দর্শনস্টিকি

বিশ্বাস ও আস্থা

বিশ্বাস ও আস্থা বাঙলা শব্দদ্বয়ের আভিধানিক ইংরেজি প্রায় একই রকম। বাঙলাতে একটি অপরটির প্রতিশব্দ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আভিধানিক অর্থ পিঠাপিঠি হলেও প্রায়োগিক ও বিশ্লেষনাত্নক দিক থেকে শব্দ দুটির মধ্যে রয়েছে ব্যপক পার্থক্য, আকাশ-পাতাল তফাৎ বললেও বেশি হবে বলে মনে হয় না। সচরাচর আমরা একই অর্থে বিশ্বাস ও আস্থা ব্যবহার করি; একটু তলিয়ে দেখলে বুঝা যায়, যা বিশ্বাস তা আস্থা নয়, যা আস্থা তা বিশ্বাস নয়।

আস্থা কথার সাথে সম্পর্কিত পূর্বভিজ্ঞতা, পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ পক্ষান্তরে বিশ্বাস মাত্রই অজ্ঞতা, সীমাবদ্ধতা, চিন্তার দীনতা ও অন্ধকার। হঠাৎ করেই মানুষ কোন বিষয় বা ব্যক্তির উপর আস্থা রাখেন না, কোন না কোনভাবে সে যাচাই করে নিয়ে তার উপর আস্থা রাখেন যদিও শব্দের ভুল প্রয়োগ করে আমরা আস্থার স্থলে বিশ্বাস শব্দ ব্যবহার করি। যেমন ঘনিষ্ঠজনদের ক্ষেত্রে আমরা হরহামেশাই বলে থাকি “আমি তাকে বিশ্বাস করি”। আসলে আমরা আমাদের কোন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে বিশ্বাস করি না, তার উপর আস্থা রাখি। আবার সকল বন্ধুর সাথে আমরা নিজের গোপনীয় বা ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করি না, কারণ কেউ বন্ধু হলেও নিজের গোপনীয় কথাটি তার সাথে বলার মত আস্থাভজন সে নয়। আবার কেউ মূহুর্তেই আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হতে পারে না, ধীরে ধীরে একটা মানুষের সাথে মেশার মধ্য দিয়ে তার রুচি, চিন্তা-ভাবনা ইত্যাদি সম্পর্কে আপনি সম্যক ধারণা লাভ করেন এবং তা আপনার কাছে কেমন লাগে তার উপর নির্ভর করে সেই মানুষটি আপনার কতটা ঘনিষ্ঠ হবে বা আস্থাভাজন হবে। শুধু ব্যক্তি নয়, কোন কোন প্রতিষ্ঠান বা পণ্যের উপরও আমরা আস্থা রাখি যা মানুষের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে মানুষ অর্জন করে। যেমন ধরুন, সকলেই বলে থাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বুয়েট ভাল। শুধু কি বুয়েট বলেই ভাল? না। মানুষ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পাঠদান, সিলেবাস, শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা, বিকাশের সুযোগ, বহির্বিশ্বে গ্রহনযোগ্যতা ইত্যাদির সাথে তুলনা করেই জানে ও মানে যে বুয়েট ভাল। আমরা ঔষধের দোকানে গিয়ে, স্কয়ার বা বেক্সিমকো’র ঔষধ চাই, কেন চাই? আমরা বিশ্বাস করিনা যে স্কয়ার বা বেক্সিমকোর ঔষধ ভাল, আমাদের অভিজ্ঞতার থেকে আমরা এগুলোর উপর আস্থা রাখি। হঠাৎ করেই যদি আস্থাভাজন স্বনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কোন পণ্য গ্রহন বা সেবন করে অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে, দেখা যাবে কেউ আর সে পণ্য কিনছে না, কারণ মানুষের আস্থার জায়গাটি নষ্ট হয়ে যায়। আস্থা চিরন্তন নয়, আপনি যে কোন সময় যে কোন ব্যক্তি বা বিষয়ের উপরেই আস্থা হারাতে পারেন যদি আপনার কাছে এমন কোন যোগ্য তথ্য থাকে। স্বামী-স্ত্রী বা প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ক বিশ্বাসের নয় বরং আস্থার, তারা একে অপরের উপর আস্থা রাখেন। আপনার স্ত্রী বা প্রেমিকা আপনাকে ভালবাসে এটি কোন বিশ্বাস নয়। আপনি তার আচরণ, প্রতিশ্রুতি, সহমর্মিতা ইত্যাদি গুণ বিচারের মধ্য দিয়ে জেনে থাকেন যে সে আপনাকে ভালবাসে। কেউ আপনাকে ভালবাসে এমন আস্থা একদিনেই অর্জিত হয় না। সম্পর্কের মধ্যে আস্থা নষ্ট হবার মত কোন কারণ ঘটলেই সেখানে বিপত্তি হয়, বিচ্ছেদ হয়।

উড়োজাহাজে চড়ে, গাড়ীতে চড়ে, জাহাজে চড়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা বা এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়া যায়। এটা বিশ্বাস? উড়োজাহাজ, গাড়ী বা জাহাজ দুর্ঘটনায় পড়ে তো মানুষ প্রাণ হারায়। এটা বিশ্বাস নয়, আস্থা। মানুষ পূর্ব অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে এসব যানবাহনের উপর আস্থা রাখে, আমরা এও জানি যে দূর্ঘটনা হবার সাম্ভাবনা আছে এবং তার জন্য কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। একটি নতুন ধরণের যানবাহন তৈরি হলেই তা সাথে সাথে সাধারণের ব্যবহার্য হয় না, প্রথমে নানাভাবে তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা হয় এবং সার্বিকভাবে উপযুক্ত প্রমাণিত হলেই তা সকলের ব্যবহার্য হয়। রোগ হলে আমরা ঔষধ খাই, ঔষধে রোগ ভাল হয়, ঔষধে আমাদের আস্থা আছে। এই আস্থা অর্জনের জন্যই একটি টিকা আবিষ্কারের সাথে সাথে তা মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা হয় না, মানুষ সদৃশ্য অন্যান্য প্রানীর শরীরে তা প্রয়োগ করে পরীক্ষা করা হয় এবং তার উপযোগীতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিরুপণ করার পরেই মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা হয়। আবার ঔষধের উপাদান সমূহ ও পরিমাণ বিশ্লেষণ করেই মানুষের সেবনের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। অর্থাৎ মানুষ তথ্য-উপাত্ত আহরণ, তুলনা, বিশ্লেষণ, বিবেচনা, অভিজ্ঞতা, পরীক্ষা, পর্যবেক্ষন দিয়েই আস্থা অর্জন ও বর্জন করে থাকে। আস্থা অর্জন ও বর্জন করার জন্য প্রয়োজন হয় বুদ্ধি-বিবেচনা, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, অনুসন্ধান ইত্যাদি।

বিশ্বাস করার জন্য অজ্ঞতা বা সীমাবদ্ধতা, চিন্তার দীনতাই যথেষ্ট। বিশ্বাস বিশ্লেষণহীণ, অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক কখনও কখনও ভয়ংকর। মানুষের চিন্তা বা জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাই তাকে বিশ্বাসের দিকে ধাবিত করে। বিশ্বাসে আছে বৈপরীত্য আস্থাতে যা নেই। বিশ্বাস একটি কুসংস্কার যা বস্তুনিষ্ঠ তথ্য প্রমাণ দ্বারা বিচার সাপেক্ষ নয়। কোন বিষয়ে বিশ্বাস পোষণ করার জন্য কোন কারণের দরকার হয় না। একজন মানুষ তার জীবনে অসংখ্য বিশ্বাস লালন করেন যার কোন ভিত্তি নেই, যৌক্তিকতা নেই। মুসলিম মাত্রই বিশ্বাস করেন শূকর মাংস হারাম, খাওয়া নিষিদ্ধ, একই ভাবে হিন্দুর জন্য গো-মাংস, কিন্তু কেন? এর কারণ কি ? কোন তথ্য প্রমাণের উপর ভিত্তি করে এ সিদ্ধান্ত তারা গ্রহণ করেন? বিশ্বাসকে প্রশ্ন করলে তার কোন বস্তুনিষ্ঠ উত্তর পাওয়া যায় না। ব্যাপারটা এমন যে বিশ্বাস করি, তাই করি। অনেকেই একটি বিশ্বাসের সাথে অন্য বিশ্বাসকে তুলনা করেন, নিজের বিশ্বাসের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করেন, যা হাস্যকর। যেহেতু বিশ্বাস ভিত্তিহীন সেহেতু একটি বিশ্বাসের থেকে অন্যটি উৎকৃষ্ট বা অপকৃষ্ট হতে পারে না। ধর্ম বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত অলৌকিকতা, যা যাচাইযোগ্য নয়। মানব জাতি নানান ধর্ম বিশ্বাসে বিভক্ত যাদের একটি বিশ্বাস অন্যটিকে খারিজ করে দেয়, আবার যুক্তির বিচারে উভয় বিশ্বাসই ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয় তবু নিজের অন্ধ বিশ্বাসের শেষ্ঠত্বের লড়াই চলছেই। একজন আরেকজনের, এক সম্প্রদায় আরেক সম্প্রদায়ের, এক ধর্মের লোক অন্যধর্মের বিশ্বাস নিয়ে হাসাহাসি করে, ঠাট্টা মশকরা ও মিথ্যা মনে করে। আল্লা-ভগবান-ঈশ্বর, স্বর্গ-নরক, বেহেশত-দোজখের বিশ্বাসের মধ্য কোন পার্থক্য নেই কারণ সকল বিশ্বাসের সূত্র একই আর তা হল বিশ্লেষণহীন অন্ধভাবে মেনে নেওয়া। মুসলিমের কাছে নামাজ বেহেশতের চাবি, হিন্দুর কাছে পুজা স্বর্গের। যতসময় পর্যন্ত আমরা বেহেশত বা স্বর্গের অবস্থান বা তার তালা কিসে খোলে বা আদৌ আছে কি না তার বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-প্রমাণ না পাব ততসময় নামাজ বা পুজার মধ্য, আল্লা-ঈশ্বর-ভগবানের মধ্যে কোন তফাৎ নাই। বিশ্বাস প্রবণতা মানুষকে হিংস্র করে তুলতে পারে। নিতান্তই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে একজন আত্নঘাতী বোমা হামলা করছে, নিজে মরছে অন্যদের মারছে। কোন গ্রন্থে বিশ্বাস করে মানুষ অন্য গ্রন্থে বিশ্বাসীকে ঘৃণা করছে, নিকৃষ্ট মনে করছে। ধর্ম বিশ্বাস মাত্রই অলৌকিকত্ব বিশ্বাস, কুসংস্কারে বিশ্বাস যা তুলনাযোগ্য নয়।

বিশ্বাসের যেহেতু বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক ভিত্তি নেই ফলে মানুষ যা বিশ্বাস করে তাতে সে নিজেই আস্থা রাখে না। যেমন ধরুন, মুসলিমরা জ্বীনে, হিন্দুরা প্রেতাত্মা, খ্রিস্টানরা শয়তান বিশ্বাস করে। তারা মনে করে এরা অশরীরী এবং যেকোন রূপ ধারণ করতে পারে। মনে করুন আপনার ঘর থেকে আপনার স্ত্রীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হল। আপনি আর আপনার স্ত্রী-ছাড়া ঐ ঘরে আর কেউ থাকে না। পুলিশ আপনাকে জিজ্ঞাসাবেদের জন্য নিয়ে গেলে আপনি তাদের বললেন “খারাপ জ্বীন” বা “শয়তান” আপনার স্ত্রীকে মেরে ফেলেছে। যারা আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে তারাও ধর্মে বিশ্বাস করে কিন্তু তাদের কাছে আপনার বক্তব্য গ্রনযোগ্য হবে না, উল্টো আপনাকে আরও বেশী সন্দেহ করা হবে সাম্ভাব্য খুনী হিসেবে। এমনকি, আপনি যে রাষ্ট্রে বাস করেন তা যদি ধর্মের আইন দ্বারা শাসিতও হয় তবু আপনার কথা প্রশাসন-আদালতে গ্রহনযোগ্য হবে না। কেন? বদ জ্বীন, খারাপ আত্মা বা শয়তান কি কাউকে মারতে পারেনা? আদতে ব্যাপার হল মানুষ ধর্মের বর্ণনা অনুযায়ী জ্বীন-প্রেতে বিশ্বাস করে কিন্তু এসব যে আছে তার কোন যৌক্তিক বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই ফলে বিচারালয়ের বিশ্বাসী কর্তারা, যারা নামাজ-পূজা করেন তারাও তাতে আস্থা রাখেন না। সম্প্রতি বাংলাদেশের শেরপুরে এক বাবা তার নিজের মেয়েকে দীর্ঘদিন ধরে ধর্ষণ করেছে, আদালত তাকে যাবজ্জীবন সাজা প্রদান করেছেন। এখন এই লোক যদি দাবী করেন যে, সে নিজের মেয়েকে আসলে ধর্ষণ করতে চায় নি, শয়তান তাকে প্ররোচিত করেছে, দোষ তার নয় দোষ শয়তানের। আদালত কি তাকে মুক্তি দিবেন? কেন দিবেন না? শয়তানের কি খারাপ কাজে মন্ত্রণা দেবার ক্ষমতা নাই?

মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ বাদে পৃথিবীর অসংখ্য-অগণিত মানুষ ধর্মীয় গ্রন্থগুলোয় বিশ্বাস করে, বিশ্বাস করে তার বিধাণে, বিশ্বাস করে গ্রন্থে বর্ণিত জীবন ব্যবস্থাই সুন্দর শ্রেষ্ঠ। এটা বিশ্বাস কিন্তু এতে কেউ আস্থা রাখে না। সকলে প্রার্থনা করে, পরকালে, শেষ বিচারে বিশ্বাস করে কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র আস্থা কেউ রাখে না। যেমন বলা হয় “পৃথিবীর জীবন ক্ষণিকের, পরকালের জীবন অনন্ত”, পরকালের জীবনের নাকি কোন শেষ নেই! আবার বলা হয় “দুনিয়াতে যার সম্পদ কম আখিরাতে তার হিসাব সহজ হবে”। বাস্তবে এই বিশ্বাসীরা সৎ, অসৎ যেভাবেই হোক সম্পদের পাহাড় কি গড়ছেন না। চুরি-বাটপারি-জালিয়াতি কি বাকি রেখেছেন। তার বিশ্বাস অনুযায়ী, তার কাছে কাছে তো পরকালের জীবনটাই গুরুত্বপূর্ণ হবার কথা ছিল। তাহলে সেকি নিশ্চিত নয় যে পরকাল আছে কি না? হ্যাঁ তাই, সে যতই ধর্মের রূপকথায় বিশ্বাস করুক না কেন, সে তাতে আস্থা রাখে না। পরকালে আস্থা অর্জন করার মত কোন প্রমাণ তার কাছে নেই ফলে মুখে পরকালের কথা বললেও সকল বিশ্বাসীদের কাছে আসলে পৃথিবীর জীবনটাই গুরুত্বপূর্ণ। সৃষ্টকর্তাই নাকি রোগ দেন, উনিই নাকি আবার সারিয়ে দেন, কিন্তু রোগ হলে প্রার্থনালয়ে না গিয়ে সকলে ডাক্তারের কাছে যান। কারণ ডাক্তারি যে ফলপ্রসূ তার প্রমান আছে কিন্তু প্রার্থনার কোন ফলাফল আজও জানা যায়নি। আপনি কয়েকবার একজন ডাক্তার দেখিয়েছেন, কিন্তু রোগ সারছে না, আপনি অকপটে বলবেন তাকে আপনার ঔষধ খেয়ে আমার রোগ সারছে না, ঔষধ বদলে দিন অথবা আপনি ডাক্তার বদল করবেন। কেননা আপনি ডাক্তারকে বিশ্বাস করছেন না, চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর আপনার আস্থা রয়েছে ফলে আপনি ডাক্তার বদলাচ্ছেন, ঔষধ বদলাচ্ছেন, নানা-প্রকার পরীক্ষা করছেন। এসব কিছুই আস্থার প্রমাণ। কিন্তু ভাবুন, আপনার প্রার্থনায় কাজ না হলে কিন্তু আপনি প্রার্থনা বদলাচ্ছেন না। প্রার্থনা করে কেউ কিছু অর্জন করেছে বলে শোনা যায়নি, কিন্তু প্রার্থনা করেই চলেছে, কারণ এটা বিশ্বাস যা যৌক্তিক নয়, আস্থাভাজন নয়। যেমন ধরা যাক, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পাবলিক বাসে নানান প্রকার দোয়া লেখা থাকে, লেখা থাকে “আল্লার নামে চলিলাম”, সেগুলোকি দূর্ঘটনায় পতিত হয় না। “ফি আমানিল্লাহ” পড়ে গাড়ীতে উঠছেন তবুও তো সেটা খাদে গিয়ে পড়ছে। একটি গাড়ী কি কি কারণে দুর্ঘটনার কবলে পড়তে পারে তা বিশ্লেষন করলে বিশ্বাস, দোয়া, মন্ত্রের ব্যাপার পাওয়া যায় না, চালক নামাজ পড়েন কি পড়েন না, পূজা করেন কি করেন না তাও পাওয়া যায় না। পাওয়া যায়- গাড়ির যন্ত্রগুলো ঠিক আছে কিনা চালানোর আগে দেখে নেওয়া, চালক দক্ষ কিনা, সে কোন নেশা জাতীয় কিছু গ্রহন করেছে কিনা, চালক ট্রাফিক নিয়ম কতটুকু মানেন, আবহাওয়া কেমন ইত্যাদি। এমনও বিশ্বাস রয়েছে একটি দোয়া পড়লে ধনী হওয়া যায়, কিন্তু কেউ সেটা পড়ে পড়ে ধনী হয়েছে বলে শোনা যায়নি ফলে যিনি এই দোয়ায় বিশ্বাস করেন তিনিও ব্যবস্যা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, ঘূষ-জালিয়াতি ইত্যাতি করেই চলেন কারোন দোয়ায় বিশ্বাস থাকলেও তাতে আস্থা রাখার মত প্রমাণ মিলেনি। বিলগেটস বা ওয়ারেন বাফেট কি দোয়া পরে ধনী হয়েছেন, নাকি মুসা বিন শমসের? আগুন নেভানোর দোয়াও নাকি আছে অথচ সরকার বছরের পর বছর ফায়ার সার্ভিসে টাকা ঢেলে যাচ্ছে, এই বিশ্বাসীরাই আবার বলছে ফায়ার সার্ভিস আরও আধুনিক করতে হবে। কেন? দোয়ায় আগুন নিভলে ফায়ার সার্ভিস কেন? কেননা দোয়ায় বিশ্বাস আছে, আস্থা নেই।

অনেকেই অসবধানতা বশত বলে ফেলেন “আমি বিজ্ঞানে বিশ্বাস করি”। বিজ্ঞানে বিশ্বাস হাস্যকর। কথাটি হবে “আমি বিজ্ঞানে আস্থা রাখি”। কারণ বিশ্বাস ও বিজ্ঞান বিপরীত। বিজ্ঞান কোন বিষয়ে বিশ্বাস করেনা বা করতে বলে না। উপস্থিত তথ্য-প্রমাণ ও অভিজ্ঞতার আলোকে বিজ্ঞান সিধান্ত গ্রহন করে মাত্র। উপযুক্ত তথ্য প্রমাণের জন্য বিজ্ঞানের যে কোন সিধান্তই পরিবর্তন হতে পারে।

বিশ্বাসীরা একটি কথা বার-বার বলে থাকেন যে, “অনেক বিজ্ঞানীও তো ধর্মে বিশ্বাস করেন”। এটা সত্য কথা অনেক বিজ্ঞানীই ধর্মে বিশ্বাস করেন কিন্তু তিনি বিশ্বাস প্রক্রিয়ায় আস্থা রাখেন না। বিশ্বাসে আস্থা রাখলে কেউ বিজ্ঞানী হতে পারেন না কারণ কাউকে বিজ্ঞানী হতে হলে তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই, পূর্ব অভিজ্ঞতা অন্যান্য বিজ্ঞানীদের সম বিষয়ে মতামত ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেই একটি সিধান্ততে আসতে হয়। সৃষ্টিকর্তা করেছেন তাই হয়েছে এমন কথায় বিজ্ঞান চলে না। ফলে কোন বিজ্ঞানী ধর্মে বিশ্বাস করলেও তিনি গবেষণাগারে গিয়ে বিজ্ঞানের কোন বিষয়ে বিশ্বাস করেন না, যে বিজ্ঞানী এমনটি করেন তার বিশ্বাস এবং কর্ম বিপরীত কারণ কর্মের ক্ষেত্রে তিনি তার বিশ্বাসে আস্থা রাখেন না।

আস্থা নষ্ট হয়, পরিবর্তন হয় এবং যৌক্তিকভাবেই হয়। বিশ্বাসের পরিবর্তন হয় কি? হ্যাঁ, বিশ্বাসও পরিবর্তন হয় তবে বিশ্বাসের অসাড়তা, অন্ধকার পরিবর্তন হয় না। যেমন কেউ একটি ধর্ম ছেড়ে অন্য ধর্মে বিশ্বাস স্থাপন করলে তার বিশ্বাসের পরিবর্তন হয় কিন্তু তার পূর্বের ধর্ম বিশ্বাস আর বর্তমান ধর্ম বিশ্বাসের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, বিশ্বাসের  বিশ্লেষনহীনতা, অযৌক্তিকতা, অন্ধত্ব, অজ্ঞতা, সীবদ্ধতা থেকেই যায়।

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is not theological neutrality or artificial both-sides balance, but evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Neutrality here means methodological fairness: accurate use of sources, logical rigor, evidentiary discipline, and factual consistency. It does not mean moral indifference or equal treatment between harmful doctrines and their criticism.

Strong criticism should not be mistaken for bias if it is supported by evidence and sound reasoning.

This article should be evaluated through source quality, evidentiary strength, logical rigor, factual consistency, and fairness in representing opposing claims—not through theological sensitivity, apologetic expectations, or demand for rhetorical softness.

Leave a comment

Your email will not be published.