‘মুখান্নাস’ ও ‘খুনসা’: হিজড়াদের সম্পর্কে ইসলামি শরিয়তের বিধান
ভূমিকা
মানুষের জন্মগত শারীরিক বৈশিষ্ট্য, লিঙ্গপরিচয় কিংবা লিঙ্গপ্রকাশ কোনো অপরাধ নয়। অথচ আমাদের সমাজে লিঙ্গবৈচিত্র্যের অসংখ্য মানুষকে শুধু তাঁদের পরিচয় ও আচরণের কারণে পরিবার থেকে বিতাড়িত করা হয়, সামাজিকভাবে অপমানিত ও বঞ্চিত করা হয় এবং শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়। যে মানুষের নিজের পরিচয় নিয়ে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার কথা, তাঁকেই সমাজের চোখে ঘৃণা, উপহাস ও অবজ্ঞার পাত্রে পরিণত করা হয়। এই অমানবিক বৈষম্যকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামি ধর্মগ্রন্থ, হাদিস এবং ধ্রুপদী আইনশাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সহিহ বুখারিতে নারীর বেশধারী পুরুষদের অভিশাপ দেওয়া এবং তাঁদের ঘর থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ বর্ণিত হয়েছে। সুনান আবু দাউদে এমন ব্যক্তিদের বসবাসের এলাকা থেকে নির্বাসিত করার বিবরণ রয়েছে। পরবর্তী যুগের ইসলামি আইনজ্ঞরা এসব ঘটনাকে শাস্তি ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বৈধ নজির হিসেবে আলোচনা করেছেন। এমনকি আধুনিক ইসলামি ফতোয়ায় নারীর মতো পোশাক ও আচরণকারী পুরুষদের সামাজিকভাবে বর্জন, তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক ও লেনদেন বন্ধ করা এবং বাড়ি, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে তাঁদের কাজে নিয়োগ না দেওয়ার নির্দেশও পাওয়া যায়। মানুষের পোশাক, চলাফেরা, কথাবার্তা কিংবা প্রচলিত লিঙ্গগত আচরণের সঙ্গে অসামঞ্জস্যকে কেন্দ্র করে এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ ব্যক্তিস্বাধীনতা, সমমর্যাদা এবং মৌলিক মানবাধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত।
ইসলামি গ্রন্থে ব্যবহৃত আরবি ‘মুখান্নাস’ এবং ‘খুনসা’ শব্দ দুটি একই অর্থ বহন করে না। মুখান্নাস বলতে সাধারণত নারীসুলভ আচরণকারী পুরুষকে বোঝানো হয়েছে, আর খুনসা বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যাঁর জন্মগত যৌন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে প্রচলিত পুরুষ বা নারী শ্রেণিতে নির্ধারণ করা জটিল। দক্ষিণ এশিয়ার হিজড়া জনগোষ্ঠীও কোনো একক শারীরিক বা চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক শ্রেণি নয়; এটি একটি স্বতন্ত্র সামাজিক ও লিঙ্গগত পরিচয়। কিন্তু বাংলা হাদিস অনুবাদে মুখান্নাস শব্দটির জন্য বহু ক্ষেত্রে ‘হিজড়া’ ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে এসব হাদিসের অভিশাপ, বহিষ্কার ও নির্বাসনের বর্ণনা সরাসরি হিজড়া জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। এই পরিভাষাগত অস্পষ্টতার মধ্যেও ইসলামি বিধানগুলোর একটি মৌলিক নৈতিক সমস্যা স্পষ্ট: সমাজস্বীকৃত পুরুষত্ব ও নারীত্বের সীমারেখা অতিক্রমকারী মানুষকে ধর্মীয়ভাবে নিন্দা, নিয়ন্ত্রণ ও বর্জনের বিধান তৈরি করা হয়েছে। একজন মানুষ অন্যের কোনো ক্ষতি না করেও শুধু তাঁর পোশাক, আচরণ বা লিঙ্গপ্রকাশের কারণে অভিশাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা নির্বাসনের শিকার হতে পারেন—এমন বিধানের কোনো ন্যায়সংগত ভিত্তি নেই। ব্যক্তির মর্যাদা ও অধিকার তাঁর জন্মগত বৈশিষ্ট্য কিংবা ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত লিঙ্গগত আচরণ অনুসরণের ওপর নির্ভর করতে পারে না।
সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম ও সুনান আবু দাউদের বর্ণনা, ইবনে হাজার আসকালানি, ইমাম নববি, শাওকানি, ইবনে তাইমিয়া ও জালালুদ্দিন সুয়ূতির ব্যাখ্যা এবং ইসলামওয়েব ও ইসলামকিউএতে প্রকাশিত ফতোয়াগুলোতে এই বৈষম্যমূলক বিধানের ঐতিহাসিক ও আইনগত ভিত্তি পাওয়া যায়। এসব উৎসে নারীর বেশ ধারণের জন্য অভিশাপ, ঘর থেকে বহিষ্কার, জনবসতি থেকে নির্বাসন, সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত করার যেসব নির্দেশ রয়েছে, সেগুলো মানুষের মৌলিক স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ধর্মীয় পবিত্রতা, সামাজিক শৃঙ্খলা কিংবা জনস্বার্থের নামে কোনো নিরপরাধ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও সামাজিক মর্যাদা কেড়ে নেওয়া ন্যায়বিচার নয়; এটি ধর্মীয় কর্তৃত্বের মাধ্যমে বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।
হিজড়া কাকে বলে
“হিজড়া” শব্দটি একটি উর্দু শব্দ, যা সেমেটিক আরবি ধাতুমূল হিজর থেকে “গোত্র হতে পরিত্যাক্ত” অর্থে এসেছে [1]। পরবর্তীতে তা বাঙলা এবং হিন্দি ভাষায় বিদেশী শব্দ হিসেবে প্রবেশ করেছে। শব্দটির ভারতীয় ব্যবহারকে প্রথাগতভাবে ইংরেজিতে “ইউনাক” (Eunuch, অর্থঃ খোজা) বা “হারমাফ্রোডাইট” (hermaphrodite, অর্থঃ উভলিঙ্গ) হিসেবে অনুবাদ করা হয়, যেখানে “পুং জননাঙ্গের অনুপস্থিতি” বোঝানো হয়। সাধারণত অধিকাংশ হিজড়াই স্বাভাবিক পুরুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মগ্রহণকারী, তবে এদের মধ্যে আন্তঃলিঙ্গ বৈচিত্র্য নিয়ে জন্মানো অল্পসংখ্যক সদস্যও রয়েছে।

হিজড়া পরিচয় কোনো ক্রোমোজোমগত ত্রুটি বা জন্মগত ‘যৌন প্রতিবন্ধকতা’র চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক নাম নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক লিঙ্গপরিচয়; এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে আন্তঃলিঙ্গ বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মানো ব্যক্তি যেমন থাকতে পারেন, তেমনি এমন মানুষও থাকতে পারেন যাঁদের জন্মের সময়ে পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল কিন্তু পরবর্তী জীবনে তাঁদের লিঙ্গপরিচয় ও সামাজিক অবস্থান ভিন্ন হয়েছে। জন্মগত আন্তঃলিঙ্গ বৈচিত্র্যও কেবল ক্রোমোজোমের ভিন্নতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; হরমোন, প্রজনন অঙ্গ ও অন্যান্য যৌন বৈশিষ্ট্যের বৈচিত্র্যও এর সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে পারিবারিক প্রত্যাখ্যান, দারিদ্র্য, সহিংসতা এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণে বহু হিজড়া মানুষ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজস্ব সম্প্রদায়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। একটি সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর জন্য পরিবারের স্নেহ, নিরাপত্তা ও পরিচর্যা মৌলিক প্রয়োজন; অথচ লিঙ্গবৈচিত্র্যের কারণে শিশুকে পরিত্যাগ করা কিংবা পরে তাঁকে পরিবার থেকে বিতাড়িত করা এই মৌলিক অধিকারকেই অস্বীকার করে। শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে অনেকে নাচগান, বকশিশ সংগ্রহ, ভিক্ষা কিংবা যৌনকর্মসহ অনিরাপদ বা সীমিত জীবিকার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। সামাজিক বঞ্চনার জন্য সংশ্লিষ্ট মানুষগুলোর পরিচয় দায়ী নয়; দায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বৈষম্য, নিপীড়ন ও সুযোগবঞ্চনা।
ভেবে দেখুন, কোন ধরণের অন্যায় অপরাধ না করেই সেই জন্ম থেকে শুধুমাত্র সামান্য একটি কারণে তাদের পুরো জীবনটি ধ্বংস করে ফেলা হয়। কোন ধরণের অধিকার, সামাজিক মর্যাদা কিংবা সম্মান তারা পান না। সর্বত্র হাসাহাসি, লজ্জা দেয়া, অবহেলা করা, একজন আত্মমর্যাদাশীল আত্মনির্ভরশীল মানুষ হয়ে উঠতে প্রতিটি স্তরে বাধা সৃষ্টি করা, এইভাবেই তাদের কোনরকমে বেঁচে থাকতে হয়। এরকম অমানবিক জীবন আপনারও হতে পারতো। একটু ভেবে দেখবেন, আপনার জীবনটি এরকম হলে কেমন লাগতো?
যারা হিজড়াদের জীবন সম্পর্কে আরো জানতে চান, তারা এই ভিডিওগুলো দেখতে পারেন-
এই বিষয়ে পাকিস্তানের একটি বিখ্যাত সিনেমা রয়েছে, সিনেমাটির নাম বোল। একটি বৈচিত্র্যময় লিঙ্গের অধিকারী শিশুর জীবনের ওপর নির্মিত। অত্যন্ত সুন্দর এই সিনেমাটি আপনারা দেখতে পারেন। সিনেমাটি এখানে যুক্ত করে দিচ্ছি-
নবী মুহাম্মদের হিজরত
ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হচ্ছে নবী মুহাম্মদের হিজরত। আরবি هِجْرَة বা হিজরত শব্দের অর্থ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যাওয়া বা দেশান্তর। ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ নিজের জন্মভূমি মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। ইসলামি ঐতিহাসিক বিবরণ অনুসারে, মুহাম্মদ তাঁর পূর্বপুরুষদের ধর্মবিশ্বাস, দেবদেবীর উপাসনা এবং প্রচলিত ধর্মীয় প্রথার বিরোধিতা করে নতুন ধর্ম প্রচার শুরু করেছিলেন। এর ফলে মক্কার প্রভাবশালী গোত্রগুলোর সঙ্গে তাঁর বিরোধ সৃষ্টি হয়। কোরআনের সূরা আনফালের ৩০ নম্বর আয়াতেও এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে মুহাম্মদকে হত্যা অথবা জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত করার পরিকল্পনাকে তাঁর বিরোধীদের ষড়যন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে [2]—
وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ ۚ وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ ۖ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ
বাংলা অনুবাদ: আর স্মরণ করো, যখন কাফেররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল, যেন তারা তোমাকে বন্দি করতে পারে অথবা হত্যা করতে পারে কিংবা তোমাকে দেশ থেকে বের করে দিতে পারে। তারা ষড়যন্ত্র করছিল এবং আল্লাহও পরিকল্পনা করছিলেন। আর আল্লাহ সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী।
নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকাশ, প্রচলিত ধর্মের সমালোচনা এবং নতুন মতবাদ প্রচারের কারণে কাউকে তাঁর জন্মভূমি ছেড়ে পালাতে বাধ্য করা নিঃসন্দেহে গুরুতর অন্যায়। একজন মানুষের জন্মভূমি শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; সেখানে তাঁর পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, জীবিকা, শৈশবের স্মৃতি এবং সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মতবিরোধের কারণে কাউকে এসব সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করা তাঁর ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নিরাপত্তার ওপর আঘাত। মুহাম্মদের ক্ষেত্রেও এই দেশত্যাগকে ইসলামি ধর্মগ্রন্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সূরা তাওবার ৪০ নম্বর আয়াতে মক্কার অবিশ্বাসীরা তাঁকে বের করে দিয়েছিল বলে সরাসরি উল্লেখ রয়েছে। সেখানে আবু বকরের সঙ্গে মুহাম্মদের গুহায় আশ্রয় গ্রহণ এবং বিপদের মুহূর্তে তাঁর সঙ্গীকে সান্ত্বনা দেওয়ার কথাও বর্ণিত হয়েছে [3]—
إِلَّا تَنْصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا ۖ فَأَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُودٍ لَمْ تَرَوْهَا وَجَعَلَ كَلِمَةَ الَّذِينَ كَفَرُوا السُّفْلَىٰ ۗ وَكَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
বাংলা অনুবাদ: তোমরা যদি তাকে সাহায্য না করো, তবে আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছিলেন, যখন কাফেররা তাকে বের করে দিয়েছিল এবং সে ছিল দুজনের একজন। যখন তারা উভয়ে গুহায় ছিল এবং সে তার সঙ্গীকে বলছিল, ‘দুঃখ করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ অতঃপর আল্লাহ তার ওপর প্রশান্তি নাজিল করলেন এবং তাকে এমন বাহিনী দিয়ে সাহায্য করলেন, যাদের তোমরা দেখতে পাওনি। তিনি কাফেরদের কথাকে অধম করে দিলেন এবং আল্লাহর কথাই সর্বোচ্চ। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
এখানেই মুহাম্মদের নিজের অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তীকালে তাঁর নির্দেশিত ব্যবস্থার মধ্যে একটি গভীর নৈতিক অসঙ্গতি দেখা যায়। যে মানুষ নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচরণের কারণে বিরোধীদের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত জন্মভূমি ছেড়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন, সেই মানুষই ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পর সমাজের প্রচলিত লিঙ্গগত আচরণের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যক্তিদের অভিশাপ দিয়েছেন, ঘর থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং নির্বাসনের ব্যবস্থা করেছেন। সহিহ বুখারির ৫৮৮৬ নম্বর হাদিসে নারীর মতো আচরণকারী পুরুষ এবং পুরুষের মতো আচরণকারী নারীদের অভিশাপ দিয়ে ‘তাদের তোমাদের ঘর থেকে বের করে দাও’ বলে নির্দেশ দেওয়ার বিবরণ রয়েছে। একই বর্ণনায় মুহাম্মদ নিজে একজনকে এবং উমর আরেকজনকে বের করে দেওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে। সুনান আবু দাউদের ৪৯২৮ নম্বর হাদিসে হাত-পায়ে মেহেদি লাগিয়ে নারীর বেশ ধারণকারী একজন মুখান্নাস ব্যক্তিকে মদিনার বাইরে নির্বাসিত করার নির্দেশ পাওয়া যায়। এমনকি ওই ব্যক্তিকে হত্যা করার অনুমতি পর্যন্ত চাওয়া হয়েছিল। মুহাম্মদের উত্তরে হত্যার অনুমতি প্রত্যাখ্যানের কারণ হিসেবে ব্যক্তিটির নামাজ আদায়ের প্রসঙ্গ এসেছে। অর্থাৎ একদিকে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশত্যাগের ঘটনাকে পবিত্র ইতিহাসের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে ভিন্ন লিঙ্গপ্রকাশের অধিকারী মানুষকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া এবং নির্বাসিত করার ঘটনাকে ধর্মীয় বিধান ও অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। [4] [5]
নিজের ধর্মবিশ্বাসের কারণে জন্মভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হওয়া যদি অন্যায় হয়, তাহলে অন্য একজন মানুষকে তাঁর পোশাক, চালচলন কিংবা লিঙ্গপ্রকাশের কারণে ঘরছাড়া ও নির্বাসিত করাও অন্যায়। মুহাম্মদের ক্ষেত্রে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও আশ্রয়ের প্রয়োজনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করে অন্য মানুষের ক্ষেত্রে সেই স্বাধীনতা অস্বীকার করার কোনো সর্বজনীন নৈতিক ভিত্তি নেই। একজন মানুষের নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী বেঁচে থাকার অধিকার এবং অন্য একজন মানুষের নিজের পরিচয় ও আচরণ নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার একই নৈতিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রথমটির লঙ্ঘনকে নিপীড়ন হিসেবে নিন্দা করে দ্বিতীয়টির লঙ্ঘনকে ধর্মীয় কর্তব্য বা বৈধ শাস্তি হিসেবে গ্রহণ করা স্পষ্ট দ্বৈতনীতি। মুহাম্মদের হিজরতকে কেন্দ্র করে যে দেশত্যাগের বেদনা, নিপীড়ন ও আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা ইসলামের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে, মুখান্নাসদের নির্বাসনের বিধানে সেই একই মানবিক অধিকারের স্বীকৃতি অনুপস্থিত।
হিজড়াদের জন্ম কীভাবে হয়
আসুন শুরুতেই বাঙলাদেশের একজন প্রখ্যাত আলেমের বক্তব্য শুনে নেয়া যাক,
ইসলামের রেফারেন্সে হিজড়াদের জন্ম কীভাবে হয়, সেই সম্পর্কে বলা হয়েছে, স্ত্রীলোকের মাসিকের সময় সঙ্গম করলে শয়তান দ্বারা মহিলাটি গর্ভবতী হয়ে যায়, অর্থাৎ হিজড়ারা আসলে শয়তানের সঙ্গমে জন্ম নেয়! [6]
শয়তান মানুষের সন্তানে শরীক হয় কীভাবে
হযরত মুজাহিদ (রহঃ) বলেছেনঃ কোনও মানুষ আপন স্ত্রীর সঙ্গে যৌনমিলন শুরু করার সময় ‘বিস্মিল্লাহ’ না বললে জ্বিন তার প্রস্রাবের ছিদ্রপথে জড়িয়ে যায় এবং সেই পুরুষের সাথে সেও যৌনসঙ্গমে শরীক হয়। এ সম্পর্কেই আল্লাহ لم يطمثهن إنس قبلهم ولا جان )
ইতোপূর্বে ওই স্বর্গসুন্দরী (হুর)-দের না কোনও মানুষ ব্যবহার করেছে আর না জ্বিন ।(২)
হিজড়া জন্মায় কেমন করে
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেনঃ হিজড়ারা জ্বিনদের সন্তান। কোনও এক ব্যক্তি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে প্রশ্ন করেন যে এমনটা কেমন করে হতে পারে? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রসূল (সাঃ) নিষেধ করেছেন যে মানুষ যেন তার স্ত্রীর মাসিক স্রাব চলাকালে যৌনসঙ্গম না করে। সুতরাং কোনও মহিলার সঙ্গে তার ঋতুস্রাব চলার সময় সঙ্গম করা হলে শয়তান তার আগে আগে থাকে এবং সেই শয়তানের দ্বারা ওই মহিলা গর্ভবতী হয় ও হিজড়া সন্তান প্রসব করে। (৩)
জ্বিন-মানুষের যৌথ মিলনজাত সন্তানের নাম কী
আল্লামা সাআলাবী (রহঃ) বলেছেনঃ মানুষ ও জ্বিনের যৌথ মিলনজাত বাচ্চাকে বলা হয় ‘খুন্নাস’। (৬)
জ্বিনের সঙ্গমে মহিলার গোসল
আবুল মাআলী ইবনুল মানজা হামবালী (রহঃ) বলেছেনঃ যদি কোনও
মহিলা বলে যে, তার কাছে জ্বিন আসে যেমন স্বামী আসে স্ত্রীর কাছে, তবে তার পক্ষে গোসল করা আব্যশিক হয় না। কতিপয় হানাফী আলেমও এরকম বলেন। কেননা এক্ষেত্রে গোসল আবশ্যিক হওয়ার শর্ত অনুপস্থিত, আর তা হল
লিঙ্গপ্রবেশ ও বীর্যস্খলন। (৭)
আল্লামা বরুদ্দীন শিবলী (রহঃ) বলেছেনঃ কথাটা আপত্তিকর। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মহিলার প্রতি গোসল জরুরী হওয়া উচিত। কেননা ‘লিঙ্গপ্রবেশ’ না ঘটলে মহিলাটি জানতে পারত না যে জ্বিন তার সাথে পুরুষের মতো সহবাস করছে।
রাণী বিলকীসের মা ছিল জ্বিন
কথিত আছে: বিলকীসের মা-বাপের মধ্যে একজন ছিল জ্বিন। ইবনুল কালবী
বলেছেন, বিলকীসের বাপ জ্বিনদের মেয়েকে বিয়ে করেছিল, যার নাম ছিল ‘রেহানা বিনতে সুকুন এরই গর্ভে বিলকীসের জন্ম হয়, এর নাম রাখা হয় পশুদের খুরের মতো এবং তার গোড়ালিতে লোমও ছিল। হযরত সুলাইমান (আঃ) তাকে বিয়ে করেছিলেন এবং শয়তানদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তোমরা গোসলখানা ও লোম-বিন্নাশক পাউডার বানাও। (৮) ‘বিলকিমাহ’। বর্ণিত আছে যে বিলকীসের পায়ের সামনের অংশ ছিল চতুষ্পদ।
আমি (আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহঃ)) বলছি–
হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, জনাব রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ
-احدا بوي بلقيس كان جنيا
বিল্কীসের পিতা-মাতার মধ্যে একজন ছিল জ্বিন। (৯)
হযরত মুজাহিদ (রহঃ) বলেনঃ সাবার রানী (বিলকীস)-এর মা ছিল জ্বিন। (১০) হযরত যুবাইর বিন মুহাম্মদ (রহঃ) বলেনঃ বিলকীসের ‘মা ফারিআহ্’ ছিল জ্বিন। (১১)
হযরত ইবনে জুরাইজ (রহঃ) বলেনঃ বিলকীসের মা ছিল ‘বিলফানাহ্’। (১২) হযরত উসমান বিন হাযির (রহঃ) বলেনঃ বিলকীসের মা ছিল জ্বিনদের অন্তর্গত এবং তার নাম ছিল ‘বিলকিমাহ বিনতে সাইসান’। (১৩)



কোরআনে যৌনকামনাহীন পুরুষ: সূরা নূর ২৪:৩১ এবং ধ্রুপদী তাফসিরে মুখান্নাসদের অবস্থান
মুখান্নাস ব্যক্তিদের নারীদের ঘরে প্রবেশ, সামাজিক অবস্থান এবং তাঁদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের সঙ্গে কোরআনের সূরা নূরের ৩১ নম্বর আয়াত সরাসরি সম্পর্কিত। এই আয়াতে মুসলিম নারীদের কার কার সামনে নিজেদের সাজসজ্জা প্রকাশ করতে দেওয়া হয়েছে, তার একটি তালিকা রয়েছে। স্বামী, পিতা, পুত্র ও নির্দিষ্ট আত্মীয়দের পাশাপাশি সেখানে এমন অধীনস্থ পুরুষদের উল্লেখ করা হয়েছে, যাঁদের নারীদের প্রতি যৌন আকাঙ্ক্ষা নেই। এই শ্রেণির জন্য ব্যবহৃত আরবি শব্দগুচ্ছ হচ্ছে غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ। প্রাচীন তাফসিরকারীরা এর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে যৌন আকাঙ্ক্ষা, শারীরিক সক্ষমতা, বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থা এবং নারীসুলভ আচরণকে একসঙ্গে আলোচনা করেছেন। মুখান্নাসদের সম্পর্কে হাদিসে যে ঘরে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা ও নির্বাসনের বিবরণ রয়েছে, তার সঙ্গে এই কোরআনিক শ্রেণিবিভাগকে সরাসরি যুক্ত করেছেন তাবারি, ইবনে কাসির, কুরতুবিসহ একাধিক ব্যাখ্যাকারী। আয়াতে বলা হয়েছে [7]—
أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَىٰ عَوْرَاتِ النِّسَاءِ
বাংলা অনুবাদ: অথবা সেই অনুসারী পুরুষদের সামনে, যাদের নারীদের প্রতি যৌন আকাঙ্ক্ষা নেই; অথবা এমন শিশুদের সামনে, যারা এখনো নারীদের গোপনীয় বিষয় সম্পর্কে অবগত হয়নি।
এই আয়াতের বিধানে কোনো মানুষের নারীদের সঙ্গে মেলামেশার অনুমতি তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করছে না; বরং তাঁর মধ্যে নারীর প্রতি যৌন আকাঙ্ক্ষা রয়েছে কি না, সেই বিষয়ে অন্যদের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করছে। কে যৌন আকাঙ্ক্ষাহীন, কে নারীদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য বোঝেন এবং কে সেই কারণে নারীদের ঘরে প্রবেশের উপযুক্ত—এসব নির্ধারণ করার কর্তৃত্ব অন্য মানুষের হাতে চলে যায়। তাবারি তাঁর জামিউল বায়ান গ্রন্থে এই শব্দগুচ্ছ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এমন পুরুষদের উল্লেখ করেছেন, যাঁরা খাদ্য বা আশ্রয়ের জন্য অন্যের অনুসারী হয়ে থাকতেন এবং যাঁদের নারীদের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই বলে ধরে নেওয়া হতো। তিনি লিখেছেন [8]—
يقول تعالى ذكره: والذين يتبعونكم لطعام يأكلونه عندكم، ممن لا أرب له في النساء من الرجال، ولا حاجة به إليهنّ، ولا يريدهنّ.
বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ এখানে সেই পুরুষদের কথা বলেছেন, যারা তোমাদের কাছে খাবার পাওয়ার জন্য তোমাদের অনুসরণ করে এবং যাদের নারীদের ব্যাপারে কোনো কামনা, প্রয়োজন কিংবা আকাঙ্ক্ষা নেই।
তাবারি ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, কাতাদা, যুহরি ও অন্যান্য প্রাথমিক ব্যাখ্যাকারীর বক্তব্যও একত্র করেছেন। তাঁদের বিভিন্ন ব্যাখ্যায় এমন পুরুষের উল্লেখ রয়েছে, যিনি খাবারের জন্য অন্যদের সঙ্গে থাকেন, নারীদের প্রতি আগ্রহী নন, নারীদের বিষয়ে অজ্ঞ কিংবা পুরুষত্বহীন। ইকরিমার নামে উদ্ধৃত একটি ব্যাখ্যায় মুখান্নাস বলতে এমন ব্যক্তির কথাও বলা হয়েছে, যার লিঙ্গ উত্থিত হয় না। অর্থাৎ যৌন আচরণ ও শরীরের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করেই ব্যক্তিকে এই বিশেষ শ্রেণিতে স্থাপন করা হয়েছে। একই আলোচনায় তাবারি আয়িশার একটি বর্ণনা এনেছেন: মুহাম্মদের স্ত্রীদের কাছে একজন মুখান্নাস ব্যক্তি প্রবেশ করতেন; তাঁকে যৌন আকাঙ্ক্ষাহীন মনে করা হতো। পরে তিনি একজন নারীর দেহের ভাঁজ সম্পর্কে বিস্তারিত মন্তব্য করলে মুহাম্মদ তাঁর প্রবেশ বন্ধ করার নির্দেশ দেন। একজন ব্যক্তির যৌন আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে পূর্বধারণা পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সামাজিক প্রবেশাধিকারও প্রত্যাহৃত হয়েছে।
ইবনে কাসির একই আয়াতের তাফসিরে প্রাথমিক ব্যাখ্যাকারীদের বর্ণনা এবং আয়িশার হাদিসকে সংযুক্ত করেছেন। তিনি প্রথমে নারীদের প্রতি যৌন আকাঙ্ক্ষাহীন পুরুষদের বিষয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা আলোচনা করেন। এরপর আয়িশার বর্ণনায় এমন এক মুখান্নাস ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যিনি মুহাম্মদের স্ত্রীদের ঘরে যাতায়াত করতেন এবং যাঁকে এই আয়াতের শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত মনে করা হতো। নারীর শারীরিক গঠনের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়ার পর তাঁকে ঘরে প্রবেশ করতে নিষেধ করা হয়। ইবনে কাসিরের উদ্ধৃত বর্ণনায় বলা হয়েছে [9]—
وَقَالَ الْإِمَامُ أَحْمَدُ: حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ، حَدَّثَنَا مَعْمَر، عَنِ الزُّهْرِيِّ، عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الزُّبَيْرِ، عَنْ عَائِشَةَ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، قَالَتْ: كَانَ رَجُلٌ يَدْخُلُ عَلَى أَزْوَاجِ النَّبِيِّ ﷺ مُخَنَّثٌ، وَكَانُوا يَعُدّونه مِنْ غير أولي الإربة، فدخل النبي صلى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمًا وَهُوَ عِنْدَ بَعْضِ نِسَائِهِ، وَهُوَ يَنْعَتُ امْرَأَةً. فَقَالَ: إِنَّهَا إِذَا أَقْبَلَتْ أَقْبَلَتْ بِأَرْبَعٍ، وَإِذَا أَدْبَرَتْ أَدْبَرَتْ بِثَمَانٍ. فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ: “أَلَا أَرَى هَذَا يَعْلَمُ مَا هَاهُنَا؟ لَا يدخلَنَّ عَلَيْكُمْ هَذَا” فَحَجَبُوهُ. وَرَوَاهُ مُسْلِمٌ، وَأَبُو دَاوُدَ، وَالنَّسَائِيُّ مِنْ طَرِيقِ عَبْدِ الرَّزَّاقِ، بِهِ.
বাংলা অনুবাদ: ইমাম আহমদ বলেছেন: আবদুর রাজ্জাক আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি মামার থেকে, তিনি যুহরি থেকে, তিনি উরওয়া ইবনে যুবাইর থেকে, তিনি আয়িশা থেকে বর্ণনা করেছেন। আয়িশা বলেন: একজন মুখান্নাস ব্যক্তি নবীর স্ত্রীদের কাছে যাতায়াত করতেন। তাঁরা তাঁকে এমন পুরুষদের অন্তর্ভুক্ত মনে করতেন, যাঁদের নারীদের প্রতি যৌন আকাঙ্ক্ষা নেই। একদিন নবী তাঁর একজন স্ত্রীর কাছে প্রবেশ করলেন। তখন ওই মুখান্নাস ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং একজন নারীর শারীরিক গঠনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘ওই নারী সামনে থেকে এলে তাঁর শরীরে চারটি ভাঁজ দেখা যায়, আর পেছন ফিরে গেলে আটটি ভাঁজ দেখা যায়।’ তখন নবী বললেন, ‘আমি কি দেখছি না যে, এই ব্যক্তি এসব বিষয় সম্পর্কে জানে? এই ব্যক্তি যেন আর তোমাদের কাছে প্রবেশ না করে।’ এরপর তাঁরা ওই ব্যক্তিকে নিজেদের কাছে প্রবেশ করতে বাধা দিলেন। মুসলিম, আবু দাউদ এবং নাসায়িও আবদুর রাজ্জাকের সূত্রে এই বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন।
কুরতুবির আল-জামি লি-আহকামিল কোরআন গ্রন্থে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় শব্দটির আরও বিস্তৃত ব্যবহার পাওয়া যায়। তিনি নির্বোধ বা নারীদের বিষয়ে অনাগ্রহী পুরুষ, পুরুষত্বহীন ব্যক্তি, খোজা, মুখান্নাস, বৃদ্ধ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর কথা উল্লেখ করেছেন। এই শ্রেণিগুলো এক ধরনের জন্মগত বৈশিষ্ট্য কিংবা একক সামাজিক পরিচয় নির্দেশ করে না। কেউ যৌন আকাঙ্ক্ষাহীন, কেউ শারীরিকভাবে অক্ষম, কেউ নারীসুলভ আচরণের অধিকারী, কেউ বৃদ্ধ কিংবা শিশু—এমন সম্পূর্ণ পৃথক অবস্থার মানুষকে নারীদের প্রতি যৌন আগ্রহ নেই, এই অনুমানের ভিত্তিতে একই বিধানের অধীন করা হয়েছে। কুরতুবি লিখেছেন [10]—
وقيل العنين . وقيل الخصي . وقيل المخنث . وقيل الشيخ الكبير ، والصبي الذي لم يدرك . وهذا الاختلاف كله متقارب المعنى
বাংলা অনুবাদ: কেউ বলেছেন পুরুষত্বহীন ব্যক্তি, কেউ বলেছেন খোজা, কেউ বলেছেন মুখান্নাস, আবার কেউ বলেছেন অতিবৃদ্ধ মানুষ কিংবা এখনো যৌন পরিপক্বতা অর্জন করেনি এমন শিশু। এসব ব্যাখ্যাকে তিনি অর্থের দিক থেকে কাছাকাছি বলে বিবেচনা করেছেন।
কুরতুবিও হীত নামের মুখান্নাস ব্যক্তির ঘটনার সঙ্গে এই আয়াতের সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রথমে হীতকে নারীদের প্রতি অনাগ্রহী মনে করা হলেও একজন নারীর শারীরিক সৌন্দর্য সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য শোনার পর মুহাম্মদ তাঁকে নারীদের কাছ থেকে দূরে রাখার নির্দেশ দেন। তাফসির ও হাদিসের এই সংযোগে ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান নির্ধারণের এক বিশেষ ব্যবস্থা দেখা যায়। নারীদের ঘরে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া বা সেই অনুমতি হারানো নির্ভর করছে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর—সংশ্লিষ্ট মানুষটি কোন ধরনের যৌন আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন বলে মনে করা হচ্ছে এবং তিনি নারীদের দেহ সম্পর্কে কতটুকু জানেন, তার ওপর। একই ব্যক্তি এক পরিস্থিতিতে যৌন আকাঙ্ক্ষাহীন বলে বিবেচিত হয়ে প্রবেশাধিকার পেতে পারেন, আবার অন্য পরিস্থিতিতে সেই অধিকার হারাতে পারেন।
কোরআনের আয়াতটিতে মুখান্নাস বা হিজড়া শব্দ সরাসরি ব্যবহার করা হয়নি। কিন্তু ধ্রুপদী তাফসিরকারীরা এই বিধানের ব্যাখ্যায় মুখান্নাস ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং হীতের ঘটনাকে তার বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে নারীদের সঙ্গে সামাজিক মেলামেশায় পুরুষদের শ্রেণিবিভাগ এবং নারীসুলভ আচরণের অধিকারী ব্যক্তিদের ওপর নিয়ন্ত্রণের একটি ধর্মীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একজন মানুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা, শারীরিক সক্ষমতা কিংবা আচরণকে অন্যরা যেভাবে মূল্যায়ন করছে, তার ভিত্তিতে তাঁর সামাজিক চলাফেরা সীমিত করা ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষত কারও বিরুদ্ধে অন্যের ক্ষতি করার অপরাধ প্রতিষ্ঠিত না করেই তাঁর পরিচয় কিংবা আচরণের কারণে প্রবেশাধিকার ও স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্ক সংকুচিত করা হলে তা লিঙ্গবৈচিত্র্যের মানুষের প্রতি বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
সহিহ হাদিসে হিজড়াদের নির্বাসন
সহীহ বুখারী হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, হিজড়াদেরকে নির্বাসিত করতে হবে। নবী নিজেই তাদের ঘর থেকে বের করে দিতেন। কেন? শুধুমাত্র তারা হিজড়া হয়ে জন্ম নিয়েছে, এই কারণে [11] [12] –
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
অধ্যায়ঃ ৭৫/ কাফের ও ধর্মত্যাগী বিদ্রোহীদের বিবরণ
পরিচ্ছেদঃ ২৮৫২. গুনাহগার ও হিজড়াদের নির্বাসিত করা
৬৩৭৩। মুসলিম ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) … ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লা’নত করেছেন নারীরূপী পুরুষ ও পুরুষরূপী নারীদের উপর এবং বলেছেনঃ তাদেরকে বের করে দাও তোমাদের ঘর হতে এবং তিনি অমুক অমুককে বের করে দিয়েছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী অর্থাৎ বুখারী হাদিসের ব্যাখ্যা গ্রন্থে কী বলা রয়েছে, সেটিও দেখে নিই [13],
بَابٌ نَفْيِ أَهْلِ الْمَعَاصِي وَالْمُخَنَّثِينَ
৩৬১৩. অনুচ্ছেদ: গুনাহগার ও হিজড়াদেরকে নির্বাসিত করা
ব্যাখ্যা: শাসক ও বিচারকের জন্য কবিরা গুণাহে লিপ্ত ও হিজড়াদেরকে নির্বাসনে পাঠানো জায়েয। এটা শুধু সেসকল গুনাহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যার জন্য হদ নেই। কেননা পূর্বে বলা হয়েছে যেসব গুনাহের ‘হদ’ নির্ধারিত রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে শাস্তি পরিবর্তনের কোনো ইখতিয়ার বিচারকের নেই বরং ‘হদ’ প্রয়োগ করা ফরয।
মুখান্নাছ বা হিজড়ার বিশ্লেষণ সবিস্তারে জানার জন্য নাসরুল বারি-৮/৩৯৩ দেখুন!

পাঠক লক্ষ্য করুন, উপরে নসরুল বারী থেকে যেই ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে, সেখানে কবিরা গুণাহে লিপ্ত কথাটির পরে “ও” যুক্ত রয়েছে। এর মানে হচ্ছে, কবিরা গুণাহে লিপ্ত এবং একই সাথে, হিজড়াদের কথা এখানে বলা হয়েছে। যদি “ও” অক্ষরটি না থাকতো, তাহলে অর্থটি হতে পারতো, শুধুমাত্র কবিরা গুণাহে লিপ্ত হিজড়াদের কথা এখানে বোঝানো হচ্ছে। যা অনেক ইসলামিস্টই আজকাল দাবী করে বিষয়টি লুকাবার চেষ্টা করেন। তারা বোঝাবার চেষ্টা করেন, এখানে হিজড়াদের সম্পর্কে নয়, শুধুমাত্র নাকি অপরাধী হিজড়াদের কথা বোঝানো হয়েছে। কিন্তু কথাটি যে সম্পূর্ণ মিথ্যা, তা ঐ “ও” অক্ষরটি দ্বারাই প্রমাণ হয়। সেইসাথে, নবী মুহাম্মদ শুধু যে নির্দেশই দিতেন সেটিই নয়, তিনি নিজেও হিজড়াদের গোত্র ত্যাগে বাধ্য করতেন [14] –
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ২৭/ পোশাক-পরিচ্ছদ
পরিচ্ছেদঃ ৩৫. মহান আল্লাহর বাণীঃ ‘‘যৌন কামনা রহিত পুরুষ’’
৪১০৯। আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে অনুরূপ হাদীস বর্ণিত। এতে আরো রয়েছেঃ ‘‘তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে আল-বায়দা নামক স্থানে পাঠিয়ে দিলেন। এরপর সে (হিজড়া) প্রতি শুক্রবার খাদ্যের জন্য শহরে আসতো।(1)
সহীহ।
(1). ইরওয়াউল গালীল (৬/২০৫)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
আসুন আরো একটি হাদিস পড়ি যেখানে পরিষ্কার যে, হিজড়াদের গৃহ থেকে বহিষ্কার করাই ইসলামের বিধান [15] –
হাদীস সম্ভার
২৪/ বিবাহ ও দাম্পত্য
পরিচ্ছেদঃ পর্দার বিধান
(২৬৬৫) ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খোজা পুরুষ এবং পুরুষসুলভ আচরণ-কারিণী নারীর উপর অভিসম্পাত করেছেন এবং বলেছেন, তোমাদের গৃহ হতে ওদেরকে বের করে দাও। তিনি স্বয়ং এক খোজাকে বহিষ্কার করেছেন এবং উমার (রাঃ) এক হিজড়ে নারীকে গৃহ হতে বহিষ্কার করেছেন।
(আহমাদ ২০০৬, ২১২৩, বুখারী ৫৮৮৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
একইসাথে, নবী মুহাম্মদ হিজড়াদের ঘৃণা করতেন, যার প্রমাণ পাওয়া যায় আরো কিছু সহিহ হাদিস থেকে [16] [17] [18] –
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
অধ্যায়ঃ ৫১/ মাগাযী (যুদ্ধাভিযান)
পরিচ্ছেদঃ ২২২০. তায়েফের যুদ্ধ। মুসা ইবন উকবা (রাঃ) এর মতে এ যুদ্ধ অষ্টম হিজরীর শাওয়াল মাসে সংগটিত হয়েছে
৩৯৮৮। হুমাইদী (রহঃ) … উম্মে সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, আমার কাছে এক হিজড়া ব্যাক্তি বসা ছিল, এমন সময়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। আমি শুনলাম, সে (হিজড়া ব্যাক্তি) আবদুল্লাহ ইবনু আবূ উমাইয়া (রাঃ)-কে বলছে, হে আবদুল্লাহ! কি বলো, আগামীকাল যদি আল্লাহ্ তোমাদেরকে তায়েফের উপর বিজয় দান করেন তা হলে গায়লানের কন্যাকে অবশ্যই তুমি লুফে নেবে। কেননা সে (এতই স্থুলদেহ ও কোমল যে), সামনের দিকে আসার সময়ে তার পিঠে চারটি ভাঁজ পড়ে আবার পিঠ ফিরালে সেখানে আটটি ভাঁজ পড়ে। (উম্মে সালামা (রাঃ) বলেন) তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এদেরকে (হিজড়াদেরকে) তোমাদের কাছে প্রবেশ করতে দিও না। ইবনু উয়াইনা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, ইবনু জুরায়জ (রাঃ) বলেছেন, হিজড়া লোকটির নাম ছিলো হীত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উম্মু সালামাহ (রাঃ)
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
অধ্যায়ঃ ৫৪/ বিয়ে-শাদী
পরিচ্ছেদঃ ২৫৩৭. যে পুরুষ মহিলার মত সাজ-গোজ করে, তার সাথে কোন নারীর চলাফেরা নিষেধ
৪৮৫৫। উসমান ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … উম্মে সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে থাকাকালে সেখানে একজন মেয়েলী ভাবাপন্ন পুরুষ ছিল। ঐ মেয়েলী পুরুষটি উম্মে সালামার ভাই আবদুল্লাহ ইবনু আবূ উমাইয়াকে বলল, যদি আগামীকাল আপনাদেরকে আল্লাহ তায়েফ বিজয় দান করেন, তবে আমি আপনাকে গায়লানের মেয়েকে গ্রহন করারা পরামর্শ দিচ্ছি। কেননা, সে এত মেদবহুল যে, সে সম্মুখ দিকে আগমন করলে তার পেটের চামড়ায় চার ভাঁজ পড়ে আর পিছু ফিরে যাওয়ার সময় আট ভাঁজ পড়ে। একথা শোনার পর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (এ মেয়েলী পুরুষ হিজড়া) সে যেন কখনো তোমাদের কাছে আর না আসে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উম্মু সুলায়ম (রাঃ)
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
অধ্যায়ঃ ৩৬/ আদব
পরিচ্ছেদঃ ৫৯. নপুংসকদের হুকুম সম্পর্কে।
৪৮৪৬. আবূ বকর ইবন আবূ শায়বা (রহঃ) …. উম্মু সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে এমন সময় প্রবেশ করেন, যখন আমর কাছে একজন নপুংসক (হিজড়া) উপস্থিত ছিল। আর সে তার ভাইকে বলছিল। আগামীকাল মহান আল্লাহ্ যদি তায়েফের উপর (মুসলমানদের) বিজয় দান করেন, তবে আমি তোমাকে এমন এক স্ত্রীলোকের খবর দেব, যার আসার সময় তার পেটে চারটি ভাঁজ দেখা যায়; আর যখন সে চলে যায় তখন তার পেটে আটটি ভাঁজ দেখা যায়। একথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ঘর থেকে বের করে দেয়ার নির্দেশ দেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উম্মু সালামাহ (রাঃ)
আসুন আর একটি দলিল দেখে নিই, যেখানে নবী মুহাম্মদের হিজড়াদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ পরিষ্কার ভাবে বোঝা যায় [19] –
৩৯৮৮/৩৩০. হুমাইদী র. উম্মুল মু’মিনীন উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত যে, আমার কাছে এক হিজড়া ব্যক্তি বসা ছিল, এমন সময়ে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। আমি
শুনলাম, সে হিজড়া ব্যক্তি আমার ভাই আবদুল্লাহ্ ইবনে আবু উমাইয়া রা-কে বলছে, হে আবদুল্লাহ্! কি বল, আগামীকাল যদি আল্লাহ্ তোমাদেরকে তায়েফের উপর বিজয় দান করেন তা হলে (বাদিয়া নাম্মী) গায়লানের কন্যাকে অবশ্যই তুমি লুফে নেবে। কেননা সে (এতই স্কুলদেহ ও কোমল যে), সামনের দিকে আসার সময়ে তার
পিঠে চারটি ভাঁজ পড়ে আবার পিঠ ফিরালে সেখানে আটটি ভাঁজ পড়ে। [উম্মে সালামা রা. বলেন। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: এদেরকে (হিজড়াদেরকে) তোমাদের কাছে প্রবেশ করতে দিও না। ইবনে উয়াইনা রা, বর্ণনা করেন যে, ইবনে জুরাইজ র. বলেছেন, হিজড়া লোকটির নাম ছিল হাইত। মাহমুদ
)ইবনে গায়লান) আবু উসামা হিশাম সূত্রে এই হাদীসটি বর্ণনা করেন। (অর্থাৎ, হিশামের পুর্বোক্ত রেওয়ায়াত عن أبيه الغ -এর ন্যায়।) তাতে এতটুকু বৃদ্ধি করেছেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ সময় তায়েফবাসীদেরকে অবরোধ করেছিলেন।

মুখান্নাসদের নির্বাসন: ধ্রুপদী ইসলামি আইনশাস্ত্রে সামাজিক বহিষ্কার ও শাস্তির বিধান
সহিহ বুখারি ও আবু দাউদের বর্ণনাগুলোতে নারীর মতো আচরণকারী পুরুষদের অভিশাপ দেওয়া, ঘর থেকে বের করে দেওয়া এবং মদিনা থেকে নির্বাসনের যে বিবরণ পাওয়া যায়, সেগুলো পরবর্তী যুগের ইসলামি আইনশাস্ত্রেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান লাভ করেছে। ধ্রুপদী ফকিহ ও হাদিস ব্যাখ্যাকারীরা এসব ঘটনাকে কেবল মুহাম্মদের ব্যক্তিগত আচরণের বিবরণ হিসেবে উল্লেখ করেননি; বরং নির্বাসন, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আইনগত ভিত্তি হিসেবেও আলোচনা করেছেন। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, এসব আলোচনায় ব্যবহৃত আরবি মুখান্নাস (مخنث) শব্দটি নারীসুলভ আচরণ, কথাবার্তা বা চলাফেরার অধিকারী পুরুষকে নির্দেশ করে। এটি জন্মগত আন্তঃলিঙ্গ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তির ফিকহি পরিচয় খুনসা (خنثى)-এর সমার্থক নয়। ফলে এই বিধানগুলোর লক্ষ্য শুধু জন্মগত যৌনাঙ্গগত বৈচিত্র্য ছিল না; পুরুষের প্রচলিত সামাজিক আচরণ ও পোশাকের মানদণ্ড অতিক্রমকারী ব্যক্তিরাও এর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর বিখ্যাত ফাতহুল বারী শরহে সহিহ বুখারি গ্রন্থের দ্বাদশ খণ্ডে বুখারির باب نفي أهل المعاصي والمخنثين অর্থাৎ ‘পাপাচারী ও মুখান্নাসদের নির্বাসন’ অধ্যায় ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর আলোচনা অনুযায়ী, বুখারি এই অধ্যায়ে এমন একটি শাস্তির নজির উপস্থাপন করেছেন, যা যুদ্ধরত শত্রু কিংবা গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইবনে হাজার নির্বাসনের ঘটনা থেকে আইনগত সিদ্ধান্তের আলোচনায় এমন ব্যক্তির কথাও এনেছেন, যিনি শুধু নারীদের অনুকরণ করেন। সেখানে তিনি একটি ফিকহি ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন, যার সিদ্ধান্ত হচ্ছে—কেবল নারীদের অনুকরণ করলেও নির্বাসনের ব্যবস্থা প্রযোজ্য হতে পারে। অর্থাৎ এই আলোচনায় কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যা, চুরি, শারীরিক আক্রমণ কিংবা অন্যের অধিকার লঙ্ঘনের অপরাধ প্রতিষ্ঠিত হওয়া নির্বাসনের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি। ইবনে হাজার বুখারির অধ্যায়ের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন [20]—
كَأَنَّهُ أَرَادَ الرَّدَّ عَلَى مَنْ أَنْكَرَ النَّفْيَ عَلَى غَيْرِ الْمُحَارِبِ فَبَيَّنَ أَنَّهُ ثَابِتٌ مِنْ فِعْلِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَنْ بَعْدَهُ
বাংলা অনুবাদ: মনে হয়, তিনি তাঁদের বক্তব্যের জবাব দিতে চেয়েছেন, যাঁরা যুদ্ধরত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কাউকে নির্বাসনের বিরোধিতা করেন। তিনি দেখিয়েছেন, মুহাম্মদ এবং তাঁর পরবর্তী ব্যক্তিদের কার্যকলাপেও এই নির্বাসনের নজির প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।
নির্বাসনের এই ব্যাখ্যায় বিধানকে ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংঘটিত কোনো নির্দিষ্ট সহিংস অপরাধের শাস্তি থেকে বিস্তৃত করে সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া হয়েছে। একজন মানুষ কীভাবে হাঁটবেন, কথা বলবেন, কোন ধরনের পোশাক পরবেন কিংবা তাঁর আচরণ সমাজের প্রচলিত পুরুষত্বের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এসব বিষয়ও তাঁর বসবাসের অধিকারকে প্রভাবিত করার কারণ হয়ে উঠতে পারে। কোনো মানুষের ব্যক্তিগত আচরণ অন্যের ক্ষতি না করলেও সেই আচরণ ধর্মীয় বিধানে অননুমোদিত বিবেচিত হলে নির্বাসনের মতো গুরুতর শাস্তির প্রশ্ন উঠতে পারে। এর ফলে একজন ব্যক্তির নিজ পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক, জীবিকা এবং পরিচিত পরিবেশে বসবাসের অধিকার ধর্মীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত সামাজিক মানদণ্ডের অধীন হয়ে পড়ে।
মুহাম্মদের নির্দেশে নির্বাসিত মুখান্নাস ব্যক্তির ঘটনাটি আরও বিশদভাবে আলোচনা করেছেন মুহাম্মদ ইবনে আলী আশ-শাওকানি। তাঁর নাইলুল আওতার গ্রন্থে আয়িশার বর্ণনার ভিত্তিতে এমন এক ব্যক্তির উল্লেখ রয়েছে, যিনি প্রথমে মুহাম্মদের স্ত্রীদের কাছে আসা-যাওয়া করতেন। তাঁকে নারীদের প্রতি যৌন আকাঙ্ক্ষাহীন ব্যক্তি বলে বিবেচনা করা হতো। পরে তিনি একজন নারীর শারীরিক গঠনের বিস্তারিত বর্ণনা করলে তাঁর প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। শাওকানি ব্যাখ্যা করেছেন, ওই ব্যক্তির নির্বাসনের পেছনে তিনটি বিষয় বিবেচিত হয়েছিল: তাঁকে যৌন আকাঙ্ক্ষাহীন মনে করার ধারণা পরিবর্তিত হওয়া, পুরুষদের সামনে নারীর শারীরিক সৌন্দর্য ও গোপন অঙ্গের বর্ণনা দেওয়া এবং নারীদের শরীর সম্পর্কে তাঁর বিশেষ জ্ঞান প্রকাশ পাওয়া। এই ঘটনার পরিণতি ছিল কেবল একটি বাড়িতে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা নয়; তাঁকে জনবসতি থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল। এমনকি জীবিকা ও খাদ্যের প্রয়োজনে লোকালয়ে আসার জন্যও বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়েছিল। শাওকানি এই ঘটনা থেকে দেশান্তরের শাস্তির বৈধতা সম্পর্কে লিখেছেন [21]—
وَفِي ذَلِكَ دَلِيلُ جَوَازِ الْعُقُوبَةِ بِالْإِخْرَاجِ مِنْ الْوَطَنِ لِمَا يُخَافُ مِنْ الْفَسَادِ وَالْفِسْقِ
বাংলা অনুবাদ: এর মধ্যে প্রমাণ রয়েছে যে, অনাচার ও পাপাচারের আশঙ্কায় কাউকে তার নিজ দেশ বা বাসস্থান থেকে বের করে দেওয়ার মাধ্যমে শাস্তি প্রদান করা বৈধ।
শাওকানির বক্তব্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, নির্বাসনের ভিত্তি হিসেবে কেবল সংঘটিত অপরাধ নয়, ভবিষ্যতে অনাচার বা পাপাচারের আশঙ্কাকেও গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি বা আচরণকে সম্ভাব্য সামাজিক বিপদের কারণ মনে করলে তাঁকে নিজের বসবাসের জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়ার যুক্তি এই আইনগত ব্যাখ্যায় বিদ্যমান। আয়িশার বর্ণনায় নির্বাসিত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ে খাদ্যের জন্য লোকালয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। এটি দেখায়, নির্বাসনের ফলে ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবিকা ও খাদ্য সংগ্রহের ওপর বাস্তব প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছিল। এমন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় ক্ষমতার সিদ্ধান্তের ফলে কোনো ব্যক্তি নিজের সামাজিক অস্তিত্ব বজায় রাখার মৌলিক উপকরণ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন।
ইবনে তাইমিয়ার মাজমুউল ফাতাওয়া গ্রন্থেও নির্বাসনকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে তিনি উমরের শাসনামলে বিভিন্ন ব্যক্তিকে নির্বাসনের নজির এবং মুহাম্মদের আমলে ব্যভিচার ও মুখান্নাস ব্যক্তিকে নির্বাসনের বিবরণ পাশাপাশি এনেছেন। তাঁর আলোচনায় নির্বাসনকে সাময়িকভাবে নিজ বাসস্থান থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার শাস্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ইবনে তাইমিয়া লিখেছেন [22]—
وَقَدْ مَضَتْ سُنَّةُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالنَّفْيِ فِي الزِّنَا وَنَفْيِ الْمُخَنَّثِ
বাংলা অনুবাদ: ব্যভিচারের ক্ষেত্রে নির্বাসন এবং মুখান্নাস ব্যক্তিকে নির্বাসনের ব্যাপারে আল্লাহর রাসুলের সুন্নাহ প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।
ইবনে তাইমিয়ার এই বক্তব্য থেকে নির্বাসনের ঘটনাটি পরবর্তী ইসলামি আইনচিন্তায় কীভাবে গৃহীত হয়েছিল, তা বোঝা যায়। এখানে মুখান্নাস ব্যক্তিকে নির্বাসন দেওয়ার ঘটনাকে ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, বরং মুহাম্মদের সুন্নাহর নজির হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধরনের আইনগত গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার সামাজিক প্রভাব কেবল সেই ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরবর্তী আইনজ্ঞরা ঘটনাটিকে বৈধ শাস্তির দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহার করলে তা নতুন সময়েও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও বহিষ্কারের ধর্মীয় ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
মুখান্নাস ব্যক্তিদের আচরণের প্রকৃতি সম্পর্কে ইমাম নববির ব্যাখ্যাতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। তিনি শরহে সহিহ মুসলিম গ্রন্থে মুখান্নাসদের দুই শ্রেণিতে আলোচনা করেছেন। প্রথম শ্রেণির ব্যক্তিদের নারীসুলভ আচরণ জন্মগতভাবে উপস্থিত থাকে; তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে নারীদের আচরণ অনুকরণ করেন না। দ্বিতীয় শ্রেণির ব্যক্তিরা ইচ্ছাকৃতভাবে নারীদের কথাবার্তা, চলাফেরা, পোশাক ও আচার-আচরণ অনুকরণ করেন। নববির মতে, প্রথম শ্রেণির ব্যক্তিরা তাঁদের জন্মগত বৈশিষ্ট্যের জন্য অপরাধী নন। তিনি লিখেছেন [23]—
بَلْ هُوَ خِلْقَةٌ خَلَقَهُ اللَّهُ عَلَيْهَا فَهَذَا لَا ذَمَّ عَلَيْهِ، وَلَا عَتَبَ، وَلَا إِثْمَ وَلَا عُقُوبَةَ؛ لِأَنَّهُ مَعْذُورٌ لَا صُنْعَ لَهُ فِي ذَلِكَ
বাংলা অনুবাদ: বরং তিনি এমন বৈশিষ্ট্য নিয়েই জন্মেছেন, যা আল্লাহ তাঁর মধ্যে সৃষ্টি করেছেন। এ কারণে তাঁর ওপর নিন্দা, তিরস্কার, পাপ কিংবা শাস্তি প্রযোজ্য নয়; কারণ এই বৈশিষ্ট্য সৃষ্টিতে তাঁর কোনো ভূমিকা নেই।
নববির এই শ্রেণিবিভাগ থেকে বোঝা যায়, ধ্রুপদী ইসলামি ব্যাখ্যায় নারীসুলভ আচরণকে জন্মগত বৈশিষ্ট্য হিসেবেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এর ফলে ব্যক্তি নিজের পোশাক, আচরণ ও সামাজিক পরিচয় স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করার অধিকার লাভ করেননি। বরং তাঁর আচরণ জন্মগত নাকি ইচ্ছাকৃত, সে সিদ্ধান্তের ওপর ধর্মীয় নিন্দা এবং শাস্তির প্রশ্ন নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। নববি নিজেই ইচ্ছাকৃতভাবে নারীদের আচরণ ও পোশাক অনুকরণকারী পুরুষদের সেই শ্রেণিতে রেখেছেন, যাদের বিরুদ্ধে সহিহ হাদিসে অভিশাপের কথা এসেছে। মানুষের ব্যক্তিগত পোশাক, কথাবার্তা ও অঙ্গভঙ্গিকে ধর্মীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করার ব্যবস্থা এভাবেই অক্ষত থাকে। জন্মগত বৈশিষ্ট্যের জন্য কাউকে নিন্দা না করার অবস্থান ব্যক্তির নিজের লিঙ্গপ্রকাশ নির্ধারণের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার সমতুল্য নয়।
জালালুদ্দিন সুয়ূতির আল-আশবাহ ওয়ান নাজায়ির গ্রন্থে। তিনি ‘তাজির’ বা বিচারকের বিবেচনাধীন শাস্তি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে এমন কিছু পরিস্থিতির উল্লেখ করেছেন, যেখানে কোনো কাজ নিজে পাপ হিসেবে গণ্য না হলেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এই আলোচনায় তিনি ইমাম শাফেয়ির মত উদ্ধৃত করে মুখান্নাস ব্যক্তির নির্বাসনের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন। সুয়ূতির বক্তব্য অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃত না হলে সংশ্লিষ্ট আচরণে পাপ না থাকা সত্ত্বেও জনস্বার্থের যুক্তিতে নির্বাসনের বিধান বিবেচিত হতে পারে। তিনি লিখেছেন [24]—
وَمِنْهَا نَفْيُ الْمُخَنَّثِ نَصَّ عَلَيْهِ الشَّافِعِيُّ مَعَ أَنَّهُ لَا مَعْصِيَةَ فِيهِ إِذَا لَمْ يَقْصِدْهُ إِنَّمَا فَعَلَ لِلْمَصْلَحَةِ
বাংলা অনুবাদ: এর একটি হচ্ছে মুখান্নাস ব্যক্তিকে নির্বাসন দেওয়া। শাফেয়ি এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন। যদিও তা ইচ্ছাকৃত না হলে এতে কোনো পাপ নেই, তবুও জনস্বার্থের জন্য এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
সুয়ূতির এই বক্তব্যটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে এমন একজন ব্যক্তিকে নির্বাসনের প্রশ্ন আলোচিত হয়েছে, যার সংশ্লিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা আচরণ ইচ্ছাকৃত নয় এবং যার বিরুদ্ধে সেই কারণে কোনো পাপও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তা সত্ত্বেও তথাকথিত জনস্বার্থের নামে তাঁকে নির্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যক্তির অপরাধী হওয়া এবং তাঁকে শাস্তি দেওয়ার মধ্যে স্বাভাবিক নৈতিক সম্পর্ক এখানে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কোনো ব্যক্তি নিজের জন্মগত বা অনিচ্ছাকৃত বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী না হয়েও সমাজের প্রচলিত মানদণ্ডের সঙ্গে তাঁর অসামঞ্জস্যের কারণে বসবাসের অধিকার হারাতে পারেন। নববির ব্যাখ্যায় জন্মগত বৈশিষ্ট্যের জন্য শাস্তি অস্বীকার করা হলেও সুয়ূতির উদ্ধৃত ফিকহি অবস্থানে পাপের অনুপস্থিতি নির্বাসনকে অসম্ভব করে তুলছে না। এই দুই বক্তব্য ধ্রুপদী ইসলামি আইনশাস্ত্রের মধ্যেই ব্যক্তিগত দায় এবং জনস্বার্থের নামে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুতর টানাপোড়েন প্রকাশ করে।
ইবনে হাজারের নির্বাসনসংক্রান্ত ব্যাখ্যা, শাওকানির দেশান্তরের শাস্তি বৈধ ঘোষণা, ইবনে তাইমিয়ার সুন্নাহ হিসেবে নির্বাসনের নজির উল্লেখ এবং সুয়ূতির পাপ না থাকা সত্ত্বেও মুখান্নাস ব্যক্তিকে নির্বাসনের ফিকহি আলোচনা—এসব দলিল একত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতা উন্মোচন করে। ইসলামি আইনশাস্ত্রে প্রচলিত লিঙ্গগত আচরণের বাইরে অবস্থানকারী মানুষের ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রয়োগের একাধিক ব্যবস্থা বিকশিত হয়েছে। ঘর থেকে বের করে দেওয়া, নারীসমাজে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা, অভিশাপ দেওয়া এবং নিজ বসবাসের এলাকা থেকে নির্বাসন—এসব ব্যবস্থার প্রত্যেকটির সরাসরি প্রভাব ব্যক্তির সামাজিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার ওপর পড়ে। একজন মানুষকে নিজের জীবিকা, পরিবার ও পরিচিত সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার মতো গুরুতর ব্যবস্থা তাঁর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ প্রমাণ ছাড়াও অনুমোদিত হতে পারে—এমন আইনগত ধারণা মানুষের মৌলিক মর্যাদা ও অধিকারকে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের বিবেচনার অধীন করে ফেলে।
নামাজি হিজড়াদের হত্যা করা যাবে না
সহিহ হাদিসে এটিও পরিষ্কারভাবে বর্ণিত রয়েছে, নবী মুহাম্মদ হিজড়াদের আসলে হত্যাই করতেন, শুধুমাত্র মুসলিম নামাজি হিজড়ারা নামাজ পড়ার কারণে তাদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ তারা আসলে হত্যারই যোগ্য, শুধুমাত্র নামাজ আদায়কারীদের আল্লাহ হত্যা করতে নিষেধ করেছেন বলে নবী তাদের হত্যা করেন নি। সেটি না হলে নবী এই হাদিসে খুব পরিষ্কারভাবেই বলে দিতেন যে, “হিজড়া হলেই কাউকে তোমরা হত্যা করো না।” নামাজ পড়ে নাকি পড়ে না, হিজড়াদের হত্যা করার অনুমতি চাওয়ায় নামাজ আদায়ের প্রসঙ্গ তখনই আসে, যখন হিজড়া হওয়ার কারণে আসলে তাদের হত্যা করাই নবীর ইচ্ছে ছিল, শুধুমাত্র নামাজ পড়ার কারণে এই হত্যাটি করা যাবে না। বাদবাকি যারা নামাজ পড়ে না, তাদের ক্ষেত্রে কী বিধান সেটি একটি প্রশ্ন হিসেবে থেকে যায় [25] –
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ৩৬/ শিষ্টাচার
পরিচ্ছেদঃ ৬১. হিজড়া সম্পর্কে বিধান
৪৯২৮। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। কোনো একদিন এক হিজড়াকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আনা হলো। তার হাত-পা মেহেদী দ্বারা রাঙ্গানো ছিলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এর এ অবস্থা কেন? বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! সে নারীর বেশ ধরেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আন-নকী নামক স্থানে নির্বাসন দেয়ার নির্দেশ দিলেন। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি তাকে হত্যা করবো না? তিনি বললেনঃ সালাত আদায়কারীকে হত্যা করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। আবূ উসামাহ (রহঃ) বলেন, আন-নাফী‘ হলো মদীনার প্রান্তবর্তী একটি জনপদ, এটা বাকী নয়।(1)
সহীহ।
(1). দারাকুতনী।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সরাসরি বই থেকেও দেখে নিই [26] –
অনুচ্ছেদ-৬১: হিজড়া সম্পর্কে বিধান
٤٩٢٨ حَدَّثَنَا هَارُونُ بْنُ عَبْدِ اللهِ، وَمُحَمَّدُ بْنُ الْعَلَاءِ، أَنْ أَبَا أَسَامَةَ، أَخْبَرَهُمْ عَنْ مُفَضْلِ بْنِ يُونُسَ، عَنِ الأَوْزَاعِي، عَنْ أَبِي يَسَارِ الْقُرَشِي، عَنْ أَبِي هَاشِمٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةً، أن النبي الله أتِي بِمُحَتْ قَدْ خَضَبَ يَدَيْهِ وَرِحْلِيْهِ بِالْحِنَّاءِ فَقَالَ النَّبِيُّ ” مَا بَالُ هَذَا ” . فَقِيلَ يَا رَسُولَ اللهِ يَتَشَبَّهُ بِالنِّسَاءِ . فَأَمَرَ بِهِ فَفِي إِلَى التَّقِيعِ فَقَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلا تَقْتُلُهُ فَقَالَ ” إِنِّي نُهِيتُ عَنْ قَتْلِ الْمُصَلِّينَ ” . قَالَ أَبُو أَسَامَةَ وَالنَّقِيعُ نَاحِيَةٌ عَنِ الْمَدِينَةِ وَلَيْسَ بِالْبَقِيعِ .
صحيح
৪৯২৮। আবু হুরাইরাহ (রা) সূত্রে বর্ণিত। কোন একদিন এক হিজড়াকে নাবী -এর নিকট আনা হলো। তার হাত-পা মেহেদী দ্বারা রাঙানো ছিল। রাসূলুল্লাহ বললেন এর এ অবস্থা কেনো? বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! সে নারীর বেশ ধরেছে। রাসূলুল্লাহ তাকে আন-নকী’ নামক স্থানে নির্বাসন দেয়ার নির্দেশ দিলেন। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি তাকে হত্যা করবো না? তিনি বললেন, সলাত আদায়কারীদের হত্যা করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। আবূ উসামাহ (র) বলেন, আন-নাফী’ হলো মাদীনাহর প্রান্তবর্তী একটি জনপদ, এটা বাকী’ নয়। ১৯২৬
সহীহ।

এই হাদিসটি আরো বেশ কয়েকজায়গাতেই পাওয়া যায় [27] –
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
অধ্যায়ঃ পর্ব-২২ঃ পোশাক-পরিচ্ছদ
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ – চুল আঁচড়ানো
৪৪৮১-(৬৩) আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এক হিজড়াকে আনা হলো, সে তার হাতে এবং পায়ে মেহেদী লাগিয়ে রেখেছিল। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এটার এ অবস্থা কেন? সাহাবীগণ বললেনঃ সে নারীদের বেশ ধারণ করেছে। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে শহর হতে বের করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে শহরের বাইরে নাক্বী‘ নামক স্থানে নির্বাসিত করা হলো। অতঃপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রসূল! আমরা কি তাকে কতল করে দেব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সলাত আদায়কারী ব্যক্তিদেরকে কতল করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। (আবূ দাঊদ)(1)
(1) সহীহ : আবূ দাঊদ ৪৯২৮, সহীহুল জামি‘ ২৫০৬, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ২৩৭৯, শু‘আবুল ঈমান ৪৬০৬, দারাকুত্বনী ৯, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ৫০৫৮, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১৭৪৪২, আস্ সুনানুস্ সুগরা ৫৯৭।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
হিজড়াদের স্বভাবগত বিষয়াদি
হিজড়া মানুষরা স্বভাবগতভাবেই নারীর পোষাক পড়তে এবং সাজসজ্জা করতে পছন্দ করে। এটি অনেক হিজড়ার মধ্যেই খুবই স্বাভাবিক ইচ্ছা। একজন মানুষের স্বাধীনতা থাকা উচিৎ, উনি যেভাবে ইচ্ছা যেভাবে পোষাক পড়বেন এবং সাজসজ্জা করবেন। কিন্তু ইসলাম খুব কঠিনভাবে এই কাজে নিষেধাজ্ঞা দেন। নবী মুহাম্মদ পুরুষ হিজড়াদের এবং নারীর বেশ ধারী পুরুষদের লানত করেছেন। অর্থাৎ অভিশাপ দিয়েছেন [28] [29] –
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৭৭/ পোশাক
পরিচ্ছেদঃ ৭৭/৬১. পুরুষের নারীর বেশ ধারণ এবং নারীর পুরুষের বেশ ধারণ প্রসঙ্গে।
৫৮৮৫. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ সব পুরুষকে লা’নত করেছেন যারা নারীর বেশ ধরে এবং ঐসব নারীকে যারা পুরুষের বেশ ধরে। (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৪৫৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৩৫৩)
‘আমরও এরকমই বর্ণনা করেছেন। আমাদের কাছে শু‘য়বা এ সংবাদ দিয়েছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৭৭/ পোশাক
পরিচ্ছেদঃ ৭৭/৬২. নারীর বেশধারী পুরুষদের ঘর থেকে বের করে দেয়া প্রসঙ্গে।
৫৮৮৬. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষ হিজড়াদের উপর এবং পুরুষের বেশধারী মহিলাদের উপর লা’নত করেছেন। তিনি বলেছেনঃ ওদেরকে ঘর থেকে বের করে দাও। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেছেনঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অমুককে বের করেছেন এবং ‘উমার (রাঃ) অমুককে বের করে দিয়েছেন। (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৪৫৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৩৫৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
এমনকি, পরচুলা পড়া মানুষকেও নবী লানত করেছেন [30] –
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৭৭/ পোশাক
পরিচ্ছেদঃ ৭৭/৮৩. পরচুলা লাগানো প্রসঙ্গে।
৫৯৩৪. ‘আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। এক আনসারী নারী বিয়ে করে। এরপর সে রোগে আক্রান্ত হয়। ফলে তার সব চুল পড়ে যায়। লোকজন তাকে পরচুলা লাগিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। আর তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। তিনি বললেনঃ আল্লাহ লা‘নত করেছেন ঐসব নারীকে যারা নিজেরা পরচুলা লাগায় এবং যারা অন্যদেরকে তা লাগিয়ে দেয়। (৫২০৫) (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৫০১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৩৯৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
ধর্মীয় ফতোয়ায় সামাজিক বর্জন, কর্মসংস্থানে নিষেধাজ্ঞা ও লিঙ্গবৈচিত্র্যের মানুষের প্রতি বৈষম্য
নবী মুহাম্মদের সময়কার মুখান্নাস ব্যক্তিদের ঘর থেকে বের করে দেওয়া, অভিশাপ দেওয়া এবং নির্বাসিত করার ঘটনাগুলো পরবর্তী যুগের ধর্মীয় বিধান ও ফতোয়াতেও প্রভাব বিস্তার করেছে। আধুনিক ইসলামি ফতোয়াগুলোতে নারীর মতো পোশাক পরা, চলাফেরা করা কিংবা প্রচলিত পুরুষসুলভ আচরণ অনুসরণ না করা ব্যক্তিদের সম্পর্কে শুধু ধর্মীয় নিন্দা প্রকাশ করা হয়নি; তাঁদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং কর্মসংস্থান নিয়েও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, কয়েকটি ফতোয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধ সংঘটনের প্রমাণ উপস্থাপন না করেই তাঁদের সামাজিকভাবে বর্জন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে ধর্মীয়ভাবে অননুমোদিত লিঙ্গপ্রকাশের অভিযোগ একজন মানুষের জীবিকা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অন্য মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার অধিকারকে প্রভাবিত করার ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
২০০৬ সালের ২ জানুয়ারি প্রকাশিত ৭০৪৭৪ নম্বর ফতোয়াটি এ বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছিলেন, প্রকাশ্যে নারীসুলভ আচরণকারী পুরুষদের সঙ্গে সামাজিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখা জায়েজ কি না। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, তাঁদের শাস্তি সম্পর্কে তাঁর প্রশ্ন নয়; তিনি জানতে চান, তাঁদের দিয়ে রান্না বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করানো যাবে কি না, এমনকি তাঁদের নারীদের সঙ্গে মেলামেশা করতে না দিলেও। পাশাপাশি তিনি জানতে চান, তাঁরা কোনো রেস্তোরাঁ পরিচালনা করলে সেখান থেকে খাবার কেনা অথবা কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে তাঁদের রান্না করা খাবার গ্রহণ করার বিধান কী। ফতোয়ার উত্তরে প্রথমেই স্বেচ্ছায় নারীর পোশাক ও চলাফেরা অনুকরণকারী এবং নির্দিষ্ট সমকামী যৌন আচরণে আগ্রহী বলে বর্ণিত পুরুষদের অপরাধী ও অভিশপ্ত বলা হয়েছে। এরপর তাঁদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বর্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উত্তরদাতা লিখেছেন [31]—
ويجب على المسلمين هجرهم والإنكار عليهم فلا يقصد المكان الذي هم فيه ولا يستأجرون في العمل في البيوت والمطاعم ومحلات الحلاقة ونحوها من الأماكن
বাংলা অনুবাদ: মুসলিমদের তাদের বর্জন করা এবং তাদের কাজের প্রতিবাদ করা আবশ্যক। তারা যেখানে থাকে সেখানে যাওয়া যাবে না এবং বাড়ি, রেস্তোরাঁ, নাপিতের দোকান ও অনুরূপ জায়গায় তাদের কাজে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।
ফতোয়ার বাকি অংশে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুরুষ কিংবা নারীদের সঙ্গে মেলামেশার অনুমতি না দেওয়া এবং কোথাও তাঁদের উপস্থিতি দেখা গেলে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া ও যথাসম্ভব তাঁদের আচরণের প্রতিবাদ করার নির্দেশও রয়েছে। এখানে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা ব্যক্তির পোশাক বা আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তাঁর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্তিত্বের ওপর সরাসরি প্রয়োগ করা হয়েছে। রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রেস্তোরাঁয় কাজ কিংবা নাপিতের দোকানে কাজ করা—এসব পেশায় দক্ষতা, সততা ও দায়িত্ব পালনের যোগ্যতাই কর্মসংস্থানের যুক্তিসঙ্গত মানদণ্ড। কিন্তু ফতোয়াটিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির লিঙ্গপ্রকাশ ও তাঁর সম্পর্কে আরোপিত যৌন আচরণের ধারণাকে চাকরি না দেওয়ার কারণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। প্রশ্নকারী এমনকি নারীদের সঙ্গে মেলামেশা ছাড়াই কাজ দেওয়ার পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছিলেন। সেই ক্ষেত্রেও কাজ দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞাটি শুধু কোনো নির্দিষ্ট কর্মপরিবেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বর্জনই এর প্রত্যক্ষ ফলাফল।
ফতোয়ায় নারীসুলভ পোশাক ও আচরণের সঙ্গে নির্দিষ্ট যৌন আচরণের আকাঙ্ক্ষাকে একই শ্রেণির মানুষের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ একজন মানুষের পোশাক, কণ্ঠস্বর, চলাফেরা কিংবা অঙ্গভঙ্গি থেকে তাঁর যৌন আচরণ বা যৌন আগ্রহ সম্পর্কে এমন সিদ্ধান্ত যৌক্তিকভাবে অনুসরণ করে না। নারীসুলভ আচরণকারী প্রত্যেক পুরুষ একই ধরনের যৌন আচরণে আগ্রহী—এমন ধারণার কোনো প্রমাণ এখানে উপস্থাপিত হয়নি। এই অপ্রমাণিত শ্রেণিবিন্যাসের ওপর ভিত্তি করেই তাঁদের ‘অপরাধী’ ও ‘অভিশপ্ত’ ঘোষণা করে কর্মসংস্থান ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে দূরে রাখার নির্দেশ এসেছে। এর ফলে ধর্মীয়ভাবে নির্ধারিত লিঙ্গগত আচরণ অনুসরণ না করা একজন মানুষ তাঁর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই সমাজের চোখে সন্দেহভাজন এবং বর্জনীয় ব্যক্তিতে পরিণত হতে পারেন।
২০০৫ সালের ১৩ এপ্রিল প্রকাশিত ৬১০১৯ নম্বর ফতোয়াতেও একই ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়। সেখানে প্রশ্নকারী ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ বলতে কাদের বোঝানো হয়, জন্মগতভাবে পুরুষ ও নারীর উভয় ধরনের যৌনাঙ্গ থাকলে কী বিধান এবং নারীদের মতো বেড়ে ওঠার কারণে নিজেকে নারী হিসেবে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে—এসব জানতে চেয়েছিলেন। উত্তরে জন্মগতভাবে লিঙ্গ নির্ধারণে জটিলতাসম্পন্ন ব্যক্তি বা খুনসা এবং স্বেচ্ছায় নারীদের আচরণ অনুকরণকারী পুরুষদের পৃথক শ্রেণিতে আলোচনা করা হয়েছে। খুনসার ক্ষেত্রে শারীরিক লক্ষণের ভিত্তিতে আইনগত শ্রেণি নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর স্বেচ্ছায় নারীদের আচরণ অনুকরণকারী পুরুষদের সম্পর্কে হাদিসের অভিশাপ উল্লেখ করে তাঁদের সঙ্গে লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফতোয়ায় বলা হয়েছে [32]—
وأما إن كان قصدك بالجنس الثالث المخنثين المتشبهين طوعا بالنساء فهؤلاء ملعونون على لسان رسول الله صلى الله عليه وسلم
বাংলা অনুবাদ: আর তৃতীয় লিঙ্গ বলতে যদি তুমি সেই মুখান্নাস পুরুষদের বোঝাও, যারা স্বেচ্ছায় নারীদের অনুকরণ করে, তাহলে তারা আল্লাহর রাসুলের বক্তব্য অনুযায়ী অভিশপ্ত।
এই বক্তব্যের পরেই ফতোয়ায় বলা হয়েছে, এই শ্রেণির মানুষের সঙ্গে মুসলিমদের লেনদেন করা জায়েজ নয়। অর্থাৎ শুধু ধর্মীয়ভাবে কাজটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি; যেসব মানুষ সেই আচরণ করেন, তাঁদের সঙ্গে স্বাভাবিক সামাজিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্কও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখানে ব্যক্তির নিজের আচরণ ও সামাজিক পরিচয় নির্ধারণের স্বাধীনতাকে ধর্মীয়ভাবে অনুমোদিত পুরুষত্বের মানদণ্ডের অধীন করা হয়েছে। কোনো মানুষের সঙ্গে ব্যবসা করা, তাঁর কাছ থেকে পণ্য কেনা অথবা তাঁকে চাকরি দেওয়া নিষিদ্ধ হলে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে তাঁর আর্থিক স্বাধীনতার ওপর। এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা সামাজিকভাবে কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি শুধু অপমান বা ঘৃণার শিকার হন না; জীবিকা নির্বাহের সাধারণ সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন।
ধর্মীয়ভাবে নির্ধারিত লিঙ্গগত আচরণ অনুসরণ না করার কারণে সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন করার নির্দেশ আরও স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় ২০০২ সালের ২৯ জানুয়ারির ১৩৭১১ নম্বর ফতোয়ায়। সেখানে একজন প্রশ্নকারী তাঁর বন্ধুর বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছিলেন। প্রশ্নকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, বন্ধুটি নারী সদস্যদের মধ্যে বেড়ে ওঠার ফলে নারীসুলভ আচরণ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং পরবর্তীতে সমকামী যৌন আচরণেও জড়িয়ে পড়েছিলেন। উত্তরে তাঁকে পুরুষদের প্রচলিত আচরণ ও অভ্যাস গ্রহণের উপদেশ দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে মুখান্নাস ব্যক্তিদের সামাজিক অবস্থান, তাঁদের প্রতি মানুষের বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরকালের শাস্তির ভয় দেখিয়ে সংশোধনের চেষ্টা করতে বলা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় কাজ না হলে বন্ধুত্ব ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে [33]—
فإن استجاب لك وأقلع عما هو فيه، فذلك المطلوب، وإلا فاهجره وابتعد عنه صوناً لدينك وعرضك.
বাংলা অনুবাদ: যদি সে তোমার উপদেশ গ্রহণ করে এবং তার বর্তমান আচরণ ত্যাগ করে, তাহলে সেটিই কাম্য। আর তা না হলে নিজের ধর্ম ও সম্মান রক্ষার জন্য তাকে বর্জন করো এবং তার কাছ থেকে দূরে সরে যাও।
এই ফতোয়ায় সামাজিক বর্জনকে ধর্ম ও সম্মান রক্ষার উপায় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রশ্নকারীর বন্ধুকে নিজের আচরণ পরিবর্তনের জন্য চাপ প্রয়োগ করা এবং পরিবর্তন না হলে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার নির্দেশ সরাসরি ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া যেকোনো মানুষের জন্য গুরুতর সামাজিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশেষত যাঁরা প্রচলিত লিঙ্গগত পরিচয় ও আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নন, তাঁদের জন্য পরিবার ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক সামাজিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এই ধরনের সম্পর্ককে শর্তসাপেক্ষ করে দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামনে দুটি পথ তৈরি হয়—নিজের আচরণ পরিবর্তন করে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করা, অথবা সামাজিক সম্পর্ক হারানোর ঝুঁকি বহন করা। ধর্মীয়ভাবে নির্দেশিত এই বর্জন ব্যক্তির স্বাধীনতা সীমিত করার পাশাপাশি তাঁকে নিজের পরিচয় ও আচরণ গোপন করতেও বাধ্য করতে পারে।
প্রচলিত পুরুষত্ব ও নারীত্বের পার্থক্যকে ধর্মীয়ভাবে অপরিবর্তনীয় বিবেচনা করার একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন মুহাম্মদ আল-আমিন আশ-শানকিতি। তাঁর আদওয়াউল বায়ান গ্রন্থের সপ্তম খণ্ডের ৪১৫ পৃষ্ঠার বক্তব্য ইসলামকিউএর ১৪৫৮০২ নম্বর উত্তরে উদ্ধৃত হয়েছে। সেখানে আশ-শানকিতি পুরুষ ও নারীর মধ্যকার পার্থক্যকে সৃষ্টিগত এবং শরিয়তগত উভয় দিক থেকে প্রতিষ্ঠিত বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, পুরুষ ও নারীর মধ্যকার এসব পার্থক্য অতিক্রম করার চেষ্টার কারণেই বিপরীত লিঙ্গের আচরণ অনুকরণকারীদের অভিশাপ দেওয়া হয়েছে। তিনি লিখেছেন [34]—
ولا شك أن سبب هذا اللعن هو محاولة من أراد التشبه منهم بالآخر لتحطيم هذه الفوارق التي لا يمكن أن تتحطم.
বাংলা অনুবাদ: নিঃসন্দেহে এই অভিশাপের কারণ হচ্ছে, যারা এক লিঙ্গের মানুষ হয়ে অন্য লিঙ্গের অনুকরণ করতে চায়, তারা এমন সব পার্থক্য ভেঙে ফেলতে চেষ্টা করছে, যেগুলো ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়।
আশ-শানকিতির বক্তব্যে নারী ও পুরুষের মধ্যকার সামাজিক আচরণগত পার্থক্যকেও ধর্মীয়ভাবে সুরক্ষিত সীমারেখার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে পোশাক, সাজসজ্জা, কণ্ঠস্বর কিংবা চলাফেরার মতো ব্যক্তিগত আচরণ কেবল সামাজিক রুচির বিষয় হিসেবে থাকছে না; এগুলো ধর্মীয় আনুগত্যের প্রশ্নে পরিণত হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি প্রচলিত পুরুষত্ব বা নারীত্বের সীমারেখা অতিক্রম করলে তাঁর আচরণকে এই ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোয় স্বাভাবিক ব্যক্তিগত বৈচিত্র্য হিসেবে না দেখে ধর্মীয় বিধান অমান্য করার চেষ্টা হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ধারণার সঙ্গে অভিশাপ, সামাজিক বর্জন এবং কর্মসংস্থানে নিষেধাজ্ঞার ফতোয়াগুলো যুক্ত হলে ব্যক্তির নিজের লিঙ্গপ্রকাশ নির্ধারণের স্বাধীনতার ওপর একাধিক স্তরের ধর্মীয় ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়।
এই সামাজিক বর্জনের ভাষা আরও কঠোর অবস্থায় পৌঁছেছে ২০০২ সালের ৪ জুলাই প্রকাশিত ১৮৬০৫ নম্বর ফতোয়ায়। প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছিলেন, দাড়ি-গোঁফ না ওঠা সুন্দর চেহারার কিশোর বা তরুণের সঙ্গে মেলামেশার বিধান কী এবং তথাকথিত তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের সঙ্গে মেলামেশার বিধান তার থেকে আলাদা কি না। উত্তরে প্রথমে অল্পবয়সী সুন্দর চেহারার পুরুষদের প্রতি যৌন আকর্ষণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এরপর তথাকথিত তৃতীয় লিঙ্গের পরিচয়ে নারীর মতো চলাফেরা, পোশাক ও কথাবার্তা অনুকরণকারী পুরুষদের উল্লেখ করে তাঁদের সমকামী যৌন আচরণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এই শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তিতে ফতোয়াকার সাহাবিদের ঐকমত্যের দাবি করে হত্যার বিধান উল্লেখ করেছেন। তবে ওই ফতোয়ার ভাষায় এই শাস্তি কার্যকর করার অধিকার কেবল শাসকের, সাধারণ ব্যক্তির নয়। সেখানে লেখা হয়েছে [35]—
وحكم هؤلاء القتل بإجماع الصحابة، ولكن هذا القتل لا يطبقه إلا السلطان، فلا يجوز للأفراد المسلمين تطبيق هذا الحد وغيره من الحدود.
বাংলা অনুবাদ: সাহাবিদের ঐকমত্য অনুযায়ী এদের বিধান হত্যা। তবে এই হত্যার শাস্তি কার্যকর করার অধিকার কেবল শাসকের; সাধারণ মুসলিম ব্যক্তিদের এই শাস্তি কিংবা অন্যান্য হদ্দের শাস্তি কার্যকর করার অনুমতি নেই।
হত্যার বিধান সম্পর্কে ফতোয়ায় যে ঐকমত্যের দাবি করা হয়েছে, সেটি ফতোয়াকারীর বক্তব্য; নারীসুলভ আচরণকারী প্রত্যেক পুরুষের বিরুদ্ধে এমন কোনো ঐতিহাসিক ঐকমত্য এই উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না। ফতোয়াটির গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, একজন মানুষের লিঙ্গপ্রকাশ, তাঁর সম্ভাব্য যৌন আকর্ষণ এবং যৌন আচরণকে একই শ্রেণির পরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করে অত্যন্ত কঠোর শাস্তির আলোচনা করা হয়েছে। নারীর মতো পোশাক পরা বা কথা বলা এবং কোনো নির্দিষ্ট যৌন আচরণে লিপ্ত হওয়া সম্পূর্ণ পৃথক বিষয়। একটির উপস্থিতি থেকে অন্যটি প্রমাণিত হয় না। অথচ ফতোয়ার শ্রেণিবিন্যাসে এই পার্থক্য কার্যকরভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। এই ধরনের শ্রেণিবিন্যাস লিঙ্গবৈচিত্র্যের মানুষের বিরুদ্ধে অপ্রমাণিত যৌন অপরাধের অভিযোগ আরোপ এবং তাঁদের সামাজিকভাবে বিপজ্জনক হিসেবে উপস্থাপনের ভিত্তি তৈরি করে।
ফতোয়াগুলোতে সামাজিক বৈষম্যের একটি ধারাবাহিক কাঠামো রয়েছে। প্রথমে প্রচলিত পুরুষত্বের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পোশাক ও আচরণকে ধর্মীয়ভাবে নিন্দনীয় ঘোষণা করা হয়েছে। এরপর সেই আচরণের সঙ্গে অপ্রমাণিত যৌন আকাঙ্ক্ষা বা অপরাধের ধারণা যুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তী ধাপে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব, সামাজিক সম্পর্ক, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান বন্ধ করার নির্দেশ এসেছে। কোনো কোনো ফতোয়ায় একই শ্রেণির ব্যক্তিদের পরিচয় যৌন অপরাধের সঙ্গে মিলিয়ে কঠোর শাস্তির বিধানও আলোচনা করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি কী করেছেন, তিনি সত্যিই কারও ক্ষতি করেছেন কি না কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের পরিবর্তে তাঁর সামাজিক পরিচয় ও আচরণকে বিচার করার প্রবণতা প্রবল হয়ে উঠেছে।
ধর্মীয় বিধানের এই ধরনের সামাজিক প্রয়োগের নৈতিক সমস্যা অত্যন্ত গুরুতর। একজন মানুষ তাঁর পোশাক, কথাবার্তা, অঙ্গভঙ্গি কিংবা লিঙ্গপ্রকাশের কারণে অন্য মানুষের চেয়ে কম অধিকারসম্পন্ন হয়ে যান না। তাঁর জীবিকা অর্জন, সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা, নিরাপদ পরিবেশে বসবাস এবং নিজের পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার অন্য সবার মতোই সমান। অথচ এখানে আলোচিত ফতোয়াগুলোতে সামাজিক বর্জনকে ধর্মীয় কর্তব্য, কর্মসংস্থান থেকে দূরে রাখাকে অনুমোদিত ব্যবস্থা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিন্ন করাকে ধর্ম ও সম্মান রক্ষার উপায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই অবস্থানগুলো মানুষের সমমর্যাদা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং বৈষম্যহীনভাবে জীবিকা অর্জনের নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। নির্বাসনের প্রাচীন বর্ণনা থেকে আধুনিক ফতোয়ার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বর্জন পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা দেখায়, লিঙ্গগত প্রচলিত মানদণ্ড অনুসরণ না করা ব্যক্তিদের অধিকার সংকুচিত করার ধর্মীয় যুক্তি কেবল প্রাথমিক যুগের গ্রন্থেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; আধুনিক ধর্মীয় নির্দেশনাতেও তার সুস্পষ্ট উপস্থিতি রয়েছে।
জন্মগত লিঙ্গবৈচিত্র্য ও ইসলামি ফিকহ: খুনসাদের বিবাহ, নামাজ, ইমামতি ও উত্তরাধিকারের বিধান
ধ্রুপদী ইসলামি আইনশাস্ত্রে জন্মগতভাবে যৌন বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে জটিলতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য পৃথক বিধান তৈরি করা হয়েছে। ফিকহি পরিভাষায় তাঁদের বলা হয়েছে খুনসা (خنثى)। শরীরের লক্ষণ দেখে পুরুষ বা নারী নির্ধারণ করা সম্ভব হলে তাঁকে খুনসা গাইরে মুশকিল, আর লক্ষণ নির্ধারক না হলে কিংবা পরস্পরবিরোধী হলে খুনসা মুশকিল হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এই শ্রেণিবিভাগের ফল শুধু নামকরণে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তির বিবাহের অধিকার, উত্তরাধিকারের অংশ, জামাতে দাঁড়ানোর জায়গা, অন্যদের নামাজে ইমামতি করার অধিকার এবং সমাজে পুরুষ বা নারীর বিধান অনুযায়ী জীবনযাপনের প্রশ্ন এসব শ্রেণির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে জন্মগত শারীরিক বৈচিত্র্য একজন মানুষের আইনগত অধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
হাম্বলি আইনজ্ঞ ইবনে কুদামা তাঁর আল-মুগনি গ্রন্থে খুনসা ব্যক্তিকে পুরুষ ও নারী—এই দুটি আইনগত শ্রেণির একটিতে স্থাপন করার বিধান আলোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যে কোরআনের পুরুষ ও নারী সৃষ্টির আয়াত উদ্ধৃত করে তৃতীয় কোনো স্বতন্ত্র আইনগত শ্রেণির অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু একই আলোচনায় তিনি খুনসা মুশকিলের বিবাহের ক্ষেত্রে একটি মত উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে ব্যক্তির নিজের বক্তব্য ও আকর্ষণের ভিত্তিতে তাঁকে পুরুষ বা নারী হিসেবে বিবেচনা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই মত অনুযায়ী, তিনি নিজেকে পুরুষ বলে জানালে নারীদের সঙ্গে এবং নারী বলে জানালে পুরুষদের সঙ্গে বিবাহের অনুমতি পাবেন; পরবর্তীতে বিপরীত পরিচয়ে অন্য বিবাহ করার সুযোগ থাকবে না। ইবনে কুদামা লিখেছেন [36]—
وَإِذَا قَالَ الْخُنْثَى الْمُشْكِلُ : أَنَا رَجُلٌ . لَمْ يُمْنَعْ مِنْ نِكَاحٍ النِّسَاءِ ، وَلَمْ يَكُنْ لَهُ أَنْ يَنْكِحَ بِغَيْرِ ذَلِكَ بَعْدُ
বাংলা অনুবাদ: খুনসা মুশকিল ব্যক্তি যদি বলেন, ‘আমি পুরুষ’, তাহলে তাঁকে নারীদের সঙ্গে বিবাহ করতে বাধা দেওয়া হবে না। তবে এরপর অন্য ধরনের বিবাহ করার অনুমতি থাকবে না।
ইবনে কুদামার গ্রন্থে এই মতের উপস্থিতি দেখায়, খুনসার বিবাহ নিয়ে ধ্রুপদী ফকিহদের অবস্থান সম্পূর্ণ অভিন্ন ছিল না। কিন্তু নিজের অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আইনগত শ্রেণি নির্ধারণের সুযোগ যেখানে দেওয়া হয়েছে, সেখানেও বিবাহকে কেবল পুরুষ ও নারীর পারস্পরিক সম্পর্ক হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। ব্যক্তির পরিচয় বিবাহসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে গ্রহণ করা হলেও সেই পরিচয়কে ধর্মীয় আইনের পূর্বনির্ধারিত দুটি শ্রেণির একটিতে স্থায়ীভাবে সীমিত করতে হয়েছে। জন্মগত বৈচিত্র্যকে স্বতন্ত্র জীবনগত বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ না করে তা পুরুষ-নারী দ্বিবিভাগের মধ্যে স্থাপন করার এই প্রবণতা আইনগত সীমাবদ্ধতার একটি মৌলিক উৎস।
হানাফি আইনজ্ঞ আলাউদ্দিন আল-কাসানি তাঁর বাদায়েউস সানায়ে গ্রন্থের ‘কিতাবুল খুনসা’ অংশে উত্তরাধিকারের হিসাব এবং খুনসা মুশকিলের অন্যান্য বিধান বিস্তারিত লিখেছেন। উত্তরাধিকার বণ্টনে খুনসা ব্যক্তির সম্ভাব্য পুরুষ ও নারী পরিচয়ে যে পরিমাণ সম্পত্তি প্রাপ্য হয়, তার মধ্যে কম অংশ গ্রহণের বিধান তিনি হানাফি মত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীর অংশ কম হওয়ায় খুনসা ব্যক্তিকে নারীর অংশ দেওয়া হয়; কিন্তু কোনো বিশেষ হিসাবে পুরুষ হিসেবে তাঁর অংশ আরও কম হলে সেই কম অংশই নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ নিজের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের অস্পষ্টতার ফলে ব্যক্তিকে উত্তরাধিকারের হিসাবের অপেক্ষাকৃত প্রতিকূল অবস্থায় স্থাপন করা হয়েছে। কাসানি লিখেছেন [37]—
قَالَ أَصْحَابُنَا – رَحِمَهُمُ اللَّهُ – يُعْطَى لَهُ أَقَلُّ الْأَنْصِبَاءِ وَهُوَ نَصِيبُ الْأُنْثَى إِلَّا أَنْ يَكُونَ أَسْوَأَ أَحْوَالِهِ أَنْ يُجْعَلَ ذَكَرًا
বাংলা অনুবাদ: আমাদের মাযহাবের আলেমদের বক্তব্য হলো, তাঁকে প্রাপ্য অংশগুলোর মধ্যে কম অংশ দেওয়া হবে; সাধারণভাবে সেটি নারীর অংশ। তবে পুরুষ হিসেবে গণ্য করলে তাঁর অবস্থা আরও প্রতিকূল হলে সে অনুযায়ী হিসাব হবে।
এই নিয়মে খুনসা ব্যক্তির উত্তরাধিকারকে পরিচয়ের অনিশ্চয়তার দায়ভার বহন করতে হয়েছে। একই পরিবারের অন্য উত্তরাধিকারীদের পুরুষ বা নারী পরিচয় আইনগতভাবে নির্ধারিত থাকলে তাঁরা সেই অনুযায়ী সম্পত্তি পান। অথচ জন্মগত শারীরিক বৈচিত্র্যের কারণে কারও পরিচয় নির্ধারিত না হলে তাঁর জন্য কম অংশ বেছে নেওয়ার বিধান কার্যকর হতে পারে। প্রাপ্য সম্পত্তির পরিমাণ তাঁর কোনো অপরাধ বা দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতার কারণে কমছে না; কমছে কেবল তাঁকে প্রতিষ্ঠিত দুটি শ্রেণির কোনটিতে স্থাপন করা হবে, সেই সিদ্ধান্তের অনিশ্চয়তার কারণে।
মালিকি ফিকহে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে আরেকটি পদ্ধতি পাওয়া যায়। মুহাম্মদ আদ-দাসুকি তাঁর হাশিয়াতুদ দাসুকি আলাশ শরহিল কবির গ্রন্থে খুনসা মুশকিলের সম্ভাব্য পুরুষ ও নারী পরিচয়ে দুটি হিসাব করে উভয় অংশের গড় নির্ধারণের কথা আলোচনা করেছেন। অর্থাৎ হানাফি পদ্ধতিতে যেখানে সম্ভাব্য কম অংশ দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে, সেখানে এই মালিকি পদ্ধতিতে দুটি সম্ভাব্য অংশের অর্ধেক করে যোগ করা হয়। একই গ্রন্থে খুনসা মুশকিলের বিবাহ বৈধ নয় বলেও উল্লেখ রয়েছে, যতক্ষণ তাঁর লিঙ্গগত অবস্থা অনির্ধারিত থাকে। দাসুকির বিবরণে বলা হয়েছে [38]—
فإذا كان على تقدير كونه ذكرا سهمان وعلى تقدير كونه أنثى سهم فإنه يعطى نصف نصيب الذكر وهو سهم ونصف نصيب الأنثى وهو نصف سهم
বাংলা অনুবাদ: পুরুষ হিসেবে হিসাব করলে যদি দুই অংশ এবং নারী হিসেবে এক অংশ পাওয়া যায়, তাহলে পুরুষ হিসেবে সম্ভাব্য প্রাপ্যের অর্ধেক, অর্থাৎ এক অংশ, এবং নারী হিসেবে সম্ভাব্য প্রাপ্যের অর্ধেক, অর্থাৎ আরও অর্ধেক অংশ দেওয়া হবে।
উত্তরাধিকার বণ্টনের এই ভিন্ন মতগুলো একই বাস্তব সমস্যার দুটি পৃথক আইনগত সমাধান: জন্মগতভাবে যৌন বৈশিষ্ট্যে বৈচিত্র্য রয়েছে এমন মানুষের জন্য ইসলামি উত্তরাধিকার আইনে স্বতন্ত্র সমান অধিকারভিত্তিক অংশ নির্ধারিত নেই। তাঁকে প্রথমে পুরুষ অথবা নারী ধরে হিসাব করতে হয়। এরপর ফকিহদের পদ্ধতিগত মতভেদ অনুযায়ী কম অংশ, গড় অংশ কিংবা অন্য হিসাব প্রযোজ্য হয়। সম্পত্তির অধিকার ব্যক্তি হিসেবে সমান মর্যাদার ভিত্তিতে নির্ধারিত না হয়ে শরীরের শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
নামাজ ও ইমামতির ক্ষেত্রেও অনুরূপ শ্রেণিবিভাগ রয়েছে। ইসলামওয়েবের ১৮৯০৮৯ নম্বর ফতোয়ায় খুনসা মুশকিল ব্যক্তির অন্য পুরুষদের নামাজে ইমামতি করা বৈধ নয় বলে জানানো হয়েছে। যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, তিনি নারী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; ফলে পুরুষেরা তাঁর পেছনে নামাজ পড়তে পারবেন না। একই যুক্তিতে খুনসা মুশকিল ব্যক্তির আরেক খুনসা মুশকিল ব্যক্তির পেছনে নামাজ পড়ার ক্ষেত্রেও বাধা দেওয়া হয়েছে। ফতোয়ায় শাফেয়ি আইনজ্ঞ আবু ইসহাক আশ-শিরাজির আল-মুহাজ্জাব গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে [39]—
ولا تجوز صلاة الرجل خلف الخنثى الْمُشْكِلِ لِجَوَازِ أَنْ يَكُونَ امرأة, ولا صلاة الخنثى خلف الخنثى لِجَوَازِ أَنْ يَكُونَ الْمَأْمُومُ رَجُلًا وَالْإِمَامُ امرأة.
বাংলা অনুবাদ: কোনো পুরুষের জন্য খুনসা মুশকিল ব্যক্তির পেছনে নামাজ পড়া বৈধ নয়, কারণ তিনি নারীও হতে পারেন। একইভাবে এক খুনসা মুশকিল ব্যক্তির জন্য আরেক খুনসা মুশকিল ব্যক্তির পেছনে নামাজ পড়াও বৈধ নয়; কারণ অনুসারী পুরুষ এবং ইমাম নারী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই বিধানে একজন ব্যক্তির ধর্মীয় যোগ্যতা, কোরআন পাঠের দক্ষতা, সততা কিংবা নামাজ পরিচালনার সামর্থ্য নয়, জন্মগত শারীরিক বৈশিষ্ট্যই তাঁর ইমামতির অধিকার সীমিত করার ভিত্তি হয়ে উঠছে। ব্যক্তিটি ইমামতির দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে সক্ষম হলেও তাঁর লিঙ্গগত অবস্থান দ্ব্যর্থক থাকলে অন্য পুরুষদের নেতৃত্ব দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নামাজের সারিতে দাঁড়ানোর স্থানও একই শ্রেণিবিভাগ অনুযায়ী নির্ধারিত। ইসলামের ধর্মীয় পরিসরে নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণের ওপর এসব বিধিনিষেধ জন্মগত বৈচিত্র্যকে অধিকার সংকোচনের ভিত্তিতে পরিণত করে।
ইসলামকিউএর ২২১৯১৯ নম্বর উত্তরে ইবনে উসাইমিনের আশ-শরহুল মুমতি এবং আল-মাওসুআ আল-ফিকহিয়্যা থেকে খুনসা মুশকিলের নামাজ ও বিবাহের বিধান উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, খুনসা ব্যক্তির ওপর মসজিদে জামাতে অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়; তিনি মসজিদে গেলে পুরুষ ও নারীদের মাঝখানে স্বতন্ত্র সারিতে দাঁড়াবেন। অধিকাংশ ফকিহের মতে তাঁর লিঙ্গগত অবস্থা অনির্ধারিত থাকলে বিবাহ বৈধ নয়। এই অবস্থান নিজের পছন্দের জীবনসঙ্গী নির্বাচন এবং পরিবার প্রতিষ্ঠার অধিকারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। উত্তরটিতে বলা হয়েছে [40]—
وإن كان ” مشكِلاً ” : فإنه لا يصح تزوجه عند جمهور العلماء ؛ لأنه يحتمل أن يكون ذَكراً فكيف يتزوج ذكراً ؟!
বাংলা অনুবাদ: আর তাঁর লিঙ্গগত অবস্থা অনির্ধারিত হলে অধিকাংশ আলেমের মতে তাঁর বিবাহ বৈধ নয়। কারণ তিনি পুরুষও হতে পারেন—সে ক্ষেত্রে কীভাবে একজন পুরুষকে বিবাহ করবেন?
ইবনে কুদামার উদ্ধৃত একটি মত ব্যক্তির নিজের বক্তব্যের ভিত্তিতে বিবাহের অনুমতি দিলেও ইসলামকিউএর উত্তরে উপস্থাপিত অধিকাংশ ফকিহের অবস্থান আরও কঠোর। জন্মগত যৌন বৈশিষ্ট্য দ্ব্যর্থক থাকলে বিবাহের অধিকার স্থগিত বা অস্বীকার করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে এমন একজন মানুষ পরিবার গঠনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, যাঁর ব্যক্তিগত সক্ষমতা, দায়িত্ববোধ কিংবা অন্য মানুষের প্রতি আচরণে কোনো অপরাধ বা ত্রুটি নেই। অধিকার সংকোচনের কারণ তাঁর নিজস্ব শারীরিক বৈচিত্র্য এবং আইনগত শ্রেণিবিন্যাসের অনিশ্চয়তা।
এই ফিকহি বিধানগুলো দক্ষিণ এশিয়ার হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রত্যেক সদস্যের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য বলে দাবি করা যায় না। ঐতিহাসিক খুনসা একটি নির্দিষ্ট আইনগত ও শারীরিক শ্রেণি, আর দক্ষিণ এশিয়ার হিজড়া পরিচয়ের পরিসর আরও বিস্তৃত। কিন্তু খুনসাদের ক্ষেত্রে যে বিধানগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলো জন্মগত লিঙ্গবৈচিত্র্যের মানুষকে পুরুষ ও নারী—এই দুটি শ্রেণিতে বাধ্যতামূলকভাবে স্থাপন করার ইসলামি আইনগত পদ্ধতি প্রকাশ করে। এই পদ্ধতির কারণে বিবাহ, উত্তরাধিকার ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মতো মৌলিক অধিকারে সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ব্যক্তির জন্মগত বৈশিষ্ট্য বা শারীরিক শ্রেণিবিন্যাসের অস্পষ্টতা তাঁর সমমর্যাদা ও স্বাধীনতার অধিকার হ্রাস করার ন্যায়সংগত কারণ হতে পারে না।
উপসংহার
মুহাম্মদের নামে বর্ণিত অভিশাপ, ঘর থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ এবং মদিনার বাইরে নির্বাসনের ঘটনাগুলো পরবর্তী ইসলামি আইনশাস্ত্রে শাস্তিমূলক বিধানের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ইবনে হাজার নির্বাসনকে অযোদ্ধা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে ব্যাখ্যা করেছেন, শাওকানি অনাচারের আশঙ্কায় বসবাসের এলাকা থেকে বহিষ্কারের বৈধতা আলোচনা করেছেন এবং সুয়ূতি এমনকি ইচ্ছাকৃত নয় ও পাপ হিসেবে গণ্য হয় না—এমন নারীসুলভ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তিকেও জনস্বার্থের নামে নির্বাসন দেওয়ার ফিকহি অবস্থান উদ্ধৃত করেছেন। এসব বিধান ব্যক্তির নিরাপত্তা, পরিবার ও সমাজে বসবাসের অধিকারকে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের অধীন করেছে। মানুষের পোশাক, অঙ্গভঙ্গি ও লিঙ্গপ্রকাশে অন্য কারও ক্ষতি না হলেও সেগুলোকে শাস্তির ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা ন্যায়বিচার নয়।
প্রাচীন নির্বাসনের বিধানের সঙ্গে আধুনিক ফতোয়ার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বর্জনের নির্দেশ যুক্ত হয়েছে। নারীর মতো পোশাক পরা বা আচরণ করার কারণে কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব ত্যাগ, ব্যবসা বন্ধ কিংবা তাঁকে চাকরি না দেওয়ার নির্দেশ ব্যক্তি হিসেবে তাঁর সমান মর্যাদাকে অস্বীকার করে। জন্মগত যৌন বৈশিষ্ট্যে বৈচিত্র্য নিয়ে জন্মানো মানুষের ক্ষেত্রেও ইসলামি ফিকহের শ্রেণিবিভাগ বিবাহ, উত্তরাধিকার এবং ধর্মীয় নেতৃত্বে বৈষম্যমূলক সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করেছে। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের পোশাক ও লিঙ্গপ্রকাশ নির্ধারণ করুন, অথবা তাঁর বৈশিষ্ট্য জন্মগত হোক—কোনো ক্ষেত্রেই তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ ছাড়াই সামাজিক বর্জন, নির্বাসন বা মৌলিক অধিকার সংকোচন বৈধ নৈতিক ব্যবস্থা হতে পারে না। এইসব ইসলামি বিধিবিধান মানুষের সমঅধিকার ও স্বাধীনতার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
একটি নবজাতক শিশু ছেলে হোক, মেয়ে হোক, বৈচিত্র্যময় লিঙ্গের অধিকারী হোক, যেই হোক, সে পবিত্র এবং সুন্দর। একজন মা যেন কোন অবস্থাতেই একজন শিশুকে তার বুকের কাছ থেকে সরিয়ে না দেন। তাকে যেন হিজড়া, মানে গোত্র থেকে পরিত্যাগ না করেন। একটি শিশুর অধিকার হচ্ছে, একটি পরিবারের মধ্যে হাসি আনন্দ, ভালবাসা এবং স্নেহের মধ্যে বেড়ে ওঠার। তার লিঙ্গের ওপর ভিত্তি করে যেন তাকে কোন অবস্থাতেই অসম্মানের জীবনের দিকে ঠেলে দেয়া না হয়। তাকে একজন স্বাধীন, আত্মনির্ভরশীল, আত্মমর্যাদাশীল মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেয়া হয়। আর ইসলামের এইসব নোংরা বিধিবিধান যেন সমাজ থেকে দূরীভূত হয়।
তথ্যসূত্রঃ
- Perspectives on Arabic linguistics XVII-XVIII: papers from the Seventeenth and Eighteenth Annual Symposia on Arabic Linguistics, (John Benjamins, 2005), p. 97 ↩︎
- কোরআন, সূরা আনফাল, আয়াত ৩০ ↩︎
- কোরআন, সূরা তাওবা, আয়াত ৪০ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৫৮৮৬ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ ৪৯২৮ ↩︎
- জ্বীন জাতির বিষ্ময়কর ইতিহাস, আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতি, পৃষ্ঠা ৫০, ৫১ ↩︎
- সূরা নূর, আয়াত ৩১ ↩︎
- ইমাম তাবারি, জামিউল বায়ান, সূরা নূর ২৪:৩১-এর তাফসির, খণ্ড ১৯ ↩︎
- ইবনে কাসির, তাফসিরুল কোরআনিল আজিম, সূরা নূর ২৪:৩১ ↩︎
- ইমাম কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কোরআন, সূরা নূর ২৪:৩১ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৩৭৩ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, দশম খণ্ড, পৃষ্ঠা নম্বর- ২৪০, হাদিসঃ ৬৩৭৩ ↩︎
- সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী, আরবি-বাংলা, সহজ তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, হযরত মাওলানা উসমান গনী, আল কাউসার প্রকাশনী, ১২তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪০ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিস: ৪১০৯ ↩︎
- হাদীস সম্ভার, হাদিস: ২৬৬৫ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস: ৩৯৮৮ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস: ৪৮৫৫ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস: ৪৮৪৬ ↩︎
- সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী, আরবি-বাংলা, সহজ তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, হযরত মাওলানা উসমান গনী, আল কাউসার প্রকাশনী, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২৬ ↩︎
- ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারী, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ১৬৫–১৬৬, باب نفي أهل المعاصي والمخنثين ↩︎
- মুহাম্মদ ইবনে আলী আশ-শাওকানি, নাইলুল আওতার, খণ্ড ৬, باب في غير أولي الإربة ↩︎
- ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড ১১, নির্বাসনের মাধ্যমে শাস্তিসংক্রান্ত আলোচনা ↩︎
- ইমাম নববি, শরহে সহিহ মুসলিম, খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ৩৩৬–৩৩৭, باب منع المخنث من الدخول على النساء الأجانب ↩︎
- জালালুদ্দিন সুয়ূতি, আল-আশবাহ ওয়ান নাজায়ির, পৃষ্ঠা ৪৯১, باب التعزير ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৯২৮ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, তাহক্বীকঃ আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩৫ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৪৪৮১ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিস: ৫৮৮৫ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিস: ৫৮৮৬ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিস: ৫৯৩৪ ↩︎
- الاختلاط والتعامل مع المخنثين من الرجال — ফতোয়া ৭০৪৭৪, ২ জানুয়ারি ২০০৬ ↩︎
- كيفية التعامل مع الجنس الثالث — ফতোয়া ৬১০১৯, ১৩ এপ্রিল ২০০৫ ↩︎
- لعن الله المخنثين من الرجال — ফতোয়া ১৩৭১১, ২৯ জানুয়ারি ২০০২ ↩︎
- মুহাম্মদ আল-আমিন আশ-শানকিতি, আদওয়াউল বায়ান, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৪১৫; ইসলামকিউএ, উত্তর ১৪৫৮০২ ↩︎
- حكم النظر إلى الأمرد، وحكم المتخنثين — ফতোয়া ১৮৬০৫, ৪ জুলাই ২০০২ ↩︎
- ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, খণ্ড ৭, كتاب النكاح, مسألة قال الخنثى المشكل أنا رجل ↩︎
- আলাউদ্দিন আল-কাসানি, বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ৭, كتاب الخنثى, فصل في حكم الخنثى المشكل ↩︎
- মুহাম্মদ আদ-দাসুকি, হাশিয়াতুদ দাসুকি আলাশ শরহিল কবির, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪৮৯–৪৯১, উত্তরাধিকার অধ্যায় ↩︎
- আবু ইসহাক আশ-শিরাজি, আল-মুহাজ্জাব; ইসলামওয়েব, ফতোয়া ১৮৯০৮৯, حكم إمامة الجنس الثالث ↩︎
- ইসলামকিউএ, উত্তর ২২১৯১৯, بعض أحكام الخنثى المشكل في باب الصلاة والنكاح ↩︎
About This Article
Genre: Islamic Sharia Critique, Gender-Diversity Rights Analysis, Mukhannath and Khuntha Jurisprudence Review, Hadith-Based Discrimination Study, Religious Persecution Analysis, and Human Rights Assessment
Epistemic Position: Secular Humanism, Universal Human Rights, Gender Equality, Bodily Autonomy, Individual Liberty, Historical Criticism, Source Criticism, Anti-Discrimination Ethics, and Critical Analysis of Religious Authority
This article examines the treatment of hijras, mukhannaths, khunthas, and gender-diverse individuals in Islamic scripture, hadith, classical jurisprudence, and contemporary fatwas, focusing on religiously sanctioned discrimination, cursing, expulsion, exile, social ostracism, and restrictions on fundamental rights.
The central argument is that Islamic legal traditions have provided religious legitimacy for punishing and excluding people whose clothing, behaviour, gender expression, or innate sex characteristics do not conform to conventional male–female classifications. These restrictions violate individual liberty, equal dignity, and fundamental human rights, particularly when imposed without evidence that the individual has harmed another person.
The article also discusses the distinction between mukhannath, khuntha, and South Asian hijra identity; the historical marginalisation of hijra communities; Muhammad's migration from Mecca and the ethical contradiction between his experience of persecution and his subsequent orders of expulsion; Quran 24:31; Sahih al-Bukhari, Sahih Muslim, and Sunan Abi Dawud; the cursing of effeminate men; the exile of mukhannaths from Medina; the request for permission to execute a mukhannath and Muhammad's response concerning prayer; the incident involving Hit; Ibn Hajar al-Asqalani's Fath al-Bari; al-Shawkani's Nayl al-Awtar; Ibn Taymiyyah's Majmu al-Fatawa; al-Nawawi's distinction between innate and deliberate feminine behaviour; al-Suyuti's discussion of exile despite the absence of sin; and modern Islamweb and IslamQA fatwas prescribing social exclusion, employment restrictions, and discriminatory treatment.
The article further examines classical Islamic jurisprudence concerning khuntha mushkil and khuntha ghayr mushkil, including Ibn Qudamah's discussion of marriage and legal classification, al-Kasani's Hanafi inheritance calculations, al-Dasuqi's Maliki inheritance rules, al-Shirazi's restrictions on prayer leadership, Ibn Uthaymin's discussions of congregational prayer, and contemporary fatwas concerning marriage, inheritance, religious participation, and the compulsory classification of individuals within binary male–female legal categories.
This article should be evaluated through Quranic interpretation, hadith criticism, classical Islamic jurisprudence, legal history, gender studies, medical understanding of intersex variations, human rights law, moral philosophy, individual autonomy, and principles of non-discrimination—not through clerical authority, religiously sanctioned gender policing, appeals to public morality, punishment without wrongdoing, compulsory gender conformity, social ostracism, or the claim that religious tradition can legitimately override an individual's fundamental dignity, freedom, and equal rights.


সহজ-সরল সাবলীল ভাষায় লেখা এই লেখাটির জন্য ধন্যবাদ ।
“ইসলাম কি সব ধরনের হিজড়াদেরকে দেশান্তর বা ঘর থেকে বের করে দিতে আদেশ করেছে?”
http://response-to-anti-islam.com/show/%E0%A6%87%E0%A6%B8%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%AE-%E0%A6%95%E0%A6%BF-%E0%A6%B8%E0%A6%AC-%E0%A6%A7%E0%A6%B0%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B9%E0%A6%BF%E0%A6%9C%E0%A7%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%BE-%E0%A6%98%E0%A6%B0-%E0%A6%A5%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A7%87-%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%86%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%9B%E0%A7%87–/258
তথ্য সমৃদ্ধ লেখাটি পড়ে ধর্ম তথা ইসলাম ধর্ম মানবতার বিরুদ্ধে কাজ করার মতো অত্যন্ত গর্হিত শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। পুরুষ-নারী ছাড়া যে কোন মানুষকে (যেমন তৃতীয় লিঙ্গ) ইসলাম স্বীকৃতি দেয় না। এমন কি হত্যা করার শিক্ষা দেয়। আধুনিক মানববাদীরা এ বিষয়ে সোাচ্চার যেন কেউই বৈষম্যের শিকার না হয়। লেখাটির জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
অনেকগুলা ভিডিও দেখলাম হিজড়া সম্পর্কে ইউটিউবে, সব হুজুর ভাল ভাল কথা বলে। কোন হুজুরই এইসব ঘর থেকে বের করে দেওয়ার আয়াত বলে না।
হুজুরদের অবস্থা অনেকটা এমন, কিছু কথা থাকনা গোপন!!