নারী

ফ্রয়েডীয় কুসংস্কার, ও মনোবিশ্লেষণাত্মক-সমাজবৈজ্ঞানিক প্রতিক্রিয়াশীলতা

হুমায়ুন আজাদ

ফ্রয়েডীয় কুসংক্কার, ও মনোবিশ্লেষণাত্মক- সমাজবৈজ্ঞানিক প্রতিক্রিয়াশীলতা

বিশশতকের এক বড়ো স্থপতির মহিমা পেয়েছেন সিগমুন্ড ফ্ুয়েড; অবচেতনার আবিষ্কারকরূপে তার জুটেছে খণ্ডকালীন অমরতা। এ-শতকের মানবিক সমস্ত কিছুর ওপর পড়েছে এ-মনোবিশ্রেষকের প্রভাব, নারীও তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে নি। তার আবিষ্কার মূল্য পেয়েছে নতুন কোনো সৌরলোক আবিষ্কারের থেকেও বেশি, কেননা তিনি উদঘাটন করেছেন মহাজগতের দুর্জেয়তম সৌরলোক- মানুষের মন-এর সূত্র! তবে এখন খুব বিরক্তিকর প্রশ্ন জাগছে তার আবিষ্কার সম্পর্কে, বিশশতকের শ্রেষ্ঠ কিংবদন্তি যে-অবচেতনা, তাও আজ বিপন্ন। নারীসম্পর্কে ফ্রযেডের সমস্ত সিদ্ধান্ত এখন গণ্য হচ্ছে অবৈজ্ঞানিক বলে; শুধু অবৈজ্ঞানিকই নয়. চূড়ান্ত গ্রতিক্রিয়াশীলও: একরাশ পিত্তান্ত্রিক, গোত্রীয় ও ব্যক্তিগত কুসংস্কাব তিনি পেশ করেছিলেন মনোবিশ্লেষণরূপে। ্রয়েড যখন উদঘাটন ও প্রকাশ করে চলছিলেন মনের “অদৃশ্য” সূত্র, শোনাচ্ছিলেন লিবিডো, অহম্, অবচেতনা, ইডিপাস-ইলেন্রা গুঁটেষা, শিশ্লাসূয়ার পুরাণ; কামকে করে তুলছিলেন বিশশতকের আল্লা; বিহ্ল হয়ে পড়ছিলো চারদিক। কেউ কেউ বিরোধিতা করেছেন তার: আাডলার, হোরনি, টমসন স'রে এসেছিলেন ফ্রয়েডীয় আধার থেকে: তবে ফ্রয়েডীয় আদিম অন্ধকারের পাতালে নেমে-যাওয়া বিশশতক তাদের আলোর ডাকে সাড়া দেয় নি! ফ্রয়েডের মানুষধারণাকেই ভুল মন্দ হয় আজ; পিতৃতন্ত্রররের, গোত্রের ও নিজেব দুস্বপ্পা মানুষ নামে তিনি উপস্থাপিত করেছিলেন বিজ্ঞানের মুখোশ পরিয়ে। ফ্য়েডের মানুষ জেবিকভাবে নিয়ন্ত্রিত, যার মুক্তি নেই প্রবৃত্তির কারাগার থেকে; ফ্রয়েডের মানুষ এমন জীব. যার জন্ম সংঘাত থেকে, যে চালিত প্রবৃত্তি দিয়ে, যাকে ঘিরে আছে স্তরেস্তরে নিরাশা; যে নিরন্তর সংঘাতরত নিজের আর বিশ্বের সাথে। ফ্রয়েডের লিবিডোতত্ত্ব সহজাত প্রবৃত্তির তত্ত্ব; লিবিডো হচ্ছে মানুষের মৌল কামশক্তি; মানুষের বিকাশ ঘটে ওই অন্ধ আদিম কামশক্তির সাথের ভয়াল সংঘাতের মধ্য দিয়ে। এ-সংঘাতের ভেতর দিয়ে বিকশিত হয় মানুষের চরিত্র, বিবেক ও সৃষ্টিশীলতা। ফ্রয়েডের জৈবিক প্রবৃত্তিনিয়ন্ত্রিত কামচালিত মানুষের সমস্ত বাস্তব কাজ তার অবদমিত কামের বহিঃপ্রকাশ। গীতাঞ্জলি অবদমিত কামের প্রকাশ, আপেক্ষিকতত্তও তাই। তার তত্ত্ব যে বিশশতককে সম্মোহিত করতে পেরেছিলো, তার কারণ বাইরে তা নিখৃতভাবে বৈজ্ঞানিক, কিন্তু ভেতরে আদিম কুসংস্কারাচ্ছন্ন। ওই তত্ত্বের আপাতজটিলতা, রহস্যময় কাব্যিকতা, প্রতীক ও চিত্রকল্লের ভীতিকরতা মুগ্ধ করেছিলো মানুষকে, যদিও তা সৃষ্টি করেছে মানুষ সম্পর্কে আদিম ও ভুল ধারণা।

১৫২ নারী

হোরনি ছেড়ে দিয়েছিলেন ফ্য়েডের লিবিডোতন্ত্; মানুষকে আদিম প্রবৃত্তির সংঘাতে জর্জরিত জীবরূপে দেখার বদলে তিনি দেখেছিলেন অশেষ সম্ভাবনাময়রূপে আডলার বেরিয়ে এসেছিলেন ফ্রয়েডীয় বৃত্ত থেকে; দাবি করেছিলেন যে মানুষ জৈবিক প্রবৃত্তির ক্রীড়নক নয়; কাম প্রধান নিয়ন্ত্রক নয় মানুষের। মানুষ খেলার পুতুল নয় অবচেতন শক্তিরাশির। অবচেতনার থেকে চেতনার মূল্য ছিলো তার কাছে বেশি; কিন্তু বিশশতকের মানুষ বিজ্ঞানের বিশ্ময়ের মধ্যে বাস করেও নিজেদের দেখতে পছন্দ করেছে আদিম প্রবৃত্তি ও কামের ক্রীড়নকরূপে। ফ্ুয়েডের লিবিডো, অবচেতনা, প্রবৃত্তি সবই খুব সন্দেহজনক ব্যাপার। ফ্রয়েড আধুনিক কালে জন্ম দিয়েছিলেন পালেপালে আদিম মানুষ। ফ্রয়েড বিশ্বাসী ছিলেন অতীতে, আডলার ভবিষ্যতে; ফ্য়েড মনে সম্ভাবনাই মানুষ। ফ্রয়েড যে-অন্ধকারকে মানুষ নামে উপস্থিত করেছিলেন, তার হাতছানি ছিলো তীব্ৰ; তাতে বিজ্ঞান, আদিমতা, কবিতা, কল্পন। , পুরাণ, কুসংস্কার ছিলো প্রচুর, তাই তাতে সাড়া দিয়েছে মানুষ। ফ্রয়েড বিশশতকের এক বড়ো স্থপতি, এবং পিতৃতন্ত্ররর, কুসংস্কার ও প্রতিক্রিয়াশীলতারও এক বড়ো মহাপুরুষ।

ফ্রয়েডের কুসংস্কার ও প্রতিক্রিয়াশীলতার মর্মস্পর্শী রূপ ধরা পড়ে তার নারীধারণায় ও নারীবিশ্রেষণে; তাই নারীবাদীরাই প্রথম প্রবলভাবে আক্রমণ করেন তাকে। নারীবাদীদের বহুমুখি তীব্র যৌক্তিক আক্রমণে তার জ্যোতিশ্চতত্রুটি এখন শ্লান। দ্য বোভোয়ার ফ্রয়েডকে অনেকটা মেনে নিয়ে অনেকখানি প্রতিবাদ করেছিলেন চার দশক আগে, তার অনেক কিছু বাতিল করে দিয়েছিলেন বিনয়ের সাথে; তবে নবনারীবাদীরা তার মতো বিনয়ী নন: ফ্রাইডান ফ্রয়েডের প্রতিক্রিয়াশীল কুসংস্কারের রূপটি তুলে ধরে দেখান তার ভ্রান্তি ও সীমাবদ্ধতা; আর মিলেট প্রচণ্ড আক্রমণ চালান ফ্রয়েড ও উত্তর-ফ্রয়েডীয়দের বিরুদ্ধে। তিনি কোনো কিছুই বিনাপ্রশ্নে মেনে নিতে রাজি নন; এবং বিজ্ঞানের নামে প্রচলিত সমস্ত কুসংফ্কারকে ছিন্রভিন্ন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। প্রধানত মিলেটের মূর্তিভাঙা আক্রমণের ফলেই ফ্রয়েড নারীবাদীদের, এবং অন্যদের কাছেও, হয়ে ওঠেন এক প্রতিক্রিয়াশীল অবৈজ্ঞানিক নাম। মিলেটের আক্রমণ তুলনাহীন ভাষায় ও যুক্তিতে। পরে নারীবাদীদেরই কেউকেউ, যেমন মিশেল ( কিছুটা ভুল ধরার চেষ্টা করেন মিলেটের; অভিযোগ করেন যে মিলেট কোনোকোনো স্থলে বিশ্বস্তভাবে ফ্রয়েডকে উপস্থাপিত করেন নি। এসব সত্তেও মিলেটের আক্রমণ যথার্থ: ফ্রয়েড যেখানে উদঘাটন করেছেন মানুষ ও নারীর জৈবিক-মানসিক সুত্র, মিলেট সেখানে উদঘাটন করেছেন ফ্রয়েডের সীমাবদ্ধতার সামাজিক-সাংস্কৃতিক সূত্র; এবং দেখিয়েছেন পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব ও ভিক্টোরীয় রক্ষশীলতাই ফ্রয়েডকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে নারীত্ববব সম্পর্কে ফয়েডীয় সুত্ররাশি। সময়টিতে পশ্চিমে ঘটেছিপে। রক্ষণশীলতার প্রত্যাবর্তন; নানা ধরনের রক্ষণশীলতার মধ্যে একটি ছিলো নারীকে আবার নারী করে তোলা, নারীকে আবার চিরন্তনী করে ঘরে ঢুকিয়ে দেয়া। এ-সময় পিতৃতান্ত্রিক

প্রতিক্রিয়াশীলতার বন্যা ধর্ম থেকে আসে নি, এসেছিলো পশ্চিমের ঝকঝকে শান্ত্রগুলো থেকে: সাহিত্য থেকে, এবং বিজ্ঞান থেকে. বিশেষ করে মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব থেকে। বিজ্ঞানের মলাটের ভেতরে এ-সময়ের মহাপুরুষেরা পরিবেশন করেন পুরোনো পৃথক এলাকা ও ভূমিকাতত্ত্ব। মিলেটের ( ১৭৮) মতে এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী সিগমুন্ড ফ্রয়েড, যিনি ছিলেন ওই সময়ের “লঙ্গিক রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিমান একক প্রতিবিপ্লবী শক্তি'। নারীসম্পর্কে যতো কুসংস্কার তৈরি করা হয়েছিলো গত কয়েক সহস্কে, নারীবাদীদের প্রতিবাদে যা হ'টে গিয়েছিলো অনেকখানি, তার সবই এ-সময়ে ফিরে এসেছিলো ফ্রয়েডীয় ছদ্মবেশে। ফ্রয়েডের জনপ্রিয় বাজারি ভাষ্যকারেরা তা ছড়িয়ে দিয়েছিলো দিকে দিকে। এতোদিন যে-নারী ছিলো ধময়ি ও সামাজিকভাবে বিকলাঙ্গ আর অধম, ফ্রয়েডের মনোবিজ্ঞানে সে হয়ে ওঠে বৈজ্ঞানিকভাবে বিকলাঙ্গ ও বিকৃত। ফ্রয়েডীয় মনোবিশ্লেষণের কুসংস্কার নারীকে যতোটা শোচনীয় জীবে পরিণত করে, তা করে নি কোনো ধর্মগ্রন্থও। ফ্রয়েড যদিও মেরি বোনাপার্তের কাছে স্বীকার করেছিলেন। দ্র ফ্রাইডান ( মিলেট ( “যে-বিশাল প্রশ্রটির উত্তর কখনো দেয়া হয় নি এবং তিরিশ বছর ধরে নারী-আত্মা সম্পর্কে গবেষণা করে যার উত্তর আমিও দিতে পারি নি, তা হচ্ছে “নারী কী চায়?”', তবু নারীমনস্তত্ত্ব সম্পর্কে তৈরি করেছিলেন তিনি এক বৈজ্ঞানিক" তত্ত, যার ভিত্তি তার এক খধ্রুববিশ্বীস যে “দেহই নিয়তি: আ্যানাটমি ইজ ডেসটিনি"। ফ্রয়েডের নারী নিজের বিকলাঙ্গ শরীরের শিকার।

ফ্রয়েড ছিলেন নিপুণ পর্যবেক্ষক; তবে রোগিনীদের সমস্যা বর্ণনা ও ব্যাখ্যায় তিনি ছিলেন ইহুদি পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির বন্দী। তিনি জন্মেছিলেন মধ্য ইউরোপের প্রবল পিতৃতান্ত্রিক ইহুদি পরিবারে; বেড়েছিলেন ওই সমাজে যেখানে নারীপুরুষের এলাকা ও ভূমিকা ছিলো সুস্পষ্টভাবে ভিন্ন। সেখানে পুরুষেরা প্র/তদিন প্রার্থনায় বিধাতাকে ধন্যবাদ জানাতো: “তোমাকে ধন্যবাদ, প্রভু, তুমি আমাকে নারী করে সৃষ্টি করো নি বলে"; আর নারীরা বিধাতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলতো: “তোমাকে ধন্যবাদ, প্রভু, আমাকে তুমি তোমার অভিলাষ অনুসারে সুষ্টি করেছো বলে। ' তাদের পরিবারে বাবা ছিলো জিহোভার সমান প্রতাপশালী, মা পতঙ্গের মতো অসহায়। পুরুষাধিপত্য ও নারী-অধীনতা ছিলো ওই পরিবারে ও সমাজে প্রকৃতির শাশ্বত বিধান। তিনি বেড়ে উঠেছিলেন পুরুষাধিপত্যবাদীরূপে, নারীমুক্তি ছিলো তার কাছে উদ্ভট ব্যাপার। মিলের নারী-অধীনতা ( প'ড়ে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন তিনি; নারী পুরুষের মতো বাইরে বেরিয়ে জীবিকা অর্জন করবে এটা ভাবতে গিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছেন তিনি, এবং উদ্বিগ্ন বোধ করেছেন যে এতে নষ্ট হয়ে যাবে নারীর নারীত্ববব ও রমণীয়তা। তিনি নিজের পরিবারে ছেলেবেলা থেকে পুরুষকে দেখেছেন প্রবল, নারীকে অসহায়, পর্যুদস্ত, দুর্বল; এবং এটা তাঁর কাছে মনে হয়েছে স্বাভাবিক। নারীর যে-স্বভাব ও অবস্থা তিনি দেখেছেন, তা যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক চাপের ফল হতে পারে, এমন বোধ তার মনে জাগে নি কখনো; বরং একে তিনি ভেবেছেন প্রাকৃতিক ও জৈবিক। বিয়ের আগে ফ্রয়েড তার ভাবী স্ত্রী মার্থা বারনেইসকে লিখেছিলেন ন-শোর মতো চিঠি: ওই চিঠিগুলোতে

১৫৪ নারী

পাওয়া যায় এক পিতৃতান্ত্রক, পুরুষাধিপত্যবাদী স্য়েডকে, যিনি ভাবী স্ত্রীকে করেন 'আমার মিষ্টি মেয়ে', “প্রিয় ছোট্ট নারী", রাজকন্যা, আমার ছোঝ্ট রাজকন্যা'র মতো সম্বোধন। ওই তরুণীকে তিনি মনে করেছেন বালিকা; বিয়ের পর তাকে মনে করেছেন বালিকাবধু, যার কোনো বিকাশ ঘটা অসন্ভব। একটি চিঠিতে লিখেছেন [দ্র ফ্রাইডান ]: “আমি জানি তৃমি কতো মিষ্টি, কীভাবে তুমি গৃহকে পরিণত করতে পারো স্বর্ণে. . মতোটা চাও আমি তোমাকে শাসন করতে দেবো আমাদের গৃহ, আর তুমি আমাকে পুরস্কৃত করবে তোমার মধুর প্রেমে"; আরেক চিঠিতে (৫ ১১ স্টুয়ার্ট মিলের নারীমুক্তির প্রস্তার সম্পর্কে তিনি লেখেন: তার সম্পূর্ণ রচনায় এটা কখনো ধরা পড়ে নি যে নারীরা পুরুষেব থেকে ভিন্ন-নিকৃষ্ট বলবো না, বলবো বিপরীত। . . . পুরুষের মতো নারীকেও জীবনসংগ্রামে পাঠাতে হবে, এটা সত্যিই একটা মৃতজাত ভাবনা। যদি আমি আমার মিষ্টি মেয়েকে কল্পনা করি এমন প্রতিযোগীরূপে, তাহলে তাকে আমি শুধু বলতে চাই, যেন সতেরো মাস আগে বলেছি যে আমি তাকে ভালোবাসি এবং আমি চাই সে নিজেকে ওই সংগাম থেকে গুটিয়ে নিয়ে আশ্রয় নেবে আমাব গৃহের শান্ত প্রতিযোগিতাহীন কাজে। . . প্রকৃতি নারীব নিয়তি নির্দিষ্ট ক'বে দিয়েছে রূপ. মোহনীয়তা, ও মাধুর্ষেব মধ্য দিয়ে। আইন ও প্রথার নারীকে তার অনেক প্রাপা দেয়াব আছে, তবে নারীর নিশ্চিত মর্যাদা হচ্ছে: যৌবনে পুজিত প্রিযতমা আব বার্ধক্যে প্রিয পড্টী।

ফ্রয়েড ছিলেন রক্ষণশীল, আদর্শ ভিক্টোরীয়; তিনি সর্বত্র কাম দেখতে পেয়েছেন, কিন্তু নিজে কামপরায়ণ ছিলেন না। তিনি ছিলেন অনেকটা আইবুড়ো আচারনিষ্ঠ নারীর মতো থে চারদিকে দেখতে পায় শুধু কাম। যে-মার্থাকে বিয়ের আগে ন-শো চিঠি লিখেছিলেন তিনি, বিয়ের পর তাকে আর চিঠি লিখেন নি; বিয়ের পর তাকে ফ্রয়েড দায়িত্ দেন পক্ঠীর, যে তার সংসার দেখে আর দেয় ছটি সন্তান। তার সংসারকে মার্থা হর্গে পরিণত করতে পারে নি, অবধারিতভাবে সেটি হয়ে ওঠে একটি পিতৃতান্ত্রিক ইহুদি সংসার, যেখানে স্ত্রীর কাজ স্বামীসেবা, প্রসব ও লালনপালন।

ফ্রয়েডের নারীতন্ত্রে প্রতিটি নারীর জীবনী হচ্ছে শিখ। সুখার ইতিহাস। শ্রতিটি নারী ধারাবাহিক শিশ্নাসুয়া (পেনিস এনভি]। লিঙ্গপূজোর ইতিহাসে ফ্রয়েড অতুলনীয়; তার তত্রে শিশ্ন বা (পুং)লিঙ্গই বিধাতা; লিঙ্গের এমন বৈজ্ঞানিক উত্থান কখনো ঘটে নি। লিঙ্গপূজোয় অদ্ভিতীয় হিন্দুরা; ফ্রয়েড তাদেরও ওপরে। শিবলিঙ্গপূজোর একটি মন্ত্র আছে: পবিত্র শিব, স্ব্গীযি লিঙ্গধারী, স্বগীয়ি মূল, স্বগীয়ি শিশ্ব, প্রভু লিঙ্গ, তোমার জ্যোতির্ময় লিঙ্গ এতো বিশাল যে ব্রহ্মা ভ্ঞার বিষ্ুও তা পরিমাপ করতে পারে না" দ্র মাইলস (। প্রাচীন কালে দেবীদের উৎখাত করে দেবতাদের প্রতিষ্ঠার পর (পুং)লিঙ্গের যে-উথান ঘটে, তা চরম পরিণতি পায় ফ্রয়েডের তত্তে। ফ্রয়েডের তত্তে নারীর ব্যক্তিত্র মূলে রয়েছে তার্ শাশ্বত শিশ্নাসূয়া; নারীর জীবন কাটে পুরুষের লিঙ্গটিকে আবিরাম ঈর্ষা করে। নারী পুরুষের প্রচণ্ড লিঙ্গের ঈর্ষায় পোড়ায় নিজের সমগ্র অস্তিতৃ। নারী সম্পর্কে ফ্রয়েডীয় তত্তেপ্ধ পরিণত রূপ উপস্থাপিত হয়েছে 'নারীমনস্তত্ত্ব' বা 'নারীত্ববব' ( নামক বক্তৃতায়। ফ্রয়েড নারীকে স্বায়ত্তশাসিত মানুষ রূপে না দেখে দেখেছেন পুরুষের খণাত্মক প্রাণী রূপে; নারী এমন মানুষ, যে পুরুষ নয়; নারী এমন

মানুষ বা পুরুষ, যার কিছু একটা হারিয়ে গেছে। নারী হারিয়ে ফেলেছে তার শিশ্ন; নারী হচ্ছে শিশ্বহীনতা। ফ্রয়েডের মতে নারী যখন আবিষ্কার করে তার লিঙ্গ, দেখতে পায় তার শিশ্ন নেই, তখন সে মুখোমুখি হয় ভয়াবহ বিপর্যয়ের, যা নিয়ন্ত্রণ করে তার ব্যক্তিতৃ ও সারা জীবনকে। ফ্রয়েডের নারীমনস্তত্ দাড়িয়ে আছে একটি বিপন্নকর অভিজ্ঞতার ওপর যে তার রয়েছে শিশ্বের বদলে একটি যোনি। নারী তার রন্ধটিকে কী চোখে দেখে? ফ্রয়েড বলেন, বালিকা নিজের যোনিটি দেখেই মনে করে বা বুঝে ফেলে যে ওখানে একটি শিশ্ব থাকার কথা ছিলো; কিন্তু সেটি কেটে ফেলা হয়েছে, তাকে খোজা করে ফেলা হয়েছে। নারী হচ্ছে খোজা পুরুষ, যে নিজের খোজাত্ের যন্ত্রণায় আমরণ ঈর্ষা করে চলে পুরুষের অনন্য অসাধারণ অঙ্গটিকে।

ফ্রয়েড পুরুষনারীর কামবিকাশকে ভাগ করেছেন কয়েকটি স্তরে। শিশুর প্রথম বছরটি তার মনোকামিক বিকাশের মৌথিক স্তর, এ-সময় মুখই তার কাম-এলাকা। দ্বিতীয় বছরে শিশু উত্তাঁর্ণ হয় পায্ুক্তর-এ, পায়ুতে বোধ করে কামসুখ। তৃতীয়-চতুর্থ বছরে শিশু পৌঁছে লিঙ্ষতর-এ, ছেলেরা শিশ্বে আর মেয়েরা ভগাঙ্কুরে বোধ করে কামসুখ। ছ-বছরের দিকে শিশুর কামবোধ কিছুটা ঘুমিয়ে পড়ে, ভখন চলে তার স্তর। এরপর কৈশোর আসে তার জননেন্সিয় স্তর, যখন আবার জাগে তার কাম। এ-সময়ে সে আকর্ষণ বোধ করে অন্য লিঙ্গের প্রতি; এবং সম্পন্ন হয় তার মনোকামিক বিকাশ। তবে ফ্রয়েডে ছেলে ও মেয়ের মনোকামিক বিকাশ অভিন্ন নয়: লিঙ্গস্তরে এসে তাদের মধ্যে ঘটে ভয়ঙ্কর ভিন্নতা। এ-স্তর থেকেই ফ্রয়েড ছেলেকে পুরুষ আর মেয়েকে বিকলাঙ্গ নারী ভাবতে শুরু করেন; এ-স্তরেই ঠিক হয়ে থায় যে ছেলে হবে পুরুষ আর মেয়ে হবে শিশ্নাসূয়াগ্রস্ত নারী। ফ্রয়েড জানিয়েছেন শিশুরা এ-স্তরেই আবিষ্কার করে তাদের লিঙ্গ, লিপ্ত হয় হস্তমৈথুনে; ছেলেরা শিশ্বের, মেয়েল! ভগাঙ্কুরের সাহায্যে। ফ্রয়েড ছেলের শিশ্ন ও মেয়ের ভগাঙ্কুরের মধ্যে দেখেছেন মহত্ব: নিকৃষ্টতা; ভিনি শিশ্নকে বলেছেন "ছেলের বহুগুণে উৎকৃষ্ট হাতিয়ার", ভগাঙ্কুরকে বলেছেন “তার নিকৃষ্ট ভগাঙ্কুর", 'জননেন্দ্রিয়গত ত্রুটি', “আদি যৌন নিকৃষ্টতা"। ফ্রয়েডের মতে লিঙ্গস্তরে প্রতিটি মেয়ের নিয়তি হচ্ছে একটি “অত্যন্ত গুরুতৃপূর্ণ আবিষ্কারের" মুখোমুখি হওয়া; সে আবিষ্কার করে যে ছেলেদের রয়েছে একটি দৃষ্টিগ্রাহ্য বৃহৎ শিশ্ল, এবং সাথেসাথে বুঝে ফেলে যে ওটা তার নিজের তুচ্ছ ভগান্কুরের থেকে কতো উৎকৃষ্ট! এ-মহৎ আবিষ্কারের পর তার আর কোনো ক্ষমা নেই; ফ্রয়েড বলেন, “সে-মুহূর্ত থেকেই চিরকালের জন্যে সে আক্রান্ত হয় শিশ্নাসূয়ার়”! বালিকা মনে করে তার শিশ্নটি কেটে ফেলে খোজা করে ফেলা হয়েছে তাকে, সে বইছে একটি ঘা: আর ওই ঘাটি শুধু শারীরিক নয়, মানসিক। এর ফলে জন্নে তার চিরজীবী হানমন্যতারোধ- হীনমন্যতা গৃট়ৈষা। ফ্য়েডের বর্ণনা ও সিদ্ধান্ত খুবই মনুয়, যা যুক্তিতে টেকে না। ছেলেমেয়েরা শিশুকালে পরস্পরের লিঙ্গ দেখে, তবে বালিকার পক্ষে বালকের শিশ্ব দেখা কেনো হবে এতো শুরুত্ৃপূর্ণঃ কেনো বালিকা বালকের “বৃহৎ শিশ্বটিকে মনে করবে উৎকৃষ্ট? বড়ো হলেই হয় উৎকৃষ্ট? তার কাছে বালকের ঝুলত্ত মাংসটুকরোটিকে মনে হ*তে পারে হাস্যকর, নিজের প্রত্যঙ্গটিকে স্বাভাবিক। বালিক। কেনো নিজের প্রত্যঙ্গটি দেখেই মনে করে ফেলবে ওটি বিকল,

১৫৬ নারী

বালকেরটিকে মনে করবে উৎকৃষ্ট, এবং সাথেসাথে আক্রান্ত হবে চিরশিশ্নাসূয়ায়? বালিকাদের অভিজ্ঞতা জানায় যে ফ্রয়েডীয় ওই সব অনুমান সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, তারা বালকদের শিশ্ন দেখে ঈর্ষায় কাতর হয়ে ওঠে না।

ফয়েডের তত্ত্ব অনেকখানি দাড়িয়ে আছে বালিকার “অতি গুরুতৃপূর্ণ' আবিষ্কারের ওপর যে তার শিশ্ন নেই। ফ্রয়েড একে উপস্থাপিত করেছেন ভয়াবহভাবে, তার বর্ণনা শিউরে দিতে পারে যে-কাউকে; মিলেট একে বলেছেন বাইবেলি স্বর্গচ্যুতির পনরাভিনয়। তবে পৌরাণিক বিধাতা স্বর্পচ্যত কবেছিলেন দুজনকেই; কিন্তু বিশশতকের মনোবিজ্ঞানের বিধাতা স্বর্গচ্যুতি ঘটান শুধু ইভের। ফ্রয়েড বিশ্বাস করেন, এবং আমাদের বিশ্বাস করতে বলেন যে বালিকা তার ভগাঙ্কুরকে মনে করে শিশ্ব। কেনো বালিকা তার ওই শিউলিবৌটাটিকে শিশ্ব মনে করে? ফ্লয়েড বলেন, বালিকা হস্তমৈথুন করে ওটি দিয়ে, তাই ওটিকে সে মনে করে শিশ্ব। যেনো ওই কাজটির জন্যে রয়েছে এক আদর্শ হাতিয়ার, যার নাম শিশ্ব; তাই যা দিয়েই করা হবে ওই কাজটি, তাকেই মনে করতে হবে শিশ্ব, বা নকল শিশ্ব, যা প্রাতোর দর্শন অনুসারে বাস্তবতা থেকে দ্িগুণ দূরবর্তী, এবং ফ্য়েডীয় বিজ্ঞানে নিকৃষ্ট! তিনি আরো বলেন, বালিকা ওটি দিয়ে হস্তমৈথুন করতে গিয়েই বুঝে ফেলে যে এ-কাজের জন্যে শ্রেষ্ঠ সামগ্রী হচ্ছে শিশ্ব। ফ্রয়েডের বালিকা তার মতোই জ্ঞানী, সে নিজের ভগাঙ্কুর ছুয়েই সব বুঝে ফেলে; তুলনা করে ফেলে শিশ্ব ও ভগাঙ্কুরের মধ্যে, এবং পৌঁছে যায় নিজের নিয়তিতে। এসব কি বালিকার ভাবনা, বালিকার বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত? পুরুষতান্ত্রিক ফ্রয়েডই বালিকা হয়ে মনে করছেন এসব, নিজের ভাবনাকে তিনি চাপিয়ে দিয়েছেন বালিকার ওপর। মেয়েশিশু যখন প্রথম দেখে কোনো ছেলেশিশুর শিশ্ব, তখনই সে কীভাবে বোঝে যে ওই সন্তরান্ত প্রত্যঙ্গটি দিয়ে হস্তমৈথুন করে ছেলেশিশুটিঃ ধরা যাক কোনো মেয়েশিশু জীবনে প্রথম শিশ্ন দেখে এমন এক ফ্রয়েডীয় বালকের, যখন সে লিপ্ত ছিলো হস্তমৈথুনে; কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সে কী করে বোঝে যে ওইটিই সর্বোত্তম এ-ক্রিয়ার জন্যেঃ ফ্রয়েড নিজেব সিদ্ধান্ত বালিকার ওপর চাপিয়ে দিয়ে তৈরি করেছেন এমন কিংবদত্তি, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। হস্তমৈথুনের উৎ্কর্ষই যদি মানদণ্ড হয় শ্রেষ্ঠত্ব, তবে স্বীকার করতেই হবে যে শিশ্লের থেকে ভগাঙ্কুর অনেক উৎকৃষ্ট! এর স্পর্শকাতরতা, বৈদ্যুতিক পুলকের প্রতিভা নেই পুরুষের কোনো প্রত্যঙ্গের। ফ্রয়েডের বিশ্বীসে পুরুষ শ্রেষ্ঠ, নারী নিকৃষ্ট; এবং পুরুষকে, শুধু পুরুষকে নয় পুরুষের সভ্যতাকে, তিনি সংহত করেছিলেন একটি প্রতীকে: প্রতীকটি হচ্ছে শিশ্ল। ফ্রযেভীয় বিশ্বে শিশ্বই বিধাতা; তাই তার চোখে শিশ্লের পাশে ভগাঙ্কুর শোচনীয়ভাবে নিকৃষ্ট। তিনি বিশ্বাস করতেন যে নারী জৈবিকভাবেই নিকৃষ্ট পুরুষের থেকে। ক্লারা টম্পসন বলেছেন, 'ফ্রয়েড নারী সম্পর্কে ভিক্টোরীয় মানসিকতা থেকে কখনোই মুক্তি পান নি। তার সমগ্র চিন্তার দুটি মূল ভাবনা, খোজা গৃঢ়েষা ও শিশ্নাসুয়া. প্রস্তার করা হয়েছে এ-ধারণা থেকে যে নারী জৈবিকভাবে পুরুষের থেকে নিকৃষ্ট' [দ্র জ্াইডান (। নারী কি সতিই ঈর্ষা করে পুরুষের প্ত্যঙ্গটিকে, নাকি কি ঈর্ষী করে ওই প্রত্যঙ্গধারীদের? শিশ্নাসূয়ার পেছনে যে কোনো

জৈবিক কারণ নেই, রয়েছে সামাজিক কারণ, এটা ফ্রয়েড উপেক্ষা করেছেন পুরোপুরি। তার পরিভাষাটি খুবই আপত্তিকর; এটি নারীকে চিহিত করে পুরুষের একটি নির্বোধি প্রত্যঙ্গের অসুয়ায় জর্জরিত জীব বলে, গোপন করে যায় নারীর দ্রোহকে।

শিশ্াসূয়ার সাথে শিশুনারীকে, ফ্লয়েডের মতে, ধরে আরেকটি রোগে; তার নাম খোজাঈর্ষা। ছেলেকেও ধরে এ-ব্যাধিতে; ফ্লয়েড বলেন, সে যখন দেখতে পায় মেয়েদের নেই তার মতো একটি গুরুতৃপূর্ণ প্রতাঙ্গ, তখন তাকে পায় খোজা হয়ে যাওয়ার ভয়ে। সে মনে করে কোনো কুকর্মের শাস্তি হিশেবে কেটে নেয়া হয়েছে মেয়েদের শিশ্ব, এবং তখন সে ভয় পেতে থাকে যে তার শিশ্নটিকেও কেটে ফেলে হয়তো খোজা করে দেয়া হবে তাকে। তার ভয়ের কারণ সে বাবাকে হটিয়ে, ইডিপাসের মতো, কামনা করছে মাকে। সে কিছুকাল থাকে উদ্বেগ আর ভয়ের মধ্যে: কিন্তু একদিন সে অর্জন করে পৌরুষ, নিজেকে অভিন্ন মনে করে পিতার সাথে; কেটে যায় তার রোগ। মেয়ের বেলা তা ঘটে না, তা হয়ে থাকে দুরারোগ্য জন্মব্যাধি। মেয়ে যখন দেখে তার নেই শিশ্ব, সে বুঝে ফেলে তাকে খোজা করে দেয়া হয়েছে; সে ভুগতে থাকে ঈর্ষায় ও হীনমন্যতায়। যখন সে দেখে তার মতো অন্য মেয়েদের, তার মায়েরও, নেই শিশ্ব, সে তখন ঘেন্না করতে শুরু করে নারীজাতিকেই। ফ্নয়েড বলেছেন:

দু-লিঙ্গের শারীরিক পার্থক্য ছাপ ফেলে মানসিক জীবনের ওপর। বিশ্রেষণ থেকে এটা আবিষ্কার করা বিশ্য়ের ব্যাপার ছিলো যে মেয়ে নিজের শিশ্বের অভাবের জন্যে দায়ী কবে তার মাকে; আর এ-অভাবের জন্যে তাকে কোনোদিন ক্ষমা করে না। . . . মেয়েদেৰ বেলাও খোজা ঈর্ষা দেখা দেয় অন্য লিঙ্গের জননেন্দ্রিয় দেখার পর। সে তৎক্ষণাৎ পার্থক্যটা লক্ষ্য করে, এবং বুঝতে পারে, স্বীকার করতেই হবে, এর তাৎপর্য। সে বোধ কবে মারাত্মক অসুবিধা, ৭বং মাঝেমাঝেই ঘোষণা করে সেও “চায় ওরকম একটা কিছু"; এবং হয়ে পড়ে শিশ্লাসৃয়িস্ত, যা তাহ বিকাশ ও চরিত্রগঠনের ওপব অমোচনীয় ছাপ ফেলে যায়, যা অশেষ মানসিক শক্তি ছাড়া জয় করা যায় না। বালিকা বুঝতে পারে তার শিশ্ব নেই, এর অর্থ এ নয় যে এর অভাবকে সে মেনে নেয় হাক্াভাবে। ঘটে এর বিপরীত, সে দীর্ঘকাল ধরে থাকে অমন একটা কিছু পাওয়ার বাসনায়; এবং এর সমন্ভবপরতায বিশ্বাস কবে বনু বছর: এমনকি যখন তার বাস্তবতারোধ তাকে বাধ্য করে ওই বাসনা ত্যাগ করতে, কেননা তা চরিতার্থ কবা অসম্ভব, বিশ্রেষণ প্রমাণ করে যে তখনো তা বিরাজ করে তার অবচেতনায়, এবং ধারণ করে বেশপরিমাণ শক্তি। শিশ্ন লাভের যে-বাসনা এতো বেশি সে পোষণ কবে, তাই হয়তো প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের মনোবিশ্লেষণে আসার পেছনে থাকে; এবং মনোবিশ্লেষণ থেকে তারা যুক্তিনঙ্গতভাবেই যা প্রত্যাশা কবে, যেমন কোনো মননশীল কর্মজীবন চালানো, তাকেও অনেক সময মনে করা যায় এ-অবদমিত বাসনার উৎকর্ষিত রূপ বলে।

অর্থাৎ শিশ্নের ঈর্ধায় ও খোজা মনোভাবের জন্যে চিরকালের জন্যে বিকৃত হয়ে যায় নারী। ূ

শিশ্নাসূয়া ও খোজাগুটেষার কুফল ফলে আরো; জীবনের শুরুতে মেয়েশিশু মাকে নেয় নিজের প্রেমাম্পদকপে, কিন্তু এ-স্তরে এসে সে ত্যাগ করে মাকে। ফ্রয়েড বলেন, সে ছেড়ে দেয় মাকে গর্ভবতী করার বাসনা! মাকে সে বর্জন করে, কেননা মা-ই "দায়ী তার শিশ্নহীনতার জন্যে"; মা-ই “তাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে এমন অপ্রস্তুতভাবে'।

১৫৮ নারী

ফ্রয়েড বলেন, “নিজের খোজাত্ব আবিষ্কার তার জীবনের এক মোড়-বিন্দু'; এ-সময় থেকে মা ও সব নারীর মুল্য ক'মে যায় তার চোখে, যে-শিশ্বহীনতার কারণে পুরুষের চোখেও নারীর মুল্য কম। এ-সময়ে তার লিবিডো ছোটে পিতার দিকে, কেননা তার আছে একটি শিশ্ন। পিতা হয়ে ওঠে তার প্রেমাম্পদ, মাকে সে দেখতে থাকে নিজের প্রতিদ্ন্ত্রীৰূপে। শিশুমেয়ে, ফ্য়েড বলেন, মনে করে যে তার পিতা খুব উদার

হয়ে তাকে উপহার দেবে একটি শিশ্ব। কিন্তু হতাশ হতে তার দেরি হয় না; তখন সে নিজের কামনা পূরণ করতে চায় গর্ভে সন্তান ধারণ করে। তবে ওই সন্তান শিশ্বের বিকল্প, শিশু নয় ওটি এক শিশ্নশিশু'। ফ্রয়েড বলেন, নারীর শিশ্নকামন। কখনো কাটে না, কেননা “শিশ্বকামনাই হচ্ছে একান্ত নারীর কামনা"। নারী শিশু চায়, কিন্তু কেনো চায়? নারী শিশুর জন্যে শিশু চায় না; ফ্রয়েড বলেন, নারী শিশু চায়, কেননা ওই শিশু ছাড়া শিশ্লের কাছাকাছি আর কিছু পাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব! নারী শিশ্বাতুর, শিশ্ন ছাড়া আর কিছু নারী চায় না; না পেয়ে সে চায় শিশু: তাই নারীর প্রেমাম্পদ হয়ে ওঠে

শিশু। পুরুষ ঠিকমতো বেড়ে নারীকে ভালোবাসতে শেখে, তবে নারী পুরুষকে ভালোবাসতে শেখে না; শেখে শিশুকে ভালোবাসতে, কেননা শিশুর মধ্যেই পায় সে তার হারানো শিশ্বকে। নারীর শিশ্বরকামনা একদিন চরম চর্রিতার্থতা লাভ করে ফ্রয়েডের ( ১৬৫) মতে এভাবে:

তার সুখ হয় সত্যিই অসামান্য যেদিন চবিতার্থ হয় তার শিশুলাভের বাসনা; এ-সুখ আরো বিশেষ হয়ে ওঠে যদি শিশুটি হয় ছেলে, যে তার জন্যে নিয়ে আসে বহুকামনার শিশ্নটি।

ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞান নারীর সন্তানকামনাও হয়ে ওঠে শিশ্লের জন্যে অনন্ত মৃগয়া। শারীর সন্তান কামনাকে ক্রয়েড চমৎকারভাবে খাপ খাইয়ে দিয়েছেন শিশ্নকামনার সাথে; এবং নারীকে উৎখাত করে দিয়েছেন তার কীর্তিত আসন থেকেও। নারীর সন্তান কামনাও জৈবিক নয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক; পিতৃতন্ত্ররর নারীকে দেখতে চায় জননীরূপে, তাই নারী মা হয়ে পিতৃতন্ত্রররের কাছে হতে চায় গ্রহণযোগ্য। পুত্রের শিশুটির প্রতি তার নেই কোনো আকর্ষণ; তার আকর্ষণ পুত্রের প্রতি, কেননা পিতৃতন্ত্রররের মধ্যে টিকে থাকার জন্যে তার দরকার এমন একজন যে হবে পিতৃতন্ত্রররের সদস্য।

বালক তার গুরুতৃপূর্ণ প্রত্যঙ্গটি নিজে নিজে ব্যবহার করে সুখ পাষ, এটা ফ্রয়েড অনুমোদন করেন; কিন্তু বালিকা তার নিকৃষ্ট অঙ্কুরটি নেড়ে সুখ আহরণ করবে, ফ্য়েড তা অনুমোদন করেন না। কেননা তার কাছে হস্তমৈথুন একটি একান্ত পুরুষি কাজ। বালিকাকে নারী হয়ে উঠতে হবে; তাই তাকে বন্ধ করতে হবে পুরুষি কাজটি, নইলে নষ্ট হবে তার নারীত্ববব। পরিপূর্ণ নারীতৃ অর্জনের জনো এটা দরকার। বালিকা যখন নিজের খোজাত্ব উপলব্ধি করে মর্মেমর্মে, তখন তার মানসিক অবস্থা কেমন হয়? ফ্য়েড বলেন [দ্র মিলেট (

সে মেনে নেয় তার খোজাত্বের সত্য, এবং এর পরিণতিরূপে পুরুষেন শ্রেষ্ঠ ও নিজের নিকৃষ্টতা. তবে সে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এ-অপ্রিষ সত্যের বিকদ্ধে।

তখন নারীর শরীরের ভেতর শুরু হয়ে যায় গৃহযুদ্ধ; এ-যুদ্ধে স্বাভাবিক নারীরা জীবনের পূর্ণতা লাভ করে মাতৃত্ব, কেননা জৈবিকভাবে এরই জন্যে তৈরি করা হয়েছে তাদের। বিকৃত নারীরা যায় ভুল পথে, তারা যায় সে-দিকে জৈবিকভাবে তারা যার অনপুযুক্ত। তারা বিকৃতির শিকার। ফ্রয়েড এর নাম দিয়েছেন প্ুংগুটৈষা। যে-নারীরা মাতৃত ছাড়া অন্য কোনো কাজে সাফল্য পেতে চায়, ব্নয়েডের চোখে তারা ব্যাধিপ্রস্ত; তারা আক্রান্ত পুংগৃঢৈষায়। তারা সন্তানের মধ্য দিয়ে পেতে চায় না কাম্য শিশ্নটিকে, শিশ্ন পেতে চায় তারা অধ্যাপক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, রাজনীতিক হয়ে বিভিন্ন পদের মধ্য দিয়ে। তারা ব্যাধিগ্রস্ত, তাই তাদের চিকিৎসা দরকার “মনোবিকলনগ্রস্ত রূপে! ফ্রয়েডের মতে এরা অবিকশিত, 'নাবালেগ' নারী। নারী যদি তার ভাগ্যকে, নিকৃষ্টতাকে, মেনে নেয়, তাহলে সে একধরনের তৃপ্তি পেতে পারে মাতৃত্ে; কিন্তু উদ্ধত অবাধ্য নারীরা নিজেদের ব্যাধির জন্যেই ঢুকতে চায় পুরুষেন এলাকায়। এমন নারী দেখলেই বুঝতে হবে সে পুংঈর্ষাথস্ত বা পুরুষালি এতিবাদের শিকার। ফ্রযয়েড ও ফ্রয়েডীয়দের মতে এদের চিকিৎসা দরকার। ফ্রয়েড বিজ্ঞানের নামে যা চালিয়েছেন, তার সবটাই কুসংস্কার: তিনি প্রথাকে ভেবেছেন সহজাত, পুরুষাধিপতানে মনে করেছেন প্রাকৃতিক। শিশ্বাসুয়াকে তিনি'মনে করেছেন জৈবিক, যদিও তা আসলে সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া। ভিক্টোরীয় সমাজবাবস্থায় পুরুষ ছিলো দেবতার মতো, তাই নারীর পক্ষে পুরুষকে ঈর্ষা করা ছিলো স্বাভাবিক। ওই নারীরা শিশ্বকে ঈর্ষা করতো না, বা এখনো করে না, কিন্তু তারা দেখে একটি শিশ্ব কতো সুযোগ এনে দিতে পারে। তাই তারা ঈর্ধা করে, তবে শিশ্নকে নয়, করে শিশ্বধারীদের। ফ্রয়েড নারীকে পুরুষের সাথে জড়িত দেখেছেন শুধু কামসম্পর্কে, মুছে ফেলেছেন আর সব সম্পর্ক। তার সময় সমাজ নারীকে কোনো সুযোগই দিতো না, এখনো সমাজ নারীকে দেয় না তার প্রাপ্য সুযোগ; সমাজ রোধ করে তার সমস্ত সম্ভাবনা। তাই নারীর পক্ষে পুরুষকে ঈর্ধা করা খুবই স্বাভাবিক, এটা কোনো ব্যাধি নয়, বরং সুস্থতা; কিন্তু ফ্রয়েড নারীর এ-সুস্থ মানবিক ব্যাপারটিকেই নির্দেশ করেছেন রোগ হিশেবে। ফ্রয়েড তার নারী রোগীদের সমস্যাগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন, কিন্তু সেগুলোর ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন শিশ্নাসুয়া নামে। তিনি দেখেছেন নারী অর্জন করতে চায় পুরুষের সাফল্য, বা মানবিক সাফল্য; একে যখন তিনি বাতিল করে দিয়েছেন শিশ্নাসূয়া নামে, তখন তিনি বিজ্ঞানচর্চা করেন নি, প্রকাশ করেছেন নিজের কুসংস্কার। তার কুসংক্কারটি হচ্ছে যে নারী কখনো পুরুষের সমান হবে না, যেমন নারী পাবে না একটি মহামানা শিশ্ন। ফ্রয়েড সমাজপরিবর্তনে উৎসাহী ছিলেন না, তিনি পিতৃতান্ত্রিক সমাজসংস্কৃতির চিকিৎসকের ভূমিকা পালন করেছেন: নারীপুরুষকে খাপ্খাওয়ানোর চেষ্টা করেছেন তিনি ওই পীড়াদায়ক সমাজের সাথে। ফ্রয়েড সূত্রগলোকে মনোবিজ্ঞানের হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে খাপ খাইয়ে দিয়েছেন মানুষের মনের সাথে।

স্রয়েডের চমৎকার উপাত্ত ও তার শোচনীয় ভাষ্য দেখে খুব দুঃখ হয়; এমন চমত্কার উপাত্তের এমন অপব্যবহার বেশি হয় নি বিজ্ঞানের ইতিহাসে। পিতৃতান্ত্রিক

১৬০ নারী

পুরুষাধিপত্যবাদী সমাজ নারীর সমস্ত সম্ভাবনা রোধ করে নারীকে কতোটা অসুস্থ করে তুলতে পারে, তা উদঘাটন করা সম্ভব ওই উপাত্ত থেকে; কিন্তু তিনি সেদিকে না গিয়ে গেছেন ভুল পথে। তিনি নারীর অবস্থাকে ব্যাখ্যা করেছেন অবধারিত জৈবিক সুত্ররূপে, যা সম্পূর্ণ ভুল। যে-অপরাধ সমাজের, তাকে তিনি কুৎসিত শিশ্নাসূয়া নামে চাপিয়ে দিয়েছেন নারীর ওপর। শিশ্লাসুয়া হচ্ছে পুরুষ-অসুয়া, যা অবধারিত বিশেষ সামাজিক পরিবেশে। পৃথিবী জুড়ে মেয়েশিশুরা ভাইয়ের শিশ্ন দেখার আগেই দেখে যে পৃথিবীটা পুরুষের। তারা দেখে সব দিকে পৃরুষের আধিপত্য; পরিবার তাদের শেখায় পুরুষ প্রধান, ধর্ম শেখায় পুরুষ প্রধান, সমাজ শেখায় পুরুষ প্রধান, বিদ্যালয় আর মহাবিদ্যালয়, প্রচার মাধ্যম শেখায় পুরুষ প্রধান। সমাজ রাষ্ট্রের প্রতিটি সংস্থা পুরুষের প্রাধান্য প্রচার, প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণের সংস্থা। ওই প্রধান্যকে একটি শিশ্বে সংহত করা মেয়েদের কাজ নয়, ফ্য়েডের কাজ। নারীরা শিশ্নটিকে ঈর্ধা করে না, একটি শিশ্ব কী দিতে পারে তাকে ঈর্ধা করে। পুরুষকে তারা শিশ্ল বলেও ভাবে না, ভাবে পুরুষ বলে, যারা অধিকার করে আছে পৃথিবী। মিলেট ( ১৮৭) বলেছেন, 'ফ্রয়েড প্রধান ও নির্বোধ গোলমাল করেছেন শরীর ও সংস্কৃতি, অঙ্গসংস্থান ও মর্যাদার মধ্যে। ' ফ্রয়েড করেছেন; পৃথিবীকে মুক্ত রাখতে চেয়েছেন নারীমুক্তিরোগ থেকে। সাফল্য অর্জনের জন্যে, ফ্রয়েডের বিশ্বাস, থাকতে হবে একটি ঝুলন্ত প্রত্যঙ্গ; রুন্ধ থাকলে চলবে না! তার বিশ্বাস মেধা আর শিশ্বের মধ্যে রয়েছে জৈবিক সম্পর্ক; পুরুষের মেধাগত শ্রেষ্ঠতার জৈবিক প্রকাশ হচ্ছে শিশ্ব। ফ্রয়েড পুরুষতন্ত্রকে দেখেছেন শিশ্বরূপে, এমনকি মস্তিষ্কের থেকে গুরুতৃপূর্ণ ভেবেছেন ওই প্রত্যঙ্গটিকে; এবং মনোবিজ্ঞানের মুখোশে প্রকাশ করেছেন কুসংস্কার।

ফ্রয়েড নারীর দুটি একান্ত বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন: সে-দুটি হচ্ছে লঙ্জা ও ঈর্ষা। তিনি দাবি করেছেন এ-দুটির মূলেও রয়েছে শিশ্নাসূয়া। নারীর লজ্জাশীলতার প্রশংসায় পিতৃতন্ত্ররর পাগল, কিন্তু ফ্রয়েড জানিয়েছেন নারীদের লাজন্ম্রতার কারণ তাদের খোজাত্ববোধ, নিজেদের বিকলাঙ্গচেতনা। ফ্রয়েড ( ১৭০) বলেন:

ল্জাশীলতা. যাকে মনে কবা হয় নারীর একান্ত ভূষণ, তাও আসলে, আমাদের মতে. নারী শুরু

করেছিলে' নিজের যৌনাঙ্গেব বটি টাকার জন্যে।

নারী লজ্জায় ম'রে যায় একথা ভেবে যে তার রয়েছে রন্ধ, তার শিশ্ব নেই। ফ্রয়েড মনে করেন জৈবিক কারণেই নারী কোনো কিছু দান করতে পারে। ন সভ্যতায়, তার সে-শক্তি নেই; তবে নারীকে তিনি সভ্যতার দুটি আবিষ্কারের গৌরব দিয়েছেন। তার মতে, নারীরাই আবিষ্কার করেছিলো কাপড় বোনা আর বেণীপাকানো। কেনো? তার ক্ষতের লজ্জা ঢাকতে! তার মতে, নারী যৌনকেশ দিয়ে রূন্ধটিকে ঢাকতে গিয়েই আবিষ্কার করেছিলো বেণীপাকানো' নারী তার রূপের গর্বেও বিভোর থাকে; এর মুলেও আছে, ফ্রয়েডের মতে, তার যৌনাঙ্গের নিকৃষ্টতা; এ দিয়ে নারী পুরণ করে তার শিশ্ব না থাকার ঘাটতি! নারীর ঈর্ষা পুরুষতন্ত্রের প্রসিদ্ধতম কিংবদন্তি আব দর্মনতম

কুসংক্কারগুলোর একটি। তার মতে এর জন্ম শিশ্নাসূয়া থেকে। নারীর সহজাত নিকৃষ্টতা থেকে জন্ম নেয়া শিশ্নাসূয়ার ফলে, ফ্রয়েড বলেন, নারীর পরাসত্তা- সৃপার ইগো- পুরুষের মতো সম্পূর্ণ বিকশিত হয় না, তাই নারীর বিবেক, ন্যায়-অন্যায় ও আদর্শ বোধ. সমাজচেতনা খুবই কম। ফ্রয়েড বলেন: “নারীর ন্যায়-অন্যায় বোধ খুবই কম; নিঃসন্দেহে এর সম্পর্ক রয়েছে নারীর মানসিক জীবনে ঈর্ষার প্রাধান্যের সাথে। ' এ-কারণেই নারীর নেই সমাজচেতনা, এবং তাদের প্রবৃত্তি লাভ করে না উৎ্কর্ষ। ফ্রয়েডের এসব হচ্ছে বিজ্ঞানের নামে পুরুষের প্রাধান্য স্থায়ী করার সচেতন ও অবচেতন চক্রান্ত। নারীকে ঈর্ধাকাতর বলার অর্থ হচ্ছে শোষিতরা সবাই ঈর্ধাকাতর; ধনীদের সুখ দেখে গরিবদের চোখ জলে বলেই তো গরিবেরা ঈর্ধাকাতর, এবং তাদের নেই বিবেক, ন্যায়-অন্যায় ও আদর্শ বোধ আর সমাজের প্রতি দায়িত্ব: ফ্রয়েড বিজ্ঞানের নামে শুধু পুরুষতন্ত্রকেই রক্ষা করতে চেষ্টা করেন নি, টিকিয়ে রাখতে চেয়েছেন সব ধরনের শোষণতন্ত্রকেই।

ফ্রয়েডের খুববিশ্বাস নারীচরিত্রের, শিশ্নাসুয়া ও অন্যান; রোগের, শেকড়ে রয়েছে তার বিকলাঙ্গ দেহ। তিনি ভুল বুঝেছিলেন প্রায় সবটাই। নারীমনস্তত্ত্ব সম্পর্কে ফ্রয়েডের ্রান্তির বড়ো কারণ হচ্ছে তিনি বোঝেন নি বা বুঝতে চান নি দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপারের ভিন্নতা: তিনি বোঝেন নি যে নারীর শরীর আর অবস্থার মধ্যে কোনো জৈবিক সম্পর্ক নেই। তিনি, অনেকের মতোই, মনে করেছেন যে নারীর সামাজিক অবস্থা নারীর শরীরের মতো প্রকৃতিরই সৃষ্টি; নারী রয়েছে যে-অবস্থায়, তা-ই নারীর অবধারিত নিয়তি। নারীর অবস্থা যে সামাজের তৈরি, নারী যে শিকার সমাজের, তা তিনি বোঝে নি, কেননা সে-মানসিকতা তার ছিলো না; তিনি বিশ্বাস করেছেন পুরুষ নারীকে যা করেছে, প্রকৃতি নারীকে করতে চেয়েছে তাই। পুরুষ কাজ করেছে শাশ্বত প্রকৃতির বিশ্বস্ত প্রতিনিধিরূপে।

ফ্রয়েডের মনোবিজ্ঞানে পুরুষ সক্রিয়তা, আর নারী অক্রিয়তা। পুরুষের সক্রিয়তা আর নারীর অক্রিয়তা তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন এমন ব্যাপার ভিত্তি করে, যার ভিত্তি খুবই দুর্বল। তিনি প্রমাণ হিশেবে নিয়েছেন তার সমকালের নারীপুরুষের যৌন আচরণ, এবং শুক্রাণু আর ডিম্বাণুর ক্রিয়াকলাপ। তিনি দেখেছেন পুরুষ নারীকে তাড়া করে ফেরে, আর সঙ্গমে নারী থাকে মাটির মতো অক্রিয় আর পুরুষ থাকে বৃষের মতো সক্রিয়, এবং এরই মাঝে প্রমাণ পেয়েছেন নারীপুরুষের জৈবিক স্বভাবের। এটা যে জৈবিক নয়, সামাজিক তা বোঝেন নি তিনি; পিতৃতন্ত্ররর পুরুষকে শিখিয়েছে সক্রিয়, আর নারীকে অক্রিয় হতে; নারীপুরুষ অভিনয় করে যাচ্ছে নির্দেশিত ভূমিকায়। এর কিছুই জৈবিক নয়; অনুমোদন পেলে নারীও হতে পারে চরম সক্রিয়। সামাজিক আচরণ পেরিয়ে ঢুকেছেন তিনি আরো ভেতরে, এবং বিশ্বাস করেছেন যে প্রবিষ্টকরণের কাজটি আর শুক্রাণুর চরিত্র সক্রিয়, আর যোনি ও ডিশ্বাণুর আচরণ আক্রিয়। ফ্রয়েড ( ১৪৭) বলেন:

পুরুষের শুক্রাণু সক্রিয় ও চলমান; এটা খুঁজে বের করে নারীর অণুকে, আর ডিম্বাণু অচল এবং

অপেক্ষা করে থাকে অক্রিয়ভাবে। কামের অণুজীবরাশির আচরণ সঙ্গমে নারীপূরুষের আচরণের

১৬২ নারী

কমবেশি আদর্শ। পুকষ সঙ্গমের জন্যে নারীকে প্রবোচিত করে, আবদ্ধ করে এবং ঠেলে নারীব ভেতরে নিজের পথ ক'বে নেয়।

ফ্রয়েড বেশ বাড়িয়ে বলেছেন শুক্রাণুর সক্রিয়তার কথা. এবং তিনি পুরোপুরি অক্রিয় ক'বে দিয়েছেন ডিম্বাণুকে, যদিও তা ঠিক নয়। ডিম্বাণুও পালন করে বেশ সক্রিয় ভূমিকা। ডিম্বাণু ফেলোপীয় নালি দিয়ে বেরিয়ে আসে, শুক্রাণুকে আবদ্ধ করে সক্রিয়ভাবে। তবে এ-অণুজীবরাশির আচরণকে আদর্শ কাঠামো হিশেবে ধরে সমাজকাঠামো ব্যাখ্যা পুরোপুরি অবৈজ্ঞানিক কাজ। পুরুষের তথাকথিত সক্রিয়তা আর নারীর অক্রিয়তার কোনো জৈবিক ভিত্তি নেই. রয়েছে সামাজিক ভিত্তি: পিতৃতান্ত্রিক সমাজই অনুশাসনের মাধ্যমে তাদের চরিত্রকে দিয়েছে এমন রূপ। তবে ফ্রয়েড মনে ওপর। তার মতে. নারীর কাজ হচ্ছে অক্রিয় থাকা যেমন পুরুষের কাজ সক্রিয় থাকা, কেননা তার প্রকৃতি তাই চেয়েছে।

ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞানে মানুষের প্রাণশক্তি বা কামের চালকশক্তির নাম লিবিডে। । এ তিনি লিবিডোকে নির্দেশ করেছিলেন পুরুষধর্মী বলে. বলেছিলেন যে লিবিডো 'নিয়মিতভাবে ও ন্যায়সঙ্গতভাবে পুরুষপ্রকৃতির, তা পুরুষ বা নারীর যারই হোক' [মিলেট (। পরে, এ, . তিনি কিছুটা মত বদলে বলেন যে লিবিডো লিঙ্গনিরপেক্ষ: তবুও ভেতরে ভেতরে তিনি বিশ্বাস করেন যে লিবিডো আসলে পুরুষপ্রকৃতিরই। এ লিবিডো সম্পর্কে ফ্রয়েড বলেন:

কামজীবনের চালকশক্তিকে আমরা বলেছি 'লিবিডো'। এ-কাম্জীবন নিয়ন্ত্রিত হয় পুরুষধর্মী ও নারীধর্মী দুই বৈপবীত্য দিয়ে; তাই অনেকে লিবিডোকে এ-দুই বৈপরীত্যের সাথে সম্পর্কিত কবার প্ররোচনা বোধ করতে পারেন। এটা বিশ্ময়কর মনে হতো না যদি দেখা যেতো যে কামের প্রত্যেক কপেব বয়েছে নিজ ধরনেব লিবিডো, এর ফলে এক ধরনেব লিবিডো কাজ করতো পুরুধর্মী কামজীবনেব লক্ষ্য থেকে, এবং অন্যটি নারীধর্মী লক্ষা থেকে। তবে এমন কিছু ঘটে না ' লিবিডো বয়েছে এক ধরনেবই, যা পুরুষের কামের ভূমিকা যতোটা পালন কবে ততোটাই পালন করে নারীর কামের ভূমিকা। এর আমরা কোনো লিঙ্গ নির্দেশ করতে পারি না; যদি আমরা প্রথাগত পুরুষধর্মিতা ও সক্রিয়তার সাদৃশ্য অনুসাবে একে পুরুষধর্মী বলি, তবে আমাদের ভুললে চলবে না যে এর অক্রিয় লক্ষে)র প্রবর্তনাও বয়েছে। তবে 'নারীধর্মী লিবিডো' পদটি গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের ধারণা হচ্ছে যখন লিবিছ্ে! কে লাগানো হয় নারীধর্মী কাজে, তখন তার ওপর পীড়ন করা হয় বেশি; এবং গবমকারণমূলকভাবে বলতে গেলে-প্রকৃতি পুরুষেব ভূমিকার দাবির প্রতি যতোটা মনোযোগ দিয়েছে নারীর ভূমিকার দাবিব প্রতি ততোটা মনোযোগ দেয় নি। এবং আবারও পরমকারণমূল্কভাবে-এর কারণ সম্ভবত এই যে জৈনিক লক্ষ্য অর্জনের ভার দেয়া হয়েছে পুরুষের আক্রমণাত্বকতার ওপর, যা কিছু পরিমাণে নারীব সহযোগিতা বা সম্মতি নিরপেক্ষ।

নারীসম্পর্কে ফ্রয়েডের সবচেয়ে আপত্তিকর সিদ্ধান্তগুলোর কয়েকটি পাচ্ছি এখানে। তিনি যদিও বলেছেন লিবিডোর কোনো লিঙ্গ নেই, ভবৃও তিনি বিশ্বাস করেন লিবিডো আসলেই পুরুষধর্মী; তাই পুরুষেরই রয়েছে সভ্যতাসৃষ্টির শক্তি, এবং তার ওপর অর্পণ করেছে সমস্ত মানবিক দায়ভার। প্রকৃতি নারীকে দিয়েছে সামান্য লিবিডো, নারীর দাবির

দিকে মনোযোগ দেয় নি, এসবই বিজ্ঞানের বেশে ভিক্টোরীয় কুসংস্কার প্রচার। তিনি অসম্ভব; নারীর প্রতিভা নেই সভ্যতাকে কিছু দেয়ার। তিনি নারীকে বাইরে রেখেছেন সভ্যতার; সভ্যতা ও তার অতুপ্তিতে ( দেখিয়েছেন নারী আসলে সভ্যতার শত্রু। ফ্রয়েড শুধু সভ্যতাসংস্কৃতির ভারই পুরুষের হাতে দেশ নি, তিনি মানবপ্রজাতিকে রক্ষার ভারই দিয়েছেন পুরুষের ওপর। নারী ধারণ করে মানব, কিন্তু ফ্রয়েড একে মূল্যবান মনে করেন না; নারী ফ্রয়েডের দৃষ্টিতে আঁধারমাত্র। প্রকৃতি নারীকে মানবপ্রজাতি টিকিয়ে রাখার ভার দেয় নি, দিয়েছে পুরুষকে! তিনি বলেছেন, জৈবিক লক্ষ্য অর্জনের ভার দেয়া হয়েছে পুরুষের আক্রমণাত্মকতার ওপর, যা কিছু পরিমাণে নারীর সহযোগিতা বা সম্মতি নিরপেক্ষ; অর্থাৎ নারী চাক বা না চাক. প্রকৃতি যেহেতু পুরুষকে দিয়েছে মানবপ্রজাতি টিকিয়ে রাখার দায়িতৃ, তাই পুরুষ নারীকে ফাক করে ঠেলে ভেতরে ঢুকে রক্ষা করবে মানবপ্রজাতি। ফ্য়েডের মানবপ্রজাতি রক্ষার প্রকল্প তাই হয়ে দীড়ায় বলাৎকার, যা সহ্য করতে হবে নারীকে।

ফ্রয়েডের চোখে নারীর তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য: অক্রিয়তা, মর্ষকাম, ও আত্মপ্রেম। বর্ণনা হিশেবে এগুলো ভুল নয়, তিনি তার সময়ের নারীদের এ-বৈশিষ্ট্যগুলো পর্যবেক্ষণ করেছেন ঠিক মতোই, কিন্তু ব্যাখ্যা করেছেন ভুল। শিতৃতন্ত্র নারীকে দেখতে চায় অক্রিয়, তাই নারী তার স্বভাবের মধ্যে মেনে নিয়েছে অনেকখানি অক্রিয়তা, কেননা সক্রিয় হলেই পুরুষতন্ত্র ক্ষেপে ওঠে তার ওপর। পিতৃতন্ত্ররর সে-নারীকেই মহীয়সী মনে করে যে সহ্য করতে পারে চরম দুঃখযন্ত্রণা, পিতৃতন্ত্ররর বিরামহীন পীড়ন সহ্য করারকেই মনে করে নারীতৃ। পিতৃতন্তর সৃষ্টি করেছে অসংখ্য সতীচরিত্র, সীতা ও রহিমা, যারা মহত্ত অর্জন করেছে শুধু অপার পীড়ন সহ্য করে। পুরুষ, শো: পনহায়ারের মতো, মনে করে যে নারী জীবনের খণ কাজ দিয়ে শোধ করে না, করে দুঃখ দিয়ে। তাই নারীকে বাধ্য হয়েই হয়ে উঠতে হয়েছে মর্ষকামী। পিতৃতন্ত্ররর নারীকে সম্ভোগসামগ্রী রূপে দেখে, এজন্যে নারী আত্মপ্রেম আয়ন্ত কনে অনেকখানি অর্থাৎ পিত্তন্ত্ নারীকে যে-ভূমিকা দিয়েছে, নারী তাতে অভিনয় করেছে নিজের অস্তিত্বববের জন্যেই। তবে ফ্রয়েড নারীর অক্রিয়তা, উন ও৪ ক বসত তিনি নারীর মধ্যে খোজেন এসবই। তিনি বিধান দেন যে নারীকে হতে হবে অক্রিয়, মর্ষকামী, আত্মপ্রেমিক; এসব যাদের আছে তারাই স্বাভাবিক নারী। নারীকে অক্রিয় হস্তে হবে; কী করতে হবে এর জন্যে? তিনি বলেন, নারীকে ভগাঙ্কুরের সুখ ছেড়ে যেতে হবে মাতৃত্বের দিকে, সুখ খুঁজতে হবে রন্ধে। তার মতে অক্রিয়তা আর মর্ষকাম একান্ত নারীর বৈশিষ্ট্য, এবং জড়ানো একে অন্যের সাথে; তাই এ-দুটি নারীর জন্যে স্বাভাবিক, অস্কাভাবিক পুরুষের জন্যে। মর্ষকাম নারীসুলভ, আর নারীত্বব মর্ষকামধর্মী। ফ্রয়েড বলেন:

তাদের আক্রমণাত্মকঙা অবদমনের ফলে, যা নারীদের ওপর চাপিয়ে দেয় তাদের গঠন ও সমাজ,

তাদের মধ্যে বিকশিত হয় তীব্র মর্ষকামবাদী প্রবর্তনা, যার ফলে তাদেব ধ্বংসাত্মক প্রবণতা কামগতভাবে রুদ্ধ হয়ে হয়ে ওঠে অন্তর্মথি। তাই মর্ষকাম, যেমন বলা হয়ে থাকে, সত্যিকাবভাবেই

১৬৪ নারী

নারীধর্মী। তবে যখন আমরা মাঝেমঝেই পুরুষের মধ্যে মর্ষকাম দেখতে পাই, তখন একথা ছাড়া আর কী বলতে পারি যে ওই সব লোকের মধ্যে প্রকাশ ঘটেছে সুস্পষ্ট নারীধর্মী বৈশিষ্ট্য?

ফয়েড মনে করেন নারী জৈবিকভাবেই তৈরি হয়েছে পীড়ন ভোগ করার জন্যে; পীড়ন নারীর জন্যে একধরনের সুখ। তাই পুরুষ যখন পীড়ন করে নারীকে, তখন পুরুষ কোনো অপরাধ করে না, বরং তাকে দেয় সুখ। ফ্রয়েডীয় মর্ষকামবাদকে তার যৌক্তিক পরিণতিতে নিলে দাড়ায় যে পীড়নধর্ষণ নারীর জন্যে শুধু ভালোই নয়, বরং নারী পুরুষের কোনো অপরাধ হওয়ার কথা নয়, কেননা তা পরিতৃপ্ত করে নারীর সহজাত মর্ধকামকে! নারী পীড়িত হয়ে সুখ পায়, এমন একটি বাজে কথা চালু রয়েছে কয়েক হাজার বছর ধরে; পুরুষতন্ত্রের মহাপুরুষেরা এ-ধারণাকে জনপ্রিয় করেছেন নানাভাবে, আর ফ্রয়েড দিয়েছেন তাকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। ফ্রয়েজীয় মর্ষকামতত্ত্ব নারীপীড়নের বৈজ্ঞানিক প্রস্তার, এবং অপবিজ্ঞান।

ফ্রয়েডের নির্দেশিত নারীর তৃতীয় বৈশিষ্ট্য আত্মপ্রেম বা নাসীর্সিজম। নার্সিসিজম শব্দটি যদিও জন্মেছে আত্মপ্রেমমত্ত এক পৌরাণিক পুরুষের নাম থেকে, তবু পুরুষতন্ত্ পৃথিবী জুড়েই আত্মপ্রেমকে মনে করে একান্ত নারীর রোগ; ফ্য়েডও তাই মনে করেন। নারীর আত্মপ্রেম, নারীর অক্রিয়তা বা মর্ধকামের মতোই, ফয়েডের মৌলিক আবিষ্কার নয়; তার আগে, কয়েক হাজার বছর ধরে, নারীর আত্মপ্রেমের বহু উপকথা লিখেছে পুরুষ, ফ্রয়েড দিয়েছেন তার অপবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। তার মতে নারীর আত্মপ্রেম বিকার, তবে খুবই স্বাভাবিক নারীর জন্যে। পুরুষও হতে পারে আত্মপ্রেমিক, স্বীকার করেন ফ্য়েড; তবে পুরুষের আত্মপ্রেম বিকার নয়, তা উন্নত প্রকৃতির; পুরুষের রয়েছে আত্মপ্রেমের উৎকর্ষায়ণের প্রতিভা। পুরুষ, ফ্রয়েড বলেন, নিজের প্রেমে পড়ে অন্যের বা নারীর প্রেমে পড়ার মতো করে, তাই তা সুস্থ; কিন্তু স্বভাববিকৃত বিকলাঙ্গ ক্ষীণলিবিডো শিশ্লাসুয়াগ্রস্ত নারী তা পারে না; তার আত্মপ্রেম নিজের দেহকেন্দ্রিক। নারী নিজের প্রেমে পড়ে যেমন পুরুষ পড়ে নারীর প্রেমে, অর্থাৎ নারী নিজে পুরুষ হয়ে পড়ে নিজের শরীরের প্রেমে। এটা বিকার। নারী পারে না আত্মপ্রেমের উৎকর্ষ সাধন করতে, পুরুষ পারে। আত্মপ্রেম, ফরয়েডের মতে, একান্তভাবেই নারীধর্মী, এবং এর মূলে রয়েছে নারীর শাশ্বত শিশ্লাসুয়া। ফ্রয়েড ( ১৭০) বলেন:

আমরা লক্ষ্য করি যে নারীর মধো রয়েছে বিপুল পব্মাণ আত্মপ্রেম, তাই তারা অন্যের প্রেমে পড়ার

আবেগেব থেকে অনেক বেশি বোধ করে অন্যেবা তাদের প্রেমে পড়বে, সে-আবেগ। রূপের জন্যে

গর্ববোধও আংশিকভাবে তাদের শিশ্বাসুয়ারই ফুল. তারা তাদের মৌলিক কামনিকৃষ্টতার বিলম্বিত

ক্ষতিপূরণ হিশেবেই নিজেদের শারীরিক সৌন্দর্যকে অতি বেশি মূল্য দিয়ে থাকে।

নারী যদি একটি শিশ্ব পেতো, তাহলে নিজের রূপে অন্ধ হতো না; শিশ্বের অভাব নারী মিটিয়ে নেয আত্মপ্রেমে! নারীর আত্মপ্রেমের সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন ফ্রয়েড; তার মতো চমৎকার পর্যবেক্ষক ও শোচনীয় অপব্যাখ্যাকার বেশি মেলে না। সমাজ নারীকে যে-রোগে রুগ্ন দেখতে পছন্দ করে, তার ভেতরে ঢুকিয়ে দেয় যে-রোগের বীজ,

ফ্রয়েড তাকে করে তুলেছেন জৈবিক। নারী নিজের রূপসচেতন, রূপের জন্যে অশেষ তার আকুলতা, নিজের রূপে সে বিভোরও হয়, এমনকি পুরুষের চোখেও সে দেখে নিজের মাংসের বিন্যাস; তার কারণ সে জানে সে কামসামগ্রী, তার মূল্য তার সম্তোগযোগ্যতায়। নিজেকে নিজে সম্তোগের জন্যে নারী আত্মপ্রেমমুগ্ধ নয়; পুরুষতন্ত্রের বিধান অনুসারে পুরুষের সম্তোভযোগ্য হয়ে ওঠার জন্যেই নারী রূপসচেতন। সে জানে তার দেহ খাদ্য হবে পুরুষের, তাই নারী নিজেকে করে তুলতে চায় সুস্বাদু খাদ্য মেরি ওলস্টোনক্র্যাফ্ট্ ( বলেছেন, “শিশুবেলা থেকেই শেখানো হয় যে রপই নারীর রাজদণ্ড, তার মন বেঁকে যায় তার দেহের আদলে, এবং এর কারুখচিত খাচার চারদিকে ঘুরেঘুরে সাজাতে শেখে শুধু কারাগারটিকে' দ্র গ্রিয়ার (। ক্রয়েড এসব মনে করেছেন জৈবিক: নারী জৈবিকভাবে অক্রিয়, মর্ষকামী, আর আত্মপ্রেমমুগ্ধ। ফ্রয়েড তার সময়ের নারীস্কভাব বর্ণনা করেছিলেন নির্ভুলভাবে, তবে প্রতিক্রিয়াশীলতারশত তা ব্যাখ্যা করেছেন ভুলভাবে; আর বিধান দিয়েছেন সম্পূর্ণ নারীবিরোধী। যদি দেখি একদল মানুষকে করে ফেলা হয়েছে অক্রিয়, দুঃখযন্ত্রণাকে করে তোলা হয়েছে তাদের জীবন, তাদের বাধ্য করা হয়েছে প্রভুদের মনোরঞ্জন করে তুচ্ছ গর্বে মেতে উঠতে, তখন কি বলবো যে এসবই অবধারিত, এ-ই তাদের জৈবস্বভাব? নিশ্চয়ই বলবো না, কিন্তু বলেন মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েড। বিশশতকে ফ্রয়েজীয়বাদ দেখা দিয়েছিলো নারীবাদের প্রধান প্রতিপক্ষরূপে।

কারেন হোরনি, ক্লারা টম্পসন, আলফেড আযাডলার বেশ আগেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ফ্রয়েডীয় প্রতিক্রিয়াশীল নারীমনোবিজ্ঞান, কেননা ওই মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্য নারীর পুরুষাধীনতাকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করা। ধর্মের বিরুদ্ধে আজ কথা বল। যায়, প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে যে-কোনে' নির্বোধ: কিন্তু বিশশতকে বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে কথা বলা অসম্ভব। বিজ্ঞানের মুখোমাথ সবাই অসহায়, তার সূত্রের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার শক্তি নেই সাধারণের। তাই ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞান নারীর বিরুদ্ধে কাজ করেছে প্রথাগত পুস্তকগুলোর থেকে অনেক বেশি প্রচণ্ডভাবে। মনোবিজ্ঞানীরাই প্রথম প্রতিবাদ করেছিলেন ফ্রয়েভীয় নারীমনোবিজ্ঞানের, যদিও তা বিশশতকের শ্রৃতিতে প্রবেশ করে নি। কারেন হোরনি মনোবিশ্রেষকদের মধ্যে দেখেছিলেন পুরুষবাদী ঝোক; তারা মানুষ বলতে বুঝেছেন পুরুষ, এবং নারীকে দেখেছেন পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে। তিনি শিশ্াসূয়া, পুংগুটৈষা, নারীদের হীনমন্যতারোধ প্রভৃতি ধারণা ব্যাখ্যা করে দেখান যে এগুলো জৈবিক নয়, সাংস্কৃতিক। মর্ষকামের কথা ধরা যাক। হোরনি দেখেছেন কোনোকোনো মনোব্যাধিগ্রস্ত নারী মর্ষকামী, কিন্তু তিনি একে জৈবিক বলে মনে করেন নি। তিনি এর দিয়েছেন ফ্রয়েডের থেকে অনেক অন্ত্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যাখ্যা। তিনি বলেছেন, 'কোনো জীবন্ত প্রাণী যখন পড়ে বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যে, তখন সে তার সাথে খাপ খাইয়ে নেয় নিজেকে' দ্র উইলিয়ম্স্ (। নারী পড়েছে প্রাণীজগতের সবচেয়ে বিপর্যয়কর অবস্থায়, তাই নারী খাপ খাইয়ে নিয়েছে বিপর্যয়ের সাথে। নারীর অবস্থা ও মন ব্যাখ্যার জন্যে বিবেচনা করতে হবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যাপারগুলো; তার শরীরের বাকে, রন্ধে, অঙ্কুরে খোজাখুঁজি করে ওগুলোর সূত্র মিলবে না। তিনি

১৬৬ নারী

মর্ষকামের একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। জারের শাসনকালে রাশিয়ার চাষীনারীরা চাইতো যে তাদের স্বামীরা তাদের প্রহার করুক, ওই প্রহার ছিলো প্রেমের প্রমাণ। এতে যদি মনে করা হয় যে নারীরা বা রুশ নারীরা মর্ষকামী, তবে বড়ো ভুল করা হবে। ওই সমাজ ব্যবস্থায় প্রহারকেই মনে করা হতো প্রেমের প্রকাশ; কিন্তু আজকের রাশিয়ার নারীরা প্রেমের প্রমাণরূপে প্রহারের কথা ভাবতেই পারে না। ওই সমাজের বদল ঘটেছে, তাই বদল ঘটেছে নারীর বাহ্যিক আচরণেরও. তবে নারীর প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটে নি। প্রতিটি জাতির ধর্মে, সাহিত্যে. কিংবদন্তিতে নারীকে দেখানো হয়েছে মর্ষকামীরূপে, গাওয়া হয়েছে নারীর মর্ষকামের গাথা। আদর্শ সতী মর্ষকামী, আদর্শ মা মর্ষকামী, আদর্শ প্রেমিকা মর্ষকামী, আদর্শ কন্যা মর্ষকামী; নারী পিতৃতন্ত্রররের ধর্ষকামের ধারাবাহিক ভোগ্যসামগ্রী।

হোরনি বলেছেন, নারীপ্রকৃতি সম্পর্কে যে-ভাবাদর্শ গড়ে তোলা হয়েছে, তা হচ্ছে নারী দুর্বল, আবেগপরায়ণ, অক্রিয়, পরনির্ভর: এ-ভাবাদর্শের জন্যেই নারীকে মনে হয় ওই সব অপবৈশিষ্ট্যের সমষ্টি। পুরুষ নারীকে এমনই দেখতে চায়। এসবের জনোই নারী ভূমিকা পালন করে অক্রিয়তার, হয় মর্ষকামী বা আত্মপ্রেমমুগ্ধ; কিন্তু একে জেবিক মনে করার কারণ নেই। প্রেমের অতিমূল্যায়ন' ( নামের একটি লেখায় তিনি দেখান যে সামাজিক অবস্থা নারীকে শেখায় যে তাকে হতে হবে পিতৃতন্ত্রররের আদর্শ নারী: তার জীবনের লক্ষ্য হবে বিশেষ কোনো পুরুষকে ভালোবাসা ও তার ভালোবাসা পাওয়া, তার সেবা করা। তার জীবন হবে বিশেষ পুরুষকেন্দ্রিক, সে ঘুরবে পুরুষসূর্যকে কেন্দ্র করে। এমন অবস্থা পুরুষের মনে বাড়িয়ে দেয় আত্মমর্যাদাবোধ, আর কমিয়ে দেয় নারীর আত্মমর্যাদাবোধ ও আত্মবিশ্বাস্। গ্রতিটি ধর্মের পবিত্র গ্রন্থে বারবার পাওয়া যায় এমন সব নির্দেশ, যা পুরুষকে দেবতা আর নারীকে করে তোলে আত্মমর্যাদাহীন জন্তু। ইহুদিধর্মের বিধান হচ্ছে স্ত্রী স্বামীকে সম্বোধন করবে বাআল [প্রভু] বা আদোন [বিধাতা] বলে; সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করবে তার কাছে। একটি হাদিসে আছে [দ্র ফজলুর রহমান (

স্বামী যদি কুষ্ঠবোগী হয় আর তাহার পুজ ইত্যাদি স্ত্রী নিজ জি দ্বারা চাটিয়া পবিষ্কাব করে, উহাতেও

স্ত্রী স্বামীব হক আদায় করিতে পাবিবে না!

হিন্দুদের কামকল্প-এ আছে [দ্র মাইলস (

স্বামী ছাড়া পৃথিবীতে নারীব আব কোনো দেবতা নেই. । . . . স্কামী হতে পারে বিকলাঙ্গ, বৃদ্ধ, পাপিষ্ট, বদমেজাজি, লম্পট, অন্ধ, বধিব বা বোবা. . তবু সাবাজীবন নারী তাকে মান্য করে চলবে।

এসব বিধানে যেমন পীড়ন করা হয়েছে নারীকে. তেমনি মুছে ফেলা হয়েছে তার আত্মমর্ধাদার শেষ কণাটিকেও। নারী পীড়ন, ও তার মর্যাদা অস্বীকারের উৎকট বিধান দিয়েছে আঠারোশতকের এক জাপানি দাম্পত্যবিধিপ্রণেতা; স্ত্রীর প্রতি উপদেশ*-এ সে বলেছে [দ্র মাইলস (

সবচেয়ে গুরুতৃপূর্ণ হচ্ছে স্বামীর প্রতি নারীর ভক্তি। . . স্ত্রী সব সময় কল্পনা করবে সে-সব, য। তার

স্বামীর আনন্দ বাড়াবে, তাকে কোনো কিছু করতে দিতে অস্বীবার করবে না। যদি সে অল্পবয়স্ক বালক

ফ্রয়েভীয় কুসংস্কার, ও মনোবিশ্লেষণাত্বক-সমাজবৈজ্ঞানিক প্রতিক্রিয়াশীলতা ১৬৭

পছন্দ করে, তবে স্ত্রী বালকের মতো হাটু গেড়ে বসবে যাতে স্বামী পেছন দিক থেকে তাকে নিতে

পারে। তবে স্ত্রীকে ভুললে চলবে না যে পুরুষ নারীর পায়ুর কোমল প্রকৃতি বুঝতে পারে না, সে জোর

করে ঠেলে ভেতরে ঢুকতে পারে। তাই স্ত্রীব উচিত ধীরেধীবে নিজেকে প্রস্তুত করা এবং সিজিশুমি

ক্রিম ব্যবহাব কবা. . .

এসবের পরেও নারী কী করে রক্ষা করে তার আত্মমর্ধাদাবোধ? যে-নারী মেনে নেয় এসব, তার জন্যে সমস্যা নেই, সে চ'লে যায় সব সমস্যার পরপারে: কিন্তু যে-নারী হতে চায় স্বাধীন, জড়িত হতে চায় কোনো পেশায়, তার জন্যে এসব তৈরি করে সংকট। এমন নারী হয়ে পড়ে অসুস্থ, সে ব্যর্থ হয় কর্মে ও প্রেমে। এর পেছনে নারীর শরীরের কোনো ভূমিকা নেই, আছে সমাজসংস্কৃতির ক্রিয়া। সমাজই বার্থ ও অসুস্থ করে দিচ্ছে নারীকে, কিন্তু ফ্রয়েড তার নিন্দা করেন পুংগটেষাগ্রস্ত বলে। হোরনি দেখিয়েছেন, মুলসহংকট হচ্ছে প্রেমের অতিমূল্যায়ন, প্রেমকেই নারীর জীবনের সব বলে ভাবা: যেনো পুরুষের সাথে নারীর কামসম্পর্কই জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিশ। যদি নারী প্রেমেই না পড়লো, প্রেমই না পেলো, স্ত্রীই না হতে পারলো, তাহলেই যেনো তার জীবনের সব নষ্ট হয়ে গেলো: তার জীবন হয়ে উঠলো অস্বাভাবিক। যে-নারী পিতৃতন্ত্রররের বিধান মানে না, সে-ই ব্যাধিপ্রস্ত ফ্রয়েীয় মনোবিজ্ঞানে; মদিও তা রোগ নয়, তা পিতৃতন্ত্রররের “হ্বরাচারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতামনঙ্ক নারীর বিদ্রোহ।

ক্লারা টম্পসন আরো প্রবলভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ফয়েডকে। তিনি দেখান যে নারীমনোবিজ্ঞান সম্পর্কে ফ্রয়েডের সিদ্ধান্তগুলো জন্মেছে নারীর নিকৃষ্টতা সম্পর্কে ফ্রয়েডের বদ্ধমূল ধারণা থেকে; তাই ভ্তরয়েড শিশ্লাসূয়া, ঈর্ষা, মর্যকাম, হীনমন্যতারোধ প্রভৃতিকে মনে করেছেন জৈবিক; তবে এসবের উৎপত্তি ঘটেছে সাংস্কৃতিক কারণে। মানুষ যে-অবস্থায় পড়ে সাধারণত তার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়, নারীও নিয়েছে। শিশু পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সুবিধা আর আধিপত্যের প্রতী”, নারী ঈর্ষা করে পুরুষের ওই সুবিধা আর আধিপত্যকে। নারী শিশ্নকে ঈর্ধা করে না, আর ঈর্ধাও সর্বজনীন নয়। ঈর্ষাবিদ্বেষ প্রতিযোগিতামূলক সংস্কৃতির চরিত্র: নারীকে বাদ দেয়া হয় ওই প্রতিযোগিতা থেকে, তাকে দেয়া হয় না বিকশিত হতে। তাই তার মনে ঈর্ধা জন্মানো স্বাভাবিক, তবে এর পেছনে কোনো জৈব কারণ নেই। বর্তমান ব্যবস্থায় একটি নির্বোধ পুরুষ যে-সাফলা লাভ করতে পারে, একটি বুদ্ধিমান নারী তা পারে না; তাই সে হতে পারে ঈর্যাকাতর। সমাজই ঈর্ধার জনক। নারীর হীনমন্যতারোধও সমাজে তার প্রকৃত অবস্থারই প্রতিফলন; তা শিশ্নহীনতার ফল নয়, মনোব্যাধিও নয়। পিত্তান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিজের অবস্থা দেখে দেখে নারী ভোগে হীনমন্যতায়, এর পেছনে তার শরীর নেই; আছে সমাজ। নারীর পরাসত্তা দুর্বল, এটা নারীর জৈবিক স্বভাব নয়; এটা সমস্ত অধীন জাতিরই কৃত্রিম স্বভাব। তারা নিজেদের নিরাপত্তার জন্যে চায় শক্তিমানদের স্বীকৃতি। ভিক্টোরীয় তরুণী বা আজকের মধ্যপ্রাচ্যের বা বাঙলাদেশের তরুণী নির্ভরশীল তার পিতার ওপর, তার কোনো সুযোগ নেই স্বাধীন মন বিকাশের। যদি সে স্বাধীন হতে চায়, তবে তা হবে বিপজ্জনক। দুর্বলকে সব সময়ই আত্মরক্ষার জন্যে শক্তিমানের ভাবাদর্শ মেনে নিতে হয়। নারীও তা মেনে নিয়েছে, তাই মনে হয় নারীর পরাসত্তা

১৬৮ নারী

দুর্বল; তবে এটা প্রাকৃতিক বা জৈবিক কারণে ঘটে নি, ঘটেছে সামাজিক কারণে। আগে। তিনি ( ১৭৩) বলেন, “তিরিশের কাছাকাছি কোনো পুরুষকে মনে হয় প্রাণবন্ত, এক অর্থে অপূর্ণ বিকশিত ব্যক্তি, যার কাছে প্রত্যাশা করি যে সে তার বিকাশের সব সম্ভাবনা পূরণ করবে. . . তবে ওই বয়সের নারীরা মাঝেমাঝেই তাদের মনস্তাত্তবিক অনমনীয়তা ও অপরিবর্তনীয়তা দিয়ে আমাদের বিচলিত করে।” এ দেখেই তিনি খুব সুত্রে পৌঁছে গেছেন যে তিরিশ বছরের পর নারীদের আর কোনো সম্ভাবনা থাকে না! তিথ্নিশ বছরেই নারী সমাপ্ত; এবং এর মূলে আছে তার শরীর। সম্পূর্ণ ভুল তার সূত্র, যদিও পর্যবেক্ষণ নির্ভুল। ফ্রয়েডের পর্যবেক্ষণের আভ্যন্তর ব্যাখ্যা দিয়েছেন টম্পসন; তিনি দেখিয়েছেন ওই কালে এ-ই ছিলো স্বাভাবিক। এখনো পৃথিবীর অধিকাংশ জুড়ে এটাই স্বাভাবিক যে নারী সমাপ্ত তিরিশে। এক সময় বাঙলায় জনাপ্রয় ছিলো একটি শ্লোক যে বাঙালির মেয়ে কুড়িতেই বুড়ী, অর্থাৎ তার জীবন নিঃশেষিত বিশ বছরেই। টম্পসন বলেছেন, নারীর জীবনের সাফল্য যতোদিন নির্ভর করবে বিয়ে ও মাতৃত্বের ওপর, ততোদিন তিরিশেই তার জীবনের সাফল্য বা ব্যর্থতা অর্জিত হয়ে যাবে। যদি তার বিয়ে হয় ষোলো বা আঠারোতে, তাহলে তিরিশ বছরের মধ্যে উজাড় হয়ে যায় তার জরায়ু ও সৌন্দর্য, যা ছিলো তার জীবনের সম্ভাবনার ভিত্তি। যদি তার বিয়ে না হয়, তাহলে তার জীবন ব্যর্থ, বিয়ে হলেও ব্যর্থ; কেননা বিয়ে ও সন্তান কোনো সাফল্যই নয়। এখনো পৃথিবী জুড়ে তিরিশ বছর বয়ঙ্ক অধিকাংশ নারীর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। টম্পসন ফ্রয়েডের পর্যবেক্ষণ মেনে নিয়ে দেখিয়েছেন তার ব্যাখ্যার ত্রুটি; দেখিয়েছেন ফ্রয়েড নারীকে দেখেছেন পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে, ফ্রয়েডের নারী হচ্ছে পুরুষের না-সূচক রূপ। ফ্রয়েড দেখেছেন তার নিজের সংস্কৃতির নারীদের, আর ওই নারীদের স্বভাবকে মনে করেছেন বিশ্বজনীন ও শাশ্বত। ফ্রয়েড স্বাভাবিক নারীদের ব্যাখ্যা করেন নি, করেছেন পিতৃতন্ত্রররের পথুদস্ত নারীদের। তিনি ফ্রয়েডের পুংগুটৈষারও দিয়েছেন গ্রহণযোগা ব্যাখ্যা; তিনি দেখিয়েছেন সংস্কৃতিই নারীকে ডাকে ওই দিকে। নারী যখন প্রথাগত আশ্রত ভূমিকা ছেড়ে স্বাধীন জীবনের খোজে বেবিয়ে পড়ে, তখন সে সাফল্যের জন্যে অনুসরণ করে সফলদেরই: নারী দেখে সফল হচ্ছে পুরুষ, তাই নারী অনুকরণ করে পুরুষের আচরণ্। পুরুষের জগতে পুরুষের অনুকরণ করে সাফল্য অর্জন করে নারী, যা তার পুরুষাধীন অবস্থায় অসম্ভব। তাই পুংগুটেষা কোনো রোগ নয়। ফ্রয়েড নারীর যে-সব বৈশিষ্ট্যকে মনে করেছেন একান্তভাবে নারীসুলভ ও জৈবিক, সেগুলোকে টম্পসন দেখিয়েছেন সামাজিক অবস্থার ফল বলে। তা শাশ্বত নয়, তার সাথে দেহের সম্পর্ক নেই; তা নারীর মৌল স্বভাব নয়। নারীর মৌল স্বভাব কী? টম্পসন বলেছেন, “নারীর মৌল স্বভাব আজো অজানা' [দ্র উইলিয়মৃস্ (।

আযাডলার ছিলেন ফ্রয়েডীয় বৃত্তে, কিন্তু বেরিয়ে এসেছিলেন ঘখন বুঝতে পারেন যে বদ্ধমূল ফ্রয়েডীয় ধারণা দিয়ে বিজ্ঞানচর্চা অসন্তব ' নারী সম্পর্কে তার ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন ফ্য়েজীয় ধারণা থেকে, এবং অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। আ্যাডলার [দ্র উইলিয়ম্স্ ( ৮০)] বলেছেন:

আমাদের সমস্ত সংস্থা, আমাদেব প্রথাগত প্রনণতা, আমাদের বিধান, আমাদেব নৈতিকতা, আমাদেব প্রথা সাক্ষী দেয় যে পুরুষাধিপত্যের গৌরব প্রতিষ্ঠার জন্যে ওই সব প্রণয়ন ও রক্ষণ করেছে সুবিধাভোগী পুরুষেরা।

শিশুকাল থেকেই শিশুরা পিতৃতন্ত্রররের বিধানের শিকার হয়ে ওঠে। ছেলেশিশুকে করে তোলা হয় আধিপত্যবাদী, মেয়েশিশুর মধ্যে জাগিয়ে তোলা হয় অধীন ও অপদার্থের বৌধ। আাডলারের মতে, বালিকা চারপাশে নারীর বিরুদ্ধে কুসংস্কার দেখে দেখে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে নিজের আর নারীজাতির ওপর; এটা কোনো খোজা ঈর্ষাব ফল নয়, সমাজব্যবস্থাই তাকে করে তোলে আত্মবিশ্বাসী। নারীকে বের করে দেয়া হয় শক্তির এলাকা থেকে, পুরুষের সম্াজব্যবস্থা তার সাথে এমন দুর্যবহার করে যে তার মনে দেখা দেয় সংকট। সমগ্র সভ্যতা নারীর ওপর যে-চাপ সৃষ্টি করে, তা নারীকে বাধ্য করে পুরুষেব কাছে আত্মসমর্পণে। তার পক্ষে সুস্থ থাকা কঠিন। তিনি দেখিয়েছেন সমাজ সমস্ত গুরুতৃপূর্ণ কাজকেই মনে করে পুরুষের কাজ, গুরুত্হীন কাজকে মনে করে নারীর কাজ; পুরুষ গুরুতৃপূর্ণ, শক্তিমান, সুযোগ্য; নারী বাধ্য, দাসভাবাপন্ন, অধীনস্থ। তিনি দেখিয়েছেন পুরুষ নারীর প্রতি যে-সৌজন্য দেখিয়ে থাকে, তাতে মনে হয় যে নারীদের খুব মুলা দেয়া হচ্ছে; তবে তাও করা হয় পুরুষের সুবিধারই জন্যে। নারীভূমিকা নিয়ে রয়েছে যে-বিশ্বজনীন অসন্তোষ, আযাডলারের মতে তা নিতে পারে তিন রকম রূপ। নারী হয়ে উঠতে পারে পুরুষের মতো সক্রিয়, বিদ্বোহ করে সে ক্ষতিপূরণ করতে পারে নিজের অবস্থার। এ-ই হচ্ছে পুরুষালি প্রতিবাদ, যার অপব্যাখ্যা করেছেন ফ্রয়েড; তবে পুরুষালি প্রতিবাদের আশ্রয় নিতে পারে নারীপুরুষ উভয়ই, যখন তারা দেখে যে তাদের মানসম্মান বিপন্ন। তার মতে নারীর জন্যে বেধে দেয়া হয়েছে বিশেষ সীমা, ওই সীমা থেকে নারী একটু 5'রে গেলেই তার নিন্দা করা হয় পুরুষালি বলে। তিনি বলেন, এটা কোনো রহস্যময় ক্ষরণের ফলে ঘটে না, ঘটে বিশেষ স্থানে ও কালে, কেননা এ ছাড়া আর কোনো পথ নেই। নারী আরেক ধরনের প্রতিবাদ জানায় নিজেকে সম্পূর্ণ নারী করে, পুরুষের পুরোপুরি অধীন হয়ে, নিজের ব্যর্থতায় নিজেকে অসুস্থ করে। আছে আরেক ধরনের নারী, যারা ভাবতে পারে যে পুরুষই সব, তারা নিজেরা কোনো কাজের নয়, সম্পূর্ণ অযোগ্য তারা; তাদের অধীনতা ন্যায়সঙ্গত। তাদের এমনোভাবও একধরনের গ্রতিবাদ, পরোক্ষ প্রতিবাদ: পুরুষের ওপর সমস্ত দবায়িত্ ছেড়ে দিয়ে, নিজেরা সামান্যও দায়িত্বভার না নিয়ে তারা জানায় প্রতিবাদ। তাদের ভাব এমন: যেহেতু তোমরা পুরুষ, তাই তোমাদেরই সব কিছু করতে হবে, আমরা কিছু করতে পারবো না। ফ্রয়েডের পুংগুটৈষা তিনি মানেন নি, মানেন নি শিশ্নীসুয়া। তিনি মনে করেন ফ্রয়েড যে-সবকে মনে করেন জৈবিক ও বিশ্বজনীন, তা আসলে সামাজিক; তাই দরকার সমাজবদল।

ফ্য়েড মনোবিজ্ঞানের নামে নারী সম্পর্কে প্রকাশ করেছিলেন একরাশ পুরুষতান্ত্রিক কুসংস্কার; পুরুষাধিপত্যকে তিনি করে তুলেছিলেন জৈবিক, যদিও তা সাং্কৃতিক। তার প্রভাবেরও সীমা ছিলো না; তিনিই যেহেতু ছিলেন মনোবিজ্ঞানের শেষ কথা, তাই দেখা

১৭০ নারী

দিয়েছিলেন তার অসংখ্য অনুসারী, ও জনপ্রিয় ভাষ্যকার, যারা প্রচার করে চলছিলেন যে নারী বিকলাঙ্গ, আর পুরুষাধাপিত্য মেনে নেয়াই নারীজীবনের সার্থকতা। চলিশের দশকে দেখা দেন একদল মনোবিজ্ঞানী, যাদের বলা হয় উত্তর-ফ্রয়েজীয়, যাদের

মধ্যে ছিলেন অনেক নারীও; কিন্তু তারা ফ্রয়েডের সমস্ত কুসংঙ্কারকে চুড়ান্ত বিজ্ঞান মনে করে বিচিত্রভাবে প্রমাণ করেন যে নারী বিজ্ঞানসম্মতভাবেই বিকলাঙ্গ পুরুষ। ইয়ুং ফ্রয়েডকে বলেছিলেন, ফ্রয়েডের মৃত্যুর পরে তার অনুসারীরা তার ভুলগুলোকেও 'পবিত্র স্মৃতিচিহ্ৃ” হিশেবে গণ্য করবে, তা প্রমাণিত হয় সত্য বলে। উত্তর-ফ্রয়েডীয়রা ফ্রয়েডের সমস্ত ভুলকে খ্রুব জ্ঞান করে সেগুলোকে চাপিয়ে দিতে থাকেন নারীর ওপর; জনপ্রিয় ভাষ্যকারেরা সেগুলোকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়ে নারীদের সন্ত্রস্ত করে তোলেন। ফ্রয়েডের নারীতত্ত্বের দুজন আদি সম্প্রসারণকারী নারী: মারি বোনাপার্ত ও হেলেন ডয়েটশ্; কিন্তু তারা কোনো প্রশ্ন তোলেন নি ফ্য়েডের নারীমনোবিজ্ঞান সম্পর্কে,

বরং তারা ফ্রয়েডকে ছাড়িয়ে গিয়ে প্রবলভাবে প্রকাশ করেন নারী সম্পর্কে ছদ্মবৈজ্ঞানিক কুসংক্কার। যেমন ফ্রয়েডীয় নারীর অক্রিয়তা ও মর্ষকামতত্ত্বকে বোনাপার্ত। দ্র মিলেট ( চরমরূপ দেন এভাবে:

পশু বা উত্ডিদ, প্রাণীজগতেব সবটা জুড়েই অক্রিমতা হচ্ছে নারীকোষেব বৈশিষ্ট্য, ডিম্বেব লক্ষ্যই হচ্ছে পুরুষকোষ্র জনো অপেক্ষা কবা, অপেক্ষায় থাকা যে সক্রিয় সচল শুব্রাণ আলবে ও তাকে বিদ্ধ কববে। এমন ধিদ্ধকরণেব অর্থ হচ্ছে তার কোষলংঘন, তবে কোনো জীবিত প্রাণীব কোষলংঘন্ বোঝাতে পাবে ধ্বংস: মৃত্যু অথবা জীবন তাই নারীকোষের উর্ববতা পুঁচিত হয় এক ধরনেব ক্ষত দিয়ে; স্বভাবে, নারাকোষ আদিরূপেই মর্ষকামী'।

তার চোখে শুক্রাণু আক্রমণাত্মক, তাই পুরুষ আক্রমণাত্মক: একেই মনে করেন তিনি স্বাভাবিক। নারী তার খর্ব ভগাঙ্কুরের মতোই, তার পক্ষে আক্রমণাত্মক হওয়া অসম্ভব। বোনাপার্তের মতে, নারীর লিবিডো যেমন দুর্বল তেমনি দুর্বল তার আক্রমণাকজ্মকতা: তাই নারীকে থাকতে হবে পুরুষপর্মূদস্থ। তিনি প্রচার করেন যে পুরুষ যেহেতু জৈবিকভাবেই আক্রমণাত্মক, তাই তার আধিপত্য অনিবার্ধ। এ-সবই হচ্ছে ফ্রয়েডীয় তত্ত্বকে ধ্রুব মনে করে চরমে নিযে যাওয়া, ফ্য়েডেব কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা, ও নারীকে সমর্পণ করা পুরুষের কাছে। বোনাপার্ত আত্মসমর্পণ করেছিলেন সম্পূর্ণরূপে ফ্রয়েডের কাছে, তাই নারী তার কাছে চরম মর্ধকামী; তানি নে করেন নারী সঙ্গমে যে সুখ পায়, তা আসলে উৎপীড়িত হওয়ারই সুখ। তার মতে সঙ্গমে নারী উপভোগ করে শিশ্নের প্রহার: সে শিশ্বের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়, সে ভালোবাসে শিশ্নের সন্ত্রাস! নারী যদি পছন্দ না করে শিশ্নের সন্ত্রাস, তাহলে? তাহলে. ঞকয়েড যেমন বলেছেন, তা নারীরই অপরাধ বা বিকার; যে-নারী এটা পছন্দ করে না সে পুংগৃটৈযাগ্রস্ত, পুরুষালি প্রতিবাদের শিকার! ফ্রয়েড বলেছেন, স্বাভাবিক নারী সঙ্গমে সুখ বোধ করে যোনির ভেতরে. স্বাভাবিক নারীর পুলক হচ্ছে যোনীয় পুলক: শুধু বিকৃতরা পুলক বোধ করে ভগাঙ্কুরে, তারা ভগাঙ্কুরীয়। ভগাঙ্কুরীয হওয়া বিকার ফ্য়েডীয় মনোবিজ্ঞানে; তাই এমনভাবে সঙ্গম করতে হবে যাতে শিশ্ব একটুও

ফ্রয়েভীয় কুসংস্কার, ও মনোবিশ্লেষণাত্বক-সমাজবৈজ্ঞানিক প্রতিক্রিয়াশীলতা ১৭১

স্পর্শ না করে ভগাঙ্কুরটিকে। বোনাপার্ত নারীকে শুধু মর্ষকামী হিশেবে বর্ণনা করেন নি, তিনি অনুশাসন দিয়েছেন যে নারীকে হতেই হবে মর্ধকামী। যে হবে না সে বিকৃত। তবে এতে কোনো বিজ্ঞান নেই, রয়েছে ভিক্টোরীয় কুসংস্কার; ফ্রয়েডের ভুল পদতলে নারীসমর্পণ।

ফ্লয়েডের ভ্রান্তি আর কুসংক্কারগুলোকে খুব সত্যরূপে মেনে নিয়েছিলেন আরেক নারী মনোবিজ্ঞানী। তিনি হেলেন ডয়েট্শ্, যার দু-খণ্ডের নারীমনোবিজ্ঞান- মনোবিশ্লেষণাত্বুক ভাষ্য ( এক সময় হয়ে উঠেছিলো খুবই প্রভাবশালী, এমনকি দ্য বোভোয়ারও মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন তার নানা অপব্যাখ্যা। তিনি নারীত্বববকে অক্রিয়তার ও পুরুষত্বকে সক্রিয়তার সাথে অবিচ্ছেদ্য করে তুলেছিলেন: শুধু কামে নয়, জীবনের সব এলাকায়। লৈঙ্গিক রাজনীতি তিনি শুরু করেছিলেন শয্যায়, এবং তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন জীবনের সবখানে। যে-নারী সক্লিয়, তার মতে সে-উ পুংঈর্ষাগ্রস্ত; ওই পুংগুটেষার মূলে রয়েছে নারীর খোজাত্ব, তার শিশ্ব আর অণ্ডকোষের অভাব। তার মতেও নারীর তিন মৌল বৈশিষ্ট্য আত্মপ্রেম, নক্রিযতা, ও মর্ষকাম। তার চোখেও নারী বিকলাঙ্গ পুরুষ, যার শিশ্ল নেই, রয়েছে একটি অক্ষম খর্ব ভগাঙ্কুর; এবং দেহসংস্থানই নারীর নিয়তি। যে-নারী আত্মপ্রেমিক, অগ্রিয়, মধকামী, সে-ই স্বাভাবিক নারী তার চোখে; আর অস্বাভাবিক তারা, যারা বর্জন করে আত্মধেম, যারা পোষণ করে বাস্তব জীবনে সাফল্যের লক্ষ্য, যারা উপভোগ করে না মর্ষকাম। স্বাভাবিক হয়ে ওঠাব জন্যে নারীকে ছেড়ে দিতে হবে স্ব লক্ষা, জীবনকে চরিতার্থ করে তুলতে হবে স্বামী বা পুত্রের কাজ ও সাফল্যের মধ্যে। তার মতে যে-নারীরা অর্জন করেছে নানা সাফল্য, তারা তা অর্জন করেছে স্বাভাবিক নারীত্ববব বিসর্জন দিয়ে; তাই তারা বিকৃত। স্বাভাবিক নারী, ডয়েটশৈর মতে, হবে কামপরায়ণ; তার্র জীবনের লক্ষ্যই হবে প্রেম দেয়া ও পাওয়া। এ-স্বাভাবিক নারীরা বিশিষ্ট করে তুল ৩ চায় না নিজেদের, তারা একাত্ম বোধ করে কোনো পুরুষের সাথে, এবং এর মধ্য দিয়েই বোধ করে জীবনের চরিতার্থতা। যে-নারী সাফল্য অর্জন করতে চায় সে বিকৃত, সে পুরুষালি প্রতিবাদের শিকার, যেমন তিনি দেখিয়েছেন যে জর্জ সা শিকার ওই রোগের। এ-মনোবিজ্ঞানী, যিনি নিজে নারী ও সাফল্য অর্জন করেছিলেন পুরুষের ক্ষেত্রে, আসলে বিশ্বাসী ছিলেন নারী সম্পর্কে কুসংস্কারে, এবং প্রথাগত নারী ধারণায় [দ্র থিযার ]:

যদি তাদের থাকে প্রচুর পরিমাণে বোধি, যেটা নারী'র বৈশিষ্ট্য, তারা হয় আদর্শ সহচরী, যাবা নিয়ত অনুপ্রাণিত করে তাদের পুরুষদের, এবং তারা এ-ভূমিকায় পায় সবচেয়ে বেশি সুখ। তাদের সহজেই প্রভাবিত কবা যায় এবং তারা তাদেব সঙ্গীদের সাথে খাপ খাইয়ে নেয় এবং তাদেন বুঝতে পাবে। তারা সুন্দরতম ও সবচেয়ে কম্ আক্রমণাত্মক সঙ্গিনী এবং তারা থাকতে চায় ওই ভূমিকায়ই; তারা নিজেদের অধিকারের জন্যে চাপ দেয় না-বরং তার বিপবীত। শুধু প্রেম দিয়ে তাদের যে-কোনোভাবে সহজে চালানো যায়। কামে তারা সহজেই উদ্দীপিত হয় এবং খুব কম সময়ই তারা কামশীতল; তবে কামে তারা আরোপ করে মর্ষকামী শর্ত যা অবশ্যই পরমভাবে পরিতৃপ্ত করতে হবে। তারা প্রেম চায় এবং প্রত্যাখ্যান কবে সব ধরনের সক্রিয় প্রবণতা।

১৭২ নারী

যদি তাদের কোনো প্রতিভা থাকে তবে তারা ওই শক্তিকে মৌলিক ও সৃষ্টিশীলভাবে কাজে লাগায়, তবে তারা প্রতিযোগিতামূলক সংগ্রামে যোগ দেয় না। তারা সব সময়ই নিজেদের অর্জন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত, এতে তারা একটুও মনে করে না যে তারা কিছু বিসর্জন দিচ্ছে, এবং তারা তাদেব সহকর্মীদের সাফল্য উল্লাস বোধ করে, যাদের তারা অনুপ্রাণিত করেছে। যখন তার! নিয়োজিত হয় কোনো বহিম্থি কাজে তখন তারা অত্যন্ত প্রয়োজন বোধ করে সহায়তার, তবে তারা যখন তাদেব অন্তজীবনেব কোনো অনুভূতি বা চিস্তায জড়িত হয়, অর্থাৎ নিযোজিত হয় অভ্তমুর্থি কাজে তখন তারা চুডান্ত স্বাধীন তাদেব [পুরুষেব সাথে] একাত্মতারোধের শক্তি কোনো আত্তর দারিদ্র্যের প্রকাশ নয়, ববং আতন্তব সম্পদের প্রকাশ।

এটা নারীর বৈজ্ঞানিক বর্ণনা নয়, এটা অনুশাসন; তিনি চান এমন আদর্শ নারী, যা শুধু দুম্প্রাপ্যই নয়, অসম্ভব। তার নারী বর্জন করবে নিজের সন্তা। এমন নারী কোনো মানুষ নয়, সে নিজের জন্যে বাঁচে না; তবে নারী নিজের জন্যেও বেঁচে থাকে। এমন নারী জীবিত থাকে যখন তার পাশে থাকে কোনো পুরুষ, যার ওপর সে শুধু নির্ভরই করে না, যে তার প্রাণধারণের নিশ্বাস। ডয়েটশু নারীকে পরামর্শ দিয়েছেন নিজেকে প্রত্যাখ্যান করার, পুরুষের সহচরী হয়ে ওঠার, পুরুষের সাথে খাপ খাওয়ানোর ও একাত্মতারোধের: এর বদলে নারী পাবে সব কিছু। সে পাবে পুরুষের আদর, কাম, প্রেম, গৃহ; পুরুষ তাকে প্রভাবিত করবে, যেমন ইচ্ছে চালাবে, চাষ করবে, যেখানে ইচ্ছে রাখবে। এমন নারী আকর্ষণীয় মনে হতে পারে অনেকের কাছে, কিন্তু আসলে এমন ডয়েট্শীয় নারী আপাদমস্তক ক্লান্তিকর। সে আত্মবিসর্জনের মর্মম্পশশী উদাহরণ। একে মনোবিশ্লেষণ হিশেবে চালিয়েছেন ডয়েট্শু, তবে এ হচ্ছে নারী সম্পর্কে প্রথাগত কুসংস্কার। তার বইয়ের দু-খণ্ডকে এক সময় মনে করা হতো নারী সম্পর্কে শেষকথা. কিন্তু তিনি নিজে নারী হয়েও প্রচার করেছিলেন পুরুষতান্ত্রিক কুসংস্কার। বোনাপার্ত ও ডয়েট্শ্ পুরুষতন্ত্রে দীক্ষার মর্মস্পশশী উদাহরণ।

চল্লিশের দশকে শুরু হয় ফ্রয়েডীয় নারীতত্ত্বের জনপ্রিয়করণ, বিচিত্র ধরনের রচনা ও বইয়ে চারপাশ ছেয়ে যায়, প্রতিক্রিয়াশীলতা উপচে পড়তে থাকে ঝকঝকে ছাপা পৃষ্ঠার ভেতর থেকে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মনোবিশ্লেষক ফার্ডিনান্ড লুর্ডবার্গ ও সমাজতাত্ত্ক মারিনিয়া ফার্নহ্যামের আধুনিক নারী, বিলুপ্ত লিঙ্গ ( নামের একটি চরম প্রতিক্রিয়াশীল বই। বইটি সাধারণ পাঠকদের ও পাঠ্যপুস্তক হিশেবে তরুণতরুণী'দের অত্যন্ত প্রভাবিত করে। বইটি মধ্যযুগের একটি প্রচারপুস্তক; এটিতে আধুনিক সমস্ত কিছুকে নিন্দা করা হয়, মধ্যযুগকে চিত্রিত করা হয় স্বর্ণযুগ রূপে, আর সমস্ত আধুনিক প্রগতিশীল আন্দোলনগুলোর বিরুদ্ধে প্রচার করা হয় ঘৃণা। তাদের বিশেষ আক্রমণের লক্ষ্য নারীমুক্তি আন্দোপন। লেখকদের মতে, যাদের একজন নারী, বর্তমান কালের অনেক নষ্টের মূলেই রয়েছে নারীবাদ, এবং এরই জন্যে নারী পরিণত হয়েছে “বিলুপ্ত লিঙ্গ'-এ। তাদের মতে নারীবাদের মূলকথা বিদ্বেষ, নারীবাদ একধরনের নাটশিবাদ। এ-প্রতিক্রিয়াশীল লেখকদের মতে মার্স আর মিল বিকৃত পুরুষ, আর বিশেষভাবে বিকৃত হচ্ছেন মেরি ওলস্টোনক্র্যাফুট্। ওই নারীই শুরু করেছিলেন নারীবিপ্লব নামক উন্মত্ততা। তাদের মতে নারীবাদ শুধু অশুভই নয়, একটি রোগ,

মনোবিকার, গৃহের শক্র: নারীবাদ আবেগগত কগ্রতার প্রকাশ। তাদের মতে নারীপুরুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না, সাম্য প্রতিষ্ঠার কোনো লক্ষ্য থাকলে তারা শারীরিকভাবে একই হতো। তারা ঘোষণা করেন যে নারীবাদীরা পুরুষ হতে চায়, তারা ভোগে চরম শিশ্নীসুয়ায়। তাদের মতে, 'নারীবাদ হচ্ছে নারীর আত্মহত্যা, পুরুষের মতো বাচার প্রয়াস" [দ্র মিলেট (। তাদের মতে মা হওয়া ছাড়া নারীর অন্য কোনো ইচ্ছে পোষণ করাই অসন্ভব অভিলাষ, পুরুষ হওয়ার অভিলাষ; এবং তারা ওই অভিলাষকে তিরফ্কার করেন প্রাণ ভরে। তারা চান নারী থাকবে নারী হয়ে; তারা মা হবে, পুরুষের অধীনে থাকবে, পুরুষের ওপর নির্ভরশীল থাকবে। নারী সৃষ্টি হয়েছে শুধু এ-জন্যেই। তাদের মতে নারীবাদী আন্দোলন কমিয়ে দিয়েছে বিবাহ ও সংসারের মহিমা; আর নারীবাদীরা যে পুরুষের জন্যে এক নৈতিকতা আর নারীর জন্যে আরেক নৈতিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়, তার কারণ তাদের ভেতরে রয়েছে অবৈধ কামের গভীর বাসনা। তারা বিবাহপূর্ব কৌমার্য চান, তবে তা শুধু নারীর জন্যে; আর মনে করেন যে নারীপুরুষের ভিন্ন নৈতিকতা শুধু অনিবার্ধই নয়, বিশেষভাবেই কাম্য। তারা জয়গান করেন নারীতে, পরিবারের, নারী-অধীনতার, মাতৃত্বের। তাদের মতে পুরুষ থাকবে পুরুষের এলাকায়, নার! নারীর এলাকায়। যে-নারী খাপ খাওয়াতে পারে না পুরুষতন্ত্রের সাথে, তারা বিকৃত, ব্যাধিপ্রস্ত। এ-দুই লেখক মনোবিজ্ঞানের নামে প্রচার করেছেন প্রতিক্রিয়াশীলতা; তাদের বইয়ের ভেতর কোনো মনোবিজ্ঞান নেই, আছে অপবিজ্ঞান।

এক মনোবিশ্রেষক, এরিক এরিকসন, নারীকে ঘরে আটকে রাখার জন্যে বের করেন ইনার স্পেস বা আতর বা আভ্যতর জগততত্। তিনি গবেষণা করেন কিশোরকিশোরীদের নিয়ে, তাদের হাতে দেন নানা মালমশলা এবং তৈরি করতে বলেন মনের মতো কাঠামো। তিনি দেখতে পান মেয়েরা বান. তৈ পছন্দ করে কোনো গৃহের অভ্যন্তর. যেখানে আছে সুখশান্তি, তারা তৈরি করে স্থির নানা অবস্থা, যেমন কেউ পিয়ানো বাজাচ্ছে। অন্যদিকে ছেলেরা তৈরি করে উচু অস্টরালিকা, অস্টালিকার ভেঙে পড়া, এবং সড়ক, যেখান দিয়ে ছুটে চলছে যানবাহন। এ দেখেই এরিকসন ঠিক করে ফেলেন যে এর সাথে সম্পর্ক আছে নারীপুরুষের লিঙ্গসংস্থানের: পুরুষ চায় উচ্চতা, সক্রিয়তা; নারী চায় অবরোধ, নিরাপত্তা। তিনি তত্ত্ব তৈরি করে ফেলেন যে নারীর শরীরসংগঠনই, তার জরায়ু ও যোনির আভ্যন্তর জগতই স্থির করে দেয় নারীর সত্তা, যা ভিন্ন পুরুষের থেকে। যেনো নারীর দেহসংগঠন পরিকল্পনার মধ্যেই রয়েছে শিশুপালনের শারীরিক, মনস্তাত্বিক, নৈতিক অঙ্গীকার! ফ্রয়েড বলেছিলেন যে নারী বোধ করে তার শিশ্ন নেই, আর এরিকসন আবিষ্কার করেন যে নারী বোধ করে যে তার অভ্যন্তরে একটি জগত রয়েছে, যেটির নাম জরায়ু। এরিকসন যে-উপাত্ত থেকে এতো বড়ো সিদ্ধান্তে পৌচেছেন, তা একটু ভালোভাবে দেখলেই তার ইনার স্পেস ও আউটার স্পেসতত্ত্ব ভেঙে পড়ে। মধ্যবিত্ত কিশোরকিশোরীরা বড়ো হয় যে-আবহাওয়ার মধ্যে, তাই তাদের শিখিয়ে দেয় যে মেয়েরা ভালোবাসবে ঘর, আর ছেলেরা বাইর; তাই তারা মেয়েলি ব্যাপারগুলোই বেছে নেয়, ছেলেরা বেছে নেয় পুরুষের ব্যাপারগুলো। এরিকসনের ইনার স্পেস,

১৭৪ নারী

আউটার স্পেসতন্ত্ব আমেরিকার মহাকাশ বিজয়ের সময়ের এক মার্কিন মনোবিশ্রেষকের অপবৈজ্ঞানিক পাগলামো। অন্যরা অন্তত পুরুষের জন্যে বাইর রেখে নারীর জন্যে রেখেছিলেন ঘর: মার্কিন মহাজগতমত্ততার কালে এ-বিজ্ঞানী পুরুষের জন্যে রাখেন মহাজগত, আর নারীর জন্যে রাখেন জরায়ু।

মনোবিশ্লেষণাত্ক কুসংস্কারের পর পশ্চিমে নারী সম্পর্কে ছড়িয়ে পড়ে সমাজতাত্তিক কুসংস্কার; সমাজবিজ্ঞানীরা সমাজকে স্থির করে দেয়ার জন্যে তৈরি করেন এক ঝকঝকে তত্তু, তার নাম দেন ফাংশনালিজম বা ভুমিকাবাদ। তারা কাজ করেন সাক্কৃতিক নৃতত্ত্ব ও সমাজতত্ত নিয়ে, ঢুকে পড়েন পরিবারের ভেতরে, এবং তাদের বিদ্যাকে বিজ্ঞানসম্মত করার জন্যে নানা ধারণা ধার করতে থাকেন শরীরবিজ্ঞান থেকে, বিভিন্ন সামাজিক সংস্থাকে বর্ণনা করতে থাকেন সংগঠন, ভূখিকা ইত্যাদি ধারণার সাহায্যে, যেনো, যেমন ফ্রাইডান ( ১১২) বলেছেন, ওই সব সংস্থার রয়েছে শক্ত অস্থি-পেশি প্রভৃতি। তারা তাদের বিদ্যাকে করে তোলেন ছদ্মবিজ্ঞান। তারা বর্ণনার বদলে প্রচার করতে থাকেন অনুশাসন; কে কী ভূমিকা পালন করে, তার বদলে নির্দেশ দিতে থাকেন কার কর্তব্য কী ভূমিকা পালন। নারী হয়ে ওঠে ভূমিকাবাদের শিকার; নারীকে তারা বন্দী করে ফেলেন নারী-ভূমিকায়। ভূমিকাবাদ বিবর্তনে বিশ্বাস করে না, মনে করে যে সব কিছু চিরস্থির হয়ে থাকবে, যে আছে যে-ভূমিকায় সে থাকবে তাতেই। লৈঙ্গিক বিপ্লবের লক্ষ্য হচ্ছে প্রথাগত লিঙ্গভেদ অস্বীকার করা, বিশেষ লিঙ্গের বলেই কাউকে পালন করতে হবে বিশেষ ভূমিকা বা হতে হবে বিশেষ মেজাজের, তা মেনে না নেয়া, আর ভূমিকাবাদের মূলকথা ওই সব মেনে নেয়া। ভূমিকাবাদীরা ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞান, সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্, গণিত প্রভৃতি মিশিয়ে তৈরি করেছিলেন এমন এক অপবিজ্ঞান, যার সারবাণী হচ্ছে গৃহই নারীর স্থান। আধ্নিক বিবাহ ( নামের এক বইয়ে এক সমাজবিজ্ঞানী লিখেছেন [দ্র ফ্াইডান (

নারীপুরুষ পরিপূরক! . . . পুরুষ ও নারী মিলে গ'ড়ে তোল এক কার্যকর একক। একলা প্রত্যেকেই

অসম্পূর্ণ। তারা পরিপূরক। . . . পুরুষ ও নারী যখন নিয়োজিত হয় একই পেশায় বা সম্পন্ন করে একই

ভূ'মকা, তখন এ-পরিপুরক সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়।

একথা বলার জন্যে নতুন সমাজবিজ্ঞানীর দরকার ছিলো না; টেনিসন, রাসকিন ও অনেক ভিষ্টোরীয় মহাপুরুষ একথা বলে গেছেন আরো আকর্ষণীয় মৌলিক ভঙ্গিতে; কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে যে একথ! আবার বলা হয়েছে বিশশতকের চল্লিশের দশকে, বলেছেন “বিজ্ঞানী!

এ-বিজ্ঞানীরা তরুণীদের শিখিয়েছেন যে সারা জীবনের জন্যে কোনো পেশা গ্রহণ; করা ঠিক নয়। যদি কোনো পেশা নিতে হয়, তবে নিতে হ'বে কিছু কালের জন্যে, ওই সময় চেষ্টা চালাতে হবে বিয়ের জন্যে, আর বিয়ে হয়ে গেলে পেশাকে বিদায় দির়ে ঢুকতে হবে ঘরে, জরায়ুকে চরিতার্থ ক'বে তুলতে হবে মাতৃত্বে। তারা শিখিয়েছেন বিয়ে আর পেশা একসাথে চালানো খুব খারাপ, পেশার থেকে বিয়ে অনেক ভালো; তাই ছেড়ে দিতে হবে বাইরের জীবন। কারণ মেয়েরা গৃহেই সুন্দর। তারা শিখিয়েছেন যদি

ফয়েডীয় কুসংস্কার, ও মনোবিশ্লেষণাত্বক-সমাজবৈজ্ঞানিক প্রতিক্রিয়াশীলতা ১৭৫

মেয়েরা পেশাই বেছে নেয়, তবে তাদের থাকতে হতে পারে চিরঅবিবাহিত; যদি তারা মিলন ঘটাতে চায় বিয়ে ও পেশার, তবে তা ডেকে আনবে বিপর্যয়। ওই বিজ্ঞানীরা পরিসংখ্যানের পর পরিসংখ্যান ছেপে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে খুব বেশি মানুষের পক্ষে একই সাথে দুটি পেশা, সংসার ও চাকুরি, চালানো সম্ভব নয়, তা পারে শুধু অসাধারণেরা। কেননা এ-পেশা দুটির দাবি দু-রকম: সংসার চমৎকারভাবে চালানোর জন্যে দরকার নিজেকে পুরোপুরি অস্বীকার করা, দরকার পারস্পরিক সহযোগিতা; আর চাকুরির জন্যে দরকার আত্মবিকাশ, প্রবল প্রতিযোগিতা। তারা তরুণীদের জানিয়েছেন যে আত্মবিকাশ খুব বিপজ্জনক ব্যাপার. খুবই সহজ ও মনোরম হচ্ছে আত্মস্বীকার। তারা শিখিয়েছেন সংসারে সুখী হওয়া যায় তখনই যখন স্বামীস্ত্রী হয় পরস্পরের পরিপূরক, স্ত্রী থাকে ঘরে স্বামী বাইরে। দুর্ঘটনা ঘটে যখন দুজনই করে একই কাজ। এ হচ্ছে বিজ্ঞানসম্মত ভূমিকাবাদ। ভূমিকাবাদীদের প্রধান ছিলেন ট্যালকট পারসন্স্, যিনি মর্কিনদেশে নারীপুরুষের ভূমিকা বিশ্রেষণ করে দেখান যে নারীর শ্রেষ্ঠ ভূমিকা হচ্ছে গৃহিণীর ভূমিকা! তার মতে [দ্র ফাইডান (

নারীর মৌল মর্যাদা হচ্ছে স্বামীর স্ত্রী, আর সন্তানের মায়েব মর্যাদা।

এটা অসার মর্যাদা, নিজের নয়, অন্যের থেকে তার ওপর পতিত মর্যাদা; আর একথা বলার জনো কোনো নতুন স্মাজবিজ্ঞানীর দরকার ছিলো না, পুরুষতন্ত্রের বিভিন্ন বই আর মনীষী এসব বলে আসছে কয়েক হাজার বছর ধরে। পুরুষ তো পিতা আর স্বামী হওযার মর্যাদায় গৌরব বোধ করে না'। নারী ব্যস্ত থাকবে ঘর আর সন্তান নিয়েঃ তবে তিনি লক্ষ্য করেছিলেন নারীর ঘরকন্নার কাজ গুরুত্ হারিয়ে ফেলেছে, দিনভর করার মতো কাজ আর সংসারে নেই; তিনি স্ত্রীর জৌলুশপর্ণতার কথা বলেছেন, তবে দেখেছেন ওটা থাকে শুধু যৌবনের কালে; তারপর সব কিছু ধ'সে পড়ে। পারসন্গ্ চান সমাজ যেভাবে চলছে চলবে সেভাবেই, নারী পালন করে যাবে তার প্রথাগত দাসীর ভূমিকা। তিনি, ও তার সঙ্গীরা, জানেন সমাজ চলছে, কেননা বিপুল জনগোষ্ঠি মেনে নেয় তাদের অবস্থা, তারা খাপ খাইয়ে নেয় তাদের ভূমিকার সাথে। সমাজ তাদের বিন্যস্ত করে যেখানে সেখানে থেকেই তারা পালন করে তাদের ভূমিকা; ব্রাহ্মণ পালন করে ব্রাহ্মণের শুদ্ব পালন করে শুদ্রের ভূমিকা; তারা চান এ-ভূমিকা পালন চলবে চিরকাল। বালিকা, যেহেতু ভবিষ্যতে হবে স্ত্রী, প্রস্তুতি নেবে স্ত্রী হওয়ার; বালক নেবে সামী হওয়ার প্রস্তুতি। বালিকা প্রস্তুতি নেবে আনুগত্যের, নির্ভরতার; বালক নেবে স্বাধীনতা, আধিপত্য, আক্রমণাত্মকতা, ও প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি।

এক ভূমিকাবাদী সমাজবিজ্ঞানী একটি আদর্শ সমকালীন তরুণীর চিত্র একেছেন এভাবে [দ্র ফ্রাইডান (

আজকের ঐতিহাসিক মুহূর্তে, শ্রেষ্ঠ খাপ-খাওয়া মেয়ে সম্ভবত সে, যার পরীক্ষায় ভালো করার মতো যথেষ্ট বুদ্ধি আছে, তবে সব বিষয়ে “এ' পাওয়ার মতো মেধা নেই. . . যে বেশ উপযুক্ত, তবে সে-সব বিষয়ে নয় যেগুলো নারীদের কাছে নতুন; যে নিজের পায়ে দীড়াতে পারে এবং নিজেব জীবিকা অর্জন করতে পাবে, কিন্তু পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতা করার মতো ভালোভাবে পারে না; কোনো কাজ

১৭৬ নারী

ভালোভাবে করতে পারে যেদি সে বিয়ে না করে, বা অন্য কোনো কারণে তাকে কাজ করতে হয়) তবে সে তার পেশাব সাথে একাত্ম বোধ করে না, নিজের সুখের জন্যে তা দরকারি মনে করেনা।

যে-আদর্শ মেয়েটিকে তিনি কামনা করেছেন, সে চিরবালিকা; ভূমিকাবাদীরা চান তাই। এখানে পাই একটি শোচনীয় মেয়েকে, যার শরীরের ভাজ আর মস্তিষ্কের কোষ সবই পুরুষের জন্যে। পরীক্ষায় সে ভালো করবে, কিন্তু বেশি ভালো করবে না; সে চাকুরি করবে, কিন্তু বেশি ভালো চাকুরি করবে না। ওসব করবে ছেলে। সে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবে নারীর ভূমিকায়। এসব কথা অনেক আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে অনেক আগে বলেছেন রাসকিন ও অন্যান্য ভিক্টোরীয়। তবে ভিক্টোরীয়রা বিজ্ঞানের বেশে এগুলো প্রকাশ করেন নি, এরা প্রতিক্রিয়াশীলতা প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানের বেশে। বিজ্ঞানীরা, ও বিজ্ঞান, হয়ে থাকেন ভবিষ্যৎমুখি, কিন্তু ভূমিকাবাদী এ-সমাজবিজ্ঞানীরা পুরোপুরি বর্তমানগ্রস্ত; না, তারা সম্পূর্ণরূপে অতীতগ্রস্ত। তারা তাদের তত্ত্বে শক্তিশালী করে তুলেছেন বাতিল অতীতের কুসংস্কার, এবং রোধ করতে চেয়েছেন পরিবর্তন। ভূমিকাবাদ বিজ্ঞান নয়, অনুশাসন; আগে যে-বিধান দেয়া হতো ধর্মের নামে, ফ্রয়েডের মনোবিজ্ঞান থেকে পারসন্সীয় ভূমিকাবাদ তাই করে ছদ্মবিজ্ঞানের নামে। ধর্মকে অস্বীকার করা সম্ভব, কিন্তু বিজ্ঞানকে অস্বীকার আজকাল অসম্ভব; তাই এসব নারীর ক্ষতি করেছে খুবই বেশি। ভূমিকাবাদ চায় যে মানুষ খাপ খাইয়ে চলবে তার অবস্থার সাথে, কেননা খাপ খাওয়ানোই স্বাভাবিকতা। ভূমিকাবাদীরা দেখেছেন প্রথাগত ব্যবস্থা বেশ কার্যকর, তাই তারা বিধান দিয়েছেন যে তাই ঠিক, এবং তাই মেনে চলতে হবে। তারা নারীদের আবার ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন ঘরে, নারীদের করে তুলতে চেয়েছিলেন মার্গারেট মিডের ভাষায় আধুনিক 'গুহামানবী"। মিড নিজে যদিও মুক্তি আদায় করে নিয়েছিলেন পুরুষতন্ত্রের শেকল থেকে, তবু তিনি নিজেও পরে অজ্ঞাতসারে কাজ করেছেন পুরুষতন্ত্রের পক্ষে; এবং শেষে বুঝতে পেরেছেন ভুল করে ফেলেছেন অনেকখানি। বিশশতক আধুনিক সময় হিশেবে চিহ্িত, কিন্তু এর বিজ্ঞান থেকে বিনে ছাডয়ে আছে কুসংস্কার, যার একটি বড়ো লক্ষ্য নারীকে পুরুষাধীন করে তোলা।

আরও বই