নারী

বালিকা

হুমায়ুন আজাদ

একটি নারী যেই গর্ভবতী হয়, শুভার্থীরা যখন পায় সে-সংবাদটি, সবাই স্বাগত

জানাতে শুরু করে একটি সম্ভাব্য পুরুষকে, এবং নিষেধ জানাতে শুরু করে সম্ভাব্য একটি নারীকে। তারা জানে আসবে ছেলে, অথবা মেয়ে; কিন্তু যে আসবে তার ওপর কারো নিয়ন্ত্রণ নেই, যদি থাকতো তবে তা খাটাতো মাবাবা দুজনই, কেউ দ্বিধা বোধ করতো না। আজ এটা জানা যে জনকই নিয়ন্ত্রণ করে সন্তানের লিঙ্গ, তার % ক্রোমোসোমই স্থির করে দেয় যে সন্তানটি হবে ছেলে। তবে সে মেপে মেপে নারীর ভেতরে নিজের % ক্রোমোসোম নিক্ষেপ করতে পারে না। তাই তারা নির্ভর করে থাকে দৈবের ওপর। পিতামাতা চায় ছেলে, অন্যরাও তাই চায়; মেয়ে বেশি মানুষ চায় না। যে-পুরুষের জন্মে একের পর এক মেয়ে, সে অপুরুষ হমে ওঠে সমাজের চোখে, যে-নারী একের পর এক মেয়ে প্রসব করে, তার জরায়ুর নিন্দার কোনো শেষ নেই। একটি ছেলে জন্ম দিতে পারলে মা কৃতিত্ব বোধ করে, তার দাম বেড়ে যায়, সে মাথা তুলে দাড়াতে পারে; সভ্যতার দাবি মেটাতে পেরেছে বলে সে নিজেকে সফল মনে করে। সন্তানটি যদি প্রথম সন্তান হয়, তাহলে কথাই নেই; সবাই প্রতীক্ষা আর দোয়াকলমা পড়তে থাকে একটি ছেলের জন্যে। সবার স্বপ্নীকে বাস্তবায়িত করে ছেলে হলে সাড়া পণড়ে যায় স্বর্গমর্ত্যে, মুসলমানের আজান দিয়ে আল্লা আর মহাজগতকে তা জানিয়ে দেয়, হিন্দুরা শঙ্খকাসর বাজিয়ে উৎসব করে, অন্যান্য ধর্মের মানুষেরাও তাকে নিয়ে মেতে ওঠে নানা আড়ম্বরে। একটি মেয়ে জন্ম নি'ল চারদিকে পড়ে শোকের ছায়া। যেনো বাড়িতে কেউ জন্ম নেয় নি, মৃত্যু হয়েছে কারে। ' একটি মেয়ের জন্ম পিতৃতন্ত্রররের জন্যে অন্যতম প্রধান দুঃসংবাদ; একটি মেয়ের জন্ম পুরুষতন্ত্রের প্রচণ্ড প্রত্যাশার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। এক সময় আরবে, এমনকি ভারতেও, জন্মের সীথেসাথেই তাকে পুঁতে ফেলা হতো, এখন পুঁতে ফেলা হয় না; কিন্তু জন্মেই মেয়ে দেখে বিরূপ বিশ্ব, এবং সে নিয়ত একাকী। তার বিরুদ্ধে সবাই। ধাত্রী তাকে অবহেলায় তুলে ধরে, মা চোখ ফিরিয়ে নেয়, বাবার মুখ কালো হয়ে যায়। তবে সে মেয়ে, অবহেলা আর পীড়ন সহ্য করার অপার শক্তি তার, জন্যসূত্রেই সে নিয়ে আসে টিকে থাকার শক্তি। মেয়ে মায়ের গর্ভে থাকে ছেলের থেকে কিছুটা কম সময়, কিন্তু বাড়ে অনেক বেশি; তার অস্থিও হয় ছেলের অস্থির থেকে বেশি শক্ত। তার নার্ভতন্ত্রও হয় অনেক বেশি পরিণত। মেয়েরা জন্মে ছেলেদের থেকে অনেক কম ত্রুটি নিয়ে, বেঁচে থাকার শক্তিও নিয়ে আসে বেশি। গর্ভপাতে নষ্ট হয় অনেক বেশি ছেলে, মৃত ছেলেও জন্মে অনেক বেশি। জন্মের পর ছেলের মৃত্যুর হার অনেক বেশি মেয়ের মৃত্যুর হারের থেকে। পল্লীবাঙলায় মেয়ের প্রাণকে তুলনা করা হয় কইমাছের প্রাণের সাথে, কুটলেও যে মরে না। মেয়ে, পৃথিবীতে অনভিনন্দিত, বেঁচে থাকে শুধু অদম্য প্রাণশক্তিতে।

১৮৮ নারী

নারীপুরুষের ডিম্বাণু আর শুক্রাণুতে % ক্রোমোসোমের পরিমাণ অনেক বেশি, তাই মেয়েই বেশি জন্ম নেয়ার সম্ভাবনা, জন্মও নেয় বেশি; কিন্তু মেয়ে পৃথিবীতে স্বাগত নয়। পৃথিবীর নানা অগ্রগতি সত্ত্বেও পৃথিবী এখনো আদিম, তার আদিমতার একটি হচ্ছে মেয়ে নিয়ে বিব্রত বোধ করা। গরিব প্রথাগত পরিবারেই শুধু নয়, আধুনিক পরিবারেও পুত্র এশ্বরিক ব্যাপার। আধুনিক পিতামাতা, যারা একটি সন্তানই যথেষ্ট শ্লোগানে দীক্ষিত, তারাও একটি ছেলের জন্যে একের পর এক মেয়ে জন্ম দিয়ে চলে, এবং একটি ছেলে জন্ম দিতে না পারার শোক সারাজীবনে ভুলতে পারে না। 'পুক্র' শব্দের মূল অর্থ 'পৃত-নরক-ত্রাতা", যে পিতার মুখাগ্নি করে পিতাকে উদ্ধার করে ওই ভয়ঙ্কর নরক থেকে; তাই পুত্রের জন্যে হিন্দুর ব্যাকুলতার শেষ নেই। পুত্র হচ্ছে “নন্দন', যে আনন্দ দেয় চিত্তে। সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ তার সূত্ররচনার সাফল্যকে তুলনা করেন পুত্রলাভের সাথে; বলেন, সূত্র থেকে একটি মাত্রা কমাতে পারলে তিনি পান পুত্র লাভের আনন্দ। হিন্দুশান্ত্রে পৃত্রের জন্যে বাতিল করে দেয়া হয়েছে নারীর সতীত্ববব ধারণা: স্বামী যদি পুত্র জন্ম দিভে না পারে তবে পুত্র উৎপাদনের জন্যে বিধান রয়েছে পুত্রবীর্যবান পুরুষ নিয়োগের! মন্ত্র তো রয়েছে সম্ভবত অসংখ্য। মেয়ে তার বিপরীত; মেয়ে অস্কাগত অযাচিত। মার্কিন নারীমুক্তি আন্দোলনের বিখ্যাত নেত্রী লুসি স্টোনের জন্মের সময় তার মা চিৎকার করে উঠেছিলো, “হায়! আমি দুঃখিত এটি মেয়ে। মেয়েমানুষের জীবন কী কষ্টকর। ' ওপন্যাসিক অনুরূপা দেবী পরে আনন্দ দিয়েছিলেন অনেককে, কিন্তু তার জন্মের সময় সকলের বুক থেকে যে-দীর্ঘশ্বাস বেরিয়েছিলো, তা তিনি মুছে ফেলতে পারেন নি জীবন ও মন থেকে। তিনি বলেছেন, “আমি পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয়ে কাহারও আনন্দ বর্ধন করতে সমর্থ হই নি বরং সকলকারই আশাপ্রণোদিত চিত্তে হতাশা এবং নিরানন্দই এনে দিয়েছিলাম। ' কারণ সবাই আকুল প্রতীক্ষায় ছিলো পুত্রের জনো, “গড়ের বাদ্য”ও প্রস্থুত ছিলো; কিন্তু “গড়ের বাদ্যি ছেড়ে একটি শাকও বাজল না, যদিও পুত্রসন্তানের শুভাগমন কল্পনায় সেটা আতুড় ঘরের দোরগোড়াতেই এনে রাখা হয়েছিলা' দ্র চিত্রা। ৬। র্জিশয়া উল্ক্ শেক্সপিয়রের বোনের কথা বলেছেন; এভাবেই পৃথিবীতে আসে শেক্সপিয়রের বোনেরা। বাঙলায় নারীদের মধ্যে যিনি প্রথম আত্মজীবনী লিখেছেন, সে-রাসসুন্দরী বলেছেন, মেয়েমানুষের জন্ম নিছ্া। সে স্ত্রীলিঙ্গ, তবে তার লিঙ্গে এমন কোনো নির্দেশ নেই যে সে হয়ে উঠবে 'নারী': পুরুষের বিপরীত, পরাধীন পর্যুদস্ত পরনির্ভর। তার জন্যেব প্র পুরুষের সভ্যতা তাকে শাসন করে তাকে বানিয়ে তোলে নারী, তাকে নানা তুচ্ছ পুরস্কার দিয়ে তাকে গণ্ড়ে তোলে এমন বস্তুরূপে, যার নাম নারী। সে বেড়ে ওঠে বালিকারূপে; তার ভেতরে চলতে থাকে আবরাম ভাঙাগড়া, তার বাইরে চলে পুরুষতন্ত্রের হাতুড়ির আঘাতে নিরন্তর ধ্বংস ও নির্মাণ। যে-নারী চারপাশে দেখতে পাই, তা এক বিকৃত জিনিশ; তা সামাজিক ভাঙাগড়ার অস্বাভাবিক পরিণতি। কোনো নারীকে স্বভাব অনুসারে বাড়তে দেয় না পিতৃতন্তর। জন্মসূত্রে সে স্ত্রীলিঙ্গ; কিন্তু পিতৃতন্ত্রররের হাতুড়ির ঘায়ে সে হয়ে ওঠে এমন এক লিঙ্গ, যাকে বোভোয়ার ( ২৯৫) বলেছেন “পুরুষ আর খোজার মাঝামাঝি লিঙ্গ

পিতৃতান্ত্রিক সমাজসভ্যতা বিচিত্র ধরনের পুলিশবাহিনীর সমষ্টি; গায়ের জোরে টিকে থাকতে হলে পুলিশ ছাড়া উপায় নেই। পিতামাতা পরিবার পুলিশ, শোয়ার ঘর রান্নাঘর সিনেগগ প্যাগোডা পুলিশ, সবাই পুরুষতন্ত্রের পুলিশ। এসব বাহিনীর প্রহরার মধ্যে বন্দী বালিকা বেড়ে ওঠে নারী হয়ে। এসব সংস্থা তাকে শুধু ভয় দেখায় না, তাকে পুরস্কারের লোভও দেখায়, তাকে ভয় দেখায় যাতে সে পুরুষের মতো বেড়ে উঠতে না চায়, তাকে পুরঙ্কারের লোভ দেখায় যাতে সে বেড়ে ওঠে পুরুষতন্ত্রের আদশ নারীকাঠামো অনুসারে। একে বলা হয় বলীয়ানকরণ বা রিইনফোসর্মেন্ট। এসব সংস্থা তার সামনে উপস্থিত রাখে অনুকরণীয় আদর্শকাঠামো, নিজেকে ঢেলে তৈরি হস্তে নির্দেশ দেয় ওই কাঠামোর আদলে। এর নাম আদরশর্কাঠামো অনুকরণ বা মডেলিং। বালকের জন্যেও রাখে আদর্শকাঠামো অনুকরণের ব্যবস্থা, তবে তার আদর্শকাঠামো বিপরীত। বালিকার অনুকরণের আদর্শ মা ও চারপাশের দীক্ষিত নারীরা; তাই বালিকা হয়ে ওঠে নারী। বালকবালিকা জন্মের পরই বুঝে ওঠে না যে তারা পুরুষ বা নারী, লিঙ্গ তাদের কাছে গুরুত্বের ব্যাপার নয়। শুরুতে তারা নিজেদের মধ্যে কোনে। পার্থক্যই করে না। তাদের চোখে তারা এক, তাদের জগত এক; তারা, বালিকা আর বালক, উভয়েই বিশ্বকে উপলব্ধি করে হাত দিয়ে, পা দিয়ে, চোখ কান নাসিকা দিয়ে। পৃথিবীতে এসেই তারা শিশ্ন বা যোনি দিয়ে পৃথিবীকে পরখ করে না। তারা ছোটোবেলা বাড়ে একই রকমে, একই রকমে মায়ের স্তন চোষে, জড়িয়ে ধরে একই রকমে, তারা আদর উপভোগ আর ঈর্ধা বোধ করে একই রকমে। বারো বছব বয়স পর্যন্ত বালকবালিকার দেহে থাকে সমান শক্তি, মনোবলও থাকে একই পরিমাণে। তবে তিন বছর বয়স থেকে, বিশেষ ক”রে বয়ঃসন্ধি থেকে বালিকার আচরণে দেখা দিতে গাকে নারীত্বব। আগে এ-নারীত্ববরে অভিব্যক্তি ঘটতো অত্যন্ত সমারোহের সাথে, এখন তার প্রকাশ অনেক ক'মে গেছে। ওই নারীত্ববব দেখে বিস্মিত আর মুগ্ধ হয়ে পড়তো পুরুষতন্ত্র, তারা মনে করতো বালিকার মধ্যে ঘুমিয়ে আছে এক নারী, যে জেগে উঠতে শুরু করেছে। বিদ্যাসাগর ( ৪১৮] এ্রভাবতীসভ্াষণ-এ প্রভাবতী নামের একটি বালিকার নারীআদর্শ অনুকরণের উল্লেখযোগ্য বিবরণ দিয়েছেন:

  1. কখনও কখনও, শ্বেহ ও মমতার আতশয্যপ্রদর্শনপূর্বকি. একান্তিক ভাবে, তনয়ের লালনপালনে বিলক্ষণ ব্যাপৃত হইতে।
  2. কখনও কখনও, “তাহার কঠিন পীড়া হইয়াছে' বলিয়া, দুর্ভাবনায় অভিভূত হইয়া, বিষণ্র বদনে, ধরাসনে শয়ন কবিয়া থাকিতে।
  3. কখনও কখনও, 'শ্বশুরালয় হইতে অশুভ সংবাদ আসিয়াছে' বলিয়া, ম্রান বদনে ও আকুল হৃদয়ে, কালযাপন করিতে।
  4. কখনও কখনও, “স্বামী আসিয়াছেন' বলিয়া, ঘোমটা দিয়া, সন্কৃচিতভাবে. এক পাশ্বে দণ্ডাযমান থাকিতে, এবং, সেই সময়ে, কেহ কিছু জিজ্ঞাসা করিলে, লঙ্জাশীলা কুলমহিলার ন্যায়, অতি মৃদু স্বরে উত্তর দিতে।
  5. কখনও কখনও, 'পুত্রটি একলা পুকুরের ধাবে গিয়াছিল, আর একটু হইলেই ডুবিয়া পড়িত', এই

১৯০ নারী

৬। কখনও কখনও, 'শ্বাশুড়ীর (512) পীড়ার সংবাদ আসিয়াছে' বলিয়া, অবিলঙ্বে শ্বশুরালয়ে যাইবার নিমিত্ত, সজ্জা করিতে।

তবে প্রভাবতী কোনো জন্মনারী নয়, সে নারীর নকল। বিদ্যাসাগর তার আচরণে মুগ্ধ হলেও তার আচরণকে কোনো বিস্ময়কর ব্যাপার বলে মনে করেন নি, মনে করেছেন সে যদি “এই পাপিষ্ঠ নশংস নরলোকে' আরো বেঁচে থাকতো তাহলে তার 'যে সকল লীলা ও অনুষ্ঠান করিতে হইত' সে তা সম্পন্ন করে গেছে শৈশবেই। সে কাঠামো অনুকরণের এক অসাধারণ উদাহরণ। বালিকার মধ্যে নারীত্বববের প্রকাশ রহস্যময় জৈবিক নিয়ন্ত্রণের অবধারিত ফল নয়, জিনক্রোমোসোম পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সংবাদ রাখে না। নারীতৃ হচ্ছে সমাজের অনিবার্ধ প্রভাব ও পীড়নের পরিণতি। সমাজে বেড়ে ওঠার অর্থ হচ্ছে সমাজের সাথে খাপ খাওয়ানোর কৌশল আয়ত্ত করা। সে টিকে থাকে, যে খাপ খায়; যে খাপ খায় না সমাজ তাকে ধ্বংস করে দেয়, বা সে বদলে দেয় সমাজকে। অধিকাংশ মানুষই নিজেদের অস্তিত্বববের জন্যে খাপ খায় সমাজের সাথে, শেখে সে-সব বিধিবিধান, যা তার অস্তিতৃকে টিকিয়ে রাখবে। ভঙ্গুর বালিকার পক্ষে সমাজ বদলে দেয়া অসম্ভব, তাই শেখে সামাজিক সূত্র। বালিকা তার জীবনের দ্বিতীয় বছর থেকে চারপাশ দেখে দেখে বোঝে য়ে নারী হয়ে ওঠাই তার সামাজিক নিয়তি। প্রতিটি বালকবালিকার কাছে সমাজ একটি বিশাল আয়না, যাতে তারা দেখতে পায় নিজেদের, ও তাদের, হয়ে উঠতে হবে যাদের মতো। তারা দেখে হয়ে উঠতে হবে পিতামাতার মতো; পিতা তাদের সামনে এক আদর্শকাঠামো, মা তাদের সামনে এক আদর্শকাঠামো। ওই কাঠামো অনুসারে ছেলে হয় পুরুষ, বালিকা হয় নারী। কোনো জৈবিক কারণে তারা সামাজিক নারীপুরুষ হয়ে ওঠে না।

ছোটোবেলা থেকেই বালিকার সাথে দুর্যবহার শুরু করে প্রিয়জনেরা। বালিকা জন্মের সময় অভিনন্দিত হয় নি, জন্মের পরও সে পায় না ভাইয়ের স্মান আদর। প্রথাগত পরিবারে, দরিদ্র পরিবারে, অনুন্নত সমাজে বালিকা অনেক কম আদর পায় ভাইয়ের থেকে। অবহেলার মধ্যে বড়ো হয় বালিকা। তার খাবার হয় কম, ও নিশ্নমানের; ছেলের জন্যে তোলা থাকে মাছের মুড়োটি, দুধের সরটুকু রেখে দেয়া হয় ছেলের জন্যে, গাছের ফলটিও পাকে তারই জন্যে। বাঙালি সমাজে শৈশব থেকেই মেয়ের ভাগে জোটে এটোকাটা বাসি খাবার। সবার খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর আসে তার খাওয়ার পালা, উচ্ছিষ্ট থেকেই মেয়েকে সংগ্রহ করতে হয় বেঁচে থাকার শক্তি। ওহ উচ্ছিষ্ট খেয়ে কারো পক্ষে বীর হওয়া সম্ভব নয়, মেয়েও বীর হয় না; তার কাছে প্রত্যাশাও করা হয় না। জন্যসূত্রে সোনয়ে এসেছিলো ছেলের থেকে অনেক শক্ত অস্থি, কিন্তু অপুষ্টির ফলে তার অস্থি হয়ে পড়ে দুর্বল। পরিপূর্ণ নারীর কংকালও থেকে যায় শিশুর কংকালের মতো অসুগঠিত, শরীরবিদ্যায় যাকে বলা হয় পেডোমোফিকি বা বালরৌপিক, তার কারণ বালিকার আশৈশব অপুষ্টি। শিশুছেলেকে যে-যত্রে শোয়ানো হয়, পরিষ্কার করা হয় তার মলমৃত্র, বালিকা সে-যক্র পায় না। পৃথিবী জুড়ে অধিকাংশ

বালিকা বড়ো হয় অনাদরে। ধীরেধীরে বালিকা জড়িয়ে পড়ে একজনের সাথে, যে বড়ো হয়েছে ও বেঁচে আছে তারই মতো অনাদরে, সে তার মা। মায়ের সাথে মেয়ের নাড়ি কখনো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয় না। বাঙালি নারীদের আত্মজীবনীতে একটি শব্দ বারবার মেলে, শব্দটি 'অভাগিনী'। এক অভাগিনী বড়ো হতে থাকে আরেক অভাগিনীর আচলের নিচে। নিয়তি নিজের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার জন্যে জড়িয়ে দেয় মা ও মেয়েকে। বালিকা জড়িয়ে পড়ে মায়ের সাথে, আর ছেলে একটু একটু দূরে স'রে যেতে থাকে; মনে হতে পারে যে বালিকা একটু বেশি আদর পাচ্ছে আর কম আদর পাচ্ছে ছেলেটি। তবে এও এক পিতৃতান্ত্রিক প্রতিভাস।

উন্নত, এমনকি আমাদের সমাজেও একটু বড়ো হবার পর ছেলে আর মাবাবার আলিঙ্গন আদর আগের মতো পায় না, কিন্তু মেয়েটি পায়। বালিকা হয়ে ওঠে তাদের পৃতুল। মায়ের শরীর ঘেষে থাকতে পারে বালিকা, ছেলে পারে না; সে নির্বাসিত হয় মায়ের আচলের বাহুর আলিঙ্গনের আপাতমনোরম এলাকা থেকে। বাবাও মেয়েকে বুকে জড়িয়ে রাখে, আদর করে কাজেঅকাজে, একটু দূরে সরিয়ে দেয় ছেলেকে। মেয়েকে দেয়া হয় রঙিন জামাকাপড়, তার ঠোটের বাকা কারুকাজে মুগ্ধ হয় মাবাবা, তার চোখে অশ্রু মুক্তো মনে হয় তাদের! তার চুল আঁচড়ে দেয়া হয় যক্রে, তার মেয়েলিপনা দেখে মুগ্ধ হয় সবাই। সে থাকে মনোরম বাগানে; আর ছেলেকে যেনো নির্বাসিত করা হয় দণ্ডকারণ্যে। তার আদুরেপনা অসহ্য মনে হয়, তার ছলাকলা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। তাকে বার বার বলা হয় 'পুরুষ এটা করে না", 'পুরুষ সেটা করে না", পুরুষ শাড়ি পরে না", 'পুরুষ লিপস্টিক দেয় না'। মেয়েকেও বলা হয় “মেয়েরা এটা করে না", “মেয়েরা ওটা করে না', “মেয়েরা শার্ট পরে না", “মেয়েরা এভাবে কথা বলে না"। স্থির করে দেয়া হয় তাদের লিঙ্গপবিচয় ও লিঙ্গভূমিকা। ভিন্ন করে দেয' হয় তাদের ভূমিকা; তাদের বাধ্য করা হয় বিপরীত ভূমিকার পাত্রপাত্রী হয়ে উঠতে। ভিন্ন করে দেয়া হয় ছেলে ও মেয়ের কাজ, আচরণ, এলাকা। ছেলেকে কাজ দেয়া হয় মুক্ত এলাকার, তাকে দেয়া হয় স্বাধীনতা; মেয়েকে দেয়া হয় অবরুদ্ধ এলাকার কাজ, তাকে দীক্ষিত করা হয় অধীনতা আর অবরোধে। মেয়ে ভয় পেলে খুশি হয় সবাই, আর ছেলে ভয় না পেলে খুশি হয় সবাই। মেয়েকে হতে হবে ভীত, সন্ত্রস্ত; টিকটিকি দেখেও সে কেঁপে উঠলে সবাই স্বস্তি বোধ করে যে একটি নারীর জন্ম হচ্ছে; সভ্যতা পাচ্ছে একটি বিশুদ্ধ নারী। তারা পৃথক, তারা পৃথক এলাকার; একজন অবরুদ্ধ ঘরের, আরেকজন মুক্ত বাইরের। তাদের জৈবনির্দেশের মধ্যে এসব নেই, আছে সামাজিক নির্দেশে; স্ত্রী ও পুংলিঙ্গ জৈব, নারী ও পুরুষ সামাজিক।

ছেলেকে যে থাকতে দেয়া হয় না মায়ের আচলের নিচে আর বাবার বুকের কাছে, হাতে মনে হতে পারে যে মেয়েটিকে আদর করছে' সবাই, অনাদর করছে ছেলেটিকে; মেয়েটি সকলের চোখের মণি। কিন্তু আসলে চোখের মণি ছেলেটিই। তার সাথে যে আপাতরূঢ আচরণ করা হয়, তার কারণ তার জন্যে সামনে প'ড়ে আছে অসামান্য সব ব্যাপার, যা ওই আদরের থেকে অনেক মহৎ, যার ভাগ মেয়ে কখনো পাবে না।

১৯২ নারী

ছেলেবেলা থেকেই ছেলের কাছে প্রত্যাশা করা করা হয় বড়ো বড়ো কাজ, কেননা সে উৎকৃষ্ট মেয়ের থেকে। সে পিতৃতন্ত্রররের ভবিষ্যৎ পিতৃতন্ত্ররর তারই হাতে অর্পণ করবে সভ্যতা। সে ছেলে, তাকে করতে হবে বিশ্বের কাজ; তাই সে হবে ভিন্ন, তাকে হতে হবে সাহসী, হতে হবে পুরুষ। সে সাগর পেরিয়ে যাবে, আকাশ ভেদ করে ছুটবে; সে ভোগ করবে বসুন্ধরা। সে পুরুষ, তাকে হয়ে উঠতে হবে পুরুষ। তার পুরুষত্বের একটি প্রতীকও সমাজ খুঁজে পায় তার শরীরে, সেটি শিশ্। বালক তার শিশ্নকে সহজাত মহৎ মনে করে না, ওই প্রত্যঙ্গটির যে রয়েছে প্রতীকী ব্যঞ্জনা তাও সে জানে না; কিন্তু চারপাশের আচরণ থেকে সে বুঝতে পারে ওটির গুরুত্ব। বড়োরা তার শিশ্নটিকে নানা ডাকনামে ডাকে, ওটিকে বলে সোনা নুনু ধন, ওটিকেই করে তোলে একটি ব্যক্তি। শিক্ষিত সমাজে শিশ্নের মহিমা কমেছে, কিন্তু চাধীসমাজে এর মহিমা এখনো অপ্রতিহত। শিশ্বটি বড়ো হয়ে একাধিক দায়িত্ব পালন করবে, কিন্তু শৈশবে এর দায়িত্ প্রস্রাবের। মেয়ের শিশ্ব নেই, রয়েছে দুটি র্ধ, যা সে দেখতে পায় না। সে দাড়িয়ে প্রস্রাব করতে পারে না। এটা এক অসুবিধা। মুসলমানদের অবশ্য পুরুষনারী উভয়েরই জন্যে বিধান রয়েছে ব'সে প্রস্রাব করার; তবে দাড়িয়ে প্রস্রাবের রয়েছে বিশেষ সুবিধা। বালিকা সে-সুবিধা নিতে পারে না। বালকের শিশ্ব তাকে করে তোলে বিশিষ্ট। বালিকার যৌনপ্রত্যঙ্গগুলো মা, বা অন্য কারো চোখে মর্যাদা পায় না। সে তার প্রত্যঙ্গগুলো দেখতে পায় না, তাকে বলা হয় ওগুলো লুকিয়ে রাখতে; তার মনে এমন নোধ সৃষ্টি করে দেয়া হয় যে ওগুলো লঙ্জার বিষয়, ওগুলো নিষিদ্ধ, ওগুলোর কথা যতো ভুলে থাকা যায় ততোই ভালো, যেনো ওগুলো নেই। তার প্রত্যঙ্গগুলো যে আড়ালে থাকে, সে যে দেখতে পায় না ওগুলো, এতে বালিকা কোনো অভাব বোধ করে না। তবে সে বুঝতে পারে তার অবস্থান ছেলের অবস্থানের থেকে অনেক ভিন্ন, অনেক নিম্ন। পরিবার, সমাজ, সভ্যতা বালিকার বিরুদ্ধে ও বালকের পক্ষে এমনভাবে অবিরাম কাজ করতে থাকে যে সে অসহায় বোধ করে, এমনকি বোধ করে হীনমন্যতা। সবাই যাদের উপেক্ষার বিষয় মনে করে, তাদের পক্ষে হীনমন্যতারোধ স্বাভাবিক; যুগ যুগ ধরে নিজেদের হীন অবস্থান দেখে দেখে তারা নিজেরাই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তারা আসলেই হীন। বালিকাও তা বোধ করতে পারে, বালিকাও তা বোধ করে। বালিকা বোধ করে সে নিকৃষ্ট তার ভাইয়ের থেকে। ভাইয়ের শিশ্ন আছে, তাকে ভালোটা খেতে দেয়া হয়, তার দাবি পূরণ করা হয় দ্রুত। বালিকা দেখে তার দাবি মেটে না, সে খাবার বেলা পায় মাছের বাজে টুকরোটি, মুড়ো খাওয়ার স্বপ্না তার স্বপ্রাই থেকে যায়। তাই তার জাগতে পারে, এবং জাগে হীনমন্যতারোধ। ফ্রয়েড বালিকার হীনমন্যতা দেখেছেন; তিনি মনোবিজ্ঞানী হিশেবে উৎকৃষ্ট হতে পারেন, কিন্তু সমাজবিজ্ঞানী হিশেবে খুবই নিকৃষ্ট। তিনি বলেছেন খোজাঈর্ষার কথা, বালিকার শিশ্বাভাবের কথা, শিশ্নাসূয়াগ্রস্ততার কথা। তিনি বনেছেন বালিকা ঈর্ধা করে বালকের শিশুকে, কেননা তার শিশ্ন নেই; বালিকা শিশ্নের অভাবে ভোগে হীনমন্যতায়। ফয়েডের তথ্য নির্ভুল, তত্ত্ব সম্পূর্ণ ভুল।

বালিকা শিশ্বকে ঈর্ষা করে না, ঈর্ধা করে শিশ্সের অধিকারীকে। একটি শিশ্ থাকলে অশেষ অধিকার, না থাকলে অধিকার নেই। শিশুবয়সে সামনের দিকে লেজের মতো ঝুলে থাকা শিশ্নটিকে বরং হাস্যকর আর খাপছাড়া বলেই মনে হয। ওটি দেখে যে ঘেন্না জনয, তা নয়; আবার ওটি দেখার সাথে সাথে যে ওটির মহত্তের কাছে অবনত হয়ে পড়তে হয়, এমনও নয়। ফ্রয়েড মনে করেছেন, আর তার অনুসারীরা রটিয়েছেন, যে বালিকা বালকের শিশ্ন দেখার সাথেসাথেই লাভ করে দিব্যদৃষ্টি, তখনই বুঝে ফেলে যে তার নেই শিশ্, এবং সাথে সাথে আক্রান্ত হয় হীনমন্যতায়। তারা ভুল বুঝেছেন বালিকার মনস্তত্ত্ব। একটি প্রত্যঙ্গ দেখেই হীনমন্যতার আবেগ জাগে না, এর জন্যে থাকা দরকার নিজের অবস্থা নিয়ে অসন্তোষ। বালিকা দেখে দেখে বড়ো হয় যে অনেক কিছুই তার প্রাপ্য নয়, আর ছেলের প্রাপ্য সব কিছু: তখন সে ঈর্ষা করে বালককে; পুরুষকে, তার শিশ্টিকে নয়। বালিকা শিশ্নের ঈর্ায় কাতর নয়, তবে একটি শিশ্বের অভাব তার জীবনে নিয়তির মতো কাজ করে। বোভোয়ারের মতে বালক তার শিশ্লে অনুভব করে নিজের ব্যক্তিতৃ, কিন্তু বালিকা তার কোনো প্রত্যঙ্গে ব্যক্তিত্ররে আশ্বাস পায় না। ছেলে খেলতে পারে তার শিশ্ব নিয়ে, মেয়ে নিজের যৌনপ্রত্যঙ্গ নিয়ে খেলতে পারে না। খেলার জন্যে সে পায় পুতুল। পুতুল বস্তু, বালিকা ওই বস্তুর সাথে নিজেকে বৌধ করে আভন্ন। বালিকা পুতুল সাজায়, তাকে নিয়ে খেলে. তাকে আদর করে, যেমন আদর সে নিজে চায়। সে নিজেকে মনে করে পুতুল। বালক যখন ব্যক্তি হয়ে ওঠে, তখন বালিকা হয়ে ওঠে পুতুল। সে চারপাশে দেখে নারীদের, বালিকা শেখে রূপের মুল্য, নিজে হয়ে উঠতে চায় রূপসী। সাজগোজ হয় তার প্রিয়, আয়নায় সে দেখে নিজেকে, অন্যরা যখন তাকে সুন্দর বলে সে সুখ পায়। সে হয়ে উঠতে চায় পরী বা রাজকন্যা। সে তখন থেকে আর নিজের জন্যে বাঁচে না, বাঁচে অন্যের জন্যে। যে-রূপের ছেন্যে তার ব্যাকুলতার শেষ নেই, সে-রূপও তার নিজের জন্যে নয়, যেমন তার জীব? ও নিজের জন্যে নয়। বালিকা

বালিকার জীবনে দেখা দেয় নাসার্সিজম বা আত্মপ্রেম, তবে তা কোনো রহস্যময় জৈবিক কারণে নয়। বালিকা দেখে তার কোনো কাজের জন্যে সে শুরুত্পূর্ণ নয়, তার গুরুতৃ শুধু তার রূপের জন্যে। চারপাশের নারীদের দেখে সে, দেখতে পায় রূপই তাদের সম্পদ। সে তখন মন দেয় নিজের শরীরের দিকে, তাকে সাজিয়ে করে তুলতে চায় রক্তমাংসের পুতুল! সে বুঝে ফেলে তার রূপ দিয়ে সে সম্ভোগ করবে না, বরং সে হবে সম্তোগের বস্তু। নারী অক্রিয়, তবে তার অক্রিয়তাও কোনো জৈবিক কারণে নয়; তাকে রহস্যময়ী বলা হলেও তার কোনো আচরণই রহস্য নয়। আত্মপ্রেম আর অক্রিয়তার পাঠ সে নেয় সমাজের কাছ থেকেই, সে হয়ে ওঠে সমস্ত সামাজিক নিয়মের মেধাবী ছাত্রী। কেননা তাতে উত্তাঁর্ণ হলে সে পুরস্কার পাবে, ব্যর্থ হলে জুটবে শাস্তি। বালিকা যখন ঘরে বন্দী হয়ে মেতে থাকে দিবাস্বধ্ো, লুপ্ত হয়ে যেতে থাকে অক্রিয়তায়, তখন বালক বেরিয়ে পড়ে বাইরের জগতে। সে গাছে ওঠে, নৌকো চালায়, রাস্তায় যায়, মারামারি করে; সে নিজের দেহকে মনে করে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার। বালিকার শরীর যখন হয়ে ওঠে সুন্দর বোঝা, তখন বালকের শরীর হয়ে ওঠে

১৯৪ নারী

তার বড়ো সম্পদ। সে তার শরীর দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে পরিপার্খকে। সে সক্ত্রিয়তার মধ্য দিয়ে অনুভব করে তার অস্তিত্ববব। বালিকার বেলা ঘটে বিপরীত, সক্রিয়তা নিষিদ্ধ তার জীবনে। বালিকা তার সত্তা আর জীবনের লক্ষ্যের মধ্যে বোধ করে বিরোধিতা। বালিকাকে শেখানো হয় তার কাজ অন্যদের মনোরঞ্জন করা; সে নিজের সুখ চাইবে না, সুখ চাইবে অন্যের; অন্যের সুখই তার সুখ। তাকে শেখানো হয় যে সে নিজেকে পরিণত করবে নিষ্প্রাণ বস্তুতে, সে ছেড়ে দেবে নিজের স্বায়ত্শাসনের অধিকার।

সে হয়ে ওঠে জীবন্ত পুতুল, বাতিল হয়ে যায় তার স্বাধানতা। সে কোনো কিছু নিজে বোঝার চেষ্টা করবে না, তার হয়ে বুঝবে অন্যরা; সে নিজে কিছু জানতে চাইবে না, তার হয়ে জানবে অন্যরা; সে নিজে কিছু করবে না, তার হয়ে করবে অন্যরা। বালিকা এভাবে হারিয়ে ফেলে তার মানসিক শক্তি, ক'মে যায় তার ভেতরের সম্পদ। সে হয়ে ওঠে শুন্য পাত্র। এভাবে নিঃশেষিত হয়ে যাওয়ার পর সে আর নিজেকে প্রধান করে তোলার সাহস করে না। যদি তাকে উৎসাহিত করা হতো, তবে সেও পারতো বালকের মতো সাহসী, উদ্যমপরায়ণ, নির্ভীক, স্বাধীন হয়ে উঠতে। যখন কোনো মেয়েকে ছেলের মতো পালন করা হয়, তখন তার মধ্যে দেখা যায় সাহস, উদ্যম, স্বাধীনতা। বালিকারা যখন পুরুষের লালনে বড়ো হয়, তখন তারা কাটিয়ে ওঠে নারীত্ববতের ত্রুটিগুলো; কিন্তু সমাজ বালিকাকে বালকরূপে লালনের অনুমতি দেয় না। কোনো মেয়ে চুল ছোটো করলেই সমাজ হাহাকার করে ওঠে। বাবার প্রভাবে বালিকা অনেকটা স্বাধীন হয়ে ওঠে, কিন্তু তার স্বাধীনতা হরণ করার মতো চারপাশে মা, খালা, ফুপুর অভাব নেই। কোনো বালিকাকে লালনের ভার নারীর হাতে দেয়ার অর্থ হচ্ছে তাকে বিকলাঙ্গ করে তোলা। নারীরাই চিরকাল পালন করে আসছে বালিকাদের, এবং তৈরি করছে বিকলাঙ্গ মানুষ। বালিকার সবচেয়ে বড়ে শুভার্থী তার মা; তবে মা-ই হয়ে ওঠে বালিকার বড়ো শক্র। মা হচ্ছে পুরুষতন্ত্রে দীক্ষিত প্রাণী, যে নিজের জীবন দিয়ে সেবা করে পুরুষতন্ত্রের। মা মেয়েকে নিজের থেকেও নারী করে তুলতে চায়, আর ছেলের মধ্যে চায় চড়ান্ত পৌরুষ। মা পিতৃতন্ত্রররের আদর্শ নারী গড়ার পারিবারিক কুন্তকার। সে মেয়েকে ভালোবেসে নিজের মতো করে তুলতে চেয়ে নিজের নিয়তি চাপিয়ে দেয় মেয়ের ওপর। মা নিয়তির মতো থাকে মেয়ের পাশে। মা ময়েকে করে তৃলতে চায় খাটি নারী, সতীসাধ্বী. কেননা সমাজ তার মেয়েকে এভাবে পেতেই পছন্দ করবে। মা তার জন্যে সংগ্রহ করে বান্ধবী, দেখে তার মেয়ের যাতে কোনো বন্ধু না জোটে: মা মেয়েকে শেখায় ধর্মকর্ম, শোনায় সতীসাপ্বীদের কাহিনী, শেখায় রান্নাবান্না, শেলাই। মা জানে রূপ খুব দরকার, তাই বালিকাকে শেখায় যে তাকে হয়ে উঠতে হবে সুন্দরী, অন্যের বাছে আকর্ষণীয়, ন্ম, লজ্জাবতী। মা তার কন্যার জীবনকে সফল করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করে নষ্ট করে কন্যার সত্তা। বালকবালিকার পোশাকে ও আছে সক্ররিয়তা ও অক্রিয়তার ব্যাপার। বালকের পোশাক সব্রিয়তার, বালিকার পোশাক সম্পূর্ণ অক্রিয়তার। বালক তার পোশাক তাড়াতাড়ি পরতে আর খুলতে পারে, যে-কোনো অবস্থায়ই তার পোশাক তার সক্রিয়তাকে বাধা দেয় না। কিন্তু বালিকা তার পোশাক

নিয়ে সারাক্ষণ থাকে বিব্রত। বালিকাকে পরতে হয় শাড়ির মতো ব্বিতকর পোশাক, যা তাকে ঘিরে রাখে, তাকে গ্রাস করে রাখে। ওই শাড়ি প'রে দৌড়োনো যায় না, গাছে ওঠা যায় না, সাতার দেয়া যায় না। শাড়ি পরে শুধু শুয়ে থাকা যায়! শাড়ির প্রতিবন্ধকতায় বালিকার পক্ষে সক্রিয় হওয়া অসম্ভব। তার পোশাকের অক্রিয়তার সাথে তাকে শেখানো হয় যে সোজা হয়ে হাটবে না, হাটবে মেরুদণ্ড বাকা করে, সংকুচিত হয়ে। নিজেকে নিয়ে সব সময় থাকবে বি্বিত। এভাবে নষ্ট করে দেয়া হয় তার স্বতস্ুর্ততা। তাকে বানিয়ে তোলা হয় দাসী, পুতুল। আজকাল মধ্যবিত্তদের মধ্যে এটা কমছে, বালিকাকে দেয়া হচ্ছে সক্রিয়তার অনেক সুযোগ, তবে তা বালকের সুযোগের একাংশও নয়। লক্ষ্য হচ্ছে যেভাবেই হোক বালিকাকে নারী করে তুলতে হবে। বালিকার জগত ছোটো, মাকে দেখে দেখে তার মনে হয় মা পিতার থেকে শক্তিমান। তাই মা তার অনুকরণীয় আদর্শকাঠামো। সে মায়ের অনুকরণ করে, মায়ের মতো হয়ে উঠতে চায়, মা হয়ে উঠতে চায়। এক সময় পুতুল খেলার খুব চল ছিলো মেয়েদের মধ্যে, প্রতিটি মেয়েরই থাকতো একরাশ পুরোনো কাপড় দিয়ে তৈরি পুতুল। বালিকারা পৃতুলকে মেয়েই মনে করতো নিজেদের, তাকে মেয়ের মতো সাজিয়ে বিয়েও দিতো। খুব মা মা ভাব দেখা যেতো ছোটো ছোটো বালিকাদের কথায়, কাজে, আচরণে। বাঙলা সাহিত্যে মায়ের আদলে গণড়ে ওঠা ছোটো ছোটো মায়েদের ছবি বেশ আবেগের সাথে আকা হয়েছে। এ-ছোটো মায়েরা সহজাত মা নয়, তারা আদর্শকাঠামো অনুকরণের দৃষ্টান্ত। কিন্তু আগে ছোটোদের আদর্শকাঠামো অনুকরণ দেখে মনে করা হতো বালিকাদের মধ্যে রয়েছে সহজাত মাতৃত্ব; একে মনে করা হতো কোনো রহস্যময় বিধানের ফল। বালিকাদের মাতৃত্ববোধ সমাজেরই শিক্ষার পরিণতি। এ নিয়ে গবেষণা হয়েছে প্রচুর, গবেষকেরা দেখিয়েছেন বালকবালিকাব' অনুকরণ করে তাদের মাবাবাদের, তিন বছর বয়স থেকেই ছোটোদের আচরণ হয়ে পড়ে বিশেষ লিঙ্গ অনুকরণমূলক, 'সেক্স-টাইপড'। চাষী পরিবারে বালিকা উঠোনে বসে মাটির হাড়িপাতিলে রান্না করে মাটির কাল্পনিক ভাতমাছ, তারপর ধোয় হাঁড়িপাতিল, গুছিয়ে রাখে থালাবাসন; বালকটি একটু দূরে হয়তো অভিনয় করে তার পিতার মতো কাল্পনিক চাষবাসের। শহরে মধ্য- বা উচ্চ-বিত্ত পরিবারে ছোটো বালিকা তার মায়ের মতো আয়নার সামনে দাড়িয়ে লিপস্টিক ঘষে, উচু গোড়ালির জুতো প"রে হাতে ব্যাগ নিয়ে খটখট করে হাটে, নিউমার্কেটে যাওয়ার অভিনয় করে; সে হয়ে ওঠে তার মায়ের মতো পরগাছার পরগাছা। আর বালকটি হয়তো বাবার মতো টেবিলে বসে অনবরত ফোন করার অভিনয় করে চলে; সে হয়ে ওঠে পরগাছা। বালিকাদের সহজাত মাতৃত্বের বোধ এক পুরোনো উপকথা; তাদের দেহ নয়, সমাজই তাদের শিখিয়ে দেয় যে তারা মা হবে। তাই মায়ের পেশা তাদের শিখতে হয় শুরু থেকেই। বালিকা বুঝতে পারে শিশুপালনের ভার পড়ে মায়েরই ওপর। তাকে শিখিয়ে দেয়া হয় যে মা হওয়া এক দারুণ ব্যাপার, মা হওয়াই বালিকার জীবনের লক্ষ্য। নিজের মাকে বার বার বিয়োতে দেখে বালিকা বুঝে ফেলে একদিন সেও মা হবে, তার পেটেও জন্ম নেবে বাচ্চা, সেও বিয়োবে তার মায়ের মতো। বাচ্চা জন্ম দেয়ার প্রক্রিয়া যখন সে বুঝতে পারে, তখন

১৯৬ নারী

ঘেননায় ভয়ে শিউরে ওঠে বালিকা; কিন্তু কিছু করার নেই তার।

বালিকা দেখে নিজেকে আর তার বয়সের বালকদের, সব কিছু দেখে তার মনে জাগে ঈর্ষা। ঈর্ধা খারাপ আবেগ নয়, ঈর্ষা নিজের অবস্থান সম্পর্কে অসন্তোষের অনিবার্য আবেগগত পরিণতি। সে দেখতে পায় সে ভাগ্যনিয়ন্ত্রিত প্রাণী। নিজের ভাগ্যকে সে মেনে নিতে বাধ্য হয়, কিন্তু এ-ভাগ্য নিয়ে থাকে অসুখী। সে যতোই বাড়তে থাকে, বুঝতে থাকে সমাজ আর জীবনের রীতিনীতি, ততোই সে ঈর্ষা করতে থাকে ছেলেদের: কিন্তু ওই ঈর্ধাকেও সে চেপে রাখতে বাধ্য হয়! বালিকা দেখে ছেলেরা স্বাধীন, তাদের জীবন অনেক সুবিধাজনক; তাতে বিধিনিষেধের বাড়াবাড়ি নেই, কিন্তু তার জীবন বিধিনিষেধ দিয়ে ঘেরা। বালিকার সবচেয়ে মুল্যবান সম্পত্তি তার দেহ, কিন্তু সে-দেহ নিয়েও সে থাকে বি্বিত। তারপর বোধ করে বিপন্ন। বালিকার দেহ বেড়ে ওঠে আবদ্ধ ফলের মতো। তার শরীব কোনো কিছুর সংস্পর্শে আসতে পারে না, সেটি নিষিদ্ধ বস্তুর ঢাকা থাকে আবরণের পর আবরণে। তার দেহ সরাসরি সংস্পর্শে আসতে পারে না জলের, বাতাসের, রৌদ্রের। ঘাস অনেক দিন ঢাকা থাকলে যেমন বিবর্ণ হয়ে ওঠে, বালিকার দেহও হয়ে ওঠে তেমনই। সে পানিতে নামে একরাশ পোশাক নিয়ে, প্রচণ্ড গরমেও সে গা থেকে একটু কাপড় সরাতে পারে না; তার দেহ জানে না বৃষ্টির সরাসরি ছোয়ার স্বাদ, তার শরীর জানে না রোদের সরাসরি ছোয়া কেমন। বালক নগ্ন শরীরে সাতার কাটে, বাতাসে নগ্ন শরীর মেলে দেয়; খেলার সময় বালকের শরীর আসে অন্য শরীরের সংস্পর্শে। বালিকার শরীরকে বাড়াতে হয় অনাঘাত পূজোর ফুলরূপে। তার ভেতরে জন্ম নেয় গুমোট, যা পুরুষের কাছে মনে হয় আকর্ষণীয়। প্রচণ্ড গরমের সময় এক কিশোরী আমাকে বলেছিলো, 'তোর মতো যদি খালি গায়ে ব'সে থাকতে পারতাম! " ওটা ছিলো তার জীবনের এক শ্রেষ্ঠ সাধ! বালিকা তার দেহকে নগ্ন মেলে ধরতে চায় প্রকৃতির সামনে, পেতে চায় প্রকৃতির সমস্ত আদর; কিন্তু তার জীবনে তা নিষিদ্ধ।

বালিকা বয়সেই তার শরীরে ওপর অনেক সমাজ শুরু করে নৃশংস আক্রমণ। এমন এক আক্রমণ হচ্ছে নারী-খতনা। মেয়েদের খনার বিভীষিকাজাগানো প্রথা আজো প্রচলিত আরব দেশগুলোতে, বিশেষ করে মিশর, সুদান, ইয়েমেন, ও নানা উপসাগরীয় রাজ্যে: এবং সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, তাঞ্জানিয়া, ঘানা, গিনি, ও নাইজেরিয়ায়। এসব দেশে কুমারীত্ব আর যোনিচ্ছদ অত্যন্ত গুকুতৃপুর্ণ, যোনির এক টুকরো পাতলা পর্দার ওপর দাড়ানো সেখানে বংশের মানসম্মান। যাতে বংশের মানসম্মান বা বালিকার সতীত্ববব ও সতীচ্ছদ অক্ষত থাকে, তার জন্যে খতনা করানো হয় বালিকাদের। নারী সেখানে ফিতনা, বিশৃঙ্খলা, যার কাজ বিপর্যয় ঘটানো; ওই বিপর্যয় থেকে সমাজকে বাচানোর জন্যে সেখানে কুরিয়ে ফেলে দেয়া হয় যোনির পাপপরায়ণ প্রত্যঙ্গগুলো। ওই বর্বর পিতৃতন্ত্ররর জানে যদি কেটে ফেলা হয় বালিকার ভগাঙ্কুর, বৃহদোষ্ট, ক্ষুদ্রোষ্ট, তাহলে থাকবে না তার কামক্ষুধা। রক্ষা পাবে সতীত্ববব, আর সমাজ। বালিকাদের খতনা করানো হয় সাত-আট বছর বয়সে, খতুস্রাব দেখা দেয়ার আগে [দ্র নওঅল, মাইল্স্ ]। সেখানে রয়েছে মেয়েদেব খতনা করানোর

জন্যে হাজামী। দুজন নারী মেয়েটিকে শক্ত করে চেপে ধরে, যেমন ধবা হয় কোরবানির পশু: দু-উরু জোরে টেনে ধরে তারা ফাক করে বালিকার যোনিঅঞ্চল, আর হাজামী ছুরি দিয়ে কেটে ফেলে বালিকার ভগাঙ্কুর ও অন্যান। প্রত্যঙ্গ। খনার সময় তারা আবৃত্তি করতে থাকে, “আল্লা মহান, মুহম্মদ তার নবী: আল্লা আমাদের দূরে রাখুক সমস্ত পাপ থেকে। ' যে-ছুরিটি দিয়ে খৎনা করা হয়, সেটি সব সময় ধারালোও হয় না। ছুরিটি হতে পারে ধারালো পাথর, ব্লেড, বা কাচের টুকরো। খৎনায় প্রথমে কেটে ফেলা হয় বালিকার সম্পূর্ণ ভগাঙ্কুর, তারপর কাটা হয় ক্ষুদ্রোষ্ট, তারপর বৃহদোষ্ঠের ভেতর ভাগের মাংস। খতনার পর শেলাই করে দেয়া হয় যোনিরন্, একটু ফাক রাখা হয় খতুস্রাবের জন্যে, খোলা রাখা হয় মৃত্রর্ন্ধ। খনার সময় বালিকার মা ও আত্মীয়ারা ক্ষতের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে পরীক্ষা করে খতনা ঠিক মতো হয়েছে কিনা। খনার পর চলিশ দিনের জন্যে শক্ত করে বেধে দেয়া হয় বালিকার দু-উরু, যাতে যোনি ভালোভাবে জোড়া লাগে। হাজামীরা অশিক্ষিত নারী, তারা খৎনা করতে গিয়ে বিপন্ন করে তোলে বালিকার জীবন। খৎনা সফল করার জন্যে তারা গভীরভাবে কাটে বালিকার ভগাঙ্কুর, যাতে দেহে কামের একটি কণাও অবশিষ্ট না থাকে।

খতনার অব্যবহিত ফল প্রবল রক্তক্ষরণ, জীবাণুসংক্রমণ. মৃত্ররন্ধ ফেড়ে যাওয়া, মুত্রথলে ও পায়ুদ্বার বিক্ষত হওয়া। যোনিঅঞ্চল শেলাই করে দেয়ার ফলে অনেক বালিকা পরে ঠিক মতো হাটতে পারে না। খতনার পর যদি বালিকা বেঁচে থাকে, সে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে; সারাজীবনের জন্যে তার কামক্ষুধা মিটে যায়। সুদানে মেয়েদের খতনা চলে মেয়েদের সারজীবন ধরে, মেয়েদের যোনি সেখানে নিরন্তর কাটাছেড়া ও শেলাইয়ের বস্তু। সুদানে বালিকার খৎনায় গভীর করে কেটে ফেলা হয় ভগাঙ্কুর, বৃহদোষ্ট, ক্ষুদ্রোষ্ঠ, বলা যায় কামিয়ে ফেলা হয় ওই আপত্তিকর জিনিশগুলো; তারপর মেষের অন্ত দিয়ে শেলাই করে দেয়া হয় যোনির্ন্ধ, একটু ফাক রাখা হয় যাতে চুইয়ে বেরোতে পারে খতুস্রাব, আর প্রস্রাবের জন্যে খোলা রাখা হয় মৃত্রর্ধটি। বিয়ের সময় যোনির শেলাই একটু কেটে ফাক করা হয় রুন্ধটি, যাতে শিশ্ল ঢুকতে পারে। সন্তান প্রসবের সময় শেলাই আরো কাটা হয় যোনি প্রসারিত করার জন্যে। প্রসবের পর আবার শেলাই করে দেয়া হয় রুন্ধ। নারী তালাক পেলে বা বিধবা হলে শেলাই করে বন্ধ করে দেয়া হয় যোনি, এবং আবার বিয়ে হলে আবার কেটে ফাক করা হয় রূন্ধ। এভাবে চলতে থাকে নারীর রুদ্ধ কাটাকাটি জোড়াতালি। খনার ফলে সঙ্গম ও প্রসব হয়ে ওঠে বিপজ্জনক, আর মনে যে-ক্ষতটি জন্ম নেয় তা নারীর জীবনকে ঢেকে ফেলে দুঃস্বঞ্ধো। খৎনা হওয়া নারীর জন্যে বিবাহ ভয়ংকর। সোমালিয়ার একটি বাসর রাত এমন: স্বামী প্রথমে নতৃন বউকে পিটোয় চাবুক দিয়ে, তারপর ছুরি দিয়ে যোনির শেলাই কেটে 'খোলে' তাকে। খোলার পর তিন দিন ধরে চালাতে থাকে অবিরাম সঙ্গম! কেনো স্বামীকে এতো পরিশ্রম করতে হয়? তার কারণ [দ্র মাইল্স্ (

তাকে এ-শ্রম' করতে হয় একটি 'প্রবেশ পথ' তৈরি করার জন্যে, যাতে ক্ষতটি আবার জোড়া লেগে

না যায়। . . . বাসর রাতের ভোরে স্বামী তার ছুরিটি কাধে ঝুলিয়ে সারা এলাকা ঘুরে আসে, সবাই

১৯৮ নারী

প্রশংসার চোখে তাকায় তার দিকে। সে-সময় বউটি বিছানায় শুয়ে থাকে, নড়াচড়া করে না, লক্ষা

রাখে যাতে তার ক্ষতটি খোলা থাকে।

নওঅল ( বর্ণনা করেছেন তার নিজের খনার বিভীষিকা, যাতে শোনা যায় নৃশংস পিতৃতন্ত্রররের আক্রমণে সমস্ত আরব বালিকার চিৎকার। ছ-বছরের নওঅল রাতে আধো ঘুমে আধো জাগরণে শুয়ে ছিলো নিজের বিছানায়। হঠাৎ সে অনুভব করে তার চাদরের নিচে ঢুকছে একটি শক্ত রোমশ হাত। হাতটি তাকে ধরে শক্ত করে: আরেকটি হাত চেপে ধরে তার মুখ। সে চিন্কার করে উঠতে চায়, কিন্তু পারে না। তারা তাকে গোশলখানায় নিয়ে যায়। সে দেখতে পায় নি তারা কজন ছিলো, বা তারা পুরুষ না নারী। তারা লোহার মতো শক্ত করে ধরে তার হাত, বাহু, দু-উরু। সে একটুও নড়তে চড়তে পারে না। সে শুনতে পায় ছুরি শানানোর শব্দ, তার মনে পণ'ড়ে যায় ঈদের দিনে মেষ জবাইয়ের দৃশ্য। তার রক্ত হিম হয়ে আসে, হর্থপণ্ থেমে যায়। সে বোধ করে তারা তার পেটের নিচে দু-উরুর মাঝে কী যেনো খুঁজছে। একটু পরে সে বুঝতে পারে তারা তার দু-উরু যতোটা সম্ভব ফাক করে ধরেছে। তার মনে হয় এই একটি ধারালো ছুরি কেটে ফেলবে তার গলা, কিন্তু সে অনুভব করে যে ছুরিটি নেমে আসে তার দু-উরুর মাঝখানে, এবং সেখান থেকে কেটে ফেলে এক টুকরো মাংস। তার মনে হয় তার শরীরে আগুন ধরে গেছে, সে চিৎকার করে ওঠে, কিন্তু কোনো শব্দ হয় না। সে দেখতে পায় রক্তে ডুবে গেছে তার নিতম্ব। কারা তার ভগাঙ্কুর কেটেছে সে জানে না, তবে সে যখন তার মাকে দেখতে পায় পাশেই, তখন তার দুঃখের সীমা থাকে না। সে দেখে তার মা হেসে কথা বলছে ওই লোকগুলোর সাথে, যারা কিছুক্ষণ আগে জবাই করেছে তাকে। তারা তাকে তার ঘরে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়, এবং চেপে ধরে তার ছোটো বোনকে। বোনটি তার চেয়ে দু-বছরের ছোটো। সে 'না, না" ক"রে চিৎকার করে ওঠে। সে দেখে ভয়ে তার বোনের মুখ নীল হয়ে গেছে; তার চোখে পড়ে বোনের চোখ, যাতে জমাট হয়ে আছে আতঙ্ক। তাদের দৃষ্টি বিনিময় হয়, যে-দৃষ্টিতে তারা বলতে চায়: “এখন আমরা জান এটা কী। এখন আমরা জানি কোথায় আমাদের-্র্যাজেডি। আমরা এক বিশেষ লিঙ্গের, নত্রীলিঙ্গের। পীড়ন ভোগ করাই আমাদের নিয়তি, আর আমাদের নিয়তি হচ্ছে যে ঠাণ্ডা নিমর্ম হাত ছিড়ে নেবে আমাদের দেহে একটি অংশ। ' এ-নৃশংস অভিজ্ঞতার পর আর কোনো বালিকা কামের কথা ভাবতে পারে না; তার যোনিটি হয়ে ওঠে একটি স্পর্শকাতরতাহীন গর্ত, যাতে একদিন স্বামী খুঁজে পায় বহু স্বপ্সিত বহু আকাঙ্খিত একটি পর্দা, কিন্তু সেটি কখনো কামসুখ বোধ করে না।

বালিকা যখন একটু বড়ো হয়, বড়ো হয় তার জগতটি; তখন সে চারপাশে দেখে পুরষাধিপত/। দেখে পৃথিবীটা পুরুষের। বালিকা এর বিরুদ্ধে যেতে পারে না, সে মেনে নেয় পুরুষাধিপত্তা। বালকের শিশ্ব দেখতে পাওয়া নয়, পুরুষাধিপত্য দেখতে পাওয়াই তার জীবনের চরম সত্যেকে দেখতে পাওয়া। এটা তার নিজের সম্বন্ধে ধারণাই পাল্টে দেয়। সে এখন বুঝতে পাবে পিতাই বাড়ির প্রভু, সম্রাট, ঈশ্বর; মা তার মতোই তুচ্ছ।

পরিবারে পিতাই সূর্য, তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয় সব কিছু। সে দেখতে পায় পিতার ইচ্ছেই সব, মায়ের ইচ্ছে কিছু নয়। যখন সে আরো ছোটো ছিলো, সে মনে করেছিলো সে হবে মায়ের মতো শক্তিমান, এখন দেখতে পায় মায়ের শক্তি নেই। সে চারপাশে দেখতে পায় পুরুষের মহিমা, শুনতে পায় পুরুষের বন্দনা। তার স্থান সেখানে নেই। সে সব কিছুতেই দেখে তার শোকাবহ নিয়তি। সে শুনতে পায় সব মহাপুরুষ পুরুষ, মহাপুরুষদের তালিকায কোনো নারী নেই; যারা রাজ্য জয় করেছে, মানুষকে ধর্মের পথে এনেছে, যারা সভ্যতা সৃষ্টি করেছে, তারা সবাই পুরুষ। কিছু কিছু নারীর কথাও শোনে বালিকা, তবে ওই নারীরা আকর্ষণীয় শুধু মর্মম্পশী মর্ষকামের জন্যে। ওই নারীরা শুধু ত্যাগ করেছে, দুঃখ ভোগ করেছে, পরিত্যক্ত হয়েছে: তারা স্মরণীয় হয়ে আছে পুরুষের পায়ে আত্মবিসর্জনের জন্যে। ধর্ম তাকে শোনায় ভয়ঞ্কর কথা, শোনায় পুরুষের পাজর থেকে জন্মেছে নারী। সে কি একথা বিশ্বাস করবে নাকি করবে নাঃ? তার মা তাকে বিশ্বাস করতে বলে, বাবা তাকে বিশ্বাস করতে বলে, সবাই বিশ্বাস করতে বলে; সে কী করে করবে অবিশ্বাসঃ সে দেখে ধর্ম তারই জন্যে, তার ভাই ধর্মের কথা সব মেনে চলে না, সে-জন্যে তার ভাইকে চাপ দেয়া হয় না: কিন্তু দেখে তার ওপর খুব বেশি চেপে বসছে ধর্ম। সে শোনে পতির পায়ের তলে নারীর বেহেস্ত। সে শুনতে পায় নারীই সমস্ত নষ্টের মুন, ' দিকে দিকে সে শুনতে পায় তার লিঙ্গের নিন্দা। সে নাটকে চলচ্চিত্রে পাঠ্যপুস্তকে উপন্যাসে দেখে পুরুষাধিপত্যের জয়। সে বোঝে সে বালিকা, সে নারী হয়ে উঠবে; সে কিছু উপভোগ করবে না, কিন্তু ভোগ করবে যন্ত্রণা। সে বোঝে পুরুষভোগ্যা পৃথিবী:

সেও পুরুষের ভোগ্যা। সবাই তাকে শেখায় তাকে প্রস্তুত হতে হবে পুরুষের উপভোগের জন্যে। তার শরীর তার উপভোগের জনে। নয়, তার কাজ ওই শরীরকে আবেদনময়, পুরুষের উপভোগের জন্যে নিটোল কণসে তোলা। তার কাজ কোনো পুরুষের মন জয় করা। সে কি পুরুষের মন জয় করবে তার বুদ্ধি দিয়ে, মেধা দিয়ে? না, পুরুষের মন জয় করতে হবে তাকে শরীর দিয়ে, তাকে হতে হবে রূপসী। সে হবে যৌনসামগ্রী। তাকে হতে হবে মর্ষকামী। সে হবে বিবি রহিমা, সে হবে সতী সীতা। সমাজ বালিকাকে শিক্ষা দেয় আত্মপ্রেমের, মর্ষকামিতার। বালিকা দেখতে শুরু করে দিবাস্বপ্ন, ওই স্বপ্নে ঘোড়া ছোটোয় রাজপুত্ররা। সে হয় আত্মপ্রেমবিভোর, ভরে ওঠে মেয়েলিপনায়; সে শেখে কটাক্ষ, শেখে শরীর বাঁকিয়ে দাড়াতে। অশ্রু হয়ে ওঠে তার সম্পদ। বালকেরা মুগ্ধ হয় তার চোখের জলের গভীরতায়, তাই সে শেখে চোখ ছলছল করতে। বালিকাকে শেখানো হয় সে কিছু করতে পারবে না, করবে ছেলেরা; তাকে শেখানো হয় অক্রিয়তা অনেক বেশি সুখকর। তাই সে হয় অক্রিয়। অক্রিয় ভূমিকাকে সে প্রতিবাদ না করে মেনে নেয়, কেননা সে মনে করে এই তার নিয়তি। বালকের জন্যে আছে ভবিষ্যৎ তার জন্যে নেই। বালক বড়ো হয়ে কর্মকর্তা হবে, বিমান চালাবে, সমুদ্রে যাবে, মাঠে যাবে, শহরে যাবে, পৃথিবী দেখবে, ধনী হবে; আর বালিকা হবে স্ত্রী, মা, পিতামহী, মাতামহী। সে তার মায়ের মতো সংসার দেখবে, সে সন্তান প্রসব আর পালন করবে তার মায়ের মতো। খুব বড়ো হয়ে ওঠে একটি কথা যে সে হবে মা।

২০০ নারী

বালিকা জেনে ফেলে সে হবে মা, তাই জন্মের রহস্য তার জন্যে হয়ে ওঠে এক বড়ো ব্যাপার। বালক যে-বয়সে জন্মের রহস্য সম্পর্কে ভাবেই না, সে-বয়সে বালিকার বড়ো ভাবনার বিধয় হয়ে ওঠে জন্মারহস্য আর কাম। বালকও ভাবে শরীরের কথা, তবে সে রহস্য উদঘাটনের জন্যে ভাবে না, ভাবে উপভোগের জন্যে। বালিকা উপভোগের জন্যে ভাবে না. ভাবে উদঘাটনের জন্যে, নিজের নিয়তিকে জানার জন্যে। বালক নারীদেহ সম্পর্কে খুবই উৎসাহী হয়, লুকিয়ে দেখার চেষ্টা করে নারীদেহ; নিয়মিত হস্তমৈথুনও করে, তবে সে এ-বয়সে স্বামী, পিতা হিশেবে কল্পনা করে না নিজেকে। কিন্তু বালিকা ভাবতে থাকে বিয়ের কথা, দেখতে থাকে নিজেকে স্ত্রী, মা-রূপে। বালিকা বুঝে ফেলে যে মায়ের পেটে সন্তান জন্ম নেয়, মা জন্ম দেয় সন্তান। সে বোঝে, গ্রামে হলে সে দেখতেও পায়, কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার সন্তান জন্ম দেয়া: কেপে ওঠে তার অস্তিত্ববব। কীভাবে মায়ের পেটে ঢোকে শিশু, এটা বালকবালিকা উভয়ের চিন্তায়ই স্থান পায়। বালক জানে এ-দায়িত্ তাকে বইতে হবে না, তাই সে মাথা ঘামায় না এ নিয়ে; কিন্তু বালিকার চিন্তায় তা স্থির হয়ে থাকে। ধীরে ধীরে একটু একটু আভাস পেতে থাকে কী করে মায়ের পেটে আসে সন্তান। এক সময় সে মনে করতো বিয়ে হ*লেই সন্তান হয়; এখন সে বোঝে কিছু একটা করতে হয় বাবামাকে। কী করতে হয়? স্পষ্ট করে কারো থেকে সংবাদ পায় না, তবু এক সময় সঙ্গমের সংবাদ সে পায়। প্রথমে বোঝে না, বোঝার পর বালিকা শিউরে ওঠে। বালকবালিকা যখন বুঝতে পারে সঙ্গম কী, তখন তারা প্রত্যেকে ঘেন্নায় চিৎকার করে ওঠে: না, না, তাদের বাবামা অতো খারাপ নয়. তারা এ-কাজ করতে পারে না। কিন্তু বালিকা চিৎকার করে সত্যকে অস্বীকার করতে পারে না, তবে তার ভয় জাগে বিয়ে সম্পর্কে। বালিকা হয়তো দেখে ফেলে (কানো পুরুষের শিশ্ন, ভয়ে সে আরো কুঁকড়ে যায়। তার জগতে নেমে আসে বিভীষিকা। বালিকা এক সময় অনুভব করে বদল ঘটছে তার ভেতরে, তার শরীর হয়ে উঠছে নারীর শরীর। বারো তেরো বছরের সময় শুরু হয় তার কৈশোরসংকট: দেখা দিতে থাকে তার স্তন. আর সে বিপন্ন বোধ করতে থাকে নিজেকে নিয়ে। তার শরীর তার কাছে হয়ে ওঠে লজ্জার বস্তু, যা নিয়ে সে থাকে ব্ব্রত। এক সময় হঠাৎ ময়লা রক্ডে ভেসে যায় তার উরু আর বিছানা; আর ভীত রক্তাক্ত অপরাধবোধ্ধস্ত বালিকা এগিয়ে চলে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে।

আরও বই