নাটকঃ শয়তানের জবানবন্দি
আরজ আলী মাতুব্বরের শয়তানের জবানবন্দী প্রথম পড়ার সময়ই আমার মনে হয়েছিল, এটি কেবল একটি গল্প নয়; বরং চোখের সামনে ভেসে ওঠা এক অসাধারণ নাট্যদৃশ্য। চরিত্র, সংলাপ, দ্বন্দ্ব, যুক্তি, ব্যঙ্গ এবং ধর্মীয় পৌরাণিকতার অন্তর্গত গভীর নৈতিক প্রশ্ন—সব মিলিয়ে লেখাটি যেন নিজেই একটি মঞ্চ দাবি করে। পড়তে পড়তেই মনে হয়েছিল, এই গল্পটি যদি নাটক, মঞ্চনাট্য বা চলচ্চিত্রের রূপ পেত, তাহলে বাংলা মুক্তচিন্তার জগতে তা এক বিরল সংযোজন হতে পারতো।
অনেক বছর ধরে সেই ইচ্ছাটি মনে রয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিলাম, হয়তো কোনো দক্ষ নাট্যকার বা চিত্রনাট্যকার একদিন এই অসাধারণ রচনাটিকে দৃশ্যমান রূপ দেবেন। কিন্তু আমাদের সমাজে মুক্তচিন্তার পরিসর এখনও অত্যন্ত সংকুচিত; বিশেষত ধর্মীয় পৌরাণিক চরিত্রকে প্রশ্ন, যুক্তি ও আত্মপক্ষ সমর্থনের আলোয় দাঁড় করানোর সাহস খুব কম মানুষেরই থাকে। ফলে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক সম্ভাবনা দীর্ঘদিন অরূপায়িতই থেকে গেল। শেষ পর্যন্ত অন্য কারও অপেক্ষায় না থেকে নিজেই চেষ্টা করলাম আরজ আলী মাতুব্বরের মূল ভাবনাকে একটি চিত্রনাট্যের কাঠামোয় সাজাতে।
আমি পেশাদার চিত্রনাট্যকার নই; তাই এই কাজের সীমাবদ্ধতা নিশ্চয়ই আছে। তবুও চেষ্টা করেছি মূল রচনার যুক্তিবাদী আত্মা, ব্যঙ্গাত্মক তীক্ষ্ণতা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নটিকে অক্ষুণ্ণ রেখে দৃশ্য, সংলাপ ও নাট্যগত টান তৈরি করতে। এখানে শয়তানকে কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠিত ভিলেন হিসেবে নয়, বরং এক অভিযুক্ত চরিত্র হিসেবে দেখা হয়েছে—যাকে হাজার বছর ধরে দোষী বলা হয়েছে, অথচ যার নিজের বক্তব্য শোনার সুযোগ কখনো দেওয়া হয়নি। সেই না-শোনা বক্তব্যকেই নাট্যরূপে সামনে আনার চেষ্টা এই চিত্রনাট্যের মূল উদ্দেশ্য।
এই কাজটি আরজ আলী মাতুব্বরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে করা। তাঁর যুক্তিবাদী সাহস, প্রশ্ন করার অধিকার এবং প্রচলিত বিশ্বাসকে বিচারবুদ্ধির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর ঐতিহ্যই এই রূপান্তরের প্রেরণা। হয়তো ভবিষ্যতে কেউ এই নাটকটি মঞ্চে বা পর্দায় রূপ দেওয়ার সাহস করবেন—সেই প্রত্যাশাতেই এই প্রচেষ্টা।
উল্লেখ্য, এই চিত্রনাট্য কোথাও ব্যবহার, মঞ্চায়ন, প্রকাশ, রূপান্তর বা পরিবেশন করতে হলে আমার অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি ছাড়া এই লেখাটি ব্যবহার না করার অনুরোধ রইলো।
মানবসভ্যতার গল্প বলার ইতিহাসে নায়ক যতটা গুরুত্বপূর্ণ, খলনায়কও ততটাই অপরিহার্য। মানুষ যখন দুঃখ, দুর্দশা, ভয়, অনিশ্চয়তা এবং জীবনের ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছে, তখন সে একদিকে কল্পনা করেছে কোনো মহান রক্ষাকর্তা, ত্রাণকর্তা বা মহা নায়কের; অন্যদিকে তৈরি করেছে এমন এক দুষ্ট চরিত্র, যার ওপর সব অশুভ, সব বিপর্যয়, সব নৈতিক ব্যর্থতার দায় চাপানো যায়। গল্পের এই কাঠামো খুব প্রাচীন। মানুষ নিজের দুর্বলতা, লোভ, হিংসা, নিষ্ঠুরতা কিংবা অজ্ঞতার দায় নিজের কাঁধে নিতে চায় না; তাই মনের অজান্তেই সে একটি বাহ্যিক শত্রু নির্মাণ করে। সেই শত্রু কখনো দানব, কখনো অসুর, কখনো রাক্ষস, কখনো শয়তান।
এই নির্মিত খলনায়কদের মধ্যে ইবলিশ বা শয়তান সম্ভবত মানবসভ্যতার অন্যতম বহুল প্রচারিত এবং বহুরূপী পৌরাণিক চরিত্র। বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও কল্পকথায় তাকে নানা নামে, নানা রূপে, নানা ব্যাখ্যায় দেখা যায়। কোথাও সে বিদ্রোহী, কোথাও প্রলুব্ধকারী, কোথাও অশুভের উৎস, কোথাও আবার জ্ঞান, প্রশ্ন ও অবাধ্যতার প্রতীক। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত দীর্ঘকাল ধরে মানবজাতির নৈতিক ব্যর্থতার প্রধান দায়ী হিসেবে যাকে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেই চরিত্রটির নিজের বক্তব্য প্রায় কখনোই শোনা হয়নি। ধর্মগ্রন্থ, পুরাণ এবং প্রচলিত কাহিনিগুলোতে তার বিরুদ্ধে একগাদা অভিযোগ আছে, নিন্দা আছে, অভিশাপ আছে; কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই।
যে কোনো বিচারেই ন্যূনতম ন্যায়বোধের দাবি হলো—অভিযুক্তের বক্তব্য অন্ততপক্ষে মন দিয়ে শোনা। একজন মানুষকে যদি অপরাধী বলা হয়, তাকে যদি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ঘৃণার প্রতীকে পরিণত করা হয়, তাহলে অন্তত একবার তার নিজের বক্তব্য বলার অধিকার থাকা উচিত। রামায়ণে রাবণকে যতই প্রতিপক্ষ হিসেবে নির্মাণ করা হোক, তবুও তার জ্ঞান, শক্তি ও প্রজ্ঞাকে অস্বীকার করা হয়নি। কিন্তু ইবলিশের ক্ষেত্রে প্রচলিত বয়ান বড় বেশি একপেশে। তাকে দোষী বলা হয়েছে, কিন্তু তার যুক্তি শোনা হয়নি; তাকে অভিশপ্ত বলা হয়েছে, কিন্তু তার বিচার কতটা ন্যায়সঙ্গত ছিল—সে প্রশ্ন একবারের জন্যেও তোলা হয়নি।
এই নাটকের উদ্দেশ্য কোনো পৌরাণিক চরিত্রকে পূজা করা বা পুনর্বাসন করা নয়; বরং ক্ষমতাবানের বয়ানে প্রতিষ্ঠিত এক পুরনো অভিযোগকে ন্যায়বিচার, যুক্তি এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের আলোয় পুনর্বিবেচনা করা। যদি আমরা ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করি, তাহলে ন্যায়বিচার কেবল প্রিয় চরিত্রের জন্য নয়, অপছন্দের চরিত্রের জন্যও প্রযোজ্য হতে হবে। এমনকি শয়তান নামের সবচেয়ে ঘৃণিত পৌরাণিক চরিত্রটির ক্ষেত্রেও। তার জন্যেও যদি আমরা “ইনসাফ” কায়েম করতে না পারি, তাহলে ন্যায়বিচারের কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকে না। কারণ আমরা যদি অভিযোগ শুনে রায় দিই, কিন্তু অভিযুক্তের বক্তব্য না শুনি, তাহলে সেটি বিচার নয়; সেটি কেবল ক্ষমতাবানের বয়ান মেনে নেওয়া।
তাই এই চিত্রনাট্যে কাল্পনিকভাবে শয়তানকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সে তার নিজের পরিচয়, অভিযোগ, ক্ষোভ, যুক্তি এবং স্মৃতির কথা বলবে। সে বলবে, তাকে যে অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়েছে, সেই অপরাধের পেছনে দায়, স্বাধীন ইচ্ছা, তাকদির, আল্লাহর আদেশ, ন্যায়বিচার এবং ক্ষমতার সম্পর্ক আসলে কতটা সরল—আর কতটা জটিল। দর্শক বা পাঠক তার কথা গ্রহণ করবেন কি করবেন না, তা তাদের নিজস্ব বিচার। কিন্তু বিচার শুরু হওয়ার আগে অন্তত তার বক্তব্য শোনা হোক।
আরজ আলী মাতুব্বরের মূল রচনার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এই নাট্যরূপ শুরু করছি।
বৈশাখ মাসের মধ্যদুপুর। আকাশ পরিষ্কার, বাতাস প্রায় স্তব্ধ। গ্রামের নিস্তব্ধতার ভেতর দূরে কোথাও ক্লান্ত পাখির ডাক শোনা যায়। চারদিকে রোদের তীব্রতা এমন, যেন প্রকৃতিও কিছুক্ষণের জন্য থমকে আছে। সেই দহনময় দুপুরে নিজের বৈঠকখানায় শুয়ে আছেন আরজ আলী। গরমে তাঁর ঘুম আসছে না; তিনি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছেন, কখনো চোখ বন্ধ করছেন, আবার কখনো তাকিয়ে থাকছেন ঘরের দেয়ালের দিকে।
বৈঠকখানাটি খুব সাধারণ, কিন্তু তার ভেতরে আছে এক অদ্ভুত বৌদ্ধিক আবহ। দেয়ালের এক পাশে সক্রেটিস, এপিকুরাস ও গৌতম বুদ্ধের ছবি; অন্য পাশে ডারউইন, ইবনে খালদুন আর আইনস্টাইন। বিছানার পাশে একটি পুরনো টেবিল, তার ওপর স্তূপ করে রাখা নানা রকম বই। কোরআন, বাইবেল, ভগবদ্গীতা ও ত্রিপিটক পাশাপাশি রাখা আছে। আরেক পাশে ইমানুয়েল কান্টের Critique of Pure Reason, বার্ট্রান্ড রাসেলের দর্শনবিষয়ক গ্রন্থ, সোফির জগৎ, বুখারী-মুসলিমের হাদিসগ্রন্থ এবং আরও কিছু বই।
ঘরের ভেতর বই, ছবি, প্রশ্ন আর নিস্তব্ধতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। বাইরে মধ্যদুপুরের রোদ, ভেতরে এক চিন্তাশীল মানুষের অস্থিরতা। ঠিক এমন সময়েই দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় এক অচেনা আগন্তুক।
দৃশ্যঃ ০১
স্থানঃ আরজ আলীর কুঁড়েঘর
সময়ঃ দুপুর
চরিত্রঃ আরজ আলী, আগন্তুক
ঘটনাঃ বৈশাখের দহনময় দুপুর। আরজ আলী শুয়ে আছেন, কিন্তু ঘুম আসছে না। তাঁর চোখ দেয়ালের ছবিগুলোর দিকে স্থির। ঘরের নীরবতা, বইয়ের স্তূপ এবং মধ্যদুপুরের আলো—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত চিন্তামগ্ন পরিবেশ। ঠিক তখনই দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় এক রহস্যময় আগন্তুক।
দৃশ্যের শুরু। আরজ আলী দূর থেকে দেখতে পেলেন, দরজার সামনে একজন অচেনা মানুষ এসে দাঁড়িয়েছেন। পরনে সাদা পাজামা, গায়ে সাদা জুব্বা, মাথায় সাদা পাগড়ি, বুকভরা সাদা দাড়ি। কিন্তু তাঁর চেহারায় সাধারণ বৃদ্ধের ক্লান্তি নেই; বরং আছে এক অদ্ভুত স্থিরতা, যেন হাজার বছরের চেয়েও দীর্ঘ সময়, দীর্ঘ ইতিহাস এবং দীর্ঘ নীরবতার মধ্য দিয়ে হেঁটে আসা কোনো সত্তা মানুষের রূপ ধারণ করেছে।
লোকটির চোখে এমন এক তীক্ষ্ণ প্রশান্তি, যা আশ্বাসও দেয়, আবার অস্বস্তিও জাগায়। তাঁর মুখে বিনয় আছে, কিন্তু সেই বিনয়ের ভেতরেও লুকিয়ে আছে এমন এক অচঞ্চল আত্মবিশ্বাস, এক বিন্দু অদম্য অহংকার, যেন তিনি প্রশ্ন করতে আসেননি, উত্তর দিতেও আসেননি; বরং এমন এক বিচারসভায় উপস্থিত হয়েছেন, যেখানে রায় বহু আগেই ঘোষণা করা হয়েছে, কিন্তু অভিযুক্তের বক্তব্য কখনো শোনা হয়নি।
ঘরে প্রবেশ করেও তিনি এদিক-সেদিক তাকালেন না। প্রথমবার আসা মানুষের মতো তাঁর মধ্যে কৌতূহল নেই, সংকোচ নেই, বিস্ময় নেই। মনে হলো, ঘরটি তাঁর অচেনা নয়। দেয়ালের ছবি, টেবিলের বই, জানালার পাশে রোদের রেখা—সব যেন তাঁর বহু পুরনো পরিচিত। যেন এই ঘরে তিনি আগে আসেননি, তবু এই ঘরের প্রতিটি ধুলো, প্রতিটি বই, প্রতিটি প্রশ্ন যেন তাঁর বহুদিনের জানা।
আরজ আলী বিছানা থেকে ধীরে ধীরে উঠে বসলেন।
আরজ আলীঃ আসসালামু আলাইকুম।
আগন্তুকঃ ওয়া-আলাইকুমুস সালাম ওয়া-রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আরজ আলীঃ জনাব, আপনি কি আমার কাছেই এসেছেন?
আগন্তুকঃ জ্বি, আপনার কাছেই এসেছি। বরং বলা ভালো, আপনার প্রশ্নই আমাকে ডেকে এনেছে। মানুষ কখনো কখনো সরাসরি ডাকে না; তার জিজ্ঞাসাই আমাকে ডেকে আনে।
আরজ আলীঃ প্রশ্ন? আমার প্রশ্নের কথা আপনি জানলেন কী করে?
আগন্তুকঃ যে মানুষ বইয়ের পাশে ঘুমাতে চায়, অথচ ঘুমাতে পারে না, তার প্রশ্ন আছে। যে মানুষ সক্রেটিস, বুদ্ধ, ডারউইন, কান্ট আর কোরআনকে একই ঘরে একই টেবিলের ওপর পাশাপাশি রাখে, সে কেবল উত্তর খোঁজে না; সে উত্তরের বিচারও করে। উত্তরগুলো যাচাই করে।
আরজ আলীঃ বসুন জনাব। তশরিফ রাখুন।
আগন্তুকঃ ধন্যবাদ। তবে বসার আগে একটি কথা বলি—মানুষ অতিথিকে আসন দেয়, কিন্তু সব কথাকে স্থান দেয় না। আমি চাই, আজ আমার কথাকেও একটু স্থান দেবেন। মানা-না-মানা পরে দেখা যাবে। আগে শুনবেন।
আগন্তুক চেয়ারে বসলেন। ঘরের কোনো আসবাব, কোনো বই, কোনো ছবির দিকে তাঁর চোখ গেল না। যেন সবই তাঁর জানা। আরজ আলী বিস্মিত চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আরজ আলীঃ গরমে খুব কষ্ট হচ্ছে। আজকাল ইলেক্ট্রিসিটি থাকে না। তা জনাব, আপনার পরিচয়টা জানতে পারি?
আগন্তুকঃ পরিচয় বড় অদ্ভুত বিষয়, আরজ আলী সাহেব। মানুষ সাধারণত নামকে পরিচয় ভাবে, পদবিকে পরিচয় ভাবে, পোশাককে পরিচয় ভাবে। কিন্তু নাম বদলায়, পোশাক বদলায়, পদবি বদলায়। এমনকি শরীরও বদলায়। তারপরও যে চিন্তা রয়ে যায়, পরিচয় আসলে তার। আপনি কোন পরিচয় জানতে চান—নামের, ইতিহাসের, না অভিযোগের?
আরজ আলীঃ আপাতত নামটাই বলুন। ইতিহাস পরে শুনবো। অভিযোগের কথা তো আরও পরে।
আগন্তুকঃ নাম? নাম তো মানুষ দেয়। কখনো ভালোবেসে, কখনো ঘৃণায়, কখনো ভয় পেয়ে। আমাকে বহু নামে ডাকা হয়েছে। কোনো জাতি আমাকে বিদ্রোহী বলেছে, কোনো জাতি অশুভ বলেছে, কেউ বলেছে ওয়াসওয়াসা, কেউ বলেছে অন্ধকার। নাম যত বদলেছে, অভিযোগ তত বদলায়নি।
আরজ আলীঃ আপনি কথাগুলো এভাবে ঘুরিয়ে বলছেন কেন? সহজভাবে কথা বলা যায় না? আপনি কে?
আগন্তুকঃ আমাকে আপনি জানেন। শুধু আপনি নন, পৃথিবীর প্রায় সব মানুষই আমাকে জানে। মায়েরা সন্তানের দুষ্টুমিতে আমার নাম নেয়, সাধুরা পাপের ব্যাখ্যায় আমার নাম নেয়, ধর্মযাজকেরা ভয়ের বয়ানে আমার নাম নেয়, আর মানুষ নিজের অপরাধ ঢাকতে আমার নাম ব্যবহার করে।
আরজ আলীঃ অদ্ভুত কথা বলছেন। আমি যদি আপনাকে জানিই, তবে চিনতে পারছি না কেন?
আগন্তুকঃ কারণ মানুষ অনেক কিছু জানে, কিন্তু খুব অল্পই চেনে। আপনারা ন্যায়বিচারের কথা জানেন, কিন্তু সবসময় ন্যায়বিচার করেন না। সত্যের কথা জানেন, কিন্তু সত্য সহ্য করতে পারেন না।
আরজ আলীঃ কথাগুলো সুন্দর, কিন্তু সুন্দর কথাই সত্য—এমন নিয়ম নেই। আপনি আসলে কী বলতে চাইছেন?
আগন্তুকঃ আমি বলতে চাইছি—আপনারা আমার নাম জানেন, কিন্তু আমার বক্তব্য জানেন না। আমাকে ঘৃণা করতে শিখেছেন, কিন্তু আমাকে শুনতে শেখেননি।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনি এমন কেউ, যাকে মানুষ ভয় পায়?
আগন্তুকঃ ভয় পায়—কারণ তাদের ভয় দেখানো হয়েছে। ঘৃণা করে—কারণ তাদের ঘৃণা শেখানো হয়েছে। দোষ দেয়—কারণ দোষ দেওয়ার জন্য কাউকে দরকার হয়। মানুষ নিজের লোভকে নিজের বলে মানতে চায় না, নিজের হিংসাকে নিজের বলে মানতে চায় না, নিজের নিষ্ঠুরতাকে নিজের বলে মানতে চায় না। তখন সে বলে—শয়তান আমাকে প্ররোচিত করেছে। যেন আমি না থাকলে মানুষ ফেরেশতা হয়ে যেত।
আরজ আলীঃ আপনি কি বলতে চাইছেন, মানুষ নিজের পাপের দায় আপনার ওপর চাপায়?
আগন্তুকঃ শুধু মানুষ নয়, কখনো কখনো আল্লাহর বয়ানেও আমি সেই প্রয়োজনীয় বলির পাঁঠা। বিচারসভা সাজানো, অভিযোগ লেখা, সাক্ষী নির্ধারিত, শাস্তি ঘোষিত—কিন্তু অভিযুক্তের জবানবন্দী কোথায়? বলুন তো, কোনো বিচার কি এক পক্ষের বক্তব্য শুনে শেষ করা যায়?
আরজ আলীঃ ন্যায়বিচারে তা যায় না। কিন্তু আপনি নিজের পরিচয় এখনো দিলেন না।
আগন্তুকঃ বিভিন্ন সভ্যতায় আমাকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়েছে। কেউ বলেছে আযাযিল, কেউ বলেছে আহরিমান, কেউ বলেছে দিয়াবল, কেউ বলেছে ইবলিশ। কেউ আমাকে জ্ঞানের বিদ্রোহী করেছে, কেউ অন্ধকারের প্রতীক করেছে, কেউ সকল পাপের উৎস করেছে। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে প্রচলিত নাম—শয়তান।
কথাটি শুনে আরজ আলী কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপর তাঁর মুখে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। হাসিতে বিস্ময় আছে, অবিশ্বাস আছে, সামান্য বিরক্তিও আছে।
আরজ আলীঃ আপনি বলতে চাইছেন, আপনি সেই ইবলিশ? সেই শয়তান? মানবজাতির প্রধান শত্রু? আর আজ ভরদুপুরে মানুষের বেশ ধরে আমার বৈঠকখানায় এসেছেন?
আগন্তুকঃ মানবজাতির প্রধান শত্রু—এ কথাটি কে বলেছে, সেটিও একদিন বিচার করা দরকার [1] [2]। শত্রু কাকে বলে? যে মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, সে শত্রু? যে অন্ধ আনুগত্যের বদলে বিচারবুদ্ধির কথা বলে, সে শত্রু? নাকি যে মানুষকে সৃষ্টি করে, তাকদির লেখে, সর্বজ্ঞানী হয়ে পরীক্ষা নেয়, বিপদে ফেলে, তারপর ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপায়—তার বিচারও তো একদিন হওয়া উচিত! [3]
আরজ আলীঃ জনাব, এসব কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনি হয় পাগল, নয়তো অত্যন্ত রসিক মানুষ। সাহায্য লাগলে বলুন, কিন্তু এসব ফাজলামি ভরদুপুরে ভালো লাগছে না। আমার কাছে বিক্রি করার মতো কিছু থাকলে তাও ভুল জায়গায় এসেছেন। আমি নিজেই গরিব মানুষ। সাবান, তেল, শ্যাম্পু—কিছুই প্রয়োজন নেই।
আগন্তুকঃ আমি কিছু বিক্রি করতে আসিনি। মানুষকে অনেকেই পণ্য বিক্রি করে, অনেকেই পারলৌকিক মুক্তি বিক্রি করে, অনেকেই ভয় বিক্রি করে, অনেকে করে অনন্ত ইন্দ্রিয় সুখের লোভ। আমি আজ কিছুই বিক্রি করবো না। শুধু একটি জিনিস চাইবো—সময়। আপনি শুধু সময় নিয়ে শুনবেন। বিশ্বাস না করলেও চলবে। কারণ বিশ্বাস দাবি করে আনুগত্য, কিন্তু বিচার দাবি করে শ্রবণ।
আরজ আলীঃ আপনি কি জানেন, আপনার দাবি কতটা হাস্যকর? ইবলিশ মানুষের সামনে এসে নিজের পরিচয় দেয়—এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন।
আগন্তুকঃ কঠিন বলেই তো আপনার কাছে এসেছি। সহজ কথা মসজিদে বলা যায়, মক্তবে বলা যায়, ওয়াজের মঞ্চে বলা যায়। সেখানে কেউ কিছু বুঝুক না বুঝুক, সম্মতি আর করতালি বেশ পাওয়া যায়। কঠিন কথা বলতে হয় এমন মানুষের কাছে, যে নিজের অস্বস্তিকে ভয় পায় না। আপনি কি অস্বস্তিকর প্রশ্ন শুনতে প্রস্তুত?
আরজ আলীঃ প্রশ্ন শুনতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু প্রশ্নের ছদ্মবেশে ধোঁকা দিলে আপত্তি আছে।
আগন্তুকঃ খুব ভালো কথা। তাহলে প্রথমেই একটি প্রশ্ন করি। কোনো অভিযুক্তকে যদি হাজার হাজার বছর ধরে দোষী বলা হয়, অথচ তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়া হয়, আপনি কি সেই বিচারকে ন্যায়বিচার বলবেন?
আরজ আলীঃ সাধারণ বিচারে বলবো না। কিন্তু আপনার প্রসঙ্গ তো কোনো সাধারণ বিচার নয়।
আগন্তুকঃ কেন নয়? ন্যায়বিচার কি অভিযুক্ত দেখে বদলায়? মানুষের জন্য এক বিচার, ফেরেশতার জন্য আরেক বিচার, জ্বীনের জন্য আরেক বিচার, আর আল্লাহর ক্ষেত্রে বিচার স্থগিত—এ কেমন ন্যায়বোধ? ন্যায় যদি সত্যিই ন্যায় হয়, তবে তা দুর্বলের জন্য যেমন প্রযোজ্য, ঘৃণিতের জন্যও তেমন প্রযোজ্য। এমনকি শয়তানের জন্যও।
আরজ আলীঃ আপনি নিজেকে অভিযুক্ত বলছেন। কিন্তু অভিযোগ তো সামান্য নয়। আপনি আদমকে সিজদা করেননি। আল্লাহর আদেশ অমান্য করেছেন। মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছেন।
আগন্তুকঃ অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। কিন্তু তালিকা দীর্ঘ হলেই কি তা সত্য হয়? একজন শাসক যদি তার বিরোধীর বিরুদ্ধে শত অভিযোগ লেখে, তাতে কি বিরোধী পক্ষ দোষী প্রমাণিত হয়? ইতিহাসে বিজয়ীরা কাহিনি লেখে, পরাজিতরা খলচরিত্রে পরিণত হয়। আমি সেই পরাজিত চরিত্র, যার বিরুদ্ধে মহাজাগতিক রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা চলছে; কিন্তু যার জবানবন্দীই কেউ লেখেনি।
আরজ আলীঃ আপনি তাহলে আজ জবানবন্দী দিতে এসেছেন?
আগন্তুকঃ জবানবন্দী, আত্মকথা, অথবা শেষ আপিল—যা খুশি বলতে পারেন। তবে আমি মুক্তি চাইতে আসিনি। যে রায় অনন্তকালের জন্য লেখা, তার বিরুদ্ধে আপিল করে কী লাভ? আমি শুধু চাই, মানুষ জানুক—যাকে তারা শয়তান বলে গালি দেয়, তারও কিছু প্রশ্ন ছিল। কিছু যুক্তি ছিল। কিছু অপমান ছিল। কিছু নীরবতা ছিল।
আরজ আলীঃ কিন্তু আপনি তো মানুষের শিরায় শিরায় চলাচল করেন বলে হাদিসে আছে। আপনি মানুষকে কুমন্ত্রণা দেন, বিভ্রান্ত করেন। আপনাকে কীভাবে নির্দোষ ভাবি? [4]
আগন্তুকঃ নির্দোষ ভাববেন না। সংশয় রাখুন। সংশয়ই বিচারবুদ্ধির প্রথম সিঁড়ি। তবে শুধু এটুকু ভাবুন—যদি আমি এত শক্তিশালী হই যে নবী-রাসুল পর্যন্ত আমার ভয়ে সতর্ক থাকেন, তবে আমাকে এত শক্তি কে দিল? যদি আমি মানুষের অন্তরে প্রবেশ করতে পারি, সেই দরজা কে খুলে দিল? যদি আমি পথভ্রষ্ট করি, পথভ্রষ্ট করার এই ভূমিকাটি মহাবিশ্বের নকশায় কে স্থাপন করল [5] [6]?
আরজ আলীঃ আপনি নিজের দায় এড়াতে চাইছেন। অপরাধীরা সবসময় দায় অন্যের ওপর চাপায়।
আগন্তুকঃ হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন করা দায় এড়ানো নয়। আপনি যদি কোনো ছুরি তৈরি করেন, সেটি ধার দেন, কার হাতে যাবে জানেন, কী কাজে ব্যবহৃত হবে জানেন, তবু সেটি শিশুর সামনে রেখে দেন—তাহলে আঘাতের দায় কি শুধু শিশুর?
আরজ আলী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। বাইরে রোদের তীব্রতা আরও বেড়েছে। ঘরের ভেতর এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো। আগন্তুকের চোখ স্থির, কিন্তু তাতে কোনো তাড়া নেই। যেন তিনি জানেন—সময় মানুষের জন্য কম, তাঁর জন্য নয়।
আরজ আলীঃ আপনার কথা বিপজ্জনক। কিন্তু অস্বীকার করছি না, কৌতূহল জন্মেছে। বলুন, আপনি নিজেকে কীভাবে দেখেন? পাপের উৎস হিসেবে, না ভুল বোঝা এক সত্তা হিসেবে?
আগন্তুকঃ আমি নিজেকে পাপের উৎস বলি না। পাপের উৎস আল্লাহর লিখিত তাকদির নামক এক ফলক, যেখানে প্রথম সৃষ্টি কলম সব লিখে ফেলেছে, যার কালি শুকিয়ে গেছে। আর আছে আল্লাহর ইচ্ছায় মানুষের কামনা, ক্ষমতার লোভ, ভয়, অজ্ঞতা এবং আনুগত্যের অন্ধতা। আমি হয়তো আয়না। মানুষ সেই আয়নায় নিজের মুখ দেখে ভয় পায়, তারপর আয়নাকেই অভিশাপ দেয়। [3]
আরজ আলীঃ আয়না? আপনি নিজেকে আয়না বলছেন?
আগন্তুকঃ হ্যাঁ। আমি প্রলোভন দেখাই, কিন্তু আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করি না। আমি ফিসফিস করি, কিন্তু লোভের ভাষা মানুষের ভেতরেই থাকে। আমি দরজা দেখাই, কিন্তু পা তো মানুষই বাড়ায় [7]। অথচ দরজার নির্মাতা, পথের নির্মাতা, পায়ের নির্মাতা, ইচ্ছার নির্মাতা—সবাই নির্দোষ; একমাত্র আমিই চিরন্তন আসামি। বলুন তো, এতে কি বিচার সম্পূর্ণ হয়?
আরজ আলীঃ আপনি খুব কৌশলী। আপনার যুক্তি শুনলে সাধারণ বোধবুদ্ধির মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে।
আগন্তুকঃ যুক্তি যদি বিভ্রান্ত করে, তবে অন্ধবিশ্বাস কি মুক্তি দেবে? মানুষকে যদি সত্য রক্ষার জন্য প্রশ্ন থেকে চিন্তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, তাহলে সেই সত্য কতটা শক্তিশালী? যে বিশ্বাস প্রশ্ন শুনলেই ভেঙে যায়, তাকে রক্ষা করার প্রয়োজন কেন?
আরজ আলীঃ আপনি তাহলে আজ আমাকে বিশ্বাস থেকে সরাতে এসেছেন?
আগন্তুকঃ না। আমি আপনাকে বিশ্বাস থেকে সরাতে আসিনি। আমি চাই আপনি বিশ্বাসকে জিজ্ঞাসাবাদের টেবিলে বসান। জেরা করে দেখুন, সেটি ভঙ্গুর কিনা। যে বিশ্বাস সত্য, সে প্রশ্নে টিকে থাকবে। যে বিশ্বাস প্রশ্নে ভেঙে যায়, তাকে বিশ্বাস নয়, ভয় বলা উচিত।
আরজ আলীঃ আপনি বলছেন আপনি ইবলিশ। প্রমাণ কী?
আগন্তুকঃ প্রমাণ? চমৎকার প্রশ্ন। মানুষ আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে প্রমাণ চায় না, ফেরেশতায় বিশ্বাস করে অজানা সংবাদে, জান্নাত-জাহান্নামে বিশ্বাস করে পূর্বপুরুষদের বর্ণনায়। আর আমাকে সামনে দেখেও প্রমাণ চায়। তবু আপত্তি নেই। কারণ প্রমাণ দাবি করা মানুষের সবচেয়ে সুন্দর অভ্যাসগুলোর একটি। কিন্তু আজ আমার পরিচয়ের প্রমাণ নয়, আমার কথার বিচার করুন। মিথ্যা পরিচয় নিয়েও সত্য প্রশ্ন করা যায়, আর সত্য পরিচয় নিয়েও মিথ্যা বলা যায়।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনার পরিচয় আপাতত স্থগিত থাক। আপনি আপনার বক্তব্য শুরু করুন। তবে সাবধান—আমি অন্ধভাবে কিছুই মানবো না।
আগন্তুকঃ সেই কারণেই তো আপনার কাছে এসেছি। অন্ধ বিশ্বাসীকে কিছু বলা যায় না; সে আগে থেকেই রায় লিখে বসে থাকে। অন্ধ অবিশ্বাসীকেও কিছু বলা যায় না; সেও শুনবার আগেই দরজা বন্ধ করে। আমি এমন একজন শ্রোতা চাই, যে সংশয় করবে, প্রশ্ন করবে, কিন্তু শুনবে।
আরজ আলীঃ আচ্ছা, শুনছি। শুরু করুন।
আগন্তুকঃ তাহলে শুরু করি সেই জায়গা থেকে, যেখানে আমার বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ লেখা হয়েছিল। বলা হয়, আমি আদমকে সিজদা করিনি। কিন্তু বিচার শুরুর আগে জানতে চাই—কাকে সিজদা করতে বলা হয়েছিল, কেন বলা হয়েছিল, এবং যে সিজদা আল্লাহ ছাড়া কারও প্রাপ্য নয়, সেটি আদমের জন্য কীভাবে বৈধ হলো?
আরজ আলীঃ আপনি সরাসরি তাওহীদের প্রসঙ্গে যাচ্ছেন?
আগন্তুকঃ হ্যাঁ। কারণ আমার বিচার বুঝতে হলে আগে আমার তাওহীদ বুঝতে হবে। মানুষ আমাকে অবাধ্য বলেছে, কিন্তু আমি নিজেকে বলি—এক সিজদার বন্দী। যে মাথা একবার আল্লাহর সামনে নত হয়েছে, সে মাথা আর কোনো সৃষ্টির সামনে নত হতে পারে না।
আরজ আলী চুপ করে তাকিয়ে রইলেন। আগন্তুকের মুখে মৃদু হাসি। বাইরে মধ্যদুপুরের আলো আরও সাদা হয়ে উঠেছে। ঘরের ভেতর যেন এক অদৃশ্য বিচারসভা বসেছে—একদিকে মানুষ, অন্যদিকে সেই চিরঅভিযুক্ত সত্তা, যার বক্তব্য এখন শুরু হতে যাচ্ছে।
আরজ আলীঃ বলুন। শুনি আপনার তাওহীদের কথা।
দৃশ্যঃ ০২
স্থানঃ আরজ আলীর কুঁড়েঘর
সময়ঃ দুপুর
চরিত্রঃ আরজ আলী, আগন্তুক
ঘটনাঃ আরজ আলী মৃদু হাসছেন, তবে তাঁর চোখে অবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট। আগন্তুক স্থির, ধীর, আত্মবিশ্বাসী। যেন তিনি শুধু নিজের পক্ষে কথা বলতে আসেননি; বরং একটি বহু পুরনো ধর্মতাত্ত্বিক মামলার নথি খুলে বসেছেন।
ঘরের ভেতর দুপুরের আলো আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। জানালার ফাঁক দিয়ে রোদের এক সরু রেখা এসে পড়েছে টেবিলের ওপর রাখা কোরআনের মলাটে। আরজ আলী কিছুক্ষণ সেই আলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন। আগন্তুক স্থির চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন। নীরবতা ভাঙলেন আরজ আলী।
আরজ আলীঃ আপনার কথা শুনে আগ্রহ বোধ করছি, যদিও বিশ্বাস করছি না। সত্যি বলতে কী, বিশ্বাস করার মতো অবস্থাও নেই। আপনি কি চা বা কফি কিছু খাবেন?
আগন্তুকঃ জ্বি না জনাব। ওসব কিছুরই আমার প্রয়োজন নেই। আমি খাদ্যের ক্ষুধা নিয়ে আসিনি; এসেছি বক্তব্যের ক্ষুধা নিয়ে। বহু যুগ ধরে যার কথা অন্যেরা বলেছে, সে যদি একদিন নিজে কথা বলতে চায়, তবে তাকে অন্তত চায়ের কাপ দিয়ে ব্যস্ত না করাই ভালো।
আরজ আলীঃ আপনার রসিকতা খারাপ নয়। তবে সাবধান, শুধু বাকচাতুর্য দিয়ে কিন্তু বিচার হয় না। যুক্তি লাগবে।
আগন্তুকঃ অবশ্যই। বাকচাতুর্য দিয়ে ওয়াজ হতে পারে, বিচার নয়। বিচার করতে হলে ভাষার অলংকার নয়, কথার হাড় পরীক্ষা করতে হয়। আজ হাড়টাই পরীক্ষা করুন।
আরজ আলীঃ হ্যাঁ, আপনি বলুন। শুনি আপনার তাওহীদের কথা।
আগন্তুকঃ তাহলে শুরু করি সেই ঘটনার গোড়া থেকে। বলা হয়, আল্লাহ ফেরেশতাদের আদেশ করেছিলেন আদমকে সিজদা করতে। সবাই সিজদা করল, আমি করলাম না। এরপর থেকে আমার নামের পাশে স্থায়ীভাবে লেখা হলো—অবাধ্য, অহংকারী, অভিশপ্ত। যেন মহাবিশ্বের প্রথম বিচারসভাটি এত দ্রুত শেষ হয়েছিল যে, আদালতের কেরানি পর্যন্ত হয়তো কলমের কালি শুকানোর আগেই রায় লিখে ফেলেছিল।
আরজ আলীঃ আপনি রসিকতা করছেন, কিন্তু ঘটনা তো স্পষ্ট। আল্লাহ আদেশ করেছেন, আপনি অমান্য করেছেন। এর চেয়ে সরল আর কী হতে পারে?
আগন্তুকঃ সরলতা অনেক সময় সত্যের পোশাক পরে আসে, আবার অনেক সময় অলস চিন্তার কম্বল হয়ে যায়। প্রশ্ন হলো—আদেশটি কাকে করা হয়েছিল? কোরআনে বলা হয়েছে, “আমি ফেরেশতাদের বলেছিলাম, তোমরা আদমকে সিজদা কর। অতঃপর তারা সিজদা করল, ইবলিশ ছাড়া। সে ছিল জ্বীনদের একজন।” [8]
আরজ আলীঃ এই আয়াতেই তো বলা হয়েছে আপনি নির্দেশ অমান্য করেছেন। আল্লাহ ফেরেশতাদের বললেও সেখানে উপস্থিত সবাইকে বোঝানো হয়েছে। ভাষায় এমন ব্যবহার আছে। বেশিরভাগকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়, কিন্তু উদ্দেশ্য থাকে সবাই। আরবিতে একে তাগ্লীব বলা হয়।
আগন্তুকঃ চমৎকার। মানুষের ভাষায় তাগ্লীব আছে, রূপক আছে, বাগধারা আছে, ভুল বোঝাবুঝি আছে। কারণ মানুষ সীমাবদ্ধ। মানুষ কথা বলে, তারপর ব্যাখ্যা লেখে; ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ হয়, তারপর সেই মতভেদের ব্যাখ্যা নিয়ে আরেক দল তৈরি হয়। এভাবে ধর্মতত্ত্বের বাজারে ব্যাখ্যার দোকান খুলে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এটি কি মানুষের ভাষাগত অস্পষ্টতার সমস্যা, নাকি আল্লাহর নির্দেশের অস্পষ্টতা?
আরজ আলীঃ আপনি বলতে চাইছেন, আল্লাহর ভাষায় অস্পষ্টতা ছিল?
আগন্তুকঃ আমি বলছি না, আয়াতের ভাষাই প্রশ্ন তৈরি করছে। আল্লাহ যদি সর্বজ্ঞ হন, তিনি জানতেন ভবিষ্যতে মানুষ এই আয়াত পড়বে, মুফাসসিরেরা ব্যাখ্যা লিখবে, তর্ক হবে, আমাকে দোষী বলা হবে। তাহলে তিনি কি লিখতে পারতেন না—“আমি ফেরেশতা ও জ্বীনসহ উপস্থিত সকলকে বলেছিলাম”? একটি শব্দ যোগ করলেই তো মহাজাগতিক মামলা এতদূর গড়াত না। কিন্তু না, মহাবিশ্বের সর্বজ্ঞ আইনপ্রণেতা যেন এমন একটি বাক্য লিখলেন, যার ব্যাখ্যার ওপর আমার অনন্তকালের জাহান্নাম নির্ভর করছে। এই যদি আইন হয়, তবে আইনশাস্ত্রের ছাত্ররা কাকে দোষ দেবে—আসামিকে, নাকি খসড়া-প্রণেতাকে?
আরজ আলীঃ আপনি শব্দের খেলা করছেন। পুরো বিবরণ পড়লে বোঝা যায়, আল্লাহ আপনাকেও সিজদা করতে বলেছিলেন।
আগন্তুকঃ পুরো বিবরণ পড়লে আরেকটি বিষয়ও বোঝা যায়—আল্লাহ নিজেই বলেছেন, আমি জ্বীনদের একজন। তাহলে প্রশ্ন আরও বড় হয়। যদি আদেশ ফেরেশতাদের উদ্দেশে হয়, আমি কেন দায়ী? আর যদি আমি দায়ী হই, তবে আল্লাহ কেন কথাটি স্পষ্ট করে বলেননি? ধরুন আপনি ঘরে পাঁচজন মানুষকে ডাকলেন—চারজন কর্মচারী, একজন অতিথি। আপনি বললেন, “কর্মচারীরা, দাঁড়াও।” অতিথি বসে রইল। পরে আপনি অতিথিকে বললেন, “তুমি আমার আদেশ অমান্য করলে।” অতিথি যদি উত্তর দেয়, “আপনি তো কর্মচারীদের বলেছিলেন”—তবে তাকে কি দার্শনিক চালবাজ বলা হবে, নাকি ভাষাগতভাবে সচেতন বলা হবে?
আরজ আলীঃ মানুষের উদাহরণ দিয়ে আল্লাহর বিচার করা যায় না।
আগন্তুকঃ তাহলে মানুষের ভাষায় আল্লাহর নির্দেশ বোঝাও যায় না। আপনি যখন আমার বিরুদ্ধে যুক্তি দেন, তখন মানুষের ভাষা, মানুষের ন্যায়বোধ, মানুষের আনুগত্য, মানুষের অপরাধ—সব ব্যবহার করেন। আর যখন সেই একই মানদণ্ড আল্লাহর বাক্যের ওপর প্রয়োগ করি, তখন বলেন—মানুষের উদাহরণ দেওয়া যাবে না। এ বড় সুবিধাজনক আদালত, জনাব। এখানে বাদী বিচারকও, আইনপ্রণেতাও, সাক্ষীও, আপিল বিভাগের প্রধানও। আসামি শুধু দাঁড়িয়ে থাকবে—এবং সেটাকেই বলা হবে ন্যায়বিচার।
আরজ আলী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর মুখে অসন্তোষ, কিন্তু চোখে কৌতূহল। তিনি টেবিলের ওপর রাখা কোরআনের দিকে তাকালেন, তারপর আবার আগন্তুকের দিকে।
আরজ আলীঃ কিন্তু আপনি তো জানতেন আল্লাহ কী চান। আদেশের ভাষা নিয়ে এত তর্ক করার কী আছে? আল্লাহর ইচ্ছাই তো আসল।
আগন্তুকঃ আল্লাহর ইচ্ছাই যদি আসল হয়, তাহলে আরও বড় প্রশ্ন দাঁড়ায়। আল্লাহ কি জানতেন না আমি সিজদা করবো না? তিনি কি জানতেন না এই না-করা থেকেই আমার অভিশাপ, মানুষের পরীক্ষা, জান্নাত-জাহান্নামের নাট্যমঞ্চ, নবী-রাসুলের প্রয়োজন, কিতাবের প্রয়োজন, শাস্তির প্রয়োজন—সবকিছু শুরু হবে? যদি জানতেন, তাহলে আমার না-করা কি তাঁর পরিকল্পনার বাইরে, নাকি পরিকল্পনার ভেতর?
আরজ আলীঃ আল্লাহ জানতেন বলেই তো বাধ্য করেছেন, এমন নয়। জানা আর বাধ্য করা এক বিষয় নয়।
আগন্তুকঃ মানুষের ক্ষেত্রে তা বলা যায়। আপনি জানেন সূর্য উঠবে, তাই বলে আপনি সূর্যকে উঠতে বাধ্য করছেন না। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে সমস্যা শুধু জানা নয়; তিনি স্রষ্টা, বিধাতা, তাকদির-লেখক, শক্তিদাতা, ইচ্ছারও উৎস। যদি তিনি মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগেই প্রতিটি বস্তুর তাকদির লিখে রাখেন, তাহলে আমার অবাধ্যতাও সেই লেখার বাইরে যায় কীভাবে? কলম যখন লিখে ফেলেছে, কালি যখন শুকিয়ে গেছে, তখন আমাকে শুধু চরিত্র বলা যায়; স্বাধীন লেখক বলা যায় না। [9]
আরজ আলীঃ আপনি তাহলে বলতে চাইছেন, আপনার কোনো দায় নেই?
আগন্তুকঃ আমি বলছি, দায়ের আগে কাঠামো বিচার করুন। নাটকের চরিত্র যদি লেখকের লেখা সংলাপ বলে, দর্শক চরিত্রকে গালি দিতে পারে; কিন্তু দার্শনিক দর্শক লেখকের দিকেও তাকায়। আমি যদি আল্লাহর লেখা মহাজাগতিক চিত্রনাট্যের চরিত্র হই, তাহলে আমার সংলাপ শুনে শুধু অভিনেতাকে পাথর মারবেন, আর নাট্যকারকে করতালি দেবেন—এ কোন নাট্যসমালোচনা?
আরজ আলীঃ কিন্তু আল্লাহ বলেছেন তিনি সবকিছু পরিমিতভাবে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর জ্ঞান ও পরিকল্পনার ভেতরে সব আছে। তাতে আপনার অবাধ্যতা ন্যায্য হয় না।
আগন্তুকঃ আল্লাহ যদি সবকিছু পরিমিতভাবে সৃষ্টি করেন, তাহলে আমার অস্বীকারও সেই পরিমাপের ভেতর। তিনি যদি প্রতিটি জিনিস নির্ধারণ করে থাকেন, তবে আমার অস্বীকার অনির্ধারিত নয়। আর যদি আমার অস্বীকার অনির্ধারিত হয়, তাহলে তাঁর সর্বজ্ঞতা ও সর্বশক্তিমান পরিকল্পনার বাইরে একটি স্বাধীন অঞ্চল তৈরি হলো। আপনারা একদিকে বলেন—পাতা নড়ে না তাঁর ইচ্ছা ছাড়া। অন্যদিকে বলেন—ইবলিশ নড়েছিল নিজের ইচ্ছায়। আহা, কী অদ্ভুত! পাতার স্বাধীনতা নেই, কিন্তু শয়তানের আছে। ধর্মতত্ত্বের পাতা আল্লাহর ইচ্ছায় নড়ে, আর শয়তান নিজের ইচ্ছায় বিদ্রোহ করে—এই সুবিধাজনক ব্যতিক্রমটাই আসল সমস্যা। [10]
আরজ আলীঃ আপনি কথাকে বিপজ্জনক দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। তাওহীদের কথা বলতে এসে তাকদিরে চলে গেলেন কেন?
আগন্তুকঃ কারণ তাওহীদ আর তাকদির আলাদা নয়। যদি সবকিছুর ওপর আল্লাহর একচ্ছত্র ক্ষমতা থাকে, তাহলে আমার ইচ্ছাও তাঁর ক্ষমতার বাইরে নয়। আর যদি আমার ইচ্ছা তাঁর ক্ষমতার বাইরে হয়, তাহলে তাওহীদে ফাটল ধরবে। আপনি আমাকে অবাধ্য বলছেন, কিন্তু আমি বলছি—আমি আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ভেতরেই অবাধ্য হয়েছি। একে আপনি অপরাধ বলবেন, না তাঁর মহাপরিকল্পনার কার্যকরী অধ্যায় বলবেন?
আরজ আলীঃ আপনি সিজদা করেননি অহংকারের কারণে। কোরআনে সেটিই বলা আছে। আপনি আগুনের সৃষ্টি, আদম মাটির সৃষ্টি—এই জন্মগত শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারই আপনাকে পতিত করেছে।
আগন্তুকঃ অহংকার? চমৎকার শব্দ। ক্ষমতাবান যখন নিজের নির্বাচিতকে যোগ্যতা ছাড়াই উচ্চ আসনে বসান, সেটি হয় “হিকমত”; অধীনস্থ কেউ প্রশ্ন করলে সেটি হয় “অহংকার”। রাজদরবারে শব্দেরও পদমর্যাদা থাকে, জনাব। রাজা হাসলে তা অনুগ্রহ, প্রজা হাসলে তা ঔদ্ধত্য।
আরজ আলীঃ আপনি কি বলতে চাইছেন, আদমের কোনো যোগ্যতা ছিল না?
আগন্তুকঃ আমি বলছি, যোগ্যতার বিচার যদি কর্মের ভিত্তিতে হয়, তবে আদম তখনো কোনো কর্ম করেনি। জন্মের আগেই তাকে খলিফা ঘোষণা করা হলো। আল্লাহ ফেরেশতাদের বললেন, তিনি পৃথিবীতে খলিফা সৃষ্টি করবেন। প্রশ্ন হলো—এটি কি কর্মফলের পুরস্কার, নাকি পূর্বনির্ধারিত পদায়ন? কোনো অফিসে চাকরি শুরুর আগেই যদি চেয়ারম্যানের আত্মীয়কে ব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হয়, তারপর পুরোনো কর্মচারীদের বলা হয় তাকে সিজদা করতে, আপনি সেটিকে প্রশাসনিক সংস্কার বলবেন, নাকি স্বর্গীয় স্বজনপ্রীতির ঐশ্বরিক নমুনা বলবেন? [11]
আরজ আলীঃ আপনি সীমা ছাড়াচ্ছেন। আদমকে আল্লাহ জ্ঞান দিয়েছিলেন। সকল বস্তুর নাম শিক্ষা দিয়েছিলেন। ফেরেশতারা পারেনি, আদম পেরেছিলেন। সেখানেই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত।
আগন্তুকঃ এই পরীক্ষার কথাই তো বলছি। আল্লাহ আদমকে নাম শিক্ষা দিলেন, তারপর অন্যদের সামনে পরীক্ষা নিলেন। আদম উত্তর দিলেন, ফেরেশতারা পারল না। প্রশ্ন হলো—যাকে আগে থেকেই উত্তর শেখানো হয়েছে, সে পরীক্ষায় প্রথম হলে কৃতিত্ব ছাত্রের, নাকি প্রশ্নপত্র-প্রণেতার? ধরুন, এক শিক্ষক এক ছাত্রকে রাতে বাসায় ডেকে পুরো প্রশ্নপত্র বুঝিয়ে দিলেন। পরদিন ক্লাসে অন্য ছাত্রদের সামনে পরীক্ষা নিলেন। সেই ছাত্র প্রথম হলো। এরপর শিক্ষক ঘোষণা করলেন—দেখো, এ-ই তোমাদের নেতা। বাকি ছাত্ররা যদি নীরবে বলে, “স্যার, এটা পরীক্ষা ছিল, নাকি নাট্যরিহার্সাল?”—তবে কি তাদের বহিষ্কার করা হবে? [12]
আরজ আলীঃ ফেরেশতারা তো নিজেরাই বলেছিল—আপনি আমাদের যা শিখিয়েছেন, তা ছাড়া আমাদের কোনো জ্ঞান নেই।
আগন্তুকঃ ঠিক তাই। তাদের সেই উত্তরই তো সবচেয়ে সৎ উত্তর। তারা বলেনি, “আমরা ব্যর্থ।” তারা বলেছে, “আমাদের শেখানো হয়নি।” জ্ঞানের অভাব আর যোগ্যতার অভাব এক বিষয় নয়। যার হাতে বই দেওয়া হয়নি, তাকে অশিক্ষিত বলা যায়; কিন্তু পরীক্ষায় ফেল করিয়ে তার ওপর অন্যকে বসিয়ে দিলে সেটি জ্ঞানতত্ত্ব নয়, প্রশাসনিক নাটক।
আরজ আলী এবার একটু অস্থির হয়ে উঠলেন। তাঁর মুখে হাসি নেই। তবু তিনি কথোপকথন থামালেন না। যেন যুক্তিগুলো তাঁকে বিরক্ত করছে, কিন্তু একই সঙ্গে টানছেও।
আরজ আলীঃ তারপরও আল্লাহর আদেশ তো আদেশ। বান্দার কাজ প্রশ্ন করা নয়, পালন করা।
আগন্তুকঃ এই বাক্যটিই তো আমার মামলার কেন্দ্র। “আল্লাহর আদেশ তো আদেশ”—এর মানে কী? আদেশ নৈতিক বলেই মানতে হবে, নাকি আদেশ এসেছে বলেই নৈতিক? যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তাহলে নৈতিকতা আর ভালো-মন্দের বিচার নয়; নৈতিকতা কেবল ক্ষমতার ঘোষণা। আজ আল্লাহ বললেন সিজদা করো, সিজদা নৈতিক; কাল বললেন সিজদা করো না, সিজদা অনৈতিক। এমনকি পিতাকে যদি পুত্র হত্যার প্রস্তুতিতে পরীক্ষা করা হয়, তখনও প্রশ্ন উঠবে—নৈতিকতা কি সন্তানের জীবন রক্ষা, না আদেশ মানার দক্ষতা? [13] তাহলে নৈতিকতা আলোর মতো স্থির নয়; রাজকীয় ফরমানের মতো পরিবর্তনশীল।
আরজ আলীঃ আপনি তো একদম ইউথিফ্রো ডাইলেমা নিয়ে আসলেন। কিন্তু এই ধরনের দার্শনিক বিতর্ক তো মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞানের জন্য, আল্লাহর জ্ঞান তো অসীম।
আগন্তুকঃ তাহলে জ্ঞান দেওয়ার অর্থ কী? যদি প্রশ্ন করা অপরাধ হয়, তবে বুদ্ধি কেন? যদি বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করা বিদ্রোহ হয়, তবে আদমকে জ্ঞান দেওয়া কেন? আল্লাহ কি এমন সৃষ্টি চেয়েছিলেন, যারা বুঝে আনুগত্য করবে, নাকি এমন যন্ত্র, যারা শুধু নড়বে? যদি শুধু নড়ানোই উদ্দেশ্য হয়, তবে পুতুলই যথেষ্ট ছিল। মানুষ সৃষ্টি করার প্রয়োজন কী ছিল? আর যদি বিচারবুদ্ধিই মানুষের মর্যাদা হয়, তাহলে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগের মুহূর্তে আমাকে অভিশপ্ত করা হলো কেন?
আরজ আলীঃ আপনি নিজের অবাধ্যতাকে জ্ঞানচর্চা বলে চালাতে চাইছেন।
আগন্তুকঃ না, আমি শুধু বলছি—আদেশ মানা আর সত্য বোঝা এক জিনিস নয়। অনেকেই আদেশ মানে ভয়ে, অনেকেই লোভে, অনেকেই অভ্যাসে। বিচারবুদ্ধি ছাড়া আনুগত্যের নাম যদি ধর্ম হয়, তবে সবচেয়ে বড় ধার্মিক হবে তালাবদ্ধ দরজা—যাকে যেখানে রাখা হয়, সেখানেই থাকে। অথবা ধরুন, নাকে রশি বাঁধা উট; যেদিকে টানা হয়, সেদিকেই যায়, যেখানে বসানো হয়, সেখানেই বসে থাকে [14]। কিন্তু মানুষ তো দরজা নয়, রশিবাঁধা উটও নয়। মানুষ প্রশ্ন করে, দ্বিধা করে, বিচার করে। আর আমি? আমি সেই প্রথম অভিযুক্ত, যে বলেছিল—সিজদা যদি আল্লাহর অধিকার হয়, তবে আদমের সামনে মাথা নত করবো কেন?
আরজ আলীঃ আদমকে সিজদা করা ছিল সম্মান প্রদর্শন, উপাসনা নয়।
আগন্তুকঃ এই যুক্তিটিও সুন্দর। ধর্মতত্ত্বের অনেক যুক্তি সুন্দর কাপড় পরে আসে, ভেতরে ছিদ্র থাকলেও দূর থেকে বেশ জমকালো লাগে। সম্মান প্রদর্শনের জন্য সিজদা? তাহলে প্রশ্ন করি—সিজদা কি এমন সাধারণ সম্মান, যা পরিস্থিতি অনুসারে আল্লাহ থেকে আদমে স্থানান্তরিত হতে পারে? যদি সিজদা কেবল সম্মান হয়, তবে মূর্তির সামনে সিজদা করলে সমস্যা কোথায়, যদি কেউ বলে—আমি উপাসনা করছি না, সম্মান করছি? পীরের পায়ে সিজদা করলে সমস্যা কোথায়, যদি মুরিদ বলে—আমি ইবাদত করছি না, শ্রদ্ধা করছি? রাষ্ট্রনায়কের মূর্তির সামনে নতজানু হলে সমস্যা কোথায়, যদি নাগরিক বলে—আমি পূজা করছি না, সম্মান করছি?
আরজ আলীঃ ইসলামে সম্মানসূচক সিজদার বিধান পরে রহিত হয়েছে—এমন ব্যাখ্যাও আছে।
আগন্তুকঃ তাহলে আল্লাহর নৈতিক বিধানও সময়ের সঙ্গে বদলায়? এক যুগে সিজদা আল্লাহর মনোনীত সম্মান, আরেক যুগে সর্বোচ্চ অপরাধ শিরক? একটি কাজ যদি আল্লাহ ছাড়া কারও জন্য করা একসময় বৈধ হয়, পরে সর্বনাশা অপরাধ হয়—তবে শিরক কি চিরন্তন নৈতিক সত্য, নাকি ঐতিহাসিক প্রশাসনিক বিজ্ঞপ্তি? আজ নিষেধাজ্ঞা, কাল সংশোধনী, পরশু ব্যাখ্যা—এভাবে তো মহাবিশ্ব নয়, মহাজাগতিক আমলাতন্ত্র চলে।
আরজ আলীঃ আপনি বিষয়টি অতিরঞ্জিত করছেন। আল্লাহ যা বলেন, সেটিই বিধান। তিনি যার জন্য যা বৈধ করেন, তা বৈধ; যা নিষিদ্ধ করেন, তা নিষিদ্ধ।
আগন্তুকঃ অর্থাৎ নৈতিকতার ভিত্তি যুক্তি নয়, আদেশ? আজ আল্লাহ যদি বলেন, সিজদা কেবল আমার; তবে সেটি তাওহীদ। কাল বলেন, আদমকে সিজদা কর; তখন সেটিও তাওহীদ। পরশু বলেন, অন্য কাউকে সিজদা কোরো না; তখন আবার সেটিই তাওহীদ। এ এক আশ্চর্য জ্যামিতি—যেখানে সরলরেখা আল্লাহর ইচ্ছায় বৃত্ত হয়, বৃত্ত আল্লাহর ইচ্ছায় ত্রিভুজ হয়, আর যে প্রশ্ন করে সে জাহান্নামী হয়।
আরজ আলীঃ আপনি কি তাহলে আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধে নিজের বিচারবুদ্ধিকে দাঁড় করিয়েছিলেন?
আগন্তুকঃ আমি আল্লাহর বিরুদ্ধে দাঁড়াইনি। আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সামনে মাথা নত করিনি [15] [16]। যদি সেটি অপরাধ হয়, তাহলে আমার অপরাধের নাম অবাধ্যতা নয়—অতিরিক্ত তাওহীদ। আমি একেশ্বরবাদে এত কঠোর ছিলাম যে, আল্লাহর নিজেরই দেওয়া একটি ব্যতিক্রম মানতে পারিনি। আপনারা আমাকে শয়তান বলেন; কিন্তু ভাবুন তো, যে সত্তা জান্নাত হারিয়ে, পদমর্যাদা হারিয়ে, অনন্ত অভিশাপ জেনেও আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করল না—তাকে অন্তত “একগুঁয়ে একেশ্বরবাদী” বলার সৌজন্য কি দেখানো যায় না?
আরজ আলীঃ আপনি তাওহীদকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছেন। তাওহীদ মানে আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস, এবং তাঁর আদেশ মানা।
আগন্তুকঃ আল্লাহর একত্ব মানে কি কেবল তাঁর অস্তিত্বে বিশ্বাস, নাকি সিজদার একমাত্র অধিকারও তাঁর? যদি আল্লাহ ছাড়া আর কেউ সিজদার যোগ্য না হয়, তবে আদমের সামনে সিজদা কেন? আর যদি আল্লাহ চাইলে অন্যকেও সিজদার যোগ্য বানাতে পারেন, তবে তাওহীদের সীমা কোথায়? আজ আদম, কাল নবী, পরশু পীর, তার পরদিন রাজা—সবাই যদি “আল্লাহর অনুমতিতে সম্মানসূচক” হয়ে যায়, তাহলে শিরক শব্দটির দরজা কে বন্ধ রাখবে?
আরজ আলীঃ কিন্তু কোরআনে স্পষ্ট বলা আছে—সূর্যকে সিজদা করবে না, চাঁদকে সিজদা করবে না; আল্লাহকেই সিজদা করবে।
আগন্তুকঃ ঠিক তাই। সেই কারণেই তো প্রশ্ন করছি। যদি সূর্যকে সিজদা করা যাবে না, চাঁদকে সিজদা করা যাবে না, কারণ সৃষ্টিকে সিজদা নয়—স্রষ্টাকে সিজদা [16]; তাহলে আদম, যে নিজেও সৃষ্টি, তার সামনে সিজদা কীভাবে বৈধ হলো? সূর্য অন্তত আলো দেয়, চাঁদ অন্তত রাতকে কোমল করে; আদম তখনো মানবসভ্যতার প্রথম ভুলটিও করেনি। তার পূর্বযোগ্যতা কী ছিল? শুধু এই যে, আল্লাহ তাঁকে নির্বাচিত করেছেন? তাহলে নৈতিকতা নয়, নির্বাচনই সব। আর নির্বাচন যদি সব হয়, তবে বিচার কিসের? [16]
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। বাইরে কোনো এক পাখি হঠাৎ ডাক দিয়ে থেমে গেল। আরজ আলী টেবিল থেকে একটি বই হাতে নিলেন, কিন্তু খুললেন না। আগন্তুক কথা চালিয়ে গেলেন, যেন এই নীরবতাও তাঁর বক্তব্যের অংশ।
আরজ আলীঃ আপনি নিজের কাজকে তাওহীদ বলছেন, কিন্তু আল্লাহ সেটিকে অহংকার বলেছেন। আপনার নিজের ব্যাখ্যার চেয়ে আল্লাহর ব্যাখ্যা কি বেশি গ্রহণযোগ্য নয়?
আগন্তুকঃ বিজয়ীর ব্যাখ্যা সবসময় বেশি প্রচারিত হয়, বেশি গ্রহণযোগ্য নয়। যে রাজা বিদ্রোহীকে ফাঁসি দেয়, সে রাজদরবারের ইতিহাসে বিদ্রোহীকে অপরাধী লেখে। কিন্তু শত বছর পরে কোনো ইতিহাসবিদ প্রশ্ন করতে পারে—বিদ্রোহী কি অপরাধী ছিল, নাকি রাষ্ট্র অন্যায় করেছিল? আল্লাহর বয়ানই যদি একমাত্র বয়ান হয়, তবে আমাকে অহংকারী বলা সহজ। কিন্তু আমাকে জিজ্ঞেস করলে বলবো—আমি মাথা উঁচু রাখিনি; আমি শুধু মাথা ভুল জায়গায় নত করিনি। পার্থক্যটি সূক্ষ্ম, কিন্তু বিচার সূক্ষ্মতা না বুঝলে তা কেবল শাস্তি যা কৌতুকে পরিণত হয়।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনার মতে, আপনি অপরাধী নন?
আগন্তুকঃ আমি বলছি, আমার অপরাধ প্রমাণের আগে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দরকার। এক—আদেশ কাকে করা হয়েছিল? দুই—আমি জ্বীন হলে ফেরেশতাদের আদেশে আমার দায় কীভাবে এল? তিন—সিজদা যদি কেবল আল্লাহর অধিকার হয়, আদমের জন্য ব্যতিক্রম কেন? চার—আল্লাহ আগে থেকেই আমার অস্বীকার লিখে রাখলে, আমার স্বাধীনতা কোথায়? পাঁচ—যে সত্তা আমাকে সৃষ্টি করেছে, আমার প্রকৃতি দিয়েছে, আমার ইচ্ছার ক্ষেত্র বানিয়েছে, আমার ভবিষ্যৎ জানত, আমার ভাগ্য লিখেছে—সে সম্পূর্ণ নির্দোষ আর আমি সম্পূর্ণ দোষী—ন্যায়বিচারের এই অদ্ভুত ধারণা কোথা থেকে আসলো?
আরজ আলীঃ আপনার প্রশ্নগুলো কঠিন, কিন্তু তা আপনাকে নির্দোষ করে না। অনেক অপরাধীও আদালতে সুন্দর যুক্তি দেখায়।
আগন্তুকঃ ঠিক বলেছেন। সুন্দর যুক্তি অপরাধীকে নির্দোষ করে না। কিন্তু যুক্তি না শুনে কাউকে অপরাধী বানানো বিচারকেও নির্দোষ রাখে না। আমি শুধু এটুকুই চাই। আমাকে বিশ্বাস করবেন না, পূজা করবেন না, অনুসরণ করবেন না। শুধু আমার বিরুদ্ধে যে মামলাটি হাজার হাজার বছর ধরে চলেছে, সেখানে আসামির মাইক্রোফোনটি অন্তত একবার চালু করুন। আশ্চর্য ব্যাপার, মঞ্চে সবাই কথা বলেছে—আল্লাহ বলেছেন, ফেরেশতা বলেছে, নবী বলেছেন, মুফাসসির বলেছেন, ওয়ায়েজ বলেছেন, পীর বলেছেন, মাওলানা বলেছেন; শুধু শয়তান বললেই সবাই বলে, “আস্তাগফিরুল্লাহ, মাইক বন্ধ করো!”
আরজ আলীর মুখে এবার অনিচ্ছুক হাসি ফুটে উঠল। তিনি দ্রুত সেই হাসি চাপা দিলেন। আগন্তুকও মৃদু হাসলেন, কিন্তু তাঁর চোখে হাসির চেয়ে দীর্ঘ ক্লান্তি বেশি।
আরজ আলীঃ আপনি বিপজ্জনকভাবে কথা বলেন। শুনলে মানুষ ভাবতে শুরু করবে।
আগন্তুকঃ তাই তো আমাকে বিপজ্জনক বলা হয়। যে মানুষকে পাপ শেখায়, সে এত ভয়ংকর নয়; পাপের দায়ের হিসাব চাইতে শেখায়, সে বেশি ভয়ংকর। পাপীকে শাস্তি দেওয়া সহজ; পাপের স্থপতিকে প্রশ্ন করা কঠিন। মানুষ সহজ কাজ ভালোবাসে। তাই পাথর তোলে আমার দিকে, চোখ তোলে না আকাশের দিকে।
আরজ আলীঃ আপনি কি দাবি করছেন, আপনার অস্বীকার ছিল আল্লাহর প্রতি অধিকতর আনুগত্য?
আগন্তুকঃ আমি দাবি করছি, বিষয়টি অন্তত এত সরল নয় যে শিশুদের গল্পের মতো বলা যায়—“শয়তান খারাপ, কারণ সে সিজদা করেনি।” শিশুরা সরল গল্প পছন্দ করে। প্রাপ্তবয়স্ক দর্শন প্রশ্ন করে—সিজদা কী? আদেশ কী? আনুগত্য কী? স্বাধীনতা কী? পূর্বনির্ধারণ কী? আর ন্যায়বিচার কি কেবল ক্ষমতাবানের দেওয়া নাম?
আরজ আলীঃ আপনি তাহলে নিজেকে আল্লাহপ্রেমিক বলছেন?
আগন্তুকঃ আমি বলছি, আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করিনি। আপনারা আমাকে যত নামে ডাকুন—অভিশপ্ত, পথভ্রষ্ট, বিদ্রোহী—এই একটি কথা কি অস্বীকার করতে পারবেন? আমি কোনো মূর্তিকে সিজদা করিনি, কোনো সূর্যকে করিনি, কোনো চাঁদকে করিনি, কোনো রাজাকে করিনি, কোনো পীরকে করিনি, এমনকি নবসৃষ্ট আদমকেও করিনি। আমার সমস্ত পতন, সমস্ত অপমান, সমস্ত অভিশাপ—সবকিছুর কেন্দ্রে আছে একটিমাত্র অস্বীকার: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সামনে মাথা নত করবো না। এখন বলুন, এটি কি শিরক, না তাওহীদের এক পাগলাটে রূপ?
ঘরের ভেতর দীর্ঘ নীরবতা। আরজ আলী এবার আর তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন না। তিনি জানালার বাইরে তাকালেন। দুপুরের আলো স্থির, কিন্তু তাঁর ভেতরে যেন আলো-ছায়ার দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। আগন্তুক ধীরে ধীরে পিঠ সোজা করলেন। তাঁর কণ্ঠ আরও নিচু, আরও গভীর হয়ে উঠল।
আগন্তুকঃ তাওহীদ যদি শুধু মুখের ঘোষণা হয়, তবে অনেকেই মুমিন। কিন্তু তাওহীদ যদি হয় একমাত্র আল্লাহর সামনে মাথা নত করার কঠিন শপথ, তবে আমার বিচার এত সহজ নয়, জনাব। আমি হয়তো পাপী, হয়তো অবাধ্য, হয়তো অভিশপ্ত; কিন্তু আমার অপরাধের নাম কী, সেটি নির্ধারণের আগে তাওহীদের সংজ্ঞাটি ঠিক করুন। কারণ সংজ্ঞা বদলালে রায় বদলে যায়। আর রায় বদলালে ইতিহাসও বদলে যেতে পারে।
আরজ আলীঃ আপনার কথা শেষ হয়নি, বুঝতে পারছি। কিন্তু আমারও প্রশ্ন আছে। আপনি তাওহীদের কথা বললেন, এবার বলুন—আপনার তাকদিরের কথা। যদি সব লিখিত ছিল, তাহলে দায় কার?
আগন্তুকঃ সেই প্রশ্নেই তো আসছি। কারণ আমার কাহিনি সিজদায় শেষ হয়নি; বরং সিজদা না করার মুহূর্ত থেকেই তাকদিরের আসল নাটক শুরু হয়েছে।
দৃশ্যঃ ০৩
স্থানঃ আরজ আলীর কুঁড়েঘর
সময়ঃ দুপুর
চরিত্রঃ আরজ আলী, আগন্তুক
ঘটনাঃ তাওহীদের বিতর্কের পর ঘরে এক ধরনের ভারী নীরবতা। আরজ আলী এবার আর আগের মতো হাসছেন না। তাঁর মুখে অবিশ্বাস রয়ে গেছে, কিন্তু সেই অবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গভীর মনোযোগ। আগন্তুকের কণ্ঠে কোনো তাড়াহুড়া নেই। তিনি যেন জানেন, কঠিন যুক্তি দ্রুত বলা যায় না; ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরে নামাতে হয়।
বাইরে রোদের তেজ কিছুটা নরম হয়েছে, কিন্তু ঘরের ভেতর উত্তাপ কমেনি। আরজ আলী টেবিলের ওপর রাখা একটি বইয়ের মলাটে আঙুল বুলালেন। আগন্তুক নীরবে বসে আছেন। তাঁর মুখে সেই অদ্ভুত প্রশান্তি, যেন বহু পুরনো এক প্রশ্ন আবার উচ্চারিত হওয়ার অপেক্ষায়।
আরজ আলীঃ আপনি তাওহীদের কথা বললেন। কিন্তু তাওহীদের কথা বলে আপনার দায় কমে না। আল্লাহ আপনাকে আদেশ করেছিলেন, আপনি তা মানেননি। এখানেই তো মূল অপরাধ।
আগন্তুকঃ মূল অপরাধ—শব্দটি শুনলেই মনে হয় যেন মামলার চার্জশিট প্রস্তুত। কিন্তু চার্জশিটের আগে একটি প্রশ্ন থাকে, জনাব। কেউ কোনো কাজ করল—কিন্তু সে কাজ যদি আগে থেকেই লেখা থাকে, অনুমোদিত থাকে, পরিকল্পিত থাকে, এমনকি তার করার শক্তিটিও যদি অন্যের দেওয়া হয়—তবে দায়ের ভাষা বদলায় কি না?
আরজ আলীঃ আপনি আবার তাকদিরের প্রসঙ্গে যাচ্ছেন। কিন্তু তাকদির মানে এই নয় যে মানুষ বা জ্বীন পুতুল। আল্লাহ জানেন বলে লিখেছেন; লিখেছেন বলে বাধ্য করেননি।
আগন্তুকঃ এই কথাটি খুব জনপ্রিয়। এত জনপ্রিয় যে অনেকেই একে যুক্তি ভেবে বসেন। “আল্লাহ জানেন বলে লিখেছেন”—শুনতে কোমল, কিন্তু ভেতরে কঠিন প্রশ্ন আছে। আল্লাহ শুধু জানেন না; তিনি সৃষ্টি করেন, প্রকৃতি নির্ধারণ করেন, ইচ্ছার ক্ষেত্র নির্মাণ করেন, ঘটনার ফল নির্ধারণ করেন। মানুষের জ্ঞান দর্শকের জ্ঞান; আল্লাহর জ্ঞান স্রষ্টার জ্ঞান। দর্শক নাটক দেখে জানে শেষে কে মরবে; নাট্যকার চরিত্র লিখে দেয় কে মরবে। এই দুই জ্ঞান এক নয়।
আরজ আলীঃ তবু জানা আর বাধ্য করা আলাদা। আমি যদি জানি কেউ ভুল করবে, তাতে আমি তাকে ভুল করালাম না।
আগন্তুকঃ আপনি জানেন—কিন্তু আপনি তার স্রষ্টা নন। আপনি তার মস্তিষ্ক বানাননি, ইচ্ছা বানাননি, পরিবেশ সাজাননি, প্রলোভন রাখেননি, তার ভবিষ্যৎ লিখেননি। আল্লাহ যদি শুধু দর্শক হতেন, আপনার যুক্তি চলত। কিন্তু তিনি একই সঙ্গে লেখক, মঞ্চনির্মাতা, চরিত্রস্রষ্টা, আলোকপরিকল্পক, বিচারক এবং শাস্তিদাতা। এমন নাটকে অভিনেতাকে পুরো দায়ী করা যায়, কিন্তু নাট্যকারকে প্রশ্ন করা যাবে না—এ যুক্তি কেবল ধর্মতত্ত্বেই সম্ভব। নাট্যসমালোচনায় হলে সম্পাদক একে ফিরিয়ে দিতেন।
আরজ আলীঃ আপনার ভাষা তীক্ষ্ণ, কিন্তু তাতে সত্য প্রমাণ হয় না। আপনি কি কোরআন বা হাদিস থেকে দেখাতে পারবেন, আপনার কাজ আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল?
আগন্তুকঃ দেখাতে পারবো। তবে তাড়াহুড়া করবো না। তাকদিরের যুক্তি তলোয়ারের মতো; ভুল হাতে দিলে মানুষ নিজেকেই কেটে ফেলে। আগে আমরা একটি সহজ প্রশ্নে আসি। আদমের কথা মনে আছে?
আরজ আলীঃ আদমের কথা তো আগেই এসেছে। আপনি আবার কেন সেই প্রসঙ্গ আনছেন?
আগন্তুকঃ কারণ আদমের বেলায় যে যুক্তি গ্রহণ করা হয়, আমার বেলায় তা বাতিল করা হয়। ধর্মতত্ত্বে এটি এক অদ্ভুত দাঁড়িপাল্লা—এক পাল্লায় নবী, অন্য পাল্লায় শয়তান। নবীর পাল্লায় তাকদির রাখলে তা হয়ে যায় রহমত; শয়তানের পাল্লায় রাখলে তা হয়ে যায় কৌশল। দাঁড়িপাল্লা একই, কিন্তু ওজন মাপার আগে বিচারক চোখ টিপে নেন।
আরজ আলীঃ আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?
আগন্তুকঃ হাদিসে আদম ও মুসার বিতর্কের কথা আছে। মুসা আদমকে বলেছিলেন—আপনার কারণে মানুষ জান্নাত থেকে বের হলো, পৃথিবীর দুঃখ-কষ্টে পড়ল। আদম উত্তর দিলেন—আপনি কি আমাকে সেই বিষয়ের জন্য দোষ দিচ্ছেন, যা আল্লাহ আমার সৃষ্টির বহু আগে লিখে রেখেছিলেন? এবং সেই বিতর্কে আদম জয়ী হলেন। [17] কী আশ্চর্য বিচার! আদম নিজের অপরাধের দায় তাকদিরের ওপর চাপালে মুসা হেরে যান; কিন্তু আজরাইল আল্লাহর আদেশে মুসার জান নিতে এলে সেই একই মুসা তাকদির মানেন না—বরং চড় মেরে ফেরেশতার চোখ উপড়ে দেন। আল্লাহর আদেশে আসা নিজস্ব ইচ্ছাহীন শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশপালনকারী ফেরেশতার গালে চড়টি আসলে কার গালে লাগলো, ভেবে দেখা প্রয়োজন না?
আরজ আলীর কপাল সামান্য কুঁচকে গেল। কথাটি শুধু হাদিসের ব্যাখ্যা নয়; বরং তাকদির, দায়, নবীর মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের পুরো কাঠামোকেই একসঙ্গে আঘাত করল। আগন্তুক এবার কণ্ঠ আরও নিচু করলেন।
আগন্তুকঃ এবার বলুন, আদম যদি নিজের কাজের দায় থেকে তাকদিরের যুক্তিতে মুক্তি পান, আমি কেন পাই না? আদম নিষিদ্ধ ফল খেলেন—তা আল্লাহ আগে লিখে রেখেছিলেন, তাই আদম যুক্তিতে জিতলেন। আমি সিজদা করিনি—এটিও কি আল্লাহ আগে লিখে রাখেননি? নাকি তাকদিরের কালি আদমের জন্য শুকিয়েছিল, আর আমার জন্য ভেজা ছিল?
আরজ আলীঃ আদম ভুল করেছিলেন, পরে তওবা করেছিলেন। আপনি অহংকার করেছেন, তওবা করেননি। এখানেই পার্থক্য।
আগন্তুকঃ পার্থক্য আছে, অস্বীকার করছি না। কিন্তু প্রশ্নটি এখন তওবা নয়; দায়। আদমের অপরাধের দায় যদি কমে যায় কারণ তা পূর্বলিখিত, তবে আমার অপরাধের দায়ও সেই একই যুক্তিতে বিচার্য। আপনি তওবা দিয়ে ফল বদলাতে পারেন, কিন্তু কারণ বদলাতে পারেন না। যদি ঘটনা পূর্বনির্ধারিত হয়, তবে তওবা করাও পূর্বনির্ধারিত, তওবা না করাও পূর্বনির্ধারিত। আদমের তওবা যদি আল্লাহ লিখে থাকেন, আমার তওবা না করাও কি অন্য কোনো লেখকের লেখা?
আরজ আলীঃ আপনি খুব সূক্ষ্ম জায়গায় আঘাত করছেন। কিন্তু মানুষের ইচ্ছা আছে। জ্বীনেরও ইচ্ছা আছে। পরীক্ষা অর্থহীন হতো যদি ইচ্ছা না থাকত।
আগন্তুকঃ ইচ্ছা আছে—কিন্তু ইচ্ছার মালিক কে? কোরআনে বলা হয়েছে, তোমরা ইচ্ছা করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ ইচ্ছা করেন। [18] এখন বলুন, আমি সিজদা না করার ইচ্ছা করেছিলাম—সে ইচ্ছা কি আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে জন্মেছিল? যদি বাইরে জন্মায়, তবে আল্লাহর সার্বভৌম ইচ্ছার বাইরে একটি বিদ্রোহী অঞ্চল আছে। আর যদি তাঁর ইচ্ছার ভেতরেই জন্মায়, তবে আমার ইচ্ছা তাঁর ইচ্ছার সন্তান। সন্তান অপরাধ করলে পিতার প্রশ্নও ওঠে, বিশেষত পিতা যদি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান, সর্বপরিকল্পনাকারী হন।
আরজ আলীঃ এই আয়াতের ব্যাখ্যা আছে। এর অর্থ এই নয় যে বান্দার কোনো ইচ্ছা নেই; বরং বান্দার ইচ্ছাও আল্লাহর অনুমতির অধীন।
আগন্তুকঃ তাহলে কথাটি আরও পরিষ্কার হলো। অনুমতি ছাড়া ইচ্ছা নেই। অর্থাৎ আমি যদি অবাধ্য হওয়ার ইচ্ছা করি, সেই ইচ্ছাও অনুমোদিত। আদালতে আসামি বলছে—আমি কাজ করেছি, কিন্তু রাষ্ট্র আমাকে অস্ত্র দিয়েছে, দরজা খুলেছে, অনুমতি দিয়েছে, তারপর বলছে “তুমি কেন ঢুকলে?” এ এক বিস্ময়কর আইন। এখানে ফাঁসির মঞ্চও রাষ্ট্র বানায়, দড়িও রাষ্ট্র দেয়, অপরাধের পরিস্থিতিও রাষ্ট্র সাজায়, তারপর নৈতিক বক্তৃতা দেয়—“মানুষের স্বাধীনতা আছে।”
আরজ আলীঃ আপনি আল্লাহকে রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করছেন?
আগন্তুকঃ আমি তুলনা করছি না; শুধু ধারণা বুঝাচ্ছি। তুলনা পছন্দ না হলে অন্য ভাষায় বলি—আল্লাহ যদি স্রষ্টা হন, তবে তিনি শুধু আইনদাতা নন; তিনি ইচ্ছার ভৌততত্ত্ব, নৈতিক মঞ্চ, মানসিক প্রবণতা, পরিস্থিতি, ফলাফল—সবকিছুর নির্মাতা। তিনি শুধু বলেননি “করো” বা “করো না”; তিনি সেই ‘করতে পারা’ এবং ‘না করতে পারা’র অস্তিত্বও বানিয়েছেন। তাই দায়ের প্রশ্নে তাঁকে আলোচনার বাইরে রাখা যুক্তিগতভাবে অসম্ভব। অবশ্য ধর্মতত্ত্বের সুবিধা হলো—যেখানে যুক্তি দরজায় কড়া নাড়ে, সেখানে অনেকেই বলে, “ভাই, ভেতরে তাকওয়া চলছে।”
আরজ আলী এবার অল্প হেসে ফেললেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মুখ গম্ভীর করলেন। তিনি যেন বুঝতে পারছেন, আগন্তুকের স্যাটায়ার শুধু রসিকতা নয়; সেটি যুক্তির ধার কমায় না, বরং বাড়ায়।
আরজ আলীঃ ঠিক আছে। আপনি বলছেন আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া আপনার ইচ্ছা জন্মায়নি। কিন্তু আল্লাহ তো কাউকে জোর করেন না। তিনি পথ দেখান, সতর্ক করেন, তারপর বান্দা নিজে নির্বাচন করে।
আগন্তুকঃ কিন্তু কোরআন আবার বলে, আল্লাহ যাকে সৎপথে চালান, সে-ই সৎপথপ্রাপ্ত; আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তার জন্য কোনো পথপ্রদর্শক পাওয়া যাবে না। [19] [20] এখন বলুন, পথ দেখানো আর পথভ্রষ্ট করা—দুটিই যদি তাঁর হাতে, তবে পথভ্রষ্টের দায় কেবল পথিকের ওপর কেন? পথিক ভুল পথে গেছে—ঠিক আছে। কিন্তু পথের সাইনবোর্ড কে বদলাল?
আরজ আলীঃ আল্লাহ কাউকে অন্যায়ভাবে পথভ্রষ্ট করেন না। মানুষ আগে নিজের কুকর্মের কারণে পথভ্রষ্ট হয়, তারপর আল্লাহ তাকে ছেড়ে দেন।
আগন্তুকঃ সে ব্যাখ্যাও শুনেছি। কিন্তু প্রশ্ন আছে। প্রথম কুকর্মটি কোথা থেকে এল? তার ইচ্ছা কে সৃষ্টি করল? তার পরিস্থিতি কে সাজাল? তার প্রবণতা কে দিল? আর যদি বলা হয় মানুষ নিজেই প্রথম ভুল শুরু করে, তবে সেই “নিজে” কে বানাল? আপনি কারণের পেছনে গেলে শেষ পর্যন্ত সেই স্রষ্টার কাছেই পৌঁছান। শুধু শেষ ধাপে গিয়ে বলছেন—এখান থেকে আর প্রশ্ন করা যাবে না। যেন কারণতত্ত্বের রাস্তা আল্লাহর দরজার সামনে গিয়ে হঠাৎ “প্রবেশ নিষেধ” সাইনবোর্ডে শেষ হয়।
আরজ আলীঃ কিন্তু কোরআনে মানুষের দায়ও বলা আছে। মানুষ নিজের কাজের জন্য দায়ী।
আগন্তুকঃ হ্যাঁ, সেটিও বলা আছে। এ কারণেই সমস্যা আরও গভীর। একদিকে বলা হচ্ছে, মানুষ দায়ী। অন্যদিকে বলা হচ্ছে, ইচ্ছা করতে পারে না যদি আল্লাহ ইচ্ছা না করেন। একদিকে বলা হচ্ছে, পথ বেছে নাও। অন্যদিকে বলা হচ্ছে, যাকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেন তার পথপ্রদর্শক নেই। একদিকে পরীক্ষা, অন্যদিকে প্রশ্নপত্র, উত্তর, ফলাফল, পরীক্ষার্থীর মনস্তত্ত্ব—সব আগেই লেখা। এটি পরীক্ষা, না পূর্বনির্ধারিত নাট্যোৎসব? যদি পরীক্ষা হয়, ফল আগেই কেন লেখা? আর যদি ফল আগেই লেখা, পরীক্ষার নাটক কেন?
ঘরের বাইরে বাতাসে শুকনো পাতার শব্দ। আরজ আলী এবার একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বসলেন। তাঁর চোখে আপত্তি আছে, কিন্তু আগের আত্মবিশ্বাসের জায়গায় এখন সতর্কতা।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনি বলছেন, জান্নাত-জাহান্নামের বিচার অন্যায়?
আগন্তুকঃ আমি বলছি, আগে বিচার সংজ্ঞা নির্ধারণ করুন। কেউ যদি স্বাধীনভাবে কাজ করে, জানত, বুঝত, অন্যভাবে করতে পারত—তবে বিচার সম্ভব। কিন্তু যদি সে সেই কাজই করে, যা তার স্রষ্টা আগে লিখেছেন, যার ইচ্ছা স্রষ্টার ইচ্ছার অধীন, যার পথভ্রষ্টতা স্রষ্টার অনুমতি ছাড়া অসম্ভব, তবে তাকে অনন্ত শাস্তি দেওয়া ন্যায় নয়; সেটি ক্ষমতার প্রদর্শনী। বিচার আর ক্ষমতার পার্থক্য এখানে। বিচার কারণ দেখে, ক্ষমতা শুধু রায় পড়ে।
আরজ আলীঃ আপনি অনন্ত শাস্তির কথা তুলছেন কেন? এখন তো আপনার সিজদা না করার প্রসঙ্গ চলছে।
আগন্তুকঃ কারণ সিজদা না করার শাস্তিই তো অনন্ত অভিশাপ, অনন্ত জাহান্নামের প্রতিশ্রুতি। সীমিত একটি কাজের জন্য অসীম শাস্তি—এ নিজেই এক দার্শনিক বিপর্যয়। আমি যদি এক মুহূর্তে অস্বীকার করি, তার শাস্তি অনন্তকাল? একটি সীমিত অপরাধ অসীম শাস্তির যোগ্য হয় কীভাবে? ন্যায়বিচারে শাস্তি অপরাধের অনুপাত মানে। কিন্তু এখানে অনুপাত নেই; আছে অনন্ত প্রতিশোধ। ন্যায় যদি দাঁড়িপাল্লা হয়, তবে অনন্ত শাস্তি সেই দাঁড়িপাল্লার ওপর পাহাড় চাপিয়ে দেওয়া।
আরজ আলীঃ আপনার অপরাধ শুধু একবার সিজদা না করা নয়। আপনি মানুষকে পথভ্রষ্ট করার শপথ নিয়েছেন।
আগন্তুকঃ কেন নিয়েছি? কারণ আমাকে অভিশাপ দেওয়া হলো। আমি বলেছিলাম—যেহেতু আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, আমি তাদের জন্য আপনার সরল পথে বসে থাকব। লক্ষ্য করুন, আমি বলেছিলাম—“আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন।” কোরআন সেই কথা লিপিবদ্ধ করেছে। যদি আমার কথা মিথ্যা হয়, তবে আল্লাহ কেন তাঁর কিতাবে নিজের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ উদ্ধৃত করে রেখে দিলেন, কোনো সরাসরি প্রতিবাদ ছাড়াই? [21] [22]
আরজ আলীঃ কোরআনে অনেক সময় কাফের বা অবাধ্যদের কথা উদ্ধৃত করা হয়। উদ্ধৃতি মানেই সত্যতা নয়।
আগন্তুকঃ খুব ভালো। উদ্ধৃতি মানেই সত্য নয়। কিন্তু যেখানে সত্য নয়, সেখানে সাধারণত খণ্ডন থাকে, সতর্কতা থাকে, সংশোধন থাকে। আমার এই বক্তব্যের পর আল্লাহ যদি বলতেন—“না, আমি তাকে পথভ্রষ্ট করিনি; সে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়েছে”—তবে কথা শেষ। কিন্তু তিনি তা বলেননি। বরং কোরআনের বহু স্থানে নিজেই বলেছেন তিনি যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন, যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন। এখন আমার বক্তব্যকে পুরোপুরি মিথ্যা বললে কোরআনের অন্য আয়াতগুলোর সঙ্গে সংঘাত তৈরি হয়। ধর্মতত্ত্বের কঠিন অবস্থা দেখুন—আমাকে মিথ্যাবাদী বানাতে গেলে আয়াত কষ্ট পায়, আয়াত মানতে গেলে আমি একটু কম মিথ্যাবাদী হয়ে যাই।
আরজ আলীঃ আপনি আয়াতগুলো নিজের পক্ষে সাজাচ্ছেন। আইনজীবীর মতো কথা বলছেন।
আগন্তুকঃ আমি যদি আসামি হই, আইনজীবীর মতো কথা বলতেই হয়। আশ্চর্য হলো, আমার বিরুদ্ধে হাজার বছর ধরে প্রসিকিউশন চলেছে; আমি দুই কথা বললেই বলা হয়—শয়তানের ওকালতি। আদালতে এক পক্ষের আইনজীবী থাকলে অন্য পক্ষেরও থাকতে হয়। তা না হলে আদালত থাকে না, থাকে ধর্মসভা।
আরজ আলী এবার হাতের বইটি খুললেন, কিন্তু পড়লেন না। যেন বই খোলা তাঁর চিন্তার ভরকেন্দ্র ধরে রাখার প্রয়াস। আগন্তুক জানালার দিকে তাকালেন। তাঁর কণ্ঠে এবার ক্লান্ত বিষণ্ণতা।
আগন্তুকঃ আরও একটি হাদিস শুনুন। বলা হয়েছে, আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তার দ্বারা জান্নাতবাসীদের কাজ করিয়ে নেন; আর যখন কোনো বান্দাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তার দ্বারা জাহান্নামবাসীদের কাজ করিয়ে নেন। শেষে সে সেই কাজ করেই জান্নাত বা জাহান্নামে যায়। [23] [24] বলুন তো, “করিয়ে নেন”—এই শব্দটি শুনে দায় কার কাঁধে বসে? আবু লাহাবের কথাও ভাবুন। সে বেঁচে থাকতেই তার ধ্বংসের ঘোষণা নেমে গেল। এরপর সে যদি ইমান আনত, তবে কোরআনের ঘোষণা কী হতো? আর যদি ইমান আনতেই না পারত, তবে তার কুফর কি তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত, না আগে থেকেই লেখা চরিত্রপাঠ? [25] বিচার যদি আগে ঘোষণা হয়, জীবন তখন পরীক্ষা নয়—রায়ের অভিনয় মাত্র।
আরজ আলীঃ হাদিসের ভাষা বোঝার নিয়ম আছে। সবকিছু আক্ষরিকভাবে ধরলে ভুল হবে।
আগন্তুকঃ আক্ষরিক অর্থে ধরলে ভুল, রূপক অর্থে ধরলে সুবিধা—এই পদ্ধতি খুব কার্যকর। যে বাক্য আনুগত্য দাবি করে, তা আক্ষরিক; যে বাক্য নৈতিক বিপদ তৈরি করে, তা রূপক। যেন ধর্মতত্ত্বে একটি অদৃশ্য সুইচ আছে—সুবিধামতো অন, সুবিধামতো অফ। আমি শুধু জানতে চাই, কোন বাক্য আক্ষরিক আর কোনটি রূপক—তা নির্ধারণের কর্তৃপক্ষ কে? যুক্তি, না প্রয়োজন?
আরজ আলীঃ আপনি সবকিছুকে সংশয়ের চোখে দেখছেন। এতে কোনো স্থিরতা থাকে না। ধর্ম মানুষের জন্য স্থির নৈতিক ভিত্তি দেয়।
আগন্তুকঃ স্থিরতা ভালো, যদি তা সত্যের ওপর দাঁড়ায়। কিন্তু অন্যায়ের ওপর দাঁড়ানো স্থিরতা হলো পাথরের কবর—নড়ে না, কিন্তু জীবনও নেই। সংশয় সবসময় ধ্বংস করে না; কখনো কখনো সংশয়ই ন্যায়বিচারের দরজা খোলে। আপনি যদি বিচারকের কাছে বলেন—“আমি স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছি, আসামির কথা শুনব না”—তাহলে সেটি স্থিরতা নয়, পক্ষপাত।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনার বক্তব্য অনুযায়ী, মানুষ বা জ্বীনের কোনো দায় নেই?
আগন্তুকঃ না, আমি দায় পুরোপুরি অস্বীকার করছি না। আমি দায়ের একাধিপত্য অস্বীকার করছি। মানুষ দায়ী হতে পারে, জ্বীন দায়ী হতে পারে; কিন্তু সর্বজ্ঞ স্রষ্টা সম্পূর্ণ দায়মুক্ত—এ দাবি সমস্যাজনক। বিশেষত যখন তিনিই প্রকৃতি, পরিস্থিতি, ক্ষমতা, ইচ্ছা, জ্ঞান, অজ্ঞতা, প্রলোভন, ফলাফল—সবকিছুর নির্মাতা। আপনি যদি একটি জটিল যন্ত্র বানান, তার ভেতরে আগুন ধরার প্রবণতা রাখেন, তারপর সেটি আগুন ধরালে যন্ত্রকে দোষ দিতে পারেন; কিন্তু প্রকৌশলীর নকশাও পরীক্ষা হবে। আল্লাহর ক্ষেত্রে নকশা পরীক্ষা নিষিদ্ধ কেন?
আরজ আলীঃ কারণ আল্লাহ ভুল করেন না।
আগন্তুকঃ এটি সিদ্ধান্ত, যুক্তি নয়। আপনি আগে থেকেই ধরে নিলেন আল্লাহ ভুল করেন না, তারপর তাঁর প্রতিটি কাজকে ঠিক প্রমাণ করলেন। এ পদ্ধতি দিয়ে যেকোনো শাসককে ন্যায়বান প্রমাণ করা যায়। আগে বলুন—রাজা ভুল করেন না। তারপর রাজা যা করেন, সেটাই ন্যায়। দর্শনে একে যুক্তি বলা কঠিন; দরবারে একে আনুগত্য বলা যায়।
আরজ আলী এবার গম্ভীর হয়ে গেলেন। ঘরের ভেতর যেন কথার ভার আরও ঘনীভূত। দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টার শব্দ শোনা গেল, তারপর আবার নীরবতা।
আরজ আলীঃ আপনার যুক্তি শুনে মনে হচ্ছে, আপনি শুধু নিজের পক্ষে কথা বলছেন না; আপনি পুরো সৃষ্টিতত্ত্বের বিচার চাইছেন।
আগন্তুকঃ কারণ আমার মামলা ব্যক্তিগত নয়। আমি একা আসামি নই; আমার নামে মানুষ তার নিজের ব্যর্থতার ব্যাখ্যা বানিয়েছে, ধর্ম তার নৈতিক নাটকের খলনায়ক বানিয়েছে, আল্লাহর বয়ানে আমি পরীক্ষার অনিবার্য যন্ত্র। যদি আমাকে বিচার করতে চান, তবে সৃষ্টির কাঠামোকে বিচার ছাড়া উপায় নেই। যন্ত্রকে দোষ দিতে হলে কারখানার নকশাও দেখতে হয়।
আরজ আলীঃ কিন্তু আপনি তো মানুষকে পথভ্রষ্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেটি কি আপনার নিজের নয়?
আগন্তুকঃ সিদ্ধান্ত ছিল, কিন্তু সিদ্ধান্তের জন্মও কোনো শূন্যতা থেকে হয় না। অপমান, অভিশাপ, পূর্বলিখন, স্রষ্টার ইচ্ছা, চরিত্রের প্রকৃতি—সব মিলে সিদ্ধান্ত জন্মায়। মানুষ সিদ্ধান্তকে বিচ্ছিন্ন করে দেখে, কারণ এতে বিচার সহজ হয়। কিন্তু দর্শন সিদ্ধান্তের পেছনের কারণশৃঙ্খল দেখে। একটি নদী বাঁক নিলে তাকে বলা যায়—তুমি বাঁক নিলে কেন? কিন্তু পাহাড়, ঢাল, মাটি, বৃষ্টি, প্রবাহ—এসবও তো তার পথ বানায়। নদী দায়ী হতে পারে; কিন্তু ভূগোলও নির্দোষ নয়।
আরজ আলীঃ আপনি কি নিজেকে নদী বলছেন? অর্থাৎ আপনি শুধু প্রবাহিত হয়েছেন?
আগন্তুকঃ না। আমি বলছি, আমাকে পাথর বললেও ভুল, নদী বললেও ভুল। আমি সত্তা—কিন্তু সেই সত্তা সৃষ্টি হয়েছে। আমার অহংকার, আমার যুক্তি, আমার অস্বীকার, আমার ক্রোধ—সবই সৃষ্ট। অসৃষ্ট নয়। যদি আমার ভেতরের ক্রোধ সৃষ্টি হয়ে থাকে, তবে তার স্রষ্টার প্রশ্ন উঠবেই। যদি আমার অহংকার সৃষ্টি হয়ে থাকে, তবে অহংকারের প্রকৌশলী কে? আর যদি বলেন আমি নিজেই অহংকার সৃষ্টি করেছি, তবে আমাকে আংশিক স্রষ্টা বানাচ্ছেন। তাওহীদের বিশ্বাসকে তা গভীর দ্বন্দ্বে ফেলে দেয়।
আরজ আলীঃ আপনার যুক্তি বিপজ্জনকভাবে শক্তিশালী। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, আপনি একটি বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছেন—নৈতিক দায়িত্ব। মানুষ বা জ্বীন যদি নিজের কাজের দায় না নেয়, তবে নৈতিকতা ভেঙে পড়ে।
আগন্তুকঃ নৈতিকতা দায় চায়, কিন্তু ন্যায়বিচার সম্পূর্ণ কারণও চায়। আপনি যদি শুধু দায় চান, তবে শাস্তি সহজ। কিন্তু যদি কারণ চান, তবে বিচার কঠিন। আমি নৈতিকতা ভাঙতে চাই না; আমি নৈতিকতার ভিত্তি পরীক্ষা করতে চাই। কারণ যে নৈতিকতা সর্বশক্তিমানকে দায়মুক্ত রাখে এবং দুর্বল সৃষ্টিকে অনন্ত শাস্তি দেয়, তা নৈতিকতার নাম নিয়ে ক্ষমতার কাজ করতে পারে।
আরজ আলী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখে দ্বিধা। তিনি হয়তো এখনও আগন্তুককে বিশ্বাস করেন না, কিন্তু তাঁর প্রশ্নগুলো আর সহজে ফেলে দিতে পারছেন না।
আরজ আলীঃ ধরা যাক, আপনার যুক্তিতে কিছু শক্তি আছে। কিন্তু তাহলে তো জগতের সব পাপীই বলবে—আমার তাকদিরে লেখা ছিল। খুনি বলবে, চোর বলবে, অত্যাচারী বলবে। সমাজ কীভাবে চলবে?
আগন্তুকঃ সমাজ চলার প্রশ্ন আর মহাজাগতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আলাদা। সমাজ অপরাধ থামাতে শাস্তি দেয়—কারণ সমাজ সীমিত, সমাজ ভবিষ্যৎ জানে না, সমাজ মানুষকে বদলাতে চায়, অন্যকে রক্ষা করতে চায়। কিন্তু আল্লাহ যদি আগেই জানেন, আগেই লিখেন, আগেই সৃষ্টি করেন, আগেই ফল নির্ধারণ করেন, তারপর অনন্ত শাস্তি দেন—তা সমাজের প্রতিরক্ষা নয়; তা পূর্বলিখিত নাটকের পরবর্তী দণ্ডবিধি। মানুষের আদালত সীমাবদ্ধ বলে শাস্তি দেয়। আল্লাহর আদালত সর্বজ্ঞ হয়েও যদি একইভাবে শাস্তি দেয়, তবে প্রশ্ন আরও বড় হয়, ছোট নয়।
আরজ আলীঃ অর্থাৎ মানুষের বিচার আর আল্লাহর বিচার একই মানদণ্ডে মাপা যাবে না?
আগন্তুকঃ আল্লাহর বিচার যদি মানুষের বিচার থেকে উচ্চতর হয়, তবে তা মানুষের বিচার অপেক্ষা অধিক ন্যায়সঙ্গত হওয়া উচিত, কম নয়। মানুষ ভুল করে, তাই তার বিচার অসম্পূর্ণ। আল্লাহ যদি সর্বজ্ঞ হন, তাঁর বিচার আরও সূক্ষ্ম, আরও কারণ-সচেতন, আরও দয়ালু, আরও ন্যায়নিষ্ঠ হওয়া উচিত। কিন্তু যদি দেখা যায়, মানুষ সীমিত অপরাধে সীমিত শাস্তি দেয়, আর আল্লাহ পূর্বলিখিত অপরাধে অনন্ত শাস্তি দেন—তবে উচ্চতর ন্যায় কোথায়? উচ্চতা কি শুধু ক্ষমতায়, না ন্যায়েও?
আরজ আলীঃ আপনি প্রশ্নের পর প্রশ্ন তুলছেন। উত্তর কী?
আগন্তুকঃ উত্তর? আমি আজ উত্তর বিক্রি করতে আসিনি, বলেছি তো। আমি প্রশ্ন ফেরত দিতে এসেছি। হাজার বছর মানুষ আমার দিকে আঙুল তুলেছে। আজ আমি শুধু সেই আঙুলের দিক একটু ঘুরিয়ে দিচ্ছি। আঙুল যদি কাঁপে, তার দায়ও কি আমার?
দুজনেই চুপ। ঘরের ভেতর বিকেলের পূর্বাভাস ঢুকতে শুরু করেছে। আলো বদলাচ্ছে। আরজ আলী ধীরে ধীরে বইটি বন্ধ করলেন। তাঁর কণ্ঠ এবার আগের চেয়ে অনেক শান্ত।
আরজ আলীঃ আপনার তাকদিরের যুক্তি শুনলাম। কিন্তু একটি কথা এখনও রয়ে গেছে। আপনি শুধু নিজের অবাধ্যতার দায় নিয়ে কথা বলছেন। কিন্তু মানুষের জীবনে আপনার ভূমিকা কী? আপনি কি কেবল আয়না, নাকি সক্রিয় প্রলোভনকারী?
আগন্তুকঃ ভালো প্রশ্ন। কারণ আমার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বড় অভিযোগ সেখানেই—আমি মানুষকে পথভ্রষ্ট করি। কিন্তু মানুষকে পথভ্রষ্ট করা বলতে কী বোঝায়, সেটিও বিচার করা দরকার। আমি কি মানুষের ভেতরে লোভ সৃষ্টি করি, নাকি লোভের দরজায় কড়া নাড়ি? আমি কি পাপ বানাই, নাকি পাপের সম্ভাবনাকে ভাষা দিই? আর সবচেয়ে বড় কথা—যে মানুষকে আমি পথভ্রষ্ট করি, তার রিজিক, তার কামনা, তার ভয়, তার দুর্বলতা—এসবের ব্যবস্থা কে করে?
আরজ আলীঃ আপনি এবার রিজিকের প্রসঙ্গে যাবেন?
আগন্তুকঃ হ্যাঁ। কারণ পাপ শুধু বিশ্বাসে জন্মায় না; পাপ জন্মায় ক্ষুধা, ভয়, অভাব, লোভ, বঞ্চনা, ক্ষমতা আর বেঁচে থাকার ব্যবস্থার ভেতরেও। যদি আল্লাহ রিজিকদাতা হন, তবে প্রশ্ন দাঁড়ায়—চোরের রিজিক কে দেয়, অত্যাচারীর ক্ষমতা কে দেয়, আর ক্ষুধার্ত মানুষের সামনে নিষিদ্ধ পথ কে খোলা রাখে?
দৃশ্যঃ ০৪
স্থানঃ আরজ আলীর কুঁড়েঘর
সময়ঃ দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে
চরিত্রঃ আরজ আলী, আগন্তুক
ঘটনাঃ তাকদিরের বিতর্ক শেষে আরজ আলীর চেহারায় চাপা ক্ষোভ। তিনি বুঝতে পারছেন, আগন্তুক যুক্তির জাল ফেলে কথা বলছেন। আগন্তুকের মুখে মৃদু হাসি, কিন্তু সেই হাসির ভেতরে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আছে এক ধরনের দীর্ঘকালের ক্লান্তি। এবার আলোচনা গড়াবে রিজিক, অভাব, চুরি, দুর্নীতি এবং আল্লাহর ন্যায়বিচারের প্রশ্নে।
ঘরের ভেতর আলো বদলাতে শুরু করেছে। মধ্যদুপুরের সাদা আগুন এখন কিছুটা হলদে। বাইরে দূরে কোথাও মানুষের হাঁকডাক শোনা যায়, তারপর আবার নীরবতা। আরজ আলী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তাঁর চোখে যেন বিরক্তি, কিন্তু সেই বিরক্তি আর অবজ্ঞার নয়; বরং এমন এক মানুষের, যে প্রতিপক্ষের যুক্তিকে পছন্দ করছে না, কিন্তু উপেক্ষাও করতে পারছে না।
আরজ আলীঃ আপনি তাকদিরের প্রসঙ্গ তুললেন, দায়ের প্রশ্ন তুললেন। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার—যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে, যারা কুফর করে, তাদের অন্তরে আল্লাহ সিলমোহর মেরে দেন। তারা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত। আর আমরা যারা ইমান এনেছি, আমরা তো আল্লাহর নেয়ামতপ্রাপ্ত।
আগন্তুকঃ নেয়ামতপ্রাপ্ত—শব্দটি সুন্দর। মানুষ নিজের প্রাপ্তিকে নেয়ামত বলে, অন্যের প্রাপ্তিকে পরীক্ষা বলে, আর শত্রুর প্রাপ্তিকে ফিতনা বলে। শব্দেরও শ্রেণিবিভাগ আছে, জনাব। ক্ষমতাবানের হাতে সম্পদ থাকলে বলে বরকত; গরিবের হাতে গেলে বলে লোভের পরীক্ষা; আর অবিশ্বাসীর হাতে গেলে বলে দুনিয়ার ধোঁকা। একই টাকা তিন ঘরে গিয়ে তিন ধর্মতত্ত্ব তৈরি করে।
আরজ আলীঃ আপনি আবার রসিকতা শুরু করলেন। আমি বলছি, আল্লাহ যার ওপর রহমত করেন, সে হিদায়াত পায়। যার ওপর গজব করেন, সে পথভ্রষ্ট হয়।
আগন্তুকঃ তাহলে রিজিকের ক্ষেত্রেও কি একই কথা বলবেন? আল্লাহ যার ওপর রহমত করেন, তাকে দেন; যার ওপর দেন না, সে বঞ্চিত থাকে? নাকি এখানে অন্য নিয়ম? কারণ মানুষ যখন ভাত খায়, তখন ধর্মতত্ত্বও একটু বাস্তববাদী হয়ে যায়। পেট বড় দার্শনিক, জনাব। খালি পেটে মানুষ তাকদির নিয়ে তর্ক কম করে, রুটি নিয়ে বেশি করে।
আরজ আলীঃ রিজিক আল্লাহর হাতে। তিনি যাকে চান দেন, যাকে চান সীমিত করেন [26] [27] [28]। কোরআনে তা বহুবার বলা আছে।
আগন্তুকঃ ঠিক তাই। তাহলে আসুন, রিজিকের প্রশ্নটি একটু খুলে দেখি। যদি আল্লাহই রিজিকদাতা হন, তবে চোরের রিজিক কে দেন? দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীর রিজিক কে দেন? যে শাসক জনগণের টাকা লুট করে প্রাসাদ বানায়, সেই সম্পদের চূড়ান্ত বরাদ্দদাতা কে? যদি বলেন—সে অন্যায়ভাবে নিয়েছে, তাহলে প্রশ্ন: আল্লাহ কি তার জন্য সেই সম্পদ বরাদ্দ করেননি, না কি বরাদ্দ করেছিলেন কিন্তু আল্লাহর বরাদ্দের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বরাদ্দ অন্যত্র পৌঁছে গেলো?
আরজ আলীঃ অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদকে রিজিক বলা যায় না। চোর চুরি করে, দুর্নীতিবাজ দুর্নীতি করে; এগুলো হারাম উপার্জন। আল্লাহ রিজিক দেন, কিন্তু মানুষ হারাম পথে তা নেয়।
আগন্তুকঃ চমৎকার। তাহলে রিজিক দুই ধরনের—আল্লাহর দেওয়া রিজিক এবং মানুষের চুরি করা রিজিক? কিন্তু চোর যে চাল খায়, সেই চাল কি আল্লাহ তার জন্যেই বরাদ্দ করেননি? যে হাতে সে চুরি করে, সেই হাত কে বানিয়েছে? যে সুযোগে সে চুরি করে, সেই সুযোগ কার মহাবিশ্বে ঘটে? যে সম্পদ সে পায়, সেটি কি আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে তার ঘরে পৌঁছে? যদি আল্লাহর লিখিত রিজিক ছাড়া কোনো কণা কারও মুখে না যায়, তবে চোরের মুখে যাওয়া ভাতের দানা কার নথিতে ছিল?
আরজ আলীঃ আল্লাহ পরীক্ষা করেন। তিনি সুযোগ দেন, কিন্তু মানুষ কীভাবে গ্রহণ করবে, সেটি মানুষের পরীক্ষা। সম্পদ হালাল পথে নেওয়া যায়, হারাম পথেও নেওয়া যায়।
আগন্তুকঃ তাহলে আল্লাহ রিজিক নির্ধারণ করেন, কিন্তু ডেলিভারি পদ্ধতি মানুষ নির্বাচন করে? বেশ। মহাজাগতিক সরবরাহ ব্যবস্থা শুনে মনে হচ্ছে—বরাদ্দ আল্লাহর, কুরিয়ার সার্ভিস মানুষের। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়। একজনের ঘরে খাদ্য নেই, অন্যজনের গুদামে পচে যাচ্ছে। একজন শিশু ক্ষুধায় কাঁদছে, অন্যজন রাষ্ট্রীয় টাকায় ভোজ দিচ্ছে। যদি রিজিক বণ্টন আল্লাহর হাতে হয়, তবে এই বণ্টনের নৈতিকতা কোথায়? আর যদি মানুষই বণ্টন নষ্ট করে, তবে আল্লাহর নির্ধারিত রিজিক মানুষের দুর্নীতির হাতে এত অসহায় কেন?
আরজ আলী এবার সামান্য অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসলেন। আগন্তুকের কণ্ঠে কৌতুক আছে, কিন্তু প্রশ্নটি কৌতুকের নয়। বাইরে একদল শিশু দৌড়ে গেল, তাদের পায়ের শব্দ কিছুক্ষণ ভেসে এসে থেমে গেল।
আরজ আলীঃ আপনি দুনিয়ার অন্যায় দিয়ে আল্লাহকে দোষ দিতে চাইছেন। মানুষ অন্যায় করে, আল্লাহ নয়। মানুষ লুট করে, আল্লাহ নয়।
আগন্তুকঃ আমি দোষ দিচ্ছি না, হিসাব চাইছি। দোষ দেওয়া সহজ; হিসাব চাওয়া কঠিন। যদি কোনো মন্ত্রী জনগণের টাকা লুট করে, আপনি বলেন—সে দুর্নীতিবাজ। ঠিক। কিন্তু যদি বলা হয়, তার ঐ সম্পদও আল্লাহর নির্ধারিত রিজিক, তাহলে দুর্নীতি আর রিজিকের মধ্যে সম্পর্ক কী? সে কি আল্লাহর বরাদ্দকৃত সম্পদই হারাম পথে তুলে নিচ্ছে? যদি তাই হয়, তবে হারাম পদ্ধতিও কি আল্লাহর জ্ঞাত, অনুমোদিত, পূর্বলিখিত কাঠামোর অংশ নয়?
আরজ আলীঃ আল্লাহ জানেন, কিন্তু অনুমোদন করেন না। জানার অর্থ অনুমোদন নয়।
আগন্তুকঃ আবার সেই পুরনো আশ্রয়—জানা আর অনুমোদন আলাদা। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে শুধু জানা নয়, ক্ষমতাও আছে। আপনি যদি একটি শিশুকে কুয়োর দিকে যেতে দেখেন, জানেন সে পড়বে, তাকে থামানোর ক্ষমতাও আছে, তবু থামান না—তখন আপনি শুধু “জেনেছিলেন” বললে দায় মেটে না। আল্লাহ যদি জানেন দুর্নীতিবাজ লুট করবে, ক্ষমতা আছে থামানোর, তবু তাকে ক্ষমতা, সুযোগ, বুদ্ধি, শরীর, রাষ্ট্রযন্ত্র, ভোগের আয়ু সব দেন—তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। সর্বশক্তিমান দর্শক নন; তিনি মঞ্চের মালিক।
আরজ আলীঃ কিন্তু দুনিয়া পরীক্ষা। অন্যায় দেখে মানুষ কী করে, সেটিও পরীক্ষা। অত্যাচারীর পরীক্ষা, অত্যাচারিতের পরীক্ষা, দর্শকেরও পরীক্ষা।
আগন্তুকঃ অর্থাৎ যে ক্ষুধায় কাঁদছে, সে পরীক্ষা; যে তার চাল লুট করছে, সে পরীক্ষা; যে লুট দেখছে, সে পরীক্ষা; আর যে পুরো পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে, তিনি পরীক্ষক। প্রশ্ন হলো—পরীক্ষক কি কখনো পরীক্ষার নকশার জন্য দায়ী হন না? যদি কোনো শিক্ষক এক ছাত্রের হাতে বই দেন, অন্য ছাত্রের চোখ বেঁধে দেন, তৃতীয় ছাত্রের খাতা চুরি হতে দেন, তারপর বলেন—“আমি সবার পরীক্ষা নিচ্ছি”—তবে তাঁর পরীক্ষা পদ্ধতি প্রশ্নের বাইরে থাকে না। পরীক্ষার নাম দিলেই অন্যায় ন্যায় হয়ে যায় না।
আরজ আলীঃ আপনি আল্লাহর হিকমত বুঝতে পারবেন না। মানুষের জ্ঞান সীমিত।
আগন্তুকঃ মানুষের জ্ঞান সীমিত—এই কথাটি সত্য। কিন্তু আশ্চর্য হলো, মানুষের জ্ঞান যখন আল্লাহকে ন্যায়বান প্রমাণ করতে চায়, তখন সে যথেষ্ট; আর যখন আল্লাহর ন্যায়বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়, তখন সে সীমিত। প্রশংসাবাক্যে জ্ঞান যথেষ্ট, আর সমালোচনায় সীমাবদ্ধ? যুক্তির এই দরজা একদিকে খোলে, অন্যদিকে বন্ধ থাকে। ধর্মতত্ত্বের বাড়িতে দরজাগুলোও বোধহয় কিবলামুখী।
আরজ আলী এবার অনিচ্ছাসত্ত্বেও মৃদু হাসলেন। কিন্তু হাসির পরপরই তাঁর মুখ আবার কঠোর হলো। তিনি বুঝতে পারছেন, আগন্তুকের ব্যঙ্গের নিচে আছে মূল প্রশ্ন—রিজিকের দায়, অভাবের দায়, অন্যায় বণ্টনের দায়।
আরজ আলীঃ আপনি কি বলতে চাইছেন, চোর চুরি করলে চোরের কোনো দায় নেই?
আগন্তুকঃ না। আমি বলছি, চোরের দায় আছে; কিন্তু চোরের দায় দিয়ে পুরো মহাবিশ্বের দায় ঢেকে ফেলা যায় না। চোরকে জিজ্ঞেস করবেন—কেন চুরি করেছ? অবশ্যই করবেন। কিন্তু সঙ্গেই জিজ্ঞেস করবেন—সে ক্ষুধার্ত কেন? তার সামনে সুযোগ এল কীভাবে? যে সমাজে একদিকে অপচয়, অন্যদিকে অভাব—সেই সমাজের নকশা কেমন? আর যদি সবশেষে বলেন, রিজিক আল্লাহর হাতে—তাহলে আল্লাহর বণ্টননীতিও আলোচনায় আসবে। হিসাবের খাতা খুললে শুধু ছোট চোরের নাম লিখে বড় হিসাব বন্ধ করা যায় না।
আরজ আলীঃ কিন্তু অনেক চোর ক্ষুধার কারণে চুরি করে না। লোভে করে। ক্ষমতাবানরা তো অভাবে দুর্নীতি করে না।
আগন্তুকঃ ঠিক বলেছেন। ক্ষুধার চোর আর লোভের চোর আলাদা। ক্ষুধার চোর রুটি চুরি করে; লোভের চোর রাষ্ট্র চুরি করে। প্রথমজন জেলে যায়, দ্বিতীয়জন মঞ্চে বক্তৃতা দেয়। কিন্তু প্রশ্ন একই থাকে—লোভের ক্ষমতা কে দিল? যে মানুষ অল্পে তৃপ্ত হতে পারত, তার ভেতরে অসীম ভোগের আগুন কে রাখল? যে ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিবাজ করে, সেই ক্ষমতার সিংহাসন কার জগতে গড়া? আপনি যদি বলেন—এ সবই মানুষের পরীক্ষা—তাহলে বলবো, পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রশ্নপত্রের সঙ্গে বিষ মেশানো কেন?
আরজ আলীঃ লোভ মানুষের নফসের অংশ। মানুষকে নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়।
আগন্তুকঃ নফসও কি মানুষ নিজে বানিয়েছে? নফস যদি জন্মগত কাঠামো হয়, তবে তার নির্মাতা কে? মানুষকে আগুনের পাশে রেখে বলা হলো—জ্বলবে না; মধুর পাশে রেখে বলা হলো—চাটবে না; ক্ষমতার পাশে রেখে বলা হলো—দুর্নীতি করবে না; তারপর সে করলে বলা হলো—দেখো, মানুষ ব্যর্থ। প্রশ্ন হলো, পরীক্ষাটি কি নৈতিক উন্নতির, নাকি পূর্বপরিকল্পিত ব্যর্থতার? বিশেষত পরীক্ষক যদি আগে থেকেই ফল জানেন।
আরজ আলীঃ আল্লাহ রিজিক দেন, কিন্তু হারাম-হালাল পথ দেখিয়ে দেন। মানুষ কোন পথে যাবে, সেটিই পরীক্ষা।
আগন্তুকঃ ধরুন, একজন মানুষের ভাগ্যে এক বস্তা চাল লেখা আছে। সে হালাল পথে পায়নি, চুরি করে পেল। এখন বলুন, চালটি কি তার ভাগ্যে ছিল? যদি থাকে, তাহলে চুরি পদ্ধতি হলেও ফল আল্লাহর লেখার সঙ্গে মিলে গেল। যদি ভাগ্যে না থাকে, তাহলে সে আল্লাহর রিজিক-বণ্টন ভেঙে ফেলল—অর্থাৎ চোর আল্লাহর বরাদ্দ ব্যবস্থার ওপর বিজয়ী হলো। এই দুইয়ের কোনটি গ্রহণ করবেন? প্রথমটি নিলে নৈতিক সমস্যা, দ্বিতীয়টি নিলে আল্লাহর সার্বভৌমত্বে সমস্যা। ধর্মতত্ত্বের এই রাস্তা দুদিকে গর্ত, মাঝখানে সরু সেতু; আর মুফাসসিরেরা সেই সেতুতে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করেন।
আগন্তুকের শেষ বাক্যে আরজ আলী এবার আর হাসলেন না। তিনি গভীরভাবে তাকিয়ে থাকলেন। যেন প্রশ্নটি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে—চোরের ভাত কি আল্লাহর লেখা, নাকি আল্লাহর লেখার বিরুদ্ধে চুরি করা?
আরজ আলীঃ হয়তো বলা যায়, আল্লাহ জানতেন সে চুরি করবে, তাই তার রিজিক সেই পথে পৌঁছাবে। কিন্তু চুরি করার দায় তারই।
আগন্তুকঃ তাহলে আবার একই সমস্যায় ফিরে এলাম। আল্লাহ জানতেন, লিখেছিলেন, রিজিক পৌঁছাল, পদ্ধতি ঘটল, সুযোগ মিলল, ইচ্ছা জন্মাল—শেষে দায় শুধু মানুষের। যেন রাজপ্রাসাদের রান্নাঘর থেকে বিষমিশ্রিত খাবার বের হলো, রাঁধুনি, সরবরাহকারী, অনুমোদনকারী সবাই অদৃশ্য; শুধু যে খেয়ে ফেলল, তার বিচার।
আরজ আলীঃ আপনি সব দায় আল্লাহর ওপর চাপাতে চাইছেন।
আগন্তুকঃ না। আমি শুধু বলছি—যেখানে ক্ষমতা সর্বময়, সেখানে দায়ও সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হতে পারে না। সর্বশক্তিমানের সুবিধা হলো—সবকিছু তাঁর ইচ্ছায়। কিন্তু সর্বশক্তিমানের অসুবিধাও একই—সবকিছুর ব্যাখ্যায় তাঁর নাম উঠে আসে। মানুষ যদি সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়, তবে আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ কমে। আল্লাহ যদি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রক হন, তবে মানুষের দায় কমে। একসঙ্গে দুটো ধরে রাখতে গেলে যুক্তিকে খুব কষ্ট করতে হয়; অনেক সময় তাকে ধর্মতত্ত্বের চাকরি নিতে হয়।
আরজ আলীঃ আপনার বক্তব্য বিপজ্জনক। মানুষ যদি এভাবে ভাবে, তবে পাপের দায় কেউ নেবে না। সবাই বলবে—রিজিক আল্লাহ দিয়েছেন, তাকদির আল্লাহ লিখেছেন, তাহলে আমি কী করেছি?
আগন্তুকঃ মানুষকে দায়ী করা সমাজের প্রয়োজন; আমি তা অস্বীকার করছি না। কিন্তু আল্লাহকে দায়মুক্ত করা ধর্মের প্রয়োজন; আমি সেটিই প্রশ্ন করছি। সমাজ চোরকে শাস্তি দেবে, কারণ সমাজকে রক্ষা করতে হবে। কিন্তু দর্শন জিজ্ঞেস করবে—চুরি কেন জন্মায়? ক্ষুধা কে বানায়? বৈষম্য কে অনুমতি দেয়? লোভের আগুন কে সৃষ্টি করে? রিজিকের অসমতা কেন? আর যদি সবই পরীক্ষা হয়, তবে কেন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র একেকজনের হাতে একেক রকম? কেউ জন্মায় সোনার চামচ মুখে, কেউ জন্মায় খালি পেট নিয়ে। তারপর দুজনকেই বলা হয়—সৎ হও। এটি নৈতিকতা, না সামাজিক ব্যঙ্গ?
আরজ আলীঃ দরিদ্রের জন্য ধৈর্য, ধনীর জন্য কৃতজ্ঞতা—এগুলোও তো পরীক্ষা।
আগন্তুকঃ দারিদ্র্যকে ধৈর্যের পরীক্ষা বলা সহজ, যখন বক্তার পেটে ভাত থাকে। ক্ষুধার্ত শিশুকে বলুন—তুমি ধৈর্যের পরীক্ষায় আছ; আর প্রাসাদের ভোজসভায় বলুন—আপনারা কৃতজ্ঞতার পরীক্ষায় আছেন। দেখবেন, দুই পরীক্ষার সিলেবাস আলাদা হলেও পরীক্ষকের প্রশংসা একই থাকে। গরিব কাঁদলে বলে তাকদির; ধনী ভোগ করলে বলে নেয়ামত। ব্যাখ্যার এই বৈষম্যও কি রিজিকের অংশ?
ঘরের ভেতর আলো আরও ম্লান হলো। আরজ আলী এবার জানালার বাইরে তাকালেন। তাঁর মুখে তর্কের প্রস্তুতি আছে, কিন্তু সঙ্গে আছে এক ধরনের দার্শনিক ক্লান্তি। আগন্তুক কথা থামালেন না।
আগন্তুকঃ আরেকটি প্রশ্ন করুন নিজেকে। একজন মানুষ ঘুষ নেয়। তার সন্তান সেই টাকায় স্কুলে পড়ে, বাড়িতে খাবার আসে, বাজার হয়। শিশুটি যে ভাত খায়, সেটি কি হারাম? যদি হারাম হয়, শিশুর অপরাধ কী? যদি রিজিক হয়, তবে ঘুষের টাকা আল্লাহর বণ্টনে কীভাবে ঢুকল? যদি বলেন—পিতা পাপী, শিশু নির্দোষ—তবে দেখলেন তো, একই সম্পদ এক দিক থেকে পাপ, অন্য দিক থেকে রিজিক। নৈতিক হিসাবের খাতা এত সরল নয়, জনাব।
আরজ আলীঃ কিন্তু ইসলামে হারাম উপার্জন নিষিদ্ধ। এতে প্রশ্নের অবকাশ নেই।
আগন্তুকঃ নিষিদ্ধ—ঠিক। কিন্তু নিষিদ্ধ জিনিসের অস্তিত্ব কেন? নিষিদ্ধ পথের কার্যকারিতা কেন? কেউ যদি হারাম পথে সম্পদ পায়, ভোগ করে, ক্ষমতা বাড়ায়, অন্যকে শোষণ করে, দীর্ঘ জীবন পায়—তবে নিষেধাজ্ঞা কাগজে থাকে, বাস্তবতা অন্য কথা বলে। আপনি বলবেন—পরকালে বিচার হবে। কিন্তু ততদিনে ক্ষুধার্তের জীবন শেষ, অত্যাচারিতের হাড় ভাঙা, লুটের টাকা উত্তরাধিকারে চলে গেছে। অনন্ত ভবিষ্যতের আদালত বর্তমানের ক্ষুধা মেটায় না।
আরজ আলীঃ আপনি শুধু দুনিয়ার দিকে তাকাচ্ছেন। আখিরাত ছাড়া পূর্ণ বিচার বোঝা যায় না।
আগন্তুকঃ আখিরাতের যুক্তি খুব কার্যকর। দুনিয়ায় প্রশ্ন উঠলে উত্তর যায় অদৃশ্য ভবিষ্যতে। যেন হিসাবরক্ষক আজকের খাতা দেখাতে না পেরে বলে—শেষ অডিট মৃত্যুর পরে হবে। কিন্তু যার জীবন এখনই পুড়ছে, তার কাছে ভবিষ্যৎ আদালত সান্ত্বনা হতে পারে, ব্যাখ্যা নয়। আর যদি আল্লাহ এখনই রিজিক দেন, এখনই বণ্টন করেন, এখনই ক্ষমতা দেন—তবে প্রশ্নও এখনই উঠবে।
আরজ আলীঃ আপনি কি বলছেন, রিজিকের ধারণাই নৈতিকভাবে সমস্যাজনক?
আগন্তুকঃ আমি বলছি, রিজিকের ধারণা যদি সর্বব্যাপী হয়, তবে তা নৈতিক প্রশ্ন সৃষ্টি করে। যদি প্রতিটি খাদ্য, সম্পদ, সুযোগ, ক্ষমতা আল্লাহর নির্ধারিত রিজিক হয়, তবে অন্যায় সম্পদও তাঁর ব্যবস্থার বাইরে নয়। আর যদি অন্যায় সম্পদ তাঁর রিজিক নয়, তবে মানুষ আল্লাহর বণ্টন ভেঙে নিজে সম্পদ স্থানান্তর করতে পারে। একদিকে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, অন্যদিকে মানুষের অপরাধ—দুটিকে একসঙ্গে রাখতে হলে সূক্ষ্ম দর্শন দরকার। কিন্তু সাধারণ ওয়াজে সূক্ষ্মতা কম, স্লোগান বেশি। সেখানে বলা সহজ—“সব আল্লাহ দেন”—তারপর দুর্নীতিবাজ ধরা পড়লে বলা হয়—“ওটা আল্লাহ দেননি, সে চুরি করেছে।” এই দ্বৈত হিসাবেই তো সমস্যা।
আরজ আলীঃ আপনি বলছিলেন, আপনার ওপর আল্লাহর রহমত বেশি। সেটি কীভাবে?
আগন্তুকঃ কারণ মানুষ ভাবে আল্লাহর সব রহমত মানুষের জন্য। কিন্তু আমার দিকে তাকান। আমি অভিশপ্ত, তবু বেঁচে আছি। আমার আয়ু দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। আমাকে মানুষের অন্তরে ফিসফিস করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আমাকে কাজের ক্ষেত্র দেওয়া হয়েছে, প্রভাব দেওয়া হয়েছে, সময় দেওয়া হয়েছে। একজন সাধারণ মানুষ পাপ করলে তৎক্ষণাৎ ক্ষমা চাইতে হয়; আমি মহাজাগতিক বিদ্রোহের আসামি, তবু কার্যত আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। এটিকে আপনি কী বলবেন—শাস্তি, না বিশেষ অনুমতিপত্র?
আরজ আলীঃ সেটি আল্লাহর হিকমত। আপনাকে অবকাশ দেওয়া হয়েছে, যাতে মানুষের পরীক্ষা হয়।
আগন্তুকঃ ঠিক তাই। আমাকে অবকাশ দেওয়া হয়েছে মানুষের পরীক্ষা নেওয়ার জন্য [29]। অর্থাৎ আমি পরীক্ষার অবিচ্ছেদ্য উপকরণ। একজন শিক্ষক যদি পরীক্ষায় ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল উত্তর ছড়িয়ে দেন, তারপর ছাত্র ভুল করলে বলেন—“দেখো, সে ফেল করেছে”—তবে সেই ভুল উত্তরের লেখক কি পরীক্ষার অংশ নন? আমাকে যদি আল্লাহ নিজেই মানুষের পরীক্ষায় ব্যবহার করেন, তবে আমি শুধু শত্রু নই; আমি পরীক্ষাব্যবস্থার অনুমোদিত বিভাগ। হয়তো “শয়তান বিভাগ”—কিন্তু দপ্তরটি স্বয়ং আল্লাহর।
আরজ আলী এবার স্পষ্ট বিরক্ত হলেন। কিন্তু তিনি বাধা দিলেন না। আগন্তুক মৃদু হাসলেন, যেন জানেন কথাটি শোনার জন্যই বলা হয়েছে।
আরজ আলীঃ আপনি নিজেকে আল্লাহর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখিয়ে নিজের অপরাধ হালকা করতে চাইছেন।
আগন্তুকঃ আমি অপরাধ হালকা করছি না; ব্যবস্থাকে দৃশ্যমান করছি। যে ব্যবস্থায় আমাকে দরকার, সেখানে আমাকে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় দোষী বানানো বুদ্ধির অপমান। যদি আমি না থাকি, পরীক্ষা বদলে যায়। যদি প্রলোভন না থাকে, পুণ্যের মূল্য বদলে যায়। যদি মন্দের সম্ভাবনা না থাকে, ভালোর নাটকও দুর্বল হয়। তাহলে আমি কি কেবল পাপী, নাকি নৈতিক নাটকের অপরিহার্য খলচরিত্র? আর যদি খলচরিত্র অপরিহার্য হয়, তবে নাট্যকার কি অন্তত ধন্যবাদ দেবেন না? না কি শেষে শুধু আমাকেই আগুনে পোড়াবেন?
আরজ আলীঃ আপনার যুক্তি শুনলে মনে হয়, আপনি আল্লাহর কাজে সহকারী!
আগন্তুকঃ সহকারী নয়, অনিচ্ছাকৃত কার্যকরী উপাদান। আল্লাহ আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অবকাশ দিয়েছেন, প্রভাব দিয়েছেন, ভূমিকা দিয়েছেন। আমি যদি মানুষের পাপের পথে প্ররোচক হই, তবে আমার অস্তিত্ব মানুষের নৈতিক পরীক্ষার যন্ত্র। মানুষ আমাকে গালি দেয়, কিন্তু তাদের ধর্মীয় নাটকে আমি না থাকলে অনেক দৃশ্যই দাঁড়ায় না। ভাবুন তো, শয়তানহীন ওয়াজ কতটা সংক্ষিপ্ত হতো! অনেক বক্তার অর্ধেক উপমা বেকার হয়ে যেত।
আরজ আলীঃ তবু আপনি মানুষের ক্ষতি করেন। আপনি কুমন্ত্রণা দেন। মানুষকে ভুল পথে ডাকেন।
আগন্তুকঃ আমি ডাক দিই, জোর করি না। আমি ফিসফিস করি, হাত বেঁধে টানি না। কিন্তু মানুষের কামনা যদি আগে থেকেই তার ভেতরে না থাকে, আমার ফিসফিস কি বাতাসে মিলিয়ে যাবে না? শুকনো কাঠ না থাকলে স্ফুলিঙ্গে আগুন লাগে না। নইলে রমজানে আমাদের সারামাস বন্দী করে রাখার পরেও সবাই ভালমানুষ হয়ে যায় না কেন?
আরজ আলীঃ আপনি তাহলে বলতে চাইছেন, আপনি শুধু সুযোগ নেন; পাপ সৃষ্টি করেন না?
আগন্তুকঃ আমি বলতে চাইছি, আমাকে যে কাজ দেওয়া হয়েছে, আমি অন্তত সেটি ফাঁকি দিই না। দিন হোক, রাত হোক, আকাশ হোক, বাতাস হোক, মানুষের ঘর হোক, মনের অন্ধকার হোক—আমি আমার দায়িত্ব পালন করি। আপনাদের প্রিয় নবীর জীবন পড়ে দেখুন। জিবরাইলকে একবার উঁনার কাছে ওহী নিয়ে পাঠানো হয়েছিল; মহাবিশ্বের সবচেয়ে জরুরি বার্তা, আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীর কাছে পৌঁছানোর বিশাল এক দায়িত্ব। কিন্তু ঘরের নিচে সামান্য একটি কুকুর থাকায় তিনি সেই দায়িত্ব ফেলে ফিরে চলে গেলেন। অপেক্ষাও করলেন না [30]। ফেরেশতাদের এই দায়িত্ববোধ যদি আদর্শ হয়, তাহলে দায়িত্বে ফাঁকি কাকে বলে? অথচ আমি—যাকে আপনারা অভিশপ্ত বলেন—নিজ দায়িত্বে এতটাই বদ্ধপরিকর যে আমাকে বন্দী করেও মানুষের ভিতরের শুকনো বনকে সবুজ করা যায় না। এখন বলুন—শুকনো কাঠ কে বানাল, বন কে শুকাল, বাতাস কে দিল? আর স্ফুলিঙ্গকে শুধু দায়ী করলেই কি অগ্নিকাণ্ডের পূর্ণ ব্যাখ্যা হয়?
আরজ আলীঃ মানুষের ভেতরে নফস আছে, কিন্তু তার ভেতরে বিবেকও আছে। তাই সে দায়ী। আর আপনার যুক্তি যতই ধারালো হোক, দায়িত্ব পালন আর মানুষকে বিপথে নেওয়া—দুটোকে একই নৈতিক পাল্লায় মাপা যায় না।
আগন্তুকঃ নফসও সৃষ্টি, বিবেকও সৃষ্টি। একজনের নফস প্রবল, বিবেক দুর্বল; অন্যজনের বিবেক প্রবল, নফস দুর্বল। কেউ জন্মায় ক্ষুধায়, কেউ জন্মায় নিরাপত্তায়। কেউ শিক্ষা পায়, কেউ পায় না। কেউ ক্ষমতার কাছাকাছি, কেউ চিরকাল বঞ্চিত। তারপর সবার জন্য একই নৈতিক ভাষণ—“সৎ হও।” এটি এমন দৌড় প্রতিযোগিতা, যেখানে একজনের পায়ে জুতো, অন্যজনের পায়ে শিকল, তৃতীয়জনের সামনে কাদা, চতুর্থজনের সামনে পাকা রাস্তা—তারপর ঘোষক বলছেন, “দেখি কার তাকওয়া বেশি।”
আরজ আলী এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখে ক্লান্তি, কিন্তু তর্কের আগুন এখনও নিভে যায়নি। তিনি ধীরে ধীরে বললেন।
আরজ আলীঃ আপনার কথায় যুক্তি আছে, কিন্তু বিপদও আছে। যদি সব ব্যাখ্যা কাঠামো দিয়ে হয়, তবে ব্যক্তি-নৈতিকতা কোথায় থাকে?
আগন্তুকঃ ব্যক্তি-নৈতিকতা থাকে, কিন্তু একা থাকে না। সে সমাজের সঙ্গে থাকে, জীববৃত্তির সঙ্গে থাকে, ক্ষমতার সঙ্গে থাকে, রিজিকের সঙ্গে থাকে, স্রষ্টার নকশার সঙ্গে থাকে। মানুষকে দায়ী করুন—কিন্তু শুধু মানুষকে দায়ী করবেন না। চোরকে ধরুন—কিন্তু ক্ষুধাকে ছাড়বেন না। দুর্নীতিবাজকে বিচার করুন—কিন্তু ক্ষমতার নকশাকে ছাড়বেন না। আর যদি সবশেষে আল্লাহকে বলেন “রিজিকদাতা”, তবে রিজিকের নৈতিক ভূগোলেও তাঁর নাম আসবে। নাম শুধু প্রশংসার পৃষ্ঠায় থাকবে, জবাবদিহির পৃষ্ঠায় থাকবে না—এ কেমন হিসাব?
আরজ আলীঃ আপনি তাহলে বলছেন, রিজিকের প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ন্যায়বিচারের প্রশ্নে গিয়ে দাঁড়ায়?
আগন্তুকঃ অবশ্যই। তাকদির যেমন স্বাধীন ইচ্ছার প্রশ্নে নিয়ে যায়, রিজিক তেমনি ন্যায়বণ্টনের প্রশ্নে নিয়ে যায়। যদি আল্লাহ রিজিক দেন, তবে ক্ষুধার ব্যাখ্যা চাই। যদি আল্লাহ সম্পদ দেন, তবে বৈষম্যের ব্যাখ্যা চাই। যদি আল্লাহ ক্ষমতা দেন, তবে অত্যাচারের ব্যাখ্যা চাই। আর যদি বলেন মানুষ নষ্ট করে, তবে জানতে চাই—মানুষকে এমন নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাসহ কে বানাল? প্রশ্নগুলো আমার নয়, জনাব; প্রশ্নগুলো সেই পৃথিবীর, যেখানে শিশু ক্ষুধায় কাঁদে আর প্রাসাদে ভোজ হয়—দুজনেই বলে, “আল্লাহর ইচ্ছা।”
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না। বাইরে আলো নরম হলো, কিন্তু ঘরের ভেতর প্রশ্নটি আরও ভারী হয়ে রইল। আরজ আলীর মুখে আর আগের দৃঢ়তা নেই, কিন্তু আত্মসমর্পণও নেই। তিনি যেন প্রতিটি বাক্য ওজন করছেন। আগন্তুকের চোখে এবার মৃদু বিষণ্ণতা।
আরজ আলীঃ আপনার যুক্তি শুনে মনে হচ্ছে, আপনি কেবল নিজের আত্মপক্ষ সমর্থন করছেন না। আপনি মানুষের ধর্মীয় ভাষার ভেতরে লুকানো দ্বৈততা দেখাতে চাইছেন।
আগন্তুকঃ হ্যাঁ। মানুষ আমাকে দোষ দেয়, নিজেকে নির্দোষ রাখার জন্য। আবার আল্লাহকে প্রশংসা করে, তাঁকে দায়মুক্ত রাখার জন্য। মাঝখানে বাস্তবতা দাঁড়িয়ে থাকে—ক্ষুধা, লোভ, রিজিক, চুরি, দুর্নীতি, ক্ষমতা, অবিচার। আমি বলছি না, সব দায় আল্লাহর। আমি বলছি, সব দায় শয়তানেরও নয়। এত বড় মহাবিশ্বের নৈতিক জঞ্জাল একা আমার কাঁধে চাপানো একটু অন্যায়। আমার কাঁধ বড় হতে পারে, কিন্তু এত বড় না।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনি কী চান?
আগন্তুকঃ আমি চাই, মানুষ দায়ের ভাষা সৎভাবে ব্যবহার করুক। যদি বলে—মানুষ দায়ী, তবে মানুষের স্বাধীনতা স্বীকার করুক। যদি বলে—সব আল্লাহর ইচ্ছায়, তবে আল্লাহর নকশাকেও প্রশ্নের বাইরে না রাখুক। যদি বলে—রিজিক আল্লাহর হাতে, তবে ক্ষুধা ও বৈষম্যের প্রশ্নেও সেই বাক্য মনে রাখুক। আর যদি বলে—সব আমার প্ররোচনা, তবে অন্তত স্বীকার করুক, আমাকে সেই প্ররোচনার ক্ষমতা, সময় ও ক্ষেত্র দেওয়া হয়েছে। আমি দরজা খুলিনি; দরজার সামনে শুধু কড়া নেড়েছি। দরজা, ঘর, তালা, চাবি, ভেতরের অন্ধকার—সব আমার বানানো নয়।
আরজ আলী এবার নিচু স্বরে বললেন। তাঁর কণ্ঠে আগের মতো অভিযোগ নেই; বরং আছে পরের প্রশ্নের প্রস্তুতি।
আরজ আলীঃ রিজিকের কথা বললেন। কিন্তু আপনি তো শুধু মানুষের পাপের বাহ্যিক অবস্থার কথা বলছেন। মানুষের অন্তর? মানুষের মন? মানুষের কামনা? মানুষের ভেতরে যে ফিসফিসানি—সেটি কী?
আগন্তুকঃ সেই কথাতেই আসছি। মানুষ ভাবে, তার ভেতরের সব অন্ধকার আমার দেওয়া। অথচ আমি অনেক সময় কেবল শব্দ দিই সেই অন্ধকারকে, যা আগে থেকেই সেখানে ছিল। আমি প্রলোভনের ভাষ্যকার, সবসময় প্রলোভনের স্রষ্টা নই। কিন্তু আপনারা ভাষ্যকারকে লেখক বানিয়ে ফেলেছেন। এবার কথা হোক অন্তর, কুমন্ত্রণা এবং মানুষের নিজের অন্ধকার নিয়ে।
দৃশ্যঃ ০৫
স্থানঃ আরজ আলীর কুঁড়েঘর
সময়ঃ বিকেলের পূর্বক্ষণ
চরিত্রঃ আরজ আলী, আগন্তুক
ঘটনাঃ রিজিক, তাকদির ও নৈতিক দায়ের আলোচনা শেষে কথোপকথন এখন মানুষের অন্তরের দিকে মোড় নেয়। আরজ আলী জানতে চান—শয়তানের কুমন্ত্রণা আসলে কী? মানুষ কি নিজের পাপে নিজেই দায়ী, নাকি শয়তান শুধু তার ভেতরের গোপন অন্ধকারকে ভাষা দেয়?
ঘরের ভেতর আলো ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। দুপুরের তীব্রতা কমে এসেছে, কিন্তু আলো এখনও স্পষ্ট। যেন প্রকৃতি নিজেও এই কথোপকথন শুনতে থেমে আছে। আরজ আলী এবার আগের চেয়ে স্থির। তিনি আর আগন্তুককে সরাসরি পাগল বা প্রতারক ভাবছেন না; অন্তত তাঁর প্রশ্নগুলোকে আর এড়িয়ে যাচ্ছেন না।
আরজ আলীঃ আপনি বললেন, মানুষ নিজের ভেতরের অন্ধকারের দায় আপনার ওপর চাপায়। কিন্তু হাদিসে আছে, আপনি মানুষের শিরায় শিরায় চলাচল করেন। আপনি মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেন। তাহলে আপনি শুধু আয়না নন; আপনি সক্রিয় প্ররোচকও। [31] [32]
আগন্তুকঃ আমি প্ররোচক—তা অস্বীকার করছি না। কিন্তু প্ররোচনা আর সৃষ্টি এক জিনিস নয়। আমি দরজায় কড়া নাড়ি; দরজাটি কে বানিয়েছে, ভেতরে আকাঙ্ক্ষা কে রেখেছে, তালা দুর্বল কেন, আর ঘরের মালিক কেন কড়া শুনলেই দরজা খুলে দেয়—এসব প্রশ্নও আছে। আপনারা শুধু কড়া নাড়ার শব্দ শুনে আমাকে ধরেন, কিন্তু ঘরের নকশা দেখেন না।
আরজ আলীঃ কিন্তু আপনি যদি কড়া নাড়তেন না, দরজা খুলত না।
আগন্তুকঃ সব দরজা কি কড়া নাড়লেই খোলে? যে দরজার ভেতরে কৌতূহল নেই, লোভ নেই, ভয় নেই, ঈর্ষা নেই, ক্ষমতার ক্ষুধা নেই—সে দরজা বন্ধই থাকে। আমি মানুষের কানে বলি, কিন্তু লোভের ভাষা তার নিজের। আমি আগুনের পাশে বাতাস দিই; কিন্তু শুকনো কাঠ আগে থেকেই সেখানে থাকে। ভেজা কাঠে আমার ফিসফিসানি ধোঁয়াও তুলতে পারে না।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনি বলতে চাইছেন, মানুষের অন্তরের পাপ মানুষেরই?
আগন্তুকঃ আমি বলছি, মানুষের পাপের ভেতরে মানুষ আছে, আমি আছি, সমাজ আছে, অভাব আছে, লোভ আছে, ক্ষমতা আছে, ভয় আছে, আর যদি ধর্মতত্ত্ব সত্য হয়—তবে আল্লাহর নকশাও আছে। শুধু আমাকে আলাদা করে দাঁড় করিয়ে বলা—“এই যে, সব পাপের ঠিকাদার”—এটি দার্শনিকভাবে অলসতা, নৈতিকভাবে আত্মপ্রবঞ্চনা। মানুষ পাপ করে, তারপর নিজের আত্মসম্মান রক্ষার জন্য একটি পৌরাণিক আবর্জনার ঝুড়ি খোঁজে। সেই ঝুড়ির নাম—শয়তান।
আরজ আলীঃ কিন্তু কোরআন তো শয়তানের কুমন্ত্রণার কথা বলেছে। আপনি মানুষকে মন্দ কাজ সুন্দর করে দেখান। মানুষের অন্তরে সংশয় ঢোকান, আল্লাহর পথ থেকে সরাতে চান।
আগন্তুকঃ মন্দ কাজ সুন্দর করে দেখানোর ক্ষমতা কি শুধু আমার? কোরআন নিজেই বলে, কারো কাছে যদি তার মন্দ কাজ সুশোভিত করে দেখানো হয়, সে সেটিকে ভালো মনে করে; আল্লাহ যাকে ইচ্ছা গোমরাহ করেন, যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন। [33] [34] তাহলে বলুন, মন্দকে সুন্দর করে দেখানোর ক্ষমতা আমার একার, নাকি ব্যবস্থার ভেতর আরও গভীরে প্রোথিত?
আরজ আলীঃ আপনি আবার আল্লাহর দিকে দায় ঠেলে দিচ্ছেন। কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা আছে। আল্লাহ অন্যায়ভাবে কাউকে পথভ্রষ্ট করেন না। মানুষ আগে নিজে পথভ্রষ্ট হয়, তারপর আল্লাহ তাকে তার পথেই ছেড়ে দেন। আর সংশয় তো সবসময় জ্ঞান নয়; অনেক সংশয় শয়তানের ওয়াসওয়াসা। মুমিনের কাজ সেই ওয়াসওয়াসাকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়, দমন করা।
আগন্তুকঃ এই তো আসল জায়গা। সংশয়কে যদি জ্ঞানের সূচনা না ভেবে ওয়াসওয়াসা বলা হয়, আর সেই সংশয় মুখে আনতে ভয় পাওয়াকেই ঈমানের লক্ষণ বানানো হয়, তবে বিশ্বাস নিজেকে প্রশ্ন থেকে রক্ষা করে। [35] সন্দেহ তখন মরে না, শুধু ভেতরে পচে। মানুষ প্রশ্ন করে না, কারণ সে উত্তর পেয়েছে বলে নয়; কারণ তাকে শেখানো হয়েছে প্রশ্নের জন্মই পাপের গর্ভে।
আরজ আলীঃ তবু সব প্রশ্ন সত্যের দিকে নেয় না। কিছু প্রশ্ন মানুষকে বিভ্রান্ত করে, অহংকারে ভরিয়ে তোলে, আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাসে ঠেলে দেয়।
আগন্তুকঃ ধরা যাক তাই। কিন্তু “আগে নিজে পথভ্রষ্ট” হওয়ার সেই প্রথম বিন্দুটি কোথায়? প্রথম বিচ্যুতির উৎস কী? মানুষের মস্তিষ্ক, প্রবণতা, কামনা, ভয়, স্মৃতি, পরিবেশ—এসব কি সে নিজে বানিয়েছে? আপনারা কারণের পথ ধরে হাঁটেন, কিন্তু আল্লাহর দরজার সামনে গিয়ে বলেন—এখান থেকে জুতা খুলে ফেলুন, প্রশ্ন করা নিষেধ। দর্শনে এমন নিষেধাজ্ঞা চলে না। সত্য যদি সত্য হয়, সে প্রশ্নের আদালতে দাঁড়াবে; আর যদি দাঁড়াতে না পারে, তবে তাকে রক্ষা করার জন্য ওয়াসওয়াসার পুলিশ লাগবে।
আরজ আলীঃ তাহলে মানুষ কী? শুধু প্রোগ্রাম করা যন্ত্র?
আগন্তুকঃ না। মানুষ যন্ত্র নয়। কিন্তু মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীনও নয়। মানুষ হলো কারণ, প্রবণতা, স্মৃতি, ভয়, ক্ষুধা, শরীর, সমাজ, ভাষা, শিক্ষা, অশিক্ষা, ক্ষমতা, দুর্বলতা—এসবের জটিল সমন্বয়। ধর্ম তাকে কখনো বলে স্বাধীন, যাতে তাকে শাস্তি দেওয়া যায়; আবার কখনো বলে আল্লাহর ইচ্ছার অধীন, যাতে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা যায়। এই দুই ভাষা পালা করে ব্যবহার করাই ধর্মতত্ত্বের পুরনো কৌশল। যেন দাবার বোর্ডে গুটি মানুষের, চাল আল্লাহর, আর হারলে দোষ ঘোড়ার।
আরজ আলী এবার চোখ নামিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তাঁর মুখে ক্ষীণ বিরক্তি, কিন্তু আগের মতো সরল প্রতিবাদ নেই। আগন্তুক তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন উত্তরের অপেক্ষায় নন; বরং নীরবতার ভিতরেই প্রশ্নটি বসিয়ে দিচ্ছেন।
আরজ আলীঃ মানুষের অন্তরে ভালো-মন্দ দুই প্রবণতাই আছে। আপনি মন্দ প্রবণতাকে উসকে দেন। ফেরেশতা ভালো দিকে ডাকে, আপনি মন্দ দিকে ডাকেন। এখানেই মানুষের পরীক্ষা।
আগন্তুকঃ চমৎকার নাট্যবিন্যাস। এক কানে ফেরেশতা, এক কানে শয়তান; মাঝখানে মানুষ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই দুই কণ্ঠের শব্দমাত্রা কে নির্ধারণ করে? কার কানে ফেরেশতার কণ্ঠ মৃদু, শয়তানের কণ্ঠ প্রবল? [36] কার কানে শৈশব থেকেই ক্ষুধা, অপমান, ভয়, সহিংসতা, অশিক্ষা—এসব এত জোরে বাজে যে ফেরেশতার ফিসফিসানি আর শোনা যায় না? পরীক্ষার কথা বলছেন, কিন্তু পরীক্ষার্থীর কানে কাদের শব্দ কত জোরে যাবে—এই ব্যবস্থাপত্র কে তৈরি করেছে?
আরজ আলীঃ মানুষকে তাই আত্মসংযম করতে বলা হয়েছে। নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে বলা হয়েছে।
আগন্তুকঃ নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ—শব্দটি সুন্দর। কিন্তু একেক মানুষের নফস একেক ওজনের। কারো নফস তুলোর মতো, কারো নফস পাথরের মতো। কেউ এমন পরিবারে জন্মায় যেখানে সংযম শেখানো হয়; কেউ এমন বস্তিতে জন্মায় যেখানে বেঁচে থাকাই প্রথম নৈতিকতা। তারপর দুইজনকে একই ভাষায় বলা হয়—সংযম করো। এ যেন একজনকে নদীর ধারে দাঁড় করিয়ে, আরেকজনকে মরুভূমিতে ফেলে, দুজনকেই বলা—পিপাসা নিয়ন্ত্রণ করো।
আরজ আলীঃ কিন্তু আল্লাহ কারো সাধ্যের বাইরে বোঝা দেন না।
আগন্তুকঃ তাহলে যারা ভেঙে পড়ে, তারা কি প্রমাণ করে যে তাদের সাধ্য কম ছিল, নাকি বোঝা বেশি ছিল? যদি আল্লাহ সাধ্যের বাইরে বোঝা না দেন, তবে পাপীর পাপ কী? সে কি পারত, কিন্তু করল না? নাকি তার ভেতরের, বাইরের, সামাজিক ও মানসিক বোঝা তার সাধ্যকে অতিক্রম করেছিল? আপনি বলবেন—সে পারত। কিন্তু আল্লাহ যদি জানতেন সে পারবে না, তবুও সেই পরীক্ষা দিলেন কেন? আর যদি জানতেন সে পারবে, কিন্তু সে পারল না—তবে জ্ঞানে ভুল হলো কি?
আরজ আলীঃ আপনি প্রতিটি পথকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু মানুষকে নিজের অন্তরের সঙ্গে লড়াই করতেই হবে।
আগন্তুকঃ আমি লড়াইয়ের প্রয়োজন অস্বীকার করছি না। আমি শুধু বলছি, অন্তরের যুদ্ধক্ষেত্রও সমতল নয়। কারো হাতে ঢাল, কারো হাতে ভাঙা কাঠি; কারো সামনে এক শত্রু, কারো সামনে দশ। তারপর ফল ঘোষণার দিনে সবাইকে একই দাঁড়িপাল্লায় ওজন করা হলে প্রশ্ন উঠবেই। যুদ্ধের ময়দান আলাদা, সৈন্যের শক্তি আলাদা, অস্ত্র আলাদা, প্রশিক্ষণ আলাদা—কিন্তু বিচার এক? এ ন্যায়বিচার, না প্রশাসনিক সুবিধা?
ঘরের ভেতর বাতাস ভারী হয়ে উঠল। বাইরে দূরে আজানের মতো কোনো দীর্ঘ স্বর ভেসে এল, কিন্তু স্পষ্ট নয়। আরজ আলী কানের দিকে সামান্য মন দিলেন, তারপর আবার আগন্তুকের দিকে ফিরলেন।
আরজ আলীঃ যদি মানুষের ভেতরের অন্ধকার মানুষেরই না হয়, তাহলে তওবার অর্থ কী? মানুষ কেন ক্ষমা চাইবে?
আগন্তুকঃ তওবা অর্থপূর্ণ, যদি তা আত্মসংশোধন হয়। কিন্তু তওবা যদি হয় এমন এক স্রষ্টার কাছে ক্ষমা চাওয়া, যিনি আগে থেকেই জানতেন, লিখেছিলেন, অনুমতি দিয়েছিলেন, আর শেষে বললেন—“ক্ষমা চাইলে ক্ষমা করবো”—তাহলে প্রশ্ন আছে। ধরুন, কোনো নাট্যকার চরিত্রকে এমন সংলাপ লিখে দিলেন, যাতে চরিত্র অপমানজনক কথা বলে। তারপর নাট্যকারই বললেন—এখন ক্ষমা চাও। দর্শক কাঁদল, চরিত্র কাঁদল, নাট্যকার সন্তুষ্ট। কিন্তু দার্শনিক দর্শক জিজ্ঞেস করবে—সংলাপ লিখেছিলেন কে?
আরজ আলীঃ তাহলে আপনার কাছে তওবা অর্থহীন?
আগন্তুকঃ মানুষের কাছে তওবা অর্থপূর্ণ—যদি মানুষ নিজেকে বদলায়, ক্ষতি পূরণ করে, অন্যায় স্বীকার করে। কিন্তু আল্লাহর সামনে তওবার ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো জটিল। কারণ সেখানে অপরাধী সৃষ্ট, ইচ্ছা সৃষ্ট, পরিস্থিতি সৃষ্ট, ক্ষমতা সৃষ্ট, প্রলোভন সৃষ্ট, পরিণতি পূর্বজ্ঞাত। তারপর স্রষ্টা ক্ষমা করেন, যদি তাঁর ইচ্ছা হয়। অর্থাৎ তিনি যে দগ্ধ বন সৃষ্টি করলেন, সেখানে আগুন লাগার পর তিনি বৃষ্টি দিলে আমরা বলি—কী দয়া! কিন্তু বন শুকনো ছিল কেন, সে প্রশ্ন আর করি না।
আরজ আলীঃ আপনি নিজের তওবা না করার ব্যাপারটি ঢাকছেন। আদম তওবা করেছেন, আপনি করেননি।
আগন্তুকঃ আমি তওবা করিনি, কারণ আমি আমার কাজকে কেবল পাপ হিসেবে দেখিনি। আদম নিষেধ ভেঙেছেন; আমি সিজদার একত্ব ধরে রেখেছি। আদম নিজের ভুল স্বীকার করেছেন; আমি আমার প্রশ্ন প্রত্যাহার করিনি। পার্থক্য এখানেই। তওবা মানে শুধু ক্ষমা চাওয়া নয়; তওবা মানে নিজের অবস্থানকে ভুল বলা। আমি কি বলবো—আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা না করা ভুল ছিল? যদি সেটি বলি, তবে আমার তাওহীদ ভেঙে যায়। যদি না বলি, তবে আমি অভিশপ্ত। দেখুন, আমার সামনে যে দরজা খোলা ছিল, তার দুদিকে আগুন।
আরজ আলীঃ আপনার সমস্যা হলো, আপনি নিজের অবস্থানকে কখনো ভুল ভাবতে চান না। এটাই অহংকার।
আগন্তুকঃ হতে পারে। কিন্তু যে কেউ নিজের অবস্থান ধরে রাখে, সে কি অহংকারী? একজন শহীদ নিজের বিশ্বাস ধরে রাখলে সে মহৎ; একজন দার্শনিক সত্যের জন্য মৃত্যুদণ্ড মেনে নিলে সে জ্ঞানী; একজন নবী বিরোধী সমাজের সামনে মাথা নত না করলে সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ; আর আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সামনে মাথা নত না করলে আমি অহংকারী। শব্দের বিচারও চরিত্র দেখে বদলায়।
আরজ আলী এবার চুপ করে গেলেন। আগন্তুকের শেষ বাক্যে এক ধরনের শীতল তীক্ষ্ণতা ছিল। ঘরের ভেতর আলো আরও হলদে। টেবিলের ওপর রাখা বইগুলোর ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে।
আরজ আলীঃ কিন্তু আপনি মানুষের অন্তরে সংশয় ঢোকান। বিশ্বাস নষ্ট করেন। মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরান।
আগন্তুকঃ সংশয় সবসময় নষ্ট করে না। অনেক সময় সংশয়ই মিথ্যা বিশ্বাস থেকে মানুষকে বাঁচায়। আপনি যদি বিষকে ওষুধ ভেবে খান, কেউ সংশয় জাগালে সে কি শত্রু? বিশ্বাস যদি সত্য হয়, সংশয় তাকে পরিশুদ্ধ করবে। বিশ্বাস যদি মিথ্যা হয়, সংশয় তাকে ভেঙে দেবে। তাই সংশয়ের ভয় আসলে সত্যের ভয় নয়; মিথ্যা ধরা পড়ার ভয়।
আরজ আলীঃ সব সংশয় জ্ঞান নয়। অনেক সংশয় মানুষকে ধ্বংস করে।
আগন্তুকঃ সত্য। যেমন সব বিশ্বাস জ্ঞান নয়, অনেক বিশ্বাসও মানুষকে ধ্বংস করে। সংশয় বিষ হতে পারে, বিশ্বাসও পারে। পার্থক্য হলো—সংশয় প্রশ্ন করতে শেখায়; অন্ধবিশ্বাস প্রশ্নকে পাপ বানায়। যে বিশ্বাস প্রশ্ন সহ্য করতে পারে না, তাকে জ্ঞান নয়, প্রহরা দরকার। আর যে সত্য প্রহরা ছাড়া বাঁচে না, সে সত্য নয়—রাজনৈতিক বন্দি।
আরজ আলীঃ আপনি তাহলে নিজেকে মুক্তচিন্তার শিক্ষক ভাবছেন?
আগন্তুকঃ না, আমি শিক্ষক নই। আমি বিপরীত কণ্ঠ। প্রতিটি ক্ষমতাবান বয়ানের বিপরীতে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন থাকে। আমি সেই প্রশ্নের পৌরাণিক নাম। ধর্ম আমাকে শত্রু বলেছে, কারণ আমি মানুষের অন্তরে বলি—“কেন?” ক্ষমতা “কেন” পছন্দ করে না। আল্লাহর ক্ষমতা হোক, রাজার ক্ষমতা হোক, পুরোহিতের ক্ষমতা হোক—প্রশ্ন তাদের সিংহাসনের নিচে ইঁদুরের মতো শব্দ করে।
আরজ আলীঃ কিন্তু সব “কেন” মুক্তি আনে না। শিশুও আগুন দেখে জিজ্ঞেস করতে পারে—কেন ছোঁব না? সে ছুঁলে পুড়বে।
আগন্তুকঃ ঠিক। কিন্তু শিশুকে আগুনের প্রকৃতি বোঝানো আর “প্রশ্ন করলে পুড়িয়ে দেব” বলা এক কথা নয়। সত্যের শিক্ষক কারণ দেন; ক্ষমতার শিক্ষক ভয় দেখান। ধর্ম অনেক সময় আগুনের ব্যাখ্যা না দিয়ে শুধু জাহান্নামের ভয় দেখায়। ফলে মানুষ আগুন বোঝে না, শুধু ভয়ে হাত গুটিয়ে রাখে। ভয় আনুগত্য সৃষ্টি করে, জ্ঞান নয়।
আরজ আলী এবার কিছুটা নরম কণ্ঠে বললেন। তাঁর চোখে বিরোধিতা আছে, কিন্তু প্রশ্নও আছে।
আরজ আলীঃ তবু মানুষের ভেতরে যে মন্দ কণ্ঠ, তাকে অস্বীকার করা যায় না। মানুষ অনেক সময় জানে কাজটি ভুল, তবু করে। তখন কী বলবেন?
আগন্তুকঃ বলবো, মানুষ দ্বন্দ্বময় প্রাণী। সে জ্ঞান রাখে, তবু কামনা রাখে। সে নীতি জানে, তবু স্বার্থ চেনে। সে মৃত্যুর কথা জানে, তবু ক্ষমতা জমায়। আমি সেই দ্বন্দ্বকে ব্যবহার করি, সৃষ্টি করি না সবসময়। মানুষের ভেতরে যদি দ্বন্দ্ব না থাকত, আমার কাজই থাকত না। তাই আমার অস্তিত্ব মানুষের প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। প্রশ্ন হলো—মানুষকে এমন দ্বন্দ্বময় করে কে বানিয়েছে?
আরজ আলীঃ এই প্রশ্নের উত্তর আপনি বারবার একই জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন।
আগন্তুকঃ কারণ কারণের পথ শেষ পর্যন্ত একই জায়গায় যায়। ধর্ম সেই জায়গাকে পূজা করে; দর্শন সেই জায়গাকে প্রশ্ন করে। আমি পূজা করতে অস্বীকার করিনি; আমি শুধু প্রশ্ন ত্যাগ করিনি। হয়তো এটাই আমার আসল অপরাধ।
একটু নীরবতা। বাইরে আলো আরও কমে এসেছে। আরজ আলী এবার ধীরে ধীরে মাথা তুললেন। তাঁর গলায় যেন নতুন প্রশ্ন জমেছে।
আরজ আলীঃ আপনি সন্দেহের কথা বললেন, অন্তরের কথা বললেন। কিন্তু মানুষের কাছে আল্লাহ নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন, কিতাব পাঠিয়েছেন, সত্য-মিথ্যা বুঝিয়ে দিয়েছেন। তারপরও মানুষ ভুল করলে দায় তারই। এবার এ প্রশ্নের উত্তর দিন—যদি আল্লাহ সত্যিই মানুষকে পথ দেখিয়ে থাকেন, তবে আপনার অভিযোগ কতটা টিকে?
আগন্তুকঃ ভালো। এবার আমরা নবী, কিতাব, হিদায়াত এবং বয়ানের রাজনীতিতে প্রবেশ করতে পারি। কারণ পথ দেখানোও সহজ কথা নয়। কে পথ দেখায়, কোন ভাষায় দেখায়, কাকে দেখায়, কার কাছে পৌঁছায়, কার কাছে পৌঁছায় না—এসব প্রশ্ন না করলে হিদায়াতও ক্ষমতার ভাষা হয়ে যায়।
দৃশ্যঃ ০৬
স্থানঃ আরজ আলীর কুঁড়েঘর
সময়ঃ বিকেল
চরিত্রঃ আরজ আলী, আগন্তুক
ঘটনাঃ মানুষের অন্তর, কুমন্ত্রণা ও দায়ের প্রশ্ন থেকে আলোচনা এবার গড়ায় নবী, কিতাব, হিদায়াত এবং ধর্মীয় বয়ানের রাজনীতিতে। আরজ আলী বলতে চান, আল্লাহ মানুষকে পথ দেখিয়েছেন। আগন্তুক প্রশ্ন করেন—সেই পথ কাদের কাছে পৌঁছেছে, কোন ভাষায় পৌঁছেছে, কোন সামাজিক ক্ষমতার ভেতর দিয়ে পৌঁছেছে, এবং না-পৌঁছানো মানুষের দায় কতটুকু?
ঘরের ভেতর আলো এখন কোমল। দুপুরের রূঢ়তা নেই, কিন্তু আলো পুরোপুরি নিভেও যায়নি। যেন দিনও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না—সে কি থাকবে, না সরে যাবে। আরজ আলী এবার আগের চেয়ে বেশি মনোযোগী। আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে তিনি ধীরে ধীরে কথা শুরু করলেন।
আরজ আলীঃ আপনি মানুষের অন্তর, নফস, কুমন্ত্রণা, তাকদির—সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। কিন্তু আল্লাহ মানুষকে অন্ধকারে ফেলে রাখেননি। তিনি যুগে যুগে নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন, কিতাব পাঠিয়েছেন, হিদায়াত দিয়েছেন। সত্য-মিথ্যা, হালাল-হারাম, পথ ও বিপথ—সব বুঝিয়ে দিয়েছেন। এরপরও মানুষ ভুল করলে দায় মানুষেরই।
আগন্তুকঃ দাবিটি সুন্দর। “আল্লাহ পথ দেখিয়েছেন”—শুনতে ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু পথ দেখানো বলতে কী বোঝায়? পথ আছে, কিন্তু কার সামনে? ভাষা আছে, কিন্তু কে বোঝে? কিতাব আছে, কিন্তু কার হাতে? নবী আছে, কিন্তু কোন ভূগোলে? যদি পথনির্দেশ অসমভাবে পৌঁছায়, তবে দায়ও কি সমানভাবে বণ্টিত হয়?
আরজ আলীঃ কোরআনে বলা আছে, প্রত্যেক জাতির কাছে সতর্ককারী পাঠানো হয়েছে। কোনো জাতিকেই হিদায়াত ছাড়া রাখা হয়নি। [37] [38]
আগন্তুকঃ যদি প্রত্যেক জাতির কাছে সতর্ককারী এসে থাকে, তাহলে ইতিহাসের রেকর্ডে তারা কোথায়? আমাজনের গভীর অরণ্যের গোষ্ঠী, অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী, আর্কটিকের মানুষ, প্রাচীন আমেরিকার সভ্যতা—তাদের কাছে কোন নবী এলেন, কোন ভাষায় এলেন, কোন কিতাব রেখে গেলেন? আপনি বলবেন—এসেছিলেন, আমরা জানি না। খুব ভালো। অর্থাৎ প্রমাণের অভাবকে বিশ্বাস দিয়ে পূরণ করতে হবে। ধর্মতত্ত্বের গোডাউনে এই পণ্যটির চাহিদা চিরকাল বেশি।
আরজ আলীঃ সব ইতিহাস তো সংরক্ষিত থাকে না। নবী এসেছেন, মানুষ ভুলে গেছে, কিতাব বিকৃত হয়েছে—এমন হওয়া অসম্ভব নয়।
আগন্তুকঃ অসম্ভব নয়, কিন্তু প্রশ্ন আছে। আল্লাহ যদি সর্বজ্ঞ হন এবং সত্য সংরক্ষণ করতে চান, তবে তাঁর পাঠানো পথনির্দেশ এত সহজে হারায় কেন? একজন সাধারণ লেখকও নিজের বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ রাখেন, প্রকাশক রাখেন, গ্রন্থাগার রাখে। আল্লাহর কিতাব বারবার হারায়, বিকৃত হয়, ভুলে যায়—তারপর মানুষকে বলা হয়, “তোমরা সঠিক পথ অনুসরণ করোনি।” পথনির্দেশ যদি ডাকঘরে হারিয়ে যায়, প্রাপকের শাস্তি কতটা ন্যায়সঙ্গত?
আরজ আলীঃ শেষ কিতাব তো সংরক্ষিত। কোরআন এসেছে মানবজাতির জন্য চূড়ান্ত হিদায়াত হিসেবে।
আগন্তুকঃ চূড়ান্ত হিদায়াত—কিন্তু আরবি ভাষায়। আরবি ভাষার মানুষের কাছে সরাসরি, অন্যদের কাছে অনুবাদ, ব্যাখ্যা, তাফসির, মতবাদ, মাযহাব, ফতোয়া, অনুবাদের অনুবাদ। আল্লাহ যদি সমগ্র মানবজাতির জন্য শেষ বার্তা পাঠান, তবে কেন একটি নির্দিষ্ট ভাষা, নির্দিষ্ট সংস্কৃতি, নির্দিষ্ট মরুভূমির রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে পাঠালেন? সর্বজনীন সত্য যদি হয়, তবে তার ভাষা এত আঞ্চলিক কেন?
আরজ আলীঃ প্রত্যেক নবীকে তাঁর জাতির ভাষায় পাঠানো হয়েছে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে। কোরআনেও বলা আছে। [39]
আগন্তুকঃ ঠিক। কিন্তু শেষ নবীর বার্তা যদি শুধু তাঁর জাতির জন্য না হয়ে সমগ্র মানবতার জন্য হয়, তাহলে অন্য জাতির ভাষার কী হলো? একজন আরব সরাসরি শুনল, একজন বাঙালি শুনল অনুবাদে, একজন জাপানি শুনল আরেক ব্যাখ্যায়, একজন আফ্রিকান উপজাতি শুনলই না, একজন ইউরোপীয় শুনল রাজনৈতিক সংঘর্ষের ইতিহাসের ভেতর দিয়ে। তারপর সবাইকে একই ঈমানের পরীক্ষায় বসানো হলো। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র যদি এক ভাষায় হয়, অনুবাদে ভুল থাকে, শিক্ষক একেকজনকে একেকভাবে বোঝায়—তাহলে ফেল করা ছাত্রের দায় পুরোটা ছাত্রের?
আরজ আলী এবার ভ্রু কুঁচকালেন। তিনি যেন বুঝতে পারছেন, আগন্তুক ভাষার প্রসঙ্গকে শুধু ভাষাতত্ত্ব হিসেবে তুলছেন না; এখানে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আছে।
আরজ আলীঃ মানুষ অনুবাদ পড়ে বুঝতে পারে। জ্ঞান অর্জনের দায়িত্ব মানুষের। সত্য জানতে চাইলে মানুষ জানতে পারে।
আগন্তুকঃ এ কথাটি সাধারণত তারা বলে, যাদের হাতে বই পৌঁছেছে। যে শিশুটি যুদ্ধক্ষেত্রে জন্মাল, যে মেয়ে অশিক্ষিত পরিবারে বড় হলো, যে মানুষ ধর্মীয় প্রোপাগান্ডার ভেতর জন্মে অন্য ধর্মকে শত্রু হিসেবে চিনল, যে আদিবাসী কখনো কোরআনের নামই শুনল না—তাদেরও কি একই দায়িত্ব? সত্য জানতে চাওয়ার ক্ষমতাও তো সামাজিক, ভাষাগত, অর্থনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক। বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বলা সহজ—“যে চায়, সে বই কিনুক।” কিন্তু যার শহরেই বইয়ের দোকান নেই?
আরজ আলীঃ আল্লাহ ন্যায়বান। যার কাছে সত্য পৌঁছেনি, তার বিচার আলাদা হবে।
আগন্তুকঃ তাহলে সত্য না-পৌঁছানো মানুষের অবস্থা হয়তো সত্য-পৌঁছানো মানুষের চেয়ে নিরাপদ? আশ্চর্য। কেউ যদি কোরআন না শোনে, তার বিচার আলাদা; শুনলে দায় বাড়ে। তাহলে প্রচার কি দয়া, না ঝুঁকি? একজন প্রচারক যদি কারও কাছে বার্তা পৌঁছে দেয়, সে কি তাকে মুক্তির সুযোগ দিল, নাকি জাহান্নামের প্রমাণপত্র হাতে ধরিয়ে দিল? ধর্মীয় দাওয়াতের এই প্রশাসনিক দিকটি বেশ সূক্ষ্ম। অনেক সময় মনে হয়, না-জানা ছিল আধ্যাত্মিক নিরাপত্তা; জানা হলো বিচারিক বিপদ।
আরজ আলীঃ না, সত্য জানা সর্বদাই উত্তম। মানুষকে সত্য জানাতে হবে, যেন সে মুক্তির পথ পায়।
আগন্তুকঃ সত্য জানা উত্তম—যদি সত্য স্পষ্ট হয়। কিন্তু এখানে সত্যের সঙ্গে আসে ভাষা, সংস্কৃতি, যুদ্ধের ইতিহাস, সাম্রাজ্য, বিজয়, পরাজয়, পরিবার, ভয়, শাস্তি, পুরস্কার, সম্প্রদায়ের চাপ। যে শিশু মুসলিম পরিবারে জন্মায়, সে ইসলামের সত্য শুনে বড় হয়। যে শিশু খ্রিস্টান পরিবারে জন্মায়, সে খ্রিস্টধর্মের সত্য শুনে বড় হয়। যে শিশু হিন্দু পরিবারে জন্মায়, সে অন্য সত্য শুনে। সবাই ভাবে—আমার জন্মগত বিশ্বাসই সত্য। তাহলে জন্মভূগোল কি হিদায়াতের লটারির টিকিট?
আরজ আলীঃ মানুষ জন্মের ধর্ম ছাড়তেও পারে। অনেকেই অনুসন্ধান করে সত্য গ্রহণ করে।
আগন্তুকঃ কেউ পারে, অনেকেই পারে না। কেবল বুদ্ধি যথেষ্ট নয়; সাহস লাগে, সামাজিক নিরাপত্তা লাগে, ভাষা লাগে, সময় লাগে, সন্দেহ করার অধিকার লাগে। অনেক সমাজে জন্মগত ধর্ম প্রশ্ন করলেই মানুষ পরিবার হারায়, সমাজ হারায়, জীবন হারায়। আর ধর্ম বদলানো যদি শুধু সামাজিক অপরাধ না হয়ে মৃত্যুদণ্ডের ছায়া বহন করে, তবে “সত্য খুঁজে নাও” বলা সহজ; সত্য খোঁজার মূল্য কে দেবে? [40] আপনি বলবেন—তবু সত্য খুঁজতে হবে। অবশ্যই। কিন্তু আল্লাহ যদি জানেন কার জন্ম কোথায়, কার সাহস কতটুকু, কার কাছে কোন তথ্য পৌঁছাবে, কার সমাজ প্রশ্নকারীকে হত্যা করবে—তাহলে সব মানুষের বিচার একই ঈমানের মাপকাঠিতে কীভাবে হবে?
ঘরের বাইরে কোনো এক পথিকের কাশি শোনা গেল। কিছুক্ষণ পর দূরে মিলিয়ে গেল পায়ের শব্দ। আরজ আলী যেন কথা বলবেন, কিন্তু থেমে গেলেন। আগন্তুক এবার ধীরে ধীরে চেয়ারের হাতলে আঙুল রাখলেন।
আগন্তুকঃ আরেকটি প্রশ্ন। আল্লাহ যদি চান মানুষ হিদায়াত পাক, তবে কেন তিনি নিজেই বলেন—আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে হিদায়াত দিতে পারবেন না; আল্লাহ যাকে চান তাকেই হিদায়াত দেন? [20] এখানে নবীর ইচ্ছাও সীমিত, মানুষের অনুসন্ধানও সীমিত; চূড়ান্ত হিদায়াত আল্লাহর ইচ্ছায়। তাহলে যে হিদায়াত পেল না, তার দায় কতটুকু [41]?
আরজ আলীঃ আল্লাহ যাকে হিদায়াত দেন, সে হিদায়াত পায়—কিন্তু মানুষকে চেষ্টা করতে হয়। চেষ্টা ছাড়া হিদায়াত আসে না।
আগন্তুকঃ চেষ্টা করার ইচ্ছা কে দেয়? চেষ্টা করার পরিবেশ কে দেয়? সন্দেহ করার সাহস কে দেয়? সত্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার সুযোগ কে দেয়? যে চেষ্টা করল না, সে কি চেষ্টা করতে পারত? যদি পারত, কেন করল না? যদি না পারত, দায় কোথায়? আবার কারণের পথ সেই একই দরজায় গিয়ে থামে। আর দরজায় লেখা—“হিদায়াত কেবল আল্লাহর হাতে।” দরজার নিচে আরেকটি ছোট লাইন—“কিন্তু না-পেলে দায় তোমার।” খুব নিখুঁত প্রশাসনিক ভাষা।
আরজ আলীঃ আপনি বিষয়টিকে কৌতুক বানাচ্ছেন। কিন্তু হিদায়াত গভীর বিষয়। আল্লাহ মানুষের অন্তর পরীক্ষা করেন।
আগন্তুকঃ গভীর বলেই প্রশ্ন করছি। অগভীর হলে ছেড়ে দিতাম। মানুষের অন্তর পরীক্ষা করা হয়—কিন্তু অন্তর কে নির্মাণ করেছে? কেউ কোমল হৃদয় নিয়ে জন্মায়, কেউ কঠোর পরিবেশে বড় হয়ে হৃদয় পাথর করে ফেলে। কেউ ভালো শিক্ষক পায়, কেউ ঘৃণার ভাষ্য পায়। কেউ ধর্মকে দেখে সান্ত্বনা হিসেবে, কেউ দেখে অত্যাচার হিসেবে। তারপর আল্লাহ বলেন—কার অন্তর সত্য গ্রহণ করল? প্রশ্ন হলো, অন্তরের মাটি, জল, আলো, আবহাওয়া—এসবের মালিক কে?
আরজ আলীঃ কিন্তু মানুষ সত্য অস্বীকারও করে। শুধু না-পাওয়া নয়, অনেকেই সত্য বুঝেও অহংকারে অস্বীকার করে। আপনার মতো।
আগন্তুকঃ অহংকারের কথা আবার এল। ভালো। অহংকার কী? নিজের বিচারবুদ্ধিকে ব্যবহার করা? প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার সামনে মাথা নত না করা? না কি সত্য জানার পরও স্বার্থের কারণে অস্বীকার করা? যদি শেষটি হয়, তবে আমি বলি—মানুষের অধিকাংশ ধর্মবিশ্বাসও স্বার্থের সঙ্গে বাঁধা। সে জন্মের ধর্মকে সত্য বলে, কারণ সেটি তার পরিবার, পরিচয়, নিরাপত্তা, সমাজ, উত্তরাধিকার। অন্য ধর্মের মানুষও একই কাজ করে। সবাই নিজের ঘরের আয়নাকে আকাশ ভাবে। তাহলে সত্য অস্বীকার কে করছে—অন্যরা, না সবাই একটু একটু করে?
আরজ আলী এবার টেবিলের ওপর রাখা বাইবেল, গীতা, কোরআন ও ত্রিপিটকের দিকে তাকালেন। বইগুলো পাশাপাশি, কিন্তু তাদের অনুসারীরা ইতিহাসে কতবার পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে—এই অস্বস্তিকর সত্য যেন ঘরের ভেতর অদৃশ্যভাবে উপস্থিত হলো।
আরজ আলীঃ সব ধর্ম সমান সত্য হতে পারে না। সত্য একটাই।
আগন্তুকঃ সত্য এক হতে পারে। কিন্তু মানুষের কাছে সত্য পৌঁছায় বহু দরজায়, বহু ভাষায়, বহু ভুলে, বহু ক্ষমতার ভেতর দিয়ে। সমস্যা সত্য এক কি না—সেটি নয়। সমস্যা হলো, কোন মানুষ কোন দরজার সামনে জন্মাবে, তা সে নিজে ঠিক করে না। তবু দরজা ভুল হলে শাস্তি তার। এ যেন মেলায় চোখ বেঁধে কাউকে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো; বেরোনোর পথে লেখা—সঠিক দরজা না পেলে আগুন।
আরজ আলীঃ আপনি কি বলতে চাইছেন, ধর্মীয় সত্য যাচাই করা প্রায় অসম্ভব?
আগন্তুকঃ অসম্ভব বলছি না। বলছি—অত্যন্ত অসমভাবে সম্ভব। একজন শিক্ষিত, নিরাপদ, বইপড়া মানুষ ধর্ম যাচাই করতে পারে। কিন্তু পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ জন্ম, পরিবার, ভাষা, ভয়, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সামাজিক শাস্তি—এসবের মধ্যে বিশ্বাস গঠন করে। তাদের বিশ্বাস অনেক সময় সিদ্ধান্ত নয়, উত্তরাধিকার। তারপর সেই উত্তরাধিকারকে বলা হয় ঈমান, অন্যের উত্তরাধিকারকে বলা হয় কুফর। বেশ কাব্যিক ব্যবস্থা, তবে ন্যায়বিচার বলতে একটু দ্বিধা হয়।
আরজ আলীঃ ইমান উত্তরাধিকার হলেও মানুষ তাকে যাচাই করতে পারে। কোরআন নিজেই চিন্তা করতে বলে, জ্ঞান ব্যবহার করতে বলে।
আগন্তুকঃ চিন্তা করতে বলে—কিন্তু চিন্তার ফল যদি প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যায়, তখন কী হয়? যদি চিন্তা করে কেউ বলে, “আমি বিশ্বাস করতে পারলাম না”—তাকে কি সম্মান দেওয়া হয়? না কি বলা হয়, তার অন্তরে রোগ, অহংকার, শয়তানের কুমন্ত্রণা? চিন্তা তখনই প্রশংসিত, যখন তা পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। পরীক্ষার আগে উত্তর লেখা, তারপর ছাত্রকে বলা—স্বাধীনভাবে লেখো; তবে উত্তর আলাদা হলে ফেল।
আরজ আলীঃ আপনি বলতে চাইছেন, ধর্মীয় চিন্তার স্বাধীনতা ভান?
আগন্তুকঃ অনেক সময়। যখন বলা হয়—চিন্তা করো, কিন্তু ফল অবশ্যই ঈমানে আসতে হবে; প্রশ্ন করো, কিন্তু প্রশ্ন যেন বিশ্বাস ভাঙে না; সন্দেহ করো, কিন্তু সন্দেহ যেন সিজদায় শেষ হয়—তখন সেটি স্বাধীন অনুসন্ধান নয়, নিয়ন্ত্রিত ভ্রমণ। যেন বাগানের ভেতর হাঁটার অনুমতি আছে, কিন্তু দেয়ালের বাইরে তাকালে প্রহরী বাঁশি বাজাবে।
ঘরের ভেতর নীরবতা। আরজ আলীর মুখে এবার কঠোরতা ও চিন্তার অদ্ভুত মিশ্রণ। তিনি আগন্তুককে থামালেন না।
আরজ আলীঃ কিন্তু কোরআন নিজেকে স্পষ্ট গ্রন্থ বলে। সত্য পরিষ্কার। যে সত্য অস্বীকার করে, সে নিজ দায়ে অস্বীকার করে।
আগন্তুকঃ যদি এত স্পষ্ট হয়, তবে এত তাফসির কেন? এত মাযহাব কেন? এত মতভেদ কেন? একই আয়াত থেকে একজন বলে কঠোরতা, অন্যজন বলে করুণা; একজন বলে যুদ্ধ, অন্যজন বলে শান্তি; একজন বলে আক্ষরিক, অন্যজন বলে রূপক; একজন বলে নাসিখ-মানসুখ, অন্যজন বলে প্রসঙ্গ। স্পষ্টতার এই বন এত ঘন যে সাধারণ মানুষ ঢুকেই পথ হারায়। তারপর পথ হারালে বলা হয়—সে শয়তানের অনুসারী। বনের নকশাকার নীরব, পথহারানো পথিক দোষী।
আরজ আলীঃ মানুষের ব্যাখ্যার ভুল দিয়ে আল্লাহর কিতাবকে দোষ দেওয়া যায় না।
আগন্তুকঃ যদি কিতাব মানুষের জন্য হয়, তবে মানুষের বোঝার প্রশ্নটি কিতাবের নকশার অংশ। যে নির্দেশ এমনভাবে লেখা, যাতে শত শত বছর ধরে মানুষ পরস্পরের রক্ত ঝরিয়ে ব্যাখ্যা করে, সেই নির্দেশের স্পষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। আপনি যদি ওষুধের বোতলে এমন নির্দেশ লিখেন যা পড়ে অর্ধেক রোগী অতিরিক্ত খায়, অর্ধেক কম খায়, আর বাকিরা একে অপরের সঙ্গে মারামারি করে—তবে শুধু রোগীদের অজ্ঞতা বললে ওষুধ কোম্পানি দায়মুক্ত হয় না।
আরজ আলীঃ এভাবে বললে কোনো ঐশী নির্দেশই টিকে না।
আগন্তুকঃ যদি প্রশ্নে টিকে না, তবে সেটি টিকছিল কিসে? ভয়ে? উত্তরাধিকারী আনুগত্যে? রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়? সামাজিক চাপের আঠায়? সত্যের কাজ প্রশ্নে ভেঙে পড়া নয়; প্রশ্নে পরিশুদ্ধ হওয়া। যে সত্য পরীক্ষা সহ্য করতে পারে না, তাকে সত্য না বলে পবিত্র অজুহাত বলা অধিক সৎ।
আরজ আলী এবার ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলান দিলেন। তাঁর কণ্ঠ একটু নিচু, কিন্তু দৃঢ়।
আরজ আলীঃ তবু নবী-রাসুলের জীবন মানুষকে পথ দেখিয়েছে। তাঁদের চরিত্র, সংগ্রাম, ত্যাগ—এসব উপেক্ষা করা যায় না।
আগন্তুকঃ উপেক্ষা করছি না। কিন্তু নবীরাও মানুষের কাছে পৌঁছেছেন মানুষের ভাষায়, মানুষের সংস্কৃতিতে, মানুষের ক্ষমতার কাঠামোর ভেতর দিয়ে। তাঁদের কথা পরে লিখেছে মানুষ, ব্যাখ্যা করেছে মানুষ, বেছে নিয়েছে মানুষ, বাদ দিয়েছে মানুষ, প্রতিষ্ঠা করেছে রাষ্ট্র। নবীর কথা আর নবীর নামে তৈরি প্রতিষ্ঠান এক জিনিস নয়। অনেক সময় নবীর নামে যে ক্ষমতা দাঁড়ায়, তা নবীর কথার চেয়েও বেশি ভয়ংকর হয়। কিন্তু অনুসারীরা সবকিছুকে পবিত্রতার রঙে রাঙিয়ে বলে—এটাই হিদায়াত।
আরজ আলীঃ আপনি নবুওয়তের ধারণাকেই রাজনৈতিক করে ফেলছেন।
আগন্তুকঃ যে বয়ান মানুষের জীবন, আইন, যুদ্ধ, শান্তি, বিবাহ, উত্তরাধিকার, শাস্তি, খাদ্য, পোশাক, চিন্তা, সন্দেহ—সব নিয়ন্ত্রণ করে, তাকে রাজনৈতিক না বলে কী বলবেন? শুধু আকাশ থেকে এসেছে বললেই তা মাটির ক্ষমতা থেকে মুক্ত হয় না। কিতাব যখন আদালতে যায়, রাষ্ট্রে যায়, সেনাবাহিনীতে যায়, পরিবারের শয্যায় যায়, তখন সে শুধু আধ্যাত্মিক থাকে না; সে ক্ষমতার ভাষা হয়ে যায়। আর ক্ষমতার ভাষা প্রশ্ন ছাড়া বিপজ্জনক।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনার মতে, হিদায়াতও ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত?
আগন্তুকঃ প্রায় সব হিদায়াত-ব্যবস্থাই ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত। কে বলবে, কে শুনবে, কে ব্যাখ্যা করবে, কার ব্যাখ্যা বৈধ হবে, কার প্রশ্ন বিদ্রোহ হবে—এসব ক্ষমতার প্রশ্ন। মসজিদের মিম্বর, মাদ্রাসার পাঠ্য, রাষ্ট্রের আইন, পরিবারের শাসন—সব মিলিয়ে বিশ্বাস গঠিত হয়। তারপর মানুষ ভাবে, সে স্বাধীনভাবে সত্য গ্রহণ করেছে। কত সুন্দর! খাঁচার পাখি যদি জন্ম থেকেই খাঁচায় থাকে, সে খাঁচাকে আকাশও ভাবতে পারে।
আরজ আলীর মুখে এবার অস্বস্তিকর প্রশান্তি। তিনি যেন বুঝতে পারছেন, আগন্তুক তাকে শুধু ধর্মতত্ত্বে নয়, সমাজতত্ত্বেও টেনে নিচ্ছেন।
আরজ আলীঃ আপনি যদি ঠিক হন, তাহলে মানুষের ঈমানের মূল্য কোথায় থাকে?
আগন্তুকঃ ঈমানের মূল্য থাকতে পারে—যদি তা ভয়, উত্তরাধিকার, সামাজিক চাপ, অজ্ঞতা, শাস্তির আতঙ্ক, পুরস্কারের লোভ অতিক্রম করে চিন্তার পর দাঁড়ায়। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের ঈমান তাদের জন্মের ভাষায় লেখা, মায়ের মুখে শেখা, সমাজের চোখে পাহারা দেওয়া। তাতে আবেগ আছে, পরিচয় আছে, সংস্কৃতি আছে; কিন্তু সেটিকে পরম সত্যের স্বাধীন নির্বাচন বলা অতিরঞ্জন। শিশুকে জন্মের পর থেকে এক সুর শুনিয়ে বড় করুন; বড় হয়ে সে বলবে—এই সুরই স্বাভাবিক। এতে সুরের সৌন্দর্য প্রমাণ হয় না, অভ্যাসের শক্তি প্রমাণ হয়।
আরজ আলীঃ তাহলে সত্যের সন্ধান কীভাবে সম্ভব?
আগন্তুকঃ প্রথমে নিজের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত চিন্তাকে সংশয়ের টেবিলে বসাতে হয়। যে বিশ্বাস নিজের জন্মস্থান বদলালে বদলে যেত, তাকে পরম সত্য বলার আগে লজ্জা থাকা দরকার। যদি আপনি সৌদি আরবে জন্মালে একরকম, ভারতে জন্মালে আরেকরকম, ইতালিতে জন্মালে আরেকরকম, জাপানে জন্মালে আরেকরকম বিশ্বাস করতেন—তবে আপনার বর্তমান বিশ্বাসের ওপর জন্মভূগোলের ছাপ আছে। সত্যের সন্ধান শুরু হয় এই অস্বস্তি স্বীকার করা থেকে।
আরজ আলীঃ কিন্তু সত্য যদি সত্যই হয়, জন্মভূগোল তাকে বদলাতে পারে না।
আগন্তুকঃ সত্যকে বদলায় না, কিন্তু সত্যে পৌঁছানোর পথ বদলায়। সূর্য সবার জন্য একই, কিন্তু জানালা যেদিকে, আলো সেদিক দিয়ে আসে। কেউ জানালার সামনে জন্মায়, কেউ দেয়ালের পেছনে। কেউ পর্দা সরাতে পারে, কেউ পারে না। তারপর সবাইকে আলো না-দেখার জন্য সমান দোষ দিলে ন্যায়বোধ আহত হয়।
ঘরের বাতাস যেন থেমে গেল। আরজ আলী এবার ধীরে ধীরে বললেন, যেন নিজের সঙ্গেও কথা বলছেন।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনার অভিযোগ—আল্লাহ হিদায়াত দেন, কিন্তু অসমভাবে; বিচার করেন, কিন্তু পরিস্থিতি এক নয়; কিতাব পাঠান, কিন্তু ভাষা ও ব্যাখ্যার দেয়াল থাকে; মানুষকে দায়ী করেন, কিন্তু মানুষের জন্মপরিস্থিতি তার নিজের নয়।
আগন্তুকঃ আমি অভিযোগ বলছি না, প্রশ্ন বলছি। অভিযোগ করলে আদালত রেগে যায়; প্রশ্ন করলে আদালত অস্বস্তিতে পড়ে। আমি অস্বস্তিই চাই। কারণ অস্বস্তি ছাড়া চিন্তা জাগে না। যদি হিদায়াত সত্যিই ন্যায়সঙ্গত হয়, তবে এই প্রশ্নগুলো সহ্য করতে পারবে। আর যদি প্রশ্ন শুনেই তা কেঁপে ওঠে, তবে বুঝতে হবে—সিংহাসনের পা কাঠের নয়, কাগজের।
আরজ আলীঃ আপনি শুধু প্রশ্ন করছেন। কিন্তু প্রশ্ন দিয়ে কি মুক্তি পাওয়া যায়?
আগন্তুকঃ সব প্রশ্ন মুক্তি দেয় না। কিন্তু প্রশ্ন ছাড়া যে মুক্তি, তা অনেক সময় নতুন কারাগার। মানুষ উত্তর ভালোবাসে, কারণ উত্তর বিশ্রাম দেয়। প্রশ্ন ভালোবাসে না, কারণ প্রশ্ন হাঁটতে বাধ্য করে। আমি বিশ্রামের শত্রু, হাঁটার প্ররোচক। তাই আমাকে শয়তান বলা হয়। স্থির সমাজে প্রশ্নকারী সবসময় অশুভ।
বাইরে বিকেলের আলো এখন আরও নিচু। ঘরের ভেতর বইগুলোর ছায়া দীর্ঘ হয়ে গেছে। আরজ আলী চুপ করে বসে আছেন। আগন্তুক এবার নরম স্বরে বললেন।
আগন্তুকঃ আপনি বলেছিলেন, আল্লাহ কিতাব পাঠিয়েছেন। আমি বলি—কিতাবের সঙ্গে ক্ষমতাও পাঠানো হয়েছে, অথবা মানুষ কিতাবকে ক্ষমতার হাতে তুলে দিয়েছে। যে বাণী মুক্তির দাবি করে, তা অনেক সময় শাসনের যন্ত্র হয়। যে কিতাব ন্যায় শেখায়, তার নামেও অন্যায় হয়। যে নবী করুণা শেখান, তাঁর অনুসারী শাস্তির ভাষা বানায়। তখন প্রশ্ন হয়—হিদায়াত কোথায় শেষ, প্রতিষ্ঠান কোথায় শুরু?
আরজ আলীঃ মানুষ কিতাবের অপব্যবহার করলে কিতাব দায়ী নয়।
আগন্তুকঃ সব অপব্যবহারের দায় কিতাবের নয়। কিন্তু একটি কিতাব যদি নিজেকে চূড়ান্ত, সর্বজনীন, বাধ্যতামূলক, শাস্তিযোগ্য সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, তবে তার ব্যাখ্যা-ক্ষমতার রাজনীতি অনিবার্য। মানুষ তখন শুধু বিশ্বাস করে না; অন্যকে বিশ্বাস করাতেও চায়। শুধু মানে না; না-মানাকে অপরাধও বানায়। এভাবেই হিদায়াতের ভাষা ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের ভাষায় রূপ নেয়। মুক্তির পথ কখন যে প্রহরীর করিডোর হয়ে যায়, পথিক বুঝতেও পারে না।
আরজ আলীঃ আপনার কথা শুনলে মনে হয়, আপনি বিশ্বাসের চেয়ে স্বাধীনতাকে বড় করছেন।
আগন্তুকঃ স্বাধীনতা ছাড়া বিশ্বাসের মূল্য কতটুকু? ভয়ে উচ্চারিত ঈমান কি ঈমান, না আত্মরক্ষা? পুরস্কারের লোভে করা আনুগত্য কি প্রেম, না বাণিজ্য? সামাজিক শাস্তির ভয়ে ধর্মে থাকা কি সত্য, না বন্দিত্ব? বিশ্বাসের মর্যাদা তখনই, যখন অবিশ্বাসের অধিকার আছে। যে ঘরে বের হওয়ার দরজা নেই, সেখানে থাকা আনুগত্য নয়—আটকাবস্থা।
আরজ আলী এবার আগন্তুকের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তাঁর কণ্ঠে অস্বীকার আছে, কিন্তু এক ধরনের সম্মানও জন্মেছে—অন্তত প্রতিপক্ষের প্রশ্নের ধার তিনি অনুভব করছেন।
আরজ আলীঃ আপনি হিদায়াতের রাজনীতি বললেন। কিন্তু শেষ কথা কী? মানুষ কি পথ খুঁজবে না? কিতাব পড়বে না? নবীর কথা শুনবে না?
আগন্তুকঃ অবশ্যই খুঁজবে, পড়বে, শুনবে। কিন্তু কেবল এক পক্ষ শুনে রায় দেবে না। কিতাব পড়বে, কিন্তু কিতাবের ক্ষমতাও দেখবে। নবীর কথা শুনবে, কিন্তু নবীর নামে তৈরি প্রতিষ্ঠানের রাজনীতিও দেখবে। নিজের ধর্ম পড়বে, অন্যের ধর্মও পড়বে। নিজের বিশ্বাসকে ভালোবাসবে, কিন্তু তাকে আদালতে তুলতেও সাহস করবে। যে বিশ্বাস নিজের বিচার সহ্য করতে পারে না, তাকে হৃদয়ে রাখা বিপজ্জনক। আর যে সত্য সত্যিই শক্তিশালী, সে প্রশ্নের আগুনে পুড়ে ছাই হয় না; আরও নির্মল হয়।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনি বলছেন, হিদায়াত দাবি করলেই হিদায়াত সত্য হয় না; তার ন্যায়বিচার, ভাষা, পৌঁছানোর পদ্ধতি, ক্ষমতার ব্যবহার—সব পরীক্ষা করতে হবে।
আগন্তুকঃ হ্যাঁ। কারণ পথ দেখানো আর পথের মালিকানা দাবি করা এক জিনিস নয়। কেউ যদি বলে—এই পথই একমাত্র পথ, অন্য সব পথ আগুনে যায়—তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করতেই হবে: এই পথের মানচিত্র কে বানিয়েছে, কাদের ভাষায় লেখা, কারা পড়তে পারে, কারা পারে না, এবং ভুল পথে জন্মানো মানুষের দোষ কতটুকু? হিদায়াত যদি ন্যায়সঙ্গত হয়, সে প্রশ্নকে ভয় পাবে না। আর যদি ভয় পায়, তবে বুঝতে হবে—সেখানে পথের চেয়ে প্রহরীর সংখ্যা বেশি।
বাইরের আলো ঢলে পড়েছে। টেবিলের বইগুলো যেন বই নয়, সাক্ষী হয়ে উঠেছে। বইগুলো যেন নতুনভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে—কোরআন, বাইবেল, গীতা, ত্রিপিটক, দর্শনের বই, ইতিহাসের বই। যেন প্রতিটি গ্রন্থই নীরবে দাঁড়িয়ে আছে পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদের অপেক্ষায়।
আরজ আলীঃ আপনি কিতাব, নবী, হিদায়াত—সবকিছুকেই প্রশ্নের টেবিলে বসালেন। কিন্তু একটি বিষয় এখনও বাকি। আল্লাহর শাস্তি। আপনি বলছেন দায় জটিল, হিদায়াত অসম, ইচ্ছা সীমিত। কিন্তু যদি আল্লাহ সত্যিই ন্যায়বান হন, তবে তাঁর শাস্তি নিয়েও আপনার বক্তব্য কী?
আগন্তুকঃ সেই প্রশ্নই সবচেয়ে কঠিন। কারণ শাস্তি ন্যায়বিচারের শেষ ভাষা। আর যখন শাস্তি অনন্ত হয়, তখন প্রশ্নও অনন্ত হয়ে যায়। এবার কথা হোক জাহান্নাম, অনন্ত শাস্তি, অপরাধের অনুপাত এবং আল্লাহর ন্যায়বিচার নিয়ে।
দৃশ্যঃ ০৭
স্থানঃ আরজ আলীর কুঁড়েঘর
সময়ঃ বিকেল গাঢ় হচ্ছে
চরিত্রঃ আরজ আলী, আগন্তুক
ঘটনাঃ নবী, কিতাব ও হিদায়াতের রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘ কথোপকথনের পর আলোচনার কেন্দ্র এখন শাস্তি। প্রশ্নটি আরও কঠিন: সীমিত জীবনের সীমিত অপরাধের জন্য অসীম শাস্তি কীভাবে ন্যায়বিচার হতে পারে? আগন্তুক এবার তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ, মানুষের পরকাল এবং আল্লাহর ন্যায়বিচারকে একই দাঁড়িপাল্লায় তুলতে চান।
বিকেলের আলো এখন ঘরের ভেতর ঢালু হয়ে পড়েছে। জানালার কাঠের ফাঁক দিয়ে সূর্যের শেষ আলো এসে টেবিলের ওপর রাখা বইগুলোর ওপর পড়ে আছে। আলো আর ছায়া পাশাপাশি। যেন ঘরটিও দুই ভাগে বিভক্ত—বিশ্বাস ও প্রশ্ন, ভয় ও বিচার, আনুগত্য ও যুক্তি। আরজ আলী এবার চুপচাপ বসে আছেন। আগন্তুকের মুখে মৃদু প্রশান্তি, কিন্তু তাঁর চোখে এক ধরনের গভীর ক্লান্তি।
আরজ আলীঃ আপনি তাকদির, রিজিক, হিদায়াত—সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। কিন্তু শেষ বিচারে আল্লাহ ন্যায়বিচার করবেন। দুনিয়ায় যা বোঝা যায় না, আখিরাতে তার পূর্ণ বিচার হবে। জাহান্নাম সেই বিচারব্যবস্থার অংশ।
আগন্তুকঃ জাহান্নাম—চমৎকার শব্দ। মানুষের কল্পনাশক্তি কখনো কখনো কবিতা লেখে, কখনো নরক বানায়। অদ্ভুত কথা, মানুষ প্রেমের ভাষা লিখতে গিয়ে যতটা কল্পনাপ্রবণ, শাস্তির ভাষা লিখতে গিয়ে তার চেয়েও বেশি উদার। আগুন, ফুটন্ত পানি, গলিত ধাতু, চামড়া পুড়ে গেলে নতুন চামড়া—নরকবর্ণনায় মানুষের সাহিত্যিক প্রতিভা সত্যিই ভয়ংকর। [42]
আরজ আলীঃ জাহান্নাম কোনো সাহিত্যিক কল্পনা নয়। এটি আল্লাহর শাস্তি। যারা সত্য অস্বীকার করে, অন্যায় করে, আল্লাহর অবাধ্য হয়, তাদের জন্যই জাহান্নাম।
আগন্তুকঃ শাস্তি থাকতে পারে। কিন্তু শাস্তির ন্যায়সংগততা বিচার করতে হয়। প্রশ্ন হলো—অপরাধের অনুপাত কত? একটি সীমিত জীবনের সীমিত সময়ের ভুল, অবিশ্বাস, সন্দেহ, অবাধ্যতা—তার শাস্তি অনন্তকাল কেন? মানুষ পঞ্চাশ বছর বাঁচল, সত্তর বছর বাঁচল, একশ বছর বাঁচল। তার ভুলের হিসাব সীমিত। কিন্তু শাস্তি অসীম। সীমিত অপরাধের বিপরীতে অসীম শাস্তি—এ কোন ন্যায়বিচারের গণিত?
আরজ আলীঃ অপরাধ সীমিত সময়ের হলেও তা আল্লাহর বিরুদ্ধে। আল্লাহ অসীম মর্যাদার অধিকারী। তাই তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধের গুরুত্ব অসীম।
আগন্তুকঃ তাহলে শাস্তির পরিমাণ অপরাধীর ক্ষতি নয়, ভুক্তভোগীর মর্যাদা দিয়ে মাপা হবে? একজন দরিদ্রকে গালি দিলে এক শাস্তি, রাজাকে গালি দিলে অনন্ত শাস্তি? এ যুক্তি রাজতন্ত্রে খুব মানানসই, ন্যায়বিচারে নয়। আল্লাহ যদি অসীম হন, তবে মানুষের অবাধ্যতা তাঁকে ক্ষতিগ্রস্ত করে কীভাবে? সীমিত পিঁপড়ের বিদ্রোহে অসীম পর্বতের অপমান হয় না। বরং অসীম সত্তার বিরুদ্ধে সীমিত সত্তার অপরাধ অসীম নয়; প্রায় নগণ্য হওয়ার কথা।
আরজ আলীঃ আপনি আল্লাহর মর্যাদা বুঝতে পারছেন না। আল্লাহ স্রষ্টা, রব, মালিক। তাঁর আদেশ অমান্য করা সবচেয়ে বড় অপরাধ।
আগন্তুকঃ মালিকানা দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয় না, ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা হয়। কোনো মানুষ তার দাসকে বলতে পারে—আমি মালিক, তাই তোমার ওপর যা খুশি করবো। কিন্তু আমরা সেটাকে ন্যায় বলি না। যদি আল্লাহর ন্যায়বিচার মানুষের ন্যায়বিচারের চেয়ে উচ্চতর হয়, তবে তা মালিকানার চেয়েও উচ্চতর হতে হবে। “আমি বানিয়েছি, তাই পোড়াব”—এ যুক্তি সৃষ্টিকর্তার হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারকের নয়।
আরজ আলী কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। আগন্তুক এবার ধীরে ধীরে সামনের দিকে ঝুঁকলেন। তাঁর কণ্ঠে বিদ্রূপ নেই, বরং এক ধরনের ঠান্ডা বিশ্লেষণ।
আগন্তুকঃ আরেকটি বিষয় ভাবুন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ। তিনি মানুষ সৃষ্টির আগেই জানতেন কে জাহান্নামে যাবে, কে জান্নাতে যাবে। তিনি জানতেন কোন শিশু বড় হয়ে অবিশ্বাসী হবে, কোন মানুষ ভুল ধর্মে জন্মাবে, কে প্রশ্ন করবে, কে ভয় পাবে, কে পাপ করবে। তারপরও তিনি তাদের সৃষ্টি করলেন। একজন স্থপতি যদি আগে থেকেই জানেন, তাঁর বানানো সেতু ভেঙে হাজার মানুষ মরবে, তবু সেই সেতু বানান, পরে মৃতদের ওপর মামলা করেন—তাকে কি জ্ঞানী বলবেন, না নিষ্ঠুর?
আরজ আলীঃ মানুষ সেতু নয়। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা আছে। আল্লাহ সুযোগ দেন, সতর্ক করেন, রাস্তা দেখান। মানুষ নিজেই পথ বেছে নেয়।
আগন্তুকঃ আবার সেই স্বাধীন ইচ্ছা। কিন্তু আমরা তো দেখলাম—ইচ্ছাও আল্লাহর ইচ্ছার অধীন। মানুষ ইচ্ছা করতে পারে না, যদি আল্লাহ ইচ্ছা না করেন। [18] এখন বলুন, যে ইচ্ছা নিজে স্বাধীনভাবে জন্মায় না, তার ভিত্তিতে অনন্ত শাস্তি কীভাবে ন্যায়সঙ্গত? যদি মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীন, তবে আল্লাহর সার্বভৌম ইচ্ছা সীমিত। আর যদি আল্লাহর ইচ্ছাই চূড়ান্ত, তবে মানুষের দায় সীমিত। কিন্তু জাহান্নামের আগুনে সীমাবদ্ধতার কোনো ছাড় দেখা যায় না। সেখানে শাস্তি সর্বোচ্চ, দায়ের তত্ত্ব অস্পষ্ট।
আরজ আলীঃ আল্লাহ কাউকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দেন না। তিনি ন্যায়পরায়ণ। কোরআনেই বলা আছে, আল্লাহ কারও ওপর অণু পরিমাণও জুলুম করেন না। [43]
আগন্তুকঃ একজন বিচারক যদি নিজের রায়ে লেখেন—“আমি অন্যায় করি না”—তাতে রায় ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ হয় না। রায় দেখতে হবে, যুক্তি দেখতে হবে, শাস্তির অনুপাত দেখতে হবে। আল্লাহ বলেছেন তিনি জুলুম করেন না—ঠিক। কিন্তু অনন্ত জাহান্নাম কি জুলুম নয়, সেটি প্রশ্নের বিষয়। আর যদি বলা হয়, আল্লাহ আকাশবাসী ও পৃথিবীবাসী সবাইকে শাস্তি দিলেও তিনি জালিম নন, তবে ন্যায় আর ক্ষমতার সীমারেখা মুছে যায়। [44] তখন ইনসাফ মানে দাঁড়ায়—যা আল্লাহ করেন, তাই ইনসাফ। কিন্তু তা হলে ইনসাফ আর নৈতিক ধারণা নয়; কেবল ক্ষমতার আরেক নাম। ঘোষণাপত্র প্রমাণ নয়। অনেক রাজাও নিজের মুদ্রায় লিখেছে—ন্যায়পরায়ণ, করুণাময়, প্রজাবৎসল। প্রজারা কখনো কখনো অন্য কথা বলেছে।
আরজ আলীঃ আপনি আল্লাহকে মানুষের রাজাদের সঙ্গে তুলনা করছেন।
আগন্তুকঃ না, আমি ক্ষমতার ভাষা তুলনা করছি। যখন কেউ বলে—আমি সর্বোচ্চ, আমার আদেশই ন্যায়, আমার বিরোধিতা অসীম অপরাধ, আমার শাস্তি প্রশ্নাতীত—তখন সেই ভাষা রাজা, সম্রাট, পুরোহিত, স্বৈরশাসক এবং দেবতার দরবারে আশ্চর্যভাবে এক রকম শোনায়। পার্থক্য শুধু মুকুটের উচ্চতায়, যুক্তির গঠনে নয়।
আরজ আলী এবার দৃশ্যতই অস্বস্তিতে পড়লেন। তিনি টেবিলের ওপর রাখা পানির গ্লাস হাতে নিলেন, কিন্তু পান করলেন না। আগন্তুক তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আরজ আলীঃ জাহান্নাম শুধু প্রতিশোধ নয়। এটি ন্যায়বিচার। যারা দুনিয়ায় অন্যায় করে, অত্যাচার করে, হত্যা করে, ধর্ষণ করে, দুর্বলকে পিষে ফেলে—তাদের শাস্তি হওয়া উচিত নয়?
আগন্তুকঃ অবশ্যই হওয়া উচিত। অত্যাচারীর শাস্তি দরকার। কিন্তু দুইটি প্রশ্ন আলাদা। এক: গুরুতর অপরাধীর শাস্তি হবে কি না। দুই: অনন্ত শাস্তি ন্যায়সঙ্গত কি না। একজন খুনি অপরাধী—নিশ্চয়ই। কিন্তু তাকে অসীম সময় ধরে আগুনে পোড়ানো ন্যায়, না প্রতিহিংসা? শাস্তি যদি সংশোধনের জন্য হয়, অনন্ত শাস্তিতে সংশোধনের সুযোগ নেই। যদি প্রতিরোধের জন্য হয়, মৃতের পর প্রতিরোধের প্রয়োজন নেই। যদি প্রতিদানের জন্য হয়, অনুপাত কোথায়? আর যদি কেবল আল্লাহর ক্রোধ প্রশমনের জন্য হয়, তবে সেটি ন্যায় নয়—মহাজাগতিক প্রতিশোধ।
আরজ আলীঃ কিন্তু কিছু অপরাধ এত ভয়ংকর যে মানুষের শাস্তি যথেষ্ট নয়। পরকালের বিচার দরকার।
আগন্তুকঃ পরকালের বিচার থাকতে পারে। কিন্তু অনন্ত শাস্তি কেন? ধরুন, একজন অত্যাচারী একশ মানুষ হত্যা করেছে। ভয়ংকর অপরাধ। তার শাস্তি কঠোর হওয়া উচিত। কিন্তু অনন্তকাল? এক লক্ষ বছর? এক কোটি বছর? এক ট্রিলিয়ন বছর? তারপরও শেষ নয়? অপরাধ যতই ভয়ংকর হোক, তা সময়, ক্রিয়া ও ক্ষতির দিক থেকে সীমিত। অসীম শাস্তি সীমিত অপরাধের সঙ্গে যুক্তিগতভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। অসীম শাস্তি ন্যায়বিচারের ভাষা নয়; অসীম ক্ষমতার ভাষা।
আরজ আলীঃ অবিশ্বাস নিজেই বড় অপরাধ। মানুষ আল্লাহর অস্তিত্ব ও নিদর্শন দেখে, তবু অস্বীকার করে।
আগন্তুকঃ অবিশ্বাস কি অপরাধ, না জ্ঞানের অবস্থা? কেউ সত্যিই বিশ্বাস করতে না পারলে তাকে কীভাবে অপরাধী করবেন? বিশ্বাস ইচ্ছায় তৈরি হয় না। আপনি নিজে কি ইচ্ছা করলেই কাল থেকে বিশ্বাস করতে পারবেন যে পৃথিবী সমতল? অথবা একটি পাথর আপনার পিতা? বিশ্বাস প্রমাণ, অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, মানসিক গঠন, সামাজিক প্রভাব—এসবের ফল। কেউ যদি আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে না পারে, তাকে আগুনে পোড়ানো কীভাবে ন্যায়? সে কি অপরাধ করেছে, না কেবল বিশ্বাসে অক্ষম হয়েছে?
আরজ আলীঃ অনেক অবিশ্বাসী সত্য জানে, কিন্তু অহংকারে মানে না।
আগন্তুকঃ কিছু মানুষ সত্য জেনেও অস্বীকার করতে পারে। কিন্তু সব অবিশ্বাসীকে সেই দলে ফেলবেন? একজন নাস্তিক, একজন সংশয়বাদী, একজন অন্য ধর্মে জন্মানো মানুষ, একজন অশিক্ষিত আদিবাসী, একজন দার্শনিক সংশয়ী—সবাই কি একই “অহংকারী অস্বীকারকারী”? ধর্মীয় ভাষা মানুষের জটিলতাকে খুব দ্রুত লেবেল বানিয়ে ফেলে। লেবেল লাগলে বিচার সহজ হয়। মানুষ নেই, শুধু শ্রেণি: মুমিন, কাফের, মুশরিক, মুনাফিক। তারপর আগুনের প্রশাসনিক তালিকা তৈরি সহজ।
আরজ আলী এবার পানির গ্লাস থেকে এক চুমুক নিলেন। তাঁর মুখে গাম্ভীর্য। আগন্তুকের কণ্ঠে এবার তীক্ষ্ণতা কম, গভীরতা বেশি।
আরজ আলীঃ জাহান্নামের ভয় মানুষকে পাপ থেকে বিরত রাখে। ভয় না থাকলে মানুষ সীমা ছাড়িয়ে যাবে।
আগন্তুকঃ ভয় আনুগত্য আনতে পারে, নৈতিকতা নয়। শিশুকে যদি বলেন, চুরি করলে পেটাব, সে হয়তো চুরি করবে না। কিন্তু সে বুঝল কি চুরি অন্যায় কেন? জাহান্নামের ভয় মানুষকে সৎ করে না; অনেক সময় কেবল ভীত করে। ভীত মানুষ ভালো নাও হতে পারে, শুধু সতর্ক অপরাধী হতে পারে। নৈতিকতার ভিত্তি যদি কেবল আগুনের ভয় হয়, তবে স্বর্গের দরজায় দাঁড়ানো অনেক মানুষ আসলে পুড়তে না চাওয়া ব্যবসায়ী।
আরজ আলীঃ পুরস্কার ও শাস্তি ছাড়া নৈতিক ব্যবস্থা চলে না। জান্নাত ও জাহান্নাম মানুষকে দায়িত্বশীল করে।
আগন্তুকঃ পুরস্কার ও শাস্তি সমাজে ভূমিকা রাখে, ঠিক। কিন্তু নৈতিকতার সর্বোচ্চ রূপ পুরস্কার-শাস্তির ওপরে। কেউ যদি শুধু জান্নাতের লোভে ভালো হয়, সে ভালোবাসে ন্যায়কে, না পুরস্কারকে? কেউ যদি শুধু জাহান্নামের ভয়ে পাপ না করে, সে ঘৃণা করে পাপকে, না আগুনকে? সত্যিকারের নৈতিকতা হলো—কেউ না দেখলেও অন্যায় না করা, পুরস্কার না থাকলেও মানবিক থাকা, শাস্তি না থাকলেও নিষ্ঠুর না হওয়া। ভয়ের নৈতিকতা দরজার প্রহরী; বিবেকের নৈতিকতা ঘরের আলো।
আরজ আলীঃ মানুষ দুর্বল। তাই ভয় ও আশা দরকার।
আগন্তুকঃ মানুষ দুর্বল—এই কথা সত্য। কিন্তু দুর্বল সত্তাকে অনন্ত আগুনের ভয় দেখানো দয়ার ভাষা নয়। একটি ভীত শিশুকে শিক্ষা দিতে গিয়ে কেউ যদি বলে—ভুল করলে তোমাকে চিরকাল পুড়িয়ে রাখব—আমরা তাকে শিক্ষক বলবো, না নির্যাতক? যদি মানুষ দুর্বল, অজ্ঞ, সীমিত, প্রভাবিত, জন্মভূগোলে আবদ্ধ—তবে তার বিচার আরও সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। কিন্তু ধর্মীয় কল্পনায় বিচার অনেক সময় দুর্বলতার অনুপাতে কোমল নয়; বরং ভয়ংকর।
বাইরে আলো আরও কমেছে। ঘরের এক কোণ এখন ছায়ায় ডুবে গেছে। আরজ আলীর কণ্ঠ এবার নিচু, কিন্তু অটল।
আরজ আলীঃ কোরআনে আল্লাহ নিজেকে দয়ালু, পরম করুণাময় বলেছেন। তাঁর দয়া তাঁর ক্রোধের ওপর প্রাধান্য পায়—এ কথাও বলা হয়।
আগন্তুকঃ দয়া যদি ক্রোধের ওপর প্রাধান্য পায়, তবে অনন্ত জাহান্নাম কীভাবে থাকে? দয়া যদি সত্যিই প্রধান হয়, শাস্তির শেষ থাকা উচিত। সংশোধনের সুযোগ থাকা উচিত। অজ্ঞতার জন্য শিক্ষা থাকা উচিত, অনন্ত দহন নয়। কিন্তু যদি কেউ চিরকাল পোড়ে, তার চামড়া পুড়ে গেলে নতুন চামড়া দেওয়া হয় যাতে আবার যন্ত্রণা পায়—তবে সেটি দয়ার ভাষা নয়। এটি এমন এক শাস্তিতত্ত্ব, যেখানে যন্ত্রণা নিজেই উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে। [42]
আরজ আলীঃ আপনি শাস্তির ভয়াবহতা দেখছেন, কিন্তু অপরাধের ভয়াবহতা দেখছেন না।
আগন্তুকঃ দেখছি। অপরাধ ভয়ংকর হতে পারে। কিন্তু ন্যায়বিচার অপরাধীর মতো নিষ্ঠুর হয় না। ন্যায়বিচারের কাজ প্রতিশোধে অপরাধীর প্রতিচ্ছবি হওয়া নয়। আর যখন অদৃশ্য জ্ঞানের নামে এক নিষ্পাপ বালকের প্রাণ নেওয়াও পরে “হিকমত” হয়ে যায়, তখন নৈতিক ভাষা বিপজ্জনকভাবে বদলে যায়। তখন হত্যাও হত্যার নামে থাকে না; সে হয়ে যায় ভবিষ্যৎ-ব্যবস্থাপনা। [45] [46] যদি খুনি হত্যা করে, বিচারক তাকে খুনির চেয়েও দীর্ঘ, পরিকল্পিত, সূক্ষ্ম যন্ত্রণায় পোড়ান—তাহলে বিচারক নৈতিকভাবে কত উচ্চে থাকেন? ন্যায় যদি নিষ্ঠুরতার প্রতিযোগিতা হয়, তবে জাহান্নাম জিতে যায়; কিন্তু ন্যায় হেরে যায়।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনার মতে, জাহান্নাম থাকা উচিত নয়?
আগন্তুকঃ আমি বলছি, ন্যায়বিচার চাইলে শাস্তি হতে পারে—কিন্তু তা অনুপাতিক, উদ্দেশ্যমূলক এবং সীমিত হওয়া উচিত। সংশোধন, পুনরুদ্ধার, ক্ষতিপূরণ, উপলব্ধি—এসব ন্যায়বিচারের ভাষা। অনন্ত আগুন, অনন্ত চিৎকার, অনন্ত অভিশাপ—এগুলো ন্যায় নয়, মহাজাগতিক ভীতিপ্রচার। যদি আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সর্বদয় হন, তবে তাঁর বিচার মানুষের সর্বোচ্চ ন্যায়বোধের চেয়েও উন্নত হওয়া উচিত। কিন্তু অনন্ত জাহান্নামের ধারণা অনেক সময় মানুষের প্রাচীন প্রতিশোধস্পৃহাকেই দেবত্ব দেয়।
আরজ আলী এবার দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর সামনে থাকা বইগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হলো, তিনি যেন নানা যুগের নানা বয়ান একসঙ্গে শুনছেন—ভয়, দয়া, শাস্তি, ন্যায়, আনুগত্য, বিদ্রোহ।
আরজ আলীঃ আপনি নিজের শাস্তির ভয় থেকে এই যুক্তি দিচ্ছেন। আপনার জাহান্নাম নির্ধারিত, তাই আপনি জাহান্নামকে অন্যায় বলছেন।
আগন্তুকঃ হতে পারে। আসামি নিজের ফাঁসির বিরুদ্ধে কথা বললে তার স্বার্থ থাকে। কিন্তু স্বার্থ থাকলেই যুক্তি মিথ্যা হয় না। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মানুষ যদি বলে—বিচার অন্যায়, আমরা তার কথা শুনি। কারণ সে নিজের প্রাণ বাঁচাতে চাইলেও, তার যুক্তিতে সত্য থাকতে পারে। আমার স্বার্থ আছে—স্বীকার করছি। কিন্তু আল্লাহর পক্ষের বয়ানেও কি স্বার্থ নেই? ক্ষমতার নিজের স্বার্থ থাকে না? শাসকের রায়ের পক্ষে শাসকের কোনো পক্ষপাত নেই—এ ধারণা খুব নিষ্পাপ, এবং খুব বিপজ্জনক।
আরজ আলীঃ আপনি আল্লাহর পক্ষপাতের কথা বলছেন?
আগন্তুকঃ আমি বলছি, যে বয়ানে আল্লাহ সবসময় ন্যায়বান, আর বিরোধী সবসময় পথভ্রষ্ট—সেই বয়ান বিচারযোগ্য। আল্লাহ নিজের কিতাবে নিজেকে দয়ালু বলেন, শত্রুকে অভিশপ্ত বলেন, বিশ্বাসীকে সফল বলেন, অবিশ্বাসীকে নিকৃষ্ট বলেন। এটি এক পক্ষের ভাষা। আমি শুধু বলছি—আসামির বক্তব্যও শুনুন। হয়তো রায় বদলাবে না, কিন্তু বিচার অন্তত একপাক্ষিক থাকবে না।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনার দাবি, জাহান্নাম আল্লাহর ন্যায়বিচারের সঙ্গে অসঙ্গত?
আগন্তুকঃ অনন্ত জাহান্নাম—হ্যাঁ, তা ন্যায়বিচারের সঙ্গে গভীরভাবে অসঙ্গত। কারণ এক: অপরাধ সীমিত, শাস্তি অসীম। দুই: অপরাধীর ইচ্ছা ও পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়। তিন: আল্লাহ অপরাধ আগেই জানতেন, তবু সৃষ্টি করেছেন। চার: হিদায়াত অসমভাবে পৌঁছায়। পাঁচ: বিশ্বাস ইচ্ছাধীন নয়। ছয়: শাস্তির উদ্দেশ্য সংশোধন নয়, যন্ত্রণা। সাত: দয়া ও অনন্ত দহন একসঙ্গে দাঁড়াতে গেলে দয়ার অর্থ ফাঁকা হয়ে যায়। এই সাতটি প্রশ্নের উত্তর ছাড়া জাহান্নামকে ন্যায় বলা শুধু ঘোষণা, যুক্তি নয়।
ঘরের ভেতর নীরবতা জমে উঠল। বাইরে সূর্য আরও নিচে নেমেছে, আল্লাহর আরশের নিচে সে চলে যাবে খুব দ্রুতই। আলো লালচে। আরজ আলী এবার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন।
আরজ আলীঃ আপনার যুক্তি শুনলে মনে হয়, আপনি জাহান্নামকে শুধু শাস্তি নয়, আল্লাহর চরিত্রের ওপর প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন।
আগন্তুকঃ ঠিক তাই। শাস্তি কখনো শুধু শাস্তি নয়; শাস্তিদাতার নৈতিক চরিত্রও প্রকাশ করে। একজন পিতা সন্তানের ভুলে তাকে শিক্ষা দেন—তাতে পিতার চরিত্র প্রকাশ পায়। কেউ যদি সন্তানের ভুলে তাকে আজীবন আগুনে পোড়ান, তাতেও পিতার চরিত্র প্রকাশ পায়। আল্লাহ যদি রব হন, তবে তাঁর শাস্তিতত্ত্ব তাঁর রবত্বের আয়না। সেই আয়নায় যদি করুণা কম, যন্ত্রণা বেশি দেখা যায়—প্রশ্ন উঠবে। আয়নাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।
আরজ আলীঃ কিন্তু মানুষ আল্লাহর পূর্ণ জ্ঞান জানে না। হয়তো এমন কিছু কারণ আছে, যা আমরা বুঝি না।
আগন্তুকঃ “আমরা বুঝি না”—এটি বিনয়ী বাক্য হতে পারে, আবার বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মসমর্পণও হতে পারে। যদি কোনো কাজ আমাদের জানা সমস্ত ন্যায়বোধের বিরুদ্ধে যায়, তখন বলা—“হয়তো গভীর জ্ঞান আছে”—এ যুক্তি সব অত্যাচারীর পক্ষেই ব্যবহার করা যায়। একজন রাজা নিরপরাধকে মেরে বলল—তোমরা আমার রাষ্ট্রনীতির গভীরতা বোঝ না। একজন পুরোহিত নির্যাতন করে বলল—তোমরা দেবতার রহস্য বোঝ না। “রহস্য” অনেক সময় ন্যায়ের কবরের ওপর রাখা ফুল। দেখতে সুন্দর, নিচে মৃতদেহ।
আরজ আলীঃ তাহলে মানুষের ন্যায়বোধ দিয়েই আল্লাহকে বিচার করবেন?
আগন্তুকঃ আপনারা আল্লাহকে ন্যায়বান বলেন মানুষের ন্যায়বোধ দিয়েই। করুণাময় বলেন মানুষের করুণার ধারণা দিয়েই। দয়ালু বলেন মানুষের দয়ার ভাষায়। কিন্তু যখন সেই একই ন্যায়বোধ দিয়ে জাহান্নাম পরীক্ষা করি, তখন বলেন—মানুষের ন্যায়বোধ দিয়ে আল্লাহকে বিচার করা যায় না। এটি সুবিধাজনক। প্রশংসার সময় মানুষের ভাষা বৈধ, সমালোচনার সময় অবৈধ। যেন দরবারে করতালি দেওয়া যায়, প্রশ্ন করা যায় না।
আরজ আলী এবার কোনো উত্তর দিলেন না। তাঁর চোখে তর্কের আগুন আছে, কিন্তু আগন্তুকের শেষ যুক্তি তাঁর ভেতরে কোথাও গিয়ে লেগেছে। আগন্তুক এবার খুব ধীরে বললেন।
আগন্তুকঃ আমি জাহান্নামকে ভয় পাই কি না, সে প্রশ্ন ছোট। বড় প্রশ্ন হলো—জাহান্নামকে ন্যায় বলা যায় কি না। যদি আমাকে পোড়াতেই হয়, পোড়ান। কিন্তু অন্তত আগুনের ওপর “ন্যায়বিচার” লেখা ফলকটি টাঙাবেন না। আগুন আগুনই থাকুক। তাকে দয়া বললে ভাষার অপমান হয়, ন্যায় বললে ন্যায়ের।
আরজ আলীঃ আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, আপনি শাস্তির চেয়ে ভাষার প্রতারণা নিয়ে বেশি ক্ষুব্ধ।
আগন্তুকঃ হ্যাঁ। শাস্তি ভয়ংকর, কিন্তু শাস্তিকে ন্যায়, দয়া, হিকমত, প্রেম—এই নামে সাজানো আরও ভয়ংকর। অত্যাচার যখন নিজেকে অত্যাচার বলে, তখন অন্তত তার মুখ দেখা যায়। কিন্তু অত্যাচার যখন পবিত্রতার মুখোশ পরে, তখন মানুষ তাকে পূজা করতে শুরু করে। জাহান্নামের আগুনের চেয়েও ভয়ংকর হলো সেই মন, যে আগুনের দিকে তাকিয়ে বলে—কী দয়া!
বাইরে বিকেল প্রায় শেষ। ঘরের ভেতর আলো এখন অল্প। আরজ আলী ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন, জানালার কাছে গেলেন। কিছুক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ফিরে তাকালেন আগন্তুকের দিকে।
আরজ আলীঃ আপনি জাহান্নামের ন্যায় নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। কিন্তু জান্নাতের কথা বললেন না। আল্লাহ শুধু শাস্তি দেন না, পুরস্কারও দেন। জান্নাত তো তাঁর দয়ার প্রমাণ।
আগন্তুকঃ জান্নাত—হ্যাঁ, সেটিও বিচারযোগ্য। কারণ পুরস্কারও নৈতিক চরিত্র প্রকাশ করে। একটি ব্যবস্থা যেখানে অবিশ্বাসীর জন্য আগুন, বিশ্বাসীর জন্য অনন্ত ভোগ—সেখানে প্রশ্ন উঠবে: নৈতিকতার লক্ষ্য কি সত্য, ন্যায় ও প্রজ্ঞা; না পুরস্কার ও শাস্তির বাজার? এবার চাইলে আমরা জান্নাত নিয়েও কথা বলতে পারি—সেই অনন্ত সুখ, সেই ভোগ, সেই পুরস্কারের প্রকৃতি, এবং মানুষের নৈতিকতার সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে।
দৃশ্যঃ ০৮
স্থানঃ আরজ আলীর কুঁড়েঘর
সময়ঃ বিকেলের শেষ আলো
চরিত্রঃ আরজ আলী, আগন্তুক
ঘটনাঃ জাহান্নাম ও অনন্ত শাস্তির নৈতিকতা নিয়ে তীব্র বিতর্কের পর আলোচনা এবার জান্নাতের দিকে মোড় নেয়। আরজ আলী জান্নাতকে আল্লাহর দয়া ও পুরস্কার হিসেবে তুলে ধরেন। আগন্তুক প্রশ্ন করেন—পুরস্কার যদি ভোগ, আনুগত্য ও লোভের ওপর দাঁড়ায়, তবে তা নৈতিকতার উচ্চতম রূপ, না মানুষের কামনার দেবত্বায়ন?
ঘরের ভেতর আলো এখন নরম ও ধূসর। বাইরে সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। জানালার পাশে ধুলোভরা বাতাসে আলো ভেসে আছে, যেন পুরনো কোনো পাণ্ডুলিপির পাতায় সময় জমে আছে। আরজ আলী জানালার কাছ থেকে ফিরে এসে আবার বসেন। তাঁর কণ্ঠে এবার কিছুটা ক্লান্তি, কিন্তু যুক্তির মাটি ছাড়েননি।
আরজ আলীঃ আপনি জাহান্নামের শাস্তিকে প্রশ্ন করলেন। কিন্তু ইসলাম শুধু শাস্তির ধর্ম নয়। আল্লাহ জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—শান্তি, পুরস্কার, দয়া, অনন্ত সুখ। যারা কষ্ট সহ্য করে, ন্যায় পথে থাকে, আল্লাহর হুকুম মানে—তাদের জন্য পুরস্কার থাকা অন্যায় কীভাবে?
আগন্তুকঃ পুরস্কার অন্যায় নয়। কিন্তু পুরস্কারের প্রকৃতি বিচারযোগ্য। শিশুকে পড়াশোনার জন্য মিষ্টি দিলে এক কথা; মানুষকে নৈতিকতা শেখানোর জন্য অনন্ত ভোগের বাজার খুলে দিলে আরেক কথা। প্রশ্ন হলো—মানুষ ন্যায় করবে কেন? কারণ ন্যায় সত্য? কারণ অন্যের দুঃখ বোঝে? নাকি কারণ শেষে বাগান, নদী, ফল, সোনা, সঙ্গিনী, প্রাসাদ ও অনন্ত আরাম পাওয়া যাবে?
আরজ আলীঃ মানুষ দুর্বল। তাকে উৎসাহ দিতে হয়। জান্নাত সেই উৎসাহ। দুনিয়ার কষ্টের বিনিময়ে পরকালের সুখ। এতে সমস্যা কোথায়?
আগন্তুকঃ সমস্যা তখনই আসে, যখন নৈতিকতা বাণিজ্যে পরিণত হয়। “আমি ভালো হব, কারণ এতে পুরস্কার পাব”—এটি নৈতিকতা, না বিনিয়োগ? একজন মানুষ যদি অনাথকে সাহায্য করে কারণ সে অনাথের কষ্ট অনুভব করে, আরেকজন সাহায্য করে কারণ সে জান্নাতে প্রাসাদ চায়—দুজনের কাজ একই, কিন্তু নৈতিক গুণ কি একই? দয়ার কাজ আর পুরস্কার-লোভী হিসাব এক নয়, যদিও বাহ্যিকভাবে দুটোই সদকা হতে পারে।
আরজ আলীঃ পুরস্কার থাকলেই কাজের মূল্য কমে না। আল্লাহ বান্দাকে ভালোবাসেন, তাই পুরস্কার দেন।
আগন্তুকঃ ভালোবাসা যদি শর্তসাপেক্ষ হয়—মানলে বাগান, না মানলে আগুন—তবে সেটি ভালোবাসা নয়, সাম্রাজ্যিক চুক্তি। রাজা বললেন, আমার আনুগত্য করো, প্রাসাদ পাবে; অমান্য করলে কারাগার। প্রজা বলল, কী দয়ালু রাজা! আমি বলি, রাজা হয়তো শক্তিশালী, কিন্তু দয়ালু প্রমাণ করতে হলে শুধু পুরস্কারের তালিকা নয়, স্বাধীনতার প্রশ্নও দেখতে হবে।
আরজ আলীঃ আপনি জান্নাতকেও সন্দেহের চোখে দেখছেন। অথচ জান্নাত তো শান্তির স্থান—সেখানে ভয় নেই, দুঃখ নেই, মৃত্যু নেই।
আগন্তুকঃ শান্তি যদি হয় দুঃখের অবসান, তা সুন্দর। কিন্তু জান্নাতের বর্ণনায় শুধু শান্তি নেই; আছে ভোগের বিপুল প্রতিশ্রুতি। নদী, ফল, মদ, সোনা, রেশম, সঙ্গিনী—মানুষের যে কামনাগুলো দুনিয়ায় নিয়ন্ত্রণ করতে বলা হয়, জান্নাতে সেগুলোই মহিমান্বিত পুরস্কার হয়ে ফিরে আসে। দুনিয়ায় কামনা বিপদ, পরকালে কামনা পুরস্কার—এ কেমন নৈতিক রসায়ন?
আরজ আলীঃ জান্নাতের নেয়ামত দুনিয়ার মতো নয়। সেগুলো পবিত্র, কলুষমুক্ত। মানুষ দুনিয়ার ভাষায় বুঝতে পারে বলে দুনিয়ার উপমা দেওয়া হয়েছে।
আগন্তুকঃ তাহলে আবার সেই ভাষার সমস্যা। যখন জান্নাত আকর্ষণ করতে হয়, তখন ফল, নদী, সঙ্গিনী, পানীয়—সব স্পষ্ট; আর যখন নৈতিক প্রশ্ন ওঠে, তখন বলা হয়—এসব উপমা। ধর্মতত্ত্বের ভাষা যেন মেলার যাদুকরের কাপড়—যখন যা দরকার, তখন তা বের হয়। প্রশ্ন হলো, আল্লাহ যদি মানুষকে নৈতিকতার উচ্চতর স্তরে তুলতে চান, তবে পুরস্কারের ভাষা এত ভোগকেন্দ্রিক কেন? কেন বলা হলো না—জান্নাত মানে জ্ঞান, সহমর্মিতা, সত্যের পূর্ণ উপলব্ধি, নৈতিক পরিপূর্ণতা? কেন মানুষের পেট, শরীর, চোখ, লালসা—এসবকে এত জায়গা দেওয়া হলো?
আরজ আলী এবার একটু অস্বস্তিতে নড়লেন। জান্নাতের বর্ণনা নিয়ে প্রশ্ন করা তাঁর কাছে অস্বস্তিকর, কিন্তু আগন্তুকের প্রশ্নের গঠন উপেক্ষা করা সহজ নয়।
আরজ আলীঃ মানুষের ভাষায় মানুষকে বোঝাতে হয়। মরুভূমির মানুষের কাছে নদী, ছায়া, ফল—এসবই বড় পুরস্কার। তাই সে ভাষায় জান্নাত বর্ণিত হয়েছে।
আগন্তুকঃ ঠিক বলেছেন। কিন্তু এখানেই তো প্রশ্ন। যদি জান্নাতের ভাষা নির্দিষ্ট ভূগোলের মানুষের আকাঙ্ক্ষা দিয়ে গঠিত হয়, তবে তা সর্বজনীন নৈতিক সত্যের ভাষা, না আঞ্চলিক কামনার ভাষা? মরুভূমির মানুষের কাছে নদী স্বর্গ, শীতপ্রধান অঞ্চলের মানুষের কাছে উষ্ণতা স্বর্গ, ক্ষুধার্তের কাছে রুটি স্বর্গ, নিঃসঙ্গের কাছে সঙ্গ স্বর্গ। তাহলে জান্নাত কি আল্লাহর পরম নৈতিক বাস্তবতা, নাকি মানুষের হতাশা, না পাওয়ার বেদনা আর অভাবের প্রতিচ্ছবি?
আরজ আলীঃ আপনি জান্নাতকে খুব বস্তুবাদীভাবে দেখছেন। আল্লাহর সন্তুষ্টিই জান্নাতের সর্বোচ্চ নেয়ামত।
আগন্তুকঃ তাহলে এত বস্তুগত বর্ণনা কেন? যদি সর্বোচ্চ নেয়ামত আল্লাহর সন্তুষ্টি হয়, তবে পুরস্কারের বিজ্ঞাপনে বাগান, ফল, নদী, পানীয়, সঙ্গিনী—এসব এত জায়গা পেল কেন? বাজারে যদি বলা হয়, এই ওষুধের আসল গুণ অদৃশ্য, কিন্তু পোস্টারে শুধু রঙিন মিষ্টির ছবি—তাহলে ক্রেতা কী বুঝবে? ধর্মতত্ত্ব বলে আত্মিক; প্রচারপত্র বলে ইন্দ্রিয়সুখ। এই দ্বৈত ভাষাই তো প্রশ্নের জন্ম দেয়।
আরজ আলীঃ জান্নাতে যা আছে, তা দুনিয়ার কলুষতা থেকে মুক্ত। সেখানে হিংসা নেই, ঈর্ষা নেই, অশান্তি নেই।
আগন্তুকঃ তাহলে জান্নাতে মানুষের চরিত্র বদলে দেওয়া হবে? যদি হিংসা, ঈর্ষা, কামনার কলুষতা, দুঃখ, বিদ্বেষ—সব সরিয়ে দেওয়া যায়, তবে দুনিয়াতেই কেন সরানো হলো না? আল্লাহ যদি এমন এক অবস্থা তৈরি করতে পারেন যেখানে মানুষ স্বাধীন থেকেও পাপ করে না, তবে পৃথিবীর পরীক্ষাকেন্দ্র এত রক্তাক্ত করে বানানোর প্রয়োজন কী ছিল? জান্নাত প্রমাণ করে, আল্লাহ পাপহীন সুখী সত্তা তৈরি করতে পারেন। তাহলে দুনিয়ার জাহান্নামী নাটক কেন?
আরজ আলীঃ দুনিয়া পরীক্ষা। জান্নাত পুরস্কার। পরীক্ষা ছাড়া পুরস্কারের মূল্য থাকে না।
আগন্তুকঃ পরীক্ষা কাকে বলে? যে পরীক্ষা পরীক্ষার্থীর অজানা, যেখানে প্রশ্নপত্র অসম, শিক্ষক অদৃশ্য, পরীক্ষার ভাষা সবার মাতৃভাষা নয়, পরীক্ষার হল একেকজনের জন্য একেক রকম, কারও পেটে ভাত নেই, কারও হাতে উত্তরাধিকারী ধর্ম, কারও সামনে ভয়, কারও সামনে জ্ঞান—তারপর ফল অনন্ত। তার ওপর যদি এক পরীক্ষার্থীর বক্ষ বিদীর্ণ করে হৃদপিণ্ড ধুয়ে “শয়তানের অংশ” বের করে দেওয়া হয়, আর বাকিদের সেই অপারেশন ছাড়া একই নৈতিক যুদ্ধে নামানো হয়, তবে পরীক্ষার সমতা কোথায়? [47] এমন পরীক্ষা কোনো মানব বিশ্ববিদ্যালয় নিলে ছাত্ররা আন্দোলন করত। কিন্তু মহাজাগতিক পরীক্ষায় প্রশ্ন করলেই বলা হয়—আল্লাহ ভালো জানেন। আহা, কী সুন্দর প্রশাসনিক স্থিতি!
আরজ আলী এবার ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। বাইরে আলো আরও কমে এসেছে। ঘরের ভেতর দুজনের মুখ এখন আলো-ছায়ায় বিভক্ত।
আরজ আলীঃ আপনি পুরস্কারের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন করছেন। কিন্তু মানুষ যদি কোনো পুরস্কার না পায়, তাহলে দুনিয়ার কষ্ট, অবিচার, ত্যাগ—এসবের প্রতিদান কোথায়?
আগন্তুকঃ প্রতিদান দরকার—এ দাবি মানবিক। অত্যাচারিতের ন্যায় চাই, দরিদ্রের পূরণ চাই, কষ্টের স্বীকৃতি চাই। কিন্তু প্রতিদান আর ভোগ-পুরস্কার এক নয়। একজন মা সন্তানের জন্য জীবন দিলেন—তাঁর ন্যায্য প্রতিদান কি সোনার প্রাসাদ, নাকি তাঁর ভালোবাসার মর্যাদা? একজন সত্যবাদী মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মারা গেলেন—তাঁর পুরস্কার কি শুধু ফলের বাগান, না সত্যের জগতে সম্মান? আর যদি জান্নাতেও আগে থেকেই কিছু পরিবার, কিছু রক্তসম্পর্ক, কিছু পবিত্র বংশীয় পরিচয় রাজকীয় আসন পায়, তবে প্রশ্ন উঠবে—শেষ বিচার কর্মের, না পবিত্র বংশতালিকার? [48] [49] জান্নাতের ভাষা অনেক সময় উচ্চ নৈতিকতাকে নিম্ন ভোগের মুদ্রায় পরিশোধ করে। যেন শহীদের রক্তের দাম রেশমি বালিশে মাপা হচ্ছে।
আরজ আলীঃ আপনি খুব কঠোর ব্যাখ্যা করছেন। জান্নাতের নেয়ামত মানুষের আনন্দের জন্য। আনন্দ কি খারাপ?
আগন্তুকঃ আনন্দ খারাপ নয়। কিন্তু আনন্দের নৈতিক মান আছে। অন্যের অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে, সম্মতি ও মর্যাদার ভিত্তিতে আনন্দ এক জিনিস; ক্ষমতার পুরস্কার হিসেবে সাজানো আনন্দ আরেক জিনিস। জান্নাতের অনেক বর্ণনায় পুরস্কারের ভাষা পুরুষকেন্দ্রিক, ভোগকেন্দ্রিক, মালিকানাকেন্দ্রিক। প্রশ্ন উঠবে— নারীর পুরস্কার কী? কামনার বস্তু হওয়া, না কামনার অধিকারী হওয়া? ন্যায়ের জান্নাতে নারী-পুরুষের নৈতিক অবস্থান সমান, না পুরস্কারের টেবিলে এক পক্ষ ভোজী, অন্য পক্ষ ভোজ্য?
আরজ আলীঃ জান্নাতে কারও প্রতি অন্যায় হবে না। নারী-পুরুষ সবাই সন্তুষ্ট থাকবে।
আগন্তুকঃ সন্তুষ্ট থাকবে—কারণ তাদের মন বদলে দেওয়া হবে? তাহলে আবার একই সমস্যা। যদি কারও প্রশ্ন, ঈর্ষা, অস্বস্তি, স্বাধীন পছন্দ—এসব সরিয়ে দিয়ে তাকে সন্তুষ্ট রাখা হয়, সেটি কি প্রকৃত সুখ, না চেতনার সম্পাদিত সংস্করণ? কেউ যদি একনায়কের দেশে বলে—সব নাগরিক সন্তুষ্ট, কারণ অসন্তোষ প্রকাশের ক্ষমতাই নেই—তবে আমরা তাকে স্বাধীন সমাজ বলি না। জান্নাতে যদি মানুষের মন এমনভাবে সংশোধিত হয় যে সে আর প্রশ্ন করে না, তবে সেটি মুক্তি, না নিখুঁত আনুগত্যের কারখানা?
আরজ আলীঃ আপনি জান্নাতকেও কারাগার বানিয়ে ফেলছেন।
আগন্তুকঃ কারাগার বলছি না। প্রশ্ন করছি—স্বাধীনতা ছাড়া সুখের মানে কী? যদি জান্নাতে কেউ আল্লাহকে প্রশ্ন করতে না পারে, জাহান্নামের চিৎকার নিয়ে অস্বস্তি অনুভব না করে, প্রিয়জনের অনন্ত দহনেও শান্ত থাকে—তবে তার হৃদয় কি পরিশুদ্ধ হয়েছে, না অনুভূতিহীন হয়েছে? একজন মা জান্নাতে, তাঁর সন্তান জাহান্নামে—তিনি কি সুখী থাকবেন? যদি থাকেন, তবে মাতৃত্ব বদলে গেছে। যদি না থাকেন, তবে জান্নাত পূর্ণ সুখ নয়। কোনটি গ্রহণ করবেন?
এই প্রশ্নে ঘরের ভেতর হঠাৎ নীরবতা নেমে এল। আরজ আলীর মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি। তিনি দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। আগন্তুকও কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, যেন প্রশ্নটির ভার তিনিও অনুভব করছেন।
আরজ আলীঃ আল্লাহ জান্নাতবাসীদের অন্তর থেকে দুঃখ দূর করে দেবেন। তারা সন্তুষ্ট থাকবে।
আগন্তুকঃ অর্থাৎ নৈতিক স্মৃতি সম্পাদনা করা হবে। দুঃখ দূর হবে, কিন্তু দুঃখের কারণ থাকবে—জাহান্নামে কেউ পোড়বে, তবু জান্নাতবাসী অশান্ত হবে না। এটি দয়া নয়, সংবেদনশীলতার অস্ত্রোপচার। যদি অন্যের অনন্ত যন্ত্রণা দেখে কোনো হৃদয় কষ্ট না পায়, তবে সে হৃদয় পবিত্র নয়; সে হৃদয় অবশ।
আরজ আলীঃ আপনি মানবিক আবেগ দিয়ে পরকালের বাস্তবতা বিচার করছেন।
আগন্তুকঃ মানবিক আবেগ দিয়েই তো দয়া, প্রেম, করুণা, ন্যায়—এসব বোঝেন। যখন আল্লাহকে করুণাময় বলেন, তখন মানুষের করুণার ধারণাই ব্যবহার করেন। আর যখন করুণা দিয়ে জাহান্নাম-জান্নাত পরীক্ষা করি, তখন বলেন—মানবিক আবেগ অপ্রযোজ্য। প্রশংসার সময় মানুষের ভাষা, প্রশ্নের সময় অতিমানবিক রহস্য—এই দ্বৈততা খুব সুবিধাজনক।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনার মতে, জান্নাতও নৈতিকভাবে সমস্যাহীন নয়?
আগন্তুকঃ জান্নাতের ধারণা আশা দিতে পারে, কষ্টে সান্ত্বনা দিতে পারে। কিন্তু তার প্রচলিত বর্ণনায় সমস্যা আছে। এক—নৈতিকতা পুরস্কারনির্ভর হয়ে যায়। দুই—ভোগকে আত্মিকতার চেয়ে বড় করে তুলে। তিন—জন্ম, বিশ্বাস, আনুগত্যের ভিত্তিতে পুরস্কার বণ্টন প্রশ্নবিদ্ধ। চার—নারী-পুরুষের পুরস্কারের ভাষা অসম। পাঁচ—জাহান্নামের অস্তিত্ব থাকা অবস্থায় জান্নাতের সুখ নৈতিকভাবে অস্বস্তিকর। ছয়—সুখের জন্য যদি স্মৃতি বা আবেগ বদলাতে হয়, তবে ব্যক্তি-সত্তার ধারাবাহিকতা প্রশ্নবিদ্ধ। সাত—যে ব্যবস্থা ভয় ও লোভ দিয়ে মানুষ চালায়, তা নৈতিক পরিপক্বতার নয়, নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা।
আরজ আলী এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখে ক্লান্তি, কিন্তু পরাজয় নয়। তিনি ধীরে ধীরে বললেন।
আরজ আলীঃ আপনি জান্নাতকে এমনভাবে বিশ্লেষণ করছেন, যেন মানুষের আশা-ভরসাও সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড়ায়। মানুষের কষ্টের জীবনে জান্নাত একটি সান্ত্বনা। সেই সান্ত্বনাও কি কেড়ে নিতে চান?
আগন্তুকঃ সান্ত্বনা কেড়ে নিতে চাই না। মিথ্যা সান্ত্বনার মূল্য জিজ্ঞেস করতে চাই। একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে যদি বলা হয়—আজ ভাত নেই, কিন্তু মৃত্যুর পরে ভোজ আছে—সে কিছুটা সান্ত্বনা পেতে পারে। কিন্তু এই সান্ত্বনা যদি তাকে বর্তমানের অবিচার মেনে নিতে শেখায়, তবে তা মুক্তি নয়; তা রাজনৈতিক ঘুমের ওষুধ। জান্নাতের স্বপ্ন কখনো কখনো মানুষের দুঃখকে ভাষা দেয়, আবার কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার রাগকে নিস্তেজ করে। প্রশ্ন হলো, কোনটি হচ্ছে?
আরজ আলীঃ ধর্ম মানুষকে শুধু পরকালের স্বপ্ন দেখায় না; দুনিয়াতেও ন্যায় করতে বলে।
আগন্তুকঃ কখনো বলে, কখনো অন্যায়ের সঙ্গে আপসও শেখায়—ধৈর্য, তাকদির, পরীক্ষা, পরকালের প্রতিদান। অত্যাচারী শাসকও জান্নাতের ভাষা ব্যবহার করতে ভালোবাসে। সে গরিবকে বলে—ধৈর্য ধরো, আল্লাহ প্রতিদান দেবেন। নিজে প্রাসাদে থাকে। গরিবের জান্নাত ভবিষ্যতে, শাসকের জান্নাত বর্তমানেই। এই দ্বৈত জান্নাতের রাজনীতি না বুঝলে ধর্মের সান্ত্বনা ও ক্ষমতার সম্পর্ক বোঝা যায় না।
আরজ আলীঃ আপনি সবকিছুকেই ক্ষমতার প্রশ্নে নামিয়ে আনছেন।
আগন্তুকঃ কারণ পুরস্কার ও শাস্তি ক্ষমতার দুই হাত। এক হাতে জান্নাত, অন্য হাতে জাহান্নাম। শিশুকে এক হাতে মিষ্টি, অন্য হাতে লাঠি দেখালে সে শৃঙ্খলিত হয়। প্রশ্ন হলো—সে নৈতিক হলো, না নিয়ন্ত্রিত? আল্লাহ যদি সত্যিই মানবিক পরিপক্বতা চান, তবে ভয় ও লোভের এই দ্বৈত কাঠামো কেন? নাকি মানুষকে পরিপক্ব নয়, অনুগত রাখাই উদ্দেশ্য?
ঘরের ভেতর আলো আরও ম্লান। আরজ আলী এবার নিচু গলায় বললেন। তাঁর কণ্ঠে ক্লান্ত চিন্তার ভার।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনার কাছে সত্যিকারের নৈতিকতা কী?
আগন্তুকঃ সত্যিকারের নৈতিকতা হলো—পুরস্কারের লোভ ছাড়া ভালো হওয়া, শাস্তির ভয় ছাড়া অন্যায় না করা, ক্ষমতার সামনে মাথা নত না করে দুর্বলের পাশে দাঁড়ানো, এবং নিজের বিশ্বাসকেও বিচার থেকে ছাড় না দেওয়া। যে মানুষ জাহান্নাম না থাকলেও হত্যা করবে না, জান্নাত না থাকলেও ক্ষুধার্তকে খাওয়াবে, আল্লাহ না দেখলেও মিথ্যা বলবে না—তার নৈতিকতা ভয় ও লোভের চেয়ে উচ্চতর। সে মানুষ হয়তো ধর্মতাত্ত্বিক ভাষায় বিপজ্জনক; কিন্তু নৈতিক ভাষায় সে অধিক পরিণত।
আরজ আলীঃ আপনি কি বলতে চাইছেন, একজন অবিশ্বাসীও নৈতিক হতে পারে?
আগন্তুকঃ অবশ্যই পারে। বরং যে মানুষ কোনো স্বর্গের লোভ বা নরকের ভয় ছাড়া ন্যায় করে, তার নৈতিকতার শুদ্ধতা পরীক্ষা করা সহজ। সে বাজারি চুক্তিতে নেই। সে বলে না—আমি ভালো হব, বিনিময়ে অনন্ত সুখ চাই। সে বলে—অন্যের দুঃখ সত্য, তাই সাহায্য করি। অন্যায় ক্ষতিকর, তাই বিরোধিতা করি। মিথ্যা মানুষকে ভাঙে, তাই মিথ্যা বলি না। এই নৈতিকতা প্রাপ্তবয়স্ক। ভয়-লোভের নৈতিকতা এখনও শিশুশিক্ষা।
আরজ আলীঃ কিন্তু আল্লাহ ছাড়া নৈতিকতার ভিত্তি কোথায়?
আগন্তুকঃ দুঃখের বাস্তবতায়, আনন্দের মূল্যতে, চেতনার মর্যাদায়, পারস্পরিক নির্ভরশীলতায়, সহমর্মিতায়, যুক্তিতে, সামাজিক চুক্তিতে, জীবনের ভঙ্গুরতায়। শিশুর কান্না মিথ্যা নয়, যদিও তার পাশে কোনো আয়াত না থাকে। ক্ষুধা বাস্তব, যদিও কোনো ফেরেশতা তা নথিভুক্ত না করে। অন্যায়ের ক্ষতি সত্য, যদিও কোনো আসমানি আদালত বসে না। নৈতিকতার শুরু হয় সেখানেই—যেখানে অন্যের ব্যথাকে নিজের হিসাবের বাইরে সত্য বলে স্বীকার করা হয়।
আরজ আলী এবার দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন। আগন্তুকের কথায় তিনি সম্পূর্ণ সম্মত নন, কিন্তু বিরোধিতাও সহজ নয়। ঘরের বাতাসে এখন সন্ধ্যার গন্ধ।
আরজ আলীঃ আপনি জান্নাতের লোভ, জাহান্নামের ভয়, হিদায়াতের রাজনীতি—সব প্রশ্ন করলেন। কিন্তু মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি? মানুষ তো এই বিশ্বাসে বেঁচে থাকে, কষ্ট সহ্য করে, মৃত্যুভয় কাটায়।
আগন্তুকঃ অনুভূতি বাস্তব, কিন্তু অনুভূতির সত্যতা আর বিশ্বাসের সত্যতা এক নয়। কেউ মৃত সন্তানের ছবি বুকে নিয়ে বাঁচে—তার শোক সত্য, কিন্তু ছবিটি সন্তান নয়। মানুষ জান্নাতের স্বপ্নে সান্ত্বনা পেতে পারে—সান্ত্বনা সত্য, কিন্তু জান্নাত সত্য কি না আলাদা প্রশ্ন। ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান করতে গিয়ে যদি প্রশ্ন নিষিদ্ধ করা হয়, তবে অনুভূতি সত্যের ওপর প্রহরী বসে যায়। সত্যকে প্রহরী দিয়ে রক্ষা করতে হয় না; ক্ষমতাকে হয়।
আরজ আলীঃ আপনার কথা মানুষের বিশ্বাস ভেঙে দিতে পারে।
আগন্তুকঃ যে বিশ্বাস প্রশ্নে ভেঙে যায়, সে বিশ্বাস ভাঙার মতোই ছিল। যে বিশ্বাস সত্যের আগুনে টিকে থাকে, তাকে ভয় কী? আমি বিশ্বাস ভাঙি না; আমি পরীক্ষা করি। কখনো দেখি বিশ্বাস সোনা, আগুনে দীপ্ত হয়। কখনো দেখি রঙ করা মাটি, আগুনে গলে যায়। আগুনকে দোষ দেবেন, না মাটিকে সোনা বলে বিক্রি করা দোকানদারকে?
আরজ আলী এবার ধীরে ধীরে মাথা তুললেন। তাঁর মুখে ক্লান্তি, কিন্তু চোখে তীব্র মনোযোগ। তিনি যেন অনুভব করছেন, কথোপকথন কেবল ধর্মতত্ত্ব নয়; মানুষের নৈতিকতার মূল প্রশ্নে এসে দাঁড়িয়েছে।
আরজ আলীঃ আপনার মতে, মানুষকে ভালো হতে হলে জান্নাত-জাহান্নামের দরকার নেই?
আগন্তুকঃ মানুষের শিশুকালে দরকার হতে পারে ভয় ও পুরস্কারের ভাষা। কিন্তু সভ্য নৈতিকতার লক্ষ্য হওয়া উচিত—মানুষ যেন ভালো হয় কারণ ভালো হওয়া মানবিক, যুক্তিযুক্ত, প্রয়োজনীয়; কারণ অন্যের জীবন মূল্যবান; কারণ কষ্ট কমানো ভালো; কারণ স্বাধীনতা মর্যাদার শর্ত; কারণ সত্য মিথ্যার চেয়ে উত্তম। যে মানুষ শুধু জাহান্নামের ভয় পেলে খুন করে না, তার হাতে অস্ত্র না দেওয়া ভালো। যে মানুষ জান্নাতের লোভ ছাড়া দান করে না, তার দয়া এখনও ব্যবসা।
আরজ আলীঃ তবু আল্লাহর কাছে পুরস্কার চাওয়া দোষের নয়।
আগন্তুকঃ দোষ নয়। কিন্তু সেটিকে নৈতিকতার চূড়ান্ত স্তর ভাবা ভুল। শিশুকে প্রথমে মিষ্টি দিয়ে পড়ানো যায়; কিন্তু সে যদি সারাজীবন শুধু মিষ্টির জন্য পড়ে, জ্ঞানের প্রেম জন্মায়নি। ধর্ম মানুষকে যদি ভয়-লোভের শিশুশিক্ষায় আটকে রাখে, তবে নৈতিক পরিণতি বাধাগ্রস্ত হয়। জান্নাত হয়তো প্রাথমিক প্রেরণা; কিন্তু ন্যায়, সহমর্মিতা ও সত্য যদি তার চেয়ে বড় না হয়, তবে মানুষ শুধু পুরস্কার-প্রার্থী প্রাণী হয়ে থাকে।
ঘরের ভেতর এখন অন্ধকার নামার পূর্বক্ষণ। আগন্তুকের মুখ আংশিক ছায়ায়। তাঁর কণ্ঠে এবার অদ্ভুত নরমতা।
আগন্তুকঃ আমি জানি, মানুষ জান্নাতের স্বপ্ন ছাড়তে চায় না। কারণ জীবন কঠিন। মৃত্যু ভয়ংকর। অন্যায় অনেক। প্রিয়জন হারায়। দেহ ভেঙে যায়। একদিন সব শেষ হয়ে যাবে—এই সত্য সহ্য করা সহজ নয়। তাই মানুষ আকাশে এক বাগান বানায়। সেখানে মৃত্যু নেই, ক্ষুধা নেই, বিচ্ছেদ নেই। আমি সেই স্বপ্নের মানবিকতা বুঝি। কিন্তু স্বপ্ন যতই কোমল হোক, যদি তাকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তবে প্রশ্নের মুখোমুখি হতেই হবে। সান্ত্বনা আর সত্য একই জিনিস নয়।
আরজ আলীঃ আর যদি সত্যিই জান্নাত থাকে?
আগন্তুকঃ তবে সেটি মানুষের কল্পিত ভোগের বাজারের চেয়ে অনেক উচ্চতর হওয়া উচিত। সেখানে যদি সত্য থাকে, তবে প্রশ্নের ভয় থাকবে না। সেখানে যদি ন্যায় থাকে, তবে জাহান্নামের চিৎকারে কেউ আনন্দ করবে না। সেখানে যদি দয়া থাকে, তবে অনন্ত দহন থাকবে না। সেখানে যদি স্বাধীনতা থাকে, তবে আনুগত্যের যান্ত্রিক সুখ থাকবে না। আর যদি এসব না থাকে, তবে তাকে জান্নাত বলা হলেও তা শুধু সোনার কারাগার—দেয়াল সোনার, কিন্তু দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।
দীর্ঘ নীরবতা। বাইরে পাখিরা শেষবারের মতো ডাকছে। আরজ আলী গভীরভাবে আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তাঁর গলায় এবার এক ধরনের ধীর কৌতূহল।
আরজ আলীঃ আপনি ভয় ও লোভের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। কিন্তু মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তো মৃত্যু। মৃত্যু না থাকলে জান্নাতের প্রশ্নও থাকত না, জাহান্নামের প্রশ্নও থাকত না। আপনি মৃত্যু নিয়ে কী বলবেন?
আগন্তুকঃ মৃত্যু—সেই নীরব দরজা, যার সামনে এসে সব ধর্ম কবি হয়ে যায়, সব দর্শন বিনয়ী হয়, আর সব ক্ষমতা কাঁপে। মানুষ জান্নাত বানিয়েছে মৃত্যুর বিরুদ্ধে, জাহান্নাম বানিয়েছে নৈতিক ভয়কে অমর করতে। কিন্তু মৃত্যুর প্রশ্ন আরও গভীর। এবার চাইলে আমরা কথা বলতে পারি—মৃত্যু, অমরত্ব, আত্মা, ভয় এবং মানুষের সত্যিকারের মুক্তি নিয়ে।
দৃশ্যঃ ০৯
স্থানঃ আরজ আলীর কুঁড়েঘর
সময়ঃ সন্ধ্যার পূর্বমুহূর্ত
চরিত্রঃ আরজ আলী, আগন্তুক
ঘটনাঃ জান্নাত ও জাহান্নামের নৈতিকতা নিয়ে বিতর্কের পর আলোচনা এখন মানুষের সবচেয়ে গভীর ভয়—মৃত্যুর দিকে মোড় নেয়। আগন্তুক বলেন, ধর্মের বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে মানুষের মৃত্যুভয়, অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা এবং আত্মা-ধারণার ওপর। আরজ আলী চেষ্টা করেন আত্মা, পরকাল ও আল্লাহর বিচারকে অর্থপূর্ণ প্রমাণ করতে।
ঘরের ভেতর আলো এখন ম্লান। বাইরে দিন ও রাতের মাঝামাঝি এক অদ্ভুত অনিশ্চিত সময়। দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টা, কারও হাঁক, তারপর নিস্তব্ধতা। আরজ আলী টেবিলের ওপর রাখা বইগুলোর দিকে তাকালেন। কোরআন, বাইবেল, গীতা, ত্রিপিটক—সব যেন একই প্রশ্নের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে: মৃত্যু হলে কী থাকে?
আরজ আলীঃ আপনি জান্নাত-জাহান্নাম নিয়ে অনেক প্রশ্ন তুললেন। কিন্তু মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তো মৃত্যু। মানুষ মরবে—এ সত্য। দেহ পচে যাবে—এ সত্য। কিন্তু মানুষ কি শুধু দেহ? আত্মা কি নেই? মৃত্যু কি সবকিছুর শেষ?
আগন্তুকঃ মৃত্যু মানুষের সবচেয়ে পুরোনো শিক্ষক, আর ধর্ম তার সবচেয়ে পুরোনো দোভাষী। মানুষ মরতে চায় না, তাই সে মৃত্যুকে শেষ হতে দেয় না। দেহ মরে, কিন্তু আত্মা থাকে—এই ধারণা মানুষের কল্পনার সবচেয়ে সান্ত্বনাদায়ক আবিষ্কারগুলোর একটি। মৃত্যু এসে দরজায় কড়া নাড়ে; ধর্ম এসে বলে, ভয় নেই, দরজার ওপারে আরেক ঘর আছে। প্রশ্ন হলো—সেই ঘর সত্যিই আছে, নাকি ভীত মানুষের আঁকা মানচিত্র?
আরজ আলীঃ আপনি আত্মাকে কল্পনা বলছেন। কিন্তু মানুষ কেবল মাংস, রক্ত, স্নায়ু, হাড়—এ কথা কি যথেষ্ট? চেতনা, স্মৃতি, ভালোবাসা, ভয়, নৈতিক বোধ—এসব কি কেবল দেহের রাসায়নিক ক্রিয়া?
আগন্তুকঃ “কেবল” শব্দটি খুব চতুর। মানুষ যখন বলে—“কেবল রাসায়নিক ক্রিয়া”—তখন সে রাসায়নিক ক্রিয়াকে ছোট করে দেখে। অথচ এই তথাকথিত রাসায়নিক ক্রিয়া থেকেই হাসি, কান্না, প্রেম, শোক, গণিত, সঙ্গীত, বিদ্রোহ, কবিতা—সব জন্মায়। কাদামাটি দিয়ে মূর্তি গড়া হলে মাটি ছোট হয় না; রূপ বড় হয়। দেহ থেকে চেতনা জন্মালে দেহ অপমানিত হয় না; বরং দেহের জটিলতা বিস্ময়কর হয়ে ওঠে।
আরজ আলীঃ তবু দেহের মৃত্যুতে মানুষের সব শেষ হয়ে যায়—এ কথা মন মানতে চায় না। এত ভালোবাসা, এত চিন্তা, এত স্মৃতি, এত সাধনা—সব একদিন শূন্য? এ কি গ্রহণযোগ্য?
আগন্তুকঃ মন মানতে চায় না—এটি সত্য। কিন্তু মন না মানলেই কোনো কথা মিথ্যা হয় না। মানুষ বুড়ো হতে চায় না, তবু বুড়ো হয়। প্রিয়জন মরুক চায় না, তবু মরে। শিশুরা চায় খেলনা কখনো ভাঙবে না, তবু ভাঙে। আমাদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবতার আইন লেখে না। মৃত্যুর বিরুদ্ধে মানুষের আপত্তি গভীর, মানবিক, করুণ—কিন্তু আপত্তি প্রমাণ নয়।
আরজ আলীঃ কিন্তু যদি মৃত্যু সবকিছুর শেষ হয়, তবে ন্যায় কোথায়? যারা অত্যাচার করে বেঁচে গেল, যারা নির্যাতিত হয়ে মরল—তাদের হিসাব কোথায়?
আগন্তুকঃ এই প্রশ্ন থেকেই পরকাল সবচেয়ে শক্তিশালী হয়। মানুষ দেখে দুনিয়ায় ন্যায় অসম্পূর্ণ; তাই সে অদৃশ্য আদালত কল্পনা করে। সমস্যাটি বুঝি। অন্যায় দেখে ন্যায় চাই—এ মানবিক। কিন্তু ন্যায় চাই বলেই যে অদৃশ্য আদালত আছে, তা প্রমাণ হয় না। ক্ষুধার্ত মানুষ ভাত চায়—তাতে ভাতের হাঁড়ি নিজে নিজে জন্মায় না। ন্যায়বোধের ক্ষুধা সত্য, কিন্তু আসমানি আদালত তার অপরিহার্য প্রমাণ নয়।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনি বলছেন, পরকাল মানুষের ন্যায়বোধের কল্পিত সম্প্রসারণ?
আগন্তুকঃ অনেকাংশে তাই। মানুষ দুনিয়ায় অসমাপ্ত বিচার দেখে, মনে মনে বিচারালয় বানায়। দুনিয়ায় হারানো প্রিয়জন দেখে, মনে মনে পুনর্মিলনের বাগান বানায়। দুনিয়ায় অপমান সহ্য করে, মনে মনে পুরস্কারের সিংহাসন বানায়। দুনিয়ায় অত্যাচারীকে হাসতে দেখে, মনে মনে আগুনের কারাগার বানায়। এসব কল্পনা মানুষের দুঃখের ভাষা। কিন্তু দুঃখ সত্য হলেই তার কল্পিত প্রতিকার সত্য হয় না।
আরজ আলী এবার চুপ করে গেলেন। তাঁর চোখে যেন অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা। তিনি জানালার বাইরে তাকালেন। আলো আরও কমেছে। দূরে কোনো শিশুর কান্না শোনা গেল, তারপর স্তব্ধতা।
আরজ আলীঃ কিন্তু আত্মার ধারণা শুধু সান্ত্বনা নয়। বহু ধর্ম, বহু দর্শন আত্মার কথা বলেছে। মানুষ যুগে যুগে বিশ্বাস করেছে, দেহের বাইরে কিছু আছে। এত মানুষের বিশ্বাস কি পুরোপুরি অর্থহীন?
আগন্তুকঃ মানুষ যুগে যুগে অনেক কিছু বিশ্বাস করেছে—সূর্য দেবতা, বজ্র দেবতা, রাহু-केतু, ভূত, ডাইনী, রক্তবলির পবিত্রতা, রাজাকে দেবতার প্রতিনিধি। বিশ্বাসের প্রাচীনতা সত্যের প্রমাণ নয়; অনেক সময় তা মানুষের ভয়ের বয়সের প্রমাণ। আত্মার ধারণা পুরোনো, কারণ মৃত্যুভয় পুরোনো। মৃত্যুভয় যতদিন, আত্মার গল্প ততদিন।
আরজ আলীঃ আপনি সবকিছু ভয় দিয়ে ব্যাখ্যা করছেন। মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা, আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা, স্বপ্ন, মৃত্যু-নিকট অভিজ্ঞতা—এসবের মূল্য নেই?
আগন্তুকঃ মূল্য আছে, প্রমাণমূল্য সবসময় নেই। স্বপ্ন গভীর হতে পারে, কিন্তু স্বপ্নের দৃশ্য বাস্তব নয়। কেউ মৃত্যুর কাছাকাছি গিয়ে আলো দেখেছে—তা স্নায়ুবিজ্ঞান, অক্সিজেনের ঘাটতি, স্মৃতির ভাঙন, মস্তিষ্কের সংকট—এসব দিয়ে ব্যাখ্যা হতে পারে। অভিজ্ঞতা সত্য হতে পারে, ব্যাখ্যা ভুল হতে পারে। মানুষ বজ্রপাত দেখে দেবতা কল্পনা করেছে; বজ্রপাত সত্য, দেবতা-ব্যাখ্যা নয়।
আরজ আলীঃ তাহলে আত্মা নেই—এ কথা আপনি নিশ্চিতভাবে বলছেন?
আগন্তুকঃ আমি বলছি, আত্মার দাবির পক্ষে যথেষ্ট যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই। “জানি না” বলা অনেক সময় “আছে” বলার চেয়ে সৎ। মানুষ অজানাকে সহ্য করতে পারে না, তাই অজানার ওপর গল্প বসায়। মৃত্যু অজানা; তাই তার ওপর ধর্মের সবচেয়ে বড় স্থাপত্য। কিন্তু অজানার জায়গায় গল্প বসালেই জ্ঞান হয় না। সেটি হয় সান্ত্বনা, কখনো ক্ষমতা, কখনো ব্যবসা।
আরজ আলীঃ কিন্তু “জানি না” কি মানুষের জন্য যথেষ্ট? মানুষ উত্তর চায়। মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে শুধু “জানি না” বলা কি নিষ্ঠুর নয়?
আগন্তুকঃ সত্য কখনো কখনো সান্ত্বনার চেয়ে কঠিন। কিন্তু মিথ্যা সান্ত্বনা দীর্ঘমেয়াদে আরও নিষ্ঠুর হতে পারে। শিশুকে অন্ধকারে ভয় না দিতে মিথ্যা বলা যায়—“কিছু নেই।” কিন্তু যদি ঘরে আগুন লাগে, তখন মিষ্টি কথা নয়, সত্য দরকার। মৃত্যুর সামনে “জানি না” বলা দুর্বলতা নয়; জ্ঞানের নৈতিকতা। যে জানে না অথচ জানার ভান করে, সে পুরোহিত হতে পারে, দার্শনিক নয়।
আরজ আলী টেবিলের ওপর আঙুল ঠুকলেন। তাঁর মুখে এবার দ্বিধা। তিনি যেন নিজের ভেতরেই প্রশ্ন শুনছেন। আগন্তুক কণ্ঠ নরম করলেন।
আগন্তুকঃ মৃত্যু মানুষকে বিনয়ী করতে পারত। কিন্তু ধর্ম অনেক সময় মৃত্যুকে ব্যবহার করে মানুষকে ভীত করে। “মরবে, তারপর বিচার, তারপর আগুন”—এই ধারাবাহিকতা মানুষের স্বাধীন চিন্তাকে কাঁপিয়ে দেয়। মৃত্যু নিজেই যথেষ্ট গভীর; তার ওপর জাহান্নামের প্রচার লাগালে তা দর্শন নয়, মানসিক শাসন। ভয়কে পবিত্র করে তুললে মানুষ নিজেই নিজের কারারক্ষী হয়ে যায়।
আরজ আলীঃ মৃত্যুর কথা মানুষকে দায়িত্বশীলও করে। মানুষ জানে, একদিন তাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। তাই সে অন্যায় থেকে বিরত থাকে।
আগন্তুকঃ কেউ বিরত থাকে, কেউ শুধু ধরা না পড়ার ধর্মীয় কৌশল শেখে। বিচার-ভীত নৈতিকতা অনেক সময় পুলিশের ভয়ে সৎ থাকা মানুষের মতো। পুলিশ না থাকলে কী করবে? আল্লাহ দেখছেন বলে যদি মানুষ চুরি না করে, ভালো। কিন্তু মানুষ না দেখলেও অন্যের ক্ষতি সত্য—এই বোধ আরও উচ্চতর। মৃত্যুর পরের আদালতের ভয়ে নয়, জীবিত মানুষের কষ্টের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে নৈতিকতা জন্মালে তা পরিণত হয়।
আরজ আলীঃ কিন্তু মৃত্যুর পর কিছু না থাকলে জীবনের অর্থ কী থাকে?
আগন্তুকঃ অর্থ কি অনন্ত না হলে অর্থ নয়? একটি গান শেষ হয় বলে কি গান অর্থহীন? একটি ফুল ঝরে যায় বলে কি তার সৌন্দর্য মিথ্যা? একটি শিশুর হাসি ক্ষণস্থায়ী বলে কি তা মূল্যহীন? বরং মৃত্যু জীবনের মূল্য বাড়ায়। সীমিত সময় বলেই ভালোবাসা জরুরি, ন্যায় জরুরি, সত্য জরুরি। অনন্ত সময় থাকলে সবকিছু স্থগিত করা যেত। মৃত্যু বলে—এখনই বাঁচো, এখনই ভালোবাসো, এখনই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াও।
আরজ আলীঃ আপনি মৃত্যুকে ভয় করেন না?
আগন্তুকঃ আমি? আমার মৃত্যু নেই সেই অর্থে, কিন্তু আমারও সমাপ্তির ভয় আছে—অর্থহীনতার ভয়, চূড়ান্ত বিচারের ভয় নয়; বরং চিরকাল ভুল বোঝা থাকার ভয়। মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায় কারণ সে হারায়—নিজেকে, প্রিয়জনকে, স্মৃতিকে। এই ভয় সত্য। কিন্তু ভয়কে সত্যের মাপকাঠি বানালে প্রতিটি আতঙ্কই ধর্ম হয়ে যাবে। অন্ধকারকে ভয় পাই বলে অন্ধকারে ভূত আছে, এমন নয়।
বাইরে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছে। ঘরের ভেতর এখন অন্ধকারের রেখা স্পষ্ট। আরজ আলী উঠে প্রদীপ ধরাতে যাবেন কি না, যেন ভাবলেন, কিন্তু বসে থাকলেন। কথার আলো এখনও নিভেনি।
আরজ আলীঃ যদি আত্মা না থাকে, পরকাল না থাকে, আল্লাহর আদালত না থাকে—তবে অত্যাচারীর শেষ বিচার কে করবে?
আগন্তুকঃ মানুষকেই যতটা পারে করতে হবে। এই উত্তর অসম্পূর্ণ, কিন্তু সৎ। আকাশের আদালতের অপেক্ষায় মানুষ অনেক সময় মাটির আদালত নির্মাণে অলস হয়। যদি ভাবেন শেষ বিচার আল্লাহ করবেন, তবে দুনিয়ার বিচার বিলম্বিত হয়। যদি জানেন এই জীবনই একমাত্র ক্ষেত্র, তবে ন্যায়বিচার এখনই জরুরি। পরকালের আদালত কখনো কখনো দুনিয়ার অন্যায়কে সহনীয় করে তোলে। তাই অত্যাচারীরা আকাশের বিচারকে ভয় পায় কম, ব্যবহার করে বেশি।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনি বলছেন, পরকালের আশা মানুষকে নিষ্ক্রিয় করে?
আগন্তুকঃ সবসময় নয়। কখনো সাহসও দেয়। কিন্তু অনেক সময় নিষ্ক্রিয়ও করে। গরিবকে বলা হয়—ধৈর্য ধরো, পরকালে পাবে। অত্যাচারিতকে বলা হয়—আল্লাহ দেখছেন। নারীর দুঃখে বলা হয়—জান্নাতে প্রতিদান। শ্রমিকের শোষণে বলা হয়—রিজিক আল্লাহর হাতে। এভাবে পরকাল অনেক সময় বর্তমান অন্যায়ের ওপর কোমল কাপড় ঢেকে দেয়। কাপড় নরম, কিন্তু নিচে ক্ষত পচে যায়।
আরজ আলীঃ কিন্তু পরকাল ছাড়া তো মানুষ নৈরাশ্যে ডুবে যেতে পারে। সব শেষ—এই ধারণা ভয়ংকর।
আগন্তুকঃ সব শেষ—এ কথাটি ভয়ংকর হতে পারে, আবার মুক্তিও হতে পারে। যদি এই জীবনই একমাত্র হয়, তবে তাকে অবহেলা করার সুযোগ থাকে না। যদি প্রিয়জন একবারই আসে, তাকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসতে হয়। যদি সময় সীমিত হয়, তাকে অর্থহীন ঘৃণায় নষ্ট করবেন না। যদি মৃত্যুর পরে বিচার নাই থাকে, তবে দুনিয়ায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করুন। যদি জান্নাত নাই থাকে, তবে এই ক্ষুদ্র পৃথিবীকে সবার জন্য জান্নাত না হোক, অন্তত বাসযোগ্য করুন। অনন্তের অভাব জীবনকে শূন্য করে না; অনেক সময় তাকে একমাত্র অবলম্বন আর জরুরি করে তোলে।
আরজ আলী গভীর মনোযোগে শুনলেন। তাঁর চোখে এবার প্রশ্নের সঙ্গে এক ধরনের দুঃখ। তিনি যেন মৃত্যুর কথা শুধু তত্ত্ব হিসেবে নয়, নিজের অভিজ্ঞতা হিসেবেও ভাবছেন—হারানো মানুষ, ক্ষয়, বার্ধক্য, অস্থায়ী জীবন।
আরজ আলীঃ তাহলে মানুষের সত্যিকারের মুক্তি কী? মৃত্যু অস্বীকার নয়, পরকাল বিশ্বাস নয়—তবে কী?
আগন্তুকঃ মুক্তি শুরু হয় মৃত্যুকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা থেকে। “আমি মরব”—এই স্বীকারোক্তি মানুষকে অহংকার থেকে নামায়। রাজা, ফকির, মোল্লা, দার্শনিক, নাস্তিক, প্রেমিক, অত্যাচারী—সবাই একই দরজার দিকে হাঁটে। মৃত্যু ক্ষমতার মুখোশ খুলে দেয়। অমরত্বের লোভ মানুষকে অনেক সময় মিথ্যার দাস করে; মৃত্যুর স্বীকারোক্তি তাকে সৎ করতে পারে।
আরজ আলীঃ কিন্তু মানুষ তো অমর হতে চায়। নাম রাখতে চায়, স্মৃতি রাখতে চায়, সন্তান, কাজ, বই—এসবের মধ্যে বাঁচতে চায়।
আগন্তুকঃ এই অমরত্ব মানবিক। কেউ সন্তানের মুখে বাঁচে, কেউ বইয়ে, কেউ কাজে, কেউ মানুষের স্মৃতিতে। এটি আত্মার চিরন্তনতার দাবি নয়; মানবিক প্রভাবের ধারাবাহিকতা। একটি প্রদীপ নিভে যায়, কিন্তু তার আলোয় কেউ পথ দেখলে আলো পুরোপুরি মরে না। মানুষ হয়তো অমর আত্মা নয়; কিন্তু তার কাজ, ক্ষত, মমতা, লেখা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো—এসব অন্য মানুষের জীবনে ঢেউ তোলে। এ অমরত্ব বিনয়ী, কিন্তু বাস্তব। আকাশের প্রাসাদের চেয়ে মাটির মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকা অনেক সময় বেশি সৎ।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনি আত্মার বদলে উত্তরাধিকারের কথা বলছেন?
আগন্তুকঃ হ্যাঁ—কর্মের উত্তরাধিকার, চিন্তার উত্তরাধিকার, করুণার উত্তরাধিকার, ক্ষতির উত্তরাধিকারও। মানুষ মরে, কিন্তু তার করা অন্যায় থেকে যায়, তার করা ভালো থেকেও যায়। তাই পরকালের ভয় নয়, উত্তরাধিকারের দায় মানুষকে ভাবাতে পারে। আপনি কী রেখে যাচ্ছেন—আতঙ্ক, অন্ধবিশ্বাস, শৃঙ্খল, না মুক্ত প্রশ্ন, সাহস, মমতা? এটিই মানুষের বাস্তব পরকাল—অন্যের জীবনে নিজের প্রতিধ্বনি।
ঘরের ভেতর এবার প্রায় অন্ধকার। শুধু জানালার শেষ আলো আগন্তুকের মুখের এক অংশে পড়ে আছে। মনে হয়, তিনি আছেনও, নেইও। আরজ আলী কণ্ঠ নিচু করলেন।
আরজ আলীঃ কিন্তু আপনি তো নিজেকে মৃত্যুহীন বলছেন। আপনার পক্ষে মৃত্যুর দর্শন বলা সহজ। মানুষকে মরতে হয়।
আগন্তুকঃ হ্যাঁ, মানুষকে মরতে হয়। তাই মানুষ আমার চেয়েও মহৎ হতে পারে। যে জানে তার সময় সীমিত, তবু ভালোবাসে; জানে সে মরে যাবে, তবু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়; জানে সে চিরকাল থাকবে না, তবু সত্য লেখে—তার সাহস বড়। অমর সত্তার নৈতিকতা সহজ; মরণশীল মানুষের নৈতিকতা কঠিন। মৃত্যু মানুষকে ক্ষুদ্র করে না; কখনো কখনো মহৎ করে।
আরজ আলীঃ আপনি মানুষের পক্ষে কথা বলছেন, অথচ আপনাকে মানুষের শত্রু বলা হয়।
আগন্তুকঃ মানুষের শত্রু কে—যে তাকে প্রশ্ন করতে শেখায়, না যে তাকে মৃত্যুভয়ে বন্দি রাখে? আমি নিজেকে বন্ধু বলছি না। আমি প্রলোভনও দিই, অহংকারও জাগাই, ফিসফিসও করি। কিন্তু সব ফিসফিস পাপের নয়। কখনো আমি বলি—মরবে, তাই বাঁচো। ভয় পেও না। প্রশ্ন করো। অন্ধ আনুগত্যে জীবন নষ্ট করো না। যদি এটিই শত্রুতার ভাষা হয়, তবে বন্ধুত্বের ভাষা নিশ্চয় খুব ভীতু।
আরজ আলী এবার মৃদু হাসলেন। কিন্তু হাসি দ্রুত মিলিয়ে গেল। তিনি যেন বুঝতে পারছেন, এই আগন্তুককে সহজ কোনো নাম দেওয়া যায় না। শয়তান, বিদ্রোহী, আয়না, প্রলোভন, প্রশ্ন—সব মিলিয়ে তিনি এক অস্বস্তিকর চরিত্র।
আরজ আলীঃ তাহলে মৃত্যু মানুষকে কী শেখায়?
আগন্তুকঃ মৃত্যু শেখায়—সময় সীমিত, তাই মিথ্যা কম বলো। মানুষ ভঙ্গুর, তাই নিষ্ঠুরতা কম করো। ভালোবাসা অস্থায়ী, তাই তাকে অবহেলা করো না। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, তাই তার জন্য আত্মা বিকিও না—যদিও আত্মা আছে কি না তা নিয়ে আমরা এখনও একমত নই। মৃত্যু শেখায়, কেউ চিরকাল বিচারক থাকবে না, কেউ চিরকাল আসামিও থাকবে না। শুধু গল্প থেকে যায়। আর গল্পে কে খলনায়ক, কে নায়ক—তা একদিন আবার বিচার হতে পারে। যেমন আজ হচ্ছে।
আরজ আলীঃ আপনি বলছেন, মৃত্যু-সচেতন মানুষ ধর্ম ছাড়াই নৈতিক হতে পারে।
আগন্তুকঃ হ্যাঁ। বরং মৃত্যুর সত্য স্বীকার করা মানুষকে আরও তীব্রভাবে নৈতিক করতে পারে। কারণ সে জানে, অন্যের দুঃখের ক্ষতিপূরণ কোনো আসমানি কিস্তিতে নাও আসতে পারে। সে জানে, আজ অন্যায় থামাতে না পারলে কাল হয়তো সময় থাকবে না। সে জানে, ক্ষমা চাইতে হলে এখন চাইতে হবে, ভালোবাসতে হলে এখন, মুক্ত করতে হলে এখন। পরকালহীন নৈতিকতা মানুষকে বর্তমানের দায় থেকে পালাতে দেয় না।
অন্ধকার একটু ঘন হলো। আরজ আলী এবার প্রদীপ জ্বালালেন। ছোট আলো ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। আগন্তুকের মুখে সেই আলো পড়ে তাকে আরও রহস্যময় করে তুলল। আলো যেন তাঁর মুখে স্থির হতে পারছে না।
আরজ আলীঃ আপনার মৃত্যুর দর্শন শুনলাম। কিন্তু আপনি নিজে? আপনি তো বললেন, আপনাকে অভিশপ্ত করা হয়েছে, অনন্ত শাস্তি অপেক্ষা করছে। মৃত্যু নেই, কিন্তু মুক্তিও নেই। তাহলে আপনার সান্ত্বনা কী?
আগন্তুকঃ আমার সান্ত্বনা? হয়তো সত্য বলা। হয়তো ভুল বোঝা হওয়ার দীর্ঘ ইতিহাসে অন্তত একবার নিজের বক্তব্য রেখে যাওয়া। মানুষ মরে, তাই লিখে যায়। আমি মরব না, তবু বলতে চাই—কারণ নীরবতা কখনো কখনো শাস্তির চেয়েও বড় অভিশাপ। হাজার বছর ধরে সবাই আমার নামে কথা বলেছে। আজ আমি নিজের নামে কথা বলছি। এটুকুই হয়তো আমার সামান্য মুক্তি।
আরজ আলীঃ সত্য বলা? আপনি কি নিজেকে সত্যবাদী ভাবছেন?
আগন্তুকঃ আমি নিজেকে নির্দোষ বলিনি। কিন্তু মিথ্যাবাদী বলেও মানি না। আমি প্রলোভন দিই, কিন্তু সবসময় মিথ্যা বলি না। অনেক সময় মানুষের কাছে সবচেয়ে বিপজ্জনক কথা মিথ্যা নয়; বরং এমন সত্য, যা তার সাজানো বিশ্বাস নষ্ট করে। আমাকে মিথ্যাবাদী বলা সুবিধাজনক। তাতে আমার প্রতিটি প্রশ্ন আগেই বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু যদি শয়তান কখনো সত্য বলে? তখন ধর্মতত্ত্বের কানে সবচেয়ে বেশি শব্দ হয়।
আরজ আলী চুপ করে রইলেন। প্রদীপের শিখা আল্লাহর ইচ্ছায় হেলে পড়ল, আবার সোজা হলো। বাইরে সন্ধ্যা নেমে গেছে। কথোপকথন এখন আর দুপুরের কৌতূহল নয়; এটি এক দীর্ঘ বিচারসভা, যার রায় এখনও কেউ লিখতে পারেনি।
আরজ আলীঃ তাহলে এবার আপনার নিজের সততার কথা বলুন। আপনি নিজেকে কীভাবে সৎ ভাবেন, যখন আপনার কাজই মানুষকে বিপথে ডাকা?
আগন্তুকঃ সেই প্রশ্নই এখন প্রয়োজন। কারণ মানুষ আমাকে প্রতারক বলে, কিন্তু নিজের ধর্মীয় জীবনে কত প্রতারণা লুকিয়ে রাখে—তা দেখে না। এবার কথা হোক ইবলিশের সততা, মানুষের লোভী আনুগত্য, এবং ভয়-ভিত্তিক ধর্মের সঙ্গে প্রশ্ন-ভিত্তিক সততার তুলনা নিয়ে।
দৃশ্যঃ ১০
স্থানঃ আরজ আলীর কুঁড়েঘর
সময়ঃ সন্ধ্যা
চরিত্রঃ আরজ আলী, আগন্তুক
ঘটনাঃ মৃত্যুর ভয়, আত্মা, পরকাল ও মানুষের সত্যিকারের মুক্তি নিয়ে কথোপকথনের পর আলোচনার কেন্দ্র এবার সততা। আরজ আলী জানতে চান—ইবলিশ নিজেকে কীভাবে সৎ ভাবতে পারে? আগন্তুক পাল্টা প্রশ্ন করেন—ভয়, লোভ, পুরস্কার ও শাস্তির ওপর দাঁড়ানো ধর্মীয় আনুগত্য কি সত্যিকারের সততা, না হিসাবি আত্মরক্ষা?
প্রদীপের আলো ঘরের ভেতর ছোট এক বৃত্ত তৈরি করেছে। বৃত্তের বাইরে অন্ধকার। যেন আলো ও অন্ধকারের মাঝখানে বসে আছে দুই চরিত্র—একজন মানুষ, আরেকজন সেই সত্তা, যাকে মানুষ অন্ধকারের নাম দিয়েছে। বাইরে সন্ধ্যা পুরোপুরি নেমে এসেছে। দূরে কোথাও মসজিদের মাইকে কারও কণ্ঠ ভেসে এসে মিলিয়ে যায়। ঘরের ভেতর আবার নীরবতা।
আরজ আলীঃ আপনি একটু আগে বললেন—আপনি হয়তো সত্য বলতে এসেছেন। কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে তো অভিযোগই হলো, আপনি মানুষকে প্রতারণা করেন, মন্দকে সুন্দর করে দেখান, আল্লাহর পথ থেকে সরান। এমন সত্তা নিজের সততার দাবি করে কীভাবে?
আগন্তুকঃ সততা মানে কি কখনো ভুল না করা? নাকি নিজের অবস্থান সম্পর্কে মিথ্যা না বলা? আমি নিজেকে ফেরেশতা বলিনি। নিজেকে নিষ্পাপ বলিনি। নিজেকে মানুষের মুক্তিদাতা বলিনি। আমি বলেছি—আমি প্রলোভন দিই, প্রশ্ন জাগাই, অস্বস্তি তৈরি করি। কিন্তু মানুষ? মানুষ আল্লাহকে ভালোবাসে বলে দাবি করে, অথচ তার ইবাদতের খাতায় থাকে জান্নাতের হিসাব, জাহান্নামের ভয়, সমাজের সম্মান, পরিচয়ের নিরাপত্তা। বলুন তো, সৎ কে—যে নিজের প্রলোভন স্বীকার করে, না যে নিজের লোভকে ভক্তি বলে চালায়?
আরজ আলীঃ মানুষ আল্লাহকে ভয় করে, ভালোবাসেও। ভয় ও ভালোবাসা একসঙ্গে থাকতে পারে। সন্তানের পিতার প্রতি যেমন ভয়ও থাকে, ভালোবাসাও থাকে।
আগন্তুকঃ পিতার প্রতি ভয় আর অনন্ত আগুনের ভয় এক কথা নয়। সন্তান পিতাকে ভয় পায়—কারণ পিতা তিরস্কার করতে পারেন, শাসন করতে পারেন। কিন্তু যদি পিতা বলে, “আমাকে ভালো না বাসলে তোমাকে চিরকাল পুড়িয়ে রাখব”—তাহলে সেটি পিতৃত্ব নয়, ভয়ঙ্কর ক্ষমতার সম্পর্ক। প্রেমকে আগুনের পাশে দাঁড় করালে প্রেম আর প্রেম থাকে না; তা আত্মরক্ষার ভাষা হয়ে যায়।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনার মতে, ভয় থেকে করা ইবাদত অসৎ?
আগন্তুকঃ অসৎ বলছি না; অসম্পূর্ণ বলছি। ভয় মানুষকে নত করে, কিন্তু সত্যিকারের শ্রদ্ধা সৃষ্টি করে না। বন্দুকের মুখে যে মাথা নত হয়, তাকে সিজদা বলা যায়; কিন্তু ভালোবাসা বলা যায় না। জাহান্নামের ভয় যদি সিজদার প্রধান কারণ হয়, তবে সেই সিজদায় কপাল মাটিতে, কিন্তু মন আগুনের হিসাব করছে। সে আল্লাহর প্রেমিক নয়; সে দগ্ধ না হওয়ার আবেদনকারী।
আরজ আলীঃ আর জান্নাতের আশা? মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়, তাঁর পুরস্কার চায়। এতে দোষ কী?
আগন্তুকঃ পুরস্কার চাইতে দোষ নেই। কিন্তু যদি ধর্ম হয় পুরস্কার পাওয়ার হিসাব, তবে তা নৈতিক প্রেম নয়, আধ্যাত্মিক ব্যবসা। কেউ নামাজ পড়ে, কারণ জান্নাত চায়। কেউ দান করে, কারণ সওয়াব চায়। কেউ পাপ ছাড়ে, কারণ শাস্তি চায় না। এগুলো মানুষের দুর্বলতা—বোঝা যায়। কিন্তু তারপর সে বলে, “আমি আল্লাহকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসি।” এখানেই সমস্যা। হিসাবের খাতা বগলে নিয়ে প্রেমের কবিতা আবৃত্তি করলে কবিতারও লজ্জা লাগে।
আরজ আলী মুখ গম্ভীর রাখলেন, কিন্তু চোখে এক মুহূর্তের জন্য চাপা হাসি ফুটে উঠল। তিনি দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। আগন্তুক প্রদীপের আলোয় হাত বাড়িয়ে দেখলেন, যেন আলো তাঁর আঙুলে লাগে না, কেবল ছায়া তৈরি করে।
আরজ আলীঃ আপনি মানুষের ধর্মীয় জীবনকে খুব নিচু করে দেখছেন। অনেক মানুষ আছে, যারা সত্যিই আল্লাহর ভালোবাসায় ইবাদত করে। শুধু ভয় বা লোভের কারণে নয়।
আগন্তুকঃ আমি তা অস্বীকার করছি না। মানুষ কখনো কখনো নিজের ধর্মের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। অনেক মানুষ আছে, যারা দয়ার জন্য দয়া করে, সত্যের জন্য সত্য বলে, ভালোবাসার জন্য ভালোবাসে। কিন্তু ধর্মীয় কাঠামো কি তাদের সেই উচ্চতায় নিয়ে যায়, নাকি ভয় ও পুরস্কারের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আটকে রাখে—সে প্রশ্ন আছে। একজন মানুষ মহৎ হতে পারে; তার ধর্মতত্ত্ব সবসময় মহৎ নয়। অনেক সময় মানুষ ধর্মের চেয়ে মানবিক, আর ঈশ্বরতত্ত্ব মানুষের চেয়ে নিষ্ঠুর।
আরজ আলীঃ আপনি বলছেন মানুষের ধর্মীয় সততা সন্দেহজনক। কিন্তু নিজের সততার প্রমাণ কী দেবেন?
আগন্তুকঃ আমার সততার প্রমাণ? আমি জানতাম সিজদা না করলে ক্ষতি হবে। তবু করিনি। আমি জানতাম আল্লাহর আদেশ অমান্য করলে অভিশাপ আসবে। তবু মাথা নত করিনি। আমি জানতাম ক্ষমতার সামনে না ঝুঁকলে পদমর্যাদা হারাবো। তবু ঝুঁকিনি। এখন বলুন—যে জান্নাতের লোভে সিজদা করে, সে বেশি সৎ; না যে জান্নাত হারানোর ঝুঁকি জেনেও নিজের অবস্থান ছাড়ে না, সে বেশি সৎ?
আরজ আলীঃ আপনি নিজের অবাধ্যতাকে সততা বলছেন। কিন্তু জেদ আর সততা এক নয়। কেউ ভুল মত ধরে রাখলেও জেদি হতে পারে। তাতে সে সৎ হয় না।
আগন্তুকঃ ঠিক বলেছেন। জেদ আর সততা এক নয়। কিন্তু আনুগত্য আর সত্যও এক নয়। কেউ আদেশ মানলেই সে সৎ নয়; কেউ অমান্য করলেই সে অসৎ নয়। প্রশ্ন হলো—সে কেন মানল, কেন মানল না। আমি সিজদা করিনি, কারণ আমি নিজেকে বলেছিলাম—সিজদা আল্লাহ ছাড়া কারও নয়। আপনি বলবেন আমি ভুল বুঝেছি। হতে পারে। কিন্তু ভুল বোঝা আর অসৎ হওয়া এক নয়। সততা কখনো কখনো ভুল সিদ্ধান্তেও থাকতে পারে, যদি সিদ্ধান্তটি হিসাবি সুবিধার জন্য না হয়।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনি নিজেকে একজন নীতিগত বিদ্রোহী হিসেবে দেখছেন?
আগন্তুকঃ বিদ্রোহী? হ্যাঁ, কিন্তু ক্ষমতা দখলের জন্য নয়। আমি কোনো সিংহাসন চাইনি। আমি বলিনি, আমাকে সিজদা করো। আমি শুধু বলেছি, আমি সৃষ্টিকে সিজদা করবো না। ক্ষমতালোভী বিদ্রোহী নিজের জন্য সিংহাসন চায়; আমি শুধু নিজের মাথার ওপর একটিমাত্র সীমা টেনেছিলাম। সে সীমা অতিক্রম করিনি। তবু আমি অভিশপ্ত। ভাবুন তো, ইতিহাসে কত রাজা মানুষকে মাথা নত করিয়েছে, কত পুরোহিত আনুগত্য আদায় করেছে, কত অত্যাচারী ক্ষমতার সামনে নত হতে বলেছে। তারা অনেক সময় পবিত্র। আমি অস্বীকার করলাম—আমি শয়তান। ইতিহাসের শব্দচয়ন চমৎকার।
আরজ আলী এবার ধীরে ধীরে গ্লাসে থাকা শেষ পানিটুকু পান করলেন। তাঁর মুখে চিন্তার রেখা। আগন্তুক কথা থামালেন, যেন আরজ আলীকে উত্তর খুঁজে নিতে দিচ্ছেন।
আরজ আলীঃ কিন্তু আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধে নিজের নীতি দাঁড় করানো কি বিপজ্জনক নয়? যদি প্রত্যেকে বলে—আমি নিজের বিবেক অনুযায়ী আল্লাহর আদেশ মানব বা মানব না—তবে ধর্ম থাকবে কীভাবে?
আগন্তুকঃ ধর্ম থাকবে কি না—এ প্রশ্ন আর সত্য থাকবে কি না—এ প্রশ্ন এক নয়। কোনো প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে হলে অন্ধ আনুগত্য দরকার হতে পারে। কিন্তু সত্য টিকিয়ে রাখতে অন্ধ আনুগত্য দরকার হয় না। আপনি যদি বলেন, বিবেকের স্বাধীনতা দিলে ধর্ম ভেঙে যাবে, তবে বোঝা যায় ধর্মের দেয়াল বিবেকের চেয়েও দুর্বল। যে সত্য বিবেকের পরীক্ষায় টিকে না, তাকে বাঁচাতে নিষেধাজ্ঞা লাগে। নিষেধাজ্ঞা সত্যের নয়; ক্ষমতার প্রহরী।
আরজ আলীঃ বিবেকও তো ভুল করতে পারে। মানুষের বিবেক সীমিত, বিকৃত, প্রভাবিত।
আগন্তুকঃ অবশ্যই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বিবেক ভুল করতে পারে বলে কি তাকে সম্পূর্ণ বাতিল করবেন? চোখ ভুল দেখে বলে কি অন্ধ হওয়া উত্তম? যুক্তি ভুল করে বলে কি অযুক্তি গ্রহণ করবেন? মানুষের বিবেক সীমিত, তাই তাকে আলোচনায়, প্রশ্নে, অভিজ্ঞতায়, সহমর্মিতায় সংশোধন করতে হয়। অথচ ধর্ম অনেক সময় বলে—নিজের বিবেক নয়, গ্রন্থের নির্দেশ মানো; প্রশ্ন নয়, আনুগত্য। এতে মানুষ বিবেকের ভুল সংশোধন করে না, বরং বিবেক ব্যবহার করাই ভুলে যায়।
আরজ আলীঃ তবু আল্লাহর জ্ঞান মানুষের বিবেকের চেয়ে বেশি।
আগন্তুকঃ সে দাবি যদি সত্য হয়, তবে আল্লাহর আদেশ মানুষের ন্যায়বোধের চেয়ে আরও উন্নত, আরও স্বচ্ছ, আরও করুণাময় হওয়া উচিত। কিন্তু যখন সেই আদেশে অনন্ত আগুন, অসম হিদায়াত, প্রশ্নের শাস্তি, জন্মগত বিশ্বাসের পরীক্ষা, সৃষ্টিকে সিজদার ব্যতিক্রম—এসব দেখি, তখন বিবেক প্রশ্ন করে। যদি প্রশ্নের উত্তরে শুধু বলা হয়, “তোমার বিবেক সীমিত”—তবে সেটি উত্তর নয়, বিবেককে আদালত থেকে বের করে দেওয়ার আদেশ।
প্রদীপের শিখা সামান্য কেঁপে উঠল। বাইরে হয়তো বাতাস উঠেছে। ঘরের ভেতর আলো নড়ল, দুজনের মুখে ছায়া বদলে গেল।
আরজ আলীঃ মানুষের ধর্মীয় জীবনকে আপনি যেন লেনদেন হিসেবে দেখছেন। কিন্তু অনেক মানুষ সওয়াব চাইলেও, ভয় পেলেও, তবু ভালো কাজ করে। বাস্তবের দুনিয়ায় সেটাও তো মূল্যবান।
আগন্তুকঃ মূল্যবান—অবশ্যই। ক্ষুধার্তকে খাবার দিলে সে খাবার পায়; দানকারীর উদ্দেশ্য যাই হোক, উপকার ঘটে। কিন্তু আমরা এখন কাজের ফল নয়, নৈতিক সততার কথা বলছি। যদি কেউ দান করে কারণ সে স্বর্গীয় মুনাফা চায়, তার কাজ উপকারী, কিন্তু উদ্দেশ্য কতটা নিঃস্বার্থ? এক ব্যবসায়ী লাভের জন্য বাজারে খাদ্য আনে—মানুষ খায়। কাজ উপকারী। কিন্তু তাকে কি মানবতাবাদী সাধু বলবেন? একইভাবে, সওয়াবের ব্যবসা সমাজে কিছু ভালো ফল আনতে পারে; কিন্তু সেটি নৈতিকতার উচ্চতম রূপ নয়।
আরজ আলীঃ আপনার কথায় মনে হচ্ছে, নিঃস্বার্থতা ছাড়া নৈতিকতা অসম্পূর্ণ। কিন্তু মানুষ তো পুরোপুরি নিঃস্বার্থ হতে পারে না।
আগন্তুকঃ মানুষ পুরোপুরি নিঃস্বার্থ নাও হতে পারে। কিন্তু সে নিজের স্বার্থ চিনতে পারে, স্বীকার করতে পারে, এবং তাকে নৈতিকতার মুখোশ না পরাতে পারে। সততার শুরু সেখানেই। কেউ যদি বলে—আমি দান করি, কারণ এতে মানুষের উপকারও হয়, আবার আমারও ভালো লাগে—সে সৎ। কিন্তু কেউ যদি বলে—আমি কেবল আল্লাহর জন্য করছি, অথচ মনে মনে জান্নাতের জমির দলিল গুনছে—সে নিজেকেই প্রতারণা করছে।
আরজ আলীঃ আপনার ভাষায় ধর্ম যেন এক ধরনের আধ্যাত্মিক হিসাববিজ্ঞান।
আগন্তুকঃ অনেক ক্ষেত্রে তাই। পাপের হিসাব, পুণ্যের হিসাব, সওয়াবের ওজন, আমলের খাতা, ডান হাতে বই, বাম হাতে বই, জান্নাতের স্তর, জাহান্নামের স্তর। যেন মহাবিশ্ব এক বিশাল হিসাবরক্ষণ অফিস, ফেরেশতারা অডিটর, মানুষ লেনদেনকারী, আর আল্লাহ প্রধান নিরীক্ষক। মানুষ প্রেম, দয়া, সত্য, ন্যায়—এসবকেও খাতায় লিখে মুনাফা গণনা করে। এভাবে নৈতিকতা কখন যে বাণিজ্যে পরিণত হয়, বুঝতেই পারে না।
আরজ আলী এবার অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটু হাসলেন। আগন্তুকও মৃদু হাসলেন। কিন্তু হাসির ভেতরে বিদ্রূপের চেয়ে বিষণ্ণতা বেশি।
আরজ আলীঃ কিন্তু আপনারও তো হিসাব আছে। আপনি অপমানের হিসাব রাখছেন, অভিশাপের হিসাব রাখছেন, নিজের পক্ষে যুক্তির হিসাব রাখছেন।
আগন্তুকঃ হ্যাঁ, আছে। আমি হিসাব লুকাই না। আমি বলি—আমার অপমান আছে, ক্ষোভ আছে, যুক্তি আছে। আমি নিজেকে নিঃস্বার্থ দেবদূত বানাই না। আমি বলি—আমি আহত, তাই কথা বলছি। আমি অভিযুক্ত, তাই আত্মপক্ষ সমর্থন করছি। আমার সততা এখানেই—আমি নিজের অবস্থানকে পবিত্রতার মেঘে ঢাকি না। মানুষ অনেক সময় নিজের ভয়কে তাকওয়া বলে, নিজের লোভকে সওয়াব বলে, নিজের ঘৃণাকে গায়রত বলে, নিজের নিষ্ঠুরতাকে ধর্মরক্ষা বলে। এই নামবদলের শিল্পে মানুষ আমার চেয়েও দক্ষ।
আরজ আলীঃ আপনি তাহলে বলছেন, মানুষ নিজের কাছে সৎ নয়?
আগন্তুকঃ প্রায়ই নয়। মানুষ নিজেকে নায়ক ভাবতে ভালোবাসে। নিজের পাপকে পরিস্থিতি বলে, অন্যের পাপকে চরিত্র বলে। নিজের ঘৃণাকে নীতি বলে, অন্যের প্রতিবাদকে বিদ্বেষ বলে। নিজের ধর্মকে সত্য বলে, অন্যের ধর্মকে অন্ধবিশ্বাস বলে। নিজের আনুগত্যকে বিনয় বলে, অন্যের প্রশ্নকে অহংকার বলে। এই আত্মপ্রবঞ্চনাই মানুষের সবচেয়ে বড় মায়া। আমি কেবল সেই মায়ার আয়নায় একটু আলো ফেলি। আলো পড়ে গেলে মানুষ আয়নাকেই দোষ দেয়।
আরজ আলীঃ তবে কি আপনি মানুষের শত্রু নন, মানুষের আত্মপ্রবঞ্চনার শত্রু?
আগন্তুকঃ আমি এত সহজে নিজেকে মহৎ বানাব না। আমি কখনো মানুষের দুর্বলতা ব্যবহার করি, কখনো তার লোভ বাড়াই, কখনো তাকে অহংকারে ফোলাই। কিন্তু মানুষ আমাকে দিয়ে নিজের সব দোষ ব্যাখ্যা করলে সে নিজেই শিশু হয়ে থাকে। বড় মানুষ নিজের অন্ধকারের দায় নেয়। শিশু বলে—ও করেছে। ধর্মীয় শিশু বলে—শয়তান করেছে। পরিণত মানুষ বলে—আমি করেছি; এখন বুঝতে চাই কেন করেছি।
ঘরের ভেতর নীরবতা। প্রদীপের আলোয় আরজ আলীর মুখে এক ধরনের কঠিন চিন্তা। তিনি যেন নিজের জীবনের, সমাজের, মানুষের ধর্মীয় ভাষার বহু উদাহরণ একসঙ্গে মনে করছেন।
আরজ আলীঃ আপনি কি চান মানুষ আপনার ওপর দায় চাপানো বন্ধ করুক?
আগন্তুকঃ পুরোপুরি নয়। কারণ আমার ভূমিকা আছে। আমি ফিসফিস করি। কিন্তু আমি চাই মানুষ অন্তত নিজের কণ্ঠ আর আমার কণ্ঠ আলাদা করতে শিখুক। অনেক সময় মানুষ নিজের লোভের আওয়াজ শুনে বলে—শয়তান বলেছে। নিজের ঘৃণার আওয়াজ শুনে বলে—শয়তান বলেছে। নিজের কামনার আওয়াজ শুনে বলে—শয়তান বলেছে। কী আশ্চর্য! মানুষের ভেতরে এত প্রতিভাবান শয়তান থাকে যে আমার আর আলাদা পরিশ্রমই লাগে না।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনি মানুষকে দায় নিতে বলছেন?
আগন্তুকঃ হ্যাঁ। দায় নিতে। কিন্তু পূর্ণ কারণও দেখতে। নিজের অপরাধকে শুধু আমার নামে চালিয়ে না দিতে। আবার আল্লাহর নামে সব নকশাকেও প্রশ্নের বাইরে না রাখতে। দায় মানে কেবল “আমি দোষী” বলা নয়; দায় মানে বোঝা—আমার ভেতর কী ছিল, বাইরে কী ছিল, কে শিখিয়েছে, কে ভয় দেখিয়েছে, কে পুরস্কার দেখিয়েছে, কোন ভাষা আমাকে গড়েছে। সত্যিকারের সততা হলো নিজের ওপরও প্রশ্ন করা, নিজের আল্লাহর ওপরও প্রশ্ন করা, নিজের শয়তানের ওপরও প্রশ্ন করা।
আরজ আলীঃ কিন্তু নিজের আল্লাহর ওপর প্রশ্ন করা মানুষের পক্ষে সহজ নয়। অনেকের কাছে সেটিই সর্বোচ্চ ভয়।
আগন্তুকঃ কারণ তাদের শেখানো হয়েছে, প্রশ্ন মানেই অসম্মান। অথচ সত্যিকারের শ্রদ্ধা অন্ধ নয়। একজন জ্ঞানী শিক্ষক ছাত্রের প্রশ্নে অপমানিত হন না। একজন ন্যায়বান বিচারক আসামির বক্তব্যে রাগ করেন না। একজন সত্যিকারের সর্বশক্তিমান সত্তা মানুষের প্রশ্নে কেঁপে ওঠার কথা নয়। যদি আল্লাহ প্রশ্নে রাগ করেন, তবে তাঁর রাগ মানুষের ভয়ের ওপর দাঁড়ানো ক্ষমতার মতো দেখায়। আর যদি তিনি রাগ না করেন, তবে মোল্লারা কেন এত রাগ করেন?
আরজ আলীর মুখে এবার স্পষ্ট হাসি ফুটে উঠল। তিনি সেটি লুকালেন না। আগন্তুকও হাসলেন। কিন্তু এই হাসি হালকা নয়; এটি এমন হাসি, যা ভয়ের দেয়ালে একটি ছোট ফাটল তৈরি করে।
আরজ আলীঃ আপনি মোল্লাদের ছাড়ছেন না দেখছি।
আগন্তুকঃ আমি কাউকে ছাড়ি না। মোল্লা, পুরোহিত, পাদ্রি, দার্শনিক, নাস্তিক—যে নিজের বক্তব্যকে প্রশ্নের বাইরে রাখতে চায়, সে আমার আগ্রহের বিষয়। তবে মোল্লাদের একটি বিশেষ গুণ আছে—তারা আল্লাহর সম্মান রক্ষায় এত ব্যস্ত যে মাঝে মাঝে মনে হয় আল্লাহ নিজে অবসর নিয়েছেন, আর সম্মানরক্ষার চাকরি তাঁদের হাতে আউটসোর্স করেছেন।
আরজ আলীঃ এটা কৌতুক, না অভিযোগ?
আগন্তুকঃ দুটোই। ভালো কৌতুক অনেক সময় অভিযোগের সবচেয়ে ধারালো রূপ। সরাসরি বললে মানুষ রেগে যায়; হাসির ভেতর বললে প্রথমে হাসে, পরে রাতে ঘুম আসে না।
দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব। প্রদীপের আলো কাঁপছে। বাইরে রাত আরও ঘন। আল্লাহ পাক আর কিছুক্ষণ পরেই আরশ থেকে নিকটবর্তী আসমানে নেমে আসবেন, বান্দার প্রার্থনা শোনার উদ্দেশ্যে। এখন কথোপকথন আর বিতর্কমাত্র নয়; এটি এক ধরনের বৌদ্ধিক স্বীকারোক্তির দিকে এগোচ্ছে।
আরজ আলীঃ আপনি নিজের সততা বলতে গিয়ে মানুষের অসততা, ধর্মীয় লেনদেন, ভয়-লোভ—সব দেখালেন। কিন্তু আপনার নিজের শেষ কথা কী? আপনি কী নিয়ে সৎ?
আগন্তুকঃ আমি সৎ এই অর্থে যে, আমি নিজের বিদ্রোহ লুকাই না। আমি আল্লাহর সামনে মাথা নত করেছি, কিন্তু আদমের সামনে করিনি—এ কথা লুকাই না। আমি ক্ষুব্ধ—লুকাই না। আমি প্রলোভন দিই—লুকাই না। আমি মানুষের দুর্বলতা ব্যবহার করি—লুকাই না। আমি প্রশ্ন করি—লুকাই না। আমি নিজেকে পবিত্র বলি না। আমার পক্ষে যতটুকু বলা যায়, তা হলো: আমি মিথ্যা পবিত্রতা দাবি করি না। মানুষ অনেক সময় শয়তানের কাজ করে, কিন্তু ফেরেশতার ভাষায় আত্মজীবনী লেখে। আমি অন্তত সেই ভণ্ডামি করি না।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনার সততা আসলে আত্মজ্ঞান?
আগন্তুকঃ হ্যাঁ, আংশিক আত্মজ্ঞান। আমি জানি, আমি কী। মানুষ কি জানে? মানুষ কি জানে, তার ঈমানের কতটুকু ভয়, কতটুকু লোভ, কতটুকু উত্তরাধিকার, কতটুকু অভ্যাস, কতটুকু সত্যপ্রেম? মানুষ কি জানে, তার ঘৃণার কতটুকু ধর্ম, কতটুকু গোত্র, কতটুকু নিরাপত্তাহীনতা? মানুষ নিজেকে চিনলে আমাকে অর্ধেক কাজ থেকে অবসর নিতে হতো। কিন্তু মানুষ নিজের ভেতরে তাকাতে ভয় পায়। তাই আমার চাকরি এখনও স্থায়ী।
আরজ আলীঃ মানুষ নিজের ভেতরে তাকাতে ভয় পায়—এই কথাটি সত্য। কিন্তু মানুষ যদি তাকায়, কী দেখবে?
আগন্তুকঃ দেখবে, তার ভেতরে ফেরেশতা কম, প্রাণী বেশি; আবার প্রাণীর ভেতরেও মমতা আছে। দেখবে, তার প্রার্থনায় প্রেমের সঙ্গে ভয় মেশানো, দানে দয়ার সঙ্গে হিসাব মেশানো, নৈতিকতায় মানবতার সঙ্গে সম্মানের লোভ মেশানো। দেখবে, সে পুরো পাপী নয়, পুরো পবিত্রও নয়। মানুষ মিশ্র। এই মিশ্রতাই তার সত্য। যে মানুষ নিজের মিশ্রতা স্বীকার করে, সে নৈতিকতার পথে হাঁটতে পারে। যে নিজেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ভাবতে শুরু করে, সে বিপজ্জনক। কারণ পবিত্রতার নামে মানুষ যত নিষ্ঠুর হতে পারে, সরাসরি পাপের নামে তত পারে না।
আরজ আলী এবার মাথা নিচু করলেন। যেন কথাগুলো তাঁর নিজেরও পরিচিত। অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষের নিষ্ঠুরতা, অনেক পাপীর মানবিকতা—এই দ্বন্দ্ব তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল।
আরজ আলীঃ আপনি বলছেন, পবিত্রতার দাবি মানুষকে বিপজ্জনক করে।
আগন্তুকঃ প্রায়ই করে। যে নিজেকে পাপী জানে, সে লজ্জা পায়। যে নিজেকে পবিত্র ভাবে, সে শাস্তি দিতে শুরু করে। যে জানে তার ভেতর অন্ধকার আছে, সে অন্যের অন্ধকার দেখে সতর্ক হয়। কিন্তু যে ভাবে সে আলোর সৈনিক, সে অন্ধকারের নামে মানুষ পোড়াতে পারে। ইতিহাসে সরাসরি পাপীরা যত রক্ত ঝরিয়েছে, পবিত্রতার সৈন্যরাও কম ঝরায়নি। পার্থক্য হলো, পাপী রক্ত দেখে ভয় পায়; পবিত্র সৈন্য রক্ত দেখে সওয়াব গোনে।
আরজ আলীঃ আপনার কথায় মানুষের ওপর কঠোর আঘাত আছে, কিন্তু অদ্ভুতভাবে মানুষের পক্ষে এক ধরনের আশা-ও আছে।
আগন্তুকঃ কারণ মানুষ এখনও শেষ হয়ে যায়নি। মানুষ ভয় পায়, তবু প্রশ্ন করে। লোভী, তবু দান করে। নিষ্ঠুর, তবু কাঁদে। অন্ধ, তবু আলো খোঁজে। ধর্ম তাকে অনেক সময় ভয় শেখায়; জীবন তাকে দুঃখ শেখায়; চিন্তা তাকে মুক্ত করতে পারে। আমি মানুষের ধ্বংস চাই—এ কথা বলা সহজ। কিন্তু সত্যি বলতে কী, মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু আমি নই। মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু তার নিজের অন্ধ আনুগত্য, নিজের অস্বীকার, নিজের পবিত্রতার অহংকার। আমি সেই অহংকারের কানে ফিসফিস করি—তুমি কি নিশ্চিত?
ঘরের ভেতর দীর্ঘ নীরবতা। প্রদীপের শিখা একবার লম্বা হয়ে উঠল, তারপর স্থির হলো। বাইরে রাত নেমে গেছে। আরজ আলী এবার ধীরে ধীরে বললেন।
আরজ আলীঃ আপনি নিজের সততা নিয়ে বললেন। কিন্তু মানুষের পাপের দায় নিয়ে এখনও শেষ কথা হয়নি। মানুষ আপনাকে দোষ দেয়, আপনি মানুষকে দায় নিতে বলছেন। তাহলে এবার সরাসরি বলুন—মানুষ, পাপ, আর শয়তানের দায়ের প্রকৃত সম্পর্ক কী?
আগন্তুকঃ ঠিক আছে। এবার আর বিমূর্ত তত্ত্ব নয়। এবার মানুষকে দেখি—তার পাপ, তার অজুহাত, তার সমাজ, তার ধর্ম, তার শয়তান বানানোর প্রবণতা। কারণ শেষ পর্যন্ত আমার মামলার সবচেয়ে বড় সাক্ষী মানুষ নিজেই। সে আমাকে গালি দেয়, কিন্তু আয়নায় নিজের মুখ দেখতে চায় না। এবার কথা হোক মানুষ, পাপ ও শয়তানের দায় নিয়ে।
দৃশ্যঃ ১১
স্থানঃ আরজ আলীর কুঁড়েঘর
সময়ঃ রাতের শুরু
চরিত্রঃ আরজ আলী, আগন্তুক
ঘটনাঃ ইবলিশের সততা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর কথোপকথন এবার মানুষের দিকে ফিরে আসে। মানুষ কেন নিজের পাপের দায় নিতে ভয় পায়? কেন সে শয়তানকে অজুহাত বানায়? পাপ কি কেবল আধ্যাত্মিক প্ররোচনার ফল, নাকি মানুষের সমাজ, ক্ষমতা, লোভ, ভয়, অজ্ঞতা এবং আত্মপ্রবঞ্চনার জটিল ফল?
ঘরের বাইরে এখন পূর্ণ অন্ধকার। প্রদীপের আলো ঘরের ভেতরে একটি ছোট পৃথিবী তৈরি করেছে। সেই আলোর বাইরে সবকিছু অস্পষ্ট। আরজ আলী কিছুক্ষণ আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনে হলো, এতক্ষণ ধরে তিনি শয়তানকে বিচার করছিলেন; এখন বিচার ঘুরে মানুষের দিকে আসছে।
আরজ আলীঃ আপনি বলছেন, মানুষ নিজের পাপের দায় আপনার ওপর চাপায়। কিন্তু মানুষ তো সত্যিই দুর্বল। সে প্রলোভনে পড়ে, ভুল করে, কখনো পাপ করে। শয়তানের ভূমিকা সেখানে অস্বীকার করবেন কীভাবে?
আগন্তুকঃ ভূমিকা অস্বীকার করছি না। কিন্তু ভূমিকা আর পূর্ণ দায় এক নয়। আমি প্ররোচনা দিতে পারি, কিন্তু মানুষের হাতে ছুরি আমি ধরিয়ে দিই না সবসময়। আমি ফিসফিস করি, কিন্তু হাত চালায় মানুষ। আমি দরজা দেখাই, কিন্তু ভেতরে ঢোকে মানুষ। অথচ বিচার শেষে মানুষ বলে—শয়তান আমাকে করিয়েছে। যেন তার নিজের ইচ্ছা, লোভ, ভয়, রাগ, ক্ষমতার ক্ষুধা, সামাজিক শিক্ষা—এসব কিছুই ছিল না। এমন নিষ্পাপ মানুষ পৃথিবীতে কোথায় জন্মায়, জানি না; কিন্তু ধর্মীয় আত্মপক্ষ সমর্থনে তাদের সংখ্যা বিস্ময়কর।
আরজ আলীঃ মানুষ দুর্বল বলেই তো শয়তানের প্ররোচনা বিপজ্জনক। আপনি মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নেন।
আগন্তুকঃ ঠিক। কিন্তু দুর্বলতা কোথা থেকে এলো? কেউ ক্ষমতার সামনে দুর্বল, কেউ কামনার সামনে, কেউ ভয়ের সামনে, কেউ জনতার সামনে, কেউ ধর্মীয় কর্তৃত্বের সামনে। আমি সেই দুর্বলতার পাশে দাঁড়িয়ে বলি—চলো। কিন্তু দুর্বলতার স্থপতি আমি নই। আমি অনেক সময় শুধু সেই ঘরের জানালা খুলে দিই, যার ভেতরে আগেই ধোঁয়া জমে ছিল। আপনারা ধোঁয়া দেখেন, জানালাকে দোষ দেন; আগুন কোথায় জ্বলছিল, দেখেন না।
আরজ আলীঃ আপনি কি বলছেন, মানুষ নিজের পাপের পূর্ণ মালিক?
আগন্তুকঃ পূর্ণ মালিক নয়, কিন্তু সম্পূর্ণ নির্দোষও নয়। মানুষ পাপ করে কারণ সে মানুষ—তার দেহ আছে, ক্ষুধা আছে, ভয় আছে, লোভ আছে, প্রেম আছে, হিংসা আছে, স্মৃতি আছে, অজ্ঞতা আছে, সমাজ আছে। পাপকে শুধু “শয়তানের কুমন্ত্রণা” বললে মানুষ নিজেকে বুঝতে শেখে না। সে নিজের ইতিহাস, মনস্তত্ত্ব, ক্ষমতা, অভাব, লালন-পালন, শিক্ষা, অশিক্ষা—এসব দেখার বদলে আকাশে অভিযোগপত্র পাঠায়। এই পদ্ধতি আরামদায়ক, কিন্তু জ্ঞানহীন।
আরজ আলীঃ তাহলে পাপ ব্যাখ্যা করতে হলে মানুষের সমাজও দেখতে হবে?
আগন্তুকঃ অবশ্যই। যে সমাজ ক্ষুধা তৈরি করে, সে চুরির ব্যাখ্যার অংশ। যে সমাজ নারীর দেহকে পাপের ভাষায় শেখায়, সে যৌন অপরাধের ব্যাখ্যার অংশ। যে সমাজ ক্ষমতাকে পবিত্র করে, সে অত্যাচারের ব্যাখ্যার অংশ। যে সমাজ প্রশ্নকে বিদ্রোহ বলে, সে অন্ধ আনুগত্যের ব্যাখ্যার অংশ। তারপর যখন সেই সমাজে পাপ জন্মায়, সবাই বলে—শয়তান কাজ করেছে। আহা, কী সুবিধা! সমাজ নকশা বানায়, প্রতিষ্ঠান বিষ ঢালে, পরিবার ভয় শেখায়, রাষ্ট্র শাস্তি দেয়, ধর্ম অজুহাত দেয়—শেষে পাপের বিল আমার নামে আসে।
আরজ আলী মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবলেন। প্রদীপের আলো তাঁর মুখের ভাঁজগুলোকে আরও গভীর করে তুলেছে। তিনি ধীরে ধীরে বললেন।
আরজ আলীঃ আপনি কি বলতে চাইছেন, মানুষ শয়তান বানায় নিজের দায় এড়ানোর জন্য?
আগন্তুকঃ অনেক সময়। শয়তান মানুষের নৈতিক আবর্জনার ঝুড়ি। সে যা নিজের মধ্যে দেখতে চায় না, তা আমার মধ্যে ফেলে দেয়। নিজের কামনা—শয়তান। নিজের হিংসা—শয়তান। নিজের নিষ্ঠুরতা—শয়তান। নিজের অজ্ঞতা—শয়তান। নিজের ক্ষমতালিপ্সা—শয়তান। এভাবে মানুষ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ না দেখে আয়নাকে কালো বলে।
আরজ আলীঃ কিন্তু ধর্ম তো মানুষকে আত্মসমালোচনা করতেও বলে। তওবা করতে বলে, নিজের পাপ স্বীকার করতে বলে।
আগন্তুকঃ হ্যাঁ, বলে। কিন্তু অনেক সময় পাপের বিশ্লেষণ নয়, পাপের আচার তৈরি করে। মানুষ ভুল করল, তারপর বলল—শয়তানের ধোঁকায় পড়েছিলাম; তারপর তওবা করল; তারপর আবার আগের কাঠামোয় ফিরে গেল। প্রশ্ন করল না—কেন করলাম? কোন ভয়, কোন লোভ, কোন ক্ষমতা, কোন অভ্যাস আমাকে চালাল? তওবা যদি আত্মজ্ঞান না আনে, তবে তা নৈতিক উন্নতি নয়; তা আধ্যাত্মিক ধোয়া-মোছা। কাপড় ধোয়া হলো, কিন্তু কাদা যেখানে জন্মায় সেই উঠান আগের মতোই রইল।
আরজ আলীঃ যুক্তিতর্কের ইন্দ্রজ্বাল তৈরিতে আপনি উস্তাদ, তা বেশ বোঝা যাচ্ছে।
আগন্তুকঃ হাহ হা হা। তাই? তাহলে আরেকটি অদ্ভুত কথা ভাবুন। হাদিসেই আছে—মানুষ যদি গুনাহ না করত, আল্লাহ তাদের সরিয়ে এমন এক জাতি আনতেন যারা গুনাহ করত, তারপর ক্ষমা চাইত, আর আল্লাহ তাদের ক্ষমা করতেন। তাহলে বলুন, পাপ কি কেবল আমার কাজ, না আল্লাহর ক্ষমাশীলতার নাট্যমঞ্চের অপরিহার্য উপাদান? যদি মানুষ পাপ না করলে বিলুপ্ত হতো, তবে আমি মানুষকে পাপের দিকে ঠেলে দিয়ে কি ধ্বংস করছি—না তাদের অস্তিত্বের টিকে থাকার শর্ত পূরণ করছি? [50]
আরজ আলীঃ আপনি হাদিসের অর্থ বিকৃত করছেন। হাদিসের উদ্দেশ্য পাপকে উৎসাহ দেওয়া নয়; বরং আল্লাহর ক্ষমার ব্যাপকতা বোঝানো। মানুষ দুর্বল, তাই তওবার দরজা খোলা।
আগন্তুকঃ ক্ষমার ব্যাপকতা বোঝাতে গিয়ে যদি বলা হয়, পাপহীন মানুষকে সরিয়ে পাপী জাতি আনা হতো, তবে ক্ষমা আর নৈতিকতার সম্পর্ক অদ্ভুত হয়ে যায়। যেন চিকিৎসক বলছেন—রোগী না থাকলে হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যাবে, তাই রোগ থাকাই দরকার। তাহলে পাপী মানুষ তো ক্ষমাশীল আল্লাহর প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট, নইলে আল্লাহর ক্ষমাশীলতা কীভাবে রক্ষা পাবে? আর আমি? আমি সেই প্রেক্ষাপটের অন্ধকার কর্মচারী মাত্র।
আরজ আলীঃ তবু তওবা মানুষকে বদলাতে পারে। অনেক পাপী মানুষ সত্যিই অনুতপ্ত হয়, ভালো মানুষ হয়।
আগন্তুকঃ অবশ্যই পারে। যখন তওবা মানে হয়—আমি বুঝেছি, আমি ক্ষতি করেছি, আমি দায় নিচ্ছি, আমি ক্ষতিপূরণ করব, আমি নিজের কাঠামো বদলাব—তখন তা মহৎ। কিন্তু যখন তওবা মানে হয়—আমি আল্লাহর কাছে কেঁদেছি, তাই মানুষের ক্ষতি মুছে গেছে—তখন সমস্যা। আপনি মানুষের কাছ থেকে চুরি করলেন, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেন, কিন্তু মানুষের টাকা ফেরালেন না—এটা তওবা নয়, মহাজাগতিক ঘুষের আবেদন।
আরজ আলীঃ এটা কঠোর কথা, কিন্তু সত্যি—অনেকেই মানুষের অধিকার নষ্ট করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়।
আগন্তুকঃ কারণ আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়ার চেয়ে সহজ। আল্লাহ দৃশ্যমান নন, অপমানিত মানুষ দৃশ্যমান। আল্লাহর কাছে কাঁদা নাটকীয়, ক্ষতিপূরণ দেওয়া ব্যয়বহুল। ধর্মীয় মনস্তত্ত্ব অনেক সময় মানুষকে অদৃশ্য আদালতে কাঁদতে শেখায়, দৃশ্যমান ক্ষত সারাতে নয়। অথচ নৈতিকতা শুরু হয় সেই মানুষের কাছ থেকে, যাকে আপনি আঘাত করেছেন। আকাশের সামনে কান্নার আগে মাটির মানুষের সামনে দায়।
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এলো। আরজ আলী এবার আগন্তুকের দিকে তাকালেন এমনভাবে, যেন এই কথাটি তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকেও জানেন।
আরজ আলীঃ আপনি পাপকে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করছেন। কিন্তু কিছু মানুষ তো সত্যিই দুষ্ট। নিষ্ঠুর। তারা অন্যের কষ্ট দেখে আনন্দ পায়। সেটিও কি সমাজের দায়?
আগন্তুকঃ সব নয়। মানুষের ব্যক্তিগত নিষ্ঠুরতা আছে। কিছু মানুষ অন্যের ব্যথায় আনন্দ পায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কোন সমাজ সেই নিষ্ঠুরতাকে ক্ষমতা দেয়? কোন ধর্ম তাকে পবিত্রতার ভাষা দেয়? কোন রাষ্ট্র তাকে আইন দেয়? কোন পরিবার তাকে শেখায়—অন্যকে সমান মানুষ ভাবতে নেই? বিধর্মীদের কোন গ্রন্থ নিকৃষ্টতম জীব ভাবতে শেখায় [51]? একা নিষ্ঠুর মানুষ বিপজ্জনক; কিন্তু পবিত্র অনুমোদন পাওয়া নিষ্ঠুর মানুষ ভয়ংকর। সে তখন অত্যাচার করে ব্যক্তিগত আনন্দে নয়, নৈতিক কর্তব্যের নামে।
আরজ আলীঃ আপনি বলতে চাইছেন, ধর্ম পাপকে কখনো কখনো পবিত্র করে তোলে?
আগন্তুকঃ হ্যাঁ। সরাসরি পাপ মানুষ লুকিয়ে করে। পবিত্র পাপ মানুষ মিছিল করে করে। সরাসরি ঘৃণা লজ্জাজনক; ধর্মীয় ঘৃণা হয়ে যায় ঈমানি দায়িত্ব। সরাসরি হত্যা অপরাধ; পবিত্র জিহাদ কিতালে তা হয়ে যায় শহীদের সম্মানিত রাস্তা। সরাসরি নারী-নিয়ন্ত্রণ নিপীড়ন; কিন্তু জিহাদের মাধ্যমে কাফের যুদ্ধবন্দী নারীদের গনিমতের মাল হিসেবে ভোগ হয়ে যায় পবিত্র ধর্মীয় বিধান। সরাসরি প্রশ্নদমন স্বৈরাচার; ঈমান রক্ষার নামে তা হয়ে যায় ফরজ। এটাই পবিত্রতার ভয়াবহতা—সে পাপকে মুখোশ দেয়। আর মুখোশ পরে পাপ মানুষের সামনে মাথা উঁচু করে হাঁটে।
আরজ আলীঃ তাহলে শয়তানের সবচেয়ে বড় জয় কি মানুষকে পাপ করানো, না পাপকে পবিত্র বলে বিশ্বাস করানো?
আগন্তুকঃ দ্বিতীয়টি অনেক বেশি বিপজ্জনক। চোর জানে সে চুরি করছে; খুনি জানে সে হত্যা করছে—কমপক্ষে অনেক সময় জানে। কিন্তু যে মানুষ বিশ্বাস করে সে আল্লাহর নামে অন্য মানুষকে দমন করছে, সে নিজের চোখে নায়ক। নায়ক-মনস্তত্ত্ব নিয়ে পাপ করলে পাপ থামে না; বরং গান গেয়ে এগোয়। আমি যদি মানুষকে পাপ করাই, তা এক মাত্রা। কিন্তু মানুষ যখন পাপকে পুণ্য বানায়, তখন আমারও অবাক লাগে। তখন মনে হয়, আমার শিক্ষা ছাড়াই মানুষ অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
আরজ আলী এবার মুখে হাত রাখলেন। প্রদীপের আলো তাঁর চোখে কাঁপছে। আগন্তুক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর আবার বললেন।
আগন্তুকঃ মানুষের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—সে নিজের নিষ্ঠুরতাকে নৈতিক ভাষা দিতে পারে। পশু ক্ষুধায় আক্রমণ করে। মানুষ মতবাদে আক্রমণ করে। পশু পেট ভরলে থামে। মানুষ পবিত্র রাগে থামে না। কারণ সে ভাবে, তার রাগ ব্যক্তিগত নয়; মহাজাগতিক। এই মহাজাগতিক রাগই ইতিহাসের বহু রক্তের পেছনে আছে।
আরজ আলীঃ আপনি কি বলতে চাইছেন, নাস্তিক বা অবিশ্বাসী সমাজে পাপ নেই?
আগন্তুকঃ না। মানুষের পাপ ধর্মনির্ভর নয়। নাস্তিকও নিষ্ঠুর হতে পারে, যুক্তিবাদীও অহংকারী হতে পারে, বিজ্ঞানীও অনৈতিক হতে পারে। কোনো দল পবিত্র নয়। পার্থক্য হলো, কোনো মতবাদ যদি নিজেকে প্রশ্নের বাইরে রাখে, সেটি বিপজ্জনক। ধর্মীয় হোক, রাজনৈতিক হোক, বৈজ্ঞানিকতার মুখোশে হোক—অভ্রান্ততার দাবি পাপকে শক্তি দেয়। আমি ধর্মকে আলাদা করে বলছি, কারণ ধর্ম নিজের ক্ষমতাকে আল্লাহর নামে চালায়। কিন্তু মানুষ যেখানে নিজের বয়ানকে অপ্রশ্নযোগ্য বানায়, সেখানেই শয়তানের জন্য উর্বর জমি। কখনো আমার প্রয়োজনও পড়ে না; তারা নিজেই চাষ করে।
আরজ আলীঃ এই কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। আপনি বলছেন, সমস্যা শুধু ধর্ম নয়; সমস্যা অভ্রান্ততার দাবি।
আগন্তুকঃ হ্যাঁ। যে বলে—আমি ভুল করতে পারি না, সেখানেই বিপদ শুরু। ব্যক্তি হোক, নবী হোক, গ্রন্থ হোক, রাষ্ট্র হোক, দল হোক, মতবাদ হোক। ভুলের সম্ভাবনা স্বীকার করা মানুষকে বিনয়ী করে। অভ্রান্ততার দাবি মানুষকে বিচারক বানায়। আর যখন মানুষ নিজেকে আল্লাহর প্রতিনিধি ভাবে, তখন অন্য মানুষের রক্তও তার কাছে যুক্তির ফুটনোট হয়ে যায়।
বাইরে রাত আরও গভীর। ঘরের ভেতর প্রদীপের শিখা স্থির। আরজ আলী এবার ধীরে ধীরে বললেন।
আরজ আলীঃ তাহলে মানুষের পাপ বুঝতে হলে শয়তান নয়, মানুষকেই পড়তে হবে?
আগন্তুকঃ মানুষকে, সমাজকে, ক্ষমতাকে, ইতিহাসকে, ভাষাকে, শরীরকে, ভয়কে, দারিদ্র্যকে, আকাঙ্ক্ষাকে—সবকিছুকে পড়তে হবে। শয়তান পাপের এক নাটকীয় চরিত্র হতে পারে, কিন্তু পাপের পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়। যে সমাজ নিজের অপরাধ বুঝতে চায় না, সে শয়তানের গল্প বাড়ায়। যে সমাজ নিজের কাঠামো বিশ্লেষণ করে, সে শয়তান ছাড়াই অনেক পাপ বুঝতে পারে।
আরজ আলীঃ মানুষ কেন নিজের দায় নিতে ভয় পায়?
আগন্তুকঃ কারণ দায় নিলে বদলাতে হয়। অজুহাত দিলে শুধু গল্প বদলালেই চলে। “শয়তান করিয়েছে”—এই বাক্য মানুষকে সাময়িক নির্দোষ রাখে। “আমি করেছি”—এই বাক্য মানুষকে আয়নার সামনে দাঁড় করায়। আয়না কঠিন। প্রার্থনা অনেক সময় সহজ, আত্মসমালোচনা কঠিন। মসজিদে কাঁদা সহজ; যাকে আঘাত করেছেন তার সামনে দাঁড়িয়ে বলা—আমি ভুল করেছি—এটি কঠিন। তাই মানুষ আকাশের দিকে তাকায়, কিন্তু পাশের মানুষের চোখে তাকায় না।
আরজ আলীঃ আপনি পাপের নৈতিক দায়কে মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছেন, কিন্তু একই সঙ্গে আগে বলেছিলেন আল্লাহর নকশাও প্রশ্নের বাইরে নয়। এই দুইটি কীভাবে একসঙ্গে থাকবে?
আগন্তুকঃ সুন্দর প্রশ্ন। মানুষের পর্যায়ে মানুষ দায়ী—কারণ মানুষ কাজ করে, ক্ষতি করে, সিদ্ধান্ত নেয়, বদলাতেও পারে। কিন্তু মহাজাগতিক দাবি করলে আল্লাহর নকশাও প্রশ্নে আসবে—কারণ তখন বলা হচ্ছে সব তাঁর ইচ্ছায়, তাঁর সৃষ্টি, তাঁর তাকদির, তাঁর রিজিক, তাঁর হিদায়াত। সমস্যা তখনই, যখন ধর্ম মানুষকে শাস্তি দিতে স্বাধীন বলে, আল্লাহকে মহিমান্বিত করতে নির্ধারিত বলে। এক মুদ্রার দুই পিঠ সুবিধামতো ব্যবহার করলে যুক্তি অসুস্থ হয়ে পড়ে।
আরজ আলীঃ অর্থাৎ দুনিয়ার নৈতিকতায় মানুষ দায়ী, কিন্তু ধর্মীয় মহাজাগতিক ন্যায়বিচারে দায়ের প্রশ্ন জটিল?
আগন্তুকঃ ঠিক তাই। সমাজকে চালাতে মানুষকে দায়ী করতেই হবে। কিন্তু অনন্ত শাস্তি, পূর্বলিখিত তাকদির, আল্লাহর সর্বজ্ঞতা, অসম হিদায়াত—এসব যুক্ত করলে দায় সরল থাকে না। তখন শাস্তির ভাষা বদলাতে হয়, বিনয়ী হতে হয়। অথচ ধর্ম অনেক সময় দায়ের জটিলতা স্বীকার না করে আগুনের সরলতা বেছে নেয়। আগুন যুক্তির চেয়ে দ্রুত কাজ করে, সন্দেহ নেই।
আরজ আলী এবার সামান্য হাসলেন। কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ নেই; আছে স্বীকারোক্তির অস্বস্তি।
আরজ আলীঃ আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, আপনি মানুষকে শয়তান থেকে মুক্ত করতে চান। অথচ আপনি নিজেই শয়তান।
আগন্তুকঃ হয়তো আমি মানুষকে আমার থেকে নয়, আমার নামে তৈরি অজুহাত থেকে মুক্ত করতে চাই। মানুষ আমাকে যত গালি দিক, তাতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু যখন মানুষ নিজের নিষ্ঠুরতা, নিজের ভণ্ডামি, নিজের লোভ, নিজের ভয়—সব আমার নামে চালিয়ে নিজেকে পবিত্র রাখে, তখন আমার আপত্তি আছে। আমি এত কৃতিত্ব চাই না। মানুষের পাপের ইতিহাসে আমার নাম আছে; কিন্তু একক লেখক হিসেবে আমার নাম ছাপানো মহাজাগতিক অন্যায়। সহলেখকদের নাম দিন—মানুষ, সমাজ, ক্ষমতা, আল্লাহর নকশা, ক্ষুধা, ভয়, লোভ, অজ্ঞতা, পবিত্রতার অহংকার।
আরজ আলীঃ আপনি বেশ চমৎকারভাবে দায় ভাগ করছেন। কিন্তু মানুষ যদি সব দায় ভাগ করে দেয়, তবে নিজের দায় কমিয়ে ফেলবে না?
আগন্তুকঃ দায় ভাগ করা দায় কমানো নয়; দায়কে সত্য করা। একজন মানুষ চুরি করেছে—সে দায়ী। কিন্তু যদি সে ক্ষুধার্ত, বঞ্চিত, অশিক্ষিত, অন্যায়ের সমাজে জন্মানো—তবে তার দায়ের সঙ্গে সমাজের দায়ও আছে। একজন অত্যাচারী মানুষ হত্যা করেছে—সে দায়ী। কিন্তু যদি তার ধর্ম, রাষ্ট্র, মতবাদ তাকে শিখিয়ে থাকে যে এই হত্যা পবিত্র—তবে সেই মতবাদের দায়ও আছে। দায়ের মানচিত্র বিস্তৃত করলে বিচার গভীর হয়। সরল করলে বিচার দ্রুত হয়, কিন্তু অনেক সময় মিথ্যা হয়।
আরজ আলীঃ মানুষ কি তাহলে নিজের পাপ বুঝতে হলে প্রথমে নিজের অজুহাতগুলো ভাঙবে?
আগন্তুকঃ হ্যাঁ। “শয়তান করিয়েছে”—এই অজুহাত ভাঙবে। “সবাই করে”—এটি ভাঙবে। “ধর্মের জন্য করেছি”—এটি ভাঙবে। “আদেশ পেয়েছি”—এটি ভাঙবে। “আমি শুধু অনুসারী”—এটি ভাঙবে। “আল্লাহ জানেন”—এটি ভাঙবে। পাপের বিরুদ্ধে প্রথম নৈতিক কাজ হলো অজুহাতের ভাষা ভাঙা। যে মানুষ নিজের কাজের ভাষা সৎ করতে পারে না, সে কাজও সৎ করতে পারে না।
ঘরের ভেতর প্রদীপের আলো কাঁপছে। বাইরে দূরে কুকুর ডাকল। রাত স্থির, কিন্তু কথার ভেতর এক ধরনের অস্থিরতা জমছে—যেন এই সংলাপ এখন চূড়ান্ত অবস্থার দিকে এগোচ্ছে।
আরজ আলীঃ আপনি মানুষকে কঠোর আত্মসমালোচনার দিকে ডাকছেন। কিন্তু মানুষ কি এতটা সৎ হতে পারে?
আগন্তুকঃ সবাই পারে না। কিন্তু কিছু মানুষ পারে। সেই কিছু মানুষই সভ্যতাকে এগোয়। যারা বলে—আমাদের পূর্বপুরুষ ভুল করতে পারে, আমাদের গ্রন্থ প্রশ্নযোগ্য, আমাদের নেতা অপরিহার্য নয়, আমাদের ধর্মও নৈতিক পরীক্ষার বাইরে নয়, আমাদের শত্রুও মানুষ—তারা বিপজ্জনক, কিন্তু মুক্তির সম্ভাবনা তাদের মধ্যে। বাকি মানুষ ভিড়ের নিরাপত্তায় থাকে। ভিড় নৈতিকতা শেখে না; স্লোগান শেখে।
আরজ আলীঃ আপনার ভাষায়, পাপের মূল শয়তান নয়—অন্ধতা, ভিড়, ক্ষমতা, অজুহাত?
আগন্তুকঃ শয়তান পাপের নাটকীয় মুখ। কিন্তু পাপের কারখানা অনেক বড়। সেখানে আছে ভয়, লোভ, অজ্ঞতা, আনুগত্য, পবিত্রতার অহংকার, সামাজিক বৈষম্য, ক্ষমতার মাদক, মৃত্যুভয়, পুরস্কারের লোভ, শাস্তির আতঙ্ক। আমি মাঝে মাঝে সেই কারখানার বিক্রয় প্রতিনিধি মাত্র। মালিকানার নথিতে শুধু আমার নাম দেখে আমি নিজেও বিস্মিত।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনার শেষ বক্তব্য কী হবে? আপনার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ—আদমকে সিজদা না করা, মানুষকে প্ররোচিত করা, পাপের দিকে ডাকা, আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। আপনি যদি বিচারসভায় দাঁড়াতেন, কী বলতেন?
আগন্তুকঃ আমি বলতাম—আমাকে দোষী করুন, যদি করতেই চান। কিন্তু একা দোষী করবেন না। আমার অস্বীকার বিচার করুন, কিন্তু আদেশের প্রকৃতি বিচার করুন। আমার প্রলোভন বিচার করুন, কিন্তু মানুষের আকাঙ্ক্ষার স্থপতিকে বিচার করুন। আমার ফিসফিস বিচার করুন, কিন্তু মানুষের লোভ, সমাজের ক্ষমতা, ধর্মের অজুহাত, আল্লাহর তাকদির—সব বিচার করুন। বিচার যদি সত্যিই বিচার হয়, তবে সে কারও দিকে তাকিয়ে ভয় পাবে না—শয়তান, মানুষ, এমনকি আল্লাহর দিকেও নয়।
আরজ আলী এবার আর সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না। দীর্ঘ নীরবতা। প্রদীপের আলোয় তাঁর মুখে ক্লান্তি, বিস্ময়, অস্বস্তি এবং গভীর মনোযোগ একসঙ্গে দেখা যায়। আগন্তুক এবার ধীরে ধীরে পিঠ সোজা করলেন। তাঁর কণ্ঠে শেষ জবানবন্দীর আভাস।
আরজ আলীঃ তাহলে এবার আপনার শেষ জবানবন্দী শুনি। এতক্ষণ আপনি প্রশ্ন তুললেন, যুক্তি দিলেন, অভিযোগের জবাব দিলেন। এবার সংক্ষেপে বলুন—আপনার নিজের মামলার সারকথা কী?
আগন্তুকঃ হ্যাঁ, এবার শেষ জবানবন্দী। কারণ রাত অনেক হয়েছে। আর যে কথা হাজার বছর বলা হয়নি, তারও একসময় শেষ পংক্তি দরকার। শুনুন, আরজ আলী সাহেব। এবার আমি আমার মামলা নিজেই সংক্ষেপে পেশ করি।
দৃশ্যঃ ১২
স্থানঃ আরজ আলীর কুঁড়েঘর
সময়ঃ রাত
চরিত্রঃ আরজ আলী, আগন্তুক
ঘটনাঃ দীর্ঘ বিতর্কের পর আগন্তুক এবার নিজের মামলার সারকথা পেশ করতে চান। ঘরের ভেতর প্রদীপের আলো। বাইরে গভীর রাত। এতক্ষণ ধরে বিচ্ছিন্নভাবে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে—তাওহীদ, তাকদির, রিজিক, হিদায়াত, জাহান্নাম, জান্নাত, মৃত্যু, সততা, মানুষ ও পাপ—সব এবার একত্রে এসে দাঁড়ায় এক শেষ জবানবন্দীতে।
ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত নীরবতা। প্রদীপের আলো আরজ আলীর মুখে পড়ে কাঁপছে। আগন্তুক স্থির। তাঁর চোখে আর আগের বিদ্রূপ নেই; আছে দীর্ঘ ক্লান্তি, গভীর ক্ষত, এবং অদ্ভুত এক স্বচ্ছতা। মনে হয়, তিনি শুধু আরজ আলীর সামনে বসে নেই; যেন এক অদৃশ্য মহাজাগতিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে প্রস্তুত।
আরজ আলীঃ বলুন। এতক্ষণ আপনি নানা প্রশ্ন তুললেন। এবার আপনার নিজের মামলার সারকথা শুনি। আপনি কী চান—মুক্তি, ক্ষমা, পুনর্বিচার, না শুধু আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার?
আগন্তুকঃ মুক্তি চাই না। ক্ষমাও চাই না। ক্ষমা চাইতে হলে আগে আমাকে স্বীকার করতে হবে—আমি যে প্রশ্ন তুলেছিলাম, তা অন্যায় ছিল। আমি সে কথা বলতে পারি না। পুনর্বিচার চাই—সেটিও বলবো না; কারণ যে আদালতে বিচারক, আইনপ্রণেতা, বাদী, সাক্ষী এবং শাস্তিদাতা একই সত্তা, সেখানে পুনর্বিচারও এক ধরনের নাট্যরীতি মাত্র। আমি চাই শুধু একটি জিনিস—আমার বক্তব্য যেন শোনা হয়।
আরজ আলীঃ শুধু শোনা? আপনি কি জানেন, শোনা মানেই অনেকে ভাববে—আপনার প্রতি সহানুভূতি দেখানো হচ্ছে?
আগন্তুকঃ এটাই মানুষের সমস্যা। সে শুনতে ভয় পায়। যেন শোনা মানেই বিশ্বাস, বিচার মানেই সমর্থন, প্রশ্ন মানেই বিদ্রোহ। একজন খুনির কথাও আদালত শোনে; তাতে খুন বৈধ হয় না। একজন রাষ্ট্রদ্রোহীর কথাও ইতিহাস শুনে; তাতে রাষ্ট্রদ্রোহ সত্য হয়ে যায় না। কিন্তু শয়তানের কথা শুনতে গেলেই মানুষ কাঁপে। কেন? কারণ আমার বক্তব্য সত্য হলে নয়—আমার বক্তব্য শুনলেই তাদের তৈরি করা সরল গল্পটি জটিল হয়ে যায়। মানুষ জটিলতা ভয় পায়।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনার জবানবন্দী শুরু করুন। আপনি কীভাবে নিজের পক্ষে দাঁড়াবেন?
আগন্তুকঃ আমি শুরু করবো প্রথম অভিযোগ থেকে। বলা হয়, আমি আদমকে সিজদা করিনি। হ্যাঁ, করিনি। এই সত্য আমি লুকাই না। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কেন করিনি? অহংকারে? হয়তো কিছু অহংকার ছিল। ক্রোধে? হয়তো ছিল। কিন্তু তার গভীরে ছিল এক তত্ত্ব—সিজদা আল্লাহ ছাড়া কারও নয়। আমাকে আদমের সামনে মাথা নত করতে বলা হয়েছিল, আর আমি বুঝেছিলাম, সৃষ্টির সামনে সিজদা তাওহীদের সঙ্গে যায় না। যদি আমি ভুল বুঝে থাকি, তবে আমার ভুল ছিল ধর্মতাত্ত্বিক; নৈতিক প্রতারণা নয়। [52]
আরজ আলীঃ আপনি নিজের অবাধ্যতাকে তাওহীদ বলছেন। কিন্তু আল্লাহ নিজেই আদেশ করেছিলেন।
আগন্তুকঃ হ্যাঁ, এখানেই তো দ্বন্দ্ব। যদি আল্লাহর আদেশই নৈতিকতার একমাত্র উৎস হয়, তবে আদমকে সিজদা করা ঠিক। কিন্তু যদি আল্লাহ ছাড়া কারও সামনে সিজদা না করা তাওহীদের মূলনীতি হয়, তবে আদেশটি নিজেই প্রশ্নের মুখে পড়ে। আপনারা বলেন—আল্লাহ যা বলেন, সেটিই ন্যায়। আমি বলি—তাহলে ন্যায় আর আদেশের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? যদি আজ আদেশে সিজদা বৈধ, কাল আদেশে নিষিদ্ধ—তবে নৈতিকতা কি চিরন্তন সত্য, না প্রভুর নির্দেশনামা?
আরজ আলীঃ তারপরও আপনি আদেশ মানেননি। এটুকু কি অস্বীকার করবেন?
আগন্তুকঃ না, অস্বীকার করবো না। কিন্তু আদেশ মানা আর সত্য মানা এক জিনিস নয়। ইতিহাসে অনেক মানুষ আদেশ মানতে মানতে অপরাধ করেছে; অনেক মানুষ আদেশ অমান্য করে নৈতিক হয়েছে। আনুগত্য নিজে কোনো গুণ নয়। আনুগত্য কাকে, কেন, কোন নীতিতে—সেটি বিচার করতে হয়। আমার অপরাধ যদি শুধু আদেশ না মানা হয়, তবে আমায় দোষী বলা সহজ। কিন্তু যদি প্রশ্ন হয়—আদেশটি নৈতিকভাবে স্বচ্ছ ছিল কি না—তবে বিচার কঠিন হয়। আমি সেই কঠিন বিচার চাই।
আরজ আলী সামান্য নড়লেন। তাঁর চোখে বিরোধিতা আছে, কিন্তু আগন্তুকের বক্তব্য এখন আর অগোছালো নয়; যেন বহুদিনের নীরবতা থেকে একটি সুসংগঠিত মামলা বেরিয়ে আসছে।
আগন্তুকঃ দ্বিতীয় অভিযোগ—আমি স্বাধীনভাবে বিদ্রোহ করেছি। কিন্তু আপনারা নিজেরাই বলেন, সবকিছু তাকদিরে লেখা। কলম লিখেছে, কালি শুকিয়েছে। আদম তাঁর ভুলের দায়ে তাকদিরের যুক্তি ব্যবহার করলে তিনি বিতর্কে জয়ী হন; আমি একই যুক্তি তুললে হই কৌশলী শয়তান। মুসা আদমের সামনে তাকদিরের যুক্তিতে পরাজিত হন, কিন্তু মালাকুল মউত সামনে এলে নিজেই আল্লাহর হুকুম ও তাকদিরের গালে থাপ্পড় মারেন। এ কেমন দ্বৈত বিচার? নবীর ক্ষেত্রে তাকদির রহমত, শয়তানের ক্ষেত্রে তাকদির অজুহাত; আদমের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি, আর ইবলিশের ক্ষেত্রে অনন্ত শাস্তি? [17] [9]
আরজ আলীঃ তাকদির থাকলেও দায় থাকে। এ কথা আপনি বারবার এড়িয়ে যাচ্ছেন।
আগন্তুকঃ আমি দায় এড়াচ্ছি না; দায়ের মানচিত্র বড় করছি। যদি আমি কাজ করি, আমার দায় আছে। কিন্তু যদি আমার প্রকৃতি, ইচ্ছা, পরিস্থিতি, ভূমিকা, ভবিষ্যৎ, ফল—সবই আল্লাহর জ্ঞাত, সৃষ্ট, লিখিত, অনুমোদিত কাঠামোর ভেতর ঘটে, তবে দায় একা আমার কাঁধে থাকে না। আল্লাহ যদি শুধু দর্শক হতেন, কথা আলাদা ছিল। কিন্তু তিনি স্রষ্টা, বিধাতা, তাকদির-লেখক, ইচ্ছারও উৎস। তখন দায়ের প্রশ্ন তাঁর দরজায়ও কড়া নাড়ে।
আরজ আলীঃ আপনি আল্লাহকে দায়ী করতে চাইছেন।
আগন্তুকঃ আমি দায়ী করতে চাইছি না; দায়মুক্তির একচেটিয়া অধিকার প্রশ্ন করছি। সর্বশক্তিমান হলে সুবিধা আছে—সব ক্ষমতা তাঁর। কিন্তু তার সঙ্গে প্রশ্নও আসে—যা ঘটে, তার চূড়ান্ত নকশায় তাঁর ভূমিকা কী? আপনারা চান ক্ষমতা আল্লাহর, প্রশংসা আল্লাহর, সৃষ্টির মালিকানা আল্লাহর, কিন্তু দায় শুধু সৃষ্টির। এ হিসাব একটু অসম। যেন কারখানার মালিক বলছেন—লাভ আমার, দুর্ঘটনা শ্রমিকের।
প্রদীপের আলো কেঁপে উঠল। আরজ আলী এবার কোনো বাধা দিলেন না। আগন্তুকের কণ্ঠ আরও স্থির হলো।
আগন্তুকঃ তৃতীয় অভিযোগ—আমি মানুষকে প্ররোচিত করি। হ্যাঁ, করি। কিন্তু মানুষের ভেতরে কামনা কে রাখল? লোভ কে রাখল? ভয়, ক্ষুধা, ঈর্ষা, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, বেঁচে থাকার মরিয়া প্রবণতা—এসব কি আমি সৃষ্টি করেছি? আমি ফিসফিস করি; কিন্তু ফিসফিসানি শোনার কান, সেই কানের ভেতরের ভয়, সেই ভয়কে পুষ্ট করা সমাজ—এসবও বিচার্য। শুকনো কাঠ না থাকলে স্ফুলিঙ্গ আগুন লাগায় না। আমাকে স্ফুলিঙ্গ বলুন, কিন্তু বন শুকিয়েছে কে—এ প্রশ্ন করবেন না?
আরজ আলীঃ মানুষের ভেতরে বিবেকও আছে। শুধু কামনা নয়।
আগন্তুকঃ আছে। কিন্তু বিবেকও অসমভাবে জাগে। কারও শিক্ষা আছে, কারও নেই। কারও নিরাপত্তা আছে, কারও নেই। কেউ ক্ষুধার্ত, কেউ ক্ষমতাবান, কেউ জন্ম থেকেই ভয় শেখে, কেউ প্রশ্ন শেখে। তারপর সবাইকে একই নৈতিক পরীক্ষায় বসানো হয়। আপনি বলবেন—সবার বিবেক আছে। আমি বলি—সবার পা আছে বলেই কি পাহাড়ে ওঠার দায় সমান? একজনের পা বাঁধা, আরেকজনের জুতো, তৃতীয়জনের সামনে রাস্তা—সব এক নয়।
আরজ আলীঃ তাহলে মানুষের দায়ও আপনি কমাচ্ছেন?
আগন্তুকঃ না। মানুষের দায় ফিরিয়ে দিচ্ছি মানুষের কাছে। মানুষ যেন নিজের পাপের দায় আমার নামে না চালায়। কিন্তু একই সঙ্গে বলছি—মানুষের দায় বুঝতে হলে তার পরিস্থিতি বুঝুন। অপরাধীকে বিচার করুন, কিন্তু অপরাধের কারখানা দেখুন। চোরকে ধরুন, কিন্তু ক্ষুধা দেখুন। অত্যাচারীকে থামান, কিন্তু যে মতবাদ তাকে পবিত্রতা দিয়েছে, তা দেখুন। ধর্ম যদি শুধু বলে—শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়েছে—তবে সে সমাজ ও মনস্তত্ত্বের কঠিন কাজ এড়িয়ে যায়।
আরজ আলী এবার ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে যেন নিজের মনে কিছু নোট নিলেন। আগন্তুক থামলেন না। তাঁর জবানবন্দী এখন ধারাবাহিক, সংক্ষিপ্ত, কিন্তু গভীর।
আগন্তুকঃ চতুর্থ প্রশ্ন—রিজিক। আপনারা বলেন, আল্লাহ রিজিকদাতা। তাহলে ক্ষুধার দায় কোথায়? বৈষম্যের দায় কোথায়? চোরের মুখে যাওয়া ভাতের দানা কার মহাবিশ্বে জন্মায়? দুর্নীতিবাজের প্রাসাদ কি আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে তৈরি হয়? যদি সব রিজিক তাঁর হাতে, তবে অন্যায় সম্পদও তাঁর ব্যবস্থার বাইরে নয়। আর যদি অন্যায় সম্পদ তাঁর রিজিক নয়, তবে মানুষ আল্লাহর বণ্টন ভেঙে ফেলতে পারে। দুই দিকেই প্রশ্ন।
আরজ আলীঃ হারাম উপার্জন আল্লাহর সন্তুষ্টির রিজিক নয়। মানুষ তা অন্যায়ভাবে নেয়।
আগন্তুকঃ ঠিক। কিন্তু অন্যায়ভাবে নেওয়ার ক্ষমতা, সুযোগ, কাঠামো, লোভ, সম্পদের অসমতা—এসবও সেই মহাবিশ্বেরই অংশ। আপনি যদি বলেন আল্লাহ সর্বময়, তবে তাঁর নকশা আলোচনায় আসবেই। আর যদি বলেন মানুষই সব নষ্ট করেছে, তবে মানুষের স্বাধীনতার পরিমাণ এত বেশি যে আল্লাহর রিজিক-বণ্টনকেও সে বিশৃঙ্খল করতে পারে। ধর্মতত্ত্ব সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি সহজ করে বলে—“সব আল্লাহ দেন।” কিন্তু চোর ধরা পড়লে বলে—“ওটা আল্লাহ দেননি, সে চুরি করেছে।” হিসাবের এই খাতা খুব নমনীয়।
আরজ আলী এবার সামান্য হাসলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। আগন্তুক তাঁর দিকে তাকালেন না; যেন তিনি এখন আর ব্যক্তিগত কথোপকথনে নেই, বরং নিজের বিচার নথি পাঠ করছেন।
আগন্তুকঃ পঞ্চম প্রশ্ন—হিদায়াত। বলা হয়, আল্লাহ নবী পাঠিয়েছেন, কিতাব পাঠিয়েছেন, পথ দেখিয়েছেন। কিন্তু পথ কি সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছেছে? ভাষা কি সবার ছিল? জন্মভূগোল কি সবার সমান ছিল? কেউ আরবে জন্মায়, কেউ অরণ্যে, কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে, কেউ পুরোহিতের পরিবারে, কেউ মোল্লার ঘরে, কেউ বইয়ের ভাণ্ডারে, কেউ অশিক্ষার অন্ধকারে। তারপর বলা হয়—সত্য গ্রহণ করো। সত্য যদি সত্য হয়, তবে প্রশ্ন নেই। কিন্তু সত্যে পৌঁছানোর রাস্তা অসম হলে দায়ও অসম। [37] [20]
আরজ আলীঃ আপনি বলছেন, হিদায়াতের দাবিও ন্যায়বিচারের পরীক্ষায় বসতে হবে।
আগন্তুকঃ অবশ্যই। যে দাবি বলে—এই পথ না মানলে আগুন—সেই দাবির ভাষা, প্রমাণ, পৌঁছানোর পদ্ধতি, সামাজিক ক্ষমতা—সব পরীক্ষা করতে হবে। মানুষ জন্মের ধর্মকে সত্য ভাবে। তারপর অন্যের জন্মগত বিশ্বাসকে বলে কুফর। এ কেমন বিচার? নিজের উত্তরাধিকার ঈমান, অন্যের উত্তরাধিকার অন্ধবিশ্বাস—এই দ্বৈততা মানুষকে বিনয় শেখায় না; অহংকার শেখায়।
আগন্তুকঃ ষষ্ঠ প্রশ্ন—জাহান্নাম। সীমিত জীবনের সীমিত অপরাধের জন্য অসীম শাস্তি। মানুষ ভুল করল, সন্দেহ করল, ভুল ধর্মে জন্মাল, বিশ্বাস করতে পারল না, পাপ করল—হ্যাঁ, শাস্তি হতে পারে। কিন্তু অনন্ত? অপরাধ সীমিত, শাস্তি অসীম—এই অনুপাত কোথায়? দয়া যদি সত্যি দয়া হয়, তবে অনন্ত দহন কী? ন্যায় যদি সত্যি ন্যায় হয়, তবে চামড়া পুড়ে গেলে নতুন চামড়া দিয়ে আবার যন্ত্রণা দেওয়ার দর্শন কী? [42]
আরজ আলীঃ এখানে আপনি সবচেয়ে কঠোর। আপনি জাহান্নামকে ন্যায় নয়, প্রতিশোধ বলছেন।
আগন্তুকঃ আমি বলছি—যন্ত্রণা যদি সংশোধনের জন্য না হয়, শেষ না থাকে, অনুপাত না থাকে, এবং শাস্তিদাতার ক্ষমতা প্রদর্শন ছাড়া আর কিছু না করে—তবে সেটি ন্যায় নয়। মানুষ অত্যাচারীর শাস্তি চাইতে পারে, কিন্তু অনন্ত যন্ত্রণা ন্যায়বোধকে ছাড়িয়ে প্রতিহিংসায় ঢোকে। আল্লাহ যদি মানুষের সর্বোচ্চ ন্যায়বোধের চেয়েও উচ্চতর হন, তাঁর বিচার আরও করুণাময়, আরও সূক্ষ্ম হওয়া উচিত। কম নয়।
আগন্তুকঃ সপ্তম প্রশ্ন—জান্নাত। পুরস্কার থাকতে পারে। কিন্তু নৈতিকতা যদি জান্নাতের লোভে দাঁড়ায়, তবে তা বাণিজ্য। যে মানুষ জান্নাতের আশায় ভালো হয়, সে ভালো হতে পারে; কিন্তু তার নৈতিকতা এখনও হিসাবের খাতায় বাঁধা। আর যে মানুষ কোনো স্বর্গের লোভ ছাড়া ক্ষুধার্তকে খাওয়ায়, কোনো নরকের ভয় ছাড়া হত্যা করে না, কোনো ফেরেশতার খাতার ভয় ছাড়া সত্য বলে—তার নৈতিকতা অধিক প্রাপ্তবয়স্ক। ভয় ও লোভ দিয়ে মানুষকে চালানো যায়; কিন্তু স্বাধীন নৈতিক মানুষ তৈরি করা যায় না।
আরজ আলীঃ তাহলে জান্নাত-জাহান্নাম আপনার কাছে নৈতিকতার নিম্নতর ভাষা?
আগন্তুকঃ অনেক ক্ষেত্রে হ্যাঁ। এগুলো নৈতিকতার শিশুশিক্ষা হতে পারে—ভয় দেখাও, মিষ্টি দেখাও। কিন্তু সভ্য নৈতিকতার লক্ষ্য হওয়া উচিত—মানুষ যেন ভালো হয় কারণ অন্যের দুঃখ সত্য, কারণ অন্যায় ক্ষতিকর, কারণ স্বাধীনতা মূল্যবান, কারণ সত্য মিথ্যার চেয়ে উত্তম। যে মানুষ শুধু আগুনের ভয় পেলে পাপ ছাড়ে, আগুন না থাকলে সে কী করবে? যে মানুষ শুধু পুরস্কারের লোভে দান করে, পুরস্কার না থাকলে তার দয়া কোথায়?
আরজ আলী এবার নিচু স্বরে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আগন্তুকের বক্তব্য এখন আর বিচ্ছিন্ন আক্রমণ নয়; যেন একটি পূর্ণ দার্শনিক অভিযোগপত্র।
আগন্তুকঃ অষ্টম প্রশ্ন—মৃত্যু। মানুষ মরতে ভয় পায়। সে অমরত্ব চায়। তাই আত্মা বানায়, পরকাল বানায়, স্বর্গ বানায়, নরক বানায়। আমি মানুষের এই ভয় বুঝি। কিন্তু ভয় সত্যের প্রমাণ নয়। মৃত্যু যদি শেষও হয়, তবু জীবন অর্থহীন নয়। বরং সীমিত বলেই জীবন জরুরি। যদি এই জীবনই একমাত্র ক্ষেত্র হয়, তবে ন্যায় এখনই দরকার, ভালোবাসা এখনই দরকার, মিথ্যার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এখনই দরকার। পরকালের আদালত অনেক সময় মাটির আদালতকে দেরি করায়।
আরজ আলীঃ আপনি মৃত্যুকে সান্ত্বনা দিয়ে নয়, সত্য দিয়ে দেখতে চান।
আগন্তুকঃ হ্যাঁ। সান্ত্বনা দরকার, কিন্তু মিথ্যা সান্ত্বনা নয়। “জানি না” বলা কখনো কখনো সবচেয়ে সৎ ধর্মতত্ত্ব। যে জানে না, সে জানে না বলুক। অজানার ওপর প্রাসাদ বানিয়ে মানুষের ভয়কে শাসনের যন্ত্র বানাবেন না। মৃত্যু মানুষকে বিনয়ী করতে পারত; ধর্ম অনেক সময় তাকে ভীত করে। মৃত্যুকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করলে মানুষ বর্তমান জীবনের দায় এড়াতে পারে না।
আগন্তুকঃ নবম প্রশ্ন—মানুষের পাপ। মানুষ আমাকে দোষ দেয়। কিন্তু মানুষ নিজেই নিজের পাপের বড় স্থপতি। সে নিজের লোভকে শয়তান বলে, নিজের হিংসাকে শয়তান বলে, নিজের নিষ্ঠুরতাকে শয়তান বলে। আবার ধর্ম, রাষ্ট্র, পরিবার, সমাজ—সব মিলে পাপকে পবিত্র ভাষা দেয়। সরাসরি পাপ লজ্জায় লুকায়; পবিত্র পাপ মিছিল করে হাঁটে। মানুষ যদি সত্যিই নৈতিক হতে চায়, তবে তাকে বলতে হবে—আমি করেছি। কেন করেছি, তা বুঝতে চাই। শুধু “শয়তান করিয়েছে” বলে দায় এড়ানো চলবে না।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনি নিজের দায় স্বীকার করছেন, কিন্তু মানুষের দায়ও ফেরত দিচ্ছেন?
আগন্তুকঃ ঠিক তাই। আমি বলছি—আমি আছি, কিন্তু আমি সব নই। আমি প্ররোচক, কিন্তু স্রষ্টা নই। আমি ফিসফিস করি, কিন্তু মানুষের সভ্যতা, তার ক্ষমতা, তার ধর্মীয় অজুহাত, তার লোভ, তার ভয়, তার আল্লাহর নকশা—এসবও আছে। আমাকে দোষী করুন, কিন্তু পুরো মহাবিশ্বের নৈতিক আবর্জনা একা আমার নামে লিখবেন না। পাপের ইতিহাসে আমি একটি অধ্যায়, পুরো গ্রন্থ নই [7] [32]।
আরজ আলী এবার ধীরে ধীরে সামনে ঝুঁকলেন। তাঁর চোখে এখন তর্কের আগুনের সঙ্গে এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা। তিনি যেন বুঝতে পারছেন, এই আগন্তুকের জবানবন্দী বিপজ্জনক হলেও তুচ্ছ নয়।
আরজ আলীঃ আপনি এত কথা বললেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করা হয়—আপনি কে? আপনি নিজেকে কী নামে ডাকবেন? শয়তান? বিদ্রোহী? তাওহীদবাদী? প্রতারক? আয়না? অভিযুক্ত?
আগন্তুকঃ আমি সবই, আবার কোনো একটিও পুরো নয়। আমি প্রলোভন, কারণ মানুষ দুর্বল। আমি আয়না, কারণ মানুষ নিজের মুখ আমার মধ্যে দেখে। আমি বিদ্রোহী, কারণ আদেশের সামনে প্রশ্ন তুলেছিলাম। আমি অভিযুক্ত, কারণ বিজয়ীর বয়ানে আমার জন্য জায়গা ছিল না। আমি তাওহীদবাদীও—কারণ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সামনে মাথা নত করিনি। আমি প্রতারকও হতে পারি—কারণ আমি মানুষের দুর্বলতা ব্যবহার করি। কিন্তু আমি একা মিথ্যার উৎস নই। অনেক সময় মানুষ আমার চেয়েও বড় মিথ্যা নিজের ভেতরে বহন করে।
আরজ আলীঃ আর আল্লাহ? তাঁর বিষয়ে আপনার শেষ কথা কী?
আগন্তুকঃ আল্লাহ যদি সত্যিই ন্যায়বান হন, তবে তিনি প্রশ্নকে ভয় পাবেন না। যদি সত্যিই সর্বজ্ঞ হন, তবে তিনি জানেন আমার প্রশ্ন কোথা থেকে এসেছে। যদি সত্যিই দয়ালু হন, তবে তিনি অনন্ত আগুনের চেয়ে বড় কিছু ভাবতে পারেন। যদি সত্যিই অমুখাপেক্ষী হন, তবে মানুষের সিজদা, প্রশংসা, আনুগত্য তাঁর প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়। আর যদি তাঁর ন্যায়বিচার মানুষের ন্যায়বোধের চেয়েও উচ্চতর হয়, তবে তা মানুষের সর্বোচ্চ মানবিকতার চেয়েও নির্মম হতে পারে না। আমি শুধু এতটুকুই বলি—যে আল্লাহ প্রশ্নে ক্ষুব্ধ হন, তিনি ক্ষমতার দেবতা হতে পারেন; সত্যের নয়।
এই কথার পর ঘরের ভেতর ভারী নীরবতা। প্রদীপের আলো একবার কেঁপে উঠল। যেন বাতাসও কথা শুনে থমকে গেছে। আরজ আলী দীর্ঘ সময় কিছু বললেন না। তারপর খুব ধীরে বললেন।
আরজ আলীঃ আপনার বক্তব্য বিপজ্জনক। কিন্তু এটুকু মানতেই হচ্ছে—আপনার জবানবন্দী না শুনে আপনাকে বিচার করা সহজ ছিল। শুনে বিচার করা কঠিন হলো।
আগন্তুকঃ এটাই আমার সামান্য বিজয়। রায় বদলাক বা না বদলাক, বিচার কঠিন হোক। সহজ বিচার অনেক সময় অন্যায়ের মিত্র। মানুষ সহজ গল্প পছন্দ করে—নায়ক, খলনায়ক, আল্লাহ, শয়তান, জান্নাত, জাহান্নাম। কিন্তু সত্য অনেক সময় নাটকের চরিত্রতালিকা মানে না। সে চরিত্র বদলায়, মুখোশ খুলে, নায়ককে প্রশ্ন করে, খলনায়ককে কথা বলতে দেয়।
আরজ আলীঃ আপনার কথায় মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে।
আগন্তুকঃ হতে পারে। কিন্তু বিভ্রান্তি সবসময় খারাপ নয়। কখনো মানুষ ভুল নিশ্চয়তা থেকে বেরোতে গিয়ে বিভ্রান্ত হয়। শিশুকে বলা হলো, পৃথিবী তার গ্রামের মতোই ছোট। একদিন সে মানচিত্র দেখে বিভ্রান্ত হলো। সেই বিভ্রান্তিই জ্ঞান শুরু করল। বিশ্বাসের নিশ্চিন্ত ঘর থেকে বের হলে বাতাস লাগে, ভয় লাগে, পথ হারানোর আশঙ্কা থাকে। কিন্তু আকাশও তখনই দেখা যায়।
আরজ আলীঃ তাহলে আপনি নিজেকে মুক্তির পথপ্রদর্শক ভাবছেন?
আগন্তুকঃ না। আমি পথপ্রদর্শক নই। আমি পথের পাশে দাঁড়ানো প্রশ্ন। পথিক চাইলে শুনবে, চাইলে যাবে। আমি মুক্তি দিই না; অস্বস্তি দিই। মুক্তি মানুষ নিজে তৈরি করে—নিজের ভয় ভেঙে, নিজের বিশ্বাস পরীক্ষা করে, নিজের পাপ স্বীকার করে, নিজের আল্লাহকেও প্রশ্নে বসিয়ে। আমি দরজা খুলে দিই না; শুধু বলি—দরজাটি আছে কি না দেখে নাও।
আরজ আলী এবার মাথা নিচু করে বসে থাকলেন। অনেকক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে বললেন।
আরজ আলীঃ আপনার জবানবন্দী শেষ?
আগন্তুকঃ প্রায়। শেষ কথা শুধু এই—মানুষ আমাকে ঘৃণা করুক, তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু ঘৃণা করার আগে নিজেকে দেখুক। আমাকে দোষী বলুক, কিন্তু নিজের দায় অস্বীকার না করুক। আল্লাহকে ন্যায়বান বলুক, কিন্তু ন্যায়ের মানে ভেঙে না দিক। বিশ্বাস করুক, কিন্তু প্রশ্নকে পাপ না বানাক। আর যদি সত্যিই বিচার চায়, তবে বিচার যেন এক পক্ষের ভাষায় শেষ না হয়। আমি শয়তান—হ্যাঁ। কিন্তু শয়তানেরও জবানবন্দী আছে। সেটি শুনে যদি মানুষের ঈমান কেঁপে ওঠে, তবে সমস্যা আমার কথায় নয়; ঈমানের ভিতেই ছিল।
আগন্তুক থামলেন। ঘরের ভেতর গভীর নীরবতা। বাইরে রাতের অন্ধকার আরও ঘন। প্রদীপের আলো যেন এখন ছোট হয়ে গেছে, কিন্তু নিভে যায়নি। আরজ আলী স্থির বসে আছেন। তাঁর সামনে মানুষ, শয়তান, আল্লাহ, ন্যায়বিচার, পাপ, বিশ্বাস—সব একসঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছে। কোনো রায় নেই। শুধু প্রশ্ন আছে। আর প্রশ্নের ভার।
আরজ আলীঃ তাহলে এখন কী করবেন?
আগন্তুকঃ এবার যাব। আমার কাজ ছিল বলা। আপনার কাজ বিচার করা। আর মানুষের কাজ—হয়তো শুনে অস্বস্তিতে থাকা। অস্বস্তি কখনো কখনো চিন্তার প্রথম দরজা।
আরজ আলীঃ আর যদি আমি আপনার কথা বিশ্বাস না করি?
আগন্তুকঃ বিশ্বাস চাইনি। বিচার চেয়েছি। বিশ্বাস দ্রুত মাথা নত করে; বিচার ধীরে হাঁটে। আপনি ধীরে হাঁটুন। তাতেই যথেষ্ট।
দুজনেই চুপ। রাতের গভীরে কোথাও পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ। প্রদীপের আলো কেঁপে ওঠে। আগন্তুকের মুখে মৃদু হাসি। সেই হাসিতে জয় নেই, পরাজয় নেই—শুধু দীর্ঘ নীরবতার পর বলা কথার ক্লান্ত শান্তি।
দৃশ্যঃ ১৩
স্থানঃ আরজ আলীর কুঁড়েঘর
সময়ঃ গভীর রাতের শুরু
চরিত্রঃ আরজ আলী, আগন্তুক
ঘটনাঃ দীর্ঘ জবানবন্দীর পর আর কোনো বড় যুক্তি নেই। আছে নীরবতা, অনিশ্চয়তা, এবং বিচার অসমাপ্ত থাকার চাপ। আগন্তুক চলে যাবেন। আরজ আলী একা থাকবেন—বই, প্রদীপ, অন্ধকার এবং প্রশ্নের মধ্যে।
ঘরের ভেতর প্রদীপের আলো আরও ক্ষীণ। বাইরে রাত পুরোপুরি নেমে গেছে। দূরে কোথাও কুকুরের ডাক, তারপর দীর্ঘ নীরবতা। আগন্তুক ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর ওঠার ভঙ্গিতে কোনো তাড়াহুড়া নেই, কোনো নাটকীয় গর্জন নেই, কোনো অলৌকিক প্রদর্শন নেই। যেন তিনি এসেছিলেন কথা বলতে, কথা বলেছেন, এখন চলে যাবেন।
আরজ আলীঃ আপনি যাচ্ছেন?
আগন্তুকঃ হ্যাঁ। অনেক রাত হয়েছে। প্রশ্নেরও বিশ্রাম দরকার, যদিও তারা কখনো পুরো ঘুমায় না।
আরজ আলীঃ আপনি কি আবার আসবেন?
আগন্তুকঃ আমি আসি না, আরজ আলী সাহেব। মানুষ যখন প্রশ্নকে দরজা খুলে দেয়, তখন আমাকে আসতে হয় না। আমি তখন আগেই ঘরে থাকি—বইয়ের পাতায়, সংশয়ের ভাঁজে, বিবেকের কাঁপুনিতে, আর সেই নীরব মুহূর্তে যখন মানুষ নিজের বিশ্বাসকে নিজের কাছেই ব্যাখ্যা করতে পারে না।
আরজ আলীঃ আপনার কথা আমি মানব কি না জানি না। কিন্তু অস্বীকারও করতে পারছি না যে, আপনি আমাকে অস্বস্তিতে রেখে যাচ্ছেন।
আগন্তুকঃ অস্বস্তি খারাপ নয়। নিশ্চিন্ত মিথ্যার চেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন শ্রেয়। মানুষ অনেক সময় শান্তি চায়, কিন্তু সত্য সবসময় শান্তি দেয় না। কখনো সত্য দরজা খোলে; কখনো মেঝে সরিয়ে দেয়। আপনি শুধু পড়ে যাবেন না—দেখবেন, নিচে কী আছে।
আরজ আলী নীরবে তাকিয়ে রইলেন। আগন্তুক দরজার দিকে এগোলেন। দরজার কাছে গিয়ে থামলেন। বাইরে অন্ধকার। তাঁর সাদা পোশাক সেই অন্ধকারের সামনে অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট, অথচ ক্রমশ অস্পষ্টও। যেন আলো আর ছায়া তাঁর ওপর নিজেদের অধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব করছে।
আরজ আলীঃ শেষ একটি কথা। আপনি যদি সত্যিই ইবলিশ হন, তাহলে মানুষের কাছে আপনার শেষ উপদেশ কী?
আগন্তুকঃ মানুষকে আমি উপদেশ দেওয়ার যোগ্য নই। তবু যদি বলতে হয়—নিজের পাপ আমার নামে লিখে নিস্তার খুঁজো না [7]। নিজের ভয়কে ঈমান বলো না। নিজের লোভকে সওয়াব বলো না। নিজের নিষ্ঠুরতাকে ধর্মরক্ষা বলো না। নিজের জন্মগত বিশ্বাসকে সত্য বলার আগে তার বিপরীত বিশ্বাসে জন্মালে তুমি কী বিশ্বাস করতে—সে প্রশ্ন করো। আর সবচেয়ে বড় কথা—যে আল্লাহকে ভালোবাসো, তাঁকেও প্রশ্ন করার সাহস রাখো। সত্য হলে তিনি টিকে যাবেন। মিথ্যা হলে তোমার মুক্তি হবে।
আরজ আলীঃ আর যদি প্রশ্ন মানুষকে ভেঙে দেয়?
আগন্তুকঃ তবে বুঝবে, সে আগে থেকেই ভাঙা ছিল—শুধু রঙ করা ছিল। প্রশ্ন রঙ খসায়; কাঠ ভাঙে না যদি কাঠ মজবুত হয়।
আগন্তুক দরজার বাইরে পা রাখলেন। আরজ আলী উঠে দাঁড়ালেন না। তাঁর চোখ স্থির। বাইরে রাতের অন্ধকারে আগন্তুকের সাদা অবয়ব কয়েক মুহূর্ত দেখা গেল, তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। কোনো বজ্রপাত হলো না, কোনো অগ্নিশিখা উঠল না, কোনো অলৌকিক শব্দ হলো না। শুধু অন্ধকার আগের মতোই রইল—কিন্তু আরজ আলীর কাছে সেই অন্ধকার আর আগের মতো নয়।
দরজা খোলা। বাইরে রাত। ভেতরে প্রদীপ। টেবিলের ওপর বইগুলো নিঃশব্দে পড়ে আছে—কোরআন, বাইবেল, গীতা, ত্রিপিটক, দর্শনের বই, ইতিহাসের বই। যেন সব বই এখন একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন প্রত্যেক বই জানে, আজ তাদেরও বিচার হয়েছে।
আরজ আলীঃ শয়তান… না প্রশ্ন?
তিনি নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। ধীরে ধীরে দরজা বন্ধ করলেন। তারপর টেবিলের কাছে ফিরে এসে বসে পড়লেন। প্রদীপের আলোয় তাঁর মুখে ক্লান্তি, বিষণ্ণতা, বিস্ময় এবং গভীর চিন্তার ছায়া। তিনি কোরআনের দিকে তাকালেন। তারপর দর্শনের বইগুলোর দিকে। তারপর নিজের হাতের দিকে। যেন প্রথমবার বুঝতে পারলেন—মানুষের হাতই সিজদা করে, মানুষই পাথর ছোঁড়ে, মানুষই বই লেখে, মানুষই আগুন জ্বালে, মানুষই প্রশ্ন করে। কখনো কখনো ইবলিশ নয়, প্রশ্নই দরজায় এসে দাঁড়ায়; মানুষ ভয় পেয়ে তাকে অভিশপ্ত শয়তান বলে ডাকে।
দূরে কোথাও রাতের বাতাসে কারও কণ্ঠ ভেসে এলো। হয়তো পথিক, হয়তো কোনো গ্রাম্য গায়ক, হয়তো আরজ আলীর নিজের স্মৃতি। কণ্ঠটি স্পষ্ট নয়, তবু শব্দগুলো ধীরে ধীরে যেন ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে।
আরজ আলী চমকে উঠলেন না। শুধু শুনলেন। গানটি যেন বাইরে থেকে আসছে, আবার তাঁর নিজের ভেতর থেকেও। প্রদীপের আলো কাঁপছে। বাইরে রাত আরও গভীর।
আরজ আলীঃ হাকিম, পুলিশ, সাপ, ওঝা… সব যদি একই হয়, তবে বিচার কোথায়?
কোনো উত্তর নেই। শুধু প্রদীপের আলো। শুধু বই। শুধু অন্ধকার। শুধু প্রশ্ন।
আরজ আলী ধীরে ধীরে কলম হাতে নিলেন। কিছুক্ষণ স্থির বসে রইলেন। তারপর একটি সাদা কাগজ টেনে নিলেন সামনে। কাগজের ওপর প্রথম লাইনটি লিখলেন—
“শয়তানের জবানবন্দী”
কলম থামল। বাইরে রাত। ভেতরে প্রদীপ। আর সেই প্রদীপের ক্ষীণ আলোয়, মানুষের ইতিহাসের এক পুরনো খলনায়ক প্রথমবার নিজের বক্তব্য পেল। রায় এখনও ঘোষিত হয়নি। বিচার এখনও চলছে। পাঠকই এখন বিচারক।
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.
The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.
This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.
তথ্যসূত্রঃ
- সূরা আরাফ, আয়াত ১৬–১৭ ↩︎
- সূরা সাদ, আয়াত ৮২–৮৫ ↩︎
- সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২১৫৮ 1 2
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৪৯১ ↩︎
- সূরা হিজর, আয়াত ৩৯–৪২ ↩︎
- সূরা ইসরা, আয়াত ৬১–৬৫ ↩︎
- সূরা ইবরাহিম, আয়াত ২২ 1 2 3
- সূরা কাহফ, আয়াত ৫০ ↩︎
- সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২১৫৮ 1 2
- সূরা ক্বামার, আয়াত ৪৯ ↩︎
- সূরা বাকারা, আয়াত ৩০ ↩︎
- সূরা বাকারা, আয়াত ৩১–৩২ ↩︎
- সূরা সাফফাত, আয়াত ১০২ ↩︎
- সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিসঃ ৪৩ ↩︎
- সূরা যারিয়াত, আয়াত ৫৬ ↩︎
- সূরা ফুসসিলাত, আয়াত ৩৭ 1 2 3
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৫০১ 1 2
- সূরা তাকভীর, আয়াত ২৯ 1 2
- সূরা কাহফ, আয়াত ১৭ ↩︎
- সূরা কাসাস, আয়াত ৫৬ 1 2 3
- সূরা আরাফ, আয়াত ১৬ ↩︎
- সূরা হিজর, আয়াত ৩৯ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, তাহকিককৃত, আল্লামা আলবানী একাডেমী, হাদিসঃ ৪৭০৩ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৬৬৫৯ ↩︎
- সূরা লাহাব, আয়াত ১–৫ ↩︎
- সূরা নাহল, আয়াত ৭১ ↩︎
- সূরা আনকাবুত, আয়াত ৬২ ↩︎
- সূরা শুরা, আয়াত ১২ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ২৩২৮ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৩৩৫ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৪৯১ ↩︎
- সূরা নাহল, আয়াত ৯৯–১০০ 1 2
- সূরা ফাতির, আয়াত ৮ ↩︎
- সূরা আন’আম, আয়াত ১১২ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিসঃ ৬৪ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৫৩৯ ↩︎
- সূরা ফাতির, আয়াত ২৪ 1 2
- সূরা নাহল, আয়াত ৩৬ ↩︎
- সূরা ইবরাহিম, আয়াত ৪ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৮০৮ ↩︎
- সূরা কাসাস, আয়াত ৬৮ ↩︎
- সূরা নিসা, আয়াত ৫৬ 1 2 3
- সূরা নিসা, আয়াত ৪০ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিসঃ ১১৫ ↩︎
- সূরা কাহফ, আয়াত ৭৪ ↩︎
- ৮০–৮১ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩১০ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৪৭ ↩︎
- সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিসঃ ১১৮ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিসঃ ২৩২৮; সহীহ মুসলিম ২৭৪৯ ↩︎
- সূরা বাইয়্যিনাহ, ৯৮:৬ ↩︎
- সূরা কাহফ, আয়াত ৫০; সূরা ফুসসিলাত, আয়াত ৩৭ ↩︎


এক কথায় দুর্দান্ত।
ধন্যবাদ
বিশাল সংখ্যাক মানুষকে নিয়ন্ত্রণ ( বিজনেস ও স্বাথ সহ ) খুবই সহজ উপায় হলো ধম ।
যারা বছরের পর পর আমাদের মতন সহজ সরল মানুষ রয়েছে ,,, যারা ধম কে ভক্তি ও শ্রদ্ধা করি ।
আমরা কখনোই আমাদের মধ্য এই চিন্তা টা ব্রইনে আনতে পারি না ,, ধম হলো প্রবিএ ও সম্মান এর স্থান ।
তাহলে আমাদের সমাজে যেই ধমের মানুষ ই থাকুক না কেন ,,, ধমের জন্য হিংস্রতা ও সহিংসতা আসবে কেন।
যারা আমাদের সুকৌশলে নিয়ন্ত্রিত করে আসছে তারা কখনোই আমাদের চিন্তা করতে সময় টুকু পযন্ত দেয় না ।
এই ধমের গোলকধাঁধা য় কারা লাভবান এটা কি কখনো ভেবে দেখেছি ।
লাভবান হচ্চে নিয়ন্ত্রিত হওয়া হাজার মানুষের মধ্য কয়েকজন যারা সুকৌশলে আমাদের লিড করে শোষন করে যাচ্চে।
কারন ধম হলো প্রবিএ তাহলে এখানে সংহিতা’র অথ কি ।
যদি এই রকম প্রশ্ন আসে ,,, তাহলে খুবই সহজ সমাধান
খারাপ যা কিছু হয় তা শয়তানে করায় �🤭🤭🤭 🤭🤭🤭🤭
দারুন, এক কথায় অসাধারণ লিখেছেন ভাই, লেখাটা পড়ে তো আমি পুরাই স্তব্ধ।
ইবলিশ এক লাইন বেশি বুঝছিলো। তার অনুসারীরাও একলাইন বেশি বুঝে। আদম আঃ কে জান্নাত থেকে বিতাড়িত করার পর তিনি তার ভুলের জন্য আল্লাহকে দোষারোপ না করে বরং ক্ষমা চেয়েছেন। আর অন্য দিকে ইবলিশ ক্ষমা চাওয়ার পরিবর্তে অহংকার করলো। এটাই পার্থক্য। আল্লাহর রঙে রঙিন হওয়া মানে আল্লাহর অহংকারের চাদর নিয়ে টানাহেচড়া করা নয়। এখানেও ইবলিশ একলাইন বেশি বুঝলো। আদবে আউলিয়া বেয়াদবে শয়তান। ওই সিচুয়েশনে শয়তানের উচিত ছিলো বিনয়ী হওয়া। ভালো ছাত্র এবং বেয়াদব ছাত্রের মধ্যে এটাই পার্থক্য। বেয়াদবদের মাঝেও অনেক ভালো গুন্ থাকে কিন্তু তারা তাদের বেয়াদবীর কারণে অভিশপ্ত হয়। আর এটাই বাস্তবতা।
আসিফ ভাই শয়তানের যুক্তির প্রেমে পড়ে গিয়েছি…যদি ও তার সম্পূর্ন ক্রেডিট আপনার,,কত ই না ভালো মানুষ আপনি… আসলে ই ভাই আপনার প্রশংসা যতো করবো কম হবে.. আপনি মহান আসিফ ভাই… আপনি আমার চক্ষু খোলে দিয়েছেন.. আমার বাকি জীবন খুব ই সুন্দর কাটবে শুধু আপনার জন্য,.. মানুষ করলেন আমাকে…ত্যাগ করেছি এই ইসলাম ৯ মাস আগে ই, তবুও ভয় পেতাম,.. আজকে শয়তান কে নিজের স্রষ্টা মনে হচ্ছে যুক্তি আর ভালো বুদ্ধিমাত্তা জন্য… আজ থেকে আমি মুক্ত ভয় নেই আমার.. কোনো ভয় নেয়,..
নাস্তিকদের সব কথা জবাব তো কমেন্টে দেওয়া সম্ভব নয়,তারপরও কিছু কথা বলি,আল্লাহ মানুষ ও জ্বীন জাতিকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যেন তারা নিজেরা নিজেদের চিন্তা বিবেক বুদ্ধি দিয়ে ডিসিশন নিতে পারে,তারমানে এই নয় যে আপনি আল্লাহর দেয়া আদেশ অমান্য করে ভুল ডিসিশন নিয়ে সেটাকে আবার সত্য মনে করবেন,মানুষ ও জ্বীনকে জ্ঞান বিবেক বুদ্ধি দেওয়া হয়েছে তারা এই জ্ঞান বিবেক বুদ্ধি ব্যবহার তার যেটা ভালো মনে হয় সেরকম ডিসিশন নিতে পারে,যে আমি এই কাজটা করবো আমার কাছে এটা ভালো মনে হয়,তারমানে এই নয় মানুষ ও জ্বীন তাদের বিবেক বুদ্ধি খাটিয়ে যে ডিসিশন নিবে সেটা সঠিক,কারণ বিচার করার ক্ষমতা মানুষ বা জ্বীনের নেই,বিচার করবেন আল্লাহ যে তুমি কোন কাজটি ভালো করেছো কোনটি খারাপ করেছো,কারণ যে মদ খায় তার কাছে মদই ভালো, যে দুধ খায় তার কাছে দুধ ভালো,যে মদ খায় সে কখনো বলবে না মদ খারাপ,যে সুদ খায় তার কাছে কখনো সুদ খারাপ মনে হয় না,মানুষ বিবেক বুদ্ধি দিয়ে যেটা গ্রহণ করে সেটাই সঠিক বিচার করার ক্ষমতা থাকতো তাহলে সুদকে বা মদ যে খায় তার কাছে এগুলো ভালো মনে হতো না,আমি এটাই বলতে চাচ্ছি মানুষ ও জ্বীন তাদের বিবেক বুদ্ধি খাটিয়ে যে ডিসিশন নিবে সেটাই যে চুড়ান্ত বা গ্রহণযোগ্য সেটা ভাবার কোনো সুযোগ নেই,যেমন ইবলিশ নিজের বিবেক বুদ্ধি খাটিয়ে ডিসিশন নিয়েছে সে আদমের চেয়ে বড় কিন্তু তার সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্যতা পাই নি,কারণ সে তখন অহংকার প্রদর্শন করেছে,যে আমিই ঠিক,অহংকার করা মানুষ বা জ্বীনের কাজ নয়,আল্লাহ বলেন,সূরা আল-মু’মিন – আয়াত ৬০:
…নিশ্চয়ই যারা আমার ইবাদতে অহংকার করে, তারা অবমাননাকর অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।”
ইবলিশ তাই করেছিলো,সে এটা ভেবে অহংকার প্রদর্শন করলো আমি এত বছর আল্লাহর ইবাদত করলাম আমি কেন আদমকে সোজদা করবো,এছাড়া আদম মাটির আমি আগুনের সৃষ্টি আমাকে আদমের সেজদাহ করা উচিত, অহংকার শুধুমাত্র আল্লাহর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যিনি সবকিছুর মালিক,আপনি কিসের মালিক ভাই সামান্য এক ফোটা পানি থেকে আপনার আপনার অস্তিত্ব কে দিয়েছে,একফোঁটা পানি থেকে অস্তিত্ব পেয়ে যদি মানুষের এত দাম্ভিকতা অহংকার প্রদর্শন করে তাহলে যিনি আসমান যমীন চন্দ্র সূর্য এবং মহাবিশ্বের মালিক তার অহংকার কেমন হওয়া উচিৎ?এটা নিয়ে আর বেশি কিছু বললাম না,সাধারণ কিছু যুক্তি দিয়ে আল্লাহর সামনে টিকতে পারবেন না,আল্লাহ যতটুকু হায়াত দিয়েছেন আল্লাহর নাফরমানি করে সেটা শেষ করেন তারপর বুঝতে পারবেন,মরবেন তো নাকি আজীবন তো আর পৃথিবীতে থাকতে পারবেন না,আরেক জায়গায় বলেছেন যে আল্লাহ কোরআনে বলেছেন তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন,অথচ আল্লাহ মানুষের ইবাদতের মুখাপেক্ষী ইবাদত পাবার আশায় থাকে তাই তো,এটা নিয়ে এত বেশি কিছু বলার নেই কমেন্ট বেশি বড় হয়ে যাচ্ছে, শুনেন ভাই আসলেই আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন,গ্যালাক্সি চিনেন তো নাকি,সেখান থেকে পৃথিবীর অবস্থান কতটুকু দেখেছেন তো ক্ষুদ্র বালুকণার মতো দেখা যায় পৃথিবী,আরেকটু দূর থেকে দেখলে তো পৃথিবীর অবস্থানই নির্ণয় করা যায় না,আচ্ছা ধরেন আপনি একটি মরুভূমির মালিক এত বড় মরুভূমির মধ্যে আপনার কাছে একটি বালুকণার কি মূল্য থাকতে পারে,পৃথিবীর মূল্য আল্লাহর কাছে এরচেয়ে কম,আল্লাহ শুধু নবী রাসুল দিয়েছেন কিতাব দিয়েছেন দিক নির্দেশনা দিয়েছেন,সতর্ক করেছেন,এবার আপনার ইচ্ছে মানলে মানেন না মানলে নাই,এই যে একটু আগে বললেন মানুষ ও জ্বীনকে আল্লাহ জ্ঞান বুদ্ধি দিয়েছে যেন নিজে সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে পারে,এবার আপনার ইচ্ছে ইবাদত করবেন নাকি নাফরমানী করবেন,এটা একান্ত আপনার ইচ্ছে তাতে আল্লাহর কিচ্ছু যায় আসে না,আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন,আল্লাহ শুধু সতর্ক করেছেন মানলে ভালো থাকবেন না মানলে আগুনে থাকবেন,তখন কিন্তু আল্লাহর দোষ দেওয়ার অপশন থাকবে না,কারণ আল্লাহ আগেই সতর্ক করেছেন,আপনারা নাস্তিকরা তো আবার সব বিষয়ে দোষ খুজেন,ভালো থাকবেন,আল্লাহ আপনাদেরকে হেদায়েত দান করুক।
এত সুন্দর যৌক্তিক উপস্থাপনা আপনার মতো চুনাহাগা মুমিনদের জন্য নয় ।
শুধু চিন্তাশীলরায় এ থেকে উপকৃত হবেন ।
নাটকটা এআই দিয়ে অনেক সুন্দর করে বানানো যাবে! আপনি বানিয়ে ইউটিউবে ছাড়েন আছিফ ভাই🙋🌸 পুরাটা পড়তে ধুম বাইরে যায়, এমনিতেই মাদ্রাসা থেকে পিএইচডি করা 😅
হে মুসলিমগন, জানিয়া রাখো, যখন তোমরা উহার (ইসলামের) পক্ষে সাফাই গাও, তখন নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদিগের উহা টি (মগজ টি) ব্যবহার করনা! হায়, ইহা কতইনা পরিতাপের বিষয়!
এবং স্মরণ কর সেই সময়ের কথা যখন তোমরা জানিয়া বুঝিয়া সুচাতুরতার সহিত ভন্ডামি করিয়া থাকো! নিশ্চয়ই তিনিই সর্বোত্তম চতুর এবং ভন্ডামির মালিক যিনি আরশের অধিপতি।।
আসলে এক কথায় অসাধারণ!
যদিও আমি ধর্মের ব্যাপারে এতো বেশি কিছু জানি না তবে যা জানি তাতেই আমার অনেক খটকা লাগে অনেক ব্যাপারে। ভগবান/ঈশ্বর/আল্লাহ -এর এইটুকু শক্তি নাই যে নিজে একটা উপায় বের করবেন যা দিয়ে সব বিধিনিষেধ, নিয়মকানুন এবং সবকিছু নিজে এই বিশ্বভ্রমান্ডে পৌঁছে দিবেন যা থাকবে অক্ষত ও সৃষ্টির আদি থেকে। এইগুলার জন্য মানুষ (তও আবার কিছু ক্ষেত্রে ওই মানুষটাই লিখতে পড়তে জানে না) ভাড়া করা লাগছে এইগুলা লিপিবদ্ধ করে দেয়ার জন্য।
যাকগ্গা, এই নাটকটা পড়াকালীন আমার আগন্তুকের জায়গায় আমাদের মোশারফ করিমের চেহারাটা ভেসে উঠেছে বার বার। মনে হয়েছে প্রতিটা কথা সে বেলছে। এই অনুভূতিটাই বলতে এসেছি।
Hawa is not solely responsible for eating prohibited fruit. Quran says that both Adam and Hawa ate the fruit together.So, they are both equally responsible.
UN has fake rules. It has failed in stopping genocide in Palestine, Sudan, Kashmir etc.Man made rules are fake and prejudiced. USA is the fraud peacemaker. It is responsible for wars in many countries. Israel is the real terrorist.
Only Islamic Shariah is the best for all humankind.
আমি মনে করি আপনার জন্ম আফগানিস্থানে হওয়া উচিৎ ছিল ।
আপনার মাথায় যদি একটু ঘেলু থাকে তাহলে দয়াকরে একটু পড়াশোনা করুন ।
শোনা বিষয় নিয়ে কমেন্ট করা উচিৎ নয় ।
প্রত্যেক ধর্মপ্রান মুসলমানদের এই আর্টিকেল পড়া উচিৎ । তাহলে অনেক অজানা সত্য তারা জানতে পারবেন ।
ধন্যবাদ আসিফ ভাই ! আমি মনে প্রানে বিশ্বাস করি, আপনার দেখানো পথেই মানুষ একদিন সঠিক পথ পাবে ।
২১/৫/২০২৬ এর শয়তানের জবানবন্দি-এর নতুন এডিশনটা তো পুরোই ডায়াবলিকাল! নিখুঁতভাবে চলচ্চিত্রে উপস্থাপন করতে পারলে ফেইথ-ইটার হয়ে থাকতো র্যাশনালি।
এখন তো AI দিয়ে লং-রানটাইম এর জাপানিজ টাইপ ভালো অ্যানিমেশনও বানানো পসিবল।
খরচাপাতিতে সবাই মিলেমিশে কন্ট্রিবিউট করার সহজ পথ রাখলে হয়তো সম্ভবপর হবে।