ইসলামি শরিয়া রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার
ভূমিকা
আমরা যারা শান্তিপ্রিয় মানুষ, বাংলাদেশ, ভারত কিংবা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে বসবাস করি, প্রত্যেকেই পরিবার, আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদা নিয়ে নিরাপদে জীবনযাপন করতে চাই। আমি যেমন নিজের সম্মান রক্ষা করে বাঁচতে চাই, অন্য মানুষও ঠিক তেমনই চান। আমার ঘরবাড়ি, সম্পত্তি, উপাসনালয় কিংবা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কারণে কেউ আমাকে আক্রমণ করুক, রাষ্ট্র আমাকে নিচু শ্রেণির মানুষ হিসেবে গণ্য করুক, আদালত আমার ধর্ম দেখে আমার বক্তব্যের মূল্য নির্ধারণ করুক—এসবের কোনোটিই আমি নিজের জন্য মেনে নেব না। অন্যের ক্ষেত্রেও তাই একই অধিকার স্বীকার করতে হবে। আমার অধিকার নিশ্চিত হওয়ার স্থায়ী ভিত্তি হচ্ছে সকলের সমান অধিকার; আমার জন্য বিশেষ সুবিধা আদায় করে অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া সেই ভিত্তিকে ধ্বংস করে। আজ যে মানুষ সংখ্যাগুরু, অন্য দেশে বা অন্য পরিস্থিতিতে তিনিই সংখ্যালঘু হতে পারেন। সংখ্যার জোরে অধিকার কমানোর নীতি মেনে নিলে নিজের বিরুদ্ধে সেই নীতি প্রয়োগের আপত্তিও দুর্বল হয়ে যায়। বাংলাদেশে বাঙালির সংখ্যাধিক্য দেখিয়ে অবাঙালি আদিবাসীর অধিকার অস্বীকার করা যেমন অন্যায়, মুসলিমের সংখ্যাধিক্য দেখিয়ে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা অবিশ্বাসীর অধিকার কমিয়ে দেওয়াও তেমনই অন্যায়। মানুষের জন্মভূমিতে বসবাস, নিরাপত্তা পাওয়া এবং মর্যাদা নিয়ে বাঁচার অধিকার সংখ্যাগুরুর দয়া বা ধর্মীয় অনুমতির ওপর নির্ভর করতে পারে না। যে রাষ্ট্রে একজন নাগরিককে সারাক্ষণ নিজের বিশ্বাস গোপন রাখতে হয়, অপমান সহ্য করতে হয় কিংবা অন্যের ধর্মীয় কর্তৃত্ব মেনে থাকার শর্তে নিরাপত্তা পেতে হয়, সেই রাষ্ট্রে তার বসবাসের অনুমতি থাকতে পারে, কিন্তু সমান নাগরিক হিসেবে স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন থাকে না।
রাষ্ট্রের চোখে মানুষ আগে নাগরিক, পরে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, নাস্তিক বা অন্য কিছু। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকদের শাসক ও অধীন প্রজা, সম্মানিত ও অপমানযোগ্য মানুষে ভাগ করা হলে সেই ব্যবস্থার ভিত্তিতেই বৈষম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামি শরিয়া রাষ্ট্রে অমুসলিমের অবস্থান নিয়ে এই প্রবন্ধের মূল প্রশ্ন এখানেই: নিজের জন্মভূমিতে একজন অমুসলিম কি মুসলিমের সমান অধিকার নিয়ে থাকতে পারবেন, নাকি তার নিরাপত্তা, ধর্ম পালন, সামাজিক মর্যাদা ও বিচারপ্রাপ্তি মুসলিম কর্তৃত্বের নির্ধারিত শর্তে সীমাবদ্ধ থাকবে? ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিমেরা সবচেয়ে নিরাপদ ও সম্মানিত থাকেন—এই প্রচলিত দাবিকে বিচার করতে হলে দেখতে হবে, তারা নতুন উপাসনালয় নির্মাণ করতে পারেন কি না, নিজের ধর্ম প্রকাশ্যে প্রচার করতে পারেন কি না, যোগ্যতা থাকলে কর্তৃত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে যেতে পারেন কি না এবং মুসলিমের বিরুদ্ধে আদালতে সমানভাবে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন কি না। একজন মুসলিম ও একজন অমুসলিম নিহত হলে হত্যাকারীর শাস্তি ও নিহতের পরিবারের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ একই নীতিতে নির্ধারিত হয় কি না, সেটিও এই বিচারের অংশ। এসব অধিকার ধর্মের কারণে বদলে গেলে বৈষম্য কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির দুর্ব্যবহার থাকে না; তা রাষ্ট্রের আইন, আদালত, প্রশাসন ও সামাজিক বিধানের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন একজন অমুসলিম আইন মেনে, কর দিয়ে এবং সমাজের জন্য কাজ করেও নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অধস্তন অবস্থান থেকে বের হতে পারেন না। এই প্রবন্ধে শরিয়তের সেই প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের দাঁত-নখ দলিলসহ খুলে দেখানো হবে। যারা শরিয়ত প্রতিষ্ঠার দাবি করেন, তাদের অনেকেই এর প্রশংসা শুনেছেন, কিন্তু অমুসলিমের ওপর আরোপিত বিধানগুলো বিস্তারিত পড়েননি। সেই বিধান জানার পরে পাঠক নিজেই বিচার করুন, এমন রাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিক হয়েও ধর্মের কারণে নিচু আসনে বসা, কম অধিকার পাওয়া, নিজের বিশ্বাস প্রকাশে বাধা পাওয়া এবং বিচারপ্রাপ্তিতে পিছিয়ে থাকা কতটা গ্রহণযোগ্য।
এই প্রশ্ন কেবল আইনগ্রন্থের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায় নিজের ঐতিহাসিক বসতিতে নিরাপদে টিকে থাকতে পারছে কি না, পরবর্তী প্রজন্ম সেখানে ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে কি না এবং নিজের বিশ্বাস বজায় রেখেই সমাজে সমানভাবে অংশ নিতে পারছে কি না—এসবও তার অবস্থান বোঝার গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতীয় উপমহাদেশে অমুসলিমদের অবস্থান বিচার করতে তাই তাদের ঐতিহাসিক উপস্থিতি, জনসংখ্যার পরিবর্তন, দেশত্যাগ, উপাসনালয়ের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণের প্রশ্নগুলো একসঙ্গে দেখতে হবে। একটি পরিবার প্রাণ বাঁচাতে জন্মভূমি ছাড়তে বাধ্য হলে, নিজের সম্পত্তি রক্ষা করতে না পারলে কিংবা সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য অন্য দেশে আশ্রয় খুঁজলে, তার কষ্টকে “অমুসলিমেরা নিরাপদে আছে” কথাটি দিয়ে মুছে দেওয়া যায় না। একইভাবে কোনো সম্প্রদায়ের কয়েকজন মানুষ টিকে থাকলেই সেই সম্প্রদায়ের স্বাধীনতা ও সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলা যায় না। তাদের টিকে থাকার শর্ত কী, সেটিই বিচার্য। নিজের অবস্থান বদলে বিষয়টি ভাবুন: একজন মুসলিম ইউরোপে যে স্বাধীনতায় ধর্ম পালন, মসজিদ নির্মাণ, ধর্ম প্রচার এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে অংশ নিতে চান, একজন অমুসলিম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে সেই স্বাধীনতা চাইলে তাকে কেন বাধা দেওয়া হবে? যে আইন আপনি সংখ্যালঘু অবস্থায় নিজের বিরুদ্ধে মেনে নিতে রাজি নন, সেই আইন সংখ্যাগুরু অবস্থায় অন্যের ওপর চাপানোর নৈতিক অধিকার আপনার নেই। ইউরোপে মুসলিমের মসজিদ নির্মাণের অধিকার থাকলে মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমের মন্দির ও গির্জা নির্মাণের অধিকারও থাকতে হবে। ভারতে মুসলিমকে রাষ্ট্রপতি হতে বাধা দেওয়া সাম্প্রদায়িকতা হলে শরিয়া রাষ্ট্রে অমুসলিমকে ধর্মের কারণে শাসনক্ষমতা থেকে বাদ দেওয়াও সাম্প্রদায়িকতা। ন্যায়বিচারের দাবি নিজের সম্প্রদায়ের সুবিধা দিয়ে নয়, অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও একই অধিকার পাচ্ছেন কি না, সেই পরীক্ষা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়।
আলোচনার শুরুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেনে নিন: ইসলাম স্পষ্টভাবে অমুসলিম দেশগুলোতে ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে আক্রমণাত্মক জিহাদের নির্দেশ দেয়। এতে অমুসলিম নাগরিকদের মধ্যে মুশরিকদের হত্যা এবং আহলে কিতাব (ইহুদি ও খ্রিস্টানদের) ওপর অবমাননাকর জিযিয়া কর আরোপের নির্দেশ রয়েছে। একই সাথে, অমুসলিম যুদ্ধবন্দী নারীদের গনিমতের মাল হিসেবে যৌনকর্মের জন্য দাসীতে পরিণত করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়গুলো এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হচ্ছে না, কারণ তাতে আলোচনা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। তবে আগ্রহী পাঠকরা এই লেখাটি পড়ে নিতে পারেন [1]। আক্রমণাত্মক জিহাদের লক্ষ্য, শিরক উচ্ছেদের নির্দেশ এবং সেই উদ্দেশ্যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ধর্মীয় ভিত্তি সম্পর্কে বিস্তারিত দলিল পাওয়া যাবে সংশয়ের পৃথক প্রবন্ধে [2]। মুহাম্মদের অভিযানে আক্রমণাত্মক যুদ্ধ ও ভিন্নমতাবলম্বী দমনের ঘটনাগুলোও পৃথকভাবে সংকলিত রয়েছে [3]। আর যুদ্ধের ফলে বেসামরিক নারী ও শিশুদের বন্দিত্ব, দাসত্ব এবং গনিমতের অন্তর্ভুক্ত করার বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে এই লেখায় [4]।
ধর্মনিরপেক্ষতা কাকে বলে
ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে সাধারণভাবে রাষ্ট্রের আইন, শাসনক্ষমতা ও নাগরিক অধিকারকে কোনো বিশেষ ধর্মের কর্তৃত্ব থেকে পৃথক রাখাকে বোঝায়। রাষ্ট্র পরিচালিত হবে মানুষের ইহলৌকিক কল্যাণ, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং সমান মর্যাদার ভিত্তিতে। একজন নাগরিক কোন ধর্মে বিশ্বাস করেন, কোনো ধর্মেই বিশ্বাস করেন না, নাকি জীবনের কোনো পর্যায়ে নিজের বিশ্বাস পরিবর্তন করেছেন—এসবের কারণে তার নাগরিক অধিকার বাড়বে বা কমবে না। রাষ্ট্রের কাছে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদি ও নাস্তিক একই মর্যাদার নাগরিক। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক এবং অন্য কাউকে অনুমতিপ্রাপ্ত অধীন বাসিন্দা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। রাষ্ট্রের আইন কোনো ধর্মের অনুসারীকে জন্মগতভাবে শাসনের যোগ্য এবং অন্য ধর্মের অনুসারীকে জন্মগতভাবে শাসিত হওয়ার উপযুক্ত ঘোষণা করবে না। আদালতে একজন মানুষের বক্তব্য কতটা সত্য, তা প্রমাণ দিয়ে যাচাই হবে; তিনি কোন ধর্মের মানুষ, তা দিয়ে সত্য-মিথ্যা নির্ধারিত হবে না। কোনো অপরাধের বিচারেও অপরাধী কিংবা ভুক্তভোগীর ধর্মীয় পরিচয় তার প্রাণ, সম্পত্তি বা মর্যাদার মূল্য বদলে দিতে পারবে না। ধর্মনিরপেক্ষতার মূল ভিত্তি হচ্ছে, রাষ্ট্রে থাকার অধিকার এবং রাষ্ট্রের কাছে সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার কোনো বিশেষ ধর্মের অনুসারীদের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। সেই অধিকার প্রতিটি নাগরিকের; সংখ্যাগুরুর অনুগ্রহে তা দেওয়া হচ্ছে না এবং সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় অসন্তোষের কারণে তা কেড়ে নেওয়াও যাবে না।
ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও স্বাধীন পছন্দের বিষয়। কেউ নিজের ধর্ম পালন করবেন, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন, অন্যের সঙ্গে নিজের বিশ্বাস নিয়ে আলোচনা করবেন কিংবা নিজের বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি দেবেন—এই স্বাধীনতা তার থাকবে। একইভাবে অন্য কেউ সেই বিশ্বাসের সমালোচনা করবেন, তা প্রত্যাখ্যান করবেন, অন্য ধর্ম গ্রহণ করবেন কিংবা কোনো ধর্মেই বিশ্বাস করবেন না—তারও সেই স্বাধীনতা থাকবে। ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্বাধীনতা স্বীকার করার অর্থ মানুষকে নিজের ঘরের ভেতরে ধর্ম পালন করতে দিয়ে জনসমাজে তার পরিচয় নিষিদ্ধ করা নয়। উপাসনা, ধর্মীয় শিক্ষা, উপাসনালয় এবং বিশ্বাস প্রকাশের সুযোগ ধর্মভেদে আলাদা করা হলে স্বাধীনতাও আলাদা হয়ে যায়। একজন মুসলিম প্রকাশ্যে নিজের ধর্ম প্রচার করতে পারবেন, কিন্তু একজন হিন্দু বা খ্রিস্টান পারবেন না; একজন মুসলিম নিজের সন্তানকে ধর্মীয় শিক্ষা দিতে পারবেন, কিন্তু অন্য ধর্মের মানুষ বাধার মুখে পড়বেন—এমন ব্যবস্থা ধর্মনিরপেক্ষতার মৌলিক নীতির বিরোধী। ধর্ম পালন বা প্রচারের নামে অন্যের ওপর জবরদস্তি, হামলা, সম্পত্তি দখল কিংবা অধিকার হরণ করা হলে রাষ্ট্র তা বন্ধ করবে। সেই হস্তক্ষেপের ভিত্তি হবে মানুষের ক্ষতি ও অধিকারহরণ, কোনো ধর্মকে সত্য বা অন্য ধর্মকে মিথ্যা ঘোষণা করার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নয়। কাউকে ধর্ম পালনে বাধ্য করা হবে না, ধর্ম ত্যাগ করতেও বাধ্য করা হবে না; নিজের বিশ্বাস বজায় রাখার জন্য তাকে অপমান সহ্য করতে বা রাষ্ট্রীয় অধিকার ছেড়ে দিতে হবে না।
ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মানুষের বাস্তব প্রয়োজন, তথ্য ও প্রমাণ দিয়ে বিচার করা হবে। কোনো বিধানকে আল্লাহর আইন, ঈশ্বরের আদেশ কিংবা ধর্মীয়ভাবে পবিত্র বলা হলেই সেটি রাষ্ট্রের সব নাগরিকের ওপর চাপানোর অধিকার তৈরি হয় না। আইন মানুষের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, কার অধিকার রক্ষা করছে এবং কার অধিকার হরণ করছে—এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। বিদ্যালয়, হাসপাতাল, আদালত, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নাগরিকের ধর্মীয় পরিচয় তার যোগ্যতার বিকল্প হতে পারবে না। একইভাবে কোনো দরিদ্র মানুষের ক্ষুধা, অসুস্থতা বা নিরাপত্তার প্রয়োজন তার ধর্ম দেখে ছোট হয়ে যায় না। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সেবায় প্রবেশের অধিকার নির্ধারিত হবে প্রাসঙ্গিক প্রয়োজন ও ন্যায্য মানদণ্ডে। সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নেবে, কিন্তু সংখ্যাধিক্য দেখিয়ে অন্যের মৌলিক অধিকার বাতিল করতে পারবে না। “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার”—এই কথার অর্থ তাই প্রত্যেকের ধর্ম থাকতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কোনো একটি ধর্মের অনুসারীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে না। আইনের সামনে সমতা, নিজের বিশ্বাস পরিবর্তনের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সমান অংশগ্রহণের এই মানদণ্ড মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাতেও স্পষ্টভাবে রয়েছে। নিচে প্রাসঙ্গিক চারটি অনুচ্ছেদের সম্পূর্ণ বাংলা অনুবাদ দেওয়া হলো [7]।
অনুচ্ছেদ ২: জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা, ধর্ম, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো মত, জাতীয় বা সামাজিক উৎস, সম্পত্তি, জন্ম কিংবা অন্য কোনো অবস্থার ভিত্তিতে কোনো ধরনের পার্থক্য ছাড়াই প্রত্যেকে এই ঘোষণায় উল্লিখিত সব অধিকার ও স্বাধীনতার অধিকারী। এ ছাড়া কোনো ব্যক্তি যে দেশ বা ভূখণ্ডের অধিবাসী, সেটি স্বাধীন, অছি-শাসিত, স্বশাসনহীন কিংবা অন্য কোনোভাবে সীমিত সার্বভৌমত্বের অধীন হোক না কেন, সেই দেশ বা ভূখণ্ডের রাজনৈতিক, বিচারিক বা আন্তর্জাতিক অবস্থানের ভিত্তিতেও কোনো পার্থক্য করা যাবে না।
অনুচ্ছেদ ৭: আইনের সামনে সবাই সমান এবং কোনো বৈষম্য ছাড়াই আইনের সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। এই ঘোষণার লঙ্ঘনকারী যেকোনো বৈষম্য এবং তেমন বৈষম্যের যেকোনো উসকানির বিরুদ্ধে সবাই সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী।
অনুচ্ছেদ ১৮: প্রত্যেকের চিন্তা, বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। এই অধিকারের মধ্যে নিজের ধর্ম বা বিশ্বাস পরিবর্তনের স্বাধীনতা এবং একা অথবা অন্যদের সঙ্গে মিলিতভাবে, প্রকাশ্যে বা ব্যক্তিগতভাবে, শিক্ষা, চর্চা, উপাসনা ও ধর্মাচার পালনের মাধ্যমে নিজের ধর্ম বা বিশ্বাস প্রকাশের স্বাধীনতা অন্তর্ভুক্ত।
অনুচ্ছেদ ২১: ১. প্রত্যেকের সরাসরি অথবা স্বাধীনভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নিজের দেশের সরকার পরিচালনায় অংশ নেওয়ার অধিকার রয়েছে। ২. প্রত্যেকের নিজের দেশের রাষ্ট্রীয় সেবায় সমান প্রবেশাধিকারের অধিকার রয়েছে। ৩. জনগণের ইচ্ছা হবে সরকারের কর্তৃত্বের ভিত্তি। এই ইচ্ছা নিয়মিত ও প্রকৃত নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকাশিত হবে; নির্বাচন হবে সর্বজনীন ও সমান ভোটাধিকারের ভিত্তিতে এবং গোপন ভোট অথবা সমতুল্য স্বাধীন ভোটদানের পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে।
এই মানদণ্ডে অমুসলিমের অধিকার বিচার করতে গেলে কেবল “তাদের হত্যা করা হবে না” কিংবা “তারা নিজ ধর্মে থাকতে পারবে” বলা যথেষ্ট নয়। মানুষের জীবন রক্ষা রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব; সেই দায়িত্ব পালনকে অন্য অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিনিময়মূল্য বানানো যায় না। একজন অমুসলিম বেঁচে থাকবেন, কিন্তু নিজের ধর্ম প্রকাশ্যে প্রচার করতে পারবেন না; কর দেবেন, কিন্তু কর্তৃত্বপূর্ণ পদ পাবেন না; আদালতে যাবেন, কিন্তু মুসলিমের বিরুদ্ধে তার সাক্ষ্য ধর্মের কারণে অগ্রহণযোগ্য হবে—এমন অবস্থায় তার নাগরিক অধিকার সমান নয়। নিজের জন্মভূমিতে তাকে বসবাসের অনুমতি দেওয়া এবং সেই রাষ্ট্রের সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। শাসকের শর্ত মেনে নিরাপত্তা পাওয়া অধীন প্রজার অবস্থান; নিজের ধর্মীয় পরিচয় বজায় রেখেও আইন, প্রশাসন ও সমাজে সমান মর্যাদা পাওয়া নাগরিকের অধিকার। শরিয়া রাষ্ট্রে অমুসলিমের অবস্থান যাচাই করতে এই পার্থক্যটি সামনে রাখতে হবে।
উপমহাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতাঃ তত্ত্ব বনাম বাস্তবতা
বাঙলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্মের পরে ১৯৭২ সালের প্রথম সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মূলনীতির কথা উল্লেখ করা হয়। সেগুলো হচ্ছে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তা থেকে বেরিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরে এই ঘোষণার তাৎপর্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের পরিচয় হবে তার নাগরিকত্ব; তার ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে রাষ্ট্র তার অধিকার কমাবে বা বাড়াবে না। কিন্তু সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা লিখে দিলেই রাষ্ট্রের প্রশাসন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সামাজিক আচরণ আপনাআপনি ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে যায় না। সেই ঘোষণার বাস্তব অর্থ বোঝা যায় একজন সংখ্যালঘু নাগরিক বিপদে পড়লে। তার বাড়ি আক্রান্ত হলে পুলিশ কী করে, তার জমি দখল হলে প্রশাসন কী করে, তার উপাসনালয় ভাঙা হলে আদালত কী করে, কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাকে ভয় দেখানো হলে রাষ্ট্র কতটা কার্যকরভাবে তার পাশে দাঁড়ায়—এসবই সেই পরীক্ষার অংশ। সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় আবেগের সামনে সংখ্যালঘুর অধিকারকে বারবার আপস করতে হলে সংবিধানের প্রতিশ্রুতি কাগজেই থেকে যায়। বাঙলাদেশের অমুসলিমদের অবস্থান বিচার করতে তাই ঘোষিত নীতির সঙ্গে তাদের বাস্তব নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, সম্পত্তির অধিকার এবং বিচার পাওয়ার সুযোগ মিলিয়ে দেখতে হবে। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা, আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কে কী বলা হয়েছে, সেটিও এখানে সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক। সংশ্লিষ্ট তিনটি অনুচ্ছেদের পূর্ণ বক্তব্য নিচে দেয়া হলো [8] [9]।
ধর্ম নিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা
১২। ধর্ম নিরপেক্ষতা নীতি বাস্তবায়নের জন্য
(ক) সর্ব প্রকার সাম্প্রদায়িকতা,
(খ) রাষ্ট্র কর্তৃক কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান,
(গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অপব্যবহার,
(ঘ) কোন বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার উপর নিপীড়ন,
বিলোপ করা হইবে।
আইনের দৃষ্টিতে সমতা
২৭। সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।
ধর্মীয় স্বাধীনতা
৪১। (১) আইন, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতা-সাপেক্ষে
(ক) প্রত্যেক নাগরিকের যে কোন ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার রহিয়াছে;
(খ) প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায় ও উপ-সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্থাপন, রক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অধিকার রহিয়াছে।
(২) কোন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে যোগদানকারী কোন ব্যক্তির নিজস্ব ধর্ম-সংক্রান্ত না হইলে তাঁহাকে কোন ধর্মীয় শিক্ষাগ্রহণ কিংবা কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা উপাসনায় অংশগ্রহণ বা যোগদান করিতে হইবে না।
বাঙলাদেশের বহু মুসলিমই মাঝে মাঝে এই বলে আক্ষেপ করেন যে, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা দুর্বল হয়ে পড়ছে, উগ্র হিন্দুত্ববাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এবং মুসলিমদের ধর্মীয় পরিচয়কে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই উদ্বেগের বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার আহ্বান, মুসলিমদের সন্দেহজনক জনগোষ্ঠী হিসেবে উপস্থাপন এবং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর বিষয়গুলো কেবল রাজনৈতিক স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এগুলো মানুষের নিরাপত্তা, জীবিকা এবং সামাজিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে। ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের তিনজন বিশেষ প্রতিবেদক ভারত সরকারের কাছে পাঠানো চিঠিতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, সহিংসতায় উসকানি এবং বয়কটের আহ্বানসংক্রান্ত অভিযোগ তুলে ধরে ব্যাখ্যা চেয়েছেন [10]। আবার বাঙলাদেশের অন্য দিকের রাষ্ট্র মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিপীড়নের সঙ্গে বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী বিদ্বেষ এবং রাষ্ট্রীয় বঞ্চনা যুক্ত হয়েছে। নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা, চলাচলে বাধা দেয়া এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকার সুযোগ সংকুচিত করা সেখানে পরস্পর সম্পর্কিত সমস্যা। জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এই বৈষম্যকে পদ্ধতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য হিসেবে উল্লেখ করে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন এবং বৈষম্যমূলক আইন ও বিধিনিষেধ অপসারণের আহ্বান জানিয়েছে [11]। এসব ক্ষেত্রে সমস্যা শুধু কোনো ব্যক্তির অন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণা নয়। সেই ঘৃণা যখন নাগরিকত্ব, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, চলাচলের অনুমতি কিংবা সেবা পাওয়ার শর্ত নির্ধারণ করে, তখন নিপীড়ন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে।
আমরা যারা নিজেদের সভ্য মানুষ বলে দাবি করি, তারা চাই কোনো রাষ্ট্রই যেন মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে ভেদাভেদ না করে। সকল মানুষ, তাদের ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গ যা-ই হোক, যেন রাষ্ট্র এবং আইনের কাছ থেকে সমান অধিকার ও সুযোগ পায়। ধর্মভিত্তিক বৈষম্যের অবসান হোক; মানুষের যোগ্যতা ও কর্মকেই মূল্য দেয়া হোক। কিন্তু এই দাবি নিজের জনগোষ্ঠীর জন্য যতটা প্রযোজ্য, অন্য জনগোষ্ঠীর জন্যও ঠিক ততটাই প্রযোজ্য। ভারতে একজন মুসলিমের উপাসনালয় আক্রান্ত হলে আমরা যে নিরাপত্তা দাবি করি, বাঙলাদেশ বা পাকিস্তানে একজন হিন্দু কিংবা খ্রিস্টানের উপাসনালয় আক্রান্ত হলেও তাকে সেই নিরাপত্তা দিতে হবে। একজন মুসলিম নিজের ধর্ম পালন ও প্রচারের স্বাধীনতা চাইলে অন্য ধর্মের অনুসারীর একই স্বাধীনতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে পারেন না। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে মুসলিম হওয়ার কারণে কাউকে অযোগ্য ঘোষণা করা অন্যায় হলে, অমুসলিম হওয়ার কারণে কাউকে অযোগ্য ঘোষণা করাও অন্যায়। নিজের ধর্মের মানুষকে পূর্ণ নাগরিক এবং অন্য ধর্মের মানুষকে শর্তসাপেক্ষে বসবাসের অনুমতিপ্রাপ্ত অধীন জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখার মধ্যে সমানাধিকারের কোনো ভিত্তি নেই। যে ব্যবস্থায় একজনের অধিকার জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে, সেই ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠের সদিচ্ছাই সংখ্যালঘুর প্রধান আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। অথচ অধিকার এমন একটি নিশ্চয়তা হওয়ার কথা, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ অসন্তুষ্ট হলেও বহাল থাকবে এবং রাষ্ট্র প্রয়োজনে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠের বিরুদ্ধেই কার্যকর করবে।
শিক্ষাদীক্ষা, চাকরি-বাকরি এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে মানুষের ধর্মীয় পরিচয় যেন যোগ্যতার বিকল্প হয়ে না ওঠে। একজন নাগরিক কী বিশ্বাস করেন, সেটি তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়; সেই বিশ্বাসের কারণে তাকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত করার অধিকার রাষ্ট্রের নেই। চাকরির সাক্ষাৎকারে একজন প্রার্থীর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ব পালনের সামর্থ্য বিচার করা হবে; তিনি কোন ধর্মে জন্মেছেন, সেটি তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে না। স্কুলে একটি শিশুকে ভর্তি করানোর সময় তার ধর্ম যেন তাকে ফিরিয়ে দেয়ার কারণ না হয়। ভাবুন তো, এমন একটি সমাজের কথা, যেখানে আপনি সংখ্যালঘু এবং আপনার সন্তানকে অন্য ধর্মের শিশুদের সঙ্গে সমান মর্যাদায় বসতে দেয়া হয় না, তার বিশ্বাসকে নিয়মিত অপমান করা হয়, কিংবা তাকে এমন ধর্মীয় শিক্ষা ও উপাসনায় অংশ নিতে বাধ্য করা হয় যার সঙ্গে তার পরিবারের বিশ্বাসের সম্পর্ক নেই। আপনি কাজে যোগ দিয়ে জানতে পারলেন, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের ওপরে আপনার ওঠার সুযোগ নেই, কারণ আপনার ধর্ম ভুল। নিজের বাড়ি বা উপাসনালয় নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে আপনি দেখলেন, আপনার বক্তব্যকে আপনার ধর্মের কারণে কম গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এমন অবস্থায় নিপীড়ন কেবল মাঝে মাঝে সংঘটিত কোনো আক্রমণের নাম থাকে না; প্রতিদিনের জীবন, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং নিজের মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম হয়ে দাঁড়ায়। আপনি কি এমন একটি সমাজে নিরাপদে এবং মাথা উঁচু করে বসবাস করতে চাইবেন? নিজের জন্য যে জীবনকে অবমাননাকর মনে হয়, অন্য মানুষের জন্য সেটিকেই ন্যায়সংগত ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। প্রত্যেকেই আত্মসম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়, এবং ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুমতি ছাড়াই সেই অধিকার তার প্রাপ্য।
সেই ছোটবেলা থেকেই আমরা আমাদের দেশের ইসলামি আলেম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের মুখে শুনি, ইসলাম নাকি অমুসলিমদের সমান অধিকার এবং মর্যাদা নিশ্চিত করে। একমাত্র ইসলাম প্রতিষ্ঠা হলেই অমুসলিমরা সর্বোচ্চ সম্মান ও নিরাপত্তা পাবে। তাই আমাদের শেখানো হয়, ইসলামের পথে জিহাদ করতে হবে, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং শরীয়তের শাসন কায়েম করতে হবে। ইসলামি রাষ্ট্রকে এমন এক আদর্শ ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সবাই ন্যায়বিচার পাবে। আমরা শুনে আনন্দ পাই এই ভেবে যে, ইসলাম প্রতিষ্ঠা হলেই আমাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতির সত্যতা বোঝার জন্য দেখতে হবে, সেই রাষ্ট্রে অমুসলিমের আইনগত অবস্থান আসলে কী। তিনি কি মুসলিমের সমান রাজনৈতিক অধিকার পাবেন? নিজের উপাসনালয় নির্মাণ, সংস্কার এবং ধর্ম প্রচারের অধিকার পাবেন? আদালতে তার সাক্ষ্য এবং তার জীবনের মূল্য কি মুসলিমের সঙ্গে সমানভাবে বিবেচিত হবে? রাষ্ট্রের নেতৃত্বে যাওয়ার যোগ্যতা কি তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বাতিল হবে? তার ধর্মীয় স্বাধীনতার মধ্যে কি নিজের বিশ্বাস প্রকাশ, অন্য বিশ্বাস গ্রহণ এবং ধর্মীয় বিধানের সমালোচনা করার সুযোগ থাকবে? এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে সেখানে সমানাধিকার আছে কি না। শাসক কখনো দয়া করেছেন, কোনো মুসলিম প্রতিবেশী ভালো ব্যবহার করেছেন, কিংবা কোনো অমুসলিম বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন—এসব ঘটনা দিয়ে আইনগত বৈষম্যের প্রশ্ন মিটে যায় না। কোনো ব্যবস্থার আইনই যদি ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে অধিকার ভাগ করে দেয়, তাহলে সেই ব্যবস্থার সমস্যা তার প্রতিষ্ঠান ও বিধানের মধ্যেই রয়েছে। ইসলামি শরীয়তের অধীনে অমুসলিমদের বসবাস কেন কঠিন হয়ে ওঠে, সেটি বুঝতে তাই প্রশংসাসূচক বক্তৃতার বাইরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় বিধান, আইনগত মর্যাদা এবং বাস্তব জীবনযাপনের শর্তগুলো পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ছোটবেলা সেই বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার সময় থেকেই শুনতাম, ভারত নাকি সাম্প্রদায়িক দেশ। অথচ, ভারতের সিনেমায় সব চাইতে বড় সুপারস্টাররা হচ্ছে তিনজন খান, তিনজন মুসলমান। শাহরুখ খান, আমীর খান, সালমান খান। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু ছিলেন একজন নাস্তিক। সে সময়ের অত্যন্ত সম্মানিত এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ছিলেন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী। ভারতের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট ছিলেন জাকির হুসাইন, এরপরে ভারতের চিফ জাস্টিস, ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং কিছু সময়ের জন্য প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হেদায়েতুল্লাহ, প্রেসিডেন্ট ফখরুদ্দীন আলী আহমেদ এবং প্রেসিডেন্ট এপিজে আবুল কালাম ছিলেন মুসলিম। এছাড়াও জৈল সিং সহ আগের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ছিলেন শিখ ধর্মাবলম্বী। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভারতের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হামিদ আনসারীও একজন মুসলিম। অন্যদিকে বাঙলাদেশ এবং পাকিস্তানের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কোন প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্ট ভিন্ন কোন ধর্মাবলম্বী ছিলেন না। সকলেই মুসলমান ছিলেন। ভবিষ্যতে কোন হিন্দু নেতা বাঙলাদেশ বা পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হবেন, অদূর ভবিষ্যতে এমন কোন সম্ভাবনাও দেখা যায় না। উল্লেখ্য, কয়েকজন মুসলিম তারকা বা রাষ্ট্রীয় পদাধিকারী থাকলেই ভারত নিখুঁত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হয়ে যায়—এ কথা বলা যাবে না। কিন্তু এটুকু অন্তত দেখা যায়, সাংবিধানিকভাবে মুসলিম পরিচয় কাউকে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক উচ্চতা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্য করে না। শরিয়া ঠিক এখানেই ধরা পড়ে, সেখানে অমুসলিমের অযোগ্যতা ব্যক্তিগত নয়, ধর্মীয় পরিচয়গত।
ভারতে মুসলমানদের ওপর সাম্প্রদায়িক আক্রমণ হয়, তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বিদ্বেষ ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা প্রয়োজন। কিন্তু অন্য দেশের সংখ্যালঘুর অধিকার নিয়ে কথা বলার সময় নিজের দেশের সংখ্যালঘুর অবস্থানও একই মানদণ্ডে পরীক্ষা করতে হবে। একজন মুসলিম ভারতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে সেটি অন্যায়, আর একজন হিন্দু বাঙলাদেশে একই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে সেটিকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গল্প দিয়ে ঢেকে দেয়া যাবে না। ভারতের এসব বিষয় জানার পরে জানতে ইচ্ছে হলো, আসলে বাঙলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর জনসংখ্যার পরিবর্তন গত কয়েক দশকে কেমন ছিল। সেই পরিসংখ্যান খুঁজতে গিয়ে বাঙলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর অনুপাত ক্রমাগত কমে যাওয়ার একটি দীর্ঘ ইতিহাস পাওয়া যায়। দেশভাগের আগে এই ভূখণ্ডের জনসংখ্যায় হিন্দুদের যে অংশ ছিল, পাকিস্তান আমলে সেটি দ্রুত সংকুচিত হয়েছে; স্বাধীন বাঙলাদেশেও সেই অনুপাতের পতন থামেনি। নিচের সারণিতে সেই পরিবর্তন দেখানো হলো। ১৯৪১ ও ১৯৫১ সালের তথ্য এই ভূখণ্ডের ঐতিহাসিক শুমারির তথ্য; তখন স্বাধীন বাঙলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পুরোনো শুমারির হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত বাঙলাদেশের হাইকোর্ট বিভাগের একটি রায়েও সংকলিত হয়েছে। ২০২২ সালের জন্য এখানে চূড়ান্ত জাতীয় প্রতিবেদনের হিসাব ব্যবহার করা হয়েছে [12] [13] [14]।
| বছর | মোট জনসংখ্যায় হিন্দুদের অনুপাত (%) | মোট জনসংখ্যা (প্রায়) |
|---|---|---|
| ১৯৪১ | ২৮.০০ | ৪.২ কোটি |
| ১৯৫১ | ২২.০৫ | ৪.২ কোটি |
| ১৯৭৪ | ১৩.৫০ | ৭.১ কোটি |
| ১৯৮১ | ১২.১৩ | ৮.৭ কোটি |
| ১৯৯১ | ১০.৫১ | ১০.৬ কোটি |
| ২০০১ | ৯.২০ | ১২.৪ কোটি |
| ২০১১ | ৮.৫৪ | ১৪.৪ কোটি |
| ২০২২ | ৭.৯৬ | ১৬.৫ কোটি |
এই সারণিতে যা কমছে, সেটি দেশের মোট জনসংখ্যায় হিন্দুদের অনুপাত। অনুপাত কমা এবং প্রতিটি শুমারিতে প্রকৃত লোকসংখ্যা কমা এক বিষয় নয়। ২০২২ সালের চূড়ান্ত জাতীয় প্রতিবেদনে হিন্দু জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ ৪৪ হাজার; কাজেই “অনুপাত কমেছে” কথাটিকে “প্রতিবার মোট লোকসংখ্যাও কমেছে” হিসেবে পড়লে হিসাব ভুল হবে। এখানে দৃশ্যমান বিষয় হচ্ছে, দেশের সামগ্রিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে হিন্দু জনগোষ্ঠীর অংশ বাড়েনি; দীর্ঘ সময়ে সেই অংশ সংকুচিত হয়েছে। ১৯৭৪ সালে প্রতি একশ মানুষের মধ্যে প্রায় সাড়ে তেরো জন হিন্দু ছিলেন, ২০২২ সালে সেই অনুপাত আটজনেরও নিচে। এই পরিবর্তনের সামাজিক ইতিহাস বুঝতে দেশভাগ, যুদ্ধ, দেশত্যাগ, জন্মহার ও মৃত্যুহারের পার্থক্য এবং পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেখতে হবে। আর দেশত্যাগের কারণ বুঝতে সম্পত্তির নিরাপত্তা, সাম্প্রদায়িক আক্রমণ, বৈষম্য এবং বিচার পাওয়ার বাস্তব সুযোগ পরীক্ষা করতে হবে। একজন মানুষ পড়াশোনা, চাকরি বা পরিবারের সঙ্গে থাকার জন্য দেশ ছাড়তে পারেন; আবার নিজের বিশ্বাস বজায় রেখে নিরাপদে বাঁচতে না পারার কারণেও দেশ ছাড়তে পারেন। দ্বিতীয় অবস্থাটিতে রাষ্ট্র ও সমাজের দায় অত্যন্ত স্পষ্ট। সেই দায় আড়াল করে শুধু “সবাই সুখে শান্তিতে আছে” ঘোষণা করলে চলে না। পত্রিকায় প্রকাশিত পরিসংখ্যানের একটি চিত্র নিচে দেয়া হলো।

এবারে আসুন ২০২২ সালের জনশুমারির প্রকাশিত তথ্যের দিকে তাকাই। প্রাথমিক প্রতিবেদনে হিন্দুদের অনুপাত ছিল ৭.৯৫ শতাংশ; চূড়ান্ত জাতীয় প্রতিবেদনে তা ৭.৯৬ শতাংশ। অর্থাৎ দুই প্রকাশনার হিসাবেই দেশের মোট জনসংখ্যায় হিন্দুদের অংশ আট শতাংশের নিচে। এই জনগোষ্ঠীর অবস্থান বোঝার প্রশ্নটি তাই শুধু কতজন মানুষ আছেন, সেই গণনায় শেষ হয় না। যারা আছেন, তারা কী অবস্থায় আছেন? নিজের বাড়ি, জমি ও উপাসনালয় নিরাপদে রাখতে পারছেন কি না, সন্তানকে নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী বড় করতে পারছেন কি না, এবং ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করেও শিক্ষা, চাকরি ও সামাজিক জীবনে সমান মর্যাদা পাচ্ছেন কি না—সেগুলোও দেখতে হবে। কোনো সম্প্রদায়ের মানুষ দেশে বসবাস করছেন বলেই তাদের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে বলা যায় না। তাদের বসবাসের শর্ত, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চয়তাই এখানে বিচার্য।

বর্তমানে বাঙলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত প্রায় আট শতাংশ। প্রশ্ন হচ্ছে, যেসব হিন্দু পরিবার দেশ ছাড়ছে, তারা কেন ছাড়ছে? তারা বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে না; তাদের দেশত্যাগের পেছনে বাস্তব অভিজ্ঞতা, ভয় এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত রয়েছে। দেশভাগ, সম্পত্তি হারানো, নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক বৈষম্য এবং সাম্প্রদায়িক আক্রমণের ইতিহাসকে এই প্রশ্ন থেকে সরিয়ে রাখা যায় না। একজন মানুষের বাড়ি আক্রান্ত হলে ক্ষতি কেবল সেই দিনের ভাঙচুরে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার সন্তান বুঝতে শেখে, এই সমাজে নিজের ধর্মীয় পরিচয় তাকে বিপদে ফেলতে পারে। একটি পরিবার জমি হারালে তার অর্থনৈতিক ভিত্তি নষ্ট হয়; বিচার না পেলে রাষ্ট্রের ওপর আস্থা নষ্ট হয়। আবার সেই সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অধিগ্রহণ বা তালিকাভুক্ত হলে বঞ্চনা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং পরবর্তী প্রজন্মেও তার প্রভাব পড়ে। সংখ্যালঘুর দেশত্যাগ ও সম্পত্তির প্রশ্নের এই যোগসূত্র হাইকোর্টের রায়েও আলোচিত হয়েছে। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের বেঞ্চের ২০১৭ সালের রায়ের ১২৩ অনুচ্ছেদের পূর্ণ বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ নিচে দেয়া হলো [15]।
বাংলা অনুবাদ: যদিও ভারতের ভূখণ্ডকে কখনো বাঙলাদেশের শত্রুভূখণ্ড হিসেবে গণ্য করা হয়নি, আমাদের বিশ্বাস, ১৯৬৫ সালে যুদ্ধের ভয়ে কিছু মানুষ বাঙলাদেশ, অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে গিয়েছিলেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এই দেশত্যাগকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার উৎসাহিত করেছিল। ফলে এই মানুষদের কখনোই দেশের শত্রু হিসেবে গণ্য করা যায় না। এই কারণেই বাঙলাদেশ সরকার এবং আমাদের আইনসভা “অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১” প্রণয়ন করেছে, যা ২০১৩ সালে সংশোধিত হয়েছে। এই আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, ১৯৭৪ সালে এবং তার পরে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত সম্পত্তিগুলো বাঙলাদেশে বসবাসকারী মূল মালিক অথবা তাদের স্বার্থাধিকারীদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া।
যুদ্ধের ভয়ে দেশ ছেড়ে যাওয়া একটি পরিবারকে শত্রু হিসেবে গণ্য করা এবং তার সম্পত্তির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা কতটা ভয়াবহ, সেটি নিজের অবস্থান বদলে ভাবলেই বোঝা যায়। আপনি নিরাপত্তার জন্য সাময়িকভাবে বাড়ি ছাড়লেন, আর ফিরে এসে জানলেন, আপনার অনুপস্থিতিই আপনার সম্পত্তি হারানোর ভিত্তি হয়েছে। তখন নিরাপত্তাহীনতা এবং সম্পত্তিহীনতা পরস্পরকে আরও শক্তিশালী করে। বাড়ি হারানো মানুষ কোথায় ফিরবেন, কী নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করবেন এবং সন্তানকে কোন ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেবেন? প্রাতিষ্ঠানিক বঞ্চনা এভাবেই মানুষের দেশে থাকার সামর্থ্য দুর্বল করে। তাই সংখ্যালঘুর অধিকার বিচার করতে কেবল প্রতিবেশীর ব্যক্তিগত সদাচরণ কিংবা কোনো উৎসবে একসঙ্গে ছবি তোলার উদাহরণ যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, আইন ও প্রশাসন তার সম্পত্তি রক্ষা করছে কি না, অন্যায়ের প্রতিকার দিচ্ছে কি না এবং বিপদের সময় তার নাগরিকত্বকে সংখ্যাগরিষ্ঠের নাগরিকত্বের সমান গুরুত্ব দিচ্ছে কি না। অধিকার রক্ষার এই নিশ্চয়তা না থাকলে “থাকতে তো দেয়া হচ্ছে” কথাটি সমানাধিকারের প্রতিশ্রুতি হয়ে ওঠে না। নিজের দেশে থাকার অধিকার একজন মানুষের প্রাপ্য; ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুগ্রহে পাওয়া কোনো সাময়িক অনুমতি নয়।
রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটিও একইভাবে জরুরি। বাঙলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে কি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের যোগ্য মানুষ নেই? শিক্ষা, বিচার, প্রশাসন কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা অর্জনের সামর্থ্য কি জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে নির্ধারিত হয়? বাস্তবে কেউ যোগ্যতা অর্জন করার পরেও যদি তার ধর্মকে দায়িত্ব গ্রহণের বিরুদ্ধে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সমস্যাটি যোগ্যতার ঘাটতিতে নয়; সমস্যাটি তাকে সমমর্যাদার নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতে অস্বীকৃতিতে। সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে ওলামা লীগের একটি অংশ তার হিন্দু পরিচয়কে সামনে এনে পদত্যাগ দাবি করেছিল। ২০১৬ সালের ২০ এপ্রিল প্রকাশিত প্রতিবেদনে পার্থ প্রতিম ভট্টাচার্য সেই দাবির কথা উল্লেখ করেছেন: মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে একজন হিন্দু প্রধান বিচারপতির উপস্থিতি ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের অনুভূতিতে আঘাত করছে—এই যুক্তিতে তার পদত্যাগ চাওয়া হয়েছিল [16]। এখানে বিচারকের সততা, দক্ষতা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট রায়ের যুক্তি নিয়ে আপত্তি তোলা হয়নি; তার ধর্মীয় পরিচয়কেই অযোগ্যতার কারণ বানানো হয়েছে। ভারতে একজন মুসলিমকে শুধু মুসলিম হওয়ার কারণে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে সরানোর দাবি উঠলে আমরা যে সাম্প্রদায়িকতা দেখতে পাই, বাঙলাদেশে একজন হিন্দুর বিরুদ্ধে একই দাবিতেও সেই সাম্প্রদায়িকতাই রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মের সঙ্গে নাগরিকের ধর্ম না মিললে তার যোগ্যতা অগ্রাহ্য করার এই মানসিকতাই ধর্মভিত্তিক অধীনতার সামাজিক ভিত্তি তৈরি করে। আর আইন যখন সেই মানসিকতাকে বাধ্যতামূলক বিধানে পরিণত করে, তখন অমুসলিমের অধিকারহরণ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

এবারে তাকাই পাকিস্তানের দিকে। আজকের পাকিস্তান এবং ১৯৪৭ সালে গঠিত পাকিস্তানের ভূখণ্ড এক নয়। তখনকার পাকিস্তানের মধ্যে পূর্ববঙ্গও ছিল, যা পরবর্তীতে স্বাধীন বাঙলাদেশ হয়েছে। ফলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলিয়ে পাওয়া কোনো পুরোনো জনসংখ্যার অনুপাতকে বর্তমান পাকিস্তানের অনুপাতের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করলে ভিন্ন ভূখণ্ডের হিসাব এক হয়ে যায়। পাকিস্তানের সরকারি পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিবরণেও ১৯৫১ ও ১৯৬১ সালের জনসংখ্যা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান হিসেবে পৃথকভাবে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে, দেশভাগের সময় হিন্দুদের পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে যাওয়া ছিল বিপুল জনস্থানান্তরের অংশ। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের দেশভাগে দুই দিকে মোট এক কোটি পঁয়তাল্লিশ লাখেরও বেশি মানুষের স্থানান্তর ঘটে। পাকিস্তানে হিন্দু সম্প্রদায়ের অবস্থান আলোচনা করতে গেলে এই বাস্তুচ্যুতির ইতিহাস এবং পরবর্তীকালের নাগরিক অধিকার—দুটিই বিচার করতে হবে। কত মানুষ দেশ ছেড়েছিলেন, আর যারা থেকে গিয়েছিলেন তাঁরা কী অধিকার পেয়েছিলেন—এগুলো আলাদা এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। [17] [18]
বর্তমান জনসংখ্যার হিসাবেও একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। পাকিস্তানের ২০২৩ সালের সরকারি জনশুমারিতে ‘হিন্দু’ এবং ‘তফসিলি জাতি’ আলাদা ঘরে গণনা করা হয়েছে। সেখানে ‘হিন্দু’ হিসেবে গণনা করা মানুষের সংখ্যা ৩৮,৬৭,৭২৯, অর্থাৎ ধর্মভিত্তিক সারণির জনসংখ্যার ১.৬১ শতাংশ; আর ‘তফসিলি জাতি’ হিসেবে গণনা করা মানুষের সংখ্যা ১৩,৪৯,৪৮৭, অর্থাৎ ০.৫৬ শতাংশ। এই দুই শ্রেণি মিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২,১৭,২১৬ এবং অনুপাত প্রায় ২.১৭ শতাংশ। একই সারণিতে খ্রিস্টানদের অনুপাত ১.৩৭ শতাংশ। সুতরাং শুধু ‘হিন্দু’ ঘরের ১.৬১ শতাংশকে পাকিস্তানের সমস্ত হিন্দুর অনুপাত হিসেবে ব্যবহার করলে তফসিলি জাতির হিসাবে থাকা মানুষগুলো বাদ পড়ে যায়। কিন্তু এই মানুষগুলো দেশে আছেন—এটুকু তথ্য দিয়ে তাঁদের সমান অধিকার প্রমাণিত হয় না। তাঁরা নিজেদের ধর্ম পালন করতে পারেন কি না, ধর্মের কারণে চাকরিতে বঞ্চিত হন কি না, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে যাওয়ার অধিকার রাখেন কি না, কিংবা তাঁদের ওপর হামলা হলে বিচার পান কি না—সংখ্যালঘুদের অবস্থান বোঝার জন্য এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও প্রয়োজন। [19]
পাকিস্তানে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার সীমিত করার সবচেয়ে পরিষ্কার প্রমাণ পাওয়া যায় রাষ্ট্রের সংবিধানেই। সংবিধানের ৪১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার জন্য একজন ব্যক্তিকে মুসলমান হতে হবে; বয়স ও সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতার পাশাপাশি ধর্মও এখানে বাধ্যতামূলক শর্ত। আবার ৯১(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় পরিষদ তার মুসলমান সদস্যদের মধ্য থেকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করবে। অর্থাৎ একজন হিন্দু বা খ্রিস্টান নাগরিক অন্য সব যোগ্যতা পূরণ করলেও এই দুই পদে যেতে পারবেন না। তাঁর সততা, মেধা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বা জনসমর্থন এই ধর্মীয় বাধা দূর করতে পারবে না। তিনি রাষ্ট্রের আইন মানবেন, কর দেবেন, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবেন, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ পদে তাঁর অধিকার থাকবে না। এখানে ধর্মীয় বৈষম্য রাষ্ট্রের সাংবিধানিক যোগ্যতার শর্ত। যে সংবিধান জন্মসূত্রে পাওয়া বা ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করা ধর্মের কারণে নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার সীমিত করে, সেখানে সমান নাগরিকত্বের দাবিটি কীভাবে টেকে? [20]
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এই বঞ্চনার প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা রয়েছে। পাকিস্তানের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ২০২২ সালে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে যে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তার সরকারি বিবরণে বলা হয়, সংখ্যালঘুদের জন্য সংরক্ষিত পদের প্রায় অর্ধেকই খালি পড়ে আছে। পূরণ হওয়া পদগুলোর মধ্যেও অমুসলিম কর্মীদের ৮০ শতাংশ নিম্নবেতনের প্রথম থেকে চতুর্থ বেতনগ্রেডের কাজে নিয়োজিত। কমিশন বৈষম্যমূলক সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বিপজ্জনক কর্মপরিবেশের বিষয়ও তুলে ধরে। ভাবুন, যাঁদের জন্য সুযোগ সংরক্ষণের কথা বলা হচ্ছে, তাঁদের বহু পদ পূরণই করা হচ্ছে না; আর যেসব সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তার বড় অংশ আটকে আছে সবচেয়ে নিচের বেতনস্তরে। এই পরিস্থিতিতে কোনো সম্প্রদায়ের পেশাগত অবস্থানকে তাদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা বা অযোগ্যতার স্বাভাবিক ফল বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। নিয়োগের দরজা কোথায় খোলা হচ্ছে, কোথায় বন্ধ রাখা হচ্ছে এবং ধর্মীয় পরিচয়কে কোন ধরনের কাজের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে—সেটিও দেখতে হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যখন এই বিভাজন বজায় রাখে, তখন বৈষম্য মানুষের জীবিকা ও সামাজিক মর্যাদার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। [21]
আহমদিয়াদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ আরও গভীরে পৌঁছেছে। পাকিস্তানের সংবিধানের ২৬০(৩) অনুচ্ছেদে তাঁদের আইনগতভাবে অমুসলিম হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে; একই সংজ্ঞায় বাহাইদেরও অমুসলিম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আহমদিয়ারা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় যেভাবেই বুঝুন, রাষ্ট্র তাঁদের জন্য একটি পরিচয় নির্ধারণ করে দিয়েছে। নাগরিকের বিশ্বাসের ওপর রাষ্ট্রের এই কর্তৃত্বের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুতর। একজন মানুষ কী বিশ্বাস করেন, তিনি নিজের বিশ্বাসকে কী নামে ডাকবেন এবং কোন ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণ করবেন—এসবের ওপর তাঁর নিজের সিদ্ধান্তের অধিকার কোথায়? সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় ব্যাখ্যা অনুসারে সংখ্যালঘুর পরিচয় স্থির করে দেওয়া হলে বিশ্বাসের স্বাধীনতা রাষ্ট্রের অনুমতির অধীন হয়ে পড়ে। পাকিস্তানের দণ্ডবিধির নিচের ধারাটি সেই নিয়ন্ত্রণের বাস্তব রূপ দেখায়। এখানে সম্পূর্ণ ধারাটির বাংলা অনুবাদ দেওয়া হলো। [22]
ধারা ২৯৮-বি। নির্দিষ্ট পবিত্র ব্যক্তি বা স্থানের জন্য সংরক্ষিত উপাধি, বর্ণনা ও নামের অপব্যবহার। (১) কাদিয়ানি বা লাহোরি গোষ্ঠীর কোনো ব্যক্তি—যারা নিজেদের আহমদি বা অন্য নামে অভিহিত করে—মৌখিক বা লিখিত শব্দ কিংবা দৃশ্যমান উপস্থাপনার মাধ্যমে যদি: (ক) নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর খলিফা বা সাহাবি ছাড়া কাউকে ‘আমিরুল মুমিনিন’, ‘খলিফাতুল মুমিনিন’, ‘খলিফাতুল মুসলিমিন’, ‘সাহাবি’ বা ‘রাযি আল্লাহ আনহু’ বলে উল্লেখ বা সম্বোধন করে; (খ) নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর স্ত্রী ছাড়া কাউকে ‘উম্মুল মুমিনিন’ বলে উল্লেখ বা সম্বোধন করে; (গ) নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিবারের সদস্য ছাড়া কাউকে ‘আহলে বাইত’ বলে উল্লেখ বা সম্বোধন করে; অথবা (ঘ) নিজের উপাসনালয়কে ‘মসজিদ’ বলে উল্লেখ, নামকরণ বা অভিহিত করে; তাহলে তাকে সর্বোচ্চ তিন বছর সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া যাবে এবং জরিমানাও করা যাবে। (২) কাদিয়ানি বা লাহোরি গোষ্ঠীর কোনো ব্যক্তি—যারা নিজেদের আহমদি বা অন্য নামে অভিহিত করে—মৌখিক বা লিখিত শব্দ কিংবা দৃশ্যমান উপস্থাপনার মাধ্যমে নিজের ধর্মের প্রার্থনার আহ্বানের পদ্ধতি বা রূপকে ‘আজান’ বলে উল্লেখ করলে, অথবা মুসলমানদের ব্যবহৃত আজান পাঠ করলে, তাকে সর্বোচ্চ তিন বছর সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া যাবে এবং জরিমানাও করা যাবে। [23]
ধারা ২৯৮-সিতে আহমদিয়াদের নিজেদের মুসলমান পরিচয় দেওয়া বা ধর্ম প্রচারের জন্যও সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান আছে। [24] এই ব্যবস্থাকে বিশ্বাসের স্বাধীনতার মানদণ্ডে বিচার করলে প্রশ্ন উঠবেই। নিজের বিশ্বাসের ভাষা ব্যবহারের অধিকার যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সংখ্যালঘুর স্বাধীনতা কোথায়? ধর্মীয় মতভেদকে যুক্তি, আলোচনা ও সমালোচনার মাধ্যমে মোকাবিলা করার পরিবর্তে কারাদণ্ডের আওতায় নিয়ে আসার নৈতিক ভিত্তি কী? একজন নাগরিকের বিশ্বাস অন্যের পছন্দ না হলেই রাষ্ট্র কেন সেই বিশ্বাসের প্রকাশে বাধা দেবে? সমান নাগরিকত্ব দাবি করে যে, ব্যক্তির অধিকার তাঁর ধর্মীয় মতের জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করবে না। রাষ্ট্র কোনো বিশেষ ধর্মীয় ব্যাখ্যার পাহারাদার হয়ে গেলে সেই সমতার জায়গাটিই নষ্ট হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হামলা, ভয় দেখানো এবং কার্যকর বিচার না পাওয়ার সমস্যা। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি ২০২৪ সালের চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণে পাকিস্তানের খ্রিস্টান, আহমদিয়া, হিন্দু, শিয়া ও শিখ সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, ঘৃণামূলক বক্তব্য, দলবদ্ধ হামলা ও উপাসনালয় ধ্বংসের খবর নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সেখানে ২০২৩ সালের আগস্টে জারানওয়ালার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। কমিটি সংখ্যালঘুদের কার্যকর সুরক্ষার অভাব এবং এসব অপরাধের জন্য জবাবদিহির ঘাটতির কথা বলেছে। একই পর্যবেক্ষণের ৫৪ অনুচ্ছেদে ধর্মীয় সংখ্যালঘু পরিবারের মেয়েদের অপহরণ, জোরপূর্বক বিয়ে ও সহিংসতার হুমকিতে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করার অভিযোগ এবং এসব ঘটনায় ব্যাপক দায়মুক্তি নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। একটি পরিবারের জন্য এই অনিরাপত্তার অর্থ কী, সেটি ভেবে দেখা প্রয়োজন। মেয়ের নিরাপত্তা, উপাসনালয়ের অস্তিত্ব এবং হামলার পরে বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে ভয় থাকলে নিজের দেশেই স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে। কাগজে নাগরিক পরিচয় থাকলেই নিরাপদ নাগরিক জীবন পাওয়া যায় না। [25]
পাকিস্তানের উদাহরণে তাই সংখ্যালঘুদের অবস্থান যাচাইয়ের প্রশ্নটি খুবই স্পষ্ট। একটি দেশে কোনো সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করছেন বলেই তাঁরা সেখানে সমান মর্যাদায় আছেন—এ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সমান মর্যাদা বিচার করতে হবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে যাওয়ার অধিকার, জীবিকা অর্জনের সুযোগ, নিজের বিশ্বাস প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে সুরক্ষার ভিত্তিতে। এসবের কোনোটি সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুগ্রহ হিসেবে পাওয়ার কথা নয়; এগুলো নাগরিকের অধিকার। ধর্মের কারণে যোগ্য নাগরিকের সামনে দরজা বন্ধ করে দেওয়া, বিশ্বাসের প্রকাশকে শাস্তিযোগ্য করা এবং আক্রান্ত মানুষকে কার্যকর বিচার দিতে ব্যর্থ হওয়া—প্রতিটি বিষয়ই সেই অধিকারকে দুর্বল করে। যে রাষ্ট্রে ধর্মীয় পরিচয় নাগরিকের সুযোগ ও স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণ করে, সেখানে সংখ্যালঘুদের বসবাসের সমস্যাটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা, আইন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই নিহিত থাকে।
এ তো গেল বাঙলাদেশ এবং পাকিস্তানের তুলনামূলক বিচার। কিন্তু হিন্দু অধ্যুষিত ভারতে মুসলমানদের কী অবস্থা? নিশ্চয়ই সাম্প্রদায়িক হিন্দুদের অত্যাচারে ভারতের মুসলমানদের আরো করুন অবস্থা, তাই না? কিন্তু পরিসংখ্যান ঝামেলা লাগাচ্ছে!

- ১৯৫১ সালে ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল শতকরা ৯.৯৩ ভাগ।
- ১৯৬১ সালে ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল শতকরা ১০.৭০ ভাগ।
- ১৯৭১ সালে ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল শতকরা ১১.২১ ভাগ।
- ১৯৮১ সালে ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল শতকরা ১১.৩৫ ভাগ।
- ১৯৯১ সালে ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল শতকরা ১২.১২ ভাগ।
- ২০০১ সালে ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল শতকরা ১৩.৪৩ ভাগ।
- ২০১১ সালে ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল শতকরা ১৪.৬০ ভাগ।
অর্থাৎ ভারতে মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, বৃদ্ধি পাচ্ছে। কীভাবে সম্ভব? ভারত সম্পর্কে সব সময়ই শুনে এসেছি, ভারত একটি অত্যন্ত উগ্র হিন্দুদের দেশ। সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হলেও সেখানে শিবসেনা বজরঙবলী বিজেপি এরা মুসলমানদের ওপর অনেক অত্যাচার চালায়, মসজিদ ভেঙে দেয়। দিনে দুপুরে নাকি মুসলমান ধরে জবাই করে ফেলে। অন্যদিকে বাঙলাদেশ এবং পাকিস্তানের মুসলমানগণ অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার, সেখানে হিন্দু মুসলমান সুখে শান্তিতে মিলে মিশে বসবাস করে। অথচ বাঙলাদেশ আর পাকিস্তানে হিন্দুর সংখ্যা কমছে, আর ভারতে মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে কীভাবে? সেই মুসলমানরা আবার প্রেসিডেন্টও হচ্ছে, সিনেমায় সুপারস্টারও হচ্ছে! অপরদিকে বাঙলাদেশের একজন হিন্দু ক্রিকেটারের ফেইসবুক পাতায় ভয়াবহ অশালীন মন্তব্যগুলো কারা করেছিল?
ভারত তো বটেই, গোটা পৃথিবীর সবচাইতে জনপ্রিয় ইসলাম প্রচারকদের অন্যতম হচ্ছে ডাক্তার জাকির নায়েক। সে একটি হিন্দু অধ্যুষিত দেশে বসবাস করে, সংখ্যাগুরু হিন্দুদের দেশে জন্ম নিয়ে তার প্রায় প্রতিটা বক্তব্যে হিন্দু ধর্মের সমালোচনা করে, তার দোষত্রুটি তুলে ধরেছে। হিন্দু ধর্মের অসংখ্য বিষয়কে মিথ্যা এবং বিকৃত বলেও প্রচার করেছে বহু বছর ধরে। ভারতে বসেই বিশাল জনসভা করে মূর্তি পূজা নিয়ে রীতিমত কটাক্ষ এবং অবমাননাকর বক্তব্যও দেয়। সেই সাথে ইসলামকে শ্রেষ্ঠ ধর্ম ঘোষণা করে, এবং হিন্দুদের মুসলমান হয়ে যেতে উপদেশও দেয়। সে প্রায়শই বলে থাকে, মূর্তি পূজা খুবই নিন্দনীয় ব্যাপার। হিন্দুদের মূর্তি পূজা বন্ধ করা উচিত। ভারতেও কিন্তু ব্লাসফেমী আইন আছে, ইন্ডিয়ান পেনাল কোড সেকশন ২৯৫(এ) অনুসারে জাকির নায়েকের অসংখ্যবার শাস্তি হতে পারে, কিন্তু তা হয় না! সে সেখানে নির্বিঘ্নে ইসলাম প্রচার এবং হিন্দু ধর্মের ভুল ধরতে পারে!
ধরা যাক, বাঙলাদেশ বা পাকিস্তানে যদি ঠিক একই কাজ কোন হিন্দু ধর্মাবলম্বী করতো, তাহলে কেমন হতো? যেমন কোন হিন্দু ধর্ম প্রচারক যদি বলে যে, ইসলাম ধর্ম হচ্ছে বিকৃত এবং মিথ্যা ধর্ম, হিন্দু ধর্মই একমাত্র সত্য ধর্ম? অথবা যদি বলে, মুসলমানদের কাবায় গিয়ে হজ্ব করা বাদ দিয়ে মূর্তি পূজা শুরু করা উচিত, কারণ কাবায় গিয়ে হজ্ব করা আসলে এক ধরণের মূর্তি পূজাই, তখন এই পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? কল্পনা করা যায়? কিছুদিন আগে লতিফ সিদ্দিকির হজ্ব বিষয়ক সাধারণ একটি মন্তব্যে যেই প্রতিক্রিয়া হলো, এই কথাটি কোন হিন্দু বললে কতগুলো হিন্দু বাড়িতে আগুন দেয়া হতো আর কত জন নারীকে ধর্ষিত হতে হতো, তার কোন ইয়াত্তা আছে?
এ তো গেল ভারত বাঙলাদেশ আর পাকিস্তানের কথা। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর কী অবস্থা? সৌদি আরবে কিংবা ইরানের মত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কী অবস্থা? তারা কী নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার সংরক্ষণ করে? তারা কী নিজ নিজ উপাসনালয় তৈরি করতে পারে? সেখানে গিয়ে উপাসনা করতে পারে? উত্তর হচ্ছে, ইরানে প্রকাশ্যে অন্য ধর্ম পালনে অতি সামান্য কিছু অধিকার থাকলেও সৌদিতে একেবারেই তা আইনগতভাবেই নিষিদ্ধ! কোন অমুসলিম কখনো আইনগতভাবেই রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারবে না। একজন মুসলিম এবং একজন অমুসলিমের নাগরিক স্ট্যাটাসই ভিন্ন। তাদের জন্য আইন ভিন্ন, তাদের অধিকার মোটেও সমান নয়।
এই সবকিছু আসলে সূক্ষ্মভাবে যাচাই বাছাই করে দেখা প্রয়োজন। সেই কারণে ইসলামের শরিয়া আইনের নানান ধারা উপধারা, সেই সাথে বিভিন্ন প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলারের ফতোয়াগুলো সম্পর্কে আমাদের ধারণা থাকা আবশ্যক। আসুন আমরা একটু ভালভাবে যাচাই করে দেখি।
সমানাধিকার কাকে বলে?
সমানাধিকার হচ্ছে, রাষ্ট্র বা আইনের চোখে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা। এই ক্ষেত্রে, নাগরিকের ধর্মীয় পরিচয়, লৈঙ্গিক পরিচয়, সুস্থতা কিংবা প্রতিবন্ধীত্ব, জাতিগত বৈশিষ্ট্য, গায়ের চামড়া, এগুলো কিছুই কোন রকম প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। অর্থাৎ, আইনের চোখে সকল মানুষ সমান সুযোগ এবং সম্মান পাবে। কেউ যদি প্রতিবন্ধী হয়, বৈচিত্র্যময় লিঙ্গের অধিকারী হয়, বা সাধারণ দৃষ্টিতে স্বাভাবিক মানুষ, তাদের সকলের অধিকার সমান। দল মত ধর্ম বিশ্বাস নির্বিশেষে তাদের চিন্তার স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা রক্ষার বিধান নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র নাগরিকের ধর্ম জানতে চাইবে না, কারণ রাষ্ট্রের কাজ মানুষের বিবেক পরীক্ষা করা নয়; রাষ্ট্রের কাজ তার অধিকার, নিরাপত্তা ও আইনি মর্যাদা নিশ্চিত করা। যেন ধর্মের ভিত্তিতে কোন প্রকার বৈষম্য সৃষ্টি না হয়, সেই স্বার্থে ধর্মকে রাষ্ট্র কখনো উৎসাহও দেবে না, নিরুৎসাহিতও করবে না। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়, তা সে তার ব্যক্তিগত সীমানায় পালন করবে।
এই কথাটি আমেরিকায় বসবাসকারি মুসলিমের জন্য যেমন প্রযোজ্য, ইসরাইলের প্যালেস্টাইনিদের জন্য যেমন প্রযোজ্য, ঠিক একইভাবে প্রযোজ্য বাঙলাদেশ বা পাকিস্তানের হিন্দুর জন্য। অনেক সময়ই আমরা চীনে উইঘুর মুসলিমদের সমান নাগরিক অধিকার চাই, সেইখানে মুসলিমদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে বলি, আবার একই সাথে আমাদের নিজেদের দেশেই হিন্দুদের অত্যাচার করি। অনেক সময় আমরা ভারতে ধর্ম নিরপেক্ষতা নেই বলে আফসোস করি, সেখানে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠা হচ্ছে বলে আশঙ্কা করি, অথচ বাঙলাদেশে শরিয়া আইন চাই। আল্লাহর আইন চাই। ধর্ম নিরপেক্ষতা চাই না।
যেই যুক্তিতে আমরা আল্লাহর আইন চাই, সেই একই যুক্তিতে ভারতে তো একজন হিন্দু রাম রাজত্ব চাইতে পারে। আর ঠিক যেই যুক্তিতে আমরা ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা চাই, হিন্দু মুসলিমের সমান অধিকার চাই, সেই যুক্তিতে তো বাঙলাদেশের হিন্দুদেরও মুসলিমদের মতই সমান অধিকার থাকা উচিত। কিন্তু হিপোক্রেসি হচ্ছে, আমরা যেইসব দেশে মুসলিমরা সংখ্যালঘু, সেসব দেশে ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং সমান অধিকার চাইলেও, যেই সব দেশে মুসলিমরা সংখ্যাগুরু, সেইসব দেশে চাই শরিয়া আইন। এই দ্বিচারিতা শুধু অযৌক্তিক নয়, নৈতিকভাবে দেউলিয়া। সংখ্যালঘু অবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষতা দাবি করা এবং সংখ্যাগুরু অবস্থায় শরিয়া দাবি করা মানে ন্যায় নয়, কেবল নিজের গোষ্ঠীর আধিপত্য চাওয়া।
শরিয়ত এবং মুসলিম আইন
রাষ্ট্রীয় শরিয়া ব্যবস্থা এমন একটি স্থান যেখানে ইসলামি শরিয়ত একটি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে এবং একটি দেশের আইনি ব্যবস্থার অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি বিদ্যমান। ইরান, সৌদি আরব, এবং সুদান রাষ্ট্রীয় শরিয়া সিস্টেমের উদাহরণ। শরিয়তকে অনেকেই “আল্লাহর আইন” বলে পবিত্র মোড়কে ঢেকে রাখেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় আইনে পরিণত হওয়ার পর এর অর্থ দাঁড়ায়—মানুষের অধিকার আর নাগরিক মর্যাদা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ভাগ করা। তখন এটি আর ব্যক্তিগত ধর্মাচার থাকে না; এটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের ধর্মীয় পদ্ধতি। শরিয়া বা ইসলামিক আইন বা শরিয়া আইন হচ্ছে মূলত, কুরআন ও হাদিস হতে নেয়া ইসলামের অপরিবর্তনীয় আইন বা অমোঘ স্বর্গীয় আইন বা বিধান। ঐতিহ্যগতভাবে ইসলামিক আইনশাস্ত্রে চারটি উৎসকে শরিয়ার স্বীকৃত উৎস হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এগুলো হচ্ছে ধর্মীয় গ্রন্থ কুরআন, সুন্নাহ (হাদিস), কুরআন বা হাদিসে যেসব বিষয়ের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই সে ক্ষেত্রে কিয়াস (যৌক্তিক সাদৃশ্য) এবং ইজমা (আলেম এবং আইনজ্ঞদের ঐক্যমত)।
আর মুসলিম আইন হচ্ছে, বিভিন্ন দেশে ইসলামি শরিয়তের বিধানকে সংযোজন বিয়োজন করে কোন দেশের উপযোগী করে তোলা এবং সেইভাবে রাষ্ট্রীয় আইন প্রবর্তন করা। যেমন ধরুন, ইসলামি শরিয়তে একজন মুসলিম পুরুষের জন্য দ্বিতীয় বিবাহ করতে গেলে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাঙলাদেশের মুসলিম আইনে একজন মুসলিম পুরুষ দ্বিতীয় বিবাহ করতে গেলে অবশ্যই প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নিতে হবে। আবার ধরুন, শরিয়া আইনে মেয়েদের বিবাহের কোন বয়সসীমা নেই। একজন পিতা চাইলে তার কোলের বাচ্চা শিশুকেও কোন মধ্যবয়সী লোকের সাথে বিবাহ দিতে পারে। অথচ, বাঙলাদেশের আইনে অপ্রাপ্তবয়ষ্ক মেয়েকে বিয়ে দেয়া দণ্ডনীয় অপরাধ।
বাঙলাদেশের অনেক ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠনই দীর্ঘদিন ধরে দেশে শরিয়ত এবং খেলাফত কায়েমের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। তারা এটিও দাবী করে আসছে, ইসলামিক শরিয়াই নাকি অমুসলিমদের জন্য সবচাইতে সম্মানজনক, এবং উত্তম ব্যবস্থা! খিলাফত আমলে শরিয়া আইনেই নাকি অমুসলিমরা সবচাইতে ভাল অবস্থায় ছিল! তাই জেনে নেয়া প্রয়োজন, এই শরিয়া আইন আসলেই কতটা উত্তম।
আফগানিস্তানে বৌদ্ধ মূর্তি ধ্বংস
বামিয়ানে অবস্থিত বুদ্ধ মূর্তি একসময় বিশ্বব্যাপী বৃহত্তম বুদ্ধ মূর্তিগুলির একটি হিসাবে বিবেচিত হত। ২০০১ সালে তালেবান দ্বারা এটি ধ্বংস হয়, তারা ইসলাম ধর্মের শরিয়তের বিধান অনুসারেই মূর্তিগুলো ধ্বংস করে ফেলে। প্রায় ১৫০০ বছরের পুরানো মূর্তি যা ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল, মধ্য আফগানিস্তানের বামিয়ান উপত্যকায় একটি পর্বত শৈলশিরায় খোদাই করা হয়েছিল। মূর্তিটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৫০০ মিটার বা ৮২০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। বড় মূর্তিটির উচ্চতা ৫৫ মিটার, আর ছোটটি ৩৫ মিটার লম্বা। উপরন্তু, এই অঞ্চলে পাহাড়ে খোদাই করা অসংখ্য ছোট বুদ্ধের মূর্তি রয়েছে। এই মূর্তিগুলিকে গান্ধার শিল্পের সর্বোত্তম উদাহরণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়, এটি একটি স্বতন্ত্র শিল্প ফর্ম যা খ্রিস্টীয় তৃতীয় থেকে দশম শতাব্দী পর্যন্ত বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে সমৃদ্ধ হয়েছিল। ইউনেস্কো এই মূর্তিগুলোকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০০১ সালের মার্চ মাসে, তালেবান নেতা মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের নির্দেশে ডিনামাইট বিস্ফোরণের মাধ্যমে দুটি বড় মূর্তি ধ্বংস করা হয়েছিল। কিন্তু এই মূর্তি ধ্বংসের পেছনে ইসলামী শরীয়তের বিধান প্রভাবশালী ছিল, নাকি মোল্লা ওমর ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এসব মূর্তি ভেঙ্গেছে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে ওঠে। এই প্রশ্ন যাচাই করতে মূর্তি ধ্বংসের বিষয়ে ইসলামি ফতোয়ার বক্তব্যগুলোও পড়া প্রয়োজন। মূর্তি ভাঙার আবশ্যকতা নিয়ে সংশয়ের পৃথক প্রবন্ধে সংশ্লিষ্ট ফতোয়া ও তার যুক্তি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে [26]। অন্য ধর্মের মানুষের উপাস্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শন রক্ষার অধিকার বিচার করতে এই ধর্মীয় নির্দেশগুলোর তাৎপর্যও বিবেচনায় নিতে হবে।

খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ভারতের প্রথম মুঘল শাসক সম্রাট বাবরও এই মূর্তিগুলো ধ্বংসের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সম্রাট বাবর ১৫২৮ সালের সেপ্টেম্বরে লিখেছিলেন যে, তিনি উভয়কেই ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন [27]। পরে, মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব মূর্তিগুলি ধ্বংস করার জন্য ভারী কামান ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের পদক্ষেপের কারণে বুদ্ধ মূর্তিগুলোর পা ভেঙ্গে যায় [28]। বামিয়ান মূর্তিগুলিকে ধ্বংস করার আরেকটি প্রচেষ্টা ১৮ শতকের পারস্যের রাজা নাদের আফশার দ্বারা করা হয়েছিল, তাদের দিকে কামান দিয়ে গুলি চালানো হয়েছিল [29]
১৯ শতকে আফগান রাজা আবদুর রহমান খান এই অঞ্চলে হাজারা বিদ্রোহের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সময় বৃহত্তর ব্যক্তিত্বের মুখের উপরের অংশটি ধ্বংস করেছিলেন[30]। ২০০১ সালে তালেবান শীর্ষ নেতা মোল্লা ওমর এই বৌদ্ধ মূর্তি ধ্বংস করার পরে স্বগৌরবে ঘোষণা করেন,
পৃথিবীর প্রতিটি মুসলমানদের এই মূর্তি ভাঙ্গা নিয়ে গর্বিত হওয়া উচিত। এই মূর্তি ধ্বংস আল্লাহরই প্রশংসা করেছে যে আমরা তাদের ধ্বংস করে দিয়েছি । [31]
ভারতে মুসলিম শাসন
ভারতে মুসলিম শাসন পুরোটা একরকম ছিল না। কখনো এই শাসন ছিল প্রজাবান্ধব, কখনো ছিল দমনপীড়নমূলক। তাই সাধারণভাবে এই বিষয়ে মতামত দেয়া যায় না। কিন্তু কিছু কিছু শাসন আমল নিয়ে আলোচনা করা যায়। আহমেদ আল-ফারুকি আল-সিরহিন্দি (২৬ জুন ১৫৬৪- ১০ ডিসেম্বর ১৬২৪) একজন ভারতীয় ইসলামি পন্ডিত, একজন হানাফি শাস্ত্রজ্ঞ এবং নকশবন্দি সুফি ধারার একজন বিশিষ্ট আলেম। ভারতে তিনিই শরীয়তপন্থী সুফিদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ আলেম বলে অনেকেই মনে করেন। তিনি পাঞ্জাবের তৎকালীন পাতিয়ালি রাজ্যের বিখ্যাত শহর সিরহিন্দে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা আব্দুল আহাদ শাইখ আব্দুল কুদ্দুস গাঙ্গোহির মুরিদ ছিলেন। তার বংশানুক্রম হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে বলে প্রচলিত রয়েছে। আহমেদ সিরহিন্দিকে বলা হয়ে থাকে একজন মুজাদ্দিদ, অর্থাৎ ইসলামকে পুনরুজ্জীবীতকারী। তাকে মুজাদ্দিদে আলফে সানি বলা হয় যার অর্থ “দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক”। সিরহিন্দি মোঘল আমলে ইসলামের বিধিবিধান মেনে না চলার তীব্র সমালোচনা করেন এবং শরীয়তের শাসন প্রতিষ্ঠায় তার প্রচেষ্টার ফলাফল হিসেবে বাদশাহ আলমগীর আবারো শরিয়তের বিধিবিধান চালু করেন, যার ফলাফল হিসেবে ভারতে আবারো ইসলামি শরিয়তের প্রবর্তন ঘটে।
মুঘল সম্রাট আকবরের সময় সম্রাট আকবর অসাম্প্রদায়িক চিন্তায় উদবুদ্ধ হয়ে ইসলামী শরীয়তের বেশ কিছু ধারা ভারতে বন্ধ করে দেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে অমুসলিমদের ওপর আরোপিত অবমাননাকর জিজিয়া কর। ইসলামি শরীয়তের এই বিধান তুলে দেয়ায় সম্রাট আকবর শরিয়ত সমর্থক ইসলামিক আলেমদের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েন। এই সমালোচকদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিলেন আহমেদ সিরহিন্দি।
মুজাদ্দিদে আলফে সানীর উল্লেখযোগ্য রচনা হচ্ছে-
- আল বাবদা ওয়াল-মাআদ
- রিসালা-ই তাহলীলিয়্যা
- রিসালা ফী ইছবাতিন নাবুওয়া ওয়া আদাবিল মুরীদিন
- রাদ্দে রাওয়াফিজ
- মাকতূবাত।
মুজাদ্দিদে আলফে সানি ওরফে আহমেদ আল-ফারুকি আল-সিরহিন্দি তার বেশ কিছু গ্রন্থে বেশ কিছু বক্তব্য দিয়ে গেছেন, যা ইসলামের ইমান আকিদার ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং ভারতে ইসলামী শরীয়ত কায়েমে ভূমিকা রেখেছিল। তার উল্লেখযোগ্য উদ্বৃতিগুলো এখানে সন্নিবেশিত করা হলো। প্রথমেই দেখে নিই সাইয়েদ আব্বাস রিজভীর একটি প্রখ্যাত গ্রন্থ Muslim Revivalist Movements In Northern India থেকে [32] –
diverted him from orthodox Islam. Their success he mainly ascribed to the nearness of the Day of Judgment and the long time that had elapsed since the ‘Seal of Prophets’ had appeared. He seemingly laboured under the wrong notion that Jahangir would set every thing right and restore Islam to its pristine purity if he were to wield his sword on the Hindus and the Shias. “Shariat can be fostered through the sword,” was the slogan he raised for his contemporaries. It was for this reason that he equated the status of the Emperor vis a vis his kingdom with the position of the soul or heart in relation to body. ‘A reform, if possible by any means, in the Emperor, would mean the eradication of evils from the body-politic of Islam’ was his firm conviction. Akbar’s eclectic tendencies and his policy of “peace with all” had frozen Mujaddid’s expectations on this score but they were revived a bit with the accession of Jahangir. This expectation had its

এবারে আসুন আহমেদ সিরহিন্দির বিখ্যাত গ্রন্থ মকতুবাত শরীফ থেকে তারই লিখিত একটি চিঠি পড়ে নিই, যেখানে সিরহিন্দি কাফের মুশরিকদের অপমান ও লাঞ্ছনা করার শরীয়তের বিধান কায়েম করার ব্যাপারে জোর দিচ্ছেন, মোঘল শাসক কেন অবমাননাকর জিজিয়া কর নিচ্ছে না সেই ব্যাপারে হতাশা ব্যক্ত করেছেন [33] –
গুরু-গোবিন্দ এবং তাহার বংশধরগণকে বধ করা উপস্থিত সময়ের জন্য বিশেষ উৎকৃষ্ট হইয়াছে, ইহাতে বিধর্মীরা ভগ্নপ্রায় হইয়া গিয়াছে। যে কোন উদ্দেশ্যেই তাহাকে বধ করা হউক না কেন, কাফেরদিগকে অপদস্থ করাই মুছলমানগণের মূলধন। উহাকে বধ করার পূর্ব্বে এ ফকীর স্বপ্নে দেখিয়াছিল যে, এই জমানার বাদশাহ শেরেকের মস্তক চূর্ণ করিয়া দিয়াছেন। সত্যই ঐ কাফের- মোশরেকদিগের শীর্ষস্থানীয় এবং এমাম (অগ্রণী) ছিল। আল্লাহ্পাক ইহাদিগকে অপদস্থ করুন। ইহকাল ও পরকালের ছরদার, হজরত (ছঃ) স্বীয় প্রার্থনাকালে অনেক সময় মোশরেকদিগকে নিম্নলিখিতরূপে অভিশাপ দিতেন যে, “হে আল্লাহ্ উহাদের একতা ভঙ্গ কর এবং উহাদের গৃহ-বাটী বিধ্বস্ত কর। পরাক্রমশালী সক্ষম ব্যক্তির আক্রমণের ন্যায় উহাদিগকে আক্রমণ কর”। সুতরাং ইছলাম ও মুছলমানগণের ইজ্জত-সম্মান— কুফর ও কাফেরগণকে বেইজ্জত-অপদস্থ করার দ্বারাই হইয়া থাকে, জিজইয়া কর গ্রহণের অর্থ উহাদিগকে লাঞ্ছিত করা। উহাদিগকে যতদূর সম্মান প্রদান করা হইবে ইছলাম ততদূর অপমানিত হইবে– এই সূত্র সুরক্ষিত রাখিয়া চলিতে হইবে। অধিকাংশ লোকই ইহা হারাইয়া ফেলিয়াছে ; অর্থাৎ ভুলিয়া গিয়াছে। ইহারই ফলে দ্বীন ধ্বংসের পথে চলিয়াছে। আল্লাহ্পাক ফরমাইয়াছেন— “হে নবী কাফের এবং মোনাফেকদিগের সহিত জেহাদ করুন এবং উহাদের সঙ্গে কঠোর ব্যবহার করুন”। অতএব জেহাদ এবং কাফেরদিগের প্রতি কঠোর ব্যবহার করা দ্বীন ইছলামের একটি অত্যাবশ্যকীয় কার্য্য। কাফেরী রীতি-নীতি যাহা পূৰ্ব্ব হইতে প্রচলিত হইয়াছে, ইছলামী বাদশাহের তদ্দিকে এখনও ভ্রূক্ষেপ নাই, ইহা মুছলমানগণের প্রাণে কষ্টদায়ক। মুছলমানগণের কর্তব্য— যে, ঐ অপবিত্রদের অপকর্মের দোষগুলি মুছলমান বাদশাহকে অবগত করায় এবং সেগুলি উঠাইয়া দিবার চেষ্টা করে। বোধ হয় ঐ অপকর্মগুলির ক্ষতি বাদশাহের জানা নাই বলিয়া উহা এখনও প্রচলিত আছে। আপনি অবসর মত মুছলমান আলেমগণকে জানাইয়া দিবেন যে, তাহারা যেন বাদশাহের নিকট কাফেরদিগের উক্ত নীতিসমূহের অনিষ্ট অবগত করাইয়া দেন। কেননা শরীয়ত প্রচারের জন্য কোনরূপ অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শনের আবশ্যক করে না ।




এবারে আসুন এই একই গ্রন্থ থেকে আরও কিছু চিঠি পড়ি [34] –
প্রতিপালন ও কুফরের আচার ব্যবহার পরিত্যাগ দ্বারাই অনুসরণ হইয়া থাকে । যেহেতু ইছলাম ও কুফর পরস্পর বিপরীত। ইহাদের একটি কায়েম করিলে অপরটি উঠিয়া যায়, অতএব একত্রিত হওয়া কোন ক্রমেই সম্ভবপর নহে। ইহাদের একটি সম্মানিত হইলে অপরটি অপমানিত হয়। আল্লাহ্পাক স্বীয় হাবিব পাকে ফরমাইয়াছেন—“হে নবী আপনি কাফের ও মোনাফেকদিগের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হউন এবং তাহাদের প্রতি কঠোর ব্যবহার করুন”। হজরত পয়গাম্বর (ছঃ) যিনি শ্রেষ্ঠ চরিত্রবান, তাঁহাকে যখন কাফেরদিগের প্রতি কঠোর ব্যবহারের আদেশ করিয়াছেন, তখন প্রতীয়মান হইতেছে যে, উহাদের সহিত উক্তরূপ ব্যবহার শ্রেষ্ঠ চরিত্রের অন্তর্ভূক্ত। সুতরাং কুফর এবং কাফেরদিগকে অপদস্থ-অপমানিত করাতেই ইছলামের সম্মান বৃদ্ধি পায়। যদি কেহ কুফরকে সম্মান দিল সে ইছলামকে অপদস্থ করিল । সম্মান প্রদানের অর্থ ইহা নহে যে, তাহাদিগকে মর্য্যাদা প্রদান করিয়া উচ্চ স্থানে স্থান দেয়, বরং তাহাদিগকে নিজের মজলিশে স্থান প্রদান করা ও ভ্রাতৃভাব পোষণ করতঃ কতাবার্তা বলাতেই সম্মান দেওয়া হয়। তাহাদিগকে কুত্তার মত বিদূরিত করিয়া দেওয়া উচিত। যদি কোন পার্থিব কার্য্যে তাহাদের আবশ্যক হয় এবং তাহারা ব্যতীত উহা সরবরাহ না হয়, তখন তাহাদের প্রতি অবিশ্বাস ভাব পোষণ করতঃ আবশ্যক মত মেলামেশা করা যাইতে পারে। কিন্তু উক্ত পার্থিব গরজ উপেক্ষা করিয়া তাহাদের সহিত মেলামেশা না করাই ইছলামের পূর্ণতা। আল্লাহ্পাক কাফেরদিগকে স্বীয় কালাম পাকে নিজের ও পয়গাম্বরগণের দুশমন বলিয়া ফরমাইয়াছেন। অতএব আল্লাহ্ রছুল (ছঃ)-এর এই দুশমনদিগের সহিত সংশ্রব রাখা অতীব দোষণীয় কার্য্য। ইহাদের সংসর্গের সর্ব্বনিম্ন ক্ষতি এই যে, উহাতে শরীয়তের হুকুম পরিচালনের ক্ষমতা এবং কাফেরদের আচার ব্যবহার বিদূরিতকরণ শক্তির লাঘব হয়। অর্থাৎ ভ্রাতৃভাবের লজ্জা প্রতিবন্ধক হইয়া দাড়ায়। ইহা ইছলামের পক্ষে অত্যন্ত অনিষ্টকর। আল্লাহ্তা’য়ালার দুশমনদিগের সহিত বন্ধুত্ব করা আল্লাহ্ ও রছুল (ছঃ)-এর দুশমনির পথে লইয়া যায়। অনেকে হয়ত মনে করেন যে, সে মুছলমান——আল্লাহ্-রছুল (ছঃ)-এর প্রতি বিশ্বাস রাখে, আপ্রাণ চেষ্টা করিবে। অতএব মুছলমানগণকেও লজ্জা করা উচিত—’লজ্জা ঈমানের অঙ্গ’ ইছলামী লজ্জা একান্ত আবশ্যক ; সর্বদা বিধৰ্ম্মীগণকে অপদস্থ করিবার চেষ্টা করা দরকার। ভারতবর্ষের বাদশাগণ তাহাদের সংসর্গ হেতুই তাহাদের উপর হইতে ‘জিজিয়া’ কর উঠাইয়া লইয়াছেন। তাহাদের নিকট হইতে জিজিয়া গ্রহণের প্রকৃত উদ্দেশ্য তাহাদিগকে অপদস্থ করিয়া রাখা। এমন অপদস্থ করিয়া রাখা আবশ্যক যে জিজিয়ার ভয়ে যেন তাহারা উৎকৃষ্ট বস্ত্র পরিধান করিতে সাহসী না হয়, জাঁকজমকের সহিত বিচরণ করিতেও না পারে। সততই যেন সম্পদ বাজেয়াপ্তির ভয়ে ভীত ও আতঙ্কিত থাকে। আল্লাহ্তায়ালা তাহাদিগকে অবনত রাখার উদ্দেশ্যেই যখন জিজিয়া নির্দ্ধারণের আদেশ করিয়াছেন, তখন বাদশাহ্গণের কি শক্তি যে, উহা বন্ধ করে ; তাহাদিগকে অবনত রাখিয়া ইছলামকে উন্নত করাই আল্লাহ্তা’য়ালার অভিপ্রায় । “বিধর্মীদেরে যত পার করিতে নিহত অবশ্য ইছলাম তাতে হইবে উন্নত” । কাফেরদের সহিত হিংসা রাখাই ইছলামের সৌভাগ্য প্রাপ্তির চিহ্ন। আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় কালাম পাকে উহাদিগকে একস্থানে ‘নাজাছ’ বা অপবিত্র ও অন্যস্থানে ‘রেজেছ’ বা অশৌচ আখ্যা দিয়াছেন। অতএব মুছলমানগণের চক্ষে উহাদিগকে অপবিত্রই দেখা উচিত। যখন তাহারা উহাদিগকে এইভাবে দেখিবে, তখন অবশ্যই উহাদিগকে ঘৃণিত জানিয়া উহাদের সংসর্গ হইতে দূরে থাকিবে।


উপরে উল্লিখিত আহমেদ আল-ফারুকি আল-সিরহিন্দির বক্তব্য এবং চিঠিগুলো কতটা ইসলাম সম্মত, আর কতটা ইসলাম পরিপন্থী, তা পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আমরা মিলিয়ে দেখবো। আশাকরি পাঠক পুরো লেখাটি মন দিয়ে পড়বেন।
অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব নিষিদ্ধ
ইসলামে অমুসলিমদের সাথে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কোরআনের বহুস্থানে এই বিষয়ে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ইদানীংকালের মুমিনগণ কোরআনের আরেকটি আয়াত নিয়ে এসে দাবী করে থাকেন যে, সকল অমুসলিমের বেলাতে নাকি এমনটি বলা হয়নি! বিস্তারিত এই লেখাটিতে আলোচনা করা হয়েছে [35] [36]। তাই সেই দলিলগুলোর চাইতে আলেমদের বক্তব্যই এখানে গুরুত্বপূর্ণ হবে। আসুন আমরা বাংলাদেশের সবচাইতে প্রখ্যাত কয়েকজন আলেমের বক্তব্য শুনে নিই,
এবারে আউন দেখে নিই, বাংলাদেশের শিশুকিশোরদের মনে কীভাবে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে,
অমুসলিমের উপাসনালয় ও ধর্ম পালন
শরিয়া বা ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিমদের নতুন কোন উপাসনালয় তৈরি করা যায় না। হযরত উমর শাম দেশের নাগরিকদের সাথে একটি চুক্তি করেছিলেন, যেই চুক্তিটি ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ এবং এই চুক্তির ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী সময়ে অমুসলিমদের সাথে মুসলিমরা চুক্তি করে থাকে। এই চুক্তিটি তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে পড়ে নিই। [37]। এখানে পরিষ্কারভাবেই বলা হচ্ছে, অমুসলিমগণ নতুন কোন উপাসনালয় তৈরি করতে পারবে না, মেরামত করতে পারবে না, যেগুলো মুসলিমগণ দখল করেছে তা ফেরত নিতে পারবে না, টুপি পাগড়ি জুতা পরতে পারবে না, ঘোড়ায় চড়লে গদি ব্যবহার করতে পারবে না, ধর্ম প্রচার করতে পারবে না, মৃতদেহ বহনের সময় জোরে কাঁদতে পারবে না, ইত্যাদি। উপাসনালয় নির্মাণ, ধর্মীয় আচার প্রকাশ এবং ধর্মপ্রচারের ওপর এসব বিধিনিষেধের বিস্তারিত আলোচনা সংশয়ের পৃথক প্রবন্ধে রয়েছে। সেখানে উমরের চুক্তি ও হানাফি ফিকহের বিধানের পাশাপাশি সমকালীন ধর্মীয় বক্তাদের বক্তব্যও আলোচনা করা হয়েছে [38]। নিজের ধর্ম পালন ও প্রচারের স্বাধীনতার সঙ্গে “তোমাদের ধর্ম তোমাদের, আমাদের ধর্ম আমাদের” কথাটি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেই প্রশ্নের আয়াত ও তাফসিরভিত্তিক বিশ্লেষণও পৃথকভাবে পড়া যেতে পারে [39]।
পরম করুণাময় দয়ালু আল্লাহ্ নামে আরম্ভ করিতেছি
ইহা হইতেছে শাম দেশের অমুক অমুক নগরের অধিবাসীগণের পক্ষ হইতে আল্লাহর বান্দা আমীরুল-মু’মিনীন উমরকে প্রদত্ত লিখিত প্রতিজ্ঞাসমূহ-‘আপনারা যখন আমাদের নিকট আগমন করিলেন, তখন আমরা আমাদের নিজেদের জন্যে, আমাদের সন্তান-সন্ততির জন্যে, আমাদের ধন-সম্পত্তির জন্যে এবং আমাদের সব ধর্মাবলম্বী লোকদের জন্যে আপনাদের নিকট নিরাপত্তা প্রার্থনা করিলাম। উক্ত নিরাপত্তার বিনিময়ে আমরা প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, আমরা আমাদের নগরে বা উহার চতুষ্পার্শ্বে কোথাও কোন নূতন গীর্জা ইবাদতখানা নির্মাণ করিব না; কোন পুরাতন গির্জা বা ইবাদত খানা মেরামত করিব না; ইতিপূর্বে যে সকল গীর্জা ও ইবাদতখানা মুসলমানদের নিজস্ব সম্পত্তিতে পরিণত হইয়াছে, উহাদিগকে গির্জা ও ইবাদত খানা রূপে পুনঃপ্রচলিত করিব না; আমাদের কোন গির্জায় রাত্রিতে বা দিনে কোন মুসলমান অবস্থান করিতে চাহিলে তাহাকে বাধা দিব না; আমাদের গির্জাগুলির দ্বারসমূহ পথিক ও মুসাফিরদের জন্যে উন্মুক্ত রাখিব; কোন পথিক মুসলমান আমাদের আবাসস্থলের কাছ দিয়া গেলে তিনদিন তাহাকে মেহমান রাখিয়া আপ্যায়ন করিব; আমাদের গির্জায় বা বাসস্থানে কোন গুপ্তচরকে আশ্রয় দিব না; মুসলমানদের সহিত কোনরূপ প্রতারণামূলক আচরণ করিব না; আমাদের সন্তানদিগকে কুরআন শিখাইব না; কোন প্রকারের ‘শিরক’-এর কথা প্রকাশ করিব না; কাহাকেও ‘শিক’-এর প্রতি আহ্বান জানাইব না; আমাদের কোন আত্মীয় ইসলাম গ্রহণ করিতে চাইলে তাহাকে উহা গ্রহণ করিতে বাধা দিব না; মুসলমানদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিব; কোন মুসলমান আমাদের মজলিসে বসিতে চাহিলে সরিয়া গিয়া তাহার জন্যে জায়গা করিয়া দিব; মুসলমানদের লেবাস-পোশাকের ন্যায় আমরা কোন লেবাস-পোশাক পরিধান করিব না; টুপি পরিধান করিব না; পাগড়ী ব্যবহার করিব না; জুতা পরিধান করিব না এবং মাথায় সিঁথি কাটিব না; মুসলমানদের ভাষার ন্যায় ভাষা ব্যবহার করিব না; মুসলমানদের উপনামের ন্যায় উপনাম গ্রহণ করিব না; অশ্বাদি বাহনে গদি ব্যবহার করিব না; গলায় তরবারি ঝুলাইয়া চলাফেরা করিব না; কোন প্রকারের অস্ত্র রাখিব না; কোন প্রকারের অস্ত্র বহন করিব না; আংটিতে আরবী ভাষায় কোন কিছু খোদাই করিব না; মদের বেচা-কেনা করিব না; মস্তকের সম্মুখভাগের চুল ছাটিয়া ফেলিব; যেখানেই থাকি না কেন সর্বত্র ও সর্বদা টিকি রাখিব; দেহে পৈতাধারণ করিব; গির্জায় প্রকাশ্য স্থানে ক্রুশ রাখিব না; মুসলামানদের রাস্তায় বা তাহাদের বাজারে ক্রুশ বা নিজেদের ধর্মীয় পুস্তক প্রকাশ করিব না; গির্জায় উচ্চ শব্দে ঘণ্টা বাজাইব না; মুসলমানের উপস্থিতিতে গির্জায় উচ্চৈঃস্বরে নিজেদের ধর্মীয় পুস্তক পাঠ করিব না; ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে কোনরূপ মিছিল বাহির করিব না; মৃতদেহ বহন করিয়া লইয়া যাইবার সময়ে উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করিব না; মুসলমানদের রাস্তা বা বাজারের মধ্য দিয়া মৃতদেহকে বহন করিয়া লইয়া যাইব না; কোন মুসলমান কর্তৃক ব্যবহৃত দাসকে ব্যবহার করিব না; পথিক মুসলমানের প্রয়োজনে তাহাকে পথ দেখাইয়া দিব এবং কোন মুসলমানের ঘরে উঁকি মারিব না। আবদুর রহমান ইব্ন গানাম আশআরী বলেন: উপরোক্ত প্রতিজ্ঞাপত্র লইয়া আমি উমর (রা)-এর নিকট পৌঁছাইলে তিনি উহাতে নিম্নোক্ত কথাগুলি সংযোজিত করিয়া দিলেন: আর আমরা কোন মুসলমানকে প্রহার করিব না। উক্ত শর্তসমূহকে মানিয়া লইয়া আমরা নিরাপত্তা লাভ করিলাম। আমরা উক্ত শর্তসমূহের মধ্য হইতে কোন শর্তকে ভঙ্গ করিলে আমাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে আপনাদের (মুসলমানদের) উপর কোন দায়িত্ব থাকিবে না। এমতাবস্থায় আমাদের সহিত শত্রুর ন্যায় আচরণ করা আপনাদের জন্যে বৈধ ও জায়েয হইয়া যাইবে।’


হানাফী ফিকাহশাস্ত্রের বুনিয়াদি গ্রন্থ আশরাফুল হিদায়াতে এই বিষয়ে যা বলা হয়েছে, সেটিও জেনে নিই, [40]
অনুবাদ: অনুচ্ছেদ: দারুল ইসলামে গির্জা ও উপাসনালয় নতুনভাবে তৈরি করা জায়েজ নয়।
কেননা রাসূলুল্লাহ বলেছেন- لا حصاء في الإسلام ولا كنيسة অর্থাৎ ইসলামে খোঁজাকারণ ও গির্জার অবকাশ নেই। উদ্দেশ্যে হলো নতুনভাবে তৈরি করা।
যদি প্রাচীন গির্জা বা উপাসনালয় ভেঙ্গে যায়, তাহলে সেগুলো পুনর্নির্মাণ করতে পারে। কেননা ভবন তো চিরস্থায়ী থাকে না। অথচ শাসক যখন দারুল ইসলামে তাদের বহাল রেখেছেন তখন (ধরে নেওয়া হবে যে.) তিনি তাদের পুনর্নির্মাণের সুযোগ দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে তাদের তা স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়া হবে না। কেননা প্রকৃতপক্ষে এটা নতুন বানানো। আর নির্জনতার জন্য সাধুনিবাস গির্জার সমতুল্য। তবে ঘরে প্রার্থনাস্থল নির্ধারণের বিষয়টি ভিন্ন। কেননা সেটা বাসস্থানের অনুবর্তী।
(নিষেধাজ্ঞা) এ বিধান শহরের সাথে সীমিত। গ্রামে প্রযোজ্য নয়। কেননা শহরেই ইসলামের বিশিষ্ট নিদর্শনসমূহ প্রতিষ্ঠা করা হয়ে থাকে। সুতরাং তার বিপরীত কিছু প্রকাশ করে তার বিরুদ্ধাচরণ করা যাবে না।
কারো কারো মতে আমাদের দেশে গ্রামেও নিষেধ করা হবে। কেননা সেখানেও কতিপয় ইসলামি নিদর্শন রয়েছে। আর মাযহাব প্রধান ইমাম আবূ হানীফা (র.) হতে যা বর্ণিত হয়েছে তা হলো কুফার গ্রমাঞ্চল সম্পর্কে। কেননা সেখানকার অধিকাংশ অধিবাসী হলো জিম্মি।
আরব ভূখণ্ডে শহরে-গ্রামে সবত্রই নিষেধ করা হবে। কেননা রাসূল বলেছেন- لا يجتمع بينان في جريرة الغرب
অর্থাৎ জাযীরাতুল আরবে দুটি দীন একত্র হতে পারে না।
প্রাসঙ্গিক আলোচনা
শব্দ-বিশ্লেষণ: خضاء – হরফে যেরযোগে। শব্দটি মাসদার বা ক্রিয়ামূল। তার অর্থ হলো ম বা অণ্ডকোষ বের
করা বা কেটে ফেলে দেওয়া।
بيغة – শব্দটি একবচন। তার বহুবচন হলো بیع।
শব্দটি ও একবচন। এর বহুবচন হলো کنائش
মূলত بیعۀ এবং کنیه উভয় শব্দ ইহুদি ও খ্রিস্টান উভয়ের উপাসনালয়ের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে শুধু ইহুদিদের উপাসনালয়কে কানীসাহ বলা হতে থাকে। আর খ্রিস্টানদের উপাসনালয়কে বলা হয় বীআ।
বক্ষ্যমাণ অনুচ্ছেদে মূলত জিম্মি সম্পর্কিত আরো কিছু বিধিবিধান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
: মতনে উল্লিখিত মাসআলার মর্ম হলো, ইসলাম ধর্মে কোনো পুরুষের অণ্ডকোষ কোটে তাকে খাসি বানানোর অনুমতি নেই। অনুরূপভাবে দারুল ইসলামে ইহুদি বা খ্রিস্টানদের জন্য নতুনভাবে গির্জা নির্মাণ করাও বৈধ নয়। এ সম্পর্কে দলিল হলো রাসূল-এর বাণلا خضاءَ وَلَا كَثِيسَةَ فِي الْإِسْلَام ا এ হাদীসটি ইমাম বায়হাকী, আবূ উবাইদ কাসেম ইবনে সাল্লাম, ইবনে আদী প্রমুখ মুহাদ্দিস নিজ নিজ কিতাবে উল্লেখ করেছেন। হাদীসটি হযরত ইবনে আব্বাস ও ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তবে হাদীসটির সনদে দুর্বলতা রয়েছে।
প্রশ্ন হতে পারে যে, রাসূল দুয়ের সামঞ্জস্য কি? খোঁজাকরণ (নপংসুক) ও গির্জা নির্মাণ বিষয় দুটিকে একত্রে উল্লেখ করেছেন কেন?
এর উত্তর হলো এই যে, দুইয়ের মাঝে সামঞ্জস্য রয়েছে। তা এভাবে যে, গির্জা হয়ে থাকে খ্রিস্টানদের। তদ্রূপ -খোঁজাকরণের নিয়মও খ্রিস্টানদের মাঝে প্রচলিত ছিল, তাই রাসূলুল্লাহ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সাথে সংশ্লিষ্ট দুটি বিষয় একত্রে নিষিদ্ধ করেছেন।
কেউ কেউ এরূপ সমঞ্জস্যও বর্ণনা করেছন যে, খোঁজার কারণ হলো মানুষের ক্ষেত্রে একটি দুর্বলতা, আর দারুল ইসলামে গির্জা নির্মাণ হলো ইসলামের একটি দুর্বলতা, তাই দুটি দুর্বলতা সম্পর্কে রাসূল একত্রে সতর্ক করেছেন।
কারো কারো মতে প্রকৃত ব্যাপার হলো এই যে, এক ব্যক্তি রাসূলকে খোঁজাকরণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছে। তখনই সাথে সাথে আরেক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছে, গির্জা বানানো সম্পর্কে। এরপর রাসূল উভয় প্রশ্নকারীর জবাব একসঙ্গে এভাবে দিয়েছেন যে, لا خضاءً وَلَا كَبَيسَةً فِي الْإِسْلام
Shan firefi CASTING FACE TEC – : قوله : وإن الهدمت الْبَيْعُ وَالْكَنَائِسُ الْقَدِيمَةُ الخ কিংবা ধ্বংস হয়ে গেল পুননির্মাণ করতে পারবে। পুরাতন গির্জা দ্বারা উদ্দেশ্যে হলো, মুসলমানদের বিজয় লাভ করার পূর্বকাল হতে যেসব গির্জা বিদ্যমান থাকে।
জাযীরাতুল আরবের গ্রাম-শহর সবখানেই গির্জা নির্মাণ নিষিদ্ধ। এর কারণ হলো, রাসূলুল্লাহ-এর বাণী لا يجتمع دينان في جزيزة الغربর্থাৎ আরব ভূখণ্ডে দুটি দীন একত্র হতে পারে না। হাদীসটি ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন। যার সনদ ও মতন নিম্নরূপ:
قال زاهرية : أَخْبَرَنَا النَّضْرُ بْنُ شُمَيْلٍ حَدَّثَنَا صَالِحُ ابْنُ أَبِي الْأَحْوَصِ عَنِ الزُّهْرِى عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيِّبِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ
(رض) أن النبي صلى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فِي مَرَضِهِ الَّذِي تُوَفَّى فِيهِ لَا يَجْتَمِعُ دِينَانِ فِي جَزِيرَةِ الْعَرَبِ.
অর্থাৎ উল্লিখিত সনদে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ তাঁর অন্তিম অসুস্থতাকালে ইরশাদ করেছেন, জাযীরাতুল আরবে দুটি দীন একত্র হতে পারে না।
অনুবাদ: ইমাম কুদূরী (র.) বলেন, জিম্মিদেরকে তাদের পোশাকে, বাহনে, জিন বা গদিতে এবং টুপিতে মুসলমানদের থেকে ভিন্নতা রক্ষা করতে বাধ্য করা হবে। সুতরাং তারা ঘোড়ায় চড়বে না এবং অস্ত্র বহন করবে না।
জামেউস সগীর কিতাবে রয়েছে যে, জিম্মিদের বাধ্য করা হবে তাদের ধর্মীয় ডোর প্রকাশ্যভাবে বাঁধতে এবং গাধার পিঠে ব্যবহৃত জিনের অনুরূপ জিন ব্যবহর করতে। এ বিষয়ে বাধ্য করার কারণ হচ্ছে তাদের প্রতি তুচ্ছতা প্রকাশ করা এবং দুর্বল মুসলমানদের ঈমান রক্ষা করা। তাছাড়া মুসলমান হলো সম্মানের যোগ্য আর জিম্মি হলো অসম্মানের যোগ্য। তাকে আগে সালাম দেওয়া যাবে না এবং রাস্তায় তাকে পাশ কেটে যেতে বাধ্য করা হবে। অথচ তার মাঝে যদি পার্থক্যকারী কোনো চিহ্ন না থাকে, তাহলে হয়তো তার সাথে মুসলমানদের অনুরূপ আচরণ করা হবে যা জায়েজ নয়।
আর চিহ্ন হতে হবে পশমের মোটা ডোর যা তাদের কোমরে বাঁধবে। রেশমের ডোর বাঁধতে পারবে না। কেননা এতে মুসলমানদের প্রতি হাম বড়াই ভাব রয়েছে। পাথেঘাটে ও হাম্মামখানায় তাদের নারীরা আমাদের নারীদের থেকে পৃথক পরিচয় বহন করবে এবং তাদের বাড়িঘরেও পরিচয় চিহ্ন রাখবে, যাতে তাদের দুয়ারে ভিক্ষুক গিয়ে না দাঁড়ায় এবং তাদের জন্য মাগফেরাতের দোয়া না করে।
মাশায়েখগণ বলেছেন, বরং অধিকতর সঙ্গত হলো প্রয়োজন ছাড়া তাদেরকে বাহনে আরোহণ করতে না দেওয়া।
আর প্রয়োজনে আরোহণ যদি করেই, তাহলে মুসলমানদের সমাবেশ স্থলে যেন নেমে যায়। আর বাহনে আরোহণের প্রয়োজন যদি দীর্ঘ স্থায়ী হয় তাহলে যেন পূর্ববর্ণিত রকমের জিন (গাধার পিঠে ব্যবহৃত জিনের অনুরূপ জিন) ব্যবহার করে। আলেম, বুজুর্গ ও অভিজাত লোকদের বিশিষ্ট পোশাক ব্যবহার করা থেকে তাদের বিরত রাখা হবে।



বারে আসুন একজোটই ইসলামিক বক্তব্য শুনি,
অমুসলিমদের ধর্ম প্রচারের অধিকার নেই
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুসলমানগণ যখন যান, তারা সেই সব দেশে ইসলাম প্রচারের অধিকার এবং অনুমতি চান। প্রতিটি সভ্য দেশেই তাদের নিজ ধর্ম পালন এবং তার প্রচারের অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে শরিয়া কায়েম হলে অমুসলিমদের আর তাদের ধর্ম প্রচারের কোন অধিকার থাকবে না। এই বিষয়ে প্রখ্যাত ইসলামিক দাইয়ি জাকির নায়েক কী বলেছেন সেটি দেখে নেয়া যাক-
অবমাননাকর জিযিয়া কর
জিযিয়া শব্দটির অর্থ কী, তা আমাদের সকলের জেনে নেয়া জরুরি । অনেকেই জিযিয়া এবং খেরাজকে মিলিয়ে ফেলে জিযিয়াকে সাধারণ অর্থে কর বা ট্যাক্স হিসেবে দাবী করেন। কথাটি সম্পূর্ণ ভুল। খেরাজ হচ্ছে অমুসলিমদের দেয়া ভূমি কর। কিন্তু জিযিয়া হচ্ছে তাদের বিজয়ী মুসলমানদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া, বেঁচে থাকার বা নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য দেয়া অর্থ। এই অর্থ দিতে হবে নত অবস্থায়, অপমানিত ভাবে। জিযিয়ার ধর্মীয় ভিত্তি, আদায়ের সঙ্গে যুক্ত অপমান ও অধীনতার নির্দেশ এবং অমুসলিমের সামাজিক মর্যাদার ওপর তার প্রভাব নিয়ে সংশয়ের একটি পৃথক প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। জিযিয়াকে সাধারণ নাগরিক কর হিসেবে উপস্থাপনের দাবিটি যাচাই করতে সেই প্রবন্ধে সংকলিত তাফসির ও ফিকহের দলিলগুলোও পড়া যেতে পারে [41]। কোরআনে পরিষ্কারভাবেই বিষয়টি বলে দেয়া হয়েছে, [42]
তোমরা লড়াই কর আহলে কিতাবের সে সব লোকের সাথে যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম মনে করে না, আর সত্য দ্বীন গ্রহণ করে না, যতক্ষণ না তারা স্বহস্তে নত হয়ে জিয্য়া দেয়।
এই বিষয়ে তাফসীরে জালালাইনে যা বলা হয়েছে, তা হচ্ছে, জিযিয়া শব্দটি “জায়া” শব্দ থেকে নিষ্পন্ন অর্থাৎ তুমি মৃত্যুদণ্ডের উপযুক্ত অপরাধী ব্যক্তি। কিন্তু তোমাকে এ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে যে, তোমার উপর এ দণ্ড জারি হচ্ছে না এবং দারুল ইসলামে নিরাপত্তার সাথে অবস্থানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে [43]

জিযিয়া কাকে বলে, এর অর্থ এবং উদ্দেশ্য আসুন আমরা পড়ে দেখি হানাফি ফিকাহ শাস্ত্রের গ্রন্থ আশরাফুল হিদায়া থেকে [44]








আল্লামা কাজী মুহাম্মদ ছানাউল্লাহ পানিপথী রচিত তাফসীরে মাযহারী কোরআনের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ তাফসীর গ্রন্থ। এই গ্রন্থে জিযিয়া সম্পর্কিত সুরা তওবার ২৯ নম্বর আয়াতে কী বলা আছে এবং তার ব্যাখ্যা কী, তা স্পষ্টভাবে বিবৃত রয়েছে। জিযিয়া যে আসলে অপমান, অপদস্থতার নিদর্শন, এবং জিযিয়া কীভাবে গ্রহণ করা হবে, সেই সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এই অধ্যায়টি পড়ে দেখতে হবে [45]











একই বিষয় আমরা দেখতে পারি তাফসীরে ইবনে কাসীরেও [46]


এবারে আসুন ভারত উপমহাদেশের বিখ্যাত একটি ফতোয়া গ্রন্থ ফাতায়ায়ে আলমগীরী থেকে দেখি যে, অমুসলিম জিম্মি মহিলাদের গলায় লোহার শেকল এবং তাদের হেয়তা ও তুচ্ছতা প্রমাণের জন্য বাড়িতে কিছু আলামত রাখার বিধান ইসলাম রেখেছে কিনা। তথ্যগুলো সরাসরি বই থেকে জেনে নিই, [47]

এবারে আসুন উমরের আমলের একটি ঘটনা পড়ে নিই, যেখানে দেখা যাচ্ছে, উমর কীভাবে খ্রিস্টানদের অপমান করতো এবং অপমানের বিষয়টি ব্যাখ্যা করছে [48]

জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ
অনেকেই দাবী করেন কুরআনে সূরা বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াতে বলা আছে, ধর্মের মধ্যে কোনোরকম জোরজবরদস্তি নেই! কিন্তু এই আয়াতটির প্রেক্ষাপট কী? আয়াতটির হুকুম কি এখনও বলবত আছে? আসুন এবারে সরাসরি তাফসীর গ্রন্থগুলো থেকে কুরআনের এই আয়াতটির ব্যাখ্যা পড়ে নিই, [49]। এখানে খুবই পরিষ্কার যে, ইসলামে জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের বৈধতাও দেয়া রয়েছে। “লা ইকরাহা ফিদ-দীন” কথাটির অর্থ ও প্রয়োগ নিয়ে সংশয়ের পৃথক প্রবন্ধে আরও বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। সেখানে আয়াতটির প্রেক্ষাপট, ধ্রুপদী তাফসিরের ব্যাখ্যা এবং ধর্মে জবরদস্তি না থাকার দাবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো মিলিয়ে দেখা হয়েছে [50]। নিজের বিশ্বাস বজায় রাখার স্বাধীনতা একজন মানুষের জীবনে কতটা কার্যকর, তা বোঝার জন্য এই বিধানগুলোর অর্থ জানা প্রয়োজন। নিচের দলিল সেই বিচারেরই অংশ।




ইসলামঃ একটি ইঁদুর ধরার ফাঁদ
এবারে আমরা একটি বিখ্যাত আকিদা গ্রন্থ থেকে দেখে নিবো, এই বিষয়ে ইসলামের হুকুমত এবং বিধান আসলে কী [51]







অমুসলিম যোগ্যতা থাকলেও উঁচু পদ পাবে না
ধরুন আপনার স্কুলে একজন শিক্ষক আছেন, যিনি ধর্ম বিশ্বাসের দিক দিয়ে একজন হিন্দু। ইসলামী শরীয়া আইন মোতাবেক, তিনি কখনওই এমন কোন পজিশন বা পদে যেতে পারবেন না, যেই পদে তিনি কোন কর্তৃত্ব পেয়ে যান, এমনকি তার যোগ্যতা, মেধা, গুণ সবকিছু থাকলেও। নিচে ইসলামওয়েব নামক প্রখ্যাত ফতোয়া ওয়েবসাইটটি থেকে একটি ফতোয়া দেয়া হল। এই ফতোয়াটিতে মূলত বলা হয়েছে, মুসলিম রাষ্ট্রে কোনো অমুসলিমকে “কোনো ধরনের পদ বা ক্ষমতার অবস্থান” দেওয়া যাবে না; কারণ কোরআনের কয়েকটি আয়াত ও কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার ভিত্তিতে প্রমাণ করা হয়েছে যে, অমুসলিমেরা স্বভাবতই মুসলমানদের বিশ্বস্ত “ওলি” (ally) হতে পারে না, আর আল্লাহ নাকি তাদের অপমানিত করেছেন, সুতরাং মুসলমানদের উচিত তাদেরকে কোনো সম্মানজনক অবস্থানে না তোলা।
এই সাম্প্রদায়িক অপ-যুক্তি পুরোপুরি ধর্মীয় পরিচয়-ভিত্তিক বৈষম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে মানুষের চরিত্র, দক্ষতা, সততা, নাগরিকত্ব—কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়; শুধু সে মুসলিম কি না, এই একটি প্রশ্নই তার সব যোগ্যতাকে অর্থহীন করে দেয়। “অমুসলিমকে সম্মান দেওয়া যাবে না, কারণ আল্লাহ তাকে ‘কুফরের’ জন্য হেয় করেছেন”—এ ধরনের ভাষা আসলে মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও আত্মসম্মানকে ধর্মীয় লেবেলের নিচে পিষে ফেলে। আধুনিক মানবাধিকারের সবচেয়ে মৌলিক ধারণা—সব মানুষ মর্যাদায় সমান—এর সঙ্গে এই ফতোয়ার সরাসরি সংঘাত; এখানে স্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে, শুধু বিশ্বাসের ভিন্নতার কারণে রাষ্ট্রের চোখে কেউ কম মানুষ, কম সম্মানের যোগ্য।
এই ফতোয়াকে যদি বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তা কতটা অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি করে, সেটা একটু কল্পনা করলেই বোঝা যায়। ধরুন, একটি দেশে ১০–২০% নাগরিক খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ, নাস্তিক বা অন্য কোনো পরিচয়ের; তারা জন্মসূত্রে এই রাষ্ট্রের নাগরিক, কর দেয়, আইন মানে, যুদ্ধ হলে সেনাবাহিনীতে যায়, কিন্তু শুধু “মুসলিম নয়” বলে তারা কখনো মন্ত্রী, মেয়র, আদালতের বিচারক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, এমনকি থানার ওসি বা একটি সরকারি হাসপাতালের পরিচালকও হতে পারবে না। একজন সৎ, অত্যন্ত দক্ষ অমুসলিম সারাজীবন পাবলিক সার্ভিসে কাজ করেও “কোনো পদে কর্তৃত্ব” পাবে না, আর মাঝারি মানের মুসলিম নাগরিক শুধুই বিশ্বাসের কারণে তার ওপরে বসতে পারবে—এটা দক্ষতার, ন্যায়ের, এবং মৌলিক মানবিকতার কোন সংজ্ঞার সঙ্গে যায়? আরও খারাপ হলো, ফতোয়ায় উদ্ধৃত উমর ইবনুল খাত্তাবের গল্পে বলা হয়েছে, অমুসলিমকে পদে রাখা মানেই তাকে “সম্মানিত” করা, আর “আল্লাহ যখন তাকে কুফরের কারণে হেয় করেছেন, তখন আমরা কেন তাকে সম্মান দেব?” [52]
Disbelievers are not to hold positions of authority in a Muslim state
1341
7-3-2012 – Rabee’ Al-Aakhir 14, 1433
598
Question
Is it permissible to appoint Christians to have positions of authority in Muslim countries?
Answer
All perfect praise be to Allaah, The Lord of the Worlds. I testify that there is none worthy of worship except Allaah, and that Muhammad sallallaahu `alayhi wa sallam ( may Allaah exalt his mention ) is His slave and Messenger.
Imaam Ibn Taymiyyah may Allaah have mercy upon him has relevant words which we will mention here with slight modifications. He stated that the righteous predecessors may Allaah be pleased with them held that Muslims should not seek the help of disbelievers in positions of power. To support this fact, they cited the sayings of Allaah (which mean):
– {O you who believe, do not take the Jews and the Christians as allies. They are [in fact] allies of one another.} [Quran 5:51]
– {Your ally is none but Allaah and [therefore] His Messenger and those who have believed – those who establish prayer and give Zakah [obligatory charity], and they bow [in worship]. And whoever is an ally of Allaah and His Messenger and those who have believed – indeed, the party of Allaah – they will be the predominant.} [Quran 5:5-56]
– {And those who disbelieve are allies of one another.} [Quran 8:73]
Abu Moosa may Allaah be pleased with him narrated he informed ‘Umar Ibn Al-Khattaab may Allaah be pleased with him that he had appointed a Christian scribe. ‘Umar may Allaah be pleased with him reproached him and reminded him of the verse in which Allaah The Almighty Says (what means): {O you who have believed, do not take the Jews and the Christians as allies. They are [in fact] allies of one another.} [Quran 5:51] He then ordered him to replace the Christian scribe with a Muslim. Abu Moosa may Allaah be pleased with him argued that he benefited from his writing while the scribe bore the sin of his religion. In turn, ‘Umar may Allaah be pleased with him explained to him that we must not honor them while Allaah The Almighty has degraded them with disbelief, nor should we dignify them while Allaah The Almighty has humiliated them, nor should we bring them closer to us while Allaah The Almighty has distanced them. [Ahmad: through a sound chain of narration]
Thus, we conclude that it is unanimously prohibited to assign disbelievers, irrespective of their sects and beliefs, to positions of authority.
Allaah Knows best.
AI অনুবাদঃ ফতোয়ার শিরোনাম- “একটি মুসলিম রাষ্ট্রে কাফেরদেরকে ক্ষমতাসীন পদে বসানো যাবে না”
ফতোয়া নম্বর: ১৩৪১
প্রকাশের তারিখ : ৭–৩–২০১২
প্রশ্ন (ভাবানুবাদ) – মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে খ্রিস্টানদেরকে কি কোনো ক্ষমতার পদে — অর্থাৎ কর্তৃত্বপূর্ণ বা শাসনমূলক পদে — নিয়োগ দেওয়া বৈধ (জায়েজ)?
উত্তর (ভাবানুবাদ)
সমস্ত পরিপূর্ণ প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সৃষ্টিকুলের রব। সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। আবার সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসুল।
ইমাম ইবন তাইমিয়্যা (রহ.) এ বিষয়ে কিছু বক্তব্য দিয়েছেন, যার সারাংশ এখানে সামান্য রূপান্তরসহ তুলে ধরা হচ্ছে। তিনি বলেন, সালাফদের (প্রথম যুগের ধার্মিক পূর্বসূরি মুসলিমগণ) অবস্থান ছিল — মুসলিমদের উচিত নয় অবিশ্বাসীদের সাহায্য নেওয়া এমন কোনো পদে, যেখানে তাদের হাতে ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব চলে যায়।
এই অবস্থানকে প্রতিষ্ঠা করতে তারা কোরআনের কয়েকটি আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করেন, যেমন—
“হে ঈমানদাররা, তোমরা ইহুদি ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধুরূপে (ওলি/মিত্র) গ্রহণ করো না; তারা একে অপরের বন্ধু।” (সূরা মায়েদাহ ৫:৫১ — অর্থগত সারাংশ)
“তোমাদের প্রকৃত ওলি/সহযোগী তো আল্লাহ, তাঁর রাসুল এবং যারা ঈমান এনেছে— যারা নামাজ কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনয় সহকারে সেজদায় ঝুঁকে থাকে। যে আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও মুমিনদেরকে ওলি বানায়, সে তো আল্লাহর দলভুক্ত; আর আল্লাহর দলই সফল ও প্রভাবশালী হবে।” (মায়েদাহ ৫:৫৫–৫৬ — অর্থগত সারাংশ)
“আর যারা কুফরি করে, তারা একে অপরের ওলি (সহযোগী/বন্ধু/রক্ষক)।” (আনফাল ৮:৭৩ — অর্থগত সারাংশ)
ইবন তাইমিয়্যার মতে, এসব আয়াত প্রমাণ করে যে, অবিশ্বাসীদেরকে মুসলিমদের ওপর কোনো ধরনের “ওলাযত” বা কর্তৃত্বপূর্ণ অবস্থানে বসানো উচিত নয়।
এ প্রসঙ্গে তিনি সাহাবি আবু মুসা আল-আশআরী (রা.)-এর একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন:
আবু মুসা (রা.) খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে জানালেন যে, তিনি একজন খ্রিস্টানকে নিজের লেখক/লেখক-কর্মচারী (scribe) হিসেবে নিয়োগ করেছেন। এটাকে শুনে উমর (রা.) তাকে ভর্ৎসনা করেন এবং উপরোক্ত আয়াতটি স্মরণ করিয়ে দেন — যেখানে ইহুদি ও খ্রিস্টানদেরকে “ওলি” বানাতে নিষেধ করা হয়েছে। এরপর তিনি আবু মুসাকে নির্দেশ দেন যেন সে ওই খ্রিস্টানকে সরিয়ে দিয়ে তার জায়গায় মুসলিম কাউকে নিয়োগ করে।
আবু মুসা (রা.) যুক্তি দেন, তিনি তো কেবল তার লেখালেখির দক্ষতা থেকে উপকৃত হচ্ছেন; আর তার ধর্মসংক্রান্ত গুনাহ সে নিজেই বহন করবে। উত্তরে উমর (রা.) ব্যাখ্যা করেন —
আমরা তাদেরকে সম্মানিত করতে পারি না, যখন আল্লাহ তাদেরকে কুফরির কারণে অপমানিত করেছেন;
আমরা তাদেরকে মর্যাদা দিতে পারি না, যখন আল্লাহ তাদের মর্যাদা কমিয়ে দিয়েছেন;
আমরা তাদেরকে কাছে টেনে আনতে পারি না, যখন আল্লাহ নিজেই তাদের থেকে দূরে রেখেছেন।
(ফতোয়ায় উল্লেখ আছে, হাদিসটি ইমাম আহমদ সঠিক সনদসহ বর্ণনা করেছেন।)
এই সব দলিলের আলোকে ফতোয়ার উপসংহার দাঁড়ায়—
অবিশ্বাসী, কাফেরদের—তাদের যে কোনো মতবাদ বা উপদলই হোক—কোনো রকম শাসন, কর্তৃত্ব, দায়িত্বশীল বা ক্ষমতাসীন উচ্চ পদে বসানো। যার সাথে কর্তৃত্বের বিষয় জড়িত, শরিয়াহর দৃষ্টিতে তা সর্বসম্মতিক্রমে (ইজমা অনুযায়ী) হারাম। মুসলিম রাষ্ট্রে কোন ক্ষমতার আসনে তাদের নিয়োগ দেওয়া বৈধ নয়।
ফতোয়াটি কেমন মনে হচ্ছে? ভাবুন তো, মুসলিমদের সাথে যদি একই আচরণ করা হয়, কেমন লাগবে? এইসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে ব্যবহার করা হচ্ছে অন্য এক মানুষের ধর্মীয় পরিচয়কে ইচ্ছাকৃতভাবে নিচু দেখানোর যন্ত্র হিসেবে—এটা কেবল বৈষম্য না, পরিকল্পিত লাঞ্ছনা এবং অপমান। কোনো আধুনিক সংবিধান, কোনো ন্যূনতম মানবিক মূল্যবোধই এটাকে ন্যায়সঙ্গত বলতে পারে না।আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, এই ধরনের বিধান সমাজে স্থায়ী শত্রুতা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। যদি মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে এভাবে ফতোয়া দিয়ে অমুসলিমদের ওপর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্যকে “ধর্মীয়ভাবে বৈধ” ঘোষণা করে, তাহলে তার সরাসরি প্রতিক্রিয়ায় অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোও মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে একই ধরনের বৈষম্যমূলক নীতি নেবে—“যেহেতু তোমরা আমাদের দেশে আমাদের নাগরিকদের সমান মর্যাদা দিতে রাজি না, আমরাও তোমাদের নাগরিকদের সমান মর্যাদা দেব না।” এইভাবে ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক অধিকার নির্ধারণের মাপকাঠি বানানো মানে মানবজাতিকে বিভিন্ন ক্যাম্পে ভাগ করে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়া, যেখানে নাগরিক হিসেবে “আমরা” আর “তোমরা”—এই বিভাজন কখনোই শেষ হয় না। মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক কোনো সামাজিক ব্যবস্থা মানুষের যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা, জবাবদিহিতা—এসবের ওপর ভিত্তি করে পদ দেয়, ধর্মীয় আইডেন্টিটির ওপর নয়। তাই এই ফতোয়ার মতবাদ কেবল অমানবিকই নয়, বাস্তবিক অর্থে ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ বিপরীত; এটি এমন এক ধর্মীয় জাতিবিদ্বেষকে আইনি রূপ দেওয়ার চেষ্টা, যা আধুনিক মানবসভ্যতার সব ন্যূনতম মানদণ্ডকেই অগ্রাহ্য করে।
অমুসলিমের সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য
ইসলামের আইন অনুসারে, একজন মুসলিমের বিরুদ্ধে একজন অমুসলিমের সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ একদিন কোন মুসলিম যদি অমুসলিম কোন মানুষের বাসায় ঢুকে তাদের পরিবারের কয়েকজনকে হত্যা করে, এবং সেই অমুসলিম পরিবারের কয়েকজন যদি ঘটনাটি দেখে, তাহলে বিচারের সময় সেই সব অমুসলিমের সাক্ষ্য ইসলামি আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে না। এর অর্থ হচ্ছে, অমুসলিমরা মুসলিমদের কোন অপরাধ দেখে ফেললে, বা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে, সেগুলো ধর্তব্যের বিষয় নয় [53]। একজন প্রত্যক্ষদর্শী কী দেখেছেন এবং তাঁর বক্তব্য কতটা নির্ভরযোগ্য, তা যাচাই করার আগেই ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাঁর সাক্ষ্য বাতিল করে দিলে বিচারপ্রাপ্তির সুযোগও ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যায়। একই অপরাধের সাক্ষী হয়েও একজন মুসলিম আদালতে যে সুযোগ পাবেন, একজন অমুসলিম সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। নিজের জন্মভূমিতে নাগরিক হয়েও আদালতের সামনে এমন অসম অবস্থান সমানাধিকারের সরাসরি বিরোধী। অমুসলিমের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্যতা এবং তার সঙ্গে জড়িত বিচারিক বৈষম্য নিয়ে সংশয়ের পৃথক প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে [54]। নিচে ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীর সংশ্লিষ্ট বিধানটি পড়ে নিই –

রাস্তার কিনারায় ঠেলে দিতে হবে
ইসলামি রাষ্ট্রে একজন ইহুদি বা খ্রিস্টানের অবমাননাকর জিযিয়া কর দিয়ে বসবাসের অনুমতি থাকলেও, তাদেরকে আসলে অপমান অপদস্থতার সাথেই জীবন যাপন করতে হয়। নিচের হাদিস থেকে জানা যায়, নবী খোদ ইহুদি নাসারাদের রাস্তায় চলাফেরার সময়ও রাস্তার কিনারার দিকে ঠেলে দিতে বলেছেন, যেন তারা রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলাফেরা করতে না পারে [55]। জনসাধারণের পথে চলার সময়ও একজন মানুষকে তাঁর ধর্মের কারণে নিচু অবস্থান মেনে নিতে বাধ্য করা হলে তাঁর সামাজিক মর্যাদা প্রতিদিনই ক্ষুণ্ণ হয়। একজন মুসলিম অন্য দেশে নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে এমন আচরণের শিকার হলে সেটিকে অপমান ও বৈষম্য হিসেবেই দেখবেন। একজন ইহুদি বা খ্রিস্টানের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য। সালাম দেওয়া, পথে জায়গা ছেড়ে দেওয়া এবং অমুসলিমকে লাঞ্ছিত করার নির্দেশ সম্পর্কে হাদিস ও সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যাগুলো সংশয়ের পৃথক প্রবন্ধে বিস্তারিতভাবে সংকলিত রয়েছে [56]। আসুন নিচে হাদিসটি পড়ে নিই –
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
অধ্যায়ঃ ১৯/ যুদ্ধাভিযান
পাবলিশারঃ হুসাইন আল-মাদানী
পরিচ্ছদঃ ৪১. আহলে কিতাবদের সালাম প্রদান প্রসঙ্গে
১৬০২। আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ইয়াহুদী-নাসারাদের প্রথমে সালাম প্রদান করো না। তোমরা রাস্তায় চলাচলের সময় তাদের কারো সাথে দেখা হলে তাকে রাস্তার কিনারায় ঠেলে দিও।
সহীহ, সহীহা (৭০৪), ইরওয়া (১২৭১), মুসলিম, বুখারী আদাবুল মুফরাদ, ২৮৫৫ নং হাদীসটির আলোচনা আসবে।
ইবনু উমার, আনাস ও আবূ বাসরা আল-গিফারী (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই হাদিসটির বর্ণনায় এটিও বলা হয়েছে যে, মুসলিমদের প্রতি নির্দেশনাই হচ্ছে অমুসলিমদের লাঞ্ছিত করার [57] [58]
সূনান তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৪/ অভিযান
পরিচ্ছেদঃ কিতাবীদের সালাম দেওয়া।
১৬০৮। কুতায়বা (রহঃ) … আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইয়াহূদী খ্রিষ্টানকে প্রথমেই সালাম দিবে না। এদের কাউকে যদি পথে পাও তবে এর কিনারায় তাদের ঠেলে দেবে। সহীহ, সহীহাহ ৭০৪, ইরওয়া ১২৭১, মুসলিম, আদাবুল মুফরাদ, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ১৬০২ [আল মাদানী প্রকাশনী]
এই বিষয়ে ইবনু উমার, আনাস, সাহাবী আবূ বাসরা গিফারী রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। ইমাম আবূ ঈসা (রহঃ) বলেন, এই হাদীসটি হাসান-সহীহ। হাদীসটির তাৎপর্য হলো, ইয়াহূদী খৃষ্টানকে প্রথমেই তুমি সালাম দিবে না। কতক আলিম বলেন, এটা অপছন্দনীয় হওয়ার কারণ হলো এতে এদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়, অথচ মুসলিমদের প্রতি নির্দেশ হল এদেরকে লাঞ্ছিত করার। এমনিভাবে পথে এদের কারো পাওয়া গেলে তার জন্য পথ ছাড়া হবে না কেননা, এতে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

এই বিষয়টি তাফসীরে ইবনে কাসীরেও বলা আছে, [59]

অমুসলিমদের যাকাত দেয়া যাবে না
একটি ইসলামিক দেশে সকল মুসলিমকে যাকাত দিতে হয়। কিন্তু ইসলামি আইন অনুসারে, দরিদ্র কাফেরদের যাকাত দেয়া যাবে না। যাকাত দেয়ার ক্ষেত্রে দেখতে হবে, দরিদ্র মানুষদের ধর্মবিশ্বাস কী। ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে তারা যাকাত পাবে। আসুন একটি বিখ্যাত ফতোয়া দেখে নিই, [60]
Question
Last week a scholar said that we can give Zakah to non-Muslims, also that where the Qur’an says to give to the 8 people it does not clearly say for Muslims only. Is this correct?
Answer
Praise be to Allah, the Lord of the Worlds; and may His blessings and peace be upon our Prophet Muhammad and upon all his Family and Companions.
Zakah should be strictly limited to the 8 categories mentioned in the verse. Allah Says (interpretation of meaning): {As-Sadaqât (here it means Zakât) are only for the Fuqarâ’ (poor), and Al-Masâkin (the poor) and those employed to collect (the funds); and for to attract the hearts of those who have been inclined (towards Islâm);….}(9:60).
Now if the person gives Zakah to non-Muslims apart from those inclined to Islam his/her deed is not permissible and does not free him/her from the Zakah duty. So, he/she still has to pay that Zakah again.
In fact, Zakah should not be paid to a Kafir (non-Muslims) unless he/she is from “those inclined to become Muslims”.
The evidence for the above rule is the Hadith reported by Muslim and Al Bukhari from Ibn Abbas (Radiya Allahu Anhu) that the Prophet (Sallallahu Alaihi wa Sallam) said: “(Zakah) is taken from their wealthy people and paid to their poor ones”. The pronoun “their” in both cases refers to Muslims.
As for those who are inclined to Islam, they are of two types:
1) The non-Muslims who could become Muslim, these could be given Zakah according to the Maliki and Hanbali but according to the Shafi’e and Hanafi should not be given Zakah.
2) Muslims who could become more firm in their religion. These should be given Zakah according to the Maliki, Shafi’e and Hanbali.
The Hanafis opinion is that neither types should be given Zakah as Allah has made Islam glorious and does not need pushing people to it.
Now those Muslims who are doubtful or weak in religion should be given Zakah not to convince them but, because they are poor or needy so, what you heard about giving Zakah to non-Muslims is wrong unless the scholars meant those inclined towards Islam.
Allah knows best.
একই বক্তব্য পাওয়া যায় প্রখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ তাফসীরে মাযহারী থেকে, [61]

এছাড়াও আল-ফিকহুল মুয়াসসার গ্রন্থেও একই কথা বলা হয়েছে [62] –

মুশরিকদের সাথে বসবাস করা নিষেধ
নবী মুহাম্মদ ইসলামিক রাষ্ট্রে মুশরিক বা মূর্তি পুজারীদের বসবাস নিষিদ্ধ করেই শেষ করে নি, একইসাথে অন্যান্য স্থানেও মুশরিকদের সাথে বসবাস নিষিদ্ধ ঘোষণা করে গেছেন। কোন মুসলিম কোন মুশরিক প্রতিবেশির সাথে মিলে মিশে বসবাস করতে পারবে না, এই হাদিসে এটিই বলা হয়েছে [63] [64]। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার যোগ্যতা তাঁর সততা, আচরণ এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করার ভিত্তিতে বিচার করা উচিত। ধর্মের কারণে তাঁর সঙ্গে বসবাস ও সাহচর্য নিষিদ্ধ করলে একই সমাজের মানুষদের মধ্যে স্থায়ী বিভাজন তৈরি হয়। বহু প্রজন্ম ধরে একই এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্মভূমি, বাড়িঘর ও সামাজিক সম্পর্কের অধিকারও তখন ধর্মীয় পরিচয়ের অধীন হয়ে পড়ে। আরব ভূখণ্ড থেকে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বহিষ্কারের নির্দেশ এবং ধর্মের ভিত্তিতে অমুসলিমদের উচ্ছেদের বিষয়ে সংশয়ের পৃথক প্রবন্ধে বিস্তারিত দলিল সংকলিত রয়েছে [65]। নিজের জন্মভূমিতে বসবাসের অধিকার ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুমতির ওপর নির্ভর করলে অমুসলিমের নিরাপত্তা ও নাগরিক মর্যাদা কতটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, সেই প্রশ্নটি মাথায় রেখেই নিচের হাদিসগুলো পড়ুন।
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
অধ্যায়ঃ ১৯/ যুদ্ধাভিযান
পাবলিশারঃ হুসাইন আল-মাদানী
পরিচ্ছদঃ ৪২. মুশরিকদের সাথে বসবাস করা নিষেধ
১৬০৫। আবূ মুআবিয়ার হাদীসের মত হাদীস হান্নাদ-আবদাহ হতে, তিনি ইসমাঈল ইবনু আবৃ খালিদ হতে, তিনি কাইস ইবনু আবূ হাযিম (রাহঃ)-এর সূত্রে বর্ণিত আছে। তবে এই সূত্রে জারীর (রাঃ)-এর উল্লেখ নেই এবং এটিই অনেক বেশি সহীহ। সামুরা (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে।
আবূ ঈসা বলেন, ইসমাঈলের বেশিরভাগ সঙ্গী তার হতে, তিনি কাইস ইবনু আবূ হাযিমের সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি ছোট বাহিনী পাঠান। এ সূত্রেও জারীরের উল্লেখ নেই। আবূ মুআবিয়ার হাদীসের মত হাদীস হাম্মাদ ইবনু সালামা-হাজ্জাজ ইবনু আরতাত হতে, তিনি ইসমাঈল ইবনু আবূ খালিদ হতে, তিনি কাইস হতে, তিনি জারীর (রাঃ)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
আমি ইমাম বুখারীকে বলতে শুনেছি, সঠিক কথা হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে কাইসের বর্ণনাটি মুরসাল। সামুরা ইবনু জুনদাব (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “মুশরিকদের সাথে তোমরা একত্রে বসবাস কর না, তাদের সংসর্গেও যেও না। যে মানুষ তাদের সাথে বসবাস করবে অথবা তাদের সংসর্গে থাকবে সে তাদের অনুরূপ বলে বিবেচিত হবে।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ৯/ জিহাদ
১৮২. মুশরিকদের এলাকায় অবস্থান সম্পর্কে
২৭৮৭। সামুরাহ ইবনু জুনদুব (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কেউ কোনো মুশরিকের সাহচর্যে থাকলে এবং তাদের সাথে বসবাস করলে সে তাদেরই মতো।(1)
(1). সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
অমুসলিমদের খাবারও দেয়া যাবে না
কাফেরদের খাবার দেয়ার বেলাতেও রয়েছে ইসলামে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। আসুন এই বিষয়ে নবী কী বলেছেন দেখে নিই [66] –
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ৩৬/ শিষ্টাচার
১৯. যার সংস্পর্শে বসা উচিত
৪৮৩২। আবূ সাঈদ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তুমি মু‘মিন ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারো সঙ্গী হবে না এবং তোমার খাদ্য যেন পরহেযগার লোকে খায়।(1)
হাসান।
(1). তিরমিযী, আহমাদ।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
কাফেরদের খাবার দাবারের পরিমাণ নিয়েও নবী মুহাম্মদ অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে গেছেন [67] –
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৭/ আহার সংক্রান্ত
পরিচ্ছেদঃ ২১১৬. মু’মিন ব্যক্তি এক পেটে খায়
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৫০০৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৫৩৯৬
৫০০৪। ইসমাঈল (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুমিন ব্যাক্তি এক পেটে আহার করে আর কাফির সাত পেটে আহার করে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
আসুন একটি বক্তব্য শুনি,
মুশরিকদের বিছানায় বসতে দেয়া যাবে না
ইসলাম ধর্মটি কতটা ভয়াবহ সাম্প্রদায়িকতার দীক্ষা দেয়, তা আরও একটি ছোট্ট ঘটনা থেকে পরিষ্কার হয়। ঘটনাটি হচ্ছে, আবু সুফিয়ান সেই সময়ে মদিনায় নবী মুহাম্মদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। নবীর সাথে তাদের সেই সময়ে বেশ শত্রুতা। নবীর স্ত্রী ছিল আবু সুফিয়ানের মেয়ে হাবীবা। তার ঘরে ঢুকে তার বিছায় বসতে গেলে নবীর স্ত্রী হাবীবা তাকে বিছায় বসতে দেয়নি এই কারণে যে, আবু সুফিয়ান ছিলেন একজন মুশরিক, অর্থাৎ মূর্তি পূজারী। তাই অপবিত্র! নবীর স্ত্রী কিন্তু অন্য কোন কারণ উল্লেখ করেননি। আবু সুফিয়ানের সাথে শত্রুতা বা যুদ্ধের কারণে নয়, আবু সুফিয়ানের মুশরিক হওয়াই ছিল এর কারণ। এর থেকে জানা যায়, একজন মুশরিক হচ্ছে ইসলামের দৃষ্টিতে অপবিত্র, তাই তার স্পর্শ বা তাকে বিছানায় বসানোও ইসলাম পরিপন্থী। তার স্পর্শে মুসলিমরাও অপবিত্র হয়ে যেতে পারে! আসুন দলিলটি দেখে নেয়া যাক [68] –

অমুসলিমের জীবনের মূল্য কম
ইসলামি শরিয়ত অর্থাৎ ইসলামি আইনের রাষ্ট্রে একজন মুসলিমের জীবনের মূল্য একজন অমুসলিমের জীবনের মূল্যের চাইতে অনেক বেশি। এই কারণে একজন অমুসলিমকে হত্যা করলে তার জন্য মুসলিমের প্রাণদণ্ড দেয়া যাবে না। অথচ, একজন অমুসলিম কোন মুসলিমকে হত্যা করলে অবশ্যই প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হবে। এর অর্থ হচ্ছে, শরিয়ার দেশে অমুসলিম হত্যার দুনিয়াবি শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নয়। আসুন একটি ওয়াজ প্রথমেই শুনে নিই,
প্রখ্যাত বাংলাদেশের আলেম এবং ইসলামী ফিকাহ শাস্ত্রের অন্যতম পণ্ডিত ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার সম্পাদনায় প্রকাশিত মো আব্দুল কাদেরের বই বাংলাদেশে প্রচলিত শির্ক বিদ‘আত ও কুসংস্কার পর্যালোচনা গ্রন্থে পরিষ্কারভাবেই বলা আছে যে, শিরক হচ্ছে হত্যাযোগ্য অপরাধ। যারা শিরক করে, তাদের রক্ত মুসলিমদের জন্য হালাল [69]। এই চিন্তার সামাজিক পরিণতি ভয়াবহ: যে সমাজে কোটি মানুষ মন্দিরে যায়, প্রতিমা পূজা করে, অন্য ধর্ম মানে বা কোনো ধর্মই মানে না, সেখানে “শিরক হত্যাযোগ্য”—এমন ধারণা সরাসরি গণনিরাপত্তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।

সেইসাথে উল্লেখ্য, আরেকটি হাদিসে বলা হয়েছে, কোন মুসলমান কোন জিম্মি অর্থাৎ জিজিয়া কর দেয়া বা চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যা করলে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না, তবে তার জন্য দুনিয়াবি মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির কথা বলা নেই। যেখানে মুসলিমকে হত্যা করা হলে তার দুনিয়াবি এবং আখিরাত উভয় শাস্তির কথাই বলা আছে [70] [71] [72]। হত্যার বিচার করতে হলে অপরাধের ধরন, প্রমাণ এবং অপরাধীর দায় বিবেচনা করতে হবে। নিহত ব্যক্তি কোন ধর্মের ছিলেন, সেই পরিচয় তাঁর পরিবারের বিচার পাওয়ার অধিকার কমিয়ে দিতে পারে না। একইভাবে হত্যাকারীর ধর্মীয় পরিচয়ও তাকে শাস্তির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দিতে পারে না। পরকালের শাস্তির ঘোষণা দিয়ে এই পৃথিবীর আদালতে নিহতের পরিবারের সমান বিচারপ্রাপ্তির প্রশ্ন মিটিয়ে দেওয়া যায় না। অমুসলিম হত্যার ক্ষেত্রে কিসাসের বিধান, সংশ্লিষ্ট হাদিস এবং ফিকহের ব্যাখ্যা নিয়ে সংশয়ের পৃথক প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে [73]। নিচের দলিলগুলোতে সেই বিচারিক অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে দেখা যাবে।
বুলুগুল মারাম
পর্ব – ৯ঃ অপরাধ প্রসঙ্গ
পরিচ্ছেদঃ কাফিরের হত্যার বদলে মুসলিম হত্যা করা প্রসঙ্গ এবং সকল মুমিনের রক্ত সমমর্যাদা সম্পন্ন
১১৬৩। আবূ জুহাইফাহ (রাঃ) হতে বৰ্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আলী (রাঃ)-কে বললাম, আপনাদের নিকট কি কিছু লিপিবদ্ধ আছে? তিনি বললেন, ‘না, শুধুমাত্র আল্লাহর কিতাব রয়েছে, আর একজন মুসলিমকে যে জ্ঞান দান করা হয় সেই বুদ্ধি ও বিবেক। এছাড়া কিছু এ সহীফাতে লিপিবদ্ধ রয়েছে’। তিনি [আবূ জুহাইফাহ (রাঃ)] বলেন, আমি বললাম, এ সহীফাটিতে কী আছে? তিনি বললেন, ‘ক্ষতিপূরণ ও বন্দী মুক্তির বিধান, আর এ বিধানটিও যে, ‘কোন মুসলিমকে কাফির হত্যার বদলে হত্যা করা যাবে না’।[1]
[1] বুখারী ১১১, ১৮৭০, ৩০৪৭, ৩১৭২, ৩১৮০, ৬৭৫৫, মুসলিম ১৩৭০, তিরমিযী ১৪১২, ২১২৭, নাসায়ী ৪৭৩৪, ৪৭৩৫, ৪৭৫৫, আবূ দাউদ ২০৩৪, ৪৫৩০, ইবনু মাজাহ ২৬৫৮, আহমাদ ৬০০, ৬১৬, ৭৮৪, ৮০০, দারেমী ২৩৫৬।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ জুহাইফাহ (রাঃ)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৮৭/ রক্তপণ
পরিচ্ছদঃ ৮৭/৩১. কাফেরের বদলে মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না।
৬৯১৫. আবূ জুহাইফাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আলী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের কাছে এমন কিছু আছে কি যা কুরআনে নেই? তিনি বললেন, দিয়াতের বিধান, বন্দী-মুক্তির বিধান এবং (এ বিধান যে) কাফেরের বদলে কোন মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না। (১১১) (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৪৩৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৪৪৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সুনানে ইবনে মাজাহ
অধ্যায়ঃ ১৫/ রক্তপণ
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
পরিচ্ছদঃ ১৫/২১. কাফের ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে মুসলিম ব্যক্তিকে হত্যা করা যাবে না
১/২৬৫৮। আবূ জুহাইফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আলী ইবনে আবূ তালিব (রাঃ) কে বললাম, আপনাদের নিকট এমন কোন জ্ঞান আছে কি যা অন্যদের অজ্ঞাত? তিনি বলেন, না, আল্লাহর শপথ! লোকেদের নিকট যে জ্ঞান আছে তা ব্যতীত বিশেষ কোন জ্ঞান আমাদের নিকট নাই। তবে আল্লাহ যদি কাউকে কুরআন বুঝবার জ্ঞান দান করেন এবং এই সহীফার মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দিয়াত ইত্যাদি প্রসঙ্গে যা আছে (তাহলে স্বতন্ত্র কথা)। এই সহীফার মধ্যে আরো আছেঃ কোন কাফেরকে হত্যার অপরাধে কোন মুসলমানকে হত্যা করা যাবে না।
সহীহুল বুখারী ১১১, ১৮৭০, ৩০৪৭, ৩০৩৪, ৩১৭২, ৩১৮০, ৬৭৫৫, ৬৯০৩, ৬৯১৫, ৭৩০০, মুসলিম ১৩৭০, তিরমিযী ১৪১২, ২১২৭, নাসায়ী ৪৭৩৪, ৪৭৩৫, ৪৭৪৪, ৪৭৪৫, ৪৭৪৬, ৪৫৩০, আহমাদ ৬০০, ৬১৬, ৪৮৪, ৯৬২, ৯৯৪, ১০৪০, দারেমী ২৩৫৬, ইরওয়া ২২০৯। তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৪/ রক্তমূল্য
পরিচ্ছেদঃ ১১. কাফির হত্যার দায়ে মুসলিমকে হত্যা করা হবে কি না?
৪৫৩০। কাইস ইবনু আব্বাদ (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি ও আল-আশতার আলী (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে বলি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি আপনাকে বিশেষ কোনো উপদেশ দিয়েছেন যা সাধারণভাবে মানুষকে দেননি? তিনি বললেন, না; তবে শুধু এতটুকু যা আমার এ চিঠিতে আছে। অতঃপর তিনি তার তরবারির খাপ থেকে একখানা পত্র বের করলেন। তাতে লেখা ছিলোঃ সকল মুসলিমের জীবন সমমানের। অন্যদের বিরুদ্ধে তারা একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তি।
তাদের একজন সাধারণ ব্যক্তি কর্তৃক প্রদত্ত নিরাপত্তাই সকলের জন্য পালনীয়। সাবধান! কোনো মু‘মিনকে কোনো কাফির হত্যার অপরাধে হত্যা করা যাবে না। চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিককেও চুক্তি বলবৎ থাকাকালে হত্যা করা যাবে না। কেউ বিদ‘আত চালু করলে তার দায় তার উপর বর্তাবে। কোনো ব্যক্তি বিদ‘আত চালু করলে বা বিদ‘আতিকে মুক্তি দিলে তার উপর আল্লাহর অভিশাপ এবং ফিরিশতা ও মানবকূলের অভিশাপ।(1)
সহীহ।
(1). নাসায়ী, আহমাদ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ কায়স ইবনু ‘উবাদ (রহঃ)
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৪/ রক্তমূল্য
পরিচ্ছেদঃ ১১. কাফির হত্যার দায়ে মুসলিমকে হত্যা করা হবে কি না?
৪৫৩১। আমর ইবনু শু‘আইব (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অতঃপর আলী (রাঃ) বর্ণিত হাদীদের অনুরূপ। তবে এতে রয়েছেঃ তাদের দূরবর্তীরাও তাদের পক্ষে নিরাপত্তা দিতে পারবে, উত্তম ও দুর্বল পশুর মালিকরা এবং পিছনে অবস্থানরত ও সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ সৈন্যগণও গানীমাতে সমান অংশ লাভ করবে।(1)
হাসান সহীহ।
(1). এটি গত হয়েছে হা/ ২৭৫১।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আমর ইবনু শু‘আয়ব (রহঃ)
এবারে আসুন ফিকহে ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু গ্রন্থ থেকে এই বিষয়ে ওসমানের শাসনামলের একটি ঘটনা জেনে নিই [74] –



এই বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানা যায় দরসে তাওহীদ ও কিতাল (চতুর্থ দরস) যে সকল কারণে কারো রক্তপাত হালাল হয়ে যায় গ্রন্থ থেকে [75] –


এই বিষয়ে ফতোয়া বিষয়ক প্রখ্যাত ওয়েবসাইট ইসলাম ওয়েব থেকে একটি ফতোয়া দেখে নিই, [76]
All perfect praise be to Allaah, The Lord of the Worlds. I testify that there is none worthy of worship except Allaah, and that Muhammad is His slave and Messenger. We ask Allaah to exalt his mention as well as that of his family and all his companions.
First of all, you should know that a Muslim should not be killed for killing a belligerent non-Muslim according to the consensus of the scholars may Allaah have mercy upon them. According to the view of the majority of the scholars may Allaah have mercy upon them a Muslim should not be killed against a free non-Muslim under the Muslim rule. The evidence about this is the saying of the Prophet sallallaahu `alayhi wa sallam ( may Allaah exalt his mention ): “A Muslim should not be killed for killing a non-Muslim.” (At-Tirmithi)
Moreover, according to the view of the majority of the scholars may Allaah have mercy upon them the title (and rulings) “disbeliever” is applicable to a free non-Muslim under the Muslim rule. However, Abu Haneefah, and the scholars of his School of jurisprudence may Allaah have mercy upon them are of the view that a Muslim should be killed for killing a free non-Muslim under Muslim rule; their evidence is the two verses which the questioner mentioned. Nonetheless, the correct opinion is that of the majority of the scholars may Allaah have mercy upon them that is based on the above Prophetic narration, which is a direct proof related to the case of dispute.
Allaah Knows best.
অমুসলিম হত্যার রক্তপণ
উপরের হাদিস এবং ফতোয়াটি থেকে স্পষ্ট যে, অমুসলিমদের হত্যার জন্য কোন মুসলিমকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে না। তার মানে হচ্ছে, অমুসলিমের জীবনের মূল্য ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে কম। তাহলে অমুসলিম হত্যার জন্য কী শাস্তি দেয়া হবে? ইসলামের বিধান অনুসারে, অমুসলিম হত্যার জন্য রক্তপণ বা দিয়াত দিতে হবে, তবে তা হবে মুসলিমের অর্ধেক দাম [77] –
সুনানে ইবনে মাজাহ
১৫/ রক্তপণ
পরিচ্ছেদঃ ১৫/১৩. কাফের-এর দিয়াত
১/২৬৪৪। ‘আমর ইবনে শু‘আইব (রাঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফয়সালা দেন যে, দু’ আহলে কিতাব সম্প্রদায় অর্থাৎ ইয়াহূদী ও নাসারাদের দিয়াত হবে মুসলমানদের দিয়াতের অর্ধেক।
তিরমিযী ১৪১৩, নাসায়ী ৪৮০৬, ৪৮০৭, ইরওয়া ২২৫১।
তাহকীক আলবানীঃ হাসান। উক্ত হাদিসের রাবী আব্দুর রহমান বিন আয়্যাশ সম্পর্কে ইবনু হাজার আল-আসকালানী বলেন, তিনি মাকবুল। ইমাম যাহাবী তাকে সিকাহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আমর ইবনু শু‘আয়ব (রহঃ)
আরেকটি হাদিস পড়ি [78] –
সূনান তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৬/ রক্তপণ
পরিচ্ছেদঃ কাফেরের দিয়াত প্রসঙ্গে।
১৪১৭. ঈসা ইবনু আহমাদ (রহঃ) ….. আমর ইবনু শুআয়ব তাঁর পিতা তাঁর পিতামহ (আবদুল্লাহ ইবনু আমর রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুসলিমকে অমুসলিমের বদলে হত্যা করা যাবে না। – ইবনু মাজাহ ২৬৫৯, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ১৪১৩ (আল মাদানী প্রকাশনী)
এই সনদে আরো বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কাফিরের দিয়াতের পরিমাণ হল মুমিনের দিয়াতের অর্ধেক। – ইবনু মাজাহ ২৬৪৪
এই বিষয়ে আবদুল্লাহ ইবনু আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসটি হাসান। ইয়াহুদী ও খৃস্টানের দিয়াতের বিষয়ে আলিমগণের মতবিরোধ রয়েছে। কতক আলিমের মাযহাব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত এই হাদীস অনুসারে। উমার ইবনু আবদুল আযীয (রহঃ) বলেন, ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের দিয়াত মুসলিমের দিয়াতের অর্ধেক। আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ) এ মত পোষণ করেন। উমর ইবনু খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত তিনি বলেছেন, ইয়াহূদী ও খৃস্টানদের দিয়াত হল চার হাজার দিরহাম। অগ্নি উপাসকের দিয়াত হল আটশত দিরহাম। এ হল ইমাম মালিক, শাফিঈ ও ইসহাক (রহঃ)-এর অভিমত। কোন কোন আলিম বলেছেন, ইয়াহুদী ও খৃস্টানের দিয়াত হল মুসলিমের দিয়াতের সমান। এ হল ইমাম সুফইয়ান ছাওরী ও কুফাবাসী আলিমগণের অভিমত।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আমর ইবনু শু‘আয়ব (রহঃ)
অর্থাৎ, অমুসলিমের জীবনের মূল্য মুসলিমের জীবনের মূল্যের অর্ধেক। ধর্মের ভিত্তিতে একজন মানুষের জীবনের মূল্য যে মতাদর্শে নির্ধারিত হয়, সেই মতাদর্শকে কীভাবে ইনসাফমূলক মতাদর্শ বলা সম্ভব, আমি জানি না। মুয়াত্তা মালিকের এই হাদিসটিও পড়ি, [79]
মুয়াত্তা মালিক
৪৩. দিয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ১৫. কাফির যিম্মীর দিয়াত
মালিক (রহঃ) বলিয়াছেন, তাহার নিকট রেওয়ায়ত পৌছিয়াছে যে, উমর ইবন আবদুল আযীয (রহঃ) বলতেন, ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানদের দিয়াত যখন তাহারা একে অন্যকে হত্যা করে, স্বাধীন মুসলমানের দিয়াতের অর্ধেক।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট বিধান এই যে, কোন মুসলমানকে কাফিরের পরিবর্তে হত্যা করা হইবে না। হ্যাঁ, যদি ধোঁকা দিয়া সে যিম্মীকে হত্যা করে তবে তাহাকে হত্যা করা হইবে।
সুলায়মান ইবন ইয়াসার (রহঃ) বলিতেন, অগ্নিউপাসকদের দিয়াত আট শত দিরহাম। মালিক (রহঃ) বলেন, ইহাই আমাদের নিকট বিধান।
মালিক (রহঃ) বলেন, ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদের ক্ষত করার দিয়াত মুসলমানদের ক্ষত করার দিয়াতের হিসাবে মুযিহার বিশ ভাগের একভাগ এবং মাসুমা ও জাইকায় তিন ভাগের একভাগ। ইহার উপর অন্যগুলির অনুমান করা যায়।
হাদিসের মানঃ তাহকীক অপেক্ষমাণ
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু আনাস (রহঃ)
ইসলাম ত্যাগের শাস্তি
বিশ্বাস মানুষের মনের ব্যাপার। যার বিশ্বাস হয় সে বিশ্বাস করে, যার বিশ্বাস হয় না তাকে জোর করলেও তার মধ্যে বিশ্বাস আসে না। আর মুসলিম পরিবারে জন্ম নিলে কেউ জিজ্ঞেসও করে না, তুমি কোন ধর্মটি বেছে নিবে? মানে, মতামত না দিয়েই, নিজে দেখেশুনে বুঝে পছন্দ করার বয়সে পৌঁছাবার আগেই একজন মানুষ মুসলমান হয়ে যায়। কিন্তু পরে যদি তারা ইসলাম ত্যাগ করতে চায়? সে যদি অন্য কোন ধর্ম বেছে নিতে চায়? বা সে যদি নাস্তিক হয়ে যায়? ইসলাম ধর্মে ধর্ম ত্যাগের শাস্তি কী? এই বিষয়ে শরিয়তের বিধান কী? ধর্ম গ্রহণের স্বাধীনতার মধ্যে সেই ধর্ম ত্যাগ করার স্বাধীনতাও থাকতে হবে। একজন মানুষ কোনো বিশ্বাসকে আর সত্য মনে না করলে প্রাণ রক্ষার জন্য তাকে সেই বিশ্বাসের অনুসারী পরিচয় ধরে রাখতে বাধ্য করা বিশ্বাসের স্বাধীনতা হতে পারে না। এতে প্রকাশ্যে ধর্মীয় পরিচয় বজায় থাকতে পারে, কিন্তু তার মনের অবিশ্বাস দূর হয় না। জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্ম ত্যাগের সিদ্ধান্তকে হত্যাযোগ্য অপরাধ বানালে নিজের বিশ্বাস যাচাই ও পরিবর্তনের অধিকারই শাস্তির অধীন হয়ে পড়ে। ধর্মত্যাগের মৃত্যুদণ্ড, সংশ্লিষ্ট হাদিস এবং ধ্রুপদী ফিকহের বিধান নিয়ে সংশয়ের পৃথক প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে [80]। আসুন নিচের হাদিসগুলো থেকে জেনে নিই। [81] [82]
সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ শাস্তির বিধান
৪৩০০. আহমদ ইব্ন মুহাম্মদ (রহঃ) — ইকরাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, আলী (রাঃ) ঐ সব লোকদের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেন, যারা মুরতাদ হয়েছিল। এ সংবাদ ইব্ন আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট পৌছলে, তিনি বলেনঃ যদি আমি তখন সেখানে উপস্থিত থাকতাম, তবে আমি তাদের আগুনে জ্বালাতে দিতাম না। কেননা, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোময়া আল্লাহ্ প্রদত্ত শাস্তির (বস্তু) দ্বারা কাউকে শাস্তি দেবে না। অবশ্য আমি তাদেরকে আল্লাহ্র রাসূলের নির্দেশ মত হত্যা করতাম। কেননা, তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কেউ দ্বীন পরিত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়, তবে তোমরা তাকে হত্যা করবে। আলী (রাঃ) ইব্ন আব্বাস (রাঃ)-এর এ নির্দেশ শুনে বলেনঃ ওয়াহ্! ওয়াহ্! ইব্ন আব্বাস (রাঃ) সত্য বলেছেন। আর ইহাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ শাস্তির বিধান
৪৩০১. আমর ইব্ন আওন (রহঃ) —- আবদুল্লাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঐ মুসলমানের রক্ত হালাল নয়, যে এরূপ সাক্ষ্য দেয় যে, “আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহ্র রাসূল”। তবে তিনটি কারণের কোন ‘একটির জন্য’ কোন মুসলমানের রক্ত প্রবাহিত করা হালালঃ (১) যদি কোন বিবাহিত ব্যক্তি যিনা করে; (২) যদি কেউ কাউকে হত্যা করে, তবে এর বিনিময়ে হত্যা এবং (৩) যে ব্যক্তি দ্বীন ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে মুসলমানের জামায়াত থেকে বেরিয়ে যায়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
আসুন, সহি বুখারী গ্রন্থ থেকে সরাসরি হাদিসগুলো যাচাই করে নিই [83] [84]


এবারে আসুন দেখি, প্রখ্যাত হাদিস প্রনেতা ইমাম মালিকের মুয়াত্তা ইমাম মালিক গ্রন্থ থেকে মুরতাদের শাস্তি কী হতে পারে তা জেনে নিই। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশ হওয়া মুয়াত্তা ইমাম মালিক দ্বিতীয় খণ্ডের ৪০৬, ৪০৭ নম্বর পৃষ্ঠায় হাদিসটি পাবেন। ডাউনলোড লিঙ্ক [85]


সেইসাথে, আরো অমানবিক ব্যাপার হলো, মুরতাদকে কেউ হত্যা করলে তার জন্য হত্যাকারীর ওপর মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগ হবে না। বিষয়টি সন্নিবেশিত আছে বিধিবদ্ধ ইসলামিক আইন খণ্ড ১ এ [86]

একই সাথে, মুরতাদের বিষয় সম্পত্তিও জবরদখল করা হবে, তেমনটিই বলা আছে ইসলামিক আইনে [87]

মুসলিম দাইয়ীগণ এই বিষয়ে কি বলে, সেটিও আসুন জেনে নিই,
আমীর হবে কুরাইশ বংশ থেকে
ইসলামে কুরাইশ বংশকে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে এবং খলিফা নির্ধারণের জন্য কুরাইশদের থেকে নেয়ার বিষয়ে জোর দেয়া হয়েছে [88] [89]। রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা বিচার করতে মানুষের দক্ষতা, সততা, দায়িত্ব পালনের সামর্থ্য এবং জবাবদিহিকে গুরুত্ব দিতে হয়। জন্মের বংশপরিচয়কে নেতৃত্বের শর্ত বানালে সেই যোগ্যতা অর্জনের আগেই একটি বিশেষ বংশের মানুষ অগ্রাধিকার পেয়ে যায়। অন্য বংশে জন্মানো মানুষ যত যোগ্যই হোক, জন্মপরিচয়ের এই বাধা নিজের চেষ্টা দিয়ে অতিক্রম করতে পারে না। ফলে অমুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার সীমিত করার পাশাপাশি মুসলিমদের মধ্যেও বংশের ভিত্তিতে নেতৃত্বের অধিকার ভাগ করা হয়। সমান নাগরিকত্বের মানদণ্ডে এই জন্মগত অগ্রাধিকারও বৈষম্য। কুরাইশ বংশের জন্য নেতৃত্ব নির্ধারণের হাদিস এবং তার সঙ্গে যুক্ত বংশগত বিশেষাধিকারের আলোচনা সংশয়ের পৃথক প্রবন্ধে রয়েছে [90]। আসুন নিচে সংশ্লিষ্ট হাদিসগুলো পড়ে নিই –
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮২/ আহকাম
পরিচ্ছেদঃ ৩০০৬. আমীর কুরাইশদের থেকে হবে
৬৬৫৪। আবূল ইয়ামান (রহঃ) … মুহাম্মাদ ইবনু জুবায়র ইবনু মুতঈম (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, তারা কুরাইশের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মুআবিয়া (রাঃ) এর নিকট ছিলেন। তখন মুআবিয়া (রাঃ) এর নিকট সংবাদ পৌছল যে, আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, অচিরেই কাহতান গোত্র থেকে একজন বাদশাহ হবেন। এ শুনে তিনি ক্ষুদ্ধ হলেন এবং দাঁড়ালেন। এরপর তিনি আল্লাহ তা’আলার যথাযোগ্য প্রশংসা করলেন, তারপর তিনি বললেন, যা হোক! আমার নিকট এ মর্মে সংবাদ পৌছেছে যে, তোমাদের কতিপয় ব্যাক্তি এরূপ কথা বলে থাকে, যা আল্লাহর কিতাবে নেই এবং যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেও বর্ণিত নেই। এরাই তোমাদের মাঝে সবচেয়ে অজ্ঞ। সুতরাং তোমরা এ সকল মনগড়া কথা থেকে যা স্বয়ং বক্তাকেই পথভ্রষ্ট করে সতর্ক থাক। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, (খিলাফতের) এ বিষয়টি কুরাইশদের মধ্যেই থাকবে, যতদিন তারা দ্বীনের উপর কায়েম থাকবে। যে কেউ তাদের সঙ্গে বিরোধিতা করে তবে আল্লাহ তা’আলা তাকেই অধোমুখে নিপতিত করবেন। নুআয়ম (রহঃ) মুহাম্মাদ ইবনু জুবায়র (রহঃ) সুত্রে শুআয়ব এর অনুসরণ করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জুবায়র ইবনু মুত‘ইম (রাঃ)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
৯৩/ আহ্কাম
পরিচ্ছেদঃ ৯৩/২. আমীর কুরাইশদের মধ্যে থেকে হবে।
৭১৩৯. মুহাম্মাদ ইবনু যুবায়র ইবনু মুতঈম (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, তারা কুরাইশের একটি প্রতিনিধি দলের সাথে মু‘আবিয়াহ (রাঃ)-এর নিকট ছিলেন। তখন মু‘আবিয়াহ (রাঃ)-এর নিকট সংবাদ পৌঁছল যে, ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘আমর (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, অচিরেই কাহতান গোত্র থেকে একজন বাদশাহ্ হবেন। এ শুনে তিনি ক্রুদ্ধ হলেন এবং দাঁড়ালেন। এরপর তিনি আল্লাহ্ তা‘আলার যথাযোগ্য প্রশংসা করলেন, তারপর তিনি বললেন, যা হোক! আমার নিকট এ মর্মে সংবাদ পৌঁছেছে যে, তোমাদের কিছু লোক এমন কথা বলে থাকে যা আল্লাহর কিতাবে নেই এবং যা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেও বর্ণিত নেই। এরাই তোমাদের মাঝে সবচেয়ে জাহিল। সুতরাং তোমরা এ সকল মনগড়া কথা থেকে যা স্বয়ং বক্তাকেই পথভ্রষ্ট করে- সতর্ক থাক। আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, (খিলাফাতের) এ বিষয়টি কুরাইশদের মধ্যেই থাকবে, যদ্দিন তারা দ্বীনের উপর দৃঢ় থাকবে। যে কেউ তাদের বিরোধিতা করে তবে আল্লাহ্ তাকেই অধোমুখে নিপতিত করবেন।(1) (৩৫০০)
নু‘আয়ম (রহ.) …. মুহাম্মাদ ইবনু যুবায়র (রহ.) সূত্রে শুআয়ব-এর অনুসরণ করেছেন। (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৬৪০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৬৫৪)
(1) যতদিন ইসলামী হুকুমাত কুরাইশ প্রভাবিত এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল ততদিন কুরাইশরাই ছিলেন ইমারাতের হকদার। কারণ কুরাইশগণ হলেন দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি। কুরাইশ প্রভাবিত ভূখন্ডে কুরাইশদের বর্তমানে অন্য কেউ আমীর হলে তিনি সকলের নিকট গ্রহণীয় হতেন না, সেখানে কুরাইশরাই সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য। আরব ভূখন্ডে ইসলামী হুকুমাতের প্রেক্ষাপটে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এ কথা বলেছিলেন। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় সংশ্লিষ্ট এলাকার সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরাই মুসলিমদের নেতৃত্ব দিবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
অমুসলিম নারীকে উলঙ্গ করার হুমকি
নবী মুহাম্মদ একবার হযরত আলীকে একজন মুশরিক নারীর কাছে প্রেরণ করলেন, যেই নারীর কাছে একটি চিঠি ছিল। সেই নারী সেই চিঠিটির কথা অস্বীকার করলে, হযরত আলী তাকে উলঙ্গ করে তল্লাশি করার হুমকি দান করেন। এরপরে বাধ্য হয়ে সেই নারী চিঠিটি হযরত আলীকে দিয়ে দেয়। সেই চিঠিটি যত গুরুত্বপূর্ণ চিঠিই হোক না কেন, একজন নারীকে উলঙ্গ করে তল্লাশি করার হুমকি কতটা ভয়াবহ হুমকি, তা আমরা সকলেই বুঝি। তল্লাশি যদি চালাতেই হয়, আধুনিক সভ্য পৃথিবীতে নারী পুলিশ সদস্য দিয়েই যেকোন নারীকে তল্লাশি করা হয়। এমনকি, কোন বোরখা পড়া নারীকে সভ্য দেশগুলোর বিমানবন্দরে তল্লাশি চালালে সেটি একজন নারী পুলিশ সদস্যকে দিয়েই তল্লাশি চালান। যদি একইভাবে কোন মুসলিম বোরখা পড়া নারীকে ভারতের বিমানবন্দরে কোন পুরুষ নিরাপত্তাকর্মী একই হুমকি দেয়, তাহলে মুসলিমরা কি তা মেনে নেবে? তারা কই বলবেন না, তল্লাশি যদি চালাতেই হয়, তাহলে কোন নারীকে দিয়ে যেন তল্লাশি চালানো হয়? একজন পুরুষ যদি একজন মুসলিম নারীকে উলঙ্গ করে তল্লাশি করার হুমকি দেন, সেটি কতটা সভ্য আচরণ হবে? [91] –
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭৯/ অনুমতি প্রার্থনা
পরিচ্ছেদঃ ৭৯/২৩. কারো এমন পত্রের বিষয়ে স্পষ্টরূপে জানার জন্য তদন্ত করে দেখা, যাতে মুসলিমদের জন্য শংকার কারণ আছে।
৬২৫৯. ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ও যুবায়র ইবনু আওয়াম এবং আবূ মারসাদ গানাভী (রাঃ)-কে অশ্ব বের করে নির্দেশ দিলেন যে, তোমরা রওয়ানা হয়ে যাও এবং ’রওযায়ে খাখে’ গিয়ে উপস্থিত হও। সেখানে একজন মুশরিক স্ত্রীলোক পাবে। তার কাছে হাতিব ইবনু আবূ বালতার দেয়া মুশরিকদের প্রতি প্রেরিত একখানি পত্র আছে। আমরা ঠিক সেই জায়গাতেই তাকে পেয়ে গেলাম যেখানকার কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন। ঐ স্ত্রী লোকটি তার এক উটের উপর সওয়ার ছিল। আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, তোমার কাছে যে পত্রখানি আছে তা কোথায়? সে বললঃ আমার সাথে কোন পত্র নেই। তখন আমরা তার উটসহ তাকে বসালাম এবং তার সাওয়ারীর আসবাবপত্রের তল্লাশি করলাম। কিন্তু আমরা কিছুই খুঁজে পেলাম না।
আমার দু’জন সাথী বললেনঃ পত্রখানা তো পাওয়া গেল না। আমি বললামঃ আমার জানা আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনর্থক কথা বলেননি। তখন তিনি স্ত্রী লোকটিকে ধমক দিয়ে বললেনঃ তোমাকে অবশ্যই চিঠিটা বের করে দিতে হবে, নইলে আমি তোমাকে উলঙ্গ করে তল্লাশি চালাব। এরপর সে যখন আমার দৃঢ়তা লক্ষ্য করল, তখন সে বাধ্য হয়ে তার কোমরে পেঁচানো চাদরে হাত দিয়ে ঐ পত্রখানা বের করে দিল। তারপর আমরা তা নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে পৌঁছলাম।
তখন তিনি হাতিব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে হাতিব! তুমি কেন এমন কাজ করলে? তিনি বললেনঃ আমার মনে এমন কোন খারাপ ইচ্ছে নেই যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান ও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলি। আমি আমার দৃঢ় মনোভাব পরিবর্তন করিনি এবং আমি দ্বীনও বদল করিনি। এই চিঠি দ্বারা আমার নিছক উদ্দেশ্য ছিল যে, এতে মক্কাবাসীদের উপর আমার দ্বারা এমন উপকার হোক, যার ফলে আল্লাহ তা’আলা আমার পরিবার ও সম্পদ নিরাপদে রাখবেন। আর সেখানে আপনার অন্যান্য সাহাবীদের এমন লোক আছেন যাঁদের দ্বারা আল্লাহ তা’আলা তাদের পরিবার ও সম্পদের নিরাপত্তা দান করবেন।
তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হাতিব ঠিক কথাই বলেছে। সুতরাং তোমরা তাকে ভাল ব্যতীত অন্য কিছুই বলো না। রাবী বলেনঃ ’উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ) বললেন, তিনি নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং মু’মিনদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। অতএব আমাকে ছেড়ে দিন আমি তাঁর গর্দান উড়িয়ে দেই। রাবী বলেন, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে ’উমার! তোমার কি জানা নেই যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে জ্ঞাত আছেন এবং ঘোষণা করেছেন যে, তোমরা যা ইচ্ছে করতে পার। নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য জান্নাত নির্ধারিত হয়ে আছে। রাবী বলেনঃ তখন ’উমার (রাঃ) এর দু’চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগলো। তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই সবচেয়ে ভাল জানেন। [৩০০৭] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৮১৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৭১২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আলী ইবনু আবী তালিব (রাঃ)
উপসংহার
উপরে আলোচিত বিধানগুলোতে অমুসলিমের অধিকার ও মর্যাদা তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সীমিত করা হয়েছে। নিজের জন্মভূমিতে বসবাস করেও তিনি মুসলিমের সমান অবস্থান পাবেন না; তাঁর উপাসনালয় নির্মাণ, ধর্ম প্রচার, কর্তৃত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব গ্রহণ এবং আদালতে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ ধর্মীয় বিধানের অধীন থাকবে। পোশাক, সম্ভাষণ এবং পথে চলাফেরার মতো দৈনন্দিন বিষয়েও তাঁকে আলাদা ও অধস্তন অবস্থানে রাখার নির্দেশ রয়েছে। হত্যার বিচার ও রক্তপণের আলোচিত বিধানগুলোতেও মানুষের ধর্মীয় পরিচয় তাঁর প্রাপ্য বিচার ও ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে। এসব বিধান কার্যকর হলে একজন অমুসলিম সততা, দক্ষতা কিংবা সমাজের জন্য অবদান রেখেও ধর্মের কারণে আরোপিত বাধা অতিক্রম করতে পারবেন না। শরিয়াকে অমুসলিমদের সমান মর্যাদা ও অধিকারের নিশ্চয়তা হিসেবে প্রচার করার দাবি এই বিধানগুলোর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
এই বঞ্চনার প্রভাব মানুষের জীবন ও পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছায়। কোনো পরিবার নিজের বাড়িঘর ও উপাসনালয় নিরাপদ রাখতে না পারলে, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হলে কিংবা অন্যায়ের শিকার হয়ে কার্যকর বিচার না পেলে, নিজের দেশেই তার বসবাস কঠিন হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে সম্পত্তি হারানো ও দেশত্যাগের ইতিহাস এবং পাকিস্তানে সাংবিধানিক ও পেশাগত বৈষম্যের আলোচনা এই বাস্তব সমস্যাগুলো সামনে এনেছে। কোনো সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ দেশে থেকে গেছেন বলেই তাঁদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলা যায় না। তাঁদের কী শর্তে থাকতে হচ্ছে, কোন সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে এবং নিজের বিশ্বাস প্রকাশ করতে গিয়ে কী পরিণতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, সেটিই বিচার্য। ধর্ম গ্রহণের অনুমতি থাকলেও ধর্ম ত্যাগের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলে বিশ্বাসের স্বাধীনতা থাকে না। একজন মানুষ কোনো বিশ্বাসকে আর সত্য মনে না করলে প্রাণ রক্ষার জন্য সেই বিশ্বাসের অনুসারী পরিচয় ধরে রাখতে বাধ্য করা তাঁর বিবেক ও স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।
যাঁরা ইউরোপ–আমেরিকায় মুসলিমদের জন্য ধর্মীয় স্বাধীনতা, মসজিদ নির্মাণ, ধর্ম প্রচার এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে অংশগ্রহণের অধিকার দাবি করেন, তাঁদের অন্য ধর্মের মানুষের একই অধিকার স্বীকার করতে হবে। সেই স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে শরিয়া প্রতিষ্ঠার দাবি করা, অথচ শরিয়ার অধীনে অমুসলিমের একই স্বাধীনতা অস্বীকার করা স্পষ্ট দ্বিচারিতা। নিজের সম্প্রদায়ের মানুষ সংখ্যালঘু হলে ধর্মনিরপেক্ষতা চাইবেন, আর সংখ্যাগুরু হলে অন্য সম্প্রদায়ের ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্ব চাপাবেন—এই অবস্থানের ভিত্তি গোষ্ঠীগত সুবিধা ও আধিপত্য। একজন মুসলিম বিদেশে যে আচরণকে অপমান, বৈষম্য ও অধিকারহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেন, একজন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা অবিশ্বাসীর ক্ষেত্রেও সেই আচরণ একইভাবে অন্যায়। নিজের ধর্মের মানুষের জন্য পূর্ণ অধিকার দাবি করে অন্যের অধিকার কমিয়ে দেওয়ার কোনো ন্যায়সংগত ভিত্তি নেই।
মানবিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক মানুষ ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ও জন্মপরিচয় নির্বিশেষে আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচবেন। রাষ্ট্র তাঁর জীবন, সম্পত্তি, বিশ্বাসের স্বাধীনতা এবং বিচারপ্রাপ্তির অধিকার সমানভাবে রক্ষা করবে। নাগরিকের ধর্ম সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মের সঙ্গে না মিললেও এই নিশ্চয়তা বহাল থাকতে হবে; প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রকে সংখ্যাগরিষ্ঠের দাবির বিরুদ্ধেই তাঁর অধিকার কার্যকর করতে হবে। ধর্মীয়ভাবে পবিত্র ঘোষণা করলেই কোনো বৈষম্যমূলক আইন ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। সেই আইন কার অধিকার রক্ষা করছে, কার স্বাধীনতা কেড়ে নিচ্ছে এবং কাকে অধস্তন করে রাখছে, তার জবাব দিতে হবে। যে রাষ্ট্রব্যবস্থা ধর্মের কারণে মানুষের অধিকার ও মর্যাদা কমিয়ে দেয়, তাকে যতই আল্লাহর আইন বলে প্রচার করা হোক, তার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত বৈষম্য ও অবিচার ন্যায়বিচারে পরিণত হয় না। মানুষের আত্মসম্মান ও সমানাধিকার কেড়ে নেওয়া একটি বর্বর রাষ্ট্রব্যবস্থারই বৈশিষ্ট্য।
তথ্যসূত্রঃ
- ইসলামে অমানবিক দাসপ্রথা ↩︎
- ইসলামি জিহাদের লক্ষ্যঃ শিরক নিশ্চিহ্ন না হওয়া অবধি কিয়ামত পর্যন্ত আক্রমণাত্মক জিহাদ-কিতাল চালাতে হবে ↩︎
- বিনা উস্কানিতে আক্রমণঃ নবী মুহাম্মদের জিহাদ-কিতাল ও ভিন্নমতাবলম্বী দমনের উদাহরণ সমূহ ↩︎
- যুদ্ধে বেসামরিক নারী ও শিশুর ভাগ্যঃ ইসলামে গনিমতের মাল বা লুটপাটের মাল ↩︎
- সহীহ বুখারী, হাদিসঃ ২৬৫২ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিসঃ ২৫৩৩ ↩︎
- জাতিসংঘ, মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা, ১৯৪৮; অনুচ্ছেদ ২, ৭, ১৮ ও ২১ ↩︎
- গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, দ্বিতীয় ভাগ, অনুচ্ছেদ ১২ ↩︎
- গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, তৃতীয় ভাগ, অনুচ্ছেদ ২৭ ও ৪১ ↩︎
- জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকদের চিঠি, ভারত, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪, নথি: AL IND 5/2024 ↩︎
- জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ, মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ে প্রস্তাব, অনুচ্ছেদ ১৭–২০ ↩︎
- বাঙলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ, রিট আবেদন নং ৮৯৩২/২০১১, রায়: ২৩ নভেম্বর ২০১৭, অনুচ্ছেদ ১২৫—১৯৪১ থেকে ২০০১ সালের হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত ↩︎
- হিন্দু জনসংখ্যার ঐতিহাসিক শুমারিভিত্তিক সংকলন ↩︎
- বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২, জাতীয় প্রতিবেদন, প্রথম খণ্ড, সারণি ৩.২.১৫; প্রতিবেদনের সংরক্ষিত অনুলিপি ↩︎
- মো. আবদুল হাই বনাম বাঙলাদেশ সরকার ও অন্যান্য, রিট আবেদন নং ৮৯৩২/২০১১, হাইকোর্ট বিভাগ, ২৩ নভেম্বর ২০১৭, অনুচ্ছেদ ১২৩ ↩︎
- পার্থ প্রতিম ভট্টাচার্য, ওলামা লীগের অবস্থান ও হিন্দু প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের দাবি বিষয়ে প্রতিবেদন, দ্য ডেইলি স্টার, ২০ এপ্রিল ২০১৬ ↩︎
- পাকিস্তান পরিসংখ্যান ব্যুরো: পাকিস্তানের জনশুমারির ইতিহাস ও পূর্ব–পশ্চিম পাকিস্তানের পৃথক হিসাব ↩︎
- জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা: People Forced to Flee, ২০২২, দেশভাগ ও জনস্থানান্তর, পৃষ্ঠা ৭৪ ↩︎
- পাকিস্তান পরিসংখ্যান ব্যুরো: জাতীয় জনশুমারি প্রতিবেদন ২০২৩, সারণি ৪.১৩—ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যা ↩︎
- পাকিস্তানের সংবিধান, ২১ নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সংশোধিত সরকারি সংস্করণ: অনুচ্ছেদ ৪১(২) ও ৯১(৩) ↩︎
- পাকিস্তানের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন: সংখ্যালঘুদের অধিকার বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের সরকারি বিবরণ, ২৩ মে ২০২২ ↩︎
- পাকিস্তানের সংবিধান: অনুচ্ছেদ ২৬০(৩)—মুসলমান ও অমুসলিমের আইনগত সংজ্ঞা ↩︎
- পাকিস্তানের দণ্ডবিধি: ধারা ২৯৮-বি, সম্পূর্ণ ধারার বাংলা অনুবাদ ↩︎
- পাকিস্তানের দণ্ডবিধি: ধারা ২৯৮-সি ↩︎
- জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি: পাকিস্তানের দ্বিতীয় পর্যায়ক্রমিক প্রতিবেদন সম্পর্কে চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ, ২ ডিসেম্বর ২০২৪, অনুচ্ছেদ ৪৬ ও ৫৪ ↩︎
- সর্বোচ্চ ফতোয়াঃ মূর্তি ভাঙ্গার আবশ্যকতা ↩︎
- The Baburnama: Memoirs of Babur, Prince and Emperor, trans. Wheeler M. Thackston (Washington, DC: Ferrer Gallery of Art/Arthur M. Sackler Gallery, 1996), 406–07; cf. Zahiru’d-Din Muhammed Babur Padshah Ghazi, Babur-nama (Memoirs of Babur), trans. Annette Susannah Beveridge (1922; New Delhi: Oriental Books Reprint Corporation, 1979), 608–13. Beveridge notes that Babur’s destruction amounted to cutting off the heads of the idls, which were restored with plaster by the Jains in the locality. ↩︎
- Jain, Meenakshi (2019). Flight of Deities and Rebirth of Temples: Episodes from Indian History. Aryan Books International. p. 28. ISBN 978-81-7305-619-2. ↩︎
- Asian Art, chap. “History of attacks on the Buddhas” ↩︎
- “Ancient Buddhas Will Not Be Rebuilt – UNESCO”. Ipsnews.net. Archived from the original on 13 September 2011. Retrieved 9 October 2013. ↩︎
- Markos Moulitsas Zúniga (2010). American Taliban: How War, Sex, Sin, and Power Bind Jihadists and the Radical Right. Polipoint Press. p. 8. ISBN 978-1-936227-02-0.
Muslims should be proud of smashing idols.
” ↩︎ - Muslim Revivalist Movements In Northern India by Rizvi,saiyid Athar Abbas, Page 247 ↩︎
- মকতুবাত শরীফ, ২য় খণ্ড, মূলঃ গাওছে ছামদানী মহবুবে ছোবহানী এমামে রব্বানী হযরত মোজাদ্দেদে আলফেছানী, অনুবাদকঃ শাহ মোহাম্মদ মুতী আহমদ আফতাবী, প্রকাশকঃ আফতাবিয়া খানকাহ শরীফ, পৃষ্ঠা ৭০-৭৩ ↩︎
- মকতুবাত শরীফ, ২য় খণ্ড, মূলঃ গাওছে ছামদানী মহবুবে ছোবহানী এমামে রব্বানী হযরত মোজাদ্দেদে আলফেছানী, অনুবাদকঃ শাহ মোহাম্মদ মুতী আহমদ আফতাবী, প্রকাশকঃ আফতাবিয়া খানকাহ শরীফ, পৃষ্ঠা ২৩-২৪ ↩︎
- ইসলাম কি অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্বের অনুমোদন দেয়? ↩︎
- অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব প্রসঙ্গে | আল্লামা ইবনে কাসীর ↩︎
- তাফসিরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৬৬-৫৬৭ ↩︎
- শরীয়া রাষ্ট্রে অমুসলিমদের ধর্মপ্রচার – উপাসনালয় নির্মান নিষিদ্ধ ↩︎
- লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীনঃ তোমাদের ধর্ম তোমাদের, আমাদের ধর্ম আমাদের? ↩︎
- আশরাফুল হিদায়া, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৯৩-৪৯৫ ↩︎
- কাফেরদের অপমান ও লাঞ্ছিত করার জন্য অবমাননাকর জিজিয়া বা জিযিয়া ↩︎
- কোরআন, সূরা তওবা, আয়াত ২৯ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, ইসলামিয়া কুতুবখানা প্রকাশনী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৫৩ ↩︎
- আশরাফুল হিদায়া, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৭৬-৪৯২ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯১-৩০১ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬৪-৫৬৫ ↩︎
- ফাতায়ায়ে আলমগীরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৪২ ↩︎
- আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ১৪৩ ↩︎
- আহকামুল কুরআন, খায়রুন প্রকাশনী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৫-৩৫৮ ↩︎
- লা ইকরাহা ফিদ-দীনঃ ইসলামে কি আসলেই কোন জবরদস্তি নেই? ↩︎
- আল-ইতকান ফি তাওহীদ আর-রহমান, শাইখ আব্দল্লাহ আল মুনির, পৃষ্ঠা ১৪-১৭, ২৫-২৭ ↩︎
- Disbelievers are not to hold positions of authority in a Muslim state ↩︎
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৭০ ↩︎
- ইসলামে অমুসলিমের সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য ↩︎
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ১৬০২ ↩︎
- অমুসলিমদের রাস্তার কিনারায় ঠেলে লাঞ্ছিত করার ইসলামিক বিধান ↩︎
- সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১৬০৮ ↩︎
- সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯৮ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬৫-৫৬৬ ↩︎
- Giving Zakah to non-Muslims Fatwa No: 87316 ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, ১১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৫১ ↩︎
- আল-ফিকহুল মুয়াসসার, প্রয়োজনীয় শব্দার্থ সহ মূলানুগ বঙ্গানুবাদ, হযরত মাওলানা শফীকুর রহমান নদভী, ভাষান্তরঃ মাওলানা আশরাফ হালিমী, বাড কম্প্রিণ্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা ২৪৭ ↩︎
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ১৬০৫ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ২৭৮৭ ↩︎
- ইসলামে কাফেরদের উচ্ছেদ, জাতিগত নিধন বা ‘এথনিক ক্লিনজিং’ – এর ভয়ঙ্কর বিধান ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৮৩২ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫০০৪ ↩︎
- আর-রাহিকুল মাখতুম, আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা ৪৫১ ↩︎
- বাংলাদেশে প্রচলিত শির্ক বিদ‘আত ও কুসংস্কার পর্যালোচনা ২. শির্কের পরিণতি ↩︎
- বুলুগুল মারাম, হাদিসঃ ১১৬৩ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৬৯১৫ ↩︎
- সুনানে ইবনে মাজাহ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ২৬৫৮ ↩︎
- ইসলামী শরীয়তে কাফের হত্যা করলে মুসলিমের কোন মৃত্যুদণ্ড নেই ↩︎
- ফিকহে ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু, ড মুহাম্মদ রাওয়াস কালা’জী, ভাষান্তর ও সম্পাদনাঃ মুহাম্মদ খলিলুল রহমান মুমিন, আধুনিক প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ১৫২-১৫৪ ↩︎
- দরসে তাওহীদ ও কিতাল (চতুর্থ দরস) যে সকল কারণে কারো রক্তপাত হালাল হয়ে যা , মূল- শাইখ মুজাহিদ হারেস বিন গাযী আন নাযারী রহ , অনুবাদ- আব্দুল্লাহ সিরাজী, আল-আবতাল মিডিয়া প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৭-৮ ↩︎
- Killing a Muslim in punishment for killing a non-Muslim ↩︎
- সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিসঃ ২৬৪৪ ↩︎
- সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১৪১৭ ↩︎
- মুয়াত্তা মালিক, হাদিসঃ ১৬১৪ ↩︎
- ইসলামে মুরতাদ কতলঃ ধর্মত্যাগের বর্বর শাস্তি ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৩০০ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৩০১ ↩︎
- সহিহ বুখারী খণ্ড ৫ পৃষ্ঠা ২৩৬ ↩︎
- সহিহ বুখারী খণ্ড ১০ পৃষ্ঠা ২৬১ ↩︎
- মুয়াত্তা ইমাম মালিক, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০৬-৪০৭ ↩︎
- বিধিবদ্ধ ইসলামিক আইন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৭ ↩︎
- বিধিবদ্ধ ইসলামিক আইন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৬ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৬৫৪ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৭১৩৯ ↩︎
- ইসলামে কোটাঃ খিলাফতের আমীর হবে কুরাইশ বংশ থেকে ↩︎
- সহিহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৬২৫৯ ↩︎
About This Article
Genre: Source-Based Critical Analysis of Sharia, Non-Muslim Status, Secularism, and Religious Inequality
Epistemic Position: Secular Humanism, Equal Citizenship, Human Rights, Anti-Discrimination Ethics, Historical Criticism, and Source-Internal Islamic Critique
This article examines whether Islamic Sharia can provide equal citizenship, dignity, religious freedom, and legal protection to non-Muslims in a modern state.
Its scope includes secularism, equal rights, Bangladesh-India-Pakistan minority questions, Sharia and Muslim law, iconoclasm, Islamic rule in India, friendship with non-Muslims, places of worship, religious preaching, jizya, forced conversion, public office, testimony, social humiliation, zakat exclusion, residence with polytheists, food and social contact, blood-money inequality, apostasy, Quraysh leadership, and threats against non-Muslim women.
The article is written in Shongshoy's tradition of sharp, evidence-based, non-apologetic criticism. It does not treat Sharia's treatment of non-Muslims as a harmless historical technicality, cultural misunderstanding, or modernly softened coexistence model; it examines the classical doctrine as a system of religious hierarchy and state-backed discrimination.
The central argument is that a law cannot be called just or humane if it grants full dignity to Muslims while reducing non-Muslims to subordinate, restricted, taxed, excluded, or legally inferior subjects.
This article should be evaluated through source accuracy, legal consistency, equal-citizenship reasoning, minority-rights ethics, freedom of religion, human dignity, and secular democratic standards—not through religious sensitivity, apologetic expectation, inherited reverence, nostalgia for Islamic rule, or the demand that discriminatory Sharia rules be rebranded as protection.




please correct the first line — বাঙলাদেশ -> বাংলাদেশ
উপমহাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা title এর ১১নং প্যারাতে দেয়া লিঙ্কটি (“হিন্দু ক্রিকেটারের ফেইসবুক পাতায়”) এখন একটি “ডেড লিংক ” হয়ে গিয়েছে ।
please correct these
…. মো আব্দুল কাদেরের বই বাংলাদেশে প্রচলিত শির্ক বিদ‘আত ও কুসংস্কার পর্যালোচনা গ্রন্থে পরিষ্কারভাবেই বলা আছে যে, “”শিকর”” (–>শিরক) হচ্ছে হত্যাযোগ্য অপরাধ। যারা শিরক করে, তাদের রক্ত….
…সেইসাথে উল্লেখ্য, আরেকটি হাদিসে বলা হয়েছে, কোন মুসলমান কোন জিম্মি অর্থাৎ জিজিয়া কর দেয়া বা “””চিক্তিবদ্ধ””” (–>চুক্তিবদ্ধ) অমুসলিমকে হত্যা করলে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না, তবে তার জন্য দুনিয়াবি মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির কথা বলা নেই। যেখানে….