বোকেয়া এখন বাঙালি মুসলমান পিতৃতন্ত্রররের কাছে এক মহীয়সী, তিনি আজ অলঙ্কৃত করছেন পুণ্যময়ীদের পংক্তি, — কোনো প্রথাগত নারীর জন্যে এটা পরম প্রাপ্তি, কিন্তু রোকেয়ার জন্যে এটা খুবই শোচনীয় স্বীকৃতি। ভারতীয় ভূভাগের এক বড়ো বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে বিদ্রোহীদের মূলেই উপড়ে ফেলা হয় বা চেষ্ট করা হয় উপড়ে ফেলার, তবে তা সম্ভব না হলে তাদের নিক্ক্িয় করে দেয়া হয় প্রথার ভেতর বিন্যস্ত করে। বিদ্রোহীরা হয়ে ওঠেন প্রথাগত। রোকেয়াকেও তাই করা হয়েছে; রোকেয়া হয়ে উঠেছেন এক মহায়সী পুণ্যময়ী সতী নারী, বা একজন মুসলমান ভদ্রমহিলা। এভাবে চূড়ান্তরূপে না স্রয় করে দেয়া হয়েছে রোকেয়াকে। তার নামটিই এর ভালো পরিচয় দেয়। পুরুষেরা ও তার ভক্ত প্রথাগ্রস্ত নারীরা তাকে বিখ্যাত করে তুলেছেন 'বেগম রোকেয়া" নামে, যদিও তার নামে কখনো “বেগম ছিলো না। তার নাম ছিলো রোকেয়া বা রুকাইয়া খাতুন; তবে তিনি নিজেও মেনে নিয়েছিলেন পশ্চিমি পুরুষতান্ত্রিক নাম 'আর এস হোসেন" বা “রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন"। তার জন্মের সালতারিখকেও অনেকটা কিংবদন্তি মনে হয়; -অনেকে শুধু ১৮৮০ সালে রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে তার জন হয়েছিলো বলে জানান, জন্মের তারিখ উল্লেখ করেন না; আবার কেউ কেউ বলেন তার জন্ম হয়েছিলো ১৮৮০ সালের ডিসেম্বরের ৯ তারিখে, এবং পুণ্যবানদের মতো তার মত্যও হয়েছিলো ডিসেম্বরের ৯ তারিখেই (। হয়তো তার জন্মের আসল তারিখটি লুপ্তই হয়ে গেছে। তার জীবনকাহিনীও জানা যায় সামান্য; তবে তার ভেতরেও চোখে পড়ে রোকেয়া নামের অগ্নিশিখাটি।
পিতৃতান্ত্রিক, দুশ্রিত্র, অপবায়ী, জমিদার পিতার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর গর্ভে তার জন! হয়েছিলো। বেড়েছেন তিনি অন্ধকার অবরোধের মধ্যে, যেখানে মেয়েদের পড়াশুনো ছিলো নিষিদ্ধ। তবে বড়ো ভাইয়ের কাছে গোপনে শিখেছেন বাঙলা ও ইংরেজি, এবং শিখেছেন অত্যন্ত ভালোভাবে নিজেরই সহজাত প্রতিভায়। কেউ কেউ মনে করেন রোকেয়া বিয়ের পরে স্বামীর কাছে ভালোভাবে শিখেছিলেন ইংরেজি: এটাও এক পুরুষতান্ত্রিক বিশ্বাস। তাদের কাছে নারীর ইংরেজি শেখা বিস্ময়কব ব্যাপাব, বাঙলা নিজে নিজেই শেখা সম্ভব; ইংরেজি শিখতে হলে দরকার একটি উদার শিক্ষিত স্বামী! যদি ধরি যে রোকেয়ার বিয়ে হয়েছিলো আঠারো বা যোলো বছর বয়সে. তাহলে স্বামীর কাছে ইংরেজি শেখার তন্ত্টি বাতিল করে দিতে হয়; কেননা ওই বযসের পর একটি বিদেশি ভাষা শেখা এবং তাতে লেখা ভাষাঅজন সম্পর্কে ভুল ধারণামাত্র। তাঁর বিয়ে হয় কারো মতে ষোলো, কারো মতে আগারো বছর বয়সে। বেশ বড়ো পরিহাস বলে মনে হয় রোকেয়াব বিয়েটিকে: বাঙালি নারীমুক্তির সন্তের বিয়ে
হয় এক দোজবর, অবাঙালি, বিহারির সাথে। তার স্বামীটি যে-বছর, ১৮৮০ তে. ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হন, সে-বছর জন্ম হয় তার; তিনি স্ত্রী হন পিতার বয়স্ক এক পুরুষের। সাখাওয়াতের বয়স তখন ছিলো ৩৮ বা ৪২, রোকেয়ার ছিলো ১৬ বা ১৮। ওটি ছিলো বিয়ের জন্যে বিয়ে; বিয়ের সময়ই সবাই জানতো যে দীর্ঘ বৈধব্য পালনই হবে রোকেয়ার বিবাহিত জীবন। মুসলমান পিতৃতন্ত্ররর রোকেয়ার জীবনকে মর্মম্পর্শী করে তুলতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি করে নি; তাকে ধ্বংস করে দিতে পারলেই সেটি সার্থকতা বোধ করতো, কিন্তু পারে নি।
রোকেয়ার পিতা অমানুষ ছিলেন, কিন্তু বড়ো ভাই ও তার স্বামীটি ভিন্ন ছিলেন ওই সময়ের মুসলমান পুরুষদের থেকে। রোকেয়ার সমগ্র রচনবলি ভরে বয়েছে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, ও ঘৃণা; “পুরুষ ধারণাটিই ছিলো তার কাছে আপত্তিকর। পুরুষদের তিনি যে সামান্য করুণা করেছেন, তা সম্ভবত ভাই ও স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে। রোকেয়ার রচনাবলির প্রধান বৈশিষ্ট্য পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ; পশ্চিমের প্রথম নারীবাদী মেরি ওলস্টোনক্র্যাফটের মধ্যেও এতোখানি পুরষবিদ্বেষ ও দ্রোহিতা দেখা যায় না। মেরি পুরুষকে সমকক্ষ বন্ধু হিশেবে মেনে নিয়েছিলেন রোকেয়া তাও মানতে রাজি হন নি। মেরিব সাথে রোকেয়ার জীবনের মিল ও অমিল দু-ই চোখে পড়ে। মেরি ছিলেন গরিব পরিবারের মেয়ে, লেখাপড়া শিখেছিলেন নিজের চেষ্টায়, বালিকা বিদ্যালয় খুলেছিলেন, বই লিখেছিলেন বালিকাদের শিক্ষা সম্পর্কে। তিনি বিয়ে না করে বাস করেছেন প্রেমিকের সাথে, জন্ম দিয়েছেন অপ্রথাগত কন্য। : প্রতারিত হয়েছেন, তারপর আবার প্রেমে পড়ে গর্ভবতী হয়েছেন, এবং কন্যা জন্ম দিতে গিয়ে লোকান্তরিত হয়েছেন মাত্র আটত্রিশ বছর বয়সে। মেলামশার সুযোগ পেয়েছেন মেরি ওই সময়ের শ্রেষ্ঠ পুরুষদের সাথে। রোকেয়া জন্মেছেন ধনী পরিবারে, বন্য কেটেছে অবরোধে, বিয়ে হয়েছে পিতার বয়সা পুরুষের সাথে, জন্ম দিয়েছেন দু অকালমৃত কন্যা। তার বিবাহিত জীবন এগারো বা তেরো বছরের। মেরি শারীরিক সম্পর্কে এসেছেন দুটি পুরুষের সাথে, এবং সংস্পর্শে এসেছেন বহু পুরুষের; রোকেয়া শারীরিকভাবে জেনেছেন একটি পুরুষকে, সে-জানাও ছিলো সম্ভবত অতৃপ্তিকর; আর সংস্পর্শে আসেন নি কোনো পুরুষের। রোকেয়ার সমাজের পুরুষ তার কাছে ছিলো পশুর সমান। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি পুরুষপ্রসঙ্গ তোলেনই নি: পিতাকে তিনি প্রায় পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন, স্বামী ও ভাইদের স্বীকার করেছেন অনেকটা করুণা করে।
নিজের ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে নীরবতাই ছিলো তার স্বভাব, কিন্তু ইঙ্গিতেই তিনি জানাতে পারতেন প্রচুর। ৩০ ৪ ৩১-এর এক চিঠিতে লিখেছিলেন: “শৈশবে বাপের আদর পাই নি, বিবাহিত জীবনে কেবল স্বামীর রোগের সেবা করেছি। প্রত্যহ 777০ পরীক্ষা করেছি। পথ্য রেঁধেছি, ডাক্তারকে চিঠি লিখেছি। দুবার মা হয়েছিলুম-তাদেরও প্রাণভরে কোলে নিতে পারি নি। একজন ৫ মাস বয়সে, অপরটি ৪ মাস বয়সে চলে গেছে। আর এই ২২ বৎসর যাবত বৈধব্যের আগুনে পুড়ছি' দ্র মোশফেকা (। এ হচ্ছে রোকেয়ার সমগ্র আত্মজীবনী, কয়েক পরংক্তিতে লেখা কয়েক খণ্ড। এতে জীবনের
২৮৪ নারী
প্রথাগত ব্যর্থতার ছবিটি যেমন মর্মস্পর্শী, তেমনই এর একটি পংস্তি সাংঘাতিক: “আর এই ২২ বৎসর যাবত বৈধব্যের আগুনে পুড়ছি। ' বৈধব্যের কথা এলেই কেনো আসে আগুনের রূপক. দাউ দাউ করে ওঠে কেনো দেহবহুৎসব? বিদ্যাসাগর বালিকা বিধবার 'অসহ্য বৈধব্যযন্ত্রণানলে'র কথা বার বার বলেছেন, রোকেয়া বলেছেন নিজেরই কথা। শরীরকে তিনি সম্পূর্ণ চেপে গেছেন কাজে ও লেখায়, পালন করে গেছেন মুসলমান ব্রক্ষমচর্য। মুসলমান পুরুষেরা যে তীকে ধন্যধন্য করে, তার অনেকটা তার ওই মর্ষকামী ব্রহ্ষচর্যের জন্যে। তিনি বলেছেন, 'আশরাফগণ সপ্তম বর্ষীয়া নিধবা কন্যাকে চির-বিধবা রাখিয়া গৌরব বোধ করেন' (“রানী ভিখারিণী", রোর, পদ্দরাগ-এ (রোর, ৪৬২) বলেছেন, সিদ্দিকা নিজেকে 'চিরকুমারী” জ্ঞান করিবেন না, কারণ চিরকুমারী নিঃস্ব; . . . তিনি নিজেকে বিধবা মনে করিবেন, যেহেতু বিধবার স্বামী-স্থৃতিরূপ বহুমূল্য সম্পদ থাকে। পতিধ্যান তাহার জীবনের নিত্যসহচর। তাহা না হইলে বিধবা বাচিবে কি লইয়া? এ হচ্ছে পুরুষতন্ত্রকে মেনে নিয়ে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
তবে রোকেয়া নিজে পতিধ্যান করেন নি। ২৫ ৪ ৩২-এর এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন: “আপনি ঘুণাক্ষরেও ভাববেন না যে, আমার শ্রদ্ধেয় স্বামীর স্মৃতিরক্ষার। মোশফেকা ]। তিনি বিদ্যালয়ের নামবদলের জন্যেও প্রস্তুত ছিলেন; কিন্তু তার পুরুষ অভিভাবকেরা তাতে রাজি ছিলেন না; কেননা তারা “সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল" নামটিতে দেখতেন পুরুষতেন্ত্রর জয়; — একটি নারী বালিকাদের শিক্ষা দেয়ার ছলে পূজো করে চলছেন একটি মৃত পুরুষকে! নারীকে মুক্তি চাইতে হবে পুরুষাধিপত্য মেনে নিয়ে: পুরুষের লাশ অনেক গুরুত্পূর্ণ জীবিত নারীর থেকে। রোকেয়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন নি, বিয়ে তার কাছে কোনো গুরুত্পূর্ণ ব্যাপার ছিলো না: তবে গুরুত্পূর্ণ ছিলো পুরুষতন্ত্রের কাছে। রোকেয়া যদি আবার বিয়ে করতেন, তাহলে পুরুষতন্ত্র তাকে বাতিল করে দিতো: নারীমুক্তির কথা ভুলে তাকে থাকতে বাধ্য করতো স্বামীর পদতলে। রোকেয়া ছিলেন আমূল নারীবাদী, কিন্ত তান জানতেন তিনি পৃথিবীর এক বর্বর পিতৃতন্ত্রররের অন্তর্ভূক্ত; তাকে বিদ্রোহ করতে হবে ওই বর্বরতাকে স্বীকার করেই। ওলস্টোক্র্যাফটের জীবন এ-সমাজে অকল্পনীয়। রোকেয়া নিজের মধো সংহত করেছিলেন প্রবল দ্রোহিতা ও মর্ষকামিতাকে, পুরুষতন্ত্রকে আক্রমণ ও পরাভূত করার জন্যে তাকে সুখের সাথে সহ্য করতে হয়েছে পুরুষতন্ত্রের পীড়ন। কিন্তু তিনি পুরুষতন্ত্রকে ধ্বংস করার জন্যে নিরন্তর লড়াই করে গেছেন; তার রচনাবলি পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক ধারাবাহিক মহাযুদ্ধ।
রোকেয়া লিখেছেন প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস; এবং প্রতিটি আঙ্গিক তিনি ব্যবহার করেছেন পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অস্ত্রূপে। তার প্রবন্ধ বিশুদ্ধ মননশীল প্রবন্ধ নয়, তাতে রয়েছে কথাশিল্লিতার ছাপ; আবার তার উপন্যাসও পুরোপুরি উপন্যাস নয়, তাতে রয়েছে প্রাবন্ধিকতার ছাপ। বিশুদ্ধ শিল্পসৃষ্টি তার লক্ষ/ ছিলো না; তার লক্ষ্য ছিলো পৌনপুনিক আক্রমণে পুরুষতন্ত্রকে দুর্বল করে নারীকে সমাজে জীবনে প্রতিষ্ঠিত
করা। চেতনায় তিনি এগিয়ে ছিলেন তার সময়ের মুসলমান ও হিন্দু সমস্ত পুরুষ, নারী ও মহাপুরুষদের থেকে; তার ছিলো সরাসরি মতপ্রকাশের চমৎকার স্বভাব, এবং ছিলো প্রখর পরিহাসের শক্তি। স্বামীর মৃত্যুর আগের রোকেয়ার লেখায় দেখা যায় আক্রমণাত্মক প্রবণতা, একাকী জীবনে তার লেখায় বড়ো হয়ে ওঠে পরিহাস, তীক্ষ উইট, যা তার অন্তর্গত বিষগ্রতার প্রকাশ। তিনটি ভাষা-বাঙলা, উর্দু, ইংরেজি-ছিলো তার আয়ত্তে, তার হাতের লেখা ছিলো পুষ্পপাপড়ির মতো মনোহর; অনুরাগী ছিলেন তিনি প্রথাগত কবিতার, তিনি নিজেই ছিলেন ভালো কবি; এবং মননশীলতায় ছিলেন সে-সময়ের শ্রেষ্ঠদের একজন। উপন্যাস রচনায় ছিলেন তিনি বঙ্কিমানুসারী, তার পদ্দরাগ-এর প্রট বঙ্কিমী রীতিতে তৈরি। তিনি কি ওলস্টোনক্র্যাফটের নাম শুনেছিলেন, তার বইটি দেখেছিলেন? এর কোনো প্রমাণ তিনি রেখে যান নি, তবে মনে হয় মেরির বই তিনি দেখেন নি; দেখলে রোকেয়া '্ত্রীজাতির অবনতি" নামে প্রবন্ধ না লিখে লিখতেন সুপরিকল্পিত পূর্ণাঙ্গ বই। তিনি ইংরেজিতে একটি চমৎকার ইউটোপিয়া লিখেছিলেন, এবং বাঙলায় অনুবাদ করেছিলেন; আজো সেটিই বাঙলায় লেখা একমাত্র ইউটোপিয়া। ইউটোপিয়া ও ত্যান্টি-ইউটোপিয়া বা ডিস্টোপিয়া তার চেতনায় বড়ো স্থান করে নিয়েছিলো; কেননা তিনি যে-সমাজে বাস করতেন সেটিই ছিলো এক মূর্ত আন্টি-ইউটোপিয়। , এবং তিনি পেরিয়ে যেতে চেয়েছিলেন ওই সমাজকে। শুধু সুলতানার স্বর" নয়, তার পদ্ঘরাগও একধরনের ইউটোপিয়া, আর তার কয়েকটি রূপকথা- 'জ্ঞানফল', “সৃষ্টিতত্', “নারীসৃষ্টি', “মুক্তিফল' ইউটোপিয়া ও আ্যান্টি-ইউটোপিয়ার মিশ্রণ!
রোকেয়া পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে চালিয়েছিলেন সার্বিক আক্রমণ। তিনি ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছেন পুরুষতন্ত্রের তৈরি নারী ও পুরুষের ভাবমূর্তি, বর্জন কবেছেন নারীপুরুষের প্রথাগত ভূমিকা; তুলনাহীনভাবে আক্রমণ করেছেন পুরুষতন্ত্রের বলপ্রয়োগসংস্থা ধর্মকে। রোকেয়া পরে ধর্মের সাথে কিছুটা সন্ধি করেছেন আত্মরক্ষার জন্যে; নইলে তাকে ও তার আদর্শকে অত্যন্ত বিপন্ন করে তলতো মুসলমান পিতৃতন্ত্ররর। তিনি এমন এক পিতৃতন্ত্রররের সদস্য ছিলেন, যেখানে পুত্র মাকে শেখায় সতীত্ববব। তার ভাগনে আবদুল মধ্যযুগ থেকে বেরোতে পারেন নি; তিনি খালা রোকেয়াকে পর্দা শেখাতে দ্বিধা করেন নি। খালাকে শর্ত দিয়েছিলেন যদি খালা পর্দা মানেন (এর অর্থ রোকেয়ার আচরণ পর্দাসম্মত ছিলো না বিলেতফেরত স্যার-ভাগনের মতে), তবে তিনি রোকেয়ার স্কুলটি সরকারি করে দেবেন। পুত্র যেখানে মাকে সতীত্ববব শেখায়, সে-উৎ্কট ভূখণ্ডে রোকেয়া ধর্মের নামে মাঝেমধ্যে দু-একটি খই উৎসর্গ করে নিস্তেজ করে দিতে চেয়েছেন ধর্মকে। এ বেরোয রোকেয়ার মুর্তিভাঙা প্রবন্ধ “আমাদের অবনতি' (নবণৃর: ভাদ্র) মতিচুর-এ (প্রথম খণ্ড: মুদ্রিত হয় এর খণ্ডিত, মুসলমান পিতৃতন্ত্রররের অনুমোদিত দ্ূপ: 'ত্রীজাতির অবনতি"। এটি রোকেয়ার 077। ওলস্টোনক্র্যাফটের মতো রোকেয়া নারীমুক্তির সার্বিক প্রস্তার পেশ করেন নি এ-প্রবন্ধে, তবে নারীমুক্তির মূলকথার সনই এতে রয়েছে সংক্ষেপে। এর
২৮৬ নারী
'আপত্তিকর' অংশের সাথে বিস্ময়কর মিল পাওয়া যায় এলিজাবেথ কেডি স্ট্যান্টন ও অন্যান্যের নারীর বাইবেল-এর (।
নারীবাদনেত্রী স্ট্যান্টন দেখেছিলেন, নারীমুক্তির বিরুদ্ধে পুরুষতন্ত্র সব সময়ই উচিয়ে ধরে বাইবেল, তাই তিনি বাতিল করে দেন বাইবেলকেই। তিনি আক্রমণ করেন বাইবেলি নারীর ভূমিকা ও ভাবঘুূর্তিকে; বলেন: “বাইবেলকে আমরা দীর্ঘকাল ধরে অন্ধভক্তির বস্তু করে ভুলেছি। এখন এটি অন্যান্য বইয়ের মতো পড়ার সময় এসে গেছে, নিতে হবে এর ভালো শিক্ষ। বাদ দিতে হবে খারাপটা' [দ্র হোল ও লেভিন (। তিনি 'পাজরের হাড়ের গল্পটি”কে "তুচ্ছ অন্ত্রোপচার" বলে বাতিল করে দেন; দেখান যে সম্পূর্ণ বাইবেল দাড়িয়ে আছে হাওয়া বা নারীর পাপের ধারণা ভিত্তি করে। তিনি বলেন, "সাপটি, ফলগাছটি এবং নারীটিকে সরিয়ে নাও; তারপর আর থাকে না কোনো পতন, কোনো ক্রুদ্ধ বিচারক, কোনো নরক, কোনো চিরশাস্তি, - সুতরাং দরকার পড়ে না কোনো ব্রাতার। এভাবে খ'সে পড়ে সমগ্র ধিস্টান ধর্মতত্ত্বের তলদেশ। এ-কারণেই সমস্ত বাইবেলি গবেষণা ও উচ্চতর সমালোচনায় পপ্ডিতেরা কখনো নারীর অবস্থানটি ছুঁয়ে দেখেন না" দ্র হোল ও লেভিন (। এর ফলে হৈচৈ পড়ে পশ্চিমে; ভদ্র নারীমুক্তিবাদীরা অস্বীকার করেন স্ট্যান্টনকে। এর মাত্র ন-বছর পরে পৃথিবীর এক অন্ধকার কোণে উ্ব পিতৃতন্ত্রররের মধ্যে রোকেয়া, মাত্র চবিবশ বছরের তরুণী, ঘোষণা করেন: “আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ এ ধর্মগরন্গুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন।” পিতৃতন্ত্রররের দীর্ঘ ইতিহাসে এই প্রথম কোনো নারী সরাসরি বাতিল করে দেন কোনো বিশেষ একটি ধর্মগ্রন্থকে নয়, সমস্ত ধর্মগ্রন্থকে; ধর্মগ্রন্থের পেছনের সত্যকে প্রকাশ করেন অকপটে। পিতৃতন্ত্রররের বলপ্রয়োণসংস্থাটি এর আগে, ও পরে, এমন আঘাত আর কখনো বোধ করে নি। রোর, সম্পাদকের নিবেদন, (
আমাদেব যথাসম্ভব অধঃপতন হওয়াব পর দাসত্বের বিরুদ্ধে কখনও মাথা তুলিতে পারি নাই: . . . যখনই কোন ভরগ্ী মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা কবিয়াছেন, অমনই ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচনরূপ অস্ত্রাঘাতে তাহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে। . . আমণা প্রথমতঃ যাহা সহজে মানি নাই, তাহা পরে ধর্মেব আদেশ ভাবিয়া শিবোধার্ধ করিয়াছি; এখন ত অবস্থা এই যে, ভূমিষ্ঠ হওযা মাত্রই শুনিতে পাই: “প্যাচ? তুই জন্মেছিস্ গোলাম, থাক্বি গোলাম। " সুতরাং আমাদের আত্মা পর্যন্ত গোলাম হইয়া
যায। . . .
আমবা যখনই উন্নত মস্তকে অতীত ও বর্তমানে প্রতি দৃষ্টিপাত করি, অমনই সমাজ বলে: ঘুমাও, ঘুমাও, এ দেখ নরক। ' মনে বিশ্বাস না হইলেও অন্ততঃ আমরা মুখে কিছু না বলিয়া নীরব থাকি। . . . আমাদিগকে অন্ধকারে বাখিবাব জন) পূরুমগণ এ ধর্মগরন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ কবিয়াছেন। . . .
এই ধর্মগরন্থগুলি পুরুষ-রচিত বিধি-ব্যবস্থা ভিন্ন আব কিছুই নহে। শুণিদের বিযানে যে-কথা শুনিতে পান, কোন স্ত্রী মুণির বিধানে হয়ত ভাহার বিপরীত নিব্ম দেখিতে পাইতেন। যাহা হউক, ধর্মগ্রন্থসমূহ ঈশ্বর-প্রেরিত কি না, তাহা কেহই নিশ্চয় বলিতে পারে না। যদি ঈশ্বর কোন দূত বমণী-শাসনের নিমিত্ত প্রেরণ স্রিতেন. তবে সে দূত বোধ হয় কেবল এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকিতেন
পুরণষতন্ত্র ও রোকেয়ার নারীবাদ ২৮৭
না। . . . এখন আমাদের আর ধর্মের নামে নত মস্তকে নরের অযথা প্রভুত্ব সহা উচিত নহে। আরও দেখ, যেখানে ধর্মের বন্ধন অতিশয় দৃঢ়, সেইখানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক. . .
'ধর্ম' শেষে আমাদের দাসত্বের বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর কবিয়াছে, ধর্মের দোহাই দিয়া পুরুষ এখন রমণীর উপর প্রভুতব করিতেছেন। . . .
রোকেয়া কোনো বিশেষ ধর্মকে বাতিল করেন নি, বাতিল করেছেন সব ধর্মকেই। এ এটা সম্ভব ছিলো, কিন্তু রোকেয়া যদি আজ একথা বলতেন, তবে তাকে প্রকাশ্য রাস্তায় ছিড়ে ফেলা হতো। মুসলমান পিতৃতন্ত্ররর তার ধর্মসমালোচনা অনুমোদন করে নি, তাই রোকেয়াকে বাদ দিতে হয়েছিলো তার রচনার শ্রেষ্ঠাংশ; এবং পরে তাকে কিছুটা সন্ধি করতে হয়েছিলো মুসলমান পিতৃতন্ত্রররের সাথে। 'স্ত্রীজাতির অবনতি”তে রোকেয়া শুধু পিতৃতন্ত্রররের হিংস্র বলপ্রয়োগসংস্থাটিকে আক্রমণ করেন নি, তিনি আক্রমণ করেছেন পুরুষতন্ত্রের সমগ্র জীবনপরিকল্পনাকেই। তিনি ব্যাখ্যা ও বাতিল করেছেন পুরুষতন্ত্রের তৈরি প্রতিটি ভাবমূর্তি। নারীর সমস্ত প্রথাগত ভাবমূর্তি বর্জন করে তিনি নারীর অবস্থানের দিকে তাকিয়ে দেখেছেন নারী দাসীমাত্র। তিনি বলেছেন, 'এই বিংশ শতার্দীর সভ্যজগতে আমরা কিঃ দাসী" (রোর, ১৭)! একবার নয়, বলেছেন বার বার। তিনি বলেছেন, ““দাসী” শব্দে অনেক শ্রীমতি আপত্তি করিতে পারেন। কিন্তু জিজ্ঞাসা করি, “স্বামী” শব্দের অর্থ কি? দানকর্তাকে “দাতা” বলিলে যেমন গ্রহণকর্তাকে “গ্রহীতা” বলিতেই হয়, সেইরূপ একজনকে “স্বামী, প্রভু, ঈশ্বর” বলিলে অপরকে “দাসী” না বলিয়া আর কি বলিতে পারেন' (রোর, পাদটীকা, তার কাছে নারীপুরুষের প্রথাগত সম্পর্ক কোনো পবিভ্র মহৎ ব্যাপার নয়; তা শক্তিব সম্পর্ক, যাতে একজন জয়ী ও আরেকজন পরাজিত। রোকেয়া জানতেন নারীপুরুষের লৈঙ্গিক রাজনীতিতে বলপ্রয়োগের ফলে নারী পরাজিত: তাদের সম্পর্ক লৈঙ্গিক রাজনাতিক।
নারী কেনো দাসী হয়েছে, তাও ব্যাখ্যা করেছেন রোকেযা; তার ব্যাখ্যা অনেকটা এঙ্গেলসের ( ব্যাখ্যার কাছাকাছি। এঙ্গেলস দেখিয়েছেন ব্যক্তিমালিকানা ও পরিবারের উৎপত্তিই নারীব পুরুষাধীনতার মুলে; এবং রোকেয়া (রোর, ১৭) বলেছেন:
পুবাকালে যখন সভ্যতা ছিল না, সমাজবন্ধন ছিল না, তখন আমাদের অবস্থা এপ ছিল না। কোন
অজ্ঞাত কারণবশতঃ মানবজাতিব এক অংশ (নর) যেমন নানা বিষয়ে উন্নতি করিতে লাগিল, অপর
অংশ (নোরী) তাহার সঙ্গে সঙ্গে সেরূপ উন্নতি করিতে পাবিল না বলিয়া পুরুষের সহচরী বা সহধর্মিনী
না হইয়া দাসী হইয়! পড়িল।
তিনি বিশ্বাস করেন যখন সমাজবন্ধন ছিলো না, তখন মুক্ত স্বায়ত্তশাসিত ছিলো নারী। সমাজবন্ধনের মূলেই রয়েছে পরিবার, তাই পরিবারই যে নারীর দাসীত্তের মূল কারণ, তা অস্পষ্ট থাকে নি তাঁর কাছে। পরিবারে পুরুষ হয়েছে প্রভু, নারী দাসী। তিনি অবশ্য প্রশ্ন করেছেন, “আমাদের এ বিশ্বব্যাগী অধঃপতনের কারণ কেহ বলিতে পারেন কি? সম্ভবত সুযোগের অভাব ইহার প্রধান কারণ। স্ত্রীজাতি সুবিধা না পইয়া সংসারের
২৮৮ নারী
সকল প্রকার কার্য হইতে অবসর লইয়াছে' (রোর, ১৭)। সুযোগটা যে নারীকে দেয় নি পুরুষ, তাও তিনি জানিয়েছেন। যুগ যুগ ধরে দাসত্বের কুপ্রভাব পড়ে দাসদের স্বভাবের ওপর, নারীর ওপরেও পড়েছে; রোকেয়া তাও দেখিয়েছেন চমৎকার ও বিস্তৃতভাবে। ওলস্টোনক্র্যাফটের ভিন্ডিকেশন-এর চতুর্থ পরিচ্ছেদের নাম ' 077 ১91০ [0 15 [ ': “নানা কারণে নারীর যে-অবনতি ঘটেছে, সে-সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ"। রোকেয়ার প্রবন্ধটির নাম 'আমাদের/শ্ত্রীজাতির অবনতি' বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ওলস্টোনক্র্য। ফ্ট্ দেখিয়েছেন নারীকে বন্দী করার পর তার মানসিক শক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট করে ফেলা হয়েছে, নারীকে শেখানো হয়েছে তুচ্ছ রূপ, বিনোদন, ভাবাবেগ প্রভৃতিতে মেতে থাকতে, আর তারাও বোধ করেছে “নিকৃষ্টতায় মহিমান্িত'! রোকেয়াও বলেছেন একই কথা: “আমাদের মন পর্যন্ত দাস ( হইয়া গিয়াছে' (রোর, ১৭)। ওলস্টোনক্র্যাফ্ট্ রূপচর্চা, অলঙ্কার, বিনোদন, উপন্যাস পড়া, শারীরিক ও মানসিক বলহীনতাকে আক্রমণ করেছেন প্রবলভাবে, রোকেয়াও তাই করেছেন। রোকেয়া বলেছেন, “সৌন্দর্যবর্ধনের চেষ্টাও কি মানসিক্ দুর্বলতা নহে' (রোর, ২১)? তিনি প্রশ্ন করেছেন, “আমরা শারীরিক বল, মানসিক সাহস. সব কাহার চরণে উৎসর্গ করিয়াছি" (রোর, ২৪)? ওলস্টোনক্র্যাফ্টের মতোই বলেছেন, শরীর যেমন জড়পিণ, মন ততোধিক জড়" (রোর, ২৫); বলেছেন, “আমাদের শয়ন-কক্ষে যেমন সূর্যালোক প্রবেশ করে না, তদ্রুপ মনোকক্ষেও জ্ঞানের আলোক প্রবেশ করিতে পায় না" (রোর, ২৬); বহুকাল হইতে নারী-হদয়ের উচ্চ বৃত্তিগুলি অঙ্কুরে বিনষ্ট হওয়ায়, নারীর অন্তর, বাহির, মস্তি, হৃদয় সবই “দাসী” হইয়া পড়িয়াছে' (রোর, ১৮)।
রোকেয়া ভিন্ডিকেশন পড়েন নি বলেই মনে হয়, পড়লে নারীর অধিকার সম্পর্কে হয়তো সম্পূর্ণ বইই লিখতেন; কিন্তু কেনো মিল ওলস্টোনক্র্যাফটের সাথে তার? এর এক চমৎকার উত্তর অন্য প্রসঙ্গে তিনি নিজেই দিয়েছেন: “বঙ্গদেশ, পাঞ্জাব, ডেকান (হায়দরাবাদ), বোম্বাই, ইংলন্ড- সব্ব্বত্র হইতে একই ভাবের উচ্ছ্বাস উথ্থিত হয় কেন? . . . ইহার কারণ সম্ভবতঃ ব্রিটাশ সাম্রাজ্যের অবলাবৃন্দের আধ্যাত্মিক একতা" (মতিচুর, নিবেদন)! এ যে প্রচণ্ড পরিহাস- 'ব্রিটীশ সাম্রাজ্যের অবলাবৃন্দের আধ্যাত্মিক একতা'- এটাও পুরুষতন্ত্রকেই পরিহাস। তিনি জানেন এটা আধ্যাত্মিক নয় সম্পূর্ণ বাস্তবের একতা, নারীর দাসীত্ব বিশ্বজনীন ব্যাপার। অলঙ্কারের যে-ব্যাখ্যা রোকেয়া (রোর, দিয়েছেন, তা নারীকে দাসী থেকে পশুর স্তরে নামিয়ে দিয়েছে:
আমাদের অতিপ্রিয় অলঙ্কারগুলি-এগুলি দাসত্বের নিদর্শন বিশেষ! এখন ইহা সৌন্দর্যবর্ধনের আশায় ব্যবহার করা হয় বটে; কিন্তু অনেক মান্যগণ্য ব্যক্তির মতে অলঙ্কার দাসত্বের নিদর্শন (originally badges of slavery) ছিল। তাই দেখা যায় কারাগারে বন্দীগণ পায় লৌহনির্মিত বেড়ী পরে, আমনর। (আদরের জিনিস বলিয়া) স্বর্ণরৌপ্যের বেড়ী অর্থাৎ “মল” পরি। উহাদের হাতকড় লোহ-নির্মিত, আমাদেব হাতকড়ি স্বর্ণ বা রৌপ্য-নির্মিত চুড়ি। কুকুরের গলে যে গলাবন্ধ (dog-collar) দেখি, উহারই অনুকরণে বোধ হয় আমাদের জড়োয়া চিক নির্মিত হইয়াছে! . . . গো-স্বামী বলদের নাসিকা বিদ্ধ করিয়া “নাকাদড়ী” পরায়, এদেশে আমাদের স্বামী আমাদের “নোলক” প্রাইয়াছেন! ! এ
পুরষতন্ত্র ও রোকেয়ার নারীবাদ ২৮৯
নোলক হইতেছে “স্বামী"ব অস্তিত্বববের (সধবার) নিদর্শন!
নারী শুধু দাসীই নয়, তারও নিম্নস্তরের; তিনি বলেছেন, আমি আজ ২২ বৎসর হইতে ভারতের সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট জীবের জন্য রোদন করিতেছি' (রোর, । তিনি দেখিয়েছেন নারী আসলে নিরাশ্রয়, কেননা তার নিজের বলে কিছু নেই; এমনকি নিজের ওপরও নেই নারীর নিজের অধিকার। নারীর সবখানেই থাকে পরাশ্রিত: “যখন আমরা রাজকন্যা, রাজবধুরূপে শ্রাসাদে থাকি, তখনও প্রভু-গৃহে থাকি। যখন. . . গোশালায় গিয়া আশ্রয় লই, -তখনও অভিভাবকের বাটিতে থাকি। . . . গৃহ বলিতে আমাদের একটিও পর্ণকুটীর নাই প্রাণী-জগতের কোন জন্তুই আমাদের মত নিরাশ্র নহে। সকলেরই গৃহ আছে- নাই কেবল আমাদের" (“গৃহ', রোর, ৭৪) মনে পড়ে উল্ফের এ রম অফ ওআদপ আৌন-এর কথা। পুরুষতন্ত্রকে আক্রমণের জন্যে তিনি নারীর অবস্থানটিকে শনাক্ত করে নিয়েছেন, এবং নারীর বিকৃত স্বভাবের পরিচয় দিয়েছেন।
পুরুষ" ধারণাটি রোকেয়ার ধারাবাহিক আক্রমণস্থল: তিনি উপহাস করেছেন পুরুষকে, তাকে গণ্য করেছেন পশুর থেকেও নিকৃষ্ট, আদমেব কাল থেকেই পুরুষকে দেখিয়েছেন নির্বোধরূপে। পুরুষ তার চোখে প্রতারক আর পীড়নকারী। প্রাচীন কাল থেকে বিশ্বজুড়ে চ'লে এসেছে নারীবিদ্বেষের যে-ধারাটি, রোকেয়া একা যেনো তাকে প্রতিরোধ করতে চেয়েছেন প্রচণ্ড পুরুষবিদ্বেষের সাহায্যে। পুরুষ তার নিরন্তর আক্রমণলক্ষ্য, কেননা পুরুষ নারীকে পরিণত করেছে দাসীতে, পুরুষ কেড়ে নিয়েছে নারীর স্বাধিকার ও স্বাধীনতা; কিন্তু তিনি নারীর সাম্য চেয়েছেন তার ধিকৃত পুরুষের সাথেই। তার পুরুষবিছেষ ও পুরুষের সাথে সাম্য লাভের দাবি এমনভাবে প্রকাশ পেয়েছে যে ফ্রয়েড বা ফ্রয়েডীয়রা তাকে পেলে খুব সু” বোধ করতেন; তারা তাকে শনাক্ত করতেন এক পুংঈর্ষা-শিশ্নাসূয়াগ্রস্ত নারীরূপে; কিন্তু তিনি তাদের যে-উত্তর দিতেন, তাতে অনেক আগেই ভেঙে পড়তো ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞানের কুসংস্কারসৌধ। তিনি পুরুষকে বলেছেন, “নরাকারে পিশাচ" (“গৃহ", রোর, ৭৩); বলেছেন, “ডাকাতী, জুয়াচুরি, পরস্বাপহরণ, পঞ্চ “মকার' আদি কোন্ পাপের লাইসেন্স তাহাদের নাই' (পদ্ধরাগ: রোর, বাঙালি পুরুষকে পরিহাস করে বলেছেন, "ভারতের পুরুষসমাজে বাঙ্গালী পুরুষিকা' ("নিরীহ বাঙ্গালী", রোর, ৩২)! পদ্ররাগ-এর সকিনা লতিফকে বিদ্রুপ করে বলেছে, 'খোদাতালার সৃষ্টিজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ জীব পুরুষ হইয়াছেন, ইহা অপেক্ষা আর কি বাঞ্ছনীয়' (রোর, এক বাক্যে তিনি কাপিয়ে দিয়েছেন পুরুষ ও তার সুষ্টাকে। পুরুষকে বলেছেন প্রতারক: “বহুকাল হইতে পুরুষ নারীকে প্রতারণা করিয়া আসিতেছে, আর নারী কেবল নীরবে সহ্য করিয়া আসিতেছে' (প্র, । বলেছেন, “কুকুরজাতি পুরুষাপেক্ষা অধিক বিশ্বাসযোগ্য (“ডেলিশিয়া- হত্যা", রো", ! : “যদি স্বার্থপরতা, ধূর্ততা ও কপটাচারকে সদৃঙুণ বলা যায়, তবে অবশ্য পুরুষজাতি কুকুরের তুলনায় শ্রেষ্ঠ' (রোর, ! পুরু তার চোখে অলস, বলেছেন: 'অলসেরা অতিশয় বাকপটু হয়” (“সুলতানার স্ব্রী', রোর, ।
২৯০ নারী
রোকেয়া তার আদর্শ রাষ্ট্রে পুরুষদের রেখেছেন, তাদের সম্পূর্ণ বহিষ্কার করেন নি; হয়তো তিনি ভেবেছেন পুরুষদের অন্তত একটি উপযোগিতা রয়েছে; কিন্তু সাম্প্রতিক প্রজননবিজ্ঞানের কথা যদি তিনি কল্পনা করতে পারতেন, ভাবতে পারতেন যদি কোনো 'সাহসী নতুন বিশ্ব'-এর কথা, তাহলে হয়তো তিনি পুরুষ প্রজাতিটিকেই বাতিল করে দিতেন। তিনি আদর্শ রাষ্ট্রে পুরুষ রেখেছেন, কিন্তু তাদের বন্দী করেছেন অবরোধে। নারীস্থানে রাস্তায় কেনো পুরুষ নেই, জানতে চায় সুলতানা। সারা তাকে জানায়, 'এ দেশে পুরুষজাতি গৃহাভ্যন্তরে অবরুদ্ধ থাকে (“সুলতানার স্ব", রোর, ; এতে পরম তৃপ্তি পেয়েছে সুলতানা: 'আমি প্রাণে বড আরাম পাইলাম; -পৃথিবীতে অন্ততঃ এমন একটি দেশও আছে, যেখানে পুরুষজাতি অন্তঃপুরে আবদ্ধ থাকে (রোর, ! তাদের জন্যে তিনি তৈরি করেছেন “জেনানা'র প্রতিরূপ “মর্দানা”। সেখানকার ভাষা বিপরীত ধরনের লিঙ্গবাদী, বাঙলায় “নারীভাবাপন্ন' বলতে যা বোঝায়, নারীস্থানে তা বোঝায “পুরুষভাবাপন্ন* শব্দে, যার অর্থ “পুরুষের মত ভীরু ও লজ্জানম্র' (রোর, । তার কাছে পুরুষ বন্য জন্তু, বদ্ধ পাগল; তাই নারী “নিরাপদ নহে, -যতদিন পুরুষজাতি বাহিরে থাকে" (রোর, ! সারা বলেছে, “তাহারা (পুরুষেরা) কোন ভাল কাজের উপযুক্ত নহে" (রোর, । তিনি পুরুষদের নিয়োগ করেছেন নিম্নপদ ও পেশায়: “তাহারা (পুরুষেরা) কেরানী মুটে মজুরের কাজ করিয়া থাকেন" (রোর, । নারীস্থান যে কল্যাণময়, তার কারণ পুরুষ-শয়তানেরা সেখানে অবরুদ্ধ; সুলতানা বলেছে, “আপনারা শ্বয়ং শয়তানকেই শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়াছেন, আর দেশে শয়তানী থাকিবে কিরূপে' (রোর. । রোকেয়া চান না যে তার একটি তাঁরও ব্যর্থ হোক; তাই তিনি পাদটীকায় 'শয়তানকে' কথাটি ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন “পুরুষ জাতিকে" বলে।
কিন্তু রোকেয়া নারীর জন্যে চেয়েছেন অপদার্থ নির্বোধ দুশ্চরিত্র পাপিষ্ঠ শয়তান পাশবিক পুরুষেরই সমকক্ষতা। এটা কোনো শিশ্নাসুয়াগ্রস্ততা বা পুংগুটেষা নয়, এটা একটি হারানো শিশ্ন ফিরে পাওয়ার ফ্য়েডীয় রোগ নয়; এটা নারীর পূর্ণ আধিকার লাভ। তিনি পুরুষকে ঈর্ধা করেন নি, ঈর্ধা করেছেন পুরুষের স্বাধীনতা ও অধিকারকে; বলেছেন, “একই সঙ্গে সকলে স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হও. . . । স্বাধীনতা অর্থে পুরুষের ন্যায় উন্নত অবস্থা বুঝিতে হইবে। . . . পুঞ্ষের সমকক্ষতা লাভের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয়, তাহাই করিব" (শ্ত্রীজাতির অবনতি", রোর, ২৯)। পুরুষের সাথে সমকক্ষতার ব্যাপারটি তিনি ব্যাখ্যা করে দিয়ে কোনো ফ্য়েডীয় অপবিজ্ঞানের অপব্যাখ্যার সম্ভাবনা নষ্ট করে দিয়েছেন। বলেছেন, “আমাদের উন্নতির ভাব বুঝাইবার জন্য পুরুষের সমকক্ষতা বলিতেছি। নচেৎ কিসের সহিত এ উন্নতির তুলন! দিব! পুরুষের অবস্থাই আমাদের উন্নতির আদর্শ' (রোর, পাদটাকা, ২৯)। রোকেয়া চেয়েছেন পুরুষের সাথে সম্পূর্ণ সাম্য; তার কাছে নারীপুরুষ লিঙ্গগতভাবে ভিন্ন, কিন্তু উভয়ই মানুষ, এবং উভয়ের জীবনেরই লক্ষ্য ও সার্থকতা এক: “পুরুষদের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে- একই। তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা, আমাদের লক্ষ্যও
তাহাই' (রোর, ৩১)। তিনি নারীর অধীনতার মূল কারণ হিশেবে, প্রাচীন থেকে আধুনিক কালের অন্যান্যের মতোই, ধরেছেন শারীরিক দুর্বলতাকে: শারীরিক দুর্বলতারশতঃ নারীজাতি অপর জাতির সাহায্যে নির্ভর করে। তাই বলিয়া পুরুষ “প্রভু” হইতে পারে না” (“অর্ধাঙ্গী', রোর, ৪৩)। “অপর জাতি কথাটি লক্ষ্য করার মতো; পুরুষ যেনো একটি ভিন্ন ও বিরোধী জাতি নারীর থেকে। তিনি শারীরিক শক্তির উপকারিতা বুঝেছেন, তিস্তব তাকে শ্রেষ্ঠত্রে মানদণ্ড বলে স্ব'কার করেন নি; তার কাছে শ্রেষ্ঠত্রে মানদণ্ড মানসিক শক্তি। তিনি নারীর জন্যে চেয়েছেন মানসিক শক্তি, যা অর্জনের উপায় হচ্ছে শিক্ষা: “আমরা পুরুষের ন্যায় সুশিক্ষা অনুশীলনের সম্যক সুবিধা না পাওয়ায় পশ্চাতে পড়িয়া আছি। সমান সুবিধা পাইলে আমরাও কি শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিতে পারিতাম নাঃ আশৈশব আত্মনিন্দা শুনিতেছি, তাই এখন আমরা অন্ধভাবে পুরুষের শ্রেষ্ঠতা স্বীকার করি এবং নিজেকে অতি তুচ্ছ মনে করি" (রোর, ।
পুরুষতন্ত্রের তৈরি এক এশী ভাবাদর্শ স্বামী, যা পুরুষকে উত্তাঁর্ণ করেছে নারীর বিধাতার স্তরে। হিন্দু নারীরা স্বামীকে পূজো করে, হিন্দু নারীর জন্যে স্বামী ছাড়া আর কোনো প্রভু নেই; মুসলমান নারীর বেহেস্তও স্বামীর পদতলে, এবং হাদিসে আছে- আল্লা ছাড়া আর কাউকে সেজদা করার বিধান যদি থাকতো, তাহলে নারীকে নির্দেশ দেযা হতো স্বামীকে সেজদা করার। বাঙলায় “স্বামী” শব্দ ও ধারণাটি এখন অশ্রীল হয়ে উঠেছে, এটা এখন পরিহার্য শব্দগুলোর একটি; রোকেয়া অনেক আগেই বাতিল করেছিলেন “স্বামী' ধারণাটি। এটিকে বাতিল করার অর্থ হচ্ছে পুরুষতন্ত্রের একটি বড়ো মন্দিব ধ্বংস করা। রোকেয়া বলেছেন, “তাহারা ভূত্বামী, গৃহস্বামী প্রভৃতি হইতে হইতে ক্রমে আমাদের স্বামী হইয়া উঠিলেন। আর আমরা ক্রমশঃ তাহাদের গৃহপালিত পণুপক্ষীর অন্তর্গভ অথবা মূল্যবান্ সম্পত্তি বিশেষ হই পড়িয়াছি' (রো'র, ! তিনি দাবি করেছেন নারী দাসীত করে, তবে পুরুষও প্রেমবশত একধ্রনের দাসত্ব করে, কিন্তু পুরুষকে “দাস' বলা হয় না। তিনি প্রশ্ন করেছেন, “সমাজ তবু বিবাহিত পুরুষকে “প্রেম-দাস” না বলিয়া স্বামী বলে কেন' (রোর, পাদটীকা, ১৯)? “স্বামী” তার কাছে অত্যন্ত আপত্তিকর শব্দ; প্রশ্ন করেছেন, 'শ্রীমতীগণ জীবনের চিরসঙ্গী শ্রীমানদিগকে “স্বামী” ভাববেন কেন' (রোর, ৪৩)? তিনি এ-শব্দটি বাতিল করে প্রস্তার করেছেন একটি নতুন শব্দ: 'আশা করি এখন “স্বামী” স্থলে “অর্ধাঙ্গ” শব্দ প্রচলিত হইবে' (রোর, 8৪)।
রোকেয়া প্রথাগত হুকবীধা নারীভাবমূর্তি বা “স্টেরিঅটাইপ' স্বীকার করেন নি; তিনি ওই ভাবমূর্তির বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে তা বর্জন করেছেন। নারী হবে সীতা বা রহিমা, হবে মর্ষকামিতার উদাহরণ, পুরুষতন্ত্র তৈরি করেছে এমন ধারণা; তিনি তা বাতিল করেছেন। রোকেয়া বলেছেন, “এ দেশের গ্রন্থৃকারেরা নারী চরিত্রকে নানা গুণ ভূষায় সজ্জিত করেন বটে; বেশীর ভাগে অবলা হৃদয়ের সহিষ্কুতা বর্ণনা করা হয় (কোরণ রমণী পাষাণ প্রায় সহিষ্ঞ্র না হইলে তাহার প্রতি অত্যাচারের সুবিধা হইত না যে!)' (“ডেলিশিয়া-হত্যা', রোর, । পুরুষতন্ত্র নারীকে করে তুলেছে মর্ষকামিতার
২৯২ নারী
উদাহরণ, সে-নারীই পুরুষতন্ত্রের প্রশংসিত যে সহ্য করে অসহ্য পীড়ন; কিন্তু রোকেয়া তা মানেন নি। তিনি (রোর, বলেছেন: নারীকে শিক্ষা দিবার জন্য গুরুলোকে সীতা দেবীকে আদর্শরূপে দেখাইয়া থাকেন। . . . পুতুলের সঙ্গে কোন বালকের যে-সন্বন্ধ, সীতার সঙ্গে রামের সন্বন্ধও প্রায় সেইরূপ। . . . রামচন্ত্র “স্বামিত্ের” ষোল আনা পরিচয় দিয়াছেন! ! আর সীতা? -কেবল প্রভূ রামের সহিত বনযাত্রার ইচ্ছা প্রকাশ কবিয়া দেখাইয়াছেন যে, তাহারও ইচ্ছা প্রকাশের শক্তি আছে।
তিনি সীতার এক প্রতিরূপ তৈরি করেছেন পদ্ররাগ-এ, যার নাম সিদ্দিকা। রামায়ণ-এ রাম তাগ করেছিলো সীতাকে, পদ্ধরাগ-এ নেয়া হয় তার প্রতিশোধ: সিদ্দিকা ত্যাগ করে স্বামীকে। সমগ্র নারীসমাজের পক্ষে প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে কয়েক হাজার বছরের প্রস্তুতি নেয় একটি নারী, তাকে সৃষ্টি করেন রোকেয়া, তার নাম সিদ্দিকা। রোকেয়ার পদন্থরাগ অসাধারণ উপন্যাস নয়, কিন্তু এতেই ঘটে এক অসাধারণ ঘটনা: এই প্রথম পূর্বদেশের এক নারী পরিত্যাগ করে পুরুষকে, তার স্বামীকে। সিদ্দিকা বলেছে (রোর,
আমি যদি উপেক্ষা লাঞ্কনার কথা ভুলিয়া গিয়া সংসারের নিকট ধরা দিই, তাহা হইলে ভবিষ্যতে এই
আদর্শ দেখাইয়া দিদিমা ঠাকু'মাগণ উদীয়মানা তেজস্বিনী রমণীদের বলিবেন, “আর রাখ তোমাব পণ
ও তেজ- এ দেখ না, এতখানি বিড়ম্বনাব পরে জয়নব আবার স্বামী-সেবাই জীবনের সার
করিয়াছিল।” আর পুরুষ-সমাজ সগর্বে বলিবেন, “নারী যতই উচ্চশিক্ষিতা, উন্নতমনা. তেজস্বিনী,
মহীয়সী, গবীয়সী হউক না কেন, — ঘুরিয়া ফিরিযা আবাব আমাদের পদতলে পড়িবেই পড়িবে!”
আমি সমাজকে দেখাইতে চাই, একমাত্র বিবাহিত জীবনই নারী-জন্মের চরম লক্ষ্য নহে: সংসারধর্মই
জীবনের সারধর্ম নহে। পক্ষান্তরে আমার এই আত্মত্যাগ ভবিষ্যতে নারীজাতির কল্যাণের কারণ
হইবে বলিয়া আশা করি!
সিদ্দিকা পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে তার অতীতের, বর্তমানের, ভবিষ্যতের সমস্ত নারীর পক্ষে। সে দেখিয়েছে “একমাত্র বিবাহিত জীবনই নারী-জন্মের চরম লক্ষ্য নহে; সংসারধর্মই জীবনের সারধর্ম নহে। ' পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এমন স্পষ্ট উচ্চারণ ও পদক্ষেপ সমগ্র বাঙলা সাহিত্যে দুর্লভ; সিদ্দিকা শুধু মনে করিয়ে দেয় ইবসেনের নোরাকে। লতিফ জানতে চেয়েছে, “সিদ্দিকা, স্পষ্ট বল, তুমি আমার গৃহিণী হইবে কি না? " সিদ্দিকা বলেছে, না। তুমি তোমার পথ দেখ, আমি আমারি পথ দেখি' (রোর, । সিদ্দিকা নিষ্ঠুর নয়, সে যেমন বিবাহবিচ্ছেদ চায় নি, তেমনই চায় নি স্বামীর পায়ের নিচে বেহেস্তও। পিদ্দিকা হয়ে উঠেছে বিশ্বপুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে নারীতন্ত্রের কণ্ঠস্বর, এবং সে শুধু কথা বলে নি, বাস্তবায়িত করেছে নিজের লক্ষ্য। সমগ্র নারীজাতির দায়ভার সে তুলে নিয়েছে নিজের কাধে। রোকেয়া কোনো মধুর মোহ জাগিয়ে রাখতে চান নি, পাঠকের মনে এমন কোনো রোম্যানটিক ভাববিলাস লালনের সুযোগ রাখেন নি যে পরে কোনো দিন মিলন ঘটবে সিদ্দিকা আর লতিফের। উপন্যাসের শেমবাক্য দুটি যেমন মানবিকতায় কোমল, তেমনই বিদ্রোহে নির্মম: 'লতীফ সিদ্দিকার হাত ধরিয়া গাড়ী হইতে নামাইলেন। এই তাহাদের শেষ দেখা' (রোদন, । সিদ্দিকা নোরার থেকেও কঠোর।
নারীর পুরুষাধীনতার দুটি প্রধান কারণ: শরীর ও অর্থনীতি। রোকেয়া বিশ্বাস করেছেন পুরুষ নারীকে প্রথমে শারীরিক শক্তিতে পরাভূত করেই বন্দী করেছে, শেষে নারীকে আর্থনীতিক এলাকা থেকে বের করে দিয়ে করে তুলেছে অসহায়। শারীরিক শক্তিতে নারী কখনো পুরুষের সমান হবে না বলে তিনি বিশ্বাস করেছেন, তার দরকার আছে বলেও মনে করেন নি। কিন্তু যদি প্রতিষ্ঠিত হয় আর্থনীতিক সাম্য, তাহলে ঘুচবে নারীর পুরুষাধীন্তা। তাই তিনি দাবি করেছেন নারীর আর্থ স্বাধিকার। তিনি বলেছেন, 'পুরুষের উপার্জিত ধন ভোগ করে বলিয়া নারী তাহার প্রভূত সহ্য করে। কথাটা অনেক পরিমাণে ঠিক। বোধ হয়, স্ত্রীজাতি প্রথমে শারীরিক শ্রমে অক্ষম হইয়া পরের উপার্জিত ধনভোগে বাধ্য হয় এবং সেইজন্য তাহাকে মস্তক নত করিতে হয়' (রোর, ২৮)। নারীর মুক্তির উপায় আর্থ স্বনির্ভরতা লাভ: “দি এখন স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়. তবে তাহাই করিব' (রোর, । তিনি জানেন যে নারী কম পরিশ্রম করে না, তবে তার পরিশ্রমের কোনো আর্থ মূল্য নেই। স্বামীর সংসারে নারী বেতনহীন দাসী। তিনি বলেছেন, “উপার্জন করিব না কেন? . . . যে পরিশ্রম আমরা “স্বামী”র গৃহকার্ে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না' (রোর, ৩০)? কোনো পেশাই তার কাছে উপেক্ষণীয় নয়, বলেছেন, “আমরা যদি রাজকীয় কার্ষক্ষেত্রে প্রবেশ করিতে না পারি, তবে কৃষিক্ষেত্রে প্রবেশ করিব। ভারতে বর দুর্লভ হইয়াছে বলিয়া কন্যাদায়ে কাদিয়া মরি কেন' (রোর, ৩০)? তান উচ্চারণ করেছেন নারীমুক্তির এক চরম বাণী (রেোঃর, ৩০):
কণ্যাগুলিকে সুশিক্ষিতা করিয়া কার্ষক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও, নিজেব অন্নবন্ত্র উপার্জন করুক।
কিন্তু আজো কন্যাগুলোকে সুশিক্ষিত করা হয় নি; আর যাদের করা হয়েছে তারা কর্মক্ষেত্রের স্বাধীনতার থেকে পছন্দ করে শুভবিবাহে* শেকল।
পুরুষতন্ত্রকে বহুমুখি আক্রমণে বিপর্যস্ত করে রোকেয়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার নারীতন্ত্! নারীতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে তিনি সৃষ্টি করেছেন নারীস্থান, এবং পুরুষকে অবরুদ্ধ করেছেন গৃহের ভেতরে (পুরুষের প্রয়োজন কেনো তা তিনি স্পষ্ট করে বলেন নি), বদলে দিয়েছেন পুংলিঙ্গবাদী ভাষার স্বভাব, বার বার লিখেছেন ইউটোপিয়া ও আ্যান্টি-ইউটোপিয়া (বা ডিস্টোপিয়া)। নারীতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সার্বিক উদ্যোগ নিয়েছেন রোকেয়া ( বা “সুলতানার স্বব্রী'-এ। ইউটোপীয় ভাবনাকল্পনার মূলে থাকে বিশেষ ধরনের সমাজ, ওই বিকৃত সমাজের চরম সংশোধন সম্পন্ন করা হয় ইউটোপিয়ায়। অরওয়েল বলেছেন, ন্যায়সঙ্গত সমাজের স্বর্ী মানুষের কল্পনাকে যুগে যুগে দুর্মরভাবে আলোড়িত করেছে, তাকে আমরা স্বর্গরাজ্য বলতে পারি বা বলতে পারি শ্রেণীহীন সমাজ, বা তাকে মনে করতে পারি অতীতের কোনো স্বর্ণযুগ, যা থেকে অধঃপতিত হয়েছি আমরা * [দ্র কৃষাণ কুমার ( ২))। ইউটোপিয়ার উদ্ভববিকাশ ঘটেছে পশ্চিমে, পূর্বাঞ্চলে কেউ ইউটো পিয়া লেখেন নি; এর একমাত্র ব্যতিক্রম রোকেয়া। অনেকে মনে করেন পশ্চিমে যতো ইউটোপিয়া লেখা হয়েছে, তার সবই কোনো-না-কোনোরপে প্লাতোর রিপাবলিক থেকে উৎসারিত, ওগুলো রিপাবলিক-এর
২৯৪ নারী
পাদটীকা। তবে প্রাতোর অনেক আগেই ইউটোপীয় ভাবনার বিকাশ ঘটেছে ইউরোপে, যার পরিচয় মেলে খিপু সপ্তম শতকের হেসিঅদের ওঅকর্স ত্যান্ড ডেইজ-এ। তিনিই প্রথম কল্পনা করেছিলেন এক স্বর্ণযুগের, যখন মানুষেরা বাস করতো দেবতার মতো, যাদের মন মুক্ত ছিলো সমস্ত দুঃখকষ্ট থেকে, যখন কোনো কাজ ছিলো না, যখন গাছে গাছে ধরে থাকতো সুমিষ্ট ফল। অসংখ্য ইউটোপিয়া লেখা হয়েছে, তবে সাহিত্যের এ-আঙ্গিকটি নাম পেয়েছে টমাস মুরের ইউটোপিয়া ( থেকে। মুরের বই থেকে ইউটোপিয়ার চরিত্র বদলে যায়; তিনি একটি শুদ্ধ সমাজের বিধান না দিয়ে তা বাস্তবায়িত করেন তার বইতে। ইউটোপিয়ায় চিত্রিত হয় উৎকৃষ্টতম সমাজব্যবস্থা, তাকে বিমূর্ত না রেখে করে তোলা হয় মূর্ত। ইউটোপিয়া বর্তমানে প্রচলিত কোনো সমাজের বিদুপাত্বক রূপ নয়, তাতে চিত্রিত হয় একটি সম্পূর্ণ সমাজ। আ্যান্টি-ইউটোপিয়া বা ডিস্টোপিয়ায় চিত্রিত হয় নিকৃষ্টতম সমাজ
রোকেয়া তার নারীতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে লিখেছেন ইউটোপিয়া ও ডিস্টোপিয়া দু-ই। রোকেয়ার “সৌরজগৎ সংলাপটিতে আভাস পাওয়া যায় ইউটোপিয়ার: ওই পরিবারে একটি মাত্র পুরুষ. আর সবাই নারী। ওই পরিবারে রয়েছে গৃহিণী ও নটি কন্যা, কোনো ছেলে নেই। সেখানে পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধি হয়ে এসেছে জাফর আলী। বিজ্ঞানের প্রতি রোকেয়ার আকর্ষণ ছিলো, ওই পরিবারের মেয়েবাও বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট; তাদের তিনজন ভর্তি হতে চায় 'টেকনিকাল স্কুলে। রোকেয়াই বোধ হয় এ-অঞ্চলে প্রথম ভাষায় লিঙ্গবাদ ব্যাপারটি উপলব্ধি করেছিলেন। গওহর জাফরকে তিরস্কার করে, “ইহা তোমার womanishness (স্ত্রীভাব)। ' নূরজাহা এতে প্রবল আপত্তি জানিয়ে বলে: “womanish” শব্দে আমি আপত্তি করি! 'ভীরুতা', 'কাপুরুষতা" বল না কেন' (রোর, পশ্চিমের নারীবাদীদের ভাষিক লিঙ্গবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অনেক আগে রোকেয়া এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন: ভাষা থেকে মুছে দিয়েছিলেন লিঙ্গবাদ। নুরজাহা প্রধান শিক্ষযিত্রীর প্রশংসা করে বলে, “উক্ত শিক্ষয়িত্রীটি অতিশয় জদ্রলোক' (রোর, । ভাষা থেকে লিঙ্গবাদ কমছে, কিন্তু শিক্ষায়ত্রীকে “ভদ্রলোক' বলার অবস্থা আজো আসে নি, তবে রোকেয়া ১৯০৫ সালেই “ভদ্রমহিলা বাদ দিয়ে ব্যবহার করেছিলেন 'জদ্রলোক"। শুধু লিঙ্গবাদ মুছে দিয়েই তিনি তৃপ্তি পান নি, তিনি শুরু করেছিলেন বিপরীত ধরনের লিঙ্গবাদ। “সুলতানার স্বনী'-এ সারা সুলতানাকে বলে, “আপনি অনেকটা পুরুষভাবাপন্ন। ' রোকেয়া “পুরুষভাবাপন্ন' শব্দের দেন নতুন অর্থ: 'পুরুষের মত ভীরু ও লজ্জান্ম্র' (রোর, । বিয়ের ভাষায় প্রকাশ পায় পুরুষের সক্রিয়তা আর নারীর নিস্ক্রিয়তা, রোকেয়া ওই ভাষারীতিকেও উল্টে দিয়েছেন। ডেলিশিয়ার বিয়েকে তিনি বর্ণনা করেছেন, “সচরাচর বলা হয়, “বর কন্যাকে বিবাহ করিল", কিন্তু এ ক্ষেত্রে বলিতে হইবে, “কন্যা বরকে বিবাহ করিলেন। কেননা ডেলিশিয়াই মিঃ কারলীঅনের অন্নবস্ত্র ইত্যাদি যোগাইবার ভার লইলেন' (রোর, !
রোকেয়া প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন পুরুষতন্ত্রের বদলে নারীতন্ত্, পুরুষাধিপত্যের স্থলে নারী-আধিপত্য। তার ডিস্টোপিয়াধর্মী রূপকথাগুলোতে সমাজের দুরবস্থার জন্যে
সম্পূর্ণরূপে দায়ী করেছেন তিনি পুরুষদের, যারা তার চোখে সমস্ত দোষের সমষ্টি। তারা অপদার্থ, দায়িতৃহীন, অবিবেচক, মিথ্যাবাদী, এবং সমাজরাষ্ট্র পরিচালনার অযোগ্য। তার 'জ্ঞানফল'-এ দেশটির নাম কনকদ্বীপ হলেও সেটি বসবাসের অযোগ্য: পুরুষেরা সেটি নষ্ট করেছে। রোকেয়া বাইবেলি স্বর্গচ্যুতির উপাখ্যানটি ব্যাখ্যা করেছেন নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে. এবং ওই পতনই তার কাছে গ্রহণযোগ্য, নির্বোধের স্বর্গ গ্রহণযোগ্য নয়। নারী যে আগে নিষিদ্ধ ফল খেয়েছিলো একে তিনি নিয়েছেন নারীর গৌরব হিশেবে, কেননা নারীরই রয়েছে জ্ঞানের প্রতি সহজাত আকর্ষণ: “ফল ভক্ষণ করিবামাত্র হাভার জ্ঞানচক্ষু উন্মিলিত হইল। . . . এই সময় তথায় আদম গিয়া উপস্থিত হইলেন। হাভা তাহাকে স্বীয় হস্তস্থিত ফল খাইতে অনুরোধ করিলেন। পঙ্টীর উচ্ছিষ্ট জ্ঞানফল ভক্ষণে আদমেরও জ্ঞানোদয় হইল' (রোর, । রোকেয়ার বর্ণনায় আদম নির্বোধ পুরুষ, জ্ঞানের প্রতি তার কোনো আকর্ষণ নেই। 'পত্রীর উচ্ছিষ্ট জ্ঞানফল ভক্ষণে' কথাটি তাৎপর্যপূর্ণ; রোকেয়া বোঝাতে চান পুরু জ্ঞানী নারীর উচ্ছিষ্ট জ্ঞানে। আদম শুধু নির্বোধ, উচ্ছিষ্টভোজীই নয়, সে অম্বানিবকও। রোকেয়ার হাওয়া তার কন্যাদের বর দিয়ে দীর্ঘায়ু করেছে, কিন্তু আদম- “তাহার ইচ্ছাশক্তি তাদৃশ প্রবল না থাকায়' পুত্রদের কোনো বর দেয় নি। ওই দ্বীপের পতন ঘটেছিলো পুরুষেরা "নারীর আহত জ্ঞানে নারীকেই বঞ্চিত করিয়ছিল' (রোর, ১৮৮) বলে। 'মুক্তিফল'ও আরেক
ট-ইউটোপিয়া, ভোল। পুরেরও পতন ঘটে নারীকে অধিকারহীন করে রাখার ফলে। সেখানে নারীর অধিকারের মাত্রা প্রকাশ পেয়েছে ভাই প্রবীণের উক্তিতে: “না বোন, তোমাকে কৈলাস পর্যন্ত যাইতে দিতে পারি না। তৃমি আমার সহিত গল্প কর, উপন্যাস পাঠ কর, আমার সঙ্গে পারমার্থিক গান গাও-এই পর্যন্তই যথেষ্ট, ইহা অপেক্ষা অধিক স্বাধীনতা বা সমকক্ষতা দিতে পারি না' (রোর, । নারীকে দেয়া হয়েছে গল্প করার. উপন্যাস পড়ার, আর 'পারমার্থিক গান গাওয়ার" স্বাধীনতা; ভোলাপুর যে ভারতবর্ষ তাতে কোনো সন্দেহ নেই!
পুরুষের সৃষ্ট আ্যান্টি-ইউটোপিয়ার বর্ণনা রোকেয়াকে তৃপ্তি দিতে পারে নি, কেননা সেখানকার নষ্ট সমাজে নারীও অসুস্থ। তাই রোকেয়া পুরুষের সমাজকেই অস্বীকার করে প্রতিষ্ঠা করেন তার নারীস্থান। রোকেয়ার পক্ষে অসম্ভব ছিলো বা “সুলতানার স্বপ্না" না লেখা; কেননা নারীতন্ত্র বা নারী-আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত দেখা ছিলো তার জন্যে অনিবার্ধ। এজন্যে তাকেই লিখতে হয় বাঙলা ভাষায় প্রথম ও শেষ ইউটোপিয়া; সম্ভবত কোনো এশীয় ভাষায়ও এটিই একমাত্র ইউটোপিয়া। পচিশ বছরের এক আমূল নারীবাদী তরুণীর নারী-আধিপত্য প্রতিষ্ঠার স্বরী বাস্তবায়িত হয়েছে 'সুলতানার স্বপ্রী'-এ, যা কোমলমধুর কিন্তু প্রতিশোধস্পৃহায় ক্ষমাহীন নির্মম। রোকেয়া ব্যাপকভাবে নারীস্থানেব সমাজজীবন উপস্থাপিত করেন নি, কিন্তু সম্পূর্ণরূপে অবরুদ্ধ করেছেন পুরুষদের। পুরুষের ওই দেশে কী প্রয়োজন, তা তিনি বলেন নি; তবে প্রতিশোধ্গ্রহণের জন্যে পুরুষদের অত্যন্ত দরকার ছিলো সেখানে। রোকেয়া পুরুষজাতিটিকেই বাদ দিতে পারতেন ওই সমাজ থেকে, কিন্তু তিনি দেন নি; তিনি হয়তো মনে করেছেন সামাজিকভাবে পুরুষ দরকার, তবে তার চেয়ে বেশি দরকার
২৯৬ নারী
পুরুষগাড়নের জন্যে। রোকেয়ার “সুলতানার স্বপ্না বৈজ্ঞানিক ইউটোপিয়া, তিনি কোনো আদিম স্বণযুগ সৃষ্টি করেন নি, সৃষ্টি করেছেন ভবিষ্যতের বিজ্ঞাননির্ভর সমাজ, কেননা বিজ্ঞানই শুধু মুক্তি দিতে পারে নারীকে। রোকেয়া নারীর শারীরিক দুর্বলতা সম্পর্কে ছিলেন সচেতন, তাই কোনো আদিম আর্কেডিয়া তার কাজে আসতো না: তার দরকার ছিলো এমন শক্তি, যা শারীরিক শক্তিকে সহজেই পরাভূত করে। বিজ্ঞান সে-শক্তি, তাই রোকেয়ার নারীস্থান বিজ্ঞাননির্ভর। রোকেয়ার নারীস্থান তার স্বদেশের বিপরীত: 'ভারতে পুরুষজাতি প্রভূ, — তাহারা সমুদয় সুখ-সুবিধা ও প্রভুত্ব আপনাদের জন্য হস্তগত কনিয়া ফেলিয়াছে, আর সরলা অবলাকে অন্তঃপুর রূপ পিঞ্জরে রাখিয়াছে' (রোর, ! তিনি তার নারীস্থান থেকে মুছে ফেলেছেন ভারতবর্ষের সমস্ত সামাজিক ব্যাধি। 'সুলতানার স্বপ্ী' রোকেয়ার নারীতন্ত্ের চূড়ান্ত বিজয়ের ও পুরুষতন্ত্রের চূড়ান্ত পরাজয়ের কাহিনী।
যে-পুরুষতন্ত্র ও পিতৃতন্ত্রররের বিরুদ্ধে ধারাবহিক লড়াই করেছেন রোকেয়া, তার সাথে কি তিনি কিছুটা সন্ধি করেছিলেন কখনো কখনো? পিতৃতন্ত্রররের সাথে সন্ধির কিছুটা পরিচয় রয়েছে তার রচনাবলিতে। পিতৃতন্ত্রররের বলগ্রয়োগসংস্থাটির সাথে, সম্ভবত বাধ্য হয়ে, তিনি সন্ধি করেছেন মাঝেমাবে: কিন্তু খুব বেশি ছাড় দেন নি সেটিকে। চবিবিশ বছর বয়সে তিনি প্রচণ্ড আক্রমণ করেছিলেন ধর্মকে, ওই আক্রমণের পরেও যে তিনি টিকে ছিলেন তার কাবণ তখন পরিবেশ ছিলো ভিন্ন; আজ হলে রাস্তায় তার লাশ পাওয়া যেতো, ব। তিনি নিন্দিত জীবন কাটাতে বাধ্য হতেন নির্বাসনে। তার ওপর নিশ্চয়ই পড়েছিলো মুসলমান পিতৃতন্ত্রররের প্রবল চাপ তিনি বুঝেছিলেন টিকে থাকতে হলে কিছুটা সন্ধি পাতিয়ে নিষ্টিয় করে দিতে হবে পিতৃতন্ত্রররের বলপ্রয়োগস স্থাটিকে। তিনি মাঝেমাঝে ধর্মকর্মের কথা বলেছেন, কিন্তু প্রথাগত ধর্মে তার অন্ধ আস্থা ছিলো না। তার নারীস্থানেও ধর্ম আছে: সেখানে 'ধর্মবিধান' হচ্ছে 'প্রেম ও সত্য', যা খুবই প্রথাবিবোধী। তিরিশোত্তর রোকেয়। ধর্মের কথা কিছু বলেছেন, এবং অবরোধবাসিনীদের ভয়াবহ জীবন আকার পাশাপাশি অবরোধের পক্ষেও বলেছেন কিছু কথা। শুনে স্তপ্তিত বোধ করি যখন অববোধবাসিনীর রোকেয়া বলেন, 'আমি অবরোধ প্রথার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হই নাই" ('অর্ধাঙ্গী', রোর, ৩৫)। নিশ্চয়ই বড়ো একটা চাপের মধ্যে পড়েছিলেন তিনি তখন।
পিতৃতন্ত্রররের সাথে বেশ কিছুটা মিটমাটের উদাহরণ 'বোরকা' প্রবন্ধটি। তিনি এতে যে শিকার হয়েছেন স্ববিরোধিতার, তা নিজেও বুঝেছেন; তাই আত্মসমর্থনের যে-চমৎকার প্রতিভা ছিলো তার. তা তিনি প্রযে! গ কবেছেন পুরোপুরি। তিনি বলেছেন, 'তাহারা প্রায়ই আমাকে “বোরকা” ছাড়িতে বলেন। বলি, উন্নতি জিনিসটা কি? তাহা কি কেবল বোরকার বাহিরেই থাকে? যদি তাই হয় তবে বুঝিবে যে জেলেনী, চামারনী, কি ডুমুনী প্রভৃতি স্ত্রীলোকেরা আমাদের অপেক্ষা অধিক উন্নতি লাভ করিয়াছে ('বোরকা', রোর, ৫৬)? বোরকা জিনিশটি কুৎসিত, মধ্যযুগীয় পিতৃত্রন্ এটি চাপিয়ে দিয়েছে নারীর ওপর, এটা তার বোঝার কথা; তবু তিনি এর পক্ষে কথা বলেছেন।
তিনি কি মনে করেছিলেন যে নারী উন্নতি করবে বোরকার ভেতরে থেকেই? তা কি হবে না নারীর জন্যে চরম গ্রানিকর? অবরোধপ্রথার উদ্ভব ঘটে নারী সম্পর্কে একটি অত্যন্ত আপত্তিকর ইসলামি ধারণা থেকে যে নারী হচ্ছে 'ফিৎনা"। ইসলামি বিশ্বাস হচ্ছে যে নারীর কাম প্রবল, তা নষ্ট করে দিতে পারে সমাজশৃঙ্খলা; তাই নারীকে রুদ্ধ করে রাখতে হবে অবরোধে। ইসলামি ধারণায় নারী মানসিক শক্তিতে দুবল, সে নিজেব কামকে বশে রাখতে পারে না; তাই নারীর কামের গ্রাস থেকে সমাজকে বাচানোর জন্যে নারীকে আটকে রাখতে হবে অবরোধে, তাকে ঢেকে দিতে হবে বোরকায়। রোকেয়া বোরকা মেনে নিয়েছেন, খুব অবজ্ঞা করেছেন “জেলেনী, চামারনী, ডুমুনী'কে, কেননা তিনি চেয়েছেন উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত নারীর কল্যাণ; এবং একটি কথা বুঝতে চান নি যে তার অবজ্ঞার 'জেলেনী, চামারনী, ডুমুনী'রা আসলেই অনেক উন্নতি করেছে অবরুদ্ধ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত নারীদের থেকে। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত নারীর! যেখানে অপদার্থ, 'জেলেনী, চামারনী, ডূমুনী'রা সেখানে অনেক মুক্ত। তিনি বলেছেন. 'আমাদের ত বিশ্বাস যে, অবরোধের সহিত উন্নতির বেশী বিরোধ নাই' (রোর, ৫৭)। “বেশী বিরোধ নাই' বলে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে অবরোধ ও উন্নতির মধ্যে বিরোধ রয়েছে, এবং তিনি বোরকার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ক্রমশ চ'লে গেছেন নিজেরই বিপক্ষে।
তিনি বলেছেন, 'অবরোধ-প্রথা স্বাভাবিক নহে — নৈতিক। . . . মানুষের “অস্বাভাবিক” সভ্যতার ফলেই অন্তঃপুরের সৃষ্টি” (রোর, ৫৭)। “ম্বাভাবিক' বলতে তিনি বুঝিয়েছেন অসভ্যতাকে, আর “অস্কাভাবিক' বলতে সভাতাকে; তিনি স্ভ্যতা ও অস্বাভাবিকতার পক্ষে, তাই অবরোধেরও পক্ষে। যদি তিনি মেনে নেন সভ্যতার সৃষ্টি অস্তঃপুরকে, তাহলে তাকে মেনে নিতে হয় অন্যান্য বিধানও। তিনি মতিকতার কথা বলেছেন, এ-নৈতিকতা! পুরুষতন্ত্রের নৈতিকতা: যে-পুরুবতন্ত্র মনে করে নারী ফিতনা বা বিশৃঙ্খলা। রোকেয়। কি নিজেকে ফিৎনা বলে স্বীকার করবেন? রোকেয়ার পক্ষে স্বাভাবিক ছিলো পুরুমকে বোরকা পরানোর প্রস্তার করা, যেমন করেছেন তিনি 'সুলতানার স্বধা'-এ, পুরুষকে ঢুকিয়েছেন অবরোধে। তিনি বোরকার পক্ষে একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন (রোর. ৫৮):
বেলওয়ে প্রাটফরমে দীড়াইয়। কোন সম্ত্ান্ত মহিলাই ইচ্ছা করেন না যে, তাহার প্রতি দর্শকবৃন্দ আকৃষ্ট হয়। সুতরাং এরূপ কুৎসিত জীব সাজিয়া দর্শকেব ঘৃণা উদ্রেক করিলে কোন ক্ষতি নাই। . . . রেলওয়ে ভ্রমণকালে সাধারণের দৃষ্টি ( ৮7৩) হইতে বক্ষা পাইবার জন্য ঘোমটা কিম্বা বোরকার দবকার হ্য।
না লোলুপ দর্শকের? যে-অপরাধ পুরুষের, তার জন্যে শাস্তি পাবেন মহিলা? তিনি 'কুৎসিত জীব সাজিয়া দর্শকের ঘৃণা উদ্রেক" করে রক্ষা করবেন পর্দা? রোকেয়া বলেছেন, আর তিনিই চাচ্ছেন নারী বোরকা পরে সেখানে পুরুষের মনে ঘৃণা জাগিয়ে
২৯৮ নারী
আত্মরক্ষা করবে। তিনি অবরোধের পক্ষে দিয়েছেন সভ্যতার দোহাই: “সকল সভ্য জাতিদেরই কোন-না-কোন রূপ অবরোধ-প্রথা আছে' (রোর, ৫৯)। তিনি জানেন যে তথাকথিত সভ্যতা হরণ করেছে নারীর অধিকার, আর তিনি লড়াই করছেন ওই পুরগ্যতান্ত্রিক সভ্যতার বিরুদ্ধেই। তিনি অবরোধের পক্ষে একটি ভুল যুক্তি দিয়েছেন: “আমরা যে এমন নিস্তেজ, সঙ্কীর্ণমনা ও ভীরু হইয়া পড়িয়াছি, ইহা অবরোধে থাকার জন্য হয় নাই- শিক্ষার অভাবে হইয়াছে" (রোর, ৬১)। অবরোধ ও শিক্ষা একসাথে চলতে পারে না; কাউকে মহাপাপ্তত করে যদি রেখে দেয়া হয় অবরোধে, তাহলে সে (তৈজপূর্ণ, মহৎ, সাহসী হবে না; ব্যর্থ হয়ে যাবে তার শিক্ষা: শিক্ষিত হওয়ার পরও সে থাকবে পুরুষের দাসী ও কামসামগ্রী। তবে রোকেয়া জানেন অবরোধ ক্ষতিকর; তিনি বলেছেন (রোর,
আমাদের অববোধ-প্রথাটা বেশী কগোব হইযা পড়িযাছে! . . . এ সকল কৃত্রিম পর্দা কম
কবিতে হইবে। . . আমরা অন্যাষ পর্দা ছাড়িয়া আবশ্যকীয় পর্দা পাখিব। . . . বোরকাব আকৃতি অত্যন্ত
মোট। ( হইয়া থাকে। ঠ্হাকে কিছু সুদর্শন কবিতে হইবে।
তিনি অবরোধকে সুদর্শন করার প্রস্তার করেছেন, চেয়েছেন মসৃণ অবরোধ; কিন্তু অবরোধ হচ্ছে অবরোধ, তা কোনো মসৃণতা জানে না। “বোরকা রচনাটিতে বিস্ময়করভাবে রোকেয়ার ওপর চেপে আছে আরব পিতৃতন্ত্ররর, এবং তিনি বিচ্যুত হয়েছেন নিজের স্বভাব থেকে। ধর্মকর্মের কথাও রোকেয়া বলেছেন পুরুষতন্ত্রের চাপে, কিন্তু ভালোভাবে চোখ দিলে দেখি যে ধর্মকে রোকেয়া খুব গুরুতৃপূর্ণ বলে ভাবতেন না। “বঙ্গীয় নারী-শিক্ষা সমিতি: সভানেত্রীর অভিভাষণ'-এ (রোর, ২৮২) রোকেয়া একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন:
মুসলমান বালিকাদের প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে কোবান শিক্ষাদান কবা সর্বাপেক্ষা অধিক প্রয়োজন। . .
আপনাবা কেহ মনে কবিবেন না যে, প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সাঙ্গ কোবান শিক্ষা দিতে বলিয়া আমি
গৌড়ামীব পবিচয় দিলাম। তাহা নহে, আমি গৌড়ামী হইত বহু দৃবে: প্রকৃত কথা এই যে,
প্রাথমিক শিক্ষা বলিতে যাহা কিছু শিক্ষা দেওয়া হয, সে সমস্ত ব্যবস্থাই কোন্ানে পাওয়া যায়!
তিনি বালিকাদের কোরান শেখাতে চেয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষার সাথে, কারণটি ও বলে দিয়েছেন: প্রাথমিক শিক্ষা বলিতে যাহা কিছু শিক্ষা দেওয়া হয়, সে সমস্ত ব্যবস্থাই কোরানে পাওয়া যায়। তিনি ইসলামি পিতৃতন্ত্রররের সাথে সুর মিলিয়ে বলেন নি যে সব শিক্ষাই পাওয়া যায় ওই গ্রন্থ; তিনি বলেছেন প্রাথমিক শিক্ষার জান্যে ওই গ্রন্থটি উৎকৃষ্ট। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য।
পুরুষতন্ত্র নারীকে কয়েকটি ভূমিকা পালন করতে বাধ্য করেছে; তার একটি গৃহিণীর ভূমিকা। রোকেয়া নারীর প্রথাগক ভূমিকায় বিশ্বাসী ছিলেন না. কিন্তু গৃহিণীর ভূমিকাটি তিনি মেনে নিয়েছিলেন। এটা তার একান্ত নিজের বিশ্বাস থেকে নয়, অন্যদেব বিশ্বাসকে তিনি দিয়েছিলেন স্বীকৃতি। তিনি প্রশ্ন করেছেন: “আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কি? বোধ হয় আপনারা স্মস্বরে বলিবেন, “সুগৃহিণী হওয়া” (দ্ুগৃহিণী"রোর, ৪৫)। বোকেয়া সুগৃহিণী হওয়াকে যে বড়ো কাজ বলে স্বীকার করেছেন, তা নয়; তবে তিনি
পুরম্যতন্ত্র ও রোকেয়ার নারীবাদ ২৯৯
মেনে নিয়েছেন পুরুষতন্ত্রের এ-বিধানটি। বলেছেন, “পুরুষ বিদ্যালাভ করেন অন্ন উপার্জনের আশায়”, আর “আমরা উচ্চশিক্ষা লাভ করিব কিসের জন্যে? আমি বলি. সুগৃহিণী হওয়ার নিমিত্তই সুশিক্ষা আবশ্যক" (রোর, । সুশিক্ষার উদ্দেশ্য সুগৃহিণী হওয়া? তাহলে কি সম্পূর্ণ নিরর্থক হয়ে পড়ে না শিক্ষা? যে-কাজ অশিক্ষিত পরিচারিকা করতে পারে একটু যক্ নিলে, বা চিরকাল ধরে করে আসছে নিরক্ষর সুগৃহিণীরা, তার জন্যে সুশিক্ষা এক প্রচ অপচয়। রোকেয়া ঘরকন্নার ক্লান্তিকর কাজের যে-দীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন: 'গৃহ এবং গৃহসামগ্রী পরিষ্কার ও সুন্দররূপে সাজাইয়া রাখা, পরিমিত ব্যয়ে সুচারুরূপে গৃহস্থালী সম্পন্ন করা, রন্ধন ও পরিবেশন, সুচিকর্ম, পরিজনদিগকে যত করা, সন্তানপালন করা' (রোর, ৪৬). এবং সেগুলো সম্পন্ন করার যে-রীতি নির্দেশ করেছেন, তাতে সুগৃহিণী হয়ে ওঠে একটি শিক্ষিত দাসী, শিক্ষার শোচনীয় অপবায়। রোকেয়া নিশ্চয়ই উন্নত জাতের দাসী উৎপাদনের জন্যে বালিকা বিদ্যালয় শ্রতিষ্ঠা করেন নি। রোকেয়া 'সূর্যোত্তাপে রান্না'র স্বপ্না দেখেছিলেন গৃহিণীকে ক্লান্তিকর ঘরকন্না থেকে মুক্তি দেয়ার জন্যে, কিন্তু 'সুগৃহিণী'তে তিনি গৃহিণীর ওপর যে-ভার চাপিয়ে দেন তাতে খুব খুশি হবে পুরুষতন্ত্র। তারা তাদের স্ত্রীদের শিক্ষা দেয়ার জন্যে খুব ব্যগ্র হয়ে উঠবে, কিন্তু শুধু নষ্ট হয়ে যাবে পুরুষতন্ত্রের সাথে, বাধ্য হয়ে, সামান্য সন্ধির কথা বাদ দিলে রোকেয়া হয়ে ওঠেন পৃথিবীর এক শ্রেষ্ঠ আমূল নারীবাদী, পিতৃ-ও পুরুষ-তন্ত্রক যিনি ধারাবাহিক আক্রমণে বিপর্যস্ত করে গেছেন। কিন্তু বঙ্গীয় মুসলমান পুরুষতন্ত্র তাকেও নিক্ক্রিয় করে দিয়েছে, এবং তিনি যে-উত্তরাধিকারীদের সৃষ্টি করে গেছেন, তারা বহু দূরে সরে গেছেন তার চেতনা থেকে। তাঁর উত্তরাধিকারী নারী! হয়েছেন “জ্দ্রমহিলা", স্বামীর শিক্ষিত দাসী ও প্রমোদসঙ্গিনী. সামাজিক সুবিধাভোগী, এবং তারা ব্যথ করে দিয়েছেন রোকেয়াকে।
