নারী

রামমোহন ও বিদ্যাসাগর : প্রাণদাতা ও জীবনদাতা

হুমায়ুন আজাদ

রামমোহন ও বিদ্যাসাগর: প্রাণদাতা ও জীবনদাতা

অভিজাতশ্রেণী সমাজের অধিকাংশ মানুষকে এমন নিপুণভাবে পীড়ন ও পর্যুদস্ত করতে পারে নি। হিন্দু পিতৃতন্ত্ররর সমাজকে শুধু চার বর্ণে বিভক্ত করে নি, অভিজাতমণ্ডলি অনভিজাতদের ওপর শুধু নির্মম পীড়ন চালায় নি; হিন্দু পিতৃতন্ত্ররর পীড়িত হওয়াকে পরিণত করেছিলো নিম্নবর্ণের ধর্মে। হিন্দু পিতৃতন্ত্রররে অধিকাংশ মানুষ মর্ষকামিতার শিকার, মর্ধকাম তাদের পুণ্য ধর্ম। উৎপীড়িত হওয়া মানুষের শোচনীয়তার লক্ষণ নয়, ওই উৎপীড়ন মেনে নেয়াই মানুষের শোচনীয়তার লক্ষণ; এবং মানুষকে হিন্দু পিতৃতন্ত এমন শোচনীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলো যে সমাজের অধিকাংশ মানুষ উৎপীড়িত হওয়াকেই ভক্তি করেছে ধর্ম বলে। হিন্দু পিতৃতন্ত্রররে অধিকাংশ পুরুষই যেখানে সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের বলি, সেখানে নারীর অবস্থা যে হবে চূড়ান্ত শোচনীয়, তার অস্তিত্ববই যে অস্বীকার করা হবে, তাকে যে শারীরিকভাবে পীড়ন করা হবে, তা ধরে নেয়া যায়; এবং হিন্দু পিতৃতন্ত্ররর নিষ্ঠুরতায় ছাড়িয়ে গেছে সমস্ত সীমা। অন্যান্য পিতৃতন্ নারীকে মনে করেছে দাসী ও ভোগ্যসামগ্রী, আর হিন্দু পিতৃতন্ত্ররর নারীকে গণ্য করেছে বলির পশু: নারীকে ধারাবাহিকভাবে বলি দিয়েছে পুরুষেব যুপকাঠে। হিন্দু পিত্তন্ নারীকে সম্পত্তির আঁধকার দেয় নি, পুরুষকে করেছে নারীর ঈশ্বর, পুরুষকে দিয়েছে অবাধ নারীঅপব্যবহারের অধিকার, বিধবাকে দেয় নি বিয়ের অধিকার, এবং নারীপোড়ানোকে করে তুলেছে ধর্ম হিন্দু পিতৃতন্ত্রররে নারীর প্রাণের মূল্য নেই, জীবনেরও অধিকার নেই; নারী শৃদ্রের থেকে শুদ্র, যদিও এ-পিতৃতন্ত্ররুই নারীকে কপট স্তন করেছে দেবীরূপে। বিদ্যাসাগর (খ, ৮৩৯) গভীর ক্ষোভে বলেছিলেন, “যে দেশের পুরুষজাতির দয়া নাই, ধর্ম নাই, ন্যাষ-অন্যায় বিচার নাই, হিতাহিত বোধ নাই, সদসদ্ধিবেচনা নাই. . . . আর যেন সে দশে হতভাগা অবলাজাতি জন্গ্রহণ না করে"; তিনি আর্তনাদ কবেছিলেন, 'হা অবলাগণ! তোমরা কি পাপে, ভারতবর্ষে আময়া, জনুগ্রহণ কর, বলিতে পারি না? নারীর জন্যে নিষ্নুরতম ভূভাগের নাম ভারতবর্ষ, নিষ্টুরতম ব্যবস্থার নাম হিন্দু পিতৃতন্ত্ররর।

যেখানে ধর্মহীনতা বেশি সেখানেই জন নেয় ধর্মপ্রবর্তকেরা, আর যেখানে পীড়ন বেশি সেখানেই ঘটে ত্রাতাদের আবিভাব। নারী সবচেয়ে পীড়িত ছিলো ভারতে, তাই এখানেই প্রথম দেখা দেন নারীত্ববরাতারা: রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। রামমোহন নারীকে বাচিয়ে রাখার জন্যে সহমরণ বিষয় এরব্তর্কি ও নিবতর্কের সম্গাদ- এথম এত্তার প্রকাশ করেন ১৮১তে, দ্বিতীয় এভাব এ; এ-বিষঘে তার শেষলেখা সহমরণ বেরোয় এ। বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ এচলিত হওয়া উচিত কিনা

এতদ্বিযয়ক- এথম প্রস্তার প্রকাশ করেন তে, এবং একই বছর প্রকাশ করেন দ্িতীয় এজাব। পৃথিবীর আর কোথাও তাদের, অন্তত রামমোহনের, আগে নারীর পক্ষে কোনো পুরুষ কিছু লেখে নি, লড়াইয়ে নামে নি। বিলেতে নারীর পক্ষে প্রথম যে-পুরুষ বই লেখেন, তিনি দার্শনিক উইলিয়ম টমসন; তার বই মানবজাতির অধের্কি, নারীদের আবেদন মানবজাতির অপর অধের্ক, পুরত্মদের দৃরহঙ্কারের বিরদ্ধে বেরোয় এ; কিন্ত তিনি হন উপহাসের পাত্র। পশ্চিমে নারীর পক্ষে পুরুষের লেখা প্রথম গুরুতৃপূর্ণ বই জন স্টুয়ার্ট মিলের নারী-অধীনতা বেরোয় এ। রামমোহন ও বিদ্যাসাগর পৃথিবীর দুই আদি নারীবাদী পুরুষ, মহাপুরুষ। তারা কর্মবীর হিশেবেও অসামান্য; তারা বই লিখেই থেমে যান নি, যাওয়ার উপায় ছিলো না; তারা আইন প্রণয়ন করিয়ে বাস্তবায়িত করেছিলেন নিজেদের স্বর্ী। পৃথিবীর নারীবাদের ইতিহাসে রামমোহন ও বিদ্যাসাগরের নাম স্বর্ণলিপিতে লেখা থাকার কথা! ।

তবে রামমোহন ও বিদ্যাসাগর নারীমুক্তি বা নারী-স্বাধীনতার কথা বলেন নি. মুক্তি বা স্বাধীনতার কথা বলা যায় সভ্য সমাজে; — যেমন বলেছেন মিল; তারা নারীর জন্যে দাবি করেছেন দুটি সামান্য জিনিশ; — বেঁচে থাকা ও জীবনযাপনের অধিকার, যা তখন হিন্দু নারীদের জন্যে হিলো মুক্তির থেকেও অনেক বড়ো। হিন্দু পিতৃতন্ত্রররের নৃশংসতা সম্পর্কে তারা ছিলেন সচেতন; বিদ্যাসাগর হিন্দু পিতৃতন্ত্রররকে তীব্র ভাষায় আক্রমণও করেছেন, একে নিকৃষ্টতম বলতে তিনি দ্বিধা করেন নি, এবং হাহাকার করেছেন বার বার। নারীপুরুষের সম্পর্ক যে লৈঙ্গিক রাজনীতি, তা বুঝেছেন তারা দুজনেই, যদিও এর ওপর জোর দেন নি। হিন্দু পিতৃতন্ত্ররর নারীর ওপর বলপ্রয়োগে নির্মম, নারীর নিন্দায় মুক্তকণ্ঠ; রামমোহনের প্রবর্তকের কণ্ঠে কথা বলেছে হিন্দু পিতৃতন্ত্রর। প্রবর্তক বা পিতৃতন্ত্রররের অভিযোগের উত্তরে িবর্তক বা রামমোহন ( ২০২) বলেছেন:

সত্রীলোককে যে পর্য্যন্ত দোষানিত আপনি কহিলেন, তাহা স্বভাবসিদ্ধ নহে। . . . স্ত্রীলোকেরা শারীবিক

পরাক্রমে পুরুষ হইতে প্রায় ন্যুন হয়, ইহাতে পুরুষেরা তাহারাদগকে আপনা হইতে দুর্বল জানিয়া

যে ২ উত্তম পদবীর প্রাপ্তিতে তাহারা স্বভাবত যোগ্যা ছিল, তাহা! হইতে উহারদিগের পুর্র্বাপব বঞ্চিত

করিযা আসিতেছেন। পবে কহেন, যে স্বভাবত তাহাবা সেই পদ প্রাপ্তির খোগ্যা নহে।

লৈঙ্গিক রাজনীতিটি এখানে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন রামমোহন। একগোত্র বলপ্রয়োগে আরেক গোত্রকে পরাভূত করে কেড়ে নিয়েছে তার সমস্ত অধিকার, নারীর যা পাওয়ার কথা ছিলো তা তাকে না দিয়ে রটিয়ে দিয়েছে যে নারী ওসবের অযোগ্য, এ-রাজনীতি ধরা পড়েছে রামমোহনের চোখে, যদিও তার পক্ষে তখন এ-রাজনীতিক লড়াইয়ে লিপ্ত হওয়া সম্ভব ছিলো না। তার রাজনীতি ছিলো বাচিয়ে রাখার রাজনীতি, নারীর বেঁচে থাকাই ছিলো রাজনীতি। বিদ্যাসাগরও ( ৮৪৩) বলেছেন:

ত্রীজাতি অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও সামাজিকনিয়মদোষে পুরুষজাতির নিতান্ত অধীন। এই দুর্বলতা ও অধীনতা নিবন্ধন, তাহারা পুক্ষজাতির নিকট অবনত ও অপদস্থ হইয়া কালহরণ করিতেছেন। প্রভৃতাপন্ন প্রবল পুরুধজাতি, যদৃচ্ছাপ্রবৃত্ত হইয়া, অত্যাচার ও অন্যায়াচরণ করিয়া থাকেন, তাহারা

২৭২ নারী

নিতান্ত নিরুপায় হইয়া, সেই সমস্ত সহ্য করিয়া জীবনযাত্রা সমাধান করেন। পৃথিবীর প্রায় সর্ব প্রদেশেই স্ত্রীজাতির ঈদৃশী অবস্থা।

বিদ্যাসাগরের বর্ণনায়ও নারী রাজনীতিকভাবে, শারীরিক দুর্বলতারশত, পরাভূত জাতি; যেনো পুরুষের থেকে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন, অনার্ধের মতো ভিন্ন ও পরাভূত জাতি; তাই তারা “পুরুষজাতির নিকট অবনত ও অপদস্থ হইয়া কালহরণ' করছে, যেমন করেছে ইংরেজের অধীনে ভারতীয়রা। পুরুষজাতি বিদ্যাসাগরের চোখে নৃশংস স্বৈরাচারী, যাদের অত্যাচার ও অন্যায় আচরণ নারী মেনে নিয়েছে নিরুপায় হয়ে। দুজনেই পুরুষনারীর সম্পর্কের ভেতরে দেখেছেন রাজনীতি, লৈঙ্গিক রাজনীতি, যদিও আর এগোন নি। কেননা তারা নারীমুক্তির যুদ্ধে নামেন নি, তাঁরা দাবি করেছেন নারীর জন্যে সামান্; অধিকার, যা নিশ্বাসের মতো সামান্য, জীবনযাপনের মতো সামান্য।

রামমোহন হিন্দ্ু নারীকে দিয়েছেন প্রাণ, বিদ্যাসাগর দিয়েছেন জীবন; রামমোহনের যেখানে শেষ, বিদ্যাসাগরের সেখানে শুরু। রামমোহন চেয়েছেন শুধু বিধবার প্রাণটুকু, আর বেশি কিছু নয়; কিন্তু বিদ্যাসাগরের কাছে ওই প্রাণটুকু যথেষ্ট নয়, নারীর জন্যে তার দরকার জীবন, যা শুধু নিশ্বাসপ্রশ্নাস নয়, উপভোগের। বিধবা বেঁচে আছে, চিতার আগুনে ছাই হয়ে যায় নি, সে পেয়েছে ব্রহ্মচর্ষ পালনের অধিকার, এ-ই যথেষ্ট রামমোহনের জন্যে; তার পক্ষে আর কিছু চাওয়া সম্ভব ছিলো না, হিন্দু পিতৃতন্ত্রররের কাছে তা মনে হতো বড়ো বেশি বাড়াবাড়ি। কিন্তু বিদ্যাসাগরের কাছে বিধবার ব্রহ্ষচর্ষ এক ধরনের চিতাগ্রিতে দগ্ধ হওয়াই, তা জীবন নয়, তা বীচা নয়। মানুষ শুধু নিশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকে না। রামমোহন ( ১৭০) বারবার বলেন ও প্রমাণ করেন, “পতির মৃত্যু হইলে পবিত্র যে পুষ্প মূল ফল তাহার ভোজনের দ্বারা শরীরকে কৃশ করিবেন এবং অন্য পুরুষের নামও করিবেন না'। আর আহারাদি বিষয়ে নিয়মযুক্ত হইয়া এক পতি যাহাদের অর্থাৎ সাধবী স্ত্রী তাহাদের যে ধর্ম তাহার আকাউক্ষা করিয়া যাবজ্জীবন ্রক্ষচর্য্ের অনুষ্ঠানপুবর্বক থাকিবেন।” তিনি চেয়েছেন শুধু বিধবার বৃন্ষচর্ষেব অধিকাব। ওই ব্রহ্মচর্যও অত্যন্ত নৃশংস: নারী শুধু মৃত পৃতির ধ্যান করে ফলমূল খেয়ে ও না খেয়ে বেঁচে থাকবে; তার রক্ত থাকবে না মাংস থাকবে না, জীবন থাকবে না। তবে হিন্দু পিতৃতন্ত্রররের কাছে এও ছিলো এক অনুমোদনঅযোগ্য আবদার। বিদ্যাসাগরের কাছে নিশ্বাসপ্রশ্নাস যথেষ্ট নয়, ব্রহ্মচর্ষে তিনি বিশ্বাসই করতেন না; তার দাবি জীবন। রামমোহনের নারী শুধু নিশ্বাসপ্রশ্নাস; বিদ্যাসাগরের নারী রক্তমাংসের সজীব মানুষ, যার একটি শরীর আছে, আর ওই শরীরের রয়েছে আগুনের থেকেও লেলিহান ক্ষুধা। বিদ্যাসাগর যখন বিধবার বিয়ের কথা বলেন, তখন বিধবার শরীরটিকে বাস্তব ও সত্য করে তোলেন; নারীকে ফিরিয়ে দেন তার হারানো অস্বীকৃত শরীর। বিদ্যাসাগর (খ, ৮৩৯) যখন বলেন:

তোমরা মনে কর, পতিবিয়োগ হইলেই, স্ত্রীজাতির শরীর পাষাণময় হইয়া যায়; দুঃখ আর দুঃখ

বলিয়া বোধ হয় না; . . . দুর্জয় রিপুবর্প এককালে নির্মূল হইয়া যায়।

তখন বড়ো হয়ে ওঠে নারীর শরীর, শরীরই হয়ে ওঠে মারী। যার নিজের শরীরের

ওপর অধিকার নেই, তার আর কোনো অধিকার নেই। বিদ্যাসাগর একথা বুঝেছিলেন, তাই তিনি পড়েন আমূল নারীবাদীদের শ্রেণীতে, যারা শুধু নারীর আর্থস্বাধীনতাকেই নয়, শরীরকেও মনে করেন গুরুতৃপূর্ণ। বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ বিষয়ক বই দুটিতে তিনটি শব্দ- বৈধব্যযন্ত্রণা', 'ব্যভিচারদোষ" ও 'ভ্রণহত্যাপাপ' — ধ্রুবপদের মতো পুনরাবৃত্ত হয়ে মনে করিয়ে দিয়েছে নারীর শরীরকে। তার বর্ণনা পড়ার সময় উনিশশতকের সমস্ত হিন্দু বালবিধবার অচরিতার্থ কাম দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে ওঠে। এতেই প্রকাশ পেয়েছে বিদ্যাসাগরের অকপট আধুনিকতা। এ-সম্পর্কে তার রচনায় পাই:

[ক] কত শত বিধবারা, ব্রহ্মচর্ষনির্বাহে অসমর্থ হইয়া, ব্যভিচারদোষে দূষিত ও ভ্রুণহত্যাপাপে লিপ্ত হইতেছে; এবং পতিকুল, পিতৃকুল ও মাতৃকুল কলঙ্কিত করিতেছে বিধবাবিবাহের প্রথা প্রচলিত হইলে, অসহ্য বৈধব্যযন্ত্রণা, ব্যভিচারদোষ ও ভুণহত্যাপাপের নিবারণ ও তিন কুলের কলঙ্ক নিরাকবণ হইতে পাবে। যাবৎ এই শুভকরী প্রথা প্রচলিত না হইবেক, তারৎ ব্যভিচারদোষের ও ভুণহত্যাপাপের প্রোত, কলঙ্কের প্রবাহ ও বৈধব্যযন্ত্রণার অনল উত্তরোত্তর প্রবল হইতেই থাকিবেক [বিদ্যাসাগর (ক. ।

[খ] দুর্ভাগ্যক্রমে যাহারা অল্প বয়সে বিধবা হয়, তাহারা যাবজ্জীবন যে অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করে, এবং বিধবাবিবাহেব প্রথা প্রচলিত না থাকাতে, ব্যভিচারদোষের ও ভ্ণহত্যাপাপেন স্রোত যে উত্তরোত্তব প্রবল হইয়া উঠিতেছে, ইহা, বোধ করি, চক্ষকর্ণাবিশিষ্ট ব্যক্তিমাত্রেই স্বীকার করিবেন। অতএব, হে পাঠক মহাশয়বর্গ' আপনারা অন্ততঃ কিয়ৎক্ষণের নিমিত্ত, স্থির চিত্তে বিবেচনা করিয়া বলুন, এমন স্থলে, দেশাচারের দাস হইয়া, শাস্ত্রের বিধিতে উপেক্ষা প্রদর্শনপূর্বক, বিধবাবিবাহের প্রথা প্রচলিত না করিযা, হতভাগা বিধবাদিগকে যাবজ্জীবন অসহ্য বৈধব্যযন্ত্রণানলে দগ্ধ করা, এবং ব্যভিচারদোষের ও ্রণহতাপাপের স্রোত উত্তরোত্তর প্রবল হইতে দেওয়া উচিত; অথবা দেশাচারের অনুগত না হইয়া, শাস্ত্রের বিধি অবলম্বনপূর্বক, বিধবাবিবাহের প্রথা প্রচলিত কবিয়া, হতভাগা বিধবাদিগের অসহ্য বৈধব্যন্ত্রণ। নিরাকরণ এবং ব্যভিচাবদোষের ও ভুণহত্যাপাপের স্রোত নিবারণ করা উচিত [বিদ্যাসাগর (১৮ ৫৫খ, ।

[গ]) তোমাদের পুণ্যভূমি ভারতবর্ষ ব্যভিচারদোষের ও ভ্ণহত্যাপাপের ত্রোতে উচ্ছলিত হইয়া যাইতেছে [বিদ্যাসাগর (খ, ।

[ঘ] হতভাগা বিধবাদিগের দুরবস্থা দর্শনে, তোমাদের চিরশুষ্ক নীরস হৃদয়ে কারুণ্যরসের সঞ্কার হওয়া কঠিন এবং ব্যভিচারদোষের ও ভূণহত্যাপাপের প্রবল প্রোতে দেশ উচ্ছলিত হইতে দেখিয়াও, মনে ঘৃণার উদয় হওয়া অসন্তারিত। তোমরা প্রাণতুল্য কন্যা প্রভৃতিকে অসহ্য বৈধব্যযন্ত্রণানলে দগ্ধ করিতে করিতে সম্মত আছ' ধর্মলোপভয়ে জলার্জলি দিয়া, কেবল লোকলজ্জাভয়ে, তাহাদেব ভ্রণহত্যার সহায়তা করিয়া, স্বয়ং সপরিবারে পাপপন্কে কলঙ্কিত হইতে সম্মত আছ; কিন্তু, কি আশ্চর্য শাস্ত্রের বিধি অবলম্বনপূর্বক, তাহাদের পুনরায় বিবাহ দিয়া, তাহাদিগকে দুঃসহ বৈধব্যযন্ত্রণা হইতে পরিক্রাণ করিতে. . . সম্মত নহ বিদ্যাসাগর ]।

বিদ্যাসাগরের রূপকগুলো লক্ষ্য করার মতো: শরীর জলে উঠেছে লেলিহান আগুনের মতো, পাপ বয়ে চলেছে নদীস্োতের মতো; — “যাবজ্জীবন অসহ্য বৈধব্যযন্ত্রণানল', 'ব্যভিচারদোষের ও ভ্রণহত্যাপাপের প্রবল স্রোতে দেশ উচ্ছলিত' প্রভৃতি রূপক চোখের সামনে নারীর অতৃপ্ত শরীরটিকে যেমন উপস্থিত করে, তেমনি হাজির করে ভারতীয় কাার্ত লম্পট পুরুষ জাতিটিকে। বিদ্যাসাগর বুঝেছিলেন জীবন হচ্ছে

২৭৪ নারী

কাম, ব্রহ্মচর্য জীবন নয়। বিদ্যাসাগর 'ব্যভিচারদোষ' ও ভ্রণহত্যাপাপের প্রোত'-এর কথা বলেছেন, এজন্যে তিনি বিধবাকে দায়ী করেন নি; বিধবাকে তিনি তার সময়ের ধর্মপ্রাণ সামাজিকদের মতো একেকটি সম্ভাব্য বারাঙ্গনা মনে করেন নি, তিনি দায়ী করেছেন সমাজকেই। বিদ্যাসাগর এ-রূপকগুলো ব্যবহার করে স্বীকৃতি জানিয়েছেন নারীর শরীরকে, শরীরকে করে তুলেছেন জীবন; এবং এগুলো দিয়ে আক্রমণ করেছেন তার সময়ের ভণ্ড সমাজকে। বিধবা একা ব্যভিচার করতে পারে না, একা জন্ম দিতে পারে না ভুণ, তার জন্যে দরকার কোনো ধার্মিক পুরুষ, তিনি তা স্মরণ করিয়ে পিয়েছেন। রামমোহন উদার নারীবাদী; আর বিদ্যাসাগর আমূল নারীবাদী, যিনি শরীরকে করে তুলেছেন জীবন।

রামমোহন ও বিদ্যাসাগর সহমরণ নিবারণে, বিধবাবিবাহ প্রবর্তনে, বহুবিবাহ নিষিদ্ধকরণে বিষ দিয়ে বিষ ক্ষয়ের চেষ্টা করেন: শাস্ত্র দিয়ে শান্ত্রকে বাতিল করে প্রবর্তন করেন নববিধান। তারা কি বিশ্বাস করতেন শান্ত্রেঃ রামমোহন হয়তো কিছুটা করতেন. কিন্তু বিদ্যাসাগরের ওই শাস্ত্রে বিশ্বাস ছিলো না বিন্দুমাত্র, কিন্তু তারা জানতেন মধ্যযুগীয় এ-অঞ্চলে এটাই উপায়। যুক্তি এখানে মূল্যহীন, মূল্যবান এখানে পুরোনো শ্লোক। বিদ্যাসাগর বলেছেন, “যদি যুক্তিমাত্র অবলম্বন করিয়া, ইহাকে কর্তব্য কর্ম বলিয়া প্রতিপন্ন কর, তাহা হইলে, এতদ্দেশীয় লোকে কখনই ইহা থাকে, তবেই তাহারা কর্তব্য কর্ম বলিয়া স্বীকার করিতে ও তদনুসারে চলিতে পারেন। এরূপ বিষয়ে এদেশে শান্ত্রই সর্বপ্রধান প্রমাণ, এবং শান্ত্রসম্মত কর্মই সর্বতোভাবে কর্তব্য কর্ম বলিয়া পরিগৃহীত হইয়া থাকে।” তাই তারা দুজনেই ঘেঁটেছেন শাস্ত্র, শান্ত্র থেকে নিয়েছেন সে-সব অংশ, যা তাদের পক্ষে। তারা শান্ত্রকে প্রমাণ হিশেবে নিয়েছেন এজন্যে নয় যে তারা ওই শাস্ত্রের সাথে একমত, তারা ওই শাস্ত্র নিয়েছেন কেননা ওই শাস্ত্র তাদের সাথে একমত। তাদের দুজনের জন্যে এটা ছিলো বিশেষ সুবিধাজনক: পাপ্তিতযে ও মেধায় তারা তাদের প্রতিপক্ষের থেকে এতো শ্রেষ্ঠ ছিলেন যে তাদের পরাজিত করা ছিলো অসম্ভব। তারা শাস্ত্রে বিশ্বাস করতেন না, বিশ্বাস করতেন আইনে; তাই শান্ত্র দিয়ে তারা প্রথাগ্রস্ত দেশবাসীদের কাবু করে প্রবর্তন করেন আইন। তারা জানতেন আইন ছাড়া অসম্ভব হবে সহমরণ নিবারণ, বা বিধবাবিবাহ প্রবর্তন; এবং এও জানতেন যদি তাদের দেশবাসী তদের যুক্তি মেনে নেয়, কিন্তু আইন প্রণীত না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আবার দেখা দিতে পারে সহমরণপ্রথা, নিষিদ্ধ হতে পারে বিধবাবিবাহ। রামমোহন ও বিদ্যাসাগর যদি উনিশশতকে ওই আইন পাশ না করাতেন, তাহলে বিশ্শতকে গান্ধির ভারতবর্ষে ওই আইন কখনো প্রবর্তিত হতো না; কেননা বিধবা হতো দুষ্ট রাজনীতিকদের জন্যে চমৎকার রাজনীতি। বিদ্যাসাগর কেনো 'মাইন চেয়েছেন, তা শোনার মতো:

কেহ কেহ আপত্তি করিতেছেন. . . . বহুবিবাহ সামাজিক দোষ. সামাজিক দোষের সংশোধন সমাজের লোকেব কার্য; সে বিষয়ে গবণমেন্টকে হস্তক্ষেপ করিতে দেওয়া কোনও ক্রমে বিধেয় নহে।

এই আপত্তি শুনিয়া আমি, আমি কিয়ৎ হাস্য সংবরণ করিতে পারি নাই। সামাজিক দোষের সংশোধন সমাজের লোকের কার্য, এ কথা শুনিতে আপাততঃ অত্যন্ত কণসুখকর 1. . .

যাহারা এই আপত্তি করেন, তীহারা নব্য সম্প্রদায়েব লোক। নব্য সম্প্রদায়ের মধ্যে যাহারা অপেক্ষাকৃত বয়োবৃদ্ধ ও বহুদর্শী হইয়াছেন, তীহারা অর্বাচীনের ন্যায়, সহসা এরূপ অসার কথা মুখ হইতে বিনির্গত করেন না। হহা যথার্থ বটে, তাহারাও এক কালে অনেক বিষয়ে অনেক আস্ফালন কবিতেন, . . . কিন্তু এ সকল পঠদ্দশার ভাব। তাহাবা পঠদাশা সমাপন করিয়া বৈষয়িক ব্যাপারে প্রবৃত্ত হইলেন। ক্রমে ক্রমে, পঠদ্দশার ভাবের তিরোভাব হইতে লাগিল। অবশেষে, সামাজিক দোষের সংশোধন দূরে থাকুক, স্বযং সেই সমস্ত দোষে সম্পূণ নিপ্ত হইয়া, সচ্ছন্দ চিত্তে কালযাপন করিতেছেন।

বাঙলা ও বাঙালি এখনো এমনই আছে; ছাত্রজীবনেই তারা প্রগতিশীল পরে প্রতিক্রিয়াশীল। বিদ্যাসাগর ও রামমোহন এদের বিশ্বাস করেন নি, বিশ্বাস করেছেন আইনে। আইনই নতৃন কালের শাস্ত্র। রামমোহন লিখেছেন সম্বাদ, তিনি তার প্রতিপাদ্য উপস্থাপন করেছেন পুরোনো দার্শনিক সংলাপের কাঠামোতে; বিদ্যাসাগর লিখেছেন প্রস্তার, তিনি সরাসরি লড়াইয়ে নেমেছেন হিন্দু পিতৃতন্ত্রররের সাথে। রামমোহনের সময় বাংলা গদ্যের, এবং রামমোহন নিজের বাঙলা গদোর, যে-অবস্থা ছিলে। , তাতে বিদ্যাসাগরের মতো সরাসরি তীব্র গবেষণাধর্মী প্রস্তার লেখা সম্ভব ছিলো না তার পক্ষে: তাই তিনি প্রবর্তক-নিবর্তকের বিতর্কের মধ্য দিয়ে প্রতিপাদন করেছেন যে শাস্ত্রে রয়েছে বিধবার বেঁচে থাকার বিধান। শুধুই বেঁচে থাকা, এর বেশি নয়; বিধবা বেঁচে থেকে পালন করবে ব্রহ্মচর্য, আর কিছু নয়। রামমোহনের প্রবর্তক হচ্ছে হিন্দু পিতৃতন্ত্রররের উনিশশতকী দেশাচারথস্ত রূপটি, যেটি দুর্বল হয়ে পড়েছিলো সব দিকে, এবং রামমোহন তান্ছে করেছেন দুর্বল থেকে দুর্বলতর। রামমোহন প্রবর্তকের মুখে দিয়েছেন শাস্ত্রের পুরোনো সমস্ত কথা; নিবর্তকের মুখে দিয়েছেন শাস্ত্রের সাথে মানবতারাদী যুক্তি, যার আক্রমণে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে প্রবর্তক। সম্থাদ-এর শুরুতেই রামমোহন ( ১৬৯) প্রবর্তকের সংলাপে পেশ করেছেন পুরোনো সংঙ্কার: স্বামী মবিলে পর যে স্ত্রী & পতির জুলত্ত চিতাতে আরোহণ করে সে অরুন্ধতী যে বশিষ্ঠের পঢতী তাহার সমান হইয়া স্বর্গে যায়। আর যে্ত্রী ভর্তার সহিত পরলোকে গমন করে সে মনুষ্যের দেহেতে যত লোম আছে যাহার সংখ্যা সাড়ে তিন কোটি তত বৎসর স্বর্গে বাস করে। । আর যেমন সর্পব্লাহকেরা আপন বলের দ্বার; গর্ত হইতে সর্ণকে উদ্ধার করিয়া লয় তাহার ন্যায় বলের দ্বারা এরস্ত্ী স্বামীকে লইয়া তাহার সহিত সুখ ভোগ করে। আর যে স্ত্রী ভর্তার সহিত পরলোকে গমন কবে সে মাতৃকুল পিতৃকুল এবং স্বামিকুল এই তিন কুলকে পবিত্র করে। আর অন্য স্ত্রী হইতে শ্রেষ্ঠ এবং শেষ্ঠ ইচ্ছাবতী আর স্বামীর গ্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাযুক্ত যে খরস্ত্রী সে পতির সহিত তারৎ পর্যয্ত স্বর্গ ভোগ করে যাবৎ চতুর্দশ ইন্ত্রপাত না হয় * আর পতি যদি ব্রন্মহত্যা করেন কিন্বা কৃত হয়েন কিন্বা মিত্রহত্যা করেন তথাপি & পতিকে সবর্বপাপ হইতে মুক্ত করে ইহা অঙ্গিরামুনি কহিয়াছেন। স্বামী মরিলে সাধবী স্ত্রী সকলের অগ্নি প্রবেশ ব্যতিরেকে আর অন্য ধর্ম নাই। ।

প্রবর্তক গ্রহণ করেছে হারীত, অঙ্গিরার মত; রামমোহন গ্রহণ করেছেন মনুর মত। রামমোহন বারবার যে-শন্ত্রবাক্যটির হাতুড়ি পিটিয়েছেন, সেটি মন্রর: ক্ত্রীলোক

২৭৬ নারী

পতির কাল হইলে পর ব্রহ্ষচযেরি দ্বারা মোক্ষ সাধন করিবেন। ' রামমোহন ও বিদ্যাসাগরের ভাগ্য ভালো যে হিন্দু ধর্মশান্ত্র পরস্পরবিরোধী বিধানের সমষ্টি; ওই পরস্পরবিরোধী বিশাল ভাপ্তার থেকে বচন উদ্ধার করে যে-কোনো কিছুকে শান্ত্রসম্মত বলে প্রমাণ করা সম্ভব, অপ্রমাণও সম্ভব। রামমোহনের আশ্রয় মনু, যে-মনু নারীকে বহু তিরফ্কার করে একটিমাত্র কৃপা করেছিলেন: ব্র্মচর্য পালন করে বেঁচে থাকার অধিকার দিয়েছিলেন [দ্র “দেবী ও দানবী”, “পিতৃতন্ত্রররের খড়ূগ']। রামমোহন স্বীকার করেছেন শাস্ত্রে সহমরণের বিধান রয়েছে, কিতু তিনি নির্ভর করেছেন বিকল্পবিধানের ওপর। তিনি ( ১৯০) শান্ত্রবাক্যকে ব্যাকরণবিদ-যুক্তিশাস্ত্রীর মতো ভেঙে ভেঙে বের করেছেন বিকল্প বিধানটি:

পতি ১ মরিলে ২ ব্রহ্মচর্য্য ৩ অথবা ৪ সহগমন ৫। অতএব ব্রহ্চর্যের প্রথম গ্রহণ দাতা ত্রহ্ষচর্য্য

বিধবার শ্রেষ্ঠ ধর্ম হয়।

বিধবার সহমরণও রামমোহন মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন, যদি তা স্বেচ্ছাসহমরণ হয়। নিবর্তক ( ১৭৩) প্রশ্ন করেছে: “তোমাদের রচিত সংকল্পবাক্যেতে স্পষ্ট বুঝাইতেছে যে পতির জ্বলন্ত চিতাতে স্বেচ্ছাপূর্বক আরোহণ করিয়া প্রাণ ত্যাগ করিবেক কিন্তু তাহার বিপরীত মতে তোমরা অথে এ বিধবাকে পতিদেহের সহিত দৃঢ় বন্ধন কর পরে তাহার উপর এত কাষ্ঠ দেও যাহাতে এ বিধবা উঠিতে না পারে। । ' তিনি স্বেচ্ছাসহমরণ মেনেছেন, কেননা তিনি জানতেন অধিকাংশ নারী স্বেচ্ছাসহমরণে যায় না বা যাবে না; তাদের বাধ্য করা হয় সহমরণে। প্রবর্তক সহমরণ চায় কলঙ্ক থেকে মুক্ত থাকার জন্যে, তার কাছে নারী হচ্ছে সম্ভাব্য কলঙ্ক। প্রবর্তকের ( ১৭৪) মতে, “স্বামীর মৃত্যু হইলে স্ত্রী সহগমন না করিয়া বিধবা অবস্থায় রহিলে তাহার ব্যভিচার হইবার সম্ভাবনা থাকে কিন্তু সহমরণ করিলে এ আশঙ্কা থাকে না জ্ঞাতি কুটুহ্ সকলেই নিঃশঙ্ক হইয়া থাকেন এবং পতিও যদি জীবকালে জানিতে পারে তবে তাহারো মনে স্ত্রীঘটিত কলঙ্কের কোনো চিন্তা হয় না। । " সন্তার্য কলঙ্ক থেকে বাচার উপায় বিধবাকে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলা; যেনো তারা কোনো মানুষকে পোড়ায না, পোড়ায় কলঙ্ককে!

রামমোহন প্রথম সম্বাদ শেষ করেছেন সহমরণ সম্পর্কে হিন্দু পিতৃতন্ত্রররের মনকে কিছুটা কোমল করে; কিন্তু তার মন অতো সহজে গলার বস্তু নয়। তাই রামমোহনকে লিখতে হয় দ্বিতীয়, দীর্ঘতর, প্রস্তার; এতে তার একটিই প্রতিপাদ্য: “ভর্তার মৃত্যু হইলে পর, স্ত্রী ব্রহ্ষচর্ধ্য করিবেন।” রামমোহন বিধবাকে বাচিয়ে রাখার জন্যে মেনে নিয়েছেন নিষ্কাম ধর্ম, কামনাকে গণ্য করেছেন পাপ; এমনকি স্বর্গকামনাও তার কাছে পাপ। পিতৃতন্ত্ররর নিজের স্বার্থ উদ্ধ। রের জন্যে নারীকে যে-কোনো স্তব করতে পারে, দেখাতে পারে যে-কোনো প্রলোভন। তিনি ( ১৯২) প্রশ্ন করেছেন, “স্বর্গের প্রলোভ দেখাইয়া এরূপ অবলা স্ত্রীবধেতে প্রবর্ত হওয়াতে কি স্বার্থ দেখিয়াছেন? ' আবার ( ১৯৪) প্রশ্ন করেছেন, “তবে বিধবাকে স্বর্গ কামনাতে প্রলোভ কেন দেখান? মুক্তিসাধন নিষ্কাম কর্মে কেন প্রবর্ত না করান? " স্বর্গের প্রলোভন দেখানো যে

ব্লামমোহন ও বিদ্যাসাগর: প্রাণদাতা ও জীবনদাতা ২৭৭

প্রতারণা রামমোহনের কাছে তা অস্পষ্ট থাকার কথা নয়। স্বর্গের প্রলোভনে নারী যদি সহমরণে না যায়, তখন হিন্দু পিতৃতন্ত্ররর কী করে? তখন বিধবাকে “বন্ধনপৃবর্বক দাহ' করে, এটা 'দেশাচারপ্রযুক্ত সৎকর্ধ'। রামমোহন বলেছেন, এটা দস্াবৃত্তি। যেভাবেই হোক হিন্দু পিতৃতন্ত্রররকে মুক্তি পেতে হবে বিধবার ভার থেকে, তাই তার শেষ যুক্তি হচ্ছে নারীনিন্দা [রামমোহন (

স্ত্রীলোক স্বভাবত অল্পবুদ্ধি, অস্থিরাস্ত করণ, বিশ্বাসের অপাত্র, সানুবাগা, এবং ধর্মজ্ঞানশৃন্যা হয়। স্বামীর পরলোক হইলে পর, শান্ত্রানুসারে পুনরায় বিধবার বিবাহ হইতে পারে না, এককালে সমুদায় সাংসারিক সুখ হইতে নিরাশ হয়, অতএব এ প্রকার দুর্ভাগা যে বিধবা তাহার জীবন অপেক্ষা মরণ

শ্রেষ্ঠ।

রামমোহন একটি একটি করে উত্তর দিয়েছেন এসবের। তার উত্তরের মধ্যে ধরা পড়েছে বলতন্ত্রের গীড়নের রাজনীতিক [রামমোহন ( রূপটি:

প্রথমত বুদ্ধির বিষয়, স্ত্রীলোকের বুদ্ধির পরীক্ষা কোন্ কালে লইযাছেন যে অনায়াসেই তাহারদিগকে

অল্পবুদ্ধি কহেন? কারণ বিদ্যা শিক্ষা এবং জ্ঞান শিক্ষা দিলে পরে ব্যক্তি যদি অনুভব ও গ্রহণ করিতে

না পারে, তখন তাহাকে অল্পবুদ্ধি কহা সম্ভব হয়; আপনারা বিদ]া শিক্ষা জ্ঞানোপদেশ স্ত্রীলোককে প্রায়

দেন নাই, তবে তাহারা বুদ্ধিহীন হয় ইহা কিরূপে নিশ্চয় করেন?

আধিপত্যকারী শ্রেণীর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা অধীন শ্রেণীকে কোনো অধিকার, দায়িত্ব দেয় না; না দিয়ে দিয়ে তাদের করে তোলে সম্পূর্ণ অযোগ্য, এবং শেষে ঘোষণা করে যে অধীনের। সহজাতভাবেই অযোগ্য। তাদের দপ্তিত করা হয় সে-অযোগ্যতায়, যে-যোগ্যতা তাদের অর্জন করতে দেয়া হয় নি। রামমোহন দেখিয়েছেন নারীর বুদ্ধিচর্চা নিষিদ্ধ করে দিয়ে তাদের নিন্দিত করা হয়েছে নির্বোধ অল্পবুদ্ধি বলে, তবে এটা তাদের সহজাত স্বভাব নয়, পুরুষতন্ত্রের পীড়নেরই ফল। নাপ: কি 'অস্থিরাত্তঃকরণ"? “বিশ্বাসের অপাত্র'ঃ “সানুরাগা' অর্থাৎ পবপুরুষাসক্ত? “ধর্মজ্ঞানশূন্যা'? তিনি দেখিয়েছেন নারীর বিরুদ্ধে এগুলো মিথ্যে অভিযোগ; আর এসব দিকে নারী পুরুষের থেকে অনেক উ তুষ্ট। সে-উত্কৃষ্ট নারী পুরুষের দাসী: “স্বামীর গৃহে প্রায় সকলের পঢী দাস্যবৃত্তি করে, অর্থাৎ অতি প্রাতে কি শীতকালে কি বর্ষাতে স্থান মার্জন, ভোজনাদি পাত্র মার্জন, গৃহ লেপনাদি তারৎ কর্ণ করিয়া থাকে; এবং সুপকারের কর্ম বিনা বেতনে দিবসে ও রাতিতে করে. . . 1" নারী এমন দাসী, যাকে উঠতে হয় প্রস্তর চিতায়! তিনি স্বেচ্ছাসহমরণও মেনে নিয়েছেন, চেয়েছেন “এই পর্য্যন্ত অধীন ও নানা দুঃখে দুঃখিনী'দের মেনো 'বন্ধনপুবর্বক দাহ করা” থেকে রক্ষা করা হয়। প্রস্তারগুলোর ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে তার সকাতর আবেগ। তার প্রস্তারগুলো অভিসন্দর্ভ হিশেবে অসামান্টা, কিন্তু তিনি নারীর কথা বলতে গিয়ে কেপেছেন আবেগে। তিনি মুখোমুখি লড়াই করেছেন হিন্দু পিতৃতন্ত্রররের সাথে, ওই পিতৃতন্ত্ররর তার সাথে যে-নিষ্ঠুরতা করেছে, তা তিনি ভোলেন নি! তিনি নারীকে শুধু নিশ্বাসের অধিকার নয়, দিতে চেয়েছেন জীবনের অধিকার, তাই তার লড়াই ছিলো আরো রক্তাক্ত। সহমরণ

২৭৮ নারী

নৃশংস বলে তার নিবারণও সহজ, সহজেই মানুষ ও জনগণকে বোঝানো সম্ভব যে নারীকে পোড়ানো নৃশংসতা। কিন্তু যাদের সংবেদনশীলতা আদিম, তাদের বোঝানো অত্যন্ত কঠিন যে ব্রহ্ষচর্য পালন করে বেঁচে থাকা চিতায় ছাই হওয়ার থেকেও মর্মান্তিক। নারীর আর্থ ও অন্যান্য স্বাধীনতা চাওয়ার মতো অবস্থা তখন ছিলো না, তিনি তা চান নি; চেয়েছেন জীবনযাপনের অধিকার। তিনি নারীর দেহকে মূল্য দিয়ে, নারীর দেহকে স্বীকার করে হয়ে উঠেছেন একজন আমূল নারীবাদী; এবং উনিশশতকের সবচেয়ে আধুনিক মানুষ। একটি আদিম পিতৃতন্ত্রররের মুখোমুখি একজন আধুনিক মানুষ দাড়ালে তাকে যে-যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়, তার সবখানিই ভোগ করেছেন বিদ্যাসাগর: তার বুকে ক্ষোভও জেগেছে অশেষ। হিন্দু পিতৃতন্ত্ররর তাকে সহ্য করে নি; অমূল্যচরণ বসু জানিয়েছেন, “বিদ্যাসাগর পথে বাহির হইলে চারিদিক হইতে লোক আসিয়া তাহাকে ঘিরিয়া ফেলিত; কেহ পরিহাস করিত, কেহ গালি দিত। কেহ কেহ তাহাকে প্রহার করিবার এমনকি মারিয়া ফেলিবারও ভয় দেখাইত। বিদ্যাসাগর এ সকলে ভুক্ষেপও করিতেন না। একদিন শুনিলেন, মারিবার চেষ্টা হইতেছে। কলিকাতার কোন বিশিষ্ট ধনাঢ্য ব্যক্তি বিদ্যাসাগরকে মারিবার জন্য লোক নিযুক্ত করিয়াছেন। দুর্বৃত্তের প্রভুর আজ্ঞা পালনের অবসর প্রতীক্ষা করিতেছে। বিদ্যাসাগর কিছুমাত্র ভীত বা বিচলিত হইলেন না। যেখানে বড় মানুষ মহোদয় মন্ত্রিবর্গ ও পারিষদগণে পরিবৃত হইয়া প্রহরীরক্ষিত অ্টালিকায় বিদ্যাসাগরের ভবিষ্যৎ-প্রহারের কাল্পনিক সুখ উপভোগ করিতেছিলেন, বিদ্যাসাগর একবারে সেইখানে গিয়া উপনীত হইলেন' [বিনয় (। এ হচ্ছে বিপন্ন পিতৃতন্ত্রররের ইতর আচরণ। প্রিয় বালিকা প্রভাবতীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছিলেন (এভাবতীসভাষণ,

তুমি, স্বল্প কালে নরলোক হইতে অপসৃত হইযা, আমার বোধে অতি সুবোধেব কার্য কবিযাছ। অধিক কাল থাকিলে, আর কি অধিক সুখভোগ করিতে: হয ত. অদ্ষ্টবৈগুণ্যবশতঃ, . অশেষবিধ যাতনাভোগের একশেষ ঘটিত। সংসার যেরূপ বিরদ্দধ স্থান, তাহাতে, তুমি. দীর্ঘজীবিনী হইলে. কখনই, সুখে ও স্বচ্ছন্দে, জীবনযাত্রীব সমাধান কবিতে পারিতে না।

বেঁচে থাকার চেয়ে ভারতে নারীর মরে যাওয়াও তার কাছে মনে হয়েছে “সুবোধের কার্ধ': বিধবাবিবাহের দ্বিতীয় প্রস্তার-এ (খ, ৮৩৯) বলেছেন, ভারতবর্ষে যেনো 'হতভাগা অবলাজাতি জন্মগ্রহণ না করে”, আর্তনাদ করেছেন, 'হা অবলাগণ! তোমরা কি পাপে, ভারতবর্ষে আস্য়া, জন্য গ্রহণ কর।” এ-ক্ষুত্ধ বিলাপ থেকেই বোঝা যায় এ-মহৎ আমূল নারীবাদীকে কতোটা যন্ত্রণা দিয়েছিলো নির্বোধ হিন্দু পিতৃতন্তর।

নারীকে জীবন দেয়ার জন্যে বিদ্যাসাগর লিখেছেন “বাল্যবিবাহের দোষ' নামের একটি প্রবন্ধ, বিধঝাবিবাহ এচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তার প্রথম পুস্তক ( বিধবাবিবাহ এচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রভাব- দ্বিতীয় পুস্তক ( বহবিবাহ রাহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্িষয়ক বিচার- প্রথম পুস্তক ( বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এত্বিষয়ক বিচার-- দ্বিতীয় পুস্তক ( নামের চারটি গুরুতৃতপূর্ণ গ্রন্থ, এবং বজবিলাস ( নামের একটি ব্দ্রপাত্মক

প্রতিআক্রমণাত্মক বই। বিদ্যাসাগরের রচনাবলির এক বড়ো অংশ নারীকল্যাণমূলক রচনা, এবং ওগুলো মানবিকতা, পাণ্তিত্য, ও যুক্তিতে অসাধারণ। শান্ত্রে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না, কিন্তু শান্তর দিয়েই তাকে প্রমাণ করতে হয়েছিলো যে বিধবাবিবাহ শান্ত্রসম্মত, বহুবিবাহ শান্ত্রবিরোধী। আধুনিক কালের এক বড়ো ট্র্যাজেডি হচ্ছে একে চলতে হয় পুরোনো কালের বিধান দিয়ে, কেননা তা 'ম্ৃতিশাস্ত্রপ্রতিপাদিত কল্পিত ফলমৃগতৃষ্থায় মুগ্ধ, এবং বিদ্যাসাগরকে তা ঘেটে দেখাতে হয় বর্তমানকালসম্মত বিধান, যদিও তাতে তার বিশ্বাস নেই, ও তিনি নিজেই লিখতে পারতেন ওই সব পুরোনো! বস্তুর থেকে অনেক উৎকৃষ্ট শাস্ত্র। নারীকে জীবন দেয়ার জন্যে তিনি শুরু করেছেন শেকড় থেকে- বাল্যবিবাহ থেকে; কেননা বাল্যবিবাহই বালবিধবা উৎপাদনের প্রধান ব্যবস্থা। তার মতে, অল্প বয়সে যে বৈধব্যদশা উপস্থিত হয়. বাল্যবিবাহই তাহার মুখ্য কারণ: সুতরাং বাল্যকালে বিবাহ দেওয়া অতিশয় নির্দয় ও নৃশংসের কর্ম" (বাল্যবিবাহের দোষ, ; “বিধবার জীবন কেবল দুঃখের ভার। এবং এই বিচিত্র সংসার তাহার পক্ষে জনশূন্য অরণ্যাকার' (ওই, । বিধবাকে তিনি জনশূন্য বনবাস থেকে মুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন মানবিক সংসারে।

বিদ্যাসাগর শাস্ত্র মেনেছেন, কেননা লোকে শাস্ত্র মানে, এবং তিনি শান্ত্রে পেয়েছেন তার প্রস্তারের সমর্থন। যদি তিনি সমর্থন না পেতেন শাস্ত্রে, তাহলে কী করতেন বিদ্যাসাগর? তিনি কি শান্ত্রকেই শেষ কথা বলে মানতেন? না, তিনি বাতিল করে দিতেন শান্রকে; হয়তো দেখাতেন ওই সব শান্ত্রের কাল শেষ কয়ে গেছে, ওই সব শাস্ত্র কলিকালের জন্যে নয়। শাস্ত্র কী? বিদ্যাসাগর প্রথমে দেখান শাস্ত্র হচ্ছে ধর্মশান্ত্র; আর মনু, অত্রি, বিষ্ণু, হারীত, যাজ্ঞবন্ক্য, উশনাঃ, অঙ্গিরা, যম, আপ্তম্ব, সংবর্ত, কাত্যায়ন, বৃহস্পতি, পরাশর, ব্যাস, শঙ্খ, লিখিত, দক্ষ, গোভ* শাতাতপ, বশিষ্ট প্রমুখ ধর্মশান্ত্রকর্তা। এর মাঝে উানশটিকে বাতিল করে বিদ্যাসাগর রেখেছেন একটিকে, কেননা সেটি তাকে সমর্থন করে; যদি সমর্থন না করতো তাহলে সেটিকেও বাতিল করতেন তিনি। তিনি স্বীকার করেছেন পরাশরসংহিতাকে। মনু বলেছেন, 'কলিযুগের ধর্ম অন্য", আর পরাশরসংহিতার প্রথম অধ্যায়ে আছে: “পরাশরনিরূপিত ধর্ম কলিযুগের ধর্ম। পরাশর বলেছেন বলেই বিদ্যাসাগর তাকে মেনেছেন, তা নয়: তিনি পরাশরকে স্বীকার করেছেন, কেননা তাতে রয়েছে বিধবার বিয়ের বিধান। তাই তিনি অন্য সব শাস্ত্র বাতিল করে বলেছেন, 'কলিযুগের লোক পূর্ব পূর্ব যগের ধর্ম অবলম্বন করিয়া চলিতে অক্ষম" (ক, ; স্থির করেছেন: 'পরাশরসংহিতা কলিযুগের ধর্মশাস্ (ক, । বাতিল অন্য সব শাস্ত্র। পরাশর বলেছেন [বিদ্যাসাগর (ক,

স্বামী অনুদ্দেশ হইলে, মাঁবলে, ক্লীব হইলে, সংসারধর্ম পরিত্যাগ করিলে, অথবা পতিত হইলে,

সত্রীদিগেব পুনর্বাৰ বিবাহ করা শাস্ত্রবিহিত। যে নারী, স্বামীর মৃত্যু হইলে, ব্রহ্ষচর্য অবলম্বন করিয়া

থাকে, সে দেহান্তে স্বর্ণলাভ করে। মনুষ্যশরীরে যে সার্ধ ব্রিকোটি লোম আছে, যে নারী স্বামীর সহগমন করে, তৎসম কাল স্বর্গে বাস করে।

স্বর্গলাভের কোনো মোহ তার ছিলো না, নারী বিয়ে কবাতে পারলে স্বর্ণের কোনো

২৮০ নারী

দরকার বোধ করবে বলেও তার মনে হয় নি। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে “রাজকীয় আদেশক্রমে, সহগমনের প্রথা রহিত হইয়া গিয়াছে। পরাশরের বিধানের বিদ্যাসাগর (ক, ৭০০) দিয়েছেন এ-ভাষ্যে: পরাশর কলিযুগের বিধবাদিগের পক্ষে তিন বিধি দিতেছেন, বিবাহ, ব্রহ্ষচর্য, সহগমন। তন্মধ্যে, বাজকীয় আদেশক্রমে, সহগমনের প্রথা রহিত হইয়া গিয়াছে। বিধবাদিগের দুই মাত্র পথ আছে বিবাহ ও ব্রহ্মচর্য; ইচ্ছা হয় বিবাহ করিবেক, ইচ্ছা হয় ব্রহ্ষচর্য করিবেক। কলিযুগে, ব্রহ্ষচর্য অবলম্বন কবিয়া, দেহযাত্রা নির্বাহ করা বিধবাদিগের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হইয়া! উঠিয়াছে। এই নিমিত্ত, লোকহিতৈষী ভগবান্ পরাশব সর্বপ্রথম বিবাহেরই বিধি দিয়াছেন।

পরাশর প্রথমেই দিয়েছেন বিয়ের বিধি। প্রশ্ন জাগে রামমোহন কেনো খুঁজে পান নি পরাশরের এ-বিধিটি, তাকে কেনো সম্তৃষ্ট থাকতে হয়েছিলো মনুর বিধি নিয়েই যে বিধবা ব্রহ্মচর্য পালন করবে বা সহমরণে যাবে? রামমোহন কি পেয়েও এড়িয়ে গিয়েছিলেন বিধিটিকেঃ তিনি কি. তে, মনে করেছিলেন যে প্রাণই যথেষ্ট নারীর জন্যে, ব্রহ্মচর্যই নারীর জীবন? রামমোহন কি মনে করেছিলেন বিধবার জন্যে প্রাণের বেশি কিছু চাইতে গেলে পণ্ড হবে সব কিছু, বা তিনি নিজেও বিশ্বাস করতেন যে বিধবার বিয়ে হওয়া ঠিক নয়ঃ কিন্তু আটত্রিশ বছরেই দেখা যায় প্রাণই যথেষ্ট নয়-'কলিযুগে, ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করিয়া, দেহযাত্রা নির্বাহ করা বিধবাদিগের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হইয়া উঠিয়াছে। ' যে-বিধবা ছিলো সামান্য নিশ্বাস, মাত্র আটত্রিশ বছরের মধ্যে বিদ্যাসাগর দাবি করেন যে তার রয়েছে একটি শরীর, তার রয়েছে কামনাবাসনা, আর ওই শরীরে রিপুরা অন্যান্য শরীরের মতোই সক্রিয়। বিধবাদের বৈধব্যযন্ত্রণা ছাড়াও ছিলো আর্থনিরাপত্তাহীনতার সমস্যা; তাদের অধিকাংশের জীবনই ছিলো অবহেলিত দাসীত্র জীবন। বিদ্যাসাগর সে-সব প্রসঙ্গ তোলেন নি, মনে করেছেন বিয়ে হলে ওগুলো মিটবে। বিধবাকে বিয়ে দিয়ে তিনি সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন সম্পর্ণরূপে: তাই তাদের ও সন্তানদের কী মর্যাদা হবে, তাও দেখিয়েছেন শান্ত্র ঘেটে। তার চোখে কুমারী ও বিধবার কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু হিন্দু পিতৃতন্ত্ররর কেনো মেনে নেবে এ-মানবিকতা? তার পাণ্ডারা কি কোলাহল করবে না? মেতে উঠবে না শাস্ত্রের শুদ্ধ-অশুদ্ধ ব্যাখ্যায়? তারা মেতে ওঠে; এবং তাকে লিখতে হয় দীর্ঘ দ্বিতীয় পুস্তক, যাতে প্রতিপাদ্য একই, কিন্তু শ্লোক আর যুক্তি অনেক বেশি। কিন্তু তিনি জানতেন শুধু শ্লোকে কাজ হবে না, আইন পাশ করাতে হবে। তা তিনি করিয়েছিলেন, বিধবাবিবাহের আইন পাশ হয় ১৬ জুলাই তে।

নারীকে সংসারে সুষ্ঠুভাবে প্রতিষ্ঠিত করার সুপরিকল্পনা নিয়ে বিদ্যাসাগর কাজ শুরু করেছিলেন; তাই বিধবাবিবাহ প্রচলনের পর তার কাজ হয় বহুবিবাহ রহিত করা। এ-লড়াইয়ে নামতে হয়েছে বিদ্যাসাগরকে, কেননা বহুবিবাহ নিষিদ্ধ না হলে তার নারী পুরুষতন্ত্রের পীড়ন থেকে বাঁচে না। বহুবিবাহ বিষয়ক তার বই দুটি আকারে অনেক বড়ো, গবেষণা হিশেবে অসামান্য: এবং এ-দুটিতে তিনি হিন্দু কুলবিন্যাস ও পুরুষের কুৎসিত রূপ তুলে ধরেছেন বিস্তৃতভাবে। তিনি বিয়ে দিয়েছেন বিধবাকে, কিন্তু ওই বিয়ে

রামযোহন ও বিদ্যাসাগর: প্রাণদাতা ও জীবনদাতা ২৮১

জিনিশটি কী? বিয়ে হচ্ছে নারীর জন্যে পুরুষের স্বেচ্ছাচারিতার শিকার হওয়া; তিনি বলেছেন, 'এ দেশে বহুবিবাহপ্রথা প্রচলিত থাকাতে, স্ত্রীজাতির যৎপরোনাস্তি ক্লেশ ও সমাজে বহুবিধ অনিষ্ট হইতেছে' ( বিজ্ঞাপন]। বহুবিবাহ নিষেধেও তিনি শান্ত্রকেই নিয়েছেন প্রমাণ হিশেবে, কিন্তু তিনি শাস্ত্রের শেষে চেয়েছেন আইন। বহুবিবাহ বিষয়ক প্রথম পুস্তকে তিনি প্রমাণ করেছেন: স্ত্রী বিদ্যমান থাকিতে, নির্দিষ্ট নিমিত্ত ব্যতিরেকে, যদৃচ্ছাক্রমে পুনরায় সবর্ণাবিবাহ করা শান্ত্রকারদিগের অনুমোদিত নহে' (। তিনি দেখান যে 'বল্লাল গুণ দেখিয়া কুলমর্যাদার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন: দেবীবর দোষ দেখিয়া কুলমর্যাদার ব্যবস্থা করিয়াছেন' (। দেবীবর ঘটক কুলীনদের দোষের তালিকা করে যে-কুলবিন্যাস করেন, তাকে বলা হয় “মেলবন্ধন', এবং এরই ফলে দেখা দেয় বহুবিবাহ। আগে অনেক বেশি ঘরে নারীদের বিয়ে দেয়া যেতো, কিন্তু মেলবন্ধনের ফলে বিয়ে দেয়ার মতো ঘরের সংখ্যা ক'মে যায়। কিন্তু নারীদের বিয়ে দিতেই হবে; তাই দেখা দেয় বহুবিবাহ। কুল কোনো এশ্বরিক ব্যাপার নয়; তিনি দেখিয়েছেন, 'কুলীনমহাশয়েরা যে কুলের অহ্ঙ্কারে মত্ত হইয়া আছেন, তাহা বিধাতার সৃষ্টি নহে” ( নিতান্তই দেবীবর ঘটকের সৃষ্টি। বিদ্যাসাগর বলেছেন, “যদি ধর্ম থাকেন, রাজা বল্লাল সেন ও দেবীবর ঘটকবিশারদ নিঃসন্দেহে নরকগামী হইয়াছেন' (। বিদ্যাসাগর দিয়েছেন কুলীনদের অমানুষিক বর্বরতার পরিচয়: বলেছেন. “এ দেশের ভঙ্গকুলীনদের মত পাষণ্ড ও পাতকী ভূমণ্ডলে নাই' (। তার এ-পুস্তক হিন্দু পিতৃতন্ত্রররের পরোহিতদের উত্তেজিত করে. তারা শান্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন বিদ্যাসাগরের ওপর। তখন তিনি লেখেন দ্বিতীয় প্রস্তক; একে একে তর্কবাচস্পতিপ্রকরণ, ন্যায়রক্রপ্রকরণ, স্মৃতিরক্রপ্রকরণ, সামশ্রমিপ্রকরণ, কবিরক্রপ্রকরণ প্রভৃতি পরিচ্ছেদে খণ্ডন করেন পিতৃতত্ত্রর্রদের শ্লোক ও যুক্তি কিন্তু তিনি বহুবিবাহ রহিত করতে পারেন নি।

রামমোহন হিন্দু বিধবার প্রাণদাতা, বিদ্যাসাগর জীবনদাতা; তবে প্রাণ দেয়ার চেয়ে জীবন দেয়া অনেক কঠিন। বিধবাকে এখন আর চিতায় উঠতে হয় না, যদিও ভারতে আবার সহমরণের পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে: কিন্তু হিন্দু বিধবা আজো জীবনে স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠা পায় নি। এখনো বিধবার বিয়ের কথায় হিন্দু পিতৃতন্ত্ররর বিচলিত হয়ে ওঠে; এমনকি বিধবারাও কেঁপে ওঠে নরকের ভয়ে। প্রথাবাদের ভারতীয় অঞ্চলে জীবনের থেকেও শক্তিশালী প্রথা।

আরও বই