বৈদিক সাহিত্য, ধর্ম ও সমাজ (Vedic Literature, Religion and Society) – খণ্ড ৪ (শেষ): ইতিহাস, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ব্যাখ্যা ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার
ভূমিকা
কোনো মতাদর্শই চিরকাল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকতে পারে না। বৈদিক যজ্ঞসংস্কৃতি এবং বর্ণাশ্রমের একচ্ছত্র আধিপত্য যখন উত্তর ভারতের গঙ্গা উপত্যকায় নিজের শেকড় শক্ত করছিল, ঠিক তখনই ইতিহাসের প্রেক্ষাপট বদলাতে শুরু করে। লোহার ফালওয়ালা লাঙল, জঙ্গল কেটে তৈরি হওয়া নতুন কৃষিজমি এবং সমৃদ্ধ নগরকেন্দ্রগুলো প্রাচীন যাযাবর মানসিকতার ভিত্তিমূল নাড়িয়ে দিল। নতুন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে মানুষ প্রশ্ন তুলতে শুরু করল পুরোহিতদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিয়ে। এই ঐতিহাসিক টানাপোড়েন থেকেই জন্ম নিয়েছিল ভারতীয় দর্শনের সবচেয়ে সংঘাতময় ও প্রাণবন্ত অধ্যায়, যা এই চতুর্থ খণ্ডের প্রধান উপজীব্য।
যাগযজ্ঞের রক্তপাত এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছিল বৈদিক বলয়ের বাইরে থেকে। আবির্ভাব ঘটল শ্রমণ আন্দোলন (Śramaṇa movement)-এর। বুদ্ধ, মহাবীর, আজীবিক নেতা মক্খলি গোসাল কিংবা চার্বাকের বস্তুবাদী অনুসারীরা সোজাসুজি বৈদিক সাহিত্যের অলৌকিক কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বসলেন। তারা বললেন, কোনো বই আকাশ থেকে পড়েনি, যজ্ঞ করে স্বর্গ পাওয়া যায় না আর মানুষের ভাগ্য কোনো দেবতার খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর করে না। ইতিহাসের এই মোড়ে দাঁড়িয়ে বৈদিক ধর্ম তার অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। আত্মরক্ষার তাগিদেই বৈদিক ধারাকে তখন বাধ্য হয়ে নিজেকে ভাঙতে হয়েছে, পুনর্বিন্যাস করতে হয়েছে এবং যুক্তিবিদ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছে।
এই খণ্ডে আমরা দেখব কীভাবে বৈদিক সাহিত্য নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য দার্শনিক ঘরানাগুলোর সঙ্গে এক দীর্ঘ বোঝাপড়ায় লিপ্ত হলো। মীমাংসকরা যখন বেদের অপৌরুষেয়তা প্রমাণ করতে শব্দের চিরন্তনতার মতো তত্ত্ব হাজির করলেন, তখন ন্যায়-বৈশেষিক দার্শনিকরা আবার সেই কর্তৃত্বকে প্রমাণের কষ্টিপাথরে ঘষে ঈশ্বরতত্ত্বের সঙ্গে মেলাতে চাইলেন। অন্যদিকে উপনিষদের ভাবাদর্শকে আঁকড়ে ধরে গড়ে উঠল বেদান্তের বিশাল সৌধ। কেবল তর্কেই এই লড়াই শেষ হয়নি; সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করার জন্য বৈদিক দেবতাদের রূপান্তর ঘটিয়ে শিব, বিষ্ণু ও দেবীকে সামনে এনে রচনা করা হলো পুরাণ। যে ধর্ম এককালে কয়েক হাজার ব্রাহ্মণের যজ্ঞবেদিতে সীমাবদ্ধ ছিল, তা টিকে থাকার প্রয়োজনে হাজারো স্থানীয় লোকসংস্কৃতি ও লৌকিক দেবদেবীকে নিজের দেহে আত্মীকরণ করে আজকের তথাকথিত সনাতন রূপ ধারণ করল।
এই খণ্ডের লক্ষ্য হলো কোনো মতাদর্শকে খাটো বা বড় না করে তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের ইতিহাসকে উন্মোচন করা। বৈদিক সাহিত্যের উত্তরাধিকার কোনো শান্ত হ্রদ নয়, এটা এক উত্তাল নদী যেখানে মত ও ভিন্নমতের হাজারটা স্রোত এসে মিশেছে। মধ্যযুগের ভাষ্যকার থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক ভারতের হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী কিংবা আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতি – সবাই কীভাবে এই প্রাচীন পাঠকে নিজের নিজের মতো করে ব্যবহার করেছে, সেই ক্ষমতার রাজনীতিকে বোঝাই এই খণ্ডের মূল অন্বেষণ।
ঐতিহাসিক কালপরিক্রমা, নগর বিপ্লব ও ভিন্নমতের সংঘাত (Historical Chronology, Urban Revolution, and the Contest of Dissent): সময়কাল, বস্তুগত রূপান্তর ও প্রতিদ্বন্দ্বী দর্শন
বৈদিক যুগের কালানুক্রম ও ঐতিহাসিক পরিসর (Chronology and Historical Span of the Vedic Age): প্রত্নতত্ত্ব, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পাঠভিত্তিক পর্যায়বিন্যাস
কালনির্ধারণের আদি বিতর্ক: ম্যাক্স মুলার থেকে আধুনিক পাঠসমালোচনা (Early Debates on Chronology: From Max Müller to Modern Textual Criticism)
ভারতবর্ষের ইতিহাসের কালপঞ্জি নির্মাণে বৈদিক যুগের সময়সীমা নির্ধারণ এক শতাব্দী প্রাচীন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। উনিশ শতকে যখন ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদ ও ভাষাতাত্ত্বিকেরা বৈদিক সাহিত্য পাঠোদ্ধারে মনোনিবেশ করেন, তখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় ধাঁধা ছিল এই বিপুল সাহিত্য ঠিক কোন সময়ে রচিত হয়েছিল। এই কালনির্ধারণের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক চেষ্টা করেছিলেন জার্মান ভারততাত্ত্বিক ম্যাক্স মুলার। তিনি ১৮৫৯ সালে বৈদিক সাহিত্যকে চারটি সাহিত্যিক স্তরে বিভক্ত করেন: ছন্দ যুগ, মন্ত্র যুগ, ব্রাহ্মণ যুগ এবং সূত্র যুগ। গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাবকে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে স্থাপন করে এবং প্রতিটি সাহিত্যিক স্তরের বিকাশের জন্য আনুমানিক দুইশত বছর সময় বরাদ্দ করে তিনি প্রস্তাব করেছিলেন যে ঋগ্বেদের সূচনা হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে ১০০০ অব্দের মধ্যে।
তবে ম্যাক্স মুলার নিজেই তার পরবর্তী লেখায় অত্যন্ত সততার সাথে স্বীকার করেছিলেন যে তার দেওয়া এই সময়রেখা ছিল নিতান্তই এক অনুমানভিত্তিক পরিকাঠামো। তিনি লিখেছিলেন যে বৈদিক স্তোত্রগুলো খ্রিস্টপূর্ব ১০০০, ১৫০০ নাকি ২০০০ অব্দে রচিত হয়েছিল, পার্থিব কোনো যুক্তি দিয়ে তা নিশ্চিতভাবে নিরূপণ করা অসম্ভব। তবুও দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরবর্তী বহু দশক ধরে এই আনুমানিক কালপঞ্জিকেই পশ্চিমা ঐতিহাসিকেরা এক অলঙ্ঘনীয় সত্য বলে ধরে নিয়েছিলেন। ভারতীয় প্রথাগত ঐতিহ্যে যেখানে বেদকে অনাদি এবং কলিযুগের সূচনা অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ৩১০২ অব্দের পূর্ববর্তী ঘটনা হিসেবে গণ্য করা হতো, সেখানে মুলারের এই সংক্ষিপ্ত সময়কাল প্রবল অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল।
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব এবং ঐতিহাসিক পাঠসমালোচনা এই বিতর্কে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। পণ্ডিতেরা লক্ষ্য করলেন যে বৈদিক ভাষার বিবর্তন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকে উত্তর সিরিয়ার মিতান্নি রাজ্যের রাজা শত্রুয়াজ এবং হিট্টাইট সম্রাট সুপ্পিলুলিউমার মধ্যকার একটি বিখ্যাত শান্তিচুক্তির কীলকাকার ফলকে বৈদিক দেবতাদের নাম আবিষ্কৃত হয়। সেখানে মিত্র, বরুণ, ইন্দ্র এবং নাসত্যের নাম প্রায় হুবহু বৈদিক উচ্চারণে খোদাই করা ছিল। এই শিলালিপিটি আন্তর্জাতিকভাবে খ্রিস্টপূর্ব ১৩৮০ অব্দের বলে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত। এই আবিষ্কার দেখায় যে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতক নাগাদ ইন্দো-আর্য ভাষার দেবতাদের ধারণা একটি সুনির্দিষ্ট রূপ লাভ করেছিল, যা ঋগ্বেদের রচনাকালের এক শক্ত বাহ্যিক সময়সীমা উপহার দেয়।
প্রত্নতত্ত্ববিদ ব্রিজেট অলচিন (Bridget Allchin) দক্ষিণ এশিয়ার প্রাক-ইতিহাসের কালানুক্রম পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে বৈদিক যুগের সময়রেখাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট বছরের ফ্রেমে বাঁধা অসম্ভব (Allchin & Allchin, 1982)। ভাষা একটি বহমান নদী, যা শতাব্দী ধরে বিবর্তিত হয়। অন্যদিকে প্রত্নতাত্ত্বিক জর্জ এফ. ডেলস (George F. Dales) সিন্ধু সভ্যতার সমাপ্তি এবং পরবর্তী সংস্কৃতির উত্থানের মধ্যকার কৃত্রিম কালগত শূন্যতাকে নাকচ করে দেখিয়েছেন যে এই রূপান্তরটি ছিল ধীর ও ধারাবাহিক (Dales, 1964)। আধুনিক ঐতিহাসিকেরা ভাষাতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের যৌথ মূল্যায়নে প্রায় একমত হয়েছেন যে ঋগ্বেদের প্রাচীন স্তোত্রগুলোর রচনাকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ১২০০ অব্দ, এবং পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যের বিস্তার ঘটেছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১১০০ থেকে ৫০০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে।
জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্য ও প্রাচীনত্বের দাবি: তিলক, জ্যাকোবি ও আধুনিক সংশয় (Astronomical Evidence and Claims of Antiquity: Tilak, Jacobi, and Modern Skepticism)
বৈদিক সাহিত্যের বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভাষাতত্ত্বের পাশাপাশি আরেকটি অত্যন্ত আলোচিত পদ্ধতি ছিল বৈদিক পাঠে ছড়িয়ে থাকা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণগুলোর বিশ্লেষণ। উনিশ শতকের শেষভাগে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতা ও পণ্ডিত বাল গঙ্গাধর তিলক (Bal Gangadhar Tilak) তার দ্য ওরিয়ন (The Orion) গ্রন্থে এবং জার্মান পণ্ডিত হারমান জ্যাকোবি (Hermann Jacobi) সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বিষুব সংক্রান্ত নক্ষত্র গণনা ব্যবহার করে বৈদিক কাল নির্ধারণের এক বৈপ্লবিক প্রস্তাব হাজির করেন। তারা দাবি করেন যে ঋগ্বেদ ও ব্রাহ্মণ সাহিত্যের বহু স্থানে বিষুব বা অয়নান্তের এমন সব বিবরণ রয়েছে, যা পৃথিবীর অক্ষীয় ঘূর্ণন বা অয়নচলনের নিয়মে কেবল হাজার হাজার বছর পূর্বেই ঘটা সম্ভব ছিল।
তিলক ও জ্যাকোবির যুক্তি ছিল, ঋগ্বেদের কিছু স্তোত্রে মৃগশিরা বা ওরিয়ন নক্ষত্রমণ্ডলে মহাবিষুব ঘটার ইঙ্গিত রয়েছে, যা মহাজাগতিক গণনার হিসেবে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০০ থেকে ৪০০০ অব্দের দিকে নির্দেশ করে। একইভাবে শতপথ ব্রাহ্মণে কৃত্তিকা বা প্লেইয়াডেস নক্ষত্রের ঠিক পূর্ব দিগন্তে উদিত হওয়ার এবং কখনো স্থানচ্যুত না হওয়ার যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা নাকি নির্দেশ করে খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ অব্দের আকাশকে। এই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবের ওপর ভিত্তি করে একদল গবেষক বৈদিক সাহিত্যকে প্রায় হরপ্পা সভ্যতার সমসাময়িক বা তার চেয়েও প্রাচীন এক সভ্যতার ফসল বলে দাবি করতে শুরু করেন। এই মতবাদ জাতীয়তাবাদী মহলে বিপুল উৎসাহ তৈরি করেছিল, কারণ তা ভারতীয় সনাতন ঐতিহ্যের প্রাচীনত্বকে মিশরের পিরামিড বা মেসোপটেমিয়ার চেয়েও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
তবে আধুনিক পেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং মূলধারার ঐতিহাসিকেরা এই ধরণের আকাশচুম্বী দাবির ক্ষেত্রে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। প্রথমত, বৈদিক স্তোত্রগুলো কোনো আধুনিক গাণিতিক জ্যোতির্বিদ্যার পাঠ্যপুস্তক ছিল না; তা ছিল কাব্যিক উপমা ও রূপকে ঠাসা ধর্মীয় প্রার্থনা। কবিরা যখন কোনো নক্ষত্রের বন্দনা করতেন, তখন তা নিখুঁত কোনো গাণিতিক মানমন্দিরের পাঠ ছিল না। দ্বিতীয়ত, প্রাচীন ভারতে নক্ষত্রের সীমানা ঠিক আধুনিক ডিগ্রির মাপে স্থির করা ছিল না; ফলে চোখের দেখায় খালি আকাশের রূপকে নিয়ে আধুনিক টেলিস্কোপিক সমীকরণ মেলানো এক ধরণের কালবৈষম্যের জন্ম দেয়।
প্রত্নতত্ত্ববিদ এস. আর. রাও (S. R. Rao) লোথাল এবং প্রাচীন সমুদ্রবাণিজ্যের কালপঞ্জি নিয়ে গবেষণার প্রেক্ষাপটে দেখিয়েছেন যে নিছক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক রূপকের ওপর ভর করে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক স্তরের বয়স নির্ধারণ করা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ঝুঁকিপূর্ণ (Rao, 1973)। ভারততাত্ত্বিক গ্রিগরি এল. পোশেল (Gregory L. Possehl) হরপ্পা ও বৈদিক সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্কের পর্যালোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে বৈদিক সাহিত্যের কোনো বর্ণনাই রেডিওকার্বন ডেটিং বা বস্তুগত খননকার্যের বাস্তব ভিত্তিকে ডিঙিয়ে অত গভীরে যেতে পারে না (Possehl, 2002)। ফলে আধুনিক বিজ্ঞানের কাছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের এই অতি-প্রাচীন দাবিগুলো একটি চিত্তাকর্ষক অ্যাকাডেমিক বিতর্ক হিসেবে টিকে থাকলেও, ঐতিহাসিক সময়রেখা নির্ধারণে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন এবং বস্তুগত সংস্কৃতির প্রমাণকেই চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কৃতির স্তর ও বৈদিক সাহিত্য: ওসিপি, পিজিডব্লিউ এবং এনবিপিডব্লিউ (Archaeological Strata and Vedic Literature: OCP, PGW, and NBPW)
বৈদিক সাহিত্যের পাঠ্যভিত্তিক বিবরণগুলোকে যখন মাটির নিচে প্রোথিত বাস্তব সংস্কৃতির সাথে মেলানোর কাজ শুরু হলো, তখন ভারতীয় প্রত্নতত্ত্বে বেশ কয়েকটি স্বতন্ত্র মাটির পাত্রের সংস্কৃতির আত্মপ্রকাশ ঘটল। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিকেরা উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় মাটি খুঁড়ে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট স্তর আবিষ্কার করেন, যা বৈদিক সাহিত্যের কালানুক্রমের সাথে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। এই স্তরবিন্যাস মূলত তিনটি প্রধান মৃৎপাত্রের সংস্কৃতির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে: গেরুয়া রঙের মৃৎপাত্র, চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্র এবং উত্তুরে কালো মসৃণ মৃৎপাত্র।
প্রথম স্তরটি হলো গেরুয়া রঙের মৃৎপাত্র (Ochre Coloured Pottery বা OCP) সংস্কৃতি, যার সাথে জড়িয়ে রয়েছে তামার তৈরি বিভিন্ন অস্ত্রের ভাণ্ডার বা কপার হোর্ডস। গঙ্গা-যমুনা দোয়াবের উত্তরাঞ্চলে এই সংস্কৃতির কালসীমা আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫০০ অব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। অনেক গবেষক মনে করেন যে এটি ছিল সিন্ধু সভ্যতার অবক্ষয়ের পরবর্তী এক স্থানীয় গ্রামীণ রূপান্তর, যার সাথে বৈদিক আর্যদের আদি তরঙ্গের সংমিশ্রণ ঘটে থাকতে পারে। তবে এই সংস্কৃতির মানুষেরা কোনো ঘোড়া বা উন্নত চাকার রথ ব্যবহার করত কি না, সেই বিষয়ে অকাট্য প্রমাণের অভাব রয়েছে।
সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট সংযোগটি তৈরি হয়েছে চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্র (Painted Grey Ware বা PGW) সংস্কৃতির সাথে। উচ্চমানের সূক্ষ্ম মাটির তৈরি এই ছাইরঙা পাত্রগুলোর গায়ে কালো রঙ দিয়ে সুন্দর জ্যামিতিক নকশা আঁকা থাকত। এই সংস্কৃতির ভৌগোলিক বিস্তার ছিল পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং পশ্চিম উত্তর প্রদেশের সেই সমস্ত এলাকায়, যা পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যে কুরু ও পাঞ্চাল জনপদ নামে বর্ণিত হয়েছে। হস্তিনাপুর, অত্রঞ্জিখেরা, কুরুক্ষেত্র, বৈরাট এবং অহিক্ছত্রের মতো মহাভারতের সাথে যুক্ত স্থানগুলোতে পিজিডব্লিউ সংস্কৃতির ব্যাপক উপস্থিতি মিলেছে। এই সংস্কৃতির সময়কাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে ৬০০ অব্দ পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে, যা হুবহু পরবর্তী বৈদিক সাহিত্য ও ব্রাহ্মণ যুগের সময়কালের সাথে মিলে যায়।
প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ব্রজ বাসি লাল (B. B. Lal) হস্তিনাপুর খননকার্যের ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে প্রথম দেখান যে পিজিডব্লিউ সংস্কৃতির স্তরটি কীভাবে পরবর্তী বৈদিক সমাজের বস্তুগত প্রমাণ হিসেবে কাজ করে (Lal, 1955)। অন্যদিকে প্রত্নতত্ত্ববিদ আর. সি. গৌর (R. C. Gaur) অত্রঞ্জিখেরার গভীর খননকার্যের স্তরবিন্যাস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে গেরুয়া মৃৎপাত্র থেকে চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্র এবং সবশেষে চকচকে উত্তুরে কালো মসৃণ মৃৎপাত্র (Northern Black Polished Ware বা NBPW)-এর দিকে বিবর্তন ঘটেছিল (Gaur, 1983)। এই শেষ স্তরটি, যার সময়কাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ থেকে ২০০ অব্দ, তা নির্দেশ করে বৈদিক যুগের সমাপ্তি এবং দ্বিতীয় নগরায়ণের সূচনালগ্নকে। মাটির পাত্রের এই বৈজ্ঞানিক স্তরবিন্যাস প্রমাণ করে যে বৈদিক সাহিত্য কোনো কল্পিত বায়বীয় কাহিনী নয়, বরং মাটির গভীরে তার বাস্তব বস্তুগত শিকড় প্রোথিত ছিল।
আদি বৈদিক ও পরবর্তী বৈদিক যুগ: ভৌগোলিক বিবর্তন ও সময়রেখা (Early Vedic and Later Vedic Eras: Geographical Evolution and Timeline)
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমগ্র বৈদিক যুগকে কোনো একটি অখণ্ড সময়ে আটকে রাখা যায় না। পাঠের অভ্যন্তরীণ প্রমাণ এবং জীবনযাত্রার রূপান্তর বিশ্লেষণ করে ঐতিহাসিকেরা একে দুটি স্পষ্ট ও প্রধান পর্বে ভাগ করেছেন: আদি বৈদিক যুগ (Early Vedic Period) এবং পরবর্তী বৈদিক যুগ (Later Vedic Period)। এই দুই যুগের মধ্যে কেবল সময়েরই ব্যবধান ছিল না; বদলে গিয়েছিল ভূগোল, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সামগ্রিক মানচিত্র।
আদি বৈদিক পর্বের সময়সীমা ধরা হয় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ১০০০ অব্দ পর্যন্ত। এই যুগের একমাত্র প্রামাণ্য সাহিত্যিক দলিল হলো ঋগ্বেদ সংহিতার প্রাচীন পারিবারিক মণ্ডলগুলো। এই পর্বের মানুষের ভৌগোলিক কেন্দ্রভূমি ছিল উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং পাঞ্জাবের নদীবিধৌত অঞ্চল, যাকে ঋগ্বেদে বলা হয়েছে সপ্তসিন্ধু (Saptasindhu)। সেখানে সিন্ধু নদ এবং সরস্বতী নদী ছিল তাদের জীবনের মূল ভিত্তি। গঙ্গা ও যমুনার নাম ঋগ্বেদের প্রাচীন অংশে নিতান্তই অপ্রধান হিসেবে মাত্র একবার বা দুবার এসেছে। এই যুগে সমাজ ছিল মূলত পশুপালক, যেখানে গরুই ছিল সম্পদের মাপকাঠি। কোনো স্থায়ী জমিদারি ব্যবস্থা ছিল না, রাজা ছিলেন যাযাবর দলের প্রধান এবং সামাজিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো সভা (Sabhā) ও সমিতি (Samiti)-র মতো গণতান্ত্রিক অধিবেশনে।
এর বিপরীতে পরবর্তী বৈদিক পর্বের বিস্তার ঘটেছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ থেকে ৫০০ অব্দ পর্যন্ত। এই সময়ে রচিত হয়েছিল সামবেদ, যজুর্বেদ ও অথর্ববেদের সংহিতা, সুবিশাল ব্রাহ্মণ গ্রন্থাবলি, আরণ্যক এবং প্রাথমিক উপনিষদগুলো। এই পর্বের ভূগোল পাঞ্জাব থেকে দ্রুত পূর্ব দিকে সরে গিয়ে গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়। কুরু ও পাঞ্চাল হয়ে ওঠে বৈদিক সংস্কৃতির মূল দুর্গ, এবং ধীরে ধীরে তার প্রভাব কোশল ও বিদেহ অর্থাৎ বিহারের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এই যুগের মানুষ আর যাযাবর পশুপালক ছিল না; তারা জঙ্গল কেটে স্থায়ী কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল এবং ধান ও যবের ব্যাপক চাষ শুরু করেছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিক সুরজ ভান (Suraj Bhan) শতদ্রু ও যমুনা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে বসতি বিন্যাসের পরিবর্তন পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে পশুপালক মানুষ ধীরে ধীরে পূর্বের সমভূমির দিকে অভিবাসন করেছিল (Bhan, 1975)। নৃবিজ্ঞানী জিম জি. শ্যাফার (Jim G. Shaffer) প্রাচীন দক্ষিণ এশিয়ার অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক রূপান্তর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে এই ভৌগোলিক বিস্তার কোনো আকস্মিক বহিরাগত ধাক্কা ছিল না, বরং তা ছিল স্থানীয় সমাজগুলোর পারস্পরিক মিশ্রণ ও অভিযোজনের এক দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া (Shaffer, 1992)। পরবর্তী বৈদিক যুগে এসে যাগযজ্ঞগুলো পারিবারিক পরিমণ্ডল ছাড়িয়ে রাজসূয় ও অশ্বমেধের মতো বিশাল রাজকীয় আচারে রূপ নিয়েছিল। ফলে আদি বৈদিক যুগের সহজ-সরল জীবন থেকে পরবর্তী বৈদিক যুগের জটিল স্তরবিন্যাসযুক্ত সমাজের এই রূপান্তর ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি।
লৌহযুগীয় রূপান্তর ও কার্বন ডেটিং: বৈজ্ঞানিক কালপঞ্জির প্রতিষ্ঠা (Iron Age Transition and Carbon Dating: Establishing a Scientific Chronology)
বৈদিক সাহিত্যের কালপঞ্জি নির্ধারণে বিশ শতকের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ছিল তেজস্ক্রিয় কার্বন পরমাণুর ক্ষয় পরিমাপ বা কার্বন-১৪ ডেটিং (Radiocarbon Dating) পদ্ধতির সফল প্রয়োগ। প্রাচীনকালের হাড়, পোড়া কাঠ বা কয়লার অবশিষ্টাংশ ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার মাধ্যমে এখন কোনো অনুমানের আশ্রয় ছাড়াই নির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক স্তরের পরম বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। এই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সাথে যুক্ত হয়েছিল ভারতবর্ষে লোহার আবির্ভাবের সময়কাল সংক্রান্ত গবেষণা, যা বৈদিক ইতিহাসের পর্যায়বিন্যাসকে প্রায় নিখুঁত এক ক্যালেন্ডারে রূপ দিয়েছে।
ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে ঋগ্বেদের আদি স্তরে ধাতুর সাধারণ নাম হিসেবে ‘অয়স’ (‘Ayas’) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। অধিকাংশ গবেষকের মতে এই অয়স ছিল তামা বা ব্রোঞ্জ, কারণ সেখানে লোহা ব্যবহারের কোনো নির্দিষ্ট লক্ষণ নেই। কিন্তু পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যে – বিশেষ করে অথর্ববেদ এবং বাজসনেয়ী সংহিতায় – ধাতুবিদ্যার এক সুস্পষ্ট বিভাজন লক্ষ্য করা যায়। সেখানে তামাকে বলা হয়েছে ‘লোহিত অয়স’ (‘Lohita Ayas’) বা লাল ধাতু, এবং লোহাকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘শ্যাম অয়স’ (‘Śyāma Ayas’) বা কৃষ্ণ অয়স অর্থাৎ কালো ধাতু হিসেবে। এই ভাষাগত পরিবর্তনটি প্রমাণ করে যে পরবর্তী বৈদিক যুগের সূচনা হয়েছিল লোহার ব্যাপক ব্যবহারের হাত ধরে।
ভারতের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে প্রাপ্ত লোহার প্রাচীনতম নমুনাগুলোর কার্বন ডেটিং এই পাঠ্যভিত্তিক প্রমাণকে অভ্রান্তভাবে সমর্থন করেছে। রাজস্থানের নোহ, উত্তর প্রদেশের অত্রঞ্জিখেরা এবং কর্ণাটকের হাল্লুর থেকে পাওয়া লোহার অস্ত্র ও সরঞ্জামের রেডিওকার্বন পরীক্ষা দেখিয়েছে যে ভারতে লোহার ব্যবহারের সূচনা হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০ থেকে ১০০০ অব্দের মাঝামাঝি সময়ে। অত্রঞ্জিখেরার পিজিডব্লিউ স্তর থেকে উদ্ধার করা লোহার তীরের ফলা ও বর্শা প্রমাণ করে যে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের শুরুতে গঙ্গা উপত্যকায় লোহার প্রযুক্তি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
ধাতুবিদ্যার প্রত্নতাত্ত্বিক এন. আর. ব্যানার্জি (N. R. Banerjee) ভারতে লৌহযুগের সূচনা নিয়ে তার বিখ্যাত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে লোহার ব্যবহার কীভাবে পরবর্তী বৈদিক সমাজকে এক নতুন সামরিক ও কৃষিভিত্তিক স্থায়িত্ব এনে দিয়েছিল (Banerjee, 1965)। শারীরিক নৃবিজ্ঞানী কেনেথ এ. আর. কেনেডি (Kenneth A. R. Kennedy) প্রাচীন মানব কঙ্কালের জৈবিক বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে এই সময়ে বাইরে থেকে কোনো বিশাল জনগোষ্ঠীর সামরিক আক্রমণ ঘটে ভারতীয় জনসংখ্যাকে রাতারাতি বদলে দেয়নি (Kennedy, 2000)। কঙ্কালের শারীরিক গঠনে এক গভীর ধারাবাহিকতা বিদ্যমান ছিল। বিজ্ঞানসম্মত এই উপাত্তগুলো প্রমাণ করে দেয় যে বৈদিক যুগের কালপঞ্জি কোনো পৌরাণিক অসীমতায় ভাসমান নয়; তা খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়ে প্রথম সহস্রাব্দের মধ্যভাগ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার বছরের এক সুনির্দিষ্ট ব্রোঞ্জ ও লৌহযুগীয় রূপান্তরের গল্প।
ঐতিহাসিক পরিসর ও যুগের সমাপ্তি: মহাজনপদ এবং প্রাক-মৌর্য রূপরেখা (Historical Span and the End of an Era: Mahājanapadas and the Pre-Mauryan Horizon)
যেকোনো ঐতিহাসিক যুগের যেমন একটি সূচনা থাকে, তেমনি থাকে একটি স্বাভাবিক সমাপ্তি। বৈদিক যুগের পরিসর ঠিক কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছিল এবং আধুনিক ঐতিহাসিকেরা কোন সীমানাকে এই যুগের অন্তিম বিন্দু বলে চিহ্নিত করেন – তা বোঝা অত্যন্ত জরুরি। ঐতিহাসিকদের সাধারণ ঐকমত্য অনুযায়ী, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ থেকে পঞ্চম শতক নাগাদ বৈদিক যুগের শাস্ত্রীয় রূপটির সমাপ্তি ঘটে এবং ভারত প্রবেশ করে এক নতুন ঐতিহাসিক অধ্যায়ে, যাকে বলা হয় প্রাক-মৌর্য বা মহাজনপদ যুগ।
এই সমাপ্তির পেছনে কয়েকটি স্পষ্ট ঐতিহাসিক মাইলফলক কাজ করেছিল। প্রথমত, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে মগধ ও কোশলের মতো কেন্দ্রীভূত রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উত্থান বৈদিক যাযাবর ও আদিম জনপদভিত্তিক রাজনীতিকে ধ্বংস করে দেয়। দ্বিতীয়ত, মুদ্রার প্রচলন এবং নতুন নগর সংস্কৃতির বিকাশ বৈদিক গ্রামীণ অর্থনীতিকে পেছনের সারিতে ঠেলে দেয়। তৃতীয়ত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, গৌতম বুদ্ধ ও বর্ধমান মহাবীরের মতো ঐতিহাসিক চরিত্রদের আবির্ভাব। বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্যের ত্রিপিটক এবং আগম গ্রন্থের কালানুক্রম ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। যেহেতু এই শ্রমণ সাহিত্যগুলো বৈদিক যাগযজ্ঞ ও বেদের কর্তৃত্বকে সরাসরি অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছিল, তাই এদের বিকাশকালটি বৈদিক ভাবাদর্শের একক আধিপত্যের চূড়ান্ত সমাপ্তি নির্দেশ করে।
সাহিত্যিক স্তরেও এই রূপান্তর স্পষ্ট ধরা পড়ে। উপনিষদের আত্মজিজ্ঞাসা যখন চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছায়, তখন রচিত হতে শুরু করে সংক্ষেপিত সূত্রসাহিত্য (Sūtra Literature) এবং ছয়টি বেদাঙ্গ (Vedāṅga)। পাণিনির বিখ্যাত সংস্কৃত ব্যাকরণ অষ্টাধ্যায়ী (Aṣṭādhyāyī) আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম বা চতুর্থ শতকে রচিত হয়েছিল। পাণিনির এই ব্যাকরণের মাধ্যমেই প্রাচীন প্রবাহমান বৈদিক ভাষা তার রূপ পরিবর্তন করে একটি অনড়, বিধিবদ্ধ ও শাস্ত্রীয় সংস্কৃত ভাষায় রূপান্তরিত হয়। বৈদিক ছন্দোবদ্ধ ভাষার সেই প্রাচীন প্রাণবন্ত যুগ এখানেই শেষ হয়ে যায় এবং শুরু হয় ধ্রুপদী সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষার নতুন অধ্যায়।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ গ্রিগরি এল. পোশেল (Gregory L. Possehl) প্রাচীন দক্ষিণ এশিয়ার এই কালপর্বকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে বৈদিক যুগ কোনো বিচ্ছিন্ন অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ ছিল না, বরং তা ছিল ব্রোঞ্জ যুগের হরপ্পা সভ্যতা এবং পরবর্তী ঐতিহাসিক মৌর্য সাম্রাজ্যের মধ্যকার এক অপরিহার্য সাংস্কৃতিক সেতু (Possehl, 2002)। আর প্রত্নতত্ত্ববিদ ব্রজ বাসি লাল (B. B. Lal) প্রমাণ করেছেন যে মাটির স্তরে পিজিডব্লিউ সংস্কৃতির ধীরে ধীরে এনবিপিডব্লিউ সংস্কৃতিতে মিলিয়ে যাওয়া আসলে বৈদিক যুগের ধীরে ধীরে প্রাক-মৌর্য যুগে বিলীন হওয়ারই বস্তুগত প্রতিচ্ছবি (Lal, 1955)। সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারতবর্ষের ইতিহাসে বৈদিক যুগের সময়কাল ছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ৫০০ অব্দ – অর্থাৎ প্রায় এক হাজার বছরের এক মহাকাব্যিক পরিক্রমা। এই দীর্ঘ সহস্রাব্দে ভারত এক পশুপালক, অনুলিখিত ও উপজাতীয় সমাজব্যবস্থা থেকে যাত্রা শুরু করে লোহার ব্যবহার, কৃষি বিপ্লব, বর্ণাশ্রমের জটিল বিন্যাস এবং গভীর দার্শনিক চিন্তার মধ্য দিয়ে এক পরিপক্ব ঐতিহাসিক সভ্যতার দ্বারে এসে উপনীত হয়েছিল।
কালানুক্রম ও বৈদিক সাহিত্যবিন্যাস (Chronology and the Strata of Vedic Literature): ঐতিহাসিক পর্যায় ও পাঠের বিবর্তন
ঋগ্বেদের পারিবারিক মণ্ডল ও আদি ব্রোঞ্জযুগীয় প্রেক্ষাপট (Family Books of the Ṛgveda and the Early Bronze Age Horizon)
বৈদিক সাহিত্যের বিশাল সংগ্রহ কোনো একক লেখকের সৃষ্টি নয়, কোনো একক শতাব্দীতেও এর জন্ম হয়নি। এটি প্রায় এক হাজার বছর ধরে প্রবাহিত হওয়া এক ঐতিহাসিক নদীর মতো, যার প্রতিটি স্তরে তৎকালীন সমাজের রাজনীতি, ভূগোল ও জীবনযাত্রার ছাপ স্পষ্টভাবে মুদ্রিত রয়েছে। এই সাহিত্যের প্রাচীনতম এবং মৌলিক স্তরটি হলো ঋগ্বেদ সংহিতা, বিশেষ করে এর দ্বিতীয় থেকে সপ্তম মণ্ডল। পাঠসমালোচনার পরিভাষায় এই অংশগুলোকে বলা হয় পারিবারিক মণ্ডল (Family Books)। কারণ এই মণ্ডলগুলো নির্দিষ্ট কিছু প্রাচীন ঋষিবংশ – যেমন গৃৎসমদ, বিশ্বামিত্র, বামদেব, অত্রি, ভরদ্বাজ এবং বশিষ্ঠদের পারিবারিক শাখায় মুখে মুখে রচিত এবং সংরক্ষিত হয়েছিল।
কালানুক্রমিক বিচারে এই পারিবারিক মণ্ডলগুলোর রচনাকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ১২০০ অব্দের মধ্যে। এই সময়কালটি দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত ও পাঞ্জাব অঞ্চলের ব্রোঞ্জ যুগের শেষ পর্ব এবং লোহার ব্যবহারের পূর্ববর্তী পর্যায়কে নির্দেশ করে। এই পাঠ্যস্তরের ভূগোল সম্পূর্ণভাবে সপ্তসিন্ধু (Saptasindhu) অঞ্চল অর্থাৎ সিন্ধু নদ, তার পাঁচটি উপনদী এবং তৎকালীন পবিত্র সরস্বতী নদীর অববাহিকায় সীমাবদ্ধ ছিল। গাঙ্গেয় সমভূমির কোনো সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক বিবরণ এই অংশে পাওয়া যায় না। সমাজ ছিল মূলত যাযাবর ও আধা-পশুপালক, যেখানে গরুই ছিল সমস্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি।
এই আদিম সামাজিক বাস্তবতা ঋগ্বেদের ভাষায় ও ছন্দে নিখুঁতভাবে ধরা পড়েছে। এখানকার বৈদিক সংস্কৃত ছিল অত্যন্ত প্রাচীন, ব্যাকরণগত রূপের বৈচিত্র্যে ভরপুর এবং স্বরের ওঠানামায় প্রাণবন্ত। কবিরা যখন ইন্দ্রের স্তব করতেন, তখন তারা পার্থিব নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করতেন – শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়, বলিষ্ঠ অশ্ব এবং শত শত গাভী লাভ করাই ছিল তাদের প্রার্থনার মূল বিষয়। যুদ্ধকে সংজ্ঞায়িত করা হতো ‘গবিষ্টি’ (‘Gaviṣṭi’) বা গাভীর অন্বেষণ হিসেবে। কোনো স্থায়ী জমিদারি, রাজপ্রাসাদ বা বিশালাকার পাথুরে স্থাপত্যের উল্লেখ এই স্তরে নেই। যাযাবর গোষ্ঠীর প্রধান ছিলেন রাজন, কিন্তু তার ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং তা নিয়ন্ত্রিত হতো বিদথ (Vidatha), সভা (Sabhā) ও সমিতি (Samiti)-র মতো যৌথ উপজাতীয় পরিষদের মাধ্যমে।
ভারততত্ত্ববিদ কার্ল ফ্রিডরিশ গেল্ডনার (Karl Friedrich Geldner) ঋগ্বেদের প্রামাণ্য অনুবাদ ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই পারিবারিক মণ্ডলগুলোর ভাষা পরবর্তী বৈদিক পাঠ্যের চেয়ে অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাকৃতিক রূপকে ঋদ্ধ ছিল (Geldner, 1951)। একই সাথে প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যের ইতিহাস গবেষক রুডলফ ফন রথ (Rudolf von Roth) উন্মোচন করেছিলেন যে ঋগ্বেদের এই আদি স্তরে কোনো জন্মভিত্তিক জাতিভেদের অস্তিত্ব ছিল না (Roth, 1846)। দেবতারা ছিলেন মূলত প্রকৃতির দৃশ্যমান শক্তির রূপক – যেমন অগ্নি, ইন্দ্র, বরুণ এবং সোম। ফলে পারিবারিক মণ্ডলগুলোর পাঠ এবং সমকালীন ব্রোঞ্জযুগীয় পশুপালক সমাজ পরস্পরকে সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।
দশম মণ্ডল ও রূপান্তরকালীন সমাজ: যাযাবর পশুপালন থেকে কৃষিভিত্তিক স্থায়িত্বে (The Tenth Maṇḍala and Society in Transition: From Pastoral Nomadism to Agrarian Stability)
ঋগ্বেদের দশটি মণ্ডলের মধ্য দিয়ে যখন আমরা প্রথম থেকে শেষ দিকে অগ্রসর হই, তখন হঠাৎ করেই দশম মণ্ডলে এসে ভাষা, ভাবাদর্শ এবং সমাজচিত্রের এক নাটকীয় পরিবর্তন চোখে পড়ে। আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিকেরা একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে দশম মণ্ডলটি (এবং প্রথম মণ্ডলের কিছু অংশ) ঋগ্বেদের সবচেয়ে আধুনিক বা নবীনতম স্তর। এর রচনাকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে ১০০০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়। এটি ছিল এমন এক সন্ধিক্ষণ যখন বৈদিক মানুষেরা পাঞ্জাবের উন্মুক্ত প্রান্তর ছেড়ে ধীরে ধীরে যমুনা ও গঙ্গার উর্বর দোয়াব অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেছিল।
দশম মণ্ডলের ভাষায় প্রাচীন রূপগুলোর ব্যবহার অনেকটাই কমে এসেছে এবং তা অনেক বেশি সংহত হয়ে পরবর্তী শাস্ত্রীয় বা ধ্রুপদী সংস্কৃতের রূপ ধারণ করতে শুরু করেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি দেখা যায় চিন্তার জগতে। আদি বৈদিক স্তরে যেখানে বহু দেবতার কাছে পার্থিব ধনসম্পদ চাওয়া হতো, দশম মণ্ডলে এসে সেখানে মহাজাগতিক একত্ববাদ এবং গভীর দার্শনিক সংশয়বাদের জন্ম হতে দেখা যায়। বিখ্যাত নাসদীয় সূক্ত (Nāsadīya Sūkta) কিংবা হিরণ্যগর্ভ সূক্ত (Hiraṇyagarbha Sūkta) এই স্তরেই রচিত হয়েছিল। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির পেছনে কোনো একক আদিম কারণের অনুসন্ধান এবং অস্তিত্বের অপার রহস্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার যে প্রবণতা, তা প্রমাণ করে যে যাযাবর সমাজ তখন থিতু হয়ে গভীর বৌদ্ধিক চর্চায় প্রবেশ করার মতো স্থিতিশীলতা অর্জন করেছিল।
সামাজিক সংগঠনের ক্ষেত্রে এই দশম মণ্ডলেই ঘটেছিল এক ঐতিহাসিক রূপান্তর। বিখ্যাত পুরুষসূক্ত (Puruṣasūkta) (ঋগ্বেদ ১০.৯০)-এ প্রথমবারের মতো চতুর্বর্ণের উৎপত্তির মহাজাগতিক রূপক হাজির করা হলো। মহাজাগতিক আদি পুরুষের মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে রাজন্য বা ক্ষত্রিয়, ঊরু থেকে বৈশ্য এবং পা থেকে শূদ্রের জন্ম হয়েছে – এই তত্ত্বটি ঘোষণা করে যে সমাজ তখন আর রক্তের সম্পর্কের সরল উপজাতি ছিল না; তা পরিণত হয়েছিল উৎপাদন, শ্রম ও ক্ষমতার জটিল স্তরবিন্যাসে। এছাড়া দশম মণ্ডলেই প্রথমবারের মতো পাওয়া যায় বিস্তারিত বিবাহ সূক্ত (Vivāha Sūkta) এবং অন্ত্যেষ্টি সূক্ত (Antyeṣṭi Sūkta), যা ইঙ্গিত করে যে পারিবারিক সম্পর্ক এবং মৃত্যুর পরবর্তী আচারগুলো একটি নির্দিষ্ট সামাজিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করছিল।
ভাষাতত্ত্ববিদ হারমান গ্রাসমান (Hermann Grassmann) তার সুবিশাল বৈদিক শব্দকোষে শব্দভাণ্ডারের পৌনঃপুনিকতা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে দশম মণ্ডলে কৃষিকাজ, ধাতুর ব্যবহার এবং সামাজিক পেশা সম্পর্কিত বহু নতুন শব্দের আবির্ভাব ঘটেছে যা পারিবারিক মণ্ডলগুলোতে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল (Grassmann, 1873)। ভারততাত্ত্বিক আলফ্রেড হিলেব্রান্ডট (Alfred Hillebrandt) বৈদিক দেবমণ্ডলীর ঐতিহাসিক রূপান্তর আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে কীভাবে দশম মণ্ডলে ইন্দ্রের একক শৌর্য কিছুটা ম্লান হয়ে প্রজাপতি এবং বিশ্বকর্মার মতো বিমূর্ত স্রষ্টা দেবতারা প্রাধান্য পেতে শুরু করেছিলেন (Hillebrandt, 1927)। এই সাহিত্যিক স্তরটি নির্দেশ করে যে পশুপালনের মুক্ত যাযাবর জীবন পেছনে ফেলে বৈদিক সমাজ এক স্থায়ী ও জটিল কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থার দিকে পা বাড়িয়েছিল।
সাম, যজু ও অথর্ববেদ সংহিতা: ভৌগোলিক পূর্বায়ন ও রাষ্ট্র গঠনের সূচনা (Sāma, Yaju, and Atharvaveda Saṃhitās: Eastward Expansion and the Genesis of Statehood)
ঋগ্বেদের কালপর্ব অতিক্রান্ত হওয়ার পর বৈদিক সাহিত্যের দ্বিতীয় প্রধান পর্যায় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বাকি তিনটি সংহিতা: সামবেদ, যজুর্বেদ এবং অথর্ববেদ। এই সাহিত্যিক স্তরের সময়কাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ থেকে ৮০০ অব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ঐতিহাসিক ও বস্তুগত বিচারে এটি ছিল ভারতের আদি লৌহযুগ এবং উত্তর ভারতের কুরু-পাঞ্চাল ভূখণ্ডের রাজনৈতিক উত্থানের যুগ। বৈদিক সংস্কৃতি এই সময়ে পাঞ্জাবকে পেছনে ফেলে পুরোপুরি গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলে নিজের স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পেয়েছিল।
এই তিনটি সংহিতা বৈদিক সাহিত্যের উদ্দেশ্য এবং বিন্যাসকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। সামবেদ ছিল মূলত ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলোরই এক সুরভিত্তিক ও সাঙ্গীতিক সংকলন, যা যজ্ঞের সময় উদগাতা পুরোহিতেরা গান হিসেবে গাইতেন। কিন্তু যজুর্বেদ – যা কৃষ্ণ এবং শুক্ল দুটি প্রধান শাখায় বিভক্ত – ছিল যাগযজ্ঞ পরিচালনার এক পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্দেশিকা। সেখানে প্রতিটি আচারের সময় অধ্বর্যু পুরোহিতকে ঠিক কোন মন্ত্রটি কীভাবে উচ্চারণ করতে হবে, তার গদ্যরূপ বিধিবদ্ধ করা হয়েছিল। যজুর্বেদের এই গদ্যময় ভাষা স্পষ্ট করে দেয় যে যজ্ঞ আর ব্যক্তিগত কোনো স্বতঃস্ফূর্ত প্রার্থনা ছিল না; তা পরিণত হয়েছিল এক অতিজটিল, গণিতনির্ভর ও যান্ত্রিক সামাজিক প্রযুক্তিতে।
অন্যদিকে অথর্ববেদ সংহিতা তুলে ধরেছিল সমাজের এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ও তৃণমূল রূপ। প্রথম তিনটি বেদ যেখানে সমাজের উচ্চবর্গের রাজকীয় ও পুরোহিততান্ত্রিক যজ্ঞ নিয়ে ব্যস্ত ছিল, অথর্ববেদ সেখানে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের ভয়, রোগবালাই, পারিবারিক শত্রুতা, সর্পভীতি, এবং প্রেমের বশীকরণের মতো লৌকিক মন্ত্র ও ভেষজ বিদ্যার এক বিশাল ভাণ্ডার উন্মুক্ত করেছিল। একই সাথে অথর্ববেদেই প্রথম লক্ষ্য করা যায় বৈদিক সংস্কৃতির বাইরে থাকা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বা ব্রাত্য (Vrātya)-দের সাথে মূলধারার সমাজের সাংস্কৃতিক লেনদেনের চিত্র। ধাতুবিদ্যার ক্ষেত্রে এই তিনটি সংহিতাতেই প্রথমবারের মতো তামাকে ‘লোহিত অয়স’ (‘Lohita Ayas’) এবং লোহাকে ‘শ্যাম অয়স’ (‘Śyāma Ayas’) হিসেবে পৃথক করে চিহ্নিত করা হয়, যা সমকালীন প্রত্নতাত্ত্বিক লৌহযুগের সাথে হুবহু সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ভাষাতত্ত্বের ইতিহাসবিদ জুল ব্লখ (Jules Bloch) ইন্দো-আর্য ভাষার ভৌগোলিক বিস্তার ও ব্যাকরণগত বিবর্তন আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই পরবর্তী সংহিতাগুলোতে আঞ্চলিক উপভাষার সংমিশ্রণ ঘটতে শুরু করেছিল (Bloch, 1965)। ইতিহাসবিদ ভিনসেন্ট এ. স্মিথ (Vincent A. Smith) প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে যজুর্বেদ ও অথর্ববেদের যুগে এসে উপজাতীয় সর্দারেরা বংশানুক্রমিক রাজায় রূপান্তরিত হতে শুরু করেছিলেন (Smith, 1919)। রাজা আর সাধারণ রাখালদের নেতা ছিলেন না; তিনি তখন অশ্বমেধ ও রাজসূয় যজ্ঞের মাধ্যমে নিজেকে দিগ্বিজয়ী সম্রাট হিসেবে জাহির করতে শুরু করেছিলেন। এই সংহিতাগুলো সাক্ষ্য দেয় যে বৈদিক সাহিত্য তৎকালীন রাষ্ট্র গঠনের প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোর প্রত্যক্ষ দলিল হিসেবে কাজ করেছিল।
ব্রাহ্মণ সাহিত্যের যুগ ও যজ্ঞীয় পুরোহিততন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার (The Age of the Brāhmaṇas and the Institutional Expansion of Sacrificial Sacerdotalism)
পরবর্তী বৈদিক যুগের সবচেয়ে বিশালাকার এবং জটিল গদ্যসাহিত্য হলো ব্রাহ্মণ গ্রন্থাবলি। সংহিতাগুলোর প্রতিটি শাখার নিজস্ব ব্রাহ্মণ গ্রন্থ রচিত হয়েছিল – যেমন ঋগ্বেদের ঐতরেয় ও কৌষীতকি, যজুর্বেদের শতপথ ও তৈত্তিরীয়, এবং সামবেদের পঞ্চবিংশ ও জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ। এই সাহিত্যের রচনাকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৯০০ থেকে ৭০০ অব্দ পর্যন্ত ধরা হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক বিচারে এটি ছিল উত্তর ভারতের চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্র (Painted Grey Ware বা PGW) সংস্কৃতির চরম বিকাশের কাল। কুরু ও পাঞ্চাল রাজ্য তখন এক সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কায়েম করেছে এবং সমাজ সম্পূর্ণরূপে একটি চার স্তরের বর্ণাশ্রম শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
ব্রাহ্মণ সাহিত্যের কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু ছিল কেবল একটাই: যজ্ঞ (Yajña)। এই বিশাল গদ্যগ্রন্থগুলোতে প্রতিটি বৈদিক আচারের পৌরাণিক ব্যাখ্যা, শব্দার্থের কাল্পনিক ব্যুৎপত্তি এবং যজ্ঞের মহাজাগতিক তাৎপর্য আলোচনা করা হয়েছে, যাকে বলা হয় অর্থবাদ (Arthavāda)। ব্রাহ্মণ যুগের সবচেয়ে বৈপ্লবিক তাত্ত্বিক দাবি ছিল এই যে, যজ্ঞ কোনো দেবতাদের করুণা পাওয়ার সাধারণ মাধ্যম নয়; বরং যজ্ঞ হলো স্বয়ং এই মহাবিশ্বের চালিকাশক্তি। এমনকি দেবতারাও যজ্ঞের নিয়মের অধীন। পুরোহিত যদি নির্ভুলভাবে যজ্ঞের আগুন প্রজ্বলন করেন এবং সঠিক উচ্চারণে মন্ত্র পাঠ করেন, তবে সেই যজ্ঞ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফল উৎপাদন করতে বাধ্য। এই ধারণার মধ্য দিয়ে পুরোহিত শ্রেণি নিজেদেরকে প্রায় দেবতাদের চেয়েও উচ্চতর এক অবস্থানে স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল।
এই সাহিত্যিক জটিলতার পেছনে কাজ করছিল তৎকালীন সমাজের শ্রেণিগত ক্ষমতা ও সম্পদের বণ্টননীতি। ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলোতে বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে রাজকীয় যজ্ঞের নিয়ম – যেমন রাজসূয় (Rājasūya), অশ্বমেধ (Aśvamedha) এবং বাজপেয় (Vājapeya)। এই যজ্ঞগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজার রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বকে এক মহাজাগতিক পবিত্রতা দেওয়া। যজ্ঞের বিনিময়ে রাজা পুরোহিতদের অকাতরে হাজার হাজার গরু, সোনা, দাস-দাসী এবং এমনকি সম্পূর্ণ গ্রামের রাজস্ব দান করতেন, যাকে বলা হতো দক্ষিণা। ব্রাহ্মণ গ্রন্থে বৈশ্যদের স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে এমন এক শ্রেণি হিসেবে যাদের কাজ কেবল উৎপাদন করা ও কর দেওয়া, আর শূদ্রদের চিহ্নিত করা হয়েছে উচ্চ তিন বর্ণের আজ্ঞাবহ সেবক হিসেবে।
সংস্কৃত ভাষাতত্ত্বের ঐতিহাসিক আর্নেস্ট ভিন্ডিশ (Ernst Windisch) প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রের পর্যায়ক্রমিক ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে ব্রাহ্মণ যুগের এই অনমনীয় গদ্যরীতি পরবর্তীকালের ভারতীয় যুক্তিবিদ্যা ও শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার মূল ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল (Windisch, 1917)। আর ভারততাত্ত্বিক ক্লাউস ফোগেল (Claus Vogel) প্রাচীন পরিভাষার বিবর্তন প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে ব্রাহ্মণ সাহিত্যের সূক্ষ্ম আচারিক নিয়মাবলি আসলে ছিল এক বিশাল যাজকীয় আমলাতন্ত্রের প্রতীক (Vogel, 1979)। যজ্ঞের এই অতিকায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রমাণ করে যে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের শুরুতে বৈদিক সমাজ তার আদি সারল্য হারিয়ে এক অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কঠোর পুরোহিততান্ত্রিক ক্ষমতার জালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছিল।
আরণ্যক ও প্রাথমিক উপনিষদ: বস্তুগত সমৃদ্ধির মুখে দার্শনিক সংশয় (Āraṇyakas and Early Upaniṣads: Philosophical Skepticism in the Face of Material Affluence)
ব্রাহ্মণ সাহিত্যের অতিরিক্ত আচারবাদ এবং পুরোহিতদের সীমাহীন লোভ তৎকালীন সমাজে এক গভীর অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল। যজ্ঞের এই যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তির ক্লান্তি থেকেই বৈদিক সাহিত্যের পরবর্তী স্তরের সূচনা ঘটে, যা পরিচিত আরণ্যক (Āraṇyaka) এবং উপনিষদ (Upaniṣad) নামে। এই সাহিত্যিক পর্বের রচনাকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ থেকে ৫০০ অব্দ পর্যন্ত। ভৌগোলিক দিক থেকে এই সময়ে বৈদিক সংস্কৃতি কুরু-পাঞ্চালের পুরনো গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও পূর্ব দিকে – কোশল, বিদেহ এবং মগধের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই যুগটি ছিল এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং একই সাথে গভীর দার্শনিক আত্মজিজ্ঞাসার যুগ।
আরণ্যক সাহিত্য ছিল যজ্ঞের বাহ্যিক রূপ থেকে অভ্যন্তরীণ রূপান্তরের সেতু। যে সমস্ত বয়োবৃদ্ধ বা চিন্তাশীল মানুষেরা অরণ্যে বাস করতেন, তাদের পক্ষে হাজার হাজার পশুবলি দিয়ে ব্যয়বহুল যজ্ঞ করা সম্ভব ছিল না। আরণ্যকগুলো তাই যজ্ঞকে প্রতীকী ও মানসিক স্তরে রূপান্তরিত করল। যজ্ঞের আগুনকে স্থাপন করা হলো মানুষের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের ভেতরে; একে বলা হলো প্রাণাগ্নিহোত্র (Prāṇāgnihotra)। বাহ্যিক কর্মের চেয়ে ভেতরের ধ্যানের শক্তি বড় হয়ে উঠল। আর এই চিন্তারই পূর্ণাঙ্গ দার্শনিক বিকাশ ঘটল প্রাচীনতম গদ্য উপনিষদগুলোতে – বিশেষ করে বৃহদারণ্যক, ছান্দোগ্য, তৈত্তিরীয়, ঐতরেয় এবং কৌষীতকি উপনিষদে।
উপনিষদের যুগে এসে সমাজের ক্ষমতাকাঠামোতেও এক দৃশ্যমান ফাটল তৈরি হয়েছিল। যাগযজ্ঞের মাধ্যমে যে স্বর্গ লাভের প্রতিশ্রুতি ব্রাহ্মণরা দিতেন, উপনিষদের ঋষিরা তাকে সম্পূর্ণ ক্ষণস্থায়ী ও অর্থহীন বলে ঘোষণা করলেন। মুণ্ডক উপনিষদে যজ্ঞের আচারকে তুলনা করা হলো ফুটো নৌকার সাথে, যা দিয়ে সংসারের সমুদ্র পার হওয়া অসম্ভব। বৈদিক সাহিত্যের এই স্তরে ব্রাহ্মণদের পাশাপাশি বিদেহের রাজা জনক, পাঞ্চালের রাজা প্রবাহণ জৈবালি কিংবা কাশীর রাজা অজাতশত্রুর মতো ক্ষত্রিয় রাজাদের গভীর আধ্যাত্মিক তত্ত্বজ্ঞান নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। তারা ব্রাহ্মণদের শেখাচ্ছেন যে আত্মাই হলো পরম সত্য এবং বাহ্যিক ক্রিয়াকর্ম মুক্তির পথ নয়। মানুষের অন্তরের আত্মন (Ātman) এবং মহাবিশ্বের পরম সত্তা ব্রহ্ম (Brahman) যে মূলত এক ও অভিন্ন – এই অদ্বৈত (Advaita) উপলব্ধির মধ্য দিয়ে বৈদিক সাহিত্যের অভিমুখ বস্তুগত আকাঙ্ক্ষা থেকে পরম জ্ঞানের দিকে মোড় নিয়েছিল।
ইতিহাসবিদ জন কেই (John Keay) প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন যে উপনিষদের এই বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; তা ছিল তৎকালীন পূর্ব ভারতের সমৃদ্ধ নগর ও রাজদরবারের এক স্বাধীন সাংস্কৃতিক বিকাশ (Keay, 2000)। গবেষক হ্যান্স বাকার (Hans Bakker) ভারতীয় পবিত্র ভূগোলের বিবর্তন আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই পর্বে গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলগুলো যাগযজ্ঞের চেয়ে দার্শনিক বিতর্কের তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল (Bakker, 2014)। উপনিষদের এই যুগ স্পষ্ট করে দেয় যে বৈদিক সাহিত্যের অভ্যন্তরেই এক বিশাল বিদ্রোহের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল, যা পুরনো আচারসর্বস্ব বৈদিক যুগের সমাপ্তি ঘোষণা করছিল এবং ধ্রুপদী ভারতীয় দর্শনের প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত করছিল।
সূত্রসাহিত্য ও বৈদিক যুগের অবসান: বিধিবদ্ধ সমাজ ও শাস্ত্রীয় নিয়ন্ত্রণ (Sūtra Literature and the End of the Vedic Era: Codified Society and Scriptural Control)
বৈদিক সাহিত্যের দীর্ঘ পরিক্রমার সর্বশেষ ও অন্তিম পর্যায়টি রচিত হয়েছিল এক সম্পূর্ণ নতুন সাহিত্যিক বিন্যাসে, যা পরিচিত সূত্রসাহিত্য (Sūtra Literature) নামে। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ থেকে ৩০০ অব্দের মধ্যে এই সাহিত্যের বিকাশ ঘটেছিল। এই সময়কালটি সরাসরি মিলে যায় ভারতের দ্বিতীয় নগরায়ণ, মহাজনপদগুলোর রাজনৈতিক উত্থান এবং বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের মতো শক্তিশালী অবৈদিক আন্দোলনের সূচনালগ্নের সাথে। বৈদিক সাহিত্য এত বিশাল হয়ে উঠেছিল যে তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে স্মৃতিতে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। এই ব্যবহারিক তাগিদ থেকেই জন্ম নিয়েছিল সূত্র (Sūtra) শৈলী – যার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল স্বল্পাক্ষর, সন্দেহহীন, সারগর্ভ এবং সংক্ষিপ্ত নিয়মাবলি।
এই সূত্র সাহিত্যের প্রধান অঙ্গ ছিল কল্পসূত্র, যা মূলত চার ভাগে বিভক্ত ছিল: শ্রৌতসূত্র (বৃহৎ সামাজিক যজ্ঞের নিয়ম), গৃহ্যসূত্র (পারিবারিক সংস্কার ও নিত্যকর্মের নিয়ম), ধর্মসূত্র (আইন, রাজনীতি ও সামাজিক অনুশাসন), এবং শুল্বসূত্র (যজ্ঞবেদির জ্যামিতিক পরিমাপ)। একই সাথে বৈদিক পাঠকে নিখুঁতভাবে রক্ষা করার জন্য গড়ে উঠেছিল ছয়টি বেদাঙ্গ (Vedāṅga): শিক্ষা, ছন্দ, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, জ্যোতিষ এবং কল্প। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম বা চতুর্থ শতকে ব্যাকরণবিদ পাণিনির রচিত অষ্টাধ্যায়ী (Aṣṭādhyāyī) এই যুগেরই এক মহান নিদর্শন। পাণিনির ব্যাকরণের কঠোর নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ হওয়ার পর বৈদিক সংস্কৃতের স্বাভাবিক ঐতিহাসিক পরিবর্তন বন্ধ হয়ে যায় এবং তা একটি চিরস্থায়ী ধ্রুপদী ভাষায় রূপান্তরিত হয়।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই সূত্রসাহিত্যের মূল লক্ষ্য ছিল এক গভীর আত্মরক্ষামূলক কৌশল। নগরায়ণের ফলে সমাজে যখন বাণিজ্য বাড়ছে, মুদ্রা চালু হচ্ছে, এবং বৌদ্ধ ও জৈনরা বর্ণাশ্রমকে অস্বীকার করছে – তখন বৈদিক সমাজপতিরা তাদের পরিবার ও সমাজকে সুরক্ষিত রাখতে কঠোর সামাজিক আইন তৈরি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ধর্মসূত্রগুলোতে স্পষ্টভাবে বিধিবদ্ধ করা হলো একজন মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বর্ণভিত্তিক নিয়মকানুন। কে কার সাথে বিয়ে করবে, কার ছোঁয়া খাবার খাওয়া যাবে আর কার সাথে কথা বলাও নিষিদ্ধ – এই অস্পৃশ্যতা ও শুচিতার নিয়মগুলো সূত্রসাহিত্যের মাধ্যমেই প্রথম লিখিত আইনি রূপ লাভ করে। এই সাহিত্যের ভেতর দিয়ে বৈদিক ঐতিহ্য নিজেকে একটি অনমনীয় সামাজিক ও আইনি প্রাচীরে আবদ্ধ করে ফেলেছিল।
লিপিতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদ রিচার্ড সলোমন (Richard Salomon) ভারতীয় অনুশাসন ও ভাষার ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে সূত্রসাহিত্যের যুগেই প্রাচীন বৈদিক মৌখিক সংস্কৃতির সাথে প্রাক-মৌর্য যুগের নথিবদ্ধ আইনি ব্যবস্থার চূড়ান্ত মিলন ঘটেছিল (Salomon, 1998)। এর মধ্য দিয়েই বৈদিক সাহিত্যের এক হাজার বছরের দীর্ঘ ঐতিহাসিক যাত্রার পরিসমাপ্তি ঘটে। সংহিতার সেই আদি ব্রোঞ্জযুগীয় পশুপালক মানুষের সরল স্তোত্র থেকে শুরু করে, ব্রাহ্মণ সাহিত্যের বিশাল যজ্ঞীয় আমলাতন্ত্র এবং উপনিষদের গভীর আত্মদর্শনের পথ বেয়ে সূত্রসাহিত্যের কঠোর আইনি অনুশাসনে এসে বৈদিক যুগ তার পূর্ণতা পায়। সাহিত্যের এই প্রতিটি স্তর ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাসের এক একটি জীবন্ত স্তরকে নিখুঁতভাবে ধারণ করে রেখেছে।
নগর বিপ্লব ও উত্তর-বৈদিক বাস্তবতা (Urban Revolution and Post-Vedic Reality): গঙ্গা উপত্যকা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতা
দ্বিতীয় নগরায়ণের ভৌগোলিক ও বস্তুগত পটভূমি: লোহার প্রযুক্তি ও কৃষি উদ্বৃত্ত (Geographical and Material Context of the Second Urbanization: Iron Technology and Agricultural Surplus)
খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময়ে, বিশেষ করে আনুমানিক ষষ্ঠ শতক নাগাদ, উত্তর ভারতের গঙ্গা অববাহিকায় এক সুদূরপ্রসারী বস্তুগত ও অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটেছিল। প্রত্নতত্ত্ব এবং ইতিহাসের পরিভাষায় এই পর্যায়টিকে বলা হয় দ্বিতীয় নগরায়ণ (Second Urbanization)। ব্রোঞ্জ যুগের সিন্ধু সভ্যতার অবসানের পর প্রায় এক হাজার বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে নগর জীবনের কোনো অস্তিত্ব ছিল না; বৈদিক সমাজের বিস্তার ঘটেছিল মূলত গ্রামীণ ও পশুপালনভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে। কিন্তু পূর্ব দিকে, বিশেষ করে মধ্য গঙ্গা উপত্যকায় – আজকের পূর্ব উত্তর প্রদেশ ও বিহার অঞ্চলে – জনবসতির বিস্তারের সাথে সাথে পুনরায় স্থায়ী নগর সংস্কৃতির পুনর্জন্ম ঘটতে শুরু করে।
এই ভৌগোলিক পরিবর্তনের পেছনে ছিল গভীর বস্তুগত ও প্রযুক্তিগত কারণ। মধ্য গঙ্গা উপত্যকার ভূমি ছিল অত্যন্ত উর্বর কিন্তু গভীর আর্দ্র মৌসুমী অরণ্যে ঢাকা। তামার হালকা অস্ত্র বা পাথরের কুঠার দিয়ে এই ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করা সম্ভব ছিল না। এই সংকট মোচনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল লৌহপ্রযুক্তি (Iron Technology)-এর ব্যাপক ব্যবহার। লোহার ভারী কুঠার দিয়ে জঙ্গল কেটে চাষযোগ্য জমির বিস্তার ঘটানো হলো, আর মাটির গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম লোহার ফালযুক্ত লাঙ্গল বা অয়স্ময় লাঙ্গল (Ayasmaya Lāṅgala) দিয়ে শক্ত দোআঁশ মাটি চাষ করা সম্ভব হলো। এই নতুন কৃষি প্রযুক্তির সাথে যুক্ত হয়েছিল বর্ষার জমা জলে ধানের চারা স্থানান্তরের কৌশল বা ধান রোপণ (Paddy Transplantation) পদ্ধতি, যা ফসলের উৎপাদনশীলতাকে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
উৎপাদনের এই উল্লম্ফন এক বিশাল কৃষি উদ্বৃত্ত (Agricultural Surplus) তৈরি করেছিল। কৃষক পরিবারগুলো তখন নিজেদের প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি খাদ্য উৎপাদন করতে সক্ষম হচ্ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এই সময়কালের সাথে জড়িয়ে থাকা যে বিশেষ মাটির পাত্র পাওয়া যায়, তাকে বলা হয় উত্তুরে কালো মসৃণ মৃৎপাত্র (Northern Black Polished Ware বা NBPW)। এই চকচকে ও অত্যন্ত মার্জিত মৃৎপাত্রের বিস্তার প্রমাণ করে যে সমাজে এক বিশেষ সচ্ছল শ্রেণির জন্ম হয়েছিল, যারা নিত্যব্যবহার্য সামগ্রীতেও আভিজাত্যের স্পর্শ চাইত। উদ্বৃত্ত খাদ্যের এই প্রাচুর্য সমাজের একটি বড় অংশকে প্রত্যক্ষ খাদ্য উৎপাদনের দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছিল।
নগর বিপ্লবের তাত্ত্বিক ভি. গর্ডন চাইল্ড (V. Gordon Childe) প্রাচীন নগরায়ণের যে সাধারণ সূত্র ব্যাখ্যা করেছিলেন, প্রাচীন ভারতেও ঠিক সেই ঘটনাই ঘটছিল (Childe, 1950)। যখন সমাজের সবাইকেই মাঠে গিয়ে ফসল ফলাতে হয় না, তখন মানুষের একটি দল শহরমুখী হয়ে কারিগরি শিল্প, ধাতুবিদ্যা, বাণিজ্য ও শাসনকাজে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারে। ঐতিহাসিক ভৈরব প্রসাদ সাহু (Bhairabi Prasad Sahu) প্রাচীন ভারতে লোহার ব্যবহার এবং সামাজিক পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই ধাতু কেবল যুদ্ধাস্ত্রের রূপ বদলায়নি, বরং গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থার আমূল রূপান্তর ঘটিয়েছিল (Sahu, 2006)। ফলে শত শত বছর ধরে টিকে থাকা বৈদিক পশুপালক ও সরল কৃষিনির্ভর সমাজ এক জটিল, শ্রমবিভক্ত ও নগরকেন্দ্রিক অর্থনীতির মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছিল।
জনপদ থেকে মহাজনপদে উত্তরণ: political কেন্দ্রীভবন ও সাম্রাজ্যের বীজ (From Janapadas to Mahājanapadas: Political Centralization and the Seeds of Empire)
বস্তুগত অর্থনীতির এই উল্লম্ফন রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামোর রূপরেখাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। প্রাক-বৈদিক বা আদি বৈদিক যুগে রাজনৈতিক পরিচয় ছিল রক্তসম্পর্কীয় ও গোত্রভিত্তিক, যাকে বলা হতো জন (Jana)। সেখানে রাজা ছিলেন কেবল একজন পশুপালক সর্দার বা গোপতি, যার স্থায়ী কোনো ভূখণ্ড ছিল না। পরবর্তী বৈদিক যুগে যখন মানুষ নির্দিষ্ট ভূমিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করল, তখন জন্ম নিল জনপদ (Janapada) বা ভূখণ্ডভিত্তিক আদি রাষ্ট্র। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে এসে এই ছোট ছোট জনপদগুলো তাদের সংকীর্ণ সীমানা ভেঙে একে অপরকে গ্রাস করতে শুরু করে এবং জন্ম দেয় বিশাল আঞ্চলিক রাজনৈতিক কাঠামোর, যা ইতিহাসে পরিচিত ষোড়শ মহাজনপদ (Ṣoḍaśa Mahājanapada) নামে।
বৌদ্ধ গ্রন্থ অঙ্গুত্তরনিকায় (Aṅguttaranikāya) এবং জৈন গ্রন্থ ভগবতীসূত্র (Bhagavatīsūtra)-এ বর্ণিত এই ষোলটি মহাজনপদের রাজনৈতিক চরিত্র একরকম ছিল না। এদের মধ্যে প্রধানত দুটি বিপরীতধর্মী শাসনব্যবস্থা পাশাপাশি চলছিল। একদল ছিল রাজতান্ত্রিক রাজ্য বা রাজ্য (Monarchy) – যেমন মগধ, কোশল, বৎস ও অবন্তী; আর অন্যদল ছিল অলিগার্কিক বা যৌথ শাসনভিত্তিক প্রজাতন্ত্র, যাকে বলা হতো গণসংঘ (Gaṇasaṅgha) বা গণরাজ্য (Gaṇarājya) – যেমন বৃজি ও মল্ল রাষ্ট্র। গণসংঘগুলোতে কোনো একক বংশানুক্রমিক রাজা ছিল না; সেখানে নির্দিষ্ট ক্ষত্রিয় বংশের প্রধানেরা একটি সাধারণ সভায় বসে সম্মিলিতভাবে নীতি নির্ধারণ করতেন। বুদ্ধ স্বয়ং শাক্য নামের এমন একটি গণরাজ্যের রাজপুত্র ছিলেন।
তবে ঐতিহাসিক বাস্তবতায় রাজতান্ত্রিক মহাজনপদগুলো দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, যার শীর্ষে উঠে এসেছিল মগধ। লোহার খনিগুলোর ভৌগোলিক নৈকট্য, গভীর নদীপথের সামরিক সুবিধা এবং বুনো হাতির প্রাচুর্য মগধকে অনন্য সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিল। রাজার ক্ষমতা আর আগের মতো যাগযজ্ঞের মাধ্যমে দেবতাদের থেকে চেয়ে নেওয়া কোনো প্রতীকী বর ছিল না। রাজা হয়ে উঠেছিলেন ভূখণ্ডের পরম অধিপতি বা ভূপতি (Bhūpati)। স্বেচ্ছায় দেওয়া উপহার বা বলির জায়গা দখল করল বাধ্যতামূলক নিয়মিত খাজনা বা করব্যবস্থা। রাজারা গড়ে তুললেন নিয়মিত পেশাদার সেনাবাহিনী বা চতুরঙ্গ সেনা (Chaturaṅga Senā), যা হস্তী, রথ, অশ্ব ও পদাতিক বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল।
ইতিহাসবিদ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী (Hemchandra Raychaudhuri) প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে জনপদ থেকে সাম্রাজ্যে উত্তরণের এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন (Raychaudhuri, 1923)। তিনি দেখিয়েছেন যে কীভাবে বিম্বিসার ও অজাতশত্রুর মতো দূরদর্শী শাসকেরা কুটনীতি ও সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে বৈদিক যুগের বিকেন্দ্রীভূত ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে ফেলেছিলেন। ইতিহাসবিদ ডি. আর. ভাণ্ডারকর (D. R. Bhandarkar) তার প্রাচীন ভারতের বক্তৃতামালায় দেখিয়েছেন যে মহাজনপদগুলোর এই উত্থান বৈদিক পুরোহিত ও রাজার মধ্যকার পুরনো পারস্পরিক সমঝোতাকে দুর্বল করে দিয়েছিল (Bhandarkar, 1919)। রাজা যখন স্থায়ী সেনাবাহিনী এবং নিয়মিত করের জোরে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হলেন, তখন রাজকীয় বৈধতার জন্য বৈদিক অশ্বমেধ বা রাজসূয় যজ্ঞের ওপর তার একচেটিয়া নির্ভরতা অনেকটাই কমে গেল।
নগর বনাম বৈদিক গ্রামীণ আদর্শ: সামাজিক স্থান ও মূল্যবোধের সংঘাত (City versus Vedic Rural Ideal: Clash of Social Space and Values)
দ্বিতীয় নগরায়ণের ফলে যে নতুন সামাজিক স্থানের জন্ম হয়েছিল, তা প্রাচীন বৈদিক মূল্যবোধের সাথে এক তীব্র আদর্শিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিল। বৈদিক সাহিত্যের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, তাদের সমগ্র বিশ্বদৃষ্টি ছিল গ্রামীণ প্রকৃতির সাথে একাত্ম। খোলা আকাশের নিচে যজ্ঞের বেদি, গোচারণভূমি, নদী এবং শান্ত বসতিই ছিল বৈদিক ঋষিদের দৃষ্টিতে পুণ্যভূমি। এর বিপরীতে নতুন গড়ে ওঠা শহরগুলো – যেমন চম্পা, রাজগৃহ, বারাণসী, কৌশাম্বী বা শ্রাবস্তী – গড়ে উঠেছিল বিশালাকার মাটির প্রাচীর, গভীর পরিখা, পোড়ামাটির ইটের তৈরি পাকা রাস্তা এবং সুনির্দিষ্ট পয়ঃনিষ্কাশন নর্দমা দিয়ে। শহর ছিল কোলাহলপূর্ণ, ঘিঞ্জি এবং বহু বিচিত্র মানুষের অবাধ মিলনক্ষেত্র।
বৈদিক শাস্ত্রকারেরা এই নতুন নাগরিক পরিবেশকে চরম সন্দেহের চোখে দেখতেন। ধর্মসূত্রের রচয়িতারা নগর জীবনকে নৈতিক অবক্ষয়, শুচিতার বিনাশ এবং পাপের কেন্দ্রস্থল হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, বৌধায়ন ধর্মসূত্র (Baudhāyana Dharmasūtra)-এ স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে কোনো ব্যক্তি যদি শহরে গিয়ে বসবাস করে এবং শহরের ধূলিকণা তার গায়ে লাগে, তবে সে তার সমস্ত আধ্যাত্মিক তেজ ও তেজস্বিতা হারিয়ে ফেলে; ফলে গ্রামে ফিরে আসার পর তাকে বিশেষ প্রায়শ্চিত্ত করে পুনরায় শুদ্ধ হতে হবে। বৈদিক পণ্ডিতদের আশঙ্কা ছিল যে শহরে বসবাস করলে বিভিন্ন বর্ণের মানুষের মধ্যকার শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
শহরে কারিগর, দূরবর্তী বণিক, বিদেশি পরিব্রাজক এবং বিভিন্ন প্রান্তের শ্রমজীবী মানুষ একসাথে বাস করত। সেখানে খাবার রান্না করে দোকানে বিক্রি করা হতো, যা বৈদিক পাকশালা ও ব্যক্তিগত শুচিতার নিয়মের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল। গ্রামের মতো সেখানে কে কার ছোঁয়া জল খাচ্ছে বা কার পাশে বসে ভোজন করছে, তা নজরদারি করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উপায় ছিল না। ফলে বৈদিক আভিজাত্য শহরের এই মিশ্র ও নিয়ন্ত্রণহীন জনপরিসরকে নিজেদের সামাজিক শ্রেষ্ঠত্বের জন্য বড় ধরণের হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছিল। তারা শহরকে দেখতেন এক ধরণের বিশৃঙ্খল গোলকধাঁধা হিসেবে, যেখানে বেদের অনুশাসন অচল হয়ে পড়ে।
প্রত্নতাত্ত্বিক অমলেন্দু ঘোষ (A. Ghosh) ভারতের আদি ঐতিহাসিক যুগের নগরগুলোর গঠন ও উদ্ভব নিয়ে তার প্রামাণ্য গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে কীভাবে নগরগুলো প্রাচীন ভারতের সামাজিক সম্পর্কের মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল (Ghosh, 1973)। প্রত্নতত্ত্ববিদ মাকখান লাল (Makkhan Lal) গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলের প্রাচীন বসতি বিন্যাস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে গ্রামীণ বৈদিক সমাজ এবং নাগরিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে এক ধরণের স্থানিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিল (Lal, 1984)। নগরগুলো পরিণত হয়েছিল মুক্ত পেশা, নতুন ধারণা এবং ভিন্নমতের সূতিকাগারে। বৈদিক সমাজ যেখানে স্থবিরতা ও নিয়মের পুনরাবৃত্তিকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চেয়েছিল, নগর সেখানে গতিশীলতা ও পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
মুদ্রা অর্থনীতি, বাণিজ্য গিল্ড ও নতুন সামাজিক শ্রেণির উত্থান (Monetized Economy, Trade Guilds, and the Rise of New Social Classes)
দ্বিতীয় নগরায়ণ প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরে যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এনেছিল, তা হলো বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ধাতব মুদ্রার প্রচলন। এর আগে বৈদিক সমাজে লেনদেন হতো গরু, খাদ্যশস্য বা নির্দিষ্ট ওজনের সোনার পিণ্ড দিয়ে, যা ছিল অত্যন্ত সীমিত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ ও পঞ্চম শতকে রৌপ্য ও তামার তৈরি এক বিশেষ ধরণের মুদ্রার আবির্ভাব ঘটে, যা পরিচিত ছাপাঙ্কিত মুদ্রা (Punch-marked Coins) নামে। মুদ্রার গায়ে সূর্য, গাছ, বৃষ বা বিভিন্ন জ্যামিতিক চিহ্নের ছাপ মারা থাকত। এই মুদ্রাব্যবস্থার ফলে পণ্যের দাম নির্ধারণ করা সহজ হলো এবং দূরপাল্লার বাণিজ্য অবিশ্বাস্য গতি লাভ করল।
মুদ্রা অর্থনীতির এই বিকাশ জন্ম দিয়েছিল সম্পূর্ণ নতুন কিছু সামাজিক শ্রেণির, যাদের অস্তিত্ব বৈদিক চতুর্বর্ণের তাত্ত্বিক ছকে সহজে এঁটে উঠত না। এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিল বড় ব্যবসায়ী বা শ্রেষ্ঠী (Śreṣṭhin) এবং সমৃদ্ধ কৃষিজীবী বা গৃহপতি (Gṛhapati) শ্রেণি। বিভিন্ন পেশার কারিগরেরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে এবং পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করতে সুসংগঠিত বাণিজ্যিক সংস্থায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, যাকে বলা হতো শ্রেণী (Śreṇī) বা নিগম (Nigama)। এই গিল্ডগুলোর নিজস্ব আইনি ক্ষমতা ছিল, তারা নিজস্ব সিলমোহর ব্যবহার করত এবং অনেক সময় রাজারাও তাদের মতামত ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। তাঁতি, কামার, মৃৎশিল্পী কিংবা গজদন্তশিল্পীদের এই গিল্ডগুলো শহরের সামাজিক ক্ষমতাকে নিজেদের হাতে কেন্দ্রীভূত করতে শুরু করেছিল।
বাণিজ্যের এই জাল ভারতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল দুটি সুবিশাল রাজপথের মাধ্যমে: উত্তরে গান্ধার থেকে মগধ হয়ে তাম্রলিপ্ত পর্যন্ত বিস্তৃত উত্তরাপথ (Uttarāpatha) এবং মধ্য ভারত হয়ে মহারাষ্ট্র ও দাক্ষিণাত্যের দিকে চলে যাওয়া দক্ষিণাপথ (Dakṣiṇāpatha)। এই দীর্ঘ বাণিজ্যপথে কাফেলা নিয়ে যেতেন সার্থবাহ বা বণিক দলের প্রধানেরা। ফলে সম্পদ আর কেবল গবাদিপশু বা কৃষিজমির পরিমাপে আটকে রইল না; সম্পদ হয়ে উঠল তরল ও গতিশীল। একজন বৈশ্য ব্যবসায়ী তার ধনসম্পদের জোরে এমন এক স্তরে পৌঁছে গেলেন, যেখানে সমাজের বংশানুক্রমিক বৈদিক পুরোহিতদের চেয়েও তার বাস্তব প্রভাব বহুগুণ বেড়ে গেল।
অর্থনৈতিক প্রত্নতত্ত্ববিদ জর্জ আর্ডসি (George Erdosy) আদি ভারতের নগরায়ণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে মুদ্রা এবং কারিগরি গিল্ডগুলো ঐতিহ্যগত গোত্রীয় আনুগত্যকে ভেঙে দিয়েছিল (Erdosy, 1988)। নগর ইতিহাসবিদ জেমস হাইৎজম্যান (James Heitzman) দেখিয়েছেন যে প্রাচীন দক্ষিণ এশিয়ায় নগরের বিকাশ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং নাগরিক ক্ষমতার এক সমন্বিত জাল (Heitzman, 2008)। এই নতুন ধনী বণিক শ্রেণি বৈদিক সমাজে সামাজিক সম্মানের দিক থেকে নিচের সারিতে থাকতে আর রাজি ছিল না। তারা এমন এক সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামোর সন্ধান করছিল যা তাদের বাণিজ্য, সঞ্চয় ও পেশাগত মর্যাদাকে বৈধতা দেবে।
ধর্মসূত্রের উদ্বেগ ও বিধান: নগরায়ণকে শাসন ও নিয়ন্ত্রণের ব্রাহ্মণ্য প্রয়াস (Concerns and Decrees of the Dharmasūtras: Brahmanical Attempts to Govern and Contain Urbanization)
নাগরিক সংস্কৃতির এই অপ্রতিরোধ্য বিস্তার দেখে বৈদিক রক্ষণশীল সমাজ হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। এই পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও ক্ষমতার অবস্থান রক্ষা করার জন্যই খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ থেকে তৃতীয় শতকের মধ্যে রচিত হয়েছিল ধর্মসূত্র (Dharmasūtra) সাহিত্য। আপস্তম্ব, গৌতম, বৌধায়ন এবং বশিষ্ঠের মতো শাস্ত্রকারেরা এই সূত্রগুলোতে সামাজিক আচরণ, বর্ণভেদ এবং খাদ্যগ্রহণের এমন সব জটিল ও অনমনীয় নিয়ম তৈরি করলেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল বৈদিক ব্রাহ্মণ্য সমাজকে নাগরিক বিশৃঙ্খলা ও অশুচিতা থেকে রক্ষা করা।
ধর্মসূত্রের বিধানগুলোর একটি প্রধান বিষয় ছিল খাদ্যগ্রহণ বা ভোজ্যান্ন (Bhojyānna) সংক্রান্ত কঠোর বিধিমালা। সেখানে লম্বা তালিকা দিয়ে বলে দেওয়া হলো একজন উচ্চবর্ণের মানুষ কার কার হাতের খাবার খেতে পারবে না। এই নিষিদ্ধ তালিকায় ঢুকিয়ে দেওয়া হলো শহরের দোকানদার, কারিগর, নর্তক, গণিকা, এবং বিশেষ করে সুদে টাকা ধার দেওয়া মহাজনদের। মহাজনি কারবার বা কুসীদ (Kusīda)-কে শাস্ত্রকারেরা চরম পাপ হিসেবে ঘোষণা করলেন। একজন ব্রাহ্মণ যদি সুদের ব্যবসা করে, তবে তাকে পতিত এবং ভ্রূণহত্যাকারীর সমান অপরাধী গণ্য করা হতো। অথচ নগর অর্থনীতির পুরো চাকাটাই ঘুরছিল এই ঋণ এবং সুদের ওপর ভিত্তি করে। একইভাবে সমুদ্র বা নদীপথে দূর বাণিজ্যে যাওয়া অর্থাৎ সমুদ্রযাত্রা (Samudrayātrā)-কে নিষিদ্ধ করে ঘোষণা করা হলো যে এতে জাত নষ্ট হয়।
শহরে পেশাগত বৈচিত্র্যের কারণে যে নতুন নতুন কর্মগোষ্ঠী তৈরি হচ্ছিল, তাদেরকে পুরনো চতুর্বর্ণের ভেতরে জায়গা দেওয়ার জন্য শাস্ত্রকারেরা উদ্ভাবন করলেন বর্ণসংকর (Varṇasaṃkara) বা মিশ্র বর্ণের তত্ত্ব। তারা দাবি করলেন যে চার বর্ণের মানুষের পারস্পরিক অনুলোম এবং প্রতিলোম বিবাহের ফলেই সমাজের এই সমস্ত মধ্যবর্তী জাতগুলোর জন্ম হয়েছে। যেমন রথ প্রস্তুতকারীকে বলা হলো রথকার, কামারকে অয়স্কার, কিংবা চামড়ার কাজ করা মানুষকে চর্মকার। এভাবে প্রতিটি নতুন পেশা ও নাগরিক সম্প্রদায়কে বৈদিক বর্ণক্রমের কোনো না কোনো স্তরে আবদ্ধ করে তাদের ওপর সামাজিক শুচিতা ও অস্পৃশ্যতার নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হলো।
ইতিহাসবিদ ডি. সি. সরকার (D. C. Sircar) প্রাচীন ভারতের ভূগোল ও সামাজিক গতিশীলতা পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে ধর্মসূত্রগুলোর এই বিধানগুলো ছিল সামাজিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে শাস্ত্রীয় নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার এক মরিয়া লড়াই (Sircar, 1960)। বৈদিক সমাজ বুঝতে পারছিল যে নগর অর্থনীতি তাদের হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে। তাই তারা বিশুদ্ধতা, বংশমর্যাদা এবং ধর্মীয় আচারের এক কল্পিত প্রাচীর তুলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। বাস্তব সমাজ যখন বাণিজ্যের দিকে দৌড়াচ্ছিল, বৈদিক শাস্ত্র তখন পিছনের দিকে তাকিয়ে এক কঠোর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা করছিল।
বৈদিক ভাবাদর্শের সংকট ও ধ্রুপদী যুগের প্রস্তুতি (Crisis of the Vedic Ideology and the Foundation for the Classical Era)
দ্বিতীয় নগরায়ণের সমাপ্তি পর্বে এসে প্রাচীন বৈদিক ধর্ম এক গভীর আত্মিক ও অস্তিত্বের সংকটে পড়েছিল। আদি বৈদিক সংহিতার যে সহজ ধর্মবিশ্বাস – যেখানে দেবতারা সোমরস খেয়ে খুশি হয়ে যুদ্ধে জয় এনে দিতেন এবং গোসম্পদ বাড়াতেন – সেই বিশ্বাস নতুন নাগরিক বুদ্ধিজীবী ও উদীয়মান প্রজন্মের কাছে নিতান্তই সেকেলে ও হাস্যকর মনে হতে শুরু করেছিল। কৃষিভিত্তিক সমাজে পশুবলি ছিল ক্ষতিকর, আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক শহরের জীবনে সমষ্টিগত যজ্ঞের অনুষ্ঠান মানুষকে মানসিক প্রশান্তি দিতে ব্যর্থ হচ্ছিল। যজ্ঞের মাধ্যমে যে অনন্ত স্বর্গ পাওয়ার কথা বলা হতো, সেই স্বর্গের নশ্বরতা নিয়ে মানুষ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিল।
এই সংকটের ভেতর থেকেই বৈদিক চিন্তার ভেতরের এক প্রগতিশীল অংশ উপনিষদের আত্মতত্ত্ব ও জ্ঞানকাণ্ডের দিকে ঝুঁকে পড়ল। তারা উপলব্ধি করেছিলেন যে আচার দিয়ে মানুষকে আর ধরে রাখা যাবে না, তাই তারা জাগতিক সম্পদ ও যজ্ঞের অগ্নি ত্যাগ করে ভেতরের অস্তিত্বের গভীরতর অর্থের অনুসন্ধানে ব্রতী হলেন। তবে বৈদিক চিন্তার বাইরে যে বিকল্প আন্দোলনগুলো গড়ে উঠেছিল – বিশেষ করে বৌদ্ধ, জৈন এবং অন্যান্য শ্রমণ ধারা – সেগুলো সরাসরি নগরায়ণের বাস্তবতাকে আলিঙ্গন করে নিয়েছিল। নগরীর রাজা এবং ধনী শেঠিরা পুরোহিতদের হাত ছেড়ে এই নতুন সমতাবাদী ও অহিংস আন্দোলনগুলোকে বিপুল অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দিতে শুরু করলেন। ফলে বৈদিক পুরোহিততন্ত্র সমাজে তার একচ্ছত্র আধিপত্য হারিয়ে এক চরম কোণঠাসা অবস্থায় নিক্ষিপ্ত হলো।
কিন্তু এই সংকটই পরবর্তীতে বৈদিক ঐতিহ্যকে ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে এক নতুন রূপান্তরের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। সমাজকে টিকিয়ে রাখতে হলে গোঁড়ামি ছেড়ে সময়ের সাথে আপস করতে হবে – এই সত্য ব্রাহ্মণ্য পণ্ডিতেরা শেষ পর্যন্ত স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তারা নগর সংস্কৃতিকে আর পুরোপুরি অস্বীকার না করে নিজেদের ব্যবস্থার ভেতর তাকে জায়গা দিতে শুরু করলেন। রাজা ও সাম্রাজ্যের প্রয়োজনীয়তাকে মেনে নিয়ে রচিত হলো রাষ্ট্র পরিচালনার নানা বিজ্ঞান; গ্রামীণ যজ্ঞবেদির জায়গায় ধীরে ধীরে নাগরিক মন্দিরের কল্পনা অঙ্কুরিত হলো; আর চার আশ্রম ও স্মৃতিশাস্ত্রের মাধ্যমে নগর ও গ্রাম উভয়ের জন্যই একটি সমন্বিত আইনি কাঠামো দাঁড় করানো হলো।
প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ জে. মার্ক কেনয়ার (J. Mark Kenoyer) দক্ষিণ এশিয়ার নগর সভ্যতার তুলনামূলক গতিধারা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে দ্বিতীয় নগরায়ণ কেবল শহর তৈরির ইতিহাস নয়, বরং তা ছিল সমগ্র প্রাচীন সমাজের আদর্শিক ভিত্তি পুনর্লিখনের এক মহাযজ্ঞ (Kenoyer, 1998)। দ্বিতীয় নগরায়ণের ধাক্কা না খেলে বৈদিক ধর্ম হয়তো কোনোদিন ধ্রুপদী হিন্দুধর্মে রূপান্তরিত হতে পারত না। এই নগরায়ণই বৈদিক ঐতিহ্যকে তার সংকীর্ণ পশুপালক পরিমণ্ডল থেকে টেনে বের করে এক সর্বভারতীয়, বহুমাত্রিক ও টিকে থাকার মতো টেকসই সভ্যতায় পরিণত করেছিল। প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যের সমাপ্তি এবং শাস্ত্রীয় ভারতীয় ঐতিহ্যের সূচনার মাঝে এই দ্বিতীয় নগরায়ণই ছিল ইতিহাসের সেই মহা সংযোগসেতু।
শ্রমণ আন্দোলন ও বৈদিক সমাজের রূপান্তর (Śramaṇa Movement and Vedic Social Transformation): সংঘাত, মিথস্ক্রিয়া ও সমন্বিত সংস্কৃতি
আরণ্যক ও নাগরিক পরিসর: বৈদিক গ্রাম বনাম শ্রমণ নগরীর দ্বন্দ্ব (The Forest and the Urban Sphere: The Conflict between Vedic Villages and Śramaṇa Cities)
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে উত্তর ভারতের ভূগোলে এক দৃশ্যমান দ্বিধাবিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। একদিকে ছিল কুরু ও পাঞ্চালকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রাচীন বৈদিক ভূখণ্ড, যার অর্থনীতি ও জীবনধারা আবর্তিত হতো গ্রামীণ বসতি এবং পশুপালনকে ঘিরে। অন্যদিকে পূর্বের মগধ, কোশল ও বজ্জি বা বৃজি অঞ্চলে দ্রুত বিস্তার লাভ করছিল দ্বিতীয় নগরায়ণের তরঙ্গ। বৈদিক সমাজ ছিল মূলত গ্রাম (Grāma)-কেন্দ্রিক, যেখানে প্রতিটি পরিবারের নিজস্ব গৃহ্য অগ্নি এবং যৌথ সামাজিক যজ্ঞের নির্দিষ্ট স্থান ছিল। এর বিপরীতে শ্রমণ আন্দোলনগুলোর মূল বিকাশ ঘটছিল রাজগৃহ, শ্রাবস্তী, বৈশালী এবং চম্পার মতো নতুন ও কোলাহলপূর্ণ বাণিজ্যিক নগরগুলোতে। এই ভৌগোলিক পার্থক্য কেবল বাসস্থানের ভিন্নতা ছিল না, বরং তা ছিল দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী জীবনদর্শনের সংঘাত।
প্রাচীন বৈদিক ভাবনায় বসতিপূর্ণ গ্রাম এবং বুনো জঙ্গল বা অরণ্য (Araṇya)-এর মধ্যে এক সুস্পষ্ট সীমারেখা টানা হয়েছিল। বৈদিক মানুষের কাছে অরণ্য ছিল ভীতিপ্রদ, বিশৃঙ্খল এবং সামাজিক নিয়মের বাইরের এক অন্ধকার জগত। সেখানে কেবল ভূতপ্রেত বা সমাজচ্যুত দস্যুদের বাস বলে মনে করা হতো। কিন্তু শ্রমণ ঐতিহ্যের পরিব্রাজকেরা এই সমীকরণকে সম্পূর্ণ উল্টে দিলেন। তারা সুরক্ষিত গ্রামীণ সমাজ ত্যাগ করে অরণ্যকে বেছে নিলেন তাদের আধ্যাত্মিক সাধনা ও মুক্ত চিন্তার নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে। ফরাসি ভারততাত্ত্বিক চার্লস মালামুদ (Charles Malamoud) প্রাচীন ভারতের গ্রাম ও অরণ্যের ধারণাগত দ্বন্দ্ব নিয়ে গভীর আলোচনা করেছেন (Malamoud, 1996)। তিনি দেখিয়েছেন যে বৈদিক মানুষ যজ্ঞের কাঠ ও সোমলতা সংগ্রহের জন্য বনে গেলেও দ্রুত গ্রামে ফিরে আসাকেই ধর্ম মনে করত, অথচ শ্রমণরা বনভূমিকে রূপান্তরিত করেছিল বৈদিক পুরোহিততন্ত্রের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করার এক রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক অভয়ারণ্যে।
নগর সংস্কৃতির দ্রুত বিকাশ বৈদিক সমাজব্যবস্থার জন্য এক বড় মনস্তাত্ত্বিক আঘাত ছিল। নতুন নগরগুলোতে মুদ্রা অর্থনীতির প্রচলন শুরু হয়েছিল, কারিগরদের সংঘ গড়ে উঠছিল এবং দূরদূরান্তের বাণিজ্যের সূত্রে বিচিত্র ভাষার ও সংস্কৃতির মানুষের মিলন ঘটছিল। বৈদিক সমাজের অনমনীয় বর্ণাশ্রম নিয়ম এই গতিশীল নাগরিক বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়াতে পারছিল না। যজ্ঞে সময় ও সম্পদ অপচয় করার চেয়ে নাগরিক ব্যবসায়ীদের কাছে বেশি প্রয়োজন ছিল চুক্তি রক্ষা, সম্পদের নিরাপত্তা এবং নৈতিক শৃঙ্খলা। শ্রমণ শিক্ষকেরা ঠিক এই শূন্যস্থানটি পূরণ করতে এগিয়ে এসেছিলেন। তারা কোনো জন্মগত আভিজাত্যের কথা না বলে মানুষের ব্যক্তিগত আচরণ ও সততার ওপর জোর দিয়েছিলেন।
সমাজবিজ্ঞানী গ্রেগ বেইলি (Greg Bailey) প্রাচীন বৌদ্ধ সমাজের গঠন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে কীভাবে শ্রমণ দর্শন নগর জীবনের বিচ্ছন্নতাবোধ ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতাকে প্রশমিত করার চেষ্টা করেছিল (Bailey, 2003)। গ্রামীণ যৌথ পরিবারের বন্ধন ভেঙে যখন মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক নগরে এসে পড়ল, তখন পুরনো বৈদিক আচার তাদের কোনো মানসিক সান্ত্বনা দিতে পারছিল না। শ্রমণদের সংঘ হয়ে উঠল এমন এক প্রতিষ্ঠান, যা শহরের নাগরিকদের মানসিক শান্তি এবং সহজ সামাজিক নীতিশাস্ত্রের সন্ধান দিয়েছিল। বৈদিক গ্রাম্য রক্ষণশীলতা এবং শ্রমণ নাগরিক আধুনিকতার এই সংঘাত প্রাচীন ভারতের সমাজ রূপান্তরের প্রথম প্রধান মঞ্চ প্রস্তুত করেছিল।
গার্হস্থ্য ধর্ম বনাম প্রব্রজ্যা: সামাজিক কর্তব্য ও ত্যাগের টানাপোড়েন (Gṛhastha Dharma versus Pravrajyā: The Tension between Social Duty and Renunciation)
বৈদিক সমাজব্যবস্থার পুরো কাঠামোটি দাঁড়িয়ে ছিল একজন গৃহস্থ পুরুষের ওপর। বৈদিক ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী, সমাজে জন্ম নেওয়া প্রতিটি দ্বিজ পুরুষের মাথায় তিনটি মৌলিক ঋণ চাপানো থাকত, যাকে বলা হতো ঋণত্রয় (Ṛṇatraya)। এই ঋণগুলো হলো দেবতাদের উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করার দেবঋণ, ঋষিদের বেদ রক্ষার জন্য ঋষিঋণ, এবং বংশবৃদ্ধি করে পূর্বপুরুষদের পিণ্ডদানের পথ খোলা রাখার জন্য পিতৃঋণ। ফলে সংসার করা বা গার্হস্থ্য (Gārhasthya) পালন করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় ছিল না; তা ছিল এক অলঙ্ঘনীয় সামাজিক দায়িত্ব। যে পুরুষ বিয়ে করেনি বা যার সন্তান নেই, বৈদিক সমাজে তার আধ্যাত্মিক মুক্তি তো দূরের কথা, সামাজিক মর্যাদাও ছিল না।
শ্রমণ আন্দোলনগুলো এই গার্হস্থ্য ব্যবস্থার ওপর সবচেয়ে মারাত্মক বুদ্ধিবৃত্তিক আঘাতটি হেনেছিল। তারা ঘোষণা করল যে গৃহজীবন কোনো পবিত্র দায়িত্ব নয়, বরং তা হলো বন্ধন, মায়া ও অনন্ত দুঃখের কারখানা। পালি ত্রিপিটকে বারবার বলা হয়েছে: “সংবাধো ঘরাবাসো রজোবথো” (Sambādho gharāvāso rajovatho) – অর্থাৎ গৃহস্থের জীবন বড়ই সংকীর্ণ এবং ধূলিমলিন, আর গৃহহীন জীবন হলো মুক্ত আকাশের মতো উন্মুক্ত। তরুণদের আহ্বান জানানো হলো সংসার, সন্তান ও সামাজিক সম্পদ পেছনে ফেলে গৃহহীন সন্ন্যাসী বা প্রব্রজ্যা (Pravrajyā) গ্রহণ করতে। দলে দলে তরুণ যখন সংসার ত্যাগ করে শ্রমণ সংঘগুলোতে যোগ দিতে শুরু করল, তখন তৎকালীন সমাজপতিদের মধ্যে রীতিমতো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।
এই গণ-গৃহত্যাগের ফলে বৈদিক সমাজে এক বিরাট শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। অর্থনীতি সচল রাখার জন্য উৎপাদনশীল শ্রমিকের অভাব দেখা দিচ্ছিল, এবং পারিবারিক রক্তধারা রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠছিল। কোনো কোনো প্রাচীন গ্রন্থে শ্রমণদের বিরুদ্ধে পরিবার ধ্বংস করার অভিযোগও তোলা হয়েছিল। ধর্মসূত্রকার গৌতম বা বৌধায়নের মতো গোঁড়া স্মার্ত (স্মৃতিশাস্ত্র ভিত্তিক) পণ্ডিতেরা তাই কঠোর ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন যে চার আশ্রমের মধ্যে কেবল গার্হস্থ্যই হলো একমাত্র প্রকৃত ও বৈধ আশ্রম; বাকি সন্ন্যাস বা বাণপ্রস্থ হলো মূলত কর্মবিমুখ ও অক্ষম মানুষদের ফাঁকিবাজি। তারা যুক্তি দিয়েছিলেন যে সন্ন্যাসীদেরও তো পেটের অন্নের জন্য গৃহস্থের দুয়ারেই ভিক্ষার পাত্র নিয়ে দাঁড়াতে হয়, তবে গৃহস্থকে অস্বীকার করার সাহস তারা পায় কোথা থেকে?
ধর্মের ইতিহাসবিদ মার্টিন উইলসট্রম (Martin Wiltshire) প্রাচীন ভারতে গৃহস্থের আত্মমর্যাদার এই সংকট নিয়ে বিশদ অনুসন্ধান চালিয়েছেন (Wiltshire, 1990)। তিনি দেখিয়েছেন যে সন্ন্যাসের এই প্রবল স্রোত বৈদিক চিন্তাবিদদের বাধ্য করেছিল তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ পুনর্বিবেচনা করতে। সমাজতাত্ত্বিক অলিভার ফ্রিবের্গার (Oliver Freiberger) উল্লেখ করেছেন যে এই সংঘাতের ভেতর দিয়েই প্রাচীন ভারতে ত্যাগের এক নতুন ব্যাকরণ তৈরি হয়েছিল (Freiberger, 2006)। কেবল সন্তান উৎপাদন করলেই জীবনের চূড়ান্ত সার্থকতা আসে না, আত্মসংযম এবং বাসনা ত্যাগের মাধ্যমেও যে এক ধরণের উচ্চতর সামাজিক মর্যাদা লাভ করা সম্ভব – শ্রমণদের এই চ্যালেঞ্জ বৈদিক পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের একক কর্তৃত্বকে স্থায়ীভাবে শিথিল করে দিয়েছিল।
আচারিক অহিংসা ও খাদ্যসংস্কৃতির পুনর্বিন্যাস (Ritual Non-violence and the Realignment of Dietary Culture)
প্রাচীন বৈদিক সমাজে খাদ্যসংস্কৃতি এবং যাগযজ্ঞের আচার ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঋগ্বেদ এবং পরবর্তী ব্রাহ্মণ সাহিত্যে এমন অজস্র বর্ণনা মেলে যেখানে দেখা যায় সোমযাগ, বাজপেয় কিংবা অশ্বমেধের মতো অনুষ্ঠানে শত শত পশু বলি দেওয়া হতো এবং যজ্ঞের শেষে সেই মাংস পুরোহিত ও যজমানদের মধ্যে বিতরণ করে ভোজন করা হতো। বিশেষ অতিথি বা রাজকীয় ব্যক্তি গৃহে এলে বড় বলদ বা ষাঁড় জবাই করে আপ্যায়ন করার প্রথা ছিল, যার জন্য গৃহকর্তাকে অনেক সময় ‘গোঘ্ন’ (‘Cattle-slayer’) বলা হতো। যাগযজ্ঞের মাধ্যমে মাংস খাওয়া কেবল পুণ্যকর্মই নয়, সামাজিক প্রতিপত্তিরও প্রতীক ছিল।
শ্রমণ ঐতিহ্যগুলো এই খাদ্যসংস্কৃতি ও আচারিক পশুহত্যার বিরুদ্ধে এক আপসহীন যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তাদের দর্শনের মূল স্তম্ভ হয়ে দাঁড়াল অহিংসা (Ahiṃsā)। জৈনরা এই ধারণাকে চরমতম মাত্রায় নিয়ে গিয়ে ঘোষণা করেছিলেন যে কোনো জীবকে সামান্য কষ্ট দেওয়াও আত্মিক মুক্তির পথ বন্ধ করে দেয়। তারা চাষাবাদের মতো পেশাকেও এড়িয়ে চলতে শুরু করলেন, কারণ জমিতে লাঙ্গল চালালে কীটপতঙ্গ মারা পড়তে পারে। বৌদ্ধরাও যজ্ঞের পশুবলিকে চূড়ান্ত পাপ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। বুদ্ধ যদিও ভিক্ষুদের জন্য মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা বাস্তববাদী শিথিলতা রেখেছিলেন – যা ত্রিকোটিবিশুদ্ধ (Trikoṭiviśuddha) বা নিজের জন্য বিশেষ করে মারা হয়নি এমন মাংস খাওয়া – তবুও পেশাদার কসাইখানা চালানো বা পশুবাণিজ্যের মতো পেশাকে তিনি অজীবিকা বা অসৎ জীবিকা হিসেবে নিষিদ্ধ করেছিলেন।
এই প্রচারের ফলে উত্তর ভারতের সমাজে মাংস খাওয়ার অভ্যাস এক বিরাট সামাজিক লজ্জার বিষয়ে পরিণত হলো। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর সমাজ দ্রুত বুঝতে পারল যে গবাদিপশু কোনো খাদ্যের উৎস নয়, বরং তা হলো অর্থনৈতিক সম্পদ। যজ্ঞের নামে গরু জবাই করা মানে কৃষির জীবনীশক্তিকে ধ্বংস করা। ফলে বৈদিক পণ্ডিতেরা যখন দেখলেন যে মাংস খাওয়ার পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে তারা সাধারণ মানুষের কাছে ঘৃণিত হয়ে পড়ছেন, তখন তারা নিজেদের খাদ্যতালিকায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে বাধ্য হলেন। তারা বলতে শুরু করলেন যে যজ্ঞের বাইরে সাধারণ গৃহস্থের জন্য মাংস খাওয়া পাপ। পরবর্তীতে এই ছাড় আরও বড় হলো; মনুস্মৃতির মতো গ্রন্থে এক অদ্ভুত তাত্ত্বিক স্ববিরোধ তৈরি হলো – একদিকে বলা হলো যজ্ঞে পশুবধ কোনো বধ নয়, আবার অন্যদিকে বলা হলো মাংস বর্জনকারী ব্যক্তি একশোটি অশ্বমেধ যজ্ঞের চেয়েও বেশি পুণ্য অর্জন করে।
নৃবিজ্ঞানী জন ই. কোর্ট (John E. Cort) জৈন অহিংসা ও খাদ্যরীতির সামাজিক প্রভাব পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে খাবার নির্বাচন প্রাচীন ভারতে সামাজিক শুদ্ধতার প্রধান মাপকাঠি হয়ে উঠেছিল (Cort, 2001)। বৈদিক ব্রাহ্মণরা তাদের হারিয়ে যাওয়া সামাজিক শ্রেষ্ঠত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য শ্রমণদের চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন। তারা মাংস পুরোপুরি পরিত্যাগ করে নিরামিষভোজী হয়ে উঠলেন এবং একেই ব্রাহ্মণ্য শুচিতার চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে ঘোষণা করলেন। যে গরু এককালে বৈদিক যজ্ঞে আহুতি দেওয়া হতো, সেই গরুই মধ্যযুগে এসে হয়ে উঠল অলঙ্ঘনীয় ও পবিত্র প্রতীক। খাদ্যাভ্যাসের এই আমূল উল্টোযাত্রা প্রাচীন বৈদিক সমাজের ওপর শ্রমণ ঐতিহ্যের বিজয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ।
উপনিষদীয় ভাবনায় শ্রমণ ধ্যানপদ্ধতি ও যোগতত্ত্বের অনুপ্রবেশ (Infiltration of Śramaṇa Meditation and Yoga into Upaniṣadic Thought)
বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীন স্তর সংহিতা ও ব্রাহ্মণ অংশে মানুষের মনোজগতের জটিল ক্রিয়াকলাপ বা ধ্যানের কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ছিল না। সেখানে ছিল দেবতাদের স্তব করা এবং যজ্ঞের অগ্নিকাণ্ডে নিয়মমাফিক ঘি ঢালা। কিন্তু বৈদিক সাহিত্যের শেষ ভাগে অর্থাৎ উপনিষদে পৌঁছালে এক আকস্মিক বুদ্ধিবৃত্তিক রূপান্তর চোখে পড়ে। বাহ্যিক যজ্ঞের বর্ণনা পেছনে ফেলে ঋষিরা হঠাৎ করেই আলোচনা করতে শুরু করেন শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি, ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ, চেতনার বিভিন্ন স্তর এবং মনের গভীর নীরবতা নিয়ে। এই রূপান্তরের পেছনে কাজ করছিল সমসাময়িক শ্রমণ ধারার আদিম ধ্যান ও মানসিক কসরতের প্রত্যক্ষ প্রভাব।
শ্রমণ সন্ন্যাসীরা বনভূমিতে বসে যে তপস্যা করতেন, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মানসিক সংকল্প বা ধ্যান (Dhyāna)। বুদ্ধের জীবনীতে দেখা যায়, তিনি বোধিলাভের আগে আলার কালাম এবং উদ্দক রামপুত্তের মতো প্রাচীন যোগীদের কাছে গিয়ে অরূপ ধ্যানের জটিল স্তরগুলো অনুশীলন করেছিলেন। শরীরকে স্থির রেখে, শ্বাসপ্রশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করে ভেতরের চৈতন্যকে পর্যবেক্ষণ করার এই প্রযুক্তি কোনো বৈদিক যজ্ঞবেদির দান ছিল না। এটি ছিল প্রাচীন পূর্ব ভারতের অবৈদিক পরিব্রাজকদের এক স্বতন্ত্র আবিষ্কার। পরবর্তীতে যখন বৈদিক সমাজের ভেতরের কিছু চিন্তাবিদ এই পদ্ধতির কার্যকারিতা উপলব্ধি করলেন, তখন তারা এটিকে বৈদিক দর্শনের নিজস্ব অঙ্গ হিসেবে সাজিয়ে নিতে শুরু করলেন।
কঠ, শ্বেতাশ্বতর এবং মৈত্রী উপনিষদের মতো মধ্যবর্তী ও পরবর্তী যুগের পাঠগুলোতে এই সমন্বয়ের ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কঠ উপনিষদে শরীরকে একটি রথ, ইন্দ্রিয়গুলোকে ঘোড়া, মনকে লাগাম এবং বুদ্ধিকে সারথির সাথে তুলনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে ইন্দ্রিয়গুলোকে বশে এনে শান্ত হওয়াই হলো যোগ (Yoga)। এই ভাষা এবং রূপকগুলো সমসাময়িক বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্যের ধ্যান বর্ণনার সাথে প্রায় হুবহু মিলে যায়। যজ্ঞের যে বাহ্যিক আগুন আগে কুশ ঘাসের ওপর জ্বালানো হতো, তাকে টেনে আনা হলো মানুষের শরীরের ভেতরে; একে বলা হলো অন্তর্যজ্ঞ বা আত্মাহুতি।
বৌদ্ধ দর্শন বিশেষজ্ঞ স্টিভেন কলিন্স (Steven Collins) প্রাচীন ভারতের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও মনস্তত্ত্বের বিকাশ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে শ্রমণদের আত্মাহীনতার তত্ত্ব এবং উপনিষদীয় পরমাত্মার ধারণার মধ্যে এক নিরন্তর বিতর্ক চলছিল (Collins, 1982)। দার্শনিক ম্যাথিউ টি. কাপস্টাইন (Matthew T. Kapstein) এই আন্তঃদার্শনিক লেনদেন তুলে ধরে প্রমাণ করেছেন যে কীভাবে প্রতিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন করতে গিয়ে উভয় পক্ষই একে অপরের পরিভাষা ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ধার করেছিল (Kapstein, 2001)। উপনিষদের চিন্তাবিদেরা শ্রমণদের ধ্যানের প্রযুক্তি গ্রহণ করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তার ভেতরে পুরে দিয়েছিলেন তাদের নিজস্ব বেদান্তবাদী ব্রহ্মের ধারণা। ফলে যোগ ও ধ্যান বৈদিক ভাবধারার স্থায়ী অঙ্গে পরিণত হয়েছিল।
অর্থনৈতিক মিথস্ক্রিয়া: বাণিজ্য, দানব্যবস্থা ও মঠতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ (Economic Interactions: Trade, Dāna Systems, and Monastic Institutionalization)
শ্রমণ আন্দোলনের অভূতপূর্ব সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তৎকালীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সাথে তাদের এক নিবিড় ও বাস্তববাদী মৈত্রী। প্রাচীন বৈদিক অর্থনীতি ছিল প্রধানত গৃহকেন্দ্রিক এবং স্থানীয় বিনিময়ের ওপর নির্ভরশীল। বৈদিক পুরোহিতদের উপার্জনের প্রধান উৎস ছিল যজ্ঞশেষে যজমানের কাছ থেকে নেওয়া দক্ষিণা (Dakṣiṇā), যা সাধারণ মানুষের কাছে এক ধরণের আর্থিক বোঝা হয়ে উঠেছিল। এর বিপরীতে বৌদ্ধ ও জৈনরা অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এক সম্পূর্ণ নতুন নৈতিক রূপ দিয়েছিলেন, যার নাম দান (Dāna)। দান কোনো নির্দিষ্ট আচারের পারিশ্রমিক ছিল না; তা ছিল সমাজের সৎ ও ত্যাগী মানুষদের প্রতি বিত্তবানদের স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক বদান্যতা।
বিশেষ করে সার্থবাহ বা দীর্ঘ দূরত্বের বণিকদের সাথে শ্রমণ সংঘগুলোর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। বণিকেরা যখন শত শত মাইল দূরবর্তী অঞ্চলে পণ্য নিয়ে যেতেন, তখন ডাকাত ও প্রতিকূল প্রকৃতির হাত থেকে বাঁচার জন্য তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন হতো। এই বাণিজ্যপথগুলোর পাশে – যেমন উত্তরাখণ্ড বা দাক্ষিণাপথগামী বড় সড়কগুলোতে – শ্রমণদের বিহার (Vihāra) ও মঠগুলো গড়ে উঠতে শুরু করে। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের মঠগুলো কেবল ধ্যানের জায়গা ছিল না; এগুলো হয়ে উঠেছিল তথ্য আদান-প্রদান, চিকিৎসাসেবা এবং বণিকদের অর্থ সঞ্চয়ের এক নিরাপদ প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্র। ঐতিহাসিক জোনাথন এ. সিল্ক (Jonathan A. Silk) প্রাচীন ভারতীয় বৌদ্ধ মঠগুলোর অর্থনৈতিক দলিল বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই প্রতিষ্ঠানগুলো সুদের কারবার এবং বাণিজ্য বিনিয়োগের সাথে জড়িয়ে পড়েছিল (Silk, 2008)।
বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম বাণিজ্যের জন্য নেওয়া ঋণ বা সুদের কারবারকে কখনো পাপ বলে গণ্য করেনি, যা বৈদিক রক্ষণশীল সাহিত্যে চরমভাবে নিন্দিত হয়েছিল। মনুস্মৃতিতে সুদের ব্যবসাকে নীচ পেশা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, বৌদ্ধ সাহিত্যে ব্যবসায়ের মাধ্যমে ন্যায্য লাভ করাকে এক প্রশংসনীয় গুণ হিসেবে দেখা হয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ী শ্রেণি তাদের উদ্বৃত্ত সম্পদের একটি বড় অংশ শ্রমণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঢেলে দিয়েছিল। পাথরে খোদাই করা প্রাচীন স্তূপের লিপিগুলোতে দেখা যায় যে সাধারণ তাঁতি, সুগন্ধি ব্যবসায়ী, কামার এবং নারী বণিকেরা পর্যন্ত এই বৌদ্ধ ও জৈন স্থাপত্য নির্মাণের জন্য অর্থ দান করছেন।
ধর্মের সমাজতাত্ত্বিক অ্যান হায়ারম্যান (Ann Heirman) মঠতন্ত্রের বিস্তার সংক্রান্ত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে এই প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য বৈদিক পুরোহিত সমাজকে এক কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে ফেলে দিয়েছিল (Heirman & Bumbacher, 2007)। রাজারা এবং ধনী শেঠিরা যখন পুরোহিতদের যজ্ঞ ছেড়ে শ্রমণ মঠগুলোতে জমি ও অর্থ দান করতে শুরু করলেন, তখন বৈদিক পণ্ডিতেরাও নিজেদের কৌশল বদলাতে বাধ্য হলেন। তারা স্মৃতিশাস্ত্রগুলোতে দানের এক বিশাল মহিমা তৈরি করলেন। বলা হলো যে ব্রাহ্মণকে ভূমি বা গরু দান করলে অসীম পুণ্য লাভ হয়। শ্রমণদের তৈরি করা মঠ ও ট্রাস্টের ধারণা পরবর্তীতে হিন্দু সমাজের নিজস্ব মঠ ও মন্দির ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে গৃহীত হয়েছিল।
সমন্বিত সমাজের উদ্ভব: আশ্রমব্যবস্থা ও ধ্রুপদী ব্রাহ্মণ্যবাদের নবজন্ম (Emergence of a Syncretic Society: The Āśrama System and the Rebirth of Classical Brahmanism)
শ্রমণ আন্দোলনের এই বহুমুখী অভিঘাতের মুখে প্রাচীন বৈদিক ব্রাহ্মণ্যবাদ যদি কেবল গোঁড়ামি আঁকড়ে বসে থাকত, তবে তা হয়তো ইতিহাসের পাতা থেকে চিরতরে মুছে যেত। কিন্তু ব্রাহ্মণ্য সমাজের তাত্ত্বিকেরা এক অসাধারণ নমনীয়তা ও কৌশলগত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন। তারা শ্রমণদের সমস্ত বৈপ্লবিক ও আকর্ষণীয় উপাদানগুলোকে একে একে নিজেদের শাস্ত্রীয় কাঠামোর ভেতর আত্মস্থ করে নিতে শুরু করলেন। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে চূড়ান্ত ও সফল প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ হলো চতুরাশ্রম (Caturāśrama) ব্যবস্থার উদ্ভাবন।
ব্রাহ্মণ্য সমাজ বুঝতে পেরেছিল যে সন্ন্যাসের আকাঙ্ক্ষাকে পুরোপুরি দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই তারা সন্ন্যাসকে ধ্বংস না করে তাকে একটি সুশৃঙ্খল কালানুক্রমিক শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলল। ধর্মসূত্র ও স্মৃতিশাস্ত্রে বিধান দেওয়া হলো যে একজন মানুষকে প্রথমে ব্রহ্মচর্য পালন করে বিদ্যা অর্জন করতে হবে, তারপর গৃহস্থ হয়ে বিয়ে করে সন্তান উৎপাদন ও সামাজিক ঋণ শোধ করতে হবে, এরপর বাণপ্রস্থে গিয়ে সমাজ থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে সরাতে হবে, এবং সবশেষে সমস্ত জাগতিক কর্তব্য সম্পন্ন করে বার্ধক্যে গিয়ে সন্ন্যাস বা মোক্ষের সন্ধান করতে হবে। এই চতুর সামাজিক বিন্যাসের মাধ্যমে শ্রমণদের সেই অনিয়ন্ত্রিত ও অকাল সন্ন্যাসের পথকে বন্ধ করে দেওয়া হলো। একজন যুবক যাতে হুট করে ঘর ছেড়ে সন্ন্যাসী হয়ে সামাজিক উৎপাদন বন্ধ না করে দেয়, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলো।
একই সাথে গড়ে তোলা হলো বর্ণাশ্রমধর্ম (Varṇāśramadharma)-এর এক দুর্ভেদ্য মতাদর্শিক দুর্গ। শ্রমণরা যে জন্মভিত্তিক সমতার কথা বলছিলেন, তাকে পাশ কাটিয়ে সমাজের ওপর তলার তিনটি বর্ণকে বৈদিক সংস্কারের বন্ধনে অটুট রাখা হলো এবং শূদ্রদের বাদ দিয়ে এক ধরণের অভ্যন্তরীণ সামাজিক সংহতি তৈরি করা হলো। নৃতাত্ত্বিক মাইকেল কারিথার্স (Michael Carrithers) প্রাচীন ভারতের সন্ন্যাসীদের এই সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই ত্যাগী ঐতিহ্য শেষ পর্যন্ত সমাজের মূলধারাকে ধ্বংস করার বদলে তাকে আরও বেশি স্থিতিশীল হতে বাধ্য করেছিল (Carrithers, 1983)। বৈদিক ধর্ম তার প্রাচীন পশুপালক রূপটি হারিয়ে ফেলে এক জটিল, অহিংস এবং দর্শননির্ভর নতুন রূপ ধারণ করল, যাকে আধুনিক ইতিহাসবিদেরা ধ্রুপদী ব্রাহ্মণ্যবাদ বা হিন্দুধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শ্রমণ ঐতিহ্য এবং বৈদিক সমাজের এই ঐতিহাসিক সংঘাত ছিল প্রাচীন ভারতের সবচেয়ে উর্বর বুদ্ধিবৃত্তিক অধ্যায়। এটি কোনো একতরফা বিজয় বা পরাজয়ের কাহিনী নয়, বরং তা ছিল দুটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক স্রোতের পারস্পরিক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এক সমন্বিত সভ্যতার জন্ম নেওয়ার ইতিহাস। শ্রমণরা বৈদিক সমাজকে পশুবলি ও অন্ধ আচারবাদ থেকে টেনে বের করে এনেছিল; আর বৈদিক ঐতিহ্য শ্রমণদের নৈরাশ্যবাদী সংসারত্যাগ ও কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনাকে পারিবারিক দায়িত্ব ও সামাজিক শৃঙ্খলার বাঁধনে বেঁধে নিয়েছিল। এই ঐতিহাসিক বোঝাপড়ার ফলেই কর্ম, সংসার, অহিংসা এবং মুক্তির মতো প্রত্যয়গুলো আজ সমগ্র ভারতীয় সভ্যতার যৌথ সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে পরিণত হতে পেরেছে।
বৈদিক ধর্মের দার্শনিক প্রতিদ্বন্দ্বী (Philosophical Rivals of the Vedic Religion): বৌদ্ধ, জৈন, আজীবিক ও চার্বাক সম্প্রদায়
আদি বৌদ্ধধর্ম ও অনাত্মাবাদ: বৈদিক নিত্যসত্তার অস্বীকৃতি (Early Buddhism and Anattāvāda: The Rejection of Vedic Eternalism)
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গঙ্গা অববাহিকার বৌদ্ধিক ময়দানে বৈদিক ধর্মের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল বৌদ্ধধর্ম। গৌতম বুদ্ধ যে ধর্মীয় ও দার্শনিক বিকল্পটি হাজির করেছিলেন, তা বৈদিক যাগযজ্ঞের বাহ্যিক আচারকে যেমন আঘাত করেছিল, তেমনি বৈদিক সাহিত্যের মূল অধিবিদ্যক ভিত্তিকেও সরাসরি নাকচ করে দিয়েছিল। উপনিষদের ঋষিরা যখন ঘোষণা করছিলেন যে এই পরিবর্তনশীল মহাবিশ্বের অন্তরালে এক শাশ্বত, অপরিবর্তনশীল ও নিত্য সত্তা রয়েছে – যাকে তারা নাম দিয়েছিলেন আত্মন (Ātman) বা ব্রহ্ম (Brahman) – বুদ্ধ তখন সেই ধারণার শিকড়েই কুঠারাঘাত করলেন। তিনি প্রচার করলেন অনাত্তাবাদ (Anattāvāda) বা আত্মাহীনতার এক বৈপ্লবিক দর্শন।
বৌদ্ধ মনস্তত্ত্বে মানুষকে কোনো স্থায়ী আত্মা বা অবিনশ্বর চৈতন্যের অধিকারী সত্তা হিসেবে দেখা হয়নি। বুদ্ধের মতে, মানুষ আসলে পাঁচটি পরিবর্তনশীল উপাদানের এক নিরবচ্ছিন্ন সমাহার মাত্র, যাকে বলা হয় পঞ্চস্কন্ধ (Pañcaskandha)। এগুলো হলো রূপ বা শারীরিক উপাদান, বেদনা বা অনুভূতি, সংজ্ঞা বা প্রত্যক্ষণ, সংস্কার বা মানসিক প্রবণতা, এবং বিজ্ঞান বা বিষয়চেতনা। এই পাঁচটি উপাদানের কোনোটিই স্থায়ী নয়; নদীর প্রবাহের মতো প্রতি মুহূর্তে এগুলো ভাঙছে এবং নতুন করে তৈরি হচ্ছে। ফলে মানুষ যাকে নিজের চিরন্তন ‘আমি’ বলে কল্পনা করে, তা আসলে এক গভীর মানসিক বিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। এই অনাত্মার ধারণার পাশাপাশি বুদ্ধ নিয়ে এলেন অনিত্য (Anicca) এবং প্রতীত্যসমুৎপাদ (Pratītyasamutpāda) বা নির্ভর উৎপাদনের কার্যকারণ নিয়ম। তিনি দেখালেন যে কোনো সর্বশক্তিমান ঈশ্বর বা বৈদিক দেবতাদের ইচ্ছা ছাড়াই এক ঘটনার ওপর নির্ভর করে আরেক ঘটনা স্বাভাবিক নিয়মে ঘটে চলেছে।
বৈদিক যজ্ঞের মূল প্রেরণা ছিল দেবতাদের কাছ থেকে পার্থিব সমৃদ্ধি বা পরলোকে স্বর্গ লাভ করা। কিন্তু বৌদ্ধ দর্শন প্রমাণ করতে চাইল যে স্বর্গ বা যজ্ঞের ফল সবই অস্থায়ী এবং তা মানুষের দুঃখের কোনো চূড়ান্ত সমাধান দিতে পারে না। মানুষের জীবনের মূল সংকট হলো তৃষ্ণা (Taṇhā) বা অন্ধ আসক্তি, যা থেকে সমস্ত দুঃখের জন্ম হয়। এই আসক্তি দূর করার জন্য কোনো পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ বা পশুবলির প্রয়োজন নেই; এর জন্য দরকার ব্যক্তিগত নৈতিক পরিশুদ্ধি এবং মানসিক সচেতনতা, যাকে বুদ্ধ সংজ্ঞায়িত করেছিলেন আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ (Noble Eightfold Path) হিসেবে। সেখানে সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প ও সম্যক কর্মের মতো নৈতিক অনুশীলনকে সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়েছিল।
বৌদ্ধ পণ্ডিত ওয়ালপোল রাহুল (Walpola Rahula) আদি বৌদ্ধধর্মের এই মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে বুদ্ধের শিক্ষা কোনো অন্ধ বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না, বরং তা ছিল মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার এক নিরাসক্ত ব্যবচ্ছেদ (Rahula, 1959)। দার্শনিক ফ্রাঙ্ক জে. হফম্যান (Frank J. Hoffman) বৌদ্ধ জ্ঞানতত্ত্বের যৌক্তিক দিকটি আলোচনা করে উল্লেখ করেছেন যে কীভাবে বৌদ্ধরা প্রমাণ হিসেবে বৈদিক শ্রুতিকে নাকচ করে মানুষের বুদ্ধি ও পর্যবেক্ষণকে প্রমাণের মর্যাদা দিয়েছিলেন (Hoffman, 1987)। অন্যদিকে জেমস পি. ম্যাকডারমট (James P. McDermott) আদি বৌদ্ধধর্মে কর্মের রূপান্তর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে বৈদিক আচারের যান্ত্রিক কর্মের বদলে বৌদ্ধরা কর্মকে ব্যক্তির মানসিক ইচ্ছার সাথে যুক্ত করে সম্পূর্ণ নৈতিক রূপ দিয়েছিলেন (McDermott, 1984)। বৌদ্ধদের তৈরি করা এই সুসংহত দর্শন বৈদিক পুরোহিততন্ত্রের মহাজাগতিক একাধিপত্যকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল।
জৈনধর্ম, অনেকান্তবাদ ও কায়িক কৃচ্ছ্রসাধন: চরম তপস্যার বিকল্প মার্গ (Jainism, Anekāntavāda, and Bodily Austerities: The Alternative Path of Extreme Asceticism)
বৈদিক ঐতিহ্যের সমান্তরালে প্রাচীন ভারতে বিকশিত অবৈদিক শ্রমণ ধারাগুলোর মধ্যে নির্গ্রন্থ পরম্পরা চব্বিশতম তীর্থঙ্কর বর্ধমান মহাবীর (Vardhamāna Mahāvīra)-এর নেতৃত্বে এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও শৃঙ্খলাবদ্ধ রূপে আত্মপ্রকাশ করে। এই দর্শন পরিচিত জৈনধর্ম (Jainism) নামে। বৈদিক ব্রাহ্মণদের যাগযজ্ঞ ও সমাজতত্ত্বের বিরুদ্ধে জৈনদের লড়াই ছিল আপসহীন। বৌদ্ধরা যেখানে মধ্যম পথ বেছে নিয়েছিল, জৈনরা সেখানে বেছে নিয়েছিল শরীরকে চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে শুদ্ধ করার এক কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনার পথ।
জৈন দর্শনের বিশ্বতত্ত্ব ছিল অত্যন্ত বাস্তববাদী এবং বহুত্ববাদী। তারা জগতকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করেছিলেন: চেতন সত্তা বা জীব (Jīva) এবং অচেতন জড় উপাদান বা অজীব (Ajīva)। বৈদিক অদ্বৈতবাদের মতো তারা সব আত্মাকে এক পরম সত্তার অংশ বলে মনে করতেন না; তাদের মতে মহাবিশ্বে অনন্ত ও স্বতন্ত্র আত্মার অস্তিত্ব রয়েছে। জৈনদের দৃষ্টিতে এমনকি উদ্ভিদ, জল, বাতাস ও মাটির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার মধ্যেও সূক্ষ্ম জীবনের উপস্থিতি রয়েছে। এই গভীর জৈবিক সচেতনতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল চরমতম অহিংসা (Ahiṃsā) ব্রত। বৈদিক যজ্ঞে যখন হাজার হাজার পশুর রক্ত ঝরিয়ে দেবতাদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা চলত, জৈনরা তখন বাতাসের ক্ষুদ্রতম জীবটি যাতে শ্বাস নেওয়ার সময় ধ্বংস না হয়, সেজন্য মুখে কাপড় বেঁধে চলাচল করার বিধান দিয়েছিলেন।
দার্শনিক তর্কের ক্ষেত্রে জৈনরা ভারতীয় চিন্তাজগতে এক অনন্য অবদান রেখেছিলেন, যা পরিচিত অনেকান্তবাদ (Anekāntavāda) এবং স্যাদ্বাদ (Syādvāda) নামে। বৈদিক পণ্ডিতেরা যখন দাবি করতেন যে বেদই পরম ও চূড়ান্ত সত্য এবং তাদের কথাই একমাত্র অভ্রান্ত, জৈনরা এই গোঁড়ামির বিপরীতে বহুমাত্রিক আপেক্ষিকতার তত্ত্ব হাজির করলেন। অনেকান্তবাদের মূল কথা হলো, যেকোনো বাস্তবতার অজস্র দিক রয়েছে এবং কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সেই অসীম সত্যের কেবল একটি নির্দিষ্ট অংশ দেখা সম্ভব। অন্ধের হস্তী দর্শনের বিখ্যাত রূপকের মাধ্যমে তারা বোঝাতে চাইলেন যে সবাই নিজের সীমিত অভিজ্ঞতা দিয়ে সত্যের এক একটি ভগ্নাংশ প্রত্যক্ষ করে মাত্র। এই জ্ঞানতত্ত্ব বৈদিক শাস্ত্রের নিরঙ্কুশ ও একমাত্রিক কর্তৃত্বকে এক চরম দার্শনিক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
ধর্মতত্ত্ববিদ উইলিয়াম জে. জনসন (W. J. Johnson) প্রাচীন জৈনধর্মে কর্মের বন্ধন এবং আত্মার মুক্তি নিয়ে বিশদ গবেষণা করেছেন (Johnson, 1995)। তিনি দেখিয়েছেন যে জৈনদের কাছে কর্ম কোনো বিমূর্ত শক্তি ছিল না; তা ছিল জড় পরমাণু যা আত্মার সাথে জড়িয়ে গিয়ে তার স্বাভাবিক উজ্জ্বলতাকে ঢেকে ফেলে। এই কর্মবন্ধন থেকে মুক্তি পেতে হলে তীব্র শারীরিক তপস্যা বা তপস (Tapas) এবং অনশন করে জীবন বিসর্জন দেওয়ার মতো সাল্লেখনা (Sallekhanā) ব্রতের প্রয়োজন হতো। ভারততাত্ত্বিক কোলেট কেইলক্স (Colette Caillat) প্রাচীন জৈন সন্ন্যাসীদের প্রায়শ্চিত্ত ও আচারিক নিয়মাবলি পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই সম্প্রদায় বৈদিক যাগযজ্ঞের বাইরে নিজস্ব আত্মশুদ্ধির এক নিশ্ছিদ্র কাঠামো গড়ে তুলেছিল (Caillat, 1975)। দার্শনিক জয়েন্দ্র সোনি (Jayandra Soni) দেখিয়েছেন যে জৈনদের আপেক্ষিকতাবাদী যুক্তিপদ্ধতি তৎকালীন বৈদিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক অত্যন্ত পরিশীলিত বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল (Soni, 2000)।
আজীবিক সম্প্রদায় ও মক্খলি গোসাল: নিয়তিবাদের চরম আঘাত (The Ājīvika Sect and Makkhali Gosāla: The Radical Challenge of Fatalism)
বৌদ্ধ ও জৈনদের পাশাপাশি খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে উত্তর ভারতে আরেকটি বিশাল ও প্রভাবশালী অবৈদিক সম্প্রদায়ের দাপট ছিল, যা ইতিহাসে আজীবিক (Ājīvika) সম্প্রদায় নামে পরিচিত। এই ধারার প্রধান তাত্ত্বিক ও নেতা ছিলেন মক্খলি গোসাল (Makkhali Gosāla)। গোসাল এক সময় মহাবীরের সাথে দীর্ঘকাল তপস্যা করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে গভীর মতপার্থক্যের কারণে তিনি সম্পূর্ণ নিজস্ব এক চরম মতবাদ প্রচার করতে শুরু করেন। বৌদ্ধ ও জৈন উভয় সাহিত্যের পাতাতেই আজীবিকদের তীব্র সমালোচনা দেখা যায়, যা প্রমাণ করে যে তৎকালীন সমাজে এই সম্প্রদায়টি অন্য সমস্ত মতবাদের জন্য কতটা বড় এক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিল।
আজীবিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল চরম ও আপসহীন নিয়তিবাদ (Niyativāda)। গোসাল প্রচার করেছিলেন যে মানুষের কোনো কর্ম, ইচ্ছা বা ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার কোনো মূল্য নেই। মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনা, মানুষের জন্ম, সুখ, দুঃখ এবং এমনকি তার মোক্ষলাভ পর্যন্ত সবকিছুই এক অমোঘ প্রাকৃতিক বিধান বা নিয়তি (Niyati) দ্বারা পূর্বনির্ধারিত। তিনি মানুষের নৈতিক সংকল্প বা পুরুষকার (Puruṣakāra)-এর ধারণাকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন। গোসালের একটি প্রসিদ্ধ উপমা ছিল: কেউ যদি একটি সুতোর বলকে উঁচু স্থান থেকে নিচে ফেলে দেয়, তবে সেই সুতোটি যেমন নিজের গতিতেই পুরোটা খুলে যাবে এবং যতক্ষণ সুতো অবশিষ্ট থাকবে ততক্ষণ তাকে থামানো যাবে না – ঠিক তেমনি প্রতিটি জীবের সংসারের চক্রে ৮৪ লক্ষ মহাকল্প কাল আবর্তন করা পূর্বনির্ধারিত। এর পূর্বে শত যজ্ঞ করেও কেউ মুক্তি পেতে পারে না, আবার কোনো পাপের কারণেও এই সময় বাড়তে পারে না।
এই নিয়তিবাদ তৎকালীন সমাজব্যবস্থার ওপর এক দ্বিমুখী আঘাত হেনেছিল। একদিকে তা বৈদিক যাগযজ্ঞের সমস্ত উপযোগিতাকে এক নিমেষে অর্থহীন করে দিয়েছিল। যদি সবকিছু নিয়তি দিয়েই ঠিক করা থাকে, তবে পুরোহিতকে দক্ষিণা দিয়ে যজ্ঞ করা বা দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করার কোনো যৌক্তিকতাই অবশিষ্ট থাকে না। অন্যদিকে, বৌদ্ধ ও জৈনদের যে নৈতিক কর্মবাদ – যেখানে বলা হতো ভালো কাজ করলে ভালো ফল হবে – সেই নীতিকেও গোসালের দর্শন সরাসরি উপহাস করেছিল। পাপ বা পুণ্য বলে কিছু নেই; মানুষ কেবল নিয়তির হাতের এক অনুভূতিহীন খেলার পুতুল মাত্র।
আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, তাত্ত্বিক দিক থেকে নিয়তিবাদী হওয়া সত্ত্বেও আজীবিক সন্ন্যাসীরা চরম শারীরিক কৃচ্ছ্রসাধন করতেন। তারা সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে চলাফেরা করতেন, মাটির পাত্রের বদলে হাতের তালুতে খাবার গ্রহণ করতেন এবং পাথরের সংকীর্ণ গুহায় দিনের পর দিন উপবাস করতেন। প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাবিদ্যা ও সন্ন্যাস ধারার ইতিহাসবিদ কেনেথ জি. জিস্ক (Kenneth G. Zysk) দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই পরিব্রাজকেরা গ্রামীণ সমাজের গভীরে এক ধরণের ভবিষ্যদ্বাণী ও লোকচিকিৎসার মাধ্যমে নিজেদের শিকড় গেড়েছিলেন (Zysk, 1991)। মৌর্য সম্রাট অশোক এবং তার পৌত্র দশরথ এই আজীবিকদের সাধনার জন্যই বিহারের বারবার ও নাগার্জুন পাহাড়ে সুবিশাল পাথুরে গুহা উৎসর্গ করেছিলেন। দার্শনিক পল জে. গ্রিফিথস (Paul J. Griffiths) উল্লেখ করেছেন যে বৈদিক আচারবাদ এবং শ্রমণ নৈতিকতা – উভয় ধারার বিরুদ্ধে আজীবিকদের এই কঠোর অদৃষ্টবাদ ছিল প্রাচীন ভারতীয় চিন্তার ইতিহাসের এক চরম কিন্তু অনিবার্য বুদ্ধিবৃত্তিক পরীক্ষা (Griffiths, 1986)।
চার্বাক ও লোকায়ত দর্শন: প্রত্যক্ষপ্রমাণ ও বৈদিক পরলোকের খণ্ডন (Cārvāka and Lokāyata Philosophy: Pratyakṣa and the Refutation of the Vedic Afterlife)
প্রাচীন ভারতে বৈদিক ভাবাদর্শ ও ধর্মীয় ভণ্ডামির ওপর সবচেয়ে নির্দয়, সাহসী ও প্রত্যক্ষ যুক্তিবাদী আক্রমণটি এসেছিল যে ধারা থেকে, তা হলো চার্বাক (Cārvāka) বা লোকায়ত (Lokāyata) দর্শন। পৌরাণিক ঐতিহ্যে এই দর্শনের আদি গুরু হিসেবে ঋষি বৃহস্পতি (Bṛhaspati)-র নাম উল্লেখ করা হয়, তবে বৌদ্ধ যুগের আদি পরিব্রাজকদের মধ্যে অজিত কেশকম্বলী (Ajita Kesakambalī) ছিলেন এই ধারার সবচেয়ে স্পষ্ট ঐতিহাসিক মুখপাত্র। শ্রমণ আন্দোলনের অন্যান্য ধারা যেখানে মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম বা নির্বাণের মতো অতিলৌকিক লক্ষ্যের পেছনে ছুটছিল, চার্বাকেরা সেখানে মানুষকে ফিরিয়ে এনেছিলেন এই দৃশ্যমান পৃথিবীর বাস্তব মাটিতে।
চার্বাক দর্শনের জ্ঞানতত্ত্ব ছিল অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন। তারা ঘোষণা করেছিলেন যে জ্ঞানের একমাত্র নির্ভরযোগ্য উৎস বা প্রমাণ হলো প্রত্যক্ষ (Pratyakṣa) বা ইন্দ্রিয়ানুভূতি। মানুষের চোখ, কান বা ত্বক দিয়ে যা সরাসরি অনুভব করা যায় না, তার অস্তিত্ব স্বীকার করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তারা অনুমান প্রমাণকেও অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দেখতেন এবং বৈদিক শব্দপ্রমাণ (Śabdapramāṇa) বা আপ্তবাক্যের দাবিকে পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছিলেন। কারণ শব্দের সত্যতা যাচাই করতেও শেষ পর্যন্ত ইন্দ্রিয়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ওপরই নির্ভর করতে হয়। ফলে যা কিছু ইন্দ্রিয়ের অতীত – যেমন ঈশ্বর, স্বর্গ, নরক, পাপ, পুণ্য বা পরলোক – সেগুলোকে চার্বাকেরা মানুষের অলীক কল্পনা এবং অন্ধবিশ্বাস বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
তাদের বিশ্বতত্ত্ব ছিল খাঁটি ভূতবাদ (Bhūtavāda) বা বস্তুবাদ। চার্বাকদের মতে, এই জগৎ কেবল চারটি মৌলিক প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে গঠিত: ক্ষিতি বা মাটি, অপ বা জল, তেজ বা আগুন, এবং মরুৎ বা বাতাস। মহাবিশ্বে আকাশের কোনো বাস্তব উপাদানগত অস্তিত্ব নেই। মানুষ বা যেকোনো প্রাণীদেহ এই চারটি জড় উপাদানের বিশেষ সংমিশ্রণ ছাড়া আর কিছুই নয়। তাহলে মানুষের চেতনা কোথা থেকে আসে? চার্বাকদের বিখ্যাত যুক্তি ছিল: বিভিন্ন জড় উপাদান যখন একটি নির্দিষ্ট জৈবিক নিয়মে একত্রিত হয়, তখন তা থেকে চেতনার জন্ম নেয়। ঠিক যেমন সুপারি, পান ও চুন আলাদাভাবে লাল নয়, কিন্তু একসাথে চিবোলে তা থেকে লাল রঙের সৃষ্টি হয়; কিংবা গুড় ও শস্য পচিয়ে রাখলে তা থেকে নিজে নিজেই মাদকতা তৈরি হয়। মৃত্যুর সাথে সাথে যখন শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ভেঙে মাটিতে ও জলে মিশে যায়, তখন সেই জৈবিক চেতনারও চিরতরে সমাপ্তি ঘটে। ফলে মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্ব থাকার কোনো সুযোগ নেই।
বৈদিক পুরোহিততন্ত্রের বিরুদ্ধে চার্বাকদের ভাষা ছিল তীব্র ব্যঙ্গাত্মক ও আক্রমণাত্মক। মাধবাচার্যের সর্বদর্শনসংগ্রহে সংরক্ষিত চার্বাক শ্লোকে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে বেদের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য নেই, কারণ তা স্ববিরোধ ও পুনরুক্তিতে ভরা। তারা ঘোষণা করেছিলেন যে বেদের রচয়িতা হলো “ভণ্ড, ধূর্ত ও নিশাচর” (Bhaṇḍa, dhūrta, niśācara) – অর্থাৎ প্রতারক ও ধান্দাবাজ কিছু মানুষ। যজ্ঞে পশুবলি দিলে সেই পশু যদি সরাসরি স্বর্গে যায়, তবে যজমান কেন তার নিজের বৃদ্ধ পিতাকে যজ্ঞের আগুনে ফেলে স্বর্গে পাঠিয়ে দেয় না? শ্রাদ্ধের নামে মৃত পূর্বপুরুষকে খাবার খাওয়ানোর ধারণাকে তারা ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, যদি ঘরে বসে দেওয়া চাল বা তিল পরলোকে থাকা মৃত মানুষের পেটে পৌঁছাতে পারে, তবে দূরদেশে যাওয়া প্রবাসীদের সাথে খাবার দেওয়ার দরকার কী, বাড়ির লোক এখানে খেলেই তো তার পেট ভরে যাওয়ার কথা! চার্বাক গবেষক রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য (Ramkrishna Bhattacharya) এই সাহিত্যের ঐতিহাসিক পাঠোদ্ধার করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই চিন্তাধারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্রাহ্মণ্য ভাববাদের এক বিকল্প সেক্যুলার কণ্ঠস্বর হিসেবে টিকে ছিল (Bhattacharya, 2011)। দার্শনিক প্রদীপ পি. গোখলে (Pradeep P. Gokhale) লোকায়ত দর্শনের নৈতিক দিকটি তুলে ধরে প্রমাণ করেছেন যে চার্বাকরা কেবল উচ্ছন্ন ভোগবাদী ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন যুক্তিবাদী এক ধারা যারা মানুষকে ধর্মের অলীক ভয় থেকে মুক্ত করে বর্তমান জীবনকে মর্যাদা দিতে শিখিয়েছিল (Gokhale, 2015)।
অক্রিয়াবাদ, অজ্ঞেয়বাদ ও অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী ধারা: নৈতিকতার বিতর্ক (Akriyāvāda, Agnosticism, and Other Rival Streams: Debates on Morality)
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের বৌদ্ধিক মানচিত্র কেবল বৌদ্ধ, জৈন বা চার্বাকদের মতো বড় বড় সংগঠনেই সীমাবদ্ধ ছিল না; সেখানে আরও বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র চিন্তাবিদ ছিলেন, যাদের প্রত্যেকেই বৈদিক মূল্যবোধের ওপর ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে আঘাত হানছিলেন। পালি সাহিত্যের বিখ্যাত সামঞ্ঞফলসুত্ত (Sāmaññaphalasutta)-তে এমন ছয়জন প্রখ্যাত শ্রমণ গুরুর বিশদ বিবরণ রয়েছে। এই বিবরণীগুলো প্রমাণ করে যে সেই যুগে প্রথাগত নৈতিকতা ও সামাজিক শৃঙ্খলার ধারণাগুলো কত গভীর প্রশ্নের মুখে পড়েছিল।
এদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিলেন পূরণ কস্সপ (Pūraṇa Kassapa), যিনি প্রচার করেছিলেন অক্রিয়াবাদ (Akriyāvāda)। কস্সপের বক্তব্য ছিল যে মানুষের কাজের কোনো নৈতিক পরিণতি বা ফল নেই। কেউ যদি কাউকে হত্যা করে, অঙ্গচ্ছেদ করে, চুরি করে, ডাকাতি করে বা পরস্ত্রী গমন করে, তবে তার কোনো পাপ হয় না। আবার একইভাবে কেউ যদি দান করে, ইন্দ্রিয় দমন করে এবং সত্য কথা বলে, তবে তারও কোনো পুণ্য হয় না। গঙ্গার দক্ষিণ তীরের সমস্ত মানুষকে যদি কেউ কেটে টুকরো টুকরো করে একটি মাংসের স্তূপ বানিয়ে ফেলে, তাহলেও তার কোনো পাপের স্পর্শ লাগবে না। এই তত্ত্ব বৈদিক যজ্ঞের সমস্ত পুণ্যতত্ত্ব এবং বর্ণাশ্রম ধর্মের নৈতিক বাধ্যবাধকতাকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলেছিল। কর্মের যদি কোনো ফলই না থাকে, তবে ধর্মাচরণের সামাজিক প্রয়োজনটাই ভিত্তিহীন হয়ে যায়।
আরেকজন প্রভাবশালী চিন্তাবিদ ছিলেন পকুঢ কচ্চায়ন (Pakudha Kaccāyana)। তিনি সাতটি চিরন্তন, অবিনশ্বর ও স্থির উপাদানের এক অদ্ভুত পরমাণুবাদী তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিলেন। এই সাতটি উপাদান হলো: মাটি, জল, আগুন, বাতাস, সুখ, দুঃখ এবং জীবন। কচ্চায়নের মতে, এই উপাদানগুলো কেউ তৈরি করেনি এবং এদের কোনো পরিবর্তন বা বিনাশ সম্ভব নয়। তারা একে অপরের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। ফলে বাস্তবে কোনো মানুষ কাউকে হত্যা করতে পারে না বা কাউকে ভালোবাসতেও পারে না। কেউ যখন ধারালো তলোয়ার দিয়ে আরেকজনের মাথা কেটে ফেলে, তখন আসলে কেউ কাউকে মারে না; তলোয়ারটি কেবল সেই সাতটি উপাদানের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান দিয়ে চলে যায় মাত্র। এই চরম নৈর্ব্যক্তিক বস্তুবাদ বৈদিক ধর্মের পাপ-পুণ্যের বিচারকে এক নির্মম বিমূর্ততায় পরিণত করেছিল।
অন্যদিকে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক সংশয়বাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সঞ্জয় বেলট্ঠিপুত্ত (Sañjaya Belaṭṭhiputta)। তিনি ছিলেন চরম অজ্ঞেয়বাদী বা অনিশ্চয়তাবাদী, যাকে বৌদ্ধ সাহিত্যে ব্যঙ্গ করে অমরবিক্ষেপবাদ (Amarāvikkhepavāda) বা পিচ্ছিল ইল মাছের মতো পিছলে যাওয়া মতবাদ বলা হতো। সঞ্জয় কোনো প্রশ্নেরই নিশ্চিত হ্যাঁ-সূচক বা না-সূচক উত্তর দিতেন না। তাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হতো পরলোক আছে কি না, তিনি বলতেন: “আমি বলি না যে পরলোক আছে, আবার এও বলি না যে পরলোক নেই; আমি এও বলি না যে তা অন্যরকম, আবার এটাও বলি না যে তা একেবারেই নেই।” তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে মানুষের বুদ্ধি দিয়ে পরকাল বা আত্মার মতো অদৃশ্য বিষয়গুলোর নিশ্চিত সত্যতা নির্ণয় করা অসম্ভব। কোনো অন্ধ ধর্মবিশ্বাসে পা না দিয়ে বৌদ্ধিক ঝুলন্ত অবস্থায় থাকাই ছিল তার দার্শনিক সততা।
সমাজবিজ্ঞানী ইয়োহানেস কুয়াক (Johannes Quack) প্রাচীন ভারতের এই যুক্তিবাদী ও সংশয়বাদী স্রোতগুলো বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই আন্দোলনগুলো তৎকালীন ভারতীয় সমাজে অন্ধ গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল (Quack, 2011)। বৈদিক পুরোহিতেরা দাবি করতেন যে তারা মহাবিশ্বের সমস্ত গোপন রহস্য জানেন এবং তাদের নির্দেশিত যজ্ঞই হলো বিশ্বের নিয়ামক। পূরণ কস্সপ, পকুঢ কচ্চায়ন এবং সঞ্জয় বেলট্ঠিপুত্তের মতো মুক্ত চিন্তাবিদেরা প্রমাণ করেছিলেন যে বৈদিক সত্যের বাইরেও জগতকে দেখার আরও বহু বিচিত্র চোখ রয়েছে। তাদের এই তীব্র সংশয়বাদ বৈদিক সমাজকে নিজের অন্ধ নিশ্চয়তাগুলো নতুন করে পরীক্ষা করতে বাধ্য করেছিল।
প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঐতিহাসিক ফলাফল: পারস্পরিক রূপান্তর ও ধ্রুপদী বিতর্কসংস্কৃতি (Historical Outcomes of the Rivalry: Mutual Transformation and Classical Debate Culture)
বৈদিক সনাতন ধারা এবং অবৈদিক এই প্রতিদ্বন্দ্বী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যকার দীর্ঘকালীন সংঘাত প্রাচীন ভারতকে এক অনন্য ঐতিহাসিক পরিণতি উপহার দিয়েছিল। এটি কেবল কোনো রাজনৈতিক যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল এক সভ্যতার ভেতরের শ্রেষ্ঠতম চিন্তকদের এক দীর্ঘস্থায়ী বৌদ্ধিক যুদ্ধ। রাজদরবার, জনসভা এবং বৌদ্ধ বিহারগুলোতে প্রতিনিয়ত এই দার্শনিকদের মুখোমুখি বিতর্ক হতো। কোনো তত্ত্বকে সমাজে টিকিয়ে রাখতে হলে তাকে প্রতিপক্ষের অকাট্য প্রশ্নের উত্তর দিয়ে টিকে থাকতে হতো। এই ঐতিহাসিক তাগিদ থেকেই প্রাচীন ভারতে জন্ম নিয়েছিল এক বিশ্বমানের বাদবিচার (Vādavicāra) বা তর্কশাস্ত্রের ঐতিহ্য।
এই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছিল খোদ বৈদিক ব্যবস্থার ওপর। বৈদিক ধর্ম বুঝতে পেরেছিল যে প্রাচীন সংহিতার অবৈজ্ঞানিক পশুহত্যা ও যজ্ঞের লোভ দেখিয়ে এই নতুন দার্শনিক স্রোতকে প্রতিহত করা যাবে না। টিকে থাকার তাগিদেই তারা নিজেদের দর্শনকে তীক্ষ্ণ যুক্তির ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে বাধ্য হলো। জন্ম নিল ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শনের মতো সূক্ষ্ম জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যবস্থা, যেখানে বৌদ্ধ ও চার্বাকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য অনুমানের কঠোর নিয়মাবলী তৈরি করা হলো। গড়ে উঠল পূর্ব মীমাংসা ও বেদান্তের মতো দার্শনিক সৌধ। যজ্ঞের নিষ্ঠুর পশুবলি প্রায় বন্ধ হয়ে গেল এবং শ্রমণদের সবচেয়ে প্রিয় নীতি অহিংসা বৈদিক সমাজের অন্যতম প্রধান নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে গৃহীত হলো। এমনকি পরবর্তীতে চার্বাকদের হাত থেকে রাজধর্ম ও অর্থনীতিকে রক্ষা করতে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের মতো বাস্তববাদী গ্রন্থ রচিত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে ধর্মনিরপেক্ষ বস্তুবাদ বৈদিক চিন্তাকেও কতটা গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
একইভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোও এই সংঘাতের প্রক্রিয়ায় নিজেদের রূপান্তর করতে বাধ্য হয়েছিল। বৌদ্ধধর্ম তার আদি সরল রূপ হারিয়ে পরবর্তীতে মহাযান ধারায় রূপ নিয়েছিল, যেখানে বুদ্ধের মূর্তিপূজা এবং দেবতাদের মতো ভক্তির আবেশ তৈরি হয়েছিল – যা মূলত ব্রাহ্মণ্য ধর্মেরই এক প্রকার আত্তীকরণ ছিল। জৈনধর্মও সমাজের বাস্তবতায় টিকে থাকার জন্য বর্ণাশ্রমের মতো কিছু সামাজিক নিয়মকে নিজেদের ভেতরে কিছুটা নমনীয় আকারে জায়গা দিয়েছিল। চার্বাক ও আজীবিকদের মতো চরম ধারাগুলো প্রাতিষ্ঠানিক মঠের অভাবে এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা হারিয়ে সময়ের সাথে সাথে বিলীন হয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের উত্থাপিত প্রশ্নগুলো ভারতীয় মননে চিরদিনের জন্য দাগ কেটে গিয়েছিল।
সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রাচীন ভারতের এই দার্শনিক বহুত্ববাদই ছিল তার আসল শক্তি। বৈদিক ধর্ম যদি এই অপ্রতিরোধ্য বৌদ্ধ, জৈন, আজীবিক ও চার্বাক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মুখোমুখি না হতো, তবে তা হয়তো কোনোদিন তার আদিম যাগযজ্ঞের সংকীর্ণতা কাটিয়ে এক বিশ্বমানের ধ্রুপদী দর্শনে পরিণত হতে পারত না। কোনো ঈশ্বর বা অলৌকিক শক্তির মধ্যস্থতায় নয়, বরং মানুষের যুক্তি, নিরীক্ষা, সংশয় এবং মুক্তচিন্তার এই বহুস্বরীয় মহাযুদ্ধই প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতাকে তার অতুলনীয় বৌদ্ধিক গভীরতা এনে দিয়েছিল। ধর্মের অন্ধ বিশ্বাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাস্তব সত্যের এই বহুত্ববাদী অনুসন্ধানই ছিল এই প্রতিদ্বন্দ্বী সম্প্রদায়গুলোর সবচেয়ে স্থায়ী ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার।
বৈদিক সাহিত্যের গ্রহণ ও উত্তরাধিকার (Reception and Legacy of Vedic Literature): দর্শন, ধর্ম, পুনর্ব্যাখ্যা ও আধুনিক গবেষণা
বেদ ও মীমাংসা (Vedas and Mīmāṃsā): শব্দপ্রমাণ, অপৌরুষেয়তা ও শাস্ত্রীয় কর্তৃত্ব
মীমাংসা দর্শনের ঐতিহাসিক পটভূমি ও বৈদিক আচারের যৌক্তিকীকরণ (Historical Context of Mīmāṃsā and Rationalization of Vedic Ritual)
খ্রিস্টপূর্ব শেষ শতকগুলোতে প্রাচীন উত্তর ভারতের বৌদ্ধিক মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। যজ্ঞের আগুন তখনও নিভে যায়নি, কিন্তু তার চারপাশের সামাজিক ও দার্শনিক নিশ্চয়তাগুলো নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। উপনিষদের চিন্তাবিদেরা বাহ্যিক যাগযজ্ঞ ছেড়ে আত্মানুসন্ধান ও ধ্যানের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন, আর অন্যদিকে বৌদ্ধ, জৈন ও চার্বাকদের মতো শ্রমণ ঐতিহ্যের চিন্তাবিদেরা সরাসরি বৈদিক যাগযজ্ঞের কার্যকারিতা ও নৈতিক ভিত্তি নিয়ে তীক্ষ্ণ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিলেন। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে বৈদিক আচার ও যজ্ঞনির্ভর জীবনধারাকে শুধুমাত্র প্রাচীন পারিবারিক প্রথা হিসেবে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। এর জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল একটি সুশৃঙ্খল, নিয়মতান্ত্রিক ও বাস্তববাদী দার্শনিক ভিত্তি। এই ঐতিহাসিক সংকট থেকেই প্রাচীন ভারতে পূর্ব মীমাংসা বা সংক্ষেপে মীমাংসা (Mīmāṃsā) দর্শনের প্রাতিষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে।
দার্শনিক জৈমিনি (Jaimini) তার রচিত প্রায় আড়াই হাজার সূত্রের সংকলন মীমাংসাসূত্র (Mīmāṃsāsūtra) গ্রন্থে এই বিশাল দায়িত্বটি নিজের কাঁধে তুলে নেন। তার উদ্দেশ্য বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোনো অতিলৌকিক স্রষ্টার সন্ধান করা ছিল না, বরং বৈদিক অনুশাসন বা আদেশের সঠিক তাৎপর্য নির্ণয় করা ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। বৈদিক সংহিতা ও ব্রাহ্মণ অংশে ছড়িয়ে থাকা অজস্র পরস্পরবিরোধী মনে হওয়া বাক্যকে একটি সুসংহত ব্যবস্থার মধ্যে বেঁধে ফেলাই ছিল মীমাংসকদের মূল কাজ। মীমাংসা শব্দটির আদি অর্থ গভীর অনুসন্ধান বা চুলচেরা বিশ্লেষণ। জৈমিনির হাত ধরে এই অনুসন্ধান শুধুমাত্র যজ্ঞের নির্দেশিকার সীমা পেরিয়ে ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসের অন্যতম সূক্ষ্ম ভাষাতাত্ত্বিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক বিদ্যায় পরিণত হয় (Pollock, 2006)। প্রাচীন শাস্ত্রের অসংলগ্ন অংশগুলোকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার মাধ্যমে তারা একটি কঠোর আইনি পদ্ধতির মতো কাঠামো গড়ে তোলেন।
পরবর্তীকালে আনুমানিক পঞ্চম শতকে দার্শনিক শবরস্বামী (Śabarasvāmin) তার প্রামাণ্য ভাষ্য শবরভাষ্য (Śabara-bhāṣya) লিখে জৈমিনির সূত্রগুলোকে দার্শনিক যুক্তির পোক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করান। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, মীমাংসার উদ্দেশ্য কেবল কিছু আচার পালন নয়, বরং ধর্ম ঠিক কী এবং তা জানার একমাত্র উপায় কী, তা প্রতিষ্ঠা করা। শবর দেখান, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ধর্মের স্বরূপ জানা যায় না। ধর্মাচরণের ফলাফল যেমন স্বর্গ বা অদৃশ্য কল্যাণ – এগুলো চোখ দিয়ে দেখা যায় না কিংবা পার্থিব যুক্তি দিয়ে এদের অস্তিত্ব নির্ণয় করা সম্ভব নয়। ফলে বৈদিক শব্দ বা ভাষাই হয়ে দাঁড়ায় একমাত্র ভরসা। এই ভাষ্যকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে মীমাংসা দর্শন দুটি প্রধান শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল, যার একদিকের নেতৃত্বে ছিলেন কুমারিল ভট্ট (Kumārila Bhaṭṭa) এবং অন্যদিকের নেতৃত্বে ছিলেন প্রভাকর মিশ্র (Prabhākara Miśra)।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, মীমাংসা ছিল প্রাচীন বৈদিক পুরোহিত শ্রেণির সামাজিক কর্তৃত্ব বজায় রাখার একটি অত্যন্ত পরিশীলিত দার্শনিক হাতিয়ার। জার্মান ভারততাত্ত্বিক ভিলহেম হালবফাস (Wilhelm Halbfass) দেখিয়েছেন যে, মীমাংসা দর্শন ভারতীয় চিন্তাজগতে এক ধরণের আপসহীন ঐতিহ্যবাদ তৈরি করেছিল, যা বহিরাগত সব ধরণের সংশয়বাদকে পদ্ধতিগতভাবে নিষ্ক্রিয় করে দিতে চেয়েছিল (Halbfass, 1988)। আচারিক ক্রিয়া কেন করতে হবে, এই প্রশ্নের জবাবে মীমাংসকরা কোনো ভাবাবেগপূর্ণ উত্তর দিতেন না। তাদের বক্তব্য ছিল, বৈদিক বিধান পালন করা মানুষের নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার নয়, এটা এক অলঙ্ঘনীয় সার্বিক নির্দেশ। সামাজিক স্তরবিন্যাস ও বর্ণাশ্রমের কাঠামোকে অটুট রাখার জন্য শাস্ত্রের এই ধরণের অনড় ব্যাখ্যার প্রয়োজন তৎকালীন শাসক ও যাজক উভয় গোষ্ঠীর জন্যই জরুরি হয়ে উঠেছিল।
প্রাচীন ভারতে বৌদ্ধ ও অন্যান্য ভিন্নমতাবলম্বী দর্শনের সঙ্গে মীমাংসকদের তীব্র বাদানুবাদ ঘটত। বৌদ্ধরা যখন যুক্তি দিতেন যে বৈদিক যজ্ঞে পশুবলি দেওয়া হিংসা এবং এই আচারগুলো নিছক পুরোহিতদের জীবিকা অর্জনের ফন্দি, তখন মীমাংসকরা বিশুদ্ধ জ্ঞানতাত্ত্বিক যুক্তি নিয়ে মাঠে নামতেন। তারা প্রমাণ করতে চাইতেন যে মানবীয় বুদ্ধি দিয়ে ভালো-মন্দের চূড়ান্ত বিচার করা সম্ভব নয়। ভালো বা মন্দের ধারণা স্থান ও কালভেদে বদলে যায়। তাই এমন একটি নির্দেশক দরকার যা মানুষের তৈরি নয়। এই প্রয়াস থেকেই মীমাংসকরা ধীরে ধীরে তাদের নিজস্ব জ্ঞানতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব ও বাক্যার্থবিজ্ঞান গড়ে তোলেন, যা শেষ পর্যন্ত পুরো ভারতীয় দর্শন চর্চাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
শব্দপ্রমাণ ও স্বতঃপ্রামাণ্যবাদ: জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি (Śabdapramāṇa and Svataḥprāmāṇyavāda: Epistemological Foundations)
মীমাংসা দর্শনের পুরো সৌধ দাঁড়িয়ে আছে তাদের স্বতন্ত্র জ্ঞানতত্ত্ব বা প্রমাণের ওপর। প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান ইত্যাদি নানা প্রমাণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে, কিন্তু মীমাংসকরা সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন শব্দপ্রমাণ (Śabdapramāṇa) বা বাচনিক সাক্ষ্যের ওপর। তবে যেকোনো শব্দ বা মানুষের সাধারণ মুখের কথা তাদের কাছে চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। মানুষের তৈরি কথা ভুল হতে পারে, কারণ মানুষের ইন্দ্রিয় ও মন নানা সীমাবদ্ধতায় দুষ্ট। সাধারণ মানুষের মুখের কথার সত্যতা নির্ভর করে বক্তার বিশ্বাসযোগ্যতা বা অন্য কোনো বাস্তব প্রমাণের ওপর। কিন্তু বৈদিক শব্দ সম্পূর্ণ আলাদা। শব্দপ্রমাণ মীমাংসকদের কাছে এমন এক স্বতন্ত্র মাধ্যম, যা অন্য কোনো উপায়ে জানা যায় না এমন অদৃশ্য বিষয়ের যথার্থ জ্ঞান উপহার দেয়।
এই জ্ঞানতত্ত্বকে সুদৃঢ় করতে গিয়ে মীমাংসকরা নিয়ে এলেন স্বতঃপ্রামাণ্যবাদ (Svataḥprāmāṇyavāda) নামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তত্ত্ব। এই তত্ত্বের বক্তব্য বেশ স্পষ্ট: যেকোনো জ্ঞানের সত্যতা সেই জ্ঞানের ভেতর থেকেই নিজে নিজে উৎপন্ন হয় এবং নিজেই তা প্রকাশ করে। আমরা যখন কোনো বস্তু দেখি বা কোনো কথা শুনি, তখন প্রাথমিক অবস্থাতেই সেই জ্ঞানটি সত্য হিসেবে আমাদের কাছে ধরা দেয়। জ্ঞানের সত্যতা প্রমাণের জন্য বাইরে থেকে অন্য কোনো প্রমাণের সাহায্য নেওয়ার দরকার পড়ে না। দার্শনিক জন তাবের (John Taber) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, কুমারিল ভট্ট কীভাবে ন্যায় দর্শনের বিরুদ্ধে গিয়ে এই অবস্থান রক্ষা করেছিলেন (Taber, 1992)। ন্যায় দার্শনিকদের মতে, জ্ঞানের সত্যতা যাচাই করতে হয় কাজের সাফল্য বা পরবর্তী কোনো পরীক্ষা দিয়ে, যাকে বলা হয় পরতঃপ্রামাণ্যবাদ (Parataḥprāmāṇyavāda)। মীমাংসকরা এই মত নাকচ করে বলেন, যদি প্রতিটি জ্ঞান প্রমাণের জন্য আরেকটি জ্ঞানের দরকার পড়ে, তবে এক অন্তহীন যুক্তিহীন চক্র বা অনবস্থা (Anavasthā) দোষ তৈরি হবে।
তাহলে মানুষের মনে ভুল বা মিথ্যা জ্ঞান তৈরি হয় কীভাবে? মীমাংসার উত্তর হলো, জ্ঞানের সত্যতা আসে নিজের ভেতর থেকে, কিন্তু অসত্য বা বিভ্রান্তি আসে বাইরে থেকে। যদি কোনো জ্ঞানের উৎসে কোনো ক্ষতিকর খুঁত বা দোষ (Doṣa) থাকে, কিংবা পরে যদি কোনো শক্তিশালী বিরোধী জ্ঞান বা বাধকজ্ঞান (Bādhakajñāna) এসে আগের জ্ঞানটিকে ভেঙে দেয়, তখনই কেবল সেই জ্ঞান বাতিল হয়ে যায়। ধরা যাক, কেউ দূর থেকে একটি চকচকে জিনিস দেখে ভাবল সেটা রূপা, কিন্তু কাছে গিয়ে দেখল সেটা ঝিনুক। এখানে ঝিনুকের প্রত্যক্ষ জ্ঞানটি আগের রূপার জ্ঞানকে বাতিল করে দিল। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত এমন কোনো বাধকজ্ঞান না আসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত যেকোনো উৎপন্ন জ্ঞানকে স্বাভাবিকভাবেই সত্য বলে গ্রহণ করতে হবে।
এই জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থানটি মীমাংসকদের বৈদিক কর্তৃত্ব রক্ষার জন্য এক নিশ্ছিদ্র সুরক্ষাবলয় এনে দিয়েছিল। দার্শনিক পুরুষোত্তম বিলিমোরিয়া (Purushottama Bilimoria) মীমাংসার এই দিকটি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, বেদ যেহেতু মানুষের ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতার বাইরের বিষয় নিয়ে কথা বলে, তাই প্রত্যক্ষ বা অনুমানের কোনো বাধকজ্ঞান দিয়ে বেদের নির্দেশকে বাতিল করা অসম্ভব (Bilimoria, 1988)। বেদের আদেশ বা বিধিবাক্যের সত্যতা তার নিজের ভেতরেই সুরক্ষিত। যদি কোনো সংশয়বাদী বলেন যে বৈদিক যজ্ঞ করলে স্বর্গ লাভ হয় না, তবে সেই সংশয়বাদীকে তা প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু সংশয়বাদীর কোনো জাগতিক ইন্দ্রিয় দিয়ে পরলোকের অপ্রত্যক্ষ বিষয়কে অসত্য দেখানো সম্ভব নয়। ফলে স্বতঃপ্রামাণ্যবাদের আশ্রয়ে বৈদিক বয়ানকে যেকোনো সমালোচনার ঊর্ধ্বে স্থাপন করা সহজ হয়েছিল।
এখানে মীমাংসা দর্শনের অবস্থান ছিল একদিকে অভিজ্ঞতানির্ভর, অন্যদিকে বৈদিক কর্তৃত্বের প্রতি কঠোরভাবে অনুগত। মীমাংসকরা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অর্জিত প্রত্যক্ষ জ্ঞানকে অস্বীকার করেননি। দৈনন্দিন জগতের কোনো বিষয় প্রত্যক্ষের মাধ্যমে জানা সম্ভব হলে সেখানে বৈদিক শব্দের আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু ধর্ম, পুণ্য, পাপ কিংবা যজ্ঞের কথিত পারলৌকিক ফলের মতো বিষয়কে তারা সাধারণ ইন্দ্রিয় ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আওতার বাইরে বলে বিবেচনা করেছেন। মীমাংসকদের মতে, এসব অতিন্দ্রিয় বিষয়ে বৈদিক শব্দই নির্ভরযোগ্য জ্ঞানের স্বতন্ত্র উৎস। ফলে বৈদিক আচারব্যবস্থার জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি রক্ষার জন্য শব্দপ্রমাণের এই বিশেষ মর্যাদা মীমাংসা দর্শনে অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
অপৌরুষেয়তার তত্ত্ব ও ঈশ্বরের অনাবশ্যকতা (The Doctrine of Apauruṣeyatā and the Rejection of God)
বৈদিক সাহিত্যের প্রশ্নাতীত কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য মীমাংসা দর্শন যে তত্ত্বটি নির্মাণ করেছিল, তা হলো অপৌরুষেয়তা (Apauruṣeyatā) বা রচয়িতাহীনতার মতবাদ। পৃথিবীর প্রায় সমস্ত ধর্মবিশ্বাসেই কোনো না কোনো ঈশ্বর, দৈববাণী বা বিশেষ পয়গম্বরের উপস্থিতি দেখা যায়। কিন্তু প্রাচীন মীমাংসকরা এখানে এক ব্যতিক্রমী অবস্থান নেন। তাদের স্পষ্ট ঘোষণা ছিল: বেদের কোনো রচয়িতা নেই – কোনো মানুষও নয়, এমনকি কোনো ঈশ্বরও নয়। বেদ চিরন্তন, অনাদি ও অনন্ত। শব্দপরম্পরা হিসেবে তা অনাদিকাল ধরে টিকে রয়েছে। কোনো ব্যক্তিবিশেষ এই গ্রন্থ রচনা করেননি বলেই এর মধ্যে কোনো ব্যক্তির সীমাবদ্ধতা, পক্ষপতিত্ব বা মূর্খতা প্রবেশ করতে পারেনি।
মানুষের যে যেকোনো রচনা ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে, এই বিষয়ে মীমাংসা দার্শনিকেরা সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন। মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে, সে ভুল দেখতে পারে, কিংবা সে স্বার্থপরতার কারণে প্রতারণামূলক বাক্য তৈরি করতে পারে। যদি বেদের পেছনে কোনো মানবিক লেখক থাকত, তবে তার রচনায় ভুলভ্রান্তি কিংবা পক্ষপাত থাকা অনিবার্য হতো। মীমাংসকরা বৈদিক পাঠকে মানবীয় ইতিহাসের পরিবর্তনের বাইরে স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল, শিক্ষকের কাছ থেকে ছাত্র যেভাবে বৈদিক ধ্বনি শুনে মুখস্থ করে এসেছে, এই ধারা অনন্তকাল ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে। কোনো একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সময় ছিল না যখন কেউ প্রথম বসে বেদ লিখেছিলেন। বৈদিক ঋষিরাও বেদের রচয়িতা নন; তারা ছিলেন কেবল দ্রষ্টা (Draṣṭā) বা আবিষ্কারক, যারা পূর্বে বিদ্যমান চিরন্তন শব্দতরঙ্গকে তাদের ধ্যানে অনুভব করেছিলেন মাত্র।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই অপৌরুষেয়তা রক্ষা করতে গিয়ে মীমাংসা দর্শন সরাসরি ঈশ্বরের অস্তিত্বের ধারণাকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করে। মীমাংসকরা ছিলেন সম্পূর্ণ নিরীশ্বরবাদী (Nirīśvaravādin)। ন্যায় কিংবা পরবর্তীতে বেদান্ত দর্শন যেখানে ঈশ্বরকে জগতের স্রষ্টা ও বেদের মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, মীমাংসকরা সেখানে ঈশ্বরের ধারণাকে দার্শনিক দিক থেকে অযৌক্তিক বলে মনে করতেন। তাদের যুক্তি ছিল সরল: ঈশ্বর বলে যদি কেউ থেকে থাকেন, তবে তিনি বেদ রচনা করতে যাবেন কেন? আর যদি ঈশ্বরই বেদ রচনা করে থাকেন, তবে সেই ঈশ্বরের সত্যতা আমরা কীভাবে জানব? নিশ্চয়ই বেদের কথা দিয়ে? এতে এক স্পষ্ট চক্রক দোষ তৈরি হয় – বেদের প্রমাণ ঈশ্বর, আবার ঈশ্বরের প্রমাণ বেদ। দার্শনিক ড্যানিয়েল আর্নল্ড (Dan Arnold) বৌদ্ধ দার্শনিকদের সঙ্গে মীমাংসকদের এই বিতর্ক বিশদভাবে তুলে ধরে দেখিয়েছেন যে, মীমাংসকরা ঈশ্বর ছাড়াই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শাস্ত্রীয় কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য কতখানি জটিল দার্শনিক লড়াই চালিয়েছিলেন (Arnold, 2005)।
জগৎ সৃষ্টির কোনো নির্দিষ্ট শুরু আছে, এই ধারণাও মীমাংসা দর্শন পুরোপুরি নাকচ করে দেয়। তারা একটি প্রসিদ্ধ সূত্র তুলে ধরেন, “ন কদাচিদ অনীদৃশং জগৎ” (Na kadācid anīdṛśaṁ jagat), যার অর্থ হলো এই পৃথিবী কখনোই বর্তমান সময়ের চেয়ে মৌলিকভাবে আলাদা ছিল না। জগতের কোনো পরম আদি নেই, কোনো চূড়ান্ত মহাপ্রলয়ও নেই; এটি একটি অন্তহীন প্রাকৃতিক চক্রে আবর্তিত হচ্ছে। ফলে কোনো সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রয়োজন মীমাংসা চিন্তায় ছিল না। গবেষক ফ্রান্সিস ক্লুনি (Francis X. Clooney) লক্ষ্য করেছেন, মীমাংসার যজ্ঞীয় ভাবনায় বৈদিক দেবতাদের ভূমিকাও অত্যন্ত প্রান্তিক (Clooney, 1990)। দেবতারা কোনো বাস্তব চেতনাসম্পন্ন সত্তা নন যাদের কাছে প্রার্থনা করা যায় বা যারা তুষ্ট হয়ে বর দেন। যজ্ঞে ইন্দ্র বা অগ্নির নাম উচ্চারণ করা হয় কেবল আচারের নির্দেশ পালনের জন্য। দেবতা আসলে কোনো ব্যক্তি নন, দেবতা হলেন কেবল বৈদিক মন্ত্রের একটি বিশেষ শব্দরূপ মাত্র।
ঈশ্বর ও অলৌকিকতাকে বাদ দিয়ে তৈরি এই ব্যবস্থা আধুনিক গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মীমাংসকরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, শাস্ত্রীয় কর্তৃত্বকে যদি কোনো ঈশ্বরের ওপর নির্ভরশীল করা হয়, তবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই শাস্ত্রের ভিত্তি ভেঙে পড়বে। তাই তারা শাস্ত্রকে কোনো ব্যক্তির সৃষ্টি হিসেবে না দেখে তাকে এক অনাদি ভাষাগত সত্য হিসেবে দাঁড় করালেন। এর ফলে একদিকে যেমন ঈশ্বরের অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ হলো, তেমনি অন্যদিকে বৈদিক পুরোহিতদের পরিচালিত আচারব্যবস্থাও সম্পূর্ণ সুরক্ষিত হয়ে গেল।
ভাষার নিত্যতা ও অর্থের সম্পর্ক: স্ফোট বনাম বর্ণবাদ (Eternality of Language and Meaning: Sphoṭa versus Varṇavāda)
বেদ চিরন্তন – এই দাবিকে যুক্তির দিক থেকে টিকিয়ে রাখতে হলে ভাষাকেও চিরন্তন প্রমাণ করার প্রয়োজন ছিল। কারণ কোনো গ্রন্থের ভাষা যদি পরিবর্তনশীল মানুষের তৈরি সামাজিক প্রথা বা সাময়িক চুক্তি মাত্র হয়, তবে সেই গ্রন্থ কখনোই অনাদি হতে পারে না। এই কারণে জৈমিনি ও তার পরবর্তী ভাষ্যকারেরা ভাষার দার্শনিক বিশ্লেষণে গভীরভাবে প্রবেশ করেন। তারা ঘোষণা করেন যে, শব্দ বা ধ্বনির সঙ্গে তার অর্থের যে সম্পর্ক, তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং অনাদি, যাকে বলা হয়েছে ঔৎপত্তিক সম্বন্ধ (Autpattika Sambandha)। মানুষ কোনো এক বিশেষ দিনে বসে গরুকে ‘গরু’ কিংবা জলকে ‘জল’ ডাকার সিদ্ধান্ত নেয়নি। শব্দ ও অর্থের এই মেলবন্ধন সৃষ্টির শুরু থেকেই প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান।
এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মীমাংসকদের সমসাময়িক ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শনের সাথে কঠিন বিতর্কে জড়াতে হয়েছিল। নৈয়ায়িকরা বলতেন শব্দ অনিত্য বা ক্ষণস্থায়ী, কারণ শব্দ উচ্চারণের সাথে সাথেই তা বাতাসে মিলিয়ে যায়। মীমাংসকরা এর জবাবে এক সূক্ষ্ম তাত্ত্বিক পার্থক্য তৈরি করলেন। তারা বললেন, আমরা কানে যে আওয়াজ শুনি তা হলো ধ্বনি (Dhvani), আর ভাষার মূল একক হলো বর্ণ (Varṇa) বা শাশ্বত ধ্বনিমূল। যখন কেউ কোনো বর্ণ উচ্চারণ করে, তখন সে নতুন কোনো শব্দ সৃষ্টি করে না, বরং বাতাসের ঘর্ষণে অনন্তকাল ধরে বিদ্যমান শাশ্বত বর্ণটি ক্ষণিকের জন্য প্রকাশিত হয় মাত্র। অন্ধকার ঘরে আলো জ্বাললে যেমন সেখানে আগে থেকে থাকা ঘট বা পাত্রটি দেখা যায়, আলো নেভালে পাত্রটি ধ্বংস হয়ে যায় না – ঠিক তেমনি আমাদের বাকযন্ত্রের সাহায্যে চিরন্তন বর্ণটি কেবল প্রকাশিত হয়, ধ্বংস হয় না। এই তত্ত্বকে বলা হয় বর্ণবাদ (Varṇavāda)।
এর বিপরীতে প্রাচীন ভারতীয় ব্যাকরণবিদ ভর্তৃহরি (Bhartṛhari) তার বিখ্যাত চিন্তায় স্ফোটবাদ (Sphoṭavāda) নামের তত্ত্ব তুলে ধরেছিলেন। স্ফোটবাদীদের মতে, আলাদা আলাদা বর্ণ শুনে কোনো অর্থ বোঝা যায় না; মনের মধ্যে একটি অখণ্ড অর্থস্ফোরণ বা স্ফোট ঘটে, যা থেকে অর্থের সামগ্রিক উপলব্ধি তৈরি হয়। কুমারিল ভট্ট তার বিখ্যাত গ্রন্থ শ্লোকবার্তিক (Ślokavārttika)-এ ভর্তৃহরির এই স্ফোট তত্ত্বকে জোরালো যুক্তিতে আক্রমণ করেন। কুমারিল প্রমাণ করতে চান যে ভাষার অর্থ বুঝতে কোনো অতিলৌকিক স্ফোটের কল্পনা করার দরকার নেই। একের পর এক উচ্চারিত বর্ণগুলোর স্মৃতি যখন শেষ বর্ণটি শোনার পর আমাদের মনে সম্মিলিতভাবে ধরা দেয়, তখনই সেই পরিচিত শব্দ থেকে স্পষ্ট অর্থবোধ তৈরি হয়। এই মতটিকে রক্ষা করা মীমাংসকদের জন্য দরকারি ছিল, কারণ বর্ণকে নিত্য না মানলে বৈদিক মন্ত্রের নিত্যতার ভিত্তিই ধসে পড়ত।
ভারতীয় ভাষাদর্শন নিয়ে পণ্ডিত বিমলকৃষ্ণ মতিলাল (Bimal Krishna Matilal) যে গভীর বিশ্লেষণ হাজির করেছেন, তাতে স্পষ্ট হয় যে মীমাংসকদের ভাষার দর্শন কেবল ব্যাকরণের অনুশীলন ছিল না (Matilal, 1990)। এটা ছিল ভাষার স্থিতিশীলতা রক্ষার এক সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ। শব্দ যদি পরিবর্তনশীল সমাজের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর করত, তবে শত শত বছর আগের বৈদিক বাক্যের অর্থ বর্তমানের মানুষের কাছে বদলে যেত। শব্দের অর্থ চিরকাল অপরিবর্তিত থাকে – এই অনুমান ছাড়া কোনো শাস্ত্রীয় বা আইনি ব্যবস্থার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব ধরে রাখা সম্ভব নয়। গবেষক লরেন্স ম্যাকক্রিয়া (Lawrence McCrea) দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ভারতীয় সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্র যেমন অলঙ্কারশাস্ত্রের তাত্ত্বিক আলোচনার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছিল (McCrea, 2008)। ভাষা মানুষের মনের তৈরি কোনো প্রতীক নয়, বরং বাস্তবের মতোই তা এক ধ্রুব সত্য – মীমাংসকদের এই অনমনীয় ভাষাতত্ত্ব বৈদিক ঐতিহ্যকে ঐতিহাসিক রূপান্তরের ঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখতে চেয়েছিল।
শব্দ ও অর্থের এই নিত্য সম্পর্ক মানবীয় সাহিত্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, কিন্তু মানুষের রচনায় ভুল শব্দ ব্যবহারের কারণে অর্থের বিকৃতি ঘটতে পারে। বেদের ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনা নেই, কারণ সেখানে কোনো মানবীয় বক্তা অনুপস্থিত। ফলে বৈদিক শব্দ তার অর্থ সরাসরি ও নির্ভেজালভাবে প্রকাশ করে। মীমাংসকদের মতে, শব্দের এই স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থপ্রকাশের ক্ষমতাই বৈদিক বিধানের প্রামাণ্যতাকে কোনো মানবীয় বক্তার নির্ভরযোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল হতে দেয় না।
বিধি, অর্থবাদ ও অপূর্ব: শাস্ত্রীয় অর্থনির্ধারণ পদ্ধতি (Vidhi, Arthavāda, and Apūrva: Methods of Scriptural Exegesis)
মীমাংসা দর্শনের মূল ব্যবহারিক কাজ ছিল বৈদিক পাঠ্যের সঠিক অর্থনির্ধারণ করা। কিন্তু বেদের সব বাক্য এক ধরনের নয়। কোনটা পালনীয় নির্দেশ আর কোনটা কেবল সাধারণ বর্ণনা, তা বিচার করার জন্য তারা বৈদিক সাহিত্যের বাক্যগুলোকে পাঁচটি প্রধান ভাগে ভাগ করেন: বিধি (Vidhi) বা সরাসরি আদেশ, মন্ত্র (Mantra) যা আচারের সময় নির্দিষ্ট বিষয় স্মরণ করতে ব্যবহৃত হয়, নামধেয় (Nāmadheya) বা যজ্ঞের বিশেষ নাম, নিষেধ (Niṣedha) বা বারণ, এবং অর্থবাদ (Arthavāda) বা প্রশংসামূলক ও বর্ণনামূলক বাক্য। এর মধ্যে মীমাংসকদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিধি। জৈমিনির একটি মৌলিক সিদ্ধান্ত হলো, শাস্ত্রের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে কোনো কাজে নিযুক্ত করা; সুতরাং যে বাক্যগুলো কোনো কাজের নির্দেশ দেয় না, সেগুলোর নিজস্ব কোনো স্বাধীন অর্থ নেই।
এই নিয়মের কারণে বৈদিক সাহিত্যে থাকা বহু পৌরাণিক কাহিনী, উপাখ্যান বা দেবতাদের স্তুতিবাক্যগুলো মীমাংসকদের কাছে অপ্রধান হয়ে পড়ে। সেগুলোকে তারা চিহ্নিত করলেন অর্থবাদ হিসেবে। অর্থবাদ সরাসরি কোনো আদেশ দেয় না, বরং বিধিবাক্যের আদেশ পালন করার জন্য মানুষের মনে আগ্রহ তৈরি করে বা প্রশংসা করে। যেমন, বেদে যখন বলা হয় “বায়ু হলেন দ্রুতগামী দেবতা”, তখন মীমাংসকদের মতে এই বাক্যের উদ্দেশ্য বায়ুর প্রশংসা বা তার চরিত্র বর্ণনা করা নয়, বরং বায়ু সম্পর্কিত একটি বিশেষ যজ্ঞে মানুষ যাতে উৎসাহিত হয়, সেই পরিবেশ তৈরি করা। অর্থাৎ যেকোনো বর্ণনামূলক বাক্য কেবল তখনই অর্থপূর্ণ, যখন তা কোনো একটি কর্ম বা আদেশের সহায়ক অঙ্গ হিসেবে কাজ করে। এই কঠোর ব্যবস্থার কারণে উপনিষদের আত্মতত্ত্ব বা ব্রহ্ম বিষয়ক বাক্যগুলোকেও মীমাংসকরা নিছক অর্থবাদ বলে অভিহিত করেছিলেন, কারণ সেখানে কোনো সরাসরি যজ্ঞ করার আদেশ নেই।
আদেশ তো পাওয়া গেল, কিন্তু সেই আদেশের ফলে মানুষ কাজটি করবে কীভাবে এবং তার ফলই বা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে? এই প্রশ্নের সমাধানে মীমাংসকরা নিয়ে আসেন ভাবনা (Bhāvanā) তত্ত্ব। প্রতিটি বিধিবাক্য মানুষের মনের ভেতর একটি বিশেষ কর্মপ্রেরণা তৈরি করে। যেমন “যজেত স্বর্গকামঃ” (যে স্বর্গ কামনা করে সে যজ্ঞ করুক) – এই বাক্যের ভেতর দিয়ে মানুষের সামনে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের পথ উন্মোচিত হয়। কিন্তু যজ্ঞ তো আজ শেষ হয়ে যায়, তার আগুন নিভে যায়, তবে বহু বছর পরে কীভাবে সেই যজ্ঞকারী পরলোকে ফল লাভ করবে? কারণ আর ফলের মাঝে এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান দূর করতে জৈমিনি প্রস্তাব করেন অপূর্ব (Apūrva) নামের একটি ধারণার। যজ্ঞের আচার সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে যজমানের জীবনে একটি অদৃশ্য শক্তি বা অপূর্ব জন্ম নেয়। এই অপূর্ব সুপ্ত অবস্থায় টিকে থাকে এবং যথাসময়ে সেই কর্মের ফলাফল হিসেবে ফল উৎপাদন করে।
বাক্যের অর্থ কীভাবে তৈরি হয়, এই নিয়ে মীমাংসা দর্শনের দুই প্রধান ধারার মধ্যে এক বিরাট ঐতিহাসিক বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। প্রভাকরের অনুসারীরা তুলে ধরেছিলেন অন্বিতাবিধানবাদ (Anvitābhidhānavāda), যার মতে প্রতিটি শব্দ কেবল তখনই অর্থ প্রকাশ করে যখন তা একটি বাক্যের অন্যান্য পদের সাথে কর্মের মাধ্যমে যুক্ত থাকে। কোনো বিচ্ছিন্ন শব্দের আলাদা অর্থ মানুষের কাছে পৌঁছায় না; শব্দের অর্থ তৈরিই হয় সামগ্রিক আদেশের সাথে যুক্ত হয়ে। এর বিপরীতে কুমারিল ভট্টের অনুসারীরা প্রতিষ্ঠা করেন অভিহিতান্বয়বাদ (Abhihitānvayavāda)। তাদের মতে, প্রতিটি শব্দ প্রথমে তার নিজস্ব আভিধানিক অর্থ প্রকাশ করে, এবং পরে সেই অর্থগুলো বাক্যের ব্যাকরণগত সম্পর্কের ভিত্তিতে যুক্ত হয়ে পুরো বাক্যের অর্থ গড়ে তোলে। আধুনিক গবেষক এলিসা ফ্রেস্কি (Elisa Freschi) দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই পদ্ধতিগুলো প্রাচীন ভারতে কেবল শাস্ত্র ব্যাখ্যা করার জন্যই নয়, বরং এক ধরণের প্রাথমিক আইনতত্ত্ব হিসেবেও কাজ করেছিল (Freschi, 2012)।
দার্শনিক কেই কাতাওকা (Kei Kataoka) কুমারিল ভট্টের ভাষাতাত্ত্বিক কৌশল পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে বিধিবাক্যের অর্থ ব্যাখ্যার এই পদ্ধতিগুলো পরবর্তীতে ভারতীয় বিচারব্যবস্থার মূল কাঠামো নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছিল (Kataoka, 2011)। শাস্ত্রের আদেশ কীভাবে কোনো ব্যক্তির ওপর বাধ্যবাধকতা তৈরি করে, সেই আইনি মনস্তত্ত্ব কুমারিল অত্যন্ত নিপুণভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন। কর্মই মানুষের জীবনের প্রধান বিষয় এবং শাস্ত্র সেই কর্মেরই চালিকাশক্তি – এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে মীমাংসা বৈদিক আদেশকে মানুষের নৈতিক ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্রে স্থাপন করেছিল।
শাস্ত্রীয় কর্তৃত্ব, অধিকারতত্ত্ব ও সামাজিক আধিপত্য (Scriptural Authority, Adhikāratattva, and Social Hegemony)
মীমাংসা দর্শনের এই জটিল ভাষাতাত্ত্বিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক বিশ্লেষণগুলো বায়বীয় কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক কসরত ছিল না। এর পেছনে কাজ করছিল সমাজের নির্দিষ্ট সুবিধাপ্রাপ্ত অংশের ক্ষমতা ও অবস্থান রক্ষা করার বাস্তব সামাজিক তাগিদ। মীমাংসাসূত্রের ষষ্ঠ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে অধিকারতত্ত্ব (Adhikāratattva) বা যজ্ঞ করার যোগ্যতার প্রশ্নটি। কে যজ্ঞ করতে পারবে, কে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করতে পারবে, আর কার সেই সুযোগ নেই – এই বিষয়টিকে মীমাংসকরা অত্যন্ত কঠোর নিয়মের মাধ্যমে বিধিবদ্ধ করেছিলেন। তারা শাস্ত্রের যুক্তির ওপর ভর করে দেখান যে কেবল সমাজের উচ্চ তিনটি বর্ণের পুরুষদেরই বেদ পাঠ ও যাগযজ্ঞ করার অধিকার রয়েছে।
এই তাত্ত্বিক বিন্যাসের মাধ্যমে সমাজের এক বিশাল জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে শূদ্র এবং নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় অধিকার থেকে সচেতনভাবে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। জৈমিনির সূত্রে একটি প্রাচীন বিরোধী মতের উল্লেখ রয়েছে, যেখানে আচার্য বাবাদরি যুক্তি দিয়েছিলেন যে সব মানুষেরই ধর্মাচরণের অধিকার থাকা স্বাভাবিক, কারণ সুখ বা কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা সবার মধ্যেই সমান। কিন্তু জৈমিনি ও তার পরবর্তী ভাষ্যকারেরা সেই মতকে দৃঢ়ভাবে নাকচ করে দেন। তারা যুক্তি দেন যে যজ্ঞ করার জন্য শাস্ত্রীয় অগ্নির সংযোগ এবং বেদ অধ্যয়নের যে শর্ত রয়েছে, তা কেবল উপনয়ন হওয়া উচ্চবর্ণের ব্যক্তিদের জন্যই প্রযোজ্য। শূদ্রদের যেহেতু বেদ পাঠের সামাজিক অধিকার নেই, তাই তাদের কোনো যাগযজ্ঞ করারও শাস্ত্রীয় যোগ্যতা থাকতে পারে না (Olivelle, 2005)। ফলে শাস্ত্রীয় বিচারপদ্ধতি পরিণত হয়েছিল সামাজিক বর্জনের এক অকাট্য দলিলে।
নারীদের ক্ষেত্রেও মীমাংসকদের অবস্থান ছিল প্রচলিত পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর সম্পূর্ণ অনুসারী। যদিও তারা স্বীকার করেছিলেন যে অবিবাহিত বা একা পুরুষ যজ্ঞ সম্পন্ন করতে পারে না এবং যজ্ঞের আনুষ্ঠানিকতার জন্য স্ত্রীর উপস্থিতি দরকার, কিন্তু সেই উপস্থিতি ছিল স্বামীর অনুবর্তী হিসেবে। নারী স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছায় কোনো বৈদিক যজ্ঞ করতে পারত না কিংবা বৈদিক মন্ত্রের ওপর একক অধিকার দাবি করতে পারত না। মীমাংসা ব্যাখ্যায় পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছিল যে পরিবারের প্রধান হিসেবে পুরুষের যে ধর্মীয় উদ্দেশ্য, নারী কেবল তারই এক সহায়ক অংশীদার। গবেষক ইয়োহানেস ব্রঙ্কহর্স্ট (Johannes Bronkhorst) তার সমাজ-ঐতিহাসিক গবেষণায় উন্মোচন করেছেন যে কীভাবে বৈদিক রক্ষণশীলতার এই দার্শনিক পুনর্নির্মাণ প্রাচীন ভারতের সমাজে ব্রাহ্মণ্যবাদী সামাজিক প্রাধান্যকে দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তি দিয়েছিল (Bronkhorst, 2007)।
সব মিলিয়ে বিচার করলে মীমাংসা দর্শনের ভূমিকা এক জটিল ও দ্বিমুখী রূপ প্রকাশ করে। একদিকে তারা গড়ে তুলেছিল অত্যন্ত সংহত এক ভাষাতাত্ত্বিক ও অর্থতাত্ত্বিক নিয়মাবলি, যা পাঠ্যের অভ্যন্তরীণ অর্থ, প্রসঙ্গ এবং বাক্যকাঠামো বোঝার জন্য অত্যন্ত কার্যকর ছিল। পরবর্তীতে ভারতীয় আইনশাস্ত্র বা ধর্মশাস্ত্রের ব্যাখ্যাপদ্ধতির ক্ষেত্রে মীমাংসার এই নিয়মগুলোকেই প্রামাণ্য পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু অন্যদিকে, এই দর্শনের প্রধান সামাজিক লক্ষ্য ছিল প্রচলিত স্তরবিন্যাস, পুরোহিততন্ত্রের সুযোগ-সুবিধা এবং ক্ষমতার বৈষম্যকে যেকোনো পরিবর্তনের হাত থেকে রক্ষা করা। কোনো ঈশ্বরের সাহায্য ছাড়াই তারা ভাষার ভেতরে এমন এক অনড় কর্তৃত্ব তৈরি করেছিলেন, যা মানুষকে আজীবন নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক নিয়মের শৃঙ্খলে বেঁধে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। শাস্ত্রীয় কর্তৃত্বের এই দার্শনিক নির্মাণ ভারতের সামাজিক ইতিহাসে এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব রেখে গেছে।
বেদ ও বেদান্ত (Vedas and Vedānta): উপনিষদ, প্রস্থানত্রয় ও ভাষ্যপরম্পরা
বৈদিক কর্মকাণ্ড থেকে জ্ঞানকাণ্ডে উত্তরণ: উপনিষদের বৌদ্ধিক রূপান্তর (Transition from Vedic Ritualism to Knowledge: Intellectual Shift of the Upaniṣads)
প্রাচীন ভারতের চিন্তাজগতে বৈদিক সাহিত্যের শেষ ভাগ এক গভীর বাঁক পরিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে যজ্ঞের আগুনকে মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু মনে করা হতো, সেই আগুনের উপযোগিতা নিয়েই এক সময় গভীর দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। যাগযজ্ঞের জটিল আচার, পুরোহিতদের দক্ষিণা আর পশুবলির ক্লান্তিকর পুনরাবৃত্তি থেকে মানুষের চোখ সরে যেতে শুরু করেছিল অস্তিত্বের গভীরতর প্রশ্নের দিকে। বৈদিক সাহিত্যের এই রূপান্তরের ফসল হলো আরণ্যক ও উপনিষদ। ঐতিহাসিকভাবে এই সাহিত্যকেই বলা হয় বেদান্ত (Vedānta), যার আক্ষরিক অর্থ বেদের অন্ত বা শেষ ভাগ। এই নামকরণ কেবল গ্রন্থপঞ্জির ক্রম নির্দেশ করে না, বরং বৈদিক চিন্তার চূড়ান্ত পরিণতিকেও নির্দেশ করে।
খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম থেকে পঞ্চম শতকের মাঝামাঝি সময়ে উত্তর ভারতের গঙ্গা উপত্যকায় বড় ধরণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর ঘটেছিল। নতুন নগর গড়ে উঠছিল, বাণিজ্যের প্রসার ঘটছিল এবং জনপদগুলো ধীরে ধীরে শক্তিশালী রাষ্ট্রে রূপ নিচ্ছিল। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় যাগযজ্ঞের মাধ্যমে পার্থিব সম্পদ বা স্বর্গ পাওয়ার আদিম আকাঙ্ক্ষা অনেক চিন্তাবিদের কাছেই অর্থহীন মনে হতে শুরু করে। যজ্ঞের বাহ্যিক রূপকে মানসিক স্তরে রূপান্তরিত করার একটি প্রবণতা এই সময়ে প্রবল হয়ে ওঠে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অগ্নিতে ঘৃতাহুতির বদলে মানুষের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস বা প্রাণকে যজ্ঞাগ্নি হিসেবে কল্পনা করা হতে থাকে। এই ধরণের চিন্তার প্রকাশ দেখা যায় প্রাণাগ্নিহোত্র (Prāṇāgnihotra) ধারণার মধ্যে, যেখানে বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে অভ্যন্তরীণ আত্মসংযম বড় হয়ে ওঠে (Potter, 1981)।
এই পটভূমিতে উপনিষদগুলো মানুষের সামনে দুটি নতুন দার্শনিক ধারণা হাজির করে: ব্রহ্ম (Brahman) এবং আত্মন (Ātman)। প্রাচীন সংহিতায় যেখানে প্রাকৃতিক শক্তিরূপী দেবতাদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা প্রধান ছিল, উপনিষদে এসে সমস্ত সৃষ্টির পেছনের এক অবিভাজ্য ও নৈর্ব্যক্তিক অস্তিত্বের অনুসন্ধান শুরু হলো। এই পরম সত্যকে বলা হলো ব্রহ্ম। আর ব্যক্তির অন্তরে থাকা চিরন্তন চৈতন্যকে চিহ্নিত করা হলো আত্মন হিসেবে। বৃহদারণ্যক কিংবা ছান্দোগ্য উপনিষদের মতো প্রাচীন পাঠগুলোতে বারবার এই প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে, সবকিছুকে ছাড়িয়ে মানুষের স্থায়ী সত্তা আসলে কোনটি। মৃত্যু, ক্ষয় ও জাগতিক দুঃখের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে যজ্ঞের নশ্বর ফলাফলের বদলে আত্মজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা সামনে চলে আসে।
পণ্ডিত পল হ্যাকার (Paul Hacker) উপনিষদের এই রূপান্তরকে একটি নতুন জ্ঞানতাত্ত্বিক পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Hacker, 1995)। তার মতে, প্রাচীন বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থায় জ্ঞানের স্থান ছিল গৌণ, আচার ছিল প্রধান। কিন্তু উপনিষদীয় ধারায় যজ্ঞকে অস্বীকার না করেও তাকে নিম্নস্তরের বিষয় বলে গণ্য করা হলো। বৈদিক সাহিত্যকে ভাগ করে ফেলা হলো দুটি স্পষ্ট ভাগে: আচারপ্রধান অংশকে বলা হলো কর্মকাণ্ড (Karmakāṇḍa) এবং উপনিষদের অধ্যায়গুলোকে বলা হলো জ্ঞানকাণ্ড (Jñānakāṇḍa)। তবে এই রূপান্তর কোনো আকস্মিক বিপ্লব ছিল না। উপনিষদের ঋষিরা কোনো একক বা সুসংহত দর্শনের জন্ম দেননি; তারা নানা ধরণের কাব্যিক রূপক, স্বগতোক্তি ও সংলাপের মাধ্যমে তাদের অন্বেষণ লিপিবদ্ধ করেছিলেন। ফলে তাদের রচনায় যেমন অদ্বৈতভাবের আভাস ছিল, তেমনি বহুত্ববাদী ও দ্বৈতবাদী চিন্তার বীজও রয়ে গিয়েছিল।
দার্শনিক ব্রায়ান ব্ল্যাক (Brian Black) উপনিষদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, এই গ্রন্থগুলোতে কেবল নির্জন বনের ঋষিদের কথা নেই, বরং রাজা ও পুরোহিতদের মধ্যকার ক্ষমতা ও মর্যাদার দ্বন্দ্বও প্রতিফলিত হয়েছে (Black, 2007)। রাজদরবারে আয়োজিত নানা দার্শনিক বিতর্কে ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের পাশাপাশি ক্ষত্রিয় রাজাদেরও গভীর তত্ত্বজ্ঞান নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। অর্থাৎ জ্ঞানের এই নতুন অভিমুখটি প্রাচীন বৈদিক যাজকতন্ত্রের একক আধিপত্যের মুখে এক ধরণের নীরব বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল। বাহ্যিক ক্রিয়াকর্মের প্রাচীর ভেঙে মানুষের মনোযোগ সরে গিয়েছিল অস্তিত্বের অন্তর্গত স্বরূপ খোঁজার দিকে।
প্রস্থানত্রয়ের শাস্ত্রীয় ত্রিকোণ: শ্রুতি, স্মৃতি ও ন্যায় (The Scriptural Triad of Prasthānatrayī: Śruti, Smṛti, and Nyāya)
উপনিষদের চিন্তাগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল বিভিন্ন শাখার নানা গ্রন্থে। সেখানে পরস্পরবিরোধী কথার অভাব ছিল না। কোথাও বলা হচ্ছিল সৃষ্টি ব্রহ্ম থেকে পৃথক, আবার কোথাও বলা হচ্ছিল সৃষ্টি ও স্রষ্টা সম্পূর্ণ অভিন্ন। এই বহুত্ববাদী ধারণার জটলার ভেতর থেকে একটি গ্রহণযোগ্য ও সংহত দর্শন গড়ে তোলা ভারতীয় পণ্ডিতদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই প্রয়োজন থেকেই পরবর্তীতে গড়ে ওঠে প্রস্থানত্রয় (Prasthānatrayī) নামের শাস্ত্রীয় কর্তৃত্বের এক নিশ্ছিদ্র কাঠামো। বেদান্ত দর্শনের যেকোনো শাখায় নিজের মত প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই তিনটি শাস্ত্রীয় স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলা বাধ্যতামূলক ছিল।
প্রস্থানত্রয়ের প্রথম স্তম্ভ হলো শ্রুতিপ্রস্থান (Śrutiprasthāna)। এর অন্তর্ভুক্ত হলো প্রধান প্রধান উপনিষদগুলো, বিশেষ করে ঈশ, কেন, কঠ, প্রশ্ন, মুণ্ডক, মাণ্ডূক্য, তৈত্তিরীয়, ঐতরেয়, ছান্দোগ্য এবং বৃহদারণ্যক। শ্রুতি হিসেবে এগুলোকে শাশ্বত ও সরাসরি প্রকাশিত জ্ঞান বলে মনে করা হতো। শ্রুতিপ্রস্থানের বাক্যগুলো মানবীয় তর্কের অতীত বলে দাবি করা হতো। তবে সমস্যা ছিল, উপনিষদের ভাষা কোনো ব্যাকরণসম্মত আইনি ধারা ছিল না; তা ছিল গভীর অতিন্দ্রীয় অনুভূতির কাব্যিক প্রকাশ। তাই কেবল শ্রুতির ওপর নির্ভর করে কোনো বিতর্কহীন দার্শনিক মত খাড়া করা সম্ভব ছিল না।
দ্বিতীয় স্তম্ভ হিসেবে স্থান পায় স্মৃতিপ্রস্থান (Smṛtiprasthāna), যার কেন্দ্রীয় টেক্সট হলো মহাভারতের অন্তর্গত ভগবদ্গীতা (Bhagavadgītā)। স্মৃতি বলতে বোঝানো হতো মানুষের স্মৃতি ও ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত পাঠ। গীতাকে স্মৃতির মর্যাদা দেওয়া হলেও বেদান্তের পরিমণ্ডলে এর ওজন ছিল অপরিসীম। গীতা প্রাচীন উপনিষদের জ্ঞানকাণ্ড এবং প্রচলিত সমাজের সামাজিক কর্তব্যের মধ্যে এক ধরণের আপস তৈরি করার চেষ্টা করেছিল। কুরুক্ষেত্রের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে অর্জুনের প্রতি কৃষ্ণের উপদেশে একদিকে যেমন ব্রহ্ম ও আত্মতত্ত্বের কথা বলা হয়েছে, তেমনি অন্যদিকে বর্ণাশ্রম ধর্মের অনুশাসনের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। তাত্ত্বিক বিচারে গীতা হয়ে উঠল এমন এক গ্রন্থ, যা সাধারণ মানুষের আচার-আচরণ ও ভক্তির সাথে উপনিষদের কঠিন জ্ঞানতত্ত্বকে যুক্ত করে দেয়।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে যৌক্তিক স্তম্ভটি হলো ন্যায়প্রস্থান (Nyāyaprasthāna), যা মূলত বাদরায়ণের রচিত ব্রহ্মসূত্র (Brahmasūtra) গ্রন্থটিকে নির্দেশ করে। শ্রুতি ও স্মৃতির ভাবাবেগপূর্ণ ও রূপক বাক্যগুলোকে একটি সুশৃঙ্খল ও তর্কশাস্ত্রসম্মত রূপ দেওয়ার জন্য এই গ্রন্থের অবতারণা। একে অনেক সময় শারীরিক সূত্র বা বেদান্তসূত্রও বলা হয়। উপনিষদের বক্তব্য যে যুক্তিগ্রাহ্য এবং তা যে অন্য কোনো দর্শনের দ্বারা খণ্ডনযোগ্য নয়, তা প্রমাণ করাই ছিল এই গ্রন্থের প্রধান লক্ষ্য। গবেষক হাজিমে নাকামুরা (Hajime Nakamura) তার বিশদ গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, প্রাচীন ভারতে প্রস্থানত্রয়ের এই কাঠামোটি কেবল ধর্মীয় কারণে নয়, বরং দার্শনিক বিতর্কের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম হিসেবে গড়ে উঠেছিল (Nakamura, 1983)।
ভারতীয় বিদ্যাবত্তার নিয়ম অনুযায়ী, কেউ যদি নতুন কোনো বেদান্ত সম্প্রদায় গড়ে তুলতে চাইতেন, তবে তাকে অবশ্যই এই তিনটি ভিত্তির ওপর নিজের বিশদ ব্যাখ্যা বা ভাষ্য (Bhāṣya) লিখতে হতো। কেবল নিজের কল্পনা বা স্বতন্ত্র যুক্তির ওপর ভিত্তি করে ভারতীয় দর্শনে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া যেত না; প্রাচীন শাস্ত্রের সাথে নিজের চিন্তার যোগসূত্র দেখানো ছিল অপরিহার্য। ইতিহাসবিদ অরবিন্দ শর্মা (Arvind Sharma) লক্ষ্য করেছেন, প্রস্থানত্রয়ের এই অনুশাসন বেদান্ত দর্শনকে একটি কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা দিয়েছিল (Sharma, 2000)। এই ব্যবস্থার কারণে কোনো দার্শনিকই ঐতিহ্যের বাইরে গিয়ে হঠাৎ কিছু দাবি করতে পারতেন না, আবার একই সাথে ঐতিহ্যের ভেতরের পাঠকে নিজের মতো করে নতুন অর্থে ব্যাখ্যা করার সুযোগও তাদের হাতে থেকে যেত।
ব্রহ্মসূত্রের সমন্বয়পদ্ধতি ও বাদরায়ণের দর্শন (The Synthetic Method of Brahmasūtra and Bādarāyaṇa’s Philosophy)
বেদান্তের বৌদ্ধিক ইতিহাসে বাদরায়ণের স্থানটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের কোনো এক সময়ে রচিত ব্রহ্মসূত্র (Brahmasūtra) ছিল উপনিষদের বিচিত্র বক্তব্যের প্রথম সুসংহত দার্শনিক বিন্যাস। গ্রন্থটি চারশো পঞ্চান্নটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সূত্রের মাধ্যমে চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত। এই চার অধ্যায়ের নাম হলো সমন্বয়, অবিরোধ, সাধন এবং ফল। সূত্রের বৈশিষ্ট্যই হলো তা হবে সংক্ষিপ্ত, দ্ব্যর্থহীন অথচ বহু অর্থগর্ভ। কিন্তু বাদরায়ণের সূত্রগুলো এতই সংক্ষিপ্ত ছিল যে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া সেগুলোর প্রকৃত অর্থ উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব।
প্রথম অধ্যায়টির নাম সমন্বয় (Samanvaya) বা সুসংগত সামঞ্জস্যসাধন। উপনিষদের বিভিন্ন অংশে দৃশ্যত যেসব পরস্পরবিরোধী কথা পাওয়া যায়, সেগুলোর মধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য দেখান বাদরায়ণ। কোথাও বলা হয়েছে জগৎ আলো থেকে তৈরি, কোথাও বলা হয়েছে প্রাণ থেকে, আবার কোথাও আকাশ থেকে। বাদরায়ণ যুক্তি দেন যে এই সমস্ত পার্থিব প্রতীক আসলে পরম সত্তা ব্রহ্মকেই ইঙ্গিত করে। পুরো উপনিষদের একমাত্র লক্ষ্য হলো ব্রহ্মের প্রতি নির্দেশ করা, অন্য কোনো জড় বস্তুর প্রতি নয়। এই অধ্যায়ের মাধ্যমে বাদরায়ণ উপনিষদের বিভিন্ন পাঠকে একটি কেন্দ্রীয় দার্শনিক সূত্রের অধীনে নিয়ে আসেন।
দ্বিতীয় অধ্যায় অর্থাৎ অবিরোধ (Avirodha)-এ বাদরায়ণ তার সমসাময়িক বিরোধী দর্শনগুলোর যুক্তি খণ্ডন করতে উদ্যোগী হন। সেই যুগে সাংখ্য দর্শনের প্রধান (Pradhāna) বা অন্ধ জড় প্রকৃতির তত্ত্ব অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। সাংখ্যরা দাবি করতেন যে জগতের সমস্ত রূপান্তর প্রকৃতির নিয়মে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে, এর জন্য কোনো চৈতন্যময় ব্রহ্মের দরকার নেই। বাদরায়ণ সাংখ্যের এই জড় পরিণামবাদকে খণ্ডন করেন। একই সাথে তিনি বৈশেষিক দর্শনের পরমাণুবাদ (Paramāṇuvāda), বৌদ্ধ দর্শনের ক্ষণিকবাদ ও বিজ্ঞানবাদ এবং জৈনদের অনেকান্তবাদকে তীক্ষ্ণ যুক্তির মাধ্যমে মোকাবেলা করেন। বাদরায়ণ দেখান যে এই সব মতবাদের ভেতরেই গভীর স্ববিরোধ রয়েছে, ফলে একমাত্র উপনিষদীয় ব্রহ্মতত্ত্বই যুক্তির কষ্টিপাথরে টিকে থাকে।
তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়ে যথাক্রমে সাধন বা আত্মজ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি এবং ফল বা মুক্তির স্বরূপ বর্ণনা করা হয়েছে। তবে বাদরায়ণের নিজের দর্শন আসলে ঠিক কী ছিল, এই নিয়ে আধুনিক গবেষকদের মধ্যে বড় ধরণের বিতর্ক রয়েছে। কারণ তার সূত্রগুলো এতটাই সংকুচিত যে সেগুলো বিভিন্ন দিকে বাঁক নেওয়া সম্ভব। গবেষক জ্যাকুলিন হার্স্ট (Jacqueline Suthren Hirst) দেখিয়েছেন যে পরবর্তী ভাষ্যকারেরা প্রত্যেকেই বাদরায়ণের এই শূন্যস্থানগুলোকে নিজেদের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহার করেছিলেন (Hirst, 2005)। কোনো কোনো সূত্রে মনে হয় বাদরায়ণ সৃষ্টিকে ব্রহ্মের বাস্তব রূপান্তর বা পরিণাম বলে মনে করতেন, যা ভেদাভেদ ধারণার খুব কাছাকাছি।
দার্শনিক ক্রিস্টোফার বার্টলি (Christopher Bartley) বাদরায়ণের সূত্রের ভাষা বিশ্লেষণ করে মন্তব্য করেছেন যে, তিনি খুব সম্ভবত কোনো এক ধরণের বাস্তববাদী অদ্বৈতবাদের পক্ষপাতী ছিলেন, যেখানে জগতকে একেবারে মিথ্যে বলা হয়নি (Bartley, 2002)। অথচ পরবর্তীকালে এই সূত্রগুলোর ওপর নির্ভর করেই তৈরি হয়েছিল পরস্পরবিরোধী সব দর্শন। সূত্রের এই অদ্ভুত নমনীয়তাই বেদান্তের ভাষ্যপরম্পরাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রাণবন্ত রেখেছিল। প্রতিটি নতুন প্রজন্মের পণ্ডিতেরা বাদরায়ণের সংক্ষিপ্ত সূত্রের ভেতর থেকে নতুন নতুন দার্শনিক তাৎপর্য আবিষ্কারের লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন।
শংকরাচার্য ও অদ্বৈত বেদান্ত: মায়াবাদ, অধ্যাস ও ভাষ্যনির্মাণ (Śaṅkarācārya and Advaita Vedānta: Māyāvāda, Adhyāsa, and Commentarial Craft)
বেদান্তের দীর্ঘ ইতিহাসে অষ্টম শতকের দার্শনিক আদি শংকর (Ādi Śaṅkara) এক অভূতপূর্ব বুদ্ধিবৃত্তিক আলোড়ন তৈরি করেছিলেন। তার পূর্বে মীমাংসা দর্শনের যাগযজ্ঞবাদী ব্যাখ্যাই সমাজের মূলধারায় কর্তৃত্ব করছিল। শংকর সেই আচারবাদের বিপরীতে গিয়ে উপনিষদের জ্ঞানতাত্ত্বিক দিকটিকে এমন এক অনমনীয় দার্শনিক রূপ দেন, যা ভারতীয় দর্শনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। তার প্রবর্তিত মতবাদ পরিচিত অদ্বৈত বেদান্ত (Advaita Vedānta) নামে। এই মতবাদের কেন্দ্রীয় কথা হলো: ব্রহ্মই একমাত্র সত্য, এই দৃশ্যমান জগৎ মিথ্যা বা মায়া, এবং জীব আসলে ব্রহ্ম ছাড়া অন্য কিছু নয়।
শংকর তার দর্শনের মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন তার বিখ্যাত ব্রহ্মসূত্রভাষ্য (Brahmasūtrabhāṣya) গ্রন্থের ভূমিকায়, যা দর্শনজগতে অধ্যাসভাষ্য (Adhyāsabhāṣya) নামে পরিচিত। এখানে তিনি আলোচনা করেছেন মানুষের জ্ঞানতাত্ত্বিক বিভ্রান্তির মূল কারণ নিয়ে। শংকর বলেন, বিষয়ী বা জ্ঞানসম্পন্ন আত্মা এবং বিষয় বা জড় জগতের ধর্ম সম্পূর্ণ বিপরীত, ঠিক যেমন আলো ও অন্ধকার। তা সত্ত্বেও মানুষ অনাদিকাল ধরে অজ্ঞতার কারণে একটার ধর্ম আরেকটার ওপর চাপিয়ে দেয়। শরীর অসুস্থ হলে মানুষ ভাবে “আমি অসুস্থ”, মন চঞ্চল হলে ভাবে “আমি অশান্ত”। এই যে এক বস্তুর ওপর অন্য বস্তুর গুণাবলিকে ভুলভাবে আরোপ করা, একেই বলা হয় অধ্যাস (Adhyāsa) বা ভ্রান্তি। রজ্জুতে সর্পভ্রমের মতো এই মৌলিক বিভ্রান্তির ফলেই মানুষ নিজেকে জগতের দুঃখ-কষ্টের অধীন মনে করে।
এই বিভ্রান্তি দূর করার জন্য শংকর জ্ঞানের দুটি স্তর নির্ধারণ করেন: পারমার্থিক সত্য (Pāramārthika Satya) এবং ব্যবহারিক সত্য (Vyāvahārika Satya)। পারমার্থিক স্তরে কোনো বহুত্ব নেই, কোনো জগৎ নেই, ঈশ্বর বা ভক্তের কোনো দ্বৈততা নেই; কেবল শুদ্ধ চৈতন্য বা ব্রহ্ম বিদ্যমান। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আত্মজ্ঞান লাভ না হচ্ছে, ততক্ষণ এই পার্থিব জগৎ, এর সুখ-দুঃখ এবং সামাজিক নিয়মকানুন সবই মানুষের কাছে সত্য বলে মনে হয়। একে বলা হয় ব্যবহারিক স্তর। এমনকি স্বপ্নের জগৎকেও তিনি আরেকটি স্তরে রেখেছেন, যার নাম প্রাতিভাসিক সত্য (Prātibhāsika Satya), যা ঘুম ভাঙার সাথে সাথে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এই বহুমাত্রিক সত্যের ধারণা ব্যবহার করে শংকর উপনিষদের বৈচিত্র্যময় বাক্যগুলোর চমৎকার সমন্বয় সাধন করেন।
শংকরের এই অনমনীয় অদ্বৈতবাদ এবং মায়াবাদ (Māyāvāda) সেযুগের রক্ষণশীল অনেক পণ্ডিতের কাছে গভীর অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশেষ করে বৌদ্ধ দর্শনের মাধ্যমক ও বিজ্ঞানবাদী ধারার সাথে শংকরের চিন্তার কিছু বাহ্যিক সাদৃশ্য থাকায় সমসাময়িক অনেকেই তাকে “প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ” (Pracchanna Bauddha) বা ছদ্মবেশী বৌদ্ধ বলে কটাক্ষ করেছিলেন। কারণ নাগার্জুনের শূন্যতা এবং শংকরের নির্বিশেষ ব্রহ্মের মধ্যেকার ধারণাগত দূরত্ব অত্যন্ত সূক্ষ্ম ছিল। গবেষক সেনগাকু মায়েদা (Sengaku Mayeda) শংকরের প্রামাণ্য রচনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, বৌদ্ধদের সাথে বিরোধ থাকলেও তাদের যুক্তিপদ্ধতি শংকরকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল (Mayeda, 1979)।
দার্শনিক জনার্দন গানেরি (Jonardon Ganeri) দেখিয়েছেন কীভাবে শংকর ভাষার নিজস্ব সীমাবদ্ধতা এবং রূপক ব্যবহারের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে একটি পরাবাস্তব দার্শনিক বয়ান তৈরি করেছিলেন (Ganeri, 2007)। শংকরের ভাষ্য কেবল শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা ছিল না, তা ছিল একই সাথে তীব্র বিতর্ক এবং নিখুঁত তর্কশাস্ত্রের মেলবন্ধন। তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে মুক্তি কোনো কর্ম বা আচার পালনের মাধ্যমে অর্জন করা যায় না। মুক্তি মানুষের কোনো নতুন অর্জন নয়; অজ্ঞানতার আবরণ সরে গেলে মানুষ বুঝতে পারে যে সে বরাবরই মুক্ত ছিল। এই মত তৎকালীন যজ্ঞনির্ভর পুরোহিত শ্রেণির সামাজিক কর্তৃত্বের ভিত্তিমূলে সরাসরি আঘাত করেছিল।
রামানুজ, মধ্ব ও ভক্তিবাদী পুনর্ব্যাখ্যা: ভেদাভেদ ও দ্বৈতের সংঘাত (Rāmānuja, Madhva, and Devotional Reinterpretations: The Clash of Bhedābheda and Dvaita)
শংকরের নির্গুণ ব্রহ্ম এবং জগতের মায়িক ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের ভক্তি আন্দোলনের ঢেউ যখন বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে প্রবেশ করতে শুরু করে, তখন শংকরের শুষ্ক জ্ঞানতত্ত্ব সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছিল। মানুষ এমন এক ঈশ্বরকে চাইছিল যার সামনে প্রার্থনা করা যায়, যাকে ভালোবাসা যায়। যদি জগৎ মিথ্যা হয় এবং জীব ও ব্রহ্ম যদি পুরোপুরি একই হয়, তবে ভক্তি বা উপাসনার কোনো জায়গাই থাকে না। এই সামাজিক ও ধর্মীয় সংকট থেকেই জন্ম নেয় বেদান্তের একাধিক ভক্তিবাদী ও ভিন্নমতাদর্শী সম্প্রদায়।
একাদশ শতকে আবির্ভূত হয়ে দার্শনিক রামানুজ (Rāmānuja) শংকরের মায়াবাদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বিশিষ্টাদ্বৈত (Viśiṣṭādvaita) বেদান্ত। তার রচিত সুবিখ্যাত ভাষ্য শ্রীভাষ্য (Śrībhāṣya)-তে তিনি শংকরের অবিদ্যার ধারণাকে সাতটি যুক্তির মাধ্যমে নস্যাৎ করেন, যা দর্শনের ইতিহাসে সপ্তবিধ অনুপপত্তি (Saptavidha Anupapatti) নামে পরিচিত। রামানুজের বক্তব্য ছিল, অবিদ্যা বা অজ্ঞান কার আশ্রয়ে থাকে? তা যদি ব্রহ্মের আশ্রয়ে থাকে, তবে ব্রহ্মের সর্বজ্ঞতা নষ্ট হয়; আর তা যদি জীবের আশ্রয়ে থাকে, তবে অবিদ্যা আসার আগেই জীবের অস্তিত্ব কল্পনা করতে হয়, যা যুক্তিহীন। রামানুজ দাবি করলেন জগৎ মিথ্যে নয়, জগৎ সম্পূর্ণ সত্য। ব্রহ্ম কোনো গুণহীন সত্তা নন, তিনি সমস্ত অনন্ত কল্যাণময় গুণের অধিকারী এক পরাৎপর ঈশ্বর, যিনি বিষ্ণু বা নারায়ণ।
রামানুজ জীব ও ব্রহ্মের সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করলেন দেহ ও আত্মার উপমায়, যাকে বলা হয় শরীর-শরীরী ভাব (Śarīra-Śarīrī Bhāva)। আমাদের আত্মা যেমন শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে কিন্তু শরীর আত্মা থেকে আলাদা, ঠিক তেমনি জড় প্রকৃতি এবং সমস্ত জীব হলো ঈশ্বরের শরীরস্বরূপ। তারা ঈশ্বরের ওপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল, কিন্তু তাদের নিজস্ব বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে। ফলে জীব ও ঈশ্বরের মধ্যে এক ধরণের বিশেষ সম্বন্ধযুক্ত অদ্বৈততা কাজ করে। এই মতবাদের মাধ্যমে রামানুজ জ্ঞানকাণ্ডের সাথে ভক্তি ও সামাজিক সেবার এক গভীর মেলবন্ধন তৈরি করতে সক্ষম হন।
ত্রয়োদশ শতকে এই বিতর্ককে আরও চরম রূপ দেন দার্শনিক মাধবাচার্য (Mādhvācārya)। তিনি আপসের সমস্ত পথ বন্ধ করে প্রবর্তন করেন দ্বৈত বেদান্ত (Dvaita Vedānta)। মধ্ব ঘোষণা করলেন যে জীব এবং ঈশ্বর কখনোই এক হতে পারে না; তাদের মধ্যে অনন্ত ও অলঙ্ঘনীয় পার্থক্য বিদ্যমান। তিনি বাস্তব জগতের পাঁচটি চিরন্তন ভেদকে চিহ্নিত করেন, যা পরিচিত পঞ্চভেদ (Pañcabheda) নামে: ঈশ্বরের সাথে জীবের ভেদ, ঈশ্বরের সাথে জড়ের ভেদ, জীবের সাথে জীবের ভেদ, জীবের সাথে জড়ের ভেদ এবং জড়ের সাথে জড়ের ভেদ। ছান্দোগ্য উপনিষদের বিখ্যাত মহাবাক্য “তত্ত্বমসি” (Tattvamasi বা ‘তুমিই সেই’)-কে তিনি বৈপ্লবিক ব্যাকরণগত কৌশলে ব্যাখ্যা করে দাবি করেন বাক্যটি আসলে হবে “অতত্ত্বমসি” (Atattvamasi বা ‘তুমি সেই নও’)।
গবেষক ভ্যালেরি স্টোকার (Valerie Stoker) বিজয়নগর সাম্রাজ্যের প্রেক্ষাপটে মধ্ব অনুসারীদের এই দার্শনিক আগ্রাসনের রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব উন্মোচন করেছেন (Stoker, 2016)। মধ্বের এই কঠোর দ্বৈতবাদ ঈশ্বরভক্তিকে এক অলঙ্ঘনীয় আনুগত্যের জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। এছাড়াও বেদান্ত ঐতিহ্যে আরও একাধিক শাখার বিকাশ ঘটেছিল। যেমন নিম্বার্ক (Nimbārka) প্রচার করেন দ্বৈতাদ্বৈত (Dvaitādvaita), যেখানে ভেদাভেদকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়; বল্লভ (Vallabha) গড়ে তোলেন শুদ্ধাদ্বৈত (Śuddhādvaita); আর পরবর্তীতে চৈতন্যের অনুসারী জীব গোস্বামী (Jīva Gosvāmin) ও বলদেব বিদ্যাভূষণ (Baladeva Vidyābhūṣaṇa) রূপ দেন অচিন্ত্যভেদাভেদ (Acintyabhedābheda) মতের। দার্শনিক রিচার্ড কিং (Richard King) দেখিয়েছেন যে, উপনিষদের একটি সাধারণ মূলধারা থেকে কীভাবে একের পর এক সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী সব দার্শনিক ব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে বেদান্ত কোনো একক মতবাদ নয়, বরং একটি বহুস্বরীয় প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য (King, 1999)।
বেদান্ত ভাষ্যপরম্পরার প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার ও সামাজিক প্রভাব (Institutional Spread and Social Impact of the Vedānta Commentarial Tradition)
বেদান্তের এই বিশাল তাত্ত্বিক বিতর্কগুলো কেবল পুঁথিপত্রের পাতায় বা পণ্ডিতদের পাঠশালায় সীমাবদ্ধ ছিল না। মধ্যযুগীয় ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় এই চিন্তাধারাগুলো গভীর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পরিগ্রহ করেছিল। এর মূল কারণ ছিল ভাষ্য রচনার ঐতিহ্য। একটি মূল টেক্সটের ওপর লেখা হতো ভাষ্য (Bhāṣya), সেই ভাষ্যের ওপর তৈরি হতো বিস্তারিত ব্যাখ্যা যাকে বলা হতো টীকা (Ṭīkā), আর টীকাকে আরও বিশদ করতে আসত টিপ্পনী (Ṭippanī)। এই বহুস্তরীয় ব্যাখ্যার জাল কেবল দার্শনিক পরিভাষা তৈরি করেনি, বরং প্রাচীন বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ব্যবস্থাকে যুগে যুগে নতুন সামাজিক রূপান্তরে টিকে থাকার রসদ জুগিয়েছিল।
দার্শনিক চিন্তাগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল মঠ ব্যবস্থার মাধ্যমে। লোকশ্রুতি অনুযায়ী শংকরাচার্য ভারতের চার প্রান্তে চারটি প্রধান মঠ (Maṭha) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন: দক্ষিণে শৃঙ্গেরি, পূর্বে পুরী, পশ্চিমে দ্বারকা এবং উত্তরে বদ্রীনাথ। ঐতিহাসিক বিচারে এই মঠগুলো সময়ের সাথে সাথে বিপুল ভূসম্পত্তি, রাজকীয় অনুদান এবং সামাজিক বিচার-আচারের কেন্দ্রে পরিণত হয়। অনুরূপভাবে রামানুজের অনুসারীরা শ্রীরঙ্গম ও মেলকোটকে কেন্দ্র করে এবং মধ্বপন্থীরা উডুপির মঠগুলোকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই মঠগুলো কেবল শাস্ত্রচর্চার জায়গা ছিল না, এগুলো ছিল নির্দিষ্ট সামাজিক ও বর্ণভিত্তিক ক্ষমতার সুরক্ষিত দুর্গ। স্থানীয় রাজারা নিজেদের শাসনের ধর্মীয় ও নৈতিক বৈধতা পাওয়ার জন্য এই বেদান্তিক মঠগুলোর ওপর নির্ভর করতেন।
তবে অধিবিদ্যার জগতে ব্রহ্মের সার্বিক ঐক্য নিয়ে যত বড় বড় কথাই বলা হোক না কেন, বাস্তব সমাজব্যবস্থায় বেদান্ত দার্শনিকদের বড় অংশই ছিলেন চরম রক্ষণশীল। উপনিষদীয় আত্মতত্ত্বের আলো সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের ওপর খুব কমই পড়েছিল। বাদরায়ণের ব্রহ্মসূত্রের প্রথম অধ্যায়ে থাকা অপশূদ্রাধিকরণ (Apaśūdrādhikaraṇa) অংশটি এর এক নির্মম প্রমাণ। সেখানে স্পষ্ট ভাষায় বিচার করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল যে শূদ্রদের বেদ অধ্যয়ন এবং বেদান্তের জ্ঞানলাভের কোনো শাস্ত্রীয় অধিকার নেই। শংকর থেকে শুরু করে রামানুজ – প্রায় সমস্ত শাস্ত্রকারই এই সামাজিক বর্জনকে কঠোরভাবে সমর্থন করেছিলেন। জীব ও ব্রহ্ম তাত্ত্বিকভাবে এক হলেও বাস্তব জগতে বর্ণাশ্রমের নিয়ম ভাঙার কোনো অনুমতি এই দর্শনে ছিল না।
নারীদের ক্ষেত্রেও বেদান্তের প্রতিষ্ঠানগুলো পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর বাইরে যেতে পারেনি। উপনিষদে গার্গী বা মৈত্রেয়ীর মতো বিদুষী নারীর উজ্জ্বল উপস্থিতি দেখা গেলেও, পরবর্তী মধ্যযুগীয় ভাষ্যপরম্পরায় নারীদের সন্ন্যাস গ্রহণ কিংবা স্বাধীন শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার অধিকারকে অস্বীকার করা হয়। রামানুজ ও মধ্বের ভক্তিবাদী আন্দোলনগুলো সাধারণ মানুষকে মানসিকভাবে কিছুটা জায়গা দিলেও, মঠ ও প্রধান শাস্ত্রীয় পদগুলো সবসময়ই নির্দিষ্ট উচ্চবর্ণের পুরুষদের দখলেই থেকে গিয়েছিল। উপনিষদের সর্বজনীন মুক্তির তত্ত্ব বাস্তবে সমাজের উচ্চবর্গের বৌদ্ধিক অলঙ্কার হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হয়েছিল।
আধুনিক যুগে এসে বেদান্তের এই ঐতিহ্যটি এক সম্পূর্ণ নতুন ঐতিহাসিক মাত্রা পায়। উনিশ শতকে যখন ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা চলছিল, তখন রাজা রামমোহন রায়, স্বামী বিবেকানন্দ এবং পরবর্তীতে সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের মতো চিন্তাবিদেরা অদ্বৈত বেদান্তকেই সমগ্র ভারতীয় সংস্কৃতির মূল সুর হিসেবে তুলে ধরেন। ইতিহাসবিদ ভিলহেম হালবফাস (Wilhelm Halbfass) একে “নব্য-বেদান্ত” (Neo-Vedānta) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Halbfass, 1991)। পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান ও বস্তুবাদকে নৈতিকভাবে মোকাবিলা করার জন্য তারা বেদান্তের অদ্বৈতবাদী আত্মতত্ত্বকে একটি আধুনিক ও মানবিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এর ফলে প্রাচীন বেদান্তের অভ্যন্তরীণ বর্ণবৈষম্য ও বর্জনের রাজনীতি ঢাকা পড়ে গিয়ে এটি আধুনিক হিন্দু পরিচয়ের এক প্রভাবশালী বৈশ্বিক প্রতীকে রূপান্তরিত হয়। এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক পরিক্রমা প্রমাণ করে যে, বেদান্ত নিছক কোনো প্রাচীন মরমীবাদ নয়, বরং তা ছিল ভারতের বৌদ্ধিক ও সামাজিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত জটিল, প্রভাবশালী ও পরিবর্তনশীল চালিকাশক্তি।
বেদ ও ন্যায়-বৈশেষিক দর্শন (Vedas and Nyāya-Vaiśeṣika): প্রমাণ, ঈশ্বর, শব্দ ও বৈদিক কর্তৃত্ব
যুক্তিপদ্ধতি ও বৈদিক ঐতিহ্যের সংযোগ (Logical Method and the Connection to Vedic Tradition)
প্রাচীন ভারতে যারা তর্ক করতেন, তাদের জীবনটা খুব সহজ ছিল না। যজ্ঞের ধোঁয়া আর মন্ত্রোচ্চারণের ভিড়ে একদল মানুষ হঠাৎ দাবি করে বসলেন, কোনো কথা শুধু প্রাচীন বা পবিত্র বলেই মেনে নেওয়া যাবে না; সেটাকে প্রমাণের কষ্টিপাথরে ঘষে দেখতে হবে। এই যুক্তিবাদী ধারার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দাঁড়িয়েছিল ন্যায় দর্শন (Nyāya Philosophy) এবং বৈশেষিক দর্শন (Vaiśeṣika Philosophy) নামের দুটি ঘরানার হাত ধরে। প্রথম দিকে বৈদিক রক্ষনশীল সমাজ এদের ভালো চোখে দেখেনি। সংহিতায় বা ব্রাহ্মণে অভ্যস্ত সমাজ ভাবত, যুক্তিশাস্ত্র বুঝি শাস্ত্রের ভিত নাড়িয়ে দেবে। মহাভারত (Mahābhārata) কিংবা মনুর বিধানে এই ধরনের তার্কিকদের ‘হৈতুক’ বা সংশয়বাদী বলে কটাক্ষ করা হয়েছিল, যারা যুক্তি দিয়ে ধর্মকে যাচাই করতে গিয়ে সমাজকে বিভ্রান্ত করে (Halbfass, 1991)।
বাস্তবে পরিস্থিতি কিন্তু অন্য মোড় নিল। যুক্তিশাস্ত্রের প্রবক্তারা সমাজের বাইরে চলে যাননি। তারা শাস্ত্রকে বাতিল না করে শাস্ত্রের চারপাশে যুক্তির এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর তোলার চেষ্টা করলেন। দর্শনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ভারতের মাটিতে দর্শনচর্চা কোনো দিন শূন্যে ঘটেনি; রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের মঞ্চ থেকেই এর জন্ম। প্রাচীন ভারতে বিতর্ক বা বাদানুবাদ ছিল রাজদরবারের বড় আকর্ষণ। অক্ষপাদ গৌতম (Akṣapāda Gautama) যখন তার সূত্র সংকলন করলেন, তখন তিনি শুধু তর্ক করার নিয়ম বাঁধেননি, একই সাথে দেখিয়েছিলেন কীভাবে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব। ন্যায়ধারার প্রথম লক্ষ্য ছিল মোক্ষ বা অপবর্গ লাভ, তবে সেই মুক্তির পথটি উপনিষদের মতো কোনো অতিন্দ্রীয় ধ্যান নয়, বরং ষোলোটি দার্শনিক পদার্থের যথার্থ জ্ঞান (Potter, 1977)।
ন্যায় সূত্রকাররা বৈদিক ঐতিহ্যকে অস্বীকার করার বদলে যুক্তির মাধ্যমে তার প্রামাণ্য প্রতিষ্ঠা করার এক কৌশলী পথ নিলেন। সেকালে বৌদ্ধ ও জৈন দার্শনিকরা বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থা এবং মন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন তুলছিলেন। চার্বাকরা তো সরাসরি বলেই বসেছিল যে বেদ হলো ভণ্ড, ধূর্ত ও নিশাচরদের রচনা। এই তীব্র আক্রমণের মুখে শুধু বিশ্বাসের দোহাই দিয়ে টিকে থাকা বৈদিক পণ্ডিতদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ঠিক এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে আসরে নামল ন্যায় এবং বৈশেষিক ঘরানা। তারা বৈদিক প্রমাণকে অন্ধবিশ্বাস হিসেবে নয়, বরং জ্ঞানতত্ত্বের একটি বৈধ মাধ্যম হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করল।
এই সমন্বয়ের কাজটা করতে গিয়ে বৈদিক সাহিত্যের রূপ অনেকটাই বদলে গেল। ঋগ্বেদের কবিরা যেভাবে প্রকৃতির স্তুতি করতেন, নৈয়ায়িকরা সেখানে খুঁজে পেতে চাইলেন কার্য-কারণ সম্পর্ক। কণাদ (Kaṇāda) তার চিন্তায় জগতকে ভাঙলেন পরমাণু স্তরে, আর গৌতম সাজালেন প্রমাণের ছক। তারা বললেন, মানুষের বুদ্ধি দিয়ে সত্য জানা সম্ভব এবং বেদ যদি সত্য প্রকাশ করে থাকে, তবে তা যুক্তির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই টিকে থাকবে। ফলে বৈদিক কর্তৃত্বের প্রশ্নটি অলৌকিক রহস্য থেকে নেমে এল মানুষের বিচারবুদ্ধি ও তর্কশাস্ত্রের বাস্তব জমিনে (Matilal, 1986)।
প্রমাণব্যবস্থা ও শব্দের স্বাতন্ত্র্য (Epistemology and the Autonomy of Verbal Testimony)
ন্যায় দর্শনের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে প্রমাণতত্ত্ব (Pramāṇa Theory)। সহজ কথায় বললে, মানুষ কীভাবে জানে এবং যা জেনেছে তা সত্যি কিনা তা বোঝার উপায় কী? ন্যায় মতে জ্ঞানের বৈধ উৎস চারটি – প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান ও শব্দ। চার্বাক কেবল প্রত্যক্ষ মানত, বৌদ্ধরা মানত প্রত্যক্ষ ও অনুমান। কিন্তু ন্যায় সম্প্রদায় দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করল যে শব্দও একটি স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ। যদি মানুষ শব্দকে প্রমাণ হিসেবে স্বীকার না করে, তবে সমাজের দৈনন্দিন কাজ অচল হয়ে পড়বে। দূরদেশের খবর, অতীতের ইতিহাস কিংবা ভূগোলের বিবরণ মানুষ কীভাবে পায়? শব্দের মাধ্যমেই পায় (Chakrabarti, 1999)।
তবে সব শব্দই প্রমাণ নয়। বাজারে দাঁড়িয়ে কেউ কিছু একটা বলে দিলেই তা সত্য হয়ে যায় না। গৌতম শব্দের যে সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, তা অত্যন্ত হিসেবি। তিনি বললেন, ‘আপ্তোপদেশঃ শব্দঃ’ বা আপ্ত ব্যক্তির বাক্যই শব্দপ্রমাণ (Matilal, 1986)। আপ্ত কে? যিনি বস্তুর প্রকৃত স্বরূপ জানেন, যার মধ্যে কোনো বিভ্রান্তি বা প্রতারণার ইচ্ছা নেই এবং যিনি যথার্থ তথ্য প্রকাশে সমর্থ, তিনিই আপ্ত। কোনো সাধারণ মানুষও আপ্ত হতে পারেন, যদি তিনি যা দেখেছেন তা সততার সঙ্গে অবিকল প্রকাশ করেন। পথচলতি কোনো লোক যদি কাউকে বলে, ‘সামনের খাদে জল আছে, সাবধানে যাও’, তবে সেই বাক্যটি শব্দপ্রমাণ হিসেবে কাজ করে, কারণ সেখানে বক্তার কথার সঙ্গে বাস্তব বিষয়ের মিল রয়েছে।
এই আপ্তবচনের ধারণাই বৈদিক কর্তৃত্ব রক্ষার মূল চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়াল। নৈয়ায়িকরা দাবি করলেন, বৈদিক বাক্যগুলো অর্থহীন প্রলাপ নয়; সেগুলো অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বক্তার নির্দেশ। এখানে একটি লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটল। উপনিষদের মরমীবাদী উপলব্ধি কিংবা মীমাংসকদের অন্ধ শব্দের মহিমাকে সরিয়ে দিয়ে ন্যায় দর্শন বৈদিক ভাষাকে মানুষের সাধারণ যোগাযোগের ভাষার সমান্তরালে নিয়ে এল। বৈদিক বাক্য বোঝার প্রক্রিয়া আর লৌকিক বাক্য বোঝার প্রক্রিয়ার মধ্যে গুণগত কোনো তফাত রাখা হলো না। উভয় ক্ষেত্রেই আকাঙ্ক্ষা, যোগ্যতা, আসত্তি এবং তাৎপর্যজ্ঞানের প্রয়োজন পড়ে (Phillips, 1995)।
শব্দপ্রমাণের এই যৌক্তিক কাঠামোটি গড়ে তোলার ফলে ন্যায় দর্শন এক ঢিলে দুই পাখি মারল। প্রথমত, তারা বৌদ্ধদের সেই আপত্তি খারিজ করল, যেখানে বলা হয়েছিল শব্দ অনুমানেরই একটি রূপ এবং তার কোনো স্বাধীন মূল্য নেই। নৈয়ায়িকরা যুক্তি দিয়ে দেখালেন, শব্দ শুনে জ্ঞান হওয়ার যে মানসিক প্রক্রিয়া, তা অনুমানের চেয়ে আলাদা। দ্বিতীয়ত, তারা দেখালেন যে বেদ কোনো অলৌকিক গোলকধাঁধা নয়, বরং একটি সুসংহত ভাষা-কাঠামো। যদি কোনো বাক্য বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বৈদিক সাহিত্যের ব্যাখ্যায় এক ধরনের সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্লেষণপদ্ধতির জন্ম দিল, যেখানে ভাষার অর্থ নির্ধারণে ব্যাকরণ ও যুক্তিই প্রধান হয়ে উঠল (Bilimoria, 1988)।
অপৌরুষেয়তা বনাম পৌরুষেয়তা: মীমাংসার সঙ্গে বিতর্ক (Apauruṣeyatva versus Pauruṣeyatva: Debate with Mīmāṃsā)
বৈদিক সাহিত্যের কর্তৃত্ব নিয়ে সনাতন দর্শনের ভেতরেই যে লড়াইটি সবচেয়ে জমজমাট ছিল, তা হলো ন্যায় এবং মীমাংসা দর্শন (Mīmāṃsā Philosophy) এর লড়াই। মীমাংসকরা ছিলেন কট্টর রক্ষণশীল। তারা বিশ্বাস করতেন, বেদ অনাদি এবং অনন্ত। বেদের কোনো রচয়িতা নেই, এমনকি ঈশ্বরও বেদ রচনা করেননি। মীমাংসকদের পরিভাষায় এটা হলো অপৌরুষেয়তা (Apauruṣeyatva)। তাদের ধারণা ছিল, যদি বেদের কোনো লেখককে স্বীকার করা হয়, তবে মানুষের তৈরি অন্যান্য বইয়ের মতো বেদের মধ্যেও ভুলভ্রান্তি, মোহ কিংবা প্রতারণার সম্ভাবনা ঢুকে পড়বে। তাই শব্দকে তারা নিত্য বা অবিনশ্বর বলে ধরে নিয়েছিলেন (Ganeri, 2001)।
ন্যায় এবং বৈশেষিক পণ্ডিতরা এই মতকে সোজাসুজি নাকচ করে দিলেন। বাৎসয়ায়ন (Vātsyāyana) তার ভাষ্যে পরিষ্কার বললেন, কোনো শব্দই চিরন্তন হতে পারে না। শব্দ উৎপন্ন হয়, কানে পৌঁছায় এবং বিনষ্ট হয়। যদি একটা ঘণ্টা বাজানো হয়, তবে আওয়াজটা কিছুক্ষণের জন্য বাতাসে ভেসে থাকে এবং মিলিয়ে যায়। যদি শব্দ নিত্য হতো, তবে জগতের সব শব্দ সবসময় শোনা যেত। তাছাড়া যে কোনো ভাষা বা পাঠ কোনো না কোনো সচেতন কর্তার দ্বারা রচিত হতে বাধ্য। অক্ষর বা বাক্যের কোনো নিজস্ব স্বয়ম্ভূ ক্ষমতা নেই। তাই বেদকেও কারো না কারো রচনা হতে হবে। ন্যায় মতে বেদ অপৌরুষেয় নয়, বরং পৌরুষেয় (Pauruṣeya) বা সচেতন কর্তার সৃষ্টি (Potter, 1977)।
এখানে একটি বড় দার্শনিক সংকট তৈরি হলো। যদি বেদ পৌরুষেয় হয়, তবে তা মানবীয় সীমাবদ্ধতায় দুষ্ট হতে বাধ্য। মানুষ মাত্রই ভ্রম-প্রমাদ-বিপ্রলিপ্সার শিকার। এই সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে ন্যায় দার্শনিকরা এক অদ্ভুত ও গভীর যুক্তি হাজির করলেন। তারা বললেন, বেদ কোনো সাধারণ মানুষের রচনা নয়, এটা এমন এক সচেতন সত্তার রচনা যার মধ্যে কোনো অসম্পূর্ণতা নেই। তবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মীমাংসক কুমারিল ভট্ট (Kumārila Bhaṭṭa) এবং তার অনুসারীদের সঙ্গে তাদের তুমুল বিতর্ক হলো। মীমাংসকরা যুক্তি দিলেন, বেদের মধ্যে কোনো লেখকের নাম পাওয়া যায় না, বংশপরম্পরায় কেবল পাঠের ধারাবাহিকতা দেখা যায়। এর জবাবে নৈয়ায়িক জয়ন্ত ভট্ট (Jayanta Bhaṭṭa) তার গ্রন্থে বললেন, লেখকের নাম সরাসরি মনে না থাকা মানেই এই নয় যে লেখক কোনো দিন ছিলেন না; বহু প্রাচীন প্রাসাদের স্থপতির নাম মানুষ ভুলে যায়, তাই বলে সেই প্রাসাদ আপনাআপনি তৈরি হয়ে যায়নি (Bhattacharyya, 1985)।
এই বিতর্কটি কেবল ধর্মতাত্ত্বিক তর্ক ছিল না; এটা ছিল ভাষা ও বাস্তবতার মধ্যকার সম্পর্ক নির্ধারণের লড়াই। মীমাংসকরা শব্দের অর্থকে ভাবতেন একটি চিরন্তন সম্পর্ক। ন্যায় পণ্ডিতরা বললেন, শব্দের সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক কোনো চিরস্থায়ী মায়াজাল নয়; এটা তৈরি হয়েছে সংকেতের মাধ্যমে। মানুষ বা কোনো কর্তা এই সংকেত নির্ধারণ করে দেয়। বেদও যেহেতু বাক্যসমষ্টি দিয়ে তৈরি, তাই তার অর্থের পেছনেও একটি সচেতন ইচ্ছা কাজ করছে। ফলে বেদের কর্তৃত্ব রক্ষার জন্য নৈয়ায়িকরা মীমাংসার মতো রহস্যময় অপৌরুষেয়তার আশ্রয় না নিয়ে একটি বৌদ্ধিক ও যুক্তিসঙ্গত রচয়িতার খোঁজ করতে শুরু করলেন (Halbfass, 1991)।
ঈশ্বরের ধারণা ও বৈদিক প্রামাণ্যের যৌক্তিক ভিত্তি (The Concept of God and the Rational Basis of Vedic Authority)
বেদের রচয়িতা খুঁজতে গিয়েই ন্যায় দর্শনে ঈশ্বরের প্রবেশ ঘটল। দর্শনের প্রাথমিক যুগে গৌতমের সূত্রে ঈশ্বরের ভূমিকা ছিল নিতান্তই ক্ষীণ। অনেকে মনে করেন, প্রথম দিকের বৈশেষিক চিন্তাও ছিল সম্পূর্ণ নিরীশ্বরবাদী বা অন্ততপক্ষে ঈশ্বর নিয়ে উদাসীন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন দেখা গেল যে বেদের পৌরুষেয়তা প্রমাণ করতে গেলে কোনো সাধারণ মানুষ দিয়ে কাজ চলবে না, তখন তারা ঈশ্বরতত্ত্বকে সামনে নিয়ে এলেন। নৈয়ায়িকদের ঈশ্বর কিন্তু ভক্তি আন্দোলনের দয়ালু বা অলৌকিক ভগবান নন; তিনি হলেন মহাবিশ্বের একজন পরম কারিগর, যার কাজ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গতি বজায় রাখা এবং জ্ঞানের যথার্থতা রক্ষা করা (Bulcke, 1968)।
পরবর্তীকালের চিন্তাবিদ উদ্যোতকর (Uddyotakara) এবং বাচস্পতি মিশ্র (Vācaspati Miśra) এই ধারণাকে আরও ধারালো করলেন। তবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব ও বৈদিক প্রামাণ্যের পক্ষে সবচেয়ে বড় দার্শনিক দুর্গ তৈরি করেছিলেন উদয়নাচার্য (Udayanācārya) তার সুবিখ্যাত গ্রন্থ ন্যায়কুসুমাঞ্জলি (Nyāyakusumāñjali)-তে। উদয়ন সেখানে কার্যকারণ সূত্রের ওপর ভিত্তি করে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা করলেন। তার যুক্তির কাঠামোটি এরকম – এই মহাবিশ্ব একটি কার্য, ঠিক যেমন একটি মাটির পাত্র একটি কার্য। প্রতিটি কার্যের পেছনে একজন বুদ্ধিমান কর্তা থাকে। মাটির পাত্র একা একা তৈরি হতে পারে না, তার পেছনে একজন কুমোর থাকে। তেমনি পর্বত, নদী এবং এই বিপুল প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের নিশ্চয় একজন সচেতন নির্মাতা রয়েছেন, আর তিনিই হলেন ঈশ্বর (Phillips, 1995)।
এই যুক্তির পিঠে ভর করে উদয়ন বৈদিক প্রামাণ্যের সমাধান করলেন। তিনি বললেন, বৈদিক বাক্যগুলো যথার্থ কারণ এগুলোর রচয়িতা স্বয়ং ঈশ্বর, যিনি সর্বজ্ঞ এবং সব ধরনের ত্রুটির ঊর্ধ্বে। ঈশ্বরের মতো আপ্ত বা নির্ভরযোগ্য বক্তা আর কেউ হতে পারে না। ফলে ঈশ্বর যদি বেদের রচয়িতা হন, তবে বেদের প্রামাণ্য নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না। এখানে ন্যায় দর্শন একটি অদ্ভুত দার্শনিক বৃত্ত বা কাঠামোর মুখোমুখি হয়েছিল, যা সমালোচকদের চোখ এড়ায়নি। বেদ সত্য কারণ তা ঈশ্বরের বাণী, আবার ঈশ্বর আছেন কারণ বেদ তা বলছে – এই চক্রক দোষ এড়াতে নৈয়ায়িকরা দাবি করলেন যে তারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব বেদের জোরে প্রমাণ করছেন না, তারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করছেন বিশুদ্ধ যুক্তির সাহায্যে, বিশেষ করে জাগতিক কার্যের কর্তা হিসেবে (Mohanty, 1992)।
এই তত্ত্বের ভেতর দিয়ে বৈদিক কর্তৃত্বের যে নতুন ব্যাখ্যা দাঁড়াল, তা প্রাচীন যাগযজ্ঞের পুরোহিততন্ত্রের চেয়ে অনেক আলাদা। সেখানে শাস্ত্র কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ অন্ধ ক্ষমতার প্রতীক নয়; শাস্ত্রের সম্মান নির্ভর করছে তার পেছনের রচয়িতার নৈতিক ও জ্ঞানগত নিখুঁততার ওপর। ন্যায় এই প্রক্রিয়ায় বৈদিক সাহিত্যকে ঈশ্বরের জ্ঞানের অভিপ্রকাশ হিসেবে চিত্রিত করল, যা মানুষের বুদ্ধির কাছে গ্রহণযোগ্য হতে বাধ্য। যদি কোনো শাস্ত্রীয় বিধান বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে চরমভাবে সাংঘর্ষিক হতো, তবে নৈয়ায়িকদের যুক্তি অনুযায়ী তার আপ্তত্বই ভেঙে পড়ত। তাই তারা সবসময় চেষ্টা করেছেন শাস্ত্রীয় বিধিনিষেধকে যুক্তির কাঠামোর মধ্যে রেখে ব্যাখ্যা করতে (Potter, 1977)।
বৈশেষিক পরমাণুবাদ, অদৃষ্ট ও বেদ (Vaiśeṣika Atomism, Adṛṣṭa, and the Vedas)
ন্যায় যখন যুক্তি আর প্রমাণের জাল বুনছিল, বৈশেষিক দর্শন তখন ব্যস্ত ছিল এই বিশ্বজগৎ কী দিয়ে তৈরি, তা বিশ্লেষণ করতে। কণাদের লেখা বৈশেষিকসূত্র (Vaiśeṣikasūtra) দিয়ে যে যাত্রার শুরু, সেখানে জগতকে বোঝার জন্য সাতটি পদার্থ কল্পনা করা হয়েছিল – দ্রব্য, গুণ, কর্ম, সামান্য, বিশেষ, সমবায় এবং অভাব। এই ভাবনার মধ্যে অতিন্দ্রীয় কোনো অনুভূতির চেয়ে বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের ঝোঁক বেশি দেখা যায়। বৈশেষিকদের মতে, মাটি, জল, আগুন এবং বাতাসের মতো মৌলিক ভূতগুলো অবিভাজ্য পরমাণু দিয়ে গঠিত। এই পরমাণুগুলো নিত্য, কিন্তু তাদের সংযোগে তৈরি হওয়া বস্তুগুলো অনিত্য (Chakrabarti, 1999)।
এই ঘোর বস্তুবাদী কাঠামোর ভেতরে বৈদিক বিধান কীভাবে জায়গা পেল, সেটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। বৈশেষিক সূত্রের একেবারে শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘যতোঽভ্যুদয়নিঃশ্রেয়সসিদ্ধিঃ স ধর্মঃ’ – যা থেকে ইহলৌকিক উন্নতি এবং পরম কল্যাণ বা মুক্তি লাভ হয়, তাই ধর্ম। ধর্মের এই সংজ্ঞাটির মধ্যে কোনো সংকীর্ণ আনুষ্ঠানিকতার গন্ধ নেই। এখানে বস্তুগত সাফল্য বা অভ্যুদয়কে মুক্তির মতোই সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এরপরের সূত্রেই কণাদ ঘোষণা করেন, ‘তদ্বচনাম্নায়স্য প্রামাণ্যম্’ – সেই ধর্মের নির্দেশ দেয় বলেই বেদ প্রমাণ (Matilal, 1986)।
তাহলে যজ্ঞের ফল কীভাবে মেলে? বৈদিক সাহিত্য দাবি করত, যজ্ঞ করলে স্বর্গে যাওয়া যায় কিংবা বৃষ্টি হয়। বৈশেষিকরা এর পেছনে কোনো অলৌকিক দেবতার হাত দেখার চেয়ে একটি যান্ত্রিক নৈতিক নিয়ম দাঁড় করানোর চেষ্টা করলেন। তারা নিয়ে এলেন অদৃষ্ট (Adṛṣṭa) নামের একটি ধারণা। মানুষ যখন কোনো সৎ বা শাস্ত্রীয় কর্ম করে, তখন তার আত্মায় একটি সূক্ষ্ম সংস্কার বা অদৃশ্য শক্তি জমা হয়। এই শক্তিটিই হলো অদৃষ্ট। উপযুক্ত সময়ে এই অদৃষ্ট কার্যকর হয় এবং পরমাণুগুলোর মধ্যে সংযোগ ঘটিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল তৈরি করে। বৈশেষিকরা যজ্ঞের ক্রিয়াকে এক ধরনের মহাজাগতিক ও পরমাণু স্তরের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও আজকের দৃষ্টিতে তা নিতান্তই অনুমাননির্ভর (Halbfass, 1991)।
বৈশেষিক পণ্ডিত প্রশস্তপাদ (Praśastapāda) তার পদার্থধর্মসংগ্রহ (Padārthadharmasaṃgraha) গ্রন্থে এই বস্তুবাদী ও বৈদিক ধারণার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বসৃষ্টির প্রক্রিয়ায় ঈশ্বরের ইচ্ছাকে স্থান দিলেন বটে, কিন্তু ঈশ্বরের কাজ কেবল সুপ্ত অদৃষ্টকে সক্রিয় করা এবং পরমাণুগুলোকে একত্রিত হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া। কোনো জাদুমন্ত্র দিয়ে শূন্য থেকে পৃথিবী তৈরি করা ঈশ্বরের কাজ নয়; ঈশ্বরকে কাজ করতে হয় পূর্ববিদ্যমান পরমাণুর নিয়ম মেনেই। ফলে বৈশেষিক দর্শনে বেদ একটি নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে যা মানুষকে জানায় কোন কর্মের ফলে কোন অদৃষ্ট তৈরি হবে, কিন্তু জগতের অভ্যন্তরীণ বস্তুসত্তা চলে তার নিজস্ব পরমাণু সংযোগের নিয়মে (Potter, 1977)।
ন্যায়-বৈশেষিক সংশ্লেষ ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার (Nyāya-Vaiśeṣika Synthesis and Historical Legacy)
দশম শতকের পর থেকে ন্যায় এবং বৈশেষিক দর্শন এতটাই কাছাকাছি চলে আসে যে তাদের আলাদা করে দেখা কঠিন হয়ে পড়ে। পণ্ডিতরা একে ‘সমান-তন্ত্র’ বলতে শুরু করেন। দুই ধারার এই মিলনের ফলে ভারতীয় দর্শনে এক নতুন যুগের সূচনা হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি দেখা যায় নব্যন্যায় (Navya-Nyāya) ধারায়। চতুর্দশ শতকে মিথিলার পণ্ডিত গঙ্গেশ উপাধ্যায় (Gaṅgeśa Upādhyāya) যখন তার কালজয়ী গ্রন্থ তত্ত্বচিন্তামণি (Tattvacintāmaṇi) লিখলেন, তখন বৈদিক প্রামাণ্যের আলোচনা এক অতুলনীয় টেকনিক্যাল এবং ভাষাতাত্ত্বিক উচ্চতায় পৌঁছে গেল (Guha, 1968)।
নব্যন্যায় বৈদিক শাস্ত্রকে কোনো অলৌকিক বিশ্বাসের স্থান হিসেবে দেখেনি। তারা বৈদিক বাক্যগুলোকে কঠোর সংজ্ঞার্থ, পরিভাষা এবং সম্বন্ধতত্ত্বের মাধ্যমে ব্যবচ্ছেদ করল। ‘অভাব’, ‘প্রতিযোগিতা’, ‘অবচ্ছেদকতা’র মতো সূক্ষ্ম ধারণার জন্ম দিয়ে তারা দেখাল কীভাবে একটি বাক্যের অর্থ নির্দ্বিধায় এবং সম্পূর্ণ দ্ব্যর্থহীনভাবে নির্ধারণ করা যায়। বৈদিক সাহিত্যের বহু দুর্বোধ্য অংশের ব্যাখ্যায় এই যৌক্তিক ভাষা নতুন প্রাণ দিল। তবে এর উল্টো পিঠও ছিল। নব্যন্যায়ের পরিভাষার মারপ্যাঁচে পড়ে মূল বৈদিক ভাবাদর্শ অনেকটাই আড়ালে চলে গেল এবং দর্শন পরিণত হলো তর্কবিদ্যার এক কঠোর কসরতে (Ingalls, 1951)।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখলে, বৈদিক কর্তৃত্ব রক্ষায় ন্যায়-বৈশেষিক ধারার ভূমিকা ছিল দ্বিবিধ। একদিকে তারা শ্রমণ ধারার বৌদ্ধ ও জৈনদের ধারালো যুক্তির হাত থেকে বৈদিক মতাদর্শকে রক্ষা করার জন্য সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার জুগিয়েছিল। তারা মীমাংসকদের মতো গোঁড়ামিতে আটকে থাকেনি, আবার বৌদ্ধদের মতো বৈদিক উত্তরাধিকারকে সম্পূর্ণ বর্জনও করেনি। অন্যদিকে, শাস্ত্রের ওপর যুক্তির এই নিরবচ্ছিন্ন খবরদারি পরোক্ষভাবে বৈদিক সাহিত্যের অলৌকিক মহিমাকেই ধ্বংস করে দিয়েছিল। যখন কোনো শাস্ত্রীয় সত্যকে টিকে থাকার জন্য মানুষের তৈরি অনুমানের ওপর নির্ভর করতে হয়, তখন চূড়ান্ত কর্তৃত্ব আর শাস্ত্রের থাকে না, তা চলে যায় মানুষের বিচারবুদ্ধির হাতে (Ganeri, 2001)।
ন্যায়-বৈশেষিক দর্শনের এই লড়াই শেষ পর্যন্ত ভারতীয় মননকে এক অদ্ভুত বাস্তববাদী শিক্ষা দিয়েছিল। তারা দেখিয়েছে যে, বিশ্বাস যত গভীরই হোক না কেন, প্রমাণের মুখোমুখি তাকে দাঁড়াতেই হবে। বৈদিক সাহিত্যের হাজার বছরের ইতিহাস কেবল মন্ত্রপাঠে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা একটি বিশাল বৌদ্ধিক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল যেখানে প্রতিটি ধারণাকে নিজের অস্তিত্বের যুক্তি প্রমাণ করতে হয়েছে। ন্যায় এবং বৈশেষিকের এই যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বৈদিক ঐতিহ্যকে একটি অন্ধ ধর্মাচরণের হাত থেকে বাঁচিয়ে দার্শনিক অনুসন্ধিৎসার এক উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত করেছিল, যার বৌদ্ধিক অনুরণন প্রাচীন ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে আজও সমান প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে (Chakrabarti, 1999)।
বেদ ও সাংখ্য-যোগ দর্শন (Vedas and Sāṃkhya-Yoga): পুরুষ, প্রকৃতি, মুক্তি ও শাস্ত্রীয় সম্পর্ক
সাংখ্য দর্শনের ঐতিহাসিক উৎস ও বৈদিক সংযোগ (Historical Origins of Sāṃkhya and Vedic Connection)
প্রাচীন ভারতের চিন্তার জগতে যা কিছু ঘটেছে, তার সবটাই শান্ত নদীর মতো বয়ে চলেনি। সেখানে তীব্র স্রোত ছিল, আবার চোরাবালিও কম ছিল না। বৈদিক সাহিত্যের বিশাল ক্যানভাসে চোখ রাখলে দেখা যায়, একদিকে যজ্ঞের আগুনের চারপাশে পুরোহিতদের অবিরাম স্তোত্রপাঠ, অন্যদিকে অরণ্যের নিভৃতে বসে কিছু মানুষের একেবারে অন্যরকম ভাবনা। ঠিক কোন সময়ে সাংখ্য দর্শন (Sāṃkhya Philosophy) আলাদা একটি চিন্তাধারা হিসেবে দানা বেঁধেছিল, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে এটা স্পষ্ট যে উপনিষদের যুগে যেসব দার্শনিক বিতর্ক শুরু হয়েছিল, সাংখ্য তারই একটি পরিণতি। ঐতিহ্য অনুসারে কপিল নামের এক প্রাচীন মুনিকে এই দর্শনের আদি প্রবক্তা বলা হয়, যদিও ঐতিহাসিকভাবে তার অস্তিত্ব কুয়াশায় ঢাকা (Larson, 1979)।
বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীনতম স্তর সংহিতা বা ব্রাহ্মণে সাংখ্যের কোনো সুবিন্যস্ত কাঠামো পাওয়া যায় না। কিন্তু ভাবনাগুলো হঠাৎ আকাশ থেকে পড়েনি। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ‘নাসদীয় সূক্ত (Nāsadīya Sūkta)’-এ সৃষ্টির আদি উপাদান নিয়ে যে গভীর সংশয় ও অনুসন্ধান ছিল, তা সাংখ্যের বস্তুবাদী অনুসন্ধানের এক প্রাথমিক পটভূমি তৈরি করেছিল। পরবর্তীকালে উপনিষদের যুগে, বিশেষ করে শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ (Śvetāśvatara Upaniṣad) এবং কঠ উপনিষদ (Kaṭha Upaniṣad)-এ এমন কিছু পরিভাষা দেখা যায় যা সরাসরি সাংখ্যের সঙ্গে মিলে যায়। সেখানে প্রকৃতি, পুরুষ এবং ত্রিগুণের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। গবেষকদের একাংশ মনে করেন, প্রাচীন ভারতে বৈদিক ধারার বাইরে সমান্তরালভাবে কিছু স্বাধীন দার্শনিক ধারা সক্রিয় ছিল, যা পরবর্তীকালে বৈদিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয় (Frauwallner, 1973)।
মহাভারতের শান্তিপর্বের অন্তর্গত ‘মোক্ষধর্ম’ অংশে সাংখ্য ভাবনার এক সমৃদ্ধ উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। সেখানে এই দর্শনকে কোনো রহস্যময় জাদুবিদ্যা হিসেবে দেখানো হয়নি, বরং বস্তু ও চেতনার একটি যৌক্তিক বিভাজন হিসেবে হাজির করা হয়েছে। ‘সাংখ্য’ শব্দের সাধারণ অর্থ গণনা বা যুক্তিনির্ভর বিচার। জগতের উপাদানগুলোকে সংখ্যায় ভাগ করে সেগুলোর কার্যকারণ খতিয়ে দেখাই ছিল এই ঘরানার প্রধান ঝোঁক। যজ্ঞের পুরোহিতরা যখন দেবতাকে খুশি করতে ব্যস্ত, তখন সাংখ্যের চিন্তাবিদরা হিসাব কষছিলেন এই মহাবিশ্ব আসলে কয়টি উপাদানে গঠিত। ফলে ঐতিহাসিকভাবে বৈদিক যজ্ঞসংস্কৃতির ভেতর থেকেও সাংখ্য গড়ে তুলেছিল এক নিজস্ব ও স্বতন্ত্র অনুসন্ধিৎসা (Burley, 2007)।
তবু এই দর্শনের সঙ্গে বৈদিক ঐতিহ্যের সম্পর্কটা ছিল অদ্ভুত রকমের অম্লমধুর। একদিকে সাংখ্য নিজেকে বেদপন্থী বা আস্তিক হিসেবে দাবি করত, অন্যদিকে বৈদিক কর্মকাণ্ডের প্রতি তাদের ছিল প্রকাশ্য অনীহা। পরবর্তীকালে বাদরায়ণ (Bādarāyaṇa) তার বেদান্তসূত্রে সাংখ্য মতকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত করে খণ্ডন করতে তৎপর হয়েছিলেন। এর থেকে বোঝা যায়, প্রাচীন ভারতে বৈদিক সাহিত্যের প্রকৃত উত্তরাধিকার কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে যে লড়াই হয়েছিল, সেখানে সাংখ্যের অবস্থান ছিল অত্যন্ত জোরালো ও অস্বস্তিকর। তারা বৈদিক ঐতিহ্যকে অস্বীকার না করেও তার ভেতরের ধর্মীয় উপাদানগুলোকে পাশ কাটিয়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ব্যাখ্যার দিকে ঝুঁকে পড়েছিল (Dasgupta, 1922)।
পুরুষ ও প্রকৃতির দ্বৈতবাদ: বৈদিক সৃষ্টিতত্ত্বের পুনর্গঠন (Dualism of Puruṣa and Prakṛti: Reconstructing Vedic Cosmology)
বেদ যেখানে বহু দেবতার উপাসনা কিংবা এক পরম ব্রহ্মের ধারণা নিয়ে আবর্তিত হচ্ছিল, সেখানে সাংখ্য দর্শন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে দ্বিখণ্ডিত করল দুটি মৌলিক সত্তায় – পুরুষ (Puruṣa) এবং প্রকৃতি (Prakṛti)। ঋগ্বেদের বিখ্যাত পুরুষসূক্তে পুরুষ ছিল একটি মহাজাগতিক সত্তা, যার দেহাবয়ব থেকে এই সমাজের চার বর্ণ এবং মহাবিশ্বের বিভিন্ন অংশ উৎপন্ন হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু সাংখ্য দর্শনে এসে পুরুষের সেই পৌরাণিক রূপ সম্পূর্ণ ভেঙে গেল। এখানে পুরুষ কোনো সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর নয়, কোনো সামাজিক শৃঙ্খলার রক্ষকও নয়। পুরুষ হলো নিছক নিষ্ক্রিয়, নির্গুণ, চৈতন্যময় সাক্ষী বা দ্রষ্টা, যার নিজস্ব কোনো রূপান্তর বা সৃষ্টির ক্ষমতা নেই (Larson, 1979)।
সৃষ্টির যাবতীয় কাজের দায়িত্ব সাংখ্য তুলে দিল প্রকৃতির কাঁধে। প্রকৃতি হলো জড় জগতের আদি কারণ। এটা স্বয়ংক্রিয়, নিরন্তর পরিবর্তনশীল এবং স্বাধীন। সাংখ্যকার ঈশ্বরকৃষ্ণ (Īśvarakṛṣṇa) তার বিখ্যাত গ্রন্থ সাংখ্যকারিকা (Sāṃkhyakārikā)-তে দেখিয়েছেন যে, বিশ্বজগতে যা কিছু দৃশ্যমান, যা কিছু অনুভূত হয়, তা প্রকৃতিরই রূপান্তর। প্রকৃতির ভেতরে তিনটি মৌলিক গুণ সুপ্ত অবস্থায় থাকে – সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ। সত্ত্ব হলো প্রকাশ ও আনন্দের প্রতীক, রজঃ হলো গতি ও উত্তেজনার চালক, আর তমঃ হলো জড়তা ও অন্ধকারের উৎস। যতক্ষণ এই তিন গুণ পরস্পরের সঙ্গে সাম্যাবস্থায় থাকে, ততক্ষণ কোনো দৃশ্যমান সৃষ্টি থাকে না। কিন্তু পুরুষ ও প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসতেই গুণের সাম্য নষ্ট হয় এবং শুরু হয় সৃষ্টিপ্রক্রিয়া (Raju, 1985)।
এই দার্শনিক ব্যাখ্যা বৈদিক সাহিত্যের ঐশ্বরিক সৃষ্টিতত্ত্বের শিকড়ে সরাসরি আঘাত করেছিল। বৈদিক সাহিত্যে বারবার কোনো না কোনো দেবতার ইচ্ছাকে সৃষ্টির উৎস হিসেবে কল্পনা করা হয়েছিল – কখনো প্রজাপতি, কখনো বিশ্বকর্মা, কখনো বা ব্রহ্মা। সাংখ্য কোনো দেবতার হস্তক্ষেপ ছাড়াই সম্পূর্ণ যান্ত্রিক ও প্রাকৃতিক নিয়মে বিশ্বসৃষ্টির একটি মডেল দাঁড় করাল। এখানে কোনো সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের পরিকল্পনা নেই, কোনো অলৌকিক রহস্যাবৃত জাদু নেই। পুরুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ককে বোঝাতে গিয়ে ঈশ্বরকৃষ্ণ এক খোঁড়া ও অন্ধ মানুষের উপমা দিয়েছিলেন। অন্ধ ব্যক্তিটি চলতে পারে কিন্তু দেখতে পায় না (যা প্রকৃতি), আর খোঁড়া ব্যক্তিটি দেখতে পায় কিন্তু চলতে পারে না (যা পুরুষ)। তারা পরস্পরের প্রয়োজনে মিলিত হয় এবং যাত্রা শুরু করে (Burley, 2007)।
এই দ্বৈতবাদী কাঠামোটি বৈদিক চিন্তার জগৎকে নতুন করে সাজিয়েছিল। উপনিষদের অদ্বৈতবাদী ঝোঁক যেখানে সবকিছুকে এক পরম সত্তা বা ব্রহ্মের অংশ হিসেবে দেখতে চেয়েছিল, সাংখ্য সেখানে সাফ জানিয়ে দিল যে চেতনা এবং জড় বস্তু সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। মন, বুদ্ধি, অহংকার – যা কিছু আমরা সাধারণ ভাষায় মানসিক প্রক্রিয়া বলে ভাবি, সাংখ্য সেগুলোকে চেতনার অংশ না বলে জড় প্রকৃতিরই সূক্ষ্ম রূপান্তর হিসেবে ঘোষণা করল। ফলে মানুষের অভ্যন্তরীণ আবেগ, দুঃখ কিংবা যজ্ঞজাত পুণ্য সবই চলে গেল প্রকৃতির আওতায়। পুরুষ থাকল কেবল এক নিঃসঙ্গ ও নির্লিপ্ত আলোকবর্তিকা হিসেবে (Frauwallner, 1973)।
সৎকার্যবাদ ও বিবর্তনপ্রক্রিয়া (Satkāryavāda and the Evolutionary Process)
সাংখ্য দর্শনের তাত্ত্বিক শৃঙ্খলার সবচেয়ে সংহত ভিত্তি হলো সৎকার্যবাদ (Satkāryavāda)। দর্শনের পুরনো প্রশ্ন হলো, কার্য কীভাবে উৎপন্ন হয়? যা পূর্বে ছিল না, তা কি হঠাৎ করে শূন্য থেকে তৈরি হতে পারে? সাংখ্য বলল, না। যা নেই, তা থেকে কখনোই কিছু হতে পারে না। তিল পিষলেই তেল পাওয়া যায়, কারণ তেল তিলের মধ্যে আগেই সুপ্ত ছিল। বালু পিষে কেউ তেল বের করতে পারে না, কারণ বালুর মধ্যে তেল থাকে না। সুতরাং কার্য উৎপত্তির আগেই তার উপাদানের মধ্যে নিহিত থাকে। এই ধারণাকে বলা হয় পরিণামবাদ, অর্থাৎ উপাদানের বাস্তব রূপান্তরের ফলেই নতুন কার্যের প্রকাশ ঘটে (Dasgupta, 1922)।
সৎকার্যবাদের এই যুক্তিজাল ব্যবহার করে সাংখ্যকাররা দেখালেন যে, এই বিপুল বৈচিত্র্যময় জগৎ কোনো শূন্য থেকে আসেনি, এমনকি ঈশ্বরের অলৌকিক ইচ্ছাতেও জন্ম নেয়নি। জগতের পেছনে নিশ্চয়ই এমন এক অবিভাজ্য ও নিত্য উপাদান রয়েছে, যার মধ্যে সব রূপান্তর সুপ্ত ছিল। সেই আদি উপাদানই হলো প্রকৃতি। সাংখ্যের সৃষ্টিতত্ত্ব একটি ধারাবাহিক বিবর্তনপ্রক্রিয়া। প্রকৃতি থেকে প্রথমে উৎপন্ন হয় মহৎ (Mahat) বা বিশ্ববুদ্ধি। মহৎ থেকে রূপ নেয় অহংকার (Ahaṃkāra), যা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বা ‘আমি’-বোধের জন্ম দেয়। অহংকার আবার তিন গুণের প্রভাবে বিভক্ত হয়ে একাধারে পাঁচটি ইন্দ্রিয়, পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়, মন এবং পাঁচটি সূক্ষ্ম তন্মাত্র তৈরি করে। সেই তন্মাত্র থেকে শেষ পর্যন্ত জন্ম নেয় পাঁচটি স্থূল ভূত – মাটি, জল, আগুন, বাতাস ও আকাশ (Larson, 1979)।
সব মিলিয়ে পঁচিশটি উপাদানের এই ছকটি ছিল অত্যন্ত হিসেবি। বৈদিক সাহিত্যের পৌরাণিক সৃষ্টিবৃত্তান্তের তুলনায় এটা ছিল অনেক বেশি পদ্ধতিগত। বৈদিক যুগে ভাবা হতো দেবতারা যজ্ঞের মাধ্যমে বিশ্বকে রূপ দিয়েছেন। সাংখ্য বলল, রূপান্তরের এই গোটা প্রক্রিয়াটি ঘটে প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে। এখানে কোনো অলৌকিক হাত নেই। কোনো কিছু ধ্বংস হয়ে যাওয়া মানে কিন্তু চিরতরে মুছে যাওয়া নয়, বরং তার আদি উপাদানে ফিরে যাওয়া। মাটি থেকে কলসি তৈরি হওয়া যেমন পরিণাম, তেমনি কলসি ভেঙে মাটিতে মিশে যাওয়াও প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্র (Raju, 1985)।
এই বিবর্তনবাদী কাঠামোটি শাস্ত্রীয় দর্শনে একটি বিকল্প ধারা তৈরি করেছিল। যেখানে বৈদিক আচারবাদ দাবি করত যে ব্রাহ্মণদের মন্ত্রোচ্চারণ ছাড়া প্রকৃতির গতি সচল রাখা সম্ভব নয়, সাংখ্য যুক্তি দিয়ে দেখাল যে মানুষের কোনো ধর্মীয় আচার বা দেবতাতুষ্টির ওপর প্রকৃতির বিবর্তন নির্ভর করে না। প্রকৃতি আপন নিয়মেই বিবর্তিত হয় এবং পুরুষকে ভোগ ও অপবর্গ দেওয়ার পর আবার নিজের গভীরে গুটিয়ে নেয়। ফলে যজ্ঞবেদির আগুন বা সোমরসের ওপর জগতের অস্তিত্ব নির্ভর করার যে বৈদিক সামাজিক বয়ান ছিল, তাত্ত্বিক স্তরে তার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল (Burley, 2007)।
যোগদর্শন ও মনস্তাত্ত্বিক অনুশীলন: বৈদিক যজ্ঞ থেকে কায়িক নিয়ন্ত্রণ (Yoga Philosophy and Psychological Practice: From Vedic Ritual to Bodily Discipline)
সাংখ্যের তাত্ত্বিক ভিত্তিটি যে ব্যবহারিক রূপ পেয়েছিল, তা আমরা দেখতে পাই যোগদর্শনের ভেতর। ঐতিহাসিক ধারায় সাংখ্য ও যোগকে একে অপরের পরিপূরক ভাবা হয়। পণ্ডিতদের ভাষায় সাংখ্য যদি হয় তত্ত্ব, তবে যোগ হলো তার প্রয়োগ। বৈদিক যুগের শেষ দিকে সমাজ যখন বাহ্যিক যাগযজ্ঞের আড়ম্বরে ক্লান্ত হয়ে উঠছিল, তখন মানুষের অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতার দিকে নজর দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছিল। এই প্রবণতা থেকেই যোগের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ। প্রাচীন চিন্তাবিদ পতঞ্জলি (Patañjali) তার সুবিখ্যাত গ্রন্থ যোগসূত্র (Yogasūtra)-তে এই মানসিক ও শারীরিক নিয়ন্ত্রণপদ্ধতিকে শাস্ত্রের রূপ দেন (Whichner, 1998)।
পতঞ্জলির যোগের সংজ্ঞাটি বৈদিক প্রার্থনার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি কোনো দেবতার বন্দনা দিয়ে গ্রন্থ শুরু করেননি। তার প্রথম দিকের সূত্রেই বলা হয়েছে, ‘যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ’ – মনের বিচিত্র তরঙ্গ বা চাঞ্চল্যকে পুরোপুরি থামিয়ে দেওয়াই হলো যোগ। বৈদিক যজ্ঞে যেখানে পুরোহিতদের নজর থাকত বাইরে – অগ্নিকুণ্ড, পশুবলি, কুশঘাস আর আহুতির ওপর, যোগদর্শন সেই দৃষ্টিকে সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিল মানুষের ভেতরের দিকে। মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস, মাংসপেশি এবং চিন্তার গতিকে পর্যবেক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা হলো। যজ্ঞের ঘি পোড়ানোর বদলে শরীরের প্রাণবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করার এই প্রয়াস ছিল ধর্মীয় চর্চার ক্ষেত্রে এক বড় রূপান্তর (Eliade, 1958)।
যোগের এই আটটি অঙ্গ বা অষ্টাঙ্গ যোগ (Aṣṭāṅga Yoga) অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ধাপে সাজানো হয়েছে। যম ও নিয়ম হলো সামাজিক ও ব্যক্তিগত সদাচার। আসন হলো শরীরকে স্থির রাখার কৌশল। প্রাণায়াম হলো শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ। এরপর প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান এবং শেষ ধাপে সমাধি। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো অলৌকিক অনুগ্রহের আশা নেই। এটা এক ধরনের কঠোর মনস্তাত্ত্বিক প্রযুক্তি। একজন মানুষ যদি ধাপে ধাপে নিজের ইন্দ্রিয় ও চিত্তকে বশ করতে পারে, তবে সে নিজের বাস্তব স্বরূপ বুঝতে সক্ষম হবে। বৈদিক ধর্মের সামাজিক স্তরের আচারগুলোর সঙ্গে এই ব্যক্তিগত সাধনার কোনো প্রত্যক্ষ লেনদেন ছিল না (Whichner, 1998)।
তবে পতঞ্জলি তার দর্শনে ঈশ্বরের একটি স্থান রেখেছিলেন, যা সাংখ্যে ছিল না। অনেকে একে বৈদিক সমাজকে শান্ত করার একটি কৌশল বলে মনে করেন। যোগসূত্রে ঈশ্বর কোনো বিশ্বস্রষ্টা নন, তিনি কোনো পাপ-পুণ্যের বিচারকও নন। পতঞ্জলির ভাষায় ঈশ্বর হলেন এক বিশেষ পুরুষ, যিনি কখনো ক্লেশ, কর্ম বা বাসনার জালে জড়াননি। ঈশ্বরের নাম জপ করা বা তার প্রতি একাগ্র হওয়া যোগসাধনার অনেকগুলো উপায়ের মধ্যে কেবল একটি ঐচ্ছিক উপায় মাত্র। কেউ চাইলে ঈশ্বরকে ছাড়াই কেবল আত্মসংযম ও ধ্যানের মাধ্যমে সমাধিতে পৌঁছাতে পারে। ফলে বৈদিক সাহিত্যের সর্বনিয়ন্তা ঈশ্বরের ধারণাটি যোগদর্শনে এসে অনেকটাই প্রান্তিক ও কৌশলগত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল (Pflueger, 1998)।
মুক্তি, কৈবল্য ও বৈদিক যাগযজ্ঞের অসারতা (Liberation, Kaivalya, and the Futility of Vedic Rituals)
মানুষ কেন দর্শনচর্চা করে? সাংখ্যের উত্তর খুব সোজাসাপটা – মানুষ কষ্ট পায় বলে। সাংখ্যকারিকা (Sāṃkhyakārikā) শুরুই হয়েছে অত্যন্ত বাস্তব এক পর্যবেক্ষণ দিয়ে। সেখানে বলা হয়েছে, ত্রিবিধ দুঃখের অভিঘাত থেকেই মুক্তির উপায় খোঁজার প্রয়োজন দেখা দেয়। এই তিন দুঃখ হলো আধ্যাত্মিক (শারীরিক ও মানসিক রোগ), আধিভৌতিক (অন্যান্য প্রাণী ও মানুষের দ্বারা সৃষ্ট কষ্ট) এবং আধিদৈবিক (প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা পরিবেশগত আঘাত)। এই দুঃখ থেকে বাঁচার পথ কী? বৈদিক শাস্ত্র তো বলেই রেখেছিল যে বড় বড় যজ্ঞ করো, তবেই স্বর্গলাভ হবে এবং সুখ মিলবে (Larson, 1979)।
ঈশ্বরকৃষ্ণ এখানে বৈদিক বিধানের ওপর এক তীব্র বৌদ্ধিক আঘাত হানলেন। তিনি কারিকার দ্বিতীয় শ্লোকটিতেই ঘোষণা করলেন যে, বৈদিক যাগযজ্ঞের মাধ্যমে দুঃখমুক্তির উপায়টি আসলে লৌকিক উপায়ের মতোই অকেজো। কেন অকেজো? কারণ শাস্ত্রীয় যজ্ঞ হলো ‘অবিশুদ্ধিক্ষয়াতিশয়যুক্তঃ’। প্রথমত, যজ্ঞ অবিশুদ্ধ, কারণ সেখানে পশুবলির মতো হিংসাত্মক কাজ করতে হয়। দ্বিতীয়ত, যজ্ঞের মাধ্যমে যে স্বর্গফল পাওয়া যায়, তা ক্ষয়িষ্ণু বা অনিত্য; পুণ্য শেষ হয়ে গেলেই স্বর্গ থেকে আবার মর্ত্যে নেমে আসতে হয়। তৃতীয়ত, এটা অতিশয়যুক্ত বা বৈষম্যমূলক; যে বেশি দক্ষিণা দিয়ে বড় যজ্ঞ করবে তার ফল বেশি, যার সামর্থ্য নেই তার ফল কম। সুতরাং বৈদিক আচার কোনো দিন মানুষকে স্থায়ী শান্তি দিতে পারে না (Burley, 2007)।
তাহলে মুক্তির পথ কী? সাংখ্যের মতে মুক্তির নাম কৈবল্য (Kaivalya) বা পুরুষ ও প্রকৃতির চরম পৃথকীকরণ। মানুষের যত দুঃখ, তার কারণ হলো অবিবেক বা অজ্ঞতা। জড় বুদ্ধি এবং নির্গুণ পুরুষের মধ্যে যে সূক্ষ্ম ফারাক রয়েছে, মানুষ তা ভুলে যায়। প্রকৃতির সুখ-দুঃখকে পুরুষ নিজের বলে ভাবতে শুরু করে। আয়নায় ময়লা জমলে মানুষ যেমন মনে করে তার মুখটাই বুঝি ময়লা হয়ে গেছে, ঠিক তেমনি প্রকৃতির চাঞ্চল্যকে পুরুষ নিজের অভিজ্ঞতা বলে ভুল করে। যখন সঠিক বিবেকের উদয় হয়, তখন পুরুষ বুঝতে পারে যে সে কখনোই প্রকৃতির এই রূপান্তরের অংশ ছিল না। সে সম্পূর্ণ মুক্ত ও নিঃসঙ্গ (Dasgupta, 1922)।
কৈবল্যের এই ধারণা উপনিষদের ব্রহ্মের সঙ্গে বিলীন হয়ে যাওয়ার ধারণার চেয়ে বেশ আলাদা। বেদান্তে আত্মা ব্রহ্মের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। সাংখ্যে পুরুষ কোনো বৃহত্তর সত্তার মধ্যে হারিয়ে যায় না; প্রতিটি পুরুষ অনন্তকাল ধরে নিজের বিশুদ্ধ চৈতন্যে আলাদাভাবে অবস্থান করে। সাংখ্য বহুপুরুষবাদী, অর্থাৎ জীবের সংখ্যা যত, পুরুষের সংখ্যাও তত। এই মুক্তি কোনো স্বর্গে যাওয়া নয়, কোনো দেবতার সান্নিধ্য পাওয়াও নয়। এটা হলো বিভ্রান্তির অবসান। নাটকের নর্তকী যেমন দর্শকদের সামনে নিজের রূপ ও কলা প্রদর্শন শেষ করে মঞ্চ থেকে বিদায় নেয়, প্রকৃতিও তেমনি পুরুষের কাছে নিজের রহস্য উন্মোচিত হওয়ার পর চিরতরে নিবৃত্ত হয় (Raju, 1985)।
শাস্ত্রপ্রমাণ, নিরীশ্বরবাদ ও শাস্ত্রীয় বৈধতার দ্বান্দ্বিকতা (Scriptural Authority, Atheism, and the Dialectics of Canonical Legitimacy)
সাংখ্য ও যোগ দর্শনের সঙ্গে বৈদিক সাহিত্যের সম্পর্কের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি হলো তাদের শাস্ত্রীয় প্রামাণ্য গ্রহণের ধরন। ভারতীয় দর্শনে আস্তিক ও নাস্তিকের সংজ্ঞা পশ্চিমা দর্শনের মতো নয়। এখানে যে ঈশ্বর মানে সে আস্তিক নয়, বরং যে বেদের প্রামাণ্য স্বীকার করে সে আস্তিক। এই অদ্ভুত সংজ্ঞার সুযোগ নিয়ে সাংখ্য নিজেকে ঠিকই আস্তিক দর্শনের তালিকায় ঢুকিয়ে নিয়েছিল, যদিও তারা স্পষ্টভাবেই ছিল নিরীশ্বরবাদী (Nirīśvara)। সাংখ্যদর্শনে ঈশ্বরকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়েছে, কারণ প্রকৃতির অন্ধ যান্ত্রিক গতি এবং কর্মের নিয়ম দিয়েই জগতের সব ঘটনা ব্যাখ্যা করা সম্ভব। ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষ বা অনুমান প্রমাণ নেই (Frauwallner, 1973)।
তাহলে বেদকে তারা কীভাবে দেখত? সাংখ্য জ্ঞানতত্ত্বে তিনটি প্রমাণ স্বীকার করা হয়েছে – প্রত্যক্ষ, অনুমান এবং আপ্তবচন বা শব্দ। এই আপ্তবচনের ভেতরেই বেদের অবস্থান। তবে বৈদিক বাক্যকে সাংখ্য কোনো অলৌকিক ঈশ্বরের বাণী হিসেবে দেখেনি, কারণ তাদের দর্শনে কোনো ঈশ্বরই নেই। আবার মীমাংসকদের মতো বেদকে অনাদি ও অনন্ত শব্দব্রহ্ম হিসেবেও তারা মানেনি। তাদের মতে, অতীত যুগে যেসব ঋষি ধ্যান বা গভীর অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে প্রকৃতির সত্য প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তাদের সেই সত্য অভিজ্ঞতার সংকলনই হলো বেদ। ফলে বেদের কর্তৃত্ব বজায় রইল ঠিকই, কিন্তু তার পেছনের ঐশ্বরিক ভিত্তি পুরোপুরি খসে পড়ল (Larson, 1979)।
ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই আপসটি ছিল টিকে থাকার এক মোক্ষম কৌশল। প্রাচীন ভারতে বৈদিক কর্তৃত্বকে পুরোপুরি নাকচ করে বৌদ্ধ ও জৈনরা শ্রমণ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, যার ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। সাংখ্য সেই পথে হাঁটেনি। তারা মুখে বেদের জয়গান গাইল, কিন্তু দর্শনের ভেতরে বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থা, দেবতার প্রাধান্য এবং সামাজিক পৌরোহিত্যকে সম্পূর্ণ অকেজো করে দিল। এই দ্বিবিধ অবস্থানের কারণে গবেষকরা অনেক সময় সাংখ্যকে ব্রাহ্মণ্য কাঠামোর ভেতর এক চোরাগোপ্তা যুক্তিবাদ বলে অভিহিত করেন (Halbfass, 1991)।
পরবর্তীকালের দর্শনে, বিশেষ করে মধ্যযুগে যখন ভক্তি আন্দোলন প্রবল হয়ে উঠল, তখন এই কঠোর নিরীশ্বরবাদী সাংখ্যকে আর টিকিয়ে রাখা গেল না। বিজ্ঞানভিক্ষু (Vijñānabhikṣu)-র মতো ভাষ্যকাররা সাংখ্যের ওপর জোর করে ঈশ্বরতত্ত্ব এবং বেদান্তের ভাবাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। তারা দাবি করলেন, সাংখ্যে যে ঈশ্বরের কথা বলা হয়নি, তার অর্থ ঈশ্বর নেই তা নয়, বরং ঈশ্বরকে জানা কঠিন তাই বলা হয়নি। মূল দর্শনের এই রদবদলই প্রমাণ করে যে, আদি সাংখ্য বৈদিক ধর্মীয় সমাজের কাছে কতটা বিপজ্জনক ছিল। সব মিলিয়ে সাংখ্য-যোগ ঐতিহ্য বৈদিক সাহিত্যের সীমানার ভেতর থেকেই মানুষের বিচারবুদ্ধি, প্রকৃতি ও মনস্তত্ত্বের এক এমন বস্তুনিষ্ঠ ব্যবচ্ছেদ তৈরি করেছিল, যা প্রাচীন ভারতের বৌদ্ধিক ইতিহাসে অনন্য হয়ে রয়েছে (Dasgupta, 1922)।
শ্রমণ ঐতিহ্য ও বৈদিক কর্তৃত্ব (Śramaṇa Traditions and Vedic Authority): বৌদ্ধ, জৈন, যজ্ঞ ও প্রত্যাখ্যান
শ্রমণ আন্দোলনের ঐতিহাসিক উত্থান ও সামাজিক ভিত্তি (Historical Rise and Social Foundations of the Śramaṇa Movement)
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ ও পঞ্চম শতকে প্রাচীন ভারতের গঙ্গা অববাহিকার পূর্ব অংশে এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সামাজিক আলোড়ন দেখা দিয়েছিল। বৈদিক আর্যদের আদি বসতি কুরু ও পাঞ্চাল অঞ্চলের তুলনায় মগধ, কোশল ও বজ্জি বা বৃজির মতো পূর্বাঞ্চলীয় জনপদগুলো ছিল সাংস্কৃতিক দিক থেকে বেশ কিছুটা ভিন্ন। বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থার যে অনমনীয় পুরোহিততান্ত্রিক আধিপত্য পশ্চিমাঞ্চলে গড়ে উঠেছিল, পূর্বের এই অঞ্চলে তার শিকড় ততটা শক্ত ছিল না। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই জন্ম নিয়েছিল যাযাবর সন্ন্যাসী ও চিন্তাবিদদের আন্দোলন, যাকে প্রাচীন ভারতে শ্রমণ (Śramaṇa) ঐতিহ্য বলা হতো। ‘শ্রম’ ধাতু থেকে আসা এই শব্দের অর্থ যিনি সত্যের সন্ধানে আত্মপ্রচেষ্টা চালান বা কঠোর তপস্যা করেন।
এই আন্দোলনের পেছনে গভীর অর্থনৈতিক রূপান্তর কাজ করছিল। লোহার কুঠার দিয়ে পূর্ব ভারতের ঘন জঙ্গল কেটে কৃষিজমির বিস্তার ঘটানো হচ্ছিল, যার ফলে এক বিশাল উদ্বৃত্ত কৃষিশস্য উৎপাদন সম্ভব হয়েছিল। একই সাথে নদীপথ ও বাণিজ্যপথগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছিল চম্পা, রাজগৃহ, বারাণসী ও শ্রাবস্তীর মতো সমৃদ্ধ নগরী। সমাজে আত্মপ্রকাশ করেছিল এক নতুন ধনী বণিক শ্রেণি, যাদের পালি ভাষায় সেট্ঠি (Seṭṭhi) এবং বিত্তশালী কৃষক যাদের গহপতি (Gahapati) বলা হতো। বৈদিক বর্ণাশ্রম ব্যবস্থায় এই উদীয়মান ধনী শ্রেণির সামাজিক মর্যাদা ছিল তৃতীয় স্তরে, অর্থাৎ বৈশ্য হিসেবে। তাদের অর্থনৈতিক প্রতিপত্তির সাথে সামাজিক সম্মানের এই বৈষম্য এক ধরণের সামাজিক অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল।
ঐতিহাসিক উমা চক্রবর্তী (Uma Chakravarti) প্রাচীন বৌদ্ধ সমাজের সামাজিক কাঠামো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে নতুন নগর সংস্কৃতির মানুষ বৈদিক যাগযজ্ঞের অতিরিক্ত খরুচে স্বভাবের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল (Chakravarti, 1987)। বৈদিক আচারগুলো ছিল পশুপালক সমাজের স্মৃতিবাহী, যেখানে হাজার হাজার গবাদিপশু যজ্ঞের আগুনে বলি দেওয়া হতো। কিন্তু নতুন কৃষি অর্থনীতিতে বলদ ও গরুর প্রয়োজন ছিল হালচাষের কাজে। ফলে কৃষিজীবী ও বণিক সমাজ এমন এক ধর্মীয় ও নৈতিক কাঠামোর সন্ধান করছিল যা প্রাণহানি বন্ধ করবে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে। শ্রমণ চিন্তাবিদেরা গৃহত্যাগ করে এই নতুন সামাজিক আকাঙ্ক্ষার একটি দার্শনিক রূপ দিতে সচেষ্ট হয়েছিলেন।
পণ্ডিত জি. সি. পাণ্ডে (G. C. Pande) দেখিয়েছেন যে শ্রমণ আন্দোলন কোনো একক দর্শন ছিল না, বরং তা ছিল বৈদিক কর্তৃত্বের বাইরে থাকা একাধিক ভিন্নমতের এক যৌথ স্রোত (Pande, 1957)। এই স্রোতে যেমন বৌদ্ধ ও জৈনরা ছিলেন, তেমনি ছিলেন আজীবিক এবং ঘোর বস্তুবাদী চার্বাকেরা। এই পরিব্রাজকেরা পরিবার ও সমাজের প্রচলিত বন্ধন ত্যাগ করে বনে বনে ঘুরে বেড়াতেন এবং মানুষের অস্তিত্বের যন্ত্রণা নিয়ে বিতর্ক করতেন। তারা রাজাদের দরবারে গিয়েও তর্ক করতেন এবং সাধারণ মানুষের ভাষাতে তাদের বক্তব্য তুলে ধরতেন। বৈদিক ব্রাহ্মণদের সংস্কৃত ভাষার আভিজাত্যের বিপরীতে পালি এবং প্রাকৃত ভাষার ব্যবহার এই আন্দোলনকে খুব দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।
বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থা ও পশুবলির সামগ্রিক প্রত্যাখ্যান (Total Rejection of Vedic Sacrificial System and Animal Slaughter)
শ্রমণ ঐতিহ্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও প্রত্যক্ষ আঘাতটি এসেছিল বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থার ওপর। বৈদিক ধর্মে বিশ্বাস করা হতো যে যজ্ঞের মাধ্যমে দেবতাদের তুষ্ট রাখলে প্রকৃতি সুশৃঙ্খল থাকে, বৃষ্টি হয় এবং মানুষ পুত্র ও সম্পদ লাভ করে। বিশেষ করে অশ্বমেধ, রাজসূয় কিংবা গোমেধের মতো বৃহৎ রাজকীয় আচারগুলোতে বিপুল পরিমাণ পশুহত্যা ছিল এক সাধারণ দৃশ্য। শ্রমণ ধারার প্রবক্তারা এই যজ্ঞীয় সহিংসতাকে সরাসরি নীতিহীন এবং অর্থহীন বলে ঘোষণা করলেন। তাদের মতে, কোনো নিষ্পাপ প্রাণীর রক্ত ঝরিয়ে নিজের কল্যাণ কামনা করা কেবল নৈতিক অবক্ষয় নয়, বরং তা অজ্ঞতার চরম প্রকাশ।
এই জায়গা থেকেই জন্ম নিয়েছিল অহিংসা (Ahiṃsā) বা কোনো জীবকে আঘাত না করার সার্বিক তত্ত্ব। জৈন ধর্মে অহিংসার নীতিকে সবচেয়ে চরম ও কঠোর রূপ দেওয়া হয়েছিল। মহাবীর ও তার অনুসারীদের মতে, কেবল দৃশ্যমান পশুপাখিই নয়, মাটি, জল, বাতাস ও উদ্ভিদের মধ্যেও সূক্ষ্ম প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে। ফলে জৈন সন্ন্যাসীরা মুখে কাপড় বেঁধে চলতেন এবং রাস্তা ঝাড়ু দিয়ে হাঁটতেন যাতে অসাবধানতাবশত কোনো ক্ষুদ্র পোকারও মৃত্যু না ঘটে। কোনো ধরণের বৈদিক যাগযজ্ঞ জৈন দর্শনে কল্পনাও করা যেত না। গবেষক পদ্মনাভ এস. জৈনী (Padmanabh S. Jaini) জৈন নৈতিকতার কঠোরতা পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে অহিংসা কেবল একটি ধর্মীয় ব্রত নয়, বরং বৈদিক আচারবাদের বিরুদ্ধে এক মৌলিক তাত্ত্বিক বিদ্রোহ হিসেবে কাজ করেছিল (Jaini, 1979)।
বৌদ্ধ সাহিত্যেও বৈদিক যজ্ঞের ওপর নির্মম ব্যঙ্গ ও যুক্তিপূর্ণ আক্রমণ দেখা যায়। দীর্ঘনিকায়ের বিখ্যাত কূটদন্তসুত্ত (Kūṭadantasutta)-তে বুদ্ধ এক ব্রাহ্মণের যজ্ঞের কাহিনী বর্ণনা করে বৈদিক ধারণাকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছিলেন। সেখানে দেখানো হয় যে শত শত বলদ ও ছাগল জবাই না করে, দাস-শ্রমিকদের মারধর না করে কীভাবে এক অহিংস যজ্ঞ করা সম্ভব। সেই রূপক যজ্ঞে আহুতি দেওয়া হয় নৈতিক আচরণ, মনের সংযম এবং প্রজ্ঞার মাধ্যমে। বুদ্ধ স্পষ্ট করে দেন যে যজ্ঞের নামে পশুহত্যা আসলে পুরোহিতদের মাংস খাওয়ার লোভ এবং অর্থ উপার্জনের ধান্দা ছাড়া আর কিছুই নয়। রক্তপাত কোনো মানুষের আধ্যাত্মিক বা নৈতিক মুক্তি আনতে পারে না।
ব্রিটিশ ভারততাত্ত্বিক রিচার্ড গমব্রিচ (Richard Gombrich) প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মের নীতিশাস্ত্রের বাস্তববাদী দিকটি তুলে ধরে দেখিয়েছেন যে শ্রমণদের এই প্রচার নতুন কৃষিভিত্তিক সমাজকে অর্থনৈতিকভাবে কীভাবে রক্ষা করেছিল (Gombrich, 1988)। কৃষিকাজের জন্য অপরিহার্য পশুপালনকে ধর্মীয় হিংসা থেকে রক্ষা করার ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। যজ্ঞের নামে পুড়িয়ে দেওয়া ঘি, খাদ্যশস্য এবং পশুর অপচয় বন্ধের এই দাবি সাধারণ গৃহস্থদের কাছে অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছিল। যজ্ঞবেদির রক্তাক্ত ধোঁয়ার বিপরীতে শ্রমণদের অহিংসার বাণী ভারতীয় উপদ্বীপের সামাজিক মূল্যবোধকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
বেদপ্রামাণ্য, বর্ণাশ্রম ও ব্রাহ্মণ্য শ্রেষ্ঠত্বের বুদ্ধিবৃত্তিক খণ্ডন (Intellectual Refutation of Vedic Authority, Varṇāśrama, and Brahmanical Supremacy)
আচার প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি শ্রমণ দার্শনিকেরা বৈদিক সাহিত্যের অলঙ্ঘনীয় কর্তৃত্বের ধারণাকেও ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। মীমাংসা বা বৈদিক পণ্ডিতেরা দাবি করতেন যে বেদ হলো অপৌরুষেয় (Apauruṣeya) বা কোনো মানুষের রচিত নয়, ফলে তা চিরন্তন ও নির্ভুল। বৌদ্ধ ও জৈন চিন্তাবিদেরা এই দাবির অসারতা প্রমাণে কোনো দ্বিধা করেননি। তারা প্রশ্ন তুলেছিলেন, যে গ্রন্থে পশুহত্যার নির্দেশ রয়েছে এবং যা মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ শেখায়, তা কীভাবে অভ্রান্ত হতে পারে? পালি ত্রিপিটকের তেবিজ্জসুত্ত (Tevijjasutta)-তে বুদ্ধ বৈদিক পুরোহিতদের আক্রমণ করে এক চমৎকার উপমা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বৈদিক ঋষিরা যে স্বর্গের বা ব্রহ্মার কথা বলেন, তা তাদের পূর্বপুরুষদের কেউ কখনো নিজের চোখে দেখেনি। এটা ঠিক যেন একদল অন্ধ মানুষের পথ চলার মতো, যেখানে প্রথম জনও দেখতে পায় না, মাঝের জনও দেখে না, আর শেষ জনও দেখে না।
বেদপ্রামাণ্যের ওপর এই আঘাতের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ছিল বর্ণাশ্রম (Varṇāśrama) ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা। বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ব্যবস্থায় দাবি করা হতো যে পরম পুরুষের মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে ক্ষত্রিয়, ঊরু থেকে বৈশ্য এবং পা থেকে শূদ্রের জন্ম হয়েছে। শ্রমণরা এই জন্মভিত্তিক পবিত্রতাকে সম্পূর্ণ জৈবিক মিথ্যাচার হিসেবে প্রমাণ করেছিলেন। অস্সলায়নসুত্ত (Assalāyanasutta)-তে তরুণ ব্রাহ্মণ অস্সলায়নকে বুদ্ধ যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছিলেন যে অন্যান্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে জাতভেদে শারীরিক বৈশিষ্ট্যের বিশাল পার্থক্য থাকে – যেমন হাতির সাথে ঘোড়ার চেহারার পার্থক্য স্পষ্ট। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে মাথা, চোখ, কান বা রক্তে কোনো জন্মগত পার্থক্য নেই; চার বর্ণের মানুষই একইভাবে গর্ভে আসে এবং একইভাবে জন্ম নেয়।
ভাষাতত্ত্ববিদ কে. আর. নরম্যান (K. R. Norman) বৌদ্ধ ও জৈন আদি পাঠগুলোর শব্দপ্রয়োগ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে শ্রমণরা ব্রাহ্মণ্য পরিভাষাগুলোকে নতুন নৈতিক অর্থে রূপান্তর করেছিলেন (Norman, 1997)। তারা ‘ব্রাহ্মণ’ শব্দটিকে বাতিল করেননি, কিন্তু তার অর্থ পুরোপুরি বদলে দিয়েছিলেন। শ্রমণদের দৃষ্টিতে ব্রাহ্মণ কোনো বিশেষ বংশে জন্মানো ব্যক্তি নয়; যে ব্যক্তি রাগ, দ্বেষ ও লোভ ত্যাগ করতে পেরেছেন, যার চরিত্র পবিত্র, তিনিই প্রকৃত ব্রাহ্মণ। বিপরীতে, কেবল বৈদিক মন্ত্র মুখস্থ করে জন্মসূত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করা ব্যক্তিকে তারা কঠোর ভাষায় তিরস্কার করতেন। জন্ম নয়, বরং মানুষের ব্যক্তিগত কর্ম (Karma) ও নৈতিক আচরণই তার আসল পরিচয় নির্ধারণ করে।
জৈনদের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ উত্তরাধ্যয়নসূত্র (Uttarādhyayanasūtra)-তেও দেখা যায় মাতঙ্গ মুনির মতো চণ্ডাল পরিবারের সন্তানও কঠোর সংযমের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ আসন অর্জন করছেন এবং বড় বড় বৈদিক পণ্ডিতেরা তার চরণে প্রণতি জানাচ্ছেন। এই দৃষ্টান্তগুলো সেই যুগে প্রচলিত সামাজিক মর্যাদক্রমকে সরাসরি উল্টে দিয়েছিল। ইতিহাসবিদ নলীনাক্ষ দত্ত (Nalinaksha Dutt) দেখিয়েছেন যে প্রাচীন বৌদ্ধ ও জৈন সংঘে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো বর্ণভেদ ছিল না (Dutt, 1960)। নাপিত উপালি থেকে শুরু করে নিম্নবর্ণের শিকারী বা পতিতা – যে কেউই সংঘে যোগ দিয়ে নির্বাণ বা মোক্ষ লাভের অধিকারী হতে পারত। ব্রাহ্মণ্য সমাজের কঠোর বর্জননীতির বিপরীতে শ্রমণ সংঘগুলো গড়ে তুলেছিল সমতাভিত্তিক এক সামাজিক স্থান।
কর্ম, সংসার ও আত্মতত্ত্ব: বৌদ্ধ ও জৈন দার্শনিক বিকল্প (Karma, Saṃsāra, and the Self: Buddhist and Jaina Philosophical Alternatives)
প্রাচীন বৈদিক চিন্তায় কর্ম বলতে প্রধানত বোঝানো হতো যজ্ঞের সঠিক আচারিক ক্রিয়া। কিন্তু শ্রমণ ঐতিহ্যে এসে কর্ম (Karma) ধারণার এক বৈপ্লবিক পুনর্নির্মাণ ঘটল। তারা কর্মকে কোনো বাহ্যিক যজ্ঞের অনুষ্ঠান নয়, বরং মানুষের মানসিক ইচ্ছা ও নৈতিক কাজের সাথে যুক্ত করলেন। বিশেষ করে বৌদ্ধ দর্শনে বুদ্ধ ঘোষণা করলেন: “চেতনা অহং ভিক্খবে কন্মং বদামি” (Cetanāhaṁ bhikkhave kammaṁ vadāmi) – অর্থাৎ হে ভিক্ষুগণ, ইচ্ছাপূর্বক করা মানসিক সংকল্পকেই আমি কর্ম বলি। কোনো ব্যক্তি মনে কী ধরণের উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছে, তার ওপরই কাজের ফলাফল নির্ভর করে। অনিচ্ছাকৃতভাবে করা কোনো কাজের নৈতিক দায়ভার থাকে না।
অন্যদিকে জৈন দর্শনে কর্মকে দেখা হয়েছিল এক অত্যন্ত বস্তুগত উপাদান হিসেবে। জৈনদের মতে কর্ম হলো এক ধরণের অতিক্ষুদ্র জড় পরমাণু বা পুদ্গল (Pudgala), যা মানুষের খারাপ চিন্তা ও হিংস্র আচরণের কারণে আত্মার সাথে আঠার মতো লেগে যায়। এই কর্মের ভারে আত্মা ভারাক্রান্ত হয়ে জন্ম-মৃত্যুর সংসার (Saṃsāra) চক্রে আবদ্ধ থাকে। জৈন সাধকদের লক্ষ্য ছিল কঠোর উপবাস ও কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে আত্মায় নতুন কর্মের প্রবেশ বন্ধ করা, যাকে বলা হয় সংবর (Saṃvara), এবং জমে থাকা পুরনো কর্মের অবশেষ পুড়িয়ে ফেলা, যাকে বলা হয় নির্জরা (Nirjarā)। গবেষক পল দুন্দাস (Paul Dundas) জৈন দর্শনের এই স্বতন্ত্র তত্ত্ব আলোচনা করে দেখিয়েছেন যে তাদের কাছে মোক্ষ ছিল এক গভীর আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো দৈব কৃপা বা মধ্যস্থতাকারীর কোনো ভূমিকা ছিল না (Dundas, 2002)।
সবচেয়ে গভীর বিতর্কটি তৈরি হয়েছিল আত্মার স্বরূপ নিয়ে। উপনিষদের ঋষিরা যখন স্থায়ী, অপরিবর্তনশীল ও শাশ্বত এক পরম আত্মার কথা বলছিলেন, বুদ্ধ সেখানে নিয়ে এলেন এক যুগান্তকারী তত্ত্ব – অনাত্তাবাদ (Anattāvāda) বা আত্মাহীনতার দর্শন। বুদ্ধ বললেন, এই বিশ্বে কোনো কিছুই চিরন্তন বা ধ্রুব নয়; সবকিছুই পরিবর্তনশীল এবং ক্ষণভঙ্গুর। মানুষ যাকে আত্মা বলে ভুল করে, তা আসলে রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার এবং বিজ্ঞান – এই পাঁচটি মানসিক ও শারীরিক উপাদানের এক নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ মাত্র। নদীর জলের মতো এই চেতনা প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে। কোনো স্থায়ী আত্মা নেই বলেই সেখানে কোনো চিরকালীন অধিকার বা অহংকারের স্থান থাকতে পারে না।
বৌদ্ধদের এই আত্মাহীনতা এবং নির্ভর উৎপত্তির তত্ত্ব, যা প্রতীত্যসমুৎপাদ (Pratītyasamutpāda) নামে পরিচিত, তৎকালীন সমস্ত ভাববাদী চিন্তার মূলে কুঠারাঘাত করেছিল। গবেষক আলেকজান্ডার উইন (Alexander Wynne) দেখিয়েছেন যে কীভাবে আদি বৌদ্ধ ধ্যানপদ্ধতি উপনিষদীয় অতিন্দ্রীয়বাদ থেকে আলাদা হয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মানসিক কার্যকারণ বিশ্লেষণের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল (Wynne, 2007)। মানুষ নিজেই নিজের নিয়ন্তা; নিজের দুঃখের কারণ সে নিজেই তৈরি করে এবং সঠিক জ্ঞান ও নৈতিক জীবনযাপনের মাধ্যমে সে নিজেই সেই দুঃখের সমাপ্তি বা নির্বাণ ঘটাতে পারে। ঈশ্বরের করুণা বা পুরোহিতের আশীর্বাদের ওপর নির্ভরশীলতার হাত থেকে মানুষকে মুক্ত করে স্বাবলম্বী করার এই তত্ত্ব প্রাচীন ভারতের চিন্তাজগতে এক বড় রূপান্তর এনেছিল।
আজীবিক, চার্বাক ও অন্যান্য শ্রমণ ধারা: বস্তুবাদ ও নিয়তিবাদ (Ājīvikas, Cārvākas, and Other Śramaṇa Streams: Materialism and Fatalism)
বৌদ্ধ ও জৈন আন্দোলন ছাড়াও সমসাময়িক উত্তর ভারতে আরও বেশ কিছু শক্তিশালী শ্রমণ মতবাদের অস্তিত্ব ছিল। পালি সাহিত্যের সামঞ্ঞফলসুত্ত (Sāmaññaphalasutta)-এ মগধের রাজা অজাতশত্রুর সাথে সমসাময়িক ছয়জন তীর্থঙ্কর বা শ্রমণ গুরুর সাক্ষাতের বিবরণ পাওয়া যায়। এই বিবরণীগুলো প্রমাণ করে যে সেই যুগে সমাজের একটি বড় অংশ সম্পূর্ণ ভিন্ন চোখে পৃথিবীকে দেখতে শুরু করেছিল। এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী দলগুলোর একটি ছিল আজীবিক সম্প্রদায়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মক্খলি গোসাল (Makkhali Gosāla)। গোসাল পূর্বে মহাবীরের সঙ্গী ছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে নিজস্ব এক চরম ধারা গড়ে তোলেন।
আজীবিকদের মূল তত্ত্ব ছিল কঠোর নিয়তিবাদ (Niyativāda) বা চরম অদৃষ্টবাদ। গোসাল প্রচার করতেন যে মানুষের ব্যক্তিগত কর্ম, নৈতিক প্রচেষ্টা বা পৌরুষের কোনো কার্যকারিতা নেই। সবকিছুই এক অমোঘ প্রাকৃতিক নিয়তি দ্বারা পূর্বনির্ধারিত। একটি সুতোর বলকে উপর থেকে নিচে ছেড়ে দিলে তা যেমন ঘুরতে ঘুরতে নিজে নিজেই পুরোটা খুলে যায়, মানবজীবনও ঠিক তেমনি মহাজাগতিক চক্রের মধ্য দিয়ে গিয়ে একসময় স্বাভাবিকভাবেই সমাপ্তিতে পৌঁছায়। ইতিহাসবিদ এ. এল. বাশাম (A. L. Basham) আজীবিকদের ইতিহাস নিয়ে তার বিখ্যাত গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে মৌর্য সম্রাট অশোক এবং তার পৌত্র দশরথ পর্যন্ত এই আজীবিক সন্ন্যাসীদের জন্য নাগार्जुन ও বারবার পাহাড়ে পাথর কেটে গুহা উপহার দিয়েছিলেন (Basham, 1951)। এর থেকে বোঝা যায় যে তাদের প্রভাব সমাজের উচ্চপর্যায়েও কতখানি গভীর ছিল।
অন্যদিকে সম্পূর্ণ বস্তুবাদী এক দর্শনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অজিত কেশকম্বলী (Ajita Kesakambalī), যিনি ভারতীয় দর্শনে চার্বাক (Cārvāka) বা লোকায়ত (Lokāyata) ধারার পূর্বসূরি ছিলেন। অজিত ঘোষণা করেছিলেন যে মানুষের আত্মা বা পরলোক বলে কিছু নেই। মানুষ কেবল চারটি ভৌতিক উপাদান – মাটি, জল, আগুন এবং বাতাস দিয়ে তৈরি। মৃত্যুর সাথে সাথে শরীরের মাটির অংশ মাটিতে, জলের অংশ জলে এবং আগুনের অংশ আগুনে মিশে যায়; ইন্দ্রিয়গুলো মিলিয়ে যায় মহাশূন্যে। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলতেন, দান বা যজ্ঞ করা নিছক নির্বোধের কাজ; মৃত্যুর পরে কোনো বিচারক নেই, কোনো স্বর্গ বা নরক নেই। মানুষের অস্তিত্ব কেবল বর্তমান জীবনেই সত্য।
দার্শনিক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (Debiprasad Chattopadhyaya) প্রাচীন ভারতের এই বস্তুবাদী স্রোতটিকে বৈদিক ভাববাদের বিরুদ্ধে এক প্রগতিশীল ধারা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Chattopadhyaya, 1959)। এছাড়াও পকুঢ কচ্চায়ন (Pakudha Kaccāyana) সাতটি শাশ্বত উপাদানের এক বহুত্ববাদী পরমাণুবাদ প্রচার করেছিলেন, যেখানে কাউকে হত্যা করাও অসম্ভব বলে দাবি করা হতো, কারণ অস্ত্র কেবল কণার ফাঁক দিয়ে চলে যায় মাত্র। অন্যদিকে সঞ্জয় বেলট্ঠিপুত্ত (Sañjaya Belaṭṭhiputta) ছিলেন চরম সংশয়বাদী বা অজ্ঞেয়বাদী, যিনি কোনো প্রশ্নেরই চূড়ান্ত ইতিবাচক বা নেতিবাচক উত্তর দিতেন না। এই বিচিত্র চিন্তার সংঘাত দেখায় যে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের ভারত কোনো অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের দেশ ছিল না; সেখানে চলছিল মানুষের যুক্তি, নিরীক্ষা ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার এক অভূতপূর্ব বৌদ্ধিক লড়াই।
বৈদিক ঐতিহ্যের প্রতিক্রিয়া, রূপান্তর ও দীর্ঘমেয়াদি সংশ্লেষ (Vedic Responses, Adaptation, and Long-Term Synthesis)
শ্রমণ ঐতিহ্যের এই বহুমুখী আক্রমণের মুখে প্রাচীন বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ব্যবস্থা এক বিরাট অস্তিত্বের সংকটে পড়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব যুগের শেষ ভাগে পতঞ্জলি তার ব্যাকরণ মহাভাষ্যে শ্রমণ ও ব্রাহ্মণদের মধ্যকার সম্পর্ককে তুলনা করেছিলেন ‘অহি ও নকুল’ অর্থাৎ সাপ এবং বেজির চিরন্তন শত্রুতার সাথে। কিন্তু কেবলমাত্র বিরোধিতা করে বা শাস্ত্রীয় গালিগালাজ দিয়ে এই নতুন গণজোয়ারকে থামিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না। ফলে বৈদিক রক্ষণশীলতাকে টিকে থাকার জন্য নিজের ভেতরে এক বিশাল কৌশলগত পরিবর্তন আনতে হয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে সময়ের দাবি মেনে নিজেকে নতুন করে সাজিয়ে না নিলে বৈদিক ব্যবস্থার বিনাশ অনিবার্য।
এই রূপান্তরের প্রথম পদক্ষেপ ছিল শ্রমণদের প্রধান নৈতিক আদর্শগুলোকে নিজেদের শাস্ত্রের মধ্যে অঙ্গীভূত করে নেওয়া। যজ্ঞের নিষ্ঠুর পশুবলি ধীরে ধীরে বন্ধ হতে শুরু করল। পরবর্তী বৈদিক সাহিত্য ও স্মৃতিশাস্ত্রে মাংস খাওয়ার ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হলো এবং শেষ পর্যন্ত নিরামিষভোজী হওয়াকেই ব্রাহ্মণ্য শুচিতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা হলো। অহিংসা, যা ছিল জৈন ও বৌদ্ধদের মূল স্লোগান, তা জায়গা করে নিল মহাভারতের পাতায়: “অহিংসা পরমো ধর্মঃ” (Ahiṃsā paramo dharmaḥ)। শ্রমণদের সন্ন্যাসের ধারণাকেও ব্রাহ্মণ্য জীবনব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো নতুন আবিষ্কৃত চতুরাশ্রম (Caturāśrama) কাঠামোর মাধ্যমে। যেখানে ঘোষণা করা হলো যে মানুষকে সরাসরি সন্ন্যাসী হতে হবে না; সে প্রথমে ব্রহ্মচর্য পালন করবে, তারপর গৃহস্থ হয়ে সমাজের দায়িত্ব পালন করবে এবং সবশেষে বাণপ্রস্থ ও সন্ন্যাসে যাবে।
ফরাসি ভারততাত্ত্বিক লুই রেনু (Louis Renou) বৈদিক ধর্মের এই রূপান্তরকে একটি জটিল ঐতিহাসিক আপস হিসেবে বর্ণনা করেছেন (Renou, 1953)। তিনি দেখিয়েছেন যে বৈদিক ধর্মের মূল কাঠামোগুলোকে মুখে স্বীকার করেও তার ভেতরের উপাদানগুলোকে প্রায় পুরোপুরি বদলে ফেলা হয়েছিল। প্রাচীন যজ্ঞের জায়গায় উঠে এলো মন্দিরকেন্দ্রিক পূজা এবং ব্যক্তিগত ভক্তি। উপনিষদগুলো আগেই শ্রমণ চিন্তার অনেক বিষয় নিজের মধ্যে টেনে নিয়েছিল, আর মধ্যযুগে এসে পৌরাণিক সাহিত্যে স্বয়ং বুদ্ধকে বিষ্ণুর দশ অবতারের এক অবতার হিসেবে স্থান দিয়ে দেওয়া হলো। যে বুদ্ধ বৈদিক যাগযজ্ঞ ও বেদের প্রামাণ্যকে খণ্ডন করেছিলেন, তাকেই বানিয়ে দেওয়া হলো ব্রাহ্মণ্য দেবতার একটি রূপ, যার উদ্দেশ্য ছিল অসুরদের ভুল পথে পরিচালিত করা। এটি ছিল কোনো মতবাদকে নিষ্ক্রিয় করে নিজের পেটে পুরে নেওয়ার এক সুনিপুণ ব্রাহ্মণ্য কৌশল।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শ্রমণ ঐতিহ্য প্রাচীন ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক মানচিত্রকে স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছিল। তারা বৈদিক পুরোহিততন্ত্রের বংশানুক্রমিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং যাগযজ্ঞের একচেটিয়া বাণিজ্যকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল। সাধারণ মানুষের ভাষাকে সাহিত্যের মর্যাদা দেওয়া, নৈতিকতাকে ধর্মের কেন্দ্রে স্থাপন করা এবং যুক্তি ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে অন্ধ বিশ্বাসের চেয়ে বড় স্থান দেওয়া ছিল এই আন্দোলনের ঐতিহাসিক অবদান। যদিও পরবর্তীকালে ভারতে বৌদ্ধধর্ম দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং জৈনধর্ম একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া অহিংসা, কর্মবাদ এবং সামাজিক সমতার প্রশ্নগুলো বৈদিক হিন্দুধর্মকে বাধ্য করেছিল নিজেকে পুরোপুরি পাল্টে ফেলে এক নতুন রূপ ধারণ করতে।
বৈদিক ধর্ম থেকে পৌরাণিক হিন্দুধর্ম (Vedic Religion to Purāṇic Hinduism): দেবতা, আচার ও ধর্মতত্ত্বের রূপান্তর
যজ্ঞানুষ্ঠান থেকে মূর্তিপূজা: আচার ও উপাসনার রূপান্তর (From Sacrificial Ritual to Image Worship: Transformation of Rituals and Devotion)
প্রাচীন ভারতের ধর্মীয় ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আচারের জগতে এক নীরব কিন্তু সুদূরপ্রসারী বদল ঘটে গিয়েছিল। প্রথম সহস্রাব্দ খ্রিস্টপূর্বাব্দের বৈদিক ধর্মে উপাসনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল যজ্ঞের অগ্নি। খোলা আকাশের নিচে বা ঘাস দিয়ে ছাওয়া সাময়িক যজ্ঞশালায় সামবেদের গান, যজুর্বেদের নির্দেশ আর ঋগ্বেদের স্তোত্র উচ্চারিত হতো। ঘি, দুধ, সোমরস আর পশুর মাংস আগুনে আহুতি দেওয়া হতো অদৃশ্য দেবতাদের উদ্দেশ্যে। যজ্ঞ শেষ হলে সেই যজ্ঞবেদির কোনো স্থায়ী গুরুত্ব থাকত না। মানুষ সেখানে কোনো দেবতার স্থায়ী আবাসের কথা কল্পনাও করত না। কিন্তু শতাব্দীর ব্যবধানে সেই যাগযজ্ঞের স্থান দখল করে নিল স্থায়ী মন্দির এবং পাথরে বা ধাতুতে খোদাই করা বিগ্রহের আরাধনা, যাকে আমরা পূজা (Pūjā) এবং মূর্তিপূজা (Mūrtipūjā) হিসেবে চিনি।
এই রূপান্তরটি উপাসনার পুরো বিন্যাসকেই নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছিল। যজ্ঞের আচার ছিল অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল এবং একটি নির্দিষ্ট পুরোহিত গোষ্ঠীর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। সাধারণ মানুষের পক্ষে রাজসূয় বা অশ্বমেধের মতো যজ্ঞ করা তো দূরের কথা, ছোটখাটো পারিবারিক শ্রৌত যজ্ঞ করাও কঠিন ছিল। এর বিপরীতে পূজা ছিল তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির সাথে যুক্ত। দেবতার মূর্তিকে একজন সম্মানিত অতিথির মতো আবাহন করা হতো। তাকে স্নান করানো, ফুল ও ফল নিবেদন করা, চন্দন মাখানো এবং সবশেষে তার সামনে নৈবেদ্য দিয়ে সেই খাবারকে প্রসাদ (Prasāda) হিসেবে গ্রহণ করার রেওয়াজ শুরু হলো। আহুতির আগুনে যা ভস্মীভূত হয়ে যেত, পূজায় তা ফিরে আসতে লাগল মানুষের ভোগ ও সামাজিক বিতরণের মাধ্যম হিসেবে।
উপাসনার এই অবকাঠামোগত পরিবর্তনকে তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করেছেন ভারততাত্ত্বিক হাইনরিখ ফন স্টাইটেনক্রন (Heinrich von Stietencron) (2005)। তিনি দেখিয়েছেন যে, যজ্ঞের মতো অস্থায়ী আয়োজন থেকে স্থায়ী স্থাপত্য বা মন্দির (Mandira) নির্মাণের দিকে যাত্রা কেবল ধর্মীয় পরিবর্তন ছিল না। মন্দির পরিণত হলো সমাজের ভূসম্পত্তি, সম্পদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার স্থায়ী ঠিকানায়। যজ্ঞের দেবতারা ছিলেন বাতাসে অদৃশ্য, তাদের কোনো নির্দিষ্ট রূপকল্প ছিল না। কিন্তু পৌরাণিক পূজা ব্যবস্থায় দেবতার শরীর ও চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা বা দর্শন (Darśana) হয়ে উঠল মুক্তির অন্যতম উপায়। ভক্ত দেবতার চোখ দেখবে এবং দেবতার কৃপাদৃষ্টি নিজের ওপর অনুভব করবে – উপাসনার এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন প্রাচীন যজ্ঞের দূরবর্তী ধারণাকে ভেঙে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল।
ব্রিটিশ গবেষক অ্যালেক্সিস স্যান্ডারসন (Alexis Sanderson) প্রাক-মধ্যযুগীয় ভারতের ধর্মীয় রীতির বিস্তার বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই রূপান্তরটি সমাজে এক নতুন যাজকীয় শ্রেণির জন্ম দিয়েছিল (Sanderson, 2009)। বৈদিক পুরোহিতদের বদলে মন্দিরের সেবায়েত বা পূজারিদের গুরুত্ব বাড়তে থাকল, যারা আগম ও পৌরাণিক নিয়ম মেনে মূর্তি প্রতিষ্ঠা ও নিত্যপূজা পরিচালনা করতেন। সাধারণ গৃহস্থ থেকে শুরু করে রাজা পর্যন্ত সবাই মন্দিরের দিকে ঝুঁকতে শুরু করলেন। যজ্ঞের সহিংস ও ব্যয়বহুল আচারের বিপরীতে পূজার অহিংস ও নান্দনিক আবেদন জনসাধারণের বৃহত্তর অংশকে একটি একক শাস্ত্রীয় বৃত্তের ভেতর টেনে আনতে সাহায্য করেছিল।
বৈদিক দেবমণ্ডল থেকে পৌরাণিক ত্রিমূর্তি: দেবদেবী ও ক্ষমতার বিন্যাস (From the Vedic Pantheon to the Purāṇic Trimūrti: Alignment of Deities and Power)
উপাসনাপদ্ধতি বদলানোর পাশাপাশি দেবতাদের ক্ষমতা ও মর্যাদার তালিকাতেও বিশাল ওলটপালট ঘটে গেল। ঋগ্বেদের প্রধান দেবতা ছিলেন ইন্দ্র, যিনি বজ্র ধারণ করে বৃত্রকে বধ করতেন; ছিলেন অগ্নি, যিনি মর্ত্যের সাথে স্বর্গের যোগাযোগ স্থাপন করতেন; আর ছিলেন বরুণ, যিনি মহাজাগতিক নিয়ম রক্ষা করতেন। কিন্তু পৌরাণিক সাহিত্য যখন পূর্ণ রূপ নিল, তখন বৈদিক দেবতারা এক প্রকার গুরুত্বহীন কোণঠাসা চরিত্রে পরিণত হলেন। ইন্দ্র হয়ে পড়লেন অপ্সরাদের নৃত্যে মগ্ন এবং অসুরদের ভয়ে সিংহাসন বাঁচাতে ছোটাছুটি করা এক দুর্বল স্বর্গের রাজা। বরুণ বা বায়ু নেমে গেলেন কেবল নির্দিষ্ট দিকের পাহারাদার বা দিকপাল (Dikpāla)-এর ভূমিকায়। স্বর্গের কর্তৃত্ব চলে গেল সম্পূর্ণ নতুন এক দেবমণ্ডলীর হাতে, যাদের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ত্রিমূর্তি (Trimūrti)।
পৌরাণিক কাঠামোতে ব্রহ্মাকে সৃষ্টির কর্তা, বিষ্ণুকে পালক এবং শিবকে সংহারকর্তা হিসেবে সাজিয়ে মহাজাগতিক ভারসাম্যের এক ধর্মতত্ত্ব দাঁড় করানো হলো। যদিও ব্যবহারিক ধর্মচর্চায় ব্রহ্মা খুব দ্রুতই তার উপাসক হারিয়ে ফেললেন এবং ধর্মীয় ক্ষমতা ভাগ হয়ে গেল মূলত দুটি প্রধান স্রোতে: বৈষ্ণবধর্ম (Vaiṣṇavism) এবং শৈবধর্ম (Śaivism), যার পাশে সমান শক্তিতে যুক্ত হয়েছিল দেবীকেন্দ্রিক শাক্তধর্ম (Śāktism)। বৈদিক সাহিত্যে বিষ্ণু ছিলেন নিতান্তই এক অপ্রধান সৌর দেবতা, যিনি মাত্র তিন পদক্ষেপে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড মেপে নিয়েছিলেন। সেই অপ্রধান বিষ্ণু পৌরাণিক যুগে এসে পরম সত্তা বা নারায়ণে রূপান্তরিত হলেন। অনন্তনাগের ওপর শুয়ে থাকা এই দেবতা মহাবিশ্ব রক্ষার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন।
এই রূপান্তরের সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক আবিষ্কার ছিল অবতারবাদ (Avatāravāda)। সমাজ যখনই সংকটে পড়বে বা ধর্মের গ্লানি ঘটবে, তখনই বিষ্ণু মর্ত্যে নেমে আসবেন – এই ধারণার মাধ্যমে অজস্র স্থানীয় ও ঐতিহাসিক চরিত্রকে বিষ্ণুর সাথে মিলিয়ে ফেলা সম্ভব হয়েছিল। মৎস্য, কূর্ম বা বরাহের মতো প্রাচীন পৌরাণিক রূপ থেকে শুরু করে রাম ও কৃষ্ণের মতো মহাকাব্যের নায়কদের এক সুতোয় বেঁধে ফেলা হলো। ডাচ ভারততাত্ত্বিক ইয়ান গোন্ডা (Jan Gonda) বিষ্ণুর এই রূপান্তর পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে বৈদিক উপাদান এবং অনার্য লোকবিশ্বাস একে অপরের সাথে মিশে গিয়ে পৌরাণিক বিষ্ণুর এক সমন্বিত চরিত্র তৈরি করেছিল (Gonda, 1970)। এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ তাদের নিজস্ব দেবতাকে পরম দেবতার একটি রূপ হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিল।
অন্যদিকে বৈদিক রুদ্রের ভেতর থেকে জন্ম নিল পৌরাণিক শিব বা মহাদেব। বৈদিক রুদ্র ছিলেন ধ্বংসাত্মক ও ভীতিকর বুনো দেবতা, যাকে যজ্ঞস্থলের বাইরে সন্তুষ্ট করে বিদায় করা হতো। কিন্তু পৌরাণিক যুগে সেই রুদ্র হয়ে উঠলেন যোগী, গৃহী এবং একই সাথে সংহারক এক জটিল ঈশ্বর। তিনি বাস করেন শ্মশানে, কিন্তু তিনিই আবার পরিবারের প্রধান। গবেষক ওয়েন্ডি ডনিগার (Wendy Doniger) শিবের এই আপাতবিরোধী রূপের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন (Doniger, 1980)। সন্ন্যাস এবং গার্হস্থ্য জীবনের যে দ্বন্দ্ব প্রাচীন ভারতীয় সমাজে ছিল, শিবের চরিত্রের ভেতর সেই দুই বিপরীত স্রোত একাকার হয়ে গিয়েছিল। দেবতাদের এই ক্ষমতার পালাবদল আসলে প্রাচীন গ্রামীণ ও শিকারী সমাজের ভাবনার সাথে বৈদিক সমাজের এক সুপরিকল্পিত ঐতিহাসিক আপসকেই ফুটিয়ে তোলে।
পুরাণ সাহিত্যের বিকাশ ও সংস্কৃতায়নের গতিপ্রকৃতি (Development of Purāṇic Literature and the Dynamics of Sanskritization)
বৈদিক ধর্মের মতো পৌরাণিক ধর্ম কোনো সংক্ষিপ্ত সূত্র বা দুর্বোধ্য বৈদিক মন্ত্রের ওপর নির্ভর করে টিকে ছিল না। এর প্রধান বাহন হয়ে উঠেছিল আঠারোটি মহাপুরাণ এবং অজস্র উপপুরাণের এক বিশাল সাহিত্যভাণ্ডার। ঐতিহ্যগতভাবে বলা হতো পুরাণের পাঁচটি প্রধান লক্ষণ থাকবে, যাকে বলা হয় পঞ্চলক্ষণ (Pañcalakṣaṇa): সর্গ বা মহাবিশ্ব সৃষ্টি, প্রতিসর্গ বা পুনঃসৃষ্টি, বংশ বা দেবতাদের বংশতালিকা, মন্বন্তর বা মানবজাতির যুগপর্যায়, এবং বংশানুচরিত বা রাজাদের ইতিহাস। কিন্তু বাস্তবে লিখিত পুরাণগুলো কেবল এই পাঁচটি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সময়ের সাথে সাথে এগুলো পরিণত হয়েছিল লোককথা, আইনকানুন, তীর্থের মহিমা, চিকিৎসাবিদ্যা এবং ভক্তিতত্ত্বের এক বিশাল বিশ্বকোষে।
সমাজবিজ্ঞানী এম. এন. শ্রীনিবাস (M. N. Srinivas) ভারতীয় সমাজের পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংস্কৃতায়ন (Sanskritization) তত্ত্বটি দিয়েছিলেন (Srinivas, 1962)। তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে প্রান্তিক ও নিম্নবর্ণের জনগোষ্ঠী তাদের সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে উচ্চবর্ণের আচার, ভাষা ও বিশ্বাসকে অনুকরণ করতে শুরু করে। পুরাণের বিকাশ ছিল এই প্রক্রিয়ার উল্টো এবং পরিপূরক রূপ। এখানে ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি নিজেই নিচে নেমে এসে স্থানীয় আঞ্চলিক বিশ্বাসগুলোকে নিজের সংস্কৃত কাঠামোর ভেতর আত্মস্থ করে নিয়েছিল। যে দেবদেবীর কোনো বৈদিক ভিত্তি ছিল না, তাদের জন্য রাতারাতি একখানা সংস্কৃত মাহাত্ম্য বা স্তোত্র লিখে দিয়ে কোনো না কোনো বৈদিক দেবতার আত্মীয় বা অবতার বানিয়ে দেওয়া হতো।
ঐতিহাসিক কুনাল চক্রবর্তী (Kunal Chakrabarti) বাংলার উপপুরাণগুলোর ওপর গভীর গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে ব্রাহ্মণ্য পণ্ডিতেরা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রচলিত লৌকিক ধর্মীয় রীতির সাথে লড়াই না করে সেগুলোকে শাস্ত্রীয় বৈধতা দিয়েছিলেন (Chakrabarti, 2001)। উদাহরণস্বরূপ, বিভিন্ন স্থানীয় দেবীকে যখন দুর্গা বা চণ্ডীর রূপ হিসেবে পুরাণে যুক্ত করা হলো, তখন স্থানীয় অধিবাসীরাও নিজেদের সেই ধর্মের অংশ ভাবতে শুরু করল। এই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় লোকায়ত সংস্কৃতির মূল বৈশিষ্ট্যগুলো অক্ষুণ্ণ রেখেই তাদের ওপর একটি ব্রাহ্মণ্য মোড়ক পরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। এই আপসকামিতা ছিল পুরাণ সাহিত্যের টিকে থাকার অন্যতম চাবিকাঠি।
পুরাণের পাঠ কখনোই স্থির ছিল না। হাজার বছর ধরে নতুন নতুন সামাজিক বাস্তবতার সাথে তাল মেলাতে এর অধ্যায়গুলো বারবার পুনর্লিখিত হয়েছে। প্রখ্যাত পুরাণ গবেষক আর. সি. হাজরা (R. C. Hazra) তার ক্লাসিক্যাল গবেষণায় দেখিয়েছেন যে খ্রিস্টীয় তৃতীয় থেকে পঞ্চম শতক নাগাদ স্মৃতিশাস্ত্র বা আইনগ্রন্থের অনুশাসনগুলো পুরোদমে পুরাণের গল্পগুলোর ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল (Hazra, 1940)। এর ফলে স্মৃতিশাস্ত্রের কঠোর নিয়মগুলো যে সাধারণ মানুষ পড়ত না, তারাও পুরাণের শ্রবণের মধ্য দিয়ে সেই সামাজিক অনুশাসনগুলোর সাথে অভ্যস্ত হয়ে উঠত। কথক ঠাকুরদের মুখে মুখে গ্রামে গঞ্জে পুরাণের কাহিনী ছড়িয়ে পড়ার ফলে সমাজনিয়ন্ত্রণের এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছিল।
তীর্থযাত্রা, ব্রত ও ভক্তি: ধর্মাচরণের গণতন্ত্রীকরণ ও নতুন অর্থনীতি (Pilgrimage, Vrata, and Bhakti: Democratization of Religious Practice and New Economy)
বৈদিক ধর্মের এক প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল তার কঠোর সামাজিক বর্জননীতি। কেবল দ্বিজ বা উচ্চ তিন বর্ণের পুরুষদেরই বৈদিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার আইনি অধিকার ছিল। নারী ও শূদ্রদের জন্য বেদ শোনা বা বৈদিক আচার পালন করা ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু পৌরাণিক হিন্দুধর্ম এই জায়গায় এক বৈপ্লবিক শিথিলতা নিয়ে এলো। পুরাণে বারবার ঘোষণা করা হলো যে কলিযুগে যাগযজ্ঞ বা কঠিন তপস্যার কোনো দরকার নেই। এর বদলে প্রবর্তন করা হলো ভক্তি (Bhakti), ব্রত (Vrata), দান (Dāna) এবং তীর্থযাত্রা (Tīrthayātrā)-এর মতো সহজ ও সর্বজনীন আচার। এই ধর্মীয় অভ্যাসগুলোতে অংশ নেওয়ার পূর্ণ অধিকার সমাজের সমস্ত স্তরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল।
বিশেষ করে তীর্থযাত্রার ধারণাটি ভারতীয় ভূগোলের সাথে সাধারণ মানুষের সম্পর্ককে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। নদী, পাহাড়, বন বা সাগরের সঙ্গমস্থলগুলোকে পুণ্যভূমি বা তীর্থ (Tīrtha) হিসেবে ঘোষণা করা হলো। গঙ্গা, যমুনা, নর্মদা বা দূর দক্ষিণের কাবেরী নদী পাপমোচনের জায়গা হয়ে উঠল। একজন দরিদ্র কৃষক বা গৃহবধূ যার কোনো বেদ পড়ার অধিকার ছিল না, সেও পায়ে হেঁটে কোনো তীর্থে গিয়ে স্নান করে পুণ্য অর্জন করতে পারত। ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার (Romila Thapar) দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই তীর্থযাত্রা এবং দানের সংস্কৃতি বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলকে একটি অভিন্ন সামাজিক মানচিত্রের মধ্যে বেঁধে ফেলেছিল (Thapar, 2000)। স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে দূরবর্তী অঞ্চলের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ঘটতে লাগল এই তীর্থগুলোকে কেন্দ্র করে।
একইভাবে পারিবারিক পরিসরে নারীদের ভূমিকা জোরদার হয়েছিল ব্রতপালনের মাধ্যমে। কোনো নির্দিষ্ট তিথিতে উপবাস থাকা, বিশেষ দেবতার জন্য ঘট পাতা এবং ব্রতকথা শোনার রেওয়াজ তৈরি হলো। এই ব্রতগুলো পরিবার ও সন্তানের মঙ্গল কামনার সাথে যুক্ত থাকায় সমাজের গভীরে তা দ্রুত শিকড় গেড়ে বসেছিল। এই আচারগুলোর জন্য কোনো বড় পুরোহিতের প্রয়োজন হতো না; সামান্য ফুল ও জল দিয়ে যে কেউ এই ধর্মাচরণ করতে পারত। ধর্মীয় কর্তৃত্বের এই ব্যাপক প্রসার সাধারণ মানুষের মানসিকতায় এক ধরণের স্বস্তির জন্ম দিয়েছিল, কারণ তারা আর নিজেদের মোক্ষ বা ধর্ম থেকে বাদ পড়া কোনো সম্প্রদায় ভাবত না।
তবে এই নতুন ধর্মচর্চার পেছনে কাজ করছিল এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক বাস্তবতা। মধ্যযুগীয় ভারতের নগরায়ণ ও সমাজ কাঠামো নিয়ে ঐতিহাসিক ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় (Brajadulal Chattopadhyaya) গভীর আলোচনা করেছেন (Chattopadhyaya, 1994)। তীর্থস্থানগুলোকে কেন্দ্র করে বাজার গড়ে উঠছিল, তীর্থযাত্রীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, জলপথ ও স্থলপথের বাণিজ্য এবং সর্বোপরি ব্রাহ্মণদের দেওয়া ভূমিদান (Bhūmidāna) পুরো অর্থনীতিকে সচল রাখছিল। রাজারা এবং ধনী বণিকেরা মন্দিরে এবং তীর্থে অকাতরে জমি ও অর্থ দান করতেন নিজেদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করতে। ফলস্বরূপ, মন্দিরের অর্থনীতি প্রাচীন যজ্ঞের সীমিত ব্যয়কে ছাপিয়ে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ও সম্পদ বণ্টনের এক বিরাট কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছিল।
লৌকিক দেবদেবী ও স্থানীয় সংস্কৃতির আত্তীকরণ (Assimilation of Folk Deities and Local Cultures)
পৌরাণিক হিন্দুধর্ম কোনো ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া একক ধর্মতত্ত্ব ছিল না; এটা ছিল বহু শতাব্দীর এক সমন্বিত সাংস্কৃতিক বিনিময়। উত্তর ভারতের আর্য ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির সাথে দক্ষিণ, পূর্ব ও মধ্য ভারতের আদিবাসী ও অনার্য লোকসংস্কৃতির নিরবচ্ছিন্ন মিশ্রণ এর প্রতিটি পদক্ষেপে দেখা যায়। প্রাচীন ট্রাইবাল বা লোকায়ত বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল গাছ, পাথর, সাপ, নদী এবং বিশেষ করে নানা ধরণের গ্রামদেবী। পৌরাণিক লেখকেরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে এই স্থানীয় সত্তাগুলোকে তাদের নিজস্ব মহাকাব্যিক কাহিনীর জালে জড়িয়ে নিয়েছিলেন। কোনো লৌকিক দেবতাকে ধ্বংস না করে তাকে একটি মর্যাদাপূর্ণ বড় কাঠামোয় স্থান দেওয়াই ছিল এই ব্যবস্থার কৌশল।
এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায় মাতৃকা ও দেবীর আরাধনায়। আদিবাসী ও অনার্য সমাজের রক্তবরণা, শিকারি ও মাতৃতান্ত্রিক দেবীদের একীভূত করে সৃষ্টি করা হলো পরম মাতৃরূপা মহামায়া (Mahāmāyā) বা দুর্গা (Durgā)। ষষ্ঠ শতক নাগাদ রচিত দেবীমাহাত্ম্য (Devīmāhātmya) পাঠে দেখা যায়, দেবী আর কোনো সাধারণ নারী নন; তিনি সমস্ত পুরুষ দেবতার সম্মিলিত তেজ থেকে উৎপন্ন এক পরম পরাক্রান্ত শক্তি, যিনি মহিষাসুরকে বধ করেন। লোকায়ত শিকারি সমাজের হিংস্র রূপকে বৈদিক মন্ত্রের আবরণে পবিত্র করে নিয়ে এক সর্বভারতীয় দেবীরূপে প্রতিষ্ঠা করা হলো। গ্রামগঞ্জের শীতলা, মনসা কিংবা চণ্ডী ধীরে ধীরে সেই একই বিশ্বজনীন মহাশক্তির স্থানীয় রূপ হিসেবে গণ্য হতে শুরু করলেন।
অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিল অন্যান্য দেবতাদের ক্ষেত্রেও। যেমন হস্তিমুখী দেবতা গণেশ (Gaṇeśa)-এর কোনো উল্লেখ ঋগ্বেদে সেই অর্থে পাওয়া যায় না। তিনি ছিলেন আদিবাসী গোষ্ঠীর কোনো এক টোটেম বা ফসলের বাধা দূরকারী লৌকিক দেবতা। তাকে ধীরে ধীরে শিব ও পার্বতীর পুত্র হিসেবে পরিবারভুক্ত করা হলো এবং যেকোনো শুভকাজের শুরুতে তাকে প্রথম পূজ্য দেবতার আসন দেওয়া হলো। দক্ষিণ ভারতের প্রধান যুদ্ধদেবতা মুরুগানকে উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে মিলিয়ে কার্তিকেয় বা স্কন্দ রূপে দাঁড় করানো হলো। ইতিহাসবিদ দামোদর ধর্মানন্দ কোশাম্বী (D. D. Kosambi) এই আত্তীকরণের বস্তুগত ভিত্তি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে খাদ্য উৎপাদনকারী কৃষি সমাজের প্রসারের সাথে সাথে খাদ্য সংগ্রহকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দেবদেবীও ব্রাহ্মণ্য প্যান্থিয়নে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়েছিল (Kosambi, 1962)।
উড়িষ্যার পুরীর জগন্নাথের রূপান্তর এই প্রক্রিয়ার আরেক ধ্রুপদী দৃষ্টান্ত। গবেষক অ্যানচার্লট এশম্যান (Anncharlott Eschmann) তার নৃবিজ্ঞানী গবেষণায় স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন যে জগন্নাথ মূলত ছিলেন শবর বা আদিবাসীদের একটি কাঠের তৈরি দেবতা (Eschmann et al., 1978)। পরবর্তীতে তাকে কৃষ্ণের সাথে একীভূত করে বৈষ্ণব ধর্মের অন্যতম প্রধান তীর্থের রূপ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই প্রাচীন আদিবাসী ঐতিহ্যকে পুরোপুরি মুছে ফেলা হয়নি; আজও জগন্নাথের মন্দিরে দ্বৈতাপতি নামে পরিচিত এক বিশেষ সেবায়েত গোষ্ঠী রয়েছেন, যাদের পরিচয় বংশপরম্পরায় অনার্য আদিবাসী উত্তরাধিকারের সাথে যুক্ত। বৈদিক গোঁড়ামির বিপরীতে এই ধরণের সাংস্কৃতিক সহনশীলতা ও আত্তীকরণই পৌরাণিক ধর্মকে একটি বহুমাত্রিক ও বিশাল ছাতার রূপ দিয়েছিল।
সামাজিক পুনর্বিন্যাস ও পৌরাণিক ধর্মতত্ত্বের রাজনৈতিক বৈধতা (Social Realignment and the Political Legitimacy of Purāṇic Theology)
ধর্মের এই অভূতপূর্ব বিবর্তন রাজনৈতিক ক্ষমতার গতিপ্রকৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিল। গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী মধ্যযুগীয় রাজবংশগুলো – যেমন পল্লব, চোল, চালুক্য, পাল বা সেন রাজারা – তাদের শাসনব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য নতুন পৌরাণিক ধর্মতত্ত্বকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছিলেন। রাজারা বুঝেছিলেন যে প্রাচীন বৈদিক অশ্বমেধ যজ্ঞ করে ব্যক্তিগত প্রতাপ হয়তো দেখানো যায়, কিন্তু প্রজা সাধারণকে দীর্ঘ মেয়াদে বশে রাখা যায় না। এর বদলে সুবিশাল পাথরের মন্দির নির্মাণ করে নিজেকে দেবতার পার্থিব প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরা অনেক বেশি কার্যকর রাজনৈতিক কৌশল ছিল।
রাজা হয়ে উঠলেন ঈশ্বরের প্রতিচ্ছবি, যাকে বলা হলো নরদেব (Naradeva)। মন্দির এবং রাজপ্রাসাদের মধ্যকার স্থাপত্যগত সাদৃশ্য কোনো আকস্মিক বিষয় ছিল না; দেবতার গর্ভগৃহ এবং রাজার দরবার প্রায় একই রকম জাঁকজমক ও আচার দিয়ে সাজানো হতো। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক রোনাল্ড ইন্দেন (Ronald Inden) মধ্যযুগীয় ভারতের রাজকীয় আচার নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে পুরাণের আখ্যানগুলো রাজাকে এক মহাজাগতিক শৃঙ্খলার কেন্দ্রীয় চরিত্রে বসিয়ে দিয়েছিল (Inden, 1990)। রাজারা নিজেদের কোনো সাধারণ বংশের বলে দাবি করতেন না; তারা রাজবংশের সূচনা হিসেবে পুরাণে বর্ণিত সূর্যবংশ বা চন্দ্রবংশের সাথে নিজেদের বংশলতিকাকে রক্তসূত্রে জুড়ে দিতেন।
এই রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে রাজারা ব্রাহ্মণদের বিপুল পরিমাণ করমুক্ত জমি দান করতেন, যা ব্রহ্মদেয় (Brahmadeya) বা অগ্রহার নামে পরিচিত ছিল। ঐতিহাসিক হারমান কুলকে (Hermann Kulke) দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই ভূমিদান ব্যবস্থার মাধ্যমে অনগ্রসর ও জঙ্গলময় অঞ্চলগুলোতে দ্রুত কৃষির বিস্তার ঘটানো হতো এবং স্থানীয় মানুষদের বর্ণাশ্রম ব্যবস্থার ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করা হতো (Kulke, 1993)। ব্রাহ্মণরা সেই প্রান্তিক অঞ্চলে গিয়ে মন্দির প্রতিষ্ঠা করতেন, পুরাণ পাঠ করতেন এবং স্থানীয় শাসকদের জন্য তৈরি করতেন ঐশ্বরিক পূর্বপুরুষের ইতিহাস। বিনিময়ে স্থানীয় শাসকেরা পেতেন তাদের ক্ষমতার এক চূড়ান্ত ধর্মীয় ও সামাজিক স্বীকৃতি।
তবে এই নতুন পৌরাণিক ধর্মতত্ত্ব সমাজকে সম্পূর্ণরূপে বৈষম্যহীন করে দেয়নি। বরং তা পুরনো বর্ণাশ্রম (Varṇāśrama) নিয়মকে এক নতুন ও সহনশীল ছাঁচে ঢালাই করে আরও স্থায়ী রূপ দিয়েছিল। নিম্নবর্ণের মানুষ ভক্তিতে অংশ নিতে পারত, মন্দিরের প্রাঙ্গণে আসতে পারত, কিন্তু গর্ভগৃহের ভেতরে ঢোকার বা সর্বোচ্চ সামাজিক ক্ষমতা পাওয়ার অধিকার তাদের ছিল না। উচ্চবর্ণের হাতে ক্ষমতার লাগাম সুরক্ষিত রেখেই সাধারণ মানুষকে একটি আবেগীয় মুক্তির স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। বৈদিক ধর্মের শুষ্ক আনুষ্ঠানিকতা থেকে পৌরাণিক ধর্মের এই রূপান্তর ছিল একাধারে ভক্তির গণজাগরণ এবং সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসকে বাঁচিয়ে রাখার এক চতুর ঐতিহাসিক আপসরফা।
বৈদিক ধর্ম ও হিন্দুধর্মের সম্পর্ক (Vedic Religion and Hinduism): ধারাবাহিকতা, রূপান্তর, সংমিশ্রণ ও পরিচয়
ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর (Historical Continuity and Institutional Transformation)
ইতিহাসের পথরেখা সোজা লাইনে চলে না। বৈদিক ধর্ম থেকে বর্তমানকালের হিন্দুধর্মে রূপান্তরের যে দীর্ঘ যাত্রা, সেখানে অনেক বাঁক রয়েছে। অনেক সাধারণ মানুষের ধারণা, আজকের হিন্দুধর্ম বুঝি হুবহু বেদ থেকে নেমে এসেছে। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রাচ্যবিদ এবং পরবর্তীকালের সমাজতাত্ত্বিকরা দেখিয়েছেন যে, বৈদিক সমাজব্যবস্থা এবং আধুনিক হিন্দুধর্মের মধ্যে যেমন সুতোর মতো কিছু ধারাবাহিকতা আছে, তেমনি বহু জায়গায় ঘটেছে বড় ধরনের ছেদ (Halbfass, 1991)। বৈদিক যুগের পশুপালনকারী যাযাবর সমাজের ধর্মীয় চাহিদা আর পরবর্তীকালের কৃষিনির্ভর নাগরিক সমাজের চাহিদা এক ছিল না। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতাই ধর্মটির রূপ বদলে দিয়েছিল।
জার্মান গবেষক হেইনরিশ ফন স্টাইটেলক্রন (Heinrich von Stietencron) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, হিন্দুধর্মকে একক কোনো ধর্ম হিসেবে দেখার চেয়ে একে একাধিক সমান্তরাল ধর্মীয় ঐতিহ্যের একটি মহাসংঘ হিসেবে দেখা অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত (Stietencron, 2005)। বৈদিক ধর্ম ছিল মূলত যজ্ঞকেন্দ্রিক একটি বিশেষ পুরোহিত-গোষ্ঠীর আচার। সেখানে মন্দির ছিল না, কোনো স্থায়ী প্রতিমা ছিল না, তীর্থযাত্রার বালাই ছিল না। সেই যাগযজ্ঞের জটিল কাঠামোর জায়গায় কয়েক শতাব্দী ধরে ধীরে ধীরে এমন এক ধর্মের জন্ম হলো, যার মূল ভিত্তি হয়ে উঠল মন্দির, প্রতিমাপূজা, ভক্তি এবং ব্যক্তিগত উপাসনা। এই পরিবর্তনটি কোনো আকস্মিক বিপ্লবের মাধ্যমে হয়নি, ঘটেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা সামাজিক লেনদেনের মধ্য দিয়ে।
ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার (Romila Thapar) এই রূপান্তরের পেছনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করেছেন (Thapar, 1989)। গঙ্গা উপত্যকায় কৃষির বিস্তার এবং নগর গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যাযাবর জীবনের উপযোগী বৈদিক প্রতিষ্ঠানগুলো অচল হয়ে পড়েছিল। বড় বড় রাজকীয় যজ্ঞে হাজার হাজার গবাদিপশু ধ্বংস করার অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা একসময় শেষ হয়ে যায়। নতুন গড়ে ওঠা বণিক ও কৃষক শ্রেণি এমন এক বিশ্বাসের খোঁজ করছিল যা দৈনন্দিন উৎপাদনের সঙ্গে খাপ খায়। ঠিক এই শূন্যস্থানেই পৌরাণিক ধর্মের বিকাশ ঘটেছিল। বৈদিক ধারার নামকাওয়াস্তে কর্তৃত্ব স্বীকার করে নিয়েই গড়ে উঠেছিল এক নতুন সামাজিক ধর্মব্যবস্থা।
ধারাবাহিকতার প্রশ্নটি আসলে এক ধরনের বৈধতা তৈরির লড়াই। পরবর্তীকালের সমাজপতি এবং শাস্ত্রকাররা কখনোই বলেননি যে তারা নতুন কিছু বানাচ্ছেন। তারা সবসময় দাবি করেছেন যে তাদের রীতিনীতি সব বেদ থেকেই এসেছে। সমাজবিজ্ঞানী লুই রেনো (Louis Renou) এটাকে অভিহিত করেছিলেন বৈদিক কর্তৃত্বের এক ধরনের প্রতীকী ব্যবহার হিসেবে (Renou, 1965)। কোনো মতবাদ বা আচারকে সমাজে গ্রহণযোগ্য করতে হলে বেদের দোহাই দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। ফলে ভেতরের কাঠামোটি পুরোপুরি বদলে গেলেও বাইরের খোলসটিতে বৈদিক সাহিত্যের নাম জড়িয়ে রাখার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
দেবমণ্ডলীর পুনর্বিন্যাস: বৈদিক প্রকৃতি-শক্তি থেকে পৌরাণিক ত্রিমূর্তি (Reconfiguration of the Pantheon: From Vedic Nature Forces to the Purāṇic Trimūrti)
বৈদিক সাহিত্যের পাতা ওল্টালে যে দেবতাদের দাপট দেখা যায়, আজকের হিন্দু মন্দিরে তাদের খুঁজে পাওয়া কঠিন। ঋগ্বেদের প্রধান চরিত্র ছিলেন ইন্দ্র (Indra), যিনি সোমরস পান করতেন, বজ্র ছুড়ে অসুর বধ করতেন আর বৃষ্টির পথ খুলে দিতেন। তার পরেই স্থান ছিল যজ্ঞের দূত অগ্নি (Agni) এবং পবিত্র লতা বা পানীয়ের রূপ সোম (Soma)-এর। বরুণ ছিলেন মহাজাগতিক নিয়ম বা ঋতের পাহারাদার। কিন্তু আজকের হিন্দু সমাজে ইন্দ্রের কোনো সক্রিয় মন্দির দেখা যায় না। তিনি পৌরাণিক কাহিনিগুলোতে পরিণত হয়েছেন এক দুর্বল, সিংহাসন হারানোর ভয়ে তটস্থ স্বর্গের রাজায়, যাকে সামান্য কোনো ঋষির অভিশাপের ভয়ে কাঁপতে হয় (Doniger, 1999)।
দেবতাদের এই পতন এবং উত্থানের ইতিহাসটি অত্যন্ত চমকপ্রদ। আধুনিক হিন্দুধর্মের কেন্দ্রে রয়েছে ত্রিমূর্তি (Trimūrti) – ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব। বৈদিক সাহিত্যে রুদ্র ছিলেন এক প্রান্তিক ও ভয়ানক দেবতা, যার ক্রোধ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ প্রার্থনা করত। অথচ সেই রুদ্রই কালক্রমে স্থানীয় অনার্য, উপজাতীয় এবং লোকায়ত শিবের ধারণার সঙ্গে মিশে গিয়ে মহাদেবের রূপ নিলেন। ভারততত্ত্ববিদ ইয়ান গোন্ডা (Jan Gonda) দেখিয়েছেন কীভাবে বৈদিক রুদ্রের সঙ্গে বুনো, নৃত্যপটু ও অরণ্যচারী লোকদেবতার সংমিশ্রণ ঘটেছিল (Gonda, 1970)। অন্যদিকে ঋগ্বেদের বিষ্ণু ছিলেন তিন পদক্ষেপে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড মেপে ফেলা এক সৌর দেবতা, যার গুরুত্ব ছিল ইন্দ্রের তুলনায় অনেক কম। সেই বিষ্ণুই পরবর্তীকালে সর্বব্যাপী পরম সত্তায় রূপান্তরিত হলেন।
দেবী উপাসনার ক্ষেত্রেও এক অবিশ্বাস্য ওলটপালট চোখে পড়ে। বৈদিক ধর্মে দেবীদের ভূমিকা ছিল নিতান্তই নগণ্য। উষা, অদিতি কিংবা সরস্বতীর উপস্থিতি ছিল মূলত কাব্যিক, তাদের কোনো শক্ত রাজনৈতিক বা সামাজিক ক্ষমতা ছিল না। পুরুষপ্রধান বৈদিক সমাজে দেবীরা কোনো বড় যজ্ঞের মূল চালক ছিলেন না। কিন্তু হিন্দুধর্মের বিকাশে শাক্তধারার উত্থান এই হিসাব সম্পূর্ণ বদলে দিল। দুর্গা, কালী বা চণ্ডীর মতো দেবীরা যেভাবে শক্তির উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেন, তার শিকড় বৈদিক স্তোত্রে ছিল না; ছিল স্থানীয় কৃষিজীবী ও অনার্য সমাজের প্রজনন এবং উর্বরতার প্রতীকগুলোর মধ্যে (Hazra, 1975)।
এই রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি নির্দেশ করে যে দেবতা তৈরি হয় সমাজের প্রয়োজনে। পশুপালক সমাজ চেয়েছিল বৃষ্টি, রোদ আর আগুন। কিন্তু স্থিতিশীল কৃষি ও সামন্ততান্ত্রিক সমাজ চাইল এমন এক রক্ষাকর্তা, যিনি অবতার হয়ে পৃথিবীতে দুষ্টের দমন করবেন। এই সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকেই অবতারবাদ (Avatāravāda) তত্ত্বের জন্ম হলো। বৈদিক সাহিত্যে অবতারের কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। মহাভারত এবং পরবর্তীকালের পুরাণগুলোতে কৃষ্ণ ও রামের মতো লোকনায়কদের বিষ্ণুর অবতার হিসেবে ঘোষণা করা হলো। এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় বীর, গোষ্ঠীদেবতা বা টোটেমকে সহজে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছিল (Doniger, 1999)।
যজ্ঞ থেকে পূজা: উপাসনাপদ্ধতির বস্তুগত পরিবর্তন (From Yajña to Pūjā: Material Transformation of Worship Practices)
বৈদিক উপাসনার প্রধান মাধ্যম ছিল শ্রৌত যজ্ঞ (Śrauta Yajña)। খোলা আকাশের নিচে যজ্ঞবেদি তৈরি হতো, সেখানে আগুন জ্বালিয়ে পশু, ঘি আর সোমরস আহুতি দেওয়া হতো। যজ্ঞ শেষ হলে বেদি ফেলে দেওয়া হতো, কোনো স্থায়ী স্থাপত্য অবশিষ্ট থাকত না। যজ্ঞের কোনো নৈতিক মাত্রা ছিল না বললেই চলে; এটা ছিল দেবতাদের সঙ্গে এক ধরনের বাণিজ্যিক চুক্তি। মানুষকে আহুতি দিতে হতো, তার বিনিময়ে দেবতারা সন্তান, গবাদিপশু কিংবা যুদ্ধজয়ের বর দিতেন। তাত্ত্বিক ফ্রিত্স স্টাল (Frits Staal) কেরালার নাম্বুদ্রিপাদদের অতি-প্রাচীন অগ্নিচয়ন যজ্ঞ পর্যবেক্ষণ করে দেখিয়েছিলেন যে, বৈদিক যজ্ঞ আসলে কোনো অভ্যন্তরীণ আধ্যাত্মিক অনুভূতির বিষয় নয়, বরং অর্থহীন বা খাঁটি নিয়মের এক নিখুঁত পুনরাবৃত্তি (Staal, 1989)।
তুলনায় হিন্দুধর্মের প্রধান উপাসনাপদ্ধতি হলো পূজা (Pūjā)। পূজার ধারণাটি যজ্ঞের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে দেবতাকে অগ্নিকুণ্ডে খাদ্য হিসেবে পোড়ানো হয় না, বরং তাকে অতিথি হিসেবে বরণ করা হয়। প্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে তাকে স্নান করানো হয়, চন্দন দেওয়া হয়, ফল-মিষ্টি নিবেদন করা হয় এবং শেষে আরতি করা হয়। পূজার ভাষা এবং আচরণে রয়েছে এক গভীর আন্তরিকতা ও আত্মীয়তার ভাব, যা প্রাচীন যজ্ঞের কঠোর সংহিতা বা ব্রাহ্মণ সাহিত্যের শুষ্ক নিয়মের মধ্যে অনুপস্থিত ছিল। গবেষক অ্যাক্সেল মাইকেলস (Axel Michaels) উল্লেখ করেছেন যে, পূজার এই আচারগুলো মূলত গৃহস্থালি সেবা এবং অতিথি সৎকার থেকে ধার করা হয়েছে (Michaels, 2004)।
ভাষাতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিকদের মতে, ‘পূজা’ শব্দটি সম্ভবত দ্রাবিড় বা অনার্য উৎস থেকে এসেছে। তামিল ভাষায় ‘পু’ মানে ফুল এবং ‘চেয়’ মানে করা; অর্থাৎ ফুল দিয়ে কোনো কিছু সাজানো বা নিবেদন করাই পূজা। বৈদিক ধর্মে ফুলের ব্যবহার প্রায় দেখাই যেত না, সেখানে আহুতির মূল দ্রব্য ছিল মাংস, চর্বি, দুধ ও যব। অহিংসা আন্দোলনের চাপে এবং স্থানীয় লোকবিশ্বাসের চাপে বৈদিক রক্তক্ষয়ী যজ্ঞ যখন সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছিল, তখন ফুল, ফল ও জল দিয়ে উপাসনার এই কোমল পদ্ধতিটি জনপ্রিয়তা পায়। রক্তপাতের বদলে নৈবেদ্য অর্পণ সামাজিক শান্তির জন্যও ছিল অনেক বেশি উপযোগী (Kane, 1974)।
পূজার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত হয়েছিল মন্দির সংস্কৃতি। বৈদিক যুগে স্থায়ী কোনো মন্দিরের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। কিন্তু প্রথম সহস্রাব্দের মাঝামাঝি থেকে ভারতজুড়ে পাথরের বড় বড় মন্দির গড়ে উঠতে শুরু করল। মন্দির কেবল প্রার্থনার জায়গা রইল না, এটা হয়ে উঠল অর্থনৈতিক লেনদেন, ভূমিদান, সঙ্গীত, নৃত্য ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। রাজারা নিজেদের শাসনকে বৈধতা দিতে বড় বড় মন্দিরে বিপুল অর্থ দান করতেন। ফলে বৈদিক পুরোহিতের জায়গা নিল মন্দিরের সেবায়েত এবং যজ্ঞের অগ্নিকুণ্ডের জায়গা দখল করল গর্ভগৃহের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে স্থাপিত বিগ্রহ (Michaels, 2004)।
সমাজকাঠামো ও স্মৃতিশাস্ত্রীয় অনুশাসন (Social Structure and the Norms of Smṛti Literature)
বৈদিক সমাজের সঙ্গে হিন্দুধর্মের সামাজিক কাঠামোর সেতু হিসেবে কাজ করেছিল স্মৃতিশাস্ত্র (Smṛti Literature)। বৈদিক সাহিত্যের শেষভাগে ঋগ্বেদের পুরুষসূক্তে যে চার বর্ণের কথা এক অলীক রূপকের মাধ্যমে বলা হয়েছিল, ধর্মসূত্র ও মনুস্মৃতির যুগে এসে তা এক অনমনীয় ও বংশানুক্রমিক জাতব্যবস্থায় রূপ নিল। বৈদিক যুগে বর্ণভেদ কতটা কঠোর ছিল তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে; ঋগ্বেদে পিতা কবি, মাতা গম পেষণকারী এবং পুত্র চিকিৎসক – এমন পরিবারের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু উত্তর-বৈদিক যুগে এসে এই গতিশীলতা চিরতরে রুদ্ধ হয়ে গেল এবং সমাজকে বেঁধে ফেলা হলো কঠোর আচার ও শুদ্ধাশুদ্ধির বেড়াজালে (Olivelle, 2005)।
ভারততত্ত্ববিদ প্যাট্রিক অলিভেল (Patrick Olivelle) ধর্মশাস্ত্রের বিবর্তন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে বর্ণাশ্রম ধর্মকে বৈদিক ঐতিহ্যের স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল (Olivelle, 1993)। মানুষের জীবনকে চারটি আশ্রমে ভাগ করা হলো – ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস। এটা ছিল এক গভীর সামাজিক আপস। একদিকে বৈদিক সমাজের গৃহস্থালি ও উৎপাদনের বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে শ্রমণ ধারার ত্যাগ ও মোক্ষের আকাঙ্ক্ষা – এই দুই বিপরীতমুখী টানকে মেলাতেই আশ্রমব্যবস্থার ছক তৈরি করা হয়েছিল। তবে এই ব্যবস্থার পূর্ণ সুবিধা কেবল উচ্চবর্ণের পুরুষদের জন্যই সংরক্ষিত ছিল।
নারীর অবস্থানের ক্ষেত্রেও এক বড় ঐতিহাসিক রূপান্তর দেখা গেল। বৈদিক যুগে অন্তত উচ্চবর্গের নারীদের উপনয়ন সংস্কারের এবং বিদ্যার্জনের কিছু সুযোগ ছিল; গার্গী বা মৈত্রেয়ীর মতো নারী দার্শনিকদের নাম বৈদিক সংলাপে পাওয়া যায়। কিন্তু মনুর স্মৃতিশাস্ত্রে নারীর সামাজিক স্বাধীনতা পুরোপুরি খর্ব করা হলো। সেখানে বিধান দেওয়া হলো যে নারী শৈশবে পিতার, যৌবনে স্বামীর এবং বার্ধক্যে পুত্রের অধীন থাকবে। শূদ্র ও অন্ত্যজদের মতো নারীদেরও বেদাধ্যয়নের অধিকার কেড়ে নেওয়া হলো। পিতৃতান্ত্রিক অনুশাসনকে বৈদিক সাহিত্যের দোহাই দিয়ে চিরস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হলো স্মৃতিশাস্ত্রগুলোর মাধ্যমে (Kane, 1974)।
একই সাথে লক্ষ্য করা যায় ভক্তি আন্দোলনের উদ্ভব, যা এই স্মৃতিশাস্ত্রীয় শৃঙ্খলার ভেতর এক ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। দক্ষিণ ভারতের আলবার এবং নয়নার সন্তদের হাত ধরে যে ভক্তিধারা শুরু হয়েছিল, তা পরে গোটা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। এই ভক্তি আন্দোলন ঘোষণা করল যে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছাতে কোনো জটিল বৈদিক মন্ত্র বা উচ্চবর্ণের পুরোহিতের দরকার নেই; ভালোবাসা আর আত্মনিবেদনই যথেষ্ট। শাস্ত্রের শুষ্ক নিয়মকে পাশ কাটিয়ে নিম্নবর্গের বহু মানুষ ভক্তিসাধক হিসেবে আবির্ভূত হলেন। তবু লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ভক্তি আন্দোলনও কিন্তু সমাজকাঠামোকে পুরোপুরি ভাঙতে পারেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে বৈদিক দেবমণ্ডলীর ছায়াতলে এসে এক ধরনের অভ্যন্তরীণ আপসে লিপ্ত হয়েছিল (Halbfass, 1991)।
আদিবাসী ও লোকায়ত ঐতিহ্যের আত্মীকরণ: মহাবৃত্ত বনাম ক্ষুদ্রবৃত্ত (Assimilation of Indigenous and Folk Traditions: Great Tradition versus Little Tradition)
হিন্দুধর্মের গঠনপ্রক্রিয়া বুঝতে হলে নৃবিজ্ঞানী রবার্ট রেডফিল্ড (Robert Redfield)-এর দেওয়া একটি তত্ত্ব খুব সাহায্য করে। তিনি সংস্কৃতিকে ভাগ করেছিলেন দুটি বৃত্তে – মহাবৃত্ত (Great Tradition) এবং ক্ষুদ্রবৃত্ত (Little Tradition) (Redfield, 1956)। মহাবৃত্ত হলো শাস্ত্রীয়, সংস্কৃতনির্ভর, লিখিত এবং উচ্চবর্গীয় ঐতিহ্য। আর ক্ষুদ্রবৃত্ত হলো স্থানীয়, অলিখিত, লোকায়ত ও গ্রামীণ ঐতিহ্য। বৈদিক ধর্ম ছিল মহাবৃত্তের প্রতিনিধি, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টিকে থাকার জন্য ভারতবর্ষের অগণিত ক্ষুদ্রবৃত্তের আচার, বিশ্বাস ও দেবদেবীকে নিজের ভেতরে শুষে নিয়েছিল।
সমাজবিজ্ঞানী এম. এন. শ্রীনিবাস (M. N. Srinivas) এই রূপান্তরকে ব্যাখ্যা করার জন্য সংস্কৃতায়ন (Sanskritization) প্রত্যয়টি ব্যবহার করেছিলেন (Srinivas, 1962)। তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে নিম্নবর্গের বা প্রান্তিক উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলো তাদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ানোর জন্য বৈদিক ও উচ্চবর্ণের আচার-আচরণ অনুকরণ করত। তবে এই প্রক্রিয়াটি একমুখী ছিল না। উল্টো দিক থেকেও উচ্চবর্গের ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্য স্থানীয় দেবতাদের গ্রহণ করছিল। জগন্নাথের উদাহরণ এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক। ওড়িশার এক স্থানীয় শবর বা উপজাতীয় কাঠের দেবতাকে ধীরে ধীরে মহাজাগতিক বিষ্ণুর রূপ দিয়ে পুরীর বিশাল মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এই গ্রহণপ্রক্রিয়ার ফলে স্থানীয় মানুষ যেমন সন্তুষ্ট হলো, তেমনি শাস্ত্রীয় ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রভাবও নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল।
গাছপালা, নদী এবং প্রাণীর পূজাও বৈদিক কেন্দ্র থেকে আসেনি; এসেছে অতি-প্রাচীন লোকায়ত জীবন থেকে। পিপুল গাছের পূজা, তুলসী গাছের পরিচর্যা, সাপের জন্য মনসাপূজা কিংবা গঙ্গা ও যমুনার মতো নদীকে জীবন্ত দেবী ভাবার সংস্কার প্রাক-বৈদিক হরপ্পা সংস্কৃতি এবং স্থানীয় জনজাতির গভীর বিশ্বাস থেকে ধার করা। বৈদিক সাহিত্যে নদী ছিল নিছক জলপ্রবাহের স্থান, ইন্দ্রের জলমুক্ত করার যুদ্ধক্ষেত্র। কিন্তু হিন্দুধর্মে এসে নদী হয়ে উঠল পাপস্খলনের তীর্থ। এই সমন্বয়ের ফলেই হিন্দুধর্ম কোনো একক গ্রন্থ বা মতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এক বিশাল লোকসংস্কৃতির নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছিল (Thapar, 1989)।
এই সার্বিক মিশ্রণকে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ বা সংঘাতহীন প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্থানীয় দেবদেবী ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে বৃহত্তর ব্রাহ্মণ্য – পুরাণিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার সময় তাদের পরিচয়, মর্যাদা ও পৌরাণিক ভূমিকার পুনর্নির্মাণ ঘটেছে। কোনো কোনো পৌরাণিক আখ্যানে স্থানীয় বা প্রান্তিক ধর্মীয় সত্তাকে অসুর, রাক্ষস কিংবা পরাজিত প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গবেষকেরা এ ধরনের আখ্যানের কিছু অংশকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যকার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের প্রতীকী প্রতিফলন হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন, যদিও এগুলোকে সরাসরি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সংঘর্ষের দলিল হিসেবে দেখা যায় না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় দেবতাকে বৃহত্তর কোনো দেবতার অনুচর, সহচর, অবতার বা আঞ্চলিক রূপ হিসেবে স্থান দেওয়া হয়েছে। ফলে এই প্রক্রিয়া শুধু দমন বা প্রতিস্থাপনের ছিল না। বরং আত্মীকরণ, পুনর্ব্যাখ্যা, সমন্বয় এবং কখনো ক্ষমতার অসম সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ব্রাহ্মণ্য – পুরাণিক ঐতিহ্য বিপুল লোকায়ত, আঞ্চলিক ও আদিবাসী ধর্মীয় উপাদানকে ধারণ ও রূপান্তর করেছে। এই দীর্ঘ পারস্পরিক রূপান্তরই পরবর্তীকালে হিন্দুধর্মের বহুমাত্রিক রূপ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে (Doniger, 1999)।
আধুনিক হিন্দু পরিচয়ে বৈদিক কর্তৃত্বের ভূমিকা (The Role of Vedic Authority in Modern Hindu Identity)
আধুনিক যুগে এসে বেদ ও হিন্দুধর্মের সম্পর্ক এক নতুন রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক মাত্রা পায়। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে যখন ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তি ভারতে থিতু হলো, তখন তারা ভারতীয় সমাজকে বোঝার জন্য পাঠভিত্তিক বা টেক্সচুয়াল পথ বেছে নিল। প্রাচ্যবিদরা দাবি করলেন, ভারতের ‘আসল’ ধর্ম লুকানো আছে বেদের পাতায়, আর বর্তমানের হিন্দুধর্ম হলো সেই প্রাচীন বিশুদ্ধ ধর্মের এক অধঃপতিত ও বিকৃত রূপ। এই ধারণার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আধুনিক হিন্দু সংস্কারকরাও বেদের দিকে ফিরে তাকানোর ডাক দিলেন (King, 1999)।
স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী (Dayananda Saraswati) যখন ১৮৭৫ সালে আর্যসমাজ প্রতিষ্ঠা করলেন, তখন তার প্রধান স্লোগান ছিল ‘বেদে ফিরে যাও’। তিনি মূর্তি পূজা, বহুদেববাদ, বাল্যবিয়ে এবং জাতব্যবস্থাকে অবৈদিক বলে ঘোষণা করলেন। তিনি যুক্তি দিলেন যে চার বেদই একমাত্র সত্য জ্ঞান এবং পরবর্তীকালের পুরাণগুলো অনর্থক কল্পনা। বিপরীতে স্বামী বিবেকানন্দ (Swami Vivekananda) বেদান্তকে সামনে এনে এক বিশ্বজনীন রূপ দেওয়ার চেষ্টা করলেন। তিনি বৈদিক সংহিতাকে পেছনে রেখে উপনিষদের অদ্বৈত দর্শনকে হিন্দুধর্মের সারাৎসার হিসেবে দাঁড় করালেন। ফলে ঔপনিবেশিক আধুনিকতার জবাবে হিন্দু পরিচিতি পুনর্গঠনের জন্য বেদ হয়ে উঠল প্রধান হাতিয়ার (Halbfass, 1991)।
ধর্মতাত্ত্বিক ব্রায়ান কে. স্মিথ (Brian K. Smith) এই প্রক্রিয়ার একটি তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ দিয়েছেন (Smith, 1989)। তিনি দেখিয়েছেন যে, হিন্দুধর্মের সংজ্ঞায় বেদ একটি ‘ক্যানন’ বা আদর্শ হিসেবে কাজ করে, কিন্তু সেই ক্যাননের ভেতরের পাঠ কেউ খুব একটা পড়ে দেখে না। আধুনিক হিন্দুদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বেদের কোনো মন্ত্র না বুঝেও বেদকে চূড়ান্ত প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে মান্য করে। বেদ এখানে কোনো সক্রিয় শাস্ত্র নয়, বরং একটি পবিত্র প্রতীক। কেউ যদি কোনো আচার বা ধারণাকে সনাতন ও খাঁটি বলে দাবি করতে চায়, তবে সে কেবল দাবি করে যে এটা বেদে আছে। এই প্রতীকী আনুগত্যের মাধ্যমেই বিভিন্ন বিরোধী মতাদর্শ নিজেদের হিন্দু ছাতার নিচে ধরে রাখে।
আজকের দিনে বৈদিক ধর্ম ও হিন্দুধর্মের সম্পর্ককে তাই সরল সমীকরণ দিয়ে মাপা যায় না। হিন্দুধর্ম বৈদিক ধর্ম নয়, আবার বৈদিক ধর্ম ছাড়া হিন্দুধর্মের ঐতিহাসিক অস্তিত্ব কল্পনা করাও কঠিন। বৈদিক সাহিত্য থেকে হিন্দুধর্ম নিয়েছে তার দার্শনিক পরিভাষা, সামাজিক বৈধতার ভিত্তি এবং এক ধরনের পবিত্রতার স্মৃতি। কিন্তু তার শরীর ও প্রাণের বেশিরভাগটাই গড়ে উঠেছে ভারতের ভৌগোলিক সীমানায় হাজার বছর ধরে মিশে থাকা দ্রাবিড়, অস্ট্রিক, তিব্বতি-বর্মি ও স্থানীয় লোকসংস্কৃতির রক্তমাংস দিয়ে। বৈদিক ধর্মের কঠোর যাগযজ্ঞ ইতিহাসের অতলে হারিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু তার ছায়া আজও আধুনিক হিন্দু পরিচয়ের গভীরে এক অদৃশ্য অথচ সক্রিয় উপস্থিতি হিসেবে কাজ করে চলেছে (Stietencron, 2005)।
মধ্যযুগে বেদের কর্তৃত্ব ও ব্যবহার (Vedic Authority in Medieval India): স্মৃতি, দর্শন, তন্ত্র ও শাস্ত্রীয় বৈধতা
মধ্যযুগীয় বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলে বেদের পরিবর্তিত অবস্থান ও প্রতীকি কর্তৃত্ব (Changing Position and Symbolic Authority of the Vedas in Medieval Intellectual Space)
মধ্যযুগীয় ভারতে পা রাখার সাথে সাথে বৈদিক সাহিত্যের অবস্থান এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। প্রাচীনকালের মতো বৈদিক সংহিতার ভাষা তখন আর কারও কথ্য ভাষা ছিল না। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে ঋগ্বেদ বা যজুর্বেদের সরাসরি কোনো সংযোগ অবশিষ্ট ছিল না বললেই চলে। শ্রৌত যাগযজ্ঞের জটিল অনুষ্ঠানগুলো সমাজের উচ্চবর্গের মধ্যেও বিরল হয়ে পড়েছিল। তবুও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মধ্যযুগে এসেই বৈদিক সাহিত্যের নাম এবং কর্তৃত্ব সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হতে শুরু করে। শাস্ত্রীয় বিতর্কে যেকোনো নতুন মতবাদকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে হলে বেদের দোহাই দেওয়া এক প্রকার বাধ্যতামূলক নিয়মে পরিণত হয়েছিল।
এই যুগে বেদ পরিণত হয়েছিল এক ধরণের বিমূর্ত ও প্রতীকী কর্তৃত্বে। কোনো দর্শনের সত্যতা যাচাইয়ের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়াল সেই দর্শন বেদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছে কি না। সমাজবিজ্ঞানী ও ভারততাত্ত্বিকেরা একে সংজ্ঞায়িত করেছেন শাস্ত্রীয় বৈধতা অর্জনের একটি প্রধান কৌশল হিসেবে। সমাজ মূলত পরিচালিত হচ্ছিল স্থানীয় প্রথা, রাজকীয় অনুশাসন এবং পৌরাণিক রীতিনীতি দ্বারা। কিন্তু তাত্ত্বিক বৈধতার প্রশ্নে স্মার্ত পণ্ডিতেরা সবসময় দাবি করতেন যে তাদের সমস্ত বিধিনিষেধের মূল ভিত্তি আসলে বেদেই রয়েছে। যদি কোনো প্রথার সরাসরি বৈদিক প্রমাণ না পাওয়া যেত, তবে তারা যুক্তি দিতেন যে সেই প্রথাটি হয়তো কোনো হারিয়ে যাওয়া বা অনুলিখিত বৈদিক শাখা থেকে এসেছে, যাকে পরিভাষায় বলা হতো অনুমিত শ্রুতি (Anumita Śruti)।
ইতিহাসবিদ সিজারি গালেভিচ (Cezary Galewicz) মধ্যযুগীয় স্মৃতি ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ সংস্কৃতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে বেদ একটি জীবন্ত আচারিক পাঠ্য থেকে ধীরে ধীরে একটি পবিত্র স্মৃতিস্মারকে রূপান্তরিত হয়েছিল (Galewicz, 2010)। পণ্ডিতেরা বেদের মূল পাঠ মুখস্থ রাখতেন ঠিকই, কিন্তু তাদের গবেষণার সিংহভাগ জুড়েই থাকত সেই পাঠের ওপর তৈরি হওয়া ভাষ্য, উপভাষ্য এবং স্মৃতিগ্রন্থের বিশ্লেষণ। অর্থাৎ সরাসরি বেদের সংস্পর্শে আসার চেয়ে বেদের ছায়াতলে তৈরি হওয়া পরবর্তী সাহিত্যের মধ্য দিয়েই মধ্যযুগীয় সমাজ বেদের কর্তৃত্ব অনুভব করত।
এই প্রতীকী উপস্থিতির ফলে একটি বড় ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটেছিল। বৈদিক যুগ যেখানে ছিল পুরোহিতদের যজ্ঞশালার প্রত্যক্ষ ক্ষমতার যুগ, মধ্যযুগ সেখানে পরিণত হলো লিপিকার, টীকাকার ও দরবারি পণ্ডিতদের শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার যুগে। আইনি তাত্ত্বিক ডোনাল্ড আর. ডেভিস (Donald R. Davis Jr.) হিন্দু আইনের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে মধ্যযুগের শাস্ত্রকারদের মূল কাজ ছিল বৈদিক কর্তৃত্বের একটি কল্পিত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা (Davis, 2010)। সমাজের বাস্তব পরিবর্তনগুলোকে তারা প্রাচীন বৈদিক ভাষার ভেতরে এমনভাবে স্থাপন করতেন, যাতে মনে হতো নতুন কোনো নিয়ম তৈরি হচ্ছে না, বরং অনাদিকাল থেকে চলে আসা বেদবাক্যই নতুন পরিস্থিতিতে নতুন রূপ ধারণ করছে মাত্র।
স্মৃতিনিবন্ধ সাহিত্যের বিকাশ ও আইনি অনুশাসনে বৈদিক বৈধতা (Development of Smṛtinibandha Literature and Vedic Legitimacy in Legal Codes)
খ্রিস্টীয় দশম থেকে ষোড়শ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতীয় শাস্ত্রচর্চায় এক বিপুল রূপান্তর ঘটে স্মৃতিনিবন্ধ (Smṛtinibandha) সাহিত্যের অভাবনীয় প্রসারের মাধ্যমে। মনু, যাজ্ঞবল্ক্য বা পরাশরের মতো প্রাচীন স্মৃতিগ্রন্থগুলোর ওপর ভিত্তি করে এক বিশাল সারসংক্ষেপ ও আইনি বিশ্বকোষ রচনার ঢেউ শুরু হয়েছিল এই সময়ে। কাশ্মীর থেকে কেরালা এবং গুজরাট থেকে বাংলা – সর্বত্রই আঞ্চলিক পণ্ডিতেরা সমাজের নিয়মকানুন শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে কলম ধরেন। এদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন মনুস্মৃতির প্রখ্যাত ব্যাখ্যাকার মেধাতিথি (Medhātithi), যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতির ভাষ্যকার বিজ্ঞানেশ্বর (Vijñāneśvara), মিথিলার চণ্ডেশ্বর ঠাকুর (Caṇḍeśvara Ṭhākura), এবং বাংলার বিখ্যাত স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দন ভট্টাচার্য (Raghunandana Bhaṭṭācārya)।
এই নিবন্ধকারদের সামনে প্রধান সংকট ছিল প্রচলিত সমাজের আচার-আচরণের সাথে প্রাচীন বৈদিক ও পৌরাণিক নিয়মের মধ্যে যে বৈপরীত্য তৈরি হয়েছিল, তার সামঞ্জস্য বিধান করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দক্ষিণ ভারতে মামাতো বা পিসতুতো ভাই-বোনের বিয়ের মতো আত্মীয়তার সম্পর্ক বেশ স্বাভাবিক ছিল, যা উত্তর ভারতীয় বৈদিক ধারায় চরম নিষিদ্ধ। এই সমস্যা মেটাতে স্মৃতিনিবন্ধকারেরা মীমাংসা দর্শনের ব্যাখ্যাকৌশল ধার করেন। তারা ঘোষণা করলেন যে কোনো অঞ্চলের দীর্ঘকালীন প্রথা বা দেশাচার (Deśācāra) এবং সামাজিক রীতিনীতি বা লোকাচার (Lokācāra) যদি সরাসরি শ্রুতির বিরুদ্ধে না যায়, তবে তা বৈদিক অনুশাসনের মতোই সম্মান পাবে। এর ফলে আঞ্চলিক ক্ষমতা ও শ্রেণিগত স্বার্থকে বেদের নাম ভাঙিয়ে বৈধতা দেওয়া সহজ হয়েছিল।
আইনি ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আরেকটি বড় কৌশল ছিল কলিবর্জ্য (Kalivarjya) তত্ত্বের উদ্ভাবন। স্মার্ত পণ্ডিতেরা লক্ষ্য করেছিলেন যে প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে বহু এমন আচারের উল্লেখ ছিল, যা মধ্যযুগীয় নৈতিকতার দৃষ্টিতে চরম অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল। যেমন বৈদিক পশুবলি, গোমেধ, ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপাদনের জন্য দেবর-মিলন বা নিয়োগপ্রথা এবং সন্ন্যাস গ্রহণের বিশেষ কিছু প্রাচীন ধারা। এই আচারগুলোকে সরাসরি ভুল বা অবৈধ না বলে পণ্ডিতেরা বললেন, এগুলো সত্য, ত্রেতা ও দ্বাপর যুগে বৈধ ছিল ঠিকই, কিন্তু পাপের যুগ অর্থাৎ বর্তমান কলিযুগে এগুলো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা কলিবর্জ্য। এই শাস্ত্রীয় কৌশলের মাধ্যমে প্রাচীন বৈদিক বিধানের প্রতি নামমাত্র শ্রদ্ধা অটুট রেখেও বাস্তব জীবনে সেগুলোকে বাতিল করে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।
আইন বিশারদ লুডো রোশার (Ludo Rocher) স্মৃতি ও নিবন্ধ সাহিত্যের ঐতিহাসিক বিকাশ আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই গ্রন্থগুলো মধ্যযুগের শাসনব্যবস্থায় সামাজিক নিয়ন্ত্রণের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল (Rocher, 2012)। রাজারা অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ, পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকার বা বর্ণাশ্রমের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এই নিবন্ধগুলোর ওপর নির্ভর করতেন। বিজ্ঞানেশ্বরের মিতাক্ষরা (Mitākṣarā) কিংবা জীমূতবাহনের দায়ভাগ (Dāyabhāga) আইনগ্রন্থগুলো ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পারিবারিক উত্তরাধিকারের যে কঠোর নিয়ম নির্ধারণ করেছিল, তার পেছনে তারা বৈদিক অনুশাসনের পবিত্রতাকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে স্মার্ত আইন হয়ে উঠেছিল এক অলঙ্ঘনীয় নির্দেশ।
সায়ণাচার্যের ভাষ্যরচনা ও বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা (Sāyaṇācārya’s Commentaries and the State Patronage of the Vijayanagara Empire)
চতুর্দশ শতকে দক্ষিণ ভারতের তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে যখন বিজয়নগর সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে, তখন বৈদিক পাণ্ডিত্যচর্চায় এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক ঘটনা তৈরি হয়। উত্তর ভারত জুড়ে তখন তুর্কি সুলতানি শাসনের বিস্তার ঘটেছে এবং প্রথাগত হিন্দু রাজন্যবর্গ রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের সনাতন বৈদিক ঐতিহ্যের একমাত্র রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে উদ্যোগী হয়েছিল বিজয়নগরের সঙ্গম রাজবংশ। এই রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক কারিগর ছিলেন দুই ভাই – মাধবাচার্য (Mādhava), যিনি পরবর্তীতে বিদ্যাবণ্য নামে পরিচিত হন, এবং তার অনুজ পণ্ডিত সায়ণাচার্য (Sāyaṇa)।
প্রথম হরিহর ও প্রথম বুক্কার রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সায়ণাচার্য এক বিশাল পণ্ডিতমণ্ডলী গঠন করেন এবং সমগ্র বৈদিক সংহিতা, ব্রাহ্মণ ও আরণ্যকের ওপর প্রামাণ্য ভাষ্য রচনার এক মহাযজ্ঞ শুরু করেন। তার এই কীর্তি পরিচিত বেদার্থপ্রকাশ (Vedārthaprakāśa) নামে। ঋগ্বেদ, সামবেদ, কৃষ্ণ ও শুক্ল যজুর্বেদ এবং অথর্ববেদের প্রায় প্রতিটি মন্ত্রের শব্দ ধরে ধরে ব্যাকরণ, ব্যুৎপত্তি ও আচারিক প্রয়োগ তিনি বিশদভাবে লিপিবদ্ধ করেন। ঐতিহাসিক বিচারে এটাই ছিল সমগ্র বৈদিক সাহিত্যের ওপর প্রথম কোনো টিকে থাকা সর্বাঙ্গীন ভাষ্য। আধুনিক যুগে এসে ম্যাক্স মুলার যখন ঋগ্বেদ সম্পাদনা করতে বসেন, তখন সায়ণের এই ভাষ্যই ছিল তার কাজের প্রধান সহায়।
সায়ণের এই ভাষ্যরচনা নিছক কোনো নির্জন জ্ঞানচর্চা ছিল না; এটা ছিল বিজয়নগর সাম্রাজ্যের একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রকল্প। গবেষক হুইটনি কক্স (Whitney Cox) দক্ষিণ ভারতীয় সংস্কৃত সাহিত্যের রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে বিজয়নগরের শাসকেরা নিজেদের বৈদিক মার্গ প্রতিষ্ঠাপনাচার্য (Vaidika Mārga Pratiṣṭhāpanācārya) বা বৈদিক পথের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন (Cox, 2016)। রাষ্ট্রের সামরিক সংঘাতকে তারা উপস্থাপন করতেন একটি বৈদিক সভ্যতা রক্ষার লড়াই হিসেবে। ফলে সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সায়ণাচার্যের এই বিশাল বৌদ্ধিক কর্মযজ্ঞে বিপুল অর্থ ঢালা হয়েছিল।
তবে ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে দেখতে গেলে সায়ণাচার্যের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত নির্দিষ্ট। তিনি ছিলেন পূর্ব মীমাংসা দর্শনের একনিষ্ঠ অনুসারী। ফলে বেদের প্রতিটি সূক্ত বা স্তোত্রকে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন যজ্ঞের আচারের ব্যবহারের নিরিখে। প্রাচীন বৈদিক ঋষিদের বহু কাব্যিক রূপক বা অতিন্দ্রীয় অভিব্যক্তি সায়ণের হাতে এসে পরিণত হয়েছিল যজ্ঞে পশুর মাংস কাটার নির্দেশ কিংবা ঘিয়ের চামচ ধরার সুনির্দিষ্ট ব্যাকরণিক আদেশে। এই আচারবাদী ব্যাখ্যার কারণে বৈদিক সাহিত্যের অন্যান্য বহুমাত্রিক সামাজিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য ঢাকা পড়ে গিয়ে তা কেবল পুরোহিতদের যজ্ঞের নির্দেশিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
দর্শন ও তর্কের রণক্ষেত্র: নব্যন্যায় এবং সর্বদর্শনসংগ্রহে বেদের স্থান (The Battlefield of Philosophy and Logic: Position of the Vedas in Navya-Nyāya and Sarvadarśanasaṃgraha)
মধ্যযুগের শেষভাগে, বিশেষ করে চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতক নাগাদ পূর্ব ভারতের মিথিলা ও নবদ্বীপে ভারতীয় দর্শনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়, যার নাম নব্যন্যায় (Navya-Nyāya)। দার্শনিক গঙ্গেশ উপাধ্যায় (Gaṅgeśa Upādhyāya) তার যুগান্তকারী গ্রন্থ তত্ত্বচিন্তামণি (Tattvacintāmaṇi) রচনার মাধ্যমে প্রাচীন ন্যায় দর্শনের জটিল তর্কপদ্ধতিকে অত্যন্ত নিখুঁত গাণিতিক রূপ দেন। এই নব্যনৈয়ায়িকেরা কোনো ভাবাবেগ দিয়ে কথা বলতেন না; তাদের কাছে মুখ্য ছিল সংজ্ঞার নির্ভুলতা, অনুমানের নিয়ম এবং ভাষার যৌক্তিক বিশ্লেষণ। এই কঠিন যুক্তিবাদের মঞ্চেও বেদের প্রামাণ্য নিয়ে এক নতুন ধরণের তর্ক তৈরি হয়েছিল।
নব্যনৈয়ায়িকেরা শব্দপ্রমাণের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বেদের কর্তৃত্বকে ঈশ্বরের অস্তিত্বের সাথে বেঁধে ফেলেছিলেন। মীমাংসকদের মতো তারা বেদকে রচয়িতাহীন বা অপৌরুষেয় মানতেন না। তাদের যুক্তি ছিল, যেকোনো বাক্য অর্থপূর্ণ হতে হলে তার একজন সচেতন বক্তা থাকা প্রয়োজন। যেহেতু সাধারণ মানুষ ভ্রান্তি বা দুর্বলতার শিকার, তাই বেদের মতো নিখুঁত বিষয়ের বক্তা কোনো সাধারণ মানুষ হতে পারে না; একমাত্র সর্বজ্ঞ ঈশ্বরই এর রচয়িতা। ঈশ্বরকে বলা হলো আপ্ত (Āpta) বা পরম বিশ্বাসযোগ্য সত্তা, আর তার বাক্য হওয়ার কারণেই বেদ স্বতঃসিদ্ধ প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে। দার্শনিক স্টিফেন ফিলিপস (Stephen Phillips) নব্যন্যায়ের জ্ঞানতত্ত্ব আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে কীভাবে তারা শব্দ এবং অনুমানের সম্পর্ককে চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে দাঁড় করিয়েছিলেন (Phillips, 2012)।
একই যুগে দর্শনের বিভিন্ন ধারাকে একটি নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে সাজিয়ে মূল্যায়ন করার এক অভিনব প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই ধরণের ডক্সোগ্রাফিক বা দার্শনিক সারসংগ্রহমূলক গ্রন্থগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হলো মাধবাচার্যের রচিত সর্বদর্শনসংগ্রহ (Sarvadarśanasaṃgraha)। এই গ্রন্থে প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ষোলোটি প্রধান দার্শনিক সম্প্রদায়কে পর পর সাজানো হয়েছিল। শুরুতে স্থান দেওয়া হয়েছিল চরম বস্তুবাদী চার্বাক দর্শনকে, যা ছিল লেখকের চোখে সবচেয়ে নিম্নমানের। এরপর ক্রমান্বয়ে বৌদ্ধ, জৈন, বৈশেষিক, ন্যায়, মীমাংসা, শৈব ও বৈষ্ণব মত পেরিয়ে গ্রন্থের শীর্ষে স্থান দেওয়া হয়েছিল অদ্বৈত বেদান্তকে।
দার্শনিক তাত্ত্বিক রয় পেরেক (Roy W. Perrett) ভারতীয় দর্শনের মূল্যবোধ সংক্রান্ত আলোচনায় দেখিয়েছেন যে এই দার্শনিক বিন্যাসের মূল চাবিকাঠি ছিল বেদের সাথে প্রতিটি দর্শনের নৈকট্য বা দূরত্ব (Perrett, 2016)। যে দর্শন বেদকে যত বেশি সরাসরি গ্রহণ করেছে, তাকে তত উচ্চতর স্তরে বসানো হয়েছিল। মধ্যযুগের দার্শনিক যুদ্ধে এই গ্রন্থটি একটি শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছিল। এর মাধ্যমে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছিল যে মানুষের চিন্তা যত পরিপক্ব হবে, সে তত বেশি নাস্তিক্য ও বহুত্ববাদ ত্যাগ করে বৈদিক অদ্বৈতবাদের পরম ঐক্যের দিকে অগ্রসর হবে। ফলে তর্কশাস্ত্রের সর্বোচ্চ বিকাশের যুগেও বেদের কর্তৃত্বকে এক পরম আদর্শ হিসেবে ধরে রাখার চেষ্টা অব্যাহত ছিল।
তন্ত্র বনাম বেদ: সংঘাত, সমঝোতা ও বৈদিকীকরণ (Tantra versus Veda: Conflict, Accommodation, and Vedicization)
মধ্যযুগীয় ভারতের ধর্মীয় জীবন যদি কোনো একক শক্তি দিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়ে থাকে, তবে তা হলো তন্ত্র (Tantra)। শৈব, শাক্ত এবং বৈষ্ণব পঞ্চরাত্র ধারাগুলোর মাধ্যমে তন্ত্রের আচার-অনুষ্ঠান সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছিল। তন্ত্রের আকর্ষণ ছিল অপ্রতিরোধ্য, কারণ সেখানে জাতিভেদ বা লিঙ্গভেদের কঠোরতা ছিল না; নারী ও নিম্নবর্ণের মানুষেরাও সেখানে সরাসরি দীক্ষা নিতে পারত। কিন্তু তন্ত্রের বেশ কিছু শাখা – বিশেষ করে বামাচারী কৌল ধারা যেখানে পঞ্চ ম-কার বা মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুনের ব্যবহার ছিল – সনাতন বৈদিক সমাজের চোখে ছিল চরম অধর্ম এবং পাপ। ফলে প্রথম দিকে বৈদিক স্মার্তরা তন্ত্রকে বেদবাহ্য (Vedabāhya) বা বেদবিরোধী বলে কঠোর ফতোয়া জারি করতেন।
কিন্তু মধ্যযুগের অগ্রগতির সাথে সাথে এই সংঘাতময় পরিস্থিতি দ্রুত এক অভূতপূর্ব সমঝোতায় রূপ নিতে শুরু করে। তন্ত্রের বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে বৈদিক পণ্ডিতেরা বুঝতে পেরেছিলেন যে একে সম্পূর্ণ বর্জন করলে ব্রাহ্মণ্য সমাজের কর্তৃত্বই ধসে পড়বে। এর ফলে শুরু হলো তন্ত্রের এক ব্যাপক বৈদিকীকরণ (Vedicization) প্রক্রিয়া। মনুস্মৃতির ভাষ্যকার কুল্লুক ভট্ট (Kullūka Bhaṭṭa) হারীতের একটি প্রাচীন উক্তি উদ্ধৃত করে এক ঐতিহাসিক সমাধান হাজির করলেন। তিনি ঘোষণা করলেন: “শ্রুতিশ্চ দ্বিবিধা – বৈদিকী তান্ত্রিকী চ” (Śrutiśca dvividhā – vaidikī tāntrikī ca), যার সহজ অর্থ হলো ঐশ্বরিক সত্য বা শ্রুতি আসলে দুই প্রকারের – বৈদিক শ্রুতি এবং তান্ত্রিক শ্রুতি। এই এক বাক্যের মাধ্যমে তন্ত্রকে বেদেরই একটি বিকল্প কিন্তু সমান মর্যাদাসম্পন্ন প্রকাশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দেওয়া হলো।
এই সমঝোতার তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণে কাশ্মীর শৈববাদের শ্রেষ্ঠ তাত্ত্বিক অভিনবগুপ্ত (Abhinavagupta) তার বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ তন্ত্রালোক (Tantrāloka)-এ অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি যুক্তি দেন যে বৈদিক যাগযজ্ঞ হলো প্রাথমিক স্তরের অধিকারীদের জন্য একটি বাহ্যিক পথ, কিন্তু তন্ত্র হলো সেই বৈদিক সত্যেরই চূড়ান্ত ও অভ্যন্তরীণ রূপ। একইভাবে শাক্ত পণ্ডিত ভাস্করারায় (Bhāskararāya) তার বিভিন্ন ভাষ্যে বৈদিক শ্রুতিসূক্তগুলোর এমন এক ব্যাখ্যা দাঁড় করান যা সরাসরি তান্ত্রিক শ্রীবিদ্যা আচারের সাথে হুবহু মিলে যায়। তারা দেখাতে চাইলেন যে তন্ত্র বেদের কোনো বিরোধী জিনিস নয়, বরং বেদের গোপন রহস্যই তন্ত্রের সংকেতময় ভাষায় লুকানো রয়েছে।
ব্রিটিশ ভারততাত্ত্বিক গ্যাভিন ফ্লাড (Gavin Flood) মধ্যযুগীয় ধর্মীয় পরিবর্তনের ওপর গবেষণা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই আপসের মধ্য দিয়ে বৈদিক সমাজ নিজের শরীরে তান্ত্রিক রক্ত সঞ্চালন করেছিল (Flood, 2006)। তন্ত্রের মন্ত্র, মণ্ডল, চক্র ও কুণ্ডলিনী যোগের ধারণাগুলো বৈদিক গৃহ্য আচারের ভেতরে অঙ্গীভূত করে নেওয়া হলো। মন্দিরের নিত্যপূজা থেকে শুরু করে দুর্গাপূজা বা কালীপূজার মতো বৃহত্তর উৎসবগুলোতে বৈদিক মন্ত্র এবং তান্ত্রিক মুদ্রার এক মিশ্র রূপ তৈরি হলো। ফরাসি গবেষক আঁদ্রে পাদো (André Padoux) তান্ত্রিক মন্ত্রের এই ভাষাতাত্ত্বিক বৈধতা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে শেষ পর্যন্ত বৈদিক কর্তৃত্বের আবরণ গায়ে চড়িয়েই তন্ত্র মধ্যযুগীয় সমাজে তার স্থায়ী ও সম্মানজনক আসন নিশ্চিত করতে পেরেছিল (Padoux, 2011)।
মধ্যযুগীয় ভক্তি আন্দোলন ও বৈদিক আভিজাত্যের সামাজিক সংকট (Medieval Bhakti Movements and the Social Crisis of Vedic Elitism)
স্মৃতি, দর্শন আর তন্ত্র যখন সংস্কৃত ভাষার দুর্গে বসে বেদের কর্তৃত্বকে রক্ষা করছিল, ঠিক তখনই সমাজের তৃণমূল স্তর থেকে এক বিশাল সাংস্কৃতিক বিদ্রোহের সূচনা ঘটেছিল। একে আমরা জানি মধ্যযুগীয় ভক্তি আন্দোলন (Bhakti Movement) হিসেবে। উত্তর ভারতের কবীর, রবিদাস, নানক, মীরাবাঈ, মহারাষ্ট্রের জ্ঞানেশ্বর ও তুকারাম, এবং বাংলার চৈতন্যদেবের মতো সাধকেরা ধর্মের আলোচনাকে রাজদরবার ও চতুষ্পাঠীর বাইরে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের ঘরের দুয়ারে। তারা সংস্কৃত ভাষাকে প্রত্যাখ্যান করে কথা বলতে শুরু করলেন প্রাকৃত, হিন্দি, অবধী, মারাঠি ও বাংলার মতো দেশজ লোকভাষায়।
এই ভক্তি সাধকদের বড় অংশই বৈদিক আচারবাদ এবং ব্রাহ্মণ্য আভিজাত্যের ওপর সরাসরি আঘাত হানেন। বেনারসের তাঁতি পরিবারের সন্তান কবীর (Kabir) তার বহু দোহায় কোনো রাখঢাক না রেখেই বেদের অসারতা নিয়ে ব্যঙ্গ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শাস্ত্রের পাতা পড়ে পড়ে কত পণ্ডিত মরে গেল কিন্তু কেউ সত্য জানতে পারল না, অথচ ভালোবাসার আড়াইটি অক্ষর জানলেই পরম জ্ঞান লাভ হয়। কবীর বেদ এবং কুরআন উভয়কেই মানবনির্মিত বিভেদের দেয়াল হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণি থেকে উঠে আসা এই সাধকদের কাছে বৈদিক শুচিতা বা অস্পৃশ্যতার নিয়ম ছিল চরম ভণ্ডামি, কারণ ঈশ্বরের ভক্তি কোনো জাতপাত বা পবিত্র রক্তের ধার ধারে না।
ইতিহাসবিদ ক্রিশ্চিয়ান লি নোভেক্সে (Christian Lee Novetzke) পশ্চিম ভারতের মারাঠি জনপরিসরের বিকাশ আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে তুকারাম ও নামদেবের ভক্তিগীতি বৈদিক সংস্কৃতের একচেটিয়া আধিপত্যকে ভেঙে এক ধরণের সমতাবাদী ভাষা তৈরি করেছিল (Novetzke, 2016)। কিন্তু এই প্রবল ঝড়ের মুখেও বৈদিক ঐতিহ্য পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি, বরং তা এক নতুন রূপ ধারণ করেছিল আত্তীকরণের মাধ্যমে। যেমন উত্তর ভারতে তুলসীদাস (Tulsidas) যখন লোকভাষা অবধীতে তার কালজয়ী গ্রন্থ রামচরিতমানস (Rāmacaritamānasa) লিখলেন, তখন তিনি প্রথাগত পণ্ডিতদের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন। সেই বিরোধিতা কমাতে তুলসীদাস বারবার দাবি করলেন যে তার এই লোকভাষার রামকথা আসলে বেদ এবং পুরাণেরই নিবিড় নির্যাস বা বেদসম্মত (Vedasammata) বয়ান।
একই ধরণের কৌশল দেখা যায় পূর্ব ভারতের গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলনের ক্ষেত্রেও। শ্রীচৈতন্যের আবেগময় ভক্তি প্লাবন সাধারণ মানুষের মধ্যে বর্ণভেদ ভুলিয়ে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তার তিরোধানের পর বৃন্দাবনের রূপ ও সনাতন গোস্বামীর মতো পণ্ডিতেরা সেই ভক্তিধারাকে শাস্ত্রীয় রূপ দিতে কলম ধরেন। তারা স্মৃতিগ্রন্থের আদলে রচনা করলেন হরিভক্তিব্লাস (Haribhaktivilāsa), যেখানে বৈদিক ও পৌরাণিক বিধিনিষেধের সাথে বৈষ্ণব ভক্তির নিখুঁত আপস ঘটানো হলো। ইতিহাসবিদ ডেভিড এন. লরেনজেন (David N. Lorenzen) দেখিয়েছেন যে কীভাবে মধ্যযুগীয় ভারতে ধর্মীয় পরিচয় গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় ভক্তি এবং শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যের মধ্যে এক নিরন্তর টানাপোড়েন কাজ করেছিল (Lorenzen, 2004)। সাধারণ মানুষ শাস্ত্রকে অগ্রাহ্য করে ভক্তির অশ্রুতে ভেসে গিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ভক্তি আন্দোলনগুলোকেও টিকে থাকার জন্য কোনো না কোনোভাবে বৈদিক কর্তৃত্বের কাছে মাথা ঝুঁকিয়েই সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কিনতে হয়েছিল। বেদের এই বহুমাত্রিক ব্যবহার মধ্যযুগীয় ভারতের বৌদ্ধিক মানচিত্রকে এক অনন্য রূপ দিয়েছিল।
আধুনিক যুগে বেদের পুনর্ব্যাখ্যা (Modern Reinterpretations of the Vedas): সংস্কারবাদ, জাতীয়তাবাদ ও হিন্দু পুনরুজ্জীবন
ঔপনিবেশিক অভিঘাত, প্রাচ্যতত্ত্ব ও বেদের আধুনিক পুনরাবিষ্কার (Colonial Encounter, Orientalism, and the Modern Rediscovery of the Vedas)
আঠারো শতকের শেষভাগে ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম হওয়ার পর ভারতীয় সমাজ এক সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের মুখোমুখি হয়। ঔপনিবেশিক শাসকেরা কেবলমাত্র রাজস্ব আদায় বা সামরিক নিয়ন্ত্রণে সন্তুষ্ট ছিল না; তাদের প্রয়োজন ছিল এই বিশাল ভূখণ্ডের মানুষকে শাসন করার মতো একটি কার্যকর প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো। এই বাস্তব প্রয়োজনে ব্রিটিশ প্রশাসক ও পণ্ডিতেরা ভারতের প্রাচীন আইন ও ধর্মশাস্ত্রের সন্ধানে নামেন। ১৭৮৪ সালে কলকাতায় উইলিয়াম জোনসের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এশিয়াটিক সোসাইটি এই প্রক্রিয়ায় এক ঐতিহাসিক অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। প্রাচ্যের ভাষা, সাহিত্য ও প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে ইউরোপীয় গবেষকদের যে চর্চা শুরু হলো, জ্ঞানতত্ত্বের ইতিহাসে তাকে প্রাচ্যতত্ত্ব (Orientalism) নামে চিহ্নিত করা হয়।
এই প্রাচ্যতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের হাত ধরেই প্রায় বিস্মৃত বৈদিক সাহিত্য নতুন করে আলোয় আসে। উইলিয়াম জোনস এবং পরবর্তীতে কোলব্রুকের মতো পণ্ডিতেরা সংস্কৃত ভাষার সাথে গ্রিক ও লাতিন ভাষার অবিশ্বাস্য কাঠামোগত মিল লক্ষ্য করেন। এই ভাষাতাত্ত্বিক আবিষ্কার থেকে জন্ম নেয় বহুল আলোচিত আর্য জাতি তত্ত্ব (Aryan Race Theory)। ফরাসি ও জার্মান পণ্ডিতদের আগ্রহে বেদচর্চা ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ম্যাক্স মুলারের সম্পাদনায় ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড থেকে প্রকাশিত ঋগ্বেদের সুবিশাল সংস্করণ সমগ্র বিশ্বের বিদ্বৎসমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা প্রচার করতে শুরু করলেন যে প্রাচীন বৈদিক যুগ ছিল এক যুক্তিবাদী, মুক্তমনা ও বীরত্বপূর্ণ জাতির সোনালী অধ্যায়, যা সময়ের পরিক্রমায় মধ্যযুগীয় পৌত্তলিকতা, কুসংস্কার ও পুরোহিততন্ত্রের চাপে অধঃপতিত হয়েছে।
ঐতিহাসিক থমাস আর. ট্রটম্যান (Thomas R. Trautmann) তার প্রামাণ্য গবেষণায় উন্মোচন করেছেন যে কীভাবে এই আর্য তত্ত্ব এবং বৈদিক গৌরবগাথা ঔপনিবেশিক ভারতের শাসক ও শাসিত উভয়ের জন্যই এক দ্বিমুখী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল (Trautmann, 1997)। একদিকে ব্রিটিশ শাসকেরা আর্য আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে তাদের শাসনকে এক ধরণের ‘হারিয়ে যাওয়া ভাইদের পুনর্মিলন’ হিসেবে ন্যায্য প্রমাণ করতে চাইত। অন্যদিকে, ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা এই তত্ত্বকে আঁকড়ে ধরে নিজেদের হীনম্মন্যতা দূর করার রসদ খুঁজে পেয়েছিলেন। ক্রিশ্চিয়ান মিশনারিরা যখন ভারতীয়দের প্রতিমাপূজা, সতীদাহ, জাতপাত ও অস্পৃশ্যতার মতো সামাজিক ব্যাধি নিয়ে তীব্র আক্রমণ চালাচ্ছিল, তখন দেশীয় সংস্কারকেরা প্রাচ্যবিদদের তৈরি করা সেই বৈদিক স্বর্ণযুগের বয়ানকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করলেন।
সমাজতাত্ত্বিক পিটার ভ্যান ডার ভীর (Peter van der Veer) লক্ষ্য করেছেন যে আধুনিক ভারতে ধর্মের এই রূপান্তরটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঐতিহ্যবাহী প্রক্রিয়া ছিল না, বরং তা ছিল ঔপনিবেশিক আধুনিকতার সাথে এক জটিল বোঝাপড়ার ফসল (Van der Veer, 2001)। বৈদিক যুগকে একটি নিখুঁত, বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিযুক্ত কালখণ্ড হিসেবে চিত্রিত করার পেছনে ইউরোপীয় জ্ঞানালোক বা এনলাইটেনমেন্টের মূল্যবোধ গভীর ভূমিকা রেখেছিল। যে বৈদিক স্তোত্রগুলো শতাব্দী ধরে যজ্ঞের ধোঁয়া আর পুরোহিতদের ব্যক্তিগত আচারের মধ্যে বন্দী ছিল, সেগুলো হঠাৎ করেই জাতীয় আত্মমর্যাদা এবং সামাজিক আত্মরক্ষার প্রধান প্রতীকে পরিণত হলো। এইভাবেই শুরু হলো বেদের আধুনিক পুনর্ব্যাখ্যার এক দীর্ঘ ও বিতর্কিত পরিক্রমা।
রামমোহন রায় ও ব্রাহ্ম আন্দোলন: একেশ্বরবাদ ও বৈদিক সংস্কার (Rammohun Roy and the Brahmo Movement: Monotheism and Vedic Reform)
উনিশ শতকের সূচনায় বাংলায় যে সমাজ সংস্কারের হাওয়া বইতে শুরু করেছিল, তার কেন্দ্রে ছিলেন রামমোহন রায় (Rammohun Roy)। প্রথাগত পৌত্তলিকতা এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনি এক নতুন সামাজিক আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করেন। রামমোহন লক্ষ্য করেছিলেন যে হিন্দু সমাজের তৎকালীন অধঃপতনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো বহু দেবতার পূজা এবং পুরোহিতদের অনৈতিক মধ্যস্থতা। এই পরিস্থিতি বদলাতে তিনি সরাসরি বৈদিক সাহিত্যের সর্বোচ্চ স্তর অর্থাৎ উপনিষদের শরণাপন্ন হলেন। তিনি দাবি করলেন যে হিন্দুধর্মের আদি ও আসল শিক্ষা বহু দেবদেবীর উপাসনা নয়, বরং তা হলো এক সর্বব্যাপী পরমেশ্বরের উপাসনা বা বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদ (Monotheism)।
রামমোহন বৈদিক কর্মকাণ্ড বা যজ্ঞের সহিংস অংশগুলোকে সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়ে কেবল জ্ঞানকাণ্ডের ওপর জোর দিলেন। তিনি একের পর এক প্রধান উপনিষদ – যেমন ঈশ, কেন, কঠ ও মাণ্ডূক্য – সাধারণ মানুষের পড়ার জন্য বাংলায় অনুবাদ করলেন এবং ইংরেজি ভাষাতেও প্রকাশ করলেন। বেদান্তের এই যুক্তিবাদী ব্যাখ্যা তৎকালীন গোঁড়া রক্ষণশীল সমাজে তুমুল আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। গোঁড়া পণ্ডিতেরা রামমোহনের বিরুদ্ধে শাস্ত্র অবমাননার অভিযোগ তুললেন। তাদের জবাবে রামমোহন দেখালেন যে তিনি নতুন কোনো ধর্ম প্রচার করছেন না, বরং হিন্দু সমাজ নিজের আদি বৈদিক সত্যকে ভুলে যে কদাচারে ডুবে গেছে, তিনি কেবল সেই প্রাচীন ভিত্তির পুনরুজ্জীবন ঘটাচ্ছেন মাত্র। ১৮২৮ সালে তার প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মসভা এবং পরবর্তীতে গড়ে ওঠা ব্রাহ্মসমাজ (Brahmo Samaj) এই বৈদিক একেশ্বরবাদের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করে।
ধর্মতত্ত্ববিদ ডারমট কিলিংলি (Dermot Killingley) রামমোহনের বেদান্ত ব্যাখ্যার ওপর গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে তিনি কীভাবে প্রাচীন শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত বেদান্তকে নিজের মতো করে এক সামাজিক ও নৈতিক দর্শনে রূপান্তর করেছিলেন (Killingley, 1993)। শঙ্করের কাছে সংসার ত্যাগ করাই ছিল মুক্তির পথ, কিন্তু রামমোহন বেদান্তকে ব্যবহার করলেন গৃহস্থ জীবনের কর্তব্য এবং সমাজসেবার কাজে। তিনি সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদের সপক্ষে যখন যুক্তি সাজিয়েছিলেন, তখনও তিনি বৈদিক ও স্মার্ত সাহিত্যের প্রাচীনতম নজিরগুলো টেনে এনে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে আত্মাহুতি দেওয়া নারীর জন্য কোনো বাধ্যতামূলক বৈদিক বিধান নয়, বরং সংযমী গার্হস্থ্য জীবনই শাস্ত্রসম্মত।
তবে রামমোহনের পরবর্তী প্রজন্মে এসে বেদের কর্তৃত্ব নিয়ে ব্রাহ্মসমাজের ভেতরেই গভীর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বেদকে ঈশ্বরের অপৌরুষেয় বাণী হিসেবে আঁকড়ে ধরে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অক্ষয়কুমার দত্তের মতো যুক্তিবাদী চিন্তাবিদদের চাপে ব্রাহ্মসমাজ শেষ পর্যন্ত বেদের অপৌরুষেয়তা ও চূড়ান্ত অভ্রান্ততার দাবি পরিত্যাগ করে। ঐতিহাসিক অমিয় পি. সেন (Amiya P. Sen) সংস্কার আন্দোলনের এই দিকটি পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে ব্রাহ্মসমাজ বেদের কর্তৃত্বকে শ্রদ্ধা করলেও অন্ধ শাস্ত্রবিশ্বাসের চেয়ে মানুষের বিবেক ও যুক্তিকে উচ্চতর স্থান দিয়েছিল (Sen, 2003)। এর ফলে ব্রাহ্ম আন্দোলন একটি বিশেষ নাগরিক ভদ্রলোক শ্রেণির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং সাধারণ হিন্দু সমাজের বৃহত্তর অংশের সাথে তাদের একটি সাংস্কৃতিক দূরত্ব তৈরি হয়।
দয়ানন্দ সরস্বতী ও আর্য সমাজ: ‘বেদে ফিরে যাও’ এবং বৈদিক অভ্রান্ততা (Dayananda Saraswati and the Arya Samaj: ‘Back to the Vedas’ and Vedic Infallibility)
রামমোহন রায়ের নরমপন্থী সংস্কারের বিপরীতে উত্তর ভারতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার এক আপসহীন ও আক্রমণাত্মক আন্দোলনের জন্ম দেন গুজরাটের সন্ন্যাসী স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী (Dayananda Saraswati)। ১৮৭৫ সালে বোম্বেতে এবং পরবর্তীতে পাঞ্জাবে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আর্য সমাজ (Arya Samaj)। দয়ানন্দের আন্দোলনের মূল সুরটি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও সরাসরি: “বেদে ফিরে যাও” (‘Back to the Vedas’)। ব্রাহ্মদের মতো তিনি বেদকে আংশিক বা প্রতীকীভাবে গ্রহণ করেননি; তিনি ঘোষণা করেন যে চার বৈদিক সংহিতা – ঋক, সাম, যজু ও অথর্ব – হলো ঈশ্বরের সাক্ষাৎ প্রকাশিত বাণী, যা সম্পূর্ণ নির্ভুল এবং চিরন্তন।
দয়ানন্দের বৈদিক পুনর্ব্যাখ্যার সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিকটি ছিল বৈদিক কর্তৃত্বের পরিধি নির্ধারণে। তিনি উপনিষদ, ব্রাহ্মণ বা পুরাণকে মূল বেদের সমকক্ষ মানতে অস্বীকার করেন। তার মতে, মহাভারত যুদ্ধের পর থেকে ভারতে ব্রাহ্মণদের তৈরি স্বার্থান্বেষী পুরোহিততন্ত্র শুরু হয়েছিল, যার চূড়ান্ত রূপ হলো পুরাণ সাহিত্য। তিনি পৌরাণিক হিন্দুধর্মকে মিথ্যা এবং ভণ্ডামি বলে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ সত্যাৰ্থপ্রকাশ (Satyārthaprakāśa)-এ তিনি প্রতিমাপূজা, তীর্থযাত্রা, শ্রাদ্ধ এবং অবতারবাদের ধারণাকে অবৈদিক ও কুসংস্কার হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন। এর পাশাপাশি তিনি দাবি করেন যে আধুনিক বিজ্ঞানের সমস্ত মৌলিক সূত্র, এমনকি বাষ্পীয় ইঞ্জিন ও টেলিগ্রাফের তত্ত্বও রূপক আকারে মূল বেদের মন্ত্রের ভেতরে নিহিত রয়েছে।
সামাজিক ক্ষেত্রে দয়ানন্দ ছিলেন প্রচলিত জাতপাতের ঘোর বিরোধী। তিনি ঘোষণা করেন যে জন্মসূত্রে কোনো মানুষ ব্রাহ্মণ বা শূদ্র হতে পারে না। বৈদিক সমাজ ছিল মানুষের গুণ, কাজ এবং মেধার ওপর প্রতিষ্ঠিত, যাকে বলা হতো গুণ-কর্ম-স্বভাব (Guṇa-Karma-Svabhāva)। ফলে একজন শূদ্রও যদি বেদ অধ্যয়ন করে জ্ঞানী হয়, তবে সে ব্রাহ্মণের মর্যাদা পাবে। তিনি নারী ও শূদ্রদের জন্য যজ্ঞোপবীত ধারণ ও বেদ পাঠের অধিকার উন্মুক্ত করে দেন, যা তৎকালীন সনাতনী পণ্ডিতদের স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। আর্য সমাজ বিধবাবিবাহের পক্ষে দাঁড়ায় এবং বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে স্কুল ও অনাথ আশ্রমের এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে।
ইতিহাসবিদ জে. টি. এফ. জরডেন্স (J. T. F. Jordens) দয়ানন্দের জীবন ও চিন্তার বিশদ বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে তার এই বৈদিক মৌলবাদ আসলে ছিল হিন্দু সমাজকে ভেতর থেকে পুনর্গঠন করার এক আত্মরক্ষামূলক কৌশল (Jordens, 1978)। গবেষক জে. ই. লেভেলিন (J. E. Llewellyn) আর্য সমাজকে একটি বিশেষ ধরণের আধুনিক সংস্কারবাদী পুনরুজ্জীবন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Llewellyn, 1993)। দয়ানন্দ বুঝতে পেরেছিলেন যে খ্রিস্টান ও মুসলিম মিশনারিদের ধর্মান্তরকরণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে হলে একটি সংগঠিত ধর্মগ্রন্থের প্রয়োজন, যেমনটা রয়েছে বাইবেল বা কুরআনের ক্ষেত্রে। এই তাগিদ থেকেই তিনি উদ্ভাবন করেন শুদ্ধি (Śuddhi) আন্দোলন, যার মাধ্যমে ধর্মান্তরিত হওয়া মানুষদের পুনরায় বৈদিক ধর্মে ফিরিয়ে আনার এক আগ্রাসী কর্মসূচি শুরু হয়। এর সাথে যুক্ত হয় গোরক্ষা (Gorakṣā) আন্দোলন, যা উত্তর ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন উত্তাপের জন্ম দিয়েছিল।
স্বামী বিবেকানন্দ ও নব্য-বেদান্ত: আধ্যাত্মিক জাতীয়তাবাদ ও বৈশ্বিক অভ্যুত্থান (Swami Vivekananda and Neo-Vedanta: Spiritual Nationalism and Global Emergence)
উনিশ শতকের শেষ দশকে বৈদিক ভাবনার পুনরুজ্জীবনে এক নাটকীয় আন্তর্জাতিক মাত্রা যোগ করেন স্বামী বিবেকানন্দ (Swami Vivekananda)। রামকৃষ্ণ পরমহংসের এই তরুণ শিষ্য ভারতীয় বৈদিক ঐতিহ্যের এক নতুন রূপরেখা তৈরি করেন, যা দর্শনের জগতে নব্য-বেদান্ত (Neo-Vedanta) নামে পরিচিতি পায়। ১৮৯৩ সালে শিকাগোর বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় তার ঐতিহাসিক বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি পশ্চিমা বিশ্বের সামনে ভারতের আধ্যাত্মিক সম্পদকে এক আত্মমর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে তুলে ধরেন। উপনিবেশের অধীনে থাকা একটি পরাধীন জাতির প্রতিনিধি হিসেবে তিনি পশ্চিমা বিশ্বকে শেখাতে চাইলেন যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দিয়ে জীবনের বস্তুগত অভাব দূর করা গেলেও, মানুষের অস্তিত্বের সংকটের সমাধান রয়েছে ভারতীয় আত্মতত্ত্বের ভেতরে।
বিবেকানন্দের চিন্তায় বেদান্ত আর কোনো সন্ন্যাসীর বনের ভেতরের ভাববিলাসিতা ছিল না; তিনি একে রূপান্তর করলেন ব্যবহারিক বেদান্ত (Practical Vedanta)-এ। তিনি উপনিষদের মহাবাক্যগুলোকে মানুষের জাগতিক সামর্থ্য ও আত্মবিশ্বাসের উৎস হিসেবে ব্যাখ্যা করলেন। দরিদ্র, ক্ষুধার্ত ও পদদলিত মানুষের দুঃখ দূর করাই ছিল তার কাছে প্রকৃত ধর্ম। তিনি ঘোষণা করলেন: ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’ (‘He who loves all creatures serves God’)। উপনিষদের আত্মার ধারণা অনুসারে আত্মা সবার মধ্যে সমানভাবে বিরাজমান। সেই আত্মাকে তিনি দেখতে চাইলেন অভুক্ত ভারতবাসীর রক্তমাংসের শরীরের মধ্যে। রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠা ছিল এই বৈদিক মানবতাবাদের বাস্তব প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োগ, যেখানে সামাজিক সেবা ও ত্রাণকার্যকে ধর্মীয় আচারের চেয়েও বড় স্থান দেওয়া হয়েছিল।
ঐতিহাসিক তপন রায়চৌধুরী (Tapan Raychaudhuri) উনিশ শতকের ভারতীয় চিন্তাবিদদের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লক্ষ্য করেছেন যে বিবেকানন্দ পশ্চিমা আধুনিকতা ও প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতার এক অদ্ভুত সংশ্লেষ ঘটাতে পেরেছিলেন (Raychaudhuri, 1988)। তিনি অন্ধভাবে পশ্চিমকে অনুকরণ করেননি, আবার প্রাচ্যের যাবতীয় মধ্যযুগীয় জড়তাকেও ক্ষমা করেননি। তিনি হিন্দু সমাজের গোঁড়ামি, বিশেষ করে অস্পৃশ্যতার মতো সামাজিক বিভেদকে নির্দয় ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন। তিনি তীব্র ক্ষোভের সাথে বলেছিলেন যে বর্তমান হিন্দুধর্ম আর উপনিষদের জায়গায় নেই, তা নেমে গেছে কেবল রান্নাঘরের ভাতের হাঁড়ি ছোঁয়াছুঁয়ির নিয়মে।
ঐতিহাসিক কেনেথ ডব্লিউ. জোন্স (Kenneth W. Jones) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে কীভাবে বিবেকানন্দের এই নব্য-বেদান্ত ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মানসিক জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল (Jones, 1989)। বিবেকানন্দ জাতিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন সমস্ত হীনম্মন্যতা ঝেড়ে ফেলে এক বলশালী ও কর্মঠ সমাজ গড়ে তুলতে। তিনি বৈদিক আর্যদের তেজ ও শৌর্যের প্রতীকগুলোকে এমন এক ভাষায় মানুষের সামনে হাজির করেছিলেন, যা স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবীদের মনে গভীর দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের প্রেরণা জুগিয়েছিল। বেদান্তের অদ্বৈতবাদী দর্শনকে তিনি ভারতের ঐক্য এবং আত্মিক সার্বভৌমত্বের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিলেন।
অরবিন্দ ঘোষ ও বাল গঙ্গাধর তিলক: বৈদিক রূপক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ (Aurobindo Ghose and Bal Gangadhar Tilak: Vedic Metaphor and Political Resistance)
বিশ শতকের শুরুতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম যখন নরমপন্থী আবেদন-নিবেদনের গণ্ডি পেরিয়ে চরমপন্থী গণআন্দোলনে রূপ নিচ্ছিল, তখন বৈদিক সাহিত্য এক শক্তিশালী রাজনৈতিক রূপকের মর্যাদা লাভ করে। এই ধারার দুই প্রধান তাত্ত্বিক ছিলেন মহারাষ্ট্রের জননেতা বাল গঙ্গাধর তিলক (Bal Gangadhar Tilak) এবং বাংলার বিপ্লবী দার্শনিক শ্রী অরবিন্দ (Sri Aurobindo)। তারা বেদকে কেবল ধর্মীয় সংস্কারের চোখ দিয়ে দেখেননি; তারা বৈদিক পাঠকে সরাসরি ব্রিটিশবিরোধী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের দার্শনিক বয়ান হিসেবে পুনর্নির্মাণ করেছিলেন।
তিলক ছিলেন একাধারে সংস্কৃত পণ্ডিত ও বাস্তববাদী রাজনীতিবিদ। ১৮৯৩ সালে প্রকাশিত দ্য ওরিয়ন (The Orion) এবং ১৯০৩ সালে প্রকাশিত দি আর্কটিক হোম ইন দ্য বেদাস (The Arctic Home in the Vedas) গ্রন্থে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের জটিল গণনা ব্যবহার করে বৈদিক মন্ত্রের বয়স নির্ধারণের চেষ্টা করেন। তিলক দাবি করেন যে বৈদিক আর্যদের আদি বাসস্থান ছিল উত্তর মেরুর বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলে এবং হিমযুগের বিপর্যয়ের পর তারা ভারতে অভিবাসন করেছিল। তিলকের এই গবেষণার রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল অত্যন্ত গভীর। তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে ভারতীয় আর্য সংস্কৃতি কোনো অনুন্নত বর্বর সমাজ ছিল না, বরং পৃথিবীর প্রাচীনতম সুসভ্য জাতিগুলোর চেয়েও তাদের ঐতিহ্য ছিল বহু প্রাচীন ও বৈজ্ঞানিক। নিজের প্রাচীনত্বকে এমন উচ্চতায় স্থাপন করে তিনি পরাধীন জাতির মনে স্বাধীনতার ন্যায্য দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন।
অন্যদিকে শ্রী অরবিন্দ বৈদিক রূপকের এক সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক ও অতিন্দ্রীয় ব্যাখ্যা হাজির করেন। তার বিখ্যাত রচনা সিক্রেট অব দ্য বেদ (The Secret of the Veda)-এ তিনি সায়ণাচার্যের যজ্ঞবাদী ব্যাখ্যা এবং ইউরোপীয় পণ্ডিতদের প্রাকৃতিক শক্তিপূজার তত্ত্ব – উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করেন। অরবিন্দের মতে, বৈদিক ঋষিরা ছিলেন আত্মজ্ঞানী দ্রষ্টা, যারা এক জটিল সাংকেতিক ভাষায় মানুষের অন্তর্জগতের আধ্যাত্মিক লড়াইয়ের বিবরণ লিখে গেছেন। বৈদিক দেবতা অগ্নি হলেন মানুষের ভেতরের ঐশ্বরিক আকাঙ্ক্ষা, ইন্দ্র হলেন আলোকিত মন, আর অসুর বৃত্র হলো অজ্ঞতা ও অন্ধকারের প্রতীক যা সত্যের আলোককে আটকে রাখে।
ইতিহাসবিদ সি. এ. বেইলি (C. A. Bayly) ঔপনিবেশিক ভারতে জাতীয়তাবাদের শিকড় সন্ধান করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই ধরণের দেশীয় রূপকগুলো সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করতে সাহায্য করেছিল (Bayly, 1998)। অরবিন্দ এই বৈদিক সংঘাতকে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপক হিসেবে উপস্থাপন করেন। জাতিকে তিনি কল্পনা করলেন এক জীবন্ত মাতৃমূর্তি হিসেবে, যিনি হলেন বৈদিক শক্তিরূপিণী দেবী। বৃত্ররূপী ঔপনিবেশিক শক্তির শাসনকে পরাস্ত করে জাতীয় জাগরণের আলো ফিরিয়ে আনা ছিল তার কাছে এক পবিত্র মহাজাগতিক লড়াই। ঐতিহাসিক সুমিত সরকার (Sumit Sarkar) দেখিয়েছেন যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এই ধর্মীয় ও বৈদিক প্রতীকী ভাষা একদিকে যেমন শিক্ষিত যুবসমাজকে প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল, তেমনি অন্যদিকে তা ভারতের অন্যান্য ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর মনে এক ধরণের বিচ্ছিন্নতাবোধেরও জন্ম দিয়েছিল (Sarkar, 1997)।
হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও বৈদিক স্বর্ণযুগের আধুনিক রূপকথা (Hindu Nationalism and the Modern Myth of the Vedic Golden Age)
বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ভারতের রাজনীতিতে আরও একটি স্পষ্ট বিভাজন রেখা তৈরি হয়, যার মূল ভিত্তি ছিল সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ। এই ধারার চূড়ান্ত তাত্ত্বিক রূপ দেন বিনায়ক দামোদর সাভারকর (Vinayak Damodar Savarkar) তার ১৯২৩ সালে প্রকাশিত পুস্তিকায়, যেখানে তিনি প্রবর্তন করেন হিন্দুত্ব (Hindutva) প্রত্যয়টি। সাভারকর হিন্দুধর্মকে নিছক একটি ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবে না দেখে তাকে এক অখণ্ড জাতি, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক পরিচয়ের কাঠামোয় বেঁধে ফেলেন। তিনি সংজ্ঞা দেন যে যার কাছে এই ভূখণ্ড একই সাথে পিতৃভূমি (Pitṛbhūmi) এবং পুণ্যভূমি (Puṇyabhūmi), তিনিই প্রকৃত হিন্দু। এই সংজ্ঞায় বৈদিক অতীতকে তুলে ধরা হলো এই ভূখণ্ডের আদিম ও অলঙ্ঘনীয় জাতীয় ঐতিহ্যের ভিত্তি হিসেবে।
এই রাজনৈতিক ভাবাদর্শের হাত ধরে তৈরি হলো এক আধুনিক ও অতিসরলীকৃত রূপকথা, যাকে বলা যায় বৈদিক স্বর্ণযুগ (Vedic Golden Age)-এর ধারণা। এই মতবাদ অনুযায়ী, প্রাচীন বৈদিক ভারত ছিল জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সামাজিক সমতার এক নিখুঁত স্বর্গরাজ্য। সেখানে কোনো বর্ণবৈষম্য ছিল না, নারীদের ছিল পূর্ণ স্বাধীনতা, এবং বৈদিক ঋষিরা বর্তমান আধুনিক বিজ্ঞানের চেয়েও উন্নত প্রযুক্তি জানতেন। এই তত্ত্বে আরও দাবি করা হলো যে মধ্যযুগীয় বহিরাগত আগ্রাসনের কারণেই এই নিখুঁত বৈদিক সমাজের সমস্ত অবক্ষয় ঘটেছে – পর্দা প্রথা, অস্পৃশ্যতা বা বাল্যবিবাহ সবই নাকি বাইরের আক্রমণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে তৈরি হয়েছিল। এই ধরণের প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু সমাজকে এক কাল্পনিক শুদ্ধ অতীতের গৌরবে ঐক্যবদ্ধ করা।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ক্রিস্টফ জাফ্রেলো (Christophe Jaffrelot) হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আদর্শিক কাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই বৈদিক স্বর্ণযুগের পুনর্নির্মাণ একটি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে কাজ করে (Jaffrelot, 1996)। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের দ্বিতীয় প্রধান এম. এস. গোলওয়ালকর (M. S. Golwalkar) তার বিভিন্ন লেখায় দাবি করেন যে বৈদিক আর্যরা বাইরে থেকে আসা কোনো অভিবাসী দল ছিল না; তারা ছিল এই মাটিরই চিরন্তন সন্তান। ফলস্বরূপ, ভারতের বৌদ্ধিক ইতিহাসের বহুত্ববাদী ও শ্রমণ ধারাগুলোকে কোণঠাসা করে বৈদিক-ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতিকেই সমগ্র ভারতীয় সংস্কৃতির একমাত্র প্রতিশব্দ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হলো।
ইতিহাসবিদ জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে (Gyanendra Pandey) তার সামাজিক ইতিহাস বিষয়ক কাজে দেখিয়েছেন যে আধুনিক যুগে ধর্ম ও অতীত ইতিহাসের এই ধরণের রাজনৈতিক ব্যবহার আসলে কোনো ঐতিহাসিক সত্যের অনুসন্ধান নয়, বরং তা হলো ক্ষমতা দখলের এক কৌশল (Pandey, 1990)। ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো, প্রাচীন বৈদিক সমাজ কোনো নিখুঁত স্বর্গ ছিল না; তা ছিল এক জটিল, পরিবর্তনশীল এবং নির্দিষ্ট দ্বন্দ্বসংকুল সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে শ্রেণি, ক্ষমতা ও আচারের নানামুখী টানাপোড়েন ছিল। আধুনিক যুগে এসে সেই ঐতিহাসিক সত্যকে আড়াল করে বেদকে কখনো সংস্কারের হাতিয়ার, কখনো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের প্রতীক, আবার কখনো সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী আত্মশ্লাঘার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বৈদিক সাহিত্যের এই আধুনিক রাজনৈতিক পুনর্জন্ম স্পষ্ট করে দেয় যে কীভাবে প্রাচীন শাস্ত্র শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়েও সমকালীন ক্ষমতার রাজনীতির এক প্রধান রণক্ষেত্র হয়ে বেঁচে থাকে।
আধুনিক বৈদিক গবেষণা ও বিতর্ক (Modern Vedic Scholarship and Debates): ভাষাতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, পাঠসমালোচনা ও ইতিহাস
ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ব ও ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবার: বৈদিক সংস্কৃতের উৎস সন্ধান (Historical Linguistics and the Indo-European Language Family: Tracing the Origins of Vedic Sanskrit)
আধুনিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বৈদিক সাহিত্যকে অধ্যয়ন করার সূচনা ঘটেছিল তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের হাত ধরে। আঠারো শতকের শেষভাগে পণ্ডিতেরা যখন লক্ষ্য করলেন যে প্রাচীন বৈদিক সংস্কৃতের সাথে গ্রিক, লাতিন, প্রাচীন পারসিক বা আবেস্তান এবং আধুনিক ইউরোপীয় ভাষাগুলোর মধ্যে ব্যাকরণ ও শব্দভাণ্ডারে এক গভীর মিল রয়েছে, তখন জন্ম নেয় ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবার (Indo-European Language Family)-এর ধারণা। যেমন সংস্কৃতে যাকে ‘মাতৃ’ (mātṛ) ও ‘পিতৃ’ (pitṛ) বলা হয়, প্রাচীন গ্রিকে তা ‘মেতের’ (mḗtēr) ও ‘পাতের’ (patḗr), লাতিনে ‘মাতের’ (māter) ও ‘পাতের’ (pater), এবং আবেস্তানে ‘মাতার’ (mātar) ও ‘পিতার’ (pitar)। এই ধরণের অবিশ্বাস্য মিল কেবল দৈব কোনো সমাপতন হতে পারে না। ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ববিদদের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে এই সমস্ত ভাষার পেছনে কোনো এক সাধারণ পূর্বপুরুষ ভাষা ছিল, যাকে তারা চিহ্নিত করেন প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় (Proto-Indo-European) হিসেবে।
বৈদিক সংস্কৃত কোনো বিচ্ছিন্ন বা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ভাষা ছিল না। প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার একটি শাখা পরবর্তীতে বিভক্ত হয়ে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়েছিল, যাকে বলা হয় ইন্দো-ইরানীয় (Indo-Iranian) শাখা। এই ইন্দো-ইরানীয় শাখার সাথে প্রাচীন ভারতীয় আর্যদের ভাষার সম্পর্ক এতটাই নিবিড় ছিল যে প্রাচীন ইরানের ধর্মগ্রন্থ আবেস্তার ভাষা এবং ঋগ্বেদের ভাষাকে প্রায় একই ভাষার দুটি আঞ্চলিক উপভাষা বলা চলে। আবেস্তার ‘হোম’ হলো বৈদিক ‘সোম’, আবেস্তার প্রধান যাজক ‘জওতার’ হলেন বেদের ‘হোতা’, এবং আবেস্তার ‘অহুর’ হলেন বৈদিক ‘অসুর’। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকে উত্তর সিরিয়ার মিতান্নি রাজ্যের এক নথিতে বৈদিক দেবতা ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র এবং নাসত্যের নাম পাওয়া যায়। এই ঐতিহাসিক প্রমাণগুলো দেখায় যে বৈদিক সংস্কৃতের প্রাথমিক রূপটি ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে একটি বিস্তৃত আন্তর্জাতিক পরিসরের সাথে যুক্ত ছিল।
তবে বৈদিক সংস্কৃতে এমন কিছু ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার মূল ধারায় অনুপস্থিত। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মূর্ধন্য ধ্বনি (Retroflex Consonants) – যেমন ট, ঠ, ড, ঢ, ণ ইত্যাদি ধ্বনিমূল। প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় এই ধরণের জিহ্বা উল্টে তালুতে আঘাত করে উচ্চারণ করার কোনো নিয়ম ছিল না। ভাষাতত্ত্ববিদদের মতে, ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশের পর স্থানীয় দ্রাবিড় এবং অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষার সাথে সংমিশ্রণের ফলেই বৈদিক সংস্কৃতে এই মূর্ধন্য ধ্বনিগুলোর অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। একে ভাষাতত্ত্বের পরিভাষায় বলা হয় অধঃস্তর (Substrate) প্রভাব। ঋগ্বেদের প্রাচীনতম অংশেও লাঙ্গল, কণ্টক, দণ্ড কিংবা কিছু গাছপালা ও পশুপাখির নামে এমন বহু অ-ইন্দো-আর্য শব্দের সন্ধান মেলে যা প্রমাণ করে যে বৈদিক ভাষাভাষী মানুষেরা ভারতে এসে স্থানীয় আদিবাসীদের ভাষার সাথে গভীরভাবে মিশে গিয়েছিল।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারততাত্ত্বিক মাইকেল উইটজেল (Michael Witzel) বৈদিক সাহিত্যের ভাষাতাত্ত্বিক স্তর ও উপভাষাগত বৈচিত্র্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই ভাষা পশ্চিম থেকে ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে বিস্তৃত হয়েছিল (Witzel, 1999)। ফিনিশ গবেষক আসকো পারপোলা (Asko Parpola) প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় এবং প্রোটো-ইন্দো-ইরানীয় ভাষার বিভাজন রেখা চিহ্নিত করে দেখিয়েছেন যে বৈদিক ভাষার জন্ম কোনো শূন্যমণ্ডলে হয়নি, বরং তা ছিল মধ্য এশিয়া ও ইউরেশীয় স্তেপ অঞ্চলের যাযাবর পশুপালক জনগোষ্ঠীর ভাষা রূপান্তরের এক ধারাবাহিক ইতিহাস (Parpola, 2015)। ফলে আধুনিক ভাষাতত্ত্বের কাছে বৈদিক সংস্কৃত কোনো স্বর্গীয় অলৌকিক ভাষা নয়, বরং তা মানব ইতিহাসের অন্যতম সুপ্রাচীন ও পরিবর্তনশীল ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তনের জীবন্ত দলিল।
ইন্দো-আর্য অভিপ্রয়াণ বিতর্ক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য: সিন্ধু সভ্যতা বনাম বৈদিক সংস্কৃতি (The Indo-Aryan Migration Debate and Archaeological Evidence: Indus Civilization versus Vedic Culture)
বিশ শতকের বিশের দশকে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো আবিষ্কারের পর প্রাচীন ভারতের ইতিহাস চর্চায় এক মহা তোলপাড় শুরু হয়। এর আগে মনে করা হতো যে ভারতে সভ্যতার সূচনা হয়েছিল বৈদিক আর্যদের হাত ধরে। কিন্তু সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কার প্রমাণ করে দেয় যে বৈদিক সাহিত্যের বহু পূর্বেই এই মাটিতে এক অত্যন্ত সুসংগঠিত, উন্নত এবং পরিকল্পিত নগর সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। এই আবিষ্কারের পরপরই ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক মর্টিমার হুইলার এক নাটকীয় তত্ত্ব হাজির করেছিলেন, যা পরিচিতি পায় ‘আর্য আক্রমণ তত্ত্ব’ (‘Aryan Invasion Theory’) নামে। ঋগ্বেদে ইন্দ্রকে বলা হয়েছে ‘পুরন্দর’ বা দুর্গ ধ্বংসকারী; হুইলার দাবি করলেন যে বহিরাগত বর্বর আর্যরা এসে সিন্ধু সভ্যতার সমৃদ্ধ নগরগুলো আক্রমণ করে ধ্বংস করেছিল এবং হরপ্পাবাসীদের হত্যা করেছিল।
কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশকের নিবিড় প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে এই আক্রমণ তত্ত্ব সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। মহেঞ্জোদারোতে যে তথাকথিত গণহত্যার কঙ্কাল পাওয়ার দাবি করা হয়েছিল, ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা যায় সেগুলো কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্য নয়, বরং বিভিন্ন সময়ে স্বাভাবিক মৃত্যু বা প্লাবনে মৃত মানুষের দেহাবশেষ। এর ফলে আধুনিক অ্যাকাডেমিক জগতে আক্রমণের ধারণার বদলে উঠে আসে ধীর ও দীর্ঘমেয়াদি অভিপ্রয়াণ (Migration) তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, আর্যরা কোনো সশস্ত্র সেনাবাহিনী নিয়ে এক দিনে ভারত দখল করতে আসেনি। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শুরুতে মধ্য এশিয়ার বিস্তৃত তৃণভূমি থেকে পশুপালক জনগোষ্ঠী ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে শত শত বছর ধরে ধাপে ধাপে উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রবেশ করেছিল।
বস্তুগত সংস্কৃতির দিক থেকে সিন্ধু সভ্যতা এবং বৈদিক সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। সিন্ধু সভ্যতা ছিল পোড়ামাটির ইটের তৈরি নগরকেন্দ্রিক সমাজ, যেখানে সমুদ্রবাণিজ্য, ওজন ও পরিমাপের নিখুঁত মান এবং চিত্রলিপির ব্যাপক ব্যবহার ছিল। বিপরীতে, ঋগ্বেদের বৈদিক সমাজ ছিল মূলত গ্রামীণ ও পশুপালননির্ভর, যেখানে যাযাবর জীবনের প্রভাব ছিল তীব্র। সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক বিরোধ তৈরি হয় ঘোড়া এবং চাকার ব্যবহার নিয়ে। বৈদিক সমাজে ঘোড়া এবং হালকা চাকার দ্রুতগামী রথ (Ratha) ছিল সামাজিক প্রতিপত্তি ও যুদ্ধের প্রধান মাধ্যম। অথচ সিন্ধু সভ্যতার হাজার হাজার সিলমোহর ও প্রত্নস্থলের মধ্যে গৃহপালিত দ্রুতগামী অশ্ব বা স্পোকযুক্ত চাকার রথের কোনো অকাট্য প্রমাণ মেলে না। সেখানে বলদ, মহিষ এবং ভারী চাকার গরুর গাড়ির প্রাধান্যই সুস্পষ্ট।
নৃতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ডেভিড ডব্লিউ. অ্যান্টনি (David W. Anthony) ইউরেশিয়ার বিস্তীর্ণ স্তেপ অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক খনন পর্যালোচনা করে সিনতাশতা ও আন্দ্রোনোভো সংস্কৃতির সাথে ইন্দো-আর্যদের যোগসূত্র তুলে ধরেছেন (Anthony, 2007)। তিনি দেখিয়েছেন যে ঘোড়াকে পোষ মানানো এবং ধাতুর তৈরি স্পোকযুক্ত চাকার আবিষ্কার মধ্য এশিয়ার এই পশুপালকদের সামরিক ও যাতায়াত ব্যবস্থায় বিশাল সুবিধা এনে দিয়েছিল, যা তাদের বিভিন্ন দিকে অভিবাসনকে সহজ করেছিল। ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক শিরিন রত্ননগর (Shereen Ratnagar) হরপ্পা নগরীর বিনাশ এবং পরবর্তী বৈদিক পশুপালক সংস্কৃতির মধ্যেকার গভীর বৈপরীত্য বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন (Ratnagar, 2001)। হরপ্পা সভ্যতার পতনের কারণ কোনো বৈদেশিক আক্রমণ ছিল না, বরং জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর গতিপথ বদল এবং বাণিজ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মতো পরিবেশগত বিপর্যয়ই ছিল এর মূল কারণ। আর্যরা যখন ভারতে আসে, তখন সিন্ধু সভ্যতা ইতিমধ্যেই ক্ষয়ে গিয়ে গ্রামীণ রূপ ধারণ করেছিল।
পাঠসমালোচনা, স্তরবিন্যাস ও বৈদিক সাহিত্যের কালানুক্রম (Textual Criticism, Stratification, and Chronology of Vedic Literature)
ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বাস করা হতো যে সমগ্র বেদ এক অখণ্ড, চিরন্তন সত্য যা সৃষ্টির শুরুতে ঋষিদের ভাবনায় একসাথে প্রতিভাত হয়েছিল। কিন্তু উনিশ ও বিশ শতকে আধুনিক পাঠসমালোচনা (Textual Criticism) পদ্ধতির প্রয়োগ বৈদিক সাহিত্যের ভেতরের জটিল স্তরবিন্যাসকে মানুষের সামনে উন্মোচিত করে দেয়। পণ্ডিতেরা দেখান যে বেদ কোনো একক লেখকের বা একটি নির্দিষ্ট সময়ের রচনা নয়। এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুখে মুখে রচিত এবং সংরক্ষিত হওয়া বহু কণ্ঠের এক মিশ্র সাহিত্যিক সংকলন। একটি বৈদিক গ্রন্থের ভেতরেই প্রাচীন এবং অপেক্ষাকৃত আধুনিক অংশের স্তর স্পষ্ট চিহ্নিত করা যায়।
ঋগ্বেদের কথাই ধরা যাক। আধুনিক পাঠসমালোচকদের গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে যে ঋগ্বেদের দশটি মণ্ডলের মধ্যে দ্বিতীয় থেকে সপ্তম মণ্ডল হলো সবচেয়ে প্রাচীন কেন্দ্র বা পারিবারিক গ্রন্থ (Family Books)। এই মণ্ডলগুলো রচিত হয়েছিল নির্দিষ্ট কিছু প্রাচীন ঋষিকুল যেমন বিশ্বামিত্র, বশিষ্ঠ বা ভরদ্বাজদের পারিবারিক ধারায়। এরপর ক্রমান্বয়ে যুক্ত হয়েছিল প্রথম এবং অষ্টম মণ্ডল। নবম মণ্ডলটি পুরোপুরি সোমরসের স্তোত্রের সংকলন হিসেবে পরে পুনর্বিন্যস্ত হয়। আর দশম মণ্ডলটি হলো সমগ্র ঋগ্বেদের সবচেয়ে আধুনিক বা নবীনতম স্তর। এই দশম মণ্ডলের ভাষাশৈলী, শব্দভাণ্ডার এবং দার্শনিক চিন্তা প্রথম স্তরের চেয়ে এতটাই আলাদা যে তা প্রায় পরবর্তী যুগের শাস্ত্রীয় সংস্কৃতের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এখানেই প্রথমবারের মতো পুরুষসূক্তে চার বর্ণের উৎপত্তির গল্প পাওয়া যায় এবং নাসদীয় সূক্তের মতো গভীর সংশয়বাদী মহাজাগতিক প্রশ্নের আবির্ভাব ঘটে।
কালানুক্রমিক বিচারে বৈদিক সাহিত্যের ধারাটিকে চারটি প্রধান ধাপে বিন্যস্ত করা হয়েছে। প্রথম ধাপে রয়েছে ঋগ্বেদের প্রাচীন স্তোত্রাবলি (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ১২০০ অব্দ)। দ্বিতীয় ধাপে আসে সামবেদ, অথর্ববেদ এবং যজুর্বেদের সংহিতা অংশ, যেখানে সমাজের ভূগোল পূর্ব দিকে সরে যেতে দেখা যায় এবং কৃষিকাজ প্রাধান্য পেতে শুরু করে। তৃতীয় ধাপে রচিত হয় বিশাল গদ্যগ্রন্থ ব্রাহ্মণ (Brāhmaṇa) সাহিত্য, যেখানে যাগযজ্ঞের নিয়মকানুন এবং পুরোহিতদের কর্তৃত্ব চূড়ান্তে পৌঁছায়। আর শেষ ধাপে আত্মপ্রকাশ করে আরণ্যক ও প্রাথমিক উপনিষদগুলো (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ থেকে ৫০০ অব্দ), যেখানে আচারের বাহ্যিকতা ছেড়ে অভ্যন্তরীণ আত্মানুসন্ধানের সূচনা ঘটে।
প্রত্নতত্ত্ববিদ জে. পি. ম্যালোরি (J. P. Mallory) ইন্দো-ইউরোপীয়দের উৎস সন্ধানের প্রেক্ষাপটে বৈদিক পাঠ্যের এই ঐতিহাসিক স্তরগুলোকে অত্যন্ত মূল্যবান উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেছেন (Mallory, 1989)। তবে প্রাচীন বৈদিক পাঠ্যের একটি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর অসাধারণ সংরক্ষণ পদ্ধতি। যদিও ভারতে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের আগে লেখার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না, তবুও বৈদিক শিক্ষকেরা পদপাঠ, ক্রমপাঠ, জটাপাঠ এবং ঘনপাঠের মতো জটিল ধ্বনিতাত্ত্বিক কৌশলের মাধ্যমে হাজার বছর ধরে এই বিপুল পাঠকে মুখে মুখে অবিকৃত রাখতে পেরেছিলেন। পাঠসমালোচকদের মতে, লিখিত পাণ্ডুলিপির চেয়েও এই স্মৃতিভিত্তিক মৌখিক ঐতিহ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাঠ্যকে অনেক বেশি মূল বা প্রামাণ্য রূপে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিল।
প্রাচীন জিনতত্ত্ব ও সাম্প্রতিক প্রত্ন-নৃতাত্ত্বিক অনুসন্ধান: আর্য বিতর্কের নতুন মোড় (Ancient Archaeogenetics and Recent Bio-Anthropological Inquiries: A New Turn in the Aryan Debate)
একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে আর্য বিতর্ক এবং বৈদিক ইতিহাসের অনুসন্ধান এক সম্পূর্ণ নতুন বৈজ্ঞানিক স্তরে উন্নীত হয়েছে। আগে যেখানে কেবল ভাঙা মাটির পাত্র, কঙ্কালের পরিমাপ আর ভাষাতাত্ত্বিক অনুমানের ওপর নির্ভর করতে হতো, সেখানে যুক্ত হয়েছে প্রাচীন কঙ্কালের হাড় থেকে উদ্ধার করা ডিএনএ বা প্রাচীন জিনতত্ত্ব (Archaeogenetics)। আধুনিক জিনবিজ্ঞানের এই অগ্রগতি প্রাচীন মানব অভিবাসনের ইতিহাসকে প্রায় অকাট্য প্রমাণের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। জীববিজ্ঞানের এই আবিষ্কার দেখিয়েছে যে রক্তের সম্পর্কের ভেতর মানব ইতিহাসের হাজার বছরের গতিপথ কীভাবে অলিখিতভাবে মুদ্রিত হয়ে থাকে।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের জিনবিজ্ঞানী ডেভিড রাইখ (David Reich) তার যুগান্তকারী গবেষণার মাধ্যমে ভারতীয় জনগোষ্ঠীর জেনেটিক মানচিত্র তৈরি করেন (Reich, 2018)। তার গবেষণাগার থেকে প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায় যে বর্তমান ভারতের সমস্ত মানুষ প্রধানত দুটি প্রাচীন বংশধারার মিশ্রণে গঠিত: পূর্বপুরুষীয় উত্তর ভারতীয় (Ancestral North Indian বা ANI) এবং পূর্বপুরুষীয় দক্ষিণ ভারতীয় (Ancestral South Indian বা ASI)। এই দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তর ভারতীয় ধারার ভেতরে ইউরেশীয় স্তেপ অঞ্চলের পশুপালক জনগোষ্ঠীর জিনগত উপাদানের এক বিরাট উপস্থিতি পাওয়া যায়। বিশেষ করে ওয়াই-ক্রোমোজোম হ্যাপ্লোগ্রুপ আর১এ-জেড৯৩ (R1a-Z93), যা মধ্য এশিয়ার স্তেপ অঞ্চলের ব্রোঞ্জ যুগের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে ছিল, তা উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের পুরুষদের মধ্যে এবং বিশেষ করে উচ্চবর্ণের সামাজিক স্তরগুলোর মধ্যে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রায় উপস্থিত।
সবচেয়ে নাটকীয় মোড় আসে হরিয়ানার হরপ্পা সভ্যতার অন্যতম বৃহত্তম কেন্দ্র রাখিগড়হির খননকার্যের ফলাফল প্রকাশের পর। প্রত্নতাত্ত্বিক বসন্ত শিন্ডে (Vasant Shinde) এবং তার আন্তর্জাতিক গবেষক দল রাখিগড়হি থেকে প্রাপ্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর পুরনো একটি নারী কঙ্কালের ডিএনএ সফলভাবে বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হন (Shinde et al., 2019)। সেই জিনগত পরীক্ষায় দেখা যায় যে পরিপক্ব হরপ্পা সভ্যতার যুগে বসবাসকারী সেই ব্যক্তির শরীরে কোনো ধরণের স্তেপ পশুপালক জিন বা মধ্য এশীয় বংশগতির লেশমাত্র ছিল না। তার জেনেটিক পরিচয় গড়ে উঠেছিল প্রাচীন স্থানীয় দক্ষিণ ভারতীয় শিকারী-সংগ্রাহক ধারা এবং প্রাচীন ইরানীয় কৃষকদের সাথে সম্পর্কিত এক শাখার মিশ্রণে।
এই বৈজ্ঞানিক ফলাফল একটি ঐতিহাসিক সত্যকে দ্বিধাহীনভাবে তুলে ধরে: সিন্ধু সভ্যতার মানুষ এবং বৈদিক সাহিত্যের ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী জিনগত দিক থেকেও সম্পূর্ণ অভিন্ন ছিল না। স্তেপ অঞ্চলের জিনগত উপাদান ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করতে শুরু করেছিল খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫০০ অব্দের মাঝামাঝি সময়ে, ঠিক যে সময়ে হরপ্পা নগর সভ্যতা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছিল। এই জিনতাত্ত্বিক উপাত্ত ভাষাতাত্ত্বিকদের বহু পুরোনো অভিপ্রয়াণ মডেলকে এক অভূতপূর্ব জৈবিক সমর্থন জুগিয়েছে। কোনো রক্তক্ষয়ী আক্রমণ নয়, বরং পশুচারণকারী অভিবাসীদের ক্রমাগত আগমন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে তাদের জৈবিক ও সাংস্কৃতিক মিশ্রণই আজকের ভারতের জনসংখ্যা ও বৈদিক সাহিত্যের প্রাথমিক ভিত্তি রচনা করেছিল।
সরস্বতী নদী বিতর্ক ও পরিবেশগত প্রত্নতত্ত্ব: পৌরাণিক নদী বনাম ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা (The Sarasvati River Debate and Environmental Archaeology: Mythological River versus Geological Reality)
বৈদিক সাহিত্যের ঐতিহাসিক ভূগোল নিয়ে যে বিতর্কগুলো আধুনিক ভারতে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক ও আবেগীয় উত্তাপ ছড়িয়েছে, তার শীর্ষে রয়েছে সরস্বতী নদী (Sarasvati River) সম্পর্কিত আলোচনা। ঋগ্বেদে সরস্বতীর মহিমা বর্ণনায় ভাষার কোনো কার্পণ্য করা হয়নি। তাকে বলা হয়েছে ‘নদীতমা’ বা শ্রেষ্ঠ নদী, যা পাহাড় থেকে নেমে সমুদ্রে গিয়ে পতিত হয় এবং যার তীরবর্তী অঞ্চল ছিল বৈদিক ঋষিদের যজ্ঞ ও তপস্যার কেন্দ্রভূমি। অথচ পরবর্তী যুগের ব্রাহ্মণ সাহিত্য যেমন পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণে উল্লেখ পাওয়া যায় যে সরস্বতী নদী মরুভূমির ভেতরে গিয়ে শুকিয়ে বিলীন হয়ে গেছে, যে স্থানটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বিনশন’।
উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে ভূগোলবিদ ও ইতিহাসবিদেরা ঋগ্বেদের এই হারানো নদীর ভৌগোলিক অবস্থান খোঁজার চেষ্টা শুরু করেন। উত্তর-পশ্চিম ভারতের ঘগ্গর এবং পাকিস্তানের হাকড়া নদীর শুকনো উপত্যকাকে অধিকাংশ গবেষক প্রাচীন সরস্বতী নদীর মূল প্রবাহপথ হিসেবে শনাক্ত করেন। কৃত্রিম উপগ্রহের চিত্র এবং ভূতাত্ত্বিক খননে দেখা গেছে যে এককালে এই শুকনো নদীখাত দিয়ে এক বিশাল জলধারা প্রবাহিত হতো। এর অববাহিকায় শত শত হরপ্পা ও প্রাক-হরপ্পা প্রত্নস্থলের সন্ধান মিলেছে। এই আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করে একদল গবেষক দাবি করতে শুরু করেন যে সিন্ধু সভ্যতার আসল নাম হওয়া উচিত ‘সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতা’ এবং বৈদিক আর্যরাই ছিল এই নদীকেন্দ্রিক মহান সভ্যতার নির্মাতা।
কিন্তু পরিবেশগত প্রত্নতত্ত্ব এবং সাম্প্রতিক জলতাত্ত্বিক গবেষণায় এই ধারণার ওপর বড় ধরণের সংশয় তৈরি হয়েছে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক দিলীপ কুমার চক্রবর্তী (Dilip K. Chakrabarti) ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে নদী ব্যবস্থার রূপান্তর বিশদভাবে আলোচনা করেছেন (Chakrabarti, 1999)। ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষায় দেখা গেছে যে ঘগ্গর-হাকড়া নদীখাত হিমালয় থেকে আসা বরফগলা জলের চিরন্তন নদী ছিল না, বরং তা ছিল মূলত বর্ষার জলের ওপর নির্ভরশীল একটি মৌসুমী নদী। প্রাচীনকালে যমুনা এবং শতদ্রু নদীর কিছু অংশ এই খাতে প্রবাহিত হতো। কিন্তু ভূত্বকের টেকটনিক নড়াচড়া এবং ভূমিকম্পের কারণে নদীগুলো তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে যমুনা পূর্বে গঙ্গার দিকে এবং শতদ্রু পশ্চিমে সিন্ধুর দিকে সরে যায়।
ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক জেন আর. ম্যাকইন্টশ (Jane R. McIntosh) সিন্ধু উপত্যকার নতুন গবেষণার সারসংক্ষেপ তুলে ধরে দেখিয়েছেন যে খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ থেকে ১৯০০ অব্দের মধ্যে জলবায়ুর চরম শুষ্কতা এবং বর্ষার দুর্বলতার কারণে এই নদীখাত ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায় (McIntosh, 2008)। এই শুকিয়ে যাওয়ার ফলেই হরপ্পার বড় বড় নগরগুলো জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। ফলে একটি জটিল কালানুক্রমিক অসঙ্গতি তৈরি হয়: নদীটি শুকিয়ে গিয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০ অব্দের দিকে, অথচ ঋগ্বেদের সিংহভাগ বর্ণনাতেই নদীটিকে বেগবতী ও জীবন্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই কারণে অনেক আধুনিক গবেষক মনে করেন যে ঋগ্বেদের আদি বর্ণনার সরস্বতী হয়তো ছিল আফগানিস্তানের হেলমান্দ বা হারাখাইতি নদী, যার স্মৃতি বৈদিক আর্যরা ভারতে আসার সময় সাথে করে নিয়ে এসেছিল এবং পরবর্তীতে ঘগ্গর নদীর ওপর সেই পবিত্র নামটি আরোপ করেছিল।
দেশীয় বনাম বহিরাগত তত্ত্ব: ‘আউট অব ইন্ডিয়া’ বিতর্ক ও আধুনিক জ্ঞানতাত্ত্বিক রাজনীতি (Indigenous versus Out-of-India Theories: The ‘Out of India’ Debate and Modern Epistemic Politics)
বৈদিক গবেষণার সমসাময়িক ময়দানে সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইটি চলছে আর্যদের আদি বাসস্থান সংক্রান্ত তত্ত্ব নিয়ে। আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিক মহলের প্রতিষ্ঠিত ইন্দো-ইউরোপীয় অভিবাসন মডেলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে একদল ভারতীয় এবং কিছু পশ্চিমা গবেষক একটি বিকল্প তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন, যা পরিচিত ‘আউট অব ইন্ডিয়া’ তত্ত্ব (‘Out of India’ Theory বা OIT) নামে। এই মতবাদের প্রবক্তাদের দাবি হলো, ভারতই ছিল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা ও সংস্কৃতির আদি মাতৃভূমি। তাদের মতে, কোনো আর্য বাইরে থেকে ভারতে আসেনি, বরং ভারত থেকেই প্রাচীন আর্যরা পশ্চিম দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং ইরান, মেসোপটেমিয়া ও ইউরোপে গিয়ে গ্রিক, লাতিন ও অন্যান্য ভাষা পরিবারের জন্ম দিয়েছিল।
এই বিকল্প মতবাদের সপক্ষে বেশ কিছু তাত্ত্বিক যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তারা বলেন যে উত্তর ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কৃতিগুলোর মধ্যে কোথাও কোনো আকস্মিক ছেদ বা বড় ধরণের বহিরাগত আগ্রাসনের চিহ্ন নেই; মেহেরগড় থেকে শুরু করে হরপ্পা হয়ে আধুনিক ভারত পর্যন্ত এক নিরবচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা বিদ্যমান। বেলজিয়ান লেখক কোনরাড এলস্ট (Koenraad Elst) এই তত্ত্বের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন (Elst, 1999)। তিনি যুক্তি দেন যে হরপ্পা সভ্যতার সিলমোহরে থাকা ধর্মীয় প্রতীক যেমন পশুপতি শিব, যোগাসন বা পিপল পাতার সম্মান স্পষ্টতই পরবর্তী হিন্দুধর্মের অঙ্গ। ফলে বৈদিক সংস্কৃতি এবং হরপ্পা সংস্কৃতিকে আলাদা ভাবাটাই ঔপনিবেশিক প্রাচ্যতত্ত্বের এক চক্রান্ত ছিল।
তবে আন্তর্জাতিক মূলধারার ঐতিহাসিক ও ভাষাতত্ত্ববিদদের কাছে এই তত্ত্বটি একেবারেই ধোপে টেকে না। তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের অকাট্য নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ভাষা পরিবারের আদি উৎস যদি ভারত হতো, তবে ইউরোপের প্রাচীন ভাষাগুলোতে ভারতীয় ভাষার কিছু না কিছু অবশেষ বা ব্যাকরণগত ছাপ স্পষ্ট থাকত। অথচ ইউরোপের কোনো প্রাচীন ভাষায় ভারতীয় দ্রাবিড় বা অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না। উপরন্তু, জীববৈচিত্র্যের ইতিহাসও এই দাবিকে খণ্ডন করে। ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষায় এমন কিছু গাছপালা ও পশুপাখির সাধারণ শব্দ পাওয়া যায় – যেমন বার্চ গাছ, ওক গাছ, ওলফ বা নেকড়ে, ভালুক এবং স্যামন মাছ – যা মূলত নাতিশীতোষ্ণ মধ্য এশিয়া বা পূর্ব ইউরোপীয় অঞ্চলের প্রকৃতিকে নির্দেশ করে, ক্রান্তীয় ভারতকে নয়।
আমেরিকান ধর্মীয় ইতিহাসবিদ এডউইন ব্রায়ান্ট (Edwin Bryant) তার সুবিশাল গ্রন্থে এই আর্য বিতর্কের দুই পক্ষের সমস্ত যুক্তিকে অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে পাশাপাশি রেখে বিচার করেছেন (Bryant, 2001)। তিনি দেখিয়েছেন যে এই বিতর্কটি এখন আর নিছক কোনো প্রাচীন ইতিহাস বা ভাষার লড়াই নয়; এটি পরিণত হয়েছে সমকালীন জ্ঞানতাত্ত্বিক আধিপত্য এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির এক প্রধান রণক্ষেত্রে। একপক্ষের কাছে অভিবাসন তত্ত্ব হলো বিজ্ঞানসম্মত ঐতিহাসিক বাস্তবতা, অন্যপক্ষের কাছে এটা পরাধীন যুগের তৈরি করা এক ঔপনিবেশিক অপমান যা ভারতীয়দের নিজেদের মাটিতেই বহিরাগত বলে দাগিয়ে দিতে চায়। স্কুলের পাঠ্যবই পরিবর্তন থেকে শুরু করে প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের রাজনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ – সবকিছুতেই এই বৈদিক অতীতের পুনর্ব্যাখ্যা জড়িয়ে গেছে। আধুনিক বৈদিক গবেষণা তাই একাধারে অতীতের নির্মোহ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং সমকালের তীব্র আদর্শিক সংঘাতের এক যৌথ আয়না।
বৈদিক সাহিত্যের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার (Historical Legacy of Vedic Literature): ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি
সাংস্কৃতিক স্মৃতির স্থান ও অনুশাসন: বেদের অনুলিখিত উপস্থিতি (Loci of Cultural Memory and Canon: The Unwritten Presence of the Veda)
মানব ইতিহাসের খুব কম সাহিত্যই বৈদিক সাহিত্যের মতো এমন অদ্ভুত সামাজিক জীবন পার করেছে। হাজার হাজার বছর ধরে এই বিপুল পাঠকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন পাঠাভ্যাস থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। প্রাচীনকাল থেকেই বৈদিক মন্ত্র লিখিত আকারে নয়, বরং মুখে মুখে গুটিকয়েক ব্রাহ্মণ্য পরিবারের স্মৃতিতে সংরক্ষিত থাকত। এর ফলে সমাজের সিংহভাগ মানুষ জীবনে কোনো দিন বেদের কোনো একটি সূক্তও স্বচক্ষে দেখেনি কিংবা তার আক্ষরিক অর্থ বোঝার সুযোগ পায়নি। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অনুপস্থিতি সত্ত্বেও সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে বেদের উপস্থিতি ছিল অনস্বীকার্য। এই ঐতিহাসিক বিষয়টিকে সমাজবিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করেছেন এক বিশেষ ধরণের সাংস্কৃতিক স্মৃতি (Cultural Memory) হিসেবে।
জার্মান সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক ইয়ান আসমান (Jan Assmann) প্রাচীন সমাজগুলোতে স্মৃতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে একটি পবিত্র পাঠ লিখিত বা উচ্চারিত হওয়ার চেয়েও একটি অবিনশ্বর প্রতীকী স্মারক হিসেবে কাজ করে (Assmann, 2011)। আসমানের তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজ যখন কোনো নির্দিষ্ট পাঠকে তার যাবতীয় পরিচয়ের চূড়ান্ত উৎস হিসেবে গ্রহণ করে, তখন সেই পাঠটি কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি থাকে না; তা পরিণত হয় এক অলঙ্ঘনীয় আইনি ও আত্মিক সীমারেখায়। বৈদিক সাহিত্য ভারতীয় ঐতিহ্যে ঠিক এই ভূমিকাই পালন করেছিল। কেউ বেদ না পড়েও জানত যে বেদ হলো পরম প্রামাণ্য গ্রন্থ। ফরাসি ইতিহাসবিদ পিয়ের নোরা (Pierre Nora) স্মৃতির যে ভৌগোলিক ও প্রতীকী আধার বা স্মৃতিস্থান (Lieux de mémoire) তত্ত্ব প্রস্তাব করেছিলেন, বৈদিক সাহিত্যের অবস্থান ছিল ঠিক তেমনই (Nora, 1989)। এটি ছিল এমন এক স্থান, যেখানে সমগ্র সমাজ তার ধর্মীয় বৈধতার নোঙর ফেলে রেখেছিল।
তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ববিদ বারবারা এ. হোল্ড্রেজ (Barbara A. Holdrege) বৈদিক ঐতিহ্য এবং ইহুদি তোরাহ ঐতিহ্যের মধ্যে গভীর তুলনামূলক আলোচনা হাজির করেছেন (Holdrege, 1996)। তিনি দেখিয়েছেন যে বৈদিক সাহিত্যে ভাষার অর্থ সবসময় প্রধান বিষয় ছিল না; বরং ভাষার ধ্বনিগত রূপটি ছিল পরম সত্য। একে বিবেচনা করা হতো মহাজাগতিক সৃষ্টির মূল স্পন্দন বা শব্দব্রহ্ম (Śabdabrahman) হিসেবে। বৈদিক মন্ত্রের প্রতিটি স্বরের নিখুঁত উচ্চারণ যজ্ঞের ফল এনে দেবে – এই বিশ্বাস শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সমাজে গেঁথে দেওয়া হয়েছিল। ফলে বেদ হয়ে উঠেছিল এক অনুলিখিত কিন্তু সর্বব্যাপী উপস্থিতি। কোনো রাজকীয় ফরমান জারি করতে হলে, কোনো নতুন মন্দিরের নিয়ম বানাতে হলে, এমনকি সাধারণ কোনো পারিবারিক বিবাদের নিষ্পত্তি করতে হলেও বেদের অদৃশ্য ছায়ার দিকে তাকাতে হতো।
এই স্মৃতিব্যবস্থার এক বড় ঐতিহাসিক পরিণতি ছিল সমাজে চরম বৌদ্ধিক অসাম্য তৈরি হওয়া। যেহেতু বেদ ছিল স্মৃতিভিত্তিক এবং শ্রুতিপরম্পরায় আবদ্ধ, তাই যারা এই স্মৃতির পাহারাদার ছিলেন, সমাজের ক্ষমতার রাশ স্বাভাবিকভাবেই তাদের হাতে কুক্ষিগত হয়েছিল। সাধারণ মানুষের কাছে বেদ কোনো সমালোচনার বিষয় ছিল না; তা ছিল এক ভীতিমিশ্রিত ভক্তির বস্তু। এই প্রতীকী কর্তৃত্বকে ব্যবহার করে পরবর্তীকালের অজস্র স্মৃতিশাস্ত্র ও সামাজিক অনুশাসনকে বেদের নাম দিয়ে বৈধ করে নেওয়া হয়েছিল। ফলে বৈদিক সাহিত্যের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার কেবল অক্ষরের উত্তরাধিকার নয়, বরং তা হলো স্মৃতি ও ক্ষমতার এক দীর্ঘস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক জাল।
সনাতন ধর্মের ভিত্তিপ্রস্তর ও আচারিক উত্তরাধিকার (Foundational Bedrock of Sanātana Dharma and Ritual Legacies)
আধুনিক যুগে যাকে সামগ্রিকভাবে হিন্দুধর্ম বা সনাতন ধর্ম (Sanātana Dharma) বলা হয়, তার আনুষ্ঠানিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে বৈদিক আচারিক কাঠামোর ওপর। যদিও বর্তমান হিন্দুধর্মের ব্যবহারিক রূপ – যেমন পাথরের মূর্তিপূজা, মন্দিরে আরতি, কিংবা ভক্তিগীতি – বৈদিক সংহিতার পশুবলি বা সোমরসের যাগযজ্ঞ থেকে বহুদূর সরে এসেছে, তবুও আচারের অভ্যন্তরীণ ব্যাকরণটি আজও অপরিবর্তিত রয়েছে। যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে হোমাগ্নি প্রজ্বলন করা এবং বৈদিক স্বরলিপিতে মন্ত্রোচ্চারণ করা এখনও অপরিহার্য। এই আচারিক ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে বৈদিক উত্তরাধিকার কত গভীরভাবে প্রাত্যহিক জীবনের সাথে জড়িয়ে রয়েছে।
ভারতীয় সমাজের পারিবারিক জীবনের মূল সন্ধিক্ষণগুলো আজও নিয়ন্ত্রিত হয় বৈদিক গৃহ্যসূত্রের নির্দেশ অনুসারে। একজন মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ষোলোটি প্রধান সংস্কারের বিধান রয়েছে, যার মধ্যে উপনয়ন, বিবাহ এবং অন্ত্যেষ্টি সবচেয়ে দৃশ্যমান। হিন্দু বিবাহ অনুষ্ঠানে আজও বর ও কনেকে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে অগ্নির চারপাশে সপ্তপদী (Saptapadī) বা সাত পাক ঘুরতে হয়। তিন হাজার বছর আগে ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের বিবাহ সূক্তে যে বাক্যগুলো উচ্চারিত হতো, আধুনিক ভারতের যেকোনো শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিবাহমণ্ডপেও প্রায় হুবহু সেই একই সংস্কৃত মন্ত্র আওড়ানো হয়। একইভাবে মানুষের মৃত্যুর পর শবদাহের সময় যে অগ্নিসংযোগ করা হয়, তার শিকড় প্রোথিত রয়েছে বৈদিক ক্রব্যাদ অগ্নির প্রাচীন ভাবনায়।
ধর্মের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক জুলিয়াস লিপনার (Julius Lipner) হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের বহুমাত্রিকতা আলোচনা করতে গিয়ে একে একটি বিশাল বটবৃক্ষের সাথে তুলনা করেছেন (Lipner, 1994)। এই বটবৃক্ষের অজস্র ডালপালা ও ঝুরি মাটির দিকে নেমে এলেও তার মূল কাণ্ডটি বৈদিক ঐতিহ্যের মাটির গভীরে প্রবেশ করে আছে। লিপনার দেখিয়েছেন যে পৌরাণিক দেবদেবী বা তান্ত্রিক রীতিনীতি যতই নতুন উপাদান যোগ করুক না কেন, তারা সবসময় বৈদিক শাখা থেকেই নিজেদের প্রাণরস সংগ্রহ করেছে বলে দাবি করে। এমনকি দক্ষিণ ভারতের মতো অঞ্চলে, যেখানে দ্রাবিড় সংস্কৃতির প্রভাব অত্যন্ত প্রবল, সেখানেও স্থানীয় মন্দিরের উৎসবে বৈদিক স্তোত্র পাঠ না করলে আচারটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
নৃবিজ্ঞানী ফ্রেডরিক এম. স্মিথ (Frederick M. Smith) ভারতীয় সমাজে আচার ও অতিন্দ্রীয় ভর সংক্রান্ত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে প্রাচীন বৈদিক যজ্ঞের মানসিক কাঠামোটি লোকায়ত সংস্কৃতির ভেতরেও রূপ বদলে টিকে গেছে (Smith, 2006)। যজ্ঞে দেবতাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার যে আদিম মানসিকতা ছিল, তা পরবর্তীতে পৌরাণিক পূজায় দেবতাকে নৈবেদ্য দেওয়ার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে বৈদিক দেবতাদের বাস্তব কোনো রূপ না থাকলেও, তাদের নামগুলো পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে বেঁচে আছে। প্রতিদিন সকালে কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হওয়া গায়ত্রী মন্ত্র (Gāyatrī Mantra) এর এক জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত। এই স্তোত্রটি কোনো ব্যক্তি দেবতার স্তব নয়, বরং তা সূর্যের প্রাকৃতিক আলোর রূপকে চেতনার উন্মেষ ঘটানোর এক বৈদিক প্রার্থনা, যা হাজার বছর ধরে ভারতীয় সাংস্কৃতিক স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে।
দার্শনিক ঐতিহ্যের প্রাক-ইতিহাস ও বৌদ্ধিক রূপরেখা (Prehistory and Intellectual Contours of Philosophical Traditions)
ভারতের দার্শনিক চিন্তার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পরবর্তীতে গড়ে ওঠা প্রায় সমস্ত জটিল জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যবস্থার বীজ লুকিয়ে ছিল বৈদিক সাহিত্যের ভেতরে। ঋগ্বেদের শেষ ভাগে পৌঁছালে আমরা আদিম প্রকৃতির বন্দনা ছাপিয়ে এক গভীর সংশয়বাদী ও আত্মজিজ্ঞাসামূলক কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। বিশেষ করে বিখ্যাত নাসদীয় সূক্ত (Nāsadīya Sūkta)-এ সৃষ্টি সম্পর্কে যে মৌলিক প্রশ্ন তোলা হয়েছিল – “সৃষ্টির আগে সৎ ছিল না, অসৎ-ও ছিল না… কে নিশ্চিতভাবে জানে কোথা থেকে এই সৃষ্টি এলো?” – এই বিস্ময়ই ভারতীয় দর্শনের গোড়াপত্তন ঘটিয়েছিল। কোনো অন্ধ বিশ্বাস নয়, বরং অস্তিত্বের কারণ খোঁজার এই ব্যাকুলতা পরবর্তীতে বিভিন্ন দার্শনিক ধারার জন্ম দেয়।
শাস্ত্রীয় ভারতীয় দর্শনের যে প্রধান ছয়টি ধারা বা ষড়দর্শন (Ṣaḍdarśana) – সাংখ্য, যোগ, ন্যায়, বৈশেষিক, মীমাংসা ও বেদান্ত – তার প্রত্যেকটি কোনো না কোনোভাবে বৈদিক সাহিত্যের সাথে নিজের বৌদ্ধিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শনের পরমাণুবাদ কিংবা বাস্তববাদী জ্ঞানতত্ত্ব বৈদিক বিশ্বতত্ত্বকে যুক্তির কাঠামোয় সাজানোর চেষ্টা করেছিল। অন্যদিকে সাংখ্য দর্শনের পুরুষ ও প্রকৃতির দ্বৈতবাদ উপনিষদের চেতনার ধারণাকে এক কঠোর বিশ্লেষণাত্মক রূপ দিয়েছিল। বেদান্ত তো সরাসরি উপনিষদের পাঠ্যভাষ্যের ওপরই দাঁড়িয়ে ছিল। ফলে ভারতের দর্শনচর্চায় কোনো নতুন তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গেলে বৈদিক পূর্বসূরিদের বক্তব্যের সাথে নিজের বক্তব্যের মিল দেখানো বা তার ত্রুটি নির্দেশ করা এক সাধারণ রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
দার্শনিক তাত্ত্বিক অরিন্দম চক্রবর্তী (Arindam Chakrabarti) ভারতীয় দর্শনের ভাষা ও জ্ঞানতত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে বৈদিক যুগের বিতর্ক পদ্ধতিই পরবর্তীতে তর্কশাস্ত্রের মূল ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল (Chakrabarti, 1997)। বেদের ব্রাহ্মণ অংশে কোনো যজ্ঞীয় বিধান আলোচনা করার সময় যে ধরণের আপত্তি ও সমাধানের কাঠামো ব্যবহার করা হতো, তা থেকেই পরবর্তীতে ভারতীয় দর্শনের সুবিখ্যাত বাদবিচার (Vādavicāra) পদ্ধতির জন্ম হয়। যেখানে প্রথমে প্রতিপক্ষের মত বা পূর্বপক্ষ তুলে ধরা হতো এবং তারপর নিজের যুক্তি বা সিদ্ধান্ত দিয়ে তাকে খণ্ডন করা হতো। এই যুক্তিবাদী কাঠামো না থাকলে ভারতীয় দর্শন কখনোই এমন পরিশীলিত রূপ ধারণ করতে পারত না।
এমনকি যেসব দর্শন বৈদিক কর্তৃত্বকে সরাসরি অস্বীকার করেছিল – যেমন বৌদ্ধ, জৈন ও চার্বাক ধারা – তাদের অস্তিত্বও বৈদিক সাহিত্য ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়। কারণ এই ভিন্নমতাবলম্বী ধারাগুলোর প্রায় সমস্ত যুক্তি আবর্তিত হয়েছিল বৈদিক যাগযজ্ঞ, বেদপ্রামাণ্য এবং বর্ণাশ্রমের ধারণাকে খণ্ডন করার তাগিদ থেকে। অর্থাৎ বৈদিক ঐতিহ্য ভারতীয় চিন্তাজগতে এমন এক শক্তিশালী কেন্দ্রবিন্দু তৈরি করেছিল যে তার পক্ষে কথা বলেই হোক কিংবা তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই হোক, প্রতিটি দার্শনিক মতকেই সেই বৈদিক মহাকর্ষের ভেতরে থেকেই নিজের অস্তিত্ব সংজ্ঞায়িত করতে হয়েছিল। এই অবিচ্ছিন্ন বিতর্কই ভারতীয় মননকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সচল ও তীক্ষ্ণ রেখেছিল।
সংস্কৃত সাহিত্য, মহাকাব্য ও নান্দনিক প্রেরণা (Sanskrit Literature, Epics, and Aesthetic Inspirations)
বৈদিক সাহিত্যের প্রভাব কেবল ধর্ম ও দর্শনের গম্ভীর পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ ছিল না; ধ্রুপদী সংস্কৃত সাহিত্যের প্রাণপ্রবাহও পুষ্ট হয়েছিল এই প্রাচীন ভাণ্ডার থেকেই। বৈদিক সংহিতার রূপক, উপমা এবং আখ্যানমূলক সূক্তগুলো ছিল পরবর্তী যুগের মহাকাব্য ও নাটকের আদি উৎস। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে থাকা পুরূরবা ও উর্বশীর মধ্যকার বিরহগাথা কিংবা যম ও যমীর মধ্যকার সংলাপ আসলে ভারতীয় নাট্যকলার প্রাচীনতম বীজ বহন করছিল। এই আদিম কাহিনীগুলোকেই পরবর্তীতে কালিদাসের মতো মহাকবিরা তাদের কালজয়ী নাটকে রূপান্তর করেছিলেন, যেমনটা দেখা যায় বিক্রমোর্বশীয় (Vikramorvaśīya) নাটকে।
ভারতের দুটি জাতীয় মহাকাব্য – মহাভারত (Mahābhārata) এবং রামায়ণ (Rāmāyaṇa) – তাদের মূল কাঠামো ও আদর্শের জন্য বৈদিক সাহিত্যের কাছে গভীরভাবে ঋণী। মহাকাব্যের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলো সরাসরি বৈদিক দেবতাদের বংশধর হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। মহাভারতের পঞ্চপাণ্ডব জন্ম নিয়েছেন ধর্ম, বায়ু, ইন্দ্র এবং অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের মতো বৈদিক দেবতাদের অনুগ্রহে। গবেষক রবার্ট পি. গোল্ডম্যান (Robert P. Goldman) মহাভারতে ভৃগু ও অঙ্গিরা বংশীয় বৈদিক পুরোহিতদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে একটি লোকায়ত বীরগাথাকে বৈদিক মূল্যবোধ ও ব্রাহ্মণ্য কাঠামোর ভেতরে নতুন করে ঢেলে সাজানো হয়েছিল (Goldman, 1977)। কুরুক্ষেত্রের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধকে শেষ পর্যন্ত উপস্থাপন করা হলো ধর্মের এক মহাজাগতিক যজ্ঞ হিসেবে, যেখানে ক্ষত্রিয়দের আত্মাহুতি ছিল বৈদিক বিধানের এক ভয়াল সামাজিক রূপ।
সংস্কৃত অলঙ্কারশাস্ত্র এবং কাব্যতত্ত্বের বিকাশেও বৈদিক পাঠের অবদান অপরিসীম। বৈদিক স্তোত্রগুলোর ছন্দোবদ্ধ বিন্যাস – যেমন গায়ত্রী, ত্রিষ্টুভ বা অনুষ্টুভ – পরবর্তী সংস্কৃত কবিতার মূল ছন্দ হয়ে দাঁড়ায়। যাস্কের নিরুক্ত এবং পাণিনির ব্যাকরণচর্চা মূলত শুরু হয়েছিল বৈদিক মন্ত্রের অর্থ ও বিশুদ্ধ উচ্চারণ রক্ষা করার তাগিদ থেকে। কিন্তু সেই ভাষাতাত্ত্বিক অনুসন্ধান এক সময় সমগ্র সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণ ও সাহিত্যের নিয়ামক হয়ে উঠল। পণ্ডিতেরা লক্ষ্য করেছেন যে উপনিষদের কাব্যময় ভাষা যেখানে প্রতীক ও রূপকের আশ্রয়ে অসীমকে প্রকাশ করতে চেয়েছিল, সেই শৈলীই পরবর্তীতে ভারতীয় সাহিত্যের মরমী ও নান্দনিক ঐতিহ্যের প্রধান ভাষা হয়ে উঠেছিল।
অর্থনীতি ও সমাজতত্ত্বের গবেষক মারিয়া হেইম (Maria Heim) দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন উপহার ও দান সংক্রান্ত রীতিনীতি পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে ধ্রুপদী সাহিত্যের বহু সামাজিক মূল্যবোধ বৈদিক যজ্ঞের দক্ষিণা প্রথা থেকে বিবর্তিত হয়েছে (Heim, 2004)। যজ্ঞের পুরোহিতকে দান করার আদি নিয়মটি পরবর্তীতে সাহিত্যে রাজধর্ম ও গৃহস্থ ধর্মের অন্যতম প্রধান পুণ্য হিসেবে চিত্রিত হতে থাকে। ফলে বৈদিক সাহিত্য ভারতীয় সাহিত্যের কল্পনাকে কেবল চরিত্র বা কাহিনীই উপহার দেয়নি, বরং তা সমাজকে দেখতে শেখানোর একটি নির্দিষ্ট নৈতিক ও নান্দনিক চশমাও তৈরি করে দিয়েছিল।
জাতিভেদ, পিতৃতন্ত্র ও সামাজিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ (Caste Hierarchy, Patriarchy, and Social Institutionalization)
বৈদিক সাহিত্যের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের একটি গভীর ও অন্ধকার দিক হলো ভারতীয় সমাজে কাঠামোগত অসাম্যকে ধর্মীয় পবিত্রতার মোড়কে স্থায়ী রূপ দেওয়া। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে এটা স্পষ্ট যে বর্তমান ভারতের জাতিভেদ প্রথা এবং সামাজিক স্তরবিন্যাসের প্রাচীনতম তাত্ত্বিক ভিত্তিটি নির্মিত হয়েছিল বৈদিক সাহিত্যের শেষভাগে। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের বিখ্যাত পুরুষসূক্ত (Puruṣasūkta)-এ প্রথমবারের মতো মহাজাগতিক পুরুষের বিভিন্ন অঙ্গ থেকে চার বর্ণের উৎপত্তির গল্প শোনানো হয়। পরম পুরুষের মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে ক্ষত্রিয়, ঊরু থেকে বৈশ্য এবং পা থেকে শূদ্রের জন্ম হয়েছে – এই পৌরাণিক রূপকটি কেবল একটি সৃষ্টির কাহিনী ছিল না, বরং তা ছিল সামাজিক বৈষম্যকে মহাজাগতিক শৃঙ্খলার রূপ দেওয়ার এক নিপুণ রাজনৈতিক প্রয়াস।
এই বৈদিক বয়ান পরবর্তী শতকগুলোতে ধর্মসূত্র ও ধর্মশাস্ত্রের মাধ্যমে সমাজের ওপর কঠোরভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়। যারা বৈদিক যজ্ঞ ও শাস্ত্রপাঠের অধিকার থেকে বাদ পড়ল, সেই শূদ্র ও অস্পৃশ্য জনগোষ্ঠীর জীবন হয়ে উঠল চিরস্থায়ী অবমাননার ইতিহাস। কোনো মানুষের মেধা বা চরিত্র নয়, বরং সে কোন বংশে জন্ম নিয়েছে, সেটাই নির্ধারণ করে দিল তার সামাজিক মর্যাদা ও বেঁচে থাকার অধিকার। ইতিহাসবিদ নিকোলাস বি. ডার্কস (Nicholas B. Dirks) দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই প্রাচীন ব্রাহ্মণ্যবাদী সামাজিক বিন্যাস ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশদের আইন ও জনগণনার মাধ্যমে আরও বেশি অনমনীয় হয়ে উঠেছিল (Dirks, 2001)। ব্রিটিশ শাসকেরা ভারতীয় সমাজকে বুঝতে গিয়ে এই বৈদিক ও স্মার্ত সাহিত্যের ওপরই অতিরিক্ত ভরসা করেছিলেন, যার ফলে সমাজে জাতপাতের দেয়ালগুলো আধুনিক যুগে এসেও ভাঙার বদলে আরও শক্ত রূপ নিয়েছিল।
একইভাবে লিঙ্গবৈষম্য এবং পিতৃতন্ত্র (Pitṛtantra) প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও বৈদিক উত্তরাধিকারের ভূমিকা ছিল সুদূরপ্রসারী। যদিও প্রাথমিক ঋগ্বৈদিক যুগে লোপামুদ্রা বা ঘোষার মতো বিদুষী নারীর স্তোত্র রচনার নজির রয়েছে এবং উপনিষদে গার্গী ও মৈত্রেয়ীর মতো দার্শনিকদের উজ্জ্বল বিতর্ক দেখা যায়, কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে বৈদিক সমাজ নারীকে তার স্বাধীন অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে থাকে। পরবর্তী বৈদিক সাহিত্য এবং ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলোতে স্পষ্ট ঘোষণা করা হলো যে পুত্রসন্তানই হলো পরিবারের রক্ষক এবং স্বর্গের পথ, আর কন্যাসন্তান হলো দুঃখের কারণ। নারীদের উপনয়ন সংস্কার এবং বেদ পাঠের অধিকার সম্পূর্ণ কেড়ে নেওয়া হলো।
বিবাহের মাধ্যমে নারীকে স্বামীর অধীনস্থ একটি প্রজায় পরিণত করার যে পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো পরবর্তীকালের মনুস্মৃতিতে পূর্ণতা পেয়েছিল, তার প্রতিটি আইনি ইট সাজানো হয়েছিল পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যের অনুশাসন দিয়ে। নারী নিজে স্বাধীনভাবে কোনো ধর্মীয় কৃত্য করতে পারত না; তার একমাত্র মোক্ষ নির্ধারিত হয়েছিল স্বামীর সেবার মধ্য দিয়ে। ফলে বৈদিক সাহিত্যের ঐতিহাসিক প্রভাব কেবল কোনো উচ্চমার্গের আধ্যাত্মিক চর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষ ও নারীর বাস্তব সামাজিক পরাধীনতা ও বঞ্চনার পেছনেও এই সাহিত্যের রক্ষণশীল ব্যাখ্যার এক দীর্ঘ ও স্থায়ী ছায়া জড়িয়ে ছিল।
আধুনিক উত্তর-ঔপনিবেশিক চৈতন্য ও বৈশ্বিক প্রাসঙ্গিকতা (Modern Postcolonial Consciousness and Global Relevance)
একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিশ্বে এসে বৈদিক সাহিত্যের অবস্থান এক নতুন উত্তর-ঔপনিবেশিক মাত্রা পরিগ্রহ করেছে। বর্তমান যুগে বৈদিক সাহিত্য আর কেবল কোনো প্রাচীন পুঁথির সংগ্রহ নয়, বরং তা জাতীয় আত্মপরিচয় এবং বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক সংঘাতের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক হোমি ভাভা (Homi K. Bhabha) তার সাংস্কৃতিক স্থান নির্ধারণের আলোচনায় দেখিয়েছেন যে কীভাবে উপনিবেশের শিকার হওয়া জাতিগুলো তাদের অতীত ঐতিহ্যকে নতুন করে বিনির্মাণ করে বর্তমানের রাজনৈতিক লড়াইয়ে ব্যবহার করে (Bhabha, 1994)। আধুনিক ভারতও এর ব্যতিক্রম নয়। বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি এবং বিশ্বায়নের যুগে দাঁড়িয়েও ভারত তার জাতীয় গৌরবের আদিম উৎস খুঁজতে বারবার সেই তিন হাজার বছর আগের বৈদিক সাহিত্যের কাছেই ফিরে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বৈদিক চিন্তা এক অদ্ভুত আকর্ষণ তৈরি করেছে। পশ্চিমা বিশ্বে যখন পরিবেশগত সংকট এবং ভোগবাদী জীবনের ক্লান্তি প্রকট হয়ে উঠছে, তখন একদল আধুনিক তাত্ত্বিক বৈদিক সাহিত্যের প্রাকৃতিক স্তোত্রগুলোর মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বা ইকোলজিক্যাল ভাবনার প্রাচীন রূপ দেখতে চাইছেন। যদিও ঐতিহাসিক বিচারে ঋগ্বেদের ঋষিরা আধুনিক পরিবেশবাদী ছিলেন না; তারা প্রকৃতির শক্তির কাছে সন্তান, গবাদিপশু ও বৃষ্টি কামনা করতেন নিতান্তই অস্তিত্বের তাগিদে। তবুও আধুনিক মানুষ সেই প্রাচীন সাহিত্যের ভেতর থেকে বর্তমানের সংকটের এক প্রতীকী উপশম খুঁজে নিতে চাইছে। এছাড়া যোগ, ধ্যান এবং আয়ুর্বেদের মতো যে প্রাচ্য অনুশীলনগুলো আজ বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে, তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও মর্যাদা বৃদ্ধির জন্যও এই বৈদিক সাহিত্যের নামকেই বিশ্ববাজারে এক ধরণের ব্র্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রখ্যাত ব্রিটিশ ভারততাত্ত্বিক জন ব্রকিংটন (John Brockington) হিন্দু ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা তুলে ধরতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে এই সাহিত্যের টিকে থাকার শক্তিটি আসলে লুকিয়ে আছে এর রূপান্তরের ক্ষমতার মধ্যে (Brockington, 1996)। বৈদিক সাহিত্য কোনো অনড় পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ নয় যা কালের নিয়মে ভেঙে পড়েছে; বরং তা ছিল এমন এক বহমান নদীর মতো, যা যুগে যুগে নতুন মতবাদ, নতুন দর্শন এবং এমনকি নিজের বিরুদ্ধ মতকেও নিজের শরীরে ধারণ করে পথ চলতে পেরেছে। আধুনিক হিন্দু সংস্কারকেরা যখন কুসংস্কার দূর করতে চেয়েছেন, তখনও তারা বেদ উদ্ধৃত করেছেন; আবার সনাতনী গোঁড়ারা যখন পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছেন, তারাও সেই বেদের কথাই বলেছেন।
সব মিলিয়ে বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে বিচার করলে দেখা যায়, বৈদিক সাহিত্য হলো মানব সভ্যতার শৈশবের এক বিশাল ও জটিল দর্পণ। সেখানে যেমন রয়েছে মহাবিশ্বের অপার রহস্য নিয়ে আদিম মানুষের সরল ও গভীর বিস্ময়, ভাষার ধ্বনি নিয়ে অসাধারণ শৈল্পিক কারুকাজ এবং মুক্তির উদগ্র দার্শনিক অন্বেষণ; তেমনি তার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে সামাজিক ক্ষমতা দখলের রাজনীতি, শ্রেণিগত বৈষম্য এবং পিতৃতান্ত্রিক শাসনের দীর্ঘ ছায়া। কোনো অতিপ্রাকৃতিক পবিত্রতা বা অন্ধ নিন্দার ঊর্ধ্বে উঠে এই সাহিত্যকে একটি মানবনির্মিত ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বুঝতে পারার মধ্যেই নিহিত রয়েছে এর আসল তাৎপর্য। বৈদিক সাহিত্যের এই বহুমাত্রিক ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের চিন্তা, ধর্ম ও সংস্কৃতির গতিপথকে নির্ধারণ করে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও মানব ইতিহাসের এক অপরিহার্য অধ্যায় হিসেবে এর প্রাসঙ্গিকতা টিকে থাকবে।
উপসংহার
বৈদিক সাহিত্যের দীর্ঘ যাত্রাপথ শেষ পর্যন্ত আমাদের দেখায় কীভাবে একটি বিশেষ ঐতিহাসিক যুগের সাহিত্য টিকে থাকার জন্য রূপ বদলাতে বাধ্য হয়। সংহিতার রাখালিয়া স্তোত্র থেকে শুরু করে মধ্যযুগের দার্শনিক ভাষ্য কিংবা আধুনিক রাজনৈতিক স্লোগান – এই পুরো পথচলাটি কোনো ঐশ্বরিক নিয়মে চলেনি; চলেছে সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতির কঠোর পার্থিব সমীকরণে। যে মুহূর্তে বৌদ্ধ, জৈন কিংবা লোকায়ত চিন্তাবিদরা বৈদিক যজ্ঞের বিরুদ্ধে সামাজিক ও নৈতিক বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন, সেই মুহূর্তেই প্রাচীন বৈদিক ধর্মের আসল রূপটি ভেঙে গিয়েছিল। টিকে থাকার জন্য তাকে নিজের শরীর থেকে মাংস কেটে বাদ দিতে হয়েছে এবং অন্যদের উপাদান গ্রহণ করতে হয়েছে।
পৌরাণিক হিন্দুধর্মের জন্ম এই বৈদিক ধর্মের সেই পরাজয় ও আপসেরই ফসল। যে ইন্দ্র-অগ্নি এককালে হাজার হাজার পশুর আহুতি দাবি করতেন, তারা নির্বাসিত হলেন পৌরাণিক রূপকথার কোণে। তাদের জায়গা নিল এমন সব দেবতা, যাদের শিকড় ছিল স্থানীয় অনার্য, উপজাতীয় এবং লোকায়ত কৃষ্টির গভীরে। এই রূপান্তর দেখায় যে, কোনো মতাদর্শই নিজের বিশুদ্ধতা বজায় রেখে চিরকাল বেঁচে থাকতে পারে না। বৈদিক সাহিত্যের নামটিকে একটি পবিত্র প্রতীক হিসেবে টিকিয়ে রাখা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তার ভেতরের উপাদানগুলো হয়ে পড়েছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সাধারণ মানুষ যে ধর্মের চর্চা করত, তার সঙ্গে ঋগ্বেদ বা যজুর্বেদের যজ্ঞের বিধানের কোনো সরাসরি সম্পর্ক আর অবশিষ্ট ছিল না।
আধুনিক যুগে এসে এই বৈদিক সাহিত্যের দ্বিতীয়বার পুনর্জন্ম ঘটানো হলো সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রয়োজনে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের মুখে দাঁড়িয়ে একদল সংস্কারক যখন নিজেদের হীনম্মন্যতা ঢাকতে চাইলেন, তখন তারা বেদকে বানিয়ে ফেললেন সব আধুনিক বিজ্ঞানের আদি উৎস। আবার জাতীয়তাবাদী নেতারা এর মধ্যে খুঁজে পেলেন এক কাল্পনিক ‘স্বর্ণযুগ’-এর হাতছানি। প্রাচীন আর্যদের সেই রাখাল সমাজকে এমনভাবে মহিমান্বিত করা হলো, যেন সেখানে কোনো শোষণ ছিল না, কোনো কান্না ছিল না, কোনো বৈষম্য ছিল না। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সেই সমাজ ছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, বর্ণভেদ এবং পিতৃতান্ত্রিক নিষ্পেষণে জর্জরিত এক অতি সাধারণ মানবসমাজ।
সব মিলিয়ে, বৈদিক সাহিত্যের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে বুঝতে হলে তাকে সব ধরনের ভাবালুতা ও অলৌকিক বিশ্বাসের ধোঁয়াশা থেকে মুক্ত করতে হবে। এটা কোনো চিরন্তন সত্যের ভাণ্ডার নয়, বরং এক প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম, ক্ষমতার দম্ভ, কাব্যিক কল্পনা এবং সামাজিক শোষণের রক্তমাংসের দলিল। কোনো গ্রন্থ বা প্রাচীন ঐতিহ্যকে যখন অন্ধ ভক্তি দিয়ে মাপা বন্ধ করা যায়, কেবল তখনই তার আসল ঐতিহাসিক মূল্য এবং সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বৈদিক সাহিত্যের এই নির্মোহ ও বৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদই আমাদের অতীতের শেকড়কে সঠিকভাবে চেনার একমাত্র পথ খুলে দেয়।
তথ্যসূত্র
- Allchin, B., & Allchin, R. (1982). The rise of civilization in India and Pakistan. Cambridge University Press.
- Anthony, D. W. (2007). The horse, the wheel, and language: How Bronze-Age riders from the Eurasian steppes shaped the modern world. Princeton University Press.
- Arnold, D. (2005). Buddhists, Brahmins, and belief: Epistemology in South Asian philosophy of religion. Columbia University Press.
- Assmann, J. (2011). Cultural memory and early civilization: Writing, remembrance, and political imagination. Cambridge University Press.
- Bailey, G., & Mabbett, I. (2003). The sociology of early Buddhism. Cambridge University Press.
- Bakker, H. (2014). The world of the Skandapurāṇa: Northern India in the sixth and seventh centuries. Brill.
- Banerjee, N. R. (1965). The iron age in India. Munshiram Manoharlal.
- Bartley, C. (2002). The theology of Rāmānuja: Realism and religion. RoutledgeCurzon.
- Basham, A. L. (1951). History and doctrines of the Ājīvikas: A vanished Indian religion. Luzac & Company.
- Basham, A. L. (1954). The wonder that was India: A survey of the history and culture of the Indian sub-continent before the coming of the Muslims. Sidgwick & Jackson.
- Bayly, C. A. (1998). Origins of nationality in South Asia: Patriotism and ethical government in the making of modern India. Oxford University Press.
- Bhabha, H. K. (1994). The location of culture. Routledge.
- Bhan, S. (1975). Excavations at Mitathal (1968) and other explorations in the Sutlej-Yamuna divide. Kurukshetra University.
- Bhandarkar, D. R. (1919). Lectures on the ancient history of India, on the period from 650 to 325 B.C.. University of Calcutta.
- Bhandarkar, R. G. (1913). Vaiṣṇavism, Śaivism and minor religious systems. Verlag von Karl J. Trübner.
- Bhattacharya, R. (2011). Studies on the Cārvāka/Lokāyata. Anthem Press.
- Bhattacharyya, J. (1985). Nyāyamañjarī of Jayanta Bhaṭṭa (Vol. 1). Motilal Banarsidass.
- Bhattacharyya, K. (1982). On the concepts of relation and negation in Indian philosophy. Sanskrit College.
- Bilimoria, P. (1988). Śabdapramāṇa: Word and knowledge in Indian philosophy. Kluwer Academic Publishers.
- Black, B. (2007). The character of the self in ancient India: Priests, kings, and women in the early Upaniṣads. State University of New York Press.
- Bloch, J. (1965). Indo-Aryan: From the Vedas to modern times (A. Master, Trans.). Librairie Adrien-Maisonneuve.
- Bopp, F. (1816). Über das Conjugationssystem der Sanskritsprache in Vergleichung mit jenem der griechischen, lateinischen, persischen und germanischen Sprache. Andreäische Buchhandlung.
- Brockington, J. (1996). The sacred thread: A short history of Hinduism (2nd ed.). Edinburgh University Press.
- Bronkhorst, J. (2007). Greater Magadha: Studies in the culture of early India. Brill.
- Brown, C. M. (1990). The triumph of the Goddess: The canonical models and theological visions of the Devī-Bhāgavata Purāṇa. State University of New York Press.
- Bryant, E. (2001). The quest for the origins of Vedic culture: The Indo-Aryan migration debate. Oxford University Press.
- Bulcke, C. (1968). The theism of Nyāya-Vaiśeṣika: Its origin and early development. Orientalia Lovaniensia Analecta.
- Burley, M. (2007). Classical Sāṃkhya and Yoga: An Indian metaphysics of experience. Routledge.
- Burrow, T. (1955). The Sanskrit language. Faber and Faber.
- Caillat, C. (1975). Atonements in the ancient ritual of the Jaina monks. L. D. Institute of Indology.
- Carrithers, M. (1983). The forest monks of Sri Lanka: An anthropological and historical study. Oxford University Press.
- Chakrabarti, A. (1997). Denying existence: The logic, epistemology and pragmatics of negative existentials and fictions. Kluwer Academic Publishers.
- Chakrabarti, D. K. (1999). India: An archaeological history: Palaeolithic beginnings to early historic foundations. Oxford University Press.
- Chakrabarti, K. (2001). Religious process: The Purāṇas and the making of a regional tradition. Oxford University Press.
- Chakrabarti, K. K. (1999). Classical Indian philosophy of mind: The Nyāya dualist tradition. State University of New York Press.
- Chakravarti, U. (1987). The social dimensions of early Buddhism. Oxford University Press.
- Chakravarti, U. (2003). Gendering caste through a feminist lens. Stree.
- Chatterji, S. K. (1926). The origin and development of the Bengali language. Calcutta University Press.
- Chattopadhyaya, B. D. (1994). The making of early medieval India. Oxford University Press.
- Chattopadhyaya, D. (1959). Lokāyata: A study in ancient Indian materialism. People’s Publishing House.
- Chattopadhyaya, S. (1970). The evolution of the theistic sects in ancient India. Progressive Publishers.
- Chemparathy, G. (1983). L’autorité du Veda selon les nyāyavaiśeṣika. Université Catholique de Louvain.
- Childe, V. G. (1950). The urban revolution. The Town Planning Review, 21(1), 3–17.
- Clooney, F. X. (1990). Thinking ritually: The Mīmāṃsā school of ethics, language, and ritual. South Asia Institute.
- Collins, S. (1982). Selfless persons: Imagery and thought in Theravāda Buddhism. Cambridge University Press.
- Cort, J. E. (2001). Jains in the world: Religious values and ideology in India. Oxford University Press.
- Coward, H. G. (1990). Derrida and Indian philosophy. State University of New York Press.
- Cox, W. (2016). Politics, kingship, and poetry in medieval South India: Kāñcīpuram in the fourteenth century. Cambridge University Press.
- Dales, G. F. (1964). The mythical massacre at Mohenjo-Daro. Expedition, 6(3), 36–43.
- Dasgupta, S. (1922). A history of Indian philosophy (Vol. 1). Cambridge University Press.
- Derrett, J. D. M. (1968). Religion, law and the state in India. Faber & Faber.
- Deussen, P. (1906). The philosophy of the Upanishads (A. S. Geden, Trans.). T. & T. Clark.
- Dirks, N. B. (2001). Castes of mind: Colonialism and the making of modern India. Princeton University Press.
- Doniger, W. (1980). Women, androgynes, and other mythical beasts. University of Chicago Press.
- Doniger, W. (1999). Splitting the difference: Gender and myth in ancient Greece and India. University of Chicago Press.
- Doniger, W. (2009). The Hindus: An alternative history. Penguin Press.
- Dundas, P. (2002). The Jains (2nd ed.). Routledge.
- Dutt, N. (1960). Early monastic Buddhism. Firma K. L. Mukhopadhyay.
- Edgerton, F. (1965). The beginnings of Indian philosophy: Selections from the Rig Veda, Atharva Veda, Upanisads, and Mahabharata. Harvard University Press.
- Eliade, M. (1958). Yoga: Immortality and freedom (W. R. Trask, Trans.). Princeton University Press.
- Elst, K. (1999). Update on the Aryan invasion debate. Aditya Prakashan.
- Erdosy, G. (1988). Urbanisation in early historic India. BAR Publishing.
- Eschmann, A., Kulke, H., & Tripathi, G. C. (Eds.). (1978). The cult of Jagannath and the regional tradition of Orissa. Manohar.
- Fick, R. (1920). The social organisation in north-east India in Buddha’s time (S. Maitra, Trans.). University of Calcutta.
- Flood, G. (2006). The Tantric body: The secret tradition of Hindu religion. I.B. Tauris.
- Frauwallner, E. (1973). History of Indian philosophy (V. M. Bedekar, Trans., Vol. 1). Motilal Banarsidass.
- Freiberger, O. (Ed.). (2006). Asceticism and its critics: Historical accounts and comparative perspectives. Oxford University Press.
- Freschi, E. (2012). Duty, language and exegesis in Prābhākara Mīmāṃsā: Including an edition and translation of Rāmānujācārya’s Tantrarahasya, Śāstrarambhasamarthana. Brill.
- Fuller, C. J. (2004). The camphor flame: Popular Hinduism and society in India (Rev. ed.). Princeton University Press.
- Galewicz, C. (2010). A commentator’s task: Sāyaṇa’s regimes of interpretation of the Ṛgveda. Institute of Oriental Studies, Jagiellonian University.
- Ganeri, J. (2001). Philosophy in classical India: The proper work of reason. Routledge.
- Ganeri, J. (2007). The concealed art of the soul: Theories of self and practices of truth in Indian ethics and epistemology. Oxford University Press.
- Gaur, R. C. (1983). Excavations at Atranjikhera: Early civilization of the upper Ganga basin. Centre of Advanced Study, Department of History, Aligarh Muslim University.
- Geldner, K. F. (1951). Der Rig-Veda aus dem Sanskrit ins Deutsche übersetzt (Harvard Oriental Series, Vols. 33–35). Harvard University Press.
- Ghosh, A. (1973). The city in early historical India. Indian Institute of Advanced Study.
- Ghoshal, U. N. (1959). A history of Indian political ideas: The ancient period and the period of transition to the middle ages. Oxford University Press.
- Gokhale, P. P. (2015). Lokāyata/Cārvāka: A philosophical inquiry. Oxford University Press.
- Gombrich, R. (1988). Theravada Buddhism: A social history from ancient Benares to modern Colombo. Routledge & Kegan Paul.
- Gonda, J. (1970). Viṣṇuism and Śivaism: A comparison. The Athlone Press.
- Grassmann, H. (1873). Wörterbuch zum Rig-Veda. F. A. Brockhaus.
- Griffiths, P. J. (1986). On being mindless: Buddhist meditation and the mind-body problem. Open Court.
- Guha, D. C. (1968). Navya Nyāya system of logic: Basic theories & techniques. Bharatiya Vidya Prakashan.
- Hacker, P. (1995). Philology and confrontation: Paul Hacker on traditional and modern Vedānta (W. Halbfass, Ed.). State University of New York Press.
- Halbfass, W. (1988). India and Europe: An essay in understanding. State University of New York Press.
- Halbfass, W. (1991). Tradition and reflection: Explorations in Indian thought. State University of New York Press.
- Hazra, R. C. (1940). Studies in the Purāṇic records on Hindu rites and customs. University of Dacca.
- Hazra, R. C. (1975). Studies in the Purāṇic records on Hindu rites and customs. Motilal Banarsidass.
- Heim, M. (2004). Theories of the gift in South Asia: Hindu, Buddhist, and Jain reflections on dāna. Routledge.
- Heirman, A., & Bumbacher, S. P. (Eds.). (2007). The spread of Buddhism. Brill.
- Heitzman, J. (2008). The city in South Asia. Routledge.
- Hiltebeitel, A. (2011). Dharma: Its early history in law, religion, and narrative. Oxford University Press.
- Hirst, J. S. (2005). Śaṃkara’s Advaita Vedānta: A way of teaching. Routledge.
- Hoffman, F. J. (1987). Rationality and mind in early Buddhism. Fairleigh Dickinson University Press.
- Holdrege, B. A. (1996). Veda and Torah: Transcending the textuality of scripture. State University of New York Press.
- Hopkins, E. W. (1901). The great epic of India: Its character and origin. Charles Scribner’s Sons.
- Houben, J. E. M. (1995). The Saṃbandha-samuddeśa (Chapter on relation) and Bhartṛhari’s philosophy of language. Egbert Forsten.
- Inden, R. (1990). Imagining India. Basil Blackwell.
- Ingalls, D. H. H. (1951). Materials for the study of Navya-Nyāya logic. Harvard University Press.
- Jaffrelot, C. (1996). The Hindu nationalist movement and Indian politics: 1925 to the 1990s. Viking.
- Jaini, P. S. (1979). The Jaina path of purification. University of California Press.
- Jaiswal, S. (1998). Caste: Origin, function and dimensions of change. Manohar Publishers.
- Jayaswal, K. P. (1924). Hindu polity: A constitutional history of India in Hindu times. Butterworth & Co.
- Jayatilleke, K. N. (1963). Early Buddhist theory of knowledge. George Allen & Unwin.
- Jha, D. N. (2004). Early India: A concise history. Manohar Publishers.
- Jha, V. (1975). Stages in the history of untouchables. The Indian Historical Review, 2(1), 14–31.
- Johnson, W. J. (1995). Harmless souls: Karmic bondage and religious change in early Jainism with special reference to Umāsvāti and Kundakunda. Motilal Banarsidass.
- Jones, K. W. (1989). Socio-religious reform movements in British India. Cambridge University Press.
- Jordens, J. T. F. (1978). Dayānanda Sarasvatī: His life and ideas. Oxford University Press.
- Kane, P. V. (1941). History of Dharmasastra: Ancient and mediaeval religious and civil law (Vol. 2, Pt. 1). Bhandarkar Oriental Research Institute.
- Kane, P. V. (1974). History of Dharmaśāstra: Ancient and mediaeval religious and civil law (2nd ed., Vol. 2, Pt. 1). Bhandarkar Oriental Research Institute.
- Kapstein, M. T. (2001). Reason’s traces: Identity and interpretation in Indian and Tibetan Buddhist thought. Wisdom Publications.
- Kataoka, K. (2011). Kumārila on truth, omniscience, and killing: Volume 1: A study on the Ślokavārttika ad 1.1.2 and ad 1.1.5. Austrian Academy of Sciences Press.
- Keay, J. (2000). India: A history. HarperCollins.
- Keith, A. B. (1925). The religion and philosophy of the Veda and Upanishads (Harvard Oriental Series, Vols. 31 & 32). Harvard University Press.
- Kennedy, K. A. R. (2000). God-apes and fossil men: Paleoanthropology of South Asia. University of Michigan Press.
- Kenoyer, J. M. (1998). Ancient cities of the Indus Valley civilization. Oxford University Press.
- Killingley, D. (1993). Rammohun Roy in Hindu and Christian tradition: The Teape lectures 1990. Universitätsverlag Dr. Norbert Brockmeyer.
- King, R. (1999a). Indian philosophy: An introduction to Hindu and Buddhist thought. Edinburgh University Press.
- King, R. (1999b). Orientalism and religion: Postcolonial theory, India and “The Mystic East”. Routledge.
- Kosambi, D. D. (1956). An introduction to the study of Indian history. Popular Book Depot.
- Kosambi, D. D. (1962). Myth and reality: Studies in the formation of Indian culture. Popular Prakashan.
- Kulke, H. (1993). Kings and cults: State formation and legitimation in India and Southeast Asia. Manohar.
- Lal, B. B. (1955). Excavation at Hastinapura and other explorations in the Upper Gaṅgā and Sutlej Basins 1950–52. Ancient India, 10–11, 4–151.
- Lal, M. (1984). Settlement history and rise of civilization in Ganga-Yamuna Doab. B.R. Publishing Corporation.
- Larson, G. J. (1979). Classical Sāṃkhya: An interpretation of its history and meaning (2nd ed.). Motilal Banarsidass.
- Lipner, J. (1994). Hindus: Their religious beliefs and practices. Routledge.
- Llewellyn, J. E. (1993). The Arya Samaj as a fundamentalist movement: A study in motive and method. Manohar Publishers.
- Lorenzen, D. N. (Ed.). (2004). Religious movements in South Asia 600–1800. Oxford University Press.
- Macdonell, A. A. (1900). A history of Sanskrit literature. D. Appleton and Company.
- Majumdar, R. C. (1918). Corporate life in ancient India. Surendra Nath Sen.
- Mallory, J. P. (1989). In search of the Indo-Europeans: Language, archaeology and myth. Thames and Hudson.
- Matilal, B. K. (1986). Perception: An essay on classical Indian theories of knowledge. Oxford University Press.
- Matilal, B. K. (1989). Moral dilemmas in the Mahabharata. Indian Institute of Advanced Study.
- Matilal, B. K. (1990). The word and the world: India’s contribution to the study of language. Oxford University Press.
- Mayeda, S. (1979). A thousand teachings: The Upadeśasāhasrī of Śaṅkara. State University of New York Press.
- McCrea, L. (2008). The teleology of poetics in medieval Kashmir. Harvard University Press.
- McDermott, J. P. (1984). Development in the early Buddhist concept of kamma/karma. Munshiram Manoharlal.
- McIntosh, J. R. (2008). The ancient Indus Valley: New perspectives. ABC-CLIO.
- Michaels, A. (2004). Hinduism: Past and present (B. Harshav, Trans.). Princeton University Press.
- Minkowski, C. (2001). The Pandit as astronomer: The story of Nityānanda. Journal of the American Oriental Society, 121(4), 606–621.
- Mohanty, J. N. (1992). Reason and tradition in Indian thought: An essay on the marginality of reason. Oxford University Press.
- Mookerji, R. K. (1947). Ancient Indian education: Brahmanical and Buddhist. Macmillan and Co.
- Müller, F. M. (1878). Lectures on the origin and growth of religion as illustrated by the religions of India. Longmans, Green, and Co.
- Murty, K. S. (1959). Revelation and reason in Advaita Vedanta. Columbia University Press.
- Myers, M. W. (2001). Let the cow wander: Modeling the metaphors in Veda and Vedanta. University of Hawaii Press.
- Nakamura, H. (1983). A history of early Vedānta philosophy: Part one. Motilal Banarsidass.
- Nora, P. (1989). Between memory and history: Les lieux de mémoire. Representations, 26, 7–24.
- Norman, K. R. (1997). A philological approach to Buddhism. The School of Oriental and African Studies.
- Novetzke, C. L. (2016). The quotidian revolution: Vernacularization, religion, and the premodern public sphere in India. Columbia University Press.
- Olivelle, P. (1993). The Āśrama system: The history and hermeneutics of a religious institution. Oxford University Press.
- Olivelle, P. (1998). The early Upaniṣads: Annotated text and translation. Oxford University Press.
- Olivelle, P. (2005). Manu’s code of law: A critical edition and translation of the Mānava-Dharmaśāstra. Oxford University Press.
- Padoux, A. (2011). Tantric mantras: Studies on mantrasāstra. Routledge.
- Pande, G. C. (1957). Studies in the origins of Buddhism. University of Allahabad.
- Pandey, G. (1990). The construction of communalism in colonial North India. Oxford University Press.
- Parpola, A. (1994). Deciphering the Indus script. Cambridge University Press.
- Parpola, A. (2015). The roots of Hinduism: The early Aryans and the Indus civilization. Oxford University Press.
- Perrett, R. W. (1998). Hindu ethics: A philosophical study. University of Hawaii Press.
- Perrett, R. W. (2016). An introduction to Indian philosophy. Cambridge University Press.
- Pflueger, L. W. (1998). Discriminating the presence of freedom: The cosmology of Patañjali’s Yogasūtra. In T. S. Rukmani (Ed.), The Mahabharata and the classical Indian traditions (pp. 57–81). Munshiram Manoharlal Publishers.
- Phillips, S. (2012). Epistemology in classical India: The knowledge sources of the Nyāya school. Routledge.
- Phillips, S. H. (1995). Classical Indian metaphysics: Refutations of realism and the emergence of “new logic”. Open Court.
- Pollock, S. (2006). The language of the gods in the world of men: Sanskrit, culture, and power in premodern India. University of California Press.
- Possehl, G. L. (2002). The Indus civilization: A contemporary perspective. AltaMira Press.
- Potter, K. H. (1963). Presuppositions of India’s philosophies. Prentice-Hall.
- Potter, K. H. (1981). Encyclopedia of Indian philosophies: Vol. 3: Advaita Vedānta up to Śaṃkara and his pupils. Princeton University Press.
- Potter, K. H. (Ed.). (1977). Encyclopedia of Indian philosophies: Indian metaphysics and epistemology: The tradition of Nyāya-Vaiśeṣika up to Gaṅgeśa (Vol. 2). Princeton University Press.
- Prasad, B. (1928). The state in ancient India: A study in the relations between the state and the individual from the earliest times to the eleventh century. Indian Press.
- Quack, J. (2011). Disenchanting India: Organized rationalism and criticism of religion in India. Oxford University Press.
- Rahula, W. (1959). What the Buddha taught. Grove Press.
- Raja, K. K. (1963). Indian theories of meaning. Adyar Library and Research Centre.
- Raju, P. T. (1985). Structural depths of Indian thought. State University of New York Press.
- Rao, S. R. (1973). Lothal and the Indus civilization. Asia Publishing House.
- Ratnagar, S. (2001). Understanding Harappa: Civilization in the Greater Indus Valley. Tulika Books.
- Raychaudhuri, H. (1923). Political history of ancient India: From the accession of Parikshit to the extinction of the Gupta dynasty. University of Calcutta.
- Raychaudhuri, T. (1988). Europe reconsidered: Perceptions of the West in nineteenth-century Bengal. Oxford University Press.
- Redfield, R. (1956). Peasant society and culture: An anthropological approach to civilization. University of Chicago Press.
- Reich, D. (2018). Who we are and how we got here: Ancient DNA and the new science of the human past. Oxford University Press.
- Renou, L. (1953). Religions of ancient India. The Athlone Press.
- Renou, L. (1965). The destiny of the Veda in India. Motilal Banarsidass.
- Roth, R. von. (1846). Zur Litteratur und Geschichte des Weda: Drei Abhandlungen. A. Liesching & Co.
- Roy, K. (1994). The emergence of monarchy in north India: Eighth-fourth centuries B.C. as reflected in the Brahmanical tradition. Oxford University Press.
- Ruben, W. (1954). Geschichte der indischen Philosophie. Deutscher Verlag der Wissenschaften.
- Sahu, B. P. (Ed.). (2006). Iron and social change in early India. Oxford University Press.
- Salomon, R. (1998). Indian epigraphy: A guide to the study of inscriptions in Sanskrit, Prakrit, and the other Indo-Aryan languages. Oxford University Press.
- Sanderson, A. (2009). The Śaiva age: The rise and dominance of Śaivism during the early medieval period. In S. Einoo (Ed.), Genesis and development of Tantrism (pp. 41–350). Institute of Oriental Culture, University of Tokyo.
- Sarkar, S. (1997). Writing social history. Oxford University Press.
- Schmidt, H.-P. (1973). The origin of Ahimsa. In Mélanges d’indianisme à la mémoire de Louis Renou (pp. 625–655). E. de Boccard.
- Sen, A. P. (2003). Social and religious reform: The Hindus of British India. Oxford University Press.
- Shaffer, J. G. (1992). The Indus Valley, Baluchistan and Helmand traditions: Neolithic through Bronze Age. In R. W. Ehrich (Ed.), Chronologies in Old World archaeology (3rd ed., Vol. 1, pp. 441–464). University of Chicago Press.
- Sharma, A. (2000). Classical Hindu thought: An introduction. Oxford University Press.
- Sharma, R. S. (1958). Śūdras in ancient India: A social history of the lower order down to circa A.D. 600. Motilal Banarsidass.
- Shinde, V., Narasimhan, V. M., Rohland, N., Mallick, S., Mah, M., Lipson, M., Nakatsuka, N., Adamski, N., Broomandkhoshbacht, N., Ferry, M., Lawson, A. M., Michel, M., Oppenheimer, J., Stewardson, K., Zalzala, F., Patel, A. K., Moorjani, P., & Reich, D. (2019). An ancient Harappan genome lacks ancestry from Steppe pastoralists or Iranian farmers. Cell, 179(3), 729–735.
- Silk, J. A. (2008). Managing monastic wealth: Buddhist practice and compound interest in ancient India. University of California Press.
- Singh, U. (2008). A history of ancient and early medieval India: From the stone age to the 12th century. Pearson Longman.
- Sircar, D. C. (1960). Studies in the geography of ancient and medieval India. Motilal Banarsidass.
- Slaje, W. (2008). Śāstrārambha: Inquiries into the preamble in Sanskrit. Otto Harrassowitz.
- Smith, B. K. (1989). Reflections on resemblance, ritual, and religion. Oxford University Press.
- Smith, F. M. (2006). The self possessed: Deity and spirit possession in South Asian literature and civilization. Columbia University Press.
- Smith, V. A. (1919). The Oxford history of India: From the earliest times to the end of 1911. Clarendon Press.
- Soni, J. (Ed.). (2000). Aspects of Jaina philosophy. University of Madras.
- Srinivas, M. N. (1962). Caste in modern India and other essays. Asia Publishing House.
- Staal, F. (1989). Rules without meaning: Ritual, mantras, and the human sciences. Peter Lang.
- Stoker, V. (2016). Polemics and patronage in the city of victory: Vyāsatīrtha, Hindu sectarianism, and the sixteenth-century Vijayanagara court. University of California Press.
- Taber, J. (1992). What did Kumārila Bhaṭṭa mean by svataḥprāmāṇya? Journal of the American Oriental Society, 112(2), 204–221.
- Thapar, R. (1984). From lineage to state: Social formations in the mid-first millennium B.C. in the Ganga Valley. Oxford University Press.
- Thapar, R. (1989). Imagined religious communities? Ancient history and the modern search for a Hindu identity. Modern Asian Studies, 23(2), 209–231.
- Thapar, R. (2000). Cultural pasts: Essays in early Indian history. Oxford University Press.
- Trautmann, T. R. (1997). Aryans and British India. University of California Press.
- Van Buitenen, J. A. B. (1957). Studies in Sāṃkhya (I). Journal of the American Oriental Society, 76(3), 153–157.
- Van der Veer, P. (2001). Imperial encounters: Religion and nation in India and Britain. Princeton University Press.
- van Driem, G. (2001). Languages of the Himalayas: An ethnolinguistic handbook of the greater Himalayan region. Brill.
- Varma, V. P. (1959). Studies in Hindu political thought and its metaphysical foundations. Motilal Banarsidass.
- Verpoorten, J.-M. (1987). Mīmāṃsā literature (A History of Indian Literature, Vol. 6, Fasc. 5). Otto Harrassowitz.
- von Stietencron, H. (2005). Hindu myth, Hindu history: Religion, art, and politics. Permanent Black.
- Weber, M. (1958). The religion of India: The sociology of Hinduism and Buddhism (H. H. Gerth & D. Martindale, Trans.). Free Press.
- Whicher, I. (1998). The integrity of the Yoga Darśana: A reconsideration of classical Yoga. State University of New York Press.
- Wiltshire, M. (1990). Ascetic figures before and in early Buddhism: The emergence of Gautama as the Buddha. Mouton de Gruyter.
- Windisch, E. (1917). Geschichte der Sanskrit-Philologie und indischen Altertumskunde (Vol. 1). Karl J. Trübner.
- Winternitz, M. (1927). A history of Indian literature: Vol. 1: Introduction, Veda, national epics, Purāṇas, and Tantras (S. Ketkar, Trans.). University of Calcutta.
- Witzel, M. (1989). Tracing the Vedic dialects. In C. Caillat (Ed.), Dialectes dans les littératures indo-aryennes (pp. 97–265). Institut de Civilisation Indienne.
- Witzel, M. (1997). The development of the Vedic canon and its schools: The social and political milieu. In M. Witzel (Ed.), Inside the texts, beyond the texts: New approaches to the study of the Vedas (pp. 257–345). Department of Sanskrit and Indian Studies, Harvard University.
- Witzel, M. (1999). Substrate languages in Old Indo-Aryan (Ṛgvedic, Middle and Late Vedic). Electronic Journal of Vedic Studies, 5(1), 1–67.
- Wynne, A. (2007). The origin of Buddhist meditation. Routledge.
- Zimmer, H. (1951). Philosophies of India (J. Campbell, Ed.). Pantheon Books.
- Zysk, K. G. (1991). Asceticism and healing in ancient India: Medicine in the Buddhist monastery. Oxford University Press.
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

