সম্পাদকীয়

বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং লাল গণহত্যা

Table of Contents

ভূমিকা

রাষ্ট্রীয় হত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, হেফাজতে নির্যাতন এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কোনো বিশেষ মতাদর্শের একচেটিয়া নৈতিক অধিকার নয়; এটি সভ্য সমাজের ন্যূনতম মানবিক শর্ত। যে রাষ্ট্র নাগরিককে আইনের স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে হত্যা করে, সে রাষ্ট্র নিজেই অপরাধী। কিন্তু এই নৈতিক অবস্থান তখনই দুর্বল, হাস্যকর এবং স্ববিরোধী হয়ে ওঠে, যখন সেই প্রতিবাদকারীর হাতেই থাকে এমন সব রাজনৈতিক নেতার ছবি, যাদের শাসনামল নিজেই গণহত্যা, শ্রমশিবির, দলীয় একনায়কতন্ত্র, মতপ্রকাশের দমন এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ইতিহাসে রক্তাক্ত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। স্ট্যালিন, মাও সে তুং, পল পট বা কিম ইল-সুংয়ের প্রতীক বহন করে বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে কথা বলা শুধু রাজনৈতিক অসংগতি নয়; এটি নৈতিক স্মৃতিভ্রংশ। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য বামপন্থার মানবিক, যুক্তিবাদী ও মুক্তিকামী সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা নয়; বরং সেই বামপন্থাকে কমিউনিস্ট ধর্মতন্ত্র, নেতা-পূজা, দলীয় ফতোয়াবাজি এবং বিপ্লবের নামে হত্যার সংস্কৃতি থেকে আলাদা করা। কারণ যে রাজনীতি মানুষের মুক্তির নামে মানুষের জীবনকেই মতাদর্শের জ্বালানি বানায়, তাকে মুক্তির রাজনীতি নয়, নতুন ধরনের ধর্মীয় উন্মাদনা বলাই অধিক যুক্তিসঙ্গত।


বামপন্থা ও কমিউনিজম: একই জিনিস নয়

প্রথমেই একটি মৌলিক বিভ্রান্তি দূর করা দরকার: বামপন্থা, সমাজতন্ত্র, মার্ক্সবাদ এবং কমিউনিস্ট রাষ্ট্রবাদ একই জিনিস নয়। “বাম” ও “ডান” রাজনৈতিক শব্দযুগলের ঐতিহাসিক উৎপত্তি ফরাসি বিপ্লব-পরবর্তী জাতীয় পরিষদের আসনবিন্যাস থেকে; যেখানে রাজতন্ত্র, ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও পুরনো সামাজিক ব্যবস্থার পক্ষে থাকা শক্তিগুলোকে সাধারণত ডানপন্থী এবং পরিবর্তন, প্রজাতন্ত্রবাদ ও পুরনো ক্ষমতা-কাঠামোর বিরোধী শক্তিগুলোকে বামপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু হয় [1]। এই অর্থে বামপন্থার প্রাথমিক নৈতিক শক্তি ছিল কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রশ্ন, প্রথার বিরুদ্ধে যুক্তি, এবং জন্মগত বিশেষাধিকারের বিরুদ্ধে মানবিক সমতার দাবি। কিন্তু পরবর্তীকালে সমাজতন্ত্র, মার্ক্সবাদ, অ্যানার্কিজম, সোশ্যাল ডেমোক্রেসি, গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র এবং বলশেভিক-ধারার কমিউনিজম—সবই বাম রাজনীতির ভেতর আলাদা আলাদা ঐতিহাসিক প্রবাহ তৈরি করে [2]। তাই স্ট্যালিনবাদ, মাওবাদ বা পল পটের খেমার রুজকে বামপন্থার একমাত্র বা অবশ্যম্ভাবী রূপ হিসেবে দেখা যেমন ঐতিহাসিকভাবে ভুল, তেমনি তাদের অপরাধকে “বামপন্থার নামে হয়েছে, তাই সমালোচনা করা যাবে না”—এই যুক্তিও নৈতিকভাবে বাজে। বরং যে মুহূর্তে কোনো মুক্তিকামী রাজনীতি দলীয় সর্বক্ষমতা, নেতা-পূজা, একদলীয় রাষ্ট্র, সেন্সরশিপ, গোপন পুলিশ, শ্রমশিবির এবং “শ্রেণীশত্রু” নির্মূলের ভাষায় কথা বলতে শুরু করে, সে মুহূর্তে তা বামপন্থার মুক্তিবাদী ঐতিহ্য থেকে সরে গিয়ে কর্তৃত্ববাদী ধর্মতন্ত্রের রাজনৈতিক সংস্করণে পরিণত হয়। মার্ক্স ইতিহাসকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, শ্রেণীসংঘাত ও উৎপাদনব্যবস্থার আলোকে বিশ্লেষণের একটি শক্তিশালী পদ্ধতি দিয়েছেন; কিন্তু কোনো পদ্ধতিকে যদি পবিত্র কিতাবে, কোনো চিন্তককে যদি নবীতে, এবং কোনো পার্টিকে যদি সত্যের একমাত্র মন্দিরে পরিণত করা হয়, তাহলে তা আর চিন্তা থাকে না—তা হয়ে ওঠে মতাদর্শিক পুরোহিততন্ত্র [3]


মার্ক্সবাদ: পদ্ধতি না হলে বিপজ্জনক ধর্মতন্ত্র

মার্ক্সকে পড়ার ন্যূনতম বুদ্ধিবৃত্তিক সততা হলো তাকে একজন ঐতিহাসিক-অর্থনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে পড়া, কোনো নবী, পয়গম্বর, মুক্তিদাতা বা মানবমুক্তির শেষ সত্য ঘোষণাকারী হিসেবে নয়। মার্ক্স পুঁজিবাদী সমাজে শ্রম, পুঁজি, শ্রেণীস্বার্থ, মজুরি, উদ্বৃত্ত মূল্য, উৎপাদনসম্পর্ক এবং শোষণের কাঠামো বিশ্লেষণের জন্য এক শক্তিশালী পদ্ধতি দিয়েছেন—এটা অস্বীকার করা মূর্খতা; কিন্তু সেই পদ্ধতিকে অপরিবর্তনীয় ধর্মগ্রন্থ বানানো আরও বড় মূর্খতা [4]। মার্ক্সের বিপদ তার বিশ্লেষণে যতটা নয়, তার অনুসারীদের ধর্মীয় আনুগত্যে তার চেয়ে বেশি; কারণ মার্ক্সবাদ যখন গবেষণাপদ্ধতি থাকে, তখন তা প্রশ্ন করে, সংশোধিত হয়, নতুন তথ্যের সামনে মাথা নত করে; কিন্তু মার্ক্সবাদ যখন দলীয় ধর্মে পরিণত হয়, তখন “ইতিহাস”, “শ্রেণী”, “বিপ্লব”, “প্রলেতারিয়েত” এবং “পার্টি”—এই শব্দগুলো যুক্তির বদলে ফতোয়ার ভাষা হয়ে ওঠে। মার্ক্স ও এঙ্গেলস The Communist Manifesto-তে ইতিহাসকে মূলত শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস হিসেবে পাঠ করেন, এবং প্রলেতারিয়েতের রাজনৈতিক আধিপত্যের মাধ্যমে পুঁজি কেড়ে নিয়ে উৎপাদনের উপকরণ রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত করার কথা বলেন; এমনকি তারা স্বীকার করেন, এই রূপান্তরের শুরুতে সম্পত্তির অধিকারের ওপর “despotic inroads”—অর্থাৎ জবরদস্তিমূলক আক্রমণ—লাগতে পারে [5]। এখানেই বিপদের দরজা খুলে যায়: যখন রাষ্ট্রকে উৎপাদনের প্রায় সব উপকরণের মালিক বানানো হয়, যখন “শ্রমিকশ্রেণীর নামে” পার্টিকে রাষ্ট্রের একচ্ছত্র প্রতিনিধি বানানো হয়, তখন বাস্তবে শ্রমিক ক্ষমতায় যায় না—ক্ষমতায় যায় পার্টির আমলাতন্ত্র, গোপন পুলিশ, সেন্সরশিপ, শুদ্ধি অভিযান এবং নেতা-পূজার যন্ত্র। মার্ক্স Critique of the Gotha Programme-এ পুঁজিবাদী সমাজ থেকে কমিউনিস্ট সমাজে উত্তরণের রাজনৈতিক পর্যায়কে “প্রলেতারিয়েতের বিপ্লবী একনায়কতন্ত্র” বলে বর্ণনা করেন; এই ধারণা অস্পষ্ট, বিপজ্জনক এবং পরবর্তী লেনিনবাদী-স্ট্যালিনবাদী রাষ্ট্রসন্ত্রাসের জন্য আদর্শিক খোলা দরজা তৈরি করে দেয় [6]। কোনো শাসক যদি নিজেকে “জনগণের প্রতিনিধি” বলে, কিন্তু জনগণকে তার বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার অধিকার না দেয়, তাকে সমালোচনা করার অধিকার না দেয়, সংবাদপত্র, আদালত, দল, সভা, বই, বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রমিক ইউনিয়ন—সবকিছুকে পার্টির নিয়ন্ত্রণে নেয়, তাহলে সেটি জনগণের শাসন নয়; সেটি জনগণের নামে জনগণের ওপর বসানো এক নতুন পুরোহিততন্ত্র। মার্ক্সের On the Jewish Question-এ নাগরিক অধিকার ও “rights of man” নিয়ে তীব্র সমালোচনা আছে, যেখানে তিনি আধুনিক অধিকারকে বুর্জোয়া সমাজের স্বার্থপর ব্যক্তির অধিকারের মধ্যে সীমিত বলে দেখেন; এই সমালোচনার দার্শনিক মূল্য থাকতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটি বিপজ্জনক, কারণ মানবাধিকারকে “বুর্জোয়া অধিকার” বলে খাটো করার পথ খুলে দিলে পরবর্তী স্বৈরশাসক খুব সহজেই বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, ধর্মত্যাগের অধিকার, সংগঠনের অধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিচারিক সুরক্ষাকে “শ্রেণীশত্রুর অধিকার” বলে বাতিল করতে পারে [7]। একইভাবে The German Ideology-তে শাসক শ্রেণীর ধারণাকে “প্রত্যেক যুগের শাসক ধারণা” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে; এই বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও মতাদর্শ বোঝার জন্য কার্যকর, কিন্তু অন্ধ অনুসারীর হাতে এটি হয়ে যায় সব ভিন্নমতকে “শাসক শ্রেণীর প্রোপাগান্ডা” বলে উড়িয়ে দেওয়ার সস্তা অস্ত্র [8]। ফলে মার্ক্সকে যারা চিন্তার পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করে তারা ইতিহাস বোঝে; কিন্তু যারা মার্ক্সকে কোরআন-বাইবেল-গীতা-লাল কিতাবের মতো পবিত্র গ্রন্থে পরিণত করে, তারা ইতিহাস বোঝে না—তারা শুধু নতুন ধর্ম বানায়। এই ধর্মে ঈশ্বরের জায়গায় ইতিহাস, নবীর জায়গায় মার্ক্স, খলিফার জায়গায় লেনিন-স্ট্যালিন-মাও, উলামার জায়গায় পার্টি-কমিটি, আর কাফেরের জায়গায় “বুর্জোয়া দালাল” বসে যায়। ফলাফলও পরিচিত: প্রশ্নের বদলে আনুগত্য, যুক্তির বদলে স্লোগান, গবেষণার বদলে উদ্ধৃতি, এবং মানুষের বদলে মতাদর্শ। যে মার্ক্সবাদ মানুষের মুক্তির নামে শুরু হয়ে মানুষকেই শ্রেণী-লেবেলে পরিণত করে, সেই মার্ক্সবাদ কোনো মুক্তিবাদ নয়; সেটি রাজনৈতিক ধর্মান্ধতা, এবং তার শেষ পরিণতি প্রায় সবসময়ই সেন্সরশিপ, দমন, রক্তপাত ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস।


লেনিন: বিপ্লবের নামে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বৈধতা

কমিউনিস্ট রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ইতিহাস স্ট্যালিন দিয়ে শুরু হয়নি; তার বীজ অনেক আগেই লেনিন নিজে বপন করেছিলেন। স্ট্যালিন শুধু সেই বীজকে পূর্ণাঙ্গ আমলাতান্ত্রিক দানবে পরিণত করেন। লেনিনকে অনেকেই “বিপ্লবী প্রয়োজনের কঠোর মানুষ” হিসেবে রোমান্টিক ভাষায় বাঁচাতে চান, কিন্তু তার নিজস্ব নির্দেশ, নীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালে এই রোমান্টিকতা ভেঙে পড়ে। ১৯১৭ সালের ডিসেম্বরেই বলশেভিক সরকার Cheka বা অল-রাশিয়ান এক্সট্রাঅর্ডিনারি কমিশন গঠন করে—যার কাজ ছিল “প্রতিবিপ্লব”, “সাবোটাজ” ও “স্পেকুলেশন” দমন করা; বাস্তবে এটি দ্রুতই বিচারবহির্ভূত গ্রেপ্তার, জিম্মি গ্রহণ, গোপন আটক, নির্যাতন, নির্বাসন ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার রাষ্ট্রীয় যন্ত্রে পরিণত হয় [9]। ১৯১৮ সালের ৯ আগস্ট পেনজা অঞ্চলে পাঠানো টেলিগ্রামে লেনিন “কুলাক, পুরোহিত ও হোয়াইট গার্ডদের বিরুদ্ধে নির্মম গণ-সন্ত্রাস” চালানোর নির্দেশ দেন এবং সন্দেহভাজনদের শহরের বাইরে বন্দিশিবিরে আটকে রাখার কথা বলেন; এখানে অপরাধ প্রমাণ, নিরপেক্ষ বিচার, ব্যক্তিগত দায়—এসব আধুনিক ন্যায়ের ধারণার কোনো স্থান নেই, আছে শুধু রাজনৈতিক শ্রেণী-পরিচয়ের ভিত্তিতে দমন [10]। এর মাত্র দুই দিন পর, ১১ আগস্ট ১৯১৮-তে লেনিন পেনজার কমিউনিস্টদের আরেক টেলিগ্রামে “কমপক্ষে একশজন কুখ্যাত কুলাক, ধনী ও রক্তচোষাকে” প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝোলানোর নির্দেশ দেন, তাদের নাম প্রকাশ করতে বলেন, শস্য বাজেয়াপ্ত করতে বলেন, এবং পুরো ঘটনাটি এমনভাবে করতে বলেন যাতে শত শত ভার্স্ট দূরের মানুষ দেখে, কাঁপে এবং বুঝতে পারে যে “রক্তচোষা কুলাকদের” গলা টিপে মারা হচ্ছে [11]। এটাই বিপ্লবী ন্যায়বিচার নয়; এটাই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নগ্ন ভাষা। এখানে লেনিন কোনো আদালত বসাতে বলছেন না, কোনো তদন্তের কথা বলছেন না, কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ চাইছেন না; তিনি বলছেন প্রকাশ্যে ঝুলাও, নাম ছাপাও, মানুষকে ভয় দেখাও। অর্থাৎ হত্যা শুধু শাস্তি নয়, হত্যা নিজেই রাজনৈতিক প্রদর্শনী। এর সঙ্গে ধর্মীয় শাস্তির মঞ্চ, মধ্যযুগীয় জনসম্মুখে ফাঁসি, কিংবা আধুনিক স্বৈরশাসকের ক্রসফায়ার নাটকের পার্থক্য কোথায়? শুধু ভাষা পাল্টেছে—এক জায়গায় বলা হয় ধর্মরক্ষা, আরেক জায়গায় বলা হয় শ্রেণীরক্ষা। ফল একই: রাষ্ট্র মানুষের জীবনকে শিক্ষা দেওয়ার উপকরণ বানায়। ১৯১৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বলশেভিক সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে “রেড টেরর” নীতি ঘোষণা করে; ডিক্রিতে বলা হয়, সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রকে শ্রেণীশত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করতে তাদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বিচ্ছিন্ন করতে হবে এবং হোয়াইট গার্ড সংগঠন, ষড়যন্ত্র ও বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের গুলি করে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে [12]। এই নীতি কোনো বিচ্ছিন্ন রাগের বিস্ফোরণ ছিল না; এটি ছিল বিপ্লবী রাষ্ট্রের ঘোষিত পদ্ধতি—শ্রেণী-পরিচয়কে অপরাধে রূপান্তর করা, সন্দেহকে প্রমাণে রূপান্তর করা, এবং পার্টির নিরাপত্তাকে মানুষের জীবনের চেয়ে বড় করে তোলা। যারা আজ লেনিনের ছবি হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তারা হয় ইতিহাস জানে না, নয় ইতিহাস জানে কিন্তু নৈতিকভাবে অসৎ। কারণ লেনিনের রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে এমন এক ভয়ঙ্কর ধারণা ছিল, যেখানে রাজনৈতিক লক্ষ্য যদি যথেষ্ট “মহৎ” বলে ঘোষণা করা যায়, তাহলে ভয়, বন্দিশিবির, জিম্মি, গণগ্রেপ্তার, প্রকাশ্য ফাঁসি—সবই বৈধ হয়ে যায়। এই যুক্তিই পরে স্ট্যালিনের শুদ্ধি অভিযান, মাওয়ের গণ-অভিযান এবং পল পটের হত্যাক্ষেত্রের নৈতিক লাইসেন্সে পরিণত হয়। তাই লেনিনকে “শুধু বিপ্লবের কঠিন সময়ের কঠোর নেতা” বলে ধোয়ার চেষ্টা আসলে রাজনৈতিক এপোলোজেটিক্স। তিনি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ভাষা, প্রতিষ্ঠান ও নৈতিক অনুমোদন তৈরি করেছিলেন—এই সত্য পাশ কাটিয়ে কমিউনিস্ট স্বৈরতন্ত্র বোঝা যায় না।


স্ট্যালিন: বিপ্লবী রাষ্ট্র থেকে আমলাতান্ত্রিক হত্যাযন্ত্র

স্ট্যালিনকে “কঠোর কিন্তু কার্যকর রাষ্ট্রনির্মাতা” হিসেবে বাঁচানোর চেষ্টা একটি নোংরা ঐতিহাসিক জালিয়াতি। তিনি শুধু কঠোর শাসক ছিলেন না; তিনি এমন এক সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রযন্ত্র নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে আইন ছিল পার্টির চাকর, আদালত ছিল রাষ্ট্রীয় নাট্যমঞ্চ, সংবাদমাধ্যম ছিল প্রচারযন্ত্র, আর নাগরিক ছিল সন্দেহভাজন। লেনিনের তৈরি সন্ত্রাসী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে স্ট্যালিন শিল্পায়িত করেন—অর্থাৎ ভয়, নজরদারি, দলীয় আনুগত্য, গোপন পুলিশ, শ্রমশিবির, বাধ্যতামূলক স্বীকারোক্তি, দেখানো বিচার এবং রাজনৈতিক হত্যাকে তিনি এক সুসংগঠিত প্রশাসনিক রুটিনে পরিণত করেন। ১৯৩৬–১৯৩৮ সালের গ্রেট টেরর বা বৃহৎ শুদ্ধি অভিযানে সোভিয়েত রাষ্ট্র নিজের নাগরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে; পার্টির পুরনো বিপ্লবী, সামরিক কর্মকর্তা, লেখক, বুদ্ধিজীবী, কৃষক, সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী, এমনকি সাধারণ শ্রমিক—কেউই রেহাই পায়নি। আর্কাইভ-ভিত্তিক গবেষণায় ১৯৩৭–১৯৩৮ সালে রাষ্ট্রীয় মৃত্যুদণ্ডের সরকারি সংখ্যা প্রায় ৬৮১,৬৯২ হিসেবে উঠে এসেছে; গ্রেপ্তার, গুলাগে মৃত্যু, নির্বাসন ও পরোক্ষ মৃত্যুসহ প্রকৃত মানবিক ক্ষতি আরও বৃহৎ [13]। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে ছিল পরিবারভাঙা রাত, দরজায় এনকেভিডির কড়া, জোর করে লেখা স্বীকারোক্তি, গুলি করে ফেলা দেহ, আর রাষ্ট্রীয় কাগজে ঠাণ্ডা ভাষায় লেখা “শত্রু নির্মূল”। কাতিন গণহত্যা এই সন্ত্রাসী রাজনীতির সবচেয়ে নগ্ন উদাহরণগুলোর একটি: ১৯৪০ সালের মার্চে স্ট্যালিন ও সোভিয়েত পলিটব্যুরোর সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রায় ২২,০০০ পোলিশ অফিসার, পুলিশ, বুদ্ধিজীবী ও বন্দিকে এনকেভিডি হত্যা করে; দশকের পর দশক সোভিয়েত রাষ্ট্র এই অপরাধ নাৎসিদের ঘাড়ে চাপিয়ে মিথ্যা প্রচার চালায় [14]। যে রাষ্ট্র নিজের গণহত্যা ঢাকতে আরেক ফ্যাসিস্ট গণহত্যাকারীর ওপর দায় চাপায়, তাকে “সমাজতান্ত্রিক ন্যায়বিচার” বলা ইতিহাসের সঙ্গে প্রতারণা। স্ট্যালিনের বাধ্যতামূলক সমবায়ীকরণ ও ডিকুলাকাইজেশন নীতি কৃষকদের ওপর রাষ্ট্রীয় যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়; “কুলাক” শব্দটি বাস্তব অর্থনৈতিক শ্রেণীর নির্ভুল বিশ্লেষণ ছিল না, বরং রাজনৈতিক মৃত্যুদণ্ডের লেবেল হয়ে ওঠে। ১৯৩২–১৯৩৩ সালের ইউক্রেনীয় দুর্ভিক্ষ বা হলদোমোরে লক্ষ লক্ষ নয়, মিলিয়ন মানুষ অনাহারে মারা যায়; খাদ্যসংগ্রহ, চলাচলে বাধা, শস্য বাজেয়াপ্তকরণ এবং কৃষক প্রতিরোধ দমনের নীতির কারণে এই দুর্ভিক্ষ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছিল না, বরং রাষ্ট্রীয় নীতির তৈরি মানবিক বিপর্যয় [15]। এরপর আছে গুলাগ—সোভিয়েত শ্রমশিবিরব্যবস্থা—যেখানে রাজনৈতিক বন্দি, অপরাধী, সন্দেহভাজন, জাতিগতভাবে চিহ্নিত মানুষ এবং রাষ্ট্রের অপছন্দের নাগরিকদের বাধ্যতামূলক শ্রমে ঠেলে দেওয়া হয়; এটি কোনো দুর্ঘটনাজনিত কারাগারব্যবস্থা ছিল না, বরং সোভিয়েত অর্থনীতি, শাস্তি ও ভয়ের কাঠামোর অংশ [16]। সবচেয়ে বিকৃত বিষয় হলো, এই সমগ্র হত্যাযন্ত্রের ওপর স্ট্যালিন ব্যক্তিপূজার ধর্মীয় স্থাপত্য বসান। শহর, প্রতিষ্ঠান, পুরস্কার, গান, পোস্টার, সাহিত্য, পাঠ্যবই—সবখানে স্ট্যালিনকে “জাতির পিতা”, “মানবতার মহান শিক্ষক”, “সমাজতন্ত্রের স্থপতি” হিসেবে নির্মাণ করা হয়; ১৯৪৪ সালের সোভিয়েত জাতীয় সংগীতেও স্ট্যালিনের নাম ঢোকানো হয়, এবং পরবর্তী দে-স্ট্যালিনাইজেশনের সময় সেই ব্যক্তিপূজার অস্বস্তিকর উত্তরাধিকার মুছে ফেলতে হয় [17]। তাই স্ট্যালিনের ছবি হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা কোনো বিপ্লবী দৃঢ়তা নয়; এটি নৈতিক অশিক্ষা। যে মানুষ রাষ্ট্রীয় হত্যাকে প্রশাসনিক নীতিতে, সন্দেহকে অপরাধে, ভিন্নমতকে বিশ্বাসঘাতকতায়, কৃষককে শ্রেণীশত্রুতে, আর নাগরিককে পার্টির সম্পত্তিতে পরিণত করেছিলেন, তার ছবি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলনে ব্যবহার করা মানে হত্যাকারীর ছুরি হাতে নিয়ে হত্যার বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেওয়া। এটি শুধু হাস্যকর নয়; এটি নিহতদের স্মৃতির প্রতি অপমান।


মাও সে তুং: বিপ্লবী রোমান্টিসিজমের আড়ালে দুর্ভিক্ষ, উন্মাদনা ও রাষ্ট্রীয় হত্যা

মাও সে তুংকে “চীনের আধুনিকীকরণের মহানায়ক” হিসেবে সাজানো ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর রাজনৈতিক প্রতারণাগুলোর একটি। চীনকে ঐক্যবদ্ধ করা, সাক্ষরতা বাড়ানো বা শিল্পায়নের ভিত্তি তৈরির মতো কিছু সাফল্যের তালিকা সামনে এনে মাওয়ের অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করা সেই একই নৈতিক নোংরামি, যেমন হিটলারের অটোবান দেখিয়ে হলোকস্টকে ছোট করা। রাষ্ট্র যদি কোটি মানুষের জীবনকে পরীক্ষাগারের ইঁদুর বানায়, তাহলে তার কিছু সেতু, কারখানা বা পরিসংখ্যান দিয়ে সেই অপরাধ ধোয়া যায় না। ১৯৫৮ সালে মাওয়ের গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড ছিল এক ভয়াবহ ইউটোপিয়ান উন্মাদনা—কৃষিকে জোরপূর্বক কমিউনে রূপান্তর, ব্যক্তিগত কৃষিকাজের বিলোপ, বাড়ির আঙিনায় অকার্যকর ইস্পাত উৎপাদন, অবাস্তব উৎপাদন-টার্গেট, স্থানীয় কর্মকর্তাদের মিথ্যা ফসল-রিপোর্ট, রাষ্ট্রীয় শস্যসংগ্রহ এবং বাস্তব কৃষি-উৎপাদন থেকে শ্রমশক্তিকে সরিয়ে নেওয়ার এক সম্মিলিত বিপর্যয় [18]। এই দুর্ভিক্ষ কোনো স্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না; এটি ছিল রাজনৈতিক মিথ্যা, কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, দলীয় ভীতি, অর্থনৈতিক অজ্ঞতা এবং নেতার ভুলকে সত্য বানানোর রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির ফল। গবেষকদের হিসাব ভিন্ন হলেও গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড-সংশ্লিষ্ট মহাদুর্ভিক্ষে মৃত্যুর সংখ্যা সাধারণত কয়েক কোটি মানুষের স্তরে ধরা হয়; অনেক গবেষক ৩০ মিলিয়নের কাছাকাছি সংখ্যা ব্যবহার করেন, আর Frank Dikötter আর্কাইভভিত্তিক গবেষণায় কমপক্ষে ৪৫ মিলিয়ন অকালমৃত্যুর কথা বলেন [19]। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল “Four Pests Campaign”—চড়ুইসহ তথাকথিত কীট-পতঙ্গ নির্মূলের এক রাষ্ট্রীয় নির্বুদ্ধিতা, যেখানে প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খল সম্পর্কে অজ্ঞ রাজনৈতিক নির্দেশ কৃষি-বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়ে দেয়; বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বদলে নেতা-ঘোষিত সত্যকে বাস্তবতার ওপর চাপিয়ে দিলে রাষ্ট্র যে কী ধরনের পরিবেশগত ও মানবিক বিপর্যয় তৈরি করতে পারে, এটি তার ক্লাসিক উদাহরণ [20]। গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ডের পরে মাও ক্ষমতার কেন্দ্রে নিজের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৬৬ সালে কালচারাল রেভল্যুশন শুরু করেন; এটি ছিল কোনো “সাংস্কৃতিক বিপ্লব” নয়, বরং রাষ্ট্র-সমর্থিত সামাজিক উন্মাদনা, যেখানে ছাত্র-যুবকদের রেড গার্ড বানিয়ে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, কর্মকর্তা, শিল্পী, লেখক, পুরনো সহযোদ্ধা—সবার ওপর হামলা চালানো হয় [21]। “চার পুরনো”—পুরনো চিন্তা, পুরনো সংস্কৃতি, পুরনো প্রথা, পুরনো অভ্যাস—ধ্বংসের নামে বাস্তবে বই পোড়ানো, মন্দির-ঐতিহ্য ধ্বংস, প্রকাশ্য অপমান, প্রহার, আত্মহত্যায় বাধ্য করা, রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান এবং জনতার হাতে জনতার বিচার—এইসব বর্বরতা চালানো হয় [22]। Stanford-প্রকাশিত আলোচনায় Andrew Walder-এর হিসাব অনুযায়ী কালচারাল রেভল্যুশনের সহিংসতায় প্রায় ১.৬ মিলিয়ন মানুষ নিহত হয়; অন্য গবেষণাতেও মৃত্যুর হিসাব প্রায় এক থেকে দুই মিলিয়নের স্তরে ঘোরে, কিন্তু সংখ্যার চেয়েও ভয়াবহ হলো এই যে, রাষ্ট্র নিজেই সমাজকে এমনভাবে উসকে দিয়েছিল যাতে সন্তান পিতার বিরুদ্ধে, ছাত্র শিক্ষকের বিরুদ্ধে, কর্মী সহকর্মীর বিরুদ্ধে দাঁড়ায় [23]। মাওবাদী রাজনীতির কেন্দ্রীয় নোংরামি এখানেই: মানুষের স্বাধীন বিচারশক্তি নষ্ট করে তাকে নেতা-উন্মাদ জনতার অংশে পরিণত করা। মাওয়ের Little Red Book রাজনৈতিক গ্রন্থ কম, পবিত্র তাবিজ বেশি ছিল; সেখানে যুক্তি নয়, উদ্ধৃতি; বিশ্লেষণ নয়, আনুগত্য; প্রশ্ন নয়, মুখস্থ স্লোগান ছিল ক্ষমতার ভাষা [24]। ফলে মাওয়ের ছবি হাতে রাষ্ট্রীয় হত্যার প্রতিবাদ করা শুধু ঐতিহাসিক অজ্ঞতা নয়, নৈতিক বিকৃতি। যে নেতা নিজের রাজনৈতিক কল্পনাকে বাস্তবতার ওপর চাপিয়ে কোটি মানুষের খাদ্য, জীবন, শ্রম, পরিবার, চিন্তা ও মর্যাদা ধ্বংস করেছিলেন, তাকে মুক্তির প্রতীক বলা যায় না। তিনি ছিলেন বিপ্লবী পোশাক পরা এক সর্বগ্রাসী শাসক, যার হাতে সমাজতন্ত্র মানুষের মুক্তির প্রকল্প থেকে নেমে এসে রাষ্ট্রীয় পরীক্ষাগার, দুর্ভিক্ষ, সামাজিক উন্মাদনা এবং ব্যক্তিপূজার রক্তাক্ত ধর্মে পরিণত হয়েছিল।


চে গুয়েভারা, মেক্সিকো ও ক্যাস্ট্রো: টি-শার্টের বিপ্লবী রোমান্টিকতা বনাম ফায়ারিং স্কোয়াডের বাস্তবতা

কমিউনিস্ট রোমান্টিসিজমের সবচেয়ে সফল পণ্য সম্ভবত চে গুয়েভারা। তার মুখ আজ পোস্টার, টি-শার্ট, দেয়ালচিত্র, ক্যাফে-সজ্জা, ছাত্ররাজনীতির ব্যানার এবং বিপ্লবী নস্টালজিয়ার বাজারে এক ধরনের পবিত্র আইকনে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই আইকনের পেছনের বাস্তব মানুষটি ছিলেন না কোনো মানবতাবাদী কবি; তিনি ছিলেন সশস্ত্র বিপ্লব, একদলীয় শাসন, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং বিপ্লবী মৃত্যুদণ্ডের এক নিষ্ঠাবান প্রচারক। চে ও ফিদেল ক্যাস্ট্রোর রাজনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হয় মেক্সিকোতে, ১৯৫৫ সালে; সেখানেই চে ফিদেল ও রাউল ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরে ১৯৫৬ সালে মেক্সিকোর তুক্সপান উপকূল থেকে Granma নৌযানে করে কিউবার উদ্দেশে রওনা দেন [25]। অর্থাৎ মেক্সিকো এই ইতিহাসে কোনো নিরীহ ভূগোল নয়; এটি ছিল কিউবান বিপ্লবের ষড়যন্ত্র, সংগঠন ও সশস্ত্র অভিযাত্রার প্রস্তুতিমঞ্চ। কিন্তু বিপ্লব সফল হওয়ার পর যে রাষ্ট্র তৈরি হলো, সেটি মুক্ত গণতন্ত্র নয়; সেটি দ্রুতই একদলীয় কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যেখানে বিরোধী মত, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, স্বাধীন সংগঠন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নাগরিক স্বাধীনতা ক্রমশ রাষ্ট্রীয় দমনের অধীন চলে যায় [26]। চে গুয়েভারার সবচেয়ে অস্বস্তিকর অধ্যায় হলো হাভানার লা কাবানা দুর্গ-কারাগার। ১৯৫৯ সালের বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে সেখানে বাতিস্তা-শাসনের সহযোগী, সৈনিক, পুলিশ, সন্দেহভাজন নির্যাতক এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী ট্রাইব্যুনাল বসে; চে সেই কারাগার ও সংশ্লিষ্ট মৃত্যুদণ্ড-প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন [27]। এখানে এপোলোজিস্টরা সাধারণত একই পুরনো কৌশল নেয়: তারা বলে, যাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল তারা সবাই বাতিস্তার খুনি, নির্যাতক, অপরাধী ছিল। কিন্তু প্রশ্নটি এত সরল নয়। প্রশ্ন হলো—স্বাধীন আদালত কোথায় ছিল? স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া কোথায় ছিল? আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের বাস্তব অধিকার কতটা ছিল? বিপ্লবী জনতার প্রতিশোধস্পৃহা থেকে আদালত কতটা স্বাধীন ছিল? এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: একটি নতুন রাষ্ট্র কি শুরুতেই ফায়ারিং স্কোয়াডকে ন্যায়বিচারের ভাষা বানাতে পারে? বিপ্লবী ট্রাইব্যুনালের নাম দিলেই মৃত্যুদণ্ড ন্যায়বিচার হয়ে যায় না; ধর্মীয় আদালত যেমন “ঈশ্বরের আইন” বলে হত্যাকে পবিত্র করে, তেমনি বিপ্লবী আদালত “জনগণের বিচার” বলে হত্যাকে রাজনৈতিকভাবে পবিত্র করে। উভয় ক্ষেত্রেই আসল কাজ একই—রাষ্ট্র বা সংগঠন নিজেকে নৈতিকতার একমাত্র মালিক ঘোষণা করে মানুষের জীবন কাড়ে। চে নিজেই সহিংস বিপ্লবী নৈতিকতার ভাষা ব্যবহার করেছিলেন; ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত “Message to the Tricontinental”-এ তিনি বিপ্লবী সংগ্রামে “hatred as an element of struggle”—সংগ্রামের উপাদান হিসেবে ঘৃণার কথা বলেন এবং কার্যকর, সহিংস, নির্বাচিত হত্যাযন্ত্রে রূপান্তরিত বিপ্লবীর ভাষা ব্যবহার করেন [28]। এই ভাষা কোনো মানবতাবাদী মুক্তির ভাষা নয়; এটি রাজনৈতিক ধর্মযুদ্ধের ভাষা, যেখানে প্রতিপক্ষ মানুষ নয়, নির্মূলযোগ্য শত্রু। ফিদেল ক্যাস্ট্রোর ক্ষেত্রেও একই ভণ্ড রোমান্টিকতা দেখা যায়। তিনি বাতিস্তার স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন—এটা সত্য; কিন্তু বাতিস্তাকে হটিয়ে যে রাষ্ট্র নির্মাণ করেন, সেটি নাগরিক স্বাধীনতার রাষ্ট্র ছিল না। প্রায় পাঁচ দশকের শাসনে কিউবায় ভিন্নমত দমন, রাজনৈতিক বন্দিত্ব, স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ, দেশত্যাগে বাধা, নজরদারি এবং রাষ্ট্রীয় ভয়কে রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ করা হয় [29]। স্বাস্থ্যসেবা বা শিক্ষার সাফল্য দেখিয়ে এই দমনকে ধোয়া যায় না। কোনো শাসক হাসপাতাল বানালেই তার কারাগার অদৃশ্য হয়ে যায় না; সাক্ষরতা বাড়ালেই ফায়ারিং স্কোয়াড নৈতিক হয়ে যায় না; সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিলেই নিজের নাগরিকের মুখ বন্ধ করার অধিকার জন্মায় না। তাই চে বা ক্যাস্ট্রোর ছবি হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা ঐতিহাসিকভাবে অশিক্ষিত এবং নৈতিকভাবে প্রতারণামূলক। চে ছিলেন বিপ্লবী মৃত্যুদণ্ডের প্রশাসক, ক্যাস্ট্রো ছিলেন দীর্ঘস্থায়ী একদলীয় রাষ্ট্রের স্থপতি, আর মেক্সিকো ছিল সেই বিপ্লবী জোটের প্রস্তুতিস্থল। এই ত্রয়ীকে যদি কেউ “মানবমুক্তির রোমান্টিক প্রতীক” বানায়, তাহলে সে বাস্তব ইতিহাস নয়, পোস্টার-ইতিহাস পড়ছে। আর পোস্টার-ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—তাতে মুখ থাকে, রক্ত থাকে না; স্লোগান থাকে, মৃত মানুষের নাম থাকে না।


পল পট ও খেমার রুজ: কমিউনিস্ট ইউটোপিয়া যখন হত্যাক্ষেত্রে পরিণত হয়

পল পটের খেমার রুজ দেখিয়ে দেয়, ইউটোপিয়ান রাজনীতি যখন বাস্তব মানুষের ওপর চাপানো হয়, তখন “নতুন সমাজ” বানানোর নামে পুরনো মানুষদের মেরে ফেলা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৭ এপ্রিল খেমার রুজ নম পেন দখল করার পর যে কাজটি করে, সেটি কোনো সাধারণ ক্ষমতা পরিবর্তন ছিল না; তারা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে শহর খালি করে মানুষকে গ্রামে শ্রম-কমিউনে ঠেলে দেয়, টাকা, বাজার, ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, ধর্ম, শিক্ষা, পেশা, শহুরে সংস্কৃতি—সবকিছুকে “পুরনো সমাজের আবর্জনা” হিসেবে ধ্বংস করতে শুরু করে [30]। এই প্রকল্পের নাম ছিল Democratic Kampuchea, কিন্তু বাস্তবে সেখানে গণতন্ত্রের কোনো অস্তিত্ব ছিল না; ছিল পার্টির গোপন কেন্দ্র, সন্দেহ, নজরদারি, বাধ্যতামূলক শ্রম, অনাহার, নির্যাতন এবং হত্যা। পল পটের মৌলিক রাজনৈতিক উন্মাদনা ছিল “Year Zero”—ইতিহাসকে শূন্য থেকে শুরু করার ধারণা; অর্থাৎ মানবসমাজের জটিলতা, স্মৃতি, প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তি, নগরসভ্যতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে মুছে দিয়ে কৃষিভিত্তিক এক বিশুদ্ধ কমিউনিস্ট সমাজ বানানোর কল্পনা [31]। এই ধরনের চিন্তার ভেতরেই গণহত্যার যুক্তি লুকিয়ে থাকে: যদি নতুন সমাজই একমাত্র সত্য হয়, তাহলে পুরনো সমাজের মানুষরা হয়ে যায় বাধা; আর বাধা সরানোই তখন নৈতিক কর্তব্য হিসেবে হাজির হয়। খেমার রুজ সেই কাজই করেছে। বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, ছাত্র, শহুরে মানুষ, বিদেশি ভাষাজ্ঞানী, চশমা-পরা মানুষ, ধর্মীয় নেতা, জাতিগত সংখ্যালঘু, ভিয়েতনামি, চাম মুসলিম, বৌদ্ধ ভিক্ষু—যে কেউ “নতুন সমাজের” শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হতে পারত [32]। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে প্রায় ১.৭ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়—ইয়েল Cambodian Genocide Program এই সংখ্যাকে কম্বোডিয়ার জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ হিসেবে উল্লেখ করে; অন্যান্য গবেষণায় মৃত্যুর পরিসর সাধারণত ১.৫ থেকে ৩ মিলিয়নের মধ্যে ধরা হয় [33]। এই মৃত্যু শুধু গুলিতে হয়নি; মানুষ মারা গেছে জোরপূর্বক শ্রমে, অনাহারে, রোগে, চিকিৎসাহীনতায়, নির্যাতনে এবং পরিকল্পিত হত্যায়। অর্থাৎ খেমার রুজের হত্যাযন্ত্র ছিল বহুমাত্রিক—কখনো বন্দুক, কখনো কোদাল, কখনো কারাগার, কখনো ক্ষুধা। Tuol Sleng বা S-21 কারাগার ছিল এই ব্যবস্থার সবচেয়ে কুখ্যাত প্রতীক; সেখানে হাজার হাজার মানুষকে জেরা, নির্যাতন ও স্বীকারোক্তির নামে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, এবং পরে Choeung Ek-সহ হত্যাক্ষেত্রে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয় [34]। খেমার রুজের যুক্তি ছিল পরিচিত: বিপ্লব বিপদে, শত্রু সর্বত্র, পার্টি ভুল করতে পারে না, সন্দেহই প্রমাণ, এবং মানুষকে বাঁচানোর চেয়ে বিপ্লবকে বাঁচানো বড়। এই যুক্তি কোনো বিচ্ছিন্ন কম্বোডীয় পাগলামি নয়; এটি লেনিনীয়-স্ট্যালিনীয়-মাওবাদী রাজনীতির চূড়ান্ত নগ্ন সংস্করণ। লেনিন “শ্রেণীশত্রু” নির্মূলের ভাষা দিয়েছিলেন, স্ট্যালিন সেই ভাষাকে গোপন পুলিশ ও শ্রমশিবিরের প্রশাসনে পরিণত করেছিলেন, মাও জনতাকে নেতা-পূজিত উন্মাদনায় নামিয়েছিলেন, আর পল পট সেই একই ঐতিহ্যকে এতদূর নিয়ে গিয়েছিলেন যে শিক্ষা, শহর, পরিবার, ধর্ম, বাজার—মানবসভ্যতার প্রায় সব মৌলিক স্তম্ভকেই অপরাধ বানিয়ে ফেলেছিলেন। ২০১৮ সালে Extraordinary Chambers in the Courts of Cambodia রায় দেয় যে পল পট-নেতৃত্বাধীন খেমার রুজ শাসন ১৯৭৫–১৯৭৯ সময়ে গণহত্যা সংঘটিত করেছিল; Nuon Chea ও Khieu Samphan-কে জাতিগত ভিয়েতনামিদের বিরুদ্ধে genocide এবং Nuon Chea-কে চাম মুসলিমদের বিরুদ্ধেও genocide-এর জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয় [35]। তাই পল পটকে কমিউনিজমের “ভুল প্রয়োগ” বলে পাশ কাটানো বুদ্ধিবৃত্তিক কাপুরুষতা। ভুল প্রয়োগের কথা তখনই বলা যায়, যখন কোনো নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে অপরাধ ঘটে; কিন্তু এখানে অপরাধ ঘটেছে সেই নীতির কেন্দ্রে থাকা মানুষের-ওপর-ইউটোপিয়া-চাপানোর রাজনীতি থেকে। যে মতাদর্শ মানুষকে বাস্তব ব্যক্তি হিসেবে নয়, ইতিহাসের কাঁচামাল হিসেবে দেখে, সে মতাদর্শের হাতে ক্ষমতা গেলে হত্যাক্ষেত্র তৈরি হওয়া দুর্ঘটনা নয়; তা প্রায় প্রত্যাশিত ফল। পল পট সেই প্রত্যাশিত ফলের সবচেয়ে ঘন, কুৎসিত এবং রক্তাক্ত উদাহরণ।


কিম ইল-সুং ও উত্তর কোরিয়া: কমিউনিজম যখন বংশগত রাজতন্ত্রে পরিণত হয়

উত্তর কোরিয়া কমিউনিস্ট রাজনীতির সবচেয়ে কুৎসিত ব্যঙ্গচিত্র: মুখে শ্রমিকের রাষ্ট্র, বাস্তবে বংশগত রাজতন্ত্র; মুখে জনগণের গণতন্ত্র, বাস্তবে এক পরিবারের ব্যক্তিগত বন্দিশালা; মুখে সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা, বাস্তবে নিজের নাগরিকের ওপর সর্বাত্মক যুদ্ধ। কিম ইল-সুং রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে এমন এক রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করেন, যেখানে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ, জুচে, সামরিকীকরণ, নেতা-পূজা এবং গোপন পুলিশ একত্রে মিশে আধুনিক কালের এক প্রায় ধর্মীয় স্বৈরতন্ত্র তৈরি করে [36]। কমিউনিজমের ঘোষিত ভাষা ছিল শ্রেণীহীন সমাজ; কিন্তু উত্তর কোরিয়ায় তৈরি হয় songbun নামে রাজনৈতিক-বংশগত শ্রেণীবিভাজন, যেখানে নাগরিকের অধিকার, খাদ্যপ্রাপ্তি, শিক্ষা, চাকরি, বসবাস, এমনকি রাষ্ট্রীয় সন্দেহের মাত্রা নির্ধারিত হয় তার পারিবারিক পটভূমি ও রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে [37]। অর্থাৎ যে মতাদর্শ শ্রেণী বিলোপের নামে ক্ষমতায় আসে, সেটিই রাষ্ট্রীয়ভাবে নতুন জন্মগত শ্রেণী বানায়—এটি শুধু ভণ্ডামি নয়, মতাদর্শিক প্রতারণা। কিম ইল-সুংয়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক নির্মাণ ছিল ব্যক্তিপূজা: “গ্রেট লিডার” কোনো সাধারণ রাজনৈতিক উপাধি ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্রীয় ধর্মের কেন্দ্রীয় দেবমূর্তি। শিশুশিক্ষা, গান, দেয়ালচিত্র, সংবাদপত্র, ইতিহাস, সাহিত্য, সামরিক শপথ, পারিবারিক জীবন—সব জায়গায় কিম পরিবারের প্রতি আনুগত্যকে নৈতিকতার মাপকাঠি বানানো হয় [38]। মার্ক্সবাদ যদি সত্যিই ধর্মবিরোধী যুক্তিবাদী রাজনীতি হয়, তাহলে উত্তর কোরিয়া তার সরাসরি অস্বীকার: এখানে ঈশ্বরের বদলে নেতা, ধর্মগ্রন্থের বদলে জুচে, মসজিদ-মন্দির-গির্জার বদলে মূর্তি ও স্মৃতিসৌধ, পুরোহিতের বদলে পার্টি-ক্যাডার, এবং পাপের বদলে রাজনৈতিক অবিশ্বাস বসানো হয়েছে। ১৯৯৪ সালে কিম ইল-সুংয়ের মৃত্যুর পর ক্ষমতা গণতান্ত্রিকভাবে জনগণের কাছে যায়নি, শ্রমিকদের কাউন্সিলেও যায়নি; ক্ষমতা যায় তার ছেলে কিম জং-ইলের হাতে, পরে নাতি কিম জং-উনের হাতে। একটি রাষ্ট্র যদি “কমিউনিস্ট” হয়, অথচ ক্ষমতা পিতা থেকে পুত্র, পুত্র থেকে পৌত্রে যায়, তাহলে সেটি কমিউনিজম নয়; সেটি লাল পতাকা-ঢাকা রাজতন্ত্র [39]। উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক কারাগার বা kwan-li-so ব্যবস্থা এই রাষ্ট্রের নৈতিক নগ্নতা প্রকাশ করে। রাজনৈতিক অপরাধের অভিযোগে শুধু ব্যক্তিকে নয়, পরিবারের সদস্যদেরও শাস্তি দেওয়া হয়; অর্থাৎ রাষ্ট্র ব্যক্তিগত দায় নয়, রক্তের দায়ে বিশ্বাস করে—যা আধুনিক বিচারনীতির নয়, গোত্রীয় প্রতিহিংসার ভাষা [40]। ২০১৪ সালে জাতিসংঘের Commission of Inquiry উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে “systematic, widespread and gross human rights violations” এবং বহু ক্ষেত্রে crimes against humanity-এর অভিযোগ নথিবদ্ধ করে; তদন্তে খাদ্যের অধিকার, কারাগার-শিবির, নির্যাতন, নির্বিচার আটক, বৈষম্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জীবনাধিকার, চলাচলের স্বাধীনতা এবং জোরপূর্বক গুম—এই সব ক্ষেত্রেই ভয়াবহ লঙ্ঘনের চিত্র উঠে আসে [41]। ১৯৯০-এর দশকের দুর্ভিক্ষ—যাকে উত্তর কোরিয়ার ভাষায় “Arduous March” বলা হয়—এই রাষ্ট্রব্যবস্থার আরেক নির্মম ফল। মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে পার্থক্য আছে; ৩৮ North ও বহু গবেষণা ৬০০,০০০ থেকে ১ মিলিয়নের স্তরের মৃত্যুর হিসাবকে সম্ভাব্য বলে উল্লেখ করে, অন্য কিছু উচ্চতর অনুমানে সংখ্যা আরও বেশি যায় [42]। কিন্তু এখানে সংখ্যার বিতর্ক দিয়ে নৈতিক অপরাধ ঢেকে যায় না; রাষ্ট্র যখন খাদ্যবণ্টনকে রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে যুক্ত করে, সীমান্ত বন্ধ করে, তথ্য আটকে রাখে, বাজার দমন করে এবং জনগণের ক্ষুধাকে স্বীকার করার বদলে প্রচারযন্ত্র চালায়, তখন দুর্ভিক্ষ আর শুধু আবহাওয়া বা অর্থনৈতিক ভুল থাকে না—তা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অপরাধ। তাই কিম ইল-সুংকে “অ্যান্টি-ইম্পেরিয়ালিস্ট নেতা” বলে সাজানো এক ধরনের নৈতিক প্রতারণা। সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা কোনো শাসককে নিজের জনগণকে বন্দি করার অধিকার দেয় না; আমেরিকাবিরোধী বক্তৃতা কোনো কারাগারকে মুক্তাঞ্চল বানায় না; লাল পতাকা কোনো বংশগত স্বৈরতন্ত্রকে শ্রমিকশ্রেণীর শাসনে পরিণত করে না। উত্তর কোরিয়া প্রমাণ করে, কমিউনিস্ট নেতা-পূজা শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় রাজতন্ত্রের চেয়েও খারাপ হতে পারে: সেখানে ঈশ্বরের নামে নয়, ইতিহাসের নামে মানুষ বন্দি হয়; রাজবংশের নামে নয়, বিপ্লবের নামে রাজবংশ টিকে থাকে; আর জনগণের নামে জনগণকেই রাষ্ট্রের সম্পত্তি বানানো হয়।


দক্ষিণ এশিয়ার লাল সন্ত্রাস: পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, নকশালবাদ ও মাওবাদী

কমিউনিস্ট সহিংসতার আলোচনা শুধু সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, কম্বোডিয়া, কিউবা বা উত্তর কোরিয়ার ইতিহাসে আটকে রাখলে ভুল হবে; দক্ষিণ এশিয়ার মাটিতেও “বিপ্লব”, “শ্রেণীসংগ্রাম” এবং “জনযুদ্ধের” নামে রক্তপাত, চাঁদাবাজি, খুন, ভয় দেখানো এবং সামাজিক সন্ত্রাসের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। বাংলাদেশের পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি বা PBCP তার একটি কুৎসিত উদাহরণ। সংগঠনটি ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বিভক্ত হয়ে গঠিত মাওবাদী ধারার একটি সশস্ত্র সংগঠন হিসেবে পরিচিত; জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনকাল থেকেই এটি নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত, এবং দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, মাগুরা, মেহেরপুর, নড়াইল, কুষ্টিয়া, যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও পিরোজপুর অঞ্চলে এর প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে [43]। PBCP-র ঘোষিত ভাষা ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল; কিন্তু বাস্তব কর্মকাণ্ডে দেখা যায় হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, জমি দখল, অপহরণ, গ্রামীণ বিরোধে সশস্ত্র সালিশ এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে “ট্যাক্স” আদায়ের অপরাধী কাঠামো [44]। অর্থাৎ শ্রেণীসংগ্রামের ভাষা এখানে দ্রুতই অপরাধী অর্থনীতির ভাষায় নেমে আসে। “শ্রেণীশত্রু খতম” করতে করতে একসময় যে সংগঠন বাজার, রাস্তা, স্কুল, কালভার্ট, ঠিকাদারি, জমি-বিরোধ এবং স্থানীয় রাজনীতির ওপর সশস্ত্র কর বসায়, তাকে আর বিপ্লবী সংগঠন বলা যায় না; সেটি আদর্শের রঙ মাখানো সন্ত্রাসী চাঁদাবাজ চক্র। SATP-র তথ্য অনুযায়ী ২০০২ সালের প্রথম তিন মাসেই PBCP ক্যাডাররা দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের ১০ জেলায় প্রায় একশ মানুষের হত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে রিপোর্ট করা হয়; ১৯৯৮ থেকে ২০০২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অন্তত ১৮ জন কর্মী হত্যার কথাও সেখানে উল্লেখ আছে [45]। একই ধারার Janajuddha বা “জনযুদ্ধ” নামে PBCP-র একটি উপদল ২০০৪ সালে সাংবাদিক মানিক সাহা ও হুমায়ুন কবির হত্যার দায় স্বীকার করেছিল বলে Committee to Protect Journalists-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে; সাহার হত্যার পর আরও স্থানীয় সাংবাদিকদের হুমকিও দেওয়া হয়, যেন তারা সংগঠনের অপরাধ নিয়ে রিপোর্ট না করে [46]। এখানে “বিপ্লবী ন্যায়বিচার” বলে কিছু নেই; আছে সংবাদমাধ্যমকে চুপ করানোর জন্য বোমা, ভয় এবং হত্যার ব্যবহার। যে সংগঠন সাংবাদিককে হত্যা করে, ঠিকাদারকে চাঁদা দেয়, গ্রামে সশস্ত্র সালিশ বসায়, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে খতম করে—তার মুখে শ্রমিক-কৃষকের মুক্তির কথা শোনা মানে ডাকাতের মুখে নীতিশাস্ত্র শোনা। ভারতের নকশাল-মাওবাদী আন্দোলনের ইতিহাসেও একই নৈতিক পচন স্পষ্ট। ১৯৬৭ সালের নকশালবাড়ি কৃষকবিদ্রোহ থেকে যে ধারার জন্ম, তা চারু মজুমদারের “ঐতিহাসিক আট দলিল”, মাওবাদী দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ এবং “class enemy annihilation”—শ্রেণীশত্রু নির্মূলের তত্ত্বে দ্রুত সশস্ত্র সহিংসতার পথে যায় [47]। চারু মজুমদারের রাজনৈতিক ভাষায় “শ্রেণীশত্রু” কোনো বিচারিক অপরাধী নয়; সে একটি রাজনৈতিক লেবেল, এবং এই লেবেল একবার লাগলে হত্যা হয়ে যায় বিপ্লবী কর্তব্য। এখানেই মাওবাদী রাজনীতির কেন্দ্রীয় বর্বরতা: ব্যক্তি মানুষকে আদালতে বিচার করার বদলে তাকে ইতিহাসের শত্রু ঘোষণা করে খতম করা। জমিদার, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, পুলিশ, রাজনৈতিক কর্মী, তথাকথিত প্রতিক্রিয়াশীল—যে কেউ “শ্রেণীশত্রু” হয়ে উঠতে পারে; আর “শ্রেণীশত্রু” হয়ে গেলে তার অধিকার, বিচার, আত্মপক্ষ সমর্থন, মানবিক মর্যাদা—সব বাতিল। পরে CPI (Maoist) ২০০৪ সালে CPI(ML) People’s War এবং Maoist Communist Centre of India-এর একীভবনের মাধ্যমে গঠিত হয়; ভারত সরকার ২০০৯ সালে CPI (Maoist)-কে Unlawful Activities (Prevention) Act-এর অধীনে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে, এবং ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় CPI (Maoist)-কে বামপন্থী চরমপন্থী সহিংসতা ও বেসামরিক/নিরাপত্তা বাহিনীর হত্যার প্রধান সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে [48]। ভারতের এই সংঘাতে রাষ্ট্রও বহুবার নিষ্ঠুরতা, ভুয়া এনকাউন্টার, নির্বিচার গ্রেপ্তার, আদিবাসী নিপীড়ন ও কর্পোরেট খনিজস্বার্থ রক্ষার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে—এটি সত্য; কিন্তু রাষ্ট্রের অপরাধ মাওবাদী হত্যাকে ন্যায়বিচারে পরিণত করে না, যেমন মাওবাদী সন্ত্রাস রাষ্ট্রীয় ক্রসফায়ারকে বৈধ করে না [49]। দুই পক্ষের সন্ত্রাসকে আলাদা নামে ডাকা যায়, কিন্তু নৈতিকভাবে দুটিই মানুষের ওপর ক্ষমতার নিষ্ঠুর প্রয়োগ। ভারতের নকশাল-মাওবাদী আন্দোলন বহু অঞ্চলে আদিবাসী, দলিত ও দরিদ্র মানুষের বাস্তব বঞ্চনা থেকে খাদ্য পেয়েছে—এটাও সত্য; কিন্তু বাস্তব বঞ্চনা কোনো সংগঠনকে মাইন পুঁতে পুলিশ হত্যা, গ্রামবাসীকে গুপ্তচর সন্দেহে মেরে ফেলা, “জন আদালত” বসিয়ে শাস্তি দেওয়া, স্কুল-রাস্তা-যোগাযোগ অবকাঠামো ধ্বংস, এবং শিশু-কিশোরকে সশস্ত্র রাজনীতিতে টেনে নেওয়ার নৈতিক অনুমতি দেয় না [50]। “জন আদালত” আসলে আদালত নয়; এটি বন্দুকধারী দলের মঞ্চ। “শ্রেণীশত্রু খতম” বিচার নয়; এটি রাজনৈতিক হত্যার শ্লোগান। “জনযুদ্ধ” জনগণের মুক্তি নয়, যদি সেই জনগণকেই ভয়ে চুপ থাকতে হয়। তাই বাংলাদেশের PBCP হোক, ভারতের নকশাল-মাওবাদী গোষ্ঠী হোক, অথবা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোনো লাল সশস্ত্র দল—তাদের ইতিহাস একই শিক্ষা দেয়: যখন কোনো মতাদর্শ মানুষের ব্যক্তিসত্তাকে মুছে দিয়ে তাকে শ্রেণী-লেবেল, রাষ্ট্রশত্রু, গুপ্তচর, দালাল বা প্রতিক্রিয়াশীল বানায়, তখন হত্যা খুব সহজ হয়ে যায়। আর যে রাজনীতি হত্যাকে সহজ করে, সেটি মুক্তির রাজনীতি নয়; সেটি লাল পতাকা হাতে সন্ত্রাসের রাজনীতি।


কমিউনিস্ট এপোলোজেটিক্স: “পশ্চিমা প্রোপাগান্ডা”, “ভুল প্রয়োগ” ও “সত্যিকারের সমাজতন্ত্র ছিল না”

কমিউনিস্ট রাষ্ট্রসন্ত্রাসের ইতিহাস সামনে আনলেই একদল বামপন্থী এপোলোজিস্ট প্রায় মুখস্থ তিনটি ঢাল বের করে: প্রথমত, সবই নাকি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী প্রোপাগান্ডা; দ্বিতীয়ত, এগুলো নাকি কমিউনিজমের ভুল প্রয়োগ; তৃতীয়ত, এগুলো নাকি “সত্যিকারের সমাজতন্ত্র” ছিল না। এই তিনটি যুক্তিই আসলে যুক্তি নয়, মতাদর্শিক পালানোর রাস্তা। “পশ্চিমা প্রোপাগান্ডা” অজুহাতটি সবচেয়ে সস্তা, কারণ সোভিয়েত, চীন, কম্বোডিয়া, কিউবা বা উত্তর কোরিয়ার অপরাধ নিয়ে সব তথ্য CIA-এর লিফলেট থেকে আসেনি; এসেছে রাষ্ট্রীয় আর্কাইভ, আদালতের নথি, জাতিসংঘের তদন্ত, গণকবর, বেঁচে যাওয়া ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য, স্বাধীন ইতিহাসবিদদের গবেষণা, মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট এবং অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের নিজস্ব পরবর্তী স্বীকারোক্তি থেকে। কাতিন গণহত্যা দশকের পর দশক সোভিয়েত রাষ্ট্র নাৎসিদের ঘাড়ে চাপিয়েছিল, কিন্তু সোভিয়েত আর্কাইভ খোলার পর পলিটব্যুরো ও এনকেভিডি-সম্পর্কিত নথির ভিত্তিতে ১৯৪০ সালে প্রায় ২২,০০০ পোলিশ বন্দির হত্যার দায় সোভিয়েত রাষ্ট্রের ওপরই স্থির হয় [51]। কম্বোডিয়ার খেমার রুজ অপরাধও কোনো পশ্চিমা কল্পকাহিনি নয়; Extraordinary Chambers in the Courts of Cambodia ২০১৮ সালে Nuon Chea ও Khieu Samphan-কে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেছে, এবং ইয়েল Cambodian Genocide Program ১৯৭৫–১৯৭৯ সময়ে প্রায় ১.৭ মিলিয়ন মৃত্যুর কথা উল্লেখ করে [52]। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রেও ২০১৪ সালের জাতিসংঘ Commission of Inquiry “systematic, widespread and gross human rights violations” এবং বহু ক্ষেত্রে crimes against humanity-এর কথা নথিবদ্ধ করেছে; এটাকে “পশ্চিমা প্রোপাগান্ডা” বলে উড়িয়ে দেওয়া মানে তদন্ত, সাক্ষ্য, দলিল ও ভুক্তভোগীদের মুখের ওপর থুতু ছোড়া [53]। দ্বিতীয় অজুহাত—“ভুল প্রয়োগ”—আরও বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতারণা। যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন, মাওবাদী চীন, খেমার রুজ, কিউবা, উত্তর কোরিয়া, পূর্ব ইউরোপীয় কমিউনিস্ট রাষ্ট্র, আফ্রিকা-এশিয়া-লাতিন আমেরিকার সশস্ত্র মার্ক্সবাদী আন্দোলন—প্রায় সব ঐতিহাসিক প্রয়োগেই একদলীয় ক্ষমতা, গোপন পুলিশ, সেন্সরশিপ, রাজনৈতিক বন্দিত্ব, রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডা, নেতা-পূজা এবং ভিন্নমত দমনের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়, তাহলে সেটাকে শুধু “ভুল প্রয়োগ” বলা চলে না; তখন প্রশ্ন উঠবে, তত্ত্বের মধ্যেই কি ক্ষমতা-কেন্দ্রীকরণ, বিরোধী মতকে শ্রেণীশত্রু বানানো এবং রাষ্ট্রকে মুক্তির সর্বাধিকারী বানানোর বিপজ্জনক বীজ আছে কিনা [54]। তৃতীয় অজুহাত—“সত্যিকারের সমাজতন্ত্র ছিল না”—হলো ধর্মীয় এপোলোজেটিক্সের “সত্যিকারের ইসলাম/সত্যিকারের খ্রিস্টধর্ম এটা নয়” যুক্তির রাজনৈতিক সংস্করণ। কোনো আদর্শের নামে শতাব্দীজুড়ে বহু রাষ্ট্র, বহু পার্টি, বহু নেতা, বহু বিপ্লব, বহু গেরিলা সংগঠন ক্ষমতা দখল করে একই ধরনের দমননীতিতে পৌঁছালে অনুসারী হঠাৎ বলে বসে—“না, এগুলো আসলটা নয়”—তাহলে সেটি বিশ্লেষণ নয়; সেটি বিশ্বাসরক্ষার কৌশল। ধর্মীয় বিশ্বাসীরা যেমন বলে, “ঈশ্বরের নামে যারা হত্যা করেছে তারা আসল ধর্ম বোঝেনি,” কমিউনিস্ট এপোলোজিস্টও তেমন বলে, “মার্ক্সের নামে যারা শ্রমশিবির বানিয়েছে তারা আসল মার্ক্স বোঝেনি।” কিন্তু ইতিহাসের আদালতে এই অজুহাত টেকে না। বাস্তব জগতে কোনো মতাদর্শকে তার স্বর্গীয় কল্পিত রূপ দিয়ে নয়, তার প্রাতিষ্ঠানিক ফল, ক্ষমতার ব্যবহার, ভিন্নমতের প্রতি আচরণ, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকারের মর্যাদা এবং মানুষের জীবন-মর্যাদার ভিত্তিতে বিচার করতে হয়। সেই পরীক্ষায় কর্তৃত্ববাদী কমিউনিজম ভয়াবহভাবে ব্যর্থ। তাই “পশ্চিমা প্রোপাগান্ডা”, “ভুল প্রয়োগ”, “আসল সমাজতন্ত্র নয়”—এইসব স্লোগান ইতিহাসের জবাব নয়; এগুলো মৃত মানুষের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে মতাদর্শ বাঁচানোর ব্যর্থ মন্ত্র। যে মতাদর্শ নিজের অপরাধের সামনে দাঁড়াতে পারে না, সে মতাদর্শ মুক্তি দিতে পারে না; সে শুধু নতুন পুরোহিত, নতুন কিতাব, নতুন কাফের এবং নতুন হত্যাযজ্ঞ তৈরি করতে পারে।


“বুর্জোয়া অধিকার” বলে মানবাধিকার বাতিল করার বিপদ

কমিউনিস্ট কর্তৃত্ববাদের সবচেয়ে বিপজ্জনক বুদ্ধিবৃত্তিক চাল হলো মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, ধর্মত্যাগের অধিকার, সংগঠনের অধিকার, স্বাধীন আদালত, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তাকে “বুর্জোয়া অধিকার” বলে খাটো করা। এই ভাষা প্রথমে খুব বিপ্লবী শোনায়, কিন্তু বাস্তবে এটি স্বৈরতন্ত্রের দরজা খুলে দেয়। কারণ একবার যদি বলা যায় ব্যক্তিস্বাধীনতা আসলে বুর্জোয়া সমাজের ভাঁওতা, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম শ্রেণীশত্রুর হাতিয়ার, স্বাধীন আদালত পুঁজিবাদী আইনের নাটক, আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিক্রিয়াশীলদের ষড়যন্ত্র—তাহলে রাষ্ট্র খুব সহজেই নাগরিকের মুখ বন্ধ করতে পারে এবং সেটিকে “শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থ” বলে চালাতে পারে। মার্ক্স On the Jewish Question-এ আধুনিক নাগরিক অধিকারকে বুর্জোয়া সমাজের বিচ্ছিন্ন, স্বার্থপর ব্যক্তির অধিকার হিসেবে সমালোচনা করেছিলেন; এই সমালোচনার দার্শনিক গুরুত্ব থাকলেও রাজনৈতিক প্রয়োগে এটি ভয়াবহ বিপজ্জনক, কারণ পরবর্তী কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো ঠিক এই যুক্তিতেই ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সন্দেহের বস্তু বানিয়েছে [55]The Communist Manifesto-এ মার্ক্স ও এঙ্গেলস বুর্জোয়া স্বাধীনতা, বুর্জোয়া আইন, বুর্জোয়া পরিবার ও বুর্জোয়া সম্পত্তির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালান; কিন্তু সমস্যা হলো, “বুর্জোয়া স্বাধীনতা” ধ্বংস করতে গিয়ে বাস্তব ইতিহাসে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো স্বাধীনতাই ধ্বংস করেছে—শুধু বুর্জোয়ার নয়, শ্রমিকেরও, কৃষকেরও, লেখকেরও, সাংবাদিকেরও, সাধারণ নাগরিকেরও [56]। লেনিন State and Revolution-এ বুর্জোয়া রাষ্ট্র ভাঙার কথা বলেন এবং প্রলেতারিয়েতের রাষ্ট্রকে পুরনো রাষ্ট্রযন্ত্রের বিকল্প হিসেবে কল্পনা করেন; কিন্তু বাস্তবে বলশেভিক শাসনে বিরোধী দল নিষিদ্ধ হয়, সংবাদপত্র বন্ধ হয়, চেকা গঠিত হয়, এবং বিপ্লবী রাষ্ট্র নিজেই এক নতুন দমনযন্ত্রে পরিণত হয় [57]। এই জায়গায় কমিউনিস্ট এপোলোজিস্টদের ভণ্ডামি সবচেয়ে নগ্ন: তারা লিবারেল মানবাধিকারকে “বুর্জোয়া” বলে গালি দেয়, কিন্তু যখন নিজেরা রাষ্ট্রীয় হত্যা, গুম, ক্রসফায়ার, সেন্সরশিপ বা পুলিশি নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয় পায়, তখন ঠিক সেই “বুর্জোয়া” অধিকারগুলোর আশ্রয়েই দাঁড়ায়—স্বাধীন বিচার চাই, মতপ্রকাশের অধিকার চাই, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা চাই, নির্যাতনবিরোধী আইন চাই, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহি চাই। অর্থাৎ যে অধিকারকে তারা তত্ত্বে অবজ্ঞা করে, বাস্তবে বাঁচার জন্য সেই অধিকারই দরকার হয়। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র ১৯৪৮ সালে জীবন, স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, নির্যাতন থেকে সুরক্ষা, ন্যায়বিচার, চিন্তা-বিবেক-ধর্মের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে ঘোষণা করে; এই অধিকারগুলো কোনো বুর্জোয়া বিলাসিতা নয়, রাষ্ট্রীয় বর্বরতার বিরুদ্ধে নাগরিকের শেষ প্রতিরক্ষা [58]। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদও জীবনাধিকার, নির্যাতনবিরোধী সুরক্ষা, নির্বিচার আটকবিরোধী অধিকার, ন্যায়বিচার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নাগরিকের সুরক্ষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে [59]। তাই মানবাধিকারকে বুর্জোয়া বলে বাতিল করা কোনো বিপ্লবী গভীরতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের জন্য তাত্ত্বিক রাস্তা পরিষ্কার করা। যে সমাজে ব্যক্তির অধিকার নেই, সেখানে শ্রমিকের অধিকারও নেই; যে রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যম স্বাধীন নয়, সেখানে কৃষকের কণ্ঠও স্বাধীন নয়; যে আদালত পার্টির অধীন, সেখানে “জনগণের বিচার” আসলে পার্টির প্রতিশোধ। কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো বারবার দেখিয়েছে, ব্যক্তি-অধিকার ধ্বংস করে সমষ্টির মুক্তি আনা যায় না; বরং ব্যক্তি-অধিকার ধ্বংস হলেই সমষ্টির নামে নতুন শাসকশ্রেণী জন্ম নেয়। সুতরাং বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে সত্যিকারের অবস্থান নিতে হলে প্রথমেই স্বীকার করতে হবে—জীবনাধিকার, ন্যায়বিচার, বাকস্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা কোনো “বুর্জোয়া ভাঁওতা” নয়; এগুলো ছাড়া যে কোনো বিপ্লব খুব দ্রুত জল্লাদের রাষ্ট্রে পরিণত হয়।


নেতা-পূজা: কমিউনিজমের ধর্মীয় রূপান্তর

কমিউনিস্ট রাজনীতির সবচেয়ে হাস্যকর অথচ ভয়ঙ্কর বৈপরীত্য হলো—এটি নিজেকে ধর্মবিরোধী, বৈজ্ঞানিক, বস্তুবাদী ও যুক্তিবাদী বলে ঘোষণা করে, কিন্তু ক্ষমতায় গেলে বারবার ধর্মের সবচেয়ে খারাপ বৈশিষ্ট্যগুলোই পুনরুৎপাদন করে: পবিত্র গ্রন্থ, নিষিদ্ধ প্রশ্ন, পুরোহিতশ্রেণী, ধর্মদ্রোহী, শহীদ-সংস্কৃতি, পবিত্র প্রতীক, মিছিলের আচার, মুখস্থ স্লোগান, কবর-পূজা, ছবি-পূজা এবং সর্বোপরি নেতা-পূজা। স্ট্যালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নে ব্যক্তিপূজা কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডার কেন্দ্রীয় কৌশল। পোস্টার, গান, কবিতা, পাঠ্যবই, সংবাদমাধ্যম ও সরকারি ভাষণে স্ট্যালিনকে শ্রমিকশ্রেণীর সাধারণ প্রতিনিধি নয়, প্রায় অতিমানবীয় পিতা, শিক্ষক, রক্ষক ও ইতিহাসের চালক হিসেবে নির্মাণ করা হয় [60]। মাওয়ের চীনেও একই জিনিস আরও গণ-উন্মাদ রূপ নেয়। Quotations from Chairman Mao Tse-tung, অর্থাৎ “লিটল রেড বুক”, রাজনৈতিক শিক্ষা-পুস্তক কম, ধর্মীয় তাবিজ বেশি ছিল; সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় মাওয়ের উদ্ধৃতি মুখস্থ করা, আনুগত্যের নৃত্য, মিছিল, শপথ, সমালোচনা-আত্মসমালোচনার আচার এবং মাও-চিত্রের সর্বব্যাপী উপস্থিতি এক ধরনের রাজনৈতিক উপাসনায় পরিণত হয় [61]। উত্তর কোরিয়ায় এই রাজনৈতিক ধর্ম সরাসরি বংশগত দেবরাজত্বে রূপ নেয়; কিম ইল-সুং, কিম জং-ইল ও কিম জং-উনের চারপাশে এমন এক আনুগত্য-সংস্কৃতি তৈরি করা হয়, যেখানে রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ, পারিবারিক বংশ, জাতীয় ইতিহাস, সামরিক শপথ এবং দৈনন্দিন নাগরিক জীবন কিম পরিবারের পবিত্র মর্যাদার অধীন চলে যায় [62]। এই তিনটি উদাহরণ দেখায়, কমিউনিস্ট কর্তৃত্ববাদ ধর্ম বিলোপ করে না; বরং ধর্মের কাঠামোকে রাষ্ট্রীয় মতাদর্শে স্থানান্তর করে। ঈশ্বরের জায়গায় নেতা, ওহির জায়গায় পার্টি-লাইন, ধর্মগ্রন্থের জায়গায় মার্ক্স-লেনিন-মাওয়ের উদ্ধৃতি, মসজিদ-মন্দির-গির্জার জায়গায় স্মৃতিসৌধ ও মূর্তি, পুরোহিতের জায়গায় পার্টি-ক্যাডার, পাপের জায়গায় “বুর্জোয়া বিচ্যুতি”, ধর্মদ্রোহিতার জায়গায় “প্রতিক্রিয়াশীলতা”—শুধু নাম পাল্টায়, আনুগত্যের কাঠামো পাল্টায় না। এই কারণেই বহু কমিউনিস্ট সংগঠনে স্বাধীন চিন্তা জন্মায় না; জন্মায় লাইন-মানা কর্মী, উদ্ধৃতি-ধারী তাত্ত্বিক, মুখস্থ স্লোগানের সৈনিক এবং নেতার ভুল ঢাকার পেশাদার এপোলোজিস্ট। একজন ধর্মান্ধ যেমন তার নবী, কিতাব ও মোল্লাকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখে, তেমনি দলান্ধ কমিউনিস্ট তার মার্ক্স, লেনিন, স্ট্যালিন, মাও, চে, ক্যাস্ট্রো বা স্থানীয় পার্টি-গুরুকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখতে চায়। এই জায়গায় ধর্মীয় মৌলবাদী ও কমিউনিস্ট মৌলবাদীর পার্থক্য সামান্য: একজন বলে “ঈশ্বর বলেছেন”, আরেকজন বলে “ইতিহাসের নিয়ম বলেছে”; একজন বলে “কাফের”, আরেকজন বলে “শ্রেণীশত্রু”; একজন বলে “ধর্মদ্রোহী”, আরেকজন বলে “বুর্জোয়া দালাল”; একজন বলে “শরিয়তের বিরুদ্ধে”, আরেকজন বলে “পার্টি-লাইনের বিরুদ্ধে”। দুজনেরই মূল সমস্যা একই—মানুষের স্বাধীন বিচারশক্তিকে ধ্বংস করা। তাই যে বামপন্থী স্ট্যালিন-মাও-চে-ক্যাস্ট্রোর ছবি বুকে নিয়ে মুক্তচিন্তার কথা বলে, সে আসলে মুক্তচিন্তার ভাষায় নতুন মাজারতন্ত্র চালায়। মুক্তচিন্তার প্রথম শর্ত হলো কোনো মানুষকে পবিত্র না করা; কোনো বইকে শেষ কথা না বানানো; কোনো পার্টিকে সত্যের একমাত্র মালিক না ভাবা; কোনো বিপ্লবকে নৈতিক জবাবদিহির ঊর্ধ্বে না তোলা। যে কমিউনিজম এই ন্যূনতম শর্ত মানতে পারে না, তা ধর্মের বিকল্প নয়; তা ধর্মেরই লাল সংস্করণ।


লাল ধর্মতন্ত্র: কমিউনিজমের নবী, কিতাব, জান্নাত, মুরতাদ ও শাতিমে-রাসুল

কর্তৃত্ববাদী কমিউনিজমের সবচেয়ে বড় প্রতারণা হলো, এটি নিজেকে ধর্মবিরোধী বলে ঘোষণা করলেও বাস্তবে ধর্মের প্রায় সম্পূর্ণ কাঠামোই রাজনৈতিক ভাষায় পুনর্নির্মাণ করে। ইসলামে যেমন নবী, কিতাব, জান্নাত, জাহান্নাম, উম্মাহ, কাফের, মুরতাদ, শাতিমে রাসুল, শহীদ, ফতোয়া, মোল্লা, পীর, দরগা ও শরিয়তের ধারণা আছে; দলান্ধ কমিউনিজমেও তেমনি আছে মার্ক্স-লেনিন-মাও-চে-ক্যাস্ট্রো নামের পবিত্র পুরুষ, Capital, Communist Manifesto, State and Revolution, Little Red Book নামের কিতাব, শ্রেণীহীন সমাজের জান্নাত, পুঁজিবাদী নরকের কল্পনা, পার্টি-উম্মাহ, পার্টি-লাইন, সংশোধনবাদী-মুরতাদ, বুর্জোয়া-কাফের, শ্রেণীশত্রু, বিপ্লবী শহীদ এবং পার্টি-কমিটির ফতোয়া। পার্থক্য শুধু শব্দে; কাঠামো একই। ধর্মীয় মৌলবাদ যেমন বলে—শেষ সত্য নেমে এসেছে, নবী বলে গেছেন, কিতাবে লেখা আছে, প্রশ্ন করা পাপ, বিরোধিতা ধর্মদ্রোহিতা; কর্তৃত্ববাদী কমিউনিজমও একইভাবে বলে—ইতিহাসের বৈজ্ঞানিক নিয়ম আবিষ্কৃত হয়েছে, মার্ক্স বলে গেছেন, লেনিন প্রয়োগ করেছেন, পার্টি ব্যাখ্যা জানে, বিরোধিতা শ্রেণীশত্রুর কাজ। ফলে এখানে যুক্তি নয়, আনুগত্য; গবেষণা নয়, উদ্ধৃতি; নৈতিক বিচার নয়, পার্টি-লাইন; মানুষ নয়, মতাদর্শই শেষ সত্যে পরিণত হয় [63]

ইসলামি ধর্মতান্ত্রিক কাঠামোকর্তৃত্ববাদী কমিউনিস্ট কাঠামোকার্যকরী মিল
নবী/রাসুল — মুহাম্মদকে শেষ নবী ও আদর্শ মানুষ হিসেবে স্থাপন করা হয়।মার্ক্স-লেনিন-মাও-চে — রাজনৈতিক সত্যের পবিত্র প্রতিষ্ঠাতা ও বিপ্লবী আদর্শপুরুষ হিসেবে স্থাপন করা হয়।ব্যক্তিকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে তোলা। মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, পবিত্র প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা [64]
কিতাব — কোরআন ও হাদিসকে চূড়ান্ত সত্যের উৎস হিসেবে ধরা হয়।লাল কিতাবCapital, Communist Manifesto, State and Revolution, Little Red Book দলীয় সত্যের উৎসে পরিণত হয়।জটিল বাস্তবতাকে উদ্ধৃতি দিয়ে মাপা; নতুন তথ্যের বদলে পুরনো বাক্যকে বিচারক বানানো [65]
জান্নাত — ঈমানদারদের জন্য চূড়ান্ত মুক্তি, শান্তি ও পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি।শ্রেণীহীন সমাজ — ভবিষ্যৎ কমিউনিস্ট ইউটোপিয়া, যেখানে শোষণ, শ্রেণী ও রাষ্ট্র বিলুপ্ত হবে বলে প্রতিশ্রুতি।বর্তমানের দমন, রক্তপাত ও কষ্টকে ভবিষ্যতের কল্পিত মুক্তির নামে বৈধ করা [66]
জাহান্নাম — অবিশ্বাসী ও অবাধ্যদের শাস্তির প্রতীক।পুঁজিবাদী নরক — বুর্জোয়া সমাজকে পূর্ণ অন্ধকার, শোষণ ও পাপের জগৎ হিসেবে দেখানো।বাস্তব সমাজের সমালোচনা থেকে সরে গিয়ে দ্বৈত নৈতিক নাটক তৈরি করা: একপাশে মুক্তি, অন্যপাশে অভিশাপ [67]
উম্মাহ — বিশ্বাসীদের পবিত্র সমষ্টি।পার্টি/প্রলেতারিয়েত — ইতিহাসের নির্বাচিত শ্রেণী ও তার একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী পার্টি।ব্যক্তির স্বাধীন বিচারশক্তিকে সমষ্টির নামে বিলুপ্ত করা; “আমরা” বনাম “তারা” বিভাজন তৈরি করা [68]
মুরতাদ — ধর্মত্যাগীকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে দেখা হয়; ঐতিহাসিক ইসলামি আইনশাস্ত্রে মুরতাদের বিরুদ্ধে দণ্ডের বিধানও আছে।সংশোধনবাদী/বিপথগামী কমরেড — পার্টি-লাইন থেকে বিচ্যুত ব্যক্তিকে বিপ্লবের বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।নিজস্ব গোষ্ঠী থেকে বেরিয়ে আসাকে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা নয়, বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা [69]
শাতিমে রাসুল — নবী-নিন্দাকে গুরুতর ধর্মদ্রোহিতা ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখা হয়েছে বহু ঐতিহাসিক ইসলামি আইনশাস্ত্রে।মার্ক্স/লেনিন/মাও-নিন্দা — প্রতিষ্ঠাতা নেতার সমালোচনাকে “সাম্রাজ্যবাদের দালালি”, “বুর্জোয়া প্রোপাগান্ডা”, “প্রতিক্রিয়াশীলতা” বলে দমন করা হয়।চিন্তকের সমালোচনাকে চিন্তার অংশ না ভেবে পবিত্র ব্যক্তির অবমাননা হিসেবে দেখা [70]
কাফের — সত্য প্রত্যাখ্যানকারী বহিরাগত।বুর্জোয়া/শ্রেণীশত্রু/প্রতিক্রিয়াশীল — বিপ্লবী সত্যের বাইরে থাকা শত্রু।প্রতিপক্ষকে যুক্তিসঙ্গত মানুষ হিসেবে না দেখে নির্মূলযোগ্য নৈতিক শত্রুতে পরিণত করা [71]
ফতোয়া — ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ও নির্দেশ।পার্টি-লাইন — কেন্দ্রীয় কমিটি/পলিটব্যুরোর ব্যাখ্যা ও নির্দেশ।স্বাধীন চিন্তার বদলে অনুমোদিত ব্যাখ্যার শাসন; সত্য নির্ধারণ করে প্রতিষ্ঠান, যুক্তি নয় [72]
শহীদ — ধর্মীয় সংগ্রামে মৃত ব্যক্তি পবিত্র মর্যাদা পায়।বিপ্লবী শহীদ — পার্টির সংগ্রামে মৃত ব্যক্তি পবিত্র রাজনৈতিক মর্যাদা পায়।মৃত্যুকে নৈতিক মহিমায় সাজিয়ে নতুন প্রজন্মকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়া [73]
শরিয়ত — জীবনব্যবস্থার সর্বগ্রাসী বিধান হিসেবে হাজির।পার্টি-রাষ্ট্র — অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সাহিত্য, বিচার, সংবাদমাধ্যম ও ব্যক্তিজীবন নিয়ন্ত্রণকারী সর্বগ্রাসী কাঠামো।মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে মতাদর্শিক প্রশাসনের অধীন করা [74]

এই তুলনাটি কোনো অলঙ্কারিক গালাগালি নয়; এটি ক্ষমতাকাঠামোর বাস্তব সাদৃশ্য। ইসলামি মৌলবাদ যেমন দাবি করে, মানুষের মুক্তি কেবল আল্লাহর বিধানে, নবীর আদর্শে এবং শরিয়তের আনুগত্যে; কর্তৃত্ববাদী কমিউনিজমও দাবি করে, মানুষের মুক্তি কেবল ইতিহাসের বৈজ্ঞানিক নিয়মে, মার্ক্সবাদী বিশ্লেষণে, পার্টির নেতৃত্বে এবং শ্রেণীসংগ্রামের আনুগত্যে। দুই ক্ষেত্রেই মুক্তি আসবে ভবিষ্যতে; বর্তমানের মানুষকে শুধু আনুগত্য করতে হবে। দুই ক্ষেত্রেই প্রশ্ন বিপজ্জনক; সন্দেহ দুর্বলতা; সমালোচনা শত্রুতার প্রমাণ। ইসলামে নবী-নিন্দা যেমন “শাতিমে রাসুল” হিসেবে পবিত্রতার বিরুদ্ধে অপরাধে পরিণত হয়, দলান্ধ কমিউনিজমে মার্ক্স-লেনিন-মাও-স্ট্যালিন-চে-ক্যাস্ট্রোর সমালোচনাও তেমনই মতাদর্শিক ব্লাসফেমি হয়ে ওঠে। ইসলামে মুরতাদ যেমন নিজের গোষ্ঠীর বিশ্বাসঘাতক, কমিউনিস্ট সংস্কৃতিতে দলত্যাগী বা সংশোধনবাদীও তেমনই বিপ্লবের বিশ্বাসঘাতক। ইসলামে জান্নাত যেমন ভবিষ্যৎ পুরস্কারের কল্পিত পরিণতি, কমিউনিজমে শ্রেণীহীন সমাজও তেমনই ভবিষ্যৎ ইউটোপিয়া; এই ইউটোপিয়ার নামে বর্তমানের শ্রমশিবির, সেন্সরশিপ, ফায়ারিং স্কোয়াড, জোরপূর্বক সমবায়ীকরণ, দুর্ভিক্ষ, জনযুদ্ধ, শুদ্ধি অভিযান এবং রাজনৈতিক হত্যা বৈধতা পায়। তাই কর্তৃত্ববাদী কমিউনিজমকে শুধু রাজনৈতিক মতবাদ বলে নিরীহ করে দেখা ভুল। এটি যখন ক্ষমতাকেন্দ্রিক পার্টি, পবিত্র নেতা, অচল কিতাব, ভবিষ্যৎ জান্নাত, নরকায়িত শত্রু, মুরতাদ-শিকার, ব্লাসফেমি-সংস্কৃতি এবং শহীদ-রোমান্টিসিজম তৈরি করে, তখন এটি ইসলামের মতোই একটি ক্ষতিকর, উগ্রবাদী ও মানববিরোধী মতাদর্শে পরিণত হয়। পার্থক্য শুধু এতটুকু—একটি আসমানের নামে মানুষকে দাস বানায়, আরেকটি ইতিহাসের নামে।


এনিমেল ফার্ম: বিপ্লব কীভাবে নতুন প্রভু তৈরি করে

জর্জ অরওয়েলের Animal Farm কর্তৃত্ববাদী কমিউনিজমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ধারালো সাহিত্যিক অস্ত্রগুলোর একটি, কারণ এটি কোনো জটিল তাত্ত্বিক ভাষায় নয়, বরং সরল রূপকের মাধ্যমে দেখিয়ে দেয়—মুক্তির নামে শুরু হওয়া বিপ্লব কীভাবে খুব দ্রুত নতুন প্রভু, নতুন ধর্মগ্রন্থ, নতুন পুলিশ, নতুন ইতিহাস, নতুন মিথ্যা এবং নতুন দাসত্ব তৈরি করে। উপন্যাসে মি. জোন্সের বিরুদ্ধে পশুদের বিদ্রোহ প্রথমে ন্যায়সঙ্গত বলেই মনে হয়; শোষক মানুষকে সরিয়ে পশুরা নিজেদের শ্রমের ওপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু বিপ্লবের পর ক্ষমতা ধীরে ধীরে শূকরদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, নেপোলিয়ন গোপন কুকুর-বাহিনী দিয়ে বিরোধীদের দমন করে, স্নোবলকে রাষ্ট্রশত্রু বানায়, পুরনো আদর্শ বদলে ফেলে, ইতিহাস পুনর্লিখন করে, এবং স্কুইলারের প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে [75]। এখানে “সব পশু সমান” স্লোগানটি শেষ পর্যন্ত বদলে যায়—“সব পশু সমান, কিন্তু কিছু পশু অন্যদের চেয়ে বেশি সমান”; এই এক বাক্যেই অরওয়েল কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ ভণ্ডামি উন্মোচন করেছেন [76]। সোভিয়েত বিপ্লবের রূপকে মেজর হলো বিপ্লবের আদর্শিক উৎস, নেপোলিয়ন স্ট্যালিনীয় ক্ষমতাকেন্দ্রিকতা, স্নোবল ট্রটস্কির নির্বাসিত বিরোধী রূপ, স্কুইলার রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডা, কুকুররা গোপন পুলিশ, আর বক্সার সেই শ্রমজীবী মানুষের প্রতীক, যে নিজের শ্রম, আনুগত্য ও সরল বিশ্বাস দিয়ে বিপ্লবকে টিকিয়ে রাখে, অথচ শেষে বিপ্লবী রাষ্ট্রই তাকে কসাইখানায় বিক্রি করে দেয় [77]। এই উপন্যাসের সবচেয়ে নির্মম শিক্ষা হলো: শুধু পুরনো শাসককে সরালেই মুক্তি আসে না; যদি ক্ষমতার জবাবদিহি না থাকে, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম না থাকে, ভিন্নমত না থাকে, আইনের শাসন না থাকে, এবং সাধারণ মানুষ নেতার ভাষাকে নিজের বিবেকের ওপর বসিয়ে দেয়, তাহলে বিপ্লব শুধু প্রভুর পোশাক বদলায়—দাসত্বের কাঠামো বদলায় না। Animal Farm তাই শুধু সোভিয়েত কমিউনিজমের ব্যঙ্গ নয়; এটি সব ধরনের মতাদর্শিক অন্ধত্বের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা। যে বিপ্লব মানুষের মুক্তির কথা বলে কিন্তু মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় না, যে রাজনীতি সমতার কথা বলে কিন্তু নেতাকে সমতার ঊর্ধ্বে তোলে, যে পার্টি শ্রমিকের নামে ক্ষমতা নেয় কিন্তু শ্রমিককেই কুকুর-বাহিনী ও প্রচারযন্ত্রের সামনে অসহায় করে ফেলে—সেই বিপ্লবের শেষ দৃশ্য সবসময় একই: মানুষ আর শূকরের মুখ আলাদা করা যায় না।


উপসংহার

কমিউনিজমের সবচেয়ে বড় সমস্যা কেবল তার অর্থনৈতিক ভুল, প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা রাষ্ট্রীয় অদক্ষতা নয়; তার গভীরতর সমস্যা হলো মানুষের ওপর মতাদর্শ চাপানোর নৈতিক ঔদ্ধত্য। যে মতবাদ মানুষের মুক্তির কথা বলে শুরু করে, কিন্তু মানুষের জীবন, স্বাধীনতা, চিন্তা, ভিন্নমত, সংবাদমাধ্যম, আদালত, ব্যক্তিসত্তা ও মর্যাদাকে পার্টির অধীন করে ফেলে, তাকে মুক্তির মতবাদ বলা যায় না। সেটি হয়ে ওঠে নতুন ধর্মতন্ত্র—যেখানে ঈশ্বরের জায়গায় ইতিহাস, নবীর জায়গায় মার্ক্স-লেনিন-মাও, কিতাবের জায়গায় দলীয় গ্রন্থ, জান্নাতের জায়গায় শ্রেণীহীন সমাজ, কাফেরের জায়গায় শ্রেণীশত্রু, মুরতাদের জায়গায় সংশোধনবাদী, আর শরিয়তের জায়গায় পার্টি-লাইন বসানো হয়। এই কাঠামো যুক্তিবাদী নয়; এটি আনুগত্যবাদী। এটি মানবিক নয়; এটি মতাদর্শিক। এটি মুক্তচিন্তা নয়; এটি লাল রঙের ধর্মীয় উন্মাদনা।

তাই স্ট্যালিন, মাও, চে, ক্যাস্ট্রো, পল পট বা কিম ইল-সুংয়ের ছবি হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা শুধু ঐতিহাসিক অজ্ঞতা নয়; এটি নৈতিক প্রতারণা। যে নেতাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার গোপন পুলিশ, ফায়ারিং স্কোয়াড, শ্রমশিবির, দুর্ভিক্ষ, সেন্সরশিপ, দলীয় বিচার, ব্যক্তিপূজা, রাষ্ট্রীয় মিথ্যা ও ভিন্নমত দমনের সঙ্গে জড়িত, তাদের প্রতীক নিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে হত্যার ইতিহাসকে পোস্টারের রোমান্টিকতায় ঢেকে দেওয়া। হত্যা যদি ধর্মের নামে অন্যায় হয়, তবে বিপ্লবের নামেও অন্যায়। মানুষ পুড়িয়ে মারা যদি জিহাদের নামে বর্বরতা হয়, তবে শ্রেণীসংগ্রামের নামে হত্যা করাও বর্বরতা। রাষ্ট্র যদি ইসলামের নামে গলা কাটে, সেটি যেমন অপরাধ; রাষ্ট্র যদি সমাজতন্ত্রের নামে গুলি করে, সেটিও অপরাধ। স্লোগান বদলালেই নৈতিকতা বদলায় না।

বামপন্থা তখনই মূল্যবান, যখন তা কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করে, শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, প্রথা ও ধর্মীয় অন্ধত্বকে চ্যালেঞ্জ করে, মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে রক্ষা করে। কিন্তু বামপন্থা যখন পার্টির মাজারে মাথা ঠোকে, নেতা-পূজায় ডুবে যায়, মার্ক্সকে নবী বানায়, স্ট্যালিন-মাওকে পীর বানায়, চে-কে টি-শার্টের দেবতা বানায়, আর প্রতিটি সমালোচনাকে “সাম্রাজ্যবাদের দালালি” বলে উড়িয়ে দেয়, তখন সেটি আর বামপন্থা থাকে না। তখন সেটি হয়ে যায় দলান্ধতা। ধর্মান্ধ মুসলমান যেমন নবী ও কিতাবের নামে নিজের বিচারশক্তি বন্ধ করে, দলান্ধ কমিউনিস্টও তেমনি পার্টি ও বিপ্লবের নামে নিজের বিবেক বন্ধ করে। এই দুই অন্ধত্বের বাহ্যিক পোশাক আলাদা, কিন্তু মানসিক কাঠামো একই।

মানুষের মুক্তির কোনো শর্টকাট নেই। কোনো ঐশী কিতাব নেই, কোনো লাল কিতাব নেই, কোনো শেষ নবী নেই, কোনো শেষ তাত্ত্বিক নেই, কোনো চূড়ান্ত পার্টি নেই, কোনো অব্যর্থ বিপ্লব নেই। আছে কেবল যুক্তি, প্রমাণ, মানবমর্যাদা, নৈতিক জবাবদিহি, স্বাধীন বিচারশক্তি এবং ভুল স্বীকার করে সংশোধিত হওয়ার সাহস। যে মতবাদ এই শর্ত মানে, তাকে আলোচনায় রাখা যায়। যে মতবাদ এই শর্ত অস্বীকার করে, তাকে প্রতিরোধ করতে হয়। কমিউনিজমের নামে সংঘটিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, গণহত্যা, দলীয় একনায়কতন্ত্র ও নেতা-পূজার ইতিহাস তাই শুধু অতীতের ভুল নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা। কোনো মতাদর্শকে মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে দেওয়া যাবে না। কারণ যখনই কোনো বই, নেতা, পার্টি, ধর্ম, জাতি বা বিপ্লব মানুষের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখনই হত্যাকারীরা নিজেদের মুক্তিদাতা বলে পরিচয় দিতে শুরু করে।

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is not theological neutrality or artificial both-sides balance, but evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Neutrality here means methodological fairness: accurate use of sources, logical rigor, evidentiary discipline, and factual consistency. It does not mean moral indifference or equal treatment between harmful doctrines and their criticism.

Strong criticism should not be mistaken for bias if it is supported by evidence and sound reasoning.

This article should be evaluated through source quality, evidentiary strength, logical rigor, factual consistency, and fairness in representing opposing claims—not through theological sensitivity, apologetic expectations, or demand for rhetorical softness.


তথ্যসূত্রঃ
  1. Marcel Gauchet, “Right and Left”; David A. Bell, Time, “What to Know About the Origins of ‘Left’ and ‘Right’ in Politics”, 2019 ↩︎
  2. Encyclopaedia Britannica, “Socialism”; Encyclopaedia Britannica, “Communism”; Michael Newman, Socialism: A Very Short Introduction, Oxford University Press, 2005 ↩︎
  3. Karl Marx and Friedrich Engels, The Communist Manifesto, 1848; Karl Marx, A Contribution to the Critique of Political Economy, 1859; Leszek Kołakowski, Main Currents of Marxism, 1976–1978 ↩︎
  4. Karl Marx, Capital, Vol. I, 1867; Karl Marx, Economic and Philosophic Manuscripts of 1844 ↩︎
  5. Karl Marx and Friedrich Engels, The Communist Manifesto, 1848, Chapter I–II ↩︎
  6. Karl Marx, Critique of the Gotha Programme, 1875 ↩︎
  7. Karl Marx, On the Jewish Question, 1843 ↩︎
  8. Karl Marx and Friedrich Engels, The German Ideology, 1845–46 ↩︎
  9. George Leggett, The Cheka: Lenin’s Political Police, Oxford University Press, 1981; Orlando Figes, A People’s Tragedy: The Russian Revolution 1891–1924, 1996 ↩︎
  10. V. I. Lenin, “Telegram to Yevgenia Bosch”, 9 August 1918, Collected Works, Vol. 28 ↩︎
  11. V. I. Lenin, “Telegram to Comrades Kuraev, Bosh, Minkin and Other Penza Communists”, 11 August 1918, Collected Works, Vol. 28 ↩︎
  12. Council of People’s Commissars, “Decree on Red Terror”, 5 September 1918; James Ryan, Lenin’s Terror: The Ideological Origins of Early Soviet State Violence, Routledge, 2012 ↩︎
  13. J. Arch Getty, Gábor T. Rittersporn and Viktor N. Zemskov, “Victims of the Soviet Penal System in the Pre-War Years”, American Historical Review, 1993; Oleg V. Khlevniuk, The History of the Gulag, Yale University Press, 2004; Robert Conquest, The Great Terror: A Reassessment, Oxford University Press, 1990 ↩︎
  14. Institute of National Remembrance, “Katyn Massacre: Basic Facts”, 2020; U.S. National Archives, “Records Relating to the Katyn Forest Massacre”; Anna M. Cienciala, Natalia S. Lebedeva and Wojciech Materski, Katyn: A Crime Without Punishment, Yale University Press, 2007 ↩︎
  15. Anne Applebaum, Red Famine: Stalin’s War on Ukraine, 2017; Timothy Snyder, Bloodlands: Europe Between Hitler and Stalin, 2010; University of Minnesota, Center for Holocaust and Genocide Studies, “Holodomor” ↩︎
  16. Aleksandr Solzhenitsyn, The Gulag Archipelago, 1973; Anne Applebaum, Gulag: A History, 2003; Oleg V. Khlevniuk, The History of the Gulag, 2004 ↩︎
  17. Anita Pisch, The Personality Cult of Stalin in Soviet Posters, 1929–1953, ANU Press, 2016; Soviet History Project, “New National Anthem”, Michigan State University; Jan Plamper, The Stalin Cult: A Study in the Alchemy of Power, Yale University Press, 2012 ↩︎
  18. Roderick MacFarquhar, The Origins of the Cultural Revolution, Vol. 2, Oxford University Press, 1983; Frank Dikötter, Mao’s Great Famine, 2010; Yang Jisheng, Tombstone: The Great Chinese Famine, 1958–1962, 2008/2012 ↩︎
  19. Judith Banister, China’s Changing Population, Stanford University Press, 1987; Yang Jisheng, Tombstone, 2012; Frank Dikötter, Mao’s Great Famine, 2010; Association for Asian Studies, “China’s Great Leap Forward” ↩︎
  20. Judith Shapiro, Mao’s War Against Nature: Politics and the Environment in Revolutionary China, Cambridge University Press, 2001; Frank Dikötter, Mao’s Great Famine, 2010 ↩︎
  21. Roderick MacFarquhar and Michael Schoenhals, Mao’s Last Revolution, Harvard University Press, 2006; Andrew G. Walder, Agents of Disorder, Harvard University Press, 2019 ↩︎
  22. Roderick MacFarquhar and Michael Schoenhals, Mao’s Last Revolution, 2006; Andrew G. Walder and Yang Su, “The Cultural Revolution in the Countryside”, The China Quarterly, 2003 ↩︎
  23. Andrew G. Walder, Agents of Disorder, 2019; Stanford News, “How violence unfolded during China’s Cultural Revolution”, 2019; Sciences Po, “Chronology of Mass Killings during the Chinese Cultural Revolution”, 2011 ↩︎
  24. Quotations from Chairman Mao Tse-tung, Foreign Languages Press, 1964; Daniel Leese, Mao Cult: Rhetoric and Ritual in China’s Cultural Revolution, Cambridge University Press, 2011 ↩︎
  25. History Today, “Fidel Castro’s Invasion of Cuba”, 2006; Jon Lee Anderson, Che Guevara: A Revolutionary Life, 1997; Paco Ignacio Taibo II, Guevara, Also Known as Che, 1997 ↩︎
  26. Human Rights Watch, “Cuba: Fidel Castro’s Record of Repression”, 2016; Amnesty International, “Fidel Castro’s human rights legacy”, 2016 ↩︎
  27. PBS American Experience, “Che Guevara 1928–1967”; Jon Lee Anderson, Che Guevara: A Revolutionary Life, 1997; Samuel Farber, The Origins of the Cuban Revolution Reconsidered, 2006 ↩︎
  28. Ernesto Che Guevara, “Message to the Tricontinental”, 1967 ↩︎
  29. Human Rights Watch, “Cuba: Fidel Castro’s Record of Repression”, 2016; Human Rights Watch, Cuba’s Repressive Machinery, 1999; Amnesty International, “Fidel Castro’s human rights legacy”, 2016 ↩︎
  30. United States Holocaust Memorial Museum, “Cambodia 1975–1979”; Ben Kiernan, The Pol Pot Regime, Yale University Press, 1996/2008 ↩︎
  31. David P. Chandler, Brother Number One: A Political Biography of Pol Pot, 1992; Philip Short, Pol Pot: Anatomy of a Nightmare, 2004 ↩︎
  32. Ben Kiernan, The Pol Pot Regime, 2008; Yale Cambodian Genocide Program; Holocaust Memorial Day Trust, “Genocide in Cambodia” ↩︎
  33. Yale Cambodian Genocide Program, “Introduction to Cambodian Genocide Program”; University of Minnesota Center for Holocaust and Genocide Studies, “Cambodia”; United States Holocaust Memorial Museum, “Cambodia” ↩︎
  34. Documentation Center of Cambodia; Extraordinary Chambers in the Courts of Cambodia, Case 001: Kaing Guek Eav alias Duch; United States Holocaust Memorial Museum, “Cambodia 1975–1979” ↩︎
  35. Yale Cambodian Genocide Program; Extraordinary Chambers in the Courts of Cambodia, Case 002/02 Judgment, 2018 ↩︎
  36. Dae-Sook Suh, Kim Il Sung: The North Korean Leader, Columbia University Press, 1988; Andrei Lankov, The Real North Korea: Life and Politics in the Failed Stalinist Utopia, Oxford University Press, 2013 ↩︎
  37. Robert Collins, Marked for Life: Songbun, North Korea’s Social Classification System, Committee for Human Rights in North Korea, 2012; Human Rights Watch, World Report 2013: North Korea ↩︎
  38. B. R. Myers, The Cleanest Race: How North Koreans See Themselves and Why It Matters, 2010; Charles K. Armstrong, The North Korean Revolution, 1945–1950, Cornell University Press, 2003 ↩︎
  39. Andrei Lankov, The Real North Korea, 2013; 38 North, “Hereditary Succession in North Korea: Lessons of the Past”, 2012 ↩︎
  40. Human Rights Watch, World Report 2013: North Korea; Amnesty International, “North Korea: Catastrophic human rights record overshadows Day of the Sun”, 2012 ↩︎
  41. UN Human Rights Council, Report of the Commission of Inquiry on Human Rights in the Democratic People’s Republic of Korea, A/HRC/25/63, 2014; OHCHR, “North Korea: UN Commission documents wide-ranging and ongoing crimes against humanity”, 2014 ↩︎
  42. Daniel Goodkind and Loraine West, “The North Korean Famine and Its Demographic Impact”, Population and Development Review, 2001; Stephan Haggard and Marcus Noland, Famine in North Korea, Columbia University Press, 2007; 38 North, “Food Insecurity in North Korea Is at Its Worst Since the 1990s Famine”, 2023 ↩︎
  43. South Asia Terrorism Portal, “Purba Banglar Communist Party (PBCP), Bangladesh” ↩︎
  44. SATP, “Purba Banglar Communist Party (PBCP), Activities and Financing” ↩︎
  45. SATP, “Purba Banglar Communist Party (PBCP), Bangladesh” ↩︎
  46. Committee to Protect Journalists, “Attacks on the Press in 2004: Bangladesh”, 2005 ↩︎
  47. Charu Mazumdar, Historic Eight Documents, 1965–1967; Biplab Dasgupta, “Naxalite Armed Struggles and the Annihilation”, Economic and Political Weekly, 1973; Sumanta Banerjee, In the Wake of Naxalbari, 1980 ↩︎
  48. Government of India, Ministry of Home Affairs, “Left Wing Extremism Division”; Press Information Bureau, Government of India, “CPI (Maoist) included in list of terrorist organizations”, 2009 ↩︎
  49. Human Rights Watch, “Being Neutral is Our Biggest Crime”, 2008; Amnesty International India, reports on Chhattisgarh and adivasi rights; The Guardian, “Eradicating India’s jungle insurgency – can it be done and at what human cost?”, 2025 ↩︎
  50. Alpa Shah, Nightmarch: Among India’s Revolutionary Guerrillas, 2018; Nandini Sundar, The Burning Forest: India’s War in Bastar, 2016; SATP, “Maoist Insurgency: Fatalities and Timeline” ↩︎
  51. Anna M. Cienciala, Natalia S. Lebedeva and Wojciech Materski, Katyn: A Crime Without Punishment, Yale University Press, 2007; U.S. National Archives, “Records Relating to the Katyn Forest Massacre”; Institute of National Remembrance, “Katyn Massacre: Basic Facts” ↩︎
  52. Extraordinary Chambers in the Courts of Cambodia, Case 002/02 Judgment, 2018; Yale Cambodian Genocide Program, “Introduction to Cambodian Genocide Program” ↩︎
  53. UN Human Rights Council, Report of the Commission of Inquiry on Human Rights in the Democratic People’s Republic of Korea, A/HRC/25/63, 2014; OHCHR, “North Korea: UN Commission documents wide-ranging and ongoing crimes against humanity”, 2014 ↩︎
  54. Karl Popper, The Open Society and Its Enemies, Vol. II, 1945; Hannah Arendt, The Origins of Totalitarianism, 1951; Leszek Kołakowski, Main Currents of Marxism, 1976–1978 ↩︎
  55. Karl Marx, On the Jewish Question, 1843 ↩︎
  56. Karl Marx and Friedrich Engels, The Communist Manifesto, 1848, Chapter II; Leszek Kołakowski, Main Currents of Marxism, 1976–1978 ↩︎
  57. V. I. Lenin, State and Revolution, 1917; George Leggett, The Cheka: Lenin’s Political Police, 1981; Orlando Figes, A People’s Tragedy, 1996 ↩︎
  58. United Nations, Universal Declaration of Human Rights, 1948, Articles 3, 5, 9, 10, 18, 19, 20 ↩︎
  59. United Nations, International Covenant on Civil and Political Rights, 1966, Articles 6, 7, 9, 14, 19, 21, 22 ↩︎
  60. Jan Plamper, The Stalin Cult: A Study in the Alchemy of Power, Yale University Press, 2012; Anita Pisch, The Personality Cult of Stalin in Soviet Posters, 1929–1953, ANU Press, 2016 ↩︎
  61. Daniel Leese, Mao Cult: Rhetoric and Ritual in China’s Cultural Revolution, Cambridge University Press, 2011; National Archives, UK, “The Cultural Revolution” ↩︎
  62. Dae-Sook Suh, Kim Il Sung: The North Korean Leader, Columbia University Press, 1988; Andrei Lankov, The Real North Korea, Oxford University Press, 2013; B. R. Myers, The Cleanest Race, 2010 ↩︎
  63. Karl Marx and Friedrich Engels, The Communist Manifesto, 1848; V. I. Lenin, State and Revolution, 1917; Daniel Leese, Mao Cult: Rhetoric and Ritual in China’s Cultural Revolution, 2011; Jan Plamper, The Stalin Cult, 2012 ↩︎
  64. Maxime Rodinson, Marxism and the Muslim World, 1979; Jan Plamper, The Stalin Cult, 2012; Daniel Leese, Mao Cult, 2011 ↩︎
  65. Karl Marx, Capital, Vol. I, 1867; Mao Zedong, Quotations from Chairman Mao Tse-tung, 1964; Leszek Kołakowski, Main Currents of Marxism, 1976–1978 ↩︎
  66. Qur’an 9:72; Karl Marx, Critique of the Gotha Programme, 1875; Karl Popper, The Open Society and Its Enemies, Vol. II, 1945 ↩︎
  67. Qur’an 4:56; Karl Marx and Friedrich Engels, The Communist Manifesto, 1848; Hannah Arendt, The Origins of Totalitarianism, 1951 ↩︎
  68. V. I. Lenin, What Is To Be Done?, 1902; V. I. Lenin, State and Revolution, 1917; Hannah Arendt, The Origins of Totalitarianism, 1951 ↩︎
  69. Sahih al-Bukhari 6922; Rudolph Peters and Gert J. J. De Vries, “Apostasy in Islam”, Die Welt des Islams, 1976; Robert Conquest, The Great Terror, 1990 ↩︎
  70. Ibn Taymiyya, Al-Sarim al-Maslul ‘ala Shatim al-Rasul; Leszek Kołakowski, Main Currents of Marxism, 1976–1978; Jan Plamper, The Stalin Cult, 2012 ↩︎
  71. Qur’an 98:6; V. I. Lenin, “Telegram to Penza Communists”, 11 August 1918; James Ryan, Lenin’s Terror, 2012 ↩︎
  72. V. I. Lenin, What Is To Be Done?, 1902; George Leggett, The Cheka, 1981; Orlando Figes, A People’s Tragedy, 1996 ↩︎
  73. David Cook, Martyrdom in Islam, 2007; Che Guevara, “Message to the Tricontinental”, 1967; Daniel Leese, Mao Cult, 2011 ↩︎
  74. Hannah Arendt, The Origins of Totalitarianism, 1951; UN Human Rights Council, Report of the Commission of Inquiry on North Korea, 2014; Roderick MacFarquhar and Michael Schoenhals, Mao’s Last Revolution, 2006 ↩︎
  75. George Orwell, Animal Farm, 1945; Bernard Crick, George Orwell: A Life, 1980 ↩︎
  76. George Orwell, Animal Farm, Chapter 10, 1945 ↩︎
  77. George Orwell, Animal Farm, 1945; Christopher Hitchens, Why Orwell Matters, 2002; John Rodden, The Politics of Literary Reputation: The Making and Claiming of “St. George” Orwell, 1989 ↩︎

আসিফ মহিউদ্দীন

আসিফ মহিউদ্দীন সম্পাদক সংশয় - চিন্তার মুক্তির আন্দোলন [email protected]

2 thoughts on

  1. আপনার লেখাটি খুব ভালো লাগলো। কিন্তু বিভিন্ন শাসকের গণহত্যার যেসব সংখ্যা উল্লেখ করেছেন, সেগুলির তথ্যসূত্র কী?

  2. পুরো লেখাটা আগাগোড়া মিথ্যায় পরিপূর্ণ। আর এই সব মিথ্যা মুলত রবার্ট কনকোয়েস্ট, নাৎসিদের সাথে হাত মিলিয়ে হার্স্ট প্রেসের বানানো মিথ্যা বয়ান। এসব মিথ্যা খন্ডন করে প্রমান দলিল সহ অনেক বই, নিবন্ধ, গবেষণা পত্র আছে। কিন্তু আপনিও রবার্ট কনকোয়েস্ট বা সলিতঝিতসিনদের মত কোন তথ্যসুত্র দেন নি। শরৎচন্দ্র বলেছিল কোন মিথ্যাকে ৫০ বা ১০০ বার বললে একটা সময় সেটাকে সত্য মনে হয়। আপনার আরেকটা ভুল ভাঙিয়ে দেই আপনি মার্কসবাদী নন বরং মার্কসবাদের মুখোশ পরা সোশাল ডেমোক্রেট লিবারাল। আর ট্রটস্কি, বুখারিনরা এটাই ছিল।

Leave a comment

Your email will not be published.