জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

ইসলামি আক্রমণাত্মক জিহাদে নারী–শিশু হত্যার বৈধতা: রাতের হামলা, অবরোধ ও অনাহারে মৃত্যু

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি 19, 2025লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন87 মিনিট পড়া

ভূমিকা

ইসলামী যুদ্ধনীতি বা জিহাদকে মানবিকতার আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করতে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের হত্যা না করার বিধানটি বারবার সামনে আনা হয়। এই উপস্থাপনার প্রতারণা হলো, হত্যার নিষেধাজ্ঞাকে এমনভাবে দেখানো, যেন তার অর্থ আক্রান্ত মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার পূর্ণ স্বীকৃতি। অথচ ধ্রুপদি ইসলামি দলিলেই সেই নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি রাতের অতর্কিত হামলায় নারী–শিশুর মৃত্যু, তাঁদের উপস্থিতি জেনেও দুর্গে আক্রমণ, বন্দিদের সম্পত্তি হিসেবে বণ্টন এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অনাহারে মৃত্যুর জন্য ফেলে রাখার অনুমোদন রয়েছে। একটি নিষেধাজ্ঞাকে তার প্রয়োগ, ব্যতিক্রম ও পরিণতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে উদ্ধৃত করলে সহজেই মানবিকতার আকর্ষণীয় প্রচার তৈরি করা যায়। কিন্তু হামলার মুখে থাকা শিশুটি কীভাবে বাঁচবে, বন্দি নারীর নিজের জীবনের ওপর কতটুকু কর্তৃত্ব থাকবে এবং আক্রমণকারীর সুবিধার সঙ্গে বিরোধ ঘটলে তাঁদের নিরাপত্তার কী হবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর রয়েছে সেই প্রচারে গোপন রাখা বিধানগুলোতে।

মানুষকে হত্যা না করার ঘোষণা এবং মানুষকে স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে স্বীকার করা আলাদা নৈতিক দাবি। বন্দি নারীকে জীবিত রেখে বিজয়ীর সম্পত্তি বানানো হলে তাঁর জীবন বজায় থাকে, কিন্তু নিজের শরীর, পরিবার ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার বিজয়ীর হাতে চলে যায়। একটি শিশুকে সরাসরি হত্যার লক্ষ্য না করেও তার উপস্থিতি জানা অবস্থায় প্রাণঘাতী হামলা চালানো হলে নিষেধাজ্ঞার ভাষা অক্ষত রাখা সম্ভব, অথচ শিশুটির প্রাণ রক্ষা হয় না। আবার খাদ্য–পানি ছাড়া নির্জন স্থানে ফেলে মৃত্যু ঘটানোর বিধানে সরাসরি হত্যার নিষেধাজ্ঞাকেই যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থায় আক্রমণকারীর কাজের শ্রেণিবিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে; আক্রান্ত মানুষের যন্ত্রণা ও মৃত্যু সেই শ্রেণিবিভাগের সীমা অতিক্রম করে একই নির্মম বাস্তবতা প্রকাশ করে। যে নীতি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি তাকে বিক্রিযোগ্য সম্পদ বানায় অথবা সরাসরি হত্যা নিষিদ্ধ বলে ধীর মৃত্যুর ব্যবস্থা করে, তার মানবিকতার দাবি গভীর নৈতিক অসংগতিতে আক্রান্ত।

এই যুদ্ধনীতিতে ধর্মীয় পরিচয়ও মানুষের নিরাপত্তা নির্ধারণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। আজান শুনে আক্রমণ বন্ধ করা, নির্দিষ্ট ধর্মীয় ঘোষণা প্রাণরক্ষার শর্ত হওয়া এবং প্রতিপক্ষের উপাসনালয় ধ্বংসের অভিযান মানুষের বিশ্বাসকে সশস্ত্র কর্তৃত্বের অধীন করে। একজন মানুষের নিজের ধর্ম পালন করা, অন্য ধর্ম গ্রহণ না করা কিংবা বিজয়ীর ধর্মীয় ঘোষণা উচ্চারণ না করার কারণে তাঁর নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়লে সেখানে বিবেকের স্বাধীনতা লঙ্ঘিত হয়। একইভাবে নারীর সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা এবং শিশুর ভবিষ্যতে বড় হয়ে ওঠাকে সম্ভাব্য শত্রুশক্তির উৎস ধরে তাঁদের মৃত্যুর বিধান দেওয়া ব্যক্তিগত কাজের দায়ের জায়গায় গোষ্ঠীগত পরিচয় ও ভবিষ্যৎ জনসংখ্যাকে বসায়। মানুষ তখন নিজের কাজের জন্য দায়ী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হয় না; শত্রুপক্ষের বর্তমান সম্পদ অথবা ভবিষ্যৎ জনবল হিসেবে তাঁর মূল্য নির্ধারিত হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি নারী ও শিশুর অসহায়তাকেও সামরিক হিসাবের উপাদানে পরিণত করে।

ধ্রুপদি ভাষ্যকার ও ফকিহদের আলোচনায় এই সমস্যাগুলো আড়ালহীন ভাষাতেই সংরক্ষিত। সেখানে নিষেধাজ্ঞা আছে, নিষেধাজ্ঞার পরিসর সংকুচিত করার ব্যাখ্যা আছে, সামরিক প্রয়োজনের যুক্তিতে প্রাণহানি অনুমোদন আছে, আবার কোনো কোনো নিষ্ঠুর বিধানের বিরুদ্ধে আপত্তিও আছে। এই মতভেদে অনুমোদিত কাজের প্রকৃতি স্পষ্ট হয়: কেউ এমন পদ্ধতিকে নিষিদ্ধ হত্যার চেয়েও কঠোর বলেছেন, কেউ নির্দিষ্ট শর্তে সেই পদ্ধতিকেই সমস্যামুক্ত গণ্য করেছেন। একটি বিধানের ধর্মীয় বৈধতা এবং মানুষের ওপর তার নৈতিক পরিণতি তাই একই সিদ্ধান্ত নয়। ধর্মীয় গ্রন্থের অনুমোদন, নবীর নজির কিংবা মাযহাবের গৃহীত মত কোনো মানুষের কষ্ট কমায় না এবং তার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার নৈতিক দায়ও শেষ করে না। মানবিকতার বিচারে মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা মুখ্য। সেগুলোকে ধর্মীয় পরিচয়, বিজয়ীর মালিকানা এবং সামরিক সুবিধার অধীন করে রাখা ব্যবস্থাকে মানবিকতার চূড়ান্ত আদর্শ বলা আক্রান্ত মানুষদের অভিজ্ঞতার প্রতি নির্মম অবজ্ঞা।


আজানের ধ্বনির ভিত্তিতে আক্রমণ

আনাস ইবনে মালিকের বর্ণনায় মুহাম্মদের অভিযানের একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্তপদ্ধতি পাওয়া যায়: ভোর হলে তিনি আজানের শব্দ শোনার অপেক্ষা করতেন; আজান শুনলে আক্রমণ থেকে বিরত থাকতেন, না শুনলে আক্রমণ করতেন। হামলা চালানো অথবা থামানোর এই মুহূর্তে যে তথ্যটি খোঁজা হচ্ছে, সেটি জনপদের ধর্মীয় পরিচয়। আজানের শব্দ প্রমাণ করে যে সেখানে ইসলামি উপাসনা চলছে, আর সেই চিহ্ন পাওয়া আক্রমণ বন্ধের কারণ। একটি গোত্রের ওপর অভিযানের মুখে কোন ধর্মীয় শব্দ উচ্চারিত হচ্ছে, তা এভাবে মানুষের নিরাপত্তার নির্ধারক হয়ে উঠছে। বর্ণনাটি কোনো একবারের ব্যতিক্রমী আচরণ হিসেবে বলা হয়নি; ‘করতেন’, ‘অপেক্ষা করতেন’, ‘বিরত থাকতেন’—এই ধারাবাহিক ভাষায় অভ্যাসগত পদ্ধতি হিসেবে এসেছে [1] [2] [3]

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৪/ কিতাবুস স্বলাত
পরিচ্ছদঃ ৬. দারুল কুফর বা অমুসলিম দেশে কোন গোত্রে আযানের ধ্বনি শোনা গেলে সেই গোত্রের উপর হামলা করা থেকে বিরত থাকা
৭৩৩। যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভোরে শক্রর বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করতেন। আযান শোনার অপেক্ষা করতেন। আযান শুনতে পেলে আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকতেন। আযান শুনতে না পেলে আক্রমণ করতেন। একবার তিনি কোন এক ব্যাক্তিকে اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ বলতে শুলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি ফিতরাত (দ্বীন ইসলাম) এর উপর রয়েছ। এর পর সে ব্যাক্তি أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ বলল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি জাহান্নাম থেকে বেরিয়ে এলে। সাহাবায়ে কিরাম লোকটির প্রতি লক্ষ্য করে দেখতে পেলেন যে, সে ছিল একজন ভেড়ার রাখাল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

নারী

আজানের শব্দ দিয়ে এখানে পুরো জনপদের ধর্মীয় পরিচয় শনাক্ত করা হচ্ছে। অধিবাসীদের ব্যক্তিগত কাজ ও যুদ্ধে অংশগ্রহণে পার্থক্য থাকলেও সামরিক সিদ্ধান্ত বদলানোর জন্য শোনা হচ্ছে একটি প্রকাশ্য উপাসনার ঘোষণা। আজান পাওয়া গেলে অভিযান থামে। ফলে যে পরিচয়ে জনপদকে আক্রমণের লক্ষ্য করা হয়েছিল, ইসলামি উপাসনার চিহ্ন সেই পরিচয় বদলে দেওয়ার ক্ষমতা পাচ্ছে। আক্রান্ত মানুষের নিরাপত্তায় এই ধর্মীয় বাছাই বৈষম্যমূলক: নিজস্ব বিশ্বাস বজায় রাখা মানুষের জীবন এবং আক্রমণকারীর ধর্মের চিহ্ন বহন করা মানুষের জীবন একই ভিত্তিতে সুরক্ষা পাচ্ছে না।

আজান কোনো ব্যক্তির যুদ্ধকাজ, অপরাধ বা নিরপরাধিতার সাক্ষ্য নয়। একজন যোদ্ধা, একজন কৃষক এবং একটি শিশুর সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতের সম্পর্ক আলাদা; জনপদের উপাসনার শব্দ সেই পার্থক্যগুলো প্রকাশ করে না। অথচ বর্ণিত অভিযানে এই শব্দই আক্রমণ থামানোর কার্যকর সংকেত। মানুষের নিজস্ব কাজের বদলে উপাসনার পরিচয়কে এভাবে নিরাপত্তার বিশেষ ভিত্তি করা অযোদ্ধাদেরও ধর্মভিত্তিক সামরিক শ্রেণিবিন্যাসের মধ্যে ফেলে। তাঁদের প্রাণরক্ষার জন্য ব্যক্তিগত যুদ্ধভূমিকা থেকে পৃথক একটি ধর্মীয় পরিচয়কে মূল্য দেওয়া হচ্ছে।

সিদ্দিক হাসান খানের আস-সিরাজুল ওয়াহহাজে এই হাদিসের ব্যাখ্যাও অত্যন্ত স্পষ্ট: আজান ওই স্থানের অধিবাসীদের ওপর আক্রমণ বন্ধ করে, কারণ তা তাঁদের মুসলিম হওয়ার প্রমাণ। তিনি একই সঙ্গে একাকী ব্যক্তির আজান এবং শাহাদাতাইন উচ্চারণের মাধ্যমে মুসলিম গণ্য হওয়ার বিষয়ও ব্যাখ্যা করেছেন। সংশ্লিষ্ট পূর্ণ ভাষ্যটি হলো: [4]

(الشرح)
(عن أنس بن مالك) رضي الله عنه: (قال: كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يغير إذا طلع الفجر، وكان يستمع الأذان، فإن سمع أذانا أمسك وإلا أغار. فسمع رجلا يقول: الله أكبر الله أكبر. فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: “على الفطرة”) أي: على الإسلام (ثم قال: أشهد أن لا إله إلا الله أشهد أن لا إله [ ص: 112 ] إلا الله). فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: “خرجت من النار”) أي: بالتوحيد (فنظروا: فإذا هو راعي معزى).
احتج به في أن الأذان مشروع للمنفرد، وهذا هو الصحيح المشهور.
“وفي الحديث” دليل على أن الأذان يمنع الإغارة على أهل ذلك الموضع، فإنه دليل على إسلامهم.
“وفيه” أن النطق بالشهادتين يكون إسلاما، وإن لم يكن باستدعاء ذلك منه، وهذا هو الصواب.

বাংলা অনুবাদ: ব্যাখ্যা।
আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভোর হলে আক্রমণ করতেন এবং আজান শোনার অপেক্ষা করতেন। আজান শুনলে বিরত থাকতেন, অন্যথায় আক্রমণ করতেন। তিনি একজনকে ‘আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর’ বলতে শুনে বললেন, ‘ফিতরাতের ওপর।’ অর্থাৎ ইসলামের ওপর। এরপর সে বলল, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া [পৃষ্ঠা ১১২] কোনো উপাস্য নেই।’ আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি আগুন থেকে বেরিয়ে এলে।’ অর্থাৎ তাওহিদের মাধ্যমে। তাঁরা তাকিয়ে দেখলেন, সে একজন ছাগলের রাখাল।
একাকী ব্যক্তির জন্য আজান বিধিসম্মত হওয়ার পক্ষে এই বর্ণনা দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এটিই সঠিক ও প্রসিদ্ধ মত।
এই হাদিসে প্রমাণ রয়েছে যে, আজান ওই স্থানের অধিবাসীদের ওপর আক্রমণ প্রতিরোধ করে; কারণ তা তাঁদের মুসলিম হওয়ার প্রমাণ।
এতে আরও রয়েছে, শাহাদাতাইন উচ্চারণ করলে মুসলিম গণ্য হবে, এমনকি তার কাছে তা উচ্চারণের অনুরোধ করা না হলেও। এটিই সঠিক মত।

ভাষ্যকারের ব্যাখ্যায় সংকেতটির অর্থও নির্দিষ্ট: আজান তাঁদের মুসলিম হওয়ার প্রমাণ, তাই হামলা থামে। উপাসনার একটি আচরণ এভাবে জনপদের সামরিক অবস্থান শনাক্ত করার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি শুধু নামাজের সময় জানানোর প্রথা নয়; অভিযানের মুখে থাকা মানুষের জন্য বাস্তব সুরক্ষার চিহ্ন। ধর্মীয় নিদর্শনের এই সামরিক মূল্য আক্রমণকারীর ধর্মের প্রকাশ্য উপস্থিতিকে সুবিধা দেয় এবং ভিন্ন বিশ্বাসে থাকা মানুষের অবস্থানকে অনিরাপদ করে।

এই সিদ্ধান্তে বাহিনী মানুষের অন্তরের বিশ্বাসের বদলে প্রকাশ্যে শোনা শব্দ অনুসরণ করে। আজানের উচ্চারণ যাচাইযোগ্য; উচ্চারণকারীর আন্তরিকতা সেই মুহূর্তে সরাসরি যাচাই করা হয় না। ফলে একটি প্রকাশ্য ধর্মীয় আচরণ এমন নিরাপত্তামূল্য পায়, যা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সীমা ছাড়িয়ে যায়। নিজের বিবেক অনুযায়ী ভিন্ন বিশ্বাসে থাকা মানুষও এই মূল্য উপলব্ধি করতে পারে। প্রাণরক্ষার সঙ্গে ধর্মীয় প্রকাশের এমন যোগসূত্র ঘোষণাটিকে নিরাপদ থাকার উপায় করে তোলে এবং স্বাধীন বিশ্বাস নির্বাচনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

একই হাদিসে রাখালের তাওহিদের ঘোষণা শুনে মুহাম্মদ তার জাহান্নাম থেকে মুক্তির কথা বলেছেন। ভাষ্যকার ‘ফিতরাতের ওপর’ কথাটির অর্থ করেছেন ইসলামের ওপর থাকা এবং ‘আগুন থেকে বেরিয়ে এলে’ কথাটির কারণ করেছেন তাওহিদ। ফলে একই বর্ণনায় পার্থিব আক্রমণ থেকে বিরত থাকার মানদণ্ড এবং পরকালের মুক্তির মানদণ্ড—দুটিতেই ইসলামি পরিচয়কে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে। রাখালের চরিত্র, অন্য মানুষের প্রতি তার আচরণ অথবা কোনো নৈতিক অপরাধের বিচার এই মুক্তিঘোষণার শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি; সামনে এসেছে তার বিশ্বাসের উচ্চারণ। ধর্মীয় মতবাদকে মানুষের মূল্যায়নের এই কেন্দ্রে বসালে ভিন্ন বিশ্বাসী মানুষের নৈতিক জীবন ও সমান মর্যাদা গৌণ হয়ে যায়। মানুষের সঙ্গে আচরণ এবং মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিচয়ের এমন প্রাধান্য একটি গভীর গোষ্ঠীকেন্দ্রিক নৈতিকতা প্রকাশ করে।

এই ব্যবস্থায় সংকেতের ভাষা ও তার ফল নির্ধারণ করে সশস্ত্র পক্ষ। আক্রান্ত জনপদের মানুষ নিজের ধর্মের পরিচয়ে একই বিশেষ নিরাপত্তা দাবি করতে পারে না। প্রার্থনার আহ্বানকে সামরিক বাছাইয়ের উপকরণ বানানোর মধ্যেই ক্ষমতার এই অসমতা রয়েছে: কোন বিশ্বাসের শব্দ শুনে অস্ত্র থামবে, সেই সিদ্ধান্ত আক্রমণকারীর ধর্মীয় মানদণ্ডে নেওয়া হচ্ছে।


আযানের কারণে নিরাপত্তা

বুখারিতে আনাসের বর্ণনায় আজান শুনে আক্রমণ বন্ধ করার নিয়মটির সঙ্গে খায়বার অভিযানের একটি প্রত্যক্ষ দৃশ্য যুক্ত হয়েছে। বাহিনী রাতে সেখানে পৌঁছায়, কিন্তু হামলা চালানোর জন্য সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে। ভোরে আজান শোনা যায় না; মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীরা এগিয়ে যান। খায়বারের অধিবাসীরা তখন থলে ও কোদাল নিয়ে বেরিয়ে এসে বাহিনী দেখতে পায় এবং বিস্মিত হয়ে মুহাম্মদ ও তাঁর সেনাদলকে চিহ্নিত করে। এই বিবরণে আক্রমণের প্রস্তুতি, ধর্মীয় শব্দের জন্য অপেক্ষা এবং জনপদের মানুষের দৈনন্দিন কাজে বেরিয়ে পড়া একই ঘটনাক্রমে সংরক্ষিত। আক্রমণকারীর কাছে সকালটি সামরিক অভিযানের সময়; যাদের সামনে হঠাৎ বাহিনী উপস্থিত হয়েছে, তাদের হাতে রয়েছে জীবিকার সরঞ্জাম [5] [6] [7]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১০/ আযান
পরিচ্ছেদঃ ৩৯৮। আযানের কারণে রক্তপাত থেকে নিরাপত্তা পাওয়া।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৫৮৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬১০
৫৮৩। কুতাইবা ইবনু সায়ীদ (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই আমাদের নিয়ে কোন গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যেতেন, ভোর না হওয়া পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করতেন না বরং লক্ষ্য রাখতেন, যদি তিনি তখন আযান শুনতে পেতেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা থেকে বিরত থাকতেন। আর যদি আযান শুনতে না পেতেন, তাহলে অভিযান চালাতেন। আনাস (রাঃ) বলেন, আমরা খায়বারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম এবং রাতের বেলায় তাদের সেখানে পৌছলাম। যখন প্রভাত হল এবং তিনি আযান শুনতে পেলেন না; তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওয়ার হলেন। আমি আবূ তালহা (রাঃ)-এর পিছনে সাওয়ার হলাম। আমার পা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কদম মুবারকের সাথে লেগে যাচ্ছিল।
আনাস (রাঃ) বলেন, তারা তাদের থলে ও কোদাল নিয়ে বেরিয়ে আমাদের দিকে আসল। হঠাৎ তারা যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখতে পেল, তখন বলে উঠল, ’এ যে মুহাম্মদ, আল্লাহর শপথ! মুহাম্মদ তাঁর পঞ্চ বাহিনী সহ!’ আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দেখে বলে উঠলেনঃ ’আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর, খায়বার ধ্বংস হোক। আমরা যখন কোন কাওমের আঙ্গিনায় অবতরণ করি, তখন সতর্কীকৃতদের প্রভাত হবে কত মন্দ!’
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

নারী 1

থলে ও কোদালের উল্লেখ ঘটনাটির মানবিক বাস্তবতা সামনে আনে। সেনাদলের বর্ণনার মাঝখানে হঠাৎ দেখা যায় এমন মানুষকে, যারা চাষাবাদ ও জীবিকার সরঞ্জাম নিয়ে বেরিয়েছে। তাদের হাতে থাকা জিনিস, তাদের বিস্ময় এবং মুহাম্মদের বাহিনীকে দেখে তাদের প্রতিক্রিয়া—এসব মিলিয়ে আকস্মিক সামরিক উপস্থিতির সঙ্গে জনজীবনের সংঘর্ষ প্রকাশ পায়। একটি জনপদে অভিযান চালানো মানে কেবল দুর্গ, অস্ত্রভান্ডার অথবা সশস্ত্র যোদ্ধার অবস্থান বদলে দেওয়া নয়; মানুষের কাজ, খাদ্য উৎপাদন, পরিবার ও বাসস্থানের ওপরও তার আঘাত পড়ে। সেই মানুষেরা নিজেদের দিনের কাজ শুরু করার মুহূর্তে অন্য পক্ষের সামরিক সিদ্ধান্তের মুখে পড়ে যায়। তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বাহিনীর উপস্থিতি কোনো বিমূর্ত ধর্মীয় বিধানের প্রয়োগ নয়; নিজেদের জীবনযাত্রার ওপর সশস্ত্র বিপদের আগমন।

খায়বারের বিবরণে আজান শোনার অপেক্ষার পরে বাহিনীর অগ্রসর হওয়া এবং অধিবাসীদের বিস্ময় পাশাপাশি এসেছে। থলে ও কোদাল হাতে বের হওয়া মানুষ আক্রমণকারীর সময় নির্ধারণে অংশ নেয়নি; বাহিনী দেখার মুহূর্তে তারা তার উপস্থিতি জানতে পেরেছে। এই ব্যবধানেই আকস্মিক অভিযানের সুবিধা তৈরি হয়। এক পক্ষ প্রস্তুত বাহিনী নিয়ে নির্ধারিত সময়ে এগোয়, অন্য পক্ষ নিজের জনপদের দৈনন্দিন কাজের মধ্যে সেই বাহিনীর মুখোমুখি হয়। জনপদের ধর্মীয় পরিচয় শনাক্ত করার নিয়ম এই নির্দিষ্ট মানুষের অপ্রস্তুত অবস্থা ও জীবিকার প্রয়োজনকে সুরক্ষা দেওয়ার কোনো পৃথক ব্যবস্থা তৈরি করেনি।

মুদ্রিত বাংলা উদ্ধৃতির ‘খায়বার ধ্বংস হোক’ এবং ঘোষণামূলক ‘খায়বার ধ্বংস হলো’—দুটি রূপের পেছনে আরবি বাক্যটির পৃথক ব্যাখ্যা রয়েছে। নববী «خَرِبَتْ خَيْبَرُ» কথাটির একটি অর্থ করেছেন খায়বারের ধ্বংসের জন্য প্রার্থনা, অন্যটি করেছেন কাফিরদের ওপর তার ধ্বংস এবং মুসলিমদের জন্য বিজয়ের সংবাদ। তাঁর সংশ্লিষ্ট পূর্ণ অনুচ্ছেদে যুদ্ধের সময় তাকবিরের তাৎপর্যও ব্যাখ্যা করা হয়েছে [8]

[ ص: 560 ] قوله : ( فلما دخل القرية قال : الله أكبر خربت خيبر ) فيه دليل لاستحباب الذكر والتكبير عند الحرب ، وهو موافق لقول الله تعالى يا أيها الذين آمنوا إذا لقيتم فئة فاثبتوا واذكروا الله كثيرا ولهذا قالها ثلاث مرات ، ويؤخذ منه أن الثلاث كثير ، وأما قوله صلى الله عليه وسلم : ( خربت خيبر ) فذكروا فيه وجهين : أحدهما أنه دعاء تقديره أسأل الله خرابها ، والثاني أنه إخبار بخرابها على الكفار وفتحها للمسلمين .

বাংলা অনুবাদ: তাঁর বক্তব্য: ‘তিনি জনপদে প্রবেশ করে বললেন, আল্লাহু আকবর, খায়বার ধ্বংস’—এতে যুদ্ধের সময় যিকির ও তাকবির বলা উত্তম হওয়ার দলিল রয়েছে। এটি আল্লাহর বাণীর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ: ‘হে মুমিনগণ, যখন তোমরা কোনো বাহিনীর মুখোমুখি হবে, তখন অটল থাকো এবং আল্লাহকে বেশি স্মরণ করো।’ এ কারণেই তিনি এটি তিনবার বলেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, তিনবারকে বেশি বলা গণ্য হয়। আর তাঁর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ‘খারিবাত খায়বার’ বক্তব্যের দুটি ব্যাখ্যা তাঁরা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, এটি প্রার্থনা; তার অর্থ, আমি আল্লাহর কাছে এর ধ্বংস চাই। দ্বিতীয়ত, এটি কাফিরদের ওপর তার ধ্বংস এবং মুসলিমদের জন্য তা বিজিত হওয়ার সংবাদ।

এই ব্যাখ্যায় জনপদের ধ্বংসকে প্রার্থনার বিষয় অথবা মুসলিম বিজয়ের সংবাদ হিসেবে স্থান দেওয়া হয়েছে। ‘আল্লাহু আকবর’ এবং সতর্কীকৃতদের মন্দ প্রভাতের কথা একই উচ্চারণে যুক্ত। ফলে আক্রান্ত মানুষের বিপদের সকাল আক্রমণকারীর ভাষায় ধর্মীয় বিজয়ের মর্যাদা পাচ্ছে। জনপদের জীবিকা ও নিরাপত্তার বিপর্যয় এবং বাহিনীর সাফল্য একই ঘটনার দুই অসম অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। ধ্বংসের এই ধর্মীয় মূল্যায়নে আক্রান্ত মানুষের ব্যক্তিগত কাজ, অসহায়তা ও নিজস্ব জীবনযাত্রা গৌণ হয়ে পড়ে।

আজান ও বলপ্রয়োগের সম্পর্ক ধ্রুপদি ফিকহে আরও বিস্তৃত হয়েছে। ইবনে রজবের ফাতহুল বারিতে এমন মুসলিম জনপদের কথাও আছে, যার বাসিন্দারা সম্মিলিতভাবে আজান ছেড়ে দিয়েছে। আজানকে ফরজে কিফায়া গণ্যকারীদের মতে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আজান চালু করাতে হবে। একে সুন্নত গণ্যকারীদের মধ্যেও যুদ্ধের অনুমতি, যুদ্ধ না করার মত এবং প্রহার করার অবস্থান সংরক্ষিত আছে। অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু মুসলিম ও অমুসলিম জনপদ শনাক্ত করার মধ্যে সীমিত থাকেনি; মুসলিমদের ওপর প্রকাশ্য ধর্মীয় আচরণ চাপিয়ে দেওয়ার প্রশ্নেও এই বর্ণনা ব্যবহার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মতগুলোর ধারাবাহিক বিবরণ হলো: [9]

والقول الثاني : أن الأذان سنة مؤكدة ، وهو ظاهر مذهب مالك وأبي حنيفة والشافعي ، ورواية عن أحمد .
فمن قال : الأذان فرض كفاية ، قال : إذا اجتمع أهل بلد على تركه قوتلوا عليه حتى يفعلوه .
ومن قال : هو سنة ، اختلفوا على قولين :
أحدهما : أنهم يقاتلون عليه – أيضا – لأنه من أعلام الدين وشرائعه الظاهرة ، وهو قول محمد بن الحسن وطائفة من الشافعية .
والثاني : لا يقاتلون عليه كسائر النوافل ، وهو قول أبي حنيفة وطائفة من الشافعية .
وقال أبو يوسف : آمرهم وأضربهم ، ولا أقاتلهم ؛ لأنه دون الفرائض وفوق النوافل .
واستدل بعض من قال : يقاتلون على تركه بحديث أنس هذا ؛ فإن النبي – صلى الله عليه وسلم – جعل الأذان مانعا من القتال ، وتركه مبيحا له ، فدل على استباحة القتال بمجرد تركه ، وإن جاز أن يكونوا قد أسلموا .

বাংলা অনুবাদ: দ্বিতীয় মত হলো, আজান সুন্নতে মুআক্কাদা। এটি মালিক, আবু হানিফা ও শাফেয়ির মাযহাবের প্রকাশ্য অবস্থান এবং আহমদ থেকে বর্ণিত একটি মত।
যাঁরা বলেন আজান ফরজে কিফায়া, তাঁরা বলেন: কোনো জনপদের অধিবাসীরা সম্মিলিতভাবে তা ছেড়ে দিলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে, যতক্ষণ না তারা তা পালন করে।
যাঁরা একে সুন্নত বলেন, তাঁদের মধ্যে দুটি মত রয়েছে।
প্রথমত, তাদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করা হবে; কারণ এটি ধর্মের পরিচয়বাহী নিদর্শন ও প্রকাশ্য বিধানগুলোর একটি। এটি মুহাম্মদ ইবনে হাসান এবং শাফেয়ি আলেমদের একটি দলের মত।
দ্বিতীয়ত, অন্যান্য নফল আমলের মতো এর জন্য তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে না। এটি আবু হানিফা এবং শাফেয়ি আলেমদের একটি দলের মত।
আবু ইউসুফ বলেছেন: আমি তাদের নির্দেশ দেব এবং প্রহার করব, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না; কারণ এটি ফরজের নিচে এবং নফলের ওপরে।
আজান ত্যাগের কারণে যুদ্ধ করা হবে—এই মতের অনুসারীদের কেউ কেউ আনাসের এই হাদিস দলিল করেছেন। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজানকে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার কারণ এবং তা ত্যাগ করাকে যুদ্ধের অনুমোদনকারী কারণ করেছেন। ফলে শুধু তা ত্যাগ করার কারণেই যুদ্ধ বৈধ হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়, এমনকি তারা ইসলাম গ্রহণ করে থাকতে পারে—এই সম্ভাবনা থাকলেও।

এখানে ধর্মীয় অনুশাসনের শ্রেণিবিভাগ সরাসরি মানুষের শরীর ও নিরাপত্তার ওপর বলপ্রয়োগের সীমা নির্ধারণ করছে। কেউ আজানকে ফরজ বলেছেন, কেউ জোরালো সুন্নত; কিন্তু সুন্নত গণ্যকারীদের একটি অংশও একে প্রকাশ্য ধর্মীয় নিদর্শন বলে যুদ্ধের অনুমতি দিয়েছেন। আবু ইউসুফের উদ্ধৃত অবস্থানে যুদ্ধের পরিবর্তে প্রহার এসেছে। ফলে ধর্মীয় আচরণের গুরুত্ব নির্ধারণের বিতর্কে জনপদের মানুষের ওপর যুদ্ধ ও শারীরিক শাস্তি চাপানোর অনুমোদন তৈরি হয়েছে। সম্মিলিতভাবে একটি উপাসনার আহ্বান না দেওয়া—এই আচরণকে বলপ্রয়োগের কারণ বানালে ধর্মপালন স্বেচ্ছায় বিশ্বাসের প্রকাশ হিসেবে থাকে না; কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করলে আঘাত পাওয়ার ভয় তার সঙ্গে যুক্ত হয়।

এই বলপ্রয়োগের নির্দিষ্ট লক্ষ্য জনপদে আজানের প্রকাশ্য আচরণ চালু করানো। আদেশ, প্রহার অথবা যুদ্ধ দিয়ে মানুষের অন্তরের বিশ্বাস তৈরি করা যায় না; বাধ্য করা যায় নির্দিষ্ট আচরণ পালনে। ফলে এখানে ধর্মীয় নিদর্শন রক্ষার নামে বাহ্যিক আনুগত্য নিশ্চিত করার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জনপদ সম্মিলিতভাবে আজান ছেড়ে দিলে তার বাসিন্দাদের ওপর সামরিক বা শারীরিক শাস্তির অনুমোদন কর্তৃপক্ষকে উপাসনার প্রকাশ নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয়। এই নিয়ন্ত্রণ অমুসলিম জনপদ শনাক্ত করার প্রশ্ন থেকে এগিয়ে মুসলিমদের ধর্মপালনেও বলপ্রয়োগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।


লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বললে রক্ষা পাওয়া

ইবনে মাজাহর বর্ণনায় ধর্মীয় পরিচয় ও প্রাণরক্ষার সম্পর্ক একটি ব্যক্তিগত ঘটনার মধ্যে অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মুহাম্মদ সঙ্গীদের সঙ্গে বসে থাকা অবস্থায় একজন ব্যক্তি এসে তাঁর সঙ্গে একান্তে কথা বলে। এরপর মুহাম্মদ নির্দেশ দেন, তাকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করতে। পরে তাকে ডেকে আল্লাহর একত্বের সাক্ষ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। উত্তর হ্যাঁ হলে হত্যার নির্দেশ প্রত্যাহার করে ছেড়ে দিতে বলেন। কেন তাকে ছেড়ে দিতে হবে, তার ব্যাখ্যায় তিনি মানুষের ধর্মীয় ঘোষণা এবং তাদের রক্ত ও সম্পদের ওপর হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ হওয়ার সম্পর্ক উল্লেখ করেন। এখানে জীবনরক্ষার প্রকাশ্য কারণটি মুহাম্মদের নিজের বক্তব্যেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে [10] [11]

সুনানে ইবনে মাজাহ
অধ্যায়ঃ ৩০/ কলহ-বিপর্যয়
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
পরিচ্ছদঃ ৩০/১. যে ব্যক্তি ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ’’ বলে, তার উপর হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা
৩/৩৯২৯। আওস (রাঃ) বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। তিনি আমাদেরকে (অতীতের) ঘটনাবলী উল্লেখপূর্বক উপদেশ দিচ্ছিলেন। ইত্যবসরে এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে তাঁর সাথে একান্তে কিছু বললো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা তাকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করো। লোকটি ফিরে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, ‘‘আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই’’? সে বললো, হাঁ। তিনি বলেনঃ যাও, তোমরা তাকে তার পথে ছেড়ে দাও। কারণ লোকেরা ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’’ না বলা পর্যন্ত আমাকে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তারা তাই করলে তাদের জান-মালে হস্তক্ষেপ আমার জন্য হারাম হয়ে গেলো।
নাসায়ী ৩৯৭৯, ৩৯৮২, ৩৯৮৩, আহমাদ ১৫৭২৭, দারেমী ২৪৪৬। তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

ঘটনাটির ক্রম হলো হত্যার নির্দেশ, ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্ন এবং মুক্তি। প্রাণদণ্ডের নির্দেশ থেকে অব্যাহতির প্রকাশ্য কারণ হিসেবে আল্লাহর একত্বের স্বীকৃতি সামনে এসেছে। কারও কৃতকর্মের দায় ধর্মীয় ঘোষণায় বদলে যায় না; দায়ের বিচার নির্ভর করে তার কাজ ও প্রমাণের ওপর। এখানে নির্দেশ প্রত্যাহারের ব্যাখ্যায় সামনে রাখা হয়েছে ধর্মীয় সাক্ষ্য। ফলে ব্যক্তির প্রাণরক্ষা এমন পরিচয়ের স্বীকৃতির সঙ্গে যুক্ত, যার শর্ত ও গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করছেন হত্যার নির্দেশদাতাই। ব্যক্তির ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ এবং সেই ক্ষমতার সীমা ঘোষণার কর্তৃত্ব একই হাতে কেন্দ্রীভূত।

মুহাম্মদের ব্যাখ্যায় শুধু প্রাণের কথা নেই; সম্পদের কথাও রয়েছে। ‘তাদের জান-মালে হস্তক্ষেপ আমার জন্য হারাম’—এই বক্তব্য ধর্মীয় ঘোষণার সঙ্গে মানুষের শরীর ও জীবিকার সুরক্ষা একত্রে যুক্ত করে। জীবন ও সম্পত্তির ওপর কর্তৃত্ব প্রয়োগের ক্ষমতা একজন মানুষের হাতে, আর সেই ক্ষমতা থামানোর সীমা তাঁর ঘোষিত ধর্মীয় শর্ত। ফলে ধর্মীয় পরিচয় ব্যক্তিগত বিশ্বাসের গণ্ডি ছাড়িয়ে পার্থিব নিরাপত্তার কার্যকর মর্যাদা হয়ে ওঠে। যে ঘোষণা প্রাণ ও সম্পদে হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে পারে, সেই ঘোষণার পক্ষে শুধু ধর্মীয় যুক্তি কাজ করে না; জীবন ও জীবিকা হারানোর আশঙ্কাও বাস্তব চাপ হিসেবে উপস্থিত থাকে। এই ক্ষমতার অবস্থান বিশ্বাসের স্বাধীনতার সঙ্গে মৌলিক সংঘাত তৈরি করে।

এখানে নিরাপত্তা দানকারী ঘোষণা মানুষের মনের ভেতরের বিশ্বাসের সরাসরি প্রমাণও নয়। বর্ণনায় একটি প্রশ্নের উত্তর এবং তার ভিত্তিতে মুক্তির নির্দেশ আছে। বিপদ থেকে বাঁচতে মানুষ যে বক্তব্য দেবে, তার আন্তরিকতা নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়ার বাস্তব কারণ এই ব্যবস্থার মধ্যেই রয়েছে: বক্তব্যটি উচ্চারণের সঙ্গে যদি প্রাণরক্ষা যুক্ত হয়, তাহলে তা বলা নিজের জীবন বাঁচানোর উপায়ও হয়ে ওঠে। আক্রমণ বা হত্যার আশঙ্কার মধ্যে উচ্চারিত ধর্মীয় পরিচয়কে স্বাধীন সম্মতির সমান মর্যাদা দিলে ভয় ও বিশ্বাসের পার্থক্য চাপা পড়ে। এই সমস্যাটি ধ্রুপদি ফকিহদের আলোচনাতেও এসেছে। সেখানে কেউ প্রাণভয়ে আজান বা ধর্মীয় ঘোষণা দেওয়ার পর ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্য অস্বীকার করলে সেই অস্বীকৃতি গ্রহণ করা হবে কি না—এমন প্রশ্ন সরাসরি আলোচিত হয়েছে।

ইবনে রজব এই বিষয়ে একাধিক অবস্থান সংরক্ষণ করেছেন। লাইস ইবনে সাদ ও সাঈদ ইবনে আবদুল আজিজের নামে বর্ণিত মতে প্রাণভয়ের কারণে আজান দেওয়ার দাবি গ্রহণ করা হবে না; ব্যক্তিকে ধর্মত্যাগী গণ্য করা হবে। আওযায়ি ও মালিকের নামে বিপরীত মত রয়েছে। ইবনে রজব নিজেও সম্ভাব্য বিপদের পরিবেশে ভয়ের ব্যাখ্যা গ্রহণের পক্ষে বলেছেন। আহমদের সূত্রে অস্বীকৃতি গ্রহণ না করা, গ্রহণ করা এবং ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা—পৃথক অবস্থান এসেছে। সংশ্লিষ্ট পূর্ণ ধারাবাহিক অংশটি হলো: [12]

وعند أصحابنا : أنه يصير الكافر بالأذان مسلما .
وبه قال الليث بن سعد ، وسعيد بن عبد العزيز . وقالا : لو ادعى أنه فعله تقية وخيفة على نفسه أنه لا يقبل منه ، ويصير مرتدا .
وحكى الوليد بن مسلم ، عن الأوزاعي ومالك ، أنه يقبل منه ذلك ولا يقتل .
ذكره محمد بن نصر المروزي في ” كتاب الصلاة ” .
وينبغي أن يقبل هذا بموضع يحتمل فيه ذلك كدار الإسلام ، أو دار يخشى أن يغار عليها المسلمون ؛ فإن الكافر إذا أتى بالشهادتين على وجه الإسلام كالذي يجيء ليسلم ، فتعرض عليه الشهادتان فيقولهما ، فإنه يصير مسلما بغير خلاف .
وإن قالهما على غير هذا الوجه ، ثم ادعى أنه لم يرد بهما الإسلام ، فالمشهور عن أحمد ، أنه لا يقبل منه ويصير مرتدا .
وعنه رواية ، أنه يقبل منه ولا يقتل . وهو قول إسحاق .
وضعف هذه الرواية أبو بكر الخلال .
وعن أحمد ، أنه يجبر على الإسلام ، ولا يقتل إن أباه .
وللشافعية – أيضا – وجهان فيما [ إذا ] أتى بالشهادتين على غير وجه الاستدعاء ولا الحكاية : هل يصير مسلما ، أم لا ؟ وأصحهما : أنه يصير مسلما – : حكاهما صاحب ” شرح المهذب ” .

বাংলা অনুবাদ: আমাদের মাযহাবের আলেমদের মতে, কাফির আজান দেওয়ার মাধ্যমে মুসলিম হয়ে যায়।
লাইস ইবনে সাদ ও সাঈদ ইবনে আবদুল আজিজও এ কথা বলেছেন। তাঁরা দুজন বলেছেন: সে যদি দাবি করে যে আত্মরক্ষা ও নিজের প্রাণের ভয়ে তা করেছে, তবে তার দাবি গ্রহণ করা হবে না এবং সে ধর্মত্যাগী হয়ে যাবে।
ওয়ালিদ ইবনে মুসলিম আওযায়ি ও মালিকের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, তার এই দাবি গ্রহণ করা হবে এবং তাকে হত্যা করা হবে না।
মুহাম্মদ ইবনে নাসর মারওয়াজি তাঁর ‘কিতাবুস সালাত’-এ এটি উল্লেখ করেছেন।
যে স্থানে এমন হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সেখানে এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করা উচিত; যেমন দারুল ইসলাম অথবা এমন কোনো স্থান, যেখানে মুসলিমদের হামলার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ কাফির যদি ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে শাহাদাতাইন উচ্চারণ করে—যেমন ইসলাম গ্রহণ করতে আসা ব্যক্তির কাছে শাহাদাতাইন উপস্থাপন করা হয় এবং সে তা বলে—তাহলে মতভেদ ছাড়াই সে মুসলিম হয়ে যায়।
অন্যভাবে তা বলার পরে সে যদি দাবি করে যে এর মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্য ছিল না, তবে আহমদের প্রসিদ্ধ মত হলো, তার দাবি গ্রহণ করা হবে না এবং সে ধর্মত্যাগী হয়ে যাবে।
তাঁর সূত্রে আরেকটি বর্ণনা হলো, তার দাবি গ্রহণ করা হবে এবং তাকে হত্যা করা হবে না। এটি ইসহাকেরও মত।
আবু বকর খাল্লাল এই বর্ণনাটিকে দুর্বল বলেছেন।
আহমদের সূত্রে আরও আছে, তাকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হবে; সে অস্বীকার করলে হত্যা করা হবে না।
শাফেয়ি আলেমদের মধ্যেও দুটি মত আছে: অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে অথবা অন্যের বক্তব্য উদ্ধৃত করার উদ্দেশ্যে না বলে কেউ শাহাদাতাইন উচ্চারণ করলে সে মুসলিম হবে কি না। দুটির মধ্যে অধিকতর বিশুদ্ধ মত হলো, সে মুসলিম হবে। ‘শরহুল মুহাযযাব’-এর লেখক মত দুটি উল্লেখ করেছেন।

যে মত প্রাণভয়ের ব্যাখ্যা গ্রহণ করে না, তার পরিণতি ভয়াবহ। মানুষ ভয় থেকে বাঁচতে একটি ঘোষণা দিল, এরপর নিজের বিশ্বাস সম্পর্কে সত্য কথা বলে জানাল যে সে ধর্ম পরিবর্তন করেনি—তখন তার সেই সত্য বক্তব্যই তাকে ধর্মত্যাগী হিসেবে চিহ্নিত করার কারণ হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ প্রথমে তার উচ্চারণকে ধর্মীয় পরিচয় নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট গণ্য করছে, পরে তার নিজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বক্তব্য অগ্রাহ্য করছে। নিজের বিশ্বাসের পরিচয় দেওয়ার কর্তৃত্বও তার হাতে থাকছে না। ঘোষণা না দিলে নিরাপত্তার সংকট, ঘোষণা দিয়ে তা বিশ্বাসের পরিবর্তন ছিল না বললে নতুন ধর্মীয় অপরাধের পরিচয়—এই চাপ মানুষের বিবেককে বন্দি করে।

উদ্ধৃত আলোচনায় ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করার মতটি এই নিয়ন্ত্রণ আরও সরাসরি প্রকাশ করে। একজন ব্যক্তি নিজের ধর্মীয় উদ্দেশ্য অস্বীকার করলেও তাকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে তার ওপর বিশ্বাস আরোপ করা, প্রকাশ্য আচরণ নির্ধারণ করা এবং নিজের পরিচয় সম্পর্কে তার বক্তব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যুক্ত। এখানে ব্যক্তির সম্মতি কর্তৃপক্ষের ধর্মীয় সংজ্ঞার অধীন। বিপদের মধ্যে উচ্চারিত একটি বাক্যকে মানুষের বিবেকের ওপর স্থায়ী কর্তৃত্বের ভিত্তি বানানো বিশ্বাসের স্বাধীনতার গুরুতর লঙ্ঘন। একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনকে তার ধর্মীয় পরিচয় দখলের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা নৈতিকভাবে নির্যাতনমূলক।

এখানে পরিচয় স্বীকার করার পরিণতি এবং নিজের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা একই পক্ষের হাতে নেই। নিরাপত্তা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ উচ্চারণ গ্রহণ করে পরিচয় নির্ধারণ করতে পারে, আবার ব্যক্তির বিপদের ব্যাখ্যাও প্রত্যাখ্যান করতে পারে—উদ্ধৃত মতগুলোর একাংশে এই ক্ষমতা অনুমোদিত। ফলে প্রাণরক্ষার একটি ঘোষণা পরবর্তী জীবনে ব্যক্তির ওপর বাধ্যতামূলক ধর্মীয় পরিচয় চাপানোর ভিত্তি হয়ে ওঠে। বিশ্বাসের বিষয়ে নিজের বক্তব্যের ওপর কর্তৃত্ব হারানো এই ব্যবস্থার বিশেষ নিপীড়নমূলক পরিণতি।


অপ্রস্তুত জনপদে অতর্কিত আক্রমণ

বনু মুস্তালিকের ওপর হামলার বর্ণনায় অধিবাসীদের অপ্রস্তুত থাকা এবং গবাদিপশুকে পানি পান করানোর দৃশ্যটি সরাসরি উল্লেখ আছে। এই অবস্থায় অভিযান চালিয়ে তাদের যুদ্ধক্ষম পুরুষদের হত্যা এবং নারী–শিশুদের বন্দি করা হয়। যুদ্ধের আগে নতুন করে ইসলামের আহ্বান জানানোর প্রয়োজন আছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তরে নাফি ঘটনাটি দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফলে বর্ণনাটি একটি আকস্মিক আক্রমণের স্মৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি পরবর্তী আক্রমণের বিধান তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়েছে। জনপদের অপ্রস্তুত অবস্থাকে সামরিক সুবিধায় পরিণত করা এবং সেই আক্রমণের ফলে মানুষের স্বাধীনতা হরণ—দুটি বিষয় একই ঘটনায় যুক্ত। মানুষ ও পশুর দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর মুহূর্তে সশস্ত্র বাহিনীর আঘাত এসে পড়েছে [13] [14] [15]

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ জিহাদ ও এর নীতিমালা
পরিচ্ছেদঃ ১. যে সকল বিধর্মীর কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছে, পূর্ব ঘোষণা ব্যতীত তাদের বিরুদ্ধে আক্রমন পরিচালনা বৈধ
৪৩৭০। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া তামীমী (রহঃ) … ইবনু আউন (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেন, আমি নাফি’ (রহঃ) কে এই কথা জানতে চেয়ে পত্র লিখলাম যে, যুদ্ধের পূর্বে বিধর্মীদের প্রতি দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া প্রয়োজন কি না? তিনি বলেন, তখন তিনি আমাকে লিখলেন যে, এ (নিয়ম) ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ মুসতালিকের উপর আক্রমণ করলেন এমতাবস্থায় যে, তারা অপ্রস্তুত ছিল (তা জানতে পারেনি।) তাদের পশুদের পানি পান করানো হচ্ছিল। তখন তিনি তাদের যোদ্ধাদের (পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ) হত্যা করলেন এবং অবশিষ্টদের (নারী শিশুদের) বন্দী করলেন। আর সেই দিনেই তাঁর হস্তগত হয়েছিল। (ইয়াহইয়া বলেন যে, আমার ধারণা হল, তিনি বলেছেন) জুওয়ায়রিয়া অথবা তিনি নিশ্চিতরূপে ইবনাতুল হারিছ (হারিছ কন্যা) বলেছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এই হাদীস আমাকে আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। তিনি সেই সেনাদলে ছিলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইবনু ‘আউন (রহঃ)

নারী 3

বুখারিতেও একই ঘটনার বর্ণনায় অপ্রস্তুত অবস্থায় হামলা, পুরুষদের হত্যা, সন্তানসন্ততিকে বন্দি করা এবং জুওয়াইরিয়াকে লাভ করার কথা এসেছে। বর্ণনার শেষেই বলা হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর ওই সেনাদলে ছিলেন। তাঁর সূত্রের বিবরণে সামরিক অভিযানের ফল হিসেবে মানুষের বন্দিত্ব ও একজন নারীর দখলে আসা পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে [16] [17]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৪৯/ ক্রীতদাস আযাদ করা
পরিচ্ছেদঃ ৪৯/১৩. কোন আরব যদি কোন দাস-দাসীর মালিক হয় এবং তাকে দান করে, বিক্রয় করে, সহবাস করে এবং ফিদিয়া হিসাবে দেয় অথবা শিশুদেরকে বন্দী করে রাখে তবে এর বিধান কী?
২৫৪১. ইবনু ‘আউন (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নাফি‘ (রহ.)-কে পত্র লিখলাম, তিনি জওয়াবে আমাকে লিখেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বানী মুস্তালিক গোত্রের উপর অতর্কিতভাবে অভিযান পরিচালনা করেন। তাদের গবাদি পশুকে তখন পানি পান করানো হচ্ছিল। তিনি তাদের যুদ্ধক্ষমদের হত্যা এবং নাবালকদের বন্দী করেন এবং সেদিনই তিনি জুওয়ায়রিয়া (উম্মুল মু’মিনীন)-কে লাভ করেন। [নাফি‘ (রহ.) বলেন] ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) আমাকে এ সম্পর্কিত হাদীস শুনিয়েছেন। তিনি নিজেও সে সেনাদলে ছিলেন। (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৩৫৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৩৭৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ)

এই আক্রমণে অপ্রস্তুত থাকার ক্ষতি শুধু প্রথম সামরিক সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পুরুষদের হত্যা করার পর নারী ও শিশুদের বন্দি করা হয়েছে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার সঙ্গে জনপদের পরিবারের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাও ঘটেছে। যাদের নিজের সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই, তাদের জীবনও বিজয়ীর সিদ্ধান্তের অধীন চলে গেছে। একজন শিশুর জন্য বন্দিত্ব মানে নিজের পরিচিত পরিবার, পরিবেশ ও নিরাপত্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো; একজন নারীর জন্য নিজের চলাফেরা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অন্যের হাতে চলে যাওয়া। বর্ণনায় এই মানুষগুলোকে যুদ্ধশেষে স্বাধীন বাসিন্দা হিসেবে ছেড়ে দেওয়ার বদলে বন্দি করার ঘটনাই এসেছে। সেই বন্দিত্বকে সামরিক সাফল্যের সাধারণ পরিণতি হিসেবে গ্রহণ করা মানুষের স্বাধীনতাকে বিজয়ীর প্রাপ্য সম্পদে নামিয়ে আনে।

‘তাদের পশুদের পানি পান করানো হচ্ছিল’—এই সংক্ষিপ্ত বিবরণ আক্রমণকারীর দৃষ্টির বাইরে থাকা একটি জীবন্ত সমাজের উপস্থিতি প্রকাশ করে। পশুপালন, পানি সংগ্রহ ও জীবিকার কাজ চলছিল; আক্রমণ এসে সেই দৈনন্দিনতার ওপর সশস্ত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। যুদ্ধক্ষম পুরুষের পরিচয় এবং নারী–শিশুর অযোদ্ধা অবস্থান আলাদা হলেও পরাজয়ের পরে উভয় গোষ্ঠীর জীবনে আক্রমণকারীর ক্ষমতা কার্যকর হয়েছে: একদিকে হত্যা, অন্যদিকে বন্দিত্ব। নারী–শিশুকে হত্যা না করার ঘোষণার মধ্যে তাঁদের মুক্ত মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকার কতটুকু ছিল, এই ঘটনাই তার কঠোর পরীক্ষা। তাঁদের জীবিত রাখা হয়েছে, কিন্তু নিজেদের জীবনের সিদ্ধান্ত তাঁদের হাতে রাখা হয়নি।

একই বর্ণনায় জুওয়াইরিয়াকে ‘লাভ’ করার উল্লেখ মানুষের দখলকে যুদ্ধের অর্জন হিসেবে প্রকাশ করে। একজন নারীর নাম জনপদ আক্রমণ, পুরুষদের হত্যা ও সন্তানসন্ততিকে বন্দি করার ধারাবাহিকতার মধ্যে এসেছে। এতে সামরিক বিজয় এবং মানুষের ওপর ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের যোগসূত্র স্পষ্ট হয়। বিজয়ের মানে শুধু প্রতিপক্ষের অস্ত্র নামানো বা ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ বদলানো নয়; বিজয়ী পক্ষ মানুষের শরীর, চলাফেরা ও পারিবারিক ভবিষ্যতের ওপর ক্ষমতা অর্জন করছে। এই অর্জনকে স্বাভাবিক যুদ্ধফল হিসেবে বর্ণনা করার মধ্যেই বন্দি মানুষের নিজস্ব ইচ্ছা ও স্বাধীনতা গৌণ হয়ে যায়। মানুষের অসহায় অবস্থাকে অন্য মানুষের প্রাপ্তিতে পরিণত করা এই ব্যবস্থার একটি মৌলিক নৈতিক বিকৃতি।


নতুন আহ্বান ছাড়াই আক্রমণ: তাহাবীর ব্যাখ্যা

তাহাবী নতুন করে আহ্বান না জানিয়েই আক্রমণের অনুমোদন ব্যাখ্যা করেছেন ইসলামের আহ্বান আগে পৌঁছানোর যুক্তিতে। তাঁর বক্তব্যে শুরুতে আহ্বান জরুরি ছিল, কারণ মানুষ জানত না কেন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হচ্ছে; পরে ইসলামের প্রচার ছড়িয়ে পড়ায় সেই প্রয়োজন শেষ হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, আহ্বানে সাড়া দিলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হতো না। ফলে এখানে আহ্বান ধর্মীয় মত উপস্থাপনের পাশাপাশি সামরিক চাপের সঙ্গে যুক্ত: আহ্বানের দাবি জানা আছে বলে আবার তা জানানো ছাড়াই লড়াই করা যাবে। শোনা, সম্মতি দেওয়া এবং পরবর্তী আক্রমণের সংবাদ জানা—এই পৃথক বিষয়গুলোর জায়গায় আগের ধর্মীয় প্রচারকে নতুন অভিযানের অনুমোদনের ভিত্তি করা হয়েছে [18]

৪৭২৪. মুহাম্মদ ইব্‌ন খুযায়মা (র) ….. মানসূর (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবরাহীম (র)-কে দায়লামীদেরকে দাওয়াত দেয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, ইসলামের দাওয়াত তার অবহিত রয়েছে।
ইমাম আবূ জা’ফর তাহাবী (র) বলেনঃ যা কিছু আমরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রিওয়ায়াত করেছি তাতে স্পষ্ট হয়ে
গিয়েছে যে, দাওয়াতের আবশ্যকতা ইসলামের শুরুতে ছিল। কেননা তখন সবার কাছে দাওয়াত পৌঁছায়নি এবং তারা জানতও না যে, তাদের বিরুদ্ধে কেন যুদ্ধ করা হয়। তাই দাওয়াত দেয়ার নির্দেশ ছিল যেন তা তাদের জন্য তাবলীগ হয়ে যায় এবং তাদেরকে অবহিত করা হয় যে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণ কি? অতঃপর অস্পর লোকদের উপর আক্রমণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই এর মর্ম এটাই হলো যে, এরা আহ্বানের মুখাপেক্ষী ছিল না, কেননা তারা অবহিত ছিল যে, তাদেরকে কিসের দিকে আহ্বান করা হচ্ছে। আর যদি তারা আহ্বানে সাড়া দিত তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হত না। সুতরাং আহ্বানের কোন অর্থ হয় না। ইমাম আবু হানীফা (র), ইমাম আবূ ইউসুফ (র) ও ইমাম মুহাম্মদ (র)-এরূপই বলতেন যে, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে গিয়েছে। এখন ইমাম আগাম দাওয়াত দেয়া ছাড়াই তাদের সঙ্গে লড়াই করতে পারেন। আর যে সমস্ত সম্প্রদায়ের কাছে ইসলামের আহ্বান পৌঁছায়নি তাদের সঙ্গে লড়াই করা সমীচীন নয়, যতক্ষণ না তাদের উপর স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কিসের জন্য বা কি কারণে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে এবং তাদেরকে কিসের দিকে আহ্বান করা হচ্ছে।
ইসলাম ত্যাগকারী মুরতাদ সম্পর্কে ফকীহগণ বিরোধ করেছেন যে, তার থেকে তাওবা তলব করা হবে কিনা? একদল আলিম বলেন, মুরতাদ থেকে ইমামের তাওবা তলব করা উত্তম। যদি সে তাওবা করে তবে তো ভাল, অন্যথায় তাকে হত্যা করা হবে। এ অভিমত যারা পোষণ করেছেন ইমাম আবু হানীফা (র), ইমাম আবু ইউসুফ (র) ও ইমাম মুহাম্মদ (র) তাদের অন্যতম। অপর একদল আলিম বলেন, তার থেকে তাওবা তলব করা হবে না। তারা তার বিধানকে হারবী কাফিরদের বিধানানুরূপ সাব্যস্ত করেছেন। যেমনভাবে আমরা তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত (আহ্বান) দেয়া না দেয়া সম্পর্কে বর্ণনা করেছি। তাঁরা বলেছেন যে, ঐ ব্যক্তি থেকে তাওবা তলব করা আবশ্যক, যে ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে মুরতাদ হয়েছে। পক্ষান্তরে যে জেনেশুনে মুরতাদ হয়েছে তাকে হত্যা করা হবে, তার থেকে তাওবা তলব করা হবেনা। ইমাম আবূ ইউসুফ (র) ‘কিতাবুলু ইমলাতে’ এ কথাটি বলেছেন। তিনি বলেন, আমি তো তাকে হত্যা করব এবং তার থেকে তাওবা তলব করব না। তবে সে যদি হত্যার পূর্বে তাওবা করে তাহলে তাকে অব্যাহতি দেবো এবং তার (অন্তরের) বিষয়টি আল্লাহর হাওয়ালা করে দিব।

নারী 5

কোনো ধর্মের কথা জানা সেই ধর্মের শাসন মেনে নেওয়ার সম্মতি নয়। একইভাবে কোনো আহ্বানে সাড়া না দেওয়া মানুষের ওপর সশস্ত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নৈতিক অনুমতিও নয়। তাহাবীর যুক্তিতে আহ্বান পৌঁছানো এবং সেই আহ্বানে সাড়া না দেওয়ার পরিণতি যুদ্ধের প্রশ্নে কার্যকর হচ্ছে। স্বাধীন বিশ্বাস নির্বাচনের জায়গায় তাই একটি বাধ্যতামূলক দাবি দাঁড়ায়: মানুষ জানে তাকে কী গ্রহণ করতে বলা হচ্ছে, সেই জ্ঞানই তার বিরুদ্ধে নতুন আহ্বান ছাড়া অভিযান চালানোর কারণ হতে পারে। এখানে জ্ঞানের বিস্তার মানুষকে বেশি স্বাধীন করছে না; সশস্ত্র চাপ প্রয়োগের আগে যে আনুষ্ঠানিক ধাপ ছিল, তা বাদ দেওয়ার যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

আগে ইসলামের আহ্বান শোনা এবং কোনো নির্দিষ্ট অভিযানের আগমন জানা দুটি আলাদা তথ্য। প্রথমটি জানা থাকলেও কোন বাহিনী কখন এসে জনপদে আঘাত করবে, তা জানা থাকে না। নাফির দলিল হিসেবে বনু মুস্তালিকের অপ্রস্তুত অবস্থার ঘটনাটি এবং তাহাবীর নতুন আহ্বান বাদ দেওয়ার ব্যাখ্যা একত্রে এই সামরিক সুবিধাটিই প্রকাশ করে। আক্রমণকারী নিজের সময়, প্রস্তুতি ও শক্তি অনুযায়ী অভিযান চালাতে পারে; আক্রান্ত জনপদের মানুষ সেই নির্দিষ্ট মুহূর্তের বিপদ সম্পর্কে অপ্রস্তুত থাকে। ধর্মীয় আহ্বান আগে পৌঁছেছিল বলে এই অসমতা অনুমোদন করা আক্রমণকারীর সুবিধাকে প্রাধান্য দেয়।

তাহাবীর উদ্ধৃতির শেষাংশে ধর্মত্যাগীর কাছ থেকে তাওবা চাওয়া হবে কি না, সেই বিতর্কেও একই নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো রয়েছে। কোনো মতে ফিরে আসার সুযোগ দিয়ে তারপর হত্যা, অন্য মতে জেনেশুনে ধর্মত্যাগ করলে নতুন আহ্বান ছাড়াই হত্যা; হত্যার আগে তাওবা করলে অব্যাহতির কথাও এসেছে। এখানে বিশ্বাস পরিবর্তন ব্যক্তির স্বাধীন সিদ্ধান্ত হিসেবে স্বীকৃত হয়নি। ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের গ্রহণযোগ্য পরিচয়ে ফিরে আসা প্রাণরক্ষার উপায়, আর সেই পরিচয়ের বাইরে থাকা শাস্তির কারণ। আহ্বানে সাড়া দেওয়া, নতুন করে আহ্বান ছাড়াই হামলা এবং ধর্মত্যাগের পরে ফিরে আসার শর্ত—এই বিধানগুলো মানুষের বিবেককে সশস্ত্র কর্তৃত্বের অধীন করে।


রাতের অন্ধকারে নারী শিশু হত্যার বৈধতা

রাতের অতর্কিত হামলায় নারী ও শিশু নিহত হওয়ার প্রশ্নটি মুহাম্মদের সামনে সরাসরি তোলা হয়েছিল। প্রশ্নে তাঁদের উপস্থিতি ও প্রাণহানির কথা স্পষ্ট; উত্তরে এসেছে, ‘তারাও তাদের অন্তর্ভুক্ত।’ এই কথার ভিত্তিতে ধ্রুপদি ভাষ্যকাররা নারী–শিশুকে আলাদা করে হত্যার লক্ষ্য করা এবং অন্যদের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে গিয়ে তাঁদের হত্যা হওয়ার মধ্যে বিধানগত পার্থক্য করেছেন। ফলে নারী–শিশু হত্যার নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি এমন আক্রমণ চালানোর অনুমোদন তৈরি হয়েছে, যার আঘাতে তাঁদের মৃত্যু ঘটতে পারে। এই অনুমোদনে আক্রমণকারীর মূল লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে; যে নারী বা শিশুটি প্রাণ হারাচ্ছে, তার যুদ্ধে অংশ না নেওয়া একাই আক্রমণ বন্ধের জন্য যথেষ্ট হয়নি [19] [20] [21] [22] [23]

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ জিহাদ ও এর নীতিমালা
পরিচ্ছদঃ ৯. রাতের অতর্কিত আক্রমনে অনিচ্ছাকৃতভাবে নারী ও শিশু হত্যায় দোষ নেই
৪৩৯৯। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া, সাঈদ ইবনু মনসুর ও আমর আন নাকিদ (রহঃ) … সা’ব ইবনু জাছছামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মুশরিকদের নারী ও শিশু সন্তান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, যখন রাতের আধারে অতর্কিত আক্রমণ করা হয়, তখন তাদের নারী ও শিশুরাও আক্রান্ত হয়। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তারাও তাদের (মুশরিকদের) অন্তর্ভুক্ত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৩৩। জিহাদ ও সফর‏
পরিচ্ছদঃ ৯. রাতের আকস্মিক হামলায় অনিচ্ছাকৃতভাবে নারী ও শিশু হত্যায় দোষ নেই
৪৪৪২-(২৭/…) আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) ….. সা’ব ইবনু জাসসামাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমরা রাতের অন্ধকারে আকস্মিক হামলায় মুশরিকদের শিশুদের উপরও আঘাত করে ফেলি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারাও তাদের (মুশরিক যোদ্ধাদের) মধ্যে গণ্য। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৪০০, ইসলামিক সেন্টার ৪৪০০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সুনানে ইবনে মাজাহ(তাওহীদ পাবলিকেশন)
অধ্যায়ঃ ১৮/ জিহাদ
১/২৮৩৯। সাব‘ ইবনে জাসসামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাতের বেলা মুশরিকদের মহল্লায় অতর্কিত আক্রমণ প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করা হলো, যাতে নারী ও শিশু নিহত হয়। তিনি বলেনঃ তারাও (নারী ও শিশু) তাদের অন্তর্ভুক্ত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

প্রশ্নের মধ্যেই নারী–শিশুর প্রাণহানির তথ্য আছে। অতএব প্রাণহানির এই সম্ভাবনা অনুমোদন দেওয়ার সময়ই জানা ছিল। আক্রমণ চালানো হবে কি না, সেই সিদ্ধান্তের আগেই ক্ষতির ধরন জানা। এর ফলে ‘অনিচ্ছাকৃত’ শব্দটির নৈতিক সীমা সামনে আসে: একজন নির্দিষ্ট শিশুকে হত্যা করার উদ্দেশ্য না থাকলেও শিশু উপস্থিত থাকা জনপদে প্রাণঘাতী অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত ইচ্ছাকৃত হতে পারে। মৃত্যুকে মূল লক্ষ্য না করা এবং মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও কাজটি চালিয়ে যাওয়া আলাদা বিষয়। এই পার্থক্যের দ্বিতীয় অংশে আক্রমণকারীর সিদ্ধান্ত, ক্ষমতা ও দায় থেকেই যায়।

‘তারাও তাদের অন্তর্ভুক্ত’ উত্তরে আক্রান্ত মানুষদের পরিচয় নির্ধারিত হয়েছে যে জনপদের ওপর হামলা হচ্ছে, তার সদস্য হিসেবে। নারী ও শিশুর নিজস্ব কাজ অথবা যুদ্ধে অংশগ্রহণের বদলে তাদের গোষ্ঠীগত অবস্থান সামনে এসেছে। একটি শিশুর জন্মপরিচয় তার সামরিক সিদ্ধান্ত নয়; পিতার ধর্মও তার নিজের নির্বাচিত যুদ্ধকাজ নয়। সেই সম্পর্ককে তার প্রাণহানি অনুমোদনের ব্যাখ্যায় ব্যবহার করলে শিশুর পৃথক নিরাপত্তার অধিকার দুর্বল হয়। তাকে এমন একটি সমষ্টির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। এই গোষ্ঠীকেন্দ্রিক যুক্তি অসহায় মানুষের ব্যক্তিসত্তাকে সামরিক শত্রুতার মধ্যে শোষণ করে।


ইবনে হিব্বানের অধ্যায়-শিরোনাম: নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাতের হামলা

ইবনে হিব্বান তাঁর অধ্যায়ের শিরোনামেই নিষেধাজ্ঞার সীমা নির্ধারণ করেছেন: নারী–শিশুকে উদ্দেশ্য করে হত্যা করা নিষিদ্ধ, কিন্তু রাতের হামলা ও অভিযানের ব্যাপক আঘাতে তাঁদের নিহত হওয়া সেই নিষেধের অন্তর্ভুক্ত নয়। এখানে ব্যতিক্রমটি শুধু ব্যাখ্যার আড়ালে নেই; সংকলনের অধ্যায়শিরোনামেই প্রকাশ্য। নারী–শিশুর জীবনের সুরক্ষা তাই আক্রমণের ধরন বদলালে ভিন্ন বিধানের অধীন হচ্ছে। একই মৃত্যুকে সরাসরি লক্ষ্য করলে নিষিদ্ধ এবং রাতের অভিযানের আঘাতে ঘটলে অনুমোদিত গণ্য করার এই বিভাজন মানুষের জীবনরক্ষার বদলে আক্রমণকারীর কাজের শ্রেণিবিভাগকে কেন্দ্রে বসায়। তাঁর অধ্যায়শিরোনাম, বর্ণনাসূত্র ও বক্তব্য একসঙ্গে রয়েছে এভাবে: [24]

ذكر البيان بأن النساء والصبيان من أهل الحرب إنما زجر عن قتلهم في القصد ، دون البيات وغشم الغارة
4786 – أخبرنا الحسن بن سفيان قال : حدثنا أبو بكر بن أبي شيبة قال : حدثنا سفيان عن الزهري عن عبيد الله بن عبد الله عن ابن عباس ، قال [ ص: 108 ] حدثني الصعب بن جثامة ، أن رسول الله صلى الله عليه وسلم سئل عن الذراري من دور المشركين يبيتون ، وفيهم النساء والصبيان ، فقال : هم منهم .

বাংলা অনুবাদ: শত্রুপক্ষের নারী ও শিশুদের হত্যার নিষেধাজ্ঞা যে তাঁদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করে হত্যার ক্ষেত্রে, রাতের হামলা ও অভিযানের ব্যাপক আঘাতের ক্ষেত্রে নয়—তার ব্যাখ্যা।
৪৭৮৬। হাসান ইবনে সুফিয়ান আমাদের জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আবু বকর ইবনে আবি শাইবা আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, সুফিয়ান আমাদের বর্ণনা করেছেন, যুহরির সূত্রে, তিনি উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহর সূত্রে, তিনি ইবনে আব্বাসের সূত্রে। ইবনে আব্বাস বলেন [পৃষ্ঠা ১০৮], সা’ব ইবনে জাসসামা আমাকে জানিয়েছেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মুশরিকদের জনপদের সন্তানসন্ততি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—সেখানে রাতের হামলা চালানো হয় এবং সেখানে নারী ও শিশুরাও থাকে। তিনি বললেন, ‘তারাও তাদের অন্তর্ভুক্ত।’

এই বিন্যাসে নিষেধাজ্ঞার কার্যকর সীমা নির্ধারিত হচ্ছে আক্রমণকারীর লক্ষ্য ও আক্রমণের পদ্ধতি দিয়ে। নারী–শিশুর মৃত্যু ঘটতে পারে বলে হামলা বন্ধ করা বাধ্যতামূলক হয়নি; তাঁদের সরাসরি লক্ষ্য না করাকে অভিযানের অনুমোদনের ভিত্তি করা হয়েছে। অথচ যে বাহিনী কখন আক্রমণ করবে এবং কোন পদ্ধতিতে করবে, তা নির্ধারণ করছে, তার সিদ্ধান্তই আক্রান্ত জনপদের বিপদ তৈরি করে। নিজের হাতে তৈরি করা সেই বিপদের ফলকে শুধু মূল উদ্দেশ্যের বাইরে ছিল বলে নৈতিক দায়মুক্তি দেওয়া যায় না। একজন মানুষের জীবন বিপন্ন করার সিদ্ধান্তের মূল্যায়নে আঘাত করার উদ্দেশ্যের পাশাপাশি ক্ষতি সম্পর্কে পূর্বজ্ঞান এবং সেই ক্ষতির মুখেও অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বিবেচ্য।

হত্যার নিষেধাজ্ঞার এই ব্যাখ্যায় মানুষের সুরক্ষা নির্ধারণে দুটি প্রশ্ন আলাদা হয়ে যায়: কাকে হত্যার লক্ষ্য করা হয়েছে এবং কাদের মৃত্যু জেনেও হামলা চালানো হয়েছে। প্রথম প্রশ্নে নিষেধ থাকলেও দ্বিতীয় ক্ষেত্রে অনুমতি থাকলে আক্রমণকারীর নিজের উদ্দেশ্য নিষেধাজ্ঞা অক্ষত রাখার উপায় হয়ে ওঠে। অথচ অযোদ্ধার সুরক্ষা কার্যকর করতে আক্রমণের পদ্ধতি ও জানা ঝুঁকির ওপরও সীমা প্রয়োজন। ইবনে হিব্বানের অধ্যায়বিন্যাসে রাতের হামলার ব্যতিক্রমটি সেই সীমা সংকুচিত করেছে; নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেই প্রাণহানির একটি ক্ষেত্র তার বাইরে রাখা হয়েছে।


নববীর ব্যাখ্যা: চেনা যায় না এমন অবস্থায় হত্যার অনুমোদন

নববী রাতের হামলাকে এমন অভিযান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, যেখানে পুরুষ, নারী ও শিশুকে আলাদা করে চেনা যায় না। নারী–শিশু হত্যার নিষেধাজ্ঞা তিনি পৃথক করে শনাক্ত করার অবস্থার জন্য প্রযোজ্য বলেছেন। অন্যদিকে রাতের হামলায় তাঁদের নিহত হওয়ার অনুমোদনকে নিজের মাযহাব, মালিক, আবু হানিফা ও অধিকাংশ আলেমের মত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় উত্তরাধিকার, বিবাহ, কিসাস ও দিয়াতে পিতার বিধান অনুসরণের প্রসঙ্গও এসেছে। ফলে আক্রমণের সময় মানুষকে শনাক্ত করার সীমাবদ্ধতা এবং পারিবারিক পরিচয়—দুটিই প্রাণহানির অনুমোদনের আলোচনায় কার্যকর। একই সঙ্গে নতুন সতর্কবার্তা ছাড়া হামলার বৈধতা যুক্ত হওয়ায় আক্রান্তদের অপ্রস্তুত অবস্থার সুরক্ষাও কমে যায়। তাঁর সম্পূর্ণ ব্যাখ্যাটি হলো: [25]

قوله : ( سئل رسول الله صلى الله عليه وسلم عن الذراري من المشركين يبيتون فيصيبون من نسائهم وذراريهم فقال : هم منهم ) هكذا هو في أكثر نسخ بلادنا ( سئل عن الذراري ) وفي رواية : ( عن أهل الدار من المشركين ) ونقل القاضي هذه عن رواية جمهور رواة صحيح مسلم قال : وهي الصواب ، فأما الرواية الأولى فقال : ليست بشيء ، بل هي تصحيف ، قال : وما بعده هو تبيين الغلط فيه ، قلت : وليست باطلة كما ادعى القاضي بل لها وجه ، وتقديره : سئل عن حكم صبيان المشركين الذين يبيتون فيصاب من نسائهم وصبيانهم بالقتل ، فقال : هم من آبائهم ، أي لا بأس بذلك ; لأن أحكام آبائهم جارية عليهم في الميراث وفي النكاح وفي القصاص والديات وغير ذلك ، والمراد إذا لم يتعمدوا من غير ضرورة .
وأما الحديث السابق في النهي عن قتل النساء والصبيان ، فالمراد به إذا تميزوا ، وهذا الحديث الذي ذكرناه من جواز بياتهم وقتل النساء والصبيان في البيات هو مذهبنا ومذهب مالك وأبي حنيفة والجمهور .
ومعنى ( البيات ، ويبيتون ) أن يغار عليهم بالليل بحيث لا يعرف الرجل من المرأة والصبي .
وأما ( الذراري ) فبتشديد الياء وتخفيفها لغتان ، التشديد أفصح وأشهر ، والمراد بالذراري هنا النساء والصبيان .
وفي هذا [ ص: 408 ] الحديث دليل لجواز البيات ، وجواز الإغارة على من بلغتهم الدعوة من غير إعلامهم بذلك .
وفيه أن أولاد الكفار حكمهم في الدنيا حكم آبائهم ، وأما في الآخرة ففيهم إذا ماتوا قبل البلوغ ثلاثة مذاهب ، الصحيح أنهم في الجنة ، والثاني : في النار ، والثالث : لا يجزم فيهم بشيء . والله أعلم .

বাংলা অনুবাদ: তাঁর বক্তব্য: ‘আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মুশরিকদের সন্তানসন্ততি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো; তাদের ওপর রাতের হামলা চালানো হয়, ফলে তাদের নারী ও সন্তানসন্ততিও আক্রান্ত হয়। তিনি বললেন, তারাও তাদের অন্তর্ভুক্ত।’ আমাদের অঞ্চলের অধিকাংশ পাণ্ডুলিপিতে এভাবেই ‘সন্তানসন্ততি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো’ কথাটি রয়েছে। আরেক বর্ণনায় আছে, ‘মুশরিক জনপদের অধিবাসীদের সম্পর্কে’। কাজি সহিহ মুসলিমের অধিকাংশ বর্ণনাকারীর সূত্রে দ্বিতীয় পাঠটি উল্লেখ করে বলেছেন, এটিই সঠিক। প্রথম পাঠ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, এটি কিছুই নয়; বরং পাঠবিকৃতি, এবং পরের বক্তব্যই তার ভুল প্রকাশ করে। আমি বলি, কাজি যেমন দাবি করেছেন, পাঠটি তেমন বাতিল নয়; এরও অর্থ রয়েছে। অর্থ হলো, যেসব মুশরিকের ওপর রাতের হামলা হয় এবং তাদের নারী ও শিশু নিহত হয়, তাদের শিশুদের বিধান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে। তিনি বললেন, তারা তাদের পিতাদের অন্তর্ভুক্ত; অর্থাৎ এতে দোষ নেই। কারণ উত্তরাধিকার, বিবাহ, কিসাস, দিয়াত ও অন্যান্য বিষয়ে পিতাদের বিধান তাদের ওপর প্রযোজ্য। উদ্দেশ্য হলো, প্রয়োজন ছাড়া তাঁদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করা না হলে।
নারী ও শিশু হত্যার নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত আগের হাদিসটির অর্থ হলো, যখন তাঁদের পৃথকভাবে চেনা যায়। আর এখানে যে হাদিসে তাঁদের ওপর রাতের হামলা ও সেই হামলায় নারী–শিশু নিহত হওয়ার বৈধতা উল্লেখ করেছি, এটিই আমাদের মাযহাব এবং মালিক, আবু হানিফা ও অধিকাংশ আলেমের মাযহাব।
‘বায়াত’ ও ‘ইউবাইয়্যাতুন’ অর্থ হলো, রাতে এমনভাবে তাঁদের ওপর হামলা চালানো, যাতে পুরুষকে নারী ও শিশু থেকে আলাদা করে চেনা যায় না।
‘যারারি’ শব্দে ইয়া বর্ণে তাশদিদ ও তাশদিদ ছাড়া—দুটি উচ্চারণ আছে। তাশদিদযুক্ত উচ্চারণটি বেশি বিশুদ্ধ ও প্রচলিত। এখানে যারারি দ্বারা নারী ও শিশু বোঝানো হয়েছে।
এই হাদিসে [পৃষ্ঠা ৪০৮] রাতের হামলা বৈধ হওয়ার এবং যাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছেছে, তাঁদেরকে হামলার কথা না জানিয়েই আক্রমণ করার বৈধতার দলিল রয়েছে।
এতে আরও রয়েছে, কাফিরদের সন্তানদের পার্থিব বিধান তাদের পিতাদের বিধানের মতো। পরকালে তারা বালেগ হওয়ার আগে মারা গেলে তাদের বিষয়ে তিনটি মত আছে: সঠিক মত হলো, তারা জান্নাতে থাকবে; দ্বিতীয় মত, জাহান্নামে; তৃতীয় মত, তাদের বিষয়ে নিশ্চিত কিছু বলা হবে না। আল্লাহ ভালো জানেন।

নারী–শিশুকে পৃথক করে চেনা না-যাওয়াই এখানে প্রাণহানির অনুমোদন কার্যকর হওয়ার পরিস্থিতি। মানুষের মধ্যে যুদ্ধরত ও অযোদ্ধাকে শনাক্ত করার ক্ষমতা কমে গেলে নিরীহ মানুষের ওপর আঘাত পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। সেই বাড়তি ঝুঁকি অভিযান স্থগিত করার বাধ্যবাধকতা তৈরি করেনি; আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার অনুমোদনের মধ্যে তা গ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলে অন্ধকারের অসুবিধা আক্রমণকারীর বিধানগত সুবিধা হয়ে ওঠে, আর আক্রান্ত মানুষের জন্য বাড়তি বিপদ। নারী ও শিশুর দুর্বলতা এবং নিজেকে আলাদা করে চেনানোর অক্ষমতা তাদের নিরাপত্তার প্রয়োজন বাড়ায়; উদ্ধৃত ব্যাখ্যায় সেই প্রয়োজনের ওপর সামরিক অভিযান এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ স্থান পেয়েছে।

নববী একই আলোচনায় যাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছেছে, তাদের হামলার কথা না জানিয়েই আক্রমণ বৈধ বলেছেন। এতে সময় সম্পর্কে অপ্রস্তুত থাকা এবং অন্ধকারে নিজেকে অযোদ্ধা হিসেবে চেনাতে না-পারার বিপদ একত্র হতে পারে। আগের ধর্মীয় আহ্বান এই নির্দিষ্ট হামলার সংবাদ দেয় না। আক্রমণকারী সময় নির্ধারণের সুবিধা ধরে রাখছে, আর আক্রান্ত মানুষের শনাক্ত হওয়ার সীমাবদ্ধতাও অভিযানের অনুমোদনের মধ্যে গ্রহণ করা হচ্ছে।

উত্তরাধিকার বা পারিবারিক আইনে পিতার বিধান অনুসরণ করার নিয়ম থেকে শিশুর প্রাণহানির অনুমোদনে পৌঁছানোর যুক্তিতেও গভীর নৈতিক সমস্যা আছে। সম্পত্তির উত্তরাধিকার নির্ধারণ এবং প্রাণঘাতী আক্রমণে একটি শিশুর সুরক্ষা নির্ধারণ ভিন্ন প্রশ্ন। পারিবারিক সম্পর্ক একটি শিশুর জীবনের ওপর অন্যের হত্যার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে না। পিতা যে ধর্মের অনুসারী অথবা যে জনপদের বাসিন্দা, সেই পরিচয় দিয়ে শিশুর অযোদ্ধা অবস্থান শেষ হয়ে যায় না। তাকে পিতার বিধানের অন্তর্ভুক্ত বললে কেবল শ্রেণিবিন্যাস পাওয়া যায়; নিজের কোনো যুদ্ধকাজ ছাড়া তার জীবন বিপন্ন করার নৈতিক অধিকার পাওয়া যায় না।

একই ব্যাখ্যায় নববী প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে মৃত অমুসলিম শিশুদের বিষয়ে জান্নাতের মতকে সঠিক বলেছেন, কিন্তু পার্থিব রাতের হামলায় তাঁদের প্রাণহানির অনুমোদনও বহাল রেখেছেন। পরকালে শিশুর কোথায় যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে এবং পৃথিবীতে তাকে প্রাণঘাতী আক্রমণ থেকে রক্ষা করা হবে কি না—দুটি পৃথক প্রশ্ন। পরকালের প্রতিশ্রুতি শিশুটির জীবন ফিরিয়ে দেয় না, তার পরিবারের ক্ষতি দূর করে না এবং আক্রমণকারীর পার্থিব সিদ্ধান্তের নৈতিক মূল্যায়নের বিকল্পও হয় না। শিশুর নিরাপত্তার বাস্তব প্রশ্নটি পৃথিবীর কাজ ও তার পরিণতির মধ্যেই থাকে।


ইবনে মুলাক্কিন: পাঠভেদ, লক্ষ্যবস্তু এবং জেনেশুনে প্রাণহানির ঝুঁকি

ইবনে মুলাক্কিন একই বর্ণনায় ‘হুম মিনহুম’—‘তারাও তাদের অন্তর্ভুক্ত’ এবং ‘হুম মিন আবাইহিম’—‘তারা তাদের পিতাদের অন্তর্ভুক্ত’—এই পাঠভেদ আলোচনা করেছেন। প্রথম পাঠে গোষ্ঠীর সদস্যত্ব এবং দ্বিতীয় পাঠে পিতার সঙ্গে সম্পর্ক প্রকাশ্য। উভয় ক্ষেত্রেই নারী–শিশুর পরিচয় যুদ্ধরত সমষ্টি বা পিতাদের সঙ্গে যুক্ত করে নির্ধারিত হচ্ছে। তাঁর আলোচনায় একই ঘটনার বর্ণনাপথ ও শব্দের পার্থক্য সংরক্ষিত হয়েছে। পাঠভেদের সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে এভাবে: [26]

ذكر فيه حديث الزهري، عن عبيد الله، عن ابن عباس، عن الصعب بن جثامة قال: مر بي النبي – صلى الله عليه وسلم – بالأبواء – أو بودان – فسئل عن أهل الدار يبيتون من المشركين، فيصاب من نسائهم وذراريهم، قال: “هم منهم”. وسمعته يقول: “لا حمى إلا لله ولرسوله”.
وعن الزهري أنه سمع عبيد الله، عن ابن عباس : قال: ثنا الصعب في الذراري كان عمرو يحدثنا، عن ابن شهاب، عن النبي – صلى الله عليه وسلم – . فسمعناه من الزهري قال: أخبرني عبيد الله، عن ابن عباس، عن الصعب قال: “هم منهم”. ولم يقل كما قال عمرو: “هم من آبائهم”.
[ ص: 181 ] الشرح:
هذا الحديث أخرجه مسلم والأربعة، وبين الإسماعيلي هذا بقوله: قال سفيان: وكان عمه، وحدثناه أولا عن الزهري قبل أن يلقاه فقال: “هم من آبائهم” فلما ثنا الزهري فتقدمه فلم يقل: “هم من آبائهم ” قال: “هم منهم” (ورواه) الطبراني من حديث حماد بن زيد، عن عمرو، عن ابن عباس بلفظ: “هم من آبائهم” لم يذكر الزهري ولا عبيد الله ولا الصعب، رواه عن علي بن عبد العزيز، ثنا حجاج بن منهال وعارم عنه.

বাংলা অনুবাদ: এখানে তিনি যুহরি, উবাইদুল্লাহ, ইবনে আব্বাস হয়ে সা’ব ইবনে জাসসামার হাদিস উল্লেখ করেছেন। সা’ব বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবওয়া অথবা ওয়াদ্দানে আমার পাশ দিয়ে গেলেন। তাঁকে মুশরিক জনপদের অধিবাসীদের ওপর রাতের হামলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, যাতে তাঁদের নারী ও সন্তানসন্ততিও আক্রান্ত হয়। তিনি বললেন, ‘তারাও তাদের অন্তর্ভুক্ত।’ আমি তাঁকে আরও বলতে শুনেছি, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ছাড়া কারও জন্য সংরক্ষিত চারণভূমি নেই।’
যুহরি থেকে বর্ণিত, তিনি উবাইদুল্লাহকে ইবনে আব্বাসের সূত্রে বলতে শুনেছেন: সা’ব আমাদের সন্তানসন্ততি সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। আমর আমাদের ইবনে শিহাবের সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করতেন। পরে আমরা যুহরির কাছে শুনলাম; তিনি বললেন, উবাইদুল্লাহ আমাকে জানিয়েছেন, ইবনে আব্বাসের সূত্রে, তিনি সা’বের সূত্রে: তিনি বলেছেন, ‘তারাও তাদের অন্তর্ভুক্ত।’ আমর যেমন বলেছিলেন, ‘তারা তাদের পিতাদের অন্তর্ভুক্ত’, তিনি তেমন বলেননি।
[পৃষ্ঠা ১৮১] ব্যাখ্যা:
এই হাদিস মুসলিম ও চার সংকলক বর্ণনা করেছেন। ইসমাইলি বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেছেন: সুফিয়ান বলেছেন, তিনি তাঁর চাচা ছিলেন। যুহরির সঙ্গে সাক্ষাতের আগে তিনি প্রথমে যুহরির সূত্রে আমাদের ‘তারা তাদের পিতাদের অন্তর্ভুক্ত’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। পরে যুহরি আমাদের বর্ণনা করলে তিনি আগের পাঠের পরিবর্তে ‘তারা তাদের পিতাদের অন্তর্ভুক্ত’ না বলে ‘তারাও তাদের অন্তর্ভুক্ত’ বলেছেন। তাবারানি হাম্মাদ ইবনে যায়েদ, আমর, ইবনে আব্বাসের সূত্রে ‘তারা তাদের পিতাদের অন্তর্ভুক্ত’ ভাষায় বর্ণনা করেছেন; সেখানে যুহরি, উবাইদুল্লাহ ও সা’বের নাম নেই। তিনি আলি ইবনে আবদুল আজিজের সূত্রে, তিনি হাজ্জাজ ইবনে মিনহাল ও আরিমের সূত্রে তাঁর কাছ থেকে এটি বর্ণনা করেছেন।

ইবনে মুলাক্কিনের আইনগত আলোচনায় একটি কঠোর সীমারেখা উঠে আসে: নারী–শিশুকে সরাসরি লক্ষ্য করা এবং অন্যদের হত্যা করতে গিয়ে তাঁদেরও হত্যা হওয়া। অনুমোদনের উদ্ধৃত ভাষায় পিতাদের কাছে পৌঁছাতে তাঁদের নারী–শিশুর প্রাণহানি ছাড়া উপায় না থাকলে আক্রমণে দোষ নেই। আবার সংরক্ষিত আরেক মতে অন্যদের লক্ষ্য করলেও নারী–শিশুর মৃত্যু থেকে নিরাপদ থাকা না গেলে হামলা নিষিদ্ধ। ফলে মতভেদের কেন্দ্র শুধু আক্রমণকারীর উদ্দেশ্য নয়; সামরিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য অযোদ্ধার মৃত্যু গ্রহণ করা যাবে কি না। তাঁর গ্রন্থে মতগুলোর পূর্ণ প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা হলো: [27]

رابعها: معنى قوله: “هم منهم” يريد كما قال الخطابي في حكم الدين، فإن ولد الكافر محكوم له بالكفر. قال: ولم يرد بهذا القول إباحة دمائهم تعمدا لها وقصدا إليها، وإنما هو إذا لم يصل إلى قتل الآباء إلا بذلك، وإلا فلا يقصدون بالقتل مع القدرة على ترك ذلك.
ومعنى النهي عن قتل النساء والصبيان في الباب الذي بعد هذا أن يقصدوا بالقتل مع القدرة على تمييزهم، إلا أن النساء إذا قاتلن قتلن؛ لأن العلة المانعة من قتلهن عدم القتل فيهن.
وقد اختلف العلماء في العمل بهذا الحديث، فتركه قوم وذهبوا إلى أنه لا يجوز قتل النساء والولدان في الحرب على حال، وأنه لا يحل أن يقصد إلى قتل غيرهم إذا كان لا يؤمن في ذلك تلفهم، مثل أن يتترس أهل الحرب بصبيانهم ولا يستطيع المسلمون منهم إلا بإصابة صبيانهم، فحرام عليهم رميهم، وكذلك إن تحصنوا بحصن أو سفينة وجعلوا فيها نساء وصبيانا أو أسارى مسلمين، فحرام رمي ذلك الحصن وخرق تلك السفينة إذا كان يخاف تلف الأسارى والنساء والصبيان.
[ ص: 183 ] واحتجوا بعموم (نهيه عن قتل النساء والصبيان وبعموم) قوله تعالى: لو تزيلوا لعذبنا الذين كفروا منهم عذابا أليما [الفتح: 25] هذا قول مالك والأوزاعي .
وقال الكوفيون والشافعي : إنما وقع النهي عن قتل النساء والصبيان إذا قصد إلى قتلهم، فأما إذا قصد إلى قتل غيرهم ممن لا يوصل إلى ذلك منه إلا بتلف نسائهم وصبيانهم فلا بأس بذلك.

বাংলা অনুবাদ: চতুর্থ দিক: ‘তারাও তাদের অন্তর্ভুক্ত’ কথাটির অর্থ, খাত্তাবি যেমন বলেছেন, ধর্মের বিধানে; কাফিরের সন্তানকে কুফরের বিধানের অধীন গণ্য করা হয়। তিনি বলেন, এর দ্বারা তাঁদের উদ্দেশ্য করে ও লক্ষ্য বানিয়ে রক্তপাত বৈধ করা বোঝানো হয়নি। বরং পিতাদের হত্যা করতে তাঁদের ওপর আঘাত করা ছাড়া উপায় না থাকলে এই বিধান; অন্যথায় তাঁদের এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হলে তাঁদের হত্যার লক্ষ্য করা হবে না।
পরবর্তী অধ্যায়ে নারী ও শিশু হত্যার নিষেধের অর্থ হলো, তাঁদের পৃথকভাবে চেনা সম্ভব হওয়া সত্ত্বেও হত্যার উদ্দেশ্য করা। তবে নারীরা যুদ্ধ করলে তাঁদের হত্যা করা হবে; কারণ তাঁদের হত্যা না করার কারণ হলো তাঁদের যুদ্ধ না-করা।
এই হাদিস অনুসারে আমল করার বিষয়ে আলেমদের মতভেদ রয়েছে। একদল এটি গ্রহণ না করে বলেছেন, যুদ্ধের কোনো অবস্থাতেই নারী ও শিশু হত্যা করা বৈধ নয়। অন্যদের লক্ষ্য করে আক্রমণ করাও বৈধ নয়, যদি তাতে তাঁদের প্রাণহানি থেকে নিরাপদ থাকা না যায়। যেমন শত্রুপক্ষ নিজেদের শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলে এবং সেই শিশুদের আঘাত না করে মুসলিমরা তাঁদের কাছে পৌঁছাতে না পারলে তাঁদের ওপর নিক্ষেপ করা হারাম। একইভাবে তাঁরা দুর্গ বা জাহাজে আশ্রয় নিয়ে সেখানে নারী–শিশু বা মুসলিম বন্দিদের রাখলে এবং সেই বন্দি, নারী ও শিশুদের প্রাণহানির আশঙ্কা থাকলে ওই দুর্গে নিক্ষেপ করা বা জাহাজ ফুটো করা হারাম।
[পৃষ্ঠা ১৮৩] তাঁরা নারী ও শিশু হত্যার নিষেধের সাধারণ বক্তব্য এবং আল্লাহর ‘তারা পৃথক হয়ে গেলে তাদের মধ্যকার কাফিরদের আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিতাম’ [ফাতহ: ২৫]—এই আয়াতের সাধারণ বক্তব্য দলিল করেছেন। এটি মালিক ও আওযায়ির মত।
কুফার আলেমরা ও শাফেয়ি বলেছেন, নারী ও শিশু হত্যার নিষেধ হলো তাঁদের হত্যার উদ্দেশ্য করার ক্ষেত্রে। অন্যদের হত্যার উদ্দেশ্য করা হলে, যাঁদের কাছে তাঁদের নারী–শিশুর প্রাণহানি ছাড়া পৌঁছানো যায় না, তাতে দোষ নেই।

অনুমোদনের উদ্ধৃত ভাষায় আক্রমণকারীর মূল লক্ষ্য অন্য ব্যক্তি; নারী–শিশুর প্রাণহানি সেই লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে যুক্ত। এই সম্পর্ক নৈতিক দায় কমিয়ে দেওয়ার সহজ ভিত্তি নয়। কাউকে আঘাত করতে গিয়ে তার কাছে থাকা একটি শিশুকে আঘাত করা ছাড়া উপায় নেই—এই পরিস্থিতি শিশুটির জীবন বিসর্জন দেওয়ার অধিকার তৈরি করে না। এখানে পিতাকে হত্যা করার সামরিক উদ্দেশ্য এবং শিশুকে বাঁচিয়ে রাখার অধিকার মুখোমুখি হয়েছে। অনুমোদনের মত সামরিক উদ্দেশ্য পূরণকে বেছে নিয়েছে এবং শিশুর মৃত্যুকে সেই কাজের গ্রহণযোগ্য ফলের মধ্যে রেখেছে। অযোদ্ধা শিশুর জীবন তাই অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্যের অধীন হয়ে যায়।

হামলা নিষিদ্ধ বলার উদ্ধৃত মতটি এই একই বিপদের ভিন্ন সিদ্ধান্ত দিয়েছে: অন্যদের লক্ষ্য করলেও নারী–শিশুর প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব না হলে আঘাত করা যাবে না। ফলে নারী–শিশুর মৃত্যু সম্পর্কে পূর্বজ্ঞানকে আক্রমণ বন্ধ করার কারণ হিসেবে ব্যবহার করা এই ফিকহি আলোচনার মধ্যেই উপস্থিত। অনুমোদনের অবস্থান সেই সীমা গ্রহণ করেনি। নারী–শিশু হত্যার নিষেধাজ্ঞার নৈতিক মূল্য এখানেই পরীক্ষা হয়—তাঁদের হত্যা করতে আলাদা করে বের হওয়া বন্ধ রাখার পাশাপাশি তাঁদের বাঁচানোর জন্য সামরিক লক্ষ্য অর্জন থেকে বিরত থাকা বাধ্যতামূলক হবে কি না। অনুমোদিত ব্যতিক্রমটি দ্বিতীয় বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে তাঁদের সুরক্ষার কার্যকর পরিসর সংকুচিত করেছে।

মতগুলোর আরোপেও পার্থক্য আছে: ইবনে মুলাক্কিনের আলোচনায় মালিক ও আওযায়ির নামে নিষেধের মত সংরক্ষিত, নববী মালিকের নামে রাতের হামলার অনুমোদন উল্লেখ করেছেন। দুই ভাষ্যে সুরক্ষার সীমা একইভাবে নির্ধারিত হয়নি। অনুমোদনের গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি হলো, অযোদ্ধা পরিচয় স্বীকার করা এবং সেই মানুষকে রক্ষার জন্য হামলা বন্ধ করা পৃথক সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। নারী–শিশুকে আলাদা করে হত্যার লক্ষ্য করা নিষিদ্ধ রেখেও তাঁদের প্রাণহানি ঘটায় এমন অভিযানের অনুমতি রয়েছে। সেই অনুমতিসহ বিধানকে তাঁদের জীবনের পূর্ণ নিরাপত্তা হিসেবে প্রচার করা দলিলের অর্থ বিকৃত করা।


নারী–শিশু থাকা দুর্গে অগ্নিসংযোগ, প্লাবন ও নিক্ষেপযন্ত্র

রাতের হামলায় নারী–শিশুর মৃত্যু সম্পর্কে অনুমোদনের সঙ্গে দুর্গ ও জনপদ অবরোধের বিধানের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। দুর্গের ভেতরে কারা আছে, ব্যবহৃত অস্ত্র কাদের আঘাত করবে এবং সামরিক উদ্দেশ্য পূরণে কতজন অযোদ্ধার প্রাণ বিপন্ন করা যাবে—এসব প্রশ্ন ধ্রুপদি ফিকহে স্পষ্টভাবে আলোচিত। সেখানে অগ্নিসংযোগ, পানি দিয়ে ডুবিয়ে দেওয়া, পানির সরবরাহ বন্ধ করা এবং মঞ্জনিক বা ভারী পাথর নিক্ষেপের যন্ত্র ব্যবহারের পৃথক বিধান আছে। ফলে নারী–শিশু হত্যার নিষেধাজ্ঞা উদ্ধৃত করেই তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ছিল বলে দাবি করা দলিলের অর্ধেক চাপা দেওয়া। ওই নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি কোন আক্রমণে তাঁদের মৃত্যু অনুমোদিত হয়েছে, সেটিও একই যুদ্ধনীতির অংশ।


কারাফি: একই দুর্গে নারী–শিশু থাকলেও আক্রমণের চার মত

মালিকি ফকিহ শিহাবুদ্দিন আল-কারাফি যুদ্ধের পদ্ধতি আলোচনায় গ্রাম ও দুর্গ পোড়ানো, প্লাবিত করা, ফলের গাছ কাটা এবং অবরুদ্ধদের পানি বন্ধ করার বিধান একত্র করেছেন। নারী–শিশু থাকা দুর্গে মঞ্জনিক, আগুন ও প্লাবন ব্যবহারের বিষয়ে তিনি চারটি পৃথক মত উল্লেখ করেছেন। মুসলিম বন্দি থাকলে বিধানের পরিবর্তন এবং মানবঢাল ব্যবহারের প্রশ্নও একই আলোচনায় এসেছে। প্রাসঙ্গিক ধারাবাহিক অংশটি হলো: [28]

البحث السادس : في وجوه القتال ، في ( الكتاب ) : لا بأس بتحريق قراهم وحصونهم وتغريقها بالماء ، وإخرابها وقطع شجرها المثمر ، وقاله ( ش ) ، وقال [ ص: 408 ] الأئمة : يجاز قطع النخل ونحوه ، لما في مسلم أنه عليه السلام حرق نخل بني النضير . ويحمل قول الصديق – رضي الله عنه – على ما يرجى انتفاع المسلمين به ، وإذا كان مسلم في حصن أو مركب لا يحرق ولا يغرق لقوله تعالى : ( لو تزيلوا لعذبنا الذين كفروا منهم عذابا أليما ) [ الفتح 25 ] ولا يعجبني ذلك إذا كان فيهم ذرية المشركين ونساؤهم ، وإذا خرق العدو سفينة المسلمين جاز خروجهم إلى البحر فرارا من الموت إلى الموت ، ولم يره ربيعة إذا طمع في النجاة أو الأسر ، وقال ربيعة أيضا : الصبر أفضل ، ولا يلقي الرجل نفسه بسلاحه ليغرق بل يثبت لأمر الله تعالى ، وفي ( الجواهر ) : يجوز إرسال الماء عليهم وقطعه عنهم لقوله تعالى : ( وأعدوا لهم ما استطعتم من قوة ومن رباط الخيل ) [ الأنفال 60 ] وفي النار خلاف ما لم يكن عندهم أسارى المسلمين فلا يجوز ، ولو تترسوا بالنساء والصبيان تركناهم إلا أن يخاف على المسلمين ، فإن تترسوا بمسلم تركوا ، وإن خفنا على أنفسنا ; لأن دم المسلم لا يباح بالخوف ، فإن تترسوا في الصف ولو تركوا لانهزم المسلمون وخيف استئصال قاعدة الإسلام أو جمهور المسلمين وأهل القوة منهم ، وجب الدفع وسقط مراعاة الترس ، ولا يجوز حمل رءوس الكفار من بلد إلى بلد ولا إلى الولاة ، وقد كرهه الصديق – رضي الله عنه – وقال : هذا فعل العجم ، قال صاحب ( البيان ) : ترمى الحصون بالمنجنيق ، وإن كان فيهم نساء وصبيان فقد رمى أهل الطائف بالمنجنيق ، فقيل له : يا رسول الله ، إن فيهم النساء والصبيان ، فقال عليه السلام : هم من آبائهم ) وإذا لم يكن بالحصن إلا المقاتلة : أجاز في ( الكتاب ) [ ص: 409 ] رميها بالنار ، وروي عنه المنع ، وإذا كان معهم النساء والصبيان فأربعة أقوال : يجوز المنجنيق دون التغريق والتحريق ، وهو مذهب ( الكتاب ) ، ويجوز جميع ذلك عند أصبغ ، ومنع جميع ذلك مروي عن ابن القاسم ، ويجوز التغريق والمنجنيق دون التحريق عند ابن حبيب ، فإن كان معهم أسارى للمسلمين امتنع التحريق والتغريق ، قال ابن القاسم : يجوز المنجنيق وقطع الماء عنهم ، وروي منع ذلك عن مالك وأصحابه المصريين والمدنيين ، وأما السفن إن لم يكن فيها أسارى المسلمين جاز التحريق ، والفرق بينها وبين الحصون أنهم إذا لم يحرقوهم فعلوا بهم ذلك ، وهو متعذر عليهم في الحصون ، فإن كان فيهم الأسارى فمنع ابن القاسم ، وجوز أشهب وإن كان فيهم النسوان والصبيان جاز قولا واحدا ، والمدرك في هذه الأحكام قوله تعالى : ( يخربون بيوتهم بأيديهم وأيدي المؤمنين ) [ الحشر 2 ] وقوله تعالى : ( ما قطعتم من لينة أو تركتموها قائمة على أصولها فبإذن الله وليخزي الفاسقين ) [ الحشر 5 ] وقال عليه السلام : ( لا يعذب بالنار إلا رب النار )

বাংলা অনুবাদ: ষষ্ঠ আলোচনা: যুদ্ধের পদ্ধতি। ‘আল-কিতাব’-এ আছে: তাদের গ্রাম ও দুর্গ আগুনে পোড়ানো, পানি দিয়ে ডুবিয়ে দেওয়া, ধ্বংস করা এবং ফলদ গাছ কেটে ফেলায় অসুবিধা নেই। শাফেয়িও এ কথা বলেছেন। [পৃষ্ঠা ৪০৮] ইমামরা বলেছেন, খেজুরগাছ ও অনুরূপ গাছ কাটা বৈধ; কারণ মুসলিমে আছে, তিনি আলাইহিস সালাম বনু নাদিরের খেজুরগাছ পুড়িয়েছিলেন। সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর বক্তব্যকে এমন সম্পদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ধরা হবে, যা মুসলিমদের উপকারে আসার আশা রয়েছে। দুর্গ বা নৌযানে মুসলিম থাকলে তা পোড়ানো বা ডোবানো হবে না; আল্লাহর বাণী: ‘তারা পৃথক হয়ে গেলে তাদের মধ্যকার কাফিরদের আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিতাম’ [ফাতহ: ২৫]। সেখানে মুশরিকদের সন্তানসন্ততি ও নারীরা থাকলেও এমন কাজ আমার পছন্দ নয়। শত্রু মুসলিমদের জাহাজ ফুটো করে দিলে মৃত্যুর এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থার দিকে পালাতে তাঁদের সমুদ্রে নেমে যাওয়ার অনুমতি আছে। রাবিয়া তা অনুমোদন করেননি, যদি বেঁচে যাওয়া অথবা বন্দি হওয়ার আশা থাকে। রাবিয়া আরও বলেছেন, ধৈর্য ধরে থাকাই উত্তম। ব্যক্তি অস্ত্রসহ নিজেকে পানিতে ফেলে ডুবিয়ে দেবে না; বরং আল্লাহর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় অটল থাকবে।
‘আল-জাওয়াহির’-এ আছে: তাদের দিকে পানি প্রবাহিত করা এবং তাদের পানি বন্ধ করে দেওয়া বৈধ; আল্লাহর বাণী: ‘তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের সাধ্য অনুযায়ী শক্তি ও প্রস্তুত অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখো’ [আনফাল: ৬০]। আগুন ব্যবহারের বিষয়ে মতভেদ আছে, যদি তাদের কাছে মুসলিম বন্দি না থাকে; মুসলিম বন্দি থাকলে তা বৈধ নয়। তারা নারী ও শিশুদের ঢাল বানালে আমরা আক্রমণ থেকে বিরত থাকব, যদি না মুসলিমদের জন্য বিপদের আশঙ্কা হয়। তারা কোনো মুসলিমকে ঢাল বানালে আক্রমণ বন্ধ রাখা হবে, এমনকি নিজেদের জন্য আশঙ্কা থাকলেও; কারণ আশঙ্কার কারণে মুসলিমের রক্ত বৈধ হয় না। কিন্তু যুদ্ধের সারিতে তারা ঢাল ব্যবহার করলে এবং আক্রমণ ছেড়ে দিলে মুসলিমদের পরাজয় ও ইসলামের ভিত্তি, অধিকাংশ মুসলিম অথবা তাঁদের শক্তিধর অংশের নিশ্চিহ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকলে প্রতিরোধ করা আবশ্যক হবে এবং ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত ব্যক্তির সুরক্ষা বিবেচনার বাধ্যবাধকতা বাদ যাবে। কাফিরদের মাথা এক দেশ থেকে আরেক দেশে অথবা শাসকদের কাছে বহন করে নেওয়া বৈধ নয়। সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু এটি অপছন্দ করে বলেছেন, এটি অনারবদের কাজ।
‘আল-বায়ান’-এর লেখক বলেছেন, দুর্গে মঞ্জনিক দিয়ে নিক্ষেপ করা হবে, যদিও সেখানে নারী ও শিশু থাকে। তিনি তায়েফবাসীর ওপর মঞ্জনিক দিয়ে নিক্ষেপ করেছিলেন। তাঁকে বলা হয়েছিল, হে আল্লাহর রাসুল, সেখানে নারী ও শিশুরা আছে। তিনি আলাইহিস সালাম বললেন, ‘তারা তাদের পিতাদের অন্তর্ভুক্ত।’ দুর্গে শুধু যোদ্ধা থাকলে ‘আল-কিতাব’-এ [পৃষ্ঠা ৪০৯] আগুন নিক্ষেপের অনুমতি আছে; তাঁর থেকে নিষেধের বর্ণনাও রয়েছে। তাদের সঙ্গে নারী ও শিশু থাকলে চারটি মত আছে: মঞ্জনিক বৈধ, কিন্তু প্লাবিত করা ও পোড়ানো বৈধ নয়—এটি ‘আল-কিতাব’-এর মত; আসবাগের মতে এগুলোর সবই বৈধ; সবই নিষিদ্ধ—এমন মত ইবনে কাসিম থেকে বর্ণিত; ইবনে হাবিবের মতে প্লাবিত করা ও মঞ্জনিক বৈধ, কিন্তু পোড়ানো বৈধ নয়।
তাদের সঙ্গে মুসলিম বন্দি থাকলে পোড়ানো ও প্লাবিত করা নিষিদ্ধ হবে। ইবনে কাসিম বলেছেন, মঞ্জনিক ব্যবহার ও তাদের পানি বন্ধ করা বৈধ। মালিক এবং তাঁর মিসরীয় ও মদিনাবাসী অনুসারীদের থেকে তা নিষিদ্ধ হওয়ার বর্ণনা রয়েছে। জাহাজের ক্ষেত্রে সেখানে মুসলিম বন্দি না থাকলে পোড়ানো বৈধ। দুর্গের সঙ্গে এর পার্থক্য হলো, মুসলিমরা তাদের না পোড়ালে তারাই মুসলিমদের সঙ্গে তা করবে; দুর্গের ক্ষেত্রে তাদের পক্ষে তা করা সম্ভব নয়। সেখানে মুসলিম বন্দি থাকলে ইবনে কাসিম নিষেধ করেছেন এবং আশহাব অনুমতি দিয়েছেন। সেখানে নারী ও শিশু থাকলে একমত অনুসারে তা বৈধ। এসব বিধানের ভিত্তি আল্লাহর বাণী: ‘তারা নিজেদের হাতে ও মুমিনদের হাতে নিজেদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে’ [হাশর: ২], এবং তাঁর বাণী: ‘তোমরা যে খেজুরগাছ কেটেছ অথবা শিকড়ের ওপর দাঁড়ানো অবস্থায় রেখেছ, তা আল্লাহর অনুমতিতেই এবং অবাধ্যদের লাঞ্ছিত করার জন্য’ [হাশর: ৫]। তিনি আলাইহিস সালাম বলেছেন, ‘আগুনের প্রভু ছাড়া কেউ আগুন দিয়ে শাস্তি দেয় না।’

কারাফির বর্ণনায় মতমঞ্জনিকপানি দিয়ে প্লাবনঅগ্নিসংযোগ
আল-কিতাবের মতঅনুমোদিতনিষিদ্ধনিষিদ্ধ
আসবাগের মতঅনুমোদিতঅনুমোদিতঅনুমোদিত
ইবনে কাসিম থেকে বর্ণিত মতনিষিদ্ধনিষিদ্ধনিষিদ্ধ
ইবনে হাবিবের মতঅনুমোদিতঅনুমোদিতনিষিদ্ধ

সারণির চার মতই নারী–শিশু থাকা দুর্গের প্রসঙ্গে। আসবাগের নামে সংরক্ষিত মত আগুন, পানি ও মঞ্জনিক—তিনটিকেই অনুমোদন করে। ‘আল-কিতাব’-এর মতে আগুন ও প্লাবন বন্ধ হলেও মঞ্জনিক বন্ধ হচ্ছে না; ইবনে হাবিবের মতে আবার পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া অনুমোদিত, আগুন নিষিদ্ধ। অর্থাৎ নারী–শিশুর উপস্থিতি একই থাকা সত্ত্বেও আক্রমণের মাধ্যম অনুযায়ী তাঁদের সুরক্ষা বদলে যাচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি নিষিদ্ধ করলেই দুর্গের ভেতরের মানুষের জীবন রক্ষিত হয় না; অনুমোদিত অন্য মাধ্যমের আঘাতও তাঁদের কাছে পৌঁছায়।

মঞ্জনিক দূর থেকে ভারী বস্তু নিক্ষেপ করে দুর্গে আঘাত করার উপায়। দুর্গে নারী–শিশু থাকার কথা স্বীকার করেই এই পদ্ধতির অনুমতি দেওয়া হলে তাঁদের আশ্রয়স্থল সামরিক আঘাতের পরিসরের মধ্যে রাখা হয়। আগুন ও প্লাবনের ক্ষেত্রেও বিপদের বিস্তার একজন নির্দিষ্ট যোদ্ধার শরীরে সীমাবদ্ধ থাকে না। ঘরবাড়ি, আশ্রয় ও চলাচলের পথ আক্রান্ত হলে সেখানে থাকা দুর্বল মানুষ পালানো এবং নিজেকে রক্ষা করার সুযোগ হারায়। অনুমোদিত মাধ্যম বেছে নেওয়ার ক্ষমতা আক্রমণকারীর হাতে, কিন্তু তার বিস্তৃত আঘাত থেকে বেঁচে থাকার দায় পড়ে অবরুদ্ধ মানুষের ওপর।

এখানে মতভেদের নৈতিক তাৎপর্য হলো, যোদ্ধাদের সঙ্গে নারী–শিশু উপস্থিত থাকার তথ্য প্রত্যেক অবস্থানেই জানা। নিষেধের মত সেই উপস্থিতিকে আক্রমণের সীমা করেছে; অনুমতির মত সামরিক উপায় চালু রাখার মধ্যে তাঁদের ঝুঁকি গ্রহণ করেছে। ফলে বিরোধটি কেবল অস্ত্রের নাম নিয়ে নয়—একটি দুর্গ দখলের জন্য সেখানে থাকা অযোদ্ধাদের কতটা বিপন্ন করা যাবে, তা নিয়েও। নারী–শিশুর নিরাপত্তার প্রচারে এই অনুমোদনের অংশ চাপা দিলে আক্রান্ত মানুষের বাস্তব বিপদ আড়াল হয়।

একই উদ্ধৃতিতে নারী–শিশুকে ঢাল বানানো এবং মুসলিমকে ঢাল বানানোর ক্ষেত্রে সুরক্ষা তুলে দেওয়ার শর্তও আলাদা। প্রথম ক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীর বিপদের আশঙ্কায় ব্যতিক্রম এসেছে; মুসলিম ঢালের ক্ষেত্রে সাধারণ আত্মরক্ষার আশঙ্কাকেও যথেষ্ট বলা হয়নি, পরে বৃহত্তর সামরিক বিপর্যয়ের ব্যতিক্রম উল্লেখ করা হয়েছে। সুরক্ষার স্তর নির্ধারণে তাই আক্রান্ত ব্যক্তির ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অবস্থান কার্যকর। একই অস্ত্রের সামনে থাকা দুই মানুষের জীবন আক্রমণকারীর সঙ্গে সম্পর্ক অনুযায়ী ভিন্ন সীমায় রক্ষা পাচ্ছে। এই পার্থক্য সমান মানবমর্যাদার বদলে গোষ্ঠীর সদস্যত্বকে প্রাণের সুরক্ষায় বিশেষ মূল্য দেয়।


নববী: অবরোধ, পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া ও অসতর্ক অবস্থায় হামলা

নববীর রওদাতুত তালিবিনে নারী–শিশু থাকা সত্ত্বেও জনপদ ও দুর্গ অবরোধ, প্রবেশ–বের হওয়া বন্ধ করা, আগুন ও নাফথা নিক্ষেপ, প্লাবিত করা এবং অসতর্ক অবস্থায় রাতের হামলার অনুমোদন রয়েছে। তিনি নারী–শিশুকে ঢাল বানালে সামরিক প্রয়োজন থাকা ও না-থাকার অবস্থাও আলোচনা করেছেন। প্রয়োজন না থাকলে আক্রমণ নিষিদ্ধ বলার মত উল্লেখ করে শেষে উভয় আলোচিত অবস্থায় অনুমোদনকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন: [29]

التاسعة : يجوز للإمام محاصرة الكفار في بلادهم ، والحصون والقلاع ، وتشديد الأمر عليهم بالمنع من الدخول والخروج ، وإن كان فيهم النساء والصبيان ، واحتمل أن يصيبهم ، ويجوز التحريق بإضرام النار ورمي النفط إليهم ، والتغريق بإرسال الماء ، ويبيتهم وهم غافلون ، ولو تترسوا بالنساء والصبيان ، نظر إن دعت ضرورة إلى الرمي والضرب ، بأن كان ذلك في حال التحام القتال ولو تركوا لغلبوا المسلمين ، جاز الرمي والضرب ، وإن لم تكن ضرورة ، بأن كانوا يدفعون بهم عن أنفسهم واحتمل الحال تركهم ، فطريقان . [ ص: 245 ] أصحهما : على قولين ، أحدهما : يجوز رميهم ، كما يجوز نصب المنجنيق على القلعة وإن كان يصيبهم ، ولئلا يتخذوا ذلك ذريعة إلى تعطيل الجهاد . والثاني : المنع ، وهذا أصح عند القفال . ومال إلى ترجيح الأول مائلون .
والطريق الثاني : القطع بالجواز ورد المنع إلى الكراهة ، وقيل : في الكراهة على هذا قولان ، ولو تترسوا بهم في القلعة ، فقيل : هذه الصورة أولى بالجواز ، لئلا يتخذ ذلك حيلة إلى استبقاء القلاع لهم ، وفي ذلك فساد عظيم ، وقيل : قولان ، وإن عجزنا عن القلعة إلا به .
قلت : الراجح في الصورتين ، الجواز . والله أعلم .
ولو كان في البلدة أو القلعة مسلم ، أو أسير ، أو تاجر ، أو مستأمن ، أو طائفة من هؤلاء ، فهل يجوز قصد أهلها بالنار والمنجنيق وما في معناهما ؟ فيه طرق ، المذهب : أنه إن لم يكن ضرورة ، كره ولا يحرم على الأظهر لئلا يعطلوا الجهاد بحبس مسلم فيهم ، وإن كانت ضرورة ، كخوف ضررهم ، أو لم يحصل فتح القلعة إلا به ، جاز قطعا ، والطريق الثاني : لا اعتبار بالضرورة ، بل إن كان ما يرمى به يهلك المسلم ، لم يجز ، وإلا فقولان ، والثالث وبه أجاب صاحب ” الشامل ” : إن كان عدد المسلمين الذين فيهم مثل المشركين ، لم يجز رميهم ، وإن كان أقل ، جاز ؛ لأن الغالب أنه لا يصيب المسلمين ، والمذهب : الجواز ، وإن علم أنه يصيب مسلما وهو نصه في ” المختصر ” لأن حرمة من معنا أعظم حرمة ممن في أيديهم ، فإن هلك منهم هالك ، فقد رزق الشهادة ، قاله أبو إسحاق ، ولو رمى بشيء منها إلى القلعة ، أو [ ص: 246 ] البلدة ، فقتل مسلما ، فإن لم يعلم أن فيها مسلما ، لم يجب إلا الكفارة ، وإن علم ، وجبت الدية والكفارة ، حكاه الروياني .

বাংলা অনুবাদ: নবম: শাসকের জন্য কাফিরদের দেশ, দুর্গ ও কেল্লা অবরোধ করা এবং প্রবেশ ও বের হওয়া বন্ধ করে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা বৈধ, যদিও সেখানে নারী ও শিশুরা থাকে এবং তাদের আঘাত লাগার আশঙ্কা থাকে। আগুন জ্বালিয়ে ও নাফথা নিক্ষেপ করে পোড়ানো, পানি প্রবাহিত করে ডুবিয়ে দেওয়া এবং তারা অসতর্ক থাকা অবস্থায় রাতে হামলা করা বৈধ। তারা নারী ও শিশুদের ঢাল বানালে দেখতে হবে: নিক্ষেপ ও আঘাতের প্রয়োজন দেখা দিলে—যেমন ঘনিষ্ঠ যুদ্ধ চলছে এবং তাদের ছেড়ে দিলে তারা মুসলিমদের পরাজিত করবে—নিক্ষেপ ও আঘাত বৈধ। প্রয়োজন না থাকলে—যেমন নিজেদের রক্ষায় তাদের সামনে দাঁড় করিয়েছে এবং তাদের ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে—দুটি ধারা আছে। [পৃষ্ঠা ২৪৫] অধিকতর বিশুদ্ধ ধারা অনুসারে দুটি মত: প্রথমত, তাদের ওপর নিক্ষেপ বৈধ; যেমন কেল্লার ওপর মঞ্জনিক স্থাপন বৈধ, যদিও তা তাদের আঘাত করে; আর যাতে তারা একে জিহাদ বন্ধ করার উপায় না বানায়। দ্বিতীয়ত, নিষিদ্ধ; কাফফালের কাছে এটিই অধিকতর বিশুদ্ধ। কেউ কেউ প্রথম মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
দ্বিতীয় ধারা: নিঃসন্দেহে অনুমোদন দেওয়া এবং নিষেধকে অপছন্দনীয় অর্থে গ্রহণ করা। বলা হয়েছে, এই ধারা অনুসারে অপছন্দনীয় হওয়ার বিষয়েও দুটি মত আছে। তারা কেল্লায় তাদের ঢাল বানালে বলা হয়েছে, এই অবস্থায় অনুমোদন আরও যুক্তিসংগত, যাতে তারা নিজেদের দখলে কেল্লা রাখার কৌশল হিসেবে এটি ব্যবহার না করে; তাতে বিরাট ক্ষতি রয়েছে। আবার বলা হয়েছে, দুটি মত আছে, এমনকি এই উপায় ছাড়া কেল্লা দখল করা সম্ভব না হলেও।
আমি বলি, উভয় অবস্থায় অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মত হলো অনুমোদন। আল্লাহ ভালো জানেন।
জনপদ বা কেল্লায় কোনো মুসলিম, বন্দি, ব্যবসায়ী, নিরাপত্তাপ্রাপ্ত ব্যক্তি অথবা তাঁদের একটি দল থাকলে আগুন, মঞ্জনিক ও অনুরূপ উপায়ে সেখানকার অধিবাসীদের আক্রমণের লক্ষ্য করা বৈধ কি না—এতে কয়েকটি ধারা আছে। মাযহাবের গৃহীত অবস্থান হলো, প্রয়োজন না থাকলে তা অপছন্দনীয়, কিন্তু অধিকতর প্রকাশ্য মত অনুসারে হারাম নয়; যাতে তারা নিজেদের মধ্যে একজন মুসলিমকে আটকে রেখে জিহাদ বন্ধ না করে। প্রয়োজন থাকলে—যেমন তাদের ক্ষতির আশঙ্কা অথবা এ ছাড়া কেল্লা জয় সম্ভব নয়—তা নিঃসন্দেহে বৈধ। দ্বিতীয় ধারা: প্রয়োজন বিবেচ্য নয়; বরং নিক্ষিপ্ত বস্তু মুসলিমকে মেরে ফেললে বৈধ নয়; তা না হলে দুটি মত। তৃতীয় ধারা, যা ‘আশ-শামিল’-এর লেখক বলেছেন: সেখানে মুসলিমদের সংখ্যা মুশরিকদের সমান হলে নিক্ষেপ বৈধ নয়; কম হলে বৈধ, কারণ সাধারণ সম্ভাবনা হলো মুসলিমদের আঘাত লাগবে না। মাযহাবের গৃহীত মত হলো অনুমোদন, যদিও জানা থাকে যে তা কোনো মুসলিমকে আঘাত করবে। ‘আল-মুখতাসার’-এ তাঁর স্পষ্ট বক্তব্যও এটি; কারণ আমাদের সঙ্গে থাকা ব্যক্তির সুরক্ষা তাদের হাতে থাকা ব্যক্তির সুরক্ষার চেয়ে অধিক। তাঁদের কেউ মারা গেলে তিনি শাহাদাত লাভ করেছেন—আবু ইসহাক এ কথা বলেছেন। এসবের কোনো বস্তু কেল্লা অথবা [পৃষ্ঠা ২৪৬] জনপদের দিকে নিক্ষেপ করে কোনো মুসলিমকে হত্যা করলে, সেখানে মুসলিম আছে জানা না থাকলে শুধু কাফফারা আবশ্যক হবে। জানা থাকলে দিয়াত ও কাফফারা আবশ্যক হবে। রুয়ানি এটি বর্ণনা করেছেন।

অবরোধে প্রবেশ ও বের হওয়া বন্ধ করার চাপ পুরো জনপদের ওপর কার্যকর হয়। ভেতরে যোদ্ধাদের পাশাপাশি নারী ও শিশু থাকলে তাঁরাও সেই বন্ধ পথ ও আশ্রয়ের অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে থাকেন। খাদ্য, পানি ও নিরাপদ চলাচলের প্রয়োজন যুদ্ধে অংশ না নেওয়া মানুষেরও আছে। নববীর অনুমোদনে তাঁদের আঘাত লাগার আশঙ্কা জানা থাকা সত্ত্বেও অবরোধ কঠোর করা যাচ্ছে। এতে জনপদে বসবাস নিজেই সামরিক চাপের বাহক হয়ে ওঠে; যোদ্ধাদের প্রতিরোধ ভাঙতে গিয়ে অন্য বাসিন্দাদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার অবস্থাও বিপন্ন করা অনুমোদিত হয়।

নারী–শিশুকে ঢাল বানানোর ক্ষেত্রে নববী সামরিক প্রয়োজন থাকা এবং না-থাকার পরিস্থিতি পৃথক করেছেন। প্রয়োজন না-থাকলে নিষেধের মত উল্লেখ করেও আলোচিত অবস্থাগুলোতে অনুমোদনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এর পক্ষে কেল্লা ধরে রাখা অথবা জিহাদ বন্ধ করার কৌশল ঠেকানোর যুক্তি এসেছে। ফলে অনুমতির সীমা তাৎক্ষণিক পরাজয় ঠেকানোর প্রয়োজনের বাইরেও বিস্তৃত হয়। ভবিষ্যতে অভিযান চালু রাখার সুবিধা রক্ষার জন্য বর্তমানে সামনে থাকা নারী–শিশুর বিপদ গ্রহণ করা হচ্ছে। সামরিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতাকে অযোদ্ধার সুরক্ষার ওপর বসানোর নৈতিক সমস্যাটি এখানেই।

দুর্গের ভেতরে মুসলিম থাকার ক্ষেত্রেও নববীর গৃহীত অবস্থানে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আঘাত লাগবে জেনেও নিক্ষেপ অনুমোদিত হয়েছে। একই আলোচনায় ‘আমাদের সঙ্গে থাকা’ মানুষের সুরক্ষাকে ‘তাদের হাতে থাকা’ মানুষের চেয়ে অধিক বলা হয়েছে। ফলে একই ধর্মের সদস্য হলেও অবস্থানভেদে মানুষের নিরাপত্তার মূল্য বদলাচ্ছে। শত্রুর হাতে বন্দি থাকা ব্যক্তির নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে কম; সেই অসহায় অবস্থাই তাকে এমন একটি হিসাবের মধ্যে ফেলছে, যেখানে বাইরে থাকা বাহিনীর স্বার্থ অধিক ওজন পাচ্ছে।

আবু ইসহাকের উদ্ধৃত ব্যাখ্যায় নিহত ব্যক্তি শাহাদাত লাভ করেছেন। এটি তার মৃত্যুর ধর্মীয় মর্যাদার বিবরণ; ব্যক্তিটি আঘাত গ্রহণে সম্মতি দিয়েছিলেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এতে পাওয়া যায় না। তাঁর জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত অন্যেরা নিয়েছে। পরে দিয়াত ও কাফফারার দায় নির্ধারণের বিধানও এসেছে, যা মৃত্যুর পরের দায় বণ্টন করে। আক্রমণের অনুমতি, মৃত্যুর ধর্মীয় নাম এবং পরবর্তী ক্ষতিপূরণ একত্রে একটি পূর্ণ ফিকহি ব্যবস্থা তৈরি করেছে; সেই ব্যবস্থার মধ্যে বন্দি মানুষের নিজের জীবনের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সামরিক উদ্দেশ্যের অধীন রয়ে গেছে।


মানবঢাল: ব্যক্তির জীবন বনাম সামরিক সমষ্টির স্বার্থ

রওদাতুত তালিবিনের পরবর্তী উপপরিচ্ছেদে মুসলিম বন্দিকে মানবঢাল বানানোর পৃথক আলোচনা আছে। প্রয়োজন না থাকলে নিক্ষেপ নিষিদ্ধ; ঘনিষ্ঠ যুদ্ধের প্রয়োজন দেখা দিলে মতভেদ রয়েছে। অনুমোদনের পক্ষে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত যুক্তি হলো, আক্রমণ থেকে বিরত থাকার ক্ষতি আক্রমণ করার ক্ষতির চেয়ে বেশি এবং ইসলামের সামষ্টিক সুরক্ষার জন্য একটি দলের ক্ষতি মেনে নেওয়া যায়। আলোচনার শেষে যিম্মি, নিরাপত্তাপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও দাসকে ঢাল বানানোর বিধানও এসেছে: [30]

فرع

لو تترس الكفار بمسلمين من الأسارى وغيرهم ، نظر إن لم تدع ضرورة إلى رميهم واحتمل الحال الإعراض عنهم ، لم يجز رميهم ، فإن رمى رام ، فقتل مسلما قال البغوي : هو كما لو قتل مسلما في دار الحرب ، إن علمه مسلما لزمه القصاص ، وإن ظنه كافرا فلا قصاص وتجب الكفارة ، وفي الدية قولان ، وإن دعت ضرورة إلى رميهم ، بأن تترسوا بهم في حال التحام القتال وكانوا بحيث لو كففنا عنهم ظفروا بنا ، وكثرت نكايتهم فوجهان ، أحدهما : لا يجوز الرمي إذا لم يمكن ضرب الكفار إلا بضرب مسلم ؛ لأن غايته أن نخاف على أنفسنا ، ودم المسلم لا يباح بالخوف بدليل صورة الإكراه ، والثاني وهو الصحيح المنصوص ، وبه قطع العراقيون : جواز الرمي على قصد قتال المشركين ، ويتوقى المسلمين بحسب الإمكان ؛ لأن مفسدة الإعراض أكثر من مفسدة الإقدام ، ولا يبعد احتمال طائفة للدفع عن بيضة الإسلام ومراعاة للأمور الكليات ، فإن جوزنا الرمي ، فرمى وقتل مسلما ، فلا قصاص ، فتجب الكفارة ، وفي الدية طرق ، أصحها وظاهر النص ، وبه قال المزني وابن سلمة : إن علم أن المرمي مسلم ، وجبت ، وإلا فلا . والثاني قاله أبو إسحاق : إن قصده بعينه ، وجبت ، سواء علمه مسلما أم لا ، وإلا فلا ، والثالث : قولان مطلقا ، والرابع قاله ابن الوكيل : إن علم أن هناك مسلما ، وجبت ، وإلا فقولان ، وإن لم نجوز الرمي ، فرمى وقتل ، ففي وجوب القصاص طريقان ، أحدهما قولان ، كالمكره ، والثاني : يجب قطعا ، كالمضطر إذا قتل رجلا ليأكله ، بخلاف المكره ، فإنه ملجأ ، ولأن هناك من يحال عليه وهو المكره .

[ ص: 247 ] ولو تترس الكفار بذمي أو مستأمن أو عبد ، فالحكم في جواز الرمي والدية والكفارة كما ذكرنا ، لكن حيث تجب دية ، يجب في العبد قيمته ، وفي ” التهذيب ” أنه لو تترس كافر بترس مسلم ، أو ركب فرسه ، فرماه مسلم فأتلفه ، فإن كان في غير التحام ، أو في التحام وأمكنه أن يتوقى الترس والفرس ، ضمن ، وإن لم يمكنه في الالتحام الدفع إلا بإصابته ، فإن جعلناه كالمكره ، لم يضمن ؛ لأن المكره في المال يكون طريقا في الضمان ، وهنا لا ضمان على الحربي حتى يجعل المسلم طريقا ، وإن جعلناه مختارا ، لزمه الضمان .

বাংলা অনুবাদ: উপপরিচ্ছেদ।
কাফিররা বন্দি অথবা অন্য মুসলিমদের ঢাল বানালে দেখতে হবে: তাদের দিকে নিক্ষেপের প্রয়োজন না থাকলে এবং তাদের ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ থাকলে নিক্ষেপ বৈধ নয়। কেউ নিক্ষেপ করে কোনো মুসলিমকে হত্যা করলে বাগাবি বলেছেন, এটি যুদ্ধভূমিতে মুসলিম হত্যার মতো: তিনি মুসলিম জানা থাকলে কিসাস আবশ্যক হবে; তাঁকে কাফির মনে করলে কিসাস হবে না, কাফফারা আবশ্যক হবে এবং দিয়াতের বিষয়ে দুটি মত আছে। তাদের দিকে নিক্ষেপের প্রয়োজন দেখা দিলে—যেমন ঘনিষ্ঠ যুদ্ধের সময় তাদের ঢাল বানিয়েছে এবং আমরা আক্রমণ বন্ধ করলে তারা আমাদের পরাজিত করবে ও ব্যাপক ক্ষতি করবে—দুটি মত রয়েছে। প্রথমত, কোনো মুসলিমকে আঘাত না করে কাফিরদের আঘাত করা সম্ভব না হলে নিক্ষেপ বৈধ নয়; কারণ সর্বোচ্চ অবস্থা হলো আমাদের নিজেদের জন্য ভয় হয়, আর ভয় মুসলিমের রক্ত বৈধ করে না, যেমন বলপ্রয়োগে বাধ্য হওয়ার উদাহরণে আছে। দ্বিতীয়ত, যা সঠিক ও স্পষ্টভাবে বর্ণিত মত এবং ইরাকের আলেমরা নিশ্চিতভাবে গ্রহণ করেছেন: মুশরিকদের সঙ্গে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ বৈধ এবং সাধ্য অনুযায়ী মুসলিমদের এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ বিরত থাকার ক্ষতি এগিয়ে যাওয়ার ক্ষতির চেয়ে বেশি। ইসলামের মূল সমষ্টিকে রক্ষা ও সামগ্রিক স্বার্থ বিবেচনায় একটি দল ক্ষতি বহন করবে—এটি অসম্ভব নয়।
আমরা নিক্ষেপ বৈধ বললে কেউ নিক্ষেপ করে মুসলিমকে হত্যা করলে কিসাস হবে না; কাফফারা আবশ্যক হবে এবং দিয়াতের বিষয়ে কয়েকটি ধারা আছে। অধিকতর বিশুদ্ধ ও স্পষ্ট বক্তব্যের সঙ্গে সংগত মত, যা মুযানি ও ইবনে সালামা বলেছেন: যাকে নিক্ষেপ করা হয়েছে তিনি মুসলিম জানা থাকলে দিয়াত আবশ্যক হবে, না হলে নয়। দ্বিতীয়টি আবু ইসহাক বলেছেন: নির্দিষ্টভাবে তাঁকেই লক্ষ্য করলে দিয়াত আবশ্যক হবে, তিনি মুসলিম জানা থাকুক বা না থাকুক; নির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য না করলে নয়। তৃতীয়ত, সব অবস্থাতেই দুটি মত। চতুর্থটি ইবনে ওয়াকিল বলেছেন: সেখানে মুসলিম থাকার কথা জানা থাকলে দিয়াত আবশ্যক হবে; জানা না থাকলে দুটি মত। আমরা নিক্ষেপ বৈধ না বলার পরও কেউ নিক্ষেপ করে হত্যা করলে কিসাস আবশ্যক হওয়ার বিষয়ে দুটি ধারা আছে। প্রথমত, বলপ্রয়োগে বাধ্য ব্যক্তির মতো দুটি মত। দ্বিতীয়ত, নিঃসন্দেহে কিসাস আবশ্যক, যেমন অনাহারে বাধ্য ব্যক্তি অন্য মানুষকে খাওয়ার জন্য হত্যা করলে; বলপ্রয়োগে বাধ্য ব্যক্তির বিষয়টি আলাদা, কারণ তাকে বাধ্য করা হয় এবং সেখানে কাজটির দায় আরোপের জন্য বলপ্রয়োগকারী আরেকজন থাকে।
[পৃষ্ঠা ২৪৭] কাফিররা কোনো যিম্মি, নিরাপত্তাপ্রাপ্ত ব্যক্তি অথবা দাসকে ঢাল বানালে নিক্ষেপের অনুমতি, দিয়াত ও কাফফারার বিধান আগের মতোই; তবে যেখানে দিয়াত আবশ্যক, দাসের ক্ষেত্রে সেখানে তার মূল্য আবশ্যক হবে। ‘আত-তাহযিব’-এ আছে: কোনো কাফির মুসলিমের ঢাল দিয়ে নিজেকে রক্ষা করলে অথবা তাঁর ঘোড়ায় চড়লে এবং মুসলিম নিক্ষেপ করে সেটি ধ্বংস করলে—ঘনিষ্ঠ যুদ্ধের বাইরে হলে, অথবা ঘনিষ্ঠ যুদ্ধে ঢাল ও ঘোড়াকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলে—ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ঘনিষ্ঠ যুদ্ধে তাকে প্রতিহত করতে সেটি আঘাত করা ছাড়া উপায় না থাকলে, আমরা তাকে বলপ্রয়োগে বাধ্য ব্যক্তির মতো গণ্য করলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। কারণ সম্পদের ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগে বাধ্য ব্যক্তি ক্ষতিপূরণের দায় কার্যকর হওয়ার মাধ্যম হয়; এখানে যুদ্ধরত অমুসলিমের ওপর ক্ষতিপূরণ নেই যে মুসলিমকে সেই দায় কার্যকর হওয়ার মাধ্যম গণ্য করা হবে। আর আমরা তাকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী গণ্য করলে ক্ষতিপূরণ আবশ্যক হবে।

মানবঢাল হিসেবে কাউকে ব্যবহার করা তাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিপদের সামনে দাঁড় করানো। বিপরীত দিকের বাহিনী তার উপস্থিতি জানার পরে আঘাত করবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত দ্বিতীয়বার তার জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। শত্রুপক্ষের প্রথম নিপীড়ন আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্য পক্ষের স্বার্থে উৎসর্গ করার নৈতিক অধিকার দেয় না। নববীর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অনুমতিতে মূল লক্ষ্য মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং সাধ্য অনুযায়ী মুসলিমদের এড়িয়ে চলার শর্ত রয়েছে। তবু যাকে এড়িয়ে চলা সম্ভব হবে না, তার জীবন সামষ্টিক সামরিক প্রয়োজনের হিসাবে গ্রহণযোগ্য ক্ষতি হয়ে উঠতে পারে।

‘ইসলামের মূল সমষ্টি’ রক্ষার জন্য একটি দলের ক্ষতি বহনের যুক্তিতে কারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং কারা মূল্য দিচ্ছে—এই অসমতা গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক সিদ্ধান্ত নেয় বাহিনী ও নেতৃত্ব; ঢাল হিসেবে আটকে থাকা মানুষের সিদ্ধান্ত জানানোর বা সরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাকে আত্মত্যাগকারী ধরে নেওয়া হলে জোর করে বিপদে ফেলা এবং স্বেচ্ছায় ঝুঁকি গ্রহণের পার্থক্য চাপা পড়ে। একটি বৃহত্তর উদ্দেশ্য পবিত্র ঘোষিত হলেই অসহায় ব্যক্তির জীবন সেই উদ্দেশ্যের অধীন সম্পদে পরিণত হয় না।

আলোচনার শেষে যিম্মি, নিরাপত্তাপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও দাসের ক্ষেত্রে দায়ের বিধান এবং দাসের পরিবর্তে তার মূল্য দেওয়ার কথা আছে। একই আঘাতে নিহত মানুষের ক্ষতিপূরণও তার আইনগত অবস্থান অনুসারে আলাদা ভাষা পায়। বিশেষত দাসের মৃত্যুর হিসাব মালিকানার মূল্যে নির্ধারিত হওয়া মানুষকে সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করার কাঠামো প্রকাশ করে। ফলে মানবঢালের প্রশ্নে সামরিক প্রয়োজনের পাশাপাশি ধর্মীয় পরিচয়, নিরাপত্তার স্বীকৃতি ও সম্পত্তির সম্পর্কও আক্রান্ত মানুষের অবস্থান নির্ধারণ করছে।


ইবনে কুদামা: যুদ্ধ ঘনিষ্ঠ হোক বা না হোক, নিক্ষেপের অনুমতি

হাম্বলি ফকিহ ইবনে কুদামা নারী–শিশুকে ঢাল বানালে যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে নিক্ষেপের অনুমতি দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, বিরত থাকলে শত্রুপক্ষ একই পদ্ধতিতে জিহাদ বন্ধ করে দিতে পারবে। তিনি স্পষ্ট করেছেন, যুদ্ধ ঘনিষ্ঠ অবস্থায় চলছে কি না—উভয় ক্ষেত্রেই অনুমতি প্রযোজ্য: [31]

( 7757 ) ( 7577 ) فصل : وإن تترسوا في الحرب بنسائهم وصبيانهم ، جاز رميهم ، ويقصد المقاتلة ; { لأن النبي صلى الله عليه وسلم رماهم بالمنجنيق ومعهم النساء والصبيان } ، ولأن كف المسلمين عنهم يفضي إلى تعطيل الجهاد ، لأنهم متى علموا ذلك تترسوا بهم عند خوفهم فينقطع الجهاد . وسواء كانت الحرب ملتحمة أو غير ملتحمة ; لأن النبي صلى الله عليه وسلم لم يكن يتحين بالرمي حال التحام الحرب .

বাংলা অনুবাদ: (৭৭৫৭) (৭৫৭৭) উপপরিচ্ছেদ: তারা যুদ্ধে নিজেদের নারী ও শিশুদের ঢাল বানালে তাদের দিকে নিক্ষেপ বৈধ এবং যোদ্ধাদের লক্ষ্য করতে হবে। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ওপর মঞ্জনিক দিয়ে নিক্ষেপ করেছিলেন, অথচ তাদের সঙ্গে নারী ও শিশুরা ছিল। আর মুসলিমরা তাদের আক্রমণ থেকে বিরত থাকলে তা জিহাদ বন্ধ করে দেওয়ার দিকে নিয়ে যায়; কারণ তারা এটি জানলে বিপদের সময় তাদের ঢাল বানাবে এবং জিহাদ থেমে যাবে। যুদ্ধ ঘনিষ্ঠ অবস্থায় থাকুক অথবা না থাকুক, বিধান একই; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিক্ষেপের জন্য ঘনিষ্ঠ যুদ্ধের মুহূর্তের অপেক্ষা করতেন না।

ইবনে কুদামা স্পষ্ট করেছেন, যুদ্ধ ঘনিষ্ঠ অবস্থায় চলুক বা না চলুক, নিক্ষেপের অনুমতি একই। তাই তাঁর যুক্তিকে শুধু মুখোমুখি লড়াইয়ের তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষায় সীমাবদ্ধ করা যায় না। মূল আশঙ্কা হলো, নারী–শিশুকে সামনে রাখলে মুসলিম বাহিনী থেমে যায়—এটি জানা হলে প্রতিপক্ষ সেই পদ্ধতি ব্যবহার করে জিহাদ বন্ধ করতে পারবে। অর্থাৎ একটি সামরিক উদ্যোগ ভবিষ্যতে বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বর্তমানে উপস্থিত নারী–শিশুর বিপদ গ্রহণের কারণ হচ্ছে। এখানে তাঁদের নিরাপত্তাকে অভিযান চালু রাখার সক্ষমতার নিচে স্থান দেওয়া হয়েছে।

যোদ্ধাদের লক্ষ্য করার নির্দেশ আঘাতের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে। কিন্তু যাদের সামনে বা আড়ালে যোদ্ধারা আছে, সেই নারী–শিশুকে অস্ত্রের আঘাত থেকে পৃথক করে দেয় না। তাঁদের উপস্থিতির কারণে হামলা বন্ধ না করার অনুমতির মধ্যেই ঝুঁকি গ্রহণের সিদ্ধান্ত আছে। আক্রমণকারীর লক্ষ্য অন্য ব্যক্তি হওয়া তাই আক্রান্ত শিশুর শরীরে আঘাত লাগার কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন শেষ করে না; অস্ত্র নিক্ষেপের সিদ্ধান্ত ও জানা বিপদ একই কাজের অংশ।

এই যুক্তিতে সুরক্ষার একটি নিয়ম মেনে চললে প্রতিপক্ষ সুবিধা পেতে পারে—এই আশঙ্কায় নিয়মটির কার্যকর সীমা ছোট করা হচ্ছে। ফলে নিরীহ মানুষের উপস্থিতি সামরিক কর্মকাণ্ডে বাধা হয়ে দাঁড়ালেই সেই বাধা কাটানোর অনুমতি তৈরি হয়। যে সুরক্ষা সামরিক সুবিধার সঙ্গে বিরোধে কার্যকর থাকে, সেটিই আক্রান্ত মানুষের জন্য বাস্তব সীমা প্রতিষ্ঠা করে। অভিযানের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে নারী–শিশুর ঝুঁকি গ্রহণের অনুমোদন সেই সীমা আক্রমণকারীর প্রয়োজন অনুযায়ী সরিয়ে দেয়।


তায়েফের অবরোধ: মঞ্জনিক, সুরক্ষিত আক্রমণযান ও বাগান ধ্বংস

ইবনে কাসির তায়েফ অবরোধের বিবরণে ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম ও ওয়াকিদির সূত্রে মঞ্জনিকের ব্যবহার, দুর্গের দেয়াল ভাঙার চেষ্টা এবং আঙুরবাগান কাটার নির্দেশ সংরক্ষণ করেছেন। সেখানে ব্যবহৃত ‘দাব্বাবা’ ছিল আক্রমণকারীদের আড়াল করে দেয়ালের কাছে পৌঁছানোর সুরক্ষিত অবরোধযান। একই ধারাবাহিক বিবরণে দুর্গ জয়ের পর বন্দিত্বের আশঙ্কায় কয়েকজন নারীকে বাইরে চলে আসার আহ্বান এবং একটি নির্দিষ্ট বাগান রক্ষার আবেদনও আছে: [32]

قال محمد بن إسحاق : وكان مع رسول الله صلى الله عليه وسلم امرأتان من نسائه ، إحداهما أم سلمة ، فضرب لهما قبتين ، فكان يصلي بينهما ، فحاصرهم وقاتلهم قتالا شديدا ، وتراموا بالنبل .
قال ابن هشام : ورماهم بالمنجنيق ، فحدثني من أثق به أن النبي صلى الله عليه وسلم أول من رمى في الإسلام بالمنجنيق ; رمى به أهل الطائف .
وذكر ابن إسحاق أن نفرا من الصحابة دخلوا تحت دبابة ، ثم زحفوا [ ص: 72 ] ليخرقوا جدار أهل الطائف فأرسلت عليهم ثقيف سكك الحديد محماة ، فخرجوا من تحتها ، فرمتهم ثقيف بالنبل ، فقتلوا منهم رجالا ، فحينئذ أمر رسول الله صلى الله عليه وسلم بقطع أعناب ثقيف ، فوقع الناس فيها يقطعون .
قال : وتقدم أبو سفيان بن حرب والمغيرة بن شعبة فناديا ثقيفا بالأمان حتى يكلماهم ، فأمنوهما ، فدعوا نساء من قريش وبني كنانة ليخرجن إليهم – وهما يخافان عليهن السباء إذا فتح الحصن – فأبين ، فقال لهما ابن الأسود بن مسعود : ألا أدلكما على خير مما جئتما له؟ إن مال بني الأسود بن مسعود حيث قد علمتما – وكان رسول الله صلى الله عليه وسلم نازلا بواد يقال له : العقيق . وهو بين مال بني الأسود وبين الطائف – وليس بالطائف مال أبعد رشاء ولا أشد مؤونة ولا أبعد عمارة منه ، وإن محمدا إن قطعه لم يعمر أبدا ، فكلماه فليأخذه لنفسه أو ليدعه لله وللرحم . فزعموا أن رسول الله صلى الله عليه وسلم تركه لهم .
وقد روى الواقدي عن شيوخه نحو هذا ، وعنده أن سلمان الفارسي هو الذي أشار بالمنجنيق وعمله بيده ، وقيل : قدم به وبدبابتين . فالله أعلم .

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক বলেছেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীদের দুজন ছিলেন; তাঁদের একজন উম্মে সালামা। তিনি তাঁদের জন্য দুটি তাঁবু স্থাপন করলেন এবং সেগুলোর মাঝখানে নামাজ পড়তেন। তিনি তাদের অবরোধ করলেন, তাদের সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধ করলেন এবং উভয় পক্ষ তির নিক্ষেপ করল।
ইবনে হিশাম বলেছেন, তিনি তাদের ওপর মঞ্জনিক দিয়ে নিক্ষেপ করলেন। যাঁকে আমি বিশ্বাস করি, তিনি আমাকে জানিয়েছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামে প্রথম মঞ্জনিক দিয়ে নিক্ষেপকারী; তিনি তা দিয়ে তায়েফবাসীর ওপর নিক্ষেপ করেছিলেন।
ইবনে ইসহাক উল্লেখ করেছেন, কয়েকজন সাহাবি একটি সুরক্ষিত অবরোধযানের নিচে ঢুকে [পৃষ্ঠা ৭২] তায়েফবাসীর দেয়াল ভেদ করতে এগিয়ে গেলেন। সাকিফ তাঁদের ওপর উত্তপ্ত লোহার দণ্ড নিক্ষেপ করল। তাঁরা সেখান থেকে বেরিয়ে এলে সাকিফ তাঁদের ওপর তির নিক্ষেপ করল এবং কয়েকজনকে হত্যা করল। তখন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাকিফের আঙুরগাছ কাটার নির্দেশ দিলেন। লোকেরা সেগুলো কাটতে লেগে গেল।
তিনি বলেন, আবু সুফিয়ান ইবনে হারব ও মুগিরা ইবনে শুবা এগিয়ে গিয়ে সাকিফের সঙ্গে কথা বলার জন্য নিরাপত্তা চাইলেন। তারা তাঁদের নিরাপত্তা দিল। তাঁরা কুরাইশ ও বনু কিনানার কয়েকজন নারীকে তাঁদের কাছে বাইরে চলে আসতে বললেন; দুর্গ জয় হলে ওই নারীরা বন্দি হবেন বলে তাঁরা আশঙ্কা করছিলেন। নারীরা রাজি হলেন না। ইবনে আসওয়াদ ইবনে মাসউদ তাঁদের বললেন, তোমরা যে উদ্দেশ্যে এসেছ তার চেয়ে ভালো একটি বিষয় কি তোমাদের জানাব? বনু আসওয়াদ ইবনে মাসউদের বাগান কোথায়, তা তোমরা জানো। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আকিক নামে একটি উপত্যকায় অবস্থান করছিলেন, যা বনু আসওয়াদের বাগান ও তায়েফের মাঝখানে। তায়েফের কোনো বাগানে এর চেয়ে গভীর থেকে পানি তুলতে হয় না, এর চেয়ে বেশি পরিশ্রম লাগে না অথবা এর চেয়ে দূরে আবাদ নেই। মুহাম্মদ সেটি কেটে দিলে তা আর কখনো আবাদ হবে না। তোমরা তাঁকে বলো, তিনি হয় সেটি নিজের জন্য নিন, নয়তো আল্লাহ ও আত্মীয়তার সম্পর্কের খাতিরে রেখে দিন। তাদের বক্তব্য অনুসারে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটি তাদের জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন।
ওয়াকিদি তাঁর শিক্ষকদের সূত্রে অনুরূপ বিবরণ বর্ণনা করেছেন। তাঁর বিবরণে সালমান ফারসি মঞ্জনিক ব্যবহারের পরামর্শ দেন এবং নিজ হাতে তা তৈরি করেন। আবার বলা হয়েছে, তিনি একটি মঞ্জনিক ও দুটি সুরক্ষিত অবরোধযান নিয়ে এসেছিলেন। আল্লাহ ভালো জানেন।

তায়েফের বিবরণে মঞ্জনিক, সুরক্ষিত অবরোধযান, দেয়াল ভাঙার চেষ্টা এবং তিরের পাল্টা আঘাত একই সামরিক কার্যক্রমের অংশ। এখানে দুর্গের প্রতিরোধ ভাঙতে দূর থেকে আঘাত এবং কাছে গিয়ে দেয়াল ভেদ—দুই পদ্ধতিই ব্যবহৃত হয়েছে। ধ্রুপদি ফকিহরা মঞ্জনিকের অনুমোদনে এই অভিযানের নজির এনেছেন। ফলে একটি বর্ণিত সামরিক কাজ পরবর্তী যুদ্ধনীতিতে বৈধতার ভিত্তি হয়েছে এবং নারী–শিশু থাকা অবস্থায় আঘাতের অনুমতির আলোচনাতেও তা কার্যকর ভূমিকা পেয়েছে।

আঙুরবাগান কাটার নির্দেশ যুদ্ধকে দুর্গের দেয়ালের বাইরে জীবিকার উৎসে বিস্তৃত করে। ফলদ গাছ একটি জনপদের খাদ্য, আয় ও ভবিষ্যৎ উৎপাদনের অংশ। তা ধ্বংস হলে ক্ষতি শুধু সামরিক প্রতিরোধ চালানো ব্যক্তির ওপর পড়ে না; সেই সম্পদের ওপর নির্ভরশীল পরিবার ও পরবর্তী জীবনযাত্রাও আঘাত পায়। বাগানের মালিকের আবেদনে পুনরায় আবাদ করা কঠিন হওয়ার কথাটি তাই তাৎপর্যপূর্ণ। ক্ষতির সময়কাল যুদ্ধের তাৎক্ষণিক সংঘর্ষ ছাড়িয়ে ভবিষ্যতের পরিশ্রম ও জীবিকার মধ্যে প্রসারিত হয়।

নির্দিষ্ট বাগানটি পরে রক্ষা পেয়েছে বলে একই বিবরণে এসেছে। সেই আবেদন মালিককে এমন অবস্থায় দেখায়, যেখানে নিজের জীবিকার উৎস বাঁচাতে আক্রমণকারীর কাছে সম্পত্তি নিয়ে নেওয়া অথবা আত্মীয়তার খাতিরে রেখে দেওয়ার অনুরোধ করতে হচ্ছে। বাগান ধ্বংস করা হবে কি না, তার নিয়ন্ত্রণ সামরিক নেতার হাতে। একই বিবরণে কয়েকজন নারীকে দুর্গ ছেড়ে আসার আহ্বানের কারণ হিসেবে বন্দিত্বের আশঙ্কাও আছে। ফলে অবরোধের চাপের মধ্যে সম্পদ হারানো ও স্বাধীনতা হারানোর বিপদ পাশাপাশি উপস্থিত।


এইসব আক্রমণের কারণ

মুহাম্মদের ধর্মপ্রচারের সঙ্গে সামরিক ক্ষমতা যুক্ত হওয়ার পর ধর্মীয় আনুগত্য আদায়ে সশস্ত্র বলপ্রয়োগের সরাসরি নজির পাওয়া যায়। তাঁর নির্দেশে পৌত্তলিকদের মূর্তি ও উপাসনালয় ধ্বংস করার অভিযান পরিচালিত হয়েছে। মানুষের নিজের ধর্ম পালন এবং ধর্মীয় ঘোষণা দিতে অস্বীকার করার স্বাধীনতা এই বলপ্রয়োগের সামনে বিপন্ন হয়েছে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মুহাম্মদ বলেছেন যে, মানুষ যতক্ষণ না ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই’ কথার স্বীকৃতি দেবে, ততক্ষণ তাদের বিরুদ্ধে কিতাল বা সশস্ত্র যুদ্ধ করতে তিনি আদিষ্ট হয়েছেন [33] [34] –

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩৮/ ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ১. যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ না বলবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কিতাল করতে আমি আদেশপ্রাপ্ত হয়েছি
২৬০৭। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মৃত্যুর পর আবূ বকর (রাযিঃ) যখন খলীফা নির্বাচিত হন, তখন আরবের কিছু সংখ্যক লোক কাফির হয়ে যায়। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) আবূ বাকর (রাযিঃ)-কে বললেন, আপনি এদের বিরুদ্ধে কিভাবে অস্ত্ৰধারণ করবেন, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষ যে পর্যন্ত না “আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত আর কোন প্ৰভু নেই” এই কথার স্বীকৃতি দিবে সেই পর্যন্ত আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি। আর যে ব্যক্তি বললো, “আল্লাহ ব্যতীত আর কোন প্ৰভু নেই” সে আমার থেকে তার মাল ও রক্ত (জীবন) নিরাপদ করে নিল। তবে ইসলামের অধিকার সম্পর্কে ভিন্ন কথা। আর তাদের প্রকৃত হিসাব-নিকাশ রয়েছে আল্লাহ তা’আলার দায়িত্বে।
আবূ বকর (রাযিঃ) বললেনঃ আল্লাহর শপথ নামায ও যাকাতের মধ্যে যে ব্যক্তি পার্থক্য করে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবোই। কেননা যাকাত সম্পদের হাক্ক। কেউ উটের একটি রশি দিতেও যদি অস্বীকার করে, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে দিত, আল্লাহর কসম! আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবোই। তারপর উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি দেখতে পেলাম আল্লাহ যেন যুদ্ধের জন্য আবূ বাকরের অন্তর উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। অতঃপর আমি বুঝতে পারলাম যে, তার সিদ্ধান্তই যথার্থ।
সহীহঃ সহীহাহ (৪০৭), সহীহ আবূ দাউদ (১৩৯১-১৩৯৩), বুখারী ও মুসলিম।
আবূ ঈসা বলেন, এই হাদীসটি হাসান সহীহ। শু’আইব ইবনু আবী হামযা (রহঃ) যুহরী হতে, তিনি উবাইদুল্লাহ ইবনু আবদিল্লাহ হতে, তিনি আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ)-এর সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন। এই হাদীস মামার-যুহরী হতে, তিনি আনাস (রাযিঃ) হতে, তিনি আবূ বাকর (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে ইমরান আল-কাত্তান বর্ণনা করেছেন। এ বর্ণনাটি ভুল। ‘ইমরানের ব্যাপারে মা’মার হতে বর্ণিত বর্ণনাতে বিরোধিতা করা হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩৮/ ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ২. আমি লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ বলবে এবং নামায আদায় করবে
২৬০৮। আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত আর কোন প্ৰভু নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ তা’আলার বান্দা ও তার রাসূল এবং আমাদের কিবলামুখী হয়ে নামায আদায় করবে, আমাদের যবেহকৃত পশুর গোশত খাবে এবং আমাদের মতো নামায আদায় করবে। তারা এগুলো করলে তাদের জান ও মালে হস্তক্ষেপ করা আমাদের জন্য হারাম হয়ে যাবে। কিন্তু ইসলামের অধিকারের বিষয়টি ভিন্ন। মুসলিমদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা তারাও পাবে এবং মুসলিমদের উপর অর্পিত দায়-দায়িত্ব তাদের উপরও বর্তাবে।
সহীহঃ সহীহাহ (৩০৩) ও (১/১৫২), সহীহ আবূ দাউদ (২৩৭৪), বুখারী অনুরূপ।
মুআয ইবনু জাবাল ও আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতেও এই অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। আবূ ঈসা বলেন, এই হাদীসটি হাসান সহীহ এবং উপরোক্ত সূত্রে গারীব। ইয়াহইয়া (রাহঃ) হুমাইদ হতে, তিনি আনাস (রাযিঃ)-এর সূত্রে একই রকম হাদীস বর্ণনা করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


যুল-খালাসা ধ্বংস: ধর্মীয় স্থাপনায় অভিযান ও ধর্মান্তরের হুমকি

বুখারির যুল-খালাসা অভিযানের বর্ণনায় উপাসনালয় ধ্বংস এবং ব্যক্তিকে মৃত্যুর হুমকিতে ধর্মীয় ঘোষণা দিতে বাধ্য করা একই ঘটনার মধ্যে রয়েছে। মুহাম্মদ জারিরকে যুল-খালাসা থেকে তাঁকে ‘স্বস্তি’ দিতে বলেন। জারির দেড়শ অশ্বারোহী নিয়ে গিয়ে উপাসনালয়টি পোড়ান ও ভাঙেন। পরে ভাগ্যনির্ণায়ক তির ব্যবহারকারী একজনকে তির ভেঙে আল্লাহর একত্বের সাক্ষ্য দিতে বলেন; তা না করলে শিরশ্ছেদের হুমকি দেন। বর্ণনার পূর্ণ পাঠ হলো: [35]

حَدَّثَنَا يُوسُفُ بْنُ مُوسَى، أَخْبَرَنَا أَبُو أُسَامَةَ، عَنْ إِسْمَاعِيلَ بْنِ أَبِي خَالِدٍ، عَنْ قَيْسٍ، عَنْ جَرِيرٍ، قَالَ قَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ أَلاَ تُرِيحُنِي مِنْ ذِي الْخَلَصَةِ ‏”‏‏.‏ فَقُلْتُ بَلَى‏.‏ فَانْطَلَقْتُ فِي خَمْسِينَ وَمِائَةِ فَارِسٍ مِنْ أَحْمَسَ وَكَانُوا أَصْحَابَ خَيْلٍ وَكُنْتُ لاَ أَثْبُتُ عَلَى الْخَيْلِ، فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَضَرَبَ يَدَهُ عَلَى صَدْرِي حَتَّى رَأَيْتُ أَثَرَ يَدِهِ فِي صَدْرِي وَقَالَ ‏”‏ اللَّهُمَّ ثَبِّتْهُ وَاجْعَلْهُ هَادِيًا مَهْدِيًّا ‏” ‏‏.‏ قَالَ فَمَا وَقَعْتُ عَنْ فَرَسٍ بَعْدُ‏.‏ قَالَ وَكَانَ ذُو الْخَلَصَةِ بَيْتًا بِالْيَمَنِ لِخَثْعَمَ وَبَجِيلَةَ، فِيهِ نُصُبٌ تُعْبَدُ، يُقَالُ لَهُ الْكَعْبَةُ‏.‏ قَالَ فَأَتَاهَا فَحَرَّقَهَا بِالنَّارِ وَكَسَرَهَا‏.‏ قَالَ وَلَمَّا قَدِمَ جَرِيرٌ الْيَمَنَ كَانَ بِهَا رَجُلٌ يَسْتَقْسِمُ بِالأَزْلاَمِ فَقِيلَ لَهُ إِنَّ رَسُولَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم هَا هُنَا فَإِنْ قَدَرَ عَلَيْكَ ضَرَبَ عُنُقَكَ‏.‏ قَالَ فَبَيْنَمَا هُوَ يَضْرِبُ بِهَا إِذْ وَقَفَ عَلَيْهِ جَرِيرٌ فَقَالَ لَتَكْسِرَنَّهَا وَلَتَشْهَدَنَّ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَوْ لأَضْرِبَنَّ عُنُقَكَ‏.‏ قَالَ فَكَسَرَهَا وَشَهِدَ، ثُمَّ بَعَثَ جَرِيرٌ رَجُلاً مِنْ أَحْمَسَ يُكْنَى أَبَا أَرْطَاةَ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم يُبَشِّرُهُ بِذَلِكَ، فَلَمَّا أَتَى النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ مَا جِئْتُ حَتَّى تَرَكْتُهَا كَأَنَّهَا جَمَلٌ أَجْرَبُ‏.‏ قَالَ فَبَرَّكَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَلَى خَيْلِ أَحْمَسَ وَرِجَالِهَا خَمْسَ مَرَّاتٍ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: ইউসুফ ইবনে মুসা আমাদের বর্ণনা করেছেন; আবু উসামা আমাদের জানিয়েছেন, ইসমাইল ইবনে আবি খালিদের সূত্রে, তিনি কায়েসের সূত্রে, তিনি জারিরের সূত্রে। জারির বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, ‘তুমি কি যুল-খালাসা থেকে আমাকে স্বস্তি দেবে না?’ আমি বললাম, অবশ্যই। আমি আহমাস গোত্রের একশ পঞ্চাশজন অশ্বারোহী নিয়ে রওনা হলাম। তাঁরা ঘোড়া চালনায় অভিজ্ঞ ছিলেন। আমি ঘোড়ার ওপর স্থির থাকতে পারতাম না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা জানালে তিনি আমার বুকে হাত দিয়ে এমনভাবে আঘাত করলেন যে, আমি আমার বুকে তাঁর হাতের চিহ্ন দেখতে পেলাম। তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহ, তাকে স্থির রাখুন এবং তাকে পথপ্রদর্শক ও সুপথপ্রাপ্ত করুন।’ জারির বলেন, এরপর আর কখনো আমি ঘোড়া থেকে পড়ে যাইনি।
যুল-খালাসা ছিল ইয়েমেনে খাসআম ও বাজিলা গোত্রের একটি উপাসনাগৃহ; সেখানে পূজিত প্রতিমা ছিল। সেটিকে কাবা বলা হতো। তিনি সেখানে গিয়ে আগুনে সেটি পুড়িয়ে দিলেন এবং ভেঙে ফেললেন।
জারির ইয়েমেনে পৌঁছালে সেখানে একজন লোক ছিল, যে ভাগ্যনির্ণায়ক তির ব্যবহার করত। তাকে বলা হলো, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দূত এখানে আছেন; তিনি তোমাকে ধরতে পারলে তোমার গর্দান কাটবেন। লোকটি তির ব্যবহার করার সময় জারির তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘তুমি অবশ্যই এগুলো ভাঙবে এবং সাক্ষ্য দেবে যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; নইলে আমি অবশ্যই তোমার গর্দান কাটব।’ সে তিরগুলো ভেঙে ফেলল এবং সাক্ষ্য দিল।
এরপর জারির আহমাস গোত্রের আবু আরতাত নামে পরিচিত একজনকে এই সুসংবাদ জানাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পাঠালেন। তিনি নবীর কাছে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ, সেটিকে খোসপাঁচড়াগ্রস্ত উটের মতো করে রেখে তবেই আমি এসেছি।’ তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহমাসের ঘোড়া ও অশ্বারোহীদের জন্য পাঁচবার বরকতের দোয়া করলেন।

‘সাক্ষ্য দাও, নইলে গর্দান কাটব’—এই হুমকিতে জীবনরক্ষার শর্ত হিসেবে ধর্মীয় ঘোষণা চাপানো হয়েছে। লোকটির তির ভাঙা ও সাক্ষ্য দেওয়া হুমকির পরেই ঘটেছে। তার নিজের ধর্মীয় আচরণ চালিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা সশস্ত্র ক্ষমতায় কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। জীবন বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে উচ্চারিত ঘোষণা মানুষের বিবেকের স্বাধীন সম্মতি প্রকাশ করে না; তা প্রাণনাশের ভয় থেকে আনুগত্য আদায়ের ফল। এই ঘটনায় বলপ্রয়োগ ও ধর্মীয় স্বীকৃতির যোগসূত্র সরাসরি কথোপকথনেই সংরক্ষিত।

যুল-খালাসা পোড়ানো ও ভাঙার মধ্যে আবার একটি সমষ্টির উপাসনার বস্তুগত ভিত্তি ধ্বংস হয়েছে। মানুষ যেখানে উপাসনা করত, সেই স্থান ও প্রতিমা আক্রমণকারীর ধর্মীয় সিদ্ধান্তে বিনষ্ট করা হয়েছে। এর আঘাত শুধু ভবনের ওপর নয়; নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী প্রকাশ্যে উপাসনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগের ওপরও। একই অভিযানে ব্যক্তির আচার বন্ধ করা এবং উপাসনালয় ধ্বংস ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দুটি স্তর প্রকাশ করে—একটি মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, অন্যটি সেই আচরণের স্থান ও উপকরণ সরিয়ে দেয়।

জারির উপাসনালয় ধ্বংসের সংবাদকে সুসংবাদ হিসেবে পাঠিয়েছেন। মুহাম্মদ সেই সংবাদ পেয়ে আহমাসের ঘোড়া ও অশ্বারোহীদের জন্য পাঁচবার বরকতের দোয়া করেছেন। ফলে উপাসনালয় ধ্বংস সামরিক অভিযানের স্বীকৃত সাফল্য এবং ধর্মীয় আশীর্বাদের বিষয় হয়েছে। এই পুরস্কারধর্মী প্রতিক্রিয়া ধ্বংসযজ্ঞকে নেতৃত্বের অনুমোদিত কাজে স্থান দেয়। আক্রান্ত মানুষের উপাসনার অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাটি বিজয়ী পক্ষের ধর্মীয় ভাষায় প্রশংসিত অর্জনে পরিণত হয়।

এখানে মানুষকে যুক্তি দিয়ে মত পরিবর্তনে আহ্বান করার স্বাধীন পরিবেশ অনুপস্থিত। একদিকে ধর্মীয় স্থান ধ্বংসের জন্য অশ্বারোহী অভিযান, অন্যদিকে নির্দিষ্ট ব্যক্তির সামনে শিরশ্ছেদের হুমকি রয়েছে। অস্ত্রের মুখে আচার ত্যাগ ও বিশ্বাসের ঘোষণা আদায় নিজের ধর্ম পালন করার অধিকারকে বলপ্রয়োগে দমন করে। ধর্মপ্রচারের সাফল্য হিসেবে এই আনুগত্য মূল্যায়ন করলে জীবন বাঁচানোর বাধ্যতা ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ হয়ে ওঠে। এই বিনিময়ে নিপীড়ন এবং বিশ্বাসের স্বেচ্ছা নির্বাচন এক করে দেখানো হয়।


জীবিত নারী ও শিশুদের সাথে কী করা হবে?

ইসলামী অপলজিস্ট বা প্রচারকরা প্রায়শই দাবি করেন যে, যুদ্ধে নারী ও শিশুদের হত্যা না করার বিধানটি ইসলামের এক অনন্য ‘মানবিক’ বৈশিষ্ট্য। ধ্রুপদি ইসলামের দালিলিক ইতিহাস ও যুদ্ধনীতিতে এই নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশিই নারী ও শিশুদের ‘যুদ্ধলব্ধ সম্পদ’ বা গনিমত হিসেবে বণ্টন, দাসে রূপান্তর এবং তাঁদের বিক্রির অর্থে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বিবরণ রয়েছে। বেঁচে থাকা এখানে স্বাধীনতা, পারিবারিক নিরাপত্তা কিংবা নিজের জীবনের ওপর কর্তৃত্বের নিশ্চয়তা নয়; বন্দি মানুষকে বিজয়ীর কেনাবেচার সম্পদ বানানোর সুযোগও রাখা হয়েছে। যাঁকে পণ্য হিসেবে হস্তান্তর করা হচ্ছে, তাঁর দৃষ্টিকোণ থেকে এই ব্যবস্থা মানুষকে সম্পত্তিতে নামিয়ে আনে।

বনু কুরাইজা গণহত্যার পরবর্তী ভয়াবহ চিত্রটি মানুষকে সম্পদে পরিণত করার এই ব্যবস্থাকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করে। সেখানে বন্দি নারী ও শিশুদের একাংশকে নাজদে পাঠিয়ে বিক্রি করা হয়। এই দাস বিক্রির লব্ধ অর্থ দিয়ে মুহাম্মদের অনুসারীরা অস্ত্রশস্ত্র ও ঘোড়া ক্রয় করেন—যা সরাসরি মানুষকে নগদে রূপান্তর করে পুনরায় যুদ্ধ-যন্ত্রে বিনিয়োগ করার এক নির্মম উদাহরণ [36] [37] [38]। এই প্রক্রিয়ায় নারী–শিশুর জীবন, শ্রম এবং স্থানান্তর বিজয়ীর সম্পত্তির অধিকারের অধীন হয়েছে। তাঁদের বিক্রির অর্থ নতুন অস্ত্র কেনার উপায় হওয়ায় বন্দি মানুষ ও পরবর্তী সামরিক শক্তির মধ্যে সরাসরি অর্থনৈতিক যোগসূত্র তৈরি হয়েছে। মানুষকে এভাবে ‘বস্তু’ হিসেবে গণ্য করে কেনাবেচা করার এই আদিম চর্চা মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদার সরাসরি লঙ্ঘন।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু কুরাইযার ধন-সম্পদ, স্ত্রী ও সন্তানদেরকে মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করেন। তারপর সা’দ ইবনে যায়িদ আনসারীকে বনু কুরাইযার কিছুসংখ্যক দাসদাসীকে দিয়ে নাজদ পাঠিয়ে দেন। তাদের বিনিময়ে তিনি সেখান থেকে মুসলমানদের জন্য অস্ত্রশস্ত্র ও ঘোড়া খরিদ করে আনেন।

নারী 7

ইবনে ইসহাকের সিরাতে রাসুলাল্লাহ গ্রন্থে গনিমতের মাল ভাগাভাগির আরও পরিষ্কার বিবরণ পাওয়া যায়। সেখান থেকে জানা যায়, মুহাম্মদ এক-পঞ্চমাংশ আলাদা করে গ্রহণ করেছিলেন এবং নিজের জন্য একজন নারীও নির্বাচিত করেছিলেন [39] –

[ ছাবিত ইবনে কায়েস এ সম্পর্কে বলেছেন:
আমার কর্তব্য শেষ, আমি উদারতা দেখিয়েছি,
অনেক চেষ্টা করেছি
অথচ বাকি সব ধৈর্যহারা হয়েছে
আমার ওপর জাবিরের সকলের চেয়ে বেশি দাবি
দড়ি দিয়ে হাত বাঁধা ছিল তার
তাকে মুক্ত করার জন্য রাসুলের (সা.) কাছে গেছি আমি।
তিনি ছিলেন আমাদের দয়ার সাগর । ]
রাসুলের (সা.) হুকুম ছিল, ওদের প্রাপ্তবয়স্ক সবাইকে যেন হত্যা করা হয়।
আতিয়া আল-কুরাজি সূত্রে আবদুল মালিক ইবনে উমায়র এবং তাঁর সূত্রে শুবা ইবনে আল-হাজ্জাজ আমাকে বলেছেন,বনু কুরাইজার সব প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আমি তখন নাবালক ছিলাম, কাজেই আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল ।
আল-মুনজিরের জননী এবং সালিত ইবনে কায়েসের বোন সালমা বিনতে কায়েস ছিলেন রাসুলের (সা.) খালা। রাসুলের (সা.) সঙ্গে তিনি জেরুজালেম ও মক্কা উভয় দিকে মুখ করে নামাজ পড়েছেন। বনু আদি ইবনে আল-নাজ্জারের ভাই আইউব ইবনে আবদুর রহমান আমাকে বলেছেন, সালমার আশ্রিত রিফা ইবনে সামাওয়াল প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। তিনি রাসুলের (সা.) কাছে তাঁর প্রাণ ভিক্ষা চান। তিনি বলেন, সেই লোক কসম খেয়েছে, সে নামাজ পড়বে, উটের মাংস খাবে। রাসুল (সা.) তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করেন।
বনু কুরাইজার সম্পত্তি ও স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের রাসুল (সা.) মুসলমানদের মধ্যে ভাগবণ্টন করে দেন। উট ও মানুষের অংশ সেদিনই স্থির হয়। তিনি গ্রহণ করেন এক-পঞ্চমাংশ। একজন ঘোড়াওয়ালা তিন অংশ পেয়েছিল, ঘোড়ার জন্য দুই আর আরোহীর জন্য এক। বনু কুরাইজার দিকে মোট ঘোড়ার সংখ্যা ছিল ছত্রিশ। এই প্রথম যুদ্ধ-সম্পদের ওপর লটারি হয় এবং এক-পঞ্চমাংশ আলাদা রাখা হয়। এই নজির পরবর্তী সময়ের অন্যান্য যুদ্ধে অনুসরণ করা হয়।
রাসুল (সা.) নিজের জন্য নির্বাচিত করেছিলেন বনু আমর ইবনে কুরাইজার এক নারীকে। তার নাম রায়হানা বিনতে আমর ইবনে খুনাফা। তিনি আমৃত্যু তাঁর কর্তৃত্বের অধীন ছিলেন। রাসুল (সা.) তাঁকে বিয়ে করে পর্দানশিন করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।কিন্তু রায়হানা বলেছিলেন, ‘তার চেয়ে বরং আপনি আমাকে আপনার কর্তৃত্বের আওতায় রাখুন। সেটা আপনার-আমার উভয়ের জন্য সহজ হবে।’ বন্দী হওয়ার সময় তিনি ইসলামের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করেন এবং ইহুদি ধর্ম আঁকড়ে থাকেন। এতে রাসুল (সা.) নারাজ হন এবং তাঁকে আলাদা করে রাখেন। একদিন সাহাবিদের সঙ্গে বসে ছিলেন তিনি, তখন পেছনে চপ্পলের আওয়াজ হলো। তিনি বললেন, ‘ছালাবা ইবনে সাইয়া আসছে, রায়হানা ইসলাম গ্রহণ করেছে সেই সুখবর নিয়ে। ছালাবা সত্যিই সেই সুসংবাদ জ্ঞাপন করল। তিনি প্রীত হলেন। খন্দক ও বনু কুরাইজা বিষয়ে আল্লাহ সুরা আহজাবে তাদের বিচার, তাদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন ও সাহায্যের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল এবং আমি তাদের বিরুদ্ধে বাতাস এবং অদৃশ্য সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলাম। তোমাদের সব কাজের দ্রষ্টা আল্লাহ।’ শত্রুবাহিনী হচ্ছে কোরাইশ, গাতাফান ও বনু কুরাইজা। বাতাসের সঙ্গে প্রেরিত আল্লাহর বাহিনী ছিল ফেরেশতারা।
– ১. সুরা ৩৩।
– ৫০৬ ● সিরাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)

নারী 9

দাসত্ব, যৌন মালিকানা ও দাসবাজারের বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে সংশ্লিষ্ট পৃথক প্রবন্ধগুলোতে: দাসীর সঙ্গে সহবাস ও যৌন দাসত্ব, দাসীর সম্মতি ও যুদ্ধবন্দি নারীর ওপর যৌন বলপ্রয়োগ, ইসলামে দাসীবাজার ও নারীদাসী কেনাবেচা এবং মুহাম্মদের দাস ব্যবসা।


বন্দি নারী ও শিশুদের সঙ্গে আনা সম্ভব না হলে

দারুল হারবে অভিযান থেকে ফেরার সময় বন্দিদের সঙ্গে আনা সম্ভব না হলে তাঁদের কী করা হবে—এই প্রশ্নে ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীতে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। উদ্ধৃত মাসআলায় পুরুষদের ইসলাম গ্রহণ না করলে হত্যা এবং নারী, শিশু ও বৃদ্ধাদের খাদ্য–পানীয় ছাড়া নির্জন স্থানে ফেলে রাখার কথা আছে, যেন তাঁরা ক্ষুধা–তৃষ্ণায় মারা যান। সরাসরি হত্যা নিষিদ্ধ হওয়ার কথাই এই মৃত্যুপদ্ধতির যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে [40] –

আর তাদের বাসন পত্র এবং আসবাবপত্রসহ ঘরের যাবতীয় আসবাব পত্র এমনভাবে ভেঙ্গে চুরমার করে দিবে যেন পরবর্তীর্তে এসব দ্বারা উপকৃত না হতে পারে। আর সকল ধরনের তরল জাতীয় পদার্থ প্রবাহিত করে দিবে, যেন তারা পরবর্তীতে এসব দ্বারা উপকৃত না হতে পারে। এসব কর্মকাণ্ড এজন্য করা হবে যাতে তারা ক্রোধান্বিত হয়ে উঠে।
১৮. মাসআলা: দারুল হারবের অভিযান থেকে ফেরার সময় যদি বন্দীদের সঙ্গে আনা
তাদের সম্ভব না হয় তাহলে পুরুষদেরকে হত্যা করা হবে যদি ইসলাম গ্রহণ না করে এবং নারী, শিশু ও বৃদ্ধাদেরকে খাদ্য ও পানীয় বিহীন নির্জন স্থানে ফেলে আসবে, যেন তারা ক্ষুধা-পিপাসায় মারা যায়। কেননা হাদীসে নিষেধাজ্ঞা আসার কারণে হত্যা করা সম্ভব নয়, আবার বাঁচিয়ে রাখাও বিশেষ কোন যুক্তি নেই।১
একারণেই মুসলমানরা যদি দারুল হারবে কোথাও সাপ বা বিচ্ছু পায় তবে তারা বিচ্ছুর লেজ কেটে দিবে আর সাপ হলে তার দাঁত ভেঙ্গে দিবে যেন মুসলমানদের ওখানে থাকা অবস্থায় কোন ক্ষতি না হয়। আর তাদের একেবারেই মেরে ফেলবে না যেন তাদের বংশ পরম্পরা বাকি থাকে পরবর্তীতে তাদের বংশধররা কাফিরদেরকে দংশন করে ও কষ্ট দেয় (সিরাজুল ওয়াহ্হাজ)।

নারী 11

মাওসিলি: পরিবহনে অক্ষম বন্দিদের জন্য অনাহারে মৃত্যুর বিধান

ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীর উদ্ধৃত বিধানটির সমান্তরাল বক্তব্য আবদুল্লাহ ইবনে মাহমুদ আল-মাওসিলির আল-ইখতিয়ার লি-তালিলিল মুখতারেও রয়েছে। এখানে শর্ত হলো, বন্দিরা মুসলিম ভূখণ্ড পর্যন্ত হেঁটে যেতে অক্ষম। এরপর পুরুষদের হত্যা এবং নারী–শিশুদের জনমানবহীন স্থানে ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় মরতে ফেলে রাখার নির্দেশ এসেছে। তার কারণও লেখক নিজেই বলেছেন: নারীরা সন্তান জন্ম দেবেন, শিশুরা বড় হবে, ফলে ভবিষ্যতে প্রতিপক্ষের জনবল তৈরি হবে। অস্ত্র ও মালপত্র ধ্বংসের আলোচনা থেকে বন্দিদের বিষয়ে প্রবেশ করা সম্পূর্ণ অনুচ্ছেদটি হলো: [41]

( ويحرق الأسلحة ) والأمتعة أيضا ، وما لا يحترق منها يدفن في موضع لا يقدر الكفار عليه إبطالا للمنفعة عليهم; أما الأسارى يمشون إلى دار الإسلام ، فإن عجزوا قتل الرجال وترك [ ص: 394 ] النساء والصبيان في أرض مضيعة حتى يموتوا جوعا وعطشا ، لأنا لا نقتلهم للنهي ، ولو تركوا في العمران عادوا حربا علينا ، فالنساء يحصل منهن النسل ، والصبيان يكبرون فيصيرون حربا علينا فتعين ما قلناه ، ولهذا قالوا : إذا وجد المسلمون في دار الحرب حيات وعقارب ينزعون حمة العقرب وأنياب الحية دفعا لضررها عنهم ولا يقتلونها لئلا ينقطع نسلهم وفيه منفعة الكفار ، وقد أمرنا بضده .

বাংলা অনুবাদ: ‘অস্ত্র পুড়িয়ে দেবে’—মালপত্রও। যেগুলো পোড়ে না, সেগুলো এমন জায়গায় পুঁতে ফেলবে, যেখানে কাফিররা পৌঁছাতে পারবে না; উদ্দেশ্য, তাদের জন্য সেগুলোর উপকারিতা নষ্ট করা। বন্দিরা হেঁটে দারুল ইসলামে যাবে। তারা অক্ষম হলে পুরুষদের হত্যা করা হবে এবং [পৃষ্ঠা ৩৯৪] নারী ও শিশুদের এমন নির্জন স্থানে ফেলে রাখা হবে, যেখানে তারা ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় মারা যাবে। কারণ নিষেধাজ্ঞার কারণে আমরা তাদের হত্যা করি না। তাদের জনবসতিতে রেখে দিলে তারা আবার আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরিণত হবে; নারীদের থেকে বংশধর জন্মায় এবং শিশুরা বড় হয়ে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরিণত হয়। তাই আমরা যে বিধান বলেছি, সেটিই নির্ধারিত হয়। এ কারণেই তাঁরা বলেছেন, মুসলিমরা দারুল হারবে সাপ ও বিচ্ছু পেলে নিজেদের ক্ষতি ঠেকাতে বিচ্ছুর হুল ও সাপের বিষদাঁত তুলে ফেলবে, কিন্তু সেগুলো হত্যা করবে না; যাতে সেগুলোর বংশ শেষ না হয় এবং তাতে কাফিরদের উপকার না হয়। আমাদের তো এর বিপরীত কাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নারী ও শিশু বন্দিরা এখানে ভবিষ্যতে কী অপরাধ করেছে, তার বিবরণ নেই। নারী সন্তান জন্ম দিতে পারেন এবং শিশু বড় হতে পারে—এই জীববৈজ্ঞানিক সত্যকেই তাঁদের মৃত্যুর যুক্তি করা হয়েছে। সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ বংশধর অথবা ভবিষ্যৎ প্রাপ্তবয়স্ককে শত্রু ধরে বর্তমান মানুষের জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত হচ্ছে। শিশুর কোনো যুদ্ধকাজ ছাড়াই তাকে ভবিষ্যতের শত্রু গণ্য করা এবং নারীর প্রজননক্ষমতাকে শত্রুপক্ষের সম্পদ হিসেবে দেখা সমষ্টিগত শত্রুতা ব্যক্তির শরীরে চাপিয়ে দেয়। এই যুক্তিতে অপরাধের দায়ের জায়গা নিয়েছে ধর্মীয়–রাজনৈতিক গোষ্ঠীর জনসংখ্যা।

বন্দিদের পরিবহনের অক্ষমতা এবং তাঁদের মৃত্যুর পরিবেশ তৈরি করা দুটি পৃথক সিদ্ধান্ত। মাওসিলি জনবসতিতে রেখে যাওয়ার বিকল্প উল্লেখ করে তা ভবিষ্যৎ শত্রুশক্তির যুক্তিতে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাই নির্জন স্থানে ফেলে রাখা এখানে কেবল যাত্রাপথে পিছিয়ে পড়ার বিবরণ নয়; যে পরিবেশে ক্ষুধা–তৃষ্ণায় মৃত্যু হবে, তা নির্বাচনের নির্দেশ। বন্দির দুর্বলতার সমস্যা থেকে তাঁর বেঁচে থাকার উপায় সরিয়ে দেওয়ার অনুমতিতে পৌঁছানো হয়েছে। সঙ্গে নিতে না-পারা ব্যক্তির ওপর সেই অক্ষমতার চূড়ান্ত মূল্য—জীবন হারানো—চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

একই অনুচ্ছেদে সাপ–বিচ্ছুর বংশ রক্ষার যুক্তি এবং নারী–শিশুর বেঁচে থাকা রোধের যুক্তি পাশাপাশি রয়েছে। বিষধর প্রাণীর বংশ থাকলে শত্রুর ক্ষতি হতে পারে, তাই সেই বংশ রাখার কথা; নারী ও শিশু বেঁচে থাকলে শত্রুপক্ষের বংশ ও জনবল থাকবে, তাই তাঁদের মরতে দেওয়ার কথা। উপকার ও ক্ষতির হিসাবটি যুদ্ধরত পক্ষের স্বার্থ দিয়ে তৈরি। অসহায় মানুষের জীবন এই হিসাবে এমন একটি ভবিষ্যৎ বিপদ, যা ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।


ইবনে নুজাইম: নিষিদ্ধ হত্যার চেয়ে কঠোর—আপত্তি এবং তার প্রত্যাখ্যান

ইবনে নুজাইম আল-বাহরুর রায়িকে একই বিধান ওয়ালওয়ালিজির ফতোয়ার সূত্রে উল্লেখ করেছেন। তাঁর উদ্ধৃতিতে ইবনে হুমামের ফাতহুল কাদিরের আপত্তি রয়েছে: নারী–শিশুকে এভাবে ফেলে রাখা তাঁদের নিষিদ্ধ হত্যার চেয়েও কঠোর। ইবনে হুমাম পরিবহনের অভাবে বাধ্য হওয়ার ব্যতিক্রমও রেখেছেন। ইবনে নুজাইম সেই আপত্তিকে আশ্চর্যজনক বলেছেন; তাঁর যুক্তি, ওয়ালওয়ালিজি আগেই পরিবহন অসম্ভব হওয়ার শর্ত দিয়েছেন, তাই কোনো সমস্যা নেই। পুরো প্রাসঙ্গিক অনুচ্ছেদটি হলো: [42]

( قوله وعقر مواش شق إخراجها فتذبح وتحرق ) أي وحرم عقر المواشي لأنه مثلة فيذبحها لأن ذبح الحيوان يجوز لغرض صحيح ولا غرض أصح من كسر شوكة الأعداء ثم تحرق بالنار لتنقطع منفعته عن الكفار وصار كتخريب البنيان بخلاف التحريق قبل الذبح لأنه منهي عنه قال في المحيط وأشار إلى أنه يحرق الأسلحة والأمتعة إذا تعذر نقلها وما لا يحترق منها يدفن في موضع لا يقف عليه الكفار إبطالا للمنفعة عليهم قال في المغرب عقره عقرا جرحه وعقر الناقة بالسيف ضرب قوائمها ، والمواشي جمع ماشية وهي الإبل والبقر والغنم وقيد بالمواشي احترازا عن النساء والصبيان التي يشق إخراجها فإنها تترك في أرض خربة حتى يموتوا جوعا كي لا يعودوا حربا علينا لأن النساء يقع بهن النسل وأما الصبيان فإنهم يبلغون فيصيرون حربا علينا كذا في فتاوى الولوالجي وتعقبه في فتح القدير بأنه أقوى من القتل المنهي عنه في قتل النساء والصبيان اللهم إلا أن يضطروا إلى ذلك بسبب عدم الحمل فيتركوا ضرورة وهو عجيب منه لأن الولوالجي صرح بأنه يفعل بالنساء والصبيان ذلك عند عدم إمكان الإخراج لا مطلقا فلا إشكال أصلا والمسألة مذكورة في المحيط أيضا وذكر بعده ولهذا قال علماؤنا إذا وجد المسلمون حية أو عقربا في دار الحرب في رحالهم ينزعون ذنب العقرب وأنياب الحية قطعا للضرر عن أنفسهم ولا يقتلونها لأن فيه منفعة الكفار وقد أمرنا بضده ا هـ .

বাংলা অনুবাদ: তাঁর বক্তব্য: ‘যেসব গবাদিপশু নিয়ে যাওয়া কঠিন, সেগুলো পঙ্গু করা; সুতরাং সেগুলো জবাই করে পোড়ানো হবে।’ অর্থাৎ গবাদিপশু পঙ্গু করা হারাম, কারণ তা অঙ্গবিকৃতি; তাই জবাই করবে। যথার্থ উদ্দেশ্যে পশু জবাই বৈধ, আর শত্রুর শক্তি ভেঙে দেওয়ার চেয়ে যথার্থ উদ্দেশ্য নেই। এরপর আগুনে পোড়াবে, যাতে কাফিরদের জন্য তার উপকারিতা শেষ হয়। এটি ঘরবাড়ি ধ্বংসের মতো। জবাইয়ের আগে পোড়ানো আলাদা; কারণ তা নিষিদ্ধ। ‘আল-মুহিত’-এ বলেছেন, ইঙ্গিত করা হয়েছে যে অস্ত্র ও মালপত্র বহন করা অসম্ভব হলে পোড়ানো হবে। যা পোড়ে না, কাফিররা খুঁজে পাবে না এমন স্থানে পুঁতে ফেলবে, যাতে তাদের জন্য তা উপকারে না আসে। ‘আল-মাগরিব’-এ আছে, ‘আকারাহু আকরান’ অর্থ তাকে আহত করা; তরবারি দিয়ে উটের পা আঘাত করাও ‘আকর’। ‘মাওয়াশি’ হলো ‘মাশিয়া’-র বহুবচন; উট, গরু ও ছাগল–ভেড়া বোঝায়। গবাদিপশুর উল্লেখ দিয়ে নারী ও শিশুদের আলাদা করা হয়েছে, যাদের নিয়ে যাওয়া কঠিন; তাদের পরিত্যক্ত স্থানে ফেলে রাখা হবে, যাতে তারা ক্ষুধায় মারা যায় এবং পুনরায় আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত শক্তিতে পরিণত না হয়। কারণ নারীদের মাধ্যমে বংশধর জন্মায়, আর শিশুরা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত শক্তিতে পরিণত হয়। ওয়ালওয়ালিজির ফতোয়ায় এমনই আছে।
‘ফাতহুল কাদির’-এ এর আপত্তি করা হয়েছে যে, নারী–শিশুর বিষয়ে এটি নিষিদ্ধ হত্যার চেয়েও কঠোর। তবে পরিবহন না-থাকায় বাধ্য হলে প্রয়োজনবশত তাদের ফেলে রাখার কথা হতে পারে। তাঁর এই বক্তব্য আশ্চর্যজনক; কারণ ওয়ালওয়ালিজি স্পষ্ট করেছেন যে, নারী–শিশুকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না হলেই এটি করা হবে, সব অবস্থায় নয়। তাই আদৌ কোনো সমস্যা নেই। বিষয়টি ‘আল-মুহিত’-এও উল্লেখ আছে। এর পরে তিনি বলেছেন, এ কারণেই আমাদের আলেমরা বলেছেন: মুসলিমরা দারুল হারবে নিজেদের অবস্থানস্থলে সাপ বা বিচ্ছু পেলে নিজেদের ক্ষতি ঠেকাতে বিচ্ছুর লেজ ও সাপের বিষদাঁত তুলে ফেলবে; কিন্তু হত্যা করবে না, কারণ তাতে কাফিরদের উপকার হয় এবং আমাদের তার বিপরীত কাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উদ্ধৃতি শেষ।

ইবনে হুমামের আপত্তি পদ্ধতির নিষ্ঠুরতা নিয়ে: ক্ষুধায় ফেলে রাখা নিষিদ্ধ হত্যার চেয়েও কঠোর। ইবনে নুজাইমের জবাব বিধানের শর্ত নিয়ে: পরিবহন অসম্ভব হলেই এটি প্রযোজ্য, তাই সমস্যা নেই। এই জবাবে শর্তটি আগে থেকেই লেখা থাকার বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয়; কিন্তু সেই শর্ত পূরণ হলে মৃত্যুর এই পদ্ধতি কেন ন্যায্য হবে, তার নৈতিক প্রশ্ন অক্ষত থাকে। পরিবহনের অসুবিধা বন্দিকে বহন করার সমস্যা ব্যাখ্যা করে। তাঁকে খাদ্য–পানিহীন স্থানে নিয়ে মৃত্যুর কারণ তৈরি করার নৈতিক অধিকার সেই অসুবিধা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না।

ইবনে হুমামের উদ্ধৃত বক্তব্যেও বাধ্যতাজনিত ব্যতিক্রম আছে; তাঁর আপত্তি ও ইবনে নুজাইমের সমর্থন তাই একই প্রয়োজনের ধারণাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। কিন্তু বিধানের লক্ষ্য হিসেবে ভবিষ্যৎ শত্রুবংশ রোধের কথা সংরক্ষিত থাকায় বন্দিদের জীবনকে সামরিক সম্পদের হিসাব থেকে আলাদা করা হয়নি। কর্তৃপক্ষের যাত্রা ও পরিবহনের সংকটের সঙ্গে নারী–শিশুর বেঁচে থাকার অধিকার বিরোধে পড়লে সেই অধিকার কতখানি কার্যকর থাকবে—বিতর্কের কঠোর প্রশ্নটি এখানে। অনাহারের ধীর কষ্টকে অনুমোদন করার অবস্থান বন্দির অসহায়তাকে আক্রমণকারীর সুবিধার অধীন করেছে।


ইবনে আবিদীন: জনশূন্য স্থানে ফেলে মৃত্যুর কারণ সৃষ্টি করার সমালোচনা

রদ্দুল মুহতারের মূলপাঠে নারী–শিশুকে পরিত্যক্ত স্থানে ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় মরতে ফেলে রাখার বিধান অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট ভাষায় রয়েছে। হত্যা নিষিদ্ধ হওয়ার কথাই সেখানে সরাসরি হত্যার পরিবর্তে এই পদ্ধতি ব্যবহারের কারণ: [43]

( ويترك صبيان ونساء منهم شق إخراجها بأرض خربة حتى يموتوا جوعا ) وعطشا للنهي عن قتلهم ولا وجه إلى إبقائهم

বাংলা অনুবাদ: তাদের মধ্যকার যেসব শিশু ও নারীকে নিয়ে যাওয়া কষ্টসাধ্য, তাদের পরিত্যক্ত স্থানে ফেলে রাখা হবে, যাতে তারা ক্ষুধায় এবং তৃষ্ণায় মারা যায়; কারণ তাদের হত্যা করার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং তাদের বাঁচিয়ে রাখার কোনো কারণ নেই।

ইবনে আবিদীন এই বক্তব্যের ব্যাখ্যায় নারীর মাধ্যমে বংশধর জন্মানো এবং শিশুর বড় হয়ে যোদ্ধা হওয়ার যুক্তি উল্লেখ করেছেন। এরপর ইবনে হুমামের আপত্তি ও ইবনে নুজাইমের জবাব তুলে এনে তিনি নিজেই জবাবটির সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সঙ্গে নেওয়া সম্ভব না হলে তাঁদের যেখানে আছেন সেখানেই ছেড়ে দিতে হবে; খাদ্য–পানিহীন ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থানে ফেলে তাঁদের মৃত্যুর কারণ সৃষ্টি করা আরও কঠোর। ব্যাখ্যার সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক অনুচ্ছেদটি হলো: [44]

( قوله ولا وجه إلى إبقائهم ) لئلا يعودوا حربا علينا ; لأن النساء بهن النسل والصبيان يبلغون فيصيرون حربا علينا ولوالجية ، واعترضه في الفتح بأن تركهم كذلك أشد من القتل المنهي عنه في حقهم قال : اللهم إلا أن يضطروا إلى ذلك بسبب عدم الحمل والميرة فيتركوا ضرورة ا هـ وهو عجيب فإن الولوالجي صرح بأن ذلك عند عدم إمكان الإخراج لا مطلقا ، والمسألة في المحيط أيضا بحر وفيه نظر فإن مراد الفتح أن تركهم في أرض خربة بلا طعام ولا شراب أشد من القتل ، فحيث لم يمكن إخراجهم فليتركوا في مكانهم بلا مباشرة السبب في إهلاكهم

বাংলা অনুবাদ: তাঁর বক্তব্য, ‘তাদের বাঁচিয়ে রাখার কোনো কারণ নেই’—যাতে তারা পুনরায় আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত শক্তি না হয়। কারণ নারীদের মাধ্যমে বংশধর জন্মায় এবং শিশুরা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত শক্তি হয়। এটি ওয়ালওয়ালিজির বক্তব্য। ‘ফাতহুল কাদির’-এ এর আপত্তি করা হয়েছে যে, তাদের এভাবে ফেলে রাখা তাদের বিষয়ে নিষিদ্ধ হত্যার চেয়েও কঠোর। তিনি বলেছেন, তবে পরিবহন ও রসদের অভাবে এমন করতে বাধ্য হলে প্রয়োজনবশত তাদের ফেলে রাখা হতে পারে। উদ্ধৃতি শেষ। এটি আশ্চর্যজনক; কারণ ওয়ালওয়ালিজি স্পষ্ট করেছেন যে, নিয়ে যাওয়া সম্ভব না হলেই এটি প্রযোজ্য, সব অবস্থায় নয়। বিষয়টি ‘আল-মুহিত’-এও আছে। এটি ‘আল-বাহর’-এর বক্তব্য।
এ বক্তব্যে আপত্তি আছে। কারণ ‘ফাতহুল কাদির’-এর উদ্দেশ্য হলো, তাদের খাদ্য ও পানীয় ছাড়া ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থানে ফেলে রাখা হত্যার চেয়েও কঠোর। তাই তাদের নিয়ে যাওয়া সম্ভব না হলে যেখানে আছে সেখানেই ছেড়ে দিতে হবে, সরাসরি তাদের ধ্বংস হওয়ার কারণ সৃষ্টি না করে।

ইবনে আবিদীন সমস্যাটিকে কারণ সৃষ্টির জায়গায় ধরেছেন: বন্দিদের সঙ্গে নিতে না-পারা এবং তাঁদের খাদ্য–পানিহীন স্থানে ফেলে মৃত্যু ঘটানো এক কাজ নয়। তাঁর প্রস্তাব, সঙ্গে নেওয়া সম্ভব না হলে তাঁরা যেখানে আছেন সেখানেই ছেড়ে দিতে হবে। ফলে মৃত্যুর পরিবেশ তৈরি করার বদলে বিরত থাকার একটি ভিন্ন সিদ্ধান্ত একই ফিকহি আলোচনায় উপস্থিত। নির্জন স্থানে সরিয়ে ফেলার নির্দেশকে পরিবহনের সমস্যার অনিবার্য ফল হিসেবে গ্রহণ করার বিরুদ্ধে এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ক্ষুধা–তৃষ্ণায় মৃত্যুর বিধানে সরাসরি অস্ত্রাঘাতের পরিবর্তে পরিবেশকে প্রাণনাশের উপায় করা হচ্ছে। মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজন জানা আছে; সেই প্রয়োজন মেটানোর সুযোগহীন স্থানে তাঁকে ফেলে রাখলে মৃত্যু ঘটবে, সেটিও বিধানের ভাষায় প্রত্যাশিত। তাই এখানে কাজটির নৈতিক মূল্যায়ন শুধু অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নে সীমিত থাকে না। বন্দিকে কোথায় রাখা হলো, কী থেকে বঞ্চিত করা হলো এবং কী ফলের উদ্দেশ্যে তা করা হলো—এসবই মৃত্যুর কারণ তৈরির অংশ।

এই কারণেই মূলপাঠে হত্যা নিষিদ্ধ বলে উচ্চারণ এবং পরবর্তী ব্যাখ্যায় সেই পদ্ধতিকে হত্যার চেয়েও কঠোর বলা পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ। নিষেধাজ্ঞার ভাষা বজায় রেখেও মানুষকে আরও দীর্ঘ যন্ত্রণার মধ্যে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার অনুমতি তৈরি হয়েছিল। ইবনে আবিদীনের সমালোচনা সেই অনুমতির কার্যকর ফলকে সামনে আনে। খাদ্য ও পানির অভাবে মরতে থাকা মানুষের জন্য আঘাতটি কোন ফিকহি নামে শ্রেণিবদ্ধ হলো, তার চেয়ে নির্ধারক হলো তাঁর জীবন রক্ষার উপায় ইচ্ছাকৃতভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে কি না।

গ্রন্থ বা ফকিহসংরক্ষিত বিধান বা অবস্থানপ্রদত্ত কারণ বা আপত্তি
মাওসিলি, আল-ইখতিয়ারহেঁটে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব হলে নারী–শিশুকে নির্জন স্থানে ক্ষুধা–তৃষ্ণায় মরতে ফেলে রাখানারী থেকে বংশধর হবে; শিশু বড় হয়ে প্রতিপক্ষ হবে
ওয়ালওয়ালিজির ফতোয়া, ইবনে নুজাইমের উদ্ধৃতিতেসঙ্গে নেওয়া কঠিন নারী–শিশুকে পরিত্যক্ত স্থানে ক্ষুধায় মরতে ফেলে রাখাভবিষ্যৎ শত্রুশক্তি গড়ে ওঠা ঠেকানো
ইবনে হুমাম, ফাতহুল কাদির; ইবনে নুজাইম ও ইবনে আবিদীনের উদ্ধৃতিতেপদ্ধতিটি নিষিদ্ধ হত্যার চেয়েও কঠোর; পরিবহন ও রসদের অভাবজনিত বাধ্যতার ব্যতিক্রম উল্লেখঅনাহারে ফেলে রাখার তীব্রতা নিয়ে আপত্তি
ইবনে নুজাইম, আল-বাহরুর রায়িকপরিবহন অসম্ভব হওয়ার শর্তে মূল বিধানে কোনো সমস্যা নেইওয়ালওয়ালিজি আগেই শর্তটি দিয়েছেন
রদ্দুল মুহতারের উদ্ধৃত মূলপাঠশিশু ও নারীকে পরিত্যক্ত স্থানে ক্ষুধা–তৃষ্ণায় মরতে ফেলে রাখাহত্যা নিষিদ্ধ; বাঁচিয়ে রাখার কারণ নেই
ইবনে আবিদীনের নিজস্ব ব্যাখ্যাসঙ্গে নেওয়া সম্ভব না হলে যেখানে আছে সেখানেই ছেড়ে দেওয়াখাদ্য–পানিহীন স্থানে ফেলে মৃত্যুর কারণ তৈরি করা হত্যার চেয়েও কঠোর

বিধানগুলোর অনুমোদনকারী যুক্তি মানুষের বর্তমান অপরাধের ওপর দাঁড়ায়নি। কোথাও সামরিক অভিযান থেমে যাওয়ার আশঙ্কা, কোথাও ভবিষ্যৎ প্রজনন ও জনবল, কোথাও বন্দিদের বহন করার অসুবিধা নির্ধারক হয়েছে। সেই হিসাবের ভেতর নারী ও শিশুর প্রাণকে ক্ষয়যোগ্য উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। খাদ্য–পানি থেকে বঞ্চিত করে মরতে ফেলে রাখার নির্দেশে হত্যার নিষেধাজ্ঞা উচ্চারণ করা তাই তীব্র নৈতিক বিরোধ সৃষ্টি করে: মুখে প্রত্যক্ষ হত্যা বন্ধ রাখা হচ্ছে, কাজে ধীর মৃত্যুর উপায় নির্ধারণ করা হচ্ছে।


উপসংহার

নারী ও শিশুদের জন্য ইসলামের যুদ্ধনীতিতে নিঃশর্ত নিরাপত্তা ছিল—এই দাবি মিথ্যা। সরাসরি হত্যার নিষেধাজ্ঞার পাশেই রাতের হামলায় তাঁদের মৃত্যু, নারী–শিশু থাকা দুর্গে প্রাণঘাতী আক্রমণ এবং বন্দিদের সম্পত্তি হিসেবে বণ্টন ও বিক্রির অনুমোদন সংরক্ষিত আছে। নিষেধাজ্ঞার একটি বাক্য সামনে এনে এই অনুমোদনগুলো গোপন করা ইতিহাসের খণ্ডিত ও প্রতারণামূলক উপস্থাপন। একটি শিশুকে আলাদা করে হত্যার লক্ষ্য করা হয়নি বলেই তার উপস্থিতি জানা অবস্থায় হামলা চালানোর নৈতিক দায় শেষ হয় না। আক্রমণের উদ্দেশ্য, পদ্ধতি ও ফল একত্রে মানুষের জীবনের ওপর আঘাত সৃষ্টি করে। নারী–শিশুর নিরাপত্তা তখনই কার্যকর সুরক্ষা পায়, যখন তাঁদের বাঁচানোর প্রয়োজন সামরিক লক্ষ্য অর্জনের ওপর বাস্তব সীমা আরোপ করে। তাঁদের মৃত্যু গ্রহণ করে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি সেই সুরক্ষাকে আক্রমণকারীর সুবিধার অধীন করে।

আজান শুনে হামলা বন্ধ করা এবং ধর্মীয় সাক্ষ্যের স্বীকৃতিতে প্রাণ ও সম্পদের সুরক্ষা দেওয়ার বিধানে মানুষের নিরাপত্তা ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই ব্যবস্থা ভিন্ন বিশ্বাসে থাকা মানুষের ওপর আনুগত্যের চাপ সৃষ্টি করে। একইভাবে পিতার ধর্মীয় পরিচয় বা শত্রুপক্ষের সদস্যত্ব দিয়ে একটি শিশুর প্রাণহানির অনুমোদন ব্যাখ্যা করলে তার স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা গোষ্ঠীগত শত্রুতার অধীন হয়। একটি শিশুর জন্মপরিচয় তার যুদ্ধকাজ নয়; কোনো মানুষের নিজস্ব উপাসনা পালন করাও তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নৈতিক অধিকার দেয় না। মানুষের জীবন ও বিবেকের স্বাধীনতাকে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ভিন্ন মূল্য দেওয়া গভীর বৈষম্য। এই বৈষম্য ধর্মীয় ভাষায় অনুমোদিত হলেও তার নৈতিক পরিণতি মানুষের সমান মর্যাদার লঙ্ঘন।

বন্দি নারী ও শিশুকে জীবিত রাখার সঙ্গে তাঁদের স্বাধীনতা রক্ষার ব্যবধানও এই ইতিহাসে নির্মমভাবে প্রকাশিত। বনু কুরাইজার গণহত্যার পর বন্দিদের একাংশকে বিক্রি করে সেই অর্থে অস্ত্র ও ঘোড়া কেনার ঘটনায় মানুষ সরাসরি যুদ্ধের অর্থনৈতিক উপাদানে পরিণত হয়েছে। বিজয়ী পক্ষ মানুষের জীবন, শ্রম ও স্থানান্তরের ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠা করেছে এবং সেই মালিকানা থেকে নতুন সামরিক শক্তি সংগ্রহ করেছে। এখানে বন্দির নিজের ইচ্ছা, পারিবারিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের অধিকার বিজয়ীর সম্পত্তির দাবির অধীন। মানুষকে বিক্রি করে যুদ্ধের সরঞ্জাম সংগ্রহের প্রক্রিয়া বন্দিত্ব ও পরবর্তী যুদ্ধক্ষমতার মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ যোগসূত্র তৈরি করে। এমন ব্যবস্থায় নারী–শিশুর বেঁচে থাকাকে মানবিক মুক্তি হিসেবে প্রচার করা তাঁদের ওপর আরোপিত দাসত্ব ও স্বাধীনতাহরণকে আড়াল করে।

সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, বন্দিদের সঙ্গে আনা সম্ভব না হলে তাঁদের ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় মরতে ফেলে রাখার বিধান এবং তার পক্ষে দেওয়া যুক্তি। নারী সন্তান জন্ম দিতে পারেন এবং শিশু বড় হয়ে প্রতিপক্ষের জনবল হতে পারে—এই সম্ভাবনাকে বর্তমান মানুষের মৃত্যুর কারণ করা হয়েছে। এখানে ব্যক্তির কোনো প্রমাণিত যুদ্ধকাজের বদলে ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা ও সামরিক হিসাব নির্ধারক। সরাসরি হত্যা নিষিদ্ধ হওয়ার কথা বলেই খাদ্য–পানিহীন স্থানে ধীর মৃত্যুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ফকিহদের মধ্যেই কেউ এই পদ্ধতিকে নিষিদ্ধ হত্যার চেয়েও কঠোর বলেছেন, কেউ পরিবহনের অক্ষমতার শর্তে তা সমস্যামুক্ত গণ্য করেছেন, আবার কেউ মৃত্যুর কারণ সৃষ্টি না করে বন্দিদের যেখানে আছেন সেখানেই ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। এই বিতর্কে নিষ্ঠুরতার প্রকৃতি স্পষ্ট: মানুষকে সঙ্গে নিতে না-পারার সমস্যা থেকে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করার অনুমতিতে পৌঁছানো হয়েছে।

এই বিধানগুলোর কেন্দ্রে বারবার ফিরে আসে বিজয়ীর ধর্মীয় কর্তৃত্ব, সামরিক সুবিধা এবং বন্দি মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ। আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা সেই স্বার্থের সঙ্গে বিরোধে পড়লে তার সুরক্ষা সংকুচিত হয়েছে। মানবিকতার নৈতিক মানদণ্ডে প্রতিটি মানুষের জীবন ও মর্যাদা সমান; শিশুর নিরাপত্তা তার পিতার ধর্মের ওপর, নারীর স্বাধীনতা বিজয়ীর মালিকানার ওপর এবং বন্দির বেঁচে থাকা তার পরিবহনযোগ্যতার ওপর নির্ভর করতে পারে না। মানুষকে দখলযোগ্য সম্পদ, ভবিষ্যৎ শত্রু অথবা গ্রহণযোগ্য সামরিক ক্ষতি হিসেবে ব্যবহার করা এই সমতার সরাসরি লঙ্ঘন। এসব কাজকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়া নিপীড়নের জন্য অনুমোদন তৈরি করে। আর সেই অনুমোদিত নিপীড়নকে মানবিকতার আদর্শ হিসেবে প্রচার করা আক্রান্ত মানুষের যন্ত্রণা, স্বাধীনতা ও বেঁচে থাকার অধিকারকে নির্মমভাবে অবজ্ঞা করা।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭৩৩ ↩︎
  2. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬৫ ↩︎
  3. সহিহ মুসলিম, আন্তর্জাতিক নম্বর ৩৮২ ↩︎
  4. সিদ্দিক হাসান খান, আস-সিরাজুল ওয়াহহাজ মিন কাশফি মাতালিবি সহিহ মুসলিম ইবনিল হাজ্জাজ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১১১–১১২; আজানের মর্যাদা অধ্যায় ↩︎
  5. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৮৩ ↩︎
  6. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৪–৪৫ ↩︎
  7. সহিহ বুখারি, আন্তর্জাতিক নম্বর ৬১০ ↩︎
  8. নববী, শরহু সহিহ মুসলিম; খায়বারের বর্ণনায় «خربت خيبر» কথার ব্যাখ্যা ↩︎
  9. ইবনে রজব, ফাতহুল বারি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৪৫; আজানের মাধ্যমে রক্তপাত থেকে নিরাপত্তাসংক্রান্ত অধ্যায় ↩︎
  10. সুনানে ইবনে মাজাহ, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৩৯২৯ ↩︎
  11. সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩৯২৯; মূল আরবি পাঠ ↩︎
  12. ইবনে রজব, ফাতহুল বারি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৪৩; আজান ও শাহাদাতাইনের মাধ্যমে মুসলিম গণ্য হওয়ার আলোচনা ↩︎
  13. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৩৭০ ↩︎
  14. সহিহ মুসলিম, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮১, হাদিসঃ ৪৩৭০ ↩︎
  15. সহিহ মুসলিম, আন্তর্জাতিক নম্বর ১৭৩০ক ↩︎
  16. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ২৫৪১ ↩︎
  17. সহিহ বুখারি ২৫৪১, মূল আরবি পাঠ ↩︎
  18. তাহাবী শরীফ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৭ ↩︎
  19. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৩৯৯ ↩︎
  20. সহীহ মুসলিম, হাঃ একাডেমী, হাদিসঃ ৪৪৪২ ↩︎
  21. সুনানে ইবনে মাজাহ, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ২৮৩৯ ↩︎
  22. সহিহ মুসলিম ১৭৪৫ক ↩︎
  23. সুনান ইবনে মাজাহ ২৮৩৯ ↩︎
  24. সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ৪৭৮৬, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ১০৮ ↩︎
  25. নববী, শরহু সহিহ মুসলিম, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ৪০৭–৪০৮; হাদিস ১৭৪৫-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  26. ইবনে মুলাক্কিন, আত-তাওদিহ লি-শারহিল জামিইস সহিহ, খণ্ড ১৮, পৃষ্ঠা ১৮০–১৮১ ↩︎
  27. আত-তাওদিহ, খণ্ড ১৮, পৃষ্ঠা ১৮২–১৮৩; চতুর্থ আলোচ্য দিক ↩︎
  28. কারাফি, আয-যাখিরা, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪০৭–৪০৯; যুদ্ধের পদ্ধতিসংক্রান্ত ষষ্ঠ আলোচনা ↩︎
  29. নববী, রওদাতুত তালিবিন, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ২৪৪–২৪৬ ↩︎
  30. রওদাতুত তালিবিন, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ২৪৬–২৪৭; মানবঢালসংক্রান্ত উপপরিচ্ছেদ ↩︎
  31. ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ২৩১; নারী–শিশুকে ঢাল বানানোর আলোচনা ↩︎
  32. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৭১–৭২; তায়েফের যুদ্ধ ↩︎
  33. সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ২৬০৭ ↩︎
  34. সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ২৬০৮ ↩︎
  35. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৩৫৭; যুল-খালাসা অভিযান ↩︎
  36. সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ২২৭ ↩︎
  37. সিরাতে রাসুলাল্লাহ (সাঃ), পৃষ্ঠা ৫০৬ ↩︎
  38. ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববিয়্যা, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৪৪–২৪৫ ↩︎
  39. সিরাতে রাসুলাল্লাহ (সাঃ), ইবনে ইসহাক, অনুবাদঃ শহীদ আখন্দ, প্রথমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৫০৬ ↩︎
  40. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৪০ ↩︎
  41. মাওসিলি, আল-ইখতিয়ার লি-তালিলিল মুখতার, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৯৩–৩৯৪ ↩︎
  42. ইবনে নুজাইম, আল-বাহরুর রায়িক, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৯০ ↩︎
  43. ইবনে আবিদীন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৪০; মূলপাঠ ↩︎
  44. রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৪০; «ولا وجه إلى إبقائهم» কথার ব্যাখ্যা ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.