গুরুপ্রসাদী প্রথাঃ হিন্দুসমাজে নববধূ যখন গুরুদেবের প্রসাদ
হিন্দুসমাজে একধরণের প্রথার প্রচলন ছিল। এই প্রথা অনুসারে, বিয়ের পর স্ত্রীর সাথে সহবাস করার আগেই গুরুদেবের কাছে নিজের স্ত্রীকে নিবেদন করতে হত। গুরুর খাওয়া হয়ে গেলে তার প্রসাদ পেতেন শিষ্য, তাই এই প্রথার নাম হল গুরুপ্রসাদী।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে লেখা কালিপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতুম প্যাঁচার নক্সা’ বইয়ে এই প্রথার মোটামুটি ভালো বিবরণ মেলে। কালিপ্রসন্ন তার বইয়ে গুরুপ্রসাদী প্রথার এরকম বিবরণ দিয়েছেনঃ
পূর্বে মেদিনীপুর অঞ্চলে বৈষ্ণবতন্ত্রের গুরুপ্রসাদী প্রথা প্রচলিত ছিল। নতুন বিয়ে হলে গুরুসেবা না করে স্বামীসহবাস করবার অনুমতি ছিল না। বেতালপুরের রামেশ্বর চক্রবর্তী পাড়াগাঁ অঞ্চলে একজন বিশিষ্ট লোক ছিলেন। চক্রবর্তীর ছেলেপুলে কিছুই ছিল না, কেবল ছিল একটি মাত্র কন্যা। শহরের ব্রকভানু চক্রবর্তীর ছেলে হরহরি চক্রবর্তীর সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের সময় বর কনের বয়স ১০/৫ বছরের বেশি ছিল না। সুতরাং জামাই নিয়ে যাওয়া কি মেয়ে আনা কিছুদিনের জন্য বন্ধ ছিল। কেবল পাল পার্বণে, পিঠে সংক্রান্তি ও ষষ্ঠীর বাটায় তত্ত্ব তাবাস চলতো।
যখন বরের বয়স প্রায় কুড়ি-একুশ হল তখন তার শ্বশুরমশাই তাকে নিয়ে গেলেন। শহুরে জামাইকে দেখার জন্য গ্রামের নানা দিক থেকে লোক আসতে লাগলো, সে হৈ হৈ রৈ রৈ ব্যাপার। এমন সময় মেয়ের বাড়ির লোকেদের মনে পড়লো গুরুপ্রসাদী প্রথার কথা। তাই পঞ্জিকাতে ভালো একটি দিন দেখে গোঁসাইগুরুকে খবর পাঠানো হল। গোঁসাইও খোল করতাল নিয়ে তার দলবলের সাথে আগমন করলেন।
হরহরি গুরুপ্রসাদীর ব্যাপারে ব্যাপারে তেমন কিছু জানতেন না। কিন্তু তার স্ত্রীকে নতুন কাপড়, আর প্রচুর গয়না পড়ে ঘুরে বেড়াতে দেখে এবং শ্বশুরবাড়ির সবাইকে ভীষণ ব্যতিব্যস্ত দেখে তার মনে সন্দেহ হল। তিনি এক ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “ কিহে, আজকে বাড়িতে কিসের এত আয়োজন?” ছেলেটি বললো, “ জামাই বাবু, তুমি জানো না, আজ আমাদের গুরুপ্রসাদী হবে। “
গুরুপ্রসাদীর কথা শুনে বর হরহরি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। কিভাবে এই গুরুপ্রসাদী হতে তার স্ত্রীকে রক্ষা করা যায় তিনি তার উপায় ভাবতে লাগলেন। আর এর মধ্যে গোঁসাই বরের মত সেজেগুজে জামাইবাবুর ঘরে গিয়ে শুলেন। এরপর গুরুপ্রসাদির জন্য হরহরি বাবুর স্ত্রী নানা রকমের অলঙ্কার পড়ে সেই ঘরে প্রবেশ করলেন।
হরহরিও গোঁসাইয়ের ঘরে ঢোকার আগেই বুদ্ধি করে একটি লাঠি নিয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে ছিলেন। হরহরি দেখলেন, তার স্ত্রী গোঁসাইকে প্রণাম করে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন। প্রভু অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে মেয়েটিকে বিছানায় নিয়ে গেলেন। আর মেয়েটিও বা কি করে, ‘বংশপরম্পরানুগত ধর্ম না মানা মহাপাপ’- এমন ধারণা তার মনে গেঁথে ছিল। তাই সেও আপত্তি করলো না। এবার গুরুদেব মেয়েটিকে স্পর্শ করে মেয়েটিকে বলতে বললেন, “আমি রাধা তুমি কৃষ্ণ”। মেয়েটিও গুরুদেবের কথামতো বললো,““আমি রাধা তুমি কৃষ্ণ”। মেয়েটি সবে তিনবার বলেছে, “আমি রাধা তুমি কৃষ্ণ” হরহরি বাবু আর থাকতে পারলেন না। খাটের নিচ থেকে উঠে এসে গুরুদেবের চরম ধোলাই করলেন। ধোলাই খেয়ে গুরুদেব সজোরে চিৎকার করতে থাকেন। গুরুপ্রসাদী করতে যাওয়ার আগে গুরুদেব তার শিষ্যদের বলে এসেছিলেন প্রসাদী সেড়ে উনি ‘হরিবোল’ বললে সবাই যেন খোল করতাল বাজায়। এখন গোঁসাইয়ের আর্তনাদকে ‘হরিবোল’ ভেবে শিষ্যরা খোল করতাল বাজাতে শুরু করলো, বাড়ির মেয়েরা উলু দিতে লাগলো। সবকিছুর শব্দে চারপাশে হুলস্থূল পড়ে গেল।
হরহরি বাবু দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। তাকে দেখে সবাই অবাক। সকলে ঘরে ঢুকে গোস্বামীকে অচেতন, আহত অবস্থায় দেখতে পেলেন।আর হরহরি সোজা থানায় গেলেন।
“সেই থেকে গুরুপ্রসাদী প্রথা বন্ধ হয়ে গেল, লোকের চৈতন্য হল, গুরুদেবরাও ভয় পেল।”
এবার আরেকটি কাহিনী বলা যাক। গুরুপ্রসাদী প্রথার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই, তবে গোঁসাইদের লীলাখেলার সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে।
একবার এক বাড়ির পুরুষেরা বাড়িতে ছিলেন না। এমন সময় গোঁসাই সেখানে গিয়ে হাজির হলেন। প্রভুকে সমাদর করে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাওয়া হল। বাড়ির সকল মেয়েরা একজায়গায় হলে গোঁসাই চৈতন্য চরিতামৃত ও ভাগবত অনুসারে বেছে বেছে গোছালো গোছালো লীলা করতে শুরু করলেন। লীলা সেরে গোঁসাই বাড়ি ফিরছেন এমন সময় সেই বাড়ির ছোটো বাবুর সাথে তার দেখা। ছোটো বাবু একটু মেজাজি লোক। প্রভুকে দেখেই তার মাথা গরম হয়ে গেল। তিনি প্রভুকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার ভাগবতের মতে লীলা দেখানো কি শেষ হল?” প্রভু ভয়ে ভয়ে আমতা আমতা করতে লাগলেন – “আজ্ঞে, ইয়ে… মানে… বলছিলাম কি” ছোটো বাবুর একজন মোসায়েব ছিল। সে এর মাঝে বলে উঠলো , “ হুজুর! গোঁসাই সকল রকমের লীলা করে চললেন, কিন্তু গোবর্ধন পর্বতটাতো ধারণ করলেন না? আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে গোঁসাইকে গোবর্ধন পর্বতটাও ধারণ করানো যেত!” একথা শুনে ছোটো বাবু মাথা নাড়িয়ে বললেন, “ হুম, একদম ঠিক বলেছ। গোঁসাই এত লীলা করলেন, এটাও বা বাকি থাকবে কেন? যাও ওনাকে গোবর্ধন ধারণ করাও।“ ছোটোবাবুর আদেশে দশ বারো মনের একটি পাথর গোঁসাই এর ঘাড়ে চাপানো হল। পাথরের ভারে গোস্বামীর কোমর গেল ভেঙ্গে। এরপর থেকে প্রভুরা আর এই ধরণের জায়গায় লীলা করতে যেতেন না। প্রয়োজন হলে শিষ্যারা পালকী চড়ে গুরুদেবের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হতেন।
তথ্যসূত্রঃ এই দুটি কাহিনীই কালিপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতুম প্যাঁচার নক্সা’ বই থেকে উল্লেখ করা হয়েছে
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
Its purpose is not theological neutrality or artificial both-sides balance, but evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.
Neutrality here means methodological fairness: accurate use of sources, logical rigor, evidentiary discipline, and factual consistency. It does not mean moral indifference or equal treatment between harmful doctrines and their criticism.
Strong criticism should not be mistaken for bias if it is supported by evidence and sound reasoning.
This article should be evaluated through source quality, evidentiary strength, logical rigor, factual consistency, and fairness in representing opposing claims—not through theological sensitivity, apologetic expectations, or demand for rhetorical softness.


Comments are closed.