ বলা যায় না: একই আয়াত বহাল রেখে কার্যকর বিধানের সীমানা বদলেছে।

কোরআন হাদিসকে অনুমোদন করে, হাদিস কোরআনের সীমানা ও সংকলনকে ব্যাখ্যা করে, আর পরবর্তী আলেমরা উভয়ের গ্রহণযোগ্য অর্থ নির্ধারণ করেন—এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক। এর কোনো অংশের আত্মঘোষণা পুরো সম্পর্কের স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ নয়। যেখানে সাক্ষ্য অনুপস্থিত বা পরস্পরবিরোধী, সেখানে ধর্মীয় প্রয়োজনের কারণে নিশ্চয়তা ঘোষণা করা অনিশ্চয়তাকে দূর করে না; তার ওপর কর্তৃত্বের রায় বসায়।


সাহাবিদের নির্ভরযোগ্যতার ধর্মতত্ত্ব, পারস্পরিক বিরোধ ও সাক্ষ্যবাছাই

সংকলনের সাক্ষীদের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সুন্নি হাদিসশাস্ত্রে একটি বিশেষ ছাড় রয়েছে। পরবর্তী বর্ণনাকারীদের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষা করার নিয়ম থাকলেও সাহাবিদের সবাইকে ন্যায়পরায়ণ বলে গ্রহণ করা হয়। খতিব বাগদাদি আল-কিফায়ায় এই ব্যতিক্রমের ভিত্তি হিসেবে কোরআনে আল্লাহর দেওয়া স্বীকৃতির কথা বলেছেন। ফলে যাঁদের মাধ্যমে কোরআন পৌঁছানোর দাবি করা হচ্ছে, তাঁদের সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা আবার সেই কোরআনের প্রশংসা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামকিউএ তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে। [1288]

كل حديث اتصل إسناده بين مَن رواه وبين النبي صلى الله عليه وسلم : لم يلزم العمل به إلا بعد ثبوت عدالة رجاله ، ويجب النظر في أحوالهم ، سوى الصحابي الذي رفعه إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم ؛ لأن عدالة الصحابة ثابتة معلومة بتعديل الله لهم وإخباره عن طهارتهم واختياره لهم في نص القرآن

বাংলা অনুবাদ: যে হাদিসের সনদ তার বর্ণনাকারী থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত সংযুক্ত, তার বর্ণনাকারীদের ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরই সে অনুযায়ী কাজ করা আবশ্যক হয়; তাঁদের অবস্থা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তবে যে সাহাবি তা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌঁছিয়েছেন, তিনি ব্যতিক্রম। কারণ সাহাবিদের ন্যায়পরায়ণতা আল্লাহর দেওয়া স্বীকৃতি, তাঁদের পবিত্রতা সম্পর্কে তাঁর সংবাদ এবং কোরআনের পাঠে তাঁদের নির্বাচন করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ও জ্ঞাত।

আবু যুরআর বক্তব্যে এই ব্যতিক্রমের প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজন আরও সরাসরি প্রকাশিত। সাহাবিদের সমালোচনাকে তিনি কোরআন–সুন্নাহ বহনকারী সাক্ষীদের অগ্রহণযোগ্য করে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছেন এবং সমালোচককে যিন্দিক বলেছেন। এখানে বর্ণনাকারীর মর্যাদা রক্ষার সঙ্গে ধর্মীয় উৎসের কর্তৃত্ব রক্ষাকে স্পষ্টভাবে যুক্ত করা হয়েছে। উদ্দেশ্যটি অনুমান করে বসাতে হচ্ছে না; উদ্ধৃত বক্তব্যেই সাক্ষীকে প্রশ্নবিদ্ধ করা মানে কিতাব–সুন্নাহকে বাতিল করার চেষ্টা—এই সম্পর্ক ঘোষণা করা হয়েছে। [1289]

إذا رأيت الرجل ينتقص أحداً من أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم فاعلم أنه زنديق، وإنما أدّى إلينا هذا القرآن والسنة أصحاب رسول الله، وإنما يريدون أن يجرحوا شهودنا، ليبطلوا الكتاب والسنة، والجرح بهم أولى، وهم زنادقة

বাংলা অনুবাদ: তুমি যখন কোনো ব্যক্তিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো সাহাবিকে হেয় করতে দেখবে, তখন জেনে রাখবে সে যিন্দিক। আমাদের কাছে এই কোরআন ও সুন্নাহ পৌঁছে দিয়েছেন রাসুলুল্লাহর সাহাবিরা। তারা আমাদের সাক্ষীদের প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়, যাতে কিতাব ও সুন্নাহকে বাতিল করতে পারে। বরং তাদেরই অগ্রহণযোগ্য বলা অধিকতর সংগত; তারাই যিন্দিক।

এই নিয়মে সাক্ষীর ব্যক্তিগত বক্তব্যের আগে তাঁর শ্রেণিগত পরিচয় নিশ্চয়তা পায়। কিন্তু ন্যায়পরায়ণতার ঘোষণা দিয়ে স্মৃতির নিখুঁততা, সব তথ্য জানার ক্ষমতা বা পরস্পরবিরোধী পাঠের অভিন্নতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। দুই ব্যক্তি আন্তরিক হয়েও একই শব্দ আলাদাভাবে স্মরণ করতে পারেন। একজন কোনো পাঠের কথা জানেন, অন্যজন তা জানেন না। একজনের মুসহাফে কোনো বাক্য থাকে, অন্যজনের সংগ্রহে থাকে না। এ ধরনের পার্থক্যে উভয়কে সৎ বলার মাধ্যমে দুই পাঠ এক হয়ে যায় না। কোন পাঠ কখন শেখানো হয়েছিল এবং কোনটি পরে নির্বাচিত হয়েছে, তার জন্য ঘটনাসংক্রান্ত সাক্ষ্যই প্রয়োজন।

বিরোধের ক্ষেত্রপরস্পরভিন্ন সাক্ষ্য বা অবস্থানসর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা যা নির্ধারণ করে নাবিস্তারিত দলিল
পাঠ শেখার কর্তৃত্বউমরের আপত্তি এবং হিশামের ভিন্ন পাঠের অনুমোদনপ্রথম আপত্তিকারীর জানা পাঠই একমাত্র অনুমোদিত পাঠ ছিল কি নাউমর ও হিশামের ভিন্ন পাঠ এবং উভয় পাঠের অনুমোদন
সংকলনের দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত মুসহাফইবনে মাসউদের নিজের পাঠের কর্তৃত্ব এবং যায়েদের নিয়োগে আপত্তিকেন একজনের পাঠ রাষ্ট্রীয় মান হলো, অন্যজনের মুসহাফ জমা দেওয়ার দাবি উঠলইবনে মাসউদের শিক্ষকতা, নিজের পাঠের কর্তৃত্ব এবং যায়েদের নিয়োগে আপত্তি; ইবনে মাসউদের মুসহাফ গোপন রাখার আহ্বান ও রাষ্ট্রীয় একীকরণের বিরোধিতা
মুসহাফে অনুপস্থিত সাবেক আয়াতউমরের রজমের পাঠসংক্রান্ত ঘোষণাঅবতরণ ও পাঠের সাক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও বর্তমান মুসহাফে বাক্য না থাকার কারণরজমের আয়াত: উমরের ঘোষণা, মুসহাফে অনুপস্থিতি ও বহাল মৃত্যুদণ্ড
মৃত্যুকালে পঠিত অংশের অবস্থানআয়েশার পাঁচবার দুধপানের বক্তব্যপাঠ চলার খবর ও পরে রহিত হওয়ার ব্যাখ্যার সময়গত সম্পর্কমুহাম্মদের মৃত্যুর সময়ও কোরআন হিসেবে পাঠ করার আয়েশার বক্তব্য
লিখিত রূপের যথার্থতাআয়েশা ও ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত ভুলের অভিযোগঅভিযোগের নির্দিষ্ট শব্দরূপ এবং গৃহীত পাঠের সঙ্গে সম্পর্কমুসহাফে লিখনত্রুটির বর্ণনা: উসমান, আয়েশা ও ইবনে আব্বাস
শেখা পাঠে অনড় থাকাআবু দারদার ভিন্ন পাঠ ও প্রচলিত অংশ পড়তে অস্বীকৃতিতাঁর গ্রহণযোগ্যতা থেকে বিপরীত পাঠের অভিন্নতা অনুসরণ করে নালায়ল ৯২:৩-এ আবু দারদা–ইবনে মাসউদের পাঠ এবং প্রচলিত অংশ পড়তে অস্বীকৃতি

সাহাবিদের সবাইকে গ্রহণযোগ্য বলা এবং তাঁদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট পক্ষের সংকলনকে চূড়ান্ত করা একই সিদ্ধান্ত নয়। প্রথমটি সকলের মর্যাদার ঘোষণা; দ্বিতীয়টি বাস্তবে কিছু মানুষের কাজ ও পাঠকে অন্যদের তুলনায় অগ্রাধিকার দেওয়া। ইবনে মাসউদকে সম্মানিত শিক্ষক হিসেবে মেনে নেওয়ার পরও তাঁর মুসহাফকে রাষ্ট্রীয় মানের বাইরে রাখা হলে সম্মানের ঘোষণা সিদ্ধান্তের অসমতা দূর করে না। একইভাবে উবাইয়ের পাঠদক্ষতা স্বীকার করে তাঁর নামে বর্ণিত অতিরিক্ত পাঠ বর্তমান মুসহাফে না রাখলে দক্ষতার প্রশংসা সেই অনুপস্থিতির ব্যাখ্যা হয়ে ওঠে না। কোন দলিল কী কারণে গ্রহণ বা বর্জিত হলো, সেই প্রশ্ন তখনো খোলা থাকে।

সাক্ষ্যবাছাইয়ের আরেকটি সমস্যা হলো একই ব্যক্তির সুবিধাজনক ও অসুবিধাজনক বক্তব্যের অসম ব্যবহার। কোনো সাহাবির বর্ণনা সংকলনের যথার্থতার সমর্থনে গ্রহণ করা হলো, কিন্তু তাঁর নামেই সংরক্ষিত অনুপস্থিত পাঠের খবর কেবল সিদ্ধান্তের সঙ্গে না মেলার কারণে বাতিল করা হলো—এতে ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা আসল মানদণ্ড থাকে না। ফলের সঙ্গে মিল মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়। বর্ণনার ভিন্ন সংযোগ, কাল বা বক্তব্যগত সমস্যা থাকলে সেগুলো নির্দিষ্ট করে পরীক্ষাযোগ্য কারণ; কেবল ধর্মতাত্ত্বিক অস্বস্তি কোনো ঐতিহাসিক বর্ণনা মিথ্যা হওয়ার প্রমাণ নয়।

অন্যদিকে একই সংবাদ বহু পরবর্তী বইয়ে পাওয়া গেলেই বহু স্বাধীন সাক্ষী পাওয়া যায় না। সুয়ূতি পূর্ববর্তী একটি গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করলে, ইসলামওয়েব সুয়ূতির সেই উদ্ধৃতি দেখালে এবং ইসলামকিউএ একই বিবরণ পুনরায় উল্লেখ করলে মূল সংবাদ একটি সংবহনধারারই হতে পারে। সাক্ষ্যের সংখ্যা গণনায় গ্রন্থের সংখ্যা ও স্বাধীন তথ্যধারার সংখ্যা পৃথক। এই সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যখন হারানো সূরা, লিখনত্রুটি বা হাজ্জাজের পরিবর্তনের বিবরণ পরবর্তী সংকলনগুলোতে ফিরে আসে। সূত্রের পুনরাবৃত্তি সংবাদটির পরবর্তী প্রচার ও গ্রহণের প্রমাণ; স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য নয়।

হাদিসশাস্ত্রের সহিহ–দুর্বল শ্রেণিবিভাগও তার নিজস্ব গ্রহণযোগ্যতার নিয়মের ফল। কোনো বর্ণনা দুর্বল সনদে এসেছে মানেই ঘটনাটি ঘটেনি—এ সিদ্ধান্ত অতিরিক্ত। আবার শুধু একটি পুরোনো বইয়ে উদ্ধৃত হয়েছে বলেই ঘটনাটির প্রতিটি বিবরণ প্রতিষ্ঠিত হয় না। সময়, বক্তব্যের রূপ, অন্য সাক্ষ্যের সম্পর্ক এবং পরবর্তী ব্যবহার মিলিয়ে ইতিহাসের দাবি দাঁড়ায়। সাহাবির প্রতি ধর্মীয় আনুগত্য বা বিরাগ কোনোটিই এসব তথ্যের জায়গা নিতে পারে না। কোরআনের নির্ভুল সংবহন প্রমাণ করতে হলে তার বহনকারীদের অগ্রিম অভ্রান্ততার ঘোষণা নয়, তাঁদের সংরক্ষিত সাক্ষ্যের বাস্তব সামঞ্জস্য প্রয়োজন।

যেখানে সাক্ষীদের মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রশ্নকারীর বিশ্বাসকেই আক্রমণ করা হয়, সেখানে সাক্ষ্য পরীক্ষার সামাজিক মূল্য বেড়ে যায়। আবু যুরআর ঘোষণার কার্যকর তাৎপর্য এখানেই: সাক্ষীর বিরুদ্ধে আপত্তি আর কেবল একটি বিবরণের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকে না; সমালোচকের ধর্মীয় পরিচয় বিচারের বিষয় হয়ে যায়। এই প্রতিরোধব্যবস্থা গ্রন্থের কর্তৃত্বকে রক্ষা করে, কিন্তু গ্রন্থের ইতিহাসের অসংগতিগুলোকে তথ্যগতভাবে নিষ্পত্তি করে না। নথি, স্মৃতি ও পাঠের পার্থক্য তখনো সেগুলোর নিজস্ব বক্তব্য নিয়েই উপস্থিত থাকে।


অবতরণ থেকে হাজ্জাজ পর্যন্ত সংগ্রহ, সংযোজন, বর্জন, ধ্বংস ও সংস্কারের কালপঞ্জি

কোরআনের সংকলনের ঘটনাক্রম একটি প্রস্তুত গ্রন্থের অনুলিপি তৈরি করার একক ঘটনা নয়। প্রথমে দীর্ঘ সময় ধরে পাঠ প্রচার ও লিখন, সেই সময়েই নতুন শব্দ ও বিধানের আগমন, পরে উপকরণ সংগ্রহ, আরও পরে রাষ্ট্রীয় নকল ও বর্জন, এবং তারও পরে লিখনচিহ্নের বিকাশ রয়েছে। প্রতিটি স্তর পরের স্তরের উপাদান তৈরি করেছে। ফলে শেষের মুসহাফকে প্রথম মুহূর্ত থেকেই একই লিখিত সীমানায় উপস্থিত ধরে নিলে মধ্যবর্তী প্রক্রিয়ার বড় অংশ অদৃশ্য হয়ে যায়। সংকলনের ইসলামি বিবরণগুলোতে ঠিক সেই মধ্যবর্তী কাজগুলোর কথাই বারবার আসে।

জীবদ্দশার একাধিক ঘটনার পারস্পরিক সুনির্দিষ্ট তারিখ সব বর্ণনায় নেই। আবু বকর ও উসমানের উদ্যোগ দুটি পৃথক শাসনামলের ঘটনা; হাফসার কাছে সহিফা থাকা, উসমানের তা ধার নেওয়া এবং পরে মারওয়ানের হাতে সেই সহিফা ধ্বংস হওয়া আরও পৃথক পর্ব। নুকতা ও স্বরচিহ্নের প্রথম প্রবর্তক সম্পর্কেও একাধিক বর্ণনা আছে। ঘটনাক্রমে এই কালগত সীমাগুলো রেখেই পাঠের ইতিহাস দাঁড়ায়; সবগুলোকে একটি “সংরক্ষণ” শব্দে একত্র করলে কে কখন কী বদলেছেন বা নির্বাচন করেছেন, তা আর বোঝা যায় না।

পর্ব বা সময়সীমাউৎসে বর্ণিত ঘটনাপাঠ, নথি বা কর্তৃত্বে ফলসূত্র ও বিস্তারিত
মুহাম্মদের জীবদ্দশা: পর্যায়ক্রমিক প্রচারকোরআন খণ্ডে খণ্ডে পাঠ ও অবতরণের বিবরণএক সময়ে প্রচলিত পাঠের সঙ্গে পরে আরও পাঠ যুক্ত হয়; অবতরণ একটি সময়জুড়ে চলা প্রক্রিয়াপূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; ইসরা ১৭:১০৬
জীবদ্দশা: লিখিত উপাদান ও মুখস্থবিচ্ছিন্ন উপকরণে লেখা এবং ব্যক্তিগত সংগ্রহলিখিত বাহক ও মুখস্থ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে থাকেপূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; বুখারি ৪৯৮৬-এ পরবর্তী অনুসন্ধানের বিবরণ
জীবদ্দশা: রোজার নির্দেশ ব্যাখ্যাসাদা–কালো সুতোর আয়াতে “মিনাল ফাজর” পরে আসার বিবরণপঠিত বাক্যে স্পষ্টীকরণমূলক শব্দের উপস্থিতি পরবর্তী পর্যায়ে ঘটেপূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; বুখারি ৪৫১১
জীবদ্দশা: অন্ধ সাহাবির আপত্তিইবনে উম্মে মাকতুমের প্রসঙ্গের পরে অক্ষমদের ব্যতিক্রমজিহাদে অংশ না নেওয়া সম্পর্কে সাধারণ বাক্যে নতুন সীমা যুক্ত হয়পূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; বুখারি ৪৫৯২
জীবদ্দশা: ভিন্ন পাঠের অনুমোদনউমর ও হিশামের ভিন্ন পাঠ শুনে উভয়কে অনুমোদনএকটি মাত্র শব্দরূপের বাইরে অনুমোদিত পাঠের পরিসর থাকেপূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; বুখারি ৪৯৯২
জীবদ্দশা: ব্যক্তিগত বিস্মৃতিঅন্যের পাঠে মুহাম্মদের আয়াত মনে পড়াবাহকের ব্যক্তিগত স্মৃতি সর্বক্ষণ নির্ভুল থাকার দাবি খণ্ডিত হয়পূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; বুখারি ৫০৩৮
জীবদ্দশা: কোরআন হিসেবে পাঠ ও প্রত্যাহারবীরে মাউনার নিহতদের সম্পর্কে পঠিত বাক্য পরে উঠিয়ে নেওয়ার বিবরণপূর্বে কোরআন হিসেবে প্রচারিত অংশ গৃহীত পাঠের বাইরে যায়পূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; বুখারি ২৮০১
জীবদ্দশা: বিধান বদলের ধারাবাহিকতাব্যক্তিগত আলাপের আগে সদকা আরোপ ও প্রত্যাহারপাঠ রয়ে গেলেও দুই পর্যায়ে কার্যকর বাধ্যবাধকতা আলাদা হয়পূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; মুজাদিলা ৫৮:১২–১৩
মুহাম্মদের মৃত্যু-পর্বদুধপানের পাঁচবারের পাঠ তখনও পড়া হতো—আয়েশার বক্তব্যমৃত্যুকালীন প্রচলন ও বর্তমান মুসহাফের সীমানার মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়পূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; মুসলিম ১৪৫২ক
আবু বকরের খিলাফত: ইয়ামামার পরেউমরের আশঙ্কা: পাঠকদের মৃত্যুর সঙ্গে অনেক কোরআন চলে যেতে পারেসংগ্রহের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়পূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; বুখারি ৪৯৮৬
আবু বকরের খিলাফত: যায়েদের অনুসন্ধানলিখিত উপকরণ ও মানুষের স্মৃতি থেকে সংগ্রহসরাসরি একটি প্রস্তুত সরকারি বই নকল করার পরিবর্তে উপাদান একত্র করা হয়পূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; বুখারি ৪৯৮৬
আবু বকর–উমর–হাফসাসংগৃহীত সহিফার হেফাজত ধারাবাহিকভাবে বদলায়পরবর্তী উসমানি উদ্যোগের লিখিত ভিত্তি হাফসার কাছে থাকেপূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; বুখারি ৪৯৮৬
উমরের খিলাফত: রজমের ঘোষণারজমের আয়াত নাজিল ও পাঠ করা হয়েছিল বলে ভাষণপূর্বপাঠের স্মৃতি ও বহাল দণ্ড বর্তমান মুসহাফের বাইরের সাক্ষ্যে থাকেপূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; মুসলিম ১৬৯১ক
উসমানের খিলাফত: আঞ্চলিক বিরোধসামরিক অভিযানের পাঠবিরোধ নিয়ে হুযাইফার সতর্কতাপাঠগত বিরোধ মেটাতে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ শুরু হয়পূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; বুখারি ৪৯৮৭
উসমানের খিলাফত: নকলের ভিত্তিহাফসার সহিফা ধার এবং যায়েদসহ চারজনের দায়িত্বএকটি অনুমোদিত লিখিত মান প্রস্তুতের জন্য নির্দিষ্ট কমিটি কাজ করেপূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; বুখারি ৪৯৮৭
উসমানের খিলাফত: ভাষা নির্বাচনমতভেদে কুরাইশি ভাষায় লেখার নির্দেশভিন্নতার নিষ্পত্তির জন্য খলিফা নির্দিষ্ট নিয়ম দেনপূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; বুখারি ৪৯৮৭
উসমানি নকলের পর্যায়আহযাব ৩৩:২৩ অনুসন্ধান ও খুজাইমার কাছে পাওয়ানকলের কাজেও নির্দিষ্ট আয়াতের লিখিত সাক্ষ্য খোঁজার ঘটনা থাকেপূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; বুখারি ৪৯৮৮
উসমানি কপি প্রস্তুত ও বিতরণঅঞ্চলগুলোতে অনুমোদিত কপি পাঠানোগ্রহণযোগ্য লিখিত পাঠের কেন্দ্রীয় মান প্রতিষ্ঠিত হয়পূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; বুখারি ৪৯৮৭
উসমানের নির্দেশে অন্য নথি অপসারণঅন্য সহিফা ও মুসহাফ পুড়িয়ে দিতে বলাবিকল্প লিখিত সাক্ষ্যের টিকে থাকার পথ সংকুচিত হয়পূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; বুখারি ৪৯৮৭
একীকরণ নিয়ে বিরোধইবনে মাসউদের আপত্তি ও মুসহাফ গোপন রাখার আহ্বানপাঠের ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সংঘাত প্রকাশ পায়পূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র
হাফসার মৃত্যুর পরে, মারওয়ানের আমলহাফসার সহিফা সংগ্রহ করে ধ্বংসের বিবরণউসমানি নকলের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত পুরোনো নথিটিও পরে আর থাকে নাপূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; ফাতহুল বারি, কোরআন সংগ্রহ অধ্যায়
প্রথম হিজরি শতকের লিখনসংস্কারআবুল আসওয়াদের সঙ্গে যুক্ত স্বরচিহ্নের পদ্ধতিমুখের উচ্চারণের সহায়ক সংকেত লিখিত পৃষ্ঠায় যুক্ত হয়পূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; দানি, আল-মুহকাম
প্রথম শতকের শেষভাগের প্রবর্তন-বিবরণনাসর ইবনে আসিম ও ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামারের নামে নুকতা দেওয়ার বর্ণনাসদৃশ বর্ণ আলাদা করার লিখিত ব্যবস্থা প্রসারিত হয়পূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; দানি, আল-মুহকাম
হাজ্জাজের নামে সংরক্ষিত প্রতিবেদনইবনে আবি দাউদের গ্রন্থে এগারো স্থানে পরিবর্তনের তালিকাসরকারি সংশোধনের একটি নির্দিষ্ট আরোপিত বিবরণ পাওয়া যায়; প্রতিটি ক্ষেত্রে পাঠসাক্ষ্যের সম্পর্ক পৃথকপূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; ইবনে আবি দাউদ, কিতাবুল মাসাহিফ
হাজ্জাজ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের পাঠগত তুলনাইউনুস ১০:২২ ও আনফাল ৮:৩৯-এ ভিন্ন পাঠের স্বতন্ত্র সাক্ষ্যপরিবর্তনের আরোপ, পুরোনো পাঠভেদ এবং পরবর্তী গৃহীত রূপের সম্পর্ক একত্রে বিচার্য তথ্য হিসেবে থাকেপূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র; পূর্ণ বর্ণনা ও সূত্র

এই ধারাবাহিকতায় আবু বকর ও উসমানের কাজের পার্থক্য মৌলিক। প্রথম উদ্যোগে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে বিচ্ছিন্ন উপাদান একত্র করার প্রয়োজন বলা হয়েছে। দ্বিতীয় উদ্যোগে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠ নিয়ে বিরোধ মেটানো ও একটি মান্য রূপ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন বলা হয়েছে। প্রথমটি সম্পন্ন হলেই দ্বিতীয়টি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়নি। অর্থাৎ সংগ্রহ থাকা এবং সবাই একই অনুমোদিত পাঠ মানা দুটি আলাদা অবস্থা। উসমানের পদক্ষেপ সেই দ্বিতীয় সমস্যায় রাষ্ট্রীয় সমাধান দিয়েছে; তার সঙ্গে অগ্রহণীয় নথি অপসারণের নির্দেশও যুক্ত ছিল।

হাফসার সহিফার যাত্রাটি এই ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একই নথি প্রথমে সংকলিত উপাদানের হেফাজত, পরে সরকারি নকলের ভিত্তি, তারপর ফেরত দেওয়া ব্যক্তিগত আমানত এবং শেষে ধ্বংসযোগ্য পুরোনো দলিল হয়েছে। নথির ব্যবহার ও মর্যাদা সময়ের সঙ্গে বদলেছে। পরবর্তী মুসহাফ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে পূর্বের ভিত্তিনথি আর টিকিয়ে রাখা হয়নি—এই ঘটনা সংরক্ষণকে কেবল বস্তু রক্ষার কাজ হিসেবে দেখার সীমা প্রকাশ করে। কোন নথি রক্ষা পাবে এবং কোনটি সরানো হবে, তার ওপর প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

লিখনচিহ্নের বিকাশ আবার আরেক স্তর। পাঠপ্রচার থেকে সংগ্রহ, সংগ্রহ থেকে মান্য কপি, মান্য কপি থেকে চিহ্নযুক্ত পাঠ-সহায়ক পৃষ্ঠা—প্রতিটি ধাপে লিখিত বস্তু নতুন বৈশিষ্ট্য পেয়েছে। এগুলোকে একটি অপরিবর্তিত পৃষ্ঠার ইতিহাস বলা অসত্য। একইসঙ্গে শব্দগত পাঠভেদের সাক্ষ্য পৃথকভাবে রয়েছে; সেগুলোকে কেবল চিহ্নের ইতিহাসে নামিয়ে আনাও অসত্য। উসমানি রাষ্ট্রীয় মান এবং পরবর্তী লিখনপদ্ধতি মিলে যে দৃশ্যমান মুসহাফ তৈরি হয়েছে, তার ইতিহাসে একাধিক পর্যায়ের মানবীয় কাজ স্পষ্ট।


শব্দ, সূরার সীমানা, লিখনরূপ, পাঠের অনুমোদন ও বিধানের পরিবর্তনের তুলনামূলক হিসাব

কোরআন নিয়ে “বদল” শব্দটি ব্যবহার করার সময় তার বস্তুটি নির্দিষ্ট থাকলে ঘটনাগুলোর শক্তি স্পষ্ট হয়। কোনো সূরার দুটি নাম থাকা, একই শব্দে দুটি স্বর থাকা, একটি সম্পূর্ণ শব্দ কোনো কপিতে থাকা ও অন্যটিতে না থাকা, পূর্বে পঠিত বাক্যের বর্তমান অনুপস্থিতি এবং আয়াত রেখে আইন প্রত্যাহার—এগুলো ভিন্ন ধরনের পরিবর্তন। সবগুলোকে নিছক উচ্চারণভেদ বলা তথ্য মুছে ফেলে। প্রতিটি ঘটনাই তার নিজস্ব মাত্রায় অপরিবর্তনীয়তার নির্দিষ্ট দাবিকে পরীক্ষা করে।

নামকরণ, বহুপাঠ, স্মৃতি, সূরার সীমা, পাঠের পরিসর এবং শব্দের রূপ—এই ছয়টি প্রশ্ন সংকলনের বিভিন্ন স্তরে কাজ করে। নামের ক্ষেত্রে পরিচয় নির্ধারণ, স্মৃতির ক্ষেত্রে বহনক্ষমতা, সূরার সীমায় গ্রন্থের গঠন এবং শব্দরূপে সরাসরি পাঠের প্রশ্ন উঠে আসে। একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে অন্য পাঁচটি নিষ্পত্তি হয় না।

জটিলতার ধরননির্দিষ্ট প্রশ্নসংশ্লিষ্ট প্রমাণের ক্ষেত্র
নামকরণসূরার নাম আয়াতের অংশ, বর্ণনামূলক পরিচয়, নাকি পরবর্তী উপাধি?একই সূরার একাধিক পরিচয় এবং আয়াতের সঙ্গে শিরোনামের অবস্থান; সূরার নাম ও বিভাগ
বহুপাঠকোন পাঠ অনুমোদিত, আর কোনটি রাষ্ট্রীয় মানের বাইরে?প্রাথমিক অনুমোদন, পরবর্তী নির্বাচন এবং মানের বাইরে থাকা পাঠ; সাত আহরুফ; একটিতে সীমাবদ্ধ করার ব্যাখ্যা
স্মৃতিভুলে যাওয়া ও অন্যের পাঠে মনে পড়ার বিবরণ কী বলে?ব্যক্তিগত স্মরণফেরত ও বিস্তৃত পাঠ বিস্মৃতির পৃথক সাক্ষ্য; মুহাম্মদের বিস্মৃতি; আবু মুসার বিবরণ
সূরার সীমাআনফাল ও তওবার সম্পর্ক কার সিদ্ধান্তে নির্ধারিত?বিন্যাস, সূরার সম্পর্ক ও বিসমিল্লাহ না লেখার ব্যাখ্যা; আনফাল–তাওবা
পাঠের পরিসরএকসময় আয়াত হিসেবে পঠিত কোন অংশ এখন মুসহাফে নেই?কোরআন হিসেবে পূর্বে পাঠের দাবি ও বর্তমান অনুপস্থিতি; রজম; দুধপান; অনুপস্থিত সূরা
শব্দের রূপশুধু স্বর বদলেছে, নাকি বর্ণ ও সম্বোধনও বদলেছে?ইয়া–তা, শব্দক্রম এবং আঞ্চলিক কপিতে পূর্ণ শব্দের পার্থক্য; পাঠভেদ; আনফাল ৮:৩৯

শব্দের উপস্থিতি–অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে দানির আল-মুকনি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখানে আঞ্চলিক মুসহাফের বর্ণনা রয়েছে। বিতর্কটি কেবল কোনো ব্যক্তির স্মৃতি বা ব্যক্তিগত নোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; স্বীকৃত আঞ্চলিক কপির লিখিত রূপ নিয়েও হয়। কোনো কপিতে সংযোজক বর্ণ বা সর্বনাম থাকা এবং অন্যটিতে না থাকার বিবরণ “প্রত্যেক কপির প্রতিটি অক্ষর এক” দাবির সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে আসে। সংশ্লিষ্ট পাঠগুলোকে অনুমোদিত বলা গেলে তাদের ধর্মীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা হয়; তাদের দৃশ্যমান পার্থক্য বিলুপ্ত হয় না। আঞ্চলিক কপির পূর্ণ উদ্ধৃতি ও দানির সূত্র এবং নির্দিষ্ট আয়াতগুলোর তুলনা একই স্থানে ভিন্ন লিখিত রূপের সাক্ষ্য বহন করে।

পরিবর্তন বা পার্থক্যের স্তরনির্দিষ্ট দৃষ্টান্তযা বাস্তবে আলাদাযে দাবির সঙ্গে সংঘাতসূত্রসমেত আলোচনা
পঠিত বাক্যে নতুন অংশফজরের সুতোর নির্দেশ; অক্ষমদের ব্যতিক্রমআগের বাক্যের সঙ্গে পরে ব্যাখ্যাকারী বা সীমাকারী শব্দপ্রথম উচ্চারিত বাক্যই শেষ পর্যন্ত একই পূর্ণ বাক্য ছিলপঠিত আয়াতে নতুন শব্দ: মানুষের প্রশ্নের পরে পাঠ সংশোধন
শব্দ বা বাক্যাংশের পরিসরশুআরা ২৬:২১৪; কাহফ ১৮:৭৯–৮০বর্ণিত পাঠে অতিরিক্ত পরিচয় বা বিশেষণসব শিক্ষকের পাঠে সবসময় একই শব্দ ছিলশুআরা ২৬:২১৪-এ ইবনে আব্বাসের অতিরিক্ত বাক্যাংশ; কাহফ ১৮:৭৯–৮০-এ নৌকার অবস্থান, নৌকার গুণ ও বালকের পরিচয়ের ভিন্ন পাঠ
শব্দের ক্রমনুর ২৪:২৭-এ ইবনে মাসউদের পাঠএকই প্রসঙ্গে শব্দের অবস্থানপ্রত্যেক বর্ণিত পাঠে শব্দক্রম অভিন্ননুর ২৪:২৭-এ ইবনে মাসউদের শব্দক্রম
বাক্যের অংশ পড়া বা না-পড়ালায়ল ৯২:৩ নিয়ে আবু দারদার অবস্থানগৃহীত বাক্যাংশ এবং সাহাবির শেখা পাঠের সীমানাসাহাবিদের শেখা পাঠ ও প্রচলিত পাঠ সর্বাংশে অভিন্ন ছিললায়ল ৯২:৩-এ আবু দারদা–ইবনে মাসউদের পাঠ এবং প্রচলিত অংশ পড়তে অস্বীকৃতি
আঞ্চলিক লিখিত পার্থক্যআলে ইমরান ৩:১৩৩; হাদিদ ৫৭:২৪; শামস ৯১:১৫কোনো স্থানে বর্ণ, কোথাও সর্বনামের উপস্থিতি–অনুপস্থিতিসরকারি আঞ্চলিক কপিতেও অক্ষরে অক্ষরে একমাত্র রূপ ছিলআলে ইমরান ৩:১৩৩, হাদিদ ৫৭:২৪, শামস ৯১:১৫ ও তাওবা ৯:১০০-এর তুলনামূলক পাঠ; দানি, আল-মুকনি
ব্যঞ্জনবর্ণ ও সম্বোধনআনফাল ৮:৩৯-এর ইয়া–তাতৃতীয় পুরুষ ও দ্বিতীয় পুরুষের পাঠরূপসব পাঠভেদ কেবল একই বর্ণের ওপর স্বরচিহ্ন বদলআনফাল ৮:৩৯ — “ইয়া’মালুন” ও “তা’মালুন”
লিখন-সহায়ক সংকেতনুকতা, হরকত ও পরবর্তী চিহ্নের আকৃতিপৃষ্ঠায় পাঠ নির্দেশ করার দৃশ্যমান উপাদানআজকের চিহ্নযুক্ত লিখনরূপ শুরু থেকেই একই ছিলপ্রাথমিক লিখনরূপ ও পরবর্তী পাঠ-সহায়ক চিহ্নের পার্থক্য; ব্যঞ্জনবর্ণের নুকতা, নাসর ও ইয়াহইয়া: প্রবর্তনের পৃথক বর্ণনা; হরকত ও স্বরচিহ্ন: আবুল আসওয়াদের পদ্ধতি ও খলিলের সঙ্গে যুক্ত পরবর্তী রূপ
সূরার গঠন ও বিন্যাসআনফাল–তাওবা এবং বিসমিল্লাহকোন একক কোথায় বসবে ও সূচনায় কী লেখা হবেগ্রন্থের প্রতিটি গঠনগত সিদ্ধান্ত একইভাবে প্রত্যক্ষ নির্দেশে নির্ধারিত ছিলআনফাল ও তাওবা: পৃথক সূরা, সংযুক্ত বিন্যাস ও উসমানের ব্যাখ্যা; বিসমিল্লাহ আয়াত কি না: সূরা, পাঠ ও মাজহাবভেদে বিরোধ
আয়াতের গণনাবিভিন্ন গণনাপদ্ধতির সংখ্যাবাক্যসমষ্টিকে আয়াত হিসেবে ভাগ করার সীমাএকটিই সর্বজনীন আয়াতসংখ্যা সবসময় প্রচলিত ছিলআয়াত গণনার বিভিন্ন পদ্ধতি ও সংখ্যার মতভেদ
সাবেক পাঠের বর্তমান অনুপস্থিতিরজম, দুধপান ও বীরে মাউনার বাক্যপূর্বে কোরআন হিসেবে পঠিত অংশ ও বর্তমান মুসহাফঅবতীর্ণ বলে বর্ণিত সব পাঠ এখনো মুসহাফে আছেরজমের আয়াত: উমরের ঘোষণা, মুসহাফে অনুপস্থিতি ও বহাল মৃত্যুদণ্ড; দুধপানের আয়াত ও সহিফা খেয়ে ফেলার বর্ণনা; বীরে মাউনার নিহতদের সম্পর্কে কোরআন হিসেবে পঠিত ও পরে সরানো বাক্য
পাঠ বহাল রেখে বিধান বদলবিধবার ব্যবস্থা; ব্যক্তিগত আলাপের সদকাদুটি আয়াত থাকে, কার্যকর বিধানের পর্যায় আলাদালিখিত আয়াত থাকলেই তার বিধান একইভাবে বহালবিধবার এক বছরের ব্যবস্থা ও চার মাস দশ দিন: তাফসিরি নসখ-মত এবং ইবনে যুবাইর–উসমানের কথোপকথন; মুহাম্মদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপের আগে সদকা: বাধ্যবাধকতা ও প্রত্যাহার
পাঠের বাইরের কার্যকর আইনঅসিয়ত, রজম ও অন্যান্য হাদিসভিত্তিক নির্ধারণআয়াতের প্রয়োগে নতুন শর্ত, শ্রেণি বা ব্যতিক্রমআইনের পূর্ণ সীমানা কেবল মুসহাফের সরাসরি শব্দেই পাওয়া যায়কোরআন নাকি হাদিস: পাঠ রেখে আইন বদলানোর কার্যকর কর্তৃত্ব

এই হিসাবের একটি তাৎপর্য হলো, “অক্ষর” শব্দটি সবসময় একই অর্থে ব্যবহৃত হয় না। আরবি ব্যঞ্জনবর্ণ, লিখিত সংকেত, পাঠের ধরন এবং আহরুফের ধর্মীয় পরিভাষা আলাদা। একাধিক আহরুফের অনুমোদন থেকে সব আঞ্চলিক লিখিত রূপ অভিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত আসে না। নির্দিষ্ট সাক্ষ্যের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট দাবিটিই দাঁড়ায়। শব্দের পার্থক্যের উদাহরণ থাকলে কেবল হরকতের ইতিহাস দিয়ে তার জবাব দেওয়া অপ্রাসঙ্গিক; সাবেক আয়াতের অনুপস্থিতির প্রশ্নে বর্তমান সূরার নাম নিয়ে আলোচনা তেমনই অপ্রাসঙ্গিক।

ধর্মীয় অনুমোদন এই স্তরগুলোর কোনো কোনো পার্থক্যকে গ্রহণযোগ্য করে। দুটি শব্দরূপ অনুমোদিত হতে পারে, পাঠ রহিত ঘোষণা করা হতে পারে, কোনো অনুলিপির বানান আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু “গ্রহণযোগ্য” একটি মূল্যায়ন, “অভিন্ন” একটি তুলনামূলক তথ্য। প্রথমটি সত্য হলেও দ্বিতীয়টি মিথ্যা হতে পারে। দুটি ভিন্ন পাঠ একই বিশ্বাসব্যবস্থায় বৈধ হওয়া তাদের এক শব্দে পরিণত করে না। রাষ্ট্র যে মুসহাফকে বহাল রাখল সেটি বৈধ—এই সিদ্ধান্ত থেকেও অন্য মুসহাফে কী ছিল, তার পূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় না।

পরিবর্তনের একটি সামগ্রিক শতাংশের নামে এসব ভিন্ন বস্তুকে যোগ করাও অর্থহীন। একটি আইন রহিত, একটি সংযোজক বর্ণ ভিন্ন, একটি সূরার নাম একাধিক এবং একটি দীর্ঘ সূরা বিস্মৃত—এগুলো একই গণনার একক নয়। যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত স্পষ্ট, তা আরও নির্দিষ্ট ও শক্ত: পাঠের পরিসর, শব্দরূপ, লিখনরূপ, অনুমোদিত পাঠের সীমা এবং কার্যকর বিধান—প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন বা পার্থক্যের পৃথক সাক্ষ্য রয়েছে। ফলে সব অর্থে, সব পর্যায়ে, সব বাহকে অপরিবর্তিত থাকার একক প্রচারিত ছবিটি এসব সাক্ষ্যের সঙ্গে মেলে না।


ধর্মীয় অনুমোদন, রাষ্ট্রীয় নির্বাচন ও অপরিবর্তিত থাকার দাবির যুক্তিগত সংঘাত

উসমানের উদ্যোগের ধর্মীয় ব্যাখ্যায় একীকরণ নিজেই সংরক্ষণের উপায় হয়ে ওঠে। ইসলামকিউএর “কে কোরআন লিখেছেন” আলোচনায় সরকারি মান প্রতিষ্ঠার পর একমত হওয়া এবং সংরক্ষিত থাকার দাবি করা হয়েছে; তারপর এই কাজকে আল্লাহর সংরক্ষণ হিসেবে হিজর ১৫:৯-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ এবং ঐশী প্রতিশ্রুতি এক সম্পর্কের মধ্যে আসে: মানুষ কপি প্রস্তুত ও নির্বাচন করেছে, আর সেই ফলকে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন বলা হয়েছে। [1290]

وكان هذا من حفظ الله تعالى لكتابه

বাংলা অনুবাদ: এটিও ছিল আল্লাহ তাঁর কিতাবকে সংরক্ষণ করার অন্তর্ভুক্ত।

এই ব্যাখ্যায় ঐশী সংরক্ষণ মানবীয় বাছাইয়ের বিপরীত কিছু নয়; বাছাইয়ের ওপর দেওয়া অনুমোদন। ফলে কমিটি গঠন, ভাষা নির্ধারণ, নকল পাঠানো এবং অন্য নথি পোড়ানোর ঘটনাগুলো ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য কাজ হয়ে ওঠে। কিন্তু গ্রহণযোগ্যতা ঘোষণার পরও সেগুলো নির্বাচন ও অপসারণের ঘটনাই থাকে। যিনি সব মুসহাফের অভিন্নতা প্রমাণ করতে চান, তাঁর জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট নথির তুলনা। যিনি একটি মুসহাফকে মান্য বলে অন্যগুলো সরিয়ে দিতে চান, তাঁর জন্য প্রয়োজন কার্যকর কর্তৃত্ব। উসমানি উদ্যোগের বর্ণনায় এই দ্বিতীয় ক্ষমতার বাস্তব প্রয়োগ স্পষ্ট।

বিকল্প নথি ধ্বংসের ফলে পরবর্তী প্রমাণের পরিবেশও বদলে যায়। যদি বিভিন্ন লিখিত দলিল টিকে থাকত, তবে তাদের তুলনায় শব্দ, বিন্যাস ও ব্যক্তিগত সংযোজনের সুনির্দিষ্ট সীমা দেখা যেত। ধ্বংসের পরে অনেক পার্থক্য জানা যায় পরবর্তী উদ্ধৃতি ও স্মৃতিবর্ণনা থেকে। তাই টিকে থাকা একক মানের বিস্তারকে ধ্বংস-পূর্ব সর্বজনীন অভিন্নতার প্রমাণ করা যুক্তিবিরুদ্ধ। যে প্রক্রিয়া বিকল্প নথি সরিয়েছে, তার ফলের মধ্যে বিকল্পের অনুপস্থিতি সেই প্রক্রিয়ার পূর্বাবস্থার সাক্ষ্য নয়। রাষ্ট্রীয় একীকরণ এভাবে শুধু কোন পাঠ চলবে তা নয়, কোন দলিল ভবিষ্যতের পাঠক তুলনা করতে পারবেন তাও প্রভাবিত করেছে।

ক্ষমতা প্রয়োগের স্থানবাস্তব সিদ্ধান্তপরবর্তী কর্তৃত্বে প্রভাব
সংগ্রহের দায়িত্বনির্দিষ্ট ব্যক্তিকে উপকরণ ও সাক্ষ্য সংগ্রহ করতে দেওয়াকার হাতে গ্রন্থের উপাদান যাচাইয়ের ক্ষমতা থাকবে তা নির্ধারিত হয়
বিরোধ নিষ্পত্তির নিয়মমতভেদে নির্দিষ্ট ভাষায় লিখতে বলাসম্ভাব্য রূপগুলোর মধ্যে সিদ্ধান্তের নীতিকে রাষ্ট্র নির্দিষ্ট করে
কপি বিতরণঅঞ্চলগুলোতে অনুমোদিত মুসহাফ পাঠানোশিক্ষা ও পাঠের কেন্দ্রগুলোতে কেন্দ্রীয় মানের বিস্তার ঘটে
অন্য নথি অপসারণঅন্য সহিফা ও মুসহাফ পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশবিকল্প লিখিত রূপের ব্যবহার ও পরবর্তী তুলনার সুযোগ কমে
পুরোনো ভিত্তিনথির ভবিষ্যৎহাফসার সহিফা পরে ধ্বংসনকলের ভিত্তি ও পরবর্তী মান পাশাপাশি পরীক্ষা করার দলিল হারায়
ভাষ্যগত অনুমোদননির্বাচিত ফলকে ঐশী সংরক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করাএকটি ঐতিহাসিক ফল ধর্মীয় অপরিহার্যতার মর্যাদা পায়

ঐতিহাসিক ফলের স্থায়িত্ব আর তার উৎপত্তির অপরিহার্যতা এক নয়। কোনো সংস্করণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যবহৃত হলে তার গ্রহণ ও প্রচারের শক্তি প্রমাণিত হয়। কিন্তু তার আগে সবসময় একই সংস্করণ ছিল, সেই সিদ্ধান্ত এর মধ্যে নেই। বিশেষত যখন সেই সংস্করণের প্রতিষ্ঠার বিবরণেই পাঠবিরোধ ও বিকল্প নথি অপসারণ আছে, তখন পরবর্তী ঐক্যকে পূর্বের অভিন্নতা বলা ঘটনাক্রম উল্টে দেওয়া। যে মান প্রতিষ্ঠা করতে পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল, তাকে পদক্ষেপের আগেও সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত ধরে নেওয়া যায় না।

ধর্মীয় অনুমোদনের প্রশ্নেও দুটি সিদ্ধান্ত আলাদা। “আল্লাহ এই পরিবর্তন করতে বলেছেন” বলা হলে পরিবর্তন স্বীকার করে তার উৎস ও বৈধতা সম্পর্কে দাবি করা হয়। “কোনো পরিবর্তন হয়নি” বলা হলে পরিবর্তনের ঘটনাই অস্বীকার করা হয়। নাসেখ–মানসুখ, বহুপাঠের অনুমোদন এবং মান্য পাঠে সীমাবদ্ধ করার ব্যাখ্যা প্রথম ধরনের সিদ্ধান্তের কাঠামো বহন করে। সেগুলোকে দ্বিতীয় সিদ্ধান্তের প্রমাণ হিসেবে পেশ করলে ভাষার মধ্যে প্রতিস্থাপন ঘটে: অনুমোদিত পরিবর্তনকে অপরিবর্তন বলে চালানো হয়। ধর্মীয় ভাষায় “উত্তোলন”, “রহিত”, “বর্জিত পাঠ” বা “একীকরণ” নাম থাকলেও আগে–পরের পার্থক্যটি থেকে যায়।

এই পার্থক্য আইনেও কার্যকর। কোনো আয়াতের মুদ্রিত উপস্থিতি বহাল রেখে তার বিধান রহিত বলা হলে অক্ষর থাকে, বাধ্যবাধকতা বদলায়। কোনো অনুপস্থিত আয়াতের বিধান বহাল বলা হলে অক্ষর নেই, বাধ্যবাধকতা থাকে। কোনো হাদিস দিয়ে সাধারণ নির্দেশের নতুন শ্রেণি নির্ধারিত হলে আয়াতের ভাষা থাকে, প্রয়োগের সীমা বদলায়। গ্রন্থের সংরক্ষণকে কেবল দৃশ্যমান অক্ষরে সীমিত করলে এই আইনগত পরিবর্তনগুলো আলোচনার বাইরে চলে যায়। অথচ অনুসারীর জীবনে কোন কাজ বাধ্যতামূলক, বৈধ বা মৃত্যুদণ্ডযোগ্য হবে, তা এই বাইরের নির্ধারণেই বদলেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃত্বগুলোকে একই ধারায় রাখলে গৃহীত কোরআনের সামাজিক নির্মাণপ্রক্রিয়া স্পষ্ট হয়। প্রচারকারী নতুন পাঠ জানাচ্ছেন; লেখক লিখছেন; মুখস্থকারী ধরে রাখছেন বা ভুলছেন; সংগ্রাহক উপকরণ নিচ্ছেন; খলিফা বিরোধ নিষ্পত্তি ও কপি বিতরণের আদেশ দিচ্ছেন; পরবর্তী ভাষ্যকার নির্ধারণ করছেন কোন পার্থক্য অনুমোদিত এবং কোন অনুপস্থিতি রহিত। প্রত্যেকের কাজ আলাদা এবং প্রত্যেক স্তরের সাক্ষ্যও আলাদা। “আল্লাহ সংরক্ষণ করেছেন” একটি ধর্মীয় রায় হিসেবে এই পুরো প্রক্রিয়াকে একসঙ্গে অনুমোদন করতে পারে। কিন্তু ঐ রায় মানুষের কাজগুলোকে ঘটনাহীন করে না, তাদের প্রতিটি ফলকে অগ্রিম নিখুঁতও প্রমাণ করে না।

সবচেয়ে কঠিন সংঘাত তাই বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের সাধারণ বিরোধে নয়; একই ব্যবস্থার দুটি দাবির মধ্যে। সংকলনের বিবরণে নির্বাচন আছে, অথচ প্রচারে নির্বাচন-পূর্ব অভিন্নতার ছবি; রহিতকরণে অপসারণ আছে, অথচ প্রচারে কোনো পাঠ কখনো না-হারানোর নিশ্চয়তা; পাঠভেদে ভিন্ন শব্দ আছে, অথচ প্রচারে সর্বকালে একটিই শব্দরূপ। এসব ক্ষেত্রে অনুপস্থিত মধ্যবর্তী প্রমাণের জায়গায় অনুমোদনের রায় বসে। গৃহীত মুসহাফের ধর্মীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় সেই রায়ের মাধ্যমে; অবতরণ থেকে তার প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত কোনো পরিবর্তন ঘটেনি—এ দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর সাক্ষ্যের সঙ্গে অসংগত থাকে।


উপসংহার

কোরআনের সংকলন কোনো প্রস্তুত, সর্বজনস্বীকৃত ও অপরিবর্তিত বই এক হাত থেকে আরেক হাতে পৌঁছে দেওয়ার সরল ইতিহাস নয়। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে অবতরণের দাবি, বিচ্ছিন্ন উপকরণে লিখন, মানুষের মুখস্থ, নতুন শব্দের আগমন, পূর্বপাঠ প্রত্যাহার, মৃত্যুর পরে সংগ্রহ, আঞ্চলিক পাঠবিরোধ, রাষ্ট্রীয় নির্বাচন এবং বিকল্প নথি ধ্বংস। আজ যে মুসহাফ ধর্মীয় কর্তৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত, তার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে এই কাজগুলো অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। মানুষ এখানে কেবল একটি প্রস্তুত পাঠ বহন করেনি; কোন উপাদান গ্রহণ করা হবে, কোন রূপে লেখা হবে এবং কোন নথি আর ব্যবহার করা যাবে না, সেই সিদ্ধান্তও নিয়েছে।

অবতরণের বর্ণনাতেই পাঠের স্থিরতার প্রচারিত ছবি ভেঙে যায়। কুরাইশি ভাষায় অবতরণ ও সাত আহরুফের সম্পর্ক নিয়েও ব্যাখ্যার মতভেদ রয়েছে। কোনো নির্দেশ প্রথমে একটি রূপে এসেছে, পরে তার সঙ্গে নতুন শব্দ বা ব্যতিক্রম যুক্ত হয়েছে; কোনো বিধান চালু হয়েছে, পরে প্রত্যাহার বা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ইবনে উম্মে মাকতুমের অক্ষমতার বক্তব্যের পরে ব্যতিক্রম যোগ হওয়ার ঘটনায় মানুষের প্রশ্ন ও নতুন বাক্যাংশের স্পষ্ট ঘটনাক্রম রয়েছে। উমরের মতের সঙ্গে পরবর্তী ওহির মিলের বর্ণনাগুলোতেও মানুষের প্রস্তাব ও ধর্মীয় নির্দেশের সম্পর্ক পাওয়া যায়। এগুলোকে পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনার অংশ বললেও প্রথম প্রকাশ ও পরবর্তী প্রকাশের পার্থক্য বহাল থাকে। অদৃশ্য পরিকল্পনার দাবি দৃশ্যমান শব্দসংযোজনকে অঘটিত করে না।

ওহি লেখকের অভিজ্ঞতা এবং “শয়তানের আয়াত” সম্পর্কে সংরক্ষিত বর্ণনাগুলো বাণী শনাক্ত করার কর্তৃত্বের প্রশ্নটিকে আরও তীক্ষ্ণ করেছে। কার মুখে উচ্চারিত কোন কথা ওহি হিসেবে গৃহীত হলো, কোনটি পরে প্রত্যাখ্যাত হলো এবং লেখকের ভূমিকা কোথায় শেষ হলো—এসব প্রশ্ন ইসলামি সাহিত্যেই আলোচিত হয়েছে। প্রথম ও শেষ অবতীর্ণ অংশের পরিচয়েও একাধিক দাবি আছে। মুহাম্মদের মৃত্যুশয্যায় তিনি কী লিখে দিতে চেয়েছিলেন, তা নিয়ে বিরোধও রয়ে গেছে। কোনো ধর্মীয় ঘোষণা এই ভিন্ন ভিন্ন সাক্ষ্যের জায়গায় একটি সর্বসম্মত প্রত্যক্ষ দলিল বসিয়ে দেয় না। পরবর্তী গৃহীত সিদ্ধান্ত আর শুরু থেকেই বিরোধহীনভাবে জানা ইতিহাস এক বিষয় নয়।

স্মৃতির ওপর নির্ভরতাও এই সংবহনের একটি বাস্তব সীমা। মুহাম্মদের অন্যের পাঠ শুনে ভুলে যাওয়া আয়াত মনে পড়ার বিবরণে ব্যক্তিগত স্মৃতির বিচ্যুতি এবং অন্যের সহায়তা দুটিই রয়েছে। আবু মুসার দীর্ঘ সূরার অল্প অংশ স্মরণে থাকার সাক্ষ্যে বিস্মৃতির পরিসর আরও বড়। একই ঐতিহ্যে আবার কিতাব বুক থেকে বিলুপ্ত না হওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ফলে কোরআনের স্মৃতি সম্পর্কে কেবল অক্ষয়তার আশ্বাসটুকু রেখে বিস্মৃতির সাক্ষ্যগুলো বাদ দিলে উৎসের একাংশ চাপা পড়ে। মুখস্থের প্রচলন নিজে থেকে প্রত্যেক পূর্বপাঠের পূর্ণ উপস্থিতি প্রমাণ করে না।

প্রথম লিখনের নির্দিষ্ট সময় ও সাক্ষ্য থেকে মৃত্যুর পরে একত্রিত গ্রন্থ তৈরির সিদ্ধান্ত পর্যন্ত সংগ্রহের একাধিক স্তর রয়েছে। আবু বকরের সংগ্রহের মূল প্রেরণা হিসেবে পাঠকদের মৃত্যুর সঙ্গে অনেক কোরআন চলে যাওয়ার আশঙ্কা এসেছে। এই আশঙ্কা খোদ নেতৃত্বের; কোনো বাইরের সমালোচকের আরোপ নয়। যায়েদের বিচ্ছিন্ন লিখিত উপকরণ ও মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহের কাজও দেখায়, উপাদান একত্র করার একটি বাস্তব প্রয়োজন ছিল। মুহাম্মদ করেননি এমন কাজ শুরু করা নিয়ে আবু বকরের প্রাথমিক আপত্তি এবং পরে তা গ্রহণের ঘটনাও মানবীয় সিদ্ধান্তেরই ইতিহাস। পরবর্তী সময়ে সফল সংগ্রহের মর্যাদা দেওয়া হলেও সেই সংগ্রহের প্রয়োজন, শ্রম ও নির্বাচনের প্রশ্ন বিলুপ্ত হয় না।

আবু বকর, উমর ও আলীর সঙ্গে যুক্ত সংগ্রহের কর্তৃত্ব নিয়েও সুন্নি–শিয়া সাহিত্যে পৃথক দাবি রয়েছে। সাহাবিদের ব্যক্তিগত মুসহাফ, তাঁদের শেখানো পাঠ এবং পরবর্তী সরকারি মান সব ক্ষেত্রে একই পরিচয়ে উপস্থিত হয়নি। কার সংগ্রহ আগে, কার বিন্যাস ভিন্ন, কোন শিক্ষক নিজের পাঠে অনড় ছিলেন—এসব প্রশ্নের মধ্যে ধর্মীয় নেতৃত্ব ও পাঠের মালিকানার সম্পর্ক কাজ করেছে। সবাইকে সম্মানিত ঘোষণা করলেই তাঁদের নামে সংরক্ষিত ভিন্ন দাবিগুলো অভিন্ন হয়ে যায় না। একজনের গ্রহণযোগ্যতা আর তাঁর সঙ্গে বিরোধী অন্যজনের বক্তব্যের যথার্থতা আলাদাভাবে বিচার্য থাকে।

উসমানের উদ্যোগে এই সম্পর্ক রাষ্ট্রীয় রূপ পায়। হাফসার সহিফা ধার নেওয়া, নির্দিষ্ট কমিটি নিয়োগ, মতভেদ হলে কুরাইশি ভাষায় লেখার নির্দেশ এবং অঞ্চলগুলোতে অনুমোদিত কপি পাঠানো—প্রতিটি পদক্ষেপ একটি কেন্দ্রীয় মান প্রতিষ্ঠার কাজ। এমন নির্দেশের প্রয়োজনই হয়েছিল পাঠবিরোধের কারণে। ফলে উদ্যোগের পরে প্রতিষ্ঠিত মানকে উদ্যোগের আগেও সর্বত্র একইভাবে প্রতিষ্ঠিত ধরে নেওয়া ঘটনাক্রমের বিপরীত। উসমান বিরোধের মধ্যে একটি কর্তৃত্বপূর্ণ নিষ্পত্তি দিয়েছেন; বিরোধ কখনো ছিল না, এমন ইতিহাস তৈরি করেননি।

অন্য মুসহাফ ও সহিফা পোড়ানোর নির্দেশ এই নিষ্পত্তির শক্তি এবং মূল্য দুটিই প্রকাশ করে। যে নথিগুলো সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেগুলো পরবর্তী প্রজন্মের প্রত্যক্ষ তুলনার উপকরণ হিসেবেও হারিয়েছে। ইবনে মাসউদের আপত্তি ও মুসহাফ গোপন রাখার আহ্বান দেখায়, একীকরণ কেবল নির্বিরোধ প্রশাসনিক অনুলিপি ছিল না। হাফসার মৃত্যুর পরে মারওয়ানের হাতে তাঁর সহিফা ধ্বংসের বর্ণনায় সরকারি নকলের ভিত্তিনথিটিও অপসারিত হয়েছে। টিকে থাকা মানের কর্তৃত্বের সঙ্গে বিকল্প সাক্ষ্য হারানোর এই ইতিহাস জড়িত। ধ্বংসের পরে নথির অনুপস্থিতিকে ধ্বংসের আগে কোনো ভিন্নতা না থাকার প্রমাণ করা যুক্তিগতভাবে অসংগত।

মুসহাফনীতি রাজনৈতিক সংঘাতেরও অংশ হয়েছে। উসমানের বিরুদ্ধে কিতাব বদলানোর অভিযোগ হত্যাকাণ্ড-সংক্রান্ত বর্ণনায় সংরক্ষিত আছে; সেই অভিযোগ তাঁর সমর্থক ও বিরোধীদের অবস্থান বোঝার দলিল। ধর্মীয় গ্রন্থের কর্তৃত্ব, খলিফার সিদ্ধান্ত এবং বিরোধীদের প্রতিরোধ তখন একই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এসে পড়েছে। “সব সাহাবি গ্রহণ করেছিলেন” ধরনের সরলীকরণে এই প্রতিরোধের তথ্য হারিয়ে যায়। যে মান পরে ব্যাপক স্বীকৃতি পেয়েছে, তার প্রতিষ্ঠার সময়কার অসম্মতি ও সংঘাতও সেই মানের ইতিহাসের অংশ।

গৃহীত মুসহাফের গঠনেও একাধিক সিদ্ধান্তের স্তর রয়েছে। সূরার নাম ও পরিচয়, অবতরণক্রমের বদলে বর্তমান বিন্যাস, আনফাল–তাওবার সম্পর্ক এবং বিসমিল্লাহর অবস্থান নিয়ে পৃথক আলোচনা আছে। আয়াত গণনার মতভেদে বাক্যকে কোথায় পৃথক আয়াত হিসেবে ভাগ করা হবে, সেই সীমার প্রশ্ন ওঠে; সূরার সংখ্যা ও নির্দিষ্ট অংশের অন্তর্ভুক্তির বর্ণনায় গ্রন্থের পরিসরের প্রশ্ন ওঠে। এসব আলাদা প্রশ্নের ওপর একটি অনির্দিষ্ট “এক অক্ষরও বদলায়নি” স্লোগান বসালে প্রয়োজনীয় তথ্য মুছে যায়। গঠন, গণনা ও পাঠের সীমানা প্রত্যেকটির নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে।

রজম ও দুধপানের বর্ণনাগুলোতে বর্তমান মুসহাফের বাইরে পূর্বপাঠের দাবি বিশেষভাবে স্পষ্ট। উমরের ভাষণে অবতরণ, পাঠ এবং রজমের প্রয়োগের সাক্ষ্য আছে; আয়েশার বিবরণে দশবার থেকে পাঁচবার দুধপানে পরিবর্তন এবং মুহাম্মদের মৃত্যুর সময়ও পাঠের কথা আছে। রজম ও দুধপানের লেখা সহিফা পোষা প্রাণীতে খেয়ে ফেলার বর্ণনাও রয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট পত্রের ধ্বংস, কোনো পাঠের রহিত ঘোষণা এবং বর্তমান মুসহাফে তার অনুপস্থিতি পৃথক তথ্য। একটিকে আরেকটির মধ্যে গুলিয়ে ফেললে ঘটনাগুলোর সম্পর্ক আড়াল হয়। যে প্রত্যক্ষ পার্থক্যটি থাকে তা হলো, পূর্বে কোরআন হিসেবে পঠিত বলে বর্ণিত সব অংশ বর্তমান মুসহাফে নেই।

লিখিত রূপ ও শব্দের পার্থক্যও কেবল বিমূর্ত বিতর্ক নয়। সাহাবিদের পাঠে অতিরিক্ত বাক্যাংশ, শব্দক্রমের ভিন্নতা এবং প্রচলিত অংশ পড়তে অস্বীকৃতির নির্দিষ্ট বিবরণ রয়েছে। আঞ্চলিক সরকারি কপিতেও কোথাও বর্ণ, কোথাও পূর্ণ শব্দের উপস্থিতি–অনুপস্থিতির সাক্ষ্য পাওয়া যায়। তার সঙ্গে নুকতা ও স্বরচিহ্ন যোগ হওয়ার ইতিহাস এবং হাজ্জাজের নামে সংরক্ষিত সংশোধনের বিবরণ যুক্ত হয়েছে। এখানে শব্দরূপ, লিখনরূপ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন পাশাপাশি উপস্থিত। প্রত্যেক পার্থক্যকে নিছক একই উচ্চারণের ভিন্ন চিহ্ন বলা সংশ্লিষ্ট শব্দগত সাক্ষ্যের সঙ্গে মেলে না।

বিধানের ইতিহাসে পরিবর্তনের আরেকটি বিস্তৃত ক্ষেত্র রয়েছে। কোনো আয়াতের পাঠ আছে, কিন্তু তার বিধান আর কার্যকর নয়; কোনো সাবেক আয়াত মুসহাফে নেই, কিন্তু তার নামে আইন বহাল; কোনো সাধারণ নির্দেশের প্রয়োগ হাদিস দিয়ে নতুন শর্তে বাঁধা। উমরের আমলে প্রথা ও প্রয়োগ পুনর্নির্ধারণের ঘটনাগুলোতেও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কার্যকর ক্ষমতা দেখা যায়। ফলে ধর্মীয় ব্যবস্থার অপরিবর্তনীয়তা প্রমাণ করতে শুধু মুদ্রিত বাক্যের উপস্থিতি দেখানো যথেষ্ট নয়। কোন পাঠ পড়া হবে, কোন বিধান মানা হবে এবং কোন ব্যাখ্যায় শাস্তি প্রয়োগ হবে—এই তিন ক্ষেত্রেই পরবর্তী কর্তৃত্ব কাজ করেছে।

কোরআন সৃষ্ট নাকি আল্লাহর অনাদি গুণ, লাওহে মাহফুজে তার অবস্থান কী এবং পূর্বলিখিত পরিকল্পনার সঙ্গে তার পার্থিব প্রকাশের সম্পর্ক কী—এসব মতভেদও অপরিবর্তনীয়তার ঘোষণাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রমাণে পরিণত করে না। অদৃশ্য ফলকের সঙ্গে বর্তমান মুসহাফের প্রত্যক্ষ তুলনা হাজির হয়নি; হাজির হয়েছে ফলক সম্পর্কে বিশ্বাস এবং মানুষের বহন করা পাঠ। একইভাবে কোরআনের সত্যতা দিয়ে বর্ণনাকারীদের নিশ্চয়তা এবং তাঁদের নিশ্চয়তা দিয়ে কোরআনের নির্ভুলতা প্রতিষ্ঠা করলে প্রমাণের নির্ভরতা ঘুরে একই জায়গায় ফিরে আসে। আত্মপ্রত্যয় যত জোরালোই হোক, তা স্বাধীন ঐতিহাসিক সাক্ষ্যের বিকল্প নয়।

পরিবর্তনকে আল্লাহর ইচ্ছা বলা হলে পরিবর্তনের অনুমোদন দাবি করা হয়। কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না এবং ঘটনাটি ধর্মীয়ভাবে বৈধ কি না—দুটি পৃথক প্রশ্ন। পাঠ রহিত, বিধান রহিত, একাধিক পাঠ অনুমোদিত কিংবা রাষ্ট্রীয় একীকরণ প্রয়োজনীয়—এসব ব্যাখ্যার প্রতিটিতে আগে ও পরের অবস্থার পার্থক্য স্বীকার করা হয়। সেই স্বীকৃত পার্থক্যগুলো রেখে আবার সব পর্যায়ে কিছুই বদলায়নি বলা পরস্পরবিরোধী। পরিবর্তনের নাম পাল্টে তাকে অপরিবর্তনীয়তার প্রমাণ বানানো যায় না। “অনুমোদিত” শব্দটি “অঘটিত” শব্দের সমার্থক নয়।

অপরিবর্তিত থাকার সর্বাত্মক দাবির বিরুদ্ধে একটি প্রতিষ্ঠিত বিরুদ্ধ উদাহরণও প্রাসঙ্গিক; পুরো গ্রন্থের পরিবর্তনের শতাংশ বের করা তার পূর্বশর্ত নয়। একইভাবে একটি গৃহীত পাঠের ব্যাপক প্রচলন তার আগের সব পাঠের অভিন্নতা প্রতিষ্ঠা করে না। বাইবেল বা অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থের মানবীয় সংকলনকে সমালোচনার বিষয় করলে কোরআনের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য। নিজের ধর্মের বাছাইকে ঐশী অনুমোদন এবং অন্যের ধর্মের বাছাইকে মানবীয় হস্তক্ষেপ বলা একটি দ্বৈত মানদণ্ড। একই ধরনের প্রমাণে একই ধরনের ঐতিহাসিক প্রশ্ন উঠে আসে।

অসংখ্য পাঠগত ও আইনগত পরিবর্তন, ভিন্ন সাক্ষ্য, সংগ্রহের প্রয়োজন, মুসহাফ ধ্বংস এবং কর্তৃত্বের সংঘাত স্বীকার করার পরে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন বা পরিমার্জন কখনো হয়নি বলে প্রচার করা ইতিহাসের সঙ্গে অসংগত। লাওহে মাহফুজ থেকে আজকের মুসহাফ পর্যন্ত একই অপরিবর্তিত পাঠ অক্ষুণ্ণভাবে নেমে এসেছে—এই নিশ্চয়তার বদলে ইসলামি সূত্রগুলো মানুষের স্মৃতি, অনুসন্ধান, মতভেদ, অনুমোদন ও দমনের মধ্য দিয়ে একটি মান্য গ্রন্থ প্রতিষ্ঠার বিবরণ সংরক্ষণ করেছে। ধর্মীয় প্রচারের নির্বিঘ্ন ছবির সঙ্গে সেই বিবরণের ব্যবধান সামান্য নয়; সংকলনের মূল প্রক্রিয়াটিই সেখানে অনুপস্থিত থাকে।

গৃহীত মুসহাফ একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফল: তার উপাদান বহন করেছেন মানুষ, সংগ্রহ করেছেন মানুষ, বিরোধের নিষ্পত্তি করেছেন শাসক এবং কার্যকর অর্থ নির্ধারণ করেছেন পরবর্তী ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ। এই দৃশ্যমান প্রক্রিয়ার ওপর আসমানি অনুমোদন আরোপ একটি বিশ্বাসের সিদ্ধান্ত। তা দিয়ে প্রক্রিয়ার বাছাই, বর্জন, পরিবর্তন ও সংঘাত মুছে ফেলা যায় না। কোরআনের প্রতি আনুগত্য সেই ইতিহাসকে পবিত্র মর্যাদা দিতে পারে; ইতিহাসকে পরিবর্তনহীন করে দিতে পারে না।



তথ্যসূত্রঃ
  1. কোরআন শব্দের অর্থ সম্পর্কে আলোচনা ↩︎
  2. মান্না আল-কাত্তান, মাবাহিস ফি উলূমিল কুরআন, পৃষ্ঠা ১৬ ↩︎
  3. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/১৭৮; জাহিযের বক্তব্য ↩︎
  4. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৩৮২৯০: কোরআনের ভাষাগত ও পারিভাষিক সংজ্ঞা ↩︎
  5. মান্না আল-কাত্তান, মাবাহিস ফি উলূমিল কুরআন, পৃষ্ঠা ২৮ ↩︎
  6. ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব, “সহফ” শব্দের আলোচনা; ইসলামওয়েব ↩︎
  7. লিসানুল আরব, “মুসহাফ” নামের ব্যাখ্যা; ইসলামওয়েবের ফতোয়া ৩৪২৫৪-তেও উদ্ধৃত ↩︎
  8. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১০০১২: কোরআন কে লিখেছেন এবং কীভাবে সংকলিত হয়েছে ↩︎
  9. ওসিয়ানা: সাফাইটিক শিলালিপি ও বর্ণমালা ↩︎
  10. ওসিয়ানা প্রকল্পের ইতিহাস ↩︎
  11. ওসিয়ানা: হিসমাইক শিলালিপি ও কালনির্ধারণ ↩︎
  12. সূরা ইউসুফ, আয়াত ২ ↩︎
  13. সূরা ইবরাহিম, আয়াত ৪ ↩︎
  14. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ২৪৭৩৬৪: আরবি ভাষা ও কোরআনের অক্ষর; ইবনে বাজের বক্তব্য ↩︎
  15. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৮৭ 1 2 3
  16. সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৯০২ ↩︎
  17. সূরা ইসরা, আয়াত ১০৬ ↩︎
  18. সূরা ইসরা, আয়াত ১০৬; মুহীউদ্দীন খানের অনুবাদ ↩︎
  19. সুয়ূতি, আল-ইতকান ফি উলূমিল কুরআন, ১/১৪৬ ↩︎
  20. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৬৭৯৩২: প্রথম আসমানে কোরআনের অবতরণ ↩︎
  21. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ৪৬৪৬২২: বাইতুল ইজ্জা ও জিবরাইলের শ্রবণের ব্যাখ্যা ↩︎
  22. সূরা ফুরকান, আয়াত ৩২ ↩︎
  23. সহিহ বুখারি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, হাদিস ৩ ↩︎
  24. সহিহ বুখারি, আন্তর্জাতিক নম্বর ৩ ↩︎
  25. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/৯১; প্রথম অবতরণের বিবরণ ↩︎
  26. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/৯২: আবু মুসার শিক্ষাদানের বিবরণ ↩︎
  27. সহিহ বুখারি, হাদিস ৩ ↩︎
  28. ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১/২৩৬–২৩৭; ইবনে ইসহাকের বর্ণনা; ইসলামওয়েব ↩︎
  29. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯২৪; ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৪৫৬৩ ↩︎
  30. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪ ↩︎
  31. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/৯৩ ↩︎
  32. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ৪০৮৪৩৫: মুদ্দাসসিরের প্রারম্ভিক আয়াতের অবতরণ ↩︎
  33. বায়হাকি, দালাইলুন নুবুওয়াহ, ২/১৫৮ ↩︎
  34. একই গ্রন্থ, ২/১৫৯ ↩︎
  35. ওয়াহিদি, আসবাবুন নুজুল, ফাতিহা, বর্ণনা ১৯ ↩︎
  36. নাজিলের সময়ানুক্রমে কুরআনের সূরাসমূহের সিরিয়াল ↩︎
  37. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/৯৪; কাশশাফের বক্তব্য ↩︎
  38. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/৯৪: ইবনে হাজারের আপত্তি ↩︎
  39. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ২১৬৬০: প্রথম সম্পূর্ণ সূরা ↩︎
  40. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ৩১৫৩৪৫: ফাতিহার অবতরণকাল ↩︎
  41. সূরা বুরুজ, আয়াত ২১-২২ ↩︎
  42. সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২১৫৮ ↩︎
  43. সুনান আত-তিরমিযী, হুসাইন আল-মাদানী প্রকাশনী, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫০-২৫১ ↩︎
  44. সুনান তিরমিজি, আন্তর্জাতিক নম্বর ২১৫৫ ↩︎
  45. বাংলা পাঠ: সুনান তিরমিজি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ২১৫৮ ↩︎
  46. ইবনে হাজার, ফাতহুল বারি, কোরআনের ফজিলত, নবীর লেখক অধ্যায় ↩︎
  47. সুনান তিরমিজি, হাদিস ৩৯৫৪ ↩︎
  48. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২০৩: বায়হাকির ব্যাখ্যা ↩︎
  49. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৬৭৯ ↩︎
  50. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৮৬ 1 2
  51. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১০০১২: লিখিত উপকরণের পরিচয় ↩︎
  52. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১৩৪৭৮: রিকাআ ও আকতাফের অর্থ ↩︎
  53. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২০২ ↩︎
  54. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২০২: খাত্তাবির ব্যাখ্যা ↩︎
  55. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১৫৩৯০৮: কোরআন সংগ্রহের পর্যায় ↩︎
  56. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/১৬০; যুহরির বক্তব্য ↩︎
  57. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২ ↩︎
  58. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, হাদিসঃ ২ ↩︎
  59. সহিহ বুখারি, হাদিস ২ ↩︎
  60. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৩৬৪, ৫৩৬৫, ৫৩৬৬ ↩︎
  61. সহিহ মুসলিম, আন্তর্জাতিক নম্বর ২১১৪ ↩︎
  62. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১১৩ক ↩︎
  63. ইসলামকিউএ ১৫০৯৩৬; বাগাভি, শারহুস সুন্নাহ, ১৩/৩২২-এ খাত্তাবির ব্যাখ্যা ↩︎
  64. ইসলামকিউএ ১৫০৯৩৬-এ উদ্ধৃত কুরতুবি, আল-মুফহিম, ৬/১৭২ ↩︎
  65. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/১৬১: মানুষের রূপে ফেরেশতা ↩︎
  66. আইনি, উমদাতুল কারি, ১/৪০, ওহির সূচনা ↩︎
  67. সহিহ বুখারী, হাদিস ৩৬৩৪ ↩︎
  68. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮ক: উমরের প্রশ্নোত্তরের বিবরণ ↩︎
  69. ইসলামকিউএ ১৫০৯৩৬; মুনাবি, ফায়যুল কাদীর, ২/৫৭১ ↩︎
  70. ইসলামকিউএ ১৫০৯৩৬; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ২/৪; আবু উমামার বর্ণনা ↩︎
  71. সুয়ূতি, আল-ইতকান ফি উলুমিল কোরআন, ১/১৬১; শামেলা ↩︎
  72. সূরা আন-নিসা, ৪:১৬৪ ↩︎
  73. সূরা আশ-শুরা, ৪২:৫১ ↩︎
  74. সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৯; নামাজ নির্ধারণের বর্ণনার অংশ ↩︎
  75. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৭৭ক ↩︎
  76. সহিহ বুখারি, হাদিস ৩২৩২ ↩︎
  77. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, হাদিসঃ ৩ ↩︎
  78. সহিহ বুখারী, হাদিস ৩ ↩︎
  79. ইসলামকিউএ ১৫০৯৩৬; বুখারী ১৩৮-এ উদ্ধৃত উবাইদ ইবনে উমাইরের মন্তব্য ↩︎
  80. সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩৮ ↩︎
  81. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১/৩৬৩; ইসমাইলের পরিচয় ↩︎
  82. সূরা আস-সাফফাত, ৩৭:১০২ ↩︎
  83. সূরা আল-ফাতহ, ৪৮:২৭ ↩︎
  84. সহিহ বুখারি, হাদিস ২৭৩১–২৭৩২; হুদাইবিয়ার বর্ণনা ↩︎
  85. একই বর্ণনার আরবি মূল; সৌদি ইফতা বিভাগের হাদিসভান্ডার ↩︎
  86. সালিহি, সুবুলুল হুদা ওয়াল রাশাদ, দ্বিতীয় খণ্ড; জিব্রাইলের আগে ইসরাফিলের সংযোগের অধ্যায় ↩︎
  87. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/১৬১; বর্ণনার সূচনা ↩︎
  88. ইসলামকিউএ ১৮৫৮৪৯-এ উদ্ধৃত ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৪ ↩︎
  89. ইসলামকিউএ ১৮৫৮৪৯-এ উদ্ধৃত ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি, ৯/৪ ↩︎
  90. সুবুলুল হুদা ওয়াল রাশাদ, দ্বিতীয় খণ্ড; আবু শামার ব্যাখ্যা ↩︎
  91. সুবুলুল হুদা ওয়াল রাশাদ; ওয়াকিদির অস্বীকার এবং তার পরবর্তী মন্তব্য ↩︎
  92. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮০৬; পূর্ণ বর্ণনা ↩︎
  93. কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কোরআন, ১/১১৬; ইবনে আতিয়্যার ব্যাখ্যা ↩︎
  94. তাফসির কুরতুবি; ফাতিহার অবতরণ ও বিধান অধ্যায় ↩︎
  95. তাফসির কুরতুবি, ১/১১৬; কুরতুবির নিজস্ব মন্তব্য ও সমন্বয় ↩︎
  96. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৫৭৯০০; পাঠ ও সওয়াবের পৃথক আগমনের ব্যাখ্যা ↩︎
  97. সুবুলুল হুদা ওয়াল রাশাদ, দ্বিতীয় খণ্ড; নামহীন ফেরেশতাকে ইসরাফিল হিসেবে শনাক্ত করার আলোচনা ↩︎
  98. ইসলামকিউএ ২০৯৬৮-এ উদ্ধৃত ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, ১/১১৭ ↩︎
  99. ইসলামকিউএ ২০৯৬৮-এ উদ্ধৃত ইবনে হাজর, আত-তালখিসুল হাবির, ৪/৩৪৬–৩৪৭ ↩︎
  100. সুবহি সালিহ, মাবাহিস ফি উলুমিল কোরআন; মুহাম্মদের আমলে লিখিত সংগ্রহ অধ্যায়ের টীকা ↩︎
  101. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৬৯৯০৪ ↩︎
  102. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৮৯ ↩︎
  103. তাবারানি, আল-মু’জামুল কাবির, হাদিস ৪৮৮৯; জায়েদের বর্ণনা ↩︎
  104. ইসলামকিউএ ৩৩৬৩৭৪; সনদ-পর্যালোচনা ↩︎
  105. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৯৯ 1 2
  106. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২৪৪; শামেলা ↩︎
  107. সহিহ বুখারি, হাদিস ৫০০০ ↩︎
  108. সুয়ূতি, আল-ইতকান, প্রথম খণ্ড, ১/২৪৯–২৫০; পাঠক ও সংগ্রাহকদের তালিকা ↩︎
  109. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২৫১; প্রসিদ্ধ কোরআন শিক্ষকদের পরিচয় ↩︎
  110. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৮৬; কোরআন সংগ্রহ অধ্যায় ↩︎
  111. ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি, কোরআন সংগ্রহ অধ্যায়; প্রদর্শিত সংস্করণ ৮/৬৩০–৬৩১ ↩︎
  112. ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি, কোরআন সংগ্রহ অধ্যায়; প্রদর্শিত সংস্করণ ৮/৬৩১ ↩︎
  113. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১০০১২: কোরআন কে লিখেছিলেন? ↩︎
  114. সহিহ বুখারি, হাদিস ৫০০৪ ↩︎
  115. সহিহ বুখারি, হাদিস ৫০০৩ ↩︎
  116. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২৪৯; ইবনে আবি দাউদের সূত্রে কুরাযির বর্ণনা ↩︎
  117. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২৪৯; বায়হাকি ও ইবনে আবি দাউদের সূত্রে শাবির বর্ণনা ↩︎
  118. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২৪৯–২৫০; আবু জায়েদের পরিচয়সংক্রান্ত আলোচনা ↩︎
  119. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২৪৬; বাকিল্লানির ষষ্ঠ ও সপ্তম ব্যাখ্যা ↩︎
  120. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৭৪১৪ 1 2
  121. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪৮৪, হাদিসঃ ৭২৪৩ 1 2
  122. সহিহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী ৭৪১৪; আন্তর্জাতিক নম্বর ৩০১৬ ↩︎
  123. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩০১৬; আনাসের বর্ণনা ↩︎
  124. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৮২ ↩︎
  125. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ২০১৬৬৮: আনাসের ওহি-সংক্রান্ত বর্ণনার অর্থ ↩︎
  126. ইবনে হাজর আহ্‌মদ বিন আলী বিন মুহাম্মদ ‘আস্কালানী, ফাত-আল-বারি (কাইরো (১৯৩৯), ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯ ↩︎
  127. ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি; কোরআন সংগ্রহ অধ্যায়, জায়েদের বক্তব্য ↩︎
  128. সুয়ূতি, আল-ইতকান ফি উলুমিল কোরআন, ১/২০২ ↩︎
  129. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২০২; খাত্তাবির ব্যাখ্যা ↩︎
  130. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ২২২০ 1 2
  131. তাহক্বীক মিশকা-তুল মাসা-বীহ (মিশকাত), ৩য় খণ্ড, হাদীস একাডেমী, তাহক্বীকঃ আল্লামা নাসিরুদ্দিন আলবানী, পৃষ্ঠা ১৮৯-১৯০ ↩︎
  132. মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস ২২২০; পূর্ণ বাংলা বর্ণনা ↩︎
  133. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৮৬; দায়িত্বের ভার সম্পর্কে জায়েদের বক্তব্য ↩︎
  134. ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি; আবু বকরের সংকলন-উদ্যোগের ব্যাখ্যা ↩︎
  135. ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি; আবদে খাইরের সূত্রে আলীর বক্তব্য ↩︎
  136. ফাতিমার ঘরে উমর – এক অনন্ত যুদ্ধের সূচনা ↩︎
  137. সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৮৩০; সাকিফার ঘটনা সম্পর্কে উমরের বক্তব্য ↩︎
  138. সূরা আল-আলা, আয়াত ৬ ↩︎
  139. সূরা আলা, ৮৭:৬–৭ ↩︎
  140. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬৬, হাদিসঃ ৪৬৬৭, ৪৬৬৮, ৪৬৬৯ ↩︎
  141. সহিহ বুখারি, আন্তর্জাতিক নম্বর ৫০৩৭; স্মরণ ফিরে পাওয়ার বর্ণনা ↩︎
  142. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৮৯৬ ↩︎
  143. সহিহ বুখারি, আন্তর্জাতিক নম্বর ৬৩৩৫ ↩︎
  144. সহিহ বুখারী, হাদিস ৬৩৩৫; বাংলা অনুবাদের সঙ্গে মূলের তুলনা ↩︎
  145. সহিহ বুখারি, হাদিস ৫০৩৮ ↩︎
  146. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৮৮খ ↩︎
  147. নববি, আল-মিনহাজ শরহ সহিহ মুসলিম, ৬/৭৬ ↩︎
  148. তাফসীরে ইবনে কাসীর, আল্লামা ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬২৬ ↩︎
  149. ইবনে কাসির, তাফসিরুল কোরআনিল আজিম; বাকারা ২:১০৬-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  150. ইসলামকিউএ ১৮৪১৪৮-এ উদ্ধৃত ইবনে হাজর ও ইসমাইলির ব্যাখ্যা ↩︎
  151. ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি; কোরআন ভুলে যাওয়া অধ্যায় ↩︎
  152. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৯০৭ ↩︎
  153. সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী, হাদিসঃ ১৭২৭ ↩︎
  154. সহিহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী ১৭২৭; আন্তর্জাতিক নম্বর ৭৯০খ ↩︎
  155. সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী, হাদিসঃ ১৭২৮ ↩︎
  156. সহিহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী ১৭২৮; আন্তর্জাতিক নম্বর ৭৯০গ ↩︎
  157. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৯০গ ↩︎
  158. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৮৯খ ↩︎
  159. বুখারি শরিফ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৯ ↩︎
  160. সহিহ বুখারি, হাদিস ২৯৯০ ↩︎
  161. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮৬৯খ ↩︎
  162. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮৬৯গ ↩︎
  163. নববি, শরহ সহিহ মুসলিম, ১৩/১৪–১৫; হাদিস ১৮৬৯-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  164. ইসলামকিউএ, উত্তর ১৩৮০৩০; নববির উদ্ধৃতি ↩︎
  165. ইসলামকিউএ, উত্তর ৯৬৬৪৬; বাজি, আল-মুনতাকা, ৩/১৬৫-এর উদ্ধৃতি ↩︎
  166. কোরআন হিজরঃ৯ 1 2
  167. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৬ ↩︎
  168. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৮৬; ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নম্বর ৪৬২১ ↩︎
  169. সহিহ বুখারী, হাদিস ৪৯৮৬ ↩︎
  170. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২০৪; ইবনে আবি দাউদের উদ্ধৃত খবর ↩︎
  171. ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি; কোরআন সংগ্রহ অধ্যায় ↩︎
  172. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২১০; ইবনুত তীনের ব্যাখ্যা 1 2
  173. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৬৩০ 1 2
  174. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪১, হাদিসঃ ৪৬২৬ ↩︎
  175. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৯২ 1 2
  176. বিস্তারিতঃ কোরআন বিকৃতি ও সাত আহরুফের সাতকাহন ↩︎
  177. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৬২৯ ↩︎
  178. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৯১ ↩︎
  179. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৯১; মূল আরবি ↩︎
  180. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮২১ক 1 2
  181. জামে তিরমিযি, হাদিস ২৯৪৪ ↩︎
  182. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮১৯ক; ইবনে শিহাবের মন্তব্য ↩︎
  183. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/১৭৩ ↩︎
  184. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/১৬৯; আবু উবাইদের ব্যাখ্যা ↩︎
  185. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/১৬৭ ↩︎
  186. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১৪৭৭ ↩︎
  187. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/১৬৬; আবুল ফজল রাজির আল-লাওয়ামিহ থেকে উদ্ধৃতি ↩︎
  188. ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি; সাত আহরুফ অধ্যায় ↩︎
  189. ইবনে তাইমিয়্যা, মাজমুউল ফাতাওয়া, ১৩/৩৯০ ↩︎
  190. ইসলামকিউএ, উত্তর ৫১৪২ 1 2
  191. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪১ ↩︎
  192. সহিহ বুখারি, হাদিস ২৪১৯; বিবদমান ব্যক্তিদের কথাবার্তা অধ্যায় ↩︎
  193. নববি, শরহ সহিহ মুসলিম, ৬/৯৮; হাদিস ৮১৮-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  194. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮১৮খ ↩︎
  195. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮১৮ক ↩︎
  196. নববি, শরহ সহিহ মুসলিম, ৬/৯৯ ↩︎
  197. মিজ্জি, তাহযিবুল কামাল, ৭/১৭৩; হাকিম ইবনে হিযামের জীবনী ↩︎
  198. ইবনে জাজারি, আন-নাশর ফিল কিরাআতিল আশর, ১/২৪ ↩︎
  199. ইবনে জাজারি, আন-নাশর ফিল কিরাআতিল আশর, ১/২৫ ↩︎
  200. তাহক্বীক মিশকা-তুল মাসা-বীহ (মিশকাত), ৩য় খণ্ড, হাদীস একাডেমী, তাহক্বীকঃ আল্লামা নাসিরুদ্দিন আলবানী, পৃষ্ঠা ১৮০ ↩︎
  201. সহিহ বুখারী, হাদিস ৪৯৯২ ↩︎
  202. সহিহ বুখারী ৪৯৯২ ↩︎
  203. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৭। হাদিসঃ ৩৫৩৬, ৩৫৩৭ ↩︎
  204. সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৮০৯; উবাই ইবনে কাবের মর্যাদা ↩︎
  205. সুনান নাসাঈ, হাদিস ৯৪১ ↩︎
  206. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮২০ক ↩︎
  207. নববি, শরহ সহিহ মুসলিম, ৬/১০২; হাদিস ৮২০-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  208. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮২০ক; উবাইয়ের প্রতিক্রিয়া ↩︎
  209. ইসলামওয়েব: সহিহ মুসলিম ৮২০ ও নববির ব্যাখ্যা ↩︎
  210. সুনান নাসাঈ, হাদিস ৯৪১; সাত আহরুফের ব্যাখ্যা ↩︎
  211. নববি, শরহ সহিহ মুসলিম, ৬/১০২; অনুমতির ধাপসংখ্যা ↩︎
  212. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮২০খ; বর্ণনান্তরের নির্দেশ ↩︎
  213. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ৫১৪২; সাত আহরুফের অর্থ ↩︎
  214. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অষ্টম খণ্ড, হাদিসঃ ৪৬৩৯ ↩︎
  215. সহিহ বুখারি, তাওহীদ প্রকাশনী, হাদিস ৫০০৫ ↩︎
  216. সহিহ বুখারী ৫০০৫ ↩︎
  217. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৪৮১; সূরা বাকারা ২:১০৬-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  218. ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি, ৮/১৬৭; বুখারি ৪৪৮১-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  219. ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি, ৮/১৬৭; প্রত্যক্ষ শ্রবণ ও নিশ্চিত জ্ঞান ↩︎
  220. ইসলামওয়েব: ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি; উবাইয়ের পাঠ ও নসখ ↩︎
  221. সহিহ বুখারি ৫০০৫; উমরের উদ্ধৃত বাকারা ২:১০৬ ↩︎
  222. হাদিসবিডি: বুখারি ৫০০৫-এর আরবি পাঠ; বাকারা ২:১০৬ ↩︎
  223. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১০৫৭৪৬; নসখের সংজ্ঞা ↩︎
  224. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১৭৬৯৭২; নসখের তিন শ্রেণি ↩︎
  225. আইনি, উমদাতুল কারি; বাকারা ২:১০৬-এর অধীনে বুখারির ব্যাখ্যা ↩︎
  226. ইবনে আবদুল বার, আল-ইস্তিআব; উবাই ইবনে কাবের জীবনী ↩︎
  227. ইবনে আবদুল বার, আল-ইস্তিআব; উমরের বক্তব্যের পুনরুল্লেখ ↩︎
  228. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৯২; ভিন্ন পাঠের অনুমোদন ↩︎
  229. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৮৭; হুযাইফার উদ্বেগ ↩︎
  230. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৮৭; মতভেদে কুরাইশি ভাষার নির্দেশ ↩︎
  231. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৮৮; মুসহাফ নকলের সময় আহযাবের আয়াত অনুসন্ধান ↩︎
  232. সহিহ বুখারী, হাদিস ৪৯৮৭ 1 2
  233. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২১০; ইবনুত তীনের দুই সংগ্রহের তুলনা ↩︎
  234. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২১০; উসমানের উদ্যোগের ব্যাখ্যা ↩︎
  235. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৪৩৫৮৫৯; উদ্ধৃত ইবনে কাইয়িমের ব্যাখ্যা ↩︎
  236. ইসলামওয়েব ৪৩৫৮৫৯; ইবনে কাইয়িমের রাস্তার উপমা ↩︎
  237. তাবারি, জামিউল বায়ান, ১/৬৪; সাত আহরুফের আলোচনা ↩︎
  238. তাবারি; ইসলামওয়েবে উদ্ধৃত জামিউল বায়ানের ভূমিকা; অনুমতি ও বাধ্যবাধকতার পার্থক্য ↩︎
  239. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ৫১৪২; উসমানি লিখনরূপ ও পাঠের সীমা ↩︎
  240. সহিহ বুখারী ৪৫১১; সাহল ইবনে সাদের বর্ণনা ↩︎
  241. সহিহ বুখারি, হাদিস ১৯১৭; সুতো বাঁধা ও পরবর্তী সংযোজন ↩︎
  242. সহিহ বুখারি, হাদিস ১৯১৬; আদীর বালিশের নিচে দড়ি রাখা ↩︎
  243. ইবনে হাজার, ফাতহুল বারি, ৪/১৩২; আদীর ঘটনার সময় ↩︎
  244. তাফসীরে মাযহারী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৮৪, ৩৮৫ ↩︎
  245. ইসলামকিউএ ৩২০৬৭৯; উদ্ধৃত ইবন আতিয়্যা, আল-মুহাররারুল ওয়াজিয, ১/২৫৮ ↩︎
  246. ইসলামকিউএ ৫০১২০; প্রথম পাঠে বাক্যাংশটির অনুপস্থিতি ↩︎
  247. কোরআন ২:১৮৭; কুরতুবির তাফসিরসহ প্রচলিত পাঠ ↩︎
  248. ইসলামওয়েব; ফাতহুল বারি, সাহলের হাদিসের ভাষ্য, তাহাবী ও দাউদীর মত ↩︎
  249. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৯-৩৪০, হাদিসঃ ৪৬২৪ ↩︎
  250. সহিহ বুখারী ৪৯৯০; নিসা ৪:৯৫-এর সংশোধিত রূপ ↩︎
  251. সহিহ বুখারি, হাদিস ২৮৩১; প্রথম পাঠ লেখা ও পরবর্তী সংযোজন ↩︎
  252. ইসলামওয়েব; ইবনে হাজার, ফাতহুল বারি, নিসা ৪:৯৫-এর ভাষ্য ↩︎
  253. সুনান নাসাঈ, হাদিস ৩১০০; লেখানোর সময় অক্ষমতার কথা জানানো ↩︎
  254. সুনান নাসাঈ, হাদিস ৩১০১; অব্যাহতির প্রশ্ন ↩︎
  255. সুনান নাসাঈ, হাদিস ৩১০২; অন্ধ ব্যক্তির প্রশ্ন ও তাৎক্ষণিক সংযোজন ↩︎
  256. ইসলামকিউএ ২৫৮৯৬৭; প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে অবতরণের বিবরণ ↩︎
  257. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৫০৭; লিখিত বাক্যে সংযোজনের স্থান ↩︎
  258. ইবনে কাসির, নিসা ৪:৯৫-এর তাফসির; প্রথম বক্তব্যে শর্তসংযোজন ↩︎
  259. কোরআন ৪:৯৫; ব্যতিক্রম, মর্যাদা ও পুরস্কারের বর্তমান ভাষ্য ↩︎
  260. ইসলামওয়েব; সহিহ ইবনে হিব্বান, ১১/১১, হাদিস ৪৭১২ ↩︎
  261. ইবনে হিব্বান; হাদিস ৪৭১২-এর পরিচ্ছেদ-শিরোনাম ↩︎
  262. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৫৯২; যায়েদের অনুভূত শারীরিক ভার ↩︎
  263. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৫০৭; প্রথমবার ভার অনুভব ও লিখননির্দেশ ↩︎
  264. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৫০৭; প্রশ্নের পরে দ্বিতীয়বার ভার অনুভব ↩︎
  265. কোরআন ৬৭:১৪; তাবারির তাফসিরসহ স্রষ্টার জ্ঞানের দাবি ↩︎
  266. ইসলামকিউএ ২৫৮৯৬৭; ঘটনাকে কেন্দ্র করে অবতরণের সংজ্ঞা ↩︎
  267. জামি তিরমিজি, হাদিস ৩৬৮২; জিহ্বা-হৃদয়ে সত্য ও মতের অনুরূপ কোরআন ↩︎
  268. সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৬৮৯; উমরের মুহাদ্দাস পরিচয় ↩︎
  269. সহিহ বুখারি ৩৬৮৯; একই বর্ণনার সম্প্রসারিত রূপ ↩︎
  270. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩৯৮ক; ইবনে ওয়াহবের শব্দার্থ ↩︎
  271. নসরুল বারী, শরহে সহিহ বুখারী, নবম খণ্ড, শিবলী প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৯৩, ৯৪ 1 2
  272. সহিহ মুসলিম ২৩৯৯ ↩︎
  273. Asbāb al-Nuzūl, Alī ibn Ahmad al-Wāhidī , পৃষ্ঠা ১১৪ ↩︎
  274. ইসলামওয়েব; সুয়ূতি, তারিখুল খুলাফা, মুওয়াফাকাতের আলোচনা ↩︎
  275. ইসলামকিউএ ৩৪১৭৭১; প্রস্তাবের অনুরূপ ওহির ব্যাখ্যা ↩︎
  276. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৯৩ ↩︎
  277. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৬ ↩︎
  278. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪০২; উমরের তিনটি মতের সঙ্গে ওহির মিল ↩︎
  279. সহিহ বুখারি ৪০২; প্রস্তাব ও পরবর্তী আয়াতের আরবি ভাষা ↩︎
  280. ইসলামওয়েব; ইবনে আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০৪ ↩︎
  281. কোরআন, সূরা বাকারা ২:১২৫ ↩︎
  282. ইসলামওয়েব; ইবনে আরাবি, আহকামুল কোরআন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬০ ↩︎
  283. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১২১৮ক; জাবিরের হজবিবরণে মাকামের সামনে নামাজ ↩︎
  284. তাফসিরে কুরতুবি, সূরা বাকারা ২:১২৫; যবরের পাঠে পূর্ববর্তী কাজের বিবরণ ↩︎
  285. তাফসিরে তাবারি, সূরা বাকারা ২:১২৫; আদেশের পাঠকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণ ↩︎
  286. তাফসিরে ইবনে কাসির, সূরা বাকারা ২:১২৫; বায়হাকির সূত্রে মাকাম সরানোর বিবরণ ↩︎
  287. ইসলামওয়েব; ফাতহুল বারী ৮/১৯; তাওয়াফকারী ও নামাজিদের অসুবিধা দূর করার ব্যাখ্যা ↩︎
  288. ইসলামকিউএ ৩৪৫৮৮৫-এ উদ্ধৃত ইবনে হুবাইরা, আল-ইফসাহ ১/১৩৪; মিলের বিবরণ ও ব্যক্তির কর্তৃত্ব ↩︎
  289. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৪৩১ 1 2
  290. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৭৯০; নবীপত্নীদের পর্দার দাবি ↩︎
  291. সহিহ বুখারি ৪৭৯০; সূরা আহযাব ৩৩:৫৩-এর পরিচ্ছেদ ↩︎
  292. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৪৮৪ ↩︎
  293. সহিহ মুসলিম ২১৭০ঘ; পর্দার আগের দাবি ও সাওদাকে চিহ্নিত করা ↩︎
  294. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৮০৬ ↩︎
  295. সহিহ বুখারী ৬২৪০; পর্দার আয়াতের পরিচ্ছেদ ↩︎
  296. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৭৯১; জয়নবের বিয়ের ভোজ ও পর্দার আয়াত ↩︎
  297. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৪৩২ ↩︎
  298. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৪৮২ ↩︎
  299. সহিহ বুখারি ৪৭৯৫; পর্দার পরের ঘটনা ↩︎
  300. সহিহ মুসলিম ২১৭০ক; একই ঘটনার বর্ণনা ↩︎
  301. সহিহ বুখারী ৪৭৯৫ ↩︎
  302. ইসলামওয়েব; ইবনে হাজর, ফাতহুল বারী; সাওদার হাদিসে আল-কিরমানির ব্যাখ্যা ↩︎
  303. ইসলামওয়েব; ফাতহুল বারী; পর্দার পরেও অবয়ব না দেখানোর দাবি ↩︎
  304. ইসলামকিউএ ৩০৪৭৪১-এ উদ্ধৃত একই ব্যাখ্যা ↩︎
  305. ইসলামওয়েব; আবুল আব্বাস কুরতুবি, আল-মুফহিম, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৯৬ ↩︎
  306. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯১৬; হুঁশিয়ারির পরে তাহরিমের আয়াত ↩︎
  307. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৪৮৩; স্ত্রীদের প্রতি হুমকি ও এক স্ত্রীর আপত্তি ↩︎
  308. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯১৪; আয়েশা ও হাফসার পরিচয় ↩︎
  309. কোরআন, সূরা তাহরিম ৬৬:৫ ↩︎
  310. তাফসিরে কুরতুবি, তাহরিম ৬৬:৫; স্ত্রীদের ভয় দেখানোর ব্যাখ্যা ↩︎
  311. তাফসিরে কুরতুবি, তাহরিম ৬৬:৫; তওবা ও নিজের পছন্দ ত্যাগের ব্যাখ্যা ↩︎
  312. সহিহ বুখারি, হাদিস ২৪৬৮; নারীদের প্রাধান্য ও উমরের স্ত্রীর প্রত্যুত্তর ↩︎
  313. সহিহ বুখারি, হাদিস ৫২১৮; হাফসাকে আয়েশার সঙ্গে তুলনা ↩︎
  314. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯১৩; উম্মে সালামার প্রতিবাদ ↩︎
  315. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৭৯ক; হাফসার গলা কাটার শর্তযুক্ত অঙ্গীকার ↩︎
  316. সহিহ মুসলিম ১৪৭৯ক; নিজের কথা সমর্থিত হওয়ার প্রত্যাশা ↩︎
  317. কোরআন, সূরা তাহরিম ৬৬:৪ ↩︎
  318. ইসলামওয়েব; ইবনে আতিয়া, আল-মুহাররারুল ওয়াজিজ; তাহরিম ৬৬:৪–৫-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  319. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৭৬৩; বন্দিদের বিষয়ে আবু বকরের প্রস্তাব ↩︎
  320. সহিহ মুসলিম ১৭৬৩; উমরের শিরশ্ছেদের প্রস্তাব ↩︎
  321. সহিহ মুসলিম ১৭৬৩; আবু বকরের মতের প্রতি মুহাম্মদের পছন্দ ↩︎
  322. ইবনে কাসিরের তাফসির; আনফাল ৮:৬৭-এ আহমাদের সূত্রে আনাসের বর্ণনা ↩︎
  323. সহিহ মুসলিম ১৭৬৩; পরদিনের কান্না ও শাস্তির আশঙ্কা ↩︎
  324. কোরআন, সূরা আনফাল ৮:৬৭ ↩︎
  325. ইসলামওয়েব; জামাখশারি, আল-কাশশাফ; আনফাল ৮:৬৭-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  326. কোরআন, সূরা আনফাল ৮:৬৮ ↩︎
  327. তাফসিরে তাবারি; আনফাল ৮:৬৮, হাসান বসরির বক্তব্য, বর্ণনা ১৬২৯৫ ↩︎
  328. তাফসিরে তাবারি, আনফাল ৮:৬৮; পূর্ববর্তী বিধানের অর্থ নিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত ↩︎
  329. কোরআন, সূরা আনফাল ৮:৬৯ ↩︎
  330. তাফসিরে কুরতুবি, আনফাল ৮:৬৭; ইবনে আব্বাসের নামে নীতির পরিবর্তনের বিবরণ ↩︎
  331. সহিহ বুখারি, হাদিস ৩১৩৯; মুতইমের সম্ভাব্য অনুরোধে বন্দিদের ছেড়ে দেওয়ার কথা ↩︎
  332. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩৯৯; বদরের বন্দিদের বিষয়কে মতের মিল হিসেবে উল্লেখ ↩︎
  333. সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৭ ↩︎
  334. তাফসীরে জালালাইন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৪ ↩︎
  335. তাফসীরে মাযহারী, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮২ 1 2
  336. তাফসীরে ইবনে কাসীর, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১১১ 1 2
  337. তাফসীরে ইবনে কাসীর; বাকারা ২:১৮৭; ইবনে আব্বাসের নামে বর্ণিত খবর ↩︎
  338. সহিহ বুখারী ৪৫০৮ ↩︎
  339. সহিহ বুখারি ১৯১৫; কায়েস ইবনে সিরমার অনাহার ও অচেতন হওয়ার বিবরণ ↩︎
  340. সহিহ বুখারি ৪৬৭০; ইবনে উমরের বর্ণনায় জানাজা, বাধা ও পরবর্তী আয়াত ↩︎
  341. কোরআন, সূরা তাওবা ৯:৮০ ↩︎
  342. তাফসিরে ইবনে কাসির; তাওবা ৯:৮০-এ সত্তর সংখ্যার একটি ব্যাখ্যা ↩︎
  343. সহিহ বুখারি ৪৬৭১; উমরের আপত্তি, মুহাম্মদের নির্বাচন ও পরবর্তী নিষেধ ↩︎
  344. কোরআন, সূরা তাওবা ৯:৮৪ ↩︎
  345. তাফসিরে ইবনে কাসির; তাওবা ৯:৮৪-এর সাধারণ প্রয়োগ ↩︎
  346. সুনান আবু দাউদ ২১৪৬; নিষেধ, উমরের অভিযোগ, অনুমতি ও নারীদের অভিযোগ ↩︎
  347. সুনান ইবনে মাজা ১৯৮৫; প্রহারের দাবি ও সত্তর নারীর অভিযোগের বিবরণ ↩︎
  348. ইসলামওয়েব; আওনুল মাবুদ, আবু দাউদ ২১৪৬-এর ব্যাখ্যায় শরহুস সুন্নাহ থেকে উদ্ধৃতি ↩︎
  349. কোরআন, সূরা নিসা ৪:৩৪ ↩︎
  350. তাফসিরে ইবনে কাসির; “ওয়াদরিবুহুন্না”-র ব্যাখ্যা ↩︎
  351. ইসলামকিউএ, উত্তর ১৪৬৬০০; নিষেধ ও অনুমতির সামাজিক ব্যাখ্যা ↩︎
  352. সহিহ বুখারি ৫২০৪; প্রহার ও পরে সহবাসের বক্তব্য ↩︎
  353. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৪, হাদিসঃ ৪৭৪০ ↩︎
  354. সহিহ বুখারি ৫১১৩; খাওলা বিনতে হাকিমের প্রসঙ্গ ↩︎
  355. সহিহ বুখারি ৪৭৮৮; আয়েশার মন্তব্যের সম্পূর্ণ মূল বক্তব্য ↩︎
  356. কোরআন, সূরা আহযাব ৩৩:৫০ ↩︎
  357. তাফসিরে ইবনে কাসির; কাতাদার নামে বিশেষ অনুমতির ব্যাখ্যা ↩︎
  358. কোরআন, সূরা আহযাব ৩৩:৫১ ↩︎
  359. তাফসীরে ইবনে কাসীর; আহযাব ৩৩:৫১ ↩︎
  360. তাফসিরে ইবনে কাসির; বাধ্যতামূলক পালা থেকে ঐচ্ছিক অনুগ্রহের ব্যাখ্যা ↩︎
  361. সহিহ বুখারি ৪৭৮৯; আয়াতের পরে অনুমতি ও আয়েশার নিজের পছন্দ ↩︎
  362. ইসলামওয়েব; ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি; ওয়াহিদীর সূত্রে স্ত্রীর পালা সমর্পণের ব্যাখ্যা ↩︎
  363. সহিহ বুখারী ৪৭৮৮; আহযাব ৩৩:৫১-এর প্রেক্ষাপট ↩︎
  364. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৫৯, হাদিসঃ ৪৮০৮ ↩︎
  365. সহিহ বুখারী ৫১৮৭ ↩︎
  366. ইসলামওয়েব; ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি; বুখারি ৫১৮৭-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  367. সহিহ বুখারি ৭২৮৯; প্রশ্নের কারণে নতুন নিষেধ ও প্রশ্নকারীর দায় ↩︎
  368. কোরআন, সূরা মায়িদা ৫:১০১ ↩︎
  369. সহিহ বুখারি ৯২; প্রশ্ন, রাগ ও উমরের তওবার বক্তব্য ↩︎
  370. কোরআন, সূরা হুজুরাত ৪৯:২ ↩︎
  371. সহিহ বুখারি ৩৬১৩; সাবিত ইবনে কায়েসের ভয় ও পরবর্তী আশ্বাস ↩︎
  372. তাফসিরে ইবনে কাসির; নবীর রাগ, আল্লাহর রাগ ও কাজ নষ্ট হওয়ার ব্যাখ্যা ↩︎
  373. সহিহ মুসলিম ৩১; জুতা দিয়ে সুসংবাদ প্রচারের নির্দেশ ↩︎
  374. সহিহ মুসলিম ৩১; উমরের আঘাত ও আবু হুরায়রার ফিরে আসা ↩︎
  375. সহিহ মুসলিম ৩১; উমরের যুক্তি ও মুহাম্মদের পরবর্তী সম্মতি ↩︎
  376. ইসলামওয়েব; নওয়বীর শরহে সহিহ মুসলিম; জ্ঞান গোপন ও আগের নির্দেশ প্রত্যাহারের ব্যাখ্যা ↩︎
  377. সহিহ বুখারি ১২৮; মুআজের সুসংবাদ, প্রচারে বাধা ও মৃত্যুর আগে প্রকাশ ↩︎
  378. সহিহ বুখারি ১২৭; আলীর নামে শ্রোতা অনুযায়ী বক্তব্য নির্বাচনের নির্দেশ ↩︎
  379. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৩৬১৭ ↩︎
  380. সহিহ বুখারি ৩৬১৭ ↩︎
  381. সহিহ বুখারী ৩৬১৭ ↩︎
  382. সহিহ মুসলিম ২৭৮১ ↩︎
  383. আল-লুলু ওয়াল মারজান ১৭৭২; বুখারি ও মুসলিমের সমান্তরাল বর্ণনার নির্দেশ ↩︎
  384. সহিহ বুখারি ৩৬১৭: ধর্মত্যাগী লেখকের মৃতদেহ এবং খ্রিষ্টানদের অভিযোগ ↩︎
  385. সুনান নাসাঈ ৩৯৬৪: আয়েশার অনুসরণ ও রাতের কবরস্থান-গমন ↩︎
  386. সহিহ মুসলিম ৯৭৪খ: রাতের অনুসরণ, স্বীকারোক্তি ও বুকে আঘাত ↩︎
  387. সহিহ মুসলিম, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, তৃতীয় খণ্ড, হাদিসঃ ২১২৮ ↩︎
  388. সহিহ মুসলিম ৯৭৪খ ↩︎
  389. সহিহ মুসলিম ৯৭৪খ; অনুসরণের স্বীকারোক্তি ও আঘাতের কথোপকথন ↩︎
  390. সুনান আবু দাউদ ৪৩৫৮ ↩︎
  391. তাফসীরে মাযহারী, আল্লামা কাজী মুহাম্মদ ছানাউল্লাহ পানিপথী, হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া প্রকাশনী, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬০-২৬১ ↩︎
  392. তাফসীরে বাগবী; আনআম ৬:৯৩ ↩︎
  393. সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত ১৪ ↩︎
  394. ওয়াহিদী, আসবাবুন নুযুল; আনআম ৬:৯৩, বিবরণ ৪৪২ ↩︎
  395. তাফসিরে বাগবী; প্রশংসাবাক্য লিখে নেওয়ার নির্দেশ ↩︎
  396. তাবারি, আনআম ৬:৯৩; ইকরিমার নামে বিবরণ ১৩৫৫৫ ↩︎
  397. তাবারি, আনআম ৬:৯৩; সুদ্দীর নামে বিবরণ ১৩৫৫৬-এর লেখাসংক্রান্ত অংশ ↩︎
  398. কোরআন ৬:৯৩ ও তাবারির তাফসির ↩︎
  399. তাবারির নিজস্ব সিদ্ধান্ত; “ওয়া আওলাল আকওয়াল” দিয়ে শুরু হওয়া অনুচ্ছেদ ↩︎
  400. তাবারি; অবতরণের উপলক্ষ ও আয়াতের সাধারণ প্রয়োগ ↩︎
  401. ওয়াহিদী, আসবাবুন নুযুল; বিবরণ ৪৪২ ম ↩︎
  402. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, আল্লামা ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১১ ↩︎
  403. সুনান নাসাঈ ৪০৬৭; নিরাপত্তার ব্যতিক্রম ও হত্যার নির্দেশ ↩︎
  404. ইবনে তাইমিয়্যার উদ্ধৃতিতে ইবনে ইসহাক; ইবনে আবি সারহকে হত্যার নির্দেশের কারণ ↩︎
  405. সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), হাদিসঃ ২৬৭৪ ↩︎
  406. সুনান আবু দাউদ ২৬৮৩; সমান্তরাল অনলাইন পাঠ ↩︎
  407. সুনান আবু দাউদ ৪৩৫৯ ↩︎
  408. সুনান আবু দাউদ ৪৩৫৯; তিনবার প্রত্যাখ্যানের ধারাবাহিক পাঠ ↩︎
  409. সুনান আবু দাউদ ৪৩৫৯; “খাইনাতুল আঈন” সংলাপ ↩︎
  410. আস-সারিমুল মাসলুলে ইবনে সাদের তাবাকাত থেকে উদ্ধৃত মানতের বিবরণ ↩︎
  411. ইবনে তাইমিয়্যা, আস-সারিমুল মাসলুল; তওবা, পাপ মোচন ও প্রাণরক্ষার পার্থক্য ↩︎
  412. ইসলামকিউএ ২২৮৬৭৫; শব্দবদলের বর্ণনার সনদমূল্যায়ন ↩︎
  413. ইসলামকিউএ ২১৭১৫৩; ব্যক্তিগত অধিকারের যুক্তিতে হত্যার কারণের ব্যাখ্যা ↩︎
  414. যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা; আবদুল্লাহ ইবনে সাদ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩–৩৫ ↩︎
  415. সিয়ারু আলামিন নুবালা; লাইসের সূত্রে প্রশাসনিক দায়িত্ব ও অভিযান ↩︎
  416. সিয়ারু আলামিন নুবালা; ওয়াকিদীর সূত্রে মিসরের রাজস্ব ও শাসনক্ষমতা ↩︎
  417. সিয়ারু আলামিন নুবালা; মৃত্যুশয্যা, ফজরের নামাজ ও মৃত্যুকালের মতভেদ ↩︎
  418. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৪৮৬২ ↩︎
  419. সহিহ বুখারি ৪৮৬২; নাজমের সম্মিলিত সিজদা ↩︎
  420. জামি আত-তিরমিজি ৫৭৫ ↩︎
  421. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৪৯৮, ৪৪৯৯ ↩︎
  422. সহিহ বুখারি ৪৮৬৩; ইবনে মাসউদের বর্ণনা ↩︎
  423. কোরআন ৫৩:১৯–২০; দেবীদের নামের উল্লেখ ↩︎
  424. ইবনে আনবারীর ব্যাখ্যা; লিসানুল আরব ১০/২৮৬ থেকে উদ্ধৃত ↩︎
  425. তাফসীরে জালালাইন, জালালুদ্দিন মহল্লী এবং জালালুদ্দিন সুয়ুতী, ইসলামিয়া কুতুবখানা প্রকাশনী, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯২-৩৯৩ ↩︎
  426. তাফসিরে জালালাইন; হাজ্জ ২২:৫২-এর আরবি মূল ↩︎
  427. তাবারী, জামিউল বায়ান; হজ ২২:৫২; সাঈদ ইবনে যুবাইরের নামে খবর ↩︎
  428. তাফসীরে ইবনে কাসীর, আল্লামা ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮১-৪৮৩ ↩︎
  429. তাফসিরে ইবনে কাসির; হাজ্জ ২২:৫২-এর পূর্ণ আলোচনা ↩︎
  430. তাবারি; মুহাম্মদ ইবনে কাব ও মুহাম্মদ ইবনে কায়সের নামে বর্ণনা ↩︎
  431. তাবারি; আবুল আলিয়ার নামে কুরাইশের প্রস্তাব ↩︎
  432. কোরআন ৫৩:২৩; দেবীদের মর্যাদার অনুমোদন অস্বীকার ↩︎
  433. কোরআন ২২:৫২ ও তাবারির পাঠসংক্রান্ত ব্যাখ্যা ↩︎
  434. তাবারির নিজস্ব সিদ্ধান্ত; তামান্না, পাঠ এবং নবীর জিহ্বায় প্রক্ষেপণ ↩︎
  435. ইবনে কাসির; “ফায়ানসাখুল্লাহ”র ভাষাগত অর্থ ↩︎
  436. কোরআন ২২:৫৩ ↩︎
  437. তাবারি; গারানিকের বাক্যকে পরীক্ষা এবং সন্দেহকে অন্তরের রোগ হিসেবে ব্যাখ্যা ↩︎
  438. কোরআন ২২:৫৪ ↩︎
  439. জালালাইন; শয়তানকে ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে প্রজ্ঞার ব্যাখ্যা ↩︎
  440. সুয়ুতি, লুবাবুন নুকুল; হাজ্জ ২২:৫২, বিবরণ ৭১৮ ↩︎
  441. ইসলামকিউএ ১০৩৩০৪; ইবনে হাজর, ফাতহুল বারী ৮/৪৩৯-এর উদ্ধৃতি ↩︎
  442. শয়তানের আয়াত বা স্যাটানিক ভার্সেস ↩︎
  443. ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি; হাজ্জের আলোচনা, প্রচলিত ৮/৪৩৯, সংযুক্ত সংস্করণে পৃষ্ঠা ২৯৩–২৯৪ ↩︎
  444. ফাতহুল বারি; ভিত্তি স্বীকারের পর অভ্রান্ততার কারণে পুনর্ব্যাখ্যা ↩︎
  445. ফাতহুল বারি; বিরতির সময়ে কণ্ঠের অনুকরণের ব্যাখ্যা ↩︎
  446. ইসলামকিউএ ১০৩৩০৪; উত্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ↩︎
  447. তাবারি; সন্ধ্যার পরে জিবরাইলের আপত্তি ও মুহাম্মদের প্রতিক্রিয়া ↩︎
  448. কোরআন ৫৩:৩–৪ এবং তাবারির কোরআন-পাঠসংক্রান্ত ব্যাখ্যা ↩︎
  449. ইবনে তাইমিয়্যা, মাজমুউল ফাতাওয়া ১০/২৯০–২৯১; ভুল স্থায়ী না থাকা ও পরে সংশোধনের পার্থক্য ↩︎
  450. মাজমুউল ফাতাওয়া ১০/২৯২; প্রকাশ্যে শোনা কথা ও পরীক্ষার সম্পর্ক ↩︎
  451. ইবনে তাইমিয়্যা; প্রথম বাণীর উৎস প্রত্যাহারকে সত্যবাদিতার নিদর্শন করার যুক্তি ↩︎
  452. ইসলামওয়েব ফতোয়া ২৬৫৩৫; যুরকানি, মানাহিলুল ইরফান, ১/৭০ ↩︎
  453. সুয়ূতি, আল-ইতকান, শেষ অবতরণ সম্পর্কে বাকিল্লানির বক্তব্য ↩︎
  454. সহিহ বুখারী, হাদিস ৪৫৪৪ ↩︎
  455. সূরা আল বাকারা, আয়াত ২৭৮ ↩︎
  456. তাফসীরে তাবারী, খণ্ডঃ ৬, পৃঃ ৩৮ ↩︎
  457. সুদের ক্ষতি-অপকার-কুপ্রভাব, ড. সাঈদ ইব্‌ন আলী ইব্‌ন ওয়াহফ আল-ক্বাহত্বানী, ইসলামহাউজ প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৬ ↩︎
  458. সুয়ূতি, আল-ইতকান, শেষ অবতরণ; ইবনে মারদাওয়াইহের সূত্রে আবু সাঈদের বর্ণনা ↩︎
  459. আল-ইতকান, অষ্টম প্রকার; উমরের খুতবার আরবি পাঠ ↩︎
  460. সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ২২৭৬ ↩︎
  461. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/১০২; সুদ, প্রত্যাবর্তন ও ঋণের আয়াতের সমন্বয় ↩︎
  462. সূরা বাকারা, আয়াত ২৮১ ↩︎
  463. তাফসীরে যাকারিয়াঃ কুরআনুল করিম বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর, প্রথম খণ্ড, বাদশাহ ফাহদ কুরআন মুদ্রণ কমপ্লেক্স, পৃষ্ঠা ২৫৭ ↩︎
  464. আদ্দুররুল মানসুর, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭০ ↩︎
  465. তাবারী, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১ ↩︎
  466. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/১০২; ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত বর্ণনা ↩︎
  467. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/১০২; সাঈদ ইবনে জুবাইরের নামে বর্ণনা ↩︎
  468. ইবনে কাসির, মায়িদা ৫:৩; আরাফার দিন থেকে মৃত্যুর ব্যবধানের বর্ণনা ↩︎
  469. সূরা নিসা, আয়াত ১৭৬ ↩︎
  470. ইবনে কাসির, নিসা ৪:১৭৬; কালালার সংজ্ঞা ↩︎
  471. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৪০৪৪ ↩︎
  472. তাফসীরে যাকারিয়াঃ কুরআনুল করিম বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর, প্রথম খণ্ড, বাদশাহ ফাহদ কুরআন মুদ্রণ কমপ্লেক্স, পৃষ্ঠা ৫১৬ ↩︎
  473. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬১৮ক ↩︎
  474. সহিহ বুখারি ৪৩৬৪; বারাআত ও নিসার শেষাংশ ↩︎
  475. সহিহ মুসলিম ১৬১৭ক; কালালা সম্পর্কে উমরের বারবার প্রশ্ন ↩︎
  476. সূরা আত-তাওবা, আয়াত ১২৮ ↩︎
  477. ইসলামওয়েব ফতোয়া ২৬৫৩৫; যুরকানি, মানাহিলুল ইরফান, শেষ অবতরণের অষ্টম মত ↩︎
  478. আল-ইতকান; উবাই ইবনে কাবের নামে তাওবার শেষ দুই আয়াতের বর্ণনা ↩︎
  479. সহিহ বুখারি ৪৯৮৬; তাওবার শেষাংশ অনুসন্ধানে পাওয়ার বিবরণ ↩︎
  480. ইসলামকিউএ ২১৯১৬; শেষ সূরার ভিন্ন পরিচয় ও বায়হাকির বক্তব্য ↩︎
  481. মুসনাদ আহমদ ২৫৫৮৮; ইসলামকিউএ ২১৯১৬-এ উদ্ধৃত আয়েশার পূর্ণ বক্তব্য ↩︎
  482. ইসলামওয়েব ফতোয়া ২৬৫৩৫; যুরকানির উদ্ধৃত সপ্তম মত ↩︎
  483. সহিহ মুসলিম ৩০২৪ক; সমগ্রভাবে নাজিল হওয়া শেষ সূরা ↩︎
  484. সহিহ বুখারি ৪৯৭০; নাসরের অর্থ নিয়ে উমরের সভায় ইবনে আব্বাস ↩︎
  485. সূরা মায়িদা, আয়াত ৩ 1 2
  486. সহিহ বুখারি ৪৫; পূর্ণতার আয়াতের দিন ও স্থান সম্পর্কে উমর ↩︎
  487. আল-ইতকান; পূর্ণতার আয়াতের পরে সুদ, ঋণ ও কালালার অবতরণসংক্রান্ত সমস্যা ↩︎
  488. আল-ইতকান; পূর্ণতা সম্পর্কে তাবারির নির্বাচিত ব্যাখ্যা ↩︎
  489. তাফসীরে ইবনে কাসীর, খণ্ড ২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ৪২৪ ↩︎
  490. তাফসীরে ইবনে কাসীর; মায়িদা ৫:৩; ইবনে জারীরের সূত্রে উদ্ধৃত খবর ↩︎
  491. সহিহ মুসলিম ৩০১৬ ↩︎
  492. সহিহ বুখারি ৪৯৮২; শেষ সময়ে ওহির প্রাচুর্য ও পরবর্তী মৃত্যু ↩︎
  493. ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি; ইসলামকিউএ ২০১৬৬৮-এ উদ্ধৃত ব্যাখ্যা ↩︎
  494. ফাতহুল বারির ব্যাখ্যা; মৃত্যুর সময়কার পর্যায় ↩︎
  495. কোরআন ৭২ঃ২৩ ↩︎
  496. হাদীস সম্ভার, হাদিসঃ ১৪৯৯ ↩︎
  497. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৪৪৫৮ ↩︎
  498. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭০ ↩︎
  499. সহিহ বুখারি ৪৪৫৮; ওষুধ খাওয়ানোর ঘটনা ও বাংলা মুদ্রিত টীকা ↩︎
  500. সহজ দরসে ইবনে মাজাহ, আল কাউসার প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৬৮ ↩︎
  501. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১১৫ 1 2
  502. সহিহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭২ ↩︎
  503. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮০-৮১ ↩︎
  504. সহিহ বুখারী ১১৪; ইলম লিখে রাখার পরিচ্ছেদ ↩︎
  505. সহিহ বুখারী ১১৪; একই বর্ণনায় উমরের বক্তব্য ↩︎
  506. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৫৬৬৯ ↩︎
  507. সহিহ বুখারি ৫৬৬৯; ঘরের বিরোধ ও ইবনে আব্বাসের মন্তব্য ↩︎
  508. সহিহ মুসলিম ১৬৩৭ক; বৃহস্পতিবারের ঘটনা ↩︎
  509. ইবনে হাজার, ফাতহুল বারি; বৃহস্পতিবারের ঘটনার ব্যাখ্যা ↩︎
  510. ফাতহুল বারিতে উদ্ধৃত নববির ব্যাখ্যা; “হাসবুনা কিতাবুল্লাহ” ↩︎
  511. সহিহ বুখারি ৪৪৩১; শেষ তিন নির্দেশ ↩︎
  512. সহিহ মুসলিম ১৬৩৭ক ↩︎
  513. সহিহ বুখারী ৪৪৩১; বৃহস্পতিবারের ঘটনা ↩︎
  514. ইবনে হাজার, ফাতহুল বারি; তৃতীয় নির্দেশ সম্পর্কে বর্ণনাকারীর দ্বিধা ↩︎
  515. ফাতহুল বারি; অনির্দিষ্ট তৃতীয় নির্দেশ বিষয়ে ভাষ্যকারদের প্রস্তাব ↩︎
  516. ফাতহুল বারিতে ইয়াজের নামে উদ্ধৃত সম্ভাবনাগুলো ↩︎
  517. সূরা হাক্কাহ, আয়াত ৪৩-৪৭ ↩︎
  518. ইবনে কাসির, সূরা হাক্কাহ ৬৯:৪৬-এর তাফসির ↩︎
  519. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৫১৩ ↩︎
  520. সুনান আবু দাউদ ৪৫১৩ ↩︎
  521. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৫১২ ↩︎
  522. সুনান আবু দাউদ ৪৫১২; খায়বারের বিষপ্রয়োগ ও শেষ অসুস্থতা ↩︎
  523. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৩-৩৪। অনুচ্ছেদঃ ২২৪৭ ↩︎
  524. সহিহ বুখারি ৪৪২৮; খায়বারের খাদ্য ও শেষ রোগ ↩︎
  525. সহিহ বুখারী ৪৪২৮ ↩︎
  526. ইবনে হাজার, ফাতহুল বারি; “আবহার” শব্দের ব্যাখ্যা ↩︎
  527. সুনানু ইবনে মাজাহ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৪-৭৫, হাদিসঃ ১৬২৯ ↩︎
  528. সুনান ইবনে মাজাহ ১৬২৯; ফাতিমার আক্ষেপ ↩︎
  529. সহিহ আত-তিরমিযী, হুসাইন আল মাদানী প্রকাশনী, তাহক্বীক আল্লামা মোহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০৪, হাদিসঃ ৯৭৯ ↩︎
  530. জামি তিরমিজি ৯৭৯; ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংস্করণে ৯৮১ ↩︎
  531. সহিহ বুখারী ৪৪৪৯ ↩︎
  532. সহিহ বুখারি ২৭৪০; ওসিয়ত ও কিতাবুল্লাহ সম্পর্কে সংলাপ ↩︎
  533. সহিহ বুখারি ৪৯৮৬; যায়েদকে কোরআন অনুসন্ধান ও সংগ্রহের দায়িত্ব ↩︎
  534. সহিহ বুখারি ৪৯৮৬; ইয়ামামার পরে উমরের আশঙ্কা ↩︎
  535. ইবনে হাজার, ফাতহুল বারি; ইয়ামামার ঘটনার পরিচয় ↩︎
  536. ফাতহুল বারি; ইয়ামামার পাঠকদের সমষ্টিগত ও ব্যক্তিগত সংগ্রহ ↩︎
  537. সহিহ বুখারি ৪৯৮৬; আবু বকরের আপত্তি ও উমরের জবাব ↩︎
  538. সহিহ বুখারি ৪৯৮৬; যায়েদের আপত্তি ও পরে সম্মতি ↩︎
  539. ফাতহুল বারিতে ইবনে বাত্তালের ব্যাখ্যা; আবু বকর ও যায়েদের আপত্তির কারণ ↩︎
  540. ইসলামকিউএ ১৩৪৭৮; আবু বকরের সংগ্রহকে সুন্নাহ বলার ব্যাখ্যা ↩︎
  541. সহিহ বুখারি ৪৯৮৬; যায়েদের যোগ্যতা ও দায়িত্ব ↩︎
  542. ফাতহুল বারি; যায়েদের চার বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা ↩︎
  543. সহিহ বুখারি ৪৯৮৬; সংগ্রহের দায়িত্ব সম্পর্কে যায়েদের মূল্যায়ন ↩︎
  544. সহিহ বুখারি ৪৬৭৯; সংগ্রহের উপকরণ ↩︎
  545. সহিহ বুখারি ৪৯৮৬; উপকরণের সমান্তরাল বিবরণ ↩︎
  546. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২০৭; লেখার উপকরণের ব্যাখ্যা ↩︎
  547. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২০৫; সংগ্রহে সাক্ষ্যের শর্ত ↩︎
  548. আল-ইতকান, ১/২০৫; ইয়াহইয়া ইবনে আবদুর রহমানের বর্ণনা ও ব্যাখ্যা ↩︎
  549. আল-ইতকান; উরওয়ার নামে দুই সাক্ষীর সংবাদ ↩︎
  550. ফাতহুল বারি; “দুই সাক্ষী”র তিনটি ব্যাখ্যা ↩︎
  551. আল-ইতকান, ১/২০৬; সুয়ূতির প্রস্তাবিত অতিরিক্ত সাক্ষ্যার্থ ↩︎
  552. আবু শামা, আল-মুরশিদুল ওয়াজিজ ১/৫৭; ইসলামকিউএ ১৫৮৮২৪-এ উদ্ধৃত ↩︎
  553. আল-ইতকান; লায়স ইবনে সাদের নামে রজমের পাঠ গ্রহণ না-করার বিবরণ ↩︎
  554. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৬, হাদিসঃ ৪৬২১ ↩︎
  555. সহিহ বুখারি ৪৯৮৬; তাওবার শেষাংশের অনুসন্ধান ↩︎
  556. সহিহ বুখারি ৪৯৮৯; ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংস্করণে ৪৬২৩ ↩︎
  557. সহিহ বুখারি ৪৯৮৯; তাওবার দুই আয়াত সম্পর্কে মূল আরবি ↩︎
  558. ফাতহুল বারি; “অন্য কারও কাছে পাইনি” কথার ব্যাখ্যা ↩︎
  559. ফাতহুল বারি; আবু খুজাইমা ও খুজাইমার নামের বর্ণনান্তর ↩︎
  560. ফাতহুল বারি; ইবনে আবি দাউদের সূত্রে হারিস ইবনে খুজাইমার বর্ণনা ↩︎
  561. সহিহ বুখারি ৪৯৮৬; সহিফার হেফাজতের ক্রম ↩︎
  562. ফাতহুল বারি; হাফসার কাছে সহিফা থাকার কারণ ↩︎
  563. সহিহ বুখারি ৪৯৮৭; হাফসার সহিফা চাওয়া ↩︎
  564. উলুমুল কোরআন, তকি্ব উসমানি, পৃষ্ঠা ১৮৬-১৮৭ 1 2
  565. তারীখে ইসলাম, সাইয়েদ মুহাম্মদ আমীমুল ইসলাম, আধুনিক প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২৮ 1 2
  566. উলুমুল কুরআন, শাইখুল ইসলাম মুফতি ত্বকী উসমানী, মাকতাবুল হারামাইন প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ১৯১, ১৯২ ↩︎
  567. তারিখুল কোরআনিল কারিম, তাহের আল কুরদি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮ ↩︎
  568. উলুমুল কুরআন, শাইখুল ইসলাম মুফতি ত্বকী উসমানী, মাকতাবুল হারামাইন প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ১৯২ ↩︎
  569. ইবনে কাসির, ফাজায়েলুল কোরআন; মারওয়ান ইবনে হাকাম ও হাফসার সহিফা ↩︎
  570. ফাতহুল বারি; সংগ্রহ ও বিন্যাসের পরিচয় ↩︎
  571. ইসলামওয়েব ৬৪৫০২; অন্য আয়াত থাকার সম্ভাবনা অস্বীকারের যুক্তি ↩︎
  572. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৯৯, কোরআনের মর্যাদা ↩︎
  573. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৬২৯, মসজিদ ও নামাজের স্থানবিষয়ক অধ্যায় ↩︎
  574. ইবনে কাসির, সূরা বাকারা ২:২৩৮-এর তাফসির; আয়েশা ও হাফসার মুসহাফের বিবরণ ↩︎
  575. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ২ইয় খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ৩০১-৩০৩ ↩︎
  576. ইবনে কাসির, সূরা বাকারা ২:২৩৮; আয়েশার মুসহাফের আরেক পাঠ ↩︎
  577. সুয়ুতি, আল-ইতকান ফি উলুমিল কোরআন, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৬ ↩︎
  578. সুয়ুতি, আল-ইতকান, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৭; উবাইয়ের কুনুত ও মুসহাফ ↩︎
  579. সুয়ুতি, আল-ইতকান, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৪; ইবনে আবি দাউদের সূত্রে আলীর সংগ্রহ ↩︎
  580. সুয়ুতি, আল-ইতকান, পৃষ্ঠা ২০৪; ইবনে হাজারের আপত্তি ও পরবর্তী উদ্ধৃতি ↩︎
  581. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ১৫৮৩৬৩; আলীর মুখস্থ এবং চার খলিফা সম্পর্কে মতভেদ ↩︎
  582. সুয়ুতি, আল-ইতকান, পৃষ্ঠা ২০৪; ইবনুদ দুরাইসের সূত্রে ইকরিমার বর্ণনা ↩︎
  583. সুয়ুতি, আল-ইতকান, পৃষ্ঠা ২০৪; ইবনে সিরিন ও ইকরিমার কথোপকথন ↩︎
  584. মুহাম্মদ হাদি মারিফা, আত-তামহিদ; ইবনে শহর আশুবের মানাকিব ২/৪০ ও আল-ফিহরিস্তের উদ্ধৃতি ↩︎
  585. সুয়ুতি, আল-ইতকান, পৃষ্ঠা ২০৪; ইবনে আশতার সূত্রে লিখিত মুসহাফ ও অনুসন্ধান ↩︎
  586. তাফসিরুস সাফি, ষষ্ঠ ভূমিকা; আল-ইহতিজাজ থেকে পূর্ণ সংগ্রহের বর্ণনা ↩︎
  587. উসুলুল কাফী (ভারতীয় সংস্করণ), মুহাম্মদ ইবন ইয়াকুব আল-কুলাইনী,পৃষ্ঠা ৬৭ ↩︎
  588. কুলায়নি, আল-কাফি, ২য় খণ্ড, কিতাবু ফাদলিল কোরআন, অধ্যায় ১৪, বর্ণনা ২৩ ↩︎
  589. আল-কাফি ২/৩/১৪/২৩; সালিম ইবনে সালামার বর্ণনার সম্পূর্ণ বক্তব্য ↩︎
  590. আত-তামহিদে ইবনে শহর আশুবের মানাকিব ২/৪০–৪১-এর উদ্ধৃতি ↩︎
  591. সুয়ুতি, আল-ইতকান, পৃষ্ঠা ২০৪; আবদে খায়েরের সূত্রে আলী ↩︎
  592. ইসলামকিউএ, উত্তর ১৫৩৯০৮; ইবনে আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ ১/৭৭; ফাতহুল বারি ৯/১৮-এর মূল্যায়ন ↩︎
  593. উসুলুল কাফী(ভারতীয় সংস্করণ)। মুহাম্মদ ইবন ইয়াকুব আল-কুলাইনী। পৃষ্ঠা ৬৭১ ↩︎
  594. কুলায়নি, আল-কাফি, ২য় খণ্ড, কিতাবু ফাদলিল কোরআন, অধ্যায় ১৪, বর্ণনা ২৮ ↩︎
  595. কুলায়নি, আল-কাফি, ২য় খণ্ড, কিতাবু ফাদলিল কুরআন, অধ্যায় ১৪, বর্ণনা ২৮ ↩︎
  596. আল-কাফি ২/৩/১৪/২৮; আরবি বক্তব্য ও মজলিসির মূল্যায়ন ↩︎
  597. সুয়ুতি, আল-ইতকান, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩২; দানির আয়াতগণনার বিবরণ ↩︎
  598. নুরি, ফসলুল খিতাব, মজলিসির উদ্ধৃত ভাষ্য; মিরআতুল উকুল ১২/৫২৫-এর উল্লেখ ↩︎
  599. ফসলুল খিতাব, পৃষ্ঠা ৯৭ ↩︎
  600. হুসাইন নুরি, ফসলুল খিতাব ফি তাহরিফি কিতাবি রব্বিল আরবাব, চতুর্থ দলিল ↩︎
  601. ফসলুল খিতাব, চতুর্থ দলিল; বিন্যাস ও শব্দগত পার্থক্যের বক্তব্য ↩︎
  602. ফসলুল খিতাব, চতুর্থ দলিল; প্রমাণের জন্য নির্ধারিত তৃতীয় বিষয় ↩︎
  603. তাফসীরুস সাফী। মুহসিন ফয়য আল-কাশানি। পৃষ্ঠা ১৩ ↩︎
  604. মুহসিন ফয়য আল-কাশানি, তাফসিরুস সাফি, ষষ্ঠ ভূমিকা; অবতীর্ণ পাঠ ও প্রচলিত পাঠের পার্থক্য ↩︎
  605. তাফসিরুস সাফি, ষষ্ঠ ভূমিকা; আলী ইবনে ইবরাহিমের তাফসির থেকে ৩:১১০-এর পাঠ ↩︎
  606. তাফসিরুস সাফি, ষষ্ঠ ভূমিকা; ২৫:৭৪-এর ভিন্ন পাঠ ↩︎
  607. তাফসিরুস সাফি, ষষ্ঠ ভূমিকা; অপসারিত বলে বর্ণিত নাম ও অধিকারসংক্রান্ত পদ ↩︎
  608. তাফসিরুস সাফি, ষষ্ঠ ভূমিকা; পরিবর্তনের দাবির ফলে প্রামাণ্যতার সমস্যা ↩︎
  609. তাফসিরুস সাফি, ষষ্ঠ ভূমিকা; আলী, মুহাম্মদের পরিবার ও মুনাফিকদের নাম এবং ঘাটতি পূরণের আলোচনা ↩︎
  610. তাফসিরুস সাফি, ষষ্ঠ ভূমিকা; কিছু অতিরিক্ত অংশের ব্যাখ্যামূলক পরিচয় ↩︎
  611. কুলায়নি, আল-কাফি, ১ম খণ্ড, কিতাবুল হুজ্জাহ, অধ্যায় ৩৫, বর্ণনা ১ 1 2
  612. আল-কাফি, কিতাবুল হুজ্জাহ, অধ্যায় ৩৫, বর্ণনা ২ ↩︎
  613. আল-কাফি ২/৩/১৪/২৩; বর্তমানের পাঠ ও কায়েমের উত্থান পর্যন্ত নির্দেশ ↩︎
  614. তাফসিরুস সাফি, ষষ্ঠ ভূমিকা; সাদুকের আল-ইতিকাদাত থেকে উদ্ধৃতি ↩︎
  615. তাফসিরুস সাফি, ষষ্ঠ ভূমিকা; তুসির আত-তিবয়ান থেকে উদ্ধৃতি ↩︎
  616. তাফসিরুস সাফি, ষষ্ঠ ভূমিকা; ব্যাপক প্রচার ও কঠোর সংরক্ষণের আগের পরিবর্তনের সম্ভাবনা ↩︎
  617. তাফসিরুস সাফি, ষষ্ঠ ভূমিকা; আল-ইহতিজাজ ও মাজমাউল বয়ানের পৃথক লেখকের আলোচনা ↩︎
  618. তাফসিরুস সাফি, ষষ্ঠ ভূমিকা; কুলায়নির অবস্থান সম্পর্কে কাশানির অনুমান ↩︎
  619. তাফসিরুস সাফি, ষষ্ঠ ভূমিকার শেষ; পূর্ণ পাঠ, অপ্রাপ্য ইমাম ও প্রতিনিধিত্ব ↩︎
  620. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৬২৬ 1 2
  621. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৮৭–৪৯৮৮; উসমানের উদ্যোগের মূল বিবরণ ↩︎
  622. ইবনে হাজার, ফাতহুল বারি, কোরআন সংকলন অধ্যায়; শাম ও ইরাকের পাঠবিরোধ ↩︎
  623. ফাতহুল বারি; আর্মেনিয়ার অভিযান ও উসমানের খুতবার বিবরণ মিলিয়ে সংকলনের সময় নির্ধারণ ↩︎
  624. সুয়ুতি, আল-ইতকান, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৯; শিক্ষক–ছাত্রের বিরোধ ও আদর্শ মুসহাফ ↩︎
  625. ফাতহুল বারি, কোরআন সংকলন অধ্যায়; ইউনুসের সূত্রে আবু বকরের সহিফার ব্যবহার ↩︎
  626. ফাতহুল বারি; মালিকের সূত্রে হাফসার অস্বীকৃতি, ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার ও অনুলিপি ↩︎
  627. ফাতহুল বারি; সহিফা ও মুসহাফের পার্থক্য সম্পর্কে ইবনে হাজারের ব্যাখ্যা ↩︎
  628. ফাতহুল বারি; চার সদস্য ও তিন কুরাইশির পরিচয় ↩︎
  629. ফাতহুল বারি; মুসআব ইবনে সাদের সূত্রে লেখক ও পাঠ বলে দেওয়ার দায়িত্ববণ্টন ↩︎
  630. সুয়ুতি, আল-ইতকান, পৃষ্ঠা ২০৯; ইবনে আবি দাউদের সূত্রে কাসির ইবনে আফলাহ ↩︎
  631. সুয়ুতি, আল-ইতকান; কাসিরের সংবাদ থেকে পৃথক ইবনে সিরিনের মন্তব্য ↩︎
  632. সহিহ বুখারি ৪৯৮৭; মতভেদে কুরাইশি ভাষার অগ্রাধিকার ↩︎
  633. ফাতহুল বারি; শুআইবের বর্ণনায় নির্দেশের ভাষা ↩︎
  634. সুয়ুতি, আল-ইতকান; ইবনুত তিনের ব্যাখ্যায় কুরাইশি ভাষায় সীমাবদ্ধকরণ ↩︎
  635. জামি আত-তিরমিযী, হাদিস ৩১০৪ ↩︎
  636. ইসলামকিউএ, উত্তর ২৫২৮৫২; মুসায়িদ আত-তায়্যারের আল-মুহাররার থেকে “তাবুত” শব্দের ব্যাখ্যা ↩︎
  637. ফাতহুল বারি; আল-খতিবের উদ্ধৃতিতে “তাবুত” সংযোজনের বর্ণনাস্তর ↩︎
  638. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৬১২ ↩︎
  639. সহিহ বুখারী ২৮০৭ ↩︎
  640. সহিহ বুখারি ৪৯৮৮; অনুসন্ধানের পরে সূরায় আয়াত সংযুক্ত করা ↩︎
  641. ফাতহুল বারি; আহযাবের আয়াত ও আবু বকরের সহিফা সম্পর্কে ইবনে হাজারের পর্যবেক্ষণ ↩︎
  642. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৩৬০৭; খুজাইমার সাক্ষ্য দুই ব্যক্তির সমান হওয়ার ঘটনা ↩︎
  643. ফাতহুল বারি; তাওবা ও আহযাবের অনুসন্ধানের সময় সম্পর্কে ইবনে হাজারের সিদ্ধান্ত ↩︎
  644. ফাতহুল বারি; আবু খুজাইমা ও খুজাইমার নামের বর্ণনাভেদ ও অগ্রাধিকার ↩︎
  645. জামি আত-তিরমিযি ৩১০৪; আহযাবের ঘটনায় ব্যক্তির নামের সংশয় ↩︎
  646. ফাতহুল বারি; তিন কাহিনির পৃথক বর্ণনাপথ ও সনদ সংমিশ্রণের আলোচনা ↩︎
  647. ফাতহুল বারি; অঞ্চলে ও সামরিক দলে মুসহাফ প্রেরণের ভাষা ↩︎
  648. ইবনে আবি দাউদ, কিতাবুল মাসাহিফ; উসমানের চার কপি ও হামযার অনুলিপি ↩︎
  649. কিতাবুল মাসাহিফ; আবু হাতিম সিজিস্তানির সাত কপি ও গন্তব্যের তালিকা ↩︎
  650. ইসলামকিউএ, উত্তর ২৬৬৫১৪; দানি, আল-মুকনি, পৃষ্ঠা ১৯-এর উদ্ধৃতি ↩︎
  651. ইসলামকিউএ ২৫২৮৫২; ব্যক্তিগত ও সাধারণ মদিনি কপিসহ ছয়টির তালিকা ↩︎
  652. ফাতহুল বারি; পাঁচ কপির প্রসিদ্ধ মত ↩︎
  653. ফাতহুল বারি; ইব্রাহিম নাখাঈর সঙ্গে এক শামির কথোপকথন ↩︎
  654. কিতাবুল মাসাহিফ; আবদুল আলা ইবনুল হাকামের বর্ণনায় অনুমোদিত কপির সঙ্গে অন্য মুসহাফ মিলিয়ে নেওয়া ↩︎
  655. সুয়ুতি, আল-ইতকান; হারিস মুহাসিবির নামে পাঠ নির্বাচন ও পূর্ববর্তী একাধিক রূপের ব্যাখ্যা ↩︎
  656. আল-ইতকানে উদ্ধৃত বাকিল্লানি, আল-ইনতিসার; গ্রহণ ও বর্জনের শ্রেণি ↩︎
  657. ইসলামকিউএ ২৬৬৫১৪; সুয়ুতি, আল-ইতকান ৪/১৮১ থেকে অনুমোদিত মুসহাফের বাড়তি–কমতি শব্দের বিবরণ ↩︎
  658. ইসলামকিউএ ৪০৩৯১৪; আবু উবাইদের উদ্ধৃতিতে হাদিদ ৫৭:২৪-এর “হুয়া” ↩︎
  659. ইসলামকিউএ ২৬৬৫১৪; ইবনুল জাযারি, মুনজিদুল মুকরিইন, পৃষ্ঠা ১৮-এর পাঠ গ্রহণের শর্ত ↩︎
  660. ইসলামকিউএ ২৬৬৫১৪; ইবনুল জাযারি, আন-নাশর ফিল কিরাআতিল আশর ১/৩২ ↩︎
  661. সহিহ বুখারী ৪৯৮৭ ↩︎
  662. ইবনে হাজর, ফাতহুল বারী, কোরআন সংকলন অধ্যায়; “وأمر بما سواه” বাক্যের ব্যাখ্যা ↩︎
  663. ফাতহুল বারী; আবু কিলাবার সূত্রে প্রাদেশিক নির্দেশের বিবরণ ↩︎
  664. ফাতহুল বারী; ধ্বংসাদেশের ব্যতিক্রম হিসেবে হাফসার সহিফা ↩︎
  665. তাবারী, জামিউল বায়ান, ভূমিকা; সাত আহরুফ ও এক হরফে একত্র করার আলোচনা, ১/৫৮–৫৯ ↩︎
  666. তাবারী, জামিউল বায়ান, ভূমিকা, ১/৫৮–৫৯; সংরক্ষণের দায়িত্ব সম্পর্কে তাঁর ব্যাখ্যা ↩︎
  667. তাবারী, জামিউল বায়ান, ভূমিকা, ১/৬৩–৬৪; ছয় আহরুফ পরিত্যাগ ও তার চিহ্ন লুপ্ত হওয়ার বক্তব্য ↩︎
  668. তাবারী, জামিউল বায়ান, ভূমিকা, ১/৬৪; অবশিষ্ট এক হরফের পরিচয় ↩︎
  669. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৮৭ ↩︎
  670. সহিহ বুখারী ৪৯৯৯; চারজনের কাছে কোরআন শিক্ষা গ্রহণের নির্দেশ ↩︎
  671. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিস একাডেমি, হাদিসঃ ২১৯৫ ↩︎
  672. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৫০০২ ↩︎
  673. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৭, হাদিসঃ ৪৬৩৬; আন্তর্জাতিক নম্বর ৫০০২ ↩︎
  674. সহিহ বুখারী ৫০০২; ইবনে মাসউদের কোরআনজ্ঞান সম্পর্কে বক্তব্য ↩︎
  675. সহিহ বুখারী ৫০০০; সত্তরের বেশি সূরা সরাসরি শেখা এবং উপস্থিতদের প্রতিক্রিয়া ↩︎
  676. জামিউত তিরমিযী, সোলেমানিয়া বুক হাউস, পৃষ্ঠা ৮৫১ 1 2
  677. Jami’ at-Tirmidhi Vol. 5, Book 44, Hadith 3104 ↩︎
  678. Jami’ at-Tirmidhi Vol. 5, Book 44, Hadith 3104 ↩︎
  679. জামি আত-তিরমিজী ৩১০৪; সংকলনের দায়িত্বে যায়েদের নিয়োগ সম্পর্কে ইবনে মাসউদের আপত্তি ↩︎
  680. ইবন সা‘দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২/৩৪৪; কোরআন সংগ্রহকারীদের বিবরণ; ইংরেজি সংস্করণের প্রচলিত সূত্র ২/৪৪৪ ↩︎
  681. জামি আত-তিরমিযী, হাদিস ৩১০৪; ইবনে মাসউদের বক্তব্য ↩︎
  682. সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩১০৪ ↩︎
  683. জামি আত-তিরমিজী ৩১০৪; যুহরীর সূত্রে ইবনে মাসউদের বক্তব্য ↩︎
  684. জামি আত-তিরমিজী ৩১০৪; ইরাকবাসীকে মুসহাফ গোপন রাখার নির্দেশ ও কোরআন ৩:১৬১-এর প্রয়োগ ↩︎
  685. কিতাবুল মাসাহিফ, ইবন আবি দাউদ, পৃষ্ঠা ১৫ ↩︎
  686. ইবন আবি দাউদ, কিতাবুল মাসাহিফ, পৃষ্ঠা ১৫ ↩︎
  687. ইবনে আবি দাউদ, কিতাবুল মাসাহিফ; ইবনে মাসউদের বিরোধিতা, ১/১৮২–১৮৪ ↩︎
  688. কিতাবুল মাসাহিফ; আবুশ-শা‘সার সূত্রে হুযাইফা ও ইবনে মাসউদের বাক্যবিনিময়, ১/১৮০–১৮১ ↩︎
  689. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও তাঁর ফিকাহ, ডঃ হানাফী রাযী, আবুল বাশার মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম অনূদিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৯৪-৯৫ ↩︎
  690. কিতাবুল মাসাহিফ; “ইবনে মাসউদের সন্তুষ্টি” শিরোনামের অন্তর্গত বর্ণনা, ১/১৯৩ ↩︎
  691. ফাতহুল বারী; হাফসার সহিফা ফেরত দেওয়ার বিবরণের ব্যাখ্যায় সালিমের সাক্ষ্য ↩︎
  692. ইসলামকিউএ ৬২২৯১৯; ইবনে হাজরের উদ্ধৃতিতে সালিম ইবনে আবদুল্লাহর বিবরণ ↩︎
  693. ফাতহুল বারী; মারওয়ানের সহিফা ধ্বংসের বিভিন্ন বর্ণনা ↩︎
  694. ইবনে আবি দাউদ, কিতাবুল মাসাহিফ; উসমানবিরোধী অভিযোগ এবং মুসহাফ প্রসঙ্গে তাঁর জবাব, ১/২৪৩–২৪৫ ↩︎
  695. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, আল্লামা ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩২-৩৩৩ ↩︎
  696. ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া; উসমানের হত্যাকাণ্ডের বিবরণ ↩︎
  697. ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, তুরকী সম্পাদনা, ১০/৩০৭; শামেলা ↩︎
  698. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া; উসমানের হত্যাকাণ্ডের একই বিবরণ, ইসলামওয়েব ↩︎
  699. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ৩৩১-৩৩৪, ৩৪২-৩৪৩ 1 2
  700. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, উসমানের হত্যাকাণ্ড; খলীফা ইবনে খাইয়াতের সূত্রে ওয়াসসাবের বিবরণ ↩︎
  701. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১০/৩০৬–৩০৮; সাইফ ইবনে উমর ও ইবনে আসাকিরের সূত্রে সংরক্ষিত বিবরণ ↩︎
  702. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১০/৩০৯–৩১১; হত্যাকাণ্ডের ভিন্ন বর্ণনা এবং মিসরীয়দের পত্র পাওয়ার ঘটনা ↩︎
  703. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১০/৩১১–৩১২; পত্র লেখা হলেও ক্ষতি নেই—ইবনে কাসীরের মূল্যায়ন ↩︎
  704. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, অবরোধের মেয়াদ, হত্যার তারিখ ও দাফনের বিবরণ, ১০/৩২২–৩২৭ ↩︎
  705. ফাতহুল বারী; মুসহাফ পোড়ানোর প্রসঙ্গে ইবন বাত্তালের ফিকহি মূল্যায়ন ↩︎
  706. কোরআন ১৫ঃ৯ ↩︎
  707. তাফসীরে ইবনে কাসীর, আল্লামা ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭৯ ↩︎
  708. ইসলামওয়েব ফতোয়া ১৭৩৫১৫; দানির বক্তব্যের উদ্ধৃতি ↩︎
  709. যরকাশি, আল-বুরহান ফি উলুমিল কুরআন, ১/৩৫০; আয়াতসংখ্যার বিভিন্ন বর্ণনা ↩︎
  710. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ১৭৩৫১৫; ফিরোজাবাদী, বাসায়ির যাওয়িত তামইয়িয থেকে আয়াতসীমার উদাহরণ ↩︎
  711. যরকাশি, আল-বুরহান, ১/৩৪৭–৩৫০; শব্দ ও অক্ষর গণনার বিবরণ ↩︎
  712. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২২৬; ইবনে মাসউদ ও উবাইয়ের মুসহাফে সূরার সংখ্যা ↩︎
  713. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৭৭; মুয়াওয়িযাতাইন বিষয়ে উবাইকে প্রশ্ন ↩︎
  714. ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি, ৮/৬১৫; আবদুর রহমান ইবন ইয়াযিদের বর্ণনা ↩︎
  715. ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি, ৮/৬১৫–৬১৬; বর্ণনা অস্বীকার ও ঐকমত্যের দাবির মূল্যায়ন ↩︎
  716. তাফহীমুল কুরআন, সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী, খণ্ড ১৯, পৃষ্ঠা ৩২০ ↩︎
  717. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২২৬; আবু উবাইদের মাধ্যমে ইবন সিরিনের বর্ণনা ↩︎
  718. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৯৩; আয়েশার মুসহাফ, পাঠক্রম ও অবতরণের ধারার বিবরণ ↩︎
  719. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৭২; হুযাইফার সঙ্গে রাতের নামাজে সূরা পাঠের ক্রম ↩︎
  720. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২১৫; কাজি আবু বকরের বক্তব্য ↩︎
  721. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১৪৫৭ ↩︎
  722. ফখরুদ্দিন রাযী, মাফাতিহুল গায়ব, ১/১৪৬; ফাতিহার পঞ্চম নাম ↩︎
  723. কুরতুবি, ফাতিহার ফজিলত ও নাম; চতুর্থ আলোচনা ↩︎
  724. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/৩৭; মক্কি–মাদানির তিনটি পরিভাষা ↩︎
  725. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/৩৮; বাকিল্লানীর বক্তব্যে মক্কি–মাদানি জ্ঞানের উৎস ↩︎
  726. কুরতুবি, ফাতিহার বিধানসংক্রান্ত দ্বিতীয় আলোচনা; মক্কি–মাদানি মতভেদ ↩︎
  727. ইবন তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, ১৩/৪০৯; ইসলামকিউএ ১০৯৮৮৫-এ উদ্ধৃত ↩︎
  728. তাফসীরে ইবনে কাসীর, আল্লামা ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১২-৫১৩ ↩︎
  729. জামি আত-তিরমিযী, হাদিস ৩০৮৬; প্রশ্নকারী ও বর্ণনাপথসহ মূল বর্ণনা ↩︎
  730. সুনানু আবু দাউদ শরীফ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২৭-৪২৮, হাদিসঃ ৭৮৬-৭৮৭ 1 2
  731. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৭৮৬; আনফাল–বারাআতের বিন্যাস ও বিসমিল্লাহ না লেখার ব্যাখ্যা ↩︎
  732. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২২৫; সূরার সংখ্যা ↩︎
  733. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২২৫ ↩︎
  734. কোরআন, সূরা নামল ২৭:৩০; সুলাইমানের চিঠির সূচনা ↩︎
  735. কুরতুবি, আল-জামি লি আহকামিল কুরআন; বিসমিল্লাহ বিষয়ে চতুর্থ আলোচনা ↩︎
  736. ইসলামকিউএ ২৩২২৯৭; ফাতাওয়া আল-লাজনাতিদ দায়িমা, ৫/৩১৭ থেকে উদ্ধৃত ↩︎
  737. ইসলামকিউএ ৫৩৯৫৮৫; নববী, আল-মাজমুউ, ৩/৩৩৩ ও ৩/৩৩৬ থেকে উদ্ধৃত ↩︎
  738. কুরতুবি, বিসমিল্লাহ বিষয়ে পঞ্চম আলোচনা; ইবনুল আরাবির যুক্তি ↩︎
  739. তাফসীরে জালালাইন, জালালুদ্দিন মহল্লী এবং জালালুদ্দিন সুয়ুতী, ইসলামিয়া কুতুবখানা প্রকাশনী, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬২৯ ↩︎
  740. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪০০১; উম্মে সালামার বর্ণনায় আয়াত ধরে পাঠ ↩︎
  741. কুরতুবি, বিসমিল্লাহ বিষয়ে পঞ্চম আলোচনা; সহিহ মুসলিমের নামাজ-বিভাগের হাদিস ↩︎
  742. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪০০ক; কাউসার পাঠের বর্ণনা ↩︎
  743. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৭৮৮; বিসমিল্লাহ ও সূরার বিভাজন ↩︎
  744. কুরতুবি, বিসমিল্লাহ বিষয়ে তৃতীয় আলোচনা; শা’বী ও আ’মাশের নামে লেখার রূপ পরিবর্তনের বর্ণনা ↩︎
  745. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২২৫; আল-মুস্তাদরাক থেকে আলীর নামে উদ্ধৃত ব্যাখ্যা ↩︎
  746. সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী, হাদিসঃ ৪৩১০ ↩︎
  747. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪২৭১ ↩︎
  748. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৯১ক; উমরের ভাষণের আরবি মূল ↩︎
  749. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪২৭১; একই পূর্ণ বর্ণনার বাংলা সংস্করণ ↩︎
  750. মুসনাদে আহমাদ, আহমদ ইবনে হাম্বল, হাদিসঃ ৩৯১ ↩︎
  751. মুসনাদ আহমদ, হাদিস ৩৯১; ভাষণ প্রচারের নির্দেশ ও রজমের ঘোষণা ↩︎
  752. সহীহুল বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২০১ 1 2
  753. সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৮৩০; ভাষণের রজম থেকে সাকিফার স্মৃতির সূচনা পর্যন্ত অংশ ↩︎
  754. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), আল্লামা আলবানী একাডেমী, হাদিসঃ ৪৪১৮ ↩︎
  755. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৪১৮; আয়াত লিখে দেওয়ার শর্তযুক্ত ঘোষণা ↩︎
  756. ইসলামকিউএ ১১১৩৮২; সুনান আবু দাউদ ৪৪১৮-এর উদ্ধৃতি ↩︎
  757. মুসনাদে আহমাদ, আহমদ ইবনে হাম্বল, হাদিসঃ ৩৫২ ↩︎
  758. মুসনাদ আহমদ, হাদিস ৩৫২; বেত্রাঘাতের আয়াত দেখিয়ে রজমের প্রশ্ন এবং লিখে দেওয়ার ইচ্ছা ↩︎
  759. মালিক, আল-মুওয়াত্তা; কিতাবুল হুদুদ, রজম অধ্যায়; যরকানির শরহে হাদিস ১৫৬০/১৫০০-এর মতন ↩︎
  760. জামি আত-তিরমিযী, হাদিস ১৪৩১; মুসহাফে লেখার ইচ্ছা ও বৃদ্ধি করতে অপছন্দ করার ভাষা ↩︎
  761. তাফসীরে ইবনে কাসীর, আল্লামা ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯ ↩︎
  762. তাফসীরে ইবনে কাসীর; সূরা আহযাবের সূচনা; আহমদ ও নাসাঈর সূত্র ↩︎
  763. নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস ৭৩১২; কিতাবুর রজম, বিবাহিতের বেত্রাঘাত রহিত করার অধ্যায় ↩︎
  764. হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, হাদিস ৮১৩২; আহযাবে রজমের পাঠের বর্ণনা ↩︎
  765. সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস ২৫৫৩; উমরের বর্ণনায় রজমের পূর্বপঠিত বাক্য ↩︎
  766. যরকানি, শরহুল মুওয়াত্তা, ৪/২৩৩; “শাইখ” ও “শাইখা”র আইনগত ব্যাখ্যা ↩︎
  767. কোরআন, সূরা নূর ২৪:২; ব্যভিচারের শাস্তির লিখিত আয়াত ↩︎
  768. আবুল আব্বাস কুরতুবি, আল-মুফহিম, ৫/৮৫; ইসলামকিউএ ১১০২৩৭-এ উদ্ধৃত ↩︎
  769. সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৮১২; আলীর রজম কার্যকর করার ঘোষিত ভিত্তি ↩︎
  770. ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি, ১২/১৫৩; রজম অস্বীকারের বিবরণ ও উদ্ধৃত সূত্রগুলো ↩︎
  771. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), আল্লামা আলবানী একাডেমী, হাদিসঃ ৪৪৪৮ ↩︎
  772. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৪৪৮; রজমবিধি পরিবর্তন ও পুনরুজ্জীবিত করার বর্ণনা ↩︎
  773. সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৮১৯; তাওরাতে রজমের আয়াতের ওপর হাত রাখার বর্ণনা ↩︎
  774. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২০৬; সংগ্রহে সাক্ষ্যের শর্তের বিবরণ ↩︎
  775. সুয়ূতি, আল-ইতকান; যরকাশির প্রশ্ন, ইবন যফরের আপত্তি ও পরবর্তী মন্তব্য ↩︎
  776. যরকানি, শরহুল মুওয়াত্তা, ৪/২৩২; “লিখতাম” কথাকে অতিশয়োক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা ↩︎
  777. ইসলামকিউএ, উত্তর ১১১৩৮২; উমরের না-লেখার কারণ সম্পর্কে প্রস্তাবিত ব্যাখ্যা ↩︎
  778. সুয়ূতি, আল-ইতকান; হাকিমের সূত্রে কাসির ইবনুস সালত, যায়েদ ও উমরের বর্ণনা ↩︎
  779. সুয়ূতি, আল-ইতকান; তিলাওয়াত রহিত ও হুকুম বহাল থাকার বিষয়ে সাহিবুল ফুনুনের ব্যাখ্যা ↩︎
  780. কোরআন ৪:২৩; তাফসির ইবনে কাসির, দুধপানজনিত বিবাহ নিষেধের আলোচনা ↩︎
  781. সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৪৯০ ↩︎
  782. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৫২খ ↩︎
  783. সহিহ মুসলিম, আবদুল বাকি সম্পাদিত সংস্করণ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১০৭৫; শামেলা ↩︎
  784. সহিহ মুসলিম, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, পঞ্চম খণ্ড, হাদিসঃ৩৪৬১-৩৪৬২, পৃষ্ঠা ১০০-১০১ ↩︎
  785. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৫২-এর অনুসারী সনদ; শামেলা ↩︎
  786. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৫২গ ↩︎
  787. সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৯৪২ ↩︎
  788. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৬৬ ↩︎
  789. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৫২ক ↩︎
  790. সহিহ মুসলিম, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১০৭৫, হাদিস ১৪৫২; শামেলা ↩︎
  791. মুয়াত্তা মালিক, কিতাবুর রাদা, আরবি নম্বর ১২৯৩; সান্নাহ ডটকমে ৩০/১৮ ↩︎
  792. মুয়াত্তা মালিক, বাংলা সংস্করণ, রেওয়ায়েত ১৭ ↩︎
  793. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২০৬২ ↩︎
  794. সুনান নাসায়ি, হাদিস ৩৩০৭; সমান্তরাল বর্ণনা ↩︎
  795. নববী, শরহ সহিহ মুসলিম, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ২৪–২৫ ↩︎
  796. সিদ্দিক হাসান খান, আস-সিরাজুল ওয়াহহাজ; পাঁচবার দুধপানের অধ্যায় ↩︎
  797. নববী, শরহ সহিহ মুসলিম, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ২৫; নসখের শ্রেণিবিভাগ ↩︎
  798. আল-আওনুল মাহমুদ ফি-হল্লি সুনানে আবী দাউদ (কিতাবুয্ যাকাত – কিতাবুল জিহাদ), সংকলন ও সম্পাদনাঃ মাওলানা আব্দুল হাফীজ বিন আব্দুর রউফ, আল-মাহমূদ প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৩৭২ ↩︎
  799. সুনানু ইবনে মাজাহ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৯৬ ↩︎
  800. সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৯৪৪ ↩︎
  801. সুনান ইবনে মাজাহ, বাংলা অনুবাদ, হাদিস ১৯৪৪ ↩︎
  802. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ১২৯০৫; দাজিন শব্দের ব্যাখ্যা ↩︎
  803. মুসনাদে আহমাদ, ইসলামওয়েবে ব্যবহৃত নম্বর ২৫৭৮৪; সমান্তরাল পাঠ ↩︎
  804. ইবনে হাযম, আল-মুহাল্লা বিল আসার, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ১৭৭; বর্ণনাটির মূল্যায়ন ↩︎
  805. ইসলামকিউএ, উত্তর ১৭৫৩৫৫; সহিফা খেয়ে ফেলার অংশের সমালোচনা ↩︎
  806. ইবনে হাযম, আল-মুহাল্লা বিল আসার, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ১৭৭; সহিফা ও দুধপানের ব্যাখ্যা ↩︎
  807. ইবনে হাযম, আল-মুহাল্লা বিল আসার, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ১৭৭–১৭৮; অনুপস্থিত পাঠ সম্পর্কে যুক্তি ↩︎
  808. আল-আওনুল মাহমুদ ফি-হল্লি সুনানে আবী দাউদ (কিতাবুয্ যাকাত – কিতাবুল জিহাদ), সংকলন ও সম্পাদনাঃ মাওলানা আব্দুল হাফীজ বিন আব্দুর রউফ, আল-মাহমূদ প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৩৭১ ↩︎
  809. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২০৬১; সাহলা, সালিম ও পাঁচবার দুধপানের পূর্ণ বর্ণনা ↩︎
  810. মুয়াত্তা মালিক, কিতাবুর রাদা, আরবি নম্বর ১২৮১; সান্নাহ ডটকমে ৩০/৭ ↩︎
  811. মুয়াত্তা মালিক, কিতাবুর রাদা, আরবি নম্বর ১২৮২; সান্নাহ ডটকমে ৩০/৮ ↩︎
  812. মুয়াত্তা মালিক, কিতাবুর রাদা, আরবি নম্বর ১২৮৬; মালিকের নিজস্ব সিদ্ধান্ত ↩︎
  813. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৫১ক; এক বা দুবার দুধপান ও বিবাহের প্রশ্ন ↩︎
  814. ইবনে জাওযি, নাওয়াসিখুল কোরআন, পৃষ্ঠা ১৬৯; দুধপানের সংখ্যা নিয়ে তিন মত ↩︎
  815. নববী, শরহ সহিহ মুসলিম, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ২৫; মালিকি ও শাফিয়ি মতের বিরোধ ↩︎
  816. ইবনে জাওযি, নাওয়াসিখুল কোরআন, পৃষ্ঠা ১৬৯; মৃত্যুর সময় পাঠের বাক্যের ব্যাখ্যা ↩︎
  817. আল ইতকান, জালালুদ্দিন সুয়ুতি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২২৬ ↩︎
  818. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২২৬ ↩︎
  819. আল-ইতকান, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২২৭; দুটি প্রার্থনার পূর্ণ পাঠ ↩︎
  820. আল ইতকান, জালালুদ্দিন সুয়ুতি, ১/২২৭ ↩︎
  821. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/২২৭; মুহাম্মদ ইবনে নাসরের সূত্রে উবাইয়ের কুনুত ও মুসহাফ ↩︎
  822. আল-ইতকান, ১/২২৬; বায়হাকির সূত্রে উমরের কুনুত ↩︎
  823. আল-ইতকান, ১/২২৭; বর্ণনার সমাপ্তি ↩︎
  824. আল-ইতকান, ১/২২৭; ইবনে জুরাইজের ব্যাখ্যা ↩︎
  825. আল-ইতকান, ১/২২৬; তাবারানির কিতাবুদ দুআর সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে যুরাইরের বিবরণ ↩︎
  826. ইসলামকিউএ, উত্তর ১৭৮২০৯; আল-ইতকান থেকে ইবনে মুনাদির উদ্ধৃতি ↩︎
  827. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬৫, হাদিসঃ ২২৯০ ↩︎
  828. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০৫০ ↩︎
  829. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০৫০; দ্বিতীয় সূরার স্মৃতি ↩︎
  830. আবু উবাইদ, ফাদায়িলুল কোরআন; যা তুলে নেওয়া হয়েছে এবং মুসহাফে প্রতিষ্ঠিত হয়নি—সেই অধ্যায় ↩︎
  831. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৪৮৪৩২; আদ-দীবাজে আবু মুসার বর্ণনার ব্যাখ্যা ↩︎
  832. কোরআন, সূরা সফ ৬১:২; কুরতুবির তাফসিরসহ মূল পাঠ ↩︎
  833. কোরআন, সূরা সফ ৬১:৩; বর্তমান পরবর্তী আয়াত ↩︎
  834. কুরতুবি, আল-জামি লিআহকামিল কোরআন; সূরা সফ ৬১:২-এর ব্যাখ্যায় ইবনুল আরাবি ↩︎
  835. আল-ইতকান, ৩/৮২; উরওয়ার সূত্রে আয়েশার নামে বর্ণনা ↩︎
  836. আবু উবাইদ, ফাদায়িলুল কোরআন; আয়েশার নামে আহযাবের দুইশ আয়াতের বর্ণনা ↩︎
  837. কুরতুবি, সূরা আহযাব ৩৩:১-এর ভূমিকা; আবু উবাইদের বর্ণনা ও আবু বকরের ব্যাখ্যা ↩︎
  838. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১৭৮২০৯; আহযাবের দুইশ আয়াতের প্রশ্নের উত্তর ↩︎
  839. আল ইত্বকান, পৃষ্ঠা ১৫ ↩︎
  840. হায়সামী, মাজমাউয যাওয়াইদ; কিতাবুত তাফসীর, সূরা বারাআত; বর্ণনা ১১০৩৫ ↩︎
  841. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৬০৭ ↩︎
  842. সহিহ বুখারি, হাদিস ২৮০১; ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২৬০৭ ↩︎
  843. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৬১৯ ↩︎
  844. সহিহ বুখারী, হাদিস ২৮১৪ ↩︎
  845. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬, হাদিসঃ ৩৭৯০ ↩︎
  846. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪০৯০; ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৭৯০ ↩︎
  847. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০৪৮ক; আবু আওয়ানার মাধ্যমে আনাসের বর্ণনা ↩︎
  848. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০৪৮খ; শুবার মাধ্যমে আনাসের অনিশ্চয়তা ↩︎
  849. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০৪৯; ইবনে আব্বাস ও যুহাইরের বর্ণনার পার্থক্য ↩︎
  850. জামে তিরমিজি, হাদিস ৩৮৯৮; উবাইকে পাঠ করে শোনানোর বিবরণ ↩︎
  851. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ২৯০৩৭৪; কাজি ইয়াদ, ইকমালুল মুআল্লিম, ৩/৫৮৫ থেকে উদ্ধৃতি ↩︎
  852. আবু উবাইদ, ফাদায়িলুল কোরআন; অধ্যায়ের শেষে উসমানি সংগ্রহ অস্বীকারের বিধান ↩︎
  853. সুয়ূতি, তাদরিবুর রাবি; অধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবিদের আলোচনায় ইবনে উমর ↩︎
  854. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮-২৯, হাদিসঃ ৬১৪৫ ↩︎
  855. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৪৭৯ক; ইবনে উমরের স্বপ্ন ও মুহাম্মদের মন্তব্য ↩︎
  856. আল ইতকান, পৃষ্ঠা ১২-১৩ ↩︎
  857. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ৩/৮১–৮২; আবু উবাইদের সূত্রে ইবনে উমর ↩︎
  858. আবু উবাইদ, ফাদায়িলুল কোরআন; ইবনে উমরের পূর্ণ বর্ণনা ↩︎
  859. আবু উবাইদ, ফাদায়িলুল কোরআন; সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ের শিরোনাম ↩︎
  860. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ১১৭৬০৫; ইবনে উমরের বক্তব্য, নসখ ও সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি ↩︎
  861. ইবনে আবি দাউদ, কিতাবুল মাসাহিফ, পৃষ্ঠা ২২৭–২৩৫; ইসলামওয়েব ↩︎
  862. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ২/৩২০; আবু উবাইদের সূত্রে ইকরিমার বর্ণনা ↩︎
  863. তাফসীরে মাযহারী, আল্লামা কাজী মুহাম্মদ ছানাউল্লাহ পানিপথী, হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া প্রকাশনী, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৮-৩৪৯ ↩︎
  864. ইবনে আবি দাউদ, কিতাবুল মাসাহিফ, পৃষ্ঠা ২২৮; সংকলকের নিজস্ব ব্যাখ্যা ↩︎
  865. কিতাবুল মাসাহিফ, পৃষ্ঠা ২৩৫; উরওয়ার প্রশ্নের উত্তরে আয়েশার নামে বর্ণনা ↩︎
  866. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ২/৩২০; আবু উবাইদের মাধ্যমে আয়েশার বক্তব্য ও সনদমূল্যায়ন ↩︎
  867. ইসলামকিউএ, উত্তর ১৩৫৭৫২; আয়েশার বর্ণনা প্রত্যাখ্যানের নির্দিষ্ট যুক্তি ↩︎
  868. কোরআন, নিসা ৪:১৬২; তাবারির তাফসিরসহ মূল পাঠ ↩︎
  869. কুরতুবি, নিসা ৪:১৬২; মুকিমিনের বিভক্তি ও সিবাওয়াইহের ব্যাখ্যা ↩︎
  870. কোরআন, মায়িদা ৫:৬৯; কুরতুবির তাফসিরসহ মূল পাঠ ↩︎
  871. কুরতুবি, মায়িদা ৫:৬৯; খলিল ও সিবাওয়াইহের বাক্যবিন্যাস ↩︎
  872. কোরআন, ত্বহা ২০:৬৩; বাগাভির তাফসিরসহ মূল পাঠ ↩︎
  873. বাগাভি, মাআলিমুত তানযিল; ত্বহা ২০:৬৩-এর পাঠভেদ ↩︎
  874. ইবনে আবি দাউদ, কিতাবুল মাসাহিফ, পৃষ্ঠা ২৩৩–২৩৪; আবান ইবনে উসমানকে যুবাইরের প্রশ্ন ↩︎
  875. কুরতুবি, নিসা ৪:১৬২; আবানের বর্ণনার পরে কুশাইরির মূল্যায়ন ↩︎
  876. সহিহ বুখারী ১৪৩ ↩︎
  877. তাফসীরে ইবনে কাসীর, আল্লামা ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৪ ↩︎
  878. তাবারী, জামিউল বায়ান; নূর ২৪:২৭ ↩︎
  879. ইবনে কাসির, নুর ২৪:২৭; সংশ্লিষ্ট পূর্ণ অনুচ্ছেদগুলো ↩︎
  880. তাবারি, নুর ২৪:২৭; ইবনুল মুসান্না ও আবু কুরাইবের বর্ণনাপথ ↩︎
  881. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ২/৩২৭; রা’দ ১৩:৩১ সম্পর্কে ইবনুল আনবারির বর্ণনা ↩︎
  882. কুরতুবি, রা’দ ১৩:৩১; বিকল্প পাঠ এবং পরবর্তী প্রত্যাখ্যানের আলোচনা ↩︎
  883. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ২/৩২৭; সাঈদ ইবনে মানসুরের সূত্রে ইবনে আব্বাস ↩︎
  884. তাবারি, ইসরা ১৭:২৩; ইবনে আব্বাসের দেওয়া মুসহাফে উবাইয়ের পাঠ ↩︎
  885. কুরতুবি, ইসরা ১৭:২৩; ইবনে আব্বাসের নামে পাঠ এবং আবু হাতিমের প্রতিক্রিয়া ↩︎
  886. ইবনে আবু হাতিম, তাফসির, ৮/২৫৯৫; নুর ২৪:৩৫, বর্ণনা ১৪৫৬০ ↩︎
  887. তাবারি, নুর ২৪:৩৫; উবাইয়ের নামে পাঠ ও ব্যাখ্যা ↩︎
  888. ইসলামকিউএ ১৩৫৭৫২-এ আল-ইতকান থেকে সুয়ূতির সরাসরি উদ্ধৃতি; আয়েশার বর্ণনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত ↩︎
  889. আল-ইতকান থেকে ইবনে আশতা ও ইবনে জাবারার ব্যাখ্যা; ইসলামকিউএতে সংরক্ষিত পূর্ণ উদ্ধৃতি ↩︎
  890. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ২/৩২২; ইবনুল আনবারির লিখন ও উচ্চারণের সম্পর্কবিষয়ক আপত্তি ↩︎
  891. আল-ইতকান, ২/৩২২; হানির বর্ণনার শুরু ↩︎
  892. আল-ইতকান, ২/৩২৩; উবাইয়ের সংশোধনের সম্পূর্ণ বিবরণ ↩︎
  893. সূরা শুয়ারা, আয়াত ২১৪ ↩︎
  894. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪০২ ↩︎
  895. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৩-২৫৪, হাদিসঃ ৪০২ ↩︎
  896. সহিহ মুসলিম ২০৮ক ↩︎
  897. তাফসির বাগাবি, শুআরা ২৬:২১৪; সম্পাদকীয় টীকায় নববি, শরহে সহিহ মুসলিম ৩/৮২ ↩︎
  898. তাফসির তাবারি, কাহফ ১৮:৭৯ ↩︎
  899. তাফসির তাবারি, কাহফ ১৮:৮০ ↩︎
  900. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৪৭২৫ ↩︎
  901. সহিহ বুখারী ৪৭২৫; সাঈদ ইবনে যুবাইরের শেষ মন্তব্য ↩︎
  902. তাফসির তাবারি, কাহফ ১৮:৭৯; ওয়ারা ও সামনে অবস্থানের ব্যাখ্যা ↩︎
  903. তাফসির তাবারি, নুর ২৪:২৭; ইবরাহিম ও সাঈদের সূত্রে দুটি পরপর বর্ণনা ↩︎
  904. সহিহ মুসলিম ৬৩০; বারা ইবনে আযিবের বর্ণনা ও মুসলিমের পরবর্তী সূত্র ↩︎
  905. সহিহ বুখারি ৪৯৪৪; লায়ল সূরার পাঠ নিয়ে আবু দারদা ও আলকামার সাক্ষাৎ ↩︎
  906. তাফসির তাবারি, তাওবা ৯:১০০; বর্ণনা ১৭১১৮ ↩︎
  907. তাফসির তাবারি, তাওবা ৯:১০০; মুহাম্মাদ ইবনে কাবের সূত্রে বর্ণনা ১৭১১৭ ↩︎
  908. তাফসির তাবারি, তাওবা ৯:১০০; গৃহীত পাঠের পক্ষে তাবারির সিদ্ধান্ত ↩︎
  909. তাফসির কুরতুবি, মায়িদা ৫:৮৯; বিয়াল্লিশতম আলোচনা ↩︎
  910. ইসলামকিউএ ১৭৭১৩৬; উদ্ধৃত ইবনে হাজর হাইতামি, তুহফাতুল মুহতাজ ৪/২৯৬ ↩︎
  911. আবু আমর দানি, আল-মুকনি; আঞ্চলিক মুসহাফে বৃদ্ধি ও হ্রাসবিষয়ক পরিচ্ছেদ, মুদ্রিত পৃষ্ঠা ১০৬ ↩︎
  912. দানির আল-মুকনি, মুদ্রিত পৃষ্ঠা ১০৬; বাকারা ২:১১৬ ↩︎
  913. দানির আল-মুকনি, মুদ্রিত পৃষ্ঠা ১০৭; মায়িদা ৫:৫৩ ↩︎
  914. দানির আল-মুকনি, মুদ্রিত পৃষ্ঠা ১০৮; ইসরা ও কাহফের আঞ্চলিক পাঠ ↩︎
  915. তাফসির কুরতুবি, আলে ইমরান ৩:১৩৩; মদিনা ও শামের কপি ↩︎
  916. দলিলুল হাইরান আলা মাওরিদিয যামআন; আল-মুকনি থেকে উদ্ধৃত হাদিদ ৫৭:২৪-এর কপিভেদ ↩︎
  917. ইবনে আবি দাউদ, কিতাবুল মাসাহিফ, আঞ্চলিক কপির পার্থক্য; মুদ্রিত পৃষ্ঠা ২৫৫–২৫৬ ↩︎
  918. দলিলুল হাইরান; আল-মুকনি থেকে উদ্ধৃত শামস ৯১:১৫-এর কপিভেদ ↩︎
  919. তাফসির কুরতুবি, শামস ৯১:১৫; ফা–ওয়াও এবং কর্তার ব্যাখ্যা ↩︎
  920. দানির আল-মুকনি, মুদ্রিত পৃষ্ঠা ১০৮; তাওবা ৯:১০০-এ মক্কার কপিতে অতিরিক্ত মিন ↩︎
  921. ইসলামকিউএ ৯৫৪৩০; ইবনে তাইমিয়া, মাজমূউল ফাতাওয়া, ১২/১০১ 1 2
  922. আবু আমর দানি, আল-মুহকাম ফি নাকতিল মাসাহিফ; মুদ্রিত পৃষ্ঠা ২ ↩︎
  923. ইসলামকিউএ ৯৫৪৩০; দানি, কিতাবুন নাকত, পৃষ্ঠা ১২৯ ↩︎
  924. দানির আল-মুহকাম; মুদ্রিত পৃষ্ঠা ৫, ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামারের নামে বর্ণনা ↩︎
  925. দানির আল-মুহকাম; মুদ্রিত পৃষ্ঠা ৬, নাসর ইবনে আসিমের নুকতা ও পাঁচ–দশ আয়াতের চিহ্ন ↩︎
  926. দানির আল-মুহকাম; আবুল আসওয়াদ, ইয়াহইয়া, নাসর ও খলিলের কাজ সম্পর্কে দানির ব্যাখ্যা ↩︎
  927. যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৪/৮২; আবুল আসওয়াদের পরিচয় ↩︎
  928. দানির আল-মুহকাম; মুদ্রিত পৃষ্ঠা ৩–৪, যিয়াদ ও আবুল আসওয়াদের বিবরণ ↩︎
  929. দানির আল-মুহকাম; মুদ্রিত পৃষ্ঠা ৭, খলিলের স্বরচিহ্নের আকৃতি ↩︎
  930. দানির আল-মুহকাম; মুদ্রিত পৃষ্ঠা ৯, ইসমাইল আল-কিস্তের মুসহাফে বিন্দুর ভিন্ন অবস্থান ↩︎
  931. ইসলামকিউএ ২৩৪৮৭; উদ্ধৃত মানাহিলুল ইরফান ১/২৮০–২৮১ ↩︎
  932. ইবনে জাওযি, আল-মুনতাযাম, ৯৫ হিজরির মৃত ব্যক্তিদের বিবরণ; হাজ্জাজের পরিচয় ↩︎
  933. দানির আল-মুহকাম; মুদ্রিত পৃষ্ঠা ১৩, কিসাইয়ের পাঠ অনুসারে মুসহাফে চিহ্ন বসানো ↩︎
  934. দানির আল-মুহকাম; মুদ্রিত পৃষ্ঠা ১০, নুকতার বিরোধিতা ও ইবনে মাসউদের বক্তব্য ↩︎
  935. দানির আল-মুহকাম; ছোট ও প্রধান মুসহাফ সম্পর্কে মালিকের মত ↩︎
  936. দানির আল-মুহকাম; মুদ্রিত পৃষ্ঠা ২০–২১, এক মুসহাফে বিভিন্ন পাঠের রঙভিত্তিক উপস্থাপনা ↩︎
  937. দানির আল-মুহকাম; মুদ্রিত পৃষ্ঠা ২০, সবুজ ও লাল রঙে ভিন্ন পাঠের মর্যাদা ↩︎
  938. ইবনে আবি দাউদ, কিতাবুল মাসাহিফ; মুদ্রিত পৃষ্ঠা ৪৬৩–৪৬৪, হাজ্জাজের এগারো পরিবর্তনের পূর্ণ প্রতিবেদন ↩︎
  939. তাফসীরে জালালাইন, জালালুদ্দিন মহল্লী এবং জালালুদ্দিন সুয়ুতী, ইসলামিয়া কুতুবখানা প্রকাশনী, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৮ ↩︎
  940. তাফসিরে জালালাইন, ইউনুস ১০:২২; পূর্ণ আরবি ব্যাখ্যা ↩︎
  941. কুরতুবি, তাফসির; ইউনুস ১০:২২ ↩︎
  942. ইসলামকিউএ ২৩৪৮৭; কিতাবুল মাসাহিফের হাজ্জাজ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি ↩︎
  943. দানির আল-মুকনি; মুদ্রিত পৃষ্ঠা ১০৮, ইউনুসের আঞ্চলিক রূপ ↩︎
  944. আনফাল ৮:৩৯; পূর্ণ আয়াত ও ইবনে আশুরের তাফসির ↩︎
  945. তাফসীরে মাযহারী, আল্লামা কাজী মুহাম্মদ ছানাউল্লাহ পানিপথী, হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া প্রকাশনী, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৯ ↩︎
  946. ইবনে আশুর, আত-তাহরীর ওয়াত-তানওয়ীর; আনফাল ৮:৩৯ ↩︎
  947. ইসলামকিউএ ২৩৪৮৭; আব্বাদ ইবনে সুহাইবের সূত্রে প্রতিবেদনের মূল্যায়ন ↩︎
  948. তাফসির বাগাবি, মুমিনুন ২৩:৮৭; সাধারণ ও বসরার পাঠ ↩︎
  949. তাফসির কুরতুবি, তাকভির ৮১:২৪; যা–দোয়াদ ও অর্থের পার্থক্য ↩︎
  950. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ৩/৬৬ ↩︎
  951. ইসলামকিউএ, ফতোয়া ১০৫৭৪৬: নসখের সংজ্ঞা ↩︎
  952. সূরা ১৭ঃ আয়াত ৭৭ ↩︎
  953. সূরা ৪৮ঃ আয়াত ২৩ ↩︎
  954. সূরা ৩৫ঃ আয়াত ৪৩ ↩︎
  955. সূরা বাকারাঃ ১০৬ ↩︎
  956. সূরা নাহলঃ ১০১ ↩︎
  957. আল-ইতকান, ৩/৭০ ↩︎
  958. ইসলামকিউএ, ফতোয়া ১৭৬৯৭২: তিলাওয়াত রহিত হলেও বিধান বহাল ↩︎
  959. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ৩/৭১: বিধান রহিত, তিলাওয়াত বহাল ↩︎
  960. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪১৭৪ ↩︎
  961. সহিহ বুখারি, ৪৫৩০: ইবনুয যুবায়র ও উসমানের কথোপকথন ↩︎
  962. তাফসির ইবনে কাসীর, বাকারা ২:১০৬: হালাল–হারাম ও অনুমতির পরিবর্তন ↩︎
  963. তাফসির ইবনে কাসীর, বাকারা ২:১০৬: হাসান বসরীর বক্তব্য ↩︎
  964. তাবারি, জামিউল বায়ান, ২/৪৭৪–৪৭৮: “আও নুনসিহা”-র ব্যাখ্যা ↩︎
  965. তাফসির ইবনে কাসীর, আ‘লা ৮৭:৭: ব্যতিক্রম ও পাঠ তুলে নেওয়া ↩︎
  966. আল ফাউযুল কবীর ফি উসুলিত তাফসীর, শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী ↩︎
  967. ইসলামওয়েবে আল-ফাওযুল কবীরের পাঠ; শাহ ওয়ালিউল্লাহর বক্তব্য ↩︎
  968. শাহ ওয়ালিউল্লাহ, আল-ফাওযুল কবীর, দ্বিতীয় অধ্যায়: নাসেখ–মানসুখ; আরবি সংস্করণ ↩︎
  969. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ৩/৬৯: মক্কীর উদ্ধৃতিতে মেয়াদ ও নসখের পার্থক্য ↩︎
  970. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ৩/৬৯: সূরার চার শ্রেণির উদ্ধৃত বিভাগ ↩︎
  971. আল-ইতকান, ৩/৬৯–৭০; সূরা-বিভাগের আলোচনা ↩︎
  972. সুয়ূতি, মু‘তারাকুল আকরান, ১/৯৪: ইবনুল হাসসারের নসখ নির্ধারণের নীতি ↩︎
  973. গাযালী, আল-মুস্তাসফা, ১/১০৩: সাহাবির নসখসংক্রান্ত বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা ↩︎
  974. আল-মুস্তাসফা, ১/১০৩: “আমাদের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য” বলে গাযালীর সিদ্ধান্ত ↩︎
  975. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ৩/৬৭: কোরআনকে সুন্নাহ দিয়ে রহিত করা নিয়ে মতভেদ ↩︎
  976. আল-ইতকান, ৩/৬৭: সুন্নাহ দিয়ে কোরআন রহিত করার মত ↩︎
  977. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ৩/৭৮: বিন্যাসে নাসেখের আগে অবস্থান ↩︎
  978. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ২১০১৩৯: জাসসাসের আল-ফুসূলের উদ্ধৃতি ↩︎
  979. কোরআন, বাকারা ২:২৪০: এক বছর পর্যন্ত সুবিধা ও বাড়ি থেকে বের না করা ↩︎
  980. কোরআন, বাকারা ২:২৩৪: চার মাস দশ দিনের অপেক্ষা ↩︎
  981. তাফসির ইবনে কাসীর, বাকারা ২:২৪০: অধিকাংশের নসখ-মত ↩︎
  982. সহিহ বুখারি, ৪৫৩১: মুজাহিদের ব্যাখ্যায় বছর পূর্ণ করা ও ঐচ্ছিক বাসস্থান ↩︎
  983. সূরা নাহল, আয়াত ৬৭ ↩︎
  984. তাফসির ইবনে কাসীর, নাহল ১৬:৬৭: হারাম করার আগের অনুমতি ↩︎
  985. সূরা বাকারা, আয়াত ২১৯  ↩︎
  986. ইসলামকিউএ, ফতোয়া ১৩১৫০২: নামাজের সময়ে নিষেধ ও অন্য সময়ে মদপান ↩︎
  987. সূরা মায়িদা, আয়াত ৯০-৯১ ↩︎
  988. সুনান আবু দাউদ, ৩৬৭০: উমরের বারবার স্পষ্ট বক্তব্য চাওয়া ↩︎
  989. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৩৬৭১ ↩︎
  990. সুনান আবু দাউদ ৩৬৭১ ↩︎
  991. জামি আত-তিরমিযী, ৩০২৬: আলীর নামে ভুল পাঠের নির্দিষ্ট ভাষা ↩︎
  992. সূরা নিসা, আয়াত ৪৩ ↩︎
  993. কোরআন, মুজাদালা ৫৮:১২: ব্যক্তিগত আলাপের আগে সদকা ↩︎
  994. কোরআন, মুজাদালা ৫৮:১৩: আগের শর্তের পরবর্তী নির্দেশ ↩︎
  995. তাফসীরে ইবনে কাসীর; মুজাদালা ৫৮:১৩ ↩︎
  996. জামি আত-তিরমিযী, ৩৩০০: সদকার পরিমাণ নিয়ে কথোপকথন ↩︎
  997. তাফসির কুরতুবী, মুজাদালা ৫৮:১৩: শর্ত বহাল থাকার সময় নিয়ে ভিন্ন বর্ণনা ↩︎
  998. কোরআন, মুমতাহিনা ৬০:১০: পরীক্ষা ও ফেরত না দেওয়ার নির্দেশ ↩︎
  999. তাফসীতে জালালাইন, প্রথম খণ্ড, ইসলামিয়া কুতুবখানা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২৭৭ ↩︎
  1000. তাফসির কুরতুবী, মুমতাহিনা ৬০:১০: ফেরত দেওয়ার চুক্তিগত শর্তে পরিবর্তন ↩︎
  1001. সহিহ বুখারি, ৪৮৯১: মুমতাহিনার বায়আতের শর্ত দিয়ে নারীদের পরীক্ষা ↩︎
  1002. তাফসির কুরতুবী, মুমতাহিনা ৬০:১০, সপ্তম মাসআলা: মোহর ফেরত দেওয়ার বিধান ↩︎
  1003. কোরআন, বাকারা ২:১০৯: ক্ষমা ও উপেক্ষার নির্দেশের সময়গত শর্ত ↩︎
  1004. জাসসাস, আহকামুল কোরআন, ১/৭৪: মাআমার–কাতাদার নসখ-মত ↩︎
  1005. জাসসাস, আহকামুল কোরআন, ১/৭৪: ইবন আব্বাসের নামে সংকলিত বিস্তৃত মত ↩︎
  1006. তাফসির ইবনে কাসীর, বাকারা ২:১০৯: ক্ষমার নির্দেশ রহিত হওয়ার ব্যাখ্যা ↩︎
  1007. কোরআন, তাওবা ৯:৫: যুদ্ধের নির্দেশ ও পথ ছেড়ে দেওয়ার শর্ত ↩︎
  1008. কোরআন, তাওবা ৯:২৯: জিজিয়া ও অধীনতার শর্ত ↩︎
  1009. কোরআন, তাওবা ৯:৪: মেয়াদ পর্যন্ত চুক্তি পূরণ ↩︎
  1010. কোরআন, তাওবা ৯:৬: আশ্রয় ও নিরাপদ স্থানে পৌঁছানো ↩︎
  1011. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ৩/৭৮: ইবনুল আরবীর ১২৪ আয়াতসংক্রান্ত মত ↩︎
  1012. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ৩/৭৮: ইবনুল আরবীর মতে আয়াতের শেষ দিয়ে প্রথম অংশ রহিত ↩︎
  1013. তাফসীরে জালালাইন, জালালুদ্দিন মহল্লী এবং জালালুদ্দিন সুয়ুতী, ইসলামিয়া কুতুবখানা প্রকাশনী, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৯ ↩︎
  1014. তাফসির জালালাইনের বাংলা সংস্করণ, পৃষ্ঠা ২৭৯-এর মূল স্ক্রিনশট ↩︎
  1015. তূফী, শরহু মুখতাসারির রওদা, ২/২৬৭–২৬৮: চিকিৎসক ও সময়ভেদে উপকারের উপমা ↩︎
  1016. তাফসীরে ইবনে কাসীর, আল্লামা ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬২৩-৬২৭ ↩︎
  1017. তাফসির ইবনে কাসীর, বাকারা ২:১০৬: উপকার ও সহজতার ব্যাখ্যা ↩︎
  1018. কোরআন, আনবিয়া ২১:২৩: বিধানদাতা ও অধীনদের জবাবদিহির পার্থক্য ↩︎
  1019. সুনান আবু দাউদ, ৪৬০৪: কিতাবের সঙ্গে অনুরূপ উৎস ও অতিরিক্ত বিধান ↩︎
  1020. ইসলামকিউএ, ১২৮১৬২; ইবন বায, মাজমুউল ফাতাওয়া ২৫/৫৮–৬১: দ্বিতীয় ওহি ↩︎
  1021. খতিব বাগদাদি, আল-কিফায়া: কিতাব ও সুন্নাহর বিধানে সমতার অধ্যায় ↩︎
  1022. সুনান দারিমি, মুকাদ্দিমা, “সুন্নাহ আল্লাহর কিতাবের বিচারক” অধ্যায়, বর্ণনা ৫৮৭ ↩︎
  1023. ইসলামকিউএ, ১৩৮৭৪২; আল-কিফায়ার সূত্রে মাকহুলের বক্তব্য ↩︎
  1024. ইসলামওয়েব, ৯৯০১৪: যরকাশির সূত্রে আহমদ ইবনে হাম্বলের উক্তি ↩︎
  1025. ইসলামকিউএ, ১৮৫০০৩; খতিব বাগদাদি, আল-কিফায়া পৃষ্ঠা ১৫-এর সূত্রে ইমরানের বক্তব্য ↩︎
  1026. সহিহ বুখারি, ৬৩১: মুহাম্মদকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখা গেছে সেভাবে পড়ার নির্দেশ ↩︎
  1027. সহিহ বুখারি, ১৪৫৪: আবু বকরের পত্রে জাকাতের নেসাব ও হার ↩︎
  1028. সহিহ মুসলিম, ১২৯৭: হজের পদ্ধতি শিখে নেওয়ার নির্দেশ ↩︎
  1029. সহিহ বুখারি, ৬৭৮৯: হাত কাটার জন্য এক-চতুর্থাংশ দিনারের সীমা ↩︎
  1030. কোরআন, নিসা ৪:২৪: নিষিদ্ধ তালিকার বাইরের অনুমোদন ↩︎
  1031. সহিহ বুখারি, ৫১০৯: নারী ও তাঁর ফুফু–খালাকে একত্র বিবাহে নিষেধ ↩︎
  1032. গাজালি, আল-মুস্তাসফা, “নসের ওপর বৃদ্ধি কি নসখ”: তাওয়াফের শর্ত ও একক বর্ণনা ↩︎
  1033. ইসলামওয়েব, ১১৮২৮: আহাদের সংজ্ঞা ও তার বিভাগ ↩︎
  1034. ইসলামকিউএ, ১৩৮৭৪২: ইবন নাজ্জার ও ইবন মুফলিহের সূত্রে বিশেষায়নের মতভেদ ↩︎
  1035. সহিহ বুখারি, ৬৭৬৪: মুসলমান ও কাফিরের মধ্যে উত্তরাধিকার নিষেধ ↩︎
  1036. জাসসাস, আহকামুল কোরআন: বাকারা ২:১০৬-এর ব্যাখ্যায় সুন্নাহ দিয়ে নসখের অনুমোদন ↩︎
  1037. যরকাশি, আল-বাহরুল মুহিত, ৫/২৬২–২৭২: সুন্নাহ দিয়ে কোরআন রহিত করার মতভেদ ↩︎
  1038. আল-বাহরুল মুহিত: শাফেয়ির আল-রিসালা থেকে সুন্নাহ ও কিতাবের সম্পর্ক ↩︎
  1039. ইসলামকিউএ, ১৩৮৭৪২: শানকিতির মতে পরবর্তী আহাদ দিয়ে মুতাওয়াতির রহিতকরণ ↩︎
  1040. কোরআন, বাকারা ২:১৮০: পিতা–মাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য অসিয়ত ↩︎
  1041. কোরআন, নিসা ৪:১১: অসিয়ত ও ঋণের পরে উত্তরাধিকারের অংশ ↩︎
  1042. সুনান আবু দাউদ, ২৮৭০: “উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই” ↩︎
  1043. তাফসির ইবনে কাসীর, বাকারা ২:১৮০: সাধারণ নির্দেশের কিছু সদস্যের বিধান অপসারণ ↩︎
  1044. যরকাশি, আল-বাহরুল মুহিত: ইবন ফুরাকের সূত্রে আশআরির অসিয়তবিষয়ক অবস্থান ↩︎
  1045. জাসসাস, আহকামুল কোরআন, ১/২০৭–২০৯: উত্তরাধিকারীদের অনুমোদনে অসিয়ত ↩︎
  1046. কাসানি, বাদায়েউস সানায়ে: অসিয়তগ্রহীতার শর্ত ও অন্য উত্তরাধিকারীদের অধিকার ↩︎
  1047. কোরআন, আনআম ৬:১৪৫: ওহিতে পাওয়া নিষিদ্ধ খাদ্যের সীমিত তালিকা ↩︎
  1048. সহিহ বুখারি, ৫৫২০: খাইবারে গাধার মাংসে নিষেধ ও ঘোড়ার মাংসে অনুমতি ↩︎
  1049. সহিহ মুসলিম, ১৯৩৪ক: দাঁতওয়ালা শিকারি পশু ও নখরওয়ালা পাখির নিষেধ ↩︎
  1050. সহিহ বুখারি, ৫৫২৯: গাধার নিষেধের খবরের প্রসঙ্গে ইবন আব্বাসের আয়াত পাঠ ↩︎
  1051. তাফসির ইবনে কাসীর, আনআম ৬:১৪৫: পরবর্তী নিষেধ ও নসখের পরিভাষা ↩︎
  1052. তাফসির কুরতুবী, নুর ২৪:২, দ্বিতীয় মাসআলা: বেত্রাঘাত ও রজমের শ্রেণি ↩︎
  1053. তাফসির কুরতুবী, নুর ২৪:২: বেত্রাঘাতের সঙ্গে অতিরিক্ত দণ্ডের মত ↩︎
  1054. যরকাশি, আল-বাহরুল মুহিত, ৫/২৭০: সায়রাফির ব্যাখ্যায় সুন্নাহর ভূমিকা ↩︎
  1055. কোরআন, বাকারা ২:২১৭: ধর্মত্যাগ ও অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুর পরিণতি ↩︎
  1056. কোরআন, নিসা ৪:১৩৭: বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের পুনরাবৃত্ত পরিবর্তন ↩︎
  1057. সহিহ বুখারি, ৬৯২২: ধর্ম পরিবর্তনকারীর হত্যার নির্দেশ ↩︎
  1058. ইসলামকিউএ, ২২১৮৫২; ইবন আশুরের সূত্রে ইসলামে থেকে যাওয়ার জবরদস্তি ↩︎
  1059. ইসলামকিউএ, ১৬৫৪৯২: মুসলমান পিতা–মাতার সন্তান ও পরবর্তী ধর্মত্যাগ ↩︎
  1060. ইবনে হুমাম, ফাতহুল কাদির, ৬/৭২–৭৩: ধর্মত্যাগী নারীর বন্দিত্ব ↩︎
  1061. নববি, শরহু সহিহ মুসলিম, ভূমিকা, ১/১১২: বিশ্বস্ত একক সংবাদ, সম্ভাব্য জ্ঞান ও বাধ্যতামূলক আমল ↩︎
  1062. ইসলামকিউএ, ৭০৪৫৫: একই হাদিসের সহিহ–দুর্বল নির্ধারণে আলেমদের মতভেদ ↩︎
  1063. সুনান আবু দাউদ, ১০১: অজুতে আল্লাহর নাম উচ্চারণসংক্রান্ত বর্ণনা ↩︎
  1064. সুনান তিরমিযী, ২৫: নাম উচ্চারণের হাদিসগুলোর সনদ সম্পর্কে আহমদের মূল্যায়ন ↩︎
  1065. সুনান তিরমিযী, ২৫: ইচ্ছাকৃতভাবে নাম উচ্চারণ না করা ও ভুলে যাওয়ার মধ্যে ইসহাকের পার্থক্য ↩︎
  1066. ইসলামকিউএ, ২১২৪১: অজুতে নাম উচ্চারণের বিধান, হাদিসের মান ও বাক্যের অর্থ নিয়ে মতভেদ ↩︎
  1067. ইসলামকিউএ, ৭০৪৫৫: হাদিসের মান বিচার করতে অক্ষম অনুসারীর বিশেষজ্ঞ নির্বাচন ↩︎
  1068. ইসলামকিউএ, ৩০৬২৫৩; শাতিবি, আল-ইতিসাম, ৩/২৭২: বিরোধ না থাকার বিশ্বাস ও সমন্বয় অনুসন্ধান ↩︎
  1069. ইসলামকিউএ, ২৯৬৭০২; ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, ৪/১৩৭–১৩৮: প্রকৃত বিরোধ অস্বীকার ↩︎
  1070. ইসলামওয়েব গ্রন্থাগার, “মাসদারিয়্যাতুস সুন্নাহ”: উৎসের ক্রম, মর্যাদা ও প্রামাণ্যতা ↩︎
  1071. শামেলা, মা‘আলিমু উসুলিল ফিকহ: কোরআনের অতিরিক্ত স্বতন্ত্র সুন্নাহর সংজ্ঞা ↩︎
  1072. শাতিবি, আল-মুওয়াফাকাত: “সুন্নাহ কিতাবের বিচারক” কথার ব্যাখ্যা এবং কিতাবের আনুষ্ঠানিক অগ্রাধিকার ↩︎
  1073. সহিহ মুসলিম, ১৪০৫ঘ: মুহাম্মদ ও আবু বকরের আমলের মুতআ এবং উমরের নিষেধ ↩︎
  1074. সহিহ মুসলিম, ১৪০৫ঙ: দুই মুতআ সম্পর্কে জাবিরের বক্তব্য ↩︎
  1075. সহিহ মুসলিম, ১৪০৭ক: আলীর সূত্রে খাইবারে মুতআ নিষেধের বর্ণনা ↩︎
  1076. সহিহ মুসলিম, ১৪০৬ঘ: সাবরার সূত্রে স্থায়ী নিষেধ ও সম্পর্ক শেষ করার নির্দেশ ↩︎
  1077. যারকানি, শরহুল মোয়াত্তা, ৩/২৩২–২৩৩: মুতআর অনুমতি–নিষেধের সময়ক্রম নিয়ে আলোচনা ↩︎
  1078. সহিহ মুসলিম, ১২১৭ক: নির্দিষ্ট মেয়াদের বিবাহের বিরুদ্ধে উমরের রজমের হুমকি ↩︎
  1079. কোরআন, বাকারা ২:১৯৬ এবং তাফসির ইবনে কাসীর: তামাত্তুর অনুমোদন ও পদ্ধতি ↩︎
  1080. সহিহ বুখারি, ৪৫১৮: হজের তামাত্তু, নিষেধ না আসা এবং পরবর্তী ব্যক্তিগত মত ↩︎
  1081. সহিহ বুখারি, ১৫৫৯: আবু মুসাকে ইহরাম ছাড়ার নির্দেশ এবং উমরের যুক্তি ↩︎
  1082. সহিহ মুসলিম, ১২২২: আবু মুসার ফতোয়া এবং উমরের স্বীকৃত আপত্তি ↩︎
  1083. জামি তিরমিযী, ৮২৪: তামাত্তু সম্পর্কে ইবনে উমরের বক্তব্য ও তিরমিযীর মূল্যায়ন ↩︎
  1084. তাফসির ইবনে কাসীর, বাকারা ২:১৯৬: উমরের নিষেধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ব্যাখ্যা ↩︎
  1085. কোরআন, নিসা ৪:১৭৬: দুই বোনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ ↩︎
  1086. কারাফি, আয-যাখিরা, ১৩/৭৫–৭৬: আউলের উদ্ভব, উমরের সিদ্ধান্ত ও ইবনে আব্বাসের আপত্তি ↩︎
  1087. ইসলামকিউএ, ১৩১৫৫৬: মূল অংশ পুরো দিতে অক্ষমতা ও আউলের হিসাব ↩︎
  1088. তাফসির ইবনে কাসীর, নিসা ৪:১১: দুই কন্যার দুই-তৃতীয়াংশ এবং অন্য দলিলের ভূমিকা ↩︎
  1089. বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা, আউল অধ্যায়, বর্ণনা ১২১৩২: ইবনে আব্বাসের আপত্তি ↩︎
  1090. ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, ফরায়েজ অধ্যায়: আউল ও ইবনে আব্বাসের বিকল্প পদ্ধতি ↩︎
  1091. বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা, বর্ণনা ১২১৩২: উমরের সামনে মত না দেওয়ার কারণ ↩︎
  1092. সুনান আবু দাউদ, ৩৯৫৪: উম্মু ওয়ালাদ বিক্রি এবং উমরের নিষেধ ↩︎
  1093. সুনান ইবনে মাজা, ২৫১৭: মুহাম্মদের জীবদ্দশায় উপপত্নী দাসী ও উম্মু ওয়ালাদ বিক্রির বিবরণ ↩︎
  1094. মোয়াত্তা মালিক, দাসত্বমুক্তি ও ওয়ালা অধ্যায়, বর্ণনা ৬; আরবি ক্রম ১৪৭১: উম্মু ওয়ালাদ সম্পর্কে উমরের বিধান ↩︎
  1095. ইবনুল মুনযির, আল-আওসাত, ১১/৬০৮–৬০৯: উম্মু ওয়ালাদের পরিচয় ও বিক্রির পক্ষে মালিকানাভিত্তিক যুক্তি ↩︎
  1096. আল-আওসাত, বর্ণনা ৮৭৮৫: উম্মু ওয়ালাদ সম্পর্কে ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত তুলনা ↩︎
  1097. আল-আওসাত, বর্ণনা ৮৭৮৪: উমর–উসমানের রায় ও আলীর পরবর্তী বিক্রয়-অনুমতির মত ↩︎
  1098. কোরআন, বাকারা ২:২৩৩ এবং তাফসির কুরতুবী: দুধপানের সময়সীমা ও দুধসম্পর্ক ↩︎
  1099. সহিহ মুসলিম, ১৪৫৩ক: প্রাপ্তবয়স্ক সালিমকে দুধপান করানোর নির্দেশ ↩︎
  1100. সহিহ মুসলিম, ১৪৫৪: অন্য নবীপত্নীদের বিশেষ ছাড়ের ব্যাখ্যা ↩︎
  1101. মোয়াত্তা মালিক, দুধপান অধ্যায়, ১৪; আরবি ক্রম ১২৮৮: উমরের কাছে প্রাপ্তবয়স্ক দাসীর দুধপানের ঘটনা ↩︎
  1102. ইবনে হুমাম, ফাতহুল কাদির, ৩/৪৪৫–৪৪৬: প্রাপ্তবয়স্কের দুধপান রহিত হওয়ার ব্যাখ্যা ও উমরের ঘটনা ↩︎
  1103. মোয়াত্তা মালিক, দুধপান অধ্যায়, ১৫; আরবি ক্রম ১২৮৯: আবু মুসা ও ইবনে মাসউদের ভিন্ন ফতোয়া ↩︎
  1104. সহিহ বুখারি, ১১২৯: রমজানের কয়েক রাত জামাত ও পরে বের না হওয়ার কারণ ↩︎
  1105. সহিহ বুখারি, ২০০৯: মৃত্যুপরবর্তী ধারাবাহিকতা ও উমরের খিলাফতের শুরুর অবস্থা ↩︎
  1106. সহিহ বুখারি, ২০১০: উমরের সংগঠিত জামাত ও “উত্তম বিদআত” ↩︎
  1107. সহিহ বুখারি, ৭৩১: ফরজ ছাড়া ঘরে নামাজ পড়ার শ্রেষ্ঠত্বের নির্দেশ ↩︎
  1108. ইবনে হাজার, ফাতহুল বারি, ৪/২৯৭: তারাবির সংগঠন ও ঘরে নামাজ পড়ার মত ↩︎
  1109. সহিহ মুসলিম, ৮৬৭ক: প্রত্যেক বিদআত পথভ্রষ্টতা হওয়ার ঘোষণা ↩︎
  1110. ফাতহুল বারি, ৪/২৯৮: উমরের “বিদআত” এবং ভালো–মন্দ শ্রেণিবিভাগ ↩︎
  1111. মোয়াত্তা মালিক, রমজানের রাতের নামাজ অধ্যায়, ৪; আরবি ক্রম ২৫০: এগারো রাকাতের বর্ণনা ↩︎
  1112. মোয়াত্তা মালিক, একই অধ্যায়, ৫; আরবি ক্রম ২৫১: তেইশ রাকাতের বর্ণনা ↩︎
  1113. সুনান আবু দাউদ, ৪৬০৭: নবীর সুন্নাহ ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নাহ অনুসরণের উপদেশ ↩︎
  1114. সহিহ বুখারি, ৭২৫৭: অন্যায় কাজে আনুগত্যের অস্বীকৃতি ও আনুগত্যের শর্ত ↩︎
  1115. ইসলামওয়েব, ২১০১৩৯; জাসসাসের আল-ফুসুলের সূত্রে নসখের প্রমাণ ও সময়সীমা ↩︎
  1116. ইসলামকিউএ, উত্তর ৩৯২৫০৮: কোরআন কি আল্লাহর বাণীর নির্দেশিত অর্থ? ↩︎
  1117. সূরা আল হাক্কাহ, আয়াত ৪১ – ৪৭ ↩︎
  1118. সূরা আল হাক্কাহ, আয়াত ৪০ ↩︎
  1119. ইবন কাসির, সূরা হাক্কাহ ৬৯:৪০-এর তাফসির ↩︎
  1120. সুয়ূতি, আল-ইতকান, ১/১৫৯ 1 2
  1121. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩৯৫ক: ফাতিহা পাঠ ও আল্লাহর উত্তর ↩︎
  1122. কুরতুবি, সূরা ফাতিহা ১:৫-এর তাফসির ↩︎
  1123. তাবারি, সূরা ফাতিহা ১:২-এর তাফসির: উহ্য “তোমরা বলো” নির্দেশ ↩︎
  1124. সূরা নিসা, আয়াত ১ ↩︎
  1125. সূরা নিসা, আয়াত ১৪ ↩︎
  1126. সূরা নিসা, আয়াত ৩২ ↩︎
  1127. কোরআন ৪:১; ইবন কাসিরের তাফসিরসহ আরবি পাঠ ↩︎
  1128. কোরআন ৪:১৪; ইবন কাসিরের তাফসিরসহ আরবি পাঠ ↩︎
  1129. কোরআন ৪:৩২; ইবন কাসিরের তাফসিরসহ আরবি পাঠ ↩︎
  1130. সূরা যারিয়াত, আয়াত ৪৬- ৫১ ↩︎
  1131. ইবন কাসির, সূরা যারিয়াত ৫১:৪৭-এর তাফসির ↩︎
  1132. ইবনে আশুর, আত-তাহরীর ওয়াত-তানওয়ীর; যারিয়াত ৫১:৫০–৫১ ↩︎
  1133. ইবন আশুর, আত-তাহরির ওয়াত-তানওয়ির, যারিয়াত ৫১:৫০: বক্তা ও উহ্য নির্দেশ ↩︎
  1134. সূরা ইসরা, আয়াত ১ ↩︎
  1135. কোরআন ১৭:১; কুরতুবির তাফসিরসহ আরবি পাঠ ↩︎
  1136. শাওকানী, ফাতহুল কাদীর; সূরা ইসরা ১৭:১ ↩︎
  1137. কুরতুবি, সূরা ইসরা ১৭:১: “সুবহান” শব্দের ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ ↩︎
  1138. সূরা হুদ, আয়াত ১, ২ ↩︎
  1139. ইবনে আশুর, আত-তাহরীর ওয়াত-তানওয়ীর; হুদ ১১:২ ↩︎
  1140. ইবন কাসির, সূরা হুদ ১১:১: শব্দ, অর্থ ও গ্রন্থের উৎস ↩︎
  1141. ইবন আশুর, হুদ ১১:২: সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতার বাক্যের অবস্থান ↩︎
  1142. কোরআন ৭১:২: “তিনি বললেন”সহ সতর্ককারীর বক্তব্য ↩︎
  1143. সূরা আল কাউসার, আয়াত ১ ↩︎
  1144. সূরা নাহল, আয়াত ৬৩ ↩︎
  1145. সূরা আল মুজাদালাহ, আয়াত ২২ ↩︎
  1146. কোরআন ২ঃ ২৮৬ ↩︎
  1147. ইবন কাসির, বাকারা ২:২৮৬: সাধ্যাতীত বোঝার ব্যাখ্যা ↩︎
  1148. সূরা আশ-শুরা, আয়াত ১০ ↩︎
  1149. কোরআন ৪২:১০ ↩︎
  1150. তাবারি, সূরা শুরা ৪২:১০: নবীকে বলতে দেওয়ার ব্যাখ্যা ↩︎
  1151. কোরআন ৬ঃ৯৭ ↩︎
  1152. কোরআন ৬ঃ৯৮ ↩︎
  1153. কোরআন ৬ঃ৯৯ ↩︎
  1154. কোরআন ৬:১০৪; ইবন কাসির ↩︎
  1155. কোরআন ৬:১০৫; ইবন কাসির ↩︎
  1156. কোরআন ৬:১০৬; ইবন কাসির ↩︎
  1157. ইবন কাসির, আনআম ৬:১০৪: “আমি তোমাদের ওপর রক্ষক নই” ↩︎
  1158. ইসলামওয়েব: হাযফুল কাওল ফিল কুরআন; ইবনে আশুরের উদ্ধৃতি ↩︎
  1159. ইসলামওয়েব: বলার ক্রিয়া উহ্য থাকার ক্ষেত্রে প্রসঙ্গের সংকেত ↩︎
  1160. সূরা মুমতাহিনা, আয়াত ৭ ↩︎
  1161. ইসলামওয়েব ফতোয়া ১৫০১২১; আল-লুবাবের উদ্ধৃতি ↩︎
  1162. তাবারি, মুমতাহিনা ৬০:৭: বিরোধীদের ইসলাম গ্রহণ ও বন্ধুত্ব ↩︎
  1163. কুরতুবি, তাহরিম ৬৬:৫: “আসা”, নিশ্চয়তা এবং তালাকের শর্ত ↩︎
  1164. কুরতুবি, তাহরিম ৬৬:৫: পূর্বজ্ঞান ও ভয় প্রদর্শনের ব্যাখ্যা ↩︎
  1165. কোরআন ২০:৪৪; তাবারির তাফসিরসহ ↩︎
  1166. তাবারি, ত্বহা ২০:৪৪: “লাআল্লা”র দুটি ব্যাখ্যা ↩︎
  1167. সূরা আল গাশিয়াহ্‌, আয়াত ৬ ↩︎
  1168. সূরা আল হাক্কাহ, আয়াত ৩৬ ↩︎
  1169. সূরা আস সাফফাত, আয়াত ৬২, ৬৬ ↩︎
  1170. সূরা সাফফাত, আয়াত ৬৬ ↩︎
  1171. ইসলামওয়েব: তাআমু আহলিন নার ↩︎
  1172. কুরতুবি, গাশিয়াহ ৮৮:৬: খাদ্যবর্ণনা সমন্বয়ের ব্যাখ্যা ↩︎
  1173. ইবন কাসির, সাফফাত ৩৭:৬৬: যাক্কুম ও দারির সম্পর্ক ↩︎
  1174. সূরা ৬, আয়াত ১৬৪ 1 2
  1175. সূরা ১৭, আয়াত ১৫ 1 2
  1176. সূরা ২৯, আয়াত ১৩ 1 2
  1177. সূরা ১৬, আয়াত ২৫ 1 2
  1178. কোরআন ২৯:১২; ইবন কাসিরের তাফসিরসহ ↩︎
  1179. ইবন কাসির, ইসরা ১৭:১৫: নিজের দায় ও বিভ্রান্ত করার অতিরিক্ত দায় ↩︎
  1180. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৭৪: আহ্বানকারী ও অনুসারীর পাপ–পুরস্কার ↩︎
  1181. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৭৫৮ 1 2
  1182. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৬৭ঘ ↩︎
  1183. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৬৭ক: আগুন থেকে মুক্তির বিনিময় ↩︎
  1184. নববি, শারহু সহিহ মুসলিম; হাদিস ২৭৬৭-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  1185. নববি, শারহু সহিহ মুসলিম: পাপ প্রচলনের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা ↩︎
  1186. সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩০৪ ↩︎
  1187. মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস ১৭২৪: প্রকাশিত বাংলা পাঠ ↩︎
  1188. সহিহ বুখারি, হাদিস ১২৮৬–১২৮৮: আয়েশার আপত্তি ও কোরআনের উদ্ধৃতি ↩︎
  1189. সহিহ বুখারি, হাদিস ১২৮৯: ইহুদি নারী সম্পর্কে আয়েশার বর্ণনা ↩︎
  1190. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯৩২ক: আয়েশার সংশোধনের প্রাসঙ্গিক অংশ ↩︎
  1191. সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩০৪: উমরের আচরণ সম্পর্কে শেষ মন্তব্য ↩︎
  1192. সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৬৪২ ↩︎
  1193. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৭১৭; ইসলামিক ফাউন্ডেশন নম্বর ৪৬৪২ ↩︎
  1194. কোরআন ৮১:৮; ইবন কাসির ↩︎
  1195. কোরআন ৮১:৯; ইবন কাসির ↩︎
  1196. মুসনাদ আহমদ, হাদিস ১৫৪৯৩; ইসলামকিউএ ১৬০৭৯৮-এ উদ্ধৃত ঘটনা ↩︎
  1197. ইবন আবদিল বার, আত-তামহিদ ১৮/১২০; ইসলামকিউএতে উদ্ধৃত ↩︎
  1198. ইবন কাসির, তাকভির ৮১:৮: ইবন আব্বাসের নামে বিপরীত বক্তব্য ↩︎
  1199. সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩৮৩: মুশরিকদের সন্তানদের বিষয়ে উত্তর ↩︎
  1200. কোরআন ১৬:৩২; ইবন কাসিরের তাফসিরসহ ↩︎
  1201. কোরআন ৪৩:৭২; ইবন কাসিরের তাফসিরসহ ↩︎
  1202. কোরআন ৭:৪৩: পথনির্দেশ ও কাজের পরিণতি ↩︎
  1203. সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৬৭৩: কাজ, জান্নাত ও অনুগ্রহ ↩︎
  1204. ইবন বাত্তাল, শারহু সহিহ বুখারি ১০/১৮০; ইসলামকিউএতে উদ্ধৃত ↩︎
  1205. ইবন তাইমিয়্যা, মাজমুউল ফাতাওয়া ৮/৭০–৭১; ইসলামকিউএতে উদ্ধৃত ↩︎
  1206. ইসলামওয়েব: জান্নাতে প্রবেশের কারণ; ইবন হাজারের উদ্ধৃত ব্যাখ্যা ↩︎
  1207. কোরআন ৭:৫৪; সাদির তাফসিরসহ আরবি পাঠ ↩︎
  1208. কোরআন ৫০:৩৮: আকাশ, পৃথিবী ও মধ্যবর্তী সৃষ্টির ছয় দিন ↩︎
  1209. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৮৯: শনিবার থেকে শুক্রবার সৃষ্টির বর্ণনা ↩︎
  1210. ইবন কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া; ইসলামওয়েব ১৩৭৭৭৩-এ উদ্ধৃত ↩︎
  1211. ইবন তাইমিয়্যা, মাজমুউল ফাতাওয়া; একই হাদিসের সময়ক্রম-সমালোচনা ↩︎
  1212. ইসলামওয়েব ২২৩১২৯: আলবানির গ্রহণ ও সমালোচকদের মতভেদ ↩︎
  1213. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬২ক: নামাজের সংখ্যা নির্ধারণের সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক অংশ ↩︎
  1214. সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৯: পাঁচ, পঞ্চাশ ও অপরিবর্তিত বক্তব্য ↩︎
  1215. খাত্তাবির ব্যাখ্যা, মিরকাতের মাধ্যমে ইসলামওয়েব ১৭৩৪৮৫-এ উদ্ধৃত ↩︎
  1216. মিরকাত: পুনরাবেদন ও সন্তুষ্টির সম্পর্ক; ইসলামওয়েবে উদ্ধৃত ↩︎
  1217. ইবনে আবি আল-ইয, শরহুল আকিদাতিত তাহাবিয়্যাহ; কালাম প্রসঙ্গ ↩︎
  1218. ইবনে নাজ্জার, শরহুল কাওকাবিল মুনির, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯২–১৯৩ ↩︎
  1219. ইসলামকিউএ ৫৮৮০৩০; অসৃষ্ট কোরআন ও নির্দিষ্ট কথনের সূচনা ↩︎
  1220. হাকামি, আ‘লামুস সুন্নাতিল মানশুরাহ, পৃষ্ঠা ৪৫ ↩︎
  1221. একই গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৪৬ ↩︎
  1222. ইসলামকিউএ ২২৭৪৪১; বুখারী, খালকু আফআলিল ইবাদ, ২/৭০ ↩︎
  1223. The Qur’an is the word of Allah, may He be exalted, and is not created ↩︎
  1224. Doubts about the creation of the Qur’aan ↩︎
  1225. হারব আল-কিরমানি, ইজমাউস সালাফ ফিল ইতিকাদ, পৃষ্ঠা ৬৪ ↩︎
  1226. ইবনে কাছির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া; ২১৮ হিজরি, মিহনার সূচনা ↩︎
  1227. ইবনে কাছির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া; আহমদ ইবনে হাম্বলের মিহনার বিবরণ ↩︎
  1228. মিযযি, তাহযীবুল কামাল; আহমদ ইবনে নসর আল-খুযায়ীর জীবনী ↩︎
  1229. ইবনে কাছির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া; মিহনার পরবর্তী পরিস্থিতি ↩︎
  1230. হাকামি, আ‘লামুস সুন্নাতিল মানশুরাহ, পৃষ্ঠা ৪৬ ↩︎
  1231. ইবনে তাইমিয়া: যে ব্যক্তি বলে আল্লাহ মুসার সঙ্গে কথা বলেননি—তাকে নিয়ে ফতোয়া ↩︎
  1232. ইসলামকিউএ ৩৬২৬৬৪; মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব, উসুলুল ইমান, পৃষ্ঠা ১১–১২; কিতাবুত তাওহিদ, পৃষ্ঠা ১০৬ ↩︎
  1233. ‘লাওহে মাহফুয’ বলতে কি বুঝায়? এর অর্থ কি? ↩︎
  1234. ইসলামকিউএ ৭০০২; লিসানুল আরব, ২/৫৮৪ ↩︎
  1235. কোরআন ৮৫:২১; তাবারি ↩︎
  1236. কোরআন ৮৫:২২; তাবারি ↩︎
  1237. ইবনে কাছির, তাফসির ৮৫:২২; প্রচলিত উদ্ধৃতির খণ্ড–পৃষ্ঠা ৪/৪৯৭–৪৯৮ ↩︎
  1238. তাবারি, তাফসির ৪৩:৪ ↩︎
  1239. তাবারি, তাফসির ৫৬:৭৮ ↩︎
  1240. ইসলামকিউএ ৭০০২; ইবনুল কাইয়্যেম, আত-তিবইয়ান, পৃষ্ঠা ৬২ ↩︎
  1241. তাবারি, তাফসির ৮৫:২২ ↩︎
  1242. ইবনে কাছির, একই আয়াতের তাফসির ↩︎
  1243. ইসলামকিউএ ২৭৬৭৫৪; ইবনে কাছির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১/১০৪ ↩︎
  1244. ইসলামকিউএ ৭০০২; ফলকের অবস্থান ও উপাদানসংক্রান্ত বর্ণনার মূল্যায়ন ↩︎
  1245. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৫০৭ ↩︎
  1246. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৯ ↩︎
  1247. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৫৩খ ↩︎
  1248. সহিহ মুসলিম ২৬৫৩খ; আরবি মূল ও বর্তমান প্রচলিত নম্বর ↩︎
  1249. সুনান আবু দাউদ ৪৭০০; তাকদিরে বিশ্বাস ↩︎
  1250. কোরআন ৫৭:২২; তাবারি ↩︎
  1251. তাবারি, তাফসির ২২:৭০ ↩︎
  1252. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৫০১ ↩︎
  1253. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৬-১৬৭ ↩︎
  1254. সহিহ মুসলিম ২৬৫২ক; আদম ও মুসার বিতর্ক ↩︎
  1255. কোরআন ২:৩০; তাবারি ↩︎
  1256. কোরআন ১৫:৩৯; তাবারি ↩︎
  1257. কোরআন ১১১:৩; তাবারি ↩︎
  1258. ইবনে কাছির, সূরা লাহাবের তাফসির; বুখারির অবতরণ-পরিস্থিতির বর্ণনা ↩︎
  1259. কোরআন ৮১:২৮; তাবারি ↩︎
  1260. কোরআন ৮১:২৯; তাবারি ↩︎
  1261. কোরআন ১৮:১৭ ↩︎
  1262. কাহফ ১৮:১৭; আরবি পাঠ ↩︎
  1263. কোরআন ৭:১৭৮ ↩︎
  1264. আরাফ ৭:১৭৮; আরবি পাঠ ↩︎
  1265. মুরতাদা আয-যাবিদি, ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকিন; সাধ্যাতীত নির্দেশের আলোচনা ↩︎
  1266. কোরআন ১৩:৩৯; তাবারি ↩︎
  1267. তাবারি, তাফসির ১৩:৩৯, বর্ণনা ২০৪৮৯; ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত ব্যাখ্যা ↩︎
  1268. সূরা আল-আনাম, আয়াত ১১৫ ↩︎
  1269. ইবনে কাসীর, তাফসির; আনআম ৬:১১৫ ↩︎
  1270. তাফসীরে ইবনে কাসীর, আল্লামা ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭ ↩︎
  1271. তাফসীরে ইবনে কাসীর; আনআম ৬:১১৫ ↩︎
  1272. সূরা ইউনুস, আয়াত ৬৪ ↩︎
  1273. ইবনে কাসীর, তাফসির; ইউনুস ১০:৬৪ ↩︎
  1274. কোরআন ৬ঃ৩৪ ↩︎
  1275. তাফসীরে ইবনে কাসীর, আল্লামা ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৪৯ ↩︎
  1276. ইবনে কাসীর, তাফসির; আনআম ৬:৩৪ ↩︎
  1277. কাহফ ১৮:২৭; আরবি পাঠ: ইবনে কাসীরের তাফসির ↩︎
  1278. তাফসীরে ইবনে কাসীর; কাহফ ১৮:২৭ ↩︎
  1279. সূরা হিজর, আয়াত ৯ ↩︎
  1280. ইবনে কাসীর, তাফসির; হিজর ১৫:৯ ↩︎
  1281. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৯৪৩ ↩︎
  1282. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮৬৫ক ↩︎
  1283. খাত্তাবি, আলামুল হাদিস; “লা ইয়াগসিলুহুল মাউ” ব্যাখ্যা; ইসলামওয়েব ↩︎
  1284. নববি, শরহু সহিহ মুসলিম; কিতাবের অক্ষয়তার ব্যাখ্যা; ইসলামওয়েব ↩︎
  1285. বাইবেল, ২ তীমথিয় ৩:১৬; কিং জেমস অনুবাদ ↩︎
  1286. ইবনে হাযম, আল-ইহকাম ফি উসূলিল আহকাম; ইসলামওয়েব, ফতোয়া ২১২৮১৮ ↩︎
  1287. ইবনে হাযমের সংরক্ষণ-যুক্তির ধারাবাহিক বক্তব্য; ইসলামওয়েব ↩︎
  1288. খতিব বাগদাদি, আল-কিফায়া ফি ইলমির রিওয়ায়া; ইসলামকিউএ ১১৮১৭৬ ↩︎
  1289. আবু যুরআর বক্তব্য; “আদালাতুস সাহাবা”; ইসলামওয়েব ↩︎
  1290. ইসলামকিউএ ১০০১২, “মান কাতাবাল কুরআন”; উসমানি একীকরণের ধর্মীয় ব্যাখ্যা ↩︎

About This Article

Genre: Quranic Compilation and Preservation Critique, Quranic Textual History, Hadith and Sira Analysis, Abrogation Studies, Islamic Legal History, and Critical Examination of Religious and Political Authority

Epistemic Position: Rational Skepticism, Secular Humanism, Historical Criticism, Textual Criticism, Source Criticism, Logical Analysis, and Evidence-Based Examination of Religious Claims

This article examines the formation of the accepted Quranic text, with particular emphasis on Uthman’s establishment of an official written standard and the processes of collection, selection, exclusion and revision before and after it. It investigates the relationship between claims of perfect preservation and the accounts of textual disagreement, missing recitations, competing codices, scribal intervention and political conflict preserved within Islamic literature.

The central argument is that religious authorization of a change does not establish historical absence of change. Describing a passage as abrogated, a reading as divinely permitted, or a caliph’s selection as an act of preservation does not erase the difference between earlier and later states of the text. Likewise, the eventual dominance of an approved mushaf does not demonstrate that every preceding collection was identical. A scripture’s declaration of its own protection also requires independent examination rather than functioning as proof of the very historical claim under investigation.

The article discusses the first-revelation narratives, competing identifications of the earliest and latest revelations, the work of revelation scribes, memorisation and forgetting, the seven ahruf, the Satanic Verses reports, and additions associated with questions or objections raised during Muhammad’s lifetime. It examines the collections associated with Abu Bakr and Ali, Hafsa’s sheets, Uthman’s committee and linguistic instructions, the distribution of official copies, Ibn Masud’s resistance, the destruction of alternative codices, and Marwan’s later destruction of Hafsa’s sheets. These accounts connect the establishment of a textual standard with decisions about whose testimony, collection and reading would acquire binding authority.

The textual analysis addresses reports concerning the stoning passage, breastfeeding recitations, the sheet eaten by a domestic animal, forgotten suras, and passages remembered outside the accepted mushaf. It also examines disagreements over sura boundaries, arrangement, verse counting and the basmala; scribal-error allegations attributed to Uthman, Aisha and Ibn Abbas; Companion readings and regional codex differences; the introduction of consonantal dots and vowel signs; and revisions attributed to al-Hajjaj. The discussion distinguishes the wording of each report, its transmission history, the textual differences it describes and the historical conclusions supported by that evidence.

The legal analysis examines abrogation of recitation and rulings, retention of recitation after a ruling’s withdrawal, and retention of a ruling after the reported removal of its Quranic wording. It considers changes involving widowhood provisions, alcohol and obligatory charity before private consultation, alongside the authority exercised through hadith, juristic interpretation and caliphal intervention. These cases expose the difference between preserving a written sentence and preserving an unchanged legal system: the scope and consequences of a provision can change while its wording remains in the mushaf.

The article further investigates changes of speaker and grammatical person, internal inconsistencies, conflicts between Quranic statements and hadith reports, the created–uncreated Quran controversy, the mihna, the Preserved Tablet and predetermination. It analyses how claims of an eternal heavenly original relate to accounts of human questions, subsequent additions, textual selection and disputed interpretation. It also examines the circular dependence that arises when scripture authenticates its transmitters and those transmitters are then used to establish the scripture’s infallible preservation.

The source base includes the Quran, hadith collections, sira, tafsir, classical legal theory, reading traditions, and works on Quranic sciences and codices, including material by Ibn Hisham, Ibn Abi Dawud, al-Dani, al-Suyuti, Ibn Hajar, al-Nawawi and Ibn Kathir. Classical texts are examined through their wording and context, including editions and quotations available through Shamela, Islamweb and IslamQA. Reports concerning the same event are compared for chronology, textual variation and source dependence; repeated quotations from a common source are not counted as independent corroboration.

The article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com. Religious prestige, communal acceptance and inherited classifications carry no exemption from historical, logical or ethical scrutiny. Source statements, historical inferences and the author’s critical judgments remain distinct. Citation accuracy, source independence, chronology, textual comparison, evidentiary strength, factual consistency and logical validity are the criteria governing its conclusions.

আসিফ মহিউদ্দীন

আসিফ মহিউদ্দীন সম্পাদক সংশয় - চিন্তার মুক্তির আন্দোলন [email protected]

48 thoughts on

  1. পশ্চিমা ইতিহাসবিদ থিওফেন এর প্রবন্ধের একটি পাতা, যার সাথে ধর্মের সম্পর্ক থাকতে পারে

    বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদ থিওফেন হচ্ছেন সবচেয়ে প্রাচীন গ্রীক ইতিহাসবিদ, একমাত্র যিনি অত্যন্ত যত্ন করে প্রাচীন গ্রীক, বাইজেন্টাইন ও পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রাচীন ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছেn। তার সেই বিরাট ইতিহাস বইতে একটি ছোট কাহিনী পাওয়া যায়, যার সাথে সাথে ইসলামের নবী ও ধর্মের সম্পর্ক থাকতে পারে বলে দীর্ঘকাল থেকেই বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন। বলা প্রয়োজন, এটি হচ্ছে ইসলাম সম্বন্ধে প্রাচীন পশ্চিমের ইতিহাসবিদের লেখা একমাত্র তথ্য। মুসলমান ধর্ম প্রচারকেরা দের ধর্ম সম্বন্ধে যা প্রচার করে এটিতে তার প্রতিফলন না থাকায় দীর্ঘকাল তারা এটি সত্য হতে পারে বলে স্বীকার করে নি, এবং এখনও স্বীকার করে না। তবে, সাম্প্রতিক কালে ইসলামের যে ইতিহাস জানা যাচ্ছে তা সত্য বলে ধরে নিলে এটিকেও সত্য বলে ধরে নেয়া সম্ভব হবে। এই লেখাটির ইংরেজী অনেক অনুবাদ পাওয়া যায়। নীচে বাংলায় যা লেখা হয়েছে তা ‘সিরিল ম্যাঙ্গো’ র করা ইংরেজী অনুবাদের বাংলা ভার্সন।। নীচে ম্যাঙ্গো’র ইংরেজী মূল অনুবাদটিও দেয়া হয়েছে।

    ইতিহাসবিদ থিওফেন কনফেসর (মৃত্যু। ৮২২)ঃ থিওফেন কনফেসর একজন উন্নত রুচির মানুষ ছিলেন, যার চেহারা ছিল সুন্দর এবং যিনি খেলাধুলা পছন্দ করতেন। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি কন্সটান্টিনোপল-বিথিনিয়া এলাকায় বাস করেছেন । তার শিক্ষা বেশী না থাকলেও নিজের প্রতিটি লেখা চূড়ান্ত সততার সঙ্গে সম্পাদন করতেন। তিনি তার গ্রন্থে ইউরোপের প্রাচীন ইতিহাস ধারাবাহিক ভাবে অত্যন্ত সংক্ষেপে বর্ননা করেছে। এই ইতিহাসের বইতে সম্ভবতঃ ইসলাম সম্বন্ধে বর্ননাটি একেবারে ছোট, এক পৃষ্ঠারও কম।

    সিরিল ম্যাঙ্গো ঃ সিরিল ম্যাঙ্গ’র সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার সুনাম রয়েছে। তিনি থিওফেন কনফেসরের ইতিহাস বইটি অনুবাদ কজরেন দীর্ঘ পনেরো বতসর ধরে। নীচের লেখাটি এই গ্রন্থের ৪৬৪ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে।

    (থিওফেনের ইতিহাস বইয়ের ক্রমঃ ৩৩৩) এই বৎসর সারাসিনদের ভন্ড নবী মৌয়ামেড (Mouamed) মারা যায়। মৃত্যুর পূর্বে সে তার আত্মীয় আবৌবাচারস (Aboubacharos)কে তার স্থলাভিষিক্ত করে যায়। একই সময় তার প্রতিপত্তি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং সকলে ভীত হয়ে পড়ে। শুরুতে ভুল পথে চালিত ইহুদীরা তাকে তাদের নবী মোসেস যিনি ঈস্বরের সাথে কথা বলেছিলেন, তার অবতার বলে মনে করেছিল। (অন্য অনুবাদ থেকে সংগৃহীতঃ পরে তাদের উটের মাংস খাওয়া দেখে তাদের ভুল ভাঙ্গে। তাদের আর ফিরে যাবার পথ ছিল না বলে ) তারা তাকে তাদের নবী হিসেবে গ্রহন করে । তাদের সংখ্যা ছিল দশ এবং তারা তার সাথেই থেকে যায়।

    মৌয়ামেড এর উৎস সম্বন্ধে জানা যায়, সে আব্রাহামের পুত্র ইসমাইলের বংশে জন্মেছিল। আব্রাহামের দুই ছেলে ছিল- মৌডারোস (Moudaros) এবং রাবিয়াস (Rabias.) মৌডারোস এর পুত্র ছিল কৌরাসস, থেমাইমস, আসাডোস (Kourasos, Kaisos, Themimes, Asados, ) এবং অন্যান্য। এরা সবাই মিডিনাইট (Midianite) মরুভূমিতে গবাদি পশু চড়াতো এবং তাবুতে বাস করতো । এ ছাড়া লেকটান নামে অন্য এক গোত্রের লোকেরা তাদের কাছ থেকে দূরে থাকতো।

    মৌয়ামেড এতিম ও দুস্থ ছিল । সে চাডিগা (Chadiga ) নামে তার এক আত্মীয়ের কাছে চাকরী নিয়েছিল। এই কাজে সে উটের সাহায্যে মিসর এবং প্যালেস্টাইনে ব্যবসা করতো। ধীরে ধীরে সে এই মহিলাকে অধিকার করে ফেলে । পরে সে তাকে বিয়ে করে এবং তার উট সহ যাবতীয় সম্পত্তি দখল করে। প্যালেস্টাইন গিয়ে সে সেখানকার ইহুদী ও খৃষ্টানদের ধর্মীয় নানা বিষয় জানতে চায়।

    মৌয়ামেড এর মৃগী রোগ ছিল। এই খবর জানার পর সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে চাডিগা এমন একজন গরীব এবং মৃগী রোগ আক্রান্ত লোককে বিয়ে করার জন্য অনুতপ্ত হয়ে পড়ে। মৌয়ামেড তার স্ত্রীকে বলে, “আমি জিব্রাইল নামের এক স্বর্গীয় দূতকে দেখি এবং তাকে দেখলেই অজ্ঞান হয়ে পড়ি।“ চাডিগা তার বন্ধুর পরিচিত একজন তান্ত্রিকের সাথে যোগাযোগ করে। এই তান্ত্রিক মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করার জন্য ইতিপূর্বে বিতাড়িত হয়েছিল। চাডিগা তাকে দূতের নাম সহ সব কাহিনী জানায় । চাডিগাকে খুশী করার জন্য তান্ত্রিক বলে, “মৌয়ামেড ঠিকই বলেছে। এই দূতকেই আগের সব নবীদের কাছে পাঠানো হয়েছিল”।

    চাডিকা ছিল প্রথম মহিলা যে এই কথা বিশ্বাস করে । সে তার গোত্রের অন্য মহিলাদের জানায় যে মৌয়ামেড একজন নবী। প্রথমে শুধুমাত্র মেয়েদের মধ্যে একথা প্রচার হতে থাকে । এর পর প্রথম যে পুরুষ একথা জানে সে হলো আবুবাচোরাস, মৌয়ামেড উত্তরাধিকারী নির্বাচিত করে ছিল। এত্রিবোস (Ethribos) এলাকায় এ কাহিনী প্রচার হতে থাকে। শেষ পর্য্যন্ত তা পরিনত হয় যুদ্ধে। প্রথমে গোপনে প্রচার হতে থাকে দশ বছর ব্যাপী, পরে আরো দশ বছর এবং তার পরে প্রকাশ্যে নয় বৎসর।

    মৌয়ামেড তার লোকদের শিখিয়েছিল, ‘যে তার শত্রুকে হত্যা করবে বা শত্রুর হাতে নিহত হবে সে স্বর্গে যাবে’। মৌয়ামেড আরো বলেছিল, ‘স্বর্গে পাওয়া যাবে প্রচুর মাংস , সঙ্গম করার জন্য মেয়ে, সেখানে আছে মদ, মধু আর দুধের নদী। আর ঐ মেয়েরা হবে একেবারে ভিন্ন রকমের । সেখানে সঙ্গম হবে দীর্ঘস্থায়ী, সুখ থাকবে অফুরন্ত, সেখানে থাকবে ভোগ বিলাসের জন্য আরো অনেক কিছু’। সে আরো বলেছিল, মানুষের অপরের জন্য সহানুভূতি থাকা উচিত, এবং যারা ভূল করে তাদের সংশোধন করা উচিত।

    সিরিল ম্যাঙ্গো’ র করা ইংরেজী অনুবাদ। ঃ
    Translated by Cyril Mango:
    [333] In this year died Mouamed, the leader and false prophet of the Saracens, after appointing his kinsman Aboubacharos (to his chieftainship).[1] At the same time his repute spread abroad) and everyone was frightened. At the beginning of his advent the misguided Jews thought he was the Messiah who is awaited by them, so that some of their leaders joined him and accepted his religion while forsaking that of Moses, who saw God. Those who did so were ten in number, and they remained with him until his murder.[2] But when they saw him eating camel meat, they realized that he was not the one they thought him to be, and were at a loss what to do; being afraid to abjure his religion, those wretched men taught him illicit things directed against us, Christians, and remained with him.
    I consider it necessary to give an account of this man’s origin. He was descended from a very widespread tribe, that of Ishmael, son of Abraham; for Nizaros, descendant of Ishmael, is recognized as the father of them all. He begot two sons, Moudaros and Rabias. Moudaros begot Kourasos, Kaisos, Themimes, Asados, and others unknown.[3] All of them dwelt in the Midianite desert and kept cattle, themselves living in tents. There are also those farther away who are not of their tribe, but of that of lektan, the so-called Amanites, that is Homerites. And some of them traded on their camels. Being destitute and an orphan, the aforesaid Mouamed decided to enter the service of a rich woman who was a relative of his, called Chadiga, as a hired worker [334] with a view to trading by camel in Egypt and Palestine. Little by little he became bolder and ingratiated himself with that woman, who was a widow, took her as a wife, and gained possession of her camels and her substance. Whenever he came to Palestine he consorted with Jews and Christians and sought from them certain scriptural matters. He was also afflicted with epilepsy. When his wife became aware of this, she was greatly distressed, inasmuch as she, a noblewoman, had married a man such as he, who was not only poor, but also an epileptic. He tried deceitfully to placate her by saying, ‘I keep seeing a vision of a certain angel called Gabriel, and being unable to bear his sight, I faint and fall down.’ Now, she had a certain monk [4] living there, a friend of hers (who had been exiled for his depraved doctrine), and she related everything to him, including the angel’s name. Wishing to satisfy her, he said to her, ‘He has spoken the truth, for this is the angel who is sent to all the prophets.’ When she had heard the words of the false monk, she was the first to believe in Mouamed and proclaimed to other women of her tribe that he was a prophet. Thus, the report spread from women to men, and first to Aboubacharos, whom he left as his successor. This heresy prevailed in the region of Ethribos, in the last resort by war: at first secretly, for ten years, and by war another ten, and openly nine.[5] He taught his subjects that he who kills an enemy or is killed by an enemy goes to Paradise; and he said that this paradise was one of carnal eating and drinking and intercourse with women, and had a river of wine, honey, and milk, and that the women were not like the ones down here, but different ones, and that the intercourse was long-lasting and the pleasure continuous; and other things full of profligacy and stupidity; also that men should feel sympathy for one another and help those who are wronged. (Check in google.com)

  2. জিহাদী ধর্মের পর্দা উন্মোচন
    (প্রায় ১৪০০ বছর আগে মোহাম্মাদ নামে একজন লোক ধর্মযুদ্ধ বা জিহাদের মাধ্যমে সারা পৃথিবী দখলের একটি রাজনৈতিক প্রকল্প চালু করে । দীর্ঘকাল একটি ধর্ম নামে পরিচিত ছিল। সাম্প্রতিক কালে উন্নততর অনুবাদ ব্যবস্থা, ইন্টারনেটের মাধ্যমে তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং জিহাদী রাষ্ট্রগুলির নিয়ন্ত্রন-ব্যর্থতার ফলে ঐ প্রকল্পের অবিকৃত তথ্য আধুনিক বিশ্বের গোচরীভূত হয়েছে। এই দীর্ঘ সময় তারা এই নোংরা এবং সভ্য মানুষের কাছে অগ্রহনযোগ্য তথ্যগুলি কি করে বিকৃত ভাবে প্রচারে সক্ষম হয়েছিল, সেটাই এখন এক বিরাট বিস্ময় ।)
    কি ভাবে এলো- দুটি অমানবিক, অনৈতিক ও নোংরা আইন?
    চারিদিকে খোলা মরুভূমি, গাছ বলতে কিছু কাঁটা ঝোপ ঝাড় । বিশাল বালুকাময় জমির মধ্যে এখানে ওখানে খেজুর পাতায় ঘেরা বড় বড় বাড়ীর মধ্যে ছোট ছোট কুটীর । এক এক জন পুরুষের অনেকগুলি বউ। তারা আলাদা কুটীরে বাস করতো। রাতের বেলা স্বামীদেরকে একবার এই বউএর র ঘরে তার পর ঐ বউএর ঘরে যাতায়াত করতো হতো । সব বাড়ীর বৌ ঝি দের আবার রাতের বেলা পেট খালি করতে একটু দূরের খোলা মাঠে যেতে হতো। কেবলমাত্র রাতেই তারা এ কাজ করতে পারতো। এই সুযোগে কে যে কার ঘরে ঢুকতো তার হিসাব রাখা যেতো না । ফলাফল? জারজ সন্তান । যেহেতু বন্ধ করার উপায় ছিল না তাই এ নিয়ে তাদের মাথা ব্যাথা ছিল না । তবে যদি দেখা যেতো, বাপের মৃত্যুর ৩ বা ৪ বছর পর সন্তান হয়েছে, তাহলে তা লোকেরা ভাল ভাবে নিতো না । শিশুর জন্মের পর প্রথম কাজ ছিল দাই ঠিক করা। মক্কার কোন বাড়িতে সন্তান হয়েছে খবর পেলেই মরুচারী গরীব বেদুইন রমনীরা এসে শিশুকে নিয়ে যেতো । স্তনপান কাল শেষ হলে শিশুকে বাড়িতে ফিরিয়ে যেতো। বিনিময়ে পেতো উট, বকরী বা নগদ মুদ্রা। এই শিশুটির ক্ষেত্রে অজ্ঞাত করনে ঘটলো ব্যতিক্রম । তার জন্য এমন দাই চাওয়া হলো, যে পাচ বছর পর্য্যন্ত শিশুকে নিজের কাছে রাখতে পারবে। এই সময়কাল পরে সে বাড়িতে ফিরে এসেছিল । অন্য আত্মীয়রা তাকে দেখে খূশী না হলেও তার দাদা খুব খুশী হয়েছিল। এর কিছুদিন পর প্রথমে তার মা এবং পরে তার দাদা মারা যায় । তাকে প্রাপ্য সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার জন্য বাড়ির লোকেরা তাকে বাড়ী থেকে বের করে দেয়। কাছেই ছিল পৌত্তলকদের মন্দির, কাবা। বিভিন্ন পৌত্তলিক গোষ্ঠীর লোক এখানে পূজো দিতে আসতো। এটি ছিল মক্কার অন্যতম অর্থনীতির উৎস। এখন ছেলেটির থাকার জায়গা কখনো এবাড়ি, কখনো ওবাড়ী, কখনো বা মন্দিরের চাতাল। সারা দিনের কাজ মাঠে ভেড়া চড়ানো, মন্দিরের পূজা দেখা আর বসে বসে চিন্তা করা। এই সময়ই ধর্ম প্রচারক হবার চিন্তা তার মাথায় আসে।
    সেই দেশে কোন কৃষি কাজ ছিল না । প্রধান আয়করী কাজ ছিল দুটি, বাণিজ্য সামগ্রী নিয়ে দেশে বিদেশে যাওয়া, আর নয় তো ডাকাত দল গঠন করে বনিক বা ভ্রমনকারীর সম্পদ লুট করা। একটু বড় হয়ে সে মাঝে মাঝে বনিকদের সাথে বিদেশে যেত। সেখানে ছোট ছেলেরা ভালোই টাকা পেতো, যতটা না কাজের জন্য তার চেয়ে বেশী লুতু সার্ভিসের জন্য । সে দেশের পুরুষেরা এসব ছাড়া থাকতেই পারতো না । বিদেশে গিয়ে সে নিজের আগ্রহে ইহুদী আর খৃষ্টান ধর্ম সম্বন্ধে অনেক কিছু শিখে নেয়। এগুলি তার পরবর্তী জীবনে ধর্ম প্রচারে সহায়তা করে।
    অল্প বয়সে কষ্টকর কাজ করতে করতে তার মনে হতো, সব কিছু থাকতেও এই বয়সে সে পিতৃসম্পদ হারা। কেন? কারন তার দাদা ও পিতা মারা যাওয়ায় চাচারা তার সুযোগ নিয়েছে । কিন্তু এই জন্য কি সে দায়ী? সে ভাবলো, ‘শুধু আমি একা কেন এই পৃথিবীতে পিতার মৃত্যুর কারনে সম্পদ-হারা হবো? আমি এমন ধর্ম প্রচার করবে যেখানে কোন পিতৃহারা শিশু দাদার সম্পত্তি পাবে না।‘ সেই বয়সে সে বুঝতে পেরেছিল, তার দাদা ও মাএর সুবিধা হবে বলেই তাকে শিশুকালে মায়ের কাছ থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। সে ভাবলো, এত কিছু না করে তার দাদা তার মাকে বিয়ে করে নিলেই পারতো । তবে সে জানতো, সে দেশে পুত্রবধূ বিয়ের প্রচলন নেই। তাই সে প্রতিজ্ঞা করলো, সে নিজে এই কাজ করে তার ধর্মে পুত্রবধূ বিবাহের বিধান চালু করবে।
    তবে পরবর্তীকালে তার কোন পুত্রসন্তান না থাকায় সে পালকপুত্র গ্রহন করেছিল । তাকে তার নিজের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করিয়েছিল । সে আশা করেছিল, তার পিতার পদাঙ্ক অনুসরন করে পুত্রটি মারা যাবে। কিন্তু পালক পুত্রটি মারা না যাওয়ায় সে পালক পুত্রকে তার স্ত্রীকে তালাক দিতে বাধ্য করে এবং পরে সেই স্ত্রীকে বিয়ে করে এই নিয়ম প্রবর্তন করে। তার সুবিধা ছিল, সে এমন এক ঈশ্বর তৈরী করেছিল, যে তার সুবিধা ও ইচ্ছেমত নিয়ম তৈরী করে পাঠাত।
    উপরের লেখাটি জিহাদী মতবাদ উদ্ভব কালের পুস্তক ও দলিলপত্রের ভিত্তিতে লিখিত । এটি পড়ে যে কোন সাধারণ বুদ্ধির লোকও বুঝবে, “কি ভাবে জিহাদী ধর্মে উপরের দুইটি অমানবিক, অনৈতিক ও নোংরা আইন এসেছিল”।

  3. ধর্মের মধ্যে জেহাদ এল কি ভাবে?
    পিতৃহীন ছেলেটা দাদার মৃত্যুর পর আর একবার পিতৃহীন হলো। বাড়ীতে ঠাই হলো না, থাকতে হলো এবাড়ি ওবাড়ি বা পৌত্তলিকদের মন্দিরের চাতালে । কাজের মধ্যে উট ভেড়া চড়ানো আর মাঝে মাঝে বনিকদের সাথে যাওয়া । পৌত্তলিক মন্দিরে মূর্তিপূজকরা তাদের মূর্তিকে পূজা করতো । তাদের দেশে বিভিন্ন দল বা সম্প্রদায়ের মাঝে ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকতো । তাই তারা নিয়ম করেছিল যে, এই মন্দিরের সীমার মধ্যে ঝগড়া বিবাদ করা ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ। সেই থেকেই এটার নাম হয়েছিল ‘হারাম শরীফ’। বিদেশে যাবার সুবাদে সে ইহূদী আর খৃষ্টান ধর্ম সম্বন্ধে অনেক কিছু জেনেছিল। একটু বড় হলে সে এক ধনী বর্ষীয়ান খৃষ্টান মহিলার ব্যবসা দেখা শোনার কাজ পেলো। আর কিছুদিন পর এই মহিলার সাথে তার বিয়ে হয়ে গেল। এখন আর তার টাকার অভাব নেই। স্ত্রীর কাছ থেকে সে খৃষ্টান ধর্ম সম্বন্ধে অনে কিছু শিখেছিল। তার স্ত্রী ও শ্যালকের সাথে পরামর্শ করে সে ঠিক করলো, তারা নিজেরাই একটি ধর্ম প্রচার করবে।
    তারা জানতো, তার নিজের যা শিক্ষা তাতে সে ধর্মের কথা বললে কেউ তা বিশ্বাস করবে না। তার শ্যালক জানিয়েছিল, আগের প্রধান দুইটি ধর্মের নবীরা চলে গেছে, তবে দুই ধর্মেই বলা হয়েছে আরও নবী আসার কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনা করা হলো, তারা বলবে আগের ধর্মের ধারাবাহিকতায় সে নবী হয়ে এসেছে। প্রথমে সে ঐ দুটি ধর্মের কথা বলে তাদের অনুসারীদের নিজের দলে নিয়ে আসবে, তারপর নিজের ধর্ম ঢোকাবে। তার প্রভূর নাম হবে আল্লাহ। জিব্রাইল নামের এক দূত তার কাছে তার বানী নিয়ে আসবে । আগের দুটি ধর্ম আর তার ধর্ম, এই তিনটি ধর্ম মিলিয়ে হবে ‘প্রভূর কাছে আত্মসমর্পন কারী ধর্ম বা ইসলাম’। তারা আরো ঠিক করলো, এই ব্যবসায়ের কফিনে সে শেষ পেরেক পুতে দেবে এই বলে যে, সেই হলো সর্বশেষ নবী, এর পর আর কেউ আসবে না। স্থির করা হলো, সে একটা নির্জন স্থানে গিয়ে সে কিছুক্ষন থাকবে, তারপর একটা ঘোরের মতন করে সেখান থেকে ছুটে এসে বলবে, তার প্রভূ দূতের মাধ্যমে তাকে ধর্মের বানী পাঠিয়েছে। তার স্ত্রী এইগুলি অন্যদের বিশ্বাসযোগ্য করে প্রচার করবে।
    প্রায় দুই দশককাল ধরে চললো এই প্রচেষ্টা। কিন্তু এতে খৃষ্টান, ইহুদী বা কুরাইশ কারো মন গলানো গেলো না। উল্লেখ করা যায় যে, একজনের কাছে শোনা কথা অন্য একজনকে বলতে গেলে কিছুটা পরিবর্তন হয়ে যায়। তার ক্ষেত্রেও তাইই হয়েছিল। যেমন, খৃষ্টান ধর্মের এক সতী নারীকে ঈশ্বরের দ্বারা সন্তানসম্ভবা করার কাহিনীটি তার জবানীতে এলো, তার প্রভূ ফু দিয়ে বা নিজের জিহবাকে লিঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করে এ কাজটি করেছিল । অনেক চেষ্টার পর তার নিজের কুরাইশ গোত্রের কিছু লোক তার অনুগত হয়। আসলে এরা ধর্মের আকর্ষনে নয়, বরং তার অদ্ভূত কথা শুনতে বার বার তার কাছে আসতো। এতে তাদের আত্মীয় স্বজনেরা বিরক্ত হয়ে তাদের ত্যাগ করে । তখন তাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায় তারা তার কাছেই আশ্রয় নিয়েছিল । স্ত্রী ধনী ছিল বলে সেই টাকায়ই তাদের খাওয়া দাওয়া চলতো । কিন্তু এভাবে তার কাছে পড়ে থাকা লোকদের আত্মীয়রা বিরক্ত হয়ে তার ক্ষতি করার ঘোষনা দিল। এই সময় তার স্ত্রী মারা গেলো। এই অবস্থায় পত্নীর আয়ে প্রতিপালিত লোকটি আর তার এই কর্মকান্ড চালিয়ে চালিয়ে যেতে সাহস পেলো না। সে তার স্বল্প সংখ্যক শিষ্য শিষ্যা নিয়ে অন্য দেশে পালিয়ে গেল ।
    মদিনা নামের নতুন জায়গায় কোন চাষাবাদ ছিল না। ব্যবসাবাণিজ্য ছিল তবে ডাকাতিই ছিল প্রধান জীবিকা। ছোট ছোট মরু ডাকাতেরা বড় বাণিজ্য বহরে আক্রমন চালাতে সাহস পেতো না । আবার দলাদলির কারনে ছোট দলগুলি সঙ্ঘবদ্ধ বা বড়ও হতে পারছিল না । লোকটি ভাবলো, যদি সে তার ধর্মের মাধ্যমে এদেরকে সংঘটিত করতে পারে তাহলে তার ডাকাত সর্দার বা রাজা হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না। সে দেখলো, মদিনার কিছু মানুষ ইতিমধ্যে তাকে ধর্ম প্রচারক হিসেবে মেনে নিয়েছে। সে বুঝতে পারলো, এখানে তার ধর্মের সাফল্য নির্ভর করছে এই ডাকাতদের তাদের সুযোগ সুবিধা বজায় থাকে এমন একটা ধর্ম প্রচারের উপর ।

  4. কি ভাবে এলো- এমন উদ্ভট ও নোংরা বেহেস্ত-দোজখ?
    ডাকাতরা ডাকাতি করতো সাধারন মানুষের সম্পদ। সে ঠিক করলো, যারা তার ধর্ম বিশ্বাস করবে তারা হবে ধার্মিক, আর অন্যেরা সব হবে অধার্মিক। তার ধর্মের মূল মন্ত্র হবে আল্লাহ নামের এক দেবতাকে একমাত্র দেবতা বলে মেনে নিতে হবে। সেই সঙ্গে সে (মুহাম্মদ) যে তার একমাত্র প্রতিনিধি তা মানতে হবে। মরুভূমি অঞ্চলে অল্প জল দিয়ে হাত মুখ ধোয়ার একটা পদ্ধতি চালূ ছিল। সে এই পদ্ধতির সাথে তার প্রভূর নাম যুক্ত করে এটিকে তার প্রার্থনার পূর্বে অবশ্য করনীয় হিসেবে যুক্ত করল ।
    একনন “তার বিশেষ ধর্মের নামে জিহাদের মাধ্যমে তার পরিবারের জন্য সমগ্র পৃথিবী দখল করে নিতে হবে” এই গোপন মূল মন্ত্রের মাধ্যমে শুরু হলো তার প্রকল্প । যারা জিহাদ করবে তারা ‘গানি মতের মাল’ এই ধর্মীয় আইন অনুযায়ী লুন্ঠিত সম্পদ ও বন্দীদের তিন পঞ্চমাংশ পাবে । আল্লাহ পাবে এক পঞ্চমাংশ এবং সে নিজে পাবে এক পঞ্চমাংশ। মদিনার ডাকাতেরা এই নিয়ম মহা আনন্দে গ্রহন করেছিল। সে নিজে এক শ’এর বেশী অভিযানে অংশগ্রহন করেছিল। শৃংখলা রক্ষার জন্য সে কঠোর ধর্মীয় নিয়ম চালু করেছিল । যেমন, লুন্ঠিত দ্রব্যের হিসাব না দেয়া বা চুরি করার জন্য হাত কাটা, বিশ্বাস ভঙ্গের জন্য অঙ্গ হানি, ধর্মে অবিশ্বাস করলে বা ধর্ম ত্যাগ করলে গলাকাটা ইত্যাদি । আরবের বাইরে সারা পৃথিবীই তখন অন্য ধর্মের বা বিনা ধর্মের লোকের আবাস। তাই জিহাদের নামে অনন্তকাল ডাকাতি চালিয়ে যেতে কোন অসুবিধা হবার কথা নয়। বিশ্বাস পোক্ত করার জন্য সে দিনে পাচ বার দৈহিক ব্যায়াম সহ উপাসনা এবং বতসরে একমাস উপবাসের বিধান দিলো।
    সে জানতো, ইহূদী আর খৃষ্টান ধর্ম পরকালে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা এরা পছন্দ করে না। সে জানতো, এই ডাকাতেরা চায়, মাংস, মেয়েমানুষ, লুতুকর্ম, মদ, দুধ, মধু, ফল, ছায়া ও ঠান্ডা পানি । তাই সে জানালো, বেহেস্তে জিহাদী ও ধার্মিকদের এসব জিনিসই দেয়া হবে। সে আরো জানালো, যারা তার ধর্ম বিশ্বাস করবে না, সর্দারকে অমান্য করবে, ধর্ম ত্যাগ করবে অথবা জিহাদে অংশ গ্রহন করবে না, পরকালে তাদের স্থান হবে দোযখে, যেখানে শুধুই আগুন।
    ডাকাতদের ইহকালের স্বার্থ নিয়েও তার চিন্তা ছিল। সে জানতো, মদ খেলে মাথা ঠান্ডা রেখে তারা ডাকাতি করতে পারবে না । আর লুতুর কথা মনে হলেই তার নিজেরই কোথাও ব্যাথা লাগতো । কাজেই ইহলোকে সে এই দুইটি আইটেম বাদ দিল। মেয়েমানুষ সহজ লভ্য করার জন্য সে ধর্মীয় বিধান দিলো, পুরুষ মানুষ একসময় সর্বোচ্চ চারটি সহ যে কোন সংখ্যক মেয়ে বিয়ে করতে পারবে এবং তাদের দাসীদের ও গনি মতে প্রাপ্ত নারীদের ভোগ করতে পারবে। যে কোন সময় বিনা কারনে তারা স্ত্রীদের তালাক দিতে পারবে । তা ছাড়া জিহাদের লুন্ঠিত সম্পদ তো আছেই । । ডাকাতেরা আগে যুদ্ধ করতো সম্পদের জন্য । ডাকাতি, যা ছিলো একটি চরম অনৈতিক কাজ, তার ধর্মের বিধানে তা হয়ে গেলো জিহাদ বা ধর্মযুদ্ধ, বেহেস্ত অর্জনের উপায়। সে জানতো, পুরুষকে প্রাধান্য দিতে হলে মেয়েদের অধিকার সংকুচিত করতেই হবে। মেয়েদের ইহকালে ঠান্ডা রাখার জন্য সে রাখলো তালাক, হিল্লা ইত্যাদি। সে আরো বলল, স্বামীদের খুশী না রাখলে এবং ধর্ম পালন না করলে পরকালে তাদের জন্য আছে দোযখের আগুন । পৃথিবীর অন্য ধর্মগুলি বেহেস্ত দোযখ সম্বন্ধে কিন্তু নারী পুরুষের জন্য একই বিধান।
    এমন সব বাস্তবতার পরে যদি কেউ বলে, “পুরুষেরা বেহেস্তে গিয়ে , মাংস, মেয়েমানুষ, লুতুকর্ম, মদ, দুধ, মধু, ফল, ছায়া ও ঠান্ডা পানি পাবে। মেয়েরা স্বামীকে অসন্তুষ্ট করলে দোযখের আগুলে পুড়বে”, তাহলে কি স্পষ্ট বোঝা যায় না যে, একজন কেউ উত্তপ্ত মরুভূমি এলাকায় ডাকাতি পেশায় রত মানুষকে জিহাদ নামের ডাকাতিতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তাদেরকে জিনিসের প্রলোভন দেখাচ্ছে? যে কোন সৎ মানুষকে আজকের যুগে “মাংস, মেয়েমানুষ, লুতুকর্ম ও মদ”ীর লোভ দেখালে সে কি অপমানিত বোধ করবে না? একজন মেয়েকে যদি বলা হয়, তোমার কর্তব্য জিহাদী স্বামীকে সন্তুষ্ট করা এবং ধর্ম পালন করা। কর। না হলে তোমাকে আগুনে পোড়ানো হবে”- তাহলে এই ধর্ম সম্বন্ধে সে কি ভাববে?

  5. কি ভাবে সম্ভব হলো মদিনা রাজের বহিঃবিশ্ব জয় ।
    মদিনায় সাফল্যের পর তার জিহাদী নামের ডাকাত বাহিনী নিয়ে সে চলে গেল মারামারী নিষিদ্ধ বা হারাম মন্দিরের দেশে । নামমাত্র যুদ্ধ হলো। আত্মোত্সর্গকারী জিহাদীদের সঙ্গে যুদ্ধে কে জিতবে ? সেখানে তার কাজ, মূর্তি ভেঙ্গে ফেলা আর আরব উপদ্বীপকে অমুসলিম মুক্ত করা। এখানে দূরের ভক্তদের প্রধান পূজা দেবার জন্য তিন মাস এবং পরে আরো এক মাস সব রকম “হানাহানির জন্য নিষিদ্ধ” হিসেবে ঘোষিত ছিল ।
    ন্যায় নীতিহীন লোক, বিশেষতঃ প্রভূর নামে যার নিজেরই নিয়ম বানানোর সুবিধা আছে, তার জন্য অনেক কাজই সহজ হয়ে যায়। মক্কায় এসে সে বিভিন্ন গোত্র এবং দলের সাথে অনাক্রমন চুক্তি স্বাক্ষর করে । কলে সে নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু সময় পেয়ে যায়। এরপর সে পুরানো সকল চুক্তি বাতিল করে ঘোষনা করে, একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর এখানে তার ধর্মের লোক ছাড়া কেউ বাস করতে পারবে না। মৃত্যুর ভয়ে মানুষ তার ধর্মগ্রহন করে। নিয়ম করা হয়, জিহাদ বা ব্যবসা থেকে তাদের যা আয় হবে তা থেকে বার্ষিক শতকরা আড়াই ভাগ ট্যাক্স বা জাকাত দিতে হবে । সমস্যা দেখা দেয় খায়বার নামের এলাকায়। এখানকার লোকেরা কৃষিকাজ করতো বলে তাদের পক্ষে জিহাদে অংশগ্রহন সম্ভব ছিল না। তাদের আয়ের শতকরা পঞ্চাশ ভাগ ট্যাক্স ধার্য্য করা হয়। এই ট্যাক্সের নাম জিজিয়া । পরবর্তী কালে কিছু ইসলামী শাসক অমুসলিমদের জন্য এই জিজিয়া কর প্রবর্তন করে। প্রকৃত সত্য এই যে, ইসলামে অমুসলিমদের জন্য কোন ট্যাক্স নেই । কারন এই ধর্মে এই অমুসলিমদের বেচে থাকারই কোন অধিকার ছিল না। তার ধর্মে আরো বিধান রাখা হয় যে পৃথিবীর যে কোন স্থানে তার ধর্মের লোকের প্রার্থনা করার অধিকার আছে। তার রাজধানী শহরের উন্নয়নের জন্য সে ঘোষনা করে যে, তার ধর্মের সকল লোকের জীবনে কমপক্ষে একবার এই স্থানে ভ্রমন বা হজ করা বাধ্যতামূলক ।
    তার দলে এখন বিপুল জিহাদী। তাদের জন্য কাজ দরকার। তাদেরকে কাজ দেয়া হলো, প্রথমে কাছের এবং পরে দূরের দেশগুলিতে আক্রমন চালিয়ে মুসলমান বানানো। মোহাম্মদের লেখা জিহাদী চিঠি যাতে লেখা ছিল ‘হয় মুসলমান হও, নয় মর’ ইউরোপের বিভিন্ন লাইব্রেরী ও সংগ্রহশালায় রাখা আছে।
    সে দিনে পাচ বার (প্রথমে ছিল তিন বার) ব্যায়াম ভিত্তিক প্রার্থনা এবং বছরে একমাসের উপবাস এর নিয়ম প্রবর্তন করে। সে জানতো, এর মাধ্যমে মানুষের ‘ইমান’ পোক্ত হবে। জীবনের প্রথম ষোল সতের বছর এই গুলি করার পর সবারই ধারনা হয়, “এগুলি মিথ্যা হলে তো আমি পাঠার মতন আমার জীবনের এই মূল্যবান সময় ও শক্তি নষ্ট করেছি।“ কেউই নিজেকে পাঠা ভাবতে চায় না। ঈমান পোক্ত হবার মূল কারন এইটি। যারা একবার এই ধর্মে ঢুকেছে তাদের বেরিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করতে ধর্মত্যাগীদের জন্য করা হয় গলা কাটার বিধান। এমন ধর্মের মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়বে, এতে আশ্চর্যের কি আছে?
    আগে মরু ডাকাত বাহিনী ডাকাতি করতো, এখন আত্মোতসর্গকারী ডাকাত বাহিনী ‘মহান ধর্মের” প্রচারের নামে বাইরের দেশ আক্রমন শুরু করলো। তারা ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়ায় অনেক রাজাকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছিল। ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ায় শান্তির ধর্ম প্রচারের নামে তারা গনহত্যা চালিয়ে একটির পর একটি দেশ দখল করতে থাকে। এই সব রাজ্যের শিক্ষিত সেনাবাহিনী মূলতঃ আইন শৃংখলা বজায় রাখতো বা অন্য রাজ্যের শিক্ষিত সৈন্যের সাথে যুদ্ধ করতো। ন্যায়নীতি হীন ডাকাত বাহিনীর সাথে যুদ্ধে তারা পরবে কেন? ডাকাত আর শিক্ষিত সৈন্যের অসম যুদ্ধে ডাকাতের জয়কেই ইসলামী ইতিহাসবিদগন ধর্মের শক্তি হিসাবে উল্লেখ করেছে। তারা রাজাদের মানুষ সৈন্য আর ধর্মের নামে আত্মোতসর্গকারী নরপশুদের পার্থক্যটা পরিষ্কার করে নি। রাজার সৈন্যদের যুদ্ধ ছিল শুধুমাত্র সৈন্যদের সঙ্গে, আর সেখানে সৈন্য হত্যা ছিল জয়ের প্রচেষ্টায় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা মাত্র । অথচ ধর্মোন্মাদ সৈন্যদের ক্ষেত্রে যুদ্ধ মানেই ছিল গনহত্যা, সাধারন মানুষদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে, লুট পাট করে, মেয়েদের উপর পাষবিক অত্যাচার করে আক্রান্ত পক্ষের মনোবল ভেঙ্গে দেয়া। সেখানে যুদ্ধজয় মানেই ছিল গানি মতের মাল অর্থাৎ বিজিত সৈন্য ও সেই অঞ্চলের সকল মানুষ ও সম্পত্তির মালিকানা লাভের উল্লাস। আর যুদ্ধে মারা যাওয়া মানে ছিল বেহেস্তে গিয়ে হুর পরী ও অন্য সব জিনিস ভোগ করা । এই সব কিছুর লোভ একটা মানুষকে যে ধরনের উন্মাদ এবং হিংস্র জন্তুতে পরিনত করতে পারে, পৃথিবীর কোন রাজার সৈন্য বাহিনীর পক্ষে তেমন হবার সুযোগ কখনই ছিল না। আর এটাই ছিল এই “ধর্মাশ্রয়ী রাজ্ত্ব বিস্তার লোভী” রাজাদের ‘অভাবনীয়’ সাফল্যের মূল কথা।

  6. কি ভাবে সম্ভব হলোঃ এত দীর্ঘ সময় টিকে থাকা।
    হ্যা, প্রায় চৌদ্দ শ’ বছর টিকে আছে বটে, তবে সন্মানের সাথে নয় । উন্নত বিশ্বে আজকাল যেখানে সবাইকে সমান নজরে দেখা হয়, সেখানে এই ধর্মের লোক জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। তাদের বিশেষ ভাবে পরীক্ষা করা হয়, কোন কোন স্থানে ঢুকতে দেয়া হয় না, এমন কি প্লেন থাকে নামিয়েও দেয়া হয়। অন্য ধর্মের লোকেরা তাদের প্রচারকের স্বভাব চরিত্র বা ধর্মের খুটি নাটী নিয়ে যেভাবে হাসাহাসি করে । তবে ভদ্রতার খাতিরে তাদের দেখতে পেলেই এই আলোচনা বন্ধ করে দেয়।
    মূলতঃ একজন ব্যাক্তির সারা পৃথিবীকে তার পরিবারের সম্পত্তি করার উদ্দেশ্যে ডাকাত দলের কর্মকান্ড অব্যাহত রেখে তাদের স্বার্থে প্রনীত “অত্যন্ত নীচু মানের ধর্মের নামে একটি রাজনৈতিক মত বাদ” পৃথিবীর বুকে প্রায় চৌদ্দ শ’ বছর ধরে টিকে আছে, এটা ভাবলে একটু অবাকই লাগে। মজার কথা হলো, নিজের পরিবারের স্বার্থে প্রনীত হলেও এই লোকটির পরিবার টেকে নি। তার কোন পুত্র সন্তান ছিল না। জামাইকে নিয়ে তার আশা ছিল। কিন্তু আল্লাহ তার আশা পূর্ন করে নি। তার ধর্মে বিধান ছিল, প্রথমে গনি মতের মাল, পরে যাকাত এবং জিজিয়া হিসেবে প্রাপ্ত সম্পদের এক পঞ্চমাংশ পাবে আল্লাহ, এক পঞ্চমাংশ তার পরিবার আর বাকীটা, প্রথমে ছিল জিহাদীরা পাবে, পরে ঠিক হয়, তা বাইতুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যাবে। তার মৃত্যুর পর তার জামাই ঝগড়া করে ইরান চলে যায়। এই জামাইএর পুত্ররা রাজত্ব দাবী করতে গেলে দুজনেই নিহত হয়। তার মৃত্যুর পর তার ‘হাওয়া থেকে পাওয়া’ বানী সঙ্কলন করতে গেলে দেখা গেল, সেখানে ভাগাভাগীর দলিলটিই নেই। সংকলকের দাবী এটি ছাগলে খেয়ে ফেলেছে। যারা তা বিশ্বাস করে নি তারা সংকলককে হত্যা করে। পরিবারতন্ত্রের প্রবাহ এখানেই শেষ।
    এদিকে জামাই ঐ ভাগাভাগির দলিল সহ ধর্মের মূল পুস্তক এর ভিত্তিতে ইরান থেকে শুরু করে এই ধর্মের নতুন সংস্করন। সেখানে শুরু হয় পরিবারতান্ত্রিক শাসন। তবে তা ইরানের বাইরে আর তেমন বিস্তৃত হতে পারে নি। এদিকে ডাকাততন্ত্রের এই ধর্মের বেচে থাকার উপায়ই হচ্ছে, জিহাদ বা আক্রমন। এই আক্রমন দূর দুরান্তে রাজ্য দখলে সফল হলেও এই রাজ্যগুলি আর “হারাম শরীফ-কাবা-মক্কা” কেন্দ্রের অধীনে থাকলো না, বরং বিভিন্ন ডাকাত সর্দারেরা নিজেরাই এগুলির রাজা হয়ে বসলো । এই রাজাদের টিকে থাকার মূলমন্ত্র ছিল দুটি ঃ (১) তাদের অস্ত্র শক্তি এবং (২) তারা যে এই ধর্মকে প্রচন্ড শ্রদ্ধা করে এটা দেখানো। এটার জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল আরবের সব আইন চালু করা। নানা কারনেই আর তা করা যাচ্ছিল না। এসব দেশে জিহাদী আয়ের অর্থনীতি আর চালানো যাচ্ছিল না। আবার হজের আয় ছিল না। আবার যে সব রাজ্য তারা দখল করেছিল সেখানে ব্যাবসার পাশাপাশি শিল্প, আহরন, রুপান্তর ইত্যাদি অর্থকরী আইটেম চালু থাকায় জিহাদের প্রয়োজনও ছিল না। সেই সঙ্গে সকল নাগরিককে ধর্মান্তরিত করাও বাস্তব সম্মত ছিল না। এমতাবস্থায় এসব দেশে অমুসলিমদের সহ্য করার মনোভাব ও মানিয়ে নেবার পরিবেশ তৈরী হয়। এই প্রেক্ষিতে কৃষিজীবিদের জন্য উদ্ভাবিত জিজিয়া কর অমুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, যদিও তা তাদের সংখ্যা কমিয়ে দেয়।
    সংক্ষেপে বলি, এভাবে চলতে চলতে কিছুটা পরিবেশ, কিছুটা সভ্য মানুষের প্রভাব সব কিছু মিলিয়ে এই ধর্ম রাষ্ট্রীয় ভাবে যে পর্য্যায়ে আছে তা হলো, শ্বশুরের প্রবর্তিত একক ধর্মের দুটি একনায়কতান্ত্রিক দেশ (সৌদী আরব এবং ব্রুনেই), জামাইয়ের প্রবর্তিত কিঞ্চিত পরিবর্তিত একক ধর্মের একটি পরিবার তান্ত্রিক দেশ (ইরান), শ্বশুরের প্রবর্তিত একক ধর্মের মানুষের বেশ কয়েকটি কিছুটা উদার নৈতিক একতান্ত্রিক দেশ, এই ধর্মের লোক বেশী এমন কয়েকটি গনতান্ত্রিক দেশ যার একটিতেও গনতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হয় নি। পৃথিবীতে উন্নত দেশের যে মানদন্ড তৈরী হয়েছে তার বিচারে এদের একটিও উন্নত দেশ নয়। এই ধর্মের মূল নীতির সাথে গনতন্ত্রের প্রকাশ্য সঙ্ঘাতের কারনে এই ধর্মের সবগুলি দেশকেই বলা যায়, “গনতন্ত্রের শত্রু দেশ”।
    এর বাইরে পৃথিবীতে রয়েছে গনতান্ত্রিক এবং উন্নতদেশ সমূ্হ, গনতন্ত্রের কারনে স্বাভাবিক কারনেই যেগুলি ধর্ম নিরপেক্ষ । নানা কারনে জিহাদী ধর্মটির কিছুটা চারিত্রিক পরিবর্তন হলেও, এমনকি গনতান্ত্রিক দেশে বসবাসরত তাদের অনেক অনুসারীর এখনও চারিত্রিক পরিবর্তন হয় নি। তারা তাদের ধর্মীয় দেশগুলির উস্কানী ও অর্থ সাহায্যে ( এটি হতে পারে তাদের ডাকাতি-জিহাদের পরিবর্তর্তিত প্রোগ্রাম) সব সময় গনতান্ত্রিক দেশগুলির ক্ষতি করার চেষ্টায় রত।

    1. মুসলিমদের মুল শক্তি তাদের সন্তান উৎপাদন । এটা ছাড়া তাদের কিছুই নেই । গত ১০০ বছর তারা কোন যুদ্ধ জিতে নি । শুধু তুরকি ২ টা সাধহারন যুদ্ধ জিতেছে ইসলামকে ফিনিস করতে হলে তাদের বাচ্চা নেওয়া থামান নয়ত তাদর চেয়ে বেশি বাচ্চা নিন ।। অথবা তাদের দেশগুলোতে আক্রমণ করে সব ধ্বংস করুন ।। এবং দুরবিক্ষ লাগান ।। সামনে ১০০ বছরের মধ্যে মুসলিমদের ২০% বানাতে হবে । আর ২২০০ এর মধ্যে ৫% ।। আর ২৫০০ এর মধ্যে ইসলামকে ফিনিস করে দিতে হবে । মানব সভ্যতার জন্য এটা করতে হবে । ইসলাম মানেই মাণবতার শত্রু ।

  7. মৌলিক সমস্যার স্বরূপ উৎঘাটন
    আজকের পৃথিবীতে মোট প্রায় ৭৫০ কোটী মানুষের মধ্যে জিহাদী ধর্মের মানুষ আছে ১৬০ কোটী (২১%), আর অন্য ধর্মের ও বিনা ধর্মের মানুষ আছে ৫৮০ কোটী (৭৯%)। এই দুই ধরনের মানুষ প্রধানতঃ ছয় ধরনের দেশে বসবাস করে। পৃথিবীর মানুষকে ২১ ও ৭৯ এই দুইভাগে বিভক্ত করে দেখানোর কয়েকটি বিশেষ কারণ আছে। যেমনঃ
    (১) পৃথিবীর মানুষ তাদের সীমিত ৬০-৮০ বৎসরের জীবন শান্তিতে কাটাতে চায় । অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং একনায়কতন্ত্রের ব্যর্থতার পর এখন যে কোন দেশের পক্ষে শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক শাসন পদ্ধতি হচ্ছে গনতন্ত্র। গনতন্ত্রে রাষ্ট্রের প্রতিটি মানূষ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে। নির্বাচিত সরকার দেশের সম্পদের সুষ্ঠুভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে তার সকল নাগরিকের সাধারন প্রয়োজন (যেমন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান ও কর্মসংস্থান) এবং স্বীকৃত মানবাধিকার রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত।
    (২) সরকারের যদি কোন বিশেষ ধর্মের প্রতি আকর্ষন বা ঘৃনা থাকে তাহলে তাদের পক্ষে গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব নয়। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে পৃথিবীর অনেক ধর্মের লোকের পক্ষে ধর্মীয় ভাবে নিরপেক্ষ আচরন করা সম্ভব হলেও জিহাদী ধর্মের লোকের পক্ষে এখন পর্য্যন্ত তা সম্ভব হয় নি। মূলতঃ এই ধর্মের ইতিহাস ও মূলনীতি পর্য্যালোচনা করলেই এর কারণ জানা যায়।
    এই প্রেক্ষাপটে পৃথিবীর সকল ধর্মই গনতন্ত্রের পথে কম বেশী বাঁধা হলেও জিহাদী ধর্মটি গনতন্ত্রের প্রমানিত শত্রু। এই আলোকে আমরা যদি বিভিন্ন রাষ্ট্রকে ভালো থেকে খারাপের মানে ভাগ করি তাহলে নিচের চিত্রটি পাওয়া যাবে।
    ০১। গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেখানে সকল ধর্মের এবং ধর্মহীন নাগরিকের সমান অধিকার। পৃথিবীর সকল উন্নত রাষ্ট্র এই গ্রুপে পড়ে। তবে সাম্প্রতিক কালে এসব দেশে দেশীয় এবং বহিরাগত জিহাদী সন্ত্রাসীদের দমন করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে।
    ০২। গনতন্ত্রের নামে অগনতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেখানে জিহাদী ধর্মের লোক সংখ্যালঘু , এবং যেখানে রাষ্ট্র সাধারন ভাবে কোন ধর্মকে উতসাহিত করে না। যেমন, চীন, জাপান, উঃ ও দঃ কোরিয়া, মায়ানমার ইত্যাদি। তবে এসব দেশে প্রাচীন ধর্মস্থানকে পর্য্যটনের আয় হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং জিহাদী ধর্মকে দমন করা হয়।
    ০৩। গনতন্ত্রের নামে অগনতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেখানে জিহাদী ধর্মের লোক সংখ্যালঘু , এবং যেখানে রাষ্ট্র সাধারন ভাবে সকল ধর্মকে উতসাহিত করে । যেমন, ভারত ও শ্রীলংকা।
    ০৪। গনতন্ত্রের নামে অগনতান্ত্রিক রাস্ট্র যেখানে জিহাদী ধর্মের লোক সংখ্যাগুরু, এবং যেখানে রাষ্ট্র সাধারন ভাবে সকল ধর্মকে সহ্য করে । যেমন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশীয়া।
    ০৫। গনতন্ত্রের নামে অগনতান্ত্রিক রাস্ট্র যেখানে সকল নাগরিক জিহাদী ধর্মের , এবং যেখানে কেবলমাত্র জিহাদী ধর্মের মানুষের স্বার্থ দেখা হয়। যেমন, ইরাক, ইয়েমেন, কুয়েত, মালদ্বীপ ইত্যাদি।
    ০৬। একনায়ক শাসিত জিহাদী ধর্মের লোকদের জন্য রাষ্ট্র, যেখান থেকে সারা বিশ্বে জিহাদ চালানোর জন্য উৎসাহ ও মদত দেয়া হয়। যেমন, সৌদী আরব, ইরান ও ব্রুনেই।
    উল্লেখ করা যায় যে, যেখানে সকল ধর্মের মানুষ গনতান্ত্রিক দেশ গঠন করতে পারে, সেখানে জিহাদী ধর্মের বা এমনকি জিহাদী সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের কোন দেশ তা পারে না। শুধু তাই নয়, এরা সন্ত্রাস প্রেরনের মাধ্যমে অন্য দেশের গনতন্ত্র ধংশ করার চেষ্টা করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই ধর্মের জন্মই হয়েছে জিহাদের মাধ্যমে সমগ্র পৃথিবী দখল করার জন্য। এখন তারা যখন বুঝে গেছে, তা আর সম্ভব নয় তখন তারা ধর্ম সম্প্রসারনের কিছু বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহন করেছে। যেমন, (১) দ্রুত সন্তানসংখ্যা বৃদ্ধি, অভিবাসন বা ধর্মান্তরের মাধ্যমে জিহাদী ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা, (২) অ-জিহাদী দেশে জিহাদী ধর্মের উপাসনালয়, ধর্মীয় স্কুল ও ছাত্রাবাস স্থাপন করা, (৩) সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ঘটিয়ে ত্রাসের মাধ্যমে অ-জিহাদী দেশের সরকারকে তাদের ধর্মের সহায়ক ব্যবস্থা গ্রহনে বাধ্য করা ইত্যাদি।
    এদিকে জিহাদী ধর্মকে নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য বিভিন্ন দেশ যে সব ব্যবস্থা করেছে তার মধ্যে আছে, (ক) টেকনোলজীর মাধ্যমে তাদের যাতায়াত ও কার্য্যকলাপ নিয়ন্ত্রন করা (যেমন, যুক্তরাষ্ট্র), (খ) তাদেরকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া (যেমন, মায়ানমার), (গ) তাদেরকে ক্যাম্প-এ বন্দী করে রাখা (যেমন- চীন) ইত্যাদি। এই যখন ছিল সামগ্রিক অবস্থা তখন বর্তমান শতাব্দীর শুরুতেই এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যা এই জিহাদী ধর্মটির ভিত্তিমূল কাপিয়ে দিয়েছে।

  8. এমন পোলারে বাঘে খাইলো কেমনে ?
    আগের এপিসোডে “বর্তমান শতাব্দীতে এমন ঘটনা ঘটেছে যা ধর্মটির ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দিয়েছে।“ আজকের আলোচনা, সেই ঘটনা। ইসলামের জিহাদী বাহিনী এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ আক্রমন করতে থাকে। ঐ বিশাল সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রন তখন আর মক্কা থেকে করা সম্ভব ছিল না। জিহাদী সেনাপতিরা নিজেরাই সব নিয়ন্ত্রন হাতে নিয়ে বিজিত দেশগুলির খলিফা হয়ে পড়ে। তারা এখন নিজেরাই আইন তৈরী করতো। তবে ইসলাম বা এর প্রচারকের বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু করতে সাহস পেতো না। কারণ এই ধর্মের প্রতি আনুগত্যই ছিল তাদের রাজ্য শাসনের মূল ভিত্তি।
    এই কারনে মোহাম্মদের মৃত্যুর উনিশ বছর পর থেকে পরবর্তী প্রায় ৩০০ বছর এই ধর্ম সম্বন্ধে যে সব বই লেখা হয়েছিল রাজারা কোন রকম পরিবর্তন করতে সাহস করে নি। এই বইগুলি হচ্ছে- (১) কোরান , (২) হাদিস এবং (৩) মাগাজী এবং (৪) সিরাত । এই বইগুলির মধ্যে এমন অসম্ভব, পরস্পরবিরোধী, উদভট, অবাস্তব এবং অতিরঞ্জিত কথা আছে যা যে কোন বুদ্ধিমান লোকই বাদ দিতে চাইবে । কিন্তু উপরে বর্নিত কারনে শত সহস্ত্র বৎসর ধরে সেগুলি অবিকৃত আছে এবং এখন ক্লাসিক বইএর মর্য্যাদা লাভ করেচে । এই গুলি আরবী ভাষায় লেখা । অন্য ভাষাভাষীরা এগুলি জানতো আরবী ভাষা জানা লোকের তরজমায় । মজার ব্যাপার, তরজমাকারীরা সেগুলি শ্রোতাদের মন জয় করার জন্য বিকৃত ভাবে পরিবেশন করতো। ফলে অন্য ভাষার লোকদের মনে এই ধর্ম সম্বন্ধে এক ভ্রান্ত এবং ভালো ধারনার সৃষ্টি হয়। আবার দুর্বোদ্ধতার সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে কোরানের আয়াতগুলি সময়-অনুক্রম অনুযায়ী সাজানো হয় না। সৌদী আরব এই বইগুলি বাংলায় অনুবাদের জন্য প্রচুর অর্থ প্রদান করে। সরকার ধার্মিক ব্যাক্তিদের সহায়তায় এগুলির বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করে। এই গুলি এখন সারা পৃথিবীর মাদ্রাসা, মসজিদ, ধর্মীয় লাইব্রেরী এবং ব্যাক্তিগত সংগ্রহে আছে। আর এর পিডিএফ কপি যে কত কম্পিঊটার, ট্যাব আর স্মার্ট মোবাইলে আছে তার কোন ইয়ত্তা নাই । এই সঙ্গে এসেছে সময় অনুক্রম মেনে তৈরী করা কোরান ।
    এগুলি পড়ে আর এর অর্থ বুঝে ধার্মিকদের চক্ষু চড়ক গাছ। অন্ধ ধার্মিকেরা বলছে, “এটা কিছুতেই হতে পারে না”। কিন্তু পরক্ষনেই শিক্ষিত ছেলেরা কম্পিউটার বা মোবাইল থেকে মূল বই পড়ে সত্যটা বলে দিচ্ছে। এই বইগুলি স্পষ্ট বলে দেয়, মোহাম্মদ যে নতুন ধর্ম প্রচার করে তাতে সে নিজেকে ইহুদী এবং খৃস্টান ধর্মের পরবর্তী এবং শেষ নবী হিসেবে ঘোষনা করে । দশ বছর এই কাজে সফল না হওয়ায় সে ডাকাতের দেশ মদিনায় চলে যায়। সেখানে সে ডাকাতেরা পছন্দ করবে এমন পরকাল (বেহেস্ত) যেখানে থাকবে মদ, মাংস, মেয়েমানুষ, শিশু, মধু, দুধ, ছায়া, ঠান্ডা পানি ইত্যাদি, এবং ইহকালে বিধর্মীদের সম্পদ লুন্ঠন ও তাদের হত্যা করার নিয়ম বা জিহাদ ঘোষনা করে। বলা হয়, জিহাদে প্রাপ্ত সম্পদ ও বন্দীদের তিন পঞ্চমাংশ তাদেরকে দেয়া হবে। মেয়েদের বিষয়ে বলা হয়, ধর্ম পালন না করলে তারা দোযখের আগুনে পুড়বে। নিজের জন্ম এবং পিতৃ সম্পত্তি না পাওয়ার দুঃখ থেকে তাকে পুত্র বধুকে বিবাহ এবং অনাথের সম্পত্তি না পাওয়ার মত অদ্ভুত আইন চালূ করতে হয়। নিজের পুত্র না থাকায় তার পারিবারিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সফল হয় নি। তার প্রচারিত ধর্মের সকল তথ্য এখন স্মার্টফোন আর নেট আছে এমন যে কোন বাংলাভাষীর হাতের একেবারে কাছে। সৌদী আরব ও বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় যে সত্য আজ থলের বাইরে বেড়িয়ে পড়েছে তাকে আর থলেতে ঢোকানো যাবে না । বরং নাড়াচাড়া করলেই তা থেকে ভুরভুরে গন্ধ বের হয়। তাই বলা হয়েছিল, “বর্তমান শতাব্দীর শুরুতেই এমন ঘটনা ঘটেছে যা জিহাদী ধর্মটির ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দিয়েছে।“ এই কাঁপন ভিত্তিকে শক্ত করবে না ভেঙ্গে ফেলবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
    (জিহাদী ধর্মের পর্দা উন্মোচন- শেষ)

  9. “বানান ভুল বা তথ্যগত ভুল কেউ পেলে বিনা দ্বিধায় সংশোধন করে দিন। আপনার সংশোধনী সঠিক হলে কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করা হবে ”

    কোথায় এবং কিভাবে এডিট করলে অশুদ্ধ বানান শুদ্ধ করা সম্ভব???

  10. এখানে কোরআন ঠিক আছে লেখক তার মূর্খতার পরিচয় দিয়েছে। ভাই ১ লিটারের বোতলের মুখে যদি আজ্ঞুল ঢুকান তাহলে কি তলা খুজে পাবেন??? তলা খুজে না পেলে কি বলবেন তলা নেই???? তেমনি আপনি বুঝতে ভুল করলে কিংবা আপনার বিজ্ঞান অসামর্থ্য হলে কেন বলেন কোরআন ভুল??? নিজের মূর্খতা ও বিজ্ঞানের অসামর্থ্যতা কেন স্বীকার করেন না??? আপনি বললেন ফাতেহা পড়লে মনে হয় না আল্লহর কথা??? আমরা আল্লাহর কাছে কি চাইব সেটা ফাতেহা দ্বারা আল্লাহ শিক্ষা দিয়েছে। আর সূরা গুলো আমরা পাঠ করি তাই এগুলো আমাদের কথার সাথে মিল রেখে আল্লাহ নাযিল করেছে আর এর গভীরে আরো কি আছে আল্লাহ ভাল জানেন।

  11. বিকল্প সার্ভারের ব্যবস্থা করুন। আমরা যেন নিয়মিত পড়তে পারি। মানুষ সচেতন হচ্ছে। মেীলবাদীদের মাথায় হাত। সংশয় এর বিরুদ্ধে লেগেছে। বিপ্লবী দমনের চেষ্টা যুগ যুগ ধরে করা হয়েছে। বিপ্লব থেমে থাকেনি। আপনারা সংগ্রাম চালিয়ে যান। নতুন প্রজন্ম আপনাদের মাধ্যম্যে সচেতন হবে। নতুন প্রজন্মকে যেন মেীলবাদ গ্রাস করতে না পারে। সে চেষ্টা আপনাদের চালিয়ে যেতে হবে। আপনারা সফল হবেন। ধন্যবাদ।

  12. ইসলাম হচ্ছে দিবালোকের মত, কিছু সত্য কিছু মিথ্যা দিয়ে বানোয়াট তথ্য পেশ করে কি সত্য ঢাকা দেয়া যায়? কখনোই না…… তোমাদের মেহনত কোন কাজে আসবে না…. একেবারে দূর্বলতম ঈমানদার ও তোমাদের মিথ্যাচার ধরে ফেলতে পারে অনায়াসে…. যতদিন গড়াবে দলে দলে মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আসবে

    1. Amin
      এখানে কোথায় মিথ্যা বলা হয়েছে তা প্রমাণ করুন
      প্রমাণ ছাড়া আজে বাজে কথা বলে শুধু নিজের
      মনেই শান্তনা দিতে পারবেন। এর বেশি কিছু না

  13. যুক্তিগুলো পরে বোঝা যায় আপনি অনেক পড়ালেখা করেছেন কিন্তূ এটাও বোঝা যায় আপনি সত্যানুসন্ধানী নন কারন সব যুক্তিই আপনার একপেশে এবং যে যুক্তিবিদ্যা জানে সে এগুলোর অসারতা বুঝতে পারে । গবেষনার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্তপূর্ণ বিষয় হলো সত্য খুজতে হলে নিরপেক্ষ হতে হয় । অর্থাৎ Bias হওয়া বা কোন fixed idea নিয়ে শুরু করলে সত্য থেকে ক্রমশ্য দুরে সরে যাওয়ার পথ তৈরী হয়। পরিষ্কার বোঝা যায় কোন কারনে ইসলামের উপর আপনি চটে আছেন । তাই সত্য না খুজে নিজের ধারনার পক্ষে যুক্তি তৈরী করেছেন যার অধিকাংশই অপরিপক্ক ও শিশু সুলভ ।
    এটাও স্পষ্ট আপনার যুক্তির প্রয়োজনে যেটুকু তথ্য তাই এনেছেন; যে তথ্য সত্যকে বুঝতে সাহায্য করতে পারতো তা হয়ত জানেন না অথবা ইচেছ করে এড়িয়ে গেছেন। আমি আপনার জন্য দঃখিত কারন যে পরিশ্রম করেছেন বা করছেন এর দ্বারা আপনি অনেক বড় আল্লাহর ‘ওলি’ হয়ে যেতে পারেন ! আল্লাহ আপনাকে কবুল করুন !আমিন !!

    1. আপনি যেসব লিখেছেন সেগুলি আপনার মন গড়া দাবি মাত্র , প্রমান নয় | আপনি একটাও রেফারেন্স বা প্রমান দেখাতে পারেননি আসিফের কোন তথ্যটা মিথ্যা কোন যুক্তিটা একপেশে এবং কেন একপেশে ? তাছাড়া আসিফ ভাই নিজের বানানো কোনো মতামত বা রেফারেন্স দেননি বা নিজিস্ব কোনো ব্যাখ্যা দেননি , তিনি স্বীকৃত তাফসীর বা দলিলগুলি থেকে প্রমান দিয়েছেনা যা নাদ্যিকদের বানানো নয় |প্রখ্যাত ও আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত ক্লাসিক যুগের ইসলামী স্কলারদের লেখা থেকে রেফারেন্স দিয়েছেন | আপনি পারলে ভুল ধরিয়ে দেন যদি রেফারেন্স ভুল বা মিথ্যা থাকে | মিথ্যাচার করছেন কেন ? নিজেকে চরম অন্ধ আর মূর্খ হিসেবে প্রমান দিয়েছেন | মুমিন মানেই মূর্খ ও অন্ধ | আসলে আপনার পূর্বধারনার সঙ্গে মেলেনি বলেই এখন তালগাছটা আমার , আবার আপনি নিরপেক্ষতার .দোহাই দিচ্ছেন ! আপনারা আসলে চরম ভন্ড | নিরপেক্ষতার মানে কি আপনি বোঝেন ? আপনি কি রেফারেন্সগুলো একবারও যাচাই করে দেখেছেন ? আমি নিশ্চিত আপনি দেখেননি কারণ আপনার মনে রায় আগেই ঠিক করা আছে যার নাম অন্ধ বিশ্বাস ! আবার অন্যকে নিরপেক্ষতার সবক দেন ! সত্যি আপনাদের ভণ্ডামির তুলনা হয়না !

      1. এ সব হদিস নামের ভন্ডামী বা ভন্ডদের কথাবার্তা! কোরান তো কোরান !! আপনার রেফার করা কথিত হাদিস ইসলামের কোন কথা নয় !! এ সব ওমুক তমুকের কথা !! এ সব কিছু ইসলামের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত নয়!! হাদিস হলো এক মাত্র কোরান যেটা আল্লার বাণী হিসাবে আমি বিশ্বাস করি !! আমি মুসলিম হিসাবে, শুধু মাত্র এবং এক মাত কোরানকেই বিশ্বাস করি !! আপনি মানতে পারেন না সেটা আপনার বিষয় !! কথিত সংগৃহিত ও সংকলিত হাদিস কি এবং কেন সেটা আপনি যেমন জানেন আমিও তেমিনী জানি !! কথিত হাদিস গুলো কোন ধর্মীয় কোন গ্রন্থ নয়, বরং আাল্লাহ ও তার রসুল সঃ কে প্রশ্নবিদ্ধ কল্পে তৈরী কৃত জাল বা ভূয়া ডুকুমেন্ট ! যার দোকানদার নামধারী আলেম সমাজ এমনকি আপনার মতো মহাঞ্জানী গন!! কোরান বোঝার ক্ষমতা থাকলে তো বুঝবেন!! সমালোচনা করছেন করেন, তাই বলে সবাই কে মূর্খ বা বোকা ভাবার কোন কারন নাই !! ধন্যবাদ ভাল থাকবেন এবং ভাল রাখবেন !!

    2. আপনি আগে বলুন যে একই বাক্যের মধ্যে তুমি আর আমি কি করে থাকে ? পৃথিবীর কোনো ভাষার কোনো ব্যাকরণের নিয়মে কি একই বাক্যে একাধিক কর্তা ব্যবহৃত হতে পারে ? আল্লাহ কি ব্যাকরণ জানেন না ? নাকি কোরানের রচয়ীতা মুহম্মদ ব্যাকরণ জানেন না ? কোনটা সত্য ?

  14. নাস্তিকরা যে একদমই মুর্খ হয় এই লেখা তার প্রমান।
    আল্লাহ কুরানে নিজেই কেন নিজের নাম ধরে বলেছেন এতেই আপনার মনে হল কুরান বিকৃত গ্রন্থ৷

    ব্যপারটা একদমই সহজ। ছোট বেলায় আপনার বাবা আপনাকে বাবা ডাক শেখানর জন্য বাবা, বাবা বলে ডাকতেন। এর মানে কি আপনি তার জন্মদাতা বাবা হয়ে গেলেন? এখন আপনি যদি উল্টা বুঝে আপনার বাবাকে আপনার সন্তান মনে করেন তাইলে তো আপনি পাগল ছাড়া কিছু না।

    তেমনিভাবে আল্লাহ কুরানে তার বান্দাদেরকে কে উনার নিজের সম্মন্ধে বোঝাতে গিয়ে নিজের নাম ধরে আয়াত অবতীর্ন করেছেন।

    সহজ বিষয়টা বুঝলে বুঝপাতা না বুঝলে তেজপাতা।

    1. রেফারেন্স তো আরো অসংখ্য দেওয়া হয়েছে , প্রায় ১০৪ টা দলিল বা প্রমান সেগুলি নিয়ে কিছু বলছেন না কেন ? আর আপনি কি আল্লার মনের মধ্যে হান্দাইছিলেন নাকি যে আপনি জেনে গেলেন যে আল্লা বোঝানোর জন্য আল্লা বলেছে ? এটা তো আপনার মন গড়া ভাষ্য | আল্লা যে তাই বুঝিয়েছে সেটার কোনো রেফারেন্স বা তাফসীর দেখতে পারবেন ? আপনার ব্যক্তিগত মতামত কে মানবে ?

    2. নাস্তিকরা মূর্খ হয় আর আপনারা মুমিনরা যে আদিম গুহাবাসী মানুষ–মগজের বিবর্তন হয়নি ভালো করে সেটা বুঝতে পারেন না : সূরা ফাতিহা যদি আল্লাহ প্রার্থনা শেখানোর জন্য অভাবে দিয়ে থাকেন তাহলে নিচের সূরাটিতে বক্তা কে
      “তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।
      কোরআন ৫৮ঃ২২” প্রশ্ন : আল্লাহ কাকে তিনি বলে সম্মোধন করছেন ? আল্লারও কি তাহলে আল্লা আছে নাকি ? আল্লার আল্লাটা কে তাহলে ?

  15. “এগুলো দ্বারা বড় কোন পরিবর্তন ঘটছে না। যেমন হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল করা হচ্ছে না।”
    Osman is right. Quoran is well preserved.

    1. Fatimah bint Muhammad, (Friday, 20 Jumada II (10 September AD 605) – 14 Jumada I AH 11 (5 August AD 632))
      আর হযরত মুহাম্মদ সা: মৃত্যু 8 June 632 (aged 61–62)Medina, Hejaz, Arabia
      তাহলে হাদিস গুলোতে Fatimah bint Muhammad,

      গ্রন্থের নামঃ সুনানে ইবনে মাজাহ
      হাদিস নম্বরঃ [1629]
      অধ্যায়ঃ ৬/ জানাযা
      পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
      পরিচ্ছদঃ ৬/৬৫. নাবী ﷺ -এর ইনতিকাল ও তাঁর কাফন-দাফন।
      ৩/১৬২৯। আনাস ইবনু মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মৃত্যু যন্ত্রণা তীব্রভাবে অনুভব করেন, তখন ফাতেমাহ (রাঃ) বলেন, হায় আমার আব্বার কত কষ্ট। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আজকের দিনের পরে তোমার আব্বার আর কোন কষ্ট থাকবে না। তোমার আব্বার নিকট এমন জিনিস উপস্থিত হয়েছে, যা কিয়ামাত পর্যন্ত কাউকে ছাড়বে না।
      সহীহুল বুখারী ৪৪৬২, আহমাদ ১৬০২৬, সহীহাহ ১৬৩৮, মুখতাসার শামাযিল ৩৩৪, বুখারী শেষ বাক্য বাদ দিয়ে। তাহকীক আলবানীঃ হাসান সহীহ।
      হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

      মৃত মানুষ কি করে বলে এগুলো বুঝলাম না।
      আরো ভালো করে যাচাই করতে হবে আপনাদের।

    2. আপনাকে দুটি প্রশ্ন : ১) আল্লাহ ওয়াদা করেছিলেন যে কোরান আল্লাহ নিজেই হেফাজত করবেন , তাহলে কোরানের আয়াত ছাগলে খায় কিভাবে ?
      ২) কোরানের মধ্যে যদি কোনো সমস্যাই না হয় তাহলে হজরত ওসমানকে কেন হত্যা করা হলো ? কেন বলা হয় যে আমরা যে কোরান পেয়েছি সেটি ওসমানের কোরান মুহম্মদেড় রচিত আসল অরিজিনাল কোরান নয় ?

    3. আপনার কাছে প্রশ্ন : সূরা ফাতেহাতে আল্লাহ বলছেন : “আমরা আপনারই ইবাদত করছি এবং আপনারই নিকট সাহায্য চাচ্ছি |” আল্লাহ নিজে নিজেকে ইবাদত করছেন কেন ? আল্লা কার ইবাদত করছেন ? আল্লার কি মাথায় গন্ডগোল দেখা দিয়েছিলো ? তিনি সাহায্য চাইছেন কার কাছে ?

  16. প্রিয় ভাই আপনার জন্য অবারিত শুকরিয়াহ্
    আমি একজন মুসলিম হিসেবে যে সকল চিন্তা/ভাবনা আমাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতো ‘আপনার জ্ঞান এবং তথ্য-উপাত্তের প্রসারে আমি তার বেশিরভাগ সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হলাম।

    একটু খেয়াল করবেন প্রিয় ভাই, এই সকল তথ্য উপাত্তের দ্বারা এটা সুস্পষ্ট প্রমাণিত যে মুসলিম সমাজ বিকৃত পথে আল্লাহর নৈকট্য অনুসন্ধান করছে। তবে এটা প্রমাণ করেনা যে আল্লাহ অস্তিত্ত্বহীন!
    তাই সর্বশক্তিমান দয়াময় আল্লাহকে যথাযত সম্মান প্রদর্শন করবেন এই অনুরোধ করছি।

  17. আসিফ ভাইয়ের লাইভে শুনেছিলাম কোন এক ওহী লেখক তার ইচ্ছামত আয়াতের অংশ জুড়ে দিয়েছিল এবং নবী বলেছিল ঠিক আছে এই শব্দটা জুড়ে দাও। পরবর্তীতে সেই ওহী লেখক ইসলাম ত্যাগ করে। সেই রেফারেন্সটা একটু দিবেন দয়া করে।

  18. আপনারা যে সব সব হদিস নামের ভন্ডামী বা ভন্ডদের কথাবার্তা নিয়ে দিবা স্বপ্ন দেখে, লাফা লাফি করছেন তা ধর্মের কোন অংশ নয়, বরং তা ধর্মের নামে ভয়ঙ্কর আগাছা ও পরগাছা ! কোরান তো কোরানই !! আপনার রেফার করা কথিত হাদিস ইসলামের কোন কথা নয় !! এ সব ওমুক তমুকের কথা !! এ সব কিছু ইসলামের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত নয়!! হাদিস হলো এক মাত্র কোরান যেটা আল্লার বাণী হিসাবে আমি বিশ্বাস করি !! আমি মুসলিম হিসাবে, শুধু মাত্র এবং এক মাত কোরানকেই বিশ্বাস করি !! আপনি মানতে পারেন না সেটা আপনার বিষয় !! কথিত সংগৃহিত ও সংকলিত হাদিস কি এবং কেন সেটা আপনি যেমন জানেন আমিও তেমিনী জানি !! কথিত হাদিস গুলো কোন ধর্মীয় কোন গ্রন্থ নয়, বরং আাল্লাহ ও তার রসুল সঃ কে প্রশ্নবিদ্ধ কল্পে তৈরী কৃত জাল বা ভূয়া ডুকুমেন্ট ! যার দোকানদার নামধারী আলেম সমাজ এমনকি আপনার মতো মহাঞ্জানী গন!! কোরান বোঝার ক্ষমতা থাকলে তো বুঝবেন!! সমালোচনা করছেন করেন, তাই বলে সবাই কে মূর্খ বা বোকা ভাবার কোন কারন নাই !! ধন্যবাদ ভাল থাকবেন এবং ভাল রাখবেন !!

  19. আপনারা যে সব সব হদিস নামের ভন্ডামী বা ভন্ডদের কথাবার্তা নিয়ে দিবা স্বপ্ন দেখে, লাফা লাফি করছেন তা ধর্মের কোন অংশ নয়, বরং তা ধর্মের নামে ভয়ঙ্কর আগাছা ও পরগাছা ! কোরান তো কোরানই !! আপনার রেফার করা কথিত হাদিস ইসলামের কোন কথা নয় !! এ সব ওমুক তমুকের কথা !! এ সব কিছু ইসলামের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত নয়!! হাদিস হলো এক মাত্র কোরান যেটা আল্লার বাণী হিসাবে আমি বিশ্বাস করি !! আমি মুসলিম হিসাবে, শুধু মাত্র এবং এক মাত কোরানকেই বিশ্বাস করি !! আপনি মানতে পারেন না সেটা আপনার বিষয় !! কথিত সংগৃহিত ও সংকলিত হাদিস কি এবং কেন সেটা আপনি যেমন জানেন, আমিও তেমিনী জানি। আপনি হয়তো মানতে পারেননা বা এগুলো কে নিজের যুক্তির পুজি বানিয়েছেন !! ইসলামের গ্রন্থ এক মাত্র কোরান এবং কোরান!! হাদিস গ্রন্থ গুলো ধর্মীয় কোন গ্রন্থ নয়, বরং আাল্লাহ ও তার রসুল সঃ কে প্রশ্নবিদ্ধ কল্পে তৈরী কৃত জাল বা ভূয়া ডুকুমেন্ট ! যার দোকানদার নামধারী আলেম সমাজ, এমনকি আপনার মতো মহাজ্ঞানী গন !! কোরান বোঝার ক্ষমতা থাকলে তো বুঝবেন !! সমালোচনা করছেন করেন, তাই বলে সবাই কে মূর্খ বা বোকা ভাবার কোন কারন নাই !! ধন্যবাদ ভাল থাকবেন এবং ভাল রাখবেন !!

  20. আপনারা যে সব সব হদিস নামের ভন্ডামী বা ভন্ডদের কথাবার্তা নিয়ে দিবা স্বপ্ন দেখে, লাফা লাফি করছেন তা ধর্মের কোন অংশ নয়, বরং তা ধর্মের নামে ভয়ঙ্কর আগাছা ও পরগাছা ! কোরান তো কোরানই !! আপনার রেফার করা কথিত হাদিস ইসলামের কোন কথা নয় !! এ সব ওমুক তমুকের কথা !! এ সব কিছু ইসলামের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত নয়!! হাদিস হলো এক মাত্র কোরান যেটা আল্লার বাণী হিসাবে আমি বিশ্বাস করি !! আমি মুসলিম হিসাবে, শুধু মাত্র এবং এক মাত কোরানকেই বিশ্বাস করি !! আপনি মানতে পারেন না সেটা আপনার বিষয় !! কথিত সংগৃহিত ও সংকলিত হাদিস কি এবং কেন সেটা আপনি যেমন জানেন, আমিও তেমিনী জানি। আপনি হয়তো মানতে পারেননা বা এগুলো কে নিজের যুক্তির পুজি বানিয়েছেন !! ইসলামের গ্রন্থ এক মাত্র কোরান এবং কোরান!! হাদিস গ্রন্থ গুলো ধর্মীয় কোন গ্রন্থ নয়, বরং আাল্লাহ ও তার রসুল সঃ কে প্রশ্নবিদ্ধ কল্পে তৈরী কৃত জাল বা ভূয়া ডুকুমেন্ট ! যার দোকানদার নামধারী আলেম সমাজ, এমনকি আপনার মতো মহাজ্ঞানী গন !! কোরান বোঝার ক্ষমতা থাকলে তো বুঝবেন !! সমালোচনা করছেন করেন, তাই বলে সবাই কে মূর্খ বা বোকা ভাবার কোন কারন নাই !! ধন্যবাদ ভাল থাকবেন এবং ভাল রাখবেন !!

  21. আসিফ ভাই আপনাকে একটা আমার কথা বলার ছিল কথাটি হল – ৫ নম্বর সূরা সূরা মায়িদা মদকে হারাম বলে ঘোষণা করেছে, কিন্তু ১৬ নম্বর সূরা নাহালে ৬৭ নম্বর আয়াতে মাদক ও উত্তম রিজিক গ্রহণ করো বলে হয়েছে।

    [৫:৯০] আল মায়িদাহ
    يا أَيُّهَا الَّذينَ آمَنوا إِنَّمَا الخَمرُ وَالمَيسِرُ وَالأَنصابُ وَالأَزلامُ رِجسٌ مِن عَمَلِ الشَّيطانِ فَاجتَنِبوهُ لَعَلَّكُم تُفلِحونَ

    হে মুমিনগণ, নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদী ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তো নাপাক শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।

    [১৬:৬৭] আন নাহল
    وَمِن ثَمَراتِ النَّخيلِ وَالأَعنابِ تَتَّخِذونَ مِنهُ سَكَرًا وَرِزقًا حَسَنًا إِنَّ في ذلِكَ لَآيَةً لِقَومٍ يَعقِلونَ

    আর তোমরা খেজুর গাছের ফল ও আঙ্গুর থেকে মাদক* ও উত্তম রিয্ক গ্রহণ কর। নিশ্চয় এতে এমন কওমের জন্য নিদর্শন রয়েছে, যারা বুঝে। \n\n* ইমাম তাবারী বলেন, আয়াতটি মাদক নিষিদ্দ হওয়ার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে।

  22. আসিফ ভাই আপনাকে একটা আমার কথা বলার ছিল কথাটি হল – ৫ নম্বর সূরা সূরা মায়িদা মদকে হারাম বলে ঘোষণা করেছে, কিন্তু ১৬ নম্বর সূরা নাহালে ৬৭ নম্বর আয়াতে মাদক ও উত্তম রিজিক গ্রহণ করো বলে হয়েছে।

    [৫:৯০] আল মায়িদাহ
    يا أَيُّهَا الَّذينَ آمَنوا إِنَّمَا الخَمرُ وَالمَيسِرُ وَالأَنصابُ وَالأَزلامُ رِجسٌ مِن عَمَلِ الشَّيطانِ فَاجتَنِبوهُ لَعَلَّكُم تُفلِحونَ

    হে মুমিনগণ, নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদী ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তো নাপাক শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।

    [১৬:৬৭] আন নাহালে
    وَمِن ثَمَراتِ النَّخيلِ وَالأَعنابِ تَتَّخِذونَ مِنهُ سَكَرًا وَرِزقًا حَسَنًا إِنَّ في ذلِكَ لَآيَةً لِقَومٍ يَعقِلونَ

    আর তোমরা খেজুর গাছের ফল ও আঙ্গুর থেকে মাদক* ও উত্তম রিয্ক গ্রহণ কর। নিশ্চয় এতে এমন কওমের জন্য নিদর্শন রয়েছে, যারা বুঝে।

  23. আল্লাহকে দেখা যায় না!

    কিছু লোকজন বলে, ‘যদি আল্লাহ থেকে থাকে, তাহলে দেখাও?’ যদি দেখাতে পারো তাহলে মেনে নিব।

    আর যখন আধুনিক বা ভৌতিক শাস্ত্ৰ বলে, ‘ইলেকট্রন আছে কিন্তু দেখা যায় না।‘ তখন কেউ এই সন্দেহ প্রকাশ করে না।

    তখন কোন ডাক্তার বা বিজ্ঞানী এই সন্দেহ প্রকাশ করে না যে,’আমরা এটা কিভাবে মেনে নিব?’

    আর তুমি বলছো, ‘আল্লাহকে দেখা যায় না, যদি থেকে থাকে তাহলে দেখাও?’

    কোন বিজ্ঞানের ক্ষমতা নেই যে, ইলেকট্রন কে দেখাতে পারবে। কিন্তু বিজ্ঞান বলে, ‘ইলেকট্রন আছে, আমরা তার পরিণাম দেখছি।

    একই কথা তো পুরান শাস্ত্র বলছে, ‘আল্লাহকে দেখা যায় না, কিন্তু দেখ পরিণাম দেখা যাচ্ছে; এত বিশাল ব্যবস্থা-এত বড় আয়োজন।‘

    আর কিসের প্রমাণ চাও?

    তুমি একটু মরুভূমিতে যাও, তাহলে দেখতে পাবে একটি সাধারণ হাত ঘড়ি পড়ে রয়েছে; অথচ কাউকে খুঁজে পাবে না, এবং দূর থেকে দূর পর্যন্ত কোন পদচিহ্ন দেখতে পাবে না। তারপরেও তুমি বলবে, ‘অবশ্যই এখানে কোন মানুষ এসেছিল, তা না হলে এই ঘড়ি কোথা থেকে আসলো? তখন তুমি এটা মেনে নিবে না যে আকস্মিক ঘটনা, এই ঘড়ি নিজে থেকে নির্মিত হয়েছে। টিকটিক করে ঘড়ি এখনো বাজছে। তুমি কি এটা মেনে নিতে পারবে আকস্মিক ঘটনা?

  24. “আমি আমার বন্দার প্রতি যাহা অবতীর্ন করেছি, তাহাতে তোমাদের বিন্দুমাত্র কোন সন্দেহ থাকলে, তোমরা ইহার অনুরুপ কোন সূরা আনয়ন কর। এবং তোমরা যদি সত্যবাদি হও তাহলে আল্লাহ ব্যাতিত তোমাদের সকল সাহায্যকারীকে নিয়ে আস। যদি আনয়ন না কর তবে সেই আগুনকে ভয় কর কাফিরদের জন্য যাহা প্রস্তুত করিয়া রাখা হয়েছে। (সূরা বাকারা:২৩, ২৪)।

  25. ভাই অনেক কষ্ট হয়েছে এত তথ্য কালেকশন করার জন্য।
    আমার অনেক উপকার হয়েছে। অনেক কিছু জানা ছিল না। তবে আপনার প্রশ্ন গুলোর জবাব আপনার দৃষ্ট ভঙ্গি থেকে মিলাতে পারেন নাই। তাই এর এর প্রশ্ন করেছেন।
    আমি আপনাকে একটা প্রশ করিঃ
    আপনার দুই সহকারীকে চেয়ারে বসে বললেন যাও পানি আন।
    ১ জন টোয়লেট থেকে বদনায় আর এক জন গ্লাসে করে খাবার পানি দিল।
    এবার বলেন আপনি কোন পানি খাবেন?

Leave a comment

Your email will not be published.