অবশ্যপাঠ্যবিজ্ঞানবৃহৎ সম্প্রসারণস্টিকি

বিগ ব্যাং থেকে মহাবিশ্ব

যার শুরু নেই, তার শেষও নেই।
যার শুরু-শেষ উভয়ই নেই, তার কোন স্রষ্টা থাকতে পারে না।
যার জন্ম নেই, তার মৃত্যুও নেই।
যার জন্ম-মৃত্যু উভয়ই নেই, সে কর্মক্ষম কোন সত্ত্বা হতেই পারে না।
যার সৃষ্টি নেই, তার ধ্বংসও নেই।
যার সৃষ্টিও ধ্বংস উভয়ই নেই, তার কোন অস্তিত্বই থাকতে পারে না।

Table of Contents

ভূমিকা

একটা সময় মানুষ উপরের নীলাকাশ দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেত রাতের নক্ষত্র খচিত আকাশ পানে দৃষ্টি দিয়ে। দিনের আলোয় যেন উপরের মিটিমিটি আলো গুলোকে নীল চাদরে ঢেকে দেয়া হতো, আর রাতে সে চাদর যেন সরিয়ে ফেলা হতো অন্ধকার রাতের শোভা বর্ধনে। অবাক বিস্ময়ে মানুষ দেখতো রাতের আকাশ, সেখানে আবার চাঁদ নামের একটা বড় প্রদীপ মনোরম আলো ছড়িয়ে রাতের পৃথিবীকে রোমাঞ্চকর করে তোলে। হয়তো তখন থেকেই মানুষ কল্পনা করতো, যদি একবার উড়ে সেই চাঁদে যেতে পারতাম….

ঠিক তখন থেকেই মানুষ চিন্তা করতে শুরু করেছিল কে সৃষ্টি করেছে এসব?

আর কিভাবেই বা সৃষ্টি করেছে?

এই “কে” দ্বারা প্রশ্ন করা মানেই পূর্ব থেকে কোন একজনকে নির্ধারণ করে নেয়া। “কারা” দ্বারা প্রশ্ন করলে পূর্ব থেকেই একাধিক জনকে নির্ধারণ করে নেয়া। যেখানে জানাই নেই কেউ আসলে সৃষ্টি করেছে কিনা, সেখানে “কে” বা “কারা” দ্বারা প্রশ্ন করাটাই বোকামি। এটা সরাসরি লজিক্যাল ফ্যালাসি। সেই সময়ে মানুষ যে এই প্রশ্নটিই করতে পেরেছিল, সেটাই ছিল একটা বিরাট ব্যাপার। কিন্তু সেই একই প্রশ্ন যখন এই আধুনিক বিজ্ঞানের যুগেও করা হয়, যেখানে আমরা আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের অনেক কিছুই জেনে ফেলেছি, পাড়ি দিতে সক্ষম হয়েছি আমাদের এই ছোট্ট পৃথিবীর সীমানা, তখনও এমন প্রশ্নকে বোকামি বললেও ভুল হবে, বলতে হয় গাধামি।

কিন্তু ঠিক তার পরেই প্রশ্ন এসেছিল, কিভাবে সৃষ্টি হল এবং কখন সৃষ্টি হল। মানুষ তখন থেকেই তাদের সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে এসেছে এসব প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে। একটা সময় ব্যর্থ হয়ে তারা ঈশ্বর নামক এক অদ্ভুতুড়ে স্রষ্টার কল্পনা করে নিতে বাধ্য হয়েছিল এসব সৃষ্টির পেছনে। কারণ, তাদের জ্ঞান আর সামনের দিকে এগোচ্ছিল না। একেক গোত্রের মানুষ একেক রকমের ভিন্ন ভিন্ন নামের ঈশ্বরকে জন্ম দিতে দিতে পৃথিবীটাকে বাহারি ঈশ্বরের একটা বিরাট ভাগার তৈরি করে ফেলেছিল, যার ফলশ্রুতিতে পৃথিবীতে ঘটে গিয়েছিল এক মহা ঈশ্বর বিস্ফোরণ। সে বিস্ফোরণ শুরু হয়েছিল প্রায় দু লক্ষ বছর পূর্বে যখন প্রথম এই বুদ্ধিমান প্রাণীর আগমন ঘটেছিল এবং যার অবসান ঘটেছে মাত্র ১৪৫০ বছর পূর্বে। এর মধ্যে জন্ম নিয়েছে প্রায় ৪২০০ ঈশ্বর। কত সব বিচিত্র নাম সেসব ঈশ্বরের, আর কত সব বাহারি ক্যারেক্টার সেসব ঈশ্বরের, যা চিন্তাই করা যায় না।

ব্যাপারটি ঠিক পাটি গণিতের ন্যায়। যখনি কোন জটিল গণিতের সম্মুখীন হতে হয়, তখনি গণিতের সমাধান কল্পে কিছু একটা “ধরে নিতে হয়”। আপনি গণিতের কোন না কোন এক সময় এরকম ধরে নিয়ে গণিতের সমাধান করতে বাধ্য হয়েছেন। যেমন, “ধরি করিমের আছে ক টাকা” কিংবা “রহিমের নিকট আছে ক টি পেন্সিল”ইত্যাদি। তারপর সেই গণিতের সমাধান শেষ করেছেন। কিন্তু বাস্তবে গণিতের ক্ষেত্রে ধরে নেয়া সহগটি ছিল আপনার সমস্যা সমাধানে একটি কল্পনা মাত্র।

অনুরূপ, কে সৃষ্টি করেছে এই মহাবিশ্ব, এমন জটিল সমস্যার সমাধানে তৎকালীন মানুষ ঈশ্বরকে ধরে না নিয়ে উপায় খুঁজে পায় নি। এবার যেন শত কাক এক ঢিলে তারিয়ে দেয়া সম্ভব হল। সকল অজানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল অতি সহজে। ঈশ্বরগুলো স্থান করে নিলো সকল অজানা প্রশ্নের উত্তরে, সকল অজানা রহস্যে। যেমন, এটা কে সৃষ্টি করেছে?

উত্তরঃ ঈশ্বর।
ওটা কে সৃষ্টি করেছে?
উত্তরঃ ঈশ্বর।
সেটা কে সৃষ্টি করেছে?
উত্তরঃ ঈশ্বর।

অসাধারণ একটি সমস্যা সমাধানের সহগ (গনিতে ধরে নেয়ার মত) পাওয়া গেল এবারে। এবারে অজানা উত্তরের সকল রহস্যের সামনেই ঈশ্বরকে দাঁড় করানো গেল। ঈশ্বর এবার হারিয়ে গেল রহস্যের অতল গহ্বরে। সেই তখন থেকেই বর্তমান অবধি কিছু মানুষের মগজ উন্নত হতে পারে নি, যারা এখনো ঈশ্বরকে সেই রহস্যের গভীরেই রেখে দিয়েছে। যেমন, তারা প্রশ্ন করবে, পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছে? (লজিক্যাল ফ্যালাসি দিয়েই প্রশ্নের শুরু)

উত্তরে যদি বলেন জানি না। দেখবেন তখনি সেই প্রশ্নকারী বলবে, ঈশ্বর সৃষ্টি করেছে। কিন্তু যদি বলেন, সূর্য থেকে পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে। ঠিক তখনি আবার প্রশ্ন করবে, তাহলে সূর্য কে সৃষ্টি করেছে?

উত্তরে যদি বলেন জানি না, তবে ঠিক তখনি সেই অজানা উত্তরে ঈশ্বরকে দাঁড় করিয়ে বলবে, এটাই ঈশ্বর সৃষ্টি করেছে। এর পর্যায়ক্রম চলতেই থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি “জানি না” বলে আত্মসমর্পণ না করবেন। কেননা, ওখানেই যে ঈশ্বর বেচারার বসত, “জানি না” এর মাঝেই।

কিন্তু জটিলতা তৈরি হল ঠিক তার পরবর্তী প্রশ্নে। কীভাবে সৃষ্টি করলেন মহাবিশ্ব?

তৎকালীন সময়ে প্রাচীন মানুষ গনিতের মত “ধরে নেয়া” ঈশ্বরকে ব্যবহার করতো তাদের সকল অজানা প্রশ্নের উত্তরের কাজে। কিন্তু জ্ঞানের বিবর্তনে সেই ধরে নেয়া ঈশ্বরকেই মনুষ্য জাতির একটা বড় অংশ ব্যবহার করছে ঈশ্বরের ইজ্জত বাঁচাতে। কেননা, পূর্বে যেসব প্রশ্নের সমাধানে ঈশ্বরকে ব্যবহার করা হতো, বর্তমানে সেসব প্রশ্নের উত্তর জানা গেছে। কাজেই, সেসব ঈশ্বর যেসব উত্তরে ঘাপটি মেরে বসে ছিল, এবার বিজ্ঞানের বদৌলতে তাদেরকে নড়েচড়ে বসতে হল এবং নতুন উত্তরের পেছনে গিয়ে পূর্বের ন্যায় আশ্রয় নিতে হল।

যেমনঃ মানুষ যখন জানতো না পৃথিবী সৃষ্টি করেছে কে? তখন এই উত্তরের স্থলে ঘাপটি মেরে বসে ছিল এই সবজান্তা ঈশ্বর। কিন্তু যখন জানা গেল, পৃথিবী মূলত কেউ সৃষ্টি করে নি, ইহা সূর্যের ডাস্ট থেকে সৃষ্ট, ঠিক তখনি ঈশ্বর প্রথম বারের মত নড়েচড়ে উঠে এবার সূর্যকে কে সৃষ্টি করেছে এই প্রশ্নের উত্তরের স্থলে পূর্বের ন্যায় ঘাপটি মেরে বসলো।

এরপর যখন জানা গেল, সূর্য মূলত কোন ঈশ্বর নামক বড় বাবু সৃষ্টি করে নি, ইহা বিগ ব্যাং থেকে সৃষ্ট। তখন আবারো ঈশ্বর বেচারাকে নড়েচড়ে উঠে “বিগ ব্যাং কে ঘটাইলো” এই প্রশ্নের উত্তরের স্থলে পূর্বের ন্যায় ঘাপটি মেরে বসতে হল।

ঠিক এভাবেই বিজ্ঞান সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, আর ঈশ্বর বেচারা গুলোকে পেছনে হটতে হচ্ছে। একারণেই ঈশ্বরের চ্যালাদের সহিত বিজ্ঞানের সম্পর্ক আদায়-কাঁচ কলায়। এর মধ্যে ঈশ্বর গুলো আবার তার মনোনীত মানুষের মাধ্যমে ধর্মের বিধান তৈরি করেছে, পাঠিয়েছে ঐশী গ্রন্থ। সেসব গ্রন্থে আবার কিভাবে ঈশ্বরকে তেল মারতে হবে সেসব নিয়মের পাশাপাশি তৎকালীন বিজ্ঞান উল্লেখ করে প্রত্যেক ঈশ্বরই নিজেকে সবজান্তা প্রমাণের একটা জোর চেষ্টা চালিয়ে গেছে। যার ফলশ্রুতিতে প্রত্যেকটি ধর্ম গ্রন্থেই মহাবিশ্ব সৃষ্টি সম্বন্ধে প্রথমে পৃথিবী, তারপর সূর্য তথা নক্ষত্র সৃষ্টির ঐশ্বরীয় বক্তব্য পাওয়া যায়। এতোদিনে এইসব ঈশ্বরকে কেন্দ্র করে ঈশ্বরের চ্যালারা রীতিমত ব্যবসা খুলে বসেছে। অতি স্বল্প পুঁজিতে বেশ ভালো ব্যবসা, অথচ লাভ সুনিশ্চিত। এখন এই ঈশ্বরের ইজ্জত বাঁচাতে তার বক্তব্য পূর্ণ বিজ্ঞানকে আধুনিক বিজ্ঞানের সহিত মিল করতে হবে, নয়তো অন্যের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাওয়ার ব্যবসা তো বন্ধ। ঠিক এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই ধর্ম গ্রন্থগুলোকে সংশোধন করার একটা বিশাল প্রক্রিয়া চলতে থাকে, যা বর্তমান অবধি চলে আসছে বহাল তবিয়তে।

আপনি যদি বর্তমানের আলোচিত ধর্মগ্রন্থ গুলো পাঠ করে থাকেন, তবে দেখতে পাবেন একেকটা ধর্ম গ্রন্থে কিসব বাহারি বিজ্ঞানের ডিব্বা লুকিয়ে আছে। ওগুলোকে বিজ্ঞান না বলে বিগ্যান বলাই শ্রেয়। ছোটখাটো ভুলগুলো তো শুধরে নিতে পারলেও জলজ্যান্ত ডাহা মিথ্যাচারকে আর শোধরানো সম্ভব হয় না। তাই কোরান বলেন, গীতা/বেদ বলেন, বাইবেল বলেন আর যে গ্রন্থই বলেন, প্রত্যেকটি গ্রন্থেই আগে পৃথিবী এবং পরে সূর্য সৃষ্টির মিথ্যাচার দেখতে পাবেন। আর ধর্ম গ্রন্থের বিবর্তন দেখতে চাইলে আপনাকে অনেক গুলো অনুবাদ গ্রন্থ সংগ্রহ করতে হবে। যেমনঃ সর্ব প্রথম কোরানের বাংলা অনুবাদ থেকে শুরু করে তৎপরবর্তী ৫-৭ জন অনুবাদকের কোরান সংগ্রহ করুন, যেসব অনুবাদের মাঝের সময়ের ব্যবধান অন্তত ৪-৫ বছর হয়ে থাকে। এরপর প্রতিটি অনুবাদ পড়তে থাকুন, দেখতে পাবেন কত সুন্দর আর সূক্ষ্ম পরিবর্তন। বাইবেল, গীতা/বেদ, সব গুলোতে একই রূপ দেখতে পাবেন। এসব ধর্ম বিশ্বাসীগন উঠেপড়ে লেগে গেছে এসব সংশোধনে এবং তা হয়েও চলেছে আম পাবলিকের দৃষ্টির আড়ালে। যদি কখনো তা প্রকাশও পায়, তবে সে সংশোধনের জন্য আবার সুন্দর যুক্তিও তৈরি করে রেখেছে। দেখবেন এক্ষেত্রে তারা বলবে, মূল গ্রন্থ ঠিক আছে, অনুবাদ করতে ভুল হয়েছিল বলে তা শুধরে নেয়া হয়েছে।

নিখাদ এক চিলতে বিনুদুন।

কৌতূহলী মন স্বাভাবিক ভাবেই জানতে চায়, সৌরজগতের গ্রহ নক্ষত্র গুলোর কিভাবে সৃষ্টি হল এবং তাদের গতিবিধি সম্বন্ধে। সাধারণ ভাবে চাঁদ, সূর্য, পৃথিবী ও সূর্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা অন্যান্য গ্রহ উপগ্রহের গতিবিধি পর্যালোচনার জন্য নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র F= GMm/r2 যথেষ্ট। কিন্তু আপনি যখন এক গ্যালাক্সিতে অবস্থান করে অন্য গ্যালাক্সির গতিবিধি পর্যালোচনা করতে যাবেন, তখন নিউটনের উক্ত সূত্র তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। তখন প্রয়োজন পরে আইনস্টাইনের “জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি”।

এখানে বলে রাখা ভালো যে, আপনি যদি আইনস্টাইনের “থিওরি ও রিলেটিভিটি” সম্বন্ধে প্রাথমিক ধারনাও না রাখেন, তবে আপনার নিকট গ্যালাক্সির গতিবিধি ব্যাখ্যা হয়ে যাবে জটিল। আপনি বিভ্রান্ত হতে বাধ্য। বিভ্রান্তটি ঠিক কেমন হতে পারে, তার একটি উদাহরণ দিচ্ছি।

মনে করুন আপনি চলন্ত ট্রেনের ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন। ট্রেনটি ঘণ্টায় ৬০ কি.মি গতিতে ছুটে যাচ্ছে। আপনার একটি বন্ধু স্টেশনে বসে আছে, ঠিক এমন সময় আপনি একটি ছোট পাথরের টুকরো ট্রেনের অভিমুখ বরাবর ঘণ্টায় ৬০ কি.মি বেগে ছুঁড়ে মারলেন। এখন ট্রেন যেহেতু ৬০ কি.মি গতিতে ছুটে চলেছে, সেহেতু আপনার গতিও ৬০ কি.মি পার আওয়ার। আপনি এই গতিতে থাকা অবস্থায় যখন ট্রেনের অভিমুখে ৬০ কি.মি পার আওয়ার গতিবেগে পাথরের টুকরোটি নিক্ষেপ করবেন, তখন আপনার দৃষ্টিতে ট্রেনের গতি সাপেক্ষে ঐ পাথর খণ্ডের ছুটে যাওয়ার গতি হবে ৬০ কি.মি পার আওয়ার। কিন্তু ট্রেনের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুটি দেখতে পাবে, পাথরটির গতি ১২০ কি.মি পার আওয়ার। কারণ, তার দৃষ্টিতে ট্রেনের গতি ৬০ কি.মি + পাথর খণ্ডের গতি ৬০ কি.মি = ১২০ কি.মি পার আওয়ার। এবার ভাবুন, নিক্ষেপিত একই পাথর খণ্ডের গতি কেউ দেখতে পাচ্ছে ৬০ কি.মি পার আওয়ার, আরেক জন দেখতে পাচ্ছে ১২০ কি.মি পার আওয়ার। আপনি কার দৃষ্টিকে ভুল, আর কার দৃষ্টিকে সঠিক হিসাবে ধরবেন, বাস্তবে যেখানে দুজনের দৃষ্টিই সঠিক।

অনুরূপ আমরা যে গ্যালাক্সিতে অবস্থান করছি, সেই গ্যালাক্সিটি গতিশীল, তন্মধ্যে অবস্থিত সূর্য গতিশীল, তন্মধ্যে গ্রহ গুলো গতিশীল, তন্মধ্যে উপগ্রহ গুলিও গতিশীল। এখন আপনি গতিশীল একটি গ্যালাক্সিতে অবস্থান করে অন্য আরেকটি গতিশীল গ্যালাক্সির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে গেলে, উপরের উদাহরণের মত ট্রেনে অবস্থানরত নিক্ষেপিত পাথর খণ্ডের প্রতি দৃষ্টিপাতের মত হয়ে যাবে।

আবার, আপনি যদি দুই গ্যাল্যক্সির মাঝামাঝি অবস্থান করেন, তখনও উপরের উদাহরনের মত ট্রেনের নিচে দাঁড়ানো ছেলেটির মত নিক্ষেপিত পাথর খন্ডের প্রতি দৃষ্টি পাতের মত হবে। এক্ষেত্রেই বা আপনি কার দৃষ্টিকে ভুল বলতে পারেন?

বিগ ব্যাং থিওরির প্রথম প্রশ্ন হল, বিগ ব্যাং নামক কিছু একটা যে ঘটেছিল, তা আমরা কেন আর কিভাবে মানবো? কিসের ভিত্তিতে আমরা এমন ঘটনাকে সত্য হিসাবে মানবো, যেখানে এমন ঘটনা কেউ চোখেই দেখে নি।

বিগ ব্যাং তথা মহা বিস্ফোরন আসলে কি?

উত্তরঃ অনেক মানুষই মনে করে, বিগ ব্যাং মানে বিরাট একটা বিস্ফোরণ। বিজ্ঞানীরাও মহা বিস্ফোরণ শব্দটাকে ব্যবহার করে। হয়তো এই কথাকেই বোমার মত একটা বিস্ফোরণ মনে করে বিজ্ঞানে অজ্ঞ ধার্মিক পন্ডিতগন। বাস্তবিক অর্থে বিস্ফোরণ অর্থে কোন বিস্ফোরণকে বুঝায় না। বিস্ফোরণ অর্থে প্রচণ্ড গতি সম্পন্ন মহাবিশ্বের প্রসারণকে বুঝায়। বিজ্ঞানীগন এই প্রচণ্ড গতিসম্পন্ন প্রসারণকেই মহা বিস্ফোরণ নামে আখ্যায়িত করেন।

এতোদিন ধর্মান্ধগন প্রশ্ন করেছে, বিস্ফোরণ কে ঘটাইছে। এখন থেকে প্রশ্ন করবে, প্রচণ্ড এই গতি কে সৃষ্টি করেছে। কে দ্বারা প্রশ্ন করা মানেই পূর্ব থেকে একজনকে স্বীকার করে নেয়া। এরকম প্রশ্ন করা মানে শুরুতেই লজিক্যাল ফ্যালাসি দ্বারা প্রশ্নের শুরু। বিজ্ঞান যেখানে রহস্য উন্মোচনে আটকে যায়, ধর্মান্ধ পাবলিক গন সেই রহস্যের ভেতরেই তাদের নিজ নিজ পারিবারিক সূত্রে পাওয়া ঈশ্বরকে গুঁজে দিয়ে প্রশ্ন করে, এটা কে করেছে, ওটা কে করেছে ইত্যাদি। বিজ্ঞান যেখানে আটকে গেলে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর গবেষণা করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, এরা ততদিন ঐ আটকে যাওয়ার স্থানে ঈশ্বরকে গুঁজে দিয়ে তার ইবাদত বন্দেগী করে। তারপর সেই রহস্যের উন্মোচন হলে, এরা ঠিক তার আগের কারণে পূর্বের ন্যায় ঈশ্বরকে স্থাপন করে, এটা কে করেছে এরূপ প্রশ্ন করে আবারো ইবাদতে মশগুল থাকে, আর বিজ্ঞানীরা সেই রহস্য উন্মোচনে আবারো গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকে।

মহাবিশ্ব যে ক্রম প্রসারনমান, বিজ্ঞানের এই তথ্যের ভিত্তি কি?

উত্তরঃ মানুষ একটা সময় ধারনা করতো, পৃথিবী সমতল এবং স্থির, সূর্য তাকে প্রতিনিয়ত প্রদক্ষিণ করে চলেছে। কিন্তু জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতির ধারাবাহিকতায় এখন আমরা স্পষ্টই জানি যে, পৃথিবী গোলাকার এবং সূর্যকে কেন্দ্রে রেখে প্রদক্ষিণরত। ঠিক একারণেই প্রাচীন সকল ধর্ম গ্রন্থেই দেখতে পাবেন পৃথিবীকে কেন্দ্রে রেখে সূর্যের প্রদক্ষিণ। এরপর এই ধারনা মিথ্যা প্রমাণিত হলে ধার্মিক পন্ডিতগন কোথাও অর্থ পরিবর্তন করে, কোথাও বা এটা দিয়ে সেটা বুঝিয়েছে, সেটা দিয়ে ওটা বুঝিয়েছে এরকম সস্তার ত্যানাবাজিতে আধুনিক বিজ্ঞানের সহিত মিল করনে উঠে পরে লেগে গেছে এবং যতই মিল করন করছে, ততই ধর্ম গ্রন্থ গুলো হাস্যকর হইতে কৌতুকে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। ধর্ম গ্রন্থ গুলোর ধারনা হতে, সনাতন ধর্মে এক লাফে হনুমানের সূর্যকে ফল মনে করে খেতে যাওয়ার কাহিনী, ইসলামে দিনশেষে সূর্যের আরশের নিচে সিজদা দিয়ে পরে থাকার হাদিস এবং সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর প্রদক্ষিণ এরকম বাইবেল বিরোধী বক্তব্যের জন্য যাজকদের হাতে বিজ্ঞানীদের হত্যার মত ঘটনা হতেই বুঝা যায় যে, ধর্ম গ্রন্থে কি বিজ্ঞান রয়েছে, নাকি বিগ্যান।

বিজ্ঞানী হাবল সর্ব প্রথম লক্ষ্য করলেন যে, একটা গ্যালাক্সি আরেকটি গ্যালাক্সি হতে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। সেগুলোর গতিবেগ নির্ধারণে তিনি আলোকে বিশ্লেষণ করে আলোক রশ্মিকে ব্যবহার করলেন। কোন গ্যালাক্সি হতে ছুটে আসা আলোকে পর্যবেক্ষণ করে তিনি সেই গ্যালাক্সির গতিবিধি নির্ণয় করতে সমর্থ হলেন। আমাদের সাপেক্ষে কোন গ্যালাক্সির যদি গতি থাকে, তবে সেখান থেকে ছুটে আসা আলোক তরঙ্গ দৈর্ঘ্য মনে হবে পরিবর্তিত হয়েছে। এই পরিবর্তনের নাম বিজ্ঞানের ভাষায় ডপলার শিফট। গ্যালাক্সিটি যদি আমাদের সাপেক্ষে ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকে, তবে আলোর তরঙ্গটি বিস্তৃত হয়ে যাবে। এটাকে বলে রেড শিফট। যদি আমাদের সাপেক্ষে গ্যালাক্সিটি কাছে আসতে থাকে, তবে আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যটি ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকবে, এটাকে বলে ব্লু শিফট। দৃশ্যমান আলোতে লাল আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য সবচেয়ে লম্বা এবং নীল আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ছোট বলেই এই তরঙ্গ দৈর্ঘ্য অনুসারে এরূপ নাম করন করা হয়েছে।

বিগ ব্যাং 1

বিঃদ্রঃ উপরোক্ত আলোচনায় একটি বিশেষ কথাকে ব্যবহার করা হয়েছে তা হল “আমাদের সাপেক্ষে”। এই আমাদের সাপেক্ষে বলতে কি বুঝানো হয়, এটা বুঝতে আপনাকে আইনস্টাইনের সেই “থিওরি অব রিলেটিভি” জানা ব্যতীত বিকল্প আর কিছুই নেই। সংক্ষেপে আলোচনার ক্ষেত্রে ঠিক ততটুকুই বলছি, যেটুকু প্রয়োজন। মহাবিশ্বে যেমন আমাদের গ্যালাক্সি গতিশীল, তদ্রূপ অন্যান্য সকল গ্যালাক্সিই গতিশীল। নিজে গতিশীল থাকা অবস্থায় অন্য আরেকটি কিছুর গতি নির্ধারণ এবং নিজে স্থির থেকে অন্য কোন গতিশীল বস্তুর গতি নির্ধারণে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। এখানে আমাদের সাপেক্ষে বলতে আমাদের গ্যালাক্সিকে স্থির ধরে বাঁকি গতিশীল গ্যালাক্সিকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, দুটি বস্তুকে পাশাপাশি সম গতিতে নিক্ষেপ করা হলে একটি বস্তুর সাপেক্ষে অন্য বস্তুটিকে গতিহীন মনে হবে। কিন্তু বস্তু দুটিকে পৃথিবীর সাপেক্ষে বিবেচনা করলেই কেবল গতিশীল মনে হবে, ব্যাপারটা ঠিক এরকম। এখন যেহেতু গ্যালাক্সি প্রতিনিয়ত দূরে সরে যাচ্ছে, সেহেতু আলোক তরঙ্গ দৈর্ঘ্যও ক্রমাগত বিস্তৃত হয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক।

এখন, আমরা যদি নির্দিষ্ট পরমাণু হতে বের হওয়া আলোক তরঙ্গ সম্বন্ধে জানি, তবে গ্যালাক্সিটি আমাদের সাপেক্ষে দূরে সরে যাচ্ছে, নাকি কাছে আসছে, নাকি স্থির রয়েছে, তা নির্ণয় করা অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়।

বিজ্ঞানী হাবল দেখলেন, একেক গ্যালাক্সি হতে আসা আলোক তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, গ্যালাক্সি গুলো ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে এবং এথেকে এই সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা যায় যে, গ্যালাক্সিগুলো কোন একটা সময় গতিপ্রাপ্ত হয়েছিল। সুতরাং মহাবিশ্বের সব কিছুই যে একটা সময় একত্রিত ছিল এবং একটা জায়গা হতেই মহাবিশ্বের প্রসারমান ঘটেছে, এ ব্যাপারে স্পষ্ট ধারনা পাওয়া যায়।

পূর্বেই আলোচনা করেছি যে, গ্যালাক্সি গুলো একে অপরের থেকে নিকটে আসছ, নাকি দূরে সরে যাচ্ছে, নাকি স্থির রয়েছে। এ পর্বে আলোচনা করবো, একটা গ্যালাক্সি হতে আরেকটা গ্যালাক্সির দূরত্ব কিভাবে নির্ণীত হয়েছে এবং এরই সূত্র ধরে সমগ্র মহাবিশ্বের বিশালতা কতটুকু তা আলোচনা করবো।

এক গ্যালাক্সি হতে অন্য গ্যালাক্সির দূরত্ব কিভাবে পরিমাপ করা হয়?

আমরা জানি, আমাদের গ্যালাক্সির সবচেয়ে কাছে অবস্থান করছে এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি। সেখান থেকেও আমাদের পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে ২.৫ মিলিয়ন বছর। নিকটতম গ্যালাক্সি হতে ১,৮৬,০০০ মাইল বেগে আলো আসতেই যদি ২.৫ মিলিয়ন বছর সময় লাগে, তবে মহাবিশ্বের সর্বশেষ গ্যালাক্সি হতে আলো আসতে কত সময় লাগতে পারে, তা কল্পনা শক্তিকেও সাময়িকের জন্য অবশ করে দেয়। হয়তো এমনও হতে পারে যে, মহাবিশ্বের শেষ গ্যালাক্সি হতে আমাদের পৃথিবীতে আলো এসে এখনো পৌঁছাতেই পারে নি। এজন্যই লক্ষ্য করে দেখবেন, যখন সমগ্র মহাবিশ্ব সম্বন্ধে কিছু বলা হয়, তখন দৃশ্যমান মহাবিশ্ব বলা হয়, কেননা বিগ ব্যাং হতে সৃষ্টিকৃত মহাবিশ্বের বাহিরেও বিরাট ঘুটঘুটে অন্ধকার সম্বলিত এক বিরাট মহাশূন্য স্থান রয়েছে, যার সম্বন্ধে বিজ্ঞান এখনো কোন কুল কিনারা করতেই পারে নি, শুধুমাত্র অনুমান ব্যতীত। হতে পারে সেই অন্ধকার জগতেও এরকম কোটি কোটি বিগ ব্যাং সংঘটিত হয়ে এরকম কোটি কোটি মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়ে আছে। হতে পারে আমাদের মহাবিশ্ব সৃষ্টির পূর্বেও কোটি কোটি বিগ ব্যাং সংঘটিত হয়েই ছিল এবং এখনো কোটি কোটি বিগ ব্যাং সংঘটিত হয়েই চলেছে। যা হোক, আমরা আমাদের মহাবিশ্ব নিয়ে আলোচনা করবো।

এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির দূরত্ব ২.৫ মিলিয়ন আলোক বর্ষ দূরে। এই দূরত্ব কিভাবে নির্ণয় করা হল? কেউ ফিতা দিয়ে তো আর মেপে দেখে নি। হ্যাঁ, ঠিকই অনুমান করেছেন। পূর্বেই বলেছি, দূরত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির একটা সম্পর্ক রয়েছে। আলো কতটুকু পথ অতিক্রম করলে আলোক তরঙ্গ কতটুকু বৃদ্ধি পায়, তার হিসাব রয়েছে বিজ্ঞানের নিকট। এই হিসাবের সূত্র ধরেই এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি কতদূরে রয়েছে, তা হিসাব করে বের করা যায় নির্ভুল ভাবে। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, বইয়ে লেখা থাকে এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির দূরত্ব ২.৫ মিলিওন আলোক বর্ষ। তার মানে এই নয় যে, এই দূরত্ব যেদিন হিসাব করে বের করা হয়েছে, সেদিন থেকে আজকের দিন পর্যন্ত ঐ একই দূরত্বে স্থির রয়েছে। এতোদিনে গ্যালাক্সিটি আরো বহু দূর পথ অতিক্রম করেছে, মানে দূরত্ব আরো বেড়ে গেছে, আর দূরত্ব বেড়ে গেছে মানেই আলোক তরঙ্গ দৈর্ঘ্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই হিসাবটা কেবল বুঝানোর জন্য প্রযোজ্য, বাস্তবে প্রতি মুহূর্তে এই দূরত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সমগ্র মহাবিশ্বের বিশালতা কিভাবে নির্ণয় করা হয়?

ঠিক আগের মতই ব্যাপার। আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের শেষ প্রান্তে যে গ্যালাক্সিটি রয়েছে এবং তার বিপরীত প্রান্তের শেষ গ্যালাক্সিটির দূরত্ব আলোক তরঙ্গের দৈর্ঘ্য প্রসারণের হিসাব থেকেই বের করা যায় অতি সহজে। মনে করুন, আমাদের গ্যালাক্সি হতে একপ্রান্তের সর্বশেষ গ্যালাক্সি হতে আলো আসতে যত সময় লাগে এবং ঠিক তার বিপরীত প্রান্তের সর্বশেষ গ্যালাক্সি হতে আলোর দূরত্ব নির্ণয় করলেই সমগ্র মহাবিশ্বের বিস্তৃতি নির্ণয় করা সম্ভব। ঠিক এ সূত্র ধরেই বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, আমাদের সমগ্র মহাবিশ্ব ৯০০০ কোটি আলোক বর্ষ বিস্তৃত একটি স্থান। এর বাহিরে ঘুটঘুটে কালো অন্ধকার, যাকে ডার্ক ইউনিভার্স বললেও ভুল বলা হবে না।

বিগ ব্যাং যে একটি বিন্দু থেকেই হয়েছিল, তা মানবো কেন?

আমরা পূর্বেই জেনেছি কিভাবে আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের প্রসারণ বা সঙ্কোচনের মাধ্যমে একটি গ্যালাক্সি হতে অপর একটি গ্যালাক্সির দূরত্ব, এমনি আমাদের সমগ্র মহাবিশ্বের দূরত্ব মাপতে পারি।

আমরা জানি, আলোর উৎস হতে দূরত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায় এবং এক সেকেন্ডে আলো যে দূরত্ব অতিক্রম করে, সেই দূরত্ব অতিক্রমের জন্য কি পরিমাণ আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়, তার হিসাব করা যায়। প্রতিটি গ্যালাক্সিই যেহেতু নির্দিষ্ট কোন দিকে গমন করছে, সেই দিকের বিপরীত দিকে যদি যেতে থাকেন, তবে আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ক্রমাগত কমতে থাকবে। এভাবে কমতে কমতে একটি স্থানে এসে তরঙ্গ দৈর্ঘ্য জিরো হয়ে যাবে। তখন বুঝতে আর বাঁকি থাকবে না যে, গ্যালাক্সিটি ঐ জিরো আলোক তরঙ্গের স্থান হতেই যাত্রা শুরু করেছিল।

এছাড়াও, প্রতি সেকেন্ড সময়ে তরঙ্গ দৈর্ঘ্য যে পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, যদি আলোক রশ্মির দিক বরাবর গ্যালাক্সির ছুটে চলার বিপরীত দিকের হিসাব করা যায়, তবে সেক্ষেত্রেও কিন্তু হিসাব পাওয়া যাবে যে, গ্যালাক্সির যাত্রা কোথা হতে শুরু হয়েছিল। অনুরূপ সমগ্র গ্যালাক্সির ক্ষেত্রেও একই হিসাব প্রযোজ্য। এরূপে সকল গ্যালাক্সির আলোক তরঙ্গ দৈর্ঘ্য হিসাব করলে দেখা যাবে যে, প্রতিটি গ্যালাক্সিই একটা নির্দিষ্ট স্থান থেকে যাত্রা শুরু করেছে। কিন্তু তার মানে এটা নয় যে, গ্যালাক্সি গুলো সব এক জায়গায় জমা হয়ে ছিল। কেননা, সব গুলো গ্যালাক্সি একসাথে একই সময়ে সৃষ্টি হয় নি। প্রায় প্রতিটি গ্যালাক্সিই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু গ্যালাক্সির ছুটে চলার দিক নির্ণয় থেকে অন্তত এটা স্পষ্ট হয় যে, গ্যালাক্সি যেদিকে ছুটে চলছে, তার সৃষ্টির উপাদানও ঠিক একই দিকে ছুটে চলবে। যদি এমনটি না হতো, তবে মহাবিশ্বের প্রসারণ সম্ভবই হত না। এখন এই গতির বিপরীত দিকে গমন করলেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মহাবিশ্ব সৃষ্টির পূর্বে সব কিছু একটি স্থানে পুঞ্জীভূত ছিল।

বিগ ব্যাং শুরুর সময় নির্ধারিত হল কিভাবে?

আলোক তরঙ্গ দৈর্ঘ্য থেকে কিন্তু এটাও প্রমাণ করা যায় যে, বিগ ব্যাং ঠিক কত বছর পূর্বে সংঘটিত হয়েছিল। আসুন, এ ব্যাপারটিও ক্লিয়ার হয়ে যাক।

আমরা জানি সময় বৃদ্ধির সাথে আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। এখন মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় আলোক তরঙ্গ যদি আপনি নির্ধারণ করতে পারেন এবং সেই পরিমাণ তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পেতে কত সময় লাগবে, সেটা যদি হিসেব করেন, তবেই আপনি নির্ণয় করতে সমর্থ হবেন যে, বিগ ব্যাং ঠিক কত বছর পূর্বে ঘটেছিল। বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখেছেন, মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছে ১৩.৫ বিলিয়ন বছর পূর্বে।

পূর্বোক্ত আলোচনায় মূলত একটি বিষয়ই প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি, তা হল মহাবিশ্বের সূচনা যে বিগ ব্যাং থেকেই হয়েছিল এটা নিশ্চিত এবং বিশ্বের সকল বিজ্ঞানীগনও এই থিওরি মানতে বাধ্য হয়েছেন। এবার জানবো বিগ ব্যাং এর পরের মুহূর্ত গুলোতে কি কি ঘটেছিল এবং কেন আর কিভাবে ঘটেছিল, যা থেকে আমরা মহাবিশ্ব সৃষ্টির একটি প্রতিচ্ছবি তৈরি করতে পারবো।

বিগ ব্যাং তথা মহা বিস্ফোরণ কোন এটম বোমার মত বিকট শব্দে ফেটে যাওয়ার মত বিস্ফোরণ নয়। ইহা কেবল অসীম গতির একটা সম্প্রসারণ। যে অসীম গতির সূচনা ঘটেছিল একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্দু থেকে বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে সিঙ্গুলারিটি। এই সিঙ্গুরিটিতেই আবদ্ধ ছিল প্রাকৃতিক চারটি বল। আমরা ফিজিক্সের ছাত্র মাত্রেই জানি যে, প্রকৃতিতে চার বলের রাজত্ব।

১. সবল নিউক্লিয় বল
২. দূর্বল নিউক্লিয় বল
৩. তড়িৎ চৌম্বকীয় বল ও
৪. মহাকর্ষ বল।

উপরোক্ত চার বলের মধ্যে দুর্বল নিউক্লিয় বল এতোটাই দুর্বল যে, তা বাস্তব জীবনে প্রত্যক্ষ হয় না বললেই চলে। দুর্বল নিউক্লিয় বলের সীমা মাত্র 10 to the power -17 মিটার এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই বল কেবল রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং তেজস্ক্রিয় ক্ষয়িষ্ণুতার উপরই কার্যকরী প্রভাব ফেলতে পারে।

অনুরূপ, সবল নিউক্লিয় বলের সীমা মাত্র 10 to the powe -15 মিটার পর্যন্ত, যা কেবল প্রোটন ও নিউট্রনের মত নিউক্লিয় কণার উপরেই প্রভাব বিস্তার করতে পারে, ইলেকট্রন ও নিউট্রিনোর উপর এই বল কোন মাতব্বরি করতে পারে না। এই বলের কারণেই প্রোটন নিউক্লিয়াসের সহিত আটকে থাকে।

কিন্তু মহাকর্ষ ও তড়িচ্চুম্বক বলের প্রভাব এতোটাই বেশি যে, এদেরকে ব্যস্ত বর্গ বল বলা হয়। মহাকর্ষ বলের প্রভাব মহাবিশ্বের সকল পদার্থের উপরেই রয়েছে, যার দরুন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে গ্রহ এবং গ্রহকে কেন্দ্র উপগ্রহ গুলো বিনাসুতোর মালার ন্যায় আটকে রয়েছে।

অনুরূপ তড়িৎ চুম্বক বল ক্রিয়া করে শুধুমাত্র আধানযুক্ত কণার উপর। যেমন ইলেকট্রন।

উপরিউক্ত চার বলের সামান্য ধারনা দেয়ার কারণ হল, বিগ ব্যাং শুরুই হয়েছিল এই চার বলের যৌথ ক্রিয়ায়। সম্প্রসারণের যে অসীম গতি, সেই গতির জন্মদাতাই মূলত এই চার বলের সমষ্টি। কেননা, আমরা যে বিন্দু বা সিঙ্গুলারিটির কথা বলি, তা মূলত কোন পদার্থের বা অণু-পরমাণুর মিশ্রণ নয়, তা প্রধানত এই চারটি বলের সমষ্টি বা Four Force এর সমন্বয়ে তৈরি হওয়া Super Force.

এই সুপার ফোর্স যখন থেকে অসীম গতিতে সম্প্রসারিত হতে শুরু করেছিল, সেই শুরুর মুহূর্তকেই বিগ ব্যাং হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়, যা বিজ্ঞানের ছাত্র মাত্রেই জানে যে, ইহা কেবল একটা প্রসারণ আর কোরানিক বিগ্যানী/বাইবেলীয় বিগ্যানী/বৈদিক বিগ্যানীরা মনে করে ইহা কোন এটম বোমার ন্যায় বড়সড় সাইজের বিস্ফোরণ। ওরা এই এটম বোমার ন্যায় বিস্ফোরণ তত্ত্ব দিয়ে মহা সম্প্রসারণের বিগ ব্যাং কে ভুল আর মিথ্যা প্রমানের প্রচেষ্টা অদ্যাবধি পর্যন্ত চালিয়ে আসছে অবুঝ বালকের ন্যায়।

যা হোক, অনেক ধর্মান্ধ বিগ্যানীই প্রশ্ন করে, বিগ ব্যাং এর ক্ষুদ্র বিন্দু মূলত কতটা ক্ষুদ্র? আলোচনার এ ধারাবাহিকতায় আমরা বুঝতে পারবো, এ ক্ষুদ্র বিন্দু আসলে কতটা ক্ষুদ্র।

বিগ ব্যাং এর ক্ষুদ্র বিন্দু মূলত কতটা ক্ষুদ্র?

এবার ফিরে চলুন ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পূর্বে, ঠিক যে মুহূর্ত হতে সম্প্রসারণ শুরু হয়েছিল। আমরা যদি সেকেন্ড বাই সেকেন্ড দ্বারা ঘটনার ব্যাখ্যা করতে যাই, তবে বিজ্ঞানের কোন সীমাবদ্ধতাই আমাদের দৃষ্টিগোচর হবে না। বিজ্ঞানের নিকট এক সেকেন্ড সময়ও অনেক দীর্ঘ সময়, যে সময়ের মধ্যে ঘটে যেতে পারে অনেক কিছু। হয়তো প্রাত্যহিক জীবনে এক সেকেন্ডের ব্যবধানে তেমন কিছুই ঘটে না, কিন্তু যেখানে অসীম ক্ষুদ্র হতে অসীম গতির সম্প্রসারণের মত ঘটনা ঘটে, সেখানে সেকেন্ড সময় তো দূর, সেখানে ন্যানো সেকেন্ড সময়ের চাইতে অতি কম সময়ে ঘটে চলে অনেক কিছু, যে সময় আমাদের কল্পনাতে পর্যন্ত আসতে পারে না।

এখানে ফিজিক্সের সীমাবদ্ধতা এই যে, বিগ ব্যাং শুরুর 10 to the power -41 সেকেন্ড সময় পর্যন্ত সেখানে কি ঘটেছিল, তার ব্যাখ্যা করতে পারে না। কারণ, এ সময়টা এতোই ক্ষুদ্র যে আমাদের কল্পনা শক্তিকেও অবশ করে দেয় এবং এতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা ব্যাখ্যা করার মত বিজ্ঞান এখনো আবিষ্কার করতে পারে নি। এক্ষেত্রে ধর্মান্ধগন প্রশ্ন করতে পারেন যে, ঐ ক্ষুদ্র সময়ের ঘটনা কে ঘটিয়েছিল? যেহেতু তারা এমন প্রশ্ন করতে বেশ পটু। সেক্ষেত্রে বিজ্ঞান বলবে আমরা এখন পর্যন্ত জানি না। আর আপনারা সেখানেই আপনাদের পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ঈশ্বরকে স্থাপন করে দাবী করতে পারেন যে, এই ঘটনা আপনারই ঈশ্বর ঘটিয়েছে। কেননা, আপনাদের দাবী করতে তো আর দাবীর সত্যতা প্রমাণে কোন প্রমাণ হাজির করতে হয় না। শুধু বিজ্ঞান জানি না বললেই সেখানে অটোভাবে ঈশ্বর বসতে পারে।

বিগ ব্যাং এর যে সময় টুকুর ব্যাখ্যা বিজ্ঞান জানে না, তা হল 10 to the power -41 সেকেন্ড তথা এক সেকেন্ডকে ১ এর পরে ৪১ টি শূন্য বসালে যে সংখ্যা হয়, সেই সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে যে সময়টা পাওয়া যায়, সে সময় পর্যন্ত ঘটনার ব্যাখ্যা করতে পারে না। বিজ্ঞানের উন্নতির ধারাবাহিকতায় সেটাও একদিন যানা যাবে, কেননা জানি না বলেই বিজ্ঞান চুপ করে বসে নেই।

সম্প্রসারণ শুরুর 10 to the power -30 সেকেন্ড সময় পর্যন্ত যে অবিশ্বাস্য গতির সম্প্রসারণ ঘটে, সেই গতিটি ছিল আলোর গতিরও কয়েক গুন বেশি গতি সম্পন্ন, যা বর্তমান ফিজিক্সের প্রায় সকল সূত্রই অকার্যকর হয়ে যায়। কিন্তু একটা প্রশ্ন দানা বাঁধতে থাকে মনে, বিজ্ঞান যে বলে আলোর গতিই সর্বোচ্চ গতি, তাহলে এরচেয়েও বেশি গতি কেমনে হয়?

আসলে সম্প্রসারণ এতো গতিতে হলেও, তা তো ভর সম্পন্ন পদার্থের হচ্ছে না। তখন তো কোন পদার্থের জন্মই হয় নি, কাজেই ভরেরও কোন ব্যাপার নেই। যা ছিল, তা কেবলই চার বলের যৌথতায় Super Force. তাহলে সম্প্রসারণটা হচ্ছিল কিসের?

হ্যাঁ, এতক্ষণে নিশ্চয় ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন (তবে কোরানিক/বাইবেলীয়/বৈদিক বিগ্যানীরা বুঝতে পারবে না), কারণ, এটা বুঝতে আইনস্টাইনের সেই “থিওরি অব রিলেটিভিটি” জানা আবশ্যক।

আসলে সম্প্রসারণ হচ্ছিল Space তথা স্থানের। আর Space এবং Time এর যাত্রা কিন্তু তখন থেকেই শুরু হয়েছিল। আমরা “থিওরি অব রিলেটিভিটি” থেকে জানি যে, কোন কিছুর গতি যদি আলোর সমান গতি সম্পন্ন হয়, তবে কি ঘটতে পারে। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানে হৈ চৈ ফেলে দেয়ার মত একটা ব্যাপারের উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না।

মনে করুন, আপনি একটি রকেটে আলোর গতিতে যাত্রা শুরু করেছেন। যাত্রাকালে আপনার যে বন্ধুটি আপনাকে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়েছিল, আপনি ৮ বছর যাত্রা শেষে যদি পৃথিবীতে ফিরে এসে আপনার বন্ধুর সাথে দেখা করেন, তবে আপনি নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারবেন না। কারণ, সেই ৮ বছরে আপনার বন্ধুর জীবনের ৮০ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েছে। আপনি যুবক থাকলেও দেখবেন আপনার সেই বন্ধুটি হুইল চেয়ারে বসে কিংবা লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আপনাকে দেখছে।

এটাই হচ্ছে আপেক্ষিকতার আসল মজা। যার উপর ভিত্তি করে চলছে টাইম মেশিন তৈরির প্রচেষ্টা। গতির উপরই সব কিছুর বয়স নির্ধারিত হয়। তাহলেই একবার ভাবুন, যেখানে আলোর গতিতে ছুটলেই এতো পরিবর্তন হতে পারে, সেখানে আলোর গতির চাইতেও কয়েক গুন বেশি গতিতে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ শুরু হলে আমাদের নিকট যা এক সেকেন্ড সময়, সেখানে ঐ গতির জন্য এক সেকেন্ড সময় তো দূর, 10 to the power -41 সেকেন্ড সময়ে কি হতে পারে এবং ঐ সময়টুকুই আমাদের জন্য কত সময় হতে পারে।

যা হোক, সম্প্রসারণ শুরুর 10 to the power -31 সেকেন্ড সময়ে মহাবিশ্বের আয়তন তথা Space তথা স্থানের বৃদ্ধি পেয়েছিল 10 to the power 60 গুন। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, এতোটা সম্প্রসারিত হয়েও তখন মহাবিশ্বের সাইজ কতবড় ছিল, জানেন? তার সাইজ ছিল একটা কমলা লেবুর সমান।

হাস্যকর হলেও ব্যাপারটি সত্য। আর এ সাইজটি থেকেই একবার চিন্তা করুন, এরকম প্রসারনের পরে 10 to the power গুন সম্প্রসারিত হবার পরেও তার সাইজ যদি একটি কমলা লেবুর মত হয়, তবে বিগ ব্যাং এর মূল বিন্দুর সাইজটা কত ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র ছিল এবার চিন্তা করুন। এই চিন্তাটা মূলত ঐসব ধার্মিক বিগ্যানীদের জন্য, যারা প্রশ্ন করে বিগ ব্যাং এর বিন্দুটি কত ক্ষুদ্র ছিল।

উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে একটা প্রশ্নের উদয় হয়।

মহাবিশ্বের চারটি বল যে একত্রিত অবস্থায় ছিল, তা মানবো কিভাবে?

কিংবা চারটি বল যে একত্রিত থাকতে পারে, সেটাই বা মানবো কিসের ভিত্তিতে?

উত্তরটা একদম সিম্পল। বর্তমানে প্রকৃতিতে চারটি বল যে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে, এটা তো সত্য। ষাটের দশকে তত্ত্বীয় পদার্থবিদ গন তড়িচ্চুম্বকীয় বল এবং দুর্বল নিউক্লিয় বলকে একীভূত করতে সমর্থ হয়েছেন, বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে Electro weak force তথা দুর্বল তড়িৎ বল। ১৯৭০ সালে এই তথ্য পরীক্ষালব্ধ ভাবে সত্য প্রমাণিত হয় এবং এই সাফল্যের জন্য আব্দুস সালাম, স্টিফেন ওয়াইনবার্গ আর শেলডন গ্লাসো ১৯৭৯ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। আর যে থিওরি গুলো দুর্বল তড়িৎ কে সবল নিউক্লিয় বলের সাথে যুক্ত করে তাদের বলা হয় Grand Unified Theories বা GUTs. কিন্তু বিগ ব্যাং এর যে সময় উক্ত তিনটি বল একীভূত অবস্থায় ছিল, তখন তাপমাত্রা ছিল প্রায় 10 to the power 28 ডিগ্রীর মত। বাস্তবে প্রকৃতিতে এই পরিমাণ তাপমাত্রা সৃষ্টি করে উক্ত তিনটি বলকে একত্রিত করে দেখানো সম্ভব নয় বলেই, এটা শুধুই একটা থিওরি। তবে সেটা ফালতু কোন থিওরি নয়। যদি ফালতু কোন থিওরিই হত, তবে একই থিওরি অনুপাতে দুর্বল নিউক্লিয় বল ও তড়িচ্চুম্বকীয় বলকে একত্রিত করা সম্ভব হত না।

কাজেই এথেকে অন্তত এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, পূর্বে উক্ত চারটি বল একত্রিত অবস্থাতেই ছিল। সম্প্রসারণের একটি সময় হতে তারা একে অন্যের থেকে পৃথক হতে শুরু করে এবং স্বতন্ত্র ভাবে তারা তাদের কার্যকলাপ শুরু করে বলেই পদার্থের মূল কণা সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে।

বিগ ব্যাং এর মহা সম্প্রসারণের পূর্বে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে নেই। অনেকেই মনে করেন, বিগ ব্যাং এর মাধ্যমে সৃষ্টিকৃত আমাদের এই মহাবিশ্বই মনে হয় একমাত্র মহাবিশ্ব, এর বাহিরে বোধহয় আর কোন মহাবিশ্ব নেই। বাস্তবে তা নয়। বাস্তবটা হল, বিগ ব্যাং হতে সৃষ্টিকৃত মহাবিশ্ব হল আমাদের মহাবিশ্ব, যেখানে আমাদের বাস। কিন্তু এই মহাবিশ্বের বাহিরেও বিশাল এক গুপ্ত পদার্থের জগত রয়েছে, যার কোন শুরু বা শেষ নেই। সেই জগতকে অন্ধকার রহস্যময় জগত বলা যায়। যাকে দেখা যায় না, কিন্তু সেই জগত তার অস্তিত্ব জানান দেয় মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে। উদাহরণ হিসাবে ব্ল্যাক হোলের কথা বলতে পারি। সেই বিশালত্বের মাঝে আমাদের এই ৯০০০ কোটি আলোক বর্ষের দৃশ্যমান মহাবিশ্ব মহা সাগরের একফোঁটা পানির চেয়েও ক্ষুদ্র। আমরা পূর্বেই জেনেছি যে মহাবিশ্ব ক্রমাগত সম্প্রসারিত হয়ে যাচ্ছে, ফলে এক গ্যালাক্সি হতে অন্য আরেকটি গ্যালাক্সির দূরত্ব ক্রমশ বেড়েই চলেছে। আর দূরত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে যেহেতু আলোক তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়, সেহেতু এই তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বাড়তে বাড়তে একটা সময় সেটা আর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে থাকে না, হয়ে যায় কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড সংক্ষেপে CMB. সর্বপ্রথম ১৯৯২ সালে এর উপর পরীক্ষা চালানো হয়, এরপর ২০০৩ সালে এবং সবিশেষ ২০১৩ সালে সফল পরীক্ষা চালানো হয়। উড্রো উইলসন এবং আর্নো পেনজিয়াস নামের দুজন বিজ্ঞানী এই CMB এর অস্তিত্ব বের করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।

আমাদের কাছের গ্যালাক্সি হল এন্ড্রোমিডা, যা ২.৫ মিলিয়ন আলোক বর্ষ দূরে অবস্থান করছে। তার মানে এন্ড্রোমিডা হতে আমাদের নিকট আলো পৌঁছাতে সময় লাগে ২.৫ মিলিয়ন বছর। দূরত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে যেহেতু আলোক তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায় এবং এ তরঙ্গ বৃদ্ধি পেতে পেতে যেহেতু সেটা এক সময় কসমিক মাইক্রোওয়েভে রূপলাভ করবে, তখন আমরা আর সে গ্যালাক্সিকে দেখতে পারবো না। কারণ, সেখান থেকে কোন আলো আর আমাদের নিকট পৌঁছাতে পারবে না। মূলত সেই গ্যালাক্সিটি তখন আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের বাহিরে সেই অন্ধকার রহস্যময় গুপ্ত জগতে চলে যায় এবং যেহেতু সেখান হতে আমাদের নিকট আলো এসে পৌঁছায় না, সেজন্য সেখানের কোন তথ্য পাওয়াও সম্ভব নয়।

আরেকটি মজার ব্যাপার হল, এন্ড্রোমিডা হতে আমাদের নিকট আলো আসতে সময় লাগে ২.৫ মিলিয়ন বছর। অর্থাৎ আমরা এই মুহূর্তে যে গ্যালাক্সিটিকে দেখছি, তার মূলত এই মুহূর্তের গ্যালাক্সি নয়, তা মূলত ২.৫ মিলিয়ন বছর অতীতের গ্যালাক্সি। কেননা, সেখান থেকে আলো পৌঁছাতে এই সময়টা অতিবাহিত হয়েছে। যদি এই মুহূর্তে ঐ গ্যালাক্সিটি হারিয়ে যায়, তবে আমরা তা দেখতে পাবো আজ থেকে ২.৫ মিলিয়ন বছর পরে। এবার চিন্তা করুন, আমরা যখন ঊর্ধ্বাকাশে তাকাই, তখন আমরা সময়ের অতীতটাকে দেখতে পাই, বর্তমানকে নয়।

সম্প্রতি ইনফ্ল্যাশন থিওরি নিয়ে বেশ তোলপাড় হচ্ছে। এই থিওরির মূল বিষয় হল, বিগ ব্যাং এর মাধ্যমে কেবল আমাদের মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েই বসে নেই। এরকম কোটি কোটি মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই কোটি কোটি মহাবিশ্বের মধ্যে আমাদের মহাবিশ্ব একটি। যেহেতু সেই দূরত্ব হতে আমাদের নিকট আলো এসে পৌঁছাতে পারে না, তাই নিজ মহাবিশ্বের বাহিরে অন্য আরেকটি মহাবিশ্বের বিষয়ে কিছু জানতেও পারবো না। ভবিষ্যতে আলোক তরঙ্গ ব্যতীত যদি কোন পদ্ধতি আবিষ্কার হয়, তখন হয়তো জানতে পারবো। যেহেতু এ থিওরি বিজ্ঞান মহলে এখনো ১০০% প্রমাণিত হয় নি, তাই এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করার দরকার নেই। এরকম আরো অসংখ্য মহাবিশ্ব থাকলে থাকুক, না থাকলে না থাকুক, সে বিষয়ে বর্তমানে কৌতূহলী না হলেও চলবে। তবে আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের বাহিরেও যে বিশাল একটা জগত রয়েছে ইহাতে কোন সন্দেহ নেই।

মহা সম্প্রসারণ শুরু হয় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পূর্বে। শুরুর 10 to the power -99 সেকেন্ড হতে 10 to the power -41 সেকেন্ড পর্যন্ত আমরা কিছুই জানি না।

আমরা যখন কোন পদার্থকে ভেঙ্গে ফেলবো, তখন পদার্থটি টুকরো টুকরো হয়ে অণুতে পরিণত হবে, একে ভেঙ্গে ফেললে আবার পরমাণু পাওয়া যাবে, একে ভেঙ্গে ফেললে ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন পাওয়া যাবে, যেখানে প্রোটন ও নিউট্রনকে কেন্দ্র করে ইলেকট্রন সতত ঘূর্ণনশীল। ইলেকট্রনকে আর ভাঙ্গা যায় না, কারণ সে এখন শুধুমাত্র একটা চার্জ ব্যতীত আর কিছু নয়। কিন্তু নিউট্রন ও প্রোটনের সমন্বয়ে গঠিত নিউক্লিয়াসকে ভেঙ্গে ফেললে, সেখানে পাওয়া যাবে কোয়ার্ক। কোয়ার্ককে আবার ভেঙ্গে ফেললে যা পাওয়া যাবে, তা হল স্ট্রিং।

সহজ ভাবে বলতে গেলে,

পদার্থ—> অণু—> পরমাণু—> ইলেকট্রন+প্রোটন+নিউট্রন।

প্রোটন+নিউট্রন—> কোয়ার্ক—> স্ট্রিং।

এই স্ট্রিং তথ্যের উপর ১৭ বছর যাবত গবেষণা চলছে, কিছু ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা সফলতার মুখ দেখলেও অনেক ক্ষেত্রেই এখন পর্যন্ত। কাজেই স্ট্রিং থিওরির বেশির ভাগটাই এখন পর্যন্ত শুধু হাইপো থিসিস রূপেই গন্য। কেবল মাত্র উচ্চতম গাণিতিক ক্যালকুলেশন আর যুক্তি নির্ভর। এরকম হাইপোথিসিস একটা সময় যে প্রমাণিত হয়, তার উদাহরণের অন্ত নেই, তবে বাতিল যে হয় না এমনটাও নয়। এই তো কিছু দিন পূর্বে পর্যন্ত পদার্থ বিজ্ঞানে কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন একটা হাইপোথিসিস হিসাবে পরিগণিত ছিল, কিন্তু একটা সময় তার প্রমাণ মিলে গেল এবং বিগ ব্যাং থিওরির সত্যতা প্রমাণে আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। এরপরেও কি যেন একটা মিসটেইক হচ্ছিল। বোসন কণার অস্তিত্ব থাকার কথা যদি বিগ ব্যাং এর মত সম্প্রসারণের মাধ্যমেই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়ে থাকে। গাণিতিক ক্যালকুলেশনে এরকম একটি কণার অস্তিত্বের প্রয়োজন হলেও বাস্তবে তার কোন হদিস নেই। অবশেষে সেই কণারও যখন হদিস মিলে গেল বিজ্ঞানীগন তাকে পরম আদরে নাম করন করলেন “গড পার্টিকেল” তথা ঈশ্বর কণা। কেননা, এই কণা আবিষ্কারের মাধ্যমে মহাবিশ্বের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায় সহজেই। অনুরূপ স্ট্রিং তথ্যও বর্তমান অবধি হাইপো থিসিস রূপেই পরিগণিত। বিজ্ঞানী গন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এর পেছনে। হাইপোথিসিস হলেও মূল বিষয়ের ধারনা থাকা দরকার আমাদের।

স্ট্রিং থিওরী মূলত কি?

উত্তরঃ বিজ্ঞানের উদ্দেশ্যই হল সহজ সরল ভাবে সৃষ্টি তথ্যকে ব্যাখ্যা করা এবং তা নিজের প্রয়োজনে সুবিধামত ব্যবহার করা। বর্তমানে সৃষ্টিতত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে বিজ্ঞানের বিভিন্ন সূত্রকে একের পর এক ব্যবহার করতে হয়, যার ফলে বিষয়টি জটিল হয়ে উঠে। কিন্তু স্ট্রিং থিওরিকে “থিওরি অব এভরিথিং” ও বলা হয়, অর্থাৎ সব কিছুর তথ্য। এটা এমন একটা তথ্য, যার দ্বারা সমগ্র মহাবিশ্বের সব কিছুকেই সহজে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

স্ট্রিং থিওরী আবিষ্কারে এতো সময় লাগছে কেন?

উত্তরঃ বর্তমান অবধি মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্বে যত প্রকার বৈজ্ঞানিক তথ্য উপাত্ত ব্যবহৃত হয়েছে, তার প্রায় সবই বিচ্ছিন্ন ভাবে সংগঠিত। এই সকল সূত্রকে একত্রিত করে সমন্বয় সাধন করা এতোটা সহজ ব্যাপার নিশ্চয় নয়। বিজ্ঞানীগন এরকম সমস্ত বিচ্ছিন্ন সূত্রকে একত্রিত করনের চেষ্টাই করে যাচ্ছেন। যেদিন সফল হবে, সেদিনই প্রতিষ্ঠা পাবে স্ট্রিং থিওরি এবং বিজ্ঞানের একটি নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।

তার মানে এই নয় যে, স্ট্রিং থিওরি ব্যতীত মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। ব্যাপারটা হল, এই থিওরি প্রতিষ্ঠিত হলে বিভিন্ন সূত্রের জটলা থেকে আমরা মুক্তি পাবো এবং সহজ ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবো। কাজেই স্ট্রিং থিওরি যে প্রতিষ্ঠিত হতেই হবে মহাবিশ্বের সৃষ্টি তত্ত্ব ব্যাখ্যায়, এমন কোন ব্যাপার নেই।

এবার আসুন, স্ট্রিং থিওরির বিষয়টা অতি সংক্ষেপে জেনে নেই।

বিগ ব্যাং এর যাত্রার শুরুতে যখন একত্রিতকরন চারটি বল Space বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের বিস্তৃতিও বাড়তে থাকে, এরকম একটা সময় বলগুলো একটা একটা করে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বতন্ত্র আর স্বাধীন হতে থাকে। প্রত্যেকটি বলই আলাদা আলাদা তন্তুর ন্যায় বিচ্ছিন্ন হয়ে এক ধরনের কম্পন সৃষ্টি করতে থাকে যা শক্তিরই আরেকটি ভিন্ন রূপ। এই তন্তু গুলোর আকার এতোটাই ক্ষুদ্র যে, তা পরমাণু কেন্দ্রের চেয়েও লক্ষ লক্ষ গুন ছোট, যার আকার 10 to the power -33 সেন্টিমিটার। অর্থাৎ ১ এর পরে ৩৩ টি শূন্য বসালে যে গাণিতিক সংখ্যা পাওয়া যায়, সেই সংখ্যা দিয়ে ১ কে ভাগ করলে যে সংখ্যা পাওয়া যাবে, কম্পনশীল সেই তন্তুর আকার ততটুকু। এর ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্রকে কল্পনার পর্যন্ত নেয়া যায় না। মূলত এরাই পদার্থের ক্ষুদ্রতম গঠনের একক। আমরা ফিজিক্সে যে কণিকার নাম শুনি, তা মূলত এই ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র তন্তুর কম্পনের ফল ব্যতীত আর কিছু নয়। একটি উদাহরণের সাহায্যে ব্যাপারটিকে বুঝানো যেতে পারে। গীটারের একটি তারের বিভিন্ন জায়গা হতে যেমন বিভিন্ন মাত্রার সুর উৎপন্ন হয়, স্ট্রিং এর ব্যাপারটাও অনুরূপ। স্ট্রিং গুলোর বিভিন্ন মাত্রার কম্পনের ফলেই সৃষ্টি হয় বিভিন্ন রকম কণিকার। এই কম্পনের রকম ফেরের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় কণিকার ভর, চার্জ এবং ঘূর্ণন। একেক কণিকার ক্ষেত্রে স্ট্রিং এর কম্পন একেক রকম। ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে স্ট্রিং এর কম্পন এক রকমের, আবার কোয়ার্কের ক্ষেত্রে হয় আরেক রকমের। অর্থাৎ একটি মাত্র স্ট্রিং ই বিভিন্ন ভাবে স্পন্দিত হয়ে বস্তু কণার ভর, তড়িৎ আধান, ঘূর্ণন এরকম বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের জন্ম দেয়। আর এই বৈশিষ্ট্যের জন্য এক ধরনের কণা থেকে আরেক ধরনের কণাকে পৃথক করে।

মোট কথায়, একটি মাত্র স্ট্রিং বিভিন্ন ভাবে কম্পিত হয়ে তৈরি করেছে বিভিন্ন ধরনের কণিকা, আলাদা আলাদা একাধিক স্ট্রিং এর কোন ব্যাপার নয়।

বিঃ দ্রঃ এসব ঘটনা কিন্তু ঘটেছিল বিগ ব্যাং শুরুর সময় হতে এক সেকেন্ড সময়ের মধ্যেই। সেই সময় এক সেকেন্ড সময় কিন্তু আবার বর্তমান সময়ের এক সেকেন্ডের সমান নয়। যেখানে আলোর গতির কয়েক গুন বেশি গতিতে সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া ঘটে, সেখানে আমাদের হিসাবের সময় আর সেই মুহূর্তের সময়ের অনেক পার্থক্য রয়েছে। বিস্তারিত জানতে আইনস্টাইনের “জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি” পড়ুন।

বিগ ব্যাং শুরুর 10 to the power -99 হতে 3 Second সময়ের মধ্যকার ঘটনাবলী। পূর্বেই বলেছি গতির সাথে সময়ের সম্পর্ক কেমন হয় এবং গতির বৃদ্ধিতে সময় কিভাবে ধীরে চলে। কাজেই বিগ ব্যাং এর মুহূর্তের এক সেকেন্ড সময় মোটেই আমাদের ঘড়ির এক সেকেন্ড সময়ের সমান হবে না, যেখানে সম্প্রসারণের গতি ছিল আলোর গতিও কয়েক গুন বেশি গতি সম্পন্ন। তো সেই সময়ের এক সেকেন্ড সময়ের মধ্যে সর্ব প্রথম একত্রিত থাকা চারটি বল পৃথক হয়ে যায় এবং সম্প্রসারণের সাথে সাথে তাপমাত্রাও কমতে থাকে। শুরুর দিকে সেই তাপমাত্রা ছিল কয়েক কোটি ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। উক্ত এক সেকেন্ড সময়ের মধ্যে বিশাল গতির সম্প্রসারণ কমতে শুরু করে ফলে তাপমাত্রাও কমতে শুরু করে সমানুপাতিক হারে এবং যুক্ত থাকা চারটি বল পৃথক হয়ে যাবার পরে স্ট্রিং তার কার্যক্রম শুরুর জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।

মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি যে কমে গেছে, তার প্রমান কি?

সাধারণ উত্তরঃ হাবল টেলিস্কোপ এবং আলোক তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের বৃদ্ধির সময় হিসাব করলেই বুঝা যায় যে, গ্যালাক্সি প্রসারণের যতই পেছনের দিকে যাওয়া যায়, সেই গ্যালাক্সির গতি ততই বৃদ্ধি পায়। এথেকে সহজেই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে, গ্যালাক্সি গুলোর গতি ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।

তবে এর বিপরীত একটি তথ্যও সাম্প্রতিক শোনা যাচ্ছে। তা হল, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের গতি অতীতের গতির তুলনায় ক্রমাগত হ্রাস পেয়ে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছালেও, তা বর্তমানে ক্রমাগত সেই গতি আরো হ্রাস পাবার বদলে উল্টা বেড়ে যাচ্ছে। যদি এমনটাই হয়, তবে মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি বিষয়ে দুইটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়।

১. মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ক্রমাগত হ্রাস পেলে, তা একটা সময় সম্প্রসারণ থেকে যাবে এবং মহাকর্ষ বলের প্রভাবে পুনরায় তারা পেছনের দিকে যাত্রা করে পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে, যাকে বলা যায় বিগ ক্রাঞ্চ।

২. যদি সম্প্রসারণের গতি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েই থাকে, তবে এ মহাবিশ্বের কোন ধ্বংস নেই।

মহাবিশ্বের তাপমাত্রা যে Space বৃদ্ধির সাথে সাথে কমে গিয়েছিল, তা মানবো কিসের ভিত্তিতে?

সাধারণ উত্তরঃ আমরা জানি যে, তাপমাত্রা সৃষ্টির উৎস হতে তাপমাত্রা প্রসারণের জন্য যদি জায়গা থাকে, তবে তা চতুর্দিকে সমানুপাতিক হারে উক্ত তাপমাত্রা হ্রাস পায়। চাইলে নিজেও এই পরীক্ষা ঘরে বসেই করতে পারেন। যেহেতু সে সময় দ্রুততম গতিতে Space এর সম্প্রসারণ হচ্ছিল এবং তাপমাত্রা যেহেতু প্রসারণের Space পেলে প্রসারিত হয়ে তাপমাত্রার হ্রাস ঘটে, সেহেতু খুব সিম্পল লজিকেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া যায় যে, Space বৃদ্ধির সাথে সাথে উৎস স্থান হতে তাপমাত্রাও সমানুপাতিক হারে হ্রাস পেয়েছিল।

স্ট্রিং তার কার্যক্রম শুরু করলে তথা স্পন্দন শুরু করলে, এক সেকেন্ড পরে সর্ব প্রথম তৈরি হয় নিউট্রন ও প্রোটনের মত দুটি মৌলিক কণিকার। একই সাথে সমানুপাতিক হারে তৈরি হয় এন্টি নিউট্রন ও এন্টি প্রোটন। সম্প্রসারণের গতি এবং তাপমাত্রা প্রচণ্ড থাকার দরুন এসব কণিকার গতিও ছিল সীমাহীন। এই প্রচণ্ড গতি সম্পন্ন কণিকা গুলো যখন এদের এন্টি কণিকার সহিত যখন পরস্পর সংঘর্ষ ঘটে, তখন মুহূর্তেই তা ধ্বংস হয়ে শক্তিতে বিলীন হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। যে শক্তি থেকে তাদের জন্ম হয়েছিল, প্রচণ্ড গতির সংঘর্ষের ফলে পুনরায় সেই শক্তিতে প্রত্যাবর্তন শুরু হয়ে যায়। এভাবেই ক্রমাগত ভাবে নিউট্রন ও প্রোটন তৈরি হতে থাকে এবং ক্রমাগত ভাবে তা ধ্বংস হয়ে পূর্বের অবস্থানে ফিরে যেতে থাকে।

নিউট্রন ও প্রোটন যদি এভাবে ক্রমাগত ভাবে ধ্বংসই হয়ে থাকে, তবে পরমাণুর কেন্দ্র নিউক্লিয়াস গঠিত হল কিভাবে?

উত্তরঃ বিগ ব্যাং থিওরির এখানে একটা সীমা বদ্ধতা রয়েছে। কারণ, অনাকাঙ্ক্ষিত কোন এক কারণে এন্টি নিউট্রন ও এন্টি প্রোটনের তুলনায় নিউট্রন ও প্রোটনের সংখ্যা একটু বেশি তৈরি হয়েছিল, যার ফলে নিউট্রন ও প্রোটন ধ্বংস হতে হতেও অতি স্বল্প পরিমাণ নিউট্রন ও প্রোটন কণিকা ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল। যদি এমনটা না হত, তবে গ্রহ-নক্ষত্র সম্বলিত এই মহাবিশ্বের কোন অস্তিত্বই থাকতো না, তখন মহাবিশ্বের বদলে তৈরি হত মহাশূন্য। সেই বেঁচে যাওয়া কণিকার সংখ্যাও ছিল এক বিলিয়ন কণিকায় মাত্র একটি।

কিন্তু অতিরিক্ত নিউট্রন ও প্রোটন কণিকা তৈরির কি সেই কারণ, তা বিজ্ঞানের নিকট এখনো এক রহস্য। যেহেতু বিজ্ঞান এই তথ্য এখনো উপস্থাপন করতে পারে নি, সেহেতু ধর্মান্ধ ভাইদের নিকট ইহা একটি বড় প্লাস পয়েন্ট। কারণ, এখানেই প্রশ্ন করতে পারেন যে, ঐ অতিরিক্ত কণিকা কে সৃষ্টি করেছিল? যেহেতু বিজ্ঞানের নিকট এর উত্তর হল “জানি না”। তো, সেখানেই আপনাদের নিজ নিজ পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ধর্মের স্রষ্টাকে গুঁজে দিতে পারেন। এরপর ভবিষ্যতে যখন এই রহস্য উন্মোচিত হয়ে যাবে, ততদিনে সেই স্রষ্টার জন্যও আরেকটি নতুন স্খান নিশ্চয় তৈরি হয়ে যাবে।

বেঁচে যাওয়া নিউট্রন ও প্রোটন এবার প্রচণ্ড গতিতে ছুটতে ছুটতে যখন একে অপরের কাছাকাছি চলে আসতো, তখনই তারা বিচ্ছিন্ন হওয়া সবল নিউক্লিয় বলের কারণে পরস্পরের সহিত যুক্ত হয়ে তৈরি হতে শুরু করলো নিউক্লিয়াস, যা পরমাণুর কেন্দ্র। সবল নিউক্লিয় বল সম্বন্ধে পূর্বেই আলোচিত হয়েছে। পুরো তিন সেকেন্ডের মত সময় নিউট্রন-প্রোটন ও এন্টি নিউট্রন-এন্টি প্রোটন তৈরি এবং ধ্বংস প্রক্রিয়া চলতে থাকে এবং অবশিষ্ট বেঁচে যাওয়া নিউট্রন ও প্রোটনের সংযোগে তৈরি হতে থাকে নিউক্লিয়াস। ইলেকট্রনের মত কণিকা কিন্তু এখনো তৈরি হয় নি। পরবর্তী পর্বে আলোচিত হবে ইলেকট্রন কখন ও কিভাবে তৈরি হল এবং কেন ও কিভাবে তা নিউক্লিয়াসের সহিত যুক্ত হয়ে পরমাণু তৈরি হল।

নিউট্রন ও প্রোটন একত্রিত হয়ে নিউক্লিয়াসে কি ভূমিকা পালন করে?

উত্তরঃ এই প্রশ্নের শুরুতেই উক্ত দুটি বিষয়ের সম্যক ধারনা থাকা দরকার।

প্রোটনঃ প্রোটন একটি মৌলিক কনিকা ও এর আধান ধনাত্মক। আর্নেস্ট রাদারফোর্ড ১৯১৯ সালে প্রোটন আবিষ্কার করেন। এর ভর 1.672621637(83) * 10 to the power -27 kg. ইলেক্ট্রনিক চার্জ 1.60217648740 * 10 to the power -19 C. প্রোটনের ভর ইলেক্ট্রনের ভরের তুলনায় ১৮৩৬.১২ গুন বেশি। মূলত প্রোটন হল একটি হাইড্রোজেন আয়ন যা সকল পারমানবিক নিউক্লিয়াসে বিদ্যমান।

নিউট্রনঃ নিউট্রন হল একটি চার্জ নিরপেক্ষ হ্যাড্রন, যা পারমানবিক নিউক্লিয়াসে স্থিথিশীল। বিজ্ঞানী জেমস চ্যাডউইক ১৯৩২ সালে সর্ব প্রথম নিউক্লিয়াসের মধ্যে এই চার্জ নিরপেক্ষ নিউট্রনের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন।

আমরা জানি, সম আধান বিশিষ্ট দুটি চার্জ বা আয়ন পরস্পর বিকর্ষন করে এবং বিপরীত আধান বিশিষ্ট দুটি চার্জ বা আয়ন পরস্পর আকর্ষন করে। একমাত্র হাইড্রোজেন আয়নেই একটি মাত্র প্রোটন বিদ্যমান। এর বাহিরে মহাবিশ্বে যত পদার্থ রয়েছে, তার প্রত্যেকটি নিউক্লিয়াসেই একাধিক প্রোটন বিদ্যমান। যদি এমনটা না হত, তবে পুরো মহাবিশ্বে একমাত্র হাইড্রোজেন ব্যতিত আর কোন পরমানুই তৈরি হওয়া সম্ভব ছিল না।

কিন্তু মূল ব্যাপার দাঁড়ায় অন্যখানে। হাইড্রোজেনে যেহেতু একটু মাত্র আয়ন বিদ্যমান, সেহেতু এর ব্যাপারটা আলাদা। কিন্তু আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানের পর্যায় সারনীতে হাইড্রোজেনের পরেই রয়েছে হিলিয়াম, যার নিউক্লিয়াসে প্রোটন সংখ্যা দুইটি। যদি সম আধান বিশিষ্ট দুটি আয়ন পরস্পর বিকর্ষন করে, তবে তো হাইড্রোজেন ব্যতিত সকল পরমানুর নিউক্লিয়াসই তো তৈরি হবার কথা নয়, যেহেতু দুটি ধনাত্মক আধান বিকর্ষন করে দূরে ঠেলে দেয়।

বিঃদ্রঃ আয়নের এসব কার্যকলাপ পর্যবেক্ষন করতে চাইলে আপনাকে ফিজিক্সের গন্ডি থেকে বেড়িয়ে কেমিস্ট্রির গন্ডিতে প্রবেশ করতে হবে। সেখানেই আপনি কেবল দেখতে পাবেন, কিভাবে রসায়নে আয়নিক বন্ধন তৈরি হয়। আরো জানতে পারবেন কিভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এক পরমানু অন্য পরমানুর সহিত কখনো ইলেক্ট্রন ত্যাগ করে, কখনো গ্রহন করে, কখনো বা দুটি পরমানুই নিজেদের মধ্যে ইলেক্ট্রন ভাগাভাগি করে নিয়ে অষ্টক পুরনের মাধ্যমে একটি অনু তৈরি করে। আমি ফিজিক্সের গন্ডি পেরোতে গেলাম না, কারন এতে মূল আলোচনা লাইনচ্যুত হয়ে যাবে।

ঠিক ধরেছেন। মূলত এই বিকর্ষন শক্তির হ্রাস ঘটায় মাঝখানের চার্জ নিরপেক্ষ নিউট্রন। যদি নিউট্রন না থাকতো, তবে মহাবিশ্বে কেবল হাইড্রোজেনই থাকতো, আর কোন পদার্থের অস্তিত্তই থাকতো না।

এবার আসুন, এক পলকে জেনে নেই ইলেক্ট্রন তৈরির সময় ও তার কার্যক্রম।

ইলেক্ট্রনঃ ইলেকট্রন একটি অধঃ-পরমাণু (subatomic) মৌলিক কণা (elementary particle) যা একটি ঋণাত্মক তড়িৎ আধান বহন করে। এটি প্রধানত তড়িৎ-চুম্বকীয় মিথষ্ক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। পারমাণবিক কেন্দ্রের (নিউক্লিয়াসের) সঙ্গে একত্র হয়ে পরমাণু তৈরি করে এবং এর রাসায়নিক বন্ধনে অংশগ্রহণ করে। মূলত ইলেকট্রন চলাচলের দরুন কঠিন পরিবাহীতে বিদ্যুতের প্রবাহ ঘটে।

ইলেক্ট্রনের প্রতিকনা পজিট্রন। ১৮৯৭ সালে জে.জে থমসন ইলেক্ট্রন আবিষ্কার করেন।

এর ভর 9.1093826(16) * 10 to the power -31 kg. ইলেক্ট্রিক চার্জ 1.60217653(14) * 10 to the power -19 C.

বিগ ব্যাং এর ধারাবাহিকতায় তিন সেকেন্ড পরে তৈরি হয় ইলেক্ট্রন এবং চতুর্দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নিউক্লিয়াসের সহিত যুক্ত হতে থাকে। যেহেতু প্রোটন হল ধনাত্মক আধান বাহী আয়ন এবং ইলেক্ট্রন ঋনাত্মক আধানবাহী, সেহেতু অতি সহজেই পরস্পর বিরোধী আয়ন আকর্ষিত হয়ে সর্ব প্রথম হাইড্রোজেনের পরমানু তৈরি হয় এবং পরস্পর দুটি পরমানু যুক্ত হয়ে তৈরি হয় হাইড্রোজেন অনু। এক্ষনে সমগ্র মহাবিশ্ব জুড়ে শুধুই হাইড্রোজেনের রাজত্ব। আর বিক্ষিপ্ত অবস্থায় রয়েছে নিউক্লিয়াস এবং ইলেক্ট্রন, যারা তখনো পরস্পর যুক্ত হতে পারে নি দূরত্বের জন্য।

সৃষ্টি তথ্যের ধারাবাহিকতায় আমরা অলরেডি জেনে গেছি যে, কোন সময়ে পরমানুর নিউক্লিয়াস এবং ইলেক্ট্রন তৈরি হয়েছিল। আমরা জানি যে, নিউক্লিয়াস ধনাত্মক আধানবাহী এবং ইলেক্ট্রন ঋনাত্মক আধানবাহী। আর এই চার্জের কারনেই আলোক কনিকা তাদের সাথে বিক্রিয়া করে আটকে যেত। তখন তাপমাত্রাও অনেক কমে বিলিয়ন ডিগ্রীতে এসে পৌঁছে গিয়েছে। মহাবিশ্ব সৃষ্টির মূল উপাদান ইলেক্ট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন তৈরি হয়ে গেলেও তারা যুক্ত হয়ে পরমানু তৈরি হতে পারছিল না। প্রচন্ড গতি, প্রচন্ড তাপ, তন্মধ্যে আবার প্রচন্ড গতি সম্পন্ন ফোটন কনার তীব্র আঘাত পরমানু তৈরিতে বাধ সাধলো। পরমানু তৈরি হবার জন্য নিউক্লিয়াস আর ইলেক্ট্রন যুক্ত হতেই তীব্র গতি সম্পন্ন ফোন কনা তাদের খন্ড বিখন্ড করে দিত। এসব ঘটনা ঘটছিল বিগ ব্যাং শুরুর ৩-২০ মিনিটের মধ্যে।

এই পরমানু তৈরির জন্য মহাবিশ্বকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল সুদীর্ঘ ৩,৮০,০০০ বছর পর্যন্ত। ততদিনে মহাবিশ্ব যেমন বিশাল একটি আকার পেল, অনুরুপ তাপমাত্রা প্রচন্ড হ্রাস পেল, ফলে নিউক্লিয়াস ও ইলেক্ট্রনের মিলনে ফোটন কনা আর মাতব্বরি করতে পারলো। তৈরি হতে লাগলো হাইড্রোজেন পরমানু এবং অতি অল্প সংখ্যক হিলিয়াম পরমানু। কিন্তু এরা যখন চার্জযুক্ত অবস্থায় বিচ্ছিন্ন ছিল, তখন ফোটন কনা এদের সহিত বিক্রিয়ায় সেই চার্জের সহিত আটকে যেত। এবার এই দুই বিপরীত চার্জ যুক্ত নিউক্লিয়াস ও ইলেক্ট্রন যখন মিলিত হতে পারলো, তখন হাইড্রোজেনের পরমানু চার্জশূন্য হয়ে পরলো এবং তখনি এদের মধ্যে আটকে থাকা ফোটন কনাকে আর নিজের সাথে আটতে রাখতে পারলো না, কেননা আটকে রাখার পুরো শক্তিটা এবার ব্যয় হচ্ছে ইলেক্ট্রন ও নিউক্লিয়াস পরস্পর পরস্পরকে নিজেদের সাথে আটতে রাখার কাজে। ফলে ফোটন কনা এবার প্রচন্ড গতিতে এদের মধ্য হতে মহাবিশ্বের বিশালতায় মুক্ত হয়ে গেল, যা মহাবিশ্ব সৃষ্টির ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পরেও সমগ্র মহাবিশ্বের সর্বত্র মাতব্বরি করে বেড়াচ্ছে কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন হিসাবে। পূর্বেই আলোচনা করেছি এই রেডিয়েশন বিষয়ে, যা আবিষ্কার করে দুজন বিজ্ঞানী নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন। কেননা, বিগ ব্যাং এর সত্যতা প্রমানে এই রেডিয়েশন অন্যতম ভূমিকা পালন করেছে।

এক্ষনে মহাবিশ্ব জুড়ে শতকরা ৭৫% হাইড্রোজেন পরমানু এবং ২৫% হিলিয়াম পরমানুর বসত। মহাবিশ্ব তখনো ঘুটঘুটে কালো অন্ধকারে ঢাকা, কারন তখনো কোন নক্ষত্রের জন্ম হয় নি।

জটিল বিষয় মগজে ঢুকাতে ঢুকাতে বোরিং হয়ে গিয়েছি, এবার একটি বিস্ময়কর তথ্য দিয়ে অবাক করে দেবার পালা। বিস্ময়কর ব্যাপারটি হল, বিজ্ঞানীরা যে মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশনের অস্তিত্ত আবিষ্কার করেছে, সেই আবিষ্কারের সূত্র ধরেই আরেকটি নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে যা বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে। আমাদের মহাবিশ্ব যেমন ইলেক্ট্রন, প্রোটন ও নিউট্রনের সমন্বয়ে গঠিত, ঠিক একই প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ন ভিন্ন ধরনের আরেকটি বস্তু জগত সৃষ্টি হয়েছে দৃশ্যমান মহাবিশ্বের বাহিরেও। বিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছেন ডার্ক ম্যাটার বা অন্ধকার বস্তু। এধরনের নাম করনের কারন হল, এখান থেকে কোন আলো আমাদের নিকট পৌঁছায় না বলেই আমরা তা দেখতে পাই না, তবে সত্যিই যে এর অস্তিত্ত রয়েছে, তার বুঝা যায় এর মহাকর্ষ বল থেকে, যার জলজ্যান্ত উদাহরন হল ব্ল্যাক হোল। শুধু তাই নয়, গ্যালাক্সি গুলো যে নিজের অক্ষ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, তা এই ব্ল্যাক হোলেরই অভিকর্ষ বলের কারনে। কিন্তু সেই ব্যতিক্রমী বস্তু জগত আমাদের দৃষ্টি গোচর হয় না বলেই সে সম্পর্কে আমরা খুব বেশি জানতে পারি না।

ডার্ক ম্যাটার যে ডার্ক এনার্জি হতে সৃষ্টি হয়েছে, তার Space বৃদ্ধির সাথে সাথে এই ডার্ক এনার্জিরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগ ব্যাং এর ৩,৮০,০০০ বছর পরে ডার্ক ম্যাটারের পরিমান ছিল ৬৩% এবং বর্তমানে ২৩% যা সমগ্র মহাবিশ্ব জুড়েই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। যেহেতু ডার্ক ম্যাটার সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা তেমন কিছু জানতে পারে নি, তাই তারা বলে, আমরা মহাবিশ্বের মাত্র ৪.৬% পর্যন্ত জানতে পেরেছি। আর ধর্মান্ধ পাবলিক এই পারসেন্টেসকেই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ধান গাছকে বট বৃক্ষ বানিয়ে দাঁত কেলিয়ে বলে, মহাবিশ্বের মাত্র ৪.৬% জ্ঞান নিয়ে কিভাবে স্রষ্টার অস্তিত্তকে অস্বীকার করি?

কিন্তু তারা এটা কখনোই বলবে না যে, আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের কত পারসেন্ট আমরা জানতে পেরেছি। কারনটা আগেই বলেছি, তাদের ঈশ্বরের বসতই হল বিজ্ঞানের “জানি না” এর উত্তরের মাঝে।

কিভাবে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের সংস্পর্শে সর্ব প্রথম মহাবিশ্ব আলোর উজ্জলতায় ঝলমল করে উঠলো?

আমরা আগেই জেনেছি, ডার্ক মেটার ও ব্লাক হোল সম্বন্ধীয় মূল কিছু বিষয়, যা আমাদের সৌরজগত গুলিকে নিজ অক্ষে ঘুরপাক খাওয়াচ্ছে, ঠিক যেমন সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী সহ যাবতীয় গ্রহ ঘুরপাক খায়। মহাবিশ্ব সৃষ্টির ৩,৮০,০০০ বছর পরে যখন মহাবিশ্ব ব্যাপক প্রসারিত হয়েছে এবং তাপমাত্রাও অনেক কমে এসেছে, এমন সময়ই ডার্ক ম্যাটার তার মহাকর্ষ বল দ্বারা হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের অনু-পরমানু সমুহকে নিজের দিকে টানতে থাকে, ফলে সেগুলো স্থানে স্থানে একত্রিত হতে থাকে এবং মহাকর্ষ বলের প্রভাবে অনু-পরমানু গুলো কেন্দ্রীভূত হতে থাকে।

আমরা জানি, একটু বস্তু আরেকটি বস্তুকে কেন্দ্র করে ঘুরপাকের ক্ষেত্রে, কেন্দ্রের বস্তুর অন্তর্মুখী টান এবং বাহিরের বস্তুর বহির্মুখী টান সমান বলেই উভয় বস্তুর দূরত্ব স্খীর থাকে। যদি কেন্দ্রের বস্তুর টান বেশি হতো, তবে বাহিরের বস্তুটি ঘুরপাক খেতে খেতে কেন্দ্রের বস্তুর সহিত মিলিত হয়ে যেত। কিংবা যদি কেন্দ্রের বস্তুর আকর্ষনের চেয়ে বাহিরের বস্তুর বহির্মুখী টান বেশি হতো, তবে বস্তুটি ঘুরতে ঘুরতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।

ঠিক ইহারই অনুরুপ ডার্ক ম্যাটারের মহাকর্ষ বলে যখন হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের অনু-পরমানুকে আকর্ষন করতে শুরু করে, তখন অনু-পরমানু গুলো ক্রমান্বয়ে ডার্ক ম্যাটারের দিকে অগ্রসর হয়ে একত্রে জমা হতে থাকে। ফলে তাদের মধ্যে একটি কেন্দ্র তৈরি হয় এবং সেই কেন্দ্রের আকর্ষনে বাঁকি অনু-পরমানু গুলো ক্রমান্বয়ে কেন্দ্রে জমা শুরু করে। ধীরে ধীরে কেন্দ্রের চাপ বাড়তে থাকে, ফলে তাপমাত্রাও বাড়তে থাকে। শুরু হয় হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের নিউক্লিয়াসে থাকা প্রোটন একে অন্যের সহিত নিউক্লিয় ফিউশান বিক্রিয়া শুরু করে দেয়। নিউক্লিয়া ফিউশান ফিউশান বিক্রিয়া হতে কি পরিমান শক্তি উৎপন্ন হয়, তা পর্যবেক্ষন করতে আপনাকে আবারো ফিজিক্সের সীমা অতিক্রম করে কেমিস্ট্রির সীমানায় পদার্পন করতে হবে। কেবল সেখানেই পাবেন নিউক্লীয় ফিশান ও নিউক্লীয় ফিউশান বিক্রিয়া সম্বলিত তথ্য এবং একটি ছোট্র বিক্রিয়ায় কি পরিমান শক্তি ও তাপমাত্রা উৎপন্ন হতে পারে।

যা হোক, প্রচন্ড চাপ, প্রচন্ড তাপ এবং নিউক্লীয় ফিউশান বিক্রিয়ার প্রভাবে এবার গ্যাসের বলয়টি জ্বলে উঠতে বাধ্য হল। ঠিক এভাবেই ডার্ক ম্যাটারের প্রভাবে যেখানে যেখানে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের অনু-পরমানু একত্রিত হয়েছিল, ঠিক সেখানেই তৈরি হয়েছে এরকম উজ্জল আলোক পিন্ড, যাকে আমরা নাম দিয়েছি নক্ষত্র বলে। এখনো সেই নক্ষত্র গুলোর ভেতরে নিউক্লীয় ফিউসান বিক্রিয়া চলছে বহাল তবিয়তে, যার ফলে প্রতি নিয়ত নক্ষত্র গুলো হতে বিপুল পরিমানে তাপ ও আলো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পরে। এভাবে মহাবিশ্বে সৃষ্টি হয়েছে সমস্ত নক্ষত্রের। সেখানে লক্ষ-কোটি নক্ষত্র নিয়ে আবার গড়ে উঠেছে একেকটা গ্যালাক্সি। ধারনা করা হয়, আমাদের গ্যালাক্সিতেই প্রায় ট্রিলিয়ন পরিমান নক্ষত্রের বসত।

আপনারা নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন যে, আমি ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে তেমন কিছু না বলেই পাশ কাটিয়ে চলে গিয়েছি। এবার বলছি কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের মাধ্যমে।

ডার্ক ম্যাটার কি?

উত্তরঃ ডার্ক ম্যাটার এমন এক ধরনের ম্যাটার, যা আমাদের বস্তু জগতের সাথে সাথে তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমরা সেই ডার্ক ম্যাটার সম্বন্ধে এখন পর্যন্ত বিশেষ কিছু জানতে পারি নি। দেখতে না পেলেও, তার মহাকর্ষ বল মহাবিশ্বে স্পষ্টতই বুঝা যায়।

তবে এখন পর্যন্ত এই অন্ধকার জগত সম্বন্ধে আমরা যেটুকু জানতে পেরেছি, তা কিছুই নয় বলা চলে।

শুরুতেই কেন নক্ষত্র সৃষ্টির কথা বলছি, কেন গ্রহ উপগ্রহ নয়?

সিম্পল উত্তরঃ কারণ অণু-পরমাণু সৃষ্টির পরে সর্ব প্রথম নক্ষত্রই সৃষ্টি হয়েছিল, কোন গ্রহ উপগ্রহ নয়। সূর্যও যেহেতু একটা ছোটখাটো নক্ষত্র, তাই সর্ব প্রথম সূর্য নিয়েই তো আলোচনা করতে হবে, আলোচনার ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে।

প্রথমে যে সূর্যই সৃষ্টি হয়েছিল, কোন গ্রহ-উপগ্রহ নয়, তার প্রমান কি?

উত্তরঃ বিগত পোস্ট পড়ার পরেও যদি কোন পাবলিক এরকম প্রশ্ন করে থাকে, তবে এটুকু তো নিশ্চিত যে, ঐ পাবলিকটি নিঃসন্দেহে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ধর্ম গ্রন্থের সৃষ্টিতত্ত্ব জানা পাবলিক। বিজ্ঞানের সাথে মিলছে না বলেই, এরকম প্রশ্ন করছে, যদি মিলে যায় এই প্রত্যাশায়। কারণ, প্রতিটি ধর্ম গ্রন্থেই সেই ধর্মের স্রষ্টা প্রথমে পৃথিবী সৃষ্টি করেছে, তারপর সূর্য সৃষ্টি করেছে, এরকম স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছে।

একটু কমন সেন্সের প্রয়োগ করুন এবার। এতক্ষণ পর্যন্ত মহাবিশ্বের সংক্ষিপ্ত সৃষ্টিতত্ত্ব ব্যাখ্যায় কেবল মাত্র হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের মত পদার্থের মৌলিক অণু পর্যন্ত জানতে পেরেছি। পৃথিবী কি মাত্র এই দুটি উপাদানের সমষ্টি? ধরেই নিলাম ধর্ম গ্রন্থানুযায়ী পৃথিবীও আগে সৃষ্টি হয়েছিল, কিন্তু বিশ্বস্রষ্টা পৃথিবী সৃষ্টি করে রাখছিলো কোথায় সূর্যহীন ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে? ধরে নিলাম কোন এক শূন্যস্থানে রেখেছিল, তারপর সেই ঘুটঘুটে অন্ধকার পৃথিবীতে স্রষ্টা পানি সৃষ্টি করছে, গাছপালা সৃষ্টি করছে, তারপর প্রাণী সৃষ্টি করছে, তারপরে করেছে সূর্য সৃষ্টি। তো যখন সূর্যই ছিল না, তখন তো সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর ঘূর্ণনের প্রশ্নই আসে। তার মানে স্রষ্টা পৃথিবীকে স্থির রেখেই পৃথিবীতে এসব করে যাচ্ছিল। এরপর যখন সূর্য সৃষ্টি করলো, তারপর সূর্যকে একটা স্থানে রেখে পৃথিবীকে একটা ধাক্কা দিয়ে সূর্যের চারপাশে ঘূর্ণনের ব্যবস্থা করে দিল। ধর্ম গ্রন্থের সৃষ্টি তথ্যের ব্যাখ্যায় এর চেয়ে সহজ বিনুদুন আর পাওয়া যাবে না।

সহীহ বিজ্ঞানীয় জবাবঃ পৃথিবী সৃষ্টি হতে যেসব রাসায়নিক উপাদান প্রয়োজন, তা নক্ষত্রের বিস্ফোরণ ব্যতীত উৎপন্ন হওয়া সম্ভব নয়। কেননা, শুধুমাত্র হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম দিয়ে কেবল নক্ষত্রই সৃষ্টি হওয়া সম্ভব। প্রত্যেকটি নক্ষত্রের মৌলিক উপাদানই এই দুটি। কাজেই প্রথমে নক্ষত্র সৃষ্টি, এরপর সৃষ্টি পৃথিবী।

সূর্য সৃষ্টি হল কিভাবে?

উত্তরঃ যেহেতু অন্যান্য নক্ষত্রের মত সূর্যও একটি নক্ষত্র, সেহেতু সূর্যও অন্যান্য নক্ষত্রের মতই সৃষ্টি হয়েছে। হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম পরমাণু যখন চতুর্দিকে আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘ রূপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, তখন বিশাল আকৃতির মেঘ মণ্ডলের কেন্দ্রের দিকে পরমাণু গুলো ক্রমান্বয়ে পতিত হতে থাকে। ফলে আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘ গুলো ঘন হতে থাকে ফলে সৃষ্টি হতে থাকে একটি কেন্দ্রের। ক্রমান্বয়ে যখন কেন্দ্র সঙ্কুচিত হতে থাকে, তখন তার কেন্দ্রের ভর বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং পরমাণু গুলোর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়, সৃষ্টি হয় বহির্মুখী চাপের। প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয় এবং শুরু হয় নিউক্লিয় ফিউশান বিক্রিয়া ফলে তাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির এক পর্যায়ে তাপমাত্রা ২০০০ কেলভিন অতিক্রান্ত হলে হঠাৎ কেন্দ্রটি জ্বলে উঠে এবং জন্ম হয় সূর্যের। তার গ্যাসীয় চারপাশ ছিল চ্যাপ্টা আকৃতির, ফলে এই অঞ্চলে গ্রহ গুলোও থালার ন্যায় চ্যাপ্টা আকৃতি হয়ে সূর্যের চারপাশে প্রদক্ষিণ করে।

প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর পূর্বে তৈরি হয় সূর্য, যা কোটি কোটি নক্ষত্রের তুলনায় মাঝারি সাইজের। সূর্যের ব্যাস ৮৬৪,০০০ মাইল, পৃথিবীর ব্যাসের ১০৯ গুন বড়। সূর্যের ভেতরে এরকম দশ লক্ষ পৃথিবী রাখা সম্ভব হলেও এর ওজন পৃথিবীর তুলনায় মাত্র ৩০,০০০ গুন বেশি। সূর্যের ভর 1.989★10 to the power 30 kg. পৃথিবীর তুলনায় সূর্যের অভিকর্ষ বল ২৮ গুন বেশি। সূর্যের গ্যাসীয় ঘনত্ব পানির ঘনত্বের মতই, কিন্তু এর কেন্দ্রস্থল সীসার চেয়েও দশগুণ বেশি ঘনত্বের। সূর্যের ভেতরের তাপমাত্রা ১০ মিলিয়ন ডিগ্রী এবং বাহিরের তাপমাত্রা ৬০০০ কেলভিনের মত। সূর্যের এই প্রচণ্ড তাপে বাহির অঞ্চলের গ্যাস গুলো আয়নিত হয় আংশিক ভাবে, কিন্তু ভেতরাঞ্চলে সম্পূর্ণ রূপে আয়নিত হয়ে পরমাণু হতে ইলেকট্রন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সূর্যের অণু ও আয়ন পরস্পরকে তীব্র বেগে টানে বলেই সূর্যের সাইজ গোলাকার। সূর্যের কেন্দ্রের দিকে চলছে প্রচণ্ড অভিকর্ষিক চাপ, যা সব কিছু কেন্দ্রের দিকে টানে এবং প্রচণ্ড উত্তপ্ত গ্যাস সৃষ্টি করে বহির্মুখী চাপ, ফলে এক ধরনের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়, যাকে বলে হাইড্রোস্ট্যাটিক ইকুইলিব্রিয়াম।

সূর্যের আরেকটু তথ্য প্রদানের পরে সবিশেষ গ্রহ ও উপগ্রহ সৃষ্টির ব্যাখ্যার মাধ্যমে আপাতত শেষ হবে বিগ ব্যাং থিওরির। এরপর ব্ল্যাক হোল, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষে চলে যাবো ধর্মান্ধ পাবলিকদের আরেকটি কমন প্রশ্নের সন্ধানে। বিগ ব্যাং কে ঘটাইছে, এই প্রশ্নের উত্তরের সন্ধানে। আপনারা নিশ্চয় জানেন যে, ধর্মান্ধ পাবলিকরা এরকম কে দ্বারা প্রশ্ন করে লজিক্যাল ফ্যালাসি করতে এক্কেবারে ওস্তাদ। কেননা, উত্তরে “জানি না” বললেই সেখানে ঘাপটি মেরে বসতে পারবে তাদের নিজ নিজ পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ধর্মেশ্বর।

সূর্যঃ সূর্য যেসব গ্যাস উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত, তার মোট উপাদানের ৭০% হাইড্রোজেন, ২৭% হিলিয়াম এবং বাঁকি উপাদান গুলোর মধ্যে রয়েছে লিথিয়াম, বেরিলিয়াম, বোরন, কার্বন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, ফ্লোরিন, নিয়ন ইত্যাদি। সূর্যের বাহিরের অঞ্চলে কোন পারমানবিক বিক্রিয়া সংঘটিত হয় নি বলেই সেখানের ৭৯% হাইড্রোজেন বিদ্যমান।

এরকম পর্যায়ক্রমিক রাসায়নিক মৌলিক উপাদানই যে তৈরি হয়েছিল, তা কিভাবে মেনে নেবো?

উত্তরঃ কথা তো খাঁটি। প্রথমে না হয় ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রনের সমন্বয়ে হাইড্রোজেনের পরমাণু ব্যতীত অন্য পরমাণু তৈরি হওয়া সম্ভব ছিল না, কিন্তু তার পরবর্তী সময়ে কেন হিলিয়াম, লিথিয়াম, বোরন, কার্বন ইত্যাদি মৌল তৈরি হল, অন্য মৌল যেমন ইউরেনিয়াম, ফ্র্যান্সিয়াম, গোল্ড ইত্যাদি মৌল তৈরি হল না?

এইবার ফিজিক্সের গণ্ডি পেড়িয়ে কেমিস্ট্রির গণ্ডিতে গণ্ডিতে পদার্পণ করতে হবে। জানতে হবে অণুর গুন বৈশিষ্ট্য এবং তার উপর তাপ ও চাপের প্রভাব। আমরা জানি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি অণুর গতিশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং তাপমাত্রা হ্রাসে গতিশক্তির হ্রাস পায়। এভাবে তাপমাত্রা ক্রমাগত হ্রাস ঘটাতে থাকলে অণুগুলি প্রথমে তরল হয়, এরপর প্লাজমা দশায় উপনীত, এরপর কঠিনে রূপলাভ করে। অনুরূপ কোন পরমাণুর তাপমাত্রা হ্রাসের দরুন তার গতিশক্তিরও হ্রাস ঘটে।

আবার, হাইড্রোজেনের গঠন প্রক্রিয়ায় দেখা যায়, এতে একটি মাত্র প্রোটন ও একটি মাত্র ইলেকট্রন বিদ্যমান। সেই সময়ে প্রচণ্ড তাপমাত্রায় নিউক্লিয়াস ও ইলেকট্রন যে গতি সম্পন্ন অবস্থায় ছিল, এতে একাধিক ইলেকট্রন ও প্রোটনের একত্রিত করন হওয়া সম্ভব ছিল না। এরপর সময় বৃদ্ধির সাথে সাথে যখন মহাবিশ্বের সম্প্রসারণও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল, তখন তাপমাত্রাও ক্রমাগত বিস্তৃতির দরুন হ্রাস পাচ্ছিল, ফলে ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াসের গতি ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছিল। ফলে একাধিক ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াসের সহিত সংযুক্ত হবার সুযোগ পেয়েছিল, অনুরূপ প্রোটনও। কাজেই হাইড্রোজেনের পরেই যে মৌলটি তৈরি হবার কথা, তা হল হিলিয়াম, এরপর লিথিয়াম, এরপর বেরিলিয়াম, বোরন, কার্বন ইত্যাদি। কেননা, এভাবেই নিউক্লিয়াসে ক্রমাগত ভাবে ইলেকট্রন ও প্রোটনের সংখ্যা বৃদ্ধির দরুন নতুন নতুন মৌলের জন্ম হওয়া ব্যতীত কোন উপায় ছিল না। কাজেই প্রথমে হিলিয়াম বা লিথিয়াম তৈরির পরে হাইড্রোজেন তৈরি হওয়া, একেবারেই সম্ভব নয়।

সূর্যের মোট ব্যাসের কেন্দ্রের ১০ ভাগ অঞ্চল থেকেই তৈরি হয় তাপশক্তি ও আলোর ফোটন কণা, যা ছড়িয়ে পরে মহাবিশ্বে। কারণ এখানেই ঘটে পারমানবিক বিক্রিয়া। সূর্যের কেন্দ্রের টান এতোটাই বেশি যে, সেই টানকে অতিক্রম করে সূর্য থেকে বেড়িয়ে আসতে সময় লাগে প্রায় এক মিলিয়ন বছর। অথচ বাধা না পেলে এই সময় লাগতো মাত্র দু সেকেন্ডের। তাহলেই এবার চিন্তা করুন, কি পরিমাণ আকর্ষণ হলে এই দু সেকেন্ডের রাস্তা পেরোতে ফোটন কণার দু মিলিয়ন বছর সময় লেগে যায়। যদি হঠাৎ করে এই মুহূর্তে সূর্যের কেন্দ্রে শক্তি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, তবে তা আমাদের জানতে সময় লাগবে প্রায় এক মিলিয়ন বছর, অর্থাৎ এক মিলিয়ন বছর পরে তা জানতে পারবো।

সূর্য কোন প্রক্রিয়ায় তন্মধ্যে শক্তি উৎপন্ন করে?

উত্তরঃ আইনস্টাইনের ভর-শক্তি সম্বলিত সূত্র আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত এই প্রশ্নের সমাধান পাওয়া যায় নি। তখন ধর্মান্ধ পাবলিকগন লজিক্যাল ফ্যালাসি সম্বলিত প্রশ্ন করতো “সূর্যের শক্তি কে দিচ্ছে?”

কিন্তু এই ফ্যালাসির উত্তর জানার পরে প্রশ্নটা হারিয়ে বিগ ব্যাং এর পেছনে স্থান করে নিয়েছে। এখন প্রশ্ন করে “বিগ ব্যাং কে ঘটাইছে?”

আইনস্টাইনের E = mc2 সূত্রের দরুন আমরা জানতে পারি, বস্তু যেমন শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে, তদ্রূপ শক্তিও বিপরীত প্রক্রিয়ায় বস্তুতে রূপলাভ করতে পারে। (এখানে, E=শক্তি, m=ভর, c=আলোর গতি)।

সূর্যের কেন্দ্রস্থলে ঠিক এই প্রক্রিয়াতেই ক্রমাগত শক্তির উৎপন্ন হচ্ছে। সূর্যের কেন্দ্রস্থলের বাহিরে আনুমানিক ৫০০ কিলোমিটার পুরুত্ব সম্বলিত আলোক মণ্ডলের অঞ্চল থেকেই আমরা আলো পেয়ে থাকি। এখানে বলে রাখা ভালো যে, সূর্য থেকে উৎপন্ন আলোর একটি ছোট অংশ মাত্র আমরা পেয়ে থাকি। বাঁকিটা পুনরায় সূর্যের কেন্দ্রেই ফিরে যায়। যে আলোক কণিকা সূর্যের কেন্দ্র হতে এর আলোক মণ্ডল অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, কেবল সেগুলোই মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পরে।

সূর্যের পরিনতি ও পৃথিবীতে তার প্রভাবঃ

অন্যান্য নক্ষত্রের মত সূর্যেরও মৃত্যু ঘটবে একদিন। বিভিন্ন রকম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মৃত্যু ঘটে একেকটি নক্ষত্রের। আমাদের সূর্যেরও অন্তিম সময়ে তা প্রথমে পরিণত হবে একটি লাল দানবে, যাকে বলা হয় রেড জায়েন্ট, এরপর পরিণত হবে হোয়াইট ডোয়ার্ফে। আজ থেকে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন পরে সূর্যের প্রভা বেড়ে যাবে প্রায় ১০০ গুন, ৫ বিলিয়ন বছর পর বাড়বে আরো ৫০০-১০০০ গুন এবং সূর্যের ব্যাস হবে বর্তমানের চেয়ে ৭০ গুন বেশি। ৫ বিলিয়ন পরে তাই পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে হবে প্রায় ১৪০০ কেলভিন, তার বহু আগেই পৃথিবীর সাগর আর বায়ুমণ্ডলের এই প্রচণ্ড তাপমাত্রার দরুন উধাও হয়ে যাবে। সূর্য রেড জায়েন্টে পরিণত হলেই পৃথিবী হতে বিলুপ্ত হয়ে যাবে সকল উদ্ভিদ ও প্রাণী। তখন পৃথিবী থেকে আকাশের ৩৫ ডিগ্রী জুড়েই থাকবে জ্বলজ্বলে সূর্য। এ অবস্থায় সূর্যের বাহিরের স্তর ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে এবং প্রকাশ পাবে সূর্যের ভেতরের অংশ, এরপর তা রূপলাভ করবে সাদা বামন তথা হোয়াইট ডোয়ার্ফে। পৃথিবীতে রাজত্ব করতে থাকবে সূর্যের বিভিন্ন ক্ষতিকর রশ্মি, ফলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে ক্ষুদ্র প্রাণ কণা পর্যন্ত। এরপর ক্রমাগত তাপমাত্রা কমতে কমতে একটা সময় পৃথিবীর তাপমাত্রা হবে ১০০ কেলভিনের মত, তখন সমগ্র পৃথিবী তুষারে ঢেকে যাবে।

সূর্য সৃষ্টির সময় যেসব গ্যাসীয় উপাদান কেন্দ্রীভূত হয়েছিল, তা কেন্দ্রে জমাট বাঁধার কারণে প্রচণ্ড আকর্ষণের সৃষ্টি হয়, ফলে সূর্যের চারপাশের অণু পরমাণু গুলো সূর্যকে কেন্দ্র করে আবার ঘুরপাক খেতে থাকে। এই ঘূর্ণনের ফলে অণু-পরমাণু গুলো একে অপরের সন্নিকটে আসার সুযোগ পেলে তারা আবার নিজেদের আকর্ষণে পরস্পর যুক্ত হয়ে নতুন নতুন মৌলিক পদার্থের জন্ম হতে থাকে।

নতুন নতুন মৌলিক পদির্থের জন্ম কিভাবে হয়?

উত্তরঃ আপনি কেমিস্ট্রির পর্যায় সারণী পর্যবেক্ষণ করেন, তবে দেখতে পাবেন, পর্যায় সারণীর একই পর্যায়ে ক্রমান্বয়ে পারমানবিক সংখ্যা বৃদ্ধির দরুন পরমাণুর গঠনের কিরূপ পরিবর্তন হয়। পর্যায় সারণীর প্রথমেই রয়েছে হাইড্রোজেন, যার নিউক্লিয়াসে রয়েছে একটি মাত্র প্রোটন এবং একে কেন্দ্র করে একটি মাত্র শেলে ঘুরছে একটি মাত্র ইলেকট্রন। হাইড্রোজেনে দুটি ইলেকট্রন যুক্ত হওয়া সম্ভব নয়, কারণ এর অভ্যন্তরে থাকা একটি মাত্র প্রোটনের এতো বেশি ক্ষমতা নেই, যার দ্বারা সে দুটি মুক্ত ইলেকট্রনকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে যুক্ত করতে পারে। দুটি ইলেকট্রনকে নিজের সাথে যুক্ত করতে চাইলে তাকে কমপক্ষে দুটি প্রোটন অর্জন করতে হবে।

হাইড্রোজেনের পরবর্তী মৌল হিলিয়ামেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। কারণ, সেখানে প্রোটনের সংখ্যা দুটি, ফলে নিউক্লিয়াসের বাহিরের শেলে দুটি ইলেকট্রনই বিদ্যমান।

অনুরূপ ভাবে পর্যায় সারণীর যত ডান দিক থেকে বাম দিকে যেতে থাকবেন, ততই তাদের নিউক্লিয়াসে প্রোটন সংখ্যা বৃদ্ধির দরুন পরমাণুর বহিস্থ শেলে সমানুপাতিক হারে ইলেকট্রনের সংখ্যাও বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। যদি কোন কারণে পরমাণুর বাহিরের শেল থেকে মাত্র একটি ইলেকট্রনকেও সরিয়ে নেয়া হয়, তবে ঐ পরমাণুটি অস্থির হয়ে উঠে হারিয়ে যাওয়া ইলেকট্রনের স্থলে একটি ইলেকট্রনকে স্থাপন করতে।

এটাই হল কেমিস্ট্রির মূল ভাষা এবং এ ভাষাতেই ব্যাখ্যা করা যায় সকল প্রকার অণু-পরমাণুর। নূন্যতম কেমিস্ট্রির ইন্টার লেভেলের জ্ঞান না থাকলে, উক্ত বিষয়টি বোধগম্য হওয়া কঠিন ব্যাপার। তবে কেমিস্ট্রির স্টুডেন্ট ব্যতীত আপনারা নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থও খুঁজে দেখতে পারেন, সেখানেও হয়তো কোন এক চিপায় পর্যায় সারণী এবং অণু-পরমাণুর গঠন প্রক্রিয়া লিখে রেখেছে সেই ধর্মের স্রষ্টা।

ক্রমাগত সম্প্রসারণের ফলে তাপ হ্রাস এবং এর ফলে পরিবেশের ক্রমাগত পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় জন্ম নিয়ে নিত্য নতুন মৌলিক পদার্থের, শুধু মাত্র প্রোটন ও ইলেকট্রনের যোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে। এরকম মৌলিক পদার্থের সমন্বয়েই সূর্যের চারপাশে ঘূর্ণন রত অবস্থায় জন্ম নিতে থাকে গ্রহ-উপগ্রহের। তন্মধ্যে উল্লেখ যোগ্য একটি গ্রহ হল আমাদের পৃথিবী। সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণনরত সকল গ্রহ-উপগ্রহ গুলো একসাথে তৈরি হয় নি। এখন অন্যান্য গ্রহ গুলো কেন একসাথে তৈরি হল না, সে ব্যাখ্যায় যাবো না, কারণ এখানে কেবল মাত্র পৃথিবী নিয়েই আলোচনা করবো।

৪.৬ বিলিয়ন বছর পূর্বে তৈরি হওয়া পৃথিবী আর বর্তমানের পৃথিবীর মাঝে কোন সামঞ্জস্যতা নেই। কারণ, সৃষ্টির সময় পৃথিবীও ছিল একটি অগ্নি গোলকের ন্যায় গ্যাসীয় একটি পদার্থ। প্রচণ্ড তেজস্ক্রিয়তার ফলে এর অভ্যন্তর ভাগ ছিল প্রচণ্ড উত্তপ্ত। ৪.৫ বিলিয়ন বছর পূর্বে পৃথিবী দুটি ভাগে বিভক্ত হয়, কেন্দ্রাঞ্চল ও বহিস্থাঞ্চল। ক্রমাগত তাপমাত্রা হ্রাসের দরুন কেন্দ্রাঞ্চল সঙ্কুচিত হতে থাকে এবং ফলে প্রচণ্ড চাপে বিভিন্ন গ্যাস বের হয়ে উপরের দিকে উড়ে যেতে থাকে। কিন্তু পৃথিবীর আকর্ষণের দরুন তা মহাবিশ্বের অসীম শূন্যতায় হারিয়ে যেতে পারে না, ফলে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে জমা হতে শুরু করে এবং তৈরি হয় বায়ু মণ্ডল। অনেক রকম গ্যাসের মত জমতে থাকে হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনও, যার উভয়ের মিথস্ক্রিয়ায় তৈরি হয় প্রথম বারের মত পানির অণু। আমরা কেমিস্ট্রির এই সিম্পল ভাষা জানি যে, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের সমন্বয়ে পানি তৈরি হয়। সেই পানির অণু পৃথিবী পৃষ্ঠে পরার চেষ্টা করতেই পৃথিবীর প্রচণ্ড তাপে তা পৃথিবী পৃষ্ঠে পরামাত্রই বাষ্প হয়ে পুনরায় হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে বিচ্ছিন্ন হয়ে উড়ে চলে যায়। ক্রমাগত বৃষ্টিপাত এবং এর ফলে ক্রমাগত শীতল হতে থাকে পৃথিবীর পৃষ্ঠ ভাগ। ফলে শুরুর দিকে যা ছিল গ্যাসীয় পিণ্ড, তাপমাত্রা হ্রাসে তা ধীরে ধীরে তরলাবস্থায় রূপ লাভ করে। এরপর বৃষ্টির দরুন আরো দ্রুত শীতলীকরণের ফলে পৃথিবীর উপরের পৃষ্ঠভাগ এবার কঠিন হতে বাধ্য হয়।

পৃথিবী নামক এই ছোট্ট গ্রহটি কোন পৌরাণিক বিধাতার দয়ার সৃষ্টি নয় এবং ইহা নয় কোন গরুর শিং এর উপর স্থির হয়ে। চার্চ বিশপের বাইবেলীয় হিসাব অনুসারে পৃথিবী খৃষ্টপূর্ব ৪০০৪ অব্দ ২৩ অক্টোবর রবিবারে পৃথিবী সৃষ্টি হয় নি, যেখানে ২৮ অক্টোবর মানুষের আবির্ভাব ঘটবে। এখানে প্রাণ সৃষ্টির মত সময়োপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হতেই কোটি কোটি বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। উপরের নীল রং দেখে যেমন ঢাকনার ন্যায় আকাশ ভেবে ভুল করি, তদ্রূপ আয়তনের বিশালতায় পৃথিবীকেও আমরা সমতল ভেবে ভুল করি। এই সমতল পৃথিবীর পানির উপর ভেঁসে নেই, যেখানে হেলেদুলে পরে যাবার ভয়ে পাহাড় পর্বতকে পেরেকের ন্যায় স্থাপন করতে হবে। বরং পাহাড় পর্বত সমৃদ্ধ অঞ্চল গুলোতেই তুলনা মূলক ভাবে ভূমিকম্প বেশি হয়, মেয়েদের বেপর্দা হয়ে চলাফেরা আর জিন্স পরিধানের জন্য নয়।

পৃথিবী কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল?

৪.৬ বিলিয়ন বছর পূর্বে সূচনা হয়েছিল আমাদের এ পৃথিবীর। বিভিন্ন বেশ কয়েকটি স্তরে গঠিত এবং স্তরগুলো ভারী রাসায়নিক উপাদানে সৃষ্ট। স্তর সৃষ্টির জন্য এসব রাসায়নিক উপাদান পৃথিবীর বাহিরে অন্য কোথাও হতে আসে নি, বরং পৃথিবীরই জৈব বিবর্তন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে। পৃথিবীর বাহির হতে ভেতর পর্যন্ত তিনটি স্তরে বিন্যস্ত, যা পৃথকীকরণ রীতিতে গড়ে উঠেছে ধারাবাহিক ভাবে। পৃথিবীর অভ্যন্তর স্তরগুলো হল অন্তস্তর, গুরুস্তর ও ভূত্বক। কেন্তস্তর গড়ে উঠেছে পৃথিবীর বাহিরের স্তরের প্রায় অর্ধেক এলাকা জুড়ে, যা গঠিত হয়েছে লোহা ও নিকেল দিয়ে। অন্তস্তরের উপরে প্রায় ২৯০০ কি.মি এলাকা জুড়ে রয়েছে গুরুস্তর, যা লোহা ও ম্যাগনেসিয়ামের মিশ্রণের ফসল। সর্ব উপরে ১৬-৪০ কি.মি পুরু রয়েছে পৃথিবীর ভূত্বক যার উপাদান সমূহ গড়ে উঠেছে আগ্নেয় শিলা হতে। পৃথিবীর সূচনা লগ্নে তার ভেতরে ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত, ফলে অন্যান্য ভারী রাসায়নিক উপাদানের মত লোহা ও নিকেলও কেন্দ্রে জমা হতে থাকে গলিত অবস্থায় এবং উপরের দিকে অবস্থান নিতে থাকে লঘু সিলিকেটের মত পদার্থ।

ভূবিজ্ঞানীরা রেডিওএ্যাক্টিভ ডেটিং পদ্ধতিতে হিসেব করে দেখেছেন, পৃথিবীর বয়স ৪.৬ বিলিয়ন বছর। এর উপর স্তরে পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডে যে সবচেয়ে প্রাচীন শিলা পাওয়া গেছে, তার বয়স ৪ বিলিয়ন বছর। অনুরূপ উল্কাপিণ্ডের বয়স ৪.৫৫ বিলিয়ন বছর এবং চন্দ্র শিলার বয়স ৪.৬ বিলিয়ন বছর। পৃথিবীতে অভিকর্ষ ছাড়াও রয়েছে এক বিশাল চুম্বক ক্ষেত্র। এই চুম্বকত্বের কারণ এর ভূস্তরে জমে থাকা লোহা ও নিকেলের স্তর, যা ক্রমাগত তৈরি করছে বিদ্যুৎ প্রবাহ।

পৃথিবীর উপরিভাগ এক কঠিন শিলাময় এলাকা এবং তার নিচেই রয়েছে তরল লঘু শিলা মণ্ডল এলাকা। শিলামণ্ডলের আলোড়নে তৈরি হয় ভূমিকম্প এবং সৃষ্টি হয় পাহাড় পর্বত।

আমরা জানি যে, কোন তরল পদার্থের উপর যদি অপেক্ষাকৃত শক্ত কোন পদার্থের চাপ থাকে, তবে নীচের তরলটি সেই চাপের ফলে কঠিন পদার্থকে ভেদ করে উপরের দিকে উঠে চাপের সমতা রক্ষা করতে চায়। অনুরূপ পৃথিবীর এই কঠিন ভূস্তর যে নীচের নরম স্তরকে ক্রমাগত চাপ দিয়ে চলেছে, তার কি কোন রিএ্যাক্ট হচ্ছে না?

অবশ্যই হচ্ছে, এই রিএ্যাক্টের ফলেই সৃষ্টি হয়েছে ফাটলের যাকে বলা হয় প্লেট। উপরের কঠিন স্তরের চাপের ফলে নিচের লঘু স্তরে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়, তারই ফলশ্রুতিতে গতিশীল হয়ে উঠে উপরের প্লেট গুলো। ধাক্কা লাগে পরস্পরের সাথে, কেঁপে উঠে পৃথিবী, সৃষ্টি হয় পর্বতের। প্লেট গুলোর ধারে যেসব ফাটল থাকে, সেখানেই অবস্থান করে আগ্নেয়গিরি এবং ভূমিকম্পও হয় সেখানেই। আমেরিকা মহাদেশের সাথে প্রশান্ত মহাসাগরের প্লেটের সংঘর্ষে জন্ম নিয়েছে সিয়েরা নেভাডা ও অ্যান্ডেজ পর্বতমালা। ভারত বর্ষের পেকটনিক প্লেট উত্তরের দিকে সরে গিয়ে সংঘর্ষ লেগেছিল এশিয়ার প্লেটের সাথে, ফলে জন্ম নিয়েছে হিমালয় পর্বমালা। কোন পৌরাণিক বিধাতা এই অস্থির পৃথিবীকে স্থির ও শান্ত করার জন্য এসব পাহাড় পর্বত পেরেক রূপে পুঁতে দেয় নি।

৪.৬ বিলিয়ন বছর পূর্বের আদি পৃথিবীতে কোন সাগর ছিল না, কারণ উত্তপ্ততার কারণে যেখানে পানিই ছিল না, সেখানে তো সাগর থাকার কোন প্রশ্নই আসে না। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় যখন তাপমাত্রা কমতে কমতে ১০০ সেন্টিগ্রেডে উপনীত হল, ঠিক তখনই পৃথিবী তার উত্তপ্ততার পিপাসা মেটায় কোমল জলে।

পৃথিবীর অভ্যন্তর ভাগের তরল পদার্থকে বলা হয় ম্যাগমা। উপরের স্তরের চাপের তরুণ নিচের এই ম্যাগমা যখন ভূত্বক ভেদ করে উপরে চলে আসে, তখন তার সাথে আরো আসে বিপুল পরিমাণে জলীয় বাষ্প, যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আটকে যায় এবং ঘনীভবন প্রক্রিয়ায় তা জমাট বেঁধে সৃষ্টি করে বৃষ্টির ফোটায় এবং পৃথিবীর অভিকর্ষের টানে পতিত হয় পৃথিবীর বুকে। এখনো পৃথিবীর অভ্যন্তর ভাগ থেকে প্রতি বছর যে পরিমাণ জল বেড়িয়ে আসে, তার পরিমাণ 10 to the power 11 গ্রাম। এরপর পানি, অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান এবং সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠে সর্ব প্রথম তৈরি হয় কার্বনের দীর্ঘ শিকল বিশিষ্ট যৌগিক উপাদান যা সমুদ্রের পানিতে প্রথম আনয়ন করেছিল প্রাণের স্পন্দন। যা হোক, নেক্সট টাইম যদি কখনো সময় পাই, তবে পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির রসায়ন নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।

চাঁদ কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল?

পৃথিবী সৃষ্টির প্রক্রিয়া চালু হবার কিছুকাল পরেই সৃষ্টি হয়েছিল চাঁদ। চাঁদে মানুষের পদার্পণের পূর্ব পর্যন্ত চাঁদ সৃষ্টির ব্যাপারে সঠিক কোন তথ্য হাতে ছিল না বিজ্ঞানের নিকট। যা ছিল, তা কেবলই হাইপোথিসিস রূপে গন্য ছিল। কিন্তু এখন আমরা জানি যে, পৃথিবীর সৃষ্টি শুরুর প্রায় এক বিলিয়ন বছর পরে থিয়া নামক একটা গ্রহাণুর মহাজাগতিক সংঘর্ষে পৃথিবী পৃষ্ঠের কিছু অংশ এবং সেই গ্রহাণু খণ্ড বিখণ্ড হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে এবং পৃথিবীর আকর্ষণে তা বাঁধা পরে ঘুরপাক খেতে থাকে সেই উত্তপ্ত বস্তুগুলো। এসবই ক্রমাগতভাবে একত্রিত হয়ে জন্ম লাভ করে চাঁদের।

-: সমাপ্ত :-

প্রাসঙ্গিক লেখাঃ

১। মহাবিশ্বঃ বিস্ময়ের এক ইতিহাস
২। ফাইন টিউনিং মহাবিশ্ব এবং ঈশ্বর বিভ্রম
৩। বিগ ব্যাং থেকে হোমো স্যাপিয়েনস – মুহম্মদ জাফর ইকবাল
৪। কুরআন কি আসলেই মহাবিশ্বের আদি অবস্থা যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করে?

প্রাসঙ্গিক বইপত্রঃ

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.

The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.

This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.

5 thoughts on

  1. অসাধারন লেখা।????
    অনেক কিছু জানলামও।
    অনেক অনেক ধন্যবাদ #Sourangshu Pal ????????????
    আপনার কাছ থেকে আরও কিছু পাবার অপেক্ষায় রইলাম।

  2. “যার সৃষ্টিও ধ্বংস উভয়ই নেই, তার কোন অস্তিত্বই থাকতে পারে না।”
    এই মহাবিশ্বের তো কোনো সৃষ্টি ও ধ্বংস উভয় নেই তাহলে মহাবিশ্বের অস্তিত্ব নেই?

  3. There was in fact no singularity at the beginning of universe- A Brief History of time page-50 .. অর্থাৎ মহাবিশ্ব সূচনার সময়ে সিংগুলারিটির অস্থিত্ব ছিলোনা।
    এই লাইট টি বলেন স্টিফেন হকিং ১৯৮৮ সালে।.
    স্টিফেন হকিং বলেছেন যে, ” কোয়ান্টাম ইফেক্টগুলোর হিসেব ধরলে এই সিংগুলারিটি আর থাকেনা”–
    কিন্তু যদি ভুল না বলে থাকি, আসিফ ভাই মাঝে মাঝে বলেন মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব বুঝতে হলে সিংগুলারিটি বিষয়টি ক্লিয়ারলি বুঝতে হবে, আমার প্রশ্ন সিংগুলারিটি বুঝতে পারা টা আবশ্যক কেন?.
    প্লিজ আমার ভুল হতে পারে, ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন যদি ভুল বলে থাকি।

  4. ‘র’ আর ‘ড়’ এর প্রয়োগে কিছু জায়গায় ভুল হয়েছে। সংশোধন করে দিলে সুন্দর থেকে সুন্দরতর হবে। সাহায্য লাগলে জানাতে পারেন। সাহায্য করতে আগ্রহী।

Leave a comment

Your email will not be published.