সিদরাতুল মুনতাহা | সাত আসমানের বৃক্ষ
সারসংক্ষেপ
সিদরাতুল মুনতাহা ইসলামী মহাজাগতিক কল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কোরআনে এর নাম এসেছে সংক্ষিপ্তভাবে; কিন্তু হাদিস, তাফসির ও মিরাজের বর্ণনায় এটি ক্রমে একটি বিস্তারিত মহাজাগতিক সত্তায় পরিণত হয়েছে: এক বিশাল সিদর বা কুলজাতীয় বৃক্ষ, যার পাতা হাতির কানের মতো, ফল বিরাট পাত্রের মতো, যার কাছে ফেরেশতা ও ঊর্ধ্বজগতের গতিবিধির সীমা নির্ধারিত, এবং যার মূলের সঙ্গে চারটি নদীর সম্পর্ক বর্ণিত হয়েছে। সেই নদীগুলোর দুটিকে জান্নাতি এবং অন্য দুটিকে পৃথিবীর নীল ও ফোরাত নদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি কেবল বিমূর্ত ধর্মীয় প্রতীক নয়; ইসলামী উৎসে এর সঙ্গে স্থান, আকার, উদ্ভিদগত বৈশিষ্ট্য এবং পৃথিবীর নির্দিষ্ট ভৌগোলিক নদীর সম্পর্কও স্থাপন করা হয়েছে।
এই বর্ণনার গুরুত্ব এখানেই যে, এর একটি অংশ সম্পূর্ণ অতিপ্রাকৃত জগতের দাবি হলেও অন্য অংশ সরাসরি পর্যবেক্ষণযোগ্য পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত। “সপ্তম আসমানে একটি মহাজাগতিক বৃক্ষ আছে”—এই দাবিকে পরীক্ষার বাইরে সরিয়ে রাখা সম্ভব; কিন্তু “সেই বৃক্ষের মূলের সঙ্গে নীল ও ফোরাত নদীর উৎস সম্পর্কিত”—এটি আর নিছক অদৃশ্য জগতের দাবি থাকে না। নীল ও ফোরাতের জলাধার, উপনদী, অববাহিকা, বৃষ্টিপাত, পার্বত্য উৎস এবং প্রবাহপথ আধুনিক ভূগোল ও জলবিদ্যার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা যায়। ফলে ধর্মীয় বর্ণনা যখন পরিচিত পৃথিবীর সঙ্গে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সংযোগ স্থাপন করে, তখন সেটিকে বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করার সুযোগও তৈরি হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মহাজাগতিক বৃক্ষের ধারণা ইসলামের জন্য অনন্য নয়। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বহু ধর্মীয় ও পৌরাণিক ঐতিহ্যে এমন বৃক্ষের কল্পনা পাওয়া যায় যা পৃথিবী, স্বর্গ, পাতাল, দেবলোক বা বহু জগতকে সংযুক্ত করে। নর্স পুরাণের ইগড্রাজেল এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ; ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যে ঊর্ধ্বমূল অশ্বত্থ, ইরানি ধর্মীয় পুরাণে গাওকেরেনা বা মহাজাগতিক বৃক্ষ, মেসোপটেমীয় ও অন্যান্য সংস্কৃতিতেও পবিত্র বা বিশ্ববৃক্ষের মোটিফ পাওয়া যায়। এসব কাহিনির বিবরণ এক নয়, কিন্তু তাদের পেছনের মানসিক কাঠামোতে একটি পরিচিত ধারা রয়েছে—বিশ্বজগতের অজানা বিন্যাসকে পরিচিত পৃথিবীর কোনো জীবন্ত প্রতীকের মাধ্যমে কল্পনা করা।
এই প্রবন্ধে তাই প্রশ্নটি শুধু “মহাকাশে গাছ কীভাবে বেঁচে থাকে” পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্লেষণের কেন্দ্র হবে আরও মৌলিক কয়েকটি বিষয়: ইসলামী উৎসে সিদরাতুল মুনতাহা সম্পর্কে ঠিক কী দাবি করা হয়েছে; বিভিন্ন বর্ণনা পরস্পরের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ; পৃথিবীর নীল ও ফোরাতের সঙ্গে এর সম্পর্কের দাবির বাস্তব ভিত্তি কী; মহাজাগতিক বৃক্ষের ধারণা অন্য ধর্মীয় পুরাণের সঙ্গে কোন কাঠামোগত সাদৃশ্য বহন করে; এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, কোনো ধর্মীয় গ্রন্থে একটি দাবি উপস্থিত থাকা আর সেই দাবির বাস্তব সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কোথায়।
ভূমিকা
মানুষ অজানা জগতকে ব্যাখ্যা করার জন্য প্রায় সব যুগেই পরিচিত জগতের উপাদান ব্যবহার করেছে। আকাশকে ছাদ, পৃথিবীকে বিস্তৃত ভূমি, নক্ষত্রকে প্রদীপ, দেবতাদের রাজাকে মানবসম্রাট, স্বর্গকে উদ্যান এবং মহাবিশ্বের স্তরগুলোকে বিশাল পর্বত, সিঁড়ি বা বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান জন্ম নেওয়ার বহু আগে মানুষের কাছে মহাবিশ্বের প্রকৃত আকার, গ্রহের প্রকৃতি, বায়ুমণ্ডল, নক্ষত্রের দূরত্ব কিংবা মহাকাশের ভৌত পরিবেশ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য জ্ঞান ছিল না। ফলে ধর্মীয় ও পৌরাণিক মহাজাগতিক বর্ণনায় পৃথিবীর পরিচিত বস্তুগুলোকে বিশাল আকারে ঊর্ধ্বজগতে স্থান দেওয়া ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি কল্পনাপদ্ধতি।
ইসলামী বর্ণনার সিদরাতুল মুনতাহা সেই বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই গুরুত্বপূর্ণ। “সিদর” একটি পরিচিত বৃক্ষ; আর “মুনতাহা” অর্থ শেষসীমা বা চূড়ান্ত সীমান্ত। ইসলামী উৎসে এই পরিচিত উদ্ভিদকে এমন এক মহাজাগতিক অবস্থানে স্থাপন করা হয়েছে যেখানে পৃথিবী ও ঊর্ধ্বজগতের সীমানা, ফেরেশতাদের চলাচল, জান্নাত, মিরাজ এবং মুহাম্মদের বিশেষ অভিজ্ঞতা একত্রিত হয়ে যায়। পরবর্তী হাদিস-বর্ণনায় গাছটিকে আরও বস্তুগত বৈশিষ্ট্য দেওয়া হয়েছে: এর ফলের আকার, পাতার আকার, অবস্থান এবং এর মূল থেকে প্রবাহিত নদীর বর্ণনা। ফলে এটি কেবল একটি কাব্যিক উপমা হিসেবে থেকে যায়নি; ইসলামী মহাজাগতিক বর্ণনায় এটি বাস্তব স্থানের বাস্তব সত্তা হিসেবেই উপস্থিত হয়েছে।
এখানেই প্রমাণের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনো প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে যদি বলা হয় একটি বিশাল বৃক্ষ বহু জগতকে ধারণ করে, সেই গ্রন্থটি সর্বপ্রথম প্রমাণ করে যে সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতির মানুষ এমন একটি কাহিনি বিশ্বাস বা প্রচার করত। কিন্তু সেই একই গ্রন্থকে আবার বৃক্ষটির বাস্তব অস্তিত্বের স্বাধীন প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। নর্স গ্রন্থে ইগড্রাজেলের বিবরণ পাওয়া যায় বলে ইগড্রাজেল বাস্তবে আছে—এ সিদ্ধান্ত যেমন অনুসরণ করে না, তেমনি ইসলামী হাদিসে সিদরাতুল মুনতাহার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া গেলেই তার বাস্তব অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। ঐতিহাসিক উৎস একটি বিশ্বাসের ইতিহাস প্রমাণ করতে পারে; মহাজাগতিক সত্তার বাস্তব অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হলে প্রয়োজন সেই বিশ্বাসের বাইরে স্বাধীন প্রমাণ।
সিদরাতুল মুনতাহার ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি আরও তীব্র, কারণ বর্ণনাটি নিজেই অতিপ্রাকৃত ও প্রাকৃতিক জগতকে এক জায়গায় যুক্ত করেছে। জান্নাতের দুটি অদৃশ্য নদীর দাবি পরীক্ষাযোগ্য নয়; কিন্তু একই বর্ণনায় যখন নীল ও ফোরাতের নাম আসে, তখন দাবি পৃথিবীর ভূগোলে প্রবেশ করে। নীল ও ফোরাত এমন নদী নয় যাদের উৎস কেবল ধর্মীয় অনুমানের বিষয়। তাদের জল কোথা থেকে আসে, কোন অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়, কোন কোন উপনদী তাদের পানি সরবরাহ করে এবং কীভাবে তাদের অববাহিকা গঠিত—এসব পর্যবেক্ষণযোগ্য। ফলে বর্ণনাটির এই অংশ ধর্মীয় বিশ্বাসের নিরাপদ অদৃশ্য অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না; বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে সংঘর্ষ বা সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা সম্ভব হয়ে যায়।
এই কারণেই প্রবন্ধটির পদ্ধতি হবে তুলনামূলক ও প্রমাণনির্ভর। প্রথমে দেখা হবে মানব ইতিহাসে মহাজাগতিক বৃক্ষের ধারণা কীভাবে বিভিন্ন ধর্ম ও পুরাণে উপস্থিত হয়েছে। এরপর ইসলামী উৎসে সিদরাতুল মুনতাহার নিজস্ব বর্ণনা—কোরআন, হাদিস ও পরবর্তী ব্যাখ্যা—পর্যালোচনা করা হবে। তারপর বর্ণনাগুলোর অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য, মহাজাগতিক অবস্থান, বৃক্ষের ভৌত বৈশিষ্ট্য এবং বিশেষ করে নীল ও ফোরাতের উৎসসংক্রান্ত দাবিকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও ভৌগোলিক জ্ঞানের আলোকে পরীক্ষা করা হবে। ধর্মীয় মর্যাদা কোনো দাবিকে প্রমাণের প্রশ্ন থেকে অব্যাহতি দেয় না; বরং বাস্তব জগত সম্পর্কে যত নির্দিষ্ট দাবি করা হবে, সেই দাবিকে যাচাই করার ক্ষেত্রও তত স্পষ্ট হবে।
মহাজাগতিক বৃক্ষের প্রাচীন মোটিফ
সিদরাতুল মুনতাহাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে এটি ইসলামের নিজস্ব একটি অদ্ভুত মহাজাগতিক ধারণা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও পুরাণের ইতিহাসে চোখ রাখলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। মানুষের বহু প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যে একটি বিশেষ ধরনের বৃক্ষ বারবার ফিরে এসেছে—যে বৃক্ষ সাধারণ উদ্ভিদ নয়, বরং আকাশ ও পৃথিবী, দেবলোক ও মানবজগৎ, জীবন ও অমরত্ব, অথবা মহাবিশ্বের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে। ধর্মতত্ত্ব ও পুরাণবিদ্যায় এই ধরনের কাঠামোকে প্রায়ই world tree, cosmic tree বা বিশ্ববৃক্ষের মোটিফ হিসেবে আলোচনা করা হয়।
এই মোটিফের শক্তি বোঝা কঠিন নয়। মানুষের কাছে বৃক্ষ এমন একটি জীবন্ত কাঠামো যার শিকড় নিচে অদৃশ্য জগতে প্রবেশ করে, কাণ্ড মানুষের স্তরে দাঁড়িয়ে থাকে এবং শাখা আকাশের দিকে উঠে যায়। একই সত্তার মধ্যে নিচ, মধ্য ও ঊর্ধ্ব—এই তিনটি স্তর স্বাভাবিকভাবেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ফলে মহাবিশ্বকে বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত করে কল্পনা করা সমাজগুলোর কাছে বৃক্ষ হয়ে উঠেছিল একটি প্রায় প্রস্তুত মহাজাগতিক মানচিত্র। কোথাও তার শিকড় পাতালে, কোথাও দেবলোকে; কোথাও তার পাশে অমরত্বের জল, কোথাও তার মূল থেকে ঝরনা বা নদী; কোথাও দেবতা, পাখি, সর্প বা অতিপ্রাকৃত প্রাণী সেই বৃক্ষকে ঘিরে অবস্থান করে।
| ধর্মীয়/পৌরাণিক ঐতিহ্য | বৃক্ষের মোটিফ | সংশ্লিষ্ট মহাজাগতিক বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| ইহুদি-খ্রিস্টীয় এডেন | এডেনের উদ্যানে “জীবনবৃক্ষ” | উদ্যান থেকে একটি নদী বের হয়ে চারটি ধারায় বিভক্ত হয়; চারটির একটি সরাসরি ফোরাত। অর্থাৎ পবিত্র উদ্যান, বিশেষ বৃক্ষ, চার নদী এবং বাস্তব পৃথিবীর পরিচিত নদীকে একই ধর্মীয় ভূগোলে স্থাপন করার মোটিফ ইসলামের বহু আগে থেকেই ছিল। [1] |
| ভারতীয় বৈদিক-উপনিষদীয় ঐতিহ্য | ঊর্ধ্বমূল অশ্বত্থ বৃক্ষ | কঠ উপনিষদ এবং পরে ভগবদ্গীতায় এমন এক অশ্বত্থের বর্ণনা এসেছে যার মূল উপরে এবং শাখা নিচে; বৃক্ষটি বিশ্বব্যবস্থা বা সংসারের মহাজাগতিক প্রতিরূপ। [2] |
| প্রাচীন ইরানি/জরথুস্ত্রীয় ঐতিহ্য | সমস্ত বীজের মহাজাগতিক বৃক্ষ এবং গাওকেরেনা | ইরানি মহাজাগতিক কাহিনিতে পৌরাণিক সমুদ্রের মধ্যে একটি “সব বীজের বৃক্ষ” এবং জীবনদায়ী গাওকেরেনা রয়েছে। বৃক্ষ, মহাজাগতিক জল, অমরত্ব এবং পৃথিবীর উদ্ভিদের উৎস একই কাহিনিতে যুক্ত। Encyclopaedia Iranica-র আলোচনায় এই বৃক্ষের সঙ্গে অসংখ্য জলধারা এবং বিশ্বব্যাপী বীজ ছড়িয়ে পড়ার কাহিনিও সংরক্ষিত। [3] |
| নর্স ঐতিহ্য | ইগড্রাজেল | একটি বিশাল বিশ্ববৃক্ষ বিভিন্ন মহাজাগতিক অঞ্চলকে যুক্ত করে; এর শিকড়ের কাছে অতিপ্রাকৃত ঝরনা বা কূপ, শাখায় ও শিকড়ে বিভিন্ন প্রাণী এবং এর চারপাশে দেবতাদের কার্যক্রম বর্ণিত। [4] |
| ইসলামী ঐতিহ্য | সিদরাতুল মুনতাহা | ঊর্ধ্বজগতের শেষসীমায় বিরাট সিদর বৃক্ষ; বিশাল পাতা ও ফল; ফেরেশতাদের জগত; মূলের কাছে চার নদী; দুটি জান্নাতে এবং দুটি পৃথিবীর নীল ও ফোরাত। |
এই তুলনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনো একটি গল্প আরেকটির হুবহু প্রতিলিপি কি না, সেটি নয়। বরং একই ধরনের মোটিফের সমাবেশ লক্ষ্য করা যায়: মহাজাগতিক বা পবিত্র বৃক্ষ, ঊর্ধ্ব ও নিম্ন জগতের সংযোগ, বৃক্ষের সঙ্গে জল বা নদীর সম্পর্ক, অতিপ্রাকৃত সত্তার উপস্থিতি এবং পরিচিত পৃথিবীর ভূগোলকে স্বর্গীয় ভূগোলের সঙ্গে যুক্ত করা। বিশেষভাবে জেনেসিসের কাহিনিটি গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে পবিত্র উদ্যানের মধ্যে জীবনবৃক্ষ রয়েছে এবং সেই একই উদ্যান থেকে একটি নদী বের হয়ে চার ভাগে বিভক্ত হচ্ছে, যার একটি ফোরাত। পরবর্তী ইসলামী মিরাজ-বর্ণনায় আবার ঊর্ধ্বজগতের একটি বিশেষ বৃক্ষের কাছে চার নদী পাওয়া যাচ্ছে, যার দৃশ্যমান নদীর একটি সেই একই ফোরাত। কাঠামোগত ধারাবাহিকতাটি অত্যন্ত স্পষ্ট।
প্রাচীন ইরানি ঐতিহ্যেও বৃক্ষকে শুধু উদ্ভিদ হিসেবে রাখা হয়নি। মহাজাগতিক সমুদ্রের মধ্যে “সব বীজের বৃক্ষ” থেকে পৃথিবীর উদ্ভিদজগতের বীজ ছড়িয়ে পড়ছে; তার পাশেই অমরত্বদায়ী গাওকেরেনা। অর্থাৎ পৃথিবীর জীবজগতের পরিচিত উপাদানকে আকাশীয় বা অতিপ্রাকৃত অঞ্চলে স্থাপন করে সেখান থেকে পার্থিব জগতের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করার পদ্ধতি ইসলাম-পূর্ব পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ায় সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। [5]
ভারতীয় ঐতিহ্যে আবার বৃক্ষটি বিশ্বজগতের একটি উল্টো মানচিত্রে পরিণত হয়েছে। ভগবদ্গীতায় “ঊর্ধ্বমূলমধঃশাখম”—মূল উপরে, শাখা নিচে—অশ্বত্থ বৃক্ষের কথা বলা হয়েছে। এখানে পৃথিবীর পরিচিত বৃক্ষকে বাস্তব উদ্ভিদবিদ্যার নিয়মে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা নেই; বৃক্ষের পরিচিত আকৃতি ব্যবহার করে একটি অদৃশ্য মহাজাগতিক কাঠামোকে মানুষের বোধগম্য চিত্রে রূপ দেওয়া হয়েছে। এই একই পুরাণ-নির্মাণের পদ্ধতি বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক অর্থ নিয়ে বারবার দেখা যায়।
নর্স পুরাণে এর সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ হলো ইগড্রাজেল। এটি একটি বিরাট বিশ্ববৃক্ষ, যার শাখা ও শিকড় মহাবিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলকে যুক্ত করে। দেবতা, মানুষ, দৈত্য এবং মৃতদের জগত একই বৃহত্তর মহাজাগতিক বিন্যাসের অংশ। এর বিভিন্ন শিকড়ের কাছে কূপ বা ঝরনার কাহিনি রয়েছে; বৃক্ষের ওপর ও নিচে অতিপ্রাকৃত প্রাণী বাস করে এবং দেবতাদের কর্মকাণ্ডও এর সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ বৃক্ষ এখানে শুধু একটি পবিত্র বস্তু নয়—এটি মহাবিশ্বের স্থাপত্য।


নর্স বিশ্ববৃক্ষের একটি প্রচলিত চিত্রায়ন নিচে দেওয়া হলো। এ ধরনের চিত্র ঐতিহাসিক ধর্মগ্রন্থের আক্ষরিক মানচিত্র নয়; বরং বিভিন্ন জগত, শিকড়, শাখা ও মহাজাগতিক স্তরের সম্পর্ক দৃশ্যমান করার আধুনিক উপস্থাপনা।

তুলনামূলকভাবে দেখলে সিদরাতুল মুনতাহার ধর্মীয় ভূমিকা তাই মোটিফগতভাবে অস্বাভাবিক নয়। অস্বাভাবিকতা বরং তখনই তৈরি হয় যখন একটি পুরাণের নিজস্ব প্রতীককে অন্য পুরাণের প্রতীকের মতো কল্পকাহিনি না ধরে বাস্তব মহাজাগতিক ভূগোল হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ইগড্রাজেল, অশ্বত্থ বা গাওকেরেনার ক্ষেত্রে যে ধরনের পৌরাণিক ভাষা সহজে শনাক্ত করা যায়—বিশাল বৃক্ষ, মহাজাগতিক স্তর, অলৌকিক জল ও অতিপ্রাকৃত প্রাণী—একই ধরনের উপাদান ইসলামী বর্ণনায় প্রবেশ করলেই তার সাহিত্যিক প্রকৃতি বদলে যায় না।
আরব ও নিকটপ্রাচ্যে পবিত্র বৃক্ষ
সিদরাতুল মুনতাহার ক্ষেত্রে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, পবিত্র বৃক্ষের ধারণা মুহাম্মদের সময়কার আরবদের কাছেও অপরিচিত ছিল না। ইসলামী উৎসই এমন একটি জাহেলি আরব বৃক্ষের কথা সংরক্ষণ করেছে যার নাম ছিল যাতু আনওয়াত। আবু ওয়াকিদ আল-লাইসির বর্ণনায় মুশরিকদের একটি সিদর বা কুলজাতীয় বৃক্ষ ছিল; তারা তার কাছে অবস্থান করত এবং নিজেদের অস্ত্র সেই বৃক্ষে ঝুলিয়ে রাখত। হুনাইনের পথে সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী কয়েকজন মুসলিম একটি সিদর দেখে মুহাম্মদকে বলেন, মুশরিকদের যাতু আনওয়াতের মতো তাদের জন্যও একটি যাতু আনওয়াত নির্ধারণ করে দিতে। [6] [7]
মূল আরবি
عَن أبي واقدٍ اللَّيْثِيّ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا خَرَجَ إِلَى غَزْوَةِ حُنَيْنٍ مَرَّ بِشَجَرَةٍ لِلْمُشْرِكِينَ كَانُوا يُعَلِّقُونَ عَلَيْهَا أَسْلِحَتَهُمْ يُقَالُ لَهَا: ذَاتُ أَنْوَاطٍ. فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ اجْعَلْ لَنَا ذَاتَ أَنْوَاطٍ كَمَا لَهُمْ ذَاتُ أَنْوَاطٍ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «سُبْحَانَ اللَّهِ هَذَا كَمَا قَالَ قَوْمُ مُوسَى (اجْعَل لنا إِلَهًا كَمَا لَهُم آلهةٌ) وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَتَرْكَبُنَّ سُنَنَ مَنْ كَانَ قبلكُمْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
تحقيق الشيخ ناصر الدين الألباني: صحيح
تحقيق الشيخ زبیر العلیزي الباكستاني: * إسنادہ صحیح، رواہ الترمذي (2180 وقال: حسن صحیح)
বাংলা অনুবাদ
৫৪০৮-[৩০] আবূ ওয়াক্বিদ আল লায়সী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত। যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) হুনায়নের যুদ্ধে বের হলেন, তখন তিনি মুশরিকদের এমন এক গাছের নিকট দিয়ে গমন করলেন, যাতে তারা নিজেদের অস্ত্রসমূহ ঝুলিয়ে রাখত। উক্ত গাছটিকে ’যাতু আনওয়াত’ বলা হত। এটা দেখে কোন কোন নতুন মুসলিমরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! ঐ সমস্ত মুশরিকদের মতো আমাদের জন্যও একটি ’যাতু আনওয়াত’ ধার্য করে দিন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) (বিস্ময় প্রকাশে) বললেন, ’সুবহা-নাল্ল-হ মূসা (আঃ)-এর সম্প্রদায়ও তাকে বলেছিল, “…(হে। মুসা!) আমাদের জন্য এরূপ উপাস্য নির্ধারণ করে দিন যেরূপ ঐ কাফির সম্প্রদায়ের উপাস্য রয়েছে…”(সূরাহ আল আ’রাফ ৭: ১৩৮)। তোমরাও তো সেরূপ কথা বললে, সেই মহান সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! নিশ্চয় তোমরা ঐ সকল লোকদের পথ অনুকরণ করে চলবে, যারা তোমাদের আগে অতীত হয়ে গেছে। (তিরমিযী)
এই তথ্যটির গুরুত্ব বিশেষ। এখানে সাধারণ “গাছপূজা পৃথিবীর বহু জায়গায় ছিল” ধরনের দূরবর্তী তুলনা নয়। ইসলাম আবির্ভাবের ঠিক আগের আরব ধর্মীয় পরিবেশেই সিদর বৃক্ষকে কেন্দ্র করে পবিত্র স্থান, আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং বস্তু ঝুলিয়ে রাখার রীতি উপস্থিত ছিল। পরে ইসলামী মহাজাগতিক বর্ণনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৃক্ষটিও একই আরবি নামের উদ্ভিদ—সিদর। পার্থিব পবিত্র সিদর থেকে মহাজাগতিক সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত ধর্মতাত্ত্বিক অর্থ পাল্টেছে, কিন্তু পবিত্র বৃক্ষ হিসেবে সিদরের সাংস্কৃতিক পরিচিতি নতুন করে সৃষ্টি করতে হয়নি।
আরবের প্রধান দেবীদের অন্যতম আল-উযযা-র উপাসনার সঙ্গেও বৃক্ষের সরাসরি সম্পর্ক সংরক্ষিত আছে। ইসলামি ঐতিহ্যে নাখলা অঞ্চলে আল-উযযার স্থানকে তিনটি সামুরা বৃক্ষের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; মক্কা বিজয়ের পর খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে সেখানে পাঠিয়ে সেই বৃক্ষগুলো কাটার বর্ণনাও পাওয়া যায়। কুরতুবির তাফসির এবং পরবর্তী ইসলামি গ্রন্থে আল-উযযার মন্দির ও তিন বৃক্ষের সম্পর্ক স্পষ্টভাবে বর্ণিত। [8] [9]
অর্থাৎ সপ্তম শতকের আরব সমাজে বৃক্ষ কেবল ছায়া, ফল বা কাঠের উৎস ছিল না; নির্দিষ্ট বৃক্ষ ধর্মীয় পবিত্রতা, উপাসনা, বরকত এবং দেবতার উপস্থিতির স্থানও হতে পারত। যাতু আনওয়াতের সিদর, আল-উযযার বৃক্ষ এবং অন্যান্য পবিত্র স্থান দেখায় যে একটি বিশেষ গাছকে অতিপ্রাকৃত তাৎপর্যের কেন্দ্র বানানোর সাংস্কৃতিক ভাষা আরবে আগে থেকেই কার্যকর ছিল। ইসলামী ধর্মতত্ত্ব পুরনো দেবতাদের বাতিল করেছে, কিন্তু বৃক্ষকে অতিপ্রাকৃত ভূগোলের বাহক হিসেবে ব্যবহারের ধারণা অদৃশ্য হয়নি; সিদর এবার পৃথিবীর কোনো স্থানীয় পূজাস্থলে নয়, মহাবিশ্বের সর্বোচ্চ সীমান্তে স্থান পেয়েছে।
এর সঙ্গে আরেকটি আরও পুরনো নিকটপ্রাচ্য মোটিফ যুক্ত হয়—পবিত্র উদ্যান, বিশেষ বৃক্ষ এবং চার নদী। জেনেসিসের এডেন-কাহিনিতে জীবনবৃক্ষ ও জ্ঞানবৃক্ষ উদ্যানের মধ্যে অবস্থান করছে; এডেন থেকে একটি নদী বের হয়ে চারটি প্রধান ধারায় বিভক্ত হচ্ছে এবং তার একটি হলো ফোরাত। ইসলাম আবির্ভাবের বহু শতাব্দী আগে ইহুদি ও খ্রিস্টীয় ধর্মীয় জগতে এই কাহিনি সুপরিচিত ছিল। [10]
ইসলামী মিরাজ-বর্ণনায় মোটিফগুলো নতুন বিন্যাসে আবার একত্রিত হয়: জান্নাতের নিকটবর্তী বিশেষ বৃক্ষ; তার কাছে চার নদী; দুটি অদৃশ্য বা জান্নাতি এবং দুটি দৃশ্যমান পার্থিব নদী; আর দৃশ্যমান নদীর একটি আবার ফোরাত। জেনেসিসে নদী চারটি সরাসরি জীবনবৃক্ষের মূল থেকে বের হয়েছে বলা নেই—নদীটি এডেন থেকে প্রবাহিত—কিন্তু ধর্মীয় ভূগোলের উপাদানগুলোর সমাবেশ লক্ষণীয়: স্বর্গীয় স্থান + বিশেষ বৃক্ষ + চার নদী + ফোরাত। ইসলামী কাহিনি এই পরিচিত নিকটপ্রাচ্য মোটিফসমষ্টিকে মিরাজ, সাত আসমান এবং সিদরাতুল মুনতাহার কাঠামোর মধ্যে পুনর্বিন্যাস করেছে।
এই ধরনের মোটিফ আরবে পৌঁছানোর জন্য কোনো সাংস্কৃতিক শূন্যতা ছিল না। ইসলাম-পূর্ব আরব ছিল বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়; উত্তর-পশ্চিম আরব ও ইয়েমেনে ইহুদি জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি ঐতিহাসিকভাবে নথিবদ্ধ, দক্ষিণ আরবে খ্রিস্টধর্ম ও ইহুদিধর্ম উভয়ের শক্তিশালী উপস্থিতি ছিল, এবং আরব উপদ্বীপ রোমান, সাসানীয়, সিরীয়, ইথিওপীয় ও মেসোপটেমীয় জগতের বাণিজ্যিক ও ধর্মীয় যোগাযোগের মধ্যে অবস্থান করত। আধুনিক Late Antique Arabia গবেষণাতেও হিজাজের ধর্মীয় পরিবেশকে ইহুদি, খ্রিস্টীয়, স্থানীয় আরব ও অন্যান্য নিকটপ্রাচ্য ধারার পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্র হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়। [11] [12]
ফলে সিদরাতুল মুনতাহার কাহিনিকে এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশে পাওয়া যায় যেখানে এর প্রধান উপাদানগুলোর কোনোটিই অপরিচিত ছিল না। আরবে সিদরসহ পবিত্র বৃক্ষ ছিল; আল-উযযার মতো দেবতার উপাসনা বৃক্ষের সঙ্গে যুক্ত ছিল; ইহুদি-খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যে পবিত্র উদ্যান, জীবনবৃক্ষ, চার নদী ও ফোরাতের কাহিনি ছিল; ইরানি ধর্মীয় ভূগোলে মহাজাগতিক বৃক্ষ ও মহাজাগতিক জল ছিল; আরও দূরের সংস্কৃতিতে বিশ্ববৃক্ষ বিভিন্ন জগতকে যুক্ত করত। ইসলামী বর্ণনার স্বাতন্ত্র্য মূলত এই পুরনো উপাদানগুলোর নতুন ধর্মতাত্ত্বিক বিন্যাসে—সাত আসমানের ঊর্ধ্বযাত্রা, মুহাম্মদের মিরাজ এবং “শেষসীমার সিদর”কে কেন্দ্র করে এগুলোকে একটি একক ইসলামী মহাজাগতিক কাহিনিতে সংগঠিত করা হয়েছে।
সিদরাতুল মুনতাহা কী?
“সিদরাতুল মুনতাহা” নামটির মধ্যেই ইসলামী মহাজাগতিক ধারণাটির মূল কাঠামো ধরা আছে। সিদরাহ অর্থ সিদর বা কুলজাতীয় বৃক্ষ, আর মুনতাহা অর্থ শেষসীমা, চূড়ান্ত প্রান্ত বা যেখানে কোনো কিছুর গতি এসে শেষ হয়। ফলে এটি সাধারণ কোনো জান্নাতি বৃক্ষ নয়; ইসলামী ব্যাখ্যায় এটি সৃষ্ট জগতের একটি মহাজাগতিক সীমাচিহ্ন। কোথাও বলা হয়েছে নিচ থেকে যা ঊর্ধ্বে যায় তা এখানে এসে শেষ হয়, ওপর থেকে যা নামে তা-ও এখানে পৌঁছে হস্তান্তরিত হয়; কোথাও নবী ও ফেরেশতাদের জ্ঞানের শেষসীমা; কোথাও সৃষ্টির জ্ঞানের চূড়ান্ত সীমানা। অর্থাৎ একটি পরিচিত আরবীয় বৃক্ষকে এখানে মহাবিশ্বের প্রশাসনিক ও জ্ঞানগত সীমান্তে বসানো হয়েছে। [13]
এই ধারণার পূর্ণাঙ্গ রূপ কোরআন একা দেয় না। কোরআনে সিদরাতুল মুনতাহার নাম, তার নিকটে জান্নাতুল মাওয়ার অবস্থান এবং সেটিকে কিছু একটার দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার কথা এসেছে। কিন্তু পরবর্তী হাদিস ও তাফসিরে বৃক্ষটির চারপাশে এক বিশাল মহাজাগতিক ভূগোল নির্মিত হয়েছে: এর ফল হিজর অঞ্চলের বিশাল কলসের মতো, পাতা হাতির কানের মতো, ফেরেশতারা একে আচ্ছন্ন করে, সোনালি পতঙ্গ বা বিস্ময়কর আলো তাকে ঢেকে ফেলে, এর সঙ্গে চার নদীর সম্পর্ক স্থাপন করা হয়, এবং কোথাও এর অবস্থান ষষ্ঠ আসমান আবার কোথাও সপ্তম আসমানের ওপরে বর্ণিত হয়। এভাবেই কোরআনের কয়েকটি সংক্ষিপ্ত বাক্য পরবর্তী বর্ণনা-ঐতিহ্যে একটি বিস্তারিত পৌরাণিক মহাবিশ্বে বিস্তৃত হয়েছে।
ইবনে কাসীরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-র বর্ণনাটি এই পরবর্তী বিকাশের একটি পরিষ্কার উদাহরণ। সেখানে সাত আসমান অতিক্রম, বিভিন্ন নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ, বায়তুল মামুর, কলমের লেখার শব্দ, সিদরাতুল মুনতাহার বিশাল পাতা ও ফল, ফেরেশতা, সোনার পতঙ্গ, আল্লাহর জ্যোতি এবং ছয়শ ডানাবিশিষ্ট জিবরাইল—সবকিছু একই মহাজাগতিক দৃশ্যের মধ্যে যুক্ত হয়েছে। [14]
মোদ্দাকথা, বায়তুল মুকাদ্দাসের কাজকর্ম শেষ করার পর তাঁর জন্যে ঊর্ধ্বারোহণের বাহন প্রস্তুত করা হয়। এটি ছিল একটি সিঁড়ি বিশেষ। সেটিতে চড়ে তিনি আকাশে উঠলেন। এ সময়ে তিনি বুরাকে আরোহণ করেননি। অবশ্য কেউ কেউ মনে করেন যে, এ সময়ে তিনি বুরাকে আরোহণ করেছিলেন। বুরাকটি বরং তখন বায়তুল মুকাদ্দাসের দরজায় বাঁধা ছিল ভ্রমণ শেষে মক্কায় ফিরে আসার জন্যে। মি’রাজে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এক আকাশ ছেড়ে অপর আকাশ এরপর পরবর্তী আকাশ অতিক্রম করে পর্যায়ক্রমে সপ্তম আকাশ অতিক্রম করলেন। প্রত্যেক আকাশে সেখানকার নেতৃস্থানীয় ও বড় বড় ফেরেশতাগণ এবং নবী-রাসূলগণ তাঁর সাথে সাক্ষাত করেন এবং তাঁকে অভিনন্দন জানান। যে সকল নবী-রাসূলের সাথে তাঁর সাক্ষাত ঘটেছিল। তিনি তাদের নামও উল্লেখ করেছেন। যেমন প্রথম আকাশে হযরত আদম (আ), দ্বিতীয় আকাশে ইয়াহয়া ও ঈসা (আ), ১ চতুর্থ আকাশে ইদরীস (‘আ) এবং ষষ্ঠ আকাশে মূসা (আ)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়েছে বলে বিশুদ্ধ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। আরো বর্ণিত আছে যে, সপ্তম আকাশে সাক্ষাত হয়েছে ইবরাহীম (আ)-এর সাথে। তিনি সেখানে বায়তুল মা’মূরের সাথে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। বায়তুল মামুরে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করেন। তাঁরা সেখানে নামায আদায় ও তাওয়াফ ইত্যাদি ইবাদত করে থাকেন। এরপর বেরিয়ে যান। কিয়ামত পর্যন্ত ওই ফেরেশতাগণ দ্বিতীয়বার বায়তুল মা’মূরে আসবেন না। এরপর তিনি নবীদের অবস্থান-স্থল অতিক্রম করেন। তিনি এমন এক সমতল স্থানে গিয়ে পৌঁছেন, যেখান থেকে কলমের লেখন-শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে তাঁর নিকট সিদরাতুল মুন্তাহা (সীমান্তের কুলবৃক্ষ) উপস্থিত করা হয়। সেটির পাতাগুলো হাতির কানের মত এবং ফলগুলো হিজর অঞ্চলের কলসীর মত। তখন একাধিক উজ্জ্বল রংয়ের বিশেষ বস্তুসমূহ ওই কুল বৃক্ষকে আচ্ছাদিত করে ফেলে। বৃক্ষে ছড়ানো পক্ষীকুলের ন্যায় ফেরেশতাগণ ওই বৃক্ষে আরোহণ করে। স্বর্ণের পতঙ্গগুলো বৃক্ষটিতে উড়াউড়ি করতে থাকে। আল্লাহ্ তা’আলার জ্যোতিতে ওই বৃক্ষ আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে। প্রিয়নবী (সা) তখন হযরত জিবরাঈল (আ)-কে তাঁর নিজস্ব অবয়বে দেখতে পান। তাঁর ছয়শ’ পাখা। এক পাখা থেকে অপর পাখার দূরত্ব যমীন থেকে আসমানের দূরত্বের সমান। এ প্রসংঙ্গে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

এই বর্ণনাটি লক্ষ্য করলে সিদরাতুল মুনতাহার সাহিত্যিক প্রকৃতিও স্পষ্ট হয়। পৃথিবীর পরিচিত একটি গাছকে অস্বাভাবিক আকারে বড় করা হয়েছে; তার পাতাকে হাতির কান এবং ফলকে বিশাল কলস দিয়ে বোঝানো হয়েছে; তারপর সেটিকে ফেরেশতা, আলো, স্বর্গ, ঊর্ধ্বজগৎ এবং মহাজাগতিক সীমার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এটি সেই একই পৌরাণিক নির্মাণপদ্ধতি যেখানে অজানা মহাবিশ্বকে পরিচিত পৃথিবীর বস্তু দিয়ে দৃশ্যমান করা হয়। পার্থক্য কেবল এই যে এখানে ব্যবহৃত পরিচিত বস্তুটি আরবদের পরিচিত সিদর বৃক্ষ।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো এর অবস্থান নিয়েও ইসলামী বর্ণনা এক নয়। বর্তমান লেখায় উদ্ধৃত সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এটি ষষ্ঠ আসমানে; আবার আনাসের মিরাজ-বর্ণনায় সপ্তম আসমানের পরে সিদরাতুল মুনতাহার কাছে পৌঁছানোর কথা এসেছে। নববীর ভাষ্যেই এই ভিন্নতা স্বীকার করা হয়েছে এবং সমাধান হিসেবে বলা হয়েছে—বৃক্ষটির গোড়া ষষ্ঠ আসমানে, কিন্তু ডালপালা সপ্তম আসমানের ওপরে বিস্তৃত। অর্থাৎ সরাসরি দুই বর্ণনায় পাওয়া ভিন্ন মহাজাগতিক অবস্থানকে পরে একটি বিশাল বৃক্ষের গোড়া ও শাখার তত্ত্ব দিয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। এটি মূল বর্ণনার তথ্য নয়; দুটি আলাদা বর্ণনাকে এক মানচিত্রে বসানোর পরবর্তী ব্যাখ্যা।
কোরআনে কাকে দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল?
সিদরাতুল মুনতাহা নিয়ে কোরআনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা শুধু বৃক্ষটি নয়; বরং সেখানে মুহাম্মদ কাকে দেখেছিলেন। সূরা আন-নাজম ১১–১৮-এর ধারাবাহিকতায় বলা হয়েছে: তাঁর অন্তর যা দেখেছে তা মিথ্যা বলেনি; মানুষ কেন তিনি যা দেখেছেন তা নিয়ে বিতর্ক করবে; “আর নিশ্চয়ই তিনি তাকে আরেকবার দেখেছিলেন, সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে”; এরপর বলা হয়েছে তাঁর দৃষ্টি বিচ্যুত হয়নি এবং তিনি তাঁর রবের বড় বড় নিদর্শন দেখেছেন। কোরআনের মূল বাক্যে ১৩ নম্বর আয়াতে শুধু “রাআহু”—“তাকে দেখেছিল” বলা হয়েছে। “তাকে” বলতে জিবরাইল, না আল্লাহ—নামটি সেখানে লেখা নেই। এই সর্বনামের পরিচয় নিয়েই প্রাচীন ইসলামী তাফসিরে দুটি বিপরীত ধারা তৈরি হয়েছে।
কোরআন 53:10-16 – আন-নাজম
রাওয়াই আল-বায়ান
অতঃপর তিনি তাঁর বান্দার প্রতি যা ওহী করার তা ওহী করলেন।
সে যা দেখেছে, অন্তকরণ সে সম্পর্কে মিথ্যা বলেনি।
সে যা দেখেছে, সে সম্পর্কে তোমরা কি তার সাথে বিতর্ক করবে?
আর সে তো তাকে* আরেকবার** দেখেছিল। * জিবরীলকে।
সিদরাতুল মুনতাহার* নিকট। * সিদরাতুল মুনতাহা হল সপ্তম আকাশে আরশের ডান দিকে একটি কুল জাতীয় বৃক্ষ, সকল সৃষ্টির জ্ঞানের সীমার শেষ প্রান্ত। তারপর কি আছে, একমাত্র আল্লাহই জানেন।
যার কাছে জান্নাতুল মা’ওয়া* অবস্থিত। * ফেরেশতা, শহীদদের রূহ ও মুত্তাকীদের অবস্থানস্থল।
যখন কুল গাছটিকে যা আচ্ছাদিত করার তা আচ্ছাদিত করেছিল।
বর্তমানে প্রচলিত সুন্নি ব্যাখ্যার একটি শক্তিশালী ধারা বলে, এখানে মুহাম্মদ দ্বিতীয়বার জিবরাইলকে তাঁর আসল আকৃতিতে দেখেছিলেন। আয়িশা, ইবন মাসউদ, আবু হুরায়রা প্রমুখের নামে এই ব্যাখ্যা সংরক্ষিত হয়েছে। সংশয়ের সংরক্ষিত আবু বকর যাকারিয়ার তাফসিরেও বলা হয়েছে, “আর অবশ্যই তিনি তাকে আরেকবার দেখেছিলেন”—এর অর্থ মুহাম্মদ সিদরাতুল মুনতাহার কাছে জিবরাইলকে দ্বিতীয়বার তাঁর প্রকৃত আকৃতিতে দেখেছেন। [15]
কিন্তু এটি ইসলামী ঐতিহ্যের একমাত্র ব্যাখ্যা নয়। কুরতুবি একই আয়াতের ব্যাখ্যায় সরাসরি ইবন আব্বাসের মত উদ্ধৃত করেছেন: “মুহাম্মদ তাঁর রবকে আরেকবার তাঁর অন্তর দিয়ে দেখেছিলেন।” কুরতুবি এরপর মুসলিমের সূত্রে ইবন আব্বাসের বক্তব্য আনেন—“তিনি তাঁকে তাঁর অন্তর দিয়ে দুইবার দেখেছেন।” একই জায়গায় তিনি আবার ইবন মাসউদ ও আবু হুরায়রার বিপরীত মতও উল্লেখ করেন যে, আয়াতটির “তাকে” বলতে জিবরাইল বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ একই ধ্রুপদি সুন্নি তাফসিরেই দুই ব্যাখ্যা পাশাপাশি সংরক্ষিত: ইবন আব্বাসের ধারায় আল্লাহ, ইবন মাসউদ–আবু হুরায়রার ধারায় জিবরাইল। [16]
আদ-দুররুল মানসূর-এ এই দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট। সেখানে মুসলিম, আহমদ, তাবারানি, বায়হাকি প্রমুখের সূত্রে ইবন আব্বাসের বক্তব্য এসেছে: “মুহাম্মদ তাঁর রবকে অন্তর দিয়ে দুইবার দেখেছেন।” আরও একটি বর্ণনায় ইবন আব্বাস সরাসরি ৫৩:১৩ সম্পর্কে বলেন: “নবী তাঁর মহান রবকে দেখেছেন।” অন্য বর্ণনায় তাঁর নামে এসেছে—একবার চোখ দিয়ে এবং একবার অন্তর দিয়ে। একই সংকলনে আবার আবু হুরায়রা ও ইবন মাসউদের সূত্রে বলা হয়েছে, সেখানে দেখা হয়েছিল জিবরাইলকে। [17] [18]
এখানে আয়িশার অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁর কাছে মুহাম্মদ আল্লাহকে চোখে দেখেছেন বলা গুরুতর ভুল; তিনি “তিনি তাকে স্পষ্ট দিগন্তে দেখেছেন” এবং “তিনি তাকে আরেকবার দেখেছেন”—এই আয়াতগুলোকেই জিবরাইলের দর্শন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। পরবর্তী বহু সুন্নি তাফসির এই আয়িশা–ইবন মাসউদ ধারাটিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। অন্যদিকে ইবন আব্বাসের ধারায় মুহাম্মদের আল্লাহ-দর্শন অক্ষুণ্ণ থেকেছে—কখনো হৃদয়ের দর্শন, কখনো চোখের দর্শন হিসেবে। ফলে “কোরআন স্পষ্টভাবেই জিবরাইলকে বোঝাচ্ছে”—এমন দাবি ইসলামী তাফসিরের নিজের ইতিহাসের সঙ্গেই মেলে না।
বরং সূরা আন-নাজমের ভাষাটি নিজের ভেতর থেকে পড়লে আল্লাহকে বোঝার পক্ষে একটি শক্তিশালী পাঠগত যুক্তি রয়েছে। ১০ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে: “অতঃপর তিনি তাঁর বান্দার প্রতি যা ওহি করার তা ওহি করলেন”—কোরআনিক ভাষায় “তাঁর বান্দা” স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহর বান্দা মুহাম্মদ, এবং ওহিদাতাও আল্লাহ। এরপর ১১ নম্বর আয়াতে সঙ্গে সঙ্গে আসে, “অন্তর মিথ্যা বলেনি যা সে দেখেছে”; ১২ নম্বরে সেই দর্শন নিয়ে বিতর্ক; তারপর ১৩ নম্বরে “সে তাকে আরেকবার দেখেছিল।” এই ধারাবাহিকতায় ওহিদাতা আল্লাহ থেকে হঠাৎ করে কোনো নাম উল্লেখ না করে “তাকে” জিবরাইল বানাতে হলে পাঠকের ওপর একটি নতুন antecedent চাপাতে হয়। ইবন আব্বাসের আল্লাহ-পাঠ সেই সমস্যা তৈরি করে না; ১০ নম্বর আয়াতের ঈশ্বরীয় উপস্থিতি থেকে দর্শনের বিষয় একই ধারায় এগোয়।
জিবরাইল-পাঠের আরেকটি সমস্যা আরও স্পষ্ট। মিরাজের হাদিসগুলোতে জিবরাইল মুহাম্মদের সফরসঙ্গী: তিনি মক্কা থেকে তাঁকে নিয়ে যান, এক আসমান থেকে আরেক আসমানে প্রবেশ করান, নবীদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং শেষ পর্যন্ত সিদরাতুল মুনতাহার কাছেও সঙ্গে থাকেন। সেই কাহিনির মাঝখানে “মুহাম্মদ জিবরাইলকে আবার দেখলেন”—বাক্যটি নিজে বিশেষ কোনো তথ্য দেয় না, কারণ তিনি তো সফরজুড়েই জিবরাইলের সঙ্গে আছেন। এই অসুবিধা দূর করতে তাফসিরে বাড়তি শর্ত যোগ হয়: এখানে সাধারণভাবে দেখা নয়, জিবরাইলকে তাঁর “আসল আকৃতিতে” দ্বিতীয়বার দেখা বোঝানো হয়েছে। কিন্তু সূরা আন-নাজম ১৩ নম্বর আয়াত নিজে “আসল আকৃতি” বলে না; আয়াতটি শুধু বলে, “তিনি তাকে আরেকবার দেখেছিলেন।” “আসল আকৃতিতে” অংশটি বাইরের হাদিসি ব্যাখ্যার মাধ্যমে বাক্যের মধ্যে প্রবেশ করে।
অন্যদিকে আল্লাহ-পাঠে “দ্বিতীয়বার দেখা” নিজেই একটি অর্থপূর্ণ ঘটনা। ইবন আব্বাসের সংরক্ষিত ব্যাখ্যায় মুহাম্মদ তাঁর রবকে দুইবার দেখেছেন; ৫৩:১১ এবং ৫৩:১৩ সেই দুই দর্শনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কুরতুবিও এই মতটি সরাসরি সংরক্ষণ করেছেন। এমনকি সূরার আগের অংশের “তারপর তিনি নিকটবর্তী হলেন এবং আরও নিকটে এলেন, ফলে দুই ধনুকের ব্যবধান বা তারও কম হলো” আয়াত সম্পর্কেও ইসলামী তাফসিরে আল্লাহ ও জিবরাইল—দুই ব্যাখ্যা আছে। বাগাভি সংরক্ষণ করেছেন যে একদল বলেছেন, এখানে আল্লাহ মুহাম্মদের নিকটবর্তী হয়েছেন; ইবন আব্বাসের একটি বর্ণনাতেও একই অর্থ পাওয়া যায়। আবার অন্যরা এটিকে জিবরাইলের নিকটবর্তী হওয়া বলেছেন। [19]
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সহিহ বুখারির একটি মিরাজ-বর্ণনার ভাষ্য নিয়ে পরবর্তী ইসলামি গ্রন্থে এমন পাঠও সংরক্ষিত হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে: “মহাপরাক্রমশালী রব নিকটবর্তী হলেন এবং আরও নিকটবর্তী হলেন, যতক্ষণ না দুই ধনুকের ব্যবধান বা তারও কম হলো।” কাজি ইয়াদের আশ-শিফা এই ধারার বর্ণনা ও ইবন আব্বাসের মত সংরক্ষণ করেছে। অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য এবং আল্লাহ-দর্শনের পাঠ কোনো আধুনিক সমালোচকের তৈরি বিকল্প নয়; ইসলামি ব্যাখ্যার পুরনো ও স্বীকৃত ধারার অংশ। [20]
ফলে সূরা আন-নাজমের এই অংশের পাঠগত পরিস্থিতি দাঁড়ায় এমন: জিবরাইল-পাঠটি পরবর্তী সুন্নি তাফসিরে শক্তিশালী ও বহুল প্রচলিত; কিন্তু আল্লাহ-পাঠটি একইভাবে প্রাচীন ইসলামি উৎসে প্রতিষ্ঠিত, বিশেষভাবে ইবন আব্বাসের নামে। আর কোরআনের বাক্যগুলোকে কেবল নিজেদের ধারাবাহিকতায় পড়লে আল্লাহ-পাঠের একটি বিশেষ শক্তি রয়েছে—ওহিদাতা আল্লাহ, তাঁর বান্দা মুহাম্মদ, তারপর মুহাম্মদের দর্শন, তারপর “তাকে আরেকবার দেখা”; অন্যদিকে জিবরাইল-পাঠে ১৩ নম্বর আয়াতকে অর্থপূর্ণ করতে “তাঁর আসল আকৃতিতে” কথাটি বাইরে থেকে যোগ করতে হয়। এই কারণে পাঠগত সংহতি ও বর্ণনার নাটকীয় চূড়ান্ততার বিচারে সিদরাতুল মুনতাহার কাছে দ্বিতীয়বার যাকে দেখা হয়েছিল তাকে আল্লাহ হিসেবে বোঝা অধিক স্বাভাবিক পাঠ।
আর এই দ্বন্দ্ব নিজেই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের অন্যতম কেন্দ্রীয় অলৌকিক ঘটনার চূড়ান্ত মুহূর্তে মুহাম্মদ কাকে দেখেছিলেন—জিবরাইল, না আল্লাহ—এই প্রশ্নে সাহাবী ও তাফসিরকারদের একক স্মৃতি নেই। একদিকে আয়িশা ও ইবন মাসউদের ধারা, অন্যদিকে ইবন আব্বাসের ধারা। পরে একটি ব্যাখ্যা প্রভাবশালী হয়েছে; কিন্তু প্রভাবশালী হওয়া আর কোরআনের একমাত্র সম্ভাব্য অর্থ হওয়া এক বিষয় নয়। ইসলামী উৎসগুলো নিজেরাই সেই অনিশ্চয়তা সংরক্ষণ করে রেখেছে।
বৃক্ষটি আসলে কী ধরনের সত্তা?
সিদরাতুল মুনতাহাকে ঘিরে একটি মৌলিক শ্রেণিগত সমস্যা রয়েছে। ইসলামী বর্ণনা একে নিছক আলো, শক্তি বা বিমূর্ত প্রতীক বলেনি; একে বলা হয়েছে সিদর—এক ধরনের বৃক্ষ। তারপর সেই পরিচয় আরও নির্দিষ্ট করা হয়েছে: এর পাতা আছে, ফল আছে, মূল আছে, ছায়া আছে, এমনকি এর মূলের সঙ্গে নদীর সম্পর্কও রয়েছে। অর্থাৎ বর্ণনার ভাষা ধারাবাহিকভাবে এমন বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করছে যেগুলো আমরা জীবন্ত উদ্ভিদের ক্ষেত্রে বুঝি। একই সঙ্গে এই বৃক্ষকে পৃথিবীর পরিচিত জীবমণ্ডলের বাইরে, ঊর্ধ্বজগতের সর্বশেষ সীমান্তে স্থাপন করা হয়েছে। ফলে কাহিনিটি পরিচিত জৈবিক সত্তার ভাষা ব্যবহার করে এমন একটি বস্তুর কথা বলছে, যার পরিবেশ, কার্যপদ্ধতি ও অস্তিত্বের কোনো স্বাধীন পর্যবেক্ষণ নেই।
বাস্তব বৃক্ষ একটি জৈবিক ব্যবস্থা। তার কোষীয় বিপাক চলে, শক্তির উৎস প্রয়োজন হয়, পানি ও পুষ্টি গ্রহণ করতে হয়, গ্যাস বিনিময় ঘটে এবং পরিবেশের সঙ্গে পদার্থ ও শক্তির আদান-প্রদান করতে হয়। মাটি নিজে অপরিহার্য নয়—হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে উদ্ভিদ জন্মানো যায়—কিন্তু পানি, প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান, শক্তি এবং উপযোগী ভৌত পরিবেশ ছাড়া পরিচিত কোনো বৃক্ষের অস্তিত্ব নেই। সিদরাতুল মুনতাহার বর্ণনায় কিন্তু এমন কোনো ভিন্ন জীবরসায়ন বা প্রাকৃতিক ব্যবস্থা দেওয়া হয়নি; বরং পৃথিবীর গাছের পরিচিত শব্দভাণ্ডার—মূল, পাতা, ফল, ছায়া—হুবহু বজায় রেখে সেটিকে মহাজাগতিক মাত্রায় বিস্তৃত করা হয়েছে।
এর আকার সম্পর্কিত পরবর্তী ইসলামি বর্ণনাগুলো এই পৌরাণিক মাত্রাকে আরও বাড়িয়েছে। আদ-দুররুল মানসূর-এ আসমা বিনতে আবু বকরের সূত্রে এমন বর্ণনা সংরক্ষিত আছে যে, একজন আরোহী সিদরাতুল মুনতাহার ডালপালার ছায়ায় একশ বছর চলতে পারে; তার ফল বড় কলসের মতো এবং সেখানে স্বর্ণের পতঙ্গ রয়েছে। একই তাফসিরে কা‘বের নামে একে আরশের মূলদেশে অবস্থিত এমন বৃক্ষ বলা হয়েছে, যেখানে নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা ও নবীদের জ্ঞান গিয়ে শেষ হয়। [21]
এখানে “বৃক্ষ” শব্দটি কেবল নামমাত্র নয়। যত বেশি ব্যাখ্যা যোগ হয়েছে, তত বেশি পৃথিবীর পরিচিত বৃক্ষের বৈশিষ্ট্যই বিশাল আকারে পুনরুৎপাদিত হয়েছে। ফলকে কলস দিয়ে মাপা হচ্ছে, পাতাকে হাতির কান দিয়ে বোঝানো হচ্ছে, ছায়ার বিস্তার আরোহীর শত বছরের যাত্রা দিয়ে নির্ধারণ করা হচ্ছে। এগুলো কোনো বিমূর্ত দর্শনের ভাষা নয়; এগুলো আকার, দূরত্ব ও বস্তুগত বৈশিষ্ট্যের ভাষা। পুরাণে এই পদ্ধতি অত্যন্ত পরিচিত: অজানা জগতকে এমনভাবে বড় করা হয় যাতে শ্রোতা পরিচিত পৃথিবীর বস্তু দিয়ে তার মহিমা কল্পনা করতে পারে।
এখান থেকে দুটি সম্ভাবনা দাঁড়ায়। যদি সিদরাতুল মুনতাহা বাস্তব অর্থেই বৃক্ষ হয়, তাহলে এর বাস্তব অস্তিত্ব, গঠন, পরিবেশ এবং পৃথিবীর সঙ্গে কথিত ভৌত সম্পর্ক প্রমাণের বিষয়। আর যদি বলা হয় এটি এমন “অতিপ্রাকৃত বৃক্ষ” যার ক্ষেত্রে বৃক্ষ সম্পর্কে পরিচিত কোনো নিয়ম, পরিবেশ বা কারণই প্রযোজ্য নয়, তাহলে দাবিটি পরীক্ষাযোগ্য বাস্তবতার বাইরে চলে যায়। তখন “মূল”, “পাতা”, “ফল”, “নদী” প্রভৃতি শব্দ বাস্তব ব্যাখ্যার পরিবর্তে কেবল ধর্মীয় কাহিনির চিত্রকল্প হয়ে দাঁড়ায়। কোনো আপত্তির জবাবে শুধু “এটি অলৌকিক” বলা কোনো কার্যকারণ ব্যাখ্যা নয়; সেটি দাবিটিকে যাচাইয়ের বাইরে সরিয়ে নেওয়া।
এই পার্থক্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইসলামী বর্ণনা নিজেই সিদরাতুল মুনতাহাকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য জগতের মধ্যে আটকে রাখেনি। এর সঙ্গে পৃথিবীর নীল ও ফোরাতের সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ কাহিনি নিজেই এক পর্যায়ে অতিপ্রাকৃত জগত থেকে পর্যবেক্ষণযোগ্য ভূগোলে প্রবেশ করেছে। সেই মুহূর্তে আর শুধু “অলৌকিক বৃক্ষ” বললেই সমস্যা শেষ হয় না; পৃথিবীর নদীর সঙ্গে তার যে সম্পর্ক দাবি করা হয়েছে, সেটিরও প্রমাণ প্রয়োজন হয়। এই দাবিটিই পরবর্তী বিশ্লেষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
হাদিসে পূর্ণাঙ্গ মহাজাগতিক বৃক্ষ
কোরআনে সিদরাতুল মুনতাহার বর্ণনা কয়েকটি বাক্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু হাদিসে এসে এই সংক্ষিপ্ত নামটি একটি বিস্তারিত মহাজাগতিক দৃশ্যে পরিণত হয়। এখানে বৃক্ষটির অবস্থান নির্ধারণ করা হয়, পাতার আকার বলা হয়, ফলের মাপ দেওয়া হয়, এর গোড়া থেকে চারটি নদী প্রবাহিত দেখানো হয়, এবং সেই নদীর দুটিকে সরাসরি পৃথিবীর নীল ও ফোরাত হিসেবে শনাক্ত করা হয়। অর্থাৎ ইসলামী মহাজাগতিক কাহিনির সবচেয়ে নির্দিষ্ট ও পরীক্ষাযোগ্য উপাদানগুলো কোরআন থেকে নয়, হাদিসের বিস্তৃত মিরাজ-বর্ণনা থেকে এসেছে।
বর্তমান লেখায় উদ্ধৃত সহিহ মুসলিম, সহিহ বুখারি, আল-লুলু ওয়াল মারজান ও সুনান নাসাঈর বর্ণনাগুলো পাশাপাশি পড়লে কয়েকটি প্রধান দাবি পাওয়া যায়। এগুলো আলাদা করে দেখা জরুরি, কারণ দীর্ঘ মিরাজ-বর্ণনার মধ্যে ছড়িয়ে থাকায় দাবিগুলোর প্রকৃতি সহজে চোখ এড়িয়ে যায়।
| দাবি | হাদিসে বর্ণিত রূপ | বিশ্লেষণ |
|---|---|---|
| অবস্থান | এক বর্ণনায় সিদরাতুল মুনতাহা ষষ্ঠ আসমানে; আনাস-মালিক ইবনু সা‘সা‘আ ধারার বর্ণনায় সপ্তম আসমানে পৌঁছানোর পর এটি দেখা হয়। | একই মহাজাগতিক সত্তার অবস্থান সম্পর্কে সরাসরি একরূপ বর্ণনা নেই। পরে গোড়া ষষ্ঠ আসমানে এবং শাখা সপ্তমের ওপরে—এই সমন্বয় তৈরি করা হয়েছে। |
| আকার | পাতা হাতির কানের মতো; ফল হাজর অঞ্চলের বড় কলসের মতো। অন্য বর্ণনায় এর ছায়া অতিক্রম করতে আরোহীর একশ বছর লাগতে পারে। | বর্ণনাটি স্পষ্টভাবে ভৌত তুলনা ও স্থানিক মাত্রা ব্যবহার করছে। |
| মহাজাগতিক সীমা | নিচ থেকে যা উঠে আসে এবং ওপর থেকে যা নামে তা এখানে এসে পৌঁছায়; অন্য ব্যাখ্যায় সৃষ্টির জ্ঞান বা ফেরেশতা-নবীদের জ্ঞানের শেষসীমা। | বৃক্ষটি উদ্ভিদ থেকে মহাবিশ্বের প্রশাসনিক সীমান্তে রূপান্তরিত হয়েছে। |
| চার নদী | বৃক্ষের মূলের কাছে চারটি নদী; দুটি অদৃশ্য/জান্নাতি, দুটি দৃশ্যমান। | এখানে প্রাচীন পবিত্র বৃক্ষ + চার নদীর মোটিফ আবার উপস্থিত। |
| নীল ও ফোরাত | দৃশ্যমান দুটি নদীকে নীল ও ফোরাত বলা হয়েছে। | এটি আর নিছক অতিপ্রাকৃত দাবি নয়; পৃথিবীর নির্দিষ্ট ভূগোল সম্পর্কে দাবি। |
প্রথম বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের সূত্রে বলা হয়েছে, সিদরাতুল মুনতাহা ষষ্ঠ আসমানে অবস্থিত এবং ঊর্ধ্ব ও নিম্ন জগতের আদান-প্রদান সেখানে এসে শেষ হয়।
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১। ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৭৬. সিদরাতুল মুনতাহার আলোচনা।
৩২০-(২৭৯/১৭৩) আবূ বকর ইবনু আবূ শাইবাহ, ইবনু নুমায়র ও যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) ….. ‘আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মি’রাজ রজনীতে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হল। এটি ষষ্ঠ আসমানে অবস্থিত(1)। জমিন থেকে যা কিছু উত্থিত হয় তা সে পর্যন্ত গিয়ে পৌছে এবং সেখান থেকে তা গ্রহণ করা হয়। তদ্রূপ ঊর্ধ্বলোক থেকে যা কিছু অবতরণ হয় তাও এ পর্যন্ত এসে পৌছে এবং সেখান থেকে তা গ্রহণ করা হয়। এরপর আবদুল্লাহ (রাযিঃ) তিলাওয়াত করলেনঃ “যখন প্রান্তবর্তী বাদরী বৃক্ষটি যা দ্বারা আচ্ছাদিত হবার, তা দ্বারা আচ্ছাদিত হলো”– (সূরাহু আন নাজন ৫৩ঃ ১৬) এবং বলেন, এখানে ‘যা দ্বারা’ কথাটির অর্থ সোনার পতঙ্গসমূহ। তিনি বলেন, তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তিনটি বিষয় দান করা হল, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত। সূরাহ আল-বাকারার শেষ দু’ আয়াত এবং শিরক মুক্ত উম্মতের মারাত্মক গুনাহ তাওবার মাধ্যমে ক্ষমার সুসংবাদ(2)। (ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩২৮, ইসলামিক সেন্টারঃ ৩৩৯)
1. ইমাম নবাবী (রহঃ) বলেন যে, প্রত্যেক কিতাবে উল্লেখ আছে যে, সিদরাতুল মুনতাহা ষষ্ঠ আসমানে। শুধু আনাস (রাযিঃ) এর বর্ণিত হাদীসসমূহে আছে যে, সিদরাতুল মুনতাহা সপ্তম আসমানের উপরে। কাযী ইয়ায বলেনঃ সঠিক এবং অধিকাংশের মত এটাই। এ দু’ প্রকার হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য এভাবে করা যায় যে, সিদরাতুল মুনতাহা’র জড় বা গোড়া ষষ্ঠ আসমানে এবং এ গাছের ডালপাতা সপ্তম আসমানের উপর পর্যন্ত গেছে। কারণ খুব বড় গাছ। খলীল বলেনঃ সিদরাতুল মুনতাহা একটি গাছ যা সপ্তম আসমানে আছে। যা আসমানসমূহ এবং জান্নাত সমূহকে ছায়া করে আছে।
2. মারাত্মক গুনাহ ক্ষমার অর্থ এ উম্মাহর যে ব্যক্তি শিরকমুক্ত অবস্থায় মারা যাবে, সে চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকবে না। বরং মহান আল্লাহ তাকে যখনি হোক ক্ষমা করে দিবেন। হে আল্লাহ! তোমার খাস রহমাতে শিরক হতে আমাদের বাঁচিয়ে রেখ এবং তাওহীদের উপর যেন আমাদের সমাপ্তি হয় এ প্রার্থনা করি। (সংক্ষিপ্ত নাবাবী)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইব্ন মাসউদ (রাঃ)

কিন্তু মালিক ইবনু সা‘সা‘আর সূত্রে সংরক্ষিত বিস্তৃত মিরাজ-বর্ণনায় মুহাম্মদ প্রথমে সপ্তম আসমানে পৌঁছান, ইবরাহিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, বায়তুল মামুর দেখেন, এরপর সিদরাতুল মুনতাহা তাঁর সামনে প্রকাশিত হয়। একই বর্ণনায় বৃক্ষটির ফল ও পাতার আকার এবং চারটি নদীর বিবরণ আসে।
আল-লুলু ওয়াল মারজান
১/ ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ১/৭২. আসমানের দিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উর্ধ্বাগমন এবং সালাত ফরজ হওয়া সম্পর্কে।
১০৩. মালিক ইবনু সা‘সা‘আ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি কা‘বা ঘরের নিকট নিদ্রা ও জাগরণ- এ দু’অবস্থার মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম। অতঃপর তিনি দু’ব্যক্তির মাঝে অপর এক ব্যক্তি অর্থাৎ নিজের অবস্থা উল্লেখ করে বললেন, আমার নিকট সোনার একটি পেয়ালা নিয়ে আসা হল- যা হিকমত ও ঈমানে ভরা ছিল। অতঃপর আমার বুক হতে পেটের নীচ পর্যন্ত চিরে ফেলা হল। অতঃপর আমার পেট যমযমের পানি দিয়ে ধোয়া হল। অতঃপর তা হিকমত ও ঈমানে পূর্ণ করা হল এবং আমার নিকট সাদা রঙের চতুষ্পদ জন্তু আনা হল, যা খচ্চর হতে ছোট আর গাধা হতে বড় অর্থাৎ বোরাক। অতঃপর তাতে চড়ে আমি জিবরীল (‘আঃ) সহ চলতে চলতে পৃথিবীর নিকটতম আসমানে গিয়ে পৌঁছলাম। জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? উত্তরে বলা হল, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে আর কে? উত্তর দেয়া হল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল, তাঁকে মারহাবা, তাঁর আগমন কতই না উত্তম!
অতঃপর আমি আদাম (‘আঃ)-এর নিকট গেলাম। তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, পুত্র ও নাবী! তোমার প্রতি মারহাবা। অতঃপর আমরা দ্বিতীয় আসমানে গেলাম। জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে আর কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল, তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল, তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম! অতঃপর আমি ‘ঈসা ও ইয়াহইয়া (‘আঃ)-এর নিকট আসলাম। তাঁরা উভয়ে বললেন, ভাই ও নাবী! আপনার প্রতি মারহাবা।
অতঃপর আমরা তৃতীয় আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? উত্তরে বলা হল, আমি জিবরীল। প্রশ্ন করা হল, আপনার সঙ্গে কে? বলা হল, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল, তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম! অতঃপর আমি ইউসুফ (‘আঃ)-এর নিকট গেলাম। তাঁকে আমি সালাম করলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নাবী! আপনাকে মারহাবা।
অতঃপর আমরা চতুর্থ আসমানে পৌঁছলাম। প্রশ্ন করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? বলা হল, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল, তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? জবাবে বলা হল, হ্যাঁ। বলা হল, তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম! অতঃপর আমি ইদরীস (‘আঃ)-এর নিকট গেলাম। আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নাবী! আপনাকে মারহাবা।
এরপর আমরা পঞ্চম আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? বলা হল আমি জিবরীল। প্রশ্ন হল আপনার সঙ্গে আর কে? বলা হল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল, তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? বলা হল, হ্যাঁ। বললেন, তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম! অতঃপর আমরা হারুন (‘আঃ)-এর নিকট গেলাম। আমি তাকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নাবী! আপনাকে মারহাবা।
অতঃপর আমরা ষষ্ঠ আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? বলা হল, আমি জিবরীল। প্রশ্ন করা হল, আপনার সঙ্গে কে? বলা হল, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বলা হল, তাঁকে আনার জন্য পাঠানো হয়েছে? তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম। অতঃপর আমি মূসা (‘আ.)-এর নিকট গেলাম। আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নাবী আপনাকে মারহাবা। অতঃপর আমি যখন তাঁর কাছ দিয়ে গেলাম, তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁকে বলা হল, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, হে রব! এ ব্যক্তি যে আমার পরে প্রেরিত, তাঁর উম্মাত আমার উম্মাতের চেয়ে অধিক পরিমাণে জান্নাতে যাবে।
অতঃপর আমরা সপ্তম আকাশে পৌঁছলাম। প্রশ্ন করা হল, এ কে? বলা হল, আমি জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? বলা হল, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বলা হল, তাঁকে আনার জন্য পাঠানো হয়েছে? তাঁকে মারহাবা। তাঁর আগমন কতই না উত্তম! অতঃপর আমি ইব্রাহীম (‘আঃ)-এর নিকট গেলাম। তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, হে পুত্র ও নাবী! আপনাকে মারহাবা।
অতঃপর বায়তুল মা’মূরকে আমার সামনে প্রকাশ করা হল। আমি জিবরীল (‘আঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এটি বায়তুল মা’মূর। প্রতিদিন এখানে সত্তর হাজার ফেরেশতা সালাত আদায় করেন। এরা এখান হতে একবার বাহির হলে দ্বিতীয় বার ফিরে আসেন না। এটাই তাদের শেষ প্রবেশ। অতঃপর আমাকে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ দেখানো হল। দেখলাম, এর ফল যেন হাজারা নামক জায়গার মটকার মত। আর তার পাতা যেন হাতীর কান। তার উৎসমূলে চারটি ঝরণা প্রবাহিত। দু’টি ভিতরে আর দু’টি বাইরে। এ সম্পর্কে আমি জিবরীলকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ভিতরের দু’টি জান্নাতে অবস্থিত। আর বাইরের দু’টির একটি হল- ফুরাত আর অপরটি হল (মিশরের) নীল নদ।
অতঃপর আমার প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফারয (ফরয) করা হয়। আমি তা গ্রহণ করে মূসা (‘আঃ)-এর নিকট ফিরে এলাম। তিনি বললেন, কী করে এলেন? আমি বললাম, আমার প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফারয (ফরয) করা হয়েছে। তিনি বললেন, আমি আপনার চেয়ে মানুষ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত আছি। আমি বানী ইসরাঈলের রোগ সারানোর যথেষ্ট চেষ্টা করেছি। আপনার উম্মাত এত আদায়ে সমর্থ হবে না। অতএব আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং তা কমানোর আবেদন করুন। আমি ফিরে গেলাম এবং তাঁর নিকট আবেদন করলাম। তিনি সালাত চল্লিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। আবার তেমন ঘটল। সালাত ত্রিশ ওয়াক্ত করে দেয়া হল। আবার তেমন ঘটলে তিনি সালাত বিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। আবার তেমন ঘটল। তিনি সালাতকে দশ ওয়াক্ত করে দিলেন।
অতঃপর আমি মূসা (‘আঃ)-এর নিকট আসলাম। তিনি আগের মত বললেন, এবার আল্লাহ সালাতকে পাঁচ ওয়াক্ত ফারয (ফরয) করে দিলেন। আমি মূসার নিকট আসলাম। তিনি বললেন, কী করে আসলেন? আমি বললাম, আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত ফারয (ফরয) করে দিয়েছেন। এবারও তিনি আগের মত বললেন, আমি বললাম, আমি তা মেনে নিয়েছি। তখন আওয়াজ এল, আমি আমার ফারয (ফরয) জারি করে দিয়েছি। আর আমার বান্দাদের হতে হালকা করেও দিয়েছি। আমি প্রতিটি নেকির বদলে দশগুণ সওয়াব দিব।
সহীহুল বুখারী, পৰ্ব ৫৯: সৃষ্টির সূচনা, অধ্যায় ৬, হাঃ ৩২০৭; মুসলিম, পর্ব ১: ঈমান, অধ্যায় ৭৪, হাঃ ১৬৪
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু সা‘সা‘আ (রাঃ)
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৯/ সৃষ্টির সূচনা
পরিচ্ছেদঃ ১৯৮৮. ফিরিশ্তার বিবরণ। আনাস ইবন মালিক (রাঃ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রাঃ) নবী (সাঃ) এর নিকট বললেন, ফিরিশতাকূলের মধ্যে জিবরীল (আঃ) ইয়াহুদীদের শত্রু। আর ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেছেন لَنَحْنُ الصَّافُّونَ এই উক্তি ফিরিশ্তাদের।
২৯৮০। হুদবা ইবনু খালিদ ও খলিফা (ইবনু খাইয়াত) (রহঃ) … মালিক ইবনু সা’সা’আ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি কাবা ঘরের নিকট নিদ্রা ও জাগরণ-এ দু’ অবস্থার মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম। এরপর তিনি দু’ ব্যাক্তির মাঝে অপর এক ব্যাক্তি অর্থাৎ নিজের অবস্থা উল্লেখ করে বললেন, আমার নিকট স্বর্ণের একটি তশতরী নিয়ে আসা হল-যা হিকমত ও ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল। তাপর আমার বুক থেকে পেটের নীচ পর্যন্ত বিদীর্ণ করা হল। এরপর আমার পেটে যমযমের পানি দ্বারা ধুয়ে ফেলা হল।
তারপর হিকমত ও ঈমান পরিপূর্ণ করা হল এবং আমার নিকট সাদা চতুষ্পদ জন্তু আনা হল, যা খচ্চর হতে ছোট আর গাধা থেকে বড় অর্থাৎ বুরাক। এরপর তাতে আরোহণ করে আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম) সহ চলতে চলতে পৃথিবীর নিকটতম আসমানে গিয়ে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা হল, এ কে? উত্তরে বলা হল, জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে আর কে? উত্তর দেওয়া হল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল, তাঁকে ধন্যবাদ, তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম।
তারপর আদম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, পুত্র ও নাবী! তোমার প্রতি ধন্যবাদ। এরপর আমরা দ্বিতীয় আসমানে গেলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ঈসা ও ইয়াহইয়া (আলাইহিমুস সালাম) এর নিকট আসলাম। তাঁরা উভয়ে বললেন, ভাই ও নাবী! আপনার প্রতি ধন্যবাদ।
তারপর আমরা তৃতীয় আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) এর নিকট গেলাম। তাঁকো আমি সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নাবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
এরপর আমরা চতুর্থ আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ইদ্রিস (আলাইহিস সালাম) এর নিকট গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নাবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
এরপর আমরা পঞ্চম আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমরা হারুন (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নাবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
তারপর ষষ্ঠ আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নাবী আপনাকে ধন্যবাদ।
তারপর আমি যখন তাঁর কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁকে বলা হল, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বলেছেন, হে রব! এ ব্যাক্তি যে আমার পর প্রেরিত, তাঁর উম্মাত আমার উম্মাতের চেয়ে অধিক পরিমাণে বেহেশতে যাবে। এরপর আমরা সপ্তম আকাশে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, হে পুত্র ও নাবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
এরপর বায়তুল মা’মুরকে আমার সামনে প্রকাশ করা হল। আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম) কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, এটি বায়তুল মামুর। প্রতিদিন এখানে সত্তর হাজার ফিরিশতা সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেন। এরা এখান থেকে একবার বের হলে দ্বিতীয় বার ফিরে আসে না। এটাই তাদের শেষ প্রবেশ। তারপর আমাকে সিদরাতুল মুনতাহা দেখানো হল। দেখলাম, এর ফল যেন, হাজার নামক স্থানের মটকার ন্যায়। আর তার পাতা যেন হাতীর কান। তার মূল দেশে চারটি ঝরনা প্রবাহিত।’ দু’টি অভ্যন্তরে আর দু’টি বাইরে। এ সম্পর্কে আমি জিবরীলকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, অভ্যন্তরে দু’টি জান্নাতে অবস্থিত। আর বাইরের দু’টির একটি হল (ইরাকের) ফুরাত আর অপরটি হল (মিশরের) নীল নদ।
তারপর আমি প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করা হয়। আমি তা গ্রহণ করে মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে এলাম। তিনি বললেন, কি করে এলেন? আমি বললাম, আমার প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করা হয়েছে। তিনি বললেন, আমি আপনার চেয়ে মানুষ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত আছি। আমি বনী ইসরাঈলের চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছি আর আপনার উম্মাত এত (সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ে) সমর্থ হবে না। অতএব আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং তা কমানোর অনুরোধ করুন।
আমি ফিরে গেলাম এবং তাঁর নিকট আবেদন করলাম। তিনি সালাত (নামায/নামাজ) চল্লিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। পুনরায় অনুরূপ ঘটল। আর সালাত (নামায/নামাজ)ও ত্রিশ ওয়াক্ত করে দেওয়া হল। পুনরায় অনুরূপ ঘটলে তিনি সালাত (নামায/নামাজ) বিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। আবার অনুরূপ হল। তিনি সালাত (নামায/নামাজ) কে দশ ওয়াক্ত করে দিলেন। এরপর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে আসলাম। তিনি পূর্বের ন্যায় বললেন, এবার আল্লাহ সালাত (নামায/নামাজ) কে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয করে দিলেন। আমি মূসার নিকট আসলাম। তিনি বললেন, কি করে আসলেন? আমি বললাম, আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত ফরয করে দিয়েছেন।
এবারও তিনি পূর্বের ন্যায় বললেন, আমি বললাম, আমি তা মেনে নিয়েছে। তখন আওয়াজ এল, আমি আমার ফরয জারি করে দিয়েছি। আর আমার বান্দাদের থেকে হালকা করে দিয়েছে। আর আমি প্রতিটি পূণ্যের জন্য দশ গুন সওয়াব দিব।
আর বায়তুল মামুর সম্পর্কে হাম্মাম (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণণা করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু সা‘সা‘আ (রাঃ)

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
৫৯/ সৃষ্টির সূচনা
পরিচ্ছেদঃ ৫৯/৬. ফেরেশতাদের বর্ণনা।
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বললেন, ফেরেশতাদের মধ্যে জিব্রাঈল (আঃ) ইয়াহূদীদের শত্রু। (১) আর ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, وإنا لَنَحْنُ الصَّافُّوْنَ অর্থ আমরা তো (ফেরেশতাকুল) সারিবদ্ধভাবে দন্ডায়মান- (সাফফাতঃ ১৬৫)। (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৯৬৬)
৩২০৭. মালিক ইবনু সা‘সা‘আ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি কা‘বা ঘরের নিকট নিদ্রা ও জাগরণ- এ দু’অবস্থার মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম। অতঃপর তিনি দু’ব্যক্তির মাঝে অপর এক ব্যক্তি অর্থাৎ নিজের অবস্থা উল্লেখ করে বললেন, আমার নিকট সোনার একটি পেয়ালা নিয়ে আসা হল- যা হিক্মত ও ঈমানে ভরা ছিল। অতঃপর আমার বুক হতে পেটের নীচ পর্যন্ত চিরে ফেলা হল। অতঃপর আমার পেট যমযমের পানি দিয়ে ধোয়া হল। অতঃপর তা হিক্মত ও ঈমানে পূর্ণ করা হল এবং আমার নিকট সাদা রঙের চতুষ্পদ জন্তু আনা হল, যা খচ্চর হতে ছোট আর গাধা হতে বড় অর্থাৎ বোরাক। অতঃপর তাতে চড়ে আমি জিব্রাঈল (আঃ) সহ চলতে চলতে পৃথিবীর নিকটতম আসমানে গিয়ে পৌঁছলাম। জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? উত্তরে বলা হল, জিব্রাঈল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে আর কে? উত্তর দেয়া হল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল, তাঁকে মারহাবা, তাঁর আগমন কতই না উত্তম। অতঃপর আমি আদাম (আঃ)-এর নিকট গেলাম। তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, পুত্র ও নাবী! তোমার প্রতি মারহাবা। অতঃপর আমরা দ্বিতীয় আসমানে গেলাম। জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিব্রাঈল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে আর কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল, তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল, তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম। অতঃপর আমি ‘ঈসা ও ইয়াহইয়া (আঃ)-এর নিকট আসলাম। তাঁরা উভয়ে বললেন, ভাই ও নাবী! আপনার প্রতি মারহাবা। অতঃপর আমরা তৃতীয় আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? উত্তরে বলা হল, আমি জিব্রাঈল। প্রশ্ন করা হল, আপনার সঙ্গে কে? বলা হল, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল, তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম। অতঃপর আমি ইউসুফ (আঃ)-এর নিকট গেলাম। তাঁকে আমি সালাম করলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নাবী! আপনাকে মারহাবা। অতঃপর আমরা চতুর্থ আসমানে পৌঁছলাম। প্রশ্ন করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? বলা হল, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল, তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? জবাবে বলা হল, হ্যাঁ। বলা হল, তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম। অতঃপর আমি ইদ্রীস (আঃ)-এর নিকট গেলাম। আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নাবী! আপনাকে মারহাবা। এরপর আমরা পঞ্চম আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? বলা হয় আমি জিব্রাঈল। প্রশ্ন হল আপনার সঙ্গে আর কে? বলা হল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল, তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? বলা হল, হ্যাঁ। বললেন, তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম। অতঃপর আমরা হারুন (আঃ)-এর নিকট গেলাম। আমি তাকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নাবী! আপনাকে মারহাবা। অতঃপর আমরা ষষ্ঠ আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? বলা হল, আমি জিব্রাঈল। প্রশ্ন করা হল, আপনার সঙ্গে কে? বলা হল, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বলা হল, তাঁকে আনার জন্য পাঠানো হয়েছে? তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম। অতঃপর আমি মূসা (আঃ)-এর নিকট গেলাম। আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নাবী আপনাকে মারহাবা। অতঃপর আমি যখন তাঁর কাছ দিয়ে গেলাম, তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁকে বলা হল, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, হে রব! এ ব্যক্তি যে আমার পরে প্রেরিত, তাঁর উম্মাত আমার উম্মাতের চেয়ে অধিক পরিমাণে বেহেশতে যাবে। অতঃপর আমরা সপ্তম আকাশে পৌঁছলাম। প্রশ্ন করা হল, এ কে? বলা হল, আমি জিব্রাঈল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? বলা হল, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বলা হল, তাঁকে আনার জন্য পাঠানো হয়েছে? তাঁকে মারহাবা। তাঁর আগমন কতই না উত্তম। অতঃপর আমি ইব্রাহীম (আঃ)-এর নিকট গেলাম। তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, হে পুত্র ও নাবী! আপনাকে মারহাবা। অতঃপর বায়তুল মা’মূরকে আমার সামনে প্রকাশ করা হল। আমি জিব্রাঈল (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এটি বায়তুল মা’মূর। প্রতিদিন এখানে সত্তর হাজার ফেরেশতা সালাত আদায় করেন। এরা এখান হতে একবার বাহির হলে দ্বিতীয় বার ফিরে আসেন না। এটাই তাদের শেষ প্রবেশ। অতঃপর আমাকে ‘সিদ্রাতুল মুনতাহা’ দেখানো হল। দেখলাম, এর ফল যেন হাজারা নামক জায়গার মটকার মত। আর তার পাতা যেন হাতীর কান। তার উৎসমূলে চারটি ঝরণা প্রবাহিত। দু’টি ভিতরে আর দু’টি বাইরে। এ সম্পর্কে আমি জিব্রাঈলকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ভিতরের দু’টি জান্নাতে অবস্থিত। আর বাইরের দু’টির একটি হল- ফুরাত আর অপরটি হল (মিশরের) নীল নদ। অতঃপর আমার প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়। আমি তা গ্রহণ করে মূসা (আঃ)-এর নিকট ফিরে এলাম। তিনি বললেন, কি করে এলেন? আমি বললাম, আমার প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়েছে। তিনি বললেন, আমি আপনার চেয়ে মানুষ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত আছি। আমি বানী ইসরাঈলের রোগ সরানোর যথেষ্ট চেষ্টা করেছি। আপনার উম্মাত এত আদায়ে সমর্থ হবে, না। অতএব আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং তা কমানোর আবেদন করুন। আমি ফিরে গেলাম এবং তাঁর নিকট আবেদন করলাম। তিনি সালাত চল্লিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। আবার তেমন ঘটল। সালাত ত্রিশ ওয়াক্ত করে দেয়া হল। আবার তেমন ঘটলে তিনি সালাত বিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। আবার তেমন ঘটল। তিনি সালাতকে দশ ওয়াক্ত করে দিলেন। অতঃপর আমি মূসা (আঃ)-এর নিকট আসলাম। তিনি আগের মত বললেন, এবার আল্লাহ সালাতকে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ করে দিলেন। আমি মূসার নিকট আসলাম। তিনি বললেন, কী করে আসলেন? আমি বললাম, আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ করে দিয়েছেন। এবারও তিনি আগের মত বললেন, আমি বললাম, আমি তা মেনে নিয়েছি। তখন আওয়াজ এল, আমি আমার ফরজ জারি করে দিয়েছি। আর আমার বান্দাদের হতে হালকা করেও দিয়েছি। আমি প্রতিটি নেকির বদলে দশগুণ সওয়াব দিব। আর বায়তুল মা’মূর সম্পর্কে হাম্মাম (রহ.)………আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। (৩৩৯৩, ৩৪৩০, ৩৮৮৭) (মুসলিম ১/৭৪ হাঃ ১৬৪, আহমাদ ১৭৮৫০) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৯৬৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৯৭৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু সা‘সা‘আ (রাঃ)
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ২১৫১. মি’রাজের ঘটনা
৩৬০৮। হুদবা ইবনু খালিদ (রহঃ) … মালিক ইবনু সা’সা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে যে রাতে তাঁকে ভ্রমণ করানো হয়েছে সে রাতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, একদা আমি কা’বা ঘরের হাতিমের অংশে ছিলাম। কখনো কখনো রাবী (কাতাদা) বলেছেন, হিজরে শুয়েছিলাম। হঠাৎ একজন আগন্তুক আমার নিকট এলেন এবং আমার এ স্থান থেকে সে স্থানের মধ্যবর্তী অংশটি চিরে ফেললেন। রাবী কাতাদা বলেন, আনাস (রাঃ) কখনো কাদ্দা (চিরলেন) শব্দ আবার কখনো শাক্কা (বিদীর্ণ) শব্দ বলেছেন। রাবী বলেন, আমি আমার পার্শ্বে বসা জারূদ (রহঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম, এ দ্বারা কী বুঝিয়েছেন? তিনি বললেন, হলকুমের নিম্নদেশ থেকে নাভী পর্যন্ত। কাতাদা (রহঃ) বলেন, আমি আনাস (রাঃ) কে এ-ও বলতে শুনেছি বুকের উপরিভাগ থেকে নাভির নিচ পর্যন্ত। তারপর (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন) আগন্তুক আমার হৃদপিণ্ড বের করলেন। তারপর আমার নিকট একটি স্বর্ণের পাত্র আনা হল যা ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল। তারপর আমার হৃদপিণ্ডটি (যমযমের পানি দ্বারা) ধৌত করা হল এবং ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ করে যথাস্থানে পুনরায় রেখে দেয়া হল।
তারপর সাদা রং এর একটি জন্তু আমার নিকট আনা হল। যা আকারে খচ্চর থেকে ছোট ও গাধা থেকে বড় ছিল? জারূদ তাকে বলেন, হে আবূ হামযা, ইহাই কি বুরাক? আনাস (রাঃ) বললেন, হাঁ। সে একেক কদম রাখে দৃষ্টির শেষ প্রান্তে। আমাকে তার উপর সাওয়ার করানো হল। তারপর আমাকে নিয়ে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) চললেন, প্রথম আসমানে নিয়ে এসে দরজা খোলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল, ইনি কে? তিনি বললেন জিবরীল। আবার জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আবার জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠান হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। তখন বলা হল, তার জন্য খোশ-আমদেদ, উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হল।
আমি যখন পোঁছালাম, তখন তথায় আদম (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাত পেলাম। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, ইনি আপনার আদি পিতা আদম (আলাইহিস সালাম) তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্কার পুত্র ও নেক্কার নাবীর প্রতি খোশ-আমদেদ। তারপর উপরের দিকে চলে দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছে দরজা খুলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল কে? তিনি বললেন জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠান হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। তারপর বলা হল- তাঁর জন্য খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর খুলে দেওয়া হল। যখন তথায় পৌঁছালাম। তখন সেখানে ইয়াহ্ইয়া ও ঈসা (আলাইহিমুস সালাম) এর সাক্ষাত পেলাম। তাঁরা দু’জন ছিলেন পরস্পরের খালাত ভাই। তিনি (জিবরীল) বললেন, এরা হলেন ইয়াহ্ইয়া ও ঈসা (আলাইহিমুস সালাম)। তাঁদের প্রতি সালাম করুন। তখন আমি সালাম দিলাম। তাঁরা জবাব দিলেন, তারপর বললেন, নেক্কার ভাই ও নেক্কার নাবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
এরপর তিনি আমাকে নিয়ে তৃতীয় আসমানের দিকে চললেন, সেখানে পৌঁছে জিবরীল বললেন খুলে দাও। তাঁকে বলা হল কে? তিনি উত্তর দিলেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠান হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। বলা হল, তাঁর জন্য খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর দরজা খুলে দেওয়া হল। আমি তথায় পৌঁছে ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) কে দেখতে পেলাম। জিবরীল বললেন, ইনি ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) আপনি তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম, তিনিও জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্কার ভাই ও নেক্কার নাবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্ব-যাত্রা করলেন এবং চতুর্থ আসমানে পৌঁছলেন। আর (ফিরিশ্তাকে) দরজা খুলে দিতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠান হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। তখন বলা হল- তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তখন খুলে দেওয়া হল। আমি ইদ্রীস (আলাইহিস সালাম) এর কাছে পৌঁছলে জিবরীল বললেন, ইনি ইদ্রীস আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনিও জবাব দিলেন। তারপর বললেন, নেক্কার ভাই ও নেক্কার নাবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
এরপর তিনি (জিবরীল) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্ব-যাত্রা করে পঞ্চম আসমানে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি উত্তর দিলেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞেস করা হল। তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। বলা হল, তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তথায় পৌঁছে হারূন (আলাইহিস সালাম) কে পেলাম। জিবরীল বললেন, ইনি হারূন (আলাইহিস সালাম) তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম; তিনিও জবাব দিলেন, এবং বললেন, নেক্কার ভাই ও নেক্কার নাবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
তারপর আমাকে নিয়ে যাত্রা করে ষষ্ঠ আকাশে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠান হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। ফিরিশ্তা বললেন, তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগন্তুক এসেছেন। তথায় পৌঁছে আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) কে পেলাম। জিবরীল(আলাইহিস সালাম) বললেন, ইনি মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম; তিনি জবাব দিলেন, এবং বললেন, নেক্কার ভাই ও নেক্কার নাবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
আমি যখন অগ্রসর হলাম তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, আপনি কিসের জন্য কাঁদছেন? তিনি বললেন আমি এজন্য কাঁদছি যে, আমার পর একজন যুবককে নাবী বানিয়ে পাঠানো হয়েছে, যার উম্মত আমার উম্মত থেকে অধিক সংখ্যায় জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারপর জিবরীল(আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে আমাকে নিয়ে সপ্তম আকাশের দিকে গেলেন এবং দরজা খুলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? তিনি উত্তর দিলেন, আমি জিবরীল। আবার জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞাসা করা হল, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছে কি? তিনি বললেন, হাঁ। বলা হল, তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। আমি সেখানে পৌঁছে ইব্রাহীম (আলাইহিস সালাম) কে দেখতে পেলাম। জিবরীল(আলাইহিস সালাম) বললেন, ইনি আপনার পিতা। তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্কার পুত্র ও নেক্কার নাবীর প্রতি খোশ-আমদেদ। তারপর আমাকে সিদ্রাতুল মুনতাহা পর্যন্ত উঠানো হল। দেখতে পেলাম, উহার ফল হাজার অঞ্চলের মটকার ন্যায় এবং তার পাতাগুলি এই হাতির কানের মত। আমাকে বলা হল, এ হল সিদরাতুল মুন্তাহা (জড় জগতের শেষ প্রান্ত)।
সেখানে আমি চারটি নহর দেখতে পেলাম, যাদের দু’টি ছিল অ্যপ্রকাশ্য দু’টি ছিল প্রকাশ্য। তখন আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম) কে জিজ্ঞেস করলাম, এ নহরগুলো কী? অ্যপ্রকাশ্য দু’টি হল জান্নাতের দুইটি নহর। আর প্রকাশ্য দুটি হল নীল নদী ও ফুরাত নদী। তারপর আমার সামনে ‘আল-বায়তুল মামুর’ প্রকাশ করা হল, এরপর আমার সামনে একটি শরাবের পাত্র, একটি দুধের পাত্র ও একটি মধুর পাত্র পরিবেশন করা হল। আমি দুধের পাত্রটি গ্রহণ করলাম। তখন জিবরীল বললেন, এ-ই হচ্ছে ফিতরাত (দ্বীন-ই-ইসলাম)। আপনি ও আপনার উম্মতগণ এর উপর প্রতিষ্ঠিত। তারপর আমার উপর দৈনিক ৫০ ওয়াক্ত সালাম ফরয করা হল।
এরপর আমি ফিরে আসলাম। মূসা (আলাইহিস সালাম) এর সম্মুখ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে কী আদেশ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমকে দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের আদেশ করা হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উম্মত দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতে সমর্থ হবে না। আল্লাহর কসম। আমি আপনার আগে লোকদের পরীক্ষা করেছি এবং বনী ইসরাইলের হেদায়েতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি। তাই আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের(বোঝা) হাল্কা করার জন্য আবেদন করুন।
আমি ফিরে গেলাম। ফলে আমার উপর থেকে (দশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) হ্রাস করে দিলেন। আমি আবার মূসা (আলাইহিস সালাম) এর নিকট ফিরে এলাম তিনি আবার আগের মত বললেন, আমি আবার ফিরে গেলাম। ফলে আল্লাহ তা’আলা আরো দশ (ওয়াক্ত সালাত কমিয়ে দিলেন। ফিরার পথে মূসা (আলাইহিস সালাম) এর নিকট পৌঁছালে, তিনি আবার পূর্বোক্ত কথা বললেন, আমি আবার ফিরে গেলাম। আল্লাহ তা’আলা আর দশ (ওয়াক্ত) হ্রাস করলেন। আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) নিকট ফিরে এলাম। তিনি আবার ঐ কথাই বললেন আমি আবার ফিরে গেলাম। তখন আমাকে দশ (ওয়াক্ত) সালাতের আদেশ দেওয়া হয়। আমি (তা নিয়ে) ফিরে এলাম। মূসা (আলাইহিস সালাম) ঐ কথাই আগের মত বললেন। আমি আবার ফিরে গেলাম, তখন আমাকে পাঁচ (ওয়াক্ত) সালাতের আদেশ করা হয়।
তারপর মূসা (আলাইহিস সালাম) এর নিকট ফিরে এলাম। তিনি বললেন, আপনাকে কী আদেশ দেওয়া হয়েছে। আমি বললাম, দৈনিক পাঁচ (ওয়াক্ত) সালাত আদায়ের আদেশ দেওয়া হয়েছে। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনার উম্মত দৈনিক পাঁচ সালাত আদায় করতেও সমর্থ হবে না। আপনার পূর্বে আমি লোকদের পরীক্ষা করেছি। বনী ইসরাইলের হেদায়েতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি। আপনি আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের জন্য আরো সহজ করার আবেদন করুন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি আমার রবের নিকট (অনেকবার) আবেদন করেছি, এতে আমি লজ্জাবোধ করছি। আর আমি এতেই সন্তুষ্ট হয়েছি এবং তা মেনে নিয়েছি। এরপর তিনি বললেন, আমি যখন (মূসা (আলাইহিস সালাম) কে অতিক্রম করে) অগ্রসর হলাম, তখন জনৈক ঘোষণাকারী ঘোষণা দিলেন, আমি আমার অবশ্য পালনীয় আদেশটি জারি করে দিলাম এবং আমার বান্দাদের উপর লঘু করে দিলাম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু সা‘সা‘আ (রাঃ)
সূনান নাসাঈ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫/ নামাজ প্রসঙ্গে
পরিচ্ছেদঃ ১/ সালাতের ফরযসমূহ এবং আনাস ইবন মালিক (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের বর্ণনাকারীদের সনদ সম্পর্কিত মতভেদ ও শব্দ প্রয়োগে তাদের বিভিন্নতা
৪৪৯। ইয়াকূব ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) … মালিক ইবনু সা’সা’আ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি কা’বার নিকট তন্দ্রাচ্ছন্নাবস্থায় ছিলাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম, তিনজনের একটি দলের মধ্যবর্তী ব্যাক্তিটি এগিয়ে আসল। আমার নিকট হিকমত ও ঈমানে পরিপূর্ণ একটি স্বর্ণের পাত্র আনা হল। তারপর ঐ ব্যাক্তি আমার সিনার অগ্রভাগ থেকে নাভি পর্যন্ত বিদীর্ণ করলো। তারপর যমযমের পানি দ্বারা ‘কল্ব’ ধৌত করলো। তারপর হিকমত ও ঈমান দ্বারা তা ভরে দেয়া হল।
পরে আমার নিকট আকারে খচ্চরের চেয়ে ছোট এবং গাধার চেয়ে বড় এরূপ একটি জন্তু আনা হল। আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে চলতে থাকি। পরে আমরা দুনিয়ার (নিকতবর্তী) আকাশ পর্যন্ত পৌঁছি। তখন বলা হল, কে? জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, (আমি) জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বলা হল, তাঁকে আনার জন্য কি দূত প্রেরণ করা হয়েছে? তাঁকে স্বাগতম, তাঁর আগমন কতই না শুভ।
এরপর আমি আদম (আলাইহিস সালাম) এর নিকট আসলাম, তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, স্বাগতম (হে) পুত্র ও নাবী। তারপর আমরা দ্বিতীয় আসমানে আসলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, কে? জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, (আমি) জিবরীল। বলা হল, আপনার সঙ্গে কে? জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। পুর্ববৎ তাঁকে স্বাগতম জানানো হল। এরপর আমি ইয়াহ্ইয়া ও ঈসা (আলাইহিমুস সালাম) এর নিকট আসলাম এবং তাঁদের উভয়কে সালাম দিলাম। তাঁরা বললেন স্বাগতম (হে) ভাই ও নাবী। তারপর আমরা তৃতীয় আসমানে আসলাম। এখানেও জিজ্ঞাসা করা হল, কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। বলা হল, আপনার সঙ্গে কে?
তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। পুর্ববৎ তাঁকে স্বাগতম জানানো হল। এখানে আমি ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট আসলাম এবং তাঁকে সালাম দিলাম। তিনিও বললেন, স্বাগতম (হে) ভাই ও নাবী। এরপর আমরা পঞ্চম আসমানে আসলাম। এখানেও পুর্ববৎ প্রশ্নোত্তর হল ও সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করা হল। পরে আমি হারুন (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট আসলাম এবং তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, স্বাগতম (হে) ভাই ও নাবী। এরপর আমরা ষষ্ঠ আসমানে আসলাম। এখানেও প্রশ্ন উত্তর সম্বর্ধনার পর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট আসলাম এবং তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, স্বাগতম (হে) ভাই ও নাবী।
আমি যখন তাঁকে অতিক্রম করে যাই, তখন তিনি কাঁদতে থাকেন। জিজ্ঞাসা করা হল আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, হে আমার রব! এ যুবক, যাকে আপনি আমার পর নাবীরূপে প্রেরণ করেছেন, আমার উম্মত হতে যত সংখ্যক লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাঁর উম্মত থেকে তার চেয়ে অধিক সংখ্যক লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাঁরা মর্যাদায় হবেন শ্রেষ্ঠতর। তারপর আমরা সপ্তম আসমানে আসলাম। এখানেও পূর্বের ন্যায় প্রশ্ন-উত্তর ও সম্বর্ধনার পর আমি ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর সঙ্গে সাক্ষাত করলাম। তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, খোশ আমদেদ স্বাগতম (হে) পুত্র ও নাবী। তারপর আমার সামনে বায়তুল মা’মূর তুলে ধরা হল।
আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, এ কোন্ স্থান? তিনি বললেন, এ বায়তুল মা’মূর। এখানে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশ্তা সালাত আদায় করেন। একদিনে যারা এখানে সালাত আদায় করেন, তারা এখানে কোনদিন প্রত্যাবর্তন করবেন না। এটাই তাদের শেষ (প্রবেশ)। তারপর আমার সামনে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ তুলে ধরা হল। তার (সিদরাতুল মুনতাহার) গাছের ফল আকারে হাজর (নামক স্থান-এর) কলসীর ন্যায় এবং পাতাগুলো হাতির কানের মত এবং দেখলাম যে, তার মূল হতে চারটি নহর প্রবাহমান। দু’টি অপ্রকাশ্য ও দু’টি প্রকাশ্য।
আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম)-কে এগুলো সম্পর্কে জজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, অপ্রকাশ্য নহর দু’টি জান্নাতে প্রবাহমান। আর প্রকাশ্য নহর দু’টির একটি ফুরাত ও অন্যটি নীল। তারপর আমার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করা হল। ফেরার পথে আমি মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট এলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি করে আসলেন? বললাম, আমার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করা হয়েছে।
তিনি বললেন, আমি মানুষের (প্রকৃতি) সম্পর্কে আপনার চেয়ে অধিক অবগত। আমি বনী ইসরাঈলকে নিয়ে কঠিনভাবে চেষ্টা করেছি। একথা নিশ্চিত যে, এগুলো আদায় করতে আপনার উম্মত সক্ষম হবে না। আপনি আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং এ নির্দেশ সহজ করে নিয়ে আসুন। আমি আমার প্রতিপালকের নিকট পুনরায় গেলাম এবং এ বিধান সহজ করার আবেদন জানালাম। এতে তিনি চল্লিশ ওয়াক্ত করে দিলেন।
আমি আবার মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট এলাম। তিনি বললেন, আপনি কি করে আসলেন? আমি বললাম, চল্লিশ ওয়াক্ত করে দিয়েছেন। তিনি এবারও আমাকে পূর্বের ন্যায় বললেন। আমি আমার মহান প্রতিপালকের নিকট ফিরে গেলাম। তিনি এবার ত্রিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। আমি আবার মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট এলাম এবং তাকে অবহিত করলাম। তিনি আমাকে পূর্বের মত বললেন।
আমি আবার প্রতিপালকের নিকট হাযির হলাম। তিনি বিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। এরপর দশ ওয়াক্ত এবং তারপর পাঁচ ওয়াক্ত করে দিলেন। এরপরে আমি মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট এলাম। তিনি পূর্বের মত একই কথা বললেন। আমি বললাম, আমি আবার আল্লাহ্র নিকট যেতে লজ্জাবোধ করছি। তারপর আল্লাহ্র তরফ থেকে ঘোষণা দেয়া হল, আমি আমার বিধান চূড়ান্ত করলাম এবং আমার বান্দাদের জন্য সহজ করে দিলাম। আর আমি একটি নেককাজের বিনিময়ে দশটি প্রতিদান দিব।
সহিহ, বুখারি হাঃ ৩২০৭, মুসলিম (ইসলামিক সেন্টার) হাঃ ৩২৩, ৩২৪
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু সা‘সা‘আ (রাঃ)


সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
৬৩/ আনসারগণ (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহুম)-এর মর্যাদা
পরিচ্ছেদঃ ৬৩/৪২. মি‘রাজের বিবরণ।
৩৮৮৭. মালিক ইবনু সা‘সা‘ (রাঃ) হতে বর্ণিত, আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে রাতে তাঁকে ভ্রমণ করানো হয়েছে সে রাতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, এক সময় আমি কা‘বা ঘরের হাতিমের অংশে ছিলাম। কখনো কখনো রাবী (কাতাদাহ) বলেছেন, হিজরে শুয়েছিলাম। হঠাৎ একজন আগন্তুক আমার নিকট এলেন এবং আমার এস্থান হতে সে স্থানের মাঝের অংশটি চিরে ফেললেন। রাবী কাতাদাহ বলেন, আনাস (রাঃ) কখনো কাদ্দা (চিরলেন) শব্দ আবার কখনো শাক্কা (বিদীর্ণ) শব্দ বলেছেন। রাবী বলেন, আমি আমার পার্শ্বে বসা জারূদ (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, এ দ্বারা কী বুঝিয়েছেন? তিনি বললেন, হলকূমের নিম্নদেশ হতে নাভি পর্যন্ত। কাতাদাহ (রহ.) বলেন, আমি আনাস (রাঃ)-কে এ-ও বলতে শুনেছি বুকের উপরিভাগ হতে নাভির নীচ পর্যন্ত। তারপর আগন্তুক আমার হৃদপিন্ড বের করলেন। তারপর আমার নিকট একটি সোনার পাত্র আনা হল যা ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল। তারপর আমার হৃদপিন্ডটি ধৌত করা হল এবং ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ করে যথাস্থানে আবার রেখে দেয়া হল। তারপর সাদা রং এর একটি জন্তু আমার নিকট আনা হল। যা আকারে খচ্চর হতে ছোট ও গাধা হতে বড় ছিল। জারুদ তাকে বলেন, হে আবূ হামযা, এটাই কি বুরাক? আনাস (রাঃ) বললেন, হাঁ। সে একেক কদম রাখে দৃষ্টির শেষ সীমায়। আমাকে তার উপর সাওয়ার করানো হল। তারপর আমাকে নিয়ে জিবরাঈল (আঃ) চললেন। প্রথম আসমানে নিয়ে এসে দরজা খোলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল, ইনি কে? তিনি বললেন, জিবরাঈল। আবার জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আবার জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠান হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। তখন বলা হল, মারহাবা, উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর আসমানের দরজা খুলে দেয়া হল।
আমি যখন পৌঁছলাম, তখন সেখানে আদম (আঃ)-এর সাক্ষাৎ পেলাম। জিবরাঈল (আঃ) বললেন, ইনি আপনার আদি পিতা আদম (আঃ) তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্কার পুত্র ও নেক্কার নাবীর প্রতি খোশ আমদেদ। তারপর উপরের দিকে চলে দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছে দরজা খুলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল কে? তিনি বললেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। তারপর বলা হল- মারহাবা! উত্তম আগমনকারীর আগমন ঘটেছে। তারপর খুলে দেয়া হল। যখন সেখানে পৌঁছলাম তখন সেখানে ইয়াহ্ইয়া ও ‘ঈসা (আঃ)-এর সাক্ষাৎ পেলাম। তাঁরা দু’জন ছিলেন পরস্পরের খালাত ভাই। তিনি (জিবরাঈল) বললেন, এরা হলেন, ইয়াহ্ইয়া ও ঈসা (আঃ)। তাদের প্রতি সালাম করুন। তখন আমি সালাম করলাম। তাঁরা জবাব দিলেন, তারপর বললেন, নেক্কার ভাই ও নেক্কার নাবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
এরপর তিনি আমাকে নিয়ে তৃতীয় আসমানের দিকে চললেন, সেখানে পৌঁছে জিবরাঈল বললেন, খুলে দাও। তাঁকে বলা হল কে? তিনি উত্তর দিলেন, জিবরাঈল (আঃ)। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। বলা হল, তাঁর জন্য খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর দরজা খুলে দেয়া হল। আমি তথায় পৌঁছে ইউসুফ (আঃ)-কে দেখতে পেলাম। জিবরাঈল বললেন, ইনি ইউসুফ (আঃ) আপনি তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম করলাম, তিনিও জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্কার ভাই, নেক্কার নাবীর প্রতি খোশ-আমদেদ। তারপর জিবরাঈল (আঃ) আমাকে নিয়ে উপর দিকে চললেন এবং চতুর্থ আসমানে পৌঁছলেন। আর দরজা খুলে দিতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। তখন বলা হল, তাঁর প্রতি মারহাবা। উত্তম আগমনকারীর আগমন ঘটেছে। তখন খুলে দেয়া হল।
আমি ইদ্রীস (আঃ)-এর কাছে পৌঁছলে জিবরাঈল বললেন, ইনি ইদ্রীস (আঃ)। তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনিও জবাব দিলেন। তারপর বললেন, নেক্কার ভাই ও নেক্কার নাবীর প্রতি মারহাবা। এরপর তিনি আমাকে নিয়ে উপর দিকে গিয়ে পঞ্চম আসমানে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি উত্তর দিলেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞেস করা হল। তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। বলা হল, তাঁর প্রতি মারহাবা। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তথায় পৌঁছে হারূন (আঃ)-কে পেলাম। জিবরাঈল বললেন, ইনি হারূন (আঃ) তাঁকে সালাম করুন। আমি তাকে সালাম করলাম; তিনিও জবাব দিলেন, এবং বললেন, নেক্কার ভাই ও নেক্কার নাবীর প্রতি মারহাবা। তারপর আমাকে নিয়ে যাত্রা করে ষষ্ঠ আকাশে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল, তাকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। ফেরেশ্তা বললেন, তার প্রতি মারহাবা। উত্তম আগন্তুক এসেছেন।
তথায় পৌঁছে আমি মূসা (আঃ)-কে পেলাম। জিবরাঈল (আঃ) বললেন, ইনি মূসা (আঃ)। তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্কার ভাই ও নেক্কার নাবীর প্রতি মারহাবা। আমি যখন অগ্রসর হলাম তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কিসের জন্য কাঁদছেন? তিনি বললেন, আমি এজন্য কাঁদছি যে, আমার পর একজন যুবককে নাবী বানিয়ে পাঠানো হয়েছে, যাঁর উম্মত আমার উম্মত হতে অধিক সংখ্যায় জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারপর জিবরাঈল (আঃ) আমাকে নিয়ে সপ্তম আকাশের দিকে গেলেন এবং দরজা খুলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল এ কে? তিনি উত্তর দিলেন, আমি জিবরাঈল। আবার জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞেস করা হল, তাকে ডেকে পাঠানো হয়েছে কি? তিনি বললেন, হাঁ। বলা হল, তাঁর প্রতি মারহাবা। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। আমি সেখানে পৌঁছে ইব্রাহীম (আঃ)-কে দেখতে পেলাম। জিবরাঈল (আঃ) বললেন, ইনি আপনার পিতা। তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্কার পুত্র ও নেক্কার নাবীর প্রতি মারহাবা। তারপর আমাকে সিদ্রাতুল মুনতাহা* পর্যন্ত উঠানো হল। দেখতে পেলাম, তার ফল ‘হাজার’ অঞ্চলের মটকার ন্যায় এবং তার পাতাগুলি হাতির কানের মত। আমাকে বলা হল, এ হল সিদরাতুল মুন্তাহা। সেখানে আমি চারটি নহর দেখতে পেলাম, যাদের দু’টি ছিল অপ্রকাশ্য দু’টি ছিল প্রকাশ্য। তখন আমি জিব্রাঈল (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, এ নহরগুলি কী? তিনি বললেন, অপ্রকাশ্য, দু’টি হল জান্নাতের দু’টি নহর। আর প্রকাশ্য দু’টি হল নীল নদী ও ফুরাত নদী।
তারপর আমার সামনে ‘আল-বায়তুল মামুর’ প্রকাশ করা হল, এরপর আমার সামনে একটি শরাবের পাত্র, একটি দুধের পাত্র ও একটি মধুর পাত্র রাখা হল। আমি দুধের পাত্রটি গ্রহণ করলাম। তখন জিবরাঈল বললেন, এ-ই হচ্ছে ফিতরাত। আপনি ও আপনার উম্মতগণ এর উপর প্রতিষ্ঠিত। তারপর আমার উপর দৈনিক ৫০ ওয়াক্ত সালাত ফরয করা হল। এরপর আমি ফিরে আসলাম। মূসা (আঃ)-এর সম্মুখ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আল্লাহ্ তা‘আলা আপনাকে কী আদেশ করেছেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাকে দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের আদেশ দেয়া হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উম্মত দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতে সমর্থ হবে না। আল্লাহর কসম। আমি আপনার আগে লোকদের পরীক্ষা করেছি এবং বানী ইসরাঈলের হিদায়াতের জন্য কঠোর শ্রম দিয়েছি। তাই আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের (বোঝা) হালকা করার জন্য আরয করুন। আমি ফিরে গেলাম। ফলে আমার উপর হতে দশ হ্রাস করে দিলেন। আমি আবার মূসা (আঃ)-এর নিকট ফিরে এলাম। তিনি আবার আগের মত বললেন, আমি আবার ফিরে গেলাম। ফলে আল্লাহ তা‘আলা আরো দশ কমিয়ে দিলেন। ফিরার পথে মূসা (আঃ)-এর নিকট পৌঁছলে, তিনি আবার আগের কথা বললেন, আমি আবার ফিরে গেলাম। আল্লাহ তা‘আলা আরো দশ হ্রাস করলেন। আমি মূসা (আঃ)-এর নিকট ফিরে এলাম। তিনি আবার ঐ কথাই বললেন। আমি আবার ফিরে গেলাম। তখন আমাকে প্রতিদিন দশ সালাতের আদেশ দেয়া হয়। আমি ফিরে এলাম। মূসা (আঃ) ঐ কথাই আগের মত বললেন। আমি আবার ফিরে গেলাম, তখন আমাকে পাঁচ সালাতের আদেশ করা হয়। তারপর মূসা (আঃ) নিকট ফিরে এলাম। তিনি বললেন, আপনাকে কী আদেশ দেয়া হয়েছে। আমি বললাম, আমাকে দৈনিক পাঁচবার সালাত আদায়ের আদেশ দেয়া হয়েছে? মূসা (আঃ) বললেন, আপনার উম্মত দৈনিক পাঁচ সালাত আদায় করতেও সমর্থ হবে না। আপনার পূর্বে আমি লোকদের পরীক্ষা করেছি। বনী ইসরাঈলের হিদায়াতের জন্য কঠোর শ্রম দিয়েছি। আপনি আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের জন্য আরো সহজ করার আরযি করুন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি আমার রবের নিকট আরজি করেছি, এতে আমি লজ্জাবোধ করছি। আর আমি এতেই সন্তুষ্ট হয়েছি এবং তা মেনে নিয়েছি। এরপর তিনি বললেন, আমি যখন অগ্রসর হলাম, তখন এক ঘোষণাকারী ঘোষণা দিলেন, আমি আমার অবশ্য প্রতিপাল্য নির্দেশ জারি করে দিলাম এবং আমার বান্দাদের উপর হালকা করে দিলাম। (৩২০৭) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৬০০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৬০৫)
* ‘সিদরাহ’ শব্দের অর্থ কূল বৃক্ষ এবং ‘মুন্তাহা’ শব্দের অর্থ শেষসীমা। পৃথিবী হতে ঊর্ধ্বলোকে নীত হয় তা ওখানে গিয়েই থেমে পড়ে, অতঃপর তার অপর পাড়ে যাঁরা রয়েছেন তাঁরা সেখান হতে তা গ্রহণ করে উপরে নিয়ে যান। শেষ সীমার চিহ্ন স্বরূপ ঐ স্থানটাতে একটা কুল বৃক্ষ থাকায় ঐ সীমানা- চিহ্নকে ‘সিদ্রাতুল মুনতাহা’ বলা হয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু সা‘সা‘আ (রাঃ)
এই দীর্ঘ বর্ণনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে লক্ষণীয় অসামঞ্জস্যটি অবস্থান নিয়ে। সহিহ মুসলিমের প্রথম বর্ণনা সিদরাতুল মুনতাহাকে ষষ্ঠ আসমানে স্থাপন করছে; অন্যদিকে বিস্তৃত মিরাজ-বর্ণনায় সপ্তম আসমানে ইবরাহিমের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এর কাছে পৌঁছানো হচ্ছে। বর্তমান হাদিসের টীকাতেই নববীর নামে এই সমস্যাটি স্বীকার করা হয়েছে। সমাধান হিসেবে বলা হয়েছে, বৃক্ষটির গোড়া ষষ্ঠ আসমানে এবং ডালপালা সপ্তম আসমানের ওপরে। এই ব্যাখ্যা দুই বর্ণনাকে মিলিয়ে দেয়, কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয় হলো—দুটি মূল বর্ণনার কোনো একটিই নিজে এই গোড়া-শাখার কাঠামো বলেনি। অসামঞ্জস্য দেখা দেওয়ার পর সমন্বয়ের জন্য তৃতীয় একটি ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে।
আদ-দুররুল মানসূর-এর সংরক্ষিত ব্যাখ্যাগুলোতে অবস্থানের বৈচিত্র্য আরও বাড়ে। কোথাও একে দুনিয়ার শেষ ও আখিরাতের শুরু বলা হয়েছে; কা‘বের নামে একে আরশের মূলদেশে অবস্থিত বৃক্ষ বলা হয়েছে; আবার এর ছায়ায় একশ বছর যাত্রার বর্ণনাও এসেছে। [22] ফলে “সিদরাতুল মুনতাহা ঠিক কোথায়?” প্রশ্নের উত্তরে ইসলামী ঐতিহ্য একটি সরল স্থানাঙ্ক দেয় না; বরং ষষ্ঠ আসমান, সপ্তম আসমানের ঊর্ধ্বপ্রান্ত, আরশের মূলদেশ এবং দুনিয়া-আখিরাতের সীমানা—বিভিন্ন ভাষায় ধারণাটিকে ব্যাখ্যা করেছে।
এই পরিবর্তনগুলোকে কেবল ভৌগোলিক পার্থক্য হিসেবে দেখলে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হারিয়ে যায়। কোরআনে “সিদরাতুল মুনতাহা” ছিল একটি সংক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট ধর্মীয় চিত্র। হাদিস ও তাফসিরের স্তর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি ক্রমশ নির্দিষ্ট হয়েছে: কোথায় আছে, কত বড়, কী দিয়ে ঢাকা, কে সেখানে পৌঁছায়, কী নদী বের হয়—সবকিছুর উত্তর তৈরি হয়েছে। কিন্তু বিস্তারিত যত বেড়েছে, বর্ণনার পারস্পরিক অসামঞ্জস্যও তত দৃশ্যমান হয়েছে। এটি মৌখিক ধর্মীয় কাহিনির একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য: সংক্ষিপ্ত কেন্দ্রীয় মোটিফ বিভিন্ন বর্ণনাকারী ও ব্যাখ্যাকারীর হাতে নতুন নতুন উপাদান গ্রহণ করে পূর্ণাঙ্গ মহাজাগতিক দৃশ্যে পরিণত হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো নীল ও ফোরাত। একটি বৃক্ষের বিশাল পাতা কিংবা স্বর্ণের পতঙ্গকে অতিপ্রাকৃত বলে পরীক্ষার বাইরে রাখা যায়; কিন্তু পৃথিবীর দুটি বাস্তব নদীর নাম উচ্চারণের পর বর্ণনা নিজেই পর্যবেক্ষণযোগ্য জগতের সঙ্গে একটি সেতু তৈরি করেছে। পরবর্তী পরিচ্ছেদে তাই প্রশ্নটি হবে: নীল ও ফোরাত বাস্তবে কোথা থেকে উৎপন্ন হয়, এবং সিদরাতুল মুনতাহার মূলের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের দাবি আধুনিক ভূগোল ও জলবিদ্যার সামনে কীভাবে দাঁড়ায়?
নীল ও ফোরাত: আসমানি উৎস বনাম বাস্তব ভূগোল
সিদরাতুল মুনতাহার কাহিনির সবচেয়ে শক্তভাবে পরীক্ষাযোগ্য অংশ হলো নীল ও ফোরাত নদী। হাদিসে এই দুটি নদীকে শুধু জান্নাতি নদীর সঙ্গে প্রতীকীভাবে তুলনা করা হয়নি; মিরাজের বর্ণনায় মুহাম্মদ সিদরাতুল মুনতাহার কাছে চারটি নদী দেখেছেন এবং জিবরাইল দৃশ্যমান দুটি নদীকে সরাসরি নীল ও ফোরাত হিসেবে শনাক্ত করেছেন। কুরতুবির তাফসিরেও একই বর্ণনা সংরক্ষিত: সিদরাতুল মুনতাহার গোড়া থেকে দুটি প্রকাশ্য ও দুটি অপ্রকাশ্য নদী বের হয়; প্রকাশ্য দুটি নীল ও ফোরাত। [23]
আধুনিক জলবিদ্যায় নীল কোনো একক রহস্যময় ঝরনা থেকে বের হওয়া নদী নয়; এটি একটি বিশাল drainage basin বা নদী-অববাহিকা। মূল নীল গঠিত হয় খার্তুমে হোয়াইট নাইল ও ব্লু নাইল-এর মিলনে। Nile Basin Initiative-এর জলসম্পদ-সংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে, হোয়াইট নাইলের পানি আসে Equatorial Lakes অঞ্চলের নদীব্যবস্থা থেকে, আর ব্লু নাইলের উৎস ইথিওপিয়ার উচ্চভূমি; মূল নীলের প্রবাহে ব্লু নাইলের অবদানই সবচেয়ে বড়। [24] [25]
অর্থাৎ নীলের পানি কোথা থেকে আসছে তা কেবল মানচিত্রে নদীর রেখা অনুসরণ করে অনুমান করা হয়নি। অববাহিকায় বৃষ্টিপাত, হ্রদ, জলাধার, উপনদীর প্রবাহ, মৌসুমি discharge, evaporation এবং বিভিন্ন junction-এ পানির পরিমাণ পরিমাপ করা হয়। খার্তুমে হোয়াইট ও ব্লু নাইলের মিলনের পর মূল নীল তৈরি হয়; আরও নিচে আতবারা নদী এতে পানি যোগ করে। এই পুরো ব্যবস্থার পানির প্রবাহ একটি পর্যবেক্ষণযোগ্য hydrological network। এখানে সপ্তম আসমান থেকে নেমে আসা কোনো অজ্ঞাত জলধারাকে নদীর প্রবাহ ব্যাখ্যা করার জন্য প্রয়োজন হয় না।
ফোরাতের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আরও সরাসরি। FAO-র Euphrates–Tigris basin সমীক্ষা অনুযায়ী ফোরাত ও টাইগ্রিস উভয়েরই উজান পূর্ব তুরস্কের পার্বত্য অঞ্চলে। ফোরাত মূলত পূর্ব আনাতোলিয়ার কারাসু ও মুরাত নদী-ব্যবস্থার মিলনে গঠিত হয়ে তুরস্ক থেকে সিরিয়া এবং পরে ইরাকের দিকে প্রবাহিত হয়। [26] FAO-র তুরস্কের জলসম্পদ-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী ফোরাতের মোট বার্ষিক প্রবাহের প্রায় ৯০ শতাংশ তুরস্ক থেকেই আসে। [27]
এখানে “উৎস” শব্দটির বৈজ্ঞানিক অর্থ পরিষ্কার। নদীর পানি আকাশে অদৃশ্য কোনো জলাধার থেকে হঠাৎ সৃষ্টি হয় না; সূর্যের শক্তিতে পরিচালিত জলচক্রের মাধ্যমে সমুদ্র, হ্রদ ও ভূমি থেকে পানি বাষ্পীভূত হয়, বায়ুমণ্ডলে ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টি বা তুষার হিসেবে পড়ে, তারপর surface runoff, groundwater এবং উপনদীর মাধ্যমে নদীতে প্রবেশ করে। নীল ও ফোরাত—উভয় নদীর ক্ষেত্রেই এই জলচক্র এবং অববাহিকার পানি সরবরাহ পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপযোগ্য।
ফলে ধর্মীয় বর্ণনা এবং বাস্তব জলবিদ্যার মধ্যে পার্থক্যটি কোনো দার্শনিক বিমূর্ততা নয়। হাদিসে একটি মহাজাগতিক বৃক্ষের মূলের সঙ্গে নীল ও ফোরাতের উৎপত্তিগত সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে; বাস্তব ভূগোলে নীল তৈরি হচ্ছে আফ্রিকার বিশাল জলাধার ও উপনদী-ব্যবস্থা থেকে, আর ফোরাত তৈরি হচ্ছে পূর্ব তুরস্কের পার্বত্য নদীব্যবস্থা থেকে। তাদের প্রবাহের পানি কোথা থেকে আসছে, কোথায় যোগ হচ্ছে এবং কোন পথে যাচ্ছে—এসব অনুসরণ করা যায়। আসমানের কোনো বৃক্ষ থেকে অতিরিক্ত পানি পৃথিবীতে প্রবেশ করার পর্যবেক্ষণযোগ্য ধাপ এই hydrological system-এ পাওয়া যায় না।
এই বৈপরীত্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয় ইতিহাসের আলোকে। আগের পরিচ্ছেদে দেখা গেছে, জেনেসিসের এডেনেও পবিত্র উদ্যানের একটি নদী চার ধারায় বিভক্ত হচ্ছে এবং তাদের একটি ফোরাত। ইসলামী মিরাজে আবার স্বর্গীয় সীমান্তের একটি বিশেষ বৃক্ষের কাছে চার নদী, যার একটি ফোরাত এবং অন্যটি নীল। প্রাচীন ধর্মীয় ভূগোলে বিখ্যাত নদীগুলোকে স্বর্গীয় জগতের সঙ্গে যুক্ত করা ছিল পরিচিত মোটিফ; আধুনিক ভূগোল সেই নদীগুলোর বাস্তব অববাহিকা উন্মোচন করার পর এই আসমানি মানচিত্র আর পৃথিবীর জলবিদ্যার মানচিত্রের সঙ্গে মেলে না।
“আসল উৎস জান্নাতে”—দাবিটি কী ব্যাখ্যা করে?
নীল ও ফোরাতের পার্থিব উৎস আবিষ্কৃত হওয়ার পর একটি সম্ভাব্য ধর্মীয় ব্যাখ্যা হলো—পৃথিবীতে দৃশ্যমান উৎস থাকলেও নদী দুটির “আসল” বা চূড়ান্ত উৎস জান্নাতে। কিন্তু এটি আধুনিক সমালোচকের বানানো কোনো কাল্পনিক প্রতিরক্ষা নয়; ধ্রুপদি ইসলামী ব্যাখ্যাতেই সমস্যাটির এই সমাধান দেওয়া হয়েছে। ইসলামওয়েবে সংরক্ষিত ফাতহুল বারি-তে ইবন হাজার নববীর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন: নীল ও ফোরাতের “মূল জান্নাত থেকে”; তারা সিদরাতুল মুনতাহার গোড়া থেকে বের হয়, আল্লাহ যেদিকে চান সেদিকে চলে, তারপর পৃথিবীতে নেমে এসে পৃথিবীর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং শেষে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে উৎসারিত হয়। [28]
قال النووي: في هذا الحديث أن أصل النيل والفرات من الجنة، وأنهما يخرجان من أصل سدرة المنتهى، ثم يسيران حيث شاء الله، ثم ينزلان إلى الأرض، ثم يسيران فيها ثم يخرجان منها، وهذا لا يمنعه العقل، وقد شهد به ظاهر الخبر فليعتمد.
বাংলা অনুবাদ: নববী বলেন: এই হাদিসে প্রমাণিত হয় যে নীল ও ফোরাতের মূল উৎস জান্নাতে এবং তারা সিদরাতুল মুনতাহার গোড়া থেকে বের হয়। এরপর আল্লাহ যেদিকে চান সেদিকে প্রবাহিত হয়, তারপর পৃথিবীতে নেমে আসে, পৃথিবীর মধ্যে দিয়ে চলে এবং পরে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে। এর মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অসম্ভব কিছু নেই; হাদিসের প্রকাশ্য অর্থও এর সাক্ষ্য দেয়, তাই এটিই গ্রহণ করতে হবে।
ইবন হাজার এরপর আরও স্পষ্ট করে বলেন: নদী দুটির উৎস প্রথমে জান্নাতে; সেখান থেকে তারা চলতে চলতে পৃথিবীতে স্থিত হয় এবং তারপর পৃথিবী থেকে ঝরনার মতো বেরিয়ে আসে। [29] অর্থাৎ ধ্রুপদি আক্ষরিক ব্যাখ্যায় “নীল ও ফোরাত জান্নাতের নদী” শুধু বরকত বা মর্যাদার রূপক নয়; বাস্তব পানির একটি অদৃশ্য মহাজাগতিক পথ কল্পনা করা হয়েছে—সিদরাতুল মুনতাহা থেকে পৃথিবী পর্যন্ত।
এই ব্যাখ্যা প্রথম সমস্যার সমাধান না করে নতুন একটি অদৃশ্য ধাপ যোগ করে। আমরা পূর্ব তুরস্কে ফোরাতের উপনদী দেখি, কিন্তু বলা হলো তার “আসল” পানি তারও আগে জান্নাত থেকে অদৃশ্য পথে সেখানে এসেছে। আমরা ইথিওপিয়ার উচ্চভূমি, পূর্ব আফ্রিকার হ্রদ ও বৃষ্টিপাত থেকে নীলের পানি তৈরি হতে দেখি, কিন্তু বলা হলো সেই দৃশ্যমান জলচক্রেরও আগে একটি অদৃশ্য স্বর্গীয় উৎস রয়েছে। এই অতিরিক্ত স্তরটির পক্ষে কোনো স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষণ নেই। ফলে যা ব্যাখ্যা করতে চাওয়া হচ্ছে তা পর্যবেক্ষিত কারণ দিয়েই ইতিমধ্যে ব্যাখ্যাত, আর নতুন কারণটি নিজেই নতুন প্রমাণ দাবি করে।
বৈজ্ঞানিকভাবে যদি জান্নাত থেকে বাস্তব পানি পৃথিবীর নদীতে প্রবেশ করে, তবে সেটি নদীর water budget-এর অংশ হতে হবে। একটি নদীতে কত পানি প্রবেশ করছে তা বৃষ্টিপাত, তুষারগলন, উপনদী, ভূগর্ভস্থ পানি এবং evaporation-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। অজ্ঞাত আরেকটি উৎস নিয়মিত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি যোগ করলে inflow ও discharge-এর হিসাবে সেই অতিরিক্ত অবদান দেখা যাওয়ার কথা। আর যদি সেই তথাকথিত জান্নাতি উৎস কোনো পরিমাপযোগ্য পানি যোগ না করে, পানির রাসায়নিক বা ভৌত বৈশিষ্ট্যে কোনো চিহ্ন না রাখে এবং নদীর প্রবাহে কোনো পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রভাব সৃষ্টি না করে, তবে তাকে নদীর “উৎস” বলা জলবিদ্যার কোনো ব্যাখ্যা দেয় না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিগত কৌশল কাজ করে: পর্যবেক্ষিত উৎস এবং দাবি করা “চূড়ান্ত উৎস”কে আলাদা করে দেওয়া। যতক্ষণ নীলের উজান অজানা ছিল, তাকে জান্নাত থেকে আসা নদী হিসেবে কল্পনা করা সরাসরি ভৌগোলিক দাবি ছিল। বাস্তব উজান জানা যাওয়ার পরে যদি বলা হয় “যা দেখা যাচ্ছে সেটি কেবল পৃথিবীর প্রকাশ্য উৎস; আসল উৎস অদৃশ্য”, তাহলে দাবিটি এমনভাবে পুনর্নির্ধারিত হয় যাতে কোনো আবিষ্কারই তাকে ভুল প্রমাণ করতে না পারে। আরও উজান আবিষ্কার করুন—তারও আগে জান্নাত। ভূগর্ভস্থ পানি অনুসরণ করুন—তারও আগে জান্নাত। সম্পূর্ণ water cycle ব্যাখ্যা করুন—তারও পেছনে জান্নাত। এই পদ্ধতিতে দাবিটি প্রমাণিত হয় না; কেবল প্রত্যেক পরীক্ষার নাগালের এক ধাপ বাইরে সরতে থাকে।
ইসলামী ব্যাখ্যার মধ্যেই আবার আক্ষরিক পাঠের পাশাপাশি অন্য ব্যাখ্যার চিহ্ন পাওয়া যায়। আল-মুফহিম-এ হাদিসের প্রকাশ্য অর্থ হিসেবে নদীগুলোর উৎস ও পানির উপাদান জান্নাত থেকে আসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে; পাশাপাশি সম্ভাবনা হিসেবে বলা হয়েছে, “জান্নাতের নদী” বলতে তাদের মিষ্টতা ও বরকতের সঙ্গে জান্নাতের নদীর সাদৃশ্যও বোঝানো হতে পারে। [30] ফলে ইসলামী ব্যাখ্যার নিজের মধ্যেই সমস্যাটি স্পষ্ট: আক্ষরিকভাবে নিলে বাস্তব পৃথিবীর hydrology-র সঙ্গে একটি অদৃশ্য মহাজাগতিক জলপথ যোগ করতে হয়; রূপকভাবে নিলে সিদরাতুল মুনতাহার গোড়া থেকে নদী বের হওয়ার মিরাজ-বর্ণনার সরাসরি ভৌগোলিক ভাষাকে রূপকে পরিণত করতে হয়।
আরও লক্ষণীয়, একই ঐতিহ্যে শুধু নীল ও ফোরাত নয়, সাইহান ও জাইহানকেও “জান্নাতের নদী” বলা হয়েছে। ইবন হাজারের আলোচনায় বলা হয়েছে পৃথিবীতে চারটি নদীর মূল জান্নাতে, যদিও মিরাজের বিশেষ বর্ণনায় সিদরাতুল মুনতাহা থেকে নীল ও ফোরাতের উৎপত্তিই আলাদাভাবে এসেছে। [31] এতে একটি বৃহত্তর প্রাচীন ধর্মীয় ভূগোল দেখা যায়: সভ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৃহৎ নদীগুলোকে পার্থিব জলচক্রের অংশ হিসেবে নয়, স্বর্গীয় জগতের সঙ্গে যুক্ত পবিত্র নদী হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং এই ধর্মীয় ব্যাখ্যার পদ্ধতিগত পার্থক্য তাই মৌলিক। জলবিদ্যা দেখায় কোথায় বৃষ্টি পড়ে, কোথা থেকে runoff আসে, কোন উপনদী কত পানি যোগ করে, কোথায় নদী মিলিত হয় এবং কীভাবে discharge পরিবর্তিত হয়। “জান্নাত থেকে অদৃশ্যভাবে পানি নেমে আসে” এই পর্যবেক্ষণগুলোর একটিও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে না, নতুন কোনো পরীক্ষাযোগ্য পূর্বাভাসও দেয় না। এটি একটি সম্পূর্ণ ব্যাখ্যাত প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর আরেকটি অদৃশ্য কারণ বসায়। সেই কারণে হাদিসের আক্ষরিক দাবিটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার বিকল্প নয়; এটি প্রাচীন ধর্মীয় মহাজাগতিক কাহিনির একটি অতিরিক্ত, অপ্রমাণিত স্তর।
চার নদীর মোটিফ: এডেন থেকে মিরাজ
সিদরাতুল মুনতাহার সঙ্গে চার নদীর সম্পর্ককে আলাদা কোনো ইসলামী কল্পনা হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক পটভূমি ধরা পড়ে না। ইসলাম আবির্ভাবের বহু শতাব্দী আগে হিব্রু বাইবেলের জেনেসিস-এ একটি পবিত্র উদ্যান, বিশেষ বৃক্ষ এবং চার নদীকে একই ধর্মীয় ভূগোলে স্থাপন করা হয়েছিল। এডেনের মধ্যে ছিল জীবনবৃক্ষ এবং ভাল-মন্দের জ্ঞানবৃক্ষ; একই এডেন থেকে একটি নদী বের হয়ে চারটি নদীতে বিভক্ত হয়—পিশোন, গিহোন, টাইগ্রিস এবং ফোরাত। [32]
9 And out of the ground the Lord God made to spring up every tree that is pleasant to the sight and good for food. The tree of life was in the midst of the garden, and the tree of the knowledge of good and evil.
10 A river flowed out of Eden to water the garden, and there it divided and became four rivers.
11 The name of the first is the Pishon. It is the one that flowed around the whole land of Havilah, where there is gold.
12 And the gold of that land is good; bdellium and onyx stone are there.
13 The name of the second river is the Gihon. It is the one that flowed around the whole land of Cush.
14 And the name of the third river is the Tigris, which flows east of Assyria.[a] And the fourth river is the Euphrates.
এই পুরনো কাহিনির কাঠামো লক্ষ্য করলে কয়েকটি উপাদান একসঙ্গে পাওয়া যায়: পবিত্র স্বর্গীয় স্থান, বিশেষ বৃক্ষ, সেখান থেকে প্রবাহিত জল, চার নদী এবং পৃথিবীর পরিচিত ফোরাত। ইসলামী মিরাজের বর্ণনায় বিন্যাসটি পরিবর্তিত, কিন্তু উপাদানগুলোর সমাবেশ বিস্ময়করভাবে পরিচিত: জান্নাতের নিকটে সিদরাতুল মুনতাহা, তার গোড়ার সঙ্গে চার নদীর সম্পর্ক, দুটি অদৃশ্য নদী এবং দুটি পৃথিবীতে দৃশ্যমান নদী—যার একটি আবার সেই একই ফোরাত। অন্য দৃশ্যমান নদী হিসেবে যুক্ত হয়েছে নীল।
| মোটিফ | জেনেসিসের এডেন | ইসলামী মিরাজ |
|---|---|---|
| স্বর্গীয়/পবিত্র অঞ্চল | এডেনের উদ্যান | সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে জান্নাতুল মাওয়া |
| বিশেষ বৃক্ষ | জীবনবৃক্ষ | সিদরাতুল মুনতাহা |
| জলধারা | এডেন থেকে নদী প্রবাহিত | সিদরাতুল মুনতাহার গোড়ায় চার নদী |
| নদীর সংখ্যা | চার | চার |
| বাস্তব পার্থিব নদী | টাইগ্রিস ও ফোরাত | নীল ও ফোরাত |
| ধর্মীয় ভূগোলের প্রকৃতি | স্বর্গীয় উদ্যানকে পৃথিবীর নদীর সঙ্গে যুক্ত করা | ঊর্ধ্বজগতের বৃক্ষকে পৃথিবীর নদীর সঙ্গে যুক্ত করা |
এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো ফোরাতের ধারাবাহিকতা। মেসোপটেমিয়ার এই বিখ্যাত নদী জেনেসিসে এডেনের চার নদীর একটি; কয়েক শতাব্দী পরে ইসলামী মিরাজ-কাহিনিতে আবার সেটি স্বর্গীয় ভূগোলের অংশ হিসেবে হাজির হয়। পার্থক্য হলো, জেনেসিসে নদীটি এডেন থেকে বের হওয়া জলধারার অংশ, আর হাদিসে সেটি সিদরাতুল মুনতাহার গোড়ায় দেখা চার নদীর একটি। প্রাচীন নিকটপ্রাচ্যের ধর্মীয় কল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ পার্থিব নদীকে স্বর্গীয় উৎসের সঙ্গে যুক্ত করার যে ধারণা আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিল, ইসলামী কাহিনিতেও একই ধরনের পবিত্র ভূগোল পুনর্গঠিত হয়েছে।
এটি শুধু চার সংখ্যাটির কাকতালীয় মিল নয়। উভয় কাহিনিতেই পৃথিবীর ভৌগোলিক বাস্তবতার ওপর একটি দ্বিতীয়, ধর্মীয় ভূগোল চাপানো হয়েছে। নদী পৃথিবীতে প্রবাহিত হচ্ছে, কিন্তু তার সর্বশেষ উৎস পৃথিবীর দৃশ্যমান ভূপ্রকৃতিতে নয়—স্বর্গীয় অঞ্চলে। এই কল্পনা এমন এক যুগের ধর্মীয় বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ, যখন পৃথিবীর বড় নদীগুলোর সম্পূর্ণ অববাহিকা, জলচক্র ও উজান সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত ছিল। রহস্যময় বড় নদীর উৎসকে দেবলোক, স্বর্গ বা পবিত্র অঞ্চলে স্থাপন করা তখন একটি স্বাভাবিক পৌরাণিক ব্যাখ্যা ছিল।
সিদরাতুল মুনতাহার কাহিনিতে নীলের সংযোজনও এই দৃষ্টিকোণ থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। নীল প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় এবং জীবনদায়ী নদীগুলোর একটি ছিল। এর মৌসুমি প্লাবন মিশরীয় সভ্যতার অস্তিত্বের ভিত্তি, অথচ বহু শতাব্দী ধরে এর দূরবর্তী উজান সাধারণ মানুষের অজানা ছিল। ফলে ফোরাতের পাশাপাশি নীলকে স্বর্গীয় নদী হিসেবে স্থাপন করা ধর্মীয় কল্পনার জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক নির্বাচন: একটি মেসোপটেমীয় সভ্যতার প্রধান নদী, অন্যটি মিশরীয় সভ্যতার প্রধান নদী—দুটিকেই ইসলামী স্বর্গীয় ভূগোলের মধ্যে টেনে নেওয়া হয়েছে।
এই মোটিফগত ধারাবাহিকতা ইসলামী কাহিনির প্রকৃতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানে নতুন কোনো জলবিদ্যা আবিষ্কৃত হয়নি; বরং ইসলাম-পূর্ব নিকটপ্রাচ্যের পরিচিত ধর্মীয় ভূগোল নতুন নবী, নতুন মিরাজ-কাহিনি এবং নতুন মহাজাগতিক বৃক্ষের সঙ্গে পুনর্গঠিত হয়েছে। এডেনের পবিত্র উদ্যান ও চার নদীর জায়গায় এসেছে সাত আসমানের ঊর্ধ্বসীমা ও সিদরাতুল মুনতাহা; কিন্তু স্বর্গীয় জগত থেকে পৃথিবীর বিখ্যাত নদীর উৎপত্তি—এই মৌলিক পৌরাণিক কাঠামো অক্ষত থেকেছে।
সংক্ষিপ্ত কোরআনিক ইঙ্গিত থেকে বিস্তৃত মহাজাগতিক মিথ
সিদরাতুল মুনতাহার কাহিনির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর ক্রমবর্ধমান বিস্তারিততা। কোরআনের সূরা আন-নাজমে মূল তথ্য খুব অল্প: মুহাম্মদ কাউকে আরেকবার দেখেছেন, ঘটনাটি সিদরাতুল মুনতাহার কাছে, তার নিকটে জান্নাতুল মাওয়া, এবং বৃক্ষটিকে কিছু একটার দ্বারা আচ্ছন্ন করা হয়েছিল। সেখানে গাছটির উচ্চতা, পাতার আকার, ফলের মাপ, নদী, নীল, ফোরাত, ষষ্ঠ বা সপ্তম আসমান, স্বর্ণের পতঙ্গ, ফেরেশতাদের জ্ঞানসীমা—এসবের কিছুই নেই। [33]
হাদিস-ঐতিহ্যে প্রবেশ করার পর দৃশ্যটি নাটকীয়ভাবে বিস্তৃত হয়। মুহাম্মদ সাত আসমান অতিক্রম করেন, প্রতিটি স্তরে পূর্ববর্তী নবীর সঙ্গে দেখা করেন, বায়তুল মামুর দেখেন, তারপর সিদরাতুল মুনতাহার কাছে পৌঁছান। বৃক্ষটির ফল হাজর অঞ্চলের কলসের মতো, পাতা হাতির কানের মতো; তার কাছে চার নদী দেখা যায়; দুটি জান্নাতের এবং দুটি পৃথিবীর নীল ও ফোরাত। আরও বর্ণনায় এর ছায়া অতিক্রম করতে শত বছরের যাত্রা, স্বর্ণের পতঙ্গ এবং অসংখ্য অতিপ্রাকৃত বৈশিষ্ট্য যুক্ত হয়। [34] [35]
| উপাদান | কোরআন | হাদিস ও তাফসিরে বিস্তৃত রূপ |
|---|---|---|
| সিদরাতুল মুনতাহা | নাম উল্লেখ | বিশাল মহাজাগতিক বৃক্ষ |
| অবস্থান | সুনির্দিষ্ট আসমান বলা হয়নি | ষষ্ঠ আসমান, সপ্তম আসমানের পর, আরশের মূলদেশ—বিভিন্ন ব্যাখ্যা |
| পাতা | কিছু বলা হয়নি | হাতির কানের মতো |
| ফল | কিছু বলা হয়নি | হাজর অঞ্চলের কলসের মতো |
| আয়তন | কিছু বলা হয়নি | ছায়ায় একশ বছরের যাত্রা |
| চার নদী | কিছু বলা হয়নি | চার নদী, দুটি জান্নাতি ও দুটি প্রকাশ্য |
| নীল ও ফোরাত | নেই | দুটি প্রকাশ্য নদী হিসেবে শনাক্ত |
| স্বর্ণের পতঙ্গ | নেই | বৃক্ষকে আচ্ছন্ন করে |
| মহাজাগতিক সীমা | “মুনতাহা” নাম | ওহি, আমল, নবী-ফেরেশতার জ্ঞান বা যাত্রার শেষসীমা—বহু ব্যাখ্যা |
কুরতুবি শুধু সিদরাতুল মুনতাহার নামকরণেরই নয়টি আলাদা ব্যাখ্যা সংরক্ষণ করেছেন। কোথাও নিচ থেকে ওঠা ও ওপর থেকে নামা সবকিছুর শেষসীমা; কোথাও নবীদের জ্ঞানের শেষ; কোথাও আমলের শেষসীমা; কোথাও ফেরেশতা ও নবীদের যাত্রার সমাপ্তি; কোথাও মুমিন বা শহীদদের আত্মার গন্তব্য; আবার কোথাও আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের মাথার ওপর অবস্থিত মহাজাগতিক বৃক্ষ। [36] একটি স্পষ্ট মহাজাগতিক তথ্যের পরিবর্তে এখানে দেখা যায়, একটি অস্পষ্ট কোরআনিক শব্দকে বিভিন্ন প্রজন্মের ব্যাখ্যাকারীরা নিজ নিজ ধর্মতাত্ত্বিক অর্থে পূর্ণ করেছেন।
আদ-দুররুল মানসূর-এ এই বিস্তার আরও দৃশ্যমান। কা‘বের বর্ণনায় বৃক্ষটি আরশের মূলদেশে; মুজাহিদের কাছে এটি দুনিয়ার শেষ ও আখিরাতের শুরু; আসমা বিনতে আবু বকরের বর্ণনায় এর একটি ডালের ছায়ায় একশ বছর চলা যায়; ইবন আব্বাসের নামে স্বর্ণের পতঙ্গের কথা আসে। [37] একই সংক্ষিপ্ত শব্দগুচ্ছের চারপাশে এভাবে স্থান, আকার, রং, প্রাণী, নদী এবং ধর্মতাত্ত্বিক কার্যকারিতা স্তরে স্তরে যুক্ত হয়েছে।
এই textual development-এর সময়গত দিকও লক্ষণীয়। কোরআন সপ্তম শতকের পাঠ; অন্যদিকে আজ যে দুই সহিহ গ্রন্থের মাধ্যমে মিরাজের বিস্তারিত বর্ণনা সবচেয়ে কর্তৃত্বপূর্ণ রূপে পাওয়া যায়, তাদের সংকলক বুখারি জন্মেছেন ১৯৪ হিজরিতে এবং মারা গেছেন ২৫৬ হিজরিতে; মুসলিম জন্মেছেন ২০৬ হিজরিতে এবং মারা গেছেন ২৬১ হিজরিতে। [38] [39] ফলে আমাদের হাতে থাকা canonical textual record-এ একটি স্পষ্ট স্তরবিন্যাস দেখা যায়: প্রথমে সংক্ষিপ্ত কোরআনিক দৃশ্য, পরে তৃতীয় হিজরি শতকের বৃহৎ হাদিসসংকলনে বিস্তারিত কাহিনি, এরপর তাফসিরে সেই কাহিনির ওপর আরও বহু ব্যাখ্যা ও অলংকরণ।
এই বিস্তারকে বুঝতে মৌখিক ধর্মীয় কাহিনির স্বাভাবিক বিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। একটি সংক্ষিপ্ত পবিত্র ইঙ্গিত যত বেশি প্রচারিত হয়, শ্রোতার অমীমাংসিত প্রশ্ন তত বাড়ে: গাছটি কোথায়? কত বড়? কী দিয়ে ঢাকা? সেখানে কে যেতে পারে? কেন তার নাম “শেষসীমা”? মুহাম্মদ সেখানে কাকে দেখেছিলেন? সেই জায়গায় কী ছিল? পরবর্তী বর্ণনা-ঐতিহ্য এসব শূন্যস্থান পূরণ করতে থাকে। ফলাফল হলো, কয়েকটি অস্পষ্ট আয়াত ধীরে ধীরে একটি অত্যন্ত নির্দিষ্ট মহাজাগতিক ভ্রমণকাহিনিতে রূপ নেয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিস্তারিত বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অসামঞ্জস্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। কোরআনে অবস্থান নির্দিষ্ট নয়; পরে কেউ ষষ্ঠ আসমান বলেছেন, অন্য বর্ণনায় সপ্তম আসমানের পর বৃক্ষটি এসেছে। “তাকে দ্বিতীয়বার দেখা” কোরআনে নামবিহীন; পরে একদল জিবরাইল, অন্যদল আল্লাহ বলেছেন। “মুনতাহা” কেন—এ প্রশ্নে নয়টি ব্যাখ্যা। অর্থাৎ পরবর্তী ব্যাখ্যাগুলো কোরআনের অস্পষ্টতা দূর করেনি; বরং একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিস্তারিত বর্ণনা তৈরি করেছে।
এই pattern-টি সিদরাতুল মুনতাহাকে ঐতিহাসিক ধর্মীয় মিথ হিসেবে বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী। একটি প্রাচীন, সংক্ষিপ্ত এবং প্রতীকঘন পাঠকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সম্প্রদায় ক্রমাগত দৃশ্য, চরিত্র, পরিমাপ, ভূগোল ও ধর্মতত্ত্ব যোগ করেছে। শেষ পর্যন্ত যে কাহিনি পাওয়া যায়, সেটি আর সূরা আন-নাজমের কয়েকটি বাক্য নয়; এটি বহু স্তরের বর্ণনা ও ব্যাখ্যার সমন্বয়ে গঠিত একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী মহাজাগতিক পুরাণ।
পুরনো মোটিফের নতুন ইসলামী বিন্যাস
সিদরাতুল মুনতাহার কাহিনিটিকে সামগ্রিকভাবে দেখলে এর বিভিন্ন উপাদানের উৎসগত স্তরগুলো আলাদা করে চেনা যায়। আরবের নিজস্ব ধর্মীয় সংস্কৃতিতে সিদর বৃক্ষের পবিত্রতা আগে থেকেই পরিচিত ছিল; যাতু আনওয়াতের কাহিনিতে মুশরিকদের পবিত্র সিদর বৃক্ষের কাছে অবস্থান করা ও অস্ত্র ঝুলিয়ে রাখার বিবরণ রয়েছে। [40] আরবের আল-উযযার উপাসনার সঙ্গেও বৃক্ষের সম্পর্ক ছিল। [41] অর্থাৎ কোনো বিশেষ বৃক্ষকে অতিপ্রাকৃত মর্যাদার স্থান হিসেবে কল্পনা করার সাংস্কৃতিক উপাদান ইসলাম আবির্ভাবের আগেই আরবের ধর্মীয় জগতে সক্রিয় ছিল।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরও পুরনো নিকটপ্রাচ্য ধর্মীয় ভূগোল। জেনেসিসে পবিত্র এডেন, জীবনবৃক্ষ, একটি স্বর্গীয় নদী, চারটি নদী এবং ফোরাত একই কাহিনির অংশ। ইসলামী মিরাজ-বর্ণনায় পাওয়া যায় জান্নাতের নিকটবর্তী পবিত্র বৃক্ষ, চার নদী এবং আবার ফোরাত। [42] প্রাচীন ইরানি ধর্মীয় ঐতিহ্যে মহাজাগতিক বৃক্ষ, অমরত্বদায়ী বৃক্ষ এবং মহাজাগতিক জল একে অপরের সঙ্গে যুক্ত; নর্স পুরাণে বিশ্ববৃক্ষ বিভিন্ন জগতকে সংযুক্ত করে এবং তার শিকড়ের কাছে অতিপ্রাকৃত জলাধার রয়েছে। ফলে বৃক্ষ + ঊর্ধ্বজগৎ + জল + বিশ্বসীমা—এই উপাদানসমষ্টি ইসলামের আগে থেকেই ইউরেশিয়ার বিস্তৃত ধর্মীয় কল্পনায় উপস্থিত ছিল।
ইসলামী কাহিনির বিশেষত্ব হলো এই পরিচিত মোটিফগুলোকে একটি নতুন ধর্মতাত্ত্বিক বিন্যাসে সংগঠিত করা। স্থানীয় আরবের পরিচিত সিদর হয়ে যায় মহাজাগতিক শেষসীমার বৃক্ষ; ইহুদি-খ্রিস্টীয় স্বর্গীয় নদীর ভূগোল যুক্ত হয় চার নদীর মাধ্যমে; ফোরাত আবার স্বর্গীয় উৎসের সঙ্গে যুক্ত হয়; নীলকেও সেই ভূগোলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়; সাত আসমানের স্তরবিন্যাস, জিবরাইল, পূর্ববর্তী নবীগণ, বায়তুল মামুর এবং মুহাম্মদের ঊর্ধ্বযাত্রা সবকিছুকে একটি একক আখ্যানের মধ্যে বসানো হয়। ফলাফল হলো পুরনো মোটিফগুলোর একটি স্বতন্ত্র ইসলামী synthesis।
| পুরনো মোটিফ | ইসলাম-পূর্ব উপস্থিতি | ইসলামী পুনর্বিন্যাস |
|---|---|---|
| পবিত্র সিদর বৃক্ষ | আরবের যাতু আনওয়াত | সিদরাতুল মুনতাহা |
| বৃক্ষ ও দেবীয় পবিত্রতা | আল-উযযা ও পবিত্র বৃক্ষ | আল্লাহর জ্যোতি, ফেরেশতা ও মহাজাগতিক বৃক্ষ |
| স্বর্গীয় উদ্যান ও বিশেষ বৃক্ষ | এডেন ও জীবনবৃক্ষ | জান্নাতুল মাওয়ার নিকটে সিদরাতুল মুনতাহা |
| চার নদী | এডেনের চার নদী | সিদরার কাছে চার নদী |
| ফোরাতের স্বর্গীয় সম্পর্ক | এডেনের চার নদীর একটি | সিদরাতুল মুনতাহার প্রকাশ্য নদী |
| মহাজাগতিক বৃক্ষ | ইরানি, ভারতীয় ও নর্স ঐতিহ্য | ঊর্ধ্বজগতের শেষসীমার সিদর |
| বহুস্তরীয় ঊর্ধ্বজগৎ | Late Antique ইহুদি-খ্রিস্টীয় ও নিকটপ্রাচ্য মহাজাগতিক ঐতিহ্য | সাত আসমানের মিরাজ |
এখানে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনটি হলো স্থানান্তর। জাহেলি আরবের পবিত্র সিদর ছিল পৃথিবীতে; ইসলামে সিদরকে সরিয়ে নেওয়া হলো মহাজাগতিক শেষসীমায়। এডেনের নদী ছিল স্বর্গীয় উদ্যান থেকে পৃথিবীর দিকে; মিরাজে নদীগুলোকে পাওয়া গেল আসমানের সিদরার কাছে। পৃথিবীর পরিচিত ফোরাত একই সঙ্গে পুরনো বাইবেলীয় পবিত্র ভূগোল এবং নতুন ইসলামী স্বর্গীয় ভূগোলের অংশ হয়ে রইল। পুরনো মোটিফগুলো বিলুপ্ত হয়নি; তাদের ধর্মতাত্ত্বিক মালিকানা ও অবস্থান বদলেছে।
অসামঞ্জস্য মেলাতে পরবর্তী ব্যাখ্যার স্তর
সিদরাতুল মুনতাহার বর্ণনাগুলো বিশ্লেষণ করলে আরেকটি ধারাবাহিক pattern দেখা যায়: যখন দুটি ধর্মীয় বর্ণনা সরাসরি মেলে না, পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীরা এমন একটি তৃতীয় ব্যাখ্যা তৈরি করেন যা উভয়টিকেই একসঙ্গে সত্য রাখতে পারে। এর সবচেয়ে পরিষ্কার উদাহরণ বৃক্ষটির অবস্থান। একটি সহিহ বর্ণনায় এটি ষষ্ঠ আসমানে; অন্য মিরাজ-বর্ণনায় সপ্তম আসমানে পৌঁছানোর পর এর কাছে যাওয়া হচ্ছে। সমাধান হিসেবে বলা হলো—গোড়া ষষ্ঠ আসমানে, ডালপালা সপ্তমের ওপরে। মূল দুই বর্ণনার কোনোটিতেই এই তথ্য নেই; বিরোধ মেলানোর জন্য পরবর্তী ভাষ্যে এটি যুক্ত হয়েছে।
একই ঘটনা নীল ও ফোরাতের ক্ষেত্রেও ঘটে। হাদিসের প্রকাশ্য ভাষায় সিদরাতুল মুনতাহার কাছে দেখা নদী দুটি নীল ও ফোরাত। পৃথিবীতে তাদের ভৌগোলিক উৎস দৃশ্যমান হওয়ায় ব্যাখ্যা তৈরি হয়—পৃথিবীতে যে উৎস দেখা যায় সেটি আসল উৎস নয়; প্রকৃত উৎস জান্নাতে, নদী দুটি অদৃশ্যভাবে পৃথিবীর মধ্যে প্রবেশ করে পরে পরিচিত উৎস থেকে বেরিয়ে আসে। নববী এবং ইবন হাজারের ব্যাখ্যায় এই ধারণা স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। [43]
কাকে দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল—এই সমস্যার ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া দেখা যায়। কোরআনের বাক্য শুধু বলে, মুহাম্মদ “তাকে আরেকবার দেখেছিলেন”। ইবন আব্বাসের ধারায় এর অর্থ আল্লাহ; আয়িশা ও ইবন মাসউদের ধারায় জিবরাইল। জিবরাইল-পাঠে আবার “দ্বিতীয়বার” কথাটিকে অর্থপূর্ণ করতে যোগ করতে হয়—সাধারণভাবে দ্বিতীয়বার দেখা নয়, জিবরাইলকে তাঁর প্রকৃত আকৃতিতে দ্বিতীয়বার দেখা। অথচ “প্রকৃত আকৃতিতে” কথাটি সংশ্লিষ্ট আয়াতে নেই। কুরতুবি দুই মতই সংরক্ষণ করেছেন। [44]
“মুনতাহা” শব্দটির ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। যদি এটি একটি স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত মহাজাগতিক সীমা হতো, তার অর্থ একটিই হওয়ার কথা। কিন্তু কুরতুবি এর নামকরণের নয়টি ব্যাখ্যা সংরক্ষণ করেছেন—আমলের শেষসীমা, জ্ঞানের শেষসীমা, ফেরেশতাদের যাত্রার শেষসীমা, নবীদের জ্ঞানের সীমা, আত্মার গন্তব্য ইত্যাদি। [45] এখানে সংক্ষিপ্ত কোরআনিক শব্দ কোনো একটি সুস্পষ্ট মহাজাগতিক তথ্য সরবরাহ করেনি; বরং ব্যাখ্যাকারীদের সামনে একটি খালি স্থান তৈরি করেছে, যা বিভিন্নভাবে পূরণ করা হয়েছে।
| মূল সমস্যা | উৎসে পাওয়া ভিন্নতা | পরবর্তী সমন্বয় |
|---|---|---|
| সিদরার অবস্থান | ষষ্ঠ আসমান / সপ্তম আসমানের পর | গোড়া ষষ্ঠে, শাখা সপ্তমের ওপরে |
| নীল ও ফোরাতের উৎস | সিদরার কাছে / পৃথিবীর দৃশ্যমান অববাহিকা | আসল উৎস জান্নাতে, পরে অদৃশ্যভাবে পৃথিবীতে আসে |
| দ্বিতীয় দর্শন | আল্লাহ / জিবরাইল | জিবরাইলকে “প্রকৃত আকৃতিতে” দ্বিতীয়বার দেখা |
| “মুনতাহা”র অর্থ | একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যাখ্যা | প্রতিটি মত নিজস্ব ধর্মতাত্ত্বিক অর্থ স্থাপন করে |
| বৃক্ষের প্রকৃতি | পাতা, ফল, মূল ও নদীসহ বস্তুগত ভাষা | ভৌত আপত্তির ক্ষেত্রে “অতিপ্রাকৃত” সত্তা |
এই ধরনের সমন্বয় পদ্ধতির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সাধারণত কোনো বর্ণনাকে ভুল হতে দেয় না। দুটি বক্তব্য ভিন্ন হলে এমন একটি অদৃশ্য কাঠামো কল্পনা করা হয় যেখানে দুটিই সত্য: গাছ একই সঙ্গে ষষ্ঠ ও সপ্তম আসমানে; নদীর উৎস একই সঙ্গে তুরস্ক-আফ্রিকার দৃশ্যমান অববাহিকায় এবং জান্নাতে; “দেখা” একই সঙ্গে আল্লাহ-দর্শনের প্রাচীন ব্যাখ্যা বহন করে আবার জিবরাইলের আসল আকৃতির দর্শনও হতে পারে। ফলে বর্ণনাকে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পরিবর্তে বাস্তবতার ওপর নতুন নতুন অদৃশ্য স্তর যোগ করা হয়।
এটি একটি self-sealing ব্যাখ্যাপদ্ধতি তৈরি করে। কোনো পর্যবেক্ষণ সরাসরি ধর্মীয় দাবির সঙ্গে না মিললে সেই পর্যবেক্ষণকে অস্বীকার করাও প্রয়োজন হয় না; শুধু বলা যায় দৃশ্যমান বাস্তবতার পেছনে আরেকটি অদৃশ্য বাস্তবতা রয়েছে। নদীর দৃশ্যমান উৎস আছে—কিন্তু তার পেছনে স্বর্গীয় উৎস। গাছ ষষ্ঠ আসমানে—কিন্তু তার শাখা সপ্তমে। জিবরাইল আগে থেকেই সঙ্গে—কিন্তু এখানে তাঁকে অন্য আকৃতিতে দেখা। এভাবে প্রত্যেক অসামঞ্জস্যের জন্য নতুন auxiliary explanation যোগ করা সম্ভব হয়।
বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ঠিক বিপরীত পথে চলে। একটি ব্যাখ্যা যত বেশি অতিরিক্ত অনুমান দাবি করে, তার প্রমাণের দায় তত বাড়ে। দুটি তথ্য না মিললে প্রথমে পরীক্ষা করা হয় কোনো একটি তথ্য ভুল কি না, measurement ভুল কি না, অথবা মডেলটি পরিবর্তন প্রয়োজন কি না। কিন্তু ধর্মীয় harmonization-এ পবিত্র বর্ণনাগুলোকে অপরিবর্তনীয় ধরে নিয়ে বাস্তবতার মডেলই বারবার সম্প্রসারিত করা হয়। ফলে ব্যাখ্যাটি ক্রমে এমন অবস্থায় পৌঁছায় যেখানে কোনো সম্ভাব্য পর্যবেক্ষণই তাকে বাতিল করতে পারে না।
সিদরাতুল মুনতাহার কাহিনির সমস্যাটি তাই কোনো একটি অদ্ভুত গাছ বা একটি ভুল নদীর উৎসে সীমাবদ্ধ নয়। সমস্যাটি পদ্ধতিগত। প্রথমে একটি সংক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট ধর্মীয় বর্ণনা; তারপর শতাব্দীব্যাপী বিস্তারিত সংযোজন; সেই বিস্তারিতগুলোর মধ্যে ভিন্নতা; এবং শেষে সেই ভিন্নতা মেলাতে আরও নতুন ব্যাখ্যা। এই স্তরগুলো একত্রে পড়লে একটি স্থির মহাজাগতিক প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেদন নয়, বরং ক্রমবিকাশমান ধর্মীয় কাহিনির ইতিহাসই বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কোন ব্যাখ্যাটি বেশি যুক্তিযুক্ত?
সিদরাতুল মুনতাহার কাহিনিকে বিচার করার সময় শেষ প্রশ্নটি হলো—উপলব্ধ তথ্য ব্যাখ্যা করতে কোন মডেলটি কম অনুমান দাবি করে এবং বেশি তথ্য ব্যাখ্যা করতে পারে? একটি মডেল হলো, সত্যিই ঊর্ধ্বজগতের কোনো স্তরে হাতির কানের মতো পাতাবিশিষ্ট, বিশাল ফলধারী একটি মহাজাগতিক সিদর বৃক্ষ রয়েছে; সেটি ষষ্ঠ ও সপ্তম আসমানের সীমানা জুড়ে বিস্তৃত; তার কাছে চারটি নদী রয়েছে; নীল ও ফোরাতের প্রকৃত উৎস সেই বৃক্ষের কাছে; সেই পানি অদৃশ্য পথে পৃথিবীতে নেমে পরে পরিচিত ভূগোলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে; এবং এই পুরো ব্যবস্থাটি আধুনিক পর্যবেক্ষণের কোনো চিহ্ন রেখে যায় না। এই ব্যাখ্যার প্রতিটি ধাপের জন্য এমন সত্তা, স্থান ও প্রক্রিয়া অনুমান করতে হয় যেগুলোর স্বাধীন প্রমাণ নেই।
অন্য মডেলটি অনেক সরল। সপ্তম শতকের আরব ও বৃহত্তর নিকটপ্রাচ্যের ধর্মীয় পরিবেশে পবিত্র বৃক্ষ, স্বর্গীয় উদ্যান, বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ, ঊর্ধ্বযাত্রা, দেবীয় সীমান্ত, স্বর্গীয় নদী এবং পৃথিবীর বিখ্যাত নদীকে অলৌকিক উৎসের সঙ্গে যুক্ত করার মোটিফ আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। কোরআনে একটি সংক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট সিদর-বর্ণনা উপস্থিত হয়; পরবর্তী মৌখিক ও হাদিসি ঐতিহ্যে সেটির সঙ্গে আকার, নদী, ফেরেশতা, মহাজাগতিক অবস্থান ও অন্যান্য বিস্তারিত যুক্ত হয়; বিভিন্ন বর্ণনায় পার্থক্য তৈরি হলে তাফসিরকারেরা সেগুলো সমন্বয়ের চেষ্টা করেন। এই মডেলের জন্য কোনো অদৃশ্য নদীপথ, অজানা জীববিজ্ঞান বা পরীক্ষার বাইরে থাকা মহাজাগতিক উদ্ভিদ অনুমান করতে হয় না; ধর্মীয় কাহিনি কীভাবে গড়ে ওঠে এবং বিস্তৃত হয়—মানব ইতিহাসে পর্যবেক্ষিত সেই প্রক্রিয়াই যথেষ্ট।
এই দুই ব্যাখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অনুমানের পরিমাণ এক নয়। প্রথমটি প্রতিটি সমস্যার সমাধানে নতুন অদৃশ্য সত্তা যোগ করে। গাছের অবস্থান মেলে না—গোড়া এক আসমানে, শাখা অন্য আসমানে। নদীর পৃথিবীর উৎস পাওয়া গেছে—আসল উৎস তারও আগে জান্নাতে। জিবরাইল সফরসঙ্গী হয়েও “দ্বিতীয়বার দেখা” হচ্ছে—তখন বলা হয় আসল আকৃতিতে দেখা। কোনো ভৌত প্রমাণ নেই—বস্তুটি অতিপ্রাকৃত। অর্থাৎ ব্যাখ্যাটি যত সমস্যার মুখোমুখি হয়, তত নতুন auxiliary assumption যোগ করা সম্ভব হয়।
কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা এমনভাবে তৈরি করা হলে যে প্রতিটি সম্ভাব্য পর্যবেক্ষণের পরেও সেটিকে সত্য রাখা যায়, তখন তার পরীক্ষাযোগ্যতা প্রায় বিলুপ্ত হয়। নীলের উজান পাওয়া গেলেও দাবি অক্ষত, ফোরাতের সম্পূর্ণ অববাহিকা জানা গেলেও দাবি অক্ষত, মহাকাশে কোনো সিদর পাওয়া না গেলেও দাবি অক্ষত—কারণ প্রতিবারই বলা যায় আসল ব্যবস্থা দৃশ্যমান জগতের বাইরে। এই ধরনের দাবি তথ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে না; তথ্য যেদিকেই যাক, দাবিটিকে তার বাইরে সরিয়ে নেওয়া যায়।
একটি শক্তিশালী ব্যাখ্যা শুধু বিদ্যমান বিশ্বাসকে রক্ষা করে না; সেটি স্বাধীনভাবে কিছু ব্যাখ্যা করে এবং ভুল হওয়ার ঝুঁকিও নেয়। পৃথিবীর জলবিদ্যা নীল ও ফোরাতের প্রবাহ সম্পর্কে পরিমাপযোগ্য পূর্বাভাস দেয়। বৃষ্টিপাত কমলে কী হবে, কোন উপনদীর প্রবাহ কত, কোন মৌসুমে discharge বাড়বে—এসব পরীক্ষা করা যায়। “আসল পানি জান্নাত থেকে আসে” এমন কোনো অতিরিক্ত পূর্বাভাস দেয় না। পৃথিবীর জলচক্র ঠিক যেভাবে কাজ করত, দাবিটি সত্য হলেও একইভাবে কাজ করবে, মিথ্যা হলেও একইভাবে কাজ করবে। ফলে নদীর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় এই অনুমানের explanatory contribution কার্যত শূন্য।
একই যুক্তি মহাজাগতিক বৃক্ষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সিদরাতুল মুনতাহার অস্তিত্ব অনুমান না করেও কোরআনের সংক্ষিপ্ত ভাষা, পরবর্তী হাদিসের বিস্তারিততা, বিভিন্ন বর্ণনার বিরোধ, ইসলাম-পূর্ব পবিত্র বৃক্ষের সংস্কৃতি, এডেনের চার নদী, ফোরাতের পুনরাবির্ভাব এবং তাফসিরের ক্রমবর্ধমান ব্যাখ্যা—সবকিছুকে ধর্মীয় কাহিনির ঐতিহাসিক বিকাশ দিয়ে একসঙ্গে ব্যাখ্যা করা যায়। বিপরীতে কাহিনিটিকে প্রত্যক্ষ মহাজাগতিক প্রতিবেদন হিসেবে ধরলে প্রতিটি স্তরে নতুন অপ্রমাণিত বাস্তবতা গ্রহণ করতে হয়।
এই কারণে দুই মডেলের মধ্যে পৌরাণিক-ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাই অধিক সাশ্রয়ী, অধিক সংহত এবং বিদ্যমান তথ্যের সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে কাহিনির কোনো অংশকে আগে থেকেই সত্য ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং যে ধরনের ধর্মীয় মোটিফ মানুষের ইতিহাসে বহুবার সৃষ্টি হয়েছে, তার আরেকটি আঞ্চলিক ও ধর্মতাত্ত্বিক রূপ হিসেবেই সিদরাতুল মুনতাহাকে বোঝা যায়।
উপসংহার
সিদরাতুল মুনতাহার কাহিনি প্রথম দর্শনে ইসলামী মহাজাগতিক বিশ্বাসের একটি স্বতন্ত্র অলৌকিক ঘটনা বলে মনে হলেও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এর নির্মাণের স্তরগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসলাম-পূর্ব আরবে পবিত্র সিদর বৃক্ষের ধর্মীয় ব্যবহার ছিল; বৃহত্তর নিকটপ্রাচ্যে স্বর্গীয় উদ্যান, বিশেষ বৃক্ষ, পবিত্র নদী ও ফোরাতকে স্বর্গীয় ভূগোলের অংশ করার কাহিনি বহু শতাব্দী পুরনো; ইরানি, ভারতীয় ও নর্স ঐতিহ্যেও মহাজাগতিক বৃক্ষ জগতের স্তর, জীবন, জল ও অতিপ্রাকৃত অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। ইসলামী কাহিনি এই পরিচিত মোটিফগুলোকে নতুন ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোয় সংগঠিত করেছে—মুহাম্মদের মিরাজ, সাত আসমান, জিবরাইল, জান্নাত এবং “শেষসীমার সিদর”কে কেন্দ্র করে।
কোরআনের নিজস্ব বক্তব্য এই পরবর্তী মহাজাগতিক কাহিনির তুলনায় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। সেখানে সিদরাতুল মুনতাহার নাম আছে, তার কাছে জান্নাতুল মাওয়ার কথা আছে এবং মুহাম্মদের একটি রহস্যময় দর্শনের উল্লেখ আছে। কিন্তু কাকে দেখা হয়েছিল, বৃক্ষটি কোন আসমানে, তার পাতা ও ফল কত বড়, তার মূলের নদীগুলো কী—এসব বিস্তারিত কোরআন দেয় না। পরবর্তী হাদিস ও তাফসিরে একে একে এই শূন্যস্থান পূরণ হয়েছে। একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে মতভেদ: দ্বিতীয়বার দেখা সত্তা আল্লাহ না জিবরাইল; বৃক্ষ ষষ্ঠ আসমানে না সপ্তমের পরে; “মুনতাহা” ঠিক কিসের শেষসীমা—এসব প্রশ্নে ইসলামি উৎসগুলো নিজেরাই একাধিক উত্তর সংরক্ষণ করেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো আল্লাহ-দর্শনের বিতর্ক। কোরআন শুধু বলে মুহাম্মদ “তাকে আরেকবার দেখেছিলেন”; নাম উল্লেখ করে না। প্রাচীন ইসলামি ব্যাখ্যার এক ধারায়, বিশেষত ইবন আব্বাসের নামে, এই দর্শনের বিষয় আল্লাহ; অন্য ধারায় আয়িশা ও ইবন মাসউদের নামে জিবরাইল। কোরআনের ধারাবাহিক ভাষায় আল্লাহ-পাঠের যথেষ্ট শক্তি রয়েছে: ওহিদাতা আল্লাহ ও তাঁর বান্দার প্রসঙ্গ থেকে দর্শনের আলোচনা এগোয়, এবং “দ্বিতীয়বার দেখা” তখন অর্থপূর্ণ একটি ঈশ্বর-দর্শনের বর্ণনা হয়। জিবরাইল-পাঠকে প্রতিষ্ঠা করতে পরবর্তী ব্যাখ্যায় “নিজস্ব বা প্রকৃত আকৃতিতে” কথাটি যোগ করতে হয়। এই বিতর্কই দেখায়, আজ যে একক ব্যাখ্যাকে অনেক সময় স্বাভাবিক অর্থ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, প্রাচীন ইসলামী ঐতিহ্যে বিষয়টি মোটেই তত সরল ছিল না।
হাদিসে এসে কাহিনিটি আরও স্পষ্টভাবে বস্তুগত রূপ নেয়। পাতা হাতির কানের মতো, ফল বিশাল কলসের মতো, মূলের কাছে চার নদী, তার দুটি নীল ও ফোরাত। এখানেই কাহিনি পরীক্ষাযোগ্য পৃথিবীর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রবেশ করে। নীলের পানি পূর্ব আফ্রিকার হ্রদ, ইথিওপীয় উচ্চভূমি, বৃষ্টিপাত ও উপনদী-ব্যবস্থার অংশ; ফোরাত পূর্ব আনাতোলিয়ার নদী ও পার্বত্য জলাধার থেকে গঠিত। তাদের পানি কোথা থেকে আসে, কোন পথে চলে এবং কত প্রবাহিত হয়—এসব পরিমাপযোগ্য। এই বাস্তব জলবিদ্যার ওপর “আসল উৎস জান্নাতে” নামে আরেকটি অদৃশ্য জলপথ বসানো কোনো নতুন তথ্য ব্যাখ্যা করে না।
একই সঙ্গে বর্ণনার অসামঞ্জস্যগুলো মেলাতে পরবর্তী ব্যাখ্যার প্রকৃতিও গুরুত্বপূর্ণ। ষষ্ঠ ও সপ্তম আসমানের সমস্যায় তৈরি হয় “গোড়া ষষ্ঠে, শাখা সপ্তমে”; পৃথিবীর নদীর উৎসের সমস্যায় “প্রথমে জান্নাত, পরে অদৃশ্যভাবে পৃথিবীতে”; জিবরাইলের দ্বিতীয় দর্শনের সমস্যায় “আসল আকৃতিতে”। এই ব্যাখ্যাগুলো মূল বর্ণনার তথ্য নয়; ধর্মীয় উৎসগুলোর কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে পার্থক্যগুলোকে একসঙ্গে সত্য করার প্রচেষ্টা।
তাই সিদরাতুল মুনতাহার কাহিনিকে বোঝার জন্য মহাকাশে সত্যিই একটি বিরাট কুলগাছ আছে—এই অনুমান প্রয়োজন হয় না। বরং মানব সংস্কৃতিতে পবিত্র বৃক্ষের দীর্ঘ ইতিহাস, ইসলাম-পূর্ব আরবের সিদর-সংস্কৃতি, এডেনের বৃক্ষ ও চার নদীর পুরনো ধর্মীয় ভূগোল, কোরআনের সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত, পরবর্তী হাদিসের বিস্তার এবং তাফসিরে ক্রমাগত সমন্বয়—এই ধারাবাহিক ইতিহাসই কাহিনিটির গঠনকে যথেষ্ট ব্যাখ্যা করে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি বিশ্বাসের আবেগ নয়, প্রমাণের মানদণ্ড। ইগড্রাজেল সম্পর্কে নর্স গ্রন্থে বিস্তারিত বর্ণনা থাকা ইগড্রাজেলের বাস্তব অস্তিত্ব প্রমাণ করে না; এডেনের চার নদীর কাহিনি বাস্তব পৃথিবীর জলবিদ্যা নির্ধারণ করে না; একইভাবে হাদিসে সিদরাতুল মুনতাহার বিস্তারিত বর্ণনা থাকাও মহাবিশ্বে সেই বৃক্ষের বাস্তব অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করে না। ধর্মীয় কাহিনি তার নিজস্ব ঐতিহ্যের ইতিহাসের প্রমাণ; প্রকৃতি ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে বাস্তব দাবি প্রমাণ করতে প্রয়োজন সেই কাহিনির বাইরে স্বাধীন, পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রমাণ। সিদরাতুল মুনতাহার ক্ষেত্রে সেই স্বাধীন প্রমাণ অনুপস্থিত, অথচ কাহিনিটির উপাদান, বিবর্তন ও অসামঞ্জস্য ব্যাখ্যা করার জন্য আমাদের সামনে রয়েছে একটি সুপরিচিত মানবিক প্রক্রিয়া—পুরাণ নির্মাণ।
তথ্যসূত্রঃ
- বাইবেল, জেনেসিস ২:৯–১৪—জীবনবৃক্ষ, চার নদী ও ফোরাত ↩︎
- ভগবদ্গীতা ১৫:১—ঊর্ধ্বমূল, অধঃশাখ অশ্বত্থ ↩︎
- Encyclopaedia Iranica—Zoroastrian cosmic tree, Tree of All Seeds এবং Gaokerena ↩︎
- Yggdrasil—নর্স বিশ্ববৃক্ষ ↩︎
- Encyclopaedia Iranica—প্রাচীন ইরানি মহাজাগতিক বৃক্ষ ও মহাজাগতিক জল ↩︎
- তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৩: মুশরিকদের সিদর বৃক্ষ “যাতু আনওয়াত” ↩︎
- ইবনু বাযের ফতোয়া, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৩৬–৩৪০: মুশরিকদের সিদর বৃক্ষের কাছে অবস্থান ও অস্ত্র ঝুলিয়ে রাখা ↩︎
- IslamWeb—তাফসির আল-কুরতুবি, সূরা আন-নাজম: আল-উযযা ও তিনটি সামুরা বৃক্ষ ↩︎
- IslamWeb—আল-উযযার তিন বৃক্ষ ও নাখলার উপাসনাস্থল ↩︎
- বাইবেল, জেনেসিস ২:৯–১৪—জীবনবৃক্ষ, এডেনের নদী, চার শাখা ও ফোরাত ↩︎
- Cambridge, Pre-Islamic Arabia—ষষ্ঠ-সপ্তম শতকের হিজাজে scriptural communities ও ধর্মীয় পরিবেশ ↩︎
- Cambridge History of Judaism—ইসলাম-পূর্ব উত্তর-পশ্চিম আরব ও দক্ষিণ আরবে ইহুদি সম্প্রদায় ↩︎
- তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ৯১–৯৫—সিদরাতুল মুনতাহার নামকরণ ও বিভিন্ন ব্যাখ্যা ↩︎
- আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৪ ↩︎
- তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া, সূরা আন-নাজম ৫৩:১৩–১৪—জিবরাইলকে দ্বিতীয়বার দেখার ব্যাখ্যা ↩︎
- তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ৯১–৯৫—৫৩:১৩-এ আল্লাহ ও জিবরাইল উভয় ব্যাখ্যা ↩︎
- তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৭—ইবন আব্বাস: মুহাম্মদ তাঁর রবকে দুইবার দেখেছেন ↩︎
- তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৭—আবু হুরায়রা ও ইবন মাসউদ: এখানে জিবরাইলকে দেখা হয়েছিল ↩︎
- তাফসির আল-বাগাভি—“তারপর তিনি নিকটবর্তী হলেন”: আল্লাহ ও জিবরাইল উভয় ব্যাখ্যা ↩︎
- কাজি ইয়াদ, আশ-শিফা—মিরাজে আল্লাহর নৈকট্য ও ইবন আব্বাসের ব্যাখ্যা ↩︎
- তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৭—সিদরাতুল মুনতাহার বিশালতা, স্বর্ণের পতঙ্গ এবং মহাজাগতিক সীমা ↩︎
- তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৭—সিদরাতুল মুনতাহার অবস্থান, বিশালতা ও সীমান্তের ব্যাখ্যা ↩︎
- তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ৯১–৯৫—সিদরাতুল মুনতাহা থেকে নীল ও ফোরাত ↩︎
- Nile Basin Initiative—White Nile, Blue Nile এবং নীলের জলবিদ্যা ↩︎
- Nile Basin Initiative—Main Nile Sub-basin hydrology ↩︎
- FAO AQUASTAT—Euphrates–Tigris River Basin ↩︎
- FAO—Turkey water resources and Euphrates flow ↩︎
- ইবন হাজার, ফাতহুল বারি—নীল ও ফোরাত সিদরাতুল মুনতাহা থেকে পৃথিবীতে নেমে আসে ↩︎
- IslamWeb—নীল ও ফোরাতের “আসল উৎস” জান্নাতে: নববী ও ইবন হাজারের ব্যাখ্যা ↩︎
- আল-মুফহিম—নীল ও ফোরাত জান্নাতের নদী: আক্ষরিক ও রূপক ব্যাখ্যা ↩︎
- IslamWeb—সাইহান, জাইহান, নীল ও ফোরাত জান্নাতের নদী ↩︎
- Genesis 2:9–14—জীবনবৃক্ষ, এডেনের নদী এবং চারটি নদীর একটি ফোরাত ↩︎
- তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া—সূরা আন-নাজম ৫৩:১৩–১৮ ↩︎
- তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ৯১–৯৫—সিদরাতুল মুনতাহার অবস্থান, আকার ও ব্যাখ্যা ↩︎
- তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৭—বিশাল বৃক্ষ, স্বর্ণের পতঙ্গ ও একশ বছরের ছায়া ↩︎
- তাফসীর আল-কুরতুবী—“সিদরাতুল মুনতাহা” নামকরণের নয়টি ব্যাখ্যা ↩︎
- তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর—সিদরাতুল মুনতাহাকে ঘিরে বিভিন্ন বর্ণনা ↩︎
- IslamWeb—ইমাম বুখারি: ১৯৪–২৫৬ হিজরি ↩︎
- IslamWeb—ইমাম মুসলিম: ২০৬–২৬১ হিজরি ↩︎
- তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর—যাতু আনওয়াত: মুশরিকদের পবিত্র সিদর বৃক্ষ ↩︎
- তাফসীর আল-কুরতুবী—আল-উযযা ও নাখলার বৃক্ষসমূহ ↩︎
- Genesis 2:9–14—এডেন, জীবনবৃক্ষ, চার নদী ও ফোরাত ↩︎
- ইবন হাজার, ফাতহুল বারি—নীল ও ফোরাত জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নেমে আসে ↩︎
- তাফসীর আল-কুরতুবী—সিদরার কাছে আল্লাহ না জিবরাইল, উভয় ব্যাখ্যা ↩︎
- তাফসীর আল-কুরতুবী—সিদরাতুল মুনতাহার নামকরণের বিভিন্ন ব্যাখ্যা ↩︎
About This Article
Genre: Islamic Cosmology Critique, Sidrat al-Muntaha Analysis, Mi‘raj Mythology Review, Comparative Religion, Tafsir Dispute Analysis, and Sacred-Tree Motif Study
Epistemic Position: Secular Humanism, Historical Criticism, Mythological Analysis, Source Criticism, Scientific Skepticism, Comparative-Religion Method, and Anti-Apologetic Reasoning
This article examines Sidrat al-Muntaha as an Islamic cosmic tree described in the Quran, hadith, tafsir, and Mi‘raj narratives, with particular attention to its location, physical features, rivers, and role as a boundary of the upper world.
The central argument is that the detailed Islamic picture of Sidrat al-Muntaha is better understood as a mythological construction built from older sacred-tree and heavenly-river motifs, later hadith expansions, tafsir harmonizations, and unverifiable supernatural geography—not as an independently established feature of the cosmos.
The article also discusses world-tree motifs, Yggdrasil, the inverted Ashvattha tree, the Zoroastrian cosmic tree, Eden's tree and four rivers, pre-Islamic Arabian sacred trees, Dhat Anwat, al-‘Uzza's tree cult, Quran 53:10–18, whether Muhammad saw Allah or Jibril near Sidrat al-Muntaha, Ibn Abbas, Aisha, Ibn Mas‘ud, Qurtubi, al-Durr al-Manthur, the sixth-heaven versus seventh-heaven problem, the tree's elephant-ear leaves and huge jar-like fruits, the four rivers, and the claim that the Nile and Euphrates originate from or near the tree.
This article should be evaluated through comparative mythology, tafsir history, hadith criticism, Quranic context, geography, hydrology, source criticism, and standards of independent evidence—not through devotional immunity, post-hoc harmonization, miracle-presumption, symbolic escape routes, selective Sunni interpretation, or the demand that a religious story about a cosmic tree be treated as verified cosmology.




তথ্য সমৃদ্ধ লেখা। রেফারেন্সগুলো একটি লেখায়, একসাথে পেয়ে অনেক সুবিধা হল। মনে শুধু একটা প্রশ্ন, আরব্য রজনীর এইসব রূপকথার গল্প কতবার বললে পরে মানুষ এর হাস্যকর দিকটা বুঝতে পারবে?
I am a deist but I follow your discussion .
Wonderful.
Mr.koyes ali….kwarais people ask Muhammod (sallahu akyhe wa sallam) about meraj night and he give answer ( with Allah’s help)….Meraz night is not fun.use your brain.thank you