হিন্দু ধর্ম সম্পর্কিতদর্শন

বৈদিক সাহিত্যের হার্মেনিউটিক্স (Hermeneutics of Vedic Literature) খণ্ড ১: ভাষা, ইতিহাস, মিথ, প্রতীক ও যজ্ঞ

ভূমিকা

প্রাচীন ধর্মগ্রন্থসমূহের অধ্যয়নে সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক সংকটটি তৈরি হয় যখন সেগুলোকে কোনো বিশেষ আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিয় আবহে পাঠ করা হয়। বৈদিক সাহিত্য কোনো অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃতিক সত্তার বাণী নয়; বরং এটি ব্রোঞ্জ ও প্রাথমিক লৌহযুগের এক সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতায় গড়ে ওঠা ভাষাগত দলিল। ফলে এই সাহিত্যের পাঠোদ্ধারে ভক্তি বা ঐতিহ্যের অন্ধ আনুগত্যের কোনো স্থান আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যায়তনে থাকতে পারে না। বৈদিক সাহিত্যের পাঠ ও তাৎপর্য অনুধাবনের জন্য প্রয়োজন একটি নির্মোহ, বস্তুনিষ্ঠ ও দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি, যা নিশ্চিত করতে পারে ব্যাখ্যাতত্ত্ব (Hermeneutics)। ঐতিহাসিকভাবে বৈদিক পাঠকে একদিকে যেমন সনাতন ধর্মতত্ত্বের কাঠামোর ভেতর অপৌরুষেয়তা (Apauruṣeyatva) বা রচয়িতাহীন শাশ্বত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করে তার ঐতিহাসিকতাকে অস্বীকার করা হয়েছে, অন্যদিকে উপনিবেশবাদী প্রাচ্যবিদ্যায় একে কেবল এক আদিম যাযাবর সমাজের অসংস্কৃত সাহিত্য হিসেবে লঘুকরণ করা হয়েছে। এই দুই প্রান্তিক অবস্থানের বাইরে দাঁড়িয়ে বৈদিক সাহিত্যের জটিল ভাষাতাত্ত্বিক, প্রতীকী ও আনুষ্ঠানিক বিন্যাসকে বুঝতে হলে পশ্চিমা মহাদেশীয় ব্যাখ্যাতত্ত্বের তাত্ত্বিক কাঠামো এবং প্রাচীন ভারতীয় ভাষাদর্শন ও মীমাংসা (Mīmāṃsā) দর্শনের বিশ্লেষণী যন্ত্রের সমন্বিত প্রয়োগ অপরিহার্য।

বৈদিক সাহিত্যের অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে প্রথম সংকটটি হলো ভাষার পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতি এবং সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক দূরত্ব (Historical Distance)। ফ্রিডরিশ শ্লাইয়ারমাখারের নির্দেশিত ব্যাকরণগত ও মানসিক ব্যাখ্যার সমন্বয় এখানে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, কারণ বৈদিক মন্ত্রের শব্দার্থ কোনো আধুনিক সংজ্ঞার অধীন নয়; তা প্রাচীন জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে যুক্ত। উইলহেম ডিলথাইয়ের জীবনজগৎসংক্রান্ত তত্ত্ব দেখায় যে, বৈদিক সমাজের গবাদিপশু, অশ্ব, রথ এবং উর্বরতার মতো বস্তুগত বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত ছিল তাদের সামগ্রিক ভাষার বিন্যাস। কোনো গ্রন্থ যখন ঐতিহাসিক ব্যবধান পেরিয়ে টিকে থাকে, তখন তার মূল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অর্থ এবং পরবর্তীতে আরোপ করা অর্থের মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি হয়, যা ই. ডি. হির্শের অর্থের স্তরবিন্যাস (Stratification of Meaning) তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। বৈদিক যাগযজ্ঞ বা আচারকে কোনো ভক্তিমূলক আনুগত্যের বিষয় হিসেবে নয়, বরং নির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্কের উৎপাদন ও মতাদর্শিক আধিপত্য বিস্তারের একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিগত পুনর্গঠন অত্যন্ত ফলপ্রসূ।

অন্যদিকে, বৈদিক সাহিত্যে ব্যবহৃত মিথ ও প্রতীকের ভাষাকে অলৌকিক ঘটনা হিসেবে পাঠ করা অবৈজ্ঞানিক। পল রিক্যুর ও রুডলফ বুল্টমানের বিমিথীকরণ তত্ত্ব বৈদিক পাঠে যুক্ত হলে দেখা যায়, প্রাকৃতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ ও সমাজগঠনের নিরাপত্তাহীনতা থেকেই সেখানে তৈরি হয়েছিল নানা রূপক ও উপাখ্যান। একই সাথে, ভারতীয় ধারার বাক্যার্থতত্ত্ব, বিশেষ করে জৈমিনি, শবরস্বামী, কুমারিল ভট্ট ও প্রভাকরের আলোচনা বৈদিক পাঠের প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত দিকটি উন্মোচন করে। তাদের কাছে বেদ কোনো আধ্যাত্মিক ভাবালুতা ছিল না, বরং তা ছিল একটি কঠোর নিয়মবদ্ধ ভাষাগত অনুশাসন বা বিধিবাক্য (Injunctions), যার কার্যকারিতা নির্ধারিত হতো যজ্ঞীয় ক্রিয়ার মাধ্যমে। অতএব, বৈদিক সাহিত্য বিশ্লেষণের এই প্রচেষ্টা কোনো ধর্মীয় পুনরুজ্জীবন নয়, বরং এটি ভাষার সমাজবিজ্ঞান, মিথতত্ত্ব এবং পাঠতাত্ত্বিক দর্শনের এক নির্মোহ অ্যাকাডেমিক অনুসন্ধান, যেখানে ভাষা ও ইতিহাসের দ্বন্দ্বই প্রধান বিচার্য বিষয়।

বৈদিক পাঠ ও ব্যাখ্যার ভিত্তি (Foundations of Vedic Interpretation): পাঠ, প্রসঙ্গ ও অর্থের সমস্যা

শ্লাইয়ারমাখার ও বৈদিক পাঠ (Schleiermacher and Vedic Texts): ব্যাকরণ, প্রসঙ্গ ও অর্থ পুনর্গঠন

হার্মেনিউটিক্সের আধুনিক সূচনা ও শ্লাইয়ারমাখারের তত্ত্ব (Modern Emergence of Hermeneutics and Schleiermacher’s Theory)

একটি পুরনো বই হাতে নিলে সাধারণ পাঠকের মনে নানা রকম কৌতূহল জাগে। কিন্তু সেই বইটি যদি হয় হাজার বছর আগের কোনো ভাষায় লেখা, তবে কৌতূহলের চেয়ে অস্বস্তি বাড়ে বেশি। প্রাচীন বাক্যগুলোর শব্দ হয়তো চেনা যায়, কিন্তু সেই শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আসল ভাবনাটিকে সহজে ধরা যায় না। আঠারো শতকের শেষভাগে এবং উনিশ শতকের শুরুতে ইউরোপে এই সমস্যাটি খুব তীব্রভাবে টের পাওয়া গিয়েছিল। সেই সময় জার্মান দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক ফ্রিডরিশ শ্লাইয়ারমাখার (Friedrich Schleiermacher) প্রাচীন সাহিত্য ও ধর্মীয় বয়ান বিশ্লেষণের এক নতুন পথ দেখান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ব্যাখ্যার কাজটা কেবল ব্যাকরণের কিছু ছকে বাঁধা নিয়ম দিয়ে হয় না। তার আগে পর্যন্ত আইন, সাহিত্য বা ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যা আলাদা আলাদা সূত্রে চলত। শ্লাইয়ারমাখার এসে বললেন, সব ধরনের পাঠ বোঝার জন্য একটি সাধারণ ভিত্তি থাকা দরকার। সেখান থেকেই জন্ম নেয় সাধারণ ব্যাখ্যাতত্ত্ব (General Hermeneutics) (Palmer, 1969)।

শ্লাইয়ারমাখারের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটি সাদামাটা কথা – কোনো কিছু নিজে থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায় না। মানুষের সহজাত প্রবণতা হলো কোনো পাঠের মুখোমুখি হলে নিজের অজান্তেই ভুল অর্থ তৈরি করা। তাই তিনি ব্যাখ্যাতত্ত্বকে চিহ্নিত করেছিলেন ‘আর্ট অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা বোঝার শিল্প’ হিসেবে (Schleiermacher, 1998)। মানুষ যখন কথা বলে বা লেখে, সে কেবল কিছু শব্দ ছুড়ে দেয় না; তার ভেতরে একটি মানসিক প্রক্রিয়া সচল থাকে। পাঠক যদি লেখকের সেই মানসিক প্রক্রিয়ার কাছে পৌঁছাতে না পারে, তবে অর্থ অপূর্ণ থেকে যায়। শ্লাইয়ারমাখার দেখান যে, যেকোনো অর্থপূর্ণ পাঠকে বুঝতে হলে দুটি সমান্তরাল চাকা ঘোরাতে হয়। একটি হলো ব্যাকরণগত ব্যাখ্যা (Grammatical Interpretation), অপরটি হলো মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা (Psychological Interpretation)। একটি ছাড়া অন্যটি অচল। এই দুই পদ্ধতির নিখুঁত মেলবন্ধন না ঘটলে প্রাচীন কোনো রচনার গভীরে যাওয়া অসম্ভব।

আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ পাঠপদ্ধতিতে এই তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা অনেক গভীর। বিশেষ করে যে পাঠগুলোকে কোনো বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায় অলৌকিক বা পবিত্র বলে দাবি করে, সেগুলোর ক্ষেত্রে এই বোঝাপড়া আরও বেশি জরুরি হয়ে পড়ে। কোনো বয়ান যখন কোনো অদৃশ্য ক্ষমতার দান বলে দাবি করা হয়, তখন সমাজ তার মানবিক উৎপত্তির ইতিহাসকে মুছে ফেলতে চায়। শ্লাইয়ারমাখার সেখানে কোনো ছাড় দেননি। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, ভাষা মানুষেরই এক ঐতিহাসিক সৃষ্টি এবং যেকোনো টেক্সট মানুষেরই চিন্তার ফসল (Forster, 2010)। প্রাচীন সমাজের কোনো সাহিত্যকে অলৌকিক সত্য হিসেবে না দেখে একটি সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বাস্তবতার ভাষিক উৎপাদন হিসেবে দেখাই হার্মেনিউটিক্সের প্রাথমিক শর্ত। শ্লাইয়ারমাখারের এই দৃষ্টিভঙ্গি পাঠকে তার অতিপ্রাকৃতিক খোলস থেকে বের করে এনে রক্ত-মাংসের মানুষের ইতিহাসের ওপর দাঁড় করায়।

তার বিখ্যাত কাজ হার্মেনিউটিক্স অ্যান্ড ক্রিটিসিজম (Hermeneutics and Criticism) সংকলনে তিনি দেখান যে, পাঠোদ্ধার কোনো অলৌকিক অনুপ্রেরণার ব্যাপার নয় (Bowie, 2003)। এটা এক ধরনের শ্রমসাধ্য ঐতিহাসিক ও ভাষাতাত্ত্বিক পুনর্গঠন। প্রাচীন কোনো সমাজ কীভাবে চিন্তা করত, তাদের ব্যবহৃত শব্দগুলো সেই সময়ে কী অর্থ প্রকাশ করত, তা পুনরুদ্ধার করতে হয় বিজ্ঞানসম্মত অনুসন্ধানের মাধ্যমে। কোনো লেখক কোনো নির্দিষ্ট যুগে বসে কী বলতে চেয়েছিলেন, তা আধুনিক পাঠকের ইচ্ছামতো ব্যাখ্যা করলে চলে না। লেখকের নিজস্ব ভাষা-পরিসর এবং তার সমকালীন সামাজিক পরিমণ্ডলের ভেতর ঢুকেই সেই অর্থ খুঁজে বের করতে হয়। শ্লাইয়ারমাখারের এই কঠোর ঐতিহাসিক ও ভাষাগত সচেতনতাই বৈদিক সাহিত্যের মতো জটিল ও প্রাচীন পাঠ বিশ্লেষণের প্রথম ও প্রধান তাত্ত্বিক হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।

ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ ও বৈদিক ভাষার গঠন (Grammatical Analysis and the Structure of Vedic Language)

শ্লাইয়ারমাখারের হার্মেনিউটিক পদ্ধতির প্রথম স্তম্ভ হলো ভাষার ব্যাকরণিক বা বস্তুগত ব্যবস্থার বিশ্লেষণ। তার মতে, একজন লেখক তার ইচ্ছামতো ভাষার অর্থ তৈরি করতে পারেন না। তিনি যে ভাষায় কথা বলেন বা লেখেন, সেই ভাষা তার চিন্তা ও প্রকাশের সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। লেখক ভাষার অধীন, ভাষা লেখকের অধীন নয়। বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই নীতি অত্যন্ত জোরালোভাবে কাজ করে। ঋগ্বেদ (Rigveda) বা অন্যান্য বৈদিক সংহিতার ভাষা হলো বৈদিক সংস্কৃত (Vedic Sanskrit), যা পরবর্তীকালের ধ্রুপদী সংস্কৃত থেকে ব্যাকরণ, ধ্বনিতত্ত্ব এবং বাক্যগঠনের দিক থেকে স্পষ্টভাবেই আলাদা (Macdonell, 1916)। পরবর্তী যুগের পন্ডিতরা যখন ধ্রুপদী ব্যাকরণের ছাঁচে ফেলে বৈদিক মন্ত্রের অর্থ করতে গেছেন, তখনই তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। শ্লাইয়ারমাখারের ব্যাকরণগত ব্যাখ্যা নির্দেশ করে যে, একটি বৈদিক শব্দের অর্থ জানতে হবে সেই যুগের ভাষাগত নিয়মের ভেতর থেকেই, পরবর্তী কোনো যুগের চাপিয়ে দেওয়া নিয়মে নয়।

বৈদিক ভাষায় ধাতুরূপ, নামরূপ এবং বিভক্তির ব্যবহার অত্যন্ত জটিল ও পরিবর্তনশীল। বিশেষ করে বৈদিক ছন্দের গঠন এবং পদগুলোর পারস্পরিক স্থানবদল অনেক সময় সাধারণ বাক্যগঠনের নিয়মকে পাশ কাটিয়ে যায়। শ্লাইয়ারমাখার যে বিষয়টির ওপর জোর দিয়েছিলেন, তা হলো – সমকালীন ভাষার সামগ্রিক কাঠামোর বাইরে কোনো একক শব্দের স্বতন্ত্র অর্থ থাকতে পারে না (Schleiermacher, 1998)। উদাহরণ হিসেবে বৈদিক সাহিত্যের বহু আলোচিত শব্দ ‘ঋত’ (Ṛta)-এর কথা ভাবা যেতে পারে। পরবর্তীকালের ভারতীয় দর্শনে এই শব্দটিকে আধ্যাত্মিক সত্য বা অতীন্দ্রিয় নৈতিকতার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রাচীনতম বৈদিক স্তরে ব্যাকরণগত ও তুলনামূলক ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাতত্ত্বের সাহায্যে তাকালে বোঝা যায়, এর শিকড় ছিল একটি নিয়মিত মহাজাগতিক ও প্রাকৃতিক আবর্তনের ধারণার মধ্যে (Jamison & Brereton, 2014)। ঋতু পরিবর্তন, দিন-রাত্রির পর্যায়ক্রমিক আগমন এবং যাগযজ্ঞের নিখুঁত ক্রম – এই সমস্ত বাস্তব প্রক্রিয়াকে একসাথে বাঁধতেই শব্দটি তৈরি হয়েছিল। ব্যাকরণগত বিশ্লেষণে ধাতুর ব্যুৎপত্তি ও ব্যবহারিক প্রয়োগ বাদ দিয়ে শব্দটির ওপর অতীন্দ্রিয় ভাব আরোপ করলে তার ঐতিহাসিক অর্থটাই হারিয়ে যায়।

ভাষার এই ঐতিহাসিক চরিত্র বুঝতে হলে ইন্দো-ইরানীয় ভাষার সমান্তরাল ক্ষেত্রগুলোর দিকেও তাকাতে হয়। আবেস্তার ভাষার সঙ্গে বৈদিক সংস্কৃতের যে অবিশ্বাস্য ব্যাকরণিক সাদৃশ্য রয়েছে, তা কোনো অলৌকিক যোগাযোগ নয়; বরং তা একটি সুনির্দিষ্ট মানবগোষ্ঠীর ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে (Witzel, 1995)। বৈদিক কবিরা যখন তাদের মন্ত্র রচনা করতেন, তখন তারা শূন্য থেকে শব্দ তৈরি করেননি। তারা বংশপরম্পরায় বয়ে চলা একটি ভাষার সম্পদ ব্যবহার করছিলেন। সেই ভাষায় বিশেষ্য ও বিশেষণের যে সম্পর্ক ছিল, ক্রিয়াপদের যে বিচিত্র কাল ও ভাব ছিল, তা তৎকালীন বাস্তবতাকে প্রকাশের জন্যই তৈরি হয়েছিল। শ্লাইয়ারমাখারের তাত্ত্বিক অবস্থান অনুযায়ী, প্রাচীন কবির ভাষা-সীমা অতিক্রম করে কোনো অর্থ কল্পনা করা হবে এক ধরনের পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভুল।

অতএব, বৈদিক পাঠের ব্যাকরণগত ব্যাখ্যা কেবল যান্ত্রিক শব্দার্থ খোঁজা নয়। এটা হলো সেই প্রাচীন ভাষিক বলয়টিকে পুনর্নির্মাণ করা, যার ভেতর বৈদিক কবি বা পুরোহিতরা নিঃশ্বাস নিতেন। বৈদিক ক্রিয়াপদের বিভিন্ন রূপ, যেমন লেট্ বা সাবজাংক্টিভ মুডের ব্যবহার প্রমাণ করে যে, তাদের ভাষা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, আকাঙ্ক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক যজ্ঞের তাৎক্ষণিক কার্যকারিতা প্রকাশের জন্য চমৎকারভাবে প্রস্তুত ছিল। সেই ব্যাকরণকে যদি পরবর্তী যুগের পৌরাণিক বা বেদান্তিক ছাঁচে ফেলে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে বৈদিক সাহিত্যের নিজস্ব কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে যায়। শ্লাইয়ারমাখারের নির্দেশিত ব্যাকরণিক পুনর্গঠন বৈদিক ভাষার এই নিজস্ব স্বরকে অক্ষুণ্ণ রাখতে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা দেয়।

মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ও প্রাচীন রচয়িতার মানসিক পুনর্গঠন (Psychological Interpretation and Reconstructing the Ancient Author’s Mind)

শ্লাইয়ারমাখারের চিন্তার দ্বিতীয় অপরিহার্য অংশটি হলো মনস্তাত্ত্বিক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যাখ্যা। অনেকে একে লেখকের মনের ভেতর উঁকি দেওয়ার অলীক চেষ্টা বলে ভুল বোঝেন। বাস্তবে এটা কোনো রহস্যময় চর্চা নয়। শ্লাইয়ারমাখারের কাছে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার অর্থ ছিল – একজন বিশেষ মানুষ কীভাবে তার যুগের ভাষাগত উপাদানগুলোকে ব্যবহার করে তার নিজস্ব ভাবনাটি রূপ দিয়েছিলেন, সেই সৃষ্টিপ্রক্রিয়াকে অনুধাবন করা (Bowie, 2003)। তিনি একে কখনো কখনো ‘কারিগরি ব্যাখ্যা’ (Technical Interpretation) বলেও ডেকেছেন। অর্থাৎ, সাহিত্য বা বয়ান হলো এক ধরনের নির্মাণকর্ম। কোনো এক ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ বসে বসে সেই নির্মাণকাজটি করেছিলেন। বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করার অর্থ হলো, বৈদিক ঋষি (Ṛṣi) বা কবি (Kavi)-দের কোনো অপার্থিব আলোকপ্রাপ্ত সত্তা না ভেবে রক্তমাংসের ঐতিহাসিক রচয়িতা বা শিল্পী হিসেবে দেখা।

ঐতিহ্যবাহী ধর্মতত্ত্ব দাবি করে যে, বৈদিক কবিরা কোনো কিছু রচনা করেননি; তারা কেবল মহাবিশ্বে অনন্তকাল ধরে ভেসে থাকা ধ্বনিকে ধ্যানযোগে ‘দর্শন’ করেছিলেন। এই দাবিকে আধুনিক বস্তুবাদী বা ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই। বৈদিক সংহিতার পাঠ নিজেই এই অলৌকিক দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে। ঋগ্বেদের কবিরা বহু জায়গায় নিজেদের তুলনা করেছেন কাঠমিস্ত্রি বা রথ নির্মাতার সঙ্গে (Gonda, 1975)। কাঠ কেটে যেমন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে রথ তৈরি করতে হয়, তেমনি শব্দ বাছাই করে, ছন্দ মিলিয়ে তারা তাদের স্তোত্র নির্মাণ করেছিলেন। শ্লাইয়ারমাখারের পরিভাষায়, এটাই হলো লেখকের সচেতন শৈল্পিক ও মানসিক সক্রিয়তা। বৈদিক কবিরা ছিলেন দক্ষ শব্দশিল্পী, যাদের পেছনে কাজ করছিল একটি সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্যটি কোনো বায়বীয় মোক্ষ বা পরলৌকিক মুক্তি ছিল না; তা ছিল একেবারেই ইহজাগতিক ও বস্তুগত।

বৈদিক কবির মানসিক জগৎকে পুনর্গঠন করতে গেলে তাদের সমকালীন আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির দিকে চোখ ফেরাতে হয়। ঋগ্বেদের কবিরা যা কিছু চাইতেন, তা খুব স্পষ্ট ভাষায় লিখে গেছেন – প্রচুর গবাদিপশু, তেজস্বী ঘোড়া, যুদ্ধে জয়, পুত্রসন্তান এবং দীর্ঘ পরমায়ু (Elizarenkova, 1995)। কবি বা পুরোহিতরা এই স্তোত্রগুলো রচনা করতেন বিভিন্ন গোত্রপতি বা রাজার উদ্দেশ্যে, যাতে যজ্ঞের মাধ্যমে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা বা দক্ষিণা (Dakṣiṇā) পাওয়া যায়। সুতরাং, বৈদিক স্তোত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক চালিকাশক্তি ছিল যাযাবর বা আধা-যাযাবর পশুপালক সমাজের বেঁচে থাকার লড়াই এবং সম্পদ দখলের প্রতিযোগিতা (Lincoln, 1991)। শ্লাইয়ারমাখারের মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতি ব্যবহার করে যখন আমরা কবির এই অবস্থানটি বুঝতে পারি, তখন বৈদিক মন্ত্র আর কোনো রহস্যময় আধ্যাত্মিক ধোঁয়াশা থাকে না। তা হয়ে ওঠে একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণীর মানুষের বস্তুগত আকাঙ্ক্ষার শৈল্পিক রূপায়ণ।

বৈদিক কবিদের এই মানসিক পুনর্গঠন দেখায় যে, বিভিন্ন ঋষিকুল বা পরিবারের মধ্যে কাব্যরীতি ও দেবভাবনায় সূক্ষ্ম পার্থক্য ছিল। বশিষ্ঠ গোত্রের কবিতার ভাব এবং বিশ্বামিত্র গোত্রের কবিতার সুর এক নয়। শ্লাইয়ারমাখার ঠিক এই স্বাতন্ত্র্যটুকুই ধরতে চেয়েছিলেন। একজন ব্যক্তি বা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী যখন ভাষা ব্যবহার করে, তখন ভাষার সাধারণ নিয়মের ভেতর থেকেও তাদের নিজস্ব শৈলী ফুটে ওঠে। ঋগ্বেদের বিভিন্ন মণ্ডলে বিভিন্ন পরিবারের এই শৈলীগত পার্থক্যের ইতিহাস সংরক্ষিত আছে। এই মানবীয় বৈচিত্র্যকে আড়াল করে সমস্ত বৈদিক সাহিত্যকে যদি একক ও সমসত্ত্ব কোনো অলৌকিক কণ্ঠস্বর মনে করা হয়, তবে বৈদিক সমাজের ঐতিহাসিক বিকাশের রেখাটি পুরোপুরি মুছে যায়। শ্লাইয়ারমাখারের মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান আমাদের বাধ্য করে বৈদিক কবিদের তাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক ও মানসিক জটিলতাসহ প্রত্যক্ষ করতে।

হার্মেনিউটিক চক্র ও বৈদিক মন্ত্রের প্রেক্ষাপট (The Hermeneutic Circle and the Context of Vedic Mantras)

ব্যাখ্যাতত্ত্বের জগতে সবচেয়ে পরিচিত ও কার্যকর ধারণাগুলোর একটি হলো হার্মেনিউটিক চক্র (Hermeneutic Circle)। শ্লাইয়ারমাখার এই ধারণাকে একটি সুসংবদ্ধ রূপ দেন। নীতিটি খুব সাধারণ কিন্তু গভীর। কোনো রচনার কোনো একটি অংশের অর্থ বুঝতে হলে পুরো রচনার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট জানতে হবে; আবার পুরো রচনার সামগ্রিক রূপটি বুঝতে হলে তার প্রতিটি ছোট ছোট অংশকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বুঝতে হবে (Palmer, 1969)। অংশ এবং সমগ্রের এই নিরন্তর চক্রাকার আবর্তন ছাড়া কোনো সঠিক বোধদয় সম্ভব নয়। পাঠক যখন একটি একক বাক্য পড়ে, তখন সে মনে মনে পুরো বইটির একটি খসড়া অর্থ ধরে নেয়। আবার পুরো বইটি পড়া শেষ হলে সেই একক বাক্যের অর্থ নতুনভাবে পরিবর্তিত হয়। বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই হার্মেনিউটিক চক্র প্রয়োগ না করলে মারাত্মক বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

পরবর্তীকালের যাগযজ্ঞের নিয়ম সংবলিত গ্রন্থ, বিশেষ করে ব্রাহ্মণ (Brāhmaṇa) সাহিত্যে এবং মীমাংসা দর্শনে বৈদিক মন্ত্রগুলোকে তাদের মূল কাব্যিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিল। সেখানে একটি দীর্ঘ ও জটিল স্তোত্র থেকে মাত্র একটি চরণ বা বাক্যাংশ কেটে নিয়ে কোনো একটি বিশেষ যজ্ঞের নির্দেশ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। একে বলা যায় প্রসঙ্গের খণ্ডায়ন। শ্লাইয়ারমাখারের তত্ত্ব অনুসারে, এটা হলো হার্মেনিউটিক চক্রের চরম লঙ্ঘন। ঋগ্বেদের কোনো একটি বিশেষ মন্ত্রের যথার্থ ঐতিহাসিক অর্থ উদ্ধার করতে হলে প্রথমে দেখতে হবে সেই মন্ত্রটি কোন সূক্তের অন্তর্গত। সেই সূক্তটির কেন্দ্রীয় ভাবনা কী? সূক্তটি আবার কোন মণ্ডলের অংশ? সেই মণ্ডলের সামগ্রিক সামাজিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা কী ছিল? এই সমগ্রকে বাদ দিয়ে যদি কেবল যজ্ঞের প্রয়োজনে একটি মন্ত্রকে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে তার ঐতিহাসিক সত্যটি সম্পূর্ণ বিকৃত হয়ে যায় (Staal, 1989)।

বৈদিক সাহিত্যের ঐতিহাসিক স্তরবিন্যাস বুঝতেও এই হার্মেনিউটিক চক্র কাজে লাগে। ঋগ্বেদের আদি পর্বের ভূগোল ছিল প্রধানত পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের, যা সপ্তসিন্ধুর অববাহিকা নামে পরিচিত। সেই সময়ের জীবনযাত্রায় ছিল পশুপালনের প্রাধান্য ও ভ্রাম্যমাণ চরিত্র। কিন্তু পরবর্তীকালের সংহিতা এবং ব্রাহ্মণ সাহিত্যের যুগে বৈদিক সমাজ ধীরে ধীরে গাঙ্গেয় উপত্যকার দিকে সরে আসে এবং সেখানে কৃষিনির্ভর স্থায়ী বসতি ও বর্ণাশ্রমভিত্তিক জটিল সামাজিক স্তরবিন্যাস গড়ে ওঠে (Witzel, 1997)। এখন, ঋগ্বেদের একটি অংশকে যদি পরবর্তীকালের গাঙ্গেয় উপত্যকার স্থায়ী সমাজব্যবস্থার আলো দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে অর্থ সম্পূর্ণ উল্টে যাবে। সমগ্র যুগের প্রেক্ষাপটটি অংশের অর্থ নিয়ন্ত্রণ করে, আবার বিভিন্ন অংশের ক্রমবিকাশ দেখেই আমরা সমগ্র যুগের রূপান্তরকে শনাক্ত করতে পারি।

ফরাসি ভারততত্ত্ববিদ লুই রেনু তার গবেষণায় দেখিয়েছিলেন যে, বৈদিক সংহিতার মন্ত্রগুলো মূলত কোনো নিরেট যজ্ঞীয় নির্দেশ ছিল না; সেগুলো ছিল কাব্যিক ও রূপকধর্মী অভিব্যক্তি (Renou, 1957)। ব্রাহ্মণ সাহিত্যের যজ্ঞকাররা এই রূপকগুলোকে বাস্তব যজ্ঞক্রিয়ার স্থূল নির্দেশে রূপান্তর করেছিলেন। শ্লাইয়ারমাখারের হার্মেনিউটিক চক্রের ভেতর দাঁড়ালে আমরা এই রূপান্তরের ফাঁকটি ধরতে পারি। অংশকে সমগ্র থেকে ছিঁড়ে ফেলে যখন যজ্ঞের আনুষ্ঠানিকতায় ব্যবহার করা হয়েছিল, তখন কবিতার মৃত্যু ঘটেছিল এবং আচারের জন্ম হয়েছিল। একজন ধর্মনিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ গবেষকের কাজ হলো এই ছিন্ন অংশগুলোকে আবার তাদের আদি সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। সমগ্রের সাথে অংশের এই সচল যোগাযোগই বৈদিক রচনার আসল সামাজিক ও ঐতিহাসিক অভিপ্রায়কে আমাদের সামনে উন্মোচিত করতে পারে।

অপৌরুষেয়তা মতবাদ বনাম শ্লাইয়ারমাখারের ঐতিহাসিকতাবাদ (The Doctrine of Apauruṣeyatva versus Schleiermacher’s Historicism)

বৈদিক পাঠ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দার্শনিক সংঘাতটি তৈরি হয় সনাতন মীমাংসা দর্শনের সাথে আধুনিক হার্মেনিউটিক্সের। মীমাংসক দার্শনিকরা দাবি করেছিলেন যে, বেদ হলো ‘অপৌরুষেয়’ (Apauruṣeyatva), অর্থাৎ এর কোনো মানবিক বা ঐশ্বরিক রচয়িতা নেই (Clooney, 1990)। তাদের যুক্তি ছিল, বেদের কোনো রচয়িতার নাম ইতিহাসে পাওয়া যায় না এবং পিতা-পুত্রের পরম্পরায় এই ধ্বনিসমূহ আবহমান কাল ধরে একইভাবে উচ্চারিত হয়ে আসছে। শব্দ এবং অর্থের সম্পর্ক তাদের মতে শাশ্বত ও নিত্য। কোনো মানুষ এই অর্থ বা ধ্বনি তৈরি করেনি। ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে এই তত্ত্ব অত্যন্ত চতুর একটি উদ্ভাবন ছিল। কোনো পাঠের যদি কোনো রচয়িতা না থাকে, তবে সেই পাঠে কোনো মানবিক ভুলত্রুটি, পক্ষপাত বা অসম্পূর্ণতা থাকার সুযোগ থাকে না। ফলে বৈদিক আচার ও পুরোহিততন্ত্রকে সমাজের চোখে প্রশ্নাতীত ও অলঙ্ঘনীয় করে তোলা সহজ হয়েছিল (Pollock, 2006)।

শ্লাইয়ারমাখারের আধুনিক হার্মেনিউটিক্স এই ধরণের অতীন্দ্রিয় ও প্রাগৈতিহাসিক দাবিকে সরাসরি খারিজ করে দেয়। শ্লাইয়ারমাখারের মূল ভিত্তিই হলো ঐতিহাসিকতাবাদ (Historicism) (Forster, 2010)। তার তত্ত্বে কোনো বয়ান বা গ্রন্থ শূন্য থেকে অবতীর্ণ হতে পারে না। প্রতিটি পাঠের পেছনে অন্তত একজন মানুষের ইচ্ছাশক্তি, সমাজ ও ভাষা জড়িত থাকে। ভাষা কোনো শাশ্বত মহাজাগতিক কম্পন নয়; ভাষা হলো মানুষের ইতিহাসের এক নির্দিষ্ট পর্যায়ে গড়ে ওঠা সামাজিক সংকেতের সমষ্টি। শ্লাইয়ারমাখার স্পষ্ট করে বলেছেন, যেকোনো টেক্সটকে বুঝতে হলে তার রচয়িতার ঐতিহাসিক অবস্থানকে স্বীকার করতেই হবে (Schleiermacher, 1998)। অতএব, অপৌরুষেয়তার দাবি আসলে বৈদিক সাহিত্যের ওপর পরবর্তীকালে চাপিয়ে দেওয়া একটি মতাদর্শিক বর্ম, যার উদ্দেশ্য ছিল সেই পাঠের ঐতিহাসিক চরিত্র ও ক্ষমতার সম্পর্ককে ঢেকে রাখা।

অ্যাকাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, বৈদিক সংহিতাগুলোর ভেতরেই তাদের মানবিক রচয়িতাদের শত শত চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। সূক্তগুলোর শেষে প্রায়ই কবিরা নিজেদের নাম উল্লেখ করেছেন – বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র, বামদেব, ভরদ্বাজ বা দীর্ঘতমা। তারা স্পষ্ট করে বলেছেন যে তারা এই স্তোত্র নতুন করে তৈরি করেছেন, যেমন করে কোনো শিল্পী কাঠের কাজ করে (Bilimoria, 1989)। মীমাংসকরা এই সমস্ত ঐতিহাসিক নামকে অর্থহীন বা রূপক হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তাদের শাস্ত্রের চিরন্তনতা রক্ষার খাতিরে। কিন্তু শ্লাইয়ারমাখারের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা পদ্ধতি দেখায় যে, কোনো রচনার ভেতরে থাকা এই নামগুলো এবং তাদের স্থান-কালের ইঙ্গিতগুলো নিছক অলংকার নয়; এগুলো হলো সেই পাঠের উৎপত্তিস্থলের অকাট্য ঐতিহাসিক প্রমাণ।

ধর্মতত্ত্বের এই বিমূর্ত দেওয়াল ভেঙে দেওয়ার ফলে বৈদিক পাঠ একটি রক্তমাংসের মানবিক দলিলে পরিণত হয়। শ্লাইয়ারমাখার আমাদের শেখান যে, একটি পাঠকে কোনো অসীম কর্তৃত্বের আসনে না বসিয়ে তার স্থানিক ও কালিক সীমাবদ্ধতার ভেতর দেখাটাই হলো সত্যিকারের সম্মান জানানো। বৈদিক সাহিত্যের কোনো চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় অর্থ নেই। ঋগ্বেদের যুগে এই পাঠের যে অর্থ ছিল, যজুর্বেদের যুগে তা বদলে গেছে, আবার উপনিষদের যুগে গিয়ে তা আরও এক নতুন রূপ নিয়েছে। শ্লাইয়ারমাখারের ঐতিহাসিকতাবাদী লেন্স দিয়ে তাকালে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, অর্থের এই পরিবর্তনশীলতাই প্রমাণ করে বৈদিক সাহিত্য কোনো স্থির শাশ্বত বস্তু নয়; বরং তা মানুষের পরিবর্তনশীল চেতনারই এক ঐতিহাসিক দলিল। অপৌরুষেয়তার ধারণা আসলে একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থকে ইতিহাসহীন করে তোলার এক ধর্মতাত্ত্বিক প্রচেষ্টা মাত্র।

বৈদিক অর্থের পুনর্গঠন ও আধুনিক পাঠের সীমাবদ্ধতা (Reconstruction of Vedic Meaning and Limitations of Modern Reading)

শ্লাইয়ারমাখারের ব্যাখ্যাতত্ত্বের একটি বহুল আলোচিত ও উদ্দীপক সূত্র হলো – কোনো লেখককে “লেখকের চেয়েও ভালো করে বোঝা বা লেখকের নিজের উপলব্ধির চেয়ে উৎকৃষ্টভাবে অনুধাবন করা” (Schleiermacher, 1998)। কথাটা প্রথম শুনলে উদ্ধত মনে হতে পারে, কিন্তু এর ভেতরে এক গভীর তাত্ত্বিক সত্য লুকিয়ে আছে। একজন লেখক যখন লেখেন, তিনি তার সমকালীন সমস্ত সামাজিক শর্ত, অবচেতন সংস্কার এবং ভাষার অন্তর্নিহিত নিয়ম সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন থাকেন না। তিনি ভাষার ভেতরে বাস করেন বলেই ভাষার বহু অন্ধত্ব তার চোখে পড়ে না। কিন্তু শতাব্দী পরে একজন নিরপেক্ষ আধুনিক গবেষক যখন সেই রচনার মুখোমুখি হন, তখন তিনি দূর থেকে পুরো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি একসাথে দেখতে পান। বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক গবেষক বৈদিক কবির সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে এমনভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেন, যা স্বয়ং কবির পক্ষে একবারে বুঝে ওঠা সম্ভব ছিল না।

তবে এই পুনর্গঠনের পথে রয়েছে বিপুল সীমাবদ্ধতা, যা শ্লাইয়ারমাখার নিজেও জানতেন। প্রাচীন সাহিত্যের অর্থ উদ্ধার করতে গিয়ে আধুনিক পাঠক প্রায়ই নিজের সময়ের মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং যুক্তিকে প্রাচীন পাঠের ওপর চাপিয়ে দেয়। উনিশ শতকের ইউরোপীয় পণ্ডিতরা কিংবা আধুনিক ভারতের জাতীয়তাবাদী ভাবুকরা বৈদিক পাঠে অনেক সময় নিজেদের আধুনিক চিন্তা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কেউ সেখানে খুঁজেছেন আধুনিক বিজ্ঞান, কেউ বা খাঁটি একশ্বরবাদ। শ্লাইয়ারমাখারের হার্মেনিউটিক্স এই ধরনের বিকৃতির বিরুদ্ধে এক সতর্কবার্তা দেয় (Bowie, 2003)। তিনি দেখিয়েছেন, ব্যাখ্যার ভিত্তি হতে হবে কঠোর ঐতিহাসিক সহানুভূতি (Historical Empathy) এবং বস্তুনিষ্ঠ সংযম। প্রাচীন বৈদিক মানুষ কীভাবে ভাবত, কেবল তাদের ভাবনার পরিসরের ভেতরে ঢুকেই অর্থ পুনর্গঠন করতে হবে; আমাদের আধুনিক ভাবনার বোঝা তাদের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো বৈদিক সাহিত্যের সুদীর্ঘ মৌখিক ঐতিহ্যের ইতিহাস। বহু শতাব্দী ধরে এই সাহিত্য কোনো লিখিত রূপ পায়নি; গুরু-শিষ্য পরম্পরায় কেবল মুখস্থ করে এই বিপুল পরিমাণ মন্ত্র বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে যখন শাকল্যের মতো ব্যক্তিরা পদপাঠ তৈরি করে এই মন্ত্রগুলোকে সুসংবদ্ধ করলেন, তখন সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেও কিছু ভাষাগত রূপান্তর ও পরিমার্জন ঘটেছিল (Houben, 2000)। ফলে মূল রচয়িতার উচ্চারণ এবং পরবর্তীতে স্থির হওয়া পাঠের মধ্যে যে কিছুটা ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করা যায় না। শ্লাইয়ারমাখারের পাঠতাত্ত্বিক সমালোচনা পদ্ধতি আমাদের শেখায় যে, কোনো পাঠকেই অন্ধভাবে নিখুঁত বা অবিকৃত বলে ধরে নেওয়া যায় না। বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি, বিভিন্ন শাখার পাঠভেদ এবং বৈদিক ব্যাকরণের অসামঞ্জস্যগুলোকে নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করেই তবে মূল অর্থের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব।

সবশেষে বলা যায়, শ্লাইয়ারমাখারের হার্মেনিউটিক্স বৈদিক পাঠের সামনে এক বিরাট দিগন্ত খুলে দেয়, যা সনাতন ভক্তিবাদের অচলায়তনকে ভেঙে চুরমার করে। বৈদিক সাহিত্য কোনো দেবদূতের বাণী নয়, কোনো অতীন্দ্রিয় রহস্যের সিন্দুকও নয়। এটি প্রাচীন ভারতের এক দল মানুষের বেঁচে থাকার আর্তি, তাদের আনন্দ-বেদনা, তাদের সামাজিক দ্বন্দ্ব এবং প্রকৃতির সাথে তাদের লড়াইয়ের এক অসাধারণ শৈল্পিক ও ভাষাগত দলিল (Olivelle, 1998)। ব্যাকরণের প্রতিটি সূত্রের ভেতর, ছন্দবদ্ধ প্রতিটি চরণের ভেতর লুকিয়ে আছে সেই প্রাচীন মানুষের ঐতিহাসিক পদচিহ্ন। শ্লাইয়ারমাখারের দেখানো পথে হেঁটে যখন আমরা ব্যাকরণ ও ইতিহাসের যৌথ আলোতে বৈদিক মন্ত্রগুলোকে পাঠ করি, তখন ধর্মতত্ত্বের সমস্ত অলীক কুয়াশা কেটে যায়। আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে এক জীবন্ত মানবসমাজ, যাদের ভাষাই ছিল তাদের জগৎ এবং যাদের সাহিত্য ছিল সেই জগতেরই সবচেয়ে শক্তিশালী বস্তুগত প্রকাশ।

শ্লাইয়ারমাখার ও মন্ত্রের ভাষা (Schleiermacher and the Language of Mantra): শব্দার্থ, বাক্যার্থ ও সামগ্রিক পাঠ

মন্ত্রের ভাষাগত সত্তা ও অর্থহীনতার বিতর্ক (Linguistic Entity of Mantra and the Debate on Meaninglessness)

প্রাচীন কাল থেকেই মানুষের সমাজে সুর ও শব্দের এক বিচিত্র প্রভাব ছিল। মানুষ যখন কোনো বিশেষ ছন্দে কথা বলত, তখন সাধারণ কথার চেয়ে সেই সুরের আবেদন অন্যরকম শোনাত। বৈদিক সাহিত্যে এই ছন্দোবদ্ধ বা বিধিবদ্ধ বাক্যগুলোকে বলা হয়েছে মন্ত্র (Mantra)। ধর্মবিশ্বাসী মানুষের কাছে মন্ত্র মানেই এক ধরনের অতিপ্রাকৃতিক শক্তি, যা উচ্চারণ করলেই কোনো অদৃশ্য জগতের দরজা খুলে যায়। সনাতন ঐতিহ্যে মন্ত্রকে এমন এক অলৌকিক ধ্বনি হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে যার ভেতর কোনো জাগতিক অর্থ খোঁজা অপ্রয়োজনীয় বা নিষিদ্ধ। কিন্তু আধুনিক বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, কোনো ভাষাগত ধ্বনিই আকাশ থেকে পড়ে না। জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিশ শ্লাইয়ারমাখার (Friedrich Schleiermacher) তার ব্যাখ্যাতত্ত্বে স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, প্রতিটি ভাষার প্রকাশই মানুষের চিন্তা ও চেতনার বাস্তব রূপ (Schleiermacher, 1998)। মানুষ যখনই কোনো সংকেত তৈরি করে, তার পেছনে থাকে তার বাস্তব জীবনের কোনো না কোনো উদ্দেশ্য।

মন্ত্রের এই ভাষাগত রূপ নিয়ে বিশ শতকের আধুনিক বিদ্যায়তনে এক বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ভারততত্ত্ববিদ ফ্রিটস স্টাল (Frits Staal) তার বিখ্যাত গবেষণায় দাবি করেছিলেন যে, বৈদিক মন্ত্রের আসলে কোনো অর্থ নেই; এগুলো নিছক কিছু আনুষ্ঠানিক ধ্বনি মাত্র (Staal, 1989)। স্টালের মতে, বৈদিক যাগযজ্ঞে মন্ত্রের কাজ কোনো অর্থ প্রকাশ করা নয়, বরং পাখির গানের মতো বা কোনো সুরের কাঠামোর মতো নির্দিষ্ট নিয়মে উচ্চারিত হওয়া। তিনি এই ধারণার সমর্থনে প্রাচীন ভারতীয় তাত্ত্বিক কৌৎস (Kautsa)-এর মত টেনে এনেছিলেন, যিনি বলেছিলেন বৈদিক মন্ত্রগুলো অর্থহীন শব্দগুচ্ছ ছাড়া আর কিছুই নয়। স্টাল বিষয়টিকে উপস্থাপন করেছিলেন এমনভাবে যেন মন্ত্র হলো কেবল এক বিশুদ্ধ ক্রিয়া, যার সাথে মানুষের অর্থবোধের কোনো সম্পর্ক নেই। ধর্মের অন্ধ উপাসক এবং আচারসর্বস্ব তাত্ত্বিকরা এই ধরনের ব্যাখ্যায় এক ধরণের তৃপ্তি পান, কারণ অর্থহীন ঘোষণা করলে মন্ত্রের ভেতরের ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব ও মানবীয় দুর্বলতাগুলোকে আর কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হয় না।

শ্লাইয়ারমাখারের সাধারণ ব্যাখ্যাতত্ত্বের কাঠামোর সামনে স্টালের এই যুক্তি ভেঙে পড়ে। শ্লাইয়ারমাখার দেখিয়েছিলেন, যেকোনো জটিল বয়ানের একটি সুস্পষ্ট যোগাযোগমূলক অভিপ্রায় (Communicative Intent) থাকে (Bowie, 1998)। মানুষ যখন সমাজবদ্ধ হয়ে কোনো উচ্চারণ তৈরি করে, তখন সেই উচ্চারণকে তার সামাজিক ও ভাষিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করলে সেটাকে অর্থহীন মনে হতেই পারে। বৈদিক যুগে মন্ত্রগুলোকে যখন তাদের মূল কাব্যিক ও সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে পরবর্তীকালের জটিল যাগযজ্ঞের আচারে কেবল যান্ত্রিক সুর হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হলো, তখনই এই ভ্রান্তি দেখা দিল। শ্লাইয়ারমাখারের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পাঠকে যদি তার প্রাথমিক ঐতিহাসিক ব্যবহারের প্রেক্ষাপটে ফিরিয়ে নেওয়া যায়, তবে তার শব্দার্থ ও বাক্যার্থ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বৈদিক কবিরা কোনো অর্থহীন সুর ভাঁজেননি; তারা তাদের বাস্তব জীবনের আকাঙ্ক্ষা, সমাজিক সংকট এবং উপজাতীয় সংঘাতের কথা অত্যন্ত সচেতন শব্দবিন্যাসের মাধ্যমেই প্রকাশ করেছিলেন।

তাই বৈদিক মন্ত্রকে কোনো মায়াবী মন্ত্রদণ্ড বা শূন্য সুর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শ্লাইয়ারমাখারের তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, মন্ত্র হলো একটি সুসংগঠিত ভাষিক বয়ান (Linguistic Discourse) (Frank, 2004)। এর ব্যাকরণ আছে, নির্দিষ্ট পদান্বয় আছে এবং আছে এক জটিল শব্দার্থের ইতিহাস। একজন বস্তুনিষ্ঠ গবেষকের কাজ হলো এই ভাষাগত কাঠামোর ওপর জমে থাকা রহস্যের পর্দা সরিয়ে ফেলা। মন্ত্রের সুর বা ধ্বনিমাধুর্য ছিল কেবল প্রাচীন মানুষের কথা মনে রাখার এবং যৌথভাবে উচ্চারণের একটি শৈল্পিক মাধ্যম। সেই সুরের আড়ালে যে রক্তমাংসের মানুষের তৈরি করা অর্থ লুকিয়ে ছিল, আধুনিক হার্মেনিউটিক্স সেই অর্থকেই নতুন করে পাঠোদ্ধার করতে চায়। মন্ত্র কোনো অতীন্দ্রিয় রহস্য নয়, বরং তা প্রাচীন মানুষের এক সুপরিকল্পিত ভাষাগত সৃষ্টি।

শব্দার্থের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও দ্যোতনা (Historical Evolution and Connotation of Word Meaning)

শ্লাইয়ারমাখারের ব্যাখ্যাপদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো, কোনো একটি একক শব্দের অর্থ কখনো অনন্তকালের জন্য স্থির থাকে না। একটি শব্দ যে যুগে উচ্চারিত হয়েছিল, সেই যুগের সাধারণ ভাষিক ভাণ্ডারের ভেতর তার যে অবস্থান ছিল, কেবল সেখান থেকেই তার আসল অর্থ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। একে বলা যায় শব্দার্থ (Word Meaning / Lexical Semantics) সংক্রান্ত ঐতিহাসিক সতর্কতা (Schleiermacher, 1998)। বৈদিক মন্ত্রগুলো বিশ্লেষণ করতে গেলে এই নিয়মটি সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে। বৈদিক সাহিত্যের বহু শব্দ পরবর্তীতে ক্লাসিক্যাল বা পৌরাণিক সংস্কৃতে এসে তাদের আদি অর্থ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিল। পরবর্তীকালের টিকাকাররা যখন সেই পরিবর্তিত অর্থগুলো প্রাচীন মন্ত্রের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন, তখন প্রাচীন কবির আসল ভাবনাটি ঢাকা পড়ে গেছে।

একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হলো ‘ব্রহ্মন’ (Brahman) শব্দটি। পরবর্তীকালের অদ্বৈত বেদান্ত বা ভাববাদী দর্শনে এই শব্দটিকে এক নিরাকার, সর্বব্যাপী, অতীন্দ্রিয় পরমাত্মা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ধর্মবিশ্বাসী গবেষকরা এখনো ঋগ্বেদের আদি মণ্ডলেও এই শব্দের ভেতর সেই একমেবাদ্বিতীয়ম রূপটি খুঁজতে যান। কিন্তু ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ব এবং শ্লাইয়ারমাখারের ব্যাকরণগত পদ্ধতি দিয়ে ঋগ্বেদের আদি স্তরে তাকালে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। গবেষক জান গোন্দা (Jan Gonda) দেখিয়েছেন যে, ঋগ্বেদের যুগে ‘ব্রহ্মন’ শব্দের অর্থ কোনো মহাজাগতিক আত্মা ছিল না; এর আদি অর্থ ছিল এক ধরনের ছন্দোবদ্ধ স্তুতি, যা কবির ভেতর তৈরি হওয়া বিশেষ এক কাব্যিক শক্তিকে প্রকাশ করত (Gonda, 1962)। শব্দটি ইন্দো-ইউরোপীয় মূলের সাথে যুক্ত, যার অর্থ কোনো কিছু বৃদ্ধি করা বা রূপ দেওয়া। অর্থাৎ, কাঠমিস্ত্রি যেমন কাঠ দিয়ে রথ বানায়, কবি তেমনি শব্দ সাজিয়ে যে শক্তিশালী স্তোত্র নির্মাণ করতেন, সেটাই ছিল ‘ব্রহ্মন’। এটিকে কোনো রহস্যময় সত্তা না ভেবে প্রাচীন কবির ভাষাশিল্পের এক প্রকাশ হিসেবে দেখাই ঐতিহাসিক সত্যের কাছাকাছি।

একইভাবে ‘বাজ’ (Vāja) শব্দের ব্যবহারের দিকে তাকানো যায়। বৈদিক মন্ত্রে এই শব্দটি শত শত বার এসেছে। পরবর্তী যুগে একে যজ্ঞের ফল বা আধ্যাত্মিক শক্তি বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ প্রাচীন পশুপালক বৈদিক সমাজের বাস্তবতায় ‘বাজ’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ছিল যুদ্ধের মাধ্যমে ছিনিয়ে আনা গবাদিপশু, সম্পদ বা দ্রুতগতির শক্তি (Elizarenkova, 1995)। ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়া বা প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ চালিয়ে পশুসম্পদ দখল করাকে বলা হতো ‘বাজসাতয়ে’ বা বাজ লাভ করা। শ্লাইয়ারমাখার যে বিষয়টির ওপর জোর দিয়েছিলেন, তা হলো কোনো বয়ানের শব্দার্থ বুঝতে হলে সমকালীন সামাজিক জীবনের সাধারণ ভাষাতাত্ত্বিক জগৎ (Linguistic World)-কে পুনর্গঠন করতে হবে (Forster, 2010)। বৈদিক সমাজ ছিল এক গতিশীল ও সংঘাতময় পশুপালক সমাজ। তাদের ভাষার শব্দগুলোও সেই বস্তুগত জীবনের ধুলোবালি ও রক্তমাংসে গড়া। সেই শব্দগুলোকে যদি কোনো স্বর্গীয় বা শান্তিময় আধ্যাত্মিক অর্থে রূপান্তরিত করা হয়, তবে পাঠের সাথে প্রতারণা করা হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ‘মায়া’ (Māyā)। শংকরাচার্যের মায়াবাদে এই শব্দটি হয়ে উঠেছে জগতকে মিথ্যা বা অলীক প্রতিপন্ন করার প্রধান অস্ত্র। কিন্তু ঋগ্বেদের প্রাথমিক স্তরে ইন্দ্র বা বরুণের মতো দেবচরিত্রের সঙ্গে যখন ‘মায়া’ শব্দটি যুক্ত হয়, তখন তা কোনো অবাস্তব বিষয় নয়। ফিলোলজিস্ট আর্থার অ্যান্থনি ম্যাকডোনেল (Arthur Anthony Macdonell) দেখিয়েছেন যে, বৈদিক সংহিতায় এই শব্দের অর্থ ছিল কোনো বিশেষ কারিগরি দক্ষতা, কৌশল বা অদ্ভুত রূপ ধারণ করার ক্ষমতা (Macdonell, 1897)। শত্রুকে পরাস্ত করার জন্য বা সংকট থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য যে রাজনৈতিক ও যুদ্ধকৌশল দরকার হতো, তাকেই ইতিবাচক অর্থে ‘মায়া’ বলা হতো। শ্লাইয়ারমাখারের কঠোর ব্যাকরণিক ও ঐতিহাসিক পাঠপদ্ধতি আমাদের দেখায় যে, বৈদিক শব্দের ভেতর কোনো আধুনিক ভাববাদী দর্শন ঢুকিয়ে দেওয়া এক ধরনের ঐতিহাসিক অসংগতি। শব্দের আদি অর্থটিকে তার বস্তুগত মাটিতে নামিয়ে আনাই হলো হার্মেনিউটিক্সের আসল কাজ।

বাক্যার্থ ও অন্বয় কাঠামোর বোঝাপড়া (Sentence Meaning and the Structure of Syntactic Connection)

শ্লাইয়ারমাখার স্পষ্ট ভাষায় বলে গেছেন, বিচ্ছিন্ন কোনো শব্দ দিয়ে মানুষের চিন্তা পুরোপুরি প্রকাশ পায় না। মানুষ চিন্তা করে বাক্যের মাধ্যমে। তাই ব্যাখ্যার মূল একক শব্দ নয়, বরং বাক্যার্থ (Sentence Meaning) (Bowie, 1998)। একটি বাক্যের ভেতর বিভিন্ন শব্দ কীভাবে পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত হচ্ছে, তাদের ব্যাকরণিক রূপ বা অন্বয় কাঠামো কীভাবে একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তা না বুঝলে বক্তার ভাব বোঝা যায় না। বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি অত্যন্ত নাটকীয় রূপ ধারণ করে। বৈদিক সংস্কৃত হলো একটি অত্যন্ত নমনীয় ও জটিল বিভক্তিপ্রধান ভাষা। এখানে পদক্রম আধুনিক ভাষার মতো কোনো নির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা থাকে না। একটি বাক্যের উদ্দেশ্য বা কর্তা হয়তো চরণের শুরুতে বসেছে, কিন্তু তার ক্রিয়াপদটি চলে গেছে একদম শেষের চরণে। মাঝখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নানা ধরণের বিশেষণ।

প্রাচীন ভারতেও বাক্যার্থের এই জটিলতা নিয়ে ব্যাপক তর্ক হয়েছিল। পরবর্তীকালের দার্শনিক কুমারিল ভট্ট (Kumārila Bhaṭṭa) যেখানে শব্দের পৃথক পৃথক অর্থ জানার পর তাদের যুক্ত হওয়াকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন, সেখানে আরেক ভাবুক প্রভাকর মিশ্র (Prabhākara Miśra) বলেছিলেন যে মানুষ সবসময় সংযুক্ত অর্থ বা বাক্যের অর্থই আগে গ্রহণ করে (Matilal, 1990)। শ্লাইয়ারমাখারের অবস্থান ছিল এই দুইয়ের মাঝে এক চমৎকার হার্মেনিউটিক মেলবন্ধনে। তিনি জানতেন, পাঠককে শব্দের আলাদা অর্থ বুঝতে হয় বটে, কিন্তু সেই অর্থটি সবসময় বাক্যের সামগ্রিক কাঠামোর দ্বারা শাসিত হয়। বৈদিক মন্ত্রে কবিরা প্রায়ই এক ধরনের জটিল বাক্যগঠন বা হাইপারবেটন ব্যবহার করতেন, যেখানে পদগুলো ছড়িয়ে থাকত এক বিশেষ কাব্যিক কৌশলে। এই অন্বয়কে কোনো আধুনিক সরল বাক্যের ছাঁচে জোর করে সাজাতে গেলে মূল বাক্যের সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনাটি নষ্ট হয়ে যায়।

বৈদিক সাহিত্যের যাগযজ্ঞকেন্দ্রিক গ্রন্থগুলোতে এই অন্বয় বা ব্যাকরণিক সম্পর্ককে মারাত্মকভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। পুরোহিতরা তাদের নিজস্ব আচারের প্রয়োজনে একটি দীর্ঘ ও জটিল মন্ত্র থেকে মাঝখানের একটি বাক্যাংশ কেটে নিয়ে স্বতন্ত্র এক মন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করতেন। ফলে সেই বিচ্ছিন্ন অংশের মূল বাক্যার্থ বদলে গিয়ে আচারের নির্দেশ হয়ে দাঁড়াত। শ্লাইয়ারমাখারের পদ্ধতি ঠিক এই জায়গাটিতে বাধা দেয় (Schleiermacher, 1998)। তিনি দেখান, কোনো বাক্যাংশের অর্থ তার মূল বাক্যের সামগ্রিক উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, বৈদিক স্তোত্রে যখন কোনো দেবতাকে আহ্বান জানানো হয়, তখন সেখানে থাকে তিনটি সুস্পষ্ট বাক্যিক অংশ – দেবতার অতীতের কোনো বীরত্বগাথা স্মরণ করা, বর্তমান সংকটে তার উপস্থিতির আকাঙ্ক্ষা এবং বিনিময়ে তাকে কোনো সোমরস বা স্তুতি নিবেদন করা। এই তিনটি অংশ মিলেই একটি সম্পূর্ণ বাক্যার্থ তৈরি করে, যা ছিল মূলত দুই পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তির ভাষা।

এই বাক্যিক কাঠামোটি পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যায়, বৈদিক কবিরা কোনো অবাস্তব স্তোত্রপাঠ করতেন না। তাদের ভাষা ছিল এক ধরনের যুক্তিনির্ভর দরকষাকষি। গবেষক মাইকেল উইটজেল (Michael Witzel) দেখিয়েছেন যে, বৈদিক বাক্যগঠনে শর্তবাচক বা সাবজাংক্টিভ রূপের যে বিপুল ব্যবহার রয়েছে, তা দেখায় যে কবিরা তাদের দেবতাকে কোনো স্থির পরম সত্য হিসেবে ভাবতেন না (Witzel, 1995)। তারা বলতেন, ‘যদি তুমি অতীতে অমুক শত্রুকে ধ্বংস করে থাকো, তবে আজও আমাদের এই যুদ্ধে সাহায্য করো’। এই দ্বান্দ্বিক বাক্যার্থটি উন্মোচিত হয় কেবল তখনই, যখন আমরা মন্ত্রের পুরো ব্যাকরণিক অন্বয়টিকে অক্ষত রেখে পাঠ করি। টুকরো টুকরো করে মন্ত্র পড়া হলো আসলে ভাষার প্রাণটিকে হত্যা করা। শ্লাইয়ারমাখার এই খণ্ডিত পাঠের হাত থেকে পাঠকে রক্ষা করে তার সম্পূর্ণ বাক্যার্থকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার পথ দেখান।

সামগ্রিক পাঠ ও নান্দনিক অখণ্ডতা (Holistic Reading and Aesthetic Integrity)

শব্দ ও বাক্যের স্তর পেরিয়ে শ্লাইয়ারমাখার যে বিষয়টিতে পৌঁছাতে চেয়েছিলেন, তা হলো সামগ্রিক পাঠ (Holistic Reading)। তার বিখ্যাত বক্তব্য হলো, কোনো রচনার কোনো একটি খণ্ডকে বুঝতে হলে যেমন সমগ্র রচনাটিকে জানা দরকার, তেমনি সমগ্রকে জানতে হলে প্রতিটি ক্ষুদ্র খণ্ডকে বোঝা দরকার (Palmer, 1969)। বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই সামগ্রিক পাঠের অভাব সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। শতাব্দী ধরে বৈদিক মন্ত্রগুলোকে দেখা হয়েছে বিচ্ছিন্ন কিছু জাদুমন্ত্র বা যজ্ঞের উপকরণ হিসেবে। অথচ ঋগ্বেদের মতো সংহিতায় সংকলিত প্রতিটি সূক্ত (Hymn) ছিল একেকটি পূর্ণাঙ্গ, সুপরিকল্পিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সাহিত্যকর্ম। বৈদিক কবিরা কোনো বিচ্ছিন্ন বাক্য রচনা করতেন না; তারা একটি পুরো সূক্তকে একটি জৈব কাঠামোর মতো গড়ে তুলতেন।

শ্লাইয়ারমাখার একটি টেক্সটকে একটি জীবন্ত দেহের সঙ্গে তুলনা করতেন, যেখানে প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল (Schleiermacher, 1998)। একটি বৈদিক সূক্তের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট মানসিক যাত্রাপথ থাকে। কবি কীভাবে একটি দৃশ্য দিয়ে শুরু করছেন, কীভাবে সেখানে উপমার বিস্তার ঘটাচ্ছেন এবং কীভাবে সমাপ্তি টানছেন – এই পুরো পরিক্রমাটি না দেখলে কোনো একক চরণের তাৎপর্য বোঝা যায় না। উদাহরণ হিসেবে ঋগ্বেদের বিখ্যাত ‘নাসদীয় সূক্ত’ (Nāsadīya Sūkta)-এর কথা ভাবা যেতে পারে। এই সূক্তের মাঝখান থেকে কোনো একটি লাইন তুলে নিয়ে যদি কেউ দাবি করে যে বৈদিক মানুষ সব জেনে ফেলেছিল, তবে ভুল হবে। এই সূক্তটির শক্তি লুকিয়ে আছে তার সামগ্রিক সংশয়বাদী বয়ানে। কবি শুরু করেছিলেন সৃষ্টির আগের শূন্যতার কথা বলে এবং শেষ করেছিলেন এই বলে যে স্বয়ং স্বর্গের অধিপতিও হয়তো জানে না এই সৃষ্টি কোথা থেকে এলো, অথবা হয়তো সে নিজেও জানে না (Jamison & Brereton, 2014)। এই সামগ্রিক পাঠটি করলেই বোঝা যায় যে, প্রাচীন বৈদিক সমাজে কোনো প্রতিষ্ঠিত অন্ধবিশ্বাস ছিল না; ছিল এক গভীর মানবীয় সংশয় ও জিজ্ঞাসা।

পরবর্তী যুগের বৈদিক আচারবিদরা এই সূক্তগুলোর নান্দনিক অখণ্ডতা (Aesthetic Integrity) সম্পূর্ণ চুরমার করে দিয়েছিলেন। যজ্ঞের সুবিধার জন্য তারা দশটি আলাদা সূক্তের দশটি চরণ এনে একটি কৃত্রিম স্তোত্র বানিয়ে নিতেন। ফলে কবির যে নিজস্ব একটি সৃষ্টিশীল মন ছিল, যে মানসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেই পুরো সূক্তটি জন্ম নিয়েছিল, তা পুরোপুরি হারিয়ে যেত। শ্লাইয়ারমাখারের মনস্তাত্ত্বিক হার্মেনিউটিক্স এই বিকৃতির বিরুদ্ধে এক বড় প্রতিরোধ তৈরি করে। তিনি বলেন, ব্যাখ্যার লক্ষ্য হলো রচয়িতার সেই মানসিক ঐক্যের জায়গায় পৌঁছানো, যা দিয়ে তিনি এই সমগ্র কাজটি তৈরি করেছিলেন (Frank, 2004)।

অতএব, বৈদিক মন্ত্রের সামগ্রিক পাঠ কোনো বায়বীয় আধ্যাত্মিক চর্চা নয়। এটা হলো একটি বিশুদ্ধ সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক বিচার। একটি সূক্ত কোন ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছিল, তাতে কোন বিশেষ ঋষিকুলের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করছিল এবং পুরো কবিতাটিতে কী ধরনের উপমা ব্যবহার করা হয়েছে – এগুলো সবই সেই সামগ্রিক পাঠের উপাদান। গবেষক স্টেফানি জ্যামিসন (Stephanie Jamison) তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, বৈদিক স্তোত্রগুলোর ভেতরের রূপকগুলো একে অপরকে ব্যাখ্যা করে (Jamison, 2007)। সূক্তের প্রথমার্ধের একটি প্রতীক দ্বিতীয়ার্ধের আরেকটি ঘটনার চাবি হয়ে দাঁড়ায়। পুরো সূক্তটিকে একসঙ্গে না পড়লে এই অভ্যন্তরীণ যোগাযোগটি অন্ধের মতোই এড়িয়ে যেতে হয়। শ্লাইয়ারমাখারের এই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বৈদিক সাহিত্যকে যজ্ঞের যান্ত্রিক খণ্ডায়ন থেকে মুক্ত করে একটি মহান ঐতিহাসিক সাহিত্যের মর্যাদায় ফিরিয়ে দেয়।

ক্রিয়াপর ভাষা বনাম বর্ণনামূলক বয়ান (Performative Language versus Descriptive Discourse)

বৈদিক মন্ত্র বোঝার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় জটিলতা হলো ভাষার কার্যকারিতার ধরন। সব ভাষা কেবল কোনো কিছুর বর্ণনা দেয় না; কিছু ভাষা নিজেই একটি কাজের সূচনা করে। ভাষাদর্শনে একে বলা হয় ক্রিয়াপর ভাষা (Performative Language), যা কোনো তথ্য দেওয়ার চেয়ে কোনো বাস্তব ক্রিয়া সম্পাদন করতে বেশি আগ্রহী (Austin, 1962)। বৈদিক মন্ত্রগুলো নিছক প্রকৃতির শোভা বা কোনো কাল্পনিক দেবতার রূপ বর্ণনা করে সময় কাটাত না। এই মন্ত্রগুলো উচ্চারিত হতো একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উপলক্ষে, যার উদ্দেশ্য ছিল কিছু বৈষয়িক ফল লাভ করা। শ্লাইয়ারমাখার যদিও ভাষার মানসিক ও ব্যাকরণিক প্রকাশের ওপর জোর দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি এ কথাও জানতেন যে প্রতিটি ভাষা ব্যবহারের পেছনে কাজ করে বক্তার একটি ব্যবহারিক প্ররোচনা বা প্রাগম্যাটিক উদ্দেশ্য (Pragmatic Purpose) (Schleiermacher, 1998)।

বৈদিক সাহিত্যের যাগযজ্ঞকেন্দ্রিক অংশগুলোতে মন্ত্রের এই ক্রিয়াপর চরিত্রটি খুব প্রকট হয়ে ওঠে। যখন পুরোহিত যজ্ঞের আগুনে ঘি ঢেলে বলতেন ‘স্বাহা’ (Svāhā), তখন তিনি কোনো নিছক শব্দ ছুড়ে দিচ্ছেন না; তিনি একটি সামাজিক চুক্তি সম্পাদন করছেন। বৈদিক মানুষ বিশ্বাস করত যে, মানুষের দেওয়া উপহার এবং প্রকৃতির বা দেবচরিত্রের দেওয়া সুরক্ষার মধ্যে একটি পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। প্রাচীন রোমানদের মতো তাদেরও মূল নীতি ছিল ‘দো উত দেস বা আমি দিচ্ছি যাতে তুমি দাও’ (Mauss, 1954)। সুতরাং, মন্ত্রের ভাষা ছিল এক ধরণের আনুষ্ঠানিক দরপত্র। এই ভাষায় কোনো ভক্তিগদগদ আত্মসমর্পণ ছিল না; ছিল দুটি সমমর্যাদার পক্ষের মধ্যে এক ধরনের চুক্তি। শ্লাইয়ারমাখারের হার্মেনিউটিক্স দিয়ে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এই মন্ত্রগুলোর ভেতর কাজ করছিল মানুষের বেঁচে থাকার এক কঠিন সামাজিক কৌশল, যাকে ধর্মের আলখাল্লা পরিয়ে পবিত্র করা হয়েছিল।

ভাষাদর্শনের আধুনিক তাত্ত্বিকরা দেখিয়েছেন যে, মন্ত্রের মতো ক্রিয়াপর উচ্চারণে একটি সামাজিক কর্তৃত্বের প্রয়োজন হয় (Searle, 1969)। যে কেউ রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোনো মন্ত্র উচ্চারণ করলে প্রাচীন সমাজ তাকে গ্রাহ্য করত না। এর জন্য লাগত একজন নির্দিষ্ট গোত্রের পুরোহিত, একটি প্রস্তুত করা যজ্ঞভূমি এবং নির্দিষ্ট দক্ষিণা। অর্থাৎ, মন্ত্রের ভাষার কার্যকারিতা কোনো অলৌকিক শব্দতরঙ্গের ভেতর ছিল না; তা ছিল সেই সমাজের প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে। শ্লাইয়ারমাখারের ঐতিহাসিক পুনর্গঠন পদ্ধতি ব্যবহার করে যখন আমরা এই প্রেক্ষাপটটি উন্মোচন করি, তখন ধর্মের সমস্ত মায়াজাল খসে পড়ে। আমরা দেখতে পাই, সমাজের শাসক বা গোত্রপতি এবং পুরোহিত শ্রেণীর যৌথ স্বার্থেই এই মন্ত্রের ভাষাকে এত দুর্ভেদ্য ও অকাট্য করে তোলা হয়েছিল।

এই ক্রিয়াপর চরিত্রের আড়ালে যে বর্ণনামূলক বয়ান (Descriptive Discourse) লুকানো ছিল, তাও উপেক্ষা করার মতো নয়। অনেক মন্ত্রে তৎকালীন রাজনৈতিক সংঘাতের নিখুঁত বিবরণ রয়েছে। দশ রাজার যুদ্ধের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো বৈদিক মন্ত্রের ভেতরেই বর্ণিত হয়েছে। তবে সেই বর্ণনাগুলো এসেছে দেবতাদের সহায়তার কাহিনির ছদ্মবেশে। পুরোহিতরা তাদের পৃষ্ঠপোষক রাজার জয়কে দেবতাদের দান হিসেবে উপস্থাপন করতেন যাতে রাজার বৈধতা তৈরি হয় এবং বিনিময়ে পুরোহিতের কর্তৃত্ব সুসংহত হয় (Lincoln, 1991)। শ্লাইয়ারমাখারের দ্বৈত পদ্ধতি – ব্যাকরণ ও মনস্তত্ত্ব – দিয়ে তাকালে আমরা একাধারে শব্দের রূপটি দেখতে পাই এবং সেই সাথে ধরতে পারি রচয়িতার সেই রাজনৈতিক অভিসন্ধি। মন্ত্র তখন আর কোনো স্বর্গীয় স্তোত্র থাকে না; তা হয়ে ওঠে ক্ষমতা, আধিপত্য এবং সামাজিক সম্পদ বণ্টনের এক জীবন্ত ঐতিহাসিক দলিল।

আধুনিক হার্মেনিউটিক্স ও মন্ত্রের নির্মোহ অবলোকন (Modern Hermeneutics and the Objective Demystification of Mantra)

আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুগে বৈদিক মন্ত্রের আলোচনা কোনো ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুভূতির অংশ হতে পারে না। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন এবং নির্মোহ গবেষকের কাছে বৈদিক সাহিত্য হলো একটি প্রাচীন সভ্যতার সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক স্মারক। সনাতন ধর্মতত্ত্ব শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে শব্দব্রহ্ম (Śabdabrahman) বা শব্দের মহাজাগতিক স্পন্দনের তত্ত্ব প্রচার করেছে, হার্মেনিউটিক্স তার সমস্ত ভিত্তিহীন দাবিকে যুক্তি ও ইতিহাসের আলোতে ভেঙে দেয়। কোনো শব্দের ভেতরেই কোনো রহস্যময় শক্তি ঘুমিয়ে থাকে না। শব্দের অর্থ নির্ধারণ করে মানুষ এবং তা টিকে থাকে মানুষের সামাজিক ব্যবহারের ওপর ভর করে (Matilal, 1990)। শ্লাইয়ারমাখারের হাত ধরে যে আধুনিক হার্মেনিউটিক্সের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার আসল কাজই ছিল এই ধরনের অতীন্দ্রিয় কুয়াশাকে দূর করে পাঠকে তার মানবিক বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনা।

বৈদিক মন্ত্রের ওপর যখন এই ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্লেষণ চালানো হয়, তখন তার আসল তাৎপর্যটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আমরা বুঝতে পারি, ব্রোঞ্জ ও লৌহযুগের একদল মানুষ কীভাবে তাদের চারপাশের প্রতিকূল প্রকৃতি, হিংস্র বন্যপ্রাণী, অজানা রোগবালাই এবং প্রতিপক্ষ মানবগোষ্ঠীর সাথে লড়াই করে টিকে থাকার চেষ্টা করেছিল। তারা আকাশকে ভয় পেত, বজ্রপাত দেখে চমকে উঠত, আর জল ও আলোর জন্য ব্যাকুল হতো। সেই ভয় ও ব্যাকুলতা থেকেই তারা তৈরি করেছিল এই ভাষা (Holdrege, 1996)। তারা মেঘের ভেতর দানব দেখেছিল এবং সেই দানবকে হত্যা করার জন্য ইন্দ্র নামের এক কাল্পনিক নায়কের বন্দনা করেছিল। এটি কোনো পরম সত্য নয়; এটি হলো প্রাক-বৈজ্ঞানিক যুগের মানুষের এক কাব্যিক ও অসহায় প্রয়াস। শ্লাইয়ারমাখারের মনস্তাত্ত্বিক পুনর্গঠন আমাদের শেখায় কীভাবে একজন আদিম কবির এই ভয় ও আশাকে কোনো অলৌকিক তকমা না দিয়ে একটি মানবিক সংকট হিসেবে দেখতে হয়।

একই সাথে, আধুনিক হার্মেনিউটিক্স আমাদের সতর্ক করে যাতে আমরা কোনো প্রাচীন পাঠের ওপর আমাদের আজকের যুগের নীতি বা বিজ্ঞানকে জোর করে চাপিয়ে না দিই। আধুনিক যুগের কিছু ভাবুক বৈদিক সাহিত্যের মন্ত্রের ভেতর পরমাণু বিজ্ঞান বা আধুনিক পদার্থবিদ্যার সূত্র আবিষ্কারের দাবি করেন, যা অত্যন্ত হাস্যকর ও অবৈজ্ঞানিক। শ্লাইয়ারমাখার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, একজন রচয়িতাকে তার নিজস্ব ঐতিহাসিক সীমানার ভেতর দাঁড়িয়েই বুঝতে হবে (Schleiermacher, 1998)। তিন হাজার বছর আগের একজন বৈদিক কবি কোয়ান্টাম মেকানিক্স জানতেন না; তিনি জানতেন কীভাবে গরু চরাতে হয়, কীভাবে সোমরস ছেঁচে পানীয় বানাতে হয় এবং কীভাবে ঘোড়ার রথ চালাতে হয়। তার মন্ত্রের ভাষা এই বাস্তবতার বাইরে এক পা-ও ফেলতে পারে না। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই বৈদিক সাহিত্যকে পাঠ করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, শ্লাইয়ারমাখারের ব্যাকরণ, বাক্যার্থ ও সামগ্রিক পাঠের সমন্বিত মডেলটি বৈদিক সাহিত্যের মূল্যায়নে একটি শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষ হাতিয়ার। এটি পাঠককে কোনো ধর্মীয় মোহের ফাঁদে পড়তে দেয় না, আবার প্রাচীন সাহিত্যের জটিল সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকেও অস্বীকার করে না। মন্ত্রের ভাষা হলো মানুষের তৈরি ভাষা – তার ভুলত্রুটি, তার স্বার্থপরতা, তার শ্রেণিগত পক্ষপাত এবং তার অপরিসীম কল্পনাশক্তি নিয়েই সেই ভাষা রচিত হয়েছিল। এই বস্তুনিষ্ঠ উপলব্ধিতে পৌঁছানোই আধুনিক অ্যাকাডেমিক হার্মেনিউটিক্সের আসল সার্থকতা। যখন আমরা বেদকে কোনো পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হিসেবে নয়, বরং মানব সভ্যতার প্রথম দিকের এক জটিল ভাষাগত ও সামাজিক অভিজ্ঞান হিসেবে পাঠ করি, তখনই তার প্রকৃত ঐতিহাসিক মূল্যায়ন সম্ভব হয়।

ডিলথাই ও বৈদিক জীবনজগৎ (Dilthey and the Vedic Lifeworld): অভিজ্ঞতা, সমাজ ও ঐতিহাসিক বোঝাপড়া

মানববিজ্ঞানের স্বাতন্ত্র্য ও ডিলথাইয়ের ব্যাখ্যাপদ্ধতি (Autonomy of Human Sciences and Dilthey’s Interpretive Method)

উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের জয়জয়কার চলছিল, তখন মানুষের তৈরি ইতিহাস, সমাজ ও সাহিত্য বোঝার পদ্ধতি নিয়ে এক গভীর সংকট তৈরি হয়। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে, পদার্থবিজ্ঞান বা রসায়নের মতো কার্যকর কার্যকারণ সূত্র দিয়েই মানুষের আচার-আচরণ ও চিন্তার ইতিহাস মেপে ফেলা সম্ভব। ঠিক এই বিভ্রান্তির মুখে দাঁড়িয়ে জার্মান দার্শনিক উইলহেম ডিলথাই (Wilhelm Dilthey) এক যুগান্তকারী বিভাজন রেখা টানেন। তিনি স্পষ্ট করে দেখান যে, প্রাকৃতিক জগতের ঘটনাবলীকে আমরা বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করে ব্যাখ্যা করি, কিন্তু মানুষের তৈরি জগতকে ভেতর থেকে উপলব্ধি করতে হয় (Dilthey, 1989)। এখান থেকেই জন্ম নেয় প্রকৃতিবিজ্ঞান (Naturwissenschaften) এবং মানববিজ্ঞান (Geisteswissenschaften)-এর মধ্যকার তাত্ত্বিক পার্থক্য। ডিলথাইয়ের এই বিভাজন বৈদিক সাহিত্যের মতো প্রাচীন পাঠকে বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী এক তাত্ত্বিক ভিত্তি এনে দেয়।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের লক্ষ্য হলো ব্যাখ্যা করা (Explanation / Erklären), যার মূল কাজ কার্যকারণ সম্পর্ক খুঁজে বের করা। কিন্তু মানুষের ইতিহাস, সাহিত্য বা ধর্মীয় আচার কোনো ভৌত কণার সংঘাত নয়। একে জানতে হলে প্রয়োজন বোঝাপড়া (Understanding / Verstehen) (Ermarth, 1978)। বৈদিক সাহিত্যকে যখন সনাতন ধর্মীয় বৃত্তে পাঠ করা হয়, তখন সেখানে অলৌকিক বিশ্বাস কাজ করে। আবার আধুনিক যুগে অনেকে একে কেবল প্রাচীন কিছু অন্ধবিশ্বাসের যান্ত্রিক সংগ্রহ হিসেবে দাগিয়ে দেন। ডিলথাইয়ের পদ্ধতি এই দুই অবস্থানকেই প্রত্যাখ্যান করে। বৈদিক সাহিত্য হলো এক বিশেষ ঐতিহাসিক পর্যায়ের মানুষের অভিজ্ঞতা ও সামাজিক চেতনার ফসল। ডিলথাইয়ের তত্ত্বে মানুষের যেকোনো সাংস্কৃতিক সৃষ্টিকে বুঝতে হলে সেই মানুষের জীবনের ভেতরে প্রবেশ করতে হয়, তাদের ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতকে জানতে হয়।

শ্লাইয়ারমাখার যেখানে ব্যক্তির মানসিক সৃষ্টিশীলতা ও ভাষার ব্যাকরণের ওপর বেশি নজর দিয়েছিলেন, ডিলথাই সেখানে পাঠকে আরও বড় এক ক্যানভাসে স্থাপন করলেন। তিনি বললেন, কোনো পাঠ কেবল একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত মস্তিষ্কের খেলা নয়; তা হলো একটি সমগ্র সংস্কৃতির ঐতিহাসিক প্রকাশ (Makkreel, 1992)। বৈদিক সংহিতার মন্ত্রগুলো কোনো একজন কবির বিচ্ছিন্ন খেয়ালখুশি ছিল না। সেই যুগের মানুষ কীভাবে দিন কাটাত, কীভাবে তারা বেঁচে থাকার লড়াই করত এবং কীসের ভয়ে তারা প্রকৃতির সামনে মাথা নত করত – এই সমস্ত কিছু মিলেই তৈরি হয়েছিল তাদের চিন্তার কাঠামো। ডিলথাইয়ের মানববিজ্ঞানের স্বাতন্ত্র্য এই ঐতিহাসিক সত্যটিকে প্রতিষ্ঠিত করে যে, বৈদিক সাহিত্যকে কোনো শাশ্বত সত্যের মানদণ্ডে বিচার করা অর্থহীন। একে বিচার করতে হবে সেই সময়ের মানবীয় অভিজ্ঞতার বাস্তব দলিল হিসেবে।

ডিলথাইয়ের প্রভাবশালী গ্রন্থ ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য হিউম্যান সায়েন্সেস (Introduction to the Human Sciences)-এ তিনি যুক্তির ঐতিহাসিকতাকে প্রাধান্য দেন (Dilthey, 1989)। কান্ট যেখানে মানবীয় বুদ্ধিকে একটি স্থির ও সর্বজনীন ছাঁচে ফেলেছিলেন, ডিলথাই সেখানে বললেন যে মানুষের চেতনা সময়ের সাথে সাথে বিবর্তিত হয়। বৈদিক মানুষের চেতনা আমাদের আধুনিক বৈজ্ঞানিক চেতনার চেয়ে গুণগতভাবে আলাদা ছিল। কিন্তু সেই পার্থক্য কোনো অলৌকিকতার কারণে নয়, বরং তাদের জীবনযাপনের বস্তুগত ও ঐতিহাসিক ভিন্নতার কারণে। মানববিজ্ঞানের এই স্বকীয় পদ্ধতি আমাদের শেখায় কীভাবে বৈদিক সাহিত্যের পাঠোদ্ধার করতে গিয়ে কোনো আধুনিক বা আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ চাপিয়ে না দিয়ে নির্মোহভাবে প্রাচীন মানুষের চিন্তা ও অভিজ্ঞতার জগতে প্রবেশ করতে হয়।

জীবন্ত অভিজ্ঞতা ও বৈদিক চেতনার উৎস (Lived Experience and the Source of Vedic Consciousness)

ডিলথাইয়ের দর্শনের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধারণা হলো ‘অভিজ্ঞতা, অভিব্যক্তি ও বোঝাপড়া বা এর্লেবনিস, আউসড্রুক উন্ড ভেরস্টেহেন’-এর অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র (Dilthey, 2002)। তার মতে, মানুষের জীবন কোনো বিমূর্ত ধারণা থেকে শুরু হয় না; শুরু হয় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে তিনি বলেছেন জীবন্ত অভিজ্ঞতা (Lived Experience / Erlebnis)। কোনো মানুষ যখন কোনো সংকটে পড়ে, আনন্দ পায় বা শোকগ্রস্ত হয়, তখন সেই অনুভূতির একটি বাস্তব রূপ তৈরি হয়। এরপর মানুষ সেই অনুভূতিকে রূপ দেয় কোনো ভাষায়, কোনো শিল্পে কিংবা কোনো আচারে। ডিলথাই একে বলেন অভিব্যক্তি (Expression / Ausdruck)। একজন পাঠকের কাজ হলো সেই অভিব্যক্তি থেকে উল্টো পথে হেঁটে মূল জীবন্ত অভিজ্ঞতাটিকে আবিষ্কার বা পুনর্গঠন করা। বৈদিক মন্ত্রের ক্ষেত্রে এই তিনটি ধাপকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি।

বৈদিক কবিরা যেসব স্তোত্র রচনা করেছিলেন, সেগুলোর পেছনে কোনো আসমানী বার্তা কাজ করেনি; কাজ করেছিল তাদের প্রাত্যহিক জীবনের তীব্র অভিজ্ঞতা। ব্রোঞ্জ ও প্রাথমিক লৌহযুগের সেই সমাজে রোগব্যাধি, খরা, শীত, অন্ধকার এবং প্রতিপক্ষ মানবগোষ্ঠীর আক্রমণ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। প্রকৃতির এই অনিশ্চয়তা তাদের ভেতর গভীর ভয়ের জন্ম দিয়েছিল। সেই ভয় এবং একই সাথে প্রকৃতির উর্বরতা দেখে তৈরি হওয়া বিস্ময় থেকেই জন্ম নিয়েছিল তাদের জীবন্ত অভিজ্ঞতা (Rau, 1957)। তারা যখন দেখত গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে আর জল শুকিয়ে যাচ্ছে, তখন তাদের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ত। এই বাস্তব কষ্ট ও সংকটের অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল খরাকে এক দানব হিসেবে কল্পনা করার প্রবণতা, যাকে তারা নাম দিয়েছিল বৃত্র। মন্ত্রগুলো ছিল এই তীব্র সংকটেরই সাহিত্যিক ও আনুষ্ঠানিক অভিব্যক্তি।

এখানে কোনো অতিলৌকিকতার জায়গা নেই। ডিলথাইয়ের তত্ত্বে মানুষের তৈরি প্রতীক হলো তার সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতার এক ধরনের ঘনীভূত রূপ (Makkreel, 1992)। বৈদিক মানুষ যখন ইন্দ্রকে ডাকছে, তখন সে কোনো স্বর্গীয় সিংহাসনে বসা রাজাকে ডাকছে না; সে ডাকছে এমন এক শক্তিকে যা মেঘকে ভেঙে জল নামিয়ে আনতে পারে। তাদের এই আকুতি অত্যন্ত বাস্তব ও ইহজাগতিক। তাদের জীবন্ত অভিজ্ঞতার কেন্দ্রীয় অংশ জুড়ে ছিল গবাদিপশু। কারণ পশুই ছিল সেই যুগে খাদ্যের উৎস, দুধের জোগানদার এবং বিনিময়ের প্রধান মাধ্যম। তাই বৈদিক সাহিত্যের পরতে পরতে গরুর উপমা, অশ্বের বন্দনা এবং চারণভূমির বর্ণনা ছড়িয়ে রয়েছে। একজন নিরপেক্ষ গবেষক যখন এই মন্ত্রগুলো পড়েন, তখন তিনি কোনো আধ্যাত্মিক তত্ত্ব খুঁজে পান না; তিনি দেখতে পান একদল পশুপালক মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার তীব্র আর্তি।

ডিলথাই দেখান যে, মানুষের অভিজ্ঞতা যখন ভাষায় রূপ নেয়, তখন তা কেবল আবেগের প্রকাশ থাকে না; তা একটি সামাজিক সম্পদে পরিণত হয়। বৈদিক কবিরা তাদের ব্যক্তিগত ভয় ও আশাকে এমন এক যৌথ রূপ দিয়েছিলেন যা পুরো গোত্রের টিকে থাকার শক্তি হয়ে উঠেছিল (Heesterman, 1985)। যজ্ঞের আগুনে ঘৃতাহুতি দেওয়ার সময় যে মন্ত্রগুলো পড়া হতো, সেগুলো ছিল প্রকৃতির সাথে মানুষের এক ধরণের বোঝাপড়া করার চেষ্টা। আধুনিক বিজ্ঞানের আলো থেকে দেখলে আমরা জানি যে মন্ত্র পড়ে বৃষ্টি নামানো যায় না। কিন্তু ডিলথাইয়ের হার্মেনিউটিক্স আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, প্রাক-বৈজ্ঞানিক যুগে প্রকৃতির নির্মমতার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ কেন এই পথ বেছে নিয়েছিল। এটা ছিল তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রামের একটি অত্যন্ত মানবিক ও ঐতিহাসিক অভিব্যক্তি।

অভিব্যক্তি হিসেবে যজ্ঞ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান (Ritual and Social Institutions as Expression)

ডিলথাই তার পরবর্তী জীবনে হেগেলের একটি ধারণাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, যা তার ব্যাখ্যাতত্ত্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধারণাটি হলো বস্তুনিষ্ঠ চেতনা (Objective Spirit / objektiver Geist) (Dilthey, 2002)। হেগেল একে দেখেছিলেন পরমাত্মার ঐতিহাসিক প্রকাশ হিসেবে। কিন্তু ডিলথাই সমস্ত অধিবিদ্যা বাদ দিয়ে একে একটি সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতাত্ত্বিক চরিত্র দেন। তার মতে, মানুষ তার চিন্তা, বিশ্বাস ও সামাজিক সম্পর্কগুলোকে যেসব বাহ্যিক প্রতিষ্ঠানের ভেতর মূর্ত করে তোলে – যেমন আইন, রাষ্ট্র, রীতিনীতি, ভাষা এবং ধর্মীয় আচার – সেগুলোই হলো বস্তুনিষ্ঠ চেতনা। বৈদিক সাহিত্যে বর্ণিত যাগযজ্ঞ, যা বহু শতাব্দী ধরে ভারতীয় ধর্মতত্ত্বের মূল ভিত্তি হয়ে ছিল, তা আসলে কোনো ঐশ্বরিক নিয়ম নয়; তা ছিল বৈদিক সমাজের বস্তুনিষ্ঠ চেতনারই এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

বৈদিক যাগযজ্ঞ বা আচারকে সনাতন ধারায় দেখা হতো মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে। ভাববাদী পন্ডিতরা একে কসমিক অর্ডারের সাথে যুক্ত করে এক ধরণের পবিত্রতা আরোপ করতেন। কিন্তু ডিলথাইয়ের হার্মেনিউটিক্স দিয়ে বিচার করলে দেখা যায়, বৈদিক যজ্ঞ (Sacrifice / Ritual) ছিল সেই সমাজের অর্থনৈতিক লেনদেন ও সামাজিক সংহতি রক্ষার প্রধান মাধ্যম (Sharma, 1983)। যজ্ঞ কোনো বায়বীয় আধ্যাত্মিক ঘটনা ছিল না; সেখানে শত শত পশু জবাই করা হতো, বিপুল পরিমাণ শস্য পোড়ানো হতো এবং সোমরস প্রস্তুত করা হতো। এই আচারের মধ্য দিয়ে তৎকালীন গোত্রপতিরা তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন করত এবং সংগৃহীত উদ্বৃত্ত সম্পদ পুরোহিতদের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে নিজেদের সামাজিক বৈধতা নিশ্চিত করত। যজ্ঞ ছিল তৎকালীন পশুপালক ও প্রাথমিক কৃষিভিত্তিক সমাজের বস্তুগত স্বার্থের একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান।

একইভাবে বৈদিক সাহিত্যের পাতায় আমরা প্রাচীন প্রতিষ্ঠানগুলোর উল্লেখ পাই, যেমন ‘সভা’ (Sabhā) এবং ‘সমিতি’ (Samiti) (Thapar, 1984)। এগুলো ছিল গোত্রভিত্তিক রাজনৈতিক ও সামরিক পরিষদ। যজ্ঞের আনুষ্ঠানিকতা এই রাজনৈতিক পরিষদগুলোর সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিল। কোনো গোত্রনেতা যখন যুদ্ধে জয়লাভ করত বা নতুন চারণভূমি দখল করত, তখন সেই বিজয়কে যৌথ রূপ দিতে এবং যোদ্ধাদের মধ্যে সম্পদ বণ্টন করতে এই ধরণের আচারের আয়োজন করা হতো। ডিলথাইয়ের তত্ত্ব অনুযায়ী, এই সমস্ত প্রতিষ্ঠান ও আচার হলো মানুষের যৌথ অভিজ্ঞতার স্থায়ী রূপায়ন। এই রূপায়নগুলোর বাইরে গিয়ে বৈদিক সাহিত্যকে পাঠ করা অসম্ভব। যারা বৈদিক মন্ত্রকে কেবল কিছু ভাববাদী দর্শনের সূচনা হিসেবে দেখতে চান, তারা আসলে বৈদিক মানুষের তৈরি করা এই বাস্তব প্রতিষ্ঠানগুলোর ইতিহাসকে এড়িয়ে যেতে চান।

বৈদিক আচারের জটিলতা পরবর্তীকালে যখন ব্রাহ্মণ সাহিত্যে চূড়ান্ত রূপ নেয়, তখন দেখা যায় ভাষার প্রতিটি পদ এবং প্রতিটি ক্রিয়ার জন্য কঠোর নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছে (Thite, 1975)। ডিলথাইয়ের ঐতিহাসিক হার্মেনিউটিক্স আমাদের দেখায় যে, কোনো সমাজের প্রতিষ্ঠান যখন অত্যন্ত কঠোর ও অনমনীয় হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে সেই সমাজে ক্ষমতা কাঠামোর এক ধরনের একচেটিয়াকরণ ঘটছে। পুরোহিত শ্রেণী তাদের পেশাগত গুরুত্ব বজায় রাখার জন্য যজ্ঞের নিয়মগুলোকে জটিল থেকে জটিলতর করে তুলেছিল। এর সাথে কোনো অলৌকিক মুক্তির সম্পর্ক ছিল না; সম্পর্ক ছিল সামাজিক আধিপত্য ও বস্তুগত সুবিধা ধরে রাখার। বৈদিক সাহিত্যের প্রতিষ্ঠানগুলোকে এভাবে ডিলথাইয়ের বস্তুনিষ্ঠ চেতনার আলোকে বিশ্লেষণ করলে ধর্মতাত্ত্বিক মোহমুক্তি ঘটে এবং প্রাচীন সমাজের বাস্তব ক্ষমতা সম্পর্কের মানচিত্রটি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

ঐতিহাসিক বোঝাপড়া ও পুনর্জীবন প্রক্রিয়ার সংকট (Historical Understanding and the Dilemma of the Re-living Process)

ডিলথাইয়ের ব্যাখ্যাপদ্ধতির অন্যতম প্রধান কৌশল ছিল পুনর্জীবন বা নবরূপায়ণ (Re-living / Nacherleben) (Ermarth, 1978)। এর অর্থ হলো, একজন ব্যাখ্যাকারকে প্রাচীন পাঠের ভেতর দিয়ে সেই যুগের মানুষের মানসিক ও সামাজিক প্রক্রিয়াটিকে নিজের চেতনার ভেতর নতুন করে পুনর্নির্মাণ করতে হবে। প্রাচীন কবির যে অভিজ্ঞতাটি ভাষায় রূপ নিয়েছিল, ব্যাখ্যাকার সেই ভাষাকে ভেঙে আবার সেই অভিজ্ঞতার স্তরে পৌঁছাবেন। তবে ডিলথাই নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, এই পুনর্জীবনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কঠিন এবং এর ভেতর নানা ধরনের তাত্ত্বিক সংকট লুকিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে বৈদিক সাহিত্যের মতো হাজার হাজার বছর পুরনো কোনো সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই দূরত্ব অতিক্রম করা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।

সবচেয়ে বড় সংকটটি তৈরি হয় আধুনিক পাঠকের নিজস্ব মানসিক প্রবণতা থেকে। আধুনিক মানুষ যুক্তি, বিজ্ঞান এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার যে জগতে বাস করে, সেই জগতের মানদণ্ড নিয়ে যদি সে তিন হাজার বছর আগের বৈদিক কবিদের বুঝতে যায়, তবে চরম বিপর্যয় ঘটবে। উনিশ শতকের অনেক রোমান্টিক তাত্ত্বিক বৈদিক সাহিত্যের ভেতর এক ধরণের নিষ্কলুষ প্রাকৃতিক আধ্যাত্মিকতা খুঁজে পেয়েছিলেন, যা ছিল তাদের নিজস্ব কল্পনার প্রতিফলন। ডিলথাইয়ের পদ্ধতি এই ধরনের কল্পনাকে কঠোরভাবে বর্জন করতে বলে (Makkreel, 1992)। বৈদিক মানুষকে পুনর্জীবিত করার অর্থ তাদের আধুনিক ঋষি বা দার্শনিক বানিয়ে ফেলা নয়; বরং তাদের যে আদিম রূঢ়তা, পশুর চামড়ার পোশাক, যজ্ঞের রক্ত ও হিংসা এবং গোত্রগত পক্ষপাত ছিল, সেগুলোকে ঠিক সেভাবেই গ্রহণ করা। এই নির্মোহ ঐতিহাসিক দূরত্ব বজায় না রাখলে পাঠের পুনর্গঠন একটি কল্পকাহিনিতে পরিণত হয়।

আরেকটি বড় সংকট হলো তথ্যের অপূর্ণতা। ডিলথাইয়ের মতে, কোনো ঐতিহাসিক জীবনজগৎকে পুনর্নির্মাণ করতে হলে তার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের তথ্য থাকা দরকার (Dilthey, 2002)। কিন্তু বৈদিক সাহিত্য আমাদের কাছে পৌঁছেছে মূলত পুরোহিত শ্রেণীর একটি নির্দিষ্ট সম্পাদিত সংকলন হিসেবে। সমাজের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, নারী বা দাসদের প্রত্যক্ষ জীবন অভিজ্ঞতা এই সাহিত্যের কেন্দ্রীয় বয়ানে অত্যন্ত বিরল। ফলে আমরা যখন বৈদিক জীবনজগৎকে পুনর্জীবিত করার চেষ্টা করি, তখন আমরা মূলত শাসক ও পুরোহিত শ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গিকেই সামনে পাই। একজন সতর্ক আধুনিক হার্মেনিউটিক গবেষককে এই সীমাবদ্ধতা সবসময় মাথায় রাখতে হয়। পাঠের ভেতরে যা বলা হয়েছে কেবল তা-ই নয়, বরং যা অত্যন্ত চতুরভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে বা চেপে যাওয়া হয়েছে, তাও পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই তাত্ত্বিক সংকটের সমাধান করতে গিয়ে ডিলথাই প্রত্নতত্ত্ব ও বস্তুগত সংস্কৃতির প্রমাণের ওপর গুরুত্ব দেন। বৈদিক সাহিত্যের পাঠকে যখন সমকালীন প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কৃতির সাথে মিলিয়ে পড়া হয় – যেমন উত্তর ভারতের ধূসর চিত্রিত মৃৎপাত্র বা পেইন্টেড গ্রে ওয়্যার (Painted Grey Ware) সংস্কৃতি – তখন পাঠের ভাষা তার আসল মাটির স্পর্শ পায় (Sharma, 1983)। কবির উচ্চারিত শব্দের পেছনে যে মাটির পাত্র, তামার অস্ত্র বা পোড়া মাটির ঘরের বাস্তবতা ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ডিলথাইয়ের ঐতিহাসিক বোঝাপড়া তাই কোনো ধ্যানস্থ কল্পনা নয়; তা হলো ভাষাতাত্ত্বিক পাঠ এবং বস্তুগত ইতিহাসের এক যৌথ ও কঠোর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান। এর মাধ্যমেই কেবল আমরা একটি বিলুপ্ত জীবনজগৎকে তার সমস্ত জটিলতাসহ সত্যনিষ্ঠভাবে অনুধাবন করতে পারি।

সামাজিক বিন্যাস ও বৈদিক বাস্তবতার ঐতিহাসিকতা (Social Structure and the Historicity of Vedic Reality)

ডিলথাইয়ের ঐতিহাসিকতাবাদের মূল কথাই হলো – মানুষের সমাজ কোনো স্থির বা অপরিবর্তনীয় বস্তু নয়; তা নিরন্তর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়। মানুষের চেতনা, মূল্যবোধ ও ভাষাগত প্রকাশও এই রূপান্তরের সাথে সাথে বদলে যায় (Dilthey, 1989)। বৈদিক সাহিত্যের সামগ্রিক বিকাশধারা পর্যবেক্ষণ করলে এই রূপান্তরের অকাট্য প্রমাণ মেলে। প্রাচীন সনাতন পন্ডিতরা সমস্ত বৈদিক সাহিত্যকে একটি অখণ্ড, শাশ্বত ও অভিন্ন সত্য হিসেবে চিত্রিত করার যে চেষ্টা করেছেন, ডিলথাইয়ের ঐতিহাসিক হার্মেনিউটিক্স তার অসারতা স্পষ্ট করে দেয়। ঋগ্বেদের আদি মণ্ডলের সমাজ এবং পরবর্তী সংহিতা বা ব্রাহ্মণ সাহিত্যের সমাজের মধ্যে ছিল এক বিরাট ঐতিহাসিক ব্যবধান।

ঋগ্বেদের আদি স্তরে আমরা দেখতে পাই একটি তুলনামূলকভাবে গতিশীল, ভ্রাম্যমাণ ও পশুপালক সমাজ। সেখানে কোনো সুসংগঠিত রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি হয়নি, কোনো স্থায়ী রাজতন্ত্র ছিল না এবং চতুরাশ্রম বা জাতিভেদের মতো কঠোর সামাজিক বিভাজনও তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি (Thapar, 1984)। সেই সমাজের মানুষের প্রধান লক্ষ্য ছিল চারণভূমির নিয়ন্ত্রণ এবং পশুর সংখ্যা বাড়ানো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে যখন এই মানবগোষ্ঠী পূর্ব দিকে গাঙ্গেয় উপত্যকার দিকে অগ্রসর হলো এবং কৃষিকাজকে প্রধান উৎপাদন ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করল, তখন তাদের জীবনজগৎ আমূল বদলে গেল। যাযাবর জীবন থেকে স্থায়ী কৃষিনির্ভর জীবনে রূপান্তরের সাথে সাথে জন্ম নিল ভূস্বামিত্ব, উদ্বৃত্ত উৎপাদনের ওপর পুরোহিত ও ক্ষত্রিয়দের নিয়ন্ত্রণ এবং এক কঠোর বর্ণব্যবস্থা (Varṇa System)।

ডিলথাইয়ের পদ্ধতি আমাদের শেখায় কীভাবে এই সামাজিক রূপান্তর সাহিত্যের ভাষার ভেতর ধরা পড়ে (Dilthey, 2002)। ঋগ্বেদের ইন্দ্র যেখানে ছিলেন একজন চারণভূমির যোদ্ধা এবং বজ্রের দেবতা, অথর্ববেদ বা ব্রাহ্মণ সাহিত্যে এসে সেই দেবতারা পরিণত হলেন জটিল যজ্ঞযন্ত্রের একেকটি নিরেট উপাদানে। কৃষির স্থায়িত্ব এবং সামাজিক শোষণের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হিসেবে যজ্ঞের চরিত্র বদলে গেল। ব্রাহ্মণ সাহিত্যে এসে দেখা যায়, পুরোহিতরা দাবি করছেন যে তাদের মন্ত্র ছাড়া সূর্য উঠবে না বা রাজা তার সিংহাসন রক্ষা করতে পারবে না (Heesterman, 1985)। এটি কোনো আধ্যাত্মিক জ্ঞানের বিকাশ নয়; এটি হলো নতুন কৃষিভিত্তিক সামাজিক বিন্যাসে পুরোহিত শ্রেণীর ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার ভাষাগত কৌশল। ডিলথাইয়ের ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ ছাড়া এই সাহিত্যিক পরিবর্তনকে বোঝা সম্ভব নয়।

অতএব, বৈদিক সাহিত্যকে একটিমাত্র সুষম জীবনদর্শন হিসেবে দেখা এক ধরণের ঐতিহাসিক ভুল। ডিলথাইয়ের সমাজতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে, বৈদিক সংকলনগুলো আসলে বিভিন্ন যুগের সামাজিক সংঘাত ও আপসের এক স্তূপীকৃত দলিল। যাযাবর জীবনের সরল প্রকৃতিবন্দনা থেকে শুরু করে পরবর্তীকালের কঠোর সামাজিক বৈষম্যমূলক যজ্ঞশাসন পর্যন্ত – প্রতিটি স্তরে রয়েছে মানুষের জীবনযাত্রার স্পষ্ট ছাপ। এই পরিবর্তনশীল ঐতিহাসিকতাকে স্বীকার করে নেওয়াই হলো ডিলথাইয়ের পদ্ধতির মূল শক্তি, যা বৈদিক সাহিত্যকে তার কাল্পনিক শাশ্বত আসন থেকে নামিয়ে এনে মানব সমাজের ক্রমবিকাশের এক বাস্তব আয়না হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

ধর্মতাত্ত্বিক বিমূর্ততা বনাম বস্তুনিষ্ঠ জীবনজগৎ (Theological Abstraction versus Objective Lifeworld)

পরবর্তীকালের ভাববাদী দার্শনিকরা বৈদিক সাহিত্যকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যেন এর একমাত্র লক্ষ্য ছিল এক ধরণের বিমূর্ত পরমাত্মা বা মোক্ষ লাভ করা। উপনিষদের কিছু অংশকে সামনে এনে পুরো বৈদিক ধারাটিকে এক বায়বীয় মরমীবাদের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ডিলথাইয়ের হার্মেনিউটিক্স আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের প্রাথমিক ইতিহাস কখনো বিমূর্ত ধারণা দিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় তার জীবনজগৎ (Lifeworld / Lebenswelt) এবং টিকে থাকার বস্তুগত শর্তাবলি থেকে (Makkreel, 1992)। বৈদিক সাহিত্যের বিপুল অংশ জুড়ে যা রয়েছে, তা কোনো বিমূর্ত ব্রহ্মজ্ঞান নয়; তা হলো ধুলোমাটি, পশুর ক্ষুরের শব্দ, বার্লি বা যবের চাষ, ঘোড়ার তেজ এবং শত্রুর বিরুদ্ধে তীব্র ক্রোধের এক জীবন্ত আখ্যান।

বৈদিক মানুষের জীবনজগতে কোনো অলীক পরকালের মোহ ছিল না। তারা স্পষ্ট ভাষায় শত শরতের আয়ু চেয়েছিল, তারা চেয়েছিল বলশালী পুত্রসন্তান যারা যুদ্ধে গোত্রকে নেতৃত্ব দিতে পারবে (Rau, 1957)। তাদের প্রার্থনায় কোনো আধ্যাত্মিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ছিল না; ছিল এই পৃথিবীতেই সমৃদ্ধি ও ক্ষমতা নিয়ে বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছা। ডিলথাইয়ের তত্ত্বে মানুষের এই প্রাথমিক জাগতিক বন্ধনই হলো তার সমস্ত সাংস্কৃতিক সৃষ্টির উৎস। পরবর্তী যুগের ধর্মতাত্ত্বিকরা যখন এই ইহজাগতিক আকাঙ্ক্ষাগুলোকে রূপক বা মায়া বলে উড়িয়ে দিয়ে তার ওপর আত্মিক মোক্ষের চাদর পরিয়ে দেন, তখন তারা আসলে পুরো বৈদিক সাহিত্যের শরীর থেকে তার রক্ত ও মাংস কেটে আলাদা করে দেন। ডিলথাইয়ের ঐতিহাসিক হার্মেনিউটিক্স এই বিমূর্তীকরণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে টেক্সটকে তার আদি বস্তুনিষ্ঠ মাটিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

বৈদিক সাহিত্যে নারীর সামাজিক অবস্থান, পশুপালনভিত্তিক পরিবারের গঠন এবং প্রাথমিক পিতৃতান্ত্রিক (Patriarchal) ক্ষমতার বিন্যাস লক্ষ্য করলে ডিলথাইয়ের বস্তুনিষ্ঠ চেতনার কার্যকারিতা আরও স্পষ্ট হয়। সেই সমাজে সম্পদের উত্তরাধিকার ছিল পুরুষতান্ত্রিক এবং বংশ রক্ষার একমাত্র মাধ্যম ছিল পুত্রসন্তান (Sharma, 1983)। বৈদিক স্তোত্রগুলোর বড় অংশ জুড়েই রয়েছে পুত্র কামনার ব্যাকুলতা। এটিকে কোনো মহৎ আধ্যাত্মিক ইচ্ছা ভাবলে ভুল হবে; এটি ছিল একটি যুদ্ধমুখী পশুপালক সমাজের টিকে থাকার অপরিহার্য শর্ত, যেখানে বাহুবলই ছিল সম্পদের প্রধান জামিনদার। ডিলথাইয়ের ব্যাখ্যাপদ্ধতি আমাদের বাধ্য করে এই সামাজিক সত্যগুলোর মুখোমুখি হতে এবং কোনো ধর্মতাত্ত্বিক ভাবালুতা ছাড়াই এই লিঙ্গভিত্তিক ও শ্রেণীভিত্তিক সম্পর্কগুলোকে উন্মোচিত করতে।

সবশেষে বলা যায়, ডিলথাইয়ের হার্মেনিউটিক্স বৈদিক সাহিত্যের অধ্যয়নে একটি মৌলিক ধর্মনিরপেক্ষ বাঁকবদল এনে দেয়। বেদ কোনো অপৌরুষেয় ঐশ্বরিক বাণী নয়, কোনো চিরন্তন মোক্ষের বার্তাবাহকও নয়। এটি হলো ব্রোঞ্জ ও লৌহযুগের এক সুনির্দিষ্ট মানবগোষ্ঠীর আনন্দ, ভয়, শোষণ, শ্রেণিভেদ ও টিকে থাকার লড়াইয়ের এক ঐতিহাসিক স্মারক (Dilthey, 2002)। ডিলথাইয়ের জীবনজগৎসংক্রান্ত তত্ত্ব আমাদের চোখ খুলে দেয় যাতে আমরা শব্দের আড়ালে লুকানো সেই প্রাচীন মানুষের নিঃশ্বাস শুনতে পাই। যখন আমরা তাদের যজ্ঞ, তাদের দেবতা এবং তাদের মন্ত্রগুলোকে তাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে পাঠ করি, তখন ধর্মতত্ত্বের সমস্ত মিথ্যা মহিমা খসে পড়ে। আমাদের সামনে অবশিষ্ট থাকে মানুষের তৈরি ইতিহাস – যার ভুলত্রুটি, সীমাবদ্ধতা এবং ঐতিহাসিক রূপান্তরই হলো তার একমাত্র ও সত্য পরিচয়।

হির্শ ও বৈদিক অর্থের স্তর (Hirsch and Levels of Vedic Meaning): প্রাথমিক অর্থ ও পরবর্তী তাৎপর্য

অর্থ ও তাৎপর্যের তাত্ত্বিক ব্যবধান (Theoretical Distinction between Meaning and Significance)

একটি পুরনো চিঠি পড়ার সময় আমরা প্রায়ই বিপদে পড়ি। চিঠিটি যিনি লিখেছিলেন, তিনি হয়তো কোনো নির্দিষ্ট খবর বা অনুভূতির কথা ভেবে লিখেছিলেন। কিন্তু বহু বছর পর সেই চিঠি পড়তে গিয়ে আমরা নিজেদের জীবনের নানা ঘটনার সাথে তার মিল খুঁজে পাই। তখন চিঠির ভেতরের কথাগুলো আমাদের কাছে একদম নতুন এক অর্থ নিয়ে হাজির হয়। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ঠিক এই ঘটনাই ঘটে। এই সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত সংবেদনশীল সমস্যাটিকে সাহিত্যতত্ত্বের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন আমেরিকান সাহিত্যতাত্ত্বিক এরিক ডোনাল্ড হির্শ জুনিয়র (Eric Donald Hirsch Jr.)। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যখন উত্তর-আধুনিক ও বিনির্মাণবাদী তাত্ত্বিকরা দাবি করতে শুরু করলেন যে একটি পাঠের কোনো নির্দিষ্ট অর্থ থাকতে পারে না এবং পাঠকের ইচ্ছামতো পাঠের অর্থ বদলে যেতে পারে, তখন হির্শ এর তীব্র বিরোধিতা করলেন। তিনি বললেন, এভাবে চললে ব্যাখ্যার কোনো বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ডই অবশিষ্ট থাকে না।

হির্শ তার বিখ্যাত গ্রন্থ ভ্যালিডিটি ইন ইন্টারপ্রিটেশন (Validity in Interpretation)-এ দুটি ধারণাকে সম্পূর্ণ আলাদা করলেন (Hirsch, 1967)। প্রথমটি হলো অর্থ (Meaning) এবং দ্বিতীয়টি হলো তাৎপর্য (Significance)। হির্শের মতে, কোনো বয়ানের প্রাথমিক অর্থ হলো সেটাই, যা তার মূল রচয়িতা একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও ভাষাগত প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সচেতনভাবে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। এই অর্থটি স্থির এবং অপরিবর্তনীয়। কারণ কোনো লেখক যখন কোনো বাক্য লেখেন, তখন তার মনের ভাবটি একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে বাঁধা থাকে। অন্যদিকে তাৎপর্য হলো একটি গতিশীল ধারণা। সময়ের সাথে সাথে সেই প্রাথমিক অর্থটি যখন কোনো নতুন যুগ, নতুন প্রেক্ষাপট বা ভিন্ন কোনো ভাবাদর্শের মুখোমুখি হয়, তখন তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় তাৎপর্য। সহজ করে বললে, অর্থ থাকে স্বয়ং পাঠের ভেতর ও রচয়িতার অভিসন্ধিতে, আর তাৎপর্য তৈরি হয় পরবর্তীতে পাঠকের সাথে পাঠের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে।

বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই তাত্ত্বিক পার্থক্যটি প্রয়োগ করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ। হাজার হাজার বছর ধরে বৈদিক মন্ত্রের নানা ধরনের ব্যাখ্যা হয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় সমাজে কখনো পুরোহিতরা, কখনো মরমী সাধকরা, আবার আধুনিক কালে সমাজ সংস্কারকরা বেদ থেকে নিজেদের পছন্দমতো ব্যাখ্যা বের করে এনেছেন। ফলে কোনটি বেদের নিজস্ব বক্তব্য আর কোনটি পরবর্তীতে মানুষের চাপিয়ে দেওয়া ভাবনা, তা গুলিয়ে গেছে। হির্শের তাত্ত্বিক চশমা দিয়ে তাকালে এই জট খুব সহজেই খুলে যায় (Hirsch, 1976)। বৈদিক কবিরা যখন কোনো মন্ত্র রচনা করেছিলেন, তখন তাদের সামনে একটি নির্দিষ্ট বাস্তব সমস্যা ছিল। তারা তাদের সমকালীন ভাষায় একটি নির্দিষ্ট প্রাথমিক অর্থ তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন শতাব্দীতে মানুষ সেই অর্থের ওপর নিজেদের প্রয়োজনমতো নতুন নতুন তাৎপর্য আরোপ করেছে।

ধর্মতত্ত্বের প্রধান চালাকিটি হলো, তারা এই পরবর্তীকালে তৈরি হওয়া তাৎপর্যকে মূল প্রাথমিক অর্থ হিসেবে চালিয়ে দেয়। তারা দাবি করে যে প্রাচীন কবিরা ঠিক এই কথাই বলতে চেয়েছিলেন যা আজকের ধর্মতাত্ত্বিকরা বলছেন। হির্শের হার্মেনিউটিক্স এই বিভ্রান্তিকে চিহ্নিত করে। তিনি দেখান যে, আমরা যদি কোনো টেক্সটের আদি ও প্রামাণ্য ইতিহাস জানতে চাই, তবে আমাদের অবশ্যই তাৎপর্যের রঙিন চশমাটি খুলে ফেলতে হবে। বৈদিক সাহিত্যের গায়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে নানা স্তরের ভাবাদর্শিক প্রলেপ পড়েছে, সেগুলোকে সরিয়ে কবির নিজস্ব প্রাথমিক অর্থটিকে উদ্ধার করাই হলো একজন বস্তুনিষ্ঠ ও ধর্মনিরপেক্ষ গবেষকের প্রধান দায়িত্ব।

বৈদিক রচয়িতার অভিপ্রায় ও প্রাথমিক অর্থ (Authorial Intent and Primary Meaning in the Vedas)

হির্শের ব্যাখ্যামডেলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রচয়িতার অভিপ্রায় (Authorial Intent)-এর প্রশ্ন। হির্শ খুব জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, কোনো পাঠের বস্তুনিষ্ঠ অর্থ উদ্ধার করতে হলে তার রচয়িতার ইচ্ছাকে একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথপ্রদর্শক হিসেবে মানতে হবে (Hirsch, 1967)। সনাতন মীমাংসা দর্শন অবশ্য আগেই ঘোষণা করেছিল যে বৈদিক সাহিত্যের কোনো রচয়িতা নেই, কারণ তা শাশ্বত। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য হলো, বৈদিক সাহিত্য কোনো আকাশবাণী নয়; তা রক্তমাংসের মানুষের তৈরি। ঋগ্বেদের সংহিতাগুলোতে স্পষ্টভাবেই বিভিন্ন গোত্র ও কবির নাম জড়িয়ে আছে। এই কবিরা যখন স্তোত্র রচনা করতেন, তখন তাদের মনে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট মানবিক উদ্দেশ্য কাজ করত। তারা বাতাসে কোনো বিমূর্ত কথা ছুড়ে দেননি। তাদের প্রতিটি শব্দের পেছনে ছিল এক অকাট্য সামাজিক ও বাস্তব প্ররোচনা।

ঋগ্বেদের আদি স্তরে এই প্রাথমিক অর্থটি ছিল খুবই সোজাসাপটা ও বস্তুনিষ্ঠ। তৎকালীন উত্তর-পশ্চিম ভারতের পশুপালক সমাজটির প্রধান চিন্তা ছিল খাদ্য, চারণভূমি এবং শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজেদের গোত্রকে রক্ষা করা। কবি যখন কোনো দেবতাকে উদ্দেশ্য করে স্তোত্র গাইতেন, তখন তার অভিপ্রায়টি কোনো রহস্যময় পরলৌকিক মুক্তির জন্য ছিল না। তিনি স্পষ্ট ভাষায় চাইতেন বলিষ্ঠ অশ্ব, দুধেল গাভী, সুস্বাদু যব এবং বিপুল সৈন্যদল (Doniger, 1981)। রচয়িতার অভিপ্রায় ছিল দেবতাকে স্তুতি দিয়ে সন্তুষ্ট করে এই ইহজাগতিক সম্পদগুলো আদায় করা। এটি ছিল দুই পক্ষের মধ্যে একটি সামাজিক আদান-প্রদানের বোঝাপড়া। হির্শের পদ্ধতি অনুযায়ী, বৈদিক মন্ত্রের প্রাথমিক অর্থ বিচার করতে হবে এই বাস্তব অভিপ্রায়ের নিরিখে, কোনো কাল্পনিক আধ্যাত্মিকতার মানদণ্ডে নয়।

বৈদিক সাহিত্যের আদি রচয়িতারা ছিলেন সেই যুগের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রত্যক্ষ অংশীদার। আর্যভাষী বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে যখন চারণভূমি বা গবাদিপশু নিয়ে লড়াই হতো, তখন কবিরা তাদের পৃষ্ঠপোষক রাজার পক্ষে স্তোত্র তৈরি করতেন (Halbfass, 1991)। শত্রুপক্ষকে পরাস্ত করার জন্য, তাদের দুর্গ ধ্বংস করার জন্য ইন্দ্রের কাছে যে প্রার্থনা করা হতো, তার প্রাথমিক অর্থটি ছিল একেবারেই যুদ্ধকালীন এক মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি। কবির অভিপ্রায়টি বুঝতে হলে সেই সময়ের উপজাতীয় যুদ্ধ, সম্পদ দখল এবং যৌথ যজ্ঞের সামাজিক পরিবেশটিকে হিসেবে নিতে হবে। প্রাচীন কবি যে শব্দগুলোকে তার বেঁচে থাকার হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, সেগুলোর বাইরে গিয়ে কোনো অতীন্দ্রিয় অর্থ কল্পনা করা হির্শের নিয়মে সরাসরি পদ্ধতিগত লঙ্ঘন।

অতএব, বৈদিক কবিদের রচনার প্রাথমিক স্তরটিকে তার আদি মানবিক সারল্যেই গ্রহণ করা দরকার। সেখানে দেবতারা কোনো সর্বব্যাপী পরমব্রহ্ম নন; তারা হলেন শক্তিশালী মিত্র, যাদের সাথে স্তোত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হচ্ছে। রচয়িতাদের এই বাস্তব চেতনা কোনো আধ্যাত্মিক বিলাসিতা ছিল না; তা ছিল এক প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার অদম্য সংগ্রাম। হির্শ দেখিয়েছেন, রচয়িতার এই মূল অভিপ্রায়টি যখন আমরা পাঠের ভেতরে আবিষ্কার করি, তখনই কেবল ব্যাখ্যার একটি সুদৃঢ় ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায়। অন্যথায়, প্রতিটি পাঠক নিজের খেয়ালখুশিমতো টেক্সটকে ব্যবহার করতে শুরু করে, যা সাহিত্যের ইতিহাসকে একটি অর্থহীন অনুমানের রূপ দেয়। বৈদিক সাহিত্যের প্রামাণ্য ইতিহাস লিখতে হলে বৈদিক কবির এই আদি অভিপ্রায়কে স্বীকার করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।

ব্রাহ্মণ সাহিত্যের যুগে অর্থের রূপান্তর (Transformation of Meaning in the Era of Brāhmaṇa Literature)

বৈদিক সাহিত্যের বিকাশের ইতিহাসে প্রথম বড় ধরনের ফাটলটি তৈরি হয় যখন সংহিতার যুগ পেরিয়ে সমাজ প্রবেশ করে ব্রাহ্মণ (Brāhmaṇa) সাহিত্যের যুগে। এই পরিবর্তনটি ছিল যেমন সামাজিক, তেমনি সাহিত্যিক। হির্শের তাত্ত্বিক ভাষায় বলতে গেলে, ব্রাহ্মণ সাহিত্যের পুরোহিতরা সংহিতার কবিদের তৈরি করা প্রাথমিক অর্থকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে সেখানে নিজেদের তৈরি করা এক জটিল তাৎপর্য (Significance) আরোপ করেছিলেন (Hirsch, 1976)। যে স্তোত্রগুলো রচিত হয়েছিল পশুপালক জীবনের উন্মুক্ত প্রান্তরে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সাথে মানুষের এক সরাসরি সম্পর্কের আকুতি হিসেবে, সেই স্তোত্রগুলোকে ব্রাহ্মণ যুগে এনে আটকে ফেলা হলো এক জটিল, যান্ত্রিক ও অন্ধ যাগযজ্ঞের খোপে।

ব্রাহ্মণ যুগের সমাজটি আর কেবল ভ্রাম্যমাণ পশুপালক সমাজ ছিল না। ততদিনে মানুষ গাঙ্গেয় উপত্যকার দিকে এসে স্থায়ী কৃষিভিত্তিক জীবন শুরু করেছে এবং সেখানে গড়ে উঠছে প্রাথমিক রাষ্ট্র ও জটিল সামাজিক বৈষম্য (Keith, 1925)। এই নতুন উৎপাদন ব্যবস্থায় পুরোহিত শ্রেণী নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করতে চেয়েছিল। তাদের প্রয়োজন ছিল এমন একটি ধর্মতাত্ত্বিক হাতিয়ার যা সমাজের রাজাকে এবং সাধারণ মানুষকে তাদের ওপর চিরকালের জন্য নির্ভরশীল করে রাখবে। এর ফলে তারা সংহিতার প্রতিটি মন্ত্রকে তাদের আদি কাব্যিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। তারা দাবি করতে শুরু করল যে, মন্ত্রের ভেতরের কবিতার ভাব কোনো কাজের কথা নয়; আসল কাজ হলো যজ্ঞের বেদিতে কোন পদটি কীভাবে উচ্চারণ করা হচ্ছে এবং কোন পাত্রে ঘি ঢালা হচ্ছে।

এখানেই ঘটেছিল হির্শ নির্দেশিত সেই মারাত্মক বিভান্তি – তাৎপর্যকে মূল অর্থ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া। ব্রাহ্মণ সাহিত্যের লেখকরা দাবি করলেন যে, আদি কবিরা আসলে এই যজ্ঞের খুঁটিনাটি নিয়মের কথাই বলতে চেয়েছিলেন (Bodewitz, 1990)। ঋগ্বেদের একটি মুক্তছন্দের কবিতাকে তারা রূপান্তর করলেন একটি নিরেট যজ্ঞীয় প্রযুক্তিতে। উদাহরণস্বরূপ, যে মন্ত্রে ইন্দ্রের কোনো বীরত্বগাথা বর্ণনা করা হয়েছিল, ব্রাহ্মণ গ্রন্থে বলা হলো সেই মন্ত্রটি পাঠ করার আসল উদ্দেশ্য হলো কোনো বিশেষ যজ্ঞীয় পাত্রকে পবিত্র করা। কবির আদি কাব্যিক অনুভূতিটিকে পুরোপুরি মুছে ফেলে সেখানে চাপিয়ে দেওয়া হলো এক অতি-আনুষ্ঠানিক বিধিবিধান। পুরোহিতরা বোঝাতে চাইলেন যে, মহাবিশ্ব স্বয়ং কোনো স্বাভাবিক নিয়মে চলে না; তা চলে তাদের যজ্ঞের অগ্নিকুণ্ডের ওপর নির্ভর করে।

হির্শের হার্মেনিউটিক্স এই ঐতিহাসিক জালিয়াতিটিকে স্পষ্ট করে ধরে ফেলে। একজন আধুনিক গবেষক যখন ব্রাহ্মণ সাহিত্য পাঠ করেন, তখন তিনি দেখতে পান কীভাবে একটি সমাজের ক্ষমতাশালী শ্রেণী প্রাচীন সাহিত্যের ওপর নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ চাপিয়ে দেয়। ব্রাহ্মণ সাহিত্যের এই ব্যাখ্যাগুলো আদি বৈদিক সংহিতার প্রকৃত অর্থ প্রকাশ করে না; তা প্রকাশ করে ব্রাহ্মণ যুগের সামাজিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও পুরোহিততন্ত্রের কায়েমি স্বার্থকে। এটি হলো বৈদিক সাহিত্যের ইতিহাসের প্রথম বড় বাঁক, যেখানে ভাষার প্রাথমিক অর্থকে হত্যা করে একটি কৃত্রিম ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক তাৎপর্যকে সাহিত্যের মূল সত্য বলে ঘোষণা করা হয়েছিল।

উপনিষদীয় চিন্তায় তাৎপর্যের আধ্যাত্মিকীকরণ (Spiritualization of Significance in Upaniṣadic Thought)

ব্রাহ্মণ সাহিত্যের পর বৈদিক ধারায় আরেকটি বড় উল্লম্ফন ঘটে যখন অরণ্যের পটভূমিতে রচিত হতে শুরু করে আরণ্যক (Āraṇyaka) এবং পরবর্তীতে উপনিষদ (Upaniṣad)। এই যুগে এসে বৈদিক চিন্তায় এক নতুন মোড় দেখা যায়, যাকে আধুনিক পণ্ডিতরা প্রায়ই দার্শনিক বিপ্লব বলে প্রশংসা করেন। কিন্তু হির্শের নির্মোহ পদ্ধতির আলোতে দেখলে বোঝা যায়, এটি ছিল বৈদিক বয়ানের ওপর আরেকটি নতুন তাৎপর্যের স্তর যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া (Hirsch, 1976)। ব্রাহ্মণ সাহিত্যের জটিল ও ব্যয়বহুল যজ্ঞের বিরুদ্ধে সমাজে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, উপনিষদের ভাবুকরা তার বিকল্প হিসেবে নিয়ে এলেন এক ধরণের অন্তর্মুখী আধ্যাত্মিকতা। তারা বললেন, বাইরে পশু হত্যা করে বা ঘি পুড়িয়ে কোনো লাভ নেই; আসল যজ্ঞ করতে হবে নিজের মনের ভেতরে।

এই প্রক্রিয়ায় উপনিষদের চিন্তাবিদরা বৈদিক মন্ত্রগুলোকে সম্পূর্ণ নতুন এক রূপক অর্থে ব্যবহার করতে শুরু করলেন। ঋগ্বেদের অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়াটিকে তারা পরিণত করলেন সমগ্র মহাবিশ্বের রূপকে। ঘোড়ার চোখ হলো সূর্য, তার নিশ্বাস হলো বাতাস এবং তার উন্মুক্ত পিঠ হলো আকাশ (Olivelle, 1996)। একইভাবে, আদি বৈদিক মানুষ যে দেবতাদের বাস্তব শক্তির প্রতীক হিসেবে ডাকত, উপনিষদে এসে সেই দেবতারা পরিণত হলেন মানুষের ইন্দ্রিয়ের প্রতীকে – অগ্নি হলেন বাকশক্তি, বায়ু হলেন প্রাণশক্তি, আর সূর্য হলেন দৃষ্টিশক্তি। আদি স্তোত্রগুলোর যে জাগতিক ও রক্তমাংসের চরিত্র ছিল, তাকে এক নিপুণ কৌশলে সম্পূর্ণ ভাববাদী ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্যে মুড়ে ফেলা হলো।

হির্শের তত্ত্ব আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, উপনিষদের এই আধ্যাত্মিক রূপান্তরটি তৎকালীন পরিবর্তিত নগরজীবন ও শ্রমণ আন্দোলনের চাপে তৈরি হওয়া এক নতুন ঐতিহাসিক তাৎপর্য মাত্র (Flood, 1996)। উপনিষদের রচয়িতারা তাদের নিজস্ব যুগের মানসিক শান্তির জন্য বা অস্তিত্বের সংকট সমাধানের জন্য পুরনো পাঠকে নতুনভাবে পুনর্ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু ধর্মবিশ্বাসী মানুষেরা ধরে নেন যে, বৈদিক সংহিতাগুলোর আসল লক্ষ্যই ছিল এই উপনিষদীয় অদ্বৈতবাদ বা মোক্ষলাভ। এটি একটি চূড়ান্ত ঐতিহাসিক ভুল। ঋগ্বেদের একজন কবি যখন সোমরসের প্রশংসা করেছিলেন, তখন তিনি কোনো বিমূর্ত আনন্দের কথা ভাবেননি; তিনি ভেবেছিলেন এক বাস্তব উদ্ভিদের রসের নেশায় তৈরি হওয়া শারীরিক উদ্দীপনার কথা। উপনিষদ সেই উদ্দীপনাকে বানিয়ে দিল আনন্দময় ব্রহ্মের উপলব্ধি।

সুতরাং, উপনিষদীয় দর্শনকে বেদ পাঠের চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার কোনো যুক্তি নেই। হির্শের হার্মেনিউটিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপনিষদ হলো বৈদিক সাহিত্যের ইতিহাসের এক বিশেষ পর্যায়ের প্রতিফলন, যার ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে ঠিকই, কিন্তু যা আদি বৈদিক কবির প্রাথমিক অর্থকে নির্দেশ করে না। প্রাথমিক অর্থে যা ছিল একটি পশুপালক মানুষের বাস্তব জীবনের স্তুতি, উপনিষদে এসে তা হয়ে উঠল এক বিমূর্ত অতিন্দ্রীয় তত্ত্ব। এই রূপান্তরের প্রক্রিয়াটিকে বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় কীভাবে মানুষের সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে সাহিত্যের তাৎপর্য বদলে যায় এবং কীভাবে নতুন প্রজন্ম তাদের নিজেদের দর্শনকে প্রাচীন গ্রন্থের মুখের ভেতর গুঁজে দিয়ে নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

সর্বজনীন সংবর্গ ও বৈদিক সাহিত্যের প্রকরণ (Intrinsic Genre and the Typology of Vedic Literature)

হির্শের ব্যাখ্যামডেলের আরেকটি অত্যন্ত মূল্যবান প্রত্যয় হলো অভ্যন্তরীণ প্রকরণ (Intrinsic Genre) (Hirsch, 1967)। হির্শের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট – কোনো পাঠের সঠিক অর্থ বুঝতে হলে পাঠককে প্রথমে বুঝতে হবে পাঠটি সাহিত্যের কোন বর্গের বা কোন ধরনের প্রকরণের অন্তর্গত। আমরা যদি একটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনিকে ইতিহাসের পাঠ্যবই হিসেবে পড়তে যাই, কিংবা একটি রূপকথাকে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র হিসেবে বিবেচনা করি, তবে চরম বিপর্যয় ঘটবে। প্রকরণ হলো একটি নিঃশব্দ সামাজিক চুক্তি, যা লেখক এবং পাঠকের মধ্যে অর্থ বিনিময়ের নিয়ম নির্ধারণ করে দেয়। পাঠক যখন প্রকরণটি সঠিকভাবে ধরতে পারেন, তখনই কেবল শব্দের আসল সীমানাটি তার কাছে স্পষ্ট হয়।

বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই প্রকরণ সংক্রান্ত বিভ্রান্তিটি ঘটেছে সবচেয়ে করুণভাবে। ঋগ্বেদের অধিকাংশ স্তোত্রই হলো প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় স্তুতিগীতির ঘরানার সাহিত্য (Doniger, 1981)। এর প্রকরণটি ছিল মূলত প্রশংসামূলক কবিতা, যার সাথে জড়িয়ে ছিল বীরত্ব, নাটকীয়তা এবং কাব্যিক অতিরঞ্জন। একজন কবি যখন কোনো রাজার বা ইন্দ্রের প্রশংসা করতেন, তখন তিনি রূপক ও উপমার এক বর্ণাঢ্য জাল বুনতেন। কবি জানতেন তিনি কবিতা লিখছেন, এবং তার শ্রোতারাও জানত যে তারা একটি কাব্যিক উপস্থাপনা শুনছে। কিন্তু পরবর্তী যুগের টিকাকাররা, বিশেষ করে মধ্যযুগে সায়নাচার্য বা বেদান্তের পণ্ডিতরা, এই কাব্যিক প্রকরণটিকে ভুলে গিয়ে একে বিবেচনা করতে শুরু করলেন কঠোর ধর্মতাত্ত্বিক শাস্ত্র বা আইনি বিধান হিসেবে।

যখন একটি কাব্যিক স্তোত্রকে কঠোর দর্শনের পাঠ্য বা যজ্ঞের নিয়মনীতি হিসেবে পড়া হয়, তখন ভাষার সমস্ত সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক সত্য নষ্ট হয়ে যায়। কবি যেখানে মেঘের গর্জনে ভয় পেয়ে তাকে একটি কাল্পনিক সাপের সাথে তুলনা করেছিলেন, পরবর্তী যুগের শাস্ত্রকাররা তাকে একটি আক্ষরিক ঐতিহাসিক ঘটনা বা কোনো চিরন্তন মহাজাগতিক বিধান বানিয়ে ফেললেন। হির্শের তত্ত্বে এটা হলো প্রকরণগত ভুল বোঝার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ (Hirsch, 1976)। একটি কবিতার রূপককে যদি বৈজ্ঞানিক সত্য বা অলঙ্ঘনীয় ধর্মীয় আদেশ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, তবে প্রাচীন কবির প্রতি এর চেয়ে বড় অবিচার আর কিছু হতে পারে না। বৈদিক সংহিতাগুলো মূলত ধর্মগ্রন্থের আধুনিক সংজ্ঞার ভেতর পড়ে না; এগুলো ছিল ব্রোঞ্জযুগের মানুষের গীতিময় সাহিত্য।

অতএব, বৈদিক পাঠের হার্মেনিউটিক বিশ্লেষণে হির্শের অভ্যন্তরীণ প্রকরণের নীতিটি ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। ঋগ্বেদকে পড়তে হবে প্রাচীন বীরগাথা ও স্তুতিগীতির প্রকরণে, যজুর্বেদকে বুঝতে হবে যাগযজ্ঞের প্রায়োগিক সূত্রের প্রকরণে, আর উপনিষদকে দেখতে হবে প্রাথমিক দার্শনিক আত্মজিজ্ঞাসার প্রকরণে। এই প্রকরণগুলোকে পরস্পরের ওপর গুলিয়ে ফেললেই ধর্মতাত্ত্বিক সংকটের জন্ম হয়। প্রাচীন সাহিত্যের এই বর্গগত স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করলেই তবে আমরা বুঝতে পারি কীভাবে একটি নির্দিষ্ট প্রকরণের ভেতর দাঁড়িয়ে কবিরা তাদের ভাষাগত খেলা পরিচালনা করেছিলেন এবং কীভাবে তাদের সমকালীন সামাজিক আকাঙ্ক্ষাকে শিল্পের মাধ্যমে মূর্ত করে তুলেছিলেন।

আধুনিক পুনর্ব্যাখ্যার রাজনীতি ও হির্শীয় সমালোচনা (Politics of Modern Reinterpretation and Hirschian Critique)

উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে বৈদিক সাহিত্যের অর্থ নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি এক চূড়ান্ত রাজনৈতিক রূপ ধারণ করে। আধুনিক ভারতে যখন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে উঠছিল, তখন বেদ হয়ে উঠল আত্মপরিচয় প্রমাণের এক প্রধান রাজনৈতিক ময়দান। এই পর্বে বৈদিক পাঠের ওপর আধুনিক তাৎপর্যের যে বিপুল বোঝা চাপানো হয়েছিল, তা পর্যবেক্ষণ করলে হির্শের ব্যাখ্যামডেলের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে বোঝা যায়। সংস্কারক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরা নিজেদের সময়ের আধুনিক চাহিদাকে প্রাচীন সাহিত্যের ভেতর আবিষ্কার করার এক অন্ধ প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন (Halbfass, 1991)। তারা বৈদিক পাঠকে এমনভাবে সাজাতে চেয়েছিলেন যাতে পশ্চিমা বিজ্ঞান ও সভ্যতার সামনে কোনো হীনম্মন্যতায় ভুগতে না হয়।

এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হলেন আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী (Swami Dayananda Saraswati)। তিনি দাবি করলেন যে, বেদের ভেতর কোনো ধরনের বহুদেববাদ বা মূর্তিপূজা নেই; বেদ প্রচার করে বিশুদ্ধ একশ্বরবাদ (Jordens, 1978)। শুধু তাই নয়, তিনি এ কথাও দাবি করতে পিছপা হননি যে আধুনিক বিজ্ঞানের সমস্ত আবিষ্কার – রেলগাড়ি, টেলিগ্রাফ, বিমান এবং পরমাণু শক্তি – বৈদিক মন্ত্রের সাংকেতিক ভাষায় আগে থেকেই বলা আছে। হির্শের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, দয়ানন্দের এই দাবি ছিল ঔপনিবেশিক চাপের মুখে দাঁড়িয়ে তৈরি হওয়া এক মরিয়া রাজনৈতিক তাৎপর্য (Hirsch, 1976)। দয়ানন্দ তার সমকালীন রাজনৈতিক সংকটের মোকাবেলা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি দাবি করেছিলেন যে এটিই নাকি বৈদিক কবিদের মূল প্রাথমিক অর্থ। এটি ছিল টেক্সটের ওপর পাঠকের সম্পূর্ণ ইচ্ছামতো অর্থ চাপিয়ে দেওয়ার এক নিখুঁত নজির।

একইভাবে জাতীয়তাবাদী ভাবুকরা বৈদিক যুগকে চিত্রিত করতে লাগলেন এক কাল্পনিক স্বর্ণযুগ হিসেবে, যেখানে কোনো সামাজিক শোষণ ছিল না, জাতিভেদ ছিল না এবং নারীরা সম্পূর্ণ সমান অধিকার ভোগ করত। কিন্তু বৈদিক সাহিত্যের ঐতিহাসিক ও ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ দেখায় যে, সেই সমাজেও যুদ্ধবন্দীদের দাস বানানো হতো, সমাজে পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার তীব্র দাপট ছিল এবং পশুসম্পদ নিয়ে নিয়মিত রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলত (Keith, 1925)। আধুনিক গবেষকদের অনেকেই যখন এই কঠোর বাস্তবতাগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে কেবল একটি মহিমান্বিত অতীত নির্মাণ করতে চান, তখন তারা হির্শ নির্দেশিত মূল অর্থ ও রচয়িতার অভিপ্রায়কে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। তারা অতীতের আয়নায় কেবল নিজেদের মুখটি দেখতে চান।

হির্শের হার্মেনিউটিক্স আমাদের এই রাজনৈতিক আত্মপ্রতারণার হাত থেকে মুক্ত হওয়ার কঠোর নির্দেশ দেয়। একজন নিরপেক্ষ ও ধর্মনিরপেক্ষ গবেষকের কাজ হলো এই আধুনিক তাৎপর্যের আবরণগুলোকে নির্মমভাবে উন্মোচন করা। বৈদিক সাহিত্য কোনো রাজনৈতিক স্লোগানের কাঁচামাল নয় এবং কোনো হারানো সাম্রাজ্যের গৌরবগাথাও নয়। এটি হলো সুদূর অতীতের এক দল মানুষের নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা, স্বার্থ ও ভাষা নিয়ে বেঁচে থাকার একটি ঐতিহাসিক দলিল। হির্শ আমাদের শেখান যে, আধুনিক মানুষ তার রাজনৈতিক বা মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োজনে কোনো প্রাচীন পাঠের কাছ থেকে নতুন তাৎপর্য খুঁজতেই পারে, কিন্তু সেই তাৎপর্যকে কোনো অবস্থাতেই যেন মূল ঐতিহাসিক অর্থ বলে বিভ্রান্ত না করা হয়। এই সীমানাটি রক্ষা করাই হলো একটি বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিক ও অ্যাকাডেমিক পাঠের সবচেয়ে বড় নৈতিকতা।

বৈদিক শব্দ ও ঐতিহাসিক অর্থ (Vedic Words and Historical Meaning): ভাষা থেকে ধারণাজগত পুনর্গঠন

শ্লাইয়ারমাখার ও ঋত (Schleiermacher and Ṛta): সত্য, শৃঙ্খলা, যজ্ঞ ও অর্থক্ষেত্র

ঋত ধারণার ব্যুৎপত্তি ও শ্লাইয়ারমাখারের শব্দার্থক্ষেত্র (Etymology of Ṛta and Schleiermacher’s Semantic Field)

একটি প্রাচীন শব্দের শরীরে হাত দিলে বোঝা যায় মানুষের চিন্তা কীভাবে ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছিল। কোনো শব্দই একদিনে তৈরি হয় না, আর কোনো শব্দের অর্থই আকাশ থেকে নেমে আসে না। বৈদিক সাহিত্যের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী ধারণাগুলোর একটি হলো ‘ঋত’ (Ṛta)। সনাতন ভাববাদী পাঠে এই শব্দটিকে প্রায়ই এক রহস্যময়, অতীন্দ্রিয় ও পবিত্র মহাজাগতিক সত্য হিসেবে চিত্রিত করা হয়। কিন্তু আধুনিক ব্যাখ্যাতাত্ত্বিক ফ্রিডরিশ শ্লাইয়ারমাখার (Friedrich Schleiermacher)-এর পদ্ধতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কোনো ধারণাকে বুঝতে হলে সবার আগে তার ভাষাগত ভিত্তি ও সমকালীন অর্থক্ষেত্রটি পরীক্ষা করতে হবে (Schleiermacher, 1998)। ভাষার বাইরে কোনো বিমূর্ত সত্যের অস্তিত্ব থাকতে পারে না। ঋত শব্দটি বোঝার প্রথম পদক্ষেপ হলো এর ব্যাকরণিক গঠন এবং ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাতত্ত্বের সাথে এর শিকড় সন্ধান করা।

ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, ঋত শব্দটি এসেছে প্রাচীন প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ধাতু ‘অর’ (*ar-) থেকে, যার সাধারণ অর্থ কোনো কিছুকে সঠিকভাবে জোড়া লাগানো, উপযুক্ত বিন্যাসে সাজানো বা মানানসই করা (Pokorny, 1959)। এই একই মূল থেকে প্রাচীন গ্রিক ভাষায় এসেছে ‘হারমোস’ (Harmos), যা থেকে আজকের আধুনিক শব্দ হারমনি বা সুরের সামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। লাতিন ভাষায় এই মূল থেকে এসেছে ‘অর্ডো’ (Ordo), যার অর্থ শৃঙ্খলা বা বিন্যাস। প্রাচীন ইরানি আবেস্তা ভাষার দিকে তাকালে আমরা এর হুবহু সমান্তরাল শব্দ পাই ‘অশ’ (Aša) বা ‘অর্ত’ (Arta) (Boyce, 1975)। এই ভাষাগত প্রমাণগুলো খুব স্পষ্ট করে দেখিয়ে দেয় যে, ঋত ধারণাটি কোনো একক আধ্যাত্মিক সাধকের ধ্যানের আবিষ্কার ছিল না। এটি ছিল প্রাচীন ইন্দো-ইরানীয় এবং ইন্দো-ইউরোপীয় পশুপালক জনগোষ্ঠীর একটি সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক ধারণা, যার মাধ্যমে তারা চারপাশের জগতের এক ধরনের সুবিন্যস্ত রূপকে প্রকাশ করতে চেয়েছিল।

শ্লাইয়ারমাখার তার হার্মেনিউটিক্সে একটি গভীর বিষয়ের অবতারণা করেছিলেন, যাকে বলা যায় শব্দার্থক্ষেত্র (Semantic Field / Bedeutungsfeld)। তার বক্তব্য ছিল, কোনো একক শব্দকে অভিধানের বিচ্ছিন্ন পাতা থেকে তুলে আনলে তার আসল অর্থ বোঝা যায় না; দেখতে হয় সেই শব্দটির চারপাশের প্রতিবেশে আর কোন কোন শব্দ বাস করছে (Schleiermacher, 1998)। ঋগ্বেদের সংহিতাগুলোতে ঋত শব্দটির অর্থক্ষেত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর ঘনিষ্ঠতম প্রতিবেশী হলো ‘সত্য’ (Satya), ‘ব্রত’ (Vrata) এবং ‘ধর্মস্থান’ বা ‘ধারক’ (Dharman)। গবেষক পল থিয়েমে (Paul Thieme) তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, বৈদিক চিন্তায় সত্য এবং ঋত এক জিনিস ছিল না (Thieme, 1957)। সত্য ছিল মূলত কোনো বস্তু বা ঘটনার বাস্তব অস্তিত্বের প্রকাশ – যা আসলেই ঘটেছে বা আছে। অন্যদিকে ঋত ছিল একটি গতিশীল শৃঙ্খলা, একটি পারস্পরিক সংযোগ, যার মাধ্যমে বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন উপাদান একটি সমন্বিত নিয়মে বাঁধা পড়ে।

শ্লাইয়ারমাখারের ব্যাকরণগত পদ্ধতি অনুসরণ করলে আমরা বুঝতে পারি যে, ঋত শব্দটিকে কোনো আধ্যাত্মিক মায়াজালে আবদ্ধ না রেখে এর আদি ভাষিক পরিসরে ফিরিয়ে নেওয়া কতটা জরুরি। প্রাচীন কবিরা যখন ঋত শব্দটি উচ্চারণ করতেন, তখন তারা কোনো বিমূর্ত ঈশ্বরের ইচ্ছার কথা বলতেন না। তারা বোঝাতে চাইতেন এমন একটি যথাযথ বিন্যাস, যা ভাঙলে পুরো ব্যবস্থাটি অচল হয়ে পড়ে। ঋতের উল্টো পিঠ ছিল ‘অনৃত’ (Anṛta), যার অর্থ কেবল মিথ্যা কথা বলা নয়, বরং সামগ্রিক শৃঙ্খলার ভেতর ফাটল ধরানো বা অসংগতি তৈরি করা। এই শব্দার্থক্ষেত্রের পুনর্গঠন আমাদের সামনে স্পষ্ট করে যে, ঋত ছিল প্রাক-বৈজ্ঞানিক যুগের এক দল মানুষের জগতকে নিয়মবদ্ধ দেখার একটি ভাষাগত ও যৌক্তিক প্রয়াস।

মহাজাগতিক শৃঙ্খলা বনাম প্রাকৃতিক চক্রের পর্যবেক্ষণ (Cosmic Order versus Observation of Natural Cycles)

প্রাচীন যুগের মানুষের জীবন ছিল প্রকৃতির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। আধুনিক মানুষের মতো প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রযুক্তি তাদের ছিল না। ঋতু পরিবর্তনের ওপর তাদের খাদ্য, গবাদিপশুর জীবন এবং নিজেদের বেঁচে থাকা নির্ভর করত। ডিলথাই যেমন বলেছিলেন যে মানুষের অভিজ্ঞতাই ভাষার জন্ম দেয়, শ্লাইয়ারমাখারের ব্যাকরণিক পাঠও দেখায় কীভাবে সেই অভিজ্ঞতার ছাপ শব্দের শরীরে বসে যায়। বৈদিক সাহিত্যের পাতায় ঋত ধারণার সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ হলো প্রাকৃতিক চক্রের নিয়মিত আবর্তন। কবিরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করতেন যে, রাতের পর দিন আসছে, শীতের পর বসন্ত আসছে, আর শুকিয়ে যাওয়া নদীগুলো আবার জলে ভরে উঠছে। এই নিয়মিত পুনরাবৃত্তিকে তারা নাম দিয়েছিলেন ‘ঋতস্য পন্থা’ (Ṛtasya Panthāḥ) বা ঋতের পথ (Lüders, 1959)।

সনাতন ধর্মতত্ত্ব এই প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণকে উল্টে দিয়ে দাবি করে যে, এক অদৃশ্য ও পবিত্র বিধানের ফলেই নাকি প্রকৃতি এভাবে চলছে। কিন্তু একজন নির্মোহ ধর্মনিরপেক্ষ গবেষকের কাছে বিষয়টি একেবারেই উল্টো। মানুষ প্রথমে প্রকৃতির এই চক্রাকার নিয়মটি স্বচক্ষে দেখেছিল, এবং সেই বাস্তব অভিজ্ঞতাকে ব্যাখ্যা করতেই ঋত নামের ধারণাটি নির্মাণ করেছিল। শ্লাইয়ারমাখারের পদ্ধতি অনুযায়ী, প্রাচীন রচয়িতার রূপকগুলোকে আক্ষরিক সত্য হিসেবে না দেখে তাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতার ভেতর দিয়ে বুঝতে হয় (Schleiermacher, 1998)। বৈদিক মানুষ যখন দেখত সূর্য প্রতিদিন সকালে একটি নির্দিষ্ট পথ ধরে উঠছে এবং পশ্চিমে ডুব দিচ্ছে, তখন তারা ভাবত নিশ্চয়ই কোনো অদৃশ্য রাস্তা আছে যা সূর্য মেনে চলতে বাধ্য। এই পথটিই হলো ঋত। এটি কোনো অলৌকিক বিধান নয়, বরং মানুষের প্রাথমিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ও ভৌগোলিক পর্যবেক্ষণের একটি কাব্যিক রূপায়ণ।

বৈদিক সাহিত্যে নদীর গতিপথকে প্রায়ই ঋতের সাথে তুলনা করা হয়েছে। পাঞ্জাব অঞ্চলের বরফগলা জলের সাতটি নদী যখন বর্ষাকালে কূল ছাপিয়ে বইত, তখন কবিরা বলতেন নদীগুলো ঋতের নিয়মে সমুদ্রে ধাবিত হচ্ছে। ঐতিহাসিক মাইকেল উইটজেল (Michael Witzel) বৈদিক ভূগোলের আলোচনায় দেখিয়েছেন যে, নদীমাতৃক এই ভৌগোলিক বাস্তবতাই ছিল ঋতের ধারণার বস্তুগত ভিত্তি (Witzel, 1995)। নদী যদি তার গতিপথ পরিবর্তন করত বা শুকিয়ে যেত, তবে পশুপালক জনপদগুলোর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ত। তাই নদীগুলোর নিজস্ব নিয়মে বয়ে চলা ছিল তাদের অস্তিত্বের প্রধান শর্ত। প্রকৃতির এই শৃঙ্খলা কোনো আধ্যাত্মিক খেয়াল ছিল না; তা ছিল জীবন ও মৃত্যুর মধ্যকার সীমানা।

অতএব, বৈদিক কবির প্রাকৃতিক স্তোত্রগুলোকে ডিকোড করতে হলে শ্লাইয়ারমাখারের ঐতিহাসিক পাঠ অত্যন্ত কার্যকর। ঊষা বা ভোরের আলোর আগমনের স্তোত্রে ঋতের উপস্থিতি বারবার দেখা যায়। ঊষাকে বলা হয়েছে ‘ঋতজাত’ (Ṛtajāta), অর্থাৎ ঋত থেকে যার জন্ম। কবিরা লক্ষ্য করেছিলেন যে আলো কখনোই অন্ধকারের নিয়ম ভেঙে ভুল সময়ে হাজির হয় না; তার আসার একটি সুনির্দিষ্ট কালক্রম রয়েছে। প্রাক-বৈজ্ঞানিক মানুষের কাছে এই প্রাকৃতিক ধারাবাহিকতাই ছিল পরম নির্ভরতার জায়গা। তারা একে কোনো অতীন্দ্রিয় জগতের আলো হিসেবে দেখেনি; তারা দেখেছিল তাদের দৈনন্দিন চারণভূমিতে আলো ফিরে আসার বাস্তব নিশ্চয়তা হিসেবে। ঋতের এই মহাজাগতিক রূপটি আসলে প্রকৃতির বাস্তব নিয়মাবলির ওপর মানুষের প্রাথমিক বুদ্ধিবৃত্তিক আস্থারই এক ভাষাগত দলিল।

সামাজিক চুক্তি, শপথ ও নৈতিক বিন্যাস (Social Contract, Oaths and Moral Arrangement)

ঋত কেবল আকাশে বা ঋতু পরিবর্তনের ভেতর সীমাবদ্ধ ছিল না; ধীরে ধীরে তা মানুষের সামাজিক সম্পর্কের ভেতরেও প্রবেশ করেছিল। একটি পশুপালক বা প্রাথমিক কৃষিভিত্তিক সমাজকে টিকে থাকতে হলে গোত্রগুলোর মধ্যে কিছু সাধারণ নিয়ম মানতে হয়। যদি প্রতিবেশীর সাথে করা চুক্তি ভেঙে ফেলা হয়, তবে অবিরাম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হতে পারে। এই বাস্তব সংকট থেকেই ঋত ধারণাটি একটি সামাজিক ও নৈতিক চরিত্র অর্জন করেছিল। প্রাচীন সমাজে যখন কোনো লিখিত আইন বা পুলিশি ব্যবস্থা ছিল না, তখন সমাজকে শৃঙ্খলিত রাখার প্রধান হাতিয়ার ছিল শপথ এবং সামাজিক চুক্তি। শ্লাইয়ারমাখারের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেখায় কীভাবে ভাষার শব্দ সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় (Schleiermacher, 1998)।

এই নৈতিক ও সামাজিক বিন্যাসের কেন্দ্রীয় অভিভাবক হিসেবে বৈদিক সাহিত্যে হাজির করা হয়েছিল দুই দেবতাকে – মিত্র (Mitra) এবং বরুণ (Varuṇa)। ভারততত্ত্ববিদ হেনরিশ লুডার্স (Heinrich Lüders) তার বিখ্যাত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, বৈদিক বরুণ মূলত কোনো দূরবর্তী স্বর্গের ঈশ্বর নন; তিনি হলেন শপথ এবং প্রতিশ্রুতির রক্ষক (Lüders, 1951)। মিত্র শব্দের অর্থই ছিল বন্ধু বা চুক্তি। এই দুই দেবতা মিলে পাহারা দিতেন যেন মানুষ তার দেওয়া কথা রক্ষা করে। কবিরা বলতেন, মিত্র ও বরুণ হলেন ‘ঋতস্য গোপা’ (Ṛtasya Gopā) বা ঋতের রাখাল। কোনো ব্যক্তি যদি গোত্রের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করত, তবে মনে করা হতো সে ঋতকে ভঙ্গ করেছে। বরুণের মায়াবী ফাঁসের ভয় দেখিয়ে মানুষকে সামাজিক চুক্তিতে অনুগত রাখার চেষ্টা করা হতো।

এখানে কোনো অতীন্দ্রিয় পাপ-পুণ্যের ধারণা ছিল না; বিষয়টি ছিল অত্যন্ত পার্থিব ও সামাজিক। গবেষক এফ. বি. জে. কুইপার (F. B. J. Kuiper) দেখিয়েছেন যে, বৈদিক সমাজে শপথ ছিল অস্তিত্ব রক্ষার এক চূড়ান্ত প্রকাশ্য আনুষ্ঠানিকতা (Kuiper, 1979)। দুই গোত্রের মধ্যে যখন গবাদিপশু ভাগাভাগি বা চারণভূমির সীমানা নিয়ে বিরোধ মেটানো হতো, তখন সেখানে ঋতের নামে শপথ নেওয়া হতো। সেই শপথ ভঙ্গ করলে পুরো গোত্রের টিকে থাকা হুমকির মুখে পড়ত। অনৃত আচরণ মানে ছিল সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করা। ফলে ঋত হয়ে উঠেছিল গোত্রীয় সংহতি ধরে রাখার প্রধান মতাদর্শিক বন্ধন। শ্লাইয়ারমাখারের হার্মেনিউটিক্স আমাদের স্পষ্ট করে দেখায় যে, ধর্মের পোশাক পরিয়ে কীভাবে প্রাচীন সমাজ তার আইনগত ও নৈতিক শৃঙ্খলাকে পবিত্র করে তুলেছিল।

এই সামাজিক ব্যবস্থার ভেতরেই নিহিত ছিল প্রাচীন ভারতের প্রাথমিক বিচারবোধের বীজ। মানুষ যখন দেখত যে কোনো চুক্তি ভঙ্গ করলে রক্তক্ষয় ঘটে, তখন তারা শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজন অনুভব করত। ঋতের এই নৈতিক চরিত্রটি পরবর্তীকালের জটিল আইনশাস্ত্র বা স্মৃতিগ্রন্থগুলোর পূর্বসূরি। তবে বৈদিক স্তরে এটি কোনো ব্যক্তিগত মোক্ষ বা অন্তর্মুখী নীতিবোধ ছিল না। এটি ছিল পুরোপুরি যৌথ জীবনের শৃঙ্খলা। গোত্রের প্রতি আনুগত্য, প্রতিবেশীর সাথে চুক্তির মর্যাদা এবং শত্রুর সাথে লড়াইয়ের সময় দেওয়া কথার মূল্য রক্ষা করাই ছিল ঋতের আসল সামাজিক দাবি। একে কোনো আধ্যাত্মিক পরমার্থ ভাবলে তার আসল সমাজতাত্ত্বিক উপযোগিতাটি হারিয়ে যায়।

যজ্ঞের নিখুঁত ক্রম ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ (Rigid Sequence of Ritual and Institutional Control)

বৈদিক সাহিত্যের বিকাশ যখন সংহিতা থেকে ব্রাহ্মণ সাহিত্যের দিকে মোড় নেয়, তখন ঋত ধারণাটির সবচেয়ে মারাত্মক রূপান্তর ঘটে। আদি স্তরে যা ছিল প্রকৃতির পর্যবেক্ষণ এবং সামাজিক চুক্তি, তা সংকুচিত হয়ে আটকে গেল যজ্ঞের অগ্নিকুণ্ডের চারপাশের কিছু কঠোর নিয়মের ভেতর। বৈদিক যজ্ঞ কোনো সাধারণ ধর্মীয় উপাসনা ছিল না; তা ছিল এক জটিল আনুষ্ঠানিক আচারপদ্ধতি। যজ্ঞের প্রতিটি চরণের উচ্চারণ, প্রতিটি কাষ্ঠখণ্ডের অবস্থান এবং ঘৃতাহুতির নিখুঁত সময়কে দাবি করা হলো ঋতের বাস্তব রূপ হিসেবে। পুরোহিতরা প্রচার করতে লাগলেন যে, যজ্ঞ হলো ‘ঋতস্য ধাম’ (Ṛtasya Dhāma) বা ঋতের আবাসস্থল (Lüders, 1959)।

শ্লাইয়ারমাখারের টেক্সট বিশ্লেষণের অন্যতম সূত্র হলো – বয়ানের পেছনে থাকা পেশাজীবী বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থকে উন্মোচন করা (Schleiermacher, 1998)। বৈদিক যুগে পুরোহিত শ্রেণী কীভাবে ঋত শব্দটিকে দখল করেছিল, তা লক্ষ্য করলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। পুরোহিতরা দাবি করলেন, মহাবিশ্বের প্রাকৃতিক শৃঙ্খলা আপনাআপনি চলে না; যজ্ঞের বেদিতে তারা যে নিখুঁত ক্রম রক্ষা করেন, তার জোরেই সূর্য ওঠে এবং বৃষ্টি নামে। যজ্ঞে একটি মন্ত্র যদি ভুল উচ্চারিত হয় বা স্বরভঙ্গ ঘটে, তবে নাকি মহাবিশ্বের ঋত ভেঙে পড়বে এবং বিনাশ নেমে আসবে। এই মারাত্মক ভীতি ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পুরোহিতরা নিজেদের যজ্ঞশিল্পকে সমাজের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী এবং অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছিলেন (Oberlies, 1998)।

এই প্রক্রিয়ায় ঋতের আসল কাব্যিক ও মানবিক অর্থটি পুরোপুরি হারিয়ে গেল। গবেষক থমাস ওবারলিজ (Thomas Oberlies) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ঋগ্বেদের শেষ ভাগে এবং যজুর্বেদে এসে ঋত হয়ে উঠল একটি যান্ত্রিক নিয়মাবলি (Oberlies, 1998)। যজ্ঞের বেদি নির্মাণে জ্যামিতিক নিখুঁততা এবং পশুবলির সুনির্দিষ্ট নিয়মই হয়ে দাঁড়াল ঋত রক্ষা করার একমাত্র উপায়। এর ফলে সাধারণ মানুষ বা উৎপাদনকারী শ্রেণীর আর সরাসরি প্রকৃতির সাথে যোগাযোগ করার ক্ষমতা রইল না। তাদের সবসময় মুখাপেক্ষী হতে হতো এমন এক দল বিশেষজ্ঞের, যারা এই যজ্ঞীয় ঋত পরিচালনায় দক্ষ। শ্লাইয়ারমাখারের প্রাতিষ্ঠানিক সমালোচনা পদ্ধতি এই ঐতিহাসিক শোষণটিকে নগ্ন করে দেয়। ঋতের মতো একটি উদার প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণকে পুরোহিততন্ত্র তাদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার আইনি খড়গ বানিয়ে ফেলেছিল।

অতএব, যজ্ঞের প্রেক্ষাপটে ঋতের আলোচনা কোনো পবিত্র আচারতত্ত্ব নয়; তা হলো ভাষার ওপর ও আচারের ওপর কায়েমি স্বার্থের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক ইতিহাস। মন্ত্রের শব্দবিন্যাস এবং যজ্ঞের ক্রিয়াকলাপের মধ্যে যে একাত্মতা তৈরি করা হয়েছিল, তার লক্ষ্য ছিল সামাজিক উদ্বৃত্ত সম্পদ যজ্ঞের নামে নিজেদের হাতে নিয়ে আসা। রাজা বা ধনী যজমানকে বিশ্বাস করানো হতো যে, ঋত রক্ষা করতে হলে পুরোহিতদের বিপুল দক্ষিণা দিয়ে এই ব্যয়বহুল যজ্ঞ সম্পন্ন করতে হবে। ঋতের এই যজ্ঞীয় রূপান্তরটি প্রমাণ করে যে, কোনো ধারণাই সমাজে চিরকাল নিষ্পাপ থাকে না। শ্রেণীস্বার্থ ও ক্ষমতার সংঘাত যেকোনো সুন্দর মহাজাগতিক কল্পনাকেও একটি নিপীড়নমূলক প্রাতিষ্ঠানিক যন্ত্রে রূপান্তর করতে পারে।

ঋত থেকে ধর্মের রূপান্তর ও অর্থগত বিলোপ (Transition from Ṛta to Dharma and Semantic Decline)

ভাষা বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনাগুলোর একটি হলো কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ শব্দের ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া। ঋগ্বেদের পাতায় যে ঋত শব্দটি শত শত বার ব্যবহৃত হয়েছিল এবং যা ছিল বৈদিক চিন্তার কেন্দ্রীয় খুঁটি, পরবর্তী ধ্রুপদী সংস্কৃত সাহিত্যে সেই শব্দটি প্রায় পুরোপুরি অপ্রচলিত হয়ে পড়ল। মহাকাব্য, নাটক বা পরবর্তী দর্শনে ঋত শব্দটির ব্যবহার খুঁজে পাওয়া কঠিন। তার জায়গায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করল একটি নতুন শব্দ – ‘ধর্ম’ (Dharma)। শ্লাইয়ারমাখারের ঐতিহাসিকতাবাদী হার্মেনিউটিক্স এই রূপান্তরটিকে বুঝতে সাহায্য করে। তিনি বলেছিলেন, কোনো ভাষার শব্দভাণ্ডার তখনই বদলে যায় যখন সমাজের অন্তর্নিহিত জীবনজগৎ ও অর্থনৈতিক ভিত্তির আমূল রূপান্তর ঘটে (Schleiermacher, 1998)।

ঋগ্বেদের যুগ ছিল চারণভূমিভিত্তিক, গতিশীল এবং গোত্রীয় ঐক্যের যুগ। সেই যুগে প্রকৃতির সাথে লড়াই এবং সহজ সামাজিক চুক্তি বোঝাতে ঋত শব্দটি মানানসই ছিল। কিন্তু যখন উত্তর ভারতে লোহার লাঙলের ব্যবহার শুরু হলো এবং স্থায়ী কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজ ও বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা গড়ে উঠল, তখন সমাজের চাহিদা বদলে গেল (Sharma, 1983)। নতুন এই স্থিতিশীল ও কঠোর বৈষম্যমূলক সমাজে এমন একটি শব্দের প্রয়োজন ছিল যা পরিবর্তনকে নয়, বরং স্থিতাবস্থাকে ধরে রাখবে। ধর্ম শব্দটি এসেছে ‘ধৃ’ (Dhṛ-) ধাতু থেকে, যার অর্থ কোনো কিছুকে ধারণ করা বা ধরে রাখা। ধর্মের প্রধান কাজ হয়ে উঠল যার যার নির্ধারিত সামাজিক অবস্থানকে চিরস্থায়ী করা – ব্রাহ্মণের কাজ শাস্ত্র পড়া, ক্ষত্রিয়ের কাজ শাসন করা, আর শূদ্রের কাজ সেবা করা।

ভাষাতাত্ত্বিক ও ভারততত্ত্ববিদ এমিল বেনভেনিস্ত (Émile Benveniste) প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন কীভাবে আইন ও নৈতিকতার শব্দগুলো বস্তুগত সম্পর্কের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয় (Benveniste, 1973)। ঋত ধারণার মধ্যে যে একটি সক্রিয়, সচল ও প্রাকৃতিক গতির ইঙ্গিত ছিল, তা নতুন কৃষিভিত্তিক পিতৃতান্ত্রিক সমাজের জন্য বিপজ্জনক হতে পারত। সেখানে দরকার ছিল এমন একটি ধারণা যা সামাজিক স্তরায়ণকে অলঙ্ঘনীয় করে তুলবে। ধর্ম ঠিক সেই কাজটিই করল। ঋতের জায়গায় ধর্ম এবং তার সাথে যুক্ত হলো ‘কর্ম’ (Karman)-এর মতবাদ। মানুষকে বোঝানো হলো যে তার বর্তমান দুঃখ বা সামাজিক নিম্নাবস্থান কোনো প্রাকৃতিক বিষয় নয়, তা তার পূর্বজন্মের কর্মের ফল এবং তার একমাত্র দায়িত্ব হলো নিজের নির্ধারিত বর্ণধর্ম পালন করে যাওয়া।

শ্লাইয়ারমাখারের পদ্ধতি অনুসরণ করলে বোঝা যায় যে, ঋতের বিলোপ এবং ধর্মের উত্থান কোনো সাধারণ শব্দবদল ছিল না। এটি ছিল একটি গভীর মতাদর্শিক ও সামাজিক বিপ্লবের প্রতিফলন। ঋতের যে আদি মহাজাগতিক ও কিছুটা গণতান্ত্রিক চরিত্র ছিল, যেখানে প্রকৃতির সামনে সব মানুষ একই শৃঙ্খলার অধীন ছিল, তা ভেঙে দিয়ে তৈরি করা হলো মানুষে মানুষে আজীবন বৈষম্য টিকিয়ে রাখার এক শাস্ত্রীয় বিধান। পরবর্তীকালের স্মৃতিশাস্ত্রগুলো ঋত শব্দটিকে কেবল সত্য কথার সমার্থক হিসেবে কোনোমতে একটি কোণায় ফেলে রাখল এবং ধর্মকে বানিয়ে দিল সমাজ শাসনের প্রধানতম নীতি। এই শব্দার্থিক বিবর্তনটি পরীক্ষা করলেই স্পষ্ট হয়ে যায় কীভাবে ইতিহাসের চাকা ঘোরার সাথে সাথে ভাষার ক্ষমতার রাজনীতিও তার রূপ বদলে ফেলে।

আধুনিক ব্যাখ্যাতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক মোহমুক্তি (Modern Hermeneutics and Spiritual Demystification)

আধুনিক যুগে এসে ঋত ধারণার পুনর্মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। উনিশ ও বিশ শতকে আধুনিক সনাতন ভাবুকরা এবং পশ্চিমা প্রাচ্যবিদদের একাংশ ঋতকে এমন এক আধ্যাত্মিক মোড়কে উপস্থাপন করেছিলেন যেন প্রাচীন ভারতীয় ঋষিরা আধুনিক পরিবেশবাদ বা পরমাত্মার তত্ত্ব আগেই আবিষ্কার করে বসেছিলেন। কেউ কেউ দাবি করেন যে, ঋত হলো মহাবিশ্বের এক অনন্ত চৈতন্য যা আধুনিক কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাথে মিলে যায়। এই ধরনের অপবৈজ্ঞানিক ও ভাবালুতাপূর্ণ দাবি যেকোনো বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চার জন্য চরম ক্ষতিকর। শ্লাইয়ারমাখারের যুক্তিবাদী হার্মেনিউটিক্স আমাদের এই সমস্ত আধুনিক পৌরাণিকতা থেকে মুক্ত হওয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা দেয় (Forster, 2010)।

শ্লাইয়ারমাখার আমাদের শিখিয়েছেন যে, একটি প্রাচীন ধারণাকে তার নিজস্ব ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতার বাইরে টেনে এনে আধুনিক কোনো বিজ্ঞানের সাথে মেলানো এক ধরণের মারাত্মক বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা। ঋগ্বেদের কবিরা কোনো আধুনিক পদার্থবিদ ছিলেন না; তারা ছিলেন ব্রোঞ্জ ও প্রাথমিক লৌহযুগের একদল মানুষ যারা প্রকৃতির কঠোরতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের অস্তিত্বের নিরাপত্তা খুঁজছিলেন (Brereton, 1981)। ঋত ছিল তাদের পর্যবেক্ষণ, তাদের ভয়, তাদের সামাজিক চুক্তি এবং তাদের যজ্ঞীয় কৌশলের এক জটিল সংমিশ্রণ। এর বাইরে একে কোনো চিরন্তন বা ঐশ্বরিক বিধান বলে দাবি করার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বিজ্ঞান কাজ করে বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কার্যকারণ সূত্রের ওপর ভিত্তি করে, কোনো প্রাচীন কাব্যের রূপকের ওপর নয়।

আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্লেষণে ঋতের গুরুত্ব তার কোনো অলৌকিক ক্ষমতার মধ্যে নেই; এর গুরুত্ব হলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের একটি আদি স্তরকে চেনার মাধ্যম হিসেবে। মানুষ কীভাবে বিশৃঙ্খল প্রকৃতির ভেতর শৃঙ্খলার সূত্র খুঁজতে শুরু করেছিল, কীভাবে সে এলোমেলো ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ নিয়মের কল্পনা করেছিল – ঋত হলো সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক (Watkins, 1995)। এটি মানুষের নিজস্ব চিন্তার ফসল, তার সামাজিক প্রয়োজনের ফসল। যখন আমরা ঋতকে কোনো পবিত্র ধর্মীয় কারাগার থেকে মুক্ত করে মানব সভ্যতার সাংস্কৃতিক বিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখি, তখনই কেবল তার প্রতি প্রকৃত ঐতিহাসিক সুবিচার করা হয়।

পরিশেষে বলা যায়, শ্লাইয়ারমাখারের শব্দার্থক্ষেত্র, ব্যাকরণ ও ঐতিহাসিক প্রসঙ্গের সমন্বিত পদ্ধতি ঋত ধারণার সমস্ত মরমীবাদী কুয়াশা দূর করে দেয়। সত্য, শৃঙ্খলা ও যজ্ঞের যে ত্রিভুজ দিয়ে ঋতকে বৈদিক সাহিত্যে সাজানো হয়েছিল, তা কোনো দেবদূতের বার্তা ছিল না; তা ছিল এক বিশেষ ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতায় মানুষের বেঁচে থাকার কৌশল। ঋত শব্দটির উত্থান, তার প্রাতিষ্ঠানিক অপব্যবহার এবং পরবর্তীতে ধর্মের কাছে তার পরাজয় – এই পুরো ইতিহাসটি আসলে প্রাচীন ভারতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরেরই এক স্পষ্ট ভাষিক প্রতিচ্ছবি। এই নির্মোহ ও বৈজ্ঞানিক উপলব্ধিটি প্রতিষ্ঠা করাই আধুনিক অ্যাকাডেমিক পাঠের মূল সার্থকতা।

গাডামার ও দেব ধারণা (Gadamer and the Concept of Deva): ঈশ্বর ধারণা ও ঐতিহাসিক দিগন্ত

গাডামারের ঐতিহাসিক দিগন্ত ও পূর্বধারণার পুনর্বিচার (Gadamer’s Historical Horizon and Re-evaluation of Prejudice)

আমরা যখন কোনো প্রাচীন বই পড়তে বসি, তখন ভাবি আমরা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ মন নিয়ে পড়তে বসেছি। কিন্তু এই ভাবনাটি একটি মস্ত বড় ভুল। মানুষ কখনো তার নিজস্ব সময়, ভাষা এবং সংস্কারের বাইরে দাঁড়িয়ে কোনো কিছু দেখতে পারে না। জার্মান দার্শনিক হান্স-গেয়র্গ গাডামার (Hans-Georg Gadamer) এই বাস্তব সত্যটিকে দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। তিনি তার প্রধান গ্রন্থ ট্রুথ অ্যান্ড মেথড (Truth and Method)-এ দেখান যে, অতীতকে বোঝার চেষ্টা কখনো অতীতের হুবহু নকল তৈরি করা নয় (Gadamer, 1989)। প্রতিটি পাঠকের একটি নিজস্ব দেখার পরিসীমা থাকে, যাকে তিনি নাম দিয়েছেন ঐতিহাসিক দিগন্ত (Historical Horizon)। অতীত পাঠের মুখোমুখি হলে পাঠকের দিগন্ত এবং টেক্সটের দিগন্ত পরস্পরের সাথে সংঘাত ও সংলাপে লিপ্ত হয়।

গাডামার আলোকায়ন বা এনলাইটেনমেন্ট যুগের সেই অন্ধ বিশ্বাসকে আক্রমণ করেছিলেন, যা মনে করত মানুষ চাইলে তার সমস্ত সংস্কার ঝেড়ে ফেলে এক বিশুদ্ধ যুক্তি দিয়ে সবকিছু বিচার করতে পারে। তিনি বললেন, মানুষের চিন্তা কখনো পূর্বধারণা ছাড়া শুরু হতে পারে না। এই ধারণাকে তিনি অভিহিত করেছেন পূর্বসংস্কার বা পূর্বধারণা (Prejudice / Vorurteil) হিসেবে (Warnke, 1987)। তবে গাডামারের কাছে পূর্বধারণা মানে কোনো সংকীর্ণ অন্ধবিশ্বাস নয়; এটি হলো কোনো বিষয়কে বোঝার প্রাথমিক প্রবেশদ্বার। আমরা যখন বৈদিক সাহিত্যের দেব-দেবী বা দেবচরিত্রের মুখোমুখি হই, তখন আমরা এক জটিল পূর্বধারণা নিয়ে হাজির হই। আধুনিক মানুষ ‘ঈশ্বর’, ‘গড’ বা কোনো সর্বশক্তিমান পরমাত্মা বলতে যা বোঝে, সেই ধারণাটি নিয়ে সে বৈদিক পাঠে প্রবেশ করে। ফলে শুরুতেই একটি বড় বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

বৈদিক সাহিত্যে ব্যবহৃত ‘দেব’ (Deva) শব্দটিকে যখন আধুনিক কোনো ধর্মবিশ্বাসী পড়েন, তখন তিনি সেখানে তার নিজস্ব একেশ্বরবাদী বা আধুনিক হিন্দুধর্মের রূপটি দেখতে পান। গাডামারের তত্ত্ব আমাদের সতর্ক করে যে, এই দেখাটি আসলে বৈদিক সত্য নয়, এটি হলো আধুনিক পাঠকের নিজস্ব ঐতিহাসিক দিগন্তের প্রতিফলন (Grondin, 1994)। প্রাচীন বৈদিক মানুষের দেখার দিগন্ত ছিল একেবারেই আলাদা। তারা যে প্রাকৃতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে দেব চরিত্রগুলোকে কল্পনা করেছিল, তার সাথে আধুনিক মানুষের কোনো মিল নেই। পাঠক যদি নিজের এই পূর্বধারণা সম্পর্কে সচেতন না হয়, তবে সে প্রাচীন পাঠের ওপর নিজের আধুনিক চিন্তা চাপিয়ে দিতে বাধ্য।

গাডামারের হার্মেনিউটিক্স তাই কোনো ধর্মতাত্ত্বিক আপস নয়; এটি হলো এক কঠোর আত্মসমালোচনা। বৈদিক পাঠ উদ্ধার করতে হলে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ গবেষককে আগে নিজের দৃষ্টিভঙ্গির সীমানা বুঝতে হবে। বৈদিক সাহিত্যে কোনো অতীন্দ্রিয় ঈশ্বরের মহিমা খোঁজা অর্থহীন, কারণ সেই ধারণার জন্মই হয়েছে অনেক পরবর্তীকালে। প্রাচীন মানুষ কীভাবে তাদের সীমাবদ্ধ জগতে দাঁড়িয়ে দেব ধারণাকে তৈরি করেছিল, তা জানতে হলে আমাদের আধুনিক ঈশ্বর-ধারণার খোলসটি ভেঙে বের হয়ে আসতে হবে। গাডামারের ঐতিহাসিক দিগন্তের ধারণা আমাদের সেই ঐতিহাসিক ব্যবধানটুকু স্পষ্ট করে দেখতে শেখায়।

দেব ধারণার ব্যুৎপত্তি ও আদি দিগন্ত (Etymology of Deva and the Original Horizon)

বৈদিক ‘দেব’ শব্দটির আসল চরিত্র বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে এর ইন্দো-ইউরোপীয় শিকড়ে। ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ব দেখায় যে, দেব শব্দটি এসেছে প্রাক-ইন্দো-ইউরোপীয় ধাতু ‘দ্যু’ (*dyeu-) থেকে, যার সাধারণ অর্থ হলো আলোকিত হওয়া, উজ্জ্বল হওয়া বা দিনের আলো (Clackson, 2007)। এই একই মূল থেকে প্রাচীন গ্রিক ভাষায় এসেছে ‘জিউস’ (Zeus), লাতিন ভাষায় এসেছে ‘দেউস’ (Deus) এবং রোমানদের প্রধান দেবতা ‘জুপিটার’ (Jupiter)-এর নাম (West, 2007)। এই ভাষাগত যোগসূত্রটি পরিষ্কার করে দেয় যে, দেব ধারণার আদি অর্থ কোনো নিরাকার, সর্বব্যাপী বা জগতের স্রষ্টা ঈশ্বর ছিল না। এর আক্ষরিক ও প্রাথমিক অর্থ ছিল – ‘আলোকিত বা উজ্জ্বল সত্তা’।

প্রাচীন বৈদিক পশুপালক জনগোষ্ঠীর আদি ঐতিহাসিক দিগন্তটি ছিল সম্পূর্ণ আকাশ ও আলোনির্ভর। তারা দিন ও রাতের তীব্র পার্থক্যের ভেতর বাস করত। রাত ছিল অন্ধকারের, শীতের এবং হিংস্র শ্বাপদের ভয়ের প্রতীক; আর দিন ছিল সূর্য, আলো ও নিরাপত্তার প্রতীক। ফলে আকাশের যেসব উপাদান আলো ছড়াত – সূর্য, বিদ্যুৎ, ঊষা বা আগুন – সেগুলোকে তারা ‘দেব’ বলে চিহ্নিত করেছিল (Müller, 1878)। এই উজ্জ্বলতা কোনো অলৌকিক পবিত্রতা ছিল না; তা ছিল তাদের চোখের সামনে ঘটা এক বাস্তব প্রাকৃতিক ঘটনা। কবিরা যখন এই প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর স্তুতি করতেন, তখন তারা আসলে নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য আলোর অপরিহার্যতাকেই স্বীকার করতেন।

বৈদিক সংহিতাগুলোর ভেতর দেবতারা কোনো অলৌকিক শূন্যতায় বাস করতেন না। তারা ছিলেন অত্যন্ত পার্থিব এবং দৃশ্যমান। যাস্ক (Yāska) তার প্রাচীন ব্যুৎপত্তি বিষয়ক গ্রন্থ নিরুক্ত (Nirukta)-এ দেবতাদের তিনটি সুস্পষ্ট ভৌগোলিক স্তরে ভাগ করেছিলেন – পৃথিবীর দেবতা (যেমন অগ্নি), অন্তরীক্ষের দেবতা (যেমন ইন্দ্র বা বায়ু) এবং দ্যুলোক বা আকাশের দেবতা (যেমন সূর্য বা বরুণ) (Sarup, 1920)। এই শ্রেণিবিন্যাস দেখায় যে, বৈদিক চিন্তায় দেবতারা ছিলেন বিশ্বজগতের বিভিন্ন প্রাকৃতিক স্তরের একেকটি রূপক। এই রূপকগুলোর সাথে পরলৌকিক বিচার বা কোনো নৈতিক স্বর্গের সম্পর্ক ছিল না; সম্পর্ক ছিল মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের বস্তুগত অভিজ্ঞতার সাথে।

গাডামারের হার্মেনিউটিক্স দিয়ে তাকালে আমরা বুঝতে পারি যে, আদি বৈদিক দিগন্তে দেবতারা ছিলেন প্রকৃতির এক একটি শক্তিশালী শক্তির প্রতীকী প্রকাশ মাত্র। সেখানে কোনো সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ধারণা ছিল না যিনি শূন্য থেকে পৃথিবী বানিয়েছেন। বৈদিক মানুষ দেখত যে প্রকৃতিতে বহু শক্তি কাজ করছে – কখনো ঝড় হচ্ছে, কখনো আগুন জ্বলছে, আবার কখনো নদী বইছে। এই বিচিত্র শক্তির মুখোমুখি হয়ে তারা একাধিক দেবতার কল্পনা করেছিল। দেব ধারণার এই আদি দিগন্তটিকে স্বীকার করলেই কেবল বৈদিক বহুদেববাদের আসল ঐতিহাসিক চরিত্রটি উন্মোচিত হয়। একে পরবর্তী যুগের একেশ্বরবাদের মোড়কে মুড়ে ফেলা একটি বড় ঐতিহাসিক জালিয়াতি।

একেশ্বরবাদী প্রকল্প বনাম বহুদেববাদী বাস্তবতা (Monotheistic Project versus Polytheistic Reality)

উনবিংশ শতাব্দীতে যখন ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদরা এবং ভারতীয় সংস্কারকরা বৈদিক সাহিত্য নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন, তখন এক বড় মতাদর্শিক সংঘাত দেখা দিল। পশ্চিমা খ্রিস্টান পণ্ডিতরা এবং তাদের প্রভাবে গড়ে ওঠা আধুনিক হিন্দু সংস্কারকরা বহুদেববাদকে এক ধরনের আদিম ও হীন ব্যবস্থা হিসেবে দেখতেন। তাদের কাছে একেশ্বরবাদই ছিল সভ্যতার চূড়ান্ত লক্ষণ। এই মানসিকতা থেকেই জার্মান প্রাচ্যবিদ ম্যাক্স মুলার (Max Müller) বৈদিক সাহিত্যের বহুদেববাদকে ব্যাখ্যা করার জন্য একটি অদ্ভুত তত্ত্ব ফাঁদলেন, যার নাম দিলেন ‘কাথেনোথিজম বা হেনোথিজম’ (Henotheism / Kathenotheism) (Müller, 1878)। এর অর্থ হলো, বৈদিক কবিরা যখন যে দেবতার স্তব করতেন, তখন তাকেই সাময়িকভাবে পরমেশ্বর বানিয়ে দিতেন, আবার কিছুক্ষণ পর অন্য দেবতার কাছে গিয়েও একই কাজ করতেন।

মুলারের এই ব্যাখ্যা মূলত বৈদিক সাহিত্যের আসল বহুদেববাদী বাস্তবতাকে আড়াল করে সেখানে একটি গোপন একেশ্বরবাদের বীজ আবিষ্কার করার চেষ্টা ছিল। পরবর্তীতে আর্য সমাজের মতো সংস্কারবাদী আন্দোলনগুলো এই ধারণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে দাবি করল যে, বেদের সমস্ত দেবতাই আসলে এক অদ্বিতীয় ঈশ্বরের ভিন্ন ভিন্ন নাম মাত্র। গাডামারের পরিভাষায়, একে বলা যায় কার্যকরী ইতিহাসের চেতনা (Effective Historical Consciousness / wirkungsgeschichtliches Bewußtsein)-এর এক বড় ধরনের বিকৃতি (Gadamer, 1989)। উপনিবেশের যুগে দাঁড়িয়ে থাকা আধুনিক মানুষের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় হীনমন্যতাই তাদের বাধ্য করেছিল প্রাচীন বৈদিক পাঠের ওপর এই একেশ্বরবাদী প্রকল্প চাপিয়ে দিতে।

কিন্তু বৈদিক সংহিতার প্রকৃত টেক্সট পরীক্ষা করলে এই একেশ্বরবাদী দাবির কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ পাওয়া যায় না। ঋগ্বেদের কবিরা অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই বহু দেবতার স্বাধীন সত্ত্বাকে স্বীকার করেছিলেন। কোনো স্তোত্রে যখন ইন্দ্রের প্রশংসা করা হতো, তার মানে এই নয় যে বরুণ বা অগ্নির কোনো অস্তিত্ব নেই। সেখানে দেবতারা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, আবার কখনো বা যৌথভাবে কাজ করতেন। ইন্দ্র ও বরুণের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের আখ্যান বৈদিক সাহিত্যের পাতায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একে আধুনিক একেশ্বরবাদের ছাঁচে ফেলা মানে বৈদিক সমাজের আদিম গোত্রীয় দ্বন্দ্বের ইতিহাসকে অস্বীকার করা।

গাডামারের তাত্ত্বিক অবস্থান আমাদের শেখায় যে, একটি প্রাচীন ঐতিহ্যকে তার নিজস্ব রূপেই গ্রহণ করতে হবে; আধুনিক কোনো মতবাদের সাথে মেলাতে গিয়ে তার সত্যকে বিকৃত করা যাবে না (Grondin, 1994)। বৈদিক বহুদেববাদ কোনো অপূর্ণ বা পশ্চাৎপদ অবস্থা ছিল না; তা ছিল একটি জটিল ও বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির সামনে প্রাচীন মানুষের এক বহুমাত্রিক প্রতিক্রিয়া। একাধিক দেবচরিত্রের মাধ্যমে তারা প্রকৃতির বিভিন্ন রূপকে ধারণ করতে চেয়েছিল। এই বহুদেববাদী বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেওয়াই হলো একজন ধর্মনিরপেক্ষ গবেষকের কাজ। একেশ্বরবাদের কোনো মহিমান্বিত আসন বৈদিক দেবতার ছিল না; এটি ছিল মানুষের বহুবিধ ভয় ও আকাঙ্ক্ষার বহুবিধ ভাষিক প্রতিফলন।

দিগন্তের সংমিশ্রণ ও অনুবাদের রাজনীতি (Fusion of Horizons and the Politics of Translation)

গাডামারের ব্যাখ্যাদর্শনের অন্যতম সেরা প্রত্যয় হলো দিগন্তের সংমিশ্রণ (Fusion of Horizons / Horizontverschmelzung) (Gadamer, 1989)। এর অর্থ হলো, অতীত কোনো পাঠের অর্থ আধুনিক পাঠকের কাছে পৌঁছায় কেবল তখনই, যখন অতীতের দিগন্ত এবং বর্তমানের দিগন্তের মধ্যে একটি খোলাখুলি সংলাপ তৈরি হয়। কিন্তু এই সংলাপ সবসময় সমমর্যাদার হয় না। অনুবাদের ক্ষেত্রে ক্ষমতার রাজনীতি জড়িয়ে পড়ে। যখন কোনো একটি বিশেষ ভাষার শব্দকে অন্য ভাষার শব্দ দিয়ে অনুবাদ করা হয়, তখন কেবল শব্দ বদলায় না; পুরো ভাবনার জগৎটি বদলে যায়। বৈদিক ‘দেব’ ধারণার ক্ষেত্রে এই অনুবাদের রাজনীতি সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

ঔপনিবেশিক আমলে যখন বৈদিক সাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদ শুরু হলো, তখন ইউরোপীয় অনুবাদকরা নির্বিচারে দেব শব্দের অনুবাদ করলেন ‘গড’ (God) বা ‘লর্ড’ (Lord) বলে (Smith, 1989)। এই অনুবাদের ফলে সেমেটিক বা আব্রাহামিক ঐতিহ্যের একেশ্বরবাদী ঈশ্বর-ভাবনাটি নিঃশব্দে বৈদিক দেবতার গায়ে সেঁটে দেওয়া হলো। পরবর্তীতে বাংলা বা ভারতীয় ভাষায় অনুবাদের সময়ও দেব শব্দের জায়গায় প্রায়ই ‘ঈশ্বর’ (Īśvara) শব্দটি বসিয়ে দেওয়া হলো। অথচ ঐতিহাসিক সত্য হলো, ঋগ্বেদের সংহিতাগুলোতে ঈশ্বর শব্দটি কোনো পরম স্রষ্টা অর্থে একবারও ব্যবহৃত হয়নি। সেখানে দেবতারা ছিলেন প্রকৃতির অংশ, জগতের স্রষ্টা নন।

গাডামারের তত্ত্বে ভাষা হলো অস্তিত্বের বাড়ি; ভাষা পরিবর্তনের সাথে সাথে চিন্তার কাঠামো বদলে যায় (Warnke, 1987)। দেবকে যখন ঈশ্বর বা গড বানানো হলো, তখন সাধারণ পাঠক ভাবতে শুরু করল যে বৈদিক দেবতারাও হয়তো মানুষের পাপ-পুণ্যের বিচার করেন, পরকালে মানুষকে স্বর্গ বা নরকে পাঠান এবং তারা জন্ম-মৃত্যুর ঊর্ধ্বে কোনো শাশ্বত সত্তা। কিন্তু বৈদিক দেবতার চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৈদিক দেবতারা জন্ম নেন, তারা বৃদ্ধ হন না ঠিকই কিন্তু সোমরস পানের জন্য পাগল থাকেন, যুদ্ধে আহত হন এবং মানুষের দেওয়া যজ্ঞের খাদ্যের ওপর নির্ভর করেন। এই অনুবাদগত জালিয়াতির ফলে বৈদিক দেবতার যে রক্তমাংসের ও পার্থিব চরিত্রটি ছিল, তা সম্পূর্ণ মুছে গিয়ে সেখানে এক পবিত্র আধ্যাত্মিক ভাবমূর্তি দাঁড়িয়ে গেল।

দিগন্তের একটি সৎ সংমিশ্রণ ঘটাতে হলে অনুবাদককে এই ব্যবধানটি স্পষ্ট করে স্বীকার করতে হবে। গাডামার আমাদের শেখান যে, প্রাচীন পাঠের সাথে সংলাপ করার অর্থ এই নয় যে আমরা প্রাচীন শব্দগুলোকে আমাদের আধুনিক শব্দের দাস বানিয়ে ফেলব (Gadamer, 1976)। দেব মানে যে ঈশ্বর নয়, দেব মানে যে সর্বশক্তিমান কোনো মহাজাগতিক বিচারক নয় – এই সীমানাটি টেনে দেওয়াই হলো আধুনিক অ্যাকাডেমিক হার্মেনিউটিক্সের দায়িত্ব। প্রাচীন বৈদিক মানুষের দিগন্তকে অক্ষত রেখে যখন আমরা আজকের ধর্মনিরপেক্ষ দিগন্ত থেকে তাকে অবলোকন করি, তখনই কেবল একটি সঠিক বোঝাপড়া তৈরি হতে পারে।

যজ্ঞীয় অংশীদারিত্ব ও দেবতার মানবিক রূপায়ণ (Ritual Partnership and Anthropomorphic Humanization of Deities)

বৈদিক সাহিত্যের সবচেয়ে লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর দেবতাদের মানবিক ও পার্থিব চরিত্র। আধুনিক ধর্মে ঈশ্বরের সাথে মানুষের সম্পর্ক হলো প্রভু ও ভৃত্যের সম্পর্ক। কিন্তু বৈদিক যুগে মানুষের সাথে দেবতার সম্পর্ক ছিল মূলত এক ধরণের যজ্ঞীয় অংশীদারিত্ব (Ritual Partnership) (Smith, 1989)। মানুষ একা যেমন বাঁচতে পারত না, তেমনি দেবতাদের বেঁচে থাকার জন্যও মানুষের সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। যাগযজ্ঞের মাধ্যমে মানুষ দেবতাদের সোমরস, ঘৃতাহুতি এবং খাদ্য সরবরাহ করত; আর তার বিনিময়ে দেবতারা বৃষ্টি দিতেন, শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতেন এবং সন্তান ও সম্পদ দান করতেন। এটি ছিল দুটি সমান বা প্রায়-সমান পক্ষের মধ্যকার একটি বৈষয়িক চুক্তি।

গাডামারের ঐতিহাসিকতাবাদী দৃষ্টি দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, বৈদিক দেবতারা ছিলেন তৎকালীন পশুপালক ও যোদ্ধা সমাজের এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। দেবতারা কেমন ছিলেন? তারা বিশাল রথে চড়ে যুদ্ধ করতেন, প্রচুর মাংস খেতেন এবং মাদকতুল্য সোমরস পান করে মাতাল হতেন (West, 2007)। ইন্দ্রের বর্ণনায় ঋগ্বেদে বারবার বলা হয়েছে কীভাবে তিনি শত শত বাটি সোমরস এক নিঃশ্বাসে পান করে নিজের পেটকে সমুদ্রের মতো ফুলিয়ে তুলতেন এবং তারপর বজ্র হাতে নিয়ে শত্রুর দুর্গ আক্রমণ করতেন। কোনো সর্বজ্ঞ বা শান্তিকামী ঈশ্বরের ছবি এখানে নেই; এখানে দাঁড়িয়ে আছেন ব্রোঞ্জযুগের এক প্রচণ্ড শক্তিশালী উপজাতীয় যোদ্ধা বা গোত্রপতি। মানুষের নিজের সমাজ যেমন ছিল, তারা তাদের দেবতাদেরও ঠিক তেমনিভাবে তৈরি করেছিল।

এই মানবিক রূপায়ণে দেবতাদের কোনো নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব ছিল না। দেবতারা ছলচাতুরি করতেন, মিথ্যা বলতেন এবং নিজেদের স্বার্থের জন্য যেকোনো সীমা অতিক্রম করতে পারতেন। ঋগ্বেদে এবং পরবর্তী সাহিত্যে ইন্দ্রের নানা অনৈতিক কাজের বিবরণ রয়েছে, যার জন্য তাকে কখনো কখনো পুরোহিতদের সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে। গাডামার দেখান যে, মানুষের সাহিত্যের প্রতীকগুলো সবসময় তার সমকালীন সামাজিক অভিজ্ঞতার প্রকাশ (Gadamer, 1989)। বৈদিক মানুষ একটি হিংস্র ও অনিরাপদ জগতে বাস করত, যেখানে টিকে থাকার একমাত্র উপায় ছিল বাহুবল। তাই তাদের দেবতারাও হয়ে উঠেছিলেন বাহুবলের পূজারী।

অতএব, বৈদিক দেবতার কোনো অলৌকিক পবিত্রতা বা নৈতিক মহিমা খোঁজা অর্থহীন। যজ্ঞের টেবিলে দাঁড়িয়ে পুরোহিতরা দেবতাদের স্তুতি করতেন তাদের শক্তি বাড়ানোর জন্য। বিশ্বাস করা হতো, স্তুতি ও সোমরস না পেলে দেবতার শক্তি কমে যাবে এবং তিনি যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারবেন না। মানুষ এবং দেবতার এই পারস্পরিক নির্ভরতা প্রমাণ করে যে, দেব ধারণাটি কোনো আসমানী ব্যাপার ছিল না; এটি ছিল প্রাচীন মানুষের টিকে থাকার এক সামাজিক কৌশল। মানুষকে যেমন রাজার ওপর নির্ভর করতে হতো, তেমনি রাজাকেও পুরোহিত ও সাধারণ সৈন্যের আনুগত্যের ওপর নির্ভর করতে হতো। বৈদিক দেবতারা ছিলেন এই পার্থিব ক্ষমতা কাঠামোরই এক স্বর্গীয় প্রতিবিম্ব।

আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ পাঠ ও দেব ধারণার অবসান (Modern Secular Reading and the Dissolution of Deva)

ইতিহাসের এক অদ্ভুত খেলা হলো, যে দেবতারা একসময় পুরো একটি সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, সময়ের সাথে সাথে তারা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেলেন। বৈদিক যুগের পরাক্রমশালী ইন্দ্র, অগ্নির মতো দেবতারা পরবর্তী পৌরাণিক ও মধ্যযুগীয় হিন্দুধর্মে এসে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর সহায়ক চরিত্রে পরিণত হলেন। তাদের জায়গা দখল করে নিল সম্পূর্ণ নতুন দেবচরিত্র – শিব, বিষ্ণু এবং দেবী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৈদিক ইন্দ্রকে দেখানো হলো দুর্বল, বিলাসী এবং অন্য শক্তির দয়ায় টিকে থাকা এক চরিত্র হিসেবে। গাডামারের হার্মেনিউটিক্স এই রূপান্তরটিকে বুঝতে আমাদের সবচেয়ে বড় সাহায্য করে। তিনি বলেছিলেন, কোনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বা ধারণা অনন্তকাল বাঁচে না; তা টিকে থাকে কেবল তার প্রাসঙ্গিকতার ওপর ভর করে (Gadamer, 1989)।

বৈদিক পশুপালক সমাজ যখন পুরোপুরি স্থায়ী কৃষিভিত্তিক এবং পরবর্তীতে নগরভিত্তিক সামন্ততান্ত্রিক সমাজে রূপান্তরিত হলো, তখন ইন্দ্রের মতো যাযাবর যুদ্ধনায়কের আর কোনো সামাজিক উপযোগিতা রইল না। কৃষকদের প্রয়োজন ছিল উর্বরতা ও স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা, যা তারা খুঁজে পেল বিষ্ণুর সুরক্ষায় কিংবা শিবের সংহার ও সৃষ্টির চক্রে। দেব ধারণার এই পতন স্পষ্ট করে দেয় যে, কোনো দেবতাই অমর নয়; দেবতাদের আয়ু নির্ধারিত হয় মানুষের সামাজিক চাহিদার ওপর ভিত্তি করে। মানুষের সমাজ যখন বদলে যায়, তখন তার কল্পনার দেবতারাও সিংহাসনচ্যুত হন। এটি ধর্মের ইতিহাসের এক নির্মম ও ধর্মনিরপেক্ষ সত্য।

আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুগে এসে দেব ধারণার কোনো বাস্তব ভিত্তি অবশিষ্ট থাকে না। আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের শিখিয়েছে যে বৃষ্টি কোনো ইন্দ্রের বজ্রের আঘাতে পড়ে না, তা পড়ে বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার সুনির্দিষ্ট প্রাকৃতিক নিয়মে; আগুন কোনো ঐশ্বরিক দূত নয়, তা হলো রাসায়নিক দহনের ফল। ফলে বৈদিক দেবতারা আজ আর কোনো বিশ্বাসের বস্তু নন; তারা হলেন মানব সভ্যতার সাংস্কৃতিক বিবর্তনের একেকটি জাদুঘরীয় স্মারক। গাডামারের তত্ত্ব আমাদের শেখায় কীভাবে অতীত পাঠের সাথে একটি নির্মোহ বোঝাপড়ায় পৌঁছাতে হয় – যেখানে আমরা অতীত মানুষের কল্পনাশক্তি ও তাদের ভাষার সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করব, কিন্তু তাদের তৈরি করা কুসংস্কার বা দেবতাকে কোনো অলৌকিক সত্য বলে ভুল করব না।

পরিশেষে বলা যায়, গাডামারের ঐতিহাসিক দিগন্ত এবং দিগন্তের সংমিশ্রণের তত্ত্ব বৈদিক দেব ধারণাকে তার প্রকৃত ঐতিহাসিক স্থানে ফিরিয়ে দেয়। ঈশ্বর বা গডের আধুনিক ছাঁচ থেকে মুক্ত হয়ে বৈদিক ‘দেব’ আমাদের সামনে হাজির হয় প্রাচীন মানুষের আশা, ভয়, আলো ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে। তারা কোনো আকাশ থেকে নামা অতীন্দ্রিয় সত্তা নন, তারা হলেন মাটির মানুষেরই কল্পনাপ্রসূত সন্তান। যখন আমরা নির্মোহ ও ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বৈদিক পাঠকে উন্মোচন করি, তখন ধর্মের সমস্ত পবিত্রতার মুখোশ খসে পড়ে। আমাদের সামনে অবশিষ্ট থাকে প্রাচীন মানুষের নির্মিত ভাষা, তাদের জটিল সমাজ এবং তাদের ঐতিহাসিক রূপান্তরের এক প্রামাণ্য ইতিহাস।

হির্শ ও যজ্ঞ ধারণা (Hirsch and the Concept of Yajña): প্রাচীন অর্থ ও পরিবর্তিত তাৎপর্য

হির্শের অর্থ-তাৎপর্য দ্বিভাজন ও যজ্ঞের প্রাথমিক ক্ষেত্র (Hirsch’s Meaning-Significance Dichotomy and the Primary Field of Yajña)

একটি পুরনো সামাজিক প্রথা যখন হাজার বছর ধরে টিকে থাকে, তখন তার ভেতরের চেহারাটা পুরোপুরি বদলে যায়। মানুষ যে উদ্দেশ্যে শুরুতে কাজটি করত, কয়েক শতাব্দী পরে দেখা যায় সেই উদ্দেশ্যটি আর কোথাও নেই; কিন্তু খোলসটা ঠিকই রয়ে গেছে। ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি ঘটেছে যে ধারণাটিকে কেন্দ্র করে, তা হলো যজ্ঞ (Sacrifice / Ritual)। ধর্মবিশ্বাসী মানুষ ধরে নেয় যে যজ্ঞ মানেই হলো কোনো এক চিরন্তন আধ্যাত্মিক সাধনা, যা আবহমান কাল ধরে একইভাবে চলে আসছে। কিন্তু সাহিত্যতাত্ত্বিক এরিক ডোনাল্ড হির্শ জুনিয়র (Eric Donald Hirsch Jr.)-এর নির্দেশিত পথ ধরে তাকালে বোঝা যায়, কোনো সাংস্কৃতিক ধারণাই চিরকাল একই অর্থ বহন করে না (Hirsch, 1967)। হির্শের তত্ত্বে একটি ধারণার আদি ও ঐতিহাসিক রূপটিকে বলা হয় অর্থ (Meaning), আর পরবর্তী যুগে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী যুক্ত হওয়া রূপগুলোকে বলা হয় তাৎপর্য (Significance)।

হির্শ তার তত্ত্বে স্পষ্ট করেছিলেন যে, কোনো বয়ানের বা প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক অর্থ হলো সেটাই যা তার আদি রূপকাররা তাদের নিজস্ব বাস্তব জীবনের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তৈরি করেছিলেন। এই প্রাথমিক অর্থটি ঐতিহাসিকভাবে নির্দিষ্ট এবং সীমাবদ্ধ। কিন্তু সময় যখন গড়ায়, সমাজ যখন নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করে, তখন মানুষ সেই আদি বয়ানের ওপর নতুন নতুন ব্যাখ্যা চাপাতে থাকে। তারা নিজেদের যুগের নৈতিকতা, ভয় ও আকাঙ্ক্ষাকে প্রাচীন বয়ানের ভেতর দেখতে পায়। হির্শ একেই বলেছেন তাৎপর্য। মুশকিল হলো, পরবর্তী যুগের পুরোহিত ও শাস্ত্রকাররা দাবি করেন যে এই নতুন তাৎপর্যটিই নাকি ছিল আদি যুগের একমাত্র অর্থ। বৈদিক যজ্ঞের ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গেলে এই বিভ্রান্তিটি পদে পদে চোখে পড়ে।

যজ্ঞ শব্দটির ভাষাগত শিকড়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি এসেছে সংস্কৃত ‘যজ্’ (Yaj-) ধাতু থেকে, যার সাধারণ অর্থ হলো পূজা করা, উপহার দেওয়া বা সম্মান প্রদর্শন করা (Malamoud, 1996)। আদি বৈদিক যুগে এই উপহার দেওয়ার বিষয়টি কোনো বায়বীয় ভক্তি ছিল না; তা ছিল এক বাস্তব আদান-প্রদান। কিন্তু আধুনিক যুগে যখন যজ্ঞের কথা বলা হয়, তখন মানুষ ভাবে কোনো আত্মত্যাগ, সমাজের জন্য নিজের স্বার্থ বলি দেওয়া কিংবা পরিবেশ রক্ষার জন্য আগুনে ঘি পোড়ানো। এটি হলো আধুনিক যুগের তৈরি হওয়া এক কৃত্রিম তাৎপর্য। হির্শের হার্মেনিউটিক্স আমাদের বাধ্য করে এই আধুনিক পর্দাগুলো সরিয়ে ফেলে আদি যজ্ঞের রক্তমাংসের চেহারাটি দেখতে।

সুতরাং, বৈদিক যজ্ঞকে বুঝতে হলে আমাদের শুরুতে সেই ব্রোঞ্জ ও প্রাথমিক লৌহযুগের চারণভূমিতে ফিরে যেতে হবে। সেখানে কোনো আধুনিক অহিংসা বা বিমূর্ত দর্শনের স্থান ছিল না। হির্শের নিয়ম মেনে আমাদের দেখতে হবে সেই আদি পশুপালক মানুষের বাস্তব অভিপ্রায় কী ছিল। প্রাচীন কবিরা যখন যজ্ঞের স্তোত্রগুলো রচনা করেছিলেন, তখন তাদের মনে কোন চাওয়াটি কাজ করছিল? সেই আদি ঐতিহাসিক অর্থকে পরবর্তীকালের দার্শনিক তাৎপর্যের সাথে গুলিয়ে ফেলা এক ধরণের বৌদ্ধিক অসততা। হির্শের এই দ্বৈত বিভাজন বৈদিক যজ্ঞের জটিল রূপান্তরকে একটি বস্তুনিষ্ঠ ও ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহাসিক মানচিত্রে স্থাপন করার সেরা হাতিয়ার।

ঋগ্বেদীয় যজ্ঞের প্রাথমিক অর্থ ও সামাজিক বিনিময় (Primary Meaning of Ṛgvedic Yajña and Social Exchange)

ঋগ্বেদের যুগে যজ্ঞ কোনো মন্দিরের শান্ত পরিবেশের পূজা ছিল না। এটি ছিল খোলা আকাশের নিচে পশুপালক জনগোষ্ঠীর এক উত্তাল ও যৌথ উৎসব। সেই সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত অনিশ্চিত। গবাদিপশু ছিল তাদের প্রধান সম্পদ, আর সেই সম্পদ বাড়ানোর জন্য নিয়মিত আন্তঃগোত্রীয় যুদ্ধ লেগে থাকত। এই কঠোর বাস্তবতায় গোত্রের ঐক্য ধরে রাখা এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান মাধ্যম ছিল যৌথ ভোজ ও উপহারের আদান-প্রদান (Hubert & Mauss, 1964)। কবিরা বিশ্বাস করতেন, তাদের চারপাশের প্রাকৃতিক শক্তিগুলো – যাদের তারা দেবচরিত্র হিসেবে কল্পনা করেছিলেন – তাদের সাথেও একই ধরনের উপহারের সম্পর্ক তৈরি করা দরকার। মানুষ যদি দেবতাদের মাংস, ঘি এবং সোমরস দেয়, তবে দেবতারাও যুদ্ধে তাদের সাহায্য করবেন এবং আকাশ থেকে বৃষ্টি নামিয়ে আনবেন।

এই আদি স্তরে যজ্ঞের প্রাথমিক অর্থ ছিল একটি নিরেট সামাজিক ও অর্থনৈতিক চুক্তি। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে একে বলা যায় উপহার বিনিময় (Gift Exchange) (Bhattacharji, 1984)। যজ্ঞের বেদিতে যে আগুন জ্বালানো হতো, সেই অগ্নি ছিলেন মূলত এক ভোজের মধ্যস্থতাকারী। মানুষ সেই আগুনে বলিদত্ত পশুর সেরা অংশগুলো উৎসর্গ করত, যাতে দেবতারা এসে সেই ধোঁয়া বা স্বাদ গ্রহণ করেন। ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলোতে অত্যন্ত খোলাখুলিভাবে বলা হয়েছে – ‘আমি তোমাকে সোমরস দিচ্ছি, তুমি আমাকে বলবান অশ্ব দাও’। এখানে কোনো আধ্যাত্মিক বিনয় ছিল না; ছিল দুটি সমমর্যাদার পক্ষের মধ্যে এক স্পষ্ট দরকষাকষি। হির্শের ভাষায়, রচয়িতার এই অভিপ্রায়টিই হলো যজ্ঞের প্রাথমিক অর্থ। এই অর্থে যজ্ঞ ছিল ক্ষুধা, যুদ্ধ এবং সম্পদের অধিকার নিশ্চিত করার এক পার্থিব প্রযুক্তি।

যজ্ঞের এই আদি রূপটিতে পশুহত্যা ছিল এক অপরিহার্য বিষয়। ছাগল, ভেড়া, বৃষ এবং অশ্বমেধের ঘোড়া – এই সমস্ত প্রাণী যজ্ঞের বেদিতে জবাই করা হতো (Dange, 1979)। এটি কোনো অতীন্দ্রিয় নিষ্ঠুরতা বা কোনো অলৌকিক পবিত্রতা ছিল না; এটি ছিল একটি শিকারী ও পশুপালক সমাজের সাধারণ খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির বণ্টন। যজ্ঞ শেষে পুরো গোত্রের মানুষ সেই পশুর মাংস আগুনে পুড়িয়ে একসাথে খেত। যাকে আজ আমরা ধর্মীয় অনুষ্ঠান বলি, তা ছিল মূলত একটি গোত্রীয় ভোজসভা। গোত্রপতিরা তাদের সামরিক সাফল্য উদ্‌যাপন করতে এবং অনুসারীদের মধ্যে লুণ্ঠিত সম্পদ ভাগ করে দিতে এই বড় বড় ভোজের আয়োজন করতেন। এর মধ্য দিয়ে রাজার বা নেতার সামাজিক বৈধতা তৈরি হতো।

হির্শের হার্মেনিউটিক্স আমাদের দেখায় যে, ঋগ্বেদের এই প্রাথমিক স্তরটিকে কোনো কাল্পনিক মরমীবাদের আলোয় দেখা ভুল। বৈদিক কবিরা কোনো পরলৌকিক স্বর্গের কথা ভাবেননি; তারা এই পৃথিবীর মাটিতে দাঁড়িয়ে শত শরতের আয়ু এবং অজস্র বংশধর চেয়েছিলেন। যজ্ঞ ছিল সেই চাওয়া পূরণ করার এক যৌথ রাজনৈতিক ও সামাজিক মঞ্চ। এই প্রাথমিক অর্থে কোনো রহস্য নেই, কোনো অতীন্দ্রিয় কুয়াশা নেই। এটি ছিল প্রাচীন মানুষের বেঁচে থাকার এক কঠিন লড়াইয়ের বাস্তব দলিল, যা ভাষার ছন্দ ও অগ্নির উত্তাপে মূর্ত হয়ে উঠেছিল।

ব্রাহ্মণ যুগে তাৎপর্যের রূপান্তর ও যজ্ঞের কসমিকীকরণ (Transformation of Significance in the Era of Brāhmaṇa Literature)

সমাজ যখন যাযাবর পশুপালন ছেড়ে গাঙ্গেয় উপত্যকার উর্বর জমিতে কৃষিকাজ শুরু করল, তখন যজ্ঞের পুরো প্রেক্ষাপটটি বদলে গেল। এই পরিবর্তনটি ধরা আছে পরবর্তী বৈদিক সাহিত্য, বিশেষ করে ব্রাহ্মণ (Brāhmaṇa) গ্রন্থগুলোতে। হির্শের তত্ত্ব অনুযায়ী, এই যুগে যজ্ঞের আদি অর্থের ওপর এক নতুন এবং ভয়ংকর তাৎপর্য (Significance) চাপানো হলো (Hirsch, 1976)। কৃষিনির্ভর সমাজ ছিল অনেক বেশি স্থায়ী এবং সেখানে উদ্বৃত্ত ফসলের উৎপাদন শুরু হয়েছিল। এই উদ্বৃত্ত ফসলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য পুরোহিত শ্রেণী যজ্ঞকে একটি সাধারণ গোত্রীয় ভোজসভা থেকে রূপান্তর করল এক দানবীয় ও জটিল সামাজিক শোষণের যন্ত্রে।

ব্রাহ্মণ সাহিত্যের যুগে প্রচার করা হলো যে, যাগযজ্ঞ কোনো সাধারণ দেবতাদের খুশি করার ব্যাপার নয়; যজ্ঞ হলো সমগ্র মহাবিশ্বের পরম চালিকাশক্তি (Biardeau, 1989)। পুরোহিতরা দাবি করলেন, যজ্ঞের আগুনে ঠিক সময়ে আহুতি না দিলে সূর্য উঠবে না, ঋতুচক্র থেমে যাবে এবং মহাবিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আদি যুগের সহজ আদান-প্রদানকে বানিয়ে দেওয়া হলো এক মহাজাগতিক বাধ্যবাধকতা বা কসমিক মেকানিজম। এই নতুন তাৎপর্য সৃষ্টির পেছনে কাজ করছিল পুরোহিতদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করার স্বার্থ। কারণ এই জটিল যজ্ঞের প্রতিটি নিয়ম, মন্ত্রোচ্চারণের টান এবং বেদির জ্যামিতিক মাপ কেবল পুরোহিতরাই জানতেন। ফলে সমাজের রাজা থেকে শুরু করে সাধারণ কৃষক – সবাইকে পুরোহিত শ্রেণীর করুণার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হলো।

এই সময়ে যজ্ঞের রূপ হয়ে উঠল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সহিংস। সাধারণ মানুষের পক্ষে এই যজ্ঞ করা অসম্ভব ছিল; কেবল বড় বড় রাজা বা সামন্ত প্রভুরা নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা জাহির করতে ‘রাজসূয়’ (Rājasūya) বা ‘অশ্বমেধ’ (Aśvamedha)-এর মতো বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করতেন (Heesterman, 1985)। শত শত নিরীহ পশুর রক্তে যজ্ঞভূমি ভেসে যেত এবং যজ্ঞ শেষে পুরোহিতদের দেওয়া হতো হাজার হাজার গরু ও বিপুল স্বর্ণমুদ্রা, যাকে বলা হতো দক্ষিণা। হির্শের পদ্ধতি দিয়ে দেখলে স্পষ্ট হয়ে যায় কীভাবে একটি আদি সামাজিক প্রথাকে নতুন ক্ষমতা কাঠামোর প্রয়োজনে নতুন তাৎপর্যে সাজানো হয়। আদি বৈদিক মানুষের সহজ উৎসবটি পরিণত হলো রাজকীয় ক্ষমতার প্রদর্শনী এবং পুরোহিতদের অর্থ উপার্জনের স্থায়ী কারখানায়।

এখানে আদি কবির মানবিক অভিপ্রায় সম্পূর্ণ মুছে দেওয়া হয়েছিল। ব্রাহ্মণ সাহিত্যের গ্রন্থগুলোতে দাবি করা হলো যে, বৈদিক সংহিতার মন্ত্রগুলো আসলে এই সমস্ত জটিল আনুষ্ঠানিকতার জন্যই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য হলো, ঋগ্বেদের কবিরা এই ধরনের কোনো জটিল পুরোহিততন্ত্রের কল্পনাও করেননি। হির্শের ঐতিহাসিক হার্মেনিউটিক্স আমাদের শেখায় কীভাবে শাস্ত্রকাররা অতীতকে নিজেদের সুবিধামতো পুনর্ব্যবহার করেন। ব্রাহ্মণ সাহিত্যের এই মহাজাগতিক তাৎপর্য ছিল মূলত একটি সামন্ততান্ত্রিক ও বর্ণভিত্তিক সমাজব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার এক মতাদর্শিক কৌশল মাত্র।

উপনিষদীয় সংকট ও অভ্যন্তরীণ যজ্ঞের উদ্ভব (The Upaniṣadic Crisis and the Emergence of Internalized Sacrifice)

কিন্তু একটি ব্যবস্থা যখন অতিরিক্ত কঠোর এবং সহিংস হয়ে ওঠে, তখন সমাজে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখা দেয়। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের দিকে উত্তর ভারতে যখন দ্বিতীয় নগরায়ন শুরু হলো, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটল এবং নতুন সামাজিক শ্রেণীর জন্ম হলো, তখন যজ্ঞের এই অপচয় ও রক্তপাতের বিরুদ্ধে প্রবল অসন্তোষ তৈরি হলো (Sharma, 1983)। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের মতো শ্রমণ আন্দোলনগুলো যজ্ঞের পশুহত্যা এবং পুরোহিততন্ত্রকে সরাসরি আক্রমণ করল। এই তীব্র সামাজিক সংকটের মুখে পড়ে বৈদিক ঐতিহ্যের ভেতরের চিন্তাবিদরাও বুঝতে পারলেন যে, এভাবে আর টিকে থাকা সম্ভব নয়। এর ফলেই জন্ম নিল আরণ্যক এবং উপনিষদ (Upaniṣad) সাহিত্য, যেখানে যজ্ঞের গায়ে এক সম্পূর্ণ নতুন তাৎপর্য চড়ানো হলো।

উপনিষদের ভাবুকরা বাহ্যিক যজ্ঞের রক্ত ও আগুনকে পরিত্যাগ করলেন, কিন্তু যজ্ঞ শব্দটিকে পুরোপুরি বাতিল করলেন না। কারণ প্রাচীন ঐতিহ্যের যে সামাজিক মর্যাদা ছিল, তাকে তারা কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। তারা শুরু করলেন এক নতুন প্রক্রিয়া, যাকে বলা যায় অভ্যন্তরীণ যজ্ঞ (Internalized Sacrifice / Antar-yajña) (Kaelber, 1989)। তারা বললেন, বাইরে আগুন জ্বালিয়ে পশু হত্যা করার কোনো প্রয়োজন নেই; মানুষের নিজের শরীরটাই হলো যজ্ঞের বেদি। মানুষের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস হলো আহুতি, তার ইন্দ্রিয়গুলো হলো যজ্ঞের আগুন, আর তার আত্মজ্ঞান হলো পরম ফল। ছান্দোগ্য বা বৃহদারণ্যক উপনিষদে দেখা যায়, পুরো যজ্ঞপ্রক্রিয়াকে এক বিমূর্ত মনস্তাত্ত্বিক ধ্যানে রূপান্তর করা হচ্ছে।

হির্শের হার্মেনিউটিক্স দিয়ে এই ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল শব্দের মর্যাদা বজায় রেখে তার আদি অর্থকে সম্পূর্ণ উল্টে দেওয়ার এক চমৎকার কৌশল (Hirsch, 1976)। যে যজ্ঞ ছিল রক্তমাংসের পশু জবাই করা এবং পোড়া মাংস খাওয়া, উপনিষদে এসে তা হয়ে গেল নিরামিষ ধ্যান ও পরমাত্মার সন্ধান। এই রূপান্তরটি আধ্যাত্মিক দিক থেকে হয়তো চমকপ্রদ মনে হতে পারে, কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য হলো এটি ছিল বৈদিক ভাবাদর্শের এক গভীর অস্তিত্বের সংকট। বৌদ্ধদের মতো সংস্কারকদের আক্রমণের হাত থেকে বৈদিক উত্তরাধিকারকে বাঁচানোর জন্যই এই তাৎপর্যের আধ্যাত্মিকীকরণ ঘটানো হয়েছিল।

সুতরাং, উপনিষদীয় এই অভ্যন্তরীণ যজ্ঞ বৈদিক সংহিতার মূল অর্থ প্রকাশ করে না; তা প্রকাশ করে এক পরিবর্তিত নগরভিত্তিক সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক আপসকে। যারা দাবি করেন যে ঋগ্বেদের যজ্ঞও আসলে এক ধরণের গোপন আধ্যাত্মিক সাধনা ছিল, তারা হির্শের অর্থ ও তাৎপর্যের সীমারেখাটিকে লঙ্ঘন করেন। উপনিষদের ভাবুকরা তাদের নিজস্ব যুগের অস্তিত্ব সংকট মেটাতে পুরনো যজ্ঞের পরিভাষা ব্যবহার করেছিলেন মাত্র। প্রাচীন যাযাবরদের ভোজসভাকে মোক্ষলাভের ধ্যান হিসেবে উপস্থাপন করা ছিল একটি ঐতিহাসিক পুনর্লিখন, যার সামাজিক কার্যকারিতা ছিল কিন্তু ঐতিহাসিক সততা ছিল না।

ভাগবত দর্শন ও নিষ্কাম কর্মের নতুন বয়ান (Bhagavad Gītā and the New Discourse of Desireless Action)

যজ্ঞ ধারণার রূপান্তরের আরেকটি মহানাটকীয় পর্যায় দেখা যায় মহাভারতের অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (Bhagavad Gītā)-তে। এই গ্রন্থে এসে যজ্ঞের তাৎপর্য আরও এক নতুন মাত্রা পায়, যা পরবর্তী ভারতীয় সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। গীতার যুগে সমাজে নানা মতবাদের সংঘাত চলছিল – একদিকে সনাতন বৈদিক যাগযজ্ঞের গোঁড়ামি, অন্যদিকে বৌদ্ধদের সন্ন্যাস ও অহিংসার আদর্শ। এই দুই বিপরীত স্রোতকে এক জায়গায় বাঁধার জন্য গীতার রচয়িতারা এক নতুন সামাজিক মতাদর্শ ফাঁদলেন, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘নিষ্কাম কর্ম’ (Desireless Action / Niṣkāma Karma)-এর ধারণা (Chapple, 2009)।

গীতা ঘোষণা করল যে, কোনো ব্যক্তিগত ফলের আশা না করে নিজের নির্ধারিত সামাজিক বা বর্ণভিত্তিক দায়িত্ব পালন করে যাওয়াই হলো প্রকৃত যজ্ঞ। যজ্ঞকে আর কোনো নির্দিষ্ট বৈদিক আচারের ভেতর সীমাবদ্ধ রাখা হলো না; একে করে তোলা হলো দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজের সমার্থক। গীতার বিখ্যাত সূত্রে বলা হলো, ইন্দ্রিয় সংযম হলো এক ধরণের যজ্ঞ, জ্ঞান অর্জন হলো এক ধরণের যজ্ঞ, এমনকি সমাজ রক্ষার জন্য যুদ্ধ করাও এক পরম যজ্ঞ। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন যে, ক্ষত্রিয় হিসেবে স্বজনদের হত্যা করাও তার পক্ষে পাপ হবে না, যদি সে সেই কাজটি ফলাকাঙ্ক্ষা বর্জন করে এক মহাজাগতিক যজ্ঞ হিসেবে সম্পন্ন করে।

হির্শের তত্ত্বের আলোকে দেখলে বোঝা যায়, এটি হলো আদি যজ্ঞের তাৎপর্যকে এক চূড়ান্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপ দেওয়া (Hirsch, 1967)। যা ছিল এককালে কিছু নির্দিষ্ট পশুর আহুতি, গীতা তাকে বানিয়ে দিল একটি স্থায়ী সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার নৈতিক বর্ম। সমাজে যার যার নির্ধারিত বর্ণাশ্রমের কাজ করে যাওয়াই হলো যজ্ঞ – শূদ্রের কাজ সেবা করা, কৃষকের কাজ চাষ করা, আর সৈনিকের কাজ যুদ্ধ করা। এই বর্ণভিত্তিক শ্রমবিভাজনকে পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয় করার জন্য যজ্ঞ শব্দটিকে এমন এক চতুরভাবে ব্যবহার করা হলো যাতে সাধারণ মানুষ কোনো বিদ্রোহ না করে নিজেদের নির্ধারিত দুঃখ ও শোষণকে এক পবিত্র আত্মত্যাগ হিসেবে মেনে নেয়।

এই নতুন বয়ানটি স্পষ্ট করে দেয় যে, যজ্ঞের ধারণা কীভাবে তার আদি বস্তুগত অবস্থান থেকে সরে গিয়ে একটি শক্তিশালী মতাদর্শিক শাসনে পরিণত হয়েছিল। আদি বৈদিক মানুষের যজ্ঞ ছিল খুবই স্পষ্ট ও লোভী – তারা কিছু পেত বলেই কিছু দিত। কিন্তু গীতার যুগে এসে সাধারণ মানুষকে শেখানো হলো যে, পাওয়ার কোনো আশা না করেই সমাজের চাকা সচল রাখতে হবে। হির্শের ঐতিহাসিক হার্মেনিউটিক্স আমাদের এই মতাদর্শিক রূপান্তরের ফাঁকটি ধরতে শেখায়। কীভাবে একটি ব্রোঞ্জযুগের আদিম বলিদান ধীরে ধীরে একটি জটিল কৃষিভিত্তিক সামন্ত সমাজের শোষণ টিকিয়ে রাখার প্রধান দার্শনিক যুক্তিতে রূপান্তরিত হলো, গীতার যজ্ঞ-ভাবনা তারই প্রামাণ্য ইতিহাস।

আধুনিক জাতীয়তাবাদী পুনর্ব্যবহার ও নির্মোহ হার্মেনিউটিক্স (Modern Nationalist Re-use and Objective Hermeneutics)

আধুনিক ভারতে উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে এসে যজ্ঞ ধারণার ওপর শেষ যে তাৎপর্যের প্রলেপটি পড়েছিল, তা ছিল সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এবং হিন্দু সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য নানা তাত্ত্বিক বৈদিক যজ্ঞকে এক নতুন আধুনিক রূপ দিয়েছিলেন (Bayly, 1998)। আর্য সমাজের মতো সংগঠনগুলো বৈদিক যজ্ঞ থেকে সমস্ত পশুহত্যার ইতিহাস মুছে ফেলে দাবি করল যে, যজ্ঞ হলো পরিবেশ বিশুদ্ধ করার একটি প্রাচীন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। তারা বলতে লাগলেন যে, ঘিয়ে ভেষজ মিশিয়ে পোড়ালে নাকি বায়ুমণ্ডল পরিষ্কার হয় এবং রোগবালাই দূর হয়।

একই সাথে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যজ্ঞ শব্দটি হয়ে উঠল রাজনৈতিক আত্মত্যাগের প্রধান স্লোগান। দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেওয়াকে বলা হলো ‘দেশমাতৃকার যজ্ঞে আত্মাহুতি’। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীরা এই রূপকটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছিলেন। দেশের যুবসমাজকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রাচীন ধর্মীয় পরিভাষাকে ব্যবহার করার এই কৌশল রাজনৈতিকভাবে হয়তো অত্যন্ত সফল হয়েছিল, কিন্তু হির্শের মানদণ্ডে এটি ছিল টেক্সটের ওপর পাঠকের চরম এক আধুনিক তাৎপর্য আরোপ (Hirsch, 1976)। আদি বৈদিক কবিরা যখন যজ্ঞের আগুনে ঘোড়া পোড়াতেন, তখন তাদের মনে ভারতের কোনো জাতীয়তাবোধ ছিল না, পরিবেশ বাঁচানোর চিন্তা তো দূরের কথা।

হির্শের হার্মেনিউটিক্স এই ধরনের আধুনিকতাবাদী বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে এক অকাট্য সুরক্ষাকবচ। একজন বস্তুনিষ্ঠ গবেষকের কাজ হলো এই আধুনিক রাজনৈতিক বা পরিবেশবাদী তাৎপর্যগুলোকে আলাদা করে দেখা। যজ্ঞ কোনো আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞান ছিল না, কোনো আধুনিক আত্মত্যাগের দর্শনও ছিল না। এটি ছিল প্রাচীন ভারতের পিতৃতান্ত্রিক ও যুদ্ধবাজ পশুপালক সমাজের একটি রক্তাক্ত, বৈষয়িক ও প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতা (Girard, 1977)। সেই আদি হিংসা ও বস্তুকেন্দ্রিকতাকে যদি আমরা কোনো আধুনিক নৈতিকতার চাদর দিয়ে ঢেকে দিই, তবে আমরা ইতিহাসের সাথে সরাসরি প্রতারণা করি।

পরিশেষে বলা যায়, হির্শের অর্থ ও তাৎপর্যের দ্বিভাজন বৈদিক যজ্ঞের সমস্ত ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মহিমাকে চূর্ণ করে দেয়। ঋগ্বেদের ভোজসভা থেকে শুরু করে ব্রাহ্মণ সাহিত্যের যজ্ঞযন্ত্র, উপনিষদের মানসিক ধ্যান, গীতার নিষ্কাম কর্ম এবং আধুনিক জাতীয়তাবাদী আত্মাহুতি – এই প্রতিটি ধাপ হলো মানুষের সামাজিক পরিবর্তনের একেকটি ঐতিহাসিক প্রতিচ্ছবি। যজ্ঞের কোনো শাশ্বত আধ্যাত্মিক সত্য নেই; যা আছে তা হলো ক্ষমতা, সমাজ ও মতাদর্শের প্রয়োজনে একটি আদিম ধারণার নিরন্তর পুনর্ব্যবহার। এই ঐতিহাসিক রূপান্তরকে কোনো ধর্মতাত্ত্বিক মোহ ছাড়াই বস্তুনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করাই হলো আধুনিক অ্যাকাডেমিক হার্মেনিউটিক্সের একমাত্র ও প্রকৃত লক্ষ্য।

ডিলথাই ও বৈদিক বস্তুজগৎ (Dilthey and the Vedic Material World): গো, অশ্ব, রথ, সম্পদ ও যুদ্ধ

ডিলথাইয়ের জীবনজগৎ ও বস্তুগত বাস্তবতার যোগসূত্র (Dilthey’s Lifeworld and the Nexus of Material Reality)

মানুষের চিন্তা কখনো শূন্য থেকে জন্ম নেয় না। কোনো সমাজ যখন কোনো কাব্য বা দর্শন তৈরি করে, তখন সেই সৃষ্টির পেছনে থাকে তাদের প্রাত্যহিক জীবনের নানা হাতিয়ার, তাদের খাদ্যের সংস্থান এবং তাদের বেঁচে থাকার লড়াই। জার্মান দার্শনিক উইলহেম ডিলথাই (Wilhelm Dilthey) মানুষের ইতিহাসকে বোঝার জন্য যে তত্ত্বটি সামনে এনেছিলেন, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কাঠামোগত যোগসূত্র (Structural Nexus / Strukturzusammenhang) (Dilthey, 1989)। ডিলথাই বললেন, কোনো রচনার অর্থ খুঁজতে হলে কেবল কবির মাথার ভেতরের ভাবনা খুঁজলে চলবে না। দেখতে হবে সেই কবি কোন বাস্তব মাটির ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন, তার চারপাশের বস্তুগত বাস্তবতা কেমন ছিল। মানুষের চিন্তা এবং তার চারপাশের বস্তুগত পরিবেশ এক অবিচ্ছেদ্য সূত্রে বাঁধা থাকে।

বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই বস্তুগত ভিত্তিটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও বাস্তব। হাজার বছর ধরে ধর্মতাত্ত্বিকরা বৈদিক স্তোত্রগুলোকে এক ধরণের আধ্যাত্মিক কুয়াশায় ঢেকে রেখেছিলেন। তারা বোঝাতে চেয়েছেন যে, বৈদিক কবিরা কেবল চোখ বন্ধ করে পরমাত্মার কথা ভাবতেন। কিন্তু ঋগ্বেদের পাতার দিকে তাকালে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পৃথিবীর গন্ধ পাওয়া যায়। সেখানে ধুলো উড়ছে, রথের চাকা ঘুরছে, ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে এবং শত শত গবাদিপশুর ডাক ভেসে আসছে। ডিলথাইয়ের পরিভাষায়, এটাই হলো বৈদিক মানুষের আসল জীবনজগৎ (Lifeworld / Lebenswelt) (Ermarth, 1978)। এই জীবনজগৎ কোনো কাল্পনিক স্বর্গে ছিল না; তা ছিল পাঞ্জাবের সপ্তসিন্ধু অববাহিকার রুক্ষ ও বাস্তব চারণভূমিতে।

ডিলথাই তার হার্মেনিউটিক্সে একটি গভীর কথা বলেছিলেন – ভাষা হলো মানুষের জীবনের জমাট বাঁধা অভিজ্ঞতা। বৈদিক কবিরা যখন কোনো উপমা ব্যবহার করতেন, তখন তারা সেই উপমাটি আকাশ থেকে পেতেন না। একজন কবি যখন একটি নদীর ঢেউ দেখে স্তোত্র বাঁধেন, তখন তিনি সেই নদীর ঢেউকে তুলনা করেন চারণভূমিতে ছুটে চলা দ্রুতগতির ঘোড়ার সাথে। কিংবা ভোরের সোনালী রোদকে তিনি তুলনা করেন লালচে রঙের স্বাস্থ্যবান গাভীর পিঠের সাথে। এই উপমাগুলো প্রমাণ করে যে, তাদের ভাষা এবং কল্পনা পুরোপুরি আটকে ছিল তাদের চারপাশের বস্তুগত সম্পদের পরিমণ্ডলে (Anthony, 2007)। ডিলথাইয়ের ঐতিহাসিক পদ্ধতি আমাদের এই বস্তুগত শেকড়টিকে চিনতে শেখায়।

সুতরাং, বৈদিক সাহিত্যকে কোনো বায়বীয় দর্শনের পাঠ্য হিসেবে দেখা এক ধরণের ঐতিহাসিক অন্ধত্ব। ডিলথাইয়ের বাস্তবতাবাদী দৃষ্টি দিয়ে তাকালে আমরা বুঝতে পারি যে, বৈদিক কবিদের রচনার চালিকাশক্তি ছিল তাদের বেঁচে থাকার তীব্র জাগতিক আর্তি। সেই আর্তি মূর্ত হয়ে উঠেছিল পাঁচটি প্রধান উপাদানের মাধ্যমে – গো বা গবাদিপশু, অশ্ব, রথ, সম্পদ এবং যুদ্ধ। এই পাঁচটি বস্তুগত খুঁটির ওপর ভর করেই গড়ে উঠেছিল পুরো বৈদিক সমাজের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো। কোনো আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা ছাড়াই কেবল এই পাঁচটি উপাদানের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলেই বৈদিক মানুষের চিন্তা ও কর্মের আসল চেহারাটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

‘গো’ বা গবাদিপশু: যাযাবর পুঁজি ও সংঘাতের উৎস (Cattle: Nomadic Capital and the Source of Conflict)

প্রাচীন বৈদিক সমাজে সবচেয়ে মূল্যবান বস্তুটির নাম ছিল গবাদিপশু। আধুনিক হিন্দুধর্মে গরুকে এক ধরণের পবিত্র দেবী বা অলৌকিক মাতৃত্বের প্রতীকে রূপান্তর করা হয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, বৈদিক যুগে গাভীর এই পবিত্রতা কোনো ধর্মীয় ভাবালুতা ছিল না; তা ছিল এক যাযাবর পশুপালক সমাজের চূড়ান্ত অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রকাশ (Jha, 2002)। সেই যুগে কৃষিকাজ তখনো প্রধান পেশা হয়ে ওঠেনি, মাটির মালিকানার কোনো সুস্পষ্ট ধারণাও ছিল না। মানুষের সমস্ত সম্পদ জমা থাকত তার পালের পশুর সংখ্যার ভেতর। যার যত বেশি গরু ছিল, সে সমাজে তত বেশি ক্ষমতাশালী ও ধনী বলে গণ্য হতো।

ডিলথাইয়ের জীবনজগৎ সংক্রান্ত তত্ত্ব দেখায় যে, কোনো সমাজের প্রধান অর্থনৈতিক উপাদানটি কীভাবে তাদের ভাষার প্রতিটি কোণায় প্রবেশ করে (Dilthey, 2002)। বৈদিক ভাষার শব্দভাণ্ডার পরীক্ষা করলেই এর অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়। বৈদিক ভাষায় যুদ্ধ বোঝাতে সবচেয়ে জনপ্রিয় যে শব্দটি ব্যবহৃত হতো, তা হলো ‘গবিষ্টী’ (Gaviṣṭi)। শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো ‘গাভীর সন্ধান’ বা গরু খোঁজা। অর্থাৎ, এক গোত্রের মানুষ অন্য গোত্রের গরুর পাল ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য যে সশস্ত্র লড়াই চালাত, সেটাই ছিল তাদের যুদ্ধ। সময়ের হিসেব করার জন্যও তারা গরুর সাহায্য নিত; যেমন গোধূলি হলো সেই সময় যখন গরু চরে বাড়ি ফেরে। এমনকি কন্যার পরিচয় ছিল ‘দুহিতা’, যার আদি অর্থ যে গাভীর দুধ দোয়ায়। একটি পশুপালক সমাজের প্রতিটি সামাজিক সম্পর্ক এভাবে গরুর বস্তুগত উপযোগিতার সাথে জড়িয়ে ছিল।

গরু ছিল তাদের খাদ্যের প্রধান উৎস। দুধ, মাখন এবং বিশেষ করে যজ্ঞের জন্য প্রয়োজনীয় ঘি আসত এই গরু থেকেই। শুধু তাই নয়, ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণ করে যে বৈদিক যুগে গোমাংস ছিল তাদের অন্যতম প্রিয় খাদ্য এবং অতিথি সৎকারের প্রধান উপকরণ (Jha, 2002)। কোনো সম্মানিত অতিথি বা রাজা এলে তাদের জন্য উৎকৃষ্ট ষাঁড় বা বন্ধ্যা গাভী জবাই করার স্পষ্ট বিবরণ বৈদিক সাহিত্যে ছড়িয়ে রয়েছে। এটিকে কোনো পাপ বা অশুচি কাজ মনে করা হতো না; বরং এটি ছিল আতিথেয়তার সর্বোচ্চ সম্মান। আধুনিক কালের গো-রক্ষার রাজনীতি আসলে এই প্রাচীন ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে এক বানোয়াট অতীত তৈরি করতে চায়। ডিলথাইয়ের নির্মোহ হার্মেনিউটিক্স এই আধুনিক বানোয়াট ধারণাকে সরাসরি ভেঙে দেয়।

অতএব, বৈদিক কবির দৃষ্টিতে গরু কোনো মায়াবী প্রাণী ছিল না; তা ছিল চারণভূমির জীবন্ত মুদ্রা। কবিরা দেবতাদের কাছে যখন প্রার্থনা করতেন, তখন তাদের স্পষ্ট দাবি থাকত – ‘আমাদের শত শত গাভী দান করো’ (Parpola, 2015)। পুরোহিতরা যজ্ঞ করতেন এই গরুর দক্ষিণা পাওয়ার আশায়। রাজা বা গোত্রপতিরা পুরোহিতদের সন্তুষ্ট করতে হাজার হাজার গরু দান করতেন। কারণ গরুই ছিল সেই সমাজের একমাত্র সচল পুঁজি, যা দিয়ে ক্ষমতা কেনা যেত এবং সামাজিক আনুগত্য তৈরি করা যেত। ডিলথাই আমাদের শেখান কীভাবে এই বস্তুগত পুঁজির প্রবাহই বৈদিক কাব্যের সমস্ত ছন্দ ও কল্পনার মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল।

‘অশ্ব’ ও গতিশীল সামরিক প্রযুক্তি (The Horse and Mobile Military Technology)

গরু যদি বৈদিক সমাজের অর্থনৈতিক পুঁজি হয়ে থাকে, তবে ঘোড়া ছিল তাদের সামরিক আধিপত্যের প্রধান চাবিকাঠি। ইন্দো-ইউরোপীয় ও ইন্দো-ইরানীয় জনগোষ্ঠীর ইতিহাস আসলে ঘোড়ার সাথে মানুষের সম্পর্কের ইতিহাস (Mallory, 1989)। মধ্য এশিয়ার স্তেপ অঞ্চল থেকে যে যাযাবর মানুষেরা ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমে প্রবেশ করেছিল, তাদের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত সুবিধা ছিল পোষ মানা ঘোড়া এবং তাদের গতি। সিন্ধু সভ্যতার পতন বা রূপান্তরের পর এই অঞ্চলের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে ঘোড়া ছিল এক নতুন ও ত্রাস সৃষ্টিকারী সামরিক শক্তি। বৈদিক সাহিত্যে ‘অশ্ব’ (Horse) কেবল একটি প্রাণী নয়; তা হলো গতি, পৌরুষ এবং অপরাজেয় শক্তির চূড়ান্ত প্রতীক।

ডিলথাইয়ের তত্ত্বে মানুষের শারীরিক ক্ষমতা বাড়ানোর যে প্রযুক্তি, তা তার মানসিক দিগন্তকে বদলে দেয় (Makkreel, 1992)। ঘোড়ায় চড়ে বা ঘোড়ায় টানা রথে চড়ে মানুষ যখন বাতাসের গতিতে ছুটতে শিখল, তখন স্থানের দূরত্ব সংকুচিত হয়ে এল। বৈদিক মানুষ দেখল যে তারা চোখের পলকে এক চারণভূমি থেকে অন্য চারণভূমিতে চলে যেতে পারছে এবং শত্রুর ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালাতে পারছে। এই গতির অভিজ্ঞতা তাদের দেবতাদের রূপায়ণেও ছাপ ফেলল। তারা সূর্যকে কল্পনা করল এক সোনার রথে বসা দেবতা হিসেবে, যাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সাতটি তেজস্বী ঘোড়া। ইন্দ্রের ঘোড়ার নাম হরি, যার কেশর বাতাসে ওড়ে। গতি ও ক্ষমতার এই যুগলবন্দী বৈদিক কবিতায় এক প্রবল পৌরুষদীপ্ত উন্মাদনা তৈরি করেছিল।

ঘোড়ার এই সামরিক গুরুত্বের কারণেই বৈদিক যাগযজ্ঞের শীর্ষস্থানে বসেছিল ‘অশ্বমেধ’ (Aśvamedha) যজ্ঞ (Parpola, 2015)। এটি কোনো সাধারণ ধর্মীয় আচার ছিল না; এটি ছিল এক প্রকাশ্য সাম্রাজ্যবাদী ও সামরিক মহড়া। একটি সুসজ্জিত ও তেজস্বী ঘোড়াকে মুক্ত করে দেওয়া হতো এক বছরের জন্য। ঘোড়াটি যেখানে যেখানে যেত, পেছনের সেনাবাহিনী সেই সমস্ত অঞ্চল নিজেদের অধীনে দাবি করত। কোনো স্থানীয় রাজা যদি ঘোড়াটিকে আটকানোর সাহস দেখাত, তবে তার সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হতো। বছর শেষে ঘোড়াটিকে রাজধানীতে ফিরিয়ে এনে আড়ম্বরপূর্ণভাবে বলি দেওয়া হতো। এই নিষ্ঠুর ও রাজনৈতিক আচারের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজার সামরিক আধিপত্যের ঘোষণা দেওয়া এবং আশেপাশের সমস্ত গোত্রকে ভয় দেখানো।

শ্লাইয়ারমাখার যেমন ভাষার ব্যাকরণ দেখেছিলেন, ডিলথাই তেমনি দেখতে চেয়েছিলেন প্রযুক্তির ব্যাকরণ। ঘোড়া ছিল সেই যুগের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র। যে গোত্রের কাছে যত ভালো ঘোড়া থাকত, যুদ্ধে তাদের জয়ের সম্ভাবনা তত বেশি হতো। তাই ঋগ্বেদের কবিরা ইন্দ্র বা মরুৎদের কাছে ঘোড়া পাওয়ার জন্য অবিরাম আর্তি জানিয়ে গেছেন (Anthony, 2007)। তারা বলতেন, ঘোড়াই পারে শত্রুর তীর এড়িয়ে তাদের নিরাপদে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরিয়ে আনতে। অশ্বের এই অবিসংবাদিত উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বৈদিক সমাজ কোনো অহিংস বা শান্তিকামী সাধকদের সমাজ ছিল না; তা ছিল এক দ্রুতগামী, আক্রমণাত্মক এবং যুদ্ধংদেহী যোদ্ধাদের সমাজ।

‘রথ’ ও সামাজিক ক্ষমতার প্রকাশ (The Chariot and the Expression of Social Power)

ঘোড়ার শক্তির সাথে যখন চাকার প্রযুক্তি যুক্ত হলো, তখন জন্ম নিল ব্রোঞ্জযুগের সবচেয়ে ভয়ংকর যুদ্ধযান – রথ (Chariot)। বিশেষ করে হালকা, দ্রুতগামী এবং স্পোকযুক্ত চাকার রথ ছিল ইন্দো-ইরানীয় সংস্কৃতির এক যুগান্তকারী প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন (Sparreboom, 1985)। প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতায় যেসব ভারী ও নিরেট চাকার গাড়ির অস্তিত্ব ছিল, বৈদিক রথ ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষিপ্র ও সংঘাতক্ষম। এই রথ বৈদিক আর্যভাষী সমাজকে এক বিরাট রণকৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছিল। যুদ্ধের ময়দানে রথের ওপর দাঁড়িয়ে তীরন্দাজরা দূর থেকেই শত্রুবাহিনীর ওপর তীরবৃষ্টি চালাতে পারত। রথ হয়ে উঠেছিল বৈদিক অভিজাত ও শাসক শ্রেণীর মর্যাদার প্রতীক।

ডিলথাইয়ের হার্মেনিউটিক্স আমাদের দেখায় কীভাবে একটি বস্তুগত হাতিয়ার কোনো সমাজের শিল্প ও সাহিত্যের রূপক তৈরি করে দেয় (Dilthey, 1989)। বৈদিক কবিদের রচনার দিকে তাকালে দেখা যায়, রথ নির্মাণের প্রতিটি অংশকে তারা রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। রথের অক্ষদণ্ড, চাকা, জোয়াল এবং চাবুক – এগুলো সবই বৈদিক দর্শনের প্রাথমিক প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ঋগ্বেদের কবিরা তাদের নিজেদের কাজকে তুলনা করতেন রথ নির্মাতার কাজের সাথে। কাঠমিস্ত্রি বা ‘তক্ষণ’ (Takṣan / Chariot-maker) যেভাবে অত্যন্ত নিখুঁত মাপে কাঠ কেটে, জোড়া লাগিয়ে একটি শক্তিশালী রথ তৈরি করে, কবিও ঠিক তেমনিভাবে শব্দ বাছাই করে, ছন্দে সাজিয়ে একটি নিখুঁত স্তোত্র তৈরি করেন (Elizarenkova, 1995)। এই তুলনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায় যে, বৈদিক যুগে শিল্পীকে কোনো অলৌকিক সাধক ভাবা হতো না; তাকে দেখা হতো একজন দক্ষ কারিগরের সমকক্ষ হিসেবে।

রথের এই প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব সমাজে এক নতুন ধরনের অভিজাত শ্রেণীর জন্ম দিয়েছিল, যাদের বলা হতো ‘রথী’ (Rathin / Charioteer-warrior) (Erdosy, 1995)। সাধারণ পদাতিক সৈন্যদের চেয়ে এই রথী যোদ্ধারা সমাজে অনেক বেশি সম্মান ও ক্ষমতা ভোগ করত। গোত্রপতি এবং তাদের ঘনিষ্ঠ যোদ্ধারাই কেবল এই রথের মালিক হতে পারত, কারণ রথ তৈরি করা এবং তা রক্ষণাবেক্ষণ করা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল কাজ। ফলে রথ হয়ে উঠেছিল শ্রেণীবিভাজনের এক দৃশ্যমান হাতিয়ার। সাধারণ মানুষকে বাধ্য করা হতো এই রথীদের আনুগত্য স্বীকার করতে। দেবতাদেরও তারা এই রথীর বেশেই কল্পনা করেছিল। ইন্দ্র হলেন মহান রথী, যিনি নিজের রথে চড়ে অন্ধকার ও শত্রুর দুর্গ চূর্ণবিচূর্ণ করে দেন।

শুধু যুদ্ধ নয়, শান্তি ও বিনোদনের সময়েও রথ ছিল সামাজিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। বৈদিক সমাজে রথদৌড়ের প্রতিযোগিতা ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয় এক আয়োজন। ‘বাজপেয়’ (Vājapeya) যজ্ঞের অন্যতম প্রধান অংশ ছিল এই রথদৌড়, যেখানে যজমান বা রাজাকে একটি সাজানো প্রতিযোগিতায় জিতিয়ে দেওয়া হতো যাতে তার রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয় (Sparreboom, 1985)। ডিলথাইয়ের বস্তুনিষ্ঠ চেতনার তত্ত্ব দিয়ে বিচার করলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, রথ কোনো নিছক যান ছিল না; তা ছিল ক্ষমতা, কারিগরি দক্ষতা এবং সামাজিক আধিপত্য প্রদর্শনের এক সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম। এই বস্তুগত যানটিকে বাদ দিয়ে বৈদিক সাহিত্যের কোনো সামাজিক পাঠ সম্ভব নয়।

বৈদিক সম্পদ ও লুণ্ঠিত দ্রব্যের বণ্টন (Vedic Wealth and Redistribution of Booty)

বৈদিক সাহিত্যের পাতায় পাতায় যে শব্দটির জন্য কবিরা সবচেয়ে বেশি হাহাকার করেছেন, তা হলো ‘রয়ি’ (Rayi) বা সম্পদ। আধুনিক মানুষ সম্পদ বলতে জমি, বাড়ি বা ব্যাংকে জমানো টাকা বোঝে। কিন্তু ব্রোঞ্জযুগের সেই পশুপালক সমাজে সম্পদের চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে জমি কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ ছিল না, কারণ চারণভূমি ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত (Sharma, 1983)। ফলে বৈদিক মানুষের সম্পদ ছিল অত্যন্ত সচল ও দৃশ্যমান। তাদের সম্পদের তালিকায় ছিল গবাদিপশু, তেজস্বী ঘোড়া, তামার তৈরি অস্ত্র, যজ্ঞের পাত্র, সোনার অলঙ্কার বা ‘নিষ্ক’ (Niṣka) এবং যুদ্ধে বন্দি করা নারী ও দাস-দাসী। এই চলমান সম্পদ অর্জনের প্রধান উপায় ছিল অন্য গোত্রের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের ধনসম্পদ লুণ্ঠন করা।

ডিলথাই দেখান যে, মানুষের সমাজ ব্যবস্থা এবং তাদের নৈতিক মূল্যবোধ নির্ভর করে কীভাবে সেই সমাজে সম্পদ উৎপাদিত ও বণ্টিত হচ্ছে (Dilthey, 2002)। বৈদিক সমাজে সম্পদ বণ্টনের একটি চমৎকার গোত্রীয় ও যৌথ ব্যবস্থা চালু ছিল। গোত্রের যোদ্ধারা যখন কোনো যুদ্ধ থেকে বিপুল সম্পদ লুণ্ঠন করে আনত, তখন তা কোনো একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত সিন্দুকে ঢুকে যেত না। সেই লুণ্ঠিত সম্পদ নিয়ে আসা হতো গোত্রীয় সমাবেশে, বিশেষ করে ‘বিদথ’ (Vidatha) বা সমিতির মতো প্রাচীন প্রতিষ্ঠানে (Sharma, 1983)। সেখানে গোত্রপতি বা রাজা সেই সম্পদ সমস্ত যোদ্ধাদের মধ্যে, পুরোহিতদের মধ্যে এবং গোত্রের বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে ভাগ করে দিতেন। এই আনুষ্ঠানিক বণ্টনই ছিল গোত্রনেতার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার মূল শক্তি।

কবি বা পুরোহিতরা এই সম্পদ বণ্টনের প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। তারা তাদের স্তোত্রের মাধ্যমে রাজার বীরত্বের স্তুতি গাইতেন, যাতে রাজা খুশি হয়ে তাদের মোটা অঙ্কের দান বা দক্ষিণা দেন। ঋগ্বেদের শেষ ভাগে কিছু বিশেষ স্তোত্র রয়েছে, যেগুলোকে বলা হয় ‘দানস্তুতি’ (Dānastuti) (Bhattacharji, 1984)। এই দানস্তুতিগুলোতে কোনো দেবতার প্রশংসা নেই; সেখানে রক্তমাংসের রাজাদের প্রশংসা করে বলা হয়েছে – ‘অমুক রাজা আমাকে একশোটি ঘোড়া, দশ হাজার গরু এবং দাসী উপহার দিয়েছেন’। কবিরা নির্লজ্জভাবে এই বস্তুগত প্রাপ্তির কথা লিখে গেছেন। ডিলথাইয়ের হার্মেনিউটিক্স আমাদের বাধ্য করে এই বাস্তব অর্থনৈতিক লেনদেনের দিকে তাকাতে। বৈদিক কবিতা ছিল মূলত এই বৈষয়িক প্রাপ্তির এক শৈল্পিক রশিদ।

এই সম্পদ ব্যবস্থার ভেতর কোনো আধ্যাত্মিক ত্যাগের জায়গা ছিল না। বৈদিক মানুষ দারিদ্র্যকে চরম অভিশাপ মনে করত। তারা কোনো সন্ন্যাস বা বৈরাগ্যের কথা কল্পনাও করত না। তাদের একটাই আর্তি ছিল – এই জীবনেই প্রচুর সম্পদের মালিক হয়ে বাঁচা, যাতে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো যায়। ডিলথাইয়ের জীবনজগৎ সংক্রান্ত তত্ত্ব আমাদের দেখায় যে, পরবর্তী যুগের ত্যাগবাদী দর্শন আসলে বৈদিক যুগের এই উলঙ্গ বস্তুবাদী আকাঙ্ক্ষাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বৈদিক সংহিতার আসল সত্য লুকিয়ে আছে তাদের এই পার্থিব সম্পদের লোভে, যা কোনো পাপবোধ ছাড়াই তারা সাহসের সাথে প্রকাশ করেছিল।

যুদ্ধ, দশরাজ্ঞ সংঘাত ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (Warfare, the Battle of Ten Kings, and Historical Reality)

বৈদিক সমাজ ছিল একটি স্থায়ী যুদ্ধের সমাজ। শান্তি সেখানে কোনো স্বাভাবিক অবস্থা ছিল না; শান্তি ছিল কেবল দুটি যুদ্ধের মাঝের একটি ক্ষণস্থায়ী বিরতি। প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ দেখায় যে, উত্তর-পশ্চিম ভারতে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করার জন্য বৈদিক আর্যভাষী গোত্রগুলোকে অবিরাম লড়াই করতে হয়েছিল (Erdosy, 1995)। তারা একদিকে যেমন লড়াই করেছিল এই মাটির আদি অধিবাসী – যাদের তারা ‘দাস’ (Dāsa) বা ‘দস্যু’ (Dasyu) বলে চিহ্নিত করেছিল – তাদের বিরুদ্ধে, তেমনি নিজেদের মধ্যেও তারা ভ্রাতৃঘাতী রক্তক্ষয়ী সংঘাতে লিপ্ত হয়েছিল। যুদ্ধ ছিল তাদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান শর্ত এবং নতুন ভৌগোলিক এলাকা দখলের একমাত্র উপায়।

এই যুদ্ধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক লড়াইটি হলো ‘দাশরাজ্ঞ যুদ্ধ’ (Battle of the Ten Kings / Dāśarājña), যার বিশদ বিবরণ ঋগ্বেদের সপ্তম মণ্ডলে সংরক্ষিত আছে (Witzel, 1995)। এটি কোনো কাল্পনিক পৌরাণিক লড়াই ছিল না। রাভী নদীর তীরে ভরত গোত্রের রাজা সুদাস এবং দশটি মিত্র গোত্রের যৌথ বাহিনীর মধ্যে এই প্রচণ্ড সংঘাত ঘটেছিল। এই দশটি গোত্রের মধ্যে যেমন আর্যভাষী গোত্র ছিল, তেমনি অনার্য গোত্রও ছিল। যুদ্ধের প্রধান কারণ ছিল জলসম্পদ এবং চারণভূমির অধিকার। বিরোধী গোত্রগুলো রাভী নদীর বাঁধ কেটে দিয়ে সুদাসের বাহিনীকে ভাসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। সুদাসের পুরোহিত বশিষ্ঠ স্তোত্র পাঠ করে ইন্দ্রের কাছে সাহায্য চেয়ে ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত সুদাসের বাহিনী জয়লাভ করে।

ডিলথাইয়ের ঐতিহাসিক হার্মেনিউটিক্স এই দশ রাজার যুদ্ধকে বোঝার ক্ষেত্রে এক নিখুঁত ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি দেয় (Dilthey, 1989)। ভাববাদী ব্যাখ্যাকাররা এই যুদ্ধকে সুর ও অসুরের, কিংবা ভালো ও মন্দের এক আধ্যাত্মিক রূপক হিসেবে দেখাতে চান। কিন্তু টেক্সটের ভেতরের ভাষা প্রমাণ করে যে, এটি ছিল ক্ষমতার জন্য দুটি মানবগোষ্ঠীর মধ্যে ঘটা এক নিষ্ঠুর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধ। বশিষ্ঠ যখন ইন্দ্রের প্রশংসা করছেন, তখন তিনি কোনো বিমূর্ত ঈশ্বরের জয়গান করছেন না; তিনি তার নিজের পক্ষের সেনাদলের মনোবল চাঙ্গা রাখছেন। নদীর জল নিয়ন্ত্রণ করা এবং চারণভূমি দখল করাই ছিল এই যুদ্ধের একমাত্র লক্ষ্য। ইতিহাসের এই রক্তমাখা বাস্তবতাকে কোনো ধর্মতাত্ত্বিক রূপক দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না।

পরিশেষে বলা যায়, ডিলথাইয়ের হার্মেনিউটিক্স বৈদিক সাহিত্যের সমস্ত কাল্পনিক ও আধ্যাত্মিক পর্দা উন্মোচন করে দেয়। গরু, ঘোড়া, রথ, সম্পদ ও যুদ্ধ – এই পাঁচটি বস্তুগত উপাদানের ভেতর দিয়েই বৈদিক মানুষ তার বাস্তব পৃথিবীকে তৈরি করেছিল। তাদের ঈশ্বররা ছিলেন তাদের নিজেদেরই বড় সংস্করণ, তাদের প্রার্থনাগুলো ছিল তাদের বেঁচে থাকার বাস্তব চাহিদাপত্র, আর তাদের সাহিত্য ছিল সেই রূঢ় জীবনসংগ্রামের এক প্রামাণ্য ইতিহাস। ডিলথাই আমাদের শিখিয়েছেন যে, মানুষের ইতিহাসকে জানতে হলে তার মাটির জগতের দিকে তাকাতে হয়। যখন আমরা নির্মোহ ও ধর্মনিরপেক্ষ চোখে বৈদিক সাহিত্যের এই বস্তুগত ভিত্তিকে প্রত্যক্ষ করি, তখন ধর্মতত্ত্বের সমস্ত অলীক অহংকার চূর্ণ হয়ে যায়। আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে প্রাক-লৌহযুগের একদল জীবন্ত মানুষ, যাদের রক্ত, ঘাম, লোভ এবং লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের প্রথম পৃষ্ঠাগুলো লেখা হয়েছিল।

মিথ ও প্রতীকের অর্থজগৎ (World of Myth and Symbol): রিক্যুর ও বুল্টমানের প্রয়োগ

রিক্যুর ও ইন্দ্র-বৃত্র আখ্যান (Ricoeur and the Indra-Vṛtra Narrative): মিথ, প্রতীক, অবরোধ ও মুক্তি

প্রতীক ও মিথের হার্মেনিউটিক্স (Hermeneutics of Symbol and Myth): রিক্যুরের তাত্ত্বিক ভিত্তি

মানুষ যখন কোনো গভীর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়, তখন সাধারণ সোজাসাপ্টা ভাষায় সেটার প্রকাশ সম্ভব হয় না। মানুষের ভাষার একটা সীমাবদ্ধতা আছে, আবার একই সাথে আছে নিজেকে অতিক্রম করার ক্ষমতা। ফরাসি দার্শনিক পল রিক্যুর (Paul Ricoeur) ভাষার এই বিশেষ শক্তিকে তার দার্শনিক অনুসন্ধানের কেন্দ্রে স্থাপন করেছিলেন। তিনি দেখান যে, মানুষের চিন্তার উন্মেষ ঘটে প্রতীকের মধ্য দিয়ে। তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য সিম্বলিজম অব ইভিল (The Symbolism of Evil)-এ তিনি একটি কথা প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীকালে আধুনিক হার্মেনিউটিক্সের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে – প্রতীক চিন্তার উদ্রেক করে (Ricoeur, 1967)। এই কথাটির অর্থ খুব গভীর। মানুষ আগে দর্শন তৈরি করে পরে তার জন্য প্রতীক বানায় না। বরং আদিমকাল থেকেই মানুষ প্রথমে প্রতীকের মুখোমুখি হয়, আর সেই প্রতীক মানুষের ভেতর চিন্তার জন্ম দেয়। প্রতীক হলো এমন এক ধরনের চিহ্ন, যার একটা অর্থ অন্য আরেকটি গভীরতর অর্থকে চোখের সামনে হাজির করে।

চিহ্ন এবং প্রতীকের মধ্যে রিক্যুর একটি পরিষ্কার বিভাজন রেখা টেনেছেন। ট্রাফিকের লাল বাতি কেবলই একটা চিহ্ন, এর একমাত্র অর্থ হলো গাড়ি থামানো। সেখানে কোনো দ্বিতীয় বা লুকানো অর্থ নেই। কিন্তু প্রতীকের ভেতরে সবসময় অর্থের দুটি স্তর থাকে। প্রথম স্তরটি হলো তার আক্ষরিক বা প্রাথমিক অর্থ, আর দ্বিতীয় স্তরটি হলো রূপকীয় বা পরোক্ষ অর্থ। উদাহরণস্বরূপ, যদি বলা হয় ‘অন্ধকার’, তবে এর প্রাথমিক অর্থ আলোর অনুপস্থিতি। কিন্তু এর পরোক্ষ অর্থ হলো অজ্ঞতা, ভয় কিংবা বিনাশ। রিক্যুর মনে করেন, এই দ্বিস্তরীয় অর্থের কারণেই প্রতীক মানুষকে সাধারণ অভিজ্ঞতার সীমানা ছাড়িয়ে এক বৃহত্তর অস্তিত্বের কথা ভাবতে বাধ্য করে। প্রতীক নিজে কোনো ব্যাখ্যা দেয় না, বরং সে ব্যাখ্যার জন্য নিজেকে উন্মুক্ত করে দেয়। প্রাচীন টেক্সটগুলো যখন আমরা পড়তে যাই, তখন এই দ্বিস্তরীয় অর্থের কাঠামোটি অনুধাবন করা জরুরি হয়ে পড়ে।

মিথকে রিক্যুর স্রেফ কোনো রূপকথা বা মিথ্যা গল্প হিসেবে দেখেননি। ঊনবিংশ শতাব্দীর অনেকে মনে করতেন মিথ হলো আদিম মানুষের ভুল বিজ্ঞান, যা বুদ্ধিমান মানুষের যুগে অপ্রয়োজনীয়। রিক্যুর এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সরাসরি নাকচ করেন। তিনি দেখান যে, মিথ আসলে প্রতীকেরই এক ধরনের বিস্তার। প্রতীক যেখানে একটি মাত্র শব্দ বা ভাবনায় সীমাবদ্ধ থাকে, মিথ সেই প্রতীককে একটা চলমান গল্পের ভেতর নিয়ে আসে। অর্থাৎ মিথ হলো প্রতীকী উপাদান দিয়ে তৈরি এমন এক আখ্যান, যা মানুষের আদিম সংকট, বিশ্বজগতের ভারসাম্য এবং অস্তিত্বের লড়াইকে নাট্যরূপ দেয় (Ricoeur, 1976)। মানুষ কীভাবে অস্তিত্ব লাভ করল, কেন জগতে সংকট বা অশুভের উপস্থিতি রয়েছে, আর কীভাবে সেই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব – এই প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রাচীন মানুষ মিথের কাঠামোর মাধ্যমেই অন্বেষণ করত। মিথকে আক্ষরিক ঐতিহাসিক ঘটনা ধরে নিলে যেমন ভুল হবে, তেমনই তাকে বানোয়াট গল্প ভেবে উড়িয়ে দিলেও মানুষের চিন্তাচেতনার শিকড়টি অজানা থেকে যাবে।

রিক্যুরের পাঠপদ্ধতির আরেকটি বড় দিক হলো কাঠামোগত বিশ্লেষণের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে অর্থের জগতে প্রবেশ করা। নৃবিজ্ঞানী ক্লদ লেভি-স্ট্রস (Claude Lévi-Strauss) যখন মিথকে কেবল কতগুলো বিপরীত বাইনারি জোড়ার ব্যাকরণ হিসেবে দেখছিলেন, রিক্যুর তখন বললেন যে কাঠামো জানাটা জরুরি, কিন্তু সেটাই সব নয় (Ricoeur, 1974)। ব্যাকরণ জেনে থেমে গেলে পাঠের প্রাণ হারিয়ে যায়। টেক্সটের নিজস্ব এক ধরনের উদ্বৃত্ত অর্থ বা অর্থের উদ্বৃত্ত (surplus of meaning) থাকে। একটা টেক্সট যখন তার মূল লেখকের হাত থেকে ছুটে এসে পাঠকের সামনে দাঁড়ায়, তখন তা নতুন ঐতিহাসিক প্রসঙ্গে নতুন অর্থের দিগন্ত উন্মোচন করে। বৈদিক সাহিত্য পড়ার ক্ষেত্রে রিক্যুরের এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে ফলপ্রসূ। প্রাচীন ঋষিরা যখন কোনো আখ্যান রচনা করেছিলেন, তারা হয়তো নির্দিষ্ট কোনো যজ্ঞীয় বা সামাজিক বাস্তবতায় তা করেছিলেন। কিন্তু সেই আখ্যানের ভেতরের প্রতীকী কাঠামোটি সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে বহু বছর পরেও মানুষের গভীর অস্তিত্বগত সংকট আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে নতুনভাবে পড়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়।

বৈদিক পাঠে ইন্দ্র-বৃত্র সংঘর্ষ (Indra-Vṛtra Conflict in Vedic Texts): প্রাকৃতিক ঘটনা নাকি মহাজাগতিক আখ্যান

ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের বত্রিশতম সূক্তটি বৈদিক সাহিত্যের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং নাটকীয় সূক্তগুলোর একটি। এই সূক্তে ঋষি হিরণ্যস্তূপ আঙ্গিরস ইন্দ্রের সেই বীরত্বপূর্ণ কাজের বর্ণনা দিয়েছেন, যা বৈদিক বিশ্বাসের কেন্দ্রে অবস্থান করত (Jamison & Brereton, 2014)। আখ্যানটি সংক্ষেপে এই: বৃত্র নামের এক সর্পিল বা দানবীয় সত্তা সমস্ত জলধারাকে আটকে রেখেছিল এক পর্বতের গুহায়। চারদিকে খরা, স্থবিরতা আর অন্ধকারের রাজত্ব। দেবরাজ ইন্দ্র সোমরস পান করে শক্তি সঞ্চয় করলেন, ত্বষ্টা তাকে বানিয়ে দিলেন ধারালো বজ্র। সেই বজ্র হাতে নিয়ে ইন্দ্র পর্বতের গায়ে আঘাত করলেন, বৃত্রকে খণ্ডবিখণ্ড করে হত্যা করলেন এবং সেই বন্দিদশা থেকে জলধারাকে মুক্ত করলেন। জলরাশি তখন কলকল শব্দে সাগরের দিকে ছুটে চলল, আর আকাশে ফিরে এল সূর্য এবং ঊষা। বৈদিক প্রার্থনায় ইন্দ্রের এই কাজকে বারবার স্মরণ করা হয়েছে এক পরম মুক্তির ঘটনা হিসেবে।

উনবিংশ শতাব্দীর প্রাচ্যবিদরা এই আখ্যানটিকে খুব সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন। পণ্ডিত ম্যাক্স মুলার (Max Müller) এবং তার সমসাময়িক বহু গবেষক মনে করতেন, এটি মূলত একটি আবহাওয়া সংক্রান্ত বা প্রাকৃতিক মিথ (meteorological myth) (Müller, 1891)। তাদের মতে, প্রাচীন ভারতের শুষ্ক গ্রীষ্মকালে যখন খরা দেখা দিত, মানুষ তখন বৃষ্টির জন্য হাহাকার করত। আকাশে মেঘ জমলেও জল পড়ত না। তারপর যখন প্রচণ্ড ঝড় উঠত এবং বজ্রপাতের পর মুষলধারে বৃষ্টি নামত, বৈদিক কবিরা সেই প্রাকৃতিক ঘটনাকেই ইন্দ্রের বজ্র দিয়ে মেঘরূপী অসুর বধের গল্প হিসেবে কল্পনা করেছিলেন। এই ব্যাখ্যাটি শুনতে খুব সহজ এবং বৈজ্ঞানিক মনে হতে পারে। কিন্তু কোনো মহৎ মিথকে কেবল আবহাওয়ার রিপোর্টে নামিয়ে আনলে তার গভীর সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক মাত্রাটি ঢাকা পড়ে যায়। প্রাকৃতিক রূপক নিশ্চিতভাবেই এই আখ্যানে উপস্থিত আছে, তবে কেবল আবহাওয়া দিয়ে ঋগ্বেদের ইন্দ্রের বিশালতাকে পুরোপুরি বোঝা যায় না।

পরবর্তীকালে ডাচ ভারততত্ত্ববিদ এফ. বি. জে. কুইপার (F. B. J. Kuiper) এই প্রাকৃতিক ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা ধরিয়ে দেন। কুইপার দেখান যে, ইন্দ্র ও বৃত্রের লড়াই নিছক একটি ঋতুভিত্তিক বৃষ্টির ঘটনা নয়, বরং এটি একটি মহাজাগতিক সৃষ্টি আখ্যান বা কসমোগনিক মিথ (cosmogonic myth) (Kuiper, 1979)। সৃষ্টি হওয়ার আগে জগত ছিল এক অখণ্ড, অবিভাজ্য এবং স্থবির অন্ধকারের মধ্যে। কোনো গতি ছিল না, নাম ছিল না, রূপ ছিল না। বৃত্র সেই অন্ধকারের প্রতীক, যে সমস্ত সম্ভাবনাময় উপাদানকে নিজের পেটের ভেতর আটকে রেখেছিল। ইন্দ্রের বজ্রাঘাত সেই অখণ্ড স্থবিরতাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। পৃথিবী এবং আকাশ আলাদা হয়ে যায়, মাঝখানে তৈরি হয় বসবাসের উপযোগী এক উন্মুক্ত স্থান, যাকে বৈদিক ভাষায় বলা হয়েছে ‘ক্ষেত্র’। জলধারা প্রবাহিত হওয়ার অর্থ কেবল বৃষ্টি হওয়া নয়, বরং মহাবিশ্বের সময় ও গতির চাকা সচল হওয়া।

রিক্যুরের হার্মেনিউটিক্স দিয়ে এই আখ্যানটি পড়লে আমরা প্রাকৃতিক ঘটনা এবং কসমোগনির বাইরেও আরও একটি স্তরে পৌঁছাতে পারি। রিক্যুর বলবেন, প্রাকৃতিক ঘটনা এখানে প্রতীকের প্রথম স্তর হিসেবে কাজ করছে, কিন্তু টেক্সটের লক্ষ্য সেই প্রাকৃতিক স্তরে থেমে থাকা নয় (Ricoeur, 1976)। প্রাচীন কবিরা প্রকৃতির ঝড়-বৃষ্টির অভিজ্ঞতাকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে মানুষের মহাজাগতিক অবস্থানের এক গভীর সত্যকে ভাষা দিতে চেয়েছিলেন। জগত কোনো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাজানো নিরাপদ বাগান নয়। জগতের শৃঙ্খলা এবং জীবনের প্রবাহকে টিকিয়ে রাখতে হলে অন্ধকারের শক্তির বিরুদ্ধে ক্রমাগত লড়াই করতে হয়। ইন্দ্র ও বৃত্রের লড়াই তাই কোনো অতীতকালের শেষ হয়ে যাওয়া ঘটনা নয়, বরং এটি সৃষ্টি এবং বিনাশের চিরন্তন দ্বন্দ্বের এক প্রতীকী বয়ান। বৈদিক সমাজের মানুষেরা যখন এই আখ্যান শুনত, তারা নিজেদের সেই লড়াইয়েরই অংশীদার হিসেবে কল্পনা করত।

বৃত্র এবং অবরোধের প্রতীকায়ন (Vṛtra and the Symbolism of Obstruction): বন্ধন ও অন্ধকারের দ্বিস্তরিক অর্থ

বৃত্র শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ খেয়াল করলে মিথটির মূল প্রতীকী চরিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভাষাভাষী পণ্ডিতদের মতে, বৃত্র শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ধাতু ‘বৃ’ থেকে, যার অর্থ ঢেকে রাখা, ঘিরে রাখা, আটকে রাখা বা প্রতিরোধ করা (Benveniste, 1973)। বৃত্র মানে সেই সত্তা, যে কোনো কিছুকে আচ্ছাদিত করে রাখে বা সামনে এগোতে বাধা দেয়। ঋগ্বেদে বৃত্রকে প্রায়ই ‘অহি’ বা সাপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সে হাত-পা হীন এক কুণ্ডলী পাকানো জীব, যে পাহাড়ের ঢালে শুয়ে থেকে জলধারাকে পথ আটকে রেখেছিল। এই শারীরিক বর্ণনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। হাত-পা না থাকা এবং কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকা আসলে নিষ্ক্রিয়তা, স্থবিরতা এবং অন্ধ বাধার প্রতীক। সে নিজে কিছু তৈরি করে না, কিন্তু সৃষ্টির সম্ভাবনাকে আটকে রাখে।

রিক্যুর তার অশুভের হার্মেনিউটিক্সে দেখিয়েছেন যে, মানব সংস্কৃতিতে সংকট বা অশুভের প্রাচীনতম প্রতীকগুলো সাধারণত অপবিত্রতা, ভার এবং বন্ধনের ভাবনার সাথে যুক্ত (Ricoeur, 1967)। মানুষ যখন কোনো বিপদে পড়ে বা অস্তিত্বের সংকটে ভোগে, তখন সে নিজেকে শৃঙ্খলিত বা অবরুদ্ধ মনে করে। ঋগ্বেদে এই সংকটের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অংহঃ’ বা সংকীর্ণতা। অংহঃ হলো এমন এক দমবন্ধ করা অবস্থা, যেখানে শ্বাস নেওয়ার জায়গা থাকে না, চারদিক থেকে প্রাচীর চেপে আসে। বৃত্র হলো এই সংকীর্ণতার মহাজাগতিক রূপ। সে মহাজাগতিক জলধারাকে আটকে রেখে সমস্ত সৃষ্টিকে এক শ্বাসরুদ্ধকর মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। বৃত্রের চরিত্রটি কোনো সাধারণ নৈতিক খলনায়কের মতো নয়, বরং সে হলো অস্তিত্বের বিরুদ্ধে অন্ধ জড়তার এক প্রতিরোধ।

জল বা অপ্ বৈদিক ভাবনায় কেবল তৃষ্ণা মেটানোর উপাদান নয়। জল হলো উর্বরতা, জীবনীশক্তি এবং রূপান্তরের প্রাথমিক উপাদান। ঋগ্বেদে বলা হয়েছে জলরাশি যেন গর্ভবতী হয়ে বৃত্রের পেটের ভেতর বা পর্বতের গুহায় বন্দি ছিল। এই বন্দিদশা জীবনের স্বাভাবিক বিকাশের পরিপন্থী। রিক্যুরের দ্বিস্তরীয় অর্থের সূত্র ধরে দেখলে বোঝা যায়, আক্ষরিক স্তরে এখানে নদীগুলোর গতি রুদ্ধ হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু গভীরতর প্রতীকী স্তরে এটি হলো সৃষ্টির প্রাণশক্তির অচলাবস্থা। যখন জীবনীশক্তি আটকে যায়, তখন সমাজের গতিশীলতা নষ্ট হয়, সংস্কৃতি স্থবির হয়ে পড়ে এবং মানুষের মন ভয়ের অন্ধকারে ডুবে যায়। বৃত্র যে জলকে আটকে রেখেছিল, তার মানে সে আসলে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ নিতে দিচ্ছিল না।

অতএব বৃত্র কোনো সাধারণ পৌরাণিক দানব নয়, সে হলো মানব অভিজ্ঞতার সেই আদিম ভয়, যেখানে মানুষ নিজেকে সম্পূর্ণ অসহায় এবং অবরুদ্ধ দেখতে পায়। অন্ধকারের শক্তি সবসময় প্রকাশকে ভয় পায়। সে সবকিছুকে নিজের পেটে গিলে ফেলে এক আদিম অখণ্ডতায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়, যাকে ঋগ্বেদে ‘অসৎ’ বা অনস্তিত্বের কাছাকাছি অবস্থা হিসেবে দেখা হয়েছে (O’Flaherty, 1981)। রিক্যুরের ভাষায়, মিথ এই অন্ধকারাচ্ছন্ন অভিজ্ঞতাকে একটা রূপ দেয় যাতে মানুষ তাকে চিনতে পারে এবং তার বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে। বৃত্রকে কল্পনা করার মাধ্যমেই বৈদিক মানুষ তার জীবনের চারপাশের সমস্ত প্রতিবন্ধকতা, খরা, রোগ এবং শত্রুর ভীতিকে একটি মূর্ত রূপ দিতে পেরেছিল। বাধা যতক্ষণ পর্যন্ত অদৃশ্য থাকে, ততক্ষণ তাকে জয় করা যায় না; বৃত্র রূপ ধারণ করার মাধ্যমেই সেই বাধার দৃশ্যমান রূপ তৈরি হলো।

ইন্দ্র এবং মুক্তির প্রতীকায়ন (Indra and the Symbolism of Liberation): গতি, প্রকাশ ও সৃজনের রূপক

অবরোধের বিপরীতে মুক্তির প্রতীক হিসেবে বৈদিক আখ্যানে ইন্দ্রের আবির্ভাব ঘটে। ঋগ্বেদের বর্ণনা অনুযায়ী, ইন্দ্র কোনো নিষ্ক্রিয় বা ধ্যানমগ্ন সত্তা নন। তিনি হলেন উদ্যম, তেজ এবং সীমাহীন গতিশীলতার প্রতিমূর্তি। তার প্রধান অস্ত্র বজ্র, যা তৈরি হয়েছে নিখাদ শক্তি এবং দ্যুতি দিয়ে। দেবতারা যখন বৃত্রের ভয়ে পিছু হটছিলেন, তখন কেবল ইন্দ্রই এগিয়ে গিয়েছিলেন সেই অচলায়তন ভাঙার জন্য (Oberlies, 1998)। কিন্তু ইন্দ্র এই শক্তি একা একা অর্জন করেননি। তিনি পান করেছিলেন সোমরস। সোম বৈদিক ভাবনায় এক ধরনের চেতনার বিস্তার এবং উদ্দীপনার প্রতীক। সোমরস পান করার পর ইন্দ্রের শরীর এবং সংকল্প এতটাই প্রসারিত হয়ে যায় যে তিনি স্বর্গ এবং মর্ত্যকে নিজের দুই পাশে ঠেলে দিয়ে সৃষ্টির জন্য নতুন স্থানের জন্ম দেন।

ইন্দ্রের এই কাজকে বৈদিক টেক্সটে প্রকাশ করা হয়েছে ‘হন’ ধাতুর মাধ্যমে, যার অর্থ আঘাত করা বা হত্যা করা। ইন্দ্র যখন বৃত্রকে আঘাত করলেন, তখন পর্বতের বুক চিরে জলের ধারা বের হয়ে এল। ঋগ্বেদের কবিরা এই মুক্ত হওয়া জলধারাকে তুলনা করেছেন হাম্বা রবে ছুটে চলা গাভীগুলোর সাথে, যারা নিজেদের বাছুরের দিকে দৌড়ে যায়। এই উপমাটি অত্যন্ত চমৎকার। জল কেবল বের হয়ে এল না, সে মুক্তির আনন্দে গর্জন করতে করতে সমতলের দিকে ধাবিত হলো। রিক্যুরের দৃষ্টিতে, এটি হলো সংকীর্ণতা বা অংহঃ থেকে প্রশস্ততা বা ‘উরু’র দিকে যাত্রা। মুক্তি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; মুক্তি হলো চলাচলের অবাধ পথ খুঁজে পাওয়া। ইন্দ্রের বিজয়ের ফলে রুদ্ধ নদীগুলো সচল হলো, আর মানুষের জন্য উন্মুক্ত হলো চারণভূমি এবং কৃষিজমির বিস্তার।

জলের মুক্তির সাথে সাথেই আখ্যানে আরেকটি বড় ঘটনা ঘটে, তা হলো আলোর প্রকাশ। ইন্দ্র বৃত্রকে বধ করার পর আকাশে সূর্যকে স্থাপন করলেন এবং ঊষার আগমনের পথ তৈরি করলেন। অন্ধকার এবং জলরোধ আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ ছিল। বৃত্র নিহত হওয়ার সাথে সাথে জগতের দৃষ্টি ফিরে এল। রিক্যুর তার আখ্যান তত্ত্বে উল্লেখ করেন যে, প্রতিটি মুক্তি আখ্যানের একটি সুনির্দিষ্ট রূপান্তর মুহূর্ত থাকে, যাকে বলা হয় অন্ধকারের স্তর থেকে আলোর স্তরে রূপান্তর (Ricoeur, 1984)। ইন্দ্রের বজ্রাঘাত সেই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু। আলো এবং জলের এই যুগপৎ মুক্তি মহাবিশ্বের গতিকে আবার ফিরিয়ে দেয়। দিন এবং রাতের পর্যায়ক্রম শুরু হয়, ঋতুগুলোর আবর্তন নিশ্চিত হয় এবং মানুষ তার কর্মময় জীবনের নিশ্চয়তা ফিরে পায়।

এই মুক্তির চরিত্রটি বৈদিক মানুষের জীবনসংগ্রামের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। আদিম পশুপালক এবং কৃষিজীবী বৈদিক আর্যদের প্রতিনিয়ত এক প্রতিকূল ভূগোলের সাথে লড়াই করতে হতো। নতুন চারণভূমির সন্ধান, বনাঞ্চল পরিষ্কার করে বসবাসের জায়গা তৈরি করা এবং অনিশ্চিত জলবায়ুর সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের দরকার ছিল সীমাহীন আত্মবিশ্বাস এবং দৈহিক শক্তির প্রেরণা। ইন্দ্র তাদের কাছে সেই আত্মবিশ্বাসের রূপক হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন। রিক্যুরের হার্মেনিউটিক্স অনুযায়ী, ইন্দ্র কোনো দূরবর্তী অলীক চরিত্র নন, বরং তিনি হলেন মানুষের নিজস্ব বিস্তারকামী ইচ্ছারই এক প্রতীকী প্রক্ষেপণ। মানুষ যখন কোনো পর্বতপ্রমাণ বাধার সামনে দাঁড়ায়, তখন সে নিজের ভেতরের যাবতীয় জড়তাকে ভেঙে চুরমার করার যে সংকল্প গ্রহণ করে, ইন্দ্র হলেন সেই সংকল্পেরই মহাকাব্যিক প্রতিচ্ছবি।

দ্বিস্তরীয় অর্থ ও অর্থের উদ্বৃত্ত (Twofold Meaning and Surplus of Meaning): রূপকীয় পাঠ ও অস্তিত্বের দিগন্ত

রিক্যুর তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য রুল অব মেটাফর (The Rule of Metaphor)-এ দেখিয়েছেন যে, রূপক নিছক ভাষার কোনো অলংকার নয়। সাধারণ ব্যাকরণে মনে করা হয় রূপক হলো এক শব্দের জায়গায় আরেক শব্দের চাতুর্যপূর্ণ ব্যবহার। কিন্তু রিক্যুর বললেন, রূপক আসলে ভাষার জগতে নতুন অর্থের জন্ম দেয়, যাকে তিনি বলেছেন শব্দার্থিক উদ্ভাবন বা শব্দার্থিক অভিনবত্ব (semantic innovation) (Ricoeur, 1977)। রূপক যখন তৈরি হয়, তখন তা আমাদের চেনা বাস্তবতার বর্ণনাকে ওলটপালট করে দেয় এবং এক নতুন বাস্তবতার দিগন্ত আমাদের সামনে খুলে ধরে। ঋগ্বেদের ইন্দ্র-বৃত্র আখ্যানটি আসলে একটি সুবিশাল রূপক কাঠামো। এখানে পর্বত মানে কেবল মাটির ঢিবি নয়, নদী মানে কেবল এইচ-টু-ও যুক্ত তরল পদার্থ নয়, আর বজ্র মানে কেবল আকাশের বিদ্যুৎ নয়। এগুলো হলো এমন এক রূপক জগত, যা বৈদিক মানুষের সামগ্রিক অস্তিত্বের সংকটকে ধারণ করেছিল।

এই আখ্যানের দ্বিস্তরীয় অর্থ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথম স্তরের প্রাকৃতিক এবং আক্ষরিক অর্থের নিচে একটি গভীর অস্তিত্বগত অর্থ কাজ করছে। বৃত্র যখন জল আটকে রাখে, আক্ষরিক অর্থে তা খরা হলেও অস্তিত্বগত অর্থে তা হলো মানুষের সৃজনশীল শক্তির অবদমন। মানুষের জীবনে যখন ক্লান্তি আসে, হতাশা আসে বা সমাজ যখন প্রথাবদ্ধ নিয়মের নিগড়ে বন্দি হয়ে পড়ে, তখন মানুষের অবস্থা হয় সেই বৃত্র-কবলিত জগতের মতো। অন্যদিকে ইন্দ্র যখন সেই পাথর ভেঙে জল বের করে আনেন, তখন অস্তিত্বের স্তরে তা নির্দেশ করে মানুষের বন্দিদশা ভেঙে নতুন সম্ভাবনার উন্মোচন। এই দ্বিস্তরীয় চরিত্র থাকার কারণেই আখ্যানটি কেবল প্রাচীন যাযাবর জীবনের গণ্ডিতে আটকে থাকে না, তা আধুনিক পাঠকের কাছেও এক তাৎপর্যপূর্ণ পাঠ হিসেবে ধরা দেয়।

এখানেই রিক্যুরের ‘অর্থের উদ্বৃত্ত’ ধারণার সার্থকতা। একটি পাঠের অর্থ কখনোই তার ঐতিহাসিক রচয়িতার ভাবনার মধ্যে সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায় না। রিক্যুরের মতে, টেক্সট যখন একবার লিখিত রূপ পায়, তখন তা লেখকের ইচ্ছা বা লেখকের তাৎক্ষণিক সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে স্বাধীন হয়ে যায় (Ricoeur, 1981)। ঋগ্বেদের এই সূক্তটি হয়তো রচিত হয়েছিল হাজার হাজার বছর আগে, কিন্তু এর ভেতরের প্রতীকের প্রাচুর্য এত বেশি যে পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বিভিন্ন পাঠক সম্প্রদায় এর মধ্য থেকে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ আবিষ্কার করেছে। উপনিষদের যুগে এসে এই বহিস্থ ইন্দ্র-বৃত্র যুদ্ধ মানুষের অন্তর্জগতের কাম, ক্রোধ এবং অজ্ঞতার বিরুদ্ধে আত্মিক সংগ্রামের রূপকে পরিণত হয়েছিল। রিক্যুর বলবেন, এই রূপান্তরের ক্ষমতা টেক্সটের ভেতরের প্রতীকী উদ্বৃত্তের কারণেই সম্ভব হয়েছে। প্রতীক নিজের ভেতরে এত বেশি অর্থের সম্ভাবনা লুকিয়ে রাখে যে কোনো একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা তাকে পুরোপুরি গ্রাস করতে পারে না।

রিক্যুর আরও একটি জরুরি কথা বলেছিলেন ব্যাখ্যা ও বোঝাপড়ার সম্পর্ক নিয়ে। তিনি দেখান যে, টেক্সট পড়ার ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা বা ব্যাখ্যা করা (expliquer) এবং বোঝা বা বোঝাপড়া (comprendre) পরস্পরের বিরোধী নয়, বরং তারা একে অপরের পরিপূরক (Ricoeur, 1976)। প্রথমে পাঠককে টেক্সটের ভাষা, ব্যাকরণ, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং মিথের ভেতরের কাঠামোগত উপাদানগুলোকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। এটি হলো ব্যাখ্যার স্তর। কিন্তু সেখানেই থেমে গেলে চলবে না। ব্যাখ্যার পর পাঠককে সেই টেক্সটের মুখোমুখি হয়ে নিজের অস্তিত্বের দিগন্তকে প্রসারিত করতে হবে, যা হলো বোঝাপড়ার স্তর। ইন্দ্র-বৃত্র মিথটিকে যখন আমরা ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকভাবে বিশ্লেষণ করি, তখন আমরা এর প্রথম স্তরটি বুঝতে পারি। কিন্তু যখন আমরা উপলব্ধি করি যে এই মিথের মাধ্যমে প্রাচীন মানুষ জীবনের আদিম প্রতিকূলতাকে জয় করার পথ খুঁজছিল, তখন টেক্সটের অর্থ আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার সাথে যুক্ত হয়। মিথ তখন দূর অতীতের কোনো নির্জীব জীবাশ্ম থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে মানব চেতনার এক জীবন্ত দলিল।

যজ্ঞের পুনরভিনয় ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ (Ritual Re-enactment and Institutionalization): আখ্যান থেকে ক্রিয়ায় উত্তরণ

মিথ কখনোই কেবল মুখে মুখে বলার গল্প ছিল না; প্রাচীন সমাজে মিথ সবসময় যুক্ত থাকত আচার বা যজ্ঞের সাথে। ঋগ্বেদের ইন্দ্র-বৃত্র আখ্যানটি ছিল বৈদিক সোমযজ্ঞের মূল চালিকাশক্তি। সোমযজ্ঞে যখন সোমলতাকে পাথরের পাত্রে রেখে পেষণ করা হতো এবং তার থেকে রস বের করা হতো, তখন সেই ক্রিয়াটিকে ইন্দ্রের বৃত্র বধের সাথে সরাসরি তুলনা করা হতো (Doniger O’Flaherty, 1981)। যজ্ঞের পুরোহিতরা যখন মন্ত্র উচ্চারণ করতেন, তারা বিশ্বাস করতেন যে এই যজ্ঞের মাধ্যমে তারা আবার সেই আদিম মুক্তির মুহূর্তটিকে এই বর্তমান সময়ে উপস্থিত করছেন। ইন্দ্রের দ্বারা জলের মুক্তি পাওয়ার ঘটনাটি যেন যজ্ঞের বেদীতে আবার নতুন করে ঘটে চলেছে।

রিক্যুর তার পরবর্তী দার্শনিক কাজগুলোতে আখ্যান এবং মানবীয় ক্রিয়ার সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তার ফ্রম টেক্সট টু অ্যাকশন (From Text to Action) গ্রন্থে তিনি দেখান যে, মানুষের অর্থপূর্ণ ক্রিয়াকে টেক্সটের মতো পাঠ করা যায়, আবার একটি টেক্সট কীভাবে মানুষের ভবিষ্যৎ কর্মকে রূপ দেয় তাও বিশ্লেষণ করা সম্ভব (Ricoeur, 1991)। তার প্রস্তাবিত মাইমেসিস (mimesis) বা অনুকরণ তত্ত্বের তিনটি ধাপ এখানে লক্ষণীয়: প্রাক-বিন্যাস, বিন্যাস এবং পুনর্বিন্যাস। প্রথম ধাপে মানুষ তার জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সংকটকে উপলব্ধি করে। দ্বিতীয় ধাপে সেই অভিজ্ঞতা মিথ বা আখ্যানের রূপ পায়, যেমন ইন্দ্র-বৃত্র আখ্যান। আর তৃতীয় ধাপে মানুষ সেই আখ্যানকে নিজ জীবনে বা যজ্ঞীয় ক্রিয়ায় পুনরুজ্জীবিত করে নিজের বাস্তবতাকে নতুন অর্থ দেয়। বৈদিক যজ্ঞ ছিল সেই পুনর্বিন্যাসেরই এক মূর্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

যজ্ঞের প্রধান ব্যক্তি বা যজমান যখন কোনো যজ্ঞের আয়োজন করতেন, তিনি আসলে ইন্দ্রের বিজয়ের সাথে নিজেকে একাত্ম করতেন। যজমানের জীবনে রোগ, শত্রুভয়, দারিদ্র্য বা সামাজিক সংকট থাকতে পারত। যজ্ঞের মাধ্যমে তিনি প্রতীকীভাবে বৃত্ররূপী সেই সংকটকে ধ্বংস করতেন এবং ইন্দ্রের মতো বিজয়ী হয়ে সম্পদ ও দীর্ঘায়ু লাভ করার প্রত্যাশা করতেন। এখানে মিথ এক ধরনের মানসিক এবং সামাজিক নিরাময় হিসেবে কাজ করত। মানুষ যখন দেখে তার ব্যক্তিগত সংকট আসলে মহাজাগতিক এক বৃহত্তর লড়াইয়ের অংশ, তখন তার ভেতরের ভীতি দূর হয়ে যায়। মিথ মানুষকে অন্ধ নিয়তির শিকার না ভেবে লড়াইয়ের একজন সক্রিয় যোদ্ধা হিসেবে ভাবতে শিখিয়েছিল।

তবে একটি নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণে এই প্রক্রিয়ার সামাজিক এবং রাজনৈতিক দিকটিকেও উন্মোচন করা প্রয়োজন। রিক্যুর যেমন টেক্সটের প্রতীকী অর্থ উদ্ধারের কথা বলেছেন, তেমনই তিনি মার্ক্স, ফ্রয়েড এবং নিৎশেকে স্মরণ করে এক ধরনের সন্দেহবাদী হার্মেনিউটিক্স বা সন্দেহের হার্মেনিউটিক্স (hermeneutics of suspicion) চর্চার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন (Ricoeur, 1970)। বৈদিক সমাজে এই ইন্দ্র-বৃত্র আখ্যানের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ কেবল আধ্যাত্মিক বা অস্তিত্বগত ব্যাপার ছিল না। এটি ছিল তৎকালীন উদীয়মান সমাজ কাঠামোর ক্ষমতার ন্যায্যতা প্রমাণের এক মোক্ষম হাতিয়ার। ইন্দ্র ছিলেন ক্ষত্রিয় বা যোদ্ধা শ্রেণির পরম আদর্শ। তার আগ্রাসী যুদ্ধনীতি এবং সম্পদ দখল করার কাজকে মহাজাগতিক মুক্তির রূপক দিয়ে মহিমান্বিত করা হতো। ফলে বৈদিক শাসক ও যোদ্ধা শ্রেণি যখন অনার্য বা প্রতিপক্ষ গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ করত, চারণভূমি দখল করত বা সম্পদ লুণ্ঠন করত, তখন তারা নিজেদের ইন্দ্রের প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করত।

একই সাথে যজ্ঞের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরোহিত বা ব্রাহ্মণ শ্রেণির হাতে। তারা এই মিথের এমন এক জটিল যজ্ঞীয় কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্পাদন করা সম্ভব ছিল না। যজ্ঞের প্রতিটি খুঁটিনাটি আচার, মন্ত্রের নিখুঁত উচ্চারণ এবং পশুর বলিদানকে অপরিহার্য করে তোলার মাধ্যমে পুরোহিত শ্রেণি সমাজে নিজেদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থান নিশ্চিত করেছিল। মুক্তির যে প্রতীকী বার্তা আখ্যানে ছিল, যজ্ঞের কড়া প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলে এসে তা অনেকাংশে একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর আধিপত্যের ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছিল। রিক্যুরের সামগ্রিক পাঠপদ্ধতি আমাদের এই দুই দিককেই সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে শেখায়। একদিকে তা ইন্দ্র-বৃত্র আখ্যানের গভীর প্রতীকী শক্তি, অন্ধকারের বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই এবং মুক্তির আবহমান রূপককে উন্মোচন করে; অন্যদিকে তা সেই আখ্যানের পেছনে থাকা সামাজিক ক্ষমতার রাজনীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের আবরণটিকেও নির্মোহভাবে উন্মুক্ত করে দেয়।

বুল্টমান ও ইন্দ্র-বৃত্র আখ্যান (Bultmann and the Indra-Vṛtra Narrative): বিমিথীকরণ ও অস্তিত্বগত অর্থ

বিমিথীকরণের তত্ত্ব ও বুল্টমানের প্রস্তাবনা (Theory of Demythologization and Bultmann’s Proposal): প্রাচীন বিশ্ববীক্ষা বনাম আধুনিক বোধ

প্রাচীন ধর্মগ্রন্থগুলো যখন একজন আধুনিক মানুষ পাঠ করতে বসেন, তখন তার সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় সেই টেক্সটের ভেতরের অলৌকিক আখ্যানগুলো। আকাশে দেবতাদের যুদ্ধ, দানবদের উপস্থিতি কিংবা কোনো দৈব অস্ত্রের আঘাতে নদীর গতিপথ বদলে যাওয়ার মতো বিবরণ আধুনিক মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে খাপ খায় না। এই টানাপোড়েন মেটানোর জন্য বিংশ শতাব্দীর জার্মান ধর্মতত্ত্ববিদ ও দার্শনিক রুডলফ বুল্টমান (Rudolf Bultmann) এক বৈপ্লবিক হার্মেনিউটিক কাঠামো প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি তার যুগান্তকারী প্রবন্ধ নিউ টেস্টামেন্ট অ্যান্ড মিথোলজি (New Testament and Mythology)-তে দেখান যে, প্রাচীন সাহিত্যকে তার প্রাচীন বিজ্ঞানের নিরিখে বিচার করলে তার আসল বক্তব্যটি হারিয়ে যায় (Bultmann, 1941/1984)। প্রাচীন মানুষ নিজেদের জীবনবোধ এবং সংকটকে প্রকাশ করত তাদের নিজস্ব যুগের ধারণাগত কাঠামোর মধ্য দিয়ে। সেই কাঠামোটি মূলত পৌরাণিক। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই পৌরাণিক রূপটি যখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে, তখন টেক্সটের অন্তর্নিহিত মানবিক অর্থকে উদ্ধার করাই ব্যাখ্যাকারকের মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায়।

বুল্টমানের মতে, প্রাচীন সাহিত্যের একটি নিজস্ব বিশ্বছবি (world-picture) বা ‘ভেল্টবিল্ড’ (Weltbild) ছিল। সেই প্রাচীন বিশ্বছবি ছিল ত্রিস্তরীয় – ওপরে স্বর্গ, নিচে পাতাল আর মাঝখানে মানুষের পৃথিবী। এই জগতে দেবদূত, অপদেবতা বা অলৌকিক শক্তির অবাধ যাতায়াত ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের বিকাশ, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং প্রাকৃতিক নিয়মের আবিষ্কারের ফলে সেই ত্রিস্তরীয় বিশ্বছবি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। বুল্টমান খুব স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, আধুনিক বৈদ্যুতিক আলো, রেডিও এবং চিকিৎসাব্যবস্থা ব্যবহার করে আবার একই সাথে প্রাচীন ভূত-প্রেত বা পৌরাণিক বিশ্বছবিতে আক্ষরিক বিশ্বাস রাখা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সততার সাথে যায় না (Bultmann, 1958)। ফলে প্রাচীন টেক্সটকে যদি আধুনিক মানুষের কাছে অর্থপূর্ণ হতে হয়, তবে তার সেই সেকেলে পৌরাণিক আবরণটিকে সরিয়ে দেখতে হবে।

এই জায়গা থেকেই বুল্টমান হাজির করেন তার বিখ্যাত বিমিথীকরণ (demythologization) বা ‘এনটমিথোলজিসিরুং’ (Entmythologisierung) ধারণাটি। সাধারণ পাঠকের কাছে মনে হতে পারে যে বিমিথীকরণ মানে বুঝি প্রাচীন টেক্সট থেকে মিথগুলোকে কেটে ফেলে দেওয়া বা বাদ দিয়ে দেওয়া। বুল্টমান এই ভুল বোঝাবুঝিটি দূর করে পরিষ্কার করেছিলেন যে, বিমিথীকরণ কোনো বর্জন নয়, বরং এটা হলো এক ধরনের গভীর ব্যাখ্যাপদ্ধতি (Macquarrie, 1960)। মিথকে বাতিল করা তার উদ্দেশ্য নয়, বরং মিথের রূপক কাঠামোর ভেতরে যে আসল অস্তিত্বগত সত্যটি লুকিয়ে আছে, তাকে খুঁজে বের করাই তার লক্ষ্য। প্রাচীন মানুষ কোনো বিমূর্ত দার্শনিক ভাষায় কথা বলত না; তারা বস্তুগত ও পৌরাণিক ছবির মাধ্যমে তাদের জীবন, ভয়, আশা এবং রূপান্তরকে ফুটিয়ে তুলত। সেই ছবির পেছনের অভিজ্ঞতাটিকে সমকালীন মানুষের অস্তিত্বের ভাষায় অনুবাদ করে নেওয়াই হলো বিমিথীকরণের প্রধান লক্ষ্য।

বুল্টমানের এই ব্যাখ্যার পেছনে গভীর প্রভাব ছিল তার সহকর্মী দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার (Martin Heidegger)-এর অস্তিত্ববাদী দর্শনের। হাইডেগারের বিখ্যাত গ্রন্থ বিয়িং অ্যান্ড টাইম (Being and Time)-এ মানুষের অস্তিত্বের যে মৌলিক দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছিল, বুল্টমান সেগুলোকে তার ধর্মতাত্ত্বিক ও হার্মেনিউটিক বিশ্লেষণে সরাসরি প্রয়োগ করেছিলেন (Heidegger, 1927/1962)। মানুষের জীবনে রয়েছে অনস্তিত্বের ভীতি (existential anxiety), রয়েছে নিয়তির অধীন হয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা যাকে হাইডেগার বলেছিলেন ‘নিক্ষিপ্ততা’। এই সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে মানুষ দুটি পথ বেছে নিতে পারে – সে নিজের সিদ্ধান্তহীনতায় ডুবে থেকে এক অপ্রকৃত অস্তিত্ব (inauthentic existence) যাপন করতে পারে, অথবা সাহসের সাথে বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে এক প্রকৃত অস্তিত্ব (authentic existence) অর্জন করতে পারে। বুল্টমান দাবি করেন, প্রাচীন মিথগুলো আসলে মহাবিশ্বের পদার্থবিদ্যা নয়, বরং মানুষের এই প্রকৃত ও অপ্রকৃত অস্তিত্বের টানাপোড়েনেরই রূপক বিবরণ (Bultmann, 1957)। ঋগ্বেদের ইন্দ্র ও বৃত্রের আখ্যানটিকে যখন আমরা এই অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পাঠ করি, তখন ইন্দ্রের বজ্র আর বৃত্রের কুয়াশাচ্ছন্ন পর্বত স্রেফ রূপকথা থাকে না, তা হয়ে ওঠে মানুষের অবরুদ্ধ চেতনা ও মুক্তির এক তীব্র নাট্যরূপ।

পৌরাণিক বিশ্ববীক্ষা বনাম আধুনিক বিজ্ঞানমনস্কতা (Mythological Worldview versus Modern Scientific Temperament): ইন্দ্র-বৃত্র কাহিনীর বস্তুগত সীমাবদ্ধতা

ঋগ্বেদের বহুল পঠিত ইন্দ্র-বৃত্র যুদ্ধের কাহিনীটি একটি সুনির্দিষ্ট পৌরাণিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের বত্রিশতম সূক্তে আমরা দেখি, এক বিশাল সর্পিল দানব বৃত্র সমস্ত জলরাশিকে পর্বতের গুহায় বন্দি করে রেখেছে। মানুষ ও প্রকৃতি তৃষ্ণায় কাতর, পৃথিবী অন্ধকার ও অচলাবস্থায় নিমজ্জিত। সেই মুহূর্তে সোমরস পান করে বলীয়ান হয়ে ইন্দ্র তার বজ্র দিয়ে বৃত্রকে আঘাত করলেন, তার শরীরের গ্রন্থিগুলো ছিন্নভিন্ন করে দিলেন এবং জলরাশিকে মুক্ত করে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত করলেন (Witzel, 1997)। এই আখ্যানটি পড়তে গিয়ে যদি কেউ মনে করে যে সত্যিই কোনো অতিলৌকিক প্রাণী হাত-পা গুটিয়ে পাহাড়ে বসে সমস্ত জল আটকে রেখেছিল, তবে তা হবে একটি প্রি-সায়েন্টিফিক বা প্রাক-বৈজ্ঞানিক কল্পনাকে অন্ধভাবে গ্রহণ করা। আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি, বাষ্পীভবন, মেঘ ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত হওয়া কিংবা ভূগর্ভস্থ জলের প্রবাহ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক কার্যকারণ নিয়মে পরিচালিত হয়। সেখানে কোনো দেবতার অস্ত্র ছোঁড়ার সুযোগ নেই।

বুল্টমানের দৃষ্টিতে এই ধরনের আখ্যানকে বলা হয় বস্তুগতকরণ (objectification)। প্রাচীন কবিরা মানুষের অভ্যন্তরীণ সংকট, ভয় এবং আশাকে বাইরের জগতের বস্তুর ওপর চাপিয়ে দিতেন (Bultmann, 1960)। প্রাচীন ভারতের একটি রাখাল বা কৃষক গোষ্ঠীর কাছে খরা ছিল চরম ধ্বংসের নামান্তর। যখন মাসের পর মাস বৃষ্টি হতো না, মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যেত, গবাদি পশু তৃষ্ণায় মারা পড়ত, তখন সেই মানুষগুলোর ভেতর এক গভীর মানসিক পঙ্গুত্ব ও হাহাকার তৈরি হতো। প্রকৃতির এই নির্দয় আচরণকে তারা ব্যাখ্যা করেছিল এক অন্ধ ও অপকারী শক্তির প্রতিরোধ হিসেবে। আবার যখন দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর আকাশে মেঘের গর্জন শোনা যেত, ঝড় উঠত এবং প্রবল বৃষ্টিতে প্রকৃতি সজীব হয়ে উঠত, তখন সেই অভিজ্ঞতাকে তারা এক মহাবীরের বিজয় হিসেবে কল্পনা করেছিল। এভাবে মানসিক ও প্রাকৃতিক অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে একটি পৌরাণিক চরিত্র দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন পরবর্তীকালের মানুষ এই রূপক প্রকাশকে আক্ষরিক ঐতিহাসিক সত্য বা মহাজাগতিক বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইন্দ্রের শারীরিক বর্ণনা, তার সোনার রথ, দুটি পিঙ্গল ঘোড়া কিংবা তার বজ্রের ওজন নিয়ে যে পৌরাণিক বিবরণ পাওয়া যায়, আধুনিক যুক্তিবাদী পাঠকের কাছে তা এক ধরনের দূরত্ব তৈরি করে। কোনো বুদ্ধিমান পাঠক বর্তমান যুগে দাঁড়িয়ে এমন দাবি মেনে নিতে পারেন না যে বৃষ্টির অভাব হলে কোনো নির্দিষ্ট যজ্ঞের ধোঁয়া আকাশে পাঠাতে হবে এবং ইন্দ্রকে সোমরস দিতে হবে যাতে তিনি দানবকে মারতে পারেন (Segal, 1999)। এই ধরনের বিশ্বাস মানুষের বাস্তব সংকট মোকাবেলার পথকে রুদ্ধ করে দেয়। বুল্টমান ঠিক এই জায়গাতেই বিমিথীকরণের অস্ত্র প্রয়োগ করতে বলেন। তিনি বলেন, পৌরাণিক বিশ্ববীক্ষাকে তার বহিরঙ্গ দিয়ে বিচার না করে দেখতে হবে সেই বিশ্ববীক্ষার পেছনে মানুষের কোন অস্তিত্বগত সত্যটি সক্রিয় ছিল।

বৈদিক যুগের মানুষের কাছে এই পৌরাণিক বয়ান ছিল তাদের জগতের একটা মানচিত্র। কিন্তু সেই মানচিত্রের ভৌগোলিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দিকটি আজ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। ঋগ্বেদের ভাষা তাই বাহ্যিক ঘটনার রিপোর্ট নয়; ওটা হলো এক বিপন্ন মানবগোষ্ঠীর নিজেদের পরিস্থিতি অনুধাবনের ভাষা। বুল্টমানের পরিভাষা ধার করে বললে, ইন্দ্র-বৃত্র আখ্যানটি হলো অবরুদ্ধ জীবনের বিরুদ্ধে মানুষের আকুলতার এক পৌরাণিক প্রক্ষেপণ। যদি আমরা এর বাহ্যিক অলৌকিক উপাদানগুলোকে ছুড়ে না ফেলে বরং রূপক হিসেবে ধরে নিই, তবেই আমরা টেক্সটটির এমন এক গভীর তাৎপর্যে পৌঁছাতে পারব, যা আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের চিন্তাচেতনার সাথেও সংলাপে বসতে পারে।

বৃত্র রূপক থেকে অস্তিত্বের সংকটে (From the Metaphor of Vṛtra to Existential Crisis): জড়তা, নিঃস্বতা ও অন্ধকারের ভয়

পৌরাণিক কাঠামোটিকে যখন বিমিথীকরণ করা হয়, তখন বৃত্র কোনো সর্পিল রাক্ষস থাকে না। অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বৃত্র হয়ে ওঠে মানুষের অস্তিত্বের অবরুদ্ধ অবস্থার এক পরম প্রতীক। অস্তিত্ববাদী দার্শনিক কার্ল ইয়াসপার্স (Karl Jaspers) মানুষের জীবনের এমন কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন, যেগুলোকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না, যেমন – মৃত্যু, দুঃখবোধ, অপরাধবোধ এবং অনিশ্চয়তা। ইয়াসপার্স এগুলোকে নাম দিয়েছিলেন সীমান্তিক পরিস্থিতি (boundary situation) বা ‘গ্রেনৎসিতুয়াসিওন’ (Grenzsituation) (Jaspers, 1932/1970)। মানুষ যখন এই সীমান্তিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, তখন তার চেনা পৃথিবী অচল হয়ে পড়ে, তার অস্তিত্ব থমকে দাঁড়ায়। ঋগ্বেদের বৃত্র হলো সেই সীমান্তিক পরিস্থিতির এক মহাকাব্যিক রূপ। সে এমন এক প্রাচীর, যা মানুষকে তার স্বাভাবিক বিকাশ ও জীবনের বিস্তার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

ঋগ্বেদের টেক্সটে বৃত্রকে বারবার বর্ণনা করা হয়েছে ‘অহি’ বা সর্প হিসেবে, যে কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছাড়াই কেবল নিজের দেহ দিয়ে সমস্ত কিছু ঢেকে রাখে। এই রূপকটি গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। হাত-পা না থাকা এবং কুয়াশার মতো ছড়িয়ে থাকা আসলে এক ধরনের নিষ্ক্রিয় অন্ধকারের লক্ষণ। মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে যখন কোনো সক্রিয় বাধা থাকে না, কিন্তু মনের ভেতরে এক গভীর শূন্যতা ও জড়তা গ্রাস করে। হাইডেগারের অস্তিত্ববাদে একে বলা হয়েছে অনস্তিত্ব বা শূন্যতার অভিজ্ঞতা। বৃত্র যখন জলরাশিকে আটকে রাখে, তখন আসলে সৃষ্টি নিজের ভেতরেই গুটিয়ে যায়। এই অবস্থাটি কোনো বাহ্যিক বিপদ নয়, বরং জীবনের নিজস্ব প্রবাহ থেমে যাওয়ার এক মানসিক ও অস্তিত্বগত প্রকাশ।

বৈদিক সাহিত্যে এই সংকটের জন্য যে পারিভাষিক শব্দটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে, তা হলো ‘অংহঃ’। শব্দটির সাধারণ অর্থ সংকীর্ণতা বা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। মানুষ যখন কোনো গভীর গহ্বরে বন্দি থাকে, চারপাশ থেকে যখন প্রাচীর তাকে চেপে ধরে এবং সামনে এগোনোর কোনো রাস্তা থাকে না, সেই অবস্থাটিকে বৈদিক ঋষিরা বলতেন অংহঃ। বৃত্র হলো এই অংহঃ বা সংকীর্ণতারই মূর্ত প্রতীক। বুল্টমানের হার্মেনিউটিক্স দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, প্রাচীন মানুষ যখন বৃত্রের উপাখ্যান বর্ণনা করছিল, তখন তারা আসলে নিজেদের জীবনের গভীরতম অসহায়তার কথা বলছিল (Bultmann, 1984)। যে মানুষটি তার গবাদিপশুর খাবারের অভাব দেখছে, পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্ধকারে রয়েছে এবং প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সামনে একা দাঁড়িয়ে কাঁপছে, তার মানসিক অবস্থাই হলো বৃত্র দ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়া।

অস্তিত্বের এই পর্যায়টিকে বুল্টমান অপ্রকৃত বা পতিত অবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করতেন। এখানে মানুষ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, নিজের ইচ্ছাশক্তি হারিয়ে ফেলে এবং অন্ধ নিয়তির হাতে নিজেকে সঁপে দেয়। বৃত্রের বন্দিশালা হলো সেই অস্তিত্বগত স্থবিরতা, যেখানে মানুষের সম্ভাবনাগুলো বন্ধ্যা হয়ে পড়ে থাকে। নদীগুলো যদি প্রবাহিত না হয়, তবে উর্বরতা আসে না, খাদ্য উৎপাদিত হয় না এবং সমাজ বিকশিত হতে পারে না। ঠিক একইভাবে, মানুষের চেতনা যদি ভয় আর স্থবিরতার কুণ্ডলীতে বন্দি হয়ে থাকে, তবে তার পক্ষে কোনো সৃষ্টিশীল কাজ করা সম্ভব নয়। অতএব বিমিথীকৃত বৃত্র হলো মানুষের ভেতরের সেই ভয় ও জড়তা, যা তাকে জীবনের প্রকৃত আলো থেকে বঞ্চিত করে রাখে।

ইন্দ্রের বজ্র ও অস্তিত্বের উন্মোচন (Indra’s Thunderbolt and Existential Disclosure): মুক্তি, সংকট নিরসন ও সিদ্ধান্ত

বৃত্রের অস্তিত্বগত অচলাবস্থা ভাঙার জন্য প্রয়োজন এক প্রচণ্ড আঘাতের। পৌরাণিক বয়ানে সেই আঘাতটি আসে দেবরাজ ইন্দ্রের হাত ধরে, তার অস্ত্রের নাম বজ্র। কিন্তু বুল্টমানের বিমিথীকরণ পদ্ধতিতে পাঠ করলে ইন্দ্র কোনো স্বর্গীয় সিংহাসনে বসা দেবতা নন, বরং তিনি হলেন মানুষের সেই সুপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা ও অস্তিত্বগত সাহসের রূপক। হাইডেগার তার দর্শনে দেখিয়েছিলেন যে, মানুষ কেবল ভয় আর জড়তার ভেতর ডুবে থাকার জন্য জন্মায়নি; মানুষের রয়েছে নিজের সীমানা ভাঙার ক্ষমতা, যাকে তিনি বলেছেন সংকল্পবদ্ধতা (resoluteness) বা ‘এনৎশ্লোসেনহাইট’ (Entschlossenheit) (Heidegger, 1927/1962)। ইন্দ্রের আবির্ভাব হলো মানুষের চেতনার সেই সংকল্পবদ্ধ মুহূর্ত, যেখানে সে নিজের বন্দিদশাকে আর মেনে নিতে অস্বীকার করে এবং অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়ানোর দুঃসাহস দেখায়।

ইন্দ্রের সোমরস পান করা এবং বলীয়ান হয়ে ওঠার আখ্যানটিকেও একটি অস্তিত্বগত রূপক হিসেবে পড়া যায়। সোম কোনো জাদু পানীয় নয় যা এক নিমেষে একজন মানুষকে ঈশ্বরে পরিণত করে। বরং সোমপানের এই বিবরণটি মানুষের মানসিক প্রস্তুতি, সংকল্পের তীব্রতা এবং আত্মচেতনার সম্প্রসারণের এক প্রতীকী ভাষা। যে কোনো বড় সংকট দূর করতে গেলে মানুষের চেতনার এক ধরনের উত্তরণ ঘটাতে হয়। সংকীর্ণ স্বার্থপরতা এবং ভয়ের স্তর পেরিয়ে যখন মানুষ এক বৃহত্তর লক্ষ্যের জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়, তখনই তার ভেতরের শক্তির বিস্ফোরণ ঘটে। ইন্দ্রের সোমপান হলো সেই অভ্যন্তরীণ রূপান্তরেরই একটি পৌরাণিক বহিঃপ্রকাশ, যা তাকে অচলায়তন ভাঙার সাহস জুগিয়েছিল।

ইন্দ্রের হাতের বজ্রটি কী? প্রাচীন ধাতুবিদ্যা বা রূপকথার অস্ত্র হিসেবে বজ্রকে দেখলে তার ভেতরের প্রতীকী তীক্ষ্ণতাটি ঢাকা পড়ে যায়। অস্তিত্ববাদী পাঠে বজ্র হলো ‘সিদ্ধান্ত’ বা চরম পদক্ষেপের প্রতীক। বুল্টমান বারংবার এই সিদ্ধান্তের ওপর জোর দিয়েছেন। মানুষ যখন সংকটজনক পরিস্থিতিতে পড়ে, তখন তাকে এক সুনির্দিষ্ট ও আপসহীন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কোনো দোদুল্যচিত্ততা দিয়ে অচলাবস্থা ভাঙা যায় না। ইন্দ্রের বজ্রাঘাত ছিল সেই চরম ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আঘাত, যা দ্বিধাদ্বন্দ্বের পাহাড়কে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল। বজ্রাঘাতের সাথে সাথেই পর্বতের পাথর ফেটে যায় এবং বন্দি জলরাশি গর্জন করতে করতে মুক্ত হয়ে বের হয়ে আসে।

এই জলের মুক্তি হলো মানুষের সম্ভাবনার মুক্তি। যে নদীগুলো বৃত্রের পেটে বন্দি ছিল, তারা মুক্ত হয়ে ছুটে চলল সাগরের দিকে। একই সাথে আকাশে উদিত হলো সূর্য, চারদিক ভেসে গেল ঊষার আলোয়। বুল্টমানের পরিভাষায় এটি হলো এক প্রকৃত অস্তিত্বে উত্তরণের ঘটনা। অন্ধকারের সংকীর্ণতা বা অংহঃ ভেঙে মানুষ প্রবেশ করল প্রশস্ততায়, যাকে ঋগ্বেদে বলা হয়েছে ‘উরু লোক’ বা উন্মুক্ত বিস্তার (Gonda, 1966)। জল যেমন গতি ফিরে পাওয়ার মাধ্যমে নিজের সার্থকতা খুঁজে পায়, মানুষও তেমনই ভয়ের অচলায়তন ভেঙে মুক্ত কর্মের জগতে প্রবেশ করার মাধ্যমে নিজের সার্থকতা আবিষ্কার করে। ইন্দ্রের জয় তাই কোনো বহির্জাগতিক বিজয় নয়; এটা হলো মানুষের ভেতরের জড়তাকে পরাস্ত করে সৃষ্টিশীল কর্মের জগতে ফিরে আসার এক অনবদ্য আখ্যান।

বুল্টমান বনাম রিক্যুর (Bultmann versus Ricoeur): অবলোপন নাকি প্রতীকের পুনর্ব্যাখ্যা

হার্মেনিউটিক্সের ইতিহাসে পল রিক্যুর এবং রুডলফ বুল্টমানের বিতর্ক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক অধ্যায়। বুল্টমানের বিমিথীকরণের প্রস্তাব যেমন একদিকে প্রাচীন টেক্সটকে আধুনিক মানুষের কাছে প্রাসঙ্গিক করার পথ খুলে দিয়েছিল, অন্যদিকে তা তীব্র সমালোচনার মুখেও পড়েছিল। দার্শনিক পল রিক্যুর (Paul Ricoeur) তার বিভিন্ন প্রবন্ধে বুল্টমানের এই পদ্ধতির কিছু সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করেছেন (Ricoeur, 1974)। রিক্যুরের প্রধান আপত্তি ছিল এই যে, বুল্টমান মিথকে খুব তাড়াহুড়ো করে মানুষের অস্তিত্বের আত্ম-বোঝাপড়ায় বা মনস্তত্ত্বে নামিয়ে আনেন। রিক্যুর মনে করতেন, মিথের একটা নিজস্ব কাব্যিক ও প্রতীকী জগৎ রয়েছে, যার ভেতরে অর্থের এমন এক বিস্তার বা প্রাচুর্য থাকে যাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট অস্তিত্ববাদী ফর্মুলায় পুরোপুরি নিঃশেষ করা যায় না।

বুল্টমানের পদ্ধতিতে কোনো পৌরাণিক বিবরণ পড়লে সবসময় একটা ঝুঁকি থেকে যায় যে, মিথের ভাষাটিকে স্রেফ মানব অস্তিত্বের রূপক অনুবাদ মনে করে তার আদি মহাজাগতিক ও সাহিত্যিক রূপটিকে অগভীর ভাবা হতে পারে। রিক্যুর বলবেন, মিথের ভেতরের যে সৃষ্টিতাত্ত্বিক কল্পনা, তার যে মহাজাগতিক ভারসাম্য রক্ষার আকুলতা, তাকে কেবল মানুষের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত বা ভয়ের গল্প বানালে টেক্সটের বহুত্ববাদী মাত্রাটি নষ্ট হয়ে যায় (Ricoeur, 1967)। বৈদিক ইন্দ্র-বৃত্র যুদ্ধের কথাই যদি ধরা যায়, তবে এটি কেবল একজন মানুষের মানসিক জড়তা কাটার গল্প নয়। এটি প্রাচীন যাযাবর ও কৃষিভিত্তিক মানুষের পরিবেশ, ঋতুচক্র এবং প্রকৃতির সাথে তাদের সম্পর্কের এক জটিল কাব্যিক দলিল। একে স্রেফ অস্তিত্ববাদী দর্শনের ছাঁচে ফেলে দিলে বৈদিক ভাষার নিজস্ব নান্দনিক সৌরভটি হারিয়ে যেতে পারে।

তবে বুল্টমানের সমর্থকরা এই সমালোচনার একটি জোরালো জবাব দিয়েছেন। বিশিষ্ট দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদ জন ম্যাককুয়ারি (John Macquarrie) বুল্টমানের পক্ষ নিয়ে যুক্তি দেন যে, বিমিথীকরণ না করলে প্রাচীন টেক্সট আধুনিক চিন্তাশীল মানুষের কাছে স্রেফ প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরের সামগ্রী হয়ে থাকবে (Macquarrie, 1960)। যদি আমরা টেক্সটটির ভেতরের অস্তিত্বগত আহ্বানটি শুনতে না পাই, তবে তার কাব্যিক সৌন্দর্য বা ভাষার জটিলতা নিয়ে হাজার বছর গবেষণা করলেও তা মানুষের জীবনকে কোনো আলো দেখাতে পারবে না। বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই কথাটি দারুণভাবে খাটে। বহু শতাব্দী ধরে বৈদিক মন্ত্রগুলোকে এমন এক দুর্ভেদ্য অলৌকিক আবরণে মুড়ে রাখা হয়েছিল যে সাধারণ মানুষ তার থেকে কোনো অর্থ উদ্ধার করতে পারত না। বুল্টমানের পদ্ধতি সেই অলৌকিক কুয়াশা সরিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, এই প্রাচীন কবিরাও আসলে আমাদের মতোই মানুষ ছিলেন, যারা প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা এবং অস্তিত্বের সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে মুক্তির পথ খুঁজছিলেন।

বাস্তবে রিক্যুর এবং বুল্টমানের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে একে অপরের শত্রু না ভেবে পরিপূরক হিসেবে দেখা যেতে পারে। রিক্যুর আমাদের মনে করিয়ে দেন যে টেক্সটের বহুমাত্রিক প্রতীকী ভাষা এবং তার অর্থের উদ্বৃত্তকে সম্মান জানাতে হবে, তাকে যেন কোনো সংকীর্ণ কাঠামোর ভেতর বন্দি না করা হয়। আর বুল্টমান আমাদের সতর্ক করেন যাতে আমরা প্রাচীন পৌরাণিক উপাদানগুলোকে আক্ষরিক অন্ধবিশ্বাস বানিয়ে না ফেলি। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মেলবন্ধন ঘটালে ইন্দ্র-বৃত্র আখ্যানের একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বস্তুনিষ্ঠ পাঠ সম্ভব হয়। একদিকে আমরা তার সমৃদ্ধ কাব্যিক ও কসমোলজিক্যাল রূপকের সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পারি, অন্যদিকে সেই রূপকের অন্তরালে থাকা মানুষের অস্তিত্বগত সংকট ও মুক্তির সার্বজনীন ডাকটিকেও নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে পড়তে পারি।

বৈদিক বিমিথীকরণের সামাজিক ও আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা (Social and Modern Relevance of Vedic Demythologization): ক্ষমতার মোহমুক্তি ও আধুনিক পাঠ

একটি সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ এবং বস্তুনিষ্ঠ পাঠের ক্ষেত্রে মিথের কেবল অস্তিত্বগত ব্যাখ্যা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; মিথের পেছনে যে সামাজিক ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ কাজ করত, তাকেও নির্মোহভাবে উন্মোচন করা প্রয়োজন। বুল্টমানের বিমিথীকরণ পদ্ধতিকে সামাজিক সমালোচনার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। প্রাচীন বৈদিক সমাজে ইন্দ্র ও বৃত্রের মিথটি কেবল গল্প বলার জন্য ব্যবহৃত হতো না। এই আখ্যানটি ছিল তৎকালীন উদীয়মান যাজকতন্ত্র ও রাজনৈতিক আধিপত্যকে টিকিয়ে রাখার এক বড় মতাদর্শিক ভিত্তি (Lincoln, 1999)। যখন সাধারণ মানুষের মনে এই বিশ্বাস তৈরি করা হয়েছিল যে ইন্দ্র কেবল সোমরস এবং নিখুঁত যজ্ঞের মন্ত্র পেলেই বৃত্রকে বধ করে বৃষ্টি দেবেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই সমাজের চাবিকাঠি চলে গিয়েছিল পুরোহিত শ্রেণির হাতে।

পুরোহিতরা সাধারণ মানুষকে বোঝাতেন যে যজ্ঞ ছাড়া সমাজ টিকবে না। যদি যজ্ঞের আগুন নিভে যায়, যদি গাভী ও সোমরস উৎসর্গ না করা হয়, তবে বৃত্র আবার ফিরে আসবে, অন্ধকার পৃথিবীকে গ্রাস করবে এবং মানুষ ধ্বংস হয়ে যাবে। এই ভীতি সঞ্চার করার মাধ্যমে পুরোহিত শ্রেণি তাদের জন্য প্রচুর দক্ষিণার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছিল এবং সমাজে নিজেদের একচ্ছত্র প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেছিল (Heesterman, 1993)। বুল্টমানের বিমিথীকরণ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে যখন আমরা এই ব্যবস্থার দিকে তাকাই, তখন যজ্ঞের সেই অলৌকিক দাবিগুলো ধসে পড়ে। আমরা বুঝতে পারি যে, প্রাকৃতিক নিয়মে বৃষ্টিপাত হওয়া বা ঋতু পরিবর্তনের সাথে যজ্ঞের ধোঁয়ার কোনো ভৌত সম্পর্ক ছিল না। যজ্ঞ ছিল আসলে একটি মানবনির্মিত সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যা এই মিথের অলৌকিকতাকে পুঁজি করে নিজের ক্ষমতার বিস্তার ঘটিয়েছিল।

একই কথা খাটে তৎকালীন শাসক ও যোদ্ধা শ্রেণির ক্ষেত্রেও। বৈদিক আর্যরা যখন নতুন নতুন অঞ্চলে প্রবেশ করছিল এবং সেখানকার আদি অধিবাসীদের সাথে দ্বন্দ্বে জড়াচ্ছিল, তখন তারা নিজেদের আক্রমণকে ইন্দ্রের বৃত্রবধের সাথে তুলনা করত। শত্রুদের তারা প্রায়ই ‘বৃত্র’ বা ‘দস্যু’ বলে চিহ্নিত করত, যাতে তাদের পরাজিত করা এবং তাদের সম্পদ দখল করাকে এক পবিত্র মহাজাগতিক কাজ হিসেবে দেখানো যায়। মিথ এভাবে রাজনৈতিক আগ্রাসনের একটি ন্যায্যতা প্রদানকারী আখ্যানে পরিণত হয়েছিল। বিমিথীকরণ আমাদের চোখ খুলে দেয় যাতে আমরা ক্ষমতার এই খেলাটি স্পষ্টভাবে ধরতে পারি। দেবতার লড়াইয়ের আড়ালে যে মানুষের সাথে মানুষের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং চারণভূমি দখলের বাস্তব ইতিহাস লুকিয়ে ছিল, তা বিমিথীকৃত পাঠের মাধ্যমেই পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ পাঠকের জন্য ইন্দ্র-বৃত্র আখ্যানের মূল্য কোথায়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বুল্টমানের সেই মৌলিক উপলব্ধিতে – মিথ মানুষের আত্ম-উন্মোচনের দলিল। আধুনিক মানুষ কোনো অলৌকিক ঈশ্বরের চরণে মাথা নত করতে চায় না, কিন্তু সে প্রতিনিয়ত নিজের জীবনের সীমাবদ্ধতা, সামাজিক শোষণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং মানসিক হতাশার মতো অসংখ্য অদৃশ্য ‘বৃত্রে’র মুখোমুখি হয়। ঋগ্বেদের এই প্রাচীন আখ্যানটি যখন তার ধর্মীয় ও যাজকীয় মোহমুক্ত রূপ নিয়ে আমাদের সামনে দাঁড়ায়, তখন তা মানুষের অদম্য প্রাণশক্তির এক উজ্জ্বল স্মারক হয়ে ওঠে। এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাধা যতই পর্বতপ্রমাণ হোক না কেন, মানুষের সচেতন সংকল্প, ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস এবং নির্ভীক পদক্ষেপের মাধ্যমেই সেই অচলায়তনকে চূর্ণ করে জীবনের প্রবাহকে আবার মুক্ত করা সম্ভব। প্রাচীন কাব্যের বিমিথীকরণ তাই অতীতকে ধ্বংস করে না, বরং অতীতকে মুক্ত করে মানুষের মুক্ত চিন্তার আলোয় নতুন করে চিনতে শেখায়।

রিক্যুর ও অগ্নির প্রতীক (Ricoeur and the Symbolism of Agni): আগুন, পুরোহিত, দূত ও মধ্যস্থতা

প্রতীকের হার্মেনিউটিক্স ও মধ্যস্থতার ধারণা (Hermeneutics of Symbol and Concept of Mediation): রিক্যুরের তাত্ত্বিক বিস্তার

মানুষের অভিজ্ঞতার জগতে কিছু বাস্তব উপাদান থাকে যা একই সাথে বস্তুজগতের অংশ, আবার মানুষের ভাবনার জগতকেও প্রবলভাবে নাড়া দেয়। আগুন এমনই এক উপাদান। ফরাসি দার্শনিক পল রিক্যুর (Paul Ricoeur) তার প্রতীকী তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, মানুষ যখন কোনো প্রাকৃতিক বস্তুকে প্রতীকে রূপান্তরিত করে, তখন সেই বস্তুটি নিছক জড় পদার্থ থাকে না (Ricoeur, 1978)। প্রতীক হলো এমন এক সেতু, যা দৃশ্যমান বাস্তবতার সাথে মানুষের অদৃশ্য আকাঙ্ক্ষা এবং মহাজাগতিক ভাবনার সংযোগ ঘটিয়ে দেয়। রিক্যুরের মতে, প্রতীকের প্রধান শক্তি হলো তার মধ্যস্থতা (mediation) করার ক্ষমতা। মধ্যস্থতা মানে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করা – মানুষের সীমাবদ্ধ পার্থিব জগতের সাথে অসীম বা অজানা জগতের এক অর্থপূর্ণ লেনদেন স্থাপন করা।

রিক্যুর তার হার্মেনিউটিক্সে প্রতীকের দ্বৈত অভিসন্ধি বা দ্বিস্তরীয় অর্থ (twofold meaning) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। একটি প্রতীকের সবসময় একটি প্রত্যক্ষ বা আক্ষরিক অর্থ থাকে, আর থাকে একটি পরোক্ষ বা রূপকীয় অর্থ। যখন আমরা আগুনের কথা বলি, তখন তার আক্ষরিক অর্থ হলো রাসায়নিক দহন, তাপ এবং আলো। কিন্তু মানব সভ্যতার আদিম পাঠগুলোতে আগুন কখনোই কেবল তাপমাত্রার উৎস ছিল না। আগুন মানুষের কাছে হাজির হয়েছিল রূপান্তরের মাধ্যম হিসেবে। রিক্যুর উল্লেখ করেন যে, প্রতীক কোনো পূর্বনির্ধারিত সংকেত নয়; প্রতীক চিন্তার জন্ম দেয় কারণ তার ভেতরে বহুস্তরীয় অর্থের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে (Ricoeur, 1976)। এই অর্থের উদ্বৃত্ত থাকার ফলেই মানুষ আগুনকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলতে পেরেছিল ভাষা, আচার এবং সমাজ শৃঙ্খলার জটিল বয়ান।

মানবীয় অস্তিত্বের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রতীকের কাজ হলো সাক্ষ্য দেওয়া। রিক্যুর দেখান যে, প্রাচীন মানুষ যখন কোনো অতীন্দ্রিয় ধারণা প্রকাশ করতে যেত, তখন তাদের হাতে কোনো প্রস্তুত দার্শনিক পরিভাষা ছিল না। তারা আশ্রয় নিত প্রকৃতির সেইসব উপাদানের কাছে, যা রূপান্তরের ক্ষমতা রাখে। জল সবকিছুকে ধুয়ে দেয়, কিন্তু আগুন সবকিছুকে বদলে দেয়। কাঁচা মাংস আগুনে দিলে পোড়া মাংস হয়, মাটির তাল আগুনে দিলে শক্ত পাত্রে পরিণত হয়, আর শুকনো কাঠ আগুনে দিলে ভস্ম এবং ধোঁয়ায় রূপ নেয়। এই যে এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় রূপান্তর, এই রূপান্তরের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই মানুষকে শিখিয়েছিল কীভাবে মধ্যস্থতার ধারণা কল্পনা করতে হয়। আগুন তাই মানুষের অভিজ্ঞতায় হয়ে উঠল এমন এক মধ্যস্থতাকারী, যা দৃশ্যমান বস্তুকে অদৃশ্য ধোঁয়ায় পরিণত করে আকাশের দিকে তুলে দেয়।

রিক্যুরের বিশ্লেষণ কাঠামোটি অনুসরণ করলে দেখা যায়, প্রাচীন ধর্মীয় সাহিত্যে প্রতীক স্রেফ কোনো অলংকার নয়। প্রতীক হলো বাস্তবতা অনুধাবনের এক সক্রিয় জ্ঞানতাত্ত্বিক উপায়। বৈদিক সাহিত্যে অগ্নির যে উপস্থিতি আমরা দেখি, তা এই রিক্যুরিয়ান মধ্যস্থতার এক চমৎকার দৃষ্টান্ত। বৈদিক কবিরা যখন আগুনের স্তুতি করতেন, তখন তারা কোনো বায়বীয় বিমূর্ত ধারণার পেছনে ছুটতেন না। তাদের সামনে জ্বলত কাঠে কাঠে ঘষে তৈরি করা বাস্তব অগ্নিকুণ্ড। সেই চাক্ষুষ আগুনকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল এক জটিল মহাজাগতিক ও সামাজিক নেটওয়ার্ক। রিক্যুর যেভাবে টেক্সটের ভেতর থেকে প্রতীকের গতিশীলতাকে উন্মোচন করতে চেয়েছেন, বৈদিক অগ্নির পাঠেও সেই পদ্ধতি প্রয়োগ করলে আগুন, পুরোহিত এবং মহাজাগতিক দূতের পারস্পরিক সম্পর্কটি গভীরভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বৈদিক ঐতিহ্যে অগ্নির ত্রিস্তরীয় রূপ (Tripartite Form of Agni in Vedic Tradition): ভৌত আগুন থেকে মহাজাগতিক সংযোগ

ঋগ্বেদের সূচনা কোনো যুদ্ধ বা রাজার কাহিনী দিয়ে হয়নি; সংহিতার একেবারে প্রথম মণ্ডলের প্রথম সূক্তের প্রথম শব্দটিই হলো ‘অগ্নি’। ঋষি মধুচ্ছন্দা বৈশ্বামিত্র সেখানে উচ্চারণ করেছিলেন – ‘অগ্নিমীলে পুরোদ্বিতং যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজম্’। এই যে ঋগ্বেদের শুরুতেই অগ্নির বন্দনা, এটা বৈদিক চিন্তাচেতনার মূল কেন্দ্রটিকে চিনিয়ে দেয়। প্রাচীন ভারততত্ত্ববিদ আর্থার অ্যান্টনি ম্যাকডোনেল (Arthur Anthony Macdonell) তার বৈদিক পুরাতত্ত্বের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ঋগ্বেদে ইন্দ্রের পরেই সবচেয়ে বেশি সূক্ত উৎসর্গ করা হয়েছে অগ্নির উদ্দেশে (Macdonell, 1897)। প্রায় দুই শতাধিক সূক্তে সরাসরি অগ্নির স্তুতি রয়েছে। বৈদিক সমাজ ছিল যাযাবর ও পশুপালক জীবন থেকে ধীরে ধীরে কৃষিনির্ভর ও স্থায়ী বসতি গড়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা এক সম্প্রদায়। সেই সমাজে বনাঞ্চল পরিষ্কার করা, হিংস্র পশু থেকে আত্মরক্ষা করা এবং তীব্র শীতের রাতে গোষ্ঠীর টিকে থাকার একমাত্র বাস্তব অবলম্বন ছিল আগুন।

তবে বৈদিক কবিরা আগুনকে কেবল মাটির চুলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তারা আগুনকে তিনটি ভিন্ন স্তরে বিভক্ত করে এক মহাজাগতিক রূপ দিয়েছিলেন, যাকে বলা হয় অগ্নির ত্রিস্তরীয় রূপ (tripartite form) (Oldenberg, 1988)। এই কাঠামো অনুযায়ী, পৃথিবীতে অগ্নির রূপ হলো পার্থিব হোমাগ্নি, অন্তরীক্ষ বা বায়ুমণ্ডলে তার রূপ হলো বিদ্যুৎ, আর আকাশে তার পরম রূপ হলো সূর্য। এই তিন স্তরের অগ্নির ধারণা আসলে মহাবিশ্বের তিনটি ভিন্ন স্তরকে একটি সাধারণ সুতোয় বাঁধার এক অসাধারণ প্রতীকী প্রয়াস। বৈদিক ঋষিরা লক্ষ্য করেছিলেন যে, পৃথিবীর অগ্নিকুণ্ডের শিখা ওপরের দিকে ওঠে, আকাশের সূর্য নিচে তাপ দেয়, আর মেঘের ভেতরের বিদ্যুৎ দুই জগতের সংযোগ ঘটিয়ে বৃষ্টি ঝরায়। এভাবে তিন জগতের আগুন মিলেমিশে এক অভিন্ন শক্তির প্রকাশ ঘটায়।

আচারিক বা যজ্ঞীয় ক্ষেত্রেও এই ত্রিমুখী অগ্নির সুনির্দিষ্ট প্রতিফলন ছিল। বৈদিক শ্রৌতযজ্ঞে তিন ধরনের অগ্নিকুণ্ড স্থাপন করা হতো: গোল আকারের গার্হপত্য (Gārhapatya), যা গৃহপতির নিজস্ব পারিবারিক আগুন এবং যা কখনো নেভানো হতো না; চারকোনা আকারের আহবনীয় (Āhavanīya), যার মধ্যে দেবতাদের উদ্দেশে আহুতি প্রদান করা হতো; এবং অর্ধচন্দ্রাকার দক্ষিণাগ্রি (Dakṣiṇāgni), যা অমঙ্গল ও অশুভ শক্তিকে ঠেকানোর জন্য যজ্ঞভূমির দক্ষিণ দিকে জ্বালানো হতো (Bodewitz, 1976)। এই তিন অগ্নির প্রতিটি আলাদা প্রতীকী অর্থ বহন করত। গার্হপত্য ছিল পৃথিবীর স্থায়িত্ব ও সামাজিক শৃঙ্খলার প্রতীক, আহবনীয় ছিল স্বর্গের সাথে যোগাযোগের প্রবেশদ্বার, আর দক্ষিণাগ্রি ছিল মানুষের ভয় ও সংকট নিরসনের প্রতিরক্ষা প্রাচীর।

রিক্যুরের হার্মেনিউটিক্স দিয়ে এই ত্রিস্তরীয় আগুনকে পাঠ করলে বোঝা যায়, প্রাচীন মানুষ কীভাবে নিজের ক্ষুদ্র গৃহকোণকে মহাবিশ্বের সাথে একাত্ম করত। ঘরের চুলার সাধারণ আগুন আর আকাশের সূর্য যে আলাদা কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়, বরং একই মহাজাগতিক শৃঙ্খলার অংশ – এই বোধটি মানুষের নিরাপত্তাহীনতাকে দূর করত। বনের হিংস্র পশু পরিবেষ্টিত অন্ধকার রাতে একটি ছোট আগুনের কুণ্ডলী মানুষের কাছে হয়ে উঠত মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু। রিক্যুর যেমন দেখিয়েছেন যে প্রতীক মানুষের অস্তিত্বকে একটি সুনির্দিষ্ট স্থান বা ‘লোক’-এ নোঙর করে, ঠিক তেমনি বৈদিক অগ্নির এই তিনটি রূপ যাযাবর মানুষকে এক টুকরো মাটির ওপর দাঁড়িয়ে মহাবিশ্বকে নিজের ঘর ভাবার সাহস জুগিয়েছিল।

পুরোহিত ও হোতা রূপে অগ্নি (Agni as Purohita and Hotṛ): আচারিক ভূমিকা ও অধিশৃঙ্খলা

ঋগ্বেদের টেক্সটে অগ্নির যে রূপটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হলো তার প্রাতিষ্ঠানিক যাজকীয় রূপ। অগ্নিকে বলা হয়েছে ‘পুরোহিত’, ‘হোতা’ এবং ‘ঋত্বিক’। পুরোহিত শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো যাকে সামনে রাখা হয়েছে (পুরঃ হিত)। প্রাচীন যজ্ঞে মানুষ যখন দেবতাদের উদ্দেশে কোনো উপহার দিতে যেত, তখন তারা মানুষের সাধারণ বাক্য বা দুর্বল হাত দিয়ে তা সরাসরি পৌঁছাতে পারত না। ফলে তারা তাদের সামনে স্থাপন করত আগুনকে। অগ্নির জ্বলন্ত শিখাই ছিল তাদের সমস্ত প্রার্থনার প্রতিনিধি। পণ্ডিত ইয়ান গোন্ডা (Jan Gonda) তার বৈদিক সাহিত্যের গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, অগ্নিকে কেবল একজন দেবতা হিসেবে ভাবা হতো না, বরং তাকে ভাবা হতো দেবতাদের মধ্যে প্রধান পুরোহিত এবং মানুষের মধ্যে প্রধান অতিথি হিসেবে (Gonda, 1975)।

মানুষের পুরোহিত ভুল করতে পারে, মন্ত্রের উচ্চারণে ত্রুটি ঘটাতে পারে বা ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু অগ্নির কোনো ভুল নেই। এই কারণে ঋগ্বেদে অগ্নিকে বলা হয়েছে ‘জাতবেদা’, অর্থাৎ যিনি সমস্ত জাত বা সৃষ্টির অতীত-বর্তমান জানেন, যিনি অভ্রান্ত জ্ঞানের অধিকারী। যজ্ঞের যিনি প্রধান আহ্বানকারী বা হোতা, তিনি অগ্নিকে আহ্বান করেন যাতে অগ্নি অন্যান্য দেবতাদের এই যজ্ঞের ঘাসে এসে বসার জন্য আমন্ত্রণ জানান। রিক্যুরের ভাষায়, এটি হলো এক ধরনের আধ্যাত্মিক প্রতিনিধির ধারণা বা প্রতীকী প্রতিনিধিত্ব। মানুষ যখন নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হয়, তখন সে এক নিখুঁত প্রতিনিধির আশ্রয় নেয়। অগ্নি সেই নিখুঁত পুরোহিত, যে মানুষের অপরিণত ও অসম্পূর্ণ নিবেদনকে গ্রহণ করে এবং নিজের পবিত্র শিখার মাধ্যমে তাকে ত্রুটিহীন করে তোলে।

এখানে অগ্নির জন্মপ্রক্রিয়াটিও অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক রূপক তৈরি করে। বৈদিক যুগে আগুন কিন্তু দেশলাই জ্বালিয়ে তৈরি করা হতো না। দুটি বিশেষ গাছের ডাল বা তক্তা, যাদের বলা হতো ‘অরণি’, পরস্পরের সাথে প্রবল ঘর্ষণের মাধ্যমে আগুনের জন্ম দেওয়া হতো। এই ঘর্ষণকে ঋগ্বেদের কবিরা এক ধরনের শ্রম ও জন্মের রূপক হিসেবে দেখেছেন। অগ্নিকে বলা হয়েছে ‘সহসস্পুত্র’ বা বলপ্রয়োগের দ্বারা জাত সন্তান। মানুষ যখন দুই হাতে সমস্ত শক্তি দিয়ে কাঠে কাঠ ঘষত, তখন ঘামের বিনিময়ে স্ফুলিঙ্গ জন্ম নিত। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আগুন মানুষের কাছে কোনো দূরবর্তী আকাশের সত্তা থাকত না; সে হয়ে উঠত মানুষের একান্ত পরিশ্রমে জন্ম নেওয়া ঘরের সন্তান, যাকে সযত্নে ঘৃতাহুতি দিয়ে লালন-পালন করতে হতো।

রিক্যুর তার আখ্যান তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, মানুষ যখন কোনো প্রাকৃতিক ঘটনাকে আচারের রূপ দেয়, তখন সে মূলত বিশৃঙ্খল প্রকৃতিকে এক সামাজিক শৃঙ্খলায় বাঁধে (Ricoeur, 1984)। বনের দাবানল ধ্বংসাত্মক, সে কাউকে ক্ষমা করে না, সামনে যা পায় সব পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। কিন্তু যজ্ঞের বেদীতে যে অগ্নিকে পুরোহিত বানানো হয়েছে, সে গৃহপালিত, শান্ত এবং মানবকল্যাণে নিয়োজিত। অরণি ঘষে আগুন জ্বালানোর এই আচারিক প্রক্রিয়াটি ছিল প্রকৃতির বুনো শক্তিকে বশ করে তাকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শৃঙ্খলার অধীন করার এক সচেতন মানবিক প্রয়াস। বনের বিধ্বংসী আগুন যখন যজ্ঞশালার পরিমিত আয়তনের ভেতর পুরোহিতের আসন গ্রহণ করল, তখন প্রাকৃতিক শক্তি হয়ে উঠল মানবিক শৃঙ্খলার প্রধান অভিভাবক।

দেবতাদের দূত ও সংবাহক (Messenger and Carrier of the Gods): সংযোগ ও রূপান্তরের হার্মেনিউটিক্স

বৈদিক কল্পনায় অগ্নির আরেকটি প্রধান পরিচয় হলো তিনি ‘দূত’ এবং ‘হব্যবাহন’। দূত মানে যিনি সংবাদ বহন করেন, আর হব্যবাহন মানে যিনি যজ্ঞের নিবেদিত উপাদান বা আহুতি বহন করে নিয়ে যান। মানুষ স্বর্গে যেতে পারে না, দেবতারাও রক্তমাংসের মানুষের মতো মাটিতে হেঁটে বেড়ান না। তাহলে এই দুই ভিন্ন সত্তার মধ্যে সম্পর্ক বজায় থাকবে কীভাবে? এই অসম্ভব যোগাযোগটি সম্ভব করে তোলে আগুন। যজ্ঞের পাত্রে যখন ঘি, যব বা সোমরস ঢেলে দেওয়া হয়, অগ্নি সেগুলোকে নিজের লেলিহান শিখা দিয়ে গ্রাস করেন। কিন্তু অগ্নি সেই খাবার নিজে গিলে ফেলেন না; তিনি সেই ভারী বস্তুকে সুগন্ধি ধোঁয়ায় রূপান্তরিত করে আকাশে উড়িয়ে দেন। এই প্রক্রিয়ায় অগ্নি হয়ে ওঠেন এক মহাজাগতিক কুরিয়ার বা সংবাহক।

রিক্যুরের রূপক তত্ত্ব এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য রুল অব মেটাফর (The Rule of Metaphor)-এ তিনি দেখিয়েছেন যে, রূপক হলো অর্থের এক ধরনের পরিবহন (Ricoeur, 1977)। রূপক একটি শব্দের চেনা অর্থকে তুলে নিয়ে গিয়ে এক অচেনা ক্ষেত্রে বসিয়ে দেয় এবং তাদের মধ্যে একটি নতুন যোগসূত্র আবিষ্কার করে। বৈদিক যজ্ঞে অগ্নির ভূমিকাটি হুবহু এই রূপকের ব্যাকরণের মতো কাজ করে। ঘৃত বা শস্যের দানা ছিল সম্পূর্ণ জড় ও পার্থিব উপাদান। কিন্তু যখন তা অগ্নির সংস্পর্শে এসে সূক্ষ্ম বাষ্প ও ঘ্রাণে পরিণত হলো, তখন তা আর সাধারণ মানুষের খাবার থাকল না; তা হয়ে উঠল দেবতাদের ভোগোপযোগী এক সূক্ষ্ম সত্তা। স্থূল বস্তুকে সূক্ষ্ম সংকেতে রূপান্তরিত করার এই প্রক্রিয়াই হলো রূপকীয় রূপান্তর।

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানী ব্রুস লিংকন (Bruce Lincoln) তার ইন্দো-ইউরোপীয় মিথোলজি সংক্রান্ত গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, প্রাচীন উৎসর্গমূলক আচারে এই বস্তুগত রূপান্তর সামাজিক সংহতির জন্য অপরিহার্য ছিল (Lincoln, 1986)। মানুষের সাথে প্রকৃতির এবং মানুষের সাথে তার কল্পিত মহাজাগতিক শক্তির একটি আদান-প্রদানের চুক্তি তৈরি হতো এই যজ্ঞের মাধ্যমে। মানুষ প্রকৃতি থেকে যা নিচ্ছে – গাভীর দুধ, মাটির শস্য – তার একটি অংশ সে আগুনে পুড়িয়ে মহাবিশ্বকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এই ফিরিয়ে দেওয়ার কাজটিতে অগ্নি ছিলেন বিশ্বস্ত মাধ্যম। ঋগ্বেদে বলা হয়েছে, অগ্নির জিহ্বা হলো সাতটি, আর এই সাতটি শিখা দিয়ে তিনি দেবতাদের হয়ে মানুষের দেওয়া উপহার গ্রহণ করেন।

রিক্যুরের হার্মেনিউটিক্স দিয়ে দেখলে, এই দূতের ধারণাটি মানুষের একাকিত্ব দূর করার এক অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। মানুষ এই সুবিশাল ও রহস্যময় মহাবিশ্বে নিজেকে বড় নিঃসঙ্গ মনে করত। আকাশের ঝড়, সূর্যের উত্তাপ আর মৃত্যুর ছায়া তাকে প্রতিনিয়ত শঙ্কিত রাখত। এই ভীতি দূর করার জন্য মানুষের প্রয়োজন ছিল এমন কাউকে, যে তার কথা ওপরের মহলে পৌঁছে দেবে। অগ্নি সেই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতেন যিনি মানুষের বিনম্র আকুতিকে মহাজাগতিক শক্তির দরবারে নিয়ে যেতেন। ফলে বৈদিক মানুষের কাছে অগ্নি ছিলেন এমন এক বন্ধু, যার ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়। তিনি ঘরে জ্বলতেন, আবার স্বর্গেও পৌঁছাতেন; ফলে মানুষ অনুভব করত যে সে কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বাস করছে না, স্বর্গের সাথে তার একটি সার্বক্ষণিক কূটনৈতিক যোগাযোগ চালু রয়েছে।

দ্বিস্তরীয় অর্থ ও অগ্নির রূপকায়ন (Twofold Meaning and Metaphorization of Agni): প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের বিস্তার

অগ্নির এই বহুবিধ ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে রিক্যুরের প্রস্তাবিত প্রতীকের প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের অর্থটি অত্যন্ত উজ্জ্বলভাবে ধরা পড়ে। প্রথম স্তরে অগ্নি হলেন প্রকৃতির এক জ্বলন্ত উপাদান – তাপ ও আলোর ভৌত প্রকাশ। কিন্তু দ্বিতীয় স্তরে এসে অগ্নি হয়ে ওঠেন সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠাতা এবং মানুষের চেতনার এক গভীর রূপক। ফরাসি নৃবিজ্ঞানী ক্লদ লেভি-স্ট্রস (Claude Lévi-Strauss) তার সুবিখ্যাত গ্রন্থ দ্য র দেন দ্য কুকড (The Raw and the Cooked)-এ দেখিয়েছিলেন যে, আগুনের ব্যবহারই মানবজাতিকে প্রকৃতির বুনো স্তর থেকে সংস্কৃতির সভ্য স্তরে উত্তীর্ণ করেছে (Lévi-Strauss, 1969)। কাঁচাকে রান্না করা হলো প্রকৃতির ওপর মানুষের সংস্কৃতির প্রথম বড় বিজয়। বৈদিক সাহিত্যে অগ্নির মহিমান্বয়ন এই সত্যটিকেই কাব্যিক ভাষায় স্বীকার করে নিয়েছে।

রিক্যুর জোর দিয়ে বলেছেন যে, প্রতীকের দ্বিতীয় স্তরের অর্থটি কখনো প্রথম স্তরের ভিত্তিকে মুছে ফেলে না, বরং তার ওপর দাঁড়িয়ে নিজেকে বিকশিত করে (Ricoeur, 1974)। অগ্নির ক্ষেত্রেও তাই ঘটে। বৈদিক কবিরা যখন অগ্নিকে ‘গৃহপতি’ বা ঘরের কর্তা বলছেন, তখন তারা ঘরের মেঝের ওপর জ্বলতে থাকা বাস্তব আগুনটিকে দেখছেন। কিন্তু সেই দেখার সাথে সাথেই তাদের মনে ভেসে উঠছে পারিবারিক নিরাপত্তা, নারী ও পুরুষের সামাজিক বন্ধন এবং গৃহস্থালির শৃঙ্খলার ছবি। অগ্নি যতক্ষণ ঘরে জ্বলছেন, ততক্ষণ পরিবার সুরক্ষিত। আগুন নিভে যাওয়ার অর্থ হলো জীবন থমকে যাওয়া, অন্ধকারের আগ্রাসনে ঘর ভেঙে যাওয়া। এই কারণে গৃহস্থের জীবনে অগ্নি রক্ষা করা ছিল এক চূড়ান্ত ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব।

অগ্নির এই রূপকায়ন কেবল সমাজ বা পরিবারে থেমে থাকেনি, তা মানুষের অন্তর্জগতের দিকেও প্রসারিত হয়েছিল। পরবর্তী বৈদিক সাহিত্য এবং বিশেষ করে ব্রাহ্মণ ও আরণ্যক অংশে এসে অগ্নির বাহ্যিক রূপটি ধীরে ধীরে মানুষের অভ্যন্তরীণ রূপকে পরিণত হতে শুরু করে। উদরস্থ পরিপাককারী তাপকে বলা হলো ‘জঠরাগ্নি’, আর মানুষের ভেতরের জ্ঞান ও বোধের শিখাকে বলা হলো ‘বৈশ্বানর’ অগ্নির এক সূক্ষ্ম রূপ (Smith, 1989)। রিক্যুরের পরিভাষায় একে বলা যায় প্রতীকের অভ্যন্তরীণকরণ বা ইন্টার্নালাইজেশন। যে আগুন বাইরে জ্বলত, মানুষ একসময় আবিষ্কার করল সেই আগুনের তেজ আসলে তার নিজের শরীরের রক্তে, তার হজম প্রক্রিয়ায় এবং তার চিন্তার দ্যুতিতে কাজ করে চলেছে।

এই রূপকীয় বিস্তারের ফলে বৈদিক আখ্যানের একটি বিশাল রূপান্তর ঘটে। বাইরে কাঠ পুড়িয়ে যে যজ্ঞ করা হতো, অন্তর্মুখী চিন্তার বিকাশের সাথে সাথে মানুষ অনুভব করল যে মানুষের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, প্রতিটি চিন্তাও এক একটি যজ্ঞের আহুতি হতে পারে। রিক্যুর দেখান যে, মহৎ প্রতীকের ক্ষমতা এখানেই; তা সময়ের সাথে সাথে নিজেকে নতুন নতুন ক্ষেত্রে প্রসারিত করতে পারে, তৈরি করতে পারে অর্থের নতুন নতুন বলয়। অগ্নি স্রেফ বৈদিক যাযাবরদের শীত নিবারণের আগুন থাকেনি, তা হয়ে উঠেছিল মানুষের জীবনধারণের জৈবিক তাপ এবং সত্য ও জ্ঞানের রূপক। বাইরের জগতের তাপ এবং ভেতরের জগতের চেতনা – এই দুই বিপরীত প্রান্তকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছিল অগ্নির বহুমুখী রূপকায়ন।

যজ্ঞের রাজনীতি ও সামাজিক মধ্যস্থতা (Politics of Sacrifice and Social Mediation): মোহমুক্তি ও মতাদর্শিক বিশ্লেষণ

কোনো প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ পাঠ সম্পন্ন হতে পারে না যদি না তার পেছনে থাকা সামাজিক স্তরবিন্যাস ও ক্ষমতার সম্পর্কগুলোকে খোলা চোখে দেখা হয়। রিক্যুর তার হার্মেনিউটিক্সে কেবল প্রতীকের আধ্যাত্মিক অর্থ উদ্ধারের কথা বলেননি; তিনি সিগমুন্ড ফ্রয়েড, কার্ল মার্ক্স এবং ফ্রিডরিখ নিৎশের উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছিলেন যে, একটি সচেতন পাঠপদ্ধতিতে সবসময় এক ধরনের সমালোচনামূলক চোখ বা সন্দেহের হার্মেনিউটিক্স (hermeneutics of suspicion) বজায় রাখতে হবে (Ricoeur, 1970)। বৈদিক সমাজে অগ্নির এই সুবিশাল মহিমান্বয়ন এবং তার মধ্যস্থতাকারী চরিত্রটি নিছক এক নিষ্পাপ কাব্যিক কল্পনা ছিল না। এটি ছিল তৎকালীন সমাজপতি ও পুরোহিত শ্রেণির নিজস্ব আধিপত্য টিকিয়ে রাখার এক চমৎকার মতাদর্শিক হাতিয়ার।

যজ্ঞের আনুষ্ঠানিক কাঠামোটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, অগ্নির মাধ্যমে দেবতাদের সাথে যোগাযোগের যে দাবি করা হতো, সেই যোগাযোগের একচ্ছত্র চাবিকাঠি ছিল পুরোহিত বা ব্রাহ্মণ শ্রেণির হাতে। বিশিষ্ট ভারততত্ত্ববিদ ফ্রিত্স স্টাল (Frits Staal) তার বিশ্বখ্যাত আকর গ্রন্থ অগ্নি: দ্য বৈদিক রিচুয়াল অব দ্য ফায়ার অল্টার (Agni: The Vedic Ritual of the Fire Altar)-এ দেখিয়েছেন যে, বৈদিক অগ্নির যজ্ঞগুলো কতটা জটিল, ব্যয়বহুল এবং কঠোর নিয়মকানুনে বাঁধা ছিল (Staal, 1983)। সাধারণ মানুষের পক্ষে সেই তিন অগ্নির শ্রৌতযজ্ঞ করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। এর জন্য প্রয়োজন হতো বিপুল পরিমাণ সম্পদ, বহুসংখ্যক গরু, মণকে মণ ঘি এবং দীর্ঘ প্রশিক্ষিত পুরোহিতদের একটি বড় দল। সাধারণ পশুপালক বা কৃষককে বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে, তারা নিজেরা সরাসরি দেবতাদের সাথে কথা বলতে পারবে না; তাদের নিবেদন কেবল অগ্নির মাধ্যমেই পৌঁছাবে, আর সেই আগুনকে জাগিয়ে তোলার গোপন সংকেত জানে কেবল ব্রাহ্মণ শ্রেণি।

ফলস্বরূপ, অগ্নির মধ্যস্থতা রূপ নিল এক ধরনের সামাজিক মধ্যস্থতায়। যে পুরোহিত অগ্নির পরিচর্যা করতেন, তিনি সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে উঠলেন অপরিহার্য। প্রাচীন বৈদিক পাঠগুলোতে ধীরে ধীরে এমন এক ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলো যে, পুরোহিতের দক্ষিণা ছাড়া এবং যজ্ঞের আগুন ছাড়া সমাজের কোনো কল্যাণ হতে পারে না। এই প্রক্রিয়ায় পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর সুবিধাজনক অবস্থানগুলো আরও দৃঢ় হয়েছিল। জটিল শ্রৌতযজ্ঞের অধিকার থেকে নারী এবং সমাজের নিম্নবর্গের মানুষদের ক্রমান্বয়ে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল (Witzel, 1995)। অগ্নির পবিত্রতার বয়ান ব্যবহার করে সমাজের ভেতর এক কৃত্রিম শুচিতা ও অশুচিতার বিভাজন রেখা টেনে দেওয়া হয়েছিল, যা তৎকালীন ক্ষমতার ভারসাম্যকে পুরোহিত ও যোদ্ধা শ্রেণির অনুকূলে রেখেছিল।

একই সাথে অর্থনৈতিক দিকটিও উপেক্ষা করার মতো নয়। যে যজ্ঞের আগুনে ঘি ও শস্য পোড়ানো হতো, সেই উপাদানগুলো ছিল সাধারণ উৎপাদনকারী মানুষের রক্তঘামে অর্জিত উদ্বৃত্ত ফসল ও সম্পদ। শত শত মণ খাদ্যশস্য ও মূল্যবান দুগ্ধজাত সামগ্রী আগুনে ভস্মীভূত করার এই অপচয়কে ‘মহাজাগতিক ঋণ শোধ’ বলে প্রচার করা হতো। সাধারণ মানুষ নিজেদের নিরাপত্তার আশায় সেই ব্যয়ভার বহন করত। অতএব অগ্নির এই মধ্যস্থতাকারী রূপকের একটি স্পষ্ট দ্বৈত চরিত্র রয়েছে। একদিকে তা মানব চেতনার সেই বিস্ময়কর ক্ষমতাকে প্রকাশ করে, যেখানে মানুষ ভৌত আগুনকে ব্যবহার করে মহাবিশ্বের সাথে নিজের আত্মিক সেতু গড়েছিল। অন্যদিকে তা দেখায় কীভাবে একটি ক্ষমতাবান গোষ্ঠী সেই কাব্যিক রূপককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে সমাজের উৎপাদন ও সম্পদের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। রিক্যুরের পূর্ণাঙ্গ হার্মেনিউটিক্স আমাদের এই দুই সত্যকেই পাশাপাশি রেখে দেখতে শেখায় – কোনো একটিকে অস্বীকার করে অপরটিকে বোঝা যায় না।

রিক্যুর ও সোমের বহুতল অর্থ (Ricoeur and the Polysemy of Soma): পদার্থ, দেবতা, অনুষ্ঠান ও অমরতা

পল রিক্যুর ও বহুতল অর্থের তত্ত্ব (Paul Ricoeur and the Theory of Polysemy): শব্দের বহুস্তরীয় সম্ভাবনা

মানুষের ভাষার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, একটি শব্দ সবসময় একটিমাত্র নির্দিষ্ট অর্থে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিজ্ঞানের পরিভাষায় একটি শব্দের একটিমাত্র অর্থ থাকা বাঞ্ছনীয়, যাতে কোনো বিভ্রান্তি তৈরি না হয়। কিন্তু সাহিত্যের ভাষায়, বিশেষ করে প্রাচীন ধর্মীয় কাব্যে, একটি শব্দ একই সাথে একাধিক অর্থের ভার বহন করে। ফরাসি দার্শনিক পল রিক্যুর (Paul Ricoeur) ভাষার এই চরিত্রটিকে নাম দিয়েছেন বহুতল অর্থ (polysemy) বা ‘পলিসেমি’ (Ricoeur, 1971)। রিক্যুর তার ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখান যে, শব্দের এই বহুমাত্রিকতা ভাষার কোনো দুর্বলতা বা ত্রুটি নয়; বরং এটাই মানব ভাষার সবচেয়ে বড় সৃজনশীল শক্তি। একটিমাত্র শব্দের ভেতর যখন বিভিন্ন অভিজ্ঞতার স্তর এসে জমা হয়, তখন ভাষা সাধারণ বিবরণের স্তর পেরিয়ে গভীরতর প্রতীকী জগতে প্রবেশ করে।

রিক্যুর তার শব্দার্থিক তত্ত্বে একটি জরুরি পার্থক্য তুলে ধরেন। তিনি দেখান যে, দ্ব্যর্থকতা বা বিভ্রান্তিকর অস্পষ্টতা আর সুশৃঙ্খল বহুতল অর্থ এক জিনিস নয়। দ্ব্যর্থকতা বক্তার অসতর্কতার কারণে তৈরি হতে পারে, যেখানে শ্রোতা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু রূপক বা প্রতীকের ভেতরের বহুস্তরীয় অর্থ সুসংগঠিতভাবে কাজ করে (Ricoeur, 1975)। একটি শব্দ যখন কোনো বিশেষ সাংস্কৃতিক বা আচারিক প্রেক্ষাপটে উচ্চারিত হয়, তখন তার আক্ষরিক অর্থটি একেবারে মুছে যায় না। বরং সেই আক্ষরিক অর্থটিকে ধরে রেখেই তার ওপর দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ স্তরের রূপকীয় অর্থ গড়ে ওঠে। রিক্যুরের ভাষায় একে বলা হয় অর্থের উদ্বৃত্ত বা একটি চিহ্নের ভেতর একাধিক দিগন্তের সহাবস্থান। প্রাচীন টেক্সট পাঠ করার সময় যদি আমরা শব্দকে আধুনিক অভিধানের মতো কেবল একটিমাত্র সংজ্ঞায় আটকে রাখতে চাই, তবে টেক্সটের আসল প্রাণটাই নষ্ট হয়ে যায়।

প্রাচীন ধর্মগ্রন্থগুলোর মধ্যে ঋগ্বেদ এমন এক সাহিত্য, যেখানে শব্দের এই বহুস্তরীয় খেলা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বৈদিক কবিরা সচেতনভাবেই একটি শব্দের ভেতর বিভিন্ন জগতের প্রতিধ্বনি তৈরি করতেন। তারা জানতেন যে, জাগতিক বস্তুর সাথে মানসিক বোধ এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলার এক নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। রিক্যুর যেমন দেখিয়েছেন যে প্রতীক মানুষের চিন্তার দিগন্তকে প্রসারিত করে, তেমনই ঋগ্বেদের রূপকগুলো পাঠককে একটি দৃশ্যমান বস্তু থেকে অদৃশ্য এক ভাবনার জগতে টেনে নিয়ে যায় (Ricoeur, 1979)। এই ধরনের পাঠপদ্ধতিকে বুঝতে হলে আধুনিক বৈজ্ঞানিক মনকে প্রাচীন রূপকের যুক্তিটিকে অনুধাবন করতে হবে। প্রাচীন রূপকের যুক্তি কোনো অবৈজ্ঞানিক বিভ্রান্তি নয়, বরং তা হলো জগতকে একটি সমগ্র বা সামগ্রিক ঐক্য হিসেবে দেখার কাব্যিক প্রয়াস।

এই বহুস্তরীয় অর্থের সবচেয়ে জটিল এবং চমকপ্রদ উদাহরণ হলো বৈদিক ‘সোম’। বৈদিক সাহিত্যে সোম এমন এক শব্দ, যা একই সাথে একটি লতা বা উদ্ভিদ, সেই উদ্ভিদ থেকে নিংড়ে নেওয়া রস বা পানীয়, এক শক্তিশালী দেবতা, যজ্ঞশালার জটিল আনুষ্ঠানিক আচার এবং মানুষের চেতনার এক রূপান্তরিত অবস্থা বা অমরত্বকে নির্দেশ করে (Elizarenkova, 1995)। এই চারটি মাত্রা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং তারা একে অপরের ভেতর প্রবেশ করে এমন এক প্রতীকী জাল তৈরি করে যা পাঠককে বিস্মিত করে। রিক্যুরের হার্মেনিউটিক্স আমাদের শেখায় কীভাবে সোম শব্দের এই প্রতিটি স্তরকে আলাদা করে চিনে নিয়ে আবার তাদের এক সূত্রে গেঁথে পাঠ করতে হয়। সোমকে কেবল একটি মাদক বা কেবল একটি কাল্পনিক দেবতা হিসেবে দেখলে তার সামগ্রিক অর্থ অনুধাবন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

উদ্ভিদ ও পানীয় রূপে সোম (Soma as Plant and Beverage): বস্তুগত বাস্তবতা ও সংবেদনশীল পাঠ

যেকোনো রূপক বা প্রতীকের আলোচনা শুরু করতে হয় তার বস্তুগত ভিত্তি থেকে। রিক্যুর জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, মানুষের কোনো উচ্চাঙ্গের ভাবনাই শূন্য থেকে জন্ম নেয় না; তার পেছনে থাকে মাটির পৃথিবীর কোনো না কোনো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতা (Ricoeur, 1986)। সোমের ক্ষেত্রে সেই বস্তুগত ভিত্তিটি হলো একটি পার্বত্য উদ্ভিদ। ঋগ্বেদের নবম মণ্ডলটি সম্পূর্ণভাবে এই সোমের বন্দনায় নিবেদিত, যা ‘পবমান মণ্ডল’ নামে পরিচিত। এই সূক্তগুলোতে সোম উদ্ভিদের যে পুঙ্খানুপুঙ্খ শারীরিক বিবরণ পাওয়া যায়, তা কোনো কাল্পনিক রূপকথার কথা নয়। বৈদিক কবিরা বর্ণনা করেছেন কীভাবে সুদূর মূজবৎ পর্বত থেকে এই লতা সংগ্রহ করে আনা হতো, কীভাবে তা শুষ্ক ডালপালার মতো আঁটি বেঁধে যজ্ঞভূমিতে রাখা হতো এবং কীভাবে জলে ভিজিয়ে তাকে সতেজ করা হতো (Keith, 1925)।

পরবর্তীকালে আধুনিক উদ্ভিদবিজ্ঞানী এবং ভারততত্ত্ববিদরা এই সোম লতার প্রকৃত ভৌগোলিক ও উদ্ভিজ্জ পরিচয় বের করার জন্য ব্যাপক গবেষণা করেছেন। গবেষক আর. গর্ডন ওয়াসেন (R. Gordon Wasson) তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী গবেষণায় দাবি করেছিলেন যে সোম ছিল আসলে আমানিতা মুসকারিয়া নামের এক ধরনের লাল রঙের হ্যালুসিনোজেনিক মাশরুম (Wasson, 1968)। তবে পরবর্তী গবেষকরা দেখিয়েছেন যে ঋগ্বেদের বর্ণনার সাথে মাশরুমের চেয়ে কোনো কণ্টকাকীর্ণ গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের মিল বেশি। গবেষক ডেভিড ফ্ল্যাটারি (David Flattery) এবং মার্টিন শোয়ার্টজ (Martin Schwartz) ইরানের আবেস্তায় উল্লিখিত ‘হওমা’ এবং বৈদিক সোমের তুলনামূলক বিচার করে একে হরমালা জাতীয় উদ্ভিদের সাথে মেলানোর চেষ্টা করেছেন (Flattery & Schwartz, 1989)। অন্যদিকে সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণায় আসকো পারপোলা (Asko Parpola) যুক্তি দিয়েছেন যে সোম ছিল মূলত এফেড্রা বা সোমলতা জাতীয় গুল্ম, যার মধ্যে এফিড্রিন নামের এক শক্তিশালী উদ্দীপক রাসায়নিক উপাদান থাকে (Parpola, 1995)।

উদ্ভিদটির প্রজাতি যাই হোক না কেন, বৈদিক আচারে এর প্রক্রিয়াকরণ ছিল অত্যন্ত স্পর্শগ্রাহ্য এক দৈহিক ঘটনা। যজ্ঞশালার পাথরের ওপর রেখে দুটি পাথরের টুকরো দিয়ে এই লতাকে থেঁতো করা হতো। সেই পাথরের আঘাতের শব্দকে ঋগ্বেদের কবিরা বজ্রের গর্জনের সাথে তুলনা করেছেন। থেঁতো করা লতা থেকে যে বাদামি বা সোনালি রঙের রস বের হতো, তাকে ভেড়ার পশম দিয়ে তৈরি ছাঁকনি বা ‘পবিত্র’-এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করা হতো। ছাঁকনি গলে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে কাঠের পাত্রে পড়া এই রসকে কবিরা বলতেন ‘হরি’ বা উজ্জ্বল পিঙ্গল বর্ণের তরল। এরপর সেই কড়া স্বাদের রসকে সরাসরি পান না করে তার সাথে মেশানো হতো দুধ, দই বা যবের ছাতু (Houben, 2003)। এই পুরো প্রক্রিয়াটির বর্ণনা বৈদিক সূক্তগুলোতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিধৃত হয়েছে।

রিক্যুরের পরিভাষায়, এটি হলো প্রতীকের প্রথম স্তর বা প্রাথমিক তথ্যসূত্র। এই পানীয়টি পান করার পর মানুষের শরীরে এক প্রবল উত্তেজনা ও শারীরিক উদ্দীপনা তৈরি হতো। এফেড্রিন জাতীয় উপাদানের প্রভাবে হৃদস্পন্দন বাড়ত, ক্লান্তি দূর হতো, রাতে জেগে থাকার ক্ষমতা বাড়ত এবং ক্ষুধা-তৃষ্ণার বোধ কমে যেত। যাযাবর পশুপালক আর্যদের জন্য দীর্ঘ পথচলা এবং যুদ্ধে টিকে থাকার ক্ষেত্রে এই ধরনের শারীরিক বলকারক পানীয়ের উপযোগিতা ছিল অপরিসীম। রিক্যুর যেমন বলেন, আক্ষরিক বস্তুর নিজস্ব একটি সার্থকতা থাকে যা রূপকের ভিত্তি তৈরি করে। সোমের এই তীব্র উদ্দীপক গুণ এবং ইন্দ্রিয়গত বাস্তবতাই তাকে সাধারণ খাবার বা জলের স্তর থেকে তুলে এনে এক অসাধারণ সাংস্কৃতিক মর্যাদার আসনে বসিয়েছিল।

দেবতা সোম ও কবিদের প্রেরণা (The Deity Soma and Poetic Inspiration): ব্যক্তিত্বায়ন ও মহাজাগতিক রূপ

বস্তুগত পানীয়ের পর সোম শব্দের দ্বিতীয় অর্থস্তরটি হলো তার দেবত্ব বা ব্যক্তিত্বায়ন। বৈদিক মানুষের কাছে যা কিছু গভীর বিস্ময় বা শক্তির জন্ম দিত, তারা তাকে একটি সচেতন সত্তা হিসেবে কল্পনা করত। সোমরস পান করার পর মানুষের মানসিক অবস্থার যে নাটকীয় রূপান্তর ঘটত, বৈদিক কবিরা তাকে কেবল উদ্ভিদের রাসায়নিক প্রভাব বলে ব্যাখ্যা করেননি। তারা অনুভব করেছিলেন যে, তাদের শরীরের ভেতর এক জীবন্ত শক্তির প্রবেশ ঘটেছে। এই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় ‘দেবতা সোম’ বা ‘সোম রাজা’। ঋগ্বেদে সোমকে কেবল ইন্দ্রের সহযোগী বীর হিসেবে দেখানো হয়নি, তাকে নিজেই এক মহান রাজা, সমস্ত ওষধির অধিপতি এবং দেবতাদের পিতা হিসেবে স্তুতি করা হয়েছে (Macdonell, 1897)।

বিশেষ করে বৈদিক কবি বা ঋষিদের কাছে সোম ছিলেন তাদের কাব্যিক প্রেরণার মূল উৎস। বৈদিক ভাষায় এই কাব্যিক দৃষ্টিকে বলা হতো ‘ধী’। ধী মানে সাধারণ চিন্তা নয়; ধী হলো গভীর ধ্যানমগ্ন দৃষ্টি বা অপ্রত্যাশিত অন্তর্দৃষ্টি, যার মাধ্যমে কবিরা বিশ্বজগতের গোপন ছন্দ বা ঋত-কে প্রত্যক্ষ করতেন। কবিরা গাইতেন যে সোমরস তাদের কণ্ঠে প্রবেশ করে তাদের জিহ্বাকে চঞ্চল করে তুলেছে, তাদের মনের জড়তা ভেঙে দিয়েছে এবং নতুন নতুন উপমা ও ছন্দের জন্ম দিচ্ছে (Gonda, 1963)। সোম হয়ে উঠলেন ‘বাচস্পতি’ বা বাক্যের অধিপতি। রিক্যুর তার আখ্যান তত্ত্বে উল্লেখ করেন যে, মানুষ যখন নিজের ভেতরের কোনো সৃজনশীল শক্তিকে নিজের অহং-এর চেয়ে বড় মনে করে, তখন সে তাকে এক বহিঃস্থ ঐশ্বরিক সত্তার রূপ দেয়। সোম দেবতার কল্পনা ছিল কবির নিজের ভেতরে জেগে ওঠা অনুপ্রেরণারই এক প্রতীকী ব্যক্তি রূপ।

দেবতা হিসেবে সোমের রূপটি ধীরে ধীরে মহাজাগতিক পরিমণ্ডলেও ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি যুক্ত হয়ে পড়েন আকাশের সাথে, বিশেষ করে চাঁদের সাথে। বৈদিক সাহিত্যে দেখা যায়, শুক্লপক্ষে চাঁদের বৃদ্ধিকে ভাবা হতো পাত্রে সোমরস জমার মতো ঘটনা, আর কৃষ্ণপক্ষে চাঁদের ক্ষয়কে কল্পনা করা হতো দেবতাদের দ্বারা সোম পান করার রূপক হিসেবে। চাঁদ যেন স্বর্গের এক সুবিশাল বাটি, যেখানে স্বর্গীয় সোমরস সংরক্ষিত থাকে। এছাড়া সোমকে বৃষ্টির জলের সাথেও একাত্ম করা হয়েছিল। আকাশ থেকে যে জল ঝরে পড়ে তা মাটিকে উর্বর করে, আর পৃথিবী থেকে যে সোমরস যজ্ঞে নিবেদিত হয় তা দেবতাদের তৃপ্ত করে। এভাবে স্বর্গ এবং মর্ত্যের মধ্যে এক চক্রাকার সম্পর্কের নিয়ামক হয়ে ওঠেন সোম।

রিক্যুর তার হার্মেনিউটিক্সে দেখিয়েছেন যে, ব্যক্তিত্বায়ন আসলে রূপকেরই একটি সম্প্রসারিত রূপ। যখন কোনো জড় বস্তু বা রসায়নকে ‘তিনি’ বলে সম্বোধন করা হয়, তখন বস্তুর সাথে মানুষের সম্পর্কের ধরনটাই বদলে যায়। মানুষ তখন আর সেই বস্তুকে নিছক ভোগের উপাদান মনে করে না, তার সাথে এক ধরনের অস্তিত্বগত সংলাপে লিপ্ত হয়। বৈদিক কবিরা সোমকে সম্বোধন করতেন বন্ধু হিসেবে, পিতা হিসেবে, কখনো বা সুরক্ষাদাতা হিসেবে। সোম তাদের পথ দেখাবেন, বিপদে রক্ষা করবেন এবং শত্রুর হাত থেকে বাঁচাবেন – এই প্রার্থনাগুলোর মাধ্যমে এক গভীর মানসিক নির্ভরতা গড়ে উঠেছিল। ভৌত পানীয়টি এভাবে মানুষের একাকী চেতনাকে এক মহাজাগতিক সঙ্গীর আশ্রয়ে পৌঁছে দিয়েছিল।

সোমযাগ ও আচারিক পুনর্গঠন (The Soma Sacrifice and Ritual Reconstruction): স্থান, কাল ও ক্রিয়ার বিস্তার

সোম ধারণার তৃতীয় মাত্রাটি গড়ে উঠেছে বৈদিক আচার বা যজ্ঞকে কেন্দ্র করে। বৈদিক ধর্মে সোমযাগ ছিল সমস্ত যজ্ঞের মুকুটমণি। একটি সাধারণ গার্হস্থ্য যজ্ঞের চেয়ে সোমযাগ ছিল অনেক বেশি জটিল, দীর্ঘমেয়াদী এবং বিপুল আয়োজনের ব্যাপার। এই যজ্ঞগুলো ছিল মূলত সমষ্টিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক যজ্ঞ, যার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত রূপটি হলো ‘অগ্নিষ্টোম’। এছাড়া অতিরাত্র, রাজসূয় বা বাজপেয় যজ্ঞেও সোম ছিল প্রধান উপাদান। ফরাসি ভারততত্ত্ববিদ সিলভ্যাঁ লেভি (Sylvain Lévi) প্রাচীন ভারতের যজ্ঞের তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, ব্রাহ্মণ সাহিত্যের যুগে এই যজ্ঞক্রিয়াই মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় নিয়মে পরিণত হয়েছিল (Lévi, 1898)। দেবতারাও যজ্ঞের অধীন, আর সেই যজ্ঞের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সোমের আহুতি।

সোমযাগ কেবল কিছু মন্ত্র পড়া বা আগুন জ্বালানো নয়; এর জন্য প্রয়োজন হতো এক বিশাল যজ্ঞভূমি বা ‘মহাবেদী’ নির্মাণ। সেই বেদীতে স্থাপন করা হতো সোমলতা বহনকারী বিশেষ কাঠের গাড়ি, যার নাম ছিল ‘হবির্ধান’। পুরো অনুষ্ঠানটিকে দিনের তিনটি সুনির্দিষ্ট ভাগে ভাগ করা হতো, যাদের বলা হতো তিন ‘সবন’ – প্রাতঃসবন, মাধ্যন্দিনসবন এবং তৃতীয়সবন (Caland & Henry, 1906)। প্রতিটি সবনে সোমরস নিংড়ানো, ছাঁকা এবং ভিন্ন ভিন্ন পাত্রে দেবতাদের উদ্দেশে নিবেদন করার আলাদা নিয়ম ছিল। এই আচারিক শৃঙ্খলার প্রতিটি মুহূর্তকে অত্যন্ত সাবধানে নিয়ন্ত্রণ করা হতো, যাতে সামান্য একটি উচ্চারণের ভুল বা একটি পাত্রের স্থানচ্যুতিও না ঘটে।

রিক্যুর তার ফ্রম টেক্সট টু অ্যাকশন (From Text to Action) গ্রন্থে মানবীয় ক্রিয়ার যে প্রতীকী বিন্যাস নিয়ে আলোচনা করেছেন, সোমযাগ তার একটি অনবদ্য সামাজিক রূপ (Ricoeur, 1991)। যজ্ঞে অংশ নেওয়া প্রতিটি মানুষ – যজমান, অধ্বর্যু, হোতা, উদ্গাতা – তাদের প্রত্যেকের ক্রিয়া আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল একটি মহাকাব্যিক নাটকের মতো। যজ্ঞের এই স্থানটি আর সাধারণ ভৌগোলিক স্থান থাকত না; তা হয়ে উঠত মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র সংস্করণ। আর যজ্ঞের সময়টি হয়ে উঠত সৃষ্টির আদিম সময়। সোমলতা পেষণ করার সময় পুরোহিতরা মনে করতেন তারা সৃষ্টি ও বিনাশের চিরন্তন নাটকটিরই পুনরাবৃত্তি করছেন।

এখানে যজ্ঞের ক্রিয়াটি টেক্সট এবং আখ্যানের সাথে একাত্ম হয়ে যায়। বৈদিক মানুষ সোমযাগের মাধ্যমে তাদের সামাজিক সম্পর্কগুলোকে পুনঃনিশ্চিত করত। রাজা বা ধনী যজমান তার ক্ষমতা প্রদর্শন করতেন, পুরোহিতরা তাদের শাস্ত্রীয় জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতেন এবং পুরো সম্প্রদায় এক ধরনের সম্মিলিত উত্তেজনার ভেতর দিয়ে নিজেদের গোষ্ঠীবদ্ধতাকে অনুভব করত। রিক্যুর যেমন দেখিয়েছেন যে আচার মানুষকে সময়ের অস্থিরতা থেকে রক্ষা করে এক ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক স্থিরতা দেয়, সোমযাগও তেমনই বৈদিক সমাজকে এক ঋতু থেকে আরেক ঋতুতে যাওয়ার সন্ধিক্ষণে সামাজিক ও মানসিক নিরাপত্তার অনুভূতি প্রদান করত।

অমরত্বের আস্বাদ ও রূপকীয় বিস্তার (Taste of Immortality and Metaphorical Extension): অস্তিত্বের রূপান্তর

সোম শব্দের চতুর্থ এবং দার্শনিক দিক থেকে সবচেয়ে দূরপ্রসারী অর্থস্তরটি হলো ‘অমরত্ব’ বা ‘অমৃত’। ঋগ্বেদের অষ্টম মণ্ডলের আটচল্লিশতম সূক্তের তৃতীয় ঋকটি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত উচ্চারণ: ‘অপাম সোমম অমৃতা অভূম অগন্ম জ্যোতির্বিদাম দেবান’। সহজ ভাষায় যার অর্থ – আমরা সোম পান করেছি, আমরা অমর হয়েছি, আমরা আলোকের জগতে প্রবেশ করেছি, আমরা দেবতাদের জেনেছি। এই একটিমাত্র বাক্যের ভেতর সোমের ভৌত বাস্তবতা থেকে অস্তিত্বগত উত্তরণের চরম শিখরটি ধরা পড়ে। সাধারণ মাটির পাত্র থেকে একটি তরল পান করে মানুষ নিজেকে অমর ভাবছে – এই দাবিটির গভীরতা অনুধাবন করতে হলে রিক্যুরের রূপকীয় সত্যের ধারণাকে বোঝা দরকার।

রিক্যুর তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য রুল অব মেটাফর (The Rule of Metaphor)-এ দেখিয়েছেন যে, রূপক যখন কোনো অসম্ভব কথা বলে, তখন সে আক্ষরিক অর্থকে ভেঙে দিয়ে এক নতুন বাস্তবতাকে পুনর্গঠন করে (Ricoeur, 1977)। মানুষ মরণশীল জীব, সে শারীরিকভাবে অমর হতে পারে না – এটি একটি দৃশ্যমান বৈজ্ঞানিক সত্য। কিন্তু যখন বৈদিক কবি বলছেন ‘আমরা অমর হয়েছি’, তখন তিনি শারীরিক মৃত্যুর অনুপস্থিতির কথা বলছেন না। তিনি বলছেন চেতনার এমন এক স্তরের কথা, যেখানে মৃত্যুর ভয় আর মানুষকে গ্রাস করতে পারে না। সোমের তীব্র উদ্দীপনা এবং যজ্ঞের সম্মিলিত আবেগের ভেতর মানুষ তার দৈনন্দিন সংকীর্ণ অহং-কে অতিক্রম করে এক অখণ্ড আলোর জগতের সাথে নিজেকে যুক্ত অনুভব করত।

বৈদিক ভাষায় ‘অমৃত’ শব্দটি তৈরি হয়েছে ‘মৃত’ শব্দের আগে ‘অ’ উপসর্গ যোগ করে। এর মূল অর্থ হলো যা মরণশীলতার অধীন নয়। প্রাচীন মানুষ প্রতিদিন রোগ, বার্ধক্য, শত্রুভয় এবং অনিশ্চয়তার ভেতর বাস করত। মৃত্যু ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সোমরস পান করার ক্ষণিক মুহূর্তে তাদের চেতনা এমন এক গভীর তৃপ্তি ও ক্ষমতায় পূর্ণ হতো যে তারা অনুভব করত তাদের ভেতরে এমন কিছু আছে যা এই ধ্বংসশীল শরীরের চেয়েও বড়। ফরাসি গবেষক শার্ল মালামুদ (Charles Malamoud) তার বৈদিক যজ্ঞ সংক্রান্ত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, প্রাচীন ভারতীয় রূপকে কাঁচা জীবনকে রান্না করার বা পরিশোধিত করার প্রক্রিয়াই হলো অমরত্বে উত্তরণ (Malamoud, 1996)। সোম ছিল সেই পরম পরিশোধক, যা পান করার মাধ্যমে মানুষ ক্ষণিকের জন্য হলেও দেবতার সমকক্ষ হওয়ার আনন্দ পেত।

রিক্যুরের হার্মেনিউটিক্স অনুযায়ী, এই অমরত্ব কোনো ভৌগোলিক স্বর্গে যাওয়ার ব্যাপার নয়; এটা হলো অস্তিত্বের দিগন্তের এক আমূল রূপান্তর। মানুষ যখন আলোর সন্ধান পায়, যখন সে অজ্ঞানতার অন্ধকারের ঊর্ধ্বে ওঠে, তখন তার অস্তিত্ব লাভ করে এক নতুন সার্থকতা। সোম তাই কোনো জাদু মলম ছিল না যা মানুষের শরীরকে অনন্তকাল বাঁচিয়ে রাখবে; সোম ছিল একটি প্রতীকী চাবি, যা মানুষের মনের ভেতরে থাকা সংকীর্ণতার তালা খুলে এক অসীম অনুভূতির রাজ্যে নিয়ে যেত। বৈদিক সাহিত্যের এই অনুভব পরবর্তীকালে উপনিষদের আত্মজ্ঞান এবং দার্শনিক ভাবনার বীজ হিসেবে কাজ করেছিল।

প্রাতিষ্ঠানিক একচেটিয়া ও বিকল্পের রাজনীতি (Institutional Monopoly and the Politics of Substitutes): মোহমুক্তি ও মতাদর্শ

একটি বস্তুনিষ্ঠ ও সমালোচনামূলক পাঠে কেবল কাব্যের সৌন্দর্য বা চেতনার বিস্তার দেখে মুগ্ধ হয়ে থাকলে চলবে না; তার পেছনে যে নির্মম ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কাজ করছিল, তাও স্পষ্ট করা দরকার। রিক্যুর তার মতাদর্শ বিষয়ক বক্তৃতামালায় দেখিয়েছেন যে, যেকোনো মহৎ প্রতীক একসময় ক্ষমতাসীন শ্রেণির মতাদর্শিক আধিপত্য কায়েমের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে (Ricoeur, 1986)। সোম প্রতীকের ক্ষেত্রেও এই ঐতিহাসিক সত্যটি অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল। সোমযাগ কোনো উন্মুক্ত গণউৎসব ছিল না; এটি ছিল সমাজের উচ্চবর্গের দ্বারা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত এক বর্ণবাদী ও পিতৃতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান।

প্রথমত, সোম পানের অধিকার সমাজের সবার ছিল না। বৈদিক সাহিত্যের নিয়ম অনুযায়ী, কেবল উচ্চবর্ণের পুরুষরাই এই যজ্ঞের আয়োজন করতে পারত এবং সোমরসের ভাগ পেত। সমাজের নিম্নবর্গ বা শূদ্র এবং নারীদের এই অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। সোমকে বলা হয়েছিল ‘রাজা’ এবং তাকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল এক অলঙ্ঘনীয় পবিত্রতার বেষ্টনী। এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সমাজে এই বার্তা দেওয়া হতো যে, মহাজাগতিক আলো বা অমরত্বের অভিজ্ঞতা কেবল একটি বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর জন্যই নির্ধারিত। সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে তারা নিজেরা কোনোদিন এই অভিজ্ঞতার অধিকারী হতে পারবে না; তাদের কেবল উচ্চবর্ণের সেবা করে যেতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিক বাস্তবতায় সোমের দুষ্প্রাপ্যতা এক নতুন রাজনৈতিক অর্থনীতির জন্ম দিয়েছিল। আর্যরা যখন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পেরিয়ে গাঙ্গেয় সমভূমির দিকে এগোতে থাকে, তখন পাহাড়ি সোমলতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। দূরবর্তী মূজবৎ পর্বত থেকে সোম লতা কিনে আনা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল বাণিজ্য। ঐতিহাসিক হ্যারি ফল্ক (Harry Falk) বৈদিক সোমের বাস্তব ব্যবহার ও বিকল্পের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে, মূল সোমলতার অভাবে একসময় যজ্ঞে ‘প্রতিনিধি’ বা বিকল্প লতা ব্যবহারের বিধান তৈরি করা হয় (Falk, 1989)। পূতিকা বা অন্যান্য ঘাস জাতীয় উদ্ভিদ দিয়ে সোমের শূন্যস্থান পূরণ করা হতো। যখন রাসায়নিকভাবে উদ্দীপক মূল লতাটি হারিয়ে গেল, তখন তার জায়গায় আচারিক আনুষ্ঠানিকতাই হয়ে উঠল প্রধান। অর্থাৎ রসায়নের কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেলেও পুরোহিতরা তাদের ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য আচারের খোলসটিকে টিকিয়ে রাখলেন।

বুল্টমানের মতো রিক্যুরও আমাদের শেখান যে, প্রতীকের অপব্যবহার থেকে প্রতীককে মুক্ত করতে হবে। সোমের ইতিহাস আসলে মানুষের সাংস্কৃতিক রূপান্তরের এক বিরাট দলিল। একদিকে তা দেখায় কীভাবে একটি সাধারণ পাহাড়ি লতা মানুষের কাব্যিক কল্পনা, রূপক নির্মাণ এবং দার্শনিক ভাবনার মধ্য দিয়ে অমরত্বের পরম প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছিল। অন্যদিকে তা প্রকাশ করে দেয় কীভাবে একটি যাজকীয় ও রাজনৈতিক এলিট শ্রেণি সেই বিস্ময়কর প্রতীককে পুঁজি করে নিজেদের শ্রেণিগত প্রভুত্ব কায়েম করেছিল। সোমের এই বহুতল পাঠ আমাদের অন্ধ ভক্ত হওয়া থেকেও রক্ষা করে, আবার প্রাচীন মানুষের সৃষ্টিশীল মেধার প্রতি অবিচার করা থেকেও বিরত রাখে। রিক্যুরের বহুতল অর্থের আলোয় সোম তাই কেবল একটি জড় পদার্থ নয়, একটি নিছক কুসংস্কারও নয়; বরং তা হলো মানব চেতনার শক্তি, দুর্বলতা, আরোহন এবং সামাজিক দ্বন্দ্বের এক জীবন্ত ইতিহাস।

রিক্যুর ও ঊষার প্রতীক (Ricoeur and the Symbolism of Uṣas): আলো, সময়, নবায়ন ও মৃত্যুচেতনা

কাল ও আখ্যানের হার্মেনিউটিক্স (Hermeneutics of Time and Narrative): রিক্যুরের কালচেতনা

মানুষের জীবন এক নিরবচ্ছিন্ন সময়ের স্রোতে বাঁধা। অথচ সময়কে সংজ্ঞায়িত করতে গেলেই মানুষের ভাষা এক গভীর সংকটে পড়ে। ফরাসি দার্শনিক পল রিক্যুর (Paul Ricoeur) তার স্মৃতিস্মারক তিন খণ্ডের রচনা টাইম অ্যান্ড ন্যারেটিভ (Time and Narrative)-এ সময়ের এই দ্বিধাদ্বন্দ্বকে হার্মেনিউটিক্সের কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন (Ricoeur, 1988)। তিনি দেখান যে, পশ্চিমা দর্শনের শুরু থেকেই সময় নিয়ে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা পাশাপাশি চলেছে। একদিকে রয়েছেন এরিস্টটল, যার কাছে সময় হলো মহাজাগতিক গতির এক বস্তুনিষ্ঠ পরিমাপ – গ্রহ-নক্ষত্রের আবর্তন, দিন ও রাতের ক্রমপর্যায়। অন্যদিকে রয়েছেন সেন্ট অগাস্টিন, যিনি তার কনফেশনস (Confessions) গ্রন্থে বলেছিলেন যে, সময় বাইরে কোথাও নেই; সময় রয়েছে মানুষের অন্তরের অনুভবে, যাকে তিনি বলেছেন ‘মনের প্রসারণ’ বা স্মৃতির টানাপোড়েন। একটি হলো মহাজাগতিক বা প্রাকৃতিক সময়, অপরটি হলো মনস্তাত্ত্বিক বা ব্যক্তিক সময়।

রিক্যুর এই দুই বিপরীত প্রান্তকে মিলিয়ে দেখার জন্য এক অনন্য তাত্ত্বিক সেতু নির্মাণ করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, মহাজাগতিক সময় মানুষের জন্য অত্যন্ত শীতল এবং উদাসীন; সেখানে কোটি কোটি বছর পার হয়ে যায় মানুষের কোনো চিহ্ন ছাড়াই। আবার কেবল মনের ভেতরের সময় দিয়েও মানুষ বাঁচতে পারে না, কারণ বাইরে সূর্য ওঠে এবং ঋতু বদলায়। এই দুই সময়ের মধ্যে সমন্বয় ঘটায় মানুষের আখ্যান বা গল্প বলার ক্ষমতা। রিক্যুরের মতে, আখ্যান হলো সেই তৃতীয় পরিসর বা আখ্যানমূলক সময় (narrative time), যা মহাজাগতিক মহাকালের সাথে মানুষের ক্ষুদ্র, মরণশীল আয়ুষ্কালকে এক সুতোয় বেঁধে দেয় (Ricoeur, 1985)। মানুষ যখন কোনো আখ্যান তৈরি করে, সে আসলে সময়ের এই নির্মম প্রবাহকে নিজের অস্তিত্বের সাথে মানানসই করে পুনর্গঠন করে।

এই আখ্যানের ভেতর সবচেয়ে সংবেদনশীল ভূমিকা পালন করে প্রতীক। প্রতীক কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; প্রতীক হলো বাস্তব জগতের এমন এক দৃশ্যমান রূপ, যা সময়ের রহস্যকে মানুষের চোখের সামনে স্পষ্ট করে তোলে। রিক্যুর তার প্রাথমিক দার্শনিক অনুসন্ধান ফলিবল ম্যান (Fallible Man)-এ মানুষের সীমাবদ্ধতা বা সীমিততা (finitude) নিয়ে যে আলোচনা করেছিলেন, তা সময়ের সাথে মানুষের লড়াইকে বুঝতে সাহায্য করে (Ricoeur, 1965)। মানুষ জানে সে একদিন মারা যাবে, তার আয়ু নির্দিষ্ট। এই মৃত্যুচেতনা মানুষকে এক গভীর যন্ত্রণায় ফেলে। মানুষ যখন আকাশের দিকে তাকায় এবং দেখে যে আলো ও অন্ধকারের খেলা চিরন্তন, তখন সে সেই প্রাকৃতিক ছন্দের ভেতর নিজের ক্ষণস্থায়িত্বের সান্ত্বনা খোঁজে।

বৈদিক সাহিত্যের ঊষা সূক্তগুলো পাঠ করার ক্ষেত্রে রিক্যুরের এই কালচেতনা এক অসাধারণ দিগন্ত খুলে দেয়। ঋগ্বেদে ঊষা কেবল ভোরের আলোর বর্ণনা নয়; ঊষা হলো সময়ের সেই প্রতীকী রূপ যা একই সাথে মহাজাগতিক শৃঙ্খলার চিরন্তনতা এবং মানুষের নশ্বর জীবনের ক্ষয়ে যাওয়াকে স্পষ্ট করে তোলে। প্রাচীন বৈদিক কবিরা যখন ভোরের আলো ফুটে ওঠার দিকে তাকিয়ে স্তুতি রচনা করেছিলেন, তারা আসলে মহাজাগতিক সময়ের সাথে মানবীয় সময়ের এক তীব্র সংলাপ রচনা করছিলেন। রিক্যুর যেভাবে সময়ের টানাপোড়েনকে ভাষার মধ্য দিয়ে মীমাংসা করার কথা বলেছেন, ঊষার স্তুতিগুলোতে প্রাচীন ঋষিরা ঠিক সেই কাজটাই করেছিলেন।

ঋগ্বেদে ঊষার চিত্রকল্প (Imagery of Uṣas in the Rigveda): আলো, উন্মোচন ও দৃশ্যমানতা

ঋগ্বেদের সমগ্র দেবমণ্ডলীর মধ্যে ঊষার মতো এমন কাব্যিক ও রূপময় চরিত্র খুব কমই দেখা যায়। প্রায় বিশটি সম্পূর্ণ সূক্তে কেবল ঊষার বন্দনা করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রথম মণ্ডলের আটচল্লিশ ও একশত তেরোতম সূক্ত এবং সপ্তম মণ্ডলের পঁচাত্তরতম সূক্ত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভারততত্ত্ববিদ লুই রেনু (Louis Renou) তার বৈদিক স্তোত্র সংক্রান্ত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ঋগ্বেদের কবিরা ঊষার বর্ণনায় তাদের ভাষার সমস্ত নান্দনিক অলংকার উজাড় করে দিয়েছিলেন (Renou, 1957)। ঊষা কোনো ভয়ঙ্কর বা রক্তপিপাসু শক্তি নন; তিনি হলেন কোমল আলোকের প্রতীক, যিনি অন্ধকারের কালো চাদর সরিয়ে পৃথিবীর সমস্ত রূপ ও বর্ণকে মানুষের চোখের সামনে উন্মোচন করেন।

এই সূক্তগুলোতে ঊষাকে নানা রূপক দিয়ে সাজানো হয়েছে। কখনো তিনি এক উজ্জ্বল বসন পরিহিতা নর্তকী (nartī), যিনি মঞ্চে এসে নিজের আবরণ উন্মোচন করেন। কখনো তিনি নদী থেকে স্নান সেরে উঠে আসা এক লাবণ্যময়ী তরুণী, যিনি নিজের দেহের সৌন্দর্য প্রকাশ করতে কোনো দ্বিধা করেন না। বৈদিক কবিরা লিখেছেন, ঊষা তার রথে লাল রঙের ঘোড়া বা গাভী জুড়ে দিয়ে পূর্ব দিগন্তে আবির্ভূত হন। এই যে লালচে আভা, বৈদিক ভাষায় তাকে বলা হয়েছে ‘অরুণ’। অন্ধকার যখন পৃথিবীকে ঢেকে রেখেছিল, তখন সবকিছু ছিল একাকার, কোনো কিছুর আলাদা অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছিল না। ঊষার আলো এসে প্রতিটি বস্তুকে তার স্বাতন্ত্র্য ফিরিয়ে দিল – গাছপালা, নদী, পশুপাখি আবার তাদের নিজস্ব সীমানা খুঁজে পেল।

রিক্যুর তার প্রতীকী তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, সত্য ও প্রকাশের ধারণাটি আলোর প্রতীকের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। প্রাচীন গ্রিক ধারণায় সত্যকে বলা হতো ‘আলেথিয়া’, যার অর্থ অনাবৃত হওয়া বা গোপন অবস্থা থেকে প্রকাশ্যে আসা। বৈদিক ঊষার কাজও ঠিক তা-ই। তিনি গোপনকে প্রকাশ করেন। রাতের অন্ধকার হলো এক ধরনের আদিম অন্ধত্ব, যেখানে মানুষের কর্মক্ষমতা রুদ্ধ হয়ে থাকে। ঊষা এসে সেই অন্ধত্ব দূর করেন এবং মানুষের দৃষ্টিকে মুক্ত করেন। রিক্যুরের পরিভাষায় একে বলা যায় বিশ্বজগতের এক নতুন উন্মোচন (poetic disclosure); কাব্যিক ভাষা যেভাবে নতুন অর্থকে দৃশ্যমান করে তোলে, ঊষাও তেমনই প্রকৃতির লুকানো রূপকে উন্মুক্ত করে দেন (Ricoeur, 1988)।

একই সাথে ঋগ্বেদে ঊষাকে বলা হয়েছে রাত্রির ভগিনী বা বোন। আলো এবং অন্ধকার এখানে পরস্পরের চিরশত্রু হয়ে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হয় না; বরং তারা এক ছন্দময় পর্যায়ক্রম মেনে চলে। রাত্রি তার বড় বোনকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে বিদায় নেয়, আবার দিন শেষে ফিরে আসে। এই অবিচ্ছিন্ন আবর্তন মহাবিশ্বের এক পরম শান্তির ইঙ্গিত দেয়। ফরাসি গবেষক জর্জেস-জঁ পিনো (Georges-Jean Pinault) ঋগ্বেদের কাব্যরীতির বিশ্লেষণ করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, বৈদিক কবিরা এই বৈপরীত্যের মধ্যে এক গভীর সুসংগতি দেখতে পেয়েছিলেন (Pinault, 2004)। দৃশ্যমান আলোর এই আগমন বৈদিক মানুষের মনে প্রতিদিন এক নতুন সৃষ্টির আনন্দ এনে দিত। কিন্তু এই আনন্দের নিচেই লুকিয়ে ছিল সময়ের এক গভীরতর প্রশ্ন।

নবায়নের প্রতীক ও ঋতের অনুবর্তন (Symbol of Renewal and Following of Ṛta): শৃঙ্খলার ছন্দ

ঊষার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তিনি বিশ্বজগতের শাশ্বত নিয়ম বা ঋত (Ṛta)-কে নিখুঁতভাবে মেনে চলেন। ঋগ্বেদে তাকে বারবার বলা হয়েছে ‘ঋতপা’ বা ঋতের রক্ষক এবং ‘ঋতবতী’ বা নিয়মানুবর্তী। ঊষা কখনোই নিজের পথ ভুল করেন না; তিনি দিগন্তের যে বিন্দু থেকে ওঠার কথা, সেখান থেকেই ওঠেন। তিনি খুব বেশি দেরিও করেন না, আবার সময়ের আগেও আসেন না। প্রাচীন যাযাবর ও পশুপালক মানুষের কাছে প্রকৃতির এই নিয়মিত ফিরে আসা ছিল এক পরম আশ্বাসের জায়গা। যদি কোনোদিন ভোর না হতো, তবে জীবন থেমে যেত। ঊষার এই সময়মতো ফিরে আসা প্রমাণ করত যে বিশ্বজগৎ কোনো বিশৃঙ্খল অন্ধ শক্তির অধীনে নেই, বরং এক সুনির্দিষ্ট ছন্দের ভেতর আবর্তিত হচ্ছে।

এই কারণে ঊষাকে বর্ণনা করা হয়েছে চিরন্তন নবায়নের প্রতীক হিসেবে। তিনি এক অদ্ভুত ধাঁধা। একদিকে তিনি অতি প্রাচীন, সৃষ্টির শুরু থেকেই তিনি আসছেন; অন্যদিকে তিনি চিরতরুণী বা ‘যুবতী’ (yuvatī)। ঋগ্বেদের কবিরা তাকে বলেছেন ‘পুনঃ পুনঃ জায়মানা পুরানী’, অর্থাৎ যিনি বারংবার জন্ম নেন কিন্তু নিজে চিরপুরাতন। মানুষের শরীর সময়ের সাথে সাথে বুড়িয়ে যায়, জরাগ্রস্ত হয়, কিন্তু ঊষার কোনো বার্ধক্য নেই। তিনি গতকাল যেমন উজ্জ্বল ছিলেন, আজকেও ঠিক তেমনই লাবণ্যময়ী, এবং আগামীকালও তার রূপের কোনো ক্ষয় ঘটবে না। এই চিরন্তন নবায়নের প্রতীক মানুষের মনে এক গভীর আশাবাদের জন্ম দিত যে, জীবন বারবার নতুন করে শুরু হতে পারে।

জার্মান ভারততত্ত্ববিদ ইয়ান গোন্ডা (Jan Gonda) বৈদিক ধর্মের আলোচনায় দেখিয়েছেন যে, ঊষার এই ঋতের অনুবর্তন কেবল একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা ছিল না, এটি ছিল মানুষের নৈতিক ও সামাজিক শৃঙ্খলার ভিত্তি (Gonda, 1960)। মানুষ যখন দেখে যে স্বর্গের আলো নিজেই একটি নিয়ম মেনে চলে, তখন সে নিজের সামাজিক জীবনেও সেই নিয়ম ও দায়িত্ব পালনের প্রেরণা পায়। ঊষা মানুষকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলেন কর্মের জন্য। অলসতাকে বৈদিক ভাবনায় অমঙ্গলজনক মনে করা হতো; ঊষার আগমনের সাথে সাথে সবাইকে নিজের নিজের কাজে নামতে হতো। পশুপালককে মাঠে যেতে হতো, কৃষককে লাঙ্গল ধরতে হতো, আর পুরোহিতকে যজ্ঞের আগুন জ্বালাতে হতো।

রিক্যুরের দৃষ্টিকোণ থেকে এই নবায়নের প্রতীকটিকে পাঠ করলে দেখা যায়, এটি আসলে আদিম মানুষের এক ধরনের মহাজাগতিক আত্মরক্ষা। মানুষ সময়ের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাকে ভয় পায়। সবকিছু ভেঙে পড়ে, ক্ষয়ে যায়, বিলীন হয়ে যায়। এই ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে মানুষ ঊষার মতো একটি প্রতীককে আঁকড়ে ধরে, যা ধ্বংসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে অনন্ত জীবনের সাক্ষ্য দেয়। রিক্যুর যেমন দেখিয়েছেন যে, প্রতীক মানুষকে আশা করার সাহস যোগায়, ঊষাও তেমনই বৈদিক মানুষকে আশ্বাস দিয়েছিল যে অন্ধকারের রাজত্ব যতই দীর্ঘ হোক না কেন, আলোর নবায়ন অনিবার্য। প্রকৃতির এই চক্রাকার আবর্তন মানুষের অস্তিত্বকে এক ধরনের স্থিতিশীলতা দান করত।

বার্ধক্য ও মৃত্যুচেতনার সংকট (Crisis of Aging and Consciousness of Death): ক্ষীয়মাণ মানবজীবন

কিন্তু ঋগ্বেদের ঊষা সূক্তগুলো কেবল সৌন্দর্যের স্তুতিতেই থেমে থাকেনি। এই সূক্তগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম গভীর ও করুণ মৃত্যুচেতনা। ঊষা নিজে চিরতরুণী, কিন্তু মানুষের প্রতি তিনি বড় নির্মম। তিনি যখন প্রতিদিন ফিরে আসেন, তখন তিনি মানুষের আয়ুর একটি করে দিন কেটে নিয়ে যান। ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের একশত তেরোতম সূক্তের দশম ও একাদশ ঋকে এই ট্র্যাজিক সত্যটি যেভাবে উচ্চারিত হয়েছে, তা যে কোনো সংবেদনশীল পাঠককে নাড়া দেয়। সেখানে কবি গভীর বিষাদের সাথে বলছেন: যে মানুষগুলো অতীতে ঊষার আলো দেখেছিল, তারা সবাই আজ মাটির নিচে চলে গেছে; আমরা যারা আজ তাকে দেখছি, আমরাও একদিন থাকব না; আবার ভবিষ্যতে যারা ঊষাকে দেখবে, তারা এখনো জন্মায়নি।

এই অংশটিতে বৈদিক কবি ঊষার একটি বিশেষ উপাধি ব্যবহার করেছেন – তিনি হলেন ‘জরয়ন্তী’, অর্থাৎ যিনি মরণশীল মানুষকে জরাগ্রস্ত বা বৃদ্ধ করেন (Brodbeck, 2019)। ঊষা হাসতে হাসতে আসছেন, তার রূপের কোনো কমতি নেই, কিন্তু তার সেই দীপ্তিময় হাসির প্রতিটি কিরণ মানুষের কপালে বার্ধক্যের বলিরেখা এঁকে দিচ্ছে। তিনি নিজে অমর থেকে সমস্ত মরণশীল প্রাণীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। এই বৈপরীত্যটি বৈদিক মানুষের অস্তিত্বের এক চরম সত্যকে প্রকাশ করে দেয়। প্রকৃতি অমর, ঋতুচক্র শাশ্বত, কিন্তু ব্যক্তিমানুষের জীবন একমুখী ও ক্ষণভঙ্গুর। নদী শুকিয়ে গেলে আবার বর্ষায় ভরে ওঠে, কিন্তু মানুষের যৌবন একবার চলে গেলে তা আর কোনোদিন ফিরে আসে না।

রিক্যুর তার দার্শনিক বিশ্লেষণে মানুষের এই সীমাকে বলেছেন অস্তিত্বের মৌলিক অসহায়তা। মানুষ যখন বুঝতে পারে যে সে প্রকৃতির অনন্ত কালের তুলনায় এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্দু, তখন তার ভেতর তৈরি হয় এক তীব্র অস্তিত্বগত হাহাকার। রিক্যুর দেখান যে, আখ্যানের কাজ হলো এই ট্র্যাজেডিকে স্বীকার করে নেওয়া (Ricoeur, 1985)। প্রাচীন বৈদিক ঋষিরা কোনো সস্তা আশ্বাসের মাধ্যমে মৃত্যুকে অস্বীকার করতে চাননি। তারা অত্যন্ত খোলামনে স্বীকার করেছেন যে, প্রতিটি নতুন সকাল মানেই হলো কবরের দিকে আরও এক কদম এগিয়ে যাওয়া। ঊষা যেমন আশার আলো নিয়ে আসেন, তেমনই তিনি প্রতিটি সকালে মানুষের মৃত্যুর পরোয়ানাটিও নিঃশব্দে বয়ে নিয়ে আসেন।

এই দ্বিস্তরীয় অনুভূতির কারণেই ঊষা সূক্তগুলো সাধারণ কোনো ধর্মীয় প্রার্থনা থাকে না; তা হয়ে ওঠে খাঁটি অস্তিত্ববাদী কবিতা। আনন্দ এবং বিষাদ এখানে হাত ধরাধরি করে চলে। কবিরা যখন ঊষাকে ডাকছেন তাদের ধনসম্পদ ও দীর্ঘায়ু দেওয়ার জন্য, তখন তারা খুব ভালো করেই জানেন যে এই দীর্ঘায়ুও শেষ পর্যন্ত একদিন শেষ হয়ে যাবে। রিক্যুরিয়ান ভাষায়, এটি হলো মানবীয় সীমিততার সাথে মহাজাগতিক অসীমের এক বেদনাদায়ক সংঘর্ষ। ঊষা সেই সংঘর্ষের আয়না, যার দিকে তাকালে মানুষ একই সাথে নিজের নশ্বরতা এবং প্রকৃতির অবিনশ্বরতাকে প্রত্যক্ষ করে।

দ্বিমুখী কাল ও রূপকীয় টানাপোড়েন (Dual Time and Metaphorical Tension): মহাজাগতিক কাল বনাম মরণশীল কাল

রিক্যুরের আখ্যান তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয়গুলোর একটি হলো রূপকীয় টানাপোড়েন বা টানাপোড়েনের রূপক (metaphorical tension)। রিক্যুর দেখান যে, একটি জীবন্ত রূপক সবসময় দুটি পরস্পরবিরোধী অর্থের মধ্যে এক ধরনের লড়াই জারি রাখে (Ricoeur, 1988)। যদি রূপকের ভেতরের এই বৈপরীত্যটি পুরোপুরি মিটে যায়, তবে রূপকটি একটি সাধারণ সংজ্ঞায় পরিণত হয়ে মারা যায়। বৈদিক ঊষার প্রতীকটি বেঁচে রয়েছে ঠিক এই টানাপোড়েনের কারণে। ঊষা একই সাথে জীবনদাত্রী মাতা এবং জীবনসংহারক শক্তি। তিনি একই সাথে মুক্তির আলোকবর্তিকা এবং মৃত্যুর নীরব বার্তাবাহক। এই দুই বিরোধী সত্যের সহাবস্থানই ঊষাকে ঋগ্বেদের সবচেয়ে জটিল প্রতীকে পরিণত করেছে।

এখানে এরিস্টটলের মহাজাগতিক সময় এবং অগাস্টিনের মনস্তাত্ত্বিক সময়ের সেই রিক্যুরিয়ান দ্বন্দ্বটি পূর্ণরূপে প্রকাশ পায়। আকাশে যখন সূর্য ওঠার আগের রক্তিম আভা দেখা যায়, তখন জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসেবে এটি কেবল পৃথিবীর ঘূর্ণন ও সৌররশ্মির প্রতিসরণ। এটি এরিস্টটলের নিরপেক্ষ মহাজাগতিক সময়। কিন্তু সেই আলোর দিকে তাকিয়ে কুৎস আঙ্গিরস বা বসিষ্ঠের মতো ঋষি যখন নিজের ফেলে আসা জীবনের কথা ভাবেন, নিজের হারিয়ে যাওয়া পূর্বপুরুষদের কথা মনে করেন, তখন সেই সময়টি হয়ে ওঠে অগাস্টিনের স্মৃতির সময়। সেখানে যুক্ত হয় নস্টালজিয়া, সেখানে যুক্ত হয় এক অপূরণীয় ক্ষতিবোধ। রিক্যুর বলেন, কবিতা বা মিথ এই দুই ভিন্ন অনুভবকে একটি রূপকীয় ফ্রেমে ধরে রাখে।

ঋগ্বেদের ভাষা এই দ্বিমুখী সময়কে চমৎকারভাবে ধারণ করেছে। কবিরা ঊষার রূপের প্রশংসা করতে গিয়ে যেসব বিশেষণ ব্যবহার করেছেন, তার নিচে সবসময় একটি চাপা দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। এই দীর্ঘশ্বাস কোনো দেবতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নয়, বরং নিয়তির অমোঘ নিয়মের সামনে মানুষের বিনম্র আত্মউপলব্ধি। গবেষক প্যাট্রিক অলিভেল (Patrick Olivelle) প্রাচীন ভারতীয় ধ্যানধারণার রূপান্তর নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, বৈদিক সংহিতার এই ক্ষণস্থায়িত্বের বোধই পরবর্তীকালে উপনিষদের সংসারচক্র এবং বৌদ্ধ দর্শনের অনিত্যতাবাদের জন্ম দিয়েছিল (Olivelle, 1998)। সংহিতায় যা ছিল ঊষার আলোয় দেখা এক কাব্যিক বিষাদ, উপনিষদে এসে তা পরিণত হয়েছিল অস্তিত্বের বন্ধন মুক্তির এক তাত্ত্বিক অনুসন্ধানে।

রিক্যুরের হার্মেনিউটিক্স আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, কেন হাজার হাজার বছর পরেও এই প্রাচীন স্তোত্রগুলো আধুনিক মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে। আধুনিক মানুষ হয়তো বৈদিক দেবতাদের পুজো করে না, বৈদিক যজ্ঞের আগুনও আজ আর জ্বালানো হয় না। কিন্তু প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মানুষ এখনো সেই একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। আমরা যখন দেখি আলো ফুটছে, তখন আমাদের মনেও একই সাথে নতুন দিনের কাজের উদ্দীপনা এবং জীবনের আরেকটি দিন ফুরিয়ে যাওয়ার নিঃশব্দ উপলব্ধি কাজ করে। ঊষার প্রতীক তাই কোনো একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সম্পত্তি নয়; তা হয়ে ওঠে মানবজাতির যৌথ স্মৃতির এক অমূল্য অংশ, যা সময় এবং মৃত্যুর চিরন্তন টানাপোড়েনকে ভাষার মধ্যে স্থায়ী করে রেখেছে।

সামাজিক জাগরণ ও দক্ষিণার অর্থনীতি (Social Awakening and Economy of Dakṣiṇā): মোহমুক্তি ও মতাদর্শ

একটি বস্তুনিষ্ঠ ও সমালোচনামূলক হার্মেনিউটিক্সে কেবল আধ্যাত্মিক বা দার্শনিক ভাবনায় মগ্ন থাকলে চলে না; টেক্সটের পেছনের বস্তুগত বাস্তবতা এবং সামাজিক স্বার্থের জালটিকেও উন্মোচিত করতে হয়। রিক্যুর যে সন্দেহবাদী হার্মেনিউটিক্সের কথা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, তার আলোয় বৈদিক ঊষাকে দেখলে এই পরম রূপময়ী দেবীর পেছনে এক সুস্পষ্ট সামাজিক ও অর্থনৈতিক কার্যকারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে (Ricoeur, 1988)। ঊষা সূক্তগুলো কেবল নির্জন প্রকৃতির মাঝে বসে লেখা কোনো ভাবালু কবিতা ছিল না। এগুলো গাওয়া হতো খুব সকালে, যখন বৈদিক যজ্ঞের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতো। আর এই স্তুতিগুলোর একটি অত্যন্ত বৈষয়িক এবং বাস্তব লক্ষ্য ছিল।

সেই লক্ষ্যটি হলো যজ্ঞের প্রধান পৃষ্ঠপোষক বা ধনী যজমানকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা। বৈদিক সমাজে যারা সম্পদশালী ছিলেন – রাজা, সেনাপতি বা গোষ্ঠীর প্রধান – তাদের বলা হতো ‘মঘবন’ বা ‘সূরি’। ঋগ্বেদের কবিরা ঊষাকে বারবার অনুরোধ করছেন যাতে তিনি এই ধনীদের ঘুম ভাঙান। কবিরা অকপটে লিখেছেন: কৃপণ ব্যক্তি যেন ঘুমাতে থাকে, যে দান করে না সে যেন জেগে না ওঠে; কিন্তু যিনি উদার, যিনি কবি ও পুরোহিতদের সোনা, ঘোড়া এবং গাভী দান করবেন, ঊষা যেন তাকে জাগিয়ে দেন (Jamison, 1996)। ভোর হওয়ার সাথে সাথে পুরোহিতরা তাদের স্তুতি শুরু করতেন যাতে ধনী পৃষ্ঠপোষকের মন গলে এবং যজ্ঞ শেষে তারা প্রচুর পরিমাণে ‘দক্ষিণা’ লাভ করতে পারেন। ঊষার কাব্যিক সৌন্দর্যের ঠিক নিচেই ছিল পশুপালক সমাজের এই বেঁচে থাকার অর্থনৈতিক লড়াই।

একই সাথে এই সূক্তগুলোর মধ্যে ফুটে ওঠে প্রাচীন পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর কিছু স্পষ্ট চিহ্ন। ঊষার নারী রূপের যে বর্ণনা বৈদিক কবিরা দিয়েছেন, তা একজন পুরুষ কবির দৃষ্টিতে নারীর রূপের উপভোক্তা হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরে। ঊষাকে সাজানো হয়েছে নর্তকী হিসেবে, প্রেমিকের সামনে উন্মুক্ত হওয়া লজ্জাশীলা বধূ হিসেবে। ভারততত্ত্ববিদ স্টেফানি জ্যামিসন (Stephanie Jamison) তার প্রাচীন ভারতের নারী ও যজ্ঞ সংক্রান্ত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, বৈদিক সাহিত্যে দেবী বা রূপক হিসেবে নারীর উপস্থিতি অত্যন্ত উজ্জ্বল হলেও বাস্তব সমাজ জীবনে নারীর সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকার ছিল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত (Jamison, 1996)। বাস্তবে নারীদের অবস্থান ছিল পুরুষের অধীনস্থ, কিন্তু কবিতায় নারীর সৌন্দর্যকে এক স্বর্গীয় মহিমায় তুলে ধরা হয়েছিল। এই বৈপরীত্যটি পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির এক অতি পরিচিত কৌশল।

পরিশেষে ঊষা সূক্তগুলোকে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, এটি মানব সভ্যতার এক অসাধারণ সাহিত্যিক দলিল। এখানে প্রকৃতির প্রত্যক্ষ রূপ, সময়ের দার্শনিক অভিঘাত, মৃত্যুর তীব্র হাহাকার এবং সমাজের টিকে থাকার অর্থনৈতিক স্বার্থ – সব একসাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। রিক্যুরের বহুস্তরীয় পাঠ আমাদের শেখায় কীভাবে একটি পাঠের ভেতরের সৌন্দর্যকে উপভোগ করার পাশাপাশি তার মতাদর্শিক সীমাবদ্ধতাগুলোকেও চিনে নিতে হয়। ঊষা কোনো বাস্তব অলৌকিক দেবী নন; তিনি হলেন প্রাচীন মানুষের এমন এক সৃষ্টিশীল রূপক, যার মাধ্যমে মানুষ একাধারে অন্ধকার দূর করার আনন্দকে উদযাপন করেছিল, সময়ের কাছে নিজের ক্ষয়ে যাওয়াকে মেনে নিয়েছিল এবং সমাজের রুঢ় বাস্তবতাকে কবিতার ছন্দে প্রকাশ করেছিল।

যজ্ঞ, বাক্য ও ভারতীয় ব্যাখ্যাতত্ত্ব (Ritual, Sentence and Indian Exegesis): মীমাংসার প্রত্যক্ষ প্রয়োগ

জৈমিনি ও বৈদিক বিধিবাক্য (Jaimini and Vedic Injunctions): ধর্ম, ক্রিয়া ও বাক্যের কার্যকারিতা

পূর্বমীমাংসার জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি ও জৈমিনি (Epistemological Foundation of Pūrva Mīmāṃsā and Jaimini): ভাষার অপরিহার্য কর্তৃত্ব

প্রাচীন ভারতে ভাষার শক্তি এবং তার কার্যকারিতা নিয়ে যত দার্শনিক বিতর্ক হয়েছে, তার একটি বড় অংশ আবর্তিত হয়েছে বৈদিক পাঠের প্রামাণ্যকে কেন্দ্র করে। বেদকে কেন প্রামাণ্য মানতে হবে এবং বেদের বাক্যের উদ্দেশ্য কী – এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যে দার্শনিক ধারাটির জন্ম হয়, তাকে ভারতীয় দর্শনে বলা হয় পূর্বমীমাংসা (Pūrva Mīmāṃsā)। এই ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা আচার্য জৈমিনি (Jaimini) খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় বা দ্বিতীয় শতকে রচনা করেছিলেন তার বিখ্যাত আকর গ্রন্থ মীমাংসাসূত্র (Mīmāṃsāsūtra) (Jha, 1942)। জৈমিনির লক্ষ্য কোনো কাল্পনিক ভাববাদী ঈশ্বরতত্ত্ব নির্মাণ করা ছিল না। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল বৈদিক টেক্সটের প্রতিটি বাক্যের সুনির্দিষ্ট অর্থ নির্ধারণ করা এবং আচারের ক্ষেত্রে সেই বাক্যের বাস্তব প্রয়োগকে এক কঠোর যুক্তিপূর্ণ শৃঙ্খলার ভেতর নিয়ে আসা।

জৈমিনির দর্শনের প্রথম ও প্রধান ভিত্তি হলো বেদের অপৌরুষেয়ত্ব (authorlessness / apauruṣeyatva) ধারণা। সাধারণ মানুষের বিশ্বাসে মনে করা হতে পারে যে কোনো ঈশ্বর বা ঋষি এই টেক্সট রচনা করেছেন। কিন্তু জৈমিনি এই ধারণাকে নাকচ করে দেন। তিনি দাবি করেন, বেদের কোনো মানবীয় বা ঐশ্বরিক রচয়িতা নেই। যদি কোনো টেক্সটের রচয়িতা থাকে, তবে সেই রচয়িতার ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা, ভ্রম বা স্বার্থপরতা টেক্সটের ভেতর ঢুকে পড়তে বাধ্য। জৈমিনির মতে, শব্দ এবং তার অর্থের সম্পর্ক কোনো মানুষের চুক্তির মাধ্যমে তৈরি হয়নি; এই সম্পর্ক চিরন্তন বা নিত্য (Bilimoria, 1988)। শব্দ হলো নিত্য ধ্বনি, আর সেই শব্দের সাথে অর্থের যে স্বাভাবিক সম্বন্ধ, তা কোনো ব্যক্তি বা দেবতার ওপর নির্ভর করে না। ফলে বেদের বাক্য কোনো স্রষ্টার আদেশ নয়, বরং তা এক স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষাগত বাস্তবতা।

এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই মীমাংসা দর্শনে প্রতিষ্ঠা করা হয় স্বতঃপ্রামাণ্যবাদ (intrinsic validity of knowledge)। এই জ্ঞানতত্ত্ব অনুযায়ী, যেকোনো জ্ঞান যখন উৎপন্ন হয়, তখন সে নিজেই নিজের যথার্থতার প্রমাণ বহন করে। বাইরে থেকে অন্য কোনো প্রমাণের মাধ্যমে সেই জ্ঞানের সত্যতা যাচাই করার প্রয়োজন পড়ে না, যদি না পরবর্তীকালে কোনো ত্রুটি সেই জ্ঞানকে খণ্ডন করে। দৈনন্দিন জীবনে আমরা যখন চোখে কোনো বস্তু দেখি, আমরা সরাসরি বিশ্বাস করি যে বস্তুটি আছে; আমরা দেখার পর আবার অন্য কোনো ইন্দ্রিয় দিয়ে যাচাই করতে যাই না। জৈমিনি এই নীতিটি ভাষার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। বৈদিক বাক্য যখন আমাদের কোনো কাজের নির্দেশ দেয়, তখন সেই বাক্য নিজেই নিজের কর্তৃত্ব প্রকাশ করে। কোনো বহিঃস্থ ঐশ্বরিক সত্তার হস্তক্ষেপ ছাড়াই ভাষা নিজেই মানুষের চেতনার চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।

এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, জৈমিনি তার দর্শনে কোনো স্রষ্টা ঈশ্বরের স্থান রাখেননি। মীমাংসকদের চোখে তথাকথিত দেবতারা হলেন নিছক ব্যাকরণগত উপাদান। ইন্দ্র বা অগ্নির কোনো রক্তমাংসের বা অলৌকিক শরীর নেই; তারা হলেন যজ্ঞের আহুতি দেওয়ার সময় উচ্চারিত মন্ত্রের একটি নামমাত্র। গবেষক ফ্রান্সিস এক্স. ক্লুনি (Francis X. Clooney) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, জৈমিনি ধর্মকে কোনো আধ্যাত্মিক ধ্যান বা ভক্তিমূলক বিষয় হিসেবে দেখেননি, বরং ধর্মকে দেখেছেন এক বিশুদ্ধ আনুষ্ঠানিক এবং প্রায়োগিক কর্ম হিসেবে (Clooney, 1990)। মানুষ এবং মহাবিশ্বের মধ্যে কোনো মধ্যস্থতাকারী দেবতার প্রয়োজন নেই; বৈদিক বাক্য মানুষকে যে ক্রিয়া সম্পাদন করতে বলেছে, সেই ক্রিয়াটি নিখুঁতভাবে পালন করাই হলো মানুষের একমাত্র দায়িত্ব। এই কারণে জৈমিনির পদ্ধতি ধর্মতত্ত্বের চেয়েও অনেক বেশি ভাষাতত্ত্ব ও আইনি ব্যাখ্যাশাস্ত্রের কাছাকাছি।

চোদনা ও ধর্মের সংজ্ঞা (Codanā and Definition of Dharma): কর্মের চালিকাশক্তি

জৈমিনির মীমাংসাসূত্র-এর একেবারে শুরুর দিকেই ধর্মের একটি যুগান্তকারী সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় সূত্রে তিনি ঘোষণা করেন – ‘চোদনা লক্ষণোহর্থো ধর্মঃ’ (codanā-lakṣaṇo ‘rtho dharmaḥ)। এই সংক্ষিপ্ত সূত্রটির গভীরতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে ধর্মের প্রচলিত ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ অর্থে মানুষ যখন ধর্ম শব্দটিকে ব্যবহার করে, তখন তারা বোঝে কোনো নৈতিক চরিত্র, ঈশ্বরভক্তি বা পারলৌকিক বিশ্বাস। কিন্তু জৈমিনির কাছে ধর্মের একমাত্র পরিচয় হলো তা ‘চোদনা’ দ্বারা চিহ্নিত। চোদনা শব্দের অর্থ হলো ভাষাগত প্ররোচনা, প্রেরণা বা নির্দেশক বাক্য (D’Sa, 1980)। অর্থাৎ যা মানুষকে কোনো শুভ ফল অর্জনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট কাজ করতে তাগিদ দেয়, সেটাই হলো ধর্ম।

জৈমিনি যুক্তি দেন যে, ধর্ম এমন কোনো বস্তু নয় যা মানুষের ইন্দ্রিয় দিয়ে দেখা বা ছোঁয়া যায়। চোখে দেখে আমরা রূপ জানতে পারি, কান দিয়ে শব্দ শুনতে পারি, কিন্তু ‘ধর্ম’ কী তা কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণের বিষয় নয়। এমনকি কোনো অনুমানের দ্বারাও ধর্মকে নির্ধারণ করা যায় না, কারণ অনুমানের জন্য আগের কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। যেহেতু ধর্ম হলো এমন এক অনাগত বা ভবিষ্যৎ ফল যা এখনো ঘটেনি, তাই ধর্ম জানার একমাত্র উপায় হলো শব্দ বা বৈদিক বিধিবাক্য (Halbfass, 1991)। মানুষ নিজের বুদ্ধি দিয়ে স্থির করতে পারে না যে কোন কাজটি ধর্মের অন্তর্গত আর কোনটি নয়। কেবল বৈদিক টেক্সটের যে বাক্যগুলো মানুষকে ক্রিয়ায় প্ররোচিত করে, সেই বাক্যগুলোই ধর্মের একমাত্র নির্ধারক।

এখানে ‘অর্থ’ শব্দটি যোগ করার মাধ্যমে জৈমিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও প্রায়োগিক সীমারেখা টেনে দিয়েছেন। বেদে এমন কিছু নির্দেশও থাকতে পারে যা কাউকে ধ্বংস করার জন্য বা শত্রুকে মারার জন্য প্রযুক্ত হয়, যেমন ‘শ্যেনযাগ’। শ্যেনযাগের মাধ্যমে শত্রুবধের বিধান থাকলেও জৈমিনি একে ‘অনর্থ’ বলে চিহ্নিত করেছেন। ধর্ম হতে হলে সেই ক্রিয়াটিকে অবশ্যই ব্যক্তির জন্য পরম মঙ্গলজনক বা মঙ্গলের সহায়ক হতে হবে। অতএব চোদনা কেবল যেকোনো কাজের নির্দেশ নয়; চোদনা হলো এমন একটি নির্দেশ যা মানুষকে ধ্বংসাত্মক পথ থেকে বিরত রেখে কল্যাণকর আনুষ্ঠানিক কর্মে নিয়োজিত করে।

এই সংজ্ঞার মাধ্যমে জৈমিনি ভাষার ভূমিকাকে এক অভূতপূর্ব স্তরে নিয়ে যান। ভাষা কেবল অতীত বা বর্তমানের কোনো তথ্য জানানোর মাধ্যম থাকে না। ভাষা মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে আঘাত করে, মানুষকে আলস্যের ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে এবং তাকে নির্দিষ্ট কোনো কর্ম সম্পাদনে বাধ্য করে। দার্শনিক বিলিমোরিয়া (Purushottama Bilimoria) উল্লেখ করেন যে, জৈমিনির এই চোদনার ধারণা আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের অনুশাসনমূলক ভাষা বা প্রেসক্রিপটিভ ল্যাঙ্গুয়েজের ধারণার চেয়েও বেশি ক্ষমতাবান (Bilimoria, 1988)। এখানে ভাষা কোনো মানুষের তৈরি আইন নয়, বরং ভাষা নিজেই এক অমোঘ শক্তির মতো মানুষের সামনে আবির্ভূত হয় এবং তাকে কর্মের শৃঙ্খলায় আবদ্ধ করে।

ক্রিয়ার প্রাধান্য ও বাক্যার্থের গতিশীলতা (Primacy of Action and Dynamics of Sentence Meaning): ক্রিয়ার্থত্ববাদ

বৈদিক সাহিত্যের একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে নানা ধরনের উপাখ্যান, দেবতাদের প্রশংসা এবং প্রকৃতির বর্ণনা। এই অংশগুলোকে দেখে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে এগুলো হয়তো কোনো গল্প বা ইতিহাস বলছে। কিন্তু জৈমিনি এই ধরনের আক্ষরিক পাঠের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি তার গ্রন্থে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এক নীতি ঘোষণা করেন, যাকে বলা হয় ক্রিয়ার্থত্ব (kriyārthatva)। সূত্রের ভাষায় – বৈদিক বাক্যের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো ক্রিয়া সম্পাদন করানো; যা ক্রিয়ার সাথে যুক্ত নয়, তা নিরর্থক (Jha, 1942)। এই মতবাদটি ভাষাদর্শনের ইতিহাসে এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। জৈমিনির মতে, ভাষা যদি কোনো কাজের নির্দেশ না দেয়, তবে সেই ভাষা স্রেফ নিষ্ক্রিয় শব্দের স্তূপ ছাড়া আর কিছুই নয়।

এই নীতি অনুযায়ী, একটি বাক্যের সমস্ত শব্দের মধ্যে সবচেয়ে প্রধান উপাদান হলো ক্রিয়াপদ বা আখ্যাত (ākhyāta)। বিশেষ্য, বিশেষণ বা কারকগুলো বাক্যের স্বাধীন উপাদান নয়; তারা কেবল ক্রিয়াটিকে সম্পন্ন করার সহায়ক বা অনুচর হিসেবে কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, ‘তিনি যজ্ঞ করছেন’ – এই বাক্যে ‘তিনি’ বা ‘যজ্ঞ’ প্রধান নয়, প্রধান হলো ‘করছেন’ অর্থাৎ ক্রিয়াটি। ক্রিয়াপদ মানুষের সামনে একটি কাজকে সম্পন্ন করার দাবি তোলে। সংস্কৃত ব্যাকরণের লিঙ্ বা লোট্ প্রত্যয়যুক্ত ক্রিয়াপদগুলো, যা নির্দেশ বা অনুজ্ঞা প্রকাশ করে, সেগুলোই হলো বৈদিক টেক্সটের আসল হৃৎপিণ্ড। একটি বাক্যের অন্যান্য সমস্ত অংশ এই মূল ক্রিয়াপদের সাথে অন্বিত হয়েই নিজেদের অর্থ খুঁজে পায়।

তাহলে বেদের যেসব অংশে কোনো স্পষ্ট কাজের নির্দেশ নেই, যেগুলোকে বলা হয় অর্থবাদ (arthavāda) বা প্রশংসামূলক বাক্য, সেগুলোর কী হবে? যেমন ঋগ্বেদে বলা হয়েছে ‘বায়ু হলেন অতি দ্রুতগামী দেবতা’। এখানে তো কোনো কাজের আদেশ দেওয়া হয়নি। জৈমিনি এই সমস্যাটির সমাধান করেন এক অসাধারণ হার্মেনিউটিক কৌশলের মাধ্যমে। তিনি দেখান যে, এই ধরনের বর্ণনামূলক বাক্যগুলোর নিজস্ব কোনো স্বাধীন অর্থ নেই। এগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ বাক্য নয়। এগুলো আসলে মূল বিধিবাক্যের সাথে যুক্ত হয়ে প্রশংসার মাধ্যমে মানুষকে সেই কাজের প্রতি উৎসাহিত করে (Freschi, 2012)। ‘বায়ু দ্রুতগামী’ – এই বাক্যটি মূলত ‘বায়ব্য শ্বেতছাগল উৎসর্গ করবে’ এই বিধিবাক্যের সাথে যুক্ত হয়ে মানুষকে আশ্বস্ত করে যে, বায়ুর উদ্দেশে কাজ করলে ফল দ্রুত পাওয়া যাবে। এভাবে সমগ্র বেদকে তিনি কর্মের এক বিশাল সূত্রে বেঁধে ফেলেন।

আধুনিক ভাষাতত্ত্বের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, বিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ দার্শনিক জে. এল. অস্টিন (J. L. Austin) তার সুবিখ্যাত গ্রন্থ হাউ টু ডু থিংস উইথ ওয়ার্ডস (How to Do Things with Words)-এ ভাষার যে কার্যসম্পাদনমূলক চরিত্র বা পারফরমেটিভ ভাষা (performative language) নিয়ে কথা বলেছিলেন, জৈমিনি হাজার বছর আগেই সেই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন (Austin, 1962)। অস্টিন দেখিয়েছিলেন যে ভাষা সবসময় কোনো সত্য বা মিথ্যা তথ্য দেয় না, অনেক সময় কথা বলার মাধ্যমেই একটি কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়, যেমন আদালতে ‘আমি শপথ করছি’ বলা। জৈমিনি ঠিক একইভাবে বৈদিক ভাষাকে তথ্য জানানোর মাধ্যম হিসেবে না দেখে কর্ম সম্পাদনের হাতিয়ার হিসেবে পাঠ করেছিলেন। ভাষা মানুষকে তথ্য দিয়ে নিষ্ক্রিয় করে রাখে না, বরং মানুষকে কর্মক্ষেত্রে নামিয়ে দেয়।

ভাবনা তত্ত্ব ও কার্যকারিতার ব্যাকরণ (The Theory of Bhāvanā and Grammar of Efficacy): শাব্দী ও আর্থী প্রেরণা

জৈমিনির দর্শনের সবচেয়ে সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক আবিষ্কারটি হলো ভাবনা (bhāvanā) তত্ত্ব। পরবর্তীকালের মীমাংসক কুমারিল ভট্ট এবং প্রভাকর মিশ্র এই ধারণাকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলেও এর মূল বীজটি জৈমিনির সূত্রেই নিহিত ছিল। ভাবনা শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো যা কোনো কিছুকে ভাবিত করে বা উৎপন্ন করে। সহজ ভাষায় বললে, কোনো কিছু উৎপাদনের জন্য কর্তার যে বিশেষ মানসিক ও শারীরিক তৎপরতা, সেটাই হলো ভাবনা। জৈমিনি দেখান যে, একটি বিধিবাক্য যখন মানুষ শোনে, তখন তার ভেতরের ভাষার ব্যাকরণ কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে একটি ধ্বনি শেষ পর্যন্ত একটি শারীরিক কর্মে রূপান্তরিত হয়, তা ব্যাখ্যা করতেই ভাবনা তত্ত্বের অবতারণা।

মীমাংসা অনুযায়ী এই ভাবনা দুই প্রকার: প্রথমটি হলো শাব্দী ভাবনা (śābdī bhāvanā) এবং দ্বিতীয়টি হলো আর্থী ভাবনা (ārthī bhāvanā) (Matilal, 1990)। শাব্দী ভাবনা হলো স্বয়ং শব্দের নিজস্ব প্রেরণা। বৈদিক বিধিবাক্যের ক্রিয়াপদে যে বিশেষ প্রত্যয় থাকে, যেমন ‘যজেত’ (যজ্ঞ করবে), সেই প্রত্যয়টি মানুষের মনে প্রথম আঘাত হানে। শব্দ নিজেই মানুষের নিষ্ক্রিয় ইচ্ছাশক্তিকে একটি কাজের দিকে ঠেলে দেয়। মানুষ সচেতন হওয়ার আগেই শব্দের ভেতরের এক অন্তর্নিহিত শক্তির কারণে তার মন সেই কাজের প্রতি ধাবিত হয়। শব্দ এখানে নিছক ধ্বনি নয়, শব্দ হলো এক শক্তি যা মানুষের ভেতর ক্রিয়ার জন্ম দেয়।

শব্দ যখন মানুষকে প্ররোচিত করে, তখন মানুষের ভেতরে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব, যার নাম আর্থী ভাবনা। এটি হলো মানুষের নিজস্ব উৎপাদনশীল উদ্যম বা শারীরিক প্রয়াস। আর্থী ভাবনার তিনটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন বা উপাদান থাকে, যার উত্তর ছাড়া কোনো কাজ শুরু হতে পারে না: এক, কী উৎপন্ন করতে হবে? দুই, কিসের দ্বারা উৎপন্ন করতে হবে? এবং তিন, কীভাবে বা কোন পদ্ধতিতে তা করতে হবে? বৈদিক টেক্সটের উদাহরণ দিয়ে বললে – ‘স্বর্গকামনা করলে যজ্ঞ করবে’। এখানে মানুষের প্রথম প্রশ্ন: কী পাব? উত্তর: স্বর্গ বা কাঙ্ক্ষিত ফল। দ্বিতীয় প্রশ্ন: কিসের দ্বারা পাব? উত্তর: যজ্ঞ বা আহুতির দ্বারা। তৃতীয় প্রশ্ন: কীভাবে করব? উত্তর: বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক নিয়ম ও পদ্ধতির দ্বারা (Clooney, 1990)।

এই ত্রিস্তরীয় কাঠামোর মাধ্যমে জৈমিনি দেখান যে, মানুষের কর্ম কোনো এলোমেলো আবেগ নয়। মানুষের প্রতিটি সচেতন কাজ এই তিনটি কাঠামোর মধ্য দিয়ে সুবিন্যস্ত থাকে। একটি বিধিবাক্য এই তিনটি প্রশ্নেরই উত্তর একসাথে হাজির করে। মানুষ যখন বাক্যটি শোনে, তখন সে আর অন্ধকারে হাতড়ায় না; সে স্পষ্ট জানতে পারে তার লক্ষ্য কী, তার মাধ্যম কী এবং তার করণীয় পথ কোনটি। চিন্তাশীল দার্শনিক বিমল কৃষ্ণ মতিলাল (Bimal Krishna Matilal) তার ভাষাদর্শন সংক্রান্ত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, জৈমিনির এই ভাবনা তত্ত্ব ভাষার মাধ্যমে মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের এক অত্যন্ত নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (Matilal, 1990)। ভাষার একটি ক্ষুদ্র প্রত্যয় কীভাবে মানুষের সমগ্র শারীরিক ও মানসিক শক্তিকে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালিত করে, তা এই তত্ত্বের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিধিবাক্যের প্রকারভেদ ও প্রায়োগিক শ্রেণিবিন্যাস (Types of Injunctions and Pragmatic Classification): বিধি ও তার স্তর

বৈদিক সাহিত্যের সুবিশাল অরণ্যে হাজার হাজার বাক্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কোনটা মূল নির্দেশ আর কোনটা সহায়ক নির্দেশ – এই পার্থক্য নির্ধারণ করতে না পারলে কোনো যজ্ঞ অনুষ্ঠান পরিচালনা করা অসম্ভব। এই সমস্যার সমাধানের জন্য জৈমিনি এবং তার অনুসারীরা বিধিবাক্যগুলোকে কতগুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। এই শ্রেণিবিন্যাস ছিল প্রাচীন ভারতীয় আইনশাস্ত্র এবং যজ্ঞ পরিচালনার প্রধান দিকনির্দেশিকা। প্রধান চারটি বিধির রূপ হলো: উৎপত্তিবিধি, বিনিয়োগবিধি, অধিকারবিধি এবং প্রয়োগবিধি (D’Sa, 1980)।

প্রথমটি হলো উৎপত্তিবিধি (originative injunction)। এই বিধিটি কোনো একটি বিশেষ কর্মের সাধারণ পরিচয় মানুষের সামনে তুলে ধরে। যেমন বলা হলো – ‘অগ্নিহোত্র জুহোতি’ বা অগ্নিহোত্র যজ্ঞ সম্পাদন করবে। এই বাক্যটি কোনো নির্দিষ্ট নিয়মকানুন বলে না, কেবল কাজটি যে করতে হবে সেই প্রাথমিক নির্দেশটি দেয়। দ্বিতীয়টি হলো বিনিয়োগবিধি (applicative injunction)। একটি মূল যজ্ঞ করতে গেলে সাথে আরও অনেক ছোট ছোট আনুষঙ্গিক কাজের দরকার হয়, যেগুলোকে বলা হয় অঙ্গ। বিনিয়োগবিধি নির্দেশ করে কোন প্রধান কাজের সাথে কোন ছোট উপাদানটি যুক্ত হবে। যেমন ‘দধ্না জুহোতি’ অর্থাৎ দই দিয়ে আহুতি দেবে। এখানে দই হলো অগ্নিহোত্র যজ্ঞের একটি সহায়ক অঙ্গ।

তৃতীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধিটি হলো অধিকারবিধি (qualification injunction)। সব মানুষ সব কাজের যোগ্য নয়। অধিকারবিধি নির্ধারণ করে কে কোন যজ্ঞটি করার অধিকারী এবং কে তার ফল ভোগ করবে। যেমন ‘স্বর্গকামো যজেত’ – যিনি স্বর্গের কামনা করেন, তিনিই এই যজ্ঞটি করবেন। এখানে যজ্ঞের ফলভোগী এবং কর্তার যোগ্যতা সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হলো। চতুর্থটি হলো প্রয়োগবিধি (performance injunction)। এটি হলো আচারের সময়ক্রম ও ধারাবাহিকতার নির্দেশিকা। যজ্ঞের কোন কাজের পর কোন কাজটি করতে হবে, কোনটা আগে হবে আর কোনটা পরে হবে, তার যে সুনির্দিষ্ট ক্রম, তা নির্ধারিত হয় প্রয়োগবিধির মাধ্যমে (Freschi, 2012)।

এর বাইরেও বিধির আরও কিছু সূক্ষ্ম শ্রেণিভাগ রয়েছে। যেমন অপূর্ববিধি (primary injunction), যা এমন কোনো কাজের নির্দেশ দেয় যা মানুষ অন্য কোনো লৌকিক উপায়ে জানতে পারত না। যেমন যজ্ঞের মাধ্যমে স্বর্গলাভ – এটি মানুষ কেবল বেদের নির্দেশ থেকেই জানতে পারে। দ্বিতীয়টি হলো নিয়মবিধি (restrictive injunction)। মানুষ যখন কোনো কাজ অনেক উপায়ে করতে পারে, তখন নিয়মবিধি একটি নির্দিষ্ট উপায়কে বাধ্যতামূলক করে দেয়। যেমন ধান থেকে চাল বের করার জন্য হাত দিয়ে খোসা ছাড়ানো যায় আবার মুষল দিয়ে পেষণও করা যায়; নিয়মবিধি বলে দিল যজ্ঞের জন্য ‘মুষল দিয়েই ধান ভানতে হবে’। আর তৃতীয়টি হলো পরিসংখ্যাবিধি (exclusionary injunction), যা অন্য সমস্ত পথকে বাদ দিয়ে একটি পথকে নির্ধারণ করে।

এই কাঠামোর মাধ্যমে জৈমিনি বৈদিক আচারের আরেকটি বড় দার্শনিক সমস্যার সমাধান করেছিলেন। যজ্ঞের আহুতি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়, যজ্ঞের অনুষ্ঠানও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। তাহলে দশ বছর পর বা মৃত্যুর পর সেই যজ্ঞের ফল মানুষ কীভাবে পাবে? এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য জৈমিনি একটি অদৃশ্য শক্তির কল্পনা করেছিলেন, যার নাম অপূর্ব (unseen potency / apūrva) (Halbfass, 1991)। বিধিবাক্য অনুযায়ী যজ্ঞ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই কর্তার আত্মায় এই অপূর্ব নামের এক অদৃশ্য শক্তি জন্ম নেয়। কর্মটি ধ্বংস হয়ে গেলেও তার এই অদৃশ্য শক্তিটি টিকে থাকে এবং সঠিক সময়ে কর্তার জন্য কাঙ্ক্ষিত ফলটি উৎপাদন করে। বিধিবাক্য কেবল তাৎক্ষণিক কাজ করায় না, তা এক অদৃশ্য কার্যকারণ শৃঙ্খলকেও সচল করে তোলে।

অর্থোডক্সির রাজনীতি ও ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ (Politics of Orthodoxy and Institutional Control of Language): মোহমুক্তি ও মতাদর্শিক বিশ্লেষণ

কোনো ঐতিহাসিক বা দার্শনিক পাঠ সম্পূর্ণ হতে পারে না যদি না সেই চিন্তার পেছনের সামাজিক অবস্থান এবং ক্ষমতার বিন্যাসটিকে উন্মুক্ত করা যায়। জৈমিনির এই কঠোর, নিখুঁত এবং যুক্তিপূর্ণ ভাষাতত্ত্ব প্রাচীন ভারতে নিছক অ্যাকাডেমিক চর্চা ছিল না। ঐতিহাসিক শেলডন পোলক (Sheldon Pollock) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মীমাংসা দর্শন ছিল আসলে বৈদিক অর্থোডক্সি বা সনাতন সামাজিক শৃঙ্খলার আত্মরক্ষার এক প্রধান বৌদ্ধিক ঢাল (Pollock, 2005)। যে যুগে জৈমিনি তার সূত্রগুলো রচনা করছিলেন, সেই যুগে বৌদ্ধ, জৈন এবং লোকায়তিক চার্বাকদের প্রবল যুক্তির আঘাতে বৈদিক যাগযজ্ঞের বিশ্বাস টালমাটাল হয়ে পড়েছিল। অবৈদিক চিন্তাবিদরা প্রশ্ন তুলছিলেন – এই যজ্ঞের ভিত্তি কী? কেন পশু বলি দেওয়া হবে? ঈশ্বর কোথায়?

এই সমস্ত বিরোধীদের মুখ বন্ধ করার জন্যই জৈমিনি এক অসাধারণ মতাদর্শিক কৌশল গ্রহণ করেছিলেন। বিরোধীরা ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছিল; জৈমিনি ঈশ্বরকেই সমীকরণ থেকে বাদ দিয়ে দিলেন। বিরোধীরা মানুষের তৈরি শাস্ত্রের ভুল নিয়ে কথা বলছিল; জৈমিনি বেদকে অপৌরুষেয় বা মানুষের ঊর্ধ্বে ঘোষণা করে টেক্সটটিকে সমালোচনার বাইরে নিয়ে গেলেন। যদি টেক্সটের কোনো লেখকই না থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে কোনো পক্ষপাত বা ভুলের অভিযোগ তোলা অসম্ভব। এভাবে তিনি বৈদিক বিধিবাক্যগুলোকে এক ধরনের পবিত্র আইনি শৃঙ্খলে পরিণত করলেন, যাকে কোনোভাবেই যুক্তি বা প্রশ্ন দিয়ে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না।

একই সাথে এই বিধিবাক্যের অধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে ছিল নির্মম সামাজিক রাজনীতি। অধিকারবিধির মাধ্যমে কারা যজ্ঞ করার অধিকারী আর কারা অধিকারী নয়, তা কঠোরভাবে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কেবল উচ্চ তিনটি বর্ণের পুরুষদের এই যজ্ঞ সম্পাদনের পূর্ণ অধিকার দেওয়া হয়েছিল। শূদ্র এবং নারীদের জটিল শ্রৌতযজ্ঞের স্বাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। এমনকি যদি কোনো নারী বা নিম্নবর্গের মানুষ যজ্ঞের মন্ত্র উচ্চারণ করতে চাইত, তবে বিধিবাক্যের লঙ্ঘন হিসেবে তাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করা হতো। ফলে আপাতদৃষ্টিতে যে ভাষাতত্ত্বকে অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও ব্যাকরণগত নিয়ম মনে হয়, তার গভীরে কাজ করছিল একটি পিতৃতান্ত্রিক ও বর্ণাশ্রমভিত্তিক সমাজ কাঠামোর স্বার্থ রক্ষা করার তাগিদ।

তবুও একজন ধর্মনিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ গবেষকের দৃষ্টিতে জৈমিনির পাণ্ডিত্যের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। তিনি অন্ধ অন্ধবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে কোনো মতবাদ চাপিয়ে দেননি; তিনি লড়াই করেছিলেন বিশুদ্ধ যুক্তি, শব্দার্থবিজ্ঞান এবং প্রায়োগিক ব্যাকরণের সাহায্যে। আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক আইন ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রেও জৈমিনির প্রস্তাবিত অনেক নিয়ম আজ পর্যন্ত ভারতীয় বিচারালয়গুলোতে প্রাসঙ্গিক হিসেবে বিবেচিত হয়। ভাষার ক্রিয়াত্মক শক্তি, কর্মের জন্য মানুষের প্রেরণাবোধ এবং বাক্যের ভেতরের কার্যকারিতাকে তিনি যেভাবে অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে ফেলে পরীক্ষা করেছিলেন, তা বিশ্ব ভাষাদর্শনের এক অসাধারণ কীর্তি। জৈমিনিকে বোঝার অর্থ হলো প্রাচীন সমাজের ক্ষমতার ব্যাকরণকে বোঝা এবং একই সাথে ভাষা কীভাবে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে তার গভীর রহস্যটি উপলব্ধি করা।

জৈমিনি ও বাক্যের শ্রেণিবিন্যাস (Jaimini and Classification of Vedic Statements): বিধি, মন্ত্র, নামধেয় ও অর্থবাদ

বৈদিক বাক্যের বর্গীকরণ ও হার্মেনিউটিক প্রয়োজনীয়তা (Taxonomy of Vedic Statements and Hermeneutic Necessity): বিশৃঙ্খলা থেকে শৃঙ্খলা

একটি প্রাচীন টেক্সটের বিশালতার ভেতর যখন কোনো সুসংগত রূপরেখা খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন পাঠকের পক্ষে পথ হারিয়ে ফেলা খুব স্বাভাবিক। বৈদিক সংহিতা এবং ব্রাহ্মণ সাহিত্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে রয়েছে হাজার হাজার চরণ। কোথাও যুদ্ধের বর্ণনা, কোথাও দেবতাদের উদ্দেশে নিবেদিত গান, কোথাও ঘোড়া ও গাভীর দীর্ঘ প্রশংসা, আবার কোথাও আগুন জ্বালানোর বা ছাগল কাটার অত্যন্ত খুঁটিনাটি নির্দেশ। এই বিশাল পাঠের সামনে দাঁড়িয়ে যেকোনো চিন্তাশীল মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে – এই বৈচিত্র্যময় ভাষার আসল উদ্দেশ্য কী? প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিক জৈমিনি (Jaimini) তার মীমাংসাসূত্র (Mīmāṃsāsūtra) গ্রন্থে এই বিশৃঙ্খল পাঠের ভেতরে এক কঠোর যৌক্তিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন (Verpoorten, 1987)। তিনি দেখান যে, আপাতদৃষ্টিতে এলোমেলো মনে হলেও বৈদিক ভাষার প্রতিটি বাক্যের একটি নির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনমূলক ভূমিকা রয়েছে।

জৈমিনির হার্মেনিউটিক প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দু ছিল একটি মূল নীতি – বেদের কোনো বাক্যই অর্থহীন হতে পারে না। মীমাংসা শাস্ত্রে এই নীতিকে বলা হয় ‘অনর্থক্য পরিহার’ বা নিরর্থকতা পরিহারের নীতি। যদি একটি একক শব্দকেও অপব্যয় বা অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়, তবে সমগ্র টেক্সটের যে স্বতঃপ্রামাণ্য চরিত্র, তা ক্ষুণ্ন হতে বাধ্য। অতএব একজন ব্যাখ্যাকারকের প্রধান কাজ হলো এমন একটি শ্রেণিবিন্যাস বা ট্যাক্সোনমি তৈরি করা, যার মাধ্যমে টেক্সটের প্রতিটি বাক্যকে তার সঠিক জায়গায় স্থাপন করা যায়। গবেষক জি. ভি. দেবাস্থলী (G. V. Devasthali) প্রাচীন ভারতের বাক্যতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, জৈমিনির মীমাংসা কোনো ভক্তিমূলক ধর্মতত্ত্ব ছিল না; এটা ছিল নিখাদ একটি বাক্যশাস্ত্র বা বাক্যতত্ত্ব (vākya-śāstra) (Devasthali, 1959)। এই শাস্ত্রের উদ্দেশ্য ছিল শব্দের সাথে বাক্যের এবং বাক্যের সাথে মানুষের বাস্তব কর্মের সম্পর্কটি বৈজ্ঞানিক সূক্ষ্মতায় বিচার করা।

এই কাজের জন্য জৈমিনি এবং তার পরবর্তী মীমাংসকরা সমগ্র বৈদিক বয়ানকে পাঁচটি প্রধান বর্গে বিভক্ত করেছেন। এই বিভাজনকে বলা হয় পঞ্চবিধ বেদবাক্য (fivefold Vedic discourse)। এগুলো হলো: বিধি (সরাসরি নির্দেশক বাক্য), মন্ত্র (স্মৃতিকে জাগ্রত করার বাক্য), নামধেয় (আচারের সুনির্দিষ্ট নাম), নিষেধ (যে বাক্য মানুষকে কোনো কাজ থেকে নিবৃত্ত করে), এবং অর্থবাদ (প্রশংসা বা নিন্দামূলক বর্ণনামূলক বাক্য) (Garge, 1952)। পরবর্তী তাত্ত্বিকরা নিষেধকে অনেক সময় বিধিরই এক বিপরীত রূপ হিসেবে দেখে পুরো কাঠামোটিকে চারটি প্রধান ভাগে আলোচনা করেছেন। এই বর্গীকরণের বিশেষত্ব হলো, এখানে কেবল ভাষার রূপ বা শৈলী দেখা হয়নি; বরং একটি বাক্য মানুষের বাস্তব আচার পরিচালনায় কী ভূমিকা পালন করছে, সেই প্রায়োগিক উপযোগিতাকেই শ্রেণিবিন্যাসের মূল মাপকাঠি বানানো হয়েছে।

জৈমিনির এই শ্রেণিবিন্যাস প্রাচীন বিশ্বের আইনি ব্যাখ্যাশাস্ত্রের ক্ষেত্রে এক মাইলফলক। আধুনিক যুগে কোনো দেশের সংবিধান বা দেওয়ানি আইন পড়তে গেলে যেভাবে প্রতিটি ধারার সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা ও পরিধি নির্ধারণ করতে হয়, জৈমিনি ঠিক সেই কাজটি করেছিলেন বৈদিক টেক্সটকে একটি মহাজাগতিক আইনি নথি হিসেবে ধরে নিয়ে। আইনশাস্ত্রে যেমন কোনো অনুচ্ছেদকে স্রেফ আবেগপূর্ণ সাহিত্য মনে করার সুযোগ নেই, প্রতিটি অনুচ্ছেদ কোনো না কোনো পক্ষের অধিকার, কর্তব্য বা সীমানা নির্ধারণ করে, বৈদিক বাক্যের ক্ষেত্রেও তিনি এই কঠোর নিয়মানুবর্তিতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি বৈদিক সাহিত্যের জটিল অরণ্যকে একটি সুশৃঙ্খল এবং ব্যবহারযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক বিধিমালার রূপ দিয়েছিল।

বিধিবাক্য ও নিষেধবাক্য (Injunctive and Prohibitive Statements): আদেশ ও নিবৃত্তির দ্বৈত রূপ

মীমাংসা দর্শনে সমস্ত বৈদিক বাক্যের কেন্দ্রীয় শাসক বা মেরুদণ্ড হলো বিধিবাক্য (injunction / vidhi)। বিধি হলো সেই অনুশাসন, যা মানুষকে এমন কোনো কাজের নির্দেশ দেয় যা মানুষ নিজের স্বাভাবিক বুদ্ধি বা অভিজ্ঞতা দিয়ে জানতে পারত না। যেমন ‘স্বর্গকামনায় যজ্ঞ করবে’ বা ‘অগ্নিহোত্র যজ্ঞ করবে’। এই বাক্যগুলো মানুষকে সরাসরি কর্মে প্ররোচিত করে। বিধি মানুষের ইচ্ছার ওপর কোনো স্বাধীনতা ছেড়ে দেয় না; এটা এক ধরনের আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি করে। জৈমিনির মতে, বিধিবাক্য না থাকলে সমগ্র বেদের কোনো প্রায়োগিক মূল্যই অবশিষ্ট থাকত না। যজ্ঞের প্রতিটি খুঁটিনাটি পদক্ষেপ, কোনটা আগে হবে আর কোনটা পরে হবে, তার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব থাকে এই বিধির হাতেই।

বিধির বিপরীতে আরেকটি সমান্তরাল এবং সমান শক্তিশালী বর্গ হলো নিষেধবাক্য (prohibition / niṣedha)। বিধি যেখানে মানুষকে কোনো কাজ করার জন্য এগিয়ে দেয়, নিষেধ সেখানে মানুষকে কোনো ক্ষতিকর বা অবাঞ্ছিত কাজ থেকে ফিরিয়ে আনে। মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি অনেক সময় তাকে এমন কাজের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে যা সমাজের বা যজ্ঞের শৃঙ্খলার পরিপন্থী। নিষেধবাক্য সেই স্বাভাবিক প্রবৃত্তির লাগাম টেনে ধরে। মীমাংসার বিখ্যাত একটি নিষেধের উদাহরণ হলো – ‘ন কলঞ্জং ভক্ষয়েৎ’, অর্থাৎ কলঞ্জ ভক্ষণ করবে না (Kataoka, 2011)। কলঞ্জ শব্দটি দিয়ে প্রাচীন ভাষ্যকাররা বিষাক্ত তিরে বিদ্ধ কোনো পশুর মাংস, বিষাক্ত ভেষজ বা নেশাজাতীয় নিষিদ্ধ খাদ্যকে বুঝিয়েছেন। মানুষ ক্ষুধার তাড়নায় বা স্বাদের লোভে যা খুশি তা খেতে পারে; কিন্তু এই নিষেধবাক্য মানুষের চেতনায় এক নৈতিক ও শারীরিক সতর্কবার্তা জারি করে।

এখানে মীমাংসকরা নিষেধবাক্যের ব্যাকরণগত কার্যপদ্ধতি নিয়ে এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিতর্ক তুলে ধরেছেন। নিষেধের ভেতর যে ‘ন’ বা না-সূচক শব্দটি থাকে, তা কার সাথে যুক্ত হয়? এটি কি ধাতুর সাথে যুক্ত হয়ে কাজের নিষেধ বোঝায়, নাকি বিশেষ্যের সাথে যুক্ত হয়ে বিকল্প কোনো বস্তুকে নির্দেশ করে? মীমাংসা নিয়ম অনুযায়ী, খাঁটি নিষেধ হলো তা-ই, যা সরাসরি মূল ক্রিয়াপদটিকে থামিয়ে দেয়, যাকে বলা হয় নিবৃত্তি (cessation from action)। কিন্তু যদি শব্দটি বিশেষ্যের সাথে যুক্ত হয়, তখন তাকে খাঁটি নিষেধ বলা হয় না; তখন তাকে বলা হয় পর্যুদাস (exclusionary alternative / paryudāsa) (Sarkar, 1909)। যেমন ‘দীক্ষিত ব্যক্তি অমাবস্যা ভিন্ন অন্য দিনে দান করবে না’। এখানে দান করাকে পুরোপুরি নিষেধ করা হচ্ছে না, কেবল অমাবস্যার দিনটিকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।

এই যে নিষেধ ও পর্যুদাসের পার্থক্য, এটা প্রাচীন ভারতীয় আইনশাস্ত্রে অপরাধ এবং প্রতিষেধকের বিচার করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। নিষেধ কোনো ব্যক্তির সামনে এক অলঙ্ঘনীয় দেওয়াল তুলে দেয়। বিধিবাক্য পালন না করলে মানুষ কাঙ্ক্ষিত ফল থেকে বঞ্চিত হয়, কিন্তু নিষেধবাক্য লঙ্ঘন করলে মানুষ পাপ বা ‘প্রত্যবায়’-এর শিকার হয়। বিধির আদেশ এবং নিষেধের বারণ – এই দুইয়ের সমন্বয়ে গঠিত হয় মানুষের সামাজিক ও আচারিক শৃঙ্খলার সীমারেখা। জৈমিনির এই বিশ্লেষণ দেখায় যে, প্রাচীন সমাজের আচারিক বিধিনিষেধ কোনো অন্ধ সংস্কার ছিল না, বরং তা ছিল ব্যাকরণের নিয়ম দিয়ে মানুষকে একটি সুনির্দিষ্ট আচরণবিধির মধ্যে বেঁধে রাখার এক নিখুঁত প্রক্রিয়া।

মন্ত্রের স্মারক চরিত্র (The Mnemonic Character of Mantras): ক্রিয়ার আলোকবর্তিকা

সাধারণ মানুষের ধারণায় ‘মন্ত্র’ শব্দটি এক ধরনের অতিন্দ্রীয় বা অলৌকিক শক্তির ছোঁয়া বহন করে। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে মন্ত্রের ভেতর কোনো গোপন জাদু লুকানো আছে, যা উচ্চারণ করলেই অলৌকিক ঘটনা ঘটে যাবে। কিন্তু আচার্য জৈমিনি মন্ত্রের এই মরমীবাদী বা জাদুকরী ব্যাখ্যাকে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে দিয়েছিলেন। তিনি তার সূত্রে দেখান যে, মন্ত্র কোনো জাদুবাস্তবতার বস্তু নয়; মন্ত্র হলো যজ্ঞের ক্রিয়া পরিচালনার এক ব্যবহারিক ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়ক। মীমাংসার পরিভাষায় মন্ত্রের প্রধান কাজ হলো স্মারকত্ব (mnemonic reminder / smārakatva), অর্থাৎ আচারের সময় করণীয় কাজটিকে স্মৃতিতে জাগিয়ে তোলা (Devasthali, 1959)।

যজ্ঞের সময় পুরোহিতকে একের পর এক দ্রুত এবং নিখুঁত কাজ করতে হয়। একটি উপাদান পাত্রে ঢালা, আগুনের নির্দিষ্ট শিখায় আহুতি দেওয়া, নির্দিষ্ট ঘাস ছেঁড়া – এই প্রতিটি কাজের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় নিয়ম। কোনো একটি কাজ করার সময় পুরোহিতের মন যেন অন্যমনস্ক না হয়ে যায়, তিনি যেন ভুলে অন্য কোনো দেবতার নাম উচ্চারণ না করেন বা ভুল পাত্র না ধরেন, সেই জন্য ঠিক কাজের মুহূর্তটিতে একটি নির্দিষ্ট মন্ত্র উচ্চারণ করতে হয়। জৈমিনির মতে, মন্ত্রের কাজ হলো কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট দেবতা, দ্রব্য এবং কর্মের রূপটিকে উপস্থিত মানুষের চেতনায় উদ্ভাসিত করে তোলা। মন্ত্র তাই কোনো নতুন কাজ তৈরি করে না; বিধি যে কাজটি করতে বলেছে, মন্ত্র সেই কাজটির বাস্তব চিত্রকে মনের পর্দায় স্পষ্ট করে দেয়।

এখানে একটি গভীর দার্শনিক প্রশ্ন উঠেছিল – যদি মন্ত্র কেবল কাজের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই ব্যবহৃত হয়, তবে কি বৈদিক মন্ত্রের বদলে কোনো সাধারণ সংস্কৃত বা প্রাকৃত ভাষায় সেই কথাটি বললেই চলত না? যদি যজ্ঞের ঘাস কাটার সময় পুরোহিত নিজের ভাষায় বলতেন ‘আমি ঘাস কাটছি’, তবে কি কাজ হতো না? জৈমিনি এই প্রশ্নের জবাবে এক কঠোর রক্ষণশীল ভাষাতাত্ত্বিক অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি বলেন যে, মন্ত্রের শব্দের গঠন কোনো মানুষের ইচ্ছামাফিক পরিবর্তন করা যাবে না। কাজের কথা স্মৃতিতে জাগিয়ে তোলার পাশাপাশি মন্ত্রের নির্দিষ্ট শব্দবন্ধটির নিজস্ব একটি অলঙ্ঘনীয় নিয়ম রয়েছে, যাকে বলা হয় অদৃষ্ট ফল (invisible potency) (Garge, 1952)। সাধারণ লৌকিক বাক্য দিয়ে তথ্য জানানো যেতে পারে, কিন্তু বৈদিক শব্দগুলোর যে সুনির্দিষ্ট বিন্যাস, কেবল সেই বিন্যাসের মধ্য দিয়েই যজ্ঞের চূড়ান্ত উপযোগিতা বাস্তবায়িত হয়।

এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে জৈমিনি বৈদিক কবিদের রচিত হাজার হাজার আবেগময় স্তুতিগানকে এক বিশুদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক দলিলে রূপান্তর করেছিলেন। ঋগ্বেদের কবিরা যখন ইন্দ্র বা অগ্নির বন্দনায় উদ্বেল হয়ে গভীর অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলেন, জৈমিনির যজ্ঞশালার টেবিলে এসে সেই মহাকাব্যিক কবিতাগুলো পরিণত হলো যজ্ঞের বাতি জ্বালানো বা ঘি ঢালার সঙ্কেতবাক্যে। এটি সাহিত্যের দিক থেকে এক বিরাট রূপান্তর। সাহিত্য যেখানে পাঠকের কল্পনাকে অসীম দিগন্তে মুক্তি দিতে চায়, জৈমিনির হার্মেনিউটিক্স সেখানে ভাষাকে একটি নির্দিষ্ট প্রায়োগিক সীমানার ভেতর শক্ত করে বেঁধে ফেলে। মন্ত্র হয়ে ওঠে এক অত্যন্ত কঠোর এবং নির্ভুল সংকেত ব্যবস্থা, যা যজ্ঞের জটিল যন্ত্রটিকে কোনো বিচ্যুতি ছাড়াই সচল রাখে।

নামধেয় ও নামকরণের যুক্তি (Nāmadheya and the Logic of Naming): পারিভাষিক স্পষ্টতা

বৈদিক টেক্সটের আরেকটি জটিল অংশের নাম হলো নামধেয় (proper names / nomenclature)। নামধেয় মানে হলো কোনো যজ্ঞ বা আচারের নিজস্ব নাম। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে কোনো কিছুর নাম বোঝা এমন কী কঠিন কাজ! কিন্তু প্রাচীন সংস্কৃত বাক্যের কাঠামো এতটাই নমনীয় এবং বহু অর্থযুক্ত ছিল যে একটি শব্দ কোনো আচারের নাম, নাকি সেই আচারের কোনো সহায়ক গুণ বা দ্রব্যের বর্ণনা – তা বোঝা বিরাট বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়াত। জৈমিনি তার গ্রন্থে দেখান যে, শব্দের পরিচয় সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে না পারলে সমগ্র বাক্যের অর্থ বিকৃত হয়ে যেতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে একটি বিখ্যাত বৈদিক বাক্য উল্লেখ করা যায় – ‘উদ্ভিদা যজেত পশুকামঃ’, অর্থাৎ যিনি পশু কামনা করেন তিনি ‘উদ্ভিৎ’ দ্বারা যজ্ঞ করবেন। এখানে ‘উদ্ভিৎ’ শব্দটির অর্থ কী? আক্ষরিক অর্থে উদ্ভিৎ মানে যা মাটি চিরে ওপরে ওঠে, যেমন কোনো গাছ বা অঙ্কুর। তাহলে কি যজমান কোনো গাছ বা লতাপাতা নিয়ে যজ্ঞ করবেন? নাকি ‘উদ্ভিৎ’ হলো সেই যজ্ঞটিরই একটি বিশেষ নাম? জৈমিনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম যুক্তির সাহায্যে প্রমাণ করেন যে উদ্ভিৎ এখানে কোনো দ্রব্য বা গুণ নয়; এটা হলো সেই বিশেষ যজ্ঞটির নিজস্ব নাম বা নামধেয় (Rao, 1998)। কারণ যদি একে কোনো দ্রব্য ধরা হয়, তবে বাক্যের ভেতরে একাধিক অর্থ চাপাতে গিয়ে বাক্যটি ভেঙে যায়, যাকে মীমাংসা ভাষায় বলা হয় বাক্যভেদ (syntactical split / vākyabheda)।

একটি শব্দকে নামধেয় হিসেবে শনাক্ত করার জন্য জৈমিনি চারটি অত্যন্ত কঠোর ভাষাতাত্ত্বিক যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন। প্রথমটি হলো মত্বর্থলক্ষণার ভয় (avoidance of possessive indication / matvartha-lakṣaṇā)। যদি কোনো শব্দকে গুণবাচক বিশেষণ ধরা হয়, তবে ধরে নিতে হবে যে যজ্ঞটির সেই গুণটি ‘আছে’ – এই পরোক্ষ অর্থ কল্পনা করতে গিয়ে ভাষার স্বাভাবিক শক্তি নষ্ট হয়। দ্বিতীয়টি হলো বাক্যভেদের ভয়, অর্থাৎ একটি বাক্যের ভেতর একই সাথে কাজের নির্দেশ এবং দ্রব্যের নির্দেশ কল্পনা করলে বাক্য তার একমুখী শক্তি হারিয়ে ফেলে। তৃতীয়টি হলো শাস্ত্রে অন্য কোনো জায়গায় সেই নামটি আগেই স্বীকৃত থাকা। আর চতুর্থটি হলো সাদৃশ্যের সম্পর্ক (Sarkar, 1909)। যেমন ‘শ্যেনেন অভিচরন যজেত’ – বাজপাখির মতো ক্ষিপ্র গতিতে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সাদৃশ্য থেকে যজ্ঞটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘শ্যেনযাগ’। এখানে কোনো বাস্তব বাজপাখিকে বলি দেওয়া উদ্দেশ্য নয়, যজ্ঞের বিধ্বংসী চরিত্র বোঝানোর জন্য এটি একটি নাম মাত্র।

আইন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এই নামধেয়র ভূমিকা অপরিসীম। আধুনিক সংবিধানে যেমন কোনো আইনের শিরোনাম বা পরিভাষা যদি বিভ্রান্তিকর হয়, তবে আদালতের বিচারকরা আইনের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করে তার পারিভাষিক পরিচয় নিশ্চিত করেন, জৈমিনি হাজার বছর আগে ঠিক সেই হার্মেনিউটিক্স প্রয়োগ করেছিলেন। নামধেয় বাক্যের ভেতরে কোনো অতিরিক্ত দায় বা শর্ত যোগ করে না; এটা কেবল চিহ্নিত করে যে নির্দেশটি কোন নির্দিষ্ট কর্মের জন্য প্রযোজ্য। এর ফলে যজ্ঞের পরিচালকরা নিশ্চিত হতে পারতেন যে তারা কোন বিধানটি পালন করছেন এবং কোন সীমানার মধ্যে তাদের কাজ করতে হবে। নামধেয় তাই ভাষার অতিরিক্ত জটিলতা দূর করে টেক্সটের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।

অর্থবাদ ও একবাক্যতার সূত্র (Arthavāda and the Principle of Syntactical Unity): রূপক থেকে সমর্থনে

সমগ্র বৈদিক সাহিত্যের সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে পৌরাণিক আখ্যান, দেবতাদের জন্মকাহিনী, অতিপ্রাকৃতিক ঘটনার রূপক এবং নানা ধরনের স্তুতিবাক্য। মীমাংসা দর্শনে এই বিপুল সাহিত্যিক উপাদানকে এক ছাতার নিচে রাখা হয়েছে, যার নাম অর্থবাদ (eulogistic and corroborative discourse / arthavāda)। জৈমিনির সামনে এই অংশগুলো নিয়ে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছিল। যেহেতু তিনি আগেই নীতি নিয়েছিলেন যে বেদ কেবল কাজের নির্দেশ দেয়, তাহলে এই দীর্ঘ গল্পগুলোর কাজ কী? এগুলো তো কোনো আদেশ দিচ্ছে না। প্রাচীন যুক্তিবাদী চিন্তাবিদদের মধ্যে কেউ কেউ, যেমন পূর্বসূরি আচার্য কৌৎস, দাবি করেছিলেন যে বৈদিক মন্ত্র ও অর্থবাদগুলোর কোনো অর্থই নেই, এগুলো নিছক অর্থহীন শব্দের উচ্চারণ।

জৈমিনি এই চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করেন এবং অর্থবাদের এক বৈপ্লবিক হার্মেনিউটিক্স দাঁড় করান। তিনি বলেন, অর্থবাদের কোনো স্বাধীন বা স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থ নেই ঠিকই, কিন্তু তারা মূল বিধিবাক্যের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করে। এই প্রক্রিয়াটিকে তিনি নাম দেন একবাক্যত্ব (syntactical unity / ekavākyatā) (Kataoka, 2011)। মানুষের মন কোনো কঠোর আদেশ খুব সহজে পছন্দ করে না; মানুষ যদি কোনো কাজের পেছনে প্রশংসা বা অনুপ্রেরণা না পায়, তবে সে কাজে আলস্য দেখায়। অর্থবাদের একমাত্র কাজ হলো মূল বিধিবাক্যটির ভূয়সী প্রশংসা করা, যাকে বলা হয় ‘রোচনা’ বা রুচি উৎপাদন করা। যখন বলা হয় ‘বায়ু হলেন অতি দ্রুতগামী দেবতা’, তখন এর আসল লক্ষ্য বায়ুর ভূগোল বর্ণনা করা নয়; এর লক্ষ্য হলো যজমানকে বোঝানো যে বায়ুর উদ্দেশে নির্দেশিত কাজটি করলে দ্রুত সাফল্য পাওয়া যাবে।

মীমাংসকরা এই অর্থবাদকে তিনটি সুনির্দিষ্ট ভাগে ভাগ করেছেন: গুণবাদ (figurative statement / guṇavāda), অনুবাদ (reiterative statement / anuvāda), এবং ভূতার্থবাদ (historical or factual report / bhūtārthavāda) (Bhattacharyya, 1987)। যখন কোনো বৈদিক বাক্য মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিরোধী কথা বলে, যেমন ‘সূর্যই হলেন যূপকাষ্ঠ’ (কাঠের খুঁটি), তখন বুঝতে হবে কাঠ কখনো সূর্য হতে পারে না; অতএব রূপক অর্থে তেজস্বিতা বোঝানোর জন্য এই বাক্য বলা হয়েছে – এটা হলো গুণবাদ। আবার যখন বাক্য এমন কথা বলে যা মানুষ এমনিতেই জানে, যেমন ‘আগুন হলো শীতের প্রতিষেধক’, তখন তাকে বলা হয় অনুবাদ; কারণ এখানে নতুন কোনো সত্য বলা হচ্ছে না, পরিচিত সত্যকেই আবার উল্লেখ করা হচ্ছে। আর যে বাক্য অতীতকালের কোনো পৌরাণিক ঘটনার কথা বলে যা মানুষের অভিজ্ঞতার বিরোধীও নয় আবার প্রমাণিতও নয়, যেমন ‘দেবতারা একবার অসুরদের সাথে লড়াই করেছিলেন’, তাকে বলা হয় ভূতার্থবাদ।

এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে জৈমিনি বৈদিক মিথোলজি বা পুরাণকথাকে সম্পূর্ণভাবে আচারের একটি অধস্তন রূপ বা জনসংযোগের হাতিয়ারে পরিণত করেছিলেন। দেবতাদের বড় বড় বীরত্বগাথা আসলে মানুষের মনে যজ্ঞ করার উৎসাহ বাড়ানোর জন্য সাজানো রূপক মাত্র। রূপক ও পৌরাণিক সাহিত্যকে এভাবে কঠোর প্রায়োগিক ব্যাকরণের অধীনে নিয়ে আসা এক অভূতপূর্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সাহস। আধুনিক সাহিত্যতাত্ত্বিকরা হয়তো একে কাব্যের প্রতি অবিচার বলতে পারেন, কিন্তু প্রাচীন আচারভিত্তিক সমাজের চোখে এটি ছিল আখ্যানের বিভ্রান্তি থেকে টেক্সটকে রক্ষা করে তাকে একমুখী সামাজিক আদেশে রূপান্তর করার এক চূড়ান্ত কৌশল।

ভাষাগত অনুশাসন ও ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ (Linguistic Discipline and Institutional Power): সামাজিক মোহমুক্তি

একটি সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ এবং বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, জৈমিনির এই বাক্য শ্রেণিবিন্যাস কেবল নিছক শব্দার্থবিজ্ঞানের তত্ত্ব ছিল না। এটি ছিল প্রাচীন ভারতের সামাজিক ক্ষমতা কাঠামো এবং অর্থোডক্সিকে রক্ষা করার এক সুদৃঢ় মতাদর্শিক দুর্গ। ঐতিহাসিক ইয়োহানেস ব্রঙ্কহর্স্ট (Johannes Bronkhorst) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, উত্তর ভারতে যখন বৈদিক ধর্মের বিপরীতে বৌদ্ধ, জৈন এবং অন্যান্য শ্রমণ আন্দোলনের বিস্তার ঘটছিল, তখন বৈদিক ব্রাহ্মণ সমাজের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল তাদের শাস্ত্রের প্রতিটি বাক্যকে নিশ্ছিদ্র এবং অভ্রান্ত প্রমাণ করা (Bronkhorst, 2007)। জৈমিনির ট্যাক্সোনমি ছিল সেই আত্মরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর বৌদ্ধিক হাতিয়ার।

এই শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের নিজস্ব ব্যাখ্যা বা ভিন্নমতের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। যদি কোনো ব্যক্তি বেদের কোনো আখ্যানে অযৌক্তিকতা বা নিষ্ঠুরতা দেখতে পেত, তবে মীমাংসকরা তাকে তৎক্ষণাৎ থামিয়ে দিয়ে বলতেন – ‘এটা তো আক্ষরিক সত্য নয়, এটা একটা অর্থবাদ, এর কাজ কেবল বিধির প্রশংসা করা’। আবার কেউ যদি কোনো মন্ত্রের অর্থ বুঝতে না পেরে প্রশ্ন তুলত, তাকে বলা হতো – ‘মন্ত্রের কাজ কোনো দর্শন শেখানো নয়, মন্ত্রের কাজ কেবল যজ্ঞের ক্রিয়াটিকে মনে করিয়ে দেওয়া’। এভাবে টেক্সটের সমস্ত আপাতবিরোধী, বৈপরীত্যপূর্ণ এবং নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ অংশগুলোকে একটি বন্ধ শৃঙ্খলার ভেতরে এনে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল যে তার ওপর বাইরে থেকে কোনো আঘাত হানা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

একই সাথে এই কঠোর ভাষাতাত্ত্বিক অনুশাসন সমাজের নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির একচ্ছত্র আধিপত্যকে স্থায়ী করেছিল। বিধির নির্দেশ, নিষেধের পরোয়ানা, মন্ত্রের সঠিক উচ্চারণ এবং নামধেয়র জটিল ব্যাকরণ বোঝা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এর জন্য প্রয়োজন ছিল দীর্ঘ বছরের শাস্ত্রচর্চা এবং বিশেষ সামাজিক সুযোগ-সুবিধা। স্বাভাবিকভাবেই এই জ্ঞানের ওপর পুরোহিত শ্রেণির একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সমাজের বিশাল শ্রমজীবী অংশ – শূদ্র ও অন্ত্যজ সম্প্রদায় – এবং নারীদের এই প্রাতিষ্ঠানিক টেক্সটের অধিকার থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা হয়েছিল। ফলে আপাতদৃষ্টিতে যাকে বিশুদ্ধ বাক্যতত্ত্ব বা ব্যাকরণ মনে হয়, তার অন্তর্নিহিত ফলাফল ছিল অত্যন্ত রাজনৈতিক; তা নিশ্চিত করেছিল যে সামাজিক বিধিবিধান তৈরির ক্ষমতা কেবল একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতেই পুঞ্জীভূত থাকবে।

উপসংহারে বলা যায়, জৈমিনির এই বাক্য শ্রেণিবিন্যাসের একটি দ্বৈত ঐতিহাসিক চরিত্র রয়েছে। একদিকে তা কোনো সন্দেহ নেই যে প্রাচীন ভাষাদর্শনের এক অবিস্মরণীয় কীর্তি। ভাষা কীভাবে মানুষকে দিয়ে কাজ করায়, একটি বাক্যের সাথে আরেকটি বাক্যের সংযোগ কীভাবে ঘটে এবং ভাষার অস্পষ্টতাকে কীভাবে দূর করা যায় – এই প্রশ্নগুলোতে জৈমিনির বিশ্লেষণ আধুনিক বিশ্লেষণাত্মক দর্শনের সমকক্ষ। অন্যদিকে, এটি দেখায় যে কীভাবে একটি ক্ষমতাবান গোষ্ঠী ভাষাতত্ত্ব এবং যুক্তিবিদ্যাকে ব্যবহার করে সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং আচারিক বাধ্যবাধকতাকে চিরস্থায়ী রূপ দিতে পারে। জৈমিনিকে পাঠ করার অর্থ হলো ভাষার সেই জাদুকরী ও নির্মম ক্ষমতাটিকে উন্মোচন করা, যার মাধ্যমে শব্দ মানুষের চেতনাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে টিকে থাকার ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

শবরস্বামী ও আপাতবিরোধী পাঠ (Śabara and Apparently Conflicting Texts): প্রসঙ্গ, সামঞ্জস্য ও অর্থ নির্ণয়

ভাষ্যকার শবরস্বামী ও আপাতবিরোধের সমস্যা (The Commentator Śabarasvāmin and the Problem of Apparent Contradiction): টেক্সটের অভ্যন্তরীণ সংহতি

প্রাচীন যে কোনো বৃহৎ ধর্মগ্রন্থে পাশাপাশি এমন অনেক বাক্য চোখে পড়ে যা আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরের বিপরীত কথা বলে। কখনো একটি নির্দেশ অন্য একটি নির্দেশকে বাতিল করে দেয়, কখনো কোনো বর্ণনা সরাসরি মানুষের পঞ্চেন্দ্রিয়ের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার বিরুদ্ধে চলে যায়। বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এই সংকটটি অত্যন্ত তীব্রভাবে দেখা দিয়েছিল। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠত – যে টেক্সট নিজেকে অপৌরুষেয় বা পরম প্রামাণ্য বলে দাবি করছে, তার ভেতরে এত বৈপরীত্য কেন? আনুমানিক চতুর্থ বা পঞ্চম শতকের প্রখ্যাত মীমাংসক শবরস্বামী (Śabarasvāmin) তার গ্রন্থ শবরভাষ্য (Śabarabhāṣya)-এ এই আপাতবিরোধ নিরসনের এক পদ্ধতি গড়ে তুলেছিলেন (Jha, 1933)। তার সামনে মূল দায়িত্ব ছিল বেদের প্রতিটি আপাতবিরোধী বাক্যকে বিশ্লেষণ করে টেক্সটের ভেতরের এক নিখুঁত অভ্যন্তরীণ সংহতি রক্ষা করা।

শবরস্বামীর যুগে বৈদিক ধর্ম বড় ধরনের বৌদ্ধিক আক্রমণের মুখে পড়েছিল। বৌদ্ধ এবং চার্বাক দার্শনিকরা বৈদিক টেক্সটের স্ববিরোধী বাক্যগুলোকে তুলে ধরে প্রমাণ করতে চাইতেন যে বেদ কোনো অভ্রান্ত গ্রন্থ নয়। তাদের যুক্তি ছিল খুব সরল: যে গ্রন্থে এক জায়গায় বলা হয় ‘সূর্যোদয়ের আগে আহুতি দেবে’ আবার অন্য জায়গায় বলা হয় ‘সূর্যোদয়ের পরে আহুতি দেবে’, সেই গ্রন্থ নিশ্চিতভাবেই বিভ্রান্তিকর এবং তা কোনো ধূর্ত মানুষের রচনা (Franco, 1997)। এই ধরনের সংকটকে ভারতীয় দর্শনে বলা হয়েছে ‘ব্যাঘাত’ (vyāghāta) বা আত্মবিরোধ। শবরস্বামী এই বিরোধকে অস্বীকার না করে অত্যন্ত খোলামনে স্বীকার করে নেন। তিনি বলেন যে বিরোধ মানুষের প্রাথমিক পাঠে চোখে পড়ে ঠিকই, কিন্তু সেই বিরোধ বাস্তব নয়; তা হলো আপাতবিরোধ বা ‘আপাতবিরোধ’ (apparent conflict)।

শবরস্বামীর হার্মেনিউটিক্স দাঁড়িয়ে আছে একটি মৌলিক অনুমানের ওপর, যাকে আধুনিক আইনি দর্শনে বলা হয় সংহতির পূর্বধারণা (presumption of coherence)। প্রখ্যাত আইন দার্শনিক রোনাল্ড ডোয়ার্কিন (Ronald Dworkin) তার লজ এম্পায়ার (Law’s Empire) গ্রন্থে যেমন দেখিয়েছিলেন যে একজন বিচারককে কোনো জটিল আইন ব্যাখ্যা করার সময় ধরে নিতে হয় যে সমগ্র আইনব্যবস্থাটি একটি সামগ্রিক সততা ও সংহতির ওপর প্রতিষ্ঠিত, শবরস্বামীও বৈদিক টেক্সটকে ঠিক সেইভাবেই পাঠ করেছিলেন (Dworkin, 1986)। তিনি বললেন, যেহেতু বেদ কোনো ব্যক্তিমানুষের লেখা নয়, তাই মানুষের সাধারণ বিভ্রান্তি বা ভুল টেক্সটের ভেতর থাকতে পারে না। যদি দুটি বাক্যের মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়, তবে বুঝতে হবে আমাদের বোঝার স্তরে কোথাও ভুল হচ্ছে। ব্যাখ্যাকারকের কাজ হলো সেই ভুল দূর করে দুটি বাক্যের মধ্যে সামঞ্জস্য বা মিলনসূত্র তৈরি করা।

এই সামঞ্জস্য তৈরির প্রক্রিয়াটি কোনো অন্ধ গোঁড়ামি ছিল না; শবরস্বামী এর জন্য এক সুশৃঙ্খল প্রায়োগিক যুক্তিপদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। তিনি দেখান যে, শব্দের অর্থ কেবল অভিধানের পাতায় স্থির হয়ে থাকে না। শব্দের অর্থ নির্ধারিত হয় তার প্রয়োগের স্থান, সময় এবং সংশ্লিষ্ট আচারের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী। একটি বাক্য কখন প্রযোজ্য হবে আর কখন তার পরিধি সীমিত থাকবে, তা বের করার জন্য তিনি কতগুলো কঠোর নিয়ম তৈরি করেছিলেন। এর ফলে বৈদিক সাহিত্যের হাজার হাজার আপাতবিরোধী নির্দেশ কোনো এলোমেলো বিশৃঙ্খলা তৈরি না করে একটি সুসংহত এবং কার্যকর আইনি ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে। শবরস্বামীর এই ভাষ্য পরবর্তীকালে ভারতীয় ব্যাখ্যাশাস্ত্রের এক অলঙ্ঘনীয় নির্দেশিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

প্রমাণের তুলনামূলক শক্তি ও ষট্প্রমাণ (Relative Strength of Evidence and the Six Means of Proof): বিরোধের অগ্রাধিকার নীতি

যখন দুটি বৈদিক নির্দেশ পরস্পর মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়, তখন কোনটি বহাল থাকবে আর কোনটি বাদ যাবে? এই জটিল প্রশ্নের মীমাংসার জন্য শবরস্বামী জৈমিনির সূত্র অনুসরণ করে প্রমাণের তুলনামূলক শক্তির একটি স্তরবিন্যাস বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। মীমাংসা দর্শনে টেক্সটের অন্তর্গত সম্পর্কের ভিত্তিতে ছয়টি প্রমাণের কথা বলা হয়েছে, যাদের একত্রে বলা হয় ষট্প্রমাণ (six textual principles of application)। এই ছয়টি নীতি হলো: শ্রুতি, লিঙ্গ, বাক্য, প্রকরণ, স্থান এবং সমাখ্যা (Bhatt, 1962)। এই নীতিগুলোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো একটির চেয়ে আরেকটি ক্রমান্বয়ে দুর্বল। অর্থাৎ প্রথমটি দ্বিতীয়টির চেয়ে শক্তিশালী, দ্বিতীয়টি তৃতীয়টির চেয়ে শক্তিশালী – এভাবে পর্যায়ক্রমে অগ্রাধিকার নির্ধারিত হয়।

এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে শ্রুতি (direct textual statement)। শ্রুতি মানে হলো সরাসরি উচ্চারিত বাক্য, যেখানে কোনো অনুমান করার অবকাশ থাকে না; যেমন ‘দই দিয়ে আহুতি দেবে’। এখানে দই ব্যবহারের নির্দেশটি সরাসরি বলা হয়েছে। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে লিঙ্গ (semantic capacity / linga), যার অর্থ শব্দের অন্তর্নিহিত প্রয়োগযোগ্যতা বা শক্তি। একটি শব্দ স্বাভাবিকভাবেই যে কাজ করার সামর্থ্য রাখে, সেই সামর্থ্য দেখে তার কাজ ঠিক করা হয়। যেমন কাস্তে দিয়ে ঘাস কাটার কথা বলা হলে কাস্তের ঘাস কাটার স্বাভাবিক ক্ষমতাই হলো তার লিঙ্গ। তৃতীয় স্তরে রয়েছে বাক্য (syntactic connection), যেখানে দুটি পদ একই বাক্যের ব্যাকরণগত সম্পর্কে বাঁধা থাকে। চতুর্থ স্তরে রয়েছে প্রকরণ (ritual context), অর্থাৎ সমগ্র যজ্ঞের যে সাধারণ বাতাবরণ। পঞ্চম স্তরে রয়েছে স্থান (sequential position) বা টেক্সটের ক্রম, এবং সর্বশেষ ও সবচেয়ে দুর্বল স্তরে রয়েছে সমাখ্যা (etymological nomenclature) বা কোনো আচারের সাধারণ নাম (Kumārila Bhaṭṭa, 1985)।

শবরস্বামী এই ছয়টি নীতির সাহায্যে বিরোধ নিষ্পত্তির এক অমোঘ সূত্র প্রতিষ্ঠা করেন, যাকে বলা হয় বিরোধের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী প্রমাণের প্রাধান্য। যদি কোনো একটি বিষয়ে শ্রুতি এবং লিঙ্গের মধ্যে লড়াই বাধে, তবে শ্রুতি জয়ী হবে এবং লিঙ্গ পরাস্ত হবে। দুর্বল প্রমাণটি শক্তিশালী প্রমাণের সামনে নিজের দাবি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। মীমাংসার পরিভাষায় এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় ‘বাধ’ (sublation / bādha) (Bhatt, 1962)। বাধ মানে দুর্বল বিধানটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া নয়; এর অর্থ হলো শক্তিশালী বিধানের উপস্থিতির কারণে দুর্বল বিধানটির কার্যকারিতা সেই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে স্থগিত বা অবদমিত থাকা।

একটি বাস্তব বৈদিক উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। দর্শপূর্ণমাস যজ্ঞের একটি মন্ত্র রয়েছে যা মূলত ইন্দ্রের প্রশংসায় রচিত। কিন্তু বাক্যটি পাঠ করার সময় বলা হয়েছে ‘অগ্নিকে এই নিবেদন দেবে’। এখানে মন্ত্রের শব্দের ভেতরের ক্ষমতা বা লিঙ্গ ইন্দ্রের দিকে নির্দেশ করছে, কিন্তু সরাসরি পাঠ বা শ্রুতি অগ্নির কথা বলছে। শবরস্বামী রায় দেন যে, এখানে লিঙ্গ দুর্বল এবং শ্রুতি শক্তিশালী; ফলে মন্ত্রের শব্দের অর্থ যা-ই হোক না কেন, আহুতিটি শেষ পর্যন্ত অগ্নির উদ্দেশ্যেই যাবে (Jha, 1933)। এই অগ্রাধিকার নীতি যজ্ঞের পরিচালকদের এক সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন দিয়েছিল। ফলে শত শত পরস্পরবিরোধী মন্ত্র বা নির্দেশের ভিড়ে তারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে না পড়ে গাণিতিক নির্ভুলতায় বুঝতে পারতেন কোন নির্দেশটিকে মেনে চলতে হবে।

প্রত্যক্ষবিরোধ ও রূপকীয় সমাধান (Conflict with Perception and Figurative Solution): লক্ষণা ও গুণবাদ

সব বিরোধ কেবল টেক্সটের ভেতরের বাক্যে বাক্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; অনেক সময় বৈদিক বাক্য সরাসরি মানুষের বাস্তব পঞ্চেন্দ্রিয়ের অনুভবের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। একে বলা হয় প্রত্যক্ষবিরোধ (conflict with empirical perception)। ঋগ্বেদ ও সংহিতাগুলোতে এমন অনেক বাক্য আছে যা শুনলে যে কোনো সাধারণ মানুষ থমকে যাবে। যেমন একটি বাক্যে বলা হয়েছে – ‘পাথরগুলো কাঁদছে’ (গ্রাবাণো রুদন্তি)। অন্য একটি বাক্যে বলা হয়েছে – ‘সূর্যই হলেন যূপকাষ্ঠ’ অর্থাৎ যজ্ঞের কাঠের খুঁটি। বাস্তব জগতে মানুষ প্রতিদিন দেখে যে পাথর কখনো কাঁদে না, তার কোনো চোখ বা অশ্রু নেই। আবার কাঠের তৈরি খুঁটি আর আকাশের জ্বলন্ত সূর্য কখনো এক বস্তু হতে পারে না। এই ধরনের বাক্যের মুখোমুখি হয়ে শবরস্বামী কীভাবে সমাধান করেছিলেন?

শবরস্বামী এখানে এক বৈপ্লবিক হার্মেনিউটিক নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কোনো মিথ্যা জিনিস নয়। প্রত্যক্ষ প্রমাণ হলো সমস্ত লৌকিক জ্ঞানের ভিত্তি (Taber, 2005)। যদি কোনো পবিত্র ধর্মীয় বাক্য সরাসরি মানুষের সুস্থ ইন্দ্রিয়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিরুদ্ধে কথা বলে, তবে সেই বাক্যের আক্ষরিক অর্থ বা বাচ্যার্থ (literal meaning) কোনোভাবেই গ্রহণ করা যাবে না। যদি আক্ষরিক অর্থ ধরে বসে থাকা হয়, তবে শাস্ত্র পাগলের প্রলাপের মতো অর্থহীন হয়ে পড়বে। অতএব এই ধরনের ক্ষেত্রে বাচ্যার্থকে ত্যাগ করে পরোক্ষ বা রূপকীয় অর্থ, যাকে মীমাংসা পরিভাষায় বলা হয় লক্ষণা (figurative indication / lakṣaṇā), গ্রহণ করতে হবে।

এই রূপকীয় ব্যাখ্যাটিকে শবরস্বামী অর্থবাদের কাঠামোর মধ্যে ফেলে নাম দিয়েছেন গুণবাদ (qualitative praise / guṇavāda) (Yoshimizu, 2007)। ‘পাথর কাঁদছে’ – এই বাক্যের ভেতর পাথর দিয়ে সোমলতা পেষণ করার সময়ের যে কর্কশ শব্দ, সেই শব্দের তীব্রতা বোঝানোর জন্য কান্নার রূপক ব্যবহার করা হয়েছে। ঠিক একইভাবে, ‘সূর্যই হলেন যূপকাষ্ঠ’ বাক্যে কাঠের খুঁটিটিকে সূর্যের মতো উজ্জ্বল, পবিত্র এবং মহিমান্বিত হিসেবে প্রশংসা করাই হলো আসল উদ্দেশ্য। কাঠের খুঁটির তেজ বা সৌন্দর্য বর্ণনা করার জন্য সূর্যের উপমা টানা হয়েছে। এখানে কাঠ বাস্তবেই সূর্য হয়ে যায়নি; তাদের দুজনের মধ্যে থাকা একটি সাধারণ গুণ বা তেজস্বিতাকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

আধুনিক শব্দার্থবিজ্ঞানের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, আমেরিকান আইনবিদ লন ফুলার (Lon L. Fuller) যেমন আইনের নৈতিকতা ও ভাষার যৌক্তিক প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছিলেন যে ভাষার অন্ধ আক্ষরিকতা আইনকে ধ্বংস করে দেয়, শবরস্বামীও ঠিক সেই সত্যটি জানতেন (Fuller, 1969)। যদি আইন প্রয়োগের সময় শব্দের বাস্তব ফলাফল বিচার না করা হয়, তবে আইন অচল হয়ে পড়ে। শবরস্বামী বৈদিক ভাষার অবাস্তব দাবিগুলোকে রূপক বা অর্থবাদের চাদরে ঢেকে দিয়ে টেক্সটটিকে বাস্তব বুদ্ধিমান মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে তুলেছিলেন। এর ফলে একদিকে যেমন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মর্যাদা রক্ষা পেয়েছিল, অন্যদিকে টেক্সটের পবিত্রতাও অক্ষুণ্ণ ছিল।

বিকল্প বনাম সমুচ্চয় (Option versus Combination): সমকক্ষ বিরোধের মীমাংসা

সবচেয়ে কঠিন সংকট তৈরি হয় তখন, যখন দুটি বিরোধী বাক্য হুবহু সমান শক্তির অধিকারী হয়। অর্থাৎ যদি দুটি বাক্যই সরাসরি শ্রুতির বিধান হয়, তবে কাকে বাদ দেওয়া যাবে? যেহেতু দুটিই সমান শক্তিশালী, তাই কেউ কাউকে ‘বাধ’ বা অবদমিত করতে পারে না। যেমন একটি বৈদিক বাক্যে বলা হয়েছে – ‘উদিতে জুহোতি’ (সূর্য ওঠার পর আহুতি দেবে), আবার ঠিক সমান মর্যাদার আরেকটি বাক্যে বলা হয়েছে – ‘অনুদিতে জুহোতি’ (সূর্য ওঠার আগে আহুতি দেবে)। এই ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষ কী করবে? সে কি একই সাথে দুটো কাজ করতে পারবে? সূর্য ওঠার আগে এবং পরে একই সাথে আহুতি দেওয়া শারীরিকভাবে অসম্ভব।

এই জটিল ফাঁদ থেকে বাঁচার জন্য মীমাংসা দর্শনে হাজির করা হয় বিকল্প (option / alternative / vikalpa) ধারণাটি। শবরস্বামী দেখান যে, যখন সমকক্ষ প্রমাণের লড়াই বাঁধে এবং তাদের একত্র করা সম্ভব হয় না, তখন কর্তাকে যে কোনো একটি পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিতে হয় (Jha, 1933)। অর্থাৎ একজন যজমান চাইলে সূর্যোদয়ের আগের পথ বেছে নিতে পারেন, অথবা সূর্যোদয়ের পরের পথ বেছে নিতে পারেন। তবে মজার বিষয় হলো, শবরস্বামী এবং তার পরবর্তী মীমাংসকরা এই বিকল্পকে কোনো আদর্শ সমাধান মনে করতেন না। তারা বিকল্পকে এক ধরনের আপদকালীন ব্যবস্থা মনে করতেন। মীমাংসা শাস্ত্রে বিকল্পকে বলা হয়েছে ‘অষ্টদোষদুষ্ট’ বা আটটি মারাত্মক দোষে আক্রান্ত।

বিকল্পকে কেন দোষযুক্ত মনে করা হতো? কারণ একজন মানুষ যখন সূর্যোদয়ের পরের পথটি গ্রহণ করে, তখন সে আসলে সূর্যোদয়ের আগের বৈধ শ্রুতিবাক্যটিকে সাময়িকভাবে অগ্রাহ্য করে। আবার আগামীকাল যদি সে মত বদলে আগের পথটি নেয়, তবে সে আজকের গৃহীত পথটিকে বর্জন করে। এভাবে একই ব্যক্তি একবার একটি শাস্ত্রীয় বাক্যকে প্রামাণ্য মানছে, আবার পরক্ষণেই তাকে অকার্যকর করছে। ফলে শাস্ত্রের কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। এই কারণে শবরস্বামীর নিয়ম ছিল – যতক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব হবে, ততক্ষণ বিকল্পকে এড়িয়ে চলতে হবে। বিকল্পের বদলে যদি দুটি বাক্যকে কোনোভাবে একসাথে মিলিয়ে নেওয়া যায়, তবে তাকে বলা হয় সমুচ্চয় (combination / samuccaya)।

যদি সমুচ্চয়ও সম্ভব না হয়, তবে শবরস্বামী আরেকটি কৌশল ব্যবহার করতেন, যার নাম ব্যবস্থা (systematic allocation / vyavasthā) (Bandyopadhyay, 1988)। ব্যবস্থা মানে হলো বিরোধটিকে কোনো ব্যক্তি, স্থান বা সম্প্রদায়ের সীমানা দিয়ে ভাগ করে দেওয়া। যেমন বলা হলো, একটি নির্দিষ্ট শাখা বা বংশের মানুষ প্রথম নিয়মটি মানবে, আর অন্য শাখার মানুষ দ্বিতীয় নিয়মটি মানবে। এর ফলে কোনো নিয়মকেই সর্বজনীনভাবে বাতিল করতে হয় না; প্রতিটি নিয়মই যার যার নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বৈধ থাকে। শবরস্বামীর এই বিশ্লেষণ আধুনিক সংবিধানের বিভিন্ন ফেডারেল আইনের বিরোধ নিষ্পত্তির কৌশলের সাথে দারুণভাবে মিলে যায়। আইনের সংঘাত মেটানোর জন্য এখতিয়ার ভাগ করে দেওয়ার এই পদ্ধতি প্রাচীন ভারতীয় বিচারপদ্ধতির এক স্বতন্ত্র পদ্ধতিগত বৈশিষ্ট্য।

প্রসঙ্গ ও একবাক্যতার হার্মেনিউটিক্স (Context and the Hermeneutics of Syntactical Unity): বিচ্ছিন্নতা থেকে সামগ্রিকতায়

শবরস্বামীর ব্যাখ্যাপদ্ধতির আরেকটি বড় শক্তি হলো তার প্রসঙ্গ বা প্রকরণের ওপর কঠোর জোর দেওয়া। কোনো একটি বাক্যকে তার প্রেক্ষাপট থেকে ছিঁড়ে এনে স্বাধীনভাবে বিচার করাকে মীমাংসা দর্শনে এক বিরাট অপরাধ মনে করা হয়। যে কোনো বিরোধের মূল কারণ হলো বিচ্ছিন্ন পাঠ। একটি বাক্য কোন মূল কাজের সাথে যুক্ত হয়ে উচ্চারিত হয়েছিল, তার পূর্বাপর ইতিহাস কী, এবং সেই বাক্যের চারপাশের পরিবেশটি কী ছিল – এই সামগ্রিক চিত্রটি না দেখলে আপাতবিরোধ তৈরি হতে বাধ্য। শবরস্বামী বারংবার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, বৈদিক সাহিত্য কোনো বিচ্ছিন্ন নীতিবাক্যের সংকলন নয়; এটি হলো যজ্ঞরূপ এক বিশাল মহাকাব্যিক নাটকের সুসংহত চিত্রনাট্য।

এখানেই মীমাংসার বিখ্যাত নীতি একবাক্যত্ব (syntactical unity / ekavākyatā) আবার এক নতুন মাত্রায় হাজির হয়। শবরস্বামী তার ভাষ্যে দেখান যে, আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন বা পরস্পরবিরোধী বাক্যগুলো আসলে মূল বাক্যের সাথে একাত্ম হয়ে একটিমাত্র দীর্ঘ বাক্য বা ‘মহা-বাক্য’ তৈরি করে (Yoshimizu, 2007)। মানবদেহের সাথে তুলনা করলে বিষয়টি বোঝা সহজ হয়। শরীরের হাত, পা বা চোখ বাইরে থেকে দেখতে সম্পূর্ণ আলাদা এবং তাদের কাজও ভিন্ন। কিন্তু তারা প্রত্যেকেই পুরো দেহের জীবনধারণের মূল উদ্দেশ্যের অধীন। বৈদিক টেক্সটের শত শত ছোট ছোট স্তুতি, নিষেধ বা মন্ত্রগুলোও ঠিক তেমনই অঙ্গ হিসেবে কাজ করে; তাদের একমাত্র সার্থকতা হলো মূল যজ্ঞরূপ দেহটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া।

এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে শবরস্বামী তথাকথিত স্ববিরোধী অংশগুলোকে খুব সহজেই হজম করে নিতে পেরেছিলেন। যখন দেখা যায় কোনো অংশে একটি বিশেষ আচারের অতি প্রশংসা করা হচ্ছে আর অন্য অংশে তাকে কিছুটা খাটো করা হচ্ছে, তখন শবরস্বামী বলেন যে এটি কোনো দ্বন্দ্ব নয়। এটি হলো মানুষের মনোযোগকে কেন্দ্রীভূত করার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। যখন যে কাজটি করা হচ্ছে, তখন সেই কাজটির ওপর পুরো আস্থা স্থাপন করানোর জন্যই ক্ষণিকের জন্য অন্য কাজটিকে গৌণ হিসেবে দেখানো হয়। একে ভারতীয় অলংকার শাস্ত্রে বলা হয় ‘নহি নিন্দা ন্যায়’ – অর্থাৎ কোনো কিছুর নিন্দা করা আসল উদ্দেশ্য নয়, বরং যে কাজটি সামনে উপস্থিত রয়েছে তার প্রশংসাকে চরম সীমায় নিয়ে যাওয়াই হলো উদ্দেশ্য।

জার্মান দার্শনিক ও হার্মেনিউটিক্স তাত্ত্বিকরা পরবর্তীকালে যাকে হার্মেনিউটিক বৃত্ত (hermeneutic circle) বলে অভিহিত করেছিলেন, শবরস্বামীর এই পদ্ধতিতে সেই বৃত্তের স্পষ্ট উপস্থিতি দেখা যায়। টেক্সটের ক্ষুদ্র অংশকে বুঝতে হলে সমগ্রের প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে, আবার সমগ্রকে বুঝতে হলে তার ক্ষুদ্র প্রতিটি অংশের বিন্যাস জানতে হবে। শবরস্বামী এই দুইয়ের মধ্যে এক গতিশীল ভারসাম্য বজায় রেখেছিলেন। তিনি কোনো একটি অংশের বিভ্রান্তির জন্য পুরো টেক্সটকে ছুড়ে ফেলে দেননি, আবার সমগ্রের রক্ষার তাগিদে ক্ষুদ্র অংশটির গুরুত্বকেও খাটো করেননি। টেক্সটকে তার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করার এই ক্ষমতা প্রাচীন বিশ্বের যে কোনো ব্যাখ্যাকারকের তুলনায় শবরস্বামীকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল।

অর্থোডক্সির প্রতিরক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্ব (Defense of Orthodoxy and Institutional Stability): ক্ষমতার মোহমুক্তি

একটি সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ, ঐতিহাসিক এবং নির্মোহ পর্যালোচনায় কোনো চিন্তাবিদের দার্শনিক চাতুর্যের পাশাপাশি তার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবটিকেও নির্দ্বিধায় উন্মোচন করতে হয়। শবরস্বামী যখন এত মেধা ও যুক্তি ব্যয় করে আপাতবিরোধ দূর করছিলেন, তখন তার পেছনে একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট সামাজিক তাগিদ সক্রিয় ছিল। তিনি যে যুগে বাস করছিলেন, সেই যুগে বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থার অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছিল। সামন্ততান্ত্রিক সমাজের বিস্তার, নগরায়ণ এবং বৌদ্ধ-জৈন দর্শনের ক্রমাগত প্রভাবে বৈদিক আচারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা টালমাটাল হয়ে পড়েছিল। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে বৈদিক আচারকে বৌদ্ধিক পতন থেকে রক্ষা করার জন্যই শবরভাষ্যের আবির্ভাব ঘটেছিল।

শবরস্বামীর এই আপাতবিরোধ নিরসনের পদ্ধতি আসলে অর্থোডক্সি বা সনাতন সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য এক অপরাজেয় বৌদ্ধিক ঢাল তৈরি করেছিল। বিরোধীদের সমস্ত যুক্তিকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার এক অদ্ভুত ব্যবস্থা এর ভেতরে ছিল। বিরোধীরা যখনই বেদের কোনো ভুল, অসংগতি বা নৈতিক বিচ্যুতির দিকে আঙুল তুলত, মীমাংসকরা তৎক্ষণাৎ শবরস্বামীর নিয়মগুলো বের করে বলতেন – ‘তোমরা টেক্সট পড়তে জানো না; এটা বিরোধ নয়, এটা গুণবাদ; এটা দুর্বল প্রমাণ, এটা বাধ হয়ে গেছে; এটা একবাক্যতার অংশ’। এভাবে একটি কঠোর ও নিশ্ছিদ্র বৌদ্ধিক পরিমণ্ডল তৈরি করা হয়েছিল, যার ভেতরে বসে যে কোনো অসঙ্গতিকে সঙ্গতিপূর্ণ বলে চালিয়ে দেওয়া সম্ভব হতো। কোনো ধরনের সংস্কার বা আত্মসমালোচনার পথ এর ফলে সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল।

একই সাথে এই পদ্ধতির কারণে যজ্ঞের প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়েছিল। প্রাচীন ভারতে যজ্ঞ কেবল ধর্ম ছিল না; যজ্ঞ ছিল পুরোহিত, রাজা এবং ভূমিমালিকদের মধ্যে সম্পদ পুনর্বণ্টন এবং সামাজিক ক্ষমতা পুনরুৎপাদনের এক প্রধান প্রতিষ্ঠান। যদি যজ্ঞের বিধিমালার ভেতর স্ববিরোধিতা থেকে যেত, তবে যজ্ঞের আচার নিয়ে নিত্যদিন বিভ্রান্তি তৈরি হতো এবং এর সাথে যুক্ত বিপুল অর্থনৈতিক লেনদেন ব্যাহত হতো। শবরস্বামীর ভাষ্য পুরোহিতদের হাতে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও ব্যবহারযোগ্য নির্দেশিকা তুলে দিয়েছিল, যার ফলে যজ্ঞের আনুষ্ঠানিক প্রযুক্তিটি কোনো ঝামেলা ছাড়াই বছরের পর বছর অবিকৃত রাখা সম্ভব হয়েছিল। এর ফলে সমাজের শাসক ও সুবিধাভোগী শ্রেণির নিয়ন্ত্রণ সাধারণ মানুষের ওপর অক্ষুণ্ণ ছিল।

পরিশেষে একজন আধুনিক যুক্তিবাদী পাঠকের কাছে শবরস্বামীর মূল্য ঠিক কোথায়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার বিশ্লেষণী ক্ষমতায়। তিনি অন্ধ বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে বিরোধ চাপা দিতে চাননি; তিনি লড়াই করেছিলেন বিশুদ্ধ ভাষা, যুক্তি এবং শব্দার্থবিজ্ঞানের অস্ত্র দিয়ে। আধুনিক আইনের শিক্ষার্থী বা সাংবিধানিক ব্যাখ্যাকারকরা আজ যখন বিভিন্ন আইনের সাংঘর্ষিক ধারার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে যান, তখন তারা অজান্তেই শবরস্বামীর উদ্ভাবিত সেই অগ্রাধিকার নীতি, লক্ষণা এবং ব্যবস্থার নিয়মগুলোই ব্যবহার করেন। শবরস্বামী আমাদের দেখান যে কীভাবে একটি জটিল টেক্সটকে যুক্তির শৃঙ্খলে বেঁধে সচল রাখা যায়, আর একই সাথে তিনি আমাদের সতর্ক করেন যে কীভাবে বিশুদ্ধ যুক্তিও শেষ পর্যন্ত একটি বিশেষ সুবিধাভোগী সমাজ ব্যবস্থার অন্ধ প্রতিরক্ষার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।

কুমারিল ভট্ট ও বাক্যার্থ (Kumārila Bhaṭṭa and Sentence Meaning): অভিহিতান্বয়বাদ দিয়ে মন্ত্র বিশ্লেষণ

কুমারিল ভট্ট ও মীমাংসা দর্শনের নবদিগন্ত (Kumārila Bhaṭṭa and the New Horizon of Mīmāṃsā Philosophy): ঐতিহ্য ও বিশ্লেষণাত্মক বিস্তার

সপ্তম শতকের ভারতে যখন বৌদ্ধ দর্শনের জ্ঞানতাত্ত্বিক আক্রমণ এবং ব্যাকরণবিদদের অখণ্ড ভাষাদর্শন বৈদিক সাহিত্যের ভিত্তি নাড়িয়ে দিচ্ছিল, তখন সনাতন দর্শনের পক্ষে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন এক অসাধারণ পণ্ডিত। তার নাম কুমারিল ভট্ট (Kumārila Bhaṭṭa)। মীমাংসা দর্শনের ইতিহাসে তার আবির্ভাব এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল, যা পরবর্তীকালে তার নামানুসারে ‘ভাট্ট মীমাংসা’ নামে পরিচিত হয়। কুমারিল কোনো আপসকামী তাত্ত্বিক ছিলেন না; তিনি তার তিনটি সুবিশাল গ্রন্থ – শ্লোকবার্তিক (Ślokavārttika), তন্ত্রবার্তিক (Tantravārttika) এবং টুপটীক (Ṭupṭīkā)-এর মাধ্যমে বৈদিক ভাষার এমন এক বাস্তববাদী ও পরমাণুবাদী শব্দার্থতত্ত্ব খাড়া করেছিলেন যা তৎকালীন সমস্ত প্রতিদ্বন্দ্বী দর্শনকে ভাবিয়ে তুলেছিল (Ganeri, 2006)। তার মূল জিজ্ঞাসাটি ছিল আপাতদৃষ্টিতে সহজ কিন্তু অত্যন্ত গভীর: কতগুলো আলাদা আলাদা শব্দ কীভাবে জোড়া লেগে একটি সম্পূর্ণ বাক্যের অর্থের জন্ম দেয়?

কুমারিলের দর্শনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল এক আপসহীন দার্শনিক বাস্তববাদ বা রিয়ালিজম। বৌদ্ধ তার্কিক দিঙ্নাগ এবং ধর্মকীর্তি যখন প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন যে ভাষা কোনো বাস্তব জগতকে নির্দেশ করে না, ভাষা কেবল মানুষের কল্পনামাত্র, কুমারিল তখন দাবি করেন যে ভাষার প্রতিটি শব্দের সাথে বাস্তব জগতের এক চিরন্তন সম্পর্ক রয়েছে (Arnold, 2005)। শব্দ কোনো কাল্পনিক বুদ্বুদ নয়; শব্দের পেছনে থাকে একটি বাস্তব সার্বিক রূপ বা ‘জাতি’। মানুষ যখন ‘গাভী’ শব্দটি উচ্চারণ করে, তখন তা কেবল একটি মানসিক ধারণা তৈরি করে না, বরং তা রক্তমাংসের গাভী-জাতির বাস্তব সত্তাকে নির্দেশ করে। কুমারিল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে বহির্জগতের বাস্তবতাকে রক্ষা না করলে কোনো ভাষার পক্ষে অর্থ প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

এই বাস্তববাদী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে কুমারিল বাক্যার্থের সমস্যাটি পরীক্ষা করতে শুরু করেন। একটি বাক্যের ভেতর অনেকগুলো পদ বা শব্দ থাকে। যেমন ‘সাদা ঘোড়াটি মাঠে দৌড়াচ্ছে’। এই বাক্যের ‘সাদা’, ‘ঘোড়া’, ‘মাঠ’ এবং ‘দৌড়ানো’ – এই চারটি শব্দের প্রত্যেকের নিজস্ব অভিধানগত অর্থ রয়েছে। কিন্তু যখন বাক্যটি একসাথে উচ্চারিত হয়, তখন শ্রোতার মনে একটি অখণ্ড অর্থ তৈরি হয়। এই অখণ্ড অর্থটি কোথা থেকে এল? শব্দগুলো কি নিজেরাই এই বাক্যার্থ তৈরি করল, নাকি শব্দের অর্থগুলো বাইরে বেরিয়ে এসে নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তুলল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কুমারিল যে তত্ত্বটি প্রতিষ্ঠা করেন, তা ভারতীয় ভাষাদর্শনের ইতিহাসে অভিহিতান্বয়বাদ (Abhihitānvayavāda) নামে অমর হয়ে আছে।

কুমারিলের এই তত্ত্বটি কেবল দর্শনের বিতর্কসভায় সীমাবদ্ধ ছিল না; এর সবচেয়ে বড় প্রায়োগিক ক্ষেত্র ছিল বৈদিক মন্ত্রের বিশ্লেষণ। ঋগ্বেদ বা যজুর্বেদের প্রাচীন মন্ত্রগুলোতে পদগুলোর বিন্যাস অনেক সময় এলোমেলো মনে হয়, ব্যাকরণ থাকে প্রাচীন এবং অনেক ক্ষেত্রে বাক্যগুলো অসম্পূর্ণ শোনায়। বৌদ্ধ এবং অন্যান্য সমালোচকরা দাবি করেছিলেন যে এই মন্ত্রগুলোর কোনো অর্থ নেই, এগুলো নিছক কতগুলো অসংলগ্ন ধ্বনির সমষ্টি। কুমারিল অভিহিতান্বয়বাদের অস্ত্র দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে প্রাচীন মন্ত্রের প্রতিটি শব্দের নিজস্ব অর্থ রয়েছে এবং সেই শব্দগুলো সুনির্দিষ্ট নিয়মে যুক্ত হয়ে আচারের সাথে প্রাসঙ্গিক এক সুসংহত অর্থ তৈরি করে।

অভিহিতান্বয়বাদের মৌলিক কাঠামো (Foundational Framework of Abhihitānvayavāda): শব্দার্থ থেকে বাক্যার্থে উত্তরণ

অভিহিতান্বয়বাদ কথাটির সন্ধি ভাঙলে দুটি মূল শব্দ পাওয়া যায়: ‘অভিহিত’ এবং ‘অন্বয়’। অভিহিত শব্দের অর্থ হলো যা শব্দের প্রাথমিক শক্তি দিয়ে ব্যক্ত হয়েছে বা বলা হয়েছে, আর অন্বয় শব্দের অর্থ হলো সেই ব্যক্ত অর্থগুলোর পারস্পরিক সম্বন্ধ বা সংযোগ। সহজ ভাষায় বললে, এই মতবাদের মূল কথা হলো – বাক্যে ব্যবহৃত শব্দগুলো প্রথমে তাদের পৃথক পৃথক অর্থকে ব্যক্ত করে; তারপর সেই ব্যক্ত অর্থগুলো পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে সামগ্রিক বাক্যার্থটি উৎপাদন করে (Raja, 1963)। অর্থাৎ শব্দ সরাসরি বাক্যার্থ তৈরি করে না; শব্দ তৈরি করে শব্দার্থ, আর শব্দার্থ তৈরি করে বাক্যার্থ। এই দ্বিস্তরীয় প্রক্রিয়াই হলো কুমারিলের শব্দার্থবিজ্ঞানের প্রধান মেরুদণ্ড।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটে দুটি অত্যন্ত পরিষ্কার ধাপে। প্রথম ধাপে, যখন কোনো বাক্যের শব্দগুলো একের পর এক কানে এসে পৌঁছায়, তখন শব্দের অন্তর্নিহিত প্রাথমিক শক্তি বা অভিধা (primary denotative power / abhidhā) জাগ্রত হয়। অভিধার কাজ হলো কেবল শব্দের নিজস্ব অভিধানগত সাধারণ অর্থটি মনের ভেতর স্মৃতি হিসেবে তুলে ধরা। যেমন ‘জল’ শব্দটি শুনলে জল-জাতিবাচক সাধারণ ধারণাটি মনে আসে, কিন্তু সেই জল দিয়ে কী করতে হবে তা জানা যায় না। এই প্রথম ধাপে শব্দগুলো থাকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো; তাদের মধ্যে কোনো সংযোগ থাকে না। শব্দ তার কাজ শেষ করে তখনই বিশ্রাম নেয়। মীমাংসা পরিভাষায় একে বলা হয় ‘বিরম্যব্যাপার’ – অর্থাৎ প্রাথমিক অর্থ প্রকাশের পর শব্দের নিজস্ব ক্ষমতার পরিসমাপ্তি ঘটে।

এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপ, যা অভিহিতান্বয়বাদের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক। শব্দের উচ্চারণের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর মনের ভেতর যে আলাদা আলাদা অর্থগুলো জেগে রইল, তারা এবার নিজেদের মধ্যে অন্বয় বা সম্পর্ক তৈরি করতে শুরু করে। এই সম্পর্ক তৈরির পেছনে শব্দের কোনো ভূমিকা থাকে না; ভূমিকা থাকে শব্দার্থগুলোর নিজস্ব চাহিদার। যেমন ‘ঘোড়া’ শব্দটি যখন ‘দৌড়াচ্ছে’ শব্দটির অর্থকে নিজের পাশে পায়, তখন তারা পরস্পরের সাথে জোড়া লেগে যায়। এই যে জোড়া লাগার প্রক্রিয়া, এর ফলে যে নতুন সামগ্রিক অর্থটি জন্ম নেয়, তাকে বলা হয় বাক্যার্থ (sentence meaning / vākyārtha) (Sarma, 1994)। কুমারিলের মতে, বাক্যার্থ কোনো নতুন শব্দ দ্বারা প্রকাশিত হয় না; বাক্যার্থ হলো পূর্বব্যক্ত অর্থগুলোর পারস্পরিক সংসর্গের অনিবার্য পরিণতি।

কুমারিল এই প্রক্রিয়ার একটি চমৎকার উপমা ব্যবহার করেছিলেন। একটি পাকা বাড়ি তৈরি করার সময় রাজমিস্ত্রিরা অনেকগুলো আলাদা আলাদা ইট স্তূপ করে রাখে। প্রতিটি ইটের নিজস্ব ওজন এবং আকার আছে। যখন সিমেন্ট ও বালুর মাধ্যমে ইটগুলোকে নির্দিষ্ট শৃঙ্খলায় পরপর সাজানো হয়, তখন সেই ইটগুলো মিলেই একটি বসবাসযোগ্য ঘরের আকার ধারণ করে। ঘরে ইট ছাড়া অতিরিক্ত কোনো অলৌকিক বস্তু থাকে না, কিন্তু ইটের সঠিক বিন্যাসই ঘরের জন্ম দেয়। কুমারিলের বাক্যার্থও ঠিক তেমনই। শব্দগুলো হলো ইটের মতো, আর অন্বয় হলো সেই সিমেন্ট যা শব্দার্থগুলোকে গেঁথে একটি সুন্দর প্রাসাদের রূপ দেয়। এই পরমাণুবাদী বা সংযোজনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ভাষাকে অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য ও বাস্তবসম্মত করে তোলে।

আকাঙ্ক্ষা, যোগ্যতা ও আসত্তি (Ākāṅkṣā, Yogyatā, and Āsatti): অন্বয়ের ত্রিবিধ শর্ত

শব্দার্থগুলো চাইলেই কি যে কারও সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে? যদি কোনো ব্যক্তি বলে – ‘ঘোড়া আগুন আকাশ পাথর’ – তবে এই শব্দগুলোর প্রত্যেকেই তো আলাদা আলাদা অর্থ প্রকাশ করেছে। কিন্তু তারা মিলে কোনো বাক্য তৈরি করতে পারে না। কেন পারে না? এই প্রশ্নের উত্তরে কুমারিল ভট্ট সংস্কৃত ব্যাকরণ ও দর্শনের তিনটি অপরিহার্য শর্তকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। যে কোনো বাক্যে শব্দার্থগুলোর অন্বয় ঘটতে হলে তিনটি শর্ত পূরণ হওয়া বাধ্যতামূলক: আকাঙ্ক্ষা, যোগ্যতা এবং আসত্তি বা সন্নিধি (Dravid, 1972)। এই তিনটির একটিরও অভাব ঘটলে শব্দের অর্থগুলো কখনো জোড়া লাগবে না।

প্রথম শর্তটি হলো আকাঙ্ক্ষা (syntactic expectancy / ākāṅkṣā)। আকাঙ্ক্ষা মানে হলো একটি শব্দের অন্য একটি শব্দের জন্য ব্যাকরণগত ও মানসিক তৃষ্ণা বা অপেক্ষা। একটি বাক্য যখন শুরু হয়, তখন মানুষের মন স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী অংশটি জানার জন্য ব্যাকুল থাকে। যদি কেউ এসে কেবল বলে – ‘আনয়ন করো’ (নিয়ে এসো), তবে শ্রোতার মন তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করবে – ‘কী নিয়ে আসব?’ এই যে ক্রিয়াপদটির একটি কর্মের জন্য অপেক্ষা, এটাই হলো আকাঙ্ক্ষা। যতক্ষণ না সেই শূন্যস্থান পূরণ করার মতো কোনো শব্দ আসছে, ততক্ষণ বাক্যের অর্থ সম্পন্ন হতে পারে না। কুমারিল দেখান যে, আকাঙ্ক্ষা কেবল মানুষের মনের ইচ্ছা নয়; এটা হলো শব্দের নিজস্ব রূপের এক অপরিহার্য ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য, যা অন্য শব্দকে কাছে টেনে নেয়।

দ্বিতীয় শর্তটি হলো যোগ্যতা (semantic compatibility / yogyatā)। যোগ্যতা মানে হলো শব্দার্থগুলোর বাস্তব অর্থবোধক সামঞ্জস্য বা বিরোধহীনতা। শব্দগুলোর মধ্যে আকাঙ্ক্ষা থাকলেও যদি তাদের বাস্তব অর্থের মধ্যে কোনো মিল না থাকে, তবে বাক্য গঠিত হবে না। কুমারিলের একটি বিখ্যাত উদাহরণ হলো – ‘আগুনে সেচন করো’ (বহ্নিনা সিঞ্চতি)। এখানে সেচন করার সাথে আগুনের ব্যাকরণগত আকাঙ্ক্ষা থাকলেও যোগ্যতা নেই। কারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা সাক্ষ্য দেয় যে আগুন পোড়াতে পারে, কিন্তু তরলের মতো ভিজিয়ে দিতে বা সেচন করতে পারে না। সেচনের যোগ্যতা রয়েছে কেবল জলের। অতএব যদি কোনো বাক্য বাস্তব জগতের কার্যকারণ নিয়মের সাথে চরম বৈপরীত্য তৈরি করে, তবে সেই বাক্য তার যোগ্যতা হারায় এবং তার ভেতরের অন্বয় ভেঙে পড়ে (Tiwary, 1984)।

তৃতীয় শর্তটি হলো আসত্তি (spatio-temporal contiguity / āsatti) বা সন্নিধি। আসত্তি মানে হলো শব্দগুলোর উচ্চারণের মধ্যে স্থান ও কালের ধারাবাহিক নৈকট্য। যদি একজন মানুষ সকালে বলে ‘গাভী’, দুপুরে বলে ‘ঘাস’ আর রাতে এসে বলে ‘খাচ্ছে’, তবে এই তিনটি শব্দের আকাঙ্ক্ষা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কোনো বাক্য তৈরি হবে না। কারণ তাদের মাঝে সময়ের এত বড় ব্যবধান রয়েছে যে আগের শব্দের স্মৃতি পরের শব্দের আসার আগেই মন থেকে মুছে যায়। একটি বাক্যের অর্থ বুঝতে হলে শব্দগুলোকে কোনো দীর্ঘ বিরতি ছাড়া পরপর উচ্চারণ করতে হবে যাতে তাদের স্মৃতি মনের ভেতর একসাথে উপস্থিত থাকে। কুমারিল দেখান যে, এই তিন শর্তের সম্মিলনেই বিচ্ছিন্ন শব্দার্থগুলো এক হয়ে বাক্যার্থে রূপান্তরিত হয়।

মন্ত্রের অর্থবত্তা ও শব্দার্থের স্বাতন্ত্র্য (Meaningfulness of Mantras): কৌৎসীয় মত খণ্ডন

বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীন ঐতিহ্যে একটি বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল যা বৈদিক মন্ত্রের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলেছিল। প্রাচীন তাত্ত্বিক কৌৎস (Kautsa) দাবি করেছিলেন যে বৈদিক মন্ত্রগুলোর কোনো বাস্তব অর্থ নেই। কৌৎসের যুক্তি ছিল অত্যন্ত জোরালো: যজ্ঞে যখন মন্ত্র পড়া হয়, তখন মন্ত্রের অর্থ বোঝার জন্য কেউ বসে থাকে না; মন্ত্রের সুনির্দিষ্ট উচ্চারণই সেখানে প্রধান। তাছাড়া অনেক মন্ত্রে দেখা যায় এমন সব শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে ঘাস বা পাথরের সাথে কথা বলা হয়েছে যা স্পষ্টতই অর্থহীন। কৌৎস এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে মন্ত্র হলো নিছক ধ্বনি বা শব্দের জাদু, এর ভেতরের অর্থের কোনো মূল্য নেই।

কুমারিল ভট্ট তার তন্ত্রবার্তিক গ্রন্থে কৌৎসের এই মতকে ধূলিসাৎ করে দেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, বেদ কোনো অর্থহীন প্রলাপ নয়। যদি মন্ত্র অর্থহীন হতো, তবে বেদের একটি বিশাল অংশকে আবর্জনা হিসেবে স্বীকার করে নিতে হতো, যা অপৌরুষেয় শাস্ত্রের ক্ষেত্রে অসম্ভব (Chari, 1990)। কুমারিল দেখান যে, মানুষ যখন কোনো শব্দ উচ্চারণ করে, তখন তার স্বাভাবিক ধর্মই হলো অর্থ প্রকাশ করা। মন্ত্রের শব্দগুলোও সেই একই সংস্কৃত ভাষার শব্দ যা লৌকিক জীবনে ব্যবহৃত হয়। লৌকিক জীবনে যে শব্দের অর্থ আছে, যজ্ঞশালায় প্রবেশ করলেই সেই শব্দ অর্থহীন বোবা শব্দে পরিণত হতে পারে না।

এখানেই কুমারিল তার অভিহিতান্বয়বাদকে একটি সক্রিয় অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ করেন। তিনি বলেন, যজ্ঞে উচ্চারিত প্রতিটি বৈদিক মন্ত্রকে এই তত্ত্বের সাহায্যে ভেঙে বিশ্লেষণ করতে হবে। একটি মন্ত্রের প্রতিটি পদ প্রথমে তার স্বতন্ত্র অভিধানগত অর্থ প্রকাশ করে। তারপর আকাঙ্ক্ষা, যোগ্যতা এবং আসত্তির মাধ্যমে সেই পদগুলোর অর্থ পরস্পর যুক্ত হয়ে এমন একটি নির্দেশ তৈরি করে যা যজ্ঞের ক্রিয়াটিকে উদ্ভাসিত করে। উদাহরণস্বরূপ, দর্শপূর্ণমাস যজ্ঞের একটি মন্ত্র হলো – ‘ইষে ত্বোর্জে ত্বা’ (তোমাকে খাদ্যের জন্য এবং শক্তির জন্য প্রস্তুত করছি)। আপাতদৃষ্টিতে এখানে কোনো ক্রিয়াপদ নেই; বাক্যটি অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে। কুমারিল দেখান যে, এখানে আকাঙ্ক্ষার নিয়মে উহ্য থাকা ক্রিয়াপদ ‘ছিনত্তি’ (ছেদন করছি) যুক্ত হয়ে যায়। মন্ত্রটি তখন যজ্ঞের ডাল কাটার বাস্তব শারীরিক কাজটির সাথে অর্থপূর্ণভাবে অন্বিত হয়ে ওঠে।

কুমারিল আরও যুক্তি দেন যে, মন্ত্রের কাজ কেবল যজ্ঞের ক্রিয়া মনে করিয়ে দেওয়া নয়; মন্ত্রের অর্থবোধ যজমানের মনে এক গভীর সচেতনতা তৈরি করে। মানুষ যদি না জেনে কেবল অন্ধের মতো মন্ত্র আওড়ে যায়, তবে সেই ক্রিয়া হয়ে পড়ে নিষ্প্রাণ। শব্দের অর্থ যখন কর্তার চেতনায় ধরা দেয়, তখনই সেই যজ্ঞফল লাভের উপযোগী হয়ে ওঠে। কুমারিলের এই অটল অবস্থানের ফলে বৈদিক মন্ত্রগুলো নিছক যাজকীয় গানের মর্যাদা থেকে উন্নীত হয়ে এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রায়োগিক সাহিত্যের রূপ লাভ করে। মন্ত্রের ভাষাকে তিনি ব্যাকরণ ও যুক্তির আলোয় পরীক্ষা করে দেখান যে, প্রাচীনতম কাব্যের মধ্যেও অর্থের শৃঙ্খল সুদৃঢ়ভাবে প্রোথিত ছিল।

অভিহিতান্বয়বাদ বনাম প্রতিদ্বন্দ্বী ধারা (Abhihitānvayavāda versus Rival Schools): বাক্যস্ফোট ও অন্বিতাভিধানের বিতর্ক

কুমারিল ভট্টের অভিহিতান্বয়বাদ কোনো শূন্য ময়দানে দাঁড়িয়ে কথা বলেনি; তাকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়েছিল সেকালের দুটি প্রধান ভাষাদর্শনের সাথে। এর প্রথমটি হলো বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ ভর্তৃহরি (Bhartṛhari)-র বাক্যস্ফোটবাদ (Akhaṇḍa-vākyasphoṭavāda)। ভর্তৃহরি তার বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ বাক্যপদীয় (Vākyapadīya)-তে দাবি করেছিলেন যে বাক্যের অর্থকে কখনো ভেঙে টুকরো টুকরো করা যায় না (Houben, 1995)। ভর্তৃহরির মতে, বাক্য কোনো শব্দের সমষ্টি নয়; বাক্য হলো এক অখণ্ড, অবিভাজ্য স্ফোট বা অর্থের আকস্মিক দীপ্তি। একটি ছবিকে যেমন রঙ বা ক্যানভাসে আলাদা করা যায় না, ছবির সামগ্রিক রূপটাই প্রধান, ঠিক তেমনই বাক্যের অর্থও এক নিমেষে মানুষের মনে সম্পূর্ণভাবে জেগে ওঠে। শব্দগুলো হলো সেই অখণ্ড স্ফোটকে প্রকাশের গৌণ মাধ্যম মাত্র।

কুমারিল ভর্তৃহরির এই অখণ্ডতাকে সরাসরি আক্রমণ করেন। তিনি বলেন, ভর্তৃহরির এই মতবাদ বাস্তব অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ বিরোধী। যদি বাক্যার্থ আগে থেকেই অখণ্ড হয়ে থাকত, তবে আমরা যখন কোনো অজানা ভাষার বাক্য শুনি, তখন আমরা অর্থ বুঝি না কেন? আমরা অর্থ বুঝি তখনই, যখন আমরা বাক্যের প্রতিটি শব্দের আলাদা অর্থ আগে থেকে জানি। কুমারিল যুক্তি দেন যে, ছোট শিশুরা প্রথমে একটি একটি করে শব্দ শেখে – ‘মা’, ‘জল’, ‘ভাত’। পরে তারা এই শব্দগুলোকে জোড়া লাগিয়ে বাক্য বলতে শেখে। যদি শব্দের কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব না থাকত, তবে মানুষের পক্ষে ভাষা শেখাই অসম্ভব হয়ে পড়ত। অতএব ভর্তৃহরির অখণ্ডতা এক ধরনের অতিন্দ্রীয় কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। বাস্তব জগতের সত্য হলো – অংশ মিলেই সমগ্র তৈরি হয়, সমগ্র থেকে অংশ আসে না।

দ্বিতীয় বড় বিতর্কটি হয়েছিল মীমাংসা দর্শনেরই আরেক দিকপাল প্রভাকর মিশ্র (Prabhākara Miśra)-র সাথে। প্রভাকর ছিলেন কুমারিলের সমসাময়িক কিন্তু তিনি প্রস্তাব করেছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত এক মতবাদ, যার নাম অন্বিতাভিধানবাদ (Anvitābhidhānavāda)। প্রভাকর বললেন যে, শব্দ কখনো একা একা কোনো বিচ্ছিন্ন অর্থ প্রকাশ করতে পারে না। একটি শব্দ যখন প্রথমবার উচ্চারিত হয়, তখনই সে অন্য শব্দের সাথে যুক্ত হয়ে ক্রিয়ার অন্বয়সহ অর্থ প্রকাশ করে। কুমারিল প্রভাকরের এই মতকে অত্যন্ত অবাস্তব বলে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, যদি প্রতিটি শব্দ আগেই অন্বিত অর্থ প্রকাশ করে, তবে অভিধানে শব্দের আলাদা অর্থ লেখা থাকে কেন? ‘গাভী’ শব্দের অর্থ যদি কেবল ‘গাভী আনো’ বাক্যের ভেতরেই বন্দি থাকে, তবে ‘গাভী বাঁধো’ বলার সময় নতুন অর্থ তৈরি হয় কীভাবে? শব্দের নিজস্ব একটি সাধারণ অর্থ না থাকলে ভাষার স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে যায়।

একই সাথে কুমারিল বৌদ্ধদের সেই বহুল আলোচিত অপোহবাদ (Apohavāda)-কেও খণ্ডন করেছিলেন। বৌদ্ধরা বলতেন শব্দের কোনো ইতিবাচক অর্থ নেই; ‘গরু’ মানে হলো যা ‘অ-গরু’ নয় অর্থাৎ ঘোড়া বা ছাগল নয়। কুমারিল বললেন, এই ধরনের নেতিবাচক ব্যাখ্যা মানুষের স্বাভাবিক বুদ্ধিকে ব্যঙ্গ করার মতো। কোনো মানুষ যখন গরুর দুধ দোয়ায়, তখন সে নিশ্চয়ই ‘অ-গরুর অভাব’ দোয়ায় না; সে একটি বাস্তব প্রাণীর সাথে আচরণ করে। শব্দের অর্থ হলো সদর্থক বা ইতিবাচক বাস্তবতার প্রকাশ। কুমারিলের এই ত্রিমুখী লড়াই ভারতীয় ভাষাদর্শনকে এক অভূতপূর্ব সূক্ষ্মতা দান করেছিল। তিনি শব্দকে যেমন স্বাতন্ত্র্য দিলেন, তেমনই বাক্যের ভেতর তার সমন্বিত রূপকেও এক সুদৃঢ় যুক্তির শৃঙ্খলে বেঁধে রাখলেন।

ভাষাদর্শনের রাজনীতি ও সামাজিক অর্থোডক্সি (Politics of Linguistic Philosophy and Social Orthodoxy): মোহমুক্তি ও বিশ্লেষণ

একটি নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ এবং ধর্মনিরপেক্ষ পাঠের ক্ষেত্রে কুমারিল ভট্টের এই সুবিশাল বৌদ্ধিক প্রাসাদের পেছনের সামাজিক ও মতাদর্শিক বাস্তবতাকে উন্মোচন করা অত্যন্ত জরুরি। কুমারিল যে ঐতিহাসিক মুহূর্তে লিখছিলেন, সেই সপ্তম ও অষ্টম শতকের ভারত ছিল এক তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের যুগ। বৌদ্ধ ধর্ম তখন রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা হারাচ্ছিল এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের এক প্রবল পুনরুত্থান ঘটছিল। এই পুনরুত্থানের প্রধান বৌদ্ধিক রূপকার ছিলেন কুমারিল ভট্ট। তিনি বৌদ্ধদের সমস্ত জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি ভেঙে দিয়ে বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থাকে সমাজের একমাত্র বৈধ নৈতিক ভিত্তি হিসেবে পুনর্প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন (Arnold, 2005)।

কুমারিলের এই ভাষাতাত্ত্বিক পরমাণুবাদ বা রিয়ালিজমের একটি অত্যন্ত গভীর মতাদর্শিক উদ্দেশ্য ছিল। তিনি যদি শব্দ এবং অর্থের সম্পর্ককে নিত্য ও অবিনশ্বর প্রমাণ করতে পারেন, তবে বৈদিক সাহিত্যের অপৌরুষেয়ত্বও স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয়ে যায়। আর বেদ যদি কোনো মানুষের তৈরি না হয়, তবে বেদে বর্ণিত চতুরাশ্রম, বর্ণব্যবস্থা এবং পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক স্তরবিন্যাসকেও কোনো ঐতিহাসিক বা সামাজিক পরিবর্তনের ফল হিসেবে দেখা যাবে না। কুমারিল এই যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন যে সামাজিক বিভাজন কোনো শাসকের তৈরি নয়, এটি ভাষার মতোই চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয়। ফলে ভাষার বাস্তববাদ এখানে এসে একটি শোষণমূলক সামাজিক ব্যবস্থাকে চিরস্থায়ী করার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

একই সাথে এই চরম পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষাতত্ত্ব সাধারণ মানুষের জন্য এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রাচীর তৈরি করেছিল। মীমাংসার এই জটিল বাক্যতত্ত্ব, আকাঙ্ক্ষা-যোগ্যতার বিশ্লেষণ এবং লক্ষণার সূক্ষ্ম কূটতর্ক কোনো সাধারণ কৃষক বা শ্রমজীবী মানুষের জানার কথা নয়। ফলে বৈদিক সাহিত্যের অর্থ নির্ধারণের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব চলে গিয়েছিল এক ক্ষুদ্র সংস্কৃতজ্ঞ পুরোহিত ও পণ্ডিত এলিট শ্রেণির হাতে। সাধারণ মানুষ শাস্ত্রীয় বিধান নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে পারত না, কারণ তাদের বলা হতো যে তারা ভাষার এই ‘পরম ব্যাকরণ’ জানে না। ফলে আপাতদৃষ্টিতে যাকে বিশুদ্ধ বাক্যার্থতত্ত্ব বলে মনে হয়, তা আসলে ছিল জ্ঞানকে একটি বিশেষ শ্রেণির হাতে কুক্ষিগত করে রাখার এক অত্যন্ত পরিশীলিত কৌশল।

সবশেষে একজন আধুনিক চিন্তাশীল পাঠকের চোখে কুমারিল ভট্টের মূল্যায়ন কী হতে পারে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার দ্বৈত পরিচয়ে। একদিকে তিনি সন্দেহাতীতভাবে প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম সেরা শব্দার্থবিজ্ঞানী, যার পরমাণুবাদী সংযোজন তত্ত্ব আধুনিক ইউরোপীয় দর্শনে গটলব ফ্রেগে বা বার্ট্রান্ড রাসেলের কম্পোজিশনালিটি বা সংযোজন নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি অত্যন্ত সাহসের সাথে অন্ধ মরমীবাদকে বর্জন করে ভাষার বাস্তবসম্মত কার্যপদ্ধতি উন্মোচন করেছিলেন। অন্যদিকে, তিনি ছিলেন এক চরম রক্ষণশীল সমাজের অভিভাবক, যিনি তার এই অসাধারণ মেধাকে ব্যবহার করেছিলেন একটি অনড়, স্তরভিত্তিক এবং বৈষম্যমূলক আচারব্যবস্থাকে বৌদ্ধিক বৈধতা দেওয়ার কাজে। কুমারিলকে বোঝার অর্থ হলো মানুষের বুদ্ধির চরম বিকাশকে প্রত্যক্ষ করা, এবং একই সাথে সেই বুদ্ধি কীভাবে ক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহৃত হয় তার নির্মম পাঠ গ্রহণ করা।

প্রভাকর ও বাক্যার্থ (Prabhākara and Sentence Meaning): অন্বিতাভিধানবাদ দিয়ে মন্ত্র বিশ্লেষণ

প্রভাকর মিশ্র ও প্রাভাকর ঘরানার আবির্ভাব (Prabhākara Miśra and the Emergence of the Prābhākara School): কর্মবাদী ভাষাদর্শন

ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে মীমাংসা ধারাটি দুটি প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। এর একটি ছিল কুমারিল ভট্টের অনুসারীদের ধারা, আর অন্যটি গড়ে উঠেছিল আচার্য প্রভাকর মিশ্র (Prabhākara Miśra)-র চিন্তাকে কেন্দ্র করে। ঐতিহ্যে প্রভাকরকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে ‘গুরু’ বলে সম্বোধন করা হতো। সপ্তম বা অষ্টম শতকের এই দার্শনিক তার সুবিখ্যাত ভাষ্যগ্রন্থ বৃহতী (Bṛhatī)-র মাধ্যমে শবরস্বামীর বক্তব্যকে এমন এক নতুন আলোয় ব্যাখ্যা করেছিলেন, যা কুমারিলের পরমাণুবাদী বাক্যতত্ত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় (Ramanujachari, 1934)। প্রভাকরের শিষ্য শালিখনাথ মিশ্র (Śālikanātha Miśra) পরবর্তীকালে তার গ্রন্থ প্রকরণপঞ্চিকা (Prakaraṇapañcikā)-তে এই মতটিকে আরও সংহত এবং সুসংবদ্ধ তাত্ত্বিক রূপ দান করেন (Śālikanātha Miśra, 1961)। প্রভাকরের মূল ঝোঁক ছিল ভাষার চরম প্রায়োগিক ও কর্মবাদী চরিত্রকে প্রতিষ্ঠা করা।

প্রভাকরের দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এক আপসহীন কর্মবাদ। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মানুষের ভাষার একমাত্র কাজ হলো মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট কর্মে নিয়োজিত করা। ভাষা কোনো অলস মানুষের জন্য তথ্য পরিবেশন করার যন্ত্র নয়। যদি কোনো বাক্য কোনো কাজের নির্দেশ না দেয়, তবে সেই বাক্যের জন্মই অর্থহীন। এই কঠোর কর্মবাদের ভিত্তি ছিল তার জ্ঞানতত্ত্ব, যা দর্শনের জগতে ত্রিপুটীপ্রত্যক্ষবাদ (tripuṭī-pratyakṣavāda) নামে পরিচিত (Mohanty, 1992)। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ যখন কোনো জ্ঞান অর্জন করে, তখন সেই একক জ্ঞান-মুহূর্তেই তিনটি জিনিস একসাথে প্রকাশিত হয়: জ্ঞানের বিষয়, জ্ঞান স্বয়ং এবং জ্ঞানের কর্তা বা জ্ঞাতা। আলো যেমন অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করলে ঘরটিকে দেখায়, ঘরের ভেতরের আসবাবপত্রকে দেখায় এবং নিজেকেও দেখায়, মানুষের জ্ঞানও ঠিক তেমনই নিজের প্রকাশের ভেতরেই বিশ্বকে উন্মোচন করে।

এই জ্ঞানতাত্ত্বিক স্পষ্টতা নিয়ে প্রভাকর ভাষার জগতে প্রবেশ করেন। তিনি লক্ষ্য করেন যে, কুমারিল ভট্ট যেভাবে বাক্যকে ভেঙে ছোট ছোট শব্দের স্বাধীন অর্থে ভাগ করেছিলেন, তা মানুষের বাস্তব ভাষা ব্যবহারের সাথে মেলে না। মানুষ যখন কথা বলে, তখন সে বিচ্ছিন্ন শব্দের অভিধান মুখস্থ করে না। মানুষ কথা বলে একে অন্যকে কোনো কাজ করানোর তাগিদে। একজন তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি যখন বলে ‘আমাকে এক গ্লাস জল দাও’, তখন ‘জল’ শব্দটি তার কাছে কোনো বিমূর্ত রাসায়নিক পদার্থ নয়; ওটা হলো সেই কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ যা তার তৃষ্ণা মেটাবে। প্রভাকর দাবি করেন যে, ভাষার প্রতিটি শব্দ জন্ম থেকেই অন্য শব্দের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়ে কাজ করে।

প্রভাকরের এই দার্শনিক অবস্থান মীমাংসা দর্শনকে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে পরিচালিত করেছিল। কুমারিল যেখানে সাধারণ জ্ঞানের সাথে আপস করে শব্দের একটি প্রাথমিক বিমূর্ত অর্থ মেনে নিয়েছিলেন, প্রভাকর সেখানে ঘোষণা করলেন যে সম্পর্কের বাইরে শব্দের কোনো অস্তিত্বই নেই। এই বিপ্লবী ধারণার ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে তার বিখ্যাত অন্বিতাভিধানবাদ (Anvitābhidhānavāda)। প্রাচীন বৈদিক মন্ত্রগুলোকে বোঝার ক্ষেত্রে এই তত্ত্বটি এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছিল, যা মন্ত্রের পৌরাণিক বা মরমীবাদী খোলসটিকে ভেঙে তাকে সরাসরি যজ্ঞশালায় মানুষের শারীরিক কর্মের সাথে একাত্ম করে দেয়।

অন্বিতাভিধানবাদের কেন্দ্রীয় প্রস্তাবনা (Central Proposition of Anvitābhidhānavāda): সম্পর্কের ভেতরেই শব্দের জন্ম

অন্বিতাভিধানবাদ তত্ত্বটির নাম বিশ্লেষণ করলেই এর মূল প্রতিপাদ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘অন্বিত’ মানে হলো যা আগেই অন্য কিছুর সাথে সম্পর্কযুক্ত বা অন্বিত হয়েছে, আর ‘অভিধান’ মানে হলো শব্দের দ্বারা ব্যক্ত হওয়া বা বাচ্য হওয়া। সহজ কথায় বললে, শব্দগুলো পৃথক পৃথকভাবে কোনো বিচ্ছিন্ন অর্থ প্রকাশ করে না; বরং শব্দগুলো সবসময় অন্য শব্দের সাথে ‘সম্পর্কিত অবস্থায়’ থেকেই নিজের অর্থ ব্যক্ত করে (Subba Rao, 1969)। কুমারিল যেখানে বলেছিলেন প্রথমে শব্দার্থ পরে বাক্যার্থ, প্রভাকর সেখানে বললেন শব্দের অর্থই হলো বাক্যার্থের সাথে অন্বিত অর্থ। অর্থাৎ একটি শব্দ যখন কোনো বাক্যে বসে, সে কোনো বিমূর্ত সাধারণ রূপ প্রকাশ করে বসে থাকে না; সে তৎক্ষণাৎ বাক্যের মূল কর্মটির সাথে নিজের সম্পর্কটি জাহির করে।

প্রভাকরের মতে, শব্দ এবং বাক্যার্থের মাঝখানে কুমারিল যে দুটি আলাদা স্তরের কল্পনা করেছিলেন, তা এক ধরনের অপ্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক জটিলতা। কুমারিল দাবি করেছিলেন যে শব্দগুলো প্রথমে তাদের শক্তি দিয়ে বিচ্ছিন্ন অর্থ প্রকাশ করে, তারপর সেই অর্থগুলো লক্ষণা বা সম্পর্কের মাধ্যমে বাক্যার্থ তৈরি করে। প্রভাকর একে তীব্র ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, ভাষার কার্যকারিতায় কোনো দুটি ধাপ থাকে না। শব্দের ভেতরের যে প্রাথমিক শক্তি বা অভিধা (primary expressive capacity / abhidhā), সেই অভিধাই এক নিমেষে সমগ্র অন্বিত অর্থটিকে প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখে (Gächter, 1983)। ফলে আলাদা করে বাক্যার্থ খোঁজার জন্য কোনো দ্বিতীয় শক্তির প্রয়োজন পড়ে না।

এই মতবাদের একটি বড় দার্শনিক যুক্তি হলো চিন্তার লাঘব বা লাঘব (principle of parsimony / lāghava)। দর্শনে একটি সাধারণ নিয়ম হলো, যে বিষয়টি সহজে ব্যাখ্যা করা যায় তার জন্য জটিল কোনো মাধ্যম কল্পনা করা ভুল। কুমারিলের তত্ত্বে প্রতিটি শব্দের জন্য একবার অর্থ কল্পনা করতে হয়, তারপর সেই অর্থগুলোর মিলনের জন্য আবার মনস্তাত্ত্বিক সেতু কল্পনা করতে হয়। প্রভাকর দেখান যে বাস্তব জীবনে মানুষ এত ঘুরিয়ে ভাবে না। আমরা যখন কোনো বাক্য শুনি, তখন শব্দের অর্থ এবং তাদের পারস্পরিক সম্বন্ধ আমাদের মনে একই সাথে ধরা দেয়। শব্দ কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয় যে তাদের মাঝে সাঁকো বাঁধতে হবে; শব্দগুলো জন্ম থেকেই একই নদীর স্রোতের মতো পরস্পরের সাথে জড়িয়ে থাকে।

অতএব অন্বিতাভিধানবাদ অনুযায়ী, বিচ্ছিন্ন শব্দের কোনো নিজস্ব স্বাধীন অর্থ বলে কিছু নেই। অভিধানে যে শব্দের আলাদা আলাদা সংজ্ঞা দেওয়া থাকে, প্রভাকরের চোখে তা হলো বৈয়াকরণদের তৈরি এক কৃত্রিম বিমূর্ততা। বাস্তব জগতে মানুষ কখনো একা একা কোনো শব্দ উচ্চারণ করে না। শব্দের অর্থ সবসময় বাক্যের অধীন, আর বাক্য সবসময় কোনো একটি বাস্তব কর্মের অধীন। সম্পর্কের ভেতরেই শব্দের জন্ম, সম্পর্কের ভেতরেই শব্দের বেড়ে ওঠা এবং সম্পর্কের বাইরে শব্দ স্রেফ অর্থহীন শব্দতরঙ্গ ছাড়া আর কিছুই নয়।

বৃদ্ধব্যবহার ও ভাষা শিক্ষার গতিপ্রকৃতি (Vṛddhavyavahāra and the Dynamics of Language Acquisition): সামাজিক প্রেক্ষাপটে শব্দের অর্থ

মানুষ কীভাবে ভাষা শেখে? একটি ছোট শিশু কোনো ব্যাকরণের বই না পড়ে কীভাবে মাতৃভাষা রপ্ত করে ফেলে? এই মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রভাকর মিশ্র এক অত্যন্ত গভীর তত্ত্ব হাজির করেছিলেন, যার নাম বৃদ্ধব্যবহার (vṛddhavyavahāra / the behavior of elders)। প্রভাকর বলেন যে, ভাষা কোনো ব্যক্তিগত সাধনার বিষয় নয়; ভাষা হলো এক সামাজিক লেনদেন (Śālikanātha Miśra, 1961)। মানুষ সমাজ থেকেই ভাষা শেখে এবং সেই ভাষা শেখার প্রক্রিয়াটি ঘটে বড়দের পারস্পরিক কাজের আদান-প্রদান প্রত্যক্ষ করার মধ্য দিয়ে।

প্রভাকর একটি দৃশ্য কল্পনা করতে বলেন। একটি পরিবারে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি আরেকজন মধ্যবয়সী ব্যক্তিকে আদেশ করলেন – ‘গাভীটিকে নিয়ে এসো’ (গাম আনয়)। মধ্যবয়সী ব্যক্তিটি আদেশ শুনে গোয়ালঘরে গেলেন এবং একটি গাভীকে দড়ি ধরে টেনে নিয়ে এলেন। ঘরের এক কোণে বসে একটি ছোট শিশু এই পুরো ঘটনাটি দেখল। শিশুটি দেখল যে বড় মানুষটি একটি নির্দিষ্ট বাক্য উচ্চারণ করলেন, আর তার পরপরই অপর মানুষটি হেঁটে গিয়ে একটি চারপেয়ে প্রাণীকে ধরে নিয়ে এলেন। শিশুটির মনে প্রথম যে ধারণাটি জন্মাল, তা হলো – এই সমগ্র বাক্যটির ফল হলো গাভীটিকে এখানে নিয়ে আসার এই কাজটি সম্পন্ন হওয়া। এই প্রাথমিক স্তরে শিশুটি কোনো একটি নির্দিষ্ট শব্দের অর্থ জানে না; সে জানে পুরো বাক্যটির সাথে একটি শারীরিক কাজের সম্পর্ক রয়েছে।

এরপর ঘটে দ্বিতীয় ঘটনা। কিছুক্ষণ পর প্রথম ব্যক্তিটি আবার নির্দেশ দিলেন – ‘ঘোড়াটিকে নিয়ে এসো’ (অশ্বম আনয়)। এবার অপর ব্যক্তিটি গাভীকে ফেলে রেখে একটি ঘোড়াকে নিয়ে এলেন। এবার শিশুটির মনে তুলনামূলক বিচার শুরু হয়। শিশুটি লক্ষ্য করে যে ‘আনয়’ (নিয়ে এসো) শব্দটি আগের বাক্যেও ছিল, এখনো আছে; এবং উভয় ক্ষেত্রেই একটি প্রাণীকে টেনে নিয়ে আসার কাজটি অভিন্ন রয়েছে। কিন্তু আগের বাক্যে ছিল ‘গাভী’, আর এবার তার বদলে এসেছে ‘ঘোড়া’। এই যে একটি শব্দ যোগ করা এবং আরেকটি শব্দ বাদ দেওয়া, মীমাংসা পরিভাষায় একে বলা হয় আবাপ (insertion / āvāpa) এবং উদ্বাপ (extraction / udvāpa) (Ramanujachari, 1934)। এই যোগ-বিয়োগের মাধ্যমেই শিশুটি ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে যে ‘গাভী’ শব্দের অর্থ হলো ওই নির্দিষ্ট চারপেয়ে প্রাণীটি, আর ‘আনয়’ শব্দের অর্থ হলো তাকে নিয়ে আসার গতিশীল কাজটি।

এই তত্ত্বটির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো, এখানে কোনো শব্দকেই কোনোদিনও নিঃসঙ্গ অবস্থায় শেখা হয়নি। শিশুটি যখন ‘গাভী’ শব্দটির অর্থ আলাদা করতে শিখল, তখনও সে শব্দটিকে চিনেছে ‘নিয়ে আসা’ বা কোনো একটি কাজের প্রেক্ষাপটের ভেতরেই। বিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত অস্ট্রিয়ান দার্শনিক লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন (Ludwig Wittgenstein) তার যুগান্তকারী গ্রন্থ ফিলসফিক্যাল ইনভেস্টিগেশনস (Philosophical Investigations)-এ ভাষার যে ‘ভাষা-খেলা’ বা ল্যাঙ্গুয়েজ গেম (language-game) এবং ব্যবহারের তত্ত্ব দিয়েছিলেন, প্রভাকরের বৃদ্ধব্যবহার ছিল ঠিক তেমনই এক সামাজিক প্রস্তাবনা (Wittgenstein, 1953)। ভিটগেনস্টাইন যেমন বলেছিলেন শব্দের অর্থ হলো ভাষার ভেতর তার ব্যবহার, প্রভাকরও হাজার বছর আগে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যে বড়দের কাজের ব্যবহারের মাধ্যমেই ভাষার অর্থ নিশ্চিত হয়।

কার্য, নিয়োগ ও নৈতিক অনুশাসন (Kārya, Niyoga, and Deontological Injunction): নিঃশর্ত কর্তব্যের ব্যাকরণ

প্রভাকরের দর্শনের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং অভিনব দিকটি হলো তার নৈতিক তত্ত্ব, যা বৈদিক বিধিবাক্যের উদ্দেশ্যকে এক সম্পূর্ণ নতুন উচ্চতায় স্থাপন করে। কুমারিল ভট্ট যেখানে বলেছিলেন যে মানুষ কোনো না কোনো ফল পাওয়ার লোভে যজ্ঞ করে – যেমন স্বর্গলাভের ইচ্ছা বা সন্তান লাভের ইচ্ছা – প্রভাকর সেখানে এই স্বার্থপর ফলের ধারণাকে পুরোপুরি খারিজ করে দেন। প্রভাকরের মতে, বৈদিক বাক্য মানুষকে কোনো পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে কাজ করায় না। বৈদিক বাক্যের আসল ক্ষমতা হলো তা মানুষকে এক পরম কর্তব্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যাকে তিনি নাম দিয়েছেন কার্য (kārya / task to be done) বা নিয়োগ (niyoga / moral command) (Gächter, 1983)।

কার্য মানে হলো যা সম্পাদন করা একান্ত আবশ্যক। বৈদিক বিধিবাক্য যখন উচ্চারিত হয় – যেমন ‘যজ্ঞ করবে’ – তখন সেই বাক্যটি মানুষের চেতনায় একটি পরম আদেশের মতো ধাক্কা দেয়। মানুষ কাজটি করে কোনো ফলের জন্য নয়, বরং কাজটি করা তার এক অলঙ্ঘনীয় দায়িত্ব বলেই সে করে। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (Immanuel Kant) তার নীতিদর্শনের বিখ্যাত গ্রন্থ গ্রাউন্ডওয়ার্ক অব দ্য মেটাফিজিকস অব মরালস (Groundwork of the Metaphysics of Morals)-এ যে শর্তহীন আদেশ (categorical imperative)-এর তত্ত্ব দিয়েছিলেন, প্রভাকরের নিয়োগ ছিল ঠিক সেই ধরনের এক নিঃশর্ত নৈতিক অনুশাসন (Kant, 1785/1998)। কান্ট যেমন বলেছিলেন কোনো স্বার্থ ছাড়া কেবল কর্তব্যের খাতিরেই কর্তব্য পালন করতে হবে, প্রভাকরও তেমনই বৈদিক যজ্ঞকে মানুষের এক নিঃশর্ত দায়িত্ব হিসেবে দেখেছিলেন।

এই আদেশের সাথে যুক্ত থাকে একজন ব্যক্তি, যাকে প্রভাকর বলেছেন নিযোজ্য (the commanded person / niyojya)। নিযোজ্য হলো সেই মানুষ, যে বুঝতে পারে এই আদেশটি তার উদ্দেশ্যেই দেওয়া হয়েছে। যখন একজন ব্যক্তি অনুভব করে যে বৈদিক আদেশ তাকে কোনো একটি কাজ সম্পন্ন করতে বাধ্য করছে, তখন তার নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা গৌণ হয়ে যায়। শাস্ত্রীয় আদেশ মানুষকে নিজের আরাম বা ভয়ের স্তর থেকে টেনে বের করে এক সক্রিয় দায়িত্বের মধ্যে ফেলে দেয়। ফলে প্রভাকরের মতে, বিধিবাক্য কোনো তথাকথিত কাল্পনিক স্বর্গের প্রলোভন নয়; এটা হলো মানুষকে দায়িত্ববান করে তোলার এক কঠোর ব্যাকরণগত নির্দেশ।

এই তত্ত্বের ফলে ভাষার সমস্ত বাক্যার্থ এসে শেষ পর্যন্ত একটিমাত্র বিন্দুতে মিলিত হয় – তা হলো এই ‘কার্য’। একটি বাক্যের সমস্ত বিশেষ্য, বিশেষণ বা কারকগুলো এই কাজের সহায়ক অঙ্গ হিসেবে কাজ করে। ‘গাভীটিকে দড়ি দিয়ে বাঁধো’ – এখানে দড়ি বা গাভী প্রধান নয়, প্রধান হলো বাঁধার এই অবশ্যকরণীয় কাজটি। প্রভাকরের অন্বিতাভিধানবাদ এই সত্যটিকেই প্রতিষ্ঠা করে যে, বাক্যের প্রতিটি শব্দ আগে থেকেই এই ‘কার্যের’ সাথে অন্বিত থাকে। মানুষ যখন বাক্যটি শোনে, তখন সে কোনো বিমূর্ত দার্শনিক তত্ত্ব খোঁজে না; সে সরাসরি সেই কাজের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

অন্বিতাভিধানবাদ দিয়ে বৈদিক মন্ত্রের ব্যবচ্ছেদ (Dissection of Vedic Mantras through Anvitābhidhānavāda): ক্রিয়া-সংযুক্ত পাঠ

বৈদিক যজ্ঞে যখন প্রাচীন স্তুতি বা মন্ত্রগুলো পড়া হয়, তখন প্রভাকরের পদ্ধতি কীভাবে কাজ করে? এটি অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরি। কুমারিল যেখানে মন্ত্রের ভেতরের শব্দগুলোর আলাদা অর্থ খুঁজে নিয়ে পরে তাদের ব্যাকরণগত আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে জুড়তে চেয়েছিলেন, প্রভাকর সেখানে পুরো প্রক্রিয়াটিকে উল্টে দেন। প্রভাকরের মতে, কোনো মন্ত্রের কোনো স্বাধীন কাব্যিক বা পৌরাণিক অর্থ হতে পারে না। একটি মন্ত্র যখন যজ্ঞের অগ্নিকুণ্ডের সামনে পুরোহিতের মুখে উচ্চারিত হয়, তখন সেই মন্ত্রের প্রতিটি পদ সরাসরি সেই মুহূর্তে ঘটে চলা আচারিক কাজের সাথে অন্বিত হয়েই নিজের অর্থ প্রকাশ করে (Subba Rao, 1969)।

ধরা যাক, যজ্ঞের একটি মন্ত্রে ইন্দ্রের কোনো বীরত্বপূর্ণ কাজের বর্ণনা রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে ইন্দ্র অসুরদের বধ করেছিলেন। একজন সাধারণ ঐতিহাসিক বা সাহিত্যের পাঠক এই বাক্যটি পড়লে একটি প্রাচীন যুদ্ধের গল্প দেখতে পাবেন। কিন্তু প্রভাকরের অন্বিতাভিধানবাদ বলবে, এই বাক্যটির অর্থ কোনো অতীতকালের যুদ্ধ নয়। কারণ অতীতকাল একটি সিদ্ধ বস্তু বা মৃত ঘটনা, তার সাথে বর্তমানের কোনো কাজের সম্পর্ক নেই। এই মন্ত্রটি যখন যজ্ঞের কোনো একটি বিশেষ আহুতির সময় পাঠ করা হচ্ছে, তখন এর ভেতরের প্রতিটি শব্দ ওই আহুতি দেওয়ার কাজটির সাথেই অন্বিত হয়ে অর্থ তৈরি করছে। ইন্দ্র এখানে কোনো ব্যক্তি নন; ইন্দ্র হলেন সেই কাজের সাথে যুক্ত সংকেত।

একইভাবে যখন কোনো মন্ত্রে বলা হয় – ‘হে ওষধি, তুমি এই যজমানকে রক্ষা করো’, তখন আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে পুরোহিত কোনো গাছের লতাপাতার কাছে অলৌকিক প্রার্থনা জানাচ্ছেন। কুমারিলের মতে এখানে গাছটির আলাদা একটি অর্থ রয়েছে এবং রক্ষার আলাদা একটি অর্থ রয়েছে। কিন্তু প্রভাকর বলবেন, এই মন্ত্রের শব্দগুলো কোনো স্বাধীন গাছকে নির্দেশ করে না। এগুলো সরাসরি নির্দেশ করে সেই ঘাস কাটার বা ডাল ভাঙার শারীরিক কাজটিকে। শব্দগুলো নিজেরা কোনো বিচ্ছিন্ন ভাবনা তৈরি না করে পুরোহিতের হাতের নড়াচড়া, তার নিঃশ্বাস এবং তার শারীরিক তৎপরতার সাথে এক হয়ে যায়। মন্ত্রের ভাষা এবং পুরোহিতের দেহভঙ্গি এখানে পরস্পরের সাথে মিশে এক অখণ্ড কার্যসম্পাদনে পরিণত হয়।

এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রভাকর বৈদিক সাহিত্যের সমস্ত রূপক, উপমা এবং কাব্যিক উচ্ছ্বাসকে এক কঠোর প্রায়োগিক যজ্ঞযন্ত্রের অংশে পরিণত করেছিলেন। কবিতার নিজস্ব কোনো স্বাধীনতা এখানে রাখা হয়নি। কবিরা এককালে গভীর আবেগে যে গান গেয়েছিলেন, প্রভাকরের বিশ্লেষণে এসে সেই গানগুলো পরিণত হলো কারখানার মেশিনের সংকেতধ্বনির মতো এক অত্যন্ত কার্যকর আদেশের ভাষায়। সাহিত্যের দিক থেকে এটি হয়তো এক ধরনের রূঢ় সংকোচন, কিন্তু যজ্ঞের প্রায়োগিক কার্যকারিতার দিক থেকে এটি ছিল এক অভূতপূর্ব শৃঙ্খলার প্রতিষ্ঠা। অন্বিতাভিধানবাদের আলোয় একটি মন্ত্রের প্রতিটি ধ্বনি তখন কেবল কাজের কথা বলে, কাজের বাইরে তার অন্য কোনো কথা বলার অধিকার থাকে না।

ভাষাগত নির্ধারণবাদ ও সামাজিক অর্থোডক্সির চূড়ান্ত রূপ (Linguistic Determinism and the Ultimate Form of Social Orthodoxy): মোহমুক্তি ও মূল্যায়ন

একটি সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ এবং বস্তুনিষ্ঠ দার্শনিক মূল্যায়নে প্রভাকরের এই তত্ত্বের অন্তর্নিহিত সামাজিক ও মতাদর্শিক পরিণতিকে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। আপাতদৃষ্টিতে অন্বিতাভিধানবাদকে অত্যন্ত আধুনিক মনে হতে পারে, কারণ এটি ভিটগেনস্টাইনের মতো ভাষার ব্যবহারিক রূপকে গুরুত্ব দিয়েছে এবং কান্টের মতো এক স্বার্থহীন নৈতিক অনুশাসন তৈরি করেছে। কিন্তু এই চমৎকার বৌদ্ধিক কাঠামোর পেছনে লুকিয়ে ছিল প্রাচীন ভারতের সামাজিক অর্থোডক্সিকে এক চরম ভাষাগত নির্ধারণবাদ (linguistic determinism)-এর মধ্যে বন্দি করার এক গভীর প্রয়াস (Mohanty, 1992)।

প্রভাকরের দর্শনে সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি ছিল মানুষের স্বাধীন চিন্তার জায়গাকে ভাষার স্তর থেকেই নির্মূল করে দেওয়া। যদি কোনো শব্দ কোনোদিন কোনো ‘সিদ্ধ বস্তু’ বা বিদ্যমান তথ্য প্রকাশ করতে না পারে, যদি শব্দের একমাত্র কাজই হয় কাজ করানো, তবে কোনো মানুষের পক্ষে সমাজ, ধর্ম বা শাস্ত্র নিয়ে কোনো সমালোচনামূলক বা তাত্ত্বিক প্রশ্ন তোলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ প্রশ্ন তুলতে গেলেও এমন ভাষা দরকার যা কাজ থেকে মুক্ত হয়ে নিছক চিন্তা বা বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করতে পারে। প্রভাকরের ভাষায় সেই ধরনের কোনো স্বাধীন চিন্তার অবকাশই ছিল না। মানুষ কেবল আদেশের দাস; সে শুনবে এবং পালন করবে। শাস্ত্র তাকে যা করতে বলেছে, সে সেটাই করবে। এভাবে ভাষার দর্শনের মধ্য দিয়ে মানুষের মুক্ত বুদ্ধিকে চিরতরে রুদ্ধ করার এক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল।

একই সাথে এই ‘নিয়োগ’ বা আদেশের কাঠামোটি সমাজের বিদ্যমান বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে এক অলঙ্ঘনীয় পবিত্রতা দান করেছিল। বৈদিক সমাজের কারা এই যজ্ঞ করার অধিকারী, অর্থাৎ কারা ‘নিযোজ্য’ হবে, তা নির্ধারণ করত তৎকালীন বর্ণব্যবস্থা ও পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক আইন। শূদ্র এবং নারীদের কোনো কাজের অধিকার দেওয়া হয়নি, ফলে তাদের কোনো আদেশের পাত্র হওয়ার যোগ্যতাই ছিল না। উচ্চবর্ণের পুরুষদের ওপর যে আদেশ চাপানো হতো, তাকেও কোনো প্রশ্ন ছাড়া পালন করতে হতো। কোনো ব্যক্তি বলতে পারত না যে ‘আমি এই যজ্ঞের কোনো যৌক্তিকতা দেখছি না, তাই আমি করব না’। প্রভাকরের নীতি অনুযায়ী, তুমি যৌক্তিকতা দেখার কেউ নও; আদেশ দেওয়া হয়েছে মানেই তোমাকে তা পালন করতে হবে। কর্তব্যই তোমার একমাত্র পরিচয়।

উপসংহারে বলা যায়, প্রভাকর মিশ্রের অন্বিতাভিধানবাদ মানব চিন্তার ইতিহাসে এক অনন্য কিন্তু দ্বিমুখী সৃষ্টি। একদিকে তা দেখায় প্রাচীন ভারতের দার্শনিকরা শব্দের সাথে বাক্যের সম্পর্ক, ভাষা শিক্ষার সামাজিক পরিবেশ এবং মানবীয় আচরণের মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলোকে কতটা বিস্ময়কর গভীরতায় অনুধাবন করেছিলেন। আধুনিক সংকেতবিজ্ঞান এবং প্রায়োগিক ভাষাতত্ত্বের বহু মূল ধারণার পূর্বাভাস প্রভাকরের এই তত্ত্বে ছড়িয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, এটি প্রমাণ করে যে কীভাবে একটি বিশুদ্ধ ভাষাদর্শন শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত হয়ে মানুষকে এক অন্ধ ও প্রশ্নহীন প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার ভেতর বন্দি করে ফেলতে পারে। প্রভাকরকে পাঠ করার অর্থ হলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিভার চরম শিখরকে চেনা, এবং একই সাথে ভাষার সেই অদৃশ্য শৃঙ্খলটিকেও শনাক্ত করা যা মানুষকে অন্ধ আনুগত্যের খাঁচায় আটকে রাখতে চায়।

পাঠ, অনুষ্ঠান ও অর্থের রূপান্তর (Text, Ritual and Transformation of Meaning): প্রয়োগ, প্রতীকায়ন ও পুনর্ব্যাখ্যা

জৈমিনি ও একই মন্ত্রের ভিন্ন প্রয়োগ (Jaimini and Multiple Uses of a Mantra): অনুষ্ঠানভেদে অর্থ ও কার্যকারিতা

বিনিয়োগের ধারণা ও মন্ত্রের প্রয়োগশীলতা (Concept of Viniyoga and Applicability of Mantras): স্থির পাঠের গতিশীল জীবন

একটি প্রাচীন কাব্য বা স্তোত্র যখন রচিত হয়, তখন আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে তার অর্থটি সেই রচনার মুহূর্তেই চিরতরে স্থির হয়ে গেছে। কিন্তু আচার্য জৈমিনি (Jaimini) তার মীমাংসাসূত্র (Mīmāṃsāsūtra) গ্রন্থে বৈদিক মন্ত্রকে কোনো নির্জীব বা স্থির জাদুঘরের সামগ্রী হিসেবে দেখেননি। তার মতে, বৈদিক মন্ত্রের আসল জীবন শুরু হয় তখনই, যখন সেই মন্ত্রকে কোনো নির্দিষ্ট যজ্ঞীয় কর্মের সাথে যুক্ত করা হয়। মীমাংসা দর্শনে এই প্রক্রিয়াটির নাম দেওয়া হয়েছে বিনিয়োগ (liturgical application / viniyoga) (Smith, 1987)। বিনিয়োগ হলো এমন এক পদ্ধতিগত যোগসূত্র, যা কোনো একটি স্তোত্রকে তার সাহিত্যিক বিমূর্ততা থেকে টেনে নামিয়ে যজ্ঞশালার বাস্তব পাত্র, আগুন এবং পুরোহিতের শারীরিক কর্মের সাথে বেঁধে দেয়।

বিনিয়োগের এই ধারণার পেছনে একটি অত্যন্ত গভীর প্রায়োগিক দর্শন কাজ করে। জৈমিনি দেখান যে, বৈদিক সংহিতার একটি মন্ত্রকে যদি আমরা কেবল তার পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি, তবে তার পূর্ণ কার্যকারিতা বোঝা অসম্ভব। একটি মন্ত্রের নিজস্ব অর্থ রয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই অর্থটি কার্যকর রূপ নেয় যখন জানা যায় মন্ত্রটি ঠিক কোন কাজের সময়, কোন দেবতার উদ্দেশ্যে এবং কোন দ্রব্যের আহুতি দেওয়ার মুহূর্তে পাঠ করতে হবে। ভারততত্ত্ববিদ ইয়ান গোন্ডা (Jan Gonda) তার বৈদিক মন্ত্রের আনুষ্ঠানিক প্রয়োগ সংক্রান্ত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, একই ঋক বা স্তোত্র ভিন্ন ভিন্ন যজ্ঞে সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে পঠিত হতে পারে (Gonda, 1980)। একটি সূক্ত হয়তো এক জায়গায় শান্তির স্তুতি হিসেবে কাজ করছে, আবার অন্য একটি যজ্ঞে তা শত্রু বিনাশের বা পশুর অঙ্গ ছেদনের সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এই বহুবিধ প্রয়োগের ফলে মন্ত্রের ভেতরের ভাষার গতিশীলতা এক অনন্য মাত্রায় পৌঁছে যায়। সাধারণ ভাষায় আমরা মনে করি একটি শব্দের একটি নির্দিষ্ট অর্থ থাকে এবং সেই অর্থ যেকোনো জায়গায় অপরিবর্তিত থাকে। কিন্তু যজ্ঞীয় বাস্তবতায় প্রেক্ষাপটই হয়ে ওঠে অর্থের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। জৈমিনির তৃতীয় অধ্যায়ের সম্পূর্ণ আলোচনা জুড়ে রয়েছে এই বিনিয়োগের নিয়মাবলী। শ্রুতি, লিঙ্গ, বাক্য, প্রকরণ, স্থান এবং সমাখ্যার মতো প্রমাণের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় কোন মন্ত্রটি কোন কর্মের অঙ্গ হবে। এই কঠোর বিধিমালার কারণেই একটি মন্ত্র যজ্ঞের সুবিশাল নাটকে নিজের সুনির্দিষ্ট স্থানটি খুঁজে পায়।

অতএব জৈমিনির কাছে মন্ত্র নিছক কোনো অতীতকালের স্মৃতিচারণ নয়। মন্ত্র হলো এমন এক কর্মোপযোগী সংকেত, যা যজ্ঞের বিভিন্ন পর্বে প্রবেশ করে নিজের কার্যকারিতাকে নতুন করে আবিষ্কার করে। একটি পাত্র থেকে সোমরস যখন অন্য পাত্রে ঢালা হয়, তখন যে মন্ত্রটি উচ্চারিত হয়, তার প্রধান কাজ কোনো নতুন দর্শন প্রচার করা নয়; তার কাজ হলো সেই মুহূর্তে ঘটা শারীরিক ক্রিয়াটিকে স্মৃতিতে জাগিয়ে তোলা এবং তার আচারিক বৈধতা নিশ্চিত করা। এই প্রায়োগিক সংযোগই বৈদিক মন্ত্রকে হাজার বছর ধরে সচল এবং জীবন্ত রেখেছিল।

প্রকৃতি ও বিকৃতি যাগের কাঠামো (Structure of Prakṛti and Vikṛti Sacrifices): অতিদেশের বিস্তার

বৈদিক আচারের সুবিশাল জগৎকে বুঝতে হলে একটি অত্যন্ত মৌলিক প্রযুক্তিগত বিভাজন জানা দরকার। মীমাংসা শাস্ত্রে সমস্ত যাগযজ্ঞকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে: প্রকৃতি যাগ (archetype sacrifice / prakṛti) এবং বিকৃতি যাগ (ectype or modified sacrifice / vikṛti) (Kane, 1977)। প্রকৃতি যাগ হলো সেই মূল বা আদর্শ যজ্ঞ, যার সমস্ত নিয়মকানুন, প্রয়োজনীয় মন্ত্র, আহুতির দ্রব্য এবং পুরোহিতের করণীয় কাজ বৈদিক টেক্সটে বিস্তারিতভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্দেশ করা থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ‘দর্শপূর্ণমাস’ হলো সমস্ত ইষ্টি বা শস্যজাতীয় যজ্ঞের প্রকৃতি। এখানে কোনো কিছুই উহ্য রাখা হয়নি; প্রতিটি পদক্ষেপের সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে।

অন্যদিকে রয়েছে বিকৃতি যাগ। বিকৃতি যাগ হলো সেইসব পরিবর্তিত বা বিশেষ উদ্দেশ্যে কৃত যজ্ঞ, যেগুলোর সমস্ত বিবরণ টেক্সটে দেওয়া থাকে না। যেমন ‘সৌর্য যাগ’ (সূর্য দেবতার উদ্দেশ্যে কৃত যজ্ঞ) বা কোনো বিশেষ কাম্য ইষ্টি। যদি হাজার হাজার বিকৃতি যাগের প্রতিটি নিয়ম নতুন করে লিখতে হতো, তবে বৈদিক সাহিত্যের আকার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ত। এই সমস্যার সমাধানের জন্য জৈমিনি এক অসাধারণ হার্মেনিউটিক্স তৈরি করেছিলেন, যার নাম অতিদেশ (transference / atideśa) (Deshpande, 1993)। অতিদেশের মূল সূত্রটি হলো – ‘প্রকৃতিবৎ বিকৃতিঃ কর্তব্যা’। অর্থাৎ যে নিয়মগুলো মূল প্রকৃতি যাগে বলা হয়েছে, সেই নিয়মগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিকৃতি যাগে স্থানান্তরিত হবে, যদি না সেখানে কোনো বিশেষ পরিবর্তনের কথা বলা থাকে।

এই অতিদেশের মাধ্যমেই শুরু হয় একই মন্ত্রের বহুবিধ প্রয়োগের এক বিশাল পরিভ্রমণ। প্রকৃতি যাগের জন্য নির্ধারিত একটি মন্ত্র অতিদেশের ডানা ভর করে এক লাফে শত শত বিকৃতি যাগের ভেতরে প্রবেশ করে। যে মন্ত্রটি দর্শপূর্ণমাসে চাল বা যবের পিঠা প্রস্তুত করার সময় পঠিত হতো, সেই একই মন্ত্রটি কোনো বিকৃতি যাগে অন্য কোনো শস্য প্রক্রিয়াকরণের সময়ও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এর ফলে বৈদিক মন্ত্রগুলো আর কোনো একটি নির্দিষ্ট আচারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক সাধারণ শাস্ত্রীয় তহবিল, যা প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন আচারিক পরিসরে পুনর্ব্যবহৃত হতে পারে।

এই সাংগঠনিক মডেলটি প্রাচীন ভারতের শাসনব্যবস্থা ও আইনশাস্ত্রের ক্ষেত্রেও এক বিশাল প্রেরণা জুগিয়েছিল। আধুনিক সংবিধানে যেমন একটি মূল কাঠামোর বিধিবিধান বিভিন্ন উপ-আইন বা প্রশাসনিক ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়, জৈমিনির প্রকৃতি ও বিকৃতির তত্ত্বটি ছিল ঠিক তেমনই এক সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক নকশা। এর ফলে একদিকে যেমন টেক্সটের অপ্রয়োজনীয় বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়েছিল, অন্যদিকে একটি একক মন্ত্রের কার্যকারিতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল।

ঊহ তত্ত্ব ও ভাষার ব্যাকরণগত রূপান্তর (The Theory of Ūha and Grammatical Transformation of Language): পাঠ বনাম প্রয়োগ

প্রকৃতি যাগের মন্ত্র যখন বিকৃতি যাগে স্থানান্তরিত হয়, তখন সবসময় তা হুবহু খাপ খায় না। এখানেই তৈরি হয় মীমাংসা দর্শনের অন্যতম জটিল এবং চিত্তাকর্ষক ভাষাতাত্ত্বিক বিতর্ক। একটি মন্ত্রে হয়তো বলা হয়েছে একবচনে, কিন্তু বিকৃতি যাগে গিয়ে দেখা গেল কাজটির জন্য দুটি উপাদান প্রয়োজন। তখন কী করা হবে? অপৌরুষেয় বা অভ্রান্ত মনে করা বৈদিক পাঠকে কি কোনো মানুষ নিজের ইচ্ছামতো বদলাতে পারে? এই সংকট সমাধানের জন্য জৈমিনি তার নবম অধ্যায়ে এক বৈপ্লবিক নীতি প্রস্তাব করেন, যার নাম ঊহ (ritual adaptation / grammatical modification / ūha) (Cardona, 1988)।

ঊহ শব্দের অর্থ হলো পরিস্থিতির প্রয়োজনে মন্ত্রের ব্যাকরণগত রূপান্তর ঘটানো। মীমাংসা অনুযায়ী ঊহ তিন প্রকার হতে পারে: মন্ত্রের শব্দের রূপান্তর বা মন্ত্রোহ, গানের সুরের রূপান্তর বা সামোহ, এবং আচারিক সংস্কারের রূপান্তর বা সংস্কারোহ। সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে মন্ত্রোহ নিয়ে। একটি বাস্তব বৈদিক উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। মূল অগ্নিষোমীয় পশুযাগে একটিমাত্র ছাগল বলি দেওয়ার বিধান ছিল। সেখানে মন্ত্রের ভাষা ছিল – ‘ছাগস্য বপায়াঃ…’ অর্থাৎ এই ছাগলটির (একবচন) চর্বি দিয়ে আহুতি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কোনো বিকৃতি যাগে গিয়ে যদি যজমান একসাথে দুটি বা তিনটি ছাগল উৎসর্গ করার সংকল্প করেন, তবে পুরোহিত কি মূল মন্ত্রের একবচন পাঠই রাখবেন?

জৈমিনি রায় দেন যে, অন্ধের মতো মূল পাঠ আউড়ে যাওয়া যাবে না। কারণ মন্ত্রের কাজ হলো যজ্ঞের বাস্তব ঘটনাটিকে স্মৃতিতে এনে প্রকাশ করা। যদি সামনে দুটি ছাগল উপস্থিত থাকে আর পুরোহিত মুখে বলেন ‘একটি ছাগল’, তবে মন্ত্রটি সরাসরি মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিকর হয়ে পড়ে। অতএব যজ্ঞের বাস্তবতাকে মর্যাদা দেওয়ার জন্য পুরোহিতকে ব্যাকরণগত বিভক্তি পরিবর্তন করতে হবে। তিনি ‘ছাগস্য’-এর জায়গায় উচ্চারণ করবেন ‘ছাগয়োঃ’ (দ্বিবচন) অথবা অনেক ছাগল হলে বলবেন ‘ছাগানাম্’ (বহুবচন) (Smith, 1987)। এটি কেবল বচনের ক্ষেত্রে নয়, লিঙ্গ পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও ঘটে। যদি কোনো যজ্ঞে পুংলিঙ্গের পশুর বদলে স্ত্রীলিঙ্গের কোনো গাভী বা ছাগী ব্যবহার করা হয়, তবে মন্ত্রের সর্বনাম ও বিশেষ্যের রূপও স্ত্রীলিঙ্গে রূপান্তরিত করতে হবে।

এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে জৈমিনি বৈদিক শব্দের তথাকথিত অনড় এবং অপরিবর্তনীয় রূপটিকে এক অদ্ভুত নমনীয়তা দান করেছিলেন। প্রশ্ন উঠেছিল – মানুষ যদি মন্ত্রের রূপ বদলায়, তবে বেদের অপৌরুষেয় চরিত্র কি নষ্ট হয় না? জৈমিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে জবাব দেন যে, ঊহ করা কোনো নতুন বেদ রচনা নয়। এটি হলো প্রয়োগের সুবিধার্থে ভাষার এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর বা সংস্কার। মূল টেক্সট নিজের জায়গায় অবিকৃত থাকছে, কিন্তু যখন সে কর্মের ক্ষেত্রে নামছে, তখন বাস্তব পরিস্থিতির দাবি মেটানোর জন্য তার পোশাকে সাময়িক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এই সমাধান প্রাচীন ভারতীয় ভাষাতত্ত্ববিদদের দেখায় যে, অন্ধ টেক্সটপূজা নয়, বাস্তব কর্মের সত্যতাই হলো ভাষার চূড়ান্ত বিচারক।

অনুষ্ঠানভেদে অর্থের রূপান্তর ও লক্ষণা (Contextual Transformation of Meaning and Lakṣaṇā): দেবতার স্থানান্তর

ব্যাকরণের বচন বা লিঙ্গ পরিবর্তনের চেয়েও গভীরতর সংকট তৈরি হয় তখন, যখন যজ্ঞের সাথে যুক্ত মূল দেবতারই পরিবর্তন ঘটে যায়। একে মীমাংসা পরিভাষায় বলা হয়েছে দেবতোহ বা দেবতার রূপান্তর সংক্রান্ত প্রশ্ন। মূল প্রকৃতি যাগে যে মন্ত্রটি ছিল অগ্নির উদ্দেশ্যে নিবেদিত, বিকৃতি যাগে এসে দেখা গেল সেই পুরো অনুষ্ঠানটি করা হচ্ছে সূর্য দেবতার উদ্দেশ্যে। এখন মন্ত্রটির ভেতরে স্পষ্ট অক্ষরে ‘অগ্নি’ শব্দটি লেখা রয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে পুরোহিত কী করবেন? তিনি কি ‘অগ্নি’ শব্দের জায়গায় ‘সূর্য’ শব্দটি বসিয়ে দেবেন, নাকি ‘অগ্নি’ শব্দটি বজায় রেখেই তার অর্থ বদলে নেবেন?

জৈমিনি এবং তার ভাষ্যকাররা এই জায়গায় এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম শব্দার্থবিজ্ঞান প্রয়োগ করেছেন। মীমাংসার একটি প্রভাবশালী মত অনুযায়ী, দেবতার নামকে সাধারণত মুখে উচ্চারণ করার সময় সরাসরি অন্য শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা নিষিদ্ধ। যদি মন্ত্রের মূল শব্দটিকে রাখা হয়, তবে সেই শব্দটিকে ব্যাখ্যা করতে হবে লক্ষণা (figurative indication / lakṣaṇā) বা পরোক্ষ অর্থের মাধ্যমে (Einoo, 1988)। এখানে অগ্নির আক্ষরিক অর্থ হলো সেই জ্বলন্ত আগুন। কিন্তু সৌর্য যাগে এসে ‘অগ্নি’ শব্দটি আর কাঠের আগুনকে বোঝাবে না; তা পরোক্ষ অর্থে সূর্যকে বোঝাবে, কারণ অগ্নি এবং সূর্য উভয়ের মধ্যেই রয়েছে আলো এবং তাপ দেওয়ার সাধারণ গুণ।

এর ফলে একটি শব্দ তার প্রচলিত আভিধানিক অর্থের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে এবং সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে এক নতুন অর্থ ধারণ করে। এই প্রক্রিয়াটি দেখায় যে, আচারভেদে শব্দের অর্থ কীভাবে স্থানান্তরিত হয়। একটি সাধারণ পাঠক হয়তো কোনো স্তোত্রে ‘অগ্নি’ দেখে মনে করবেন এটি কেবল আগুনের স্তুতি। কিন্তু একজন অভিজ্ঞ মীমাংসক সেই একই স্তোত্র পাঠ করার সময় দেখবেন এটি কোন যজ্ঞের কোন পর্বে ব্যবহৃত হচ্ছে। যদি এটি সূর্যের যজ্ঞে থাকে, তবে সেখানে অগ্নি আসলে সূর্যেরই এক প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প। ফলে পাঠের অর্থ আর অক্ষরের ওপর নির্ভর করে না; পাঠের অর্থ নির্ধারিত হয় যজ্ঞের মহাজাগতিক লক্ষ্যের ওপর।

এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বৈদিক দেবতারা তাদের পৌরাণিক স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলেন। দেবতারা এখানে রক্তমাংসের কোনো অলৌকিক জীব নন, তারা হলেন যজ্ঞের আহুতি গ্রহণের কতগুলো সাংকেতিক ক্ষেত্র। এক দেবতার জায়গায় অন্য দেবতা সহজেই স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন, যদি তাদের আচারিক কার্যকারিতা একই থাকে। গবেষক হাওয়ার্ড ডব্লিউ. টুল (Howard W. Tull) তার কর্মের বৈদিক উৎস সংক্রান্ত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, এই প্রক্রিয়ায় যজ্ঞের টেক্সটটি একটি জটিল গাণিতিক সূত্রের মতো কাজ করত (Tull, 1989)। চলক বা ভ্যারিয়েবলের মতো এক দেবতার স্থানে অন্য দেবতাকে বসিয়ে দিলে পুরো সমীকরণটি সচল থাকত। ভাষা এখানে দেবতার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল; অনুষ্ঠানের শাসন শব্দের নিজস্ব পরিচিতিকে পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত।

কার্যকারিতা ও প্রাসঙ্গিক তাৎপর্য (Efficacy and Contextual Significance): বহুবিধ প্রয়োগের শব্দার্থবিজ্ঞান

একটি মন্ত্রকে যখন একাধিক অনুষ্ঠানে ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হয়, তখন তার প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা বা এফিকেসি কীভাবে বজায় থাকে? আধুনিক সংকেতবিজ্ঞান বা সেমিওটিক্সের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, একটি চিহ্নের নিজস্ব কোনো পরম অর্থ থাকে না; চিহ্নটির অর্থ নির্ভর করে সে কোন সংকেত-ব্যবস্থার ভেতরে কাজ করছে তার ওপর। জৈমিনি ঠিক এই সেমিওটিক সত্যটিকে হাজার বছর আগে যজ্ঞীয় আচারের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একটি একক ঋক বা স্তোত্র কোনো অনুষ্ঠানে একটি আহ্বানকারী মন্ত্র হিসেবে কাজ করতে পারে, আবার অন্য একটি অনুষ্ঠানে তা কাজ করতে পারে কেবল নিবেদিত ঘৃতকে স্পর্শ করার শুদ্ধিকরণ মন্ত্র হিসেবে।

এর একটি চমৎকার উদাহরণ হলো ঋগ্বেদের সেই বিখ্যাত চরণগুলো যা কোনো এককালে হয়তো প্রাকৃতিক কোনো ভোরের সৌন্দর্যে গাওয়া হয়েছিল। সেই সূক্তগুলোকে যখন সোমযাগের প্রাতঃসবনে নিয়ে আসা হলো, তখন তার কাজ হয়ে গেল যজ্ঞের সোমরস ছাঁকার শব্দকে মহিমান্বিত করা। আবার সেই একই মন্ত্র যখন গার্হস্থ্য কোনো গৃহপ্রবেশের আচারে প্রবেশ করল, তখন তার কাজ হয়ে দাঁড়াল গৃহকর্তার দীর্ঘায়ুর আশিস ঘোষণা করা। রচনার সময় হয়তো কোনো কবি কল্পনাই করতে পারেননি যে তার কবিতা একদিন এই বিচিত্র উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে। কিন্তু যজ্ঞের ব্যাখ্যাতত্ত্ব কবিতার মূল ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতকে মুছে ফেলে তার গায়ে এঁকে দিল শুদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক উপযোগিতা।

এই ব্যবস্থার কারণে বৈদিক সাহিত্যে এক ধরনের অসাধারণ শব্দার্থিক স্থিতিস্থাপকতা বা সেম্যান্টিক ইলাস্টিসিটি তৈরি হয়েছিল। টেক্সটকে অনমনীয় পাথরের মতো আটকে রাখা হয়নি; বরং তাকে করা হয়েছিল এমন এক নরম মাটির মতো, যা যেকোনো নতুন আচারের ছাঁচে ঢেলে নেওয়া যায়। এই স্থিতিস্থাপকতার কারণেই প্রাচীন যাযাবর যুগের ছোট ছোট স্তোত্রগুলো পরবর্তীকালের বিশাল সাম্রাজ্যবাদী যজ্ঞগুলোর সাথে কোনো সংঘাত ছাড়াই মানিয়ে নিতে পেরেছিল। অশ্বমেধ বা রাজসূয়ের মতো বিশাল রাজনৈতিক যজ্ঞগুলোতেও সেই প্রাচীন যাযাবর কবিদের মন্ত্রগুলোকেই পুনর্ব্যবহার করা হয়েছিল, কেবল তাদের প্রয়োগের বিন্দুগুলোকে বদলে দিয়ে।

জৈমিনির এই ব্যাখ্যাপদ্ধতি আমাদের আধুনিক সাহিত্যের পাঠককেও এক নতুন শিক্ষা দেয়। একটি টেক্সটের অর্থ কখনোই কেবল তার লেখকের প্রথম চিন্তার ভেতর শেষ হয়ে যায় না। টেক্সট যখন বিভিন্ন ঐতিহাসিক সম্প্রদায় ও প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে, তখন নতুন নতুন ব্যবহারের ভেতর দিয়ে তার নতুন নতুন অর্থস্তর উন্মোচিত হয়। প্রয়োগের এই বৈচিত্র্য টেক্সটকে কোনো ক্ষতি করে না, বরং টেক্সটের ভেতরের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে দীর্ঘস্থায়ী করে। একই মন্ত্রের ভিন্ন ভিন্ন যজ্ঞে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করার এই ক্ষমতাই বৈদিক সাহিত্যকে যুগের পর যুগ এক অপ্রতিরোধ্য সামাজিক শক্তি হিসেবে টিকিয়ে রেখেছিল।

প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার ও পুরোহিততন্ত্রের রাজনীতি (Institutional Recycling and the Politics of Priesthood): সামাজিক মোহমুক্তি

একটি সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ এবং বস্তুনিষ্ঠ পাঠে কেবল ভাষাতাত্ত্বিক চাতুর্য দেখে থেমে থাকলে চলে না; এই মন্ত্র পুনর্ব্যবহার এবং ঊহ পদ্ধতির পেছনের নির্মম সামাজিক ও অর্থনৈতিক রাজনীতিটিকেও উন্মোচিত করতে হয়। বৈদিক সংহিতার মন্ত্রগুলোকে নতুন নতুন যজ্ঞে পুনর্ব্যবহার করার এই যে জটিল প্রক্রিয়া, এটা কোনো নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক খেলা ছিল না। এটি ছিল তৎকালীন উদীয়মান পুরোহিততন্ত্রের এক অত্যন্ত সুপরিকল্পিত মতাদর্শিক কৌশল (Stoker, 2016)। কেন তারা নতুন নতুন যজ্ঞের জন্য নতুন কবিতা বা মন্ত্র রচনা করলেন না? কেন তারা পুরনো মন্ত্রগুলোকেই এত কষ্ট করে টেনেটুনে বদলাতে গেলেন?

এর প্রধান কারণ হলো কর্তৃত্ব বা অথরিটির রাজনীতি। প্রাচীন বৈদিক মন্ত্রগুলোর পেছনে ছিল এক ধরনের অবিতর্কিত পবিত্রতার মোহ। সমাজে যদি কোনো নতুন ধরনের যজ্ঞ চালু করতে হতো – বিশেষ করে রাজাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি, কর আদায়ের ন্যায্যতা বা ভূমি দখলের জন্য যেসব নতুন নতুন বিকৃতি যাগ তৈরি হচ্ছিল – সেগুলোকে যদি সম্পূর্ণ নতুন ভাষায় করা হতো, তবে সাধারণ মানুষ সেগুলোকে সন্দেহের চোখে দেখতে পারত। কিন্তু পুরোহিতরা যখন দেখালেন যে এই নতুন যজ্ঞগুলোতেও সেই আদিম ঋষিদের মন্ত্রই পঠিত হচ্ছে, কেবল সামান্য একটু রূপান্তর ঘটিয়ে, তখন শাসক ও প্রজাদের কাছে সেই আচারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকত না। পুরনো মন্ত্রের পবিত্রতাকে পুঁজি করে নতুন সামাজিক চাহিদাকে বৈধতা দেওয়ার এটি ছিল এক মোক্ষম হাতিয়ার।

একই সাথে এই ঊহ এবং অতিদেশের জটিল ব্যাকরণ পুরোহিত শ্রেণির অর্থনৈতিক একচেটিয়া অধিকারকে চিরস্থায়ী করেছিল। সাধারণ মানুষের পক্ষে কোনোদিনই এই জটিল নিয়ম বোঝা সম্ভব ছিল না যে কোন যজ্ঞে বচন পরিবর্তন করতে হবে, কোথায় দেবতার নাম ঊহ করা নিষিদ্ধ আর কোথায় তা বাধ্যতামূলক। সামান্য একটি ভুলের কারণে পুরো যজ্ঞ পণ্ড হয়ে যেতে পারে এবং যজমানের বিনাশ ঘটতে পারে – এই ভীতি সমাজের ভেতর সুকৌশলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে রাজা থেকে শুরু করে ধনী কৃষক পর্যন্ত সবাই এই উচ্চপ্রশিক্ষিত যাজক শ্রেণির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। পুরোহিতরা তাদের এই বিশেষায়িত ভাষাতাত্ত্বিক দক্ষতাকে এমন এক প্রযুক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন, যার চাবিকাঠি ছিল কেবল তাদের নিজেদের হাতেই।

উপসংহারে বলা যায়, জৈমিনির এই একাধিক প্রয়োগের তত্ত্ব মানুষের বৌদ্ধিক ইতিহাসের এক দ্বিমুখী স্মৃতিস্তম্ভ। একদিকে এটি প্রাচীন ভারতের এক অসাধারণ ভাষাতাত্ত্বিক কৃতিত্ব, যা আধুনিক আইনি নজির বা প্রেসিডেন্স ব্যবহারের তত্ত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কীভাবে একটি প্রাচীন আইনকে সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে নমনীয় করে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করতে হয়, জৈমিনির এই বিশ্লেষণ তার এক চূড়ান্ত নিদর্শন। অন্যদিকে, এটি দেখায় যে কীভাবে ভাষাদর্শন ও ব্যাকরণকে ব্যবহার করে একটি সুবিধাভোগী পুরোহিত শ্রেণি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সমাজের উৎপাদন ও ক্ষমতার ওপর নিজেদের একচ্ছত্র প্রাধান্য বজায় রেখেছিল। জৈমিনিকে পাঠ করার অর্থ হলো টেক্সটের এই সৃজনশীল রূপান্তরকে জানা, এবং একই সাথে সেই রূপান্তরের পেছনে কাজ করা ক্ষমতার অদৃশ্য নকশাটিকেও নির্মোহ চোখে চিনে নেওয়া।

শবরস্বামী ও যজ্ঞীয় প্রসঙ্গ (Śabara and Ritual Context): মন্ত্র, ক্রিয়া ও অনুষ্ঠানের পারস্পরিক নির্ভরতা

যজ্ঞীয় প্রসঙ্গ ও শবরস্বামীর প্রারম্ভিক প্রস্তাবনা (Ritual Context and Śabara’s Foundational Proposal): বিচ্ছিন্ন পাঠের অসম্ভবতা

একটি লিখিত বা শ্রুত বাক্যকে যখন তার পারিপার্শ্বিক বাস্তব পরিস্থিতি থেকে আলাদা করে ফেলা হয়, তখন সেই বাক্যের অর্থ একধরনের বিপজ্জনক শূন্যতায় ভেসে বেড়ায়। প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই সত্যটি সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য। আচার্য শবরস্বামী (Śabarasvāmin) তার প্রামাণ্য গ্রন্থ শবরভাষ্য (Śabarabhāṣya)-এ খুব স্পষ্ট ভাষায় দেখিয়েছেন যে, বৈদিক মন্ত্রকে কোনো নির্জন ঘরে বসে পাঠ করার সাহিত্য মনে করলে তার আসল চরিত্রটি সম্পূর্ণ অধরা থেকে যায় (Potter, 2014)। মন্ত্র কোনো বিমূর্ত কাব্য নয়, কোনো ব্যক্তিগত ভাবালুতার প্রকাশও নয়। মন্ত্র হলো একটি সুবিশাল প্রাতিষ্ঠানিক যজ্ঞের জীবন্ত অঙ্গ। শবরস্বামীর মতে, যজ্ঞের সামগ্রিক আবহ বা যজ্ঞীয় প্রসঙ্গ (ritual context / prakaraṇa) হলো সেই ভিত্তিভূমি, যা মন্ত্রের প্রতিটি ধ্বনিকে তার সুনির্দিষ্ট অর্থ ও কার্যকারিতা দান করে।

শবরস্বামী তার ভাষ্যজুড়ে একটি মৌলিক যুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন: যজ্ঞের বাইরে বৈদিক মন্ত্রের কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব নেই। আধুনিক সাহিত্যের পাঠকরা যেভাবে একটি কবিতাকে তার লেখকের সামাজিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবল শব্দের খেলায় মেতে উঠতে পারেন, প্রাচীন মীমাংসা শাস্ত্রে সেই সুযোগ সম্পূর্ণ রুদ্ধ ছিল। যদি কেউ বৈদিক সংহিতার একটি স্তোত্রকে যজ্ঞের বাইরে নিয়ে গিয়ে বিশ্লেষণ করতে চায়, তবে সে একটি মাছকে জল থেকে তুলে ডাঙায় ফেলার মতো অবস্থা তৈরি করবে। জল ছাড়া মাছ যেমন বাঁচে না, যজ্ঞের অনুষ্ঠান ছাড়া বৈদিক মন্ত্রও তেমনই প্রাণহীন শব্দতরঙ্গে পরিণত হয়। এই কারণে শবরস্বামী পাঠ এবং প্রয়োগের এই অবিচ্ছেদ্য বন্ধনটিকে তার ব্যাখ্যার কেন্দ্রে স্থাপন করেছিলেন।

এই যজ্ঞীয় বাস্তবতায় তিনটি উপাদান সবসময় একসাথে কাজ করে: প্রথমটি হলো উচ্চারিত মন্ত্র (sacred utterance / mantra), দ্বিতীয়টি হলো পুরোহিতের শারীরিক অঙ্গভঙ্গি বা ক্রিয়া (bodily ritual action / kriyā), এবং তৃতীয়টি হলো এই দুইয়ের সমন্বয়ে গঠিত সমগ্র অনুষ্ঠান (the comprehensive sacrifice / anuṣṭhāna)। এই তিনটি উপাদান কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়; তারা পরস্পরের ওপর এমনভাবে নির্ভরশীল যে একটিকে বাদ দিলে অন্য দুটি অচল হয়ে পড়ে। মন্ত্র ছাড়া ক্রিয়া হলো অন্ধ, আর ক্রিয়া ছাড়া মন্ত্র হলো বোবা। শবরস্বামী দেখান যে, মানুষের শারীরিক কর্ম এবং তার উচ্চারিত শব্দের এই যুগলবন্দীই হলো বৈদিক যজ্ঞের মূল চালিকাশক্তি।

আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী ও আচার তাত্ত্বিক ক্যাথরিন বেল (Catherine Bell) তার বিখ্যাত গ্রন্থ রিচুয়াল থিওরি, রিচুয়াল প্র্যাকটিস (Ritual Theory, Ritual Practice)-এ যেমন আচারকে কেবল বিশ্বাসের প্রকাশ না দেখে তাকে মানুষের শারীরিক ও স্থানিক অনুশীলনের এক সমন্বিত কাঠামো হিসেবে বিশ্লেষণ করেছিলেন, শবরস্বামীও ঠিক সেই কাজটি করেছিলেন (Bell, 1992)। শবরস্বামীর দৃষ্টিতে যজ্ঞশালা হলো এমন এক বিশেষ ক্ষেত্র, যেখানে প্রতিটি কথা একটি কাজের সাথে বাঁধা থাকে এবং প্রতিটি কাজ একটি কথার দ্বারা সমর্থিত হয়। বিচ্ছিন্ন পাঠের অসম্ভবতা ঘোষণা করে শবরস্বামী বৈদিক হার্মেনিউটিক্সকে এক কঠোর প্রায়োগিক শৃঙ্খলার ভেতর নিয়ে এসেছিলেন, যেখানে প্রেক্ষাপটই হলো অর্থের পরম নিয়ন্ত্রক।

অঙ্গ ও অঙ্গীর পারস্পরিক সম্বন্ধ (The Reciprocal Relation of Aṅga and Aṅgī): কাঠামোগত স্তরবিন্যাস

বৈদিক যজ্ঞের সুবিশাল কাঠামোকে একটি বিশাল রাজপ্রাসাদের সাথে তুলনা করা যায়। সেই প্রাসাদে একটি কেন্দ্রীয় কক্ষ থাকে, আর থাকে অসংখ্য সহায়ক বারান্দা, সিঁড়ি ও সুরক্ষা প্রাচীর। মীমাংসা দর্শনে যজ্ঞের ক্রিয়াগুলোকে এই ধরনের একটি স্তরবিন্যাসে ভাগ করা হয়েছে, যাকে বলা হয় অঙ্গ ও অঙ্গীর সম্বন্ধ (relationship of subordinate and principal / aṅga-aṅgī-bhāva) (Biardeau, 1964)। এই বিভাজনটি যজ্ঞের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বোঝার জন্য অপরিহার্য। শবরস্বামী তার ভাষ্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে একটি যজ্ঞের শত শত ছোট ছোট কাজ শেষ পর্যন্ত একটি মূল উদ্দেশ্যের অধীনে এসে জমা হয়।

এই কাঠামোর শীর্ষে অবস্থান করে প্রধান কর্ম (principal action / pradhāna karma) বা ‘অঙ্গী’। অঙ্গী হলো সেই মূল যজ্ঞক্রিয়া, যার সাথে সরাসরি যজ্ঞের চূড়ান্ত ফলের নির্দেশ যুক্ত থাকে। যেমন দর্শপূর্ণমাস যজ্ঞের মূল পিঠা উৎসর্গ করার কাজটি। এই কাজটি করার প্রধান উদ্দেশ্য হলো যজমানের জন্য কাঙ্ক্ষিত স্বর্গ বা সমৃদ্ধি অর্জন করা। কিন্তু একটি প্রধান কাজ কখনোই একা একা শূন্যের মধ্যে সম্পন্ন হতে পারে না। তাকে সার্থক করে তোলার জন্য প্রয়োজন হয় অসংখ্য সহায়ক ক্রিয়া, যাদের বলা হয় অঙ্গ (subordinate auxiliary / aṅga)। এই অঙ্গগুলোর নিজস্ব কোনো স্বাধীন ফল নেই; এদের একমাত্র সার্থকতা হলো মূল কাজটিকে যথাযথভাবে সম্পন্ন হতে সাহায্য করা।

শবরস্বামী এখানে একটি চমৎকার হার্মেনিউটিক নিয়ম ব্যাখ্যা করেছেন। বৈদিক টেক্সটে এমন অনেক নির্দেশ ছড়িয়ে রয়েছে যেগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট ফলের উল্লেখ নেই। যেমন যজ্ঞের পাত্র ধোয়া, চাল থেকে তুষ ছাড়ানো বা যজ্ঞবেদী পরিষ্কার করা। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এই কাজগুলো হয়তো অর্থহীন, কারণ এদের কোনো ফল ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু শবরস্বামী বলেন, এই নিষ্ফল কাজগুলোই হলো ফলবান প্রধান কাজের অঙ্গ। ব্যাকরণগত ও বাস্তব আকাঙ্ক্ষার কারণে এই সহায়ক কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল কাজের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। যেমন একজন মানুষ যখন কোনো ভোজের আয়োজন করে, তখন বাজার করা বা রান্নার হাঁড়ি ধোয়ার কোনো আলাদা উৎসব হয় না; সেই কাজগুলো ভোজনের মূল উৎসবটির সাহায্যকারী হিসেবেই অর্থ খুঁজে পায়।

এই অঙ্গ-অঙ্গী সম্পর্কের কারণে যজ্ঞের প্রতিটি মন্ত্র এবং ক্রিয়ার মর্যাদা নির্ধারিত হয়। কোনো মন্ত্রটি প্রধান আহুতির সময় উচ্চারিত হবে আর কোনটি সহায়ক ঘাস কাটার সময় পঠিত হবে – এই স্তরবিন্যাসটি পরিষ্কার না থাকলে যজ্ঞে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারত। শবরস্বামী দেখান যে, সমগ্র অনুষ্ঠানের ভেতরে থাকা ছোট ছোট কাজগুলো আসলে একে অপরের সাথে এক সুসংগত ঐক্য তৈরি করে। মূল উদ্দেশ্যটি একটি অদৃশ্য আকর্ষণের মতো সমস্ত সহায়ক অংশকে নিজের কেন্দ্রের দিকে টেনে রাখে। এর ফলে হাজার হাজার মন্ত্র ও ক্রিয়ার জটিল সমাহার একটি সুশৃঙ্খল ও অখণ্ড মহাকাব্যিক রূপ লাভ করে।

সন্নিপত্যোপকারক ও আরাদুপকারক ক্রিয়া (Directly Assisting and Indirectly Assisting Actions): বস্তু বনাম অদৃশ্য রূপান্তর

সহায়ক বা অঙ্গ ক্রিয়াগুলোর চরিত্রও সব সময় এক রকম হয় না। শবরস্বামী তার ভাষ্যে এই সহায়ক ক্রিয়াগুলোকে তাদের প্রায়োগিক কার্যপদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাগে বিভক্ত করেছেন। প্রথম ভাগটির নাম হলো সন্নিপত্যোপকারক (directly assisting action / sannipatyopakāraka) এবং দ্বিতীয় ভাগটির নাম হলো আরাদুপকারক (indirectly assisting action / ārādupakāraka) (Potter, 2014)। এই বিভাজনটি প্রাচীন ভারতের বৈষয়িক বা বস্তুগত চিন্তা এবং অদৃশ্য ধর্মতাত্ত্বিক ভাবনার মধ্যকার সীমানাকে বোঝার জন্য এক চমৎকার দলিল।

সন্নিপত্যোপকারক ক্রিয়া হলো সেইসব শারীরিক কাজ, যা যজ্ঞের কোনো বাস্তব বা দৃশ্যমান উপাদানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। যেমন ধান থেকে চাল বের করার জন্য মুষল দিয়ে আঘাত করা, যজ্ঞের ঘি আগুনে দেওয়ার আগে পাত্রে ছাঁকা, কিংবা বলি দেওয়ার পশুকে দড়ি দিয়ে যূপকাষ্ঠে বাঁধা। এই কাজগুলোর প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি দৃশ্যমান বস্তুর গুণগত বা কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটে। ধান ভাঙলে চাল বের হয়ে আসে – এটি একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পরিবর্তন। শবরস্বামী দেখান যে, এই ধরনের ক্রিয়ার সাথে যে মন্ত্রগুলো উচ্চারিত হয়, সেগুলোর কাজ হলো ওই দৃশ্যমান বস্তুর রূপান্তরের মুহূর্তটিকে চেতনায় স্পষ্ট করে তোলা। এখানে মন্ত্র সরাসরি বস্তুর শারীরিক প্রক্রিয়ার সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করে।

অন্যদিকে রয়েছে আরাদুপকারক ক্রিয়া। এই কাজগুলোর কোনো দৃশ্যমান বস্তুগত লক্ষ্য থাকে না। যেমন মূল যজ্ঞের আগে যে পাঁচটি ছোট ছোট আহুতি দেওয়া হয়, যাদের বলা হয় ‘প্রয়াজ’, কিংবা যজ্ঞের শেষে দেওয়া ‘অনুযাজ’ আহুতি। এই আহুতিগুলো কোনো পাত্র বা চালকে পরিবর্তন করে না; এগুলো কেবল অগ্নিকুণ্ডে ঢেলে দেওয়া হয়। তাহলে এদের কাজ কী? শবরস্বামী বলেন, এই ক্রিয়াগুলো কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন তৈরি না করলেও তারা সরাসরি একটি অদৃশ্য সংস্কার বা কার্যকারিতা তৈরি করে, যা মূল যজ্ঞের অপূর্ব (unseen potency / apūrva) উৎপাদনে সরাসরি সাহায্য করে (Biardeau, 1964)। এগুলো হলো এমন এক আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি, যা যজ্ঞভূমির সমগ্র পরিবেশকে মহাজাগতিক রূপান্তরের উপযোগী করে তোলে।

এই দুই ধরনের ক্রিয়ার পার্থক্য বিশ্লেষণ করে শবরস্বামী একটি বিষয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যজ্ঞের জগৎ কেবল বস্তুহীন জাদুকরী কোনো জগত নয়; সেখানে একাধারে দৃশ্যমান বাস্তব পদার্থের প্রক্রিয়াকরণ চলে এবং সমান্তরালভাবে চলে অদৃশ্য আস্থার পুনরুৎপাদন। কাঠ কাটা, শস্য ধোয়া এবং চামড়া ছাড়ানোর মতো অত্যন্ত পার্থিব শারীরিক শ্রমের সাথে যখন ধর্মীয় অদৃশ্য শক্তির ধারণা যুক্ত হয়, তখন একটি সাধারণ পশুপালক বা কৃষিভিত্তিক শ্রমপ্রক্রিয়া এক মহাজাগতিক মর্যাদা লাভ করে। সন্নিপত্যোপকারক ক্রিয়া নিশ্চিত করে যে যজ্ঞটি মাটির পৃথিবীর বাস্তব উপাদানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, আর আরাদুপকারক ক্রিয়া নিশ্চিত করে যে সেই উপাদানগুলো এক অলৌকিক লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

মন্ত্র ও শারীরিক ক্রিয়ার সমকালিকতা (Simultaneity of Mantra and Bodily Action): উচ্চারণ ও স্পর্শের মেলবন্ধন

শবরস্বামীর আচার দর্শনের সবচেয়ে কঠোর নিয়মগুলোর একটি হলো মন্ত্র এবং শারীরিক কর্মের সময়ের অভিন্নতা। মীমাংসা শাস্ত্রে এই নিয়মকে বলা হয় সমকালিকতা (simultaneity / samakālikatā)। এর সহজ অর্থ হলো, পুরোহিত যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট শারীরিক কাজ করবেন, ঠিক সেই কাজের মুহূর্তটিতেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রটি উচ্চারণ করতে হবে (Sharma, 1983)। কোনো কাজ করার দশ মিনিট আগে মন্ত্র পড়ে বসে থাকা যাবে না, আবার কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর এসে মন্ত্র আওড়ালেও যজ্ঞ ত্রুটিপূর্ণ হবে। শারীরিক হাতের স্পর্শ এবং মুখের উচ্চারিত শব্দের মিলন ঘটতে হবে একই সেকেন্ডের ভগ্নাংশের ভেতর।

এই কঠোর নিয়মের পেছনে শবরস্বামী এক অসাধারণ জ্ঞানতাত্ত্বিক কারণ তুলে ধরেছেন। মন্ত্রের কাজ হলো মানুষের স্মৃতিকে জাগ্রত করা, যাকে বলা হয় ‘সমবেত স্মরণ’। পুরোহিত যখন সোম পাত্রটি হাত দিয়ে স্পর্শ করছেন, তখন তার মন যাতে অন্য কোনো দিকে বিভ্রান্ত না হয়, তিনি যেন পুরোপুরি সচেতন থাকেন যে তিনি ঠিক কোন পাত্রটি স্পর্শ করছেন এবং কোন দেবতার উদ্দেশ্যে তা উৎসর্গ করা হচ্ছে – সেই সচেতনতা তৈরি করতেই মন্ত্রের উচ্চারণ। যদি হাতের কাজের সাথে মুখের কথার কোনো সামঞ্জস্য না থাকে, তবে মানুষের একাগ্রতা নষ্ট হয়ে যায় এবং কর্মটি হয়ে পড়ে যান্ত্রিক ও অচেতন। সমকালিকতা মানুষের শরীর এবং মনকে একটি একক বিন্দুতে এনে স্থির করে দেয়।

এখানে ভাষার ব্যাকরণগত নির্দেশক বা অঙ্গুলিনির্দেশক শব্দগুলোর এক বড় ভূমিকা রয়েছে। বৈদিক মন্ত্রগুলোতে প্রচুর সর্বনাম ব্যবহার করা হয়, যেমন ‘অয়ম্’ (এই), ‘ইদম্’ (ইহা) বা ‘অসৌ’ (ঐটি)। এখন যদি কোনো পুরোহিত কেবল মুখে উচ্চারণ করেন – ‘ইদং ইন্দ্রায়’ (ইহা ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি), তবে এই ‘ইহা’ শব্দটি বাতাসে শূন্যে ঝুলে থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত না পুরোহিতের হাত বাস্তবে একটি নির্দিষ্ট পাত্রের সোমরস বা পুরডাশকে স্পর্শ করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ‘ইহা’ শব্দটির কোনো বাস্তব নির্দেশক তৈরি হয় না। শারীরিক কাজ ভাষার সর্বনামটিকে রক্তমাংসের রূপ দেয়, আর মুখের বাক্যটি সেই বোবা কাজটিকে একটি সামাজিক ও ধর্মীয় স্বীকৃতি দান করে।

বিখ্যাত নৃতাত্ত্বিক রয় র‍্যাপাপোর্ট (Roy A. Rappaport) তার ধর্ম ও আচার সংক্রান্ত মহাগ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, আচারের মূল শক্তি হলো বাক্যের সাথে শারীরিক রূপান্তরের এই অপরিবর্তনীয় বন্ধন (Rappaport, 1999)। মুখে এক কথা বলা আর শরীরে অন্য কাজ করার যে ভণ্ডামি বা অসততা মানুষের সাধারণ জীবনে দেখা যায়, আচারের পবিত্র ভূমিতে তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। শবরস্বামী বৈদিক যজ্ঞকে এমন এক নিখুঁত যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন যেখানে কথা এবং কাজের মধ্যে কোনো ফাঁক থাকার সুযোগ ছিল না। শরীর যা করছে, কণ্ঠ ঠিক তা-ই গাইছে। এই দ্বৈত প্রকাশ যজ্ঞের বাস্তবতাকে উপস্থিত মানুষের কাছে এক অবিশ্বাস্য রকমের নিশ্চিত ও সন্দেহাতীত সত্য হিসেবে তুলে ধরত।

প্রকরণের শাসন ও টেক্সটের সংহতি (The Rule of Prakaraṇa and Textual Coherence): সামগ্রিকতার জাল

বৈদিক সাহিত্যের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার বাক্য কীভাবে একটি একক যজ্ঞের অধীনে এসে শান্তভাবে সমবেত হয়? এই অলৌকিক ঐক্য সম্ভব হয় যার শাসনে, তার নাম প্রকরণ (ritual context / macro-context)। মীমাংসা দর্শনের প্রমাণের স্তরবিন্যাসে প্রকরণকে একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শবরস্বামী তার ভাষ্যে দেখান যে, শ্রুতি বা সরাসরি নির্দেশ যেমন শক্তিশালী, প্রকরণের কাজ হলো সেই শক্তিশালী নির্দেশগুলোর পারস্পরিক ভৌগোলিক ও পদ্ধতিগত বিস্তার ঘটানো (Potter, 2014)। প্রকরণ হলো এমন এক ক্ষেত্রীয় শক্তি, যা শত শত বিচ্ছিন্ন নির্দেশকে একটি সুনির্দিষ্ট যজ্ঞের সীমানায় বেঁধে ফেলে।

প্রকরণের এই ঐক্য তৈরির জন্য শবরস্বামী একটি বিখ্যাত তাত্ত্বিক শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন, যার নাম উভয়াকাঙ্ক্ষা (mutual expectancy / ubhayākāṅkṣā)। এটি হলো এক ধরনের দ্বিপাক্ষিক ব্যাকরণগত ও বাস্তব প্রয়োজন। একদিকে রয়েছে মূল প্রধান যজ্ঞ, যার একটি বড় ফল ঘোষণা করা হয়েছে (যেমন স্বর্গলাভ), কিন্তু সেই যজ্ঞটি কীভাবে করতে হবে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ পদ্ধতিটি সেখানে বলা নেই। অর্থাৎ প্রধান যজ্ঞটির একটি তীব্র পদ্ধতিগত তৃষ্ণা বা ‘কীভাবে করব’ (কথম্ভাব) এর আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। অন্যদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে শত শত ছোট ছোট বিধান, যেখানে বলা হয়েছে ‘ঘাস কাটো’, ‘জল ছিটকাও’, কিন্তু সেগুলোর কোনো নিজস্ব ফল বা সার্থকতা বলা নেই। অর্থাৎ সহায়ক ক্রিয়াগুলোর একটি লক্ষ্যের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। প্রকরণ এই দুই ভিন্ন অভাবকে মুখোমুখি এনে তাদের মধ্যে এক অচ্ছেদ্য বন্ধন তৈরি করে।

এই কাঠামোর কারণে কোনো একটি বৈদিক বাক্যকে তার প্রসঙ্গ থেকে ছিঁড়ে এনে স্বাধীনভাবে কোনো মনগড়া অর্থ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। আধুনিক সাংবিধানিক আইনবিদরা যেভাবে কোনো একটি আইনি ধারাকে পুরো সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সাপেক্ষে ব্যাখ্যা করেন, শবরস্বামী ঠিক সেই হার্মেনিউটিক্স প্রয়োগ করেছিলেন। যদি কোনো বাক্যে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যে এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ উপদেশ, শবরস্বামী পরীক্ষা করে দেখবেন বাক্যটি কোন প্রকরণের ভেতর বসে আছে। যদি দেখা যায় এটি দর্শপূর্ণমাসের প্রকরণে উচ্চারিত হয়েছে, তবে তার সমস্ত অর্থ ওই বিশেষ যজ্ঞের নিয়মবিধির অধীনে নত হতে বাধ্য হবে। টেক্সট কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের সমষ্টি নয়; টেক্সট হলো একটি বিশাল জাল, যার প্রতিটি সুতো অন্য সুতোর সাথে বাঁধা।

এই সামগ্রিকতার কারণে প্রাচীন বৈদিক সাহিত্য এক ধরনের অদ্ভুত টেক্সটগত দুর্গে পরিণত হয়েছিল। বাইরে থেকে কোনো নতুন বাক্য এনে এই জালের ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া বা ভেতর থেকে কোনো বাক্যকে অপ্রয়োজনীয় বলে বাদ দেওয়া অসম্ভব ছিল। শবরস্বামী দেখান যে, প্রকরণের শাসন নিশ্চিত করে যে বৈদিক ভাষার প্রতিটি শব্দ একটি বিশাল মেশিনের নাট-বল্টুর মতো নিখুঁতভাবে তার নিজ নিজ স্থানে বসে কাজ করে চলেছে। একটি নাট-বল্টুর আলাদা কোনো মহিমা নেই, কিন্তু পুরো মেশিনের সচল থাকার জন্য সে যেমন অপরিহার্য, বৈদিক মন্ত্রের প্রতিটি ক্ষুদ্র চরণও সমগ্র যজ্ঞের শৃঙ্খলার জন্য তেমনই অপরিহার্য।

যজ্ঞের যান্ত্রিকীকরণ ও সামাজিক শৃঙ্খলার রাজনীতি (Mechanization of Ritual and Politics of Social Order): মোহমুক্তি ও বিশ্লেষণ

একটি সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ, ঐতিহাসিক এবং নির্মোহ মূল্যায়নে শবরস্বামীর এই যজ্ঞীয় প্রযুক্তির সামাজিক ও রাজনৈতিক মাত্রাকে উন্মোচিত করা ছাড়া উপায় নেই। শবরস্বামী যখন মন্ত্র, ক্রিয়া এবং প্রকরণের এই নিখুঁত পারস্পরিক নির্ভরতার তত্ত্ব খাড়া করছিলেন, তখন তিনি আসলে বৈদিক যজ্ঞকে এমন এক স্বয়ংক্রিয় যান্ত্রিক শৃঙ্খলায় পরিণত করেছিলেন, যা তৎকালীন সামাজিক স্তরবিন্যাসকে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়ার পক্ষে কাজ করেছিল। ভারততত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিক রামশরণ শর্মা (R. S. Sharma) প্রাচীন ভারতের সামাজিক ও বস্তুগত ইতিহাস প্রসঙ্গে দেখিয়েছেন যে, উত্তর ভারতে যখন জটিল কৃষিনির্ভর সমাজ এবং রাজকীয় ক্ষমতার বিকাশ ঘটছিল, তখন এই যাগযজ্ঞগুলো ছিল উৎপাদনের উদ্বৃত্ত সম্পদকে পুরোহিত ও শাসক শ্রেণির অনুকূলে জড়ো করার এক প্রধান মতাদর্শিক মাধ্যম (Sharma, 1983)।

শবরস্বামীর এই ব্যাখ্যাপদ্ধতির ফলে যজ্ঞ হয়ে উঠেছিল এক ধরনের নিশ্ছিদ্র সাইবারনেটিক সিস্টেম বা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র। এই যন্ত্রে মানুষের নিজস্ব আবেগ, ভক্তি বা নৈতিক বিচারের কোনো জায়গা রাখা হয়নি। যজ্ঞ সফল হবে কি হবে না, তা নির্ভর করত যন্ত্রের প্রতিটি নিয়ম নিখুঁতভাবে পালিত হলো কি না তার ওপর। মন্ত্রের সাথে কাজের মিল থাকতে হবে, সময়ের মিল থাকতে হবে, প্রকরণের বাইরে যাওয়া যাবে না। এর ফলে সমাজের ভেতর এক ধরনের পরম আনুগত্যের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। যদি কোনো ফল না পাওয়া যেত, তবে বলা হতো কোথাও কোনো সামান্য আনুষ্ঠানিক ত্রুটি হয়েছিল; সমগ্র ব্যবস্থার ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো অধিকার কারও ছিল না। এটি ছিল মানুষের সমালোচনামূলক চিন্তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রীতির নিচে সম্পূর্ণ পিষ্ট করার এক চূড়ান্ত ব্যবস্থা।

একই সাথে এই যজ্ঞীয় নির্ভরতার পেছনে কাজ করছিল এক তীব্র শ্রমবিভাজন এবং সামাজিক বৈষম্যের রাজনীতি। যজ্ঞে যে বিপুল পরিমাণ ঘি, শস্য, পশুপালন এবং শারীরিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজন হতো, সেই কঠোর শ্রমের কাজগুলো করত সমাজের অন্ত্যজ ও শ্রমজীবী মানুষ। কিন্তু যজ্ঞভূমির পবিত্র সীমানায় তাদের প্রবেশাধিকার ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শবরস্বামী যে অঙ্গ-অঙ্গী সম্পর্কের কথা বলেছিলেন, তা আসলে তৎকালীন সমাজের দাসত্ব ও আধিপত্যের কাঠামোরই এক প্রতীকী প্রতিচ্ছবি। প্রধান ফলভোগী হলো উচ্চবর্ণের পুরুষ যজমান ও পুরোহিত, আর বাকি সমস্ত উপাদান ও মানুষের অস্তিত্ব ছিল কেবল সেই প্রধানের সহায়ক অঙ্গ হিসেবে বিলীন হওয়ার জন্য। ভাষা এবং আচারের মধ্য দিয়ে সমাজের এই নির্মম পিতৃতান্ত্রিক ও বর্ণাশ্রমভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসকে এক স্বাভাবিক মহাজাগতিক বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

সবশেষে একজন আধুনিক যুক্তিবাদী পাঠকের কাছে শবরস্বামীর এই ভাষ্যের তাৎপর্য কী? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার বিশ্লেষণী প্রতিভায়। শবরস্বামী কোনো ভাববাদী কুয়াশার আশ্রয় নেননি; তিনি অত্যন্ত নির্মোহভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে ভাষা এবং মানুষের শরীর একসাথে মিলে একটি সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করে। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা আজ যে পারফরমেটিভিটি বা ক্রিয়াশীল ভাষার কথা বলেন, শবরস্বামী বহু শতাব্দী আগেই তার বিশদ ব্যাকরণ তৈরি করে রেখেছিলেন। তিনি আমাদের বুঝতে সাহায্য করেন যে কীভাবে আচার মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে, কীভাবে শব্দের জাল মানুষকে এক অমোঘ শৃঙ্খলার ভেতর আটকে ফেলে। শবরস্বামীকে পাঠ করার অর্থ হলো প্রাচীন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার চরম রূপটিকে প্রত্যক্ষ করা, এবং একই সাথে সেই ক্ষমতার নিগড় থেকে মানুষের চিন্তাকে মুক্ত করার ঐতিহাসিক তাগিদ অনুভব করা।

রিক্যুর ও ব্রাহ্মণ সাহিত্যের প্রতীকায়ন (Ricoeur and Brāhmaṇa Symbolism): যজ্ঞীয় বস্তু, সাদৃশ্য ও মহাজাগতিক অর্থ

ব্রাহ্মণ সাহিত্যের প্রতীকী কাঠামো ও রিক্যুর (Symbolic Framework of Brāhmaṇa Literature and Ricoeur): গদ্যভাষ্যে রূপকের বিস্তার

প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যের ইতিহাসে সংহিতার কাব্যময় স্তর থেকে ব্রাহ্মণ সাহিত্যের গদ্যময় স্তরে উত্তরণ এক বিশাল রূপান্তর। ঋগ্বেদে যেখানে কবিদের আবেগ, রূপক এবং ছন্দময় স্তুতি ছিল প্রধান, শতপথ, ঐতরেয় বা তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে এসে ভাষা পরিণত হলো এক অত্যন্ত জটিল, বিশ্লেষণাত্মক এবং আচারকেন্দ্রিক গদ্যভাষ্যে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে যে এই গ্রন্থগুলো কেবল যাগযজ্ঞের একঘেয়ে নিয়মকানুনের সংকলন। কিন্তু ফরাসি দার্শনিক পল রিক্যুর (Paul Ricoeur) তার রূপক তত্ত্বে যেভাবে ভাষাকে ব্যাখ্যা করেছেন, সেই দৃষ্টি দিয়ে তাকালে ব্রাহ্মণ সাহিত্যকে মনে হয় মানব ইতিহাসের অন্যতম চমকপ্রদ প্রতীকী গবেষণাগার (Ricoeur, 1995)। এই সাহিত্যে প্রতিটি দৃশ্যমান বস্তুকে অন্য এক অদৃশ্য মহাজাগতিক সত্তার সাথে মেলানোর এক নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস চালানো হয়েছে।

ব্রাহ্মণ সাহিত্যের এই পদ্ধতিটির নাম হলো নিদান (etiological identification / nidāna)। নিদান মানে হলো কোনো একটি আচারিক নিয়মের অন্তর্নিহিত আদি কারণ বা গোপন সংযোগ খুঁজে বের করা। যজ্ঞের পুরোহিতরা কোনো একটি পাত্র কেন নির্দিষ্ট আকারের হবে, কেন যজ্ঞের আগুন নির্দিষ্ট দিকে জ্বালাতে হবে, কিংবা কেন কোনো প্রাণীকে নির্দিষ্ট কাঠের খুঁটিতে বাঁধতে হবে – এই প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ের পেছনে এক একটি প্রতীকী ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। রিক্যুর তার সুবিখ্যাত গ্রন্থগুলোতে দেখিয়েছেন যে, রূপক নিছক অলংকার নয়; রূপক হলো বাস্তবতাকে নতুন করে দেখার এবং পুনর্বিন্যাস করার এক সক্রিয় জ্ঞানতাত্ত্বিক উপায় (Ricoeur, 1995)। ব্রাহ্মণ সাহিত্যের রচয়িতারাও ঠিক সেই কাজটি করেছিলেন। তারা যজ্ঞের মাটির পাত্র, কাঠ এবং ঘাসকে সাধারণ গৃহস্থালির স্তর থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে এক সুবিশাল মহাজাগতিক রূপকের অংশ বানিয়ে ফেলেছিলেন।

রিক্যুর তার প্রতীকী তত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যের কথা বলেন – প্রতীক সবসময় মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে যুক্ত থাকে, কিন্তু রূপক সেই প্রতীককে ভাষার ভেতরে এনে গতিশীল করে তোলে। ব্রাহ্মণ সাহিত্যে এই রূপকায়ন ঘটেছে চরম মাত্রায়। সেখানে কোনো বস্তুই কেবল তার নিজের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রতিটি যজ্ঞীয় পদার্থ যেন এক চিরন্তন রূপকের রূপ ধারণ করে। যখন শতপথ ব্রাহ্মণে বলা হয় যে যজ্ঞই হলো সূর্য, অথবা যজ্ঞের অগ্নিই হলো মানুষের প্রাণবায়ু, তখন সেখানে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎকে এক বিন্দুতে এনে মেলানো হয়। রিক্যুরের ভাষায় একে বলা যায় শব্দার্থিক অভিনবত্ব; যেখানে ভাষা পরিচিত সীমানা ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন এক অর্থজগতের জন্ম দেয়।

এই রূপক কাঠামোর কারণে ব্রাহ্মণ সাহিত্যকে স্রেফ প্রাচীন মানুষের অবৈজ্ঞানিক কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ব্রিটিশ ভারততত্ত্ববিদ জুলিয়াস এগেলিং (Julius Eggeling) তার শতপথ ব্রাহ্মণের অনুবাদে উল্লেখ করেছিলেন যে, এই গ্রন্থগুলোর প্রতিটি পৃষ্ঠায় রয়েছে এমন এক চিন্তাপদ্ধতি যা বিশ্বজগতের সাথে মানুষের অস্তিত্বের নিখুঁত ভারসাম্য খুঁজতে চেয়েছিল (Eggeling, 1882)। যজ্ঞভূমি এখানে হয়ে উঠেছিল এক প্রতীকী ক্যানভাস, যার ওপর দাঁড়িয়ে প্রাচীন ভারতীয় তাত্ত্বিকরা মহাবিশ্ব, মানুষ এবং সমাজের মধ্যকার অদৃশ্য সম্পর্কগুলোকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেছিলেন। রিক্যুরের হার্মেনিউটিক্স এই প্রাচীন রূপকগুলোর ধুলো ঝেড়ে তাদের ভেতরের গভীর অর্থকাঠামোটি বুঝতে আমাদের সাহায্য করে।

যজ্ঞীয় বস্তুর রূপান্তর ও দ্বিস্তরীয় অর্থ (Transformation of Sacrificial Objects and Twofold Meaning): মাটির ইট থেকে অনন্ত আকাশ

রিক্যুরের হার্মেনিউটিক্সের সবচেয়ে পরিচিত ধারণাগুলোর একটি হলো প্রতীকের দ্বিস্তরীয় অর্থ। একটি প্রতীকের সবসময় একটি প্রত্যক্ষ বা আক্ষরিক অর্থ থাকে, আর থাকে একটি গভীরতর পরোক্ষ অর্থ। ব্রাহ্মণ সাহিত্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, যজ্ঞের প্রতিটি ভৌত বস্তুকে এই দ্বিস্তরীয় অর্থের কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো হয়েছে। যজ্ঞের উপকরণগুলো দেখতে নিতান্তই পার্থিব ও সাধারণ; কিন্তু আচারের ভেতর প্রবেশ করার সাথে সাথেই তারা নিজেদের সাধারণত্ব হারিয়ে এক মহাজাগতিক দ্যুতিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।

এর সবচেয়ে বড় এবং বিস্ময়কর উদাহরণ হলো অগ্নিচয়ন যজ্ঞের ইষ্টক (sacrificial brick / iṣṭakā) বা মাটির ইট। অগ্নিচয়নে একটি সুবিশাল পাখির আকারে অগ্নিকুণ্ড তৈরি করা হতো, যার জন্য প্রয়োজন হতো দশ হাজার আটশোটি বিশেষ নিয়মে পোড়ানো ইট। বাস্তব জগতে এই ইটগুলো মাটি এবং খড় পুড়িয়ে তৈরি করা সাধারণ পোড়ামাটির পিণ্ড ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু শতপথ ব্রাহ্মণে এই প্রতিটি ইটের একটি করে দ্বিতীয় স্তরের প্রতীকী নাম দেওয়া হয়েছে। কোনো ইটকে বলা হয়েছে ‘বিরাজ’, কোনোটিকে ‘ছন্দ’, কোনোটিকে ‘আকাশের নক্ষত্র’, আবার কোনোটিকে বলা হয়েছে মহাজাগতিক পুরুষের এক একটি হাড় বা অস্থি (Eggeling, 1882)। একটি মাটির ইটের ওপর হাত রাখার সময় পুরোহিত অনুভব করতেন যে তিনি আসলে নক্ষত্রমণ্ডল বা সময়কে নিজের হাতে স্পর্শ করছেন।

একই রূপান্তর ঘটে কাঠের পাত্রগুলোর ক্ষেত্রেও। সোমরস বা ঘি ঢালার জন্য যে বিশেষ কাঠের হাতা ব্যবহার করা হতো, যাদের নাম স্রুক ও স্রুব (sacrificial ladles / sruc and sruva), সেগুলোকে কেবল রান্নাঘরের চামচ মনে করা হতো না। ব্রাহ্মণ গ্রন্থে বলা হয়েছে, স্রুক হলো স্বয়ং দ্যুলোক বা আকাশ, আর স্রুব হলো পৃথিবী; অথবা এগুলো হলো যজ্ঞকারী ব্যক্তির দুটি বাহু। ঘৃতাহুতি দেওয়ার সাধারণ ঘটনাটি তখন আর ঘি পোড়ানো থাকে না; তা হয়ে ওঠে আকাশ ও পৃথিবীর মিলনের ফলে মহাজাগতিক শক্তির পুনর্জন্মের রূপক। পার্থিব কাঠের তৈরি বস্তুটি এভাবে নিজের উপাদানগত সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এক অসীম অর্থের বাহক হয়ে দাঁড়ায়।

রিক্যুর উল্লেখ করেন যে, প্রতীক যখন কাজ করে, তখন সে বাস্তব বস্তুর মূল সত্তাটিকে মুছে ফেলে না, বরং তার ওপর দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় অর্থটিকে ভাসিয়ে তোলে। যজ্ঞের পুরোহিতরা খুব ভালো করেই জানতেন যে ইটটি মাটির এবং হাতাটি কাঠের। কিন্তু আচারের পরিসরে তারা সেই বস্তুর ভেতরে অন্য এক গভীরতর বাস্তবতাকে দেখতে পেতেন। এই রূপান্তর ক্ষমতা মানুষের চেতনার এক বড় অর্জন। মানুষ কোনো সাধারণ জড় বস্তুকে সামনে রেখে কীভাবে বিশ্বজগতের অখণ্ড শৃঙ্খলার সাথে নিজেকে যুক্ত করতে পারে, ব্রাহ্মণ সাহিত্যের এই যজ্ঞীয় বস্তুগুলোর রূপান্তর তার এক চরম নিদর্শন। সাধারণ মাটি এভাবে রূপকের ছোঁয়ায় হয়ে ওঠে অনন্ত আকাশের অংশীদার।

সাদৃশ্যের রাজনীতি ও ‘বন্ধু’ ধারণা (Politics of Resemblance and the Concept of Bandhu): হিসেবে দেখার ব্যাকরণ

ব্রাহ্মণ সাহিত্যের দার্শনিক ভিত্তি যে বিশেষ প্রত্যয়টির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে, বৈদিক পরিভাষায় তাকে বলা হয় বন্ধু (homological connection / bandhu) বা সম্পদ্ (ritual equivalence / sampad) (Smith, 1994)। বন্ধু শব্দের অর্থ কেবল কোনো আত্মীয় বা বন্ধু নয়; প্রাচীন বৈদিক ভাষায় বন্ধু মানে হলো দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বস্তুর ভেতরের এক গোপন, অদৃশ্য এবং অপরিহার্য সংযোগ বা সাদৃশ্য। ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলোতে বারবার দাবি করা হয়েছে – যিনি এই গোপন বন্ধন জানেন, তিনি জগতের সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অর্জন করেন।

এই বন্ধন বা সাদৃশ্যের ধারণাকে রিক্যুরের রূপক তত্ত্বের সাথে মেলালে এক অসাধারণ মিল চোখে পড়ে। রিক্যুর তার তত্ত্বে এক বিশেষ মানসিক প্রক্রিয়ার কথা বলেছিলেন, যার নাম হিসেবে দেখা (seeing-as / voir-comme) (Ricoeur, 1995)। মানুষ যখন কোনো রূপক পাঠ করে, তখন সে একটি বস্তুকে হুবহু আরেকটি বস্তু মনে করে না; সে প্রথম বস্তুটিকে দ্বিতীয় বস্তুটির ‘হিসেবে দেখে’। যেমন যখন বলা হয় ‘মানুষটি একটি সিংহ’, তখন মানুষটি শারীরিকভাবে চারপেয়ে পশু হয়ে যায় না, কিন্তু আমরা তার সাহসিকতাকে সিংহের সাহসিকতা ‘হিসেবে দেখি’। ব্রাহ্মণ সাহিত্যের প্রতিটি বাক্য এই হিসেবে দেখার ব্যাকরণ দিয়ে তৈরি। সেখানে বলা হয়েছে – ‘ইয়ং বৈ বেদিঃ’ অর্থাৎ এই যজ্ঞের বেদীটিই হলো সমগ্র পৃথিবী; যজ্ঞের ঘোড়াটিই হলো স্বয়ং সূর্য।

গবেষক ব্রায়ান কে. স্মিথ (Brian K. Smith) প্রাচীন ভারতীয় শ্রেণিবিভাগ এবং সাদৃশ্যের তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, ব্রাহ্মণরা এই বন্ধু বা সমরূপতার ধারণাকে ব্যবহার করে সমগ্র মহাবিশ্বকে একটি নিশ্ছিদ্র জালে বেঁধে ফেলেছিলেন (Smith, 1994)। বিশ্বজগতে কোনো বস্তুই আর বিচ্ছিন্ন বা নিঃসঙ্গ ছিল না। পৃথিবীর প্রতিটি ঘাস, প্রতিটি পশু এবং প্রতিটি বর্ণের মানুষের সাথে স্বর্গের কোনো না কোনো দেবতা, নক্ষত্র বা ছন্দের এক অচ্ছেদ্য সংযোগ স্থাপন করা হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, গায়ত্রী ছন্দের সাথে যুক্ত ব্রাহ্মণ বর্ণ, তাদের দেবতা অগ্নি; আবার ত্রিষ্টুপ ছন্দের সাথে যুক্ত ক্ষত্রিয় বর্ণ, তাদের দেবতা ইন্দ্র। এভাবে ভাষা, সমাজ এবং প্রকৃতিকে এক অভিন্ন ছাঁচে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

রিক্যুরের হার্মেনিউটিক্স দিয়ে দেখলে এই সাদৃশ্য তৈরির প্রক্রিয়াটি কোনো খেয়ালখুশির রূপক নয়। এটি ছিল এক ধরনের গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ। যে জিনিসটি অজানা, দূরবর্তী এবং ভীতিকর, তাকে চেনা এবং হাতের কাছের বস্তুর সাথে মিলিয়ে ফেলার মাধ্যমে মানুষ তার মনের ভয়কে দূর করতে চেয়েছিল। আকাশের সূর্যকে মানুষ স্পর্শ করতে পারে না, কিন্তু যজ্ঞের ঘোড়াটিকে বা আগুনের শিখাটিকে সে স্পর্শ করতে পারে। যজ্ঞের আগুনকে সূর্যের বন্ধু বা রূপক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে মানুষ অনুভব করত যে সে স্বয়ং আকাশের সূর্যকেই নিজের যজ্ঞবেদীতে বশ করে ফেলেছে। হিসেবে দেখার এই ক্ষমতা প্রাচীন মানুষের হাতে এক পরাবাস্তব ক্ষমতার অনুভূতি এনে দিয়েছিল।

প্রজাপতির পুনর্গঠন ও মহাজাগতিক অর্থ (Reconstruction of Prajāpati and Cosmic Meaning): খণ্ডতা থেকে পূর্ণতায়

ব্রাহ্মণ সাহিত্যের সমস্ত যাগযজ্ঞ এবং রূপকের কেন্দ্রবিন্দুতে যে প্রধান চরিত্রটি বাস করে, তিনি কোনো বীর যোদ্ধা ইন্দ্র নন, তিনি হলেন সৃষ্টিকর্তা প্রজাপতি (Prajāpati)। ব্রাহ্মণ আখ্যান অনুযায়ী, সৃষ্টির শুরুতে কেবল প্রজাপতি একাকী ছিলেন। তিনি একাকীত্ব অনুভব করলেন এবং সৃষ্টির তীব্র ইচ্ছা বা ‘কাম’-এর দ্বারা তপস্যা শুরু করলেন। সেই তপস্যার তাপে তার শরীর থেকে বিশ্বজগতের সমস্ত উপাদান – দেবতারা, মানুষ, পশু, পৃথিবী এবং সময় – জন্ম নিতে শুরু করল। কিন্তু এই সৃষ্টির পর এক করুণ ট্র্যাজেডি ঘটল। সমগ্র সৃষ্টিকে নিজের ভেতর থেকে বের করে দিয়ে প্রজাপতি সম্পূর্ণ শূন্য, দুর্বল এবং খণ্ডবিখণ্ড হয়ে ভেঙে পড়লেন। তার সন্ধিবন্ধনগুলো খুলে গেল, তার অস্থিগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল এবং তিনি নিঃশেষ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন (Jamison, 1991)।

ব্রাহ্মণ সাহিত্যে বৈদিক যজ্ঞের একমাত্র পরম উদ্দেশ্য হলো এই ভেঙে পড়া প্রজাপতিকে আবার জোড়া লাগানো বা পুনর্গঠন করা। যজ্ঞের প্রতিটি ইট সাজানো, প্রতিটি আহুতি দেওয়া আসলে প্রজাপতির খণ্ডিত দেহাবশেষকে একত্রিত করে তাকে আবার পূর্ণ জীবন দান করার এক মহাজাগতিক রূপক। যখন যজমান এবং পুরোহিতরা অগ্নিচয়নের বেদীতে হাজার হাজার ইট নিখুঁত ছন্দে সাজিয়ে তুলতেন, তখন তারা বিশ্বাস করতেন যে তারা কেবল মাটি পোড়াচ্ছেন না; তারা স্বয়ং মহাজাগতিক পিতাকে আবার পুনরুজ্জীবিত করছেন। আর প্রজাপতি যখন সুস্থ হয়ে ওঠেন, তখন সমগ্র বিশ্বজগৎ তার ধ্বংস ও বিশৃঙ্খলার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে আবার এক নতুন স্থায়িত্ব লাভ করে।

এখানে এক অনন্য ত্রিস্তরীয় সমরূপতা কাজ করে, যাকে প্রাচীন ভারতীয় চিন্তায় বলা হয়েছে অধ্যাত্ম (microcosm / the individual), অধিযজ্ঞ (ritual plane) এবং অধিদৈব (macrocosm / the cosmic sphere) (Frazier, 2011)। মানুষের নিজের শরীর (অধ্যাত্ম), যজ্ঞশালার বেদী (অধিযজ্ঞ) এবং সমগ্র মহাবিশ্ব (অধিদৈব) – এই তিনটি আসলে একই সত্যের তিনটি ভিন্ন মাত্রা। মানুষের শরীরের হাড়গুলোই হলো যজ্ঞের ইট, আর যজ্ঞের ইটগুলোই হলো আকাশের নক্ষত্র। ফলে মানুষ যখন যজ্ঞে কোনো কিছু আহুতি দিচ্ছে, সে আসলে নিজের ভেতরের উপাদানকেই বিশ্বজগতের সাথে মিলিয়ে দিচ্ছে।

রিক্যুর তার আখ্যান তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, মানব সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় রূপকগুলো জন্ম নেয় মানুষের ভাঙন ও খণ্ডতাকে নিরাময় করার তাগিদ থেকে। মানুষ মৃত্যুকে দেখে, ক্ষয়কে দেখে, ধ্বংসকে দেখে শঙ্কিত হয়। প্রজাপতির এই মিথটি আসলে মহাবিশ্বের চিরন্তন ভাঙন এবং পুনর্গঠনের এক দার্শনিক পাঠ। প্রকৃতি প্রতিদিন ক্ষয়ে যাচ্ছে, শক্তি ফুরিয়ে যাচ্ছে; সেই শক্তিকে নতুন করে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন মানুষের সচেতন উদ্যোগ। ব্রাহ্মণরা বিশ্বাস করতেন যে, যজ্ঞের এই মহাজাগতিক রূপকের মাধ্যমেই বিশ্বকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। মানুষের শারীরিক শ্রম এবং ভাষার মেলবন্ধনে খণ্ডতা রূপ নেয় এক পরম পূর্ণতায়।

অর্থের উদ্বৃত্ত ও আচারিক রূপকায়ন (Surplus of Meaning and Ritual Metaphorization): প্রতীকী অতিরিক্ততার শক্তি

ব্রাহ্মণ সাহিত্য পাঠ করতে গিয়ে আধুনিক পাঠক যে বিষয়টি দেখে সবচেয়ে বেশি অবাক হন, তা হলো একই আচারের জন্য দেওয়া ব্যাখ্যার বহুত্ব। কোনো একটি বিশেষ পাত্র কেন ব্যবহার করা হলো, তার কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যাবে শতপথ ব্রাহ্মণ এক জায়গায় বলছে এর কারণ দেবতারা অসুরদের তাড়িয়েছিলেন, অন্য জায়গায় বলছে এর কারণ এটি বাতাসের মতো দ্রুতগামী, আবার আরেক জায়গায় বলছে এটি মানুষের মস্তিষ্কের রূপক। একই ঘটনার এতগুলো ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা কেন?

রিক্যুরের শব্দার্থবিজ্ঞানের বিখ্যাত প্রত্যয় অর্থের উদ্বৃত্ত (surplus of meaning) এই বিভ্রান্তি দূর করার সবচেয়ে মোক্ষম চাবিকাঠি (Ricoeur, 1995)। রিক্যুর বলেন যে, একটি প্রতীক কখনো একটিমাত্র সংজ্ঞায় নিঃশেষ হয়ে যায় না। মহৎ প্রতীকের ভেতরে সবসময় অর্থের এক অতিরিক্ততা বা উদ্বৃত্ত সঞ্চিত থাকে, যা সময়ের সাথে সাথে এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। ব্রাহ্মণ সাহিত্যের রচয়িতারা কোনো সংকীর্ণ বা একমুখী ব্যাখ্যাকারক ছিলেন না। তারা জানতেন যে মহাবিশ্বের সম্পর্কগুলো এত জটিল যে কোনো একটিমাত্র রূপক দিয়ে তাকে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা যায় না। ফলে তারা যজ্ঞের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ের ওপর একের পর এক অর্থের স্তর চাপিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি।

এই অর্থপ্রাচুর্যের কারণেই ব্রাহ্মণ সাহিত্যের প্রতীকগুলো পরবর্তীকালে উপনিষদের গভীর আত্মজ্ঞানে রূপান্তরিত হতে পেরেছিল। যখন শতপথ ব্রাহ্মণে অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়াটিকে বর্ণনা করা হয়, তখন বলা হয় – ঊষা হলো তার মাথা, সূর্য তার চোখ, বাতাস তার প্রাণ এবং আকাশ তার পিঠ (Eggeling, 1882)। এটি আর নিছক একটি বলিদানের ঘোড়া থাকে না; এটি হয়ে ওঠে সমগ্র মহাবিশ্বের এক জীবন্ত রূপক। বাহ্যিক যজ্ঞের এই রূপকায়ন যখন চরম সীমায় পৌঁছাল, তখন ভাবুক মানুষের মনে এই উপলব্ধি জন্মাল যে – বাইরে ঘোড়া বা ইট সাজিয়ে যজ্ঞ করার আর কী প্রয়োজন? যদি ঘোড়া নিজেই মহাবিশ্ব হয় এবং মানুষের প্রাণ নিজেই আগুন হয়, তবে মানুষের নিজের ভেতরের আত্মাই তো পরম যজ্ঞভূমি।

রিক্যুর দেখান যে, প্রতীকের এই অভ্যন্তরীণকরণ বা ইন্টার্নালাইজেশন রূপকের নিজস্ব শক্তির কারণেই ঘটে। ব্রাহ্মণ সাহিত্যিকরা যে জটিল প্রতীকী অরণ্য তৈরি করেছিলেন, সেই অরণ্যই একসময় বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার খোলস ভেঙে ভেতরের আধ্যাত্মিক চিন্তার জন্ম দিয়েছিল। মাটির ইট সাজাতে সাজাতে মানুষ একসময় মনের চিন্তাকে সাজাতে শিখেছিল। ফলে ব্রাহ্মণ সাহিত্যের এই প্রতীকী অতিরিক্ততা কেবল অলস মস্তিষ্কের জল্পনাকল্পনা ছিল না; এটি ছিল মানব চেতনার সেই রূপান্তর পর্ব, যা বহিস্থ ধর্মাচরণ থেকে মানুষকে অন্তর্মুখী দার্শনিক জিজ্ঞাসার দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

মতাদর্শিক আধিপত্য ও মহাজাগতিক একচেটিয়া (Ideological Hegemony and Cosmic Monopoly): মোহমুক্তি ও সমালোচনামূলক পাঠ

একটি সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ, ঐতিহাসিক এবং নির্মোহ মূল্যায়নে ব্রাহ্মণ সাহিত্যের এই অসাধারণ প্রতীকী প্রাচুর্যের পেছনের সামাজিক ক্ষমতা কাঠামোটিকে উন্মোচন করা অত্যন্ত জরুরি। রিক্যুর যে সন্দেহবাদী হার্মেনিউটিক্সের কথা বলেছিলেন, তার আলোয় ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলোকে দেখলে বোঝা যায় যে এই জটিল মহাজাগতিক সমরূপতা কেবল কোনো নিষ্পাপ দর্শন চর্চা ছিল না। এটি ছিল প্রাচীন ভারতে ব্রাহ্মণ পুরোহিত শ্রেণির একচ্ছত্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য কায়েমের সবচেয়ে নিখুঁত মতাদর্শিক দুর্গ (Smith, 1994)।

ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলোতে একটি বাক্য হাজার হাজার বার ফিরে এসেছে – ‘য এবং বেদ’ অর্থাৎ ‘যিনি এই গোপন রহস্য জানেন’। এই বাক্যটি কোনো সাধারণ জ্ঞানের কথা নয়; এটি ছিল একটি ক্ষমতা নির্দেশক সিলমোহর। ব্রাহ্মণ সাহিত্যিকরা প্রচার করেছিলেন যে যজ্ঞ নিছক কাঠ পোড়ানো নয়; যজ্ঞ হলো মহাবিশ্বকে টিকিয়ে রাখার একমাত্র প্রযুক্তি। আর সেই প্রযুক্তির যে গোপন সংকেত – কোন ইটটি আকাশের নক্ষত্র, কোন হাতাটি পৃথিবী – সেই ‘বন্ধু’ বা সমরূপতার জ্ঞান কেবল এবং কেবল ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের কাছেই গচ্ছিত রয়েছে। যদি কোনো রাজা বা সমাজ সেই জ্ঞান ছাড়া যজ্ঞ করে, তবে মহাবিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাবে এবং যজমানের বিনাশ ঘটবে। এই বয়ানের মাধ্যমে পুরোহিত শ্রেণি নিজেদেরকে সমাজের সবচেয়ে অপরিহার্য ব্যক্তিতে রূপান্তর করেছিল।

একই সাথে এই সাদৃশ্যের রাজনীতি তৎকালীন শাসক শ্রেণি বা ক্ষত্রিয়ের সাথে পুরোহিতের এক কৌশলগত মৈত্রী তৈরি করেছিল, যাকে সমাজবিজ্ঞানী পল মুস (Paul Mus) বা পরবর্তীকালের তাত্ত্বিকরা ‘ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় জোট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Proferes, 2007)। রাজাকে বলা হতো স্বয়ং ইন্দ্রের বা প্রজাপতির পার্থিব প্রতিনিধি, আর পুরোহিত ছিলেন তার মহাজাগতিক অভিভাবক। এই দুই উচ্চবর্ণ মিলে সমাজের উৎপাদনের যে উদ্বৃত্ত, যা আসত বৈশ্য কৃষক ও পশুপালকদের কর থেকে এবং শূদ্রের দাসশ্রম থেকে, তাকে যজ্ঞের নামে হস্তগত করত। সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে সমাজে তাদের এই নীচ অবস্থান কোনো মানুষের তৈরি নয়; স্বয়ং প্রজাপতির শরীর থেকে যখন চার বর্ণের জন্ম হয়েছিল, তখনই এই সামাজিক বৈষম্য মহাজাগতিক নিয়মে নির্ধারিত হয়ে গেছে।

উপসংহারে বলা যায়, রিক্যুরের হার্মেনিউটিক্স দিয়ে ব্রাহ্মণ সাহিত্যকে পাঠ করার অর্থ হলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের এক দ্বিমুখী সত্যকে উন্মুক্ত করা। একদিকে তা আমাদের দেখায় প্রাচীন মানুষের সেই অবিশ্বাস্য সৃজনশীল ক্ষমতা, যার মাধ্যমে তারা একটি মাটির ইট বা কাঠের চামচকে মহাবিশ্বের সাথে একাত্ম করে এক সুবিশাল রূপক মহাকাব্য নির্মাণ করেছিল। অন্যদিকে, তা আমাদের চোখ খুলে দেয় যাতে আমরা দেখতে পাই কীভাবে মানুষের এই মহান প্রতীকী ক্ষমতাকে একটি ধূর্ত সুবিধাভোগী শ্রেণি তাদের সামাজিক শোষণ, পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং বর্ণবাদী আধিপত্য কায়েমের চিরস্থায়ী হাতিয়ারে পরিণত করেছিল। ব্রাহ্মণ সাহিত্যকে জানা মানে হলো মানুষের চিন্তার এই মহিমা এবং সেই চিন্তার নির্মম রাজনৈতিক অপব্যবহার – উভয়কেই এক সাথে নির্মোহ সত্যের আলোয় বিচার করা।

গাডামার ও আরণ্যকের পুনর্ব্যাখ্যা (Gadamer and Āraṇyaka Reinterpretation): বাহ্যিক যজ্ঞ থেকে অন্তর্মুখী প্রতীক

গাডামারের হার্মেনিউটিক্স ও ঐতিহ্যের রূপান্তর (Gadamer’s Hermeneutics and the Transformation of Tradition): দিগন্তের মিলন

একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কীভাবে নিজেকে শতাব্দী পর শতাব্দী টিকিয়ে রাখে? সে কি প্রাচীন নিয়মকানুনকে পাথরের মতো অপরিবর্তনীয় করে রাখে, নাকি সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজের ভেতরের অর্থকে নতুন ছাঁচে ঢেলে নেয়? জার্মান দার্শনিক হান্স-গেয়র্গ গাডামার (Hans-Georg Gadamer) তার কালজয়ী গ্রন্থ ট্রুথ অ্যান্ড মেথড (Truth and Method)-এ দেখিয়েছেন যে, ঐতিহ্য কোনো স্থির বা জমে থাকা পুকুর নয় (Gadamer, 1960/1989)। ঐতিহ্য হলো একটি বহমান নদী। কোনো প্রাচীন টেক্সটকে বুঝতে গেলে তার আদি ঐতিহাসিক যুগে পুরোপুরি ফিরে যাওয়া মানুষের পক্ষে অসম্ভব। মানুষ সবসময় নিজের বর্তমান ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েই অতীতকে দেখে। গাডামারের মতে, প্রকৃত বোঝাপড়া ঘটে তখনই, যখন অতীতের টেক্সটের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বর্তমানের পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে এক অভূতপূর্ব মিলন ঘটে। এই মিলনকে তিনি নাম দিয়েছেন ঐতিহাসিক দিগন্তের মিলন (fusion of horizons / Horizontverschmelzung)।

গাডামারের দর্শনে আরেকটি বড় ধারণা হলো কার্যকরী ইতিহাস (effective history / Wirkungsgeschichte) (Gadamer, 1976)। এই ধারণার সারকথা হলো, অতীত আমাদের ওপর প্রতিনিয়ত নিজের প্রভাব ফেলে চলেছে, আবার আমরাও অতীতের অর্থকে নতুন করে তৈরি করছি। ঐতিহ্য কোনো মৃত অতীত নয় যা পেছনের দিকে পড়ে থাকে; ঐতিহ্য সচল থাকে পুনর্ব্যাখ্যার মাধ্যমে। যখন একটি সমাজ বড় ধরনের ঐতিহাসিক সংকটের মুখোমুখি হয়, তখন সে তার প্রাচীন প্রথাগুলোকে পুরোপুরি ছুড়ে ফেলে দেয় না। বরং সে তার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ভাষা ও প্রতীকগুলোকে এমন এক নতুন অর্থে ব্যবহার করতে শুরু করে, যা বর্তমানের নতুন বাস্তবতার সাথে সংগতিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রাচীন ভারতীয় চিন্তার ইতিহাসে বৈদিক আরণ্যক সাহিত্য হলো গাডামারের এই দিগন্তের মিলনের এক ধ্রুপদী দৃষ্টান্ত। ব্রাহ্মণ সাহিত্যের যুগে বৈদিক ধর্ম দাঁড়িয়েছিল সুবিশাল, জটিল এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল বাহ্যিক যাগযজ্ঞের ওপর। সেখানে শত শত পশু বলি দেওয়া হতো, মণকে মণ শস্য পোড়ানো হতো এবং বিশাল পুরোহিত দলের উপস্থিতি ছিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই বাহ্যিক যজ্ঞব্যবস্থা সাধারণ মানুষের কাছে ক্লান্তিকর এবং বহুলাংশে অর্থহীন মনে হতে শুরু করেছিল। এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে আবির্ভূত হয়েছিল আরণ্যক সাহিত্য, যা রচিত হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম বা সপ্তম শতকে (Witzel, 1987)। আরণ্যকগুলো বৈদিক যজ্ঞকে নাকচ করেনি, কিন্তু তারা যজ্ঞের পুরো অর্থটাকেই আমূল বদলে দিয়েছিল।

গাডামার যেভাবে দেখিয়েছেন যে ঐতিহ্য নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে সৃজনশীল ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে, প্রাচীন ভারতীয় আরণ্যককাররাও ঠিক সেই কাজটি করেছিলেন। তারা যজ্ঞের রক্তপাত, আগুন এবং মাটির পাত্রকে অক্ষুণ্ণ রেখেও সেগুলোকে মানুষের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্বগত স্তরে স্থানান্তর করেছিলেন। বাহ্যিক যজ্ঞের যে দিগন্তটি ব্রাহ্মণ সাহিত্যে গড়ে উঠেছিল, আরণ্যকে এসে তা মিলিত হলো অরণ্যের ধ্যানমগ্ন সাধকের অন্তর্মুখী চেতনার দিগন্তের সাথে। এই রূপান্তর কোনো আকস্মিক বিদ্রোহ ছিল না; এটি ছিল ঐতিহ্যের ভেতরের থেকেই ঐতিহ্যের এক পরম নবায়ন।

গ্রাম থেকে অরণ্যে অভিপ্রয়াণ (Migration from Village to Wilderness): স্থানিক রূপান্তর ও সংকট

আরণ্যক সাহিত্যের জন্ম বুঝতে হলে প্রাচীন বৈদিক সমাজের একটি গভীর স্থানিক বা ভৌগোলিক বিভাজনকে বোঝা দরকার। বৈদিক সাহিত্যে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত স্থানিক পরিসরের কথা বলা হয়েছে: গ্রাম (village / settlement / grāma) এবং অরণ্য (wilderness / forest / araṇya) (Heesterman, 1985)। গ্রাম ছিল মানুষের চেনা সামাজিক জগত। সেখানে ছিল পরিবার, কৃষিকাজ, পশুপালন, সামাজিক নিয়মকানুন এবং ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের দ্বারা পরিচালিত বিশাল শ্রৌতযজ্ঞ। গ্রামে যজ্ঞের উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত পার্থিব – ধনসম্পদ লাভ, যুদ্ধে জয়, দীর্ঘায়ু এবং পুত্রসন্তান অর্জন। গ্রামের যজ্ঞ ছিল সামাজিক প্রদর্শনী, যেখানে মানুষের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি নির্ধারিত হতো।

কিন্তু বয়সের সাথে সাথে বা মানসিক রূপান্তরের ফলে মানুষ যখন এই চেনা সামাজিক পরিসর ছেড়ে বনের নির্জনতায় আশ্রয় নিত, তখন তৈরি হতো এক গভীর অস্তিত্বগত সংকট। বৈদিক সমাজের আদর্শ কাঠামো অনুযায়ী, জীবনের একটি পর্বে মানুষকে সংসার ত্যাগ করে অরণ্যে প্রবেশ করতে হতো, যাকে পরবর্তীকালে ‘বানপ্রস্থ’ বলা হয়েছে। অরণ্য ছিল এমন এক জায়গা যেখানে কোনো গ্রাম্য আরাম-আয়েশ নেই, কোনো সমাজ নেই, এবং সবচেয়ে বড় কথা – সেখানে কোনো বিশাল যজ্ঞশালা নির্মাণ করার মতো সম্পদ বা পুরোহিতের দল নেই। বনের নির্জনতায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন নিঃসঙ্গ মানুষের পক্ষে কীভাবে অগ্নিহোত্র বা দর্শপূর্ণমাসের মতো জটিল যজ্ঞ করা সম্ভব?

এই স্থানিক রূপান্তর মানুষের সামনে এক মারাত্মক ধর্মীয় সংকট হাজির করেছিল। বৈদিক অনুশাসন অনুযায়ী, প্রতিদিন যজ্ঞের আগুন রক্ষা করা এবং আহুতি দেওয়া ছিল মানুষের এক অলঙ্ঘনীয় কর্তব্য। যদি কেউ যজ্ঞ না করে, তবে সে পাপের ভাগী হবে এবং সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্ট হবে। কিন্তু বনে তো ঘি পাওয়া যায় না, দুধ দেওয়ার মতো গাভী নেই, আর সোমলতা পেষণ করার জন্য এক ডজন পুরোহিতও হাজির নেই। তাহলে কি বনবাসী মানুষটি তার ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করা থেকে বঞ্চিত হবে? সে কি শাস্ত্রীয় বিধানের চোখে এক অপরাধী হয়ে থাকবে?

এই সংকটের উত্তর হিসেবেই জন্ম নিয়েছিল আরণ্যকের হার্মেনিউটিক্স। আরণ্যককাররা বললেন, যজ্ঞ কেবল মাটির চুলার মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো বাহ্যিক ঘটনা নয়। যদি কোনো মানুষের কাছে কাঠ বা ঘি না থাকে, তবে সে তার নিজের শরীর এবং মনকেই যজ্ঞশালা বানিয়ে নিতে পারে। গবেষক আর্থার বেরিডেল কিথ (Arthur Berriedale Keith) তার ঐতরেয় আরণ্যকের ভূমিকায় দেখিয়েছেন যে, এই সাহিত্য মূলত এমন সব মানুষের জন্য তৈরি হয়েছিল যারা সামাজিক আচারের কেন্দ্র থেকে দূরে গভীর অরণ্যে বাস করতেন এবং যাদের পক্ষে বাহ্যিক কর্মকাণ্ড সম্পাদন করা অসম্ভব ছিল (Keith, 1909)। ফলে স্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে যজ্ঞের রূপও স্থানান্তরিত হলো – মাটি থেকে মানুষের চেতনায়।

যজ্ঞের অন্তর্মুখীকরণ ও প্রাণাগ্নিহোত্র (Internalization of Sacrifice and Prāṇāgnihotra): শরীর যখন যজ্ঞভূমি

আরণ্যক সাহিত্যের সবচেয়ে বিপ্লবী ও সৃজনশীল অবদান হলো যজ্ঞের অন্তর্মুখীকরণ (internalization of ritual)। এই প্রক্রিয়ায় বাহ্যিক যজ্ঞের সমস্ত উপকরণকে মানুষের শরীরের বিভিন্ন জৈবিক ও মানসিক অঙ্গের ওপর প্রতীকীভাবে স্থাপন করা হলো। বাইরে যে আগুন জ্বলত, আরণ্যক দেখাল সেই আগুন আসলে মানুষের পেটের ভেতর খাদ্য পরিপাককারী তাপ হিসেবে জ্বলছে। বাইরে যে ঘি বা দুধ ঢালা হতো, তা আসলে মানুষের গ্রহণ করা খাদ্য ও পানীয় ছাড়া আর কিছুই নয়।

এই অন্তর্মুখীকরণের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো প্রাণাগ্নিহোত্র (internal breath-sacrifice / prāṇāgnihotra) (Deussen, 1906)। সাধারণ অগ্নিহোত্র যজ্ঞে একজন গৃহস্থকে প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় বিশেষ নিয়ম মেনে অগ্নিকুণ্ডে দুধ বা ঘি আহুতি দিতে হতো। আরণ্যকে এসে ঋষিরা ঘোষণা করলেন যে, মানুষ যখন শ্বাস গ্রহণ করে এবং শ্বাস ত্যাগ করে, তখনই আসলে এক অবিচ্ছিন্ন অগ্নিহোত্র সম্পন্ন হতে থাকে। মানুষের শরীরের ভেতরের ‘প্রাণ’ বায়ু হলো আহবনীয় অগ্নির রূপ, ‘অপান’ বায়ু হলো গার্হপত্য অগ্নির রূপ, আর ‘ব্যান’ বায়ু হলো দক্ষিণাগ্রি। একজন মানুষ যখন কোনো খাবার মুখে তুলে নেয় এবং চিবিয়ে গিলে ফেলে, সে আসলে কোনো সাধারণ খাওয়া-দাওয়া করছে না; সে তার ভেতরের জ্বলন্ত প্রাণাগ্নিতে পবিত্র আহুতি প্রদান করছে।

এই রূপান্তরের ফলে যজ্ঞের চরিত্র এক অবিশ্বাস্য গভীরতা লাভ করল। একজন মানুষ দিনে দুবার যজ্ঞের চুলার সামনে বসতে পারে, কিন্তু মানুষের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস তো কোনোদিন এক সেকেন্ডের জন্যও থামে না। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতি মুহূর্তে মানুষ শ্বাস নিচ্ছে এবং ছাড়ছে। অতএব আরণ্যকের দৃষ্টিতে, মানুষের সমগ্র জীবনটিই হয়ে উঠল এক অনন্ত এবং অবিচ্ছিন্ন যজ্ঞ। গাডামারের ভাষায় একে বলা যায় ঐতিহ্যের এমন এক প্রয়োগ, যা মূল ধারণার পরিধিকে অসীমভাবে প্রসারিত করে দেয়। যজ্ঞের পুরোহিত বা অগ্নিকুণ্ডের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল; মানুষের রক্তমাংসের শরীরটি নিজেই হয়ে উঠল পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র যজ্ঞভূমি।

এই শারীরিক রূপক কেবল শ্বাস-প্রশ্বাসে থেমে থাকেনি। মানুষের বাকশক্তি বা কণ্ঠ হলো যজ্ঞের প্রধান আহ্বানকারী পুরোহিত ‘হোতা’, মানুষের চোখ হলো যজ্ঞের পথপ্রদর্শক ‘অধ্বর্যু’, আর মানুষের মন হলো সমগ্র যজ্ঞের নীরব পর্যবেক্ষক ‘ব্রহ্মা’ (Flood, 2013)। শরীরের প্রতিটি ইন্দ্রিয়কে যজ্ঞের এক একটি উপাদানের সাথে একাত্ম করে দেওয়া হলো। এই প্রক্রিয়ায় মানুষ বুঝতে পারল যে, মহাজাগতিক শক্তিগুলো বাইরে কোথাও দূর আকাশে বসে নেই; সেগুলো কাজ করে চলেছে মানুষের নিজের ইন্দ্রিয় ও চিন্তার ভেতরেই। বহিস্থ আচারের এই রূপান্তর মানুষের আত্মসচেতনতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।

উপাসনা ও ধ্যানরূপ যজ্ঞ (Upāsanā and Meditative Sacrifice): বাহ্যিক ক্রিয়া থেকে মননশীলতায়

আরণ্যক সাহিত্যের আরেকটি কেন্দ্রীয় বিষয় হলো ‘উপাসনা’ বা মানসিক ধ্যান। ব্রাহ্মণ সাহিত্যের মূল কথা ছিল ‘কর্ম’ বা বাহ্যিক ক্রিয়া সম্পাদন করা; সেখানে হাত দিয়ে কাজ করাটাই ছিল প্রধান। কিন্তু আরণ্যকে এসে কর্মের জায়গাটি ধীরে ধীরে দখল করে নিল উপাসনা (contemplative meditation / upāsanā) (Roebuck, 2000)। উপাসনা মানে হলো কোনো একটি আচারিক বিষয়কে কোনো শারীরিক কাজ ছাড়াই কেবল মনের ভেতরে অবিচ্ছিন্নভাবে চিন্তা করা এবং তার গভীর মহাজাগতিক তাৎপর্যকে নিজের চেতনায় ধারণ করা।

এর একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত হলো ঐতরেয় আরণ্যকে বর্ণিত মহাব্রত (Mahāvrata) আচারের পুনর্ব্যাখ্যা। মহাব্রত ছিল এক বিরাট সোমযজ্ঞ, যেখানে পুরোহিতরা বিশেষ বিশেষ ছন্দে গান গাইতেন, বাঁশি বাজাতেন এবং এক সুবিশাল পাখির আকারে বেদী নির্মাণ করতেন। ঐতরেয় আরণ্যক এই দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর অনুষ্ঠানটিকে এক বিশুদ্ধ মনস্তাত্ত্বিক ধ্যানে রূপান্তর করল। সেখানে বলা হলো, এই মহাব্রত যজ্ঞের যে প্রধান স্তোত্র বা ‘উকথ’, তা বাইরে গাওয়ার দরকার নেই। মানুষ যদি বুঝতে পারে যে এই বিশ্বজগৎই হলো সেই সুবিশাল পাখি, যার মাথা হলো পূর্ব দিক, দুটি ডানা হলো উত্তর ও দক্ষিণ দিক এবং লেজ হলো পশ্চিম দিক – তবে এই জ্ঞানের মাধ্যমেই যজ্ঞটি সম্পন্ন হয়ে যায় (Keith, 1909)। বাহ্যিক সঙ্গীত রূপ নিল এক অভ্যন্তরীণ নিস্তব্ধ ভাবনায়।

এই মানসিক যজ্ঞকে প্রাচীন তাত্ত্বিকরা নাম দিয়েছিলেন মানসযজ্ঞ (mental sacrifice / mānasayajña)। মানসযজ্ঞে কোনো পশুর রক্ত ঝরে না, কোনো মূল্যবান শস্য আগুনে ছাই হয় না, এবং কোনো দক্ষিণার দাবি তোলা হয় না। মানুষ তার সমস্ত ইন্দ্রিয়কে শান্ত করে চোখ বন্ধ করে নিজের অন্তর্জগতে সেই যজ্ঞের প্রতিটি পদক্ষেপকে নাটকের মতো প্রত্যক্ষ করে। গাডামারের হার্মেনিউটিক্সে ব্যাখ্যার একটি অপরিহার্য অঙ্গ হলো ‘প্রয়োগ’। তিনি বলতেন, কোনো টেক্সটকে বোঝার অর্থই হলো তাকে নিজের বর্তমান বাস্তবতার সাথে প্রাসঙ্গিক করে তোলা (Gadamer, 1960/1989)। আরণ্যকের ঋষিরা যজ্ঞের যে মানসিক প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন, তা প্রমাণ করে যে তারা ঐতিহ্যকে স্রেফ মুখস্থ করে রাখেননি; তারা যজ্ঞের মূল সারবত্তাকে নিজেদের মানসিক মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে প্রয়োগ করেছিলেন।

এই রূপান্তরের ফলে প্রাচীন বৈদিক চিন্তায় এক বিরাট দার্শনিক উল্লম্ফন ঘটেছিল। মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছিল যে বাহ্যিক আচার হলো এক ধরনের প্রস্তুতি বা প্রশিক্ষণ মাত্র; আসল কাজ হলো মনের ভেতরের রূপান্তর। যদি মানুষের মনের কাম, ক্রোধ এবং অহংকারকে ত্যাগ করা না যায়, তবে শত শত গাভী আগুনে পুড়িয়ে কোনো লাভ নেই। নিজের অহংকে পোড়ানোই হলো আসল বলিদান। এই বোধটি বৈদিক সাহিত্যের আবহকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল, যা পরবর্তীকালে উপনিষদের বিশুদ্ধ আত্মজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল।

কার্যকরী ইতিহাসের ধারাবাহিকতা (Continuity of Effective History): বিচ্ছেদহীন রূপান্তর

গাডামারের দর্শনের অন্যতম প্রধান শিক্ষা হলো, সত্যিকারের গভীর ঐতিহ্য কখনোই অতীতের সাথে সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ ঘটায় না। যখন কোনো সংস্কারক এসে প্রাচীন সবকিছুকে ভেঙে নতুন করে শুরু করতে চান, তখন সেই আন্দোলন অনেক সময় শিকড়হীন হয়ে পড়ে। কিন্তু যারা অতীতের ভাষার ভেতরে থেকেই নতুন সত্যকে প্রকাশ করেন, তাদের কাজ সমাজের গভীরে প্রবেশ করে। প্রাচীন ভারতে বৌদ্ধ বা চার্বাক দর্শনের মতো কিছু ধারা বৈদিক যজ্ঞ এবং বেদকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে বর্জন করার ডাক দিয়েছিল। কিন্তু আরণ্যকের চিন্তাবিদরা কোনো ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নেননি। তারা বৈদিক ঐতিহ্যকে ভেতর থেকে রূপান্তর করেছিলেন।

এখানে গাডামারের কার্যকরী ইতিহাসের ধারণাটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হতে দেখা যায়। আরণ্যকের লেখকরা বৈদিক সংহিতার পবিত্র মর্যাদাকে বিন্দুমাত্র খাটো করেননি। তারা কোনো নতুন ঈশ্বর তৈরি করেননি, কোনো নতুন ধর্মগ্রন্থের দাবিও তোলেননি। তারা ব্রাহ্মণ সাহিত্যের সেই সুপরিচিত পরিভাষাগুলোকেই ব্যবহার করেছিলেন – যেমন ‘অগ্নিহোত্র’, ‘সোম’, ‘উকথ’, ‘প্রজাপতি’। কিন্তু এই প্রতিটি পুরনো শব্দের ভেতর তারা ভরে দিয়েছিলেন সম্পূর্ণ নতুন আধ্যাত্মিক অর্থ (Heesterman, 1985)। একজন সাধারণ মানুষ যখন আরণ্যক পাঠ করত, সে দেখতে পেত যে তার চেনা পিতৃপুরুষদের ধর্মই সেখানে আলোচিত হচ্ছে; কিন্তু পড়ার শেষে সে আবিষ্কার করত যে সে আর আগের সেই কুসংস্কারাচ্ছন্ন আচারবাদী মানুষটি নেই, সে পরিণত হয়েছে এক গভীর ভাবুকে।

ঐতিহ্যের এই সচলতা আরণ্যককে বৈদিক সাহিত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে পরিণত করেছিল। একদিকে রয়েছে ব্রাহ্মণ সাহিত্যের কঠোর আচারবাদী এবং বস্তুকেন্দ্রিক জগৎ, অন্যদিকে রয়েছে উপনিষদের চরম জ্ঞানবাদী এবং অদ্বৈত দার্শনিক জগৎ। এই দুই বিপরীত মেরুর মধ্যে কোনো শূন্যতা তৈরি হতে দেয়নি আরণ্যক। সে মানুষকে ধীরে ধীরে বাহ্যিক কর্মকাণ্ডের হাত ধরে নিয়ে এসে অন্তর্জগতের দরজায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। যদি আরণ্যকের এই প্রতীকী রূপান্তর না ঘটত, তবে ভারতীয় চিন্তায় উপনিষদের মতো এক বৈপ্লবিক দর্শনের আত্মপ্রকাশ হয়তো এত সহজে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পেত না।

গাডামারের ভাষায় একে বলা যায় ঐতিহ্যের সাথে এক দীর্ঘ ও সার্থক কথোপকথন বা সংলাপ। আরণ্যককাররা অতীতের সাথে এক গভীর সংলাপে বসেছিলেন। তারা অতীতকে প্রশ্ন করেছিলেন – ‘এই যজ্ঞের আসল লক্ষ্য কী? কেবল পশু হত্যা করা, নাকি মানুষের ভেতরের সত্যকে জানা?’ আর সেই কথোপকথনের ভেতর দিয়েই অতীত নিজের এক নতুন রূপ উন্মোচন করেছিল। ঐতিহ্যের এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করার ক্ষমতা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত, যা দেখায় যে কীভাবে ধ্বংসের বদলে সৃষ্টির মাধ্যমে একটি সংস্কৃতি শতাব্দীর পর শতাব্দী নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

সামাজিক রূপান্তর ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোজন (Social Transformation and Institutional Adaptation): মোহমুক্তি ও সমালোচনামূলক পাঠ

একটি সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ, ঐতিহাসিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্লেষণে কেবল দার্শনিক রূপান্তরের প্রশংসা করলেই চলে না; এই পরিবর্তনের পেছনের বস্তুগত পরিস্থিতি এবং ক্ষমতার বিন্যাসটিকেও খোলা চোখে দেখা প্রয়োজন। গাডামারের হার্মেনিউটিক্স আমাদের ঐতিহ্যের গভীরতা বুঝতে শেখায়, কিন্তু সেই গভীরতার পেছনে কাজ করা সামাজিক স্বার্থকে উন্মোচন করার জন্য প্রয়োজন এক সমালোচনামূলক দৃষ্টি। আরণ্যক সাহিত্যের এই যে বাহ্যিক যজ্ঞ ছেড়ে অন্তর্মুখী প্রতীকের দিকে যাত্রা, এটা কোনো আকস্মিক অলৌকিক আধ্যাত্মিক ঘটনা ছিল না। এর পেছনে ছিল তৎকালীন উত্তর ভারতের সমাজ ও অর্থনীতির এক গভীর সংকট ও রূপান্তর (Thapar, 1978)।

খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময়ে গাঙ্গেয় উপত্যকায় যখন দ্বিতীয় নগরায়ণ শুরু হচ্ছিল, লোহার লাঙ্গলের ব্যবহারের ফলে কৃষির উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং বড় বড় জনপদ ও রাষ্ট্রের জন্ম হচ্ছিল, তখন বৈদিক পশুপালক যুগের যাগযজ্ঞগুলো সমাজের জন্য এক বিরাট বোঝায় পরিণত হয়েছিল। কৃষিকাজের জন্য যেখানে বলদ এবং গবাদিপশুর সংরক্ষণ অপরিহার্য ছিল, সেখানে যজ্ঞের নামে হাজার হাজার পশু হত্যা করার ফলে কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম নিচ্ছিল। একই সাথে শ্রমণ আন্দোলন – বিশেষ করে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের অহিংসার বাণী – সাধারণ মানুষের কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছিল। বৈদিক পুরোহিত সমাজ বুঝতে পেরেছিল যে, যদি তারা কেবল এই রক্তক্ষয়ী ও ব্যয়বহুল বাহ্যিক যজ্ঞকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকে, তবে তাদের সমগ্র সামাজিক আধিপত্য অচিরেই ধসে পড়বে।

এই সংকট থেকে নিজেদের নেতৃত্বকে বাঁচানোর জন্যই পুরোহিত শ্রেণি আরণ্যকের এই রহস্যময় ও অন্তর্মুখী রূপকে অনুমোদন দিয়েছিল। এটি ছিল এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোজন বা স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডাপটেশন। তারা দেখলেন, বনের সন্ন্যাসী এবং চিন্তাশীল মানুষদের তো আর জোর করে যজ্ঞের চুলার সামনে বসানো যাবে না; অতএব তাদের চিন্তাকেই বৈদিক সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করে নিতে হবে। তারা ঘোষণা করলেন যে, বনের এই ধ্যান আসলে যজ্ঞেরই এক উচ্চতর রূপ। এর ফলে যে সাধকরা হয়তো বৈদিক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে নতুন কোনো অবৈদিক ধারার জন্ম দিতে পারতেন, তাদেরকে আবার বৈদিক কর্তৃত্বের অধীনেই ধরে রাখা সম্ভব হলো।

একই সাথে আরণ্যকের এই জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে রাখার জন্য এক কঠোর গোপনীয়তার প্রাচীর গড়ে তোলা হয়েছিল। এই সাহিত্যকে ‘আরণ্যক’ বলার অন্যতম কারণ ছিল – এই গ্রন্থগুলো গ্রামে বা লোকালয়ে পাঠ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। এগুলো পাঠ করতে হতো কেবল গভীর বনের নির্জনতায়, গুরু ও শিষ্যের মধ্যে একান্তে। প্রচার করা হয়েছিল যে, এই বিদ্যা এতই শক্তিশালী ও বিপজ্জনক যে কোনো অপবিত্র বা অনধিকারী ব্যক্তি এটি শুনলে তার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। এই গোপনীয়তার বয়ান আসলে তৈরি করা হয়েছিল এক নতুন ধরনের বৌদ্ধিক এলিট শ্রেণি গড়ে তোলার জন্য। সাধারণ মানুষের জন্য রইল মন্দিরের পূজা বা ছোটখাটো সংস্কার, আর আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টির উচ্চতর মর্যাদাটি কুক্ষিগত হয়ে রইল এক ক্ষুদ্র অংশের হাতে।

উপসংহারে বলা যায়, গাডামারের দিগন্তের মিলনের আলোয় আরণ্যক সাহিত্যকে পাঠ করলে মানুষের সংস্কৃতির এক দ্বিমুখী সত্য আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। একদিকে তা দেখায় মানব মনের সেই অবিশ্বাস্য ক্ষমতা, যার মাধ্যমে মানুষ রক্তের বদলে চিন্তাকে, আগুনের বদলে শ্বাসকে এবং পশুর বদলে অহংকে আহুতি দিয়ে নিজের হিংস্র আচারকে এক শান্ত ধ্যানমগ্ন সৃষ্টিতে রূপান্তরিত করেছিল। অন্যদিকে, এটি প্রমাণ করে যে প্রাচীন সমাজপতিরা কতটা চতুরতার সাথে মানুষের এই মহৎ আধ্যাত্মিক উত্তরণটিকেও তাদের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ও আধিপত্য রক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। আরণ্যককে বোঝা মানে হলো মানুষের ভেতরের এই আলোর অভিযাত্রাকে জানা, এবং একই সাথে সেই আলোর পেছনে থাকা সামাজিক স্বার্থের ছায়াটিকেও নির্দ্বিধায় চিনে নেওয়া।

উপসংহার

বৈদিক সাহিত্যের বিশদ হার্মেনিউটিক বিশ্লেষণ এটিই স্পষ্ট করে যে, কোনো প্রাচীন ধর্মীয় পাঠই স্থির, অপরিবর্তনীয় বা পবিত্র আধ্যাত্মিক সত্যের বাহক নয়; বরং তা নিরন্তর সামাজিক ও অর্থগত পরিবর্তনের এক গতিশীল ভাষিক ক্ষেত্র। আধুনিক পশ্চিমা ব্যাখ্যাতত্ত্ব এবং ধ্রুপদী ভারতীয় বিশ্লেষণ পদ্ধতির মেলবন্ধন বৈদিক পাঠকে তার অতিপ্রাকৃতিক খোলস থেকে মুক্ত করে মানবীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের একটি সুনির্দিষ্ট স্তরে স্থাপন করতে সক্ষম হয়। এই তাত্ত্বিক সংঘাত ও সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে বেদ আর কোনো অপার্থিব শাস্ত্র থাকে না, বরং তা পর্যবসিত হয় একটি প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতা কাঠামোর রূপায়ণের ভাষাগত নথিতে।

হান্স-গেয়র্গ গাডামারের দিগন্তের সংমিশ্রণ (Fusion of Horizons) তত্ত্বটি এখানে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রাচীন বৈদিক রচনাকারীদের সাংস্কৃতিক দিগন্ত এবং আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ গবেষকের ঐতিহাসিক দিগন্ত সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই দুই দিগন্তের কৃত্রিম মিলন ঘটানোর চেষ্টা না করে তাদের ব্যবধানটিকে স্বীকার করাই বস্তুনিষ্ঠ পাঠের মূল শর্ত। বৈদিক সমাজের প্রতীক ও মিথগুলো কোনো শাশ্বত সত্য নয়, বরং রুডলফ বুল্টমানের পরিভাষায় তা এক প্রাক-বৈজ্ঞানিক যুগের অস্তিত্বগত রূপক। যখন বৈদিক মিথগুলোকে বিশ্লেষণ করা হয়, তখন প্রাকৃতিক উপাদানের সাথে মানুষের সংঘাত ও সমঝোতার স্পষ্ট ছাপ দেখা যায়। একইভাবে, পল রিক্যুরের প্রতীকী ব্যাখ্যার সূত্র ধরে স্পষ্ট হয় যে, যজ্ঞ বা আচারের উপাদানগুলো বস্তুজগতের বাইরে কোনো রহস্যময় জগতের সাথে সম্পর্কিত ছিল না; তা ছিল মানব মনের বস্তুগত আকাঙ্ক্ষারই আনুষ্ঠানিক বহিঃপ্রকাশ।

মীমাংসা দর্শনের ভাষাতাত্ত্বিক বিচার বৈদিক পাঠের এই ধর্মনিরপেক্ষ ও অ্যাকাডেমিক চরিত্রটিকে আরও দৃঢ় ভিত্তি দেয়। কুমারিল ভট্টের অভিহিতান্বয়বাদ (Abhihitānvayavāda) এবং প্রভাকরের অন্বিতাভিধানবাদ (Anvitābhidhānavāda) প্রমাণ করে যে, বৈদিক সংহিতা ও ব্রাহ্মণের অর্থ কোনো স্বতঃসিদ্ধ রহস্য নয়, বরং তা ভাষার অন্তর্গত ব্যাকরণ, সামাজিক প্রয়োগ ও বাক্যার্থের বিধিবদ্ধ নিয়মের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে কোনো দেবতার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বা তাদের সন্তুষ্টির প্রশ্নটি মুখ্য ছিল না; মূল বিষয় ছিল ভাষার কার্যকারিতা এবং সামাজিক আচরণের শৃঙ্খলা। একই মন্ত্রের ভিন্ন ভিন্ন যজ্ঞীয় প্রেক্ষাপটে রূপান্তর এবং পরবর্তীতে আরণ্যক ও উপনিষদে এসে বাহ্যিক যজ্ঞের অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিকীকরণ কোনো আধ্যাত্মিক বিপ্লব নয়; বরং এটি ছিল পরিবর্তিত কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও জটিল সামাজিক বিন্যাসের সাথে তাল মেলাতে পুরোহিত শ্রেণীর একটি মতাদর্শিক কৌশল।

পরিশেষে বলা যায়, বৈদিক সাহিত্যকে যদি সমসাময়িক জ্ঞানের অংশ করতে হয়, তবে তার ওপর আরোপিত সমস্ত অতিলৌকিক মহিমা ও অহেতুক ভক্তির আবরণ উন্মোচন করতে হবে। হার্মেনিউটিক্স বা ব্যাখ্যাতত্ত্বের কাজ কোনো ধর্মগ্রন্থের প্রতি আনুকূল্য প্রদর্শন নয়, বরং পাঠের অভ্যন্তরীণ স্ববিরোধ, ক্ষমতার রাজনীতি এবং ইতিহাসের পদচিহ্নকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। এই লেখার পদ্ধতিগত অনুসন্ধান বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীন স্তূপ থেকে অন্ধবিশ্বাসকে পৃথক করে সেখানে মানবীয় ভাষা, যুক্তি, সামাজিক দ্বন্দ্ব ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের নির্মোহ সাক্ষ্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। এটি প্রমাণ করে যে, চূড়ান্ত বিচারে বৈদিক সাহিত্য মানব চেতনার বিকাশ ও জটিল মতাদর্শিক উৎপাদনেরই এক প্রামাণ্য ইতিহাস।

তথ্যসূত্র

  • Anthony, D. W. (2007). The horse, the wheel, and language: How Bronze-Age riders from the Eurasian steppes shaped the modern world. Princeton University Press.
  • Arnold, D. (2005). Buddhists, Brahmins, and belief: Epistemology in South Asian philosophy of religion. Columbia University Press.
  • Austin, J. L. (1962). How to do things with words. Oxford University Press.
  • Bandyopadhyay, N. (1988). The concept of contradiction in Indian philosophy. Sanskrit Pustak Bhandar.
  • Bayly, C. A. (1998). Origins of nationality in South Asia: Patriotism and ethical government in the making of modern India. Oxford University Press.
  • Bell, C. (1992). Ritual theory, ritual practice. Oxford University Press.
  • Benveniste, É. (1973). Indo-European language and society (E. Palmer, Trans.). University of Miami Press.
  • Bhaduri, S. (1947). Studies in Nyāya-Vaiśeṣika metaphysics. Bhandarkar Oriental Research Institute.
  • Bhatt, G. P. (1962). Epistemology of the Bhāṭṭa school of Pūrva Mīmāṃsā. Chowkhamba Sanskrit Series Office.
  • Bhattacharji, S. (1984). Literature in the Vedic age: The Samhitās. K. P. Bagchi & Co.
  • Bhattacharyya, S. (1987). The Mīmāṃsā philosophy of language. Cultural Heritage of India, The Ramakrishna Mission Institute of Culture.
  • Biardeau, M. (1964). Théorie de la connaissance et philosophie de la parole dans le brahmanisme classique. Mouton & Co.
  • Biardeau, M. (1989). Hinduism: The anthropology of a civilization (R. Nice, Trans.). Oxford University Press.
  • Bilimoria, P. (1988). Śabdapramāṇa: Word and knowledge in Indian philosophy. Kluwer Academic Publishers.
  • Bodewitz, H. W. (1976). The daily evening and morning offering (Agnihotra) according to the Brāhmaṇas. E. J. Brill.
  • Bodewitz, H. W. (1990). The Jyotiṣṭoma ritual: Jaiminīya Brāhmaṇa I, 66-364. E. J. Brill.
  • Bowie, A. (1998). Introduction. In F. Schleiermacher, Hermeneutics and criticism: And other writings (pp. vii–xxxi). Cambridge University Press.
  • Bowie, A. (2003). Introduction to German philosophy: From Kant to Habermas. Polity Press.
  • Boyce, M. (1975). A history of Zoroastrianism: Volume one, The early period. E. J. Brill.
  • Brereton, J. P. (1981). The Ṛgvedic Ādityas. American Oriental Society.
  • Brodbeck, S. (2019). The poetic art of the Ṛgveda. In J. Frazier (Ed.), The Oxford history of Hinduism: The Vedic world (pp. 112–134). Oxford University Press.
  • Bronkhorst, J. (2007). Greater Magadha: Studies in the culture of early India. Brill.
  • Bultmann, R. (1957). History and eschatology: The presence of eternity. Edinburgh University Press.
  • Bultmann, R. (1958). Jesus Christ and mythology. Charles Scribner’s Sons.
  • Bultmann, R. (1960). Existence and faith: Shorter writings of Rudolf Bultmann (S. M. Ogden, Trans.). Living Age Books.
  • Bultmann, R. (1984). New Testament and mythology. In H. W. Bartsch (Ed.), Kerygma and myth: A theological debate (R. H. Fuller, Trans., pp. 1–44). Fortress Press. (Original work published 1941)
  • Caland, W., & Henry, V. (1906). L’Agniṣṭoma: Description complète de la forme normale du sacrifice de Soma dans le culte védique (2 vols.). Ernest Leroux.
  • Cardona, G. (1988). Pāṇini: His work and its traditions (Vol. 1). Motilal Banarsidass.
  • Chakrabarti, A. (1997). Denying existence: The logic, epistemology and pragmatics of negative existentials and fictions. Kluwer Academic Publishers.
  • Chapple, C. K. (2009). The Bhagavad Gītā: Twenty-fifth–anniversary edition. State University of New York Press.
  • Chari, V. K. (1990). Sanskrit criticism. University of Hawaii Press.
  • Clackson, J. (2007). Indo-European linguistics: An introduction. Cambridge University Press.
  • Clooney, F. X. (1990). Thinking ritually: Rediscovering the Pūrva Mīmāṃsā of Jaimini. E. Peeters.
  • D’Sa, F. X. (1980). Śabdaprāmāṇyam in Śabara and Kumārila: Towards a study of the Mīmāṃsā experience of language. E. Peeters.
  • Dange, S. A. (1979). Sexual symbolism from the Vedic ritual. Ajanta Publications.
  • Deshpande, M. M. (1993). Sanskrit & Prakrit: Sociolinguistic issues. Motilal Banarsidass.
  • Deussen, P. (1906). The philosophy of the Upanishads (A. S. Geden, Trans.). T. & T. Clark.
  • Devasthali, G. V. (1959). Mīmāṃsā: The vākya-śāstra of ancient India. Booksellers’ Publishing Co.
  • Dilthey, W. (1989). Introduction to the human sciences (R. A. Makkreel & F. Rodi, Eds. & Trans.; Selected Works, Vol. 1). Princeton University Press.
  • Dilthey, W. (2002). The formation of the historical world in the human sciences (R. A. Makkreel & F. Rodi, Eds. & Trans.; Selected Works, Vol. 3). Princeton University Press.
  • Doniger O’Flaherty, W. (1981). The Rig Veda: An anthology. Penguin Books.
  • Dravid, R. R. (1972). The problem of universals in Indian philosophy. Motilal Banarsidass.
  • Dworkin, R. (1986). Law’s empire. Harvard University Press.
  • Eggeling, J. (Trans.). (1882). The Śatapatha-Brāhmaṇa: According to the text of the Mādhyandina school (Part 1, Books I and II). Clarendon Press.
  • Einoo, S. (1988). Die Cāturmāsya-Liturgie: Darstellung der Riten nach den Śrautasūtras. Harrassowitz Verlag.
  • Elizarenkova, T. Y. (1995). Language and style of the Vedic Ṛṣis (W. Doniger, Ed.). State University of New York Press.
  • Erdosy, G. (Ed.). (1995). The Indo-Aryans of ancient South Asia: Language, material culture and ethnicity. Walter de Gruyter.
  • Ermarth, M. (1978). Wilhelm Dilthey: The critique of historical reason. University of Chicago Press.
  • Falk, H. (1989). Soma im Rgveda. Harrassowitz Verlag.
  • Flattery, D. S., & Schwartz, M. (1989). Haoma and Harmaline: The botanical identity of the Indo-Iranian sacred hallucinogen “Soma” and its agent “Harmaline”. University of California Press.
  • Flood, G. (1996). An introduction to Hinduism. Cambridge University Press.
  • Flood, G. (2013). The truth within: A history of inwardness in Christianity, Hinduism, and Buddhism. Oxford University Press.
  • Forster, M. N. (2010). After Herder: Philosophy of language in the German tradition. Oxford University Press.
  • Franco, E. (1997). Dharmakīrti on compassion and rebirth. Arbeitskreis für Tibetische und Buddhistische Studien Universität Wien.
  • Frank, M. (2004). The text and its style: Schleiermacher’s theory of language. In K. Ameriks (Ed.), The Cambridge companion to German idealism (pp. 214–234). Cambridge University Press.
  • Frazier, J. (Ed.). (2011). Categorisation in Indian philosophy: Thinking inside the box. Ashgate Publishing.
  • Freschi, E. (2012). Duty, language and exegesis in Prābhākara Mīmāṃsā: Including an edition and translation of Rāmānujācārya’s Tantrarahasya, Śāstrārambha. Brill.
  • Fuller, L. L. (1969). The morality of law (Rev. ed.). Yale University Press.
  • Gächter, O. (1983). Hermeneutics and language in Pūrva Mīmāṃsā: A study in Śabara Bhāṣya. Motilal Banarsidass.
  • Gadamer, H.-G. (1976). Philosophical hermeneutics (D. E. Linge, Ed. & Trans.). University of California Press.
  • Gadamer, H.-G. (1989). Truth and method (2nd rev. ed., J. Weinsheimer & D. G. Marshall, Trans.). Continuum. (Original work published 1960)
  • Ganeri, J. (2006). Artha: Meaning. Oxford University Press.
  • Garge, D. V. (1952). Citations in Śabara-Bhāṣya: A study. Deccan College Postgraduate and Research Institute.
  • Girard, R. (1977). Violence and the sacred (P. Gregory, Trans.). Johns Hopkins University Press.
  • Gonda, J. (1960). Die Religionen Indiens: Veda und älterer Hinduismus (Vol. 1). W. Kohlhammer.
  • Gonda, J. (1963). The vision of the Vedic poets. Mouton & Co.
  • Gonda, J. (1966). Loka: World and heaven in the Veda. N.V. Noord-Hollandsche Uitgevers Maatschappij.
  • Gonda, J. (1975). Vedic literature: (Saṃhitās and Brāhmaṇas). Otto Harrassowitz.
  • Gonda, J. (1980). The Mantras of the Agnyupasthāna and the Sautrāmaṇī. North-Holland Publishing Company.
  • Gonda, J. (1987). Rice and barley offerings in the Veda. E. J. Brill.
  • Grondin, J. (1994). Introduction to philosophical hermeneutics. Yale University Press.
  • Halbfass, W. (1991). Tradition and reflection: Explorations in Indian thought. State University of New York Press.
  • Heesterman, J. C. (1985). The inner conflict of tradition: Essays on Indian ritual, kingship, and society. University of Chicago Press.
  • Heesterman, J. C. (1993). The broken world of sacrifice: An essay in ancient Indian ritual. University of Chicago Press.
  • Heidegger, M. (1962). Being and time (J. Macquarrie & E. Robinson, Trans.). Harper & Row. (Original work published 1927)
  • Hillebrandt, A. (1980). Vedic mythology (Vol. 1, S. R. Sarma, Trans.). Motilal Banarsidass.
  • Hirsch, E. D. (1967). Validity in interpretation. Yale University Press.
  • Hirsch, E. D. (1976). The aims of interpretation. University of Chicago Press.
  • Holdrege, B. A. (1996). Veda and Torah: Transcending the textuality of scripture. State University of New York Press.
  • Houben, J. E. (2000). The ritual pragmatics of a Vedic hymn: The “Riddle Hymn” and the Pravargya ritual. Journal of the American Oriental Society, 120(4), 499–536.
  • Houben, J. E. M. (1995). The Sambandha-samuddeśa (Chapter on relation) and Bhartṛhari’s philosophy of language. E. J. Brill.
  • Houben, J. E. M. (2003). The Soma-Haoma problem: Innovations in the study of the prehistory and history of the Central Asian sacred beverage. Electronic Journal of Vedic Studies, 9(1), 42–89.
  • Hubert, H., & Mauss, M. (1964). Sacrifice: Its nature and function (W. D. Halls, Trans.). University of Chicago Press.
  • Jamison, S. W. (1991). The ravenous hyenas and the wounded sun: Myth and ritual in ancient India. Cornell University Press.
  • Jamison, S. W. (1996). Sacrificed wife / Sacrificer’s wife: Women, ritual, and hospitality in ancient India. Oxford University Press.
  • Jamison, S. W. (2007). The Rig Veda between two worlds: Four lectures at the Collège de France. Publications de l’Institut de Civilisation Indienne.
  • Jamison, S. W., & Brereton, J. P. (Trans.). (2014). The Rigveda: The earliest religious poetry of India (3 vols.). Oxford University Press.
  • Jaspers, K. (1970). Philosophy (Vol. 2, E. B. Ashton, Trans.). University of Chicago Press. (Original work published 1932)
  • Jha, D. N. (2002). The myth of the holy cow. Verso.
  • Jha, G. (1933). Śabara-Bhāṣya (3 vols.). Oriental Institute, Baroda.
  • Jha, G. (1942). Pūrva-Mīmāṃsā in its sources. Benares Hindu University.
  • Jordens, J. T. F. (1978). Dayānanda Sarasvatī: His life and ideas. Oxford University Press.
  • Kaelber, W. O. (1989). Tapta Mārga: Asceticism and initiation in Vedic India. State University of New York Press.
  • Kane, P. V. (1977). History of Dharmaśāstra: Ancient and medieval religious and civil law (Vol. 5, Part 2). Bhandarkar Oriental Research Institute.
  • Kant, I. (1998). Groundwork of the metaphysics of morals (M. Gregor, Trans.). Cambridge University Press. (Original work published 1785)
  • Kataoka, K. (2011). Kumārila on truth, omniscience, and killing: A critical edition and translation of Mīmāṃsāślokavārttika ad 1.1.2. Österreichische Akademie der Wissenschaften.
  • Keith, A. B. (1925). The religion and philosophy of the Veda and Upanishads (2 vols.). Harvard University Press.
  • Keith, A. B. (Ed. & Trans.). (1909). The Aitareya Āraṇyaka. Clarendon Press.
  • Kemp, P. (1989). Narrative ethics and moral philosophy in Paul Ricoeur. Philosophy & Social Criticism, 15(3), 229–246.
  • Krick, H. (1982). Das Ritual der Feuergründung (Agnyādheya). Verlag der Österreichischen Akademie der Wissenschaften.
  • Kuiper, F. B. J. (1979). Varuṇa and Vidūṣaka: On the origin of the Sanskrit drama. North-Holland Publishing Company.
  • Kumārila Bhaṭṭa. (1985). Tantravārttika (G. Jha, Trans., 2 vols.). Sri Satguru Publications.
  • Lévi, S. (1898). La doctrine du sacrifice dans les Brāhmaṇas. Ernest Leroux.
  • Lévi-Strauss, C. (1969). The raw and the cooked (J. Weightman & D. Weightman, Trans.). Harper & Row.
  • Lincoln, B. (1986). Myth, cosmos, and society: Indo-European themes of creation and destruction. Harvard University Press.
  • Lincoln, B. (1991). Death, war, and sacrifice: Studies in ideology and practice. University of Chicago Press.
  • Lincoln, B. (1999). Theorizing myth: Narrative, ideology, and scholarship. University of Chicago Press.
  • Lüders, H. (1951). Varuṇa I: Varuṇa und die Wasser (L. Alsdorf, Ed.). Vandenhoeck & Ruprecht.
  • Lüders, H. (1959). Varuṇa II: Varuṇa und das Ṛta (L. Alsdorf, Ed.). Vandenhoeck & Ruprecht.
  • Macdonell, A. A. (1897). Vedic mythology. Verlag von Karl J. Trübner.
  • Macdonell, A. A. (1916). A Vedic grammar for students. Oxford University Press.
  • Macquarrie, J. (1960). The scope of demythologizing: Bultmann and his critics. SCM Press.
  • Makkreel, R. A. (1992). Dilthey: Philosopher of the human studies. Princeton University Press.
  • Malamoud, C. (1996). Cooking the world: Ritual and thought in ancient India (D. White, Trans.). Oxford University Press.
  • Mallory, J. P. (1989). In search of the Indo-Europeans: Language, archaeology and myth. Thames and Hudson.
  • Matilal, B. K. (1990). The word and the world: India’s contribution to the study of language. Oxford University Press.
  • Mauss, M. (1954). The gift: Forms and functions of exchange in archaic societies (I. Cunnison, Trans.). Cohen & West.
  • Minkowski, C. Z. (1991). Priesthood in ancient India: A study of the Maitrāvaruṇa priest. De Nobili Research Library.
  • Mohanty, J. N. (1992). Reason and tradition in Indian thought: An essay on the marginality of Indian thought. Oxford University Press.
  • Müller, F. M. (1878). Lectures on the origin and growth of religion as illustrated by the religions of India. Longmans, Green, and Co.
  • Müller, F. M. (1891). Physical religion: The Gifford lectures delivered before the University of Glasgow in 1890. Longmans, Green, and Co.
  • Oberlies, T. (1998). Die Religion des Ṛgveda: Erster Teil – Das religiöse System des Ṛgveda. De Nobili Research Library.
  • Oldenberg, H. (1988). The religion of the Veda (S. B. Shrotri, Trans.). Motilal Banarsidass. (Original work published 1894)
  • Olivelle, P. (1996). Upanisads. Oxford University Press.
  • Olivelle, P. (1998). The early Upaniṣads: Annotated text and translation. Oxford University Press.
  • Palmer, R. E. (1969). Hermeneutics: Interpretation theory in Schleiermacher, Dilthey, Heidegger, and Gadamer. Northwestern University Press.
  • Parpola, A. (1995). The problem of the Aryans and the Soma: Textual-linguistic and archaeological evidence. In G. Erdosy (Ed.), The Indo-Aryans of ancient South Asia: Language, material culture and ethnicity (pp. 353–381). Walter de Gruyter.
  • Parpola, A. (2015). The roots of Hinduism: The early Aryans and the Indus civilization. Oxford University Press.
  • Pinault, G.-J. (2004). The poetic style of the Ṛgveda: The case of the hymns to the Dawn. Indo-Iranian Journal, 47(3), 195–216.
  • Pokorny, J. (1959). Indogermanisches etymologisches Wörterbuch. Francke Verlag.
  • Pollock, S. (2005). The revelation of tradition: Śruti, smṛti, and the choices of classical Indian hermeneutics. In F. Squarcini (Ed.), Boundaries, dynamics and construction of traditions in South Asia (pp. 5–17). Firenze University Press.
  • Pollock, S. (2006). The language of the gods in the world of men: Sanskrit, culture, and power in premodern India. University of California Press.
  • Potter, K. H. (Ed.). (2014). Encyclopedia of Indian philosophies: Vol. 16. Philosophy of Pūrva-Mīmāṃsā. Motilal Banarsidass.
  • Proferes, T. N. (2007). Vedic ideals of sovereignty and the poetics of power. American Oriental Society.
  • Raja, K. K. (1963). Indian theories of meaning. The Adyar Library and Research Centre.
  • Ramanujachari, R. (1934). Bṛhatī of Prabhākara Miśra: Tarkapāda. University of Madras.
  • Rao, K. K. (1998). Philosophy of sentence meaning according to the Indian thinkers. Sri Satguru Publications.
  • Rappaport, R. A. (1999). Ritual and religion in the making of humanity. Cambridge University Press.
  • Rau, W. (1957). Staat und Gesellschaft im alten Indien: Nach den Brāhmaṇa-Texten dargestellt. Alfred Töpelmann.
  • Renou, L. (1957a). Études védiques et pāṇinéennes (Tome 3: Les hymnes aux Uṣas). E. de Boccard.
  • Renou, L. (1957b). Veda and Bharat: The study of Hinduism. University of Calcutta.
  • Ricoeur, P. (1965). Fallible man (C. A. Kelbley, Trans.). Henry Regnery Company.
  • Ricoeur, P. (1967). The symbolism of evil (E. Buchanan, Trans.). Harper & Row.
  • Ricoeur, P. (1970). Freud and philosophy: An essay on interpretation (D. Savage, Trans.). Yale University Press.
  • Ricoeur, P. (1971). The model of the text: Meaningful action considered as a text. Social Research, 38(3), 529–562.
  • Ricoeur, P. (1974). The conflict of interpretations: Essays in hermeneutics (D. Ihde, Ed.). Northwestern University Press.
  • Ricoeur, P. (1975). The language of faith. Union Seminary Quarterly Review, 28(3), 213–224.
  • Ricoeur, P. (1976). Interpretation theory: Discourse and the surplus of meaning. Texas Christian University Press.
  • Ricoeur, P. (1977). The rule of metaphor: Multi-disciplinary studies of the creation of meaning in language (R. Czerny, K. McLaughlin, & J. Costello, Trans.). University of Toronto Press.
  • Ricoeur, P. (1978). The philosophy of Paul Ricoeur: An anthology of his work (C. E. Reagan & D. Stewart, Eds.). Charles Scribner’s Sons.
  • Ricoeur, P. (1979). Main trends in philosophy. Holmes & Meier.
  • Ricoeur, P. (1981). Hermeneutics and the human sciences: Essays on language, action and interpretation (J. B. Thompson, Ed. & Trans.). Cambridge University Press.
  • Ricoeur, P. (1984). Time and narrative (Vol. 1, K. McLaughlin & D. Pellauer, Trans.). University of Chicago Press.
  • Ricoeur, P. (1985). Time and narrative (Vol. 2, K. McLaughlin & D. Pellauer, Trans.). University of Chicago Press.
  • Ricoeur, P. (1986). Lectures on ideology and utopia (G. H. Taylor, Ed.). Columbia University Press.
  • Ricoeur, P. (1988). Time and narrative (Vol. 3, K. Blamey & D. Pellauer, Trans.). University of Chicago Press.
  • Ricoeur, P. (1991). From text to action: Essays in hermeneutics, II (K. Blamey & J. B. Thompson, Trans.). Northwestern University Press.
  • Ricoeur, P. (1995). Figuring the sacred: Religion, narrative, and imagination (D. Pellauer, Trans., M. I. Wallace, Ed.). Fortress Press.
  • Roebuck, V. J. (2000). The Upaniṣads. Penguin Books.
  • Śālikanātha Miśra. (1961). Prakaraṇapañcikā (A. S. Sastri, Ed.). Banaras Hindu University.
  • Sarkar, K. L. (1909). The Mīmāṃsā rules of interpretation: As applied to Hindu law. Tagore Law Lectures, University of Calcutta.
  • Sarma, R. (1994). The philosophy of language in classical Indian tradition. Munshiram Manoharlal.
  • Sarup, L. (1920). The Nighaṇṭu and the Nirukta: The oldest Indian treatise on etymology, philology, and semantics. Oxford University Press.
  • Sastri, S. K. R. (1936). A primer of Indian logic according to Annambhaṭṭa’s Tarkasaṃgraha. P. Varadachary & Co.
  • Schleiermacher, F. (1998). Hermeneutics and criticism: And other writings (A. Bowie, Ed. & Trans.). Cambridge University Press.
  • Searle, J. R. (1969). Speech acts: An essay in the philosophy of language. Cambridge University Press.
  • Segal, R. A. (1999). Theorizing about myth. University of Massachusetts Press.
  • Sharma, R. S. (1983). Material culture and social formations in ancient India. Macmillan India.
  • Smith, B. K. (1989). Reflections on resemblance, ritual, and religion. Oxford University Press.
  • Smith, B. K. (1994). Classifying the universe: The ancient Indian varṇa system and the origins of caste. Oxford University Press.
  • Smith, F. M. (1987). The Vedic sacrifice in transition: A translation and study of the Trikāṇḍamaṇḍana of Bhāskaramiśra. Bhandarkar Oriental Research Institute.
  • Sparreboom, M. (1985). Chariots in the Veda. E. J. Brill.
  • Staal, F. (1983). Agni: The Vedic ritual of the fire altar (Vols. 1–2). Asian Humanities Press.
  • Staal, F. (1989). Rules without meaning: Ritual, mantras, and the human sciences. Peter Lang.
  • Stoker, V. (2016). Polemics and patronage in the city of victory: Vyāsatīrtha, Hindu sectarianism, and the sixteenth-century Vijayanagara court. University of California Press.
  • Subba Rao, V. (1969). The philosophy of a sentence and its parts. Munshiram Manoharlal.
  • Taber, J. (2005). A Hindu critique of Buddhist epistemology: Kumārila on perception. Routledge.
  • Tambiah, S. J. (1979). A performative approach to ritual. Proceedings of the British Academy, 65, 113–169.
  • Thapar, R. (1978). Ancient Indian social history: Some interpretations. Orient Longman.
  • Thapar, R. (1984). From lineage to state: Social formations in the mid-first millennium B.C. in the Ganga Valley. Oxford University Press.
  • Thieme, P. (1957). Mitra and Aryaman. American Oriental Society.
  • Thite, G. U. (1975). Sacrifice in the Brāhmaṇa texts. University of Poona.
  • Tiwary, R. S. (1984). A critical approach to classical Indian poetics. Chaukhambha Orientalia.
  • Tull, H. W. (1989). The Vedic origins of karma: Cosmos as man in ancient Indian myth and ritual. State University of New York Press.
  • van Buitenen, J. A. B. (1968). The Pravargya: An ancient Indian iconic ritual described and annotated. Deccan College Postgraduate and Research Institute.
  • Verpoorten, J.-M. (1987). Mīmāṃsā literature. Otto Harrassowitz.
  • Warnke, G. (1987). Gadamer: Hermeneutics, tradition and reason. Stanford University Press.
  • Wasson, R. G. (1968). Soma: Divine mushroom of immortality. Harcourt Brace Jovanovich.
  • Watkins, C. (1995). How to kill a dragon: Aspects of Indo-European poetics. Oxford University Press.
  • West, M. L. (2007). Indo-European poetry and myth. Oxford University Press.
  • Wittgenstein, L. (1953). Philosophical investigations (G. E. M. Anscombe, Trans.). Basil Blackwell.
  • Witzel, M. (1987). On the localisation of Vedic texts and schools. In G. Pollet (Ed.), India and the ancient world: History, art, and culture between South and Southeast Asia (pp. 173–213). Departement Oriëntaliek, Katholieke Universiteit Leuven.
  • Witzel, M. (1995). Early Sanskritization: Origins and development of the Kuru state. Electronic Journal of Vedic Studies, 1(4), 1–26.
  • Witzel, M. (1997). The development of the Vedic canon and its schools: The social and political milieu. In M. Witzel (Ed.), Inside the texts, beyond the texts: New approaches to the study of the Vedas (pp. 257–345). Department of Sanskrit and Indian Studies, Harvard University.
  • Yoshimizu, K. (2007). The dual significance of the term ‘artha’ in the Mīmāṃsā theory of action. In B. Kellner, H. Krasser, H. Lasic, M. T. Much, & H. Tauscher (Eds.), Pramāṇakīrtiḥ: Papers dedicated to Ernst Steinkellner on the occasion of his 70th birthday (Part 2, pp. 1045–1068). Arbeitskreis für Tibetische und Buddhistische Studien Universität Wien.

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.