খিলজির বঙ্গ আক্রমণ এবং ভারতে শরিয়তী শাসন
ভূমিকা
প্রাচীন মিশর, মেসোপটেমিয়া ও মিনোয়ান সভ্যতার পাশাপাশি সিন্ধু অববাহিকায় গড়ে ওঠা হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর সভ্যতা মানবসমাজের নগরজীবনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, লোথাল, কালিবাঙ্গান, ধোলাভিরা ও রাখিগাড়ির মতো নগর প্রাচীন এই অঞ্চলের পরিকল্পিত বসতি, পুরকৌশল ও উৎপাদনব্যবস্থার পরিচয় বহন করে। পরবর্তী যুগগুলোতেও ভারতীয় উপমহাদেশের কৃষিভূমি, বাণিজ্য, ধনসম্পদ এবং জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রগুলো নানা বহিরাগত শক্তির আগ্রহের বিষয় হয়েছে। আলেকজান্ডারের অভিযান থেকে ইউরোপীয় বাণিজ্যিক শক্তির আগমন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্য এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন—বিভিন্ন যুগে এখানে সামরিক ক্ষমতার সাহায্যে ভূখণ্ড, সম্পদ ও মানুষের শ্রমের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি অভিযানের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল; কিন্তু কোনো দেশের ঐশ্বর্য অন্যের জন্য সেই দেশ আক্রমণ, তার অধিবাসীদের হত্যা কিংবা তাদের সম্পদ লুট করার নৈতিক অধিকার সৃষ্টি করে না। নগর ও শিক্ষাকেন্দ্রের ইতিহাস যেমন আমাদের অতীতের অংশ, তেমনি সেগুলোর ওপর আক্রমণ এবং অধিবাসীদের দুর্দশাও সেই ইতিহাসের অংশ। বিজয়ীর গৌরবগাথার নিচে চাপা পড়া মানুষের অভিজ্ঞতাকে বাদ দিলে ইতিহাস ক্ষমতার আত্মপ্রশংসায় পরিণত হয়।
ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শোষণ নিয়ে আমাদের সমাজে বিস্তর আলোচনা হয়। কিন্তু ভারতে ইসলামি সামরিক আগ্রাসন, লুটপাট, বন্দিত্ব এবং অমুসলিমদের ওপর শরিয়তভিত্তিক কর্তৃত্বের আলোচনা অনেক সময় ধর্মীয় আবেগের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। সমালোচনাকে “ইসলামোফোবিয়া” বলে দাগিয়ে দেওয়া কিংবা লেখককে ভয় দেখানো কোনো ঐতিহাসিক দলিলের উত্তর নয়। হত্যা ও চাপাতির হুমকির পরিবেশে মানুষ নীরব হলে সেই নীরবতাকে অপরাধের অনুপস্থিতির প্রমাণ হিসেবে দেখানোও অসৎ কাজ। এই প্রবন্ধে বিশেষভাবে বখতিয়ার খিলজির বিহার-বঙ্গ অভিযান, তার পরবর্তী শাসন-পরম্পরার সঙ্গে সম্পর্কিত শরিয়তি বিধান এবং আহমদ সিরহিন্দির রাজনৈতিক-ধর্মীয় বক্তব্য আলোচনা করা হবে। এখানে প্রশ্ন কেবল কে কোন ভূখণ্ড জয় করেছিল তা নয়; প্রশ্ন হচ্ছে, বিজিত মানুষের জীবন, স্বাধীনতা, সম্পত্তি ও মর্যাদার কী হয়েছিল এবং সেই ব্যবস্থাকে ধর্মের নামে কীভাবে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল।
ভারত, বিশেষত বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শক্তি আক্রমণ করেছে। যে পক্ষই করুক, নিরপরাধ বেসামরিক মানুষের হত্যা, দাসত্ব ও লুটপাটের বিচার একই মানদণ্ডে করতে হবে। একটি আগ্রাসন নিয়ে আলোচনা করার সময় অন্য আগ্রাসনের তালিকা তুলে ধরে প্রথমটির দায় মুছে দেওয়া যায় না। কলিমুদ্দিন দশটি ধর্ষণ করেছে বলে রহিমুদ্দিনের আটটি ধর্ষণ বৈধ হয়ে যায় না; উভয় অপরাধই অপরাধ থাকে। একইভাবে ব্রিটিশ শোষণ ইসলামি লুটপাটকে ন্যায়সংগত করে না, আর ইসলামি লুটপাট ব্রিটিশ শোষণের পক্ষে কোনো যুক্তি নয়। যে ধর্ম নিজের বিধানকে আল্লাহপ্রদত্ত ন্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তার যুদ্ধনীতি ও শাসননীতির নৈতিক দায়ও পরীক্ষা করতে হবে। “সেই যুগে সবাই এমন করত”—এই বক্তব্য থেকে সর্বোচ্চ যা বোঝা যায় তা হলো সেই যুগে অন্যায় ব্যাপক ছিল; সেখান থেকে কোনো ধর্মীয় ব্যবস্থার নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয় না।
ইসলামে ভারত আক্রমণের ফজিলত
মুহাম্মদের সময়কার আরব সমাজে বাইরের চিকিৎসাজ্ঞান ও চিকিৎসকদের পরিচিতি ছিল। হারিস ইবনে কালাদা সেই সময়ের একজন পরিচিত আরব চিকিৎসক। তাঁর জীবনী সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সীমিত, তবে গুন্দেশপুরে চিকিৎসাশিক্ষা গ্রহণের বর্ণনা তাঁর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। পারস্যের জ্ঞানকেন্দ্র গুন্দেশপুরে তাঁর শিক্ষাগ্রহণের এই বিবরণ আরবের বাইরের চিকিৎসাজ্ঞানের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের কথা তুলে ধরে। তাঁর প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রাথমিক আরব সমাজ চিকিৎসাজ্ঞান অর্জনের জন্য নিজস্ব ধর্মীয় বৃত্তের বাইরে তাকাত এবং পরবর্তী ইসলামি সাহিত্যে একজন চিকিৎসকের বক্তব্যও কখনো নবীর হাদিস হিসেবে প্রচারিত হয়েছে। নিচের ফতোয়ায় হারিসের নামে প্রচলিত একটি চিকিৎসাবিষয়ক উক্তিকে মুহাম্মদের হাদিস হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার ভুলটি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আসুন, ফতোয়াটি সম্পূর্ণ পড়ি।
২১৯৯. প্রশ্ন
আমি একজন আলেমকে স্বাস্থ্য রক্ষার গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে নিম্নোক্ত হাদীসটি বলতে শুনেছি।
المعدة بيت الداء، والحمية رأس الدواء، وأعط كل بدن ما عودته
(অর্থাৎ) উদর হল সর্বরোগের কেন্দ্র। আর খাদ্য-সংযম সর্বরোগের মহৌষধ। দেহকে তা-ই দাও, যাতে তাকে অভ্যস্ত করেছ। জানার বিষয় হল, এটি কি হাদীস। হাদীস হলে তা কোন কিতাবে আছে? জানিয়ে উপকৃত করবেন।
উত্তর
প্রশ্নোক্ত কথাটি কোথাও হাদীস হিসেবে উল্লেখেতি হলেও হাদীস বিশারদগণ বলেছেন, এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস হিসেবে প্রমাণিত নয়; বরং তা আরবের প্রসিদ্ধ চিকিৎসক হারিস ইবনে কালদাহ-এর উক্তি।
অতএব তা হাদীস হিসেবে বর্ণনা করা যাবে না।
-আলমাকাসিদুল হাসানাহ পৃ. ৬১১; কাশফুল খাফা ২/৯৩; আদ্দুরারুল মুনতাছিরাহ ১৬৮; আল লাআলিল মানসুরাহ ১৪৫; আলফাওয়াইদুল মাজমূআহ ১৬৬; যাদুল মাসীর ৩/১৮৮; রুহুল মাআনী ৫/১১০; তাফসীরে কুরতুবী ৭/১৯২
হারিস ইবনে কালাদার কাছে রোগী পাঠানোর একটি বর্ণনাও হাদিসগ্রন্থে পাওয়া যায়। নিচের দুই অনুবাদে একই ঘটনার বিবরণ রয়েছে এবং উভয় ক্ষেত্রেই বর্ণনাটি দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত। উদ্ধৃত সংকলনেই বর্ণনার মান এবং দুর্বলতার কারণ উল্লেখ আছে। বর্ণনায় যে ঘটনাটি সংরক্ষিত হয়েছে তা হলো: অসুস্থ সা’দকে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে বলা হচ্ছে। হারিসের সঙ্গে গ্রিক চিকিৎসাজ্ঞানের পরিচিতি ও অনুবাদের কথাও বিভিন্ন জীবনীমূলক আলোচনায় আসে। এই চিকিৎসকের প্রসঙ্গ এবং রোগীকে তাঁর কাছে পাঠানোর বর্ণনা আরব সমাজে চিকিৎসাগত দক্ষতার স্বীকৃতির আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক বিষয় হলো, চিকিৎসাবিদ্যার ক্ষেত্রে বহিরাগত জ্ঞান ও বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন স্বীকৃত ছিল। নিচে দুর্বলতার কারণসহ মূল দুটি উদ্ধৃতি দেওয়া হলো।
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব ২১: খাদ্য
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪২২৪-[৬৬] সা‘দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সময় আমি মারাত্মকভাবে পীড়িত হয়ে পড়লাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার খোঁজ-খবর নিতে তাশরিফ আনলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের হাতখানা আমার দু’ স্তনের মাঝখানে (বুকের উপর) রাখলেন। তাতে আমি আমার কলিজায় শীতলতা অনুভব করলাম। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি একজন হৃদ-বেদনার রোগী। সুতরাং তুমি সাক্বীফ গোত্রীয় হারিস ইবনু কালদাহ্-এর নিকট যাও। সে একজন চিকিৎসক। পরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সে যেন অবশ্যই মদীনার সাতটি ‘আজওয়াহ্ খেজুর বীচিসহ পিষে তোমার মুখের মধ্যে ঢেলে দেয়। (আবূ দাঊদ)[1]
[1] য‘ঈফ : আবূ দাঊদ ৩৮৭৫, য‘ঈফুল জামি‘উস্ সগীর ২০৩৩, আল মু‘জামুল কাবীর লিতু ত্ববারানী ৫৩৪৬, য‘ঈফুল জামি‘ ২০৩৩।
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো মুজাহিদ সা‘দ হতে বর্ণনা করাটা মুরসাল। আবূ যুর্‘আহ্ আর্ রাযী এমনটিই বলেছেন। বিস্তারিত দেখুন- ‘আওনুল মা‘বূদ ১০/২৫৫ পৃঃ, হাঃ ৩৮৭৫।
হাদিসের মানঃ যঈফ (Dai’f)
বর্ণনাকারীঃ সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২২/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ১২. আজওয়া খেজুর সম্পর্কে।
৩৮৩৫. ইসহাক ইবন ইসমাইল (রহঃ) …. সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একবার আমি পীড়িত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখার জন্য আসেন। এ সময় তিনি তাঁর হাত আমার বুকের উপর রাখলে আমি তাঁর শৈত্যতা আমার হৃদয়ে অনুভব করি। এরপর তিনি বলেনঃ তুমি হার্টের রুগী। কাজেই তুমি ছাকীফ গোত্রের অধিবাসী হারিছা ইবন কালদার নিকট যাও। কেননা, সে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক। আর সে যেন মদীনার আজওয়া খেজুরের সাতটা খেজুর নিয়ে, তা বীচিসহ চূর্ণ করে তোমার জন্য তা দিয়ে সাতটি বড়ি তৈরী করে দেয়।
হাদিসের মানঃ যঈফ (Dai’f)
বর্ণনাকারীঃ সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)
ভারতের পণ্যের সুনাম যে মুহাম্মদের সময়কার আরব পর্যন্ত পৌঁছেছিল, তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ পাওয়া যায় নিচের হাদিসে। মুহাম্মদ তাঁর অনুসারীদের ভারতীয় উৎসের একটি ঔষধি দ্রব্য ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন। বাংলা অনুবাদে সেটিকে “হিন্দুস্থানের চন্দনকাঠ” বলা হয়েছে; সংশ্লিষ্ট আরবি পরিভাষা ও বুখারির পরিচ্ছেদে ভারতীয় কুস্ত বা কুষ্টজাতীয় ঔষধি দ্রব্যের উল্লেখ রয়েছে। পণ্যের নামের এই অনুবাদগত পার্থক্য সত্ত্বেও আলোচ্য তথ্যটি একই: ভারত থেকে আসা ঔষধি উপকরণ আরবে পরিচিত ছিল এবং তার গুণাগুণ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা ধর্মীয় বর্ণনাতেও সংরক্ষিত হয়েছে। অর্থাৎ ভারত কোনো সম্পূর্ণ অপরিচিত দূরদেশ ছিল না; তার পণ্য এবং চিকিৎসাগত উপযোগিতার সুনাম আরব সমাজে পৌঁছেছিল। হিন্দুস্থানের প্রতি আরবদের আগ্রহের ঐতিহাসিক পটভূমি বোঝার জন্য এই পরিচিতি গুরুত্বপূর্ণ [1]। আসুন, নিচের হাদিসটি সম্পূর্ণ পড়ি।
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২২/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ১৩. আংগুল দিয়ে গলা দাবানো সম্পর্কে।
৩৮৩৭. মুসাদ্দাদ ও হামিদ ইবন ইয়াহইয়া (রহঃ) …. উম্মু কায়স বিনত মিহসান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আমি আমার এক ছেলেকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট হাযির হই; যার গলা (অসুখের কারণে) আমি মালিশ করেছিলাম। তখন তিনি বলেনঃ তোমরা তোমাদের সন্তানদের গলার আসুখে কেন তাদের গলা মালিশ কর? বরং তোমাদের উচিত (এ রোগের জন্য) হিন্দুস্থানের চন্দনকাঠ ব্যবহার করা। কেননা, তাতে সাত ধরনের রোগ ভাল হয়, যার একটি হলো নিউমোনিয়া। গলা-ফুলা রোগে তা নাকের ছিদ্রে ব্যবহার করবে এবং নিউমোনিয়া হলে তা বড়ি বানিয়ে খাবে।
ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেনঃ চন্দন কাঠের অর্থ- তা চূর্ণ করে বড়ি বানিয়ে খাবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উম্মু কায়স বিনত মিহসান (রাঃ)
ভারতীয় ঔষধি উপকরণের এই উল্লেখ থেকে বোঝা যায়, ভারতের পণ্যের পরিচিতি ও সুনাম মুহাম্মদের সময়কার আরব পর্যন্ত পৌঁছেছিল। ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষাকেন্দ্র, পাণ্ডিত্য ও সমৃদ্ধির পরিচয়ও পরবর্তী অংশে দেখা যাবে। ফলে আরব অঞ্চলের মানুষের কাছে ভারত ছিল সম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্যের জন্য পরিচিত একটি ভূখণ্ড। এবার সেই ভূখণ্ড সম্পর্কে ধর্মীয় যুদ্ধের বর্ণনাটি দেখা যাক। মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত একটি হাদিসে ভারত অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তাঁর উম্মতের দুটি দলকে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন বলা হচ্ছে, যার একটি ভারত অভিযানে অংশগ্রহণকারী দল। এই বক্তব্যে ভারতের কোনো পূর্ববর্তী আক্রমণ, মদিনার বিরুদ্ধে শত্রুতা কিংবা আত্মরক্ষার শর্ত উল্লেখ নেই। ভারতের কেউ মুহাম্মদের পাকা ধানে মই দিয়েছিল—এই বর্ণনা তেমন কোনো ঘটনাও দেখায় না। অথচ সেই ভারতের বিরুদ্ধে অভিযানের সঙ্গে পরকালীন মুক্তির পুরস্কার যুক্ত হচ্ছে। আক্রমণকারীর ধর্মীয় লাভের এই হিসাবে আক্রান্ত মানুষের জীবন, সম্পদ ও স্বাধীনতার অবস্থান কোথায়? আসুন, হাদিসটি সম্পূর্ণ পড়ি।
সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৫/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ৪১. হিন্দুস্থানের জিহাদ
৩১৭৮. মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ ইবন আব্দুর রহীম (রহঃ) … রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গোলাম ছাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মতের দুটি দল আল্লাহ্ তা’আলা তাদেরকে জাহান্নাম হতে পবিত্রাণ দান করবেন, একদল যারা হিন্দুস্থানের জিহাদ করবে, আর একদল যারা ঈসা ইবন মারিয়াম (আঃ) এর সঙ্গে থাকবে।
তাহক্বীকঃ সহীহ। সহীহাহ ১৯৩৪, সহীহ জামে’ আস-সগীর ৪০১২।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সাওবান (রাঃ)
এই একই বর্ণনা অন্য প্রচলিত নম্বরপদ্ধতিতে সুনান আন-নাসায়ি ৩১৭৫ হিসেবে পাওয়া যায়; ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপরের উদ্ধৃতিতে নম্বর ৩১৭৮। সংশ্লিষ্ট অনলাইন সংস্করণে দারুসসালামের মূল্যায়ন “হাসান”, আর উদ্ধৃত বাংলা সংস্করণে “সহিহ” লেখা আছে [2]। ধর্মীয় সংকলনের ভেতরে গ্রহণযোগ্যতার এই মূল্যায়ন বর্ণনাটির নৈতিক যথার্থতার প্রমাণ নয়। মূল সমস্যাটি তার বক্তব্যে: অন্য একটি ভূখণ্ডে যুদ্ধের সঙ্গে পরকালীন মুক্তির পুরস্কার জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এতে যুদ্ধের নৈতিক মূল্যায়নের কেন্দ্র থেকে আক্রান্ত মানুষের জীবন ও স্বাধীনতা সরে গিয়ে অভিযানে অংশগ্রহণকারীর ধর্মীয় লাভ কেন্দ্রে আসে। একজন মানুষ কেন নিজ দেশের ওপর আক্রমণকারীর পরকালীন পুরস্কারের মূল্য নিজের জীবন, সম্পদ বা বন্দিত্ব দিয়ে শোধ করবে?
ভারত অভিযান সম্পর্কে নুআইম ইবনে হাম্মাদের কিতাবুল ফিতান গ্রন্থেও বর্ণনা রয়েছে। এই সংকলনের বর্ণনাগুলোর মান নিয়ে ইসলামি হাদিসবিদদের আপত্তি আছে। এখানে প্রাসঙ্গিক বিষয় হলো, ভারত অভিযানের ধারণা বিভিন্ন ধর্মীয় সংকলনে সংরক্ষিত ও প্রচারিত হয়েছে। একটি দূরবর্তী ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে পরকালীন মুক্তির সঙ্গে যুক্ত করার যে মতাদর্শ আমরা দেখছি, তার প্রচারের ইতিহাসেও এই সংকলনের স্থান আছে। এখানে ভারত অভিযানের ধর্মীয় পুরস্কার সম্পর্কে আলোচনার প্রত্যক্ষ ভিত্তি হলো উপরে সম্পূর্ণ উদ্ধৃত সাওবানের বর্ণনা। নুআইমের গ্রন্থটি ভারত অভিযানের ধারণা কীভাবে পরবর্তী ধর্মীয় সাহিত্যে প্রচারিত হয়েছে তা বোঝার জন্যও প্রাসঙ্গিক [3]। এই বিষয়টির আরও বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে সংশয়ের ইসলামে গাজওয়াতুল হিন্দ বা ভারত আক্রমণের বিধান প্রবন্ধে।


প্রাচীন বঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়
বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি অঞ্চলে অবস্থিত তক্ষশীলা প্রাচীন উপমহাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র। টলেমির ভূগোলে স্থানটি “তক্ষিয়ালা” নামে বর্ণিত হয়েছে [4]। প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে তক্ষশীলার পরিচিতি উপমহাদেশে উচ্চতর জ্ঞানচর্চার দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ। শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং পাণ্ডিত্যের সমাবেশের জন্য এই কেন্দ্র স্মরণীয়। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র রচনা এবং রাজা বিম্বিসারের চিকিৎসক জীবকের অধ্যয়নের কাহিনি এই শিক্ষাকেন্দ্রের খ্যাতির সঙ্গে যুক্ত। এর সূচনা খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ করা হয়। ভারতের বিহারে অবস্থিত নালন্দা মহাবিহারও প্রাচীন বিশ্বের একটি সুপ্রসিদ্ধ আবাসিক শিক্ষাকেন্দ্র। পঞ্চম শতাব্দী থেকে তার বিশেষ বিকাশ ঘটে এবং বহু শতাব্দী ধরে চীন, তিব্বত ও মধ্য এশিয়া থেকে ছাত্র ও পণ্ডিতেরা সেখানে আসতেন। ইউনেসকোর বিবরণে নালন্দার সংগঠিত জ্ঞানচর্চার দীর্ঘ ধারাবাহিকতার উল্লেখ রয়েছে [5]। বাংলার পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহারও দক্ষিণ হিমালয় অঞ্চলের বৃহৎ বৌদ্ধ শিক্ষা ও ধর্মচর্চার কেন্দ্রগুলোর একটি ছিল। প্রায় তিন শতাব্দী ধরে তার খ্যাতি বিস্তৃত ছিল এবং উপমহাদেশের বাইরে চীন, তিব্বত, মায়ানমার বা তৎকালীন ব্রহ্মদেশ, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার সঙ্গে তার যোগাযোগের বিবরণ পাওয়া যায়। অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের মতো বাঙালি পণ্ডিতের নাম এই বিস্তৃত শিক্ষাপরম্পরার সঙ্গে যুক্ত। দশম-একাদশ শতাব্দীর এই পণ্ডিতের জীবন ও কাজ বাংলার সঙ্গে বৃহত্তর বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার সম্পর্ক তুলে ধরে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব ছিল ধর্মীয় উপাসনার পাশাপাশি শিক্ষা, পাণ্ডিত্য, অনুবাদ এবং আন্তঃআঞ্চলিক জ্ঞানবিনিময়ের ক্ষেত্রেও।
এই জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম মহাপণ্ডিত মহাস্থবির শীলভদ্র। বর্তমান কুমিল্লা অঞ্চলের সঙ্গে তাঁর জন্মপরিচয় যুক্ত বলে প্রচলিত, এবং তিনি নালন্দার একজন প্রধান আচার্য ও বৌদ্ধশাস্ত্রের বিশিষ্ট পণ্ডিত ছিলেন। চীনা পরিব্রাজক ও সন্ন্যাসী হিউয়েন সাঙ তাঁর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। নালন্দার বিশাল গ্রন্থাগার সম্পর্কে পরবর্তী বিবরণে “ধর্মগঞ্জ” নাম পাওয়া যায়। রত্নসাগর, রত্নোদধি ও রত্নরঞ্জক নামে তিনটি ভবনের কথা বলা হয়; রত্নোদধিকে নয়তলা ভবন হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র, গুহ্যসমাজ এবং বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্রের পাশাপাশি বহু বিষয়ের পুঁথি সেখানে সংরক্ষিত ছিল বলে এই বিবরণগুলোতে উল্লেখ রয়েছে। গ্রন্থাগার পোড়ানোর পর কয়েক মাস ধরে বই জ্বলেছিল—এ কথাও বহুল প্রচলিত জনশ্রুতি। এই জনশ্রুতি নালন্দার গ্রন্থসম্পদের বিপুলতা সম্পর্কে মানুষের ঐতিহাসিক স্মৃতির অংশ। গ্রন্থাগারে আঘাত মানে মানুষের সংগৃহীত জ্ঞান, পাণ্ডুলিপি এবং সেগুলো পাঠ ও ব্যাখ্যা করার পরম্পরায় আঘাত। শিক্ষক-শিক্ষার্থী হত্যা এবং জ্ঞান সংরক্ষণের প্রতিষ্ঠান ধ্বংস একই সঙ্গে ঘটলে ক্ষতি একটি ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; পরবর্তী প্রজন্মের জ্ঞানলাভের পথও বিপর্যস্ত হয়।
বখতিয়ারের বিহার অভিযানের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো শিক্ষায়তনে তাঁর বাহিনীর আক্রমণ, অধিবাসীদের হত্যা এবং সম্পদ লুণ্ঠনের বিবরণ। তবকাত-ই-নাসিরীর উদ্ধৃত অংশে একটি দুর্গ-শিক্ষায়তনের কথা আছে, যেটিকে অনুবাদকের টীকায় ওদন্তপুরী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। প্রাচীন বাংলা ও মগধে পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা বড় শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর মধ্যে বিক্রমশিলা বিশ্ববিদ্যালয়, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়, সোমপুর মহাবিহার, ওদন্তপুরী ও জগদ্দল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর দীর্ঘ ইতিহাস, আবাসিক শিক্ষার ব্যবস্থা এবং আন্তঃআঞ্চলিক পাণ্ডিত্য উপমহাদেশের জ্ঞানচর্চার সমৃদ্ধি তুলে ধরে। এগুলো ছিল শিক্ষা, অনুবাদ এবং পুঁথি সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এই মহাবিহারগুলো রাজপৃষ্ঠপোষকতা, পাণ্ডিত্য এবং শিক্ষকদের পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে যুক্ত ছিল। খ্যাতিমান পণ্ডিতেরা এক কেন্দ্র থেকে অন্য কেন্দ্রে যেতেন এবং শিক্ষা ও ধর্মচর্চার একটি বিস্তৃত আন্তঃআঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। নালন্দা ও ওদন্তপুরীর সঙ্গে বাংলার আচার্য ও শিক্ষার্থীদেরও সম্পর্ক ছিল। ফলে একটি শিক্ষায়তনের ধ্বংস কেবল একটি ভবনের পতন ছিল না; তা শিক্ষক, ছাত্র, পুঁথি এবং জ্ঞানের আদানপ্রদানের বৃহত্তর ব্যবস্থায় আঘাত করেছিল।
বখতিয়ারের বিহার অভিযানের সাল নিয়ে বিভিন্ন রচনায় ১১৯৩ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর ভিন্ন তারিখ পাওয়া যায়; বাংলাপিডিয়ার বিবরণে বিহার আক্রমণ ১২০৩ এবং নদিয়া অভিযান ১২০৫ সালের শুরুতে স্থাপন করা হয়েছে [6]। বিহার ও বাংলার এই শিক্ষাকেন্দ্রগুলো একটি বিস্তৃত জ্ঞানচর্চার পরম্পরার অংশ ছিল। শিক্ষায়তনের অধিবাসীদের ওপর আক্রমণ এবং প্রতিষ্ঠান দখলের ঘটনা সেই পরম্পরার মানুষ ও অবকাঠামোকে বিপন্ন করেছে। এখানে যে ঘটনাটি দলিলসহ আলোচনা করা হচ্ছে তা হলো বখতিয়ারের বাহিনীর বিহারের দুর্গসদৃশ শিক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ, অধিবাসীদের হত্যা এবং সম্পদ লুট। মিনহাজ মুণ্ডিতমস্তক অধিবাসীদের “ব্রাহ্মণ” বলেছেন; বাংলা সংস্করণের টীকায় তাঁদের বৌদ্ধভিক্ষু হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। বাহিনী শুরুতে স্থানটিকে কী ভেবেছিল, সেই প্রশ্ন মানুষের নির্বিচার হত্যার দায় মুছে দেয় না। কোনো ভবনকে দুর্গ মনে করা এবং সেখানে পাওয়া মানুষকে হত্যা করা দুটি পৃথক সিদ্ধান্ত; প্রথমটির ভুল দ্বিতীয়টির নৈতিক অনুমতি নয়।
বখতিয়ার খিলজির আক্রমণ
উপরের ধর্মীয় বর্ণনায় ভারত অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের জাহান্নাম থেকে মুক্তির সুসংবাদ পাওয়া গেল। ভারত অভিযানে অংশগ্রহণকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির পথ হিসেবে উপস্থাপন করাই এখানে গুরুতর নৈতিক সমস্যা। ধর্মীয় বিশ্বাসে জাহান্নাম অপরাধ ও পাপের শাস্তির স্থান; সেই শাস্তি থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি যখন অন্য ভূখণ্ডে যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন অভিযানে অংশগ্রহণকারী নিজের কাজকে পরকালীন লাভের উপায় হিসেবে দেখার সুযোগ পায়। আক্রান্ত মানুষের জীবন, সম্পদ ও স্বাধীনতার ক্ষতি আক্রমণকারীর মুক্তির এই হিসাবের নিচে চাপা পড়ে। যুদ্ধ, লুটপাট ও বন্দিত্বের সঙ্গে যখন পুণ্যের ভাষা যুক্ত হয়, তখন অংশগ্রহণকারী নিজের কাজকে আক্রান্ত মানুষের অভিজ্ঞতা দিয়ে বিচার করার পরিবর্তে ধর্মীয় পুরস্কারের হিসাব দিয়ে বিচার করতে পারে। এই ব্যবস্থা অপরাধের নৈতিক বাধা দুর্বল করার সুযোগ তৈরি করে। বখতিয়ারের অভিযানের বর্ণনায় ধর্মযুদ্ধের ভাষা এবং ফিকহে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও বন্দি মানুষের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার বিধান এই নৈতিক সমস্যাকে আরও স্পষ্ট করে। সামরিক শক্তি দিয়ে মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, আর সেই কর্তৃত্বকে ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে। ফলে আক্রমণকারীর পুণ্য অর্জনের বয়ানে আক্রান্ত মানুষের দুর্দশা আড়াল হয়ে যায়। এখন সেই সামরিক অভিযানের দলিলগুলো দেখা যাক।
তুর্কি খলজি গোষ্ঠীভুক্ত ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি আফগানিস্তানের গরমশির অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন। প্রাথমিক জীবনে তিনি সামরিক চাকরি খুঁজতে বিভিন্ন দরবারে যান এবং পরে হিজবার উদ্দিনসহ স্থানীয় শাসকদের অধীনে কাজের সুযোগ পান। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থান করে ছোট ছোট অভিযানের মাধ্যমে তাঁর বাহিনী ও শক্তি বাড়তে থাকে। বিহার ও বঙ্গ অভিযানে বিপুল সম্পদ তাঁর হাতে আসে এবং দখল করা অঞ্চলে তিনি নিজস্ব কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। সামরিক পেশায় উন্নতি, সম্পদ অর্জন এবং ভূখণ্ড বিস্তার তাঁর এই অভিযানের বাস্তব ফল; এগুলো বোঝার জন্য বিজয়ীর আত্মপ্রশংসার ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। পরে তিব্বত অভিমুখে অভিযান চালিয়ে তিনি বিপর্যস্ত হন। ব্যাপক সৈন্যক্ষয়, প্রত্যাবর্তনের দুর্দশা এবং নিহত সৈন্যদের পরিবারের অভিযোগ তাঁর শেষ জীবনের বর্ণনায় উঠে এসেছে। মিনহাজের বিবরণে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর কথা আছে, পাশাপাশি আলী মর্দান খলজির হাতে হত্যার কথাও একটি প্রচলিত বর্ণনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উভয় বিবরণেই তাঁর শেষ জীবনের পটভূমি ছিল সামরিক বিপর্যয়, অসুস্থতা এবং ক্ষমতার সংকট। যে অভিযানে তিনি নিজের বাহিনীকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন, তার পরিণতি তাঁর ক্ষমতা ও অনুগামীদের পরিবারের ওপরও ফিরে এসেছিল।
মিনহাজ-ই-সিরাজ জুজজানি, পূর্ণ নাম আবু উসমান মিনহাজউদ্দিন বিন সিরাজউদ্দিন, ত্রয়োদশ শতাব্দীর একজন গুরুত্বপূর্ণ ফারসি ভাষার ইতিহাসলেখক। তাঁর জন্ম ১১৯৩ সালে বলে উল্লেখ করা হয়। তাঁর রচিত তবকাত-ই-নাসিরীতে নবী-রসুল, রাজবংশ এবং বিভিন্ন মুসলিম শাসকের ইতিহাস থেকে নিজের সময় পর্যন্ত ঘটনার বিবরণ রয়েছে। বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রাথমিক ইতিহাস পুনর্গঠনে এটি একটি প্রধান আকরগ্রন্থ, বিশেষত বখতিয়ার ও তাঁর উত্তরসূরিদের সম্পর্কে এর তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই উৎসের বিশেষ তাৎপর্য হলো, এটি আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর কোনো পরবর্তী প্রতিবাদপত্র নয়; মুসলিম শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত একজন ইতিহাসলেখকের রচনা। সেই লেখক যখন হত্যা, লুণ্ঠন এবং নারী বন্দি হওয়ার কথা লিখছেন, তখন এগুলোকে কেবল ইসলামবিরোধী কল্পকাহিনি বলে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
ঘোরের জুজজান অঞ্চলের সঙ্গে মিনহাজের পরিবারের সম্পর্ক ছিল এবং তাঁর পিতা ঘোরি শাসকদের অধীনে কাজি ছিলেন। প্রায় চৌত্রিশ বছর বয়সে মিনহাজ ভারতে আসেন। শিক্ষিত এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই ব্যক্তি প্রথমে উচে নাসিরুদ্দিন কুবাচার দরবারে যোগ দেন ও কাজির পদে নিযুক্ত হন। ইলতুৎমিশের হাতে কুবাচার ক্ষমতার পতনের পর তিনি দিল্লিতে চলে আসেন। দিল্লির শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ইমাম, খতিব, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ, কাজি এবং সদর-ই-জাহানের মতো দায়িত্ব পালন করেন। সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদের আমলে তাঁর গ্রন্থটি রচিত ও সুলতানের নামে উৎসর্গ করা হয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান তাঁর লেখার ভাষা বুঝতে সাহায্য করে: যাদের আমরা হত্যাকারী ও লুটকারী হিসেবে বিচার করছি, তাঁর বর্ণনায় তারা “ধর্মযোদ্ধা” ও বিজয়ী। ফলে ঘটনা এবং ঘটনাকে গৌরবমণ্ডিত করার ভাষা—দুটিই এই উৎস থেকে পরীক্ষা করা যায়।
বখতিয়ারের অভিযান থেকে ১২৫৯ সাল পর্যন্ত বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য তবকাত-ই-নাসিরী একটি অপরিহার্য লিখিত উৎস। শিলালিপি ও মুদ্রার পাশাপাশি এই গ্রন্থের বিস্তারিত বর্ণনা বখতিয়ার ও তাঁর উত্তরসূরিদের শাসনের ইতিহাস পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে। এর গুরুত্বের একটি কারণ হলো, মিনহাজ নিজে বাংলায় এসে প্রায় দুই বছর অবস্থান করেন এবং ঘটনাবলির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। তাঁর রচনায় বাংলার মুসলিম শাসকদের জন্য স্বতন্ত্র তবকাতও রয়েছে। বখতিয়ারের বিহার অভিযানের প্রায় চল্লিশ বছর পর তিনি সমসামউদ্দিন নামে অভিযানে অংশগ্রহণকারী এক ব্যক্তির কাছে ঘটনাটি শোনেন—উদ্ধৃত পাঠেই এই তথ্য আছে। মিনহাজ এখানে অভিযানে অংশগ্রহণকারীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য সংরক্ষণ করেছেন। হত্যাকাণ্ড ও লুণ্ঠনের এই বর্ণনা আক্রমণকারী বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত একজন ব্যক্তির সাক্ষ্যের মাধ্যমে মুসলিম ইতিহাসলেখকের রচনায় স্থান পেয়েছে। ফলে বিজয়ের ধর্মীয় ভাষার ভেতর থেকেই আক্রান্ত মানুষের ওপর চালানো সহিংসতার বিবরণ উঠে এসেছে। বাংলা অনুবাদের তবকাত-ই-নাসিরী পাঠকদের জন্য দেওয়া হলো; তাঁরা সম্পূর্ণ গ্রন্থ ডাউনলোড করে মূল পাঠ ও টীকা মিলিয়ে দেখতে পারেন [7]। নিচে প্রাসঙ্গিক পৃষ্ঠাগুলো তাদের উদ্ধৃতি ও টীকাসহ দেওয়া হচ্ছে।
প্রথমে দেখা যাক, বিহারের শিক্ষায়তনে বখতিয়ারের বাহিনীর হামলার বিবরণ। মিনহাজের লেখায় আক্রমণ, সম্পদ লুণ্ঠন এবং মুণ্ডিতমস্তক অধিবাসীদের সবাইকে হত্যার কথা এসেছে। তিনি তাঁদের “ব্রাহ্মণ” বলেছেন; বাংলা অনুবাদের টীকায় স্থানটিকে ওদন্তপুরী এবং অধিবাসীদের বৌদ্ধভিক্ষু বা শ্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। “ব্রাহ্মণ” পরিচয়টি গ্রহণ করা হোক কিংবা বৌদ্ধভিক্ষু হিসেবে তাঁদের শনাক্ত করা হোক, হত্যার নৈতিক সমস্যাটি একই থাকে। ধর্মীয় পরিচয় কাউকে হত্যা করার অধিকার সৃষ্টি করে না। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, বহু গ্রন্থের অর্থ জানার জন্য মানুষ খোঁজা হচ্ছে, অথচ তার আগেই শিক্ষায়তনের অধিবাসীদের হত্যা করা হয়েছে। যে সমাজ জ্ঞান সংরক্ষণ করছিল, আক্রমণকারী প্রথমে তার মানুষগুলোকে সরিয়ে দিয়েছে; পরে সেই জ্ঞানের অর্থ বুঝতে চেয়েছে [8]।
বখতিয়ার এর (নিকট কাজে) নিযুক্ত ছিলেন। (তাঁদের মধ্যে) একজনের নাম নিজাম-উদ্-দীন ও অপর জনের নাম সমসাম-উদ্-দীন। এ গ্রন্থের রচয়িতার সঙ্গে লাখনৌতিতে সমসাম-উদ্-দীনের সাক্ষাৎ ঘটে ৬৪১ (হিজরী) সনে এবং এ বর্ণনা তাঁরই কাছ থেকে প্রাপ্ত।
দুর্গদ্বারে উপস্থিত হবার পর প্রবল আক্রমণ শুরু হল। মোহাম্মদ বখতিয়ারের দুঃসাহসী ধর্ম-যোদ্ধাদের মধ্যে এই দুই বিজ্ঞ ভ্রাতাও ছিলেন। স্বীয় শক্তি ও সাহসের বলে (মোহাম্মদ বখতিয়ার) এই দুর্গন্ধার’ ভেদ করে অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে তাঁর সৈন্যগণ দুর্গ অধিকার করে এবং অনেক দ্রব্য লুণ্ঠন করে হস্তগত করে। এ স্বানের অধিকাংশ অধিবাসী ব্রাহ্মণ’ ছিলেন। তাঁদের মস্তক মুণ্ডিত ছিল। তাঁদের সকলকেই হত্যা করা হয়েছিল। সেখানে অনেক গ্রন্থ ছিল।
যখন বহুসংখ্যক গ্রন্থ মুসলমানদের দৃষ্টিতে পড়ল তখন উপস্থিত ব্যক্তিগণকে গ্রন্থে লিখিত বিষয়ের মর্মোদ্ধারের জন্য আহ্বান করা হল ও এক ঘোষণা প্রচার করা হল। সকলেই নিহত মাত্র ২০০ অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে দুর্গ অধিকারে এসেছিলেন। এত অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে একটি দুর্গ অধিকার করতে আসার পিছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। যথা:
(ক) বিহার অঞ্চলে এমন কোন প্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্তিত্ব ছিল না যার জন্য আরও অধিক সৈন্যের প্রয়োজন ছিল।
(খ) মোহাম্মদ বখতিয়ারের অশ্বারোহী সৈন্য সংখ্যা এর চেয়ে খুব বেশী ছিল না।
১। সমসাম-উদ্-দীন বিহার অধিকারের সময় মোহাম্মদ বখতিয়ারের সঙ্গী ছিলেন। প্রায় ৪০ বৎসর পরে মীনহাজ এই প্রত্যক্ষদর্শীর নিকট থেকে এ কাহিনী সংগ্রহ করেন। এতদিন পরের বর্ণনা হলেও একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে তাঁর বর্ণনা যোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে।
২। মূল ফারসী পাঠ “তনুরায়ে দরওয়াজাহ’ )تئوره دروازه( শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘টানেল’ (tunnel(, এখানে প্রধান প্রবেশপথ।
৩। বিহারে অবস্থানকারী মুণ্ডিত মস্তক বিশিষ্ট অধিবাসীদের পরিচয় দিতে গিয়ে মীনহাজ এ’দেরকে ‘ব্রাহ্মণ’ )برهمنان( বলে অভিহিত করেছেন। উদ্দণ্ডপুর (Uddandapur) বা উদন্তপুর বৌদ্ধ বিহার বলে এটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ বিহারের অধিবাসীরা যে বৌদ্ধভিক্ষু বা শ্রমণ ছিলেন তা বলাই বাহুল্য। মীনহাজ ভুল করে এঁদেরকে ব্রাহ্মণ বলেছেন। পরে কামরূপ ও তথাকখিত তিব্বত অঞ্চলের অধিবাসীদেরকেও তিনি ভুল করে ব্রাহ্মণ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
সে সময়ে ভারতের প্রায় সর্বত্র বৌদ্ধ ধর্ম এক রকম নিঃশেষ হয়ে আসছিল। বাঙলাদেশে যে তখন বৌদ্ধ ধর্ম ছিল না তা অনুমান করতে কষ্ট হয় না। যদিও মহারাজ। লক্ষ্যণসেনের ২য় রাজ্যাঙ্কে প্রদত্ত তর্পণদীধি তাম্রশাসনের ভূমির সীমানা উল্লেখ করতে গিয়ে প্রদত্ত ভূমির এক প্রান্তে একটি বিহারের উল্লেখ দেখা যায় যে বিহারটি আদতে পরিত্যক্ত বিহার ছিল কিনা বলা কঠিন। পরিত্যক্ত না হলেও তা যে নামেমাত্র ও একটি নিষ্প্রাণ বৌদ্ধ বিহার ছিল এ অনুমান যুক্তিসহ।
বর্তমান বিহার অঞ্চলের কোন কোন স্থানে সে সময়ে হয়ত বৌদ্ধ ধর্মের কিছু অস্তিত্ব ছিল। নামেমাত্র রাজা হলেও পালবংশের শেষ নৃপতি গোবিন্দ পালদেব অথবা পনপালদেব একটি ক্ষুদ্রায়তনের রাজ্য নিয়ে কোন রকমে টিকে ছিলেন বলে ধারণা করা যায়। তাঁদের প্রভাবেই হয়ত যে অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্ম কোন রকমে টিকে ছিল ও আলোচ্য উদন্তপুর বিহার বোধ হয় তাঁদের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
৪। বেভার্ট: ‘when all these books came under the observation of the Musalmans, they summoned a number of Hindus that they might give them information res-pecting the import of the books’-p. 552. রেডার্টির এই অনুবাদে মূল ফারসী পাঠের সঙ্গে কিছু ব্যতিক্রম দেখা যায়।
এ বাক্য মায়া গ্রন্থকার কি যোগাতে চেয়েছেন তা পরিষ্কার নয়। পরবর্তী উক্তি ‘ঘোষণা করা হল )اعلامی باز دهند ও ‘সকলেই নিহত হয়েছিল’ )جمله کشته شده بودند( থেকে ধারণা হয় যে বিহারের অভ্যন্তরের অধিবাসীদের মধ্যে কেউ জীবিত ছিলেন না। সেইজন্য বাইয়ের লোককে যোষণা পত্রদ্বারা জমায়েত করা হয়েছিল এবং পুস্তকের পাঠ উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু রেডার্টি কোথায় ‘হিন্দ’ পাঠ পেয়েছেন তা বোঝা গেল না।

পরের পৃষ্ঠায় মিনহাজ জানান, বইগুলোর বিষয় জানা গেলে বোঝা যায় সমগ্র নগর ও দুর্গটি একটি শিক্ষায়তন ছিল। তাঁর ভাষায় সেটি “মাদ্রাসা”, অর্থাৎ পরিচিত শব্দ দিয়ে শিক্ষাকেন্দ্রকে বোঝানো হয়েছে। শিক্ষায়তন ও বসতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি বিস্তৃত কেন্দ্র এখানে বর্ণিত হয়েছে। বহু গ্রন্থ, সেগুলো পাঠ করার মানুষ এবং শিক্ষা-কেন্দ্রিক নগরজীবন এই প্রতিষ্ঠানের সামাজিক গুরুত্ব তুলে ধরে। প্রাচীন এথেন্স ও আলেক্সান্দ্রিয়ার জ্ঞানচর্চা কিংবা আধুনিক অক্সফোর্ডের শিক্ষা-কেন্দ্রিক নগরজীবনের সঙ্গে তুলনা করলে সাধারণ পাঠক এই ধরনের জ্ঞানকেন্দ্রের সামাজিক গুরুত্ব বুঝতে পারবেন; শিক্ষা ও নগরজীবনের এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে শিক্ষায়তনে আক্রমণ গোটা জনপদের জ্ঞানচর্চাকে আঘাত করে। বখতিয়ারের বাহিনীর হাতে সেখানে হত্যা ও লুট হয়েছিল, এবং লুটের সম্পদ নিয়ে ফিরে তিনি শাসকের কাছে সম্মান ও পুরস্কার পান। অর্থাৎ অপরাধের পরিণতি কেবল ব্যক্তিগত সম্পদলাভ ছিল না; সামরিক সাফল্য হিসেবে তার সামাজিক ও দরবারি স্বীকৃতিও ছিল [9]।
হয়েছিল।১ যখন পুস্তকের মর্মোদ্ধার করা হল তখন জানা গেল যে সমগ্র নগর ও দুর্গ নিয়ে এটি ছিল একটি শিক্ষায়তন (মাদ্রাসা)। হিন্দুদের ভাষায় শিক্ষায়তনকে বিহার’ বলা হয়ে থাকে।
এ বিজয় লাভের পর বহু লুণ্ঠিত দ্রব্য নিয়ে মোহাম্মদ বখতিয়ার প্রত্যাবর্তন করেন ও সুলতান কুতর্-উদ্-দীন-এর হুজুরে উপস্থিত হন। তিনি সেখানে (প্রভূত) সম্মান ও পুরস্কার লাভ করেন। দরবারে উপস্থিত আমিরদের মধ্যে একদল মোহাম্মদ বখতিয়ারের সুখ্যাতির প্রচার ও তাঁকে সুলতান কুতব্-উদ্-দীন (তাবারাহ) কর্তৃক সম্মান ও পারিতোষিক প্রদান দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। (সুলতানের) দরবারে মোহাম্মদ বখতিয়ারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা কালে পরিহাস, কৌতুক ও ছদা বিনয়ের সঙ্গে (তাঁরা যে কথাবার্তা বলেন) তা এমন পর্যায়ে এসে পড়ে যে শেষ পর্যন্ত তাঁকে শ্বেত-প্রাসাদে (একটি) হস্তীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে বলা হয়। শুধুমাত্র একটি কুঠার হস্তে তিনি হস্তীর
১। মোহাম্মদ বখতিয়ার কোন প্রতিআক্রমণের সম্মুখীন হয়েছিলেন কিনা বলা কঠিন। দুর্গাকারে নিষিত ও সুরক্ষিত এ বিহারে প্রবেশ করা যে খুব সহজসাধ্য ব্যাপার ছিলনা তা অনুমান করা যায়। আর বিহারবাসীরা যে প্রাণ-পণে দুর্গদ্বার আগলিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন এবং সাধ্যমত ছোটখাট আক্রমণও করেছিলেন এ অনুমান বক্তিসঙ্গত। অতি কষ্টে দুর্গয়ার ভেদ করে মোহাম্মদ বখতিয়ার যখন অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন তখন ভিতরে যাঁকে পেয়ে ছিলেন তাঁকে যে নির্বিচারে হত্যা করেছিলেন তা অনুমান করা যায়।
২। সং. বিহার [বি+হৃ+অ (ব)-তা] শব্দ দ্বারা সাধারণতঃ গমন, ভ্রমণ, বেড়ান, ক্রীড়া, কেলি ইত্যাদিকে বোঝায়। এ সমস্ত অর্থ থেকেই সম্ভবতঃ বিহার শব্দের আর এক অর্থ বৌদ্ধ দেবালয় বা নঠ হিসাবে ধরা হয়েছে। এ বিহার নাম থেকে পরবর্তীকালে সমগ্র অঞ্চল বিহার রাজ্য নামে পরিচিত হয়।
৩। মালিক কুতর্-উদ্-দীন ও মোহাম্মদ বখতিয়ারের মধ্যে এ সাক্ষাৎ কবে ও কোথায় ঘটেছিল মীনহাজের বর্ণনায় তা নেই। তবে এ সাক্ষাৎ ‘শ্বেতপ্রাসাদে’ ) قصر( ঘটেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। সমসাময়িক ঐতিহাসিক হাসান নিজামী তাঁর রচিত ‘তাজ-উল-মাসির’ গ্রন্থে বলে গেছেন যে ৫৯৯ হিজরীতে কালিনজর অধিকার করার পর কুতর্-উদ্-দীন বদাউনে গেলে সেখানে এ সাক্ষাৎকার ঘটে। বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি তুলনা করে ডক্টর আহমদ হাসান দানী যে পাঠ খাড়া করেছেন। (I.H, Q. XXX, P. 146) তা নিম্নে দেওয়া হল:
چون خاطر خطیر از ترتیب مهمات ولظم امور ولایت فارغ امد واحوال ممالک بصلاحمقرون وامال واما في بنجاج موصول شد و روی رایت خورشید بیگر بر سمت بداون که از امهات بلاد و معظمات ديار هندست کردانیده امد ومتعاب وصول ركاب فرنده ای و عنان جها الكثای ملك الأمراً اختيار الدین محمد بختیار که از ان انصار دولت و اعضاد مملکت بمزيد باس و بخدمت ممتاز بود و از حمات بیضه اسلام و حفظه تغوردون بكمال شجاعت و بسالت مستتنى و ذکر مساعی و مکارم او در اطراف هندوسند منتشر کشت وصیت غررات مشهورار در اقصی بود بدر سائر
রেডার্টির মতে এ সাক্ষাৎকার ঘটে দিল্লীতে।-৫৫২ পৃঃ
৪। এ বাক্য ও পূর্ববর্তী বাক্যের যে অনুবাদ বেভার্টি দিয়েছেন তাতে কিছু ব্যতিক্রম আছে। যথা:
‘A party of Amirs at the capital [Dihli), through the noising abroad of Muhammad-1-Bakht-yar’s praises, and at beholding the honour he received, and the gifts bestowed upon him by Sultan Kutb-ud-din, became envious of Muhammad-i-Bakht-yar, and at a convivial banquet, they treated him in a reproachful and supercili-ous manner, and were deriding him and uttering inuendoes and matters reached such a pitch that he was directed to combat with an elephant at the Kasr-i-Safed [White Castle]’ -p. 554.

এরপর নদিয়া অভিযানের বর্ণনায় রাজপ্রাসাদে প্রবেশ, তরবারির আঘাতে মানুষ ধরাশায়ী করা এবং রাজার ধনসম্পদ, অন্তঃপুরের নারী ও দাসদাসীদের বখতিয়ারের হাতে পড়ার কথা পাওয়া যায়। আক্রান্ত পরিবার ও নারীদের পরিণতি এখানে কেবল সম্পদলাভের হিসাবের পাশে লেখা হয়েছে। নারীদের এখানে নিজস্ব অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখা হচ্ছে না; তাঁরা ধনাগার ও অন্যান্য দখল করা সম্পদের পাশেই বিজয়ের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। রাজার পরাজয়ের সঙ্গে তাঁদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাও বিজয়ীর করতলগত হয়েছে। কোনো নারী কার স্ত্রী, মা, বোন বা কন্যা ছিলেন, সেই সম্পর্ক তাঁকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বানানোর অধিকার দেয় না। মানুষের জীবন ও স্বাধীনতার ওপর সামরিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার এই বিবরণ দখলদারি শাসনের নৈতিক চরিত্র স্পষ্ট করে। পরবর্তী অংশে গনিমতের বিধানে নারী ও শিশুকে কীভাবে বণ্টনযোগ্য সম্পদ হিসেবে দেখা হয়েছে, তা আমরা পূর্ণ উদ্ধৃতি দিয়ে দেখব [10]।
জন্য) এনেছেন।১ (এ ভাব তাদের মনের মধ্যে রইল) যে পর্যন্ত না (তিনি) লখমনিয়ার রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করে অসি নিষ্কাশন করে আক্রমণ শুরু করলেন।
এ সময়ে রায় (লখমনিয়াহ) ভোজনে বসেছিলেন ও তাঁর সম্মুখে স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত পাত্রে ভোজ্যদ্রব্য পরিবেশিত ছিল। এমন সমন রায়ের প্রাসাদ ও নগরের মধ্য থেকে আর্তনাদ (তাঁর কানে) এসে পৌঁছল। যখন তিনি প্রকৃত অবস্থা কি সে সম্পর্কে অবহিত হলেন তখন মোহাম্মদ বখতিয়ার রাজপ্রাসাদ ও রাজঅন্তঃপুরে আক্রমণ শুরু করে দিয়েছেন এবং লোকেদেরকে তরবারির আঘাতে ধরাশায়ী করছেন।
রায় নগ্নপদে পশ্চাৎত্ত্বার দিয়ে নিজ গ্রাসাদ থেকে পলায়ন করেন ও তাঁর সমুদয় ধনাগার, হেরেমের নারী দাসদাসী, (তাঁর) ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও (পুর) নারী তাঁর (মোহাম্মদ বখতিয়ারের) করতলগত
‘No fort, no protective wall of brick, is mentioned by any historian as guarding Navadwip then or ever afterwards, and such a defensive work seems unlikely to have existed in 1200 A. D. Most probably a bamboo palisade-like the Sal wood palisade of ancient Pataliputra noticed by Megasthenes-encircled the main portion of the city, with an octroi post at the gate.’
উত্তরে এটুকু বলা যেতে পারে যে এদেশে কোন নগর বা দুর্গকে বাঁশের বেড়া দিয়ে সুরক্ষিত করার দৃষ্টান্ত বা উল্লেখ কোথাও দেখা যায় না। ১২০০ খ্রীস্টাব্দে কেন তার বহু আগে নির্মিত অনেক দুর্গ বা নগরের ইষ্টক নিমিত বেষ্টনী প্রাচীরের চিহ্ন পাওয়া যায়। দুষ্টান্তস্বরূপ মহাস্থানগড় ও ভিতবগড়ের উল্লেখ করা যেতে পারে। তবে একথা সত্য যে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ইষ্টক প্রাচীরের স্কুলে মাটির প্রাচীর দ্বারাই সেকালে নগর বা দুর্গকে সুরক্ষিত করা হত। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এ রকম শত শত মৃত্তিকা নিমিত বেষ্টনী প্রাচীরের চিহ্ন আজও দেখা যায়।
বাঁশের বেড়া দিয়ে নবদ্বীপকে সুরক্ষিত করা হয়েছিল এমন ধারণা হাস্যকর বলে মনে হয়। মাটির প্রাচীর যে দেশে অতি সহজ ও চিরাচরিত প্রথা ছিল সেখানে বাঁশের প্রাচীর নির্মাণের কথা চিন্তাও করা যায় না। বাঁশের বেড়া নির্মাণ অধিক ব্যয়সাধ্য হওয়ার কথা এবং তা হত অতি সাময়িক ব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষার দিক থেকে অত্যন্ত বিপদজনক। মুসলমান আক্রমণে সমস্ত রাজার পক্ষে বাঁশের বেড়া নির্মাণ উদ্ভট কল্পনা ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। বাঁশের বেড়ার কথা তর্কের খাতিরে মেনে নিলেও সেখানে পরিখা থাকার কথা। কিন্তু কোন পরিখার চিহ্ন নবদ্বীপ অঞ্চলে নেই।
যেহেতু নবদ্বীপকে ‘নওদীয়াহ’ বলে ধরা হয়েছে সেখানে গৃহীত সিদ্ধান্তের অনুকূলে যুক্তি খাড়া করতেই হবে-তা যত মনগড়াই হোক না কেন-এমন একটা ধারণাই বোধ হয় বাঁশের বেড়া সম্পর্কে করা যায়।
১। সেকালে পশ্চিম দেশীয় বণিকেরা অশ্ব বিক্রয় করতে বাংলাদেশে আসতেন এ ইঙ্গিত এ বাক্য থেকে পাওয়া যায়। খুব সম্ভব এ ধরনের ব্যবস। সেকালে প্রচলিত ছিল। কিন্তু মুসলমানদের সমগ্র উত্তর ভারতসহ বিহার পর্যন্ত অধিকার করার পর এবং লক্ষক্ষ্মণসেনের রাজ্যে মুসলমান-ভীতি সৃষ্টি হবার পর এ ধরনের মানসিক অবস্থার অস্তিত্ব খুব স্বাভাবিক ঘটনা বলে ধরা যায় না।
তদুপরি পশ্চিম ও উত্তর ভারত থেকে অণু বিক্রেতাদের পথ নবদ্বীপ পর্যন্ত ছিল কিনা তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। বাংলাদেশে গৌড়-লক্ষ্মণাবতী, দেবকোট, মহাস্তান, তাম্রলিপ্ত ইত্যাদি প্রাচীন সহর পর্যন্ত এ ধরনের স্বল-বাণিজ্যপথ পশ্চিমাঞ্চল থেকে থাকার কথা। কিন্তু দুর্গম ও বসতিহীন ঝাড়খণ্ড অঞ্চল অতিক্রম করে অখ্যাত নবদ্বীপে এ বাণিজ্য-পথ প্রসারিত ছিল এটা কল্পনা করাও কঠিন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে স্যার যদুনাথসহ প্রায় সকল ঐতিহাসিকই স্বীকার করেছেন যে এখানে সেনদের রাজধানী ছিল না। তাঁরা অবশ্য এ স্বানকে তীর্থভূমি বলে আখ্যা দিয়েছেন। গঙ্গার তীরে অবস্থিত এ স্থানের তীর্থ মহিমা আগেও হয়ত ছিল। কিন্তু শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের পরে (১৪৮৬-১৫৩২ খ্রীঃ) এ স্থানের তীর্থ মহিমা যে বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে তা স্বীকার করতে হবে।
২। ফা. ‘মাঈদাহ্’ )یه০) শব্দের অর্থ ভোজনের টেবিল, কোন বিশেষ সময়ের আহার নয়। অনেকে এটিকে মধ্যাহ্ন ভোজ বলে অভিহিত করে নানা রকম উদ্ভট ‘থিউরী’ প্রচার করেছেন। রেডার্টি যথার্থই বলেছেন যে এটি ‘ডিনার’ না হয়ে প্রাতঃরাশও হতে পারে। এই হঠাৎ আক্রমণ সকালের দিকেই ঘটেছিল বলে অধিক সম্ভাব্য মনে হয়।
৩। মূল ফা. ‘হেরেম’ )حم( শব্দকে রেভার্ট স্ত্রীগণ (wives) বলেছেন। এ শব্দের অর্থ সোজাসুজি স্ত্রী নয়, রাজঅন্তঃপুরে রক্ষিত স্থান অথবা সেখানে বসবাসকারী নারীগণ। এতে স্ত্রী, রক্ষিতা, কন্যা সকলেই থাকতে পারেন।
৪। বলে: ‘বাস’ )خواص(। হাবিবী কর্তৃক গৃহীত পাঠ ‘খাসান’ )خواصان(

বখতিয়ারের হাতে এত বিপুল লুণ্ঠিত সম্পদ আসে যে মিনহাজ তার পরিমাণ ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে লিখছেন। হস্তী, ধনাগার এবং অন্যান্য সম্পদের দখল এই বিবরণে এসেছে। বিপুল সম্পদলাভকে লেখক বিজয়ের কৃতিত্ব হিসেবে তুলে ধরেছেন। অথচ সেই সম্পদ অন্য মানুষের কাছ থেকে সামরিক শক্তির সাহায্যে কেড়ে নেওয়া হয়েছে; বিজয়ীর প্রাপ্তির হিসাবের বিপরীতে রয়েছে পরাজিত মানুষের সম্পদহানি। বিজয়ীর কৃতিত্বের আড়ালে এই সম্পদ কার ছিল, কীভাবে তা হাতবদল হলো এবং পরাজিত মানুষের ওপর তার কী প্রভাব পড়ল—এই প্রশ্নগুলো চাপা পড়ে যায়। কোনো সেনাপতি বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন বলেই তিনি আক্রান্ত মানুষের কল্যাণ করেছেন, এমন সিদ্ধান্ত আসে না। উদ্ধৃতির শেষভাগে লক্ষ্মণসেনের উত্তরসূরিদের বঙ্গের অন্য অংশে কর্তৃত্ব বজায় থাকার তথ্যও রয়েছে; যা বাংলার অন্য অংশে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও পরবর্তী সংঘাতের ধারাবাহিকতার পরিচয় দেয় [11]।
হয় এবং তিনি অসংখ্য হস্তী অধিকার করেন। মুসলমান সৈন্যদের হস্তে এত লুণ্ঠিত দ্রব্য পতিত হয় যে তা বর্ণনা করা যায় না। যখন তাঁর সমুদয় সৈন্য এসে পৌঁছল তখন তিনি সমস্ত নগর অধিকার করে সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেন।*
রায় লখমনিয়াহ সকোনাত ও বঙ্গ রাজ্যের দিকে পৌঁছে গেলেন। তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন (অর্থাৎ তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিলেন)। তাঁর বংশধরগণ এ সময় পর্যন্ত বঙ্গরাজ্যে রাজত্ব করছেন।
১। ‘যখন তার সমুদয় সৈন্য এসে পৌঁছন’-এ বাক্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এতে দেখা যাচ্ছে শুধুমাত্র ১৮জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে মহারাজার প্রাসাদ তিনি অধিকার করেছিলেন। মোটেই বিশ্বাস্য ঘটনা বলে ধরা যায় না। ভূমিকার নওদীয়াহ্ বিজয় দ্রঃ।
২। সেখানে কতদিন ছিলেন এ উল্লেখ নেই। তবে তা যে খৰ অন্নদিনের জন্য তা পরবর্তী বর্ণনা থেকে অনুমান করা যায়।
৩। মহারাজা লক্ষক্ষ্মণসেন ১২০৬ খ্রীস্টাব্দে প্রাণত্যাগ করেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। মতান্তরে তিনি ১২০৫ খ্রীস্টাব্দে মৃত্যুমুখে পতিত হন।
৪। মীনহাজ-ই-সিরাজ ৬৫৮ হিজরী (১২৬০খ্রীঃ) সনে ‘তবকাত-ই-নাসিরী’ গ্রন্থ রচনা সমাপ্ত করেন। বিহার অধিকার ও তিব্বত অভিযানের বর্ণনা তিনি ৬৪১ হিজরী (১২৪৩ খ্রীঃ) সনে সংগ্রহ করেছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন (পরে দ্রঃ)। আলোচ্য ঘটনার বিবরণ কবে সংগ্রহ করেছিলেন সে উল্লেখ তিনি করেননি। তবে ৬৪১ হিজরীতে বা তার কাছাকাছি সময়ে এ বর্ণনা সংগৃহীত হয়েছিল এ ধারণা যুক্তিসহ। সেক্ষেত্রে ৬৪১ হিজরীতে বা তার কাছাকাছি সময়ে মহারাজ। লক্ষ্মণসেনের কোন বংশধর বঙ্গে রাজত্ব করেছিলেন তা মীনহাজের উক্তি থেকে ধরা যেতে পারে। পুস্তক সমাপ্তির সময় অর্থাৎ ১২৬০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত সেন বংশীয় রাজত্বকে টেনে নিয়ে যাবার পিছনে কোন যুক্তি আছে বলে মনে হয় না। অন্ততঃ মীনহাজের বর্ণনা থেকে এ ধারণা করা যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ মীনহাজ ৬৪৩ হিজরীতে (১২৪৫ খ্রীঃ) তোম্বরীল তোষাদের সঙ্গে লাখনৌতি ছেড়ে দিল্লী প্রত্যাবর্তন করেন। এর পরে তিনি আর বাংলাদেশে ফিরে আসেননি। দিল্লীতে অবস্থানকালে তিনি বঙ্গের সেনবংশের সংবাদ সংগ্রহ করে তাঁর গ্রন্থে তা লিপিবদ্ধ করে গেছেন সে অনুমানের পিছনে কোন গ্রহণযোগ্য যুক্তি আছে বলে মনে হয় না। ১২৫৯ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে বঙ্গে মুসলমানদের বিভিন্ন অভিযানের ইঙ্গিত থাকলেও কোন রাজা বা রাজবংশের উল্লেখ নেই। এতে মনে হয় ১২৪৫ সনের পরের কথা এটি নয়।
লক্ষক্ষ্মণসেনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র বিশ্বরূপসেন ১২২০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত এবং লক্ষক্ষ্মণসেনের অপর পুত্র কেশবসেন ১২২০ খ্রীস্টাব্দ থেকে ১২২৩ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন বলে তাঁদের বিভিন্ন তাম্রশাসন থেকে জানা যায়। সেনবংশের পরবর্তী রাজত্ব সম্পর্কে ফোন নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। গৌড়-লক্ষক্ষ্মণাবতীর মুসলিম শক্তি যে বঙ্গ রাজ্য অধিকারের জন্য বারবার প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন তবকাতের বর্ণনা (গিয়াসউদ-দীন ইওয়াজ খলজী দ্রঃ) থেকেই জানা যায়। আর তার সমর্থন পাওয়া যায় বিশ্বরূপ ও কেশব সেনের তাম্রশাসনে যেখানে তাদেরকে যবন বিজয়ী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
লক্ষক্ষ্মণসেনের সময় থেকেই সেন রাজ্যে ভাঙন শুরু হয়। বিদ্রোহ বা অন্য কোন কারণে রাজ্যের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন হবার দৃষ্টান্ত প্রস্ত প্রমাণেই পাওয়া যায়। পটিকারা (কুমিল্লা) অঞ্চলের রণবক্ষনন্ন হরিকেল দেবের তাম্রশাসন (১২২০ খ্রীঃ) ও দামোদরদেব প্রস্তুতিদের তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে ১২২০ খ্রীস্টাব্দের আগেই কুমিল্লা অঞ্চল সেন রাজাদের আওতার বাইরে চলে যায়। শ্রীমদভোম্মন পালদেবের তাম্রশাসন (১১৯৬ খ্রীঃ) থেকে ধারণা করা যেতে পারে যে লক্ষাণ-সেনের রাজত্বের শেষদিকে ডোন্মনপাল নামক এক বৌদ্ধ নৃপতি সুন্দরবন (খাড়ি) অঞ্চলে এক স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। চব্বিশ পরগণা, খুলনা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল নিয়ে গঠিত এ রাজ্য পুনরায় সেনদের অধিকারে এসেছিল বলে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। কুমিল্লা অঞ্চল যে সেনদের অধিকারে আর ফিরে আসেনি তা বোঝা যায় রণবন্ধ হরিকেল দেবের পরে দনুজরায় পর্যন্ত আরও কয়েকজন নৃপতির রাজত্ব করার দৃষ্টান্ত থেকে।
কেশব সেনের পর এ বংশের আর কোন নৃপতি রাজত্ব করেছিলেন কিনা সে সম্পর্কে কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। জনশ্রুতিতে অবশ্য দ্বিতীয় বল্লালসেন সহ আরও কোন কোন সেন নৃপতির কথা শোনা যায়। এঁদের মধ্যে ‘পঞ্চরত্ব’ নামক গ্রন্থে উল্লিখিত মধুসেন ছাড়া আর কেউ ঐতিহাসিক ব্যক্তি ছিলেন কিনা সে সম্পর্কে প্রচুর সন্দেহ আছে। ১২৮৯ খ্রীস্টাব্দে রাজত্বকারী বলে কথিত বৌদ্ধ নৃপতি (?) মধু সেন আদৌ ঐতিহাসিক ব্যক্তি কিনা, হলেও তিনি সেন বংশীয় কিনা তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ঘোড়শ শতকে রচিত বলে কথিত ‘বল্লাল চরিত’ নামক গ্রন্থে বণিত দ্বিতীয় বল্লাল সেন (১৩১০ খ্রীঃ ৭) যে (১৩১০ খ্রীঃ৭) যে কারনিক ব্যক্তি তাতে সন্দেহ নেই। ১২৮২ খ্রীস্টাব্দে সুলতান গিয়াস-উদ্-দীন বলবন কর্তৃক বিদ্রোহী মুখীস-উদ্-দীন তোম্বরীলকে নিহত করার পর বিক্রমপুরে কোন সেন বংশীয় রাজার রাজত্ব করার সম্ভাবনা নেই। তুম্বরীলের সময়েও সে সম্ভাবনার কথা চিন্তা করা যায় না।
এ সমস্ত কারণে ধারণা করা যেতে পারে যে ১২৪৫ খ্রীস্টাব্দের কিছু আগে বা পরে বঙ্গে সেন রাজত্বের অবসান ঘটে। ত্রয়োদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যে যেন রাজত্ব শেষ হয়ে যায় তাতে সন্দেহের অবকাশ কম। অবশ্য ইউজবকীর বর্ণনা থেকে দেখা যায় যে ১২৫৯ খ্রীস্টাবেদ তিনি ‘বঙ্গ’ অভিযানে গিয়েছিলেন (মালিক আরসালান খান সনজর-ই-চাত্ ২২ তবকত, ১৯ পরিচ্ছেদ দ্রঃ)। এতে প্রমাণিত হয় যে তখন পর্যন্ত বঙ্গের অনেকাংশ মুসলমান অধিকারে আসেনি। তবে সে সময়ে সেন বংশীয় কোন রাজা রাজত্ব করেছিলেন বলে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

এরপর আসে তিব্বত অভিমুখে বখতিয়ারের অভিযানের বিবরণ। এই অংশে বিশেষভাবে লক্ষ করার বিষয় হলো, বাহিনী বসতিপূর্ণ অঞ্চলে পৌঁছে লুটতরাজ শুরু করার পর স্থানীয় অধিবাসীরা প্রতিরোধে এগিয়ে আসে। আক্রমণকারীর ধর্মীয় পরিচয় ও উদ্দেশ্য যা-ই হোক, নিজের বাড়ি, ক্ষেত এবং জনপদ রক্ষার অধিকার স্থানীয় মানুষের ছিল। বিজয়ীর ভাষায় পরাজিত বা বিরোধী বাহিনীকে কী বলা হয়েছে, তা থেকে তাদের প্রতিরোধ অন্যায় হয়ে যায় না [12]।
পারে যে (মোহাম্মদ বখতিয়ার) সেতু অতিক্রম করে পঞ্চদশ দিবস ধরে উঁচু মালভূমি, উঁচু পর্বত, সঙ্কীর্ণ গিরিপথ এবং অনেক স্থান ও জনপদ অতিক্রম করে ঘোড়শ দিবসে তিব্বতের উন্মুক্ত (সম) তুমিতে পদার্পণ করেন।
ঐ (সমুদয়) অঞ্চলে (শস্য) ক্ষেত্র ছিল ও লোকের বসতিপূর্ণ জনপদ ছিল। (তারা) প্রথমে যে স্বানে উপস্থিত হয় সেখানে একটি দুর্গ ছিল। যখন মুসলমান সৈন্যগণ লুটতরাজ আরম্ভ করল (তখন ঐ) দুর্গের অধিবাসী ও পার্শ্ববর্তী স্বানের জনগণ লুঠতরাজের বিরুদ্ধে এগিয়ে আসলে যুদ্ধ আরম্ভহল। প্রাতঃকাল থেকে আরম্ভ করে সন্ধ্যার নামাজের সময় পর্যন্ত প্রচণ্ড লড়াই চলল। মুসলমান সৈন্যদের মধ্য থেকে বহু (লোক) নিহত ও আহত হল। ১
ঐ (শত্রুপক্ষের) সৈন্যদের সমুদয় অস্ত্র ছিল খণ্ডিত বাঁশের বর্ষা; এমন কি (তাদের) বর্ম, অশ্ববর্ষ, শিরস্ত্রাণ ও ঢাল ইত্যাদি সমুদয় অস্ত্র টুকরা টুকরা বাঁশের খণ্ডকে একত্রে সংযোজিত করে রেশমী সূতা দ্বার। ঘনভাবে (সেলাই করে) সন্নিবেশিত করে নির্মিত ছিল। সমুদয় লোক (সৈন্য) তীরন্দাজ ও তুর্কী ছিল এবং সুদীর্ঘ ধনুক (তাদের নিকট) ছিল।
যুদ্ধক্ষেত্রে যখন রাত্রি নেমে এল এবং যুদ্ধে (শত্রুপক্ষের) যারা বন্দী হয়েছিল তাদের একদলকে সম্মুখে আনা হল এবং (তাদের নিকট থেকে) অনুসন্ধান করা হল (তখন) তারা বলল, ‘এ স্থান থেকে পাঁচ ফার্সাং দূরে একটি শহর আছে। এটিকে করমবত্তন বলা হয়ে থাকে। সেখানে প্রায়
১। সমগ্র তিব্বত অভিযানে এটিই একমাত্র ঘটন। যেখানে মুসলিম বাহিনী যুদ্ধ করেছিল বলে মীনহাজ উল্লেখ করেছেন এবং সারাদিন ব্যাপী যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর অনেক সৈন্য নিহত ও আহত হয়। কিন্তু যুদ্ধের কারণ একটি অতি তুচ্ছ ঘটনা বলে মনে হয় এবং এত তুচ্ছ কারণে এত বড় যুদ্ধ হবার কথা স্বাভাবিক ঘটনা বলে মনে হয় না। এখানে যে একটি বড় ধরনের যুদ্ধ হয়েছিল তা অনুমান করা যায় বহুসংখ্যক মুসলমান সৈন্য নিহত ও আহত হবার উল্লেখ থেকে। মীনহাজ প্রকৃত ঘটনা বর্ণনা করেছেন বলে মনে হয় না। অথবা তিনি প্রকৃত ঘটন। জানতে পারেন নি এমন ও হতে পারে। এ সম্পর্ক ভূমিকার তিব্বত অভিযান দ্রঃ।
২। মূল ও প্যাঃ ‘বরেসনে খান’ )برسم خام(। ‘রেসম’ (১) কে হাবিবী রেশম বলে ধরে নিয়েছেন। রেভার্ট ‘রেসম’ শব্দ ‘রেশম’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছি কিনা সে সম্পর্কে নিশ্চিত নন বলে পাদটীকায় উল্লেখ করেছেন। তিনি যে পাঠ দিয়েছেন তা নিম্নরূপ: ‘The whole of the defensive arms of that host were of pieces of spear bambu, namely, their cuirasses and body armour, shields and helmets, whice were all slips of it, crudely fastened and stitched, overlapping (each other]; and all the people were Turks, archers and [furnished writh) long bows.
৩। মূলে: ‘তীর আন্দাজ ওয়া তুর্কী ওয়া কামান হায়ে’ )تیرانداز و ترکی و کمالهای(। রেভার্ট যে এ পাঠ গ্রহণ করেছেন তা উপরে উদ্ধৃত পাঠে দেখা যায়। হাবিবী তুর্কী’ শব্দ কেন বাদ দিয়েছেন সে কারণ উল্লেখ করেননি।
৪। রেভার্টি: ‘করবর্তন, করপত্তন বা করারপত্তন’ Kar-battan [or Kar-pattan, or Karar-pattan])। পাদটীকায় তিনি বলেন,
The text varles considerably here, and great discrepancy exists with respect to the name of this Important place. The oldest copy has کربن-Karbattan, possibly Kar-pattan, the next two oldest and best have کاربن-Karar-battan, or pattan, but what seemo the second (re) in this word may be (nun) thus Karan pattan. All the other coples have کرم بن – Karam-battan or Karam-pattan. Zubdat-ut-Tawarikh has کرشن which might be read Karshin, or Karan-tan; and some other histories have کرم سین-Karam-Sin.

অভিযানের বিপর্যয়ের পর বখতিয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অভিশাপ ও গালাগালির বর্ণনা এসেছে। এই অংশে অভিযোগকারীদের পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ: অনুবাদের টীকায় তাঁদের নিহত খলজি সৈন্যদের স্ত্রী ও পরিবারের মানুষ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নিজের অভিযানে অনুগামী সৈন্যদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার ফল তাঁদের পরিবারের ক্ষোভ হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ফিরে এসেছিল। সেনাপতির ক্ষমতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার মূল্য নিহত সৈন্যদের স্ত্রী ও সন্তানদেরও দিতে হয়েছে। মিনহাজ মানসিক যন্ত্রণা, অসুস্থতা ও মৃত্যুর বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর বিবরণে সামরিক বিপর্যয়, শোক এবং সেনাপতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ একসঙ্গে এসেছে। ক্ষমতা ও বিজয়ের আড়ালে সাধারণ পরিবারের দুর্দশা এখানেও স্পষ্ট। যে বিজয়কে ধর্মীয় বীরত্ব বলে মহিমান্বিত করা হয়, তার মূল্য অনেক সময় আক্রমণকারীর অধীনস্থ মানুষের পরিবারকেও দিতে হয় [13]।
সমুদয় লোক (তাদের মধ্যে অধিকাংশ) নারী ও শিশু (তাঁর বিরুদ্ধে) অভিযোগ করত ও (তাঁকে) অভিশাপ দিত ও গালি গালাজ করত। (ফলে তিনি অশ্বারোহণে বেশী নির্গত হতেন না।)
সেই (ঘোর) বিপদের সময়ে তাঁর মুখ থেকে অধিকাংশ (সময়) উচ্চারিত হত, ‘সুলতানে-ই-গাজী মু’ঈজ্জ-উদ্-দুনিয়া-ওয়াদ-দীন মোহাম্মদ সান-এর কি এমন কোন বিপদ ঘটেছে যে আমার ভাগ্য আমাকে পরিত্যাগ করেছে।’ তখন এমন ঘটেছিল যে সে সময়েই সুলতান-ই-গাজী (তাব সারাহ্) শাহাদৎ বরণ করেন।৩
মোহাম্মদ বখতিয়ার এই মানসিক যন্ত্রণায় অসুস্থ ও শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন ও আল্লার রহমতে প্রাণত্যাগ করেন। কেউ কেউ বলেন যে আলীসদান নামে তাঁর এক দুঃসাহসী ও দুধর্ষ আমির ছিলেন। নারকোটি অঞ্চলের জায়গীর তাঁর উপর ন্যস্ত ছিল। এই দুঃসংবাদ পেয়ে তিনি দেওকোটে আসেন।
১। এ সম্পর্কে জুবদাৎ-উৎ-তোয়ারিখ নামক গ্রন্থে যে বর্ণনা আছে রেভার্ট তার অনুবাদ দিয়েছেন:
‘by the time he reached Diwhkot, through excessive grief and vaxation illness overcame him; and, whenever he rode forth, the women of those Khalj who had perished stood on the house-tops and reviled him as he passed. This dishonour and reproach added to his illness’. P. 572.
‘Rauzat-us-Safa says his mind gave way under his misfortunes, and the sense of the disaster he had brought about resulted in hopeles melanchoty.’ রোভার্টি, ৫৭২ পৃঃ।
অধিকাংশ পণ্ডিতের মতে যোহাম্মদ বখতিযাবের তিব্বত অভিযান শুরু হয়েছিন লাখনৌতি সহর থেকে। যেহেতু তিনি লাখনৌতিতে প্রথমে রাজধানী স্বাপন করেন যেহেতু এ অভিযানের প্রাথমিক প্রস্তুতি সেখানেই নেওয়া হয়েছিল বনে ধরে নিলেও বিপর্যয়ের পরে মোহাম্মদ বখতিয়ারের দেবকোটে প্রত্যাবর্তন এবং সেখানকার পরিস্থিতি দেখে ধারণা হয় যে অভিযানের পূর্ণ প্রস্তুতি দেবকোটেই গৃহীত হয়েছিল এবং সেখান থেকেই প্রকৃত অভিযান শুরু হয়। অভিযানে অংশ গ্রহণ কারী সৈন্যদলের পরিবার-পরিজনদের দেবকোটে অবস্থান রত দেখে নিঃসংশয়ে ধারণা করা যেতে পারে যে অধিকাংশ সৈন্য দেবকোটের অধিবাসী ছিলেন। এতে আরও ধারণা হয় যে এখানে রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানীও স্থাপন করা হয়েছিল। মোহাম্মদ বখতিয়ারের পরবর্তী শাসনকর্তা মোহাম্মদ শিরান ও আলীমদান খলজীর শাসন কেন্দ্র দেবকোটে ছিল বলে তবকাতের বর্ণনায় পাওয়া যায়।
২। সুলতান-ই-গাজী মু’ইজ্জ-উদ-দীন মোহাম্মদ সাম-এর প্রতি মোহাম্মদ বখতিয়ারের পূর্ণ আনুগত্যের ইঙ্গিত এ বাক্যে পাওয়া যায়। মীনহাজের বর্ণনায় এমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না যে মোহাম্মদ সাম কোন কালে সৈন্য বা অর্থ দিয়ে মোহাম্মদ বখতিয়ারকে সাহায্য করেছিলেন। মালিক কুতব-উদ-দীনের নিকট থেকে তিনি সম্মান ও পারিতোধিক পেয়েছিলেন এই তথ্য পাওয়া যায়। তাতে মোহাম্মদ সামের কতটুকু হাত ছিল তার উল্লেখ কোথাও নেই।
মোহাম্মদ বখতিয়ার তাঁর এই চরম দুঃসময়ে মোহাম্মদ সামের কাছ থেকে সাহায্য চেয়েছিলেন বা আশা করেছিলেন, না সুলতানের শুভেচ্ছাই তাঁর বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার পক্ষে যথেষ্ট ছিল তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তবে মোহাম্মদ বখতিয়ার যে সুলতানের স্নেহপুষ্ট ছিলেন বর্তমান উক্তি থেকে। এ ধারণা করা যেতে পারে।
৩। সুলতানে গাজী ৬০২ হিজরী সনের ৩র। শাবন মাসে (১৫ই মার্চ, ১২০৬ খ্রীঃ) আততায়ীর হস্তে নিহত হন (৭ পৃষ্ঠার ২ পাদটীকঃ দ্রঃ)।
৪। মূল ও প্যাঃ ‘বার কোটি’ )بارکوئی(। ক: দিয়ারকোনি’ )بارکونی(। রেভার্ট: ‘নারণ-গোই’ ব। ‘নারণ কোই’ [14]। তিনি পাদটীকায় বলেন,
‘The name of this fief or district is mentioned twice or three times and the three oldest coples, and one of the best coples next in age, and the most perfect of all the Mss. have قمار لوئی )Naran-ko-eas above in all cases; and one-the best Petersburg copy-has a jazm over the last letter in addition, but all four have the hamzah. The Zubdat-ut-Tawarikh has also لارنكوى Naran-go-e or Naran-ko-e. The next best coples of the text have قمار کوقی )Narkote) in which in all Probability the has bean mistaken

এবার একই ঘটনার ইংরেজি অনুবাদও দেখা যাক। নিচের অংশগুলোতে বিহারের শিক্ষায়তনে হত্যা ও লুণ্ঠন, নদিয়ায় বণিক বলে ভুল করা অশ্বারোহীদের অতর্কিত প্রবেশ, রাজার পলায়ন, নারী ও ধনসম্পদের দখল এবং পরবর্তী সময়েও বঙ্গের অন্য অংশে সেনবংশীয় কর্তৃত্ব থাকার বক্তব্য রয়েছে। একই গ্রন্থের বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদ পাশাপাশি রাখলে হত্যাকাণ্ড, লুণ্ঠন এবং মানুষ দখলের বর্ণনা পাঠক সরাসরি মিলিয়ে দেখতে পারবেন। এখানে আক্রমণকারীর সাফল্যের হিসাবের মধ্যেই আক্রান্ত মানুষের দুর্দশা লেখা আছে। ধর্মযোদ্ধার গৌরবগাথা হিসেবে যে অভিযান বর্ণিত হয়েছে, তার বাস্তব কাজ ছিল মানুষ হত্যা, সম্পদ দখল এবং নারীসহ অধিবাসীদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা [15]।
with two hundred horsemen in defensive armour, and sud-denly attacked the place. There were two brothers of Farghānah, men of learning, one Nizām-ud-Din, the other Şamşām-ud-Din [by name], in the service of Muhammad-i-Bakht-yär; and the author of this book met with Şam-şam-ud Din at Lakhanawați in the year 641 H., and this account is from him. These two wise brothers were soldiers among that band of holy warriors when they reached the gateway of the fortress and began the attack, at which time Muhammad-i-Bakht-yär, by the force of his intre-pidity, threw himself into the postern of the gateway of the place, and they captured the fortress, and acquired great booty. The greater number of the inhabitants of that place were Brahmans, and the whole of those Brahmans had their heads shaven; and they were all slain. There were a great number of books’ there; and, when all these books came under the observation of the Musalmans, they sum-moned a number of Hindüs that they might give them information respecting the import of those books; but the whole of the Hindüs had been killed. On becoming ac-quainted [with the contents of those books], it was found that the whole of that fortress and city was a college, and in the Hindül tongue, they call a college مدرسه Bihar
When that victory was effected, Muhammad-i-Bakht-yär returned with great booty, and came to the presence of the beneficent Sultan, Kutb-ud-Din, I-bak, and re-ceived great honour and distinction. A party of Amirs at the capital [Dihli], through the noising abroad of Muham-
A few modern copies say, “he, Şamşām-ud-Din, discovered the author,” &c.
Jän-baz, which does not mean “active.”
Books on the religion of the Hindüs.
The Zubdat-ut-Tawarikh, which quotes our author verbatim on most occasions, says they sent for a number of Hindüs, who made them acquainted with the contents of the books, and in them it was written that that fortress and city was called a college, but, correctly, a Budhist monastery.
In Persian words derived or borrowed from the Sanskrit the letter & is often substituted for Nägarf -o-thus, Bihär or Wihär, but there is no e in the word: hence Behár is impossible.
He was not then Sultan, and his master, Sultan Mu’izz-ud-Din, was still alive, and was assassinated thirteen years afterwards, and, some time even after that event, Malik Kutb-ud-Din received his manumission and the title of Sultan from the nephew of Mu’izz-ud-Din. Our author does not mean that Kutb-ud-Din was Sultan at that very time. He was not Sulţăn, in fact, during the lifetime of Muhammad-i-Bakht-yar.
trustworthy persons should be despatched in order that they may, in a proper manner, investigate those peculiar characteristics.” In accordance with the Rae’s command, they sent trustworthy persons, and they made investigation respecting this matter, and, in the external form and figure of Muhammad-i-Bakht-yar, those characteristics they found.
When they became assured of these peculiarities, most of the Brahmans and inhabitants of that place left, and retired into the province of Sankanat, the cities and towns of Bang, and towards Kāmrüd; but to begin to abandon his country was not agreeable to Räe Lakhmaniah. The following year after that, Muhammad-i-Bakht-yär caused a force to be prepared, pressed on from Bihar, and suddenly appeared before the city of Nüdiah, in such wise that no more than eighteen horsemen could keep up with him, and the other troops followed after him. On reaching the gate of the city, Muhammad-i-Bakht-yär did not molest any one, and proceeded onwards steadily and sedately, in such manner that the people of the place imagined that mayhap his party were merchants and had brought horses for sale, and did not imagine that it was Muhammad-i-Bakht-yär, until he reached the entrance to the palace of Rae Lakh-maniah, when he drew his sword, and commenced an on-slaught on the unbelievers.
At this time Räe Lakhmaniah was seated at the head of his table, and dishes of gold and silver, full of victuals, were placed according to his accustomed routine, when a cry arose from the gateway of the Rae’s palace and the interior of the city. By the time he became certain what
All but the two oldest copies have Sähän [from साधु], which signifies merchants, shopkeepers, and the like-inoffensive people, not “chiefs.”
In the best and oldest copies of the text, Sanknat – نكاتis plainly written, with the exception of two, which have Sanat – سكات The Zubdat-ut-Tawäıfkh also has Saknät; but other works, including the Tabakät-i-Akbart and the Taskarat-ul-Mulük, say Jagnath. The part meant by our author more probably refers to a province of eastern Bang.
The more modern copies of the text have خودند-one even has نودبار instead of نودیه and نودیا
The text varies in different copies here. It appears from the above remark, that traders were in the habit of bringing horses from Bihar into the Räe’s territory, and such is stated by some other more modern writers.
Not at dinner” necessarily: it might have been the morning meal.
was the state of affairs, Muhammad-i-Bakht-yär had dashed forwards through the gateway into the palace, and had put several persons to the sword. The Rae fled bare. footed by the back part of his palace; and the whole of his treasures, his wives, and [other] females, his domestics and servants, his particular attendants, were taken, and the Musalmans captured a number of elephants, and such a vast amount of booty fell to their lot, as cannot be recorded’. When the whole of Muhammad-i-Bakht-yär’s army arrived, and the city and round about had been taken possession of, he there took up his quarters; and Räe Lakhmaņiah got away towards Sankanāt and Bang, and there the period of his reign shortly afterwards came to a termination. His descendants, up to this time, are rulers in the country of Bang’.
The Rãe, on hearing of the arrival of Muhammad-i-Bakht-yär, was dumbfounded. He fled alone and unattended, and succeerled in reaching a boat, and escaped. His boundless treasures, the accumulations of eighty years, fell into the possession of the Musalmans; and a large portion of them, the greatest rarities, were transmitted to Malik Kutb-ud-Din, for the Sultan. According to Munshi Shiăm Parshad, who wrote an account of Gaur Gaudah – گوده for Major William Franklin [In referring to this work I shall call it the Gaur MS.], Räe Lakhmanfah ruled from 510 to 590 H., which is correct. It was in the early part of the last-mentioned year that Muhammad-
i-Bakht-yär took Nikliah. His rule extended over a period of twelve years, and he was assassinated in the middle of the year 602 H.
Mr. Thomas, however, in his “PATHẦN KINGS OF DEHLI,” page 110, says Muhammad-i-Bakht-yär, whom he erroneously makes “Sipak sálár” of Awadh, “in A. H. 599, pushed his forces southward, and expelled, with but little effort, the ancient Hindu dynasty of Nuddeah.” Here is an error of ten years: Muhammad-i-Bakht-yär moved from Bihär in 589 H., and in the following year took Nüdiah by surprise. Were 599 H. correct, his sway over Lakhanawatt would have been less than three years, as he was assassinated about the middle of 602 H. See note, page 516, para. next to last, and note, page 572.
Here, as previously, some copies have Saknāt, and the other authors, previously referred to, Jagnath and Kämrüd. In some copies, the period of his life , &c.
1 The Rajah, it is said, escaped in a boat to Bikram-pür or Wikräm-pür. We shall also find that Sunargānw, near Bikräm-pür, continued to be a place of refuge for those who were discontented at Gaur, and was not finally reduced for a long time after the overthrow of Räe Lakhmapfah, who had a son, Madhob Sen, who had a son, Sü Sen, who by Hindüs is considered the last ruler. Bikram-pür is about eight miles south-east, from Dhakah, and is said to have been the principal residence of Balal Sen, the predecessor of Adisur, who preceded Lakhman Sen, the predecessor of our author’s Lakhmayfah, but he sometimes resided at Gaur, which did not become the



বিজয়ের ভাষায় আড়াল হওয়া মানুষের পরাজয়
এই বর্ণনাগুলোর সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো, হত্যা ও লুণ্ঠনকে লেখক অপরাধ হিসেবে বিচার করেননি; সেগুলো বিজয়ের কৃতিত্ব হিসেবে বিবৃত হয়েছে। আক্রমণকারীরা “ধর্মযোদ্ধা”, সম্পদ “লুণ্ঠিত দ্রব্য”, আর দখল করা নারী ও অধিবাসীরা বিজয়ের ফলাফলের তালিকায় স্থান পেয়েছেন। ইতিহাসের এই ভাষা ক্ষমতার দৃষ্টিভঙ্গি বহন করে। কিন্তু মানুষকে পণ্যে পরিণত করার জন্য একটি মহৎ শব্দ ব্যবহার করলেই তার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার কাজ মহৎ হয়ে যায় না। “গনিমত” বললে মালিকানা প্রতিষ্ঠার ধর্মীয় ধারণা বোঝা যায়; আক্রান্ত মানুষ সেই সম্পদ বা নিজের শরীর স্বেচ্ছায় হস্তান্তর করেছিলেন—এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। ফলে সম্পদলাভের গৌরব এবং মানুষের অধিকার লঙ্ঘনের বিচার একই বিষয় নয়। যে সেনাপতি নিজের ক্ষমতা বাড়িয়েছেন, তিনি যাদের ওপর ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছেন তাদের মুক্তিদাতা হয়ে যাননি।
এখানে আত্মরক্ষা ও আগ্রাসনের পার্থক্যও নির্দিষ্ট। তিব্বত অভিমুখে উদ্ধৃত অভিযানে বাহিনী স্থানীয় জনপদে লুটতরাজ শুরু করেছে, তারপর অধিবাসীরা প্রতিরোধে এসেছে। এই বিবরণে স্থানীয় মানুষের প্রতিরোধকে প্রথম আক্রমণ বলে সাজানো যায় না। একইভাবে অতর্কিত প্রবেশের সামরিক দক্ষতা দিয়ে বিজিত মানুষের সম্মতি প্রমাণ হয় না। দ্রুত জয় পাওয়া, কম সৈন্যে প্রাসাদ দখল করা কিংবা প্রতিপক্ষকে অবাক করা যুদ্ধকৌশলের বিষয়; সেখান থেকে কোনো ভূখণ্ডে অন্যের শাসন চাপানোর নৈতিক অধিকার আসে না। জিহাদকে মুক্তিযুদ্ধ বলে চালানোর এই সমস্যাটি বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে সংশয়ের ইসলামিক জিহাদ কি মুক্তিযুদ্ধ বা গেরিলাযুদ্ধ? প্রবন্ধে।
বখতিয়ারের ঘোড়া ও জিহাদী চেতনা
উপরের উদ্ধৃতিগুলোতে বখতিয়ারের বাহিনীর হত্যা, শিক্ষায়তনে আক্রমণ, সম্পদ লুণ্ঠন এবং নারীসহ মানুষের দখল হওয়ার বিবরণ পাওয়া গেল। অথচ ঐতিহাসিক স্মৃতিতে অনেক সময় আক্রমণকারীর নাম গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হয়, আর অতীশ দীপঙ্কর ও মহাস্থবির শীলভদ্রের মতো জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত বাঙালি পণ্ডিতদের পরিচয় আড়ালে থাকে। শিশুকিশোরদের কাছে একজন হত্যাকারী ও লুটকারীর অভিযানকে নিছক বীরত্ব হিসেবে হাজির করলে ইতিহাসের নৈতিক বিচার উল্টে যায়: মানুষের ওপর কী করা হয়েছে, তা বিচার না করে কত দ্রুত কত ভূখণ্ড জয় করা হয়েছে, সেটিই প্রশংসার মানদণ্ড হয়ে ওঠে। আল মাহমুদের “বখতিয়ারের ঘোড়া” কবিতায় এই আক্রমণকারীকে “আল্লার সেপাই” ও “দুঃখীদের রাজা” হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই কবিতায় রক্ত, বারুদ এবং জিহাদের আকাঙ্ক্ষা ফিরে ফিরে আসে। আসুন, কবিতাটি সম্পূর্ণ পড়ি এবং তার মধ্যে ইতিহাসের হত্যাকারী কীভাবে ধর্মীয় নায়ক হয়ে ওঠেন, তা দেখি।
বখতিয়ারের ঘোড়া- আল মাহমুদ
—————————————–
মাঝে মাঝে হৃদয় যুদ্ধের জন্য হাহাকার করে ওঠে।
মনে হয় রক্তই সমাধান, বারুদই অন্তিম তৃপ্তি;
আমি তখন স্বপ্নের ভেতর জেহাদ, জেহাদ বলে জেগে উঠি।
জেগেই দেখি কৈশোর আমাকে ঘিরে ধরেছে।
যেন বালিশে মাথা রাখতে চায় না এ বালক,
যেন ফুৎকারে উড়িয়ে দেবে মশারি,
মাতৃস্তনের পাশে দু’চোখ কচলে উঠে দাঁড়াবে এখুনি;
বাইরে তার ঘোড়া অস্থির, বাতাসে কেশর কাঁপছে।
আর সময়ের গতির ওপর লাফিয়ে উঠেছে সে।
না, এখনও সে শিশু। মা তাকে ছেলে ভোলানো ছড়া শোনায়।
বলে, বালিশে মাথা রাখো তো বেটা। শোনো
বখতিয়ারের ঘোড়া আসছে।
আসছে আমাদের সতেরো সোয়ারি
হাতে নাংগা তলোয়ার।
মায়ের ছড়াগানে কৌতূহলী কানপাতে বালিশে
নিজের দিলের শব্দ বালিশের সিনার ভিতর।
সে ভাবে সে শুনতে পাচ্ছে ঘোড়দৌড়। বলে, কে মা বখতিয়ার?
আমি বখতিয়ারের ঘোড়া দেখবো।
মা পাখা ঘোরাতে ঘোরাতে হাসেন,
আল্লার সেপাই তিনি, দুঃখীদের রাজা।
যেখানে আজান দিতে ভয় পান মোমেনেরা,
আর মানুষ করে মানুষের পূজা,
সেখানেই আসেন তিনি। খিলজীদের শাদা ঘোড়ার সোয়ারি।
দ্যাখো দ্যাখো জালিম পালায় খিড়কি দিয়ে
দ্যাখো, দ্যাখো।
মায়ের কেচ্ছায় ঘুমিয়ে পড়ে বালক
তুলোর ভেতর অশ্বখুরের শব্দে স্বপ্ন তার
নিশেন ওড়ায়।
কোথায় সে বালক?
আজ আবার হৃদয়ে কেবল যুদ্ধের দামামা
মনে হয় রক্তেই ফয়সালা।
বারুদই বিচারক। আর
স্বপ্নের ভেতর জেহাদ জেহাদ বলে জেগে ওঠা।
কবিতায় স্বপ্ন, কৈশোর, মায়ের ছড়া এবং ঘোড়ার শব্দের সঙ্গে যুদ্ধের রোমাঞ্চ মিশেছে। কিন্তু “রক্তই সমাধান” ও “বারুদই বিচারক”—এই ধারণা বিচারবুদ্ধির জায়গায় অস্ত্রের ক্ষমতাকে বসায়। একজন মানুষ দুঃখীদের রাজা কি না, তা নির্ধারণ করতে তাঁর হাতে বিপন্ন মানুষের অভিজ্ঞতা দেখতে হয়; তাঁকে আল্লাহর সৈনিক বলা সেই প্রশ্নের উত্তর দেয় না। আগের দলিলে যাদের হত্যা ও লুটের কথা আছে, কবিতায় তাদের কণ্ঠ নেই। নিহত শিক্ষক ও ভিক্ষু, বন্দি নারী কিংবা সম্পদ হারানো অধিবাসীর অনুপস্থিতিই আক্রমণকারীকে নির্দোষ বীর হিসেবে কল্পনা করার সুবিধা তৈরি করে। এই ধরনের সাহিত্যকে ইতিহাসের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করলে সামরিক বিজয়ের ধর্মীয় রোমাঞ্চ মানুষের ক্ষয়ক্ষতির স্মৃতিকে সরিয়ে দেয়। কবিতার সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা করা যায়, কিন্তু সেই সৌন্দর্য হত্যাকে মানবিক কাজ কিংবা লুটকারীকে মুক্তিদাতা বানায় না।
মুঘল আমল ও ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী
বখতিয়ারের আগে ও পরে বিভিন্ন মুসলিম শাসক ভারতীয় উপমহাদেশে অভিযান চালিয়েছেন। সমস্ত অভিযানের বিস্তারিত ইতিহাস এই প্রবন্ধের বিষয় নয়; এখানে বিশেষভাবে দেখা হচ্ছে, বিজিত অমুসলিম মানুষের ওপর কর্তৃত্ব, যুদ্ধ, বন্দিত্ব ও সম্পদ দখলকে ইসলামি আইন কীভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। এই আলোচনায় ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। আল-ফাতাওয়া আল-আলমগিরিয়্যা বা আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা নামে পরিচিত এই আরবি আইনসংকলন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হয়। হানাফি ফিকহের স্বীকৃত গ্রন্থগুলো থেকে বিভিন্ন বিধান সংগ্রহ করে এটিকে সাজানো হয়েছে। কোরআন ও হাদিসের ধর্মীয় ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো হানাফি আইনপরম্পরার হিদায়া, মাবসুত, মুহিতসহ স্বীকৃত গ্রন্থের সিদ্ধান্ত এই সংকলনে ব্যবহৃত হয়েছে। এসব সূত্রের মাধ্যমে যুদ্ধ, সম্পদ এবং বিজিত মানুষের অবস্থান সম্পর্কে বিধানগুলো একটি প্রাতিষ্ঠানিক আইনগত কাঠামো পেয়েছে। নিচের উদ্ধৃতিতে সেই গ্রন্থগুলোর নাম নিজেই আছে। এই উৎসপরিচয় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে কোনো সেনাপতির ব্যক্তিগত খেয়াল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না; যুদ্ধ ও বিজিত মানুষের অবস্থান সম্পর্কে একটি প্রতিষ্ঠিত ফিকহি পরম্পরার বিধান পরীক্ষা করা হচ্ছে।
সংকলনকারীদের সংখ্যা সম্পর্কে প্রচলিত বিবরণে পাঁচশ আলেমের কথা এবং তাঁদের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার তিনশ, ইরাকের একশ ও হেজাজের একশ জনের বিভাজন উল্লেখ করা হয়। সংকলন-ইতিহাসের অন্য বিবরণে শেখ নিজাম বুরহানপুরির নেতৃত্বে চার সহকারী ও তাঁদের অধীন দলগুলোর কথা রয়েছে। টিডিভি ইসলাম বিশ্বকোষ অনুযায়ী কাজটি ১৬৬৪–১৬৭২ সালে সম্পন্ন হয় [16]। বহু বছরের এই সংকলনে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়, দাসত্ব, যুদ্ধ, সম্পত্তি, আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক, কর ও লেনদেনের বিধান স্থান পেয়েছে। এটি হানাফি আইনের একটি প্রভাবশালী ভিত্তিগ্রন্থ। রাজপৃষ্ঠপোষকতায় সংকলিত এই বিধানগুলো ধর্মীয় জ্ঞান, বিচারব্যবস্থা এবং শাসনক্ষমতার সম্পর্ক বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মুহাম্মদ খালিদ মাসুদের গবেষণায় সংকলনটির রাষ্ট্রীয় অবস্থান, রাজপৃষ্ঠপোষকতা এবং বিচারব্যবস্থার সঙ্গে এর সম্পর্ক আলোচনা করা হয়েছে [17]। আমাদের আলোচনার নির্দিষ্ট প্রশ্ন হলো, এই গ্রন্থে অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, তাঁদের অধিকার, গনিমত এবং বন্দি মানুষের ওপর কর্তৃত্ব সম্পর্কে কী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আসুন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের অনুবাদ থেকে সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো সম্পূর্ণ পড়ি [18]।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
জিহাদ ও লড়াইয়ের পদ্ধতি
১. মাসআলা: ইমামুল মুসলিমীন (শাসক) যখন দারুল ইসলামে প্রবেশের উদ্যোগ নেবেন তখন তার কর্তব্য হবে বাহিনী পরিদর্শন করে আশ্বারোহী ও পদাতিকের সংখ্যা জেনে নেয়া। তাদের নাম লিপিবদ্ধ করা (এবং প্রয়োজনীয় বিষয় অবগত হওয়া) (শরহে তাহাবী)।
২. মাসআলা: মুসলিম বাহিনী দারুল হারবে প্রবেশ করে কোন শহর বা দুর্গ অবরোধ
করে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিবে১ যদি তারা দাওয়াতে সাড়া দেয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে বিরত থাকবে। আর যদি তারা সাড়াদানে বিরত থাকে তাহলে তাদেরকে জিযয়া প্রদানের আহবান জানাবে (হিদায়া)। যদি তারা জিয়া দিতে সম্মত হয় তাহলে মুসলমানদের যাবতীয় সুবিধা ও দায় তাদের ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে (কান্য)।
উপরোক্ত হুকুম ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে যাদের থেকে (ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে) জিযয়া কবুল করা যায়। অতএব যার থেকে জিযয়া গ্রহণ করা যায় না তাদেরকে জিয়া প্রদানের প্রতি আহবান জানানো হবে না (তাবয়ীন)। 510
উল্লেখ থাকে যে, কাফিররা কয়েক শ্রেণীতে বিভক্ত:
প্রথম শ্রেণী: ঐ সমস্ত লোক যাদের থেকে জিযয়া নেওয়া (সর্বসম্মতিক্রমে) জাইয নেই।
তারা হলো, আরবের ঐ সমস্ত মুশরিক যারা আসমানী কোন কিতাবেরই অনুসারী নয়। অতএব মুসলমানগণ যখন তাদের উপর বিজয়ী হবে, হয় তারা পুরুষদের ইসলাম কবুল করবে, নতুবা তাদের হত্যা করা হবে। অবশ্য তাদের নারী ও শিশুরা মালে গনীমত হিসাবে গণ্য হবে।
দ্বিতীয় শ্রেণী: ঐ সকল লোক যাদের থেকে সর্বসম্মতিক্রমে জিয়া নেয়া জাইয। তারা হলো, আসমানী কিতাবের অনুসারী। আরব বা অনারব ইয়াহুদী খৃস্টানরা এবং আরব বা অনারব অগ্নিপূজকরা।
তৃতীয় শ্রেণী: ঐ সমস্ত লোক যাদের থেকে জিযয়া আদায় করার ব্যাপারে ফকীহদের মতপার্থক্য রয়েছে। তারা হলো, উপরে বর্ণিত জনগোষ্ঠী ছাড়া অন্যরা। তবে আমাদের হানাফী মাযহাব অনুযায়ী তাদের থেকে জিযয়া আদায় করা ওয়াজিব (মুহীত)।
৩. মাসআলা: যাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌছেনি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত
দেয়া ছাড়া লড়াই শুরু করা জাইয নেই (হিদায়া)। মুসলমানগণ ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো ব্যতীত যদি তাদের সাথে লড়াই করে তারা গুনাহগার হবে। তবে তাদের জানমাল ক্ষতি করার দায় মুসলমানদের উপর আরোপিত হবে না। যেরূপ তাদের নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে তাদেরকে দায়বদ্ধ করা হয় না (মাবসূত)। যাদের কাছে ইতোপূর্বে দাওয়াত পৌঁছেছে অতিরিক্ত সতর্কীকরণ হিসাবে তাদেরকেও (পুনরায়) দাওয়াত দেওয়া মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়২ (হিদায়া)।
১. কেননা হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সা) ইসলামের প্রতি দাওয়াত না দিয়ে কোন কাউমের বিরুদ্ধে লড়াই করেন নি।
২. কেননা বিশুদ্ধ বর্ণনায় প্রমাণিত যে, নবী (সা) অসতর্ক অবস্থায় বনী মুসতালিকের উপর হামলা করেছিলেন এবং উসামা (রা)-কে দায়িত্ব দিয়েছিলেন উবনা বস্তিতে খুব জোরে হামলা চালানোর এবং বস্তি জ্বালিয়ে দেয়ার আর অসতর্ক হানা কখনো দাওয়াত দিয়ে হয় না।
৫০৩
তবে এটা মুস্তাহাব হওয়ারও দু’টি শর্ত। প্রথমতঃ পুনঃদাওয়াতে মুসলমানদের কোন রূপ অনিষ্টের সম্ভাবনা না থাকা। যেমন অতিরিক্ত সময়কে তারা সমরায়োজনের কাজে লাগাবে। কিংবা কোন কূট-কৌশল অবলম্বন করে তাহলে এক্ষেত্রে লড়াইর পূর্বে পুনরায় দাওয়াত দেওয়া মুস্তাহাব নয়।
দ্বিতীয় শর্তটি হলো: পুনঃদাওয়াত দ্বারা তাদের ইসলাম গ্রহণের সম্ভাবনা থাকা। যদি
সম্ভাবনা না থাকে তাহলে তাদেরকে দাওয়াত দিবে না (মুহীত)। কাজেই যে ভূখণ্ডের কাফিরদের নিকট একবার ইসলামের দাওয়াত পৌছেছে তাদের উপর রাত্রে অথবা দিনে অতর্কিত হামলা চালালে অন্যায় হবে না (মুহীত: সারাসী)।
যদি তারা (ইসলামের দাওয়াত প্রত্যাখান করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করবে এবং লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে (ইখতিয়ার: শরহুল মুস্তার)। তাদের বিরুদ্ধে মিনজানিক (কামান) মোতায়েন করবে, জ্বালাও পোড়াও চালাবে, (বাঁধ ভেঙ্গে বা অন্য উপায়ে) তাদের উপর পানি ছেড়ে দিবে এবং তাদের বৃক্ষ নিধন করবে এবং তাদের শষ্য, ফসলাদি নষ্ট করবে (হিদায়া)। তাদের দুর্গসমূহ ভেঙ্গে বিরান করে দিবে ও পানি বহিয়ে তা ডুবিয়ে দিবে এবং তাদের দালান প্রাসাদ বিধ্বস্ত করে ফেলবে। হযরত হাসান ইন্ন যিয়াদ (র) বলেন, এ যদি জানতে পারে যে, উক্ত দুর্গে কোন মুসলমান কয়েদী নেই। অতএব যদি তা জানতে না পারে তবে জ্বালানো এবং পোড়ানো জাইয নেই। কিন্তু আমাদের বক্তব্য হলো, আমরা যদি এ কাজ থেকে মুসলিম বাহিনীদেরকে বিরত রাখি তবে তাদের জন্য মুশরিকদের সাথে লড়াই করে জয়লাভ করা কঠিন হবে। তাছাড়া খুবই কম দুর্গ এমন আছে যাতে বিপক্ষীয় বন্দী থাকে না। তবে এসব কর্মকাণ্ড মুশরিকদের উদ্দেশ্যেই করবে (মাবসূত)।
তাদের মাঝে মুসলিম বন্দী বা ব্যবসায়ী থাকলেও তাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করতে বাঁধা নেই।১ যদি তারা মুসলিম বালকদের কিংবা বন্দীদের ঢাল রূপে ব্যবহার করা হয় তাহলেও তাদের প্রতি তীর বর্ষণ থেকে বিরত থাকবে না। অবশ্য কাফিরদের প্রতি তীর বর্ষণের নিয়্যত করবে। ২ ঐ মুসলমানদের যে ক’জন তাদের তীর বর্ষণের শিকার হবে তাদের দিয়্যত মুজাহিদদের উপর ওয়াজিব হবে না। আর কাফফারাও ওয়াজিব হবে না। ৩
৪. মাসআলা: মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে নারী ও কুরআন শরীফ নিয়ে যাওয়া দোষের না, যদি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু নিরাপদ নয় এমন ক্ষুদ্র বাহিনীর সাথে নিয়ে যাওয়া মারূহ। কোন মুসলমান যদি নিরাপত্তা নিয়ে তাদের দেশে প্রবেশ করে এবং তারা যদি প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী হয়, তাহলে কুরআন শরীফ সঙ্গে নিতে বাধা নেই (হিদায়া)।
৫. মাসআলা: বড় বাহিনীতে প্রয়োজনীয় সেবা কর্মের জন্য বয়স্কা নারীদের নেয়া যায়। পক্ষান্তরে যুবতী নারীর জন্য গৃহই অধিক নিরাপদ। তবে ফিতনার আশঙ্কা থাকার কারণে
১. কেননা ইসলামের কেন্দ্র থেকে তীর বর্ষণের মাধ্যমে বৃহৎ ক্ষতিরোধ করা যায় পক্ষান্তরে মুসলিম বন্দী ও ব্যবসায়ী নিহত হওয়ায় সীমিত ক্ষতি তাছাড়া খুব কম দুর্গই মুসলমান থেকে খালি হয়। সুতরাং তা বিবেচনা করে যদি বিরত থাকতে হয় তাহলে তো জিহাদের দরজাই বন্ধ হয়ে যাবে।
২. কেননা কার্যত: পার্থক্য করা অসম্ভব হলেও উদ্দেশ্যগতভাবে তা সম্ভব। তাছাড়া আদেশ পালনের দায়িত্ব সাধ্য অনুযায়ী বিবেচিত।
৩. কেননা জিহাদ হলো ফরজ, আর ফরয পালনের সাথে “দণ্ড” যুক্ত হতে পারে না।
৪. যেমন রান্নাবাড়ি, পানি পান করানো, সেবা শুশ্রূষা করা ইত্যাদি।
৭. মাসআলা: বন্দীদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করা (অর্থাৎ তাদেরকে দাস কিংবা যিম্মী না বানিয়ে কিংবা হত্যা না করে এমনিতেই ছেড়ে দেয়া জাইয নেই১ (কাফী)।
৮. মাসআলা: ইমাম মুহাম্মদ (র) বলেন, যদি মুশরিক শিশুদের সঙ্গে তাদের মাতাপিতারাও বন্দী হয় তাহলে ঐ শিশুদেরকে মুক্তিপণ২ হিসাবে দেয়া যাবে। আর যদি শুধু শিশুরা বন্দী হয় (তাদের মাতা-পিতারা বন্দী না হয়) এবং তাদেরকে দারুল ইসলামে নিয়ে আসা হয় তাহলে তাদেরকে মুক্তিপণ হিসাবে দেওয়া যাবে না।
অনুরূপ যদি দারুল হরবেই গনীমত বণ্টন করা হয় এবং একটি শিশু কোন ব্যক্তির অংশে পড়ল কিংবা তথায় গনীমতের মাল বিক্রি করা হলে ঐ ব্যক্তি ক্রয় সূত্রে সে শিশুটির মালিক হলো তাহলে উক্ত শিশু ঐ ব্যক্তিরই অনুবর্তীরূপে মুসলমান বলে বিবেচিত হবে (মুহীত)।
৯. মাসআলা: ইমাম মুহাম্মদ (র) বলেন, মুসলমানরা যদি কাফিরদের থেকে ঘোড়া এবং
হাতিয়ার নিয়ে নেয়। এরপর তারা তা মালের বিনিময়ে ছাড়িয়ে নিতে চায় তাহলে তাদেরকে এ সুযোগ প্রদান জাইয হবে না। পক্ষান্তরে যদি তারা এ দরখাস্ত করে যে তোমরা আমাদের বন্দী লোকদের আমাদেরকে দিয়ে দাও আর এর পরিবর্তে একজন কিংবা বলল দু’জন মুশরিক নিয়ে নাও তাহলে মুসলমানদের জন্য এরূপ করা জাইয নেই। দারুল হারবে বন্দী মুসলমানদের বিনিময়ে দিরহাম-দিনার এবং যুদ্ধের দ্বারা উপকরণ বা উপাদান নয় এমন জিনিস দেয়া যায়। যেমন বস্ত্র, খাদ্য ইত্যাদি। যুদ্ধের উপকরণ দেয়া জাইয নেই। যেমন অস্ত্র, ঘোড়া, লোহা। (সিরাজুল ওয়াহ্হাজ)।
১০. মাসআলা: ইমাম মুহাম্মদ (র) সিয়ারে কবীরে উল্লেখ করেছেন, কোন আযাদ মুসলমান বা যিম্মী যদি দারুল হারবে বন্দী থাকে। এমতাবস্থায় সে তাদের ওখানেই নিরাপত্তাধীন কোন মুসলমান বা যিম্মীকে বলল, তুমি আমাকে (মুক্তি দিয়ে) মুক্ত কর বা ক্রয় কর, এরপর সে তাই করল এবং তাকে দারুল ইসলামে নিয়ে এলো। তাহলে সে আযাদ বলে গণ্য হবে। আর মুক্তিপণ বা ক্রয় মূল্য ঐ ব্যক্তির উপর ঋণ হিসাবে বিবেচিত হবে। সুতরাং আদিষ্ট ব্যক্তি যে পরিমাণ মাল মুক্তিপণ দিয়েছিল তা তার থেকে আদায় করে নিবে। তবে আদায়কৃত মুক্তি দিয়্যত সমপরিমাণ হতে হবে। অতএব যদি দিয়্যতের নিসাব থেকেও বেশী মুক্তিপণ আদায় করে তাহলে এক্ষেত্রে সে দিয়্যতের নিসাব পরিমাণ মালই আদায় করতে পারবে এর চেয়ে বেশী নয়।
অনেকে বলেছেন যে ইমাম আবু হানীফা (র)-এর বক্তব্য অনুযায়ী এ হুকুমই কার্যকর হওয়া উচিৎ যে আদিষ্ট ব্যক্তি মুক্তি হিসাবে যে পরিমাণই আদায় করুক তা আদেশ দাতা (বন্দী) থেকে আদায় করে নিবে অর্থাৎ দিয়্যতের নিসাব থেকে কম হোক বা বেশী হোক তাতে কোন পার্থক্য হবে না। তবে বিশুদ্ধতম কথা হলো (ইমাম আবু হানীফা, আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মদ (র) তাঁদের সকলের নিকট এ ক্ষেত্রে ঐ হুকুমই প্রযোজ্য (যা প্রথমে উল্লেখ করা হয়েছে।
১. কেননা ইরশাদ হচ্ছে: তোমরা মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা করো (সূরা বাকারা) তাছাড়া তাদেরকে বন্দী করে হাতের মুঠোয় আনার কারণে তারা দাস হওয়ার উপযুক্ত এবং তাতে রয়েছে মুসলমানদের হক। সুতরাং কোন লাভ ও বিনিময় ছাড়া উক্ত হক রহিত করা জাইয হবে না। এতদ্ব্যতীত এদের দ্বারা পরবর্তীতে মুসলমানদের ক্ষতি ও অনিষ্টতার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
২. কারণ এগুলোর যুদ্ধের সামান এবং যুদ্ধ ক্ষেত্রে দুশমনকে পরাস্ত করার অন্যতম মাধ্যম।
আর তাদের বাসন পত্র এবং আসবাবপত্রসহ ঘরের যাবতীয় আসবাব পত্র এমনভাবে ভেঙ্গে চুরমার করে দিবে যেন পরবর্তীর্তে এসব দ্বারা উপকৃত না হতে পারে। আর সকল ধরনের তরল জাতীয় পদার্থ প্রবাহিত করে দিবে, যেন তারা পরবর্তীতে এসব দ্বারা উপকৃত না হতে পারে। এসব কর্মকাণ্ড এজন্য করা হবে যাতে তারা ক্রোধান্বিত হয়ে উঠে।
১৮. মাসআলা: দারুল হারবের অভিযান থেকে ফেরার সময় যদি বন্দীদের সঙ্গে আনা
তাদের সম্ভব না হয় তাহলে পুরুষদেরকে হত্যা করা হবে যদি ইসলাম গ্রহণ না করে এবং নারী, শিশু ও বৃদ্ধাদেরকে খাদ্য ও পানীয় বিহীন নির্জন স্থানে ফেলে আসবে, যেন তারা ক্ষুধা-পিপাসায় মারা যায়। কেননা হাদীসে নিষেধাজ্ঞা আসার কারণে হত্যা করা সম্ভব নয়, আবার বাঁচিয়ে রাখাও বিশেষ কোন যুক্তি নেই।১
একারণেই মুসলমানরা যদি দারুল হারবে কোথাও সাপ বা বিচ্ছু পায় তবে তারা বিচ্ছুর লেজ কেটে দিবে আর সাপ হলে তার দাঁত ভেঙ্গে দিবে যেন মুসলমানদের ওখানে থাকা অবস্থায় কোন ক্ষতি না হয়। আর তাদের একেবারেই মেরে ফেলবে না যেন তাদের বংশ পরম্পরা বাকি থাকে পরবর্তীতে তাদের বংশধররা কাফিরদেরকে দংশন করে ও কষ্ট দেয় (সিরাজুল ওয়াহ্হাজ)।
১৯. মাসআলা: গনীমতের মাল যতক্ষণ পর্যন্ত দারুল ইসলামে এনে সংরক্ষণ না করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার মালিক হওয়া যায় না (মুহীত: সারাঙ্গী)।
উপরোক্ত মূলনীতির উপর অনেক মাসাইল ভিত্তি করে (১) গনীমতের হকদারদের কেউ যদি (দারুল হারবের মধ্যেই) বন্দীকৃত দাসীর সাথে সংগম কর্ম করে এরপর উক্ত দাসী একটি সন্তান প্রসব করল আর ঐ ব্যক্তি সে সন্তানের দাবী করল তাহলে এক্ষেত্রে তার সাথে উক্ত সন্তানের বংশ সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে না। তবে (সংগম করার কারণে) ঐ ব্যক্তির উপর উফর ওয়াজিব হবে।
কাজেই উক্ত দাসী, তার সন্তান এবং (আদায়কৃত) উফর গনীমতের হকদারদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হবে। (২) দারুল হারবে গনীমতের মাল বণ্টন করার পর যখন প্রত্যেকেই নিজ
নিজ অংশ পেয়ে গেল এমতাবস্থায় কেউ যদি নিজ অংশ দারুল ইসলামে আনার পূর্বেই মারা যায় তাহলে কোন ব্যক্তি উত্তরাধিকার সূত্রে তার অংশের হকদার হবে না। (৩) মুজাহিদদের কেউ যদি গনীমতের কোন জিনিস নষ্ট বা ধ্বংস করে ফেলে তাহলে হানাফী মাযহাব অনুযায়ী সে তার জন্য দায়বদ্ধ হবে না। (৪) শাসক যদি ইজতিহাদ করা ব্যতীত কিংবা গাযীদের প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য না করে গনীমত বণ্টন করে তাহলে তা আমাদের (হানাফী) মাযহাব অনুযায়ী সহীহ হবে না২ (তাবয়ীন)।
১. হত্যার নিষেধাজ্ঞার এ বা হেতু হচ্ছে দুর্বলের প্রতি করুণা, সুতরাং একই হেতুতে উপরোক্ত আরেন বৈধ হতে পারে না। (সম্পাদক)
২. অর্থাৎ ইমাম যদি আলিম হয় এবং তার মধ্যে ইজতিহাদ করে সঠিক ও মঙ্গলজনক সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা থাকে তাহলে এরূপ চিন্তা-ভাবনা ছাড়া বণ্টন করা কিংবা মুজাহিদদের ফায়দা ও প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য না করে বণ্টন করা সহীহ হবে না। অতএব ইমাম যদি এ বিবেচনা করে বণ্টন করে যে দারুল ইসলামে গনীমত নিয়ে যাওয়ার আগে তা ধ্বংস বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে তবে তা সহীহ হবে অনুরূপ যদি তাতে মুজাহিদদের উপকার নিহিত থাকে তবুও সহীহ হবে।





দাওয়াতের পর যুদ্ধ: ধর্মীয় আনুগত্যের সামরিক শর্ত
ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীর দ্বিতীয় মাসআলায় একটি স্পষ্ট ক্রম দেওয়া হয়েছে: মুসলিম বাহিনী অন্য ভূখণ্ডের শহর বা দুর্গ অবরোধ করবে, অধিবাসীদের ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাবে, আর তারা তা গ্রহণ না করলে যাদের কাছ থেকে জিযিয়া নেওয়া বৈধ তাদের জিযিয়া দিতে বলা হবে। যুদ্ধ থেকে অব্যাহতির শর্ত হিসেবে ধর্মগ্রহণ কিংবা শাসকের নির্ধারিত অধীনতা হাজির করা হয়েছে। আক্রান্ত মানুষ আগে মুসলিমদের ওপর হামলা করেছে—এমন শর্ত এই বিধানে নেই। ফলে এখানে যুদ্ধ কেবল নিজের ভূখণ্ড রক্ষার প্রতিক্রিয়া নয়; অন্য ভূখণ্ডে ঢুকে ধর্মীয়-রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি পদ্ধতি। একটি স্বাধীন সমাজের সামনে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে “ধর্ম গ্রহণ করো, কর দাও, নইলে লড়াই”—এই শর্ত রাখা বিশ্বাসের স্বাধীন সিদ্ধান্তের পরিবেশ তৈরি করে না। সামরিক শক্তির সাহায্যে চাপানো বিকল্পকে স্বেচ্ছাসম্মতি বলা যায় না। এই ধরনের জিহাদের ধর্মীয় লক্ষ্য সম্পর্কে আরও আলোচনা রয়েছে সংশয়ের ইসলামি জিহাদের লক্ষ্যঃ শিরক নিশ্চিহ্ন না হওয়া অবধি কিয়ামত পর্যন্ত আক্রমণাত্মক জিহাদ-কিতাল চালাতে হবে এবং বিনা উস্কানিতে আক্রমণঃ নবী মুহাম্মদের জিহাদ-কিতাল ও ভিন্নমতাবলম্বী দমনের উদাহরণ সমূহ প্রবন্ধে।
জিযিয়ার ধর্মীয় ভিত্তি বুঝতে কোরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতটিও সম্পূর্ণ দেখা প্রয়োজন। এখানে যুদ্ধ বন্ধের সঙ্গে জিযিয়া ও অধীনতার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। নিচের আয়াতের “ওয়াহুম সাগিরুন” অংশ পরবর্তী ফিকহ ও সিরহিন্দির আলোচনায় অমুসলিমের অবস্থান নির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কোরআন, সূরা তওবা, আয়াত ২৯।
قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّىٰ يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ
বাংলা অর্থ: কিতাবপ্রাপ্তদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস করে না, আল্লাহ ও তাঁর রসুল যা নিষিদ্ধ করেছেন তা নিষিদ্ধ মনে করে না এবং সত্য ধর্ম অনুসরণ করে না, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না তারা নিজ হাতে জিযিয়া দেয় এবং তারা অধীনতাপ্রাপ্ত থাকে।
মূল আয়াত: সূরা তওবা ৯:২৯।
ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কর আরোপ এবং সামরিক অধীনতা দাবি করার এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সমান মর্যাদার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না। এক পক্ষ কর্তৃত্বের ধর্মীয় মালিক, অন্য পক্ষ সেই কর্তৃত্ব মেনে থাকার অনুমতি পায়। ফাতাওয়ায়ের উদ্ধৃত অংশে আবার কার কাছ থেকে জিযিয়া নেওয়া যাবে আর কার ক্ষেত্রে ইসলামগ্রহণ বা হত্যার বিকল্প থাকবে, তার শ্রেণিবিভাগও দেওয়া হয়েছে। ফলে একই ভূখণ্ডে মানুষের নিরাপত্তা তার আচরণের পাশাপাশি তার জন্মগত বা গ্রহণ করা ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ধর্ম না বদলে বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে একটি নির্ধারিত অধস্তন অবস্থান গ্রহণ করতে বাধ্য করা হলে সেখানে বিশ্বাসের স্বাধীনতার দাবিটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। “ইসলামে জবরদস্তি নেই” বক্তব্যের সঙ্গে এই বিধানগুলোর সম্পর্ক বিস্তারিত বিচার করা হয়েছে সংশয়ের লা ইকরাহা ফিদ-দীনঃ ইসলামে কি আসলেই কোন জবরদস্তি নেই? প্রবন্ধে।
দাওয়াত না দিয়ে ক্ষতি করলেও ক্ষতিপূরণের দায় নেই
তৃতীয় মাসআলায় আরও গুরুতর একটি বিষয় আছে। যাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি, তাদের দাওয়াত না দিয়ে যুদ্ধ করলে মুসলিম বাহিনী গুনাহগার হবে বলা হয়েছে; কিন্তু তাদের জানমালের ক্ষতির দায় বাহিনীর ওপর আরোপিত হবে না। এখানে ধর্মীয় অনিয়মের স্বীকৃতি আছে, অথচ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতিকার নেই। যে মানুষ নিহত হলো বা যার সম্পদ নষ্ট হলো, তার জন্য আক্রমণকারীর পরকালীন গুনাহের হিসাব কোনো ক্ষতিপূরণ নয়। অন্যদিকে যাদের কাছে আগেই দাওয়াত পৌঁছেছে তাদের ওপর পুনরায় সতর্ক না করে দিনের বা রাতের অতর্কিত আক্রমণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। “দাওয়াত পৌঁছানো”কে এভাবে আক্রমণের নৈতিক অনুমতিতে রূপান্তর করলে ধর্মীয় বক্তব্য শোনা এবং সামরিক হুমকি মেনে নেওয়া একই হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ একটি ধর্মের কথা শুনেছে বলে তার বাড়িতে অতর্কিত আক্রমণ করা বৈধ হয়ে যায়—এমন সিদ্ধান্ত স্বাধীন মানুষের অধিকারের সঙ্গে অসংগত। এই অতর্কিত আক্রমণ ও নারী-শিশুর পরিণতি নিয়ে রয়েছে সংশয়ের ইসলামে রাতের অন্ধকারে অতর্কিত আক্রমণে নারী-শিশু হত্যার বৈধতা প্রবন্ধ।
ফসল, পানি ও বসতি ধ্বংসের অনুমোদন
উদ্ধৃত বিধানে শত্রুর বিরুদ্ধে কামান বা অবরোধযন্ত্র মোতায়েনের পাশাপাশি জ্বালাও-পোড়াও, পানি ছেড়ে ডুবিয়ে দেওয়া, গাছ কাটা, শস্য নষ্ট করা এবং দালান বিধ্বস্ত করার অনুমতি এসেছে। এই উপকরণগুলো কেবল যুদ্ধরত সৈন্যের অস্ত্র নয়; সাধারণ মানুষের জীবনধারণের অবকাঠামো। ক্ষেতের ফসল, বাসস্থান, পানির ব্যবস্থা ও ফলদ বৃক্ষ ধ্বংস হলে ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি ও মৃত্যুর বোঝা অধিবাসীদের ওপর পড়ে। বিধানে মুসলিম বন্দি বা ব্যবসায়ী থাকা দুর্গেও আক্রমণের আলোচনা আছে। বন্দি মুসলিম শিশু ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হলেও তীরবর্ষণ বন্ধ না করার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে এবং তাদের মৃত্যুর জন্য দিয়ত ও কাফফারা ওয়াজিব হবে না বলা হয়েছে। অর্থাৎ সম্ভাব্য নিরপরাধের প্রাণহানি আলোচনার বাইরে ছিল না; তা জেনেই যুদ্ধের অগ্রগতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র “শত্রুকে লক্ষ্য করার নিয়ত” মৃত শিশুকে ফিরিয়ে আনে না। যে আইন আগেই এই ক্ষতির দায় থেকে আক্রমণকারীকে অব্যাহতি দেয়, তাকে ইনসাফের ব্যবস্থা বলার আগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতিকারের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
মানুষকে গনিমত বানানো: নারী, শিশু ও দাসত্ব
বন্দি নারী ও শিশুর বিষয়ে এই সংকলনের বক্তব্য আরও সরাসরি। একটি শ্রেণির অমুসলিম পুরুষদের ইসলামগ্রহণ অথবা হত্যার কথা বলার পর তাদের নারী ও শিশুকে গনিমত বলা হয়েছে। পরে শিশুকে বণ্টন বা বিক্রয়ের মাধ্যমে ব্যক্তির অধীনে দেওয়ার বিধান রয়েছে। মুক্ত মানুষকে এভাবে ক্রয়যোগ্য ও বণ্টনযোগ্য করার মুহূর্তে তার অধিকার মালিকের সিদ্ধান্তের অধীন হয়। শিশুর ধর্মীয় পরিচয়ও মালিকের অনুসারী হিসেবে নির্ধারণ করা হচ্ছে। বন্দিত্বের কারণে পরিবার, স্বাধীনতা এবং নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষমতা হারানোকে কোনো মানবিক অভিভাবকত্ব বলা যায় না। যে পরিবার আগে স্বাধীন ছিল, তাকে যুদ্ধের মাধ্যমে সম্পত্তির শ্রেণিতে নামিয়ে আনার জন্য “গনিমত” নামটি ব্যবহার করা হয়েছে। বখতিয়ারের অভিযানে নারী ও প্রাসাদের মানুষ দখলের যে বিবরণ পড়লাম, এই আইনগত কাঠামো তার সামাজিক তাৎপর্য বোঝায়। বিস্তারিত দলিল রয়েছে সংশয়ের যুদ্ধে বেসামরিক নারী ও শিশুর ভাগ্যঃ ইসলামে গনিমতের মাল বা লুটপাটের মাল প্রবন্ধে।
উনিশ নম্বর মাসআলায় দাসীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক এবং সন্তান জন্মের পর বংশপরিচয়, অর্থপ্রদান ও বণ্টনের হিসাব এসেছে। আলোচনার কেন্দ্র মালিকানা কখন প্রতিষ্ঠিত হবে, কার অংশে দাসী পড়বে এবং সন্তান বা অর্থ কীভাবে ভাগ হবে। নারীর স্বাধীন সিদ্ধান্ত এই হিসাবের কেন্দ্র নয়। বণ্টনের নিয়ম ভাঙলে আর্থিক দায় হতে পারে, কিন্তু বন্দি নারীর দেহের ওপর কর্তৃত্বের ব্যবস্থাটিই বহাল থাকে। একজন নারীর জীবনকে এই মালিকানার হিসাব দিয়ে সাজানো এবং তাকে পূর্ণ অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখা একসঙ্গে সম্ভব নয়। বন্দির মুক্তি সম্পর্কেও উদ্ধৃত সপ্তম মাসআলায় লাভ বা বিনিময় ছাড়া ছেড়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে বক্তব্য রয়েছে। এই বিধানের ধর্মীয় যুক্তি ও যুদ্ধবন্দীর মানবিক অবস্থান সম্পর্কে আরও পড়া যাবে সংশয়ের অসীম করুণাময় আল্লাহর ইচ্ছাঃ কাফের যুদ্ধবন্দীদের প্রচুর রক্ত প্রবাহিত করা হোক! প্রবন্ধে।
ক্ষতির অনুমতি, সম্পাদকের আপত্তি ও বিধানের নৈতিক দায়
শত্রুর গবাদিপশু সরিয়ে নেওয়া সম্ভব না হলে অনাহারে মারা যাওয়ার মতোভাবে ফেলে রাখার কথাও উদ্ধৃত অংশে রয়েছে। অন্যদিকে সাপ-বিচ্ছুর ক্ষতিসাধনের ক্ষমতা পুরোপুরি শেষ না করে তাদের বংশ টিকিয়ে রাখার কারণ হিসেবে পরবর্তীতে কাফেরদের দংশন করার সম্ভাবনা বলা হয়েছে। মানুষের ধর্মীয় পরিচয় এখানে এমন শত্রুতা তৈরির ভিত্তি হয়েছে যে ভবিষ্যতে তাদের ক্ষতিও কাম্য বলে বিবেচিত। একই উদ্ধৃতিতে অনাহারে পশু মেরে ফেলার বিষয়ে সম্পাদকের আপত্তিও আছে: হত্যার নিষেধের পেছনে দুর্বলের প্রতি করুণা থাকলে একই কারণে এমন কাজ বৈধ হতে পারে না। এই টীকাটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায়, গ্রন্থের ভেতরেও বিধানের যুক্তিগত অসামঞ্জস্য চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। অতএব সমালোচনা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ধর্মীয় উৎসকে শুধু পবিত্র বলে ঘোষণা করার দরকার নেই; সূত্রের বক্তব্য, তার যুক্তি এবং জীবন্ত প্রাণীর ওপর তার ফল সরাসরি বিচার করতে হবে।
সুফিবাদ: ভেড়ার ছদ্মবেশে নেকড়ে
সুফিবাদ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের একটি পরিচিত ধারণা হলো, এটি কঠোর শরিয়তনির্ভর ইসলামের বদলে প্রেম, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক আধ্যাত্মিকতার ধারা। সুফি গান, কবিতা ও দরবেশের কাহিনি এই ধারণাকে জনপ্রিয় করেছে। ঈশ্বরপ্রেম, আত্মশুদ্ধি, আত্মসমর্পণ এবং জীবনের গভীর সত্য উপলব্ধির আকাঙ্ক্ষা সুফি সাধনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতিতেও এই ধারার দীর্ঘ প্রভাব রয়েছে। কিন্তু আধ্যাত্মিক প্রেমের ভাষা এবং ভিন্ন ধর্মের মানুষের সমান সামাজিক মর্যাদা স্বীকার করা দুটি আলাদা প্রশ্ন। একজন সাধক নিজের ঈশ্বরকে গভীরভাবে ভালোবাসতে পারেন এবং একই সঙ্গে সেই ঈশ্বরে অবিশ্বাসী মানুষকে অপমানিত অবস্থায় রাখতে চাইতে পারেন। তাঁর আধ্যাত্মিক পরিচয় থেকে তাঁর রাজনৈতিক নীতির মানবিকতা নিজে থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় না। সুফিবাদের সহিষ্ণুতার দাবি বিচার করতে তাই গান ও সাধনপদ্ধতির পাশাপাশি তার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বক্তব্যও পড়তে হবে।
ভারতে সুফিবাদের ইতিহাস গড়ে উঠেছে দীর্ঘ আরব-পারসিক যোগাযোগ, সাধকদের যাতায়াত এবং বিভিন্ন তরিকার বিস্তারের মধ্য দিয়ে। প্রাথমিক শিকড়ের আলোচনায় অষ্টম শতাব্দীর যোগাযোগের প্রসঙ্গ আসে; পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে সাধক, শিক্ষার্থী ও তরিকার বিস্তারের মাধ্যমে এই যোগাযোগ সুসংগঠিত পরম্পরায় রূপ নেয়। একাদশ শতাব্দীতে পারসিক শাসন ও জ্ঞানচর্চার প্রভাবে সুফি ভাবনার প্রসার ঘটে এবং পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে নানা তরিকা প্রতিষ্ঠিত হয় [19]। স্থানীয় ভাষা, সমাজ ও ধর্মীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মেলামেশার ফলে উপমহাদেশে সুফিবাদের বিভিন্ন রূপ তৈরি হয়েছে। এই পরম্পরার মধ্যেই নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দিদিয়া ধারা আধ্যাত্মিক সাধনার সঙ্গে কঠোর শরিয়তি কর্তৃত্বের দাবি যুক্ত করেছে। সিরহিন্দির চিঠিতে শাসক, অভিজাত ও আলেমদের উদ্দেশে দেওয়া নির্দেশগুলো সেই সংযোগের প্রত্যক্ষ দলিল। এই নির্দেশগুলোর মধ্যেই অমুসলিমের সামাজিক অবস্থান এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের নির্দিষ্ট নীতি পাওয়া যায়।
ভারতীয় সুফি সাধনার নানা রূপে স্থানীয় হিন্দু ভক্তিবাদ, বৌদ্ধ ধ্যানপরম্পরা এবং অন্যান্য আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির সঙ্গে সাদৃশ্য ও আদানপ্রদান দেখা যায়। ভক্তি, আত্মসমর্পণ, ধ্যান ও আত্মদর্শনের মতো বিষয় বিভিন্ন ধারার মধ্যে আলোচনার সেতু তৈরি করেছে। এই সাংস্কৃতিক মেলামেশা সুফি সাধনার ভাষা ও সামাজিক চর্চাকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু অমুসলিম মানুষের অধিকার বিচার করতে গেলে দেখতে হবে, সেই মানুষকে সমাজে কী মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁর ওপর কী ধরনের বিধান চাপানো হচ্ছে। স্থানীয় সংস্কৃতির গান বা সাধনভাষা গ্রহণ করেও কেউ স্থানীয় অমুসলিমদের ওপর শরিয়তভিত্তিক অধীনতা দাবি করতে পারে। তাই সুফিবাদের সাংস্কৃতিক মিশ্রণকে তার প্রতিটি রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে অগ্রিম নৈতিক ছাড়পত্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
ভারতীয় সুফি সংস্কৃতিতে সঙ্গীত ও কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান আছে। কাওয়ালিসহ বিভিন্ন গানে ঈশ্বরপ্রেম, মিলনের আকাঙ্ক্ষা ও আত্মিক অভিজ্ঞতার কথা আসে। মাজার ও সমাবেশের সঙ্গে যুক্ত এই শিল্প অনেক মানুষের কাছে ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরেও আকর্ষণীয়। আমি নিজেও সুফি সঙ্গীতের বিভিন্ন শাখার বহু গান পছন্দ করি; নুসরাত ফতে আলী খান থেকে এ আর রহমানের অনেক গান এই পছন্দের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু একটি গানের সৌন্দর্য এবং কোনো সুফি নেতার সামাজিক বক্তব্যের নৈতিক মূল্য এক মাপে বিচার করা যায় না। শিল্প উপভোগ করার জন্য অমুসলিমের অপমান, জিযিয়ার লাঞ্ছনা কিংবা ধর্মীয় বিরোধীর হত্যাকে সমর্থন করার প্রয়োজন নেই। বরং এই দুটিকে এক করে ফেললেই প্রিয় শিল্পের আবেগ ব্যবহার করে অসহিষ্ণু রাজনৈতিক মতকে আড়াল করা সম্ভব হয়।
সুফি সাধনায় পীর বা আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অনুসারীরা তাঁকে আত্মিক জ্ঞানের অধিকারী, উপদেশদাতা এবং সাধনার পথ দেখানোর উপযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে শ্রদ্ধা করেন। পীর ও অনুসারীর সম্পর্ক অনেক সময় প্রেম, ভক্তি ও গভীর আনুগত্যের ভাষায় প্রকাশ পায়। এই সম্পর্কের সামাজিক ফলও আছে: যাঁর বক্তব্যকে আধ্যাত্মিকভাবে উচ্চতর বলে মানা হয়, তাঁর রাজনৈতিক মতও অনুসারীদের কাছে অতিরিক্ত কর্তৃত্ব পেতে পারে। ফলে পীরের বক্তব্যে অন্য ধর্মের মানুষকে অবিশ্বাস, ঘৃণা বা অপমান করার নির্দেশ থাকলে সেটি নিছক ব্যক্তিগত রাগ থাকে না; ভক্তির সম্পর্কের মাধ্যমে একটি সামাজিক আচরণে পরিণত হওয়ার সুযোগ পায়। অনুসারীর শ্রদ্ধা কোনো নেতার বক্তব্যকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখে না। ভিন্ন ধর্মের মানুষের ওপর সেই বক্তব্যের প্রভাব দিয়েও তার বিচার করতে হয়।
জিকর বা ঈশ্বরের নাম ও স্মরণের পুনরাবৃত্তিও সুফি সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। হৃদয় পরিশুদ্ধ করা, মনোযোগ স্থির করা, ভক্তি বাড়ানো ও আত্মিক উপলব্ধির জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। কোনো কোনো সামাজিক চর্চায় পীর-সাধকের নামস্মরণও থাকে। এই সাধনার সঙ্গে পীরের শিক্ষা ও নির্দেশের সম্পর্ক রয়েছে, আর সেই নির্দেশ যখন অমুসলিমকে অপমানিত অবস্থায় রাখার দাবি করে, তখন তার সামাজিক ফলও বিচার করতে হয়। সিরহিন্দির চিঠিগুলোতে আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের সঙ্গে এমন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নির্দেশ সরাসরি যুক্ত হয়েছে। ধর্মীয় অনুশীলনের শান্ত পরিবেশের পাশাপাশি রাষ্ট্রক্ষমতার কাছে অন্য সম্প্রদায়কে অধস্তন করার দাবি থাকলে প্রথমটির দৃশ্যমান শান্তি দিয়ে দ্বিতীয়টির ক্ষতি মুছে দেওয়া যায় না।
ভারতীয় সুফিবাদের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রেম, আত্মসমর্পণ, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মেলামেশা এবং বিভিন্ন সাধনপরম্পরার সংযোগ আছে। তার সঙ্গীত ও সাহিত্য এখনও মানুষের জীবনে প্রভাব রাখে। এই বৈচিত্র্যের মাঝেই শরিয়ত প্রতিষ্ঠা ও অমুসলিমের সামাজিক অবনমনের পক্ষে জোর দেওয়া একটি প্রবণতাও পাওয়া যায়। “সুফি” পরিচয়কে মানবিকতার নিশ্চয়তা ধরে নিলে সেই প্রবণতা চোখের আড়ালে থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে, আধ্যাত্মিক উন্নতির যে ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে, তার মধ্যে অন্য মানুষের স্বাধীনতা ও সম্মানের জায়গা কতটুকু আছে। যে বক্তব্য অন্য সম্প্রদায়ের অবমাননাকে নিজের ধর্মের উন্নতি বলে সংজ্ঞায়িত করে, তাকে প্রেমের ভাষা দিয়ে নির্দোষ করা যায় না। এই জায়গাতেই মুজাদ্দিদিয়া ধারার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব আহমদ সিরহিন্দির রচনাগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিচ্ছেদে বিশেষভাবে আলোচনা করা হচ্ছে আহমদ সিরহিন্দির সঙ্গে যুক্ত নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দিদিয়া ধারা। বাহাউদ্দিন নকশবন্দের নামে পরিচিত নকশবন্দিয়া পরম্পরার মধ্যে সিরহিন্দির অনুসারীদের শাখাটি মুজাদ্দিদিয়া নামে প্রসার লাভ করে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও তুরস্কসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এই ধারার অনুসারী রয়েছেন। সিরহিন্দি “মুজাদ্দিদে আলফে সানি” বা দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক হিসেবে পরিচিত। তাঁর চিঠি ও রচনাগুলো ব্যক্তিগত সাধনার আলোচনার পাশাপাশি শাসক, অভিজাত এবং আলেমদের করণীয়ও নির্ধারণ করে। এই কারণেই তাঁর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ: তিনি অমুসলিমদের বিষয়ে কেবল নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি লিখছেন না; মুসলিম শাসনের নীতি কী হওয়া উচিত এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কীভাবে ধর্মের স্বার্থে ব্যবহার করা উচিত, তার নির্দেশ দিচ্ছেন।
আহমদ আল-ফারুকি আল-সিরহিন্দি (১৫৬৪–১৬২৪) ছিলেন পাঞ্জাবের সিরহিন্দে জন্ম নেওয়া একজন হানাফি ধর্মশাস্ত্রজ্ঞ ও নকশবন্দি সুফি নেতা। তাঁর পিতা আবদুল আহাদ সুফি পরম্পরার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এবং তাঁর পরিবারের বংশপরিচয় খলিফা উমর পর্যন্ত পৌঁছে বলে প্রচলিত রয়েছে। টিডিভি ইসলাম বিশ্বকোষে তাঁর জীবন, নকশবন্দিয়া তরিকার সঙ্গে সংযোগ এবং মুজাদ্দিদিয়া শাখার প্রসারের বিবরণ পাওয়া যায় [20]। তিনি মুঘল আমলে ধর্মীয় মিশ্রণ ও শরিয়তের বিধান শিথিল করার বিরোধিতা করেন এবং অভিজাতদের কাছে লেখা চিঠিতে ইসলামি বিধান প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। সিরহিন্দির মৃত্যু আওরঙ্গজেবের শাসন শুরুর আগেই, কিন্তু তাঁর রচনায় সংরক্ষিত শরিয়তপন্থী রাজনৈতিক চিন্তা পরবর্তী ধর্মীয় পরম্পরার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকে। তাঁর নিজের চিঠিতেই অমুসলিমকে অধস্তন রাখা, জিযিয়ার মাধ্যমে লাঞ্ছিত করা এবং শাসকের শক্তি ব্যবহার করে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট আহ্বান রয়েছে। আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের নামে প্রচারিত এই রাষ্ট্রীয় নীতির নৈতিক দায় তাঁর বক্তব্যের মধ্যেই উপস্থিত।
সম্রাট আকবরের শাসনামলে ধর্মীয় সহাবস্থান ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সহযোগিতার নীতির সঙ্গে অমুসলিমদের ওপর জিযিয়া তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত যুক্ত ছিল। এই ধরনের পদক্ষেপ কঠোর শরিয়তপন্থী চিন্তার সঙ্গে বিরোধ তৈরি করে। সিরহিন্দির চিঠিতে জিযিয়া বন্ধ থাকা সম্পর্কে হতাশা এবং অমুসলিমকে সম্মান দেওয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ সরাসরি পাওয়া যায়। অর্থাৎ তাঁর আপত্তির কেন্দ্র শুধু ব্যক্তিগত ধর্মাচরণ ছিল না; অমুসলিম মানুষ রাষ্ট্র ও সমাজে কতটুকু মর্যাদা পাবে, সেটিও ছিল। নিচের উদ্ধৃতিতে তিনি জিযিয়ার উদ্দেশ্য হিসেবে লাঞ্ছনার কথাই বলেছেন। এই কর ও অমুসলিমের অধস্তন অবস্থান সম্পর্কে আরও আলোচনা রয়েছে সংশয়ের অবমাননাকর জিজিয়া কর বিষয়ক প্রবন্ধে। এখন তাঁর নিজের ভাষায় বক্তব্যগুলো দেখা যাক।
মুজাদ্দিদে আলফে সানীর উল্লেখযোগ্য রচনা হচ্ছে-
- আল বাবদা ওয়াল-মাআদ
- রিসালা-ই তাহলীলিয়্যা
- রিসালা ফী ইছবাতিন নাবুওয়া ওয়া আদাবিল মুরীদিন
- রাদ্দে রাওয়াফিজ
- মাকতূবাত।
সিরহিন্দির ভয়ংকর সব উদ্ধৃতি
সিরহিন্দির বক্তব্যের দুটি স্তর নিচে রাখা হয়েছে: প্রথমে ঐতিহাসিক সাইয়িদ আতহার আব্বাস রিজভীর গবেষণায় তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকার আলোচনা, তারপর মকতুবাত শরীফের বাংলা অনুবাদে তাঁর নিজের চিঠি। এর ফলে গবেষকের বিশ্লেষণ ও সিরহিন্দির প্রত্যক্ষ বক্তব্য পাশাপাশি পড়া যায়। রিজভীর Muslim Revivalist Movements In Northern India গ্রন্থে শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় তরবারির ব্যবহার, সম্রাটের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং অভিজাতদের মাধ্যমে ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনের প্রচেষ্টার কথা এসেছে। এই আলোচনা বোঝায়, সিরহিন্দির লক্ষ্য কেবল নিজের খানকাহে আধ্যাত্মিক চর্চা সীমাবদ্ধ রাখা ছিল না; রাষ্ট্রের নীতি ও শাসকের ক্ষমতাকেও তাঁর ধর্মীয় প্রকল্পে যুক্ত করা ছিল [21]।
diverted him from orthodox Islam. Their success he mainly ascribed to the nearness of the Day of Judgment and the long time that had elapsed since the ‘Seal of Prophets’ had appeared. He seemingly laboured under the wrong notion that Jahangir would set every thing right and restore Islam to its pristine purity if he were to wield his sword on the Hindus and the Shias. “Shariat can be fostered through the sword,” was the slogan he raised for his contemporaries. It was for this reason that he equated the status of the Emperor vis a Dis his kingdom with the position of the soul or heart in relation to body. ‘A reform, if possible by any means, in the Emperor, would mean the eradication of evils from the body-politic of Islam’ was his firm conviction. Akbar’s eclectic tendencies and his policy of “peace with all” had frozen Mujaddid’s expectations on this score but they were revived a bit with the accession of Jahangir. This expectation had its stimulant not in the belief that Jahangir had previously shown any leanings towards Sunni orthodoxy but in the hope that if efforts to persuade the Emperor to stand by his (Mujaddid’s) ideals succeeded in the beginning of the new reign, the transformation from heterodoxy to orthodoxy was guaranteed. He, therefore, quite oblivious of the problems which the Mughul emperors and the nobles had to face in governing a country of such heterogeneous population as India, sought to make the nobles his tool for the revival of orthodoxy. He underestimated the complexity of the task by appealing only to the communal sentiments. He did not make any attempt to organise the common Muslims or those below the status of the nobility. It was only on one occasion, that he wrote to the eminent Saiyids, Qazis and inhabitants of Samana against the Khatib of that place who had intentionally dropped the name of the first four Caliphs from the Khutba. When the people raised objections, the Khatib emphatically said, “How does it matter then if I did not mention the names of the Caliphs?” Mujaddid expressed great surprise over the indifference and tolerance of the eminent as well as common people of the locality towards this ‘sacrilegious act’ of the unscrupulous Khatib. In his view they should have taken serious steps against him. He accepted that the mention of the name of the Caliphs was, no doubt, not one of the fundamentals of the Sunni faith but it was one of the important Sunni practices and as such deserved to be strictly adhered to. Intentional omission of the name of the Caliphs smacked of Shiism. Even if the

এবার সিরহিন্দির মকতুবাত শরীফের একটি দীর্ঘ অংশ পড়ি। এর মধ্যে ১৯৩ নম্বর চিঠিতে সুন্নি বিশ্বাস বিশুদ্ধ রাখার নির্দেশ, একজন শিখ ধর্মীয় নেতার হত্যায় সন্তোষ, কাফেরকে অপদস্থ করার আহ্বান এবং জিযিয়ার মাধ্যমে লাঞ্ছনার উদ্দেশ্য একসঙ্গে এসেছে। তিনি শাসকের কাছে অমুসলিমদের প্রচলিত রীতি বন্ধ করার জন্য আলেমদের উদ্যোগী হতে বলছেন। ফলে এটি নিছক ধর্মতাত্ত্বিক মতভেদ নয়; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে অন্য সম্প্রদায়ের সামাজিক অবস্থান নির্ধারণের দাবি। নিচে আগের চিঠির শেষাংশসহ ১৯৩ নম্বর চিঠির সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠাগুলোর পাঠ দেওয়া হলো [22]।
শ্রেষ্ঠত্ব পয়গাম্বর (আঃ)-গণেরই। এই হিসাবে যদি নবী ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তি উক্ত আংশিক পূর্ণতার মাকামে উপনীত হয় এবং নিজেকে সেই নবী (আঃ)-এর মাকাম হইতে উচ্চ মাকামে প্রাপ্ত হয় তাহাও জায়েজ। অবশ্য তাহার উক্ত মাকাম লাভ নবী (আঃ)-এর অনুসরণ দ্বারাই হইয়া থাকে। অপিচ নবী (আঃ)ও উক্ত মাকামের অংশ পাইয়া থাকেন। যেহেতু যে ব্যক্তি সৎপথ আবিষ্কার করে সে তাহার পারিশ্রমিক প্রাপ্ত হয়, অন্য যাহারা উক্তরূপ আমল করে তাহাদেরও পারিশ্রমিক সে প্রাপ্ত হয়। অতএব যখন নবী ব্যতীত অন্য ব্যক্তি আংশিক হিসাবে নবী হইতেও শ্রেষ্ঠ হইতে পারে, তখন নবী ব্যতীত অন্য ব্যক্তি হইতে আংশিকরূপে নিশ্চয় শ্রেষ্ঠ হইতে পারিবে। সুতরাং আর কোনই সন্দেহ থাকিল না। ওয়াচ্ছালাম ॥
১৯৩ মকতুব
ছাইয়েদ শায়েখ ফরীদের নিকট ছুন্নত জামা’তের মতানুযায়ী আকিদা-বিশ্বাস বিশুদ্ধ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করিয়া লিখিতেছেন।
বিছমিল্লাহের রাহমানির রাহীম।
যে সকল বস্তু আপনাকে নিন্দিত ও দোষণীয় করে তাহা হইতে রক্ষা পাইবার প্রতি আল্লাহতা’য়ালা আপনাকে সাহায্য ও শক্তি প্রদান করুন। ছুন্নত জামাতের আলেমগণের মতানুযায়ী আকিদা বিশ্বাস বিশুদ্ধ করা ইছলামের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণের প্রতি প্রথম কর্তব্য। যেহেতু এই বোজর্গগণের প্রদর্শিত সত্য পথের অনুসরণ করার প্রতিই পরকালের উদ্ধার নির্ভর করে। ইহারা এবং ইহাদের অনুসরণকারীগণই নাজাত প্রাপ্ত দল। ইঁহারাই হজরত নবীয়ে করীম (ছঃ) এবং তাঁহার ছাহাবাগণের পথে আছেন। হাদীছ-কোরআনের ঐ এল বা মহুআলা গ্রহণযোগ্য, যাহা ইঁহারা উহা হইতে উদ্ধার করিয়াছেন। কেননা প্রত্যেক বেদআতী-ভ্রষ্ট দল স্বীয় (অপ্রকৃত) বিশ্বাস সমূহ নিজ নিজ জ্ঞানানুযায়ী কোরআন-হাদীছ হইতেই উদ্ধার করিয়া থাকে। অতএব কোরআন-হাদীছের যে অর্থই বুঝা যায়, তাহাই যে গ্রহণীয় তাহা নহে। আকিদা সংশোধন করার জন্য ইমামে আজল্ল ‘তওরপুস্তীর’ গ্রন্থই শ্রেষ্ঠ, সহজ-বোধ্য। আপনি স্বীয় মজলিশে উল্লিখিত গ্রন্থের চর্চা করিতে থাকিবেন। উক্ত গ্রন্থে দলীল প্রমাণাদি অনেক আছে বলিয়া গ্রন্থটি বৃহৎকায়। যদি কোন সংক্ষিপ্ত পুস্তক কেবলমাত্র মহুআলার বর্ণনায় পাওয়া যায়, তাহাই ভাল হয়। ইতিমধ্যে আমারও মনে জাগিয়াছিল যে, এবিষয়ে আমি একটি পুস্তক লিখি, যাহাতে আহলে ছুন্নত জামাতের আকিদা (বিশ্বাস) উল্লেখ থাকে এবং সহজে বুঝা যায়। অতঃপর যদি এরূপ পুস্তক লিখিতে পারি তবে আল্লাহ্ চাহে আপনার খেদমতে পাঠাইব।
উক্তরূপ আকিদা- বিশ্বাস সংশোধন করার পর হালাল, হারাম, ফরজ,
ওয়াজেব, ছুন্নত, মোস্তাহাব, মকরূহ যাহা ‘ফেকাহ্’এ বর্ণিত আছে, তাহার জ্ঞান লাভ এবং তদনুযায়ী আমল করা অবশ্য কর্তব্য। আপনি কোন তালেবে এলঙ্কে বলিবেন যে, সে ফারছি ভাষায় লিখিত কোন ‘ফেকাহ্’র কেতাব আপনার মজলিশে চর্চা করিতে থাকে। যথাঃ- মজমুয়ায়ে খানী, ওমদাতুল ইছলাম ইত্যাদি। আল্লাহ্ না করুন, যদি আবশ্যকীয় বিশ্বাসসমূহে ব্যতিক্রম ঘটে তবে পরকালের উদ্ধার হইতে বঞ্চিত থাকিবে। কিন্তু যদি আমল করিতে কোনরূপ অবহেলা হয়, তবে তওবা না করিয়াও রেহাই পাইতে পারে এবং তাহার জন্য ধৃত হইলেও পরে মুক্তি পাইতে পারে। সুতরাং আকিদা বিশুদ্ধ করাই মূল কার্য্য। হজরত খাজা ওবায়েদুল্লাহ্ আহ্বার (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলিয়ছেন যে, আল্লাহ্পাক যদি যাবতীয় আত্মিক অবস্থা ও প্রেরণা আমাকে দান করেন এবং আহলে ছুন্নতের বিশ্বাস অনুযায়ী আমার অন্তর্জগতকে সুসজ্জিত না করেন তবে আমি অনিষ্ট ব্যতীত কিছুই মনে করিব না। পক্ষান্তরে যদি যাবতীয় অনিষ্ট ও খারাবী আমার প্রতি সমবেতভাবে অর্পণ করেন এবং আমার আকিদা ছুন্নত জামাতের বিশ্বাস অনুযায়ী বিশুদ্ধ করিয়া দেন, তবে কোনই আশঙ্কা করিব না। হজরত নবীয়ে করীম (ছঃ)-এর তোফায়লে আল্লাহ্পাক আমাদিগকে ও আপনাদিগকে হাঁহাদের তরীকার প্রতি দণ্ডায়মান রাখুন;
(আমিন)।
জনৈক দরবেশ লাহোর হইতে আসিয়া বলিলেন যে, শায়েখ জিউ অর্থাৎ শায়েখ ফরিদ পুরাতন বাজারের জামে মসজিদে জুমার নামাজের জন্য গিয়াছিলেন। মিঞা রফিউদ্দিন ইছলামের প্রতি তাঁহার শুভ দৃষ্টির আলোচনা করিয়া বলিলেন যে, নবাব শায়েখ জিউ নিজের হাবেলিতেই (বাটিতেই) জামে মসজিদ নির্মাণ করিয়াছেন। উহার জন্য আমি আল্লাহ্পাকের শোকর গোজারী করিতেছি। আল্লাহ্ তায়ালা আপনাকে আরও এই প্রকারের শক্তি ও সুযোগ প্রদান করুন; এইরূপ সংবাদ খালেছ বন্ধুগণ শুনিলে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়া থাকে।
জনাব ছাইয়েদ সাহেব, ইদানীং ইছলাম- পথিকের ন্যায় অত্যন্ত দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে। ইহার পিছনে এক কপর্দক ব্যয় করা কোটী কোটী টাকা ব্যয় করার ন্যায় মূল্য রাখে। কোন্ বীর পুরুষ যে এই সৌভাগ্য প্রদত্ত হইবে তাহা আল্লাহই জানেন। ইছলামের সাহায্য যখনই যাহার দ্বারা হউক না কেন তাহা অতীব সুন্দর, কিন্তু ইছলামের এই দুর্বলতার সময় আপনার মত আহলে-বয়েত-ই রছুলুল্লাহ (ছঃ)-এর বীর পুরুষ দ্বারা হওয়া অতীব সুশ্রী ও প্রীতিকর। এই দৌলত (সম্পদ) আপনাদের গৃহজাত। অতএব আপনার জন্য ইহা নিজস্ব এবং অন্যের জন্য অর্জিত- অপরের নিকট হইতে গৃহীত। এই উচ্চস্তরের কার্য্যটি লাভ করাই হজরত নবীয়ে (ছঃ)-এর প্রকৃত ওয়ারেছ বা উত্তরাধিকারী হওয়া। হজরত নবীয়ে করীম (ছঃ) স্বীয় ছাহাবাগণকে সম্বোধন করিয়া বলিয়াছিলেন যে, “তোমরা এমন এক সময়ে কালে বর্তমান আছ যে, আল্লাহতায়ালার আদেশ নিষেধাদির একদশমাংশ পরিত্যাগ করিলে তোমরা বরবাদ হইয়া যাইবে। কিন্তু তোমাদের পর একদল লোক আসিবে যাহারা উহাদের একদশমাংশ প্রতিপালন করিলেই উদ্ধার পাইবে”। ইহাই সেই সময় এবং ইহারাই সেই দল।
সৌভাগ্যের ‘বল’ আছে মাঠে অনিবার, খেলিতে আসে না কেহ কোথায় ছওয়ার।
গুরু-গোবিন্দ এবং তাহার বংশধরগণকে বধ করা উপস্থিত সময়ের জন্য বিশেষ উৎকৃষ্ট হইয়াছে, ইহাতে বিধর্মীরা ভগ্নপ্রায় হইয়া গিয়াছে। যে কোন উদ্দেশ্যেই তাহাকে বধ করা হউক না কেন, কাফেরদিগকে অপদস্থ করাই মুছলমানগণের মূলধন। উহাকে বধ করার পূর্ব্বে এ ফকীর স্বপ্নে দেখিয়াছিল যে, এই জমানার বাদশাহ শেরেকের মস্তক চূর্ণ করিয়া দিয়াছেন। সত্যই ঐ কাফের-মোশরেকদিগের শীর্ষস্থানীয় এবং এমাম (অগ্রণী) ছিল। আল্লাহ্পাক ইহাদিগকে অপদস্থ করুন। ইহকাল ও পরকালের ছরদার, হজরত (ছঃ) স্বীয় প্রার্থনাকালে অনেক সময় মোশরেকদিগকে নিম্নলিখিতরূপে অভিশাপ দিতেন যে, “হে আল্লাহ্ উহাদের একতা ভঙ্গ কর এবং উহাদের গৃহ-বাটী বিধ্বস্ত কর। পরাক্রমশালী সক্ষম ব্যক্তির আক্রমণের ন্যায় উহাদিগকে আক্রমণ কর”। সুতরাং ইছলাম ও মুছলমানগণের ইজ্জত-সম্মান- কুফর ও কাফেরগণকে বেইজ্জত-অপদস্থ করার দ্বারাই হইয়া থাকে, জিজইয়া-কর গ্রহণের অর্থ উহাদিগকে লাঞ্ছিত করা।
উহাদিগকে যতদূর সম্মান প্রদান করা হইবে ইছলাম ততদূর অপমানিত হইবে- এই সূত্র সুরক্ষিত রাখিয়া চলিতে হইবে। অধিকাংশ লোকই ইহা হারাইয়া ফেলিয়াছে; অর্থাৎ ভুলিয়া গিয়াছে। ইহারই ফলে দ্বীন ধ্বংসের পথে চলিয়াছে।
আল্লাহ্পাক ফরমাইয়াছেন- “হে নবী কাফের এবং মোনাফেকদিগের সহিত জেহাদ করুন এবং উহাদের সঙ্গে কঠোর ব্যবহার করুন”। অতএব জেহাদ এবং কাফেরদিগের প্রতি কঠোর ব্যবহার করা দ্বীন ইছলামের একটি অত্যাবশ্যকীয় কার্য্য। কাফেরী রীতি-নীতি যাহা পূর্ব্ব হইতে প্রচলিত হইয়াছে, ইছলামী বাদশাহের তদ্দিকে এখনও ভ্রূক্ষেপ নাই, ইহা মুছলমানগণের প্রাণে কষ্টদায়ক। মুছলমানগণের কর্তব্য যে, ঐ অপবিত্রদের অপকর্মের দোষগুলি মুছলমান বাদশাহকে অবগত করায় এবং সেগুলি উঠাইয়া দিবার চেষ্টা করে। বোধ হয় ঐ অপকর্মগুলির ক্ষতি বাদশাহের জানা নাই বলিয়া উহা এখনও প্রচলিত আছে। আপনি অবসর মত মুছলমান আলেমগণকে জানাইয়া দিবেন যে, তাহারা যেন বাদশাহের নিকট কাফেরদিগের উক্ত নীতিসমূহের অনিষ্ট অবগত করাইয়া দেন। কেননা শরীয়ত প্রচারের জন্য কোনরূপ অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শনের আবশ্যক করে না।
রোজকেয়ামতে তাঁহাদের এই আপত্তি গ্রাহ্য হইবেনা যে, অলৌকিক ঘটনার ক্ষমতা না থাকায় তাঁহারা শরীয়ত প্রচার করিতে সক্ষম হন নাই। পয়গাম্বর (আঃ)-গণ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ ছিলেন, তাঁহারাও শরীয়ত প্রচার করিতেন। যদি কোন উম্মত মো’জেজা দেখিতে চাহিত তখন তাঁহারা বলিতেন যে, “মো’জেজা আল্লাহতায়ালার নিকট হইতেই; অর্থাৎ আমাদের ক্ষমতার বাহিরে, আমাদের প্রতি হুকুম প্রচার ব্যতীত




হত্যার কারণ যা-ই হোক, ধর্মীয় পরিচয়েই সন্তোষ
উপরের বাংলা অনুবাদে নিহত শিখ নেতার নামের জায়গায় “গুরু-গোবিন্দ” লেখা আছে। এখানে চিঠির ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন: ১৯৩ নম্বর চিঠিতে গোবিন্দওয়াল বা গোইন্দওয়ালের ধর্মীয় নেতার হত্যার যে উল্লেখ আছে, সেটি ১৬০৬ সালে জাহাঙ্গীরের আদেশে গুরু অর্জুনের মৃত্যুর ঘটনা হিসেবে শনাক্ত করা হয় [23]। অনুবাদের এই নামগত সমস্যার বাইরে সিরহিন্দির নৈতিক অবস্থানটি তাঁর নিজের বক্তব্যেই পরিষ্কার: যে কারণেই হত্যা করা হোক, কাফেরের অপদস্থ হওয়া মুসলমানের লাভ। অর্থাৎ একজন মানুষ সত্যিই কোনো অপরাধ করেছিলেন কি না, ন্যায়সংগত বিচার হয়েছিল কি না কিংবা শাস্তি অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের বদলে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ই সন্তোষের ভিত্তি হচ্ছে। এই মানদণ্ডে বিচার করলে নির্দোষ অমুসলিমের মৃত্যুও ধর্মীয় সাফল্য হিসেবে উদ্যাপন করার সুযোগ থাকে।
সিরহিন্দি শুধু এই সন্তোষ প্রকাশ করে থামেননি। একই চিঠিতে তিনি জিযিয়ার উদ্দেশ্য হিসেবে লাঞ্ছনার কথা বলেছেন এবং অমুসলিমকে যত সম্মান দেওয়া হবে ইসলাম তত অপমানিত হবে—এই সূত্র রক্ষা করতে বলেছেন। মানুষের মর্যাদাকে এখানে একটি সম্প্রদায়ের একচেটিয়া সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে: অন্যের সম্মান বাড়লে নিজের সম্মান কমবে। এই ধারণা গ্রহণ করলে সমান মর্যাদার সহাবস্থান সম্ভব হয় না, কারণ প্রতিবেশীর মাথা নিচু থাকা নিজের ধর্মের উন্নতির শর্ত হয়ে দাঁড়ায়। আরও লক্ষণীয়, তিনি আলেমদের শাসকের কাছে অমুসলিমের রীতি সম্পর্কে অভিযোগ করতে বলেছেন, যাতে সেগুলো উঠিয়ে দেওয়া হয়। আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব থেকে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি এখানে সরাসরি তৈরি হচ্ছে। ধর্মীয় স্বাধীনতা সংকুচিত করার জন্য এমনকি অলৌকিক ক্ষমতারও দরকার নেই—রাজদরবার ও শাসকের শক্তিই তাঁর প্রস্তাবিত উপায়।
একই গ্রন্থের আরেকটি দীর্ঘ উদ্ধৃতিতে সিরহিন্দি অমুসলিমের সঙ্গে বন্ধুত্ব, সামাজিক যোগাযোগ ও সম্মান প্রদানের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর যুক্তিতে ইসলাম ও কুফরের সম্মান পরস্পরবিরোধী; তাই অমুসলিমকে সম্মান দিলে ইসলামের সম্মান কমে। এই ধারণা থেকেই তিনি সম্পর্ক সীমিত করা, ঘৃণা রাখা এবং জিযিয়ার মাধ্যমে ভীত ও অবনত রাখার কথা বলেন। একটি মানুষের আচরণ, সততা বা অপরাধের বদলে তার ধর্মীয় পরিচয় এখানে সামাজিক আচরণের মূল মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়। আসুন, তাঁর এই বক্তব্যের সম্পূর্ণ উদ্ধৃত অংশ পড়ি [24]।
প্রতিপালন ও কুফরের আচার ব্যবহার পরিত্যাগ দ্বারাই অনুসরণ হইয়া থাকে। যেহেতু ইছলাম ও কুফর পরস্পর বিপরীত। ইহাদের একটি কায়েম করিলে অপরটি উঠিয়া যায়, অতএব একত্রিত হওয়া কোন ক্রমেই সম্ভবপর নহে। ইহাদের একটি সম্মানিত হইলে অপরটি অপমানিত হয়। আল্লাহ্পাক স্বীয় হাবিব পাক্কে ফরমাইয়াছেন-“হে নবী আপনি কাফের ও মোনাফেকদিগের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হউন এবং তাহাদের প্রতি কঠোর ব্যবহার করুন”। হজরত পয়গাম্বর (ছঃ) যিনি শ্রেষ্ঠ চরিত্রবান, তাঁহাকে যখন কাফেরদিগের প্রতি কঠোর ব্যবহারের আদেশ করিয়াছেন, তখন প্রতীয়মান হইতেছে যে, উহাদের সহিত উক্তরূপ ব্যবহার শ্রেষ্ঠ চরিত্রের অন্তর্ভূক্ত। সুতরাং কুফর এবং কাফেরদিগকে অপদস্থ-অপমানিত করাতেই ইছলামের সম্মান বৃদ্ধি পায়। যদি কেহ কুফরকে সম্মান দিল সে ইছলামকে অপদস্থ করিল। সম্মান প্রদানের অর্থ ইহা নহে যে, তাহাদিগকে মর্য্যাদা প্রদান করিয়া উচ্চ স্থানে স্থান দেয়, বরং তাহাদিগকে নিজের মজলিশে স্থান প্রদান করা ও ভ্রাতৃভাব পোষণ করতঃ কতাবার্তা বলাতেই সম্মান দেওয়া হয়। তাহাদিগকে কুত্তার মত বিদূরিত করিয়া দেওয়া উচিত। যদি কোন পার্থিব কার্য্যে তাহাদের আবশ্যক হয় এবং তাহারা ব্যতীত উহা সরবরাহ না হয়, তখন তাহাদের প্রতি অবিশ্বাস ভাব পোষণ করতঃ আবশ্যক মত মেলামেশা করা যাইতে পারে।
কিন্তু উক্ত পার্থিব গরজ উপেক্ষা করিয়া তাহাদের সহিত মেলামেশা না করাই ইছলামের পূর্ণতা। আল্লাহ্পাক কাফেরদিগকে স্বীয় কালাম পাকে নিজের ও পয়গাম্বরগণের দুশমন বলিয়া ফরমাইয়াছেন। অতএব আল্লাহ্ রছুল (ছঃ)-এর এই দুশমনদিগের সহিত সংশ্রব রাখা অতীব দোষণীয় কার্য্য। ইহাদের সংসর্গের সর্বনিম্ন ক্ষতি এই যে, উহাতে শরীয়তের হুকুম পরিচালনের ক্ষমতা এবং কাফেরদের আচার ব্যবহার বিদূরিতকরণ শক্তির লাঘব হয়। অর্থাৎ ভ্রাতৃভাবের লজ্জা প্রতিবন্ধক হইয়া দাড়ায়। ইহা ইছলামের পক্ষে অত্যন্ত অনিষ্টকর। আল্লাহ্তা’য়ালার দুশমনদিগের সহিত বন্ধুত্ব করা আল্লাহ্ ও রছুল (ছঃ)-এর দুশমনির পথে লইয়া যায়। অনেকে হয়ত মনে করেন যে, সে মুছলমান-আল্লাহ্-রছুল (ছঃ)-এর প্রতি বিশ্বাস রাখে,
কিন্তু এই প্রকারের কার্য্য যে তাহার ইছলাম সম্পদ সমূলে বিনষ্ট করে এবং সে তাহা আদৌ অবগত নহে। আমাদের কুপ্রবৃত্তি ও অপকর্ম হইতে আমরা আল্লাহ্ তা’য়ালার আশ্রয় গ্রহণ করিতেছি।
আপনারে ভাবে খাজা, খোদাপ্রাপ্তি বলি, পাইয়াছে তিনি, শুধু স্বীয় চিন্তাবলী।
ইছলাম ও মুছলমানগণের প্রতি তিরস্কার করাই শুধু এই অকেজোদের কার্য্য।
ইহারা সুযোগ পাইলে মুছমানদিগকে আহত বা নিহত অথবা কাফের করিয়া লইতে আপ্রাণ চেষ্টা করিবে। অতএব মুছলমানগণকেও লজ্জা করা উচিত ‘লজ্জা ঈমানের অঙ্গ’ ইছলামী লজ্জা একান্ত আবশ্যক; সর্বদা বিধর্মীগণকে অপদস্থ করিবার চেষ্টা করা দরকার। ভারতবর্ষের বাদশাহগণ তাহাদের সংসর্গ হেতুই তাহাদের উপর হইতে ‘জিজিয়া’ কর উঠাইয়া লইয়াছেন। তাহাদের নিকট হইতে জিজিয়া গ্রহণের প্রকৃত উদ্দেশ্য তাহাদিগকে অপদস্থ করিয়া রাখা। এমন অপদস্থ করিয়া রাখা আবশ্যক যে জিজিয়ার ভয়ে যেন তাহারা উৎকৃষ্ট বস্ত্র পরিধান করিতে সাহসী না হয়, জাঁকজমকের সহিত বিচরণ করিতেও না পারে। সততই যেন সম্পদ বাজেয়াপ্তির ভয়ে ভীত ও আতঙ্কিত থাকে। আল্লাহতায়ালা তাহাদিগকে অবনত রাখার উদ্দেশ্যেই যখন জিজিয়া নির্দ্ধারণের আদেশ করিয়াছেন, তখন বাদশাহগণের কি শক্তি যে, উহা বন্ধ করে তাহাদিগকে অবনত রাখিয়া ইছলামকে উন্নত করাই আল্লাহ্তা’য়ালার অভিপ্রায়।
“বিধর্মীদেরে যত পার করিতে নিহত অবশ্য ইছলাম তাতে হইবে উন্নত”।
কাফেরদের সহিত হিংসা রাখাই ইছলামের সৌভাগ্য প্রাপ্তির চিহ্ন। আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় কালামপাকে উহাদিগকে একস্থানে ‘নাজাছ’ বা অপবিত্র ও অন্যস্থানে ‘রেজেছ’ বা অশৌচ আখ্যা দিয়াছেন। অতএব মুছলমানগণের চক্ষে উহাদিগকে অপবিত্রই দেখা উচিত। যখন তাহারা উহাদিগকে এইভাবে দেখিবে, তখন অবশ্যই উহাদিগকে ঘৃণিত জানিয়া উহাদের সংসর্গ হইতে দূরে থাকিবে। উহাদিগকে কিছু


জিযিয়ার মাধ্যমে স্থায়ী ভীতি ও সামাজিক অধস্তনতা
এই উদ্ধৃতিতে জিযিয়াকে কেবল রাষ্ট্রের আয় বা সুরক্ষার বিনিময়ের অর্থ হিসেবে ব্যাখ্যা করার পথ সিরহিন্দি নিজেই বন্ধ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে লক্ষ্য হলো অমুসলিমকে এমনভাবে অপমানিত ও ভীত রাখা, যাতে সে ভালো পোশাক পরতে কিংবা জাঁকজমক নিয়ে চলতে সাহস না করে এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকে। যে করের ঘোষিত লক্ষ্য মানুষের মাথা নিচু রাখা, তাকে নাগরিক দায়িত্বের নিরপেক্ষ ভাষায় ঢেকে দেওয়া অসৎ ব্যাখ্যা। এখানকার সম্পর্ক শাসক ও সমান অধিকারের নাগরিকের নয়; কর্তৃত্বশীল ধর্মীয় পক্ষ এবং অনুমতি নিয়ে বেঁচে থাকা অধীন পক্ষের। কেউ কর দিচ্ছে বলে সে সম্মানজনকভাবে নিরাপদ—এই ধারণা সিরহিন্দির নিজের ব্যাখ্যার সঙ্গে মেলে না; করদাতার স্থায়ী আতঙ্ককেই তিনি কাম্য বলেছেন।
অমুসলিমের সঙ্গে বন্ধুত্ব নিয়েও তাঁর বক্তব্য একই কাঠামো অনুসরণ করে। ব্যবসার প্রয়োজন ছাড়া সম্পর্ক না রাখা, প্রয়োজন হলেও অবিশ্বাস বজায় রাখা এবং সামাজিক সান্নিধ্যকে ইসলামের ক্ষতি বলা হয়েছে। কেন ক্ষতি? তাঁর ব্যাখ্যায় ভ্রাতৃভাব তৈরি হলে অমুসলিমের বিরুদ্ধে কঠোর বিধান প্রয়োগ করতে লজ্জা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই স্বীকারোক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: অন্য মানুষকে পরিচিত, প্রিয় ও সমমর্যাদার বলে দেখতে শুরু করলে তাকে অপমান করার কাজে বিবেক বাধা দিতে পারে; তাই সম্পর্কটিকেই দুর্বল করতে হবে। মানুষের সঙ্গে মানুষের স্বাভাবিক সহমর্মিতা এখানে সংশোধনের বিষয় নয়, ধর্মীয় আধিপত্যের প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখা হয়েছে। এই অবস্থানকে অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদ বলা যায় না।
সিরহিন্দির এসব বক্তব্য অন্য গবেষণা ও সংকলনেও উদ্ধৃত হয়েছে। রিজভী ও ফ্রিডম্যানের গবেষণা এবং অ্যান্ড্রু বস্টমের সংকলনের মাধ্যমে উদ্ধৃত বক্তব্যগুলো মকতুবাতের উপরোক্ত সরাসরি পাঠের সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে তরবারির সাহায্যে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা, অমুসলিমের অপমান এবং নিজের ধর্মের সম্মানকে তাদের পতনের ওপর নির্ভরশীল করার ধারণাটি আরও স্পষ্ট হয়। বিভিন্ন সূত্রে একই বক্তব্য পুনরুদ্ধৃত হওয়া তার প্রচার ও গ্রহণের ইতিহাসও দেখায়। নিচে সেই বক্তব্যগুলো রেফারেন্সসহ দেওয়া হলো।
■ শরীয়ত তলোয়ারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হবে। [25]
■ অবিশ্বাসীদের সাথে লড়াই করা এবং তাদের সাথে কঠোর আচরণ করা ইসলামের অন্যতম আবশ্যিক শর্ত।
■ ইসলামের সম্মান অবিশ্বাস ও অবিশ্বাসীদের পতনের মধ্যে।
■ (অবিশ্বাসীদের) থেকে জিজিয়া নেওয়ার মূল লক্ষ্য তাদের অবক্ষয় এবং এই অবক্ষয় যেন এমন হয় যে তারা জিজিয়ার ভয়ে সুন্দর পোশাক পরতে না পারে… এবং তারা সর্বদা ভীত ও কাঁপতে থাকে…
■ সেদিন গোবিন্দওয়ালের অভিশপ্ত কাফেরকে খুব সৌভাগ্যক্রমে হত্যা করা হয়। এটি নরকী হিন্দুদের পরাজয়ের এক কারণ। তাদের যে উদ্দেশ্যে বা যে লক্ষ্য পূরনেই হত্যা করা হোক, তাদের জীবনই আসলে মুসলমানদের জন্য অপমানের। এই কাফিরকে হত্যা করার আগে, আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম যে, সে সময়ের সম্রাট শিরক বা কুফরির মাথার মুকুট ধ্বংস করেছেন। এটা সত্য যে, এই কাফের (গুরু অর্জুন) কাফিরদের প্রধান এবং কাফিরদের নেতা ছিল। তাদের উপর জিজিয়া (অমুসলিমদের উপর কর) ধার্য করার লক্ষ্য হল কাফিরদের লাঞ্চিত ও অপমান করা এবং তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা এবং তাদের প্রতি বৈরিভাব রাখাই হল মুহাম্মদীয় বিশ্বাসের আবশ্যকতা।
■ যখনই কোনও ইহুদিকে হত্যা করা হয় তা ইসলামের স্বার্থে হয়। [26]
■ সুতরাং প্রত্যেক মুসলমানকে সমস্ত নতুনত্ব বা বিদাত ( যা ইসলামে নেই ) এর বিরুদ্ধে জিহাদ পরিচালনা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। [27]
■ ভারতে গরু-কোরবানি হল ইসলামি রীতিগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। কাফিররা (হিন্দুরা) হয়ত জিজিয়া কর দিতে রাজি হতে পারে তবে তারা কখনও গরু-কোরবানি রাজি হবে না… তাদের (হিন্দুদের) থেকে জিজিয়া নেওয়ার মূল লক্ষ্য তাদের এতদূর অবমাননা করা যেন তারা জিজিয়ার ভয়ে সুন্দর পোশাক পরতে না পারে এবং জাঁকজমকপূর্ন জীবনযাপন করতে না পারে। তাদের ক্রমাগত আতংকে ও কাপুনিতেঁ রাখা উচিত। এর উদ্দেশ্য তাদের অবক্ষয় এবং ইসলামের সম্মান এবং গরীমার উত্থান। [28]
■ কুফর এবং ইসলাম একে অপরের পরিপন্থী। একটির অগ্রগতি কেবল অন্যটির অবক্ষয়ে সম্ভব এবং এইদুটি পরস্পরবিরোধী বিশ্বাসের মধ্যে সহাবস্থান অচিন্তনীয়।
■ কুফর এবং কাফিরদের অপমান করার মধ্যেই ইসলামের সম্মান নিহিত। যে কাফিরদের সম্মান করে, মুসলমানদের অসম্মান করে সে। তাদের শ্রদ্ধা করার অর্থ কেবল তাদের সম্মান করা এবং সংসদে একটি আসন অর্পণ করা তা নয়, বরং এটি তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখা বা তাদের গুরুত্ব দেয়া বুঝায়। তাদের এক হাত দূরে রাখতে হবে যেমনটি একটি কুকুরকে রাখা হয়… যদি তাদের ছাড়া কোনো পার্থিব ব্যবসা সম্পাদন করা সম্ভব না হয় তবে সেক্ষেত্রে তাদের সাথে কেবল ন্যূনতম যোগাযোগ স্থাপন করা উচিত তবে তাদের উপর কোনো বিশ্বাস ব্যতিরেকেই। শীর্ষস্থানীয় ইসলামিক মনোভাব জোর দেয় যে, সেই পার্থিব ব্যবসাটি পরিহার করাই উচিত এবং কাফিরদের সাথে কোনও সম্পর্ক স্থাপন না করা উচিত।
■ তাদের (অমুলিমদের) উপর জিজিয়া ধার্য করার লক্ষ্য হল কাফিরদের এমনভাবে লাঞ্চিত ও অপমান করা যেন তারা জিজিয়ার ভয়ে সুন্দর পোশাক পরতে না পারে এবং জাঁকজমকপূর্ন জীবনযাপন করতে না পারে। তাদের ক্রমাগত আতংকে ও কাপুনিতেঁ রাখা উচিত। এর উদ্দেশ্য তাদের অবক্ষয় এবং ইসলামের সম্মান এবং গরীমার উত্থান।
■ (তিনি লালা বেগকে লিখেছেন) ভারতে গরু-কোরবানি হল ইসলামি রীতিগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। কাফিররা (হিন্দুরা) হয়ত জিজিয়া কর দিতে রাজি হতে পারে তবে তারা কখনও গরু-কোরবানি রাজি হবে না।
■ গোবিন্দওয়াল (শিখ নেতা) -এ অভিশপ্ত কাফিরের ফাঁসি কার্যকর হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন এবং অভিশপ্ত হিন্দুদের মহান পরাজয়ের কারণ। ‘মৃত্যুদন্ডের পিছনে যে উদ্দেশ্যে বা যে লক্ষ্যই থাকুক না কেন, কাফিরদের অসম্মান মুসলমানদের জন্য সর্বোচ্চ প্রশংসনীয় কাজ। এই কাফিরদের হত্যা করার আগে, আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম যে, সে সময়ের সম্রাট, শিরক এর মাথার মুকুট ধ্বংস করেছেন। প্রকৃত সে ছিল মুশরিকদের প্রধান এবং কাফিরদের নেতা [29]
ধর্মীয় আচারকে অন্যের অপমানের উপায় করা
গরু-কোরবানির বিষয়ে উদ্ধৃত বক্তব্যগুলোতেও একই নীতি দেখা যায়। একটি ধর্মীয় আচারকে গুরুত্বপূর্ণ বলার কারণ হিসেবে অন্য সম্প্রদায় সেটিতে কতটা কষ্ট পায় কিংবা মেনে নিতে পারে না, সেই বিষয় সামনে এসেছে। উদ্ধৃত বক্তব্যে অন্য সম্প্রদায়ের আপত্তি ও অপমানকে নিজের ধর্মীয় আচারের বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে প্রতিবেশীর দুর্দশাই এখানে ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রদর্শনের উপায় হয়ে উঠেছে। যে আচারের মাহাত্ম্য নির্ধারিত হয় প্রতিবেশীর অপমান দিয়ে, তার সামাজিক লক্ষ্য সহাবস্থান হতে পারে না। জিযিয়া গ্রহণ করতে রাজি হলেও গরু-কোরবানি মেনে নিতে না পারার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, অর্থনৈতিক অধীনতাকেও যথেষ্ট মনে করা হচ্ছে না; প্রতিপক্ষের ধর্মীয় অনুভূতির ওপর কর্তৃত্ব প্রকাশ করাও কাম্য। এই ধারণা অমুসলিমের স্বাধীন জীবনকে শাসকের দয়ার অধীন করে এবং তার আপত্তিকে নিজের মর্যাদা রক্ষার চেষ্টা হিসেবে স্বীকার করে না।
এই দীর্ঘ উদ্ধৃতিমালায় অমুসলিমের হত্যায় সন্তোষ, সামাজিক অপমান, অবিশ্বাস, ভীতির মাধ্যমে কর আদায় এবং ধর্মীয় আচারে কর্তৃত্ব প্রদর্শন একই চিন্তার মধ্যে যুক্ত হয়েছে। ফলে সিরহিন্দির বক্তব্যকে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন রূঢ় শব্দ বলে সরিয়ে দেওয়া যায় না। এগুলো তাঁর কাঙ্ক্ষিত সামাজিক বিন্যাসের অংশ: মুসলমানের ধর্মীয় সম্মান বাড়বে অমুসলিমের অবস্থান নিচু হলে। আধ্যাত্মিক উন্নতি ও রাষ্ট্রীয় আধিপত্যের এই সংযোগই “প্রেমময় সুফিবাদ” সম্পর্কে অগ্রিম ধারণাকে পরীক্ষা করার কারণ। একটি পীরের মর্যাদা, ভক্তের সংখ্যা কিংবা সাধনার খ্যাতি তাঁর রাজনৈতিক নির্দেশকে ন্যায়সংগত করে না। যে নীতি মানুষের ধর্মীয় পরিচয়কে অপমানের যথেষ্ট কারণ করে, তার বিরুদ্ধে আপত্তি মানুষের সমান মর্যাদা থেকেই আসে।
উপসংহার
উপরের দলিলগুলোতে আমরা সামরিক অভিযান, সম্পদলাভ, বন্দিত্ব এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের একটি স্পষ্ট সম্পর্ক দেখতে পেলাম। বখতিয়ারের অভিযানের বর্ণনায় শিক্ষায়তনের অধিবাসীদের হত্যা, বিপুল লুণ্ঠন এবং নারীসহ মানুষের দখল হওয়ার কথা আছে। ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীতে অন্য ভূখণ্ডে প্রবেশ করে ইসলামগ্রহণ বা জিযিয়ার শর্ত আরোপ, অতর্কিত আক্রমণ, জীবনধারণের উপকরণ ধ্বংস এবং নারী-শিশুকে গনিমতের অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রয়েছে। সিরহিন্দির চিঠিতে অমুসলিমের অপমানকে ইসলামের সম্মান, জিযিয়াকে লাঞ্ছনার উপায় এবং ভিন্ন ধর্মের নেতার মৃত্যুকে সন্তোষের বিষয় বলা হয়েছে। এই বক্তব্যগুলো একত্রে দেখায়, আলোচ্য ব্যবস্থায় আক্রান্ত মানুষের অধিকার বিজয়ীর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক স্বার্থের অধীন করা হয়েছে। লুটপাটকে গনিমত, অভিযানে অংশগ্রহণকে পুণ্য এবং অধীনতাকে সুরক্ষা বললে সেই অধিকারহরণের প্রকৃতি বদলে যায় না।
মুঘল শাসনের বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় সহাবস্থানের চেষ্টা এবং কঠোর শরিয়তপন্থী চাপের দ্বন্দ্বও এই ইতিহাসের অংশ। আকবরের ধর্মীয় উদারতার উদ্যোগ, দীন-ই-ইলাহির পরীক্ষামূলক পরিসর এবং গুরু নানকের মাধ্যমে সূচিত শিখ পরম্পরা সেই সমাজে ভিন্ন চিন্তার অস্তিত্ব দেখায়। কিন্তু মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা যদি শাসকের ব্যক্তিগত সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে, তাহলে একটি উদার রাজত্ব স্থায়ী অধিকার প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা দেয় না। শাসক বদলালে বা ধর্মীয় কট্টরতার প্রভাব বাড়লে অধিকার আবার সংকুচিত হতে পারে। অমুসলিমের সম্মানকে ইসলামি সম্মানের বিপরীত এবং তার অধীনতাকে ধর্মীয় কর্তব্য বলে মানা হলে এই সংকট বিধানের মধ্যেই থেকে যায়। কোনো শাসক সাময়িকভাবে তা প্রয়োগ না করলেও সমস্যাটির নৈতিক নিষ্পত্তি হয় না।
এই ইতিহাসের বিচার করতে বিজয়ীর ধর্মীয় পরিচয়কে বিশেষ ছাড় দেওয়া যাবে না। মানুষের জীবন, স্বাধীনতা, সম্পত্তি ও মর্যাদা হরণ যে পক্ষই করুক, তার দায় থাকবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠা বা পরকালীন পুরস্কারের দাবি সেই দায় মোচন করে না। বরং কোনো বিধান আল্লাহপ্রদত্ত বলে নিজেকে সংশোধনের ঊর্ধ্বে রাখতে চাইলে তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুক্তিনির্ভর প্রশ্ন আরও জরুরি হয়। শিক্ষক ও ভিক্ষুর হত্যাকে বীরত্ব, নারী ও শিশুর বন্দিত্বকে বৈধ সম্পদলাভ এবং প্রতিবেশীর অপমানকে ধর্মীয় উন্নতি বলে গ্রহণ করার কারণ নেই। আমাদের প্রয়োজন আক্রান্ত মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে দলিল পড়া, লুট ও হত্যার গৌরবায়ন প্রত্যাখ্যান করা এবং এমন শাসনব্যবস্থার বিরোধিতা করা যেখানে ধর্মীয় পরিচয় মানুষের অধিকার নির্ধারণ করে। ভারতীয় উপমহাদেশে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা মানুষের সমান মর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে; তরবারির শক্তি বা শরিয়তি কর্তৃত্বের নামে সেই মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার কোনো অনুমতি থাকতে পারে না।
তথ্যসূত্রঃ
- সহিহ বুখারি, ৫৬৯২–৫৬৯৩; ভারতীয় কুস্ত বিষয়ে পরিচ্ছেদ ↩︎
- সুনান আন-নাসায়ি, ৩১৭৫; কিতাবুল জিহাদ, হিন্দুস্থান অভিযানের পরিচ্ছেদ ↩︎
- কিতাবুল ফিতান, নুআইম বিন হাম্মাদ ↩︎
- J. W. McCrindle, The Invasion of India by Alexander the Great as Described by Arrian, Q. Curtius, Diodorus, Plutarch and Justin, Westminster, Constable, 1893, pp.343-344 ↩︎
- ইউনেসকো: নালন্দা মহাবিহারের প্রত্নস্থলের বিবরণ ↩︎
- এ বি এম শামসুদ্দীন আহমদ, “Bakhtiyar Khalji”, বাংলাপিডিয়া ↩︎
- তবকাত-ই-নাসিরী, মিনহাজ-ই-সিরাজ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ↩︎
- তবকাত-ই-নাসিরী, মিনহাজ-ই-সিরাজ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, পৃষ্ঠা ১৯ ↩︎
- তবকাত-ই-নাসিরী, মিনহাজ-ই-সিরাজ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, পৃষ্ঠা ২০ ↩︎
- তবকাত-ই-নাসিরী, মিনহাজ-ই-সিরাজ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, পৃষ্ঠা ২৭ ↩︎
- তবকাত-ই-নাসিরী, মিনহাজ-ই-সিরাজ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, পৃষ্ঠা ২৮ ↩︎
- তবকাত-ই-নাসিরী, মিনহাজ-ই-সিরাজ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, পৃষ্ঠা ৩৪ ↩︎
- তবকাত-ই-নাসিরী, মিনহাজ-ই-সিরাজ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, পৃষ্ঠা ৪২ ↩︎
- Naran-go-e or Naran-ko-e ↩︎
- Tabakat-i-nasiri Vol.1, page 552, 557, 558 ↩︎
- আহমেত ওজেল, “el-Âlemgîriyye”, টিডিভি ইসলাম বিশ্বকোষ ↩︎
- মুহাম্মদ খালিদ মাসুদ, “Religion and State in Late Mughal India: The Official Status of the Fatawa Alamgiri” ↩︎
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০২, ৫০৩, ৫৩৫, ৫৩৭, ৫৪০ ↩︎
- স্ট্যানফোর্ড দর্শন বিশ্বকোষ: আরবি ও ইসলামি দর্শনে অতীন্দ্রিয়বাদ ↩︎
- হামিদ আলগার, “İmâm-ı Rabbânî”, টিডিভি ইসলাম বিশ্বকোষ ↩︎
- Muslim Revivalist Movements In Northern India by Rizvi,saiyid Athar Abbas, Page 247 ↩︎
- মকতুবাত শরীফ, ২য় খণ্ড, মূলঃ গাওছে ছামদানী মহবুবে ছোবহানী এমামে রব্বানী হযরত মোজাদ্দেদে আলফেছানী, অনুবাদকঃ শাহ মোহাম্মদ মুতী আহমদ আফতাবী, প্রকাশকঃ আফতাবিয়া খানকাহ শরীফ, পৃষ্ঠা ৭০-৭৩ ↩︎
- ইয়োহানান ফ্রিডম্যান, “Ahmad Shaikh (1564–1624)”, The Encyclopaedia of Sikhism ↩︎
- মকতুবাত শরীফ, ২য় খণ্ড, মূলঃ গাওছে ছামদানী মহবুবে ছোবহানী এমামে রব্বানী হযরত মোজাদ্দেদে আলফেছানী, অনুবাদকঃ শাহ মোহাম্মদ মুতী আহমদ আফতাবী, প্রকাশকঃ আফতাবিয়া খানকাহ শরীফ, পৃষ্ঠা ২৩-২৪ ↩︎
- সাইয়েদ আব্বাস রিজভী, ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দীতে উত্তর ভারতে মুসলিম পুনরুজ্জীবনের আন্দোলন, আগ্রা, ১৯৬৫, পৃঃ ২৪৭ ↩︎
- Excerpted from Saiyid Athar Abbas Rizvi, Muslim Revivalist Movements in Northern India in the Sixteenth and Seventeenth Centuries (Agra, Lucknow: Agra University, Balkrishna Book Co., 1965), pp.247-50; and Yohanan Friedmann, Shaykh Ahmad Sirhindi: An Outline of His Thought and a Study of His Image in the Eyes of Posterity (Montreal, Quebec: McGill University, Institute of Islamic Studies, 1971), pp. 73-74 ↩︎
- Saiyid Athar Abbas Rizvi, Muslim Revivalist Movements in Northern India in the Sixteenth and Seventeenth Centuries (নয়া দিল্লিঃ মুনশিরাম মনোহরলাল প্রকাশনী প্রাইভেট লিঃ, ১৯৬৫), ২৫৬ ↩︎
- বোষ্টম, দি লিগেছি অব জিহাদ, পৃঃ২০০-২০১ ↩︎
- বোষ্টম, এ.জি.এম.ডি. এবং বোষ্টম, এ.জি. (২০১০)। দি লিগেছি অব জিহাদঃ ইসলামিক হলি ওয়ার এন্ড দি ফেইট অব নন-মুসলিমস। এমহার্স্টঃ প্রমিথিউস। স.আ.আ. রিজভী কর্তৃক উদ্বৃত, ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দীতে উত্তর ভারতে মুসলিম পুনর্জাগরনের আন্দোলন, আগ্রা, ১৯৬৫, ওয়াই. ফ্রেডমেন, শায়েখ আহমেদ সিরহিন্দিঃ এন আউটলাইন, ১৯৭১। ↩︎
About This Article
Genre: Semi-Academic Historical and Textual Critique.
Epistemic Position: Rational Skepticism, Historical Inquiry and Secular Humanism.
This article examines the religious glorification of military campaigns against India, Bakhtiyar Khalji’s conquests in Bihar and Bengal, and the human consequences of conquest, plunder and the destruction of centres of learning. It also investigates the religious and legal foundations of coercion, enslavement and the subordination of non-Muslims through the Fatawa Alamgiri and Ahmad Sirhindi’s letters.
Drawing on hadith collections, medieval chronicles, Hanafi jurisprudence and historical scholarship, the article examines how violence and religious discrimination acquired sacred authority. Its ethical standard is human life, freedom, equality and dignity: promises of salvation, the prestige of a conqueror or the spiritual reputation of a religious figure cannot establish the justice of the actions and doctrines examined here.


The picture you had provided is of Sikh warrior Banda Singh Bahadur, not Bakhtiyar Khilji. Kindly rectify it(if possible)!
অনেক অনেক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা, আজই প্রথম আপনার ওয়েবসাইটে ভিজিট করলাম, সত্যিই এক অসাধারণ কাজ করে যাচ্ছেন। এজন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি সাইটটি সাবস্ক্রাইব করেছি।আমির অতৃপ্ত মনের অনেক তৃপ্তিকর প্রশ্নোত্তর খুঁজে পাব বলে আশা করি। তবুও অনুরোধ যদি কোন হার্ড প্রকাশনা থাকে জানালে উপকৃত হবো। কারন আমি পড়তে চাই ও জানতে চাই, এর মধ্যে কিছু সংখ্যক বই পুস্তক পড়েছি এছাড়াও ছোট হতেই মনের মধ্যে আল্লাহ, স্রষ্টা, ঈশ্বর, ভগবান এবং প্রাগৈতিহাসিক নানা জিজ্ঞেস জমেছে। সেই সবের উত্তর খুঁজছি নিরলস ভাবে। আমার পছন্দের বিষয় কম্পারেটিভ রিলিজিয়ন এণ্ড সাইন্স। উল্লেখ্য আমি একজন জীববিজ্ঞানের নগন্য শিক্ষার্থী মাত্র । তবে ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, পদার্থ, প্রাণরসায়ন,জিনত্ত্ব এবং কোয়ান্টাম তত্ত্ব পছন্দের বিষয়। আমি ২০০৪-৫ সালে কোরআন এর সুরা জিন নিয়ে নিজস্ব সামান্য গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে ব্লগ লেখা শুরু করেছিলাম দুঃখের বিষয় কিছু তথাকথিত শিক্ষিত মূর্খদের হুমকি ধামকির জন্য পারিবারিক নিরাপত্তার খাতিরে বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছি।এতদ্ সত্তেও ইচ্ছা আছে প্রকাশ করবোই। পরিশেষে আপনার লেখা আমাকে যথেষ্ট পরিমাণে উর্বর করবে বলে আমার বিশ্বাস। সত্যিকারার্থে আমি একজন সংসয়বাদী মানুষ। অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা ভালো থাকবেন সবসময়।”নমো তসস্ ভগবতো অরহতো সম্মাসম্বুদ্ধসস” বা “ওঁত তৎ সৎ”
very rich content.
thank you.