ইসলাম

ইসলামে বর্ণবাদ ও জাতিভেদ: বংশগত শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য

সারসংক্ষেপ

ইসলামে বর্ণবাদ, জাতিভেদ ও বংশগত বৈষম্য নেই—এমন দাবি প্রায়ই শোনা যায়। এই দাবির পক্ষে কোরআনের সূরা হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াত এবং মুহাম্মদের সেই বিখ্যাত বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়, যেখানে বলা হয়েছে, কোনো আরবের ওপর অনারবের কিংবা কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, তাকওয়া ছাড়া। নিঃসন্দেহে এসব বক্তব্য বংশ ও গায়ের রঙের ভিত্তিতে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের বিরোধিতা করে। অথচ একই ইসলামি ধর্মগ্রন্থ, হাদিস, তাফসীর এবং ধ্রুপদী আইনশাস্ত্রে এমন বহু বিধান ও ধারণা পাওয়া যায়, যেখানে মানুষের জন্মপরিচয়, বংশ, গোত্র, গায়ের রং, সামাজিক অবস্থান এবং ধর্মবিশ্বাসকে তার সম্মান, রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামাজিক অধিকার ও মর্যাদার নির্ধারক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ইসলামে মানুষের সমতার দাবি এবং এর বাস্তব ধর্মীয় ও আইনি কাঠামোর মধ্যে গভীর অসংগতি দেখা যায়।

এই অসংগতির সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হচ্ছে কুরাইশ বংশের রাজনৈতিক একাধিপত্য। যে ধর্মে আরব ও অনারবের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নেই বলে ঘোষণা করা হয়েছে, সেই ধর্মেরই একাধিক হাদিসে খিলাফতের অধিকার কুরাইশ বংশের জন্য নির্ধারিত হয়েছে। ধ্রুপদী ইসলামি রাষ্ট্রতত্ত্বে এই বংশপরিচয়কে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের যোগ্যতার শর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি যতই যোগ্য, জ্ঞানী, ন্যায়পরায়ণ ও নেতৃত্বদানে দক্ষ হোক না কেন, কেবল কুরাইশ বংশে জন্ম না নেওয়ার কারণে সে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারে। একইভাবে, একজন হাবশি ক্রীতদাসের আনুগত্য করার নির্দেশকে প্রায়ই বর্ণগত সমতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, সংশ্লিষ্ট হাদিসের ভাষা এবং ধ্রুপদী ব্যাখ্যায় দাসত্ব, কৃষ্ণাঙ্গ পরিচয় ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে কীভাবে সামাজিক নিকৃষ্টতা ও অযোগ্যতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মুহাম্মদের নিজের বংশকে আল্লাহ কর্তৃক বিশেষভাবে নির্বাচিত ও সম্মানিত ঘোষণা করার বর্ণনাগুলোও জন্মগত শ্রেষ্ঠত্বের একই ধারণাকে সামনে নিয়ে আসে।

বৈষম্যের এই প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হাদিসে শহরবাসীর বিরুদ্ধে গ্রামবাসীর সাক্ষ্য গ্রহণের নিষেধাজ্ঞা, নির্দিষ্ট গোত্রের ওপর দুর্ভিক্ষের অভিশাপ, কোনো কোনো অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ আশীর্বাদ এবং অন্য অঞ্চলের সঙ্গে অশুভ ঘটনার সম্পর্ক স্থাপনের বিবরণ পাওয়া যায়। এসব বর্ণনা মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্র ও কাজের পরিবর্তে তার গোষ্ঠীগত পরিচয়কে মূল্যায়নের ভিত্তি করে তোলে। একই সঙ্গে ইসলামি বর্ণনায় কালো ও সাদা রঙের প্রতীকী ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। পাপের কারণে হাজরে আসওয়াদের কালো হয়ে যাওয়া, মানুষের অন্তরে পাপের কালো দাগ, শাস্তিপ্রাপ্তদের মুখ কালো ও পুরস্কৃতদের মুখ উজ্জ্বল হওয়ার বর্ণনা, কালো নারীর অবয়বে মহামারীর স্বপ্ন এবং কালো কুকুরকে শয়তান বলার মতো বিবরণে কালো রঙ বারবার অশুভ, পাপ ও বিপদের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েছে। অন্যদিকে শুভ্রতা ও উজ্জ্বলতা ব্যবহৃত হয়েছে পবিত্রতা, সৌন্দর্য ও পুরস্কারের প্রতীক হিসেবে। এসব ধর্মীয় প্রতীকের সঙ্গে মানুষের গায়ের রঙকে কেন্দ্র করে সমাজে প্রচলিত সৌন্দর্যবোধ, হীনম্মন্যতা এবং বর্ণগত পূর্বধারণার সম্পর্কও গভীরভাবে বিচারযোগ্য।

বংশ ও গায়ের রঙের পাশাপাশি ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেও ইসলামি বিধানে মানুষের মধ্যে গভীর বিভাজন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কোরআনে অবিশ্বাসীদের সৃষ্টির অধম, নিকৃষ্ট জীব কিংবা চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও অধম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। হাদিসে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের আগে সালাম না দেওয়া, রাস্তায় তাদের সংকীর্ণ অংশে চলতে বাধ্য করা, মুশরিকদের সঙ্গে বসবাস নিরুৎসাহিত করা এবং আরব উপদ্বীপ থেকে অমুসলিমদের বিতাড়নের নির্দেশ পাওয়া যায়। ধ্রুপদী শরীয়তেও মুসলিম ও অমুসলিমের নাগরিক মর্যাদা, সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা, হত্যার বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক বিধান রয়েছে। জিজিয়া ও অমুসলিমদের অধস্তন অবস্থান, অমুসলিমদের আইনি অধিকার এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে উচ্ছেদ ও নিধনের বিধান নিয়ে সংশয়ের পৃথক আলোচনাগুলোয় এই বৈষম্যের প্রাতিষ্ঠানিক ও ঐতিহাসিক রূপ বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।

মানুষের জন্ম কোথায় হয়েছে, তার পূর্বপুরুষ কারা, গায়ের রঙ কেমন, সে কোন গোত্রের সদস্য কিংবা কোন ধর্মে বিশ্বাস করে—এসবের কোনোটিই তার জন্মগত শ্রেষ্ঠত্ব বা নিকৃষ্টতার প্রমাণ নয়। মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, আইনি নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও মানবিক সম্মান নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এসব পরিচয় বৈষম্যের বৈধ ভিত্তি হতে পারে না। অথচ ইসলামি ধর্মতত্ত্ব ও আইনশাস্ত্রের উল্লিখিত বিধানগুলোতে বংশগত বিশেষাধিকার, গোষ্ঠীগত শ্রেণিবিন্যাস এবং ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক অধস্তনতার সুস্পষ্ট উপস্থিতি রয়েছে। ইসলামে বর্ণগত সমতার কিছু ঘোষণা থাকলেই এই বৈষম্যমূলক বিধানগুলোর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায় না। বরং এগুলো একসঙ্গে ইসলামি সমতার দাবির একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে: মানুষকে সমান মর্যাদার অধিকারী ঘোষণা করা এবং বাস্তবে তার জন্ম, বংশ ও ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে অসম অধিকার নির্ধারণ করা পরস্পর অসংগত নীতি।


ভূমিকা

ছোটবেলা আমাদের এলাকায় একটি হিন্দু বাড়ি ছিল। সেই বাড়িতে আমার এক বন্ধুও ছিল, যার সাথে খেলাধুলা করতাম। তাদের বাসায় মাঝে মাঝেই পূজা হলে, আমি মজার মজার খাওয়ার লোভে যেতাম। তারা নানা ধরনের ফলমূল এবং লাড্ডু খেতে দিতো। অবাক হয়ে লক্ষ্য করতাম, অন্য হিন্দু ছেলেমেয়েদের বাটিতে খাবার দিলেও, আমাকে দেওয়া হতো কলাপাতার ওপর। তখন বিষয়টি বুঝতাম না, কিন্তু ছোট মানুষ হলেও এতে খানিকটা আত্মসম্মানে লাগতো। পরে বুঝেছিলাম, মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়ার কারণে আমি ছিলাম তাদের চোখে নিচু জাতের মানুষ। তারা ছিল ব্রাহ্মণ, অর্থাৎ হিন্দু বর্ণব্যবস্থায় সবচেয়ে উঁচু বর্ণের মানুষ। প্রচলিত হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে ব্রাহ্মণদের সৃষ্টি হয়েছে ব্রহ্মার মুখ থেকে। তাদের জাতপাত ও ছোঁয়াছুঁয়ির ধারণা অনুসারে, আমি তাদের ব্যবহৃত থালাবাসন ব্যবহার করলে, এমনকি স্পর্শ করলেও, সেইসব থালাবাসন অপবিত্র হয়ে যাবে। আমি এতটাই অপবিত্র যে, আমার ছায়াও নাকি মাড়ানো যাবে না। এরকম আরও নানা ধরনের কেচ্ছা, যা অত্যন্ত সাম্প্রদায়িক এবং নিচু মনমানসিকতার প্রকাশ। সেই সময়ে ভাবতাম, এগুলো হিন্দুধর্মের কুসংস্কার। ইসলামে এসব নেই। মানুষের জন্ম কোথায়, কোন পরিবারে, কোন ধর্মের অনুসারী পিতামাতার ঘরে, তার ওপর নির্ভর করে তার সম্মান ও মর্যাদা নির্ধারণের এই নিয়মগুলো অত্যন্ত অমানবিক এবং মানুষ হিসেবে আমাদের লজ্জিত করে। একজন শিশু পৃথিবীতে জন্ম নেওয়ার সময় নিজের ধর্ম, বংশ, জাতি, গোত্র কিংবা গায়ের রং নির্বাচন করতে পারে না। অথচ জন্মের পরপরই সমাজ তার ওপর এমন কিছু পরিচয় চাপিয়ে দেয়, যার ভিত্তিতে তাকে সম্মানিত কিংবা অপমানিত করা হয়। যে শিশুটি কোনো অপরাধ করেনি, কোনো অন্যায় করেনি, সে কেবল একটি নির্দিষ্ট পরিবারে জন্ম নেওয়ার কারণে অন্যের চোখে অপবিত্র বা নিকৃষ্ট হয়ে যায়। এর চেয়ে অযৌক্তিক এবং অমানবিক সামাজিক ব্যবস্থা আর কী হতে পারে?

এটি অবশ্যই সত্য যে, ইসলামে হিন্দু বর্ণব্যবস্থার মতো ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের নির্দিষ্ট চার-বর্ণের ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাস নেই। ইসলাম ধর্ম এই দিক দিয়ে অনেকটা মুক্ত। সেই সাথে, ইসলামে মুসলিমদের মধ্যে জাতি, গোত্র, বংশ এবং গায়ের রঙের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের বিরুদ্ধেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রয়েছে। বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশে শত শত বছর ধরে জাতিভেদের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত বহু দলিত ও নিম্নবর্ণের হিন্দুর কাছে ইসলামের সমতার ধারণা আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। সামাজিক অপমান ও বংশগত অধস্তনতা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও অনেকের ইসলাম গ্রহণের একটি কারণ ছিল। কিন্তু একইসাথে এটিও সত্য যে, ইসলামের ভেতরে জাতিভেদ, বংশগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং গোষ্ঠীগত বৈষম্যের বিষও রয়েছে, খুব ভালোভাবেই। ইসলামের কিছু বক্তব্যে মানুষের সমতার কথা বলা হলেও, অন্য অনেক বক্তব্যে নির্দিষ্ট বংশকে শাসনক্ষমতার অধিকারী, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে অধিক সম্মানিত এবং নির্দিষ্ট ধর্মবিশ্বাসের মানুষদের নিকৃষ্ট বা অধস্তন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে কেবল সমতার কথাগুলো প্রচার করে ইসলামকে সম্পূর্ণ বর্ণবাদমুক্ত ও বৈষম্যহীন ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করা হলে, ধর্মটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়াল করা হয়।

বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে, যখন এসব শ্রেষ্ঠত্ব ও নিকৃষ্টতার ধারণা কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ধর্মীয় বিধান এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভিত্তিতে পরিণত হয়। একজন মানুষ কুরাইশ বংশে জন্ম নিয়েছেন বলেই তিনি খিলাফতের বিশেষ দাবিদার হবেন, অথচ অন্য বংশের একজন অধিক যোগ্য মানুষ সেই একই অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন—এটি কীভাবে মানুষের সমতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে? একজন কৃষ্ণাঙ্গ হাবশি দাসের আনুগত্য করতে বলা হচ্ছে, অথচ সেই দাসের পরিচয় ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেন সে সমাজের সবচেয়ে অযোগ্য ও তুচ্ছ একজন মানুষ। আবার কোথাও শহরবাসী ও গ্রামবাসীর সাক্ষ্যের মধ্যে পার্থক্য করা হচ্ছে, কোথাও নির্দিষ্ট গোত্রের মানুষের ওপর দুর্ভিক্ষের অভিশাপ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে একদল মানুষকে অন্য দলের তুলনায় কম সামাজিক ও আইনি মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে। এসবের কেন্দ্রে রয়েছে একই সমস্যা—মানুষের ব্যক্তিগত যোগ্যতা, চরিত্র, কাজ এবং আচরণের পরিবর্তে তার জন্মগত বা গোষ্ঠীগত পরিচয়কে বিশেষ সুবিধা কিংবা বঞ্চনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা।

বর্ণবাদ শুধু কাউকে সরাসরি নিকৃষ্ট বলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কোনো জনগোষ্ঠীকে জন্মগতভাবে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করা, কোনো বিশেষ বংশের জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতা সংরক্ষিত রাখা, কোনো মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে অবজ্ঞার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের অধিকার ও সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করাও বৈষম্যমূলক চিন্তার প্রকাশ। বর্ণগত, বংশগত ও ধর্মীয় বৈষম্যের ধরন এক নয়, কিন্তু এসবের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে কৃত্রিম উচ্চ-নীচের শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করা সম্ভব। একইভাবে ধর্মীয় কাহিনি, উপমা এবং প্রতীকেও একটি সমাজের মূল্যবোধ ও পূর্বধারণা প্রকাশ পেতে পারে। পাপ, অশুভ, অপবিত্রতা এবং শাস্তির সঙ্গে বারবার কালো রঙের সম্পর্ক স্থাপন করা এবং পবিত্রতা, সৌন্দর্য ও পুরস্কারের সঙ্গে শুভ্রতার সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টিও সেই কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এসব ধারণা কীভাবে মানুষের মনোজগতে প্রভাব বিস্তার করে, তার উদাহরণ আমাদের সমাজের প্রচলিত সৌন্দর্যবোধ, সাহিত্য, গণমাধ্যম এবং দৈনন্দিন ভাষার মধ্যেও পাওয়া যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষের সমতা বলতে আসলে কী বোঝায়? একজন মানুষের গায়ের রঙ, বংশ কিংবা জাতি নিয়ে তাকে অপমান করা নিষিদ্ধ করলেই কি সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়, যদি একইসাথে অন্য কোনো বিধানে তার জন্মপরিচয়ের কারণে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধিকার সীমিত করা হয়? মানুষের বংশ নিয়ে অহংকার করতে নিষেধ করা হলেও, সেই একই ধর্মীয় ব্যবস্থায় কোনো বিশেষ বংশকে আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত ও অধিক মর্যাদাসম্পন্ন বলে ঘোষণা করা হলে, সেখানে বংশগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা কি বিলুপ্ত হয়? আবার, একদিকে সব মানুষকে একই পূর্বপুরুষের সন্তান বলা হলেও, অন্যদিকে ধর্মবিশ্বাসের কারণে একদল মানুষকে সৃষ্টির অধম ঘোষণা করা হলে, সেই সমতার নৈতিক ভিত্তিই বা কোথায় থাকে? মানুষের সমান মর্যাদার দাবি এবং পরিচয়ভিত্তিক অসম অধিকার প্রতিষ্ঠার বিধান পরস্পর সাংঘর্ষিক। জন্মগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা কেবল এই কারণে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না যে, সেটিকে কোনো ধর্মগ্রন্থ, নবী কিংবা ধর্মীয় আইনবিদের কর্তৃত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

আমার ছোটবেলার সেই হিন্দু বন্ধুর বাড়িতে কলাপাতায় খাবার দেওয়ার ঘটনা আজও মনে পড়ে। তখন ভেবেছিলাম, মানুষকে জন্মপরিচয়ের কারণে অপমান করার এমন অমানবিক ধারণা কেবল অন্য ধর্মের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ইসলামি ধর্মগ্রন্থ, হাদিস, তাফসীর এবং শরীয়তের বিধানগুলো পড়তে গিয়ে বুঝেছি, জন্মগত শ্রেষ্ঠত্ব, গোত্রাভিমান, ধর্মীয় বৈষম্য এবং মানুষের মধ্যে উচ্চ-নীচের বিভাজন ইসলামের মধ্যেও গভীরভাবে উপস্থিত। কারও কাছে এসব ধারণা পবিত্র ধর্মীয় বিধান হতে পারে, কিন্তু পবিত্র বলে বিশ্বাস করলেই কোনো বৈষম্যমূলক বিধান ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। একজন মানুষকে তার নিজের কাজের পরিবর্তে তার বংশ, গায়ের রং কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করার মধ্যে যে অবিচার রয়েছে, তা ব্রাহ্মণদের জাতপাতের বিধানে থাকলেও অবিচার, কুরাইশদের বংশগত শ্রেষ্ঠত্বের বিধানে থাকলেও অবিচার। মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো ধর্ম, জাতি, বংশ কিংবা গোত্রের জন্য আলাদা নৈতিক মানদণ্ড থাকতে পারে না।


জাতিভেদ বা বর্ণবাদ কাকে বলে?

বর্ণবাদ হচ্ছে এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্বাস, সামাজিক ব্যবস্থা বা চর্চা, যেখানে মানুষকে তার গায়ের রং, জাতিগত পরিচয়, বংশপরিচয় কিংবা পূর্বপুরুষের ভিত্তিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে কোনো গোষ্ঠীকে অন্য গোষ্ঠীর তুলনায় জন্মগতভাবে শ্রেষ্ঠ বা নিকৃষ্ট বলে বিবেচনা করা হয়। এই ধারণা অনুসারে, কোনো কোনো জনগোষ্ঠী অন্যদের তুলনায় বেশি বুদ্ধিমান, বেশি যোগ্য, অধিক সভ্য কিংবা শাসন করার জন্য জন্মগতভাবেই উপযুক্ত; অন্যদিকে কিছু জনগোষ্ঠী স্বভাবগতভাবেই কম যোগ্য, অধস্তন কিংবা শাসিত হওয়ার উপযুক্ত। বর্ণবাদ কখনো গায়ের চামড়ার রং দিয়ে হতে পারে, কখনো জাতিগত পরিচয় দিয়ে, কখনো বংশ বা গোত্র দিয়ে, আবার কখনো বংশানুক্রমিক সামাজিক অবস্থান দিয়ে হতে পারে। এসব ধারণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, একজন মানুষকে তার ব্যক্তিগত যোগ্যতা, চরিত্র, বুদ্ধিমত্তা বা কাজের ভিত্তিতে বিচার না করে, সে কোন জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত কিংবা কোন পরিবারে জন্ম নিয়েছে, তার ভিত্তিতে তার সম্মান, মর্যাদা, অধিকার ও সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করা। কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীকে অন্যদের ওপর শাসন করার জন্মগত অধিকার দেওয়া, অন্য জনগোষ্ঠীর ওপর তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা কিংবা মানুষের বংশপরিচয়ের ভিত্তিতে আইনগত ও রাজনৈতিক অধিকার নির্ধারণ করা এই বৈষম্যমূলক চিন্তারই প্রকাশ।

বর্ণবাদ, জাতিভেদ, গোত্রবাদ এবং ধর্মীয় বৈষম্য পরস্পর সম্পর্কিত হলেও এগুলোর অর্থ সম্পূর্ণ এক নয়। বর্ণবাদ সাধারণত মানুষের কথিত জাতিগত বা বংশগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব ও নিকৃষ্টতার ধারণাকে বোঝায়। জাতিভেদ বা বর্ণপ্রথা হচ্ছে জন্মসূত্রে নির্ধারিত সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস, যেখানে একজন মানুষের পরিবার ও বংশ তার সামাজিক অবস্থান, বিবাহের সুযোগ, পেশা কিংবা অধিকার নির্ধারণ করতে পারে। গোত্রবাদ হচ্ছে নিজের গোত্রকে অন্য গোত্রের তুলনায় বিশেষ সুবিধা, আনুগত্য বা ক্ষমতার অধিকারী বিবেচনা করার প্রবণতা। অন্যদিকে, ধর্মীয় বৈষম্য হচ্ছে কারও ধর্মবিশ্বাস বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাকে অসম অধিকার, সুযোগ কিংবা মর্যাদা দেওয়া। একজন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে তার গায়ের রঙের কারণে চাকরি না দেওয়া বর্ণগত বৈষম্য; একজন দলিতকে জন্মপরিচয়ের কারণে অস্পৃশ্য বিবেচনা করা জাতিভেদ; একটি বিশেষ বংশের জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতা সংরক্ষিত রাখা বংশগত বিশেষাধিকার; আর একজন অমুসলিমকে শুধু ধর্মপরিচয়ের কারণে একজন মুসলিমের তুলনায় কম আইনগত অধিকার দেওয়া ধর্মীয় বৈষম্য। এসবের শ্রেণিগত পার্থক্য থাকলেও মানুষের ব্যক্তিগত যোগ্যতার পরিবর্তে তার গোষ্ঠীগত পরিচয়ের ভিত্তিতে অসম মর্যাদা বা অধিকার নির্ধারণ করার নৈতিক সমস্যাটি একই।

জাতিসংঘের ১৯৬৫ সালের বর্ণবৈষম্য বিলোপবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে জাতি, গায়ের রং, বংশপরিচয় এবং জাতীয় বা জাতিগত উৎসের ভিত্তিতে এমন পার্থক্য, বর্জন, বিধিনিষেধ বা বিশেষ সুবিধাকে বর্ণবৈষম্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য বা ফলাফল হচ্ছে মানুষের সমানভাবে মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা ভোগের সুযোগ ক্ষুণ্ণ করা। অর্থাৎ বর্ণবৈষম্য চিহ্নিত করার জন্য কেবল প্রকাশ্য ঘৃণা, গালাগালি বা শারীরিক নির্যাতনের উপস্থিতি প্রয়োজন হয় না। কোনো আইনে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ রাজনৈতিক অধিকার সংরক্ষণ করা হলে, অথবা অন্য জনগোষ্ঠীকে তার জন্মপরিচয়ের কারণে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলে, সেখানেও বৈষম্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক সনদটির ভূমিকায় জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের মতবাদকে বৈজ্ঞানিকভাবে মিথ্যা, নৈতিকভাবে নিন্দনীয় এবং সামাজিকভাবে অন্যায় ও বিপজ্জনক বলা হয়েছে। [1]

Any doctrine of superiority based on racial differentiation is scientifically false, morally condemnable, socially unjust and dangerous.

বাংলা অনুবাদ: জাতিগত পার্থক্যের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্বের যেকোনো মতবাদ বৈজ্ঞানিকভাবে মিথ্যা, নৈতিকভাবে নিন্দনীয়, সামাজিকভাবে অন্যায় এবং বিপজ্জনক।

আধুনিক জীববিজ্ঞানও মানুষকে কয়েকটি পৃথক, বিশুদ্ধ এবং জন্মগতভাবে উচ্চ-নীচ জাতিতে বিভক্ত করার ধারণাকে সমর্থন করে না। মানুষের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে জিনগত ও শারীরিক বৈচিত্র্য অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু সেই বৈচিত্র্য প্রচলিত বর্ণগত শ্রেণিবিভাগের সীমানা অনুসরণ করে না। গায়ের রং, চুলের ধরন, মুখের গঠন বা আঞ্চলিক বংশপরিচয় দিয়ে কোনো মানুষের বুদ্ধিমত্তা, নৈতিকতা কিংবা শাসনক্ষমতা নির্ধারণ করা যায় না। মানুষের গায়ের রঙের বৈচিত্র্যের পেছনে বিবর্তন, পরিবেশগত অভিযোজন এবং জিনগত উত্তরাধিকারের ভূমিকা রয়েছে। কোনো জনগোষ্ঠীর গায়ের রং গাঢ় হওয়া তাকে কম বুদ্ধিমান কিংবা কম সভ্য করে না; আবার কারও গায়ের রং হালকা হওয়া তাকে অধিক ন্যায়পরায়ণ বা শাসনক্ষমতার জন্য যোগ্য করে তোলে না। আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব বায়োলজিক্যাল অ্যানথ্রোপোলজিস্টস ২০১৯ সালে প্রকাশিত বিবৃতিতে মানুষের কথিত বর্ণগত শ্রেণিবিভাগকে মানবজাতির প্রকৃত জীববৈজ্ঞানিক বৈচিত্র্যের যথাযথ প্রতিফলন নয় বলে উল্লেখ করেছে। [2]

Humans are not divided biologically into distinct continental types or racial genetic clusters.

বাংলা অনুবাদ: মানুষ জীববৈজ্ঞানিকভাবে পৃথক মহাদেশীয় ধরন কিংবা স্বতন্ত্র বর্ণগত জিনগত গোষ্ঠীতে বিভক্ত নয়।

বর্ণবাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, এটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য সবসময় কাউকে প্রকাশ্যে অপমান বা আঘাত করার প্রয়োজন পড়ে না। একজন ব্যক্তি মনে করতে পারেন, তার বংশের মানুষরা জন্মগতভাবেই বেশি সম্মানিত কিংবা নেতৃত্বের জন্য বিশেষভাবে নির্বাচিত। তিনি হয়তো অন্য বংশের মানুষদের সরাসরি ঘৃণা করেন না, তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্কও বজায় রাখেন। কিন্তু একইসাথে তিনি যদি বিশ্বাস করেন যে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে কেবল তার নিজের বংশের মানুষদেরই অধিকার রয়েছে, তাহলে তার বিশ্বাসের মধ্যে বংশগত বিশেষাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কারণ সেখানে একজন মানুষের যোগ্যতার চেয়ে তার জন্মপরিচয়কে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে। কাউকে নিকৃষ্ট ঘোষণা করেই কেবল বৈষম্য সৃষ্টি হয় না; কোনো গোষ্ঠীকে জন্মগতভাবে অন্যদের চেয়ে বেশি অধিকারী ঘোষণা করলেও বৈষম্য সৃষ্টি হয়। একইভাবে অন্যদের প্রতি ব্যক্তিগত বিদ্বেষ না থাকলেও একটি আইন বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান বৈষম্যমূলক হতে পারে, যদি সেটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা এবং অন্যদের জন্য অযৌক্তিক বাধা তৈরি করে।

বিষয়টি আরও সহজভাবে বোঝা যায় একটি উদাহরণ থেকে। মনে করুন, একটি দেশের সংবিধানে লেখা হলো, সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে হলে অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট পরিবারের সদস্য হতে হবে। সেই পরিবারের সদস্যরা জন্মগতভাবেই শাসন করার জন্য অধিক যোগ্য। অন্য যেকোনো পরিবারের মানুষ যতই মেধাবী, অভিজ্ঞ, শিক্ষিত বা ন্যায়পরায়ণ হোক না কেন, সে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। এমন একটি বিধান নিঃসন্দেহে বংশগত বৈষম্য। কারণ, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতার সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের সন্তান হওয়ার যৌক্তিক সম্পর্ক নেই। একজন মানুষের নেতৃত্বের দক্ষতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, বিচারবুদ্ধি কিংবা ন্যায়পরায়ণতা তার বংশপরিচয় দিয়ে প্রমাণিত হয় না। একইভাবে একটি নির্দিষ্ট গোত্রকে ঐশ্বরিকভাবে নির্বাচিত শাসকগোষ্ঠী ঘোষণা করা হলেও তার বংশগত বিশেষাধিকার প্রতিষ্ঠার সমস্যাটি অপরিবর্তিত থাকে। ঈশ্বরের নামে দাবি করা হয়েছে বলেই কোনো রাজনৈতিক বিশেষাধিকার যুক্তিসংগত হয়ে যায় না। সেই দাবির পক্ষে স্বাধীন প্রমাণ এবং নৈতিক যৌক্তিকতা প্রয়োজন।

এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে, মানুষের মধ্যে বাস্তব যোগ্যতার পার্থক্য এবং জন্মপরিচয়ের ভিত্তিতে আরোপিত শ্রেষ্ঠত্ব এক বিষয় নয়। একজন মানুষ অন্যজনের তুলনায় বেশি শিক্ষিত হতে পারেন, বেশি অভিজ্ঞ হতে পারেন, কোনো বিশেষ দায়িত্ব পালনে অধিক দক্ষ হতে পারেন। এসব পার্থক্য বাস্তব এবং প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাইযোগ্য। একজন দক্ষ চিকিৎসককে চিকিৎসার দায়িত্ব দেওয়া কিংবা একজন প্রশিক্ষিত প্রকৌশলীকে সেতু নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া যুক্তিসংগত, কারণ সেই দায়িত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অর্জিত যোগ্যতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু চিকিৎসকের সন্তান বলেই কেউ দক্ষ চিকিৎসক হয়ে যায় না, কিংবা বিচারকের সন্তান বলেই কেউ ন্যায়বিচার করার জন্মগত ক্ষমতা অর্জন করে না। একজন যোগ্য ব্যক্তির সন্তান অযোগ্য হতে পারে, আবার সামাজিকভাবে অবহেলিত কোনো পরিবারের সন্তান অসাধারণ মেধাবী হতে পারে। বংশগত বিশেষাধিকারের ধারণা এই সাধারণ সত্যকেই অস্বীকার করে। এটি ব্যক্তির নিজের অর্জনের পরিবর্তে তার পূর্বপুরুষের পরিচয়কে অধিকার ও ক্ষমতার ভিত্তি বানায়।

বর্ণবাদের ইতিহাসে এর সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণগুলোর একটি হচ্ছে হিটলার এবং নাৎসি জার্মানি। হিটলার ও নাৎসিরা মনে করতো, জার্মান জাতির কথিত আর্য জনগোষ্ঠী বিশুদ্ধ রক্তের অধিকারী এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর তুলনায় জন্মগতভাবে শ্রেষ্ঠ। তাদের ধারণা অনুসারে, মানুষের বুদ্ধিমত্তা, সৃজনশীলতা, নৈতিক চরিত্র এবং সভ্যতা গড়ে তোলার ক্ষমতা বংশগত জাতিগত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভরশীল। তারা নিজেদের আর্য জাতির বিশুদ্ধ উত্তরসূরি হিসেবে প্রচার করতো এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীকে তাদের কথিত রক্তের বিশুদ্ধতার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতো। বিশেষত ইহুদিদের তারা একটি পৃথক ও নিকৃষ্ট জাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। নাৎসি মতাদর্শে ইহুদিবিদ্বেষ কেবল ধর্মীয় মতপার্থক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; ইহুদিদের পূর্বপুরুষ ও বংশপরিচয়কে তাদের স্থায়ী জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তি বানানো হয়েছিল। ফলে একজন ইহুদি ধর্ম পালন না করলেও, এমনকি অন্য ধর্ম গ্রহণ করলেও, নাৎসিদের বংশগত শ্রেণিবিন্যাসে তার ওপর আরোপিত পরিচয় বিলুপ্ত হতো না।

এই বর্ণবাদী মতাদর্শকে নাৎসিরা রাষ্ট্রীয় আইন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিণত করেছিল। ১৯৩৫ সালের নুরেমবার্গ আইন অনুসারে ইহুদিদের পূর্ণ নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয় এবং ইহুদি ও কথিত জার্মান রক্তের মানুষের মধ্যে বিবাহ ও যৌনসম্পর্ক নিষিদ্ধ করা হয়। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের আইন নির্ধারণ করে দিয়েছিল কার পূর্বপুরুষের পরিচয় কী, সেই পরিচয়ের ভিত্তিতে কে পূর্ণ নাগরিক হওয়ার যোগ্য এবং কার সঙ্গে কে বিবাহ করতে পারবে। পরবর্তী সময়ে ইহুদি ও অন্যান্য নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করা, তাদের সম্পত্তি ও জীবিকার ওপর আঘাত হানা, নিজ এলাকা থেকে উৎখাত করা এবং শেষ পর্যন্ত গণহত্যার মাধ্যমে নাৎসি বর্ণবাদ তার ভয়াবহ পরিণতিতে পৌঁছায়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় অধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যক্তির কাজ কিংবা যোগ্যতার পরিবর্তে তার বংশগত পরিচয়কে আইনগত মানদণ্ডে পরিণত করা হয়েছিল। জন্মপরিচয়ের ভিত্তিতে মানবিক মর্যাদার শ্রেণিবিন্যাস যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভ করে, তখন সেই ধারণা নিছক ব্যক্তিগত কুসংস্কার থাকে না; তা মানুষের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং জীবনের ওপর প্রত্যক্ষ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে। [3]

The Nuremberg Race Laws defined Jews in racial terms. The laws proclaimed that Jews could not be citizens and restricted who Jews could marry.

বাংলা অনুবাদ: নুরেমবার্গের বর্ণগত আইনগুলো ইহুদিদের জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করেছিল। এসব আইনে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, ইহুদিরা নাগরিক হতে পারবে না এবং তারা কাদের সঙ্গে বিবাহ করতে পারবে, তার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।

হিন্দুধর্মের বর্ণপ্রথার মধ্যেও এই অঞ্চলের মানুষ হাজার বছর ধরে জন্মগত বৈষম্যের শিকার হয়েছে। হিন্দু সমাজের প্রচলিত বর্ণব্যবস্থায় ব্রাহ্মণদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় মর্যাদা এবং ক্ষত্রিয়দের রাজশক্তি ও সামরিক কর্তৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে। বৈশ্য ও শূদ্রদের জন্য পৃথক সামাজিক ও পেশাগত অবস্থান নির্ধারিত ছিল। এই ব্যবস্থায় একজন মানুষ কোন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে, কোন বর্ণ বা বংশের অন্তর্ভুক্ত, তার ওপর ভিত্তি করে তার সামাজিক মর্যাদা এবং নানা ক্ষেত্রে অধিকার নির্ধারিত হতো। ব্রাহ্মণদের জন্য যেসব বিশেষ সম্মান ও সুবিধা নির্ধারিত ছিল, শূদ্র বা তথাকথিত অস্পৃশ্য জনগোষ্ঠীর জন্য সেই একই অবস্থান স্বীকৃত ছিল না। ধর্মীয় আচার, সামাজিক মেলামেশা, বিবাহ, শিক্ষা এবং পেশার ক্ষেত্রে বংশগত পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠেছিল। সবচেয়ে অমানবিক ব্যাপার ছিল, কোনো মানুষের জন্মগত সামাজিক পরিচয়কে তার পবিত্রতা বা অপবিত্রতার মানদণ্ডে পরিণত করা। একজন মানুষ কী করেছেন, তার চরিত্র কেমন, তিনি কতটা সৎ কিংবা মেধাবী, সেসবের পরিবর্তে তিনি কার সন্তান, সেই পরিচয়ের ভিত্তিতে তার প্রতি আচরণ নির্ধারণ করা হতো।

জাতিভেদ প্রথার সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতিগুলোর একটি হচ্ছে অস্পৃশ্যতা। কোনো মানুষকে কেবল তার জন্মপরিচয়ের কারণে স্পর্শের অযোগ্য, অপবিত্র কিংবা সামাজিকভাবে অধম বিবেচনা করা মানুষের মৌলিক মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। একজন উচ্চবর্ণের মানুষ অন্য একজনকে স্পর্শ করলে অপবিত্র হয়ে যাবেন, একই পাত্রে খাবার খেলে ধর্মীয় শুচিতা নষ্ট হবে কিংবা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মানুষের মন্দির, কূপ অথবা সামাজিক প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের অধিকার থাকবে না—এমন বিশ্বাস মানুষের মধ্যে কৃত্রিম উচ্চ-নীচের বিভাজন তৈরি করে। এখানে ব্যক্তির অপরাধ কিংবা নৈতিক চরিত্রের কোনো প্রশ্ন নেই। একজন নবজাতকও কেবল একটি তথাকথিত নিম্নবর্ণের পরিবারে জন্মগ্রহণ করার কারণে সামাজিকভাবে অধস্তন হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। জন্মের আগে কেউ নিজের পিতামাতা নির্বাচন করতে পারে না, অথচ জন্মের পর তার জন্য নির্ধারিত হয়ে যায় সমাজে তার অবস্থান। এরকম ব্যবস্থা মানুষকে তার নিজের কাজের জন্য নয়, পূর্বপুরুষের পরিচয়ের জন্য পুরস্কৃত কিংবা দণ্ডিত করে। এটি ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ বিপরীত।

ভারতীয় উপমহাদেশে এই অমানবিক বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকর। তিনি নিজেও দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন এবং জন্মগত জাতিভেদের নিষ্ঠুরতা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ভারতীয় সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে তিনি স্বাধীন ভারতের সাংবিধানিক কাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন। ভারতের সংবিধানের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ ও জন্মস্থানের ভিত্তিতে রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিকদের সঙ্গে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই অনুচ্ছেদে দোকান, রেস্তোরাঁ, হোটেল এবং জনসাধারণের ব্যবহারের নির্দিষ্ট স্থানে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রেও এসব পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিধান রয়েছে। ফলে মানুষের জন্মপরিচয়কে সামাজিক ও নাগরিক অধিকার নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করার প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। [4]

(1) The State shall not discriminate against any citizen on grounds only of religion, race, caste, sex, place of birth or any of them.

বাংলা অনুবাদ: (১) রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের সঙ্গে কেবল ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, জন্মস্থান কিংবা এগুলোর যেকোনো একটির ভিত্তিতে বৈষম্য করতে পারবে না।

ভারতের সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে অস্পৃশ্যতা প্রথাকে সরাসরি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে এবং যেকোনো রূপে এর চর্চা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অস্পৃশ্যতার কারণে কারও ওপর সামাজিক বা নাগরিক অক্ষমতা চাপিয়ে দেওয়াকে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে। এখানে একটি মৌলিক নৈতিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যে সমাজে একসময় কোনো ব্যক্তিকে স্পর্শ করাকেও অপবিত্রতার কারণ বলে বিবেচনা করা হতো, সেই রাষ্ট্রের সাংবিধানিক নীতিতে অস্পৃশ্যতার ধারণাকেই অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। জন্মগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে অস্পৃশ্য ঘোষণা করার অধিকার কারও নেই। একটি ধর্মীয় বিশ্বাস শত শত বছর ধরে সমাজে প্রচলিত থাকলেও সেটি মানুষের মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধে গেলে তার আইনগত বৈধতা অস্বীকার করা সম্ভব। [5]

“Untouchability” is abolished and its practice in any form is forbidden.

বাংলা অনুবাদ: অস্পৃশ্যতা বিলুপ্ত করা হলো এবং যেকোনো রূপে এর চর্চা নিষিদ্ধ করা হলো।

বর্ণবাদ ও জাতিভেদের বিরুদ্ধে আধুনিক মানবাধিকারের ধারণার ভিত্তি হচ্ছে, প্রতিটি মানুষ জন্মগতভাবে সমান মানবিক মর্যাদার অধিকারী। এই সমতা বলতে সকল মানুষের বুদ্ধিমত্তা, শারীরিক শক্তি, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা কিংবা ব্যক্তিগত চরিত্র একরকম—এমন কোনো অবৈজ্ঞানিক দাবি বোঝায় না। মানুষে মানুষে নানা ধরনের বাস্তব পার্থক্য রয়েছে এবং থাকবে। কিন্তু এসব পার্থক্যের কোনোটিই একটি সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীকে জন্মগতভাবে শাসক এবং অন্য জনগোষ্ঠীকে জন্মগতভাবে শাসিত ঘোষণা করার অধিকার দেয় না। একইভাবে কোনো মানুষের গায়ের রং, পিতামাতার ধর্ম, বংশের নাম কিংবা পূর্বপুরুষের পরিচয় তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অধিক সম্মানিত বা নিকৃষ্ট করে না। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধিকার, আইনের সুরক্ষা, সামাজিক সম্মান এবং মৌলিক স্বাধীনতা মানুষের জন্য সমানভাবে স্বীকৃত হওয়া প্রয়োজন। ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর বাস্তব বৈষম্য দূর করার জন্য বিশেষ সহায়তা দেওয়া এবং কোনো বংশকে জন্মগতভাবে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করা এক বিষয় নয়। প্রথমটির উদ্দেশ্য অসম সুযোগ কমানো; দ্বিতীয়টি জন্মপরিচয়কে বিশেষাধিকারের ভিত্তিতে পরিণত করে।

বর্ণবাদ কেবল আইন, রাষ্ট্রক্ষমতা কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই প্রকাশ পায় না; মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় কাহিনি এবং দৈনন্দিন আচরণের মধ্যেও এর উপস্থিতি থাকতে পারে। কোনো জনগোষ্ঠীর শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে বারবার তুচ্ছতা, অযোগ্যতা কিংবা কুৎসিত হওয়ার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করলে সেই জনগোষ্ঠী সম্পর্কে নেতিবাচক সামাজিক ধারণা শক্তিশালী হতে পারে। একজন মানুষের গায়ের রঙের সঙ্গে তার নৈতিক চরিত্রের কোনো সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও, নির্দিষ্ট রঙকে ঘৃণা, অশুভ বা অপবিত্রতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করার সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। একইভাবে একটি নির্দিষ্ট বংশকে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী এবং অন্য বংশগুলোকে অপেক্ষাকৃত কম মর্যাদার বলে বিবেচনা করার ধারণা দীর্ঘদিন প্রচলিত থাকলে, সমাজে বংশগত শ্রেষ্ঠত্বের মনোভাব স্বাভাবিক বলে গৃহীত হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে একটি বক্তব্যের আক্ষরিক অর্থের পাশাপাশি তার সামাজিক ব্যবহার, ক্ষমতার সম্পর্ক এবং মানুষের আচরণের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ।

সুতরাং, কোনো ধর্ম বা মতাদর্শ বর্ণবাদ ও জাতিভেদের বিরোধী কি না, সেটি কেবল সেই ধর্মের দু-একটি সুন্দর বক্তব্য দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। মানুষের সমতার কথা ঘোষণা করার পাশাপাশি সেই একই ধর্মীয় ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট বংশের জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতা সংরক্ষিত থাকলে, সেখানে বংশগত বিশেষাধিকার বিদ্যমান। মানুষের গায়ের রং দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করতে নিষেধ করার পরেও কোনো জনগোষ্ঠীর শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে নিকৃষ্টতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হলে, সেই বক্তব্যের মধ্যেও অবমাননাকর পূর্বধারণা থাকতে পারে। আবার সকল মানুষকে একই পূর্বপুরুষের সন্তান হিসেবে ঘোষণা করার পরেও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে তাদের আইনি অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা অসমভাবে নির্ধারণ করা হলে, সেখানে ধর্মীয় বৈষম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষের সমতার প্রকৃত মানদণ্ড হচ্ছে, কারও জন্ম, বংশ, গোত্র, গায়ের রং কিংবা ধর্মীয় পরিচয় তাকে অন্য মানুষের তুলনায় জন্মগতভাবে অধিক ক্ষমতা, অধিকার বা মানবিক মর্যাদার দাবিদার করে তোলে কি না। কোনো বিশেষ ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পেলেই এই বৈষম্য ন্যায়সংগত হয়ে যায় না।


বর্ণবাদী মানসিকতা: মুখে সমতার ঘোষণা, বাস্তবে বৈষম্যের প্রতিষ্ঠা

বর্ণবাদ বা জাতিভেদ বলতে আমরা সাধারণত বুঝি, একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে তার গায়ের রং, বংশ, গোত্র কিংবা জন্মপরিচয়ের কারণে ঘৃণা করছে, নিচু জাত বলে অপমান করছে, অথবা তার সাথে প্রকাশ্যে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। কিন্তু বর্ণবাদী মানসিকতা সবসময় এতটা সরাসরি এবং প্রকাশ্যভাবে প্রকাশ পায় না। অনেক সময় একজন ব্যক্তি মুখে বর্ণবাদের বিরোধিতা করতে পারেন, সব মানুষকে সমান বলে ঘোষণা দিতে পারেন, এমনকি অন্যের বংশ নিয়ে অহংকার করাকে নিন্দনীয়ও মনে করতে পারেন। অথচ একই ব্যক্তির চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ, ভাষা, সামাজিক আচরণ এবং ক্ষমতা বণ্টনের ধারণার মধ্যে জন্মগত শ্রেষ্ঠত্ব ও নিকৃষ্টতার সূক্ষ্ম বিশ্বাস উপস্থিত থাকতে পারে। তিনি হয়তো মনে করেন, কোনো বিশেষ বংশের মানুষ নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য স্বাভাবিকভাবেই অধিক উপযুক্ত, কোনো জনগোষ্ঠীর মানুষ অন্যদের তুলনায় অধিক সম্মানিত, কিংবা কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক পরিচয়ের মানুষের অধস্তন অবস্থানই স্বাভাবিক। এসব বিশ্বাস সরাসরি ঘৃণার ভাষায় প্রকাশ না পেলেও মানুষের মধ্যে উচ্চ-নীচের শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করে। সেই শ্রেণিবিন্যাস সামাজিক প্রতিষ্ঠান, আইন কিংবা ধর্মীয় বিধানের মাধ্যমে স্বীকৃতি পেলে তা ব্যক্তিগত পূর্বধারণার গণ্ডি পেরিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যে পরিণত হয়।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বর্ণবাদী মানসিকতা থাকার জন্য কাউকে প্রকাশ্যে ঘৃণা করা অপরিহার্য নয়; আবার বর্ণবাদী প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার জন্য সেই প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক সদস্যের ব্যক্তিগতভাবে বর্ণবিদ্বেষী হওয়াও প্রয়োজন নেই। একজন মানুষ কোনো জনগোষ্ঠীর প্রতি ব্যক্তিগত বিদ্বেষ পোষণ না করেও এমন একটি ব্যবস্থা সমর্থন করতে পারেন, যেখানে সেই জনগোষ্ঠীর মানুষের অধিকার সীমিত। তিনি হয়তো ব্যক্তিগত জীবনে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেন, তাদের সাহায্য করেন, তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, বিচারব্যবস্থা কিংবা সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন এলে তাদের সমান অধিকার স্বীকার করতে অস্বীকার করেন। ফলে ব্যক্তিগত সৌজন্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমতার মধ্যে বিরাট পার্থক্য সৃষ্টি হয়। কাউকে ভালোবাসার দাবি করা এবং তাকে নিজের সমান অধিকারী বলে স্বীকার করা এক বিষয় নয়। একজন দাসমালিক তার দাসের প্রতি সদয় হতে পারেন, তাকে ভালো খাবার দিতে পারেন, তার অসুস্থতায় চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেন। কিন্তু সেই সদয় আচরণ দাসপ্রথার মধ্যে বিদ্যমান মালিক ও অধীনস্থ মানুষের অসম ক্ষমতার সম্পর্ককে বিলুপ্ত করে না। একইভাবে কোনো উচ্চবর্ণের মানুষ নিম্নবর্ণের একজন ব্যক্তির প্রতি ব্যক্তিগতভাবে সদয় হলেও, তিনি যদি জন্মগত বর্ণব্যবস্থাকে বৈধ বলে বিশ্বাস করেন, তাহলে সেই ব্যবস্থা সমর্থনের মাধ্যমে জন্মগত বৈষম্যকেই বজায় রাখছেন।

মানুষের চিন্তাজগতে এই সূক্ষ্ম পূর্বধারণা কীভাবে কাজ করে, তা মনোবিজ্ঞানের গবেষণাতেও আলোচিত হয়েছে। অনেক সময় আমরা সচেতনভাবে কোনো জনগোষ্ঠীকে নিকৃষ্ট মনে করি না, কিন্তু দীর্ঘদিনের সামাজিক শিক্ষা, প্রচলিত গল্প, পারিবারিক পরিবেশ, ধর্মীয় বিশ্বাস, ভাষা এবং গণমাধ্যমের প্রভাবে সেই জনগোষ্ঠী সম্পর্কে কিছু স্বয়ংক্রিয় ধারণা আমাদের মনে তৈরি হতে পারে। মনোবিজ্ঞানে একে প্রচ্ছন্ন পক্ষপাত বা Implicit Bias বলা হয়। কোনো ব্যক্তির গায়ের রং, মুখের গঠন, ভাষা কিংবা সামাজিক পরিচয় দেখেই তার বুদ্ধিমত্তা, সততা, যোগ্যতা বা চরিত্র সম্পর্কে আমাদের মনে তাৎক্ষণিক ধারণা তৈরি হতে পারে, যদিও সেই ব্যক্তিকে আমরা আদৌ চিনি না। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন এই ধরনের পক্ষপাতকে এমন নেতিবাচক মনোভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে, যা কোনো ব্যক্তি নিজের মধ্যেই সচেতনভাবে শনাক্ত করতে পারেন না। এসব প্রচ্ছন্ন ধারণা মানুষের উপলব্ধি ও আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। [6]

Individuals’ perceptions and behaviors can be influenced by the implicit biases they hold, even if they are unaware they hold such biases.

বাংলা অনুবাদ: ব্যক্তির নিজের মধ্যে থাকা প্রচ্ছন্ন পক্ষপাত তার উপলব্ধি ও আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে, এমনকি তিনি নিজেই যদি সেই পক্ষপাত সম্পর্কে সচেতন না থাকেন।

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি বিশ্বাস করেন যে, কালো এবং ফর্সা মানুষ সমান মর্যাদার অধিকারী। কিন্তু একজন ফর্সা মানুষকে দেখলে তার মনে স্বাভাবিকভাবেই সৌন্দর্য, ভদ্রতা কিংবা উচ্চ সামাজিক অবস্থানের ধারণা তৈরি হয়; অন্যদিকে একজন কালো মানুষকে দেখলে একই ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয় না। তিনি হয়তো কাউকে সরাসরি অপমান করছেন না, কাউকে তার গায়ের রঙের কারণে নিষিদ্ধও করছেন না। কিন্তু মানুষের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দুটি ভিন্ন মানদণ্ড তার মনে কাজ করছে। সামাজিক জীবনে এই ধরনের পূর্বধারণা যদি বারবার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তাহলে নিয়োগ, পদোন্নতি, বিবাহ, সামাজিক সম্পর্ক কিংবা নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রেও অসম আচরণ তৈরি হতে পারে। আবার যেসব মানুষ এই ধরনের পূর্বধারণার শিকার হন, তাদের নিজেদের মধ্যেও হীনম্মন্যতা জন্ম নিতে পারে। একজন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি যদি ছোটবেলা থেকে শুনে বড় হন যে ফর্সা হওয়াই সৌন্দর্য, তাহলে তিনি নিজেও নিজের স্বাভাবিক গায়ের রংকে অসুন্দর বলে ভাবতে শুরু করতে পারেন। বৈষম্য তখন কেবল অন্যের আচরণে সীমাবদ্ধ থাকে না; নিপীড়িত মানুষের নিজের আত্মপরিচয় ও আত্মসম্মানকেও প্রভাবিত করে।

এই মানসিকতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো বৈষম্যকে স্বাভাবিক, ন্যায়সংগত কিংবা অপরিবর্তনীয় বলে মনে করা। যে সমাজে শত শত বছর ধরে একটি বিশেষ বংশের মানুষ শাসনক্ষমতা ভোগ করেছে, সেই সমাজের সদস্যরা একসময় মনে করতে পারেন যে, শাসন করার অধিকার ওই বংশের মানুষেরই থাকা উচিত। যে সমাজে একটি নির্দিষ্ট বর্ণের মানুষেরা ধর্মীয় আচার পরিচালনা করে এসেছে, সেই সমাজের মানুষ ভাবতে পারেন যে, অন্য বর্ণের কেউ সেই দায়িত্ব পালন করলে ধর্মীয় শৃঙ্খলা নষ্ট হবে। যে সমাজে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মানুষকে অধস্তন অবস্থানে রাখা হয়েছে, সেখানে সেই অবস্থানটিই স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হতে পারে। এইভাবে ঐতিহাসিক ক্ষমতার সম্পর্ককে মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একটি বংশ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল বলেই সেই বংশের মানুষ জন্মগতভাবে অধিক যোগ্য—এই সিদ্ধান্ত যৌক্তিকভাবে অনুসরণ করে না। বরং ক্ষমতা, শিক্ষা, সম্পদ এবং সামাজিক সুযোগের ওপর দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণ সেই বংশের সদস্যদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা তৈরি করতে পারে। পরে সেই সুবিধার ফলাফলকেই তাদের জন্মগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি একটি আত্মসমর্থনকারী বৈষম্যমূলক চক্র।

বর্ণবাদী মানসিকতা যখন ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সমর্থন লাভ করে, তখন সমস্যাটি আরও গভীর হয়। সাধারণ কোনো মানুষ যদি দাবি করেন যে, তার বংশ অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ, তাহলে সেই দাবি যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে খণ্ডন করা যায়। কিন্তু একই দাবি যখন কোনো পবিত্র ধর্মগ্রন্থ, নবী, ধর্মীয় আইন কিংবা ঈশ্বরের নির্দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সেই বংশগত শ্রেষ্ঠত্বকে শুধু সামাজিক প্রথা নয়, ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবেও গ্রহণ করার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীকে ঈশ্বর কর্তৃক নির্বাচিত, অধিক সম্মানিত কিংবা শাসনক্ষমতার জন্য নির্ধারিত বলে ঘোষণা করা হলে জন্মগত বিশেষাধিকারের সঙ্গে ধর্মীয় বৈধতা যুক্ত হয়। তখন বংশগত বৈষম্য বজায় রাখাকে অনেকেই অন্যায় মনে না করে ধর্মীয় আনুগত্য হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। অথচ একজন মানুষ কোন বংশে জন্ম নিয়েছেন, সেটি তার অর্জিত নৈতিক গুণ কিংবা রাজনৈতিক যোগ্যতার প্রমাণ নয়। কোনো ধর্মীয় কর্তৃত্ব জন্মগত শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করলেই সেই দাবির যৌক্তিক সমস্যা দূর হয় না।

এখানেই মৌখিক সমতার ঘোষণা এবং বাস্তব ক্ষমতা বণ্টনের মধ্যে পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ধর্মীয় ব্যবস্থা একদিকে বলতে পারে যে, সব বংশের মানুষ সমান, বংশ নিয়ে অহংকার করা অন্যায়, একজন মানুষের নৈতিক মর্যাদা তার জন্মপরিচয় দিয়ে নির্ধারিত হয় না। কিন্তু সেই একই ব্যবস্থায় যদি সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য একটি নির্দিষ্ট বংশে জন্ম নেওয়াকে অপরিহার্য শর্ত করা হয়, তাহলে বাস্তবে সেই বংশের মানুষের জন্য বিশেষ রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। কথায় সমতা ঘোষণা করা হলেও ক্ষমতার কাঠামোয় অসমতা বজায় থাকে। একইভাবে কাউকে সম্মান করতে বলা হলেও, তার গোষ্ঠীগত পরিচয়কে অযোগ্যতা, তুচ্ছতা কিংবা সামাজিক নিম্নতার উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা হলে, সেই ভাষার মধ্যেও বিদ্যমান সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের ছাপ থাকতে পারে। কেবল ‘সব মানুষ সমান’ ঘোষণা করলেই কোনো ব্যবস্থা সমতাভিত্তিক হয়ে যায় না; সেই ব্যবস্থায় কারা শাসন করতে পারে, কারা আইনগত সুরক্ষা পায়, কার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়, কারা বিশেষ সম্মান লাভ করে এবং কারা জন্মপরিচয়ের কারণে বঞ্চিত হয়—এসব প্রশ্নের উত্তরেই তার প্রকৃত বৈষম্যমূলক চরিত্র প্রকাশ পায়।

ভাষার মধ্যেও এসব সূক্ষ্ম সামাজিক ধারণা প্রকাশ পায়। যেমন, কাউকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বলা হলো, ‘তিনি নিম্নবর্ণের মানুষ, কিন্তু অত্যন্ত ভদ্র।’ অথবা, ‘তিনি কালো, তবুও দেখতে সুন্দর।’ এখানে ‘কিন্তু’ কিংবা ‘তবুও’ শব্দগুলো দুটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি প্রত্যাশাবিরোধী সম্পর্ক তৈরি করছে। বক্তব্যটির অন্তর্নিহিত সামাজিক ধারণা হচ্ছে, নিম্নবর্ণের মানুষের ভদ্র হওয়া কিংবা কালো মানুষের সুন্দর হওয়া যেন স্বাভাবিক প্রত্যাশার বাইরে। একইভাবে কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে এমন একটি বাক্যে ব্যবহার করা হতে পারে, যেখানে সেই পরিচয়ের মানুষকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পাওয়া অপ্রত্যাশিত বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। এই ধরনের ভাষার তাৎপর্য বুঝতে শব্দগুলোর অভিধানগত অর্থের পাশাপাশি বাক্যের সামাজিক প্রেক্ষাপট, তুলনার উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর প্রচলিত অবস্থান বিশ্লেষণ করতে হয়। একটি বিশেষ পরিচয়কে কেন তুলনার জন্য নির্বাচন করা হলো, সেই পরিচয়ের সঙ্গে কী ধরনের সামাজিক ধারণা যুক্ত ছিল এবং বাক্যটি সেই ধারণাকে কীভাবে ব্যবহার করছে—এসব প্রশ্নের উত্তর ভাষার অন্তর্নিহিত পূর্বধারণা প্রকাশ করতে পারে।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ১৯৭৮ সালের Declaration on Race and Racial Prejudice-এর দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বর্ণবাদকে কেবল প্রকাশ্য ঘৃণা বা ব্যক্তিগত বিদ্বেষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। সেখানে বর্ণবাদী মতাদর্শ, পূর্বধারণাপ্রসূত মনোভাব, বৈষম্যমূলক আচরণ, সামাজিক কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক চর্চাকে বর্ণবাদের বিভিন্ন উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ বর্ণবাদ মানুষের চিন্তা থেকে শুরু করে সামাজিক প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে কাজ করতে পারে। কোনো বৈষম্যমূলক প্রথা দীর্ঘদিন প্রচলিত থাকলে সেটি মানুষের কাছে স্বাভাবিক মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘকাল প্রচলিত থাকার কারণে কোনো অন্যায় ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। [7]

Racism includes racist ideologies, prejudiced attitudes, discriminatory behavior, structural arrangements and institutionalized practices resulting in racial inequality […]

বাংলা অনুবাদ: বর্ণবাদের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বর্ণবাদী মতাদর্শ, পূর্বধারণাপ্রসূত মনোভাব, বৈষম্যমূলক আচরণ, কাঠামোগত ব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা, যার ফলে বর্ণগত অসমতা সৃষ্টি হয় […]

সামাজিক বৈষম্যের গবেষণায় ব্যক্তিগত বর্ণবিদ্বেষ, প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ এবং কাঠামোগত বর্ণবাদের মধ্যে পার্থক্য করা হয়। ব্যক্তিগত বর্ণবিদ্বেষ মানুষের বিশ্বাস, আচরণ এবং পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে প্রকাশ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ তৈরি হয় যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়ম, নীতি বা প্রচলিত কার্যপদ্ধতি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মানুষকে অন্যদের তুলনায় নিয়মিত সুবিধা কিংবা অসুবিধার মধ্যে রাখে। আর কাঠামোগত বর্ণবাদ বলতে বোঝায়, যখন একাধিক সামাজিক প্রতিষ্ঠান, আইন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, শিক্ষা, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে গোষ্ঠীগত বৈষম্য দীর্ঘস্থায়ী হয়। আমেরিকার ন্যাশনাল অ্যাকাডেমিজ অব সায়েন্সেস, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেডিসিন প্রকাশিত ২০২৩ সালের গবেষণা প্রতিবেদনে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত বর্ণবাদের এই পার্থক্য স্পষ্ট করা হয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানের নিয়মের মধ্যে থাকা বৈষম্য এবং সমাজের বহু প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত কার্যক্রমে টিকে থাকা বৈষম্য একই বিষয়ের ভিন্ন স্তর। [8]

The key difference between institutional and structural racism is that structural racism happens across institutions, while institutional racism happens within institutions.

বাংলা অনুবাদ: প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত বর্ণবাদের প্রধান পার্থক্য হচ্ছে, কাঠামোগত বর্ণবাদ একাধিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করে, আর প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ম ও কার্যক্রমের মধ্যে কাজ করে।

একটি বৈষম্যমূলক প্রতিষ্ঠান কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে কোনো জনগোষ্ঠীকে বিশেষ মর্যাদা কিংবা ক্ষমতার অধিকারী ঘোষণা করা হয়। সেই ধারণার ভিত্তিতে আইন, সামাজিক রীতি কিংবা ধর্মীয় বিধান তৈরি হয়। এরপর সেই বিধানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মানুষ শিক্ষা, সম্পদ, সামাজিক সম্মান কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতার অতিরিক্ত সুযোগ লাভ করে। তাদের পরবর্তী প্রজন্ম সেই সুবিধা উত্তরাধিকারসূত্রে পায়। অন্যদিকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সদস্যরা একই সুযোগ থেকে দূরে থাকে। কিছুদিন পর সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর অধিক ক্ষমতা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠাকে তাদের স্বাভাবিক যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এভাবে প্রথমে যে বৈষম্যমূলক ধারণা বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি করেছিল, সেই বিশেষ সুবিধার ফলাফল আবার মূল ধারণাটিকেই শক্তিশালী করে। বর্ণবাদী কাঠামো তখন নিজেকে নিজেই পুনরুৎপাদন করতে থাকে। এর জন্য প্রতিটি নতুন প্রজন্মকে প্রকাশ্যে বর্ণবাদী হতে হয় না; পুরোনো বৈষম্যমূলক নিয়মগুলো অনুসরণ করলেই পূর্ববর্তী অসমতা বজায় থাকতে পারে।

এই প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় ও সামাজিক শিক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশু যখন ছোটবেলা থেকে শুনে বড় হয় যে, নির্দিষ্ট বংশের মানুষ বেশি সম্মানিত, কোনো জনগোষ্ঠীর মানুষ জন্মগতভাবেই বিশেষ নেতৃত্বের অধিকারী, কিংবা নির্দিষ্ট পরিচয়ের মানুষদের সামাজিক অবস্থান অন্যদের নিচে, তখন এসব ধারণা তার স্বাভাবিক মূল্যবোধের অংশ হয়ে উঠতে পারে। সে হয়তো নিজেকে বর্ণবাদী মনে করে না। বরং তার কাছে এই শ্রেণিবিন্যাসই সঠিক এবং স্বাভাবিক সামাজিক ব্যবস্থা। পরবর্তী সময়ে সে যখন অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবে, নেতৃত্ব নির্বাচন করবে কিংবা সামাজিক বিধান সমর্থন করবে, তখন তার সিদ্ধান্তে সেই শৈশবে শেখা শ্রেণিবিন্যাস প্রতিফলিত হতে পারে। এর ফলে বৈষম্য একটি প্রজন্মের ব্যক্তিগত বিশ্বাস থেকে পরবর্তী প্রজন্মের সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়। ধর্মীয় কর্তৃত্বের মাধ্যমে এই ধরনের শ্রেণিবিন্যাস প্রতিষ্ঠিত হলে, শিশুদের কাছে তা প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবেও উপস্থাপিত হতে পারে।

বর্ণবাদী মানসিকতার অন্যতম সূক্ষ্ম প্রকাশ হচ্ছে, অন্য জনগোষ্ঠীকে সমান মানুষ হিসেবে স্বীকার করেও তাদের সমান ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে স্বীকার না করা। কাউকে দয়া করা, তাকে সাহায্য করা, তার সঙ্গে ভালো আচরণ করা কিংবা তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা মানবিক গুণ হতে পারে। কিন্তু এসব আচরণ অন্য ব্যক্তির সমান অধিকার স্বীকার করার বিকল্প নয়। একজন প্রভু তার অধীনস্থ ব্যক্তির প্রতি সদয় হলেও প্রভু ও অধীনস্থের অসম সম্পর্ক বজায় থাকতে পারে। কোনো শাসক অন্য ধর্মের মানুষদের নিরাপত্তা দিলেও তাদের রাজনৈতিক অধিকার নিজের ধর্মের অনুসারীদের তুলনায় কম নির্ধারণ করতে পারেন। কোনো উচ্চবর্ণের মানুষ নিম্নবর্ণের কাউকে ব্যক্তিগতভাবে সম্মান করলেও তার নিজের বংশের জন্য সংরক্ষিত বিশেষ অধিকার বজায় রাখতে চাইতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আচরণের সৌজন্য বৈষম্যমূলক ক্ষমতার সম্পর্ককে বিলুপ্ত করে না। বরং অনেক সময় সদয় আচরণ ও বৈষম্যমূলক কর্তৃত্ব একই ব্যবস্থার মধ্যে পাশাপাশি অবস্থান করে।

বর্ণবাদ, জাতিভেদ ও বংশগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার সবচেয়ে মৌলিক যুক্তিগত সমস্যা এখানেই। একজন মানুষ কোন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন, সেটি তার নিজের অর্জন নয়। তিনি তার পূর্বপুরুষ নির্বাচন করেননি, নিজের গায়ের রং নির্বাচন করেননি, জন্মস্থান নির্বাচন করেননি। অথচ এই অনির্বাচিত পরিচয়গুলোর ভিত্তিতে তাকে অন্য মানুষের তুলনায় অধিক সম্মানিত, অধিক যোগ্য কিংবা অধিক ক্ষমতার অধিকারী ঘোষণা করা হলে, সেই বিশেষাধিকার ব্যক্তিগত অর্জনের পরিবর্তে জন্মগত পরিচয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে একই কারণে কাউকে কম অধিকারী ঘোষণা করা হলে, কোনো ব্যক্তিগত অপরাধ ছাড়াই তাকে বঞ্চিত করা হয়। জন্মগত সুবিধা এবং জন্মগত বঞ্চনা এইভাবে একই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার দুটি দিক হয়ে ওঠে। এক পক্ষকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলে, সেই সুবিধা থেকে বাদ পড়া অন্য পক্ষগুলোর সঙ্গে অধিকারগত অসমতা সৃষ্টি হয়। ফলে বংশগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে সমর্থন করে একইসাথে সম্পূর্ণ বংশনিরপেক্ষ রাজনৈতিক সমতা দাবি করা যৌক্তিকভাবে অসংগত।

সবশেষে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কোনো ধর্ম, সমাজ কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যে বর্ণবাদী বা বৈষম্যমূলক মানসিকতা রয়েছে কি না, সেটি নির্ধারণের জন্য শুধু তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাগুলো যথেষ্ট নয়। সেই ধর্ম বা সমাজের প্রচলিত ভাষা, মানুষের প্রতি ব্যবহার, আইনগত অধিকার, সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস, নেতৃত্বের যোগ্যতা এবং ক্ষমতা বণ্টনের বিধানগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যবস্থা একদিকে মানুষের সমতা ঘোষণা করে, অন্যদিকে নির্দিষ্ট বংশের জন্য ক্ষমতা সংরক্ষণ করলে, সেখানে বংশগত বৈষম্য রয়েছে। কোনো ব্যবস্থা জন্মগত অহংকার নিষিদ্ধ করে, অথচ বিশেষ জন্মপরিচয়কে অধিক মর্যাদার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলে, সেখানে জন্মগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা অক্ষত থাকে। কোনো ব্যবস্থা মানুষকে ভালোবাসার নির্দেশ দেয়, অথচ তাদের গোষ্ঠীগত পরিচয়ের ভিত্তিতে অসম নাগরিক অধিকার নির্ধারণ করে, তাহলে সেই ব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য রয়েছে। বর্ণবাদবিরোধী বক্তব্যের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় সেই বক্তব্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামাজিক ও আইনি ব্যবস্থার সামঞ্জস্য দিয়ে। মুখে সমতার ঘোষণা দিয়ে বাস্তবে জন্মগত শ্রেষ্ঠত্ব, বংশগত বিশেষাধিকার এবং গোষ্ঠীগত অধস্তনতা বজায় রাখা হলে, সেই সমতার দাবি অসম্পূর্ণ এবং পরস্পরবিরোধী।


ইসলামে বর্ণবাদ বিরোধীতা

বর্ণবাদ, জাতিভেদ, বংশ মর্যাদা বা গোত্রের মর্যাদা বিষয়ে ইসলামে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া যায়। কোরআনের কিছু আয়াত এবং কিছু হাদিসে যেরকম বর্ণবাদ, জাতিভেদ ইত্যাদির বিরোধীতার প্রমাণ মেলে, আবার অনেক জায়গাতে বর্ণবাদ, জাতিভেদকে সমর্থন করা কিছু বক্তব্যও পাওয়া যায়। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কোরআনে সূরা হুজরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে বলা রয়েছে, [9]

হে মানুষ! তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই লোকই অধিক সম্মানীয় যে লোক অধিক মুত্তাক্বী। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সব খবর রাখেন।
Taisirul Quran
হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদা সম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকী। আল্লাহ সব কিছু জানেন, সব কিছুর খবর রাখেন।
Sheikh Mujibur Rahman
হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।
Rawai Al-bayan
হে মানুষ! আমরা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে (১), আর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অন্যের সাথে পরিচিত হতে পার (২)। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই বেশী মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে বেশী তাকওয়াসম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

উপরে বর্ণিত কোরআনের আয়াতটিতে আল্লাহ সকল মানুষকে একই নারী ও পুরুষ থেকে সৃষ্টি ঘোষণা দিয়ে বর্ণবাদের বিপক্ষেই কথা বলেছেন। যদিও সমগ্র মানবজাতি একটি আদি দম্পতি থেকে উৎপন্ন হয়েছে—এই ধর্মীয় ধারণাটি আধুনিক মানববিবর্তন ও জনসংখ্যাগত জিনবিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তারপরেও আয়াতটির সামাজিক বক্তব্যে বংশগত অহংকারের বিরোধিতা রয়েছে। এখানে মানুষের জাতি ও গোত্রের পার্থক্যকে পারস্পরিক পরিচয়ের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, জন্মগত শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি হিসেবে নয়। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আয়াতটিতে সম্মানের মানদণ্ড হিসেবে কোনো নির্দিষ্ট বংশে জন্মগ্রহণ, গায়ের রং, জাতিগত পরিচয় কিংবা পূর্বপুরুষের মর্যাদাকে নির্ধারণ করা হয়নি; বরং তাকওয়া বা ধর্মীয় নীতিনিষ্ঠাকে মর্যাদার ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে বংশপরিচয়ের কারণে একজন মানুষ জন্মগতভাবেই অন্য মানুষের চেয়ে বেশি সম্মানিত—এমন ধারণার বিরুদ্ধে আয়াতটি একটি স্পষ্ট বক্তব্য।

একইভাবে কোরআনের সূরা রুমের ২২ নম্বর আয়াতে মানুষের ভাষা ও গায়ের রঙের বৈচিত্র্যকে আল্লাহর নিদর্শন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে মানুষের গায়ের রঙের পার্থক্যকে অপবিত্রতা, নিকৃষ্টতা কিংবা অযোগ্যতার চিহ্ন হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং মানবজাতির বৈচিত্র্যের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বর্ণবাদবিরোধী বক্তব্যের আলোচনায় এই আয়াতটিও গুরুত্বপূর্ণ। [10]

وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِلْعَالِمِينَ

বাংলা অনুবাদ: আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।

নবী মুহাম্মদের নামে বর্ণিত কয়েকটি হাদিসেও বংশগত অহংকার এবং অন্যের বংশকে হেয় করার বিরুদ্ধে সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়। নিচের হাদিসটিতে বংশের গৌরব করা এবং অন্যের বংশে দোষারোপ করাকে ইসলামপূর্ব জাহিলি যুগের কুপ্রথা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আরবের গোত্রভিত্তিক সমাজে বংশপরিচয় ছিল সামাজিক সম্মান, ক্ষমতা এবং মর্যাদার অন্যতম ভিত্তি। সেই সমাজে বংশ নিয়ে অহংকার করাকে নিন্দনীয় বলা এবং অন্যের পূর্বপুরুষের পরিচয় দিয়ে তাকে অপমান করার বিরোধিতা করা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অবস্থান। [11]

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১২। জানাযাহ সম্পর্কিত
পরিচ্ছেদঃ ১০. বিলাপ করে কান্নাকাটি করার ব্যাপারে হুশিয়ারী
২০৪৯-(২৯/৯৩৪) আবূ বাকর ইবনু আবূ শায়বাহ, ইসহাক ইবনু মানসূর (রহঃ) (শব্দাবলী তার) ….. আবূ মালিক আল আশ’আর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমার উন্মাতের মধ্যে জাহিলী যুগের চারটি কু-প্রথা রয়ে গেছে যা লোকেরা পরিত্যাগ করতে চাইবে না। (১) বংশের গৌরব, (২) অন্যকে বংশের খোটা দেয়া, (৩) নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করা, (৪) মৃতের জন্য বিলাপ করে কান্নাকাটি করা। তিনি আরও বলেন, বিলাপকারী যদি মৃত্যুর পূর্বে তওবা না করে তাহলে কিয়ামতের দিন তাকে এভাবে উঠানো হবে যে, তার গায়ে আলকাতরার (চাদর) খসখসে চামড়ার ওড়না থাকবে। (ইসলামী ফাউন্ডেশন ২০২৮, ইসলামীক সেন্টার ২০৩৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ মালিক আল আশ্‘আরী (রাঃ)

এই হাদিসটির নৈতিক তাৎপর্য হচ্ছে, কোনো মানুষের নিজের কোনো অর্জন ছাড়াই কেবল তার পূর্বপুরুষের পরিচয় নিয়ে অহংকার করা এবং অন্য মানুষকে তার বংশের কারণে অপমান করা নিন্দনীয়। একজন মানুষ কোন বংশে জন্মগ্রহণ করবেন, তা তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে সেই জন্মপরিচয়কে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। এই দৃষ্টিকোণ থেকে হাদিসটির বক্তব্য বংশগত অহংকার ও গোত্রবিদ্বেষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

মুসনাদে আহমদে আরেকটি হাদিস পাওয়া যায়, যেখানে আরব-অনারব এবং বিভিন্ন গায়ের রঙের মানুষের মধ্যে জন্মগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে আরও স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এই বর্ণনাটি ইসলামে বর্ণবাদবিরোধী বক্তব্যগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। [12]

নবী মুহাম্মদ বলেছিলেন, “হে লোকজন! সাবধান তোমাদের আল্লাহ একজন। কোন অনারবের ওপর কোন আরবের ও কোন আরবের ওপর কোন অনারবের কোন কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের ও কোন শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণঙ্গের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই আল্লাহভীতি ছাড়া। তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশী আল্লাহভীরু সেই আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদাবান। আমি কি তোমাদেরকে পৌঁছিয়েছি? তারা বলল, আল্লাহর রাসূল পৌঁছিয়েছেন। তিনি বললেন, তাহলে যারা এখানে উপস্থিত আছে তারা যেন অনুপস্থিত লোকদের কাছে এ বাণী পৌছিয়ে দেয়।” (মুসনাদে আহমাদ: ৫/৪১১)
Abu Nadrah reported: The Messenger of Allah, peace and blessings be upon him, said during the middle of the day at the end of the pilgrimage, “O people, your Lord is one and your father Adam is one. There is no favor of an Arab over a foreigner, nor a foreigner over an Arab, and neither white skin over black skin, nor black skin over white skin, except by righteousness. Have I not delivered the message?” They said, “The Messenger of Allah has delivered the message.”
Source: Musnad Aḥmad 23489
Grade: Sahih (authentic) according to Al-Arna’ut
عَنْ أَبِي نَضْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي وَسَطِ أَيَّامِ التَّشْرِيقِ فَقَالَ يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَلَا إِنَّ رَبَّكُمْ وَاحِدٌ وَإِنَّ أَبَاكُمْ وَاحِدٌ أَلَا لَا فَضْلَ لِعَرَبِيٍّ عَلَى أَعْجَمِيٍّ وَلَا لِعَجَمِيٍّ عَلَى عَرَبِيٍّ وَلَا لِأَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ وَلَا أَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ إِلَّا بِالتَّقْوَى أَبَلَّغْتُ قَالُوا بَلَّغَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
23489 مسند أحمد باقي مسند الأنصار
23489 المحدث شعيب الأرناؤوط خلاصة حكم المحدث إسناده صحيح في تخريج المسند

এই হাদিসটিতে কেবল আরবদের অহংকার করতে নিষেধ করা হয়নি; বরং আরবের ওপর অনারবের এবং অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব উভয়ই অস্বীকার করা হয়েছে। একইভাবে গায়ের রঙের ক্ষেত্রেও এক পক্ষকে অন্য পক্ষের চেয়ে জন্মগতভাবে শ্রেষ্ঠ বিবেচনা করার ধারণা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে গোত্র ও বর্ণগত শ্রেষ্ঠত্বের বিরুদ্ধে একটি পারস্পরিক নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বর্ণবাদবিরোধী অবস্থানের অর্থ কেবল কোনো নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে সহানুভূতি দেখানো নয়, বরং জন্মগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো জনগোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠত্বের দাবিকেই অস্বীকার করা। এই নির্দিষ্ট বিষয়ে হাদিসটির বক্তব্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

সহিহ মুসলিমে আরেকটি হাদিসে মানুষের বাহ্যিক চেহারা কিংবা সম্পদকে আল্লাহর বিচারের মানদণ্ড হিসেবে অস্বীকার করে অন্তর ও কাজকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মানুষের বাহ্যিক গঠন, গায়ের রং কিংবা সম্পদের ভিত্তিতে মর্যাদা নির্ধারণের বিপরীতে ব্যক্তির নিজস্ব আচরণ ও নৈতিক গুণকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে এই বক্তব্যটিও প্রাসঙ্গিক। [13]

حَدَّثَنَا عَمْرٌو النَّاقِدُ، حَدَّثَنَا كَثِيرُ بْنُ هِشَامٍ، حَدَّثَنَا جَعْفَرُ بْنُ بُرْقَانَ، عَنْ يَزِيدَ بْنِ الْأَصَمِّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ إِنَّ اللَّهَ لاَ يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ ‏”‏‏.

বাংলা অনুবাদ: আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক আকৃতি এবং সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর এবং কাজের দিকে তাকান।

নিঃসন্দেহে উপরের কোরআনের আয়াত [14] এবং হাদিস [15] বর্ণবাদ ও বংশগত অহংকারের বিরুদ্ধে কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রশংসনীয় বক্তব্য উপস্থাপন করেছে। নবী মুহাম্মদ এসব কথা আসলেই বলে থাকলে, খুবই ভালো কথা বলেছেন। প্রায় চৌদ্দশ বছর আগে সেই গোত্রাভিমান ও বংশমর্যাদাকে কেন্দ্র করে সংঘাতপ্রবণ আরব সমাজে দাঁড়িয়ে এরকম বক্তব্য দেওয়া সাহসের এবং প্রগতির কাজ। এতে কোনো সন্দেহ নেই। এমন একটি সমাজে, যেখানে বংশপরিচয় সামাজিক সম্মান, আনুগত্য এবং রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম ভিত্তি ছিল, সেখানে আরব-অনারব কিংবা কালো-ফর্সা মানুষের জন্মগত শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করার সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। অন্তত এই বক্তব্যগুলোতে মানুষের জন্মপরিচয়ের চেয়ে তার নিজস্ব নৈতিক আচরণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একইসাথে, ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুয়াজ্জিন বিলাল ছিলেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস। তাকে আবু বকর মুক্ত করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে তিনি মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ঘটনা। সেই সমাজে একজন সাবেক ক্রীতদাসের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দায়িত্ব লাভ করা সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। সহিহ বুখারির বর্ণনাতেও উমরকে আবু বকর ও বিলাল উভয়কে সম্মানসূচকভাবে নিজেদের নেতা বলতে দেখা যায়। বিলালের মতো একজন সাবেক ক্রীতদাসকে এভাবে সম্মানিত করা তৎকালীন সমাজের প্রচলিত বংশগত মর্যাদার ধারণার বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। [16]

حَدَّثَنَا أَبُو نُعَيْمٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ أَبِي سَلَمَةَ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْمُنْكَدِرِ، أَخْبَرَنَا جَابِرُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ ـ رضى الله عنهما ـ قَالَ كَانَ عُمَرُ يَقُولُ أَبُو بَكْرٍ سَيِّدُنَا، وَأَعْتَقَ سَيِّدَنَا‏.‏ يَعْنِي بِلاَلاً‏.‏

বাংলা অনুবাদ: জাবির ইবনু আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত, উমর বলতেন, আবু বকর আমাদের নেতা এবং তিনি আমাদের নেতাকে মুক্ত করেছেন। এর দ্বারা তিনি বিলালকে বোঝাতেন।

সেই সাথে এটিও সত্য যে, সেই সময়ে ক্রীতদাসদের মতো অসহায় এবং অধিকারহীন মানুষদের কাছে সামাজিক মুক্তি ও মর্যাদার প্রতিশ্রুতি বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হওয়ার কথা। নিপীড়িত এবং অধিকারবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সমর্থন প্রথম যুগের ইসলামি আন্দোলনকে সামাজিক শক্তি জোগাতে পারত। তাদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তী সময়ে ইসলামের পক্ষে যুদ্ধ করেছেন এবং নতুন রাজনৈতিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজে অংশ নিয়েছেন। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষদের সংগঠিত শক্তি ইতিহাসের বহু সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এসব মানুষের সমর্থন লাভকে মুহাম্মদের একমাত্র বা প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পৃথক ঐতিহাসিক প্রমাণ প্রয়োজন। সেই নিয়ে আরেকদিন আলোচনা করা যাবে। আজকের বিষয় হচ্ছে বর্ণবাদ এবং জাতিভেদ।

এ পর্যন্ত উদ্ধৃত আয়াত ও হাদিসগুলো থেকে এটি স্পষ্ট যে, ইসলামি ধর্মীয় সাহিত্যে বংশগত অহংকার, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং গায়ের রঙের ভিত্তিতে মানুষকে নিকৃষ্ট বিবেচনা করার বিরুদ্ধে বাস্তব বক্তব্য রয়েছে। এসব বক্তব্যের ইতিবাচক তাৎপর্য অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু কোনো ধর্মে বর্ণবাদবিরোধী বক্তব্যের উপস্থিতি এবং সেই ধর্মের সমস্ত সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইনি বিধানে বর্ণগত ও বংশগত সমতা প্রতিষ্ঠিত থাকা এক বিষয় নয়। প্রথমটি কয়েকটি নির্দিষ্ট বক্তব্যের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে; দ্বিতীয়টি নির্ধারণ করতে হয় সেই ধর্মের সামগ্রিক বিধান, ক্ষমতা বণ্টন, সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস এবং মানুষের অধিকারসংক্রান্ত নিয়মগুলো পরীক্ষা করে। বিশেষত কোনো বংশকে জন্মগতভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী ঘোষণা করা হলে, কিংবা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে সামাজিক অযোগ্যতা ও তুচ্ছতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হলে, সেগুলোর সঙ্গে সমতার ঘোষণার সম্পর্ক বিচার করা প্রয়োজন। সেই কারণেই ইসলামে বর্ণবাদ ও জাতিভেদ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য অন্যান্য হাদিস এবং ধ্রুপদী ইসলামি বিধানগুলোও পড়া প্রয়োজন। শুধুমাত্র একপাক্ষিক বক্তব্য দেখলে ধর্মটির প্রকৃত সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়।


হাবশী গোলাম শাসক হতে পারবে?

মুসলিমদের মধ্যে অনেকেই একটি হাদিস নিয়ে গর্বের সঙ্গে বলেন যে, ইসলামে বর্ণবাদ নেই, কারণ হাদিসে হাবশি ক্রীতদাসকে শাসক নিযুক্ত করা হলেও তার আনুগত্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই বক্তব্যকে কখনো কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসের সমান রাজনৈতিক অধিকারের প্রমাণ হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু হাদিসে শাসক নিযুক্ত হওয়ার পরে তার আনুগত্য করার নির্দেশ রয়েছে; প্রত্যেক বংশের মানুষের সর্বোচ্চ খলিফা নির্বাচিত হওয়ার সমান অধিকার রয়েছে—এমন কোনো ঘোষণা নেই। আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, একজন হাবশি দাসকে উদাহরণ হিসেবে বেছে নেওয়ার ভাষাগত তাৎপর্য এবং ধ্রুপদী ব্যাখ্যাকাররা সেই উদাহরণকে কীভাবে বুঝেছেন। এই দুই বিষয় একত্রে দেখলেই বক্তব্যটির সামাজিক মনস্তত্ত্ব স্পষ্ট হয়।

মনে করুন, একজন আওয়ামী লীগ সমর্থক মানুষ তার এলাকায় তার বন্ধুদের বললেন,

আওয়ামী লীগ থেকে যদি একটি কুকুরও নির্বাচনে দাঁড়ায়, সেই কুকুরটিকেই ভোট দিতে হবে।

উপরের কথাটিতে কী কুকুরকে মর্যাদা দেয়া হচ্ছে? নাকি কুকুর বলতে এখানে কোন নিকৃষ্ট কিছু বোঝানো হচ্ছে? ভেবে বলুন তো? এখানে উদ্দেশ্যটি কী কুকুরকে সম্মান দেয়া, নাকি কুকুর নামক রূপকটি ব্যবহার করে অত্যন্ত ঘৃণ্য বা নিকৃষ্ট কিছুকে তুলনা দেয়া? “যদিও” “এমনকি” “তবুও” এই শব্দগুলো কখন ব্যবহৃত হয়? বাক্যটি থেকে কী বক্তার মনোভাব বোঝা যায় না যে, এগুলো তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত হয়েছে? আসুন এবারে দেখি, ঐ হাদিসটিতে আসলে কী বলা হয়েছে, [17] [18] [19] [20]

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৮ঃ প্রশাসন ও বিচারকার্য
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৬৩-(৩) আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা শুনো এবং আনুগত্য করো, যদিও তোমাদের ওপর হাবশী গোলাম শাসক নিযুক্ত করা হয়, যার মাথা কিসমিসের ন্যায়। (বুখারী)(1)
(1) সহীহ : বুখারী ৭১৪২, ইবনু মাজাহ ২৮৬০, আহমাদ ১২১২৬, সহীহ আল জামি‘ ৯৮৫।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮২/ আহকাম
পরিচ্ছেদঃ ৩০০৮. ইমামের আনুগত্য ও মান্যতা, যতক্ষন তা নাফরমানীর কাজ না হয়
৬৬৫৭। মুসাদ্দাদ (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি তোমাদের উপর এরূপ কোন হাবশী দাসকেও শাসক নিযুক্ত করা হয়, যার মাথাটি কিশমিশের ন্যায় তবুও তার কথা শোন ও তার আনুগত্য কর।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

হাদীস সম্ভার
১৮/ শাসন
পরিচ্ছেদঃ বৈধ কাজে শাসকবৃন্দের আনুগত্য করা ওয়াজিব এবং অবৈধ কাজে তাদের আনুগত্য করা হারাম
(১৮২৮) আনাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (শাসকদের) কথা শোনো এবং (তাদের) আনুগত্য কর; যদিও তোমাদের উপর কোন নিগ্রো ক্রীতদাসকে (নেতা) নিযুক্ত করা হয়; যেন তার মাথাটা কিশমিশ। (অর্থাৎ, কিশমিশের ন্যায় ক্ষুদ্র ও বিশ্রী তবুও)!
(বুখারী ৬৯৩, ৬৯৬, ৭১৪২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

রিয়াযুস স্বা-লিহীন (রিয়াদুস সালেহীন)
বিবিধ
পরিচ্ছেদঃ ৮০: বৈধ কাজে শাসকবৃন্দের আনুগত্য করা ওয়াজিব এবং অবৈধ কাজে তাদের আনুগত্য করা হারাম
৪/৬৭১। আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘(শাসকদের) কথা শোনো এবং (তাদের) আনুগত্য কর; যদিও তোমাদের উপর কোন নিগ্রো ক্রীতদাসকে (নেতা) নিযুক্ত করা হয়; যেন তার মাথাটা কিশমিশ। (অর্থাৎ কিশমিশের ন্যায় ক্ষুদ্র ও বিশ্রী তবুও)!’’ (বুখারী) [1]
[1] সহীহুল বুখারী ৬৯৩, ৬৯৬, ৭১৪২, ইবনু মাজাহ ২৮৬০, আহমাদ ১১৭২৬, ১২৩৪১
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এবারে, হাদিসটির ব্যাখ্যাও আমরা পড়ে নিই, সহজ দরসে ইবনে মাজাহ গ্রন্থ থেকে, [21]

তাক্বওয়ার সংজ্ঞা
আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. হযরত উবাই ইবনে কা’ব রাযি.-এর সূত্রে তাকওয়ার যে সংজ্ঞা উদ্ধৃত করেছেন, তা হযরত উমর রাযি. এর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন- হযরত উমর রাযি. হযরত উবাইকে একবার তাকওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে হযরত উবাই রাযি. বলেন: আপনি যখন কণ্টকাকীর্ণ জঙ্গল দিয়ে অতিক্রম করেন, তখন কিভাবে অতিক্রম করেন? হযরত উমর রাযি. বলেন: এমনভাবে চলি, যাতে একটি কাঁটার আঁচড়ও না লাগে। হযরত উবাই রাযি. বলেন, আকওয়া হচ্ছে এমনভাবে চলা, যাতে বদদীনের একটি কাঁটাও গায়ে না লাগে। তাকওয়ার ৫টি স্তর রয়েছে।
)1( ى الإِنْقَاء عَنِ الشَّرْكِথা শিরক থেকে বেঁচে থাকা।
)2( الْإِيِّقَاءُ عَنِ الْكَبَائِرِ অর্থাৎ কবীরা গুনাহসমূহ থেকে বেঁচে থাকা।
)اقَاءُ عَنِ السَّيِّئَاتِ (٥ অর্থাৎ ছোট-খাট গুনাহসমূহ থেকে বেঁচে থাকা।
الانْقَاء عَنِ الْمُبَاحَاتِ وَالشُّبُهَاتِ حَيْرًا عَنِ الْوُقُوعِ فِي الْمُحْرمَاتِ (8)
অর্থাৎ মুবাহ ও সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকা, হারামসমূহে পতিত
হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়।
)৫( الإغراضُ عَمَّاسِوَى اللَّهِ গাইরুল্লাহ থেকে সম্পূর্ণ বিমুখ থাকা। উল্লেখ্য, তাকওয়ার সর্বশেষ স্তরটি সাধারণ লোকদের জন্য নয় বরং এটি নবী, সিদ্দীক ও উম্মতের বিশেষ তবকার জন্য।
الا وَإِنْ كَانَ عَبْدًا حَبَشِيا
একটি প্রশ্নও তার সমাধান
এখানে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। যথা- এ হাদীসে বলা হয়েছে, একজন হাবশী কৃতদাসকে নেতা বানিয়ে দিলে সকলের জন্য তার নেতৃত্ব মেনে নিয়ে তার আনুগত্য করা জরুরী অথচ প্রসিদ্ধ হাদীস রয়েছে الأَئِمَّةُ مِن قريش নেতা সর্বদা কুরাইশ বংশ থেকেই হবে। বুঝা গেল, খলীফা বা নেতা হওয়ার জন্য কুরাইশ বংশের হওয়া জরুরি। সুতরাং বাহ্যত দুই হাদীসের মধ্যে বিরোধ দেখা যায়। এর সমাধান কী?
জবাব: প্রশ্নে উল্লিখিত বিরোধ দূর করতে الأئمة من قريش হাদীস কে তার বাহ্যিক অর্থের উপর রেখে বলতে হবে- হ্যাঁ, খলীফা হওয়ার জন্য কুরাইশ বংশ থেকে হওয়া জরুরি, যা এ হাদীসে বলা হয়েছে। তবে حَدِيثُ الْبَابِ এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা করা হবে আর এ ব্যাখ্যা তিনভাবে করা যেতে পারে। যথা-
(এক) হাদীসে আমীরের হুকুম মান্য করার প্রতি বিশেষ তাকিদ করার লক্ষ্যেই এ কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ যদি ধরে নেওয়া হয়, কোনো হাবশী কৃতদাসকেও তোমাদের আমীর বানিয়ে দেওয়া হল, যে কিনা আমীর হওয়ার যোগ্যতা রাখে না, তার আনুগত্য করাও তোমাদের জন্য জরুরি। এ অর্থ করা হলে কৃতদাস কর্তৃক আমীর হওয়ার বৈধতা প্রমাণিত হয় না। কাজেই তাالأ من قرنين এ হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক হবে না।
(দুই) সাধারণভাবে কোনো কৃতদাস আমীর হতে পারে না, তবে যদি জোর পূর্বক সে তোমাদের আমীর হয়েই যায়, তবে তার আনুগত্য করাও তোমাদের উপর একান্ত কর্তব্য। তা না হলে ফিতনা সৃষ্টি হবে।
)তিন) হাদীসে عید خشنی বলতে প্রকৃত অর্থে হাবশী কৃতদাস উদ্দেশ্য নয় বরং রূপক অর্থে বলতে এমন ব্যক্তি উদ্দেশ্য, যার জ্ঞান-বুদ্ধি ও যোগ্যতা একেবারেই সামান্য। আর বলতে কুৎসিত ও কদাকৃতির ব্যক্তি উদ্দেশ্য। সুতরাং মর্ম হবে- তোমাদের উপর যদি এমন কাউকে আমীর বানিয়ে দেওয়া হয়, যার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ কোনো যোগ্যতা নেই অর্থাৎ সে যেমনিভাবে কুৎসিত, তেমনিভাবে স্বল্পবুদ্ধি সম্পন্ন, তবুও তোমাদেরকে তার আনুগত্য করে যেতে হবে এবং তাকে বরখাস্ত করার জন্য আন্দোলনে নামা যাবে না। কারণ, এতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।
وَسَتَرُونَ مِنْ بَعْدِي اخْتِلَافًا شَدِيدًا
এ বাক্যের মাধ্যমে প্রিয়নবী তার ওফাতের পর বিভিন্ন বাতিল ফিরকা সমূহের আবির্ভাব ও তাদের পক্ষ থেকে আকীদাগত নানা মত ও পথ সৃষ্টি হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন অথবা রাজত্ব দখলকে কেন্দ্র করে উম্মতের মধ্যে যে কত বিরোধ সৃষ্টি হবে এবং এর কারণে উম্মতের মাঝে যে অনৈক্যের সৃষ্টি হবে, তার ভবিষ্যত বাণী করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে, এ মতবিরোধ দ্বারা উম্মতের ফুকাহা ও মুজতাহিদগণের পরস্পরে শাখা মাসয়ালায় মতবিরোধের বিষয়টি মোটেও উদ্দেশ্য নয় কারণ, সেই মতবিরোধ তো উম্মতের জন্য আরো রহমতের কারণ হয়েছে। যেমনটি কোনো কোনো হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আছে।
RICH CAT HD : السُنَّةَ الْخُلْفَاءِ الرَّاشِدِينَ পারে। (১) আভিধানিক ও ব্যাপক অর্থ, যার মধ্যে এমন সব উলামায়ে উম্মত অন্তর্ভুক্ত। যারা নবী এর মুবারক সীরাত নিজের জীবনের পরিপূর্ণ হিসেবে অবলম্বন করেছেন। এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী خُلْنَا رَاشِدِينِ এর মধ্যে ইসলামের প্রসিদ্ধ চার খলীফা ছাড়াও চার ইমাম, অন্যান্য ফুকাহা, মুহাদ্দেসীন, মুজতাহেদীন প্রমুখ উলামা অন্তর্ভুক্ত আছেন কিছুসংখ্যক আলেমের মতে এখানে خلف لا نَبِيَّ بَعْدِي وَ سَيَكُونُ راشدين خُلَفَاهُ كَثِيرُونَ )অর্থাৎ আমার পর আর কোনো নবী আসবে না। তবে অনেক খলীফা হতে থাকবে।) এর দ্বারাও তাদের এ মতের প্রতি সমর্থন হয়।

জাতিভেদ বর্ণবাদ
জাতিভেদ

হাদিসটির ব্যাখ্যাতে দেখুন, বলা হচ্ছে, (তিন) হাদীসে প্রকৃত অর্থে হাবশী কৃতদাস উদ্দেশ্য নয় বরং রূপক অর্থে এমন ব্যক্তি উদ্দেশ্য, যার জ্ঞান-বুদ্ধি ও যোগ্যতা একেবারেই সামান্য। কুৎসিত ও কদাকৃতির ব্যক্তি উদ্দেশ্য। এর অর্থ হচ্ছে, হাবশী কৃতদাস বলতে আসলে অযোগ্য, তুচ্ছ, কুৎসিত ও কদাকৃতি বোঝানো হয়েছে। তাহলে, এটি কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের প্রতি সম্মান জানানোর জন্য বলা হয়েছে, নাকি অসম্মান করে, সেটি বিবেচক পাঠকের হাতেই ছেড়ে দিচ্ছি।


হাবশি দাসের আনুগত্য ও রাজনৈতিক যোগ্যতার পার্থক্য

হাদিসটিতে বলা হচ্ছে, হাবশি দাসের মতো একজনকেও যদি তোমাদের ওপর দায়িত্বপ্রাপ্ত করা হয়, তবু তার নির্দেশ মান্য করতে হবে। এখানে প্রাথমিক নির্দেশটি শাসকের প্রতি আনুগত্যসংক্রান্ত। তার বিপরীতে খলিফা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কুরাইশ বংশের শর্ত একটি পৃথক রাজনৈতিক বিধান। একটি ব্যবস্থায় অধস্তন প্রশাসক, সেনানায়ক কিংবা নিযুক্ত আমির হওয়ার সুযোগ থাকা এবং সেই ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ক্ষমতাসীন পদে জন্মপরিচয় নির্বিশেষে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অধিকার থাকা এক কথা নয়। এই পার্থক্যটি মুছে ফেললে আনুগত্যের হাদিসটিকে ভুলভাবে সমান রাজনৈতিক অধিকারের সনদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

ইবনে রজব আল-হাম্বলী তাঁর জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম-এ হাবশি দাসের আনুগত্যের বর্ণনা এবং কুরাইশদের খিলাফতসংক্রান্ত হাদিস পাশাপাশি আলোচনা করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় হাবশি দাস কোনো কুরাইশ ইমামের পক্ষ থেকে নিযুক্ত শাসক হতে পারেন; ফলে নিযুক্ত দাসের আনুগত্য করার নির্দেশকে কুরাইশ বংশের রাজনৈতিক শর্ত বিলুপ্ত হওয়ার প্রমাণ ধরা হয়নি। অর্থাৎ ইসলামের ধ্রুপদী ব্যাখ্যাতেই সর্বোচ্চ খলিফার যোগ্যতা ও তার দ্বারা নিযুক্ত অধস্তন শাসকের অবস্থান পৃথক করা হয়েছে। [22]

لِأَنَّ وِلَايَةَ الْعَبِيدِ قَدْ تَكُونُ مِنْ جِهَةِ إِمَامٍ قُرَشِيٍّ، وَيَشْهَدُ لِذَلِكَ مَا خَرَّجَهُ الْحَاكِمُ مِنْ حَدِيثِ عَلِيٍّ.

বাংলা অনুবাদ: কারণ দাসদের শাসনকর্তৃত্ব কোনো কুরাইশ ইমামের পক্ষ থেকে নিযুক্তির মাধ্যমেও হতে পারে। আলীর বর্ণনা থেকে হাকিম যা উদ্ধৃত করেছেন, তাও এর সমর্থন করে।

সমসাময়িক ধ্রুপদী ধারার ব্যাখ্যাকার ইবনে উসাইমীনও এই দুই ধরনের ক্ষমতার পার্থক্য করেছেন। ইসলামওয়েবে সংরক্ষিত তাঁর বক্তব্যে কুরাইশদের মধ্যে থেকে খলিফা নির্বাচনের শর্ত এবং শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতায় আসা হাবশি দাসের আনুগত্য করার বিধানকে আলাদা করা হয়েছে। ফলে হাবশি দাসের উল্লেখকে রাজনৈতিক অধিকারসমতার পূর্ণ ঘোষণা হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। এ ব্যবস্থায় জন্মপরিচয় ক্ষমতা অর্জনের পূর্বশর্ত হিসেবে অক্ষত থাকে। [23]

এবার প্রশ্নটি আরও সরাসরি করা যায়: একজন মানুষের গায়ের রং কিংবা দাসত্বের পরিচয় কেন আনুগত্যের নির্দেশের সবচেয়ে চূড়ান্ত উদাহরণ হলো? বিদ্যমান বাংলা ব্যাখ্যাগুলোয় মাথাকে কিশমিশের সঙ্গে তুলনা করে কুৎসিততা, অযোগ্যতা ও স্বল্পবুদ্ধির যে রূপক তৈরি করা হয়েছে, সেটি উদ্ধৃত মূল হাদিসের প্রতিটি শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ নয়; ব্যাখ্যাকারদের নিজস্ব অর্থনির্ধারণ। কিন্তু ওই ব্যাখ্যাকারদের ভাষাই দেখায়, তাঁরা উদাহরণটির মধ্যে সামাজিক নীচতা ও অবজ্ঞার অর্থ পেয়েছিলেন। ব্যক্তিগত অবমাননার বিরুদ্ধে আনুগত্যের নির্দেশ থাকলেও উপমার মাধ্যমে প্রচলিত অধস্তনতার ধারণা বিলুপ্ত হয়নি।


কুরাইশ বংশ ও গোত্র মর্যাদা

উপরে বর্ণবাদের সংজ্ঞার মধ্যে আমরা ইতিপূর্বে বলেছি, মেধা যোগ্যতা বুদ্ধিমত্তা নেতৃত্ব দেয়ার গুণ ইত্যাদির চাইতে যদি কোন কোন গোত্র জন্মগতভাবেই শাসন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন, এরকম ধারণাবশত শাসন ক্ষমতায় কোন নির্দিষ্ট গোত্র বা বংশের মানুষকেই বসাতে হয়, এটি বর্ণবাদের অন্তর্ভূক্ত। যেমন নাৎসিরা মনে করতো, তারাই বিশুদ্ধ রক্তের অধিকারী এবং তারাই পৃথিবী শাসন করার একমাত্র দাবীদার। অন্য সকল জাতি এবং গোত্রকে তাদের অধীনে থাকতে হবে। আবার, হিন্দুদের ভেতরে যারা ক্ষত্রিয়, তারাও মনে করতো, তাদের মধ্যে থেকেই শাসক নির্বাচিত হতে হবে, ব্রাহ্মনদের পরেই তাদের অবস্থান। ইসলামেও ঠিক একইভাবে কুরাইশ বংশকে সম্মানিত বংশ এবং খিলাফতের দাবীদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামে অসংখ্য হাদিসে কুরাইশ বংশকে শাসন করার জন্য, বিশেষ মর্যাদার অধিকারী বংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ, কুরাইশ বংশের একজন অযোগ্য ব্যক্তিও অন্যান্য গোত্রের একজন যোগ্য ব্যক্তির চাইতে বিশেষ সম্মানের অধিকারী হবে, শুধুমাত্র তার জন্ম কুরাইশ বংশে হয়েছে এই কারণে। এটি খুবই স্পষ্টভাবে গোত্রাভিমান, জাতিভেদ এবং বর্ণবাদের প্রকরণ। কোন বিশেষ বংশে জন্ম নিলেই, সে কীভাবে কোন নির্দিষ্ট পদমর্যাদার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে, তা আমাদের জানা নেই। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, এটি অত্যন্ত বাজে এবং অসভ্য ধারণা। আজ যদি শেখ হাসিনা সংবিধানে এই ধারাটি সন্নিবেশিত করে যে, এই দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে হলে তাদের গোপালগঞ্জে জন্ম নেয়া শেখ পরিবারের সদস্য হলে হবে, সেটি যেমন অসভ্য আইন হবে, এটিও একটি অসভ্য আইন। আসুন হাদিসগুলো পড়ে দেখি, [24] [25] [26] [27]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৪/ রাষ্ট্রক্ষমতা ও প্রশাসন
পরিচ্ছেদঃ ১. জনগন কুরায়শ এর অনুগামী এবং খিলাফত কুরায়শ এর জন্য
৪৫৫০। আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা ইবনু কানাব, কুতায়বা ইবনু সাঈদ, যুহায়র ইবনু হারব ও আমর আন নাকিদ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “জনগণ এর বিষয়ে (প্রশাসনিক ব্যাপারে) কুরায়শদের অনুসারী। মুসলিমরা তাদের মুসলিমদের এবং কাফেররা তাঁদের কাফেরদের (অনুসারী)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৩৪। প্রশাসন ও নেতৃত্ব
পরিচ্ছেদঃ ১. জনগণ কুরায়শদের অনুগামী এবং খিলাফত কুরায়শদের মধ্যে সীমিত
৪৫৯৭-(৩/১৮১৯) ইয়াহইয়া ইবনু হাবীব হারিসী (রহঃ) ….. জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ লোকজন ভাল-মন্দ উভয় ব্যাপারেই কুরায়শদের অনুসারী। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৫৫২, ইসলামিক সেন্টার ৪৫৫৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮২/ আহকাম
পরিচ্ছেদঃ ৩০০৬. আমীর কুরাইশদের থেকে হবে
৬৬৫৪। আবূল ইয়ামান (রহঃ) … মুহাম্মাদ ইবনু জুবায়র ইবনু মুতঈম (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, তারা কুরাইশের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মুআবিয়া (রাঃ) এর নিকট ছিলেন। তখন মুআবিয়া (রাঃ) এর নিকট সংবাদ পৌছল যে, আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, অচিরেই কাহতান গোত্র থেকে একজন বাদশাহ হবেন। এ শুনে তিনি ক্ষুদ্ধ হলেন এবং দাঁড়ালেন। এরপর তিনি আল্লাহ তা’আলার যথাযোগ্য প্রশংসা করলেন, তারপর তিনি বললেন, যা হোক! আমার নিকট এ মর্মে সংবাদ পৌছেছে যে, তোমাদের কতিপয় ব্যাক্তি এরূপ কথা বলে থাকে, যা আল্লাহর কিতাবে নেই এবং যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেও বর্ণিত নেই। এরাই তোমাদের মাঝে সবচেয়ে অজ্ঞ। সুতরাং তোমরা এ সকল মনগড়া কথা থেকে যা স্বয়ং বক্তাকেই পথভ্রষ্ট করে সতর্ক থাক। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, (খিলাফতের) এ বিষয়টি কুরাইশদের মধ্যেই থাকবে, যতদিন তারা দ্বীনের উপর কায়েম থাকবে। যে কেউ তাদের সঙ্গে বিরোধিতা করে তবে আল্লাহ তা’আলা তাকেই অধোমুখে নিপতিত করবেন। নুআয়ম (রহঃ) মুহাম্মাদ ইবনু জুবায়র (রহঃ) সুত্রে শুআয়ব এর অনুসরণ করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জুবায়র ইবনু মুত‘ইম (রাঃ)

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮২/ আহকাম
পরিচ্ছেদঃ ৩০০৬. আমীর কুরাইশদের থেকে হবে
৬৬৫৫। আহমাদ ইবনু ইউনুস (রহঃ) … ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (খিলাফতের) এই বিষয়টি সর্বদাই কুরাইশদের মধ্যেই থাকবে, যতদিন তাদের থেকে দু’জন লোকও অবশিষ্ট থাকবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইব্‌ন উমর (রাঃ)

এখানে উদ্ধৃত কুরাইশদের খিলাফতসংক্রান্ত হাদিসগুলোর পাশাপাশি সাধারণ শাসকের আনুগত্য সম্পর্কে আরেকটি হাদিস প্রাসঙ্গিক। সহিহ বুখারির ৬৬৫৮ নম্বর হাদিসে ক্ষমতাসীন আমিরের অপছন্দনীয় আচরণ দেখলেও ধৈর্য ধরার নির্দেশ রয়েছে। এই বর্ণনাটি নিজে কুরাইশ পরিচয়ের কথা বলে না; কুরাইশদের বিশেষ রাজনৈতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পূর্ববর্তী নির্দিষ্ট হাদিসগুলো এবং ধ্রুপদী খিলাফত-আইনের বক্তব্যে। [28]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮২/ আহকাম
পরিচ্ছেদঃ ৩০০৮. ইমামের আনুগত্য ও মান্যতা, যতক্ষন তা নাফরমানীর কাজ না হয়
৬৬৫৮। সুলায়মান ইবনু হারব (রহঃ) … ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কেউ তার আমীর (ক্ষমতাসীন) থেকে এমন কিছু দেখে, যা সে অপছন্দ করে, তাহলে সে যেন ধৈর্য ধারণ করে। কেননা, যে কেউ জামাআত থেকে এক বিঘত পরিমাণ দুরে সরে মরবে, তার মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

বর্ণবাদ শুধুমাত্র যে কোন বংশ বা গোত্র বা জাতিকে নিচু দেখালে হয় তা নয়, কোন জাতিকে অন্য জাতির চাইতে কোন না কোন ভাবে শ্রেষ্ঠ এরকম বলা হলেও সেটি বর্ণবাদ। অসংখ্য সহিহ হাদিসে নবী মুহাম্মদের বংশের প্রশংসা করা হয়েছে, এবং তার বংশকে সবচাইতে উঁচু স্থান দেয়া হয়েছে। নিচের হাদিসটি পড়ুন [29] [30] –

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৪৬/ রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তার সাহাবীগণের মর্যাদা
পরিচ্ছেদঃ ৬৬. আনসারগণের ও কুরাইশদের মর্যাদা
৩৯০৫। মুহাম্মাদ ইবনু সা’দ (রহঃ) হতে তার বাবার সনদে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে কেউ কুরাইশদেরকে অপদস্ত করার ইচ্ছা করবে, আল্লাহ তাকে অপদগ্ৰস্ত করবেন।
সহীহঃ সহীহাহ (১১৭৮)।
আবূ ঈসা বলেন, এ সনদ সূত্রে হাদীসটি গারীব। আবদ ইবনু হুমাইদ-ইয়াকুব ইবনু ইবরাহীম ইবনু সা’দ হতে, তিনি তার পিতা হতে, তিনি সালিহ ইবনু কাঈসান হতে, তিনি ইবনু শিহাব (রাহঃ) হতে উক্ত সনদে একই রকম বর্ণনা করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৪৪। ফাযীলাত
পরিচ্ছেদঃ ১. নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বংশের ফযীলত এবং নুবুওয়াত প্রাপ্তির আগে (তাকে) পাথরের সালাম করা প্রসঙ্গ
৫৮৩২-(১/২২৭৬) মুহাম্মাদ ইবনু মিহরান আর রাযী ও মুহাম্মাদ ইবনু ‘আবদুর রহমান ইবনু সাহম (রহঃ) …… আবূ আম্মার শাদ্দাদ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি ওয়াসিলাহ্ ইবনু আসকা (রহঃ) কে বলতে শুনেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেনঃ মহান আল্লাহ ইসমাঈল (আঃ) এর সন্তানদের থেকে কিনানাহ-কে চয়ন করে নিয়েছেন, আর কিনানাহ (‘র বংশ) হতে, কুরায়শ’ কে বাছাই করে নিয়েছেন আর কুরায়শ (বংশ) হতে বানু হাশিমকে বাছাই করে নিয়েছেন এবং বানু হাশিম হতে আমাকে বাছাই করে নিয়েছেন। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫৭৩৯, ইসলামিক সেন্টার ৫৭৭০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এখানে আরও একটি বর্ণনায় কুরাইশদের সঙ্গে রাজত্ব, আনসারদের সঙ্গে বিচার, হাবশিদের সঙ্গে আজান এবং ইয়ামানবাসীদের সঙ্গে আমানতদারির সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। এটি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক সামাজিক ভূমিকা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তিরমিজির উদ্ধৃত বর্ণনায় নবীর নামে একটি সংস্করণ থাকলেও একই বক্তব্য আবু হুরায়রার নিজস্ব উক্তি হিসেবেও এসেছে, এবং তিরমিজি সাহাবি-উক্তি সংস্করণটিকে অধিক নির্ভরযোগ্য বলেছেন। ফলে এই বিশেষ বর্ণনাটিকে নিঃশর্তভাবে মুহাম্মদের সরাসরি উক্তি ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই; এর মধ্য দিয়ে প্রাচীন মুসলিম সমাজে গোত্রভিত্তিক মর্যাদা ও দায়িত্ব বণ্টনের ধারণা স্পষ্ট হয়। ধরা যাক, একজন বাঙালি মানুষ নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য অধিক যোগ্য। কুরাইশে জন্ম না হওয়ার কারণে তার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের যোগ্যতা অস্বীকার করার বিধান জন্মগত অধিকারবৈষম্যই প্রতিষ্ঠা করে। [31]

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৪৬/ রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তার সাহাবীগণের মর্যাদা
পরিচ্ছেদঃ ৭২. ইয়ামানের মর্যাদা
৩৯৩৬। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রাজত্ব কুরাইশদের মাঝে, বিচার-বিধান আনসারদের মধ্যে, (সুমধুর সুরে) আযান হাবশীদের মাঝে এবং আমানতদারি আযদ অর্থাৎ ইয়ামানবাসীদের মাঝে।
সহীহঃ সহীহাহ (১০৮৩)।
মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী হতে, তিনি মু’আবিয়াহ ইবনু সালিহ হতে, তিনি আবূ মারইয়াম আল-আনসারী হতে, তিনি আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে এই সনদে উপর্যুক্ত হাদীসের একই রকম বর্ণনা করেছেন, তবে মারফুরূপে নয়। এ হাদীস যাইদ ইবনু হুবাবের বর্ণিত হাদীসটির তুলনায় অনেক বেশি সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)


রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় কুরাইশ বংশের শর্ত: মাওয়ার্দীর আইনশাস্ত্র

কুরাইশদের রাজনৈতিক বিশেষাধিকার কেবল কয়েকটি হাদিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আবুল হাসান আল-মাওয়ার্দী তাঁর আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ গ্রন্থে সর্বোচ্চ ইমাম বা খলিফা হওয়ার সাতটি শর্ত আলোচনা করেছেন। বিচারক্ষমতা, জ্ঞান, শারীরিক সক্ষমতা, রাষ্ট্রপরিচালনার দক্ষতা ও সাহসের পাশাপাশি সপ্তম শর্ত হিসেবে তিনি সরাসরি কুরাইশ বংশপরিচয় নির্ধারণ করেন। এখানে বংশপরিচয় ব্যক্তির অর্জিত যোগ্যতা নয়; বরং তার পূর্বপুরুষের পরিচয়। ধ্রুপদী ইসলামি আইনশাস্ত্রে এভাবেই একটি অনির্বাচিত জন্মগত পরিচয় সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ক্ষমতায় প্রবেশের শর্ত হয়েছে। [32]

وَالسَّابِعُ: النَّسَبُ، وَهُوَ أَنْ يَكُونَ مِنْ قُرَيْشٍ، لِوُرُودِ النَّصِّ فِيهِ وَانْعِقَادِ الْإِجْمَاعِ عَلَيْهِ.

বাংলা অনুবাদ: সপ্তম শর্ত হচ্ছে বংশপরিচয়; অর্থাৎ তাকে কুরাইশ বংশের হতে হবে। কেননা এ বিষয়ে ধর্মীয় বক্তব্য এসেছে এবং এর ওপর ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

মাওয়ার্দী একই আলোচনায় সাকিফার ঘটনাও উল্লেখ করেছেন। তাঁর বিবরণে আনসারদের খিলাফতের দাবির বিপরীতে আবু বকর ‘নেতারা কুরাইশ থেকে’ বক্তব্য ব্যবহার করেন। সাকিফায় নেতৃত্বের বিতর্কের এই বিবরণে জন্মগত পরিচয় কেবল সামাজিক সম্মানের বিষয় নয়; রাষ্ট্রক্ষমতা কার হাতে থাকবে, সেই বিরোধ মীমাংসার ভিত্তি। আনসারদের দাবি প্রত্যাখ্যান করার ক্ষেত্রে কুরাইশ পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় বংশপরিচয়কে রাজনৈতিক যুক্তিতে পরিণত করার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।


বংশগত মর্যাদা ও ব্যক্তিগত যোগ্যতার মৌলিক সংঘাত

কেউ কুরাইশে জন্ম নিলে তার নেতৃত্বের দক্ষতা অর্জিত হয় না, আবার কুরাইশ না হলে নেতৃত্বের দক্ষতা বিলুপ্ত হয় না। যোগ্যতার তালিকায় জ্ঞান ও ন্যায়পরায়ণতার পাশে বংশগত শর্ত যোগ করার ফলে একজন যোগ্য অনারব কিংবা অ-কুরাইশ আরব সর্বোচ্চ ক্ষমতা থেকে বাদ পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই ব্যক্তির বঞ্চনার কারণ তার কর্মদক্ষতা কিংবা অপরাধ নয়, তার জন্ম। এটি জন্মনির্ভর রাজনৈতিক বিশেষাধিকার। কোরআন ৪৯:১৩-তে গোত্রকে পরিচয়ের মাধ্যম বলা হলেও এই আইনি ব্যবস্থায় গোত্র নেতৃত্বের যোগ্যতা নির্ধারণের বাধ্যতামূলক শর্তে পরিণত হয়েছে।


শহরের মানুষ আর গ্রামের মানুষ

ইসলামি হাদিস সাহিত্যে মরুবাসী যাযাবর এবং স্থায়ী জনপদে বসবাসকারীদের সাক্ষ্য সম্পর্কেও অসম বিধানের বর্ণনা পাওয়া যায়। আবু দাউদের হাদিসে বলা হয়েছে, বেদুইন বা মরুবাসীর সাক্ষ্য শহর বা স্থায়ী জনপদবাসীর বিরুদ্ধে গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে শুধু দুই ব্যক্তির সততা বা ঘটনাটি দেখার সক্ষমতা বিচার করা হচ্ছে না; বাসস্থান ও সামাজিক পরিচয়কে সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। একজন মরুবাসী সত্যবাদী এবং প্রত্যক্ষদর্শী হলেও কেবল তার জীবনযাপনের ধরনকে বিচারিক প্রতিবন্ধকতার ভিত্তি বানানোর মধ্যে গুরুতর ন্যায়সংগত সমস্যা রয়েছে। [33] [34]

সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৮/ বিচার
পরিচ্ছেদঃ ৪০১. শহরবাসীদের উপর গ্রামবাসীদের সাক্ষ্যদান।
৩৫৬৩. আহমদ ইবন সাঈদ (রহঃ) ….. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এরূপ বর্ণনা করতে শোনেন যে, শহরবাসীদের উপর গ্রামবাসীদের সাক্ষ্য দেওয়া বৈধ নয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)


সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতায় বাসস্থান: মালিকি ও শাফেয়ি ব্যাখ্যা

এই হাদিসের আইনগত প্রয়োগে ধ্রুপদী ফকিহদের মধ্যে মতভেদ ছিল। মাওয়ার্দীর আল-হাবি আল-কাবির গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, মালিক মরুবাসীর সাক্ষ্য স্থায়ী জনপদবাসীর বিরুদ্ধে সাধারণত গ্রহণ করতেন না, যদিও আঘাত-সংক্রান্ত মামলায় ব্যতিক্রম রাখতেন। বিপরীতে শাফেয়ি এবং মাওয়ার্দীর বক্তব্য অনুযায়ী, সাক্ষীর ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠিত হলে মরুবাসী ও শহরবাসীর সাক্ষ্য সমভাবে গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ হাদিসের জন্মস্থানভিত্তিক সাক্ষ্য-অযোগ্যতার ধারণাটি কিছু ফিকহি অবস্থানে আইনি রূপ পেয়েছিল; সব মাজহাবের নিয়ম হিসেবে একে উপস্থাপন করা যথাযথ নয়। [35]

قَالَ الْمَاوَرْدِيُّ: إِذَا كَانَ الْبَدَوِيُّ عَدْلًا قُبِلَتْ شَهَادَتُهُ عَلَى الْقَرَوِيِّ، كَمَا تُقْبَلُ شَهَادَةُ الْقَرَوِيِّ عَلَى الْبَدَوِيِّ.

বাংলা অনুবাদ: মাওয়ার্দী বলেন, মরুবাসী ব্যক্তি ন্যায়পরায়ণ হলে জনপদবাসীর বিরুদ্ধে তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে, যেমন জনপদবাসীর সাক্ষ্য মরুবাসীর বিরুদ্ধে গ্রহণ করা হয়।

এখানে বংশগত বৈষম্যের মতোই একটি সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের প্রশ্ন উঠে আসে। সাক্ষ্য দেওয়ার অধিকার নির্ধারিত হওয়ার কথা ব্যক্তির প্রত্যক্ষ জ্ঞান, সততা এবং প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতার ওপর। মরুবাসী হওয়ার কারণে কোনো ব্যক্তি সত্য বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন না। এই হাদিসকে আইনের ভিত্তি বানানো হলে সাক্ষ্যের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই ব্যক্তির সামাজিক পরিচয় তার বিপক্ষে কাজ করতে পারে।


অঞ্চল বা গোত্রভিত্তিক মানসিকতা

দুর্ভিক্ষ একটি ভয়াহব ব্যাপার। একজন সভ্য মানুষ হিসেবে আমি আমার চরম শত্রুকেও দুর্ভিক্ষের অভিশাপ দিতে পারি না। কারণ কোন অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ হলে সেখানে দলে দলে শিশুরা মারা যায়, নারী এবং বৃদ্ধরা মারা যায়, প্রতিবন্ধীরা মারা যায়। এমনকি, কেউ চিহ্নিত অপরাধী হয়ে থাকলেও, দুর্ভিক্ষে না খেতে পেয়ে কেউ তিলে তিলে মারা যাক, এমনটাও আমি কখনো কামনা করি না। আমার চরম শত্রুও যদি দুর্ভিক্ষের সময় আমার কাছে একটু খাদ্য চায়, আমি তাকে খাদ্য দেবো; যদি আমার কাছে থাকে। ধর্ম বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তাকে সাহায্য করবো না। তার ধর্মবিশ্বাস নিয়ে মাথাই ঘামাবো না। তাদের অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ হোক, এমনটা কামনা করা বা এমনটা অভিশাপ দেয়ার তো প্রশ্নই আসে না। নিচের হাদিস দুইটি পড়ুন, যেখানে নবী মুহাম্মদ মুযার গোত্রের ওপর অভিশাপ দিচ্ছে, যেন তাদের অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ হয়। তর্কের খাতিরে ধরে নিই, মুযার গোত্রের কোন একজন খুব চরম কোন অন্যায় করেছিল। কিন্তু সেই একজন বা কয়েকজনার অপকর্মের দায়ে পুরো গোত্র সুদ্ধ মানুষকে অভিশাপ দেয়া, যেখানে নারী শিশু প্রতিবন্ধী মানুষ সকলেই আছে, তাদের সকলকে দুর্ভিক্ষের অভিশাপ দেয়া যেন, তারা সকলে মিলে খাবার অভাবে কষ্ট পেয়ে তিলে তিলে মারা যায়, এগুলো কীভাবে কোন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের কাজ হতে পারে, আমি জানি না [36] [37] –

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৫/ বৃষ্টির জন্য দু’আ
পরিচ্ছেদঃ ৬৩৬. নবী (ﷺ) এর দু’আ ইউসুফ (আঃ) এর যমানার দুর্ভিক্ষের বছরগুলোর মত (এদের উপরেও) কয়েক বছর দুর্ভিক্ষ দিন।
৯৫২। কুতাইবা ইবনু সায়ীদ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন শেষ রাকাআত থেকে মাথা উঠালেন, তখন বললেন, হে আল্লাহ! আইয়্যাশ ইবনু আবূ রাবী’আহকে মুক্তি দিন। হে আল্লাহ! সালামা ইবনু হিশামকে মুক্তি দিন। হে আল্লাহ! ওয়ালীদ ইবনু ওয়ালীদকে রক্ষা করুণ। হে আল্লাহ! দুর্বল মু’মিনদেরকে মুক্তি দিন। হে আল্লাহ! মুযার গোত্রের উপর আপনার শাস্তি কঠোর করে দিন। হে আল্লাহ! ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) এর যমানার দুর্ভিক্ষের বছরগুলোর ন্যায় (এদের উপর) কয়েক বছর দুর্ভিক্ষ দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বললেন, গিফার গোত্র, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করুন। আর আসলাম গোত্র, আল্লাহ তাদেরকে নিরাপদে রাখুন। ইবনু আবূ যিনাদ (রহঃ) তাঁর পিতা থেকে বলেন, এ সমস্ত দু’আ ফজরের সালাতে ছিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৫/ বৃষ্টির জন্য দু’আ
পরিচ্ছেদঃ ৬৩৬. নবী (ﷺ) এর দু’আ ইউসুফ (আঃ) এর যমানার দুর্ভিক্ষের বছরগুলোর মত (এদের উপরেও) কয়েক বছর দুর্ভিক্ষ দিন।
৯৫৩। হুমাইদী ও উসমান ইবনু আবূ শাইবা (রহঃ) … আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন লোকদেরকে ইসলাম বিমুখ ভুমিকায় দেখলেন, তখন দু’আ করলেন, হে আল্লাহ! ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) এর যামানার সাত বছরের (দুর্ভিক্ষের) ন্যায় তাঁদের উপর সাতটি বছর দুর্ভিক্ষ দিন। ফলে তাঁদের উপর এমন দুর্ভিক্ষ আপতিত হল যে, তা সব কিছুই ধ্বংস করে দিল। এমনকি মানুষ তখন চামড়া, মৃতদেহ এবং পচা ও গলিত জানোয়ারও খেতে লাগলো। ক্ষুদার তাড়নায় অবস্থা এতদূর চরম আকার ধারণ করল যে, কেউ যখন আকাশের দিকে তাকাত তখন সে ধুঁয়া দেখতে পেত। এমতাবস্থায় আবূ সুফিয়ান (ইসলাম গ্রহনের পূর্বে) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বলল, হে মুহাম্মদ! তুমি তো আল্লাহর আদেশ মেনে চল এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখার আদেশ দান কর। কিন্তু তোমার কওমের লোকেরা তো মরে যাচ্ছে। তুমি তাঁদের জন্য আল্লাহর নিকট দু’আ কর। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’লা বলেছেনঃ
‏فَارْتَقِبْ يَوْمَ تَأْتِي السَّمَاءُ بِدُخَانٍ مُبِينٍ‏‏ إِلَى قَوْلِهِ ‏‏عَائِدُونَ * يَوْمَ نَبْطِشُ الْبَطْشَةَ الْكُبْرَى
আপনি সে দিনটির অপেক্ষায় থাকুন যখন আকাশ সুস্পষ্ট ধুঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যাবে সেদিন আমি প্রবলভাবে তোমাদের পাকড়াও করব”। (৪৪ঃ ১০-১৬)
আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, সে কঠিন আঘাত এর দিন ছিল বদরের যুদ্ধের দিন। ধুঁয়াও দেখা গেছে, আঘাতও এসেছে। আর মক্কার মুশরিকদের নিহত ও গ্রেফতারের যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, তাও সত্য হয়েছে। সত্য হয়েছে সুরা রুম-এর এ আয়াতও (রুমবাসী দশ বছরের মধ্যে পারসিকদের উপর আবার বিজয় লাভ করবে)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ‌ ইব্‌ন মাসউদ (রাঃ)

অন্যদিকে কোনো বিশেষ অঞ্চল বা গোত্রের জন্য সামষ্টিকভাবে বরকতের দোয়া এবং অন্য অঞ্চলের সঙ্গে বিপর্যয়ের সম্পর্ক স্থাপনের বর্ণনাও পাওয়া যায়। একটি অঞ্চলের মানুষের চরিত্র, যোগ্যতা বা নৈতিকতা সকলের জন্য একরকম নয়। কারও জন্মের কারণে তিনি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সদস্য হয়েছেন, তাই তার ব্যক্তিগত কর্মফল সেই অঞ্চলের অন্য সবার মতো হবে—এমন ধারণা যুক্তিসংগত নয়। কোনো জনগোষ্ঠীর কল্যাণ কামনা করা নিজে অন্যায় নয়, কিন্তু অঞ্চলগত পরিচয়কে বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদা বা অশুভতার ধারক হিসেবে উপস্থাপন করলে সেই অঞ্চলের মানুষকে নিয়ে পূর্বধারণা তৈরি হতে পারে। তিরমিজির এই হাদিসে শাম ও ইয়ামানের জন্য বরকতের প্রার্থনা এবং নজদ সম্পর্কে বিপর্যয়ের বক্তব্য এসেছে। [38]

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৪৬/ রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তার সাহাবীগণের মর্যাদা
পরিচ্ছেদঃ ৭৫. শাম ও ইয়ামানের মর্যাদা।
৩৯৫৩। ইবনু উমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে আল্লাহ! আমাদের শামদেশে বারাকাত দান করুন, হে আল্লাহ! আমাদের ইয়ামানদেশে বারাকাত দান করুন। লোকেরা বলল, আমাদের নাজদের জন্যও (দুআ করুন)। তিনি পুনরায় বলেনঃ হে আল্লাহ! আমাদের সিরিয়ায় বারাকাত দান করুন, আমাদের ইয়ামানদেশে বারাকাত দান করুন। এবারও লোকেরা বলল, আমাদের নাজদের জন্যও (দু’আ করুন)। তিনি বললেনঃ সেখানে ভূমিকম্প, বিশৃঙ্খলা বা বিপর্যয় রয়েছে অথবা তিনি বলেছেনঃ সেখান হতেই শাইতানের শিং আবির্ভাব হবে।
সহীহ তাখরাজ ফাযায়িলিশ শাম (৮), সহীহাহ (২২৪৬)।
আবূ ঈসা বলেন, উপর্যুক্ত সনদে এ হাদীসটি হাসান সহীহ এবং ইবনু ‘আওনের বর্ণনার পরিপ্রেক্ষিতে গারীব। হাদীসটি সালিম ইবনু আবদিল্লাহ ইবনু উমার-তার বাবা হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সনদেও বর্ণিত হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইব্‌ন উমর (রাঃ)


সমষ্টিগত শাস্তি ও নিরপরাধ মানুষের দায়

মুযার গোত্রের ওপর দুর্ভিক্ষের প্রার্থনার বর্ণনায় প্রধান নৈতিক প্রশ্নটি হচ্ছে সমষ্টিগত দায় আরোপ। একটি গোত্রের কিছু সদস্য বিরোধিতা করেছেন কিংবা সংঘাতে অংশ নিয়েছেন—এমন পরিস্থিতি থাকলেও গোত্রের প্রতিটি শিশু, বৃদ্ধ ও নিরস্ত্র মানুষ একই কাজে যুক্ত ছিলেন, এমন সিদ্ধান্ত করা যায় না। দুর্ভিক্ষ কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধীকে লক্ষ্য করে আঘাত করে না; খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য এবং জীবনধারণের ওপর নির্ভরশীল পুরো জনসমাজকে বিপন্ন করে। বুখারির দ্বিতীয় বিবরণে মানুষ মৃতদেহ ও পচা প্রাণী খেতে বাধ্য হওয়ার মতো দুর্দশার কথাই এসেছে। ফলে এ ঘটনাকে কেবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষার প্রার্থনা হিসেবে দেখলে দুর্ভিক্ষের বাস্তব মানবিক ক্ষতি আড়ালে পড়ে যায়।

শাম, ইয়ামান ও নজদসংক্রান্ত বর্ণনাটি আলাদা ধরনের সমস্যা দেখায়। এখানে অপরাধের বিচার না করে একটি অঞ্চলকে আশীর্বাদ এবং অন্য অঞ্চলকে বিপর্যয়ের ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। একটি অঞ্চলে অসৎ ব্যক্তি থাকতে পারেন, অন্য অঞ্চলে ন্যায়পরায়ণ মানুষ থাকতে পারেন; জন্মস্থান দিয়ে কারও ব্যক্তিগত চরিত্র নির্ধারণ করা যায় না। আশীর্বাদের প্রার্থনা কাউকে দণ্ড দেওয়ার সমতুল্য নয়, কিন্তু অঞ্চলভিত্তিক নৈতিক শ্রেণিবিন্যাসকে ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভাষায় প্রতিষ্ঠা করার সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে।


কালো, তবু সুন্দর?

সেই ছোটবেলা থেকেই আমরা নানা ধরণের রূপকথা এবং দাদীনানীর মুখ থেকে অনেক গল্প শুনে বড় হই। আমাদের মন মানসিকতার ভিত্তি গঠনে সেগুলো খুব বড় প্রভাব বিস্তার করে। আমরা অনেকেই ভাবতেও পারি না, সেই ছোটবেলা থেকেই আমাদের শিক্ষা দেয়া হয় বর্ণবাদের। যেমন, আমি একটি গল্প ছোটবেলায় শুনেছিলাম, এক রাণী, তার গায়ের রঙ কালো। তার মনে বেজায় দুঃখ। তো একবার সে একটি বর পেলো। একটি পুকুরে ডুব দিলে সে ফর্সা হয়ে যাবে। সে পুকুরে গিয়ে ডুব দিলো, অমনি ফর্সা হয়ে গেল। সেই রানীর এক সতীন ছিল। সে ছিল ফর্সা। সে এই ঘটনাটি জেনে গেল। তো আরো বেশি ফর্সা হওয়ার জন্য সে ঐ পুকুরে অনেকবার গিয়ে ডুব দিতে লাগলো। কিন্তু দেখা গেল, অনেকবার ডুব দেয়ার কারণে সে কালো হয়ে গেছে। গল্পটি দ্বারা আমাদের শেখানোর চেষ্টা হয়েছিল যে, অতি লোভ করতে নেই। কিন্তু, একইসাথে আমরা এটিও শিখেছিলাম যে, ফর্সা হওয়াটাই সুন্দর। মানে ফর্সা মানেই সৌন্দর্য্য, কালো মানেই কুৎসিত! যা ছিল অত্যন্ত নোংরা বর্ণবাদী একটি ধারণা।

বড় হওয়ার পরেও টেলিভিশন, মিডিয়া, সংবাদপত্রে একই ধরণের বিজ্ঞাপন দেখতাম। একটি মেয়ে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছে, তার গায়ের রঙ কালো। তাকে চাকরিটি দেয়া হলো না। সে ফেয়ার এন্ড লাভলি কিনলো। মাখলো। দুই সপ্তাহেই সে হয়ে উঠলো ফর্সা। এরপরে তাকে চাকরিতে নেয়া হলো। যে তাকে দেখে সেই প্রেম করতে চায়। সে এক দারুণ অবস্থা! এইসব বিজ্ঞাপন দ্বারা আসলে খুব কৌশলে মানুষের মধ্যে এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করে দেয়া হয় যে, কালো মানেই অসুন্দর, আর ফর্সা মানেই সুন্দর। সাহিত্যে, শিল্পকলায়, গানে, সিনেমায়, সব জায়গাতেই লক্ষ্য করলে দেখবেন, গল্পটির অশুভ বা খলনায়ক চরিত্রটি হয় কালো চামড়ার, আর শুভ চরিত্রটির গায়ের চামড়া হয় ফর্সা। যুগযুগ ধরে কালো বেড়াল আমাদের দেশে অশুভ বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। ডাউনি, পেত্নী, রাক্ষুসী এগুলো সবকিছুর কথা মনে হলেই, মানসিকভাবেই আমাদের চোখে ভেসে আসে কালো গায়ের রঙের একজনার ছবি। অবচেতনভাবেই আমরা ভেবে নিই, সে কালোই হবে। আর দেবদূত বা ফেরেশতা বা দেবতা হিসেবে কল্পনা করলে, মনের মধ্যে ভেসে আসে ফর্সা ধবধবে একজনার ছবি। সাদা দাড়িওয়ালা সাদা জামা পড়া একজনার ছবি। এগুলো সেই ছোটবেলাতেই আমাদের মগজে এমনভাবে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে যে, এসব বর্ণবাদী চিন্তা থেকে বের হওয়া খুব কঠিন ব্যাপার।

কিছুদিন আগে বাঙলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র প্রথম আলো “কালো, তবু সুন্দর” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। লক্ষ্য করলে দেখবেন, এখানে তবু শব্দটি দিয়ে যাদের গায়ের রঙ কালো, তাদের সম্পর্কে অসম্ভব নোংরা এবং বর্ণবাদী চিন্তা প্রকাশ করা হয়েছে। তবু, যদিও, তবুও, এমনকি, এই শব্দগুলো কখন এবং কীভাবে ব্যবহৃত হয়, সেটি আমরা সকলেই বুঝি। এর অর্থ হচ্ছে, উনি কালো, তারপরেও সুন্দর! যেন কালো মানুষ মাত্রই অসুন্দর, তবে এই কালো মেয়েরা কালো হওয়ার পরেও সুন্দর! অত্যন্ত নোংরা এবং ইতর শ্রেণির এই প্রতিবেদন বিপুল সমালোচনার শিকার হয়, এবং পরবর্তীতে তারা তাদের শিরোনামটি বদলে ফেলতে বাধ্য হয়। এই নিয়ে বিবিসির এই প্রতিবেদনটি দেখতে পারেন [39]

জাতিভেদ 2

কিছু গবেষণাতে এই বিষয়গুলোর সরাসরি প্রমাণও পাওয়া গেছে যে, ছোটবেলা থেকে কালো গায়ের চামড়ার মানুষদের সম্পর্কে অন্য কোন তথ্য না জেনেই, একটি স্বাভাবিক ধারণা তৈরি থাকে যে, কালো মানুষ মাত্রই খারাপ মানুষ। নিচের ভিডিওটি দেখুন, এখানে কয়েকজন শিশুর ওপর পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। পরীক্ষাটিতে এমনকি কালো চামড়ার শিশুরাও কালো রঙের পুতুলগুলোকে অসুন্দর এবং খারাপ চরিত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, আমরা সেই ছোটবেলা থেকেই এই ধারণাগুলো মানুষের মধ্যে ঢুকিয়ে দিই ( Clark Doll experiments ) ।

https://youtu.be/PZryE2bqwdk

শৈশবের শেখা পূর্বধারণা থেকে সামাজিক বৈষম্য

রূপকথা, বিজ্ঞাপন ও সংবাদপত্রের এই তিনটি উদাহরণে একই মানসিক প্রক্রিয়া কাজ করছে। প্রথমে একটি নির্দিষ্ট বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যকে সৌন্দর্য কিংবা নিকৃষ্টতার প্রতীক বানানো হয়; পরে সেই মূল্যায়নকে এতবার পুনরাবৃত্ত করা হয় যে, মানুষ সেটিকে স্বাভাবিক সত্য বলে ধরে নিতে শুরু করে। এমনকি যিনি নিজেকে বর্ণবাদবিরোধী মনে করেন, তিনিও সৌন্দর্য, বিবাহযোগ্যতা কিংবা যোগ্যতা বিচারের ক্ষেত্রে গায়ের রঙকে অজান্তে প্রাধান্য দিতে পারেন। ‘কালো, তবু সুন্দর’ বাক্যটিতে কালো হওয়া এবং সুন্দর হওয়ার মধ্যে অপ্রত্যাশিত সম্পর্ক তৈরি হয়—যেন কালো হওয়া সাধারণত সৌন্দর্যের বিপরীত। এই সূক্ষ্ম ভাষাই সামাজিক ধারণা পুনরুৎপাদন করে।

ক্লার্ক দম্পতির পুতুল পরীক্ষার বিভিন্ন সংস্করণে শিশুদের পুতুলের রং অনুযায়ী পছন্দ ও মূল্যায়ন অনুসন্ধান করা হয়েছিল। এই পরীক্ষাগুলো থেকে নির্দিষ্ট সময় ও সামাজিক পরিবেশে রঙ-সংক্রান্ত পূর্বধারণা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়; পরীক্ষার ফলকে পৃথিবীর প্রতিটি শিশুর জন্মগত মানসিক বৈশিষ্ট্যের প্রমাণ বলা যায় না। বরং এর তাৎপর্য হচ্ছে, শিশুরা সমাজ থেকে শেখা সৌন্দর্য ও মর্যাদার মানদণ্ড নিজেদের মধ্যেও গ্রহণ করতে পারে। ধর্মীয় উপমা, লোককথা এবং সামাজিক ভাষা একই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক শিক্ষার অংশ হতে পারে।


মুহাম্মদের গায়ের রঙ

এই প্রশ্নটি অনেকের মনেই আসতে পারে, নবী মুহাম্মদ ব্যক্তিগতভাবে কীরকম ছিলেন? তার গায়ের রঙ কেমন ছিল? আসুন হাদিস থেকেই সেটিও জেনে নিই [40] [41] –

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৫/ ফযীলত
পরিচ্ছেদঃ ২৮. নবী (ﷺ) এর দিলে কমনীয় (লালচে) শুভ্র চেহারার অধিকারী
৫৮৬২। সাঈদ ইবনু মানসুর (রহঃ) … আবূ তুফায়ল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি (জুরায়রী) বলেন, আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, আপনি কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তিনি ছিলেন ফর্সা, লাবণ্যময় চেহারার অধিকারী।
মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (রহঃ) বলেন, একশ হিজরীতে আবূ তুফায়ল (রাঃ) ইন্তেকাল করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীদের মধ্যে তিনই সর্বশেষে ইন্তেকাল করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবুত্ব তুফায়ল (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৫/ ফযীলত
পরিচ্ছেদঃ ২৮. নবী (ﷺ) এর দিলে কমনীয় (লালচে) শুভ্র চেহারার অধিকারী
৫৮৬৩। উবায়দুল্লাহ ইবনু উমর কাওয়ারীরী (রহঃ) … আবূ তুফায়েল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছেন আমি ছাড়া এমন কেউ দুনিয়ায় আর অবশিষ্ট নেই। রাবী বলেন, আমি বললাম, তাঁকে কেমন দেখেছেন? তিনি বললেন, ফর্সা, লাবণ্যময় এবং মধ্যমাকৃতির।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবুত্ব তুফায়ল (রাঃ)

এই বর্ণনাগুলো সরাসরি অন্য গায়ের রঙের মানুষকে নিকৃষ্ট ঘোষণা করে না। এখানে মুহাম্মদের শারীরিক বর্ণনার সঙ্গে সৌন্দর্য ও লাবণ্যের বিশেষণ একত্রে এসেছে। ব্যক্তিগতভাবে কারও ফর্সা হওয়া বা সেই রঙের বর্ণনা দেওয়া নিজে বর্ণবাদ নয়। কিন্তু ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্যবর্ণনার সঙ্গে কোন কোন শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে নিয়মিত যুক্ত করা হচ্ছে, তা একটি বৃহত্তর সামাজিক সৌন্দর্যবোধের সঙ্গে তুলনা করা যায়। এই পর্যবেক্ষণকে স্বয়ংসম্পূর্ণ বর্ণবাদের প্রমাণ না বানিয়ে পাপ, অশুভ, শাস্তি ও জান্নাতের শুভ্রতা-সংক্রান্ত পরের বর্ণনাগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।


পাপের রঙ কালো?

নবী মুহাম্মদের নামে প্রচলিত একাধিক বর্ণনায় কালো রঙকে পাপের ফলাফল এবং শুভ্রতাকে পাপমুক্ত অবস্থার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। হাজরে আসওয়াদ সম্পর্কে বলা হয়েছে, পাথরটি জান্নাত থেকে অবতীর্ণ হওয়ার সময় দুধের চেয়েও সাদা ছিল; মানুষের পাপের কারণে তা কালো হয়ে গেছে। এখানে রঙের পরিবর্তনটিই নৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের চিহ্ন। একটি সাদা পাথরকে পাপ কালো করে দিয়েছে—এই ভাষা কালো ও সাদার মধ্যে ভালো-মন্দের প্রতীকী বৈপরীত্য নির্মাণ করে। [42]

সূনান তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৯/ হাজ্জ (হজ্জ)
পরিচ্ছেদঃ হাজরে আসওয়াদ রুকন ও মাকামে ইবরাহীমের ফযীলত।
৮৭৮. কুতায়বা (রহঃ) ……. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হাজরে আসওয়াদ জান্নাত থেকে অবতীর্ন হয়েছিল তখন সেটি ছিল দুধ থেকেও শুভ্র। মানুষের গুণাহ- খাতা এটিকে এমন কালো করে দিয়েছে। – মিশকাত ২৫৭৭, তা’লীকুর রাগীব ২/১২৩, আল হাজ্জুল কাবীর, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ৮৭৭ (আল মাদানী প্রকাশনী)
এই বিষয়ে আবদুল্লাহ ইবনু আমর ও আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। ইমাম আবূ ঈসা (রহঃ) বলেন, ইবনু আব্বাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীসটি হাসান-সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

আরো অনেকগুলো হাদিসে পাপকে কালো রঙের সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে, আর সাদাকে করা হয়েছে পুন্যের সাথে [43] [44] [45]।

সুনানে ইবনে মাজাহ
৩১/ পার্থিব ভোগবিলাসের প্রতি অনাসক্তি
পরিচ্ছেদঃ ৩১/২৯. পাপের স্মরণ
৩/৪২৪৪। আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মুমিন ব্যক্তি যখন গুনাহ করে তখন তার কলবে একটি কালো দাগ পড়ে। অতঃপর সে তওবা করলে, পাপকাজ ত্যাগ করলে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করলে তার কলব পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। সে আরও গুনাহ করলে সেই কালো দাগ বেড়ে যায়। এই সেই মরিচা যা আল্লাহ তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন (অনুবাদঃ) ‘‘কক্ষনো নয়, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে জং (মরিচা) ধরিয়েছে’’ (সূরা আল-মুতাফফিফীনঃ ১৪)।
তিরমিযী ৩৩৩৪, আহমাদ ৭৮৯২, আত-তালীকুর রাগীব ২/২৬৮, ৪/৭৪। তাহকীক আলবানীঃ হাসান।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)

সূনান তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ কুরআন তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ সূরা ওয়াইলুল-লিল-মুতাফফিফীন
৩৩৩৪. কুতায়বা (রহঃ) ….. আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বান্দা যখন কোন গুনাহ করে তখন তার হৃদয়ে একটি কাল দাগ পড়ে। পরে যখন সে গুনাহ থেকে বিরত হয় এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে ও তাওবা করে তখন তার হৃদয় উজ্জ্বল হয়ে যায়। কিন্তু সে যদি পুনরাবৃত্তি করে তবে কাল দাগ বৃদ্ধি পায়। এমনকি তার হৃদয়ের উপর তা প্রবল হয়ে উঠে। এই আবস্থাটিকেই আল্লাহ তা’আলা রা’ন (মরচে পড়া) বলে উল্লেখ করেছেনঃ (كلاَّ بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ) – কখনও নয়, বরং এদের কৃতকর্মেও দরুন এদের হৃদয়ে জং ধরেছে। (সূরা মুতাফফিফীন ৮৩ঃ ১৪)।
হাসান, আত তা’লীকুর রাগীব ২/২৬৮, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ৩৩৩৪ (আল মাদানী প্রকাশনী)
(আবু ঈসা বলেন) হাদীসটি হাসান- সহীহ।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৬৩. কতকের অন্তর থেকে ঈমান ও আমানতদারী উঠিয়ে নেয়া এবং অন্তরে ফিতনার সৃষ্টি হওয়া
২৬৭. মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু নুমায়র (রহঃ) … হুযায়ফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, একদিন আমরা উমর (রাঃ)-এর কাছে ছিলাম। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ফিতনা সম্পর্কে আলোচনা করতে শুনেছ? উপস্থিত একদল বললেন, আমরা শুনেছি। উমর (রাঃ) বললেন, তোমরা হয়ত একজনের পরিবার ও প্রতিবেশীর ফিতনার কথা মনে করেছ। তারা বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। তিনি বললেন, সালাত (নামায/নামাজ), রোযা ও সা’দকার মাধ্যমে এগুলোর কাফফারা হয়ে যায়। উমর (রাঃ) বললেন, না, আমি জানতে চেয়েছি, তোমাদের কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সে বৃহৎ ফিতনার কথা আলোচনা করতে শুনেছে, যা সমুদ্র তরঙের মত ধেয়ে আসবে।
হুযায়ফা (রাঃ) বলেন, প্রশ্ন শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল। আমি বললাম, আমি (শুনেছি)। উমর (রাঃ) বললেন, তুমি শুনেছ, মা-শা আল্লাহ। হুযায়ফা (রাঃ) বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, চাটাই বুননের মত এক এক করে ফিতনা মানুষের অন্তরে আসতে থাকে। যে অন্তরে তা গেঁথে যায়, তাতে একটি করে কাল দাগ পড়ে। আর যে অন্তর তা প্রত্যাখ্যান করবে, তাতে একটি করে শুভ্রোজ্জ্বল চিহ্ন পড়বে। এমনি করে দুটি অন্তর দু’ধরণের হয়ে যায়। একটি শ্বেত পাথরের মত; আসমান ও যমীন যতদিন থাকবে ততদিন কোন ফিতনা তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আর অপরটি হযে যায় উল্টানো কাল কলসির মত, প্রবৃত্তি তার মধ্যে যা সেঁধে দিয়েছে তা ছাড়া ভালমন্দ বলতে সে কিছুই সে চিনে না।
হুযায়ফা (রাঃ) বললেন, উমর (রাঃ) কে আমি আরো বললাম, আপনি এবং সে ফিতনার মধ্যে একটি বন্ধ দরজা রয়েছে। অচিরেই সেটি ভেঙ্গে ফেলা হবে। উমর (রাঃ) বললেন, সর্বনাশ! তা ভেঙে ফেলা হবে? যদি ভেঙে ফেলা না হতো, তাহলে হয়ত পূনরায় বন্ধ করা যেত। হুযায়ফা (রাঃ) উত্তর করলেন, না ভেঙে ফেলাই হবে। হুযায়ফা (রাঃ) বলেন, আমি উমর (রাঃ) কে এ কথাও শুনিয়েছি, সে দরজাটি হল একজন মানুষ; সে নিহত হবে কিংবা স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করবে। এটি কোন গল্প নয় বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাদীস। বর্ণনাকারী আবূ খালিদ বলেন, আমি সা’দকে জিজ্ঞেস করলাম,أَسْوَدُ مُرْبَادًّا এর অর্থ কি? উত্তরে তিনি বললেন, ‘কালো-সাদায় মিশ্রিত রং-। আমি বললাম,الْكُوزُ مُجَخِّيًا এর অর্থ কি? তিনি বললেন ‘উল্টানো কলসি’।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ হুযাইফাহ (রাঃ)


কিয়ামতের দিন কালো মুখ ও সাদা মুখ: কোরআনের সরাসরি বক্তব্য

এই প্রতীক শুধু হাদিসে সীমাবদ্ধ নেই। কোরআনের সূরা আলে ইমরানের ১০৬ ও ১০৭ নম্বর আয়াতে কিয়ামতের দিনে একদল মানুষের মুখ কালো এবং অন্যদলের মুখ সাদা হওয়ার বর্ণনা রয়েছে। মুখ কালো হওয়া শাস্তির সঙ্গে এবং মুখ সাদা হওয়া আল্লাহর অনুগ্রহের সঙ্গে সম্পর্কিত। সংশ্লিষ্ট আয়াতের ভাষাতেই নৈতিক পুরস্কার ও শাস্তির এই রঙগত বৈপরীত্য উপস্থিত। [46]

يَوْمَ تَبْيَضُّ وُجُوهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوهٌ ۚ فَأَمَّا الَّذِينَ اسْوَدَّتْ وُجُوهُهُمْ أَكَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُونَ

বাংলা অনুবাদ: যেদিন কিছু মুখ সাদা হবে এবং কিছু মুখ কালো হবে। যাদের মুখ কালো হবে, তাদের বলা হবে: তোমরা কি বিশ্বাসের পর অবিশ্বাস করেছিলে? তোমাদের অবিশ্বাসের কারণে শাস্তি আস্বাদন করো।

একই ধারাবাহিকতার পরবর্তী আয়াতে সাদা মুখের মানুষকে স্থায়ী অনুগ্রহপ্রাপ্ত হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। [47]

وَأَمَّا الَّذِينَ ابْيَضَّتْ وُجُوهُهُمْ فَفِي رَحْمَةِ اللَّهِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

বাংলা অনুবাদ: আর যাদের মুখ সাদা হবে, তারা আল্লাহর অনুগ্রহের মধ্যে থাকবে; সেখানে তারা স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে।

সূরা যুমার ৩৯:৬০-এ আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যারোপকারীদের মুখ কালো হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই আয়াতেও কালো মুখকে শাস্তি ও নৈতিক নিন্দার চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। [48]

وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ تَرَى الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى اللَّهِ وُجُوهُهُمْ مُسْوَدَّةٌ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوًى لِلْمُتَكَبِّرِينَ

বাংলা অনুবাদ: কিয়ামতের দিন তুমি দেখবে, যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা বলেছিল তাদের মুখ কালো হয়ে গেছে। অহংকারীদের আবাস কি জাহান্নামে নয়?

কোরআনের এই আয়াতগুলোতে মানুষের স্বাভাবিক জন্মগত কালো গায়ের রংকে অপরাধের প্রমাণ বলা হয়নি; বলা হয়েছে শাস্তিপ্রাপ্তদের মুখ কালো হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু প্রতীকী ভাষার নিজস্ব সামাজিক অর্থ রয়েছে। যখন কোনো সংস্কৃতিতে কালো রঙকে একই সঙ্গে অপবিত্রতা, পাপ ও শাস্তির চিত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, সেই প্রতীকসমষ্টি কালো রঙ সম্পর্কে নেতিবাচক মূল্যবোধ তৈরি বা দৃঢ় করতে পারে। মানুষের প্রতি সরাসরি বর্ণগত বৈষম্যের প্রমাণ এবং রঙকে ব্যবহার করে গড়ে ওঠা নেতিবাচক সাংস্কৃতিক প্রতীক—এই দুই ধরনের সাক্ষ্য পরস্পর সম্পর্কিত হলেও অভিন্ন নয়।


মহামারী ও অশুভ হচ্ছে কালো

নবী মুহাম্মদ স্বপ্নে দেখলেন একজন এলোমেলো চুলের নারীকে, যার গায়ের রঙ কালো। সে আসলে ছিল মহামারী। অর্থাৎ, একটি অশুভ চরিত্রকে চিত্রিত করতে নবী কালো গায়ের চামড়ার একজন নারীকে স্বপ্নে দেখেছেন, তার সাহাবীরাও এর ব্যাখ্যা হিসেবে বুঝে নিয়েছে যে, সেই কালো রঙের মহিলাটি ছিল অশুভ মহামারী! [49] [50]

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩২/ স্বপ্ন ও তার তাৎপর্য
পরিচ্ছেদঃ ১০. স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাড়িপাল্লা ও বালতি দর্শন
২২৯০৷ আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বপ্ন দর্শন প্রসঙ্গে তিনি বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ আমি এলোমেলো চুল ওয়ালা এক কালো মহিলাকে মদীনা হতে বের হয়েমাহইয়াআহ-তে গিয়ে দাঁড়াতে দেখেছি। মাহইয়াআহ হলো জুহফা। তারপর আমি এর ব্যাখ্যা করেছি যে, মাদীনার মহামারী জুহফাতে স্থানান্তরিত হলো।
সহীহ, ইবনু মা-জাহ (৩৯২৪), বুখারী।
আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি সহীহ গারীব।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইব্‌ন উমর (রাঃ)

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
৯১/ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা
পরিচ্ছেদঃ ৯১/৪২. স্বপ্নে কালো মহিলা দেখা।
৭০৩৯. ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি মাদ্বীনাহ সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্বপ্নের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন। তিনি বলেছেনঃ আমি দেখেছি এলোমেলো চুল ওয়ালা একজন কালো মহিলা মাদ্বীনাহ থেকে বের হয়েছে। অবশেষে মাহইয়ায়া নামক জায়গায় অবস্থান নিয়েছে। আমি এর ব্যাখ্যা করলাম যে, মাদ্বীনাহর মহামারী মাহইয়া‘আহ তথা জুহ্ফা নামক জায়গায় স্থানান্তরিত হল। (৭০৩৮) (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৫৪৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৫৬২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইব্‌ন উমর (রাঃ)

এই দুই হাদিস একই স্বপ্নের বিবরণ তুলে ধরেছে; সেগুলোকে দুটি স্বাধীন ঘটনার প্রমাণ হিসেবে গণনা করার প্রয়োজন নেই। বর্ণনায় একজন এলোমেলো চুলের কালো নারীর অবয়বকে মহামারীর স্থানান্তরের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। রোগ ছড়ানোর সঙ্গে কোনো বাস্তব কৃষ্ণাঙ্গ নারীর সম্পর্ক এখানে প্রমাণ করা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী একটি বিপদের প্রতীক হিসেবে কোন অবয়বটি বেছে নেওয়া হয়েছে। সামাজিক কল্পনায় কালো রঙ এবং নারীর ভয়াবহ অবয়ব অশুভের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হতে পারে, এই বিবরণ সেই প্রশ্ন তুলেছে।


কালো কুকুর হচ্ছে শয়তান

নবী বলেছেন, কালো কুকুর হচ্ছে শয়তান [51] [52] , সেগুলোকে হত্যা করতে হবে [53]। মানব ইতিহাসে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যে, কালো রঙের কুকুর অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করেছে। আমি নিজেই এরকম কয়েকটি ঘটনার সাক্ষী। সেইসব কালো কুকুর শয়তান হয়ে থাকলে, এত এত মানুষের জীবন তারা কেন রক্ষা করলো? কালো কুকুর মাত্রই কেন শয়তান, কেন অশুভ, কেন খারাপ, কেন হত্যাযোগ্য, এর থেকে কী বোঝা যায়, সেটি পাঠকের হাতেই ছেড়ে দিচ্ছি [54]।

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৪/ কিতাবুস স্বলাত
পরিচ্ছদঃ ৫০. মুসল্লীর সুতরার পরিমাণ
১০২০। আবূ বাকর ইবনু আবূ শায়বা ও যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) … আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তোমাদের মধ্যে কেউ-সালাত (নামায/নামাজ)-এ দাঁড়াবে, তখন তার সম্মুখে হাওদার পিছনের কাষ্ঠ পরিমাণ কোনও বস্তু রেখে দিবে। যদি এরূপ কোনও বস্তু না থাকে, তবে তার সম্মুখ দিয়ে গাধা স্ত্রীলোক ও কালো কুকুর গমন করলে তার সালাত (নামায/নামাজ) ভঙ্গ হয়ে যাবে।
রাবী ইবনু সামিত বলেন, আমি বললাম, হে আবূ যার! লাল কুকুর ও হলুদ কুকুর থেকে কালো কুকুরকে পৃথক করার কারণ কি? তিনি জওয়াব দিলেন, হে ভাতিজা, আমিও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তোমার মত এই বিষয়টি জিজ্ঞাস করেছিলাম। তিনি বলেছেন, কালো কুকুর একটি শয়তান।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

 সহিহ মুসলিম
সহিহ মুসলিম

সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ১১/ শিকার প্রসঙ্গে
পরিচ্ছদঃ ৯৯. শিকারে উদ্দেশ্যে বা অন্য কোন প্রয়োজনে কুকুর পোষা।
২৮৩৬. মুসাদ্দআদ (রহঃ) ……….. ‘আবদুল্লাহ্ ইবন মুগাফফাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি কুকুর আল্লাহ্ তা‘আলার বহুজাতিক সৃষ্টজীবের মাঝে এক জাতীয় সৃষ্টি না হত, তবে আমি তাদের হত্যা করার নির্দেশ দিতাম। এখন তোমরা তাদের থেকে কেবল কালবর্ণের কুকুরকেই হত্যা করবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এখানে বর্ণনার প্রভাব কেবল উপমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আবু দাউদের হাদিসে নির্দিষ্ট রঙের কুকুর হত্যার নির্দেশও এসেছে। অর্থাৎ পশুটির নিজস্ব আচরণ—সে কাউকে আক্রমণ করেছে কি না, রোগ ছড়িয়েছে কি না কিংবা মানুষের ক্ষতি করেছে কি না—এসবের পরিবর্তে তার বাহ্যিক রংকে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত আচরণের মানদণ্ড করা হয়েছে। কালো কুকুরকে শয়তান বলা মানুষের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী আইন নয়, কিন্তু একই রঙকে অশুভ পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করার ধর্মীয় প্রবণতার একটি বাস্তব উদাহরণ। পশুটির গায়ের রং তার নৈতিক চরিত্র বা বিপজ্জনক হওয়ার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়। কালো কুকুর হত্যা সম্পর্কে বিস্তারিত রেফারেন্স ও বিশ্লেষণ রয়েছে [55] প্রবন্ধে।


জান্নাতে গায়ের রঙ হবে ফর্সা

জান্নাতের সৌন্দর্যবর্ণনায় শুভ্রতা ও উজ্জ্বলতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বুখারির নিচের হাদিসগুলোয় জান্নাতে প্রবেশকারীদের মুখ পূর্ণিমার চাঁদ ও উজ্জ্বল তারকার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। মুখের উজ্জ্বলতা এবং জন্মগত গায়ের রং একই অর্থ বহন করে না; তাই শুধু এই দুই হাদিস দিয়ে জান্নাতবাসী প্রত্যেক মানুষের গায়ের রং ফর্সা হয়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত হয় না। তবে পরের বর্ণনায় আগুনে পোড়া মানুষের কালো হয়ে যাওয়া এবং জান্নাতের পানিতে সাদা হয়ে ওঠার সরাসরি বিবরণ রয়েছে। তাফসীরে ইবনে কাসীরে সংরক্ষিত আরেকটি বিবরণে কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিকে জান্নাতে শুভ্র রং দেওয়ার বক্তব্যও এসেছে। এসব উৎসের মাধ্যমে ধর্মীয় পুরস্কারের সঙ্গে শুভ্রতার সম্পর্ক আরও নির্দিষ্টভাবে বিচার করা যায়। [56] [57]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ২০০০. আদম (আঃ) ও তাঁর সন্তানদের সৃষ্টি।
৩০৯২। কুতায়বা ইবনুু্‌ সাঈদ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সর্বপ্রথম যে দল জান্নাতে প্রবেশ করবে তাদের মুখমণ্ডল হবে পূর্ণিমার রাতের চাঁদের মত উজ্জ্বল। তারপর যে দল তাদের অনুগামী হবে তাদের মুখমণ্ডল হবে আকাশের সর্বাদিক দীপ্তমান উজ্জ্বল তারকার মত। তারা না করবে পেশাব আর না করবে পায়খানা। তাদের থুথু ফেলার প্রয়োজন হবে না এবং তাদের নাক হতে শ্লেম্মাও বের হবে না। তাদের চিরুনি হবে স্বর্ণের তৈরি। তাদের ঘাম হবে মিস্‌কের ন্যায় সুগন্ধপূর্ণ। তাদের ধনুচি হবে সুগন্ধযুক্ত চন্দন কাঠের। বড় চক্ষু বিশিষ্ট হুরগণ হবেন তাদের স্ত্রী। তাদের সকলের দেহের গঠন হবে একই। তারা সবাই তাদের আদি-পিতা আদম (আলাইহিস সালাম) এর আকৃতিতে হবেন। উচ্ছতায় তাদের দেহের দৈর্ঘ্য হবে ষাট হাত বিশিষ্ট।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
৫৯/ সৃষ্টির সূচনা
পরিচ্ছেদঃ ৫৯/৮. জান্নাতের বর্ণনা সম্পর্কে যা বলা হয়েছে আর তা হল সৃষ্ট।
৩২৫৪. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রথম যে দল জান্নাতে প্রবেশ করবে তাদের চেহারা পূর্ণিমা রাতের চাঁদের মত উজ্জ্বল হবে আর তাদের অনুগামী দলের চেহারা আকাশের উজ্জ্বল তারকার চেয়েও অধিক সুন্দর ও উজ্জ্বল হবে। তাদের অন্তরগুলো এক ব্যক্তির অন্তরের মত হবে। তাদের মধ্যে কোন বিদ্বেষ থাকবে না, কোন হিংসা থাকবে না, তাদের প্রত্যেকের জন্য ডাগর ডাগর চোখওয়ালা দু’জন করে এমন স্ত্রী থাকবে, যাদের পদ তলের অস্থি মজ্জা ও গোশ্ত ভেদ করে দেখা যাবে। (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩০১৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩০২৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

নিচের এই হাদিসটিতে বলা হচ্ছে, জাহান্নামে পাপীদের গায়ের রঙ কালো হয়ে যাবে, আর তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করালে তারা ফর্সা হয়ে যাবে [58]।

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৮০. সর্বনিম্ন মর্যাদার জান্নাতবাসী
৩৬৯। হাজ্জাজ ইবনু শাইর (রহঃ) … ইয়াযীদ আল ফাকীর (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, খারিজীদের একটি মত, আমাকে বড়ই আকৃষ্ট করছিল। আমরা একবার একটি দলের সাথে বের হই। উদ্দেশ্য ছিল হজ্জ করা তারপর মানুষের সাথে যোগাযোগ করা। আমরা মদিনা দিয়ে যাচ্ছিলাম দেখি জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) একটি খুঁটির পাশে বসে লোকদেরকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস বর্ননা করছেন। বর্ননাকারী বলেন, আর একটু এগিয়ে দেখি, তিনি জাহান্নামীদের আলোচনা তুলেছেন। আমি বললাম, হে রাসুলের সাহাবী! আপনারা এ কি বলছেন? অথচ আল্লাহ তায়াআলা ইরশাদ করেছেনঃ (অর্থ) “কাকেও আপনি অগ্নিতে নিক্ষেপ করলে তাকে তো আপনি নিশ্চয়ই হেয় করলেন” (৩ঃ ১১২)। আরো ইরশাদ করেনঃ (অর্থ) যখনই তারা জাহান্নাম হতে বেরোবার চেষ্টা করবে, তখনই ফিরিয়ে দেয়া হবে।” (৩২ঃ ২৫)
জাবির (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কুরআন পাঠ কর? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তা হলে কুরআনে তুমি মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সে সম্মানিত আসন, যেখানে আল্লাহ তাঁকে (কিয়ামত দিবসে) সমাসীন করবেন, সে আসনের কথা শুননি? বললাম, হ্যাঁ। জাবির (রাঃ) বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সে আসনটি হচ্ছে “মাকামে মাহমুদ” যার মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা যাকে জাহান্নাম থেকে বের করার, বের করবেন। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর জাবির (রাঃ) পুলসিরাত স্থাপন ও মানুষ তা অতিক্রম করার কথা বর্ণনা করেন।
বর্ণনাকারী আরো বলেন, আলোচনাটি পুরোপুরি সংরক্ষণ করতে পারিনি বলে আমার আশঙ্কা হয়। তবে তিনি অনশ্যই একথা উল্লেখ করেছেন যে, কতিপয় মানুষ কিছু কাল জাহান্নামে অবস্থান করার পর, তাদেরকে বের করা হবে। জাহান্নামে আগ্নি দগ্ন হয়ে রোদেপোড়া তিল গাছের মত কালো বর্ণ ধারণ করবে, তখন তাদেরকে বের করে আনা হবে। এরপর তারা জান্নাতের একটি নহরে নেমে গোসল করবে। পরে সকলে কাগজের মত সাদা ধবধবে হয়ে সে নহর থেকে উঠে আসবে। ইয়াযীদ (রহঃ) বলেন, এ হাদীস নিয়ে আমরা আমাদের এলাকায় ফিরে এলাম এবং সকলকে বললাম, অমঙ্গল হোক তোমাদের! তোমরা কি মনে কর যে, এ বৃদ্ধ (জাবির) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর ওপর মিথ্যা আরোপ করতে পারেন? পরিশেষে আমাদের সকলেই (ঐ ভ্রান্ত বিশ্বাস) থেকে ফিরে আসে। আল্লাহর কসম! মাত্র এক ব্যাক্তি ছাড়া কেউ আমাদের এ সঠিক আকীদা পরিত্যাগ করে নাই, বা আবূ নূয়ায়ম যা বলেছেন তার অনুরূপ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইয়াযীদ আল ফাকীর (রহঃ)

তাফসীরে ইবনে কাসীরে আরেকটি হাদিসের কথা বলা রয়েছে, যেখানে পাওয়া যায়, কালো বর্ণের মানুষদেরকে জান্নাতে ফর্সা করে দেয়া হবে। [59]

… আমাদের উপর ফযীলত দেয়া হয়েছে। এখন বলুন তো, যার উপর আপনি ঈমান এনেছেন তার উপর যদি আমিও ঈমান আনি এবং যার উপর আপনি আমল করছেন তার উপর যদি আমিও আমল করি তবে কি আমিও আপনার সাথে জান্নাতে থাকতে পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কালো বর্ণের লোককে জান্নাতে ঐ সাদা রঙ দেয়া হবে যা হাজার বছরের পথের দূরত্ব হতে দেখা যাবে!” তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)
বললেনঃ “যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে তার জন্যে আল্লাহর আহদ বা প্রতিশ্রুতি নির্দিষ্ট হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ বলে তার জন্যে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পুণ্য লিখা হয়।” লোকটি তখন বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরপরেও আমরা কি করে ধ্বংস হতে পারি?” রাসূলুল্লাহ …

জাতিভেদ 6

জাহান্নাম থেকে বের হওয়া ব্যক্তিদের আগুনে কালো হয়ে পরে গোসলের মাধ্যমে সাদা হওয়ার বর্ণনায় শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে পাপের শাস্তি থেকে মুক্তির সম্পর্ক রয়েছে। এখানে কালো হওয়া মূলত অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ফল, এবং পরে সাদা হওয়া পরিশুদ্ধির চিত্র। তাফসীরে ইবনে কাসীরে উদ্ধৃত কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির বিবরণ আরও সরাসরি গায়ের রঙের প্রসঙ্গ এনেছে। এই সব বক্তব্য একত্রে ধর্মীয় পুরস্কারের কল্পনায় শুভ্রতাকে কতখানি কাঙ্ক্ষিত অবস্থার প্রতীক করা হয়েছে, সেই প্রশ্নের ভিত্তি তৈরি করে। মূল ধর্মগ্রন্থ বা হাদিসের ভাষাকে ছাড়িয়ে প্রতিটি জান্নাতবাসীর জন্মগত রং সম্পর্কে অতিরিক্ত দাবি করার প্রয়োজন নেই।


ইহুদি বিদ্বেষ কাকে বলে?

ইহুদি-বিদ্বেষ বলতে ইহুদি জাতি, গোষ্ঠী বা ধর্মের প্রতি যেকোনো ধরণের বৈরিতা বা কুসংস্কারকে বোঝানো হয়ে থাকে। এধরণের বিদ্বেষের মধ্যে ব্যক্তিগত ঘৃণা থেকে শুরু করে এমনকি সংঘবদ্ধ জাতি-নিধনও পড়ে। ইংরেজিতে একে বলা হয় এন্টি-সেমিটিজম (Anti-Semitism) ,যার অর্থ দাঁড়ায় সেমিটীয় সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ। সেমিটীয় একটি বৃহৎ ভাষাভাষী গোষ্ঠী যার মধ্যে হিব্রুভাষী ছাড়াও আরবিভাষীরাও অন্তভুক্ত। তথাপি অ্যান্টি-সেমিটিজম ইহুদি-বিদ্বেষ বোঝাতেই ব্যবহৃত হয়। ইহুদি-বিদ্বেষের ইতিহাস প্রাচীন হলেও এটি চরম আকার ধারণ করে হিটলার-শাসিত জার্মানিতে। খ্রিস্টান-শাসিত ইউরোপে বৃহত্তম সংখ্যালঘু ধর্মীয়-গোষ্ঠী হিসেবে ইহুদিরা বিভিন্ন সময় ধর্মীয় বিদ্বেষ, নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হত। ধর্মীয় নির্যাতনের মধ্যে ছিল – ধর্ম-পালনে বাধা, জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ, দেশ থেকে বিতাড়ন, ইত্যাদি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার শাসিত জার্মানি আইন করে যুগযুগ ধরে জার্মানিতে বসবাস করা ইহুদিদের ভিটেমাটি দোকানপাট জায়গাজমি সব অধিগ্রহণ করে তাদের কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পে প্রেরণ করে এবং পর্যায়ক্রমে হত্যা করে। প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করা হয়। ইতিহাসে এই ঘটনা ‘হলোকস্ট’ (Holocaust) নামে পরিচিত। এবার ইসলামের ঐতিহাসিক উৎসে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে উচ্ছেদের নির্দেশগুলো দেখা যাক [60] [61]।

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮৫/ কুরআন ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে ধারণ
পরিচ্ছেদঃ ৩০৯২. মহান আল্লাহর বাণীঃ মানুষ অধিকাংশ ব্যাপারেই বিতর্কপ্রিয় (১৮ঃ ৫৪)। মহান আল্লাহর বাণীঃ তোমরা কিতাবীদের সাথে বিতর্ক করবে না………. (২৯ঃ ৪৬)
৬৮৪৭। কুতায়বা (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা মসজিদে নববীতে ছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদ থেকে বের হয়ে আমাদেরকে বললেনঃ তোমরা চলো ইহুদীদের সেখানে যাই। আমরা তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে এলাম। অবশেষে আমরা বায়তুল মিদরাসে (তাদের শিক্ষাগারে) পৌছলাম। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে দাঁড়িয়ে তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ হে ইহুদী সম্প্রদায়! তোমরা ইসলাম কবুল কর, এতে তোমরা নিরাপদে থাকবে। ইহুদীরা বলল, হে আবূল কাসিম! আপনার পৌছানোর দায়িত্ব আপনি পালন করেছেন। এরপর তিনি বললেনঃ আমার ইচ্ছা তোমরা ইসলাম কবুল কর এবং শান্তিতে থাক। তারাও আবার বলল, হে আবূল কাসিম! আপনার পৌছানোর দায়িত্ব আপনি পালন করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেনঃ আমি এরূপই ইচ্ছা রাখি। তৃতীয়বারেও তিনি তাই বললেন। পরিশেষে রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ জেনে রেখো, যমীন একমাত্র আল্লাহ ও তার রাসুলের। আমি তোমাদেরকে এই এলাকা থেকে উচ্ছেদ করে দিতে চাই। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যাদের অস্থাবর সম্পত্তি আছে, তা যেন সে বিক্রি করে দেয়। অন্যথায় জেনে রেখো যমীন আল্লাহ ও তার রাসুলের।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ১৪/ কর, ফাই ও প্রশাসক
৩০০৩। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আমরা মাসজিদে উপস্থিত ছিলাম, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে বেরিয়ে এসে বললেনঃ ইয়াহুদীদের এলাকায় চলো। ‘আমরা তাঁর সাথে বের য়ে সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে তাদেরকে ডেকে বললেনঃ হে ইয়াহুদী সম্প্রদায়! তোমরা ইসলাম কবূল করো শান্তিতে থাকবে। তারা বললো, হে আবুল কাসিম! আপনি পৌঁছে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে আবার বললেনঃ তোমরা ইসলাম কবূল করো, নিরাপত্তা পাবে। তারা বললো, হে আবুল কাসিম! আপনি পৌঁছে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেনঃ এ দাওয়াত পৌঁছে দেয়াই আমার উদ্দেশ্য ছিলো। তৃতীয় বারও তিনি একই কথার পুনরাবৃত্তি করে বললেনঃ জেনে রাখো! এ ভুখন্ডের মালিকানা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের। আমি তোমাদের এ ভূখন্ড থেকে বিতাড়িত করতে চাই। সুতরাং তোমরা কোনো জিনিস বিক্রি করতে সক্ষম হলে বিক্রি করো। অন্যথায় জেনে রাখো! এ ভূখন্ডের মালিক আল্লাহ ও তাঁর রাসূল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

নবী

আরো অসংখ্য হাদিস রয়েছে, যেসব হাদিসে পরিষ্কারভাবেই ইহুদীদের ধর্মের ভিত্তিতে পুরো জাতি গোত্র ধরেই উচ্ছেদ করার ঘোষণা দিয়ে গিয়েছিলেন নবী মুহাম্মদ [62] [63] [64] [65]।

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ জিহাদ ও এর নীতিমালা
পরিচ্ছদঃ ২১. ইয়াহুদী ও নাসারাদের আরব উপ-দ্বীপ থেকে বহিস্কার
৪৪৪২। যুহায়র ইবনু হারব ও মুহাম্মাদ ইবনু রাফি (রহঃ) … জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, আমার কাছে উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন যে, নিশ্চয়ই আমি ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান সম্প্রদায়কে আরব উপ-দ্বীপ থেকে বহিস্কার করবো। পরিশেষে মুসলমান ব্যতীত অন্য কাউকে এখানে থাকতে দেবো না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৩৩। জিহাদ ও সফর
পরিচ্ছদঃ ২১. ইয়াহুদী ও নাসারাদের আরব উপ-দ্বীপ থেকে বের করে দেয়া
৪৪৮৬-(৬৩/১৭৬৭) যুহায়র ইবনু হারব ও মুহাম্মাদ ইবনু রাফি’ (রহঃ) ….. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, আমার কাছে উমর ইবনু খাত্তাব (রাযিঃ) বর্ণনা করেন যে, তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন যে, নিশ্চয়ই আমি ইয়াহুদী ও খ্ৰীষ্টান সম্প্রদায়কে আরব উপ-দ্বীপ থেকে বের করে দেবো। তারপর মুসলিম ব্যতীত অন্য কাউকে এখানে থাকতে দেবো না। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৪৪২, ইসলামিক সেন্টার ৪৪৪৪)
যুহায়র ইবনু হারব ও সালামাহ্ ইবনু শাবীব (রহঃ) ….. উভয়েই আবূ যুবায়র (রহঃ) থেকে এ সানাদে অনুরূপ বর্ণনা করেন। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৪৪২, ইসলামিক সেন্টার ৪৪৪৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
অধ্যায়ঃ ১৯/ যুদ্ধাভিযান
পাবলিশারঃ হুসাইন আল-মাদানী‏
পরিচ্ছদঃ ৪৩. আরব উপদ্বীপ হতে ইয়াহুদী-নাসারাদের বের করে দেওয়া প্রসঙ্গে
১৬০৭। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেনঃ আমি ইহুদী ও নাসারাদের আরব উপদ্বীপ হতে অবশ্যই বহিষ্কার করব। মুসলমান ব্যতীত অন্য কাউকে সেখানে বসবাস করতে দিব না।
সহীহ, সহীহা (১১৩৪), সহীহ আবূ দাউদ, মুসলিম
এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

পরিচ্ছদঃ ৩৭০ : দাজ্জাল ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী সম্পর্কে
১৩/১৮২৯। আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘‘কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যে পর্যন্ত মুসলিমরা ইহুদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করবে। এমনকি ইহুদী পাথর ও গাছের আড়ালে আত্মগোপন করলে পাথর ও গাছ বলবে ‘হে মুসলিম! আমার পিছনে ইহুদী রয়েছে। এসো, ওকে হত্যা কর।’ কিন্তু গারক্বাদ গাছ (এরূপ বলবে) না। কেননা এটা ইহুদীদের গাছ।’’ (বুখারী-মুসলিম)
(1) সহীহুল বুখারী ২৯২৬, মুসলিম ১৫৭, ২৯২২, আহমাদ ৮৯২১, ১০৪৭৬, ২০৫০২
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এখানে হাদিসগুলোতে যে বিষয়টি সরাসরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা হলো ইহুদি ও খ্রিস্টান পরিচয়ের ভিত্তিতে আরব উপদ্বীপ থেকে বিতাড়নের নির্দেশ এবং মুসলিম-ইহুদি হত্যাযুদ্ধসংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী। এই বর্ণনাগুলোকে নাৎসি গণহত্যার সঙ্গে ঘটনাগতভাবে অভিন্ন বলা যায় না; একটি হলো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদসংক্রান্ত নির্দেশ, অন্যটি আধুনিক রাষ্ট্রের পরিকল্পিত গণহত্যার ইতিহাস। কিন্তু ধর্মীয় বা বংশগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো জনগোষ্ঠীকে নিজের বসতভূমি থেকে উৎখাত করার নৈতিক সমস্যাটি উভয় প্রসঙ্গেই বিচারযোগ্য। ইহুদি ও অন্যান্য অমুসলিম জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদ, খায়বার ও আরব উপদ্বীপ-সংক্রান্ত বিস্তৃত ইতিহাস ও ফিকহি দলিলের জন্য দেখুন [66]।


রাস্তার কিনারায় ঠেলে দিতে হবে

ইসলাম ধর্মের নবী মুহাম্মদ ইয়াহুদী ও নাসারাদের রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলাফেরা করতে দেখলে তাদের রাস্তার কিনারায় ঠেলে দিয়ে কিনারা ঘেষে চলতে বাধ্য করতে নির্দেশ [67] দিয়ে গেছে [68] [69] –

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৪০। সালাম
পরিচ্ছেদঃ ৪. আহলে কিতাব (ইয়াহুদী-নাসারা)-কে আগে সালাম করার নিষিদ্ধকরণ এবং তাদের সালামের উত্তর দেয়ার বিবরণ
৫৫৫৪-(১৩/২১৬৭) কুতাইবাহ ইবনু সাঈদ (রহঃ) ….. আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইয়াহুদী ও নাসারাদের আগে বাড়িয়ে সালাম করো না এবং তাদের কাউকে রাস্তায় দেখলে তাকে রাস্তার পাশে চলতে বাধ্য করো। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫৪৭৬, ইসলামিক সেন্টার ৫৪৯৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
অধ্যায়ঃ ১৯/ যুদ্ধাভিযান
পাবলিশারঃ হুসাইন আল-মাদানী
‏পরিচ্ছদঃ ৪১. আহলে কিতাবদের সালাম প্রদান প্রসঙ্গে
১৬০২। আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ইয়াহুদী-নাসারাদের প্রথমে সালাম প্রদান করো না। তোমরা রাস্তায় চলাচলের সময় তাদের কারো সাথে দেখা হলে তাকে রাস্তার কিনারায় ঠেলে দিও।
সহীহ, সহীহা (৭০৪), ইরওয়া (১২৭১), মুসলিম, বুখারী আদাবুল মুফরাদ, ২৮৫৫ নং হাদীসটির আলোচনা আসবে।
ইবনু উমার, আনাস ও আবূ বাসরা আল-গিফারী (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এখানে নির্দেশটি অমুসলিমের আচরণে কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না, সেই শর্তের ওপর নির্ভরশীল নয়। ধর্মীয় পরিচয় জানার পরই তার চলাচলের সামাজিক অবস্থান আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। আগে সালাম না দেওয়া এবং পথের সংকীর্ণ অংশে বাধ্য করার বিধান একত্রে প্রকাশ্য জনপরিসরে অসম সামাজিক সম্মান প্রতিষ্ঠার উদাহরণ। মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে এ ধরনের পার্থক্য কীভাবে ধ্রুপদী ব্যাখ্যাকাররা আইনগত ও সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করেছেন, তা বিস্তারিত রয়েছে [70] প্রবন্ধে।


খাবার, বন্ধুত্ব ও ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক পছন্দ

সামাজিক মেলামেশা ও খাবার ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক পছন্দের নির্দেশ পাওয়া যায়। নবী মুহাম্মদের নামে বর্ণিত নিচের হাদিসে মুমিন ব্যতীত অন্য কাউকে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী না করা এবং আল্লাহভীরু ব্যক্তিকে খাবার খাওয়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাদিসটির ভাষা থেকে সমস্ত পরিস্থিতিতে অমুসলিমকে খাবার দেওয়া নিষিদ্ধ—এমন সার্বিক আইন সরাসরি প্রতিষ্ঠিত হয় না; কিন্তু ঘনিষ্ঠতা ও আতিথেয়তার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় আনুগত্যকে বাছাইয়ের মানদণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করার ঘটনা স্পষ্ট। লেখাটির শুরুতে হিন্দু পরিবারের কাছ থেকে খাবার পাওয়ার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই বক্তব্যের নৈতিক প্রশ্নটি সম্পর্কিত: কার সঙ্গে আমরা মিশব, কাকে আপ্যায়ন করব, তা কি মানুষের আচরণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে, নাকি প্রধান মানদণ্ড হবে তার ধর্ম? [71] [72]

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৫ঃ শিষ্টাচার
পরিচ্ছেদঃ ১৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ – আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০১৮-(১৬) আবূ সা‘ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন, মু’মিন ব্যতীত অন্য কাউকে বন্ধু বানাবে না এবং তোমার খাদ্য আল্লাহভীরু লোক ছাড়া যেন অন্য কেউ না খায়। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও দারিমী)(1)
(1) হাসান : তিরমিযী ২৩৯৫, আবূ দাঊদ ৪৮৩২, সহীহুল জামি‘ ৭৩৪১, সহীহ আত্ তারগীব ৩০৩৬, সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৫৪, আহমাদ ১১৩৩৭, আবূ ইয়া‘লা ১৩১৫, দারিমী ২০৫৭, শু‘আবুল ঈমান ৯৩৮২, হিলইয়াতুল আওলিয়া ৭/৭৪, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ৩১৩৬, আল মুসতাদরাক ৭১৬৯।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ৩৬/ শিষ্টাচার
১৯. যার সংস্পর্শে বসা উচিত
৪৮৩২। আবূ সাঈদ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তুমি মু‘মিন ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারো সঙ্গী হবে না এবং তোমার খাদ্য যেন পরহেযগার লোকে খায়।(1)
হাসান।
(1). তিরমিযী, আহমাদ।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)

এই হাদিসের ‘তোমার খাবার যেন পরহেজগার লোক খায়’ কথাটি বিশেষভাবে ধর্মীয় নৈকট্যের পরিসর তৈরি করে। খাদ্যের অধিকার, ক্ষুধার্ত মানুষকে সাহায্য এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের নির্বাচনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু মানুষকে তার বিশ্বাসের ভিত্তিতে বাছাই করার সামাজিক প্রবণতা এখানেও উপস্থিত। ক্ষুধার্ত ব্যক্তির মানবিক প্রয়োজন তার ধর্মের ওপর নির্ভর করে না, এবং কাউকে সম্মানিত অতিথি হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে ধর্মপরিচয়কে অগ্রাধিকার দেওয়াও বৈষম্যমূলক সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে পারে।


অমুসলিমদের সঙ্গে বসবাস ও সামাজিক পৃথকীকরণ

অমুসলিমদের সঙ্গে বসবাস সম্পর্কেও সামাজিক পৃথকীকরণের নির্দেশ পাওয়া যায়। আবু দাউদের নিচের বর্ণনায় মুশরিকদের সঙ্গ ও বসবাসকে একই পরিচয়ের অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই বক্তব্য থেকে মুসলিম ও অমুসলিমের সহাবস্থান সম্পর্কে কী ধরনের সন্দেহ বা দূরত্ব গড়ে তোলা হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিমের জন্য অমুসলিম-অধ্যুষিত দেশে বসবাসের বিধান নিয়ে ধ্রুপদী এবং আধুনিক ফতোয়ার বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে [73] প্রবন্ধে। এখানে মূল প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হচ্ছে, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মানুষের মধ্যে সামাজিক দূরত্বকে পবিত্র বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলে তা সমমর্যাদার সহাবস্থানের ওপর কী প্রভাব ফেলে। [74]

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ৯/ জিহাদ
১৮২. মুশরিকদের এলাকায় অবস্থান সম্পর্কে
২৭৮৭। সামুরাহ ইবনু জুনদুব (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কেউ কোনো মুশরিকের সাহচর্যে থাকলে এবং তাদের সাথে বসবাস করলে সে তাদেরই মতো।(1)
(1). সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


আল্লাহর চোখে অমুসলিমগণ

এগুলো পড়ার পরে মনে হয়, আল্লাহ আসলে অমুসলিমদের কী চোখে দেখতেন? আসুন কোরআন থেকে কয়েকটি আয়াত দেখে নেয়া যাক [75] [76] [77] [78] [79] –

আহলে-কিতাব ও মুশরেকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম।
কুরআন ৯৮ঃ৬

সমস্ত জীবের মাঝে আল্লাহর নিকট তারাই সবচেয়ে নিকৃষ্ট, যারা অস্বীকারকারী হয়েছে অতঃপর আর ঈমান আনেনি।
কোরআন ৮:৫৫

নিশ্চয় যারা কুফরী করে এবং কাফের অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করে, সে সমস্ত লোকের প্রতি আল্লাহর ফেরেশতাগনের এবং সমগ্র মানুষের লা’নত।
কোরআন ২-১৬১

বস্তুতঃ এহেন কাফেরদের উদাহরণ এমন, যেন কেউ এমন কোন জীবকে আহবান করছে যা কোন কিছুই শোনে না, হাঁক-ডাক আর চিৎকার ছাড়া বধির মুক, এবং অন্ধ। সুতরাং তারা কিছুই বোঝে না।
কোরআন ২:১৭১

আর আমি সৃষ্টি করেছি দোযখের জন্য বহু জ্বিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তার দ্বারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হল গাফেল, শৈথিল্যপরায়ণ।
কোরআন ৭:১৭৯

আসুন তা জেনে নিই সর্বাপেক্ষ গ্রহণযোগ্য তাফসীর গ্রন্থে এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যাতে কী বলা রয়েছে। আসুন পড়ি ইবনে কাসীর [80] ও জালালাইনের [81] প্রখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ থেকে।

অমুসলিমরা নিকৃষ্ট জীব তাফসীরে ইবনে কাসীর
অমুসলিমরা নিকৃষ্ট জীব তাফসীরে জালালাইন

উপরের তাফসীর পড়ে আপনি কী শিখলেন? ইসলাম অমুসলিম জাতিগোষ্ঠীগুলো সম্পর্কে কী ধ্যানধারণা পোষণ করে?

এই আয়াতগুলোয় সব মানুষের জন্মগত বর্ণ কিংবা গোত্র নিয়ে একই রকম বক্তব্য নেই। এখানে পরিচয়ের মাপকাঠি হচ্ছে ধর্মীয় বিশ্বাস। কিন্তু একটি গোষ্ঠীর মানুষকে বিশ্বাসের কারণে ‘সৃষ্টির অধম’, ‘নিকৃষ্ট জীব’ কিংবা চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট হিসেবে বর্ণনা করলে তাদের সম্পর্কে গোষ্ঠীগত অবমাননার ভাষা প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যক্তির কোনো নির্দিষ্ট অপরাধ বা কাজের পরিবর্তে তার বিশ্বাসী কিংবা অবিশ্বাসী পরিচয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়নের প্রবণতা এখানে স্পষ্ট।

সূরা বাকারা ২:১৭১-এর উদাহরণে পশুর তুলনা ও বধির-অন্ধ-নির্বোধের চিত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ইবনে কাসীরের তাফসীরে এই উপমাকে এমন পশুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যারা রাখালের ডাকের অর্থ বোঝে না। ফলে এটি কেবল অস্পষ্ট নৈতিক সমালোচনা নয়; অবিশ্বাসী গোষ্ঠীর বিচারবুদ্ধি ও বোধশক্তিকে অবমাননাকর রূপকের মাধ্যমে উপস্থাপন করার বক্তব্য। [82]

ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে এই ধরনের অবমাননাকর শ্রেণিবিন্যাস সামাজিক ও রাজনৈতিক বিধানে রূপ নেওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ সূরা তাওবা ৯:২৯-এর জিজিয়ার বিধান। জিজিয়া আদায় এবং অমুসলিমদের অধস্তন অবস্থানের তাফসীর ও ফিকহি ব্যাখ্যা বিস্তৃতভাবে রয়েছে [83] প্রবন্ধে। ধর্মবিশ্বাসের কারণে মানুষের রাজনৈতিক মর্যাদা অসম করা এবং বংশপরিচয়ের কারণে খলিফার পদ সংরক্ষণ করা একই ধরনের পরিচয়ভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক বিশেষাধিকারের দুটি ভিন্ন দৃষ্টান্ত।


ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় অধস্তনতা: জিজিয়া ও অসম অধিকার

বংশগত বিশেষাধিকারের আলোচনা থেকে ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক অধিকারবৈষম্যের আলোচনায় একটি মৌলিক মিল দেখা যায়। উভয় ক্ষেত্রেই একজন মানুষকে তার ব্যক্তিগত যোগ্যতা বা কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের ভিত্তিতে নয়, একটি গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার ভিত্তিতে আলাদা অধিকার ও মর্যাদার অধিকারী করা হয়। কুরাইশ শাসকের ক্ষেত্রে বংশের পরিচয় রাজনৈতিক ক্ষমতার শর্ত। জিম্মি ও অমুসলিমদের ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অধস্তনতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। কোরআন ৯:২৯-এর জিজিয়ার নির্দেশ এবং ধ্রুপদী আইনবিদদের ব্যাখ্যায় সেই অধস্তন অবস্থান প্রত্যক্ষ করা যায়।

জিজিয়াকে কেবল একটি সাধারণ রাজস্বনীতি হিসেবে দেখলে মূল ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক মর্যাদার পার্থক্যটি আড়াল হতে পারে। কার কাছ থেকে কর আদায় হবে, কেন তাকে আলাদা কর দিতে হবে এবং তার রাজনৈতিক অবস্থান কী—এসব প্রশ্ন জিজিয়ার আইনশাস্ত্রীয় আলোচনার অংশ। সংশয়ের [83] প্রবন্ধে এই উৎসগুলোর পূর্ণ উদ্ধৃতি ও বিশ্লেষণ রয়েছে। জিহাদের বিধান ও উচ্ছেদসংক্রান্ত বিস্তৃত ঐতিহাসিক আলোচনার জন্য রয়েছে [84]। জন্মগত বংশবিশেষাধিকার এবং ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক আইনি অধস্তনতা—এই দুটো ভিন্ন ধরনের বৈষম্যই মানুষের সমান অধিকারের দাবিকে সীমিত করে।


মৃত্যুর আগে নবীর শেষ ওয়াসিয়ত

মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর মুহাম্মদ সেই শেষ সময়েও একটি অত্যন্ত সাম্প্রদায়িক ওয়াসিয়ত করে গিয়েছেন। যা হচ্ছে, অমুসলিম মুশরিকদের আরব থেকে বিতাড়িত করতে। মৃত্যুর আগেই তিনি তার সাম্প্রদায়িকতার বিষ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। [85]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
অধ্যায়ঃ ৪৮/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ১৯১৭. প্রতিনিধি দলকে উপঢৌকন প্রদান
১৯১৬. পরিচ্ছেদঃ জিম্মিদের জন্য সুপারিশ করা যাবে কি এবং তাদের সাথে আচার-আচরণ
২৮৩৮। কাবীসা (রহঃ) … ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি (কোন এক সময়) বললেন, বৃহস্পতিবার! হায় বৃহস্পতিবার! এরপর তিনি কাঁদতে শুরু করলেন, এমনকি তাঁর আশ্রুতে (যমিনের) কঙ্করগুলো সিক্ত হয়ে গেল। আর তিনি বলতে লাগলেন, বৃহস্পতিবারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রোগ যাতনা বেড়ে যায়। তখন তিনি বললেন, তোমার আমার জন্য লিখার কোন জিনিস নিয়ে আস, আমি তোমাদের জন্য কিছু লিখিয়ে দিব। যাতে এরপর তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট না হয। এতে সাহাবীগণ পরস্পর মতপার্থক্য করেন। অথচ নাবীর সম্মুখে মতপার্থক্য সমীচীন নয়। তাদের কেউ কেউ বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়া ত্যাগ করেছেন?’
তিনি বললেন, ‘আচ্ছা’ আমাকে আমার অবস্থায় থাকতে দাও। তোমরা আমাকে যে অবস্থার দিকে আহবান করছো তার চেয়ে আমি যে অবস্থায় আছি তা উত্তম। ’ অবশেষে তিনি ইন্তেকালের সময় তিনটি বিষয়ে ওসীয়ত করেন। (১) মুশরিকদেরকে আরব উপদ্বীপ থেকে বিতাড়িত কর, (২) প্রতিনিধি দলকে আমি যেরূপ উপঢৌকন দিয়েছি তোমরাও আনুরূপ দিও (রাবী বলেন) তৃতীয় ওসীয়তটি আমি ভুলে গিয়েছি। আবূ আবদুল্লাহ (রহঃ) বলেন, ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) ও ইয়াকুব (রহঃ) বলেন, আমি মুগীরা ইবনু আবদুর রাহমানকে জাযীরাতুল আরব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বললেন, তাহল মক্কা, মদিনা ইয়ামামা ও ইয়ামান। ইয়াকূব (রহঃ) বলেন, ‘তিহামা আরম্ভ হল ‘আরজ থেকে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

বুখারির এই বর্ণনায় মুসলিম ছাড়া অন্য সম্প্রদায়কে আরব উপদ্বীপ থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ মুহাম্মদের জীবনের শেষ দিকের ওসিয়তগুলোর একটি হিসেবে এসেছে। এটি কেবল কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির অপরাধের বিচার নয়; একটি বৃহত্তর ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ভূখণ্ডে বসবাসের অধিকার নির্ধারণের নির্দেশ। পূর্বের ইহুদি-খ্রিস্টান উচ্ছেদসংক্রান্ত হাদিসগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে একই অঞ্চলে ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক বসবাসের সীমা স্থাপনের ধারণা পাওয়া যায়। আরব উপদ্বীপের সীমানা, খায়বারের ইহুদি সম্প্রদায় এবং পরবর্তী শাসনামলে উচ্ছেদনীতির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে বিস্তারিত দলিল রয়েছে [66] প্রবন্ধে।


উপসংহার

উপরের দীর্ঘ আলোচনাতে এটি একদমই পরিষ্কার যে, ইসলামে জাতিভেদ, বংশগত অহংকার এবং বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কয়েকটি ভালো বক্তব্য যেমন আছে, একইসাথে এমন অসংখ্য বক্তব্য ও বিধানও রয়েছে, যেগুলোতে জন্মগত শ্রেষ্ঠত্ব, গোত্রভিত্তিক বিশেষাধিকার, সামাজিক অধস্তনতা এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কোরআনের সূরা হুজুরাতে মানুষের বংশ ও গোত্রের পার্থক্যকে পারস্পরিক পরিচয়ের মাধ্যম বলা হয়েছে। মুহাম্মদের নামে বর্ণিত হাদিসে আরবের ওপর অনারবের এবং শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করা হয়েছে। বংশ নিয়ে অহংকার করা এবং অন্যের বংশকে অপমান করাকেও জাহিলি যুগের কুপ্রথা হিসেবে নিন্দা করা হয়েছে। এসব বক্তব্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু সেই একই ধর্মীয় ব্যবস্থায় যখন কুরাইশ বংশের জন্য সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ক্ষমতার বিশেষ অধিকার নির্ধারণ করা হয়, মুহাম্মদের নিজের বংশকে আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত ও অধিক সম্মানিত ঘোষণা করা হয় এবং অন্য বংশের মানুষের জন্য সেই একই রাজনৈতিক অধিকার অস্বীকার করা হয়, তখন সমতার ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব বিধানের একটি মৌলিক অসংগতি প্রকাশ পায়। মানুষের জন্মগত শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করা এবং একইসাথে জন্মগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বিশেষ ক্ষমতা ও মর্যাদা নির্ধারণ করা পরস্পরবিরোধী নীতি।

এই অসংগতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, বর্ণবাদ ও জাতিভেদ সবসময় প্রকাশ্য ঘৃণা, অপমান কিংবা নির্যাতনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না। অনেক সময় মানুষের সমতার কথা মুখে স্বীকার করেও বাস্তবে এমন একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো বজায় রাখা হয়, যেখানে নির্দিষ্ট বংশের মানুষ অন্যদের তুলনায় অধিক অধিকার ও ক্ষমতার দাবিদার। একজন হাবশি ক্রীতদাসের আনুগত্য করতে বলা হয়েছে বলেই সেই ক্রীতদাস সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমান অধিকার লাভ করেছেন, এমন সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে না। বিশেষত সেই হাদিসের ব্যাখ্যাতেই যখন হাবশি ক্রীতদাসের পরিচয়কে অযোগ্যতা, স্বল্পবুদ্ধি এবং কদাকার চেহারার রূপক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন সেখানে বিদ্যমান সামাজিক পূর্বধারণাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন মানুষকে শাসকের আনুগত্য করতে বলা এবং সেই মানুষকে বংশনির্বিশেষে শাসক নির্বাচিত হওয়ার সমান অধিকার দেওয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। ধ্রুপদী ইসলামি রাষ্ট্রতত্ত্বে কুরাইশ বংশের জন্য খিলাফতের শর্ত নির্ধারণের মাধ্যমে এই বৈষম্য ব্যক্তিগত মনোভাবের সীমা অতিক্রম করে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক বিধানে পরিণত হয়েছে। যে ব্যবস্থায় একজন মানুষের রাজনৈতিক যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য তার মেধা, ন্যায়পরায়ণতা ও নেতৃত্বের দক্ষতার পাশাপাশি নির্দিষ্ট বংশে জন্ম নেওয়াকে অপরিহার্য করা হয়, সেই ব্যবস্থায় জন্মগত বৈষম্য রয়েছে। মুখে সমতার ঘোষণা সেই বৈষম্য দূর করে না।

একই ধরনের গোষ্ঠীগত মানসিকতা অন্য অনেক বর্ণনাতেও প্রকাশিত হয়েছে। শহরবাসীর বিরুদ্ধে গ্রামবাসীর সাক্ষ্য গ্রহণের নিষেধাজ্ঞা, কোনো বিশেষ গোত্রের ওপর দুর্ভিক্ষের অভিশাপ, নির্দিষ্ট অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ আশীর্বাদ কিংবা অশুভ ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী—এসবের মধ্যে মানুষের ব্যক্তিগত পরিচয়ের পরিবর্তে তার গোষ্ঠীগত পরিচয়কে মূল্যায়নের ভিত্তি করার প্রবণতা রয়েছে। একজন গ্রামবাসী কেবল গ্রামে বসবাস করেন বলেই তার সাক্ষ্য অবিশ্বাসযোগ্য হয়ে যায় না। একইভাবে একটি গোত্রের কয়েকজন মানুষ অন্যায় করলে সেই গোত্রের নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং নিরপরাধ মানুষ দুর্ভিক্ষের শাস্তির উপযুক্ত হয়ে যায় না। একজন মানুষ নিজের জন্মস্থান বা গোত্র নির্বাচন করেন না। ফলে সেই পরিচয়ের ভিত্তিতে তার ওপর বিশেষ অধিকার, বঞ্চনা কিংবা সমষ্টিগত শাস্তি আরোপ করার নৈতিক ভিত্তি নেই। অপরাধের দায় ব্যক্তিগত; বংশগত নয়। যোগ্যতাও ব্যক্তিগতভাবে যাচাই করতে হয়; পূর্বপুরুষের পরিচয় দিয়ে নয়।

বর্ণবাদী মানসিকতার আরেকটি সূক্ষ্ম দিক হচ্ছে মানুষের ভাষা, ধর্মীয় কল্পনা, সৌন্দর্যবোধ এবং শুভ-অশুভের প্রতীকের মধ্যে গড়ে ওঠা পূর্বধারণা। ইসলামের বিভিন্ন বর্ণনায় কালো রঙকে পাপ, অশুভ, অন্ধকার, শাস্তি এবং বিপদের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে। হাজরে আসওয়াদ মানুষের পাপের কারণে কালো হয়ে গেছে, পাপের ফলে মানুষের অন্তরে কালো দাগ পড়ে, মহামারীকে কালো নারীর অবয়বে উপস্থাপন করা হয়েছে, কালো কুকুরকে শয়তান বলা হয়েছে এবং শাস্তিপ্রাপ্ত মানুষের মুখ কালো হয়ে যাওয়ার বর্ণনাও রয়েছে। অন্যদিকে শুভ্রতা ও উজ্জ্বলতা বারবার পবিত্রতা, সৌন্দর্য, অনুগ্রহ এবং পুরস্কারের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। মানুষের গায়ের রং এবং ধর্মীয় রঙের প্রতীক এক বিষয় নয়। কিন্তু মানুষের সমাজে যখন কালো গায়ের রঙকে অসৌন্দর্য এবং ফর্সা গায়ের রঙকে সৌন্দর্যের মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়, তখন কালো রঙের সঙ্গে অশুভ ও নিকৃষ্টতার পুনরাবৃত্ত সম্পর্ক সামাজিক পূর্বধারণাকে শক্তিশালী করার উপাদান হতে পারে। বিশেষত ধর্মীয় কাহিনি এবং উপমাগুলোকে যখন পবিত্র ও প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে শেখানো হয়, তখন সেগুলোর মাধ্যমে প্রচারিত প্রতীকী মূল্যবোধ মানুষের অবচেতন চিন্তারও অংশ হয়ে উঠতে পারে।

বংশগত শ্রেষ্ঠত্ব ও গায়ের রঙের বাইরে ইসলামে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেও সুস্পষ্ট বৈষম্যমূলক বিধান রয়েছে। কোরআনে অবিশ্বাসীদের সৃষ্টির অধম কিংবা চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। হাদিসে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের আগে সালাম দিতে নিষেধ করা হয়েছে, রাস্তার সংকীর্ণ অংশে চলতে বাধ্য করার নির্দেশ রয়েছে, অমুসলিমদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক ও বসবাসের ওপর বিধিনিষেধের বর্ণনা রয়েছে। এমনকি আরব উপদ্বীপ থেকে মুশরিক, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বিতাড়নের নির্দেশও পাওয়া যায়। ধ্রুপদী শরীয়তের বিভিন্ন বিধানে মুসলিম ও অমুসলিমের রাজনৈতিক অধিকার, সামাজিক মর্যাদা, বিচারিক সুরক্ষা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও পার্থক্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব বৈষম্য সব ক্ষেত্রে আধুনিক অর্থে বর্ণবাদ নয়; অনেকগুলো সরাসরি ধর্মীয় বৈষম্য। কিন্তু মানুষের সমান মানবিক মর্যাদা ও অধিকারের প্রশ্নে এগুলোর নৈতিক সমস্যাটি অত্যন্ত স্পষ্ট। একজন মানুষ মুসলিম পরিবারে জন্মেছেন, অন্যজন হিন্দু, খ্রিস্টান কিংবা ইহুদি পরিবারে জন্মেছেন—এই পার্থক্য তাদের মৌলিক মানবিক মর্যাদা কিংবা রাষ্ট্রীয় অধিকার অসম করার যৌক্তিক ভিত্তি হতে পারে না।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ব্যক্তিগত সদাচরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমতা এক জিনিস নয়। একজন শাসক অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি সদয় হতে পারেন, একজন দাসমালিক তার দাসের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারেন, একজন উচ্চবর্ণের মানুষ নিম্নবর্ণের ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পারেন। কিন্তু এসবের কোনোটিই সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার অসম ক্ষমতা ও অধিকারকে বিলুপ্ত করে না। কোনো মানুষকে দয়া করা এবং তাকে নিজের সমান অধিকারী হিসেবে স্বীকার করা এক বিষয় নয়। একইভাবে কোরআনের কয়েকটি আয়াতে অথবা হাদিসের কয়েকটি বক্তব্যে বংশগত অহংকারের বিরোধিতা থাকলেই ইসলামি আইন ও সামাজিক ব্যবস্থায় বিদ্যমান সমস্ত জন্মগত বিশেষাধিকার দূর হয়ে যায় না। একটি ধর্মীয় ব্যবস্থার প্রকৃত সমতামূলক চরিত্র প্রকাশ পায় তার আইন, শাসনক্ষমতার শর্ত, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানুষের অধিকার নির্ধারণের বিধানগুলোতে। সেখানে যদি বংশ, গোত্র কিংবা ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যক্তির নিজের যোগ্যতা ও কাজের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ করা হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থায় বৈষম্য রয়েছে।

আধুনিক সময়ে ইসলামের বর্ণবাদবিরোধী আয়াত ও হাদিসগুলো ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। কিন্তু কুরাইশদের বংশগত রাজনৈতিক বিশেষাধিকার, হাবশি দাস সম্পর্কে অবমাননাকর ব্যাখ্যা, ধর্মভিত্তিক সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস এবং অমুসলিমদের অধিকার সীমিত করার বিধানগুলো বাদ দিয়ে ইসলামের সমতার ধারণা উপস্থাপন করলে সেটি একটি খণ্ডিত চিত্র হয়ে দাঁড়ায়। কেবল প্রশংসনীয় বক্তব্যগুলো নির্বাচন করে প্রচার করার মাধ্যমে বৈষম্যমূলক বক্তব্য ও বিধানগুলোর অস্তিত্ব মুছে ফেলা যায় না। একই ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভেতরে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থাকলে সেই বিরোধ বাস্তব, এবং তা যুক্তিগতভাবেই বিশ্লেষণযোগ্য। ধর্মগ্রন্থের কোনো বক্তব্যকে পবিত্র ঘোষণা করা, কোনো হাদিসকে সহিহ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা কিংবা কোনো বিধানকে শত শত বছর ধরে অনুসরণ করা—এসবের কোনোটিই সেই বক্তব্য বা বিধানের নৈতিক যথার্থতার প্রমাণ নয়। বংশগত বৈষম্য অন্যায় হলে সেটি কুরাইশ বংশের নামে প্রতিষ্ঠিত হলেও অন্যায়। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে অধস্তন করা অন্যায় হলে সেটি শরীয়তের বিধান হলেও অন্যায়। নৈতিকতার মানদণ্ড ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিচয় অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে না।

আমার ছোটবেলার সেই হিন্দু বন্ধুর বাড়িতে কলাপাতায় খাবার দেওয়ার ঘটনাটির কথাই আবার মনে পড়ে। তখন মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়ার কারণে আমাকে নিচু জাতের মানুষ বলে বিবেচনা করা হয়েছিল। সেই অপমানের বিরুদ্ধে আমার আপত্তির ভিত্তি ছিল অত্যন্ত সাধারণ—আমি কোনো অপরাধ করিনি, আমার জন্মপরিচয় আমার নিজের নির্বাচন নয়, এবং শুধু সেই পরিচয়ের কারণে অন্য মানুষের তুলনায় আমাকে নিকৃষ্ট বিবেচনা করার কোনো অধিকার কারও নেই। আজ একই যুক্তি ইসলামের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। কোনো মানুষ কুরাইশ বংশে জন্মেছেন বলে তিনি অন্য বংশের মানুষের চেয়ে জন্মগতভাবে অধিক রাজনৈতিক অধিকারী হতে পারেন না। কোনো মানুষ হাবশি বা কৃষ্ণাঙ্গ বলে তার পরিচয় অযোগ্যতা কিংবা কুৎসিততার প্রতীক হতে পারে না। কোনো মানুষ অমুসলিম বলে তার মানবিক মর্যাদা কমে যায় না। ব্রাহ্মণের জন্মগত শ্রেষ্ঠত্বের দাবি যেমন অযৌক্তিক, কুরাইশের জন্মগত শ্রেষ্ঠত্বের দাবিও তেমনি অযৌক্তিক। একটির সমালোচনা করে অন্যটিকে ধর্মীয় পবিত্রতার নামে গ্রহণ করা স্পষ্ট দ্বিচারিতা।

মানুষের গায়ের রং, বংশ, গোত্র, জন্মস্থান কিংবা পিতামাতার ধর্ম তার নৈতিক চরিত্রের প্রমাণ নয়। এগুলোর কোনোটি মানুষের নিজের অর্জিত যোগ্যতাও নয়। একজন মানুষের নিজের কাজ, আচরণ এবং বাস্তব দক্ষতার মূল্যায়ন করা যেতে পারে; কিন্তু তার পূর্বপুরুষের পরিচয়ের কারণে তাকে জন্মগতভাবে শ্রেষ্ঠ বা নিকৃষ্ট ঘোষণা করা যায় না। একইভাবে একজন মানুষের বিশ্বাসকে যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে সমালোচনা করা যায়, কিন্তু শুধু সেই বিশ্বাসের কারণে তার মৌলিক মানবিক অধিকার অস্বীকার করা যায় না। মানুষের সমান অধিকার কোনো বিশেষ ধর্মের অনুমোদন, কোনো নবীর নির্দেশ কিংবা কোনো বংশের অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। যে সমাজে মানুষের জন্মপরিচয়ের পরিবর্তে তার ব্যক্তিগত যোগ্যতা, স্বাধীনতা ও সমান মানবিক মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেই সমাজই জাতিভেদ ও বংশগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত অবস্থান গ্রহণ করে। আর যে ব্যবস্থায় একদিকে সমতার ঘোষণা দেওয়া হয়, অন্যদিকে জন্মগত শ্রেষ্ঠত্ব ও পরিচয়ভিত্তিক বিশেষাধিকার বজায় রাখা হয়, সেই ব্যবস্থার সমতার দাবি তার নিজের বিধানের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। সত্যের স্বার্থেই সকল প্রকার বর্ণবাদ, জাতিভেদ, গোত্রাভিমান এবং ধর্মীয় বৈষম্যের সমালোচনা করে যেতে হবে। এতে কে খুশি হলো আর কার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগল, সেটি সত্য ও ন্যায়বিচার নির্ধারণের মানদণ্ড নয়।


তথ্যসূত্রঃ
  1. International Convention on the Elimination of All Forms of Racial Discrimination, Preamble and Article 1 ↩︎
  2. American Association of Biological Anthropologists, Statement on Race and Racism, 2019 ↩︎
  3. United States Holocaust Memorial Museum — The Nuremberg Race Laws ↩︎
  4. Constitution of India — Article 15: Prohibition of Discrimination ↩︎
  5. Constitution of India — Article 17: Abolition of Untouchability ↩︎
  6. American Psychological Association — Implicit Bias ↩︎
  7. UNESCO — Declaration on Race and Racial Prejudice, Article 2, 1978 ↩︎
  8. National Academies of Sciences, Engineering, and Medicine — Federal Policy to Advance Racial, Ethnic, and Tribal Health Equity, 2023 ↩︎
  9. কোরআন ৪৯ঃ১৩ ↩︎
  10. কোরআন ৩০ঃ২২ ↩︎
  11. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিস: ২০৪৯ ↩︎
  12. Farewell Sermon: Your Lord is one, your father Adam is one ↩︎
  13. সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৫৬৪c ↩︎
  14. কোরআন সংকলন এবং পরিমার্জনের ইতিহাস ↩︎
  15. ইসলামে হাদিসের গুরুত্ব এবং অপরিহার্যতা ↩︎
  16. সহীহ বুখারী, হাদিস ৩৭৫৪ ↩︎
  17. মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস নম্বরঃ ৩৬৬৩ ↩︎
  18. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৬৬৫৭ ↩︎
  19. হাদীস সম্ভার, হাদিস নম্বরঃ ১৮২৮ ↩︎
  20. রিয়াযুস স্বা-লিহীন (রিয়াদুস সালেহীন), হাদিস নম্বরঃ ৬৭১ ↩︎
  21. সহজ দরসে ইবনে মাজাহ , পৃষ্ঠা ১২২, ১২৩ ↩︎
  22. ইবনে রজব, জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম, হাবশি দাসের আনুগত্যের ব্যাখ্যা ↩︎
  23. ইবনে উসাইমীন, কুরাইশ খলিফা ও হাবশি শাসকের বিধান ↩︎
  24. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৪৫৫০ ↩︎
  25. সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী, হাদিস নম্বরঃ ৪৫৯৭ ↩︎
  26. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৬৬৫৪ ↩︎
  27. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৬৬৫৫ ↩︎
  28. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বর ৬৬৫৮ ↩︎
  29. সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিস নম্বরঃ ৩৯০৫ ↩︎
  30. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিস নম্বরঃ ৫৮৩২ ↩︎
  31. সুনান তিরমিজি, ৩৯৩৬ ↩︎
  32. আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, খলিফার যোগ্যতার সপ্তম শর্ত ↩︎
  33. সুনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), ৩৫৬৩ ↩︎
  34. সুনান আবু দাউদ, আন্তর্জাতিক নম্বর ৩৬০২ ↩︎
  35. আল-মাওয়ার্দী, আল-হাবি আল-কাবির, মরুবাসী ও শহরবাসীর সাক্ষ্য ↩︎
  36. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৯৫২ ↩︎
  37. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৯৫৩ ↩︎
  38. সুনান তিরমিজি, ৩৯৫৩ ↩︎
  39. কালো বা ফর্সা: বাংলাদেশে সৌন্দর্যের নির্ধারক কেন গায়ের রং? ↩︎
  40. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৫৮৬২ ↩︎
  41. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৫৮৬৩ ↩︎
  42. সুনান তিরমিজি (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), ৮৭৮ ↩︎
  43. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নম্বরঃ ৪২৪৪ ↩︎
  44. সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৩৩৩৪ ↩︎
  45. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ২৬৭ ↩︎
  46. কোরআন ৩:১০৬–১০৭ ↩︎
  47. কোরআন ৩:১০৭ ↩︎
  48. কোরআন ৩৯:৬০ ↩︎
  49. সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিস নম্বরঃ ২২৯০ ↩︎
  50. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিস নম্বরঃ ৭০৩৯ ↩︎
  51. সহীহ মুসলিম (ইফাঃ), হাদিস নম্বরঃ ১০২০ ↩︎
  52. সহিহ মুসলিম, খণ্ড ২, ইসলামিক সেন্টার পাবলিকেশন্স, ডাউনলোড লিঙ্ক দেখুন ↩︎
  53. সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ), হাদিস নম্বরঃ ২৮৩৬ ↩︎
  54. ইসলামি শরীয়তে অসহায় প্রানি হত্যার অমানবিক বিধান ↩︎
  55. ইসলামি শরীয়তে অসহায় প্রাণী হত্যার অমানবিক বিধান ↩︎
  56. সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), ৩০৯২ ↩︎
  57. সহীহ বুখারী (তাওহীদ), ৩২৫৪ ↩︎
  58. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৩৬৯ ↩︎
  59. তাফসীরে ইবনে কাসীর, তাফসীর পাবলিকেশন্স কমিটি, খণ্ড ১৭, নবম সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৭৭৭ ↩︎
  60. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৬৮৪৭ ↩︎
  61. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), আল্লামা আলবানী একাডেমী, হাদিস নম্বরঃ ৩০০৩ ↩︎
  62. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৪৪৪২ ↩︎
  63. সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী, হাদিস নম্বরঃ ৪৪৮৬ ↩︎
  64. সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিস নম্বরঃ ১৬০৭ ↩︎
  65. রিয়াযুস স্বা-লিহীন (রিয়াদুস সালেহীন), হাদিস নম্বরঃ ১৮২৯ ↩︎
  66. ইসলামে কাফেরদের উচ্ছেদ, জাতিগত নিধন বা এথনিক ক্লিনজিং 1 2
  67. অমুসলিমদের রাস্তার কিনারায় ঠেলে লাঞ্ছিত করার ইসলামিক বিধান ↩︎
  68. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিস নম্বরঃ ৫৫৫৪ ↩︎
  69. সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিস নম্বরঃ ১৬০২ ↩︎
  70. অমুসলিমদের রাস্তার কিনারায় ঠেলে লাঞ্ছিত করার ইসলামিক বিধান ↩︎
  71. মিশকাতুল মাসাবীহ, ৫০১৮ ↩︎
  72. সুনান আবু দাউদ, ৪৮৩২ ↩︎
  73. মুসলিমের জন্য কাফেরের দেশে অমুসলিমদের মাঝে বসবাস হারাম ↩︎
  74. সুনান আবু দাউদ, ২৭৮৭ ↩︎
  75. কোরআন ৯৮:৬ ↩︎
  76. কোরআন ৮:৫৫ ↩︎
  77. কোরআন ২:১৬১ ↩︎
  78. কোরআন ২:১৭১ ↩︎
  79. কোরআন ৭:১৭৯ ↩︎
  80. তাফসীরে ইবনে কাসীর (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪৮১ ↩︎
  81. তাফসীরে জালালাইন, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩৮ ↩︎
  82. তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূরা বাকারা ২:১৭১ ↩︎
  83. কাফেরদের অপমান ও লাঞ্ছিত করার জন্য অবমাননাকর জিজিয়া 1 2
  84. ইসলামে জিহাদসংক্রান্ত প্রবন্ধসমূহ ↩︎
  85. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ২৮৩৮ ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

আসিফ মহিউদ্দীন

আসিফ মহিউদ্দীন সম্পাদক সংশয় - চিন্তার মুক্তির আন্দোলন [email protected]

3 thoughts on

  1. 🌿 কুরআনের আলোয় বর্ণবাদ ও জাতিভেদ: অপপ্রচারের জবাব 🌿
    নাস্তিক বা সংশয়বাদী পেজগুলো প্রায়শই কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা, সমাজতান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা বিতর্কিত কিছু বর্ণনার অপব্যাখ্যা করে ইসলামকে বর্ণবাদী বা জাতিভেদপূর্ণ ধর্ম হিসেবে প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু আমরা যদি সব ধরণের মানুষের তৈরি ব্যাখ্যা বা প্রথা দূরে সরিয়ে রেখে একমাত্র গাইডলাইন আল-কুরআনের দিকে তাকাই, তবে দেখব এই দাবি কতটা অসার ও মিথ্যা।

    আসুন, সরাসরি কুরআনের আয়াত দিয়ে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি:
    শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মানদণ্ড: চরিত্র ও নৈতিকতা (সূরা হুজুরাত ৪৯:১৩)
    আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পুরো মানবজাতিকে উদ্দেশ্য করে বৈষম্যের প্রাচীর এক আয়াতেই ভেঙে দিয়েছেন:
    “হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে। আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পারো। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে সম্মানিত, যে সবচেয়ে মুত্তাকী (আল্লাহ-সচেতন/নৈতিকবান)।”
    💡 কুরআন থেকে ৩টি অকাট্য সত্য:
    সব মানুষের উৎস এক (আদম ও হাওয়া), তাই জন্মগতভাবে কেউ কারো চেয়ে বড় নয়।
    জাতি বা গোত্র কেবল মানুষের ‘পরিচিতি’র জন্য, অহংকার বা শ্রেষ্ঠত্বের জন্য নয়।
    আল্লাহর কাছে ভিআইপি (VIP) হওয়ার একমাত্র ক্রাইটেরিয়া হলো চরিত্র ও তাকওয়া—বংশ বা গায়ের রঙ নয়।
    রঙের বৈচিত্র্য আল্লাহর নিদর্শন, কোনো অভিশাপ নয় (সূরা রূম ৩০:২২)
    বর্ণবাদীরা যেখানে কালো বা ভিন্ন রঙের মানুষকে নিকৃষ্ট মনে করে, সেখানে কুরআন বলছে:
    “এবং তাঁর অন্যতম নিদর্শন হলো আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।”
    💡 শিক্ষা: মানুষের গায়ের রঙ বা ভাষার ভিন্নতা কোনো ভেদাভেদের দেয়াল নয়; বরং এটি আল্লাহর সৃষ্টির এক অপূর্ব সৌন্দর্য ও নিদর্শন।
    বংশগৌরব ও অহংকারের মুখে চড় (সূরা লোকমান ৩১:১৮)
    কুরআন অহংকার ও বংশের বড়াই করাকে তীব্রভাবে নিন্দা করেছে:

    “আর তুমি মানুষের দিক থেকে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিও না এবং পৃথিবীতে ঔদ্ধত্যের সাথে চলাফেরা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো দাম্ভিক ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না।”
    দাসপ্রথা নিয়ে বিভ্রান্তির অবসান
    সংশয়বাদীরা দাসপ্রথা নিয়ে ইসলামকে আক্রমণ করতে পছন্দ করে। কিন্তু তারা ভুলে যায় যে, কুরআন এমন এক বৈশ্বিক সমাজে নাযিল হয়েছিল যেখানে দাসপ্রথা ছিল অর্থনীতির মূল ভিত্তি। কুরআন রাতারাতি অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা তৈরি না করে ধাপে ধাপে দাসমুক্তির এমন এক আইনি কাঠামো তৈরি করেছে, যা দাসপ্রথাকে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলে:

    মুক্তির নির্দেশ: কুরআন সরাসরি দাসমুক্তির কাজকে সর্বোচ্চ নেক আমল বলেছে— “তা হলো দাসমুক্তি।” (সূরা বালাদ ৯০:১৩)।
    মুক্তির চুক্তি (মুকাতাবাহ): “তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসদের মধ্যে যারা মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি করতে চায়, তাদের সাথে চুক্তি করো যদি তোমরা তাদের মধ্যে কল্যাণ দেখতে পাও…” (সূরা নূর ২৪:৩৩)।

    কোনো মুসলিম শাসক, সমাজ বা কোনো ব্যক্তিবিশেষের বর্ণবাদী আচরণ কখনো ইসলামের শিক্ষা হতে পারে না। “মুসলিমদের কাজ ≠ কুরআনের বিধান।” পুরো কুরআনে এমন একটি আয়াতও নেই যেখানে বলা হয়েছে—”আরব জাতি জন্মগতভাবে শ্রেষ্ঠ” কিংবা “শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের চেয়ে উত্তম”। বরং কুরআনের স্পষ্ট অবস্থান হলো:
    ❌ আরব বনাম অনারব বৈষম্য = জাহেলিয়াত।
    ❌ সাদা বনাম কালো বৈষম্য = আল্লাহর নিদর্শনের অবমাননা।
    🌿 মানবতা = এক উৎস থেকে সৃষ্টি এবং মর্যাদার মাপকাঠি কেবলই চরিত্র।

    তাই যারা মানুষের তৈরি ইতিহাস বা দুর্বল বর্ণনা এনে ইসলামকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চায়, তারা মূলত কুরআনের এই চিরন্তন ও সাম্যবাদী বাণীকেই এড়িয়ে যেতে চায়।
    #onlyquranresearch

Leave a comment

Your email will not be published.