ইসলাম ও নারী – সর্বোচ্চ সম্মান এবং সুমহান মর্যাদা!
সংক্ষিপ্তসার
ইসলাম নারীকে “সর্বোচ্চ মর্যাদা” দিয়েছে—এই দাবি মুসলিম ধর্মীয় প্রচারণার সবচেয়ে পরিচিত দাবিগুলোর একটি। এর পক্ষে সাধারণত বলা হয়, ইসলাম-পূর্ব আরবে নারী ছিল সম্পূর্ণ অধিকারহীন, কন্যাশিশুকে নির্বিচারে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো, নারী সম্পত্তি বা উত্তরাধিকার পেত না, নিজের বিবাহের সিদ্ধান্ত নিতে পারত না; ইসলাম এসে তাকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি, সম্পত্তি, উত্তরাধিকার, বিবাহের অধিকার ও সামাজিক সম্মান দিয়েছে। এই প্রচারণা ইতিহাসের নির্বাচিত অংশকে বড় করে দেখায় এবং ইসলামের নিজস্ব পুরুষতান্ত্রিক বিধানগুলোকে আড়াল করে। কোরআন, সহিহ হাদিস ও ধ্রুপদী ফিকহ একসঙ্গে পড়লে দেখা যায়, ইসলামী নারী-ব্যবস্থার কেন্দ্র সমান অধিকার নয়; কেন্দ্র হলো পুরুষের কর্তৃত্ব, নারীর আনুগত্য, যৌনপ্রাপ্যতা, প্রজনন এবং পরিবারে নারীর নিয়ন্ত্রিত অবস্থান।
কোরআন ও সহিহ হাদিসে নারীকে পুরুষের জন্য বিপজ্জনক ফিতনা, জন্মগতভাবে বাঁকা, বুদ্ধি ও ধর্মে ঘাটতিসম্পন্ন, অমঙ্গলের সম্ভাব্য উৎস এবং জাহান্নামের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। দাম্পত্যে পুরুষকে নারীর ওপর কাওয়াম বা কর্তৃত্বশীল করা হয়েছে; সৎ স্ত্রীর বৈশিষ্ট্য হিসেবে আনুগত্য নির্ধারিত হয়েছে; স্ত্রীর অবাধ্যতার আশঙ্কায় উপদেশ, শয্যা বর্জন ও প্রহারের ক্ষমতা স্বামীকে দেওয়া হয়েছে। স্বামীর যৌন আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলে ফেরেশতার অভিশাপ, স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোজায় নিষেধ, যৌনসম্পর্কে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা এবং ধ্রুপদী ফিকহে স্ত্রীর যৌনপ্রাপ্যতাকে স্বামীর অধিকার হিসেবে ব্যাখ্যা—সব মিলিয়ে বিবাহকে সমান দুই ব্যক্তির সম্পর্কের বদলে পুরুষের কর্তৃত্ব ও নারীর আনুগত্যের কাঠামোয় স্থাপন করা হয়েছে।
এই বৈষম্য বিবাহের বাইরেও বিস্তৃত। পুরুষ একইসাথে সর্বোচ্চ চারজন স্ত্রী ও অগণিত যৌনদাসী রাখতে পারে [1] [2], অন্যদিকে নারী একাধিক স্বামী বা একজনও যৌনদাস রাখতে পারে না; দ্বিতীয় বিবাহের জন্য প্রথম স্ত্রীর সম্মতি আবশ্যক নয়; তালাকের মৌলিক একতরফা ক্ষমতা স্বামীর হাতে [3], অথচ নারীর বিচ্ছেদের পথ খুলা, বিচারিক বিচ্ছেদ বা অর্পিত ক্ষমতার মতো আলাদা শর্তের অধীন। পুত্র ও কন্যা একসঙ্গে উত্তরাধিকারী হলে পুত্র কন্যার দ্বিগুণ পায়; স্বামীর নির্ধারিত উত্তরাধিকার স্ত্রীর দ্বিগুণ; নির্দিষ্ট আর্থিক লেনদেনে দুই নারীর সাক্ষ্য এক পুরুষের সাক্ষ্যের বিকল্প হিসেবে এসেছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে স্ত্রী বানানো এবং নির্দিষ্ট অবস্থায় তার সঙ্গে বৈবাহিক সহবাসকে কোরআনের ইদ্দতের আয়াত, বুখারির অধ্যায়, আয়িশার ছয় বছরে বিবাহ ও নয় বছরে বাসর এবং ধ্রুপদী ফিকহের মাধ্যমে বৈধ কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছে [4]। যুদ্ধবন্দিনী ও দাসী নারীদের মালিকের যৌন অধিকারের আওতায় আনা হয়েছে, যেখানে স্বাধীন সম্মতির প্রশ্নকে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি[5]।
ইসলামী নারী-ব্যবস্থার মূল সমস্যা কোনো একটি বিচ্ছিন্ন হাদিস, একটি বিতর্কিত অনুবাদ কিংবা একজন আলেমের ব্যক্তিগত মত নয়। কোরআন, সহিহ হাদিস ও ধ্রুপদী ফিকহের বিভিন্ন বিধান পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এমন একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে পুরুষের কর্তৃত্ব, যৌন অধিকার ও পারিবারিক সিদ্ধান্তক্ষমতা নারীর তুলনায় বেশি এবং নারীর আনুগত্য, যৌনপ্রাপ্যতা, প্রজনন ও আচরণকে পুরুষকেন্দ্রিক নিয়মের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় নারী পূর্ণ স্বাধীন ব্যক্তি নয়; সে সীমিত অংশপ্রাপ্ত, শর্তাধীন, অভিভাবকনির্ভর, স্বামীনির্ভর এবং পুরুষতান্ত্রিক আইনে নিয়ন্ত্রিত সত্তা। কোনো ব্যবস্থায় নারীকে সামান্য সম্পত্তি, মোহর বা ভরণপোষণ দিলেই তা সমতা হয় না। প্রশ্ন একটাই: একই অবস্থানে নারী ও পুরুষের স্বাধীনতা, কর্তৃত্ব, শরীরের মালিকানা এবং আইনি ক্ষমতা সমান কি না। ইসলামী মূল উৎসগুলোর উত্তর বারবার—না।
ভূমিকা
নারীর প্রতি কোনো ধর্মের অবস্থান বিচার করতে হলে প্রশংসাসূচক স্লোগান দিয়ে শুরু করলে চলবে না। “মায়ের পায়ের নিচে জান্নাত”, “নারীকে ইসলাম সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে”, “ইসলামই প্রথম নারীকে অধিকার দিয়েছে”—এ ধরনের বাক্য জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু কোনো সমাজে নারীর প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ করে তার আইনি ও সামাজিক ক্ষমতা। সে নিজের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারে কি না, কাকে বিয়ে করবে তা নিজে নির্ধারণ করতে পারে কি না, বিবাহ থেকে সমানভাবে বেরিয়ে যেতে পারে কি না, স্বামীর যৌন দাবি প্রত্যাখ্যান করতে পারে কি না, সম্পত্তিতে সমান অংশ পায় কি না, তার বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত পুরুষের সমান মূল্য বহন করে কি না, পরিবারে কে কর্তৃত্ব করে, এবং যুদ্ধ বা দাসত্বের পরিস্থিতিতে তার শরীরের ওপর কার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়—নারীর মর্যাদার প্রকৃত পরীক্ষা এগুলো।
ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত নারী-মুক্তির বয়ান সাধারণত বর্তমান বিধানকে সরাসরি বিচার না করে সপ্তম শতকের ইসলাম-পূর্ব আরবকে সামনে আনে। প্রথমে একটি ভয়াবহ অতীত নির্মাণ করা হয়: কন্যাশিশুকে জন্মমাত্র জীবন্ত কবর দেওয়া হতো, নারীর কোনো সম্পত্তি ছিল না, কোনো সামাজিক মর্যাদা ছিল না, সে নিজেই পুরুষের সম্পত্তি ছিল। তারপর সেই অন্ধকার পটভূমির সামনে ইসলামের কিছু নির্বাচিত বিধান দেখিয়ে ঘোষণা করা হয়—ইসলাম নারীকে মুক্ত করেছে। এই গল্প ইতিহাস নয়; এটি ধর্মীয় উদ্ধারকাহিনি। ইসলাম-পূর্ব আরবে নারীর ওপর নিপীড়ন ও বৈষম্য ছিল, কন্যাহত্যার ঘটনাও ছিল; কিন্তু একই সমাজজগতে সম্পদের মালিক, ব্যবসা পরিচালনাকারী, সামাজিকভাবে প্রভাবশালী এবং নিজের সিদ্ধান্তে সক্রিয় নারীর অস্তিত্বও ছিল। মুহাম্মদের প্রথম স্ত্রী খাদিজার ইসলামী সীরাতেই এমন একজন সম্পদশালী ব্যবসায়ী নারীর ছবি পাওয়া যায়। ফলে “ইসলামের আগে নারীর কোনো অধিকারই ছিল না” কথাটি মিথ্যা।
কোনো পূর্ববর্তী সমাজের অন্যায় পরবর্তী ব্যবস্থার অন্যায়কে ন্যায়সঙ্গত করে না। কন্যাহত্যার নিন্দা নারীমুক্তির প্রমাণ নয়। হত্যার হাত থেকে বাঁচিয়ে পরে সেই কন্যাকে স্বামীর অধীন করা, তার উত্তরাধিকার কমানো, তার স্বামীকে একাধিক স্ত্রী নেওয়ার একতরফা অধিকার দেওয়া, তার যৌন প্রত্যাখ্যানকে পাপ বানানো কিংবা তার ওপর শারীরিক শাস্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা করা মুক্তি নয়। একজন নারীকে মেরে না ফেলা তার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান নয়; সেটি মানুষের প্রতি ন্যূনতম নৈতিক দায়িত্ব। প্রকৃত প্রশ্ন শুরু হয় সে বেঁচে থাকার পরে তার জীবন, শরীর, সম্পদ ও স্বাধীনতার মালিক কে।
ইসলামের নারী-সংক্রান্ত বিধান বিচ্ছিন্ন কয়েকটি নিয়ম নয়। নারীকে কী ধরনের সত্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং তার ওপর কী ধরনের আইন আরোপ করা হয়েছে—এই দুই স্তর পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। হাদিসে নারীকে ফিতনা, বাঁকা, বুদ্ধি ও ধর্মে ঘাটতিপূর্ণ এবং অধিক জাহান্নামী বলা হলে সেটি শুধু অপমানজনক ভাষা হয়ে থাকে না; এমন ধারণা নারীর ওপর পুরুষের অভিভাবকত্ব, তার সাক্ষ্যের কম মূল্য, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং দাম্পত্য আনুগত্যকে সহজে ন্যায়সঙ্গত করার মানসিক ভিত্তি তৈরি করে। একইভাবে স্ত্রীকে পুরুষের “শস্যক্ষেত্র”, দুনিয়ার উত্তম উপভোগ্য উপকরণ এবং স্বামীর যৌন অধিকারের বিষয় হিসেবে দেখার ভাষা পরে যৌন প্রত্যাখ্যানের শাস্তি, দেনমোহর, বৈবাহিক আনুগত্য এবং দাসী সহবাসের আইনি কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়।
এই ক্ষমতার বিন্যাস পরিবারের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরে পুনরাবৃত্ত। পুরুষ নারীর কাওয়াম; স্ত্রীকে তার আনুগত্য করতে হয়; নুশূযের ক্ষেত্রে স্বামী শাস্তিমূলক ক্ষমতা পায়। পুরুষ একাধিক স্ত্রী নিতে পারে, নারী পারে না। পুরুষের তালাকের ক্ষমতা ও নারীর বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষমতা একই নয়। পুত্র ও কন্যার উত্তরাধিকার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ২:১; স্বামী ও স্ত্রীর অংশও একইভাবে অসম। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে স্ত্রী বানানো যায় এবং ফিকহি আলোচনায় তার সঙ্গে সহবাসের শর্তও বয়ঃসন্ধি নয়, শরীর যৌনপ্রবেশ সহ্য করতে পারবে কি না—এই ভয়াবহ মানদণ্ডে নামিয়ে আনা হয়েছে। যুদ্ধবন্দিনী নারী মালিকানার অধীনে যৌনভাবে বৈধ হতে পারে। একটি নিয়মকে আলাদা করে দেখলে তার গুরুত্ব ছোট মনে হতে পারে; সবগুলো একসঙ্গে রাখলে একটি সুসংহত পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো দেখা যায়—পুরুষ অধিক স্বাধীন, অধিক কর্তৃত্বশীল এবং অধিক যৌন ও পারিবারিক ক্ষমতার অধিকারী; নারী অধিক নিয়ন্ত্রিত, অধিক বাধ্য এবং অধিক নির্ভরশীল।
মানদণ্ড একটাই—মানুষের সমান মর্যাদা। নারী ও পুরুষ উভয়েই পূর্ণ ব্যক্তি; কারও লিঙ্গ তাকে অন্য মানুষের প্রাকৃতিক অভিভাবক, প্রভু বা যৌন অধিকারী বানায় না। বিবাহ কাউকে অন্যের শরীরের মালিক করে না; অর্থনৈতিক দায়িত্ব শারীরিক শাস্তির অধিকার দেয় না; সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা নারীর মানবিক মূল্য নির্ধারণ করে না; কোনো পৌরাণিক পূর্বনারীর কথিত অপরাধ বর্তমান নারীজাতির চরিত্র নির্ধারণ করতে পারে না। একজন মানুষের ওপর আরেকজনের ক্ষমতা বৈধ হওয়ার ভিত্তি জন্মগত লিঙ্গ হতে পারে না।
এই কারণেই ইসলামের নারী-সংক্রান্ত বিধানকে “সপ্তম শতকের জন্য উন্নত ছিল কি না” প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে মূল বিষয়টি হারিয়ে যায়। ইসলাম নিজেকে কোনো বিলুপ্ত গোত্রীয় সংস্কারের অস্থায়ী আইন হিসেবে উপস্থাপন করে না; মুসলিম বিশ্বাসে কোরআন আল্লাহর চূড়ান্ত বিধান এবং মুহাম্মদ সর্বকালের অনুসরণীয় আদর্শ। সেই দাবি সত্য হলে এই বিধানগুলোকে একবিংশ শতাব্দীতেও ন্যায্যতার পরীক্ষায় দাঁড়াতে হবে। যে বিধান আজ সমান অধিকার, দেহগত স্বাধীনতা, যৌনসম্মতি এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে সংঘর্ষে যায়, তাকে “তখনকার তুলনায় ভালো ছিল” বলে চিরন্তন ন্যায়বিচারে পরিণত করা যায় না।
কোরআন, সহিহ হাদিস, তাফসীর, সীরাত ও ধ্রুপদী ফিকহের দলিল পাশাপাশি রাখলে ইসলামী নারী-ব্যবস্থার অবস্থান স্পষ্ট হয়। নারী এখানে স্বাধীন ও সমমর্যাদার মানুষ নয়; তাকে পুরুষের কর্তৃত্ব, যৌন অধিকার, পারিবারিক প্রয়োজন ও ধর্মীয় শৃঙ্খলার অধীন নিয়ন্ত্রিত সত্তা হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে। উত্তরটি কোনো একটি আয়াত বা হাদিসে নয়; পুরো কাঠামো একসঙ্গে পড়লেই তা দেখা যায়।
“জাহেলিয়াত থেকে মুক্তি”: ইসলাম-পূর্ব নারী সম্পর্কে ইসলামী বয়ান
ইসলাম নারীকে কী দিয়েছে, এই প্রশ্ন উঠলেই ইসলামি বক্তৃতায় প্রায় অবধারিতভাবে একটি নাটকীয় ইতিহাস হাজির করা হয়। ইসলাম-পূর্ব আরবকে এমন এক সর্বব্যাপী নারীবিদ্বেষী অন্ধকার হিসেবে দেখানো হয়, যেখানে কন্যাশিশু জন্মালেই তাকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলা হতো, নারী সম্পত্তির মালিক হতে পারত না, ব্যবসা করতে পারত না, উত্তরাধিকার পেত না, নিজের বিবাহে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারত না, এমনকি পূর্ণ মানুষ হিসেবেও তার স্বীকৃতি ছিল না। এরপর ইসলাম আসে এবং যেন এক মুহূর্তে এই সমস্ত বর্বরতা ভেঙে নারীকে মানুষ, সম্পত্তির মালিক, উত্তরাধিকারী ও সম্মানিত সামাজিক সত্তায় পরিণত করে। গল্পটি অত্যন্ত কার্যকর, কারণ তুলনার এক পাশে যদি শুধু অন্ধকার রাখা যায়, অন্য পাশের সামান্য পরিবর্তনও বিপ্লবী আলো বলে মনে হয়। কিন্তু ইতিহাস ধর্মীয় প্রচারণার এই সুবিধাজনক দুই রঙে বিভক্ত ছিল না।
“জাহেলিয়াত” নিজেই একটি ধর্মতাত্ত্বিক মূল্যায়ন, নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক যুগনাম নয়। ইসলাম-পূর্ব আরব ছিল অসংখ্য গোত্র, নগর, মরুসমাজ, বাণিজ্যকেন্দ্র, সামাজিক শ্রেণি ও স্থানীয় রীতির সমষ্টি। সেখানে নারীর ওপর ভয়াবহ বৈষম্য ছিল, কিছু অঞ্চলে ও গোত্রে কন্যাহত্যার ঘটনাও ছিল, উত্তরাধিকার থেকে নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের বাদ দেওয়ার রীতিও ছিল। একই সঙ্গে সেই আরবজগতেই সম্পদশালী ব্যবসায়ী নারী, সম্পত্তির অধিকারী নারী, কবি, যোদ্ধা, গোত্রীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী নারী এবং নিজের বিবাহ ও অর্থনৈতিক জীবনে সক্রিয় নারীর উপস্থিতিও ছিল। “ইসলামের আগে নারী ছিল অধিকারহীন বস্তু”—এই সর্বজনীন বাক্যটি ইতিহাসের বর্ণনা নয়; বহু ভিন্ন সমাজ ও নারীর বাস্তবতাকে মুছে দিয়ে ইসলামের জন্য একটি সুবিধাজনক উদ্ধারকাহিনি তৈরি করা।
কন্যাশিশুকে জীবন্ত পুঁতে ফেলার বয়ান
কন্যাশিশুকে হত্যা করার ঘটনা কোরআনে এসেছে এবং কোরআন সেই আচরণের নিন্দা করেছে। সূরা আন-নাহলে কন্যাসন্তানের সংবাদ শুনে একজন পুরুষের মুখ কালো হয়ে যাওয়া, লজ্জায় মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকা এবং শিশুটিকে অপমান সহ্য করে বাঁচিয়ে রাখবে নাকি মাটিতে পুঁতে ফেলবে—এই দ্বিধার কথা বলা হয়েছে। [6]। সূরা আত-তাকভীরে আবার কিয়ামতের দৃশ্যে জীবন্ত প্রথিত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। [7]। এসব আয়াত থেকে কন্যাসন্তানকে লজ্জার কারণ মনে করা এবং কন্যাহত্যার ঘটনা পরিচিত ছিল—এটুকু পরিষ্কার। কিন্তু সেখান থেকে “আরবদের ঘরে কন্যা জন্মালেই জীবন্ত কবর দেওয়া হতো” সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্পূর্ণ আলাদা দাবি। কোরআনের নিন্দামূলক উল্লেখ কোনো প্রথার জনসংখ্যাগত বিস্তার, গোত্রভিত্তিক ব্যাপ্তি বা গোটা আরবের সার্বজনীন আচরণের পরিসংখ্যান নয়।
কোরআন, সূরা আন-নাহল ১৬:৫৮–৫৯
কন্যাসন্তানের সংবাদ দেওয়া হলে তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়। সে মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকে—তাকে কি অপমান সহ্য করে রেখে দেবে, নাকি মাটির মধ্যে পুঁতে ফেলবে? তাদের বিচার কতই না মন্দ।
কোরআন, সূরা আত-তাকভীর ৮১:৮–৯
“আর যখন জীবন্ত প্রথিত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে—কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?”
Adnan Demircan ইসলাম-পূর্ব আরবে ওয়াদুল বানাত বা কন্যাকে জীবন্ত কবর দেওয়ার প্রচলন নিয়ে ঐতিহাসিক উৎস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, পরবর্তী যুগে ঘটনাটি এমনভাবে পুনরাবৃত্ত হয়েছে যেন এটি সমগ্র আরবের সাধারণ সামাজিক রীতি ছিল; অথচ উৎসে এর উল্লেখ মূলত সীমিত কয়েকটি গোত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থনৈতিক সংকট এবং ভবিষ্যতে বন্দিত্ব বা তথাকথিত সম্মানহানির ভয়কে তিনি সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রেখেছেন। [8]। ফলে কিছু গোত্রে কন্যাহত্যার নৃশংসতা থাকা এবং “ইসলাম-পূর্ব আরবের স্বাভাবিক নিয়মই ছিল কন্যাকে জীবন্ত কবর দেওয়া”—এই দুই বক্তব্যকে এক করে ফেলার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।
Ilkka Lindstedt-এর ২০২৩ সালের গবেষণা আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যাটিকেই প্রশ্ন করেছে। প্রাক-ইসলামী কবিতা, কোরআনিক ভাষা এবং মাওউদাহ শব্দের ব্যবহার বিশ্লেষণ করে তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে ৮১:৮–৯ এবং সংশ্লিষ্ট আয়াতকে পরবর্তী মুসলিম ব্যাখ্যাকারীরা যেভাবে ব্যাপক ও নিয়মিত “কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার” প্রমাণ হিসেবে পড়েছেন, সেই পাঠ ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত অনিশ্চিত। [9]। কন্যাহত্যা ছিল—এই কথার সঙ্গে “কন্যা হলেই আরবরা পুঁতে ফেলত”—এই প্রচারণামূলক গল্পের বিরাট পার্থক্য আছে। প্রথমটি ঐতিহাসিকভাবে সমর্থনযোগ্য সীমিত দাবি; দ্বিতীয়টি অতিরঞ্জিত ধর্মীয় আগমনকাহিনি।
জীবন্ত প্রথিত কন্যার পরকালীন নিয়তি
কোরআনের ভাষায় জীবন্ত প্রথিত কন্যা স্পষ্টতই অন্যায়ের শিকার—তাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু আবু দাউদের একটি সহিহ হিসেবে চিহ্নিত বর্ণনায় মুহাম্মদ সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন: “জীবন্ত প্রথিত কন্যা এবং তার মা—উভয়ই জাহান্নামী।” [10]। একটি শিশু অন্য মানুষের হাতে জীবন্ত কবর হয়েছে; সে নিজের জন্ম, ধর্ম, পরিবার বা মৃত্যুর কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি; অথচ হাদিসের সরাসরি ভাষায় সেই নিহত শিশুকেও জাহান্নামে রাখা হয়েছে। কোরআনের প্রশ্ন ছিল—তার অপরাধ কী? এই হাদিস পড়ার পর একই প্রশ্ন আরও তীব্রভাবে ফিরে আসে।
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ মুশরিকদের সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে
৪৬৪২। আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “জীবন্ত প্রথিত কন্যা এবং তার মা—উভয়ই জাহান্নামী।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই বর্ণনার সমস্যা ইসলামী ব্যাখ্যাকারীদেরও এড়িয়ে যায়নি। IslamQA হাদিসটিকে সকল জীবন্ত প্রথিত কন্যার সাধারণ পরিণতি হিসেবে না দেখে নির্দিষ্ট একটি মা ও মেয়ের ঘটনা বলে ব্যাখ্যা করেছে। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মুহাম্মদ ওহির মাধ্যমে জেনেছিলেন যে সেই নির্দিষ্ট মেয়েটির পরিণতি জাহান্নাম [11]। এই ব্যাখ্যাও নৈতিক প্রশ্নের উত্তর দেয় না। “সব নিহত শিশু নয়, শুধু এই নিহত শিশুটি জাহান্নামী” বললে শিশুটির অপরাধ কী ছিল তা জানা যায় না; সিদ্ধান্তটিকে কেবল ওহির কর্তৃত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়।
IslamWeb আরও সরাসরি স্বীকার করেছে যে হাদিসটি সমস্যাজনক, কারণ জীবন্ত পুঁতে দেওয়া মেয়েটি এমন ছোট শিশু হতে পারে যে পাপ করার বয়সেই পৌঁছেনি, অথচ হাদিস তাকে জাহান্নামী বলছে। [12]। এরপর বিভিন্ন ব্যাখ্যার মাধ্যমে সমস্যাটি মেলানোর চেষ্টা করা হয়েছে। যে ধর্মীয় বয়ানে কন্যাশিশুকে হত্যার বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের উদাহরণ হিসেবে হাজির করা হয়, সেই বয়ানের ভেতরেই নিহত শিশুকে জাহান্নামে পাঠানোর সহিহ-চিহ্নিত বর্ণনা “ইসলাম কন্যাশিশুকে মর্যাদা দিয়েছে” স্লোগানকে নৈতিকভাবে ধসিয়ে দেয়।
ইসলাম-পূর্ব আরবে নারীর অধিকার, ক্ষমতা ও সামাজিক উপস্থিতি
ইসলাম-পূর্ব আরবে নারীর একটি মাত্র সামাজিক অবস্থান ছিল—এই ধারণাটিই ভুল। আরব উপদ্বীপ কোনো একক রাষ্ট্র বা অভিন্ন আইনি ব্যবস্থার অধীন ছিল না। মক্কার বাণিজ্যিক সমাজ, মরুভূমির যাযাবর গোত্র, ইয়েমেনের রাজনীতি, উত্তর আরবের বিভিন্ন নগর ও নাবাতীয় সমাজের সামাজিক কাঠামো এক ছিল না। কোনো গোত্রে নারী উত্তরাধিকার থেকে বাদ পড়ত, কোথাও বিবাহ ছিল কঠোরভাবে পিতৃতান্ত্রিক, কোথাও যুদ্ধবন্দিত্ব ও দাসত্ব নারীর জীবন ধ্বংস করত; আবার অন্য পরিবেশে নারী নিজস্ব সম্পদ, ব্যবসা, কবিতা, গোত্রীয় রাজনীতি বা পারিবারিক সিদ্ধান্তে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখত। একটি মহাদেশসম বিস্তৃত অঞ্চলের শত শত গোত্রের নারীকে “অধিকারহীন জাহেলি নারী” নামে এক শ্রেণিতে ফেলে দেওয়া ইতিহাসকে ধর্মীয় প্রচারণার উপযোগী করে সরলীকরণ।
Feyza Betül Köse-র ২০২৪ সালের গবেষণায় ইসলাম-পূর্ব আরব নারীর পারিবারিক জীবন, ধর্মীয় ভূমিকা, যুদ্ধ, বাণিজ্য ও সামাজিক উপস্থিতি বিশ্লেষণ করে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে—তাদের একটি মাত্র সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা যায় না। [13]। সামাজিক শ্রেণি, পারিবারিক শক্তি, গোত্র, অর্থনৈতিক অবস্থা ও স্থানীয় প্রথার ওপর নারীর সুযোগ ও অধিকার বদলাত। অর্থাৎ ইসলাম-পূর্ব নারীর ইতিহাসের সঠিক চিত্র অসমতা ও স্বাধীনতা—দুটিরই বহু রূপ নিয়ে গঠিত; সর্বব্যাপী দাসত্বের একটি একরঙা ছবি দিয়ে নয়।
Feyza Betül Köse, Women in Pre-Islamic Arab Society, 2024
গবেষণাটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইসলাম-পূর্ব আরব নারীদের একটি মাত্র সামাজিক অবস্থান বা একক সংজ্ঞায় ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়; তাদের জীবন ও ক্ষমতা সামাজিক পরিবেশভেদে উল্লেখযোগ্যভাবে পৃথক ছিল।
আরব উপদ্বীপের বৃহত্তর প্রাক-ইসলামী ইতিহাসেও এর শক্তিশালী প্রমাণ আছে। Hatoon al-Fassi নাবাতীয় নারীদের নিয়ে শিলালিপি, মুদ্রা ও প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে নারীরা ব্যবসায় অংশ নিতেন এবং উল্লেখযোগ্য মাত্রায় আইনগত স্বাধীনতা ভোগ করতেন। [14]। “ইসলামের আগে আরব নারী সম্পদ, চুক্তি বা ব্যবসায় আইনগত সত্তাই ছিল না”—এই সর্বজনীন দাবি প্রাক-ইসলামী আরবের নিজের দলিলেই টেকে না। বরঞ্চ ইসলামের আবির্ভাবের পরে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে নারীদের কী অবস্থা, তার পরিসংখ্যান আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। আসুন এই প্রসঙ্গে দুইটি ভিডিও দেখে নেয়া যাক,
ইসলামের প্রায় তেরোশ বছর আগেই “আরবদের রানি”
ইসলাম-পূর্ব আরবে নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোনো সপ্তম শতকের নতুন ঘটনা ছিল না। Neo-Assyrian রাজকীয় নথিতে খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম ও সপ্তম শতকে একাধিক নারীকে সরাসরি “Queen of the Arabs” বা “আরবদের রানি” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আধুনিক Assyriologist Ellie Bennett-এর বিস্তৃত গবেষণায় Neo-Assyrian সূত্রে এই উপাধিধারী পাঁচজন নারীর উপস্থিতি পাওয়া যায়, যারা আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৭৩৮ থেকে ৬৫১ সালের মধ্যে সক্রিয় ছিলেন। তারা শুধু কোনো অজ্ঞাত পুরুষ রাজার স্ত্রী হিসেবে নথিভুক্ত হননি; তারা আরব রাজনৈতিক গোষ্ঠীর শাসক হিসেবে সেনাবাহিনী পরিচালনা করেছেন, Assyrian সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনা করেছেন, tribute দিয়েছেন এবং অন্তত একজন ধর্মীয় কর্তৃত্বের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। Bennett-এর গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো, এই নারী নেতৃত্ব একবারের বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; প্রায় এক শতাব্দী ধরে Neo-Assyrian নথিতে “Queens of the Arabs” পাওয়া যায়। [15]
Zabibê, Samsi, Iatiʾe, Teʾelḫunu ও Tabūʾa-র মতো নারীদের নাম Assyrian নথিতে পাওয়া যায়। বিশেষভাবে Samsi-র ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। Tiglath-Pileser III-এর রাজকীয় inscription-এ তাকে Queen of the Arabs হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং তার নেতৃত্বাধীন আরব বাহিনীর বিরুদ্ধে Assyrian সামরিক অভিযানের বিবরণ দেওয়া হয়। কয়েক বছর পরে Sargon II-এর শাসনকালেও Samsi আবার নথিতে উপস্থিত হন এবং Assyria-কে tribute দেন। অর্থাৎ একজন নারী আরব শাসক দুইজন আলাদা Assyrian সম্রাটের সমসাময়িক রাজনৈতিক actor হিসেবে imperial records-এ উপস্থিত। এটি কোনো পরবর্তী মুসলিম কিংবদন্তি নয়; ইসলাম আসার প্রায় তেরোশ বছর আগের নিকটপ্রাচ্যের রাষ্ট্রীয় নথিতে আরব নারী নেতৃত্বের প্রমাণ। [16]
এই ইতিহাস “ইসলামের আগে আরব নারী সামাজিক বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধারণাই জানত না”—জাতীয় দাবিকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ করে। ইসলামের প্রায় তেরোশ বছর আগে আরব রাজনৈতিক গোষ্ঠীতে এমন নারী ছিলেন, যাদের পরিচয় কোনো স্বামীর পদবির ছায়ায় নয়, তাদের নিজস্ব শাসনক্ষমতার কারণে Assyrian রাষ্ট্রকে নথিভুক্ত করতে হয়েছে। তারা যুদ্ধের পক্ষ, tribute প্রদানকারী রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ এবং নিজ নিজ গোষ্ঠীর ক্ষমতার কেন্দ্র। সপ্তম শতকের ইসলাম তাই আরব নারীকে প্রথম রাজনৈতিক সত্তা বানায়নি; তার বহু শতাব্দী আগেই আরব সমাজে নারী শাসনের প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক নজির ছিল।
নাবাতীয় আরবে নারী: সম্পত্তি, আইন ও জনজীবনে দৃশ্যমান সত্তা
উত্তর আরব ও নাবাতীয় সমাজের evidence এই চিত্রকে আরও বিস্তৃত করে। Hatoon al-Fassi নাবাতীয় নারীদের নিয়ে inscription, numismatic evidence, archaeological material এবং classical sources বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, ইসলাম-পূর্ব আরবের এই সমাজে নারীকে সর্বজনীনভাবে পুরুষের সম্পত্তি বা আইনগতভাবে অদৃশ্য সত্তা হিসেবে বর্ণনা করা যায় না। তার গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল pre-Islamic Arabia-র নারী সম্পর্কে blanket subordination-এর ধারণাকে পরীক্ষা করা। নাবাতীয় নারীরা inscription ও মুদ্রায় দৃশ্যমান; সম্পত্তি, পারিবারিক সম্পদ ও বিভিন্ন আইনগত কর্মকাণ্ডে তাদের সক্রিয় উপস্থিতির প্রমাণ রয়েছে। [17]
এর অর্থ নাবাতীয় সমাজ আধুনিক অর্থে লিঙ্গসমতাভিত্তিক ছিল—এমন নয়। কিন্তু ঐতিহাসিক প্রশ্ন সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, ইসলামের আগে আরব অঞ্চলের নারী কি নিজ নামে সম্পদ, আইন ও সামাজিক জীবনে উপস্থিত হতে পারত? প্রত্নতাত্ত্বিক ও inscriptional evidence-এর উত্তর হ্যাঁ। তাই ইসলাম-পূর্ব আরবকে এমনভাবে আঁকা, যেন সেখানে নারী ছিল কেবল কেনাবেচার বস্তু এবং ইসলাম এসে প্রথম তাকে legal personality দিয়েছে, ইতিহাসের সঙ্গে মেলে না। বরং ইসলাম-পূর্ব আরবের মধ্যেই নারীর অবস্থানের একাধিক ভিন্ন মডেল ছিল—কোনো অঞ্চলে গভীর পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, আবার কোথাও সম্পত্তি, ব্যবসা, ধর্মীয় ভূমিকা ও সামাজিক ক্ষমতায় দৃশ্যমান নারী।
খাদিজা: ইসলাম-পূর্ব সম্পদশালী ও স্বাধীন ব্যবসায়ী নারী
“ইসলামের আগে নারী সম্পত্তির মালিক হতে পারত না, ব্যবসা করতে পারত না”—এই সর্বজনীন দাবির বিরুদ্ধে ইসলামী ঐতিহ্যের সবচেয়ে অস্বস্তিকর সাক্ষী মুহাম্মদের নিজের প্রথম স্ত্রী খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ। ইবন ইসহাক ও ইবন হিশামের সীরাত-ঐতিহ্যে খাদিজাকে স্পষ্টভাবে একজন ব্যবসায়ী, মর্যাদাবান ও সম্পদশালী নারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি নিজের পুঁজি দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতেন, পুরুষদের ব্যবসার কাজে নিয়োগ করতেন এবং লাভের অংশের ভিত্তিতে তাদের হাতে সম্পদ দিতেন। মুহাম্মদও নবুয়তের আগে খাদিজার পুঁজিতে তার বাণিজ্যিক প্রতিনিধি হিসেবে সিরিয়ায় যান। [18] [19]।
সীরাতে ইবন হিশাম, ইবন ইসহাকের বর্ণনা
وَكَانَتْ خَدِيجَةُ بِنْتُ خُوَيْلِدٍ امْرَأَةً تَاجِرَةً، ذَاتَ شَرَفٍ وَمَالٍ…
“খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ ছিলেন একজন ব্যবসায়ী নারী, মর্যাদা ও সম্পদের অধিকারী; তিনি নিজের সম্পদে ব্যবসার জন্য পুরুষদের নিয়োগ করতেন এবং তাদের সঙ্গে লাভের অংশ নির্ধারণ করতেন।”
খাদিজা শুধু উত্তরাধিকারসূত্রে কিছু সম্পদ হাতে পাওয়া নিষ্ক্রিয় নারী ছিলেন না। ইসলামী সীরাতের নিজের বর্ণনায় তিনি পুঁজির মালিক, নিয়োগদাতা, বিনিয়োগকারী এবং বাণিজ্যের সিদ্ধান্তগ্রহণকারী। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, মুহাম্মদের সঙ্গে বিবাহের ঘটনাতেও খাদিজাকে নিষ্ক্রিয় পক্ষ হিসেবে দেখানো হয়নি। বাণিজ্যিক সফরের পর মুহাম্মদ সম্পর্কে মাইসারার বর্ণনা শুনে খাদিজার পক্ষ থেকেই বিবাহের উদ্যোগ নেওয়ার কাহিনি পাওয়া যায়—“ফা‘আরাদাত নাফসাহা আলাইহি”, অর্থাৎ তিনি নিজেকে মুহাম্মদের কাছে বিবাহের জন্য উপস্থাপন করেন [20]।
আদ-দুরার আস-সানিয়্যাহ, খাদিজা ও মুহাম্মদের বিবাহের বিবরণ
“فَعَرَضَت نَفسَها عليه” — খাদিজা নিজেই মুহাম্মদের কাছে বিবাহের জন্য নিজেকে উপস্থাপন করেন।
একটি সর্বজনীন দাবি খণ্ডনের জন্য একটি নিশ্চিত বিপরীত উদাহরণই যথেষ্ট। খাদিজা যদি ইসলাম আসার আগেই নিজের সম্পদের মালিক হন, পুরুষ কর্মী নিয়োগ করেন, বাণিজ্যের পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং নিজের বিবাহের উদ্যোগ নিতে পারেন, তাহলে “ইসলামের আগে নারীর সম্পত্তির মালিকানা, ব্যবসা বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের অধিকার ছিলই না” কথাটি মিথ্যা। খাদিজার জীবন প্রমাণ করে না যে সব আরব নারী স্বাধীন ছিলেন; বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় প্রমাণ করে—সব আরব নারী অধিকারহীনও ছিলেন না। খাদিজার অস্তিত্বই ইসলাম-পূর্ব নারী সম্পর্কে ইসলামী প্রচারণার সবচেয়ে সুবিধাজনক সর্বজনীন দাবিগুলো ভেঙে দেয়। আসুন বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেমগণের কিছু বক্তব্য শুনি,
হিন্দ বিনতে উতবা: নিজের বিবাহের সিদ্ধান্ত থেকে গোত্রীয় রাজনীতির কেন্দ্র পর্যন্ত
ইসলাম-পূর্ব মক্কার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র হিন্দ বিনতে উতবা। তাকে শুধু আবু সুফিয়ানের স্ত্রী বা মুয়াবিয়ার মা হিসেবে দেখলে তার ইসলাম-পূর্ব সামাজিক ব্যক্তিত্বের বড় অংশ হারিয়ে যায়। সীরাত, তাবাকাত ও ইতিহাসের গ্রন্থে তিনি শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব, বক্তা, কবিতা রচয়িতা এবং কুরাইশের গোত্রীয় রাজনীতিতে সরাসরি অংশগ্রহণকারী নারী হিসেবে উপস্থিত। উহুদের যুদ্ধে তার প্রকাশ্য রাজনৈতিক ভূমিকা ইসলামী ঐতিহাসিক ঐতিহ্যেই সংরক্ষিত। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইবন সা‘দের আল-তাবাকাত আল-কুবরা-তে তার বিবাহসংক্রান্ত একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে হিন্দ নিজের বাবার সামনে নিজের বৈবাহিক সিদ্ধান্তের কর্তৃত্ব সরাসরি ঘোষণা করেন।
ইবন সা‘দ, আল-তাবাকাত আল-কুবরা
قالت هند لأبيها: إني امرأة قد ملكت أمري فلا تزوجني رجلا حتى تعرضه علي
হিন্দ তার বাবাকে বলেন: “আমি এমন একজন নারী, যে নিজের ব্যাপারের কর্তৃত্ব নিজের হাতে রাখি। তাই কোনো পুরুষের সঙ্গে আমাকে বিবাহ দিও না, যতক্ষণ না তাকে আমার সামনে উপস্থাপন কর।”
তার বাবা এর উত্তরে বলেন, “ذلك لك”—“সে অধিকার তোমার।” এরপর দুইজন পাত্রের বৈশিষ্ট্য হিন্দের সামনে বর্ণনা করা হয়। হিন্দ তাদের স্বভাব ও যোগ্যতা বিশ্লেষণ করেন, একজনকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং অন্যজনকে নির্বাচন করেন; সেই দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন আবু সুফিয়ান ইবন হারব। [21]। এই বর্ণনা থেকে “ইসলাম-পূর্ব আরবের প্রত্যেক নারী নিজের স্বামী নির্বাচন করত” প্রমাণ হয় না; কিন্তু “ইসলামের আগে আরব নারী নিজের বিবাহের সিদ্ধান্তে কোনো অধিকারই রাখত না”—এই সর্বজনীন দাবি সরাসরি মিথ্যা প্রমাণিত হয়। ইসলাম-পূর্ব কুরাইশের একজন বিশিষ্ট নারী নিজের বাবাকে বলছেন নিজের বিবাহের কর্তৃত্ব তার নিজের, এবং বাবা সেটি মেনে নিচ্ছেন।
হিন্দের ব্যক্তিগত পরিচয় ও সামাজিক মর্যাদা কতটা শক্তিশালী ছিল, তার আরেকটি অসাধারণ উদাহরণ পাওয়া যায় তার ছেলে মুয়াবিয়ার নিজের বক্তব্যে। ইবন আসাকিরের তারিখ মদিনাত দিমাশক-এর একটি বর্ণনায় হাসান ও হুসাইনকে বিপুল অর্থ দেওয়ার পর মুয়াবিয়া নিজের সামর্থ্য নিয়ে গর্ব করে বলেন:
خُذَاها وَأَنَا ابْنُ هِنْدٍ
“এটি নাও—আমি হিন্দের পুত্র।”
এখানে “ইবন হিন্দ”—“হিন্দের ছেলে”—পরিচয়টি তার নিজের মুখে নিজের ক্ষমতা ও মর্যাদা প্রদর্শনের মুহূর্তে এসেছে। [22]। পিতৃবংশীয় আরব সমাজে একজন পুরুষ শাসক নিজের শক্তি জাহির করতে গিয়ে যখন নিজের মায়ের নামকে পরিচয়ের চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করেন, তখন সেই মায়ের নিজস্ব সামাজিক prominence কতটা ছিল তা বোঝা কঠিন নয়। হিন্দ কোনো অজ্ঞাত গৃহবন্দী নারী ছিলেন না; তিনি এমন একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও সামাজিক নাম, যার পরিচয়ে পরবর্তী উমাইয়া খলিফাও নিজেকে প্রকাশ করতে পারতেন।
আল-খানসা: পুরুষ আত্মীয়ের পদমর্যাদায় নয়, নিজের কবিতায় বিখ্যাত নারী
ইসলাম-পূর্ব আরবের নারী public figure-এর আরেকটি শক্তিশালী উদাহরণ তুমাদির বিনতে আমর, যিনি আল-খানসা নামে পরিচিত। তার খ্যাতির উৎস কোনো নবীর স্ত্রী, কোনো শাসকের কন্যা বা কোনো ক্ষমতাবান পুরুষের মা হওয়া নয়; তার খ্যাতি তার নিজের কবিতা। ভাই সাখর ও মুয়াবিয়ার মৃত্যু নিয়ে লেখা তার elegy ইসলাম-পূর্ব আরবেই তাকে অসাধারণ কবিখ্যাতি দেয়। Classical Arabic literary tradition তাকে আরবি ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ elegiac poets-এর একজন হিসেবে স্থান দিয়েছে। উকাজের সাহিত্যিক সমাবেশে আল-নাবিঘা আল-ধুবইয়ানির সামনে কবিতা আবৃত্তি এবং সমকালীন পুরুষ কবিদের সঙ্গে তার প্রতিযোগিতার কাহিনি আরবি সাহিত্য ঐতিহ্যে সংরক্ষিত। [23]
আল-খানসার কবিসত্তা ইসলাম গ্রহণের পরে তৈরি হয়নি। তার সাহিত্যিক authority এবং public reputation ইসলাম-পূর্ব আরবেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। অর্থাৎ ইসলাম-পূর্ব আরবের জনপরিসরে নারী নিজের প্রতিভার ভিত্তিতে এমন সাংস্কৃতিক মর্যাদা অর্জন করতে পারতেন যে শতাব্দীর পর শতাব্দী পরে আরবি সাহিত্য তাকে নিজস্ব নামে স্মরণ করেছে। “ইসলাম এসে নারীকে প্রথম সামাজিক কণ্ঠ দিয়েছে”—এই দাবির সঙ্গে আল-খানসার pre-Islamic career-এর কোনো সামঞ্জস্য নেই।
আসমা বিনতে মারওয়ান: নারী রাজনৈতিক কবির প্রকাশ্য বিরোধিতা
আসমা বিনতে মারওয়ানের কাহিনি প্রাথমিক মদিনার নারী-রাজনৈতিক agency-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আল-ওয়াকিদির কিতাব আল-মাগাজি, ইবন সা‘দের আল-তাবাকাত আল-কুবরা এবং পরবর্তী সীরাত-ইতিহাসে তাকে একজন নারী কবি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যিনি মুহাম্মদ ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও ব্যঙ্গাত্মক কবিতা রচনা করেছিলেন। তার কবিতায় শুধু ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নয়; গোত্রীয় নেতৃত্ব, মদিনার রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং নতুন ধর্মীয়-রাজনৈতিক কর্তৃত্ব মেনে নেওয়া নিয়ে তীব্র আক্রমণ ছিল। অর্থাৎ নারী এখানে কোনো নীরব গৃহবন্দী চরিত্র নয়; একজন প্রকাশ্য political commentator, যার অস্ত্র ছিল কবিতা।
আসমার হত্যার ঘটনা প্রাচীন ঐতিহাসিক tradition-এ সংরক্ষিত। কোনো কোনো isnad হাদিসবিশারদদের বিচারে দুর্বল; কিন্তু একটি নির্দিষ্ট chain-এর দুর্বলতা আর একটি ঘটনা নিয়ে একাধিক প্রাচীন ঐতিহাসিক গ্রন্থে থাকা narrative tradition একই বিষয় নয়। আল-ওয়াকিদি ও ইবন সা‘দের বিবরণে হত্যার ঘটনা রয়েছে, এবং পরবর্তী ইতিহাসেও তা পুনরাবৃত্ত হয়েছে। বিভিন্ন version-এ কে উদ্যোগ নিয়েছিল, মুহাম্মদের পূর্বানুমোদন ঠিক কোন ভাষায় ছিল এবং ঘটনার কিছু detail-এ পার্থক্য আছে; কিন্তু নারী রাজনৈতিক কবি আসমাকে ঘিরে হত্যার historical tradition প্রাথমিক মুসলিম historiography-রই অংশ। [24]
এই আলোচনার জন্য আরও মৌলিক বিষয় হলো আসমার public role। ইসলামের একেবারে প্রথম যুগের ঐতিহাসিক স্মৃতি একজন নারীকে এমন রাজনৈতিক কবি হিসেবে মনে রেখেছে, যার বক্তব্য ক্ষমতাসীন নতুন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল যে তার হত্যা একটি স্মরণীয় রাজনৈতিক ঘটনায় পরিণত হয়। এই দৃশ্য “ইসলামের আগে বা ইসলামের সূচনায় আরব নারী জনপরিসরে কোনো স্বাধীন রাজনৈতিক কণ্ঠই ছিল না”—এই caricature-কে ভেঙে দেয়। নারী কবি গোত্রীয় পুরুষদের সমালোচনা করছেন, নতুন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন এবং তার বক্তব্য রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে।
ইসলাম-পূর্ব দৃশ্যমান নারী বনাম পরবর্তী ধর্মীয় নারী-পরিচয়
খাদিজা, হিন্দ, আল-খানসা ও আসমাকে পাশাপাশি রাখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য চোখে পড়ে। খাদিজা মুহাম্মদের স্ত্রী হওয়ার আগেই সম্পদশালী ব্যবসায়ী; হিন্দ ইসলাম গ্রহণের আগেই কুরাইশি রাজনীতি ও জনপরিসরের শক্তিশালী চরিত্র; আল-খানসা ইসলাম গ্রহণের আগেই নিজের কবিতায় বিখ্যাত; আসমা নিজের রাজনৈতিক কবিতার জন্য ঐতিহাসিক স্মৃতিতে প্রবেশ করেছেন। তাদের সামাজিক visibility ইসলামের দেওয়া কোনো পদবির ফল নয়। তারা ইতিমধ্যেই নিজস্ব অর্থনৈতিক, সাহিত্যিক বা রাজনৈতিক পরিচয়ে দৃশ্যমান।
প্রাথমিক ইসলামী collective memory-র সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নারী চরিত্রগুলোর পরিচয় অন্য একটি pattern দেখায়। আয়িশা, হাফসা ও উম্মে সালামার canonical authority মুহাম্মদের স্ত্রী পরিচয়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য; ফাতিমার সর্বোচ্চ মর্যাদার কেন্দ্র তার মুহাম্মদের কন্যা হওয়া; পরবর্তী বহু নারী চরিত্রের সামাজিক পরিচয়ও “অমুকের স্ত্রী”, “অমুকের কন্যা” বা “অমুকের মা” সম্পর্কের মাধ্যমে canonical memory-তে প্রবেশ করেছে। এর অর্থ এই নয় যে এসব নারীর ব্যক্তিগত বুদ্ধি, দক্ষতা বা agency ছিল না। অর্থ হলো, তাদের ধর্মীয় authority-র মূল institutional উৎস একটি পুরুষ ধর্মীয় কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক। আয়িশার হাদিসি authority-র বিশেষত্বই তিনি মুহাম্মদের ঘরের প্রত্যক্ষ সাক্ষী; ফাতিমার মর্যাদাও নবীকন্যা পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
এই তুলনাটি তাই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম এমন একটি আরব সমাজে আবির্ভূত হয়নি যেখানে নারী আগে কোনো স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে দৃশ্যমানই ছিল না। বরং ইসলাম এমন বহু নারীকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, যারা ব্যবসা, কবিতা, গোত্রীয় রাজনীতি ও জনমতের জগতে আগেই দৃশ্যমান ছিলেন। পরবর্তী ধর্মীয় কাঠামোয় নারী-আদর্শের কেন্দ্র ক্রমশ স্ত্রী, কন্যা, মা, আনুগত্যশীল সঙ্গিনী এবং পুরুষ ধর্মীয় কর্তৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত ভূমিকায় আরও শক্তভাবে সংগঠিত হয়েছে।
আরবের বাইরেও ইসলাম নারী-অধিকারের সূচনা নয়
আরবের বাইরে তাকালে “ইসলামই প্রথম নারীকে সম্পত্তি, আইনগত সত্তা ও সামাজিক অধিকার দিয়েছে”—এই দাবি আরও স্পষ্টভাবে ভেঙে পড়ে। ইসলাম আবির্ভূত হওয়ার বহু শতাব্দী ও সহস্রাব্দ আগেই বিভিন্ন সভ্যতায় নারীরা এমন আইনি ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন, যেগুলোকে সপ্তম শতকের কোনো নতুন আবিষ্কার বলা অসম্ভব। এই সমাজগুলো আধুনিক অর্থে লিঙ্গসমতাভিত্তিক ছিল না; কিন্তু নারী যে সম্পত্তির মালিক, contractual party, litigant, ব্যবসায়ী, উত্তরাধিকারী কিংবা কখনও রাষ্ট্রশাসক হতে পারে—এই ধারণাগুলো ইসলামের বহু আগেই প্রতিষ্ঠিত ছিল।
প্রাচীন মিশর: ইসলাম আসার দুই হাজার বছর আগেই স্বতন্ত্র আইনি নারী
প্রাচীন মিশর এর সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণগুলোর একটি। New Kingdom-এর দ্বিতীয় সহস্রাব্দ খ্রিস্টপূর্বাব্দের evidence নিয়ে Metropolitan Museum of Art-এর গবেষণায় দেখা যায়, মিশরীয় নারী নিজের নামে সম্পত্তি উত্তরাধিকার করতে, কিনতে এবং বিক্রি করতে পারতেন। বিবাহের আগে বা বিবাহের সময় তার নিজের যে সম্পত্তি ছিল তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বামীর সম্পত্তিতে পরিণত হতো না। তিনি নিজের সম্পত্তি কার কাছে যাবে তা উইলের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে পারতেন, আদালতে অভিযোগ আনতে পারতেন, মামলায় সাক্ষ্য দিতে পারতেন এবং এমনকি jury-তেও বসতে পারতেন। অর্থাৎ ইসলাম আবির্ভূত হওয়ার প্রায় দুই সহস্রাব্দ আগে একটি বড় সভ্যতায় নারীকে আইনগতভাবে স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। [25]
একই সভ্যতায় খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ শতকে Hatshepsut মিশরের ফারাও হিসেবে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রক্ষমতা ধারণ করেন। অর্থাৎ মুহাম্মদের জন্মের প্রায় দুই হাজার বছর আগে একজন নারী পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্রের শাসক ছিলেন। নারী নেতৃত্বকে মানবসমাজ প্রথম সপ্তম শতকে আবিষ্কার করেনি; আরবের নারী শাসকদের পাশাপাশি মিশরের নারী ফারাওয়ের ইতিহাস সেই দাবিকে অযৌক্তিক করে দেয়।
মেসোপটেমিয়া: ব্যবসা, ঋণ, সম্পত্তি ও প্রশাসনে নারী
মেসোপটেমিয়ার লিখিত evidence আরও প্রাচীন। Cambridge University Press প্রকাশিত Women’s Writing of Ancient Mesopotamia-এর গবেষণায় দেখা যায়, মেসোপটেমিয়ার দীর্ঘ ইতিহাসে নারীরা legal transaction পরিচালনা করেছেন, ব্যবসায় অংশ নিয়েছেন, ঋণ দিয়েছেন ও নিয়েছেন এবং সম্পত্তি অর্জন করেছেন। বিশেষত Sippar-এর nadītum নারীরা আর্থিক লেনদেন, কৃষি উৎপাদন ও ধর্মীয় দায়িত্বে সক্রিয় ছিলেন। কিছু নারী নিজে পড়তে-লিখতেও পারতেন এবং সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় স্বাধীন ভূমিকা রাখতেন। [26]
এই গবেষণার সামগ্রিক evidence-এ elite নারীদের পুরুষদের মতোই বহু ধরনের অর্থনৈতিক ভূমিকায় দেখা যায়: তারা কেনাবেচা করেছে, ঋণ দিয়েছে ও নিয়েছে, debt guarantee করেছে, সাক্ষী হয়েছে, seal ব্যবহার করেছে, সম্পত্তির মালিক হয়েছে এবং commercial venture-এ অংশ নিয়েছে। প্রাসাদ ও মন্দিরের প্রশাসনেও নারীর উপস্থিতি ছিল। অর্থাৎ ইসলামের প্রায় দুই বা তিন হাজার বছর আগে থেকেই নিকটপ্রাচ্যের নারী অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক actor হিসেবে লিখিত নথিতে উপস্থিত।
স্পার্টা: বিপুল ভূমিসম্পত্তির মালিক নারী
প্রাচীন গ্রিক জগতের সব সমাজে নারীর অবস্থা একই ছিল না। এথেন্সে নারীর আইনি ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা কঠোরভাবে সীমিত ছিল, কিন্তু স্পার্টার চিত্র ভিন্ন। Aristotle তাঁর Politics-এ অভিযোগের সুরে লিখেছিলেন যে স্পার্টার প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ জমি নারীদের হাতে ছিল, কারণ নারীরা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতো এবং বড় dowry পেত। Aristotle এটিকে সমালোচনা করেছিলেন; কিন্তু তার সমালোচনার মধ্য দিয়েই ঐতিহাসিক তথ্যটি স্পষ্ট হয়—ইসলামের প্রায় এক হাজার বছর আগে স্পার্টায় নারী বিপুল পরিমাণ ভূমিসম্পত্তির মালিক হতে পারত। [27]
রোম: সম্পত্তি, চুক্তি ও দেওয়ানি আইনে বিস্তৃত ক্ষমতা
রোমান সমাজও পুরুষতান্ত্রিক ছিল এবং নারী ভোট দিতে বা সাধারণভাবে public office ধারণ করতে পারত না। কিন্তু private law-এ তাদের অবস্থান অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল। Roman-law গবেষণায় দেখা যায়, নারী সম্পত্তির মালিক হতে পারত, contract করতে পারত এবং আদালতে মামলা করতে বা মামলার পক্ষ হতে পারত। বিশেষত Imperial period-এ বিবাহিত নারীও substantial property নিজের নামে রাখতে এবং তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারতেন। আধুনিক Roman-law গবেষণা এই অবস্থানকে “remarkably strong” বলেছে। [28]
অর্থাৎ ইসলাম আবির্ভূত হওয়ার কয়েক শতাব্দী আগেই Mediterranean বিশ্বের একটি প্রধান আইনি ব্যবস্থায় নারী সম্পত্তির মালিক, contractual party এবং litigant হতে পারতেন। Roman law নিখুঁত বা সমান ছিল না; male guardianship-এর অবশেষও বহুদিন ছিল। কিন্তু “নারীকে legal personality, সম্পত্তি বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা প্রথম ইসলাম দিয়েছে”—এমন দাবি এই comparative legal history-র সামনে টেকে না।
ইতিহাসের প্রকৃত চিত্র: নারীকে ইসলাম শূন্য থেকে সৃষ্টি করেনি
এই evidence একসঙ্গে রাখলে ইসলামি নারী-মুক্তির প্রচলিত আগমনকাহিনির মূল সমস্যা স্পষ্ট হয়। ইতিহাসের এক পাশে সবচেয়ে খারাপ কিছু ইসলাম-পূর্ব আরবীয় প্রথা—কন্যাহত্যা, নারীকে উত্তরাধিকার থেকে বাদ দেওয়া, পিতৃতান্ত্রিক বিবাহ—জমা করা হয়; তারপর সেগুলোকে পুরো ইসলাম-পূর্ব আরব এবং প্রায় পুরো মানবসভ্যতার নারী-অবস্থা বলে উপস্থাপন করা হয়। অথচ একই ইতিহাস থেকে আরব নারী শাসক, নাবাতীয় নারীর আইনগত visibility, খাদিজার বাণিজ্যিক ক্ষমতা, হিন্দের নিজের বিবাহে সিদ্ধান্ত, আল-খানসার সাহিত্যিক খ্যাতি এবং আসমার রাজনৈতিক কবিতা বাদ দেওয়া হয়। আর আরবের বাইরে মিশর, মেসোপটেমিয়া, স্পার্টা ও রোমের evidence প্রায় সম্পূর্ণ অদৃশ্য করে দেওয়া হয়।
ইসলামের আগে নারী অধিকারহীন কোনো একক শ্রেণি ছিল না। অঞ্চল, গোত্র, শ্রেণি ও সমাজভেদে তার অবস্থান ব্যাপকভাবে বদলেছে। কোথাও নারী ভয়াবহভাবে নিপীড়িত, কোথাও সীমিত সম্পত্তির অধিকারী, কোথাও ব্যবসায়ী, কোথাও কবি, কোথাও বিপুল জমির মালিক, কোথাও আদালতের সক্রিয় পক্ষ, কোথাও সেনাবাহিনী পরিচালনাকারী শাসক। ইতিহাসের এই বৈচিত্র্য মুছে ফেলে “ইসলাম আসার আগে নারী মানুষই ছিল না” বলা ইতিহাসের বিবরণ নয়; এটি ধর্মীয় প্রচারণার জন্য তৈরি একটি মিথ।
ইসলাম নারীকে সম্পত্তি, ব্যবসা, আইনি সত্তা, সাহিত্যিক পরিচয় বা রাজনৈতিক agency-র ধারণা প্রথম দেয়নি। ইসলাম এমন এক পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিল যেখানে নারী বহু শতাব্দী ও সহস্রাব্দ ধরে এসব ক্ষমতার বিভিন্ন রূপ ব্যবহার করছিল। তাই ইসলামের নারী-সংক্রান্ত আইনকে মূল্যায়ন করতে হলে প্রশ্ন “তার আগে সবচেয়ে খারাপ কোনো গোত্রে কী হতো” নয়; প্রশ্ন হলো ইসলাম শেষ পর্যন্ত নারী ও পুরুষের জন্য কী ধরনের স্থায়ী ক্ষমতা ও অধিকার নির্ধারণ করেছে।
ইসলাম-পূর্ব উত্তরাধিকার এবং কোরআনিক পরিবর্তন
উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে কোরআন নারীকে সমান উত্তরাধিকারী করেনি; পুরনো পুরুষকেন্দ্রিক সম্পত্তি কাঠামোর ভেতরে নারীর জন্য নির্দিষ্ট কিন্তু অসম ভগ্নাংশ বসিয়েছে। বহু আরব গোত্রে যুদ্ধ করতে সক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ আত্মীয় সম্পদের প্রধান দাবিদার ছিল এবং নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে উত্তরাধিকার থেকে বাদ দেওয়া হতো। সূরা আন-নিসা ৪:৭-এর তাফসীরে তাবারী ও ইবন আবি হাতিমে এই প্রথার বর্ণনা পাওয়া যায়। [29] [30]। কিন্তু সেই প্রেক্ষাপট নারীকে পুত্রের অর্ধেক, স্বামীর তুলনায় অর্ধেক এবং অবশিষ্ট সম্পদে পুরুষ আগনাতের অধীন করার বৈষম্যকে ন্যায়সঙ্গত করে না।
তাফসীরে ইবন আবি হাতিম, সূরা আন-নিসা ৪:৭-এর ব্যাখ্যা
“জাহেলি যুগের লোকেরা নারী এবং ছোট শিশুদের কোনো উত্তরাধিকার দিত না; সম্পদ বয়স্ক পুরুষদের জন্য রাখত।”
তবে “ইসলামই উত্তরাধিকার সৃষ্টি করেছে” কথাটিও সঠিক নয়। সহিহ বুখারিতে ইবন আব্বাস স্পষ্টভাবে একটি পূর্ববর্তী উত্তরাধিকার ব্যবস্থার কথা বলেছেন—সম্পদ সন্তানরা পেত এবং পিতা-মাতার জন্য ওসিয়াত ছিল; পরে আল্লাহ সেই ব্যবস্থার কিছু অংশ পরিবর্তন করে নতুন নির্ধারিত ভাগ দেন। সেই নতুন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান নিয়মই ছিল, পুত্রের অংশ কন্যার দ্বিগুণ। [31]। অর্থাৎ ইসলাম শূন্য থেকে সম্পত্তির উত্তরাধিকার আবিষ্কার করেনি; বিদ্যমান ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে নারীর জন্য নির্দিষ্ট অংশ যুক্ত করেছে।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
২৭৪৭। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, পূর্বে উত্তরাধিকারী হিসেবে সম্পদ পেত সন্তান এবং পিতা-মাতার জন্য ছিল অসীয়াত। এরপর আল্লাহ বিধান পরিবর্তন করে “ছেলের অংশ মেয়ের দ্বিগুণ”, পিতা-মাতার প্রত্যেকের জন্য এক-ষষ্ঠাংশ, স্ত্রীর জন্য এক-অষ্টমাংশ বা এক-চতুর্থাংশ এবং স্বামীর জন্য অর্ধেক বা এক-চতুর্থাংশ নির্ধারণ করেন।
নতুন ব্যবস্থায় পুরনো পুরুষ-আত্মীয়কেন্দ্রিক কাঠামোও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। সহিহ বুখারিতে মুহাম্মদ বলেছেন, নির্ধারিত অংশের উত্তরাধিকারীদের অংশ দেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে তা মৃত ব্যক্তির নিকটতম পুরুষ আত্মীয় পাবে। [32]। গবেষক Noel J. Coulson এবং M. Habibur Rahman-ও ইসলামী উত্তরাধিকারব্যবস্থায় প্রাক-ইসলামী পুরুষ বংশীয় উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করেছেন। [33] [34]।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৭৩২। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “সুনির্দিষ্ট অংশের হকদারদের মীরাস পৌঁছে দাও। অতঃপর যা বাকী থাকবে তা মৃতের নিকটতম পুরুষের জন্য।”
কোরআন নারীর জন্য কিছু নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ নির্ধারণ করেছে, কিন্তু সেই বণ্টনের ভেতরেই পুরুষের সংখ্যাগত ও কাঠামোগত অগ্রাধিকার বহাল রেখেছে। পুত্র কন্যার দ্বিগুণ পায়, স্বামী স্ত্রীর দ্বিগুণ নির্ধারিত অংশ পায় এবং অবশিষ্ট সম্পদের সাধারণ নিয়মে নিকটতম পুরুষ আত্মীয় অগ্রাধিকার পায়। এটি সমান উত্তরাধিকার নয়; এটি ধর্মীয় ভাষায় বৈধ করা লিঙ্গভিত্তিক সম্পদবণ্টন।
“অধিকার” নয়, পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের ভেতরে সীমিত অংশ
“ইসলাম নারীকে অধিকার দিয়েছে”—এই বাক্যটি বিভ্রান্তিকর, কারণ এখানে “অধিকার” শব্দ দিয়ে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে দেওয়া সীমিত অংশকে মুক্তি হিসেবে বিক্রি করা হয়। একটি আইনে নারী কিছু উত্তরাধিকার পেতে পারে, কিন্তু একই আইনেই তার ভাই তার দ্বিগুণ পেতে পারে। স্ত্রী মোহর পেতে পারে, কিন্তু একই দাম্পত্যে স্বামী তার ওপর কর্তৃত্বের অধিকার পেতে পারে। নারী ভরণপোষণ পেতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে তার যৌনপ্রাপ্যতা স্বামীর ধর্মীয় অধিকার হতে পারে। সীমিত সুবিধা সমতা নয়; শর্তাধীন অংশগ্রহণ স্বাধীনতা নয়।
ইসলামের নারী-আইনের প্রকৃতি বোঝার জন্য “আগে কী ছিল?” প্রশ্নে আটকে থাকলে চলবে না; দেখতে হবে ইসলাম শেষ পর্যন্ত কী প্রতিষ্ঠা করেছে। কোরআন নারীকে সমান উত্তরাধিকারী করেনি; পুত্রকে কন্যার দ্বিগুণ দিয়েছে। নারীকে দাম্পত্যে সমান কর্তৃত্ব দেয়নি; পুরুষকে তার ওপর কাওয়াম করেছে। নারীর বিবাহকে স্বাধীন ব্যক্তির চুক্তি হিসেবে দাঁড় করায়নি; ওয়ালী, মোহর, স্বামীর কর্তৃত্ব ও যৌনপ্রাপ্যতার কাঠামোর মধ্যে রেখেছে। পুরুষকে চার স্ত্রী ও দাসীর সঙ্গে যৌনসম্পর্কের অধিকার দিয়েছে। নারীর বিচ্ছেদের পথকে পুরুষের একতরফা তালাকের সমান করেনি। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিবাহ, স্ত্রীর আনুগত্য, স্ত্রী প্রহার এবং যুদ্ধবন্দিনী দাসীর ওপর যৌন অধিকারকে বৈধ কাঠামোর মধ্যে রেখেছে।
একজন অধীনস্থ মানুষকে কিছু সুবিধা দেওয়া তাকে সমান মানুষ বানায় না। সমতার প্রশ্নে হিসাব করতে হয় কে সিদ্ধান্ত নেয়, কে নিয়ন্ত্রণ করে, কার শরীরের ওপর কার অধিকার, কে সম্পর্ক ভাঙতে পারে, কে একাধিক সঙ্গী রাখতে পারে, কে কাকে শাস্তি দিতে পারে এবং সম্পদ ও আইনি ক্ষমতা কীভাবে বণ্টিত হয়। এই পূর্ণ হিসাব সামনে আনলেই “ইসলাম নারীকে অধিকার দিয়েছে” স্লোগানের আড়ালে থাকা পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো দৃশ্যমান হয়।
তাই ইসলাম-পূর্ব আরবকে কালো রঙে ঢেকে ইসলামের নারী-আইনকে সাদা করা যায় না। ইসলাম-পূর্ব সমাজে কন্যাহত্যা থাকলে সেটি নৃশংস; নারীকে উত্তরাধিকার না দিলে সেটি বৈষম্য; তাকে সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করলে সেটিও অন্যায়। ঠিক একই নৈতিক মানদণ্ড ইসলামের বিধানের ওপরও প্রয়োগ করতে হবে। সপ্তম শতকের তুলনামূলক পরিবর্তনের গল্প আধুনিক মানবাধিকারের আদালতে কোনো ডিফেন্স নয়। প্রশ্ন হলো—বিধানটি নারীকে সমান স্বাধীনতা, সমান দেহগত অধিকার এবং সমান আইনি মর্যাদা দেয় কি না। ইসলাম-পূর্ব বর্বরতার গল্প দিয়ে ইসলামের বৈষম্যকে ধুয়ে ফেলা যায় না। একটি অন্যায়কে বিচার করতে আরেকটি আরও বড় অন্যায়ের প্রয়োজন হয় না।
নারী সম্পর্কে ইসলামী চরিত্রায়ণ
কোনো গোষ্ঠীর ওপর স্থায়ী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু আইন বানালেই হয় না; সেই গোষ্ঠীকে আগে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হয়, যেন তার ওপর নিয়ন্ত্রণ স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় বলে মনে হয়। নারী যদি পুরুষের মতোই পূর্ণবুদ্ধিসম্পন্ন, নৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং নিজের সিদ্ধান্তের জন্য নিজেই দায়ী মানুষ হয়, তাহলে কেন তার ওপর পুরুষ কর্তা হবে, কেন স্বামী তাকে শাসন করবে, কেন তার যৌন প্রত্যাখ্যান ধর্মীয় অপরাধ হবে, কেন তার জন্য আলাদা সামাজিক নিয়ন্ত্রণ দরকার—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া কঠিন। কিন্তু নারীকে যদি শুরুতেই বক্র, কমবুদ্ধিসম্পন্ন, ধর্মে ঘাটতিপূর্ণ, পুরুষের জন্য বিপজ্জনক ফিতনা, বিশ্বাসঘাতকতার উত্তরাধিকারী এবং অমঙ্গলের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে নির্মাণ করা হয়, তাহলে পরবর্তী নিয়ন্ত্রণমূলক বিধানগুলোকে “নারীর স্বভাবের উপযোগী ব্যবস্থা” হিসেবে হাজির করা অনেক সহজ হয়ে যায়। ইসলামী হাদিস-সাহিত্যে এই চরিত্রায়ণ কোনো একটি বিচ্ছিন্ন বাক্যে সীমাবদ্ধ নয়; একাধিক সহিহ বর্ণনায় একই নেতিবাচক নারীমূর্তি ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় ফিরে এসেছে।
হাওয়া এবং নারীজাতির “বিশ্বাসঘাতকতা”
ইসলামী হাদিসে নারীজাতির বৈবাহিক বিশ্বাসঘাতকতার উৎস পর্যন্ত একজন নারী, হাওয়ার মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। সহিহ বুখারিতে মুহাম্মদ বলেছেন, বনী ইসরাঈল না থাকলে মাংস পচত না এবং হাওয়া না থাকলে কোনো নারী স্বামীর প্রতি খিয়ানত করত না। [35]। এখানে কোনো নির্দিষ্ট নারীর ব্যক্তিগত বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে কথা বলা হয়নি; হাওয়ার কাজকে সমগ্র নারীজাতির বৈবাহিক আচরণের আদিম উৎস হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬০/ আম্বিয়া কিরাম
৩৩৩০। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “বনী ইসরাঈল যদি না হতো তবে গোশত দুর্গন্ধময় হতো না। আর যদি হাওয়া না হতেন তাহলে কোনো নারীই স্বামীর খিয়ানত করত না।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই বক্তব্যের সমস্যাটি শুধু হাওয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগে নয়; একজন পূর্বনারীর কথিত আচরণকে কোটি কোটি ভবিষ্যৎ নারীর চরিত্রের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ায়। কোনো পুরুষের অপরাধ থেকে সমগ্র পুরুষজাতির জন্মগত বিশ্বাসঘাতকতা ঘোষণা করা হলে সেটিকে যে ধরনের নির্বোধ লিঙ্গবিদ্বেষ বলা হতো, নারী সম্পর্কে একই সাধারণীকরণও ঠিক ততটাই অসঙ্গত। ব্যক্তির আচরণ ব্যক্তি দিয়ে বিচার করার বদলে নারীজাতির নৈতিক চরিত্রকে একটি পৌরাণিক পূর্বপুরুষের ঘটনার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নারী এখানে নিজের কাজের ভিত্তিতে বিচারযোগ্য স্বাধীন ব্যক্তি নয়; সে হাওয়ার কথিত খিয়ানতের উত্তরাধিকার বহনকারী একটি লিঙ্গ। আসুন আধুনিক সময়ের বাংলাদেশের একজন আলেম মুফতি ইব্রাহিমের বক্তব্য শুনি,
পুরুষের জন্য সবচেয়ে বড় ফিতনা নারী
নারীকে শুধু সম্ভাব্য বিশ্বাসঘাতক নয়, পুরুষের ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক পরীক্ষাও বলা হয়েছে। সহিহ বুখারিতে মুহাম্মদ বলেছেন—তার পরে পুরুষদের জন্য নারীর চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কোনো ফিতনা তিনি রেখে যাচ্ছেন না। [36]। একই বক্তব্য সহিহ মুসলিমেও পাওয়া যায়। নারী এখানে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের কারণে বিপদ নয়; পুরুষের সামনে তার অস্তিত্বই বৃহত্তম পরীক্ষার উৎস।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৭/ বিয়ে
৫০৯৬। উসামাহ ইবনু যায়দ (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীর চেয়ে অধিক ক্ষতিকর কোনো ফিতনা আমি রেখে যাচ্ছি না।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই ধারণার সামাজিক পরিণতি সরাসরি নারীর স্বাধীনতার ওপর পড়ে। পুরুষ কোনো নারীকে দেখে আকৃষ্ট হলে সমস্যার উৎস পুরুষের নিজের যৌন আকাঙ্ক্ষা নয়, নারী “ফিতনা”; কর্মক্ষেত্রে নারী থাকলে পুরুষের আত্মসংযমের দায়িত্ব পুরুষের নয়, নারীর উপস্থিতিই বিপদ; নারী কথা বললে, সুগন্ধি ব্যবহার করলে, জনসমক্ষে চলাফেরা করলে বা পুরুষের সঙ্গে স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্ক রাখলে একই ভাষা দিয়ে তাকে বিপদের উৎস বানানো যায়। পুরুষের কামনার দায় নারীর শরীরে চাপিয়ে দিলে সমাধান হয় পুরুষকে সংযত করা নয়, নারীকে ঢেকে রাখা, আলাদা করা, নীরব করা এবং জনজীবন থেকে সরিয়ে দেওয়া। “ফিতনা” শব্দটি তাই শুধু ধর্মীয় সতর্কতা নয়; নারী-নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী সামাজিক ভাষা। আসুন আবদুর রাজ্জাক বিন ইউসুফের একটি বক্তব্য শুনি,
নারী জন্মগতভাবে “বাঁকা”
নারীর চরিত্রকে জন্মগত ত্রুটির ভাষায় বর্ণনার সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ “বাঁকা পাঁজর” হাদিস। সহিহ মুসলিমে মুহাম্মদ বলেছেন, নারী পাঁজরের হাড়ের মতো; তাকে সোজা করতে গেলে ভেঙে যাবে, আর তার বাঁকাভাব রেখেই তার কাছ থেকে উপকার নিতে হবে। [37]। এটি কোনো নির্দিষ্ট নারীর বদমেজাজ, অন্যায় বা ভুলের বর্ণনা নয়; “নারী” নামক পুরো শ্রেণির স্বভাব ব্যাখ্যা করতে বক্রতার উপমা ব্যবহার করা হয়েছে।
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
হাদিস ৩৫১৩
“নারী পাঁজরের হাড়ের ন্যায়। যদি তুমি তাকে সোজা করতে যাও তবে তাকে ভেঙে ফেলবে, আর যদি তার কাছ থেকে উপকার গ্রহণ করতে চাও তবে তার মধ্যে বক্রতা থাকা অবস্থাতেই উপকার গ্রহণ করবে।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই ভাষায় পুরুষই নীরবভাবে “সোজা” মানদণ্ড, নারী তার থেকে বিচ্যুত “বাঁকা” সত্তা। পুরুষকে কখনো নারীর জন্য ব্যবহারযোগ্য কিন্তু জন্মগতভাবে বক্র প্রাণী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। নারী স্বামীর সঙ্গে দ্বিমত করলে, নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলে বা পুরুষের প্রত্যাশামতো আচরণ না করলে এই হাদিস সহজেই ব্যক্তিগত মতবিরোধকে নারীজাতির জন্মগত ত্রুটির প্রমাণে পরিণত করতে পারে। কোটি কোটি ভিন্ন ব্যক্তিত্বের মানুষকে একটি লিঙ্গের ভিত্তিতে “বাঁকা” বলে সংজ্ঞায়িত করা কোনো গভীর মানবমনস্তত্ত্ব নয়; এটি একটি প্রাচীন লিঙ্গগত সাধারণীকরণকে ধর্মীয় কর্তৃত্ব দেওয়া।
নারী অশুভ বা অমঙ্গলের উৎস
নারীকে ফিতনা ও বক্রতার সঙ্গে যুক্ত করার পর সহিহ হাদিসে তাকে অমঙ্গলের সম্ভাব্য উৎস হিসেবেও পাওয়া যায়। সহিহ বুখারিতে মুহাম্মদ বলেছেন, অমঙ্গল তিন বস্তুর মধ্যে—স্ত্রীলোক, গৃহ এবং পশুতে। [38]। নারীকে এখানে তার কোনো অপরাধের কারণে নয়, নারী হওয়ার কারণেই এমন একটি তালিকায় রাখা হয়েছে যেখানে অন্য দুটি বিষয় হলো বাড়ি ও বাহন বা পশু।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭৬/ চিকিৎসা
৫৭৫৩। ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “অমঙ্গল তিন বস্তুর মধ্যে—স্ত্রীলোক, গৃহ এবং পশুতে।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই ধরনের শ্রেণিবিন্যাস কুসংস্কারের সঙ্গে লিঙ্গবিদ্বেষকে মিশিয়ে দেয়। কোনো নির্দিষ্ট নারী অসৎ, নির্যাতনকারী বা ক্ষতিকর হতে পারেন—ঠিক যেমন কোনো নির্দিষ্ট পুরুষও হতে পারেন। কিন্তু নারী নামক পুরো শ্রেণিকেই অমঙ্গলের সম্ভাব্য বাহক হিসেবে বসানোর কোনো যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি নেই। বাড়ি অসুবিধাজনক হতে পারে, বাহন বিপজ্জনক হতে পারে; কিন্তু পূর্ণ মানবগোষ্ঠীকে একই তালিকায় বসানো তাকে সমমর্যাদার মানুষ নয়, পুরুষের জীবনে শুভ বা অশুভ ফল বয়ে আনা একটি উপকরণের মতো বিচার করে। নারীর মূল্য তখন তার নিজের জীবন দিয়ে নয়—পুরুষের জীবনে সে শান্তি, সন্তান ও আনুগত্য আনছে, নাকি দুর্ভোগ ও “অমঙ্গল” আনছে—এই মানদণ্ডে নির্ধারিত হয়।
নারী, গাধা এবং কালো কুকুর
ইসলামী নারী-চরিত্রায়ণের সবচেয়ে অপমানজনক বর্ণনাগুলোর একটি পাওয়া যায় নামাজের সামনে দিয়ে অতিক্রম করার বিধানে। সহিহ হিসেবে চিহ্নিত হাদিসে বলা হয়েছে, মুসল্লীর সামনে যথেষ্ট আড়াল না থাকলে নারী, গাধা এবং কালো কুকুর সামনে দিয়ে অতিক্রম করলে সালাত ছিন্ন হয়; একই বর্ণনায় কালো কুকুরকে শয়তান বলা হয়েছে। [39]। একই মূল বক্তব্য সহিহ মুসলিম, নাসাঈ ও আবু দাউদেও এসেছে।
সুনান ইবনে মাজাহ (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫/ সালাত
৯৫২। আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মুসল্লীর সামনে প্রয়োজনীয় আড়াল না থাকলে “নারী, গাধা ও কালো কুকুর তার সালাত ছিন্ন করে।” কালো কুকুর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “কালো কুকুর হলো শয়তান।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই শ্রেণিবিন্যাস কতটা অপমানজনক, তা আয়িশার প্রতিক্রিয়াতেই ধরা পড়ে। তার সামনে যখন বলা হয় কুকুর, গাধা ও নারী নামাজ নষ্ট করে, তিনি প্রতিবাদ করে বলেন—“তোমরা আমাদের কুকুর ও গাধার সমান করে দিলে!” এরপর তিনি নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন যে নবী নামাজ পড়তেন আর তিনি সামনে শুয়ে থাকতেন। [40]। অর্থাৎ এই অপমানজনক তুলনাটি আধুনিক সমালোচকের তৈরি নয়; মুহাম্মদের নিজের স্ত্রী আয়িশাও তুলনাটির অবমাননাকর চরিত্র বুঝেছিলেন।
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
সালাত
আয়িশা (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা আমাদের কুকুর ও গাধার সমান করে দিলে!” এরপর তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ আদায় করতেন এবং তিনি তাঁর ও কিবলার মাঝখানে শুয়ে থাকতেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
ফকিহি কারিগরি বিতর্ক মূল অপমান ঢাকে না: তালিকায় নারী, গাধা এবং কালো কুকুর পাশাপাশি আছে। “সালাত ছিন্ন” বলতে বাতিল হওয়া নাকি একাগ্রতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বোঝানো হয়েছে—এই প্রশ্ন দ্বিতীয়। প্রথম প্রশ্ন হলো, কেন নারীকে গাধা ও কালো কুকুরের সঙ্গে একই ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতার তালিকায় রাখা হলো। একজন পুরুষ মুসল্লীর সামনে দিয়ে গেলে তাকে একই শ্রেণিতে রাখা হয়নি; নারী হওয়ার পরিচয়ই এখানে ধর্মীয় আচারের প্রতিবন্ধকতার কারণ হিসেবে এসেছে।
নারীর জ্ঞান ও বুদ্ধির “ঘাটতি”
সহিহ বুখারির সবচেয়ে আলোচিত নারী-সংক্রান্ত হাদিসগুলোর একটিতে মুহাম্মদ নারীদের সরাসরি “জ্ঞান-বুদ্ধি ও দ্বীনে ত্রুটিপূর্ণ” সম্প্রদায় বলে বর্ণনা করেন। নারীরা এর কারণ জানতে চাইলে বুদ্ধির ঘাটতির প্রমাণ হিসেবে বলা হয়, দুই নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান; আর ধর্মের ঘাটতির প্রমাণ হিসেবে মাসিকের সময় নামাজ ও রোজা থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়। [41]।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬/ হায়েয
৩০৪। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের উদ্দেশ্যে বলেনঃ “দ্বীন ও জ্ঞান-বুদ্ধিতে ত্রুটিপূর্ণ কোনো সম্প্রদায়, জ্ঞানীদের ওপর তোমাদের চেয়ে অধিক প্রভাব বিস্তারকারী আর কাউকে আমি দেখিনি।” এরপর তিনি বলেনঃ “দুজন স্ত্রীলোকের সাক্ষ্য একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান—এটাই তোমাদের বুদ্ধির ত্রুটির প্রমাণ।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এখানে একটি বৃত্তাকার যুক্তি তৈরি হয়েছে। প্রথমে নির্দিষ্ট আর্থিক সাক্ষ্যে দুই নারীকে এক পুরুষের বিকল্প করার আইন দেওয়া হলো; তারপর সেই আইনকেই নারীর কম বুদ্ধির প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হলো। কোনো আধুনিক জ্ঞানীয় পরীক্ষা, স্মৃতিশক্তি, যুক্তিবোধ, শিক্ষাগত দক্ষতা বা সিদ্ধান্তগ্রহণের পরিমাপ এখানে নেই। আইনটি নিজেই বৈষম্য তৈরি করছে এবং পরে সেই বৈষম্যকে জন্মগত মানসিক ঘাটতির সাক্ষ্য বানানো হচ্ছে। “দুই নারীর সাক্ষ্য রেখেছি, তাই নারী কম বুদ্ধিমান”—এটি নারীর বুদ্ধি সম্পর্কে প্রমাণ নয়; ধর্মীয় বিধানকে নিজের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা একটি বদ্ধ যুক্তিচক্র।
আর বাস্তব মানবসমাজে বুদ্ধিমত্তা লিঙ্গের ভিত্তিতে এমন একক শ্রেণিতে ভাগ হয় না। একজন নারী একজন পুরুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হতে পারেন, একজন পুরুষ আরেক পুরুষের চেয়ে কম; শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও ব্যক্তিগত সক্ষমতা মানুষের বিচারক্ষমতায় প্রভাব ফেলে। কোটি কোটি নারীকে জন্মগতভাবে “কমবুদ্ধি” নামে একই শ্রেণিতে ফেলে দেওয়া ব্যক্তির বাস্তব সক্ষমতাকে মুছে দিয়ে লিঙ্গকে মেধার মানদণ্ডে পরিণত করে।
মাসিকের কারণে নারীর ধর্মে “ঘাটতি”
একই হাদিসে নারীর ধর্মীয় ঘাটতির কারণ হিসেবে ঋতুস্রাবকে সামনে আনা হয়েছে। মাসিকের সময় ইসলামী বিধান অনুযায়ী নারী নামাজ পড়ে না এবং রমজানের রোজা পরে কাজা করে; সেই ধর্মীয় নিষেধের ফলকেই আবার তার “দ্বীনের ঘাটতি” বলা হয়েছে। অর্থাৎ নারী নিজের ইচ্ছায় ইবাদত ত্যাগ করছে না—ধর্মই তাকে সেই সময়ে নামাজ থেকে বিরত থাকতে বলছে, তারপর সেই বাধ্যতামূলক বিরতিকেই তার ধর্মীয় অসম্পূর্ণতার উদাহরণ বানাচ্ছে।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন), হাদিস ৩০৪
নারীদের ধর্মীয় ঘাটতি ব্যাখ্যা করতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “স্ত্রীলোক মাসিকের সময় কয়েকদিন সালাত থেকে বিরত থাকে এবং রমযানে রোজা ভঙ্গ করে—এটাই দ্বীনের ত্রুটি।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
ঋতুস্রাব কোনো নৈতিক ত্রুটি নয়; এটি সুস্থ নারীদেহের স্বাভাবিক প্রজনন-প্রক্রিয়ার অংশ। নারী নিজে এই প্রক্রিয়া নির্বাচন করে না এবং এর উপস্থিতি তার সততা, নৈতিকতা বা ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে কিছুই বলে না। অথচ পুরুষদেহকে ধর্মীয় স্বাভাবিক মানদণ্ড ধরে নারীদেহের স্বাভাবিক জীববৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকেই “ঘাটতি”র ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের কারণেই মানবপ্রজাতির প্রজনন সম্ভব, সেই শরীরকেই একই কার্যক্রমের জন্য ধর্মীয়ভাবে “কম” বলা হয়েছে।
“পরিপূর্ণ” পুরুষ অনেক, নারী হাতে গোনা
নারী ও পুরুষের ধর্মীয় মর্যাদা নিয়ে আরেকটি সহিহ বুখারির বর্ণনায় বলা হয়েছে—অনেক পুরুষ পরিপূর্ণতা লাভ করেছে, কিন্তু নারীদের মধ্যে মরিয়ম বিনতে ইমরান ও ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া ছাড়া কেউ সেই পরিপূর্ণতায় পৌঁছেনি; এরপর অন্যান্য নারীর ওপর আয়িশার শ্রেষ্ঠত্বকে অন্য খাবারের ওপর সারিদ-এর শ্রেষ্ঠত্বের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। [42]।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬০/ আম্বিয়া কিরাম
৩৪৩৩। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “পুরুষদের মধ্যে অনেকেই পরিপূর্ণতা লাভ করেছে; কিন্তু নারীদের মধ্যে ইমরানের কন্যা মারইয়াম এবং ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া ছাড়া কেউ পরিপূর্ণতা লাভ করেনি।” এরপর আয়িশার মর্যাদার তুলনাও উল্লেখ করা হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
হাদিসে ব্যবহৃত “পরিপূর্ণতা” আধুনিক মনোবৈজ্ঞানিক ধারণা নয়; এখানে ধর্মীয় মর্যাদা ও উৎকর্ষ বোঝানো হয়েছে। সেই ধর্মীয় মর্যাদার ক্ষেত্রেই লিঙ্গগত বৈপরীত্য স্পষ্ট—পুরুষদের মধ্যে “অনেক” পরিপূর্ণ হয়েছে, নারীদের মধ্যে নাম করা হয়েছে ব্যতিক্রমী কয়েকজনকে। বুদ্ধি ও ধর্মে ঘাটতি, বাঁকা স্বভাব এবং ফিতনার অন্যান্য বর্ণনার পাশে এই হাদিস একই নারীমূর্তিকে আরও শক্তিশালী করে: পুরুষের ধর্মীয় পূর্ণতা বহুজনের সম্ভাবনা, নারীর পূর্ণতা বিরল ব্যতিক্রম।
নারীরা জাহান্নামের সংখ্যাগরিষ্ঠ
নারী সম্পর্কে এই নেতিবাচক ধারার সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি আসে পরকালের বর্ণনায়। সহিহ বুখারি ৩০৪-এ মুহাম্মদ নারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, তিনি জাহান্নাম দেখেছেন এবং সেখানে অধিকাংশ অধিবাসী নারী। কারণ হিসেবে নারীদের বেশি অভিসম্পাত করা এবং স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞতার কথা বলা হয়; একই বক্তব্যের মধ্যেই বুদ্ধি ও ধর্মের ঘাটতির অভিযোগও আসে। [43]।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
হাদিস ৩০৪
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের বলেনঃ “আমি জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসী তোমাদেরকেই দেখেছি।” কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, নারীরা বেশি অভিসম্পাত করে এবং স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এখানে অপরাধের তালিকাটিও লক্ষণীয়। হত্যাকাণ্ড, যুদ্ধাপরাধ, নির্যাতন, দাসব্যবসা বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মতো অপরাধ নয়—নারীর জাহান্নামে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ব্যাখ্যায় সামনে এসেছে বেশি অভিশাপ দেওয়া এবং স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞতা। স্বামীকে কেন্দ্র করেই নারীর পরকালীন নৈতিকতাও বিচার করা হচ্ছে। পৃথিবীতে নারী স্বামীর আনুগত্যের অধীন, আর পরকালের সংখ্যাগরিষ্ঠ শাস্তির কারণ ব্যাখ্যাতেও স্বামীর প্রতি তার আচরণকে কেন্দ্রীয় করা হয়েছে।
এই চরিত্রায়ণের সামাজিক অর্থ
প্রতিটি বর্ণনাকে আলাদা করে ব্যাখ্যা করলে সামগ্রিক ধারাটি আড়াল হয়। হাওয়া নারীজাতির খিয়ানতের উৎস, নারী পুরুষের সবচেয়ে বড় ফিতনা, স্বভাবে বাঁকা, অমঙ্গলের সম্ভাব্য উৎস, নামাজের প্রতিবন্ধক, বুদ্ধি ও ধর্মে ঘাটতিপূর্ণ এবং পরকালে জাহান্নামের সংখ্যাগরিষ্ঠ—একাধিক সহিহ বর্ণনায় একই নেতিবাচক নারীমূর্তি ভিন্ন ভাষায় পুনরাবৃত্ত হয়েছে। এগুলো বিচ্ছিন্ন উপমা নয়; একত্রে এগুলো নারী সম্পর্কে একটি ধারাবাহিক ধর্মীয় চরিত্রায়ণ তৈরি করে।
এই নারীমূর্তি পরের আইনগুলোর জন্য মানসিক ভিত্তি তৈরি করে। যে গোষ্ঠীকে বুদ্ধিতে কম বলা হয়েছে, তার সিদ্ধান্তের ওপর পুরুষ অভিভাবক বসানো সহজ; যাকে ফিতনা বলা হয়েছে, তার চলাফেরা ও পোশাক নিয়ন্ত্রণ করা সহজ; যাকে বাঁকা বলা হয়েছে, তার স্বামীর সঙ্গে মতবিরোধকে স্বভাবগত ত্রুটি বলা সহজ; যাকে ধর্মে ঘাটতিপূর্ণ বলা হয়েছে, তাকে ধর্মীয় নেতৃত্বে নিচে রাখা সহজ; যাকে স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞতার কারণে জাহান্নামের সংখ্যাগরিষ্ঠ বলা হয়েছে, তার দাম্পত্য আনুগত্যকে পরকালীন ভয় দিয়ে নিশ্চিত করা সহজ। প্রথমে নারীকে ত্রুটিপূর্ণ ও বিপজ্জনক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে; পরে সেই সংজ্ঞার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তার ওপর পুরুষের কর্তৃত্ব, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও দাম্পত্য আনুগত্যের আইন বসানো হয়েছে। চরিত্রায়ণ এবং অধিকারহরণ একই কাঠামোর দুটি স্তর।
এই ভাষার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি কেবল আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি মেয়ে ছোটবেলা থেকে যদি শুনে সে ছেলেদের তুলনায় বুদ্ধিতে কম, ধর্মে কম, তার শরীর পুরুষের জন্য ফিতনা, তার মাসিক তাকে ধর্মীয়ভাবে ঘাটতিপূর্ণ করে এবং তার লিঙ্গ জাহান্নামের সংখ্যাগরিষ্ঠ—তাহলে নিজের ওপর আস্থা, শরীর সম্পর্কে ধারণা এবং সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কে তার মানসিকতা সেই ধর্মীয় ভাষায় গঠিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। একইভাবে একটি ছেলে যদি ছোটবেলা থেকে শেখে নারী জন্মগতভাবে বাঁকা, বিপজ্জনক এবং কমবুদ্ধি, তাহলে তাকে সমান সহকর্মী, নেতা, বিচারক বা স্বাধীন জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করার বদলে নিয়ন্ত্রণযোগ্য সত্তা হিসেবে দেখার মানসিক ভিত্তি তৈরি হয়। ধর্মীয় বাক্য তখন শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস থাকে না; পরিবার, শিক্ষা, বিবাহ এবং সামাজিক ক্ষমতার সম্পর্কের ভাষা হয়ে ওঠে। এই ওয়াজগুলো সেই সামাজিক ক্ষমতার ভাষার কিছু বাস্তব নমুনা,
মানুষের মূল্য তার লিঙ্গ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। একজন নারী বুদ্ধিমান না নির্বোধ, বিশ্বস্ত না বিশ্বাসঘাতক, নৈতিক না অনৈতিক, শান্ত না বিপজ্জনক—তা তার নিজের চরিত্র ও কাজ দিয়ে বিচার করতে হবে। জন্মের মুহূর্তে তাকে “বাঁকা”, “ফিতনা”, “কমবুদ্ধি” বা “অমঙ্গল” নামের ধর্মীয় ছাপ বসিয়ে দেওয়া ন্যায়বিচার নয়; এটি লিঙ্গবিদ্বেষকে পবিত্র ভাষা দেওয়া।
নারী মানুষ, নাকি পুরুষের জন্য নির্মিত ভোগ্যসামগ্রী?
নারী সম্পর্কে ইসলামী চরিত্রায়ণের একটি দিক তাকে দুর্বল, বাঁকা, বিপজ্জনক বা ঘাটতিপূর্ণ হিসেবে নির্মাণ করে; আরেকটি দিক তাকে পুরুষের প্রয়োজন পূরণের জন্য কার্যকর একটি সত্তা হিসেবে হাজির করে। কোরআনে স্ত্রী পুরুষের “শস্যক্ষেত্র”; নারীকে সন্তান, সোনা-রূপা, ঘোড়া, গবাদিপশু ও ক্ষেতখামারের সঙ্গে মানুষের আকাঙ্ক্ষিত পার্থিব বস্তুর তালিকায় রাখা হয়েছে; সহিহ হাদিসে পুণ্যবতী নারীকে দুনিয়ার সর্বোত্তম উপভোগ্য উপকরণ বলা হয়েছে; বিবাহের ভাষায় নারীর যৌনাঙ্গ পুরুষের জন্য “হালাল” হওয়ার কথা এসেছে; আবার স্ত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রেমময়ী ও অধিক সন্তানপ্রসবকারী নারীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব বক্তব্যকে উপমা, প্রশংসা বা পারিবারিক উপদেশ বলে আলাদা করে নরম করা যায়; কিন্তু একসঙ্গে রাখলে একটি সুস্পষ্ট পুরুষকেন্দ্রিক মূল্যায়ন দেখা যায়—নারী কতটা পুরুষকে আনন্দ দেয়, প্রশান্তি দেয়, যৌনভাবে প্রাপ্য থাকে এবং সন্তান উৎপাদন করে, তার মূল্য সেই উপযোগিতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে বাঁধা।
যৌন বস্তুতে নামিয়ে আনা: সমস্যাটি কোথায়
একজন মানুষকে যৌন বস্তুতে নামিয়ে আনা বা sexual objectification বলতে শুধু তার সৌন্দর্য বা যৌন আকর্ষণ লক্ষ্য করা বোঝায় না। সমস্যাটি হলো একজন পূর্ণ মানুষকে তার নিজস্ব ইচ্ছা, অনুভূতি, লক্ষ্য ও সিদ্ধান্তক্ষমতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে অন্য মানুষের ব্যবহার, আনন্দ বা যৌন প্রয়োজন পূরণের উপকরণ হিসেবে দেখা। নারীবাদী দর্শনে Martha Nussbaum বস্তুতে নামিয়ে আনার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যের উদ্দেশ্য পূরণের যন্ত্র হিসেবে দেখা, আত্মনিয়ন্ত্রণকে অস্বীকার করা, ব্যক্তিসত্তাকে গৌণ করা এবং মালিকানাযোগ্য বা ব্যবহারযোগ্য সত্তা হিসেবে বিবেচনার কথা উল্লেখ করেছেন। [44]।
সমস্যা যৌন আকর্ষণ নয়; সমস্যা হলো ধর্মীয় ভাষায় নারীকে পুরুষের ব্যবহারযোগ্য সত্তা বানানো। দুই স্বাধীন মানুষের পারস্পরিক কামনা এক জিনিস, আর একজন মানুষকে অন্যজনের ক্ষেত্র, প্রশান্তির স্থান, ভোগ্য উপকরণ ও সন্তান উৎপাদনের মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করা আরেক জিনিস। এখানে সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ একমুখী—একজন চায়, নির্বাচন করে, ব্যবহার করে ও উপভোগ করে; অন্যজন হয়ে ওঠে সেই চাওয়া ও ব্যবহারের বিষয়। নারী যদি পুরুষের “ক্ষেত্র”, তার প্রশান্তির স্থান, তার জন্য সর্বোত্তম উপভোগ্য উপকরণ এবং তার সন্তান উৎপাদনের মাধ্যম হয়, তাহলে ভাষার কেন্দ্র পুরুষের প্রয়োজন; নারী সেখানে নিজের জীবনের কেন্দ্র নয়, অন্যের প্রয়োজন পূরণের কার্যকর সত্তা।
ধর্মীয় ভাষা শুধু ব্যক্তিগত রুচির ভাষা নয়। কোরআন, হাদিস ও ফিকহ মুসলিম সমাজে পরিবার, যৌনতা, বিবাহ ও নৈতিক আচরণের মানদণ্ড তৈরি করেছে। নারীকে কী নামে ডাকা হচ্ছে, তার শরীরকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে এবং বিবাহে তার যৌনতার ওপর কার অধিকার তৈরি হচ্ছে—এসব শব্দ পরে বাস্তব আইনি ও সামাজিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়।
নারী পুরুষের “শস্যক্ষেত্র”
কোরআনের সূরা আল-বাকারা ২:২২৩-এ স্ত্রীদের স্বামীদের হারস—শস্যক্ষেত্র বা চাষের জমি—বলা হয়েছে এবং পুরুষদের বলা হয়েছে, তারা নিজেদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন করতে পারে। [45]। আয়াতটির উপমাই সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় দুই ভূমিকা নির্ধারণ করে: কৃষক জমিতে যায়, বীজ বপন করে এবং ফসল প্রত্যাশা করে; জমি কৃষককে ব্যবহার করে না। নারীকে ক্ষেত্র এবং পুরুষকে সেই ক্ষেত্রের ব্যবহারকারী হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে।
কোরআন, সূরা আল-বাকারা ২:২২৩
“তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র। সুতরাং তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন কর।”
ধ্রুপদী তাফসীরে এই উপমার প্রজননমূলক অর্থ আরও স্পষ্ট। তাফসীরে কুরতুবিতে নারীকে বংশধর উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে; নারীর যোনিপথকে জমি, পুরুষের বীর্যকে বীজ এবং সন্তানকে সেই বীজ থেকে উৎপন্ন ফলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। [46]। অর্থাৎ “ক্ষেত্র” শব্দটি শুধু কাব্যিক প্রেমের উপমা নয়; প্রজনন ও যৌনসংসর্গের বিধান ব্যাখ্যা করতে ব্যবহৃত একটি পুরুষকেন্দ্রিক রূপক।
তাফসীর আল-কুরতুবী, সূরা আল-বাকারা ২:২২৩-এর ব্যাখ্যা
নারীকে বংশধর উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করে নারীর যোনিপথকে জমি, পুরুষের বীর্যকে বীজ এবং সন্তানকে সেই বীজ থেকে জন্মানো ফলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
আয়াতটির সঙ্গে সম্পর্কিত আবু দাউদের একটি বর্ণনা এই ক্ষমতার দিকটিকে আরও তীক্ষ্ণ করে। সেখানে একজন মুহাজির পুরুষ তার আনসারী স্ত্রীর সঙ্গে মক্কাবাসীদের পরিচিত বিভিন্ন ভঙ্গিতে যৌনসম্পর্ক করতে চায়। স্ত্রী তা প্রত্যাখ্যান করে বলে, তারা একটি নির্দিষ্ট ভঙ্গিতেই যৌনসম্পর্ক করে; স্বামীকে সেভাবেই করতে হবে, নইলে দূরে থাকতে হবে। বিরোধের পর ২:২২৩ আয়াত নাজিল হওয়ার বর্ণনা এসেছে এবং বলা হয়েছে, স্বামী সামনে, পেছনের দিক থেকে বা অন্য ভঙ্গিতে, তবে যোনিপথেই সহবাস করতে পারে। [47]।
সুনান আবূ দাউদ
৬/ বিবাহ
২১৬৪। স্ত্রী ভিন্ন ভঙ্গিতে যৌনসম্পর্কে আপত্তি জানিয়ে বলেছিল, “আমরা শুধু এক অবস্থাতেই সঙ্গম করি। সুতরাং তোমাকেও সেভাবেই করতে হবে, অন্যথায় আমার থেকে দূরে থাকো।” এরপর সূরা ২:২২৩-এর “তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের ক্ষেত্রস্বরূপ” আয়াত নাজিল হওয়ার বর্ণনা এসেছে।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাটি পায়ুপথে যৌনসম্পর্ককে বৈধ করছে না; আলোচ্য অনুমতি যোনিপথে বিভিন্ন ভঙ্গির মধ্যে সীমিত। কিন্তু ক্ষমতার প্রশ্নটি থেকেই যায়। নারী নিজের যৌন পছন্দ স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল; ধর্মীয় সমাধান তার সেই পছন্দকে স্বামীর সমান বাধ্যতামূলক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেনি, বরং পুরুষ কোন কোন ভঙ্গিতে তার “ক্ষেত্রে” যেতে পারবে তা নির্ধারণ করেছে। যৌনতার প্রথম নৈতিক প্রশ্ন হওয়া উচিত দুজনেই কি এটি চাইছে; এই বর্ণনায় প্রধান প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বামী কোন ভঙ্গিতে স্ত্রীর শরীর ব্যবহার করতে পারবে।
নারী, সন্তান, স্বর্ণ, ঘোড়া ও সম্পদের তালিকা
সূরা আলে ইমরান ৩:১৪-এ মানুষের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলা পার্থিব কাম্য বিষয়ের একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে। তালিকার শুরুতে নারী; তারপর সন্তান, সোনা-রূপার স্তূপ, উৎকৃষ্ট ঘোড়া, গবাদিপশু ও শস্যক্ষেত্র। শেষে এগুলোকে দুনিয়ার জীবনের মাতা‘—পার্থিব উপভোগের সামগ্রী—বলা হয়েছে। [48]। তালিকার দৃষ্টিকোণ পুরুষের আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে তৈরি: নারী এখানে আকাঙ্ক্ষাকারী নয়, আকাঙ্ক্ষিত।
কোরআন, সূরা আলে ইমরান ৩:১৪
মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে নারীর প্রতি আকর্ষণ, সন্তান, স্তূপীকৃত স্বর্ণ-রৌপ্য, উৎকৃষ্ট ঘোড়া, গবাদিপশু ও শস্যক্ষেত্র; এগুলো দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রী।
আয়াতটির সমস্যা সরাসরি ভাষাতেই আছে: নারীকে সন্তান, সোনা-রূপা, ঘোড়া, গবাদিপশু ও ক্ষেতখামারের সঙ্গে একই পার্থিব আকাঙ্ক্ষার তালিকায় রাখা হয়েছে। এগুলো মানুষ অর্জন করে, ধারণ করে, ব্যবহার করে এবং উপভোগ করে। ক্লাসিক্যাল তাফসীরেও পুরুষের প্রতি নারীর আকর্ষণকে কেন্দ্র করে আয়াতটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে; ইবন কাসীর এই জায়গায় নারীর ফিতনাকে বিশেষ শক্তিশালী বলেও সংশ্লিষ্ট হাদিস উদ্ধৃত করেছেন। ফলে নারী একই সঙ্গে পুরুষের কামনার বিষয় এবং সেই কামনার বিপদের উৎস।
পুরুষ নারীকে কামনা করে, কিন্তু সেই কামনার দায়ও শেষ পর্যন্ত নারীর ওপর—সে কাম্য বস্তু, আবার সে-ই ফিতনা। পুরুষের আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক; নারীর উপস্থিতি হয়ে ওঠে বিপজ্জনক। এই দ্বৈত ধারণাই পরবর্তী পর্দা, বিচ্ছিন্নতা ও যৌন নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত কার্যকর ভিত্তি।
“দুনিয়ার সর্বোত্তম উপভোগ্য উপকরণ” পুণ্যবতী নারী
সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে এই উপভোগের ভাষা আরও সরাসরি। আবদুল্লাহ ইবন আমর থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন—দুনিয়া উপভোগের উপকরণ এবং দুনিয়ার সর্বোত্তম উপভোগ্য উপকরণ পুণ্যবতী নারী। HadithBD-র বাংলা অনুবাদে বন্ধনীর মধ্যে “ভোগ্যপণ্য” শব্দও ব্যবহৃত হয়েছে। [49]।
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৮/ দুধপান
৩৫১২। আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “দুনিয়া উপভোগের উপকরণ, আর দুনিয়ার উত্তম উপভোগ্য উপকরণ পুণ্যবতী নারী।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এখানে আরবি মাতা‘ শব্দের অর্থ পার্থিব ব্যবহার, উপকার বা উপভোগের সামগ্রী। হাদিসের ভাষাতেই পুণ্যবতী নারীকে দুনিয়ার সর্বোত্তম মাতা‘ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। তার নিজস্ব চিন্তা, অর্জন, স্বাধীনতা বা জীবনের লক্ষ্য এখানে মূল্যায়নের বিষয় নয়; মূল্যায়নের কেন্দ্র হলো একজন পুরুষের দুনিয়াবি জীবনে সে কত উপকারী ও উপভোগ্য সঙ্গী। মানুষ হিসেবে নারীর স্বতন্ত্র সত্তার বদলে পুরুষের জন্য তার ব্যবহারমূল্যই এই ভাষার কেন্দ্র।
আর “পুণ্যবতী স্ত্রী”র ইসলামী সংজ্ঞাও পুরুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। হাদিসে উত্তম স্ত্রী এমন যে স্বামী তাকালে আনন্দ দেয়, নির্দেশ দিলে পালন করে, স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজের সম্ভ্রম ও তার সম্পদ রক্ষা করে। ফলে এখানে সর্বোত্তম মাতা‘ এমন নারী, যার ধর্মীয় গুণের একটি বড় অংশই তার স্বামীকেন্দ্রিক কার্যকারিতা দিয়ে নির্ধারিত। মূল্যবান ভোগ্যসামগ্রীকে যতই “সর্বোত্তম” বলা হোক, সেই প্রশংসার কেন্দ্র যদি থাকে অন্য মানুষের উপকার ও উপভোগ, তাহলে মানুষটির নিজস্ব ব্যক্তিসত্তা পেছনেই পড়ে থাকে।
পুরুষের প্রশান্তি, যৌনতা ও বংশবিস্তারের সঙ্গিনী
কোরআনের সৃষ্টি ও দাম্পত্যবয়ানেও নারীর ভূমিকা পুরুষের প্রশান্তি ও প্রজননের সঙ্গে যুক্ত। সূরা আল-আরাফ ৭:১৮৯-এ বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করা হয়েছে “যাতে সে তার কাছে প্রশান্তি লাভ করে”; তারপর আয়াতটি যৌনমিলন, গর্ভধারণ এবং সন্তান লাভের দিকে এগিয়ে যায়। [50]। সূরা আর-রূম ৩০:২১-এও জীবনসঙ্গীর কাছে প্রশান্তি পাওয়া, ভালোবাসা ও দয়ার কথা এসেছে। [51]।
কোরআন, সূরা আল-আরাফ ৭:১৮৯
তিনিই তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তা থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, “যাতে সে তার কাছে প্রশান্তি পায়।” এরপর তাদের যৌনমিলন, গর্ভধারণ এবং সন্তান লাভের কথা বলা হয়েছে।
সূরা ৭:১৮৯-এর সৃষ্টিবয়ানের গতিপথ প্রথম ব্যক্তি থেকে তার সঙ্গিনী, তারপর যৌনমিলন, গর্ভধারণ ও সন্তান উৎপাদনের দিকে যায়। এই ভাষাকে স্ত্রীকে পুরুষের “ক্ষেত্র” বলা, পুণ্যবতী নারীকে দুনিয়ার সর্বোত্তম উপভোগ্য উপকরণ বলা এবং অধিক সন্তানপ্রসবকারী স্ত্রীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বর্ণনার সঙ্গে রাখলে একই পুরুষকেন্দ্রিক কাঠামো বারবার ফিরে আসে। নারীকে পুরুষের শান্তি, পুরুষের যৌনতা এবং তার বংশধারা উৎপাদনের সঙ্গে বারবার সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে; নারীর মূল্য নিজের জীবনের স্বাধীন উদ্দেশ্যের বদলে পুরুষের প্রয়োজন ও প্রজননস্বার্থের সঙ্গে বাঁধা হয়েছে।
বিবাহে স্ত্রীর যৌনতার ওপর স্বামীর অধিকার
এই পুরুষকেন্দ্রিক ভাষা ধ্রুপদী ইসলামী বিবাহ আইনে আরও বাস্তব রূপ পায়। ফিকহে বিবাহের অন্যতম প্রধান আইনি ফল হলো স্বামীর জন্য স্ত্রীর সঙ্গে যৌন উপভোগ বৈধ হওয়া। বিভিন্ন গ্রন্থে মিলকুল বুদ‘ বা মিলকুল ইস্তিমতা‘-র মতো শব্দ যৌন উপভোগ বা যৌন অধিকারের ধারণা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ধারণার সরাসরি প্রতিফলন হাদিসের ভাষাতেও পাওয়া যায়। আয়িশার সূত্রে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, ওয়ালীর অনুমতি ছাড়া নারী বিয়ে করলে বিবাহ বাতিল; কিন্তু সেই বিয়েতে সহবাস হয়ে গেলে নারী মোহর পাবে, কারণ পুরুষ তার যৌনাঙ্গ “উপভোগ” করেছে। [52]।
মিশকাতুল মাসাবীহ
পর্বঃ বিবাহ
৩১৩১। আয়িশা (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। ওয়ালীর অনুমতি ছাড়া বিবাহ বাতিল হওয়ার কথা বলার পর বলা হয়েছে, সহবাস হয়ে থাকলে “স্ত্রীর মোহর দিতে হবে তার লজ্জাস্থান উপভোগ করার কারণে।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
ধ্রুপদী ইসলামী বিবাহে যৌন বৈধতার ভাষা সমান দুই ব্যক্তির বর্তমান ইচ্ছাকে কেন্দ্র করে দাঁড়ায় না; কাঠামোটি স্বামীর যৌন দাবিকে বিশেষ ধর্মীয় ও আইনি শক্তি দেয়। স্বামীর যৌন আহ্বানে স্ত্রীর সাড়া দেওয়া ধর্মীয় কর্তব্য; প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে ফেরেশতার অভিশাপের হাদিস যুক্ত; স্বামী উপস্থিত থাকলে তার অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর নফল রোজাও নিষিদ্ধ, কারণ তা তার যৌন অধিকারে বাধা দিতে পারে। ফলে বিবাহ এখানে শুধু “যৌনতা বৈধ” করে না; স্বামীর পক্ষে স্ত্রীর শরীরের ওপর একটি চলমান যৌন দাবি তৈরি করে।
যৌনতার বৈধতা আর যৌনতার ওপর স্থায়ী অধিকার এক জিনিস নয়। বিয়ে দুজন মানুষকে যৌনসম্পর্কের অনুমতি দিতে পারে; কিন্তু কোনো চুক্তি একজন মানুষের ভবিষ্যতের প্রতিটি “হ্যাঁ” আগাম কিনে নিতে পারে না। প্রতিটি যৌনসম্পর্কে শরীরের বর্তমান মালিক সেই মানুষটিই।
দেনমোহর ও নারীর যৌনাঙ্গ “হালাল” হওয়ার ভাষা
দেনমোহরকে সাধারণত নারীর আর্থিক অধিকার, সম্মান বা বিবাহের উপহার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু হাদিসের আইনি ভাষায় এর সঙ্গে যৌনপ্রাপ্যতার সরাসরি সম্পর্কও রয়েছে। সুনান আন-নাসাঈতে মুহাম্মদ বলেছেন—সবচেয়ে বেশি পূরণযোগ্য শর্ত হলো সেই শর্ত, যার মাধ্যমে নারীর লজ্জাস্থান পুরুষের জন্য হালাল করা হয়েছে। HadithBD-র বাংলা অনুবাদ এটিকে মোহর পরিশোধের সঙ্গে ব্যাখ্যা করেছে। [53]।
সুনান আন-নাসাঈ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৬/ নিকাহ
৩২৮৪। উকবা ইবন আমির (রাঃ) সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “সর্বাধিক পূরণযোগ্য শর্ত হলো তা, যার মাধ্যমে তোমরা নারীদের লজ্জাস্থান নিজেদের জন্য হালাল করেছ।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
মিশকাত ৩১৩১-এর বক্তব্যের সঙ্গে এই হাদিস রাখলে বিবাহের বিনিময়মূলক যৌন কাঠামো স্পষ্ট হয়। বিবাহের শর্তের মাধ্যমে নারীর যৌনাঙ্গ পুরুষের জন্য হালাল হয় এবং সেই যৌন উপভোগ সংঘটিত হলে নারী মোহরের অধিকারী হয়। অর্থাৎ মোহরের আর্থিক দাবি এবং পুরুষের যৌনপ্রাপ্যতা একই আইনি সম্পর্কের মধ্যে যুক্ত। নারী অর্থ পায়, পুরুষ তার শরীরের যৌন উপভোগের বৈধ অধিকার পায়—ধ্রুপদী বিবাহ আইনের বিনিময়মূলক ভাষাটি এখানেই।
এই জায়গাতেই আধুনিক যৌনসম্মতির সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি হয়। অর্থ, উপহার, ভরণপোষণ বা বিবাহচুক্তি কোনো মানুষের ভবিষ্যৎ যৌনসম্মতি স্থায়ীভাবে কিনে নিতে পারে না। আজ একজন মানুষ বিবাহে সম্মতি দিলেও আগামীকাল কোনো নির্দিষ্ট যৌনসম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করার অধিকার তার থাকে। মোহর নারীকে সম্পত্তির অধিকার দেয়; কিন্তু মোহরকে যদি একই সঙ্গে পুরুষের যৌনপ্রাপ্যতার মূল্য বা শর্ত হিসেবে দেখা হয়, তাহলে নারীর শরীর সম্পর্কের স্বাধীন কেন্দ্র থেকে চুক্তিগত অধিকারের বিষয়ে পরিণত হয়।
প্রজনন ও যৌন উপযোগিতা দিয়ে নারীর মূল্য নির্ধারণ
নারীর মূল্যকে পুরুষের যৌন ও প্রজনন প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করার আরেকটি সরাসরি উদাহরণ আবু দাউদ ২০৫০। একজন পুরুষ মুহাম্মদের কাছে এসে বলেন, তিনি সুন্দরী ও মর্যাদাসম্পন্ন একজন নারী পেয়েছেন, কিন্তু নারীটি সন্তান জন্ম দিতে অক্ষম; তিনি তাকে বিয়ে করবেন কি না। মুহাম্মদ তাকে নিষেধ করেন। লোকটি আবার এলে আবার নিষেধ করেন; তৃতীয়বার এলে বলেন, প্রেমময়ী ও অধিক সন্তানপ্রসবকারী নারীকে বিয়ে করতে, কারণ তিনি অন্যান্য উম্মতের সামনে মুসলিমদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গর্ব করবেন। [54]।
সুনান আবূ দাউদ
৬/ বিবাহ
২০৫০। এক ব্যক্তি সুন্দরী ও মর্যাদাসম্পন্ন কিন্তু সন্তান জন্ম দিতে অক্ষম একজন নারীকে বিয়ে করার অনুমতি চাইলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিষেধ করেন। পরে বলেনঃ “প্রেমময়ী ও অধিক সন্তানপ্রসবকারী নারীকে বিয়ে করো; কারণ আমি অন্যান্য উম্মতের সামনে তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গর্ব করব।”
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
নারীটি সুন্দরী ও মর্যাদাসম্পন্ন—তবু তার প্রজননক্ষমতার অভাব বিয়েতে নিরুৎসাহিত করার সিদ্ধান্তমূলক কারণ। বিপরীতে আদর্শ স্ত্রী হিসেবে সামনে আসে ওয়াদূদ ও ওয়ালূদ—প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তানপ্রসবকারী নারী। এখানে নারীকে বিয়ের মূল্যায়নে তার ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি তার জরায়ুর কার্যক্ষমতা সরাসরি ধর্মীয় মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। আরও লক্ষণীয়, সন্তান উৎপাদনের কারণ ব্যক্তিগত দম্পতির ইচ্ছাতেই সীমাবদ্ধ নয়; মুসলিম সম্প্রদায়ের সংখ্যাবৃদ্ধি নবীর গর্বের কারণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
এই প্রজননের শারীরিক মূল্য আবার পুরুষ ও নারী সমানভাবে বহন করে না। গর্ভধারণ, প্রসব, গর্ভপাতের ঝুঁকি, শারীরিক পরিবর্তন, স্তন্যদান এবং মাতৃত্বের প্রথম পর্যায়ের প্রধান জৈবিক বোঝা নারীর শরীর বহন করে। অথচ সেই শরীরকে বৃহত্তর ধর্মীয় জনসংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। নারীর জরায়ু তার নিজের শরীরের অংশ; কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সম্পদ নয়। সন্তান নেবে কি না, কয়টি নেবে—এই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে সেই নারী ও তার স্বাধীন জীবন থাকা উচিত, অন্য কারও সংখ্যাধিক্যের গর্ব নয়।
পুরো পরিচ্ছেদটি একত্রে পড়লে একই সূত্র বারবার সামনে আসে। স্ত্রী পুরুষের ক্ষেত্র, নারী পুরুষের কাম্য পার্থিব বিষয়ের তালিকায়, পুণ্যবতী স্ত্রী সর্বোত্তম উপভোগ্য উপকরণ, বিবাহে তার যৌনাঙ্গ পুরুষের জন্য হালাল হয়, মোহর যৌনপ্রাপ্যতার আইনি ভাষার সঙ্গে যুক্ত, এবং আদর্শ স্ত্রী প্রেমময়ী ও অধিক সন্তানপ্রসবকারী। এই ব্যবস্থায় নারীর মানবমর্যাদাকে স্বাধীন সত্তার মর্যাদা হিসেবে দেখা হয়নি; তাকে প্রায়শ পুরুষের জন্য তার ব্যবহারমূল্য দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে—সে কত কাম্য, কত অনুগত, কত যৌনভাবে প্রাপ্য এবং কত কার্যকরভাবে সন্তান উৎপাদন করতে পারে। মানুষকে সম্মান করা আর মানুষকে অত্যন্ত মূল্যবান উপযোগী বস্তু হিসেবে সাজিয়ে রাখা এক জিনিস নয়।
এই পুরুষকেন্দ্রিক যৌন ও প্রজনন কাঠামোর আরও বিস্তৃত দলিল রয়েছে সংশয় জ্ঞানকোষের [55], [56], [57] এবং [58] প্রবন্ধে।
পুরুষের কর্তৃত্ব, নারীর আনুগত্য
নারীকে বুদ্ধিতে ও ধর্মে ঘাটতিপূর্ণ, পুরুষের জন্য ফিতনা এবং স্বভাবে বাঁকা হিসেবে নির্মাণ করার পর ইসলামী পারিবারিক আইন সেই ধারণার একটি বাস্তব ক্ষমতা-কাঠামো তৈরি করে। সেখানে নারী ও পুরুষ শুধু ভিন্ন দায়িত্বের দুই সমান অংশীদার নয়; স্বামীকে পরিবারের কর্তৃত্বশীল পক্ষ এবং স্ত্রীকে তার আনুগত্যশীল পক্ষ হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে। কোরআনের কাওয়ামাহ, পুরুষের “এক মর্যাদা”, সৎ স্ত্রীর আনুগত্য, স্বামীর প্রায়-সিজদাযোগ্য অধিকার, স্ত্রীকে “বন্দী” হিসেবে বর্ণনা, স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোজায় নিষেধ এবং বিবাহে পুরুষ ওয়ালীর ক্ষমতা—এসব বিধান একই দিকে নির্দেশ করে। সম্পর্কটির কেন্দ্র পারস্পরিক ভালোবাসার পাশাপাশি একটি স্পষ্ট উল্লম্ব ক্ষমতার বিন্যাস: পুরুষ পরিচালনা করবে, নারী মেনে চলবে।
এই ক্ষমতা শুধু প্রতীকী সম্মান নয়। স্বামী স্ত্রীর ওপর এমন কিছু অধিকার পায় যা স্ত্রী স্বামীর ওপর সমান্তরালভাবে পায় না। সে স্ত্রীর নুশূযের বিচার করতে পারে, তাকে উপদেশ দিতে পারে, শয্যা বর্জন করতে পারে এবং শেষ ধাপে প্রহার করতে পারে; স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে একই শাস্তিমূলক ক্ষমতা পায় না। স্বামী দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ স্ত্রী গ্রহণ করতে পারে; স্ত্রী তাকে একইভাবে আরেক স্বামীর সঙ্গে ভাগ করতে বাধ্য করতে পারে না। স্ত্রী স্বামীর যৌন আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলে ধর্মীয় নিন্দা আসে; স্বামীর উপস্থিতিতে তার ব্যক্তিগত নফল ইবাদতও স্বামীর অনুমতির অধীন হতে পারে। ইসলামী দাম্পত্যে পুরুষের কর্তৃত্ব কোনো একটি বিচ্ছিন্ন আয়াতের ব্যাখ্যা নয়; কোরআন, হাদিস ও ফিকহের বহু বিধান মিলে সেই কর্তৃত্বকে কার্যকর সামাজিক ও যৌন ক্ষমতায় পরিণত করেছে।
পুরুষ নারীর কর্তা—কাওয়ামাহ
ইসলামী দাম্পত্যের শ্রেণিবিন্যাস সবচেয়ে সরাসরি ঘোষণা করা হয়েছে সূরা আন-নিসা ৪:৩৪-এ। সেখানে পুরুষদের নারীদের ওপর কাওয়ামূন বলা হয়েছে। এর সঙ্গে দুটি কারণও জুড়ে দেওয়া হয়েছে—আল্লাহ এক পক্ষকে অন্য পক্ষের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন এবং পুরুষরা নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে। এরপর “সৎ” নারীদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে আনুগত্যের কথা আসে; যেসব স্ত্রীর নুশূয বা অবাধ্যতার আশঙ্কা হয়, তাদের ক্ষেত্রে পুরুষকে উপদেশ, শয্যা বর্জন এবং প্রহারের পর্যায়ক্রমিক ক্ষমতা দেওয়া হয়। [59]। আয়াতটির ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ: পুরুষের কর্তৃত্ব → সৎ নারীর আনুগত্য → স্ত্রীর অবাধ্যতা → স্বামীর সংশোধনমূলক ব্যবস্থা।
কোরআন, সূরা আন-নিসা ৪:৩৪
“পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল”, কারণ আল্লাহ তাদের এককে অন্যের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন এবং তারা নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে। অতএব সৎ নারীরা অনুগত এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে যা সংরক্ষণীয় তা সংরক্ষণ করে। আর যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর, তাদের উপদেশ দাও, শয্যায় তাদের থেকে পৃথক থাক এবং তাদের প্রহার কর; অতঃপর তারা তোমাদের আনুগত্য করলে তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো পথ খুঁজো না।
কাওয়ামাহ-কে শুধু “দায়িত্ব নেওয়া” বা “সংসারের খরচ দেওয়া”তে সংকুচিত করলে আয়াতের অর্ধেক অংশ বাদ পড়ে যায়। অর্থ ব্যয়ের উল্লেখের পরেই স্ত্রীকে আনুগত্যশীল বলা হয়েছে এবং অবাধ্য স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামীকে সংশোধনমূলক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক দায়িত্ব থেকে শুধু দায় নয়, কর্তৃত্বও উৎপন্ন হচ্ছে। একজন ব্যক্তি সংসারের বেশি খরচ বহন করতে পারেন; কিন্তু আধুনিক সমান সম্পর্কের ধারণায় সেই খরচ অন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর শাসনক্ষমতা তৈরি করে না। কেউ পরিবারের পুরো ভাড়া দিলেও সে তার সঙ্গীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, শরীর বা আনুগত্যের মালিক হয়ে যায় না।
আয়াতটির আরেকটি মৌলিক সমস্যা হলো কর্তৃত্ব ব্যক্তিগত যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে না। স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি শিক্ষিত হতে পারেন, বেশি আয় করতে পারেন, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিকভাবে দক্ষ হতে পারেন, সংসারের অধিকাংশ অর্থও বহন করতে পারেন—তবুও কোরআনিক শ্রেণিবিভাগ ব্যক্তিগত দক্ষতার পরীক্ষা নিয়ে তৈরি হয়নি; পুরুষ ও নারী হিসেবে তৈরি হয়েছে। পরিবারের নেতৃত্ব যদি সক্ষমতার বদলে জন্মগত লিঙ্গ দিয়ে নির্ধারিত হয়, তাহলে সেটি দায়িত্ববণ্টন নয়; এটি পুরুষকে জন্মসূত্রে উচ্চতর পারিবারিক ক্ষমতা দেওয়া।
আর এই কর্তৃত্ব নিছক পারিবারিক ব্যবস্থাপনার অধিকার নয়—৪:৩৪-এর শেষ অংশই দেখায় এর মধ্যে শাস্তিমূলক ক্ষমতা রয়েছে। স্ত্রী স্বামীর আচরণে অসন্তুষ্ট হলে কোরআন তাকে স্বামীকে প্রহার করার সমান্তরাল ধাপ দেয়নি। ফলে “কাওয়ামাহ”র আইনগত রূপ একমুখী: স্বামী স্ত্রীর আনুগত্য বিচার করবে, স্ত্রী স্বামীর ওপর একই কর্তৃত্ব প্রয়োগ করবে না। এই শাস্তিমূলক দিকটি পরের স্ত্রী-প্রহার অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচিত হবে।
পুরুষের নারীর ওপর “এক মর্যাদা”
সূরা আল-বাকারার ২:২২৮ নম্বর আয়াতে তালাক ও ইদ্দতের আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমে বলা হয়েছে—ন্যায়সঙ্গতভাবে নারীদের যেমন অধিকার আছে, তেমনি তাদের ওপর দায়িত্বও আছে। কিন্তু একই বাক্যের পরেই ঘোষণা করা হয়েছে, পুরুষদের নারীদের ওপর একটি দারাজাহ বা মর্যাদা রয়েছে। [60]। এই বাক্যটিকে ৪:৩৪-এর কাওয়ামাহ-র পাশে রাখলে পারিবারিক শ্রেণিবিন্যাস আরও স্পষ্ট হয়। পারস্পরিক অধিকার আছে, কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষস্থানটি সমান নয়।
কোরআন, সূরা আল-বাকারা ২:২২৮
নারীদের জন্য ন্যায়সঙ্গতভাবে তেমন অধিকার রয়েছে যেমন তাদের ওপর দায়িত্ব রয়েছে; “আর পুরুষদের তাদের উপর এক মর্যাদা রয়েছে।”
এই “এক মর্যাদা”কে কোনো সর্বজনীন দাবি হিসেবে নিয়ে প্রত্যেক পুরুষ প্রত্যেক নারীর চেয়ে মানুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠ—এমন কথা কোরআন সরাসরি বলেনি। আয়াতটি দাম্পত্য ও পারিবারিক অধিকারের প্রসঙ্গে এসেছে। কিন্তু ঠিক সেই ক্ষেত্রেই তার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি: স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকারের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষকে অতিরিক্ত অবস্থান দেওয়া হয়েছে। বাস্তব ইসলামী পারিবারিক আইনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে সেই অতিরিক্ত অবস্থান নিছক সম্মানসূচক শব্দে আটকে থাকে না—তালাক, বহুবিবাহ, কাওয়ামাহ, নুশূয, যৌন অধিকার ও পারিবারিক সিদ্ধান্তে তার প্রতিফলন পাওয়া যায়।
“দুই পক্ষের অধিকার আছে, কিন্তু একজন অন্যজনের ওপর এক ধাপ ওপরে”—এটি সমমর্যাদার ভাষা নয়। একটি সম্পর্ককে সমান বলা এবং একই সঙ্গে জন্মগত লিঙ্গের ভিত্তিতে এক পক্ষকে অতিরিক্ত মর্যাদা দেওয়া পরস্পরবিরোধী ধারণা।
স্বামীর অধিকার, স্ত্রীর আনুগত্য
হাদিসে “ভালো স্ত্রী”র সংজ্ঞাতেও একই ক্ষমতার দিকটি দেখা যায়। একজন উত্তম নারীকে এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে স্বামী তাকে দেখলে সে স্বামীকে আনন্দ দেয়, স্বামী নির্দেশ দিলে সে তা পালন করে এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজের সম্ভ্রম ও তার সম্পদ রক্ষা করে। স্ত্রীর আদর্শ চরিত্রের কেন্দ্র হয়ে ওঠে স্বামীর সন্তুষ্টি, নির্দেশ ও সম্পদ। বিপরীতে স্বামীর দায়িত্বের আলোচনায় প্রধানত ভরণপোষণ, খাদ্য, পোশাক এবং শারীরিক আচরণের কথা আসে। [61]।
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৬/ বিবাহ
২১৩৯। মু‘আবিয়া আল-কুশাইরী (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, স্ত্রীর ওপর আমাদের কী অধিকার এবং আমাদের ওপর স্ত্রীর কী অধিকার? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তুমি যখন খাবে তাকেও খাওয়াবে, তুমি যখন পোশাক পরবে তাকেও পোশাক দেবে; মুখে আঘাত করবে না, গালমন্দ করবে না…”
ইসলামী দাম্পত্যে পুরুষের ওপর ভরণপোষণের দায়িত্ব আরোপের সঙ্গে নারীর ওপর আনুগত্য ও যৌনপ্রাপ্যতার দায়িত্ব যুক্ত করা হয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক দায়িত্ব এখানে শুধু পারস্পরিক দায়িত্ববণ্টনে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার সঙ্গে স্বামীর কর্তৃত্বও প্রতিষ্ঠিত হয়। পুরুষ খাদ্য, পোশাক ও ভরণপোষণ দেবে, আর স্ত্রী তার নির্দেশ মানবে, যৌন দাবিতে সাড়া দেবে এবং স্বামীর অধিকারের অনুকূলে নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করবে। অর্থনৈতিক দায়িত্বকে আরেকজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর কর্তৃত্বের ভিত্তি বানানো সমান অংশীদারিত্ব নয়।
এই কর্তৃত্ব যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রবল। সহিহ বুখারি ৫১৯৩-এ বলা হয়েছে, স্বামী স্ত্রীকে বিছানায় ডাকলে স্ত্রী না এলে এবং স্বামী অসন্তুষ্ট অবস্থায় রাত কাটালে ফেরেশতারা সকাল পর্যন্ত স্ত্রীকে অভিশাপ দেয়। [62]। যৌনতার এই অংশ পরবর্তী অধ্যায়ে বিস্তারিত আসবে; বর্তমান প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বামীর একটি ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে স্ত্রীর ধর্মীয় কর্তব্যে রূপ দেওয়া হয়েছে।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৭/ বিয়ে
৫১৯৩। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে তার বিছানায় ডাকলে সে যদি আসতে অস্বীকার করে এবং স্বামী তার ওপর অসন্তুষ্ট অবস্থায় রাত কাটায়, তবে সকাল পর্যন্ত ফেরেশতারা তাকে অভিশাপ দিতে থাকে।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এখানে কর্তৃত্বের ধর্মীয় শক্তি বোঝা যায়। স্ত্রীর কাছে স্বামীর দাবি কেবল “আমার ইচ্ছা” হয়ে থাকে না; ফেরেশতা, পাপ ও পরকালের ভাষা তার পেছনে দাঁড়ায়। যখন স্বামীর ব্যক্তিগত দাবি ধর্মীয় কর্তব্য হয়ে যায়, তখন স্ত্রী শুধু একজন মানুষের সঙ্গে দরকষাকষি করে না; তাকে শেখানো হয় তার স্বামীর অসন্তুষ্টির পেছনে স্বর্গীয় অসন্তুষ্টিও দাঁড়িয়ে আছে।
স্বামী প্রায় সিজদার উপযুক্ত
স্বামীর অধিকার কত উঁচুতে তোলা হয়েছে, তার সবচেয়ে তীব্র প্রতীক পাওয়া যায় সিজদার হাদিসে। ইসলামে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা অনুমোদিত নয়; সিজদা চরম বশ্যতা ও আত্মসমর্পণের প্রতীক। অথচ একাধিক হাদিসে মুহাম্মদ বলেছেন—যদি কোনো মানুষকে আরেক মানুষকে সিজদার অনুমতি দেওয়া হতো, তাহলে স্ত্রীকে তার স্বামীকে সিজদা করার নির্দেশ দেওয়া হতো। [63]।
মিশকাতুল মাসাবীহ
পর্বঃ বিবাহ
৩২৫৫। আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আমি যদি কোনো মানুষকে অন্য কোনো মানুষকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তবে স্ত্রীকে তার স্বামীকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম।”
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
কায়স ইবন সা‘দের বর্ণনায় ঘটনাটি আরও বিস্তারিত। তিনি হীরা শহরে লোকদের নেতাকে সিজদা করতে দেখে মুহাম্মদকে এর চেয়ে বেশি সিজদার যোগ্য মনে করেন এবং ফিরে এসে তাকে সিজদা করতে চান। মুহাম্মদ মানুষের জন্য সিজদা নিষিদ্ধ রাখেন, কিন্তু এরপর একই তুলনা করে বলেন—যদি কাউকে কারও সামনে সিজদা করার নির্দেশ দিতেন, তাহলে নারীদের স্বামীদের সামনে তা করতে বলতেন। [64]।
মিশকাতুল মাসাবীহ
৩২৬৬। কায়স ইবনু সা‘দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। হীরায় লোকদের নেতাকে সিজদা করতে দেখে তিনি নবীকে সিজদা করতে চাইলে নবী তা নিষেধ করেন এবং বলেনঃ “আমি যদি কাউকে কাউকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তবে নারীদের তাদের স্বামীদের সিজদা করার নির্দেশ দিতাম—স্বামীরা তাদের ওপর যে অধিকার রাখে তার কারণে।”
হাদিসটি বাস্তব সিজদার নির্দেশ দেয় না; এটি স্বামীর অধিকার বোঝাতে সিজদার মতো চূড়ান্ত বশ্যতার প্রতীক ব্যবহার করে। স্বামীকে ভালোবাসা, সম্মান বা সহযোগিতার ভাষায় নয়, মানুষের প্রতি সিজদা বৈধ হলে সেই সিজদার দাবিদার হিসেবে স্বামীকে কল্পনা করা হয়েছে। সমান জীবনসঙ্গীর সম্পর্ক বোঝাতে প্রায়-সিজদার ভাষা লাগে না; এই উপমা সম্পর্কের স্তরবিন্যাস প্রকাশ করে—স্বামীর অধিকারকে প্রায় উপাসনাসদৃশ বশ্যতার মাত্রায় উঁচু করা হয়েছে।
স্ত্রী “বন্দী”: দাম্পত্যের অধীনতার ভাষা
বিদায় হজের বর্ণনায় নারীদের সম্পর্কে পুরুষদের উদ্দেশে ব্যবহৃত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ‘আওয়ান’। সুনান আত-তিরমিযীর ব্যাখ্যায় এর অর্থ দেওয়া হয়েছে—পুরুষদের হাতে বন্দী। একই বর্ণনায় নারীদের খাদ্য-পোশাকের অধিকার, পুরুষদের অধিকার এবং নুশূযের ক্ষেত্রে শয্যা বর্জন ও অগুরুতর প্রহারের কথাও এসেছে। [65]।
সুনান আত-তিরমিযী
১১৬৩। নারীদের সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “তারা তোমাদের কাছে বন্দীর মতো।” তাদের ওপর পুরুষদের অধিকার ও পুরুষদের ওপর তাদের খাদ্য-পোশাকের অধিকারের কথাও একই বর্ণনায় এসেছে। ইমাম তিরমিযী ‘আওয়ানুন ‘ইন্দাকুম’ অর্থ করেছেন—“তোমাদের হাতে বন্দী।”
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
“ভালোভাবে রাখা” এবং “সমান স্বাধীন মানুষ” সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা। বন্দীকে খাবার, পোশাক ও নিরাপত্তা দেওয়া তাকে প্রহরীর সমান ক্ষমতার অংশীদার বানায় না; বন্দিত্বের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো স্বাধীনতার অসমতা। হাদিসে স্ত্রীকে পুরুষের হাতে বন্দীর উপমা দেওয়া হয়েছে, আর একই ধর্মীয় কাঠামোয় স্বামীকে তার আনুগত্য দাবি, যৌন অধিকার প্রয়োগ এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। উপমা ও আইনি ক্ষমতার বিন্যাস একই অধীনতামূলক সম্পর্ক প্রকাশ করে।
ধ্রুপদী ইসলামী নৈতিক সাহিত্যে এই অধীনতার ভাষা আরও নগ্ন হয়েছে। আবু হামিদ আল-গাযযালী ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন-এ স্বামীর অধিকারের আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন—বিবাহ এক অর্থে নারীর জন্য দাসীত্বের মতো; স্ত্রী যেন স্বামীর দাসী এবং তার আনুগত্য করা তার কর্তব্য। সংশয়ের বৈবাহিক ধর্ষণবিষয়ক প্রবন্ধে এই অংশটি বাংলা সংস্করণের উদ্ধৃতিসহ রাখা হয়েছে। [57]।
ইমাম আবু হামিদ আল-গাযযালী, ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন
“বিবাহ প্রকারান্তরে বাঁদী হওয়ার নামান্তর বিধায় স্ত্রী যেন স্বামীর বাঁদী হয়ে যায়। সুতরাং স্বামীর আনুগত্য করা সর্বাবস্থায় তার ওপর ওয়াজিব।”
স্ত্রীকে বন্দী, বাঁদী বা প্রায়-সিজদাকারী হিসেবে কল্পনা করার তিনটি ভাষাই একই দিকে যায়: বিবাহ এখানে সমান দুই স্বাধীন মানুষের ক্ষমতার সমান বিনিময় নয়; পুরুষের অধিকারের পরিমাণ এবং নারীর আনুগত্যের মাত্রা ব্যাখ্যা করতে অধীনতার প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে।
স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর সিদ্ধান্তের সীমা
স্বামীর কর্তৃত্ব শুধু বড় পারিবারিক সিদ্ধান্ত বা যৌনতার মধ্যে সীমিত নয়; স্ত্রীর ব্যক্তিগত ধর্মীয় আচরণ এবং গৃহের সামাজিক ব্যবস্থাপনাতেও তার অনুমতির শর্ত বসানো হয়েছে। সহিহ বুখারি ৫১৯৫-এ বলা হয়েছে, স্বামী উপস্থিত থাকলে স্ত্রী তার অনুমতি ছাড়া নফল রোজা রাখতে পারবে না এবং স্বামীর অনুমতি ছাড়া কাউকে তার ঘরে প্রবেশ করতে দেবে না। [66]।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৭/ বিয়ে
৫১৯৫। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “স্বামী উপস্থিত থাকলে তার অনুমতি ছাড়া স্ত্রী নফল সওম পালন করবে না এবং তার অনুমতি ছাড়া কাউকে তার ঘরে প্রবেশ করতে দেবে না।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
নফল রোজার পেছনের ফিকহি যুক্তি স্বামীর যৌন অধিকারের সঙ্গে যুক্ত: স্ত্রী রোজায় থাকলে দিনের বেলায় যৌনসম্পর্ক সম্ভব নয়। অর্থাৎ নারীর নিজের শরীর নিয়ে করা একটি অতিরিক্ত ধর্মীয় ইবাদতও তার স্বামীর সম্ভাব্য যৌন চাহিদার নিচে স্থান পায়। তিনি আল্লাহর উদ্দেশ্যে নফল রোজা রাখতে চান—তবুও স্বামীর উপস্থিতিতে তার অনুমতি প্রয়োজন। স্বামীর নিজের নফল রোজার জন্য স্ত্রীর অনুমতির সমান্তরাল হাদিস নেই।
মিশকাতুল মাসাবীহের আরেক বর্ণনায় স্বামী নিজের প্রয়োজনের জন্য স্ত্রীকে ডাকলে তাকে সাড়া দিতে বলা হয়েছে, এমনকি সে চুলার কাছে কাজ করতে থাকলেও। [67]। এই হাদিসের যৌন তাৎপর্য পরে বিস্তারিত আসবে; এখানে তার ক্ষমতার তাৎপর্য হলো—স্ত্রীর কাজ, সময় ও শরীরের ওপর স্বামীর দাবি তার চলমান ব্যক্তিগত কাজেরও অগ্রাধিকার পেতে পারে।
মিশকাতুল মাসাবীহ
৩২৫৭। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “স্বামী যখন তার স্ত্রীকে নিজের প্রয়োজনের জন্য ডাকে, তখন সে যেন তার কাছে আসে—যদিও সে চুলার পাশে থাকে।”
স্ত্রীর ব্যক্তিগত ইবাদত, গৃহে কে প্রবেশ করবে এবং তার সময় ও শরীরের ব্যবহার—এই তিন ক্ষেত্রেই স্বামীর অনুমতি বা দাবি প্রবেশ করলে কাওয়ামাহ আর বিমূর্ত “দায়িত্ব” থাকে না; সেটি নারীর দৈনন্দিন জীবনের ওপর কার্যকর কর্তৃত্বে পরিণত হয়।
প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বিবাহেও পুরুষ ওয়ালী
নারীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তক্ষমতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বিবাহ। সুন্নি ফিকহের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকি, শাফিঈ ও হাম্বলি মত অনুযায়ী একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের সম্মতি জানালেও পুরুষ ওয়ালী ছাড়া তার বিবাহ বৈধ হয় না। আয়িশার সূত্রে বর্ণিত আবু দাউদের হাদিসে বলা হয়েছে, যে নারী তার ওয়ালীর অনুমতি ছাড়া বিবাহ করে তার বিবাহ বাতিল—এ কথা তিনবার বলা হয়েছে। [68]।
সুনান আবূ দাউদ
৬/ বিবাহ
২০৮৫। আয়িশা (রাঃ) সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “যে নারী তার ওয়ালীর অনুমতি ছাড়া বিবাহ করে, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল।” পরবর্তীতে বিরোধ হলে শাসককে সেই নারীর ওয়ালী বলা হয়েছে যার কোনো ওয়ালী নেই।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এর মানে নারীর সম্মতি অপ্রয়োজনীয় নয়। প্রাপ্তবয়স্ক কুমারী ও পূর্বে বিবাহিত নারীর অনুমতি সম্পর্কে আলাদা হাদিস রয়েছে এবং জোর করে বিবাহ দেওয়ার ঘটনাতেও নারীর অভিযোগের বর্ণনা পাওয়া যায়। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিকহি কাঠামোয় তার সম্মতি একাই বিবাহ সম্পন্ন করার জন্য যথেষ্ট নয়; পুরুষ ওয়ালীর অনুমোদনও প্রয়োজন। পিতা না থাকলে নির্দিষ্ট ক্রমে পিতৃসূত্রীয় পুরুষ আত্মীয়, আর কেউ না থাকলে শাসক বা বিচারক ওয়ালীর ভূমিকা নেয়।
হানাফি মাযহাবে এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম আছে। প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন স্বাধীন নারী নির্দিষ্ট শর্তে নিজের বিবাহচুক্তি নিজেই করতে পারে; ওয়ালী তার বৈধতার অপরিহার্য শর্ত নয়। ফলে “ইসলামে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী কখনো নিজের বিবাহ করতে পারে না”—এমন সর্বজনীন বক্তব্য সঠিক নয়। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি মাযহাবের কাঠামোতে পুরুষ ওয়ালীর ক্ষমতা সুস্পষ্ট।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ নিজের বিবাহে কোনো নারী অভিভাবকের অনুমোদন ছাড়াই চুক্তির পক্ষ হতে পারে; অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি আইনে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নিজের সম্মতির পাশাপাশি পুরুষ অভিভাবকের অনুমোদন প্রয়োজন। একই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে এই অতিরিক্ত পুরুষ কর্তৃত্বই ওয়ালী ব্যবস্থার লিঙ্গগত অসমতা।
স্বামীর আনুগত্য জান্নাতের পথ
দাম্পত্য আনুগত্যকে শুধু সামাজিক শৃঙ্খলা নয়, নারীর পরকালীন মুক্তির সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে। মিশকাতুল মাসাবীহে বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছে, কোনো নারী যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজানের রোজা রাখে, নিজের সতীত্ব রক্ষা করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, তাকে জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে বলা হবে। [69]। ধর্মীয় কর্তব্যের তালিকায় আল্লাহর প্রতি নামাজ ও রোজার পাশাপাশি সরাসরি স্বামীর আনুগত্যকে বসানো হয়েছে।
মিশকাতুল মাসাবীহ
পর্বঃ বিবাহ
৩২৫৪। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “যে নারী পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে, রমযানের সওম পালন করে, নিজের লজ্জাস্থান হিফাযত করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, তাকে বলা হবে—জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ কর।”
এখানে স্বামী শুধু সংসারের অংশীদার নয়; তার প্রতি আনুগত্য নারীর ধর্মীয় সাফল্যের একটি পরিমাপক। অন্য বর্ণনাগুলোতে স্বামীর অসন্তুষ্টি, বিছানার আহ্বান এবং নারীর পরকালীন অবস্থার মধ্যে সম্পর্ক আরও শক্ত করা হয়েছে। এভাবে ব্যক্তিগত বৈবাহিক কর্তৃত্বকে সরাসরি স্বর্গ-নরকের ভাষার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। স্ত্রী যদি বিশ্বাস করেন স্বামীর আনুগত্য তার জান্নাতের পথের একটি শর্ত, তাহলে স্বামীর ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো শুধু পারিবারিক বিরোধ নয়; তা তার ধর্মীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
এই ব্যবস্থার সামাজিক শক্তি এখানেই। আইনের প্রয়োগের জন্য সবসময় পুলিশ প্রয়োজন হয় না; মানুষের বিশ্বাসই তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। একজন নারী যদি শৈশব থেকে শেখেন স্বামী তার কর্তা, তার সন্তুষ্টি ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তাকে প্রায় সিজদার উপযুক্ত অধিকার দেওয়া হয়েছে, স্ত্রী তার হাতে বন্দীর মতো এবং স্বামীর আনুগত্য জান্নাতের দরজা খুলে দেয়—তাহলে অধীনতাকে ধর্মীয় গুণ হিসেবে গ্রহণ করার জন্য একটি পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি হয়।
নারীর সৃষ্টি: পুরুষের অনুগামী ও তৃপ্তির উপকরণ
ইসলামী সৃষ্টিতত্ত্বের প্রচলিত ব্যাখ্যায় নারীকে পুরুষের সমান্তরাল ও স্বতন্ত্র সৃষ্টি হিসেবে উপস্থাপন না করে আদমের শরীর থেকে উৎপন্ন এক অনুগামী সত্তা হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ড. মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব তাঁর নবীদের কাহিনী-১ গ্রন্থে সরাসরি লিখেছেন, ফেরেশতাদের সিজদা ছিল কেবল আদমের জন্য, হাওয়ার জন্য নয়; কারণ হাওয়াকে আদমের অবয়বের অংশ থেকে পরে সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই ব্যাখ্যা থেকে তিনি যে সিদ্ধান্ত টেনেছেন সেটিও স্পষ্ট—হাওয়া “পৃথক কোন সৃষ্টি” ছিলেন না এবং এর মাধ্যমে “পুরুষের প্রতি নারীর অনুগামী হওয়া প্রমাণিত হয়।” এরপর তিনি এই ধারণার সঙ্গে কোরআনের “পুরুষেরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল” বক্তব্যকেও যুক্ত করেছেন। [70]
নারী জাতি পুরুষেরই অংশ এবং তার অনুগত:
সিজদা অনুষ্ঠানের পর আল্লাহ আদমের জুড়ি হিসাবে তার অবয়ব হ’তে একাংশ নিয়ে অর্থাৎ তার পাঁজর হ’তে তার স্ত্রী হাওয়াকে সৃষ্টি করলেন। […] এতে বুঝা যায় যে, ফেরেশতাগণের সিজদা কেবল আদমের জন্য ছিল, হাওয়ার জন্য নয়। দ্বিতীয়তঃ সিজদা অনুষ্ঠানের পরে আদমের অবয়ব থেকে হাওয়াকে সৃষ্টি করা হয়, পূর্বে নয়। তিনি পৃথক কোন সৃষ্টি ছিলেন না। এতে পুরুষের প্রতি নারীর অনুগামী হওয়া প্রমাণিত হয়। আল্লাহ বলেন, “পুরুষেরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল” (নিসা ৪/৩৪)।

এটি কেবল “পুরুষ ও নারী একে অপরের সঙ্গী”—এমন নিরপেক্ষ ধারণা নয়। এখানে সৃষ্টির ক্রম থেকেই একটি শ্রেণিবিন্যাস নির্মাণ করা হয়েছে: আদম প্রথম ও মূল সৃষ্টি, হাওয়া তার শরীর থেকে উদ্ভূত; আদমের জন্য ফেরেশতাদের সিজদা, হাওয়ার জন্য নয়; এবং সেই উৎপত্তিকেই পরে নারীর পুরুষের “অনুগামী” হওয়ার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ জৈবিক বা পৌরাণিক উৎপত্তির একটি কাহিনী থেকে সামাজিক কর্তৃত্বের নীতি তৈরি করা হয়েছে—পুরুষ মূল, নারী তার অংশ; পুরুষ কর্তৃত্বশীল, নারী অনুগামী।
তাফসীরে ইবনে কাসীরের একটি বর্ণনায় এই পুরুষকেন্দ্রিক সৃষ্টির ধারণা আরও স্পষ্ট যৌন অর্থ ধারণ করে। সেখানে আদমকে জান্নাতে নিঃসঙ্গভাবে চলাফেরা করতে দেখা যায়; তাঁর “সাহচর্য ও তৃপ্তি দানের জন্য” কোনো স্ত্রী ছিল না। এরপর আল্লাহ তাঁর পাঁজর থেকে হাওয়াকে সৃষ্টি করেন। আদম যখন হাওয়াকে জিজ্ঞেস করেন, “তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হলো?”, তখন হাওয়ার মুখে উত্তর বর্ণিত হয়েছে—“আমার দ্বারা তৃপ্তি লাভের জন্য।” [71]
আদমকে জান্নাতে রাখা হইল। তিনি সেখানে নিঃসঙ্গ চলাফেরা করিতেন, সাহচর্য ও তৃপ্তি দানের জন্য কোন স্ত্রী ছিল না। একবার গভীর নিদ্রামগ্ন হইলেন এবং জাগিয়া তাঁহার মাথার পাশেই এক নারীকে বসা দেখিতে পাইলেন। তাহাকে আদমেরই পাঁজরের হাড় হইতে আল্লাহ্ তা’আলা সৃষ্টি করিয়াছেন। আদম (আ) তাহাকে প্রশ্ন করিলেন, তুমি কে? হাওয়া (আ) বলিলেন—নারী। আদম (আ) প্রশ্ন করিলেন—কেন তোমাকে সৃষ্টি করা হইল? হাওয়া (আ) বলিলেন—আমার দ্বারা তৃপ্তি লাভের জন্য।

এই বর্ণনায় নারী নিজস্ব কোনো স্বাধীন উদ্দেশ্য নিয়ে সৃষ্ট সত্তা হিসেবে আবির্ভূত হয় না; তার সৃষ্টির কারণ ব্যাখ্যা করা হয় পুরুষের প্রয়োজন দিয়ে। আদম নিঃসঙ্গ, তাই নারী; আদমের সাহচর্যের প্রয়োজন, তাই নারী; আদমের তৃপ্তির প্রয়োজন, তাই নারী। প্রশ্নটিও নারী কী হতে চায় তা নয়, বরং পুরুষের জন্য তার প্রয়োজন কী। উত্তরও সেই পুরুষকেন্দ্রিক কাঠামোর মধ্যেই—নারীর অস্তিত্বের উদ্দেশ্য পুরুষকে তৃপ্ত করা।
এখানে “তৃপ্তি” শব্দটি শুধু আধুনিক অর্থে যৌন তৃপ্তিতে সীমাবদ্ধ করে পড়ার প্রয়োজন নেই; উদ্ধৃত বর্ণনায় “সাহচর্য ও তৃপ্তি” উভয় ধারণাই রয়েছে। কিন্তু সমস্যাটি তাতেই কমে না। বরং আরও পরিষ্কার হয় যে নারীর অস্তিত্বকে তার নিজস্ব মানবিক লক্ষ্য, ইচ্ছা বা স্বাধীনতার মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি; তাকে পুরুষের নিঃসঙ্গতা দূর করা, সাহচর্য দেওয়া এবং তৃপ্তি প্রদানের প্রয়োজনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এই ধারণাটি সূরা আ‘রাফ ৭:১৮৯-এর পুরুষকেন্দ্রিক ভাষার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে বলা হয়েছে এক ব্যক্তি থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করা হয়েছে “যাতে সে তার কাছে শান্তি পায়।” অর্থাৎ নারী সৃষ্টি নিয়ে একই ধারার ব্যাখ্যায় বারবার পুরুষের প্রয়োজনই কেন্দ্রে ফিরে আসে—শান্তি, সাহচর্য, তৃপ্তি এবং আনুগত্য। এর সঙ্গে যখন “পুরুষেরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল” বিধান যুক্ত হয়, তখন নারীকে সমমর্যাদার স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং পুরুষকে কেন্দ্র করে সংজ্ঞায়িত অধীন ও কার্যকরী সত্তা হিসেবে নির্মাণের একটি ধারাবাহিক কাঠামো তৈরি হয়।
কুমারী স্ত্রীকে অগ্রাধিকার
নারীর যৌন ও প্রজননমূল্য নির্ধারণের আরেকটি দিক হলো কুমারী স্ত্রীকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া। সহিহ বুখারিতে জাবির ইবন আবদুল্লাহ পূর্ববিবাহিতা নারীকে বিয়ে করলে মুহাম্মদ তাকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কেন এমন কুমারী নারীকে বিয়ে করলেন না যার সঙ্গে তিনি খেলতে পারতেন এবং যে তার সঙ্গে খেলত। অন্য বর্ণনায় কুমারীদের প্রতি আকর্ষণের কথা সরাসরি এসেছে। [72]
সুনান ইবনে মাজাহর আরেক বর্ণনায় কুমারী নারীকে বিয়ে করার পরামর্শের কারণ হিসেবে তাদের মুখ অধিক মধুর, জরায়ু অধিক সন্তানধারী এবং অল্পে অধিক সন্তুষ্ট হওয়ার কথা বলা হয়েছে। [73]। এখানে স্ত্রী নির্বাচনের মূল্যায়নে নারীর পূর্ব যৌন-অভিজ্ঞতা, যৌন আকর্ষণ, প্রজননক্ষমতা এবং স্বল্প প্রত্যাশাকে একই সঙ্গে সুবিধাজনক বৈশিষ্ট্য হিসেবে হাজির করা হয়েছে। নারী কেমন মানুষ, তার স্বাধীন জীবনদর্শন কী—তার পাশাপাশি সে কতটা কুমারী, সন্তান উৎপাদনে কতটা কার্যকর এবং স্বল্পে কতটা সন্তুষ্ট থাকবে, সেগুলোও আদর্শ স্ত্রী নির্বাচনের ধর্মীয় মানদণ্ডে ঢুকে পড়েছে।
সহিহ বুখারির আরেক বিধানে নতুন কুমারী স্ত্রীকে সাত দিন এবং নতুন পূর্ববিবাহিতা স্ত্রীকে তিন দিন দেওয়ার নিয়ম এসেছে। [74]। এই হাদিস মুহাম্মদের ব্যক্তিগত মানসিক আসক্তির প্রমাণ নয়; এটি কুমারী ও পূর্ববিবাহিতা স্ত্রীকে বৈবাহিক ব্যবস্থায় পৃথক শ্রেণিতে রাখার সরাসরি দলিল।
নারীর কুমারীত্ব: ‘খাওয়া’ ও ‘না-খাওয়া’ গাছের উপমা
নারীর কুমারীত্বকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হতো, তার একটি অস্বস্তিকর উদাহরণ সহিহ বুখারির একটি হাদিসে পাওয়া যায়। আয়িশা নিজেই নিজের কুমারীত্ব বোঝাতে “খাওয়া” এবং “না-খাওয়া” গাছের উপমা ব্যবহার করেন। তিনি মুহাম্মদকে জিজ্ঞেস করেন, কোনো ময়দানে একটি গাছের কিছু অংশ ইতিমধ্যে খাওয়া হয়ে গেছে এবং আরেকটি গাছ একেবারেই অক্ষত—এই দুটির মধ্যে কোন গাছের পাতা তিনি নিজের উটকে খাওয়াবেন? মুহাম্মদ উত্তর দেন, যে গাছ থেকে এখনো কিছুই খাওয়া হয়নি। হাদিসের ব্যাখ্যাতেই স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে আয়িশা বোঝাতে চেয়েছিলেন যে মুহাম্মদ তাঁকে ছাড়া আর কোনো কুমারী নারীকে বিয়ে করেননি। [75]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৪/ বিয়ে-শাদী
পরিচ্ছেদঃ ২৪৩৪. কুমারী মেয়ের শাদী সম্পর্কে।
ইবন আবী মুলায়কা (রহ.) বলেন, ইবন আব্বাস (রা.) আয়িশা (রা.)-কে বললেন, আপনাকে ছাড়া নবী (সা.) আর কোনো কুমারী মেয়ে শাদী করেননি।
৪৭০৬। ইসমাঈল ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মনে করুন আপনি এমন একটি ময়দানে গিয়ে পৌঁছলেন, যেখানে একটি গাছের কিছু অংশ খাওয়া হয়ে গেছে। আর এমন একটি গাছ পেলেন, যার কিছুই খাওয়া হয়নি। এর মধ্যে কোন গাছের পাতা আপনার উটকে খাওয়াবেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন, যে গাছ থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি। এ কথার দ্বারা আয়িশা (রাঃ)-এর উদ্দেশ্য ছিল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ছাড়া অন্য কোনো কুমারীকে শাদী করেননি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
এখানে “খাওয়া নারী” ইসলামি শরিয়তের কোনো আনুষ্ঠানিক পরিভাষা নয়; উপমাটি আয়িশার নিজের। কিন্তু উপমাটির প্রকৃতি তাৎপর্যপূর্ণ। যৌনসম্পর্কের অভিজ্ঞতা থাকা নারীকে এমন একটি গাছের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যার কিছু অংশ ইতিমধ্যে অন্য কেউ ভোগ করেছে; আর কুমারী নারীকে এমন অক্ষত গাছের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যেখান থেকে আগে কেউ কিছু গ্রহণ করেনি। মুহাম্মদের উত্তরে পছন্দের বস্তু হিসেবেও সেই “না-খাওয়া” গাছটিই নির্বাচিত হয়।
এই উপমায় নারীর পূর্ব যৌন-অভিজ্ঞতা তার ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিমত্তা, চরিত্র বা মানবিক গুণের প্রশ্ন হিসেবে আসে না; তাকে মূল্যায়ন করা হয় অন্য কোনো পুরুষ আগে তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করেছে কি না—এই মানদণ্ডে। নারীকে একটি গাছ এবং তার যৌন-অভিজ্ঞতাকে সেই গাছের পাতা অন্যের দ্বারা আগে “খেয়ে নেওয়া”র সঙ্গে তুলনা করার মধ্যেই যৌন অবজেক্টিফিকেশনের একটি স্পষ্ট ভাষা দেখা যায়। কুমারীত্ব এখানে শুধু একটি শারীরিক অবস্থা নয়; “অব্যবহৃত” থাকার কারণে অধিক পছন্দনীয় হওয়ার ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
আনুগত্যের ধর্মীয় কাঠামো
এই পরিচ্ছেদের দলিলগুলো একত্রে রাখলে ইসলামী দাম্পত্যের ক্ষমতার বিন্যাস অস্পষ্ট থাকে না। কোরআনে পুরুষ কাওয়াম, তার নারীর ওপর অতিরিক্ত দারাজাহ আছে; সৎ নারী অনুগত; অবাধ্যতার বিচারে সংশোধন ও শাস্তির ক্ষমতা স্বামীর হাতে; হাদিসে তার অধিকারকে প্রায় সিজদার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে; স্ত্রীকে পুরুষের কাছে বন্দী বলা হয়েছে; তার নফল রোজা, গৃহে প্রবেশাধিকার এবং যৌনপ্রাপ্যতার ওপর স্বামীর দাবি আছে; সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি ফিকহে বিবাহেও পুরুষ ওয়ালীর অনুমোদন প্রয়োজন; আর স্বামীর আনুগত্য নারীর জান্নাতপ্রাপ্তির গুণের তালিকায় স্থান পেয়েছে। এগুলো আটটি বিচ্ছিন্ন নিয়ম নয়—একই সম্পর্কের আটটি দিক।
এই কাঠামোকে “দুই পক্ষের দায়িত্ব আলাদা” বলে শেষ করা যায় না, কারণ দায়িত্বের পার্থক্য আর কর্তৃত্বের পার্থক্য এক বিষয় নয়। একজন সংসারের অর্থ বহন করতে পারেন, আরেকজন সন্তান পালন করতে পারেন—এটি দায়িত্ববণ্টন। কিন্তু একজন অন্যজনের আনুগত্য দাবি করবে, তার অবাধ্যতা বিচার করবে, তার ধর্মীয় ইবাদত সীমিত করতে পারবে, তার যৌনপ্রাপ্যতার ওপর দাবি রাখবে এবং তার প্রতি আনুগত্যকে পরকালীন পুরস্কারের সঙ্গে যুক্ত করা হবে—এটি ক্ষমতার শ্রেণিবিন্যাস।
ইসলামী দাম্পত্যের কেন্দ্রীয় অসমতা তাই শুধু পুরুষ সংসারের “প্রধান” কি না, সেই নামের প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো কে নির্দেশ দেয় এবং কে মানে; কে অবাধ্যতা বিচার করে এবং কে বিচারের অধীন হয়; কার অনুমতি অন্যের শরীর, সময় ও ইবাদতে প্রবেশ করে; কার সন্তুষ্টিকে পরকালের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একই দিকে গেলে সম্পর্কটি সমান অংশীদারিত্ব নয়—এটি ধর্মীয়ভাবে বৈধ করা পুরুষ কর্তৃত্ব।
এই কর্তৃত্বের সবচেয়ে কঠোর বাস্তব রূপ—স্ত্রীর ওপর শারীরিক শাস্তির অধিকার—পরবর্তী পরিচ্ছেদে কোরআন, সহিহ হাদিস এবং সাহাবিদের পারিবারিক ঘটনার আলোকে বিস্তারিতভাবে দেখা হবে।
স্ত্রী প্রহার: দাম্পত্য কর্তৃত্বের শারীরিক রূপ
পুরুষের কাওয়ামাহ, স্ত্রীর আনুগত্য এবং নুশূযের ধারণা কেবল বিমূর্ত পারিবারিক কর্তৃত্বে থেমে থাকেনি; কোরআন সেই কর্তৃত্বের সঙ্গে শারীরিক বলপ্রয়োগের ক্ষমতাও যুক্ত করেছে। সূরা আন-নিসা ৪:৩৪-এ স্ত্রীদের মধ্যে যাদের নুশূয বা দাম্পত্য অবাধ্যতার আশঙ্কা করা হয়, তাদের বিরুদ্ধে স্বামীকে পর্যায়ক্রমে উপদেশ দেওয়া, শয্যা বর্জন এবং শেষে ওয়াদরিবূহুন্না—প্রহার করার—নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ধ্রুপদী তাফসীর ও ফিকহ এই শব্দকে স্ত্রীকে শারীরিকভাবে আঘাত করার অনুমতি হিসেবেই বুঝেছে; পরে এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে “অগুরুতর”, “চিহ্ন না ফেলা”, “মুখে নয়” ইত্যাদি সীমা আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু সীমাবদ্ধ প্রহারও প্রহার। আইনের নৈতিক কেন্দ্রটি হলো—একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ তার প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রীকে নিজের বিচার অনুযায়ী শারীরিকভাবে শাস্তি দেওয়ার অধিকারী।
এর সঙ্গে ইসলামের প্রথম প্রজন্মের বাস্তব বর্ণনাগুলো রাখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। আয়িশার নিজের বর্ণনায় মুহাম্মদের আঘাত, উমরের অভিযোগের পর স্ত্রী প্রহারের অনুমতি, মুহাম্মদের পরিবারের কাছে বিপুলসংখ্যক নারীর স্বামীদের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ, শরীর সবুজ হয়ে যাওয়া স্ত্রীর ঘটনা, প্রহারে হাড় ভাঙা হাবীবার কাহিনি এবং যুবায়েরের হাতে স্ত্রী নির্যাতন—এসব ঘটনা দেখায় স্ত্রী প্রহার কোনো পরবর্তী মুসলিম সমাজের আকস্মিক বিচ্যুতি নয়। ধর্মীয় বিধানটি ছিল, তার সীমা নিয়ে আলোচনা ছিল, এবং তার বাস্তব প্রয়োগের অভিযোগও ইসলামের প্রাথমিক উৎসেই ছিল।
গার্হস্থ্য সহিংসতার বিরুদ্ধে নৈতিক বিধান হওয়া উচিত—স্বামীর স্ত্রীকে মারার কোনো অধিকার নেই। ইসলামী বিধান সেই সীমা টানেনি; বরং প্রশ্ন করেছে কখন মারবে, কতটা মারবে, কোথায় মারবে এবং কতটা মারলে তাকে “উত্তম” বলা যাবে না। নিষেধের বদলে সহিংসতাকে নিয়ন্ত্রণের নিয়ম তৈরি করা হয়েছে।
নুশূযের জন্য স্ত্রীর ওপর শারীরিক শাস্তির অধিকার
সূরা আন-নিসা ৪:৩৪-এর গঠনই ইসলামী দাম্পত্যে শাস্তিমূলক ক্ষমতার দিকটি পরিষ্কার করে। প্রথমে ঘোষণা করা হয়েছে পুরুষ নারীর কাওয়াম; এরপর সৎ নারীকে কানিতাত বা অনুগত বলা হয়েছে; তারপর যেসব নারীর নুশূয-এর আশঙ্কা হয়, তাদের বিরুদ্ধে স্বামীকে তিন ধাপের ব্যবস্থা দেওয়া হয়েছে। প্রথমে উপদেশ, তারপর বিছানায় বিচ্ছিন্নতা, এরপর ওয়াদরিবূহুন্না। স্ত্রী পুনরায় “আনুগত্য” করলে স্বামীকে তার বিরুদ্ধে আর পথ খুঁজতে নিষেধ করা হয়েছে। [59]।
কোরআন, সূরা আন-নিসা ৪:৩৪
যেসব স্ত্রীর নুশূযের আশঙ্কা কর, “তাদের উপদেশ দাও, শয্যায় তাদের থেকে পৃথক থাক এবং তাদের প্রহার কর; অতঃপর তারা তোমাদের আনুগত্য করলে তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো পথ খুঁজো না।”
দারাবা শব্দের আরবিতে একাধিক অর্থ থাকলেও সূরা ৪:৩৪-এর ওয়াদরিবূহুন্না-কে ধ্রুপদী তাফসীরকার ও ফকিহরা শতাব্দীর পর শতাব্দী স্ত্রীকে শারীরিকভাবে আঘাত করার বিধান হিসেবেই ব্যাখ্যা করেছেন। ইবনে কাসীর নুশূযকারী স্ত্রীকে প্রথমে উপদেশ, পরে শয্যা বর্জন এবং তাতেও কাজ না হলে এমনভাবে প্রহার করার কথা বলেন যা গুরুতর ক্ষতিকর নয়। ফকিহরাও প্রহারের অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি; তারা বৈধ প্রহারের সীমা নির্ধারণ করেছেন। আধুনিক অনুবাদে শব্দটিকে “separate”, “discipline” বা অন্য কোমল অর্থে বদলানো ধ্রুপদী তাফসীর ও ফিকহের এই সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাকে বদলায় না।
আর “মৃদু” শব্দটি নৈতিক সমস্যার সমাধান করে না। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী তার স্বামীর অধীনস্থ শিশু নয় যে স্বামী তাকে শৃঙ্খলা শেখানোর জন্য অনুমোদিত মাত্রায় আঘাত করবে। কোনো অফিসে বস কর্মীকে “মৃদু” মারতে পারে না; শিক্ষক প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীকে “চিহ্ন না রেখে” পেটাতে পারে না; স্ত্রীও অবাধ্য স্বামীকে একইভাবে শারীরিকভাবে সংশোধনের কোরআনিক ক্ষমতা পায় না। প্রহার কতটা জোরে হবে, তার আগের প্রশ্ন হলো—একজন স্বামী কেন নিজের স্ত্রীকে শারীরিকভাবে শাস্তি দেওয়ার অধিকারই পাবে?
স্ত্রীর নুশূযে প্রহার, স্বামীর নুশূযে সমঝোতা
৪:৩৪-এর লিঙ্গবৈষম্য আরও স্পষ্ট হয় একই সূরার ৪:১২৮ আয়াতের সঙ্গে তুলনা করলে। ৪:৩৪-এ স্বামী স্ত্রীর নুশূযের আশঙ্কা করলে শেষ ধাপে শারীরিক প্রহারের ক্ষমতা পায়। কিন্তু ৪:১২৮-এ কোনো নারী তার স্বামীর নুশূয বা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা করলে তাকে স্বামীকে উপদেশ → শয্যা বর্জন → প্রহার করার সমান্তরাল ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। বরং বলা হয়েছে, উভয়ে নিজেদের মধ্যে কোনো সমঝোতায় পৌঁছালে তাতে দোষ নেই এবং সমঝোতাই উত্তম। [76]।
কোরআন, সূরা আন-নিসা ৪:১২৮
“কোনো নারী যদি তার স্বামীর নুশূয অথবা বিমুখতার আশঙ্কা করে, তবে তারা নিজেদের মধ্যে কোনো সমঝোতা করে নিলে তাদের কোনো দোষ নেই; আর সমঝোতাই উত্তম।”
একই শব্দ নুশূয স্ত্রী ও স্বামী—উভয়ের ক্ষেত্রেই কোরআনে এসেছে, কিন্তু সমাধান এক নয়। স্ত্রীর ক্ষেত্রে স্বামী বিচারক ও শাস্তিদাতা; স্বামীর ক্ষেত্রে স্ত্রী আলোচনাকারী পক্ষ। স্ত্রী স্বামীর আচরণে সমস্যায় পড়লে তাকে সম্পর্ক বাঁচাতে কিছু অধিকার ছাড় দিয়ে সমঝোতায় যেতে হতে পারে; কিন্তু স্বামী স্ত্রীর ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রয়োগে শারীরিক শাস্তির ধাপ পায়।
যদি স্ত্রীকে মারার বিধানটি সত্যিই শুধু “পারিবারিক সমস্যা সমাধানের একটি শেষ উপায়” হতো, তাহলে একই সমস্যার ক্ষেত্রে স্ত্রীও কেন স্বামীকে মারার সমান অধিকার পেল না? একই অপরাধে এক পক্ষ শাস্তি দেয় আর অন্য পক্ষ সমঝোতা করে—এটি দায়িত্বের পার্থক্য নয়, ক্ষমতার পার্থক্য।
আয়িশার বুকে মুহাম্মদের আঘাত
স্ত্রীর ওপর মুহাম্মদের নিজের শারীরিক বলপ্রয়োগের একটি সরাসরি বর্ণনা আয়িশার মুখ থেকেই পাওয়া যায়। এক রাতে মুহাম্মদ ঘর থেকে বের হলে আয়িশা তাকে অনুসরণ করেন। পরে মুহাম্মদ বুঝতে পারেন তিনি তাকে অনুসরণ করেছিলেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে আয়িশা বলেন, মুহাম্মদ তার বুকে এমনভাবে আঘাত করেন যে তিনি ব্যথা পান। সুনান আন-নাসাঈর বাংলা সংস্করণে বর্ণনাটি সহিহ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। [77] [78]
সুনান আন-নাসাঈ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৯৬৫। আয়িশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম “আমার বক্ষে এমন একটি আঘাত করলেন যা আমাকে ব্যথা দিল।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

হাদিসটি ঘটনাটিকে সূরা ৪:৩৪-এর নুশূয-প্রহারের প্রয়োগ হিসেবে চিহ্নিত করে না। এই বর্ণনা থেকে যে তথ্য সরাসরি পাওয়া যায় তা হলো—মুহাম্মদ নিজের স্ত্রী আয়িশার বুকে আঘাত করেছিলেন এবং আয়িশা স্পষ্টভাবে বলেছেন, সেই আঘাতে তিনি ব্যথা পেয়েছিলেন। কাজেই এই হাদিস ৪:৩৪-এর প্রয়োগ প্রমাণ না করলেও মুহাম্মদের স্ত্রীর ওপর শারীরিক বলপ্রয়োগের একটি প্রত্যক্ষ বর্ণনা।
এই বর্ণনাটি “মুহাম্মদ জীবনে কোনো স্ত্রীকে আঘাত করেননি” ধরনের প্রচারণার সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ তৈরি করে। আয়িশা নিজেই বলেছেন, মুহাম্মদের আঘাতে তিনি ব্যথা পেয়েছিলেন। একজন নারী নিজে যখন বলেন তার স্বামী তাকে আঘাত করেছেন এবং তিনি ব্যথা পেয়েছেন, তখন সেই ঘটনাকে “আদরের স্পর্শ” বানিয়ে দেওয়া তার নিজের সাক্ষ্যকেই অস্বীকার করা।
উমরের অভিযোগের পর স্ত্রী প্রহারের অনুমতি
স্ত্রী প্রহারের প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাদিসগুলোর একটি আবু দাউদে এসেছে। সেখানে প্রথমে মুহাম্মদ বলেন—আল্লাহর বান্দীদের, অর্থাৎ স্ত্রীদের, মারবে না। এরপর উমর এসে অভিযোগ করেন যে নারীরা স্বামীদের বিরুদ্ধে সাহসী বা অবাধ্য হয়ে উঠেছে। এই অভিযোগের পর মুহাম্মদ স্ত্রীদের প্রহার করার অনুমতি দেন। তারপর বহু নারী মুহাম্মদের স্ত্রীদের বাড়িতে এসে স্বামীদের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ জানায়। মুহাম্মদ তখন বলেন, যারা এমন করছে তারা “তোমাদের মধ্যে উত্তম নয়।” [79]।
সুনান আবূ দাউদ
৬/ বিবাহ
২১৪৬। প্রথমে নবী বলেনঃ “আল্লাহর বান্দীদের প্রহার করো না।” পরে উমর এসে বলেন, নারীরা স্বামীদের বিরুদ্ধে সাহসী হয়ে গেছে; তখন স্ত্রীদের প্রহারের অনুমতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বহু নারী নবীর পরিবারে এসে স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তিনি বলেনঃ “তারা তোমাদের মধ্যে উত্তম নয়।”
ঘটনাটির ক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম অবস্থা: স্ত্রী মারবে না। দ্বিতীয় অবস্থা: উমরের অভিযোগ—নারীরা স্বামীদের বিরুদ্ধে সাহসী হয়েছে। তৃতীয় অবস্থা: স্ত্রী প্রহারের অনুমতি। চতুর্থ অবস্থা: নারীরা ব্যাপকভাবে অভিযোগ করছে। পঞ্চম অবস্থা: প্রহারকারীদের নৈতিকভাবে “উত্তম নয়” বলা হচ্ছে। কিন্তু শেষ ধাপে “এখন থেকে স্ত্রী প্রহার আবার সম্পূর্ণ হারাম”—এমন কোনো নতুন সার্বজনীন নিষেধ এই বর্ণনায় নেই। কোরআন ৪:৩৪-এর প্রহারের বিধানও বহাল থাকে।
হাদিসের ঘটনাক্রমে প্রথমে স্ত্রী প্রহার নিষেধ করা হয়; উমর নারীদের স্বামীদের বিরুদ্ধে “সাহসী” হয়ে ওঠার অভিযোগ করার পর সেই নিষেধ প্রত্যাহার করে প্রহারের অনুমতি দেওয়া হয়। পরে অসংখ্য নারী মারধরের অভিযোগ করলে প্রহারকারী পুরুষদের “উত্তম নয়” বলা হয়, কিন্তু প্রহারের অনুমতি বাতিল করে নতুন কোনো সার্বজনীন নিষেধ দেওয়া হয়নি। “মারবে না” থেকে নারীর অবাধ্যতার অভিযোগের পর “মারতে পারো”—এই পরিবর্তন প্রহারকে স্ত্রীর আনুগত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার বৈধ উপায় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার স্পষ্ট দলিল।
সত্তর নারীর স্বামী-প্রহারের অভিযোগ
ইবনে মাজাহর একটি বর্ণনায় অভিযোগের সংখ্যাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মুহাম্মদের পরিবারের কাছে সত্তরজন নারী এসে নিজেদের স্বামীদের বিরুদ্ধে প্রহারের অভিযোগ করেন। এরপর মুহাম্মদ বলেন—এসব পুরুষকে উত্তমদের মধ্যে পাওয়া যাবে না। [80]।
সুনান ইবনে মাজাহ
বিবাহ
১৯৮৫। মুহাম্মদের পরিবারের কাছে সত্তরজন নারী তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে প্রহারের অভিযোগ নিয়ে আসে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এমন লোকদের তোমরা উত্তমদের মধ্যে পাবে না।
হাদিসের মানঃ হাসান সহিহ হিসেবে চিহ্নিত
সত্তর সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ শুধু পরিমাণের জন্য নয়; এটি দেখায় প্রহারের অনুমতি কীভাবে বাস্তবে নারীদের জন্য ব্যাপক সমস্যায় পরিণত হতে পারে। যখন ক্ষমতার সম্পর্ক আগে থেকেই অসম, তখন “প্রয়োজনে”, “শেষ উপায় হিসেবে” বা “মৃদুভাবে” মারার অনুমতি বাস্তবে কোথায় থামবে, সেটি স্বামীর বিবেচনার ওপর নির্ভর করে। যে মানুষ নিজেই অভিযোগের বিচারক, শাস্তির প্রয়োজন নির্ধারণকারী এবং শাস্তিদাতা, তার ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে স্ত্রীর অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল।
মুহাম্মদ প্রহারকারী পুরুষদের “উত্তম” বলেননি—এটি তাদের নৈতিক নিন্দা। কিন্তু নৈতিকভাবে “উত্তম নয়” বলা এবং কাজটিকে নিষিদ্ধ অপরাধ ঘোষণা করা একই জিনিস নয়। কোনো কাজ যদি একজন মানুষের মৌলিক শারীরিক নিরাপত্তা লঙ্ঘন করে, তাহলে ন্যায়সঙ্গত আইন শুধু বলবে না “যারা এটি করে তারা ভালো মানুষ নয়”; আইন বলবে কাজটি করার অধিকারই তোমার নেই।
একটি বিধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা তার আদর্শ ভাষা নয়, তার হাতে ক্ষমতা পাওয়া মানুষের আচরণ। স্ত্রী প্রহারের অনুমতির পর যদি সত্তর নারী অভিযোগ নিয়ে নবীর পরিবারে এসে দাঁড়ায়, তাহলে “নিয়ন্ত্রিত প্রহার” বাস্তব জীবনে কত সহজে নির্যাতনে পরিণত হয়, ইসলামের প্রথম যুগের এই বর্ণনাই তার সাক্ষ্য।
মারধরে স্ত্রীর শরীর কাপড়ের চেয়েও সবুজ
সহিহ বুখারি ৫৮২৫-এ স্ত্রী প্রহারের ফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ আছে। রিফা‘আর তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী পরে আবদুর রহমান আল-কুরাযীকে বিয়ে করেছিলেন। তিনি আয়িশার কাছে এসে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। আয়িশা তার শরীরের আঘাতের চিহ্ন দেখে বলেন, তিনি কোনো মুমিন নারীকে এমন দুর্দশায় দেখেননি; তার চামড়া তার সবুজ পোশাকের চেয়েও সবুজ হয়ে গেছে। [81]।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭৭/ পোশাক
৫৮২৫। আয়িশা (রাঃ) আহত নারীর শরীর দেখে বলেনঃ “আমি মুমিন নারীদের মতো এত কষ্টভোগী নারী দেখিনি; তার চামড়া তার কাপড়ের চেয়েও সবুজ।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
চামড়া সবুজ হয়ে যাওয়া কোনো “প্রতীকী প্রহার” নয়; এটি এমন আঘাতের দৃশ্যমান চিহ্ন যা আয়িশাকে বিস্মিত করেছিল। নারীটি স্বামীর কাছে ফিরে থাকতে চাইছিলেন না; স্বামী তাকে “অবাধ্য” বলে অভিযুক্ত করেন। কিন্তু হাদিসের পরবর্তী বিচারিক আলোচনার কেন্দ্র তার মারধরের বিচার নয়। মুহাম্মদের প্রশ্ন ও সিদ্ধান্ত চলে যায় নারীটি তার প্রথম স্বামী রিফা‘আর কাছে ফিরতে পারবেন কি না এবং দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে পূর্ণ যৌনসম্পর্ক সংঘটিত হয়েছে কি না—অর্থাৎ হিল্লা-সংক্রান্ত যৌন শর্তের দিকে।
হাদিসে আবদুর রহমানকে ওই প্রহারের জন্য কোনো নির্দিষ্ট শাস্তি, কিসাস, দিয়াত বা অন্য দণ্ড দেওয়া হয়েছে—এমন উল্লেখ নেই। এই সীমিত বক্তব্যটিই যথেষ্ট; এর বাইরে গিয়ে “ইসলামী আইনে কোনো স্ত্রী প্রহারের কখনোই শাস্তি নেই” বলা প্রয়োজন নেই, কারণ গুরুতর ক্ষতি, সীমালঙ্ঘন বা অপরাধমূলক আঘাত নিয়ে ফিকহে আলাদা আলোচনা রয়েছে।
একজন নারী নিজের শরীরের ক্ষত দেখাচ্ছে, আয়িশা বলছেন তার চামড়া কাপড়ের চেয়েও সবুজ, অথচ ঘটনাটির বিচারিক কেন্দ্র হয়ে যাচ্ছে তার পরবর্তী যৌনসম্পর্ক। এই অগ্রাধিকারের ভেতরেই স্ত্রী-প্রহারের সামাজিক অবস্থানটি নগ্ন হয়ে ওঠে।
প্রহারে হাবীবার শরীরের অঙ্গ ভেঙে দেওয়া
আরেকটি বর্ণনায় প্রহারের ফল আরও গুরুতর। সাবিত ইবন কায়সের স্ত্রী হাবীবা বিনতে সাহল মুহাম্মদের কাছে এসে অভিযোগ করেন যে তার স্বামী তাকে প্রহার করে শরীরের একটি অঙ্গ ভেঙে দিয়েছেন। আবু দাউদের ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংস্করণে এই ঘটনা এসেছে। এরপর মুহাম্মদ সাবিতকে ডেকে তার স্ত্রীকে দেওয়া সম্পদ ফেরত নিয়ে তাকে আলাদা করে দিতে বলেন। [82]।
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
তালাক
২২২২। হাবীবা বিনতে সাহল অভিযোগ করেন যে সাবিত ইবন কায়স তাকে প্রহার করে তার শরীরের একটি অঙ্গ ভেঙে দিয়েছেন। পরে নবী সাবিতকে তার দেওয়া সম্পদ ফেরত নিয়ে স্ত্রীকে পৃথক করে দিতে বলেন।
ঘটনাটির সমাধান বিচ্ছেদ। এটি হাবীবার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুক্তির পথ ছিল; তাকে নির্যাতনকারী স্বামীর সঙ্গে থাকতে বাধ্য করা হয়নি। কিন্তু একই সঙ্গে বর্ণনায় একটি লক্ষণীয় অনুপস্থিতি আছে—হাড় বা অঙ্গ ভেঙে দেওয়ার জন্য সাবিতের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তি, ক্ষতিপূরণ, কিসাস বা দিয়াতের উল্লেখ নেই। ঘটনার আইনি পরিণতি মূলত বিবাহ বিচ্ছেদের দিকে গেছে।
এই বর্ণনা একা থেকে স্ত্রীকে হাড় ভেঙে মারার জন্য ইসলামী ফিকহে সর্বক্ষেত্রে কোনো শাস্তি নেই—এমন সাধারণ বিধান প্রমাণ করে না। বর্ণনাটি যে তথ্য সরাসরি দেয় তা হলো, একজন নারী স্বামীর প্রহারে এমনভাবে আহত হয়েছিলেন যে তার অঙ্গ ভেঙে গিয়েছিল এবং অভিযোগ মুহাম্মদের সামনে পৌঁছেছিল। অথচ এই ঘটনার বর্ণনায় স্বামীর সহিংসতার জন্য কোনো স্বতন্ত্র শাস্তির উল্লেখ নেই; বিবাহ থেকে নারীকে বের করে দেওয়াই দৃশ্যমান সমাধান হিসেবে এসেছে।
“গোলামের মতো প্রহার করো না”—প্রহার নিষিদ্ধ নয়
স্ত্রী প্রহারের বিরুদ্ধে মুহাম্মদের আরেকটি বহুল উদ্ধৃত বক্তব্য হলো—কেউ যেন নিজের স্ত্রীকে গোলামের মতো প্রহার না করে, তারপর দিনের শেষে তার সঙ্গে যৌনসম্পর্কে লিপ্ত হয়। সহিহ বুখারিতে এই বক্তব্য এসেছে। [83]।
সহীহ বুখারী
হাদিস ৪৮২৯ [৫২০৪]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “তোমাদের কেউ যেন তার স্ত্রীকে গোলামকে প্রহার করার মতো প্রহার না করে, তারপর দিনের শেষে তার সঙ্গে সহবাস করে।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই হাদিস স্ত্রীকে কঠোরভাবে মারার সমালোচনা করে এবং একই নারীর ওপর চরম সহিংসতার পর যৌন ঘনিষ্ঠতার ভণ্ডামিকে সামনে আনে। কিন্তু এটি স্ত্রী প্রহারের সর্বজনীন নিষেধ নয়। বাক্যটি “স্ত্রীকে কখনোই মারবে না” বলছে না; বলছে গোলামকে যেভাবে পেটাও, সেভাবে পেটিও না। কোরআন ৪:৩৪-এর সীমিত প্রহারের বিধান এর সঙ্গে বহাল থাকে।
তুলনার ভাষাটিও গুরুত্বপূর্ণ। যে সমাজে গোলামকে মারধর পরিচিত বাস্তবতা, সেখানে স্ত্রীকে মারার সীমা বোঝাতে গোলামের প্রহারের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। স্ত্রীকে বলা হচ্ছে না “সে স্বাধীন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, তাকে আঘাত করার অধিকার তোমার নেই”; বরং মাত্রার পার্থক্য তৈরি করা হচ্ছে—গোলামকে যেভাবে মারো, স্ত্রীকে সেভাবে নয়।
“গোলামের মতো মারবে না” বাক্যটি স্ত্রী প্রহার নিষিদ্ধ করে না; বরং স্ত্রীকে কতটা মারা গ্রহণযোগ্য নয়, তার সীমা তৈরি করে। মানবাধিকারের নীতি প্রহারের মাত্রা নির্ধারণ করে না—প্রহারের অধিকারটাই অস্বীকার করে।
মুখে আঘাত করা যাবে না
স্ত্রীর ওপর স্বামীর কর্তব্য সম্পর্কে আবু দাউদের হাদিসে বলা হয়েছে—নিজে যা খায় স্ত্রীকে তা খাওয়াবে, নিজে যা পরে তাকে তা পরাবে, মুখে আঘাত করবে না, তাকে অপমান করবে না এবং বিচ্ছিন্নতা করলে ঘরের মধ্যেই করবে। [61]। মুখে আঘাত নিষিদ্ধ করা একটি বাস্তব সীমা; মুখ মানুষের সম্মান, সৌন্দর্য এবং গুরুতর আঘাতের ঝুঁকির কেন্দ্র বলে ইসলামী ফিকহে এ নিষেধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২১৩৯। স্ত্রী সম্পর্কে স্বামীর দায়িত্বের মধ্যে বলা হয়েছেঃ “মুখে আঘাত করবে না, গালমন্দ করবে না…”
কিন্তু “মুখে নয়” মানে “শরীরে কোথাও নয়” নয়। বরং এই সীমা তখনই অর্থবহ যখন অন্য স্থানে কোনো মাত্রার আঘাত অনুমোদিত থাকে। একইভাবে “হাড় ভাঙবে না”, “চিহ্ন রাখবে না”, “গুরুতর প্রহার নয়”—এসব সীমা সহিংসতা বাতিল করে না; সহিংসতার অনুমোদিত পরিসর নির্ধারণ করে।
সভ্য নৈতিকতার বিধান হওয়া উচিত—স্ত্রীকে মারবে না। ইসলামী বিধান সেখানে থামেনি; বরং বলেছে—মারার সীমা অতিক্রম করো না, মুখে মারো না। এই দুই অবস্থানের পার্থক্য মৌলিক।
সাহাবীদের সংসারে স্ত্রী নির্যাতন
স্ত্রী প্রহার শুধু আয়াত ও হাদিসের বিধান হিসেবে ছিল না; ইসলামের প্রথম প্রজন্মের গুরুত্বপূর্ণ পুরুষদের পারিবারিক জীবনেও তার বর্ণনা পাওয়া যায়। সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ যুবায়ের ইবনুল আওয়াম। তিনি মুহাম্মদের ঘনিষ্ঠ সাহাবী, ইসলামী ঐতিহ্যে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবীর একজন এবং আবু বকরের কন্যা আসমা বিনতে আবু বকরের স্বামী। প্রাচীন জীবনী ও হাদিসসংক্রান্ত সূত্রে যুবায়েরের স্ত্রীদের মারধরের ঘটনা এসেছে। পুরোনো ড্রাফটে ইবন সা‘দের কিতাবুত তাবাকাত আল-কাবীর-এর ইংরেজি অনুবাদ এবং ইসলামি ফতোয়া-সাইটে আলোচিত আরবি সূত্র দুটোই দেওয়া হয়েছিল। [84] [85]।
আসমার বিষয়ে আত-তাবারানীর আল-মু‘জাম আল-কাবীর-এর একটি বর্ণনায় যুবায়েরের হাতে তার মার খাওয়ার ঘটনা এসেছে। একপর্যায়ে আসমা নিজের ছেলে আবদুল্লাহ ইবন যুবায়েরকে ডাকেন; আবদুল্লাহ এসে মাকে রক্ষা করেন। [86]।
এই দৃশ্য কোনো ফিকহি কল্পনা নয়: একজন স্ত্রী স্বামীর হাতে মার খাচ্ছেন, সন্তানকে সাহায্যের জন্য ডাকছেন এবং সন্তান এসে মাকে রক্ষা করছে। যুবায়েরকে মুসলিম ঐতিহ্যে একজন বিশিষ্ট সাহাবী হিসেবে সম্মান করা হয়; ফলে তার পরিবারে এমন ঘটনা থাকা দেখায় স্ত্রী প্রহারকে প্রথম মুসলিম সমাজে আধুনিক অর্থে অচিন্তনীয় অপরাধ হিসেবে দেখা হতো না।
যুবায়েরের আরেক স্ত্রী উম্মে কুলসুম সম্পর্কেও ইবন সা‘দের জীবনীগ্রন্থে তার কঠোর আচরণের বর্ণনা রয়েছে। এই সব সূত্রের প্রতিটি সনদ ও ঘটনা একই শক্তির নয়; তাই প্রত্যেকটিকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। কিন্তু এগুলোকে আয়িশার সহিহ বর্ণনা, সত্তর নারীর অভিযোগ, সবুজ হয়ে যাওয়া স্ত্রী ও হাবীবার হাড় ভাঙার ঘটনার পাশে রাখলে একটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতা সামনে আসে।
স্ত্রী প্রহার যদি ইসলামের প্রথম প্রজন্মের নৈতিক জগতে একেবারেই নিষিদ্ধ ও অকল্পনীয় সহিংসতা হতো, তাহলে নবীর নিজের স্ত্রী, নবীর পরিবারের কাছে অভিযোগকারী নারীরা এবং বিশিষ্ট সাহাবীদের ঘর—এতগুলো জায়গায় একই আচরণের বর্ণনা বারবার দেখা যেত না।
“মৃদু প্রহার” বাস্তবে কোথায় থামে?
স্ত্রী প্রহারের পক্ষে আধুনিক ব্যাখ্যায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ হলো “মৃদু”। বলা হয়, কোরআন যে প্রহার অনুমোদন করেছে তা ব্যথাদায়ক নয়, দাগ ফেলে না, হাড় ভাঙে না এবং কেবল প্রতীকী শাসন। কিন্তু এই ব্যাখ্যার প্রধান সমস্যা ইসলামী উৎসের ঘটনাগুলো নিজেরাই। কোরআন তাত্ত্বিক সীমা দেয়, কিন্তু আবু দাউদের বর্ণনায় অনুমতির পর নারীরা দলবদ্ধভাবে অভিযোগ করতে আসে; ইবনে মাজাহতে তাদের সংখ্যা সত্তর; বুখারিতে নারীর শরীর সবুজ; আবু দাউদে হাবীবার শরীরের অঙ্গ ভাঙা; আসমার ক্ষেত্রে ছেলে এসে মাকে বাঁচায়।
আইন যখন বলে “প্রয়োজনে মারতে পারো, কিন্তু সীমা ছাড়াবে না”, তখন সীমা নির্ধারণের বাস্তব ক্ষমতা থাকে সেই ব্যক্তির হাতে যে ইতিমধ্যে রাগান্বিত এবং নিজেকেই শাস্তি দেওয়ার অধিকারী মনে করছে। স্ত্রী বলছে স্বামী সীমা ছাড়িয়েছে; স্বামী বলতে পারে সে শুধু “শাসন” করেছে। পরিবার, স্থানীয় ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ বা আদালত যদি প্রথমেই স্বামীর কোনো মাত্রার প্রহারকে বৈধ বলে ধরে নেয়, তাহলে নারীকে প্রথমে প্রমাণ করতে হয় মারধর হয়েছে তা নয়—প্রমাণ করতে হয় বৈধ মারধরের সীমা অতিক্রম হয়েছে।
এটাই “নিয়ন্ত্রিত সহিংসতা”র মূল সমস্যা। শারীরিক শাস্তির বৈধতা দেওয়ার পর সমাজকে বলতে হয় কোন লাঠি, কত আঘাত, শরীরের কোন জায়গা, কত ব্যথা, কত দাগ হলে অপরাধ হবে। আধুনিক গার্হস্থ্য সহিংসতা আইনের নীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন: স্বামী স্ত্রীকে আনুগত্য করানোর জন্য মারতে পারে না—আঘাতের মাত্রা দিয়ে এই অধিকার তৈরি হয় না।
“মৃদু প্রহার” স্ত্রী-প্রহারের সমাধান নয়; এটি স্ত্রী-প্রহারের একটি অনুমোদিত শ্রেণি। সমস্যা শুরু হয় ঠিক সেখানেই—একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে অন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে শাসনের নামে হাত তোলার ধর্মীয় অধিকার দেওয়া হয়েছে।
গার্হস্থ্য সহিংসতার মানবিক মূল্য
স্ত্রী প্রহারকে শুধু ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক হিসেবে দেখলে বাস্তব মানুষ হারিয়ে যায়। গার্হস্থ্য সহিংসতা শরীরের ক্ষত দিয়ে শেষ হয় না; এটি ভয়ের একটি পরিবেশ তৈরি করে। নারী কখন আবার আঘাত আসবে জানেন না, ফলে নিজের আচরণ, কথা, পোশাক, যৌন প্রত্যাখ্যান, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত বা আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ পর্যন্ত পরিবর্তন করতে শুরু করতে পারেন। মারধর তখন শুধু একটি আঘাত নয়; ভবিষ্যৎ আঘাতের ভয় নিজেই নিয়ন্ত্রণের অস্ত্রে পরিণত হয়।
শারীরিক সহিংসতায় কালশিটে, কাটা-ছেঁড়া, হাড় ভাঙা, মাথায় আঘাত, দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে স্থায়ী অক্ষমতা বা মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। মানসিক প্রভাবের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ, হতাশা, আত্মসম্মানের ক্ষতি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা থাকতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতাকে নারীর শারীরিক, মানসিক, যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলা একটি বড় জনস্বাস্থ্য ও মানবাধিকার সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে। [87]।
সহিংস পরিবারে শিশুরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা মাকে মার খেতে দেখে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বড় হতে পারে, আবার পারিবারিক সম্পর্ক সম্পর্কে এমন একটি শিক্ষা পেতে পারে যেখানে অধিক ক্ষমতাশালী ব্যক্তি দুর্বল পক্ষকে “শাসন” করতে হাত তুলতে পারে। ধর্মীয়ভাবে প্রহারকে বৈধ বলা হলে এই শিক্ষা আরও শক্তিশালী হয়—বাবা শুধু রাগে মারছে না, সে মনে করতে পারে ধর্মই তাকে এই কর্তৃত্ব দিয়েছে।
এই কারণেই স্ত্রী প্রহারের প্রশ্নে “কতটা মারা যাবে” মূল নৈতিক প্রশ্ন নয়। একজন স্ত্রী তার স্বামীর অধীনস্থ সম্পত্তি, শিশু বা শাস্তিযোগ্য প্রজা নয়। সে পূর্ণবয়স্ক স্বাধীন মানুষ। দাম্পত্য মতভেদ, অবাধ্যতার অভিযোগ, যৌন প্রত্যাখ্যান বা পারিবারিক বিরোধ—কোনোটিই স্বামীকে স্ত্রীর শরীরে আঘাত করার অধিকার দেয় না।
স্ত্রী প্রহারের বিধানের সামগ্রিক চিত্র
সব দলিল একত্রে রাখলে ছবিটি যথেষ্ট স্পষ্ট। কোরআন পুরুষকে নারীর কাওয়াম ঘোষণা করে; সৎ স্ত্রীকে আনুগত্যশীল বলে; নুশূযের আশঙ্কায় স্বামীকে উপদেশ, শয্যা বর্জন এবং প্রহারের ক্ষমতা দেয়। একই সূরায় স্বামীর নুশূযের ক্ষেত্রে স্ত্রীকে সমান্তরাল প্রহারের অধিকার দেওয়া হয় না। সহিহ হাদিসে আয়িশা নিজের বুকে মুহাম্মদের ব্যথাদায়ক আঘাতের কথা বলেন। উমরের অভিযোগের পর স্ত্রী প্রহারের অনুমতি আসে। এরপর নারীরা দলে দলে অভিযোগ করে; একটি বর্ণনায় তাদের সংখ্যা সত্তর। আরেক নারীর শরীর প্রহারে সবুজ হয়ে যায়। অন্য নারী প্রহারে অঙ্গ ভেঙে মুহাম্মদের কাছে আসে। একই ধর্মীয় সাহিত্যে বলা হয় স্ত্রীকে গোলামের মতো মারবে না এবং মুখে আঘাত করবে না—অর্থাৎ প্রহারের অস্তিত্ব অস্বীকার নয়, তার সীমা নির্ধারণ করা হয়।
সব দলিল একই ক্ষমতার কাঠামো দেখায়। সূরা ৪:৩৪ স্বামীকে নুশূযের ক্ষেত্রে প্রহারের ক্ষমতা দেয়; আয়িশার বর্ণনায় মুহাম্মদের আঘাতে তার ব্যথা পাওয়ার কথা আছে; প্রহারের অনুমতির পর বহু নারী স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে; হাদিসে মুখে আঘাত বা গোলামের মতো মারধর নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু স্ত্রী প্রহারের অধিকার বিলুপ্ত করা হয়নি। ইসলাম স্বামীকে স্ত্রীর ওপর শারীরিক শাস্তির অধিকার অস্বীকার করেনি; সেই অধিকার স্বীকার করে তার মাত্রা ও পদ্ধতির সীমা নির্ধারণ করেছে। সমমর্যাদার সম্পর্কের সঙ্গে সংঘর্ষটি এখানেই।
একটি মানুষের শরীরের নিরাপত্তা তার আনুগত্যের পুরস্কার হতে পারে না। কোরআন ৪:৩৪-এর শেষে বলা হয়েছে স্ত্রী আনুগত্য করলে তার বিরুদ্ধে আর পথ খুঁজবে না—অর্থাৎ শারীরিক শাস্তি বন্ধ হওয়ার শর্তই আনুগত্যে প্রত্যাবর্তন। আধুনিক মানবিক নীতিতে হিসাবটি উল্টো: স্ত্রী অনুগত, অবাধ্য, রাগান্বিত, বিরোধী বা সম্পর্ক ছাড়তে আগ্রহী—যাই হোক, তার শরীরে স্বামীর শাস্তিমূলক অধিকার নেই।
স্বামী যদি স্ত্রীকে মারতে পারে কিন্তু স্ত্রী একই অপরাধে স্বামীকে মারতে না পারে, যদি পুরুষ শাস্তিদাতা আর নারী শাস্তিপ্রাপ্তা হয়, তাহলে সেই দাম্পত্যে ক্ষমতা সমান নয়। কাওয়ামাহর সবচেয়ে নির্মম অর্থ এখানেই প্রকাশিত হয়—পুরুষের কর্তৃত্ব শেষ পর্যন্ত নারীর শরীর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
স্ত্রী প্রহার সম্পর্কিত কোরআন, হাদিস, সাহাবিদের ঘটনা এবং ধ্রুপদী ফিকহের বিস্তারিত দলিল সংশয় জ্ঞানকোষের [88] প্রবন্ধে আরও বিস্তৃতভাবে রয়েছে।
স্ত্রীর যৌনতা, তরবারির হুমকি এবং “ঘায়রাহ”
সহিহ মুসলিমে সা‘দ ইবন উবাদাহ বলেন, তিনি নিজের স্ত্রীর সঙ্গে অন্য কোনো পুরুষকে দেখলে চারজন সাক্ষী সংগ্রহের অপেক্ষা না করে তরবারির ধার দিয়ে আঘাত করবেন। মুহাম্মদের কাছে এই বক্তব্য পৌঁছালে তিনি সা‘দের এই আচরণকে কাপুরুষতা, সহিংসতা বা উন্মত্ততা হিসেবে নিন্দা করেননি; বরং তার প্রবল “ঘায়রাহ” বা আত্মমর্যাদাবোধের কথা উল্লেখ করে বলেন, তার নিজের ঘায়রাহ সা‘দের চেয়েও বেশি এবং আল্লাহর ঘায়রাহ তার চেয়েও বেশি। [89]
এই বর্ণনা বিচারবহির্ভূত হত্যার আইনি অনুমতি দেয় না; বরং একই আলোচনায় চারজন সাক্ষীর বিধান বহাল থাকে। কিন্তু যে বিষয়টি সরাসরি দেখা যায় তা হলো, স্ত্রীর যৌন বিশ্বস্ততা নিয়ে একজন পুরুষের প্রাণঘাতী সহিংসতার ঘোষণাকে নৈতিক নিন্দার বদলে “ঘায়রাহ”র ভাষায় প্রশংসিত করা হয়েছে। নারীর যৌনতা এখানে শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় নয়; পুরুষের সম্মান, অধিকার ও ঈর্ষার সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত যে তরবারির হুমকিও সেই সম্মানবোধের প্রকাশ হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে।
দাম্পত্য যৌনতা: স্বামীর যৌন অধিকার বনাম স্ত্রীর সম্মতি
ইসলামী বিবাহে যৌনসম্পর্ককে শুধু স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আকাঙ্ক্ষা হিসেবে দেখা হয়নি; স্ত্রীকে স্বামীর যৌন অধিকারের আওতায় রাখা হয়েছে। স্বামী যৌনসম্পর্কের জন্য ডাকলে স্ত্রীকে সাড়া দিতে হবে, প্রত্যাখ্যান করলে ফেরেশতারা তাকে অভিশাপ দেবে, রান্নার চুলার পাশে থাকলেও স্বামীর ডাকে যেতে হবে, উটের জিনের ওপর থাকলেও স্বামীকে বাধা দেওয়া যাবে না, স্বামী উপস্থিত থাকলে তার অনুমতি ছাড়া নফল রোজা রাখা যাবে না—কারণ তাতে স্বামীর যৌন অধিকার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ধ্রুপদী ফিকহে স্ত্রীর যৌনপ্রাপ্যতা স্বামীর হক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বিনা বৈধ কারণে তা প্রত্যাখ্যান করলে স্ত্রী নাশিযা বা অবাধ্য বলে গণ্য হতে পারে।
এই ব্যবস্থায় যৌনতার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন “দুইজন মানুষ এখন যৌনসম্পর্ক চাইছে কি না” নয়। বরং প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—স্বামী তার বৈবাহিক যৌন অধিকার দাবি করেছে কি না এবং স্ত্রী সেই দাবিতে সাড়া দিয়েছে কি না। বিবাহের সময় দেওয়া সম্মতিকে পরবর্তী যৌনপ্রাপ্যতার ভিত্তি বানিয়ে স্ত্রীর প্রতিবারের স্বাধীন সিদ্ধান্তকে স্বামীর অধিকারের নিচে বসানো হয়েছে। যে যৌনসম্পর্কে একজনের “চাই” ধর্মীয় অধিকার এবং অন্যজনের “চাই না” ফেরেশতার অভিশাপ, নুশূয, অর্থনৈতিক চাপ ও প্রহারের ঝুঁকি তৈরি করে, সেখানে যৌন ক্ষমতা দুই পক্ষের হাতে সমান নয়।
স্বামী বিছানায় ডাকলে অস্বীকারে ফেরেশতার অভিশাপ
সহিহ বুখারিতে উল্লেখ আছে, মুহাম্মদ বলেছে—স্বামী স্ত্রীকে বিছানায় ডাকলে স্ত্রী যদি অস্বীকার করে এবং স্বামী অসন্তুষ্ট অবস্থায় রাত কাটায়, তাহলে সকাল পর্যন্ত ফেরেশতারা সেই স্ত্রীকে অভিশাপ দিতে থাকে। [62]। পাশের হাদিস ৫১৯৪-তেও একই বক্তব্য এসেছে। [90]। ফিকহে অসুস্থতা, শারীরিক ক্ষতি বা বৈধ অক্ষমতার মতো নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম আলোচনা করা হয়েছে; সাধারণ বিধানে স্বামীর যৌন আহ্বান প্রত্যাখ্যানকে ফেরেশতার অভিশাপের সঙ্গে যুক্ত করে ধর্মীয় অপরাধে পরিণত করা হয়েছে।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৭/ বিয়ে
৫১৯৩। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে তার বিছানায় ডাকলে সে যদি আসতে অস্বীকার করে এবং স্বামী তার ওপর অসন্তুষ্ট অবস্থায় রাত কাটায়, তবে সকাল পর্যন্ত ফেরেশতারা তাকে অভিশাপ দিতে থাকে।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এখানে স্বামীর যৌন আকাঙ্ক্ষা শুধু ব্যক্তিগত অনুরোধ নয়; তার পেছনে সরাসরি ধর্মীয় ভয় দাঁড় করানো হয়েছে। স্ত্রী স্বামীকে “না” বলছে, কিন্তু সেই “না” স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত মতপার্থক্য হিসেবে থাকছে না—ফেরেশতারা তাকে রাতভর অভিশাপ দিচ্ছে। ফলে নারীর যৌন সিদ্ধান্তের ওপর স্বামী ছাড়াও অদৃশ্য ধর্মীয় কর্তৃত্ব বসে যায়। একজন বিশ্বাসী নারীর কাছে ফেরেশতার অভিশাপ কোনো তুচ্ছ সামাজিক চাপ নয়; এটি আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও পরকালীন ভয়ের সঙ্গে যুক্ত।
স্বাধীন যৌনসম্মতি তখনই সম্ভব যখন “না” বলার জন্য মানুষকে পাপী, অভিশপ্ত বা অবাধ্য বানানো হয় না। “তুমি স্বাধীন, কিন্তু না বললে ফেরেশতা তোমাকে অভিশাপ দেবে”—এটি স্বাধীনতা নয়; ধর্মীয় ভয় দেখিয়ে যৌন আনুগত্য আদায় করা।
চুলার পাশে থাকলেও স্বামীর ডাকে যেতে হবে
মিশকাতুল মাসাবীহে উল্লেখ আছে, মুহাম্মদ বলেছে—স্বামী নিজের প্রয়োজনের জন্য স্ত্রীকে ডাকলে স্ত্রী যেন তার কাছে আসে, এমনকি সে চুলার পাশে থাকলেও। [67]। ব্যাখ্যায় স্বামীর “প্রয়োজন”কে যৌন প্রয়োজন হিসেবে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ স্ত্রী রান্না করছে, প্রয়োজনীয় কাজের মধ্যে আছে বা নিজের সময় অন্য কাজে ব্যয় করছে—স্বামী যৌনতার জন্য ডাকলে তার কাজ থামিয়ে স্বামীর কাছে যাওয়াই তার কর্তব্য।
মিশকাতুল মাসাবীহ
পর্বঃ বিবাহ
৩২৫৭। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “স্বামী যখন তার স্ত্রীকে নিজের প্রয়োজনের জন্য ডাকে, তখন সে যেন তার কাছে আসে—যদিও সে চুলার পাশে থাকে।”
এটি শুধু যৌনতার প্রশ্ন নয়; নারীর সময়ের ওপর কার অগ্রাধিকার থাকবে, সেই প্রশ্নও। স্ত্রী যে কাজটি করছে তার প্রয়োজনীয়তা, তার নিজের ইচ্ছা বা মানসিক অবস্থা গৌণ হয়ে যায়। স্বামীর যৌন প্রয়োজনের সামনে তার চলমান কাজ স্থগিতযোগ্য। স্বামীর কামনা জরুরি দাবি; স্ত্রীর সময় অপেক্ষমাণ সম্পদ—এই বর্ণনার ক্ষমতার ভাষা এতটাই সরাসরি।
একটি সমান যৌন সম্পর্কে একজন সঙ্গী অন্যজনকে আহ্বান করতে পারে, আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতে পারে, এমনকি প্রত্যাখ্যাত হয়ে হতাশও হতে পারে। কিন্তু সেই হতাশা অন্য ব্যক্তির শরীরের ওপর অধিকার তৈরি করে না। “আমি এখন চাই” কোনো মানুষের জন্য “তোমাকে এখন আসতেই হবে” হয়ে যেতে পারে না।
উটের জিনের ওপর থাকলেও স্বামীর দাবি
একাধিক হাদিসে একই ধারণা আরও চরম ভাষায় এসেছে। সুনান ইবনে মাজাহর বিবাহ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে—স্ত্রী যেন স্বামীর যৌন অধিকার প্রত্যাখ্যান না করে, এমনকি সে উটের জিনের ওপর থাকলেও। [91]। অনুরূপ বক্তব্য আদাবুল মুফরাদেও পাওয়া যায়। [92]।
“উটের জিনের ওপর” বাক্যটির উদ্দেশ্যই হলো কোনো ব্যস্ততা বা অস্বস্তিকর পরিস্থিতিকেও স্বামীর যৌন দাবির সামনে যথেষ্ট অজুহাত না বানানো। এটিকে আক্ষরিকভাবে রাস্তার মাঝখানে উটের পিঠে যৌনসম্পর্কের নির্দেশ হিসেবে পড়া জরুরি নয়; বাক্যের জোরটি অন্য জায়গায়—স্বামীর আহ্বানে সাড়া দেওয়ার বাধ্যবাধকতা কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত, সেটি বোঝাতে একটি চরম পরিস্থিতির উদাহরণ ব্যবহার করা হয়েছে।
কিন্তু সেই জোরটিই সমস্যার কেন্দ্র। স্ত্রী কোথায় আছে, কী করছে, সে মুহূর্তে তার নিজের শরীর বা মানসিক অবস্থা কী—এসবের তুলনায় স্বামীর দাবি ধর্মীয়ভাবে উচ্চতর স্থানে বসে। নারী উটের পিঠে থাকুক, রান্নাঘরে থাকুক অথবা বিছানায় থাকুক—তার শরীরের শেষ সিদ্ধান্ত যদি স্বামীর “হক”-এর নিচে রাখা হয়, তাহলে তার যৌন স্বাধীনতা কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়।
স্ত্রী স্বামীকে ঘৃণা করলেও বিছানায় আসবে
ধ্রুপদী ফিকহে স্বামীর যৌন অধিকার স্ত্রীর আবেগিক অনিচ্ছাকেও অতিক্রম করতে পারে। সংশয়ের বৈবাহিক ধর্ষণবিষয়ক প্রবন্ধে মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকের একটি প্রাচীন বর্ণনা উদ্ধৃত আছে, যেখানে সুফিয়ান আস-সাওরীর সূত্রে বলা হয়েছে—স্ত্রী স্বামীকে ঘৃণা করলেও তার বিছানায় আসবে। [57]। এখানে স্ত্রীর আবেগিক অনিচ্ছা স্বামীর যৌন অধিকার বাতিল করছে না।
একজন মানুষ কাউকে ঘৃণা করছে—এই তথ্য যৌনসম্মতির প্রশ্নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাউকে ঘৃণা করা অবস্থায় তার সঙ্গে বাধ্যতামূলক যৌনসম্পর্ক শুধু শারীরিক কাজ নয়; তা মানসিকভাবে গভীর অপমান ও আঘাতের কারণ হতে পারে। অথচ অধিকারভিত্তিক বিবাহ-ধারণায় প্রশ্নটি হয়ে যায় স্ত্রী কেন স্বামীর বিছানা প্রত্যাখ্যান করছে এবং সেই প্রত্যাখ্যান তার বৈবাহিক কর্তব্য লঙ্ঘন করছে কি না।
আধুনিক ইসলামি ফতোয়াতেও একই কাঠামো বজায় আছে। IslamQA-র 219686 নম্বর ফতোয়ায় এমন স্ত্রীর প্রশ্ন এসেছে যে স্বামীকে ঘৃণা করে। উত্তরে বলা হয়েছে, বিবাহ বহাল থাকা অবস্থায় বৈধ কারণ ছাড়া স্বামীর বিছানা প্রত্যাখ্যান করা তার জন্য বৈধ নয়; সম্পর্ক অসহনীয় হলে সে খুলা চাইতে পারে। [93]। অর্থাৎ “আমি এই মানুষটির সঙ্গে এখন যৌনসম্পর্ক চাই না” নিজে যথেষ্ট কারণ নয়; তাকে সম্পর্কটিই শেষ করার দিকে যেতে বলা হয়।
একটি যৌনসম্পর্কের জন্য মানুষের পুরো বিবাহ ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি কেন প্রয়োজন হবে? যৌনসম্মতি প্রতিবারের সিদ্ধান্ত। স্ত্রী আজ স্বামীকে ভালোবাসলেও আজ যৌনসম্পর্ক না চাইতে পারে; কাল চাইতে পারে। তার শরীরের ওপর অধিকার রক্ষার জন্য তাকে তালাক বা খুলার দরজায় পাঠানোই প্রমাণ করে বিবাহের ভেতরে তার “না”কে স্বতন্ত্র অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
স্ত্রীর পছন্দের যৌন অবস্থান বনাম স্বামীর দাবি
সূরা আল-বাকারা ২:২২৩ এবং এর নাজিলের প্রেক্ষাপট হিসেবে বর্ণিত একটি হাদিস যৌনতার ভেতরে স্বামী-স্ত্রীর ইচ্ছার ভারসাম্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। আবু দাউদে উল্লেখ আছে, একজন মুহাজির পুরুষ তার আনসারী স্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন যৌন অবস্থানে সহবাস করতে চাইলে স্ত্রী আপত্তি জানায়। সে স্পষ্টভাবে বলে—তাদের এলাকায় একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় সহবাসের রীতি, স্বামীকে সেভাবেই করতে হবে, নইলে তার থেকে দূরে থাকতে হবে। এরপর ২:২২৩ আয়াত নাজিল হওয়ার কথা বলা হয়েছে—“তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র; তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন কর।” [47]।
সুনান আবূ দাউদ
৬/ বিবাহ
২১৬৪। স্ত্রী বলেছিলঃ “আমরা শুধু এক অবস্থাতেই সঙ্গম করি। সুতরাং তোমাকেও সেভাবেই করতে হবে, অন্যথায় আমার থেকে দূরে থাকো।” এরপর “তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র” আয়াত নাজিল হওয়ার বর্ণনা এসেছে।
এই বিধান পায়ুপথে যৌনসম্পর্ক বৈধ করেনি; আলোচনা যোনিপথে বিভিন্ন ভঙ্গির মধ্যে সীমিত। কিন্তু এখানে সেই সীমার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো স্ত্রীর স্পষ্ট আপত্তির পর ধর্মীয় সমাধানের দিক। স্ত্রী বলেছিল কোন অবস্থায় সে যৌনসম্পর্ক চায়; কিন্তু তার সেই পছন্দকে স্বামীর ওপর বাধ্যতামূলক ব্যক্তিগত অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। বরং স্বামীকে বলা হয়েছে বৈধ পথে বিভিন্ন ভঙ্গিতে তার “ক্ষেতে” যেতে পারবে।
যৌনতার প্রশ্ন “কোন ভঙ্গি শরিয়তে বৈধ?” দিয়ে শেষ হয় না। আরও মৌলিক প্রশ্ন হলো—এই নির্দিষ্ট নারী এই নির্দিষ্ট ভঙ্গিটি চাইছে কি না। শরিয়ত স্বামীর জন্য কোন ভঙ্গিগুলো বৈধ তা নির্ধারণ করেছে, কিন্তু স্ত্রীর “আমি এভাবে চাই না” কথাটিকে সমান যৌন অধিকারের চূড়ান্ত সীমারেখা বানায়নি।
স্বামীর যৌন অধিকারের নিচে স্ত্রীর নফল ইবাদত
স্বামীর যৌন অধিকার স্ত্রীর ব্যক্তিগত ধর্মীয় সাধনার ওপরও অগ্রাধিকার পেয়েছে। সহিহ বুখারিতে মুহাম্মদ বলেছে—স্বামী উপস্থিত থাকলে স্ত্রী তার অনুমতি ছাড়া নফল রোজা রাখতে পারবে না। [66]। ফিকহি ব্যাখ্যায় এর কারণ পরিষ্কার: নফল রোজা রাখলে স্ত্রী দিনের বেলায় যৌনসম্পর্কে অংশ নিতে পারবে না, ফলে স্বামীর যৌন অধিকার বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৭/ বিয়ে
৫১৯৫। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “স্বামী উপস্থিত থাকলে তার অনুমতি ছাড়া স্ত্রী নফল সওম পালন করবে না।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
একজন নারী আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি অতিরিক্ত ইবাদত করতে চায়। কাজটি তার নিজের শরীরের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু বিবাহিত অবস্থায় তার এই ব্যক্তিগত ধর্মীয় সিদ্ধান্তেও স্বামীর অনুমতি প্রবেশ করছে, কারণ স্বামী সেই সময় যৌনসম্পর্ক চাইতে পারে। স্ত্রী কখন ক্ষুধার্ত থাকবে, কখন রোজা রাখবে—এই সিদ্ধান্তেও সম্ভাব্য যৌন দাবি অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
স্বামীর নফল রোজার ক্ষেত্রে স্ত্রীর সম্ভাব্য যৌন দাবির কারণে তার অনুমতি নেওয়ার সমান্তরাল বিধান নেই। ফলে এটি “দাম্পত্যে একে অপরের যৌন প্রয়োজন বিবেচনা করা” নামের পারস্পরিক নিয়ম নয়। পুরুষের যৌন অধিকার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নারী আল্লাহর জন্য নিজের শরীর নিয়ে নফল ইবাদত করবে কি না, সেই সিদ্ধান্তও পুরুষের অনুমতির অধীন।
যৌন প্রত্যাখ্যান, নুশূয এবং অর্থনৈতিক শাস্তি
যৌন প্রত্যাখ্যানের পরিণতি শুধু ফেরেশতার অভিশাপে সীমিত নয়। ধ্রুপদী ফিকহে বৈধ কারণ ছাড়া স্বামীর যৌনপ্রাপ্যতা প্রত্যাখ্যান করা স্ত্রীকে নাশিযা বা অবাধ্য স্ত্রীর অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে। নুশূযের ফলে তার ভরণপোষণের অধিকার স্থগিত হতে পারে; আর ৪:৩৪-এর কাঠামো অনুযায়ী নুশূযের বিরুদ্ধে উপদেশ, শয্যা বর্জন এবং শেষ ধাপে প্রহারের ক্ষমতাও স্বামীর হাতে থাকে।
IslamQA-র 33597 নম্বর ফতোয়ায় স্ত্রী কখন স্বামীর যৌন আহ্বান প্রত্যাখ্যান করতে পারে, সেই প্রশ্নে বলা হয়েছে—শরিয়তস্বীকৃত ক্ষতি বা বাধা না থাকলে তাকে সাড়া দিতে হবে। একই আলোচনায় নুশূযের বিধান এবং ভরণপোষণ হারানোর বিষয় এসেছে। [94]। ইবন তাইমিয়ার বক্তব্য উদ্ধৃত করে এ ধরনের ফতোয়ায় বলা হয়েছে, স্ত্রী স্বামীর যৌন দাবি প্রত্যাখ্যান করে নুশূযে অটল থাকলে তার বিরুদ্ধে অগুরুতর প্রহারসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রযোজ্য হতে পারে।
এখন যৌনসম্মতির বাস্তব অবস্থাটি দেখা যাক। একদিকে স্ত্রীকে বলা হচ্ছে স্বামীর বিছানায় না গেলে ফেরেশতার অভিশাপ; অন্যদিকে সে নুশূযকারী হতে পারে; ভরণপোষণের অধিকার হারাতে পারে; শয্যায় বর্জিত হতে পারে; শেষ পর্যন্ত প্রহারের ধর্মীয় বিধানও সামনে আসতে পারে। “হ্যাঁ” বলার পেছনে যদি পাপের ভয়, অর্থ হারানোর ভয় এবং প্রহারের ক্ষমতা দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে সেই “হ্যাঁ”কে স্বাধীন যৌনসম্মতি বলা যায় না। এটি ক্ষমতার চাপের মধ্যে আত্মসমর্পণ।
বৈবাহিক ধর্ষণ: বিবাহ কি স্থায়ী যৌনসম্মতি?
এই সব বিধান শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক প্রশ্নে এসে দাঁড়ায়—বিবাহ কি স্বামীকে স্ত্রীর শরীরের ওপর স্থায়ী যৌন অধিকার দেয়? ধ্রুপদী ইসলামী ফিকহের কাঠামোয় বিবাহের প্রধান আইনি ফলগুলোর একটি হলো স্বামীর জন্য স্ত্রীর যৌন উপভোগ বৈধ হওয়া এবং স্ত্রীকে তামকীন, অর্থাৎ নিজেকে বৈবাহিক যৌনতার জন্য প্রাপ্য করার দায়িত্ব দেওয়া। যৌনপ্রাপ্যতা প্রত্যাখ্যান নুশূযের কারণ হতে পারে। এই কাঠামোয় “স্বামী যৌনসম্পর্ক চাইছে কিন্তু স্ত্রী এখন চাইছে না”—এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সম্মতির প্রশ্ন নয়; স্বামীর প্রতিষ্ঠিত অধিকারের সঙ্গে স্ত্রীর প্রত্যাখ্যানের সংঘর্ষ।
IslamQA-র “স্বামী কি স্ত্রীকে যৌনসম্পর্কে বাধ্য করতে পারে?” প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে, স্ত্রী কোনো শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া নিজেকে স্বামীর কাছ থেকে বিরত রাখতে পারে না। শারীরিক ক্ষতি, মাসিক, বাধ্যতামূলক ইবাদত বা বৈধ প্রতিবন্ধকতার মতো অবস্থায় নিষেধ রয়েছে; কিন্তু স্ত্রীর বর্তমান অনিচ্ছা নিজে স্বামীর যৌন অধিকার বাতিল করে না। [94]।
এই কাঠামোতেই বৈবাহিক ধর্ষণের সমস্যাটি তৈরি হয়। ধর্ষণের কেন্দ্রে শুধু অপরিচিত ব্যক্তি, অস্ত্র বা প্রকাশ্য শারীরিক হামলা নেই; মূল প্রশ্ন হলো একজন মানুষ যৌনসম্পর্কে স্বাধীনভাবে সম্মতি দিয়েছে কি না। স্ত্রী স্বামীকে বিয়ে করেছে—তার অর্থ সে স্বামীর সঙ্গে যৌনসম্পর্কের সম্ভাবনায় সম্মতি দিয়েছে। কিন্তু সে কোনো দিন, কোনো সময়, যেকোনো অবস্থায়, যেকোনো যৌনসম্পর্কে আগাম সম্মতি দিয়ে দেয়নি।
বিয়ের “কবুল” যৌনজীবনের আজীবন খোলা অনুমতিপত্র নয়। একজন নারী স্বামীকে ভালোবাসতে পারে, শতবার স্বেচ্ছায় যৌনসম্পর্ক করতে পারে, এবং একশ এক নম্বর বার “না” বলতে পারে। সেই একটি “না”ও পূর্ণ “না”। আগের শতটি “হ্যাঁ”, দেনমোহর, বিবাহচুক্তি কিংবা স্বামীর ভরণপোষণ তার বর্তমান শরীরের মালিকানা কেড়ে নেয় না।
যে মুহূর্তে বিবাহকে স্থায়ী যৌন অধিকার হিসেবে দেখা হয়, স্ত্রীকে ব্যক্তি থেকে চুক্তিবদ্ধ যৌনপ্রাপ্যতায় নামিয়ে আনা হয়। তখন যৌনতার বৈধতা নির্ধারণ করছে তার বর্তমান ইচ্ছা নয়, তার বৈবাহিক পরিচয়। এই কারণেই বৈবাহিক ধর্ষণকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া আধুনিক যৌনস্বাধীনতার একটি মৌলিক নীতি: স্বামীও অন্য সকল মানুষের মতো স্ত্রীর বর্তমান সম্মতির সীমার বাইরে যেতে পারে না।
একবারের সম্মতি ভবিষ্যতের সম্মতি নয়
যৌনসম্মতির সবচেয়ে মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এটি নির্দিষ্ট, বর্তমান এবং প্রত্যাহারযোগ্য। একজন মানুষ একটি যৌনকাজে সম্মতি দিয়ে অন্যটিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে; শুরুতে সম্মতি দিয়ে মাঝপথে মত বদলাতে পারে; গতকাল সম্মতি দিয়ে আজ না বলতে পারে। সম্পর্ক, বিয়ে, পূর্বের যৌন ইতিহাস, পোশাক, ভালোবাসা কিংবা আর্থিক নির্ভরতা—কোনোটিই বর্তমান সম্মতির বিকল্প নয়।
ইসলামী যৌন-অধিকার কাঠামো ঠিক এই জায়গাতেই সংঘর্ষ তৈরি করে। হাদিসে স্বামী ডাকে, স্ত্রীকে যেতে হয়; না গেলে ফেরেশতার অভিশাপ। চুলার পাশে থেকেও যেতে হয়। উটের পিঠের উদাহরণেও প্রত্যাখ্যান সংকুচিত। নফল রোজার ক্ষেত্রেও স্বামীর সম্ভাব্য যৌন দাবি অগ্রাধিকার পায়। ধ্রুপদী ফিকহে প্রত্যাখ্যান নুশূয তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ স্ত্রীকে প্রতিবার জিজ্ঞেস করা হচ্ছে না “তুমি চাইছ কি?”; বরং পূর্বনির্ধারিত দায়িত্ব হলো স্বামীর দাবি পূরণ করা।
যৌনসম্মতি মানে কাউকে যৌনসম্পর্ক করতে বাধা না দেওয়া নয়; সম্মতি মানে সে নিজে স্বাধীনভাবে সেই যৌনসম্পর্ক চাইছে। ভয়, ধর্মীয় অভিশাপ, আর্থিক নির্ভরতা, প্রহারের ক্ষমতা বা বৈবাহিক কর্তব্যের চাপের নিচে শরীর সমর্পণ আর স্বেচ্ছায় যৌনসম্পর্ক এক বিষয় নয়।
স্বামীর যৌন অধিকারকেন্দ্রিক ব্যবস্থার সামগ্রিক চিত্র
এই পরিচ্ছেদের দলিলগুলো পাশাপাশি রাখলে একই কাঠামো বারবার দেখা যায়। স্বামী বিছানায় ডাকলে স্ত্রী অস্বীকার করলে ফেরেশতারা অভিশাপ দেয়; চলমান কাজ ফেলে চুলার পাশ থেকেও তাকে আসতে বলা হয়; চরম উদাহরণ হিসেবে উটের জিনের ওপর থেকেও স্বামীর দাবি অগ্রাহ্য না করার কথা আসে; স্ত্রী স্বামীকে ঘৃণা করলেও বিবাহ বহাল থাকলে তার যৌনপ্রাপ্যতা ধর্মীয় দায়িত্ব; নিজের শরীর নিয়ে নফল রোজা রাখতেও স্বামীর অনুমতি দরকার; যৌন ভঙ্গি নিয়ে স্ত্রীর স্পষ্ট আপত্তির পরও স্বামীর বৈধ গমনের ক্ষেত্র প্রসারিত করা হয়; আর যৌন প্রত্যাখ্যান নুশূয, ভরণপোষণ হারানো এবং প্রহারের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
এগুলোকে “স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার” বলে এক বাক্যে সমান করা যায় না। যদি সত্যিই নিয়মটি পারস্পরিক হতো, তাহলে স্ত্রীর যৌন আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলে স্বামীর ওপর ফেরেশতার অভিশাপের সমান্তরাল হাদিস থাকত; স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া স্বামী নফল রোজা রাখতে পারত না; স্ত্রী নিজের যৌন অধিকার আদায়ের জন্য স্বামীকে নুশূযকারী ঘোষণা করে ভরণপোষণ বন্ধ বা প্রহারের ক্ষমতা পেত। কিন্তু নিয়মগুলো সেইভাবে নির্মিত হয়নি। কেন্দ্রীয় যৌন অধিকারটি পুরুষের।
আর এখানেই “দাম্পত্য অধিকার” ও “যৌন মালিকানা”র সীমা আলাদা করতে হয়। সঙ্গীর যৌন চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া সম্পর্কের অংশ; কিন্তু গুরুত্ব দেওয়া মানে শরীর পাওয়ার অধিকার নয়। স্বামী স্ত্রীর যৌন চাহিদা উপেক্ষা করলে সে খারাপ সঙ্গী হতে পারে; স্ত্রী স্বামীর আকাঙ্ক্ষা প্রত্যাখ্যান করলেও সম্পর্কের সমস্যা হতে পারে। কিন্তু কোনো পক্ষেরই অন্য পক্ষের শরীর ব্যবহার করার অধিকার তৈরি হয় না। আলোচনা, ভালোবাসা, হতাশা, আপস—সবকিছু হতে পারে; জবরদস্তি হতে পারে না।
ইসলামী দাম্পত্য যৌননীতির কেন্দ্রীয় সমস্যা হলো, স্ত্রীর শরীরকে তার বর্তমান ইচ্ছার ভিত্তিতে নয়, স্বামীর বৈবাহিক অধিকারের ভিত্তিতে প্রাপ্য ধরে নেওয়া হয়েছে। ফেরেশতার অভিশাপ থেকে নুশূয, ভরণপোষণ থেকে প্রহার—পুরো ধর্মীয় চাপের কাঠামোটি একই লক্ষ্য রক্ষা করে: স্বামীর যৌনপ্রাপ্যতা। স্বাধীন যৌনসম্মতির নীতি ঠিক তার বিপরীত—শরীর যার, শেষ সিদ্ধান্ত তার।
এই বিষয়ে হাদিস, ফিকহ, মোহর, তামকীন, নুশূয এবং বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে বিস্তৃত দলিল সংশয় জ্ঞানকোষের [57] প্রবন্ধে রয়েছে।
বহুবিবাহ: পুরুষের একতরফা যৌন ও বৈবাহিক সুবিধা
ইসলামী বহুবিবাহের কাঠামো শুরু থেকেই লিঙ্গভিত্তিক। একজন পুরুষ একই সময়ে চারজন স্ত্রী রাখতে পারে, কিন্তু একজন নারী একই সময়ে একাধিক স্বামী রাখতে পারে না। পুরুষের জন্য নতুন বৈবাহিক ও যৌন সম্পর্কের দরজা খোলা থাকে, স্ত্রীদের প্রত্যেককে আবার সেই পুরুষের প্রতিই একগামী থাকতে হয়। দ্বিতীয় বিবাহের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি প্রয়োজন হয় না, এমনকি তাকে আগে জানানোও শরিয়তের বৈধতার শর্ত নয়। কোরআন স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচারের নির্দেশ দিয়েছে, আবার একই কোরআন বলেছে পূর্ণ সমতা কখনো সম্ভব হবে না। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা মুহাম্মদের নিজের পরিবারেই ঘটেছে। আলী যখন ফাতিমাকে রেখেই আরেকটি বিয়ে করতে চেয়েছিল, মুহাম্মদ নিজের কন্যার কষ্ট মেনে নেয়নি এবং সেই বিয়ে ঠেকিয়ে দিয়েছিল। অথচ সাধারণ মুসলিম নারীর জন্য একই আপত্তি স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে বন্ধ করার অধিকার তৈরি করে না।
বহুবিবাহকে শুধু “একজন পুরুষ চারটি পরিবার চালাচ্ছে” বলে দেখলে এর আসল রাজনৈতিক ও যৌন অর্থ আড়াল হয়ে যায়। এখানে একটি পুরুষকে একই সঙ্গে একাধিক নারীর যৌনতা, প্রজনন, সময়, আবেগ ও পারিবারিক জীবনের কেন্দ্র করা হয়েছে। স্ত্রীদের প্রত্যেকে শুধু একজন স্বামী রাখবে, কিন্তু সেই একজন স্বামীকে অন্য নারীদের সঙ্গে ভাগ করবে। এটি পারস্পরিক বহুগামিতা নয়। এটি পুরুষের বহুবিবাহ এবং নারীর বাধ্যতামূলক একগামিতা। এক পক্ষের যৌন ও বৈবাহিক স্বাধীনতা বিস্তৃত, অন্য পক্ষের স্বাধীনতা সংকুচিত। নিচে দেয়া বাংলাদেশের একজন ইসলামিক আলেমের এই বক্তব্যটি বিষয়টি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে,
চার স্ত্রী পর্যন্ত পুরুষের অধিকার
কোরআনের সূরা আন-নিসা ৪:৩ একজন পুরুষকে দুই, তিন অথবা চারজন নারীকে বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছে। একই আয়াতে ন্যায়বিচার করতে না পারার আশঙ্কা থাকলে একজন স্ত্রীতে সীমাবদ্ধ থাকার কথা বলা হয়েছে। [95]। চারজনের সীমা ইসলামী ফিকহের পরবর্তী উদ্ভাবন নয়। হাদিসে উল্লেখ আছে, ইসলাম গ্রহণের সময় গাইলান ইবন সালামাহর দশজন স্ত্রী ছিল। মুহাম্মদ তাকে তাদের মধ্যে চারজন রেখে বাকিদের ছেড়ে দিতে বলেছিল। [96]।
সুনান ইবনে মাজাহ (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৯/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ চারের অধিক সংখ্যক স্ত্রী থাকা অবস্থায় কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে
১৯৫৩। ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। গাইলান ইবনু সালামাহ ইসলাম গ্রহণ করার সময় তার দশজন স্ত্রী ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেনঃ “তুমি তাদের মধ্যে চারজনকে রাখো।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
আরেক বর্ণনায় কায়েস ইবনুল হারিস আটজন স্ত্রী নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করলে মুহাম্মদ তাকে চারজন বেছে রাখতে বলে। ফলে ইসলামের নিয়মটি স্পষ্ট, পুরুষের একাধিক বিবাহ বৈধ, সর্বোচ্চ সীমা চার। এই অধিকার ব্যবহার করতে তাকে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহ শেষ করতে হয় না, প্রথম স্ত্রীর যৌন বা আবেগিক অনুমোদনও মৌলিক বৈধতার শর্ত নয়। পুরুষ একটি বিদ্যমান বিবাহের মধ্যেই নিজের যৌন ও পারিবারিক জীবন নতুন নারীর দিকে সম্প্রসারিত করতে পারে।
এই সিদ্ধান্তের পরিণতি শুধু পুরুষের নিজের জীবনে পড়ে না। প্রথম স্ত্রীর স্বামীর সঙ্গে কাটানোর সময় কমে যায়, তার সন্তানদের বাবার সময় ভাগ হয়, পারিবারিক অর্থ নতুন সংসারে যায়, স্বামীর যৌন ও আবেগিক মনোযোগ ভাগ হয়, উত্তরাধিকারী ও নতুন সন্তান যুক্ত হয়। অথচ এই পরিবর্তনের মূল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে পুরুষের হাতে। একজন পুরুষের ব্যক্তিগত ধর্মীয় অধিকার একাধিক নারীর জীবনের কাঠামো বদলে দেয়, কিন্তু যেসব নারীর জীবন বদলে যাচ্ছে তাদের প্রত্যেকের সম্মতি সেই অধিকারের শর্ত নয়। আসুন বাংলাদেশের একজন ইসলামিক আলেমের দৃষ্টিভঙ্গি শুনি,
পুরুষের চার স্ত্রী, নারীর একজন স্বামী
বহুবিবাহের সবচেয়ে স্পষ্ট বৈষম্য সংখ্যার মধ্যেই রয়েছে। একজন পুরুষ একই সময়ে চারজন নারীর সঙ্গে বৈধ যৌন ও বৈবাহিক সম্পর্ক রাখতে পারে। কিন্তু একজন বিবাহিত নারী একই সময়ে আরেক পুরুষকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না। সূরা আন-নিসা ৪:২৪ বিবাহিত নারীদের অন্য পুরুষের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, অধিকারভুক্ত দাসী নারীদের আলাদা ব্যতিক্রম হিসেবে রেখেছে। [97]। ফলে যৌন একনিষ্ঠতার নীতি নারী ও পুরুষের জন্য এক নয়।
একজন বিবাহিত পুরুষ অন্য নারীকে ভালোবাসলে বা যৌনভাবে আকৃষ্ট হলে তাকে দ্বিতীয় স্ত্রী করার বৈধ পথ আছে। দ্বিতীয় স্ত্রীতেও আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হলে তৃতীয়, তারপর চতুর্থ স্ত্রী পর্যন্ত যেতে পারে। কিন্তু একজন বিবাহিত নারী অন্য পুরুষের প্রতি ভালোবাসা বা যৌন আকর্ষণ অনুভব করলে তার জন্য একই ধরনের সমান্তরাল বৈধতা নেই। বর্তমান স্বামীর সঙ্গে বিবাহ শেষ না করা পর্যন্ত অন্য পুরুষের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক যিনা। অর্থাৎ পুরুষের বহুমুখী যৌন আকাঙ্ক্ষাকে বৈধ বিবাহের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়েছে, নারীর একই ধরনের আকাঙ্ক্ষাকে গ্রহণ করা হয়নি।
এর ফলে একই পরিবারের ভেতর একটি অদ্ভুত যৌন সমীকরণ তৈরি হয়। একজন পুরুষের চার স্ত্রী থাকলে সেই চারজন নারী প্রত্যেকে নিজেদের পুরো বৈবাহিক যৌন একনিষ্ঠতা একজন পুরুষকে দেবে। কিন্তু সেই পুরুষ নিজের যৌন একনিষ্ঠতা তাদের কারও প্রতিই দেবে না। প্রত্যেক স্ত্রীকে একজন স্বামী নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হবে, অথচ স্বামী চারজন স্ত্রী নিয়ে থাকতে পারে। চার নারীর প্রত্যেকে একজন পুরুষের একটি অংশ পায়, আর সেই পুরুষ চার নারীর প্রত্যেকের পূর্ণ বৈবাহিক একনিষ্ঠতা পায়। এই ব্যবস্থায় যৌন স্বাধীনতার হিসাব শুরু থেকেই পুরুষের পক্ষে ভারী।
বংশপরিচয় বা পিতৃত্ব শনাক্ত করার যুক্তি দিয়ে এই বৈষম্যের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। কিন্তু লিঙ্গবৈষম্যটি তাতেই অদৃশ্য হয় না। বিধানটি কী ফল তৈরি করছে তা সংখ্যাতেই দেখা যায়, একই সময়ে একজন পুরুষ চার বৈধ সঙ্গী রাখতে পারে, নারী পারে একজন। সামাজিক কারণ দিয়ে কোনো অসম বিধানের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা দেওয়া যায়, কিন্তু ৪:১ ও ১:১ একই অধিকার হয়ে যায় না।
বহুবিবাহ শুধু অনুমতি নয়, আদর্শ পুরুষের উদাহরণেও বহু স্ত্রী
বহুবিবাহকে ইসলামে অনিচ্ছুকভাবে সহ্য করা একটি জরুরি ব্যতিক্রম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু সহিহ বুখারির একটি বর্ণনা সেই ছবির সঙ্গে মেলে না। ইবন আব্বাস সাঈদ ইবন জুবায়রকে জিজ্ঞেস করে সে বিয়ে করেছে কি না। সে না বললে ইবন আব্বাস তাকে বিয়ে করতে বলে এবং মন্তব্য করে, এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির অধিকসংখ্যক স্ত্রী ছিল। [98]। ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংস্করণেও হাদিসটি বহুবিবাহের পরিচ্ছেদের অধীনে রাখা হয়েছে।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৭/ বিয়ে
৫০৬৯। সাঈদ ইবনু জুবায়র থেকে বর্ণিত। ইবনু আব্বাস তাকে বিয়ে করতে উৎসাহ দিয়ে বলেনঃ “এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন অধিক স্ত্রীসম্পন্ন।”
“উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি” বলতে মুহাম্মদকে বোঝানো হয়েছে। তার জীবনে একাধিক স্ত্রী ছিল এবং তার বৈবাহিক জীবন মুসলিম পুরুষের কাছে নববী আদর্শের অংশ। ফলে বহুবিবাহকে এমনভাবে উপস্থাপন করা যায় না যেন ইসলাম সেটিকে কেবল দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ বা বিধবা নারীদের উদ্ধার করার জন্য অনিচ্ছায় রেখে দিয়েছে। হাদিসে বহু স্ত্রী থাকার বিষয়টি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির জীবনকে উল্লেখ করে বিবাহের উৎসাহের প্রসঙ্গে এসেছে।
মুহাম্মদের নিজের বিবাহের সংখ্যা সাধারণ মুসলিমের চার স্ত্রীর সীমার মধ্যে ছিল না। তার জন্য বিশেষ বিধান ছিল, যা পরে আলাদা পরিচ্ছেদে বিস্তারিত আসবে। বর্তমান প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বহুবিবাহ ইসলামী ঐতিহ্যে লজ্জাজনক ব্যতিক্রম নয়। মুহাম্মদ নিজেই বহু স্ত্রী রেখেছিল, সাহাবিরাও বহুবিবাহ করেছে এবং কোরআন এটিকে সরাসরি বৈধ করেছে। যে ব্যবস্থার নবী নিজেই বহু স্ত্রী রাখে এবং যার সাহাবি সেই বহু স্ত্রীকেই উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করে, সেই ব্যবস্থাকে বহুবিবাহবিরোধী বলে উপস্থাপন করা অর্থহীন। আসুন মতিউর রহমান মাদানির একটি বক্তব্য শুনি,
ন্যায়বিচারের শর্ত এবং অসম্ভব সমতা
সূরা আন-নিসা ৪:৩ বহুবিবাহের সঙ্গে ন্যায়বিচারের শর্ত যুক্ত করেছে। দুই, তিন বা চার স্ত্রী নেওয়ার অনুমতির পর বলা হয়েছে, ন্যায়বিচার করতে না পারার আশঙ্কা হলে একজন স্ত্রীতে সীমাবদ্ধ থাকতে। [95]। স্ত্রীদের মধ্যে রাত, বাসস্থান, অর্থ ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রণযোগ্য অধিকারের বণ্টনে ন্যায়বিচার ধ্রুপদী ফিকহে বাধ্যতামূলক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। দুই স্ত্রীর একজনের দিকে অন্যায়ভাবে ঝুঁকে পড়ার বিরুদ্ধেও হাদিসে কঠোর সতর্কতা এসেছে।
সুনান আত-তিরমিযী
বিবাহ
হাদিস ১১৪২। মুহাম্মদ বলেছে, “যদি কারও দুই স্ত্রী থাকে এবং সে তাদের মধ্যে সমতা রক্ষা না করে, কিয়ামতের দিন সে এক পার্শ্ব ঝুঁকে থাকা অবস্থায় আসবে।”
কিন্তু একই সূরার ৪:১২৯-এ কোরআন ঘোষণা করেছে, মানুষ যতই আগ্রহী হোক স্ত্রীদের মধ্যে পূর্ণ সমতা করতে পারবে না। এরপর একজনের দিকে সম্পূর্ণ ঝুঁকে অন্যজনকে ঝুলন্ত অবস্থায় ফেলে রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। [99]। ধ্রুপদী তাফসীরে সাধারণত এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে, সময়, অর্থ ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রণযোগ্য বিষয়ে সমতা সম্ভব এবং বাধ্যতামূলক, কিন্তু হৃদয়ের ভালোবাসা ও আকর্ষণে পূর্ণ সমতা সম্ভব নয়।
কোরআন, সূরা আন-নিসা ৪:১২৯
“তোমরা স্ত্রীদের মধ্যে কখনো পূর্ণ সমতা করতে পারবে না, যদিও তোমরা তা খুবই কামনা কর। অতএব একজনের দিকে সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকে পড়ে অন্যজনকে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখো না।”
একজন স্ত্রী শুধু সমান টাকা, সমান খাবার এবং ক্যালেন্ডারে সমান রাতের হিসাব নিয়ে বিবাহে থাকে না। মানুষের দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা, কামনা, ঘনিষ্ঠতা, মানসিক নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গুরুত্ব এবং সঙ্গীর কাছে বিশেষ হওয়ার অনুভূতি থাকে। স্বামী একজন স্ত্রীকে বেশি ভালোবাসে, তার সঙ্গে বেশি কথা বলতে চায়, তার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়, তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, এসব অনুভূতিকে রাত ও টাকার অঙ্ক দিয়ে সমান করা যায় না। কোরআন নিজেই এই আবেগিক অসম্ভবতাকে স্বীকার করেছে।
ফলে বহুবিবাহের ন্যায়বিচার প্রধানত পরিমাপযোগ্য অধিকারের বণ্টনে আটকে যায়। চারজন স্ত্রী প্রত্যেকে সপ্তাহে নির্দিষ্ট রাত পেলেও তারা একই পরিমাণ ভালোবাসা পায় না। এক স্ত্রী জানে স্বামী অন্য স্ত্রীকে বেশি ভালোবাসে, কিন্তু সে কেবল এতটুকু দাবি করতে পারে যেন তাকে পুরোপুরি “ঝুলন্ত” অবস্থায় ফেলে না রাখা হয়। বহুবিবাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অসমতাগুলো টাকার খাতা দিয়ে মাপা যায় না। ভালোবাসাকে চার ভাগে, আকর্ষণকে চার ভাগে এবং আবেগিক নিরাপত্তাকে চারটি সমান পালায় কেটে দেওয়া যায় না।
প্রথম স্ত্রীর সম্মতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিবাহ
একজন পুরুষের দ্বিতীয় বিবাহ তার প্রথম স্ত্রীর জীবনকে আমূল বদলে দেয়। তবুও ধ্রুপদী শরিয়তে দ্বিতীয় বিয়ের বৈধতার জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি প্রয়োজন নেই। IslamQA-তে সরাসরি বলা হয়েছে, দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণের আগে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক, এমন কোনো কোরআনিক বা হাদিসি শর্ত নেই। [100]। একই ধরনের ফতোয়ায় স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহের ধর্মীয় অধিকারের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
IslamQA, প্রশ্ন 61
দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণের আগে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া শরিয়তের শর্ত নয়।
IslamWeb-এর একটি ফতোয়ায় আরও বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিবাহের কথা প্রথম স্ত্রীকে জানানোও শরিয়তের বাধ্যতামূলক শর্ত নয়। [101]। অর্থাৎ একজন নারী নিজের বিবাহের এমন একটি মৌলিক পরিবর্তন সম্পর্কেও আগে জানতে নাও পারে। স্বামী গোপনে দ্বিতীয় বিবাহ সম্পন্ন করতে পারে এবং সেই গোপনীয়তা নিজে নতুন বিবাহকে অবৈধ করে না।
এটি কেবল “স্বামীর আরেকটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক” নয়। দ্বিতীয় বিবাহের পর প্রথম স্ত্রীর স্বামীর সঙ্গে সময় ভাগ হবে, পারিবারিক আয় ভাগ হবে, যৌনজীবন ভাগ হবে, নতুন সন্তান ও উত্তরাধিকারী যুক্ত হতে পারে, ভবিষ্যৎ বাসস্থান ও পরিচর্যার ব্যবস্থা বদলাতে পারে। বিবাহের প্রায় প্রতিটি বাস্তব উপাদান বদলে যায়। অথচ যেই নারী সেই পরিবর্তনের সরাসরি অংশ, তার সম্মতি দ্বিতীয় বিয়ের বৈধতার শর্ত নয়।
স্বামী সিদ্ধান্ত নেবে সে আরেকজন নারীকে বিয়ে করবে কি না। প্রথম স্ত্রী সেই সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করবে, কিন্তু সিদ্ধান্তে তার ভেটো নেই। ক্ষমতার এই বিন্যাসে একজন সম্পর্কের কাঠামো বদলায়, অন্যজনকে বদলে যাওয়া কাঠামোর মধ্যে বসবাস করতে হয়।
প্রথম স্ত্রী সেই পরিস্থিতি সহ্য করতে না চাইলে তার সামনে বিচ্ছেদের পথ থাকতে পারে, কিন্তু সেটি দ্বিতীয় বিয়ে ঠেকানোর সমান ক্ষমতা নয়। স্বামী নতুন সম্পর্ক তৈরি করার অধিকার ব্যবহার করছে, স্ত্রী নিজের পুরনো সম্পর্ক ছেড়ে যাওয়ার প্রশ্নে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। পুরুষের হাতে সম্পর্ক বিস্তারের ক্ষমতা, নারীর হাতে সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ। এই দুই ক্ষমতা এক নয়; একটিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, অন্যটিতে সিদ্ধান্তের ক্ষতি থেকে পালানোর চেষ্টা করা হয়।
ফাতিমার ক্ষেত্রে মুহাম্মদের বহুবিবাহবিরোধিতা
বহুবিবাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক ঘটনাগুলোর একটি মুহাম্মদের নিজের কন্যা ফাতিমাকে ঘিরে। আলী ইবন আবু তালিব তখন ফাতিমার স্বামী। আলী ফাতিমাকে স্ত্রী হিসেবে রেখেই আবু জাহলের কন্যাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। ফাতিমা বিষয়টি জেনে মুহাম্মদের কাছে অভিযোগ করে। সহিহ মুসলিমে উল্লেখ আছে, মুহাম্মদ জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে এই বিয়ের বিরোধিতা করে এবং নিজের কন্যার কষ্টকে গুরুতর বিষয় হিসেবে তুলে ধরে। শেষ পর্যন্ত আলী বিয়ের পরিকল্পনা ছেড়ে দেয়। [102]।
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৪৫/ সাহাবাগণের মর্যাদা
৬২০৪ [২৪৪৯]। মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। আলী ফাতিমাকে স্ত্রী হিসেবে রেখেই আবু জাহলের কন্যাকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়। মুহাম্মদ বলে, “ফাতিমাহ আমারই একটা টুকরা, আমি অপছন্দ করি যে লোকে তাকে ফিতনায় ফেলুক। আল্লাহর শপথ, আল্লাহর রাসূলের মেয়ে ও আল্লাহর শত্রুর মেয়ে কোনো লোকের নিকট একসঙ্গে মিলিত হতে পারে না।” এরপর আলী প্রস্তাবটি ছেড়ে দেয়।
সহিহ মুসলিমের আরেক বর্ণনায় মুহাম্মদ আরও পরিষ্কার করে বলে, সে কোনো হালালকে হারাম করছে না এবং কোনো হারামকে হালাল করছে না। অর্থাৎ আলীর দ্বিতীয় বিবাহের সাধারণ শরিয়তি বৈধতা সে অস্বীকার করেনি। তারপরও নিজের কন্যার ক্ষেত্রে বিয়েটি ঠেকিয়ে দিয়েছে। একই বর্ণনায় ফাতিমা তার নিজের একটি অংশ এবং তার কষ্ট মুহাম্মদকে কষ্ট দেয়, এই বিষয়টিও এসেছে। [103]।
সহীহ মুসলিম, হাদিস ৬২০৩ [২৪৪৯]
মুহাম্মদ বলে, “ফাতিমা আমারই অংশ। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, সে তার দীনের ব্যাপারে ফিতনায় না পড়ে… আমি কোনো হালালকে হারাম করি না এবং কোনো হারামকে হালাল করি না।”
এই ঘটনাটির শক্তি এখানেই। মুহাম্মদ নিজেই জানত বহুবিবাহ একটি স্ত্রীর জন্য গভীর কষ্টের কারণ হতে পারে। ফাতিমার ক্ষেত্রে সেই কষ্টকে তুচ্ছ ঈর্ষা বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়নি। বরং তাকে এমন গুরুতর বলা হয়েছে যে তার ধর্মীয় অবস্থার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। মুহাম্মদ জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে নিজের কন্যার পক্ষে হস্তক্ষেপ করেছে এবং আলীর দ্বিতীয় বিবাহ বাস্তবে থেমে গেছে।
বহুবিবাহ যদি স্ত্রীর জন্য স্বাভাবিক, নিরীহ ও সহজ কোনো ব্যবস্থা হতো, তাহলে মুহাম্মদ নিজের কন্যার ক্ষেত্রে তাকে “ফিতনায় পড়ে যাওয়ার” মতো গুরুতর বিপদ হিসেবে দেখত না। ফাতিমার ঘটনা ইসলামী ঐতিহ্যের ভেতর থেকেই বহুবিবাহের মানসিক আঘাতের সবচেয়ে শক্তিশালী স্বীকৃতিগুলোর একটি।
ফাতিমার কষ্টের মূল্য আছে, অন্য নারীর কষ্টের নেই?
সহিহ বুখারিতেও মুহাম্মদ ফাতিমাকে নিয়ে বলেছে, “ফাতিমা আমার একটি অংশ, যে তাকে কষ্ট দেয় সে আমাকে কষ্ট দেয়।” [104]। অন্য বর্ণনাতেও একই বক্তব্য এসেছে। [105]। দ্বিতীয় বিবাহে ফাতিমার কষ্ট মুহাম্মদ নিজের কষ্ট হিসেবে গ্রহণ করেছে।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৩৭১৪। মুহাম্মদ বলেছে, “ফাতিমা আমার অংশ। যে তাকে অসন্তুষ্ট করল সে আমাকেই অসন্তুষ্ট করল।”
তাহলে সাধারণ মুসলিম স্ত্রীর অবস্থান কী? তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে সে ঈর্ষা, অপমান, নিরাপত্তাহীনতা, আবেগিক ভাঙন বা ধর্মীয় সংকটে পড়তে পারে। কিন্তু তার এই কষ্ট স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহের বৈধতা বাতিল করে না। প্রথম স্ত্রীর সম্মতি প্রয়োজন নেই, তার আপত্তি নতুন বিবাহের শরিয়তি বৈধতাকে থামায় না। ফাতিমার ক্ষেত্রে যে মানসিক কষ্ট একটি বিয়ে ঠেকিয়ে দিতে যথেষ্ট হয়েছে, সাধারণ নারীর ক্ষেত্রে সেই একই কষ্ট তাকে সমান ক্ষমতা দেয় না।
এখানে পারিবারিক বিশেষত্বের বৈষম্য ভয়াবহভাবে স্পষ্ট। মুহাম্মদ নিজের কন্যার জন্য এমন একটি সুরক্ষা বাস্তবে প্রয়োগ করেছে যা মুসলিম নারীদের সাধারণ বৈবাহিক অধিকার হয়ে ওঠেনি। যদি দ্বিতীয় স্ত্রীর কারণে প্রথম স্ত্রীর গভীর কষ্টকে বৈধ আপত্তি ধরা হয়, তাহলে সকল নারীর ক্ষেত্রেই সেই নীতি প্রযোজ্য হওয়ার কথা। আর যদি স্বামীর বহুবিবাহের অধিকার স্ত্রীর আবেগের চেয়ে বড় হয়, তাহলে ফাতিমার ক্ষেত্রেও আলীকে একই অধিকার ব্যবহার করতে দেওয়ার কথা ছিল।
নিজের কন্যার চোখের জল যখন দ্বিতীয় বিয়ে ঠেকায়, কিন্তু অন্য নারীর চোখের জল স্বামীর বহুবিবাহের অধিকার থামাতে পারে না, তখন সেখানে সার্বজনীন ন্যায়বিচার নেই। আছে নবীর কন্যার জন্য একটি বাস্তব সুরক্ষা এবং সাধারণ নারীর জন্য পুরুষের বহুবিবাহের অধিকার।
ঈর্ষা, প্রতিযোগিতা এবং নারীর মানসিক মূল্য
বহুবিবাহের বাস্তব জীবনে স্ত্রীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা কাঠামোগত। একই পুরুষের সময়, স্নেহ, যৌন আকর্ষণ, অর্থনৈতিক সম্পদ এবং পারিবারিক মনোযোগ একাধিক নারী ভাগ করে নেয়। প্রতিটি স্ত্রী জানে তার স্বামী অন্য নারীর সঙ্গে ঘুমায়, অন্য নারীর প্রতি যৌন আকর্ষণ প্রকাশ করে, অন্য সংসারে সন্তান জন্ম দেয় এবং নিজের সময় নির্দিষ্ট পালায় ভাগ করে। এই সম্পর্কের মধ্যে ঈর্ষা কোনো অস্বাভাবিক মানসিক বিকৃতি নয়। এটি সম্পর্কের কাঠামো থেকেই তৈরি হতে পারে।
মুহাম্মদের স্ত্রীদের জীবনেও ঈর্ষার বহু বর্ণনা আছে। আয়িশা নিজেই অন্যান্য স্ত্রীকে নিয়ে ঈর্ষার কথা বলেছে। সাফিয়াকে নিয়ে মন্তব্য, খাদিজাকে নিয়ে আয়িশার ঈর্ষা, স্ত্রীদের মধ্যে পালা ও উপহার নিয়ে প্রতিযোগিতা, এসব ঘটনা হাদিসসাহিত্যে ছড়িয়ে আছে। অর্থাৎ একই পুরুষকে ভাগ করার ফলে স্ত্রীদের মধ্যে ঈর্ষা ও দ্বন্দ্বের বাস্তবতা ইসলামের প্রথম পরিবারের মধ্যেই উপস্থিত।
কোরআন ৪:১২৯-এর “একজনের দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে অন্যজনকে ঝুলিয়ে রেখো না” সতর্কতাও একই সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। একজন পুরুষ একটি স্ত্রীকে বেশি ভালোবাসতে পারে, অন্যজনকে কম। স্ত্রী তার পালার রাত পেতে পারে, কিন্তু জানে স্বামীর মন অন্য ঘরে। এই অবস্থায় সমান সময় পাওয়া আবেগিক সমতা তৈরি করে না।
বহুবিবাহে ক্ষমতার একটি অতিরিক্ত সমস্যা রয়েছে। স্বামী জানে স্ত্রীদের প্রত্যেকে তাকে হারানোর ভয়, তালাকের ভয়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে থাকতে পারে। একজন স্ত্রীকে অন্য স্ত্রীর সঙ্গে তুলনা করা, কারও দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া, নতুন বিবাহের হুমকি দেওয়া অথবা প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ব্যবহার করে আনুগত্য আদায় করা সহজ হয়ে যায়। ধর্মীয় আইন যখন পুরুষকে নতুন স্ত্রী নেওয়ার বৈধ ক্ষমতা দেয়, সেই ক্ষমতাটি পারিবারিক দরকষাকষির অস্ত্র হিসেবেও কাজ করতে পারে।
অর্থনৈতিক দিকটিও উপেক্ষা করা যায় না। একজন পুরুষের আয় একাধিক স্ত্রী, সন্তান ও পৃথক পরিবারের মধ্যে ভাগ হয়। কাগজে সমান ভরণপোষণের নিয়ম থাকলেও সীমিত সম্পদের বাস্তবে প্রত্যেক পরিবারের জন্য উপলভ্য অর্থ কমতে পারে। স্ত্রী যদি স্বামীর ওপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল হয়, দ্বিতীয় বিয়ে তার অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকেও বদলে দেয়। নিজের সিদ্ধান্ত ছাড়াই তার সংসারের সম্পদ নতুন পরিবারে ভাগ হয়।
বহুবিবাহে নারীরা শুধু একজন পুরুষকে ভাগ করে না। তারা ভাগ করে তার সময়, যৌনতা, আয়, ভালোবাসা, উত্তরাধিকার, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের ভেতরে নিজেদের অবস্থান। অথচ এই প্রতিযোগিতামূলক কাঠামো তৈরি করার মূল সিদ্ধান্তটি নারীদের হাতে নয়, পুরুষের হাতে।
বহুবিবাহের সামগ্রিক ক্ষমতা-কাঠামো
ইসলামী বহুবিবাহের সব বিধান একসঙ্গে রাখলে কাঠামোটি খুবই পরিষ্কার। পুরুষ চারজন স্ত্রী রাখতে পারে, নারী একজন স্বামী। পুরুষ প্রথম স্ত্রীকে রেখেই দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারে, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নতুন বিবাহের শর্ত নয়। প্রথম স্ত্রীকে আগে জানানোও বাধ্যতামূলক নয়। স্ত্রীদের মধ্যে পরিমাপযোগ্য বিষয়ে ন্যায়বিচার করতে হবে, কিন্তু পূর্ণ আবেগিক সমতা সম্ভব নয় বলে কোরআন নিজেই ঘোষণা করেছে। স্ত্রী দ্বিতীয় বিবাহে ভেঙে পড়লেও সেই কষ্ট সাধারণভাবে পুরুষের অধিকার বাতিল করে না।
এর সঙ্গে আগের পরিচ্ছেদগুলোর বিধান যোগ করলে অসমতা আরও তীক্ষ্ণ হয়। যে পুরুষ চার স্ত্রী রাখতে পারে, সেই চার স্ত্রীর প্রত্যেককে তার প্রতি যৌনভাবে একনিষ্ঠ থাকতে হবে। সে প্রত্যেক স্ত্রীকে বিছানায় ডাকতে পারে, প্রত্যাখ্যানে ফেরেশতার অভিশাপের হাদিস আছে, নুশূযের বিরুদ্ধে তার শাস্তিমূলক ক্ষমতা আছে। কিন্তু স্ত্রী নিজের স্বামীকে অন্য স্ত্রী থেকে বিরত রাখার সমান ধর্মীয় ক্ষমতা পায় না।
এটি “নারী ও পুরুষের ভিন্ন দায়িত্ব” নয়। দায়িত্বের পার্থক্য হলে একজন অর্থ উপার্জন করতে পারে, অন্যজন অন্য কাজ করতে পারে। এখানে পার্থক্যটি অধিকার ও স্বাধীনতায়। একজন একই সময়ে চার যৌন ও বৈবাহিক সঙ্গী পায়, অন্যজন পায় একজন। একজন সম্পর্কের সংখ্যা বাড়াতে পারে, অন্যজনকে সেই বৃদ্ধির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয় অথবা সম্পর্ক ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবতে হয়। একজন সিদ্ধান্ত নেয়, অন্যজন সিদ্ধান্তের পরিণতি বহন করে।
ফাতিমার ঘটনাই এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সবচেয়ে নির্মম সাক্ষ্য। মুহাম্মদ বুঝেছিল দ্বিতীয় বিবাহ তার কন্যাকে কষ্ট দেবে। সে বলেছিল ফাতিমা তার অংশ, ফাতিমার কষ্ট তার কষ্ট এবং এই পরিস্থিতিতে তার ধর্মীয় সংকটের ভয় আছে। তারপর আলীর বিয়ে থেমে যায়। কিন্তু মুহাম্মদের এই উপলব্ধি থেকে সকল মুসলিম নারীর জন্য দ্বিতীয় বিবাহে বাধ্যতামূলক সম্মতির অধিকার তৈরি হয়নি।
বহুবিবাহের মূল সমস্যা শুধু একজন পুরুষের চারজন স্ত্রী থাকা নয়। সমস্যা হলো যৌন স্বাধীনতার একতরফা বণ্টন। পুরুষ সম্পর্ক বাড়াতে পারে, নারী পারে না। পুরুষ নতুন স্ত্রী আনতে পারে, পুরনো স্ত্রীর অনুমতি লাগে না। স্ত্রীকে স্বামীর অন্য সম্পর্ক মেনে নিতে হয়, কিন্তু স্বামীকে স্ত্রীর অন্য সম্পর্ক মেনে নিতে হয় না। এই ব্যবস্থার কেন্দ্র প্রেম নয়, পুরুষের বহুগামী অধিকার এবং নারীর একগামী আনুগত্য।
বহুবিবাহের এই বৈষম্য, প্রথম স্ত্রীর সম্মতি, মুহাম্মদের বহুবিবাহ এবং ফাতিমার ঘটনা নিয়ে সংশয় জ্ঞানকোষের নারী ও বিবাহবিষয়ক প্রবন্ধগুলোতে আরও বিস্তৃত দলিল রয়েছে।
শিশুবিবাহ: কন্যাশিশুর শরীর, বিবাহ ও যৌন অধিকার
ইসলামী শিশুবিবাহের প্রশ্ন শুধু আয়িশার বয়স নিয়ে একটি ঐতিহাসিক বিতর্ক নয়। কোরআনে ঋতুস্রাব শুরু না হওয়া স্ত্রীর ইদ্দত নির্ধারণ করা হয়েছে, সহিহ বুখারি সেই আয়াতকে নাবালিকা বিবাহের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছে, মুহাম্মদ ছয় বছর বয়সে আয়িশাকে বিয়ে করেছে এবং নয় বছর বয়সে তার সঙ্গে দাম্পত্য জীবন শুরু করেছে, ধ্রুপদী ফিকহে পিতাকে অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিবাহ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, আবার সহবাসের ক্ষেত্রেও সর্বত্র বয়ঃসন্ধিকে শর্ত করা হয়নি। মেয়েটির শরীর সহবাস সহ্য করতে পারে কি না, এই ভয়াবহ মানদণ্ড পর্যন্ত ফিকহে আলোচনা হয়েছে। এমনকি ছোট স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসে তার শরীর বিদীর্ণ হয়ে গেলে কত দিয়াত দিতে হবে, সেটিও আইনশাস্ত্রের বিষয় হয়েছে।
এখানে মূল প্রশ্নটি বয়সের একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়। প্রশ্ন হলো একটি শিশুর ওপর একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের বৈবাহিক ও যৌন অধিকার আদৌ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে কি না। একটি শিশু নিজের ভবিষ্যৎ বিবাহ, যৌনতা, গর্ভধারণ, মাতৃত্ব, বাসস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি জীবনের পরিণতি একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতো বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। যে ব্যবস্থায় শিশুকে আগে স্ত্রী বানানো যায়, পরে তার শরীর সহবাস সহ্য করতে পারবে কি না তা বিচার করা হয়, সেখানে শিশুর সুরক্ষা কেন্দ্র নয়। কেন্দ্র হলো কখন স্বামীর যৌন অধিকার কার্যকর হবে।
ঋতুস্রাব শুরু না হওয়া স্ত্রীর ইদ্দত
কোরআনের সূরা আত-তালাক ৬৫:৪ শিশুবিবাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলোর একটি। তালাকপ্রাপ্তা নারীদের ইদ্দত নির্ধারণ করতে গিয়ে সেখানে তিন ধরনের নারীর কথা এসেছে, যাদের ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেছে, যাদের এখনো ঋতুস্রাব হয়নি, এবং গর্ভবতী নারী। ঋতুস্রাব না হওয়া স্ত্রীদের জন্য তিন মাসের ইদ্দত নির্ধারণ করা হয়েছে। [106]।
কোরআন, সূরা আত-তালাক ৬৫:৪
“তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ঋতুস্রাব থেকে নিরাশ হয়েছে, তাদের ইদ্দত সম্পর্কে সন্দেহ হলে তাদের ইদ্দত তিন মাস, এবং তাদেরও যাদের এখনো ঋতুস্রাব হয়নি।”
এই আয়াত শুধু এমন কোনো মেয়ের কথা বলছে না যার বিয়ে হয়েছে কিন্তু দাম্পত্য জীবন শুরু হয়নি। সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪৯-এ বলা হয়েছে, বিবাহের পর সহবাসের আগেই তালাক হলে স্ত্রীর কোনো ইদ্দত নেই। [107]। ফলে ৬৫:৪-এ ঋতুস্রাব না হওয়া স্ত্রীর জন্য ইদ্দত নির্ধারণের অর্থ, এমন বিবাহও কল্পনা করা হয়েছে যেখানে ঋতুস্রাব শুরু না হওয়া স্ত্রীর সঙ্গে বৈবাহিক সহবাস ঘটেছে এবং পরে তালাক হয়েছে।
তাফসীরে তাবারীতে সরাসরি অল্প বয়সের কারণে ঋতুস্রাব শুরু না হওয়া মেয়েদের কথা বলা হয়েছে। তাবারী আয়াতটির ব্যাখ্যায় এমন কন্যাদের উল্লেখ করেছেন যারা অল্প বয়সের কারণে এখনো ঋতুমতী হয়নি এবং স্বামী তাদের সঙ্গে সহবাস করার পরে তালাক দিয়েছে। [108]। কাতাদা ও দাহহাকের ব্যাখ্যাতেও একই অর্থ এসেছে।
ঋতুস্রাব শুরু না হওয়া মেয়ের জন্য তালাকোত্তর ইদ্দত নির্ধারণের অর্থ খুবই স্পষ্ট, শরিয়ত এমন নাবালিকা স্ত্রীর অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে যার সঙ্গে বৈবাহিক যৌনসম্পর্কও ঘটতে পারে।
বুখারির পরিচ্ছেদেই নাবালিকা বিবাহের স্বীকৃতি
সহিহ বুখারিতে বিষয়টি আরও সরাসরি এসেছে। আয়িশার বিবাহের হাদিসটি বুখারি যে পরিচ্ছেদের অধীনে রেখেছে, সেই পরিচ্ছেদের শিরোনামই ছোট শিশুদের বিবাহ দেওয়ার বৈধতা নিয়ে। সেখানে সূরা আত-তালাক ৬৫:৪-এর “যাদের এখনো ঋতুস্রাব হয়নি” অংশ উদ্ধৃত করে নাবালিকা মেয়ের ইদ্দতের কথা বলা হয়েছে, তারপর আয়িশার ছয় বছরে বিবাহ এবং নয় বছরে দাম্পত্য জীবন শুরু হওয়ার হাদিস রাখা হয়েছে। [109]।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৭/ বিয়ে
পরিচ্ছেদঃ “কার জন্য ছোট শিশুদের বিয়ে দেয়া বৈধ।”
এরপর সূরা আত-তালাক ৬৫:৪-এর “এবং যারা ঋতুমতী হয়নি” অংশকে নাবালিকা মেয়ের ইদ্দতের দলিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ “কোরআন কোথাও শিশুবিবাহের কথা বলেনি” বললে শুধু তাফসীর নয়, সহিহ বুখারির নিজের অধ্যায়বিন্যাসও অস্বীকার করতে হয়। বুখারির কাছে আয়িশার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক কাহিনি ছিল না, নাবালিকা বিবাহের ফিকহি অধ্যায়ের দলিল ছিল।
এই কারণেই পরবর্তী ফকিহরা ৬৫:৪ এবং আয়িশার বিবাহকে অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিবাহের বৈধতার শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছে। ধর্মীয় আইনশাস্ত্রে একটি ঘটনা যখন নির্দিষ্ট মাসআলার প্রমাণ হিসেবে বারবার ব্যবহৃত হয়, তখন সেটিকে শুধু “সেই সময়ের সামাজিক ঘটনা” বলে আলাদা করে রাখা যায় না। সেটি আইনের নজিরে পরিণত হয়েছে।
আয়িশার ছয় বছরে বিবাহ, নয় বছরে দাম্পত্য জীবন
সহিহ বুখারিতে আয়িশা নিজেই বলেছে, মুহাম্মদ তাকে বিয়ে করেছিল যখন তার বয়স ছয় বছর, এবং নয় বছর বয়সে মুহাম্মদ তার সঙ্গে দাম্পত্য জীবন শুরু করে। [110]। বুখারির আরেকটি বর্ণনাতেও একই বয়স এসেছে। [111]।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫১৩৩। আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিয়ে করেন যখন তার বয়স ছিল ছয় বছর এবং নয় বছর বয়সে তার সঙ্গে বাসর করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহিহ মুসলিমেও একাধিক বর্ণনায় একই তথ্য এসেছে। মুসলিমের ৩৩৭০ ও ৩৩৭১ নম্বর হাদিসে ছয় বছর বয়সে বিবাহ এবং নয় বছর বয়সে দাম্পত্য জীবন শুরু হওয়ার কথা আছে। একটি বর্ণনায় বিবাহের বয়স সাত বলা হলেও সহবাসের বয়স আবার নয়। [112]।
সহিহ মুসলিমের অধ্যায়ের নামও সরাসরি পিতার হাতে অপ্রাপ্তবয়স্ক কুমারী কন্যার বিবাহ দেওয়ার অনুমতি নিয়ে। [113]। ফলে আয়িশার বয়সের হাদিসকে মুসলিম হাদিসসংকলকেরাও শিশুবিবাহের ফিকহি প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন রাখেনি।
ছয় বছরের একটি শিশুকে বিবাহচুক্তির মধ্যে নেওয়া এবং নয় বছর বয়সে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সঙ্গে তার দাম্পত্য যৌনজীবন শুরু করা শুধু মুহাম্মদের ব্যক্তিগত ইতিহাস নয়। এই ঘটনাই পরবর্তী ইসলামী আইনে নাবালিকা কন্যার বিবাহের অন্যতম প্রধান নজির হয়েছে।
মুহাম্মদ মুসলিমদের কাছে সাধারণ কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তি নয়। তার কাজ সুন্নাহ, তার বিবাহ ধর্মীয় ইতিহাসের অংশ এবং তার আচরণ ফিকহের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সেই কারণে আয়িশার বয়সের প্রশ্নটি “১৪০০ বছর আগের ব্যক্তিগত ঘটনা” বলে সরিয়ে দেওয়া যায় না। যে ঘটনা আজও নাবালিকা বিবাহের বৈধতার দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেটি বর্তমান নৈতিক প্রশ্নও।
পিতা নাবালিকা কন্যাকে বিয়ে দিতে পারে
ধ্রুপদী সুন্নি ফিকহে অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিবাহের ক্ষমতা তার নিজের হাতে নয়, অভিভাবকের হাতে রাখা হয়েছে। বিশেষ করে পিতার হাতে নাবালিকা কন্যাকে বিবাহ দেওয়ার ক্ষমতা মূলধারার ফিকহে স্বীকৃত। ইবন আবদুল বার-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে IslamQA-তে বলা হয়েছে, আলেমরা পিতার হাতে অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাকে তার সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই বিবাহ দেওয়ার ক্ষমতা স্বীকার করেছেন এবং আয়িশাকে আবু বকর ছয় বা সাত বছর বয়সে মুহাম্মদের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে এর দলিল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। [114]।
একটি শিশুর পিতা তার চিকিৎসা, নিরাপত্তা বা শিক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, কারণ শিশুটি সেই সিদ্ধান্তগুলো নিজে নেওয়ার মতো বয়সে পৌঁছায়নি। কিন্তু বিবাহ আলাদা। বিবাহ মানে একজন নির্দিষ্ট প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক, যৌনজীবন, সম্ভাব্য গর্ভধারণ, মাতৃত্ব, বাসস্থান, পারিবারিক কর্তৃত্ব এবং ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ। এই সিদ্ধান্ত শিশুর হয়ে অন্য একজন নেওয়া মানে শুধু তার অভিভাবকত্ব করা নয়, তার ভবিষ্যৎ শরীর ও যৌনজীবনকেও চুক্তির মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া।
পিতার সম্মতি শিশুর সম্মতি নয়। একজন বাবা তার ছয় বছরের মেয়ের হয়ে বিবাহে “হ্যাঁ” বললেই সেই শিশু একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দাম্পত্য ও যৌন অধিকারে স্বাধীনভাবে সম্মতি দিয়েছে, এমন হয়ে যায় না।
এখানে ক্ষমতার অসমতা সম্পূর্ণ। মেয়েটি স্বামী নির্বাচন করছে না, পিতা নির্বাচন করছে। মেয়েটি বিবাহের অর্থ বুঝছে না, কিন্তু চুক্তি তার জীবনকে বেঁধে দিচ্ছে। যে বয়সে সে খেলাধুলা, শিক্ষা, পরিবার ও শৈশবের ওপর নির্ভরশীল, সেই বয়সে তাকে একজন পুরুষের স্ত্রী হিসেবে আইনগত পরিচয় দেওয়া হচ্ছে।
নিকাহ শিশুকে প্রাপ্তবয়স্ক করে না
শিশুবিবাহের পক্ষে একটি পরিচিত সাফাই হলো—নিকাহ এবং সহবাস এক জিনিস নয়। এই আলাদা করা নৈতিক সাফাই নয়; বরং সমস্যাটিকে আরও স্পষ্ট করে। ইসলামী আইনে শিশুকে আগে স্ত্রী বানানো যায়, তারপর আলোচনার কেন্দ্র হয় স্বামীর যৌন অধিকার কখন কার্যকর হবে। সহবাস সঙ্গে সঙ্গে শুরু হোক বা পরে, শিশুটি তখনও প্রাপ্তবয়স্ক নয়, স্বাধীন যৌন সিদ্ধান্তগ্রহণকারী নয়, এবং প্রাপ্তবয়স্ক স্বামীর ক্ষমতার সামনে সমান পক্ষ নয়। ধ্রুপদী ফিকহে শিশুর সঙ্গে যৌন সম্পর্কের সীমা সর্বত্র বয়ঃসন্ধি দিয়ে নির্ধারিত হয়নি; অনেক আলোচনায় মানদণ্ড হয়ে উঠেছে শিশুর শরীর যৌনপ্রবেশ সহ্য করতে পারবে কি না।
ফিকহের আলোচনায় মেয়েটি সহবাসের জন্য শারীরিকভাবে সক্ষম কি না, এই মানদণ্ড এসেছে। অর্থাৎ প্রশ্নটি শিশুর মানসিক পরিপক্বতা, স্বাধীন সম্মতি, ভয় ছাড়া প্রত্যাখ্যানের ক্ষমতা বা যৌনসম্পর্কের অর্থ বোঝার ক্ষমতা নয়। প্রশ্নটি নেমে এসেছে তার শরীর যৌনপ্রবেশ বহন করতে পারবে কি না—এই নির্মম শারীরিক পরীক্ষায়। আরও ভয়াবহ প্রশ্ন হলো, এই “সহবাস-সহ্যক্ষমতা” কে নির্ধারণ করবে, কীভাবে নির্ধারণ করবে, এবং কেন কোনো আইন শিশুর শরীরকে এমন পরীক্ষার বিষয় বানাবে।
IslamQA-র 22442 নম্বর ফতোয়ায় মালিক, শাফিঈ ও আবু হানিফার মত উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, সহবাসের কোনো সর্বজনীন নির্দিষ্ট বয়স নেই; মেয়েটি শারীরিকভাবে সহবাস সহ্য করতে সক্ষম হলে সহবাস করা যেতে পারে। [115]। আরবি IslamQA-র 176799 নম্বর ফতোয়ায় আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বয়ঃসন্ধি সহবাসের অপরিহার্য শর্ত নয়, মেয়েটি সহবাসের উপযুক্ত হলে বয়ঃসন্ধির আগেও সহবাস সম্ভব। [116]।
IslamQA, প্রশ্ন 176799
সহবাসের সঙ্গে বয়ঃসন্ধির আবশ্যিক সম্পর্ক নেই। মেয়েটি সহবাসের উপযুক্ত হলে স্বামী তার সঙ্গে সহবাস করতে পারে, বয়ঃসন্ধি হওয়া তার শর্ত নয়।
এখানে শিশুর সম্মতি, মানসিক পরিপক্বতা বা নিজের শরীরের ওপর অধিকার বিচার হচ্ছে না; বিচার হচ্ছে তার শরীর প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের যৌনপ্রবেশ সহ্য করতে পারবে কি না। একটি শিশুকে মানুষ নয়, যৌন ব্যবহারের জন্য শারীরিকভাবে প্রস্তুত দেহ হিসেবে মাপা—এটাই শিশুবিবাহের ফিকহি কাঠামোর সবচেয়ে নগ্ন নৈতিক দেউলিয়াত্ব।
বয়ঃসন্ধিও পূর্ণ যৌনসম্মতির প্রমাণ নয়
বয়ঃসন্ধি শুরু হওয়া মানেই একজন শিশু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতো মানসিক সিদ্ধান্তক্ষমতা অর্জন করেছে, এমন নয়। ঋতুস্রাব শুরু হওয়া একটি জৈবিক পরিবর্তন। এটি মস্তিষ্কের পূর্ণ বিকাশ, সামাজিক পরিপক্বতা, ঝুঁকি বোঝার ক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অথবা একজন প্রাপ্তবয়স্ক সঙ্গীর বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে “না” বলার বাস্তব ক্ষমতার প্রমাণ নয়।
একজন দশ বা এগারো বছরের মেয়ের ঋতুস্রাব শুরু হতে পারে। তার শরীর গর্ভধারণেও সক্ষম হতে পারে। কিন্তু সে এখনো শিশু। সে বিদ্যালয়ে পড়ে, পরিবারের ওপর নির্ভরশীল, আর্থিকভাবে অসহায়, আইনি ও সামাজিক অভিজ্ঞতায় অপরিণত। তার শরীরের একটি প্রজনন-প্রক্রিয়া শুরু হওয়া তাকে একজন ত্রিশ বা চল্লিশ বছরের পুরুষের সমান যৌন সিদ্ধান্তগ্রহণকারী বানায় না।
এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ শিশুবিবাহের পক্ষে “বালেগ হয়ে গেছে” কথাটি প্রায়ই নৈতিক বৈধতার চূড়ান্ত উত্তর হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মাসিক শুরু হওয়া শরীরের ঘটনা, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পূর্ণ মানবিক, মানসিক ও সামাজিক সক্ষমতার প্রশ্ন। এই দুই জিনিসকে এক করে শিশুকে যৌনভাবে প্রাপ্য ঘোষণা করা জীববিজ্ঞানের অপব্যবহার।
খিয়ারুল বুলুগ, বালেগ হলে কি বিয়ে বাতিল করা যায়?
শিশুবিবাহের পক্ষে আরেকটি সাফাই হলো, ছোট বয়সে অভিভাবক বিয়ে দিলেও বালেগ হওয়ার পরে মেয়েটি চাইলে বিবাহ বাতিল করতে পারে। এই যুক্তিও শিশুবিবাহের নৈতিক অপরাধ ঢাকে না। ইসলামী ফিকহে খিয়ারুল বুলুগ, অর্থাৎ বয়ঃসন্ধির পরে বিবাহ গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের একটি ধারণা আছে; কিন্তু এই পথ সব শিশুর জন্য সমান, সহজ বা নিশ্চিত নয়। বিশেষ করে ধ্রুপদী হানাফি ফিকহে পিতা বা পিতামহ অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে বিয়ে দিলে সাধারণভাবে বালেগ হওয়ার পরে সেই বিবাহ বাতিলের একই খিয়ার থাকে না, অন্য অভিভাবকের দেওয়া বিবাহে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তা থাকতে পারে। [117]। ই বিষয়ে আহকামুল কুরআন গ্রন্থে যা বলা হয়েছে, সেটি দেখা নেয়া জরুরি [118] –
আলোচ্য আয়াতে এ কথারও প্রমাণ রয়েছে যে, পিতার জন্যে তার ছোট বয়সের কন্যাকে বিয়ে দেয়ার অধিকার আছে এ হিসেবে যে, সমস্ত অভিভাবকের জন্যেই তা জায়েয। আর পিতা তাদের সকলের তুলনায় অতি নিকটবর্তী অভিভাবক। আর বিভিন্ন দেশের আগের ও পরবর্তীকালের ফিকাহবিদদের মধ্যে তার জায়েয হওয়ার ব্যাপারে কোন মতপার্থক্য আছে বলে আমরা জানি না। তবে বশর ইবনুল অলীদ শিবরামাতা থেকে বর্ণনা প্রচার করেছেন যে, ছোট বয়সের ছেলেমেয়েকে বিয়ে দেয়া পিতার জন্যেও জায়েয নয়। এটা আল-আসাম-এর মাযহাব। এ মাযহাব যে বাতিল, তা আমরা ইতিপূর্বেই বলেছি। তাছাড়া এ আয়াতটিও এ মাযহাবের বাতুলতা প্রমাণ করে:
وَالَّتِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِنْ نِسَاءِ كُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ تَلْقَةُ أَشْهُرٍ وَالَّتِي لَمْ يَحِضْنَ –
তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যারা হায়য হওয়া থেকে নিরাশ হয়ে গেছে, তাদের ব্যাপারে তোমরা সন্দিহান হয়ে পড়লে, তাহলে তাদের ইদ্দত তিন মাসকাল ধরবে। এ নিয়ম তাদের জন্যেও,
যাদের এখনও হায়য আসতে শুরু করেনি।
(সূরা তালাক: ৪)
অতএব হায়য হয়নি- এমন অল্প বয়সী মেয়েকে তালাক দেয়া সহীহ্ হবে। আর তালাক তো সহীহ্ বিয়ের ক্ষেত্রেই হতে পারে। তাই আয়াতের এ তাৎপর্য রয়েছে যে, অল্প বয়সী মেয়েকে বিয়ে দেয়া সম্পূর্ণ জায়েয। তাছাড়া বাস্তব প্রমাণ হচ্ছে, রাসূলে করীম (স) হযরত আয়েশা (রা)-কে বিয়ে করেছিলেন যখন তাঁর বয়স মাত্র ছয় বছর। তাঁর পিতা হযরত আবূ বকর (রা)-ই তাঁকে বিয়ে দিয়েছিলেন। এ ঘটনার দুটি তাৎপর্য। একটি, ছোট বয়সের মেয়েকে তার পিতা বিয়ে দিতে পারে- সম্পূর্ণ জায়েয। আর দ্বিতীয় হচ্ছে, এই ছোট বয়সের মেয়ে পূর্ণবয়স্কা হয়ে সে বিয়ে রাখা-না-রাখার অধিকারিণী হবে না। তা বাধ্যতামূলক। কেননা নবী করীম (স) পূর্ণবয়স্কতা লাভের পর তাঁকে সে ইখতিয়ার দেন নি।

আল-মাবসুতে পিতার অভিভাবকত্বকে শক্তিশালী ধরে তার সম্পাদিত বিবাহে খিয়ার না থাকার ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পিতামহের ক্ষেত্রেও একই বিধান আলোচিত হয়েছে। অন্য আত্মীয় অভিভাবকের ক্ষেত্রে হানাফি ফিকহে বয়ঃসন্ধির পরে খিয়ার থাকতে পারে। ফলে “শিশুকে বিয়ে দিলেও বড় হয়ে সে সহজেই বেরিয়ে যাবে” বক্তব্যটি বাস্তব ফিকহি কাঠামোর সঙ্গে মেলে না।
কিছু মাযহাবি ও আধুনিক আলোচনায় বালেগ হওয়ার পরে মেয়েকে বিবাহ গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। [119]। কিন্তু এই সুযোগ শিশুবিবাহকে নৈতিকভাবে বৈধ করে না। শিশুর শৈশব, শরীর, সামাজিক পরিচয় এবং বৈবাহিক অবস্থার ওপর যে সিদ্ধান্ত আগেই চাপানো হয়েছে, পরবর্তী খিয়ার সেই ক্ষতি মুছে দিতে পারে না।
একটি আট বছরের মেয়েকে বিয়ে দেওয়া হলো, কয়েক বছর সে স্বামীর বৈবাহিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে থাকল, পরে তাকে বলা হলো এখন চাইলে বিবাহ প্রত্যাখ্যান করতে পারো। এই ব্যবস্থাকে শিশুর স্বাধীনতা বলা যায় না। স্বাধীনতার শুরু হওয়া উচিত আগে, শিশুকে বিবাহে ঢোকানো যাবে না।
প্রথমে শিশুর হয়ে তার জীবন নির্ধারণ করা, পরে বড় হলে বের হওয়ার সীমিত সুযোগ দেওয়া সম্মতির বিকল্প নয়। প্রকৃত অধিকার হলো সে নিজে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে কেউ তার হয়ে তার স্বামী নির্বাচন করতে পারবে না।
শিশুস্ত্রীর শরীর বিদীর্ণ হলে দিয়াত
শিশুবিবাহের ফিকহি বাস্তবতা সবচেয়ে নগ্ন হয়ে ওঠে সেই সব মাসআলায়, যেখানে ছোট স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসের ফলে তার শরীর বিদীর্ণ হয়ে গেলে কত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে তা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইবন কুদামার আল-মুগনি-তে সরাসরি এমন ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে যে তার ছোট স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করে তাকে বিদীর্ণ করেছে। সেখানে এক-তৃতীয়াংশ দিয়াতের বিধান উল্লেখ আছে। [120]।
ইবন কুদামা, আল-মুগনি
وَمَنْ وَطِئَ زَوْجَتَهُ، وَهِيَ صَغِيرَةٌ، فَفَتَقَهَا، لَزِمَهُ ثُلُثُ الدِّيَةِ
“যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে সহবাস করল যখন সে ছোট, এবং তাকে বিদীর্ণ করে ফেলল, তার ওপর এক-তৃতীয়াংশ দিয়াত আবশ্যক হবে।”
ফাতক বলতে যৌনপথ ও অন্য নালির মধ্যবর্তী প্রাচীর ছিঁড়ে যাওয়ার ভয়াবহ শারীরিক ক্ষতি বোঝানো হয়েছে। ফিকহি আলোচনায় মূত্রপথ ও যোনিপথের মাঝের অংশ অথবা যোনি ও মলদ্বারের মধ্যবর্তী অংশ ছিন্ন হওয়ার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এই ধরনের আঘাত আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভয়াবহ প্রসূতি ও যৌন আঘাতের সঙ্গে তুলনীয়।
আল-মুগনির পরবর্তী আলোচনায় ক্ষতিপূরণ বিশেষভাবে ছোট স্ত্রী অথবা এমন দুর্বল নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলা হয়েছে যার শরীর সহবাস সহ্য করতে পারে না। অর্থাৎ ফিকহ এমন একটি পরিস্থিতিকে বাস্তব আইনগত সমস্যা হিসেবে গ্রহণ করেছে যেখানে একটি স্ত্রী এত ছোট যে স্বামীর যৌনপ্রবেশ তার শরীর ছিঁড়ে দিতে পারে।
একটি সভ্য আইন শিশুর যোনি ছিঁড়ে গেলে কত টাকা দিতে হবে, সেই প্রশ্ন দিয়ে শুরু করে না। প্রথম বিধান হওয়া উচিত, এমন শিশুর শরীরে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের যৌনপ্রবেশের অধিকারই নেই।
দিয়াত ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর শরীর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেয় না। তার ব্যথা, স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি, মূত্রনিয়ন্ত্রণের সমস্যা, যৌন ও প্রজনন জটিলতা, মানসিক আঘাত, এসব কোনো অর্থমূল্যে মুছে যায় না। ফিকহ যখন ক্ষতির পর অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করছে, তখন মূল বিপর্যয় ইতিমধ্যে ঘটে গেছে।
শিশুগর্ভধারণ এবং মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি
অল্প বয়সে বিবাহের যৌন পরিণতির মধ্যে দ্রুত গর্ভধারণ অন্যতম। একটি মেয়ের ঋতুস্রাব শুরু হলে সে গর্ভধারণ করতে পারে, কিন্তু তার শরীর নিরাপদ গর্ভধারণ ও প্রসবের জন্য পূর্ণভাবে প্রস্তুত হয়ে যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরী মায়েদের এক্ল্যাম্পসিয়া, প্রসবপরবর্তী জরায়ুর সংক্রমণ এবং গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের তুলনায় বেশি। তাদের সন্তানদের কম জন্ম-ওজন, সময়ের আগে জন্ম এবং গুরুতর নবজাতক জটিলতার ঝুঁকিও বেশি। [121]।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, Adolescent pregnancy
১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরী মায়েদের এক্ল্যাম্পসিয়া, প্রসবপরবর্তী সংক্রমণ ও গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি, এবং তাদের শিশুদের অপরিণত জন্ম ও কম জন্ম-ওজনের ঝুঁকিও বেশি।
UNICEF শিশুবিবাহের সঙ্গে বিদ্যালয় থেকে ছিটকে যাওয়া, দ্রুত গর্ভধারণ, গার্হস্থ্য সহিংসতা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং সীমিত ভবিষ্যৎ সুযোগের সম্পর্কও চিহ্নিত করেছে। [122]। শিশুবধূ শুধু একজন অল্পবয়সী স্ত্রী নয়, প্রায়ই সে দ্রুতই অল্পবয়সী মা হয়ে যায়। শৈশব, শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত বিকাশ একই সঙ্গে সংকুচিত হয়।
প্রজননক্ষম হওয়া এবং নিরাপদ মাতৃত্বের উপযুক্ত হওয়া এক জিনিস নয়। একটি এগারো বছরের মেয়ে গর্ভধারণ করতে পারে, এই তথ্য তার শরীরের ওপর একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের যৌন অধিকারকে ন্যায়সঙ্গত করে না। বরং ঠিক উল্টো, তার শারীরিক ঝুঁকি আরও বেশি হওয়ায় তাকে আরও বেশি সুরক্ষা প্রয়োজন।
শিশুর শরীর সন্তান তৈরি করতে সক্ষম হলেই তাকে সন্তান তৈরির জন্য ব্যবহারযোগ্য মানুষ বলা যায় না। প্রজননক্ষমতা যৌনসম্মতির সনদ নয়।
শিশুবিবাহে সম্মতির ধারণা ভেঙে পড়ে
শিশুবিবাহের সবচেয়ে মৌলিক সমস্যা সম্মতি। একটি শিশুকে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে সে বিয়ে করতে চায় কি না, সে হয়তো “হ্যাঁ”ও বলতে পারে। কিন্তু স্বাধীন সম্মতির জন্য শুধু মুখে হ্যাঁ বলা যথেষ্ট নয়। সিদ্ধান্তটির অর্থ, ঝুঁকি, দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি এবং প্রত্যাখ্যানের স্বাধীনতা বুঝতে হয়। পরিবার, ধর্ম, অর্থনীতি এবং বয়সের ক্ষমতার ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ।
একজন শিশু যদি বাবার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারে, স্বামী তার চেয়ে বহু বছর বড় হয়, মেয়েটি আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়, বিবাহ ভাঙার আইনি জ্ঞান না থাকে এবং তাকে শেখানো হয় স্বামীর আনুগত্য ধর্মীয় কর্তব্য, তাহলে সেই কাঠামোর মধ্যে তার সম্মতি একজন স্বাধীন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সম্মতির সমান নয়।
শিশু নিজের জীবন সম্পর্কে অনেক কিছুই চায়, কিন্তু সমাজ সেই সব ইচ্ছাকে চূড়ান্ত আইনগত সম্মতি বলে মানে না। একটি দশ বছরের শিশু গাড়ি চালাতে চাইতে পারে, ঋণ নিতে চাইতে পারে, স্থায়ী চুক্তি করতে চাইতে পারে। আইন তাকে এসব থেকে সুরক্ষা দেয় কারণ সে দীর্ঘমেয়াদি ফল বোঝার মতো পরিপক্ব নয়। যৌন ও বৈবাহিক সম্পর্ক এর চেয়ে কম গুরুতর নয়, বরং অনেক বেশি।
একটি শিশুর “হ্যাঁ”কে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের যৌন অধিকারের বৈধতা বানানো শিশুর সম্মান নয়। শিশুর অধিকার হলো এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগে তাকে সেই সিদ্ধান্তের মধ্যে ঠেলে না দেওয়া।
শিশুবিবাহের সামগ্রিক কাঠামো
শিশুবিবাহের ইসলামী কাঠামোর সব দলিল পাশাপাশি রাখলে একটি ধারাবাহিক চিত্র পাওয়া যায়। কোরআন ঋতুস্রাব শুরু না হওয়া স্ত্রীর ইদ্দত নির্ধারণ করেছে। বুখারি সেই আয়াতকে নাবালিকা বিবাহের অধ্যায়ে ব্যবহার করেছে। মুহাম্মদ ছয় বছর বয়সে আয়িশাকে বিয়ে করেছে এবং নয় বছর বয়সে তার সঙ্গে বাসর করেছে। পিতা অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাকে বিয়ে দিতে পারে। সহবাসের ক্ষেত্রে সর্বত্র বয়ঃসন্ধি শর্ত নয়; বরং মেয়েটি যৌনপ্রবেশ সহ্য করতে পারবে কি না, এমন শারীরিক মানদণ্ডও ব্যবহৃত হয়েছে। ছোট স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসে শরীর বিদীর্ণ হয়ে গেলে দিয়াতের পরিমাণ নিয়ে ফিকহি আলোচনা আছে। এই দলিলগুলো মিলিয়ে ফলাফল স্পষ্ট: ধ্রুপদী ইসলামী আইনে শিশুবিবাহ শুধু সামাজিক ঘটনা নয়, আইনি বৈধতার বিষয়; এবং শিশুর সঙ্গে সহবাসের প্রশ্নও সরাসরি ফিকহের আলোচনায় এসেছে।
এই কাঠামোতে শিশুর জীবনের প্রশ্নগুলো উল্টোভাবে সাজানো হয়েছে। প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল, একটি শিশু আদৌ স্ত্রী হতে পারে কীভাবে। ফিকহ জিজ্ঞেস করেছে, কে তাকে বিয়ে দিতে পারবে। প্রথম বিধান হওয়া উচিত ছিল, শিশুর শরীরে প্রাপ্তবয়স্কের যৌনপ্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফিকহ আলোচনা করেছে, কখন তার শরীর সহবাস সহ্য করতে পারবে। প্রথমেই থামানো উচিত ছিল এমন সহবাসের বৈধতা। ফিকহ হিসাব করেছে, সহবাসে শিশুর শরীর ছিঁড়ে গেলে কত দিয়াত দিতে হবে।
এখানেই আধুনিক শিশু-অধিকার এবং ধ্রুপদী ইসলামী যৌন আইনের সংঘর্ষ সবচেয়ে নগ্ন। শিশু-অধিকারের নীতি শিশুকে প্রাপ্তবয়স্কের যৌন নাগাল থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেয়। এই ফিকহি কাঠামো শিশুকেই স্ত্রী হিসেবে সেই নাগালের মধ্যে নিয়ে আসে, তারপর তার শরীর কতটা ক্ষতি সহ্য করতে পারবে সেই হিসাব করে। এটি সুরক্ষা নয়; এটি শিশুর শরীরকে বৈবাহিক যৌন অধিকারের অধীন করা।
একটি শিশুর জন্য ন্যায়সঙ্গত আইন হলো তাকে বিয়ের উপযুক্ত ঘোষণা করা নয়, তাকে শৈশব দেওয়া। স্বামীর যৌন অধিকার কখন শুরু হবে তা নির্ধারণ করা নয়, প্রাপ্তবয়স্কের যৌন অধিকার থেকেই শিশুকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া। শরীর ছিঁড়ে গেলে দিয়াতের অঙ্ক করা নয়, এমন সহবাসকে শুরু থেকেই নিষিদ্ধ বলা। যে আইন এই প্রথম কথাটি বলতে পারে না, সেই আইন শিশুকে রক্ষা করে না; শিশুকে বৈধ যৌন প্রবেশের ঝুঁকির ভেতরে রাখে।
শিশুবিবাহ, আয়িশার বয়স, পিতার হাতে নাবালিকা বিবাহ, বয়ঃসন্ধির আগের সহবাস, খিয়ারুল বুলুগ এবং শিশুস্ত্রীর শরীর বিদীর্ণ হওয়ার ফিকহ—এসব বিষয়ে সংশয় জ্ঞানকোষের শিশুবিবাহ বিভাগে আলাদা দলিলভিত্তিক আলোচনা রয়েছে। এই প্রবন্ধে মূল সিদ্ধান্তটি সংক্ষেপে দাঁড়ায়: ইসলামী উৎস ও ধ্রুপদী ফিকহে শিশুবিবাহ এবং নির্দিষ্ট অবস্থায় শিশুর সঙ্গে বৈবাহিক সহবাসের বৈধতা সরাসরি আলোচিত হয়েছে; এটি কোনো আধুনিক সমালোচকের বানানো অভিযোগ নয়। [123]
তালাক, খুলা, হিল্লা ও ইদ্দত
ইসলামী বিবাহবিচ্ছেদের কাঠামোতেও স্বামী ও স্ত্রী সমান ক্ষমতার অধিকারী নয়। স্বামী সরাসরি তালাক উচ্চারণের ক্ষমতা পায়। স্ত্রী একইভাবে স্বামীকে তালাক দিয়ে বিবাহ শেষ করতে পারে না। তাকে খুলা চাইতে হয়, পারস্পরিক বিচ্ছেদে যেতে হয়, বিচারিক বিচ্ছেদের কারণ দেখাতে হয়, অথবা স্বামী আগে থেকে তালাকের ক্ষমতা তার হাতে অর্পণ করলে সেই ক্ষমতা ব্যবহার করতে হয়। অর্থাৎ পুরুষের বিচ্ছেদের ক্ষমতা বিবাহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, নারীর বিচ্ছেদের পথ শর্ত, প্রতিদান, পারস্পরিক সম্মতি, বিচারক অথবা স্বামীর অর্পিত ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত।
এই বৈষম্য তিন তালাকের পর আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। স্বামী চূড়ান্তভাবে তালাক দিলে আগের স্বামীর কাছে ফিরে যেতে চাইলে নারীকে অন্য একজন পুরুষকে সত্যিকারভাবে বিয়ে করতে হবে, সেই দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করতে হবে, দ্বিতীয় বিবাহ শেষ হতে হবে, তারপর ইদ্দত পার করে প্রথম স্বামীকে আবার বিয়ে করা সম্ভব হবে। তালাক উচ্চারণ করেছে পুরুষ, কিন্তু সেই তালাকের চূড়ান্ত ফল সংশোধনের জন্য অন্য পুরুষের সঙ্গে বিবাহ ও যৌনসম্পর্কের শারীরিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় নারীকে।
বিবাহ শেষ হওয়ার পরও নিয়ন্ত্রণ নারীর শরীর ছেড়ে যায় না। তালাকপ্রাপ্তা নারীকে নির্দিষ্ট সময় ইদ্দত পালন করতে হয়, গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে বা এখনো ঋতুস্রাব শুরু না হলে তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়, স্বামী মারা গেলে চার মাস দশ দিন ইদ্দত ও শোকপালন করতে হয়। বিধবা নারীকে এই সময়ে সাজসজ্জা, সুগন্ধি এবং প্রসাধন থেকেও বিরত রাখা হয়। স্ত্রী মারা গেলে স্বামীর ওপর একই সময়ের বাধ্যতামূলক শোক, সাজসজ্জা বর্জন বা নতুন বিবাহে সমান অপেক্ষা নেই। ইসলামী বিবাহে পুরুষের হাতে প্রধান বিচ্ছেদক্ষমতা, আর বিচ্ছেদের পরে নারীর শরীর, সময়, যৌনতা ও পুনর্বিবাহের ওপর দীর্ঘতর বিধিনিষেধ। এখানেও ক্ষমতা এবং বোঝা সমানভাবে বণ্টিত নয়।
স্বামীর একতরফা তালাকের ক্ষমতা
কোরআনের তালাকের বিধান সরাসরি পুরুষকে তালাকদাতা হিসেবে সম্বোধন করে। সূরা আল-বাকারা ২:২২৯-এ বলা হয়েছে, তালাক দুইবার, এরপর স্ত্রীকে ভালোভাবে রেখে দেওয়া অথবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেওয়া। সূরা আত-তালাক ৬৫:১-এ পুরুষদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, “তোমরা যখন নারীদের তালাক দাও, তখন তাদের ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দাও।” [124] [125]। কোরআনের ভাষাতেই কর্তৃত্বের দিকটি পরিষ্কার, পুরুষ তালাক দেয়, নারী তালাকপ্রাপ্তা হয়।
কোরআন, সূরা আল-বাকারা ২:২২৯
“তালাক দুইবার। এরপর হয় বিধিমত রেখে দেবে, অথবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে।”
ধ্রুপদী ফিকহে স্বামীর তালাকের জন্য স্ত্রীর সম্মতি প্রয়োজন নেই। স্ত্রী বিচ্ছেদ চাইছে কি না, তালাকের সিদ্ধান্তে সে একমত কি না, এগুলো তালাক কার্যকর হওয়ার মৌলিক শর্ত নয়। স্বামী তালাক কার্যকর করতে পারে নিজের সিদ্ধান্তে। স্ত্রীর হাতে একই স্বয়ংক্রিয় ক্ষমতা নেই। সে স্বামীকে “তালাক দিলাম” বললেই বিবাহ শেষ হয় না, যদি না স্বামী আগে সেই ক্ষমতা তাকে অর্পণ করে থাকে।
এখানেই বিবাহের ক্ষমতার মৌলিক অসমতা। দুইজন মানুষ বিবাহে প্রবেশ করেছে, কিন্তু সম্পর্ক ভাঙার প্রাথমিক ক্ষমতা একজনের হাতে সরাসরি, অন্যজনের হাতে নয়। স্বামী স্ত্রীকে আর রাখতে না চাইলে তার জন্য স্ত্রীর অপরাধ প্রমাণ করতে হয় না, বিচারকের সামনে নির্যাতনের দলিল হাজির করতে হয় না, মোহর ফেরত নিতে স্ত্রীর সঙ্গে দরকষাকষি করতে হয় না। সে তালাকের ক্ষমতার মালিক।
একই চুক্তির দুই পক্ষের একজন নিজের সিদ্ধান্তে সম্পর্ক শেষ করতে পারে, আর অন্যজনকে বের হওয়ার জন্য আলাদা পথ খুঁজতে হয়। এটিই ইসলামী তালাকব্যবস্থার প্রথম এবং সবচেয়ে মৌলিক লিঙ্গবৈষম্য। আসুন মুফতি ইব্রাহিমের বক্তব্য শুনি,
এবারে আসুন এই বিধানটি আরও স্পষ্টভাবে দেখা যাক, [126] –
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
অধ্যায়ঃ পর্ব-১৩ঃ বিবাহ
পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি
পরিচ্ছদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ – খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৭৯-(৬) সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে রমণী বিনা কারণে স্বামীর নিকট তালাক চায়, সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না। (আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ, দারিমী)(1)
(1) সহীহ : আবূ দাঊদ ২২২৬, তিরমিযী ১১৮৭, ইবনু মাজাহ ২৫০০, দারিমী ১৩১৬, আহমাদ ২২৪৪০, ইরওয়া ২০৩৫, সহীহ আল জামি‘ ২৭০৬, সহীহ আত্ তারগীব ২০১৮।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
ব্যাখ্যাঃ
ব্যাখ্যা: তালাক স্বামীর অধিকার, স্ত্রীর নয়। স্ত্রীর সঙ্গত কারণ থাকলে খুলা‘র মাধ্যমে সে স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন হবে। কোনো মহিলা একান্ত কারণ ছাড়া স্বামীর কাছ থেকে তালাক প্রার্থনা করবে না। কোনো কোনো বর্ণনায় এ কথাও এসেছে, কোনো মহিলা নিজের জন্য অথবা অন্যের জন্য তালাক প্রার্থনা করবে না।
যে নারী বিনা কারণে তার স্বামীর কাছে তালাক প্রার্থনা করবে তার জন্য জান্নাতের ঘ্রাণ হারাম অর্থাৎ জান্নাতে প্রবেশ নিষিদ্ধ। এটা ভীতি ও ধমকিমূলক বাক্য। মুহসিন বা নেককারগণ যেমন প্রথম ধাপেই জান্নাতের সুঘ্রাণ পাবেন তারা সেই সুঘ্রাণ পাবে না। ‘আল্লামা কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ এটাও হতে পারে যে, যদি সে জান্নাতে প্রবেশ করে তবে সুঘ্রাণ থেকে বঞ্চিত থাকবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
এবারে আসুন দেখে নেয়া যাক, তাফসীরে মা’আরেফুল কোরআনে কী বলা আছে, [127] –
ودرو
-এর তফসীর রসূল (সা) নিজে বর্ণনা করেছেন: النِّكَاحِ بيده عقدة الذي بيده
ولى عقدة النكاح الزوج
দারুকুতনী গ্রন্থে আমর ইবনে শো’আইব তাঁর পিতা থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন। আর হযরত আলী (রা) এবং ইবনে আব্বাস (রা) হতেও উদ্ধৃত করেছেন।
-(কুরতুবী)
এতে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, বিয়ে সমাধা হওয়ার পর তা বহাল রাখা বা ভঙ্গ করার মালিক স্বামী। সে-ই তালাক দিতে পারে। স্ত্রীলোকের পক্ষে তালাক দেওয়ার সুযোগ সীমিত।

আসুন ফিকহে ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু গ্রন্থ থেকে তৃতীয় খলিফা ওসমানের সময়ে আইনটি দেখে নিই, [128]
এ প্রেক্ষিতে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে-তালাক মহিলাদের ওপর কার্যকর হয় কোনো পুরুষের ওপর হয় না। এজন্য ততক্ষণ তা কার্যকরী হয় না যতক্ষণ তা নির্দিষ্ট করে দেয়া না হয়। যদি
কেউ তার স্ত্রীকে বলে- أنا منك طالق “আমি তোমার থেকে তালাক গ্রহণ করলাম।”
অথবা তালাকের ক্ষমতা স্ত্রীকে প্রদানের পর বললো- أنت طالق “তোমাকে তালাক।”
তো একথার প্রেক্ষিতে তালাক সংঘটিত হবে না। আবার যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো পুরুষকে তালাক দেয় তবু তালাক হবে না। কারণ তালাক কার্যকর হয় মহিলাদের ওপর। ২৭
হযরত ওসমান (রা)-এর সময়ের ঘটনা। মুহাম্মদ ইবনু আবদুর রহমান ইবনু আবু বকর (রা) তার স্ত্রী রমীসা ফারাসিয়াকে তালাক দানের ক্ষমতা অর্পণ করে রেখেছিলেন। তিনি তাকে
বললেন – أنت طالق ثلاث مرات “তোমাকে তিনবার তালাক দেয়া হলো।”
এ মামলার রায়ে হযরত ওসমান (রা) বললেন-মহিলা এরূপ বলে ভুল করেছে। কারণ মহিলাতো তালাক দিতে পারে না (বরং তালাক গ্রহণ করতে পারে)। ২৮

এবারে আসুন একটি ফতোয়া দেখে নিই [129] –
স্ত্রী স্বামীকে কোনো অবস্থায়ই তালাক দিতে পারে না
প্রশ্ন: আমার স্ত্রী স্বপ্নে দেখেছে যে সে আমাকে তালাক দিচ্ছে। আর এমনিতেও তার সাথে অনেক দিন যাবৎ একটা খারাপ আছর আছে, এটা উঠলে তার আর হুঁশ থাকে না। আবোলতাবোল কথা বলতে থাকে। “তোমাকে তালাক দেব”-এ ধরনের তালাকের কথা বলতে থাকে। আর সেটা যদি চলে যায় তখন সে অজ্ঞান অবস্থায় অনেকক্ষণ পড়ে থাকে। জ্ঞান ফিরলে সে বলে, ‘না, আমি তোমাকে তালাক দেব কেন? আমার দুই ছেলে আছে, স্বামী আছে, কী বলো এগুলো?’ এ ক্ষেত্রে তালাক হবে কি না?
উত্তর: ইসলামী শরীয়তে একমাত্র স্বামীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে, মহিলাকে নয়। তাই উল্লিখিত মাসআলায় মহিলা স্বপ্নে হোক বা জাগ্রত অবস্থায়, সচেতন হোক বা অজ্ঞান অবস্থায়, স্বামীকে তালাক দিলে তা পতিত হবে না। (১৭/৬৪৮/৭২৩৯)

প্রত্যাহারযোগ্য তালাক এবং ইদ্দতের মধ্যে স্বামীর ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা
প্রথম ও দ্বিতীয় তালাকের ক্ষেত্রে ইসলামী আইনে তালাক রাজঈ, অর্থাৎ প্রত্যাহারযোগ্য তালাকের ব্যবস্থা আছে। কোরআন ২:২২৮-এ তালাকপ্রাপ্তা নারীকে তিন কুরু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে এবং একই আয়াতে বলা হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে স্বামীরা পুনর্মিলন চাইলে তাদের স্ত্রীদের ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকতর অধিকার রাখে। [60]।
কোরআন, সূরা আল-বাকারা ২:২২৮
তালাকপ্রাপ্তা নারীরা তিন কুরু পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। এরপর বলা হয়েছে, “এই সময়ের মধ্যে তাদের স্বামীরা তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকতর হকদার, যদি তারা সংশোধন কামনা করে।”
অর্থাৎ তালাক উচ্চারণ করেছে স্বামী, আবার প্রথম দুই প্রত্যাহারযোগ্য তালাকের ইদ্দতের মধ্যে সে রুজু করে বিবাহ পুনরায় চালু করতে পারে। ধ্রুপদী ফিকহে রুজুর পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত বিধান রয়েছে। স্ত্রীকে প্রথমে তালাক দিয়ে সম্পর্কের অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা এবং পরে ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রও স্বামী।
কোরআন ২:২৩১ এই ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে সতর্ক করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইদ্দতের শেষ পর্যায়ে স্ত্রীকে হয় ভালোভাবে রেখে দাও, নয়তো ভালোভাবে ছেড়ে দাও, ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে আটকে রেখো না। [130]। এই নির্দেশের প্রয়োজনই দেখায় তালাক এবং রুজুর ক্ষমতা নারীকে ঝুলিয়ে রাখার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব ছিল।
পুরুষ প্রথমে সম্পর্ক ভাঙে, তারপর অপেক্ষাকালের মধ্যে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের বিশেষ ক্ষমতাও তার হাতে থাকে। নারী সেই সময় নিজের পরবর্তী বিবাহ শুরু করতে পারে না। ফলে তালাকের পরের মধ্যবর্তী সময়টিও পুরুষ ও নারীর জন্য সমান স্বাধীনতার সময় নয়।
নারীর বিচ্ছেদের পথ, খুলা
স্বামীকে আর সহ্য করতে না পারলে নারীর সবচেয়ে পরিচিত বিচ্ছেদপথ হলো খুলা। সহিহ বুখারিতে সাবিত ইবন কায়সের স্ত্রীর ঘটনা রয়েছে। নারী মুহাম্মদের কাছে এসে বলে, সাবিতের চরিত্র বা ধর্ম নিয়ে তার অভিযোগ নেই, কিন্তু সে তার সঙ্গে আর সংসার করতে চায় না। মুহাম্মদ তাকে জিজ্ঞেস করে, সাবিত মোহর হিসেবে যে বাগান দিয়েছিল সে তা ফেরত দেবে কি না। নারী সম্মতি দিলে মুহাম্মদ সাবিতকে বলে, বাগান গ্রহণ কর এবং তাকে এক তালাক দিয়ে দাও। [131]।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৮/ তালাক
৫২৭৩। সাবিত ইবনু কায়সের স্ত্রী মুহাম্মদের কাছে এসে বলে, “চরিত্রগত বা দ্বীনি বিষয়ে সাবিতের ওপর আমি দোষারোপ করছি না, কিন্তু আমি তার সঙ্গে সংসার করতে পারছি না।” মুহাম্মদ বলে, “তুমি কি তার বাগানটি ফিরিয়ে দেবে?” নারী বলে, হ্যাঁ। তখন মুহাম্মদ সাবিতকে বলে, “বাগানটি গ্রহণ কর এবং তাকে এক তালাক দিয়ে দাও।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
ঘটনাটির ক্ষমতার কাঠামো খুবই স্পষ্ট। স্ত্রী এই বিবাহ আর চায় না। তার স্বামীর বিরুদ্ধে চরিত্রহীনতা, ধর্মহীনতা বা নির্যাতনের অভিযোগও নেই। সে শুধু এই পুরুষের সঙ্গে থাকতে চায় না। কিন্তু সে স্বামীর মতো দাঁড়িয়ে সরাসরি বিবাহ শেষ করছে না। তাকে নিজের প্রাপ্ত বাগান ফেরত দিতে হচ্ছে, তারপর মুহাম্মদ স্বামীকে তালাক দিতে বলছে।
কোরআন ২:২২৯-এও স্ত্রী নিজের মুক্তির জন্য কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার ভিত্তি রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, স্বামী ও স্ত্রী আল্লাহর সীমা রক্ষা করতে না পারার আশঙ্কা করলে স্ত্রী বিনিময়ে কিছু দিয়ে মুক্তি নিলে তাদের ওপর অপরাধ নেই। [124]। খুলার আর্থিক কাঠামোর মূল এখানেই।
স্বামীর তালাক এবং স্ত্রীর খুলার পার্থক্য সংখ্যায় লেখা যায়। স্বামী সম্পর্ক আর চাইছে না, সে তালাক দেয়। স্ত্রী সম্পর্ক আর চাইছে না, তার কাছে মোহর বা অন্য বিনিময় ফেরতের প্রশ্ন আসে এবং বিচ্ছেদের আলাদা প্রক্রিয়া শুরু হয়। পুরুষের স্বাধীনতা সম্পর্ক শেষ করার ক্ষমতা, নারীর স্বাধীনতা নিজের প্রাপ্ত সম্পদ ফিরিয়ে দিয়ে মুক্তি কেনার পথে ঠেলে দেওয়া হতে পারে।
মুবারাত, উভয়ের সম্মতি ছাড়া বিচ্ছেদ নয়
নারীর বিচ্ছেদের আরেকটি পথ মুবারাত। এখানে স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই সম্পর্ক শেষ করতে সম্মত হয় এবং পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে বিবাহ শেষ করে। এই ব্যবস্থায় নারী বিচ্ছেদ পেতে পারে, কিন্তু এর শক্তি একতরফা নয়। স্বামীও বিচ্ছেদে সম্মত, তাই সম্পর্ক ভাঙে।
মুবারাতের সঙ্গে স্বামীর তালাকের পার্থক্য খুব পরিষ্কার। স্বামী নিজের একতরফা তালাকের জন্য স্ত্রীর সম্মতি চায় না। কিন্তু মুবারাতের অস্তিত্বই দুই পক্ষের সমঝোতার ওপর নির্ভরশীল। স্ত্রী একাই মুবারাত ঘোষণা করে অনিচ্ছুক স্বামীর সঙ্গে বিবাহ শেষ করে দিতে পারে না।
সমঝোতামূলক বিচ্ছেদ নিজে অস্বাভাবিক কিছু নয়। আধুনিক আইনেও পারস্পরিক বিচ্ছেদ থাকে। সমস্যাটি তৈরি হয় যখন একই ব্যবস্থায় পুরুষের জন্য পারস্পরিক সম্মতি ছাড়াই আলাদা একতরফা দরজা রাখা হয়, কিন্তু নারীকে সেই সমান দরজা দেওয়া হয় না।
পুরুষের হাতে একতরফা তালাক রেখে নারীর জন্য “তোমরা দুজন রাজি হলে বিচ্ছেদ করতে পারো” বলা সমান ক্ষমতা নয়। একজনের কাছে নিজের দরজার চাবি, অন্যজনের কাছে যৌথ দরজার অনুমতি।
তালাক-ই তাফওয়িজ, স্বামী ক্ষমতা দিলে স্ত্রী তালাক দিতে পারে
ইসলামী আইনে তালাক-ই তাফওয়িজ বা অর্পিত তালাকের ব্যবস্থাও রয়েছে। স্বামী বিবাহচুক্তির সময় অথবা পরে নিজের তালাকের ক্ষমতার একটি অংশ স্ত্রীকে অর্পণ করতে পারে। নির্ধারিত শর্ত ঘটলে স্ত্রী সেই অর্পিত ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের ওপর তালাক কার্যকর করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম পারিবারিক আইনে এই ব্যবস্থা বিশেষ পরিচিত।
এই ব্যবস্থার নামই এর ক্ষমতার উৎস প্রকাশ করে। এটি স্ত্রীর জন্মগত ও সমান্তরাল তালাকক্ষমতা নয়, স্বামীর তাফওয়িজ, অর্থাৎ অর্পণ। পুরুষের হাতে থাকা ক্ষমতা সে স্ত্রীকে ব্যবহার করতে দিয়েছে। বিবাহচুক্তিতে এই শর্ত রাখা নারীর জন্য বাস্তব সুরক্ষা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করলে, ভরণপোষণ বন্ধ করলে অথবা নির্দিষ্ট শর্ত ভঙ্গ করলে। কিন্তু যে ক্ষমতা স্বামীর অর্পণ ছাড়া তার হাতে আসে না, সেটিকে স্বামীর নিজের মূল তালাকক্ষমতার সমান বলা যায় না।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের বিবাহ শেষ করার জন্য স্ত্রীকে আগে থেকে ক্ষমতা দিতে হয় না। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর একই ক্ষমতা ব্যবহারের জন্য চুক্তিতে স্বামীর অর্পণ প্রয়োজন হতে পারে। নারীর তালাকের ক্ষমতা যদি পুরুষের দেওয়া ক্ষমতা হয়, তাহলে ক্ষমতার আসল মালিক কে, উত্তরটি ব্যবস্থার নামের মধ্যেই লেখা আছে।
বিচ্ছেদ চাওয়ার ওপর ধর্মীয় হুমকি
নারীর জন্য খুলার পথ থাকলেও সেই পথের ওপর ধর্মীয় চাপও আরোপ করা হয়েছে। সুনান আবু দাউদ ও তিরমিজিতে মুহাম্মদ বলেছেন, যে নারী কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া স্বামীর কাছে বিচ্ছেদ চায়, তার জন্য জান্নাতের সুগন্ধ হারাম। [132] [133]।
এখানে “কারণ ছাড়া” কথাটি গুরুত্বপূর্ণ; হাদিসটি নির্যাতিত বা যথার্থ কারণ থাকা নারীর বিচ্ছেদের অধিকার সরাসরি বাতিল করে না। কিন্তু ক্ষমতার অসমতা এখানেই স্পষ্ট: স্বামীর হাতে তালাকের মৌলিক একতরফা ক্ষমতা রয়েছে, আর নারীর বিচ্ছেদ চাওয়ার ওপর অতিরিক্ত ধর্মীয় ভয়ও বসানো হয়েছে। ফলে বিবাহ থেকে বের হওয়ার ক্ষমতা দুই পক্ষের হাতে একই আইনি ও ধর্মীয় কাঠামোয় রাখা হয়নি।
স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্ত্রীর সামনে খুলার দরজা
বহুবিবাহের পরিচ্ছেদে দেখা গেছে, স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নিতে বাধ্য নয়। প্রথম স্ত্রী সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না চাইলে তার অবস্থান আবার তালাকের অসম ক্ষমতার মধ্যে ফিরে আসে। সে নিজের স্বামীকে সরাসরি তালাক দিয়ে বলতে পারে না, “তুমি দ্বিতীয় বিয়ে করেছ, তাই আমি তোমাকে তালাক দিলাম।” তাকে খুলা, বিচারিক বিচ্ছেদ অথবা চুক্তিতে থাকা অর্পিত তালাকের পথ ব্যবহার করতে হতে পারে।
IslamQA-র একটি ফতোয়ায় স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহের কারণে স্ত্রী বিচ্ছেদ চাইলে খুলার পথের কথা বলা হয়েছে এবং মোহর ফেরতের প্রশ্ন এসেছে। [134]। ফলে একই ঘটনায় পুরুষের অধিকার এবং নারীর প্রতিক্রিয়ার ক্ষমতা ভিন্ন। পুরুষ নতুন স্ত্রী এনে বিদ্যমান বিবাহের কাঠামো একতরফাভাবে বদলাতে পারে। প্রথম স্ত্রী সেই পরিবর্তন প্রত্যাখ্যান করলে তার করণীয় নতুন বিবাহ বাতিল করা নয়, নিজের বিবাহ থেকে বের হওয়ার পথ খোঁজা।
এখানে নারীর ওপর দ্বিগুণ মূল্য পড়ে। প্রথমে তার স্বামী তার সম্মতি ছাড়াই আরেক নারীকে বিয়ে করে তার সংসারের সময়, অর্থ, যৌনতা এবং পারিবারিক কাঠামো বদলে দেয়। তারপর নারী সেই জীবন মেনে নিতে না চাইলে তার নিজের বিবাহ ছাড়ার জন্য আলাদা প্রক্রিয়া, আর্থিক ত্যাগ বা বিচারিক লড়াই লাগতে পারে।
পুরুষ সম্পর্ক সম্প্রসারণের স্বাধীনতা পায়। নারী সেই সম্প্রসারণ সহ্য না করলে সম্পর্ক ত্যাগ করার মূল্য দেয়। বহুবিবাহ এবং তালাকের দুই বিধান একসঙ্গে পড়লে নারীর ক্ষমতার সীমাটি আরও পরিষ্কার হয়।
তৃতীয় তালাকের পর আগের স্বামীর কাছে ফেরা
কোরআন ২:২৩০-এ বলা হয়েছে, স্বামী স্ত্রীকে তৃতীয়বার তালাক দিলে সে নারী আর তার জন্য বৈধ থাকবে না, যতক্ষণ না সে অন্য একজন স্বামীকে বিয়ে করে। দ্বিতীয় স্বামী পরে তাকে তালাক দিলে প্রথম স্বামী ও নারী আবার বিবাহ করতে পারে। [135]।
কোরআন, সূরা আল-বাকারা ২:২৩০
“অতঃপর সে যদি তাকে তালাক দেয়, তবে সে নারী তার জন্য হালাল হবে না যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিয়ে করে। এরপর সেই স্বামীও যদি তাকে তালাক দেয়, তবে তারা দুজন আবার একত্র হলে তাদের কোনো অপরাধ নেই।”
দ্বিতীয় বিবাহের কাগজে স্বাক্ষর করলেই এই শর্ত পূরণ হয় না। সহিহ বুখারিতে রিফাআ আল-কুরাযীর স্ত্রীর ঘটনা রয়েছে। রিফাআ তাকে চূড়ান্ত তালাক দেওয়ার পর নারী আবদুর রহমান ইবন যুবাইরকে বিয়ে করে। পরে সে প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যেতে চাইলে মুহাম্মদ স্পষ্ট করে বলে, দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে পূর্ণ যৌনসম্পর্ক না হওয়া পর্যন্ত সে রিফাআর কাছে ফিরতে পারবে না। [136]।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
২৬৩৯। রিফাআর স্ত্রী প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যেতে চাইলে মুহাম্মদ বলে, “না, তা হবে না, যতক্ষণ না তুমি তার মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে আর সে তোমার মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
“মধুর স্বাদ” এখানে যৌনসম্পর্কের রূপক। শুধু দ্বিতীয় স্বামীকে বিয়ে করা নয়, তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক সম্পন্ন হওয়া আবশ্যক। এরপর সেই দ্বিতীয় বিবাহ সত্যিকারভাবে শেষ হতে হবে। তারপর নারী ইদ্দত পার করে প্রথম স্বামীর সঙ্গে নতুন বিবাহ করতে পারে।
পুরুষ তিন তালাক দিয়ে সম্পর্কের দরজা বন্ধ করেছে। পরে দুজনেই আবার একত্র হতে চাইলে প্রথম পুরুষকে অন্য নারীর সঙ্গে যৌনসম্পর্কের মধ্য দিয়ে যেতে হয় না। নারীকে অন্য পুরুষের স্ত্রী হতে হয়, তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করতে হয়, সেই সম্পর্ক শেষ করতে হয়, তারপর অপেক্ষা করতে হয়। তিন তালাক পুরুষের মুখ থেকে বের হয়, কিন্তু সেই তালাকের অপরিবর্তনীয় ফল সংশোধনের শারীরিক মূল্য নারীর শরীর বহন করে।
পরিকল্পিত হিল্লা, মুহাল্লিল এবং “ভাড়া করা পাঠা”
তিন তালাকের পর প্রথম স্বামীর কাছে ফেরানোর উদ্দেশ্যে আগে থেকেই পরিকল্পনা করে অন্য পুরুষকে অস্থায়ীভাবে বিয়ে করা তাহলিল বা প্রচলিত ভাষায় হিল্লা বিবাহ নামে পরিচিত। হাদিসে এই পরিকল্পিত ব্যবস্থাকে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে। মুহাম্মদ মুহাল্লিল, অর্থাৎ যে পুরুষ নারীকে প্রথম স্বামীর জন্য হালাল করার উদ্দেশ্যে বিয়ে করে এবং মুহাল্লাল লাহু, অর্থাৎ যে প্রথম স্বামীর জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়, উভয়ের ওপর অভিশাপ দিয়েছে। [137]।
মিশকাতুল মাসাবীহ
৩২৯৬। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুহাম্মদ মুহাল্লিল এবং মুহাল্লাল লাহুর ওপর অভিশাপ দিয়েছে। হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাল্লিলকে এমন পুরুষ বলা হয়েছে যে তিন তালাকপ্রাপ্তা নারীকে বিয়ে করে এবং সহবাসের পর তালাক দেয়, যাতে সে আগের স্বামীর জন্য পুনরায় বৈধ হয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
মিশকাতের ব্যাখ্যায় এই পুরুষকে “ভাড়া করা পাঠা”র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো এমন সাজানো বিবাহের অপমানজনক চরিত্র বোঝানো। কিন্তু এই নিন্দা তিন তালাকের পর দ্বিতীয় স্বামী এবং বাস্তব যৌনসম্পর্কের শর্ত তুলে দেয়নি। বরং সাজানো একরাতের চুক্তিকে নিন্দা করে সত্যিকারের দ্বিতীয় বিবাহের দাবি আরও শক্ত করেছে।
অর্থাৎ নারী প্রথম স্বামীর কাছে ফিরতে চাইলে তাকে কোনো নামমাত্র পুরুষকে এক রাতের জন্য স্বামী বানিয়ে কাগজে শর্ত পূরণ করলেই হবে না। দ্বিতীয় বিবাহকে সত্যিকারের বিবাহ হতে হবে এবং যৌনসম্পর্ক ঘটতে হবে। সেই বিবাহের পরিণতিও স্বাভাবিকভাবে বিচ্ছেদে পৌঁছাতে হবে।
পরিকল্পিত হিল্লাকে অভিশপ্ত বলা হয়েছে, কিন্তু নারীর শরীরকে দ্বিতীয় স্বামীর যৌনসম্পর্কের মধ্য দিয়ে প্রথম স্বামীর জন্য পুনরায় বৈধ করার মূল বিধান অক্ষত। সমস্যাটি কেবল সাজানো হিল্লা নয়, সমস্যাটি সেই আইন যা প্রথম স্বামীর কাছে ফেরার দরজায় অন্য পুরুষের যৌনসম্পর্ককে বাধ্যতামূলক শর্ত বানিয়েছে।
তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত
বিবাহ শেষ হওয়ার পর নারী সঙ্গে সঙ্গে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারে না। কোরআন ২:২২৮-এ তালাকপ্রাপ্তা নারীকে তিন কুরু অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। কুরু-এর অর্থ ঋতুস্রাব নাকি ঋতুশুদ্ধির সময়, এ নিয়ে ফিকহি তর্ক আছে; কিন্তু নারীর ওপর অপেক্ষার বাধ্যবাধকতা নিয়ে দ্বিমত নেই। [60]।
সূরা আত-তালাক ৬৫:৪-এ যাদের ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেছে এবং যাদের এখনো ঋতুস্রাব হয়নি, তাদের জন্য তিন মাসের ইদ্দত নির্ধারণ করা হয়েছে। গর্ভবতী নারীর ইদ্দত সন্তান প্রসব পর্যন্ত। [106]। শিশুবিবাহের পরিচ্ছেদে দেখা গেছে, “যাদের এখনো ঋতুস্রাব হয়নি” অংশটিই নাবালিকা স্ত্রীর বিবাহ ও সহবাসের ফিকহি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
কোরআন, সূরা আত-তালাক ৬৫:৪
যাদের ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেছে তাদের ইদ্দত তিন মাস, যাদের এখনো ঋতুস্রাব হয়নি তাদেরও তিন মাস, আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দত সন্তান প্রসব পর্যন্ত।
ইদ্দতের সঙ্গে বংশপরিচয় ও গর্ভের অবস্থা নির্ধারণের সম্পর্ক আছে। প্রত্যাহারযোগ্য তালাকের ক্ষেত্রে পুনর্মিলনের সময়ও এটি। কিন্তু বাস্তব বিধিনিষেধটি নারীর শরীর ও যৌনজীবনের ওপর পড়ে। সে নতুন সঙ্গী নির্বাচন করে সঙ্গে সঙ্গে বিবাহ করতে পারে না। তার মাসিক, গর্ভাবস্থা এবং জরায়ুর অবস্থাই পরবর্তী বিবাহের সময়সীমা নির্ধারণ করে।
পুরুষের জন্য তালাকের পর নারীর মতো সাধারণ তিন কুরু বা তিন মাসের সমান্তরাল অপেক্ষাকাল নেই। কিছু বিশেষ অবস্থায় তার নতুন বিবাহে সাময়িক বাধা থাকতে পারে, যেমন চার স্ত্রী থাকা অবস্থায় প্রত্যাহারযোগ্য তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর ইদ্দত চলাকালে পঞ্চম স্ত্রী নেওয়ার প্রশ্ন। কিন্তু পুরুষের শরীরের জন্য সাধারণ ইদ্দত নেই।
স্বামী তালাকের ক্ষমতা ব্যবহার করে, তারপর তালাকের শারীরিক সময়সূচি নারীর মাসিক, গর্ভ এবং জরায়ু দিয়ে মাপা হয়। ক্ষমতা পুরুষের হাতে, অপেক্ষা নারীর শরীরে।
বিধবার চার মাস দশ দিনের ইদ্দত
স্বামী মারা গেলে বিধবার জন্য আরও দীর্ঘ অপেক্ষাকাল রয়েছে। কোরআন ২:২৩৪-এ বলা হয়েছে, যেসব পুরুষ স্ত্রী রেখে মারা যায়, তাদের স্ত্রীদের চার মাস দশ দিন অপেক্ষা করতে হবে। এই সময় শেষ হওয়ার আগে নারী নতুন বিবাহ করতে পারে না। [138]।
কোরআন, সূরা আল-বাকারা ২:২৩৪
“তোমাদের মধ্যে যারা মারা যায় এবং স্ত্রী রেখে যায়, তাদের স্ত্রীগণ নিজেদেরকে চার মাস দশ দিন অপেক্ষায় রাখবে।”
গর্ভবতী বিধবার ক্ষেত্রে সূরা ৬৫:৪ অনুযায়ী সন্তান প্রসব পর্যন্ত ইদ্দতের বিধান প্রযোজ্য হয়। ফলে কোনো নারীর স্বামী মারা যাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে সন্তান জন্ম হলে তার ইদ্দত সেই প্রসবে শেষ হতে পারে। অন্যদিকে গর্ভবতী নয় এমন বিধবা সাধারণভাবে চার মাস দশ দিনের সময়সীমায় থাকে।
এই চার মাস দশ দিন শুধু নতুন বিবাহ থেকে অপেক্ষা নয়। হাদিসে বিধবার জন্য ইহদাদ, অর্থাৎ বাধ্যতামূলক শোকপালনের বিধানও আছে। এই সময়ে নারীকে সুগন্ধি, চোখে কাজল এবং সাজসজ্জামূলক রঙিন পোশাক থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
বিধবার সাজসজ্জা, সুগন্ধি ও কাজলের ওপর নিষেধ
সহিহ বুখারিতে উম্মু আতিয়্যার বর্ণনায় উল্লেখ আছে, স্বামী ছাড়া অন্য কারও জন্য তিন দিনের বেশি শোক করতে নিষেধ করা হয়েছে, কিন্তু স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রীকে চার মাস দশ দিন শোক পালন করতে হবে। এই সময়ে কাজল ব্যবহার, সুগন্ধি ব্যবহার এবং সাধারণ রঙিন পোশাক পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিছু বিশেষ কাপড় ব্যতিক্রম। [139]।
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৯৫১ [৫৩৪১]। উম্মু আতিয়্যা (রাঃ) বলেন, “স্বামী ছাড়া অন্য মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশি শোক করতে আমাদের নিষেধ করা হতো। স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন। এই সময়ে আমরা কাজল লাগাতাম না, সুগন্ধি ব্যবহার করতাম না এবং বিশেষ কাপড় ছাড়া রঙিন পোশাক পরতাম না।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
আরেক সহিহ বুখারির ঘটনায় এক বিধবার চোখে অসুখ হয়েছিল। পরিবারের লোকেরা তার চোখে কাজল ব্যবহারের অনুমতি চাইলে মুহাম্মদ অনুমতি দেয়নি এবং চার মাস দশ দিনের সময়সীমা পূর্ণ করার কথা বলেছে। [140]।
এখানে মৃত স্বামীর সঙ্গে নারীর বৈবাহিক সম্পর্ক শেষ হয়েছে মৃত্যুর মাধ্যমে, কিন্তু তার নিজের পোশাক, সৌন্দর্যচর্চা, সুগন্ধি এবং পরবর্তী বিবাহের সময়ও ধর্মীয় বিধানের অধীনে থাকে। শোক অনুভূতির বিষয় হলেও শরিয়ত সেটিকে নারীর শরীর ও সাজসজ্জার ওপর বাধ্যতামূলক আচারে পরিণত করেছে।
স্বামী মারা গেছে, কিন্তু মৃত স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের আইনি ছায়া চার মাস দশ দিন জীবিত নারীর শরীর, পোশাক, প্রসাধন এবং নতুন সম্পর্কের ওপর থেকে যায়।
স্ত্রী মারা গেলে স্বামীর জন্য সমান শোকপালন নেই
বিধবার ওপর চার মাস দশ দিনের ইদ্দত ও ইহদাদ বাধ্যতামূলক, কিন্তু স্ত্রী মারা গেলে স্বামীর ওপর সমান বিধান নেই। তাকে চার মাস দশ দিন নতুন বিবাহ থেকে বিরত থাকতে হয় না, সুগন্ধি ব্যবহার বন্ধ করতে হয় না, পোশাক ও সাজসজ্জা ত্যাগ করতে হয় না। ধ্রুপদী ফিকহে পুরুষের ওপর ইহদাদ বাধ্যতামূলক নয়। আল-মাওসুআ আল-ফিকহিয়্যার বক্তব্যেও আলেমদের মতৈক্যের কথা এসেছে যে পুরুষের ওপর এই শোকপালন নেই।
ফলে একই মৃত্যু স্বামী ও স্ত্রীর জীবনে ভিন্ন ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে। স্বামী মারা গেলে স্ত্রী চার মাস দশ দিন নতুন বিবাহ করতে পারে না এবং সাজসজ্জা বর্জন করে। স্ত্রী মারা গেলে পুরুষ চাইলে অল্প সময়ের মধ্যেই অন্য নারীকে বিয়ে করতে পারে। তার জন্য ধর্মীয়ভাবে নির্ধারিত সমান অপেক্ষাকাল নেই।
এই বৈষম্যকে গর্ভ ও বংশপরিচয়ের প্রশ্ন দিয়ে আংশিক ব্যাখ্যা করা যায়, কারণ পুরুষ গর্ভধারণ করে না। কিন্তু সাজসজ্জা ও শোকপালনের বিধান গর্ভ নির্ধারণের বিষয় নয়। বিধবার সুগন্ধি, কাজল, পোশাক এবং শোকের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, বিধুর ক্ষেত্রে একই ধর্মীয় আচরণ নেই।
স্ত্রীর মৃত্যু পুরুষকে নতুন জীবনে এগিয়ে যেতে শরিয়তি অপেক্ষায় আটকে রাখে না। স্বামীর মৃত্যু নারীকে চার মাস দশ দিন অপেক্ষা, শোক, পোশাক ও সাজসজ্জার বিধানের মধ্যে আটকে রাখে। একই দাম্পত্য সম্পর্কের সমাপ্তিতেও নারী ও পুরুষের স্বাধীনতা সমান নয়।
তালাক, খুলা, হিল্লা ও ইদ্দতের সামগ্রিক ক্ষমতা-কাঠামো
সবগুলো বিধান একত্রে রাখলে বিবাহবিচ্ছেদের ইসলামী কাঠামো স্পষ্ট হয়। স্বামী নিজের সিদ্ধান্তে তালাক দিতে পারে। প্রথম দুই তালাকের ইদ্দতের মধ্যে রুজুর বিশেষ ক্ষমতাও তার হাতে থাকে। স্ত্রী সম্পর্ক ছাড়তে চাইলে খুলা, মুবারাত, বিচারিক বিচ্ছেদ অথবা অর্পিত তালাকের পথে যেতে হয়। খুলার প্রধান হাদিসে নারী নিজের পাওয়া বাগান ফিরিয়ে দেয় এবং স্বামী তাকে তালাক দেয়। মুবারাতে উভয়ের সম্মতি লাগে। তাফওয়িজে স্ত্রী যে তালাকক্ষমতা ব্যবহার করে, সেই ক্ষমতাটিও স্বামীর অর্পিত।
তৃতীয় তালাকের পর পুরুষের উচ্চারিত শব্দ নারীর পরবর্তী যৌনজীবনের ওপর আরও গভীর নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে। আগের স্বামীর কাছে ফিরে যেতে চাইলে নারীকে অন্য পুরুষকে বিয়ে করতে হয়, তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করতে হয়, দ্বিতীয় বিবাহ শেষ হতে হয়, তারপর নতুন ইদ্দত পার করতে হয়। সাজানো হিল্লা করলে ধর্মীয় অভিশাপ, কিন্তু প্রকৃত দ্বিতীয় বিবাহ ও সহবাস ছাড়া প্রথম স্বামীর কাছে ফেরার পথও নেই।
এরপর ইদ্দত। তালাকপ্রাপ্তা নারী অপেক্ষা করে। গর্ভবতী নারী সন্তান প্রসব পর্যন্ত অপেক্ষা করে। ঋতুস্রাব না হওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া নারী তিন মাস অপেক্ষা করে। বিধবা চার মাস দশ দিন অপেক্ষা করে এবং শোকপালন করে। পুরুষের জন্য সমান্তরাল সাধারণ ইদ্দত নেই, বিধুর জন্য বাধ্যতামূলক ইহদাদ নেই।
ইসলামী বিবাহবিচ্ছেদের পুরো কাঠামোতে একই ধারা দেখা যায়: সম্পর্ক ভাঙার প্রধান ক্ষমতা পুরুষের হাতে, আর সম্পর্ক ভাঙার পর অপেক্ষা, যৌন নিষেধ, পুনর্বিবাহের শর্ত এবং শোকের বড় অংশ নারীর শরীর ও সময়ের ওপর। তালাক পুরুষের অধিকার, খুলা নারীর মুক্তির দরকষাকষি, হিল্লা নারীর শরীরকে দ্বিতীয় পুরুষের মধ্য দিয়ে পার করায়, ইদ্দত নারীর সময়কে আটকে রাখে। এটি সমান বিচ্ছেদক্ষমতার ব্যবস্থা নয়।
উত্তরাধিকার: সম্পদের বণ্টনে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য
ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় নারী ও পুরুষের অংশ ব্যক্তিগত প্রয়োজন, শিক্ষা, আয়, দায়িত্ব, দরিদ্রতা, সম্পদের উৎস অথবা মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কের বাস্তব গভীরতা দেখে নির্ধারণ করা হয় না। বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে লিঙ্গ নিজেই ভাগের পরিমাণ নির্ধারণ করে। একই পিতা-মাতার ছেলে ও মেয়ে উত্তরাধিকারী হলে পুত্র পায় কন্যার দ্বিগুণ। একই দাম্পত্য সম্পর্কে স্ত্রী মারা গেলে স্বামী যে নির্ধারিত অংশ পায়, স্বামী মারা গেলে স্ত্রী একই অবস্থায় তার অর্ধেক পায়। ভাই ও বোন একসঙ্গে উত্তরাধিকারী হলেও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে পুরুষের অংশ দুই নারীর সমান। নির্ধারিত অংশ বণ্টনের পর অবশিষ্ট সম্পদের ক্ষেত্রেও সহিহ হাদিসে নিকটতম পুরুষ আত্মীয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এই ব্যবস্থায় নারী কখনো সম্পদ পায়, কখনো পুরুষের সমান অংশও পায়, আবার বিশেষ পরিস্থিতিতে একজন নারী কোনো নির্দিষ্ট পুরুষের চেয়েও বেশি পেতে পারে। কিন্তু উত্তরাধিকারব্যবস্থার লিঙ্গবৈষম্য বিচার করতে প্রতিটি সম্ভাব্য পারিবারিক সমীকরণে নারী কম পাচ্ছে কি না, সেটি দেখার প্রয়োজন নেই। যেখানে একই সম্পর্কের দুই উত্তরাধিকারীকে শুধু নারী ও পুরুষ হওয়ার কারণে ১:২ অনুপাতে ভাগ দেওয়া হয়েছে, সেখানেই বৈষম্য সরাসরি প্রতিষ্ঠিত। একই বাবা-মায়ের দুই সন্তান, একজন ছেলে এবং একজন মেয়ে। তাদের একজনের যৌনাঙ্গ পুরুষের বলে সে দ্বিগুণ সম্পদ পাবে, আর অন্যজন নারী বলে অর্ধেক। এই বৈষম্যের জন্য আর কোনো জটিল ধর্মতত্ত্বের প্রয়োজন নেই। সংখ্যাই আইনটির চরিত্র বলে দেয়।
পুত্রের অংশ দুই কন্যার সমান
সূরা আন-নিসা ৪:১১ উত্তরাধিকারের সবচেয়ে পরিচিত লিঙ্গভিত্তিক নিয়মটি ঘোষণা করেছে। সন্তানদের মধ্যে ছেলে ও মেয়ে একসঙ্গে থাকলে একজন পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান। একই আয়াতে বলা হয়েছে, শুধু একটি কন্যা থাকলে সে অর্ধেক পাবে, দুই বা ততোধিক কন্যা থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে দুই-তৃতীয়াংশ পাবে। [141]।
কোরআন, সূরা আন-নিসা ৪:১১
“আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন, একজন পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান।”
একটি সাধারণ হিসাবেই বৈষম্যটি পরিষ্কার। একজন ব্যক্তি ৩০ লক্ষ টাকা রেখে মারা গেল এবং তার উত্তরাধিকারী শুধু একজন ছেলে ও একজন মেয়ে। কোরআনের নিয়মে সম্পদ তিন ভাগ হবে। ছেলে পাবে দুই ভাগ, অর্থাৎ ২০ লক্ষ টাকা। মেয়ে পাবে এক ভাগ, অর্থাৎ ১০ লক্ষ টাকা। তারা একই বাবা-মায়ের সন্তান, মৃত ব্যক্তির সঙ্গে একই প্রজন্মের সম্পর্ক, কিন্তু ছেলের অংশ মেয়ের দ্বিগুণ।
এখানে ছেলেটি দরিদ্র কি ধনী, মেয়েটি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী কি অসহায়, মেয়েটি বৃদ্ধ পিতা-মাতার দেখাশোনা করেছে কি না, ছেলেটি পরিবার থেকে বহু বছর দূরে ছিল কি না, এসবের কোনো ভূমিকা নেই। ছেলে নারী সন্তানের দ্বিগুণ পাবে কারণ সে ছেলে। একটি উচ্চ আয়ের সফটওয়্যার প্রকৌশলী ছেলে এবং বেকার, অসুস্থ, তিন সন্তানের মা মেয়ের ক্ষেত্রেও লিঙ্গগত অনুপাতটি একই থাকে।
আবার পরিস্থিতি উল্টো হলেও নিয়ম বদলায় না। মেয়ে কোটি টাকা আয় করে এবং ছেলে বেকার হলেও ছেলে দ্বিগুণ পায়। অর্থাৎ আইনটি ব্যক্তির প্রকৃত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিচার করছে না। এটি আগেই ধরে নিচ্ছে পুরুষের জন্য বৃহত্তর সম্পত্তিগত অংশ নির্ধারণ করা উচিত। ব্যক্তির বাস্তব প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে জন্মগত লিঙ্গের ভিত্তিতে দ্বিগুণ উত্তরাধিকার দেওয়া সম্পদের বৈষম্যমূলক বণ্টন।
স্বামী পায় স্ত্রীর দ্বিগুণ
সন্তানের ক্ষেত্রেই শুধু ২:১ অনুপাত নেই। সূরা আন-নিসা ৪:১২ স্বামী ও স্ত্রীর নির্ধারিত অংশেও একই লিঙ্গগত অসমতা তৈরি করেছে। স্ত্রী মারা গেলে সন্তান না থাকলে স্বামী তার সম্পদের অর্ধেক পাবে। সন্তান থাকলে স্বামী পাবে এক-চতুর্থাংশ। বিপরীতে স্বামী মারা গেলে সন্তান না থাকলে স্ত্রী পাবে এক-চতুর্থাংশ, সন্তান থাকলে স্ত্রী পাবে এক-অষ্টমাংশ। [142]।
কোরআন, সূরা আন-নিসা ৪:১২
স্ত্রী সন্তান না রেখে মারা গেলে স্বামী পাবে অর্ধেক, সন্তান থাকলে এক-চতুর্থাংশ। স্বামী সন্তান না রেখে মারা গেলে স্ত্রী পাবে এক-চতুর্থাংশ, সন্তান থাকলে এক-অষ্টমাংশ।
ধরা যাক, সন্তানহীন একটি দম্পতির একজন ৪০ লক্ষ টাকা রেখে মারা গেল। স্ত্রী মারা গেলে স্বামী কোরআনিক নির্ধারিত অংশ হিসেবে পাবে ২০ লক্ষ টাকা। একই পরিস্থিতিতে স্বামী মারা গেলে স্ত্রী পাবে ১০ লক্ষ টাকা। আবার সন্তান থাকলে স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে স্বামী পাবে ১০ লক্ষ টাকা, কিন্তু স্বামী মারা গেলে স্ত্রী পাবে ৫ লক্ষ টাকা। অন্যান্য উত্তরাধিকারীর উপস্থিতি অবশিষ্ট সম্পদের বণ্টন বদলাতে পারে, কিন্তু স্বামী এবং স্ত্রীর নির্ধারিত অংশের অনুপাত বদলায় না।
এই বৈষম্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ স্বামী ও স্ত্রী একই বিবাহের দুই পক্ষ। একজন নারী হয়তো ত্রিশ বছর স্বামীর সঙ্গে সংসার করেছে, সন্তান জন্ম দিয়েছে, সন্তান পালন করেছে, নিজের পেশা ছেড়েছে, অসুস্থ স্বামীর সেবা করেছে এবং পুরো সংসার পরিচালনা করেছে। স্বামী মারা গেলে সন্তান থাকলে তার নির্ধারিত অংশ এক-অষ্টমাংশ। একই পরিবারে স্ত্রী মারা গেলে স্বামীর নির্ধারিত অংশ এক-চতুর্থাংশ।
একই বিবাহের দুই পক্ষের একজন মারা গেলে জীবিত পুরুষ সঙ্গী যে অনুপাতে সম্পদ পায়, বিপরীত ঘটনায় জীবিত নারী সঙ্গী তার অর্ধেক পায়। এটি ব্যাখ্যার প্রশ্ন নয়, কোরআনের সরাসরি সংখ্যাগত বিধান।
একাধিক স্ত্রী থাকলে এক-অষ্টমাংশও ভাগ হবে
বহুবিবাহের সঙ্গে উত্তরাধিকার মিললে নারীর অংশ আরও ছোট হতে পারে। একজন পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকলে কোরআন ৪:১২-এ স্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত এক-চতুর্থাংশ অথবা এক-অষ্টমাংশ প্রত্যেক স্ত্রী আলাদাভাবে পায় না। সকল স্ত্রী মিলে সেই অংশ ভাগ করে নেয়। অর্থাৎ সন্তান থাকলে মৃত পুরুষের দুই, তিন বা চার স্ত্রী সম্মিলিতভাবে মোট এক-অষ্টমাংশ পাবে।
ধরা যাক, একজন পুরুষ ৮০ লক্ষ টাকা রেখে মারা গেল, তার সন্তান আছে এবং চারজন স্ত্রীও আছে। স্ত্রীদের নির্ধারিত সম্মিলিত অংশ এক-অষ্টমাংশ, অর্থাৎ ১০ লক্ষ টাকা। চার স্ত্রী সমানভাবে ভাগ করলে প্রত্যেকে পাবে ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। একই পরিস্থিতিতে কোনো নারী মারা গেলে তার একমাত্র স্বামী সন্তান থাকার কারণে একাই এক-চতুর্থাংশ পাবে, অর্থাৎ ২০ লক্ষ টাকা।
একদিকে শরিয়ত একজন পুরুষকে চারজন স্ত্রী রাখার অধিকার দেয়, অন্যদিকে তার মৃত্যুর পর স্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত অংশটি স্ত্রীসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ে না। চারজন নারী একই এক-অষ্টমাংশ ভাগ করে নেয়। পুরুষ জীবিত অবস্থায় চার নারীর ওপর বৈবাহিক অধিকার বিস্তার করতে পারে, মৃত্যুর পরে সেই চার নারীকে তার সম্পদের একই ছোট অংশ নিজেদের মধ্যে ভাগ করতে হয়।
ভাইয়ের অংশ দুই বোনের সমান
পুত্র-কন্যার ২:১ অনুপাত সূরা আন-নিসা ৪:১৭৬-এ ভাই-বোনের ক্ষেত্রেও ফিরে এসেছে। কোনো ব্যক্তি সন্তান ও পিতা ছাড়া মারা গেলে তার ভাই-বোনের উত্তরাধিকার সম্পর্কে আয়াতটি বলে, একজন বোন থাকলে সে অর্ধেক পাবে, দুই বোন থাকলে তারা দুই-তৃতীয়াংশ পাবে, আর ভাই ও বোন উভয়েই থাকলে একজন পুরুষের অংশ দুই নারীর অংশের সমান হবে। [143]।
কোরআন, সূরা আন-নিসা ৪:১৭৬
“আর যদি ভাই ও বোন উভয়েই থাকে, তবে একজন পুরুষের অংশ দুই নারীর অংশের সমান।”
অর্থাৎ একই গাণিতিক অগ্রাধিকার দুই পৃথক আত্মীয়তার সম্পর্কে ব্যবহৃত হয়েছে। সন্তানদের মধ্যে ছেলে দ্বিগুণ, ভাই-বোনের মধ্যে ভাই দ্বিগুণ। এটি কোনো একক পারিবারিক পরিস্থিতির আকস্মিক ফল নয়। কোরআনিক উত্তরাধিকারব্যবস্থার ভেতরে পুরুষের জন্য দ্বিগুণ অংশ একটি পুনরাবৃত্ত নীতি।
ধরা যাক, মৃত ব্যক্তি শুধু একজন ভাই ও একজন বোন রেখে গেছে এবং ৩০ লক্ষ টাকা বণ্টনযোগ্য সম্পদ আছে। সংশ্লিষ্ট ২:১ নিয়মে ভাই পাবে ২০ লক্ষ, বোন পাবে ১০ লক্ষ। ভাইটি ধনী এবং বোনটি নিঃস্ব হলেও অংশ বদলাবে না। বোনটি মৃত ব্যক্তির জীবনের শেষ দশ বছর তার সেবা করেছে আর ভাই কোনো যোগাযোগ রাখেনি, তবুও কোরআনিক ভাগের গাণিতিক সূত্রটি ব্যক্তিগত অবদান বিবেচনা করে না।
পুত্রের পরে ভাইয়ের ক্ষেত্রেও একই ঘোষণা ফিরে আসে, একজন পুরুষ দুই নারীর সমান। লিঙ্গ এখানে উত্তরাধিকারের গাণিতিক মূল্য নির্ধারণ করছে।
অবশিষ্ট সম্পদের অগ্রাধিকার নিকটতম পুরুষ আত্মীয়ের
নারী-পুরুষের নির্ধারিত কোরআনিক অংশের বাইরে ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো আসাবা বা অবশিষ্টভোগী উত্তরাধিকার। সহিহ বুখারিতে মুহাম্মদ বলেছে, কোরআনে যাদের নির্ধারিত অংশ আছে তাদের অংশ দেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে তা নিকটতম পুরুষ আত্মীয়কে দিতে হবে। [32]।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৮৫/ উত্তরাধিকার
৬৭৩২। ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুহাম্মদ বলেছে, “নির্ধারিত অংশগুলো তাদের হকদারদের দিয়ে দাও। এরপর যা অবশিষ্ট থাকে তা নিকটতম পুরুষ আত্মীয়ের জন্য।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
একটি সাধারণ উদাহরণ ধরা যাক। একজন ব্যক্তি একজন কন্যা এবং একজন পিতৃকুলীয় চাচা রেখে মারা গেল, এবং এমন আর কোনো উত্তরাধিকারী নেই যে হিসাব পরিবর্তন করবে। একমাত্র কন্যা কোরআন ৪:১১ অনুযায়ী অর্ধেক পাবে। অবশিষ্ট অর্ধেক নিকটতম পুরুষ আসাবা হিসেবে চাচার কাছে যেতে পারে। মৃত ব্যক্তির নিজের কন্যা অর্ধেক সম্পদে থেমে গেল, আর তার পিতার ভাই বাকি অর্ধেক নিল।
একজন কন্যা মৃত মানুষের সরাসরি সন্তান। চাচা এক প্রজন্ম পাশের পিতৃকুলীয় আত্মীয়। তবুও কন্যার নারী পরিচয় তাকে নির্দিষ্ট অর্ধেক অংশে সীমিত করতে পারে এবং অবশিষ্ট অংশ পুরুষ আগনাত আত্মীয়ের দিকে চলে যায়। এই আসাবা নীতি ইসলাম-পূর্ব আরবের পিতৃবংশীয় সম্পত্তি কাঠামোর সঙ্গে গভীর ধারাবাহিকতা বহন করে। Noel J. Coulson এবং M. Habibur Rahman-এর গবেষণাও এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা দেখিয়েছে।
কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে নারীও অবশিষ্টভোগী হতে পারে, বিশেষ করে কন্যার সঙ্গে সহোদরা বা পিতৃসূত্রীয় বোনের কিছু সমন্বয়ে। কিন্তু এই ব্যতিক্রম পুরুষকেন্দ্রিক আসাবা কাঠামো বদলায় না। মুহাম্মদের নির্দেশের মূল ভাষাই সরাসরি “নিকটতম পুরুষ”কে অবশিষ্ট সম্পদের অগ্রাধিকার দিয়েছে।
কন্যাকে নির্ধারিত অংশ দিয়ে থামিয়ে অবশিষ্ট সম্পদ পুরুষ পিতৃকুলীয় আত্মীয়ের হাতে দেওয়া নারীকে সম্পত্তির কেন্দ্রীয় উত্তরাধিকারী নয়, সীমিত অংশীদার হিসেবে রাখে।
কোরআনিক অংশে কোথায় সমান ভাগ আছে
কোরআনিক উত্তরাধিকারব্যবস্থায় প্রতিটি নারী প্রতিটি পুরুষের অর্ধেক পায় না। সূরা আন-নিসা ৪:১১-এ মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে পিতা ও মাতা উভয়েই এক-ষষ্ঠাংশ পায়। আবার সূরা আন-নিসা ৪:১২-এ মাতৃসূত্রীয় ভাই-বোনের ক্ষেত্রে একজন হলে এক-ষষ্ঠাংশ এবং একাধিক হলে তারা সম্মিলিতভাবে এক-তৃতীয়াংশ ভাগ করে নেয়, সেখানে নারী ও পুরুষের মধ্যে ২:১ অনুপাত নেই।
এই ভিন্ন নিয়মগুলো দেখায় ইসলামী উত্তরাধিকারব্যবস্থা একটি মাত্র সূত্রে তৈরি হয়নি। কিন্তু যেখানে কোরআন নিজেই পুরুষ ও নারীকে একই সম্পর্কের উত্তরাধিকারী হিসেবে পাশাপাশি রেখেছে, সেখানেই আবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পুরুষকে দ্বিগুণ দিয়েছে। ছেলে ও মেয়ের ক্ষেত্রে ২:১, স্বামী ও স্ত্রীর নির্ধারিত অংশে ২:১, ভাই ও বোনের ক্ষেত্রে ২:১। সমান অংশের কিছু ঘটনা এই স্পষ্ট বৈষম্যগুলো বাতিল করে না।
ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠানের বেতননীতিতে কিছু পদে নারী ও পুরুষ সমান বেতন পায়, কিন্তু একই পদে অন্য একটি শ্রেণিতে নিয়ম লেখা আছে, পুরুষ কর্মী নারী কর্মীর দ্বিগুণ বেতন পাবে। প্রথম শ্রেণির সমতা দ্বিতীয় শ্রেণির বৈষম্যকে মুছে দেয় না। উত্তরাধিকারেও একই বিষয়।
বৈষম্য প্রমাণের জন্য নারীকে সব পরিস্থিতিতে কম পেতে হবে না। একটি আইন যদি নির্দিষ্ট একই সম্পর্কের নারীকে নারী হওয়ার কারণেই অর্ধেক দেয়, সেই নির্দিষ্ট বিধানই বৈষম্যমূলক।
“পুরুষ ভরণপোষণ করে, তাই দ্বিগুণ পায়”
পুরুষের দ্বিগুণ উত্তরাধিকারের পক্ষে সবচেয়ে পরিচিত যুক্তি হলো, ইসলামে পুরুষের ওপর স্ত্রী ও পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব আছে, তাই তাকে বেশি সম্পদ দেওয়া হয়েছে। এই যুক্তি উত্তরাধিকারবৈষম্যের অস্তিত্ব অস্বীকার করে না, বরং বৈষম্যের কারণ হিসেবে আরেকটি লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা সামনে আনে। পুরুষ অর্থনৈতিক দায়িত্ব বহন করবে, তাই পুরুষ বেশি সম্পত্তি পাবে। নারীকে নির্ভরশীল অবস্থানে রেখে পরে তার কম সম্পত্তিকে সেই নির্ভরতার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়।
বাস্তব জীবনে এই পূর্বধারণা সব পরিবারে সত্য নয়। বহু নারী নিজের সংসারের প্রধান উপার্জনকারী। বহু নারী বৃদ্ধ পিতা-মাতার চিকিৎসা ও জীবনযাপনের খরচ বহন করে। বহু নারী বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা হয়ে সন্তানদের একাই পালন করে। বহু ভাই বোনের কোনো অর্থনৈতিক দায়িত্ব নেয় না। আবার একটি ছেলে অপ্রাপ্তবয়স্ক, প্রতিবন্ধী অথবা কর্মহীন হতে পারে, কিন্তু তার বোন উচ্চ আয়ের চিকিৎসক হতে পারে। উত্তরাধিকারবিধান এসব বাস্তবতা দেখে ভাগ বদলায় না।
আর পুরুষের ভরণপোষণ দায়িত্বও একই পুরুষকেন্দ্রিক পারিবারিক কাঠামোর অংশ। পুরুষকে পরিবারের অর্থনৈতিক কর্তা ঘোষণা করা হয়েছে, নারীকে তার ওপর নির্ভরশীল অবস্থানে রাখা হয়েছে, তারপর বলা হয়েছে কর্তা পুরুষ তাই বেশি সম্পদ পাবে। এর ফলে সম্পদ এবং ক্ষমতা একই দিকে জমা হয়। পুরুষের হাতে বেশি উত্তরাধিকার, পুরুষের হাতে কাওয়ামাহ, পুরুষের হাতে তালাক, পুরুষের হাতে বহুবিবাহের অধিকার।
নারীকে অর্থনৈতিকভাবে অধীনস্থ ভূমিকা দিয়ে তারপর সেই অধীনতার কারণেই তাকে কম সম্পদ দেওয়া সমতার যুক্তি নয়। এটি পিতৃতান্ত্রিক ভূমিকা এবং পিতৃতান্ত্রিক সম্পত্তিবণ্টনকে একে অপরের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা।
উত্তরাধিকার ব্যক্তির প্রয়োজন দেখে নয়, লিঙ্গ দেখে
আধুনিক সম্পত্তির অধিকারে একটি মৌলিক ধারণা হলো নারী ও পুরুষ একই আইনি ব্যক্তি। কেউ ছেলে বলে দ্বিগুণ নাগরিক নয়, কেউ মেয়ে বলে অর্ধেক সন্তান নয়। কোনো বাবা-মা চাইলে জীবদ্দশায় সন্তানদের প্রয়োজন অনুযায়ী সাহায্য করতে পারে, অসুস্থ সন্তানকে বেশি ব্যয় দিতে পারে, প্রতিবন্ধী সন্তানকে আলাদা সুরক্ষা দিতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় উত্তরাধিকার আইন যদি জন্মের মুহূর্তেই বলে দেয় পুরুষ সন্তান নারী সন্তানের দ্বিগুণ সম্পদের অধিকারী, তাহলে ব্যক্তিগত বাস্তবতা শুরু হওয়ার আগেই লিঙ্গ ফলাফল নির্ধারণ করে দেয়।
এই বৈষম্যের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এক প্রজন্মেই শেষ হয় না। জমি, বাড়ি, ব্যবসা, পুঁজি এবং সঞ্চয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যায়। প্রত্যেক প্রজন্মে পুত্ররা কন্যাদের তুলনায় বড় অংশ পেলে পরিবারের জমি ও মূলধনের মালিকানা ক্রমে পুরুষ বংশধরদের দিকে বেশি জমা হয়। সম্পত্তি শুধু টাকা নয়, সম্পত্তি সামাজিক ক্ষমতা, নিরাপত্তা, ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা, ব্যবসা শুরু করার সুযোগ এবং সংকটের সময় স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি।
যে নারী কম সম্পদ পায়, সে স্বামী বা অন্য পুরুষ আত্মীয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল হতে পারে। অর্থনৈতিক নির্ভরতা আবার নির্যাতনমূলক বিবাহ থেকে বের হওয়া, সন্তান নিয়ে আলাদা থাকা অথবা নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। ফলে উত্তরাধিকারবৈষম্য শুধু মৃত্যুর পরে সম্পদের অঙ্ক নয়, জীবিত নারীর ক্ষমতার প্রশ্ন।
সম্পত্তি যার হাতে বেশি, সিদ্ধান্তক্ষমতাও সাধারণত তার হাতে বেশি। উত্তরাধিকার আইনে পুরুষকে বারবার বড় অংশ দেওয়া শুধু অর্থের বৈষম্য নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম পুরুষের হাতে অর্থনৈতিক ক্ষমতা জমা রাখার ব্যবস্থা।
ইসলাম-পূর্ব পুরুষ উত্তরাধিকার কাঠামোর ধারাবাহিকতা
ইসলামী উত্তরাধিকারব্যবস্থা সম্পূর্ণ শূন্য থেকে সৃষ্টি হয়নি। ইসলাম-পূর্ব আরবের বহু গোত্রে সম্পত্তির প্রধান উত্তরাধিকারী ছিল যুদ্ধক্ষম পুরুষ আত্মীয়। সূরা আন-নিসা ৪:৭-এর ব্যাখ্যায় প্রাচীন সূত্রে বলা হয়েছে, নারী ও ছোট শিশুদের উত্তরাধিকার না দেওয়ার একটি কারণ ছিল তারা ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করে না, শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে না এবং গনিমত অর্জন করে না। আদ-দুররুল মানসুরেও এই বর্ণনা এসেছে। [144]।
সহিহ বুখারিতে ইবন আব্বাসও আগের উত্তরাধিকারব্যবস্থার অস্তিত্বের কথা বলেছে। সেখানে বলা হয়েছে, পূর্বে মৃত ব্যক্তির সম্পদ সন্তানরা পেত এবং পিতা-মাতার জন্য ওসিয়াত ছিল। পরে আল্লাহ সেই ব্যবস্থার কিছু অংশ পরিবর্তন করে পুরুষের জন্য নারীর দ্বিগুণ, পিতা-মাতার জন্য নির্ধারিত অংশ, স্ত্রী ও স্বামীর জন্য পৃথক অংশ স্থির করেছে। [145]।
সহীহ বুখারী
৪৫৭৮। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, মৃত ব্যক্তির সম্পদ লাভ করত সন্তানরা এবং ওসিয়াত ছিল পিতা-মাতার জন্য। পরে আল্লাহ বিধান পরিবর্তন করে “পুরুষদের জন্য মহিলার দ্বিগুণ নির্দিষ্ট করলেন”, পিতা-মাতা, স্ত্রী ও স্বামীর জন্য পৃথক অংশ নির্ধারণ করলেন।
Noel J. Coulson ইসলামী উত্তরাধিকার আইন বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, কোরআনিক নির্ধারিত অংশগুলো পুরনো পুরুষ পিতৃবংশীয় উত্তরাধিকার কাঠামোর ওপর যুক্ত হয়েছে। কন্যা, মা, স্ত্রী ও বোন নির্দিষ্ট অংশ পেয়েছে, কিন্তু পুরুষ আসাবা কাঠামো বিলুপ্ত হয়নি। [146]। M. Habibur Rahman-এর গবেষণাতেও ইসলাম-পূর্ব আরব উত্তরাধিকাররীতির সরাসরি ও পরোক্ষ ধারাবাহিকতা ইসলামী আইনের মধ্যে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। [34]।
অর্থাৎ নতুন ধর্মীয় ব্যবস্থায় পুরনো পুরুষ বংশীয় সম্পত্তি কাঠামো সম্পূর্ণ উল্টে যায়নি। নারী নির্দিষ্ট অংশ পেয়েছে, কিন্তু পুত্রের দ্বিগুণ অংশ, স্বামীর দ্বিগুণ অংশ, ভাইয়ের দ্বিগুণ অংশ এবং অবশিষ্ট সম্পদে পুরুষ আগনাতের অগ্রাধিকার একই ব্যবস্থায় পাশাপাশি রয়েছে।
ইসলামী উত্তরাধিকারব্যবস্থা নারী ও পুরুষকে সমান সম্পত্তির অধিকারী করেনি। পুরনো পিতৃবংশীয় সম্পত্তিকাঠামোকে নতুন নির্ধারিত অংশের সঙ্গে মিলিয়ে ধর্মীয় আইনে পরিণত করেছে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ বহু সম্পর্কেই পুরুষের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার স্পষ্টভাবে লেখা আছে।
উত্তরাধিকার বৈষম্যের সামগ্রিক হিসাব
পুরো ব্যবস্থাটি পাশাপাশি রাখলে সংখ্যাগুলো নিজেরাই কথা বলে। একজন ছেলে একজন মেয়ের দ্বিগুণ। একই দাম্পত্যে স্বামী স্ত্রী থেকে দ্বিগুণ নির্ধারিত অংশ পায়। ভাই ও বোন একসঙ্গে থাকলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ভাই বোনের দ্বিগুণ পায়। একাধিক স্ত্রী থাকলে তারা একই এক-চতুর্থাংশ বা এক-অষ্টমাংশ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। আর নির্ধারিত অংশের পরে অবশিষ্ট সম্পদের সাধারণ নীতিতে নিকটতম পুরুষ আগনাতের অগ্রাধিকার রয়েছে।
এই বৈষম্য শুধু একটি পরিবারের একবারের বণ্টন নয়। প্রতিটি প্রজন্মে জমি, বাড়ি, ব্যবসা ও সঞ্চয়ের বড় অংশ পুরুষ উত্তরাধিকারীদের দিকে গেলে পুরুষের অর্থনৈতিক শক্তি প্রজন্মগতভাবে পুনরুৎপাদিত হয়। নারী কম সম্পদ নিয়ে বিবাহে প্রবেশ করে, স্বামীর অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের অধীনে থাকে, আবার নিজের পিতৃপরিবারের সম্পদেও বহু ক্ষেত্রে কম অংশ পায়।
এর সঙ্গে আগের পরিচ্ছেদগুলোর ক্ষমতা যোগ করলে ছবিটি আরও স্পষ্ট। পুরুষ পরিবারের কাওয়াম, চার স্ত্রী রাখতে পারে, তালাকের প্রধান ক্ষমতা তার হাতে, স্ত্রীর যৌনপ্রাপ্যতার ওপর তার ধর্মীয় দাবি আছে, এবং উত্তরাধিকারের বহু কেন্দ্রীয় পরিস্থিতিতেও তার অংশ বড়। সম্পদ, বিবাহ, যৌনতা ও পারিবারিক কর্তৃত্ব একই লিঙ্গের দিকে জমা হয়েছে।
একজন নারী অর্ধেক সন্তান নয়, অর্ধেক ভাইবোন নয়, অর্ধেক জীবনসঙ্গীও নয়। তাই একই সম্পর্কের পুরুষের তুলনায় তার উত্তরাধিকার অর্ধেক হওয়ার কোনো ন্যায়সঙ্গত ভিত্তি নেই। উত্তরাধিকার মানুষের সম্পর্ক ও প্রয়োজনের প্রশ্ন হতে পারে, কিন্তু জন্মগত লিঙ্গকে সম্পদের গাণিতিক মূল্য বানানো সরাসরি বৈষম্য।
নারীর আইনি মর্যাদা: সাক্ষ্য, দিয়াত, বিচার ও নেতৃত্ব
ইসলামী আইন ও হাদিসে নারীর বুদ্ধি, সাক্ষ্য এবং নেতৃত্বকে একই পুরুষকেন্দ্রিক ধারণার মধ্যে যুক্ত করা হয়েছে। কোরআনের ঋণচুক্তির বিধানে একজন পুরুষ সাক্ষীর পরিবর্তে দুইজন নারী প্রয়োজন, কারণ একজন নারী ভুল করলে অন্যজন তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে। সহিহ বুখারিতে মুহাম্মদ এই বিধানকেই নারীর “বুদ্ধির ঘাটতি”র প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছে। ধ্রুপদী ফিকহে সাক্ষ্যের ক্ষেত্র আরও সংকুচিত হয়েছে, চার সুন্নি মাযহাবের প্রতিষ্ঠিত মত অনুযায়ী হুদুদ ও কিসাসে নারীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় না। বিচারকের পদেও অধিকাংশ ধ্রুপদী ফকিহ পুরুষ হওয়াকে শর্ত করেছে। সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সহিহ বুখারিতে মুহাম্মদ সরাসরি বলেছে, যে জাতি তাদের শাসনভার নারীর হাতে দেয় তারা সফল হবে না।
এই বিধানগুলো একই মৌলিক ধারণা বহন করে। নারী তথ্য মনে রাখতে পুরুষের তুলনায় কম নির্ভরযোগ্য, গুরুতর অপরাধের সাক্ষী হিসেবে কম গ্রহণযোগ্য, বিচারিক কর্তৃত্বের জন্য কম উপযুক্ত এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের জন্য অযোগ্য। ব্যক্তিগত মেধা, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, বিচারবুদ্ধি, রাজনৈতিক দক্ষতা অথবা নৈতিকতার আগে লিঙ্গ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে সে কতটা বিশ্বাসযোগ্য এবং কতদূর ক্ষমতার আসনে যেতে পারবে। একজন অশিক্ষিত পুরুষ শুধু পুরুষ হওয়ার কারণে যে সাক্ষ্য বা রাজনৈতিক যোগ্যতার শ্রেণিতে প্রবেশ করে, একজন অত্যন্ত শিক্ষিত ও সক্ষম নারী শুধু নারী হওয়ার কারণে সেই একই অবস্থান থেকে বাদ পড়ে। এই ব্যবস্থায় ব্যক্তির যোগ্যতার আগে তার লিঙ্গের বিচার হয়।
দিয়াত: নারীর প্রাণের আর্থিক মূল্য পুরুষের অর্ধেক
ইসলামী ফৌজদারি ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার একটি বড় লিঙ্গবৈষম্য হলো দিয়াত বা রক্তপণ। ধ্রুপদী সুন্নি ফিকহের প্রতিষ্ঠিত বিধানে স্বাধীন মুসলিম নারীর পূর্ণ দিয়াত স্বাধীন মুসলিম পুরুষের দিয়াতের অর্ধেক। ইবন কুদামা আল-মুগনি-তে সরাসরি লিখেছেন, “স্বাধীন মুসলিম নারীর দিয়াত স্বাধীন মুসলিম পুরুষের দিয়াতের অর্ধেক।” একই জায়গায় ইবনুল মুনযির ও ইবন আবদুল বার থেকে আলেমদের ঐকমত্যের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। [147]।
এখানে বৈষম্য কোনো পারিবারিক দায়িত্বের বণ্টন নয়; এটি মানুষের মৃত্যু বা গুরুতর শারীরিক ক্ষতির আর্থিক মূল্য নির্ধারণের প্রশ্ন। একই অপরাধে একজন স্বাধীন মুসলিম পুরুষ নিহত হলে তার জন্য যে পূর্ণ দিয়াত, একই অবস্থানের নারী নিহত হলে তার জন্য অর্ধেক—লিঙ্গই এখানে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক বদলে দেয়। একজন নারীর জীবন তার ভাই, স্বামী বা পিতার জীবনের অর্ধেক মূল্যবান নয়। কিন্তু ধ্রুপদী ফিকহের দিয়াত-ব্যবস্থা সেই বৈষম্যকে সরাসরি আইনি অঙ্কে পরিণত করেছে।
উত্তরাধিকারে পুত্রের দ্বিগুণ অংশ, নির্দিষ্ট সাক্ষ্যে দুই নারীর বিপরীতে এক পুরুষ এবং দিয়াতে নারীর অর্ধেক মূল্য—এই বিধানগুলো পাশাপাশি রাখলে আইনি মর্যাদার একই pattern দেখা যায়। নারীকে শুধু সামাজিকভাবে ভিন্ন ভূমিকা দেওয়া হয়নি; সম্পদ, প্রমাণ এবং ক্ষতিপূরণের অঙ্কেও তার লিঙ্গ সরাসরি আইনগত পার্থক্য তৈরি করে।
একজন পুরুষের বদলে দুইজন নারী সাক্ষী
কোরআনের সবচেয়ে দীর্ঘ আয়াত, সূরা আল-বাকারা ২:২৮২, ঋণ ও আর্থিক লেনদেন লিখিতভাবে সংরক্ষণ এবং সাক্ষী রাখার বিধান দিয়েছে। সেখানে প্রথম পছন্দ দুইজন পুরুষ সাক্ষী। দুইজন পুরুষ পাওয়া না গেলে একজন পুরুষ এবং দুইজন নারী নিতে বলা হয়েছে। কারণটিও আয়াতেই বলা হয়েছে, দুই নারীর একজন ভুল করলে অন্যজন তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে। [148]।
কোরআন, সূরা আল-বাকারা ২:২৮২
“তোমাদের পুরুষদের মধ্য থেকে দুইজন সাক্ষী রাখো। যদি দুইজন পুরুষ না থাকে, তাহলে তোমাদের পছন্দের সাক্ষীদের মধ্য থেকে একজন পুরুষ ও দুইজন নারী, যাতে তাদের একজন ভুল করলে অন্যজন তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।”
আয়াতটির গাণিতিক কাঠামো পরিষ্কার। একজন পুরুষের জায়গায় একজন নারী যথেষ্ট নয়। একজন পুরুষের বিকল্প হতে দুইজন নারী দরকার। দুইজন নারী আবার দুইজন পুরুষের সমান নয়, কারণ আয়াতে দুই পুরুষের বিকল্প হিসেবে বলা হয়েছে একজন পুরুষ এবং দুই নারী। অর্থাৎ নারী সাক্ষীকে একা পুরুষ সাক্ষীর সমমানের আইনি বিকল্প হিসেবে রাখা হয়নি।
কারণ হিসেবেও নারীর সম্ভাব্য ভুল বা স্মৃতিভ্রংশকে আলাদাভাবে সামনে আনা হয়েছে। পুরুষ সাক্ষী ভুল করতে পারে কি না, তার স্মৃতি দুর্বল হতে পারে কি না, সে অসৎ হতে পারে কি না, তার আর্থিক জ্ঞান শূন্য হতে পারে কি না, এসবের জন্য দ্বিতীয় পুরুষকে তার ব্যক্তিগত স্মৃতিসহায়ক হিসেবে রাখা হয়নি। কিন্তু নারী হওয়ার কারণেই দ্বিতীয় নারীকে তার পাশে দাঁড় করানো হয়েছে, যেন একজনের ভুল অন্যজন ঠিক করে দেয়।
ধরা যাক, একটি আর্থিক চুক্তির সাক্ষী একজন নারী ব্যাংকার, যার বিশ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা রয়েছে। অন্যদিকে একজন পুরুষ সাক্ষী কোনো আর্থিক চুক্তি বোঝে না, পড়তেও কষ্ট হয়। কোরআনিক বিধান ব্যক্তিগত দক্ষতার ভিত্তিতে তাদের সাক্ষ্যের সংখ্যা নির্ধারণ করে না। নারী ব্যাংকারটি নারী, তাই তার সঙ্গে আরেক নারী লাগবে, পুরুষটি পুরুষ, তাই তার একক উপস্থিতিই সেই সংখ্যাগত জায়গা পূরণ করতে পারে।
সাক্ষ্য যদি স্মৃতি, সততা ও জ্ঞানের প্রশ্ন হয়, তাহলে সেই গুণগুলো ব্যক্তিভেদে পরীক্ষা করতে হবে। জন্মগত লিঙ্গ দেখে একজন মানুষকে পূর্ণ সাক্ষী এবং অন্যজনকে অর্ধেক জোড়ার অংশ বানানো যুক্তিসঙ্গত বিচার নয়।
নিজের তৈরি সাক্ষ্যবিধান দিয়েই নারীর “বুদ্ধির ঘাটতি” প্রমাণ
সহিহ বুখারিতে উল্লেখ আছে, মুহাম্মদ নারীদের “বুদ্ধি ও ধর্মে ঘাটতিপূর্ণ” বলার পর নারীরা জিজ্ঞেস করেছিল তাদের বুদ্ধির ঘাটতি কী। মুহাম্মদ উত্তর দেয়, দুই নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান, এটাই তাদের বুদ্ধির ঘাটতির প্রমাণ। [41]।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬/ হায়েয
৩০৪। নারীরা জিজ্ঞেস করল, জ্ঞান ও দ্বীনে তাদের ঘাটতি কী। মুহাম্মদ বলল, “দুজন স্ত্রীলোকের সাক্ষ্য একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান, এটাই তোমাদের বুদ্ধির ঘাটতির প্রমাণ।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
যুক্তিটির কাঠামো ভয়াবহভাবে বৃত্তাকার। প্রথমে ধর্মীয় আইন বলেছে একজন পুরুষের জায়গায় দুই নারী লাগবে। তারপর মুহাম্মদ বলেছে দুই নারী একজন পুরুষের সমান হওয়ার ঘটনাই প্রমাণ করে নারীর বুদ্ধি কম। অর্থাৎ নারীর কম বুদ্ধির কোনো স্বাধীন পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। ধর্মীয় বিধানটি আগে নারীর সাক্ষ্যের মূল্য কমিয়েছে, তারপর নিজের তৈরি সেই বৈষম্যকেই নারীর মানসিক ঘাটতির প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছে।
এই যুক্তি যেকোনো গোষ্ঠীকে হীন প্রমাণ করতে ব্যবহার করা যায়। একটি আইন যদি ঘোষণা করে দুইজন নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ভোট একজন অন্য জাতির মানুষের ভোটের সমান, তারপর বলা হয়, দেখো আইনেই তো তাদের দুই ভোট এক ভোটের সমান, কাজেই তারা কম যোগ্য, তাহলে সেখানে কোনো প্রমাণ তৈরি হয় না। বৈষম্যমূলক নিয়মটিকেই বৈষম্যের ন্যায্যতার প্রমাণ বানানো হয়।
নারী কম বুদ্ধিমান বলে দুই নারীর সাক্ষ্য লাগবে, তার প্রমাণ হিসেবে আবার বলা হচ্ছে দুই নারীর সাক্ষ্য লাগে। এটি যুক্তি নয়। ধর্মীয় আইন নিজের বৈষম্যকে নিজের সত্যতার সাক্ষী বানিয়েছে।
সাক্ষ্যের বৈষম্য শুধু “অর্ধেক” নয়
নারীর সাক্ষ্য সম্পর্কে প্রচলিত সংক্ষিপ্ত বাক্য হলো, “ইসলামে দুই নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষের সমান।” পুরো ধ্রুপদী ফিকহ আরও কঠোর। সূরা ২:২৮২ সরাসরি ঋণ ও আর্থিক লেনদেনের প্রসঙ্গে একজন পুরুষ ও দুই নারীর নিয়ম দিয়েছে। ফকিহরা সাক্ষ্যের বিষয়ভেদে আলাদা শ্রেণি তৈরি করেছে। অর্থসম্পর্কিত বিষয়ে নারী পুরুষের সঙ্গে সাক্ষ্য দিতে পারে। নারীর শরীর, প্রসব, স্তন্যদান, কুমারীত্ব অথবা এমন কিছু বিষয় যেখানে সাধারণত পুরুষ উপস্থিত থাকে না, সেখানে শুধু নারীদের সাক্ষ্যও গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু হুদুদ ও কিসাসের মতো গুরুতর অপরাধে চার সুন্নি মাযহাবের প্রতিষ্ঠিত মত নারীর সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করেছে। [149]।
মালিকি ফিকহের আল-মুদাওয়ানা-তে সরাসরি বলা হয়েছে, হুদুদ, কিসাস, তালাক ও বিবাহে নারীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় না। [150]। হানাফি বাদায়িউস সানায়ি-তেও হুদুদ ও কিসাসে পুরুষ হওয়াকে সাক্ষ্যের শর্ত হিসেবে উল্লেখ করে নারীর সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য বলা হয়েছে। সেখানে যুক্তির অংশ হিসেবে নারীদের ভুল, অসতর্কতা এবং “বুদ্ধি ও ধর্মের ঘাটতি”র ধারণাও ব্যবহার করা হয়েছে। [151]।
তাই সমালোচনার জায়গা “সবক্ষেত্রে নারী অর্ধেক সাক্ষী” নয়; সমালোচনার জায়গা আরও নির্দিষ্ট এবং আরও গুরুতর। কিছু ক্ষেত্রে দুই নারী একজন পুরুষের সঙ্গে সাক্ষ্য দেয়, কিছু ক্ষেত্রে শুধু নারীরাই সাক্ষ্য দিতে পারে, কিন্তু গুরুতর হুদুদ বা কিসাসের ক্ষেত্রে বহু নারী উপস্থিত থাকলেও প্রচলিত মাযহাবি নিয়মে তাদের সাক্ষ্য দিয়ে শাস্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। অর্থাৎ আইন নারীকে সর্বত্র একইভাবে অর্ধেক করেনি; কিন্তু যেখানে অপরাধ, শাস্তি, অর্থ এবং পুরুষের স্বার্থের প্রশ্ন বড়, সেখানে পুরুষের সাক্ষ্যকে নারীর তুলনায় বেশি আইনি শক্তি দেওয়া হয়েছে।
একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি কল্পনা করা যাক। নারীদের একটি অনুষ্ঠানে একজন পুরুষ ঢুকে একজন নারীকে হত্যা করল। ঘটনাটি বিশজন নারী দেখল, কোনো পুরুষ দেখল না। চার সুন্নি মাযহাবের প্রচলিত হুদুদ ও কিসাসের সাক্ষ্যবিধানে নারী সাক্ষ্যের বাধা তৈরি হয়। কিছু ফকিহ প্রয়োজনের পরিস্থিতিতে নারীর সাক্ষ্য গ্রহণের মত দিয়েছে, আহমদ ইবন হাম্বলের একটি বর্ণনা এবং ইবন তাইমিয়ার মতও এই দিকে গেছে। কিন্তু মূল মাযহাবি অবস্থানে হুদুদ ও কিসাসের পূর্ণ সাক্ষ্যক্ষমতা পুরুষের হাতেই আটকে ছিল।
একজন নারী খুনের ঘটনা নিজের চোখে দেখেছে, সে সুস্থ, শিক্ষিত, বিশ্বস্ত এবং ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী, তবুও তার লিঙ্গ তার সাক্ষ্যের আইনি শক্তিকে সীমিত করতে পারে। সত্য দেখার জন্য পুরুষের চোখ এবং নারীর চোখ আলাদা নয়, কিন্তু ধ্রুপদী আইন তাদের দেখা সত্যকে সমান আইনি ওজন দেয়নি।
নারীর নিজস্ব শরীরের বিষয়ে নারী সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য, জনক্ষমতায় নয়
ধ্রুপদী ফিকহে এমন কিছু বিষয়ে নারীর একক বা শুধু নারীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে, যেসব বিষয়ে সাধারণত পুরুষদের প্রত্যক্ষ জ্ঞান থাকে না। প্রসব, শিশুর জন্মের সময় জীবিত থাকার চিহ্ন, স্তন্যদান, নারীর দেহের ঢাকা অংশের ত্রুটি, কুমারীত্ব বা পূর্ব যৌনসম্পর্কের শারীরিক অবস্থা এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার মতো বিষয়ে নারীর সাক্ষ্য গ্রহণের আলোচনা আছে।
এই শ্রেণিবিন্যাসের সামাজিক অর্থ তাৎপর্যপূর্ণ। নারীর শরীর, প্রসব, স্তন্যদান এবং ঘরের ভেতরের নারীসংক্রান্ত বিষয়ে নারী প্রয়োজনীয় সাক্ষী। কিন্তু জনপরিসরের গুরুতর বিচার, রক্তপাত, শাস্তি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার দিকে যেতে থাকলে পুরুষের কর্তৃত্ব বাড়ে। নারী এমন জায়গায় গ্রহণযোগ্য যেখানে পুরুষ প্রবেশ করে না, কিন্তু রাষ্ট্র ও বিচারিক ক্ষমতার কেন্দ্রে তার লিঙ্গ বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এই ব্যবস্থায় জ্ঞানের ক্ষেত্রও লিঙ্গভিত্তিক। নারী নারীর শরীর সম্পর্কে জানবে, সন্তান জন্মের ঘটনা জানবে, গৃহের গোপন বিষয় জানবে। পুরুষ সম্পদ, অপরাধ, বিচার এবং রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সাক্ষী ও কর্তৃপক্ষ হবে। নারীকে ঘরের ভেতরের জ্ঞানের সাক্ষী রেখে জনক্ষমতার জ্ঞান ও সিদ্ধান্ত পুরুষের হাতে রাখা পিতৃতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক আইনি প্রতিচ্ছবি।
নারী বিচারক হওয়ার ওপর নিষেধ
সাক্ষ্যের সীমা বিচারকের আসনে আরও স্পষ্ট হয়। মালিকি, শাফিঈ ও হাম্বলি মাযহাবের প্রচলিত অবস্থানে নারী বিচারক হতে পারে না। বহু হানাফি ফকিহ নারীর বিচারিক ক্ষমতা সেই সব বিষয়ে স্বীকার করেছে যেখানে তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য, অর্থাৎ হুদুদ ও কিসাসকে এর বাইরে রেখেছে। ইবন জারির আত-তাবারীর নামে নারীর সব বিষয়ে বিচারক হওয়ার অনুমতির মতও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু ধ্রুপদী সুন্নি ফিকহের সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থান বিচারকের পদকে পুরুষের জন্য নির্ধারিত করেছে। [152]।
এই নিষেধের পক্ষে কাওয়ামাহ, নারীর সাক্ষ্যের বিধান এবং নারী নেতৃত্ববিরোধী হাদিস ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ আগের বৈষম্যগুলো পরের বৈষম্যের ভিত্তি হয়েছে। নারীকে সাক্ষ্যে কম নির্ভরযোগ্য বলা হলো, তারপর সেই কম নির্ভরযোগ্যতাকে বিচারকের পদ থেকে তাকে বাদ দেওয়ার যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হলো। পরিবারে পুরুষকে নারীর কর্তা বলা হলো, তারপর বৃহত্তর জনক্ষমতাতেও পুরুষের নেতৃত্বকে স্বাভাবিক করা হলো।
একজন বিচারকের প্রয়োজন আইনজ্ঞান, প্রমাণ বিশ্লেষণ, যুক্তি, নিরপেক্ষতা, নৈতিক সাহস এবং সিদ্ধান্তক্ষমতা। এসব গুণের কোনোটিই পুরুষের শরীরে জন্মগতভাবে থাকে না। একজন অযোগ্য পুরুষ বিচারক হতে পারে, একজন অসাধারণ নারী আইনজ্ঞ শুধু নারী বলে অযোগ্য হতে পারে, এমন বিধান যোগ্যতা নির্বাচন করে না। এটি লিঙ্গ নির্বাচন করে।
বিচারের আসনে বসতে মস্তিষ্ক লাগে, পুরুষাঙ্গ নয়। আইন জানা, প্রমাণ বিচার করা এবং ন্যায়সঙ্গত রায় দেওয়ার ক্ষমতা লিঙ্গের অঙ্গ নয়। নারীকে বিচারক হতে বাধা দেওয়া বিচারব্যবস্থার সুরক্ষা নয়, পুরুষের জন্য ক্ষমতার আসন সংরক্ষণ।
“নারীকে শাসক করলে সেই জাতির কল্যাণ হবে না”
রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্নে সহিহ বুখারির হাদিস আরও সরাসরি। পারস্যের সম্রাট কিসরা মারা যাওয়ার পর তার কন্যাকে শাসক করা হয়েছে, এই সংবাদ মুহাম্মদের কাছে পৌঁছালে সে বলেছিল, যে জাতি তাদের শাসনভার নারীর হাতে দেয় তারা কখনো সফল হবে না। সহিহ বুখারির ৪৪২৫ নম্বর হাদিসে আবু বাকরা এই বক্তব্য বর্ণনা করেছে। [153]।
সহীহ বুখারী
৪৪২৫। আবূ বাকরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। পারস্যবাসীরা কিসরার কন্যাকে তাদের বাদশাহ করেছে শুনে মুহাম্মদ বলল, “যে জাতি নিজেদের শাসক হিসেবে নারীকে নিয়োগ করে সে জাতির কখনো কল্যাণ হতে পারে না।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বাক্যটিতে শাসক নারীর ব্যক্তিগত দক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। সে শিক্ষিত কি না, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা আছে কি না, সামরিক ও অর্থনৈতিক জ্ঞান আছে কি না, জনগণ তাকে সমর্থন করে কি না, তার প্রতিদ্বন্দ্বী পুরুষটি নির্বোধ কি না, এসব কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। জাতির ব্যর্থতার কারণ হিসেবে সরাসরি তার নারী হওয়াকে সামনে আনা হয়েছে।
একজন নারী অসাধারণ রাষ্ট্রনায়ক হতে পারে, একজন পুরুষ ভয়াবহ স্বৈরশাসক হতে পারে। ইতিহাসে উভয়ের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার সাফল্য প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, যুদ্ধ, প্রশাসন, শিক্ষা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নেতৃত্বের দক্ষতা এবং অসংখ্য বাস্তব উপাদানের ওপর নির্ভর করে। শাসকের লিঙ্গ দিয়ে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়, সরাসরি লিঙ্গগত কুসংস্কার। আসুন বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেমগণ এই বিষয়ে কী বলেন শুনি,
একটি রাষ্ট্র ধ্বংস করতে অযোগ্য পুরুষই যথেষ্ট, আর একটি রাষ্ট্র গড়তে সক্ষম নারীও যথেষ্ট হতে পারে। নেতৃত্বের যোগ্যতা মানুষের মস্তিষ্ক, চরিত্র ও দক্ষতায়, তার নারী বা পুরুষ পরিচয়ে নয়।
আয়িশার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একই হাদিস
বুখারির হাদিসটির আরেকটি দিক আরও তাৎপর্যপূর্ণ। আবু বাকরা শুধু পারস্যের একটি পুরনো ঘটনার স্মৃতি হিসেবে এই হাদিস বলেনি। সে বলেছে, জামালের যুদ্ধের সময় আয়িশা বসরায় এসে আলীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামরিক পক্ষের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর মুহাম্মদের এই বক্তব্য তার মনে পড়ে এবং সে আয়িশার পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকে। অর্থাৎ প্রথম মুসলিম গৃহযুদ্ধের রাজনৈতিক বাস্তবতায় হাদিসটি সরাসরি একজন নারী নেতার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়েছিল।
আয়িশা সাধারণ কোনো নারী ছিল না। সে মুহাম্মদের স্ত্রী, বিপুল হাদিসের বর্ণনাকারী, সাহাবিদের কাছে ধর্মীয় জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ উৎস এবং ইসলামী ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারীদের একজন। পুরুষ সাহাবিরা তার কাছ থেকে ধর্মীয় বিধান শিখেছে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বে তার নারী পরিচয়ই এমন একটি হাদিসের মুখোমুখি হয়েছে যেখানে নারী শাসনের সঙ্গে জাতির ব্যর্থতা জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
এখানে ধর্মীয় জ্ঞানের একটি অদ্ভুত দ্বৈততা দেখা যায়। একজন নারী পুরুষকে মুহাম্মদের ব্যক্তিগত জীবন, যৌনতা, নামাজ, বিবাহ এবং শরিয়তের বিধান শেখাতে পারে, কিন্তু সেই নারী রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে গেলে তার লিঙ্গ জাতির অকল্যাণের কারণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। পুরুষ তার কাছ থেকে ধর্ম শিখবে, কিন্তু সে পুরুষের ওপর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব করবে না।
আয়িশার ঘটনা প্রমাণ করে নারী নেতৃত্ববিরোধী হাদিসটি কেবল পারস্যের একটি নির্দিষ্ট রানিকে নিয়ে ঐতিহাসিক মন্তব্য হিসেবে পড়ে থাকেনি। মুহাম্মদের মৃত্যুর কয়েক দশকের মধ্যেই একজন মুসলিম নারী রাজনৈতিক নেতৃত্ব গ্রহণ করলে সেই হাদিস তার নেতৃত্ব প্রত্যাখ্যানের কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব পুরুষের জন্য
নারী শাসক সম্পর্কিত বুখারির হাদিসের ওপর ভিত্তি করে ধ্রুপদী সুন্নি রাষ্ট্রতত্ত্বে ইমামতে কুবরা, অর্থাৎ মুসলিম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য পুরুষ হওয়াকে শর্ত করা হয়েছে। আধুনিক রক্ষণশীল ফতোয়াগুলোও একই অবস্থান ধরে রেখেছে। IslamWeb রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক এবং সেনাপতির মতো উচ্চ নেতৃত্বের পদ নারীর জন্য বৈধ নয় বলে সরাসরি ফতোয়া দিয়েছে। [154]।
এই নিষেধের বাস্তব অর্থ হলো একটি রাষ্ট্রের জনসংখ্যার অর্ধেককে জন্মের মুহূর্তেই সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদ থেকে বাদ দেওয়া। একটি মেয়েশিশু ভবিষ্যতে যত শিক্ষিত, জনপ্রিয়, অভিজ্ঞ বা দক্ষই হোক, তার সামনে একটি অদৃশ্য ধর্মীয় ছাদ আগেই বসানো আছে। তার পাশে জন্মানো কম সক্ষম ছেলেশিশুটির সামনে সেই নিষেধ নেই।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এই বাদ দেওয়ার ফল ব্যক্তিগত কর্মজীবনের সীমার চেয়েও বড়। আইন, যুদ্ধ, বাজেট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পারিবারিক নীতি, নারীর অধিকার, শ্রমনীতি এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সর্বোচ্চ ক্ষমতা একটি লিঙ্গের হাতেই আটকে গেলে রাজনৈতিক ব্যবস্থাই পুরুষতান্ত্রিক হয়ে ওঠে। যাদের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে তারা শাসিত হতে পারে, কিন্তু সর্বোচ্চ শাসক হতে পারে না।
নারীকে ভোটার, প্রজা, করদাতা অথবা শাসকের সিদ্ধান্তের অধীন মানুষ হিসেবে গ্রহণ করে, কিন্তু শুধু নারী হওয়ার কারণে সর্বোচ্চ শাসক হতে নিষেধ করা রাজনৈতিক সমতা নয়। এটি রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে পুরুষের একচেটিয়া অধিকার।
বুদ্ধি কম, সাক্ষ্য কম, ক্ষমতাও কম
সাক্ষ্য, বিচার ও নেতৃত্বের বিধানগুলো আলাদাভাবে তৈরি হয়নি। এগুলো আগের পরিচ্ছেদের নারীচরিত্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। মুহাম্মদ নারীকে বুদ্ধিতে ঘাটতিপূর্ণ বলেছে। সেই ঘাটতির প্রমাণ হিসেবে দুই নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষের সমান হওয়ার কথা বলেছে। ফিকহ আবার সেই ধারণাকে ব্যবহার করে গুরুতর অপরাধে নারীর সাক্ষ্যের ওপর বাধা দিয়েছে। বিচারকের যোগ্যতায় পুরুষ হওয়াকে সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহ শর্ত করেছে। সর্বোচ্চ নেতৃত্বে নারী এলে জাতির কল্যাণ হবে না বলে হাদিস ব্যবহার করা হয়েছে।
এভাবে একই ধারণা এক স্তর থেকে আরেক স্তরে চলে যায়। প্রথমে নারী সম্পর্কে বলা হয় তার বুদ্ধি কম। তারপর আইনে তার সাক্ষ্য কমানো হয়। কম সাক্ষ্যক্ষমতা জনবিচারের কেন্দ্র থেকে তাকে দূরে রাখে। এরপর রাজনৈতিক নেতৃত্বেও তার লিঙ্গকে অযোগ্যতার কারণ বানানো হয়। নারী সম্পর্কে অপমানজনক ধর্মীয় চরিত্রায়ণ শেষ পর্যন্ত বাস্তব ক্ষমতা বণ্টনের নিয়মে পরিণত হয়।
একজন নারী চিকিৎসক জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিতে পারে, বিজ্ঞানী মহাকাশযান তৈরি করতে পারে, আইনজ্ঞ সংবিধান ব্যাখ্যা করতে পারে, অর্থনীতিবিদ রাষ্ট্রের অর্থনীতি বিশ্লেষণ করতে পারে, সেনা কর্মকর্তা হাজার মানুষের দায়িত্ব নিতে পারে। কিন্তু লিঙ্গভিত্তিক ধর্মীয় কাঠামোয় সেই একই নারী সাক্ষ্য, বিচার বা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে পুরুষের সমমর্যাদা হারাতে পারে।
নারীর বুদ্ধিকে ছোট করা শুধু অপমান নয়। এর রাজনৈতিক কাজ আছে। যাকে কম বুদ্ধিমান বলা যায়, তার সাক্ষ্য কমানো সহজ। যার সাক্ষ্য কম, তাকে বিচারক্ষমতা থেকে দূরে রাখা সহজ। যাকে বিচারক্ষমতা থেকে দূরে রাখা যায়, তাকে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষ থেকেও সরানো সহজ। ধর্মীয় লিঙ্গবিদ্বেষ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার বণ্টনেই গিয়ে দাঁড়ায়।
সাক্ষ্য ও নেতৃত্বের সামগ্রিক বৈষম্য
পুরো কাঠামোটি পাশাপাশি রাখলে হিসাবটি পরিষ্কার। ঋণচুক্তিতে প্রথম পছন্দ দুই পুরুষ, দুই পুরুষ না থাকলে একজন পুরুষের সঙ্গে দুই নারী। মুহাম্মদ সেই নিয়মকে নারীর বুদ্ধির ঘাটতির প্রমাণ বলেছে। চার সুন্নি মাযহাবের প্রতিষ্ঠিত মত হুদুদ ও কিসাসে নারীর সাক্ষ্য গ্রহণ করে না। বহু বিষয়ে নারীর সাক্ষ্য পুরুষের সঙ্গে মিলিয়েই কার্যকর হয়। জনবিচারের সর্বোচ্চ পদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহ নারীকে নিষিদ্ধ করেছে। সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে নারীকে বসালে জাতি সফল হবে না, মুহাম্মদের এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক আইন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
এই বিধানগুলোর কেন্দ্রীয় প্রশ্ন নারী কী করতে পারে তা নয়, নারীকে কতদূর বিশ্বাস ও ক্ষমতা দেওয়া হবে। তার সাক্ষ্যকে পুরুষের সমান ধরা হবে কি না, সে গুরুতর অপরাধের সত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবে কি না, সে অন্য মানুষের মামলার বিচার করবে কি না, সে একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত নেবে কি না। প্রতিটি ধাপেই পুরুষের দিকে ক্ষমতার পাল্লা ভারী।
একটি আইনে নারীকে পূর্ণ মানুষ বলা আর বাস্তবে তার কণ্ঠকে অর্ধেক, তার বিচারক্ষমতাকে সন্দেহজনক এবং তার নেতৃত্বকে জাতির অকল্যাণ ঘোষণা করা একসঙ্গে চলতে পারে না। সমান মর্যাদার অর্থ হলো একই যোগ্যতায় একই বিশ্বাস, একই আইনি মূল্য এবং একই ক্ষমতার সুযোগ। ইসলামী সাক্ষ্য ও নেতৃত্বের ধ্রুপদী কাঠামো সেই সমতা দেয় না।
পর্দা, চলাফেরা ও জনপরিসরে নারীর উপস্থিতি
ইসলামী নারী-ব্যবস্থায় নারীর শরীরকে শুধু স্বামীর যৌন অধিকারের বিষয় হিসেবে দেখা হয়নি, জনপরিসরে তার উপস্থিতিকেও পুরুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা ও নৈতিক বিপদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। নারীকে আওরাত বা আবরণীয় সত্তা বলা হয়েছে, বাইরে বের হলে শয়তান তাকে পুরুষের চোখে আকর্ষণীয় করে তোলে বলা হয়েছে, সুগন্ধি ব্যবহার করে পুরুষদের পাশ দিয়ে গেলে তাকে ব্যভিচারিণী বলা হয়েছে, দীর্ঘ সফরে মাহরাম পুরুষের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, মসজিদে যেতে বাধা দিতে নিষেধ করেও নারীর ঘরকে তার নামাজের জন্য উত্তম বলা হয়েছে। কোরআনে মুহাম্মদের স্ত্রীদের ঘরে অবস্থান করতে, পরপুরুষের সঙ্গে কোমলভাবে কথা না বলতে এবং পর্দার আড়াল থেকে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। পরে একই ধর্মীয় সংস্কৃতি সাধারণ মুসলিম নারীর পোশাক, চলাফেরা, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র এবং জনপরিসরে উপস্থিতির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি তৈরি করেছে।
এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে একটি পুরুষকেন্দ্রিক সমস্যা আছে। একজন পুরুষ একজন নারীকে দেখে কামনা অনুভব করতে পারে। সেই কামনার উৎস পুরুষের নিজের মস্তিষ্ক, শরীর ও যৌন আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু ইসলামী পর্দা-সংস্কৃতিতে সেই আকাঙ্ক্ষার বড় অংশের দায় নারীর শরীরের ওপর চাপানো হয়েছে। তার চুল ঢাকতে হবে, শরীর ঢাকতে হবে, অলঙ্কার গোপন রাখতে হবে, সুগন্ধি সীমিত করতে হবে, কথা বলার ভঙ্গি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, একা সফর করা যাবে না এবং বহু রক্ষণশীল ব্যাখ্যায় ঘরের বাইরে উপস্থিতিই সন্দেহের বিষয়। পুরুষের কামনা নিয়ন্ত্রণের সহজতম উপায় হিসেবে পুরুষকে আত্মসংযম শেখানোর বদলে নারীকে আবৃত, সীমাবদ্ধ এবং অদৃশ্য করার ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। পুরুষের চোখের দায় শেষ পর্যন্ত নারীর শরীর বহন করে।
“নারী আওরাত”, বাইরে বের হলে শয়তান তাকে আকর্ষণীয় করে
তিরমিজির হাদিসে মুহাম্মদ নারীকে সরাসরি আওরাত বলেছে। আরবি আওরাহ শব্দটি এমন কিছু বোঝাতে ব্যবহৃত হয় যা আবৃত বা গোপন রাখতে হয়। একই হাদিসে বলা হয়েছে, নারী যখন বাইরে বের হয় তখন শয়তান তাকে পুরুষের দৃষ্টিতে আকর্ষণীয় করে তোলে। মিশকাতুল মাসাবীহে হাদিসটির বাংলা অনুবাদ এসেছে, “রমণী মাত্রই আবরণীয় বিষয়, যখন সে বের হয় তখন শয়তান তাকে সুশোভিত করে তোলে।” [155]।
মিশকাতুল মাসাবীহ
পর্ব ১৩, বিবাহ
হাদিস ৩১১০
ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুহাম্মদ বলেছে, “রমণী মাত্রই আবরণীয় বিষয়। যখন সে বের হয় তখন শয়তান তাকে সুশোভিত করে তোলে।”
মূল সূত্র, সুনান আত-তিরমিজি ১১৭৩
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই বক্তব্যে নারী কোনো নির্দিষ্ট পোশাক পরার কারণে, কাউকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করার কারণে অথবা কোনো যৌন আচরণের কারণে বিপজ্জনক হয়ে ওঠেনি। তার নারীসত্তাই প্রথমে আওরাত, তারপর ঘরের বাইরে তার উপস্থিতিকে শয়তানের যৌন প্রলোভনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। নারী রাস্তা দিয়ে হাঁটছে, বাজারে যাচ্ছে, কাজ করছে, পড়াশোনা করছে, চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছে অথবা বন্ধুর সঙ্গে দেখা করছে, তার এই স্বাভাবিক মানবিক উপস্থিতির ওপর একটি যৌন সন্দেহের ছায়া বসিয়ে দেওয়া হয়।
এই ধারণার সামাজিক প্রভাব বিশাল। একটি মেয়েকে যদি ছোটবেলা থেকে শেখানো হয় তার শরীর নিজেই এমন কিছু যা বাইরে গেলেই শয়তান পুরুষের সামনে আকর্ষণীয় করে তোলে, তাহলে তার নিজের শরীর সম্পর্কে লজ্জা ও অপরাধবোধ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। পুরুষ তাকে কুরুচিপূর্ণভাবে তাকালে সে ভাবতে পারে তার পোশাকে ভুল ছিল। তাকে হয়রানি করা হলে প্রশ্ন উঠতে পারে সে কেন বাইরে গিয়েছিল। পুরুষের আচরণ বিশ্লেষণের আগে নারীর উপস্থিতিই বিচারাধীন হয়ে যায়।
নারী কোনো হাঁটতে থাকা যৌনাঙ্গ নয়, কোনো আবরণযোগ্য বিপজ্জনক বস্তু নয়। সে একজন পূর্ণ মানুষ। তার রাস্তায় হাঁটা, বাজারে যাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অথবা অফিসে কাজ করা শয়তানি প্রলোভনের ঘটনা নয়। একজন পুরুষ নারীকে দেখে নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সমস্যাটি সেই পুরুষের, নারীর অস্তিত্বের নয়।
মুহাম্মদের স্ত্রীদের ঘরে অবস্থানের নির্দেশ
সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩২ ও ৩৩:৩৩ সরাসরি মুহাম্মদের স্ত্রীদের সম্বোধন করেছে। প্রথমে তাদের বলা হয়েছে তারা অন্য নারীদের মতো নয়, তারপর পরপুরুষের সঙ্গে কোমলভাবে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে, যাতে যার অন্তরে রোগ আছে সে লোভ না করে। এরপর বলা হয়েছে নিজেদের ঘরে অবস্থান করতে এবং পূর্ববর্তী জাহেলি যুগের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বাইরে না বের হতে। [156]।
কোরআন, সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩২ থেকে ৩৩
“কথাবার্তায় কোমলতা প্রদর্শন করো না, তাহলে যার অন্তরে রোগ আছে সে লালসা করবে… আর তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো এবং পূর্ববর্তী জাহেলি যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়িও না।”
আয়াতটির সরাসরি সম্বোধন মুহাম্মদের স্ত্রীদের প্রতি। কিন্তু এই নারীরা ইসলামী সংস্কৃতিতে সাধারণ স্ত্রী নয়, মুসলিম নারীর ধর্মীয় আদর্শ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। তাদের পর্দা, ঘরে থাকা, পুরুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বাইরে যাওয়ার আচরণ পরবর্তী মুসলিম নৈতিক সাহিত্যে নারীর লজ্জাশীলতার উচ্চতম উদাহরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে একটি বিশেষ পারিবারিক বিধান বৃহত্তর নারী-আচরণের আদর্শে পরিণত হয়েছে।
৩৩:৩২-এর ভাষাটিও একই দায়বণ্টন প্রকাশ করে। কোনো পুরুষের “অন্তরে রোগ” আছে, কিন্তু তার কামনার ঝুঁকি এড়াতে নারীর কথার স্বর নিয়ন্ত্রণ করতে বলা হচ্ছে। নারীকে অশ্লীল কথা বলতে নিষেধ করার কথা নয়, “কোমল” বা আকর্ষণীয়ভাবে কথা বলতেও সতর্ক করা হচ্ছে, কারণ অসুস্থ কামনার পুরুষ তা থেকে লোভ করতে পারে। পুরুষটির লালসা তার নিজের মানসিক সমস্যা হলেও নারীর কণ্ঠ সেই সমস্যার ব্যবস্থাপনার অংশ হয়ে যায়।
ঘরে থাকার আদর্শের ফল আরও বিস্তৃত। জনজীবনে অংশ নিতে হলে ঘর ছাড়তে হয়। শিক্ষা, কর্মজীবন, ব্যবসা, রাজনীতি, বিজ্ঞান, প্রশাসন, শিল্প, সামাজিক আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সবই জনপরিসরের সঙ্গে যুক্ত। নারী যত বেশি গৃহকেন্দ্রিক হবে, রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও জ্ঞানের প্রতিষ্ঠানগুলো তত বেশি পুরুষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। নারীকে ঘরের মর্যাদা দেওয়া আর পুরুষকে পৃথিবী দেওয়া সমতা নয়। ঘর যদি নারীর প্রধান ক্ষেত্র আর জনপরিসর পুরুষের ক্ষেত্র হয়, তাহলে অর্থনীতি, আইন, রাজনীতি ও জ্ঞান উৎপাদনের ক্ষমতাও পুরুষের হাতেই জমা হয়।
পর্দার আড়াল থেকে কথা বলার বিধান
সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৩-এ মুহাম্মদের স্ত্রীদের কাছ থেকে কোনো জিনিস চাইলে পর্দা বা আড়ালের পেছন থেকে চাইতে বলা হয়েছে। আয়াতে বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থা পুরুষদের হৃদয় এবং নবীর স্ত্রীদের হৃদয়ের জন্য অধিক পবিত্র। [157]। ইসলামী পরিভাষায় হিজাব শব্দের অন্যতম প্রাথমিক কোরআনিক ব্যবহার এই শারীরিক আড়ালকে বোঝায়।
কোরআন, সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৩
“তোমরা যখন নবীর স্ত্রীদের কাছ থেকে কোনো কিছু চাইবে, তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটি তোমাদের হৃদয় এবং তাদের হৃদয়ের জন্য অধিক পবিত্র।”
এখানে নারী ও পুরুষের সরাসরি সামাজিক যোগাযোগকে হৃদয়ের পবিত্রতার ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একজন পুরুষ একজন নারীর কাছ থেকে কোনো বস্তু চাইবে, এত সাধারণ যোগাযোগেও শারীরিক পর্দা আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়। নারীকে দেখা, তার সামনে থাকা এবং সরাসরি কথা বলা যৌন বা নৈতিক বিপদের সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
এই ধারণা পরে স্থাপত্যেও প্রবেশ করেছে। ঘরের নারী অংশ, পর্দা, জেনানা, আলাদা বসার জায়গা, নারী-পুরুষের পৃথক প্রবেশপথ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভাজন এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পর্দা, এসবের পেছনে নারী-পুরুষের সরাসরি উপস্থিতিকে সন্দেহের চোখে দেখার সংস্কৃতি কাজ করেছে। নারী তখন শুধু শরীর ঢাকে না, সামাজিকভাবে আড়ালেও যায়।
পবিত্রতার মানদণ্ড যদি নারী ও পুরুষের স্বাভাবিক মানবিক যোগাযোগ কমানোর ওপর দাঁড়ায়, তাহলে যৌন সংযম মানুষের চরিত্রে নয়, দেয়াল ও কাপড়ে খোঁজা হয়। ফল হয় নারীকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা।
জিলবাব, খিমার এবং নারীর শরীর ঢাকার বিস্তৃত বিধান
মুহাম্মদের স্ত্রীদের জন্য পর্দার পাশাপাশি কোরআন সাধারণ বিশ্বাসী নারীদের পোশাক নিয়েও নির্দিষ্ট বিধান দিয়েছে। সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৯-এ মুহাম্মদকে বলা হয়েছে, তার স্ত্রী, কন্যা এবং বিশ্বাসী নারীদের বলতে যেন তারা নিজেদের ওপর জিলবাব টেনে নেয়। আয়াতে এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এতে তাদের পরিচিত করা সহজ হবে এবং তারা হয়রানির শিকার হবে না। [158]।
কোরআন, সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৯
“হে নবী, তোমার স্ত্রীদের, তোমার কন্যাদের এবং বিশ্বাসী নারীদের বলো তারা যেন নিজেদের ওপর তাদের জিলবাবের কিছু অংশ টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে এবং তারা হয়রানির শিকার হবে না।”
সূরা আন-নূর ২৪:৩১-এ বিশ্বাসী নারীদের দৃষ্টি সংযত রাখতে, যৌনাঙ্গ রক্ষা করতে, প্রকাশমান অংশ ছাড়া সৌন্দর্য প্রদর্শন না করতে এবং খিমার বক্ষদেশের ওপর টেনে দিতে বলা হয়েছে। এরপর কোন কোন পুরুষ আত্মীয়ের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ করা যাবে তার বিস্তারিত তালিকাও দেওয়া হয়েছে। [159]।
কোরআন, সূরা আন-নূর ২৪:৩১
“বিশ্বাসী নারীদের বলো তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে, যৌনাঙ্গ সংরক্ষণ করে, যা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশমান তা ছাড়া নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে এবং নিজেদের খিমার বক্ষদেশের ওপর টেনে দেয়।”
নারীর পোশাক এখানে নিছক ব্যক্তিগত রুচি নয়। শরীরের কোন অংশ কার সামনে দেখা যাবে, কোন অলঙ্কার প্রকাশ করা যাবে, কোন পুরুষ আত্মীয়ের সামনে কোন মাত্রার শিথিলতা থাকবে, সবকিছু ধর্মীয় আইনের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। মুখ ও হাত ঢাকার মাত্রা নিয়ে ফিকহি তর্ক থাকতে পারে, কিন্তু মূল কাঠামো বদলায় না: নারীর শরীরকে পরপুরুষের দৃষ্টির জন্য ধর্মীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত বস্তু করা হয়েছে।
পোশাকের এই একতরফা যৌন বোঝা বিশেষভাবে দৃশ্যমান। পুরুষেরও সতর আছে, তাকেও দৃষ্টি সংযত করতে বলা হয়েছে। কিন্তু নারীর শরীরের আবরণ, চুল, বক্ষ, অলঙ্কার, সুগন্ধি এবং কখনো মুখ পর্যন্ত নিয়ে যে ব্যাপক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, পুরুষের শরীরকে একই মাত্রায় সামাজিক বিপদের উৎস মনে করে তার ওপর তা বসানো হয়নি।
পুরুষ নারীর চুল দেখে কামনা করতে পারে বলে নারীর চুল অপরাধের বস্তু হয়ে যায় না। পুরুষ নারীর শরীর দেখে উত্তেজিত হতে পারে বলে নারীর শরীর জনপরিসর থেকে মুছে ফেলার বিষয় হয়ে যায় না। কামনা যার, নিয়ন্ত্রণের প্রথম দায়িত্বও তার।
সুগন্ধি ব্যবহার করলে “ব্যভিচারিণী”
নারীর জনপরিসরে উপস্থিতির ওপর সবচেয়ে কুরুচিপূর্ণ ধর্মীয় ভাষাগুলোর একটি সুগন্ধি নিয়ে এসেছে। সুনান আত-তিরমিজিতে উল্লেখ আছে, মুহাম্মদ বলেছে, প্রতিটি চোখ ব্যভিচারী, আর কোনো নারী সুগন্ধি ব্যবহার করে কোনো মজলিসের পাশ দিয়ে গেলে সে ব্যভিচারিণী। [160]। তিরমিজির পরিচ্ছেদের নামই নারীদের আতর লাগিয়ে বাইরে যাওয়ার নিষেধ নিয়ে।
সুনান আত-তিরমিজি (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৬/ কিতাবুল আদব
পরিচ্ছেদঃ আতর লাগিয়ে মেয়েদের বাইরে যাওয়া নিষেধ
২৭৮৬। আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুহাম্মদ বলেছে, “প্রতিটি চোখ ব্যভিচারী। কোনো মহিলা যদি আতর লাগিয়ে কোনো মজলিসের পাশ দিয়ে যায়, তবে সে এমন, অর্থাৎ ব্যভিচারিণী।”
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
নারী এখানে কারও সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করেনি, কাউকে স্পর্শ করেনি, কোনো প্রস্তাব দেয়নি, এমনকি কোনো পুরুষের দিকে তাকানোর কথাও নেই। সে নিজের শরীরে সুগন্ধি ব্যবহার করেছে এবং মানুষের পাশ দিয়ে গেছে। তাতেই তার জন্য “ব্যভিচারিণী”র ভাষা এসেছে। অপরাধটি বাস্তব যৌন আচরণ নয়, পুরুষ তার গন্ধ পেতে পারে এবং কামনা করতে পারে, এই সম্ভাবনা।
একজন পুরুষ সুগন্ধি ব্যবহার করে নারীদের পাশ দিয়ে গেলে তার জন্য একই “ব্যভিচারী” পরিচয়ের সমান্তরাল হাদিস নেই। বরং পুরুষের সুগন্ধি ব্যবহার ইসলামী সংস্কৃতিতে স্বাভাবিক ও প্রশংসিত। ফলে সুগন্ধির রাসায়নিক গুণ ধর্মীয় সমস্যা নয়। সমস্যা নারীদেহের সঙ্গে তার সম্পর্ক। একই গন্ধ পুরুষের শরীরে সুগন্ধি, নারীর শরীরে যৌন বিপদ।
কোনো নারী সুগন্ধি লাগিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটলে সে ব্যভিচারিণী হয় না। যে পুরুষ তার গন্ধ পেয়ে যৌন কল্পনা করে, সেই কল্পনা পুরুষটির নিজের। নারীর শরীরে সুগন্ধি থাকার কারণে তার চরিত্র যৌন অপরাধীর পর্যায়ে নামিয়ে দেওয়া সরাসরি যৌন নিয়ন্ত্রণ।
মসজিদে যেতে পারবে, কিন্তু ঘরই উত্তম
ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মসজিদ। আবু দাউদের সহিহ হাদিসে মুহাম্মদ পুরুষদের বলেছে নারীদের মসজিদে যেতে বাধা দিও না, কিন্তু একই বাক্যে বলেছে তাদের ঘরই তাদের নামাজের জন্য উত্তম। [161]।
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২/ সালাত
৫৬৭। ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুহাম্মদ বলেছে, “তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের মসজিদে যেতে বাধা দিও না, কিন্তু তাদের ঘরসমূহই তাদের জন্য উত্তম।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুরুষের ক্ষেত্রে জামাতে মসজিদের নামাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক কাজ। মসজিদ শুধু নামাজের জায়গা ছিল না, রাজনৈতিক আলোচনা, শিক্ষা, বিচার, সামাজিক যোগাযোগ এবং সম্প্রদায়ের কেন্দ্রও ছিল। নারীকে সরাসরি নিষিদ্ধ না করেও যদি বলা হয় তার ধর্মীয়ভাবে উত্তম স্থান ঘর, তাহলে জনধর্মীয় কেন্দ্রের নিয়মিত উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই পুরুষের দিকে যায়।
জনপরিসরের ক্ষমতা উপস্থিতি থেকে তৈরি হয়। যে নিয়মিত মসজিদে যায় সে আলেমের বক্তব্য শোনে, অন্যদের সঙ্গে পরিচিত হয়, বিতর্কে অংশ নেয়, সামাজিক যোগাযোগ তৈরি করে এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের কাছে দৃশ্যমান থাকে। যে ঘরে থাকে সে সেই নেটওয়ার্ক থেকে দূরে থাকে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পুরুষকেন্দ্রিক হওয়ার পেছনে এই গৃহমুখী নারী-আদর্শের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না।
নারীর জন্য ঘরকে উত্তম আর পুরুষের জন্য জনধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে স্বাভাবিক স্থান বানালে ধর্মীয় জ্ঞান, সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং নেতৃত্বও পুরুষের হাতে জমা হয়। ঘরে থাকার পুরস্কার শেষ পর্যন্ত জনক্ষমতা হারানোর মূল্য নিয়ে আসে।
রাস্তার মাঝখানও নারীর জন্য নয়
সুনান আবু দাউদের একটি হাসান বর্ণনায় জনপরিসরের বিভাজন আরও আক্ষরিক রূপ নেয়। মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় নারী-পুরুষ রাস্তায় মিশে গেলে মুহাম্মদ নারীদের পিছিয়ে যেতে বলেন এবং নির্দেশ দেন, তারা যেন রাস্তার মাঝখান দিয়ে না চলে, বরং রাস্তার কিনারা দিয়ে যায়। বর্ণনায় বলা হয়েছে, নারীরা দেয়ালের এত কাছে দিয়ে চলত যে তাদের পোশাক দেয়ালে আটকে যেত। [162]।
রাস্তা সবার জন্য একই জনপরিসর, কিন্তু চলাচলের সুবিধাজনক কেন্দ্র পুরুষের এবং প্রান্ত নারীর—এই বর্ণনায় লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক স্থানবণ্টন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। নারী শুধু শরীর ঢাকবে না; পুরুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার আশঙ্কায় একই রাস্তার কোন অংশ দিয়ে হাঁটবে, সেটিও নিয়ন্ত্রিত হয়েছে।
মাহরাম ছাড়া নারীর সফরে নিষেধ
নারীর চলাফেরার ওপর সবচেয়ে সরাসরি বিধিনিষেধগুলোর একটি দীর্ঘ সফরের ক্ষেত্রে। সহিহ বুখারিতে উল্লেখ আছে, মুহাম্মদ বলেছে, আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী কোনো নারী মাহরাম পুরুষ ছাড়া এক দিন ও এক রাতের পথ সফর করতে পারবে না। [163]। অন্য হাদিসে দূরত্বের বর্ণনায় এক দিন, দুই দিন, তিন দিন ইত্যাদি পার্থক্য এসেছে, কিন্তু ধ্রুপদী ফিকহে নারীর সফরের সঙ্গে মাহরামের প্রশ্নটি শক্তিশালী বিধানে পরিণত হয়েছে।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
১৮/ সালাত কসর করা
১০৮৮। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুহাম্মদ বলেছে, “যে মহিলা আল্লাহ এবং আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, তার পক্ষে কোনো মাহরাম পুরুষকে সঙ্গে না নিয়ে একদিন ও এক রাতের পথ সফর করা জায়েয নয়।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই বিধানের বাস্তব অর্থ হলো একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীও নিজের ভ্রমণের সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ স্বাধীন ব্যক্তি নয়। সে শিক্ষার জন্য অন্য শহরে যাবে, চাকরির সাক্ষাৎকারে যাবে, ব্যবসা করবে, চিকিৎসার জন্য যাবে, আত্মীয়ের কাছে যাবে অথবা নিজে পৃথিবী দেখতে চাইবে, তার দীর্ঘ সফরের বৈধতা একজন পুরুষ আত্মীয়ের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে। পুরুষকে একইভাবে নারী মাহরাম সঙ্গে রাখতে বলা হয়নি। আসুন এই বিষয়ে বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম আহমাদুল্লাহর বক্তব্য শুনি,
আধুনিক সময়ে বিমান, ট্রেন, নিবন্ধিত হোটেল, মোবাইল যোগাযোগ, জিপিএস, পুলিশ, দূতাবাস এবং নিরাপদ গণপরিবহন থাকা সত্ত্বেও বহু রক্ষণশীল আলেম এই বিধানকে বর্তমান নারীর স্বাধীন সফরের ওপর প্রয়োগ করে। কিছু আধুনিক শিথিলতা মূল কাঠামো বদলায় না। ধ্রুপদী ধারণার কেন্দ্র অপরিবর্তিত: প্রাপ্তবয়স্ক নারীর চলাচল পুরুষের চলাচলের মতো স্বয়ংসম্পূর্ণ ধরা হয়নি।
নিরাপত্তার যুক্তি দিয়ে এই বিধানকে চালানো হলেও এর ফল লিঙ্গভিত্তিক অভিভাবকত্ব। কোনো রাস্তা বিপজ্জনক হলে পুরুষও ডাকাতি, হত্যা বা দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে। নিরাপত্তার ব্যবস্থা হওয়া উচিত বিপদ কমানো, অপরাধীর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ এবং মানুষকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা দেওয়া। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে নিরাপদ রাখতে তার স্বাধীনতাই কেড়ে নেওয়া সুরক্ষা নয়। খাঁচা নিরাপদ হতে পারে, কিন্তু খাঁচা স্বাধীনতা নয়।
ধর্মীয় স্থানেও পুরুষ সামনে, নারী পেছনে
সহিহ মুসলিমে মুহাম্মদ বলেছেন, পুরুষদের জন্য সর্বোত্তম নামাজের সারি প্রথম সারি এবং সবচেয়ে খারাপ শেষ সারি; নারীদের জন্য ঠিক বিপরীত—সর্বোত্তম শেষ সারি এবং সবচেয়ে খারাপ প্রথম সারি। [164]। ধর্মীয় সমাবেশের শারীরিক বিন্যাসেও তাই পুরুষকে সামনে এবং নারীকে পেছনে রাখাই আদর্শ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে।
“পোশাক পরেও নগ্ন” নারী এবং জাহান্নামের হুমকি
নারীর পোশাককে শুধু সামাজিক শালীনতার বিষয় রাখা হয়নি; তার সঙ্গে পরকালীন শাস্তিও যুক্ত হয়েছে। সহিহ মুসলিমে মুহাম্মদ এমন নারীদের জাহান্নামীদের একটি শ্রেণি হিসেবে বর্ণনা করেছেন যারা “পোশাক পরেও নগ্ন”, অন্যকে আকর্ষণ করে এবং নিজেরাও আকৃষ্ট হয়; তাদের মাথাকে হেলে থাকা উটের কুঁজের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না। [165]।
পোশাকের একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় মানদণ্ড লঙ্ঘন এখানে ব্যক্তিগত পোশাক-পছন্দ হিসেবে থাকছে না; সেটিকে জাহান্নামের উপযুক্ত অপরাধে উন্নীত করা হয়েছে। নারীর শরীর কতটা দৃশ্যমান, পোশাক কতটা আঁটসাঁট বা আকর্ষণীয়, চুল ও সাজসজ্জা কীভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে—এই প্রশ্নগুলো ধর্মীয় শাস্তির ভাষার মধ্যে ঢুকে যায়।
পুরুষ অভিভাবকের ওপর চলাফেরা নির্ভর করলে শিক্ষা ও কর্মজীবনও নির্ভরশীল হয়
চলাফেরার স্বাধীনতা আলাদা কোনো বিলাসী অধিকার নয়। মানুষের প্রায় সব বড় অধিকার বাস্তবে ব্যবহার করতে চলাচল প্রয়োজন। বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়, কর্মক্ষেত্রে যেতে হয়, ব্যবসার জন্য ভ্রমণ করতে হয়, আদালতে যেতে হয়, রাজনৈতিক সভায় যেতে হয়, চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যেতে হয়। একজন নারীর বাইরে যাওয়া, দূরে যাওয়া অথবা কোথায় যাবে সেই সিদ্ধান্ত যদি পরিবারের পুরুষের অনুমোদন ও উপস্থিতির সঙ্গে বাঁধা থাকে, তাহলে তার শিক্ষা, অর্থনীতি এবং সামাজিক ক্ষমতাও সেই পুরুষের হাতে যায়।
ধরা যাক একটি মেয়ে একটি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেল, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় অন্য শহরে। তার মাহরাম পুরুষ তার সঙ্গে থাকতে পারবে না অথবা পরিবার তাকে একা যেতে দেবে না। ছেলেটি একই সুযোগ পেলে চলে গেল, মেয়েটি থেকে গেল। কয়েক বছর পরে ছেলেটির শিক্ষা বেশি, আয় বেশি, পেশাগত যোগাযোগ বেশি এবং সিদ্ধান্তক্ষমতাও বেশি। তারপর সমাজ বলে পুরুষরাই পরিবারের নেতৃত্ব দেওয়ার উপযুক্ত। যে ব্যবস্থাই আগে মেয়েটির সুযোগ কেটে দিয়েছে, পরে সেই ব্যবধানকে তার অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও একই বিষয়। চাকরি না করলে নিজের আয় থাকে না। নিজের আয় না থাকলে নির্যাতনকারী স্বামী ছেড়ে যাওয়া কঠিন হয়, নিজের বাসা নেওয়া কঠিন হয়, আইনজীবী নিয়োগ করা কঠিন হয়, সন্তানদের নিয়ে স্বাধীনভাবে থাকা কঠিন হয়। ফলে চলাফেরার ওপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত দাম্পত্যের ওপরও পুরুষের ক্ষমতা বাড়ায়।
নারীকে ঘরে রেখে তারপর বলা যে পুরুষ অর্থ উপার্জন করে, তাই পুরুষ কাওয়াম, একটি আত্মসম্পূর্ণ পুরুষতান্ত্রিক চক্র। প্রথমে নারীর জনজীবন সীমিত করো, তারপর তার কম অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে পুরুষের কর্তৃত্বের কারণ বানাও।
নারীর কণ্ঠও যৌন ঝুঁকির অংশ
সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩২-এ মুহাম্মদের স্ত্রীদের পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলার ধরন নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। “কোমল”ভাবে কথা না বলতে বলা হয়েছে, কারণ যার অন্তরে রোগ আছে সে লালসা করতে পারে। এই বিধানের সরাসরি ক্ষেত্র মুহাম্মদের স্ত্রী হলেও পরবর্তী পর্দা-সংস্কৃতিতে নারীর কণ্ঠ কতটা প্রকাশ্য হবে, অপ্রয়োজনীয় কথা বলা যাবে কি না, গান, আবৃত্তি বা জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়া যাবে কি না, এসব নিয়েও কঠোর আলোচনা তৈরি হয়েছে।
মূলধারার বহু ফকিহ নারীর স্বাভাবিক কণ্ঠকে নিজে আওরাত বলেনি। নারীরা মুহাম্মদকে প্রশ্ন করেছে, সাহাবিদের সঙ্গে কথা বলেছে, হাদিস বর্ণনা করেছে এবং পুরুষ আলেমরা নারীদের কাছ থেকে জ্ঞান নিয়েছে। কিন্তু কণ্ঠ আকর্ষণীয় হলে, কোমল হলে, গান হলে অথবা পুরুষের কামনার কারণ হতে পারে এমনভাবে ব্যবহার হলে নিষেধের পরিসর বাড়ানো হয়েছে। ফলে নারীর কথা বলার অধিকারও পুরুষের সম্ভাব্য উত্তেজনা দিয়ে মাপা শুরু হয়। আসুন কোরআনের আয়াতটি পড়ি,
হে নবী পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও। তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর, তাহলে পর পুরুষের সঙ্গে আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না, যাতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে প্রলুদ্ধ হয়। তোমরা সঙ্গত কথা বলবে।
— Taisirul Quran
হে নাবীর পত্নীরা! তোমরা অন্য নারীদের মত নও, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তাহলে পর-পুরুষের সাথে কোমল কন্ঠে এমনভাবে কথা বলনা যাতে অন্তরে যার ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয় এবং তোমরা ন্যায় সঙ্গত কথা বলবে।
— Sheikh Mujibur Rahman
হে নবী-পত্নিগণ, তোমরা অন্য কোন নারীর মত নও। যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে (পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, তাহলে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে।
— Rawai Al-bayan
হে নবী -পত্নিগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর সুতরাং পর-পুরুষের সাথে কমল কন্ঠে এমন ভাবে কথা বলো না, কারণ এতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে, সে প্রলুব্ধ হয় এবং তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলবে।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
অনেকে দাবী করতে পারেন যে, এই আয়াত শুধুমাত্র নবীর স্ত্রীদের সম্পর্কে নাজিল হয়েছিল। অথচ তাফসীর গ্রন্থগুলো ভিন্ন কথা বলে। ইসলামে নবীর স্ত্রীদের বিভিন্ন হুকুম দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহ আসলে স্বাধীনা মুমিনা নারীদেরই হুকুম দিয়েছেন বহু স্থানে। এই বিষয়ে সাহাবী ও তাবে তাবেইনগণই এই রকমই বুঝেছেন যে, এই বিধান সকল মুমিনা নারীর জন্যেই প্রযোজ্য [166] –
পুণ্যবতী স্ত্রীগণের প্রতি বিশেষ হেদায়েত
পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে পুণ্যবতী স্ত্রীগণকে (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সমীপে এমন দাবি পেশ করতে বারণ করা হয়েছে, যা পূরণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন অথবা যা তাঁর মহান মর্যাদার পক্ষে অশোভনীয়। যখন তাঁরা তা মেনে নিয়েছেন, তখন সাধারণ নারীদের তুলনায় তাঁদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের এক আমলকে দুয়ের সমতুল্য করে দেওয়া হয়েছে।
পরবর্তী পর্যায়ে তাঁদের কর্মের পরিশুদ্ধি এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সান্নিধ্য ও দাম্পত্য সম্পর্কের যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য কয়েকটি হেদায়েত প্রদান করা হয়েছে। এসব হেদায়েত যদিও পুণ্যবতী স্ত্রীগণ তথা أَزْوَاجٌ مُطَهَّرَاتٌ-এর জন্য নির্দিষ্ট নয়; বরং সমগ্র মুসলিম নারীকুলের প্রতিই তা নির্দেশিত। কিন্তু এখানে তাঁদেরকে বিশেষভাবে সম্বোধন করে তাঁদের দৃষ্টি এদিকে আকৃষ্ট করা হয়েছে যে, এসব আমল ও আহকাম সমস্ত মুসলিম রমণীকুলের প্রতিই ওয়াজিব ও অবশ্য পালনীয়। তাই এগুলোর প্রতি তাঁদের বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা উচিত। আর
لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِنَ النِّسَاءِ দ্বারা এ বিশেষত্বই বোঝানো হয়েছে।
নবী করীম ﷺ-এর পুণ্যবতী স্ত্রীগণ বিশ্বের সমস্ত নারীকুলের চাইতে শ্রেষ্ঠ কি?
আয়াতের শব্দাবলি দ্বারা বাহ্যিকভাবে বোঝা যায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পুণ্যবতী স্ত্রীগণ বিশ্বের সমস্ত নারীকুলের চাইতে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু হযরত মরিয়ম (আ.) সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاكِ وَطَهَّرَكِ وَاصْطَفَاكِ عَلَى نِسَاءِ الْعَالَمِينَ
অর্থাৎ, আল্লাহ আপনাকে মনোনীত করেছেন, পবিত্র ও কলঙ্কমুক্ত করেছেন এবং বিশ্বের সমস্ত নারীকুলের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন।
এর দ্বারা হযরত মরিয়ম (আ.) সমস্ত নারীজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে প্রমাণিত হন। তিরমিযী শরীফে হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, সমগ্র রমণীকুলের মধ্যে হযরত মরিয়ম, উম্মুল মু’মিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা, হযরত ফাতেমা এবং ফিরাউন-পত্নী হযরত আসিয়া (আ.)-ই তোমাদের জন্য যথেষ্ট। এ হাদীসে হযরত মরিয়মের সঙ্গে আরো তিনজনকে নারীজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
এ আয়াতে আযওয়াজে মুতাহহারাতের যে শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চ মর্যাদার কথা বলা হয়েছে, তা এক বিশেষ দিক বিবেচনায়—নবী-পত্নী হিসাবে। এদিক দিয়ে তাঁরা নিঃসন্দেহে সমস্ত রমণীকুলের চাইতে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু এর দ্বারা সর্বদিক দিয়ে তাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয় না; কারণ তা অন্যান্য কুরআনের আয়াত ও হাদীসের পরিপন্থী।
—তাফসীরে মাযহারী
لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِنَ النِّسَاءِ
এর পরও আল্লাহ পাক তাঁদের নবী-পত্নী হিসেবে যে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন, তার ভিত্তিতে একটি শর্ত আরোপ করেছেন। এর উদ্দেশ্য এ বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়া, যেন তাঁরা নবী করীম ﷺ-এর পত্নী হওয়ার সম্পর্কের উপর ভরসা করে বসে না থাকেন। বস্তুত তাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের শর্ত হলো তাকওয়া এবং আহকামে ইলাহিয়ার অনুসরণ ও অনুকরণ।
—তাফসীরে কুরতুবী
এরপর আযওয়াজে মুতাহহারাতের উদ্দেশ্যে কয়েকটি হেদায়েত রয়েছে।
প্রথম হেদায়েত: নারীদের পর্দা সম্পর্কিত তাঁদের কণ্ঠ ও বাক্যালাপ নিয়ন্ত্রণ
فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ
অর্থাৎ, যদি পরপুরুষের সঙ্গে পর্দার অন্তরাল থেকে কথা বলার প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে বাক্যালাপের সময় কৃত্রিমভাবে নারী-কণ্ঠের স্বভাবসুলভ কোমলতা ও নাজুকতা প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকবে। অর্থাৎ এমন কোমলতা অবলম্বন করবে না, যা শ্রোতার মনে অবাঞ্ছিত কামনা সঞ্চার করতে পারে।
فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ
অর্থাৎ, যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, তার মনে যেন কু-লালসা ও আকর্ষণের উদ্রেক না হয়।
লালসার সঞ্চার হওয়া স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগত বিষয়। কিন্তু কোনো লোক খাঁটি মু’মিন হওয়া সত্ত্বেও যদি কোনো হারামের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তবে সে মুনাফিক নয় সত্য; কিন্তু অবশ্যই দুর্বল ঈমানবিশিষ্ট। এরূপ দুর্বল ঈমান, যা হারামের দিকে আকৃষ্ট করে, প্রকৃতপক্ষে কপটতারই একটি শাখাবিশেষ। কপটতার লেশমুক্ত খাঁটি ঈমানবিশিষ্ট লোক কোনো হারামের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে না।
—তাফসীরে মাযহারী
প্রথম হেদায়েতের সারমর্ম এই যে, নারীদেরকে পরপুরুষ থেকে এমনভাবে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা উচিত, যাতে কোনো অপরিচিত দুর্বল ঈমানবিশিষ্ট লোকের অন্তরে কোনো কামনা ও লালসার উদ্রেক হওয়ার সুযোগ না পায়; বরং সে ধরনের পরিস্থিতির কাছেও যেন ঘেঁষতে না পারে।
নারীদের পর্দার বিস্তারিত বিবরণ এই সূরারই পরবর্তী আয়াতসমূহের আলোচনায় আসবে। এখানে নবীজীর সহধর্মিণীগণের বিশেষ হেদায়েতসমূহের সঙ্গে প্রাসঙ্গিকভাবে যা এসেছে, শুধু তারই ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে।
আয়াতে বর্ণিত বাক্যালাপ-সংশ্লিষ্ট হেদায়েতসমূহ শোনার পর উম্মাহাতুল মু’মিনীগণের কেউ যদি পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলতেন, তবে মুখে হাত রেখে বলতেন, যাতে কণ্ঠস্বর পরিবর্তিত হয়ে যায়।
এজন্যই হযরত আমর ইবনুল আস (রা.) কর্তৃক বর্ণিত এক হাদীসে রয়েছে—
إِنَّ النَّبِيَّ ﷺ نَهَى أَنْ تَكَلَّمَ النِّسَاءُ إِلَّا بِإِذْنِ أَزْوَاجِهِنَّ
অর্থাৎ, নবী করীম ﷺ নারীদেরকে নিজ নিজ স্বামীর অনুমতি ব্যতীত বাক্যালাপ করতে বিশেষভাবে বারণ করেছেন।
মাসআলা: এ আয়াত ও উল্লিখিত হাদীস থেকে এতটুকু প্রমাণিত হয়েছে যে, নারীদের কণ্ঠস্বর সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও সতর্কতামূলক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে, যা যাবতীয় ইবাদত ও আহকামে অনুসৃত হয়েছে।
পরপুরুষ শুনতে পায়—নারীদেরকে এমন উচ্চৈঃস্বরে কথাবার্তা বলতে বারণ করা হয়েছে। নামাজের সময় ইমাম কোনো ভুল করলে পুরুষ মুকতাদিদের মৌখিকভাবে লুকমা দেওয়ার হুকুম রয়েছে। কিন্তু মেয়েদের মৌখিকভাবে লুকমা দেওয়ার পরিবর্তে এ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, নিজের এক হাতের পিঠের উপর অপর হাত মেরে তালি বাজিয়ে ইমামকে অবহিত করবে; মুখে কিছু বলবে না।
—তাফসীরে তাবারানী-মাযহারী
দ্বিতীয় হেদায়েত: পূর্ণ পর্দা করা সম্পর্কিত
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى
অর্থাৎ, তোমরা তোমাদের গৃহে অবস্থান কর এবং জাহিলিয়াত যুগের নারীদের ন্যায় দেহসৌষ্ঠব ও সৌন্দর্য প্রদর্শন করে ঘোরাফেরা করো না।
এখানে পূর্ববর্তী অন্ধযুগ বলে ইসলাম-পূর্ব অন্ধযুগকে বোঝানো হয়েছে, যা বিশ্বের সর্বত্র বিস্তৃত ছিল। এ শব্দে এ ইঙ্গিত রয়েছে যে, এরপর আবার অপর কোনো অজ্ঞতার প্রাদুর্ভাবও ঘটতে পারে, যে সময় এই প্রকার নির্লজ্জতা ও পর্দাহীনতাই বিস্তার লাভ করবে। সেটা সম্ভবত এ যুগের অজ্ঞতাই, যা অধুনা বিশ্বের সর্বত্র পরিদৃষ্ট হচ্ছে।
এ আয়াতে পর্দা সম্পর্কিত আসল হুকুম এই যে, নারীগণ গৃহেই অবস্থান করবে; অর্থাৎ শরয়ী প্রয়োজন ব্যতীত যেন বাইরে বের না হয়। সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও বলা হয়েছে যে, যেভাবে ইসলাম-পূর্ব অজ্ঞ যুগের নারীরা প্রকাশ্যভাবে বেপর্দা চলাফেরা করত, তোমরা সেরকম চলাফেরা করো না।
تَبَرُّج
শব্দের মূল অর্থ প্রকাশ ও প্রদর্শন করা। এখানে এর অর্থ পরপুরুষের সামনে স্বীয় সৌন্দর্য প্রদর্শন করা। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে—
غَيْرَ مُتَبَرِّجَاتٍ بِزِينَةٍ
অর্থাৎ, সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে।
নারীদের পর্দা সম্পর্কিত পূর্ণ আলোচনা ও বিস্তারিত আহকাম এ সূরারই পরবর্তী অধ্যায়ে বর্ণিত হবে। এখানে কেবল উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রদান করা হচ্ছে।
এ আয়াতে পর্দা সম্পর্কিত দুটি বিষয় জানা গেছে।
প্রথমত, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ পাকের নিকট নারীদের বাড়ি থেকে বের না হওয়াই কাম্য। গৃহকর্ম সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যেই তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে; এতেই তারা পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করবে। বস্তুত শরিয়তকাম্য আসল পর্দা হলো গৃহের অভ্যন্তরে অনুসৃত পর্দা।
দ্বিতীয়ত, একথা জানা গেছে যে, শরয়ী প্রয়োজনের তাগিদে যদি নারীকে বাড়ি থেকে বের হতে হয়, তবে যেন সৌন্দর্য ও দেহসৌষ্ঠব প্রদর্শন করে বের না হয়; বরং বোরকা অথবা গোটা শরীর আবৃত করে এমন চাদর ব্যবহার করে বের হবে। যেমন সামনে সূরা আহযাবেরই—
يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ
আয়াতে, ইনশাআল্লাহ, এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
গৃহে অবস্থানের প্রয়োজন সম্পর্কিত হুকুমের ব্যতিক্রম
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ
দ্বারা নারীদের ঘরে অবস্থান ওয়াজিব করে দেওয়া হয়েছে। এর মর্ম এই যে, নারীর পক্ষে ঘর থেকে বের হওয়া সাধারণভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম।
কিন্তু প্রথমত, এ আয়াতেই—
وَلَا تَبَرَّجْنَ
দ্বারা এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে বের হওয়া নিষিদ্ধ নয়; বরং সৌন্দর্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে বের হওয়াই নিষিদ্ধ।
দ্বিতীয়ত, এই সূরা আহযাবেরই পরবর্তীতে উল্লিখিত—
يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ
আয়াতে এ হুকুমই রয়েছে যে, বিশেষ প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে মেয়েদের বোরকা অথবা অন্য কোনো প্রকারে পর্দা করে ঘর থেকে বের হওয়ার অনুমতি আছে।



এই মানসিকতার সামাজিক ফল খুব পরিচিত। নারী বক্তার বক্তব্যের বিষয় নিয়ে আলোচনা না করে তার কণ্ঠ নিয়ে আলোচনা হয়। নারী গান গাইলে তার প্রতিভার বদলে পুরুষ উত্তেজিত হবে কি না প্রশ্ন ওঠে। নারী রাজনৈতিক মঞ্চে কথা বললে তার কণ্ঠ, পোশাক ও শরীর একসঙ্গে বিচার করা হয়। পুরুষ বক্তার ক্ষেত্রে তার কণ্ঠকে নারী শ্রোতাদের কামনার সম্ভাবনা দিয়ে একইভাবে সীমিত করা হয় না।
একজন পুরুষ নারীর কণ্ঠ শুনে কামনা করলে নারীর কণ্ঠ অপরাধী হয়ে যায় না। মানুষের কথা বলার অধিকার অন্য মানুষের যৌন কল্পনার ওপর নির্ভর করতে পারে না।
হয়রানির দায় পোশাকের ওপর চাপানো
সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৯-এ জিলবাব পরার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এতে বিশ্বাসী নারীরা পরিচিত হবে এবং হয়রানির শিকার হবে না। এই যুক্তির মধ্যে একটি গভীর সামাজিক সমস্যা আছে। একজন নারীকে হয়রানি করা অপরাধীর কাজ। কিন্তু তার নিরাপত্তার জন্য প্রথম পরিবর্তনটি অপরাধীর আচরণে নয়, নারীর পোশাকে চাওয়া হয়েছে।
এই ধারণা আজও যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের ঘটনায় ফিরে আসে। নারী কী পরেছিল, কেন রাতে বের হয়েছিল, কেন একা ছিল, কেন সুগন্ধি ব্যবহার করেছিল, কেন পুরুষের সঙ্গে কথা বলেছিল, এসব প্রশ্ন অপরাধীর আচরণের আগে চলে আসে। নারী যত বেশি ধর্মীয় পোশাকের নিয়ম মেনে চলে, তাকে তত “ভালো” নারী হিসেবে দেখা হয়। অন্য নারী হয়রানির শিকার হলে তার নিজের আচরণ নিয়েই সন্দেহ তৈরি করা সহজ হয়। বাস্তবতা হলো, শিশু ধর্ষিত হয়, বোরকা পরা নারী হয়রানির শিকার হয়, বৃদ্ধ নারী যৌন সহিংসতার শিকার হয়, নিজের ঘরেও নারী স্বামী বা আত্মীয়ের হাতে আক্রান্ত হয়। যৌন সহিংসতার কারণ পোশাক নয়, অপরাধীর ক্ষমতা, মানসিকতা এবং ভুক্তভোগীর সম্মতিকে অস্বীকার করা।
নারীর পোশাক কখনো ধর্ষণের অনুমতি নয়, সুগন্ধি হয়রানির অনুমতি নয়, রাতে বাইরে থাকা আক্রমণের অনুমতি নয়। অপরাধের দায় অপরাধীর। নারীকে ঢেকে অপরাধীর দায় কমানো যায় না।
পর্দা যখন ব্যক্তিগত পোশাক থেকে সামাজিক নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়
একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের ইচ্ছায় মাথা ঢাকতে পারে, বোরকা পরতে পারে, নিকাব পরতে পারে অথবা কোনো নির্দিষ্ট পোশাককে নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের অংশ মনে করতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে মানুষ কী পরবে, সেটি তার নিজের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। কিন্তু ধর্মীয় আইনে পোশাককে বাধ্যতামূলক নৈতিক কর্তব্য বানানো হলে বিষয়টি আর ব্যক্তিগত রুচিতে থাকে না। পরিবার, সমাজ, মসজিদ, ধর্মীয় নেতা এবং রাষ্ট্র সেই পোশাক কার্যকর করার ক্ষমতা দাবি করতে পারে।
এই সামাজিক নিয়ন্ত্রণে নারীর শরীর পরিবার ও সম্প্রদায়ের সম্মানের প্রতীক হয়ে যায়। মেয়ের চুল দেখা গেলে বাবার সম্মান নষ্ট, স্ত্রী বেপর্দা হলে স্বামীর ব্যর্থতা, বোনের পোশাক ছোট হলে ভাইয়ের লজ্জা। নারী নিজের শরীরের মালিকের বদলে পুরুষ পরিবারের ধর্মীয় সম্মানের বাহক হয়ে ওঠে। তার পোশাক আর তার পোশাক থাকে না, পরিবারের পুরুষদের নৈতিকতার প্রতিবেদন হয়ে যায়।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই ধারণা আরও ভয়াবহ হতে পারে। নৈতিকতা পুলিশ, বাধ্যতামূলক হিজাব, পোশাক পরীক্ষা, বেত্রাঘাত, জরিমানা, গ্রেপ্তার, শিক্ষা থেকে বহিষ্কার অথবা পরিবারের পুরুষের হাতে শাস্তি, এসব সম্ভব হয় যখন নারীর পোশাককে তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নয়, ধর্মীয় শৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখা হয়।
নারী হিজাব পরতে চাইলে তাকে বাধা দেওয়া যেমন তার স্বাধীনতার লঙ্ঘন, তেমনি হিজাব না পরতে চাইলে তাকে বাধ্য করাও তার স্বাধীনতার লঙ্ঘন। শরীর তার, পোশাকের সিদ্ধান্তও তার। ধর্ম, পরিবার অথবা রাষ্ট্রের সম্মান রক্ষার জন্য নারীর শরীর কোনো পতাকা নয়।
পর্দা ও চলাফেরার সামগ্রিক ক্ষমতা-কাঠামো
সবগুলো বিধান পাশাপাশি রাখলে একটি ধারাবাহিক সামাজিক কাঠামো দেখা যায়। নারী আওরাত, বাইরে গেলে শয়তান তাকে আকর্ষণীয় করে। মুহাম্মদের স্ত্রীদের ঘরে থাকতে বলা হয়েছে, কোমল কণ্ঠে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে এবং পুরুষদের তাদের সঙ্গে পর্দার আড়াল থেকে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। বিশ্বাসী নারীদের জিলবাব টানতে ও সৌন্দর্য আবৃত রাখতে বলা হয়েছে। নারীর সুগন্ধিকে এমন পর্যায়ে যৌন অপরাধের ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে যে মানুষের পাশ দিয়ে গেলে তাকে ব্যভিচারিণী বলা হয়েছে। মসজিদে যেতে বাধা দিতে নিষেধ করা হলেও ঘরকে তার উত্তম নামাজের স্থান বলা হয়েছে। দীর্ঘ সফরের জন্য মাহরাম পুরুষের শর্ত এসেছে।
এই বিধানগুলোর প্রতিটির বিষয় আলাদা হলেও দিক একই। নারী জনপরিসরে যত দৃশ্যমান হয়, ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ তত বাড়ে। তার শরীর ঢাকো, গন্ধ নিয়ন্ত্রণ করো, কণ্ঠ নিয়ন্ত্রণ করো, যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করো, কার সঙ্গে থাকবে নির্ধারণ করো, কোথায় নামাজ পড়বে তার শ্রেষ্ঠ স্থান ঘর ঘোষণা করো। বিপরীতে পুরুষ জনপরিসরের স্বাভাবিক অধিবাসী। সে মসজিদে যায়, ভ্রমণ করে, ব্যবসা করে, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে।
এর সঙ্গে আগের বিধানগুলো যোগ করলে ফল আরও পরিষ্কার। পরিবারে পুরুষ কাওয়াম, বিবাহে পুরুষ ওয়ালী, স্বামীর যৌন দাবি অগ্রাধিকার পায়, তালাকের প্রধান ক্ষমতা পুরুষের, বহুবিবাহ পুরুষের, উত্তরাধিকারের বহু ক্ষেত্রে বড় অংশ পুরুষের, বিচার ও নেতৃত্বে পুরুষের অগ্রাধিকার, আবার জনপরিসরের চলাফেরাতেও নারী বেশি নিয়ন্ত্রিত। এই ব্যবস্থাগুলো একে অপরকে শক্তিশালী করে।
নারীকে প্রথমে ফিতনা বলা হয়েছে, তারপর ফিতনা ঠেকানোর নামে তার শরীর ঢাকতে বলা হয়েছে, কণ্ঠ সংযত করা হয়েছে, সুগন্ধি অপরাধী করা হয়েছে, চলাফেরায় পুরুষ অভিভাবক বসানো হয়েছে এবং ঘরকে তার শ্রেষ্ঠ স্থান বানানো হয়েছে। পুরুষের কামনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে নারীকে।
একটি সমান সমাজে নারী ও পুরুষ উভয়েই জনপরিসরের পূর্ণ নাগরিক। দুজনেই পড়বে, কাজ করবে, ভ্রমণ করবে, রাজনীতি করবে, উপাসনালয়ে যাবে, কথা বলবে এবং নিজের পোশাক নির্বাচন করবে। কারও স্বাধীনতা অন্যের সম্ভাব্য কামনার কাছে বন্ধক থাকবে না। নারীর নিরাপত্তার সমাধান নারীকে অদৃশ্য করা নয়। সমাধান হলো পুরুষকে শেখানো, নারী দৃশ্যমান হলেও তার শরীর পুরুষের সম্পত্তি নয়, তার পোশাক যাই হোক, তার সম্মতি ছাড়া তাকে স্পর্শ করার অধিকার কারও নেই।
নারীর শরীরের ওপর ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ
নারীর শরীর নিয়ে ইসলামী বিধান শুধু পোশাক, পর্দা, যৌনতা ও প্রজননে থেমে নেই। তার যৌনাঙ্গ কাটা হবে কি না, ভ্রু তোলা যাবে কি না, দাঁতের গঠন সৌন্দর্যের জন্য বদলানো যাবে কি না, শরীরে উল্কি করা যাবে কি না, কৃত্রিম চুল ব্যবহার করা যাবে কি না, এসবও ধর্মীয় বিধানের বিষয় হয়েছে। বিশেষ করে নারী খৎনা বা নারীর যৌনাঙ্গ কর্তনের ক্ষেত্রে ধ্রুপদী ইসলামী ফিকহের অবস্থান ভয়াবহ। শাফিঈ মাযহাবের প্রতিষ্ঠিত মত অনুযায়ী নারী ও পুরুষ উভয়ের খৎনা বাধ্যতামূলক। হাম্বলি মাযহাবেও বাধ্যতামূলক হওয়ার শক্তিশালী মত রয়েছে। অন্য ফকিহরা নারীর ক্ষেত্রে এটিকে সুন্নাহ, সম্মানজনক বা সুপারিশকৃত কাজ হিসেবে গণ্য করেছেন। অর্থাৎ তর্কটি মেয়েশিশুর সুস্থ যৌনাঙ্গ অক্ষত থাকবে কি না—এই নীতিতে নয়; তর্কটি সেই কাটাকে কত স্তরের ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়া হবে, সেখানে।
নারীর যৌনাঙ্গ একটি স্বাভাবিক, সুস্থ এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ। তার কোনো অংশ রোগের চিকিৎসা ছাড়া কেটে ফেলার প্রয়োজন নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পষ্টভাবে বলেছে, চিকিৎসাবহির্ভূত কারণে নারীর বাহ্যিক যৌনাঙ্গ আংশিক বা সম্পূর্ণ অপসারণ অথবা তাতে আঘাত করার সব পদ্ধতিই নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতি বা Female Genital Mutilation। এর কোনো স্বাস্থ্যগত উপকার নেই। এর ফলে তীব্র ব্যথা, রক্তক্ষরণ, সংক্রমণ, প্রস্রাবের সমস্যা, দীর্ঘমেয়াদি যৌন সমস্যা, প্রসবের জটিলতা এবং মানসিক আঘাত হতে পারে। [167]।
একটি সুস্থ মেয়েশিশুর যৌনাঙ্গে ছুরি চালানোর কোনো চিকিৎসাগত প্রয়োজন নেই। ধর্মীয় অনুমোদন সেই কাটাকে চিকিৎসা বানায় না। শিশুর শরীর ধর্মীয় প্রথা পরীক্ষার জায়গা নয়, তার যৌনাঙ্গ তার নিজের শরীরের অংশ।
নারীর খৎনা ইসলামী ফিকহের স্বীকৃত প্রথা
নারীর খৎনাকে ইসলামের বাইরের কোনো বিচ্ছিন্ন আফ্রিকান সংস্কৃতি বলে সরিয়ে দেওয়া যায় না। ধ্রুপদী ইসলামী ফিকহে এই প্রথার বিধান নিয়ে সরাসরি আলোচনা আছে। ইমাম নববী আল-মাজমু-তে শাফিঈ মাযহাবের অবস্থান উল্লেখ করে বলেছেন, তাদের মতে পুরুষ ও নারী উভয়ের খৎনা বাধ্যতামূলক। IslamQA-র ফিকহি সংকলনে নববীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে শাফিঈ ও হাম্বলি মাযহাবের বাধ্যতামূলক মত, হানাফি ও মালিকিদের সুন্নাহর মত এবং নারীর জন্য সুপারিশকৃত হওয়ার অন্যান্য মত একত্রে দেওয়া হয়েছে। [168]।
ইমাম নববী, আল-মাজমু, ১/৩৬৭
“আমাদের মাযহাবে পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য খৎনা ওয়াজিব।”
উদ্ধৃতি ও মাযহাবভিত্তিক আলোচনা, [169]
ইবন কুদামার আল-মুগনি-তে নারীর খৎনাকে পুরুষের মতো কঠোর বাধ্যবাধকতা না দিয়ে নারীর জন্য মাকরুমাহ, অর্থাৎ সম্মানজনক বা মর্যাদার কাজ বলা হয়েছে। [170]। হানাফি ও মালিকি সূত্রেও নারীর খৎনাকে সুন্নাহ বা স্বীকৃত ধর্মীয় প্রথা হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ মতভেদটি মেয়েশিশুর সুস্থ যৌনাঙ্গ অক্ষত থাকবে কি না, সেই নীতিতে নয়; মতভেদটি এই কাটাকে কত স্তরের ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়া হবে, সেখানে। আসুন বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম আহমাদুল্লাহর বক্তব্য শুনি,
অর্থাৎ একটি মেয়েশিশুর যৌনাঙ্গ অক্ষত থাকবে, এই অবস্থান ধ্রুপদী ফিকহের সাধারণ সিদ্ধান্ত ছিল না। একটি বড় মাযহাবে তার যৌনাঙ্গ কাটাকে বাধ্যতামূলক বলা হয়েছে, অন্য মতগুলোতে সেটিকে সুন্নাহ, সম্মানজনক অথবা অনুমোদিত প্রথা হিসেবে রাখা হয়েছে। ফকিহদের তর্কের কেন্দ্র ছিল মেয়েটির সুস্থ যৌনাঙ্গে ছুরি লাগানো হবে কি না, তা নয়। তর্ক ছিল সেই ছুরি ধর্মীয়ভাবে কতটা বাধ্যতামূলক।
মদিনায় নারী খৎনা এবং মুহাম্মদের নির্দেশের বর্ণনা
সুনান আবু দাউদে উম্মে আতিয়্যার সূত্রে একটি বর্ণনা আছে, মদিনায় একজন নারী মেয়েদের খৎনা করত। মুহাম্মদ তাকে বেশি গভীরভাবে না কাটতে বলে এবং এটিকে নারীর জন্য ভালো ও স্বামীর কাছে অধিক পছন্দনীয় বলে বর্ণনা করে। এই বর্ণনার সনদ দুর্বল বলা হয়েছে; অন্যরা বিভিন্ন সূত্র মিলিয়ে এটিকে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সনদের বিতর্ক ভাষাটির কুরুচিপূর্ণ চরিত্র বদলায় না: মেয়ের যৌনাঙ্গ কতটা কাটা হবে, সেটিও স্বামীর পছন্দের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। [171]।
সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৫২৭১, উম্মে আতিয়্যার বর্ণনা
মদিনায় একজন নারী খৎনা করত। মুহাম্মদ তাকে বলে, “অতিরিক্ত গভীরভাবে কেটো না, এটি নারীর জন্য ভালো এবং স্বামীর কাছে অধিক পছন্দনীয়।”
হাদিসটির সনদ দুর্বল বলা হয়েছে; তবু এই ভাষা নারী খৎনার ফিকহি আলোচনায় ব্যবহৃত হয়েছে। [172]
এই নির্দিষ্ট বর্ণনার সনদ দুর্বল বলা হয়েছে; কিন্তু নারী খৎনার ফিকহি বৈধতা এই এক বর্ণনার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। ফকিহরা অন্য হাদিস, “দুই খৎনাকৃত অঙ্গ মিলিত হলে গোসল ফরজ” ধরনের ভাষা, ইবরাহিমের খৎনা এবং বিভিন্ন ফিকহি যুক্তি ব্যবহার করে নারী খৎনাকে শরিয়তের আলোচনার মধ্যে রেখেছেন। IslamWeb-এর আউনুল মাবুদ ব্যাখ্যাতেও শাফিঈ, আহমদ ও অন্যান্য ফকিহের নারী খৎনা নিয়ে আলোচনা এসেছে। [173]।
এই বর্ণনার ভাষায় আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে কুরুচিপূর্ণ। নারীর যৌনাঙ্গ কতটা কাটা হবে, তার একটি বিবেচনা হিসেবে স্বামীর যৌন পছন্দকে সামনে আনা হয়েছে। নারীর শরীরের একটি সংবেদনশীল অঙ্গ নিয়ে সিদ্ধান্তের আলোচনায় নারীর নিজের যৌন আনন্দ, শারীরিক অখণ্ডতা এবং সম্মতির বদলে স্বামীর কাছে কী বেশি পছন্দনীয়, সেটিও মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়।
একটি মেয়ের ক্লিটোরিস তার ভবিষ্যৎ স্বামীর সুবিধার জন্য তৈরি অঙ্গ নয়। তার যৌনাঙ্গে কতটা কাটলে পুরুষ বেশি সন্তুষ্ট হবে, এই প্রশ্নটাই নারীর শরীরকে পুরুষের যৌন সুবিধার সম্পত্তি হিসেবে দেখে।
“সামান্য কাটলে ক্ষতি নেই”
নারী খৎনার পক্ষে একটি প্রচলিত দাবি হলো, ইসলামী খৎনা আফ্রিকার ভয়াবহ যৌনাঙ্গ বিকৃতির মতো নয়। শুধু সামান্য অংশ কাটলে সেটি নিরাপদ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সংজ্ঞায় এই বিভাজন টেকে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চিকিৎসাবহির্ভূত কারণে ক্লিটোরাল গ্লান্স, ক্লিটোরাল হুড বা অন্য বাহ্যিক যৌনাঙ্গের আংশিক অপসারণকেও নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতির প্রথম শ্রেণির মধ্যে রেখেছে। সূচ ফোটানো, ছেদন, কাটা অথবা অন্য ক্ষতিও চতুর্থ শ্রেণির মধ্যে পড়ে। [174]।
শরীরের সুস্থ অঙ্গের কত শতাংশ কাটা হলো, সেই হিসাব নৈতিক সমস্যাকে বদলায় না। একটি শিশুর যৌনাঙ্গে কোনো চিকিৎসাগত রোগ নেই। সে এই অস্ত্রোপচারের অর্থ বোঝে না এবং সম্মতি দেওয়ার বয়সেও পৌঁছেনি। তবুও পরিবার বা ধর্মীয় সমাজ তার হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি স্বাভাবিক অঙ্গ কেটে দেয়। ক্ষতি কম বলে চালানো হলেও মূল ঘটনা বদলায় না: শিশুর শরীরের অখণ্ডতা তার নিজের সম্মতি ছাড়া ভাঙা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সব ধরনের নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতির বিরোধিতা করে, চিকিৎসক দিয়ে করালেও। চিকিৎসকের হাতে জীবাণুমুক্ত যন্ত্র ব্যবহার করলে সংক্রমণের কিছু ঝুঁকি কমতে পারে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় অঙ্গচ্ছেদ চিকিৎসা হয়ে যায় না। [175]।
“অল্প কাটব” কোনো নৈতিক উত্তর নয়। প্রশ্ন হলো সুস্থ শিশুর যৌনাঙ্গ কাটার অধিকার পরিবার, ধর্মীয় নেতা বা সমাজকে কে দিয়েছে। উত্তর, কেউ দেয়নি। শরীরটি শিশুটির।
নারী খৎনার কোনো স্বাস্থ্যগত উপকার নেই
নারী খৎনার পক্ষে ধর্মীয় ওয়েবসাইটগুলোতে স্বাস্থ্যগত উপকারের দাবিও করা হয়েছে। IslamQA-র পুরনো ফতোয়াগুলোতে এমন দাবির উদাহরণ পাওয়া যায়। [176]। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। WHO বলেছে নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতির কোনো স্বাস্থ্যগত উপকার নেই এবং সব ধরনের পদ্ধতিই স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। [177]।
তাৎক্ষণিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে তীব্র ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, ফুলে যাওয়া, সংক্রমণ, প্রস্রাবের সমস্যা, আশপাশের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, শক এবং মৃত্যু। দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, যৌনাঙ্গের সংক্রমণ, মূত্রনালির সংক্রমণ, মাসিকের সমস্যা, দাগ, যৌনমিলনে ব্যথা, যৌন আনন্দ কমে যাওয়া এবং প্রসবকালীন জটিলতা। মানসিক সমস্যার মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আঘাত-পরবর্তী মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের নির্দেশিকায় নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতি প্রতিরোধ এবং এর শিকার নারীদের চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তার জন্য নতুন সুপারিশ প্রকাশ করা হয়েছে। [178]। আজ বিশ্বজুড়ে ২৩ কোটিরও বেশি নারী ও মেয়ে এই প্রথার শিকার হয়ে জীবিত আছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞান যেখানে সুস্থ যৌনাঙ্গ কেটে ফেলার কোনো উপকার খুঁজে পায় না এবং অসংখ্য ক্ষতি চিহ্নিত করে, সেখানে হাজার বছরের ধর্মীয় ফিকহ কোনো চিকিৎসা-প্রমাণ নয়। প্রাচীন আলেমের মতামত ক্লিটোরিসের শারীরবিদ্যা বদলে দেয় না।
ক্লিটোরিস এবং নারীর যৌন আনন্দ
ক্লিটোরিস নারীর যৌন আনন্দের প্রধান অঙ্গগুলোর একটি। এতে বিপুল সংখ্যক স্নায়ুপ্রান্ত রয়েছে এবং এর প্রধান জৈবিক কাজ যৌন অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত। যৌনাঙ্গ বিকৃতির বিভিন্ন পদ্ধতিতে ক্লিটোরাল গ্লান্স, হুড অথবা আশপাশের টিস্যু কেটে ফেলা হলে যৌন সংবেদন ও আনন্দ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। WHO সরাসরি যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া, যৌন আনন্দ হ্রাস, ব্যথাযুক্ত যৌনসম্পর্ক এবং যৌনক্রিয়ার অন্যান্য সমস্যার কথা উল্লেখ করেছে।
নারীর যৌনতা নিয়ন্ত্রণ নারী খৎনার সামাজিক কারণগুলোর মধ্যেও রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, অনেক সমাজে এই প্রথাকে মেয়েকে বিবাহের উপযুক্ত করা, বিয়ের আগে কুমারীত্ব রক্ষা করা এবং বিবাহের পরে যৌন একনিষ্ঠতা নিশ্চিত করার উপায় হিসেবে দেখা হয়। [179]। নারীর কামনা কমিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, পুরুষকেন্দ্রিক যৌননীতির একটি চরম রূপ।
আগের পরিচ্ছেদগুলোতে দেখা গেছে, ইসলামী বিবাহে স্বামীর যৌন দাবিকে ধর্মীয় অধিকার বানানো হয়েছে। স্ত্রী অস্বীকার করলে ফেরেশতার অভিশাপ, নুশূয এবং অন্যান্য চাপের কাঠামো আছে। এখানে আরেক প্রান্তে নারীর নিজের যৌন আনন্দের অঙ্গ নিয়েই কাটাছেঁড়ার ফিকহ তৈরি হয়েছে। পুরুষের যৌনপ্রাপ্যতা গুরুত্বপূর্ণ, নারীর যৌনাঙ্গের অখণ্ডতা সেই গুরুত্ব পায়নি।
নারীর যৌনতা পুরুষের জন্য প্রাপ্য হবে, কিন্তু নারী নিজের যৌন আনন্দের পূর্ণ অধিকারী হবে না, এই মানসিকতার সবচেয়ে নিষ্ঠুর শারীরিক প্রকাশ নারী যৌনাঙ্গ কাটা।
ভ্রু তোলা, উল্কি এবং দাঁতের সৌন্দর্য পরিবর্তনে অভিশাপ
নারীর শরীরের ওপর ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ শুধু যৌনাঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। সহিহ বুখারিতে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের সূত্রে উল্লেখ আছে, যে নারীরা উল্কি করে ও করায়, ভ্রু বা মুখের লোম তুলে ফেলে এবং সৌন্দর্যের জন্য সামনের দাঁত সরু করে ফাঁক তৈরি করে, তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে তারা আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করে। [180]।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭৭/ পোশাক
৫৯৩১। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। “আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক সে সব নারীর ওপর যারা শরীরে উল্কি আঁকে এবং যারা আঁকায়, যারা ভ্রু তুলে ফেলে এবং যারা সৌন্দর্যের জন্য দাঁত সরু করে দাঁতের মধ্যে ফাঁক তৈরি করে, যারা আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন আনে।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
একজন নারী নিজের মুখের ভ্রুর আকৃতি বদলাতে চায়, দাঁতের সৌন্দর্য বদলাতে চায় অথবা শরীরে উল্কি করতে চায়। এসব ব্যক্তিগত সৌন্দর্য সিদ্ধান্তকেও সরাসরি আল্লাহর অভিশাপের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ধর্ম তার শরীরের মালিকানায় প্রবেশ করে বলছে কোন লোম সে তুলতে পারবে, দাঁতের কোন আকৃতি বদলাতে পারবে এবং চামড়ায় কী আঁকতে পারবে।
চিকিৎসার প্রয়োজনে দাঁত সোজা করা, বিকৃতি সংশোধন করা বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা আলাদা বিষয়। হাদিসে বিশেষভাবে সৌন্দর্যের উদ্দেশ্যে পরিবর্তনের কথা এসেছে। ফলে ব্যক্তিগত নান্দনিক পছন্দই ধর্মীয় বিচারাধীন হয়েছে। একজন নারী নিজের মুখ নিয়ে কী করবে, তার সিদ্ধান্তের সীমা তার নিজের রুচি দিয়ে নয়, সপ্তম শতাব্দীর ধর্মীয় নিষেধ দিয়ে নির্ধারিত।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ভ্রু তার নিজের, দাঁত তার নিজের, ত্বক তার নিজের। সে নিজের শরীরে কী সৌন্দর্য পরিবর্তন করবে, তার জন্য আকাশ থেকে অভিশাপ নামানোর প্রয়োজন নেই। ব্যক্তিগত শরীরকে ধর্মীয় সম্পত্তি বানালেই এমন বিধান স্বাভাবিক মনে হয়।
কৃত্রিম চুল লাগানো নারীর ওপর অভিশাপ
সহিহ বুখারিতে কৃত্রিম চুল সংযোজনের ক্ষেত্রেও নারীর ওপর সরাসরি অভিশাপ এসেছে। ইবন উমারের বর্ণনায় মুহাম্মদ বলেছে, যে নারী অন্যের চুলের সঙ্গে কৃত্রিম চুল সংযোগ করে এবং যে নারী নিজের চুলে তা করায়, তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ। একই হাদিসে উল্কিকারিণী নারীর কথাও এসেছে। [181]।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭৭/ পোশাক
৫৯৩৭। ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুহাম্মদ বলেছে, “আল্লাহ সেই নারীকে অভিশাপ করেছেন যে চুল সংযোজন করে এবং যে তা করায়, আর যে উল্কি আঁকে এবং যে তা করায়।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
নারীর চুল পড়ে যেতে পারে রোগে, বয়সে, প্রসবের পরে, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় অথবা স্বাভাবিকভাবেই পাতলা হতে পারে। সৌন্দর্যের জন্য কৃত্রিম চুল ব্যবহার আজ একটি সাধারণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু হাদিসের ভাষায় বিষয়টি শুধু অপছন্দনীয় নয়, অভিশাপযোগ্য। একটি নারী নিজের মাথার চেহারা কেমন রাখতে চায়, সেই নান্দনিক সিদ্ধান্তও ধর্মীয় শাস্তির ভাষায় বাঁধা।
এখানে শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিটি আগের মতোই। প্রথমে আল্লাহর সৃষ্টি একটি স্থির আদর্শ হিসেবে ধরা হচ্ছে, তারপর কিছু নান্দনিক পরিবর্তনকে সেই সৃষ্টির অবৈধ পরিবর্তন বলা হচ্ছে। কিন্তু মানুষের পুরো জীবনই শরীর পরিবর্তনে ভরা। চুল কাটা হয়, নখ কাটা হয়, খৎনায় যৌনাঙ্গের চামড়া কাটা হয়, দাঁতের চিকিৎসা করা হয়, শরীরের লোম সরানো হয়। কোন পরিবর্তন আল্লাহর সৃষ্টি নষ্ট করা এবং কোন পরিবর্তন ধর্মীয়ভাবে অনুমোদিত, সেই সীমাটি স্বাভাবিক শরীরের কোনো বৈজ্ঞানিক নীতি দিয়ে নয়, ধর্মীয় বিধান দিয়ে স্থির করা হয়েছে।
একদিকে সুস্থ মেয়েশিশুর যৌনাঙ্গ কেটে পরিবর্তন করা ধর্মীয়ভাবে স্বীকৃত, অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের ভ্রু তুলে বা দাঁতের সৌন্দর্য বদলালে “আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন” করার অভিযোগে অভিশপ্ত। এই দ্বৈততার মধ্যে শরীরের অখণ্ডতার কোনো ধারাবাহিক নীতি নেই, আছে ধর্মীয় অনুমোদিত পরিবর্তন আর ধর্মীয় নিষিদ্ধ পরিবর্তনের তালিকা।
শরীর যখন নারীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকে না
শরীরের স্বাধীনতার মূলনীতি হলো একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবে, যতক্ষণ সেই সিদ্ধান্ত অন্য মানুষের অধিকার লঙ্ঘন করছে না। চিকিৎসা নেবে কি না, চুল কীভাবে রাখবে, উল্কি করবে কি না, সৌন্দর্যচর্চা করবে কি না, এসব সিদ্ধান্তের কেন্দ্র সে নিজে। শিশুর ক্ষেত্রে উল্টো নীতি প্রযোজ্য, কারণ শিশু পূর্ণ সম্মতি দিতে পারে না। তাই চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া তার সুস্থ অঙ্গ কেটে ফেলার বিরুদ্ধে তাকে সুরক্ষা দিতে হয়। ইসলামী শরীরনীতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এই নীতিকে উল্টো করে দিয়েছে।
শিশু নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, কিন্তু তার যৌনাঙ্গে ধর্মীয় খৎনা করা যেতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু নিজের ভ্রু তোলা, উল্কি করা, দাঁতের সৌন্দর্য বদলানো বা কৃত্রিম চুল ব্যবহার ধর্মীয় অভিশাপের বিষয় হতে পারে। একদিকে যেখানে সম্মতি নেই সেখানে শরীর পরিবর্তন অনুমোদিত, অন্যদিকে যেখানে পূর্ণ ব্যক্তিগত সম্মতি আছে সেখানে শরীর পরিবর্তন নিষিদ্ধ।
এই উল্টো বিন্যাসের কারণ শরীরের মালিকানা ব্যক্তির হাতে না থাকা। ধর্মীয় বিশ্বদৃষ্টিতে শরীর আল্লাহর সৃষ্টি, ফলে ব্যক্তি নিজের শরীরের ওপরও পূর্ণ সিদ্ধান্তক্ষমতার মালিক নয়। সেই ধারণা যখন নারীর ওপর প্রয়োগ হয়, তখন তার শরীর নিয়ে সিদ্ধান্তের সঙ্গে আরও যুক্ত হয় স্বামী, পরিবার, লজ্জা, যৌনতা এবং সামাজিক সম্মান।
শিশুর যৌনাঙ্গ কেটে দেওয়ার অধিকার সমাজের নেই, আর প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ভ্রু, চুল, দাঁত বা ত্বকের ওপর সমাজের মালিকানাও নেই। শরীরের নৈতিক মালিকানা যার শরীর, তারই।
নারীর শরীর নিয়ন্ত্রণের সামগ্রিক চিত্র
আগের পরিচ্ছেদগুলোর সঙ্গে এই বিধানগুলো মিলিয়ে দেখলে নারীর শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণের বিস্তৃতি স্পষ্ট হয়। তার পোশাক ধর্মের বিষয়, চুল ধর্মের বিষয়, ভ্রু ধর্মের বিষয়, দাঁত ধর্মের বিষয়, ত্বক ধর্মের বিষয়, সুগন্ধি ধর্মের বিষয়, যৌনাঙ্গ ধর্মের বিষয়, মাসিক ধর্মীয় কর্তব্য নির্ধারণ করে, যৌনপ্রাপ্যতা স্বামীর অধিকারের সঙ্গে যুক্ত, গর্ভধারণ উম্মতের সংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত, আবার শিশুকন্যার যৌনাঙ্গ কাটাও ফিকহের বিধানের মধ্যে পড়ে।
এই নিয়ন্ত্রণগুলো সব একই মাত্রার ক্ষতি করে না। ভ্রু তোলা নিষিদ্ধ হওয়া এবং যৌনাঙ্গ কেটে ফেলা একই ধরনের শারীরিক ক্ষতি নয়। কিন্তু উভয়ের পেছনে একই কর্তৃত্বের ধারণা কাজ করে, নারী নিজের শরীরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা নয়। কোন পরিবর্তন করতে পারবে, কোন অঙ্গ ঢাকবে, কোন অংশ কাটবে, কীভাবে সাজবে, কীভাবে যৌনতা ব্যবহার করবে, এসবের ওপর ধর্মীয় বিধান বসানো হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর উদাহরণ নারী খৎনা। এখানে ধর্মীয় আইন শুধু আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে না, সুস্থ শরীরের স্থায়ী পরিবর্তন ঘটায়। মেয়েটি বড় হয়ে নিজের শরীর ফিরে পেতে পারে না। কাটা টিস্যু, নষ্ট স্নায়ু এবং শৈশবের আঘাত কোনো ধর্মীয় ব্যাখ্যায় আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে না।
নারীর শরীর কোনো পরিবারের সম্মানপত্র নয়, কোনো স্বামীর যৌন সুবিধার যন্ত্র নয়, কোনো ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের পরীক্ষাগারও নয়। তার যৌনাঙ্গ থেকে তার ভ্রু পর্যন্ত, নিজের শরীরের বিষয়ে শেষ সিদ্ধান্তের অধিকার তার নিজের।
দাসী, যুদ্ধবন্দিনী ও যৌনদাসত্ব
ইসলামী নারী-ব্যবস্থার সবচেয়ে নির্মম অধ্যায় দাসী ও যুদ্ধবন্দিনী নারীদের যৌন অবস্থান। একজন স্বাধীন নারীকে বিয়ে ছাড়া যৌনসম্পর্কের জন্য বৈধ নয় বলা হয়েছে, কিন্তু মালিকানাধীন দাসীর ক্ষেত্রে বিবাহ ছাড়াই মালিকের যৌন অধিকার স্বীকৃত। কোরআন বারবার স্ত্রীদের পাশাপাশি মা মালাকাত আইমানুকুম, অর্থাৎ “তোমাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে” তাদের সঙ্গে যৌনসম্পর্ককে বৈধ করেছে। যুদ্ধের মাধ্যমে বন্দী হওয়া নারী, এমনকি যার স্বামী জীবিত ছিল, বন্দিত্বের ফলে সেই পূর্বের বিবাহিক সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে এবং মুসলিম মালিকের জন্য সে যৌনভাবে বৈধ হয়ে যায়। সহবাসের আগে তার স্বাধীন সম্মতি নয়, তার গর্ভে আগের পুরুষের সন্তান আছে কি না, সেটি পরীক্ষা করার বিধান এসেছে।
এই নারীর অবস্থান কোনো স্বাধীন প্রেমের সম্পর্কের অবস্থান নয়। তার সমাজ যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে, পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে, স্বাধীনতা চলে গেছে, সে নিজেই অন্য মানুষের মালিকানাধীন সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। তাকে কেনাবেচা করা যায়, শ্রম নেওয়া যায়, শাস্তি দেওয়া যায় এবং সাধারণ দাসীর ক্ষেত্রে মালিক পরিবর্তন করা যায়। একই মালিক আবার তার সঙ্গে যৌনসম্পর্কের অধিকারও পায়। একজন মানুষ একই সঙ্গে আরেকজন মানুষের মালিক এবং তার যৌনসঙ্গী হলে সেখানে স্বাধীন সম্মতির ভিত্তি ধ্বংস হয়ে যায়। মালিকানা ও যৌন অধিকার একত্র হলে তার নাম যৌনদাসত্ব।
স্ত্রী এবং “ডান হাতের মালিকানাধীন নারী”
কোরআনের সূরা আল-মুমিনুন ২৩:৫ থেকে ৬-এ বিশ্বাসীদের যৌনসংযমের প্রশংসা করতে গিয়ে দুটি বৈধ ক্ষেত্র রাখা হয়েছে, স্ত্রী এবং ডান হাতের মালিকানাধীন নারী। একই ভাষা সূরা আল-মাআরিজ ৭০:২৯ থেকে ৩০-এও এসেছে। [182] [183]।
কোরআন, সূরা আল-মুমিনুন ২৩:৫ থেকে ৬
“আর যারা নিজেদের যৌনাঙ্গ সংরক্ষণ করে, তাদের স্ত্রী অথবা তাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে তারা ছাড়া, তাদের ক্ষেত্রে তারা নিন্দিত নয়।”
এখানে স্ত্রী এবং দাসী দুটি পৃথক আইনগত শ্রেণি। স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহচুক্তি থাকে, মোহর থাকে, বিবাহবিচ্ছেদের বিধান থাকে। দাসীর সঙ্গে মালিকের যৌনসম্পর্কের জন্য আলাদা বিবাহ প্রয়োজন হয় না। তার যৌন বৈধতার উৎস বিবাহ নয়, মালিকানা। অর্থাৎ একজন পুরুষ নারীর শরীরের ওপর যৌন অধিকার দুই পথে পেতে পারে, বিবাহের মাধ্যমে অথবা মানুষটিকেই নিজের সম্পত্তি হিসেবে মালিকানায় নেওয়ার মাধ্যমে।
একজন স্বাধীন নারীর সঙ্গে বিবাহের বাইরে যৌনসম্পর্ক যিনা হতে পারে, কিন্তু একই নারীকে যুদ্ধবন্দিনী ও দাসীতে পরিণত করা হলে মালিকের সঙ্গে তার যৌনসম্পর্ক যিনা থাকে না। নারীটির শরীর একই, নারীটিও একই মানুষ, পরিবর্তন হয়েছে তার স্বাধীনতার আইনগত অবস্থান। স্বাধীন নারীকে যে যৌনসম্পর্কে অনুমতি নেই, তাকে দাসী বানানোর পর সেই সম্পর্ক বৈধ হয়ে যায়। অর্থাৎ দাসত্ব শুধু মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়নি, তার শরীরের যৌন বৈধতাও মালিকের পক্ষে বদলে দিয়েছে।
বিবাহিত যুদ্ধবন্দিনীও বিজয়ীর জন্য বৈধ
সূরা আন-নিসা ৪:২৪-এ বিবাহিত নারীকে সাধারণভাবে যৌনসম্পর্কের জন্য নিষিদ্ধ করার পর একটি ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে, “তোমাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে।” [97]। আওতাসের যুদ্ধের সহিহ হাদিস এই ব্যতিক্রমের অর্থ সরাসরি প্রকাশ করে। মুসলিম বাহিনী এমন নারীদের বন্দী করেছিল যাদের স্বামী ছিল। সাহাবিরা তাদের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করতে দ্বিধা করলে এই আয়াত নাজিল হয় এবং বন্দিত্বের ফলে সেই নারীদের মুসলিম মালিকদের জন্য বৈধ করা হয়। [184]।
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৮/ দুধপান
পরিচ্ছেদঃ ইস্তিবরার পর যুদ্ধবন্দিনীর সঙ্গে সঙ্গম করা জায়েয এবং তার স্বামী বর্তমান থাকলে সে বিবাহ বাতিল
৩৪৮০। আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, আওতাসের যুদ্ধে সাহাবিদের হাতে এমন নারী বন্দী হয় যাদের স্বামী ছিল। তাদের সঙ্গে সহবাস করতে তারা দ্বিধা করলে “বিবাহিত নারীরা, তোমাদের অধিকারভুক্তদের ছাড়া” আয়াত নাজিল হয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই ঘটনার নৈতিক বাস্তবতা ভয়াবহ। নারীটি একজন বিবাহিত মানুষ। তার স্বামী আছে। যুদ্ধের আগে তার নিজস্ব সংসার ছিল। মুসলিম বাহিনী তার সমাজকে পরাজিত করে তাকে বন্দী করেছে। বন্দিত্বের পর তার পূর্বের বিবাহিক বন্ধন এমনভাবে অকার্যকর হয় যে বিজয়ী পুরুষ তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করতে পারে। এই পরিবর্তনে নারীটির মতামত কোথাও নেই। সে স্বামীকে ত্যাগ করতে চেয়েছিল কি না, নতুন মালিককে যৌনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেছিল কি না, তার পরিবারে ফিরে যেতে চেয়েছিল কি না, এসব বৈধতার শর্ত নয়।
হাদিসটির অধ্যায়ের নামও বিষয়টিকে আড়াল করে না। HadithBD-র মুসলিম সংস্করণে পরিচ্ছেদের নাম সরাসরি, “ইস্তিবরার পর যুদ্ধ বন্দিনীর সাথে সঙ্গম করা জায়েয এবং তার স্বামী বর্তমান থাকলে সে বিবাহ বাতিল।” অর্থাৎ স্বামী জীবিত থাকা নারীকে যুদ্ধবন্দিত্ব নতুন পুরুষের যৌন অধিকার থেকে রক্ষা করেনি।
যুদ্ধের বিজয় কোনো নারীর বিবাহের সম্মতি বাতিল করার অধিকার দেয় না। বন্দী করার ক্ষমতা তার স্বামী বদলে দেওয়ার ক্ষমতা নয়, আর তরবারির জোরে মালিক হওয়া তার শরীরের যৌন অনুমতিপত্র নয়।
বনু মুস্তালিকের বন্দিনী নারী এবং সাহাবিদের যৌন আকাঙ্ক্ষা
সহিহ বুখারিতে বনু মুস্তালিক অভিযানের আরেকটি বর্ণনা রয়েছে। আবু সাঈদ আল-খুদরি বলে, মুসলিমরা অভিযানে আরব নারীদের বন্দী করে। দীর্ঘদিন স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকায় তারা নারীদের কামনা করছিল। একই সঙ্গে বন্দিনী নারীদের মুক্তিপণ নিয়ে বিক্রি বা বিনিময় করে অর্থ পাওয়ার ইচ্ছাও ছিল। গর্ভবতী হয়ে গেলে নারীদের আর্থিক মূল্য ও মুক্তিপণের সম্ভাবনা প্রভাবিত হতে পারে বলে সাহাবিরা আযল, অর্থাৎ বীর্য বাইরে ফেলে সহবাসের বিষয়ে মুহাম্মদকে জিজ্ঞেস করে। মুহাম্মদ আযলকে নিষিদ্ধ করেনি। [185]।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৪১৩৮। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) বলেন, “বনু মুস্তালিক যুদ্ধে আমরা আরবদের মধ্য থেকে কিছু নারী বন্দী করেছিলাম। আমরা নারীদের কামনা করছিলাম এবং স্ত্রীবিহীন থাকা আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। আমরা আযল করতে চাইলাম।” তারা মুহাম্মদকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে, আযল না করলেও ক্ষতি নেই, কারণ যে প্রাণ জন্ম নেওয়ার জন্য নির্ধারিত তা জন্ম নেবেই।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই বর্ণনায় বন্দিনী নারীদের মানসিক অবস্থার কোনো আলোচনা নেই। তারা সদ্য পরাজিত জনগোষ্ঠীর নারী। তাদের নিজেদের পুরুষদের হত্যা, বন্দী বা পরাজিত করা হয়েছে। তারা নিজেরাও বন্দী। যারা তাদের বন্দী করেছে, সেই পুরুষরাই বলছে দীর্ঘদিন স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকার কারণে তারা নারী কামনা করছে। তারপর আলোচনা হচ্ছে সেই বন্দিনীদের সঙ্গে যৌনসম্পর্কের সময় কীভাবে গর্ভধারণ এড়ানো যায়।
নারীগুলো একই সময়ে যৌনসঙ্গী এবং আর্থিক সম্পদ। তাদের সঙ্গে সহবাসের আকাঙ্ক্ষা আছে, আবার তাদের বিনিময় বা মুক্তিপণ থেকে অর্থ পাওয়ার আগ্রহও আছে। এই দুই উদ্দেশ্য একই মানুষের শরীরে মিলেছে। নারীটি মানুষ, কিন্তু বিজয়ীর হিসাবে সে একই সঙ্গে কামনা মেটানোর শরীর এবং অর্থমূল্য বহনকারী বন্দী সম্পত্তি। এর চেয়ে স্পষ্ট যৌনদাসত্বের কাঠামো আর কী হতে পারে?
সহবাসের আগে নারীর সম্মতি নয়, জরায়ু পরীক্ষা
যুদ্ধবন্দিনী নারীর সঙ্গে কখন সহবাস করা যাবে, সে বিষয়ে হাদিসে নির্দিষ্ট অপেক্ষার বিধান রয়েছে। সুনান আবু দাউদে মুহাম্মদ বলেছে, গর্ভবতী বন্দিনীর সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত এবং গর্ভবতী নয় এমন বন্দিনীর একটি ঋতুস্রাব না হওয়া পর্যন্ত তার সঙ্গে সহবাস করা যাবে না। [186]।
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৬/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ বন্দী স্ত্রীলোকের সাথে সহবাস করা
২১৫৫। রুওয়াইফি ইবন সাবিত আল-আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুহাম্মদ বলেছে, গর্ভবতী বন্দিনী নারীর সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত তার সঙ্গে সহবাস করা বৈধ নয়, আর অন্য বন্দিনী নারীর সঙ্গে একটি ঋতুস্রাবের মাধ্যমে তার গর্ভমুক্ত অবস্থা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সহবাস করা যাবে না।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
অন্য বর্ণনাতেও আওতাসের বন্দিনীদের ক্ষেত্রে একই নিয়ম এসেছে। গর্ভবতী হলে সন্তান জন্ম পর্যন্ত অপেক্ষা, গর্ভবতী না হলে একটি ঋতুস্রাব পর্যন্ত অপেক্ষা। [187]।
বিধানটির কেন্দ্রীয় উদ্বেগ নারীটি যৌনসম্পর্কে রাজি কি না নয়। উদ্বেগ হলো তার জরায়ু আগের পুরুষের সন্তান বহন করছে কি না। গর্ভ থাকলে অপেক্ষা করতে হবে। ঋতুস্রাব হয়ে গর্ভমুক্ত অবস্থা নিশ্চিত হলে মালিকের যৌন অধিকার কার্যকর হতে পারে। তার ভয়, শোক, স্বামী হারানোর কষ্ট, পরিবারে ফেরার আকাঙ্ক্ষা অথবা নতুন মালিকের প্রতি ঘৃণা এই পরীক্ষার অংশ নয়।
যৌনতার আগে যে প্রশ্নটি করা প্রয়োজন ছিল, “তুমি কি এই মানুষটির সঙ্গে যৌনসম্পর্ক চাও?” শরিয়তি আলোচনায় তার জায়গায় প্রধান প্রশ্ন হয়েছে, “তোমার জরায়ু আগের পুরুষের সন্তান থেকে খালি কি না?” নারীকে সম্মতিসম্পন্ন মানুষ থেকে প্রজননক্ষম দেহে নামিয়ে আনার দৃশ্য এটি।
দাসী ছিল কেনাবেচাযোগ্য মানুষ
দাসত্বের মৌলিক অর্থ মালিকানা। দাস ও দাসী কেনা, বিক্রি, উপহার, উত্তরাধিকার এবং মুক্ত করার বিস্তারিত বিধান ইসলামী ফিকহের স্বাভাবিক অংশ। সহিহ বুখারির ক্রয়-বিক্রয় অধ্যায়ে আয়িশার একটি দাসী কিনে মুক্ত করার ঘটনা রয়েছে। দাসীর মালিকেরা নির্দিষ্ট শর্তে তাকে বিক্রি করতে রাজি হয়েছিল এবং মুহাম্মদ আয়িশাকে তাকে কিনতে বাধা দেয়নি। [188]।
সহীহ বুখারী
২১৬৯। আয়িশা একটি দাসী কিনে তাকে মুক্ত করতে চেয়েছিল। দাসীর মালিকেরা শর্ত দিয়েছিল তার ওয়ালা তাদের থাকবে। মুহাম্মদ বলে, “এটি তোমাকে তাকে কেনা থেকে বিরত রাখবে না। ওয়ালা তারই যে মুক্ত করে।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
আরেক সহিহ বুখারির হাদিসে মুহাম্মদ এমন দাসীর কথা বলেছে যে বারবার যিনা করলে তাকে বেত্রাঘাত করতে হবে এবং পরে “চুলের রশির বিনিময়েও” বিক্রি করে দিতে হবে। [189]।
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৬/ ক্রয়-বিক্রয়
২০১৯ [২১৫২]। মুহাম্মদ বলেছে, দাসী বারবার যিনা করলে তাকে বেত্রাঘাত করতে হবে এবং পরে “তাকে বিক্রি করে দাও, এমনকি চুলের রশির বিনিময়েও।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই হাদিসে কোনো রূপকের কথা নেই। একজন নারী অর্থমূল্যের বিনিময়ে মালিক বদল করছে। তার নিজের সম্মতি বিক্রয়ের শর্ত নয়। একজন মালিক থেকে আরেক মালিকের হাতে চলে যাওয়া তার জীবনের বাসস্থান, শ্রম, নিরাপত্তা এবং যৌন অবস্থাও বদলে দিতে পারে। নতুন মালিক তার সঙ্গে যৌনসম্পর্কের অধিকার পেতে পারে যদি শরিয়তির অন্যান্য শর্ত পূরণ হয়।
মানুষকে বিক্রি করা দাসত্বের সংজ্ঞা, আর বিক্রি করা সেই মানুষের সঙ্গে মালিকের যৌন অধিকার যুক্ত হলে সেটি যৌনদাসত্বের সংজ্ঞা। ধর্মীয় পরিভাষা ব্যবহার করলে বাজারে বিক্রি হওয়া মানুষ সম্পত্তি থেকে মানুষে পরিণত হয় না।
দাসীর যৌন সম্মতি মালিকের অধিকারের শর্ত নয়
ধ্রুপদী ফিকহের সবচেয়ে স্পষ্ট দলিলগুলোর একটি পাওয়া যায় ইবন কুদামার আল-মুগনি-তে। দাসীর সঙ্গে সহবাসের সময় মালিক আযল করতে চাইলে দাসীর অনুমতি প্রয়োজন কি না, এই প্রশ্নে ইবন কুদামা লিখেছে মালিক তার দাসীর অনুমতি ছাড়াই আযল করতে পারে। আহমদ ইবন হাম্বল, মালিক, আবু হানিফা ও শাফিঈর মত হিসেবেও একই অবস্থান উল্লেখ করেছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, “তার সহবাসে কোনো অধিকার নেই এবং সন্তানেও কোনো অধিকার নেই।” [190]।
ইবন কুদামা, আল-মুগনি, ৭ম খণ্ড
فصل العزل عن أمته بغير إذنها
“নিজের দাসীর অনুমতি ছাড়াই তার সঙ্গে আযল করা জায়েয… কারণ সহবাসে তার কোনো অধিকার নেই এবং সন্তানেও কোনো অধিকার নেই।”
এই বক্তব্য যৌন সম্পর্কের ক্ষমতা এক বাক্যে প্রকাশ করে। স্বাধীন স্ত্রীর ক্ষেত্রে আযলে তার অনুমতির প্রশ্ন আলোচনা করা হয়েছে, কারণ তার যৌন ও সন্তানসংক্রান্ত অধিকার স্বীকৃত। দাসীর ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে তার সেই অধিকার নেই। মালিক সিদ্ধান্ত নেবে তার শরীর ব্যবহার করবে, আবার গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমাতে আযল করবে কি না, সেই সিদ্ধান্তেও দাসীর নিজস্ব অধিকার নেই।
যে নারী সহবাসে নিজের অধিকারী নয়, তার যৌন স্বাধীনতা কল্পনার বিষয় হয়ে যায়। যৌন সম্মতি মানে শুধু শারীরিক প্রতিরোধ না করা নয়। সম্মতি মানে নিজের শরীরের বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। দাসীর সেই স্বাধীনতা আইনগত মালিকানার নিচে চলে গেছে।
“তার সহবাসে কোনো অধিকার নেই” বাক্যটি যৌনদাসত্বের আইনগত সারসংক্ষেপ। নিজের যৌনজীবনের অধিকার যার নেই, তার শরীরের অধিকার আছে মালিকের।
মালিককে “না” বলার স্বাধীনতা কোথায়?
স্বাধীন যৌন সম্মতির সবচেয়ে সহজ পরীক্ষা হলো, মানুষটি নিরাপদভাবে “না” বলতে পারে কি না। দাসীর ক্ষেত্রে উত্তরটি মালিকানা সম্পর্কের মধ্যেই রয়েছে। সে মালিকের সম্পত্তি, মালিকের বাড়িতে থাকে, তার শ্রম মালিকের নিয়ন্ত্রণে, তাকে বিক্রি করা সম্ভব, তার স্বাধীন চলাফেরা নেই এবং মালিক তার ওপর শাস্তিমূলক ক্ষমতাও রাখে। সেই একই মালিক যখন যৌনসম্পর্ক দাবি করে, তখন দাসীর প্রত্যাখ্যান কোনো স্বাধীন নাগরিকের প্রত্যাখ্যানের মতো শক্তিশালী হতে পারে না।
একজন বন্দী কারারক্ষীর সঙ্গে, একজন দাসী মালিকের সঙ্গে অথবা একজন সম্পূর্ণ নির্ভরশীল মানুষ তাকে নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তির সঙ্গে যৌনসম্পর্কে “হ্যাঁ” বললেও ক্ষমতার পরিবেশ বিবেচনা করতে হয়। মালিক যদি তার খাদ্য, বাসস্থান, শাস্তি, বিক্রি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে সেই মালিকের বিরুদ্ধে প্রত্যাখ্যানের বাস্তব মূল্য অত্যন্ত বেশি।
যুদ্ধবন্দিনীর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও নগ্ন। যে পুরুষের বাহিনী তাকে বন্দী করেছে, সেই ব্যবস্থাই তাকে মালিকের হাতে দিয়েছে। সে কোথাও চলে যেতে পারে না। তার স্বামী বা পরিবার তাকে রক্ষা করতে পারে না। তার সামনে সমান দুইটি বিকল্প নেই, রাজি হওয়া অথবা স্বাধীনভাবে চলে যাওয়া।
সম্মতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ “হ্যাঁ” নয়, “না”। যে মানুষ নিরাপদে “না” বলতে পারে না, তার “হ্যাঁ” স্বাধীন সম্মতির প্রমাণ নয়। দাসত্ব প্রথমেই সেই “না” বলার স্বাধীনতাকে কেড়ে নেয়।
মুকাতাবা দাসীকেও জোর করলে যিনার হদ নেই
মালিকানা যৌন অপরাধের আইনি অবস্থান কতটা বদলে দেয়, তার একটি ভয়াবহ উদাহরণ মালিকি ফিকহের আল-মুদাওয়ানা-তে পাওয়া যায়। সেখানে এমন মুকাতাবা দাসীর কথা আলোচনা হয়েছে যে মালিকের সঙ্গে মুক্তির জন্য অর্থপ্রদানের চুক্তি করেছে। মালিক যদি তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে যৌনসম্পর্কে বাধ্য করে, তার ওপর যিনার হদ প্রযোজ্য হবে কি না, এই প্রশ্নে মালিকের ওপর যিনার হদ নেই বলা হয়েছে। তবে তাকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা তানকিল করা যেতে পারে। [191]।
আল-মুদাওয়ানা
في الرجل يطأ مكاتبته طوعا أو غصبا
প্রশ্ন করা হয়, কোনো ব্যক্তি তার মুকাতাবা দাসীর সঙ্গে তার সম্মতিতে অথবা জোরপূর্বক যৌনসম্পর্ক করলে তার ওপর হদ হবে কি না। মালিকের মত হিসেবে উত্তর এসেছে, “তার ওপর হদ নেই”, তবে অজ্ঞতার অজুহাত না থাকলে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে।
নারীটি মুক্তির পথে থাকা দাসী। সে যৌনসম্পর্ক চায়নি। মালিক জোর করেছে। তবুও মালিকের সঙ্গে তার মালিকানা সম্পর্ক অপরাধের আইনি শ্রেণিকে স্বাধীন নারীকে ধর্ষণের অবস্থা থেকে আলাদা করেছে। যৌন জবরদস্তি ঘটেছে, কিন্তু মালিকের ওপর যিনার নির্ধারিত হদ বসছে না।
এই ফিকহে আর্থিক ক্ষতির হিসাবও আসে, কারণ জোরপূর্বক যৌনসম্পর্কের কারণে মুকাতাবা দাসীর মূল্য বা মুক্তিচুক্তির অবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে। ফলে নারীটির শারীরিক স্বাধীনতার পাশাপাশি তার বাজার ও মালিকানাগত মূল্যও আইনের বিষয়।
একজন নারী “না” বলেছে, মালিক জোর করেছে, তবুও মালিকানা অপরাধের শ্রেণি বদলে দিচ্ছে। এই ব্যবস্থায় নারীর সম্মতির চেয়ে মালিকের সম্পত্তিগত সম্পর্কের আইনি ওজন বেশি।
দাসীর সন্তান এবং উম্মে ওয়ালাদ
মালিকের সঙ্গে যৌনসম্পর্কে দাসী সন্তান জন্ম দিলে তার অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে। মালিক সন্তানটিকে নিজের বলে স্বীকৃতি দিলে দাসী উম্মে ওয়ালাদ, অর্থাৎ মালিকের সন্তানের মা হিসেবে বিশেষ মর্যাদা পায়। পরবর্তী সুন্নি ফিকহের প্রধান ধারায় উম্মে ওয়ালাদকে সাধারণ দাসীর মতো বিক্রি করা হয় না এবং মালিক মারা গেলে সে মুক্ত হয়। ইবন কুদামার আল-মুগনি-তে উম্মে ওয়ালাদের বিক্রি, মুক্তি এবং সম্পত্তির অবস্থান নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা আছে। [192]।
কিন্তু উম্মে ওয়ালাদ হওয়া সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ স্বাধীনতা নয়। ইবন কুদামা স্পষ্টভাবে লিখেছে, উম্মে ওয়ালাদ তখনও দাসী এবং তার উপার্জন মালিকের। মালিকের মৃত্যুর মাধ্যমে সে মুক্ত হয়। [193]।
অর্থাৎ নারীর অবস্থান তার নিজের স্বাধীনতার ঘোষণায় বদলায় না, মালিকের সন্তান জন্ম দেওয়ার মাধ্যমে বদলায়। একজন সাধারণ দাসী বিক্রিযোগ্য। মালিকের সন্তান জন্ম দিলে তার সম্পত্তিগত অবস্থানে সীমাবদ্ধতা আসে এবং ভবিষ্যৎ মুক্তির পথ তৈরি হয়। তার গর্ভ ও মাতৃত্ব মালিকানার আইন পরিবর্তন করে।
একজন নারীর স্বাধীনতা তার নিজের মানুষ হওয়ার কারণে নিশ্চিত নয়, মালিকের সন্তান জন্ম দেওয়ার পরে তার অবস্থান উন্নত হয়। যে সমাজে মাতৃত্ব মানুষকে ধীরে ধীরে সম্পত্তি থেকে স্বাধীনতার দিকে নেয়, সেখানে মানুষ হিসেবে তার জন্মগত স্বাধীনতাই অস্বীকার করা হয়েছে।
স্বাধীন নারী ও দাসীর জন্য আলাদা যৌন নৈতিকতা
ইসলামী যৌন আইনে একই যৌনকর্ম নারীর আইনগত অবস্থান বদলালে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ পায়। একজন স্বাধীন নারী অন্যের স্ত্রী হলে তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক হারাম। যুদ্ধ করে তাকে বন্দী করার পরে তার পূর্ব বিবাহ ভেঙে যেতে পারে এবং নতুন মালিকের জন্য সে বৈধ হয়। একজন স্বাধীন নারীর সঙ্গে বিবাহ ছাড়া যৌনসম্পর্ক যিনা। একজন মালিক তার দাসীর সঙ্গে বিবাহ ছাড়াই যৌনসম্পর্ক করতে পারে। স্বাধীন নারীর সঙ্গে জোরপূর্বক যৌনসম্পর্ক ধর্ষণ ও জবরদস্তিমূলক যিনার আলোচনায় যায়। নিজের দাসীর ক্ষেত্রে মালিকানাই যৌন অধিকারের ভিত্তি।
এই শ্রেণিবিন্যাস যৌন নৈতিকতার কেন্দ্রকে সম্মতি থেকে সরিয়ে সামাজিক অবস্থানে বসায়। নারী রাজি কি না, সেই একক নীতি সবক্ষেত্রে বৈধতা নির্ধারণ করে না। সে স্বাধীন কি দাসী, বিবাহিত কি বন্দিনী, কার মালিকানায় আছে, এসব প্রশ্ন আগে আসে।
আধুনিক যৌন নৈতিকতায় একজন মানুষের সামাজিক মর্যাদা তার সম্মতির মূল্য পরিবর্তন করে না। গৃহকর্মী, বন্দী, যৌনকর্মী, স্ত্রী, শরণার্থী, দরিদ্র নারী, ধনী নারী, সবার “না” সমান। কাউকে কিনে নিলে তার “না” কমে যায় না। কাউকে যুদ্ধে বন্দী করলে তার যৌন অধিকার বিজয়ীর হাতে চলে যায় না।
শরীরের অধিকার ব্যক্তির স্বাধীনতার সঙ্গে জন্মায়, মালিকানার কাগজে বদলায় না। স্বাধীন নারীকে ধর্ষণ অপরাধ হলে দাসীকে জোর করাও অপরাধ। মানুষকে সম্পত্তি বানিয়ে তার যৌনসম্মতির মূল্য কমানো নৈতিকতার সবচেয়ে ভয়াবহ পতন।
যুদ্ধের লুণ্ঠন থেকে নারীর শরীর পর্যন্ত
যুদ্ধবন্দী দাসী ব্যবস্থা গনিমতের অর্থনীতির অংশ ছিল। যুদ্ধে পরাজিত মানুষের সম্পদ, অস্ত্র, পশু এবং বন্দীদের বিজয়ীরা নিজেদের মধ্যে বণ্টন করত। নারী বন্দীও এই বণ্টনের অংশ হতে পারত। আবু দাউদের ২১৫৫ নম্বর হাদিসের শেষাংশে গনিমত বণ্টনের আগে তা বিক্রি নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। অর্থাৎ বন্দী ও অন্যান্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের নির্দিষ্ট আইনি পর্যায় ছিল।
নারী বন্দীকে এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ঢোকানোর সঙ্গে যৌনতার যোগ ছিল সরাসরি। বনু মুস্তালিকের বর্ণনায় সাহাবিরা নারী বন্দীদের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক চেয়েছে, আবার তাদের বিনিময়ে অর্থ পাওয়ার আগ্রহও ছিল। আওতাসে বিবাহিত বন্দিনী নারীরা পূর্বস্বামী থাকা সত্ত্বেও মালিকদের জন্য যৌনভাবে বৈধ হয়েছে। একদিকে যুদ্ধজয়, অন্যদিকে নারী বন্দী, তারপর মালিকানা, বণ্টন, যৌনসম্পর্ক এবং সম্ভাব্য পুনর্বিক্রয় একই ব্যবস্থার ধারাবাহিক ধাপ।
একজন পরাজিত পুরুষ হয়তো নিহত বা বন্দী হয়েছে। তার স্ত্রী বিজয়ী বাহিনীর দখলে গেছে। বিজয়ী সৈন্য তাকে নিজের সম্পত্তি হিসেবে পেয়েছে এবং নির্দিষ্ট অপেক্ষার পরে তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক বৈধ হয়েছে। এই দৃশ্যকে “তৎকালীন যুদ্ধনীতি” নামে বর্ণনা করা ঘটনার বাস্তবতা বদলায় না। যুদ্ধের ফল হিসেবে নারীর শরীর বিজয়ীর যৌন অধিকারে গেছে।
যুদ্ধে পরাজিত হওয়া কোনো নারীর যৌন স্বাধীনতা বাতিল করে না। বিজয়ীর তরবারি জমি দখল করতে পারে, মানুষ বন্দী করতে পারে, কিন্তু নৈতিকভাবে কারও শরীরের সম্মতি তৈরি করতে পারে না। যুদ্ধবন্দিনীকে যৌনভাবে ব্যবহার করা যুদ্ধলব্ধ পুরস্কার নয়, যৌনদাসত্ব।
ধর্ষণের ক্ষতিপূরণেও স্বাধীন নারী ও দাসীর ভিন্ন মূল্য
মুয়াত্তা মালিকের বিচার-সংক্রান্ত অধ্যায়ে জোরপূর্বক যৌনসম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি পার্থক্য পাওয়া যায়। মালিক বলেন, কোনো স্বাধীন নারীকে ধর্ষণ করা হলে অপরাধীকে তার সমপর্যায়ের নারীর মোহরের সমপরিমাণ অর্থ দিতে হবে। কিন্তু ধর্ষণের শিকার নারী দাসী হলে ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত হবে ধর্ষণের ফলে তার বাজারমূল্য যতটুকু কমেছে তার ভিত্তিতে। একই বক্তব্যে ধর্ষকের ওপর হদ শাস্তি এবং ধর্ষিত নারীর ওপর কোনো শাস্তি না থাকার কথাও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। [194]।
এই দলিল থেকে “ধর্ষক শুধু মোহর দিয়ে ছাড়া পায়” বলা ভুল; মালিক স্পষ্টভাবে অপরাধীর শাস্তির কথাও বলেছেন। কিন্তু স্বাধীন নারী ও দাসীর ক্ষতিপূরণের ভাষার পার্থক্য আরও মৌলিক একটি সমস্যা প্রকাশ করে। স্বাধীন নারীর ক্ষতি হিসাব করা হচ্ছে তার নিজের প্রাপ্য অর্থে; দাসীর ক্ষেত্রে যৌন আঘাতকে তার বাজারদর কমে যাওয়ার ক্ষতি হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। অর্থাৎ দাসীর শরীরের ওপর অপরাধ একই সঙ্গে তার মালিকের সম্পত্তির আর্থিক ক্ষতি। মানুষটিকে প্রথমে পণ্য বানানোর ফলেই তার ধর্ষণের ক্ষতিও বাজারমূল্যের ভাষায় হিসাব করা সম্ভব হয়েছে।
আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনে যৌনদাসত্ব
আধুনিক আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে যৌনদাসত্বের ধারণা মালিকানা ও যৌন জবরদস্তিকে একসঙ্গে বিবেচনা করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের Elements of Crimes-এ যৌনদাসত্বের উপাদান হিসেবে একজন মানুষের ওপর মালিকানার সঙ্গে যুক্ত ক্ষমতা প্রয়োগের কথা এসেছে, যেমন কেনা, বিক্রি, ধার দেওয়া, বিনিময় করা অথবা অনুরূপ স্বাধীনতাহরণ, এবং সেই ব্যক্তিকে যৌন প্রকৃতির কাজে বাধ্য করা। [195]।
এই সংজ্ঞার নৈতিক কেন্দ্র খুব সহজ। মানুষ সম্পত্তি হতে পারে না। কাউকে দখল করা, কেনা বা বিক্রি করা তার ওপর যৌন অধিকার সৃষ্টি করতে পারে না। বন্দিত্ব, ভয়, মালিকানা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার স্বাধীন সম্মতির পরিবেশ ধ্বংস করে।
ধ্রুপদী ইসলামী দাসী-সহবাসের ব্যবস্থায় ঠিক সেই উপাদানগুলোই একত্রে উপস্থিত। নারী মালিকানাধীন, বিক্রিযোগ্য, স্বাধীনভাবে চলে যেতে অক্ষম, মালিকের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং মালিক তার সঙ্গে বিবাহ ছাড়াই যৌনসম্পর্ক করতে পারে। আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনে যে মালিকানাসদৃশ ক্ষমতা যৌনদাসত্বের অপরাধের কেন্দ্র, ধ্রুপদী ফিকহ সেই মালিকানাকেই যৌন বৈধতার ভিত্তি বানিয়েছে।
দাসী ও যুদ্ধবন্দিনী নারীর সামগ্রিক অবস্থান
সব দলিল একসঙ্গে রাখলে কোনো অস্পষ্টতা থাকে না। কোরআন স্ত্রী এবং ডান হাতের মালিকানাধীন নারীকে পৃথক বৈধ যৌন শ্রেণি করেছে। যুদ্ধবন্দী বিবাহিত নারীকে পূর্বস্বামী থাকা সত্ত্বেও মালিকের জন্য বৈধ করা হয়েছে। বনু মুস্তালিকের বন্দিনীদের সাহাবিরা যৌনভাবে কামনা করেছে এবং আযল নিয়ে মুহাম্মদের কাছে প্রশ্ন করেছে। বন্দিনী নারীর সঙ্গে সহবাসের আগে তার সম্মতির বদলে গর্ভমুক্ত অবস্থা নিশ্চিত করার বিধান এসেছে। দাসী কেনাবেচাযোগ্য মানুষ। দাসীর সঙ্গে আযলের জন্য তার অনুমতির প্রয়োজন নেই বলে ফিকহে লেখা হয়েছে, কারণ “সহবাসে তার কোনো অধিকার নেই।” মুকাতাবা দাসীকে মালিক জোর করলেও মালিকানার কারণে অপরাধের আইনি অবস্থান স্বাধীন নারীর ধর্ষণের মতো হয়নি। মালিকের সন্তান জন্ম দিলে উম্মে ওয়ালাদ হিসেবে তার সম্পত্তিগত অবস্থান বদলায়।
এই ব্যবস্থায় নারী শুধু যৌনভাবে অধীন নয়, একই সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে মালিকানাধীন। তার শ্রমের মালিক অন্য মানুষ, তার বাসস্থানের সিদ্ধান্ত অন্য মানুষ নেয়, তার বিক্রির ক্ষমতা অন্য মানুষের হাতে, আবার সেই মানুষ তার শরীরের ওপর যৌন অধিকারও দাবি করতে পারে। যৌন জবরদস্তির জন্য এর চেয়ে অসম ক্ষমতার সম্পর্ক কল্পনা করা কঠিন।
দাসত্বের মধ্যে কোনো মানুষের স্বাধীন যৌনসম্মতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, কারণ দাসত্বের সংজ্ঞাই স্বাধীনতাহীনতা। একজন নারী মালিককে প্রত্যাখ্যান করে নিজের ঘরে ফিরে যেতে পারে না। মালিক বদলাতে চাইলে নিজে নতুন জীবন নির্বাচন করতে পারে না। সে যে সম্পর্কের মধ্যে আছে, সেখান থেকে বের হওয়ার মৌলিক ক্ষমতাই তার নেই।
নারীর শরীরকে প্রথমে যুদ্ধলব্ধ সম্পত্তি বানানো, তারপর সেই মালিকানাকে যৌন বৈধতার ভিত্তি করা কোনো নারীমর্যাদা নয়। এটি মানুষের ওপর মানুষের মালিকানা এবং সেই মালিকানার ভেতরে যৌন অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা। এর সঠিক নাম দাসত্ব, আর যৌনতার ক্ষেত্রে এর সঠিক নাম যৌনদাসত্ব।
দাসী সহবাসে সম্মতি, যুদ্ধবন্দিনী নারী এবং যৌনদাসত্ব নিয়ে বিস্তারিত দলিল সংশয় জ্ঞানকোষের [196] প্রবন্ধে রয়েছে।
জান্নাতেও নারী: পুরুষের যৌন পুরস্কার ও চিরস্থায়ী কুমারীত্ব
ইসলামী নারীচিত্র মৃত্যুর পরেও পুরুষকেন্দ্রিকতা থেকে মুক্ত হয় না। কোরআনের জান্নাতের বর্ণনায় পুরুষ বিশ্বাসীর জন্য প্রশস্ত বাগান, নদী, ফল, পানীয়, সোনার পাত্র, রেশমি পোশাকের পাশাপাশি বারবার এসেছে সুন্দরী নারীসঙ্গী। তারা বড় চোখের হুর, গোপন মুক্তার মতো সুন্দর, তাঁবুতে অবস্থানকারী, দৃষ্টি সংযত রাখা নারী, যাদের আগে কোনো মানুষ বা জিন স্পর্শ করেনি। অন্য আয়াতে জান্নাতের নারীসঙ্গীদের নতুনভাবে সৃষ্টি করে কুমারী, প্রেমময় এবং সমবয়সী করার কথা এসেছে। হাদিসে জান্নাতি পুরুষের একাধিক স্ত্রী, তাদের শরীরের সৌন্দর্য, তাদের পায়ের মজ্জা পর্যন্ত দেখা যাওয়া এবং পুরুষকে একশ পুরুষের সমান যৌনশক্তি দেওয়ার বর্ণনা রয়েছে।
জান্নাতের এই যৌন কল্পনায় দর্শক প্রধানত পুরুষ। নারীকে দেখানো হয়েছে পুরুষের কামনার বস্তু হিসেবে। তার চোখ কেমন, শরীর কত সুন্দর, সে কুমারী কি না, অন্য কোনো পুরুষ তাকে আগে স্পর্শ করেছে কি না, সে নিজের স্বামীর জন্য কতটা প্রেমময়, এসব বিস্তারিত। জান্নাতি নারীর জন্য একইভাবে বহু সুদর্শন পুরুষসঙ্গী, পুরুষের চিরস্থায়ী কুমারত্ব, তার শরীরের যৌন সৌন্দর্য অথবা নারীর জন্য একশ পুরুষের যৌনশক্তিসম্পন্ন পুরুষের পুরস্কার বর্ণিত হয়নি। দুনিয়ায় নারী পুরুষের আনুগত্যশীল স্ত্রী, জান্নাতে নারী পুরুষের যৌন পুরস্কার। দৃশ্যপট বদলায়, পুরুষকেন্দ্রিক যৌন কল্পনা বদলায় না।
হুর, গোপন মুক্তার মতো নারী
কোরআনের সূরা আদ-দুখান ৪৪:৫৪-এ জান্নাতিদের বড় চোখের হুরদের সঙ্গে জোড়া লাগানোর কথা বলা হয়েছে। সূরা আত-তূর ৫২:২০-এ একইভাবে হুরদের সঙ্গে বিবাহ বা যুগল করার বর্ণনা এসেছে। সূরা আল-ওয়াকিয়া ৫৬:২২ থেকে ২৩-এ তাদের বড় চোখের নারী এবং গোপন মুক্তার মতো বলে বর্ণনা করা হয়েছে। [197] [198] [199]।
কোরআন, সূরা আল-ওয়াকিয়া ৫৬:২২ থেকে ২৩
“আর থাকবে বড় বড় চোখবিশিষ্ট হুর, যেন তারা আবরণে রাখা মুক্তা।”
মুক্তা, রত্ন, সাদা সৌন্দর্য, বড় চোখ, কোমলতা, এসব উপমা নারীকে দেখার পুরুষকেন্দ্রিক নান্দনিক ভাষা। জান্নাতের পুরুষ বিশ্বাসী পুরস্কার গ্রহণকারী, হুর সেই পুরস্কারের একটি অংশ। নারীটির নিজের আকাঙ্ক্ষা, পছন্দ, ব্যক্তিত্ব বা সে কোন ধরনের পুরুষ কামনা করে, এই বর্ণনায় সেগুলো বিষয় নয়। তার প্রধান পরিচয় তার সৌন্দর্য এবং পুরুষের জন্য তার প্রাপ্যতা।
এই বস্তুীকরণ আরও স্পষ্ট হয় যখন অন্যান্য জান্নাতি সম্পদের সঙ্গে হুরের বর্ণনা পাশাপাশি আসে। বাগান, ফল, নদী, পানীয়, রেশম, সোনা, মুক্তা, তারপর সুন্দরী নারী। পুরুষ জান্নাতের ভোক্তা, নারী জান্নাতের ভোগ্য সুখের অংশ।
নারীকে মুক্তার সঙ্গে তুলনা করা কবিতাময় শোনাতে পারে, কিন্তু নারী মুক্তা নয়। মুক্তা মালিকের জন্য সৌন্দর্যের বস্তু, নারী নিজে আকাঙ্ক্ষা, সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। জান্নাতের পুরুষকেন্দ্রিক বর্ণনায় সেই মানুষটি বারবার পুরস্কারে রূপান্তরিত হয়েছে।
যাদের আগে কোনো মানুষ বা জিন স্পর্শ করেনি
সূরা আর-রহমান ৫৫:৫৬-এ জান্নাতি নারীসঙ্গীদের বর্ণনায় বলা হয়েছে, তারা দৃষ্টি সংযত রাখবে এবং তাদের আগে কোনো মানুষ বা জিন স্পর্শ করেনি। একই সূরার ৫৫:৭২ থেকে ৭৪-এ তাঁবুতে অবস্থানকারী হুরদের কথা বলে আবার বলা হয়েছে, তাদের আগে কোনো মানুষ বা জিন স্পর্শ করেনি। [200] [201]।
কোরআন, সূরা আর-রহমান ৫৫:৫৬
“তাদের মধ্যে থাকবে দৃষ্টি সংযত রাখা নারীরা, যাদের আগে কোনো মানুষ অথবা জিন স্পর্শ করেনি।”
নারীর যৌন ইতিহাসকে পুরুষের আকাঙ্ক্ষার মাপকাঠি বানানোর যে প্রবণতা দুনিয়ার বিবাহে কুমারী নারীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার হাদিসে দেখা গেছে, জান্নাতের বর্ণনাতেও একই মানসিকতা চূড়ান্ত আদর্শে পৌঁছে যায়। পুরুষের পুরস্কার এমন নারী, যাকে অন্য কোনো পুরুষ আগে স্পর্শ করেনি। তার মূল্য শুধু সৌন্দর্যে নয়, তার অক্ষত যৌন ইতিহাসেও।
এই কল্পনায় পুরুষের আগের যৌন ইতিহাস কোনো সমস্যা নয়। সে দুনিয়ায় একাধিক স্ত্রী রাখতে পারে, দাসীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করতে পারে, পরে জান্নাতে আরও নারীসঙ্গী পেতে পারে। তার যৌন অভিজ্ঞতা তার মূল্য কমায় না। কিন্তু জান্নাতি নারীকে আদর্শ করা হয়েছে এমনভাবে যে অন্য কেউ তাকে স্পর্শ করেনি।
পুরুষের যৌন অভিজ্ঞতা পুরস্কারকে বাড়ায়, নারীর যৌন অনভিজ্ঞতা পুরস্কারের মূল্য বাড়ায়। এই দ্বৈত মানদণ্ডেই পিতৃতান্ত্রিক কুমারীত্ববোধের সারাংশ।
জান্নাতে আবার কুমারী নারী
সূরা আল-ওয়াকিয়া ৫৬:৩৫ থেকে ৩৭-এ জান্নাতের নারীসঙ্গীদের বিষয়ে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাদের বিশেষভাবে সৃষ্টি করবে, তাদের কুমারী করবে, প্রেমময় করবে এবং সমবয়সী করবে। [202]। ধ্রুপদী তাফসীরে এই আয়াতকে জান্নাতি নারীদের নবসৃষ্ট যৌবন, কুমারীত্ব ও স্বামীপ্রেমের বর্ণনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
কোরআন, সূরা আল-ওয়াকিয়া ৫৬:৩৫ থেকে ৩৭
“নিশ্চয়ই আমরা তাদের বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর তাদের করেছি কুমারী, প্রেমময় এবং সমবয়সী।”
এখানে জান্নাতি নারীর আদর্শ বৈশিষ্ট্য তিনটি একই সঙ্গে এসেছে, কুমারী, প্রেমময় এবং সমবয়সী। নারীকে এমনভাবে পুনর্গঠিত করা হচ্ছে যেন সে পুরুষের যৌন ও আবেগিক আনন্দের নিখুঁত সঙ্গী। তার বয়স পুরুষের কামনার উপযোগী, তার শরীর কুমারী, তার আবেগ স্বামীর প্রতি প্রেমময়।
একজন নারী দুনিয়ায় বিবাহিত ছিল, সন্তান জন্ম দিয়েছে, বৃদ্ধ হয়েছে, তার নিজস্ব যৌন ইতিহাস আছে, কিন্তু জান্নাতি যৌন আদর্শে কুমারীত্ব আবার ফিরে আসে। এই পুনরায় কুমারী করার ধারণা নারীর যৌন মূল্যকে তার নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে নয়, পুরুষের জন্য “প্রথমবারের” অনুভূতি দিয়ে মাপার মানসিকতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
জান্নাতেও আদর্শ নারীকে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাসহ পূর্ণ মানুষ হিসেবে রাখা হয়নি। তাকে আবার কুমারী, যৌবনা এবং স্বামীপ্রেমে নিবেদিত করে পুরুষের জন্য নতুন করে প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রত্যেক পুরুষের জন্য দুই স্ত্রী
সহিহ হাদিসে জান্নাতি পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকার বর্ণনা এসেছে। তিরমিজি ২৫৩৭-এ মুহাম্মদ বলেছে, প্রথম দল যারা জান্নাতে প্রবেশ করবে তাদের প্রত্যেকের দুইজন স্ত্রী থাকবে। তাদের সৌন্দর্য এমন হবে যে মাংসের ভেতর দিয়ে পায়ের হাড়ের মজ্জা পর্যন্ত দেখা যাবে। হাদিসটি সহিহ এবং বুখারি ও মুসলিমেও একই বর্ণনা রয়েছে। [203]।
সুনান আত-তিরমিজি
৩৬/ জান্নাতের বিবরণ
২৫৩৭। আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুহাম্মদ বলেছে, “তাদের প্রত্যেকের জন্য দুইজন করে স্ত্রী থাকবে। সৌন্দর্যের কারণে মাংসের ভেতর দিয়ে তাদের পায়ের হাড়ের মজ্জা পর্যন্ত দেখা যাবে।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
তিরমিজি ২৫৩৫-এ একইভাবে প্রত্যেক পুরুষের জন্য দুই স্ত্রী এবং তাদের সত্তর স্তরের পোশাকের ভেতর দিয়েও পায়ের মজ্জা দেখা যাওয়ার বর্ণনা এসেছে। [204]। দারেমির সহিহ বর্ণনাতেও জান্নাতে প্রত্যেকের দুই স্ত্রী এবং তাদের শরীরের ভেতরের মজ্জা পর্যন্ত দৃশ্যমান হওয়ার কথা এসেছে। [205]।
নারীর সৌন্দর্যের বর্ণনায় শুধু মুখ নয়, শরীরের স্বচ্ছতা পর্যন্ত যৌন নান্দনিকতার অংশ হয়ে গেছে। পুরুষের জান্নাতি স্ত্রী কত সুন্দর, তার শরীর কত কোমল, তার পায়ের হাড়ের মজ্জা পর্যন্ত কীভাবে দেখা যায়, এসব বিশদভাবে বলা হয়েছে। বিপরীতে জান্নাতি নারীর জন্য পুরুষের উরু, বুক, শরীর বা যৌন সৌন্দর্যের সমান্তরাল সহিহ হাদিসি বর্ণনা নেই।
জান্নাতের নারীকে এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যেন তাকে পুরুষের চোখ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তার শরীর দর্শনের বস্তু, তার সৌন্দর্য পুরুষের পুরস্কার। নারী সেখানে দর্শক নয়, প্রদর্শিত শরীর।
পুরুষকে একশ পুরুষের যৌনশক্তি
জান্নাতের পুরুষকেন্দ্রিক যৌন পুরস্কার শুধু বহু স্ত্রীতে থেমে নেই। তিরমিজি ২৫৩৬-এ আনাসের সূত্রে মুহাম্মদ বলেছে, জান্নাতে মুমিন পুরুষকে যৌনসম্পর্কের জন্য বিশেষ শক্তি দেওয়া হবে। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করে, সে কি এত যৌনসম্পর্ক করতে সক্ষম হবে? মুহাম্মদ উত্তর দেয়, তাকে একশ ব্যক্তির শক্তি দেওয়া হবে। [206]।
সুনান আত-তিরমিজি (তাহকীককৃত)
৩৬/ জান্নাতের বিবরণ
পরিচ্ছেদঃ জান্নাতীদের সঙ্গমশক্তি
২৫৩৬। আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুহাম্মদ বলেছে, “জান্নাতে মুমিনকে সঙ্গমের জন্য এত এত শক্তি দেওয়া হবে।” জিজ্ঞেস করা হলো, “সে কি তা করতে পারবে?” মুহাম্মদ বলল, “তাকে একশ ব্যক্তির শক্তি দেওয়া হবে।”
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
এই হাদিসের পরিচ্ছেদের নামই HadithBD-তে “জান্নাতীদের সঙ্গমশক্তি।” জান্নাতের পুরস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে পুরুষের যৌনক্ষমতা শতগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। তার বহু নারী থাকবে, আবার সেই নারীদের সঙ্গে যৌনসম্পর্কের জন্য অতিমানবীয় শক্তিও থাকবে।
একজন নারী জান্নাতে শত পুরুষের যৌনশক্তিসম্পন্ন বহু পুরুষ পাবে, এমন সমান্তরাল প্রতিশ্রুতি নেই। নারীকে একাধিক পুরুষের যৌনসঙ্গী করার কল্পনাও ইসলামী জান্নাতের পুরস্কারব্যবস্থায় নেই। পুরুষের বহুগামিতা জান্নাতেও পুরস্কার, নারীর বহুগামিতা অনুপস্থিত।
পুরুষের কামনা শুধু জান্নাতে অনুমোদিত নয়, অলৌকিকভাবে শক্তিশালী করা হয়েছে। নারীকে দেওয়া হয়েছে সেই শক্তির লক্ষ্য হওয়ার ভূমিকা।
দুনিয়ার স্ত্রীকে হুরের অভিশাপ
দুনিয়ার স্ত্রী স্বামীকে কষ্ট দিলে জান্নাতের হুরও তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। মিশকাতুল মাসাবীহ ৩২৫৮-এ মুয়াজ ইবন জাবালের সূত্রে মুহাম্মদ বলেছে, কোনো নারী তার স্বামীকে কষ্ট দিলে তার হুর স্ত্রী সেই নারীকে বলে, স্বামীকে কষ্ট দিও না, আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করুন; সে তোমার কাছে সাময়িক অতিথি, শিগগিরই তোমাকে ছেড়ে আমাদের কাছে চলে আসবে। [207]।
মিশকাতুল মাসাবীহ
পর্ব ১৩, বিবাহ
৩২৫৮। মুয়ায ইবন জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুহাম্মদ বলেছে, “কোনো নারী দুনিয়ায় তার স্বামীকে কষ্ট দিলে তার হুর স্ত্রী বলে, তাকে কষ্ট দিও না, আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করুন। সে তো তোমার কাছে সাময়িক অতিথি, শিগগিরই তোমাকে ছেড়ে আমাদের কাছে চলে আসবে।”
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
এই হাদিসে দুনিয়ার স্ত্রী এবং জান্নাতের হুরের সম্পর্কও পুরুষকে কেন্দ্র করে। দুনিয়ার স্ত্রী স্বামীকে কষ্ট দিয়েছে, জান্নাতের নারী তাকে অভিশাপ দিচ্ছে এবং পুরুষটিকে নিজের ভবিষ্যৎ যৌনসঙ্গী হিসেবে দাবি করছে। স্বামীর অত্যাচারে স্ত্রী কষ্ট পেলে জান্নাতের কোনো পুরুষসঙ্গী নেমে এসে স্বামীকে বলে না, “তাকে কষ্ট দিও না, সে শিগগিরই তোমাকে ছেড়ে আমার কাছে আসবে।”
এর আগের পরিচ্ছেদগুলোতে স্ত্রীকে স্বামীর আনুগত্য, যৌনপ্রাপ্যতা ও প্রহারের কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছে। এখানেও সেই স্বামীকেন্দ্রিক আনুগত্যকে পরকাল পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হয়েছে। দুনিয়ার স্ত্রীকে শাসন করতে জান্নাতের নারীও যেন পুরুষের পক্ষে একটি ধর্মীয় চাপের কণ্ঠ।
দুনিয়ার স্ত্রী স্বামীর অধীন, জান্নাতের হুর স্বামীর পক্ষে। দুই নারীকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়ে পুরুষকে কেন্দ্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সত্তা হিসেবে রাখা হয়েছে।
শহীদের জন্য বাহাত্তর হুর: দুর্বল লোককথা নয়
জান্নাতে পুরুষের ৭২ স্ত্রী নিয়ে বহুল প্রচারিত একটি বর্ণনা সুনান ইবন মাজাহ ৪৩৩৭-এ পাওয়া যায়। সেখানে মুহাম্মদ বলেছেন, জান্নাতে প্রবেশকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে ৭২ স্ত্রী দেওয়া হবে, দুইজন হুর এবং সত্তরজন এমন নারী যাদের স্বামীরা জাহান্নামে গেছে। একই বর্ণনায় নারীদের যৌনাঙ্গকে কামাতুর এবং পুরুষের যৌনাঙ্গকে কখনো শিথিল না হওয়ার ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। [208]।
সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস ৪৩৩৭
“আল্লাহ যাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন তাকে বাহাত্তর স্ত্রী দেবেন, দুইজন হুর এবং সত্তরজন জাহান্নামিদের থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া নারী…”
এই সনদটি দুর্বল (Da’if)।
সুনান আত-তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ১৬৬৯
মুহাম্মদ বলেছেন, শহীদের জন্য আল্লাহর কাছে ছয়টি বৈশিষ্ট্য আছে; এর মধ্যে রয়েছে, “বাহাত্তর জন আয়াত লোচন হুরের সঙ্গে তার বিবাহ হবে।”
ইমাম আবূ ঈসা বলেছেন, হাদিসটি হাসান-সহীহ-গারীব। HadithBD-তে হাদিসের মান: সহিহ। [209]
ইবন মাজাহ ৪৩৩৭-এর নির্দিষ্ট বর্ণনাটি দুর্বল বলা হলেও “৭২ হুর” ধারণাটিকে দুর্বল বলে সরিয়ে দেওয়া যায় না। সুনান আত-তিরমিজীর বর্ণনায় শহীদের ছয় বৈশিষ্ট্যের একটি হিসেবে সরাসরি বলা হয়েছে, তার বাহাত্তর জন আয়াতলোচন হুরের সঙ্গে বিবাহ হবে; ইমাম আবূ ঈসা হাদিসটিকে হাসান-সহীহ-গারীব বলেছেন এবং HadithBD-তেও এর মান সহিহ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। [209] তাই ৭২ সংখ্যাটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্বল লোককথা নয়। ইসলামী জান্নাতের পুরুষকেন্দ্রিক যৌন পুরস্কারের কাঠামো কোরআনের হুর, সহিহ ও গ্রহণযোগ্য হাদিসের একাধিক স্ত্রী, কুমারীত্ব, অতিমানবীয় পুরুষ যৌনশক্তি এবং শহীদের জন্য বাহাত্তর হুরের বর্ণনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
“৭২ হুর”কে দুর্বল বলে পাশ কাটানো যায় না। ইবন মাজাহর নির্দিষ্ট বর্ণনা দুর্বল হলেও তিরমিজীর বর্ণনায় শহীদের জন্য বাহাত্তর হুর আছে এবং সেটি HadithBD-তে সহিহ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। ফলে জান্নাতের পুরুষকেন্দ্রিক যৌন পুরস্কার কোনো দুর্বল প্রান্তিক বর্ণনার ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এর মূল কাঠামো কোরআন, সহিহ বা গ্রহণযোগ্য হাদিস এবং মূলধারার ইসলামী বর্ণনাতেই উপস্থিত। আসুন কয়েকজন আলেমের বতব্য শুনি,
আসুন দেখি, মাদ্রাসার ছাত্রদের হুর সম্পর্কে কি শেখানো হচ্ছে,
গেলমান কি নারীর জন্য পুরুষ হুর?
কোরআনে জান্নাতের গিলমান বা চিরযুবক সেবকদের উল্লেখ আছে। সূরা আত-তূর ৫২:২৪-এ বলা হয়েছে, তাদের চারপাশে এমন কিশোররা ঘুরে বেড়াবে যারা লুকানো মুক্তার মতো। সূরা আল-ইনসান ৭৬:১৯-এ চিরযুবক সেবকদের কথা বলা হয়েছে, যাদের দেখলে ছড়িয়ে থাকা মুক্তার মতো মনে হবে। [210] [211]।
এই গেলমানদের নারীদের যৌনসঙ্গী হিসেবে কোরআন সরাসরি বর্ণনা করেনি। বলা হয়েছে তারা জান্নাতিদের সেবক, তবে সেই প্রসঙ্গে আরও বেশি পর্যালোচনা প্রয়োজন [212] । হুরদের ক্ষেত্রে যৌন ও বৈবাহিক ভাষা স্পষ্ট, তাদের সঙ্গে জোড়া লাগানো, কুমারীত্ব, অন্য পুরুষের স্পর্শহীনতা, দৃষ্টি সংযত রাখা এবং পুরুষের স্ত্রী হওয়ার বর্ণনা রয়েছে। গেলমানদের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ এমন যৌন ভাষা নেই। ফলে “পুরুষ হুর পাবে, নারী গেলমান পাবে” কথাটি কোরআনিক সমান্তরাল নয়। হুর পুরুষের স্ত্রী বা যৌনসঙ্গী, গেলমান জান্নাতিদের সেবক। নারীকে পুরুষের সমান বহুসঙ্গীর পুরস্কার দেওয়ার কোনো স্পষ্ট কোরআনিক ব্যবস্থা গেলমান দিয়ে তৈরি হয় না।
হুরের বিপরীতে গেলমান বসিয়ে যৌন সমতা বানানো যায় না। একজন স্ত্রী, অন্যজন সেবক। কোরআনের ভাষাই তাদের ভূমিকা আলাদা করেছে।
নারীর জন্য বহু পুরুষ কোথায়?
জান্নাতে পুরুষের জন্য বহু নারীসঙ্গীর প্রতিশ্রুতি ইসলামী গ্রন্থে স্পষ্ট। কিন্তু একজন জান্নাতি নারী একই সময়ে বহু পুরুষসঙ্গী পাবে, এমন সমান্তরাল কোরআনিক প্রতিশ্রুতি নেই। দুনিয়ায়ও একজন পুরুষ চার স্ত্রী রাখতে পারে, নারী একজন স্বামী। জান্নাতেও পুরুষের বহুনারী যৌন পুরস্কারের ধারণা বহাল থাকে। নারীর জন্য বিপরীত বহুপতি যৌন পুরস্কার তৈরি হয়নি।
নারী জান্নাতে যা চাইবে তা পাবে, কোরআনের সাধারণ সুখ ও আকাঙ্ক্ষাপূরণের আয়াত দিয়ে এর উত্তর দেওয়া হয়। সূরা ফুসসিলাত ৪১:৩১-এ জান্নাতিদের জন্য তাদের মন যা চায় তা থাকার কথা বলা হয়েছে, সূরা আয-যুখরুফ ৪৩:৭১-এ আত্মা যা কামনা করে এবং চোখ যা উপভোগ করে তা পাওয়ার কথা এসেছে। [213] [214]। কিন্তু সাধারণ “যা চাইবে” ঘোষণার পাশে পুরুষের যৌন পুরস্কারকে বিস্তারিতভাবে নারীদেহ দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে, নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষাকে সমপরিমাণ নির্দিষ্টতায় পুরুষদেহ দিয়ে বর্ণনা করা হয়নি।
এই নীরবতাই তাৎপর্যপূর্ণ। কোরআন চাইলে বলতে পারত জান্নাতি নারীরা বড় চোখের, সুন্দর, কুমার পুরুষসঙ্গী পাবে যাদের অন্য নারী স্পর্শ করেনি। বলতে পারত প্রত্যেক নারীর দুই বা বহু স্বামী থাকবে। বলতে পারত নারীর যৌনশক্তি শতগুণ হবে। এই বর্ণনাগুলো নেই। কিন্তু পুরুষের হুর, কুমারী নারী, একাধিক স্ত্রী এবং যৌনশক্তির বর্ণনা আছে।
পুরুষের আকাঙ্ক্ষা জান্নাতের বিস্তারিত দৃশ্য, নারীর আকাঙ্ক্ষা একটি সাধারণ বাক্যের মধ্যে হারিয়ে যায়। যে জান্নাতের যৌন কল্পনায় এক লিঙ্গের কামনা এত নির্দিষ্ট এবং অন্য লিঙ্গের কামনা এত অস্পষ্ট, সেই কল্পনার দর্শক কারা ছিল তা বোঝা কঠিন নয়। আসুন এই বিষয়ে আলেমগণের বক্তব্য শুনি,
জান্নাতে ঈর্ষাও মুছে দেওয়া হবে
সহিহ হাদিসে জান্নাতিদের মধ্যে পারস্পরিক বিদ্বেষ ও ঈর্ষা না থাকার বর্ণনা আছে। তিরমিজি ২৫৩৭-এ দুই স্ত্রীসহ জান্নাতিদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে বিরোধ বা পারস্পরিক ঘৃণা থাকবে না, তাদের হৃদয় এক ব্যক্তির হৃদয়ের মতো হবে। কোরআনেও জান্নাতিদের অন্তর থেকে বিদ্বেষ দূর করে দেওয়ার কথা এসেছে। [215]।
এর ফলে বহুবিবাহের সমস্যার একটি পরকালীন সমাধান তৈরি হয়, পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকবে, কিন্তু স্ত্রীদের ঈর্ষা থাকবে না। দুনিয়ায় নারী স্বামীর অন্য স্ত্রী নিয়ে কষ্ট পেতে পারে, ফাতিমার ক্ষেত্রে মুহাম্মদ নিজেই সেই কষ্টকে গুরুতর বলেছে। জান্নাতে পুরুষের বহুনারী সম্পর্ক বজায় থাকবে, কিন্তু বিরোধী আবেগগুলো মুছে যাবে।
এটি নারীর পছন্দকে সম্মান করার সমাধান নয়। যদি একজন নারী স্বামীকে ভাগ করতে না চায়, সমাধান হতে পারত স্বামীকে একক সঙ্গী করা। জান্নাতের পুরুষকেন্দ্রিক কল্পনায় বরং পুরুষের বহু নারীসঙ্গী অক্ষত থাকে এবং এমন মানসিক অবস্থা সৃষ্টি করা হয় যেখানে স্ত্রী তা নিয়ে কষ্ট পাবে না।
পুরুষের বহুগামিতা বাদ দেওয়া হয়নি, নারীর আপত্তির অনুভূতিই বাদ দেওয়া হয়েছে। পুরুষের আকাঙ্ক্ষা অপরিবর্তিত, নারীকে সেই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মানানসই করে দেওয়া হয়েছে।
জান্নাতের নারীচিত্রের সামগ্রিক হিসাব
জান্নাতের নারীচিত্রের সব দলিল পাশাপাশি রাখলে একটি ধারাবাহিক পুরুষকেন্দ্রিক যৌন কল্পনা পাওয়া যায়। বড় চোখের হুর, মুক্তার মতো শরীর, অন্য কোনো মানুষ বা জিনের স্পর্শহীনতা, কুমারীত্ব, সমবয়স, প্রেমময় স্বভাব, তাঁবুতে অবস্থান, এক পুরুষের একাধিক স্ত্রী, নারীর শরীরের ভেতরের মজ্জা পর্যন্ত দৃশ্যমান সৌন্দর্য এবং পুরুষের একশ ব্যক্তির যৌনশক্তি। দুনিয়ার স্ত্রী স্বামীকে কষ্ট দিলে জান্নাতের হুর তাকে অভিশাপ দেয় এবং বলে স্বামী শিগগির তাদের কাছে চলে আসবে।
এটি আগের পরিচ্ছেদগুলোর সঙ্গে বিচ্ছিন্ন নয়। দুনিয়ায় পুরুষ চার স্ত্রী রাখতে পারে, জান্নাতে আবার একাধিক নারীসঙ্গী। দুনিয়ায় কুমারী স্ত্রীকে বিশেষ আকর্ষণীয় বলা হয়েছে, জান্নাতে নারীকে কুমারী করা হয়েছে। দুনিয়ায় স্ত্রীকে স্বামীর যৌন আহ্বানে সাড়া দিতে বলা হয়েছে, জান্নাতে পুরুষকে একশ পুরুষের যৌনশক্তি দেওয়া হয়েছে। দুনিয়ায় নারী স্বামীর অন্য স্ত্রী নিয়ে ঈর্ষা করে, জান্নাতে সেই ঈর্ষাই মুছে যায়। পুরুষের যৌন কেন্দ্রিকতা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অক্ষত।
হুরের বর্ণনায় নারী কী চায় তা নেই, পুরুষ তাকে কেমন দেখতে চায় সেটি আছে। সে কুমারী, সে সুন্দরী, সে দৃষ্টি সংযত রাখে, অন্য কেউ তাকে স্পর্শ করেনি, সে প্রেমময়, সে পুরুষের স্ত্রী। নারী এখানে নিজের কামনার অধিকারী বিষয় নয়, পুরুষের কামনার নিখুঁত উত্তর।
ইসলামী জান্নাতের যৌন পুরস্কার পুরুষের কামনার কল্পিত পরিপূর্ণতা। সেখানে নারী চিরসুন্দরী, চিরযৌবনা, চিরকুমারী, স্বামীপ্রেমে নিবেদিত এবং পুরুষের জন্য প্রাপ্য। পুরুষ বহু নারী পায় এবং অতিমানবীয় যৌনশক্তি পায়। নারী পুরুষের সমান বহুসঙ্গী যৌন পুরস্কার পায় না। দুনিয়ার পিতৃতন্ত্রের শেষ সীমানা তাই মৃত্যু নয়, জান্নাত পর্যন্ত তার সম্প্রসারণ।
উপসংহার
“ইসলাম নারীকে সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে”—এই দাবিটি যাচাই করার উপায় ধর্মীয় স্লোগান নয়, ইসলামের নিজের কোরআন, হাদিস, তাফসীর ও ফিকহ। সেই দলিলগুলো একসঙ্গে রাখলে যে ছবি পাওয়া যায়, তা “নারীমুক্তির বিপ্লব”-এর ছবি নয়। সেখানে নারীকে একদিকে পুরুষের জন্য ফিতনা, বাঁকা, বুদ্ধি ও ধর্মে ঘাটতিপূর্ণ, অমঙ্গলের সম্ভাব্য উৎস এবং জাহান্নামের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে; অন্যদিকে তার দাম্পত্য, যৌনতা, শরীর, বিবাহ, বিচ্ছেদ, সন্তান উৎপাদন এবং সম্পদের ওপর এমন একটি আইনগত কাঠামো বসানো হয়েছে যার কেন্দ্রীয় ক্ষমতা পুরুষের হাতে।
এই কাঠামোর ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করার মতো। প্রথমে নারী সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করা হয়—সে পুরুষের তুলনায় দুর্বল, ত্রুটিপূর্ণ, বিপজ্জনক এবং নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয় সত্তা। এরপর তাকে পুরুষের শস্যক্ষেত্র, দুনিয়ার উপভোগ্য সম্পদ, স্বামীর প্রশান্তির মাধ্যম এবং সন্তান উৎপাদনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। তারপর সেই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে পুরুষকে তার কাওয়াম বা কর্তৃত্বকারী করা হয়, ভালো স্ত্রীর ধর্মীয় গুণ হিসেবে স্বামীর আনুগত্য স্থাপন করা হয় এবং সেই আনুগত্য ভাঙলে শয্যা বর্জন থেকে শারীরিক প্রহার পর্যন্ত শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়। নারী সম্পর্কে অবমাননাকর ধারণা এবং নারীর ওপর পুরুষের আইনগত কর্তৃত্ব দুটি বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; একটি অন্যটিকে ন্যায্যতা দেয়।
যৌনতার ক্ষেত্রে এই ক্ষমতার অসমতা আরও নগ্ন। স্বামী স্ত্রীকে বিছানায় ডাকলে প্রত্যাখ্যানের জন্য ফেরেশতার অভিশাপ, চুলার পাশে থাকলেও স্বামীর ডাকে সাড়া দেওয়ার নির্দেশ, স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোজায় নিষেধ, স্ত্রীর যৌন অস্বীকৃতিকে নুশূয হিসেবে দেখা—সবকিছু একই ধারণার দিকে যায়: বিবাহের পর নারীর শরীরের ওপর স্বামীর একটি স্থায়ী যৌন দাবি তৈরি হয়। অথচ আধুনিক সম্মতির মৌলিক নীতি ঠিক বিপরীত—বিবাহ যৌনসম্মতির স্থায়ী লাইসেন্স নয়; প্রতিটি যৌনসম্পর্কে প্রত্যেক মানুষের স্বাধীনভাবে “হ্যাঁ” বা “না” বলার অধিকার আছে। যে ব্যবস্থায় স্ত্রীর “না” বলার জন্য তাকে ধর্মীয় অভিশাপ, আর্থিক অধিকার হারানো, অবাধ্যতার তকমা বা শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়, সেখানে যৌন সম্মতি স্বাধীন থাকে না।
দাসী ও যুদ্ধবন্দিনী নারীর ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গভীর। যুদ্ধের মাধ্যমে বন্দী হওয়া একজন নারীর আগের বিবাহ থাকা সত্ত্বেও মালিকের জন্য তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক বৈধ হতে পারে; তার স্বাধীন সম্মতিকে যৌন বৈধতার শর্ত করা হয়নি। ফলে নারীর শরীরের ওপর যৌন অধিকার কখনো বিবাহচুক্তি, কখনো দাস-মালিকানা থেকে সৃষ্টি হয়েছে। একজন নারীর বর্তমান ইচ্ছার বদলে তার আইনগত অবস্থান—স্ত্রী, দাসী বা বন্দিনী—নির্ধারণ করেছে কোন পুরুষ তার শরীরের ওপর যৌন অধিকার দাবি করতে পারবে। এটিই যৌন স্বায়ত্তশাসনের সরাসরি বিপরীত।
বিবাহের অন্য ক্ষেত্রেও একই লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতার বিন্যাস দেখা যায়। পুরুষ চারজন স্ত্রী রাখতে পারে, নারী পারে না। দ্বিতীয় বিবাহের জন্য প্রথম স্ত্রীর সম্মতি প্রয়োজন হয় না। পুরুষের হাতে একতরফা তালাকের মৌলিক ক্ষমতা থাকে, অথচ নারীকে বিচ্ছেদের জন্য খুলা, মোহর ফেরত দেওয়া কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তিন তালাকের পর আগের স্বামীর কাছে ফেরার জন্য নারীকেই অন্য পুরুষকে বিয়ে করে তার সঙ্গে যৌনসম্পর্কের ধাপ অতিক্রম করতে হয়। কুমারীত্বকে নারীর আকাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য এবং সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতাকে বিবাহযোগ্যতার মূল্যবান গুণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। একই ব্যবস্থায় পুরুষ সম্পর্ক নির্বাচন, সম্প্রসারণ ও সমাপ্ত করার বেশি ক্ষমতা পায়; নারীকে সেই সম্পর্কের ভেতরে আনুগত্য, যৌনপ্রাপ্যতা ও প্রজননের ভূমিকায় বেশি আবদ্ধ করা হয়।
শিশুবিবাহ এই ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতিগুলোর একটি। ছয় বা সাত বছরের কন্যাকে তার পিতা বিবাহ দিতে পারে; আয়িশার নয় বছরে বাসর ইসলামী আইনশাস্ত্রে তার নজির হয়েছে; কিছু ধ্রুপদী ফিকহে বয়ঃসন্ধিও সহবাসের অপরিহার্য শর্ত নয়—শিশুর শরীর যৌনপ্রবেশ “সহ্য করতে পারে” কি না, সেটিই মানদণ্ড হতে পারে। এমনকি ছোট স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসে তার যৌনাঙ্গ বিদীর্ণ হয়ে গেলে কত দিয়াত দিতে হবে, তারও ফিকহি হিসাব তৈরি হয়েছে। এখানে সমস্যাটি ইতিহাসের কোনো অস্বস্তিকর ঘটনা নয়; সমস্যাটি এমন একটি নৈতিক ও আইনগত কাঠামো, যেখানে একজন শিশুকে প্রথমে “স্ত্রী” বানিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের যৌন নাগালের মধ্যে আনা যায়। নিকাহ শিশুকে প্রাপ্তবয়স্ক করে না; পিতার সম্মতি শিশুর যৌনসম্মতি নয়; শরীর যৌনপ্রবেশ সহ্য করতে পারা স্বাধীন যৌন সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা নয়।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও “ইসলাম নারীকে প্রথম সম্পত্তির অধিকার দিয়েছে” ধরনের জনপ্রিয় বক্তব্য ইতিহাসের সঙ্গে মেলে না। ইসলামের আগেই খাদিজা নিজের বিপুল সম্পদের মালিক ছিলেন, ব্যবসা পরিচালনা করতেন এবং পুরুষদের নিজের পুঁজিতে নিয়োগ করতেন। ইসলাম-পূর্ব আরবেও উত্তরাধিকারব্যবস্থা ছিল। ইসলামী বিধান সেই বিদ্যমান উত্তরাধিকার কাঠামোকে সমতায় রূপান্তর করেনি; বরং নারীকে অসম ভগ্নাংশে সীমিত করে পুরুষের সংখ্যাগত ও আগনাত অগ্রাধিকার বহাল রেখেছে। একই পিতা-মাতার পুত্র কন্যার দ্বিগুণ পায়, নির্দিষ্ট অবস্থায় স্বামী স্ত্রীর দ্বিগুণ পায় এবং নির্ধারিত অংশ বণ্টনের পর অবশিষ্ট সম্পদের সাধারণ আগনাত নীতিতে নিকটতম পুরুষ আত্মীয় অগ্রাধিকার পায়।
এ কারণেই “জাহেলি যুগে নারীর অবস্থা আরও খারাপ ছিল” কোনো উত্তর নয়। ইসলাম-পূর্ব আরবের নারীজীবন একরকম ছিল না; খাদিজার মতো নারী ইসলামের আগেই সম্পদ, ব্যবসা ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বাস্তব ক্ষমতা ভোগ করেছেন। তার চেয়েও বড় কথা, কোনো ধর্মীয় বিধান ন্যায়সঙ্গত কি না তা বিচার করতে তার আগের সমাজে আরও খারাপ কিছু ছিল কি না জানা প্রয়োজন হয় না। দাসপ্রথার চেয়ে গণহত্যা খারাপ হতে পারে; তাই দাসপ্রথা ন্যায়সঙ্গত হয় না। একইভাবে কোনো প্রাচীন সমাজ নারীকে সম্পূর্ণ উত্তরাধিকারবঞ্চিত করে থাকলে কন্যাকে পুত্রের অর্ধেক দেওয়া ন্যায়বিচার হয়ে যায় না। নৈতিকতার মানদণ্ড “আগের চেয়ে কিছুটা ভালো” নয়; মানদণ্ড হলো মানুষের সমান মর্যাদা, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং নিজের জীবন ও শরীরের ওপর সমান অধিকার।
নারীর অধিকার কোনো ধর্ম, নবী, স্বামী, পিতা কিংবা পুরুষ অভিভাবকের দান নয়। নারী মানুষ বলেই তার অধিকার আছে। নিজের সম্পদের ওপর অধিকার, নিজের জীবনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকার, বিবাহ প্রত্যাখ্যানের অধিকার, যৌনসম্পর্কে “না” বলার অধিকার, সহিংসতা থেকে মুক্ত থাকার অধিকার, সন্তান নেবে কি না সেই সিদ্ধান্তের অধিকার, সমান আইনি মর্যাদা, সমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ—এসব অধিকার কোনো পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। যে মুহূর্তে বলা হয় একজন পুরুষ আল্লাহর নামে নারীর ওপর কর্তৃত্ব করবে, তার আনুগত্য দাবি করবে, তার যৌনপ্রাপ্যতা দাবি করবে কিংবা অবাধ্যতার জন্য তাকে শাস্তি দিতে পারবে, সেই মুহূর্তেই সমান মানবমর্যাদার নীতি ভেঙে যায়।
ইসলামী নারী-ব্যবস্থার মূল সমস্যা কয়েকটি বিচ্ছিন্ন “কঠিন হাদিস” বা “ভুল ব্যাখ্যা” নয়। সমস্যাটি কাঠামোগত। নারী সম্পর্কে নেতিবাচক ধর্মীয় চরিত্রায়ণ, পুরুষের কাওয়ামাহ, স্ত্রীর আনুগত্য, যৌনপ্রাপ্যতার বাধ্যবাধকতা, প্রহারের অনুমতি, একতরফা বহুবিবাহ, অসম বিবাহবিচ্ছেদ, যৌনদাসত্ব, শিশুবিবাহ এবং লিঙ্গভিত্তিক উত্তরাধিকার—সবগুলো একই দিকে নির্দেশ করে: পুরুষকে অধিক ক্ষমতা এবং নারীকে অধিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে রাখা।
ইসলামী নারী-পুরুষ সম্পর্কের চূড়ান্ত কাঠামো সমতা নয়; এটি পুরুষের কর্তৃত্ব, যৌন অধিকার, পারিবারিক সিদ্ধান্তক্ষমতা এবং নারীর আনুগত্যভিত্তিক ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় নারী পূর্ণ সমান নাগরিক নয়; সে কখনো পুরুষের অধীন স্ত্রী, কখনো তার যৌনপ্রাপ্য সঙ্গিনী, কখনো তার শস্যক্ষেত্র, কখনো তার প্রজননের মাধ্যম, কখনো তার অনুমতির অধীন ব্যক্তি, কখনো তার অর্ধেক উত্তরাধিকারী, কখনো তার যুদ্ধবন্দিনী যৌনদাসী। আধুনিক মানবাধিকারের ভিত্তি ঠিক উল্টো জায়গায় দাঁড়ায়—নারী কারও অধীন সত্তা নয়; নারী নিজেই নিজের শরীর, জীবন, যৌনতা, সম্পদ এবং ভবিষ্যতের পূর্ণ অধিকারী মানুষ।
তথ্যসূত্রঃ
- ইসলামে পুরুষের বহুবিবাহের উৎসাহ প্রদান ↩︎
- ইসলামি বিধানে সর্বোচ্চ কতজন যৌনদাসী রাখা যাবে? ↩︎
- ইসলামি শরিয়তে তালাক দেয়ার অধিকার একমাত্র স্বামীর ↩︎
- বাল্যবিবাহ, পেডোফিলিয়া এবং ইসলাম – আয়িশা কি ৯ বছর বয়সে বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছেছিলেন? ↩︎
- ইসলামে যুদ্ধবন্দি নারী বা দাসী ধর্ষণের বৈধতা প্রসঙ্গে: দাসীর সম্মতি কি জরুরি? ↩︎
- কোরআন, সূরা আন-নাহল ১৬:৫৮–৫৯ ↩︎
- কোরআন, সূরা আত-তাকভীর ৮১:৮–৯ ↩︎
- Adnan Demircan, “Custom of Wa’d al Banat … in Jahiliyya Arabs”, İSTEM, 2004 ↩︎
- Ilkka Lindstedt, “The Qurʾān and the Putative pre-Islamic Practice of Female Infanticide”, 2023 ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৪৬৪২ ↩︎
- IslamQA, প্রশ্ন 160798 ↩︎
- IslamWeb, Fatwa 95797 ↩︎
- Feyza Betül Köse, “Women in Pre-Islamic Arab Society”, Journal of Academic Sirah, 2024 ↩︎
- Hatoon al-Fassi, Women in Pre-Islamic Arabia: Nabataea, 2007 ↩︎
- Ellie Bennett, The Queens of the Arabs During the Neo-Assyrian Period, Eisenbrauns/Penn State University Press, 2024 ↩︎
- Ellie Bennett, The Queens of the Arabs During the Neo-Assyrian Period, chapters on Tiglath-Pileser III and Sargon II ↩︎
- Hatoon Ajwad al-Fassi, Women in Pre-Islamic Arabia: Nabataea, BAR International Series 1659, 2007 ↩︎
- IslamQA — সীরাতে ইবন হিশাম থেকে খাদিজার বাণিজ্যের বর্ণনা ↩︎
- আদ-দুরার আস-সানিয়্যাহ — খাদিজার বাণিজ্য ও মুহাম্মদের সিরিয়া সফর ↩︎
- আদ-দুরার আস-সানিয়্যাহ — খাদিজা ও মুহাম্মদের বিবাহ ↩︎
- Ibn Saʿd, al-Tabaqat al-Kubra, biography of Hind bint ʿUtba ↩︎
- Ibn ʿAsakir, Tarikh Madinat Dimashq, biography of al-Husayn b. ʿAli ↩︎
- Kitab al-Aghani, biography of al-Khansa; classical biographical traditions on al-Khansa ↩︎
- al-Waqidi, Kitab al-Maghazi; Ibn Saʿd, al-Tabaqat al-Kubra ↩︎
- The Metropolitan Museum of Art, “The Housemistress in New Kingdom Egypt: Hatnefer” ↩︎
- Charles Halton and Saana Svärd, Women’s Writing of Ancient Mesopotamia, Cambridge University Press, chapter “Mesopotamian Women” ↩︎
- Aristotle, Politics, Book II, 1270a ↩︎
- Antti Arjava, “The End of Tutela Mulierum,” Journal of Roman Studies; Andrew M. Riggsby, Roman Law and the Legal World of the Romans, chapter “Women and Property” ↩︎
- তাফসীরে তাবারী, সূরা আন-নিসা ৪:৭ ↩︎
- তাফসীরে ইবন আবি হাতিম, সূরা আন-নিসা ৪:৭ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ২৭৪৭ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৬৭৩২ 1 2
- Noel J. Coulson, Succession in the Muslim Family ↩︎
- M. Habibur Rahman, “The Role of Pre-Islamic Arab Tradition in Islamic Inheritance Law” 1 2
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৩৩৩০ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৫০৯৬ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৩৫১৩ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৫৭৫৩ ↩︎
- সুনান ইবনে মাজাহ, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৯৫২ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৪৮৪ [৫০৮] ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৩০৪ 1 2
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৩৪৩৩ ↩︎
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৩০৪ ↩︎
- Stanford Encyclopedia of Philosophy — Feminist Perspectives on Objectification ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-বাকারা ২:২২৩ ↩︎
- তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৯১–৯৫ — সংশয় ইসলাম আর্কাইভ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, হাদিস ২১৬৪ 1 2
- কোরআন, সূরা আলে ইমরান ৩:১৪ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৩৫১২ ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-আরাফ ৭:১৮৯ ↩︎
- কোরআন, সূরা আর-রূম ৩০:২১ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস ৩১৩১ ↩︎
- সুনান আন-নাসাঈ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৩২৮৪ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, হাদিস ২০৫০ ↩︎
- ইসলামে নারী হচ্ছে ভোগ্যপণ্য ↩︎
- দেনমোহরঃ নারীর লজ্জাস্থানের মূল্য ↩︎
- ইসলামে বৈবাহিক ধর্ষণের অনুমোদন 1 2 3 4
- ইসলাম অনুসারে বন্ধ্যা নারীদের বিয়ে করা নিষেধ ↩︎
- কোরআন, সূরা আন-নিসা ৪:৩৪ 1 2
- কোরআন, সূরা আল-বাকারা ২:২২৮ 1 2 3
- সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ২১৩৯ 1 2
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৫১৯৩ 1 2
- মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস ৩২৫৫ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস ৩২৬৬ ↩︎
- সুনান আত-তিরমিযী, হাদিস ১১৬৩ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৫১৯৫ 1 2
- মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস ৩২৫৭ 1 2
- সুনান আবূ দাউদ, হাদিস ২০৮৫ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস ৩২৫৪ ↩︎
- নবীদের কাহিনী-১, ড. মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, পৃষ্ঠা ১৯ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯৯ ↩︎
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৫০৮০ ↩︎
- সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৮৬১ ↩︎
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৫২১৩ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৪৭০৬ ↩︎
- কোরআন, সূরা আন-নিসা ৪:১২৮ ↩︎
- সুনান আন-নাসাঈ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৩৯৬৫ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, তৃতীয় খণ্ড, হাদিস নম্বরঃ ২১২৮ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, হাদিস ২১৪৬ ↩︎
- সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৯৮৫ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৫৮২৫ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ২২২২ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৪৮২৯ [আন্তর্জাতিক ৫২০৪] ↩︎
- Ibn Sa‘d, Kitab al-Tabaqat al-Kabir, The Women of Madina ↩︎
- IslamQA — যুবায়ের আসমাকে প্রহার করতেন কি না ↩︎
- আত-তাবারানী, আল-মু‘জাম আল-কাবীর — IslamWeb ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা — নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ↩︎
- ইসলামে স্ত্রী প্রহারের বৈধতা ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৪৯৯ ↩︎
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৫১৯৪ ↩︎
- সুনান ইবনে মাজাহ, বিবাহ অধ্যায়, সংশ্লিষ্ট হাদিস ↩︎
- আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস ১১৯ ↩︎
- IslamQA, প্রশ্ন 219686 ↩︎
- IslamQA, প্রশ্ন 33597 1 2
- কোরআন, সূরা আন-নিসা ৪:৩ 1 2
- সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৯৫৩ ↩︎
- কোরআন, সূরা আন-নিসা ৪:২৪ 1 2
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৫০৬৯ ↩︎
- কোরআন, সূরা আন-নিসা ৪:১২৯ ↩︎
- IslamQA, প্রশ্ন 61 ↩︎
- IslamWeb, Fatwa 257119 ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ৬২০৪ [২৪৪৯] ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ৬২০৩ [২৪৪৯] ↩︎
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৩৭১৪ ↩︎
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৩৭৬৭ ↩︎
- কোরআন, সূরা আত-তালাক ৬৫:৪ 1 2
- কোরআন, সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪৯ ↩︎
- তাফসীর আত-তাবারী, সূরা আত-তালাক ৬৫:৪ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৫১৩৩ ↩︎
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৫১৩৩ ↩︎
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৫১৫৮ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ৩৩৭০ থেকে ৩৩৭৩ [১৪২২] ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ৩৩৭২ [১৪২২] ↩︎
- IslamQA, প্রশ্ন 12708 ↩︎
- IslamQA, প্রশ্ন 22442 ↩︎
- IslamQA, প্রশ্ন 176799 ↩︎
- আল-সারাখসী, আল-মাবসুত, নাবালক ও নাবালিকার বিবাহ ↩︎
- আহকামুল কুরআন, ইমাম আহমাদ ইবনে আলী আবূ বকর আর-রায়ী আল-যাস্সাস, অনুবাদঃ মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম, খায়রুন প্রকাশনী, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩১ ↩︎
- IslamQA, প্রশ্ন 282876 ↩︎
- ইবন কুদামা, আল-মুগনি, মাসআলা ৬৯৮৫ ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, কিশোরী গর্ভধারণ ↩︎
- UNICEF, Child Marriage ↩︎
- শিশুবিবাহ সম্পর্কিত, সংশয় জ্ঞানকোষ ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-বাকারা ২:২২৯ 1 2
- কোরআন, সূরা আত-তালাক ৬৫:১ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিস একাডেমি, হাদিস নম্বরঃ ৩২৭৯ ↩︎
- তাফসীরে মা’আরেফুল কোরআন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৫০ ↩︎
- ফিকহে ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু, ড মুহাম্মদ রাওয়াস কালা’জী, ভাষান্তর ও সম্পাদনাঃ মুহাম্মদ খলিলুল রহমান মুমিন, আধুনিক প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ১৭৬ ↩︎
- ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৮২ ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-বাকারা ২:২৩১ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৫২৭৩ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২২২৬ ↩︎
- জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ১১৮৭ ↩︎
- IslamQA, প্রশ্ন 186325, স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহের কারণে স্ত্রীর বিচ্ছেদ ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-বাকারা ২:২৩০ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ২৬৩৯ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস ৩২৯৬ ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-বাকারা ২:২৩৪ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৪৯৫১ [৫৩৪১] ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৪৯৪৯ [৫৩৩৮, ৫৩৩৯] ↩︎
- কোরআন, সূরা আন-নিসা ৪:১১ ↩︎
- কোরআন, সূরা আন-নিসা ৪:১২ ↩︎
- কোরআন, সূরা আন-নিসা ৪:১৭৬ ↩︎
- আদ-দুররুল মানসুর, সূরা আন-নিসা ৪:৭-এর ব্যাখ্যা ↩︎
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৪৫৭৮ ↩︎
- Noel J. Coulson, Succession in the Muslim Family, Cambridge University Press ↩︎
- ইবন কুদামা, আল-মুগনি, কিতাবুদ দিয়াত, মাসআলা ৬৮৩৭ ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-বাকারা ২:২৮২ ↩︎
- IslamWeb, ফতোয়া 374497, হুদুদ ও কিসাসে নারীর সাক্ষ্য ↩︎
- আল-মুদাওয়ানা, কিতাবুশ শাহাদাত, নারীর সাক্ষ্য ↩︎
- আল-কাসানি, বাদায়িউস সানায়ি, সাক্ষ্যের শর্ত ↩︎
- IslamWeb, ফতোয়া 110835, বিচারকের জন্য পুরুষ হওয়ার শর্ত ↩︎
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৪৪২৫ ↩︎
- IslamWeb, ফতোয়া 43419, নারী রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক ও সেনাপতি ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস ৩১১০, তিরমিজি ১১৭৩ ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩২ থেকে ৩৩ ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৩ ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৯ ↩︎
- কোরআন, সূরা আন-নূর ২৪:৩১ ↩︎
- সুনান আত-তিরমিজি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ২৭৮৬ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৫৬৭ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৫২৭২ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ১০৮৮ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ৪৪০ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ২১২৮ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, ইসলামিয়া কুতুবখানা, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪০, ১৪২, ১৪৩ ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, Female Genital Mutilation ↩︎
- IslamQA, প্রশ্ন 60314, নারীর খৎনার ফিকহি বিধান ↩︎
- IslamQA, প্রশ্ন 60314 ↩︎
- IslamQA, প্রশ্ন 427, ইবন কুদামার আল-মুগনি থেকে নারী খৎনার বিধান ↩︎
- IslamQA, প্রশ্ন 82859, নারী খৎনা সম্পর্কিত হাদিস ↩︎
- সূত্র ও সনদ আলোচনা ↩︎
- আউনুল মাবুদ, নারী খৎনার ফিকহি আলোচনা ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, FGM-এর শ্রেণিবিভাগ ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতি প্রতিরোধ ↩︎
- IslamQA, প্রশ্ন 45528, নারী খৎনার কথিত স্বাস্থ্যগত উপকার ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, FGM-এর স্বাস্থ্যঝুঁকি ↩︎
- WHO Guideline on the Prevention of Female Genital Mutilation and Clinical Management of Complications, 2025 ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, FGM-এর সামাজিক কারণ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৫৯৩১ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৫৯৩৭ ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-মুমিনুন ২৩:৫ থেকে ৬ ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-মাআরিজ ৭০:২৯ থেকে ৩০ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৩৪৮০ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৪১৩৮ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ২১৫৫ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, বন্দী স্ত্রীলোকের সঙ্গে সহবাস অধ্যায় ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ২১৬৯ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ২০১৯ [২১৫২] ↩︎
- ইবন কুদামা, আল-মুগনি, দাসীর অনুমতি ছাড়া আযল ↩︎
- আল-মুদাওয়ানা, মুকাতাবা দাসীর সঙ্গে জোরপূর্বক সহবাস ↩︎
- ইবন কুদামা, আল-মুগনি, উম্মে ওয়ালাদ বিক্রির বিধান ↩︎
- আল-মুগনি, উম্মে ওয়ালাদ দাসী এবং তার উপার্জন মালিকের ↩︎
- মুয়াত্তা মালিক, বিচার অধ্যায়, রেওয়ায়াত ১৪ ↩︎
- International Criminal Court, Elements of Crimes ↩︎
- দাসী সহবাসে সম্মতি ↩︎
- কোরআন, সূরা আদ-দুখান ৪৪:৫৪ ↩︎
- কোরআন, সূরা আত-তূর ৫২:২০ ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-ওয়াকিয়া ৫৬:২২ থেকে ২৩ ↩︎
- কোরআন, সূরা আর-রহমান ৫৫:৫৬ ↩︎
- কোরআন, সূরা আর-রহমান ৫৫:৭২ থেকে ৭৪ ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-ওয়াকিয়া ৫৬:৩৫ থেকে ৩৭ ↩︎
- সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস ২৫৩৭ ↩︎
- সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস ২৫৩৫ ↩︎
- সুনান আদ-দারেমি, হাদিস ২৮৭০ ↩︎
- সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস ২৫৩৬ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস ৩২৫৮ ↩︎
- সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস ৪৩৩৭ ↩︎
- সুনান আত-তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ১৬৬৯ 1 2
- কোরআন, সূরা আত-তূর ৫২:২৪ ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-ইনসান ৭৬:১৯ ↩︎
- গেলমান বা প্রমোদ বালক প্রসঙ্গে ↩︎
- কোরআন, সূরা ফুসসিলাত ৪১:৩১ ↩︎
- কোরআন, সূরা আয-যুখরুফ ৪৩:৭১ ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-আরাফ ৭:৪৩ ↩︎
About This Article
Genre: Critical Analysis / Islamic Studies / Women’s Rights
Epistemic Position: Evidence-based, source-critical, secular analysis.
This article examines the claim that Islam granted women exceptional dignity and rights by comparing that claim with the Qur’an, canonical hadith, classical Islamic jurisprudence, sīrah and historical scholarship. It covers pre-Islamic Arabia, inheritance, testimony, political authority, marriage and divorce, sexual autonomy, domestic violence, veiling and mobility, slavery and concubinage, and the portrayal of women in the Islamic afterlife.
Claims in this article should be evaluated according to the cited primary texts, historical evidence, the validity of the inferences drawn from those sources, and their implications for equality, autonomy, bodily integrity and legal status.





Notun kichu jante parlam.
ভাই আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ , মানবতার সার্থে এগিয়ে চলুন , জিৎ আমাদের হবেই ।
অসাধারন।
লেখাটা বেশ ভাল যুক্তিপূর্ণ ও তথ্য সমৃদ্ধ, আমি এটি আগেও পড়েছিলাম। তখন কৌতূহল নিয়ে কিছু আয়াত ফোনে থাকা বাংলা কুরান এপ্লিকেশন ঘেটে মিলিয়েও দেখেছিলাম! এরকম লেখা সত্যিই যে কারোর ই চোখ খুলে(অন্ধত্বের মুক্তি) দেবার মত।
ভাই আমার অনেক প্রশ্ন আছে ।সরসরি ফোনে বলতে চাই
ভাই বিজ্ঞানী আইনস্টাইন এবং নিউট ঈশ্বরে বিশ্বাস করত কেন তারা সবচেয়ে বড় বিজ্ঞান
আপনার চেয়ে বেশি জ্ঞানী।
আইনস্টাইন নাস্তিক ছিলেন। তবুও যদি ধরে নেই আইনস্টাইন আস্তিক ছিলেন তাহলে আপনার যুক্তি অনুসারে আমাদের সবাইকে ইহুদি হয়ে যাওয়া উচিত।
কারন আইনস্টাইন ছিলেন ইহুদি। নিউটনের বেলাতেও একই কথা।
These fuckers are mostly crackheads ganjakhor and hardcore alcoholic. They all misinterpreting the Quran and hadith here. And some of the hadith they listed here are not genuine at all. I’m just putting a simple example below which they have mentioned here above. Every Quran excerpt and genuine hadith came out for a particular situation or incident. Yusuf (AS) was the most good looking man in his time and also among the all prophets. Yusuf(AS) Landlord’s young wife tried to seduce him then this Quran verse got revealed. you can read that full sura online n Bangla. And yes of course woman can never be equal to men that’s the creation. Even in USA the Americans don’t wana see woman as the president as plane pilot etc. (you can also find this in humayun ahmed, jafar Iqbal’s book cause they lived in USA for a long time). They also said women drivers are usually the worse drivers. The most dumbbest dumbfuck are those who believe there’s no creator or believe that there is multiple creators.
আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন,إِنَّ كَيْدَكُنَّ عَظِيمٌ ‘নিশ্চয়ই তোমাদের (নারীদের) চক্রান্ত শক্তিশালী’ (ইউসুফ ২৮)।
Dumbfuck USA is a christian country… Germany,Netherlands,Sweden,Norway,Denmark and many more are atheist countries ????????????
জাকির নায়েকের মিথ্যাচার সম্পর্কে জানতে চাই
আপনি জাকির নায়েক এর সঙ্গে সরসরি তর্ক করুন
নুমান আলি খান ও জাকির নায়েকের যুক্তি গুলো খন্ডন করে লেখা চাই ৷
আপনার চেষ্টা দেখে আমি সত্যিই খুব অবাক, আপনি আপনার চেষ্টা চালিয়ে যান। কোরানের আয়াতের এবং হাদিস সমুহের আরো ভালো ভাবে সঠিক বিশ্লেষণ চাই। দয়া করে ভূলভাল বিশ্লেষণ করবেন না ।
Do not listen to this fuckers here they have all misinterpreted the Quran and mention some unauthentic hadiths here . These fuckers are mostly crackheads ganjakhor and hardcore alcoholic. They all misinterpreting the Quran and hadith here. And some of the hadith they listed here are not genuine at all. I’m just giving below a simple example which they have referenced here above. Every Quran excerpt and genuine hadith came out for a particular situation or incident.
আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন,إِنَّ كَيْدَكُنَّ عَظِيمٌ ‘নিশ্চয়ই তোমাদের (নারীদের) চক্রান্ত শক্তিশালী’ (ইউসুফ ২৮). Yusuf (AS) was the most good looking man in his time and also among the all prophets. Yusuf(AS) Landlord’s young wife tried to seduce him then this Quran verse got revealed. you can read that full sura online n Bangla. And yes of course woman can never be equal to men that’s the creation. Even in USA the Americans don’t wana see woman as the president as plane pilot etc. (you can also find this in humayun ahmed, jafar Iqbal’s book cause they lived in USA for a long time). They also said women drivers are usually the worse drivers. The most dumbbest dumbfuck are those who believe there’s no creator or believe that there is multiple creators. You can Obey Allah as your creator or you don’t obey him as your creator that is up to you but you do not have the right to misguide others with intentional wrong explanation and provide wrongful meanings. These are the Islam haters ‘munafiq’ whom the holy Quran warned us about.
Saadat
এটা আপনার জন্য
https://www.shongshoy.com/archives/14331
প্রত্যেক মুসলমানকে বলছি,
আপনারা আপনাদের চেনাজানা যেকোনো ভালো আলেম বা মসজিদের ইমাম কে ২ টি প্রশ্নঃ করবেন:
১) আল্লাহ নারীদের কেন সৃষ্টি করেছেন?
২) ইসলাম কি নারীদের পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে মনে করে? নাকি অর্ধেক মানুষ হিসেবে মনে করে?
As usual you don’t show any proof except claiming it’s wrong. Stop bitching everywhere. You feel the need of commenting as you take it as a part of your duty that goes by the name ZIHAD. Also, Dont play smart by writing English. No matter how much you tried you’ve still got some grammatical errors. Cry please…
ব্যাখ্যা গ্রন্থগুলি ভালো করে পড়বেন
ইসলামসহ সকল ধর্মই নারীকে ছোট করেছে
কেমন আছেন আপনি? জ্বী আমি পড়ে শেষ করলাম বিশাল এই ডকুমেন্টটি এবং বলেছিলাম আসব কথা বলতে। ধন্যবাদ সব কোরআন হাদীস এর আয়াত শেয়ার করার জন্য। আমি আপনার যুক্তির পক্ষে বিপক্ষে কিছু বলবনা এখন। আমি কার ও ধর্মবিশ্বাসে হস্তক্ষেপ করা পছন্দ করিনা।
আমার কাছে ধর্মের বই পড়া বা বলার থেকে ও বেশী উপলব্ধির।
কিছু আত্নসম্মানহীন নারীদের জন্য সমস্ত নারীরা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে না বা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছে না। কিছু মূর্খ মানুষের দাবী এটাই নাকি নারীদের স্বাধীনতা। তারা শিয়াল মুরগীর উদাহরণ দিয়ে নারী এবং পুরুষের মধ্যে ব্যবধান বুঝাচ্ছে। তারা চায় নারীদের তাদের ইচ্ছামত নাচাতে।