বৈদিক সাহিত্যের হার্মেনিউটিক্স (Hermeneutics of Vedic Literature) খণ্ড ২ (শেষ): ক্ষমতা, বিনির্মাণ, পুনর্ব্যাখ্যা ও অর্থের বহুত্ব
ভূমিকা
যেকোনো প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের পাঠমাত্রই কেবল শব্দের সমষ্টির পাঠ নয়; তা একাধারে ক্ষমতা, সামাজিক আধিপত্য এবং ঐতিহাসিক পরিস্থিতির সাথে ভাষার নিরবচ্ছিন্ন লড়াইয়ের পাঠ। সনাতন ও গোঁড়া ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বৈদিক সাহিত্যকে প্রায়শই এক শাশ্বত, অপৌরুষেয় ও অপরিবর্তনীয় মহাজাগতিক বাণী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু আধুনিক সমালোচনামূলক জ্ঞানতত্ত্ব এবং পাঠ-বিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো পাঠ্যই শূন্যে বা স্থান-কাল-নিরপেক্ষ জগতে বিরাজ করে না। বৈদিক সাহিত্যের বিশাল পরিসর – সংহিতা ও ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে উপনিষদ, স্মৃতি, মহাকাব্য ও দর্শন পর্যন্ত – আসলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর স্বার্থ, আত্মপরিচয় ও ভাবাদর্শ নির্মাণের একটি জটিল ক্ষেত্র। বর্তমান খণ্ডের মূল লক্ষ্য কোনো আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য প্রচার নয়, বরং আধুনিক হার্মেনিউটিক্স (Hermeneutics) বা ব্যাখ্যাতত্ত্বের তাত্ত্বিক হাতিয়ার ব্যবহার করে এই সুবিশাল সাহিত্যের ভেতরের ক্ষমতার বিন্যাস, অর্থ-উৎপাদনের রাজনীতি এবং পাঠের অন্তর্নিহিত অস্থিতিশীলতাকে উন্মোচন করা।
ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি ঘটে যখন প্রাচীন পাঠকে একটি স্থির এবং একমাত্রিক অর্থের আধার মনে করা হয়। ব্যাখ্যামূলক দর্শনে ঐতিহাসিক দিগন্ত (Historical Horizon) এবং পূর্বধারণার সমস্যা (Problem of Prejudice) স্পষ্ট করে দেয় যে অতীতে উচ্চারিত একটি শব্দের অর্থ কখনোই পরবর্তী যুগের পাঠকের কাছে অবিকল এক থাকে না। বৈদিক সমাজ ছিল মূলত একটি পরিবর্তনশীল পশুপালক ও কৃষিভিত্তিক সমাজ, যার সামাজিক বাস্তবতা আজকের পাঠক বা এমনকি মধ্যযুগীয় ভাষ্যকারদের বাস্তবতা থেকেও আলাদা ছিল। তাই যখন কোনো ভাষ্যকার বৈদিক পাঠকে চিরন্তন বলে দাবি করেন, তখন তিনি প্রকৃতপক্ষে নিজের যুগের সামাজিক ও রাজনৈতিক এজেন্ডাকে প্রাচীন পাঠ্যের ওপর আরোপ করেন। এই প্রক্রিয়ায় পাঠের মূল ঐতিহাসিক অর্থ এবং পরবর্তী ধর্মীয় তাৎপর্যের মধ্যে এক অলঙ্ঘনীয় ব্যবধান রচিত হয়, যা পরীক্ষা করা যে কোনো নির্মোহ অ্যাকাডেমিক পর্যালোচনার প্রধান দায়িত্ব।
একই সাথে বৈদিক সাহিত্যকে পাঠ করার ক্ষেত্রে সামাজিক ক্ষমতার সম্পর্কটি এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যাগযজ্ঞের নিখুঁত বিধিনিষেধ সংবলিত গ্রন্থগুলো নিছক কোনো পূজার নির্দেশিকা ছিল না; এগুলো ছিল এক বিশেষ পুরোহিত শ্রেণির জ্ঞানতাত্ত্বিক আধিপত্য কায়েমের ক্ষমতার ডিসকোর্স (Discourse of Power)। মহাজাগতিক ভাষা ব্যবহার করে কীভাবে একটি বৈষম্যমূলক সামাজিক স্তরবিন্যাসকে ‘স্বাভাবিক’ ও অলঙ্ঘনীয় করে তোলা হয়েছিল, তা আধুনিক সমাজতত্ত্বের অন্যতম প্রধান আলোচ্য। শরীরের প্রতীকায়ন ঘটিয়ে মানুষের জন্মগত মর্যাদা নির্ধারণের যে প্রয়াস প্রাচীন সূক্তগুলোতে দেখা যায়, তা শেষ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা অর্জনের একটি কার্যকর মতাদর্শিক কৌশল। আধুনিক সমালোচনামূলক তত্ত্বের সাহায্যে এই কৌশলগুলোর ব্যবচ্ছেদ করা হলে দেখা যায় যে ধর্মীয় কর্তৃত্ব আসলে সমাজের বৈষয়িক ক্ষমতার সম্পর্কের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল।
এর পাশাপাশি যেকোনো প্রাচীন পাঠ্যের ভেতরেই তার নিজস্ব বয়ানকে ভেঙে ফেলার উপাদান সুপ্ত থাকে। উত্তর-কাঠামোবাদী বিনির্মাণ (Deconstruction) আমাদের দেখায় যে কোনো পাঠই নিরবচ্ছিন্নভাবে সুসংহত নয়। বৈদিক সাহিত্যে নির্মিত দেব ও অসুর, আর্য ও দাস, কিংবা শুদ্ধ ও অশুদ্ধের যে কড়া দ্বৈত বৈপরীত্য (Binary Oppositions) দাঁড় করানো হয়েছিল, পাঠের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে দেখা যায় সেই বিভাজনরেখাগুলো আসলে অত্যন্ত ভঙ্গুর ও পারস্পরিকভাবে নির্ভরশীল। বর্তমান খণ্ডটি বৈদিক ঐতিহ্যের এই বহুস্তরীয় রূপান্তরের গতিপথটিকেই অনুসন্ধান করতে চেয়েছে। এখানে কোনো অন্ধ শ্রদ্ধা বা আধ্যাত্মিক ভাবালুতার আশ্রয় না নিয়ে, তাত্ত্বিক শৃঙ্খলা ও কঠোর বস্তুনিষ্ঠতার মাধ্যমে দেখানো হয়েছে কীভাবে একটি প্রাচীন সাহিত্য সময়ের স্রোতে বারবার বিনির্মিত হয়েছে এবং কীভাবে এককালের যজ্ঞকেন্দ্রিক অনুশাসন কালক্রমে আইন, দর্শন, মহাকাব্য ও জনপ্রিয় ধর্মের ভিন্ন ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করেছে।
ঐতিহাসিক দিগন্ত ও অর্থের পরিবর্তন (Historical Horizons and Changing Meaning): গাডামার, হির্শ ও ব্যাখ্যার ইতিহাস
গাডামার ও বৈদিক ঐতিহাসিক দিগন্ত (Gadamer and the Vedic Historical Horizon): প্রাচীন পাঠ ও আধুনিক পাঠকের সাক্ষাৎ
ঐতিহাসিক দূরত্বের বাস্তবতা ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা (Reality of Historical Distance and Continuity of Tradition)
দার্শনিক হান্স-গেয়র্গ গাডামার (Hans-Georg Gadamer) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ওয়াহরহাইত উন্ট মেথোদে (Wahrheit und Methode) বা সত্য ও পদ্ধতি (Truth and Method)-এ একটি জরুরি প্রশ্ন তুলেছিলেন। কোনো প্রাচীন পাঠ যখন হাজার বছর পেরিয়ে বর্তমান পাঠকের সামনে আসে, তখন কি পাঠক সরাসরি সেই রচয়িতার মনের ভেতর প্রবেশ করতে পারেন? ঐতিহ্যবাদী ব্যাখ্যাকাররা ভাবতেন এটা সম্ভব। তারা বিশ্বাস করতেন, অতীতকে তার নিজের শর্তে হুবহু উদ্ধার করা যায়। গাডামার এই ধারণাকে সরাসরি খারিজ করে দেন (Gadamer, 1989)। তার মতে, প্রাচীন পাঠ এবং বর্তমান পাঠকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে একটি বাস্তব ব্যবধান। এই ব্যবধানকে তিনি নাম দিয়েছেন কালগত দূরত্ব (Temporal Distance)। ঋগ্বেদের মতো আড়াই থেকে তিন হাজার বছরের পুরোনো সংকলন পড়ার ক্ষেত্রে এই কালগত দূরত্ব অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীন অংশগুলো যখন সৃষ্টি হয়েছিল, তখন সমাজ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই সমাজ ছিল ব্রোঞ্জ ও প্রাথমিক লৌহযুগের যাযাবর পশুপালক ও কৃষকদের সমাজ। সেখানে যুদ্ধ, গবাদি পশুর অন্বেষণ এবং প্রকৃতির নানা শক্তির সঙ্গে বোঝাপড়ার তাগিদ থেকেই স্তোত্রগুলো রচিত হয়েছিল। সেই পাঠ যখন আজকের একজন আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদে অভ্যস্ত পাঠক পড়েন, তখন দুই যুগের মাঝে কয়েক হাজার বছরের সাংস্কৃতিক রূপান্তর ছায়া ফেলে। বৈদিক ঐতিহ্যের নিজস্ব দাবি অনুযায়ী সংকলনটি অপৌরুষেয় বা মানব-কর্তৃত্বহীন। প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের মীমাংসা (Mīmāṃsā) শাখা মনে করত, বৈদিক শব্দের কোনো শুরু নেই, কোনো রচয়িতা নেই, ফলে এর কোনো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও নেই (Clooney, 1990)। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে এই দাবি টেকে না। মাইকেল উইটজেল দেখিয়েছেন যে ঋগ্বেদের ভাষা ও ভৌগোলিক বর্ণনা পরিষ্কারভাবে একটি সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পর্যায়কে নির্দেশ করে (Witzel, 1997)।
গাডামার এই ঐতিহাসিক দূরত্বকে জ্ঞানের পথে কোনো বাধা হিসেবে দেখেননি। উল্টো তিনি মনে করতেন, এই দূরত্বই নতুন অর্থ তৈরির প্রধান চালিকাশক্তি। অতীতে কী ঘটেছিল তা জানার জন্য অতীতকালের মানুষের মনের ভেতর অলৌকিকভাবে প্রবেশ করার দরকার নেই। এটা বাস্তবে অসম্ভবও বটে। একজন আধুনিক মানুষ কখনোই ব্রোঞ্জযুগের যজ্ঞশালার পুরোহিত হয়ে উঠতে পারবেন না। স্টেফানি জ্যামিসন ও জোয়েল ব্রেয়ারটন তাদের অনুবাদে স্পষ্ট করেছেন যে বৈদিক স্তোত্রগুলোর যে যাজকীয় জটিলতা ছিল, তা তৎকালীন সামাজিক স্বার্থ এবং পুরোহিতদের নিজেদের মধ্যকার প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত ছিল (Jamison & Brereton, 2014)। আধুনিক পাঠক যখন এই পাঠের মুখোমুখি হন, তখন তিনি সেই প্রাচীন মানসিকতাকে অন্ধভাবে গ্রহণ করেন না; বরং দূরত্বের কারণে পাঠটিকে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করার এক ধরনের স্বাধীনতা লাভ করেন।
ঐতিহ্য কোনো স্থির পাথর নয় যা অতীতে তৈরি হয়ে একই অবস্থায় বর্তমান পর্যন্ত গড়িয়ে এসেছে। ঐতিহ্যের রূপান্তর ঘটে। গাডামার এই ধারাবাহিকতাকে বলেছেন প্রভাব-ইতিহাস (Effective History/Wirkungsgeschichte)। কোনো প্রাচীন গ্রন্থ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে সমস্ত ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে আজকের দিনে এসে পৌঁছেছে, সেই ব্যাখ্যার ধারাগুলো গ্রন্থটির অর্থের অংশ হয়ে ওঠে। ঋগ্বেদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। যাস্কের নিরুক্ত, সায়নাচার্যের ভাষ্য কিংবা উনিশ শতকের ম্যাক্স মুলারের সম্পাদনা পেরিয়ে বৈদিক পাঠ আমাদের কাছে এসেছে (Halbfass, 1988)। ফলে আজকের পাঠক যখন বৈদিক সাহিত্যের কোনো স্তোত্র পাঠ করেন, তিনি কেবল প্রাচীন সেই যাযাবর কবির কথা শোনেন না, বরং সেই পাঠের ওপর জমা হওয়া হাজার বছরের সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার বোঝাও অবচেতনে বহন করেন।
বৈদিক পাঠের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ও পূর্বধারণার ভূমিকা (Institutional Control of Vedic Texts and Role of Prejudices)
ইউরোপের আলোকায়ন বা এনলাইটেনমেন্ট যুগের চিন্তাবিদরা মনে করতেন, যেকোনো সুস্থ চিন্তার প্রথম শর্ত হলো সমস্ত পূর্বধারণা সম্পূর্ণ মুছে ফেলা। তারা পূর্বধারণাকে দেখতেন অজ্ঞতার লক্ষণ হিসেবে। গাডামার এই বিশ্বাসের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি দেখান যে পূর্বধারণামুক্ত কোনো মন বাস্তবে সম্ভব নয়। গাডামারের তত্ত্ব অনুযায়ী পূর্বধারণা (Prejudice/Vorurteil) কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়; এটি হলো কোনো কিছু বোঝার প্রাথমিক কাঠামো (Gadamer, 1989)। মানুষ যখন কোনো বই পড়তে শুরু করে, তখন সে শূন্য মন নিয়ে শুরু করতে পারে না। তার ভাষা, তার লালিত সংস্কৃতি এবং সামাজিক অবস্থান আগেই তার চিন্তার একটি ভিত্তি তৈরি করে রাখে। জর্জিয়া ওয়ার্নকে তার বিশ্লেষণে তুলে ধরেন যে গাডামারের কাছে পূর্বধারণা হলো সেই প্রাথমিক চশমা, যার মাধ্যমে পাঠকে প্রথম দেখা হয় (Warnke, 1987)।
বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই পূর্বধারণার বিষয়টি অত্যন্ত জটিল রূপ ধারণ করে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বৈদিক পাঠ বোঝার ক্ষেত্রে দুটি প্রধান পূর্বধারণা কাজ করেছে। প্রথমটি হলো ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় সমাজের ভেতরের দৃষ্টিভঙ্গি। বিশেষ করে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা বৈদিক সংকলনকে সমাজ নিয়ন্ত্রণের একটি অবিসংবাদিত ভিত্তি হিসেবে দেখতেন। জৈমিনির পূর্ব মীমাংসা সূত্র (Pūrva Mīmāṃsā Sūtra) পাঠ করলে দেখা যায়, বৈদিক শব্দের বাইরে অন্য কোনো জাগতিক ইতিহাসকে তারা স্বীকারই করতে চাননি (Clooney, 1990)। তাদের পূর্বধারণা ছিল, যজ্ঞের বিধিমালার বাইরে বৈদিক সাহিত্যের আর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। সেখানে দেবতার রূপ বা মহাজাগতিক ভাবনার চেয়ে প্রধান হয়ে উঠেছিল যজ্ঞের যান্ত্রিক শুদ্ধতা। ফলে সেই যুগের পাঠকের পূর্বধারণা তৈরি হয়েছিল যাজকীয় কর্তৃত্বের সুরক্ষার স্বার্থে।
অন্যদিকে আধুনিক যুগে যখন ইউরোপীয় গবেষকরা বৈদিক পাঠের মুখোমুখি হলেন, তখন তাদেরও কিছু নির্দিষ্ট পূর্বধারণা কাজ করেছিল। ম্যাক্স মুলার কিংবা উইলিয়াম জোন্সের মতো প্রাচ্যবিদরা নিজেদের খ্রিস্টীয় ও রোমান্টিক ভাবাদর্শের চশমা দিয়ে বৈদিক সাহিত্যকে পাঠ করতে চেয়েছিলেন। তারা ঋগ্বেদের মধ্যে খুঁজেছিলেন আদিম মানবজাতির এক ধরনের শিশুতোষ প্রকৃতিপূজা। উইলহেম হাল্বফাস তার গবেষণায় বিশদভাবে দেখিয়েছেন, কীভাবে উনিশ শতকের ইউরোপীয় ভারততত্ত্ববিদরা প্রাচ্যকে নিজেদের মনগড়া ছাঁচে ফেলে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন (Halbfass, 1988)। ইউরোপীয়দের সেই পূর্বধারণা বৈদিক পাঠকে একটি বিশেষ ঔপনিবেশিক দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করেছিল, যা প্রায়শই বৈদিক সমাজের প্রকৃত দ্বন্দ্ব ও বৈষয়িক সংকটকে পাশ কাটিয়ে যেত।
আজকের একজন ধর্মনিরপেক্ষ ও বস্তুবাদী পাঠকের ক্ষেত্রেও পূর্বধারণা কাজ করে। তিনি যখন পাঠটি পড়েন, তখন তার পূর্বধারণা গড়ে ওঠে আধুনিক নৃবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং তুলনামূলক ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ব দিয়ে। ভেন্ডি ডনিগার যখন ঋগ্বেদ অনুবাদ করেন, তখন তিনি দেব-দেবীর স্তোত্রগুলোর আড়ালে থাকা যৌনতা, ভয় এবং ক্ষমতার সম্পর্কগুলোকে পাঠের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন (Doniger, 1981)। একজন আধুনিক পাঠক হিসেবে তিনি প্রাচীন আধ্যাত্মিক দাবির মুখে নতজানু হন না। গাডামার বলবেন, এই আধুনিক পূর্বধারণাগুলোকে লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। বরং পাঠককে সচেতন হতে হবে যে তিনি একটি নির্দিষ্ট স্থান ও কাল থেকে পাঠটিকে দেখছেন। নিজের এই অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হওয়াই সমালোচনামূলক পাঠের প্রথম পদক্ষেপ।
দিগন্তের ধারণা ও বৈদিক যাযাবর জীবনের প্রেক্ষাপট (Concept of Horizon and Context of Vedic Pastoral Life)
গাডামারের হার্মেনিউটিক্সে একটি কেন্দ্রীয় পরিভাষা হলো দিগন্ত (Horizon)। দিগন্ত বলতে তিনি বোঝান একটি নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে মানুষের দেখার বা বোঝার সর্বোচ্চ সীমা (Gadamer, 1989)। মানুষ যেখানে দাঁড়িয়ে থাকে, সেখান থেকেই তার দৃষ্টির সীমানা নির্ধারিত হয়। এই সীমানা কিন্তু চিরকালের জন্য বন্ধ কোনো দেয়াল নয়; মানুষ যখন স্থান পরিবর্তন করে, তখন তার দিগন্তও প্রসারিত হয় বা বদলে যায়। জিন গ্রন্ডিন গাডামারের এই দিগন্তের ধারণাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, কোনো ঐতিহাসিক পাঠ বোঝার অর্থ হলো সেই পাঠের নিজস্ব দিগন্তকে চেনা এবং নিজের দিগন্তের সঙ্গে তার পার্থক্যটা স্পষ্ট করা (Grondin, 1994)। বৈদিক সাহিত্যের নিজস্ব দিগন্তটি তৈরি হয়েছিল এমন এক বাস্তবতায়, যা বর্তমান নাগরিক সমাজ থেকে বহু দূরে।
ঋগ্বেদের প্রাচীনতম অংশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানকার জগৎ গড়ে উঠেছিল যাযাবর পশুপালনভিত্তিক অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে। সেখানে সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল গরু আর ঘোড়া। সেই সমাজের মানুষের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা ঘুরপাক খেত বংশবৃদ্ধি, দীর্ঘ পরমায়ু, যুদ্ধে বিজয় এবং বিপুল গবাদি পশুর মালিকানা লাভের আশাকে ঘিরে (Jamison & Brereton, 2014)। ঋগ্বেদের ষষ্ঠ বা সপ্তম মণ্ডলের মতো অংশগুলোতে কবিরা দেবতাদের কাছে যে প্রার্থনা জানাচ্ছেন, তার ভাষা অত্যন্ত সরাসরি ও বৈষয়িক। ইন্দ্রের কাছে চাওয়া হচ্ছে শত্রুর দুর্গ ভেঙে দেওয়া এবং তাদের সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে আসার ক্ষমতা। এটি কোনো আধ্যাত্মিক বা পরলৌকিক মুক্তির ভাষা নয়। তাদের ঐতিহাসিক দিগন্ত ছিল প্রকৃতির খামখেয়ালি রূপ, যেমন অনাবৃষ্টি, খরা, নদীভাঙন এবং ভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সীমানায় আবদ্ধ।
সেই প্রাচীন দিগন্তের সামাজিক কাঠামোটিও আধুনিক পাঠকের কাছে অত্যন্ত অপরিচিত ও বৈষম্যমূলক। পরিবার কাঠামো ছিল কঠোরভাবে পিতৃসূত্রীয় (Patrilineal) এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল পুরোপুরি পিতৃতান্ত্রিক (Patriarchal)। রোমিলা থাপার তার ঐতিহাসিক গবেষণায় স্পষ্ট করেছেন যে প্রাথমিক বৈদিক সমাজে কোনো স্থায়ী রাষ্ট্রব্যবস্থা বা লিখিত আইন ছিল না; গোষ্ঠীভিত্তিক আনুগত্য এবং যজ্ঞের আনুষ্ঠানিক অংশীদারত্বই ছিল সামাজিক শৃঙ্খলার মাধ্যম (Thapar, 2002)। দেবতাদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটি ছিল স্পষ্টতই দেনা-পাওনার। মানুষকে যজ্ঞের মাধ্যমে সোমরস ও পশুর চর্বি নিবেদন করতে হবে, আর তার বিনিময়ে দেবতারা বৃষ্টি ও যুদ্ধের জয় উপহার দেবেন। এই লেনদেনভিত্তিক ও বৈষয়িক বিশ্বদর্শনই ছিল বৈদিক কবির দিগন্তের সীমা।
আজকের আধুনিক পাঠকের দিগন্ত এর চেয়ে একেবারেই আলাদা। আধুনিক পাঠক বাস করেন রাষ্ট্রব্যবস্থা, পুঁজিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক আইন এবং বৈজ্ঞানিক কার্যকারণ সম্পর্কের জগতে। আধুনিক মানুষের কাছে বজ্রপাত কোনো ক্রুদ্ধ দেবতার অস্ত্র নয়, বরং বৈদ্যুতিক চার্জের নিঃসরণ। ফলে আধুনিক পাঠক যখন ঋগ্বেদের মতো পাঠের মুখোমুখি হন, তখন এই দুই ভিন্ন দিগন্তের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট সংঘাত বা ফারাক তৈরি হয়। প্রাচীন কবি যে জিনিসটিকে একটি স্বাভাবিক মহাজাগতিক শৃঙ্খলা বা ঋত হিসেবে দেখেছিলেন, আধুনিক পাঠক সেখানে দেখতে পান একটি নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণির উৎপাদন সম্পর্ক ধরে রাখার মতাদর্শিক বয়ান। গাডামারের তত্ত্ব অনুযায়ী, এই দুই দিগন্তের সংঘাতই ব্যাখ্যার জন্ম দেয়।
দিগন্তের সংমিশ্রণ ও অর্থের উৎপাদনশীলতা (Fusion of Horizons and Productivity of Meaning)
প্রাচীন গ্রন্থ পাঠের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী? গাডামার এখানে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ধারণার অবতারণা করেছেন, যার নাম দিগন্তের সংমিশ্রণ (Fusion of Horizons/Horizontverschmelzung)। অনেকেই ভুলবশত মনে করেন যে দিগন্তের সংমিশ্রণ মানে হলো অতীতের দিগন্তের সঙ্গে বর্তমানের সম্পূর্ণ একাকার হয়ে যাওয়া। কিন্তু গাডামার নিজে স্পষ্ট করেছিলেন যে সংমিশ্রণ মানে নিজের বর্তমান সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে অতীতে হারিয়ে যাওয়া নয় (Gadamer, 1989)। বরং এটি হলো এমন এক অবস্থা, যেখানে অতীতের দিগন্ত এবং বর্তমানের দিগন্ত পরস্পরের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় এবং একটি নতুন উপলব্ধির জন্ম দেয়। এই প্রক্রিয়ায় পাঠের অর্থ স্থির থাকে না; অতীতের অর্থ এবং বর্তমানের প্রশ্নের সংঘাত থেকে এক নতুন অর্থ উৎপাদিত হয়।
বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে দিগন্তের এই সংমিশ্রণ কীভাবে ঘটে? ধরা যাক ঋগ্বেদের বিখ্যাত নাসদীয় সূক্ত (Nāsadīya Sūkta)-এর কথা। দশম মণ্ডলের ১২৯ নম্বর এই সূক্তে মহাবিশ্ব সৃষ্টির আদিম অবস্থা সম্পর্কে গভীর সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে কবি প্রশ্ন তুলেছেন, সৃষ্টি কোথা থেকে এল, দেবতারাও তো সৃষ্টির পরে এসেছেন, তাহলে কে জানে এই রহস্য? (Doniger, 1981)। একজন ঐতিহ্যবাদী ধর্মতাত্ত্বিক হয়তো এই সূক্তকে ব্যাখ্যা করবেন কোনো পরম অতিন্দ্রীয় সত্যের সংকেত হিসেবে। কিন্তু একজন আধুনিক পাঠক, যিনি কসমোলজি এবং অস্তিত্ববাদী দর্শনের দিগন্তে দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি এই সূক্তটিকে দেখবেন প্রাচীন মানবচিন্তার একটি চমকপ্রদ সংশয়বাদী প্রয়াস হিসেবে। প্রাচীন কবির সংশয় এবং আধুনিক পাঠকের বৈজ্ঞানিক জিজ্ঞাসার মিলনবিন্দুতেই তৈরি হয় পাঠটির নতুন অর্থ।
এই অর্থে পাঠের অর্থ কখনই অপরিবর্তনীয় নয়। গাডামার তার তত্ত্বে দেখিয়েছেন, কোনো সাহিত্যকর্মের অর্থ তার রচয়িতার অভিপ্রায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। রচয়িতা যা ভেবেছিলেন, পাঠের অর্থ তার চেয়ে সবসময়ই বেশি হতে পারে। একে বলা হয় অর্থের উৎপাদনশীলতা (Productivity of Meaning)। ঋগ্বেদের ঋষিরা যখন ইন্দ্র বা অগ্নির উদ্দেশ্যে শ্লোক রচনা করেছিলেন, তখন তারা দূর ভবিষ্যতের কোনো আধুনিক সেক্যুলার পাঠকের কথা ভাবেননি। কিন্তু আজ যখন সেই স্তোত্রগুলো পড়া হয়, তখন তাদের মূল যাজকীয় উদ্দেশ্য পেছনে পড়ে যায়। আজকের পাঠক সেখানে খুঁজে পান ব্রোঞ্জযুগের মানুষের ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, তাদের সামাজিক ভীতি এবং পরিবেশের সঙ্গে তাদের টিকে থাকার নিরন্তর লড়াইয়ের ইতিহাস।
এই দিগন্তের সংমিশ্রণ বৈদিক সাহিত্যের পবিত্রতার দেয়ালকে গুঁড়িয়ে দেয়। ঐতিহ্য দাবি করে যে পাঠটিকে কেবল তাদের নির্ধারিত পদ্ধতিতেই বুঝতে হবে। কিন্তু গাডামারের মডেল দেখায়, কোনো একক গোষ্ঠীর পক্ষে কোনো পাঠের অর্থকে চিরকালের জন্য কব্জা করে রাখা সম্ভব নয় (Warnke, 1987)। বর্তমান পাঠক যখন তার ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে প্রাচীন পাঠের দিকে তাকান, তখন তিনি পাঠের সেই সমস্ত দিক আবিষ্কার করতে পারেন যা স্বয়ং প্রাচীন রচয়িতার কাছেও স্পষ্ট ছিল না। বৈদিক স্তোত্রগুলোর ভেতরের শ্রেণি-স্বার্থ এবং ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার যে চিত্র আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা তুলে ধরছেন, তা প্রাচীন বৈদিক ঋষিদের ভাবনার বাইরে ছিল। কিন্তু আজকের দিগন্তের সঙ্গে সংমিশ্রণের ফলেই এই সত্যগুলো পাঠের ভেতর থেকে উন্মোচিত হতে পেরেছে।
প্রয়োগ এবং ব্যাখ্যার অবিভাজ্য রূপ (Application and Indivisible Nature of Interpretation)
গাডামারের হার্মেনিউটিক্সের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যাখ্যার সঙ্গে প্রয়োগের সম্পর্ক। সনাতন ব্যাখ্যাতত্ত্বে মনে করা হতো, প্রথমে একটি পাঠকে বুঝতে হয়, তারপর সেটিকে কোনো বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করতে হয়। গাডামার এই বিভাজন ভেঙে দেন। তিনি দাবি করেন, বোঝা এবং প্রয়োগ করা আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ (Gadamer, 1989)। কোনো পাঠকে বোঝার অর্থই হলো নিজের বর্তমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে সেটিকে প্রয়োগ করা। একে তিনি নাম দিয়েছেন প্রয়োগ (Application/Anwendung)। তিনি এই ধারণার ভিত্তি খুঁজে পেয়েছিলেন আইনের ব্যাখ্যা এবং ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার কাঠামোর মধ্যে। একজন বিচারক যখন কোনো পুরোনো আইন পড়েন, তিনি আইনটি নিছক জানার জন্য পড়েন না; বর্তমান মামলার রায় দেওয়ার জন্য তিনি আইনটির অর্থ নতুন করে নির্ধারণ করেন।
ঐতিহাসিকভাবে বৈদিক সাহিত্যের ব্যাখ্যা সবসময়ই একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল ছিল। উদাহরণ হিসেবে প্রাচীন ভারতের ধর্মসূত্র ও স্মৃতিশাস্ত্রের কথা বলা যায়। মনুর মতো আইনপ্রণেতারা যখন বৈদিক পাঠের ব্যাখ্যা করেছিলেন, তখন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল তৎকালীন সমাজে চতুর্বর্ণের কঠোর স্তরবিন্যাস টিকিয়ে রাখা (Olivelle, 2005)। সেখানে বৈদিক শ্লোকগুলোর অর্থ নির্ধারণ করা হয়েছিল শুদ্র ও নারীদের অধিকারহীনতাকে যুক্তিগ্রাহ্য করার প্রয়োগিক তাগিদ থেকে। ঋগ্বেদের পুরুষসূক্ত (Puruṣa Sūkta)-কে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল যাতে মনে হয়, সমাজব্যবস্থা ঈশ্বরের দেহাংশ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ প্রাচীন ব্যাখ্যাকাররা কোনো নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক আগ্রহ থেকে বেদ পড়েননি; সমাজ পরিচালনার আইনি ও রাজনৈতিক প্রয়োজনে তারা পাঠটিকে ব্যবহার করেছিলেন।
আধুনিক যুগে বৈদিক সাহিত্যের পাঠ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রয়োগিক ভূমিকার মুখোমুখি। উনিশ শতকে যখন ভারতে আধুনিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা হয়, তখন রামমোহন রায় থেকে শুরু করে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর মতো সংস্কারকরা বৈদিক সাহিত্যের সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিলেন। দয়ানন্দ দাবি করেছিলেন যে বেদের মধ্যে কোনো মূর্তিপূজা বা জন্মভিত্তিক জাতিভেদ নেই (Halbfass, 1988)। তিনি চাইলেন বৈদিক পাঠকে এমনভাবে প্রয়োগ করতে, যাতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের মুখে একটি আত্মমর্যাদাশীল সমাজ গঠন করা যায়। এখানেও দেখা যাচ্ছে, প্রাচীন পাঠটি যা ছিল হুবহু তা গ্রহণ করা হয়নি; বরং সমকালীন সামাজিক সংকটের মোকাবেলা করার জন্য বৈদিক বয়ানকে এক নতুন ছাঁচে ফেলে প্রয়োগ করা হয়েছিল।
বর্তমানের ধর্মনিরপেক্ষ অ্যাকাডেমিক পরিসরে এই প্রয়োগের চেহারাটি আরও আলাদা। আজ যখন একজন সমাজবিজ্ঞানী বা ইতিহাসবিদ বৈদিক সংকলন বিশ্লেষণ করেন, তখন তার প্রয়োগটি ঘটে প্রাচীন সমাজের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো, দাসদের অবস্থান এবং পরিবেশগত শোষণের রূপরেখা উন্মোচন করার জন্য। সুকুমারী ভট্টাচার্য তার গবেষণায় প্রাচীন ভারতের অর্থনীতি ও সমাজের যে নির্মোহ চিত্র তুলে ধরেছেন, সেখানে বৈদিক স্তোত্রগুলো কাজ করেছে শ্রেণিশোষণের ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে (Bhattacharji, 1975)। এখানে আধুনিক জ্ঞানকাণ্ডের প্রয়োগ ঘটছে পাঠটির অপৌরুষেয় বা আধ্যাত্মিক খোলসটি ভেঙে ফেলে তার অন্তর্নিহিত সামাজিক স্বার্থকে চিহ্নিত করার মাধ্যমে। গাডামারের তত্ত্ব এটাই দেখায় যে প্রয়োগ ছাড়া ব্যাখ্যার কোনো বাস্তব অস্তিত্বই থাকতে পারে না।
কথোপকথনের মডেল ও বৈদিক প্রশ্নের পুনর্নির্মাণ (Dialogical Model and Reconstruction of the Vedic Question)
কোনো পাঠের সঙ্গে পাঠকের সম্পর্কটি কেমন হওয়া উচিত? গাডামার এর উত্তর দিয়েছেন প্লেটোর সংলাপের উদাহরণ টেনে। তার মতে, যেকোনো সত্যিকারের বোঝাপড়া হলো দুই ব্যক্তির মধ্যকার একটি কথোপকথন (Conversation/Dialogue)-এর মতো (Gadamer, 1989)। এখানে পাঠক কেবল নিষ্ক্রিয় শ্রোতা নন, আবার তিনি একতরফাভাবে পাঠের ওপর নিজের মত চাপিয়ে দেওয়া কোনো স্বৈরাচারী সত্তাও নন। একটি ভালো কথোপকথনে উভয়েই প্রশ্ন করে এবং উভয়েই অপরের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। গাডামার এখানে ব্রিটিশ দার্শনিক আর. জি. কলিংউডের কাছ থেকে একটি ধারণা ধার করেছিলেন, যাকে বলা হয় প্রশ্ন ও উত্তরের যুক্তি (Logic of Question and Answer)। এই যুক্তি অনুসারে, কোনো ঐতিহাসিক বক্তব্যের অর্থ বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে বক্তব্যটি কোন প্রশ্নের উত্তর হিসেবে এসেছিল।
বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই কথোপকথন চালানো অত্যন্ত শ্রমসাধ্য একটি কাজ। কারণ এই পাঠ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একতরফা নির্দেশের রূপ নিয়ে সমাজে উপস্থিত ছিল। যাজকশ্রেণি দাবি করত, বেদ কেবল আদেশ দেয়, প্রশ্ন করা সেখানে নিষিদ্ধ। কিন্তু গাডামারের মডেল অনুসরণ করে আধুনিক পাঠক বৈদিক সাহিত্যকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারেন। বৈদিক কোনো স্তোত্র পাঠ করার সময় পাঠক নিজেকে প্রশ্ন করবেন: এই বিশেষ স্তোত্রটি কোন ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রশ্নের উত্তর হিসেবে তৈরি হয়েছিল? ঋগ্বেদের সোমরস পানের বিস্তারিত বর্ণনা কিংবা শত্রুর নগর ধ্বংসের উচ্ছ্বসিত গানগুলো আসলে যাযাবর আর্যভাষীদের কোন আদিম নিরাপত্তাহীনতা ও সম্পদের ক্ষুধার প্রশ্নের উত্তর ছিল? (Witzel, 1997)। এই প্রশ্নগুলো উত্থাপন করার মুহূর্তেই বৈদিক সাহিত্যের আপাত-পবিত্র রূপটি খসে পড়ে।
একই সাথে আধুনিক পাঠক প্রাচীন পাঠটিকেও তাকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেন। প্রাচীন বৈদিক স্তোত্রগুলো যখন প্রকৃতির রুদ্র রূপ এবং অসীম শক্তির সামনে মানুষের অসহায়ত্বকে তুলে ধরে, তখন তা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর মানুষকেও আত্মসচেতন করে তোলে। তবে এই কথোপকথন কোনো ভাববাদী বা অতিন্দ্রীয় আত্মসমর্পণে পর্যবসিত হয় না। বরং এটি হয়ে ওঠে একটি টানটান বোঝাপড়া। আধুনিক বস্তুবাদী পাঠক প্রাচীন সেই যাযাবর কবির অনুভূতির মুখোমুখি হয়ে পরখ করে দেখেন, আদিম সমাজ কীভাবে প্রকৃতির কার্যকারণ বুঝতে ব্যর্থ হয়ে অতিপ্রাকৃত দেবতাদের কল্পনা করেছিল। পাঠের এই দ্বান্দ্বিক পর্যালোচনা কোনো ভক্তিমূলক উপলব্ধি নয়, বরং এটি মানব ইতিহাসের প্রাথমিক বৌদ্ধিক চেষ্টার সঙ্গে আধুনিক সমালোচনামূলক বুদ্ধির একটি বোঝাপড়া।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, গাডামারের হার্মেনিউটিক্স বৈদিক সাহিত্যের অধ্যয়নে একটি কার্যকর দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। এটি একদিকে ঐতিহ্যবাদী ভারতীয় ব্যাখ্যার চিরন্তন ও অপৌরুষেয়তার দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে, অন্যদিকে অন্ধ ঔপনিবেশিক পাঠের বাইরে গিয়ে পাঠটির জটিলতাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে দেখার সুযোগ করে দেয়। বৈদিক সাহিত্য কোনো স্থির আধ্যাত্মিক সত্যের সংকলন নয়; এটি মানবজাতির ইতিহাসের একটি বিশেষ পর্বের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং ভাষিক দলিল। কালগত দূরত্ব, ঐতিহ্যের প্রভাব, দিগন্তের স্বাতন্ত্র্য এবং কথোপকথনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই প্রাচীন পাঠ যখন আধুনিক পাঠকের সামনে আসে, তখন তা মহিমান্বিত কোনো ধর্মগ্রন্থ হিসেবে থাকে না। বরং তা পরিণত হয় মানব সংস্কৃতির বিবর্তন এবং ক্ষমতা কাঠামোর রূপান্তর বোঝার একটি মূল্যবান উপাদানে।
গাডামার ও পূর্বধারণার সমস্যা (Gadamer and the Problem of Prejudice): ধর্ম, ঈশ্বর, প্রকৃতি ও আধুনিক শ্রেণিবিভাগ
আলোকায়ন-পরবর্তী কুসংস্কার এবং পূর্বধারণার পুনর্বাসন (Post-Enlightenment Prejudice and the Rehabilitation of Vorurteil)
ইউরোপের আলোকায়ন বা এনলাইটেনমেন্ট যুগের বুদ্ধিজীবীরা একটি বিশেষ বিশ্বাসকে খুব শক্তভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, কোনো বিষয়কে সঠিকভাবে জানতে হলে মনের সমস্ত পুরোনো বিশ্বাস এবং সংস্কার সম্পূর্ণ ধুয়ে-মুছে ফেলতে হবে। সেই যুগে যুক্তিকে দেখা হতো এক ধরনের স্বচ্ছ আয়না হিসেবে, যার ওপর কোনো দাগ থাকা চলবে না। জার্মান দার্শনিক হান্স-গেয়র্গ গাডামার (Hans-Georg Gadamer) এই অবস্থানটিকে একটি ঐতিহাসিক ভুল বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, আলোকায়নের পণ্ডিতরা নিজেরাই একটি গভীর কুসংস্কারে আক্রান্ত ছিলেন, যাকে তিনি বলেছেন পূর্বধারণাবিরোধী পূর্বধারণা (Prejudice Against Prejudice)। গাডামারের বক্তব্য হলো, মানুষ কখনোই শূন্য পটভূমিতে দাঁড়িয়ে চিন্তা করতে পারে না। তার ভাষার গঠন, তার পারিপার্শ্বিক সংস্কৃতি এবং অতীত থেকে বয়ে আসা চিন্তা তার মাথায় কিছু প্রাথমিক ছক তৈরি করে দেয়। এই প্রাথমিক ছককেই তিনি ইতিবাচক অর্থে পূর্বধারণা (Prejudice/Vorurteil) বলে অভিহিত করেছেন।
জোয়েল সি. ওয়েনশাইমার তার বিশ্লেষণে পরিষ্কার করেছেন যে গাডামারের কাছে পূর্বধারণা মানে কোনো অন্ধ গোঁড়ামি বা অযৌক্তিক একগুঁয়েমি নয় (Weinsheimer, 1985)। ল্যাটিন শব্দ প্রেইজুডিশিয়াম থেকে আসা এই প্রত্যয়টির আদি অর্থ ছিল কোনো চূড়ান্ত বিচারের আগের প্রাথমিক বোঝাপড়া। একটি প্রাচীন রচনা পাঠের সময় পাঠকের মনের মধ্যে থাকা এই পূর্বধারণাগুলোই আসলে অর্থ তৈরির দরজা খুলে দেয়। মানুষ যখন কোনো প্রাচীন সংকলনের মুখোমুখি হয়, তখন সে আগে থেকেই কিছু প্রশ্ন এবং অনুমান নিয়ে সেখানে প্রবেশ করে। এই অনুমানগুলো যদি না থাকত, তাহলে প্রাচীন ভাষা বা চিহ্নের স্তূপ দেখে মানুষের মনে কোনো চিন্তার সঞ্চারই হতো না। তাই পূর্বধারণা হলো মানুষের ভাবনার সেই জমি, যার ওপর দাঁড়িয়ে সে অন্য কোনো দূরবর্তী দিগন্তকে দেখার চেষ্টা করে।
সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন ব্যাখ্যাকারী নিজের এই পূর্বধারণা সম্পর্কে পুরোপুরি অসচেতন থাকেন। একজন পাঠক যদি ধরে নেন যে তিনি কোনো পক্ষপাত ছাড়াই সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে একটি পাঠ পর্যবেক্ষণ করছেন, তখনই বিভ্রান্তির সূচনা ঘটে। বৈদিক সাহিত্যের আধুনিক পঠনপাঠনে এই ধরনের ঘটনা হরহামেশাই দেখা গেছে। উনিশ এবং বিশ শতকে যখন ইউরোপীয় ও ভারতীয় পণ্ডিতরা বৈদিক সংকলনগুলো অনুবাদ ও শ্রেণিবদ্ধ করতে শুরু করলেন, তখন তারা দাবি করেছিলেন যে তারা খাঁটি বৈজ্ঞানিক ও ফিলোলজিক্যাল পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। কিন্তু বাস্তবে তাদের সেই তথাকথিত নিরপেক্ষ পদ্ধতির পেছনে সক্রিয় ছিল সমসাময়িক ইউরোপীয় দর্শন, খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব এবং ঔপনিবেশিক রাজনীতির অদৃশ্য পূর্বধারণা। তারা নিজেদের মনের ভেতরের ছকগুলোকে সার্বজনীন যুক্তি বলে ধরে নিয়েছিলেন।
গাডামারের হার্মেনিউটিক্স আমাদের শেখায়, পূর্বধারণাকে মন থেকে জোর করে তাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। বরং দরকার হলো নিজের ভেতরে থাকা পূর্বধারণাগুলোকে চিহ্নিত করা এবং সেগুলোকে সমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করানো। বৈদিক পাঠের ক্ষেত্রে এর অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট। একজন আধুনিক গবেষক যখন ঋগ্বেদ বা অথর্ববেদ পড়তে বসেন, তখন তাকে শুরুতেই সচেতন হতে হবে যে তিনি একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক যুক্তি, ধর্মনিরপেক্ষতা ও শ্রেণিবিন্যাসের চশমা পরে আছেন। এই সচেতনতা না থাকলে তিনি প্রাচীন যাযাবর মানুষের মুখের কথাকে আধুনিক কোনো মতবাদের প্রতিফলন ভেবে ভুল করবেন। নিজের অবস্থানকে জানতে পারলেই কেবল প্রাচীন পাঠের স্বাতন্ত্র্য ধরা পড়ে।
‘ধর্ম’ প্রত্যয়ের আধুনিক বিনির্মাণ ও বৈদিক বাস্তবতার ব্যবধান (Modern Construction of the Category ‘Religion’ and Vedic Divergence)
আধুনিক চিন্তার সবচেয়ে বড় একটি পূর্বধারণা হলো যেকোনো প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধর্ম (Religion) নামক একটি সাধারণ বাক্সে বন্দি করে বোঝার চেষ্টা করা। কিন্তু এই ‘রিলিজিয়ন’ বা ধর্ম প্রত্যয়টি কোনো সার্বজনীন বা সনাতন সত্য নয়। ইতিহাসবিদ ও ধর্মতাত্ত্বিক জোনাথন জেড. স্মিথ একটি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ কথা বলেছিলেন। স্মিথ তার গবেষণায় স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন যে ধর্ম কোনো মানুষের বাইরে থাকা প্রাকৃতিক বস্তু নয়; বরং এটি পুরোপুরি গবেষকদের নিজস্ব অধ্যয়নের প্রয়োজনে তৈরি করা একটি মনস্তাত্ত্বিক বর্গ (Smith, 1982)। ইউরোপে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর চার্চ ও রাষ্ট্রের বিভাজন চিহ্নিত করতে গিয়ে ‘রিলিজিয়ন’ প্রত্যয়টি তার আধুনিক রূপ পেয়েছিল। সেখানে ধর্মকে দেখা হয়েছিল ব্যক্তিগত বিশ্বাস, শাস্ত্রগ্রন্থ এবং কিছু নৈতিক অনুশাসনের একটি সুসংহত ব্যবস্থা হিসেবে।
এই ইউরোপীয় বর্গটিকে যখন পরবর্তী সময়ে বৈদিক সাহিত্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো, তখন এক বিশাল বিভ্রান্তির জন্ম নিল। নৃতাত্ত্বিক তালাল আসাদ দেখিয়েছেন কীভাবে ধর্মকে একটি সর্বজনীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে কল্পনা করা আধুনিক পশ্চিমা ক্ষমতার রাজনীতির অংশ (Asad, 1993)। বৈদিক সাহিত্য যখন রচিত হয়েছিল, তখন সেখানে আধুনিক অর্থে কোনো ‘ধর্ম’ ছিল না। ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলোতে যে শব্দটি বারবার আসে তা হলো ধর্মন (Dharman)। কিন্তু প্রাচীন সংকলনে এই শব্দের অর্থ কোনো ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা মোক্ষলাভের পথ ছিল না। সেখানে ধর্মন বলতে বোঝাত মহাজাগতিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার সুনির্দিষ্ট আচার এবং ক্রিয়াকর্ম। এটি ছিল এমন এক বস্তুগত নিয়ম, যা যজ্ঞের সঠিক সম্পাদনা এবং সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর দায়িত্ব বণ্টনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
তোমোকো মাসুজাওয়া তার গবেষণায় উন্মোচন করেছেন কীভাবে উনিশ শতকের ইউরোপীয় পণ্ডিতরা সারা বিশ্বের নানা সংস্কৃতিকে সাজিয়ে বিশ্বধর্ম (World Religions) নামক এক নতুন সাম্রাজ্যবাদী ধারণা তৈরি করেছিলেন (Masuzawa, 2005)। এই নতুন তালিকায় ভারতের বৈদিক ঐতিহ্যকে একটি সুসংহত প্রাচীন ‘ধর্ম’ হিসেবে স্থান দেওয়া হয়। এর ফলে বৈদিক সাহিত্যের বহুমাত্রিক ও পরস্পরবিরোধী বাস্তবতাকে অস্বীকার করে তাকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় মতাদর্শ হিসেবে দেখানোর প্রবণতা শুরু হলো। অথচ প্রাচীন বৈদিক ধারাটি কোনো গির্জাভিত্তিক বা সংঘবদ্ধ ধর্মীয় আন্দোলন ছিল না। সেখানে কোনো কেন্দ্রীয় মতবাদ ছিল না, যার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা সবার জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। এটি ছিল প্রধানত কিছু পুরোহিত পরিবারের মুখে মুখে সংরক্ষিত আচার-অনুষ্ঠানের ব্যবহারিক সংকলন।
ব্রায়ান কে. স্মিথ দেখিয়েছেন যে বৈদিক সমাজের ভিত্তি ছিল যজ্ঞীয় সাদৃশ্যের এক জটিল জাল, যাকে তারা বলত বন্ধুতা বা সংযোগ (Smith, 1989)। সেখানে বিশ্বাসের চেয়ে মুখ্য ছিল সঠিক শারীরিক ভঙ্গি, সঠিক উচ্চারণে মন্ত্রপাঠ এবং নির্দিষ্ট উপাচার নিবেদন। আধুনিক গবেষক যখন প্রোটেস্ট্যান্ট ভাবাদর্শের পূর্বধারণা নিয়ে বৈদিক সাহিত্যের মধ্যে ব্যক্তিগত মুক্তি, বিশ্বাস বা পাপ-পুণ্যের দ্বান্দ্বিক লড়াই খুঁজতে যান, তখন তিনি হতাশ হন অথবা পাঠটিকে বিকৃত করেন। বৈদিক সাহিত্যে আধুনিক ‘ধর্ম’ খোঁজা মানে হলো এমন একটি প্রশ্ন নিয়ে প্রাচীন দরজায় কড়া নাড়া, যে প্রশ্নের কোনো অর্থ সেই যুগের মানুষের জানা ছিল না।
একেশ্বরবাদ বনাম বহুদেববাদের চশমা এবং বৈদিক দেবমণ্ডলী (Monotheism versus Polytheism Lens and the Vedic Pantheon)
পশ্চিমা ধর্মীয় চিন্তার আরেকটি গভীর পূর্বধারণা হলো একেশ্বরবাদ (Monotheism)-কে মানব চেতনার সর্বোচ্চ ও শ্রেষ্ঠ রূপ মনে করা এবং বহুদেববাদ (Polytheism)-কে আদিম ও অনুন্নত ভাবা। এই পূর্বধারণার শেকড় ছিল সেমেটিক ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে। উনিশ শতকে যখন ইউরোপীয় ভারততত্ত্ববিদরা ঋগ্বেদ অনুবাদ করতে শুরু করলেন, তখন তারা দেখলেন সেখানে বহু দেবতার ভিড়। ইন্দ্র, অগ্নি, বরুণ, সোম, মরুৎ – একের পর এক শক্তির বন্দনা চলছে। এই দৃশ্য ইউরোপীয় পণ্ডিতদের বেশ অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিল। তারা ভাবতে পারেননি যে একটি প্রাচীন ও জটিল সাহিত্যের ভিত্তি হতে পারে বহু দেবতার উপাসনা। এই অস্বস্তি থেকেই তারা বৈদিক সাহিত্যে এক অদৃশ্য একেশ্বরবাদ খোঁজার চেষ্টা শুরু করলেন।
ম্যাক্স মুলার এই সংকট কাটাতে একটি নতুন পরিভাষা উদ্ভাবন করেছিলেন, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন একৈকদেববাদ (Henotheism/Kathenotheism) (Müller, 1878)। মুলারের তত্ত্বটি ছিল এমন: বৈদিক কবিরা বহু দেবতায় বিশ্বাস করলেও যখন যে দেবতার সামনে দাঁড়াতেন, তাকেই সেই মুহূর্তের জন্য পরম ও সর্বেসর্বা বলে মনে করতেন। মুলার আসলে বহুদেববাদ থেকে একেশ্বরবাদে উত্তরণের একটি মধ্যবর্তী ধাপ হিসেবে বৈদিক দেবমণ্ডলীকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন। তার অবচেতন পূর্বধারণা ছিল, যেকোনো সভ্য ধর্মীয় সমাজকে শেষ পর্যন্ত একটি একক ঈশ্বরের ধারণায় পৌঁছাতেই হবে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা ছিল পাঠটির ওপর আধুনিক ব্যাখ্যাকারীর নিজস্ব ইচ্ছার এক কৃত্রিম চাপিয়ে দেওয়া রূপ।
ফরাসি ভারততত্ত্ববিদ লুই রেনু বৈদিক সাহিত্যের ভাষা বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় দেখিয়েছেন। রেনু স্পষ্ট করেছিলেন যে বৈদিক দেবতারা গ্রিক বা রোমান দেবতাদের মতো সুনির্দিষ্ট শারীরিক অবয়ব বা ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে উপস্থিত হন না (Renou, 1953)। বৈদিক সাহিত্যে ঈশ্বর (God) বা দেবতারা হলেন যজ্ঞের বিভিন্ন ব্যবহারিক উপাদানের কাব্যিক রূপ মাত্র। অগ্নি হলেন সরাসরি যজ্ঞাগ্নির শিখা, সোম হলো যজ্ঞে ব্যবহৃত এক ধরনের লতা ও তার রস, আর ইন্দ্র হলেন ঝড় ও ধ্বংসাত্মক শক্তির প্রতীকী রূপ। এই দেবতাদের কোনো স্থায়ী স্বর্গীয় সিংহাসন ছিল না, তারা যজ্ঞবেদীর আহ্বানে আবির্ভূত হতেন এবং নিবেদিত খাদ্য গ্রহণ করে মানুষের বৈষয়িক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতেন। ফলে আধুনিক একেশ্বরবাদী ঈশ্বরের মতো সর্বশক্তিমান কোনো মহাজাগতিক শাসকের ধারণা বৈদিক প্রথম পর্বে অনুপস্থিত ছিল।
ব্রুস লিংকন তার রাজনৈতিক ও পৌরাণিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন কীভাবে দেবমণ্ডলীর স্তরবিন্যাস আসলে তৎকালীন মানবসমাজের গোষ্ঠীগত সংঘাত এবং ক্ষমতার পুনর্বণ্টনকে নির্দেশ করত (Lincoln, 1994)। এক গোত্রের দেবতা যখন অন্য গোত্রের দেবতার চেয়ে বেশি স্তুতি পেত, তার পেছনে থাকত সেই গোত্রের বৈষয়িক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। আধুনিক পাঠক যদি বৈদিক দেবতাদের একেশ্বরবাদ বনাম বহুদেববাদের সরল দ্বন্দ্বে ফেলে বিচার করতে যান, তবে তিনি এই সামাজিক বাস্তবতাকে দেখতে ব্যর্থ হবেন। বৈদিক চিন্তায় কোনো একক সর্বময় ঈশ্বরের অধীনতা ছিল না; সেখানে ছিল বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও সামাজিক শক্তির সঙ্গে মানুষের এক ধরনের ব্যবহারিক ও কৌশলগত আদান-প্রদান।
‘প্রকৃতি’ এবং অতিপ্রাকৃতের দ্বৈততা আরোপের সমস্যা (The Problem of Imposing the ‘Nature’ and Supernatural Binary)
আধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শনের একটি মৌল ভিত্তি হলো প্রকৃতি (Nature) এবং মানুষের তৈরি সমাজের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন রেখা টেনে দেওয়া। দেকার্ত পরবর্তী পশ্চিমা দর্শনে বিশ্বকে দুটি ভাগে ভাগ করে দেখা হয়েছে: একদিকে নিষ্ক্রিয়, অচেতন বস্তুগত প্রকৃতি এবং অন্যদিকে সচেতন মন বা মানবীয় সমাজ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বিভাজন – যা কিছু প্রাকৃতিক তার বাইরে এক অলৌকিক অতিপ্রাকৃত (Supernatural) জগতের কল্পনা। আধুনিক পাঠক যখন বৈদিক সংকলনগুলো পাঠ করেন, তখন তিনি এই আধুনিক দ্বৈততাকে সাথে নিয়েই অগ্রসর হন। তিনি ভাবতে শুরু করেন, বৈদিক মানুষ হয়তো রোমান্টিক কবিদের মতো উন্মুক্ত প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে নদীর গান বা ভোরের আলোর প্রশংসা লিখেছিলেন।
উনিশ শতকের রোমান্টিক সাহিত্যতত্ত্বের এই পূর্বধারণা ম্যাক্স মুলার ও তার সমসাময়িক গবেষকদের লেখায় প্রবলভাবে দেখা যায়। মুলার বৈদিক দেব-দেবীকে প্রাকৃতিক শক্তির সরল রূপক হিসেবে দেখেছিলেন। তার মতে, বৈদিক আর্যরা যখন প্রভাতের সূর্যোদয় বা প্রলয়ংকরী বজ্রপাত দেখে বিস্মিত হতেন, তখন সেই বিস্ময় থেকেই তারা উষা বা ইন্দ্রের স্তোত্র রচনা করতেন (Müller, 1878)। এই ব্যাখ্যা শুনতে কাব্যিক লাগলেও বৈদিক মানুষের বাস্তব জীবনচর্চার সাথে এর কোনো মিল ছিল না। যাযাবর বা পশুপালক মানুষের কাছে প্রকৃতি কোনো দূর থেকে উপভোগ করার মতো চিত্রকর্ম ছিল না। প্রকৃতি ছিল এক রুক্ষ, অনিশ্চিত এবং বিপজ্জনক বাস্তব শক্তি, যার সাথে টিকে থাকার লড়াই ছিল প্রতিদিনের ঘটনা।
গেভিন ফ্লাড হিন্দুধর্মের উৎপত্তি নিয়ে আলোচনায় উল্লেখ করেছেন যে বৈদিক মানুষের কাছে কসমস বা মহাজাগতিক পরিমণ্ডল এবং তাদের প্রতিদিনের সামাজিক জীবন একে অপরের থেকে আলাদা ছিল না (Flood, 1996)। ঋগ্বেদের অন্যতম প্রধান ধারণা হলো ঋত (Ṛta)। আধুনিক পরিভাষায় একে মহাজাগতিক শৃঙ্খলা বলা হলেও বৈদিক মানুষের কাছে ঋত ছিল একাধারে ঋতুচক্রের আবর্তন, দিন-রাত্রির পরিবর্তন এবং যজ্ঞের নির্ভুল গতিপথ। মানুষ যদি ঠিকমতো যজ্ঞ না করে, তাহলে ঋত নষ্ট হবে এবং বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাবে – এমনটাই ছিল তাদের ধারণা। অর্থাৎ মানবীয় কর্মকাণ্ড এবং প্রাকৃতিক নিয়ম একে অপরের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে ছিল। সেখানে প্রকৃতি মানুষের বাইরের কোনো পর্যবেক্ষণের বস্তু ছিল না।
বৈদিক আচারগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, যজ্ঞ (Sacrifice/Yajña) ছিল তৎকালীন মানুষের কাছে এক ধরনের ব্যবহারিক প্রযুক্তি। ব্রায়ান কে. স্মিথ যেমনটি দেখিয়েছেন, বৈদিক মানুষের উদ্দেশ্য প্রকৃতির বন্দনা করা ছিল না, বরং যজ্ঞের মাধ্যমে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য (Smith, 1989)। সোমরস প্রস্তুত করা, পশু বলি দেওয়া এবং নির্দিষ্ট ছন্দে মন্ত্র উচ্চারণ করার মাধ্যমে তারা খরা দূর করতে চাইতেন বা শস্যের ফলন বাড়াতে চাইতেন। এটিকে রোমান্টিক প্রকৃতিপূজা বলা আধুনিক চেতনার একটি বড় ধরনের ভ্রান্তি। প্রাচীন মানুষ প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যকার যে নিবিড় জৈব ও যান্ত্রিক সম্পর্ক কল্পনা করেছিল, আধুনিক দ্বৈততাবাদী চশমা দিয়ে তাকালে সেই সংযোগটি হারিয়ে যায়।
আধুনিক অ্যাকাডেমিক শ্রেণিবিন্যাস ও বৈদিক বর্গের সংকট (Modern Academic Classifications and the Crisis of Vedic Categories)
আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একটি বড় স্বভাব হলো জ্ঞানকে বিভিন্ন স্বতন্ত্র বর্গে ভাগ করে ফেলা। আমরা ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, ধর্ম এবং সমাজবিজ্ঞানকে আলাদা আলাদা কুঠুরিতে সাজিয়ে নিয়ে অভ্যস্ত। রাসেল টি. ম্যাককাটচিয়ন তার তাত্ত্বিক রচনায় তুলে ধরেছেন কীভাবে এই ধরনের অ্যাকাডেমিক শ্রেণিবিন্যাস কোনো নিষ্পাপ পদ্ধতি নয়, বরং তা জ্ঞানের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর হাতিয়ার (McCutcheon, 1997)। বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে আধুনিক পণ্ডিতরা এই একই কাজ করেছিলেন। তারা বিশাল বৈদিক পাঠকে চটজলদি চারটি ভাগে ভাগ করে দিলেন: সংহিতা হলো স্তোত্র বা কবিতা, ব্রাহ্মণ হলো যজ্ঞের শুষ্ক গদ্য বিবরণী, আরণ্যক হলো রূপক পাঠ এবং উপনিষদ হলো খাঁটি দর্শন।
এই শ্রেণিবিন্যাসের পেছনে কাজ করেছিল ইউরোপের আলোকায়ন এবং প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কারের এক গভীর পূর্বধারণা। প্রোটেস্ট্যান্টরা মনে করতেন, ধর্মের শুরুতে থাকে পবিত্র বাণী বা কাব্য, মাঝখানে যাজক বা পুরোহিতরা এসে আচারের জঞ্জাল তৈরি করে এবং শেষে সংস্কারকরা এসে আচারের খোলস ভেঙে বিশুদ্ধ দর্শনে ফিরে যান। ঠিক এই ছাঁচেই বৈদিক সাহিত্যকে সাজানো হলো। সংহিতাকে বলা হলো সরল আদিম কবিতা, ব্রাহ্মণ অংশকে চিহ্নিত করা হলো পুরোহিতদের অর্থহীন স্বার্থপর আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে, আর উপনিষদকে মাথার ওপর তুলে বলা হলো এটাই বৈদিক চিন্তার চূড়া বা বিশুদ্ধ দর্শন। কিন্তু এই বিভাজন বৈদিক সাহিত্যের নিজস্ব সাংগঠনিক যুক্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল।
লুই রেনু তার বিভিন্ন গবেষণায় সতর্ক করেছিলেন যে বৈদিক সাহিত্যের এই কৃত্রিম খণ্ডীকরণ প্রাচীন ঐতিহ্যের বাস্তব রূপটিকে ধ্বংস করে দেয় (Renou, 1953)। বৈদিক ধারায় সংহিতার মন্ত্র এবং ব্রাহ্মণের যজ্ঞবিধি কোনো আলাদা বিষয় ছিল না। মন্ত্র কেন উচ্চারণ করা হচ্ছে তা বোঝার জন্যই রচিত হয়েছিল ব্রাহ্মণ। একইভাবে উপনিষদও যজ্ঞের বাস্তবতা থেকে হঠাৎ উড়ে আসা কোনো বিচ্ছিন্ন দার্শনিক চিন্তা নয়। উপনিষদ হলো সেই একই যজ্ঞক্রিয়াকে শরীরের ভেতরে বা চেতনার ভেতরে রূপক আকারে পুনর্ব্যাখ্যা করার প্রয়াস। ফলে যারা উপনিষদকে খুব উন্নত আর ব্রাহ্মণ সাহিত্যকে নিকৃষ্ট পুরোহিততন্ত্র বলে দাগিয়ে দেন, তারা মূলত প্রোটেস্ট্যান্ট আচার-বিরোধিতার পূর্বধারণাটিকেই প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের ওপর চাপিয়ে দেন।
আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্লেষকদেরও এই ফাঁদে পা দিলে চলবে না। সংহিতা, ব্রাহ্মণ ও উপনিষদ – এই পুরো চক্রটিই ছিল প্রাচীন উত্তর ভারতের একটি নির্দিষ্ট শাসক ও যাজকশ্রেণির সামাজিক প্রতিপত্তি নির্মাণের পর্যায়ক্রমিক রূপ। ব্রায়ান কে. স্মিথ দেখিয়েছেন যে বৈদিক জ্ঞানকাণ্ডের আসল উদ্দেশ্য ছিল সাদৃশ্য খুঁজে বের করে পুরো মহাবিশ্বকে একটি যজ্ঞীয় শৃঙ্খলার ভেতর সংজ্ঞায়িত করা (Smith, 1989)। একে আজকের দিনের সমাজতত্ত্ব বা দর্শনের আলাদা খোপে ফেলে বিচার করতে গেলে বৈদিক সাহিত্যের অভ্যন্তরীণ ধারাবাহিকতা ও তার অন্তর্নিহিত বস্তুগত রাজনীতির চেহারাটি পুরোপুরি আড়ালে চলে যায়।
পূর্বধারণা সম্পর্কে আত্মসচেতনতা ও বস্তুনিষ্ঠ পাঠের রূপরেখা (Self-Awareness of Prejudices and Framework for Objective Reading)
তাহলে এই সমস্ত পূর্বধারণার জাল ভেদ করে বৈদিক সাহিত্যের একটি বস্তুনিষ্ঠ পাঠ কীভাবে সম্ভব? গাডামার এর কোনো জাদুকরী সমাধান দেননি, তবে তিনি একটি বাস্তবসম্মত পথের নির্দেশ করেছেন। তার মতে, সমাধানটি পূর্বধারণা বর্জন করার মধ্যে নেই, বরং রয়েছে ঐতিহাসিক সচেতনতা (Historically Effected Consciousness/Wirkungsgeschichtliches Bewußtsein) অর্জনের মধ্যে (Weinsheimer, 1985)। এর অর্থ হলো, গবেষককে সর্বদা মনে রাখতে হবে যে তিনি নিজে একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পর্বের ফল। তার সমস্ত ভালো লাগা, মন্দ লাগা, যুক্তিবোধ এবং শ্রেণিবিন্যাসের মাপকাঠিগুলোও ইতিহাসের ভেতর দিয়েই গড়ে উঠেছে। যখন পাঠক নিজের এই সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সজাগ থাকেন, তখনই তিনি পাঠের ভিন্নতা ও স্বাতন্ত্র্যকে মর্যাদা দিতে পারেন।
একটি বস্তুনিষ্ঠ ও সমালোচনামূলক পাঠের প্রধান শর্ত হলো প্রাচীন পাঠটির ওপর কোনো আধুনিক বা অলৌকিক মহিমা আরোপ না করা। বৈদিক সাহিত্য কোনো দেবতার বাণী নয়, আবার এটি কোনো অসভ্য আদিম মানুষের প্রলাপও নয়। এটি হলো ব্রোঞ্জ ও লৌহযুগের সন্ধিক্ষণে ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে টিকে থাকার জন্য লড়াই করা কিছু পশুপালক ও কৃষিভিত্তিক গোত্রের ভাষার দলিল। ব্রুস লিংকন যেমনটি জোর দিয়েছেন, যেকোনো প্রাচীন মিথ বা পৌরাণিক পাঠের অধ্যয়নে গবেষকের কাজ হলো তার ভেতরের সামাজিক টানাপোড়েন এবং রাজনৈতিক স্বার্থকে চিহ্নিত করা (Lincoln, 1994)। বৈদিক ঋষিরা কোনো স্বর্গীয় সত্য প্রচার করছিলেন না, তারা মূলত নিজেদের গোত্রের নিরাপত্তা, ধনসম্পদের প্রাচুর্য এবং যজ্ঞের মাধ্যমে সমাজে নিজেদের অপরিহার্য অবস্থান ধরে রাখার বয়ান তৈরি করছিলেন।
আজকের ধর্মনিরপেক্ষ গবেষকের আরেকটি বড় দায়িত্ব হলো বৈদিক সাহিত্যের তথাকথিত সর্বজনীনতার দাবিকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত দিয়ে খণ্ডন করা। ঐতিহ্যবাদী ব্যাখ্যাকাররা প্রচার করেন যে বেদ সমস্ত মানবজাতির জন্য সমান ও চিরন্তন সত্য ধারণ করে। অথচ পাঠটির ভেতরে প্রবেশ করলেই দেখা যায়, সেখানে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে আর্য ও অনার্য, দাস ও দস্যুদের মধ্যে বিভাজন টানা হয়েছে। অনার্যদের ধনসম্পদ কেড়ে নেওয়ার জন্য ইন্দ্রের কাছে উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে। আধুনিক গবেষক যদি নিজের মানবিক ও ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তবে তিনি এই বৈষম্যমূলক ঐতিহাসিক সত্যগুলোকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে পারবেন। তিনি ঐতিহ্যবাদীদের মতো একে রূপক বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করবেন না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, গাডামারের হার্মেনিউটিক্স বৈদিক সাহিত্যের অধ্যয়নে এক গভীর রূপান্তরমূলক ভূমিকা রাখতে পারে। এটি আধুনিক পাঠককে তার নিজের অন্ধবিন্দুগুলো সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়। ‘ধর্ম’, ‘ঈশ্বর’, ‘প্রকৃতি’ কিংবা ‘দর্শনের’ মতো আধুনিক ইউরোপীয় ও সংস্কারবাদী বর্গগুলোকে অন্ধভাবে বৈদিক সাহিত্যে আরোপ না করে পাঠটিকে তার নিজস্ব ভৌগোলিক ও সামাজিক জমিতে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়। এই নির্মোহ, বস্তুনিষ্ঠ ও ঐতিহাসিক বোঝাপড়াই একটি প্রাচীন টেক্সটের অপৌরুষেয়তার কুয়াশা কাটিয়ে তাকে মানুষের তৈরি এক রক্তমাংসের সামাজিক দলিল হিসেবে চিনতে শেখায়।
গাডামার ও দিগন্তের সংমিশ্রণ (Gadamer and Fusion of Horizons): একটি ঋগ্বৈদিক সূক্তের প্রাচীন ও আধুনিক পুনর্পাঠ
দিগন্তের সংমিশ্রণের তাত্ত্বিক কাঠামো ও পাঠের গতিশীলতা (Theoretical Framework of Fusion of Horizons and Textual Dynamics)
দার্শনিক ব্যাখ্যাতত্ত্বে প্রাচীন পাঠকে বোঝার ক্ষেত্রে যে পদ্ধতিগত বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল, জার্মান চিন্তাবিদ হান্স-গেয়র্গ গাডামার (Hans-Georg Gadamer) সেখানে একটি বড় ধরনের মোড় ঘুরিয়ে দেন। উনিশ শতকের ঐতিহাসিকতাবাদী পণ্ডিতরা মনে করতেন, কোনো প্রাচীন সাহিত্য বা দলিলকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে ব্যাখ্যাকারীকে নিজের বর্তমান পরিচয় সম্পূর্ণ ভুলে যেতে হবে। তাদের মতে, ব্যাখ্যাকারীর কাজ ছিল কাল্পনিকভাবে অতীতে ফিরে গিয়ে প্রাচীন লেখকের মনস্তত্ত্বের হুবহু প্রতিরূপ তৈরি করা। রিচার্ড ই. পামার তার ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় উল্লেখ করেছেন, গাডামার এই পদ্ধতিকে অসম্ভব এবং বিভ্রান্তিকর হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন (Palmer, 1969)। অতীতে ফিরে যাওয়া মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ মানুষ তার নিজস্ব সময় ও সংস্কৃতির বাইরে পা রাখতে পারে না। অতীতের কোনো পাঠ যখন বর্তমানের পাঠকের মুখোমুখি হয়, তখন সেখানে মূলত দুটি ভিন্ন ঐতিহাসিক বাস্তবতা বা দিগন্ত পরস্পরের সম্মুখীন হয়।
গাডামারের হার্মেনিউটিক্সে কেন্দ্রীয় ধারণাটি হলো দিগন্তের সংমিশ্রণ (Fusion of Horizons/Horizontverschmelzung)। এখানে দিগন্ত বলতে বোঝানো হয়েছে একজন মানুষের অবস্থান থেকে দেখার এবং ভাবার সমগ্র পরিধিকে। প্রাচীন রচনার একটি নির্দিষ্ট দিগন্ত থাকে, যা তার তৎকালীন অর্থনৈতিক রূপরেখা, সামাজিক সম্পর্ক এবং ভাষা দিয়ে তৈরি। একইভাবে বর্তমান পাঠকেরও একটি নিজস্ব দিগন্ত থাকে, যা গঠিত হয় আধুনিক বিজ্ঞানচেতনা, সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং যুক্তিবাদী বিশ্লেষণের সমন্বয়ে। রবার্ট জে. ডস্টাল তার সম্পাদিত গ্রন্থে স্পষ্ট করেছেন যে দিগন্তের সংমিশ্রণ কোনো স্থির বা সমাপ্ত ঘটনা নয়, বরং এটি একটি নিরন্তর চলমান প্রক্রিয়া (Dostal, 2002)। প্রাচীন পাঠ এবং বর্তমান পাঠক যখন সংলাপে লিপ্ত হয়, তখন উভয়ের দিগন্ত প্রসারিত হয় এবং একটি নতুন উপলব্ধি ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়।
এই তাত্ত্বিক বোঝাপড়া বৈদিক সাহিত্যের পাঠে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বৈদিক সাহিত্যকে দীর্ঘদিন ধরে একটি অপরিবর্তনীয়, অলৌকিক ও পবিত্র সংকলন হিসেবে দেখার একটি প্রাতিষ্ঠানিক চাপ ছিল। সনাতন ব্যাখ্যাকাররা দাবি করতেন, বেদের অর্থ নির্দিষ্ট এবং তা কেবল প্রাচীন যাজকীয় বিধিমালার কাঠামোর ভেতর থেকেই উদ্ধার করতে হবে। কিন্তু গাডামারের তত্ত্ব দেখায় যে কোনো পাঠের অর্থ অতীতে চিরকালের জন্য সিলগালা হয়ে থাকতে পারে না। পাঠ যখন নতুন যুগে নতুন পাঠকের সামনে আসে, তখন তা নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। ফলে বৈদিক স্তোত্রগুলোকে কেবল প্রাচীন পুরোহিতদের সম্পত্তি হিসেবে না দেখে সেগুলোকে বর্তমানের সমালোচনামূলক চোখের সামনে মেলে ধরা সম্ভব হয়।
দিগন্তের এই সংমিশ্রণ কোনো ধর্মতাত্ত্বিক আপস নয়। এটি মূলত একটি পাঠের অভ্যন্তরীণ সম্ভাবনাকে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সাথে মিলিয়ে বোঝার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস। প্রাচীন কবির সামাজিক অবস্থান এবং আধুনিক গবেষকের ধর্মনিরপেক্ষ অনুসন্ধিৎসার সংঘাত থেকেই উন্মোচিত হয় পাঠটির নানা না-বলা কথা। ঋগ্বেদের মতো আড়াই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো একটি সাহিত্য সংকলন যখন আধুনিক অ্যাকাডেমিক পরিসরে পঠিত হয়, তখন ঐতিহ্যের এই দ্বান্দ্বিক রূপটি খুব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। এখানে প্রাচীন দিগন্তটি আধুনিকের ওপর জোর করে চেপে বসে না, আবার আধুনিক পাঠকও প্রাচীন পাঠের স্বাতন্ত্র্যকে মুছে দেন না; বরং উভয়ের টানাপোড়েনেই একটি বস্তুনিষ্ঠ বোঝাপড়া তৈরি হয়।
অক্ষসূক্তের আদি দিগন্ত ও ব্রোঞ্জযুগের সামাজিক বাস্তবচিত্র (Original Horizon of the Akṣa Sūkta and Bronze Age Social Reality)
ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের চৌত্রিশতম সূক্তটি পরিচিত অক্ষসূক্ত (Akṣa Sūkta) বা দ্যূতক্রীড়াকারীর বিলাপ হিসেবে। এটি ঋগ্বেদের অত্যন্ত ব্যতিক্রমী একটি রচনা, কারণ এখানে কোনো দেবতাকে তুষ্ট করার জন্য গতানুগতিক স্তুতি গাওয়া হয়নি। আর্থার অ্যান্থনি ম্যাকডোনেল তার অনুবাদ ও ব্যাকরণগত বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, সূক্তটিতে চোদ্দটি শ্লোক রয়েছে এবং পুরো বয়ানটি গড়ে উঠেছে পাশা খেলায় সর্বস্বান্ত হওয়া এক হতভাগ্য মানুষের আত্মকথনকে কেন্দ্র করে (Macdonell, 1917)। কভীতক গাছের বাদামি ফল দিয়ে তৈরি পাশা কীভাবে একজন মানুষকে সম্মোহিত করে এবং ধীরে ধীরে তাকে পরিবার, সমাজ ও অর্থনৈতিক ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তার নিখুঁত বর্ণনা রয়েছে এই স্তোত্রে। এই পাঠটির আদি দিগন্তকে বুঝতে হলে তৎকালীন ব্রোঞ্জ ও প্রাথমিক লৌহযুগের বস্তুগত সংস্কৃতিকে বিবেচনায় নিতে হবে।
রামশরণ শর্মা প্রাচীন ভারতের উপাদান সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনায় দেখিয়েছেন যে ঋগ্বেদের শেষ পর্ব ছিল যাযাবর পশুপালন থেকে স্থায়ী কৃষিনির্ভর সমাজে উত্তরণের এক জটিল ক্রান্তিকাল (Sharma, 1983)। অক্ষসূক্তের ঐতিহাসিক দিগন্তটি ঠিক এই অর্থনৈতিক রূপান্তরের টানাপোড়েনকে ধারণ করে আছে। জুয়া খেলা কেবল কোনো ব্যক্তিগত বিনোদন ছিল না; আদিম সমাজে এটি প্রায়ই যুক্ত ছিল গোষ্ঠীর সম্পদ পুনর্বণ্টন এবং ভাগ্য পরীক্ষার এক বিপজ্জনক আচারের সাথে। অক্ষসূক্তের বক্তা বর্ণনা করছেন, কীভাবে পাশাগুলোর মায়াবী আকর্ষণ তাকে ঘরের বাইরে টেনে নিয়ে যায়। সে নিজের চোখেই দেখছে তার স্ত্রীর স্নেহময়ী রূপ, যার সাথে তার কখনোই কোনো বিরোধ ছিল না; অথচ পাশার চালের এক উন্মাদনায় সে নিজের স্ত্রীকে পর্যন্ত বাজি রেখে বসে এবং ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
এই সূক্তে তৎকালীন সমাজের পারিবারিক ও আইনি কাঠামোর যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা অত্যন্ত স্পষ্ট। পরিবার ছিল কঠোরভাবে পিতৃসূত্রীয় (Patrilineal) এবং পিতৃতান্ত্রিক (Patriarchal)। জুয়াড়ি যখন নিঃস্ব হয়ে যায়, তখন তার পরিবারের সদস্যরা তাকে অস্বীকার করে। শ্লোকে জুয়াড়ি আর্তনাদ করে বলছে, তার মা তাকে আর নিজের ছেলে বলে স্বীকার করতে চান না, শ্বশুর তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন এবং সমাজের কেউই এই পরাজিত মানুষকে আশ্রয় বা ঋণ দিতে চায় না। প্রাচীন এই যাযাবর ও আধা-কৃষিভিত্তিক সমাজে ব্যক্তির মর্যাদা নির্ভর করত তার গবাদি পশু এবং পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষমতার ওপর। জুয়া খেলায় হেরে যখন একজন মানুষ তার সমস্ত পশু হারাত, তখন সে কার্যত সমাজের চোখে একটি অচল ও অবাঞ্ছিত প্রাণীতে পরিণত হতো।
অক্ষসূক্তের আদি দিগন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দাসত্বের ভয়। স্তোত্রে পরিষ্কার উল্লেখ আছে, ঋণের দায়ে জুয়াড়িকে অন্যরা বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে এবং তার স্ত্রী অন্য পুরুষের অধীন হয়ে পড়ছে। জন ব্রাফ তার বৈদিক সমাজসংক্রান্ত গবেষণায় প্রাচীন আর্যভাষী গোত্রগুলোর ভেতরের ঋণ ও সামাজিক শৃঙ্খলার বিষয়টি বিশদভাবে খতিয়ে দেখেছেন (Brough, 1953)। প্রাচীন সেই সমাজে মুদ্রা ব্যবস্থা ছিল না; ফলে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য অথবা শারীরিক শ্রম দিয়ে ঋণ শোধ করতে হতো। জুয়া খেলার পরাজয় মানুষকে সরাসরি ঋণদাসত্ব বা স্থায়ী দারিদ্র্যের মুখে ঠেলে দিত। সুতরাং, অক্ষসূক্ত কোনো অলৌকিক দেব-মহিমার গান নয়; এটি ব্রোঞ্জযুগের উত্তর-পশ্চিম ভারতের একটি তীব্র বৈষয়িক সংকট এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলার সরাসরি ভাষিক প্রকাশ।
ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় ভাষ্য ও যাজকীয় পাঠের সীমাবদ্ধতা (Traditional Indian Commentaries and Limits of Priestly Reading)
প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যের যে দীর্ঘ ব্যাখ্যা-ঐতিহ্য ভারতবর্ষে গড়ে উঠেছিল, তা অক্ষসূক্তের মতো বাস্তববাদী রচনাকে এক বিশেষ সংকটে ফেলে দিয়েছিল। বৈদিক শাস্ত্রের আনুষ্ঠানিক পণ্ডিতরা বিশ্বাস করতেন, বেদের প্রতিটি শ্লোকের একমাত্র কাজ হলো যজ্ঞের কোনো না কোনো অংশকে নির্দেশ করা। ইয়ান গোন্ডা বৈদিক সাহিত্যের ধারাক্রমের ওপর তার প্রামাণ্য গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে পরবর্তী যুগের ব্রাহ্মণ গ্রন্থ ও সূত্রসাহিত্যে প্রতিটি জাগতিক স্তোত্রকেও যজ্ঞীয় আচারের ছাঁচে ঢালাই করার জোরদার চেষ্টা চলেছে (Gonda, 1975)। এই যাজকীয় দিগন্তের কারণে অক্ষসূক্তের মতো সমাজ-সচেতন ও মর্মস্পর্শী কবিতাকেও পরিণত করা হয়েছিল যজ্ঞের আনুষ্ঠানিক বিধিমালার একটি উপকরণে।
সায়নাচার্যের মতো মধ্যযুগীয় মহান বৈদিক ভাষ্যকার যখন এই সূক্তের ব্যাখ্যা লিখতে বসলেন, তখন তার প্রধান লক্ষ্য ছিল সূক্তটির একটি প্রায়শ্চিত্তমূলক বা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবহার খুঁজে বের করা। যাস্কের নিরুক্ত বা কাত্যায়নের সর্বানুক্রমণীতে দাবি করা হয়েছিল, এই স্তোত্রটির ঋষি হলেন স্বয়ং কবাষ ঐলুষ অথবা একজন অনুতপ্ত জুয়াড়ি, আর এর দেবতা হলেন অক্ষ বা পাশা এবং কৃষি। ঐতিহ্যবাহী পণ্ডিতরা এই সূক্তটিকে পাঠ করতেন এমন এক মন্ত্র হিসেবে, যা পাঠ করলে জুয়া খেলার কুফল থেকে বাঁচা যায় কিংবা শত্রু জুয়াড়িকে পরাজিত করা যায়। অর্থাৎ একটি রক্তমাংসের মানুষের সামাজিক পতনের বাস্তব হাহাকারকে পুরোহিততন্ত্র রূপান্তরিত করল একধরনের আনুষ্ঠানিক মন্ত্রতন্ত্রে।
এই যাজকীয় দিগন্তের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল এর ঐতিহাসিক অন্ধত্ব। পুরোহিতশ্রেণির কাছে সমাজের উৎপাদন সম্পর্কের বদল বা ঋণদাসত্বের রাজনৈতিক অর্থনীতি কোনো আলোচনার বিষয় ছিল না। তারা সবকিছুকে দেখতে চেয়েছিল অলঙ্ঘনীয় মহাজাগতিক নিয়মের অংশ হিসেবে। চার্লস মালামাউদ প্রাচীন ভারতের যজ্ঞভাবনা নিয়ে তার গ্রন্থে স্পষ্ট করেছেন যে বৈদিক আচারবিদরা বাস্তব জগতের সমস্ত বিশৃঙ্খলাকে যজ্ঞের নিখুঁত বিন্যাসের ভেতর বন্দি করে ফেলতে চেয়েছিলেন (Malamoud, 1996)। ফলে অক্ষসূক্তে বর্ণিত জুয়াড়ির গৃহহীন হওয়ার ট্র্যাজেডি ঐতিহ্যবাহী ভাষ্যে পরিণত হলো নিছক একটি সতর্কবার্তায়, যার একমাত্র নিদান হলো কিছু বৈদিক আচার ও দান-দক্ষিণা সম্পন্ন করা।
এই ধরনের ঐতিহ্যবাদী ব্যাখ্যা পাঠটির সামাজিক চরিত্রকে কার্যত ধামাচাপা দেয়। সেখানে সমাজের অসম অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে আঙুল তোলার কোনো সুযোগ ছিল না। ঐতিহ্য দাবি করেছিল, বেদ পাঠ করতে হবে কেবল আত্মিক কল্যাণ বা আচারের শুদ্ধতার জন্য। অথচ অক্ষসূক্তের ভাষা এতটাই প্রত্যক্ষ ও সামাজিক বাস্তবতায় ঠাসা যে তাকে কেবল যজ্ঞের স্তোত্র বলে চালিয়ে দেওয়া কঠিন ছিল। তবুও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যাজকীয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পাঠটির এই বৈষয়িক ও সমালোচনামূলক দিকগুলোকে আড়ালে রাখা হয়েছিল, যাতে বৈদিক সংকলনের নির্বিচার ধর্মীয় আধিপত্য সমাজে অটুট থাকে।
আধুনিক পাঠকের সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিগন্ত (Sociological and Psychological Horizon of the Modern Reader)
একবিংশ শতাব্দীর একজন আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ পাঠক যখন অক্ষসূক্ত পাঠ করতে বসেন, তখন তার চোখের সামনে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দিগন্ত উন্মোচিত হয়। আধুনিক পাঠক কোনো দৈব আশির্বাদ বা প্রায়শ্চিত্তের খোঁজে এই স্তোত্র পড়েন না। তার কাছে এই পাঠটি ধরা দেয় প্রাচীন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং আসক্তির এক অনন্য ঐতিহাসিক কেস-স্টাডি হিসেবে। ফ্রিটস স্টাল আচারের অর্থহীনতা এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আচরণের ওপর গভীর গবেষণা চালিয়ে দেখিয়েছেন যে প্রাচীন আচারগুলোর বহু বিবরণ আসলে তৎকালীন মানবমনের অচেতন তাড়না ও সামাজিক শৃঙ্খলার দ্বন্দ্ব থেকে জন্ম নিয়েছিল (Staal, 1989)। আধুনিক পাঠক অক্ষসূক্তের ভেতরে দেখতে পান জুয়া খেলার মতো একটি বিনাশী আসক্তির নিখুঁত ক্লিনিকাল রূপরেখা।
সূক্তের দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্লোকে জুয়াড়ি যেভাবে পাশার লোভনীয় রূপ বর্ণনা করে, তা আধুনিক আচরণগত মনোবিজ্ঞানের পাঠকদের চমকে দেয়। পাশাগুলোকে বলা হচ্ছে শীতল, অথচ সেগুলো জুয়াড়ির কলিজাকে যেন আগুনে পুড়িয়ে দেয়; সেগুলো হাতহীন, অথচ তাদের হাত আছে এবং তারা মানুষকে পরাভূত করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। একজন আধুনিক পাঠক এখানে কোনো অতিপ্রাকৃত দানবের ছায়া দেখেন না। তিনি দেখেন একজন আসক্ত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিভক্তি, যেখানে মানুষটি নিজের যুক্তি দিয়ে বুঝতে পারছে যে সে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে, অথচ একটি বিশেষ বস্তুর আকর্ষণ সে কোনোভাবেই প্রতিহত করতে পারছে না। আদিম কাব্যের এই মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা আধুনিক মননশীলতার সাথে সরাসরি সংযোগ তৈরি করে।
একই সাথে সমাজতাত্ত্বিক দিগন্ত থেকে আধুনিক পাঠক এখানে প্রাচীন শ্রমব্যবস্থার সংকট দেখতে পান। জুয়াড়ি যখন নিঃস্ব হয়ে নিঃসঙ্গ রাতের অন্ধকারে অপরের বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে এবং অন্যের প্রাচুর্যময় পরিবার দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তখন তা বিচ্ছিন্নতাবোধের এক চরম রূপ তুলে ধরে। ইয়ুর্গেন হাবারমাস তার সামাজিক ক্রিয়াতত্ত্বে যেভাবে বস্তুগত বিচ্ছিন্নতা এবং সামাজিক যোগাযোগের বিকৃতি নিয়ে আলোচনা করেছেন, তার আলোকেই আধুনিক বিশ্লেষক এই দৃশ্যটি পাঠ করেন (Habermas, 1984)। জুয়াড়ি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে কারণ সে সমাজের উৎপাদনশীল কার্যক্রমে অংশ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। যাযাবর শিকারি বা পশুপালক সমাজের অবক্ষয়ের যুগে যারা নতুন কৃষিভিত্তিক শৃঙ্খলার সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেনি, জুয়াড়ি হলো তাদেরই এক করুণ ঐতিহাসিক প্রতিনিধি।
আধুনিক পাঠকের কাছে অক্ষসূক্ত তাই কেবল কোনো অতীত স্মৃতিচিহ্ন নয়। এটি এমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের দলিল, যেখানে মানবজাতি প্রথমবারের মতো তীব্র ব্যক্তি-সংকট ও সম্পত্তির মালিকানা হারানোর ভীতিকে ভাষায় রূপ দিতে শিখেছিল। আধুনিক পাঠক তার সমাজবিজ্ঞান, অপরাধবিজ্ঞান এবং অর্থনীতি বিষয়ক জ্ঞান নিয়ে পাঠটির মুখোমুখি হন। ফলে প্রাচীন যাজকীয় চশমা দিয়ে যে পাঠটিকে নিছক একটি আচারিক মন্ত্র হিসেবে দেখা হয়েছিল, আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ দিগন্তে তা হয়ে ওঠে আদিম যৌথ জীবনের ভাঙন এবং ব্যক্তিস্বার্থের উন্মেষের এক তীব্র সমাজতাত্ত্বিক দলিল।
দুই দিগন্তের মুখোমুখি সাক্ষাৎ ও অক্ষসূক্তের পুনর্ব্যাখ্যা (Face-to-Face Encounter of Two Horizons and Reinterpretation of the Akṣa Sūkta)
অক্ষসূক্তের প্রাচীন দিগন্ত এবং আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ পাঠকের দিগন্ত যখন গাডামারের তত্ত্ব অনুযায়ী পরস্পরের মুখোমুখি হয়, তখনই ঘটে দিগন্তের আসল সংমিশ্রণ। এই সংমিশ্রণের চূড়ান্ত প্রমাণ মেলে সূক্তটির ত্রয়োদশ শ্লোকে। এই শ্লোকে হঠাৎ করেই জুয়াড়িকে উদ্দেশ্য করে এক অমোঘ নির্দেশ দেওয়া হয়: “কৃষিম্ ইত্ কৃষস্ব বিত্তে রমস্ব” – অর্থাৎ জুয়া খেলা বন্ধ করো, কৃষিকাজে মন দাও এবং নিজের শ্রমার্জিত সম্পদে আনন্দ খুঁজে নাও। প্রাচীন যাজকীয় পাঠে এটিকে দেবতার আদেশ হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু আধুনিক পাঠকের ঐতিহাসিক ও বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টি এই শ্লোকটিতে খুঁজে পায় যাযাবর পশুপালন থেকে স্থায়ী কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থায় উত্তরণের এক প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক ফরমান।
পল রিক্যুর তার ব্যাখ্যাতত্ত্বে দেখিয়েছেন যে রূপক ও ভাষার ভেতরে সবসময় একটি অর্থের উদ্বৃত্ত (Surplus of Meaning) লুকিয়ে থাকে, যা লেখকের তাৎক্ষণিক সময়ের চেয়েও অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে (Ricoeur, 1976)। অক্ষসূক্তের ক্ষেত্রে এই কথাটি গভীরভাবে সত্য। কৃষি করার এই আহ্বান কেবল একজন জুয়াড়ির জন্য ব্যক্তিগত উপদেশ নয়; এটি ছিল ব্রোঞ্জযুগের শেষভাগে পুরো সমাজের প্রতি দেওয়া এক ঐতিহাসিক বার্তা। পশুপালনভিত্তিক যাযাবর জীবনে পশুর জন্য যুদ্ধ এবং ভাগ্যের ওপর নির্ভরতা বেশি ছিল। কিন্তু স্থায়ী বসতি স্থাপন এবং কৃষির বিকাশের জন্য প্রয়োজন ছিল নিয়মিত কায়িক শ্রম, স্থিরতা এবং পরিবারের সুরক্ষা। জুয়া খেলা সেই নতুন সামাজিক স্থায়িত্বের জন্য এক মহা হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছিল। তাই জুয়াকে বর্জন করে লাঙল ধরার পরামর্শটি আসলে একটি নতুন উৎপাদন ব্যবস্থার পক্ষে প্রাচীন সমাজের দেওয়া এক প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশ।
দিগন্তের সংমিশ্রণ এখানে পাঠককে বুঝতে সাহায্য করে যে কেন দেবতা সবিতা এসে জুয়াড়িকে গরু ও কৃষিকাজের দিকে ফিরে যেতে বলছেন। প্রাচীন কবির কাছে যা ছিল মহাজাগতিক দেবতার কণ্ঠস্বর, আধুনিক পাঠকের কাছে তা ধরা পড়ে সমাজ-বিবর্তনের অর্থনৈতিক কণ্ঠ হিসেবে। পশুপালক সমাজের অনিশ্চিত ভাগ্যনির্ভরতা ভেঙে যখন কৃষিভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠছে, তখন সমাজকে টিকে থাকতে হলে প্রতিটি হাতকে উৎপাদনে যুক্ত করতে হবে। জুয়াড়ি ছিল সেই উৎপাদনহীনতার প্রতীক। তাকে জমিতে ফিরিয়ে আনার এই আহ্বানটি প্রাচীন বাস্তবতার একটি রূপ, যা আজকের শ্রম ও অর্থনীতির ইতিহাসের সাথে অনায়াসে যুক্ত হয়ে যায়।
এই মুখোমুখি সাক্ষাৎ বৈদিক সাহিত্যের তথাকথিত আধ্যাত্মিক একচেটিয়া ভাবমূর্তিকে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে দেয়। ঐতিহ্যবাদীরা যে বেদকে কেবল মোক্ষ বা পরলোকের পথপ্রদর্শক বলে দাবি করে থাকেন, অক্ষসূক্তের আধুনিক সংমিশ্রণমূলক পাঠ দেখায় যে বৈদিক মানুষের সবচেয়ে গভীর উদ্বেগগুলো ছিল অত্যন্ত জাগতিক। সেখানে পেটের ভাত, পরিবারের নিরাপত্তা, ঋণের দায় থেকে মুক্তি এবং জমির অধিকার ছিল প্রধান জিজ্ঞাসা। গাডামারের মডেল অনুসরণ করে আধুনিক পাঠক প্রাচীন কবির এই হাহাকারকে নিজের বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধিৎসার সাথে মিলিয়ে নেন। ফলে পাঠটি কোনো আকাশকুসুম অতিন্দ্রীয় সত্যের বদলে রক্তমাংসের মানুষের অর্থনৈতিক বাঁকবদলের ইতিহাস হয়ে ওঠে।
অতীন্দ্রিয়তামুক্ত হার্মেনিউটিক্স ও বৈদিক সাহিত্যের বস্তুমুখী সম্ভাবনা (Demystified Hermeneutics and Material Possibilities of Vedic Literature)
গাডামারের হার্মেনিউটিক্যাল পদ্ধতির চূড়ান্ত পরিণতি হলো পাঠকে যেকোনো ধরনের ধর্মীয় অন্ধত্ব ও অলৌকিক মহিমা থেকে মুক্ত করে একটি গতিশীল ঐতিহাসিক সংলাপে রূপান্তরিত করা। জে. সি. হিস্টারম্যান ভারতীয় ঐতিহ্যের ভেতরের দ্বন্দ্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে বৈদিক সাহিত্যে সবসময়ই দুটি পরস্পরবিরোধী স্রোত ক্রিয়াশীল ছিল – একদিকে যাযাবর জীবনের অবাধ সংঘাত ও উন্মুক্ততা, অন্যদিকে যজ্ঞের মাধ্যমে সবকিছুকে কঠোর নিয়মে বাঁধার যাজকীয় প্রয়াস (Heesterman, 1985)। অক্ষসূক্তের মতো পাঠগুলো এই দ্বিতীয় ধারার কঠোর নিয়ন্ত্রণকে ভেঙে প্রথম ধারার রক্তাক্ত সামাজিক বাস্তবতাকে সামনে এনে দেয়। যখন আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ গবেষক এই সাহিত্য অধ্যয়ন করেন, তখন তিনি ঐতিহ্যের এই অন্তর্নিহিত সংঘাতকে স্পষ্টভাবে দেখতে পান।
বৈদিক সাহিত্যের বস্তুনিষ্ঠ পাঠ দুটি বিপরীতমুখী বিভ্রান্তি থেকে আমাদের রক্ষা করে। এক প্রান্তে রয়েছে ঐতিহ্যবাদী ও হিন্দুত্ববাদী পাঠ, যা বৈদিক সংকলনকে বিজ্ঞানের সমস্ত আবিষ্কারের আদি উৎস এবং অপৌরুষেয় ঐশ্বরিক সত্য বলে দাবি করে। অন্য প্রান্তে রয়েছে ঔপনিবেশিক বা অগভীর আধুনিক পাঠ, যা একে নিছক কিছু বর্বর পশুপালকের অবোধ্য প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিতে চায়। গাডামারের দিগন্তের সংমিশ্রণ এই দুই চরমপন্থার বাইরে গিয়ে একটি সুষম ও গভীর ঐতিহাসিক পথ তৈরি করে। এটি স্বীকার করে যে বৈদিক সাহিত্য মানবজাতির সাংস্কৃতিক শৈশবের এক অমূল্য ভাষিক দলিল, তবে এর মধ্যে কোনো অলৌকিক বা সার্বজনীন মুক্তির সূত্র নেই। এটি মূলত টিকে থাকার লড়াইয়ে লিপ্ত কিছু প্রাচীন মানুষের অভিজ্ঞতা, মতাদর্শ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের চিত্র।
অক্ষসূক্তের পুনর্পাঠ দেখায় যে হার্মেনিউটিক্স কেবল তাত্ত্বিক বিলাসিতা নয়; এটি ইতিহাসের নতুন পাঠোদ্ধারের একটি কার্যকর পদ্ধতি। প্রাচীন যাযাবর কবির অনুভূতির সাথে আধুনিক পাঠকের সমাজতাত্ত্বিক চেতনার মিলনের ফলে অক্ষসূক্ত আর কোনো আচারের মন্ত্র থাকে না। এটি হয়ে ওঠে মানুষের আসক্তি, অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা এবং যাযাবর সমাজ থেকে কৃষিজীবী সমাজে রূপান্তরের এক মর্মস্পর্শী নাটক। এখানে প্রাচীন কবির অসহায়ত্ব আধুনিক মানুষের পুঁজিবাদী বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতার সাথে এক অদ্ভুত ঐতিহাসিক সাদৃশ্য তৈরি করে, যা পাঠকের ঐতিহাসিক বোধকে আরও শাণিত করে।
পরিশেষে বলা যায়, বৈদিক সাহিত্যকে কোনো পবিত্র সিংহাসনে বসিয়ে পূজা করার দরকার নেই, আবার তাকে অবহেলা করে ইতিহাসের ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ারও কোনো যুক্তি নেই। গাডামারের দিগন্তের সংমিশ্রণ আমাদের শেখায় কীভাবে একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও আপাত-দুর্বোধ্য সংকলনকে সমালোচনামূলক আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে হয়। বৈদিক ঋষিদের ভয়, আকাঙ্ক্ষা, শ্রেণি-স্বার্থ এবং তাদের চারপাশের রুক্ষ মাটির গন্ধ যখন আধুনিক বস্তুনিষ্ঠ বিজ্ঞানের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়, তখনই প্রাচীন সাহিত্যের প্রকৃত ঐতিহাসিক মূল্য উন্মোচিত হয়। অপৌরুষেয়তার মোহমুক্ত এই বস্তুমুখী পাঠই পারে বৈদিক সাহিত্যকে আধুনিক জ্ঞানচর্চার একটি উর্বর এবং উদ্দীপক ক্ষেত্রে পরিণত করতে।
হির্শ ও অর্থের ঐতিহাসিক পরিবর্তন (Hirsch and Historical Change of Meaning): মূল অর্থ ও পরবর্তী ধর্মীয় তাৎপর্য
অর্থ ও তাৎপর্যের দ্বৈততা: হির্শের তাত্ত্বিক কাঠামো (Duality of Meaning and Significance: Hirsch’s Theoretical Framework)
সাহিত্যতত্ত্ব ও ব্যাখ্যাবিদ্যার জগতে যখন উত্তর-আধুনিক আপেক্ষিকতাবাদ প্রবল হয়ে উঠেছিল, তখন আমেরিকান সাহিত্যতাত্ত্বিক এরিক ডোনাল্ড হির্শ জুনিয়র (E. D. Hirsch Jr.) একটি অত্যন্ত কঠোর ও পদ্ধতিগত অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি তার প্রভাবশালী গ্রন্থ ভ্যালিডিটি ইন ইন্টারপ্রিটেশন (Validity in Interpretation)-এ দেখান যে পাঠের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যদি কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা না থাকে, তবে ব্যাখ্যাচর্চা শেষ পর্যন্ত নৈরাজ্যে পর্যবসিত হয় (Hirsch, 1967)। হির্শের মতে, ব্যাখ্যার আলোচনাকে স্পষ্ট করতে হলে দুটি ধারণার মধ্যে পরিষ্কার বিভাজন রেখা টানতে হবে। একটি হলো অর্থ (Meaning) এবং অন্যটি হলো তাৎপর্য (Significance)। এই দুটি ধারণাকে গুলিয়ে ফেলাই ক্যানোনিকাল বা ধর্মীয় সাহিত্যের পর্যালোচনায় যাবতীয় বিভ্রান্তির জন্ম দেয়।
হির্শের তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো পাঠের অর্থ হলো রচয়িতা তার লেখার মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে যা বোঝাতে চেয়েছিলেন। এই অর্থ লেখক কর্তৃক নির্ধারিত এবং তা ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের ভাষিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর সাথে আবদ্ধ থাকে। একে তিনি নাম দিয়েছেন লেখকের অভিপ্রায় (Authorial Intent)। লেখক যখন কোনো বাক্য লেখেন, তখন তার মনের ভাবটি একটি নির্দিষ্ট ব্যাকরণগত ও সামাজিক পরিমণ্ডলে রূপ নেয়। হির্শ জোর দিয়ে বলেন, কোনো পাঠের এই আদি অর্থ সময়ের সাথে সাথে কখনোই পরিবর্তিত হয় না (Hirsch, 1976)। যে জিনিসটি স্থির এবং অপরিবর্তনীয়, কেবল সেটাই কোনো ব্যাখ্যার সঠিকতা যাচাইয়ের একমাত্র বৈধ মানদণ্ড হতে পারে। আদি অর্থ যদি সময়ের স্রোতে বদলে যেতে থাকে, তবে সত্য-মিথ্যার ভেদরেখাই মুছে যায়।
বিপরীতভাবে তাৎপর্য ধারণাটি সম্পূর্ণ আলাদা। তাৎপর্য হলো কোনো স্থির অর্থের সাথে অন্য কোনো নতুন পরিস্থিতি, কোনো ব্যক্তি বা পরবর্তী ঐতিহাসিক যুগের তৈরি হওয়া সম্পর্ক। কোনো একটি টেক্সটের আদি অর্থ অপরিবর্তিত থেকেও তার তাৎপর্য যুগে যুগে বদলে যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রাচীন কোনো রচয়িতা হয়তো খরা থেকে বাঁচার জন্য একটি প্রার্থনা লিখেছিলেন; সেই আদি অর্থটি সেখানে অপরিবর্তিত থাকে। কিন্তু পরবর্তীকালের এক রাজা হয়তো সেই একই লেখাকে যুদ্ধজয়ের মন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করলেন। এখানে টেক্সটটির অর্থ বদলায়নি, বদলে গেছে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার ব্যবহারিক প্রয়োগ বা তাৎপর্য।
হির্শ দেখিয়েছেন, ব্যাখ্যাকাররা যখন এই পার্থক্যের কথা ভুলে যান, তখন তারা নিজেদের যুগের তাৎপর্যকে প্রাচীন পাঠটির ওপর জোর করে চাপিয়ে দেন। তারা দাবি করতে শুরু করেন যে প্রাচীন রচয়িতা আসলে তাদের সমকালের কথাই বলতে চেয়েছিলেন। বৈদিক সাহিত্যের হাজার বছরের ইতিহাসে ঠিক এই ঘটনাটিই নিয়মিতভাবে ঘটেছে। প্রাচীন যাযাবর চারণকবিদের রচিত স্তোত্রগুলোর যে নিজস্ব বস্তুগত অভিপ্রায় ছিল, পরবর্তী ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলো তাকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলে নিজেদের সুবিধাজনক আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যকে বেদের আদি অর্থ বলে চালিয়ে দিয়েছে। হির্শের এই দ্বৈত কাঠামো বৈদিক সাহিত্যের সেই দীর্ঘ মতাদর্শিক কারসাজিকে উন্মোচন করার এক মোক্ষম হাতিয়ার।
বৈদিক রচয়িতার ঐতিহাসিক অভিপ্রায় ও বৈষয়িক অর্থ (Historical Intent of Vedic Composers and Material Meaning)
ঋগ্বেদের প্রাচীনতম মণ্ডলগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানকার স্তোত্রগুলোর রচয়িতা ছিলেন কিছু নির্দিষ্ট পুরোহিত পরিবার ও চারণকবি। এদের মধ্যে বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র, ভরদ্বাজ বা বামদেবের মতো পরিবারের নাম পাওয়া যায়। এই কবিদের ঐতিহাসিক অভিপ্রায়টি কী ছিল? থিওডোর এন. প্রোফেরেস প্রাচীন সার্বভৌমত্ব ও ক্ষমতার কাব্যতত্ত্ব নিয়ে গবেষণায় দেখিয়েছেন যে বৈদিক স্তোত্রগুলো মূলত রচিত হয়েছিল তৎকালীন উপজাতীয় প্রধানদের সঙ্গে পুরোহিতদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আঁতাতকে সুসংহত করার জন্য (Proferes, 2007)। যাযাবর বা আধা-কৃষিজীবী সমাজের কবিরা কোনো বিমূর্ত পরলৌকিক মুক্তির আশায় গান বাঁধেননি। তাদের রচনার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত জাগতিক।
এই আদি অভিপ্রায়ের সবচেয়ে নগ্ন রূপ দেখা যায় ঋগ্বেদের দানস্তুতি (Dānastuti) স্তোত্রগুলোতে। সেখানে কবিরা মুক্তকণ্ঠে বর্ণনা করছেন, কোন রাজা বা গোত্রপ্রধান তাদের যজ্ঞের বিনিময়ে কত হাজার গরু, ঘোড়া, রথ কিংবা নারী দাসী উপহার দিয়েছেন। লরি এল. প্যাটনের গবেষণা থেকে দেখা যায়, প্রাথমিক বৈদিক স্তোত্রগুলোর কেন্দ্রীয় কাজ ছিল ব্যবহারিক ও কার্যকারণমুখী, যেখানে দেবতাদের আহ্বান করা হতো নির্দিষ্ট পার্থিব লেনদেনের অংশ হিসেবে (Patton, 2005)। স্তোত্রগুলোতে ইন্দ্রের কাছে প্রার্থনা করা হচ্ছে যেন তিনি প্রতিপক্ষের গবাদি পশু ছিনিয়ে আনতে সাহায্য করেন, অগ্নির কাছে চাওয়া হচ্ছে বিপুল বংশবৃদ্ধি এবং সোমরসের বিনিময়ে মরুৎদের কাছে চাওয়া হচ্ছে তীব্র বজ্রপাতের শক্তি।
এই বাস্তবতায় বৈদিক কবির ভাষার অর্থটি ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও পার্থিব। শ্লোকে যখন জল, গাভী বা ঘোড়ার কথা বলা হতো, তখন কবিরা জল দিয়ে সেচের জল বা পানীয় জলই বোঝাতেন, আর গাভী দিয়ে বোঝাতেন চারপেয়ে দুগ্ধবতী পশুকে। সেখানে কোনো অদৃশ্য পরব্রহ্ম বা অতীন্দ্রিয় চেতনার গোপন সংকেত ছিল না। হির্শের পরিভাষা ব্যবহার করে বললে, এই স্তোত্রগুলোর আদি অর্থ নির্ধারিত হয়েছিল ব্রোঞ্জযুগের শেষভাগের উত্তর-পশ্চিম ভারতের যুদ্ধবিগ্রহ, পশুপালন এবং গোত্রভিত্তিক ক্ষমতা দখলের ঐতিহাসিক বাস্তবতার ভেতর দিয়ে। কবি যা লিখেছিলেন, তিনি ঠিক সেটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন; তার অতিরিক্ত কোনো অতিলৌকিক তত্ত্ব সেখানে লুকিয়ে ছিল না।
বৈদিক কবিরা নিজেদের একটি বিশেষ শ্রেণির মুখপাত্র হিসেবে দেখতেন। তারা সমাজের অন্যান্য অনার্য বা প্রতিপক্ষ গোত্রকে দাস, দস্যু বা পণিদের মতো নানা নিন্দাসূচক নামে ডাকতেন। তাদের লক্ষ্য ছিল নিজ গোত্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা। ফলে তাদের স্তোত্রের অর্থ কোনো সার্বজনীন আধ্যাত্মিক বাণী ছিল না; তা ছিল একটি বিশেষ গোষ্ঠীর বস্তুগত অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার হিংস্র ও প্রত্যক্ষ প্রয়াস। পরবর্তী যুগের ধর্মতত্ত্ববিদরা যখন এই রক্তমাংসের কাব্যগুলোকে স্বর্গীয় শান্তি ও বিশ্বপ্রেমের বাণীতে রূপান্তর করতে চান, তখন তারা মূলত বৈদিক কবির মূল অভিপ্রায়কে পুরোপুরি বিকৃত করেন।
অর্থ থেকে তাৎপর্যে রূপান্তর: পরবর্তী যাজকীয় রূপায়ণ (Shift from Meaning to Significance: Subsequent Priestly Reconfiguration)
বৈদিক সাহিত্য যখন উত্তর-পশ্চিম ভারতের শুষ্ক সমভূমি পেরিয়ে পূর্বদিকে গাঙ্গেয় উপত্যকার আর্দ্র অঞ্চলে প্রবেশ করল, তখন সমাজের চেহারা নাটকীয়ভাবে বদলে গেল। যাযাবর পশুপালনের জায়গা নিল স্থায়ী ধান চাষ এবং লৌহপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার। জোহানেস ব্রঙ্কহর্স্ট তার গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে বৃহত্তর মগধ এবং পূর্ব ভারতের সম্পূর্ণ ভিন্ন সাংস্কৃতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে বৈদিক ঐতিহ্য নিজেকে নতুন করে পুনর্গঠন করতে বাধ্য হয়েছিল (Bronkhorst, 2007)। এই নতুন ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে প্রাচীন পশুপালক স্তোত্রগুলোর মূল উপযোগিতা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। কারণ নতুন সমাজে আর প্রতিদিন গরু লুটের যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল না; সেখানে প্রয়োজন ছিল স্থায়ী রাষ্ট্রযন্ত্র, কর আদায় এবং বর্ণভিত্তিক সামাজিক বিভাজন টিকিয়ে রাখা।
ঠিক এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে বৈদিক সাহিত্যের আদি অর্থ থেকে তার পরবর্তী যাজকীয় তাৎপর্যে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। উত্তর-বৈদিক যুগের পুরোহিতরা সংহিতার স্তোত্রগুলোকে নিয়ে ব্রাহ্মণ সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করলেন। সেখানে প্রাচীন যুদ্ধগীতির প্রতিটি লাইনকে একটি বিশাল, ব্যয়বহুল ও জটিল যজ্ঞের নিখুঁত বিধিমালার সাথে যুক্ত করে দেওয়া হলো। জে. এ. বি. ভ্যান বুইটেনেন তার সোমযজ্ঞ ও প্রবর্গ্য সংক্রান্ত গবেষণায় দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রাথমিক যুগের সাধারণ দুগ্ধপান বা পশুবলির আচারগুলো পরবর্তীকালে রাজকীয় ক্ষমতার বৈধতা আদায়ের নাটুকে মহাযজ্ঞে রূপান্তরিত হয়েছিল (van Buitenen, 1968)। স্তোত্রটি কেন রচিত হয়েছিল সেই ইতিহাসকে পুরোপুরি মুছে ফেলা হলো; তার বদলে স্তোত্রটিকে যজ্ঞবেদীর কোন কোণে বসে কীভাবে উচ্চারণ করতে হবে, সেটাই হয়ে উঠল একমাত্র বিবেচ্য বিষয়।
এই প্রক্রিয়ায় আদি বৈদিক কবিদের অভিপ্রায়কে কার্যত নির্বাসনে পাঠানো হয়। সংহিতার পার্থিব আকাঙ্ক্ষার গানগুলো ব্রাহ্মণ সাহিত্যের ভেতর এসে পরিণত হলো এক মহাজাগতিক রূপকে। বলা হতে লাগল, যজ্ঞের পুরোহিত যদি একটি শব্দও ভুল উচ্চারণ করেন, তবে মহাবিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। আদি যাযাবর সমাজের সীমিত সম্পদ বণ্টনের গানগুলো পরিণত হলো এক স্থায়ী সামাজিক সুবিধাভোগী শ্রেণির চিরস্থায়ী সনদপত্রে। হির্শের পরিভাষায়, এটি অর্থের পরিবর্তন নয়; এটি হলো একটি বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক শ্রেণির দ্বারা পাঠটির ওপর সম্পূর্ণ নতুন একটি তাৎপর্য আরোপ করা।
ব্রাহ্মণ সাহিত্যের এই যাজকীয় প্রকল্প প্রমাণ করে যে ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে ক্যানোনিকাল পাঠের তাৎপর্য কীভাবে বদলে যায়। যে মন্ত্রগুলো একদা গোত্রপ্রধানের দান করা পশুর সংখ্যা গুনত, পরবর্তীকালে সেগুলোকেই রাজসূয় বা অশ্বমেধ যজ্ঞে রাজার সার্বভৌম ক্ষমতার ঐশ্বরিক প্রতীক হিসেবে পাঠ করা হতে লাগল। পুরোহিতরা নিজেদের যজ্ঞীয় একচেটিয়া অধিকার কায়েম রাখার জন্য এই রূপান্তরটি ঘটিয়েছিলেন। ফলে সাধারণ মানুষের চোখে বৈদিক ভাষা তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হারিয়ে এক দুর্ভেদ্য, অলৌকিক এবং ভীতিপ্রদ ক্ষমতার প্রতীকে পরিণত হলো।
অপৌরুষেয়তার মতাদর্শ ও অভিপ্রায়ের উচ্ছেদ (Ideology of Apauruṣeyatva and the Erasure of Authorial Intent)
বৈদিক সাহিত্যের ঐতিহাসিক রূপান্তর প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে দূরভিসন্ধিমূলক তাত্ত্বিক পদক্ষেপটি নিয়েছিল প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের মীমাংসা (Mīmāṃsā) ধারা। মীমাংসক পণ্ডিতরা বুঝতে পেরেছিলেন, যদি স্বীকার করা হয় যে বৈদিক স্তোত্রগুলো কোনো সাধারণ মানুষ বা কবির রচনা, তবে সেই পাঠের ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়ে যাবে। বারবারা এ. হোল্ড্রেজ বৈদিক এবং ইহুদি শাস্ত্রের তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন যে মীমাংসকরা কীভাবে টেক্সটটিকে মানব ইতিহাসের ঊর্ধ্বে তুলে নিয়ে একটি চিরন্তন সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন (Holdrege, 1996)। এই মতাদর্শের নামই হলো অপৌরুষেয়তা (Apauruṣeyatva) – অর্থাৎ বেদের কোনো প্রণেতা নেই, ঈশ্বরও এর রচয়িতা নন; বেদ হলো অনাদি ও অনন্তকাল ধরে বিদ্যমান এক পরম শব্দরাশি।
হির্শের তত্ত্ব দিয়ে বিচার করলে দেখা যায়, অপৌরুষেয়তার এই মতাদর্শটি আসলে লেখকের অভিপ্রায়কে চিরতরে মুছে ফেলার একটি নিখুঁত দার্শনিক অস্ত্র। যদি কোনো রচয়িতাই না থাকেন, তবে তার ঐতিহাসিক অভিপ্রায় খোঁজার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। রচয়িতাকে অস্বীকার করার মাধ্যমে মীমাংসকরা বৈদিক পাঠকে তার প্রাচীন ব্রোঞ্জযুগের সামাজিক বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন। এর ফলে টেক্সটটি পরিণত হলো একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও প্রেক্ষাপটহীন শব্দজালে। আর টেক্সটকে যখন তার মূল ঐতিহাসিক মাটি থেকে উপড়ে ফেলা হয়, তখন সুবিধাভোগী ব্যাখ্যাকাররা নিজেদের ইচ্ছামতো তার যে কোনো তাৎপর্য তৈরি করার অবাধ লাইসেন্স পেয়ে যান।
মীমাংসকরা দাবি করলেন, বেদের প্রতিটি শব্দের অর্থ নিত্য বা চিরস্থায়ী। কিন্তু বাস্তবে তারা যা করলেন তা হলো, তৎকালীন পিতৃতান্ত্রিক ও বর্ণবাদী সমাজের সুযোগ-সুবিধাগুলোকে সেই নিত্যতার নামে চিরস্থায়ী রূপ দিলেন। উদাহরণস্বরূপ, বৈদিক স্তোত্রের ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোকে তারা কাল্পনিক বা রূপক বলে উড়িয়ে দিলেন। ঐতিহাসিক রাজা সুদাস বা দিবোদাস হয়ে উঠলেন কোনো বিশেষ যজ্ঞীয় গুণের প্রতীক। ইতিহাসকে অস্বীকার করার এই কৌশল যাজকশ্রেণিকে এমন এক ক্ষমতা দিল, যার মাধ্যমে তারা যেকোনো সমকালীন বৈষম্যমূলক অনুশাসনকে বেদের পরম অনুশাসন বলে দাবি করতে পারত।
এই দার্শনিক কৌশলের ফলে বৈদিক সাহিত্যের মূল অর্থ পুরোপুরি ধামাচাপা পড়ে গেল পরবর্তী ধর্মীয় তাৎপর্যের আড়ালে। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করল যে বৈদিক শব্দগুলো মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে থেকেই মহাশূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছিল। লেখককে হত্যা করার এই প্রাচীন প্রয়াসটি আধুনিক উত্তরাধুনিক পাঠ-তত্ত্বের চেয়েও অনেক বেশি রাজনৈতিক ছিল। কারণ এর একমাত্র লক্ষ্য ছিল বেদের যাজকীয় ব্যাখ্যাকারদের বাইরে অন্য কারো কোনো প্রশ্ন তোলার অধিকারকে আইনি ও দার্শনিক উপায়ে রুদ্ধ করে দেওয়া।
আধুনিক পুনরুজ্জীবনবাদ ও রাজনৈতিক তাৎপর্যের নির্মাণ (Modern Revivalism and Construction of Political Significance)
উনিশ শতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রেক্ষাপটে বৈদিক সাহিত্যের ওপর আরেক দফা নতুন তাৎপর্য আরোপের জোয়ার আসে। ভারতের আধুনিক পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনগুলো, বিশেষ করে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী প্রতিষ্ঠিত আর্য সমাজ, বৈদিক সাহিত্যকে এমন একভাবে পাঠ করতে শুরু করল যার সাথে প্রাচীন ইতিহাসের কোনো দূরতম সম্পর্কও ছিল না। জে. ই. ললেভিলিন আর্য সমাজের ব্যাখ্যাতাত্ত্বিক কাঠামোর বিশদ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে তারা মূলত আধুনিক পশ্চিমা বিজ্ঞানের সাথে প্রতিযোগিতায় নামার জন্য বেদকে একটি মৌলিক ধর্মগ্রন্থের মতো ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন (Llewellyn, 1993)। দয়ানন্দ দাবি করলেন, চার বেদের মধ্যে কোনো বহুদেববাদ নেই, কোনো মূর্তিপূজা নেই, এমনকি সেখানে বাষ্পীয় ইঞ্জিন ও টেলিগ্রাফের প্রযুক্তির ইঙ্গিতও নাকি লুকিয়ে আছে।
এই ধরনের ব্যাখ্যা হির্শের নির্দেশিত বিভ্রান্তির এক চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত। বৈদিক যাযাবর কবিরা যখন আগুনের শিখা দেখে অগ্নিকে বন্দনা করেছিলেন, তখন তাদের কল্পনায় কোনো আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি বা উনবিংশ শতাব্দীর জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রচেতনা ছিল না। কিন্তু আধুনিক পুনরুজ্জীবনবাদীরা ঔপনিবেশিক হীনম্মন্যতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বৈদিক পাঠের ওপর আধুনিক বিজ্ঞানের তাৎপর্য আরোপ করলেন এবং তাকেই বেদের আদি ও আসল অর্থ বলে প্রচার করলেন। তারা বৈদিক মাংসাহার বা গোমেধ যজ্ঞের স্পষ্ট উল্লেখগুলোকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে শুরু করলেন। ইতিহাসবিদ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঝা প্রাচীন ভারতে খাদ্যাভ্যাসের ঐতিহাসিক প্রমাণাদি ঘেঁটে দেখিয়েছেন যে বৈদিক সাহিত্যে গোমাংস ভক্ষণ ছিল একটি সাধারণ ও সুপ্রতিষ্ঠিত সামাজিক সত্য (Jha, 2002)। অথচ আধুনিক রাজনৈতিক তাৎপর্যের প্রয়োজনে সেই বাস্তব অর্থকে রূপক বলে অস্বীকার করে একটি পবিত্র নিরামিষাশী মিথ গড়ে তোলা হলো।
এই আধুনিক তাৎপর্য নির্মাণের পেছনে কাজ করেছিল সমকালীন জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। বৈদিক যুগকে একটি স্বর্ণযুগ হিসেবে তুলে ধরার প্রবল ইচ্ছা থেকে সমস্ত নেতিবাচক ঐতিহাসিক সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া হলো। বৈদিক সমাজে দাসদের প্রতি যে নৃশংস আচরণ করা হতো, কিংবা নারীদের যেভাবে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে কঠোর পিতৃতন্ত্রে আবদ্ধ রাখা হতো, সেই ঐতিহাসিক সত্যগুলোকে পাশ কাটিয়ে দাবি করা হলো যে বৈদিক সমাজ ছিল সাম্য ও প্রগতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ফলে প্রাচীন পশুপালক সমাজের অমার্জিত ও আদিম যুদ্ধোন্মাদনার টেক্সটগুলো আধুনিক হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পবিত্র ইশতেহারে পরিণত হলো।
হির্শ আমাদের স্পষ্ট সতর্ক করে দেন যে কোনো টেক্সটের সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা থাকতেই পারে, কিন্তু সেই প্রাসঙ্গিকতাকে আদি অর্থ বলে চালালে তা হয় বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতারণা। আর্য সমাজ বা পরবর্তী হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ঠিক এই কাজটিই করেছে। তারা নিজেদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে প্রাচীন ঋষিদের মুখে বসিয়ে দিয়েছে। বৈদিক কবির হিংস্র বেঁচে থাকার লড়াইকে আধুনিক আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা ঐতিহাসিক সত্যের এক বিশাল বিকৃতি। এই ধরনের পাঠ মূলত আধুনিক পাঠকের নিজস্ব দিগন্তকেই অন্ধভাবে পূজা করা ছাড়া আর কিছুই নয়।
ক্যাননের বস্তুনিষ্ঠ ব্যবচ্ছেদ ও সেক্যুলার অ্যাকাডেমিক অনুসন্ধান (Objective Dissection of Canon and Secular Academic Inquiry)
বৈদিক সাহিত্যের এই শতাব্দীপ্রাচীন তাৎপর্যের কুয়াশা দূর করতে হলে আধুনিক ঐতিহাসিক হার্মেনিউটিক্সের সাহায্য নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কেমব্রিজ ধারার ইতিহাসবিদ কোয়েন্টিন স্কিনার চিন্তার ইতিহাসের পর্যালোচনায় দেখিয়েছিলেন যে কোনো ঐতিহাসিক রচনার উদ্দেশ্য বুঝতে হলে লেখকের সমকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপ্রেক্ষিতকে হুবহু চিহ্নিত করতে হবে (Skinner, 1969)। লেখক তার সমকালের কোন বিশেষ বিতর্কের উত্তর দিচ্ছিলেন এবং তার ভাষার প্রচলিত অর্থ কী ছিল, তা না জেনে কোনো টেক্সটের অর্থ নির্ধারণ করা অসম্ভব। একইভাবে ইতালীয় আইনবিদ ও ব্যাখ্যাতাত্ত্বিক এমিলিও বেত্তি জোর দিয়েছেন যে ব্যাখ্যার প্রথম কাজ হলো পাঠটির নিজস্ব ঐতিহাসিক স্বাতন্ত্র্য ও ভিন্নতাকে নিরপেক্ষভাবে শ্রদ্ধা জানানো (Betti, 1980)।
একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও অ্যাকাডেমিক মূল্যায়নের কাজ হলো বৈদিক সাহিত্যের তথাকথিত ধর্মীয় মহিমাকে দূরে সরিয়ে রেখে তার রচনার আসল পরিবেশকে পুনর্নির্মাণ করা। বৈদিক স্তোত্রগুলো কোনো অলৌকিক আকাশবাণী নয়; সেগুলো হলো খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষভাগে দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পশ্চিমে প্রবেশ করা ইন্দো-আর্য ভাষী পশুপালক দলগুলোর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির প্রকাশ। এই পাঠের বস্তুনিষ্ঠ ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যায়, সেখানে যেমন রয়েছে তাদের ভয়ংকর নিরাপত্তাহীনতা ও প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণের চিহ্ন, তেমনই রয়েছে অন্য মানবগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তাদের তীব্র বর্ণবিদ্বেষ এবং সম্পদ দখলের সহিংস লড়াই। এই সত্যগুলোকে কোনো আধুনিক বা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দিয়ে আড়াল করার সুযোগ নেই।
হির্শের পদ্ধতি মেনে আমাদের কঠোরভাবে আলাদা করতে হবে যে পাঠটির আদি অর্থ কী ছিল এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন কায়েমি স্বার্থবাদীরা এর কী কী তাৎপর্য তৈরি করেছিল। বৈদিক কবির কাছে গাভী ছিল একটি অর্থনৈতিক সম্পদ, পরবর্তী পুরোহিতের কাছে গাভী হলো যজ্ঞের যন্ত্র, আর আধুনিক রাজনৈতিকদের কাছে গাভী হলো রাজনীতির হাতিয়ার। এই তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ঐতিহাসিক মুহূর্তের তিনটি আলাদা তাৎপর্য। একজন বস্তুনিষ্ঠ গবেষকের দায়িত্ব হলো পরবর্তী এই তাৎপর্যগুলোর স্তরগুলোকে একের পর এক খুলে ফেলে টেক্সটের সেই আদি কঙ্কালটিকে উন্মোচন করা। ক্যাননের এই ব্যবচ্ছেদ ধর্মের অলৌকিক ভীতিকে দূর করতে সাহায্য করে।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, হির্শের অর্থ ও তাৎপর্যের বিভাজন বৈদিক সাহিত্যকে ভাববাদী মায়াজাল থেকে মুক্ত করার একটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক ভিত্তি দেয়। এটি আমাদের স্পষ্ট করে দেয় যে বৈদিক সাহিত্যের কোনো চিরন্তন বা সর্বজনীন আধ্যাত্মিক সত্য নেই। যা আছে তা হলো একটি প্রাচীন সমাজের নিজস্ব ভাষায় লেখা কিছু বিশেষ ঐতিহাসিক দলিল। পরবর্তীকালের যাজকীয় কূটকৌশল, অপৌরুষেয়তার মতাদর্শ কিংবা আধুনিক উগ্র জাতীয়তাবাদী পুনর্নির্মাণ – এই সবকিছুই হলো সুবিধাবাদী তাৎপর্যের এক একটি ধাপ। এই কৃত্রিম তাৎপর্যগুলোকে বর্জন করে বৈদিক পাঠের আদি বৈষয়িক ও ঐতিহাসিক অর্থকে অনুসন্ধান করাই একটি দায়িত্বশীল, আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক জ্ঞানচর্চার একমাত্র পথ।
জ্ঞান, যজ্ঞ ও সামাজিক ক্ষমতা (Knowledge, Ritual and Social Power): ফুকো ও হাবারমাসের সমালোচনামূলক পাঠ
ফুকো ও ব্রাহ্মণ সাহিত্যের জ্ঞান (Foucault and Knowledge in the Brāhmaṇas): বিশেষজ্ঞতা, সত্য ও পুরোহিতীয় কর্তৃত্ব
জ্ঞান-ক্ষমতার গ্রন্থন ও সত্যের অনুশাসন: ফুকোর তাত্ত্বিক দিগন্ত (The Power-Knowledge Nexus and Regimes of Truth: Foucault’s Theoretical Horizon)
দার্শনিক ভাবনায় দীর্ঘকাল ধরে একটি জনপ্রিয় বিশ্বাস চালু ছিল যে জ্ঞান হলো এমন এক বিশুদ্ধ আলো, যা মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে মুক্তি দেয়। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপীয় আলোকায়ন পর্যন্ত বহু চিন্তাবিদ জ্ঞানকে ক্ষমতার নির্মম আগ্রাসনের বিপরীতে একটি নিষ্কলঙ্ক আশ্রয় বলে মনে করতেন। বিংশ শতকের ফরাসি তাত্ত্বিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault) এই প্রচলিত ভাববাদী ধারণাকে একেবারে গোড়া থেকে নাড়িয়ে দেন। তিনি দেখান যে জ্ঞান কখনোই ক্ষমতার প্রভাবমুক্ত কোনো নিরপেক্ষ বা নিষ্কাম সত্য নয়। তার উদ্ভাবিত জ্ঞান ও ক্ষমতা (Power and Knowledge/Pouvoir-Savoir) প্রত্যয়টি প্রতিষ্ঠা করে যে জ্ঞান এবং ক্ষমতা আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ (Foucault, 1980)। ক্ষমতা কেবল দমন বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই কাজ করে না; বরং ক্ষমতা প্রতিনিয়ত সমাজে নতুন নতুন তথাকথিত জ্ঞানের ক্ষেত্র তৈরি করে এবং সেই জ্ঞানের মাধ্যমেই মানুষের মন ও আচরণকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখে।
ফুকোর চিন্তায় আরেকটি বড় ধারণা হলো সত্যের অনুশাসন (Regime of Truth)। সমাজে যাকে পরম ‘সত্য’ বলে প্রচার করা হয়, তা কোনো আকাশ থেকে পড়া চিরন্তন বিষয় নয়। পল রেবিনো তার সংকলনে ফুকোর বয়ানতত্ত্ব ব্যাখ্যা করে তুলে ধরেছেন যে প্রতিটি সমাজেই সত্য উৎপাদনের কিছু সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল থাকে (Rabinow, 1984)। ক্ষমতাশীল প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারণ করে দেয় কোন কথাটিকে মানুষ সঠিক জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করবে, কোন পদ্ধতিটিকে বিজ্ঞান বা প্রামাণ্য শাস্ত্র বলে মানবে এবং কে এই সত্য উচ্চারণের বৈধ অধিকার পাবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয় সুনির্দিষ্ট কিছু সামাজিক রীতিনীতি, বিধিবিধান এবং বয়ান তৈরির কৌশলের মধ্য দিয়ে। সত্য এখানে কোনো বস্তুনিষ্ঠ আবিষ্কার নয়, বরং তা হলো ক্ষমতা ধরে রাখার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার।
এই সত্য-উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি সমাজকে গ্রাস করে বয়ান (Discourse)-এর মাধ্যমে। ফুকোর কাছে বয়ান মানে নিছক কিছু বাক্য বা ব্যাকরণের খেলা নয়; এটি হলো কিছু সামাজিক অনুশীলনের সমন্বিত রূপ যা নির্ধারণ করে দেয় সমাজ কোন জিনিসকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখবে আর কোন জিনিসকে অস্বাভাবিক বা নিষিদ্ধ বিবেচনা করবে। বয়ান মানুষের চিন্তার সীমানা এমনভাবে বেঁধে ফেলে যে মানুষ অবচেতনেই সেই সীমানার ভেতর ভাবতে শুরু করে। যে বয়ান সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করে, তা বিরোধিতাকে বাতিল করে দেয় এবং বিকল্প কণ্ঠস্বরকে অজ্ঞতা বা উন্মাদনা বলে দাগিয়ে দেয়। ফলে ক্ষমতার আসল জয় ঘটে তখন, যখন মানুষ কোনো জবরদস্তি ছাড়াই ক্ষমতার তৈরি করা সত্যকে নিজের সত্য বলে মেনে নেয়।
প্রাচীন ভারতের ব্রাহ্মণ সাহিত্যকে বোঝার জন্য ফুকোর এই বয়ান ও জ্ঞান-ক্ষমতার ধারণাটি অসাধারণ এক অন্তর্দৃষ্টি এনে দেয়। বৈদিক সংহিতার পরবর্তী স্তরে রচিত ব্রাহ্মণ সাহিত্যগুলোকে ঐতিহ্যবাদী পণ্ডিতরা প্রায়শই যজ্ঞের ধর্মীয় বিধিবিধানের সংকলন বলে পরিচয় করিয়ে দেন। কিন্তু আধুনিক সমালোচনামূলক দৃষ্টি দিয়ে তাকালে পরিষ্কার ধরা পড়ে যে এই সংকলনগুলো ছিল প্রাচীন দক্ষিণ এশিয়ার বুকে গড়ে ওঠা এক অত্যন্ত শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক বয়ান। যজ্ঞের প্রতিটি ছোটখাটো খুঁটিনাটিকে জটিল তত্ত্বে রূপান্তর করে প্রাচীন পুরোহিতশ্রেণি নিজেদের জ্ঞানকে এমন এক উচ্চতায় স্থাপন করেছিল, যা প্রশ্নাতীত সামাজিক ক্ষমতা নিশ্চিত করত। এই জ্ঞান সাধারণ মানুষকে মুক্ত করেনি; বরং তা তৈরি করেছিল এক জটিল ক্ষমতার শৃঙ্খল, যার একমাত্র নিয়ন্ত্রক ছিল যাজকীয় বিশেষজ্ঞগোষ্ঠী।
যজ্ঞীয় বিশেষজ্ঞতা ও পুরোহিতীয় একচেটিয়া অধিকার (Ritual Expertise and Priestly Monopoly)
ঋগ্বেদের আদি যুগে যজ্ঞের যে রূপটি দেখা যায়, তা ছিল অনেকটাই সরল ও যৌথ প্রকৃতির। সেখানে গোষ্ঠীর প্রধান বা সাধারণ গৃহস্থ নিজেই অগ্নির সামনে বসে দেবতাকে নিজের ভাষায় আহ্বান করতে পারতেন। কিন্তু বৈদিক সমাজ যখন স্থায়ী কৃষির দিকে অগ্রসর হতে শুরু করল, তখন ব্রাহ্মণ সাহিত্যের আবির্ভাব ঘটল এবং যজ্ঞের এই সরলতা কর্পূরের মতো উবে গেল। ফরাসি ভারততত্ত্ববিদ সিলভ্যাঁ লেভি ব্রাহ্মণ সাহিত্যের যজ্ঞতত্ত্ব বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত চমকপ্রদ একটি ঐতিহাসিক সত্য সামনে এনেছিলেন (Lévi, 1966)। লেভি দেখান যে এই সাহিত্যে এসে স্বয়ং দেবতারাও আর যজ্ঞের প্রভু থাকেননি; দেবতারা পরিণত হয়েছিলেন যজ্ঞের যান্ত্রিক কলাকৌশলের আজ্ঞাবহ এক একটি ক্রীড়নকে। যজ্ঞকেই ঘোষণা করা হয়েছিল মহাবিশ্বের পরম কেন্দ্র হিসেবে, আর এই মহাযজ্ঞ পরিচালনার চাবিকাঠি কুক্ষিগত করা হয়েছিল বিশেষ কিছু পুরোহিত পরিবারের হাতে।
এই প্রক্রিয়াকে সফল করতে গড়ে তোলা হলো অতি-উচ্চমাত্রার বিশেষজ্ঞতা (Expertise)। যজ্ঞ পরিচালনার পুরো কাজটিকে অত্যন্ত জটিল চারটি ভাগে বিভক্ত করে ফেলা হলো। ঋগ্বেদের স্তোত্র আবৃত্তির জন্য নির্ধারিত হলেন হোতা (Hotṛ) পুরোহিত, যজ্ঞের যাবতীয় শারীরিক কায়িক শ্রম, বেদি তৈরি ও পশু জবাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট হলেন অধ্বর্যু (Adhvaryu), সামবেদের সুর দিয়ে মন্ত্র গাওয়ার জন্য নিযুক্ত হলেন উদ্গাতা (Udgātṛ) এবং পুরো যজ্ঞের ওপর সার্বভৌম নজরদারি চালানোর জন্য সর্বোচ্চ আসনে বসানো হলো ব্রহ্মা (Brahman) পুরোহিতকে। উইলিয়াম ক্যালান্ড এবং ভিক্টর হেনরি সোমযজ্ঞের রূপরেখা নিয়ে তাদের প্রামাণ্য গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে এই চারটি দলের প্রতিটি কাজের পদক্ষেপকে কীভাবে সেন্টিমিটারের মাপে নিয়ন্ত্রণ করা হতো (Caland & Henry, 1906)। যজ্ঞবেদির মাটি কতটুকু গভীর করে খুঁড়তে হবে, যজ্ঞের কাঠ কোন গাছ থেকে কোন তিথিতে কাটতে হবে এবং ঘাসের ডগা কোন দিকে থাকবে – এই সবকিছুই আইনের মতো বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।
এই ধরনের অতি-বিশেষজ্ঞতা সমাজে এক গভীর বিভাজন রেখা তৈরি করে। যখন কোনো সাধারণ আচারকে এত বেশি কারিগরি ও অবোধ্য রূপ দেওয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষ সেই কর্মকাণ্ড থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়ে। তখন কোনো সাধারণ মানুষের আর সাধ্য থাকে না যে সে নিজে নিজের কোনো প্রার্থনা প্রকাশ করবে। তাকে প্রতি পদক্ষেপে হাত পাততে হয় সেই বিশেষজ্ঞদের কাছে, যারা এই জটিল ভাষার সংকেত জানেন। একে বলা যায় জ্ঞানের একচেটিয়া বাণিজ্যিকীকরণ। সাধারণ মানুষকে মানসিকভাবে বোঝানো হয়েছিল যে যজ্ঞের মন্ত্র উচ্চারণে যদি মাত্রাগত সামান্য ত্রুটি ঘটে, তবে সঙ্গে সঙ্গে যজমানের পরিবার বংশ ধ্বংস হয়ে যাবে। ভীতি উৎপাদনের এই মনস্তাত্ত্বিক কৌশলটি বিশেষজ্ঞ শ্রেণির অপরিহার্যতাকে সমাজে নিখুঁতভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিল।
এই বিশেষজ্ঞ জ্ঞানকে একটি কঠোর জাতিগত প্রাচীরের ভেতর আটকে রাখা হয়েছিল। এটি শেখার এবং চর্চা করার অধিকার কেবল পুরোহিত বংশের পুরুষ সদস্যদের জন্যই বরাদ্দ ছিল। সমাজের বিশাল উৎপাদনশীল অংশ, বিশেষ করে শূদ্র এবং নারীদের জন্য এই জ্ঞান স্পর্শ করাও মৃত্যুদণ্ডতুল্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ফুকো তার আলোচনায় দেখিয়েছেন কীভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান নিজের টিকিয়ে রাখার স্বার্থে বয়ানের ভেতর অন্যদের প্রবেশাধিকার রুদ্ধ করে দেয়। ব্রাহ্মণ সাহিত্য ঠিক এই কাজটিই করেছিল। জ্ঞানের চারধারে পবিত্রতা ও অপবিত্রতার এমন এক অদৃশ্য লোহার দেয়াল তোলা হয়েছিল, যার ফলে পুরোহিতদের এই একচেটিয়া অধিকার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চ্যালেঞ্জহীন থেকে যায়।
শতপথ ব্রাহ্মণ ও ‘সত্য’ নির্মাণের ভাষিক কলাকৌশল (Śatapatha Brāhmaṇa and the Linguistic Mechanics of Constructing ‘Truth’)
ব্রাহ্মণ সাহিত্যের বিশাল সমুদ্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী এবং দীর্ঘকায় সংকলন হলো শতপথ ব্রাহ্মণ (Śatapatha Brāhmaṇa)। জুলিয়াস এগেলিং তার অনুবাদে শতপথ ব্রাহ্মণের অভ্যন্তরীণ যুক্তিকাঠামো বিশদভাবে তুলে ধরেছেন (Eggeling, 1882)। এই গ্রন্থে দেখা যায়, রচয়িতারা প্রতিটি সাধারণ বস্তুর সাথে মহাজাগতিক বিষয়ের এমন এক অদৃশ্য ও জটিল সমীকরণ তৈরি করেছেন, যা বাস্তব সত্যের বদলে এক কৃত্রিম সত্যের জাল বুনে চলে। যজ্ঞের ঘি হয়ে যায় স্বয়ং সূর্যরশ্মি, যজ্ঞের কাঠ হয়ে যায় মানবদেহের অস্থি, আর যজ্ঞশালাটি হয়ে ওঠে স্বয়ং মহাবিশ্বের রূপক। পুরোহিতরা দাবি করেন, সাধারণ মানুষ চোখে যা দেখে তা আসল নয়; আসল সত্য লুকিয়ে আছে তাদের তৈরি করা এই রূপক সম্পর্কের গভীরে।
এই সাহিত্যে একটি বিশেষ ভাষিক ফরমুলা বারবার ঘুরে ফিরে আসে: “য এবং বেদ” (Ya evaṃ veda) – যার সহজ বাংলা হলো “যিনি ইহা জানেন”। আর্থার বেরিডেল কিথ প্রাচীন ভারতের দর্শনের ঐতিহাসিক রূপরেখায় উল্লেখ করেছেন যে ব্রাহ্মণ সাহিত্যে আচারের নিখুঁত সম্পাদনার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল এই গোপন সমীকরণগুলো জানার দাবি (Keith, 1925)। কোনো পুরোহিত যখন কোনো বিশেষ মন্ত্রের পেছনের এই তৈরি-করা সম্পর্কটি জানেন, তখন তিনি ঘোষণা করেন যে তিনিই এখন পুরো বিশ্বের নিয়ন্ত্রণকারী। এটি কোনো বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ বা বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের সত্য নয়; এটি হলো ভাষার চাতুর্য দিয়ে সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক স্বনির্মিত সত্য। যিনি এই বয়ান জানেন, তিনি মহিমান্বিত; আর যিনি জানেন না, তিনি অজ্ঞ ও অধস্তন।
শতপথ ব্রাহ্মণের রচয়িতারা ব্যাকরণ ও ব্যুৎপত্তি নিয়ে এক ধরনের অবিশ্বাস্য খেলা খেলেছিলেন, যাকে বলা হয় নিরুক্ত বা কৃত্রিম বুৎপত্তি বিশ্লেষণ। শব্দের মূল অর্থকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে তারা তাদের ইচ্ছামতো যজ্ঞীয় ব্যাখ্যা তৈরি করতেন। ইন্দ্র শব্দের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলা হতো, যেহেতু ইনি আকাশে দেখা যান বা ইন্দন করেন, তাই ইনি ইন্দ্র। শব্দের এই মনগড়া রূপান্তরের উদ্দেশ্য ছিল একটাই – যে কোনো জাগতিক ঘটনাকে পুরোহিতদের যজ্ঞীয় শৃঙ্খলার ভেতর জোর করে টেনে আনা। ফুকোর ভাষায় একে বলা যায় বয়ানগত জবরদস্তি। ভাষার গতিপথকে এমনভাবে ঘুরিয়ে দেওয়া হতো যাতে মনে হয় সমাজের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো যজ্ঞের আগুনে ঘি ঢালা এবং পুরোহিতদের আধিপত্য স্বীকার করা।
এই সত্য-নির্মাণের চূড়ান্ত এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপটি প্রকাশ পায় শতপথ ব্রাহ্মণের একটি সরাসরি ঘোষণায়। সেখানে কোনো রাখঢাক না রেখেই বলা হয়েছে যে এই পৃথিবীতে দেবতাদের দুটি ভাগ রয়েছে – স্বর্গের দেবতারা হলেন মূল দেবতা, আর পৃথিবীর বুকে মানুষের মাঝে দেবতা হলেন স্বয়ং বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণরা। ভাষার এমন নির্লজ্জ ব্যবহারের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট রক্তমাংসের সামাজিক শ্রেণিকে স্বর্গের সমমর্যাদায় বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মানুষ যখন যুগের পর যুগ এই ভাষিক প্রচার শুনতে শুনতে একে স্বতঃসিদ্ধ সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করল, তখন তাদের ওপর পুরোহিতদের মানসিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হয়ে গেল। সত্য এখানে মুক্ত চিন্তার কোনো পথ ছিল না; তা ছিল নিছকই ক্ষমতার দাস।
ভুল, শাসন ও প্রায়শ্চিত্তের নজরদারি প্রযুক্তি (Error, Discipline, and Surveillance Technologies of Expiation)
মিশেল ফুকো তার বিখ্যাত গ্রন্থ ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ (Discipline and Punish)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে একটি ক্ষমতা কাঠামো কোনো ব্যক্তিকে চাবুক মেরে শাসন করার চেয়ে তার শরীরের প্রতিটি নড়াচড়াকে একটি শৃঙ্খলার ভেতর বেঁধে ফেলে অনেক বেশি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে (Foucault, 1977)। তিনি একে নাম দিয়েছেন শৃঙ্খলামূলক নজরদারি। প্রাচীন যজ্ঞশালা ছিল ঠিক এই ধরনের একটি কঠোর শারীরিক ও মানসিক নজরদারির কারখানা। সেখানে যজ্ঞ কোনো ভাবাবেগপূর্ণ আরাধনা ছিল না; তা ছিল নিখুঁত সামরিক ড্রিলের মতো এক যান্ত্রিক পরিবেশ। পুরোহিতের হাত কতটুকু উঠবে, তিনি কোন দিকে মুখ করে শ্বাস ছাড়বেন, এবং কোন শব্দে কতটা টান দেবেন – তার প্রতিটি মুহূর্ত ছিল কড়া শৃঙ্খলার অধীন।
এই পুরো শৃঙ্খলাটি টিকে ছিল ভুলের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভীতির ওপর ভিত্তি করে। এইচ. ডব্লিউ. বোদেভিৎস জৈমিনীয় ব্রাহ্মণের পাঠোদ্ধার করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে বৈদিক যুগের আচারবিদরা ভুলের আশঙ্কায় কতটা তীব্র মানসিক উদ্বেগের মধ্যে থাকতেন (Bodewitz, 1973)। কোনো মন্ত্রে একটি হ্রস্বস্বর যদি দীর্ঘস্বর হয়ে যায়, কিংবা যজ্ঞের চামচটি যদি সামান্য বাঁকা হয়ে যায়, তবে সঙ্গে সঙ্গে নেমে আসবে মহাজাগতিক অভিশাপ। এই ভীতি দূর করার জন্য ব্রাহ্মণ সাহিত্যে এক সুবিশাল অধ্যায় জুড়ে রাখা হয়েছিল, যার নাম প্রায়শ্চিত্ত (Expiation/Prāyaścitta)। ভুলের এই বিধানগুলো নিছক কোনো সমাধান ছিল না; এগুলো ছিল মূলত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এমন এক ফাঁদ, যা ব্যক্তিকে সারাক্ষণ তার নিজের অপর্যাপ্ততা সম্পর্কে অপরাধবোধে ভোগাত।
যজ্ঞশালার এই নজরদারির কেন্দ্রবিন্দুতে যিনি বসে থাকতেন, তিনি হলেন ব্রহ্মা পুরোহিত। ফুকোর সুবিখ্যাত সর্বদর্শী কারাগার বা প্যানোপটিকন ধারণার সাথে ব্রহ্মার কাজের সাদৃশ্য চমকে দেওয়ার মতো। ব্রহ্মা যজ্ঞের কোনো মন্ত্র জোরে উচ্চারণ করতেন না; তিনি একপাশে সম্পূর্ণ নীরব হয়ে বসে থাকতেন। তার একমাত্র দায়িত্ব ছিল অন্য পুরোহিতরা ঠিকঠাক কাজ করছেন কি না তা পাহারা দেওয়া। অন্য পুরোহিতরা যখন ভৌত কর্মে ব্যস্ত, ব্রহ্মা তখন নিজের মন দিয়ে পুরো দৃশ্যটি স্ক্যান করতেন। সামান্যতম বিচ্যুতি ঘটলেই তিনি যজ্ঞ থামিয়ে দিতেন এবং প্রায়শ্চিত্তের গোপন বিধান জারি করতেন। তিনি ছিলেন যজ্ঞশালার এক জীবন্ত নজরদারি ক্যামেরা।
এই ভুলের অর্থনীতি সমাজের বুকে এক গভীর পরনির্ভরশীলতার মনস্তত্ত্ব তৈরি করেছিল। সাধারণ মানুষ এবং যজ্ঞের অর্থ জোগানদাতা যজমান সারাক্ষণ এই আতঙ্কে থাকতেন যে তাদের সামান্য অসাবধানতায় হয়তো কোনো বিপর্যয় ঘটে যাবে। ফলে নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হিসেবে তারা পুরোহিতদের হাতে নিজেদের আত্মসমর্পণ করতেন। প্রায়শ্চিত্তের জন্য নতুন করে ঘি, সোমরস এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হতো। অর্থাৎ ভুল যত বেশি হতো, পুরোহিতদের আয় এবং গুরুত্ব তত বেশি বাড়ত। এই নজরদারি ও প্রায়শ্চিত্তের প্রযুক্তি সামাজিক অসমতাকে এক অলঙ্ঘনীয় শৃঙ্খলায় রূপান্তরিত করেছিল।
যজমানের বশ্যতা ও রাজকীয় ক্ষমতার ওপর পুরোহিতীয় নিয়ন্ত্রণ (Subjection of the Sacrificer and Priestly Control over Royal Power)
ব্রাহ্মণ সাহিত্যের বয়ান যার অর্থ ও শ্রমে বাস্তবায়িত হতো, প্রাচীন শাস্ত্রে তাকে বলা হতো যজমান (Yajamāna)। যজমান ছিলেন মূলত সমাজের ক্ষমতাশালী ব্যক্তি – কোনো ধনী যোদ্ধা, গোত্রপ্রধান বা স্বয়ং রাজা। ফুকো যাকে বলেছেন বশ্যতা-উৎপাদন (Subjectification/Assujettissement), যেখানে কোনো স্বাধীন মানুষকে একটি বিশেষ ব্যবস্থার বাধ্য অনুগত প্রজায় রূপান্তর করা হয়, ব্রাহ্মণ সাহিত্যে যজমানের সাথে ঠিক তাই ঘটানো হতো। পল-এমিল দুমন্ট প্রাচীন অশ্বমেধ যজ্ঞের বিশদ বিবরণে দেখিয়েছেন কীভাবে এই বিশাল সামরিক রাজকীয় অনুষ্ঠানের ছলে রাজাকে পুরোহিতদের তৈরি আচারের খাঁচায় বন্দি করে ফেলা হতো (Dumont, 1939)। তরবারি দিয়ে যে রাজা পুরো দেশ জয় করতেন, যজ্ঞশালায় প্রবেশ করার পর তার সেই রাজনৈতিক অহংকারকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হতো।
যজ্ঞের শুরুতে যজমানকে দিয়ে করানো হতো দীক্ষা অনুষ্ঠান। এই দীক্ষা ছিল চরম এক অপমানজনক ও কৃচ্ছ্রসাধনের প্রক্রিয়া। রাজার সমস্ত রাজকীয় পোশাক ও অলংকার খুলে নেওয়া হতো। তাকে পরানো হতো একটি নোংরা কালো হরিণের চামড়া, তার নখ ও চুল কেটে তাকে একটি ছোট্ট কুঁড়েঘরের ভেতর ঘুটঘুটে অন্ধকারে বন্দি করে রাখা হতো। ব্রাহ্মণ সাহিত্যের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল যে যজমানকে মায়ের পেটের ভ্রূণের মতো কুঁকড়ে বসে থাকতে হবে। পুরোহিতরা ঘোষণা করতেন যে রাজা তার পুরোনো দেহ ত্যাগ করে এখন পুরোহিতের তৈরি এক নতুন গর্ভে অবস্থান করছেন। এই প্রতীকী নাটকের উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত রাজনৈতিক: রাজাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে তার পার্থিব শক্তি যতই থাকুক না কেন, পুরোহিতের আধ্যাত্মিক অনুমোদন ছাড়া সে আসলে কিছুই নয়।
এর পরেই আসত সবচেয়ে বৈষয়িক এবং প্রকাশ্য শোষণের অধ্যায়, যার নাম দক্ষিণা (Dakṣiṇā)। ব্রাহ্মণ সাহিত্যের প্রতিটি পাতায় দক্ষিণার যে পরিমাণ লোভাতুর ও বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়, তা পড়লে যেকোনো বস্তুনিষ্ঠ পাঠকের চোখ কপালে উঠবে। ঐতরেয় এবং শতপথ ব্রাহ্মণে বারবার নিদান দেওয়া হয়েছে যে দক্ষিণা ছাড়া যজ্ঞ হলো মৃতদেহের মতো বিপজ্জনক। পুরোহিতদের সোনা, হাজার হাজার গাভী, দাসী, ঘোড়া এবং উর্বর জমি দান না করলে যজ্ঞ কোনোদিন ফল দেবে না। রাজারা নিজেদের সামরিক ক্ষমতাকে জনগণের কাছে ঐশ্বরিক বলে প্রমাণ করার জন্য পুরোহিতদের স্তাবকতা কিনতে বাধ্য হতেন, আর পুরোহিতরা সেই বৈধতার বিনিময়ে রাজার রাজকোষ শূন্য করে সম্পদ নিজেদের ঝুলিতে ভরতেন।
এইভাবে তরবারি ও বৈদিক শ্লোকের মধ্যে এক পারস্পরিক স্বার্থের লেনদেন সম্পন্ন হয়েছিল। রাজা পেতেন সমাজে রাজত্ব করার স্বর্গীয় অধিকার, আর পুরোহিত পেতেন রাজার ওপর ছড়ি ঘোরানোর ক্ষমতা এবং করমুক্ত জীবনযাপনের নিশ্চয়তা। যজমান নিজেকে ভাবতেন মহাবিশ্বের রক্ষক, কিন্তু বাস্তবে তিনি ছিলেন পুরোহিতদের তৈরি বয়ানের এক বশীভূত ভোক্তা। ক্ষমতার এই সূক্ষ্ম জালে আবদ্ধ হয়ে প্রাচীন ভারতের শাসকশ্রেণি নিজেদের অজান্তেই পুরোহিতদের সমাজতাত্ত্বিক এজেন্ডাকে কার্যকর করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল।
বয়ানের সীমানা এবং অপৌরুষেয় ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি (Discursive Limits and Institutional Foundation of Authorless Power)
মিশেল ফুকো তার বিখ্যাত গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ দ্য অর্ডার অব ডিসকোর্স (The Order of Discourse)-এ স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে বয়ান সমাজ থেকে তার প্রতিপক্ষকে ঝেঁটিয়ে বের করে দেয় (Foucault, 1984)। তিনি দেখিয়েছেন যে যেকোনো প্রভাবশালী বয়ানের মূল কাজ হলো নিষিদ্ধকরণের সীমানা টানা। সমাজে কোন কথাটি বলা যাবে না এবং কাদের অস্তিত্বকে ভাষার জগৎ থেকেই মুছে ফেলা হবে, তা ঠিক করে দেওয়াই হলো কর্তৃত্বের প্রথম লক্ষণ। ব্রাহ্মণ সাহিত্যে এই বর্জনের দেওয়ালটি তোলা হয়েছিল অত্যন্ত নির্মমভাবে। আস্কো পারপোলা বৈদিক ঐতিহ্যের শিকড় সন্ধানের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ব্রাহ্মণ সাহিত্যের যুগে এসে অনার্য জনগোষ্ঠী এবং নিম্নশ্রেণিকে সম্পূর্ণভাবে অমানবিক এক স্তরে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল (Parpola, 2015)।
শূদ্র, চণ্ডাল এবং স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ব্রাহ্মণ সাহিত্য কোনো মানবিক মর্যাদাই দেয়নি। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে শূদ্রকে বর্ণনা করা হয়েছে এমন এক জীব হিসেবে, যাকে উচ্চবর্ণের মানুষ যখন খুশি তখন তাড়িয়ে দিতে পারে অথবা নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারে। তাদের যজ্ঞের সীমানায় প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল, কারণ পুরোহিতদের মতে তাদের উপস্থিতি যজ্ঞের আগুনকে অপবিত্র করে তুলত। ফুকো আধুনিক যুগে পাগল ও অপরাধীদের যেভাবে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার কৌশল নিয়ে আলোচনা করেছেন, ব্রাহ্মণ সাহিত্য ঠিক একই কায়দায় তথাকথিত অশুদ্ধির তকমা দিয়ে সমাজের মূল উৎপাদনশীল কৃষক ও শ্রমজীবীদের ক্ষমতার বলয় থেকে বহু যোজন দূরে ঠেলে দিয়েছিল। তাদের কণ্ঠস্বরকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক লিখিত প্রাতিষ্ঠানিক সনদ ছিল এই সাহিত্য।
ব্রাহ্মণ সাহিত্যের এই বয়ানগত আধিপত্যের সবচেয়ে ধূর্ত দিকটি ছিল এর পেছনের রচয়িতাকে গায়েব করে দেওয়ার কৌশল। পুরোহিতরা কখনোই বলেননি যে এই নিয়মগুলো তারা নিজেরা নিজেদের পকেট ভারী করার জন্য বানিয়েছেন। বরং তারা এমন এক মতাদর্শের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন, যা পরবর্তীতে বেদের অপৌরুষেয়তা (Authorlessness/Apauruṣeyatva) নামে বিখ্যাত হয়েছিল। তারা প্রচার করলেন যে এই যজ্ঞের নিয়ম কোনো মানুষের তৈরি নয়, স্বয়ং ঈশ্বরেরও নয়; এগুলো হলো মহাবিশ্বের নিজস্ব অলঙ্ঘনীয় সুর। ফুকো আমাদের মনে করিয়ে দেন যে কর্তৃত্ব যখন নিজেকে একজন রক্তমাংসের মানুষের তৈরি বলে স্বীকার না করে একটি প্রাকৃতিক বা অদৃশ্য সত্য বলে দাবি করে, তখনই তা সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে। কারণ তখন আর তাকে প্রশ্ন করার কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না।
পরিশেষে বলা যায়, মিশেল ফুকোর সমালোচনামূলক দর্শন প্রাচীন ব্রাহ্মণ সাহিত্যকে তার সমস্ত অলৌকিক ও ধর্মতাত্ত্বিক ধোঁয়াশা থেকে মুক্ত করে এক নিরেট ঐতিহাসিক আলোয় উন্মোচিত করে। এই গ্রন্থগুলো কোনো আধ্যাত্মিক সাধনার স্মারক নয়; এগুলো ছিল ব্রোঞ্জ ও লৌহযুগের সন্ধিক্ষণে উত্তর ভারতের এক চরম চতুর, সুবিধাবাদী এবং সংগঠিত পুরোহিতশ্রেণির ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লিখিত প্রযুক্তি। বিশেষজ্ঞতার কঠিন দেয়াল তুলে, ভুলের আতঙ্ক ছড়িয়ে, মনগড়া সত্যের বয়ান বানিয়ে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রকে কব্জা করে ব্রাহ্মণ সাহিত্য যে সমাজব্যবস্থা কায়েম করেছিল, তা ছিল অসমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শোষণের এক নিটোল কাঠামো। ফুকোর লেন্স দিয়ে এই সাহিত্যের ব্যবচ্ছেদ করা আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ ও মুক্তচিন্তার মানুষের জন্য তাই কোনো তাত্ত্বিক বিলাসিতা নয়, বরং প্রাচীন আধিপত্যের ঐতিহাসিক চরিত্রকে উন্মোচন করার এক জরুরি বৌদ্ধিক দায়িত্ব।
ফুকো ও সঠিক যজ্ঞের ভাষ্য (Foucault and the Discourse of Correct Sacrifice): নিয়ম, বিচ্যুতি ও কর্তৃত্ব নির্মাণ
স্বাভাবিকীকরণ ও নিয়ম-শৃঙ্খলার ফুকোবাদী পাঠ (Normalization and the Foucauldian Reading of Rules and Discipline)
মানুষের সমাজে কোনো নিয়ম যখন চালু হয়, তখন তা কেবল কিছু সাধারণ বিধিনিষেধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault) তার কলেজ দ্য ফ্রঁসের বক্তৃতামালায়, যা পরবর্তীতে অ্যাবঅর্ডিনারি বা অস্বাভাবিক (Abnormal) শিরোনামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল, সেখানে একটি জরুরি ধারণা তুলে ধরেছিলেন (Foucault, 2003)। তিনি দেখান যে ক্ষমতা কাঠামো টিকে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত সমাজে একটি আদর্শ মানদণ্ড খাড়া করে। এই প্রক্রিয়ার নাম হলো স্বাভাবিকীকরণ (Normalization/Normalisation)। ক্ষমতা প্রথমে ঠিক করে দেয় কোনটি স্বাভাবিক আর কোনটি অস্বাভাবিক। জর্জ কঁগিলেম তার চিকিৎসাদর্শন সংক্রান্ত ধ্রুপদী গ্রন্থে স্পষ্ট করেছেন যে স্বাভাবিকের এই ধারণাটি কোনো প্রাকৃতিক সত্য নয়; এটি মূলত তৈরি করা হয় সমাজকে একটি সুনির্দিষ্ট ছাঁচে পরিচালনা করার প্রয়োজনে (Canguilhem, 1989)। যা কিছু এই নির্ধারিত ছাঁচের সঙ্গে মেলে, তা-ই বৈধ; আর যা সামান্য বিচ্যুত হয়, তাকেই অপরাধ বা ব্যাধি বলে চিহ্নিত করা হয়।
বৈদিক সাহিত্যের পরবর্তী স্তরে, বিশেষ করে ব্রাহ্মণ ও শ্রৌতসূত্রগুলোতে ঠিক এই স্বাভাবিকীকরণের এক বিশাল কারখানা গড়ে তোলা হয়েছিল। সেখানে যজ্ঞের পুরো বয়ানটি দাঁড়িয়েছিল সঠিক এবং ভুলের এক অনড় দ্বৈততার ওপর। বৈদিক আচারবিদরা এমন এক ধারণার জন্ম দিয়েছিলেন যাকে বলা যায় সঠিক যজ্ঞের বয়ান। এই বয়ানে প্রতিটি আচারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল শত শত অনুশাসন, যাকে সংস্কৃতে বলা হয় বিধি (Injunction/Vidhi)। কোনো স্তোত্র কীভাবে গাইতে হবে, আগুনের জন্য কতগুলো কাষ্ঠখণ্ড লাগবে, এবং কোন পুরোহিত কোন পথ দিয়ে যজ্ঞশালায় ঢুকবেন – তার প্রতিটি পদক্ষেপকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল যাতে মনে হয় এর বাইরে আর কোনো সত্যের অস্তিত্ব নেই। এই বিধিবিধানের পুঙ্খানুপুঙ্খ সংকলন ছিল প্রাচীন সমাজের ওপর আচরণগত অনুশাসন চাপিয়ে দেওয়ার একটি কার্যকর ব্যবস্থা।
ক্যাথরিন বেল তার আচার সংক্রান্ত সমাজতাত্ত্বিক গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে কোনো সমাজে আচার পালন করা নিছক কোনো ভক্তিভাবের প্রকাশ নয়; বরং এটি সামাজিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করার একটি কৌশলগত প্রক্রিয়া (Bell, 1992)। বৈদিক যজ্ঞে যখন কোনো নিয়ম জারি করা হতো, তখন সেই নিয়মের মাধ্যমেই ক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট বিন্যাস পুনরুৎপাদিত হতো। যজ্ঞে সামান্যতম হেরফের হওয়াকে বলা হতো মারাত্মক অমঙ্গলজনক। এই নিয়মের কঠোর বেড়াজাল তৈরি করার মধ্য দিয়ে পুরোহিতশ্রেণি নিজেদের তৈরি বিধানকে এমন এক চূড়ান্ত স্থানে নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে দাঁড়িয়ে অন্য যেকোনো ধরনের সামাজিক আচরণ বা চিন্তাকে বাতিল করে দেওয়া যেত। সমাজকে বোঝানো হয়েছিল যে সঠিক বিধির বাইরে যা কিছু আছে, তা-ই অশুদ্ধ এবং বিনাশকারী।
এই প্রক্রিয়ায় নিয়ম কেবল পালন করার বিষয় ছিল না; নিয়ম পরিণত হয়েছিল এক অলঙ্ঘনীয় শাসনে। সাধারণ মানুষ যখন এই নিয়মের জটিলতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যেত, তখনই পুরোহিতদের ক্ষমতা প্রশ্নাতীত হয়ে উঠত। ফুকোর তত্ত্ব অনুযায়ী, আইন বা বিধির আসল শক্তি শাস্তি দেওয়ার মধ্যে থাকে না; তার আসল শক্তি থাকে মানুষকে নিয়ম মেনে চলার এক সার্বক্ষণিক অভ্যাসের মধ্যে বন্দি করে ফেলার ক্ষমতায়। বৈদিক সংকলনগুলোতে এই বিধির আধিপত্য এমন এক সামাজিক পরিবেশ তৈরি করেছিল যেখানে প্রতিটি মানুষ সারাক্ষণ নিজেকে পরিমাপ করত পুরোহিতদের ঠিক করে দেওয়া মানদণ্ড দিয়ে। ফলে ক্ষমতা কোনো দৃশ্যমান চাবুক ছাড়াই মানুষের মনস্তত্ত্বকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল।
শব্দের বিশুদ্ধতা ও ধ্বনিগত বিচ্যুতির অপরাধীকরণ (Phonetic Purity and the Criminalization of Deviance)
বৈদিক সাহিত্যের যজ্ঞীয় বয়ানে সবচেয়ে চমকপ্রদ নজরদারি দেখা যায় ভাষার উচ্চারণের ক্ষেত্রে। সেখানে ভাষার অর্থ কী, তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্ব পেত ধ্বনির নিখুঁত উচ্চারণ। বৈদিক শিক্ষাশাস্ত্রে স্বরকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল: উদাত্ত, অনুদাত্ত এবং স্বরিত। উচ্চারণের সময় জিহ্বা ঠিক কোন স্থানে স্পর্শ করবে এবং শ্বাস কতটুকু ছাড়তে হবে, তার নিয়ম ছিল লোহার মতো শক্ত। ওয়েড টি. হুইলক বৈদিক ও তান্ত্রিক ভাষার তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে বৈদিক যজ্ঞে ভাষা কোনো যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না; এটি কাজ করত একটি স্বয়ংক্রিয় বস্তুগত শক্তির মতো (Wheelock, 1982)। সামান্যতম উচ্চারণগত ত্রুটি ঘটলেই পুরো যজ্ঞের প্রভাব ধ্বংস হয়ে যাবে – এই বিশ্বাস পুরোহিতরা খুব সযত্নে সমাজে প্রোথিত করেছিলেন।
এই ধ্বনিগত নজরদারির একটি বিখ্যাত পৌরাণিক উদাহরণ পাওয়া যায় শতপথ ব্রাহ্মণ ও পাণিনির ব্যাকরণে। এটি হলো ত্বষ্টা ও ইন্দ্রের বিরোধের কাহিনি। বিশ্বরূপকে হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ত্বষ্টা একটি যজ্ঞ করেছিলেন যেন এমন এক পুত্রের জন্ম হয় যে ইন্দ্রকে বধ করতে পারবে। ত্বষ্টা মন্ত্র উচ্চারণ করতে চাইলেন: “ইন্দ্রশত্রু”। কিন্তু উচ্চারণ করার সময় তিনি সমাসের স্বরবিন্যাসে একটি ছোট ভুল করে বসলেন। তিনি উদাত্ত স্বরটি দিলেন প্রথম পদে, যার ফলে ব্যাকরণের নিয়মে শব্দটির অর্থ দাঁড়িয়ে গেল: “ইন্দ্র যার বিনাশকারী”। ফলাফল হলো উল্টো; যে বৃত্র ইন্দ্রকে বধ করার জন্য জন্ম নিয়েছিল, ইন্দ্রের হাতেই তার মৃত্যু ঘটল। এই কাহিনিটি কোনো নিরীহ রূপকথা নয়; এটি ছিল সমাজে একটি চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়ার ভাষিক চাল।
ফুকোর ভাষায় একে বলা যায় বিচ্যুতির অপরাধীকরণ। ভাষার একটি ক্ষুদ্র স্বরভঙ্গকে এখানে পরিণত করা হয়েছে এক মহাজাগতিক বিপর্যয়ে। এর মাধ্যমে পুরোহিতরা একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন: সাধারণ মানুষের পক্ষে বৈদিক ভাষা উচ্চারণ করার কোনো অধিকার নেই। কারণ যে ভাষায় একটি মাত্রার ভুলে জীবন চলে যেতে পারে, সেই ভাষা কেবল আজীবন প্রশিক্ষণ নেওয়া উচ্চবর্ণের যাজকদের মুখেই শোভা পায়। এর ফলে সাধারণ মানুষ তো বটেই, সমাজের উদীয়মান শাসকশ্রেণিও এই ভাষার সামনে থতমত খেয়ে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। ভাষা এখানে মানুষের মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম না হয়ে পরিণত হয়েছিল মানুষকে বশীভূত রাখার এক রহস্যময় অস্ত্রে।
এই ধ্বনিগত নিয়ন্ত্রণ ভাষার বহুমাত্রিকতাকে মেরে ফেলেছিল। ভাষার ভেতরে যে পরিবর্তনশীলতা থাকে, যে আঞ্চলিক বৈচিত্র্য থাকে, তাকে ঘোষণা করা হয়েছিল পাপ হিসেবে। ম্লেচ্ছ বা অনার্যদের ভাষার নিন্দার পেছনে এই ধ্বনিগত বিশুদ্ধতার রাজনীতি কাজ করেছিল। যারা বৈদিক নিয়মে উচ্চারণ করতে পারত না, তাদের ভাষাকে বলা হতো অসুরদের ভাষা, যা কোনো সুফল বয়ে আনতে পারে না। অর্থাৎ ধ্বনির শুদ্ধতা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে মূলত জাতিগত ও সামাজিক স্তরবিন্যাসকে আরও পাকাপোক্ত করা হয়েছিল। ফুকো দেখিয়েছেন কীভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বা আইনব্যবস্থা পাগলামি বা বিচ্যুতিকে চিহ্নিত করে সমাজ থেকে আলাদা করে দেয়; বৈদিক যুগে ভাষার এই ধ্বনিগত শুদ্ধি ঠিক একইভাবে ক্ষমতার বাইরে থাকা মানুষদের আলাদা করে ফেলেছিল।
দৈহিক বিন্যাস, জ্যামিতিক বেদি ও স্থানিক নিয়ন্ত্রণ (Bodily Posture, Geometric Altars, and Spatial Control)
মিশেল ফুকো তার বিভিন্ন গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে মানুষের শরীরকে একটি নির্দিষ্ট স্থানের ভেতর আটকে রেখে তাকে অনুগত করে তোলা হয়। বৈদিক যজ্ঞশালা ছিল ঠিক এই ধরনের একটি কঠোর স্থানিক নিয়ন্ত্রণের দুর্গ। সেখানে কোনো ব্যক্তি যেখানে খুশি দাঁড়াতে পারতেন না। যজ্ঞশালার পরিমাপ, তার প্রবেশদ্বার এবং প্রতিটি বেদির অবস্থান ছিল জ্যামিতিক সূত্রের দ্বারা নিখুঁতভাবে নির্ধারিত। হের্থা ক্রিক প্রাচীন অগ্নিস্থাপন যজ্ঞের বিশদ পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন যে বৈদিক যজ্ঞশালাটি গড়ে উঠত একটি কৃত্রিম মহাবিশ্বের প্রতিরূপ হিসেবে, যেখানে স্থানের প্রতিটি বিন্দু ছিল ক্ষমতা ও শৃঙ্খলার প্রতীক (Krick, 1982)।
এই স্থানিক শৃঙ্খলার চূড়া দেখা যায় শুল্বসূত্রের জ্যামিতিক নকশায়। বিশেষ করে অগ্নিচয়ন যজ্ঞের ক্ষেত্রে দেখা যায়, মাটির ইট দিয়ে একটি বিশাল উড়ন্ত বাজপাখির আকৃতির বেদি তৈরি করা হতো, যার নাম শ্যেনচিতি। এই বেদি তৈরির জন্য হাজার হাজার ইটের প্রয়োজন হতো এবং প্রতিটি ইটের আকার ও বিন্যাস ছিল পূর্বনির্ধারিত। যজমানের নিজের শরীরের মাপ অনুযায়ী এই ইটগুলোর আকার ঠিক করা হতো। আঙুল, বাহু এবং পুরুষের উচ্চতা দিয়ে যজ্ঞের স্থান মেপে নেওয়া হতো। অর্থাৎ যজমানের জীবন্ত শরীরটিকে টেনে আনা হতো এক নির্জীব জ্যামিতিক কাঠামোর ভেতর। শরীরকে এভাবে যন্ত্রের অংশ বানিয়ে ফেলার এই প্রাচীন কৌশলটি আধুনিক শৃঙ্খলামূলক ক্ষমতার কথাই মনে করিয়ে দেয়।
যজ্ঞশালায় মানুষের শরীরের গতিবিধিকেও একইভাবে বেঁধে ফেলা হয়েছিল। পুরোহিতরা কীভাবে বসবেন, তাদের মেরুদণ্ড কতটা সোজা থাকবে, কোন পাত্রটি ডান হাত দিয়ে ধরতে হবে এবং কোনটি বাঁ হাত দিয়ে ছোঁয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ – তার দীর্ঘ তালিকা ছিল। যজ্ঞের ঘি আগুনে ঢালার সময় শরীরের প্রতিটি পেশির নড়াচড়াকে একটি নির্দিষ্ট নাটুকে রূপ দেওয়া হতো। কোনো পুরোহিত যদি অনিচ্ছাকৃতভাবেও কোনো বেদি ভুল দিক দিয়ে প্রদক্ষিণ করতেন, তবে পুরো অনুষ্ঠানটি দূষিত হয়ে যেত। এই শরীরচর্চা কোনো ভক্তিভাবের বিষয় ছিল না; এটি ছিল মানুষের শরীরকে পুরোপুরি যান্ত্রিক শৃঙ্খলার অধীন করে ফেলার একটি অনুশীলন।
স্থান ও শরীরের এই বন্দিদশা মানুষের মনে গভীর আনুগত্যের জন্ম দিত। যজ্ঞশালায় প্রবেশ করা মাত্রই একজন মানুষ অনুভব করত যে সে এমন এক ব্যবস্থার মধ্যে পা রেখেছে যার প্রতিটি ধূলিকণা পর্যন্ত একটি উচ্চতর নিয়মের দ্বারা শাসিত। সেখানে মানুষের নিজস্ব কোনো স্বাধীনতা বা ইচ্ছা প্রকাশের সুযোগ ছিল না। ফুকো দেখিয়েছেন যে ক্ষমতার সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো যখন তা স্থানকে এমনভাবে বিন্যস্ত করে যাতে মানুষের চলাচল স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ক্ষমতার নির্দেশ মেনে চলে। বৈদিক যজ্ঞের জ্যামিতিক বেদি এবং কঠোর স্থানিক বিভাজন ঠিক এই কাজটিই সম্পন্ন করেছিল।
ঋত্বিকদের অভ্যন্তরীণ ক্রমবিন্যাস ও ক্ষমতার ভারসাম্য (Internal Hierarchy of Officiants and the Balance of Power)
যজ্ঞের পুরোহিতরা কোনো একক বা সমজাতীয় গোষ্ঠী ছিলেন না। তাদের নিজেদের ভেতরেও ছিল এক জটিল স্তরবিন্যাস এবং ক্ষমতার সূক্ষ্ম ভারসাম্য। ক্রিস্টোফার জেড. মিনকোভস্কি প্রাচীন ভারতীয় পুরোহিততন্ত্রের ওপর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে বিভিন্ন পুরোহিতের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের পেছনে ছিল গভীর রাজনৈতিক ও পেশাগত প্রতিযোগিতা (Minkowski, 1991)। হোতা, অধ্বর্যু, উদ্গাতা এবং ব্রহ্মা – এই প্রধান চার পুরোহিতের অধীনে আরও বহু সহকারী পুরোহিত কাজ করতেন। যেমন মৈত্রাবরুণ, পোতা, নেষ্টা, কিংবা আচ্ছাভাক। এই বিশাল পুরোহিতমণ্ডলীর প্রত্যেকেই ছিলেন অপরের কাজের ওপর নজরদারি রাখার এক একটি মাধ্যম।
হেনরি হুবার্ট এবং মার্সেল মস তাদের ধ্রুপদী তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে যজ্ঞ হলো এমন এক বিপজ্জনক খেলা যেখানে পবিত্র ও অপবিত্রের সীমানা রক্ষা করতে হলে মধ্যস্থতাকারীদের নিজেদের ভেতর অত্যন্ত কড়া শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হয় (Hubert & Mauss, 1964)। যজ্ঞের ভেতরে কেউ যদি নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে অন্য কোনো পুরোহিতের কাজে হস্তক্ষেপ করত, তবে তা একটি বড় ধরনের অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো। প্রত্যেকে নিজের নির্দিষ্ট সীমানায় দাঁড়িয়ে অন্যকে পাহারা দিত। অধ্বর্যু যখন আগুন জ্বালাতেন, হোতাকে তখন মন্ত্র পড়তে হতো সেই অগ্নির প্রতিটি স্ফুলিঙ্গের গতি লক্ষ্য করে। এই পারস্পরিক তদারকি ব্যবস্থাটি ছিল ক্ষমতার এক অনুভূমিক জাল, যেখানে কেউ কারো চেয়ে পুরোপুরি স্বাধীন ছিলেন না, অথচ পুরো ব্যবস্থাটি সম্মিলিতভাবে সমাজকে শাসন করত।
ফুকো তার ক্ষমতা তত্ত্বে বারবার উল্লেখ করেছেন যে ক্ষমতা কেবল ওপর থেকে নিচে চাপিয়ে দেওয়া কোনো একক বিষয় নয়। ক্ষমতা কাজ করে একটি জালের মতো, যার মধ্যে সবাই জড়িয়ে থাকে। বৈদিক পুরোহিতদের এই অভ্যন্তরীণ সংগঠনটি ফুকোর সেই বিকেন্দ্রীভূত ক্ষমতার এক চমৎকার নিদর্শন। প্রধান ব্রহ্মা পুরোহিত যদিও সবার ওপরে বসে পুরো বিষয়টি তদারকি করতেন, কিন্তু তিনি নিজেও ছিলেন যজ্ঞের সেই বিধানের দাস। যদি অধ্বর্যু কোনো ভুল করতেন, ব্রহ্মা কেবল সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্তের উপায় বলে দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি নিজের ইচ্ছামতো কোনো নতুন নিয়ম তৈরি করতে পারতেন না। অর্থাৎ ক্ষমতা কোনো ব্যক্তির হাতে ছিল না, ক্ষমতা ছিল স্বয়ং সেই নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে।
এই অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার কারণে পুরোহিতশ্রেণির ভেতর কোনো বড় ধরনের ভাঙন ধরা কঠিন ছিল। তাদের পেশাগত স্বার্থ এক সুতোয় গাঁথা ছিল। যজ্ঞের প্রতিটি পদক্ষেপে তারা একে অপরের বৈধতা নিশ্চিত করত। যজমান যখন এই সুসংগঠিত দলের মুখোমুখি হতেন, তখন তার পক্ষে এদের তৈরি বিধানের বিরুদ্ধে কোনো প্রশ্ন তোলা সম্ভব হতো না। ব্যক্তি এখানে কোনো একক পুরোহিতের সাথে লড়ছিলেন না; তিনি লড়ছিলেন একটি নিরেট প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যার প্রতিটি অংশ ছিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় এবং সুরক্ষিত।
যজমানপত্নী, লিঙ্গীয় ভূমিকা ও বিচ্যুতির পাহারা (The Sacrificer’s Wife, Gendered Roles, and Guarding Against Deviance)
বৈদিক যজ্ঞ কেবল শ্রেণিশোষণ বা বর্ণভেদের ক্ষেত্র ছিল না; এটি ছিল কঠোর পিতৃতান্ত্রিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠারও এক সক্রিয় ময়দান। স্টেফানি ডব্লিউ. জ্যামিসন প্রাচীন ভারতীয় যজ্ঞে নারীর অবস্থান নিয়ে বিশ্লেষণে উন্মোচন করেছেন কীভাবে যজমানের স্ত্রীকে যজ্ঞের মঞ্চে এক চরম অপমানজনক ও নিয়ন্ত্রিত ভূমিকার ভেতর বেঁধে ফেলা হতো (Jamison, 1996)। বৈদিক তত্ত্বে বলা হয়েছিল যে স্ত্রী ছাড়া কোনো পুরুষ যজ্ঞ করতে পারে না। শুনতে এটি নারীর খুব বড় সম্মান মনে হলেও বাস্তবে এটি ছিল নারীকে আচারের খাঁচায় বন্দি করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ফন্দি মাত্র। যজ্ঞে স্ত্রীর উপস্থিতি ছিল অপরিহার্য, কিন্তু সেই উপস্থিতি ছিল পুরোপুরি নির্বাক এবং অধীনস্থ।
যজ্ঞের মঞ্চে যজমানপত্নীর শরীরকে দেখা হতো এমন এক ক্ষেত্র হিসেবে, যেখান থেকে যেকোনো মুহূর্তে অপবিত্রতা বা বিচ্যুতি ছড়াতে পারে। তাই তাকে ঘিরে রাখা হতো নানা ধরনের জটিল বিধিনিষেধ দিয়ে। যজ্ঞের একটি নির্দিষ্ট পর্বে পত্নীকে কটিদেশে এক বিশেষ ধরনের রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলা হতো। এই প্রতীকী বন্ধনের মাধ্যমে ঘোষণা করা হতো যে তার স্বাধীন যৌনতা এবং ইচ্ছা এখন থেকে পুরোপুরি যজ্ঞীয় শৃঙ্খলার অধীন। এছাড়া বরুণপ্রঘাস নামক আচারে যজমানের স্ত্রীকে পুরোহিতদের সামনে প্রকাশ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো যে তার কোনো পরপুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক আছে কি না। পুরো সমাজের সামনে একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবনকে এভাবে টেনে এনে তাকে অপরাধী হিসেবে দাঁড় করানোর এই দৃশ্য ছিল পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার এক নগ্ন প্রদর্শনী।
ফুকো তার যৌনতার ইতিহাসে যেভাবে দেখিয়েছেন যে কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা মানুষের ব্যক্তিগত যৌনজীবনকে স্বীকারোক্তির মাধ্যমে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে, বৈদিক যজ্ঞে পত্নীর এই জিজ্ঞাসাবাদ ঠিক একই কাজ করেছিল। নারী যদি সত্য কথা স্বীকার না করত, তবে তার পরিবারের সর্বনাশ হবে বলে হুমকি দেওয়া হতো। তাকে বাধ্য করা হতো সমাজের অনুশাসন মেনে নিজের অপরাধবোধ প্রকাশ করতে। ফলে নারীর শরীর ও মানসিকতাকে পিতৃতন্ত্রের পুরোপুরি অনুগত করে তোলার এক সামাজিক রিহার্সাল ছিল এই যজ্ঞীয় পর্বগুলো।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় নারীকে দেখানো হয়েছিল এমন এক সম্ভাব্য বিচ্যুতি হিসেবে, যাকে সারাক্ষণ পাহারায় রাখতে হবে। যজ্ঞের পবিত্রতা রক্ষা করার নামে মূলত পারিবারিক ও যৌন সম্পর্কের ওপর এক চরম নজরদারি কায়েম করা হয়েছিল। পুরুষতান্ত্রিক সম্পত্তি ও রক্তের উত্তরাধিকার যাতে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, যজ্ঞের বিধানগুলো তা নিশ্চিত করার ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সঠিক যজ্ঞের এই বয়ান নারীকে কেবল দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেনি, বরং তাকে পরিণত করেছিল এমন এক স্থায়ী সন্দেহের পাত্রে, যাকে প্রতি মুহূর্তে পুরুষের ধর্মীয় কর্তৃত্বের সামনে নিজের শুদ্ধতার প্রমাণ দিয়ে বেঁচে থাকতে হতো।
কর্তৃত্বের পুনরুৎপাদন ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থোডক্সি (Reproduction of Authority and Institutional Orthodoxy)
বৈদিক আচারের এই সুবিশাল নিয়ম-কানুন শেষ পর্যন্ত কোন সামাজিক উদ্দেশ্য সাধন করেছিল? উইলহেম রাউ প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্র ও সমাজকাঠামোর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে এই ধরনের কঠোর যজ্ঞীয় কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল তৎকালীন উদীয়মান রাজতন্ত্র এবং উচ্চবর্ণের সুবিধাবাদকে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়ার জন্য (Rau, 1957)। সঠিক যজ্ঞের এই ধারণাটি সমাজে এমন এক অর্থোডক্সি বা রক্ষণশীল গোঁড়ামি তৈরি করেছিল, যা অন্য যেকোনো ধরনের সাংস্কৃতিক বা লৌকিক চর্চাকে পুরোপুরি অবৈধ বলে ঘোষণা করতে পারত। তৎকালীন উত্তর ভারতে বহু ধরনের লোকায়ত ও অনার্য আচার প্রচলিত ছিল। কিন্তু শ্রৌত বা সঠিক যজ্ঞের বয়ান সেই সমস্ত ধারাকে নিকৃষ্ট ও অপবিত্র বলে প্রান্তিক করে দিয়েছিল।
হারমান ডব্লিউ. তুল বৈদিক চিন্তায় কর্মের ধারণার উৎপত্তি নিয়ে আলোচনায় তুলে ধরেছেন যে কীভাবে মানুষের ভবিষ্যৎ এবং অস্তিত্বকে যজ্ঞের কার্যকারণ নিয়মের সাথে অচ্ছেদ্যভাবে বেঁধে ফেলা হয়েছিল (Tull, 1989)। সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়েছিল যে এই জীবনে কার কী সামাজিক অবস্থান হবে, তা নির্ধারিত হয় যজ্ঞীয় নিয়মের সঠিক পালনের ওপর। কেউ যদি ব্রাহ্মণ হয়ে জন্মায়, তবে তা তার পূর্ববর্তী যজ্ঞীয় যোগ্যতার ফল; আর কেউ যদি শূদ্র হয়ে জন্মায়, তবে তা তার বিচ্যুতির ফল। এভাবে একটি নির্মম সামাজিক বৈষম্যকে মহাজাগতিক ন্যায়ের চাদর পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ক্ষমতার এই স্বয়ংক্রিয় পুনরুৎপাদন ছিল যজ্ঞীয় বয়ানের সবচেয়ে মারাত্মক সাফল্য।
সঠিক যজ্ঞের এই বয়ান কোনো বিকল্প চিন্তার সুযোগ রাখেনি। বিচ্যুতিকে এমন এক পাপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল যা শুধু ব্যক্তিকেই ধ্বংস করে না, বরং পুরো বিশ্বপ্রকৃতিকে উলটপালট করে দিতে পারে। ফলে সমাজের ভেতরে কোনো বিদ্রোহ বা অসন্তোষ দেখা দিলে তাকে খুব সহজেই ধর্মের বিরুদ্ধে অধর্ম বা আচারের বিরুদ্ধে বিচ্যুতি বলে দমন করা যেত। ফুকোর পরিভাষা ব্যবহার করে বললে, এই ব্যবস্থাটি এমন এক জীবরাজনীতি কায়েম করেছিল যা মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি জৈবিক ও সামাজিক আচরণকে পুরোহিতদের অনুশাসনের আওতায় নিয়ে এসেছিল। খাদ্য গ্রহণ থেকে শুরু করে বিবাহ, সন্তানের জন্ম এবং শেষকৃত্য – জীবনের প্রতিটি ধাপকে সঠিক নিয়মের ফ্রেমে আটকে ফেলা হয়েছিল।
পরিশেষে বলা যায়, মিশেল ফুকোর লেন্স দিয়ে যখন বৈদিক সাহিত্যের যজ্ঞীয় নিয়মাবলিকে পর্যবেক্ষণ করা হয়, তখন তার ভেতরের পবিত্রতার মুখোশটি সম্পূর্ণ খসে পড়ে। সেখানে কোনো নিষ্কলঙ্ক আধ্যাত্মিক আরতি দেখা যায় না; দেখা যায় ক্ষমতার এক নিখুঁত, জ্যামিতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্র। শব্দের উচ্চারণকে পাহারা দিয়ে, শরীর ও স্থানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে, অভ্যন্তরীণ নজরদারির জাল বুনে এবং লিঙ্গীয় অধীনতাকে মহাজাগতিক রূপ দিয়ে প্রাচীন পুরোহিতশ্রেণি যে কর্তৃত্ব নির্মাণ করেছিল, তা ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম জটিল ক্ষমতার দুর্গ। সঠিক যজ্ঞের এই বয়ান কোনো অলৌকিক সত্যের বাহক ছিল না; তা ছিল একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণির আধিপত্যকে প্রাকৃতিক ও অলঙ্ঘনীয় করে তোলার এক চরম চতুর ঐতিহাসিক প্রয়াস।
হাবারমাস ও পুরুষসূক্ত (Habermas and the Puruṣa Sūkta): মহাজাগতিক ভাষা ও সামাজিক বৈধতা
বৈধতার সংকট ও যোগাযোগের বিকৃতি: হাবারমাসের তাত্ত্বিক কাঠামো (Legitimation Crisis and Distorted Communication: Habermas’s Theoretical Framework)
জার্মান সমাজদার্শনিক ইয়ুর্গেন হাবারমাস (Jürgen Habermas) ফ্রাঙ্কফুর্ট ধারার চিন্তাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন মানুষের পারস্পরিক ভাষা ব্যবহারের চরিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে। তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ লেজিটিমেশন ক্রাইসিস (Legitimation Crisis)-এ দেখান যে সমাজে যখন ক্ষমতার অসম বণ্টন তৈরি হয়, তখন শাসকশ্রেণিকে সবসময় এক গভীর সংকটের মোকাবেলা করতে হয় (Habermas, 1975)। এই সংকটের নাম হলো বৈধতার সংকট (Legitimation Crisis)। কেবল অস্ত্র বা গায়ের জোর দিয়ে মানুষকে দীর্ঘকাল দাবিয়ে রাখা যায় না; মানুষকে মানসিকভাবে বোঝাতে হয় যে এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাটি তাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্যই দরকার। এই বৈধতা তৈরি করার জন্য ক্ষমতার পরিচালকরা এমন কিছু প্রতীকী বয়ান তৈরি করে যা সমাজের অসম সম্পর্কগুলোকে একটি স্বাভাবিক ও কল্যাণকর ব্যবস্থা হিসেবে মানুষের সামনে হাজির করে।
হাবারমাসের চিন্তার কেন্দ্রীয় ভিত্তি হলো যোগাযোগমূলক ক্রিয়া (Communicative Action) এবং যোগাযোগমূলক যৌক্তিকতা (Communicative Rationality)। টমাস ম্যাককার্থি হাবারমাসের দর্শনের ওপর তার প্রামাণ্য গ্রন্থে তুলে ধরেছেন যে মানুষের ভাষার আসল লক্ষ্য হলো কোনো বলপ্রয়োগ ছাড়া পারস্পরিক যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে একটি ঐকমত্যে পৌঁছানো (McCarthy, 1978)। একটি মুক্ত সমাজে মানুষ যখন কথা বলে, তখন সেখানে যেকোনো দাবির সত্যতা, নৈতিক ন্যায্যতা এবং বক্তার আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পূর্ণ অধিকার সবার থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতা কাঠামো কখনোই সাধারণ মানুষকে সেই খোলামেলা প্রশ্ন করার সুযোগ দেয় না। ক্ষমতা সবসময় মানুষের পারস্পরিক সংলাপের ময়দানটিকে কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
যখন কোনো সমাজে ক্ষমতার স্বার্থে ভাষার এই উন্মুক্ত যোগাযোগকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়, তখন জন্ম নেয় পদ্ধতিগতভাবে বিকৃত যোগাযোগ (Systematically Distorted Communication)। এটি এমন এক ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা যেখানে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোনো অনুশাসন মেনে নিচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে ভাষাটিকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে প্রশ্ন তোলার পথটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ থাকে। উইলিয়াম আউটহোয়েট হাবারমাসের সমাজতত্ত্বের পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন যে প্রাচীন পৌরাণিক বা ঐতিহ্যবাহী সমাজগুলোতে এই বিকৃত যোগাযোগ সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী রূপ নিয়ে দেখা দিত (Outhwaite, 1994)। সেখানে ক্ষমতার বৈষম্যকে আড়াল করা হতো মহাজাগতিক ও পৌরাণিক গল্পের চাদর দিয়ে, যাতে সাধারণ মানুষ বৈষম্যকে মানুষের তৈরি ষড়যন্ত্র না ভেবে মহাবিশ্বের প্রাকৃতিক নিয়ম বলে বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়।
হাবারমাসের এই তাত্ত্বিক লেন্স দিয়ে প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যকে পাঠ করলে তার সামাজিক মতাদর্শের গভীর ফাঁদগুলো পরিষ্কার ধরা পড়ে। বৈদিক ঐতিহ্যে সামাজিক অনুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যে সমস্ত পৌরাণিক রূপক ব্যবহার করা হয়েছে, তা কোনো নিষ্পাপ দার্শনিক উপলব্ধি ছিল না। এগুলো ছিল তৎকালীন শাসক ও পুরোহিতশ্রেণির ক্ষমতার বৈধতা উৎপাদনের ভাষা। অসম ক্ষমতা-সম্পর্ককে দেবত্ব বা কসমসের সাথে গুলিয়ে দিয়ে এমন এক মতাদর্শিক বয়ান খাড়া করা হয়েছিল যা হাজার বছর ধরে সমাজকে প্রশ্নহীনতার অন্ধকারে ডুবিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। হাবারমাসের ক্রিটিকাল থিওরি এই মহাজাগতিক ভাষার মুখোশটি টেনে খুলে ফেলে তার পেছনের বস্তুগত রাজনৈতিক কৌশলটিকে উন্মোচিত করে।
পুরুষসূক্তের ঐতিহাসিক পটভূমি ও দশম মণ্ডলের রূপান্তর (Historical Context of the Puruṣa Sūkta and the Shift in Mandala 10)
ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের নব্বইতম সূক্তটি ঐতিহাসিকভাবে পুরুষসূক্ত (Puruṣa Sūkta) নামে খ্যাত। এই সূক্তটিকে গোটা বৈদিক সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক সনদপত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এই সূক্তেই পুরো ঋগ্বেদের মধ্যে প্রথমবারের মতো ভারতীয় সমাজের চতুর্বর্ণের – ব্রাহ্মণ, রাজন্য বা ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের – স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। ভাষা এবং ব্যাকরণের দিক থেকে আধুনিক ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ববিদরা নিশ্চিত করেছেন যে ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলটি সংকলনটির সবচেয়ে নবীন বা পরবর্তীকালে যুক্ত হওয়া অংশ। অর্থাৎ এই সূক্তটি প্রাথমিক বৈদিক পশুপালক সমাজের সরল যুগে রচিত হয়নি; এটি রচিত হয়েছিল অনেক পরে, যখন বৈদিক সমাজ গাঙ্গেয় সমভূমির দিকে এগোচ্ছিল এবং সমাজ একটি কঠোর শ্রেণিবিন্যাসের রূপ নিচ্ছিল।
ভারতের অন্যতম প্রধান সমাজ-চিন্তাবিদ ও সংবিধানপ্রণেতা বি. আর. আম্বেদকর তার সুবিখ্যাত গবেষণামূলক গ্রন্থ হু ওয়ার দ্য শূদ্রাজ? (Who Were the Shudras?)-এ পুরুষসূক্তের ঐতিহাসিক চরিত্র বিশদভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন (Ambedkar, 1946)। আম্বেদকর দেখান যে এই সূক্তটি কোনো চিরন্তন সৃষ্টিতত্ত্ব নয়; এটি ছিল একটি সচেতন ও পরিকল্পিত মতাদর্শিক সংযোজন। যাযাবর সমাজে যখন গোত্রভিত্তিক সমতা ভেঙে গিয়ে স্থায়ী কৃষি ও উদ্বৃত্ত উৎপাদনের সূচনা হলো, তখন এমন একটি তত্ত্বের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল যা নতুন উৎপাদন সম্পর্কের সুবিধাবাদীদের নিরাপত্তা দেবে। উচ্চবর্ণের পুরোহিত ও রাজন্যরা সমাজের মূল শ্রমজীবী শ্রেণিকে পদানত করার জন্য এই সূক্তটিকে ঋগ্বেদের পবিত্র ক্যাননের ভেতর জোর করে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন।
ইতিহাসবিদ সুবীরা জয়সোয়াল প্রাচীন ভারতে জাতিভেদ প্রথার উৎস সংক্রান্ত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে পুরুষসূক্তের সময়কালটি ছিল উপজাতীয় গোত্রকাঠামো ভেঙে একটি স্থায়ী শ্রেণিবিভক্ত সমাজে উত্তরণের ক্রান্তিকাল (Jaiswal, 1998)। প্রাথমিক বৈদিক সমাজে কোনো বংশানুক্রমিক ও অনড় বর্ণভেদ ছিল না; একজন ব্যক্তি তার পেশা বদলাতে পারতেন এবং সমাজে পারস্পরিক আদান-প্রদান ছিল অনেক বেশি তরল। কিন্তু কুরু-পাঞ্চাল অঞ্চলে যখন স্থায়ী বসতি গড়ে উঠল এবং চাষাবাদের জন্য বিপুল পরিমাণ কায়িক শ্রমের দরকার হলো, তখন পরাজিত অনার্য জনগোষ্ঠী এবং প্রান্তিক মানুষদের একটি স্থায়ী অধীনস্থ স্তরে আটকে রাখা জরুরি হয়ে পড়ল। পুরুষসূক্ত হলো সেই নতুন শ্রমশোষণকে ধর্মীয় মোড়কে বাঁধাই করার আনুষ্ঠানিক সূচনা।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি বোঝার পর সূক্তটির ভাষিক চরিত্র পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এটি কোনো আকাশবাণী নয়, বরং এক বিশেষ ঐতিহাসিক পর্বে রচিত রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র। কবি এখানে কোনো পরম সত্য আবিষ্কার করছেন না; তিনি মূলত তার চোখের সামনে ঘটে চলা সামাজিক অসমতাকে মহিমান্বিত করছেন। হাবারমাসের বৈধতার সংকটের ধারণাটি এখানে পুরোপুরি মিলে যায়। নতুন কৃষিভিত্তিক রাষ্ট্রে যখন উৎপাদনের সিংহভাগ কুক্ষিগত হচ্ছিল উচ্চবর্ণের হাতে, তখন নিম্নবর্ণের মানুষের মনে যে অসন্তোষ বা সংকট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, তাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার জন্য পুরুষসূক্তের মতো একটি মহাজাগতিক রূপকথার বৈধতাদায়ক অস্ত্র তৈরি করা হয়েছিল।
মহাজাগতিক ভাষা ও সামাজিক বৈষম্যের স্বাভাবিকীকরণ (Cosmic Language and the Naturalization of Social Inequality)
পুরুষসূক্তের পুরো বয়ানটি গড়ে উঠেছে এক আদিম মহাজাগতিক মানবের রূপককে কেন্দ্র করে, যাকে বলা হয়েছে পুরুষ (Puruṣa)। এফ. বি. জে. কুইপার প্রাচীন ভারতীয় সৃষ্টিতত্ত্বের পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন যে বৈদিক ঋষিরা প্রায়ই আদিম একত্ব বা অখণ্ডতাকে বলিদানের মাধ্যমে বহুরূপে ভেঙে পড়ার পৌরাণিক গল্প ফাঁদতেন (Kuiper, 1983)। পুরুষসূক্তে বলা হয়েছে, দেবতারা সেই আদিম সহস্রশীর্ষ পুরুষকে যজ্ঞে বলি দিলেন এবং তার শরীরটিকে খণ্ড খণ্ড করে কেটে ফেললেন। সেই বলিদানের ছাই ও দেহাংশ থেকেই তৈরি হলো পুরো মহাবিশ্ব। চাঁদ তৈরি হলো তার মন থেকে, সূর্য তৈরি হলো তার চোখ থেকে, আর তার মুখ থেকে বের হয়ে এল ইন্দ্র ও অগ্নির মতো প্রধান দেবতারা।
এই পর্যন্ত বর্ণনাটি অন্যান্য প্রাচীন পৌরাণিক সৃষ্টির রূপকের মতোই মনে হতে পারে। কিন্তু সূক্তটির সবচেয়ে মারাত্মক বাঁকটি আসে এর এগারো এবং বারো নম্বর শ্লোকে। হঠাৎ করেই মহাজাগতিক সৃষ্টির তালিকা থেকে নেমে এসে মানবসমাজের জাতিভেদকে সেই একই বলিদানের সাথে গেঁথে দেওয়া হয়। বলা হয়: “ব্রাহ্মণোঽস্য মুখমাসীদ্ বাহূ রাজন্যঃ কৃতঃ। ঊরূ তদস্য যদ্বৈশ্যঃ পদ্দ্ভ্যাং শূদ্রো অজায়ত॥” – অর্থাৎ সেই আদিম পুরুষের মুখ থেকে জন্ম নিল ব্রাহ্মণ, তার দুই বাহু থেকে তৈরি হলো ক্ষত্রিয় বা রাজন্য, তার ঊরু থেকে এল বৈশ্য এবং তার দুটি পা থেকে জন্ম নিল শূদ্র।
হাবারমাসের ক্রিটিকাল থিওরি দিয়ে তাকালে এই রূপকের পেছনের ভয়াবহ মতাদর্শিক চাতুর্যটি ধরা পড়ে। একে বলা হয় সামাজিক বৈষম্যের স্বাভাবিকীকরণ বা মহাজাগতিকীকরণ। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, কবি সূর্য, চাঁদ, বাতাস বা আকাশের সৃষ্টির পাশাপাশি একই সমান্তরালে সমাজের চারটি বর্ণকে স্থাপন করেছেন। একজন সাধারণ মানুষের কাছে সূর্য বা চাঁদ যেমন অপরিবর্তনীয় ও চিরন্তন সত্য, সামাজিক এই বিভাজনকেও ঠিক তেমনই এক প্রাকৃতিক ও অলঙ্ঘনীয় সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হলো। মানুষ যেন মনে করে, আকাশে যেমন প্রতিদিন সূর্য ওঠা বন্ধ করা যায় না, তেমনই সমাজে শূদ্রের সেবা করা এবং ব্রাহ্মণের কর্তৃত্ব মেনে নেওয়াও একটি প্রাকৃতিক বিধান, যা কোনো মানুষের ইচ্ছার অধীন নয়।
ভাষার এই মহাজাগতিক রূপক দিয়ে মূলত মানুষের তৈরি একটি শোষণমূলক রাজনীতিকে কসমসের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হলো। হাবারমাস দেখান যে মতাদর্শের চূড়ান্ত সাফল্য ঘটে তখন, যখন তা ঐতিহাসিক ও পরিবর্তনশীল মানবিক সিদ্ধান্তকে প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম বলে মানুষের মগজে ঢুকিয়ে দিতে পারে। পুরুষসূক্তে ভাষার এই কাজটিই করা হয়েছে নিখুঁতভাবে। কোনো রাজা বা পুরোহিত নিজের নামে এই বৈষম্যের নির্দেশ জারি করেননি; তারা এটিকে বসিয়ে দিয়েছেন এক কাল্পনিক মহাজাগতিক যজ্ঞের ভেতর। ফলে সাধারণ মানুষের সমস্ত প্রতিবাদী যুক্তি সৃষ্টির এই আদিম গল্পের সামনে মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য হয়েছিল।
বৈধতাদায়ক বয়ান ও প্রশ্নহীনতার সংস্কৃতি (Legitimating Discourse and the Culture of Unquestionability)
ইয়ুর্গেন হাবারমাস তার সামাজিক রূপান্তর তত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাজন দেখিয়েছেন, যা হলো মানুষের প্রতিদিনের জীবন-জগৎ (Lifeworld/Lebenswelt) এবং ক্ষমতার কাঠামোগত ব্যবস্থা (Habermas, 1987)। মানুষের জীবন-জগৎ হলো পারস্পরিক ভাষা, বিশ্বাস এবং যোগাযোগের এক সহজাত ক্ষেত্র। কিন্তু ক্ষমতা যখন এই জীবন-জগতে অনধিকার প্রবেশ করে, তখন তা মানুষের স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতাকে অবশ করে ফেলে। পুরুষসূক্তের মতো বয়ানগুলো প্রাচীন ভারতীয় জীবন-জগতে ঠিক এই ধ্বংসাত্মক অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছিল। এই সূক্ত মানুষের মনের ভেতরে এমন এক প্রশ্নহীনতার সংস্কৃতি ঢুকিয়ে দিয়েছিল যা যে কোনো ধরনের যুক্তিসঙ্গত বিতর্ককে চিরতরে অসম্ভব করে তুলেছিল।
ফরাসি নৃতাত্ত্বিক লুই দ্যুমোঁ তার বিখ্যাত গ্রন্থ হোমো হায়ারার্কিকাস (Homo Hierarchicus)-এ ভারতীয় জাতিভেদ প্রথাকে একটি বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের স্তরবিন্যাস হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন (Dumont, 1980)। দ্যুমোঁ দাবি করেছিলেন যে ভারতে ক্ষমতার চেয়েও পবিত্রতা সবসময় বড় ছিল। কিন্তু হাবারমাসের দৃষ্টি দিয়ে তাকালে দ্যুমোঁর এই দৃষ্টিভঙ্গির অসাড়তা স্পষ্ট হয়ে যায়। পুরুষসূক্তে পবিত্রতার যে মুখরোচক বয়ান দেওয়া হয়েছে, তার ভেতরের চালিকাশক্তি ছিল পুরোপুরি ক্ষমতার রক্ষা ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ। পবিত্রতার মোড়কটি ছিল মূলত সেই বিকৃত যোগাযোগের খোলস, যার মাধ্যমে ক্ষমতার নগ্ন রূপটিকে একটি স্বর্গীয় মহিমায় ঢেকে রাখা হয়েছিল।
হাবারমাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে কোনো বক্তব্য তখনই বৈধ হতে পারে যখন তা উন্মুক্ত সমালোচনার মুখোমুখি হওয়ার সাহস রাখে। কিন্তু পুরুষসূক্তের বয়ানটি ছিল পুরোপুরি স্বৈরাচারী। এখানে কোনো তর্কের অবকাশ রাখা হয়নি। যেহেতু এই বিন্যাসটি স্বয়ং দেবতাদের করা যজ্ঞের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে, তাই এর বিরোধিতা করা মানে স্বয়ং মহাবিশ্বের নিয়মের বিরোধিতা করা। এই ধরনের ধর্মতাত্ত্বিক প্রচার সামাজিক প্রতিরোধকে মানসিকভাবে অসম্ভব করে তোলে। নিম্নবর্ণের মানুষ ভাবতে শুরু করে যে তাদের এই অবমাননাকর সামাজিক অবস্থান তাদের কোনো দুর্ভাগ্যের বিষয় নয়, বরং মহাবিশ্বের ভারসাম্য রক্ষার জন্য তাদের এই অবস্থানে থাকাটা অপরিহার্য।
এইভাবে একটি বয়ান পুরো সমাজকে নৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিতে পারে। হাবারমাস যাকে বলেছেন চিন্তার পদ্ধতিগত বিকৃতি, পুরুষসূক্ত হলো তার এক চরম ঐতিহাসিক স্মারক। এটি সমাজের মানুষকে নিজেদের মুক্ত মানুষ হিসেবে ভাবতে শেখায়নি; বরং তাদের শিখিয়েছে একটি কাল্পনিক মহাজাগতিক দেহের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অঙ্গ হিসেবে নিজেদের বিলিয়ে দিতে। মুখ যদি কথা বলে আর মাথা যদি চিন্তা করে, তবে পায়ের কোনো অধিকার নেই প্রশ্ন তোলার। শরীরবিজ্ঞানের এই আপাত-সরল যুক্তিকে সমাজবিজ্ঞানে প্রয়োগ করে এক চিরস্থায়ী শোষণযন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল এই বৈদিক সূক্তের মাধ্যমে।
কায়িক শ্রমের অবমূল্যায়ন ও শূদ্রের প্রান্তিকীকরণ (Devaluation of Manual Labor and Marginalization of the Śūdra)
পুরুষসূক্তের রূপকটির দিকে গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, এটি মানবদেহের অঙ্গগুলোকে এক চরম অসম মর্যাদার ছাঁচে ফেলে দিয়েছে। শরীর একটি জৈবিক সত্তা, যার প্রতিটি অঙ্গই বেঁচে থাকার জন্য সমান জরুরি। কিন্তু পুরুষসূক্তের কবি সচেতনভাবেই মানবদেহের অঙ্গগুলোর মধ্যে এক কৃত্রিম স্তরবিন্যাস টেনে দিয়েছেন। মুখ বা মাথা হলো সবচেয়ে উঁচু ও সম্মানজনক স্থান, আর পা হলো মাটির সাথে মিশে থাকা সবচেয়ে নিচু ও ধূলিমলিন স্থান। সুসান বেইলি জাতি ও ক্ষমতার রাজনীতি বিষয়ক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে এই দেহতত্ত্ব মূলত প্রাচীন ভারতে কায়িক শ্রমকে অপবিত্র ঘোষণা করার এক প্রাতিষ্ঠানিক নীলনকশা ছিল (Bayly, 1999)।
শূদ্রকে পায়ের সাথে তুলনা করার মধ্য দিয়ে তৎকালীন সমাজের পুরো শ্রমজীবী মানুষের অবস্থানকে চূড়ান্তভাবে অধস্তন করে ফেলা হয়েছিল। উমা চক্রবর্তী প্রাচীন ভারতের সামাজিক সচলতা নিয়ে গবেষণায় স্পষ্ট করেছেন যে বৈদিক সমাজ যত বেশি বিকশিত হয়েছে, কায়িক শ্রমের প্রতি ঘৃণা তত বেশি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে (Chakravarti, 1985)। যারা মাঠে ধান ফলাত, যারা মাটি কেটে ঘর বানাত, যারা চামড়ার কাজ করত বা বর্জ্য পরিষ্কার করত – অর্থাৎ যাদের শ্রমে পুরো সমাজ বেঁচে থাকত – তাদের স্থান দেওয়া হলো সবার নিচে। কারণ পুরোহিতদের যুক্তি অনুযায়ী, তাদের জন্ম হয়েছে পায়ের তলা থেকে।
হাবারমাসের যোগাযোগের তত্ত্বের নিরিখে এটি ছিল এক চরম ভাষিক অবিচার। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, পুরুষসূক্তে ভাষার অধিকার কেবল মুখের দাবিদার ব্রাহ্মণকেই দেওয়া হয়েছে। বাহুর অধিকারী ক্ষত্রিয় পেয়েছে তরবারি চালানোর অধিকার, আর পায়ের অধিকারী শূদ্রের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে কেবল মৌন সেবা। শূদ্রের কোনো ভাষা নেই, তার কোনো নিজস্ব মতামত দেওয়ার অধিকার নেই। সে কেবল একটি অনুভূতিহীন যন্ত্রের মতো সমাজের বাকি তিন উচ্চবর্ণের ভার বহন করে চলবে। যোগাযোগমূলক ক্রিয়ায় যেখানে প্রত্যেকের কথা বলার সমান সুযোগ থাকার কথা ছিল, পুরুষসূক্ত সেখানে সমাজের সিংহভাগ শ্রমজীবী মানুষের মুখটিকে ধর্মীয়ভাবে সেলাই করে দিয়েছিল।
এই শ্রমের অবমূল্যায়ন ভারতীয় সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে এক পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। সমাজের উৎপাদনশীল অংশকে চিরতরে অপবিত্র ও অধিকারহীন করে রেখে কেবল কিছু অনুৎপাদনশীল পরজীবী শ্রেণির বিলাসিতাকে মহিমান্বিত করা হয়েছিল। পুরুষসূক্ত কেবল একটি তাত্ত্বিক রূপক ছিল না; এটি পরবর্তী শতকগুলোতে রচিত সমস্ত ধর্মশাস্ত্র ও মনুসংহিতার জন্য একটি নির্মম ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করেছিল। মনু যখন শূদ্রদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান দিচ্ছিলেন, তখন তিনি বারবার এই পুরুষসূক্তের পদজাত হওয়ার যুক্তিটিকেই ধার করেছিলেন। ক্ষমতার এই শারীরিক প্রতীকায়ন তাই কোনো অলৌকিক কাব্য নয়; এটি ছিল মানুষের শ্রমকে চুরি করার এক সুসংগঠিত মতাদর্শিক প্রযুক্তি।
ক্রিটিকাল হার্মেনিউটিক্স ও মহাজাগতিক মিথের বি-মিথিকায়ন (Critical Hermeneutics and the Demythologization of Cosmic Myth)
ইয়ুর্গেন হাবারমাসের ক্রিটিকাল হার্মেনিউটিক্সের মূল লক্ষ্য হলো ভাষার ভেতরে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতার এই অদৃশ্য শেকলগুলোকে চিনে ফেলা এবং সেগুলোকে ভেঙে ফেলা। তিনি তার যোগাযোগ ও সামাজিক বিবর্তন সংক্রান্ত কাজে দেখিয়েছেন যে আধুনিক সমাজের মুক্তি নির্ভর করে অন্ধ ঐতিহ্যের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হয়ে একটি যুক্তিবাদী ও সংলাপাভিমুখী সমাজে পৌঁছানোর ওপর (Habermas, 1979)। পুরুষসূক্তের মতো ক্যানোনিকাল সাহিত্যের অধ্যয়নে আজকের ধর্মনিরপেক্ষ গবেষকের দায়িত্ব হলো একটি কঠোর বি-মিথিকায়ন (Demythologization) সম্পন্ন করা। এই পৌরাণিক গল্পের ওপর থেকে অলৌকিকতার সমস্ত চাদর সরিয়ে ফেলে তাকে তার আদি কঙ্কালসার রাজনৈতিক রূপে প্রত্যক্ষ করা ছাড়া মুক্তচিন্তার কোনো বিকাশ সম্ভব নয়।
বি-মিথিকায়ন মানে হলো এটি স্পষ্ট করে দেওয়া যে কোনো আদিম মহাজাগতিক পুরুষ কখনো ছিল না, আর আকাশ বা পৃথিবী কোনো বলিদানের মাধ্যমে তৈরি হয়নি। এটি ছিল ব্রোঞ্জ ও লৌহযুগের একদল চতুর যাজকের মনগড়া কল্পনা, যা তাদের তৎকালীন শ্রেণি-স্বার্থ রক্ষার তাগিদে রচিত হয়েছিল। আধুনিক নৃবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের জ্ঞান দিয়ে বিচার করলে দেখা যায়, বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও শাসকশ্রেণি এই ধরনের নানা সৃষ্টিতত্ত্বের মিথ তৈরি করেছিল নিজেদের আধিপত্য ন্যায্য করার জন্য। মেসোপটেমিয়ার এনুমা এলিশ কিংবা প্রাচীন চীনের নানা সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে পুরুষসূক্তের কাঠামোগত মিল রয়েছে। এটি ভারতীয় কোনো অনন্য আধ্যাত্মিক সত্য নয়; এটি হলো মানব ইতিহাসের আদিম শ্রেণি-শোষণের এক পরিচিত কৌশল।
হাবারমাসের অনুসারীরা দেখান যে কোনো সমাজ যতক্ষণ পর্যন্ত তার প্রাচীন মতাদর্শিক মিথ্যাচারগুলোকে মহিমান্বিত করতে থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই সমাজে সত্যিকার অর্থে কোনো গণতান্ত্রিক বা সমতাভিত্তিক যোগাযোগ গড়ে উঠতে পারে না। আজ যখন কোনো ঐতিহ্যবাদী বা হিন্দুত্ববাদী তাত্ত্বিক দাবি করেন যে পুরুষসূক্তে আসলে জৈব ঐক্যের কথা বলা হয়েছে এবং দেহের অঙ্গ হিসেবে সবাই সমান, তখন তারা মূলত সেই প্রাচীন বিকৃত যোগাযোগকেই আধুনিক রূপ দিতে চান। পায়ের কাজ যদি মাটির নিচে পড়ে থাকা হয় আর মাথার কাজ যদি সিংহাসনে বসা হয়, তবে তাকে কোনোভাবেই সাম্য বলা যায় না। এই ধরনের অপব্যাখ্যাকে খণ্ডন করা একটি বৈজ্ঞানিক ও বস্তুনিষ্ঠ অ্যাকাডেমিক পাঠের প্রধান কর্তব্য।
পরিশেষে বলা যায়, হাবারমাসের সমাজতত্ত্ব পুরুষসূক্তের সেই মহাজাগতিক ভাষাকে ধূলিসাৎ করে দেয় যা হাজার বছর ধরে সামাজিক অন্যায়কে ন্যায়ের মুখোশ পরিয়ে রেখেছিল। পুরুষসূক্ত কোনো পবিত্র আকাশবাণী নয়; এটি হলো প্রাচীন ভারতের এক তীব্র সংঘাতময় মুহূর্তের লিখিত রাজনৈতিক দলিল, যেখানে ভাষার চাতুর্য দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারকে অমরত্ব দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। মহাজাগতিক রূপকের এই পর্দা ছিঁড়ে ফেলে যখন পাঠটিকে দেখা হয়, তখন উন্মোচিত হয় এক চরম পক্ষপাতদুষ্ট ও শোষণমূলক বয়ান। এই নির্মোহ ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমেই কেবল প্রাচীন সাহিত্যের ওপর থেকে অপৌরুষেয়তার ভূত নামানো সম্ভব এবং গড়ে তোলা সম্ভব এক মুক্ত, সমতাভিত্তিক ও যুক্তিবাদী সমাজচেতনা।
হাবারমাস ও বর্ণের প্রতীকায়ন (Habermas and the Symbolization of Varṇa): শরীর, সামাজিক পার্থক্য ও মতাদর্শ
প্রতীকী প্রজনন ও মতাদর্শের ক্রিটিক: হাবারমাসের সমাজতত্ত্ব (Symbolic Reproduction and Critique of Ideology: Habermas’s Sociology)
মানবসমাজ কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজের অসম সামাজিক কাঠামোকে টিকিয়ে রাখে, তা আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম বড় এক জিজ্ঞাসা। কোনো শাসকগোষ্ঠী কেবল অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। মানুষ একসময় চাবুকের ভয় কাটিয়ে ওঠে। জার্মান দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক ইয়ুর্গেন হাবারমাস (Jürgen Habermas) দেখিয়েছেন যে সমাজকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে বস্তুগত উৎপাদনের পাশাপাশি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জগতেও এক ধরনের উৎপাদন চালিয়ে যেতে হয়। হাবারমাস তার সমাজতত্ত্বে একে নাম দিয়েছেন প্রতীকী প্রজনন (Symbolic Reproduction) (Habermas, 1990)। এই প্রক্রিয়ায় সমাজের বিদ্যমান ক্ষমতার সম্পর্কগুলোকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক চিহ্ন, পৌরাণিক রূপক এবং ধর্মীয় আচারের ভেতর দিয়ে এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে সমাজের নতুন প্রজন্ম কোনো প্রশ্ন ছাড়াই সেগুলোকে নিজের বিশ্বাস বলে গ্রহণ করে নেয়।
সমাজদার্শনিক টেরি ঈগলটন মতাদর্শের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে ক্ষমতা নিজেকে স্বাভাবিকতার চাদরে ঢেকে ফেলে। ঈগলটন তার প্রভাবশালী গ্রন্থে স্পষ্ট করেছেন যে মতাদর্শের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো কোনো একটি বিশেষ গোষ্ঠীর কায়েমি স্বার্থকে পুরো মানবজাতির প্রাকৃতিক নিয়মের মতো হাজির করা (Eagleton, 1991)। শাসকশ্রেণি এমন কিছু প্রতীক তৈরি করে যা মানুষের চিন্তার দিগন্তকে সংকীর্ণ করে ফেলে। মানুষ তখন আর সামাজিক বিভাজনকে কোনো মানুষের তৈরি শোষণ বলে ভাবতে পারে না। সুইডিশ সমাজবিজ্ঞানী ইয়োরান থেরবর্ন তার গবেষণায় তুলে ধরেন যে মতাদর্শ মানুষের মনে তিনটি মৌলিক ধারণা তৈরি করে দেয় – সমাজ আসলে কী, কোন জিনিসটিকে ভালো বা পবিত্র বলে মানতে হবে এবং বিদ্যমান বাস্তবতার বাইরে অন্য কিছু ভাবা সম্ভব কি না (Therborn, 1980)। এর ফলে মানুষ বিদ্যমান বৈষম্যকেই একমাত্র বাস্তব সত্য বলে ধরে নেয়।
হাবারমাসের ক্রিটিকাল থিওরির মূল জায়গাটি হলো মানুষের মুক্ত যোগাযোগ করার ক্ষমতার ওপর নজর দেওয়া। হাবারমাসের মতে, মানুষ ভাষার মাধ্যমে যুক্তিতর্ক করে একটি ঐকমত্যে পৌঁছানোর ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। কিন্তু মতাদর্শ ভাষার এই মুক্ত ময়দানটিকে দখল করে নেয়। সেখানে এমন কিছু প্রতীক ও সংস্কার প্রতিষ্ঠা করা হয়, যাদের নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা বা আলোচনা করা নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে। ক্ষমতার এই প্রতীকায়ন সাধারণ মানুষের বিচারবুদ্ধিকে অবশ করে ফেলে। মানুষ যখন দেখে যে একটি অসম ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে অলঙ্ঘনীয় কোনো পবিত্র প্রতীক, তখন সে নিজের যুক্তিকে বিসর্জন দিয়ে সেই প্রতীকের সামনে মাথা নত করে। এর ফলে সমাজে এমন এক নীরব আনুগত্য তৈরি হয় যা চাবুকের চেয়েও বেশি শক্তিশালী।
এই তাত্ত্বিক পাটাতনে দাঁড়িয়ে বৈদিক এবং উত্তর-বৈদিক সাহিত্যের সামাজিক স্তরবিন্যাসকে পর্যবেক্ষণ করলে এক গভীর মতাদর্শিক চাতুর্য চোখে পড়ে। প্রাচীন ভারতে বর্ণব্যবস্থাকে কোনো রাজা বা সামন্তপ্রভুর গায়ের জোরের ফল হিসেবে হাজির করা হয়নি। বরং তাকে সাজানো হয়েছিল মানবদেহের অঙ্গসংস্থান এবং কসমসের গভীর রূপক দিয়ে। হাবারমাসের ক্রিটিকাল হার্মেনিউটিক্স আমাদের শেখায় কীভাবে এই পবিত্র প্রতীকের খোলস ভেঙে তার ভেতরের ক্ষমতার রাজনীতিকে উন্মোচন করতে হয়। বর্ণব্যবস্থা কোনো অতীন্দ্রিয় বিধান ছিল না; এটি ছিল প্রাচীন ভারতের সুবিধাভোগী শ্রেণির তৈরি করা এক প্রতীকী মতাদর্শ, যার আসল উদ্দেশ্য ছিল সমাজের উৎপাদনশীল অংশকে চিরতরে অধস্তন করে রাখা।
বর্ণ প্রত্যয়ের উৎপত্তি ও শারীরিক রূপকের নির্মাণ (Origin of the Category Varṇa and Construction of Bodily Metaphors)
প্রাচীন ভারতীয় সংকলনগুলোতে সামাজিক বিভাজনের যে কাঠামোটি সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে, তা হলো বর্ণ (Varṇa)। এই প্রত্যয়টির আদি ব্যাকরণগত অর্থ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, এর সংযোগ ছিল কোনো বস্তুর বহিঃপ্রকাশ, আবরণ বা রঙের সাথে। ঋগ্বেদের আদিম যাযাবর যুগে যখন আর্যভাষী পশুপালক দলগুলো উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রবেশ করছিল, তখন স্থানীয় দাস বা অনার্য জনগোষ্ঠীর সাথে তাদের শারীরিক বৈসাদৃশ্য বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হতো। হ্যারল্ড এ. গোল্ড ভারতের কাস্ট ব্যবস্থার সমাজতাত্ত্বিক পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন যে প্রাথমিক যুগের এই উপজাতীয় ও বর্ণগত ফারাক পরবর্তীকালে একটি পবিত্র সামাজিক বিভাজনে রূপ নেয় (Gould, 1987)। সময়ের বিবর্তনে একটি সাধারণ শারীরিক পরিচয়কে পরিণত করা হলো অলঙ্ঘনীয় এক সামাজিক শৃঙ্খলায়।
পরবর্তী বৈদিক যুগে এসে যখন স্থায়ী কৃষি ও বসতি গড়ে উঠল, তখন এই বর্ণ প্রত্যয়টিকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হলো এক কৃত্রিম স্তরবিন্যাস। পুরো সমাজকে চারটি প্রধান বর্গে ভাগ করা হলো: ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র। এই সামাজিক বিভাজনকে টিকিয়ে রাখার জন্য সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল মানবদেহের রূপককে। সমাজকে দেখা হলো একটি বিশালাকার জীবন্ত শরীর হিসেবে। মানবদেহে যেমন অঙ্গের তারতম্য থাকে, তেমনই সমাজের কাজগুলোকেও সেই দেহাংশের মর্যাদা দিয়ে বেঁধে ফেলা হলো। মাথা বা মুখ হলো চিন্তা এবং ভাষার আধার, তাই সেখানে বসানো হলো পুরোহিত ব্রাহ্মণকে। বাহু হলো শক্তির প্রতীক, তাই তা গেল যোদ্ধা ক্ষত্রিয়ের ভাগে। পেট বা ঊরু হলো পুষ্টি উৎপাদনের উৎস, সেখানে জায়গা দেওয়া হলো কৃষক ও বণিক বৈশ্যকে। আর পা হলো সবার নিচে থাকা ধূলিমলিন অঙ্গ, সেখানে ঠেলে দেওয়া হলো সমস্ত কায়িক শ্রমের দায়িত্বপ্রাপ্ত শূদ্রকে।
নৃতাত্ত্বিক ক্লিফোর্ড গিয়ার্টজ তার সংস্কৃতিবিষয়ক তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে প্রতীক কেবল বাস্তবতাকে দেখায় না; প্রতীক বাস্তবতাকে নির্দিষ্ট ছাঁচে গড়ে তোলার নকশাও তৈরি করে (Geertz, 1973)। শরীরের এই রূপকটি প্রাচীন সমাজে ঠিক এই কাজটিই করেছিল। সমাজের অসমতা যে কিছু মানুষের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফসল, সেই সত্যটি আড়াল করতে মানবদেহের চেয়ে উপযুক্ত প্রতীক আর হতে পারত না। কোনো মানুষ নিজের সুস্থ পা কেটে ফেলে দিতে চায় না, আবার পা কখনো দাবি করতে পারে না যে সে মাথার জায়গায় গিয়ে বসবে। শরীরবিজ্ঞানের এই আপাত-অনিবার্য যুক্তিকে সমাজবিজ্ঞানে টেনে এনে পুরোহিতরা এমন এক আবহ তৈরি করলেন যাতে মনে হয় শূদ্রের সেবা করা এবং ব্রাহ্মণের আদেশ মানা মানুষের শারীরিক গঠনের মতোই এক স্বাভাবিক ও অমোঘ নিয়ম।
এই শারীরিক রূপকের মধ্য দিয়ে সামাজিক বৈষম্যকে মানুষের জীববিজ্ঞানের সাথে একাকার করে দেওয়া হয়েছিল। হাবারমাসের ভাষায় যাকে বলা যায় যোগাযোগের পদ্ধতিগত বিকৃতি, এটি ছিল তারই চূড়ান্ত রূপ। ক্ষমতা এখানে নিজের রূপটি গোপন রেখে মানুষের নিজস্ব শারীরিক অভিজ্ঞতার ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। এর ফলে সমাজে এমন এক স্থায়ী বিশ্বাস তৈরি হলো যে একজন মানুষ যে বর্ণের হয়ে জন্মেছে, তার সামাজিক মর্যাদা তার শরীরের মতোই অপরিবর্তনীয়। এই প্রতীকায়ন বৈষম্যের রাজনীতিকে এক অলৌকিক জৈব শৃঙ্খলার রূপ দিয়েছিল।
শরীরের সীমানা ও শুচিতা-অশুচিতার প্রতীকী রাজনীতি (Bodily Margins and the Symbolic Politics of Purity-Pollution)
বর্ণের এই শারীরিক প্রতীকায়ন কেবল রূপকের স্তরে থেমে থাকেনি; এটি বাস্তব জীবনে নেমে এসেছিল মানবদেহের সীমানা এবং শুচিতা-অশুচিতার এক নির্মম বিধিমালার মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশ নৃতাত্ত্বিক মেরি ডগলাস তার সুবিখ্যাত গবেষণাগ্রন্থ পিউরিটি অ্যান্ড ডেঞ্জার (Purity and Danger)-এ শরীর ও সমাজের এই গভীর সংযোগের রূপরেখা উন্মোচন করেছিলেন (Douglas, 1966)। ডগলাস দেখান যে মানবদেহ হলো সমাজের এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রূপক। সমাজ যখন নিজের ভেতরের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে চায়, তখন সেই উদ্বেগ প্রকাশ পায় মানবদেহের বিভিন্ন রন্ধ্র, তরল পদার্থ এবং শারীরিক স্পর্শের ওপর নানাবিধ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে। প্রাচীন বৈদিক ও উত্তর-বৈদিক সাহিত্য এই শারীরিক উদ্বেগের এক চরম পরাকাষ্ঠা তৈরি করেছিল।
ধর্মসূত্র এবং পরবর্তী স্মৃতিশাস্ত্রে মানুষের শরীরের বর্জ্য, ঘাম, লালা, রক্ত বা মৃতদেহ স্পর্শ করাকে চরম অশুচিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হলো। এই অশুচিতার ধারণাটিকে খুব চতুরতার সাথে জুড়ে দেওয়া হলো নির্দিষ্ট কিছু শ্রমজীবী মানুষের ওপর। যারা সমাজের ময়লা পরিষ্কার করত, পশুর চামড়া ছাড়াত কিংবা কৃষির জমিতে ঘাম ঝরাত, তাদের শরীরকে ঘোষণা করা হলো স্থায়ীভাবে দূষিত। রবার্ট ডেলিজে ভারতের দলিত জনগোষ্ঠীর ওপর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে অস্পৃশ্যতার এই ধারণাটি আসলে কায়িক শ্রমের সাথে যুক্ত মানুষদের সমাজ থেকে শারীরিকভাবে তাড়িয়ে রাখার এক প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল ছিল (Deliege, 1999)। উচ্চবর্ণের শরীর হয়ে উঠল পবিত্র ও সুরক্ষিত, আর নিম্নবর্ণের শরীর পরিণত হলো এক সম্ভাব্য অপবিত্রতার উৎসে, যার ছায়া লাগলেও সমাজ অপবিত্র হয়ে যাবে।
হাবারমাসের যোগাযোগমূলক যৌক্তিকতার আলোকে বিচার করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে শুচিতা-অশুচিতার এই রাজনীতি ছিল সামাজিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার এক নিখুঁত নকশা। শারীরিক স্পর্শ নিষিদ্ধ করা, এক সাথে বসে আহার বন্ধ করা এবং একই জলাশয় থেকে জল নেওয়াকে অপরাধ গণ্য করার মূল উদ্দেশ্য ছিল কোনো ধরনের মানবিক আদান-প্রদান যাতে গড়ে উঠতে না পারে। মানুষ যখন একে অপরের শরীরকে বিপজ্জনক এবং দূষিত ভাবতে শুরু করে, তখন তাদের মধ্যে কোনো সমমর্যাদার সংলাপ হওয়া সম্ভব নয়। ক্ষমতা মানুষের মধ্যে দূরত্বের এমন এক অদৃশ্য দেওয়াল তুলে দিয়েছিল যার ফলে সমাজের বৃহৎ অংশটি নিজেদের অধিকার নিয়ে একজোট হতে পারেনি।
এই মানসিক দূরত্ব নিম্নবর্ণের মানুষের মনকে হীনম্মন্যতায় পূর্ণ করে দিয়েছিল। একজন প্রান্তিক মানুষকে ছোটবেলা থেকেই শেখানো হতো যে তার শরীরটাই পাপের আধার। ফলে সে নিজেই নিজের অস্তিত্বকে ঘৃণা করতে শুরু করত এবং উচ্চবর্ণের শরীরকে দেখত কোনো দূরবর্তী স্বর্গের অংশ হিসেবে। কনস্ট্যান্স ক্লাসেন তার ইন্দ্রিয় সমাজতত্ত্বে দেখিয়েছেন কীভাবে শরীরের গন্ধ ও স্পর্শকে সামাজিক শ্রেণিভেদের সাথে যুক্ত করে ক্ষমতা কায়েম করা হয় (Classen, 1993)। বৈদিক ধারার এই শরীরতত্ত্ব মানুষের স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতিগুলোকে হত্যা করে সেখানে এক স্থায়ী অপরাধবোধের রাজত্ব কায়েম করেছিল।
প্রতীকী ক্ষমতা ও স্বভাবগত পার্থক্যের স্বাভাবিকীকরণ (Symbolic Power and the Naturalization of Inherent Difference)
ফরাসি তাত্ত্বিক পিয়ের বুরদিউ তার সমাজদর্শনে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রত্যয় হাজির করেছিলেন, যার নাম প্রতীকী ক্ষমতা (Symbolic Power) (Bourdieu, 1991)। বুরদিউর মতে, এই ক্ষমতা কোনো শারীরিক বলপ্রয়োগ করে না; এটি মানুষের মনের মধ্যে এমন কিছু ধারণা বা ছক বসিয়ে দেয় যার ফলে শোষিত মানুষ নিজের শোষককে বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে মেনে নেয়। বুরদিউ তার আরেকটি তাত্ত্বিক গ্রন্থে মানুষের অবচেতন শারীরিক অভ্যাসকে হ্যাবিটাস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Bourdieu, 1977)। প্রাচীন বর্ণব্যবস্থার প্রতীকায়নে এই প্রতীকী ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটেছিল মানুষের জন্মগত গুণ ও স্বভাবের কাল্পনিক তত্ত্ব তৈরির মাধ্যমে।
পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যে এবং উপনিষদের পরবর্তী দার্শনিক বিতর্কে বর্ণকে আর নিছক সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। তাকে যুক্ত করা হলো মানুষের আত্মা ও মহাজাগতিক গুণের সাথে। বলা হলো, প্রতিটি মানুষ জন্ম থেকেই তিনটি গুণের কোনো একটি বহন করে: সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ। সত্ত্ব হলো আলোক ও পবিত্রতার প্রতীক, যা থাকবে কেবল ব্রাহ্মণের ভেতর; রজঃ হলো অহংকার ও শক্তির প্রতীক, যা বরাদ্দ হলো ক্ষত্রিয়ের জন্য; আর তমঃ হলো অন্ধকার, জড়তা ও পাপের প্রতীক, যা চাপিয়ে দেওয়া হলো শূদ্রের কপালে। এই মনগড়া তত্ত্বটি সমাজতাত্ত্বিক বিভাজনকে এক নিমেষে জৈবিক ও অধিবিদ্যক নিয়মে পরিণত করল।
হাবারমাস দেখিয়েছেন যে যখন কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে মানুষের জন্মগত প্রকৃতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তখন সেখানে সমস্ত যুক্তিবাদী বিতর্কের ইতি ঘটে। কোনো রাজার আইনকে প্রশ্ন করা যায়, কিন্তু মানুষের জন্মগত রক্তের স্বভাবকে কীভাবে প্রশ্ন করা যাবে? বৈদিক মতাদর্শে দাবি করা হলো যে প্রতিটি মানুষের একটি নির্দিষ্ট স্বভাব (Inherent Nature/Svabhāva) রয়েছে এবং সেই স্বভাব অনুযায়ী কাজ করাই তার একমাত্র ধর্ম। মানুষ ভাবতে বাধ্য হলো যে সে যদি নিম্নবর্ণ হয়ে জন্মায়, তবে তা কোনো মানুষের অন্যায় নয়, বরং তার পূর্বজন্মের কর্মের ফলে অর্জিত অন্ধকার প্রকৃতির প্রকাশ।
প্রতীকী ক্ষমতার এই চাতুর্যের ফলে নিপীড়িত মানুষ নিজেই নিজের অধীনতাকে সার্থকতা দিতে শুরু করল। একজন দাস ভাবত যে তার ভাগ্যে এটাই লেখা ছিল এবং এই সেবা করাই তার বর্তমান জীবনের সার্থকতা। হাবারমাসের সমাজতত্ত্বে এটি হলো পদ্ধতিগতভাবে বিকৃত যোগাযোগের সবচেয়ে করুণ পর্যায়। মতাদর্শ এখানে মানুষের বিচারবুদ্ধিকে এমনভাবে দখল করে নিল যাতে মানুষ মুক্তির বদলে নিজের দাসত্বকেই নিজের একমাত্র গৌরবময় পরিচয় বলে আঁকড়ে ধরে থাকে।
যোগাযোগের অসমতা ও প্রান্তিক সত্তার নির্বাককরণ (Communicative Asymmetry and the Silencing of Marginal Subjects)
ইয়ুর্গেন হাবারমাসের চিন্তার একটি আদর্শ রূপ হলো এমন এক সামাজিক পরিস্থিতি তৈরি করা যেখানে সবার সমান কথা বলার অধিকার থাকবে। হাবারমাস একে সংজ্ঞায়িত করেছেন আদর্শ বক্তব্য পরিস্থিতি (Ideal Speech Situation) হিসেবে (Habermas, 1990)। এই পরিস্থিতিতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ভাষার ওপর একচেটিয়া অধিকার ফলাতে পারে না। প্রত্যেকে নিজের যুক্তি প্রকাশ করতে পারে এবং যেকোনো কর্তৃত্ববাদী দাবির প্রমাণ চাইতে পারে। কিন্তু প্রাচীন ভারতীয় বর্ণকাঠামো পরীক্ষা করলে দেখা যায়, এটি ছিল এই সমতাভিত্তিক যোগাযোগের এক চূড়ান্ত বিপরীত রূপ। সেখানে যোগাযোগকে সাজানো হয়েছিল এক কঠোর একমুখী হুকুমের কাঠামোয়।
নিকোলাস বি. ডার্কস তার বিখ্যাত ঐতিহাসিক গ্রন্থে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে কাস্ট ব্যবস্থা কীভাবে ভারতের সমাজে এক সুসংগঠিত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ জারি রেখেছিল (Dirks, 2001)। যোগাযোগের ক্ষেত্রে এর প্রথম আক্রমণটি এসেছিল ভাষার ওপর। বৈদিক সংস্কৃতকে ঘোষণা করা হলো স্বর্গের ভাষা, যা শোনার বা বলার অধিকার কেবল উচ্চবর্ণের কিছু পুরুষের ছিল। শূদ্র এবং নারীদের জন্য এই ভাষার দরজা ছিল সম্পূর্ণ বন্ধ। প্রাচীন আইনশাস্ত্রগুলোতে বিধান দেওয়া হয়েছিল যে শূদ্র যদি ভুল করেও বেদের কোনো মন্ত্র শুনে ফেলে, তবে তার কানে গলিত লোহা বা গরম তেল ঢেলে দিতে হবে; আর যদি সে সেই মন্ত্র উচ্চারণ করে, তবে তার জিহ্বা কেটে ফেলতে হবে।
ভাষার ওপর এই রক্তাক্ত নিষেধাজ্ঞা কোনো সাধারণ আইনি শাস্তি ছিল না। এটি ছিল প্রান্তিক মানুষের যোগাযোগের সমস্ত পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক চেষ্টা। যে মানুষের কথা বলার ভাষা নেই, সে সমাজে কোনো প্রতিবাদী বয়ান তৈরি করতে পারে না। শূদ্রদের জন্য বরাদ্দ রাখা হলো কেবল প্রাকৃত বা স্থানীয় উপভাষা, যার কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় ক্ষমতা ছিল না। ফলে সমাজ পরিণত হলো এক অদ্ভুত বাকহীন কারখানায়, যার শীর্ষে বসে ছিল কথা বলার একক অধিকারী পুরোহিতশ্রেণি, আর নিচে পড়ে ছিল এক বিশাল নির্বাক ও অধিকারহীন শ্রমজীবী মানুষ।
হাবারমাসের দৃষ্টি দিয়ে তাকালে পরিষ্কার ধরা পড়ে যে এই যোগাযোগের অসমতা টিকে ছিল এক চরম ভণ্ডামির ওপর। উচ্চবর্ণের মানুষ প্রচার করেছিল যে শূদ্রের কোনো দাবি জানানোর দরকার নেই, তাদের নিঃশব্দ সেবাই তাদের আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ। ভাষার এই চাতুর্য মানুষের ভেতর থেকে প্রতিবাদের আগুন নিভিয়ে দিয়েছিল। ক্ষমতা যখন যোগাযোগের এমন ভারসাম্যহীন কাঠামো তৈরি করে, তখন সমাজে কোনো গণতান্ত্রিক সংলাপের সুযোগ থাকে না। প্রান্তিক মানুষের এই মুখ বন্ধ করে দেওয়াটাই ছিল বৈদিক বর্ণের প্রতীকায়নের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অপরাধ।
মতাদর্শিক প্রতীকের বিনির্মাণ ও যুক্তিবাদী রূপান্তর (Deconstruction of Ideological Symbols and Rational Transformation)
এই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা প্রতীকী শেকল থেকে মানুষের মুক্তি কীভাবে সম্ভব? হাবারমাস তার শুরুর দিকের ধ্রুপদী গ্রন্থ নলেজ অ্যান্ড হিউম্যান ইন্টারেস্টস (Knowledge and Human Interests)-এ মানুষের একটি বিশেষ বৌদ্ধিক ইচ্ছার কথা বলেছিলেন, যার নাম মুক্তিদায়ক স্বার্থ (Emancipatory Interest) (Habermas, 1971)। তার মতে, মানুষের আসল কাজ হলো সেই সমস্ত মিথ্যা মতাদর্শিক কাঠামোকে চিনে ফেলা এবং ধ্বংস করা যা মানুষকে অবচেতনভাবে দাস বানিয়ে রেখেছে। এই মুক্তির সূচনা ঘটে তখন, যখন মানুষ কোনো অন্ধ ভক্তি ছাড়া ঐতিহ্যের তৈরি করা প্রতীকগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করার সাহস অর্জন করে।
বর্ণের প্রতীকায়নকে যদি আজকের ধর্মনিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি দিয়ে দেখা হয়, তবে তার সমস্ত শারীরিক ভিত্তি মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বা জীববিজ্ঞান দ্ব্যর্থহীনভাবে তুলে ধরেছে যে মানুষের রক্ত, জিন বা কঙ্কালের মধ্যে এমন কোনো পার্থক্য নেই যা জন্ম দিয়ে মানুষকে উঁচু বা নিচু করে তৈরি করে। কোনো মানুষ মাথায় জ্ঞান নিয়ে জন্মায় না, আর কোনো মানুষ পায়ে দাসত্ব নিয়ে জন্মায় না। প্রাচীন বৈদিক সমাজপতিরা যে দেহতত্ত্ব তৈরি করেছিলেন, তা ছিল নিছকই একটি কৃষিভিত্তিক পিতৃতান্ত্রিক সমাজের উদ্বৃত্ত সম্পদ কুক্ষিগত রাখার মনগড়া গল্প। এর কোনো বস্তুনিষ্ঠ সত্যতা কোনোদিনই ছিল না।
যুক্তিবাদী সমাজ গঠনের প্রধান শর্ত হলো এই সমস্ত প্রতীকী বোঝাকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলা। হাবারমাসের সমাজতত্ত্ব আমাদের এমন এক মুক্ত গণপরিসরের স্বপ্ন দেখায় যেখানে কোনো মানুষের পরিচয় তার বংশ বা শরীর দিয়ে মাপা হবে না। যেখানে প্রতিটি মানুষ সমান মর্যাদায় সংলাপে অংশ নেবে এবং কোনো ধর্মীয় রূপক দিয়ে মানুষের শ্রমকে অবমূল্যায়ন করা যাবে না। প্রাচীন সাহিত্যের এই সমালোচনা কোনো ক্ষোভের প্রকাশ নয়; এটি হলো বর্তমান মানবজাতিকে অতীতের তৈরি করা মতাদর্শিক বিষবাষ্প থেকে মুক্ত করার একটি লড়াই।
সব মিলিয়ে বলা যায়, হাবারমাসের সমাজতত্ত্ব বৈদিক সাহিত্যের বর্ণের প্রতীকায়নকে তার সমস্ত পবিত্রতার মুখোশ খুলে এক নগ্ন ক্ষমতার খেলা হিসেবে উন্মোচিত করে। বর্ণব্যবস্থা কোনো স্বর্গীয় সামঞ্জস্য ছিল না; এটি ছিল মানুষের শরীরকে শোষণের যন্ত্রে রূপান্তর করার এক ধূর্ত বুদ্ধিবৃত্তিক ফাঁদ। শরীরকে অসম অঙ্গের রূপক বানিয়ে, অশুচিতার আতঙ্ক ছড়িয়ে, জন্মগত স্বভাবের মিথ খাড়া করে এবং মুখের ভাষা কেড়ে নিয়ে যে সমাজব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছিল, তা ছিল মানব মর্যাদার ওপর এক স্থায়ী কুঠারাঘাত। এই প্রতীকী কাঠামোর নির্মোহ ঐতিহাসিক বিনির্মাণই পারে এক নতুন মানবিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও সমতাভিত্তিক যুক্তিবাদী সমাজচেতনার দ্বার উন্মুক্ত করতে।
দ্বৈততা, অন্যতা ও পাঠের অস্থিতিশীলতা (Binary, Otherness and Textual Instability): দেরিদার বিনির্মাণমূলক প্রয়োগ
দেরিদা ও দেব-অসুর দ্বৈততা (Derrida and the Deva-Asura Binary): পরিচয়, বিরোধ ও পারস্পরিক নির্ভরতা
দ্বৈত বৈপরীত্যের বিনির্মাণ ও লোগোকেন্দ্রিকতা: দেরিদার পাঠপদ্ধতি (Deconstruction of Binary Opposition and Logocentrism: Derrida’s Method)
পাশ্চাত্য দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের মূল ভিত্তি পরীক্ষা করতে গিয়ে ফরাসি দার্শনিক জাক দেরিদা (Jacques Derrida) ভাষার ভেতরে থাকা এক অদৃশ্য পক্ষপাতিত্বকে চিহ্নিত করেছিলেন। দেরিদা তার যুগান্তকারী গ্রন্থ অফ গ্রামাটোলজি (Of Grammatology)-তে দেখান যে ঐতিহ্যবাহী চিন্তা সবসময় সত্যের একটি স্থায়ী কেন্দ্র কল্পনা করে নেয় (Derrida, 1976)। এই কেন্দ্রকে তিনি নাম দিয়েছেন লোগোকেন্দ্রিকতা (Logocentrism)। এই লোগোকেন্দ্রিক চিন্তা সমাজ ও ভাষার প্রতিটি ধারণাকে এক জোড়া অনড় বিপরীত মেরুতে ভাগ করে বুঝতে অভ্যস্ত। এই জোড়গুলোকে দর্শনতত্ত্বে বলা হয় দ্বৈত বৈপরীত্য (Binary Opposition)। যেমন আলো ও অন্ধকার, ভালো ও মন্দ, পবিত্র ও অপবিত্র, আত্মা ও শরীর, কিংবা ঈশ্বর ও শয়তান।
দেরিদা প্রমাণ করেন যে এই দ্বৈততাগুলো কোনো নিরপেক্ষ বা নিষ্পাপ বিভাজন নয়। জোনাথন কালার দেরিদার বিনির্মাণ তত্ত্বের ব্যাখ্যায় দেখিয়েছেন যে প্রতিটি দ্বৈত বৈপরীত্যের ভেতরে একটি অদৃশ্য ক্ষমতার অসমতা বা স্তরবিন্যাস লুকিয়ে থাকে (Culler, 1982)। জোড়ের প্রথম পদটিকে সবসময় বিশুদ্ধ, আদিম এবং ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়, আর দ্বিতীয় পদটিকে দেখা হয় প্রথম পদের চেয়ে নিকৃষ্ট, দূষিত বা ঘাটতিযুক্ত একটি উপাদান হিসেবে। ভালোকে সংজ্ঞায়িত করা হয় মন্দের অনুপস্থিতি হিসেবে, আলোকে দেখা হয় অন্ধকারের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হিসেবে। এই কৃত্রিম বিন্যাসের উদ্দেশ্য হলো প্রথম পদটিকে এক ধরনের পরম নৈতিক ও তাত্ত্বিক সিংহাসনে বসিয়ে দেওয়া।
দেরিদার বিনির্মাণ (Deconstruction) পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো এই অনড় স্তরবিন্যাসকে ভেঙে ফেলা। ক্রিস্টোফার নরিস তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে বিনির্মাণ কোনো ধ্বংসযজ্ঞ নয়; এটি হলো কোনো পাঠ কীভাবে নিজের তৈরি নিয়মের বিরুদ্ধেই নিজে অবস্থান নেয়, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া (Norris, 1987)। দেরিদা দেখান যে তথাকথিত উচ্চতর প্রথম পদটি নিজের পরিচয় নির্ধারণের জন্য আসলে সেই নিচু বলে চিহ্নিত দ্বিতীয় পদটির ওপরই পুরোপুরি নির্ভর করে। অন্ধকার না থাকলে আলোর কোনো অর্থ থাকে না; মন্দের ধারণা না থাকলে ভালো নিজেকে আলাদা করে চেনাতে পারে না। অর্থাৎ যে দ্বিতীয় পদটিকে বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, সেটি আসলে প্রথম পদের অস্তিত্বের কেন্দ্রেই গোপনে বসে থাকে।
এই বিনির্মাণবাদী পদ্ধতি যখন প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যের দিকে ফেরানো হয়, তখন সেখানকার সবচেয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় বিভাজনগুলোর ভিত্তি কেঁপে ওঠে। বৈদিক পৌরাণিক চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেব ও অসুরের এক চিরন্তন যুদ্ধ। ধর্মীয় পাঠে দেবতাদের চিত্রিত করা হয়েছে আলোর প্রতীক, পুণ্যের রক্ষক এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলার ধারক হিসেবে। অন্যদিকে অসুরদের দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্ধকারের শক্তি, বিশৃঙ্খলার জনক এবং যজ্ঞের বিনাশকারী হিসেবে। দেরিদার লেন্স দিয়ে পাঠ করলে পরিষ্কার ধরা পড়ে যে এই নৈতিক দ্বৈততা কোনো প্রাকৃতিক বা আদিম সত্য নয়। এটি হলো বৈদিক সাহিত্যের নির্মিত এক ভাষিক বিভাজন, যা পাঠের গভীরে প্রবেশ করলেই নিজের ভেতরে নিজে ভেঙে পড়তে শুরু করে।
আদি বৈদিক ঐতিহ্যে ‘অসুর’ প্রত্যয়ের রূপান্তর (Transformation of the Concept ‘Asura’ in Early Vedic Tradition)
ঋগ্বেদের প্রাচীনতম স্তরগুলো পাঠ করলে যে চমকপ্রদ ভাষাতাত্ত্বিক সত্যটি উন্মোচিত হয়, তা সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসকে এক বড় ধাক্কা দেয়। পরবর্তী হিন্দু ঐতিহ্যে অসুর বলতে যে ভয়ংকর রাক্ষস বা দানবীয় সত্তাকে বোঝানো হয়, আদি বৈদিক স্তোত্রগুলোতে অসুর শব্দের অর্থ তা ছিল না। ওয়াশ এডওয়ার্ড হেল প্রাচীন বৈদিক ধর্মে অসুর শব্দের ব্যবহার সংক্রান্ত তার আকর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ঋগ্বেদের প্রথম যুগে অসুর শব্দটি ব্যবহার করা হতো গভীর শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমের সাথে (Hale, 1986)। শব্দটি মূলত কোনো অশুভ সত্তাকে বোঝাত না; বরং তা বোঝাত এক প্রবল জীবনীশক্তি, সার্বভৌম ক্ষমতা এবং মহাজাগতিক কর্তৃত্বের অধিকারীকে।
ঋগ্বেদের প্রাচীন মণ্ডলগুলোতে পরম নৈতিক শৃঙ্খলার ধারক বরুণকে বারবার অসুর (Asura) বলে স্তুতি করা হয়েছে। এমনকি মিত্র, রুদ্র, অগ্নি এবং স্বয়ং দেবতাদের প্রধান সেনাপতি ইন্দ্রকেও বিভিন্ন স্তোত্রে অসুর উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। সেখানে দেবতাদের চেয়ে অসুররা কোনো নিকৃষ্ট প্রজাতি ছিলেন না; বরং দেবতাদের ক্ষমতাকেই অসুরের মতো মহিমান্বিত বলে বর্ণনা করা হতো। কারণ অসুর শব্দের মূল লুকিয়ে ছিল ‘অসু’ ধাতুতে, যার অর্থ হলো প্রাণ বা প্রাণশক্তি। যিনি প্রাণের আধার, তিনিই ছিলেন অসুর। ফলে আদি বৈদিক স্তরে দেব ও অসুরের সম্পর্কটি কোনো ভালো বনাম মন্দের নৈতিক যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল একই শক্তির ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ।
তুলনামূলক ইন্দো-ইরানীয় ভাষাতত্ত্বের দিকে তাকালে এই ভাষিক সত্যটি আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমিল বেনভেনিস্ত প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা ও সমাজকাঠামো নিয়ে তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ইরানীয় ও ভারতীয় আর্যদের ঐতিহ্যে এই প্রত্যয়গুলো কীভাবে উল্টো অর্থ ধারণ করেছিল (Benveniste, 1973)। প্রাচীন পারস্যের আবেস্তা গ্রন্থে দেখা যায়, পরম ঈশ্বরকে বলা হয়েছে আহুর বা আহুরা মাজদা, যা বৈদিক অসুর শব্দেরই সমার্থক। আর পারস্যে ‘দাইব’ বা দেভ বলতে বোঝানো হয়েছে অন্ধকারের শয়তানদের, যা ভারতে এসে হয়েছিল পূজনীয় দেবতা। এই ঐতিহাসিক প্রমাণটি দেখায় যে দেব ও অসুরের এই তথাকথিত পবিত্র ও অপবিত্র বিভাজন কোনো অতীন্দ্রিয় সত্য ছিল না; এটি ছিল ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং দুই মানবগোষ্ঠীর পারস্পরিক রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ফলে সৃষ্ট এক ঐতিহাসিক ভাষিক রূপান্তর।
দেরিদার পরিভাষা ব্যবহার করে বললে, আদি বৈদিক পাঠে এই দ্বৈততার কোনো অনড় সীমানা ছিল না। সেখানে দেব এবং অসুর ছিলেন একই সত্তার তরল রূপ। কিন্তু পরবর্তী যুগে এসে যখন বৈদিক সমাজ উত্তর ভারতের মাটিতে নিজেদের রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করতে চাইল, তখন এই তরল শব্দটিকে একটি কঠোর শত্রুতামূলক ছাঁচে ফেলে দেওয়া হলো। অসুরকে এক ধাক্কায় নৈতিকভাবে অধঃপতিত করে তাকে দেবতার ঠিক বিপরীত মেরুতে বসিয়ে দেওয়া হলো। এই রূপান্তরটি কোনো ধর্মীয় উপলব্ধি ছিল না; এটি ছিল ভাষার ভেতরে একটি রাজনৈতিক কেন্দ্র তৈরি করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত বয়ানগত সহিংসতা।
দেব ও অসুরের কৃত্রিম মেরুকরণ ও বয়ানগত নির্মাণ (Artificial Polarization and Discursive Construction of Deva and Asura)
ঋগ্বেদের শেষ ভাগে এবং পরবর্তীকালে রচিত ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলোতে এসে দেব ও অসুরের এই দ্বৈততা চরম এক নৈতিক মেরুকরণের রূপ পরিগ্রহ করে। টমাস ওবারলিজ বৈদিক ধর্মের ঐতিহাসিক গঠনে দেবতাদের রূপান্তর নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন (Oberlies, 1998)। ওবারলিজ দেখান যে পরবর্তী বৈদিক পুরোহিতরা সচেতনভাবেই অসুরদের সমস্ত ইতিবাচক গুণগুলো মুছে ফেলে তাদেরকে যজ্ঞের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করেন। সেখানে দেবতারা হয়ে উঠলেন সত্য (Satya), পুণ্য এবং যজ্ঞীয় শৃঙ্খলার একমাত্র প্রতিভূ। অন্যদিকে অসুরদের পরিচয় নির্ধারণ করা হলো অনৃত (Anṛta) বা অসত্য, পাপ এবং ধ্বংসাত্মক অন্ধকারের প্রতিনিধি হিসেবে।
এই মেরুকরণটি তৈরি করা হয়েছিল যজ্ঞীয় সমাজব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেওয়ার প্রয়োজনে। ব্রাহ্মণ সাহিত্যে প্রায় প্রতিটি যজ্ঞের বিবরণে একটি পরিচিত নাটক সাজানো হতো: দেবতারা যজ্ঞ করতে চাইছেন, আর অসুররা এসে সেই যজ্ঞ নষ্ট করার চক্রান্ত করছে। এরপর দেবতারা কোনো বিশেষ মন্ত্র বা আচারের জোরে অসুরদের পরাস্ত করছেন এবং যজ্ঞ রক্ষা করছেন। এই পৌরাণিক আখ্যানটি বারবার পুনরাবৃত্তি করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে দেওয়া হয়েছিল যে পুরোহিতদের এই যজ্ঞ ছাড়া পুরো পৃথিবী অসুরদের অশুভ শক্তির দখলে চলে যাবে। অর্থাৎ যজ্ঞের প্রয়োজনীয়তা ও পুরোহিতদের জীবিকা টিকিয়ে রাখার জন্য একটি স্থায়ী কাল্পনিক শত্রুর প্রয়োজন ছিল, আর সেই শত্রুর ভূমিকায় বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল অসুরকে।
দেরিদা দেখান যে যেকোনো লোগোকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় এই ধরনের মেরুকরণ টিকিয়ে রাখতে হলে অপর সত্তাকে পুরোপুরি অমানবিক ও দানবীয় রূপ দিতে হয়। অসুরদের এই নতুন পরিচয়ে তাদের ভাষা, তাদের জীবনযাপন এবং তাদের খাবারকে অপবিত্র ঘোষণা করা হলো। বলা হলো, অসুররা যজ্ঞ জানে না, তারা অহংকারী এবং তারা দেবতাদের মতো মন্ত্রের বিশুদ্ধ উচ্চারণ করতে পারে না। তাদের ভাষাকে বলা হলো ম্লেচ্ছ বা অমার্জিত ভাষা। এইভাবে একটি সম্পূর্ণ কৃত্রিম দেওয়াল তুলে দেওয়া হলো যাতে কেউ দেবতাদের তৈরি নৈতিক শৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে ভাবতে না পারে।
তবে এই ভাষিক মেরুকরণের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভয়। দেবতারা সারাক্ষণ এই আতঙ্কে থাকতেন যে অসুররা যেকোনো মুহূর্তে তাদের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। শতপথ ও ঐতরেয় ব্রাহ্মণের কাহিনিগুলো পড়লে দেখা যায়, অসুররা কিন্তু অজ্ঞ বা দুর্বল ছিলেন না; প্রায়শই দেখা যেত অসুররা দেবতাদের চেয়ে বেশি পরিশ্রমী এবং বেশি ধনসম্পদের অধিকারী। ফলে দেবতাদের এই শ্রেষ্ঠত্ব কোনো স্বতঃসিদ্ধ সত্য ছিল না; এটি ছিল বয়ানের জোরে তৈরি করা এক নড়বড়ে অহংকার। দেরিদার দৃষ্টিতে এই কৃত্রিম মেরুকরণই প্রমাণ করে যে প্রথম পদটি কতটা ভয়ার্তভাবে দ্বিতীয় পদটির উপস্থিতিকে দমন করার চেষ্টা করে।
পরিপূরকতা ও চিহ্ন: দেবের অস্তিত্বে অসুরের অনিবার্য উপস্থিতি (Supplementarity and Trace: The Inevitable Presence of Asura in Deva)
দেরিদার বিনির্মাণ তত্ত্বের দুটি অত্যন্ত গভীর ও কার্যকর পরিভাষা হলো পরিপূরক (Supplement/Supplément) এবং চিহ্ন (Trace)। দেরিদা তার ধ্রুপদী প্রবন্ধ সংকলন মার্জিনস অব ফিলোসফি (Margins of Philosophy)-এ দেখান যে পরিপূরক হলো এমন এক উপাদান যা বাইরে থেকে এসে কোনো আপাত-পূর্ণাঙ্গ বস্তুকে সম্পূর্ণ করে (Derrida, 1982)। কিন্তু পরিপূরক যুক্ত হওয়ার এই ঘটনাই স্পষ্ট করে দেয় যে আদি বস্তুটি আসলে নিজে সম্পূর্ণ ছিল না; তার ভেতরে এক অদৃশ্য অপূর্ণতা বা শূন্যতা লুকিয়ে ছিল। বৈদিক সাহিত্যের দেব-অসুর সম্পর্কের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেবতা নামক সত্তাটি অসুর নামক এই পরিপূরকের সাহায্য ছাড়া এক মুহূর্তও টিকে থাকতে পারে না।
বরিস ওগুইবেনিন বৈদিক সংস্কৃতি ও পৌরাণিক দ্বন্দ্বের ওপর তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে বৈদিক মিথতত্ত্বে দেবতা ও অসুর মূলত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ (Oguibénine, 1988)। দেবতারা যে অমর, তার কারণ তারা অমৃত পান করেছেন; কিন্তু সেই অমৃত উদ্ধার করার জন্য তাদের অসুরদের সাথে নিয়েই সমুদ্র মন্থন করতে হয়েছিল। ইন্দ্র যে মহান যোদ্ধা, তার কারণ তিনি বৃত্রাসুরকে বধ করেছিলেন; যদি বৃত্র নদীগুলোকে আটকে না রাখতেন, তবে ইন্দ্রের বীরত্বের কোনো প্রকাশই ঘটত না। দেবতাদের প্রতিটি অস্ত্র, প্রতিটি মন্ত্র এবং প্রতিটি গৌরবময় উপাধি তৈরি হয়েছে কোনো না কোনো অসুরের কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায়। অসুর না থাকলে দেবতার সমস্ত ক্ষমতা একটি নিষ্ক্রিয় ও অর্থহীন বিষয়ে পরিণত হতো।
দেরিদা যাকে চিহ্ন (Trace) বলেছেন, তা হলো কোনো ধারণার ভেতরে তার বিপরীত ধারণার মুছে না যাওয়া এক অদৃশ্য উপস্থিতি। দেবতার ধারণার ভেতরে এই অসুরের চিহ্ন গভীরভাবে খোদাই করা রয়েছে। একজন দেবতা যখন নিজেকে প্রকাশ করেন, তিনি আসলে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করেন অসুরের নেতিকরণ হিসেবে – অর্থাৎ তিনি অসুর নন, তাই তিনি দেবতা। এর মানে দাঁড়ায়, দেবতার প্রতিটি সংজ্ঞার কেন্দ্রেই অসুর এক নিঃশব্দ উপস্থিতি হিসেবে বসে আছে। দেবতা অসুরকে যতই বাইরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করুন না কেন, অসুরের স্মৃতি ছাড়া দেবতা নিজের অস্তিত্বকে এক মুহূর্তের জন্যও ভাষা দিতে পারেন না।
এই পারস্পরিক নির্ভরতা বৈদিক ধর্মের তথাকথিত বিশুদ্ধতাকে ধূলিসাৎ করে দেয়। ঐতিহ্য দাবি করেছিল যে দেবতারা স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং পরম শক্তির উৎস। কিন্তু দেরিদার বিনির্মাণ দেখায় যে দেবতারা মূলত অসুরদের ওপর পরজীবী হয়ে বেঁচে থাকা এক ভাষিক নির্মাণ। অসুরকে যদি বৈদিক সাহিত্য থেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে পুরো বৈদিক দেবমণ্ডলী এক মুহূর্তে ধসে পড়বে। তাদের যজ্ঞ করার কোনো কারণ থাকবে না, তাদের স্তোত্র গাওয়ার কোনো ভাষা থাকবে না এবং তাদের পুরোহিতদের রুটি-রুজির সমস্ত ব্যবস্থাও বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে অসুর কোনো শত্রু নয়; অসুর হলো দেবতার সত্তারই এক অপরিহার্য ও অভ্যন্তরীণ পরিপূরক।
প্রজাপতির সন্তান ও যজ্ঞ দখলের রাজনীতি (Sons of Prajāpati and the Politics of Usurping Sacrifice)
বৈদিক সাহিত্যের রূপকগুলো যখন নিজেদের তৈরি করা নৈতিক বিভাজনকে আর ধরে রাখতে পারে না, তখনই ঘটে পাঠের আসল বিচ্যুতি বা স্ববিরোধিতা। ব্রাহ্মণ সাহিত্যের বহু স্থানে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে দেব এবং অসুর উভয়েই একই পিতা প্রজাপতি (Prajāpati)-র সন্তান। শতপথ ব্রাহ্মণে বারবার এই স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়: “দ্বয়া বৈ প্রাজাপত্যা দেবাশ্চাসুরাশ্চ” – অর্থাৎ প্রজাপতির দুই ধরনের সন্তান রয়েছে, একদিকে দেবতারা এবং অন্যদিকে অসুররা। অসুররা হলেন বয়সে বড় ভাই, আর দেবতারা হলেন ছোট ভাই। এই একটি স্বীকারোক্তি বৈদিক সাহিত্যের গোটা নৈতিক দেওয়ালকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
দেরিদা তার গ্রন্থ ডিসেমিনেশন (Dissemination)-এ ভাষার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অনির্ণেয়তা (Undecidability) নিয়ে আলোচনা করেছেন (Derrida, 1981)। অনির্ণেয়তা হলো এমন এক অবস্থা যেখানে কোনো একটি পক্ষকে চূড়ান্তভাবে সঠিক বা ভুল হিসেবে রায় দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। যখন জানা যায় যে দেব ও অসুর আসলে একই রক্ত ও বংশের উত্তরাধিকারী, তখন তাদের বিরোধটি কোনো মহাজাগতিক ভালো বনাম মন্দের যুদ্ধ থাকে না। এটি পরিণত হয় এক সাধারণ পারিবারিক কলহ এবং পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার দখলের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে। আর সেই সম্পত্তিটি কী ছিল? সম্পত্তিটি ছিল যজ্ঞ, ভাষা এবং তৎকালীন সমাজের উদ্বৃত্ত সম্পদ।
ব্রাহ্মণ সাহিত্যের গল্পগুলোতে দেখা যায়, যজ্ঞ এবং মন্ত্রের আসল দখলদার কিন্তু শুরুতে ছিল অসুররাই। অসুরদের কাছেই ছিল সমস্ত সম্পদ এবং সৃষ্টির গোপন কলাকৌশল। দেবতারা সেই সম্পদ অধিকার করেছিলেন কোনো নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের জোরে নয়; বরং এক চরম প্রতারণা, ছলনা এবং চাতুর্যের মাধ্যমে। শতপথ ব্রাহ্মণে এমন অসংখ্য কাহিনি রয়েছে যেখানে দেখা যায়, দেবতারা কীভাবে রূপ বদলে অসুরদের যজ্ঞশালায় ঢুকে তাদের আহুতি চুরি করছেন, কিংবা কীভাবে দেবী বাককে বা ভাষারূপী নারীকে অসুরদের কাছ থেকে ফুসলিয়ে নিজেদের দলে নিয়ে আসছেন। দেবতারা যে জয়ী হয়েছিলেন, তা তাদের ধর্মের কারণে নয়; তা হয়েছিল তাদের ধূর্ত রাজনৈতিক কৌশলের কারণে।
দেরিদার বিখ্যাত প্রত্যয় দিফারঁস (Différance) দিয়ে বিচার করলে দেখা যায়, অর্থের এই খেলা কখনোই স্থির থাকে না। বৈদিক টেক্সট একদিকে প্রচার করতে চায় যে দেবতারা পুণ্যবান আর অসুররা প্রতারক, কিন্তু সেই টেক্সটের নিজস্ব বর্ণনাতেই ধরা পড়ে যে দেবতারা নিজেরাই ছিলেন সবচেয়ে বড় প্রতারক। তারা প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছেন, নিরস্ত্র অসুরকে পেছন থেকে আঘাত করেছেন এবং নারীর ছদ্মবেশ নিয়ে অসুরদের অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছেন। এই যে নিজের বক্তব্যের বিরুদ্ধেই নিজের প্রমাণ দাঁড় করিয়ে ফেলা – এটাই হলো পাঠের বিনির্মাণ। কোনো বহিরাগত সমালোচকের দরকার নেই; বৈদিক সাহিত্য নিজেই নিজের ভেতরের অনৈতিকতাকে পাঠকের সামনে নগ্ন করে দেয়।
ক্যানোনিকাল বিভাজনের পতন ও সেক্যুলার অ্যাকাডেমিক তাৎপর্য (Collapse of Canonical Binaries and Secular Academic Significance)
দেরিদা তার ধ্রুপদী গ্রন্থ রাইটিং অ্যান্ড ডিফারেন্স (Writing and Difference)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে একটি পাঠের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত তার কেন্দ্রকে স্থানচ্যুত করে (Derrida, 1978)। বৈদিক সাহিত্যে দেব ও অসুরের যে কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছিল, বিনির্মাণের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে সেই কেন্দ্র সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়। দেব ও অসুরের এই তথাকথিত মহাজাগতিক যুদ্ধ কোনো অলৌকিক আধ্যাত্মিক সত্য নয়। এটি ছিল ব্রোঞ্জ ও লৌহযুগের সন্ধিক্ষণে উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রবেশ করা বিভিন্ন আর্যভাষী গোত্র এবং স্থানীয় কৃষিজীবী আদিবাসীদের মধ্যকার সম্পদ ও চারণভূমি দখলের সংঘাতের এক পৌরাণিক রূপান্তর।
প্রাচীন সমাজের বস্তুগত বাস্তবতাকে দেবতাদের স্বর্গীয় যুদ্ধে রূপান্তরিত করার উদ্দেশ্য ছিল একটাই – বিজয়ী গোষ্ঠীর হিংস্রতাকে একটি চিরন্তন নৈতিক মহিমা দেওয়া। ইন্দ্র যখন দাস বা অসুরদের একের পর এক দুর্গ ধ্বংস করছিলেন এবং তাদের হাজার হাজার গবাদি পশু লুট করছিলেন, তখন সেই লুটতরাজকে নিছক ডাকাতি হিসেবে দেখলে সমাজে প্রতিরোধের ঝুঁকি থাকত। কিন্তু যখন সেই লুটতরাজকে অসুরবিনাশী এক পবিত্র যজ্ঞ হিসেবে চিত্রিত করা হলো, তখন সেই রক্তপাত একটি মহৎ ধর্মে পরিণত হলো। দেরিদার হার্মেনিউটিক্স আমাদের দেখায় কীভাবে ভাষা দিয়ে ইতিহাসের নির্মম বৈষয়িক সত্যগুলোকে একটি স্বর্গীয় নাটকের রূপ দেওয়া হয়।
একটি আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ অ্যাকাডেমিক পাঠের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি কোনো ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসের কাছে নতজানু হয় না। ক্যাননের দেওয়া নৈতিক রায়কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করাই এই পাঠের লক্ষ্য। দেবতারা ভালো আর অসুররা খারাপ – এই আপ্তবাক্যটি মেনে নেওয়ার কোনো ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক কারণ নেই। বরং আমাদের দেখতে হবে কীভাবে একটি গোষ্ঠী অন্য একটি মানবগোষ্ঠীকে অসুর উপাধি দিয়ে তাদের সমস্ত মানবিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিল এবং তাদের জমিজমা ও সম্পদ দখল করেছিল। পৌরাণিক সাহিত্যের এই রাজনৈতিক বিনির্মাণ মানুষের চিন্তাকে অতীতের ধর্মীয় দাসত্ব থেকে মুক্ত করার একটি কার্যকর হাতিয়ার।
পরিশেষে বলা যায়, দেরিদার বিনির্মাণবাদী পদ্ধতি বৈদিক সাহিত্যের দেব-অসুর দ্বৈততার ভেতরের সমস্ত ধর্মীয় মায়াজাল ছিন্নভিন্ন করে দেয়। দেব ও অসুর কোনো পরম নৈতিক সত্যের প্রতীক নয়; তারা হলো একে অপরের ওপর নির্ভরশীল দুটি ভাষিক চিহ্ন, যাদের বিরোধটি গড়ে উঠেছিল বৈষয়িক ক্ষমতা ও সামাজিক আধিপত্যের তাগিদে। দেবতারা অসুরকে ছাড়া অচল, আর অসুরের বিরুদ্ধাচরণ ছাড়া দেবতার অস্তিত্বই অর্থহীন। এই সত্যটি যখন উন্মোচিত হয়, তখন বৈদিক সাহিত্যের তথাকথিত অপৌরুষেয় ও চিরন্তন ভাবমূর্তি ধসে পড়ে। উন্মোচিত হয় মানব ইতিহাসের এক জটিল, সংঘাতময় এবং ভাষার ছলনায় মোড়ানো রক্তমাংসের লড়াইয়ের দলিল।
দেরিদা ও আর্য-দাস দ্বৈততা (Derrida and the Ārya-Dāsa Binary): আত্মপরিচয়, অন্যতা ও সীমানা নির্মাণ
আত্মপরিচয় ও অন্যতার বিনির্মাণ: দেরিদার আতিথেয়তা ও সীমানা তত্ত্ব (Deconstruction of Self-Identity and Otherness: Derrida’s Theory of Hospitality and Borders)
কোনো ব্যক্তি বা জাতি কীভাবে নিজের পরিচয় তৈরি করে? এই প্রশ্নের গভীরে গিয়ে ফরাসি দার্শনিক জাক দেরিদা (Jacques Derrida) উন্মোচন করেছিলেন এক নিদারুণ দার্শনিক সত্য। মানুষ সাধারণত মনে করে যে তার নিজের একটি খাঁটি, স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পরিচয় আগে থেকেই বিদ্যমান থাকে, এবং পরে সে বাইরের কোনো অপরিচিত সত্তার মুখোমুখি হয়। দেরিদা তার প্রভাবশালী গ্রন্থ অফ হসপিটালিটি (Of Hospitality)-তে দেখান যে এই ধারণাটি একটি সম্পূর্ণ বিভ্রম (Derrida, 2000)। কোনো আত্মপরিচয় কখনোই একা একা জন্ম নিতে পারে না। আত্ম বা ‘সেলফ’ নিজেকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য সবসময় এক কাল্পনিক ‘অপর’ বা অন্যতা (Otherness/Altérité) নির্মাণ করে। যাকে সে নিজের সীমানার বাইরে ছুড়ে ফেলে দেয়, মূলত তার পার্থক্যের ওপর দাঁড়িয়েই নিজের সত্তার ভিত্তি তৈরি হয়।
দেরিদা আতিথেয়তার ধারণাটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একটি চমৎকার যুগলবন্দি পরিভাষা তৈরি করেছিলেন, যার নাম হোস্টিপিটালিটি বা শত্রু-আতিথেয়তা (Hostipitality)। এই ধারণার মূল কথা হলো, গৃহস্বামী যখন বাইরের কোনো আগন্তুককে নিজের ঘরে স্থান দেয় বা তার মুখোমুখি হয়, তখন তার মনের ভেতরে একই সাথে কাজ করে আতিথেয়তা এবং শত্রুতা। গৃহস্বামী নিজেকে কর্তা বলে প্রমাণ করতে চায় সেই আগন্তুকের ওপর এক ধরনের নজরদারি ও শর্ত চাপিয়ে দিয়ে। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক দেরিদার এই সূত্রকে উত্তর-ঔপনিবেশিক পাঠে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন যে সমাজ কীভাবে অপরকে বর্জন করার মাধ্যমে নিজের ভেতরের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে, যাকে তিনি নাম দিয়েছেন অন্যকরণ (Othering) (Spivak, 1988)। নিজের শুদ্ধতা প্রমাণ করতে হলে কাউকে না কাউকে অপবিত্র ও বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করা অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
দেরিদা তার অপর একটি রাজনৈতিক গ্রন্থ পলিটিক্স অব ফ্রেন্ডশিপ (Politics of Friendship)-এ তুলে ধরেন কীভাবে একটি গোষ্ঠী নিজেদের ভেতরকার সংহতি তৈরি করার জন্য একজন সাধারণ শত্রুর অস্তিত্ব কল্পনা করে (Derrida, 1997)। যদি বাইরে কোনো শত্রু বা ভীতি না থাকে, তবে গোষ্ঠীর ভেতরের ফাটলগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক সীমানা পাহারা দেওয়ার আসল উদ্দেশ্য বহিরাগতকে ঠেকানো নয়; বরং নিজের ভেতরের কৃত্রিম ঐক্যকে টিকিয়ে রাখা। সীমান্ত হলো এমন এক অস্বস্তিকর রেখা যা প্রমাণ করে যে আত্মপরিচয় আসলে কতটা ভঙ্গুর এবং অন্যের আক্রমণের ভয়ে কতটা আতঙ্কগ্রস্ত।
এই বিনির্মাণবাদী অন্তর্দৃষ্টি প্রাচীন ঋগ্বেদের সামাজিক ভূগোলের দিকে তাকালে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ঋগ্বেদের সংকলনটিতে আমরা বারবার দেখতে পাই এক তীব্র সংঘাতময় মেরুকরণ: একদিকে আর্য (Ārya) এবং অন্যদিকে দাস (Dāsa) বা দস্যু। সনাতন ও ঔপনিবেশিক ব্যাখ্যাকাররা এই বিভাজনকে একটি প্রাকৃতিক ও চিরন্তন সীমানা হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু দেরিদার লেন্স দিয়ে ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যায়, আর্য কোনো জন্মগত বা স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা ছিল না। আর্য নিজেকে সংজ্ঞায়িত করেছিল মূলত দাস নামক অন্যকে নির্মাণ করার মাধ্যমে। দাসকে বাইরে ঠেলে দেওয়ার যে ব্যাকুল প্রয়াস বৈদিক স্তোত্রগুলোতে দেখা যায়, তা আসলে আর্য আত্মপরিচয়ের ভেতরের নিরাপত্তাহীনতাকেই স্পষ্ট করে তোলে।
বৈদিক পাঠে ‘আর্য’ আত্মপরিচয়ের নেতিবাচক গঠন (Negative Construction of ‘Ārya’ Self-Identity in Vedic Texts)
উনিশ শতকে যখন ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদরা বৈদিক সাহিত্যের পাঠোদ্ধার শুরু করলেন, তখন তারা আর্য শব্দটিকে একটি বিশেষ জৈবিক ও জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের রূপ দিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদ টমাস আর. ট্রটম্যান তার বিখ্যাত গ্রন্থ আর্যন্স অ্যান্ড ব্রিটিশ ইন্ডিয়া (Aryans and British India)-তে প্রমাণ করেছেন কীভাবে ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি এই আর্য ধারণাকে একটি জৈবিক রক্তের মিথ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল (Trautmann, 1997)। অথচ ঋগ্বেদের প্রাচীন স্তোত্রগুলোর নিবিড় পাঠে এই ধরনের কোনো আধুনিক জাতিগত তত্ত্বের সমর্থন মেলে না। বৈদিক সাহিত্যে আর্য কোনো রক্ত বা জৈবিক বিশুদ্ধতার নাম ছিল না; এটি ছিল একটি বিশেষ সামাজিক, ভাষিক এবং আচরণগত পরিচয়ের দাবি।
ঋগ্বেদের কবিরা যখন নিজেদের আর্য বলে ঘোষণা করছেন, তখন তারা আসলে কী বোঝাতে চাইছেন? আশ্চর্যের বিষয় হলো, আর্যত্বের কোনো ইতিবাচক ও স্বতন্ত্র সংজ্ঞা পাঠের ভেতর পাওয়া যায় না। কবিরা আর্যকে সংজ্ঞায়িত করছেন মূলত নেতিকরণের মধ্য দিয়ে – অর্থাৎ দাসরা যা নয়, আর্যরা হলো তা-ই। বৈদিক স্তোত্রগুলোতে দাসদের বিরুদ্ধে যে দীর্ঘ অভিযোগের তালিকা দেওয়া হয়েছে, তা লক্ষ্য করলেই এই নেতিবাচক নির্মাণের কৌশলটি ধরা পড়ে। দাসদের বলা হচ্ছে অযজ্বন্ (Ayajvan) বা যারা যজ্ঞ করে না, অব্রহ্মন্ (Abrahman) বা যাদের কোনো বৈদিক স্তোত্র নেই, অদেবয়ু (Adevayu) বা যারা বৈদিক দেবতাদের মানে না, এবং অব্রত (Avrata) বা যারা বৈদিক অনুশাসন মানে না।
দেরিদার বিনির্মাণ তত্ত্ব আমাদের দেখায় যে যখন কোনো পাঠ কোনো সত্তাকে কেবল অন্যের ঘাটতি বা অভাব দিয়ে সংজ্ঞায়িত করে, তখন সেই সত্তার নিজস্ব কোনো কেন্দ্র থাকে না। আর্য কোনো স্বয়ম্ভূ মহিমা নয়; আর্য হলো দাসদের তথাকথিত বিচ্যুতিগুলোর একটি বিপরীত তালিকা মাত্র। দাস যদি যজ্ঞ না করে, তবে আর্য হলো সেই যে যজ্ঞ করে। দাস যদি দেবতাদের সোমরস নিবেদন না করে, তবে আর্য হলো সেই যে দেবতাদের সোমরস দেয়। এর মানে দাঁড়ায়, দাস নামক ধারণাটি যদি বৈদিক কবির সামনে না থাকত, তবে আর্য পরিচয়ের কোনো ভিত্তিই তৈরি হতে পারত না। আর্য নিজের প্রতিটি গুণ আবিষ্কার করেছে দাসের ত্রুটি কল্পনা করার ভেতর দিয়ে।
এই প্রক্রিয়ায় দাস হয়ে ওঠে আর্য পরিচয়ের এক অপরিহার্য ভিত্তি। আর্য নিজেকে যত বেশি মহিমান্বিত করতে চেয়েছে, দাসকে তত বেশি অসভ্য ও ধর্মহীন হিসেবে চিত্রিত করতে হয়েছে। ইন্দ্রের কাছে প্রার্থনা করা হচ্ছে যেন তিনি আর্য বর্ণকে রক্ষা করেন এবং দাস বর্ণকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেন। এই যে দাসকে ধ্বংস করার উন্মাদনা, এর পেছনে কাজ করছিল এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতা। আর্যভাষী কবিরা খুব ভালো করেই জানতেন যে দাসদের এই নেতিবাচক উপস্থিতি ছাড়া তাদের নিজস্ব বিশেষাধিকার ও শ্রেষ্ঠত্বের দাবি এক মুহূর্তও টিকে থাকতে পারে না।
অন্যতা নির্মাণ ও ভাষার রাজনীতি (Construction of Otherness and the Politics of Language)
বৈদিক সাহিত্যে আর্য ও দাসের মধ্যে যে সীমান্ত রেখাটি সবচেয়ে বেশি কড়াভাবে টানা হয়েছিল, তা ছিল ভাষার ময়দানে। মানুষের অস্তিত্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা হলো তার মুখের ভাষা। মাধব এম. দেশপাণ্ডে প্রাচীন ভারতের সমাজভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে বৈদিক আর্যরা ভাষাকে সামাজিক শ্রেষ্ঠত্ব ও বর্জনের প্রধান প্রাচীর হিসেবে ব্যবহার করেছিল (Deshpande, 1979)। ঋগ্বেদের স্তোত্রে দাসদের পরিচয় দিতে গিয়ে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত বিশেষণ ব্যবহার করা হয়েছে: মৃধ্রবাচ্ (Mṛdhravāc)। এর অর্থ হলো যাদের ভাষা বিকৃত, অস্পষ্ট বা শত্রুতাপূর্ণ। অন্য একটি স্থানে তাদের বলা হয়েছে অনাস্ (Anās), যাকে অনেক পণ্ডিত নাসিকাহীন বলে ব্যাখ্যা করলেও ভাষাতাত্ত্বিকভাবে এর অর্থ মুখহীন বা সঠিক উচ্চারণহীন।
দাসদের ভাষাকে এভাবে অবমূল্যায়ন করার উদ্দেশ্য ছিল তাদের কোনো মানবিক ভাষাভাষী প্রাণী হিসেবে স্বীকার না করা। ফ্রাঙ্কলিন সি. সাউথওয়ার্থ দক্ষিণ এশিয়ার ভাষাতাত্ত্বিক প্রত্নতত্ত্বের বিশ্লেষণে তুলে ধরেছেন যে প্রাচীন বৈদিক যুগে উত্তর-পশ্চিম ভারতে ইন্দো-আর্য ভাষার পাশাপাশি দ্রাবিড় এবং অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষার শক্তিশালী উপস্থিতি ছিল (Southworth, 2005)। স্থানীয় অধিবাসীরা যে ভাষায় কথা বলত, তা যাযাবর আর্যদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হতো। কিন্তু সেই ভাষাকে একটি ভিন্ন মানবভাষা হিসেবে না দেখে তাকে পশুসুলভ বা অমানুষিক ধ্বনি হিসেবে উপস্থাপন করা হলো। এডওয়ার্ড ডব্লিউ. সাইদ প্রাচ্যতত্ত্বের পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন কীভাবে কোনো শক্তিশালী বয়ান অপরকে ভাষা ও যুক্তিহীন হিসেবে চিত্রিত করে তার ওপর নিজের আধিপত্যকে ন্যায্যতা দেয় (Said, 1978)। বৈদিক কবিরা ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন।
দেরিদা তার বিভিন্ন তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে লোগোকেন্দ্রিক ব্যবস্থা সবসময় নিজের ভাষাকে মনে করে সত্যের একমাত্র স্বাভাবিক প্রকাশ, আর অন্যের ভাষাকে মনে করে অপভ্রংশ বা বিচ্যুতি। বৈদিক স্তোত্রগুলোতে দাবি করা হলো যে কেবল বৈদিক সংস্কৃতই হলো দেবতাদের ভাষা বা ছন্দ, আর বাকি সমস্ত ভাষা হলো বিশৃঙ্খলা। দাসদের ভাষাকে মৃধ্রবাচ বলে দেগে দেওয়ার অর্থ ছিল তাদের সমস্ত সাংস্কৃতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া। কারণ যার ভাষা শুদ্ধ নয়, সে যজ্ঞ করতে পারে না; আর যে যজ্ঞ করতে পারে না, সমাজের সম্পদে তার কোনো ন্যায্য অধিকার থাকতে পারে না।
ভাষার এই রাজনীতির মাধ্যমে দাসদের একটি স্থায়ী প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। তাদের কোনো কথা শোনার দরকার ছিল না, কারণ শুরুতেই ধরে নেওয়া হয়েছিল যে তাদের ভাষা অর্থহীন। তবে ভাষার এই সীমানা নির্মাণ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। বৈদিক সংস্কৃতের নিজস্ব গঠনের ভেতরেই অজস্র অনার্য শব্দ ও ধ্বনিতাত্ত্বিক উপাদান, যেমন মূর্ধন্য ধ্বনির অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। দেরিদা যেমনটি বলেন, যে অপরকে তুমি ভাষা থেকে তাড়িয়ে দিতে চাও, সে আগেই তোমার ভাষার ব্যাকরণে নিজের পদচিহ্ন রেখে যায়। বৈদিক সংস্কৃতের রূপান্তর নিজেই প্রমাণ করে যে ভাষার এই শুদ্ধতার প্রাচীর ছিল এক ঐতিহাসিক আত্মপ্রবঞ্চনা।
অভ্যন্তরীণ দূষণ: দিবোদাস, সুদাসের নাম ও ঐতিহাসিক সংমিশ্রণ (Internal Contamination: Names of Divodāsa, Sudās, and Historical Intermingling)
দেরিদার বিনির্মাণের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো যখন কোনো পাঠের ভেতরেই সেই প্রমাণগুলো বেরিয়ে আসে যা পাঠটির মূল দাবিকে সম্পূর্ণ চূর্ণ করে দেয়। দেরিদা একে নাম দিয়েছেন অভ্যন্তরীণ দূষণ (Internal Contamination)। একটি বিশুদ্ধ পরিচয় যখন নিজেকে সুরক্ষিত করতে চায়, তখন দেখা যায় তার রক্তের ভেতরেই সেই অপবিত্র উপাদানটি ঢুকে বসে আছে। বৈদিক সাহিত্যে আর্য-দাস দ্বৈততার ক্ষেত্রে এই দূষণের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলে খোদ আর্য নায়কদের নামের মধ্যে। বিশিষ্ট ঐতিহাসিক দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বী প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের বিশ্লেষণে এই সত্যটি প্রথম অত্যন্ত সাহসের সাথে সামনে এনেছিলেন (Kosambi, 1956)।
ঋগ্বেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বংশগুলোর একটি হলো ভরত ও তৃৎসু বংশ। এই বংশের যে রাজারা বৈদিক সাহিত্যের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে পূজিত হয়েছেন, তাদের নাম কী? তাদের প্রধান রাজার নাম ছিল দিবোদাস (Divodāsa), যার আক্ষরিক অর্থ হলো স্বর্গের দাস। তার উত্তরসূরি এবং বিখ্যাত দাশরাজ্ঞ বা দশ রাজার যুদ্ধের বিজয়ী আর্য অধিপতির নাম ছিল সুদাস (Sudās), যার অর্থ হলো উত্তম দাস। আরও গভীরে গেলে দেখা যায় ত্রসদস্যু নামক আর্য রাজার নাম, যার অর্থ হলো যার ভয়ে দস্যুরা কাঁপে অথবা যিনি স্বয়ং দস্যুদের মতো। যে টেক্সট দাস ও দস্যুদের চরম শত্রু এবং অপবিত্র বলে ঘোষণা করছে, সেই টেক্সটেই আর্য শ্রেষ্ঠত্বের পতাকাধারীরা নিজেদের নামের সাথে গর্বভরে ‘দাস’ শব্দটি যুক্ত করে রেখেছেন।
জর্জ এরদোসি প্রাচীন দক্ষিণ এশিয়ার ইন্দো-আর্যদের ওপর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে এই নামগুলো কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এগুলো প্রমাণ করে যে প্রাথমিক বৈদিক সমাজে আর্য ও দাসের মধ্যে কোনো অনমনীয় দেয়াল ছিল না (Erdosy, 1995)। যাযাবর আর্য গোত্রগুলো যখন স্থানীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছিল, তখন স্থানীয় দাস প্রধানদের সাথে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক আঁতাত এবং রক্তমিশ্রণ ঘটেছিল অত্যন্ত ব্যাপক আকারে। দিবোদাস বা সুদাস ছিলেন সেই ঐতিহাসিক সংমিশ্রণেরই ফল। অর্থাৎ যে দাসকে পরম শত্রু বলে স্তোত্র লেখা হচ্ছিল, সেই দাসের রক্তই বইছিল স্বয়ং প্রধান আর্য পৃষ্ঠপোষকদের ধমনিতে।
দেরিদা বলবেন, এটিই হলো সীমানার পতন। আর্য এবং দাসের যে অনড় বাইনারি পুরোহিতরা তৈরি করতে চেয়েছিলেন, টেক্সটের ঐতিহাসিক বাস্তবতাই সেই বাইনারিকে উপহাস করছে। কেন্দ্র যাকে বর্জন করতে চেয়েছিল, দেখা যাচ্ছে সেই বর্জিত উপাদানটি খোদ কেন্দ্রের সিংহাসনে বসে আছে। দাস কোনো বহিরাগত অপর ছিল না; দাস ছিল আর্য পরিচয়েরই এক অবিচ্ছেদ্য এবং অভ্যন্তরীণ অংশ। এই সত্যটি বৈদিক আর্যত্বের তথাকথিত পবিত্রতা ও মৌলিকত্বের দাবিকে এক লহমায় ধূলিসাৎ করে দেয়।
পৃষ্ঠপোষক দাস ও যজ্ঞের বাস্তব অর্থনীতি (The Dāsa as Patron and the Material Economy of Sacrifice)
বৈদিক সাহিত্যের অর্থনৈতিক স্তরে প্রবেশ করলে আর্য-দাস দ্বৈততার ভণ্ডামি আরও বেশি নগ্ন রূপ নিয়ে হাজির হয়। বৈদিক ঋষিদের জীবনধারণ নির্ভর করত যজ্ঞের দক্ষিণার ওপর। তারা সেই সমস্ত রাজাদের জন্য স্তোত্র রচনা করতেন যারা তাদের বিপুল পরিমাণ সোনা, ঘোড়া এবং গবাদি পশু দান করতেন। ঋগ্বেদের একাধিক দানস্তুতিতে দেখা যায়, এই বৈদিক পুরোহিতরা এমন সব রাজাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন যাদের পরিচয় স্পষ্টতই দাস হিসেবে চিহ্নিত। যেমন ঋগ্বেদের অষ্টম মণ্ডলে বল্বূথ এবং তরুক্ষ নামক দাস শাসকদের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে, কারণ তারা ঋষিদের শত শত গরু ও রথ উপহার দিয়েছিলেন।
ইতিহাসবিদ কুমকুম রায় প্রাচীন উত্তর ভারতে রাজতন্ত্রের উন্মেষ নিয়ে গবেষণায় দেখিয়েছেন যে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব এবং পৃষ্ঠপোষকতা কোনো নির্দিষ্ট জাতিগত পরিচয়ের সীমানায় বন্দি ছিল না (Roy, 1994)। বৈদিক পুরোহিতদের কাছে আসল বিবেচ্য বিষয় ছিল কে সম্পদ দিতে পারছে। যখন কোনো দাস রাজা পুরোহিতদের পর্যাপ্ত ধনসম্পদ দান করতেন, তখন পুরোহিতরা কোনো দ্বিধা ছাড়াই সেই দাস রাজাকে মহৎ ও ধর্মপ্রাণ বলে স্তুতি করতেন। যে ইন্দ্রকে ডাকা হতো দাসদের দুর্গ ধ্বংস করার জন্য, সেই ইন্দ্রের পুরোহিতরাই দাস রাজার দেওয়া গরু নিয়ে বাড়ি ফিরতেন।
দীপেশ চক্রবর্তী তার ইতিহাসতত্ত্বে দেখিয়েছেন কীভাবে সার্বজনীন নৈতিক দাবির আড়ালে বাস্তব বস্তুগত স্বার্থের আপস লুকিয়ে থাকে (Chakrabarty, 2000)। বৈদিক সাহিত্যের এই দৃশ্যটি দেরিদার সেই অনির্ণেয়তা (Undecidability)-র এক নিখুঁত দৃষ্টান্ত। এখানে এসে আর্য ও দাসের নৈতিক বিভাজন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। দাস কি অশুভ শত্রু, নাকি সে একজন পরম হিতৈষী পৃষ্ঠপোষক? পুরোহিতদের ভাষাই এই প্রশ্নের কোনো স্থির উত্তর দিতে পারে না। অর্থনৈতিক স্বার্থের টানে শত্রুর সীমানা নিমেষে মুছে যায় এবং যাকে পশু বলে গালি দেওয়া হয়েছিল, সে-ই পরিণত হয় যজ্ঞের মহিমান্বিত রক্ষকে।
এই বৈষয়িক অর্থনীতি উন্মোচন করে দেয় যে আর্য-দাস দ্বন্দ্ব কোনো পরম সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় লড়াই ছিল না। এটি ছিল প্রধানত সম্পদ দখল, চারণভূমির নিয়ন্ত্রণ এবং পশুর মালিকানার এক নগ্ন লড়াই। যখন দাসরা আর্যদের প্রতিরোধ করত, তখন তারা হয়ে উঠত ঘৃণ্য শত্রু; আর যখন তারা বৈদিক ব্যবস্থার সাথে আপস করে পুরোহিতদের সম্পদ জোগান দিত, তখন তারা হয়ে উঠত মিত্র। ফলে আর্য ও দাসের সীমানাটি কোনো ঐশ্বরিক নিয়মে আঁকা হয়নি; তা আঁকা হয়েছিল তৎকালীন শাসক ও পুরোহিতদের পেটের তাগিদে এবং রাজনৈতিক সুবিধাবাদের ওপর ভিত্তি করে।
বিশুদ্ধতার মিথ ও আর্য-দাস দ্বৈততার অবসান (The Myth of Purity and the Dissolution of the Ārya-Dāsa Binary)
বিশ শতকের প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ভি. গর্ডন চাইল্ড তার ধ্রুপদী গবেষণায় আর্য সম্পর্কিত সমস্ত ধরনের জাতিগত এবং নৃতাত্ত্বিক অহংকারকে বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে খারিজ করে দিয়েছিলেন (Childe, 1926)। চাইল্ড স্পষ্ট করেছিলেন যে আর্য কোনো মানুষের খুলি, রক্ত বা ত্বকের রঙের পরিচয় নয়; এটি নিছক একটি বিশেষ ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের নাম। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে পৃথিবীতে কোনো খাঁটি বা বিশুদ্ধ মানবগোষ্ঠী কখনো ছিল না। মানুষ সবসময়ই অভিবাসন, সংমিশ্রণ এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে নিজের পরিচয় পুনর্নির্মাণ করেছে। বৈদিক সংকলনগুলো যে এক বিশুদ্ধ ও অপৌরুষেয় আর্য সংস্কৃতির গান গায়, তা ছিল একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক শ্রেণির তৈরি করা মনগড়া মিথ।
দেরিদার বিনির্মাণ এই বিশুদ্ধতার মিথের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। বিনির্মাণের কাজ কোনো নতুন ঈশ্বর প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং এটি দেখায় কীভাবে যেকোনো ক্ষমতার বয়ান নিজের ভেতরের দুর্বলতা লুকাতে কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করে। আর্য-দাস দ্বৈততা ছিল বৈদিক কবিদের তৈরি করা এমন এক প্রতিরক্ষামূলক দেওয়াল, যার মাধ্যমে তারা একটি জটিল ও সংঘাতময় বাস্তবতাকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু টেক্সটটির নিজস্ব ভাষা, তার ঐতিহাসিক নামগুলো এবং তার ভেতরের অর্থনৈতিক লেনদেনই সেই দেওয়ালটিকে পদে পদে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
আজকের একবিংশ শতাব্দীর একজন ধর্মনিরপেক্ষ ও সমালোচনামূলক পাঠকের কাছে এই পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। এই পাঠ আমাদের সতর্ক করে দেয় যে বর্তমান কালেও যখন কোনো গোষ্ঠী নিজেদের বিশুদ্ধ আর্য বা খাঁটি সংস্কৃতির দাবিদার হিসেবে জাহির করে অন্য কোনো সম্প্রদায়কে অপর বা শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে চায়, তখন তারা মূলত সেই প্রাচীন আর্য-দাস বয়ানেরই পুনরাবৃত্তি করে। অতীতের এই কৃত্রিম বিভাজনকে মহিমান্বিত করা মানে হলো আধুনিক সমাজেও ঘৃণা ও বৈষম্যের রাজনীতিকে ইন্ধন জোগানো। দেরিদার পদ্ধতি আমাদের শেখায় কীভাবে এই সমস্ত শ্রেষ্ঠত্বকামী বয়ানের অভ্যন্তরীণ অসাড়তাকে টেনে বের করতে হয়।
পরিশেষে বলা যায়, দেরিদার বিনির্মাণবাদী পাঠ বৈদিক সাহিত্যের আর্য-দাস বাইনারিকে তার সমস্ত কৃত্রিম পবিত্রতা থেকে মুক্ত করে একটি রক্তমাংসের ঐতিহাসিক টানাপোড়েন হিসেবে মেলে ধরে। আর্য ও দাস কোনো স্থায়ী আলোর ও অন্ধকারের প্রতীক নয়; তারা হলো প্রাচীন ভারতের পরিবর্তনশীল ভূখণ্ডে টিকে থাকার লড়াইয়ে লিপ্ত কিছু মানুষের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়, যা পরস্পরের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে ছিল। আর্য দাসকে ছাড়া সংজ্ঞাহীন, আর দাসের অস্তিত্ব ছাড়া আর্যের কোনো মহিমা নেই। এই পারস্পরিক নির্ভরতা যখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন বৈদিক সাহিত্যের আর্য শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার ধসে পড়ে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকে কেবল প্রাচীন মানুষের ইতিহাস – যেখানে কোনো দলই পরম পবিত্র ছিল না, আর কোনো দলই পরম অপবিত্র ছিল না।
দেরিদা ও শুদ্ধ-অশুদ্ধ দ্বৈততা (Derrida and the Pure-Impure Binary): পার্থক্য, শ্রেণিবিন্যাস ও সীমার অস্থিতিশীলতা
বিশুদ্ধতার অধিবিদ্যা ও ফার্মাকন: দেরিদার দ্বৈততা ব্যবচ্ছেদ (Metaphysics of Purity and Pharmakon: Derrida’s Dissection of Duality)
যেকোনো ধর্মীয় বা গোঁড়া সমাজব্যবস্থার প্রধান খুঁটি হলো ভালো এবং মন্দের মতো কিছু অনমনীয় বিভাজন তৈরি করে রাখা। এই বিভাজনগুলোর শীর্ষে থাকে শুদ্ধ এবং অশুদ্ধের দ্বন্দ্ব। ঐতিহ্যবাহী চিন্তায় বিশ্বাস করা হয় যে বিশুদ্ধতা হলো একটি আদিম, মৌলিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ অবস্থা। ধরে নেওয়া হয়, কোনো বস্তু বা ব্যক্তি শুরুতে সম্পূর্ণ পবিত্র থাকে, আর অপবিত্রতা হলো বাইরে থেকে আসা একটি আপতিক ময়লা বা দূষণ। ফরাসি দার্শনিক জাক দেরিদা (Jacques Derrida) পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তার এই ভিত্তিপ্রস্তরটিকেই ভেঙে চুরমার করে দেন। দেরিদা দেখান যে বিশুদ্ধতার এই দাবি একটি তাত্ত্বিক জালিয়াতি। কোনো সত্তাই নিজের ভেতর বিশুদ্ধ বা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; বরং তথাকথিত শুদ্ধতা টিকে থাকার জন্য প্রতি মুহূর্তে তার বিপরীত অশুদ্ধতার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে।
দেরিদা তার বিভিন্ন টেক্সট বিশ্লেষণে একটি চমকপ্রদ গ্রিক প্রত্যয়ের অবতারণা করেছিলেন, যার নাম ফার্মাকন (Pharmakon)। প্লেটোর ডায়ালগ ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে দেরিদা দেখান যে ফার্মাকন শব্দটির একই সাথে দুটি বিপরীত অর্থ রয়েছে – এটি একাধারে বিষ এবং এই একই বস্তু হলো ওষুধ। কোনো সুস্থ শরীরে রোগ সারাতে যে ওষুধ প্রয়োগ করা হয়, সেই ওষুধটি নিজেই শরীরে বাইরে থেকে প্রবেশ করা একটি বহিরাগত উপাদান। দেরিদা তার গ্রন্থ অ্যাপোরিয়াজ (Aporias)-তে সীমানার সংকট নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন (Derrida, 1993)। তিনি দেখান যে প্রতিটি সমাজ নিজের ভেতরের বিশুদ্ধতা রক্ষা করার জন্য একটি অদৃশ্য সীমারেখা বা বর্ডার তৈরি করে। কিন্তু এই সীমানা কখনোই দুর্ভেদ্য হতে পারে না; কারণ সীমানার কাজই হলো সবসময় দুই পাশের উপাদানের মিশ্রণ ঘটানো।
দেরিদার এই বিনির্মাণবাদী অন্তর্দৃষ্টি প্রাচীন ভারতের বৈদিক ও শাস্ত্রীয় শুদ্ধ-অশুদ্ধের ধারণার ওপর এক প্রচণ্ড আঘাত হানে। ব্রাহ্মণ্য চিন্তায় দাবি করা হয়েছিল যে যা কিছু বৈদিক, যা কিছু যজ্ঞীয়, তা হলো পরম শুদ্ধ (Pure/Śuddha)। আর যজ্ঞের বাইরে থাকা সমস্ত জাগতিক উপাদান, মানুষের কায়িক শ্রম ও শারীরিক বর্জ্য হলো অশুদ্ধ (Impure/Aśuddha)। এই দ্বৈততার ওপর ভর করেই পুরো চতুর্বর্ণের স্তরবিন্যাস সাজানো হয়েছিল। কিন্তু দেরিদার লেন্স দিয়ে তাকালে পরিষ্কার ধরা পড়ে যে এই বিশুদ্ধতা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এটি হলো এক ধরনের কৃত্রিম ভাষিক ও সামাজিক নির্মাণ। শুদ্ধতা নিজেকে উচ্চাসনে বসাতে গিয়ে অশুদ্ধতাকে বাইরে ঠেলে দেয় বটে, কিন্তু সেই বহিষ্কৃত উপাদানটির সাহায্য ছাড়া শুদ্ধতা নিজের অস্তিত্বের কোনো অর্থই খুঁজে পায় না।
এই ব্যবচ্ছেদের ফলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে শুদ্ধ ও অশুদ্ধ কোনো প্রাকৃতিক বা জন্মগত বাস্তবতা নয়। এরা হলো ভাষার জালে আটকে থাকা দুটি আপেক্ষিক চিহ্ন। একটিকে ছাড়া অন্যটিকে চিন্তা করা অসম্ভব। ফলে ব্রাহ্মণ্যবাদী সাহিত্যের যে বিশুদ্ধতার অহংকার, তা কোনো চিরন্তন সত্য নয়; তা হলো ক্ষমতার এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা। ক্ষমতা সারাক্ষণ এই আতঙ্কে ভুগত যে অশুদ্ধতার সামান্য ছোঁয়া লাগলেই তার পুরো আধিপত্যের দুর্গ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। এই ভয়টাই প্রমাণ করে যে তাদের তৈরি করা বিশুদ্ধতার ধারণাটি কতটা নড়বড়ে এবং অন্তঃসারশূন্য ছিল।
যজ্ঞের রক্ত ও হিংসা: বিশুদ্ধতার অভ্যন্তরীণ অপবিত্রতা (Sacrificial Blood and Violence: Internal Impurity of Purity)
বৈদিক সাহিত্যের সবচেয়ে বড় পবিত্রতার মঞ্চ হলো যজ্ঞশালা। সেখানে অগ্নিকে বলা হয়েছে পরম পাবক বা সমস্ত কিছুকে পবিত্রকারী সত্তা। কিন্তু সেই পরম পবিত্র যজ্ঞশালার ভেতরে আসলে কী ঘটত? ফরাসি তাত্ত্বিক জর্জেস বাতাই তার বিখ্যাত গ্রন্থ ভিশনস অব এক্সেস (Visions of Excess)-এ ধর্মীয় বলিদানের অর্থনীতি ও মনস্তত্ত্বের গভীর ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন (Bataille, 1985)। বাতাই দেখান যে আদিম সমাজের পবিত্র আচারগুলো কোনো শান্ত আধ্যাত্মিক ধ্যান ছিল না; সেগুলো ছিল চরম সহিংসতা, রক্তপাত এবং ধ্বংসের এক উৎসব। বৈদিক পশুযজ্ঞের বা পশুবন্ধের দিকে তাকালে বাতাইয়ের এই বক্তব্যের বাস্তব সত্যতা হাড়েমজ্জায় টের পাওয়া যায়।
একটি আদর্শ বৈদিক পশুযজ্ঞে একটি নিরীহ পশুকে দড়ি দিয়ে বেঁধে যজ্ঞের খাঁচায় নিয়ে আসা হতো। শতপথ ও ঐতরেয় ব্রাহ্মণের নির্দেশ অনুযায়ী, পশুর কোনো রক্ত যাতে বাইরে না পড়ে সেজন্য তাকে শ্বাসরোধ করে বা শ্বাসযন্ত্র পিষে হত্যা করা হতো। এরপর সেই পশুর পেট চিরে তার চর্বি বা বপা বের করে এনে আগুনে পোড়ানো হতো, পশুর কাঁচা রক্ত যজ্ঞবেদির বিশেষ কোণে উৎসর্গ করা হতো এবং তার মাংস কেটে পুরোহিতরা ভক্ষণ করতেন। এই পুরো দৃশ্যটি ছিল চরম রক্তপাত, মলমূত্র, কাঁচা মাংসের দুর্গন্ধ এবং বীভৎস শারীরিক যন্ত্রণার এক দৃশ্য। অথচ ব্রাহ্মণ্য বয়ান দাবি করত যে এটিই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র ও বিশুদ্ধতম কাজ।
দেরিদার পরিভাষা ব্যবহার করে একে বলা যায় পাঠের চরম স্ববিরোধিতা বা অভ্যন্তরীণ দূষণ। যে যজ্ঞকে বিশুদ্ধতার চূড়া বলে প্রচার করা হচ্ছে, সেই যজ্ঞের কেন্দ্রবিন্দু গড়ে উঠেছে এমন সব উপাদানের ওপর যা সমাজের চোখে চরম অপবিত্র ও ঘৃণ্য – যেমন রক্ত, নাড়িভুঁড়ি, চর্বি এবং পশুর শবদেহ। ব্রাহ্মণ্য পুরোহিতরা এই অপবিত্রতাকে আড়াল করার জন্য ভাষার এক অদ্ভুত কারসাজি করতেন। তারা পশুকে হত্যা করাকে বলতেন সংজ্ঞপন বা পশুকে শান্ত করা। তারা মন্ত্র পড়তেন: “আমরা তোমাকে মারছি না, তুমি স্বর্গে যাচ্ছ”। এই ভাষিক ভণ্ডামি প্রমাণ করে যে পুরোহিতরা নিজেরাই তাদের কাজের ভেতরের অপবিত্রতা ও রক্তপাত নিয়ে কতটা অপরাধবোধ ও আতঙ্কে ভুগতেন।
দেরিদা আমাদের দেখান যে শুদ্ধতা কখনোই বাইরে থেকে আসা কোনো আক্রমণ দ্বারা নষ্ট হয় না; শুদ্ধতা নিজেই নিজের ভেতরে অশুদ্ধতাকে বহন করে। বৈদিক যজ্ঞ কোনোদিন সেই রক্ত ও হিংসার গন্ধ থেকে মুক্ত হতে পারেনি। যে রক্তাক্ত হাত দিয়ে পুরোহিত পশু জবাই করতেন, সেই হাত দিয়েই তিনি অমৃতের মন্ত্র পাঠ করতেন। ফলে বিশুদ্ধতার আসল চেহারাটি কোনো নিষ্কলঙ্ক আলো নয়; তা হলো হিংসা ও বর্জ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক সামাজিক অহংকার। যজ্ঞের এই অন্ধকার দিকটি উন্মোচিত হওয়া মাত্রই বৈদিক পবিত্রতার সমস্ত অলৌকিক দাবি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
বর্জন ও অ্যাবজেকশন: অপবিত্র সত্তার অপরিহার্য ভূমিকা (Exclusion and Abjection: The Indispensable Role of the Impure)
যেকোনো পবিত্র সমাজব্যবস্থা টিকে থাকার জন্য নিজের সীমানার বাইরে কিছু মানুষকে ছুড়ে ফেলে দেয় এবং তাদের ওপর সমস্ত অপবিত্রতার দায় চাপিয়ে দেয়। ফরাসি দার্শনিক জুলিয়া ক্রিস্তেভা তার মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক তত্ত্বে এই বর্জনের প্রক্রিয়াটিকে ব্যাখ্যা করেছেন। ক্রিস্তেভা তার বিখ্যাত গ্রন্থ পাওয়ার্স অব হরর (Powers of Horror)-এ একটি নতুন পরিভাষা এনেছিলেন, যার নাম অ্যাবজেক্ট বা ঘৃণিত বর্জ্য (Abject/Abjection) (Kristeva, 1982)। অ্যাবজেক্ট হলো এমন এক উপাদান যা মানুষের পরিচয়ের সীমানাকে নাড়িয়ে দেয়। যেমন মানুষের শরীর থেকে বের হয়ে যাওয়া রক্ত, থুতু, বিষ্ঠা বা পচা লাশ। মানুষ এই জিনিসগুলোকে দেখে শিউরে ওঠে এবং এগুলোকে শরীর থেকে আলাদা করে দেয় যাতে সে নিজেকে পরিচ্ছন্ন ভাবতে পারে।
প্রাচীন ভারতের বর্ণাশ্রম সমাজ নিম্নবর্গের মানুষকে, বিশেষ করে চণ্ডাল ও অস্পৃশ্যদের ঠিক এই অ্যাবজেক্টের জায়গায় বসিয়ে দিয়েছিল। সমাজ টিকে থাকার জন্য যে কাজগুলো সবচেয়ে বেশি নোংরা কিন্তু অপরিহার্য – যেমন মানুষের মলমূত্র পরিষ্কার করা, চামড়া ছাড়ানো এবং শ্মশানে মড়া পোড়ানো – সেই কাজগুলো চাপিয়ে দেওয়া হলো নির্দিষ্ট কিছু মানুষের ওপর। ইতালীয় দার্শনিক জর্জিও আগামবেন তার রাজনৈতিক দর্শনে এমন এক মানুষের কথা বলেছেন যাকে সমাজ আইনের বাইরে ছুড়ে ফেলে দেয় কিন্তু তার অস্তিত্বকে শোষণ করে, যার নাম হোমো সাকের (Homo Sacer) (Agamben, 1998)। বৈদিক ও উত্তর-বৈদিক সমাজের অস্পৃশ্যরা ছিল এই প্রাচীন হোমো সাকের। তাদের কোনো নাগরিক বা ধর্মীয় অধিকার ছিল না, কিন্তু উচ্চবর্ণের পবিত্রতা রক্ষার জন্য তাদের অস্তিত্ব ছিল অপরিহার্য।
সমাজবিজ্ঞানী দীপঙ্কর গুপ্ত ভারতের কাস্ট কাঠামোর জটিলতা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে এই স্তরবিন্যাস কোনো নিছক সম্মতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না; এটি ছিল এক সার্বক্ষণিক অসম ক্ষমতা ও অপমানের কাঠামো (Gupta, 2000)। উচ্চবর্ণের মানুষ প্রতিদিন সকালে স্নান করে নিজেকে পবিত্র ঘোষণা করত এই আত্মতৃপ্তি নিয়ে যে সমাজের সমস্ত অপবিত্র কাজগুলো করার জন্য অন্য একটি দল মানুষ মাটির নিচে পড়ে আছে। যদি সেই চণ্ডাল বা দলিত মানুষটি সমাজের ময়লা পরিষ্কার না করত, তবে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণের বাড়ি ও মন্দির এক নিমেষে মানুষের বর্জ্যে ভেসে যেত। অর্থাৎ ব্রাহ্মণের বিশুদ্ধতা কোনো নিজস্ব অর্জন ছিল না; তা ছিল নিম্নবর্ণের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া বর্জ্যের এক পরজীবী ফসল।
দেরিদার বিনির্মাণ এই পরজীবী সম্পর্কের মুখোশটি খুলে দেয়। তথাকথিত শুদ্ধ মানুষটি আসলে সেই অশুদ্ধ মানুষটির করুণার ওপর বেঁচে আছে। অশুদ্ধ মানুষটি যদি তার কাজ বন্ধ করে দেয়, তবে শুদ্ধতার সমস্ত প্রাচীর ধসে পড়বে। এর মানে দাঁড়ায়, সামাজিক শৃঙ্খলার আসল চালিকাশক্তি ছিল সেই ঘৃণিত অ্যাবজেক্ট, যাকে সমাজ অস্পৃশ্য বলে দূরে ঠেলে রেখেছিল। ক্ষমতার কেন্দ্র যে নিজেকে সর্বেসর্বা বলে জাহির করে, সে আসলে তার প্রান্তের কাছে চিরকালের জন্য ঋণী। এই বিপরীত সত্যটি স্পষ্ট করে দেয় যে বৈদিক সমাজের শুদ্ধ-অশুদ্ধের দেয়ালটি ছিল এক চরম অকৃতজ্ঞ ও শোষণমূলক ব্যবস্থার মানসিক প্রতিফলন।
পদার্থ-সংহিতা ও তরল সত্তা: ম্যারিয়টের বিনিময় তত্ত্বের বিনির্মাণ (Substance-Code and Fluid Being: Deconstructing Marriott’s Transaction Theory)
পাশ্চাত্য দর্শনে মানুষকে ভাবা হয় একটি সম্পূর্ণ একক ও বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হিসেবে। কিন্তু ভারতীয় সমাজতত্ত্বে ম্যাককিম ম্যারিয়ট একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন তাত্ত্বিক মডেল প্রস্তাব করেছিলেন। ম্যারিয়ট প্রাচীন ভারতীয় আচার ও চিকিৎসাবিজ্ঞান বিশ্লেষণ করে দেখান যে ভারতীয় সংস্কৃতিতে শরীর ও আত্মাকে দুটি আলাদা জিনিস ভাবা হতো না; সেখানে মনে করা হতো যে মানুষের নৈতিক গুণ এবং তার শারীরিক উপাদান একে অপরের সাথে মিশে থাকে (Marriott, 1976)। এই ধারণাকে তিনি নাম দিয়েছিলেন পদার্থ-সংহিতা (Substance-Code)। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একজন মানুষের রক্ত, বীর্য, ঘাম বা লালার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে তার বর্ণ ও নৈতিক চরিত্র। ফলে মানুষ এখানে কোনো বন্ধ পাত্র নয়; মানুষ হলো একটি ছিদ্রযুক্ত সত্তা যা সারাক্ষণ চারপাশের পরিবেশের সাথে উপাদান আদান-প্রদান করে।
এই পদার্থ-সংহিতার কারণে প্রাচীন বৈদিক ও শাস্ত্রীয় সমাজে শারীরিক লেনদেন নিয়ে এক চরম বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল। কার হাত থেকে জল খাওয়া যাবে, কার সাথে একাসনে বসা যাবে এবং কার স্পর্শ করা খাদ্য গ্রহণ করা যাবে – তার জন্য তৈরি হলো হাজার হাজার বিধিনিষেধ। বিশেষ করে অন্যের খাওয়া খাবারের অবশিষ্ট বা এঁটো, যাকে বলা হতো উচ্ছিষ্ট, তা গ্রহণ করাকে দেখা হতো মারাত্মক পাপ হিসেবে। মানুষ ভাবত, অন্য বর্ণের মানুষের মুখের লালা বা হাতের ঘাম খাদ্যের মাধ্যমে নিজের পেটে গেলে তার নিজের রক্তের বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়ে যাবে এবং সে জাত হারাবে।
ইতিহাসবিদ রোনাল্ড ইনডেন প্রাচ্যতত্ত্বের পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন যে ইউরোপীয় পণ্ডিতরা কীভাবে ভারতের এই শারীরিক ও জাতভিত্তিক ভাবনাকে একটি অদ্ভুত ও অপরিবর্তনীয় স্বভাব হিসেবে তুলে ধরেছিলেন (Inden, 1990)। কিন্তু দেরিদার দৃষ্টি দিয়ে এই পদার্থ-সংহিতাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল আসলে শরীরের সীমানা পাহারা দেওয়ার এক ব্যর্থ ও আতঙ্কগ্রস্ত চেষ্টা। মানুষ একটি জৈবিক প্রাণী। তাকে প্রতিদিন শ্বাস নিতে হয়, জল খেতে হয় এবং খাবার হজম করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় বাইরের জগৎ প্রতি মুহূর্তে তার শরীরের ভেতর ঢুকছে এবং তার শরীর থেকে নানা পদার্থ বাইরে নির্গত হচ্ছে। ফলে কোনো মানুষের শরীর কখনোই একটি সুরক্ষিত বা স্বয়ংসম্পূর্ণ দুর্গ হতে পারে না।
দেরিদা যাকে দিফারঁস (Différance) বলেছেন, অর্থের মতো শরীরের বিশুদ্ধতাও সবসময় এই তরল আদান-প্রদানের কারণে পিছিয়ে যায় বা বদলে যায়। যে ব্রাহ্মণ দাবি করত যে সে সম্পূর্ণ পবিত্র, সে যে বাতাস গ্রহণ করছিল, সেই একই বাতাসে নিঃশ্বাস ফেলছিল রাস্তার এক অস্পৃশ্য মানুষ। সে যে জল পান করছিল, সেই জল হয়তো কোনো এক সময় অন্য কোনো জীবের শরীর বেয়ে এসেছে। ফলে শারীরিক বিশুদ্ধতার যে দেওয়াল শাস্ত্রকাররা তুলতে চেয়েছিলেন, প্রকৃতির জৈবিক কার্যকারণ সেই দেওয়ালকে প্রতিদিন গুঁড়িয়ে দিত। জাত রক্ষার এই সার্বক্ষণিক শুচিবাই আসলে প্রমাণ করে যে মানুষের শরীরকে কোনোদিনও জাতের কৃত্রিম খাঁচায় শতভাগ বন্দি করা সম্ভব ছিল না।
মহাভারতের শবদাহ ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পুরোহিত: অপবিত্রতার আধার (Cremation and the Funeral Priest: Bearer of Impurity)
ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজব্যবস্থায় শুদ্ধ ও অশুদ্ধের সীমা কীভাবে একই বর্গের ভেতরে ভেঙে পড়ে, তার সবচেয়ে মর্মান্তিক ও জীবন্ত উদাহরণ হলো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পুরোহিতরা। জোনাথন পি. প্যারি বেনারসের শ্মশানঘাট ও মৃত্যুতত্ত্ব নিয়ে তার বিশ্বখ্যাত নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই সত্যটি বিশদভাবে তুলে ধরেছেন (Parry, 1994)। শাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী, কোনো মানুষের মৃত্যুর পর তার আত্মার সদ্গতির জন্য শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান করা অপরিহার্য। এই কাজটি একজন উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য কেউ করতে পারে না। ফলে মৃত্যুর মতো এক চরম অপবিত্র ও বিপজ্জনক ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় স্বয়ং সেই পুরোহিতকেই।
এই কাজের জন্য যে বিশেষ পুরোহিত দল তৈরি হয়েছিল, তাদের নাম মহাব্রাহ্মণ বা কাত্তাহা ব্রাহ্মণ। সি. জে. ফুলার হিন্দু সমাজের জনপ্রিয় আচার ও পুরোহিতদের দ্ব্যর্থবোধক অবস্থান নিয়ে আলোচনায় দেখিয়েছেন যে এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পুরোহিতরা একই সাথে পূজনীয় এবং চরম ঘৃণিত (Fuller, 1992)। শ্রাদ্ধের সময় যজমান তার মৃত পূর্বপুরুষের সমস্ত পাপ ও মৃত্যুর অশৌচ এই পুরোহিতের মাথায় চাপিয়ে দেয়। পুরোহিতকে দান করা হয় মৃত ব্যক্তির ব্যবহৃত কাপড়, বিছানা, সোনা এবং বিশাল পরিমাণ অন্ন। বিশ্বাসের নিয়ম হলো, পুরোহিত এই সমস্ত দান গ্রহণ করে এবং সেই অন্ন খেয়ে মৃত ব্যক্তির আত্মাকে মুক্তি দেন। অর্থাৎ তিনি নিজেই পরিণত হন মৃত্যুর সমস্ত অপবিত্রতার আধারে।
এই প্রক্রিয়ার পরিণতিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যে মুহূর্তে একজন মহাব্রাহ্মণ এই দান গ্রহণ করেন, তিনি নিজের জাতের ভেতরেই চরম অপবিত্র ও অস্পৃশ্য হিসেবে গণ্য হন। সাধারণ ব্রাহ্মণরা তার সাথে বসে আহার করেন না, তার মেয়ের সাথে নিজেদের ছেলের বিয়ে দেন না এবং রাস্তায় তাকে দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেন। মাইকেল মফাট দক্ষিণ ভারতের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিয়ে গবেষণায় দেখিয়েছেন যে এই শুদ্ধ-অশুদ্ধের কাঠামোটি সমাজের প্রতিটি স্তরে নিজের প্রতিলিপি তৈরি করে চলে (Moffatt, 1979)। এখানে যে মানুষটি ধর্ম রক্ষার জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজটি করল, তাকেই পুরস্কৃত করা হলো সমাজ থেকে একঘরে করে দিয়ে।
দেরিদার বিনির্মাণের ভাষায় একে বলা যায় দ্বৈততার চরম বিপর্যয়। যে ব্রাহ্মণ নিজেকে বিশুদ্ধতার প্রতীক বলে দাবি করেছিল, দেখা যাচ্ছে সেই ব্রাহ্মণের ভেতরেই তৈরি হচ্ছে চরম অপবিত্র এক সত্তা। বিশুদ্ধতা এখানে নিজেই নিজের ভেতরে বিষ বা ফার্মাকন তৈরি করছে। যে হাত পিণ্ডদান করে আত্মাকে পবিত্র করল, সেই হাতই হয়ে উঠল মৃত্যুর বিষে নীল। ফলে শুদ্ধ ও অশুদ্ধ কোনো দুটি আলাদা ভৌগোলিক বা সামাজিক অঞ্চল নয়। শুদ্ধতার চূড়ান্ত বিন্দুতেই বসে থাকে চরম অশুদ্ধি। এই সত্যটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে জাতব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিটি কতটা আত্মঘাতী এবং স্ববিরোধী ছিল।
সীমার অস্থিতিশীলতা ও ধর্মনিরপেক্ষ পাঠের যুক্তি (Instability of the Boundary and the Logic of Secular Reading)
রবার্ট আই. লেভি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নগরীর স্থানিক বিন্যাস নিয়ে গবেষণায় দেখিয়েছেন যে সনাতন ধর্মীয় সমাজ সবসময় শহরকে বিভিন্ন পবিত্র ও অপবিত্র জোনে ভাগ করে রাখতে চেয়েছিল (Levy, 1990)। মন্দিরের কেন্দ্রটি হবে পরম পবিত্র, আর শহরের বাইরের শ্মশান বা বর্জ্যের জায়গাটি হবে অপবিত্র। কিন্তু এই ভৌগোলিক বিভাজন কোনোদিনই পুরোপুরি সফল হতে পারেনি। কারণ শহরের অস্তিত্বের জন্যই প্রতিনিয়ত এই দুই অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ঘটতে হয়। অর্জুন আপ্পাদুরাই বস্তু ও সামাজিক মর্যাদার রাজনীতি নিয়ে বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে সম্পদের আদান-প্রদান এবং মানুষের চলাচল সবসময় এই কৃত্রিম সীমানাগুলোকে লঙ্ঘন করে চলে (Appadurai, 1981)।
দেরিদার বিনির্মাণের চূড়ান্ত শিক্ষা হলো এই যে সীমানা কখনোই স্থির বা অটল থাকতে পারে না। বৈদিক ও শাস্ত্রীয় সাহিত্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে শুদ্ধ-অশুদ্ধের দেওয়ালটি খাঁড়া করে রেখেছিল, পাঠটির নিজস্ব ভাষিক বাস্তবতা এবং মানুষের বেঁচে থাকার দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাই সেই দেওয়ালটিকে প্রতিদিন চূর্ণ করেছে। মানুষ যখন খেতে যায়, ভালোবাসতে যায়, কাজ করতে যায় কিংবা রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়, তখন এই সমস্ত কৃত্রিম শুচিবাই অর্থহীন হয়ে পড়ে। রক্তমাংসের মানুষ কোনোদিন সেই বিমূর্ত বিশুদ্ধতার মূর্তি হয়ে উঠতে পারে না।
একটি আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রধান কাজ হলো মানুষের শরীর ও শ্রমকে এই প্রাচীন অপবিত্রতার গ্লানি থেকে চিরতরে মুক্ত করা। প্রাচীন সমাজপতিরা তাদের নিজেদের পরজীবী জীবনকে আড়াল করার জন্য মানুষের কায়িক শ্রমকে অপবিত্র বলে দাগিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের শেখায় যে কোনো মানুষের শরীর অপবিত্র নয় এবং কোনো উৎপাদনশীল শ্রমই হীন নয়। যারা মাটি কাটে, যারা চামড়ার কাজ করে কিংবা যারা মানুষের বর্জ্য পরিষ্কার করে, তারাই সমাজের আসল মেরুদণ্ড। তাদের কাজের ওপর অপবিত্রতার তকমা লাগানো ছিল মানব ইতিহাসের এক জঘন্যতম মতাদর্শিক অপরাধ।
পরিশেষে বলা যায়, জাক দেরিদার বিনির্মাণবাদী পদ্ধতি বৈদিক সাহিত্যের শুদ্ধ-অশুদ্ধ দ্বৈততার সমস্ত আধ্যাত্মিক মিথ্যাচারকে ধূলিসাৎ করে দেয়। শুদ্ধতা কোনো পরম সত্য নয়; এটি ছিল কিছু মানুষের স্বার্থে তৈরি করা এক কাল্পনিক সীমানা, যা নিজের ভেতরের হিংসা ও বর্জ্যের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। অশুদ্ধতা ছাড়া শুদ্ধতার কোনো অস্তিত্ব নেই, এবং যে শুদ্ধতা দাবি করে সে নিজেই নিজের ভেতরে চরম অপবিত্রতাকে লুকিয়ে রাখে। এই নির্মোহ ঐতিহাসিক ও দার্শনিক বোঝাপড়াই পারে মানুষের শরীর ও মনকে কয়েক হাজার বছরের শুচিবাইয়ের কারাগার থেকে মুক্ত করতে এবং এক মানবিক, যুক্তিবাদী ও সমতাভিত্তিক পৃথিবীর ভিত্তি রচনা করতে।
দেরিদা ও পুরুষসূক্ত (Derrida and the Puruṣa Sūkta): মুখ, পদ, কেন্দ্র ও প্রান্ত
কেন্দ্র ও প্রান্তের বিনির্মাণ: দেরিদার সংস্থানিক পাঠ (Deconstruction of Center and Margin: Derrida’s Structural Reading)
পাশ্চাত্যের জ্ঞানকাণ্ডে প্রচলিত একটি গভীর বিশ্বাস হলো যেকোনো সুসংহত ব্যবস্থার একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র থাকতে হবে। সেই কেন্দ্রটি পুরো ব্যবস্থাকে চালিত করবে, অথচ নিজে সবসময় সমস্ত পরিবর্তনের বাইরে অক্ষত থাকবে। ফরাসি দার্শনিক জাক দেরিদা (Jacques Derrida) কাঠামোর এই কেন্দ্রীয় ভাবনাটির ওপর কঠোর বুদ্ধিবৃত্তিক আঘাত হেনেছিলেন। জন ডি. কাপুতো দেরিদার বিনির্মাণ পদ্ধতির মূল কথা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে দেরিদা যে কোনো ব্যবস্থার তথাকথিত কেন্দ্রকে এক ধরনের কৃত্রিম কল্পনা হিসেবে প্রমাণ করেছিলেন (Caputo, 1997)। দেরিদা দেখান যে প্রতিটি কাঠামো নিজেকে সংহত প্রমাণ করতে গিয়ে একটি কেন্দ্র (Center) তৈরি করে এবং সেই কেন্দ্রের বাইরে যা কিছু থাকে, তাকে অবমূল্যায়ন করে প্রান্ত (Margin) হিসেবে নির্বাসনে পাঠায়।
পেগি কামুফ তার সংকলিত গ্রন্থে দেরিদার পাঠরীতির চরিত্র তুলে ধরে দেখিয়েছেন যে কেন্দ্র কোনো স্বাধীন সত্য নয় (Kamuf, 1991)। কেন্দ্রটি নিজেকে সংজ্ঞায়িত করে মূলত প্রান্তকে অস্বীকার করার মাধ্যমে। একটি বৃত্তের কেন্দ্র যেমন তার পরিধির রেখাগুলোর ওপর নির্ভরশীল, ঠিক তেমনই সমাজের বা টেক্সটের কেন্দ্রীয় ধারণাটিও তার প্রান্তিক উপাদানগুলোর ওপর পরজীবী হয়ে বেঁচে থাকে। দেরিদার বিনির্মাণ কোনো বহিরাগত তাত্ত্বিক আক্রমণ নয়; এটি হলো কোনো বয়ান কীভাবে নিজের তৈরি কেন্দ্রের মহিমাকে নিজেই ভেতরে ভেতরে ধসিয়ে দেয়, সেই ফাটলগুলোকে উন্মোচন করা। কেন্দ্র দাবি করে সে স্বয়ংসম্পূর্ণ, কিন্তু তার প্রতিটি পদক্ষেপে ধরা পড়ে প্রান্তের কাছে তার চিরকালীন ঋণের চিহ্ন।
ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের বিখ্যাত পুরুষসূক্ত (Puruṣa Sūkta) হলো বৈদিক সাহিত্যের সবচেয়ে পরাক্রমশালী কেন্দ্র-নির্মাণের দৃষ্টান্ত। এই সূক্তে এক আদিম সহস্রশীর্ষ মহাজাগতিক পুরুষকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পরম কেন্দ্র হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এই পরম পুরুষের শরীর থেকেই সূর্য, চন্দ্র, বায়ু, আগুন এবং মানবসমাজের চতুর্বর্ণের সৃষ্টি। ঐতিহ্যবাহী পাঠে এই পুরুষকে সমস্ত অস্তিত্বের পরম আধার বা অনতিক্রম্য অর্থবহ বলে দাবি করা হয়। এই মহাজাগতিক কেন্দ্রের ভিত্তিতেই প্রাচীন সমাজে ক্ষমতার এমন এক অটুট ভূগোল তৈরি করা হয়েছিল, যার বিরুদ্ধে কোনো প্রশ্ন তোলার সাহস মানুষের ছিল না।
দেরিদার বিনির্মাণবাদী দৃষ্টি নিয়ে যখন এই পুরুষসূক্তের মুখোমুখি হওয়া যায়, তখন সেই সুসংহত কেন্দ্রের রূপটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। সূক্তটি যেভাবে কেন্দ্র এবং প্রান্তের সীমানা এঁকেছে, তা পরীক্ষা করলে দেখা যায় যে তথাকথিত উচ্চতর কেন্দ্রটি প্রান্তকে বর্জন না করে এক মুহূর্তও দাঁড়াতে পারে না। পুরুষের দেহের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যে কৃত্রিম অসমতা তৈরি করা হয়েছে, তা পাঠটির নিজস্ব যুক্তিতেই এক গভীর সংকটের জন্ম দেয়। দেরিদার পদ্ধতি অনুসরণ করে আমরা দেখতে পাই কীভাবে বৈদিক ক্যাননের এই পরম কেন্দ্রটি আসলে নিজেই নিজের প্রান্তিক উপাদানের হাতে জিম্মি হয়ে আছে।
মুখ বনাম পদ: শারীরিক স্তরবিন্যাসের লোগোকেন্দ্রিকতা (Mouth versus Feet: Logocentrism of Bodily Hierarchy)
পুরুষসূক্তের দ্বাদশ শ্লোকটি গোটা দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক ইতিহাসের এক অন্যতম বিতর্কিত ভাষিক দলিল। সেখানে সমাজের চারটি বর্ণকে আদিম পুরুষের চারটি আলাদা দেহাংশ থেকে জন্ম নিতে দেখানো হয়েছে। বলা হয়েছে, ব্রাহ্মণ উৎপন্ন হলো পুরুষের মুখ থেকে, ক্ষত্রিয় তার বাহু থেকে, বৈশ্য তার ঊরু থেকে এবং সবার নিচে থাকা শূদ্রের জন্ম হলো তার পা বা পদযুগল থেকে। সাইমন ক্রিচলে দেরিদার দর্শনের নৈতিক ও রাজনৈতিক মাত্রা আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন কীভাবে যেকোনো লোগোকেন্দ্রিক ব্যবস্থা মানুষের শরীর ও ভাষার ভেতর অন্যায্য ক্ষমতার স্তরবিন্যাস ঢুকিয়ে দেয় (Critchley, 1992)। পুরুষসূক্তে মানবদেহের প্রাকৃতিক গঠনকে এক চরম বৈষম্যমূলক নৈতিক ছাঁচে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
এই শারীরিক রূপকের শীর্ষে বসানো হয়েছে মুখকে। মুখ হলো মানুষের শ্বাস, আহার এবং সবচেয়ে বড় কথা ভাষার কেন্দ্র। দেরিদা দেখিয়েছেন যে ঐতিহ্যবাহী চিন্তা সবসময় মুখের উচ্চারিত ধ্বনি বা কণ্ঠস্বরকে লেখার চেয়ে উচ্চতর স্থান দেয়, যাকে তিনি বলেছেন ধ্বনি-কেন্দ্রিকতা (Phonocentrism)। বৈদিক সংস্কৃতি ছিল এক চরম ধ্বনিকেন্দ্রিক সমাজ। সেখানে লিখিত অক্ষরের চেয়ে মুখে মুখে উচ্চারিত বৈদিক মন্ত্রের ধ্বনিকে পবিত্রতার চূড়ান্ত রূপ মনে করা হতো। ডেভিড স্মিথ আধুনিকতা ও হিন্দু ঐতিহ্যের সমাজতাত্ত্বিক পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন কীভাবে এই মুখের রূপকটি পুরোহিত ব্রাহ্মণদের জন্য ভাষার ওপর এক নিরঙ্কুশ একচেটিয়া অধিকার কায়েম করেছিল (Smith, 2003)। মুখ থেকে জন্ম নেওয়ার অর্থ হলো ব্রাহ্মণই একমাত্র সত্তা যে দেবতাদের সাথে কথা বলার এবং পবিত্র মন্ত্র আবৃত্তি করার একক অধিকারী।
বিপরীতভাবে এই শারীরিক পিরামিডের সবচেয়ে অন্ধকার ও অবহেলিত প্রান্তে রাখা হয়েছে পা-কে। পা হলো মাটির ধূলিধূসরতার সাথে লেগে থাকা এক অনুভূতিহীন অঙ্গ। পা-কে দেখানো হয়েছে সমস্ত মানবিক মর্যাদাহীন এক কায়িক শ্রমের প্রতীক হিসেবে। যে মুখ থেকে মন্ত্র বের হয়, তার সাথে পায়ের কোনো তুলনা হতে পারে না – এই ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদী বয়ানের মূল সুর। শূদ্রের কোনো ভাষা নেই, কারণ তার জন্ম মুখ থেকে হয়নি। তাকে তৈরি করা হয়েছে কেবল মৌন সেবা দেওয়ার জন্য। শরীরের এই রূপকের মধ্য দিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমকে পবিত্রতার শিখরে তোলা হলো, আর সমস্ত কায়িক শ্রমকে অপবিত্রতার নরকে নির্বাসিত করা হলো।
দেরিদা আমাদের দেখান যে এই বিভাজনটি আসলে ক্ষমতার এক চরম হিংস্র প্রকাশ। শরীরের সমস্ত অঙ্গের জৈবিক কার্যকারিতাকে অস্বীকার করে কেবল মুখকে কেন্দ্র বানানো এবং পা-কে প্রান্তিক করে ফেলা একটি মতাদর্শিক কৌশল। কিন্তু এই কৌশলটি বজায় রাখতে গিয়ে পাঠটি এক জটিল স্ববিরোধিতার ফাঁদে পড়ে যায়। কারণ যে পা-কে মাটির সাথে মিশে থাকা অপবিত্র অঙ্গ বলা হচ্ছে, সেই পা না থাকলে তো খোদ শরীরের অস্তিত্বই অসম্ভব হয়ে পড়ে। শরীরবিজ্ঞানের এই স্বাভাবিক সত্যটিকেই বৈদিক বয়ান খুব সচেতনভাবে আড়াল করতে চেয়েছিল, যা বিনির্মাণের আলোয় আর গোপন থাকে না।
পদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মাথা: কাঠামোর পরজীবী নির্ভরতা (The Head Standing on the Feet: Parasitic Dependence of the Structure)
দেরিদার বিনির্মাণের প্রধান কৌশল হলো কোনো টেক্সটের প্রতিষ্ঠিত স্তরবিন্যাসকে উল্টে দিয়ে দেখা। টেক্সট যেটিকে ওপরে রেখেছে আর যেটিকে নিচে নামিয়ে দিয়েছে, তাদের পারস্পরিক সম্পর্কটি আসলে কী? গোপাল গুরু এবং সুন্দর সারুক্কাই তাদের প্রভাবশালী গবেষণাগ্রন্থ দ্য ক্র্যাকড মিরর (The Cracked Mirror)-এ জাতব্যবস্থার শারীরিক ও স্থানিক রাজনীতির ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে ঠিক এই প্রশ্নটি তুলেছিলেন (Guru & Sarukkai, 2012)। পুরুষসূক্তে মুখ বা মাথাকে সবার ওপরে বসিয়ে অহংকার করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে একজন মানুষের মাথা কোথায় দাঁড়িয়ে থাকে? মাথা কি মহাশূন্যে ভেসে থাকতে পারে?
শারীরবিজ্ঞানের নিরেট সত্য হলো, মানুষের পুরো শরীর, তার শক্তিশালী বুক, তার বলিষ্ঠ বাহু এবং তার অহংকারী মাথা – সবকিছুকেই মাটির ওপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হলে পায়ের ওপর ভর করতে হয়। পা যদি এক মুহূর্তের জন্য ভেঙে পড়ে বা সরে যায়, তবে সেই সুউচ্চ মাথাটি সশব্দে মাটিতে আছড়ে পড়তে বাধ্য। অর্থাৎ যে পদযুগলকে তথাকথিত অপবিত্র এবং সবার নিচে থাকা প্রান্তিক অঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, প্রকৃতপক্ষে সেই পদযুগলই হলো পুরো মহাজাগতিক কাঠামোর একমাত্র বাস্তব ভিত্তি। মাথা কোনো স্বাধীন সত্তা নয়; মাথা হলো পায়ের ওপর পরজীবী হয়ে বেঁচে থাকা এক দুর্বল চূড়া মাত্র।
সামাজিক উৎপাদন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই বিনির্মাণবাদী সত্যটি হুবহু মিলে যায়। প্রাচীন ভারতে পুরোহিত ব্রাহ্মণের যজ্ঞ কিংবা ক্ষত্রিয় রাজার রাজপ্রাসাদ কোনো শূন্যের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না। সেই যজ্ঞের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য, ঘি, পশুর দেখাশোনা এবং যজ্ঞশালার কায়িক পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করত সেই তথাকথিত পদজাত শূদ্র সম্প্রদায়। শূদ্র যদি জমিতে লাঙল না চালাত, যদি সে শ্রম না দিত, তবে পুরোহিতের মুখে কোনো অন্ন জুটত না এবং তার মুখ দিয়ে কোনো স্তোত্রও উচ্চারিত হতে পারত না। ফলে যাকে প্রান্ত বলে অবহেলা করা হয়েছিল, দেখা যাচ্ছে সেই প্রান্তই আসলে কেন্দ্রটিকে প্রতিদিন বাঁচিয়ে রাখছে।
দেরিদা যাকে বলেছেন কাঠামোর পরজীবী নির্ভরতা, পুরুষসূক্ত হলো তার নিখুঁত দৃষ্টান্ত। কেন্দ্র নিজেকে আদি ও অকৃত্রিম বলে জাহির করে, কিন্তু বাস্তবে কেন্দ্রের প্রতিটি নিঃশ্বাস নির্ভর করে প্রান্তের জোগানের ওপর। মুখের সমস্ত তেজ ও বিশুদ্ধতা আসলে পায়ের দেওয়া কায়িক শ্রমের বিনিময়ে কেনা। এই সত্যটি যখন উন্মোচিত হয়, তখন পুরুষসূক্তের ব্রাহ্মণ্য অহংকার ধূলিসাৎ হয়ে যায়। পদ তখন আর কোনো হীন অঙ্গ থাকে না; পদ হয়ে ওঠে পুরো সমাজের প্রাণভোমরা, যাকে অস্বীকার করার অর্থ হলো পুরো সমাজদেহকেই আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া।
আদি বলিদানের স্ববিরোধিতা ও অনির্ণেয়তা (Contradictions and Undecidability of the Primordial Sacrifice)
পুরুষসূক্তের সৃষ্টিতত্ত্বের বর্ণনার দিকে তাকালে এর ভেতরের যৌক্তিক অসঙ্গতিগুলো অত্যন্ত নগ্নভাবে ধরা পড়ে। সূক্তটির ষোড়শ শ্লোকে একটি সুবিখ্যাত ঘোষণা রয়েছে: “যজ্ঞেন যজ্ঞম অযজন্ত দেবাস্তানি ধর্মাণি প্রথমান্য আসন্” – অর্থাৎ দেবতারা যজ্ঞের মাধ্যমে যজ্ঞেরই আরাধনা করলেন এবং সেইগুলোই ছিল সৃষ্টির প্রথম ধর্ম বা বিধান। দেরিদা তার রাজনৈতিক দর্শনের গ্রন্থ রগ্স (Rogues)-এ সার্বভৌম ক্ষমতার এই ধরনের বৃত্তাকার আত্মঘাতী যুক্তিকে অটোইমিউনিটি বা স্ব-অনাক্রম্য ধ্বংসপ্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Derrida, 2005)। কোনো বয়ান যখন নিজেকে প্রমাণ করতে গিয়ে এমন এক বৃত্ত তৈরি করে যা যুক্তির বাইরে, তখন তা নিজেই নিজের ভিতকে ধ্বংস করে ফেলে।
এই আদি বলিদানের দিকে তাকালে সাধারণ বুদ্ধিতেই একটি মৌলিক প্রশ্ন জাগে: যদি পুরো মহাবিশ্ব সেই আদিম পুরুষের শরীর থেকেই সৃষ্টি হয়ে থাকে, তবে যজ্ঞকারী দেবতারা কোথা থেকে এলেন? পুরুষকে যিনি বলি দিচ্ছেন, তিনি তো স্বয়ং সেই পুরুষের চেয়ে আগে থাকতে পারেন না। আবার সূক্তেই বলা হচ্ছে যে দেবতারা স্বয়ং পুরুষের মুখ, চোখ ও মন থেকেই উৎপন্ন হয়েছেন। তাহলে দেবতারা কি নিজেদের জন্মের আগেই নিজেদের জনককে বলি দিয়েছিলেন? আলফ হিল্টেবিটেল প্রাচীন ভারতীয় মহাকাব্য ও সৃষ্টিতত্ত্বের জটিলতা নিয়ে পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন যে এই পৌরাণিক আখ্যানগুলোর ভেতর সবসময়ই এক অমীমাংসিত কালানুক্রমিক জট পাকিয়ে থাকে (Hiltebeitel, 2001)।
দেরিদা একেই বলবেন টেক্সটের অনির্ণেয়তা (Undecidability)। এখানে কার্য এবং কারণের সমস্ত ব্যাকরণ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কে স্রষ্টা আর কে সৃষ্টি, কে যজ্ঞের উপাচার আর কেই বা যজ্ঞকারী – এর কোনো স্থির উত্তর টেক্সট দিতে পারে না। দেবতারা পুরুষকে তৈরি করলেন নাকি পুরুষ দেবতাদের জন্ম দিলেন, এই বিভ্রান্তি স্পষ্ট করে দেয় যে সৃষ্টিতত্ত্বটি কোনো সুসংহত দার্শনিক সত্য ছিল না। এটি ছিল বিভিন্ন গোত্রীয় গল্প এবং যাজকীয় স্বার্থের এক জগাখিচুড়ি জোড়াতালি। একটি রাজনৈতিক বয়ান দাঁড় করাতে গিয়ে কবিরা এমন এক পৌরাণিক ফাঁদ তৈরি করেছিলেন যা যুক্তির সামান্য স্পর্শেই নিজের জালে নিজে বন্দি হয়ে যায়।
এই স্ববিরোধিতা বৈদিক সৃষ্টির তথাকথিত পরম কর্তৃত্বকে নস্যাৎ করে দেয়। যে সৃষ্টির গল্প নিজের রচয়িতার অস্তিত্বের যুক্তিই ঠিকমতো দিতে পারে না, সেই গল্পের ওপর দাঁড়িয়ে হাজার বছরের একটি সামাজিক স্তরবিন্যাসকে চিরন্তন সত্য বলে দাবি করা এক বড় ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতারণা। বিনির্মাণ দেখায় যে পুরুষ কোনো একক মহাজাগতিক সত্য নন; পুরুষ হলেন ভাষার চাতুর্য দিয়ে ফাঁদা এক বিভ্রান্তিকর পৌরাণিক গোলকধাঁধা, যার একমাত্র কাজ ছিল তৎকালীন সুবিধাবাদী শ্রেণির ক্ষমতাকে তাত্ত্বিক সুরক্ষা দেওয়া।
তিন ভাগ স্বর্গে, এক ভাগ মর্ত্যে: উপস্থিতির অধিবিদ্যার ফাটল (Three Parts in Heaven, One on Earth: Fissures in the Metaphysics of Presence)
পুরুষসূক্তের তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্লোকে পুরুষের ক্ষমতার একটি অদ্ভুত গাণিতিক অনুপাত পেশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এই দৃশ্যমান মহাবিশ্ব এবং সমস্ত জীবজগৎ হলো পুরুষের মাত্র এক চতুর্থাংশ বা এক পদ; আর তার বাকি তিন চতুর্থাংশ বা ত্রিপাদ অমৃত হিসেবে স্বর্গে অবস্থান করছে। ঐতিহ্যবাহী বেদান্ত ও ধর্মতাত্ত্বিক দর্শনে এই শ্লোকটিকে ঈশ্বরের অসীমত্ব এবং ইন্দ্রিয়াতীত মহিমার পরম প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়। দেরিদা পাশ্চাত্য অধিবিদ্যার ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে এই ধরনের অপার্থিব কল্পনাকে উপস্থিতির অধিবিদ্যা (Metaphysics of Presence) বলে চিহ্নিত করেছেন (Kamuf, 1991)। যেখানে বাস্তব নশ্বর জগতের অপূর্ণতা ঢাকতে এক কাল্পনিক, অপরিবর্তনীয় ও স্বর্গীয় সত্তার উপস্থিতি দাবি করা হয়।
হাইনরিশ ফন স্টিটেনক্রন হিন্দু পৌরাণিক ইতিহাসের বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন কীভাবে প্রাচীন ধর্মতাত্ত্বিকরা পার্থিব অসাম্যকে রক্ষা করার জন্য স্বর্গের একটি সুবিশাল অলৌকিক ক্ষেত্র তৈরি করতেন (Stietencron, 2005)। বৈদিক কবিরা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন যে মাটির পৃথিবীতে তারা যে সামাজিক বৈষম্য তৈরি করছেন, তা প্রতিদিন রক্তমাংসের মানুষের প্রতিবাদের মুখে পড়তে পারে। তাই সেই মাটির বাস্তবতাকে পুরুষের মাত্র এক চতুর্থাংশ বলে তুচ্ছ করা হলো। আর বাকি তিন ভাগকে এমন এক জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হলো যেখানে কোনো মানুষের হাত পৌঁছাতে পারে না, কোনো যুক্তির আলো প্রবেশ করতে পারে না। অর্থাৎ নিজেদের তৈরি শোষণব্যবস্থাকে অপার্থিব স্বর্গের অংশ বলে জাহির করার এক চতুর দার্শনিক ছলনা ছিল এই তিন চতুর্থাংশের তত্ত্ব।
দেরিদার বিনির্মাণ এই স্বর্গের বুদ্বুদকেও ফুটো করে দেয়। দেরিদার পরিপূরকতার নিয়ম অনুযায়ী, স্বর্গে থাকা সেই তথাকথিত তিন ভাগ কিন্তু নিজের শক্তিতে টিকে নেই। স্বর্গে থাকা সেই অদৃশ্য পুরুষের অস্তিত্ব মানুষ জানল কীভাবে? মানুষ জানল এই মর্ত্যের এক চতুর্থাংশের ভেতর থাকা বৈদিক কবির ভাষার মাধ্যমে। যদি এই মর্ত্যের পৃথিবী না থাকত, যদি মানুষের মুখের ভাষা না থাকত, তবে স্বর্গের সেই তিন চতুর্থাংশ পুরুষের কোনো অস্তিত্বেরই কোনো খবর পাওয়া যেত না। অর্থাৎ যে মর্ত্যকে তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র এক ভাগ বলা হচ্ছে, সেই মর্ত্যই আসলে স্বর্গের পরম সত্তাটির অস্তিত্বের একমাত্র সাক্ষ্য বহন করছে।
এই পারস্পরিক নির্ভরতা প্রমাণ করে যে উচ্চতর স্বর্গীয় উপস্থিতি আসলে মর্ত্যের মাটির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। বৈদিক পুরোহিতরা যা কিছুকে পরম ও অবিনশ্বর বলে প্রচার করেছিলেন, তা আসলে এই মাটির মানুষের তৈরি করা কল্পনার ফানুস ছাড়া কিছুই ছিল না। স্বর্গ মর্ত্যকে তৈরি করেনি; মর্ত্যের মানুষের ভীতি এবং শ্রেণি-স্বার্থই স্বর্গের পুরুষকে জন্ম দিয়েছিল। উপস্থিতির এই অধিবিদ্যা যখন খসে পড়ে, তখন পুরুষসূক্ত কোনো স্বর্গীয় সংগীত থাকে না; তা উন্মোচিত হয় মাটির পৃথিবীর ক্ষমতাকে অনন্তকাল ধরে রাখার এক কৃত্রিম মতাদর্শিক বুনট হিসেবে।
শূদ্রের প্রান্তিকীকরণ থেকে প্রতিরোধের বিনির্মাণ (From Marginalization of the Śūdra to Deconstructive Resistance)
দেরিদার বিনির্মাণবাদী পদ্ধতি কেবল লাইব্রেরিতে বসে প্রাচীন টেক্সটের ব্যাকরণ কাটাছেঁড়া করার কোনো বিলাসিতা নয়। এর একটি অত্যন্ত গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি রয়েছে। দলিত তাত্ত্বিক কাঞ্চা আইলাইয়া তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ হোয়াই আই অ্যাম নট আ হিন্দু (Why I Am Not a Hindu)-তে দেখিয়েছেন কীভাবে শূদ্র ও দলিতরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই সমস্ত ব্রাহ্মণ্যবাদী ক্যাননের বাইরে নিজেদের এক বিকল্প উৎপাদনশীল সংস্কৃতি তৈরি করে রেখেছিল (Ilaiah, 1996)। আইলাইয়া তুলে ধরেন যে যাদের বৈদিক সাহিত্যে অবজ্ঞার সাথে পদজাত বলা হয়েছিল, প্রকৃতপক্ষে তারাই ছিল প্রকৃতির রূপান্তরকারী, কৃষির জনক এবং সভ্যতার আসল কারিগর।
গেল ওমভেত ভারতের গণতান্ত্রিক বিপ্লব এবং দলিত আন্দোলনের ইতিহাসে দেখিয়েছেন কীভাবে জ্যোতিরাও ফুলে এবং বি. আর. আম্বেদকরের মতো মুক্তিকামী চিন্তাবিদরা এই পুরুষসূক্তের মিথকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন (Omvedt, 1994)। ফুলে এই বৈদিক সৃষ্টিতত্ত্বকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়ে ঘোষণা করেছিলেন যে শূদ্ররা কোনো পাপের ফসল নয়; তারা হলো এই মাটির আদি ও প্রকৃত সন্তান। আম্বেদকর পুরুষসূক্তের প্রতিটি শ্লোককে আধুনিক সমাজবিজ্ঞান এবং আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তার ভেতরের জালিয়াতি উন্মোচন করেছিলেন। তারা ঠিক সেই কাজটিই করেছিলেন যা দেরিদা তাত্ত্বিক পরিসরে প্রস্তাব করেছিলেন – প্রান্তকে কেন্দ্রে নিয়ে আসা এবং তথাকথিত পবিত্র কেন্দ্রকে তার মিথ্যা সিংহাসন থেকে নামিয়ে দেওয়া।
ডেভিড এন. লরেনজেন হিন্দু পরিচয়ের ঐতিহাসিক বিনির্মাণ নিয়ে আলোচনায় উল্লেখ করেছেন যে প্রাচীন ক্যাননগুলো কখনোই পুরো সমাজের সর্বসম্মত কণ্ঠস্বর ছিল না (Lorenzen, 2006)। প্রান্তিক মানুষ সবসময়ই নানা লোকায়ত দর্শনের মাধ্যমে এই শারীরিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে নীরব বা প্রকাশ্য প্রতিরোধ জারি রেখেছিল। পুরুষসূক্ত যাকে নিশ্চুপ পা বানিয়ে রাখতে চেয়েছিল, সেই পা বারবার বিদ্রোহের ময়দানে নেমে এসেছে। ভারতের চার্বাক, বৌদ্ধ, জৈন এবং পরবর্তীকালের ভক্তি ও দলিত আন্দোলনগুলো ছিল এই প্রান্তের পক্ষ থেকে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে এক অবিরাম যুদ্ধ।
পরিশেষে বলা যায়, দেরিদার বিনির্মাণ বৈদিক পুরুষসূক্তকে তার সমস্ত মহাজাগতিক গাম্ভীর্য থেকে মুক্ত করে এক নগ্ন রাজনৈতিক দলিল হিসেবে পাঠকের সামনে মেলে ধরে। মুখ এবং পদের বিভাজন কোনো প্রাকৃতিক সত্য নয়; এটি ছিল মানুষের শরীরকে কেটে শ্রেণি-স্বার্থের ছাঁচে ফেলার এক নিষ্ঠুর চেষ্টা। কিন্তু পা ছাড়া মাথা দাঁড়াতে পারে না, প্রান্ত ছাড়া কেন্দ্র অর্থহীন, আর শূদ্রের কায়িক শ্রম ছাড়া ব্রাহ্মণের মুখের কোনো অস্তিত্ব থাকে না। এই বৈপরীত্য যখন উন্মোচিত হয়, তখন পুরুষসূক্তের তৈরি করা চতুর্বর্ণের শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। প্রাচীন সাহিত্যের এই নির্মোহ বিনির্মাণ আজকের মুক্তচিন্তার মানুষকে শেখায় কীভাবে কোনো পবিত্র ধর্মগ্রন্থের ভয়ে অন্ধ না হয়ে মানুষের শ্রম, মর্যাদা ও সমতার আসল ভিত্তিকে চিনে নিতে হয়।
দেরিদা ও নাসদীয় সূক্ত (Derrida and the Nāsadīya Sūkta): সৎ-অসৎ, জ্ঞান-অজ্ঞান ও সৃষ্টির অনির্ণেয়তা
আদি উৎসের সংকট ও অনির্ণেয়তা: দেরিদার অধিবিদ্যা-বিরোধিতা (Crisis of the Origin and Undecidability: Derrida’s Anti-Metaphysics)
যেকোনো দর্শনের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্নিবার ইচ্ছাটি হলো সৃষ্টির একদম শুরুতে কী ছিল তা জানার চেষ্টা করা। মানুষ সবসময় কল্পনা করতে চেয়েছে যে মহাবিশ্বের সূচনায় এমন একটি পরম সত্য, পরম ঈশ্বর বা মূল উপাদান ছিল যা থেকে বাকি সবকিছুর জন্ম হয়েছে। এই আদি বিন্দুকে পাশ্চাত্য দর্শনে বলা হয়েছে আর্কে বা আদি ভিত্তি। ফরাসি দার্শনিক জাক দেরিদা (Jacques Derrida) তার চিন্তার শুরু থেকেই এই আদি উৎসের ধারণাকে কঠোরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। রোদলফ গাশে দেরিদার দর্শনের ওপর তার ধ্রুপদী গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে কোনো আদিম স্বয়ংসম্পূর্ণ উৎস কল্পনা করা আসলে মানুষের এক গভীর বৌদ্ধিক বিভ্রম (Gasché, 1986)। দেরিদা প্রমাণ করেন যে সৃষ্টির কোনো খাঁটি বা নিখাদ শুরু থাকতে পারে না; কারণ যাকে আমরা শুরু বলে ভাবি, তার ভেতরেও সবসময় কোনো না কোনো পূর্ববর্তী চিহ্ন বা রূপান্তর সক্রিয় থাকে।
দেরিদা তার গ্রন্থ গিভেন টাইম (Given Time)-এ দেখান যে যেকোনো পরম শুরু বা উপহারের ধারণা আসলে একটি অসম্ভব পরিস্থিতি তৈরি করে (Derrida, 1992)। কোনো ঘটনাকে যখন পরম শুরু বলা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে সেই শুরুর আগের অবস্থাটি কী ছিল? কোনো কিছু কি হঠাৎ করে শূন্য থেকে লাফ দিয়ে অস্তিত্বে আসতে পারে? দর্শন যখন এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়, তখন তার প্রচলিত ব্যাকরণ ভেঙে পড়ে। দেরিদা একে নাম দিয়েছেন অনির্ণেয়তা (Undecidability)। এটি এমন এক অবস্থা যেখানে কোনো চূড়ান্ত সত্যের পক্ষে বা বিপক্ষে নিশ্চিত রায় দেওয়া অসম্ভব হয়ে যায়। ভাষা এখানে এমন এক প্রান্তে এসে পৌঁছায় যেখানে কোনো স্থির উত্তর মেলে না, বরং প্রতিটি উত্তর নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।
এই বিনির্মাণবাদী অ্যান্টি-ফাউন্ডেশনালিজম বা ভিত্তিমূল-বিরোধিতার এক চমকপ্রদ প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া যায় ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১২৯ নম্বর স্তোত্রে, যা বিশ্বজুড়ে নাসদীয় সূক্ত (Nāsadīya Sūkta) নামে পরিচিত। সাতটি মাত্র শ্লোকে রচিত এই ছোট স্তোত্রটি গোটা বৈদিক সাহিত্যের মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ও গভীর দার্শনিক পাঠ হিসেবে স্বীকৃত। যেখানে বৈদিক সাহিত্যের অন্যান্য অংশে দেবতারা পরম ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে হাজির হন কিংবা যজ্ঞকে সৃষ্টির কেন্দ্র বলে দাবি করা হয়, নাসদীয় সূক্ত সেখানে সমস্ত ধর্মীয় দাবিকে দূরে ঠেলে দিয়ে সৃষ্টির আদি মুহূর্ত নিয়ে চরম সংশয় প্রকাশ করেছে।
দেরিদার লেন্স দিয়ে এই সূক্তটি পাঠ করলে দেখা যায়, এটি যেন আড়াই হাজার বছর আগেই বিনির্মাণের খেলা শুরু করেছিল। সূক্তটির কবি কোনো ঈশ্বর বা স্বর্গীয় শক্তির জয়গান গাননি। বরং তিনি সৃষ্টির আদি বিন্দুটিকে এমন এক ভাষায় বর্ণনা করেছেন যা মানুষের তৈরি সমস্ত দ্বৈততাকে এক ধাক্কায় ভেঙে ফেলে। অস্তিত্ব ও অনস্তিত্বের যে সহজ সমীকরণ দিয়ে মানুষ বিশ্বকে বুঝতে চায়, নাসদীয় সূক্ত শুরুতেই সেই সমীকরণটিকে ধূলিসাৎ করে দেয়। ফলে এটি কোনো ভক্তিমূলক ধর্মীয় স্তোত্র নয়; এটি হলো মানব ইতিহাসের এক বিস্ময়কর বৌদ্ধিক দলিল যা সৃষ্টির পরম উৎসের দাবিকে চিরতরে অনির্ণেয় করে রেখে দেয়।
সৎ ও অসতের দ্বৈততা ধস: নাসদাসীন্নো সদাসীৎ (Collapse of the Being and Non-Being Binary: Nāsadāsīnno Sadāsīt)
নাসদীয় সূক্তের প্রথম চরণটিই যেকোনো প্রথাগত অধিবিদ্যাকে স্তম্ভিত করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। স্তোত্রের শুরুতে কবি ঘোষণা করছেন: “নাসদাসীন্নো সদাসীত্তদানীং নাসীদ রজো নো ব্যোমা পরো যৎ” – অর্থাৎ তখন অসৎ বা অনস্তিত্বও ছিল না, আবার সৎ বা অস্তিত্বও ছিল না; তখন কোনো মহাকাশ ছিল না, তার ওপারে বিস্তৃত কোনো শূন্য আকাশও ছিল না। জোয়েল পি. ব্রেরটন বৈদিক হেঁয়ালি ও এই সূক্তের ভাষার ওপর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে এই চরণটি পাঠককে এক গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক ধাঁধার মুখোমুখি দাঁড় করায় (Brereton, 1999)। ভাষার সবচেয়ে মৌলিক যে দুটি বিপরীত মেরু – থাকা এবং না-থাকা – কবি শুরুতেই সেই দুটি মেরুকেই বাতিল করে দিয়েছেন।
পাশ্চাত্য ও ভারতীয় দর্শনে চিন্তা সবসময় গড়ে উঠেছে সৎ ও অসৎ (Being and Non-Being/Sat and Asat)-এর দ্বৈততার ওপর। আমরা হয় ভাবি কোনো কিছু আছে, নয়তো ভাবি কোনো কিছু নেই। ডব্লিউ. নরম্যান ব্রাউন প্রাচীন বৈদিক সৃষ্টিতত্ত্বের পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন যে নাসদীয় সূক্ত কোনো সরল সৃষ্টিতত্ত্বের গল্প পেশ করে না; এটি মহাবিশ্ব সৃষ্টির ধারণাকেই ব্যাকরণের সীমানার বাইরে নিয়ে যায় (Brown, 1965)। কবি যদি বলতেন যে শুরুতে অসৎ বা শূন্যতা ছিল, তবে বোঝা যেত যে শূন্য থেকে কিছুর জন্ম হয়েছে। আবার তিনি যদি বলতেন যে শুরুতে সৎ বা ঈশ্বর ছিলেন, তবে ধরে নেওয়া যেত যে এক অস্তিত্ব থেকে বহু অস্তিত্ব তৈরি হয়েছে। কিন্তু কবি এই দুটি ধারণাকেই একসাথে খারিজ করে দিলেন।
দেরিদার পরিভাষা ব্যবহার করে বললে, এটি হলো কোনো টেক্সটের নিজস্ব বাইনারিকে নিজেই চূর্ণ করে ফেলা। সৎ এবং অসৎ হলো ভাষার এমন দুটি ধারণা যা একে অপরকে ছাড়া বাঁচতে পারে না। কোনো কিছু ‘নেই’ বললে তবেই ‘আছে’র অর্থ স্পষ্ট হয়। কিন্তু সৃষ্টির আদি মুহূর্তে যখন এই দুটোর কোনোটাই ছিল না, তখন ভাষা কাকে আঁকড়ে ধরে দাঁড়াবে? দেরিদা যে উপস্থিতির অধিবিদ্যার সমালোচনা করেছেন, নাসদীয় সূক্ত ঠিক সেই উপস্থিতির কেন্দ্রটিকে মুছে দেয়। সেখানে কোনো পরম উপস্থিতিও ছিল না, আবার কোনো শূন্য অনুপস্থিতিও ছিল না।
এই ভাষিক কৌশল প্রমাণ করে যে সৃষ্টির আদি মুহূর্ত মানুষের ভাষার আওতাভুক্ত নয়। মানুষ যখনই কোনো পরম স্রষ্টা বা শূন্যতার রূপকথা তৈরি করতে যায়, সে মূলত নিজের চেনা জগতের ভাষা দিয়ে অচেনাকে বাঁধতে চায়। নাসদীয় সূক্ত এই চেষ্টাকে নাকচ করে দেয়। এটি দেখায় যে অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্বের দ্বন্দ্ব মানুষের মনের তৈরি এক কৃত্রিম ছক। সৃষ্টির আদি বাস্তবতাকে এই ছাঁচে ফেলা যায় না। ফলে পরম ঈশ্বরের যে সমস্ত সংজ্ঞা পরবর্তী ধর্মতত্ত্বে দেওয়া হয়েছে, নাসদীয় সূক্তের এই একটি চরণ সেই সমস্ত ধারণার গোড়ায় কুঠারাঘাত করে।
শূন্যতা, অন্ধকার ও পার্থক্যের আদিম বীজ (Emptiness, Darkness, and the Primordial Seed of Difference)
নাসদীয় সূক্তের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শ্লোকে কবি আদিম অবস্থার যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা কোনো আলোকিত স্বর্গীয় দৃশ্য নয়। সেখানে বলা হচ্ছে, তখন মৃত্যুও ছিল না, আবার অমৃত বা অমরত্বও ছিল না; দিন ও রাত্রির কোনো চিহ্ন ছিল না। কেবল সেই আদিম এক সত্তা কোনো বাতাস ছাড়াই নিজের শক্তিতে শ্বাসহীন হয়ে স্পন্দিত হচ্ছিল। এরপর তৃতীয় শ্লোকে এক চরম রূপক ব্যবহার করা হয়েছে: “তম আসীৎ তমসাগূঢ়মগ্রেঽপ্রকেতং সলিলং সর্বমা ইদম্” – অর্থাৎ শুরুতে অন্ধকার ঢাকা ছিল অন্ধকারের ভেতর, সবকিছু ছিল চিহ্নহীন এক অতল জলরাশির মতো। সেই অতল শূন্যতার ভেতর তপস বা উত্তাপের প্রভাবে প্রথম স্ফুলিঙ্গ দেখা দিল।
ডেভিড উড সময়ের বিনির্মাণ সংক্রান্ত তার তাত্ত্বিক গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে কাল বা সময়ের ধারণাটি সবসময় পার্থক্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে (Wood, 1989)। দিন এবং রাত না থাকলে সময়ের কোনো হিসাব হতে পারে না; মৃত্যু এবং জীবনের ব্যবধান না থাকলে অস্তিত্বের কোনো অর্থ দাঁড়ায় না। নাসদীয় সূক্ত এমন এক সময়ের কথা বলছে যখন এই সমস্ত পার্থক্য স্তব্ধ ছিল। অনন্যা বাজপেয়ী বালসেভ ভারতীয় দর্শনে সময়ের রূপরেখা নিয়ে আলোচনায় দেখিয়েছেন যে বৈদিক ঋষিরা আদিম সময়কে এমন এক নিশ্চল বিন্দু হিসেবে কল্পনা করেছিলেন যা মানুষের ইতিহাসের বাইরের বিষয় (Balslev, 1983)। সেখানে সবকিছু ছিল এক চিহ্নহীন বিস্তার।
এর পরেই চতুর্থ শ্লোকে আসে সেই সবচেয়ে চমকপ্রদ মোড়, যেখানে সৃষ্টির প্রথম সক্রিয় উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয় মন এবং ইচ্ছাকে। কবি বলছেন: “কামস্তদগ্রে সমবর্ততাধি মনসো রেতঃ প্রথমং যদাসীৎ” – অর্থাৎ শুরুতে সেই শূন্যতার বুকে প্রথম উদিত হলো কাম (Desire/Kāma), যা ছিল মনের প্রথম আদিম বীজ। এই শ্লোকটি কোনো ঐশ্বরিক আদেশের কথা বলে না। এটি বলে অন্ধ আকাঙ্ক্ষা বা কামনার কথা। সেই অন্ধকার অতলান্তিকের ভেতর হঠাৎ এক ইচ্ছার উদয় হলো, আর সেই ইচ্ছাই অচলায়তন ভেঙে জন্ম দিল বহুত্বের।
দেরিদার চিহ্ন (Trace) এবং দিফারঁসের তত্ত্ব দিয়ে বিচার করলে দেখা যায়, এই কাম বা আকাঙ্ক্ষা হলো শূন্যতার বুকে পার্থক্যের প্রথম অনুপ্রবেশ। কোনো কিছু চাওয়ার অর্থই হলো নিজের ভেতরে কোনো অভাব বা শূন্যতা অনুভব করা। যে সত্তা পূর্ণ, তার কোনো ইচ্ছা থাকতে পারে না। অর্থাৎ সৃষ্টির মূলে কোনো পরিপূর্ণ ঈশ্বর বসে ছিলেন না; সৃষ্টির মূলে ছিল এক অতৃপ্তির স্পন্দন, এক অভাববোধ। সেই অভাববোধ থেকেই তৈরি হলো এক থেকে বহু হওয়ার আকুলতা। ফলে সৃষ্টির গল্পটি কোনো মহিমান্বিত স্বর্গীয় পরিকল্পনা নয়; এটি হলো অন্ধ আকাঙ্ক্ষার এক অস্থির রূপান্তর, যা দেখায় যে শূন্যতা নিজেই নিজের ভেতর এক ফাটল তৈরি করে মহাবিশ্বকে জন্ম দিয়েছিল।
জ্ঞান ও অজ্ঞানের সীমানা লোপ: ঋষিদের জিজ্ঞাসার বিনির্মাণ (Dissolution of the Boundary of Knowledge and Ignorance: Deconstruction of the Rsis’ Inquiry)
নাসদীয় সূক্তের পঞ্চম এবং ষষ্ঠ শ্লোকে এসে ঋষিদের আত্মবিশ্বাস এক চরম পরীক্ষার মুখে পড়ে। চতুর্থ শ্লোকের শেষাংশে বলা হয়েছিল যে প্রজ্ঞাবান ঋষিরা নিজেদের হৃদয়ে গভীর অনুসন্ধান চালিয়ে অসতের সাথে সতের সংযোগ খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু এই দাবির পরেই পঞ্চম শ্লোকে কবি নিজেই নিজের সমাধান নিয়ে সন্দেহে পড়ে যান। তিনি দেখছেন, সৃষ্টির সেই রশ্মিগুলো কি আড়াআড়িভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, নাকি ওপর-নিচ হয়ে বিস্তৃত হয়েছিল? সেখানে কে ছিল ধারণকারী আর কেই বা ছিল ভোগের বস্তু? কোনো প্রশ্নেরই কোনো নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
জন স্যালিস বিনির্মাণ ও দর্শনের মধ্যকার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে কোনো গভীর দার্শনিক চিন্তা একপর্যায়ে নিজের নিশ্চিত উত্তরের প্রাচীর নিজেই ভেঙে দেয় (Sallis, 1987)। নাসদীয় সূক্তের ষষ্ঠ শ্লোকে কবি মানুষের সমস্ত জ্ঞানকে এক চরম অসহায়ত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন। কবি কোনো আপ্তবাক্য উচ্চারণ না করে সোজাসুজি প্রশ্ন করছেন: “কো অদ্ধা বেদ ক ইহ প্র বোচৎ কুত আজাতা কুত ইয়ং বিসৃষ্টিঃ” – অর্থাৎ কে সত্যিই জানে? কে এখানে সাহস করে বলবে যে এই বিচিত্র সৃষ্টি কোথা থেকে এল এবং কীভাবে এর বিস্তার ঘটল?
সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ভারতীয় দর্শনের প্রামাণ্য ইতিহাসে আলোচনা করতে গিয়ে নাসদীয় সূক্তের এই গভীর সংশয়বাদকে ভারতীয় যুক্তিবাদী চিন্তার আদিম ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Dasgupta, 1922)। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, কবি কোনো পুরোহিতসুলভ অহংকার নিয়ে কথা বলছেন না। তিনি দাবি করছেন না যে তিনি ধ্যানে বসে সমস্ত সৃষ্টিরহস্য জেনে ফেলেছেন। বরং তিনি অকপটে স্বীকার করছেন যে মানুষের জানার ক্ষমতার একটি চরম ঐতিহাসিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মানুষ সৃষ্টির পরের ঘটনা; সে কীভাবে জানবে সৃষ্টির আগের মুহূর্তের সত্য?
দেরিদা দেখান যে জ্ঞান ও অজ্ঞান (Knowledge and Ignorance) কোনো অনড় বিপরীত বিষয় নয়। কোনো পরম জ্ঞান বলে কিছু হতে পারে না; প্রতিটি জ্ঞানের ভেতরেই অজ্ঞানের ছায়া লুকিয়ে থাকে। নাসদীয় সূক্তের ঋষিরা এই সত্যটি বুঝতে পেরেছিলেন। তারা জ্ঞানের যে শিখরে পৌঁছেছিলেন, সেখান থেকে তারা দেখতে পেয়েছিলেন অজ্ঞানের সুবিশাল সমুদ্র। ফলে তাদের স্তোত্রটি কোনো ধর্মীয় অনুশাসনের রূপ নেয়নি; তা হয়ে উঠেছে মানুষের সীমাবদ্ধ বুদ্ধির এক সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ হাহাকার। জানার ভণ্ডামিকে ছুড়ে ফেলে না-জানাকে স্বীকার করে নেওয়ার এই সততাই পাঠটিকে বিনির্মাণের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
মহাজাগতিক অধ্যক্ষের পতন: ‘বেদ যদি বা ন বেদ’ (Fall of the Cosmic Overseer: ‘Veda Yadi Vā Na Veda’)
নাসদীয় সূক্তের চূড়ান্ত আঘাতটি আসে এর সপ্তম এবং শেষ শ্লোকে। এই শ্লোকটি প্রাচীন পৃথিবীর সমগ্র ধর্মতাত্ত্বিক ইতিহাসের সবচেয়ে সাহসী ও বিস্ময়কর উচ্চারণগুলোর একটি। ষষ্ঠ শ্লোকে কবি দেবতাদের অক্ষমতা তুলে ধরে বলেছিলেন যে দেবতারাও তো সৃষ্টির পরে এসেছেন, তাহলে দেবতারা কীভাবে জানবেন সৃষ্টি কোথা থেকে এসেছে? দেবতাদের সিংহাসনচ্যুত করার পর শেষ শ্লোকে কবি তাকিয়েছেন মহাবিশ্বের তথাকথিত সর্বোচ্চ সত্তার দিকে। সেখানে বলা হয়েছে: “ইয়ং বিসৃষ্টির্যত আবভূব যদি বা দধে যদি বা ন। যো অস্যাধ্যক্ষঃ পরমে ব্যোমন্ সো অঙ্গ বেদ যদি বা ন বেদ॥”
সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন যে এই শেষ চরণটি ভারতীয় সৃষ্টিতত্ত্বের সমস্ত গোঁড়ামিকে এক লহমায় ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল (Radhakrishnan, 1923)। শ্লোকটির অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট এবং নিদারুণ। কবি বলছেন: এই যে মহাবিশ্ব ছড়িয়ে পড়েছে, এটি নিজে নিজেই তৈরি হয়েছে নাকি কেউ একে বানিয়েছে? স্বর্গের পরম আকাশে যিনি এই বিশ্বজগতের অধ্যক্ষ বা অধিপতি হয়ে বসে আছেন, হয়তো তিনিই এই রহস্য জানেন; অথবা হতে পারে যে তিনিও এটি জানেন না!
উইলিয়াম কে. মাহনি বৈদিক কল্পনার নান্দনিক ও দার্শনিক রূপরেখা তুলে ধরতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে নাসদীয় সূক্ত কোনো নিশ্চিত উপসংহারে পৌঁছাতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে (Mahony, 1998)। শেষ বাক্যটি খেয়াল করার মতো: “বেদ যদি বা ন বেদ” – অর্থাৎ “হয়তো তিনি জানেন, অথবা হয়তো তিনিও জানেন না”। স্বর্গের সর্বোচ্চ ঈশ্বর বা অধ্যক্ষের জ্ঞানকেও এখানে চরম সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। যিনি পরম স্রষ্টা বলে পূজিত হন, তিনিও হয়তো জানেন না যে এই বিশাল কসমস কীভাবে সৃষ্টি হলো। হতে পারে তিনিও প্রকৃতির এক অন্ধ নিয়মের ভেতর অজান্তেই আবির্ভূত হয়েছেন।
দেরিদার বিনির্মাণের চরমতম পরিণতি হলো লোগোস বা ঈশ্বরের এই সিংহাসনচ্যুতি। ধর্মতত্ত্ব সবসময় চেয়েছে একজন সর্বজ্ঞানী ঈশ্বরের কল্পনা করতে যিনি সবকিছু জানেন এবং সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। কিন্তু নাসদীয় সূক্ত সেই সর্বজ্ঞাতাকে এক নিমেষে অজ্ঞতার অন্ধকারে নামিয়ে এনেছে। যে ঈশ্বর নিজেই জানেন না যে সৃষ্টির রহস্য কী, সেই ঈশ্বরকে পরম আশ্রয় ভাবার কোনো দার্শনিক যুক্তি থাকতে পারে না। এই একটি সন্দেহের দোলাচল বৈদিক সাহিত্যের সমস্ত অপৌরুষেয় বা ঐশ্বরিক অহংকারকে সমূলে উপড়ে ফেলে। সৃষ্টি কোনো ঐশ্বরিক নাট্যমঞ্চ নয়; এটি এক অনির্ণেয় মহাজাগতিক বিস্ময়, যার কোনো একক প্রভু বা রচয়িতা নেই।
লোগোসের অনুপস্থিতি ও অপৌরুষেয়তার বিমুক্তি (Absence of Logos and the Emancipation of Authorlessness)
গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক তার বিখ্যাত তাত্ত্বিক গ্রন্থ আ ক্রিটিক অব পোস্টকলোনিয়াল রিজন (A Critique of Postcolonial Reason)-এ প্রাচীন ক্যানোনিকাল সাহিত্যের বিনির্মাণমূলক পাঠের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন (Spivak, 1999)। স্পিভাক দেখান যে প্রাচীন গ্রন্থগুলোকে যখন রক্ষণশীল ধর্মতত্ত্ববিদদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে পড়া হয়, তখন তাদের ভেতরের অবদমিত বহুত্ব ও সংশয়বাদী কণ্ঠস্বরগুলো মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পায়। নাসদীয় সূক্তের ক্ষেত্রে এই কথাটি বর্ণে বর্ণে সত্য। হিন্দু জাতীয়তাবাদী বা ঐতিহ্যবাদী পণ্ডিতরা যখন এই সূক্তটিকে কোনো পরম ভাববাদী একেশ্বরবাদের দলিল বলে দাবি করেন, তখন তারা মূলত সূক্তটির শেষ চরণের সেই জ্বলজ্বলে সংশয়টিকে চেপে যেতে চান।
নাসদীয় সূক্ত কোনো সুসংহত ধর্মমত প্রচারের জন্য লেখা হয়নি। এর ভেতরে কোনো মন্দিরের ঘণ্টা নেই, কোনো যজ্ঞের ঘি নেই এবং কোনো পুরোহিতের দক্ষিণা আদায়ের ফন্দি নেই। এটি ব্রোঞ্জযুগের শেষভাগের এক নিঃসঙ্গ চিন্তাশীল মানুষের মহাবিশ্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে করা গভীর দার্শনিক আর্তি। প্রকৃতির অপার রহস্যের সামনে দাঁড়িয়ে প্রাচীন কবি বুঝতে পেরেছিলেন যে মানুষের তৈরি দেব-দেবী বা যজ্ঞীয় মন্ত্রের সাধ্য নেই এই অনন্ত সৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করার। তাই তিনি কোনো মিথ্যা আশ্বাসের আশ্রয় নেননি। তিনি চরম অনিশ্চয়তা এবং অনির্ণেয়তাকে আলিঙ্গন করে স্তোত্রটি শেষ করেছেন।
দেরিদার অ্যান্টি-ফাউন্ডেশনালিজম আমাদের শেখায় কীভাবে কোনো টেক্সটকে কোনো স্থায়ী কেন্দ্রে না বেঁধে তাকে উন্মুক্ত রাখতে হয়। নাসদীয় সূক্ত সেই উন্মুক্ততার এক অনন্য পরাকাষ্ঠা। এটি সৃষ্টির কোনো সমাপ্তি টানে না, কোনো ঈশ্বরকে জয়ী ঘোষণা করে না, আবার কোনো নির্দিষ্ট মতবাদকেও চাপিয়ে দেয় না। এটি পাঠককে রেখে যায় এক অসীম জিজ্ঞাসার মুখে। ফলে মীমাংসক পণ্ডিতরা যে অপৌরুষেয়তার ধারণা দিয়ে বেদের বাণীকে চিরন্তন অন্ধ বিশ্বাসের শৃঙ্খলে বাঁধতে চেয়েছিলেন, নাসদীয় সূক্ত সেই শৃঙ্খলকেই ভেঙে দেয়। এর রচয়িতা যদি কেউ নাও থাকেন, তবে তা কোনো স্বর্গীয় অহংকারের কারণে নয়; তা হলো প্রকৃতির এই অসীমতার সামনে মানুষের অহংকারের সম্পূর্ণ বিলুপ্তির কারণে।
পরিশেষে বলা যায়, জাক দেরিদার বিনির্মাণবাদী দৃষ্টি নাসদীয় সূক্তের ভেতরের সমস্ত ধর্মীয় কুয়াশা দূর করে তাকে এক বৈপ্লবিক সংশয়বাদী পাঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই সূক্ত সৎ ও অসতের দ্বৈততা ভেঙে দেয়, আলো ও অন্ধকারের লড়াইকে অতিক্রম করে এবং স্বয়ং ঈশ্বরের সর্বজ্ঞাতাকে অস্বীকার করে অনির্ণেয়তার পতাকা ওড়ায়। এটি কোনো ভাববাদী বা ধর্মীয় কুসংস্কারের স্মারক নয়; এটি হলো মানব চেতনার সেই পরম মুহূর্ত যখন মানুষ অন্ধ বিশ্বাসের চেয়ে সৎ অজ্ঞতাকে বেশি মর্যাদাপূর্ণ মনে করেছিল। আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ ও মুক্তচিন্তার মানুষের জন্য নাসদীয় সূক্ত তাই কোনো অলৌকিক শাস্ত্র নয়, বরং প্রাচীন মানুষের যুক্তিবাদী সংশয় ও সততার এক উজ্জ্বল ঐতিহাসিক দলিল।
উপনিষদ, পুনর্ব্যাখ্যা ও প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থ (Upaniṣads, Reinterpretation and Competing Meanings): গাডামার, রিক্যুর ও বেদান্ত
রিক্যুর ও যজ্ঞের অন্তর্মুখীকরণ (Ricoeur and the Internalization of Sacrifice): অনুষ্ঠান থেকে শরীর ও চেতনার প্রতীক
হার্মেনিউটিক্স, প্রতীক ও রিক্যুরের তাত্ত্বিক পটভূমি (Hermeneutics, Symbols, and Ricoeur’s Theoretical Framework)
পাঠের ভেতরের অর্থ কীভাবে সময়ের সাথে সাথে তার রূপ বদলায়, সেই অনুসন্ধানে ফরাসি দার্শনিক পল রিক্যুর (Paul Ricoeur) ব্যাখ্যাশাস্ত্র বা হার্মেনিউটিক্স (Hermeneutics) চর্চায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিলেন। চিরাচরিত কাঠামোগত ভাষাতত্ত্বের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি প্রতীকের গভীর স্তরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। রিক্যুর তার দ্য সিম্বলিজম অব ইভল (The Symbolism of Evil) (1967) গ্রন্থে দেখান, প্রতীক কোনো সাধারণ সংকেত নয় যার অর্থ স্থির বা একরৈখিক। চিহ্নের একটি নির্দিষ্ট নির্দেশক থাকে, কিন্তু প্রতীকের ক্ষেত্রে প্রাথমিক বা আক্ষরিক অর্থটি নিজেই আরেকটি দ্বিতীয় স্তরের অর্থের দিকে ইঙ্গিত করে। এই দ্বিস্তরীয় অর্থকাঠামোই প্রতীকের মূল শক্তি। কোনো প্রাচীন ধর্মীয় বা সামাজিক আচার যখন সরাসরি তার বাস্তব ক্রিয়াকলাপের বাইরে গিয়ে নতুন ভাবনার জন্ম দেয়, তখন সেখানে এই রূপক কাঠামোর সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। রিক্যুর এই প্রক্রিয়াকে বোঝাতে গিয়ে একটি বিখ্যাত দার্শনিক সূত্রের অবতারণা করেছিলেন, “প্রতীক ভাবনার উদ্রেক করে” (Le symbole donne à penser. বা The symbol gives rise to thought)। এর অর্থ হলো, প্রতীকের ভেতরে এমন এক ধরনের উদ্বৃত্ত তাৎপর্য থাকে যা মানুষকে নতুনভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করে।
রিক্যুর তার পরবর্তী তাত্ত্বিক কাজ, বিশেষ করে দ্য রুল অব মেটাফর (The Rule of Metaphor) (1975) গ্রন্থে রূপক ও প্রতীকের মধ্যে এক গভীর যোগসূত্র তৈরি করেন। রূপক সেখানে কেবল অলংকার শাস্ত্রের খেলনা নয়, বরং বাস্তবের এক নতুন বর্ণনা। আক্ষরিক অর্থের আপাত অসংগতি বা অসঙ্গতি যখন দূর হয়ে যায়, তখন জন্ম নেয় এক নতুন অর্থ যাকে তিনি শব্দার্থিক উদ্ভাবন বলে অভিহিত করেছেন। প্রাচীন কোনো আচার বা যাগযজ্ঞের বাহ্যিক রূপ যখন অচল বা সামাজিক সংকটের মুখে পড়ে, তখন সেই আচারের ভাষিক বর্ণনা এক রূপক রূপান্তর প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যায়। যজ্ঞের কাঠে আগুন জ্বালানো আর সেই আগুনে ঘৃতাহুতি দেওয়ার যে দৃশ্যমান ক্রিয়া, তা যখন প্রতীকায়িত হয়, তখন তা আর নিছক কাঠের টুকরো বা গলিত মাখনে সীমাবদ্ধ থাকে না। এই রূপান্তর কীভাবে ঘটে তা বুঝতে হলে প্রতীকের এই উদ্বৃত্ত অর্থের চরিত্রটি অনুধাবন করা প্রয়োজন।
ভাষার এই রূপান্তরমূলক ক্ষমতাকে বুঝতে রিক্যুর পাঠ্যতার ধারণাকে সামনে আনেন। রিক্যুর তার ইন্টারপ্রিটেশন থিওরি: ডিসকোর্স অ্যান্ড দ্য সারপ্লাস অব মিনিং (Interpretation Theory: Discourse and the Surplus of Meaning) (1976) গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেন, যেকোনো কথ্য রূপ যখন লেখায় বা পাঠে রূপ নেয়, তখন তা তার মূল বক্তা, প্রাথমিক শ্রোতা এবং তাৎক্ষণিক ঐতিহাসিক পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই ঘটনাকে তিনি দূরত্বায়ন বা ডিস্ট্যান্সিয়েশন (Distanciation) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই দূরত্বায়ন বিশেষভাবে স্পষ্ট। প্রাথমিক পর্বে যা ছিল উন্মুক্ত আকাশের নিচে পুরোহিতদের যৌথ শারীরিক কর্মযজ্ঞ, পরবর্তী সংকলন ও ব্রাহ্মণ-আরণ্যক সাহিত্যের যুগে তা ধীরে ধীরে বিধিবদ্ধ পাঠে পরিণত হয়। একবার যখন কোনো আচারিক ক্রিয়া পাঠ্য হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়, তখন সেই পাঠ তার মূল ভৌগোলিক ও সাময়িক সীমানা ছাড়িয়ে নতুন পাঠকের সামনে উন্মুক্ত হয়।
এই তাত্ত্বিক আলোয় বৈদিক সাহিত্যের শেষভাগের পরিবর্তনগুলোকে খুব স্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। বৈদিক যাগযজ্ঞ একসময় ছিল দৃশ্যমান বস্তুগত লেনদেন এবং প্রাকৃতিক শক্তির সন্তুষ্টি বিধানের একটি সুনির্দিষ্ট প্রযুক্তি। কিন্তু সেই আচারের ভাষা যখন উপনিষদের যুগে প্রবেশ করে, তখন তার মধ্যে এক গভীর শব্দার্থিক ভাঙন তৈরি হয়। যজ্ঞের নামাবলী, পরিভাষা এবং পদ্ধতিগুলো অপরিবর্তিত থাকে, কিন্তু তাদের নির্দেশক সম্পূর্ণ বদলে যায়। বাহ্যিক অগ্নি পরিণত হয় মানুষের অভ্যন্তরীণ প্রাণবায়ুতে, বলির পশু রূপান্তরিত হয় জৈবিক বাসনায়, আর যজ্ঞবেদী হিসেবে কল্পনা করা হয় মানুষের শরীরকে। রিক্যুরের প্রতীক তত্ত্বের সাহায্যে দেখলে বোঝা যায়, এটি কোনো আকস্মিক বিচ্ছিন্নতা ছিল না; বরং প্রাচীন পাঠের শব্দার্থিক উদ্বৃত্তকে ব্যবহার করে একটি নতুন দার্শনিক ভিত্তি নির্মাণের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া ছিল।
বৈদিক যাগযজ্ঞ ও বাহ্যিক অনুষ্ঠানগত কাঠামো (Vedic Sacrificial System and the External Ritual Framework)
প্রাচীন বৈদিক সংস্কৃতির সামাজিক ও মতাদর্শিক মেরুদণ্ড গড়ে উঠেছিল যাগযজ্ঞ বা যজ্ঞীয় প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। ব্রাহ্মণ (Brāhmaṇa) সাহিত্যের বিশাল অংশে এই যজ্ঞের খুঁটিনাটি নিয়মকানুন, জ্যামিতিক নকশার বেদী নির্মাণ এবং মন্ত্র উচ্চারণের সূক্ষ্ম বিধিবিধান লিপিবদ্ধ আছে। সেখানে যজ্ঞ কোনো মানসিক বা আধ্যাত্মিক ধ্যান ছিল না; তা ছিল বাস্তব জগতের বস্তুগত রূপান্তরের একটি কঠোর প্রযুক্তি। ঐতিহাসিক ও ভারততাত্ত্বিক ইয়ান হেস্টারম্যান (Jan Heesterman) তার দ্য ব্রোকেন ওয়ার্ল্ড অব সেক্রিফাইস: অ্যান এসে ইন হিস্টোরিক্যাল অ্যানথ্রোপোলজি (The Broken World of Sacrifice: An Essay in Historical Anthropology) (1993) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, প্রাচীন বৈদিক যজ্ঞ ছিল সমাজ, প্রকৃতি এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একটি রক্তাক্ত ও জটিল পদ্ধতি। এই যজ্ঞে ব্যবহৃত হতো বাস্তব অগ্নি, নির্দিষ্ট পরিমাপের কাঠ, পুরোডাশ নামের যব বা চালের পিঠা, সোমরস এবং গৃহপালিত পশুর বলি। পুরো ব্যবস্থার পেছনে ক্রিয়াশীল ছিল দেবতাদের সাথে এক ধরনের পারস্পরিক আদান-প্রদানের ধারণা, যেখানে মানুষ দেবতাদের হব্য দেবে এবং বিনিময়ে লাভ করবে দীর্ঘায়ু, গবাদিপশু, পুত্রসন্তান কিংবা যুদ্ধে বিজয়।
এই আচারিক বিন্যাস পরিচালিত হতো অত্যন্ত কঠোর এবং পেশাদার পুরোহিত শ্রেণির মাধ্যমে। ঋগ্বেদের হোতা মন্ত্রপাঠ করতেন, যজুর্বেদের অধ্বর্যু সমস্ত শারীরিক ক্রিয়া ও আহুতির দায়িত্ব পালন করতেন, সামবেদের উদ্গাতা সুর সহযোগে স্তোত্র গাইতেন এবং অথর্ববেদের সাথে যুক্ত ব্রহ্মা পুরো যজ্ঞের সামগ্রিক তত্ত্বাবধান ও ভুলত্রুটি সংশোধনের দায়িত্বে থাকতেন। শতপথ ব্রাহ্মণ (Śatapatha Brāhmaṇa) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে প্রতিটি আচারের আক্ষরিক নির্ভুলতার ওপর চরম জোর দেওয়া হয়েছে। একটু উচ্চারণের ভুল বা একটি কাঠে অগ্নির অসমান বিস্তার পুরো যজ্ঞের কার্যকারিতাকে ধ্বংস করে দিতে পারত। এই স্তরে ভাষা ছিল পুরোপুরি নির্দেশের ভাষা, যা রিক্যুরের পরিভাষায় আক্ষরিক বা প্রাথমিক নির্দেশক স্তর। এখানে অগ্নির অর্থ ছিল কেবলই প্রজ্বলিত কাঠকয়লার আগুন, যা ধোঁয়ার মাধ্যমে আহুতিকে আকাশের দিকে পৌঁছে দেয়।
তবে এই বিশাল ও জটিল আচারিক কাঠামোর ভেতরেই ধীরে ধীরে এক ধরনের সামাজিক ও বস্তুগত সংকট জমা হতে থাকে। একদিকে বিপুল পরিমাণ গবাদিপশু নিধন এবং যাগযজ্ঞের আকাশচুম্বী ব্যয়ভার তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় কৃষিজীবী ও উদীয়মান বণিক শ্রেণির জন্য ভারী হয়ে উঠছিল। অন্যদিকে পুরোহিততন্ত্রের একচেটিয়া কর্তৃত্ব যজ্ঞের আক্ষরিক কার্যকারিতাকে এমন এক যান্ত্রিক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল যেখানে ক্রিয়ার পেছনের তাৎপর্য হারিয়ে যেতে বসেছিল। ভারততাত্ত্বিক ব্রায়ান স্মিথ (Brian K. Smith) তার রিফ্লেকশন্স অন রিসেম্বল্যান্স, রিচুয়াল অ্যান্ড রিলিজিয়ন (Reflections on Resemblance, Ritual, and Religion) (1989) গ্রন্থে উল্লেখ করেন, বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ব্যবস্থায় সাদৃশ্য বা ‘বন্ধু’ ধারণার মাধ্যমে স্বর্গ, পৃথিবী ও যজ্ঞের মধ্যে এক কৃত্রিম সংযোগ স্থাপন করা হতো। প্রতিটি বৈদিক উপাদানের বিপরীতে একটি করে মহাজাগতিক প্রতিরূপ দাঁড় করানো হতো। এই অতি-জটিল সমীকরণ একসময় এমন এক সীমায় পৌঁছে যায় যেখানে আচারের বাহ্যিক রূপটি নিজেই নিজের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
ফলস্বরূপ, যজ্ঞের আক্ষরিক স্তরে অর্থের যে প্রাচুর্য দাবি করা হচ্ছিল, তা ধীরে ধীরে সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। পুরোহিতদের এই বিশেষায়িত জ্ঞানের বাইরে সাধারণ মানুষের সাথে প্রকৃতির সরাসরি সংযোগটি খণ্ডিত হয়ে পড়েছিল। যজ্ঞ তখন আর মুক্ত মহাজাগতিক উল্লাস ছিল না, বরং তা পরিণত হয়েছিল কিছু বিশেষ সামাজিক গোষ্ঠীর ক্ষমতা পুনরুৎপাদনের যন্ত্রে। এই ধরনের ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণেই পাঠের পুনর্ব্যাখ্যার ঐতিহাসিক প্রয়োজন তৈরি হয়। প্রাচীন আচারের ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত না হেনেও কীভাবে তার অর্থকে বদলে দেওয়া যায়, তার ক্ষেত্র প্রস্তুত হতে থাকে বৈদিক সাহিত্যের পরবর্তী স্তরে। বাহ্যিক বলিদানের রক্তক্ষয়ী দৃশ্য এবং ব্যয়বহুল আনুষ্ঠানিকতার বিকল্প হিসেবে এমন এক বিকল্পের সন্ধান শুরু হয়, যা সমাজের রূপান্তরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
অন্তর্যজ্ঞের সূচনা: আরণ্যক ও প্রাথমিক রূপান্তর (The Inception of Antaryajña: Āraṇyakas and the Early Shift)
বৈদিক সাহিত্যের ধারাবাহিকতায় সংহিতা ও ব্রাহ্মণের ঠিক পরেই অবস্থান করে আরণ্যক (Āraṇyaka) সাহিত্য। নাম থেকেই বোঝা যায়, এই পাঠগুলো রচিত ও চর্চিত হতো লোকালয় বা গ্রামের বাইরে, গভীর অরণ্যে। এই ভৌগোলিক পরিবর্তনটি ছিল প্রতীকী এবং সমাজতাত্ত্বিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রামে যে যজ্ঞ হতো, তা ছিল দৃশ্যমান, কোলাহলপূর্ণ এবং সামাজিক ক্ষমতার প্রদর্শনী। বিপরীতে, অরণ্য ছিল এমন এক নির্জন পরিসর যেখানে যজ্ঞের বিশাল সামাজিক পরিকাঠামো – যেমন বিপুল সংখ্যক পুরোহিত, শত শত দর্শক বা বলি দেওয়ার মতো পশুর পাল – উপস্থিত রাখা অসম্ভব ছিল। গবেষক প্যাট্রিক অলিভেল (Patrick Olivelle) তার দ্য আর্লি উপনিষদস: অ্যানোটেড টেক্সট অ্যান্ড ট্রান্সলেশন (The Early Upanisads: Annotated Text and Translation) (1998) গ্রন্থে দেখান, আরণ্যক সাহিত্য কীভাবে গৃহস্থালির আচারভিত্তিক সংস্কৃতি এবং পরবর্তীকালের প্রব্রজ্যা বা সন্ন্যাস সংস্কৃতির মধ্যে একটি রূপান্তরমূলক সেতুর কাজ করেছিল। এখানে এসেই প্রথমবার যজ্ঞকে তার বাহ্যিক রূপ থেকে মুক্ত করে ভাবনার স্তরে নিয়ে আসার প্রয়াস দেখা যায়।
আরণ্যকের এই নতুন বিন্যাসে যে ধারণার বিকাশ ঘটে তাকে বলা হয় অন্তর্যজ্ঞ (Internal Sacrifice) বা মানস যজ্ঞ। যজ্ঞের সমস্ত উপাদান অরণ্যে অনুপস্থিত থাকার কারণে ঋষিরা সেই উপাদানগুলোকে কল্পনার মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করেন। রিক্যুরীয় হার্মেনিউটিক্সের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এটি ছিল বাস্তব বস্তু থেকে মানসিক প্রতীকে রূপান্তরের প্রথম সুনির্দিষ্ট ধাপ। শারীরিক অগ্নি প্রজ্বলনের বদলে কল্পনা করা হলো মনের ভেতরের একাগ্রতাকে। যজ্ঞের পুরোডাশ বা মাংসের আহুতির বদলে উপস্থাপিত হলো নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের গতিবিধি। আচারের যে শারীরিক ক্রিয়াগুলো আগে উন্মুক্ত বেদী প্রাঙ্গণে সম্পন্ন হতো, সেগুলো স্থানান্তরিত হলো মানুষের নিজস্ব চেতনার অন্দরমহলে। এর ফলে যজ্ঞ আর কোনো সামাজিক বা অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ রইল না, তা পরিণত হলো একটি ব্যক্তিগত মনস্তাত্ত্বিক অনুশীলনে।
এই প্রক্রিয়ায় আরণ্যক সাহিত্য যজ্ঞীয় পরিভাষাকে বাতিল করেনি, বরং তাকে পুনর্ব্যবহার করেছে। এটি হার্মেনিউটিক রূপান্তরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। কোনো পুরোনো ঐতিহ্যকে যখন সম্পূর্ণ অস্বীকার করা ঝুঁকিপূর্ণ বা অসম্ভব মনে হয়, তখন ব্যাখ্যাকাররা সেই ঐতিহ্যের ভাষাটিকে ধরে রেখে তার ভেতরের অর্থটি সম্পূর্ণ বদলে দেন। যেমন ঐতরেয় আরণ্যক (Aitareya Āraṇyaka) গ্রন্থে দেখা যায়, বিভিন্ন স্তোত্র এবং যজ্ঞীয় মন্ত্রের এমন সব ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে যা বাহ্যিক ক্রিয়ার পরিবর্তে মানুষের অভ্যন্তরীণ শক্তিগুলোকে ইঙ্গিত করে। কাঠের তৈরি যজ্ঞপাত্রগুলোর প্রতীকী সমীকরণ তৈরি করা হয় মানুষের চোখ, কান বা নাকের সাথে। এই রূপান্তরটি আচারের প্রতি এক ধরনের নীরব বিদ্রোহ ছিল, কিন্তু সেই বিদ্রোহ প্রকাশ পেয়েছিল ঐতিহ্যের নিজস্ব ব্যাকরণ ব্যবহার করেই।
আরণ্যকের এই অন্তর্মুখীকরণ প্রক্রিয়া বৈদিক ভাবনার ভেতরে একটি বড় ধরনের প্যারাডাইম শিফট বা ভাবাদর্শগত পরিবর্তন তৈরি করে। এতদিন যেখানে যজ্ঞের সাফল্য নির্ভর করত পুরোহিতের সঠিক শারীরিক ভঙ্গি এবং নির্ভুল উচ্চারণের ওপর, এখন তা নির্ভর করতে শুরু করল ব্যাখ্যার গভীরতা এবং ব্যক্তির মানসিক উপলব্ধির ওপর। যে ব্যক্তি এই অন্তর্যজ্ঞের প্রতীকী কাঠামো বুঝতে পারত, তাকে আর ব্যয়বহুল আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে হতো না। তার কাছে জ্ঞানই হয়ে উঠল যজ্ঞের বিকল্প। এইভাবে যজ্ঞের সামাজিক মালিকানায় ফাটল ধরে এবং আচারিক কর্তৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ শুরু হয়। রিক্যুর যেভাবে পাঠের স্বায়ত্তশাসনের কথা বলেন, আরণ্যক সাহিত্যের ঋষিরাও যেন বৈদিক আচারের পাঠটিকে পুরোহিতদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে এক নির্জন, মননশীল চিন্তার জগতে পুনর্স্থাপন করেছিলেন।
শরীরের প্রতীকায়ন ও প্রাণাগ্নিহোত্র (Symbolization of the Body and Prāṇāgnihotra)
আরণ্যক পর্বে যে অন্তর্মুখীকরণের সূচনা হয়েছিল, তা উপনিষদের যুগে এসে মানব শরীরের এক বৈপ্লবিক প্রতীকায়নে রূপ নেয়। শরীর আর কেবল রক্ত-মাংসের একটি নশ্বর কাঠামো রইল না; তা হয়ে উঠল সমগ্র যজ্ঞীয় ব্রহ্মাণ্ডের এক জীবন্ত প্রতিরূপ। উপনিষদীয় সাহিত্যে এই পরিবর্তনের সবচেয়ে উজ্জ্বল নিদর্শন হলো প্রাণাগ্নিহোত্র (Prāṇāgnihotra) তত্ত্ব। চিরাচরিত বৈদিক ধর্মে একজন দ্বিজ বা উচ্চবর্ণের গৃহস্থের প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় অগ্নিহোত্র যজ্ঞ করা ছিল বাধ্যতামূলক। সেই যজ্ঞে অগ্নিকুণ্ডে দুধ বা ঘি আহুতি দিতে হতো। কিন্তু ছান্দোগ্য উপনিষদ (Chāndogya Upaniṣad) এবং প্রশ্ন উপনিষদ (Praśna Upaniṣad)-এর মতো পাঠগুলোতে এই বাহ্যিক অগ্নিহোত্রকে সরাসরি মানুষের শরীরের ভেতরের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করা হয়। আহার গ্রহণকে এখানে নিছক ক্ষুধা নিবারণ হিসেবে না দেখে একটি যজ্ঞ হিসেবে কল্পনা করা হয়, যেখানে মুখগহ্বর হলো যজ্ঞকুণ্ড এবং খাদ্যবস্তু হলো সেই কুণ্ডে নিবেদিত আহুতি।
ভারততাত্ত্বিক হেন্ড্রিক বোদেউইৎস (Hendrik Bodewitz) তার গবেষণামূলক গ্রন্থ দ্য ডেইলিজ্যাভিস অব দ্য অগ্নীহোত্র ইন দ্য জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ (The Daily Evening and Morning Offering to the Fire) (1973) গ্রন্থে প্রাণাগ্নিহোত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে জৈমিনীয় শাখা এবং পরবর্তী উপনিষদগুলোতে শারীরিক শ্বাসপ্রশ্বাস বা প্রাণবায়ুকে যজ্ঞের পাঁচ প্রকার অগ্নির সাথে একীভূত করা হয়েছিল। শরীরের ভেতরের প্রধান পাঁচটি বায়ু – প্রাণ, অপান, ব্যান, উদান এবং সমান – পরিণত হয় যজ্ঞের বিভিন্ন অগ্নির প্রতীকে। যেমন, খাদ্য যখন শরীরে প্রবেশ করে পরিপাক হয়, তখন পেটের ভেতরের যে উত্তাপ কাজ করে তাকে বৈশ্বানর অগ্নির সাথে তুলনা করা হয়। এইভাবে একজন মানুষ যখনই কোনো খাদ্য গ্রহণ করছে, সে অজান্তেই তার ভেতরের অগ্নিতে আহুতি প্রদান করছে। বাহ্যিক অগ্নির জন্য যে কাঠ বা ঘৃতের প্রয়োজন হতো, শরীরের অভ্যন্তরীণ মেকানিক্সে তা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ল।
রিক্যুরের রূপক তত্ত্ব প্রয়োগ করলে দেখা যায়, শরীরের এই রূপান্তর আসলে এক গভীর স্তরের পুনর্বর্ণনা (Redescription)। রিক্যুর তার মিমিসিস বা অনুকরণের ধারণায় তিনটি ধাপের কথা বলেন: পূর্ব-বিন্যাস, রূপায়ন এবং পুনর্গঠন। বৈদিক প্রেক্ষাপটে শারীরিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ছিল পূর্ব-বিন্যস্ত জৈবিক বাস্তবতা। উপনিষদের পাঠ্যগুলো সেই শরীরকে যজ্ঞের প্রতীকী কাঠামো দিয়ে নতুনভাবে সাজায় বা রূপায়ন করে। বুক হয়ে ওঠে যজ্ঞবেদী, হৃদয়ের লোমগুলো হয় কুশঘাস, এবং চোখ বা কান হয়ে ওঠে যজ্ঞের বিভিন্ন পুরোহিত। অবশেষে পাঠক বা সাধক যখন এই প্রতীকী ভাষাকে নিজের অস্তিত্বের সাথে মিলিয়ে নেয়, তখন তার নিজের শরীরের অভিজ্ঞতা পুনর্গঠিত হয়। শরীর আর তখন অপবিত্র বা তুচ্ছ কোনো জৈবিক পাত্র থাকে না, তা নিজেই হয়ে ওঠে এক পবিত্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ মন্দির।
শরীরকে কেন্দ্র করে এই প্রতীকায়ন প্রাচীন ধর্মীয় অর্থনীতির ওপরও এক বড় ধরনের আঘাত হানে। ব্রাহ্মণ্য ব্যবস্থার অধীনে সাধারণ মানুষকে যজ্ঞ করার জন্য পুরোহিতদের বিপুল দক্ষিণ দিতে হতো। কিন্তু প্রাণাগ্নিহোত্র ধারণার মাধ্যমে যখন দেখানো হলো যে মানুষের নিজের শরীরটাই একটি চব্বিশ ঘণ্টার যজ্ঞশালা এবং শ্বাসপ্রশ্বাসই হলো নিরবচ্ছিন্ন আহুতি, তখন বাইরের পুরোহিতের মধ্যস্থতার প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। কৌষীতকি উপনিষদ (Kauṣītaki Upaniṣad)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়, মানুষ যখন কথা বলে তখন সে তার শ্বাসকে বাক্যের মধ্যে আহুতি দেয়, আর যখন সে কথা বলা বন্ধ করে শ্বাস নেয় তখন বাক্যকে প্রাণের মধ্যে আহুতি দেয়। এই শ্বাশত আত্ম-যজ্ঞের জন্য কোনো পাথরের বেদী বা সোনার পাত্রের দরকার হয় না। শরীরের প্রতিটি জৈবিক ক্রিয়াকে এইভাবে মহাজাগতিক ও আচারিক মর্যাদা দিয়ে উপনিষদগুলো মানুষের দেহচেতনাকেই এক নতুন দার্শনিক তাৎপর্যে অভিষিক্ত করে।
চেতনার রূপক ও উদ্বৃত্ত অর্থের বিস্তার (Metaphor of Consciousness and the Surplus of Meaning)
শারীরিক সীমানা অতিক্রম করে এই প্রতীকায়ন প্রক্রিয়া একসময় মানুষের বিশুদ্ধ চেতনা ও মনের গভীরে প্রবেশ করে। উপনিষদের দার্শনিকরা বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল শরীরকে যজ্ঞ হিসেবে কল্পনা করাই যথেষ্ট নয়; আসল রূপান্তর ঘটতে হবে মানুষের জানার পদ্ধতিতে। এই পর্যায়ে এসে যজ্ঞের সমস্ত বস্তুগত উপাদান চেতনার বিমূর্ত রূপকে পরিণত হয়। বৃহদারণ্যক উপনিষদ (Bṛhadāraṇyaka Upaniṣad)-এর সূচনালগ্নে এই রূপান্তরের এক চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সেখানে বিখ্যাত অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়াটিকে কীভাবে দেখা হচ্ছে তা লক্ষ্য করার মতো। ঐতিহ্যগতভাবে অশ্বমেধ ছিল সার্বভৌম রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক, যেখানে একটি বাস্তব ঘোড়াকে বলি দেওয়া হতো। কিন্তু বৃহদারণ্যকের ঋষি শুরুতেই ঘোষণা করেন, সেই মহাজাগতিক অশ্বের মস্তক হলো ঊষা, চক্ষু হলো সূর্য, প্রাণ হলো বায়ু, এবং উন্মুক্ত মুখ হলো বৈশ্বানর অগ্নি। ঘোড়ার শারীরিক অস্তিত্বকে মহাবিশ্বের বিশালতার সাথে মিলিয়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে মানুষের সচেতন মনের ধ্যানের বস্তুতে রূপান্তর করা হয়।
রিক্যুর তার হার্মেনিউটিক্সে যে উদ্বৃত্ত অর্থ (Surplus of Meaning) ধারণার কথা বলেছেন, বৃহদারণ্যকের এই বর্ণনা তার এক নিখুঁত ঐতিহাসিক প্রমাণ। অশ্বমেধের আক্ষরিক ঘোড়াটি যখন তার বাস্তব রক্তের অস্তিত্ব হারিয়ে মহাবিশ্ব ও মনের প্রতীক হয়ে ওঠে, তখন সেখানে অর্থের এক বিপুল স্ফীতি ঘটে। একটি বাস্তব ঘোড়ার উপযোগিতা সীমিত, তাকে একটি নির্দিষ্ট স্থানেই বলি দেওয়া সম্ভব। কিন্তু যখন ঘোড়াটি হয়ে ওঠে কাল ও মহাজাগতিক শৃঙ্খলার রূপক, তখন তার অর্থ আর কোনো একটি স্থানের বা সময়ের আচারে আটকে থাকে না। রিক্যুরের ভাষায়, আক্ষরিক অর্থের এই ধ্বংসসাধনই রূপক অর্থের নতুন জন্ম দেয়। পাঠক যখন বোঝে যে এখানে কোনো রক্তমাংসের ঘোড়াকে কাটার কথা বলা হচ্ছে না, বরং নিজের অহংকার এবং সীমিত মনস্তাত্ত্বিক ধারণাকে মহাজাগতিক চেতনায় সমর্পণ করার কথা বলা হচ্ছে, তখনই আচারের ভাষা তার সর্বোচ্চ দার্শনিক স্তরে পৌঁছায়।
এই রূপান্তরের ফলে মন এবং বুদ্ধি যজ্ঞের প্রধান উপাদানে পরিণত হয়। মুণ্ডক উপনিষদ (Muṇḍaka Upaniṣad)-এ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বাহ্যিক যজ্ঞগুলোকে আক্রমণ করা হয়। সেখানে বলা হয়, এই আঠারোটি যজ্ঞরূপ ভেলা অত্যন্ত নড়বড়ে এবং যারা এদের পরম কল্যাণ মনে করে তারা বারবার জরা ও মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হয়। বাহ্যিক যজ্ঞকে এভাবে বাতিল করে দিয়ে তার জায়গায় স্থাপন করা হয় আত্মজ্ঞান বা চেতনার অনুসন্ধানকে। যজ্ঞের কাঠে অগ্নির উৎপত্তির প্রক্রিয়াটিকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে বলা হয়, নিজের শরীরকে বানাও নিচের অরণি কাষ্ঠ এবং প্রণব বা ওঁ-কারকে বানাও উপরের অরণি কাষ্ঠ; তারপর ধ্যানের ঘর্ষণের মাধ্যমে চেতনার সেই পরম সত্যকে প্রত্যক্ষ করো। এখানে প্রাচীন প্রযুক্তিটি রূপক হিসেবে টিকে রইল, কিন্তু তার পুরো উদ্দেশ্যটি পাল্টে গিয়ে নিছক মননশীলতার দিকে মোড় নিল।
সমাজতাত্ত্বিক দিক থেকে এটি ছিল জ্ঞানের রাজনীতির এক বিশাল পুনর্বিন্যাস। ভারততাত্ত্বিক ওয়েন্ডি ডনিগার (Wendy Doniger) তার বিভিন্ন গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে বৈদিক ঐতিহ্যের প্রান্তে থাকা গোষ্ঠীগুলো উপনিষদের এই রূপকায়নের মাধ্যমে ব্রাহ্মণ্য একাধিপত্যকে পাশ কাটিয়ে নিজস্ব আধ্যাত্মিক পরিসর তৈরি করেছিল। ক্ষত্রিয় রাজা যেমন অশ্বপতি কৈকেয় বা জনক, কিংবা সাধারণ সত্যকাম জাবালের মতো চরিত্ররা উপনিষদের সংলাপে যজ্ঞের এই গভীর প্রতীকী অর্থ ব্যাখ্যা করছেন। যে জ্ঞান আগে কেবল বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণদের মুখস্থবিদ্যার অধীনে বন্দি ছিল, তা চেতনার প্রতীকায়নের ফলে সার্বজনীন রূপ ধারণ করে। রিক্যুরের পরিভাষা ব্যবহার করে বলা যায়, পাঠ এখানে তার প্রাতিষ্ঠানিক মালিকানা হারিয়ে এমন এক “জগতের” সৃষ্টি করেছে যেখানে যেকোনো সচেতন মানুষ তার নিজের চিন্তার মাধ্যমে প্রবেশ করতে পারে।
দূরত্বায়ন, মতাদর্শ ও হার্মেনিউটিক মুক্তি (Distanciation, Ideology, and Hermeneutic Emancipation)
বৈদিক আচার থেকে উপনিষদীয় চেতনার এই দীর্ঘ পদযাত্রাকে সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করতে গেলে পল রিক্যুরের দূরত্বায়ন তত্ত্বের কার্যকারিতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। রিক্যুর যুক্তি দেন যে কোনো পাঠ্য বা সামাজিক প্রথা যখন তার আদিম পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন সেই বিচ্ছিন্নতা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং তা পাঠের মুক্তির শর্ত তৈরি করে। বৈদিক যজ্ঞের ক্ষেত্রেও ঠিক এটাই ঘটেছিল। যতদিন যজ্ঞ কেবল নির্দিষ্ট বেদী এবং পুরোহিতদের শারীরিক উচ্চারণে সীমাবদ্ধ ছিল, ততদিন তার অর্থ ছিল অনমনীয় এবং একমুখী। কিন্তু যখন সেই যজ্ঞের স্মৃতি পাঠে রূপান্তরিত হলো এবং কালক্রমে সেই পাঠ তার আদি যাগযজ্ঞের পরিবেশ থেকে বহু দূরে সরে গেল, তখনই সম্ভব হলো তার এক আমূল অভ্যন্তরীণ পুনর্নির্মাণ। শারীরিক দূরত্ব এবং সময়ের ব্যবধান ঋষিদের এই সুযোগ করে দিয়েছিল যাতে তারা পুরোনো আচারকে একটি নতুন জীবনদৃষ্টির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
এই প্রক্রিয়ায় একটি গভীর মতাদর্শিক টানাপোড়েনও সক্রিয় ছিল। রিক্যুর তার আইডিওলজি অ্যান্ড ইউটোপিয়া (Ideology and Utopia) (1986) গ্রন্থে দেখান যে প্রতীকী ব্যবস্থা একদিকে বিদ্যমান সামাজিক ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে মতাদর্শ হিসেবে কাজ করে, আবার অন্যদিকে সেই ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে ইউটোপীয় কল্পনার জন্ম দেয়। উপনিষদের এই অন্তর্মুখীকরণও ছিল এই দুই শক্তির এক অদ্ভুত দোলাচল। একদিকে উপনিষদের লেখকরা কখনই বলেননি যে তারা বেদকে অস্বীকার করছেন। তারা বেদের প্রামাণ্যতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নিয়েছিলেন, যা ছিল মতাদর্শিক বৈধতা রক্ষার প্রয়াস। কিন্তু অন্যদিকে, তারা যজ্ঞের আক্ষরিক অর্থকে সম্পূর্ণ ফাঁকা করে দিয়ে তার ভেতরে এমন এক বিমূর্ত ও সর্বজনীন জ্ঞানতত্ত্ব ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যা বাস্তবে পুরোহিততান্ত্রিক যজ্ঞব্যবস্থাকে অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছিল। এটি ছিল একটি গভীর সাবভার্সন বা ভেতর থেকে ঐতিহ্যের বিন্যাস বদলে দেওয়ার কৌশল।
তবে এই পরিবর্তনকে অতি-সরলীকরণ করে কেবল একটি রোমান্টিক আধ্যাত্মিক বিপ্লব হিসেবে দেখা ভুল হবে। ইতিহাস ও দর্শনের গবেষক উইলহেম হাল্বফাস (Wilhelm Halbfass) তার ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইউরোপ: অ্যান এসে ইন আন্ডারস্ট্যান্ডিং (India and Europe: An Essay in Understanding) (1988) গ্রন্থে সতর্ক করে দেন যে উপনিষদীয় এই জ্ঞানতত্ত্ব পুরোপুরি সামাজিক সমতার জন্ম দেয়নি। যজ্ঞের ক্ষমতা হয়তো পুরোহিতের আঙিনা থেকে সরে এসেছিল, কিন্তু তা পুনরায় এক নতুন ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজাততন্ত্রের জন্ম দিয়েছিল। যারা জটিল দার্শনিক যুক্তি ও আত্মতত্ত্বের প্রতীকী ভাষা বুঝতে পারত, তারাই কেবল এই নতুন জ্ঞানের অধিকারী হতে পারত। সাধারণ শূদ্র বা প্রান্তিক মানুষের জন্য যেমন বৈদিক যজ্ঞের অধিকার ছিল না, তেমনই উপনিষদের এই ব্রহ্মজ্ঞানের ক্ষেত্রেও জন্মগত যোগ্যতার প্রশ্নটি পুরোপুরি মুছে যায়নি। ফলে প্রতীকী মুক্তি ব্যক্তিমানুষের মনস্তাত্ত্বিক স্তরে ঘটলেও, কাঠামোগত সামাজিক রূপান্তর সেখানে ছিল সীমিত।
সব মিলিয়ে রিক্যুরের ব্যাখ্যাতাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ক আমাদের দেখায় কীভাবে প্রাচীন সমাজের ধর্মীয় ভাষা রূপকের মাধ্যমে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে এবং বদলে ফেলে। বৈদিক যাগযজ্ঞের বাহ্যিক পশুরক্ত, সোমরসের ধারা এবং আগুনের লেলিহান শিখা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়েছিল ইতিহাসের গর্ভে। কিন্তু সেই আচারের ভাষা হারিয়ে যায়নি; তা মানুষের শরীরের শিরা-উপশিরায়, শ্বাসপ্রশ্বাসে এবং চেতনার গভীর স্তরে প্রতীকের রূপ নিয়ে টিকে রইল। উপনিষদের ঋষিরা যজ্ঞকে ধ্বংস করেননি, বরং তাকে এক নতুন শব্দার্থিক রূপান্তর দান করেছিলেন। একটি আক্ষরিক ও বৈষয়িক ধর্মীয় প্রযুক্তি কীভাবে মানব চেতনার সবচেয়ে বিমূর্ত রূপকে পরিণত হতে পারে, বৈদিক সাহিত্যের এই অন্তর্মুখীকরণ তার এক ধ্রুপদী ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। রিক্যুরের সেই সত্যটিই এখানে আবার দৃশ্যমান হয়, যেখানে ভাষা কেবল বাস্তবকে বর্ণনা করেই ক্ষান্ত হয় না, বরং রূপকের শক্তিতে বাস্তবকে পুনর্নির্মাণ করে।
গাডামার ও উপনিষদীয় পুনর্ব্যাখ্যা (Gadamer and Upaniṣadic Reinterpretation): পূর্ববর্তী বৈদিক ঐতিহ্যের নতুন দিগন্ত
গাডামারের হার্মেনিউটিক্স ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা (Gadamer’s Hermeneutics and the Continuity of Tradition)
জার্মান দার্শনিক হান্স-গেয়র্গ গাডামার (Hans-Georg Gadamer) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ট্রুথ অ্যান্ড মেথড (Truth and Method) (1989)-এ ব্যাখ্যাশাস্ত্র বা দার্শনিক হার্মেনিউটিক্স (Philosophical Hermeneutics) চর্চায় এক মৌলিক বাঁক তৈরি করেছিলেন। জ্ঞানালোকের যুগের চিন্তাবিদরা মনে করতেন কোনো অতীত পাঠকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে পূর্বের সমস্ত বিশ্বাস ও সংস্কার মুছে ফেলে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হতে হবে। গাডামার এই ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানান। তিনি দেখান যে অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো জ্ঞান তৈরি হতে পারে না। মানুষ সবসময় কোনো না কোনো ঐতিহাসিক পরিবেশের মধ্যে বসবাস করে এবং সেই পরিবেশের মাধ্যমেই চিন্তা করে। অতীত থেকে প্রবাহিত এই চিন্তার প্রবাহকে তিনি বলেন ঐতিহ্য (Tradition)। ঐতিহ্য কোনো জড় বস্তু নয় যা জাদুঘরের শোকেসে সাজিয়ে রাখা থাকে; ঐতিহ্য একটি সচল প্রক্রিয়া যার ভেতর দাঁড়িয়ে মানুষ কথা বলে, চিন্তা করে এবং পাঠ্যের মুখোমুখি হয়।
গাডামারের এই তাত্ত্বিক কাঠামোতে পূর্বধারণা (Prejudice / Vorurteil) একটি অত্যন্ত কেন্দ্রীয় প্রত্যয়। পূর্বধারণা বলতে তিনি কোনো নেতিবাচক অন্ধবিশ্বাসকে বোঝাননি, বরং বুঝিয়েছেন সেই প্রাথমিক শর্তগুলোকে যার ওপর দাঁড়িয়ে একজন পাঠক কোনো কিছু বুঝতে শুরু করে। কানাডীয় দার্শনিক জঁ গ্রোন্দাঁ (Jean Grondin) তার দ্য ফিলোসফি অব গাডামার (The Philosophy of Gadamer) (2003) গ্রন্থে উল্লেখ করেন, গাডামারের কাছে পূর্বধারণা হলো ব্যাখ্যার প্রারম্ভিক বিন্দু। পূর্ববর্তী বৈদিক সাহিত্যের সাথে উপনিষদের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গেলে এই ধারণাটি গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। উপনিষদের দার্শনিকরা আকাশ থেকে হঠাৎ কোনো নতুন চিন্তা নিয়ে আবির্ভূত হননি। তারা দাঁড়িয়েছিলেন বৈদিক সংহিতা ও ব্রাহ্মণের বিশাল ঐতিহ্যের ওপর। সেই ঐতিহ্যই ছিল তাদের চিন্তার প্রারম্ভিক দিগন্ত।
উপনিষদীয় পাঠগুলোকে প্রায়শই বৈদিক যাগযজ্ঞের বিরুদ্ধে এক চরম বিদ্রোহ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা দেখা যায়। তবে গাডামারের হার্মেনিউটিক্স দিয়ে পাঠ করলে এই রূপান্তরকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হয় না। উপনিষদের লেখকরা পুরোনো বৈদিক ঐতিহ্যকে ছুড়ে ফেলে দেননি। তারা সেই ঐতিহ্যের ভেতর থেকেই তাকে নতুন করে বুঝতে চেয়েছেন। ঐতিহ্যের এই সচলতাকে গাডামার ঐতিহ্যের সাথে বোঝাপড়া বা কথোপকথন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বৈদিক ঐতিহ্যের পরিভাষা, দেবমণ্ডল এবং আচারিক কাঠামোকে ধরে রেখেই তারা এমন এক আলোচনা শুরু করেছিলেন যা সেই পুরোনো পাঠের নতুন অর্থ তৈরি করে। একে ঐতিহ্যের অস্বীকার না বলে ঐতিহ্যের ভেতরে দাঁড়িয়ে নতুন অর্থ আবিষ্কারের চেষ্টা বলা যায়।
এই কারণে উপনিষদকে বুঝতে হলে পূর্ববর্তী বৈদিক স্তরের সাথে তার কার্যকর সম্পর্কটি দেখা জরুরি। গাডামারের মতে, কোনো টেক্সট বা পাঠ কখনই একটি স্থির অর্থের খনি নয় যা একবার খুঁড়ে বের করলেই শেষ হয়ে যায়। সময়ের পরিবর্তনে ঐতিহ্যের ভেতরে থাকা মানুষ যখন নতুন পরিস্থিতিতে পড়ে, তখন সেই একই পাঠ থেকে নতুন অর্থ উন্মোচিত হতে থাকে। উপনিষদ হলো বৈদিক ঐতিহ্যের সেই মুহূর্ত, যেখানে দাঁড়িয়ে প্রাচীন মন্ত্র ও যাগযজ্ঞের অর্থ নতুন অভিজ্ঞতার আলোকে পুনরায় নির্ধারিত হয়েছিল। এটি প্রাচীন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর এক বিশেষ প্রক্রিয়া।
পূর্ববর্তী বৈদিক দিগন্ত: সংহিতা ও ব্রাহ্মণের প্রেক্ষাপট (The Preceding Vedic Horizon: Context of Saṃhitās and Brāhmaṇas)
গাডামারের তত্ত্বে ঐতিহাসিক দিগন্ত (Historical Horizon) বলতে বোঝায় কোনো একটি নির্দিষ্ট যুগে মানুষের দৃষ্টিসীমা বা দৃষ্টিভঙ্গির সামগ্রিক পরিসর। মানুষ যা কিছু দেখে বা মূল্যায়ন করে, তা এই দিগন্তের ভেতরে থেকেই করে। প্রাথমিক বৈদিক সাহিত্যের, বিশেষ করে সংহিতা (Saṃhitā) এবং ব্রাহ্মণ (Brāhmaṇa) সাহিত্যের একটি সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক দিগন্ত ছিল। সেই দিগন্ত গড়ে উঠেছিল পশুচারণ ও প্রাথমিক কৃষিনির্ভর এক সমাজের অভিজ্ঞতায়। ইন্দো-ইউরোপীয় ও বৈদিক গবেষক মাইকেল উইটজেল (Michael Witzel) তার সম্পাদিত সংকলন ইনসাইড দ্য টেক্সটস, বিয়ন্ড দ্য টেক্সটস: নিউ অ্যাপ্রোচেস টু দ্য স্টাডি অব দ্য বেদাস (Inside the Texts, Beyond the Texts: New Approaches to the Study of the Vedas) (1997)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে উত্তর ভারতের কুরু-পাঞ্চাল অঞ্চলে এই বৈদিক সংহিতা ও যাগযজ্ঞের বিধিমালারা সামাজিকভাবে সংহত রূপ লাভ করেছিল। সেখানে মানুষের প্রধান উদ্বেগ ছিল বেঁচে থাকা, গবাদিপশুর বৃদ্ধি, সন্তান লাভ, যুদ্ধে জয় এবং প্রাকৃতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ।
ব্রাহ্মণ সাহিত্যের যুগে এই দিগন্ত আরও বেশি আচারসর্বস্ব ও যান্ত্রিক রূপ ধারণ করে। শতপথ বা তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণের মতো পাঠে দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল যজ্ঞের বাহ্যিক নির্ভুলতার ওপর। সেখানে ভাষা ব্যবহৃত হতো একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত কাজের মতো করে। মন্ত্রোচ্চারণ যদি নিখুঁত হয় এবং আহুতি যদি সঠিক নিয়মে প্রদান করা হয়, তবে মহাজাগতিক শক্তি ফলাফল দিতে বাধ্য – এমন একটি নিয়মনিষ্ঠ বিশ্বাস সেই সময়ের দিগন্তকে নিয়ন্ত্রণ করত। মার্কিন দার্শনিক জর্জিয়া ওয়ার্নকে (Georgia Warnke) তার গ্রন্থ গাডামার: হার্মেনিউটিক্স, ট্র্যাডিশন অ্যান্ড রিজন (Gadamer: Hermeneutics, Tradition and Reason) (1987)-এ উল্লেখ করেন, কোনো নির্দিষ্ট দিগন্তের ভেতরে থাকা মানুষ সেই দিগন্তের সীমানাটিকে পরম বা একমাত্র বাস্তবতা বলে মনে করে। বৈদিক পুরোহিতদের কাছেও যজ্ঞশালা এবং যজ্ঞাগ্নিই ছিল মহাবিশ্ব পরিচালনার একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু।
এই বৈদিক দিগন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এর সামাজিক কাঠামো। যজ্ঞের জটিলতা বৃদ্ধির সাথে সাথে একটি বিশেষজ্ঞ পুরোহিত গোষ্ঠীর সামাজিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। যজ্ঞ পরিচালনা এবং মন্ত্রের অর্থ রক্ষার একচেটিয়া অধিকার তৈরি হয়েছিল। সংহিতার দেবতাদের সাথে মানুষের সম্পর্ক ছিল এক ধরনের বাস্তবমুখী লেনদেনের। দেবতারা আহুতি গ্রহণ করবেন এবং বিনিময়ে বৃষ্টি, খাদ্য ও নিরাপত্তা প্রদান করবেন। ফলে সেই যুগে ভাষা বা পাঠ্যের কাজ ছিল মহাজাগতিক ক্ষমতার সাথে সামাজিক প্রয়োজনের সংযোগ ঘটিয়ে দেওয়া। এটি ছিল একটি বহির্মুখী এবং বস্তুগত কর্মকাণ্ড যা মানব শরীরের বাইরের জগতের সাথে সম্পর্কিত ছিল।
কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক দিগন্তই চিরকাল অপরিবর্তিত থাকে না। সমাজের ভেতরে যখন অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটে, নগরজীবনের বিস্তার হতে থাকে এবং চিন্তার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়, তখন সেই পুরোনো দিগন্তের সীমাবদ্ধতাগুলো চোখে পড়তে শুরু করে। যজ্ঞের মাধ্যমে সবকিছু পাওয়ার যে নিশ্চয়তা ব্রাহ্মণ সাহিত্য দিয়েছিল, তা তৎকালীন মানুষের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছিল না। মানুষের অস্তিত্বের সংকট, মৃত্যুর পরের অনিশ্চয়তা এবং নৈতিকতার মতো বিষয়গুলো যাগযজ্ঞের যান্ত্রিক নিয়মের বাইরে নতুন ব্যাখ্যার দাবি তুলছিল। বৈদিক দিগন্তের এই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনই পরবর্তী উপনিষদীয় জিজ্ঞাসার পটভূমি তৈরি করে।
উপনিষদের ঐতিহাসিক পরিস্থিতি ও নতুন প্রশ্ন (The Historical Situation of the Upaniṣads and the New Question)
গাডামার তার দর্শনে প্রশ্ন ও উত্তরের যুক্তি (Logic of Question and Answer) ধারণাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, কোনো পাঠ্যকে বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে সেই পাঠ্যটি কোন প্রশ্নের উত্তর হিসেবে রচিত হয়েছিল। ঐতিহাসিক পরিস্থিতি বদলে গেলে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়, আর সেই নতুন প্রশ্ন প্রাচীন পাঠ্যের ভেতরে নতুন উত্তরের সন্ধান করতে বাধ্য করে। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম ও ষষ্ঠ শতকের দিকে উত্তর ভারতে দ্বিতীয় নগরায়নের সূচনা ঘটে এবং লোহার ব্যবহারের ফলে কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। এই ঐতিহাসিক রূপান্তরের ফলে সমাজের শ্রেণিবিন্যাসে পরিবর্তন আসে। ভারততাত্ত্বিক জোহানেস ব্রঙ্কহর্স্ট (Johannes Bronkhorst) তার গ্রেটার মগধ: স্টাডিজ ইন দ্য কালচার অব আর্লি ইন্ডিয়া (Greater Magadha: Studies in the Culture of Early India) (2007) গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে বৈদিক বলয়ের পূর্ব প্রান্তে, বিশেষ করে মগধ অঞ্চলে, বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থার বাইরে গিয়ে কর্ম ও পুনর্জন্ম সংক্রান্ত নতুন চিন্তার বিস্তার ঘটেছিল।
এই পরিবর্তিত সামাজিক পরিস্থিতিতে উপনিষদের লেখকরা পুরোনো বৈদিক ঐতিহ্যের মুখোমুখি হন একদম নতুন কিছু প্রশ্ন নিয়ে। এতদিন প্রশ্ন ছিল: “কোন যজ্ঞ করলে কীভাবে ধনসম্পদ পাওয়া যাবে?” কিন্তু নতুন প্রশ্ন দাঁড়িয়ে গেল: “মৃত্যুর পর মানুষের কী অবশিষ্ট থাকে?” কিংবা “এই দৃশ্যমান ক্ষণস্থায়ী জগতের পেছনে অপরিবর্তনীয় ভিত্তি কোনটি?” ব্রাহ্মণ সাহিত্যের আচারিক উত্তরগুলো এই নতুন প্রশ্নের সামনে অপ্রতুল প্রমাণিত হচ্ছিল। নতুন ঐতিহাসিক পরিস্থিতি চিন্তাবিদদের বাধ্য করেছিল প্রাচীন বৈদিক পাঠের দিকে ফিরে তাকাতে এবং সেই পাঠের ভেতর থেকেই নতুন উত্তরের সন্ধান করতে।
গবেষক ব্রায়ান ব্ল্যাক (Brian Black) তার দ্য ক্যারেক্টার অব দ্য সেলফ ইন অ্যানশিয়েন্ট ইন্ডিয়া: প্রিস্টস, কিংস, অ্যান্ড উইমেন ইন দ্য আর্লি উপনিষদস (The Character of the Self in Ancient India: Priests, Kings, and Women in the Early Upaniṣads) (2007) গ্রন্থে দেখান, উপনিষদীয় পাঠগুলোতে বিতর্ক ও সংলাপের এক অভূতপূর্ব পরিসর তৈরি হয়েছিল। সেখানে কেবল ঐতিহ্যবাহী পুরোহিতরাই কথা বলছেন না; রাজা, সাধারণ চিন্তাবিদ এবং নারীরাও বিতর্কে অংশ নিচ্ছেন। যাজ্ঞবল্ক্য ও গার্গীর সংলাপ কিংবা জনক ও যাজ্ঞবল্ক্যের কথোপকথন প্রমাণ করে যে প্রশ্ন করার অধিকার এবং নতুন ব্যাখ্যার অনুসন্ধান তখন সমাজের একটি বিস্তৃত অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই সংলাপের ভিত্তি ছিল যুক্তি এবং অনুসন্ধান, অন্ধ আনুগত্য নয়।
গাডামারের তত্ত্বানুসারে, উপনিষদের এই চিন্তাবিদরা প্রাচীন বৈদিক ঐতিহ্যকে অগ্রাহ্য করে শূন্য থেকে এই সংলাপ শুরু করেননি। তারা বৈদিক মন্ত্র, উপমা এবং রূপকগুলোকে টেবিলে রেখে সেগুলোর পুনর্ব্যাখ্যা শুরু করেছিলেন। প্রাচীন প্রশ্নগুলোর বদলে তারা যে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন, তা পুরোনো বৈদিক পাঠ্যের ভেতরের সুপ্ত সম্ভাবনাগুলোকে জাগিয়ে তোলে। যজ্ঞের কাঠে অগ্নির প্রজ্বলন দেখে তারা প্রশ্ন করেছিলেন সেই অগ্নির ভেতরের পরম তেজ সম্পর্কে। এইভাবেই উপনিষদের লেখকরা তাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক পরিস্থিতির দাবি মেটাতে গিয়ে বৈদিক ঐতিহ্যের এক নতুন দার্শনিক পাঠ হাজির করেন।
দিগন্তের সংমিশ্রণ: প্রাচীন মন্ত্র ও নতুন অর্থ (Fusion of Horizons: Ancient Mantras and New Meanings)
গাডামারের হার্মেনিউটিক্সের সবচেয়ে পরিচিত প্রত্যয় হলো দিগন্তের সংমিশ্রণ (Horizontverschmelzung / Fusion of Horizons)। এর অর্থ হলো, অতীত পাঠের দিগন্ত এবং বর্তমান পাঠকের দিগন্ত যখন একে অপরের সাথে মিলিত হয়, তখন এক নতুন বোধের জন্ম হয়। পাঠক কেবল অতীতের দিগন্তে বিলীন হয়ে যান না, আবার অতীত পাঠকেও নিজের ইচ্ছামতো বিকৃত করেন না। বরং দুই দিগন্তের পারস্পরিক সাক্ষাতে এমন এক অর্থ তৈরি হয় যা কেবল অতীতের ছিল না, আবার কেবল বর্তমানের ব্যক্তিগত কল্পনাও নয়। উপনিষদের দার্শনিকরা যখন বৈদিক সংহিতার মন্ত্র এবং ব্রাহ্মণ সাহিত্যের আচারগুলোকে পুনর্ব্যাখ্যা করেন, তখন সেখানে এই দিগন্তের সংমিশ্রণ অত্যন্ত স্পষ্ট রূপ ধারণ করে।
একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হিসেবে ছান্দোগ্য উপনিষদ (Chāndogya Upaniṣad)-এর উদগীথ বা প্রণব (ওঁ)-এর ব্যাখ্যার কথা বলা যায়। সামবেদের সুর সহযোগে গাওয়া উদগীথ ছিল যজ্ঞের একটি সুনির্দিষ্ট অংশ। কিন্তু ছান্দোগ্যের প্রথম প্রপাঠকেই সেই উদগীথকে সমস্ত অস্তিত্বের সারাংশ হিসেবে পুনর্গঠন করা হয়। বলা হয়, পৃথিবীর সার জল, জলের সার ওষধি, ঔষধির সার পুরুষ, পুরুষের সার বাক্য, বাক্যের সার ঋক, ঋকের সার সাম, আর সামের সার হলো এই উদগীথ। বৈদিক যজ্ঞের একটি বিশেষ স্তোত্রকে এখানে জীবনের ক্রমান্বয়ে বিবর্তিত ও পরিশোধিত একটি ধারণার সাথে যুক্ত করা হলো। পুরোনো বৈদিক দিগন্তের আচারিক উপাদানটি উপনিষদীয় দার্শনিকের অনুসন্ধিৎসু দিগন্তের সাথে যুক্ত হয়ে এক মহাজাগতিক তত্ত্বে রূপ নিল।
একইভাবে ঋগ্বেদের বিখ্যাত গায়ত্রী মন্ত্র (Gāyatrī Mantra)-র উপনিষদীয় রূপান্তরটি লক্ষ্য করা যেতে পারে। আদিতে যা ছিল সূর্যদেবতা সবিতাকে উদ্দেশ্য করে রচিত একটি পার্থিব প্রার্থনা, উপনিষদের দিগন্তে এসে তা হয়ে উঠল মানব মনের বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির এক পরম রূপক। বৃহদারণ্যক উপনিষদ (Bṛhadāraṇyaka Upaniṣad)-এ গায়ত্রীর প্রতিটি পদের সাথে বিভিন্ন লোক, বেদ এবং প্রাণের সমীকরণ টানা হয়। ভারততাত্ত্বিক ভ্যালেরি রোবাক (Valerie J. Roebuck) তার অনুবাদ সংকলন দ্য উপনিষদস (The Upaniṣads) (2003)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে উপনিষদের সংকলকরা পুরোনো বৈদিক মন্ত্রগুলোকে তাদের আক্ষরিক অর্থ থেকে বের করে এনে জ্ঞানতাত্ত্বিক স্তরে স্থাপন করেছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় মন্ত্রগুলোর মর্যাদা একটুও কমেনি, বরং তাদের কার্যকারিতা যজ্ঞের সীমাবদ্ধ গণ্ডি পেরিয়ে অস্তিত্বের দর্শনে রূপান্তরিত হয়েছে।
গাডামার জোর দিয়ে বলেন যে কোনো ব্যাখ্যা কেবল অতীতের হুবহু পুনরুৎপাদন নয়; ব্যাখ্যা হলো একটি সৃষ্টিশীল প্রয়োগ। উপনিষদের ঋষিরা বৈদিক মন্ত্রের ঐতিহাসিক বা ব্যাকরণগত অর্থ খোঁজার জন্য ব্যস্ত ছিলেন না। তারা দেখতে চেয়েছিলেন সেই মন্ত্রের মূল বার্তাটি তাদের বর্তমান বাস্তবতায় কীভাবে কার্যকর হতে পারে। সংহিতার ইন্দ্র বা প্রজাপতির মতো দেবতারা উপনিষদে এসে তাদের পৌরাণিক চরিত্র হারিয়ে মানসিক শক্তি ও পরম চেতনার প্রতীকী রূপ লাভ করেন। এইভাবেই প্রাচীন বৈদিক দিগন্ত এবং উপনিষদের নতুন দার্শনিক দিগন্তের সংমিশ্রণ ঘটেছিল, যা প্রাচীন পাঠের ভেতরে নতুন জীবনের সঞ্চার করেছিল।
কার্যকর ইতিহাসের চেতনা ও বৈদিক কর্তৃত্ব (Historically Effected Consciousness and Vedic Authority)
গাডামারের মতে, ঐতিহ্য মানুষকে এমনভাবে প্রভাবিত করে রাখে যা মানুষ সব সময় পুরোপুরি সচেতনভাবে বুঝতে পারে না। এই পরিস্থিতিকে তিনি বলেন কার্যকর ইতিহাস (Wirkungsgeschichte / Effective History) এবং এর ফলে মানুষের ভেতরে তৈরি হয় কার্যকর ইতিহাসের চেতনা (Historically Effected Consciousness)। একজন চিন্তাবিদ যখন নিজেকে ঐতিহ্য থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত মনে করেন, তখনও তিনি আসলে সেই ঐতিহ্যের ভাষা ও ধারণাগত কাঠামোর মাধ্যমেই চিন্তা করতে থাকেন। উপনিষদীয় ধারার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তৎকালীন অন্যান্য দার্শনিক স্রোতের মতো তারা কিন্তু বৈদিক ঐতিহ্যকে বর্জন করেননি। বৌদ্ধ বা জৈন দর্শনের মতো সমসাময়িক আন্দোলনগুলো বৈদিক প্রামাণ্যকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে নতুন পথ নির্মাণ করেছিল। কিন্তু উপনিষদের ঋষিরা বৈদিক ঐতিহ্যের ভেতরে অবস্থান করেই সেই ঐতিহ্যকে বদলে দিতে চেয়েছিলেন। এটি কার্যকর ইতিহাসের প্রভাবেরই প্রকাশ।
গাডামার তার তত্ত্বে কর্তৃত্ব (Authority)-র ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। কর্তৃত্ব মানেই কোনো স্বৈরাচারী চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম নয়। মানুষের বিচারবুদ্ধি যখন বুঝতে পারে যে ঐতিহ্যের ভেতরে মূল্যবান কোনো অন্তর্দৃষ্টি সংরক্ষিত আছে, তখন মানুষ স্বেচ্ছায় সেই কর্তৃত্বকে স্বীকৃতি দেয়। উপনিষদের চিন্তাবিদরা বেদের কর্তৃত্বকে এইভাবেই গ্রহণ করেছিলেন। তারা তাদের নতুন ও বিমূর্ত দার্শনিক সিদ্ধান্তগুলোকে সর্বদা বেদের শেষ ভাগ বা বেদান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তারা দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে তাদের দর্শন পূর্ববর্তী বেদের বিরোধী নয়, বরং বেদের অন্তর্নিহিত চূড়ান্ত লক্ষ্যেরই স্বাভাবিক প্রকাশ।
এই কার্যকর ইতিহাসের চেতনার কারণেই উপনিষদে একটি বিশেষ কৌশল দেখা যায়, যাকে বলা হয় টেক্সটের ভেতর থেকে টেক্সটের পুনর্বিন্যাস। যেমন মুণ্ডক উপনিষদ (Muṇḍaka Upaniṣad)-এ জ্ঞানকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: অপরা বিদ্যা এবং পরা বিদ্যা। যজ্ঞের নিয়মকানুন, ব্যাকরণ, জ্যোতিষ এবং চারটি সংহিতাকেও সেখানে স্থান দেওয়া হয় অপরা বা নিম্নতর বিদ্যার তালিকায়। আর যার মাধ্যমে সেই অপরিবর্তনীয় পরম সত্তাকে জানা যায়, তাকে বলা হয় পরা বা উচ্চতর বিদ্যা। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, সংহিতাগুলোকে সরাসরি বাতিল করা হচ্ছে না, কিন্তু তাদের গুরুত্বকে দ্বিতীয় সারিতে নামিয়ে দিয়ে একটি নতুন জ্ঞানতত্ত্বকে শীর্ষে স্থাপন করা হচ্ছে। ঐতিহ্যের ভাষাকে ব্যবহার করেই ঐতিহ্যের পদক্রম বদলে দেওয়া হলো।
এই কৌশল উপনিষদীয় চিন্তাকে ভারতীয় সমাজে এক বিশাল সাংস্কৃতিক বৈধতা এনে দিয়েছিল। ঐতিহ্যের মূল শিকড় অক্ষুণ্ণ রেখে যখন তার ভেতরের রসদ বদলে দেওয়া হয়, তখন সমাজ সেই নতুন চিন্তাকে সহজে গ্রহণ করে। উপনিষদের লেখকরা এটি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তারা বৈদিক ঐতিহ্যের বাইরে গিয়ে বিচ্ছিন্ন কোনো তত্ত্ব খাড়া করতে চাননি। তারা চেয়েছিলেন ঐতিহ্যের বহমান স্রোতটিকে একটি নতুন মোহনায় পরিচালিত করতে। কার্যকর ইতিহাসের এই সচেতন উপলব্ধিই বৈদিক ঐতিহ্যের ভেতরে উপনিষদকে এক অমোঘ দার্শনিক ভিত্তি দান করেছিল।
ঐতিহ্যের সচলতা ও ব্যাখ্যার উন্মুক্ততা (The Mobility of Tradition and the Openness of Interpretation)
গাডামারের হার্মেনিউটিক্স আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ব্যাখ্যা একটি অন্তহীন প্রক্রিয়া। কোনো টেক্সট বা ঐতিহ্যের এমন কোনো চূড়ান্ত অর্থ হতে পারে না যা ভবিষ্যতের সমস্ত ব্যাখ্যার পথ বন্ধ করে দেবে। ঐতিহ্য সবসময় উন্মুক্ত থাকে এবং প্রতিটি নতুন যুগ তার নিজস্ব দিগন্ত নিয়ে ঐতিহ্যের সাথে বোঝাপড়া করে। উপনিষদ ছিল বৈদিক ঐতিহ্যের এমন এক উন্মুক্ত মুহূর্ত, যা সেই ঐতিহ্যের অর্থকে চিরতরে স্থির করে দেওয়ার ব্রাহ্মণ্য প্রচেষ্টাকে ভেঙে দিয়েছিল। যজ্ঞের প্রতিটি ক্রিয়ার যে সুনির্দিষ্ট এবং একমাত্র অর্থ দাবি করত ব্রাহ্মণ সাহিত্য, উপনিষদ এসে দেখিয়ে দিল যে সেই একই আচারের অজস্র বিকল্প অর্থ তৈরি হতে পারে। এই উন্মুক্ততাই বৈদিক ঐতিহ্যকে একটি মৃত আচারিক ধর্মে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করে তাকে একটি জীবন্ত দর্শনে রূপান্তর করেছিল।
তবে ঐতিহ্যের এই সচলতাকে সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতার আলোকেও দেখা দরকার। উপনিষদের এই দিগন্তের সংমিশ্রণ কেবল একটি ভাষাতাত্ত্বিক বা তাত্ত্বিক খেলা ছিল না। এটি ছিল প্রাচীন ভারতের সামাজিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক আপস। তৎকালীন পুরোহিততান্ত্রিক বর্ণব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে তীব্র ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল, উপনিষদীয় পুনর্ব্যাখ্যা সেই ক্ষোভের একাংশকে ঐতিহ্যের ভেতরে আত্মস্থ করে নিয়েছিল। বাহ্যিক যজ্ঞের পশুবলির বিরুদ্ধে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল, তাকে অন্তর্যজ্ঞ এবং আত্মজ্ঞানের রূপকে স্থানান্তরিত করে ঐতিহ্যের পতন ঠেকানো সম্ভব হয়েছিল। ফলে ব্যাখ্যার এই উন্মুক্ততা যেমন একটি চিন্তাগত মুক্তি ছিল, তেমনই ছিল বিদ্যমান ঐতিহ্যের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার এক অভিনব প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল।
গাডামারের তত্ত্ব ঐতিহ্যের মধ্যে যে ঐকমত্য এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার ওপর জোর দেয়, উপনিষদের ইতিহাসের ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি সরল ছিল না। সেখানে বিভিন্ন গুরুকুলের মধ্যে, পুরোহিত ও রাজাদের মধ্যে তীব্র তাত্ত্বিক প্রতিযোগিতা ছিল। কোনো একটি সার্বিক অর্থ রাতারাতি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বহু শতাব্দীর বিতর্ক, প্রশ্নোত্তরের পালা এবং ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে উপনিষদের দিগন্ত নির্মিত হয়েছিল। বৃহদারণ্যক, ছান্দোগ্য, ঈশ বা কঠ – প্রতিটি উপনিষদ নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বৈদিক ঐতিহ্যকে নতুন করে ব্যাখ্যা করেছে। এর ফলেই পরবর্তীকালে শঙ্কর, রামানুজ বা মাধ্বের মতো পরবর্তী ব্যাখ্যাকাররা উপনিষদের পাঠ্য থেকে তাদের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দার্শনিক মতবাদ গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছিলেন।
পরিশেষে বলা যায়, বৈদিক সাহিত্যের বিকাশের ধারাকে বুঝতে হলে গাডামারের দার্শনিক হার্মেনিউটিক্স এক শক্তিশালী বিশ্লেষণাত্মক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। উপনিষদ পূর্ববর্তী বৈদিক ঐতিহ্যকে ধ্বংস করেনি, আবার তাকে আক্ষরিকভাবে অনুসরণও করেনি। তারা ঐতিহ্যের সাথে এমন এক সৃষ্টিশীল সংলাপে যুক্ত হয়েছিল যা তাদের সমকালের নতুন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারত। অতীতের বৈদিক দিগন্ত এবং সমকালীন উপনিষদীয় দিগন্তের এই সংমিশ্রণই ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে এক সুদূরপ্রসারী বুদ্ধিবৃত্তিক রূপান্তর ঘটিয়েছিল। ঐতিহ্য যে অতীতের কোনো অচলায়তন নয়, বরং তা সময়ের সাথে সাথে নতুন অর্থ উৎপাদনের এক অফুরন্ত উৎস – উপনিষদের পুনর্ব্যাখ্যা সেই গাডামারীয় সত্যকেই ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল করে রেখেছে।
শঙ্কর ও তৎ ত্বমসি (Śaṅkara and Tat Tvam Asi): অদ্বৈত ব্যাখ্যার পাঠগত নির্মাণ
ছান্দোগ্য উপনিষদ ও শ্বেতকেতু-উদ্দালক সংবাদ (Chāndogya Upaniṣad and the Śvetaketu-Uddālaka Dialogue)
প্রাচীন ভারতীয় চিন্তার ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত বাক্যগুলোর একটি হলো “তৎ ত্বমসি” (দ্যাট দাও আর্ট বা তুমিই সেই)। বাক্যটি পাওয়া যায় ছান্দোগ্য উপনিষদ (Chāndogya Upaniṣad)-এর ষষ্ঠ প্রপাঠকে। সেখানে একটি পারিবারিক ও শিক্ষামূলক আখ্যানের মধ্য দিয়ে এই বক্তব্যের অবতারণা করা হয়েছে। মূল চরিত্র দুজন – পিতা উদ্দালক আরুণি এবং তার বারো বছর বয়সী পুত্র শ্বেতকেতু। শ্বেতকেতু বারো বছর ধরে গুরুগৃহে থেকে চারটি বেদ মুখস্থ করে অত্যন্ত উদ্ধত ও অহংকারী হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন। তিনি ভাবছিলেন জগতের সমস্ত বিদ্যা তার আয়ত্তে এসে গেছে। পিতা উদ্দালক পুত্রের এই অহংকার লক্ষ্য করে তাকে একটি অপ্রচলিত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি সেই জ্ঞানের সন্ধান পেয়েছো, যা শুনলে অশোনা বস্তু শোনা হয়ে যায়, যা ভাবলে অভাবিত বিষয় ভাবা হয়ে যায়, যা জানলে অজ্ঞাত বিষয় জানা হয়ে যায়?” শ্বেতকেতু এমন কোনো বিদ্যার কথা জানতেন না। তিনি বিনীত হয়ে পিতার কাছে সেই শিক্ষা প্রার্থনা করলেন।
উদ্দালক তার পুত্রকে বোঝানোর জন্য একের পর এক পার্থিব উপমা ব্যবহার করতে শুরু করলেন। প্রথম উপমাটি ছিল মাটির। মাটির একটি পিণ্ডকে জানলে যেমন মাটির তৈরি সমস্ত পাত্রকে জানা যায়, কারণ ঘট বা পাত্র হলো নিছক ভাষার খেলা বা নামের রূপভেদ, কিন্তু তাদের উপাদানগত সত্য কেবল মাটি। একইভাবে একটি সোনার পিণ্ডকে জানলে সমস্ত সোনার অলংকারকে জানা যায়, কিংবা লোহার তৈরি জিনিসকে জানা যায় একটি নখ কাটার অস্ত্র পরীক্ষা করলেই। উদ্দালক এখান থেকে যুক্তি টানেন যে এই সমগ্র জগতের মূলে রয়েছে একটি একক অস্তিত্ব যাকে তিনি বলেন ‘সৎ’। এই সৎ থেকেই সৃষ্টির সমস্ত রূপ ও বৈচিত্র্যের উদ্ভব হয়েছে। সৃষ্টির আদিতে এই একমেবাদ্বিতীয়ম্ সত্তা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
এরপর উদ্দালক নদীর উপমা দেন। পূর্ব ও পশ্চিমমুখী বিভিন্ন নদী যেমন সাগরে গিয়ে মিশে যায় এবং সাগরে মেশার পর তারা আর আলাদা করে বলতে পারে না “আমি গঙ্গা” বা “আমি সিন্ধু”, তেমনই সমস্ত সত্তা গভীর ঘুমে বা প্রলয়ে সেই এক আদি কারণে ফিরে যায়। তিনি এক পাত্র জলের মধ্যে এক টুকরো লবণ ফেলে দিয়ে পুত্রকে পরের দিন সকালে তা দেখতে বললেন। পরদিন সকালে লবণটি জলে সম্পূর্ণ গলে গিয়েছিল। উদ্দালক পাত্রের ওপর থেকে, মাঝখান থেকে এবং তলদেশ থেকে জল পান করতে বললেন। শ্বেতকেতু সব অংশ থেকেই নোনতা স্বাদ পেলেন। উদ্দালক তখন বললেন, লবণকে চোখে দেখা যাচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু তা জলের প্রতিটি কণার মধ্যে মিশে আছে। এই সমগ্র মহাবিশ্বের ভেতরেও সেই সূক্ষ্ম সত্তা এভাবেই ব্যাপ্ত হয়ে আছে।
এই দীর্ঘ আলোচনার প্রতিটি পর্বের শেষে উদ্দালক একটি নির্দিষ্ট ধ্রুবপদ পুনরাবৃত্তি করেন: “স য এষোঽণিমৈতদাত্ম্যমিদং সর্বং তৎ সত্যং স আত্মা তৎ ত্বমসি শ্বেতকেতো”। অর্থাৎ, এই যে সূক্ষ্ম সত্তা, যা এই সমস্ত কিছুর আত্মা, সেটাই সত্য, সেটাই আত্মা এবং হে শ্বেতকেতু, তুমিই সেই। উপনিষদের পাঠে এই বাক্যটি মোট নয়বার উচ্চারিত হয়। উপনিষদের মূল আখ্যানে এটি কোনো নিছক তাত্ত্বিক ধোঁয়াশা ছিল না; তা ছিল পিতাপুত্রের একটি বাস্তবমুখী কথোপকথন যার মাধ্যমে পার্থিব বৈচিত্র্যের পেছনে এক অভিন্ন ঐক্যকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন শাখা এই বাক্যটির ওপর দাঁড়িয়ে তাদের নিজস্ব মতাদর্শিক সৌধ নির্মাণ করেছে।
শঙ্করের হার্মেনিউটিক কাঠামো ও শব্দপ্রমাণ (Śaṅkara’s Hermeneutic Framework and Śabdapramāṇa)
অষ্টম শতকের বিশিষ্ট দার্শনিক আদি শঙ্কর (Adi Śaṅkara) যখন ছান্দোগ্য উপনিষদের এই সংলাপটি ব্যাখ্যা করতে বসেন, তখন তিনি এটিকে কোনো সাধারণ উপকথা হিসেবে দেখেননি। তার কাছে এটি ছিল অদ্বৈত বেদান্তের ভিত্তিপ্রস্তর। শঙ্কর তার দর্শনে জ্ঞানের উৎস হিসেবে শব্দপ্রমাণ (Śabdapramāṇa) বা বৈদিক বাণীর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। প্রত্যক্ষ বা অনুমানের মতো লৌকিক জ্ঞানপদ্ধতি কেবল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুকে জানতে পারে। কিন্তু ইন্দ্রিয়ের অগম্য যে ব্রহ্ম বা পরম চেতনা, তাকে জানতে হলে শাব্দিক সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করতেই হবে। শঙ্কর তার ব্রহ্মসূত্রভাষ্য (Brahmasūtrabhāṣya) এবং ছান্দোগ্যোপনিষদ্ভাষ্য (Chāndogyopaniṣadbhāṣya) গ্রন্থে স্পষ্ট করে বলেছেন যে যুক্তির নিজস্ব কোনো স্থির ভিত্তি নেই; এক তার্কিকের যুক্তিকে আরেকজন দক্ষ তার্কিক খণ্ডন করে দিতে পারে। তাই পরম অদ্বৈত বাস্তবতাকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে বৈদিক মহাবাক্যের হার্মেনিউটিক বা অর্থতাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ অনিবার্য।
ভারততাত্ত্বিক ও দার্শনিক অন্বিষান রামবাচান (Anantanand Rambachan) তার গবেষণা গ্রন্থ অ্যাকমপ্লিশিং দ্য অ্যাকমপ্লিশড: দ্য বেদাস অ্যাজ আ সোর্স অব ভ্যালিড নলেজ ইন শঙ্কর (Accomplishing the Accomplished: The Vedas as a Source of Valid Knowledge in Śaṅkara) (1991)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে শঙ্কর বৈদিক বাণীর পাঠগত কর্তৃত্বকে একটি স্বশাসিত জ্ঞানপদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শঙ্করের মতে, শ্রুতি কেবল প্রাচীন ঋষিদের কোনো ব্যক্তিগত অনুভূতির বিবরণ নয়, বরং তা এমন এক শাব্দিক সংকেত যা উপযুক্ত পাঠকের কাছে উদ্ভাসিত হলে সরাসরি ভ্রম নাশ করে। তবে এখানে একটি মৌলিক ভাষাতাত্ত্বিক সমস্যা তৈরি হয়। ভাষা সবসময় দ্বৈততার জগতে কাজ করে। ভাষার শব্দ কোনো বস্তুর নাম দেয়, তার গুণ বা ক্রিয়া প্রকাশ করে। কিন্তু যে সত্তা নির্গুণ, নির্বিশেষ এবং অদ্বিতীয়, মানবভাষা কীভাবে তাকে প্রকাশ করতে পারে?
শঙ্কর এই সমস্যার সমাধান খোঁজেন তার তাত্ত্বিক গ্রন্থ উপদেশসাহস্রী (Upadeśasāhasrī)-তে। সেখানে তিনি দেখান যে বৈদিক বাক্যগুলো সবসময় আক্ষরিক অর্থে পরম সত্তাকে প্রকাশ করে না। ভাষা যখন তার সীমাবদ্ধতার প্রান্তে পৌঁছায়, তখন তা পরোক্ষ বা নির্দেশক ক্ষমতার মাধ্যমে সেই অবর্ণনীয় বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। এই কারণে “তৎ ত্বমসি” বাক্যটি শঙ্করের কাছে নিছক একটি ইতিবাচক বর্ণনামূলক বাক্য নয়, বরং এটি একটি নিরাসক বা নিষেধমূলক বাক্য যা অজ্ঞানের আবরণকে সরিয়ে দেয়। এই বাক্যের হার্মেনিউটিক কাজ হলো যা আত্মা নয়, সেই সমস্ত অনাত্ম উপাদানকে মানবচেতনা থেকে খারিজ করে দেওয়া।
শঙ্কর পাঠ্যের অর্থ নির্ধারণে একটি অত্যন্ত সুসংহত এবং নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি অবলম্বন করেন। তিনি উপক্রম (সূচনা), উপসংহার (সমাপ্তি), অভ্যাস (পুনরাবৃত্তি), অপূর্বতা (নতুনত্ব), ফল (প্রয়োজন), অর্থবাদ (প্রশংসা) এবং উপপত্তি (যুক্তি) – এই ছয়টি চিরাচরিত লিঙ্গ বা ব্যাখ্যার মানদণ্ড ব্যবহার করে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে পুরো ছান্দোগ্য উপনিষদের একমাত্র তাৎপর্য হলো জীব ও ব্রহ্মের নিরঙ্কুশ অভিন্নতা। নয়বার যে উদ্দালক বাক্যটি পুনরাবৃত্তি করেছেন, শঙ্করের চোখে তা ছিল ঐতিহ্যের ইচ্ছাকৃত প্রয়াস যাতে শিষ্যের মনে কোনো প্রকার দ্বৈততার সংশয় অবশিষ্ট না থাকে। এইভাবে শঙ্কর একটি ব্যাকরণগত ও পৌরাণিক সংলাপকে এক কঠোর অদ্বৈত জ্ঞানতত্ত্বে রূপান্তরিত করেন।
বাচ্যার্থ ও লক্ষণা: ভাষাতাত্ত্বিক মীমাংসা (Vācyārtha and Lakṣaṇā: Linguistic Exegesis)
“তৎ ত্বমসি” বাক্যটির অদ্বৈত অর্থ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে শঙ্করকে সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণ ও শব্দার্থবিদ্যার সবচেয়ে জটিল হাতিয়ারগুলো ব্যবহার করতে হয়েছিল। বাক্যটিতে দুটি প্রধান পদ রয়েছে: ‘তৎ’ (সেই) এবং ‘ত্বম’ (তুমি)। এই দুই পদের মাঝখানে আছে একটি সংযোগকারী ক্রিয়া ‘অসি’ (হও)। সাধারণ ব্যাকরণের নিয়মে যখন দুটি ভিন্ন পদ একই বিভক্তি নিয়ে পাশাপাশি বসে এবং তাদের মধ্যে একটি সমীকরণ নির্দেশ করে, তখন তাকে বলা হয় সামানাধিকরণ্য (Sāmānādhikaraṇya) বা সমান অধিকরণে অবস্থান। কিন্তু ব্যাকরণের এই সরল নিয়মটি প্রয়োগ করতে গেলেই একটি বিশাল অর্থগত অসঙ্গতি দেখা দেয়।
শব্দের সরাসরি বা আক্ষরিক অর্থকে বলা হয় বাচ্যার্থ (Vācyārtha)। এখন দেখা যাক এই দুটি পদের বাচ্যার্থ কী দাঁড়ায়। ‘তৎ’ পদের আক্ষরিক অর্থ হলো সেই আদি কারণ বা ঈশ্বর, যিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান, জগতের স্রষ্টা এবং সমস্ত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সীমানার বাইরে অবস্থান করেন। অন্যদিকে ‘ত্বম’ পদের আক্ষরিক অর্থ হলো শ্বেতকেতু বা সেই ব্যক্তি যে রক্তমাংসের শরীরের ভেতর আবদ্ধ, যার জ্ঞান সীমিত, শক্তি নগণ্য এবং যে সুখ-দুঃখ ও জরা-মৃত্যুর অধীন। যুক্তি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে, এই দুটি বিপরীত বৈশিষ্ট্যের সত্তা কীভাবে এক হতে পারে? একজন সসীম ও শোকগ্রস্ত জীব কীভাবে অসীম ও সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের সাথে অভিন্ন হতে পারে? এই বৈপরীত্য দূর করার জন্য শঙ্কর সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্রের লক্ষণা (Lakṣaṇā) পদ্ধতির আশ্রয় নেন।
গবেষক মাইকেল কোমান্স (Michael Comans) তার গ্রন্থ দ্য মেথড অব আর্লি অদ্বৈত বেদান্ত: আ স্টাডি অব গৌড়পাদ, শঙ্কর, সুরেশ্বর অ্যান্ড পদ্মপাদ (The Method of Early Advaita Vedānta: A Study of Gauḍapāda, Śaṅkara, Sureśvara and Padmapāda) (2000)-এ শঙ্করের এই লক্ষণাপদ্ধতি প্রয়োগের ভাষাতাত্ত্বিক সূক্ষ্মতা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। লক্ষণা হলো শব্দের এমন এক গৌণ শক্তি যা আক্ষরিক অর্থ অনুপযুক্ত হলে প্রাসঙ্গিক অন্য এক অর্থকে উন্মোচিত করে। যেমন “গঙ্গায় ঘোষপল্লী” বললে কেউ নদীর জলের স্রোতের ওপর বাড়ি তৈরি বোঝে না, বরং বোঝে গঙ্গার তীরে অবস্থিত পল্লী। শঙ্কর “তৎ ত্বমসি” বাক্যের ক্ষেত্রে এক বিশেষ ধরনের লক্ষণা ব্যবহার করেন, যা পরবর্তী অদ্বৈত বেদান্তের তাত্ত্বিক সাহিত্যে ভাগত্যাগ লক্ষণা (Bhāgatyāga-lakṣaṇā) বা জহদজহৎ লক্ষণা নামে সুপরিচিত হয়।
এই পদ্ধতিতে উভয় পদের আক্ষরিক অর্থের যে অংশগুলো পরস্পরবিরোধী, সেগুলোকে বর্জন করা হয় এবং যে অভিন্ন অংশটি অবশিষ্ট থাকে তাকে গ্রহণ করা হয়। উদাহরণ হিসেবে শাস্ত্রীয় আলোচনায় একটি বিখ্যাত উপমা দেওয়া হয়: “সোঽয়ং দেবদত্তঃ” (সেই এই দেবদত্ত)। অতীতে কাশীতে দেখা দেবদত্ত এবং বর্তমানে ঢাকায় দেখা দেবদত্ত – এই দুই স্থানের ও সময়ের বৈপরীত্য বাদ দিলে ব্যক্তি হিসেবে দেবদত্ত কিন্তু একই থাকে। ঠিক তেমনই, ‘তৎ’ পদের সর্বজ্ঞত্ব বা পরোক্ষতা এবং ‘ত্বম’ পদের অল্পজ্ঞত্ব বা সীমাবদ্ধতা – এই দুটিই হলো বাহ্যিক উপাধি বা কৃত্রিম আবরণ। এই উপাধিগুলোকে বাদ দিলে উভয় পদের ভেতরে যে অভিন্ন চৈতন্য বা বিশুদ্ধ আত্মবস্তু বিদ্যমান, বাক্যটি আসলে সেই চৈতন্যের অভিন্নতাকেই নির্দেশ করে। শঙ্কর দেখান, এই পাঠগত অপারেশনের মাধ্যমেই কেবল বাক্যের সামানাধিকরণ্য অর্থপূর্ণ হতে পারে।
বিধি বনাম জ্ঞান: মীমাংসকদের সাথে বিতর্ক (Injunction vs Knowledge: Debate with the Mīmāṃsakas)
শঙ্কর যখন উপনিষদের এই বাক্যটিকে একটি নিখাদ বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনামূলক জ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছিলেন, তখন তাকে সবচেয়ে কঠিন লড়াই করতে হয়েছিল পূর্বমীমাংসা (Pūrvamīmāṃsā) দর্শনের পণ্ডিতদের সাথে। মীমাংসকদের মতে, সমগ্র বেদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মানুষকে কোনো কাজে প্রবৃত্ত করা অথবা কোনো কাজ থেকে নিবৃত্ত করা। বেদ কোনো অলস তত্ত্বকথা প্রচারের বই নয়, তা হলো আদেশের সংকলন। জৈমিনির সূত্রে বলা হয়েছে যে সমস্ত বৈদিক বাক্যের প্রধান কাজ হলো বিধি (Vidhi) বা কর্মের নির্দেশ দেওয়া; যে বাক্য কোনো কাজের নির্দেশ দেয় না, তা নিছক অর্থবাদ বা প্রশংসামূলক অপ্রয়োজনীয় কথা। এই অবস্থান থেকে মীমাংসকরা দাবি করেছিলেন যে “তৎ ত্বমসি” কোনো স্বতন্ত্র জ্ঞান দিতে পারে না। এটি হয়তো কোনো উপাসনা বা ধ্যানের বিধি, যেখানে সাধককে নিজের মনকে ঈশ্বরের সাথে একাত্ম কল্পনা করতে আদেশ দেওয়া হচ্ছে, অথবা এটি কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশংসাবাক্য।
শঙ্কর এই মীমাংসা তত্ত্বের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি স্পষ্ট পার্থক্য টেনে দেন কর্ম এবং জ্ঞানের মধ্যে। কর্ম হলো পুরুষ-তন্ত্র (Puruṣa-tantra), অর্থাৎ তা মানুষের ইচ্ছা, চেষ্টা ও শারীরিক ক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। একজন মানুষ একটি যাগযজ্ঞ করতেও পারে, নাও করতে পারে, কিংবা ভিন্নভাবেও করতে পারে। কিন্তু জ্ঞান হলো বস্তু-তন্ত্র (Vastu-tantra), তা সম্পূর্ণভাবে বস্তুর নিজস্ব বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে। অন্ধকারের ভেতর পড়ে থাকা একটি দড়িকে যখন আলো ফেলে দেখা হয়, তখন “এটা একটা দড়ি” – এই বোধটি কোনো মানবিক আদেশের ফল নয়। মানুষ চাইলেই সেই দড়িকে সাপ বা লাঠি হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না, বস্তু যেভাবে আছে বুদ্ধি তাকে সেভাবেই জানতে বাধ্য হয়। শঙ্কর যুক্তি দেন যে “তৎ ত্বমসি” কোনো মানসিক ক্রিয়া করার আদেশ নয়; এটি একটি বিদ্যমান বাস্তবতার উন্মোচন।
ভারততাত্ত্বিক ও দর্শনের ইতিহাসবিদ কার্ল পটার (Karl H. Potter) সম্পাদিত এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইন্ডিয়ান ফিলোসফিস: ভলিউম ৩ (Encyclopedia of Indian Philosophies: Vol. 3. Advaita Vedānta up to Śaṅkara and his pupils) (1981) গ্রন্থে এই বিতর্কের ঐতিহাসিক গভীরতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে দেখানো হয়েছে কীভাবে শঙ্কর তার সমসাময়িক ভেদাভেদবাদী চিন্তাবিদ ভর্তৃপ্রপঞ্চের মতকেও আক্রমণ করেছিলেন। ভর্তৃপ্রপঞ্চ মনে করতেন জীব ও ব্রহ্ম একই সাথে ভিন্ন এবং অভিন্ন, এবং মুক্তির জন্য জ্ঞান ও কর্মের সমন্বয় বা জ্ঞানকর্মসমুচ্চয় (Jñāna-karma-samuccaya) প্রয়োজন। শঙ্কর এই সমন্বয়বাদকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তার মতে, আলো ও অন্ধকারের যেমন মিলন সম্ভব নয়, তেমনই কর্ম এবং জ্ঞানের মিলন অসম্ভব। কর্ম সবসময় দ্বৈততার স্বীকৃতির ওপর দাঁড়ায় – সেখানে কর্তা আছে, কর্ম আছে এবং ফল আছে। বিপরীতে অদ্বৈত জ্ঞান সমস্ত দ্বৈততাকে এক নিমেষে বাতিল করে দেয়।
শঙ্করের মতে, “তৎ ত্বমসি” বাক্যটি শোনার সাথে সাথেই যদি কোনো ব্যক্তির চিত্ত শুদ্ধ থাকে, তবে তার ভেতরের সমস্ত কর্মবাসনা চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়। কারণ কর্মের জন্য প্রয়োজন “আমি অপূর্ণ, আমার কিছু পাওয়ার আছে” – এই বোধ। কিন্তু যে ব্যক্তি উপলব্ধি করেছে যে সে নিজেই সেই অখণ্ড সৎ-স্বরূপ, তার আর কোনো বৈদিক বিধি পালন করার দরকার থাকে না। ফলে এই বাক্যটি কোনো আচারের অংশ নয়, বরং তা সমস্ত বৈদিক আনুষ্ঠানিকতার চরম পরিসমাপ্তি। এই হার্মেনিউটিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে শঙ্কর উপনিষদকে যজ্ঞীয় ব্রাহ্মণ্যবাদের অধীনতা থেকে পুরোপুরি মুক্ত করে একটি স্বাধীন দার্শনিক অস্তিত্ব দান করেন।
অবিদ্যার অধ্যাস ও অদ্বৈত অভিন্নতা (Adhyāsa of Avidyā and Non-dual Identity)
ভাষাতাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্কের পর শঙ্কর তার ব্যাখ্যার মনস্তাত্ত্বিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তিটি উন্মোচন করেন। যদি মানুষ জন্মগতভাবেই সেই ব্রহ্মের সাথে অভিন্ন হয়ে থাকে, তবে সে নিজেকে অসহায়, দুঃখী ও সীমিত জীব মনে করে কেন? এর উত্তরে শঙ্কর তার বিখ্যাত অধ্যাস (Adhyāsa) বা বিভ্রান্তিকর আরোপের তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। অধ্যাস মানে হলো একটি বস্তুর ওপর আরেকটি ভিন্ন বস্তুর ধর্মকে ভুলবশত চাপিয়ে দেওয়া। মানুষ তার বিশুদ্ধ চৈতন্যময় আত্মার সাথে জড় শরীর, ইন্দ্রিয় এবং মনকে গুলিয়ে ফেলে। শরীর আঘাত পেলে মানুষ মনে করে “আমি আহত হলাম”, মন দুঃখ পেলে মানুষ মনে করে “আমি শোকগ্রস্ত হলাম”। এই যে অনাত্ম বস্তুকে আত্মা বলে মনে করা, এটিই হলো অবিদ্যা (Avidyā) বা অজ্ঞানের মূল রূপ।
উপনিষদের গবেষক জোনাথন বাডার (Jonathan Bader) তার গ্রন্থ মেডিটেশন ইন শঙ্করস বেদান্ত (Meditation in Śaṅkara’s Vedānta) (1990)-এ আলোচনা করেছেন কীভাবে শঙ্কর জ্ঞানোদয়ের প্রক্রিয়াটিকে কোনো নতুন বস্তু পাওয়ার বদলে একটি ভুল বোঝাবুঝির অবসান হিসেবে দেখেছেন। শঙ্কর এই পরিস্থিতি বোঝাতে শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যের দশম ব্যক্তির বিখ্যাত গল্পটি ব্যবহার করেন। দশজন মানুষ সাঁতরে একটি নদী পার হলো। তীরে উঠে দলের নেতা সবাইকে গুনতে শুরু করল। সে একে একে বাকি নয়জনকে গুনল কিন্তু নিজেকে গুনতে ভুলে গেল। ফলে সে কাঁদতে শুরু করল যে তাদের দশম সঙ্গীটি নদীতে ডুবে মারা গেছে। তখন দূর থেকে এক পথচারী এসে পুরো ঘটনাটি দেখল। সে দলপতির কাছে এসে তাকে একটি মৃদু চড় মেরে বলল, “দশমস্ত্বমসি” (তুমিই সেই দশম ব্যক্তি)। এই একটি বাক্য শোনার সাথে সাথে দলপতির শোক মুহূর্তে অন্তর্হিত হলো। দশম ব্যক্তি কিন্তু কোথাও হারিয়ে যায়নি, সে সবসময় উপস্থিতই ছিল; কেবল নিজের প্রতি তার অজ্ঞতাই ছিল সমস্ত কান্নাকাটির কারণ।
শঙ্করের মতে, ছান্দোগ্য উপনিষদে উদ্দালক যখন শ্বেতকেতুকে “তৎ ত্বমসি” বলছেন, তখন ঠিক এই ঘটনাই ঘটছে। এটি কোনো দূরবর্তী স্বর্গীয় সত্তার সন্ধান নয়, বরং নিজের প্রকৃত স্বরূপের এক তাৎক্ষণিক প্রত্যভিজ্ঞা। বাক্যটি কোনো নতুন তথ্য পরিবেশন করছে না, বরং একটি ভুল ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। শঙ্কর জোর দিয়ে বলেন যে বাক্যটি শোনার পর যদি কারো মনে হয় যে তাকে এখন সেই ব্রহ্ম হওয়ার জন্য দীর্ঘকাল ধরে কিছু একটা অনুশীলন করতে হবে, তবে সে বাক্যটির অর্থই বুঝতে পারেনি। কারণ বাক্যটি বলছে না “তুমি ভবিষ্যতে সেই সত্তা হবে” (তৎ ত্বং ভবিষ্যাসি), বাক্যটি বলছে “তুমি এখনই সেই সত্তা আছো” (তৎ ত্বমসি)।
এইভাবে শঙ্কর পার্থিব জগত এবং পরম সত্তার মধ্যে একটি দ্বিস্তরীয় স্তরবিন্যাস তৈরি করেন। যতদিন এই বাক্যের মর্ম উপলব্ধি না হয়, ততদিন এই দৃশ্যমান সংসার, কর্মফল, ধর্মাধর্ম এবং সামাজিক নিয়মকানুন সবই বাস্তব এবং কার্যকর। একে তিনি বলেন ব্যবহারিক স্তর। কিন্তু যে মুহূর্তে বৈদিক শব্দের আঘাতে অধ্যাসের আবরণ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, সেই মুহূর্তে একমাত্র অদ্বৈত চৈতন্য ছাড়া আর কোনো কিছুর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব অবশিষ্ট থাকে না। একে বলা হয় পরমার্থিক স্তর। এই অদ্বৈত অভিন্নতা কোনো মরমী ভাবের ফসল নয়, শঙ্করের কাছে এটি ছিল নিখুঁত ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে আবিষ্কৃত এক অনস্বীকার্য বাস্তব সত্য।
পাঠগত কর্তৃত্ব ও মতাদর্শিক বিনির্মাণ (Textual Authority and Ideological Construction)
আধুনিক জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে শঙ্করের এই ব্যাখ্যা পদ্ধতিকে বিশ্লেষণ করলে এর নির্মাণগত চরিত্রটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। জাপানি ভারততাত্ত্বিক সেঙ্গাকু মায়েদা (Sengaku Mayeda) তার সম্পাদিত ও অনূদিত গ্রন্থ আ থাউজ্যান্ড টিচিংস: দ্য উপদেশসাহস্রী অব শঙ্কর (A Thousand Teachings: The Upadeśasāhasrī of Śaṅkara) (1992)-এ মন্তব্য করেন যে শঙ্করের কাজ কেবল উপনিষদের সরল ব্যাখ্যা ছিল না, তা ছিল একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের পাঠগত পুনর্নির্মাণ। ছান্দোগ্য উপনিষদের মূল বয়ানটি যদি নিরপেক্ষভাবে পাঠ করা হয়, তবে দেখা যাবে উদ্দালকের বর্ণনায় একটি প্রাচীন সৃষ্টিতত্ত্ব এবং প্রকৃতিবাদী দর্শনের উপাদান ছড়িয়ে ছিল। মাটি, জল বা লবণের উপমাগুলো বস্তুজগতের রূপান্তরকে নির্দেশ করছিল। কিন্তু শঙ্কর তার অদ্বৈতবাদী প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে সেই সমস্ত রূপান্তরকে কেবল মায়া বা নামমাত্র ভ্রম হিসেবে ব্যাখ্যা করে পুরো পাঠকে একটি চূড়ান্ত নির্বিশেষ ভাববাদের ছাঁচে ফেলে দেন।
তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ববিদ ফ্রান্সিস ক্লুনি (Francis X. Clooney) তার থিওলজি আফটার বেদান্ত: অ্যান এক্সপেরিমেন্ট ইন কম্পারেটিভ থিওলজি (Theology after Vedānta: An Experiment in Comparative Theology) (1993) গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে উত্তর-মীমাংসা বা বেদান্তের ব্যাখ্যাকাররা টেক্সটকে একটি জীবন্ত ধর্মতাত্ত্বিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছিলেন। শঙ্করের এই অদ্বৈত নির্মাণ নিছক বায়বীয় কোনো চিন্তা ছিল না; এটি তৎকালীন ভারতীয় সমাজে বৌদ্ধ শূন্যবাদ এবং মীমাংসকদের আচারবাদের দ্বিমুখী আক্রমণ মোকাবেলা করে সনাতন ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্যকে নতুন শক্তিতে সংহত করার একটি সফল রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক প্রকল্প ছিল। বৌদ্ধরা যা কিছু অনিত্য বলে উড়িয়ে দিচ্ছিল, শঙ্কর বৈদিক মহাবাক্যের জোরে তার পেছনে এক শাশ্বত চৈতন্যকে দাঁড় করিয়ে দিলেন, আবার মীমাংসকদের ব্যয়বহুল যজ্ঞের বিপরীতে তুলে ধরলেন এক আত্মনির্ভর জ্ঞানকাণ্ড।
তবে এই পাঠগত নির্মাণের সীমাবদ্ধতাগুলোও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। শঙ্কর যখন দাবি করেন যে কেবল সন্ন্যাসী বা নির্দিষ্ট অধিকারী ব্যক্তিরাই এই মহাবাক্যের অর্থ গ্রহণের যোগ্য, তখন তিনি জ্ঞানের এই রূপান্তরকে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। বেদের শব্দপ্রমাণের ওপর তার অটল নির্ভরতা চিন্তার মুক্ত বিস্তারকে একটি শাস্ত্রীয় সীমানার মধ্যে আটকে ফেলেছিল। পরবর্তীকালে রামানুজ বা মধ্বাচার্য যখন এই একই “তৎ ত্বমসি” বাক্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তখন তারা শঙ্করের এই লক্ষণা পদ্ধতিকে কৃত্রিম এবং মূল বয়ানের বিকৃতি বলে আক্রমণ করেছিলেন। তারা দেখিয়েছিলেন কীভাবে সামান্য ব্যাকরণগত বিভাজন বদলে দিয়ে এই বাক্য থেকেই সম্পূর্ণ ভিন্ন দ্বৈতবাদী অর্থ বের করে আনা সম্ভব।
তা সত্ত্বেও, দর্শনের ইতিহাসে শঙ্করের এই পাঠগত নির্মাণের গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে মাত্র তিনটি শব্দের একটি আপাত-সরল বৈদিক বাক্যকে কেন্দ্র করে মানবচেতনা, ভাষা এবং অস্তিত্বের এক বিরাট রূপরেখা তৈরি করা যায়। ছান্দোগ্য উপনিষদের ধুলোমাটি মাখা প্রাচীন আরণ্যক সংলাপ শঙ্করের কলমে এসে পরিণত হয়েছিল বিশ্বদর্শনের অন্যতম গভীর তাত্ত্বিক তর্কে। “তৎ ত্বমসি” বাক্যটি তাই কেবল একটি ধর্মীয় বাণী হিসেবে থাকেনি; শঙ্করের হার্মেনিউটিক্সে তা হয়ে উঠেছিল মানুষের আত্মপরিচয় পুনর্গঠনের এক শক্তিশালী বৌদ্ধিক হাতিয়ার।
রামানুজ ও তৎ ত্বমসি (Rāmānuja and Tat Tvam Asi): বিশিষ্টাদ্বৈত ব্যাখ্যার বিকল্প নির্মাণ
অদ্বৈতের সংকট ও রামানুজের উত্থান (The Crisis of Advaita and the Rise of Rāmānuja)
একাদশ ও দ্বাদশ শতকের দক্ষিণ ভারতে বৈদিক দর্শনের অঙ্গনে এক গভীর তাত্ত্বিক আলোড়ন শুরু হয়েছিল। আদি শঙ্করের অদ্বৈত বেদান্ত তখন ভারতের বিদ্বৎসমাজে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে বসে আছে। শঙ্করের নির্বিশেষ ব্রহ্ম এবং মায়াবাদের ধারণা বহু পণ্ডিতের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও ভক্তিবাদী ধারার মানুষের কাছে তা এক বড় ধরনের সংকট তৈরি করছিল। যদি এই দৃশ্যমান জগত নিছক মায়া বা মিথ্যা হয়, যদি ব্যক্তি মানুষের আত্মা এবং পরম সত্তার মধ্যে কোনো ধরনের বাস্তব পার্থক্য না থাকে, তবে প্রেম, ভক্তি বা আরাধনার কোনো দার্শনিক যৌক্তিকতা অবশিষ্ট থাকে না। ঠিক এই ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে আবির্ভূত হন তামিলনাড়ুর বিশিষ্ট চিন্তাবিদ রামানুজ (Rāmānuja)। তিনি উপনিষদের প্রামাণ্যতাকে বিন্দুমাত্র অস্বীকার না করে শঙ্করের মায়াবাদকে খণ্ডন করার এক বিশাল বৌদ্ধিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই দার্শনিক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় বিশিষ্টাদ্বৈত বেদান্ত (Viśiṣṭādvaita Vedānta)।
রামানুজ তার চিন্তার উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন দুটি সমান্তরাল ধারা থেকে, যাকে শাস্ত্রীয় পরিভাষায় বলা হয় উভয়বেদান্ত। একদিকে ছিল সংস্কৃত ভাষায় রচিত উপনিষদ, ব্রহ্মসূত্র এবং ভগবদগীতা; অন্যদিকে ছিল তামিল আলভার সন্তদের রচিত আবেগঘন ভক্তিমূলক স্তোত্রাবলী। ব্রিটিশ ধর্মতাত্ত্বিক ও ভারততাত্ত্বিক জন কারম্যান (John B. Carman) তার গবেষণা গ্রন্থ দ্য থিওলজি অব রামানুজ: অ্যান এসে ইন ইন্টাররিলিজিয়াস আন্ডারস্ট্যান্ডিং (The Theology of Rāmānuja: An Essay in Interreligious Understanding) (1974)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে রামানুজ এই উভয় ধারার মধ্যে এক যৌক্তিক সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। তার মূল লক্ষ্য ছিল প্রমাণ করা যে উপনিষদের পরম সত্তা কোনো গুণহীন, শূন্যগর্ভ বা নিষ্ক্রিয় চৈতন্য নয়। বরং তিনি অসীম গুণসম্পন্ন এক সবিশেষ বাস্তব সত্তা, যার সাথে এই জগত এবং জীবের সম্পর্ক অত্যন্ত বাস্তব ও নিবিড়।
এই তাত্ত্বিক লড়াইয়ের কেন্দ্রে এসে দাঁড়ায় ছান্দোগ্য উপনিষদের সেই সুপরিচিত মহাবাক্য “তৎ ত্বমসি” (তুমিই সেই)। শঙ্কর এই বাক্যটির ওপর ভিত্তি করে ঘোষণা করেছিলেন যে জীব ও ব্রহ্মের মধ্যে কোনো মৌলিক ভেদ নেই, ভেদ কেবল মায়ার কারণে তৈরি হওয়া একটি ভ্রম। কিন্তু রামানুজের কাছে এই ধরনের ব্যাখ্যা ছিল উপনিষদের মূল চেতনার চরম বিকৃতি। তিনি যুক্তি দেন যে উপনিষদ কোথাও জগতকে মিথ্যা বলেনি। যদি স্রষ্টা সত্য হন, তবে তার দ্বারা সৃষ্ট এই মহাবিশ্ব মিথ্যা হতে পারে না।
রামানুজ তার প্রধান গ্রন্থ শ্রীভাষ্য (Śrībhāṣya) এবং সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর তাত্ত্বিক রচনা বেদার্থসংগ্রহ (Vedārthasaṃgraha)-এ অদ্বৈত ব্যাখ্যার বিকল্প একটি পাঠগত নির্মাণ হাজির করেন। তিনি দেখান যে সংস্কৃত ব্যাকরণ এবং অর্থতত্ত্বের যথাযথ নিয়ম মেনে পাঠ করলে এই একই বাক্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বেরিয়ে আসে। “তৎ ত্বমসি” বাক্যটি কোনো মায়াবাদী অভিন্নতা ঘোষণা করছে না; বাক্যটি প্রকাশ করছে এক পরম বাস্তবতার সাথে তার সৃষ্টির অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ। এই বিকল্প পাঠ নির্মাণের মধ্য দিয়ে রামানুজ দর্শনের জগতে এক নতুন আলোচনার সূচনা করেন।
লক্ষণা পদ্ধতির খণ্ডন ও মুখ্যার্থ রক্ষা (Refutation of Lakṣaṇā and Preservation of Primary Meaning)
শঙ্করের অদ্বৈত ব্যাখ্যার সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল লক্ষণা (Lakṣaṇā) বা শব্দের গৌণ অর্থের আশ্রয় নেওয়া। শঙ্কর দাবি করেছিলেন যে “তৎ” (সেই ব্রহ্ম) এবং “ত্বম” (তুমি বা জীব) – এই দুটি পদের আক্ষরিক অর্থ বা বাচ্যার্থ (Vācyārtha) পরস্পরবিরোধী। কারণ ব্রহ্ম সর্বজ্ঞ ও অসীম, আর জীব সসীম ও দুঃখী। তাই উভয় পদের আক্ষরিক অর্থ ত্যাগ করে এক বিশেষ লক্ষণাপদ্ধতির মাধ্যমে তাদের ভেতরের বিশুদ্ধ চৈতন্যকে গ্রহণ করতে হবে। রামানুজ তার আলোচনায় এই যুক্তিকে শুরুতেই কঠোরভাবে আঘাত করেন। তিনি বলেন, কোনো পাঠ্যের ব্যাখ্যায় যখন সরাসরি বা আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করা সম্ভব, তখন সেখানে লক্ষণাপদ্ধতি প্রয়োগ করা একটি মারাত্মক তাত্ত্বিক ত্রুটি বা দোষ।
ভারততাত্ত্বিক ও অনুবাদক জে. এ. বি. ভ্যান বুইতেনেন (J. A. B. van Buitenen) তার সম্পাদিত ও অনূদিত গ্রন্থ রামানুজাস বেদার্থসংগ্রহ (Rāmānuja’s Vedārthasaṃgraha) (1956)-এ রামানুজের এই অর্থতাত্ত্বিক লড়াইয়ের সূক্ষ্ম দিকগুলো তুলে ধরেছেন। রামানুজ প্রশ্ন তোলেন, একটি বাক্যে যদি একই সাথে দুটি প্রধান পদের আক্ষরিক অর্থ বাতিল করে গৌণ অর্থ কল্পনা করতে হয়, তবে সেই বাক্যের প্রামাণ্যতা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? শ্রুতি বা উপনিষদ যদি জীব ও ব্রহ্মের অভিন্নতা বোঝাতে গিয়ে এমন দুটি শব্দ ব্যবহার করে যার আসল অর্থই ত্যাগ করতে হবে, তবে তা শ্রুতির দুর্বলতা প্রমাণ করে। বৈদিক বাণী কোনো বিভ্রান্তিকর ধাঁধা নয় যে তাকে বুঝতে হলে শব্দের স্বাভাবিক শক্তিকে ধ্বংস করতে হবে।
রামানুজ জোর দিয়ে বলেন যে শব্দের প্রাথমিক শক্তি বা মুখ্যার্থ (Mukhya-vṛtti) রক্ষা করাই একজন ব্যাখ্যাকারীর প্রথম দায়িত্ব। শঙ্করের ভাগত্যাগ লক্ষণায় “তৎ” পদের সর্বজ্ঞত্ব বাদ দেওয়া হয় এবং “ত্বম” পদের সীমাবদ্ধতা বাদ দেওয়া হয়। রামানুজ ব্যঙ্গ করে বলেন, এই পদ্ধতিতে বাক্যের আসল বক্তব্যই হারিয়ে যায় এবং এমন এক নির্বিশেষ সত্তা অবশিষ্ট থাকে যা উপনিষদের পাঠ্যে কোথাও বলা হয়নি। যদি দুটি শব্দের সমস্ত নির্দিষ্ট অর্থই মুছে ফেলতে হয়, তবে “তৎ ত্বমসি” না বলে কেবল “চৈতন্যম্” বললেই তো চলত। বাক্যে দুটি ভিন্ন শব্দ ব্যবহারের কোনো উদ্দেশ্যই তখন থাকে না।
অতএব রামানুজের হার্মেনিউটিক চ্যালেঞ্জটি ছিল পরিষ্কার। তাকে দেখাতে হবে যে “তৎ” এবং “ত্বম” – উভয় পদের প্রাথমিক বা আক্ষরিক অর্থ বজায় রেখেও বাক্যটিকে অর্থপূর্ণ করা সম্ভব। এর জন্য তিনি কোনো অলৌকিক ব্যাখ্যার আশ্রয় নেননি; তিনি সাহায্য নিয়েছেন প্রাচীন সংস্কৃত ব্যাকরণ শাস্ত্রের মূল নীতিগুলোর। তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে উপযুক্ত ব্যাকরণগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে শব্দের আক্ষরিক তাৎপর্য রক্ষা করেই উপনিষদের মূল বক্তব্যকে উদ্ধার করা যায়।
সামানাধিকরণ্য ও ভিন্ন-প্রবৃত্তি-নিমিত্ত (Sāmānādhikaraṇya and Diverse Grounds of Application)
রামানুজের ব্যাখ্যার মূল তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো সামানাধিকরণ্য (Sāmānādhikaraṇya) বা ব্যাকরণগত সমন্বয়ের একটি ধ্রুপদী নিয়ম। প্রাচীন সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ পতঞ্জলির সংজ্ঞা উদ্ধৃত করে রামানুজ দেখান, সামানাধিকরণ্য হলো এমন একটি ভাষিক প্রক্রিয়া যেখানে বিভিন্ন প্রবৃত্তিনিমিত্ত বা ভিন্ন অর্থবাহী একাধিক শব্দ একটিমাত্র মূল সত্তাকে নির্দেশ করতে প্রযুক্ত হয়। সহজ কথায়, একটি বাক্যে ব্যবহৃত শব্দগুলোর অর্থ বা প্রয়োগের ক্ষেত্র আলাদা হবে, কিন্তু তারা সবাই মিলে একটি অভিন্ন বাস্তবতাকে প্রকাশ করবে। এই নিয়মের সবচেয়ে প্রচলিত উদাহরণ হলো “নীলং উৎপলম্” (নীল পদ্ম)।
এই উদাহরণটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘নীল’ শব্দটির কাজ হলো একটি নির্দিষ্ট রঙকে বোঝানো, আর ‘পদ্ম’ শব্দটির কাজ হলো একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির ফুলকে বোঝানো। এই দুটি শব্দের প্রয়োগের কারণ বা প্রবৃত্তিনিমিত্ত সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু যখন তারা একসাথে বসে “নীল পদ্ম” বাক্যটি তৈরি করে, তখন তারা একই বস্তুর দুটি ভিন্ন দিক বা গুণ প্রকাশ করে। সেখানে নীল রঙটি পদ্মকে বাতিল করে দেয় না, আবার পদ্ম ফুলটিও নীল রঙকে অস্বীকার করে না। বরং নীল গুণের দ্বারা বিশেষিত হয়ে পদ্মটি একটি সুনির্দিষ্ট পরিচয় লাভ করে।
দার্শনিক ও গবেষক জুলিয়াস লিপনার (Julius Lipner) তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য ফেস অব ট্রুথ: আ স্টাডি অব মিনিং অ্যান্ড মেটাফিজিকস ইন দ্য বেদান্তিক থিওলজি অব রামানুজ (The Face of Truth: A Study of Meaning and Metaphysics in the Vedāntic Theology of Rāmānuja) (1986)-এ রামানুজের এই ব্যাকরণগত যুক্তির গভীরতা ব্যাখ্যা করেছেন। লিপনার দেখান, রামানুজ কীভাবে প্রমাণ করেছিলেন যে সামানাধিকরণ্য কখনই গুণহীন বা নির্বিশেষ অভিন্নতা প্রকাশ করতে পারে না। যদি ‘নীল’ এবং ‘পদ্ম’ পুরোপুরি এক হয়ে যেত, তবে বাক্যটি হতো নিছক পুনরুক্তি বা অর্থহীন প্রলাপ। বৈচিত্র্য বা পার্থক্যের উপস্থিতিই সমন্বয়মূলক বাক্যের মূল প্রাণ।
এই ব্যাকরণগত নীতিটি রামানুজ প্রয়োগ করেন “তৎ ত্বমসি” বাক্যের ওপর। এখানে ‘তৎ’ পদটির প্রবৃত্তিনিমিত্ত হলো পরম সত্তার সেই রূপ যা সমগ্র সৃষ্টির আদি কারণ, সমস্ত শুভ গুণের আধার এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়ন্ত্রক। অন্যদিকে ‘ত্বম’ পদটির প্রবৃত্তিনিমিত্ত হলো সেই একই সত্তা, যিনি প্রতিটি সসীম জীবের অন্তরে অবস্থান করছেন। এই দুটি পদ একই পরম সত্তাকে নির্দেশ করছে, কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন গুণের মাধ্যমে। ফলে কোনো শব্দের অর্থ বিসর্জন না দিয়েই সামানাধিকরণ্যের নিখুঁত প্রয়োগ সম্ভব হয়। বাক্যটি জীবকে ঈশ্বর বানিয়ে দিচ্ছে না, বরং দেখাচ্ছে যে পরম সত্তা একই সাথে মহাবিশ্বের কারণ হিসেবে এবং জীবের ভেতরের নিয়ন্ত্রক হিসেবে বিদ্যমান।
শরীর-শরীরী ভাব ও সর্বশব্দবাচ্যত্ব (The Body-Soul Model and Universal Denotation of Brahman)
সামানাধিকরণ্যের এই ভাষাতাত্ত্বিক কাঠামোকে একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে রামানুজ তার নিজস্ব সত্তাতত্ত্বের অবতারণা করেন। এই তত্ত্ব দর্শনের ইতিহাসে শরীর-শরীরী ভাব (Śarīra-Śarīrī Bhāva) নামে পরিচিত। রামানুজ তার শ্রীভাষ্য (Śrībhāṣya) গ্রন্থে শরীরের এক অভূতপূর্ব সংজ্ঞা প্রদান করেন। তিনি বলেন, শরীর হলো এমন কোনো জড় বা সচেতন সত্তা যাকে একজন চেতন আত্মা নিজের প্রয়োজনে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, ধারণ করতে পারে এবং যা সেই আত্মার অধীনস্থ অংশ হিসেবে অবস্থান করে। এই সংজ্ঞার আলোকে তিনি সমগ্র সৃষ্টিকে ব্রহ্মের শরীর হিসেবে ঘোষণা করেন।
রামানুজের মতে, জগতে মূলত তিনটি বাস্তব সত্তা রয়েছে: অচেতন জড়বস্তু যাকে বলা হয় অচিৎ (Acit), সচেতন জীবাত্মা যাকে বলা হয় চিৎ (Cit), এবং এই উভয়ের পরম নিয়ন্তা ঈশ্বর (Īśvara)। এই অচিৎ এবং চিৎ – উভয়ই পরম সত্তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা নয়, আবার তারা ঈশ্বরের সাথে একাকারও নয়। তারা ঈশ্বরের সাথে যুক্ত হয়ে আছে ঠিক সেভাবে, যেভাবে মানুষের রক্ত-মাংসের শরীরটি তার আত্মার সাথে যুক্ত থাকে। শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেমন আত্মার অধীনে কাজ করে, তেমনই সমগ্র মহাবিশ্ব এবং সমস্ত জীব ঈশ্বরের শরীর হিসেবে তার ইচ্ছার অধীন। ঈশ্বর হলেন অন্তর্যামী আত্মা, আর বিশ্ব হলো তার প্রকাশমান দেহ।
এই শরীর-শরীরী সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে রামানুজ আরেকটি বৈপ্লবিক শব্দার্থতাত্ত্বিক নীতি তৈরি করেন, যার নাম সর্বশব্দবাচ্যত্ব (Sarva-śabda-vācyatva)। এই নীতির অর্থ হলো, ভাষার যেকোনো শব্দ যা কোনো বস্তুকে নির্দেশ করে, তা মূলত সেই বস্তুর ভেতরের আত্মাকে নির্দেশ করে। সাধারণ জীবনে যখন কেউ বলে “ঐ যে একজন মানুষ আসছে”, তখন সে কেবল একটি মাংসের পিণ্ডকে বোঝায় না; সে বোঝায় সেই মাংসের কাঠামোর ভেতরে থাকা সচেতন ব্যক্তিসত্ত্বাকে। একইভাবে জগতের প্রতিটি বস্তু বা প্রাণীর অন্তরে যেহেতু পরম সত্তা অন্তর্যামী হিসেবে বিরাজ করছেন, তাই যেকোনো বস্তুবাচক বা জীববাচক শব্দ শেষ পর্যন্ত সেই পরম সত্তাকেই নির্দেশ করে।
ভারততাত্ত্বিক সি. জে. বার্টলে (C. J. Bartley) তার গবেষণামূলক কাজ দ্য থিওলজি অব রামানুজ: রিয়ালিজম অ্যান্ড রিলিজিয়ন (The Theology of Rāmānuja: Realism and Religion) (2002)-এ এই শব্দার্থিক প্রসারণের বিশ্লেষণ করেছেন। বার্টলে দেখান, রামানুজের এই ফ্রেমওয়ার্কে “ত্বম” শব্দটি আর সাধারণ শ্বেতকেতুতে আটকে থাকে না। “ত্বম” শব্দটি সরাসরি ইঙ্গিত করে সেই ঈশ্বরকে, যিনি শ্বেতকেতু নামক জীবাত্মার ভেতরে তার অন্তর্যামী আত্মা হিসেবে অবস্থান করছেন। ফলে “তৎ ত্বমসি” বাক্যের অর্থ দাঁড়ায়: জগত সৃষ্টির মূল কারণ হিসেবে যে ঈশ্বর বিদ্যমান (তৎ), তিনিই তোমার ভেতরে অন্তর্যামী আত্মা হিসেবে বিদ্যমান (ত্বম)। এখানে জীব ও ঈশ্বরের কৃত্রিম মিলন ঘটাতে হয় না, কারণ তারা প্রকৃতিগতভাবেই শরীর ও আত্মার গভীর সম্পর্কে চিরকাল আবদ্ধ।
উদ্দালকের উপমার পুনর্ব্যাখ্যা ও সবিশেষ বাস্তববাদ (Reinterpreting Uddālaka’s Analogies and Qualified Realism)
ছান্দোগ্য উপনিষদে উদ্দালক আরুণি তার পুত্র শ্বেতকেতুকে বোঝাতে গিয়ে যে উপমাগুলো ব্যবহার করেছিলেন, রামানুজ সেগুলোরও সম্পূর্ণ বাস্তববাদী পুনর্ব্যাখ্যা দেন। শঙ্কর মাটির তৈরি পাত্রের উপমাটিকে ব্যবহার করে দেখিয়েছিলেন যে ঘট বা পাত্রের কোনো নিজস্ব বাস্তব অস্তিত্ব নেই, কেবল মাটিই সত্য এবং বাকি সব নামমাত্র মিথ্যা। রামানুজ এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সরাসরি নাকচ করেন। তিনি যুক্তি দেন যে মাটি যখন পাত্রে রূপান্তরিত হয়, তখন সেই রূপান্তরটি মিথ্যা নয়। একটি মাটির পিণ্ড দিয়ে জল বহন করা যায় না, কিন্তু সেই মাটি দিয়ে যখন একটি পাত্র তৈরি করা হয়, তখন তা জল ধারণের এক বাস্তব ক্ষমতা অর্জন করে। অতএব রূপের এই পরিবর্তন বাস্তব এবং কার্যকরী।
রামানুজ কার্য ও কারণের এই বাস্তব রূপান্তরকে বলেন সৎকার্যবাদ (Satkāryavāda) বা পরিণামবাদ। অদ্বৈতবাদীরা যে জগতকে মায়িক বিবর্ত বা অলীক রূপান্তর মনে করতেন, রামানুজের কাছে তা ছিল ঈশ্বরের বাস্তব আত্ম-প্রকাশ। মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে জড় ও জীব ঈশ্বরের শরীরের ভেতরে অতি-সূক্ষ্ম অবস্থায় সুপ্ত ছিল। সৃষ্টির মুহূর্তে সেই সুপ্ত উপাদানগুলোই স্থূল ও দৃশ্যমান রূপ ধারণ করে। মাটির ভেতরেই যেমন পাত্রের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে, তেমনই পরম সত্তার ভেতরেই মহাবিশ্বের সমস্ত রূপ নিহিত ছিল। ফলে কার্য এবং কারণের মধ্যে কোনো মিথ্যা মায়ার স্থান নেই।
একইভাবে উদ্দালকের লবণের উপমাটিকে রামানুজ তার শরীর-শরীরী তত্ত্বের সপক্ষে ব্যবহার করেন। জলের পাত্রে লবণ যখন গলে যায়, তখন লবণ কিন্তু ধ্বংস হয়ে যায় না বা জলের সাথে পুরোপুরি এক হয়ে যায় না। লবণের কণাগুলো জলের প্রতিটি অংশে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে তাদেরকে আলাদা করে দেখা যায় না, কিন্তু তাদের স্বাদ সর্বত্র অনুভব করা যায়। রামানুজ বলেন, ঠিক একইভাবে ঈশ্বর এই মহাবিশ্বের প্রতিটি কণার মধ্যে এবং প্রতিটি জীবের অন্তরে সূক্ষ্মভাবে ব্যাপ্ত হয়ে আছেন। এই ব্যাপ্তির অর্থ অভিন্নতা নয়, এই ব্যাপ্তির অর্থ হলো অন্তর্যামী উপস্থিতি।
গবেষক রবার্ট লেস্টার (Robert C. Lester) তার গ্রন্থ রামানুজ অন দ্য যোগ (Rāmānuja on the Yoga) (1976)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে রামানুজের এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি আধ্যাত্মিক চর্চার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল। উপনিষদের “তৎ সত্যং” কথাটির অর্থ রামানুজের কাছে জগত-উচ্ছেদকারী কোনো জ্ঞান নয়। জগতের অস্তিত্ব সত্য, জীবের দুঃখ-কষ্ট সত্য, এবং সেই জগতকে ধারণ করে থাকা ঈশ্বরের অস্তিত্বও সত্য। রামানুজ যে দর্শনের প্রতিষ্ঠা করলেন তা ছিল সবিশেষ বাস্তববাদ (Qualified Realism), যেখানে বহুত্ব এবং ঐক্য কোনো পরস্পরবিরোধী ধারণা নয়, বরং তারা একই পরম কাঠামোর দুটি অবিচ্ছেদ্য মাত্রা।
পাঠগত বিকল্প, ভক্তি ও ধর্মতাত্ত্বিক রাজনীতি (Textual Alternative, Devotion, and Theological Politics)
রামানুজের এই বিকল্প পাঠগত নির্মাণ ভারতীয় ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাসে এক বিশাল পরিবর্তন সূচনা করেছিল। শঙ্করের অদ্বৈত দর্শনে সাধারণ মানুষের অনুভূতির কোনো স্থায়ী মূল্য ছিল না; সংসারকে সেখানে এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন হিসেবে দেখা হতো যা থেকে কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞানের মাধ্যমেই মুক্তি সম্ভব। রামানুজ এই শুষ্ক জ্ঞানমার্গের বিপরীতে ভক্তি ও আত্মসমর্পণের পথকে শক্তিশালী দার্শনিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন। তিনি দেখান যে জীব যদি ঈশ্বরের শরীর হয়, তবে ঈশ্বরের প্রতি জীবের স্বাভাবিক মনোভাব হওয়া উচিত নির্ভরতা ও সেবা। এই মনোভাব কোনো অজ্ঞানের লক্ষণ নয়, বরং এটিই হলো অস্তিত্বের সবচেয়ে গভীর সত্য উপলব্ধি।
এই তাত্ত্বিক রূপান্তরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক ছিল। বৈদিক যজ্ঞ এবং শঙ্করের অদ্বৈত সন্ন্যাস – উভয়ই মূলত উচ্চবর্ণের শিক্ষিত পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু রামানুজ যখন ঈশ্বরের শরীর হিসেবে সমস্ত সৃষ্টির সমান সম্পর্কের কথা ঘোষণা করলেন, তখন আধ্যাত্মিক মুক্তির দরজা সমাজের প্রান্তিক মানুষের জন্যও উন্মুক্ত হয়ে গেল। তিনি প্রপত্তি (Prapatti) বা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের ধারণাকে উৎসাহিত করলেন, যেখানে জাতি, বর্ণ বা লিঙ্গের কোনো ভেদাভেদ ছিল না। গবেষক এস. এম. শ্রীনিবাস চারি (S. M. Srinivasa Chari) তার গ্রন্থ ফান্ডামেন্টালস অব বিশিষ্টাদ্বৈত বেদান্ত (Fundamentals of Viśiṣṭādvaita Vedānta) (1988)-এ উল্লেখ করেছেন কীভাবে রামানুজ এই অন্তর্ভুক্তিমূলক ধর্মতত্ত্বের মাধ্যমে দক্ষিণ ভারতীয় মন্দিরের পরিচালনা ও ধর্মীয় সংস্কৃতিতে নিম্নবর্গের মানুষদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন।
তবে এই সামাজিক উদারতাকে অতিরিক্ত বৈপ্লবিক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রামানুজ বর্ণাশ্রম ব্যবস্থার বাহ্যিক নিয়মগুলোকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে চাননি; তিনি সেগুলোকে বেদান্তের কাঠামোর ভেতরে নতুন এক সহনশীল রূপ দিতে চেয়েছিলেন। তার মূল লড়াইটি ছিল বৌদ্ধিক ও প্রাতিষ্ঠানিক। শঙ্করের কঠোর নৈর্ব্যক্তিক দর্শন যাতে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে ধর্মের সজীবতাকে মুছে দিতে না পারে, তার জন্য তিনি উপনিষদের পাঠ্য থেকেই এক বিকল্প অস্ত্র তৈরি করেছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে উপনিষদ পাঠের অধিকার কেবল অদ্বৈতবাদীদের একচেটিয়া সম্পদ নয়।
পরিশেষে বলা যায়, রামানুজের “তৎ ত্বমসি” ব্যাখ্যা কেবল একটি ধর্মতাত্ত্বিক মতামত নয়, তা হলো হার্মেনিউটিক্স বা পাঠ ব্যাখ্যার এক অনন্য পাঠশালা। তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে একই বৈদিক বাক্যকে ভিন্ন এক ব্যাকরণগত ও সত্তাতাত্ত্বিক চশমা দিয়ে দেখলে তার থেকে এক সম্পূর্ণ নতুন জগতের জন্ম হতে পারে। যেখানে শঙ্কর দেখেছিলেন সব পার্থক্যের বিলুপ্তি, রামানুজ সেখানে উন্মোচন করার চেষ্টা করলেন এক মহাজাগতিক সম্পর্কের ঐকতান। তার তৈরি এই বিকল্প পাঠের ফলেই ভারতীয় দর্শনের আঙিনায় ভক্তি কেবল একটি ভাবালুতা হয়ে থাকেনি, বরং তা পরিণত হয়েছিল যুক্তি ও পাঠগত প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত এক অপরাজেয় তাত্ত্বিক শক্তিতে।
মাধ্ব ও তৎ ত্বমসি (Madhva and Tat Tvam Asi): দ্বৈত ব্যাখ্যা ও অর্থের প্রতিদ্বন্দ্বিতা
ত্রয়োদশ শতকের প্রেক্ষাপট ও দ্বৈত দর্শনের ভিত্তি (Thirteenth-Century Context and the Foundation of Dvaita Philosophy)
ত্রয়োদশ শতকের দক্ষিণ ভারত, বিশেষ করে কর্ণাটকের উপকূলীয় অঞ্চল এক অভূতপূর্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাতের সাক্ষী হয়েছিল। আদি শঙ্কর এবং রামানুজ ততদিনে উপনিষদের ওপর দাঁড়িয়ে তাদের নিজস্ব দার্শনিক সৌধ নির্মাণ করে গেছেন। কিন্তু শঙ্করের চরম অদ্বৈতবাদ এবং রামানুজের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ – কোনোটিই উদুপির তরুণ পণ্ডিত আনন্দতীর্থ, যিনি ইতিহাসে মধ্বাচার্য (Madhvācārya) বা মাধ্ব নামে সমধিক পরিচিত, তাকে পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারেনি। মাধ্ব লক্ষ্য করলেন, বেদান্তের নামে সমাজে এমন এক ভাবাদর্শিক ধারা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে যা মানুষের প্রতিদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করে। প্রত্যক্ষ জগতকে মায়া বা অবাস্তব বলে উড়িয়ে দেওয়ার এই প্রবণতাকে তিনি বৈদিক ঐতিহ্যের ওপর সবচেয়ে বড় হুমকি বলে মনে করলেন। এই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন দ্বৈত বেদান্ত (Dvaita Vedānta), যা তত্ত্ববাদ নামেও পরিচিত।
মাধ্ব তার দর্শনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এক আপসহীন বাস্তবতাবাদের ওপর। ভারততাত্ত্বিক ও দর্শনের ইতিহাসবিদ বি. এন. কে. শর্মা (B. N. K. Sharma) তার আকর গ্রন্থ ফিলোসফি অব শ্রী মধ্বাচার্য (Philosophy of Śrī Madhvācārya) (1962)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে মাধ্ব ভারতীয় দর্শনে ভেদের ধারণাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। মাধ্ব বললেন, ভেদ কোনো কাল্পনিক বা সাময়িক বিষয় নয়; ভেদ হলো বাস্তব এবং শাশ্বত। তিনি জগতের সমস্ত সম্পর্ককে পাঁচটি চিরন্তন পার্থক্যের মধ্যে বিন্যস্ত করলেন, যা দর্শনে পঞ্চভেদ (Pañcabheda) নামে খ্যাত: ১) ঈশ্বর ও জীবের মধ্যকার ভেদ, ২) ঈশ্বর ও জড়ের মধ্যকার ভেদ, ৩) জীব ও জীবের মধ্যকার পারস্পরিক ভেদ, ৪) জীব ও জড়ের মধ্যকার ভেদ, এবং ৫) জড় বস্তুর সাথে অপর জড় বস্তুর পারস্পরিক ভেদ। এই পঞ্চভেদ কোনো দিনও বিলুপ্ত হয় না, এমনকি মুক্তির পরেও জীব এবং ঈশ্বরের মধ্যকার এই পার্থক্য অক্ষুণ্ণ থাকে।
এই বাস্তববাদী দর্শনের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল মাধ্বের সাক্ষী (Sākṣī) তত্ত্ব। সাধারণ ইন্দ্রিয় অনেক সময় ভুল করতে পারে, যেমন দূর থেকে রশিকে সাপ মনে হতে পারে। কিন্তু মানবচেতনার গভীরে এমন এক স্বতঃসিদ্ধ অনুভূতির ক্ষমতা আছে যা মানুষের নিজস্ব অস্তিত্ব, সুখ-দুঃখ এবং পার্থক্যের বোধকে অভ্রান্তভাবে গ্রহণ করে। আমি যে এই চেয়ার বা টেবিল থেকে আলাদা, আমি যে অন্য একজন ব্যক্তি থেকে আলাদা – এই অভিজ্ঞতা কোনো মায়া নয়। আধুনিক গবেষক দীপক শর্মা (Deepak Sarma) তার গবেষণামূলক গ্রন্থ অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু মাধ্ব বেদান্ত (An Introduction to Mādhva Vedānta) (2003)-এ তুলে ধরেন যে মাধ্বের কাছে কোনো শাস্ত্রীয় বাক্যই প্রত্যক্ষ বা অনুভবের বাস্তব সত্যতাকে খারিজ করে দিতে পারে না। শ্রুতির কাজ প্রত্যক্ষকে খণ্ডন করা নয়, বরং তাকে স্পষ্ট করা।
স্বাভাবিকভাবেই মাধ্বের এই চরম দ্বৈতবাদী অবস্থানের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল ছান্দোগ্য উপনিষদের সেই সুপরিচিত মহাবাক্য “তৎ ত্বমসি”। অদ্বৈতবাদীরা এই বাক্য দেখিয়ে দাবি করতেন যে জীব এবং পরম সত্তা এক ও অভিন্ন। রামানুজও অন্তত তাদের মধ্যে শরীর ও আত্মার সম্পর্ক স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু মাধ্ব বললেন, ঈশ্বর যদি স্বতন্ত্র এবং নিখুঁত হন, আর জীব যদি সম্পূর্ণ পরতন্ত্র এবং ত্রুটিপূর্ণ হয়, তবে তারা কোনোভাবেই এক হতে পারে না। এই আপাত-অভেদমূলক বাক্যটির মুখোমুখি হয়ে মাধ্ব এক বিস্ময়কর পাঠগত কৌশল অবলম্বন করলেন, যা ভারতীয় হার্মেনিউটিক্সের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
সন্ধিচ্ছেদ ও ভাষাতাত্ত্বিক উলটপালট: অতৎ ত্বমসি (Sandhi-viccheda and Linguistic Upheaval: Atat Tvam Asi)
ছান্দোগ্য উপনিষদের ষষ্ঠ প্রপাঠকে পিতা উদ্দালক পুত্র শ্বেতকেতুকে উদ্দেশ্য করে নয়বার যে বাক্যটি উচ্চারণ করেছিলেন, প্রচলিত সমস্ত পণ্ডিত সমাজ সেই বাক্যটির সন্ধি ভেঙে পাঠ করতেন: “স আত্মা তৎ ত্বমসি” (তিনিই আত্মা, তুমিই সেই)। শঙ্কর এবং রামানুজ উভয়েই এই পাঠকে গ্রহণ করে তার ওপর নিজেদের ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্তু মাধ্ব তার ছান্দোগ্যোপনিষদ্ভাষ্য (Chāndogyopaniṣadbhāṣya) এবং অনুব্যাখ্যান (Anuvyākhyāna) গ্রন্থে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ব্যাকরণগত সম্ভাবনা উন্মোচন করলেন। তিনি দেখালেন যে সংস্কৃত ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব ও সন্ধির নিয়ম অনুসারে এই অংশটিকে সম্পূর্ণ বিপরীতভাবেও পড়া সম্ভব। মাধ্ব বললেন, মূল পাঠটি আসলে “স আত্মা অতৎ ত্বমসি” – অর্থাৎ “অতৎ ত্বমসি” (তুমি সেই নও)।
সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম অনুসারে কোনো শব্দের শেষে যদি আ-কার থাকে এবং তার পরবর্তী শব্দটি যদি অ-কার দিয়ে শুরু হয়, তবে সন্ধির নিয়মে পূর্ববর্তী আ-কার বজায় থাকে এবং পরবর্তী অ-কারটি লুপ্ত হয়ে যায় বা একটি মৃদু উচ্চারণচিহ্ন (অবগ্রহ) দিয়ে নির্দেশিত হয়। প্রাচীন তালপাতার পুথিতে এই অবগ্রহ চিহ্ন দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। ফলে “স আত্মা” শব্দের পরের শব্দটি “তৎ” ছিল নাকি “অতৎ” ছিল, তা নিছক দৃশ্যমান অক্ষরের ওপর নির্ভর করে চূড়ান্ত করার সুযোগ নেই। মাধ্ব দাবি করলেন, পূর্ববর্তী ব্যাখ্যাকাররা অসতর্কতাবশত বা নিজেদের অদ্বৈত মতাদর্শ টিকিয়ে রাখতে সেখানে একটি ‘অ’ বর্ণকে উপেক্ষা করে গেছেন। প্রকৃতপক্ষে উদ্দালক তার পুত্রকে বলছিলেন, “তুমি সেই নও”।
দার্শনিক গবেষক কে. বি. রামকৃষ্ণ রাও (K. B. Ramakrishna Rao) তার তুলনামূলক গ্রন্থ অদ্বৈত অ্যান্ড দ্বৈত: আ স্টাডি ইন দ্য ক্রিটিক অব ইন্ডিয়ান মনিজিম (Advaita and Dvaita: A Study in the Critique of Indian Monism) (1966)-এ মাধ্বের এই ভাষাতাত্ত্বিক হস্তক্ষেপের গুরুত্ব বিশ্লেষণ করেছেন। রাও দেখান, মাধ্বের এই ব্যাখ্যা প্রাচীন বৈদিক টেক্সটের দৃশ্যমান স্থিতিশীলতাকে এক নিমেষে ধসিয়ে দিয়েছিল। যে বাক্যটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতীয় ভাববাদের অদ্বৈত ঐক্যের প্রধান ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল, সামান্য একটি স্বরবর্ণের উপস্থিতির যুক্তিতে তা পরিণত হলো দ্বৈতবাদের সবচেয়ে স্পষ্ট ঘোষণাপত্রে। এটি কোনো অলৌকিক দাবি ছিল না; এটি ছিল ব্যাকরণের কাঠামোর ভেতর থেকেই ব্যাকরণকে কাজে লাগিয়ে টেক্সটের অর্থ উল্টে দেওয়ার এক চরম নিদর্শন।
মাধ্বের এই পদক্ষেপ অন্যান্য সমস্ত বেদান্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্কের জন্ম দেয়। প্রতিপক্ষ পণ্ডিতরা অভিযোগ করেন যে মাধ্ব নিজের মনগড়া মতবাদ প্রতিষ্ঠা করার জন্য বৈদিক বাণীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বিকৃত করছেন। কিন্তু মাধ্ব পিছু হটার পাত্র ছিলেন না। তিনি পাণিনীয় ব্যাকরণের সূক্ষ্ম নিয়মগুলো একের পর এক উদ্ধৃত করে দেখালেন যে তার করা সন্ধিচ্ছেদ কেবল ব্যাকরণগতভাবে নির্ভুলই নয়, বরং উপনিষদের সামগ্রিক প্রসঙ্গের সাথে এটিই একমাত্র সংগতিপূর্ণ পাঠ। তিনি প্রমাণ করতে চাইলেন যে পূর্ববর্তী ব্যাখ্যাকাররাই টেক্সটের ওপর এক কৃত্রিম অদ্বৈত ভাবাদর্শ চাপিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি কেবল টেক্সটের হারিয়ে যাওয়া মূল অর্থটিকে পুনরুদ্ধার করেছেন।
শ্বেতকেতুর অহংকার ও শিক্ষার মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট (Śvetaketu’s Arrogance and the Psychological Context of Instruction)
মাধ্ব কেবল ব্যাকরণের দোহাই দিয়ে ক্ষান্ত হননি; তিনি তার “অতৎ ত্বমসি” পাঠকে প্রতিষ্ঠিত করতে উপনিষদের আখ্যানের মনস্তাত্ত্বিক ও শিক্ষামূলক পরিস্থিতির আশ্রয় নেন। ছান্দোগ্য উপনিষদের শুরুতেই বলা হয়েছে যে শ্বেতকেতু বারো বছর ধরে গুরুগৃহে থেকে সমস্ত বেদ অধ্যয়ন করে বাড়ি ফিরেছিলেন। তার আচরণে বিনয়ের বিন্দুমাত্র লক্ষণ ছিল না, বরং তিনি ছিলেন অহংকারে স্ফীত ও উদ্ধত, যাকে টেক্সটে বলা হয়েছে “স্তব্ধ” এবং “মানী”। পিতা উদ্দালক পুত্রের এই মানসিক বৈকল্য ও পাণ্ডিত্যের অহংকার দূর করার জন্যই তাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে শুরু করেন।
মাধ্ব তার ব্যাখ্যার সমর্থনে এক সাধারণ মনস্তাত্ত্বিক যুক্তি হাজির করেন। একজন শিক্ষক যখন একজন অতি-অহংকারী এবং দাম্ভিক শিষ্যকে শিক্ষা দেন, তখন তার শিক্ষার উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত? নিশ্চয়ই সেই শিষ্যের অহংকারকে ভেঙে দিয়ে তাকে বিনয়ী করে তোলা। এখন, পিতা উদ্দালক যদি সেই অহংকারী পুত্রকে বারবার বলেন “শ্বেতকেতু, তুমিই এই মহাবিশ্বের পরম ঈশ্বর, তুমিই সমস্ত সৃষ্টির উৎস”, তবে শিষ্যের অহংকার কি কমবে নাকি তা আরও শতগুণ বৃদ্ধি পাবে? মাধ্বের মতে, অহংকারী মানুষকে “তুমিই ঈশ্বর” বলা মানে তার মানসিক ব্যাধিকে আরও উসকে দেওয়া। এটি কোনো সুশিক্ষকের কাজ হতে পারে না।
ফরাসি ভারততাত্ত্বিক সুজান সিওভ (Suzanne Siauve) তার গবেষণামূলক গ্রন্থ লা দকত্রিন দ্য মাধ্ব: দ্বৈত-বেদান্ত (La doctrine de Madhva: Dvaita-Vedānta) (1968)-এ মাধ্বের এই প্রাসঙ্গিক হার্মেনিউটিক্স অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। সিওভ দেখান, মাধ্ব কীভাবে বাক্যটির অর্থকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে পুরো গল্পের গতিপ্রকৃতির সাথে মিলিয়ে পড়েছিলেন। উদ্দালক পুত্রকে বিভিন্ন উপমা দিয়ে দেখাচ্ছিলেন যে মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রক সত্তা কত বিশাল ও সূক্ষ্ম, আর তার তুলনায় মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতা কত সীমাবদ্ধ। এই দীর্ঘ বর্ণনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে “তুমি সেই নও” বলাই ছিল সবচেয়ে স্বাভাবিক ও শিক্ষামূলক সমাপ্তি। এর মাধ্যমে শ্বেতকেতুর ভ্রান্ত অহংকার ভেঙে পড়ে এবং সে বুঝতে পারে যে সে মহাবিশ্বের পরম প্রভু নয়, বরং সে একজন অধীনস্থ ও নির্ভরশীল জীব মাত্র।
এই মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাটি উপনিষদের পাঠে এক নতুন যুক্তিযুক্ত মাত্রা যোগ করে। মাধ্ব দাবি করেন, অদ্বৈতবাদীরা টেক্সটের এই শিক্ষামূলক গতিশীলতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বাক্যটিকে একটি বিমূর্ত ভাববাদী সূত্রে রূপান্তর করেছিলেন। কিন্তু উপনিষদ কোনো আবেগহীন দর্শনের সংকলন নয়; এটি গুরু ও শিষ্যের মধ্যকার একটি জীবন্ত কথোপকথন। সংলাপের প্রেক্ষাপট, বক্তার উদ্দেশ্য এবং শ্রোতার মানসিক অবস্থান – এই সবকিছুকে বিবেচনায় নিলে “অতৎ ত্বমসি” পাঠটিই সবচেয়ে বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে। এইভাবে মাধ্ব টেক্সটের ব্যাকরণ এবং মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাকে এক সুতোয় গেঁথে তার ব্যাখ্যার দুর্গ নির্মাণ করেন।
উপমার পুনর্বিচার: নয়টি দৃষ্টান্তের দ্বৈতবাদী পাঠ (Re-evaluating the Analogies: Dvaitin Reading of the Nine Examples)
ছান্দোগ্য উপনিষদের ষষ্ঠ প্রপাঠকে উদ্দালক তার বক্তব্য প্রমাণ করতে নয়টি ভিন্ন ভিন্ন উপমা বা দৃষ্টান্ত ব্যবহার করেছিলেন। অদ্বৈতবাদীরা দাবি করতেন যে এই সমস্ত উপমার উদ্দেশ্য হলো সমস্ত বৈচিত্র্যের ভেতরে এক অভিন্ন সত্তাকে দেখানো। কিন্তু মাধ্ব তার বিভিন্ন গ্রন্থে এই নয়টি উপমার প্রতিটি খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখান যে এগুলোর একটিও অভিন্নতা প্রমাণ করে না, বরং প্রতিটি উপমাই জীব ও ঈশ্বরের মধ্যকার মৌলিক ভেদকে প্রতিষ্ঠিত করে। উপমাগুলোকে নিজেদের পক্ষে টেনে নেওয়ার এই লড়াইটি ছিল মধ্যযুগীয় ভারতীয় দর্শনের অন্যতম জমজমাট তাত্ত্বিক বিতর্ক।
প্রথমেই ধরা যাক বিভিন্ন গাছের মধুর উপমাটি। মৌমাছিরা বিভিন্ন ফুলের রস সংগ্রহ করে একটি মৌচাকে জমা করে এবং সেই রসগুলো এমনভাবে মিশে যায় যে আলাদা করে বলা যায় না কোনটি কোন ফুলের রস। অদ্বৈতবাদীরা বলতেন, এটি হলো ব্যক্তিসত্ত্বার ব্রহ্মে বিলীন হয়ে একাকার হয়ে যাওয়ার প্রমাণ। মাধ্ব এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে বললেন, ফুলের রসগুলো একত্রে মিশে গেলেও তারা কিন্তু একে অপরের সাথে এক হয়ে যায় না। তাদের নিজস্ব গুণ ও উপাদানগত পার্থক্য অপরিবর্তিত থাকে, কেবল মানুষের পক্ষে সেই পার্থক্য আলাদা করে চেনা সম্ভব হয় না। একইভাবে গভীর ঘুমে বা প্রলয়ে জীব যখন পরম সত্তার আশ্রয়ে যায়, তখন তাদের ভেতরের স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হয় না; কেবল তাদের সচেতন প্রকাশটি সাময়িকভাবে স্তব্ধ থাকে।
এরপর আসে নদী ও সমুদ্রের বিখ্যাত উপমা। পূর্ব ও পশ্চিমের নদীগুলো সমুদ্রে গিয়ে মিশে গেলে তাদের নাম ও রূপ হারিয়ে যায়। অদ্বৈতবাদীরা একে পরম অভেদ বলতেন। মাধ্ব যুক্তি দিলেন, নদীর জল যখন সমুদ্রে মেশে, তখন সেই জল কি সত্যি সত্যি সমুদ্রের জলে পুরোপুরি একাকার হয়ে যায়? সমুদ্রের জল লবণাক্ত, কিন্তু নদীর জল মিষ্টি। নদীর জল প্রবেশ করার ফলে সমুদ্রের জলের আয়তন বৃদ্ধি পায়, যা প্রমাণ করে যে দুটি ভিন্ন বস্তু সেখানে একত্রিত হয়েছে। যদি তারা সম্পূর্ণ এক হতো, তবে আয়তনের কোনো পরিবর্তন হতো না। জলরাশির এই সংমিশ্রণ কোনো সত্তাগত অভেদ নয়, এটি কেবল একটি মিশ্রণ যেখানে দুটি ভিন্ন উপাদান তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই সহাবস্থান করে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ ছিল জলে লবণের উপমার ব্যাখ্যা। জলের পাত্রে লবণ গলে গেলে চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সব জায়গা থেকেই নোনতা স্বাদ পাওয়া যায়। শঙ্কর এবং রামানুজ – উভয়েই এই উপমাটি দিয়ে ঈশ্বরের সর্বব্যাপী উপস্থিতি বা একত্ব প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। ভারততাত্ত্বিক ডেভিড বুখটা (David Buchta) তার তাত্ত্বিক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন কীভাবে মাধ্ব এই উপমার অদ্বৈত ব্যাখ্যাকে খারিজ করে দিয়েছিলেন। মাধ্ব বললেন, নোনা জল পান করার সময় মানুষ কিন্তু স্বাদ পায় লবণের, জলের নয়। জল আলাদা বস্তু এবং লবণ সম্পূর্ণ আলাদা বস্তু। তারা একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে থাকলেও জলের ধর্ম লবণে যায়নি, আবার লবণের ধর্মও জলে রূপান্তরিত হয়নি। জল ও লবণের এই সুস্পষ্ট পার্থক্যই তুলে ধরে যে জগত ও ঈশ্বর একসাথে অবস্থান করলেও তাদের মধ্যকার ভেদ চিরকাল অক্ষুণ্ণ থাকে।
বিকল্প পাঠ: তস্য ত্বমসি ও সাদৃশ্যের যুক্তি (Alternative Readings: Tasya Tvam Asi and the Logic of Similarity)
মাধ্ব কেবল “অতৎ ত্বমসি” পাঠের ওপরই তার সমস্ত বাজি ধরেননি। একজন অত্যন্ত সতর্ক এবং চতুর তার্কিক হিসেবে তিনি জানতেন যে প্রতিপক্ষ পণ্ডিতরা কোনোভাবেই সহজে এই সন্ধিচ্ছেদ মেনে নেবে না। তাই তিনি এক দ্বিতীয় স্তরের হার্মেনিউটিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মাধ্ব ঘোষণা করলেন, কোনো কারণে যদি “তৎ ত্বমসি” পাঠটিকেই ধরে রাখা হয়, তবুও সেখান থেকে অদ্বৈত বা অভেদ অর্থ বের করা অসম্ভব। প্রচলিত পাঠের ভেতরে থেকেও কীভাবে দ্বৈতবাদী অর্থ বের করা যায়, তার জন্য তিনি ব্যাকরণের আরও কিছু বিকল্প পথ উন্মুক্ত করলেন।
এর প্রথম বিকল্পটি হলো সমাসগত ব্যাখ্যা। মাধ্ব বললেন, “তৎ ত্বমসি” বাক্যের ‘তৎ’ পদটিকে একটি প্রথমা বিভক্তির পদ হিসেবে না দেখে এটিকে ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাসের সংক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ ‘তৎ’ মানে হলো “তস্য” বা “তার”। তাহলে পুরো বাক্যের অর্থ দাঁড়ায়: “তস্য ত্বমসি” (তুমি তার)। এর অর্থ হলো, হে শ্বেতকেতু, তুমি সেই পরমেশ্বরের দাস বা অধীনস্থ প্রজা। সংস্কৃত ব্যাকরণে এই ধরনের বিভক্তি লোপ পেয়ে সমাসবদ্ধ পদ তৈরি হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। একজন রাজার প্রজা যেমন বলতে পারে “আমি রাজার”, তেমনই একজন ভক্ত বা জীব বলতে পারে “আমি ঈশ্বরের”। এখানে কোনো সত্তাগত ঐক্যের দাবি নেই, বরং এটি হলো সম্পর্কের এক স্পষ্ট দ্বৈতবাদী সমীকরণ।
দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে মাধ্ব নিয়ে আসেন সাদৃশ্যের যুক্তি। সাধারণ ভাষাব্যবহারে কোনো একটি বস্তুর সাথে আরেকটি বস্তুর গভীর মিল থাকলে মানুষ রূপকভাবে একটিকে অন্যটির নাম দিয়ে ডেকে থাকে। যেমন অত্যন্ত সাহসী কোনো সৈন্যকে দেখে মানুষ বলে “ঐ লোকটি একটি সিংহ”। এর অর্থ এই নয় যে লোকটি চারপেয়ে একটি বন্য পশুতে রূপান্তরিত হয়েছে; এর অর্থ হলো লোকটির মধ্যে সিংহের মতো সাহস রয়েছে। মাধ্ব বললেন, “তৎ ত্বমসি” কথাটিকে যদি আক্ষরিকভাবেও গ্রহণ করা হয়, তবে তার অর্থ দাঁড়াবে: “তুমি সেই ঈশ্বরের মতো”। কারণ জীব চৈতন্যময় এবং ঈশ্বরও চৈতন্যময়। এই সাধারণ চৈতন্যের সাদৃশ্যের কারণে জীবকে রূপকভাবে পরম সত্তার নামে অভিহিত করা হয়েছে, কিন্তু এর দ্বারা তাদের সম্পূর্ণ এক হয়ে যাওয়া বোঝায় না।
মাধ্বের এই দ্বৈতমুখী কৌশল অদ্বৈতবাদীদের জন্য এক বিরাট তাত্ত্বিক সংকট তৈরি করেছিল। পণ্ডিত এল. স্টাফোর্ড বেটি (L. Stafford Betty) তার গ্রন্থ বদিরাজাস রেফিউটেশন অব শঙ্করস নন-ডুয়ালিজম (Vādirāja’s Refutation of Śaṅkara’s Non-Dualism) (1978)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে পরবর্তীকালের মাধ্ব অনুসারী ব্যাখ্যাকাররা, বিশেষ করে জয়তীর্থ এবং বাদিরাজ তীর্থ, এই যুক্তিগুলোকে আরও তীক্ষ্ণ ও দুর্ভেদ্য করে তুলেছিলেন। মাধ্ব প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে অদ্বৈতবাদীদের অর্থটি কোনো স্বতঃসিদ্ধ সত্য নয়, বরং তা বহু ব্যাখ্যার মধ্যে কেবল একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা মাত্র। ব্যাকরণ এবং অলংকার শাস্ত্রের সামান্য হেরফের ঘটিয়ে যে যেকোনো টেক্সট থেকে সম্পূর্ণ উল্টো সিদ্ধান্ত টেনে আনা যায়, মাধ্বের এই বিকল্প পাঠগুলো ছিল তার এক অবিসংবাদিত প্রমাণ।
ব্যাখ্যার রাজনীতি ও পাঠের মালিকানা (Politics of Interpretation and Ownership of the Text)
উপনিষদের এই মহাবাক্যটিকে কেন্দ্র করে শঙ্কর, রামানুজ এবং মাধ্বের মধ্যকার এই দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ কেবল ব্যাকরণ বা শব্দার্থবিদ্যার লড়াই ছিল না। এটি ছিল প্রাচীন ভারতের ধর্মীয় ক্ষমতার রাজনীতি এবং পাঠ্যের মালিকানা দখলের এক জটিল সামাজিক প্রক্রিয়া। কোনো একটি নতুন ধর্মীয় বা দার্শনিক আন্দোলন যখন সমাজে নিজের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে চাইত, তখন প্রাচীন বৈদিক পাঠ্যগুলোর সমর্থন আদায় করা ছিল তাদের জন্য অপরিহার্য। মাধ্ব যদি চাইতেন, তিনি উপনিষদের এই বাক্যটিকে ভ্রান্ত বা অবাস্তব বলে প্রত্যাখ্যান করতে পারতেন। কিন্তু বৈদিক সমাজে বেদের কর্তৃত্ব অস্বীকার করার অর্থ ছিল নাস্তিক হিসেবে চিহ্নিত হওয়া এবং সামাজিক বৈধতা হারানো।
ভারততাত্ত্বিক বি. এন. কে. শর্মা (B. N. K. Sharma) তার ইতিহাসমূলক গ্রন্থ আ হিস্ট্রি অব দ্য দ্বৈত স্কুল অব বেদান্ত অ্যান্ড ইটস লিটারেচার (A History of the Dvaita School of Vedānta and Its Literature) (2000)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে উদুপিতে মাধ্বের প্রতিষ্ঠিত অষ্ট মঠ এবং শৃঙ্গেরির অদ্বৈত মঠের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা চলেছিল। মাধ্বকে প্রমাণ করতেই হতো যে উপনিষদ মূলত দ্বৈতবাদের পক্ষেই কথা বলে। উপনিষদীয় পাঠের ওপর এই অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তিনি তার তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণাত্মক মেধা প্রয়োগ করেছিলেন। টেক্সটের আক্ষরিকতাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে তিনি এমন এক নতুন অর্থকাঠামো তৈরি করেছিলেন যা বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলনের রাজনৈতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেছিল।
এই বিতর্কটি আমাদের দেখায় যে কোনো একটি পাঠ বা টেক্সটের নিজস্ব কোনো একক, চিরকালীন অর্থ থাকে না। পাঠকের ঐতিহাসিক অবস্থান, তার দার্শনিক অঙ্গীকার এবং তার সামাজিক প্রয়োজন নির্ধারণ করে দেয় সে টেক্সটের ভেতর থেকে কোন অর্থটি উদ্ধার করবে। রিক্যুর বা গাডামারের মতো আধুনিক ব্যাখ্যাতাত্ত্বিকরা যে টেক্সটের উন্মুক্ততা এবং অর্থের বহুত্বের কথা বলেছেন, ত্রয়োদশ শতকের ভারতে মাধ্বের এই পাঠগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছিল তারই এক নিখুঁত ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। শঙ্কর যেখানে দেখেছিলেন সর্বজনীন একত্ব, রামানুজ যেখানে দেখেছিলেন শরীর ও আত্মার সম্পর্ক, মাধ্ব সেখানে আবিষ্কার করলেন চিরন্তন প্রভেদ।
সব মিলিয়ে “তৎ ত্বমসি” মহাবাক্যের মাধ্বীয় পাঠ ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে হার্মেনিউটিক্স বা পাঠ ব্যাখ্যার অন্যতম সাহসী অধ্যায়। মাত্র তিনটি শব্দের একটি বাক্যকে কেন্দ্র করে ব্যাকরণ, মনোবিজ্ঞান এবং সত্তাতত্ত্বের এমন গভীর ও বহুমুখী বিতর্ক পৃথিবীর অন্য কোনো দার্শনিক ঐতিহ্যে খুব কমই দেখা যায়। মাধ্ব হয়তো উপনিষদের প্রচলিত প্রবাহকে উল্টে দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে একটি টেক্সট কখনো স্থির বা মৃত নয়। ব্যাখ্যাকারীর হাত ধরে তা বারবার নতুন জীবনের সন্ধান পায় এবং যুগের পর যুগ ধরে নতুন নতুন অর্থ উৎপাদনের ক্ষেত্র তৈরি করে চলে।
পরবর্তী হিন্দু ধর্মীয় সাহিত্য ও বৈদিক পুনর্ব্যাখ্যা (Later Hindu Religious Literature and Vedic Reinterpretation): শ্রুতি-স্মৃতি, মহাকাব্য, পুরাণ ও ধর্মীয় ঐতিহ্য
ধর্মসূত্র ও স্মৃতিশাস্ত্রে বৈদিক কর্তৃত্ব (Vedic Authority in Dharmaśūtras and Dharmaśāstras): শ্রুতি-স্মৃতি, ধর্মবিধি ও সামাজিক বৈধতা
শ্রুতি ও স্মৃতির বিভাজনরেখা: বৈদিক প্রামাণ্যের তাত্ত্বিক ভিত্তি (The Demarcation between Śruti and Smṛti: Theoretical Foundations of Vedic Authority)
প্রাচীন ভারতের জ্ঞানতাত্ত্বিক ইতিহাসে একটি মজার দ্বন্দ্ব লক্ষ করা যায়। একদিকে রয়েছে অপৌরুষেয় বা কোনো মানুষের দ্বারা রচিত নয় বলে দাবি করা বৈদিক সংহিতা ও ব্রাহ্মণ গ্রন্থ, যা শ্রুতি (Śruti) নামে পরিচিত। অন্যদিকে রয়েছে মানুষের স্মৃতি ও ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বিশাল অনুশাসনমূলক রচনা, যার সাধারণ নাম স্মৃতি (Smṛti)। প্রশ্ন হলো, মানুষের লেখা আইনকানুন বা সামাজিক বিধিনিষেধ কীভাবে একটি প্রাচীন যজ্ঞকেন্দ্রিক ধর্মগ্রন্থের সমান বা তার কাছাকাছি কর্তৃত্ব দাবি করতে পারে? স্মৃতিশাস্ত্রের প্রণেতারা খুব সচেতনভাবেই জানতেন যে নিজেদের বক্তব্যকে সমাজের ওপর চাপিয়ে দিতে হলে একটি চূড়ান্ত ক্ষমতার উৎসের সাথে সেটিকে জুড়তে হবে। বৈদিক সাহিত্য ছিল সেই চূড়ান্ত পবিত্রতার প্রতীক। ফলে শ্রুতি ও স্মৃতির মধ্যে যে বিভাজনরেখা টানা হয়েছিল, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক ছিল না। এটি ছিল মূলত ক্ষমতার উৎস নির্ধারণের একটি হার্মেনিউটিক লড়াই।
শ্রুতিকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল এমন এক জ্ঞান হিসেবে যা চিরন্তন এবং যা ঋষিরা ধ্যানের মাধ্যমে দর্শন করেছিলেন। বিপরীতে স্মৃতি হলো সেই জ্ঞান যা মহর্ষিরা স্মরণ করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য লিপিবদ্ধ করে গেছেন। এই বিভাজন আপাতদৃষ্টিতে স্মৃতিকে দ্বিতীয় সারির মর্যাদা দিলেও ব্যবহারিক জীবনে স্মৃতির প্রভাব ছিল অনেক বেশি। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন কীভাবে চলবে, সম্পত্তি কীভাবে ভাগ হবে, বিয়ে কার সাথে কার হওয়া সম্ভব – এসব প্রশ্নের কোনো বিস্তারিত উত্তর ঋগ্বেদ বা যজুর্বেদের স্তোত্রে ছিল না। স্মৃতিকাররা তাই একটি জটিল তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করলেন। তারা বললেন, স্মৃতির প্রতিটি নির্দেশের পেছনে কোনো না কোনো শ্রুতিবাক্য বা বৈদিক অনুমোদন রয়েছে। যদি সরাসরি কোনো বৈদিক শ্লোক খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে ধরে নিতে হবে যে সেই সম্পর্কিত বৈদিক পাঠটি কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।
এই ধারণাকে শক্ত দার্শনিক ভিত্তি দেওয়ার কাজ করেছিলেন প্রাচীন ভারতীয় ব্যাখ্যাকাররা। পূর্ব মীমাংসা (Pūrva Mīmāṃsā) দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা জৈমিনি (Jaimini) তার বিখ্যাত গ্রন্থ মীমাংসাসূত্র (Mīmāṃsāsūtra)-এ স্মৃতির প্রামাণ্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। জৈমিনি দেখিয়েছেন যে শ্রুতি এবং স্মৃতির মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে শ্রুতির নির্দেশই প্রাধান্য পাবে। কিন্তু যেখানে সরাসরি কোনো বৈদিক বিরোধ নেই, সেখানে স্মৃতিকে প্রামাণ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। পরবর্তী সময়ে মীমাংসা দর্শনের প্রধান ভাষ্যকার কুমারিল ভট্ট (Kumārila Bhaṭṭa) তার তন্ত্রবার্তিক (Tantravārtika) গ্রন্থে এই অনুমিত বেদের তত্ত্বকে আরো জোরালো করেন। কুমারিল যুক্তি দেন যে স্মৃতির রচয়িতারা ছিলেন বেদের গভীর পণ্ডিত এবং তাদের সততা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তাই তারা নিশ্চয়ই এমন কোনো বৈদিক অনুশাসনের ভিত্তিতেই নিয়মগুলো তৈরি করেছিলেন যা হয়তো এখন আর সরাসরি পাওয়া যায় না (Olivelle, 2005)।
হার্মেনিউটিক্সের দৃষ্টিতে এই ব্যাখ্যাপদ্ধতিটি দারুণ কৌতূহলোদ্দীপক। এখানে হারিয়ে যাওয়া পাঠ্যের এক কাল্পনিক অস্তিত্ব নির্মাণ করা হচ্ছে বর্তমানের আইনকে বৈধতা দেওয়ার স্বার্থে। প্রাচীন শাস্ত্রকাররা খুব ভালো করেই বুঝতেন যে পরিবর্তিত বাস্তবতায় কেবল বৈদিক যজ্ঞের নিয়ম দিয়ে পরিবার বা সমাজ চালানো সম্ভব নয়। কিন্তু নতুন কোনো নিয়মকে ‘নতুন’ বললে সমাজ তা নাও মানতে পারে। তাই উদ্ভাবনকে রূপ দেওয়া হলো প্রাচীন স্মরণের মোড়কে। ঐতিহ্যের এই পুনর্নির্মাণ দেখায় যে কীভাবে একটি কর্তৃত্বহীন নতুন বিধানও পূর্ববর্তী প্রাচীন গ্রন্থের অদৃশ্য উপস্থিতির অজুহাতে সর্বোচ্চ সামাজিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে। শ্রুতি ও স্মৃতির এই সম্পর্কটি শেষ পর্যন্ত নিছক ধর্মতত্ত্ব থাকেনি, বরং তৎকালীন সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার এক চমৎকার আইনি কৌশলে পরিণত হয়েছিল।
ধর্মসূত্রের উদ্ভব ও পুরোহিতীয় কর্তৃত্বের বিস্তৃতি (The Emergence of Dharmaśūtras and Expansion of Priestly Authority)
বৈদিক সাহিত্যের শেষভাগে কল্পসূত্রের শাখা হিসেবে সূত্র সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। যাগযজ্ঞের নিয়ম নিয়ে তৈরি হয়েছিল শ্রৌতসূত্র (Śrautasūtra) এবং গৃহস্থের দৈনন্দিন পারিবারিক আচার নিয়ে তৈরি হয়েছিল গৃহ্যসূত্র (Gṛhyasūtra)। কিন্তু সমাজ যখন আরও বড় হলো, মানুষ যখন যাযাবর বা ছোট গ্রামীণ গণ্ডি ছাড়িয়ে বড় জনপদ ও নগরজীবনের মুখোমুখি হতে শুরু করল, তখন কেবল পারিবারিক আচার দিয়ে সব মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না। এই শূন্যতা থেকেই খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ থেকে তৃতীয় শতকের মধ্যে জন্ম নিল ধর্মসূত্র (Dharmaśūtras)। আপস্তম্ব, গৌতম, বৌধায়ন এবং বশিষ্ঠের মতো প্রাচীন পণ্ডিতেরা এই সংক্ষিপ্ত গদ্য সূত্রের মাধ্যমে মানুষের সামাজিক অধিকার, বর্ণাশ্রমের দায়িত্ব এবং বিচারপদ্ধতিকে বিধিবদ্ধ করতে শুরু করলেন।
ধর্মসূত্রগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সেগুলোর সংক্ষিপ্ত ও ছন্দহীন ভাষা। মনে রাখার সুবিধার জন্য অত্যন্ত সংহত ভাষায় নিয়মগুলো সাজানো হয়েছিল। সমাজবিজ্ঞানী ও আইনতাত্ত্বিক রবার্ট লিঙ্গাত (Robert Lingat) তার প্রামাণ্য গ্রন্থ দ্য ক্লাসিক্যাল ল অব ইন্ডিয়া (The Classical Law of India)-তে দেখিয়েছেন যে এই সূত্রগুলো প্রথম দিকে কোনো রাষ্ট্র বা রাজার চাপিয়ে দেওয়া আইন ছিল না (Lingat, 1973)। এগুলো ছিল বিভিন্ন বৈদিক চারণশালা বা পাঠশালার অভ্যন্তরীণ নির্দেশিকা। প্রতিটি বৈদিক শাখার নিজস্ব গৃহ্য ও ধর্মসূত্র ছিল। কিন্তু খুব দ্রুতই এই পাঠশালাভিত্তিক অনুশাসনগুলো সর্বজনীন রূপ নিতে শুরু করে। এর কারণ ছিল পুরোহিত শ্রেণির সামাজিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
ধর্মসূত্রগুলোর ভেতরে গভীরভাবে তাকালে দেখা যায় যে কীভাবে বৈদিক পাঠকে একটি সামাজিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। গৌতম বা আপস্তম্বের সূত্রে বারবার জোর দেওয়া হয়েছে যে বৈদিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্রাহ্মণই হবেন সমাজের নৈতিক ও আইনি দিকনির্দেশক। যদি কোনো বিষয়ে স্পষ্ট বিধান না থাকে, তবে দশজন বা অন্তত তিনজন বৈদিক পণ্ডিতের একটি দল, যার নাম পরিষদ (Pariṣad), যে সিদ্ধান্ত দেবে সেটিই ধর্মের মর্যাদা পাবে। অর্থাৎ ক্ষমতার চাবিকাঠি চলে গেল পাঠের ব্যাখ্যাকারদের হাতে। রাজা শাসন করবেন ঠিকই, কিন্তু সেই শাসনের বৈধতা আসবে বৈদিক জ্ঞানসম্পন্ন পুরোহিতের অনুমোদনের মাধ্যমে। এই ব্যবস্থা রাজার ক্ষমতার ওপরেও এক ধরনের ধর্মীয় নজরদারি কায়েম করেছিল।
এই ধর্মসূত্রগুলোর মধ্য দিয়ে পুরোহিতীয় কর্তৃত্ব কেবল মন্দিরে বা যজ্ঞবেদীতে সীমাবদ্ধ রইল না। তা মানুষের জন্ম, বিবাহ, খাদ্যগ্রহণ, অশৌচ পালন এমনকি মৃত্যুর পরের ক্রিয়াকর্ম পর্যন্ত বিস্তৃত হলো। অর্থনৈতিক লেনদেন বা ঋণের সুদের হার কেমন হবে, সে বিষয়েও বিধান দেওয়া শুরু হলো। প্রাচীন ভারততাত্ত্বিক প্যাট্রিক অলিভেল (Patrick Olivelle) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে ধর্মসূত্রকাররা একদিকে সমকালীন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনকে স্বীকার করছিলেন, অন্যদিকে সেই পরিবর্তনকে প্রাচীন বৈদিক আদর্শের নিয়ন্ত্রণে আনার অবিরাম চেষ্টা চালাচ্ছিলেন (Olivelle, 2005)। ফলে ধর্মসূত্র কেবল আইনের বই ছিল না, এটি ছিল একটি উদীয়মান শ্রেণিবিন্যস্ত সমাজের ওপর নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর জ্ঞানতাত্ত্বিক ও সামাজিক আধিপত্য বিস্তারের প্রথম সুসংগঠিত লিখিত দলিল।
মনুস্মৃতি ও বৈদিক মূলকরণের কৌশল (Manusmṛti and Strategies of Vedic Rooting)
ধর্মসূত্রের সংক্ষিপ্ত গদ্যের যুগ পেরিয়ে যখন শ্লোকবদ্ধ স্মৃতিশাস্ত্রের যুগ শুরু হলো, তখন যে গ্রন্থটি পুরো ভারতীয় উপমহাদেশের আইনি ও সামাজিক ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল, তা হলো মনুস্মৃতি (Manusmṛti) বা মানবধর্মশাস্ত্র (Mānavadharmaśāstra)। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকের মধ্যে এই বিশাল সংকলনটি পূর্ণ রূপ পায়। মনুর রচয়িতারা ধর্মসূত্রের কঠোর ও জটিল শৈলী বাদ দিয়ে সহজ অনুষ্টুপ ছন্দ বেছে নিয়েছিলেন। ফলে এর শ্লোকগুলো আবৃত্তি করা এবং লোকস্মৃতিতে গেঁথে দেওয়া অনেক সহজ হয়েছিল। কিন্তু মনুর সবচেয়ে বড় কৌশলটি ছিল তার তাত্ত্বিক দাবির মধ্যে। মনু এক অবিশ্বাস্য ঘোষণা দিয়ে বসলেন: সমগ্র বেদই ধর্মের মূল ভিত্তি।
শ্লোকের ভাষায় বলা হলো, “বেদোঽখিলো ধর্মমূলম্”। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ ধর্মীয় স্তুতি মনে হতে পারে। তবে এর পেছনের আইনি রাজনীতি অত্যন্ত গভীর। ঋগ্বেদ বা সামবেদে কোথাও কি চুরি করার শাস্তি, বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমির সীমানা নির্ধারণের স্পষ্ট নিয়ম আছে? উত্তর হলো, নেই। তাহলে মনু কেন সমগ্র বেদকে সব ধরনের আইনের মূল ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করলেন? মার্কিন ভারততাত্ত্বিক ওয়েন্ডি ডনিগার (Wendy Doniger) তার এবং ব্রায়ান কে. স্মিথের যৌথ অনুবাদে দেখিয়েছেন যে মনুর এই বৈদিকীকরণের প্রক্রিয়াটি ছিল আসলে একটি প্রতীকী ক্ষমতা দখলের লড়াই (Doniger & Smith, 1991)। সমকালীন সমাজে বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্মের মতো বৈদিক কর্তৃত্ব-অস্বীকারকারী আন্দোলনগুলোর যে তীব্র উত্থান ঘটেছিল, তার বিপরীতে সনাতন বৈদিক ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন দাবি করা ছিল মনুর মূল উদ্দেশ্য।
মনুস্মৃতির প্রণেতারা জানতেন যে তাদের প্রস্তাবিত বহু বিধানই বৈদিক সমাজের বাস্তবতার সাথে মেলে না। ঋগ্বৈদিক সমাজে যা ছিল অনেকটাই অনানুষ্ঠানিক ও পরিবর্তনশীল, মনুস্মৃতিতে তা হয়ে উঠল কঠোর এবং অপরিবর্তনীয়। এই রূপান্তরকে সিদ্ধ করার জন্য তারা বৈদিক কর্তৃত্বের ছাতা ব্যবহার করলেন। মনুস্মৃতির বয়ানে বলা হলো, প্রজাপতি ব্রহ্মা স্বয়ং এই শাস্ত্র মনুকে দিয়েছিলেন এবং মনু তা ভৃগুর মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রচার করেছেন। এই পৌরাণিক বয়ানের সাথে বৈদিক মূলের দাবি যুক্ত হয়ে এক অদ্ভুত বৈধতা তৈরি করল। যে কোনো সাধারণ বা স্থানীয় অনুশাসনকেও যখন মনুর শ্লোকে অন্তর্ভুক্ত করা হলো, তখন তা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বৈদিক অনুমোদনপ্রাপ্ত হয়ে উঠল।
এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে স্মৃতিকাররা বৈদিক পাঠের অর্থে এক বিশাল পরিবর্তন ঘটালেন। তারা সরাসরি বৈদিক মন্ত্র উদ্ধৃত করার প্রয়োজন মনে করলেন না। তার বদলে বৈদিক ভাবাবেগকে ব্যবহার করে এমন সব বিধান দিলেন যা সম্পূর্ণরূপে তৎকালীন রাজতান্ত্রিক ও বর্ণভিত্তিক স্বার্থের অনুকূলে যায়। আইন ও সমাজের এই সমন্বয় ছিল মূলত একটি হার্মেনিউটিক কারসাজি। এখানে বেদ একটি বাস্তব পাঠ্য হিসেবে উপস্থিত থাকে না, উপস্থিত থাকে একটি অবিতর্কিত প্রতীক হিসেবে। মনুস্মৃতি প্রমাণ করে যে কোনো প্রাচীন গ্রন্থের বাস্তব পাঠ ছাড়াই কীভাবে তার নাম ও ভাবমূর্তিকে ব্যবহার করে একটি নতুন সামাজিক সংবিধান রচনা করা যায় এবং তাকে অলঙ্ঘনীয় মর্যাদা দেওয়া সম্ভব হয়।
সদাচার, শিষ্ট ও বৈদিক কর্তৃত্বের বাস্তব প্রয়োগ (Sadācāra, Śiṣṭa and the Empirical Application of Vedic Authority)
স্মৃতিশাস্ত্রকাররা কেবল আকাশকুসুম তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন না। তারা জানতেন যে বইয়ের নিয়ম আর মাটির বাস্তবতার মধ্যে সব সময় ফারাক থাকে। জীবন এত বিচিত্র যে সব সমস্যার সমাধান কোনো একটি নির্দিষ্ট গ্রন্থে লিখে রাখা অসম্ভব। এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে মনু এবং তার অনুসারীরা ধর্মের চারটি স্পষ্ট উৎসের কথা বলেছিলেন। প্রথমটি হলো বেদ বা শ্রুতি; দ্বিতীয়টি স্মৃতি; তৃতীয়টি হলো সৎ মানুষদের আচরণ বা সদাচার (Sadācāra); এবং চতুর্থটি হলো নিজের অন্তরাত্মার সন্তুষ্টি। এই ক্রমতালিকায় তৃতীয় উপাদানটি, অর্থাৎ সদাচার, বাস্তব সমাজে আইনের গতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল।
তবে এখানে একটি জরুরি প্রশ্ন তৈরি হয়। এই ‘সৎ মানুষ’ কারা, যাদের আচরণকে আইনের মর্যাদা দেওয়া হবে? ধর্মসূত্র এবং স্মৃতিশাস্ত্রগুলো এই সৎ মানুষদের নাম দিয়েছিল শিষ্ট (Śiṣṭa)। বশিষ্ঠ ধর্মসূত্রে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে, শিষ্ট হলেন সেই ব্যক্তি যিনি কাম ও ক্রোধ থেকে মুক্ত, যিনি অর্থলোভী নন এবং যিনি যথাযথভাবে বৈদিক শাখা অধ্যয়ন করেছেন। এর অর্থ দাঁড়ায়, সমাজের যে কোনো সাধারণ মানুষ ভালো কাজ করলেই তা সদাচার হিসেবে গণ্য হবে না। শিষ্ট হতে হলে উচ্চবর্ণের পুরুষ হতে হবে এবং তার বৈদিক শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হবে। ব্রিটিশ আইন-ইতিহাসবিদ জে. ডানকান এম. ডেরেট (J. Duncan M. Derrett) তার বিভিন্ন গবেষণায় দেখিয়েছেন যে শিষ্টের এই ধারণাটি মূলত প্রভাবশালী পুরোহিত অভিজাতদের হাতে সামাজিক রীতিনীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তুলে দিয়েছিল (Derrett, 1968)।
এর বাস্তব প্রভাব ছিল অনেক দূরপ্রসারী। ভারতবর্ষের মতো বিশাল ভৌগোলিক অঞ্চলে হাজারো উপজাতি, স্থানীয় গোষ্ঠী এবং পেশাজীবী সম্প্রদায় ছিল। তাদের নিজস্ব বহু প্রথা ছিল যা বৈদিক সাহিত্যের ধারকাছ দিয়েও যেত না। এখন প্রশ্ন হলো, স্মৃতিশাস্ত্র কি সেই প্রথাগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছিল? বাস্তবে তা ঘটেনি। স্মৃতিকাররা খুব চতুরভাবে সদাচারের ধারণাকে সম্প্রসারিত করলেন। তারা বললেন, যদি কোনো অঞ্চলের প্রচলিত প্রথা শ্রুতির প্রত্যক্ষ বিরোধী না হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য। এই অনুমোদনের দায়িত্ব দেওয়া হলো শিষ্ট পণ্ডিতদের। শিষ্টরা যদি কোনো স্থানীয় প্রথাকে সমাজে শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে মেনে নিতেন, তবে তাকে ঘুরিয়ে বৈদিক অনুমোদনের পোশাক পরিয়ে দেওয়া হতো।
এই হার্মেনিউটিক কৌশলের ফলে বৈদিক কর্তৃত্ব একটি নমনীয় রূপ পেয়েছিল। প্রাচীন ভারততাত্ত্বিকদের একাংশ মনে করেন, এই ব্যবস্থা না থাকলে বৈদিক অনুশাসন বহু আগেই অচল হয়ে পড়ত। সদাচারের মাধ্যমে স্মৃতিশাস্ত্র একদিকে প্রাচীন বৈদিক কর্তৃত্বের বিশুদ্ধতা বজায় রাখার দাবি করতে পেরেছিল, অন্যদিকে প্রতিদিনের বাস্তব সামাজিক চাহিদার সাথে আপস করার পথও খোলা রেখেছিল। কিন্তু এই নমনীয়তার একটি বড় সামাজিক মূল্য ছিল। শিষ্টদের হাতে এই ক্ষমতা থাকার ফলে সামাজিক ক্ষমতার মূল কেন্দ্রটি সব সময় নির্দিষ্ট একটি সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির হাতেই বন্দি থেকে গিয়েছিল, যা অন্য কোনো প্রান্তিক গোষ্ঠীকে আইনি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কোনো কণ্ঠস্বর দেয়নি।
সামাজিক বিধিব্যবস্থা, জাতিভেদ ও পিতৃতান্ত্রিক শৃঙ্খলা (Social Regulations, Caste Hierarchy and Patriarchal Order)
ধর্মসূত্র ও স্মৃতিশাস্ত্রের সবচেয়ে স্থায়ী এবং বিতর্কিত অবদান ছিল একটি কঠোর সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস এবং কঠোর পারিবারিক শৃঙ্খলার প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান। ঋগ্বেদের শেষভাগে পুরুষসূক্তে চতুর্বর্ণের যে মহাজাগতিক রূপক তৈরি হয়েছিল, স্মৃতিশাস্ত্রে এসে তা পরিণত হলো রক্ত, জন্ম এবং শাস্তির এক অলঙ্ঘনীয় আইনি বেড়াজালে। এখানে সামাজিক বৈষম্য কোনো দুর্ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল ধর্মের মূল স্তম্ভ। এই পুরো বৈষম্যমূলক কাঠামোটিকে বৈধতা দেওয়ার জন্য বৈদিক কর্তৃত্বকে বারবার সামনে টেনে আনা হয়েছিল। উচ্চবর্ণের জন্মগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং নিম্নবর্ণের অধীনতাকে এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যেন এটি প্রকৃতিরই এক শাশ্বত বৈদিক নিয়ম।
ইতিহাসবিদ রামশরণ শর্মা (Ram Sharan Sharma) তার আকরগ্রন্থ শূদ্রাস ইন অ্যানশিয়েন্ট ইন্ডিয়া (Śūdras in Ancient India)-তে বিস্তারিত দেখিয়েছেন যে কীভাবে স্মৃতিশাস্ত্রগুলো শূদ্রদের বৈদিক জ্ঞানচর্চা থেকে আইনত বিচ্ছিন্ন করেছিল (Sharma, 1958)। বৈদিক মন্ত্র শোনা বা উচ্চারণের অপরাধে নিম্নবর্ণের মানুষের জন্য যে ধরনের শারীরিক ও আর্থিক দণ্ডের বিধান মনুস্মৃতি বা গৌতম ধর্মসূত্রে দেওয়া হয়েছে, তা ছিল জ্ঞানের ওপর একচেটিয়া পুরোহিতীয় নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রাখারই নামান্তর। উপনয়ন সংস্কার এবং বৈদিক অধ্যয়ন কেবল প্রথম তিন বর্ণের, বিশেষ করে ব্রাহ্মণদের জন্য সংরক্ষিত রেখে শূদ্র ও অন্ত্যজদের কার্যত প্রাতিষ্ঠানিক অধিকারহীন করে রাখা হয়েছিল। এখানে বেদ কোনো আধ্যাত্মিক মুক্তির বিষয় ছিল না, বরং তা হয়ে উঠেছিল সামাজিক সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের মাপকাঠি।
একই ধরনের বৈদিক যুক্তি প্রয়োগ করা হয়েছিল পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। স্মৃতিশাস্ত্রগুলোতে যে পরিবারকাঠামোর চিত্র পাওয়া যায়, তা ছিল আগাগোড়া পিতৃতান্ত্রিক (Patriarchal) এবং পিতৃসূত্রীয় (Patrilineal)। নারীবাদী ইতিহাসবিদ উমা চক্রবর্তী (Uma Chakravarti) তার বহু গবেষণায় বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে প্রাচীন ভারতীয় আইনে নারীর যৌনতা ও স্বাধীন ইচ্ছাকে সম্পূর্ণভাবে পিতৃতান্ত্রিক শৃঙ্খলার অধীন করা হয়েছিল (Chakravarti, 1993)। চক্রবর্তী একে ‘ব্রাহ্মণ্যবাদী পিতৃতন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মনুর সেই বিখ্যাত উক্তি – নারী শৈশবে পিতার, যৌবনে স্বামীর এবং বার্ধক্যে পুত্রের অধীনে থাকবে, সে কখনোই স্বাতন্ত্র্যের যোগ্য নয় – কেবল একটি বিচ্ছিন্ন মত ছিল না। এটি ছিল পারিবারিক সম্পত্তি রক্ষা এবং রক্তের বিশুদ্ধতা টিকিয়ে রাখার একটি সমাজতাত্ত্বিক কৌশল।
মজার বিষয় হলো, এই কঠোর লিঙ্গীয় নিয়ন্ত্রণের পেছনেও বৈদিক প্রতীককে ব্যবহার করা হয়েছিল। ঋগ্বৈদিক যুগে নারীদের কিছু ক্ষেত্রে যজ্ঞে উপস্থিতি বা শিক্ষার যে বিক্ষিপ্ত উল্লেখ দেখা যায়, স্মৃতিশাস্ত্রের যুগে এসে তা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হলো। মনু নিদান দিলেন যে নারীর জন্য পৃথক কোনো যজ্ঞ বা বৈদিক সংস্কার নেই। স্বামীর সেবাই হলো স্ত্রীর বৈদিক যজ্ঞ, আর বিবাহই হলো তার জন্য বৈদিক উপনয়নের সমতুল্য। অর্থাৎ, প্রাচীন বৈদিক কর্তৃত্বকে ব্যবহার করেই বৈদিক অধিকার থেকে নারীকে পুরোপুরি বঞ্চিত করা হলো। ধর্মের এই অদ্ভুত হার্মেনিউটিক্স দেখায় যে কীভাবে একটি পবিত্র প্রাচীন উত্তরাধিকারকে সুবিধাজনকভাবে ব্যাখ্যা করে সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণভাবে অধিকারহীন করে ফেলা সম্ভব হয়েছিল।
হার্মেনিউটিক রূপান্তর: বৈদিক শূন্যতা পূরণ ও বিধিবদ্ধকরণ (Hermeneutical Transformation: Filling the Vedic Void and Codification)
ধর্মসূত্র ও স্মৃতিশাস্ত্রের এই দীর্ঘ বিকাশধারাকে যদি আধুনিক ব্যাখ্যাতত্ত্বের আলোতে দেখা যায়, তবে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রাচীন বৈদিক পাঠ্যে একটি বিরাট ব্যবহারিক শূন্যতা ছিল। সেই শূন্যতা তৈরি হয়েছিল ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়মে। একটি পশুপালক ও প্রাথমিক কৃষিনির্ভর সমাজের প্রার্থনাসংগীত কখনো একটি জটিল নগরকেন্দ্রিক, বাণিজ্যিক ও রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সামগ্রিক আইনকানুন সরবরাহ করতে পারে না। স্মৃতিশাস্ত্রের লেখকেরা সচেতন বা অবচেতনভাবে এই ঐতিহাসিক ব্যবধানটি বুঝতে পেরেছিলেন। তাদের সামনে পথ ছিল দুটি: হয় বেদকে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করে সম্পূর্ণ নতুন সামাজিক দর্শন তৈরি করা, নয়তো বেদকেই সব কিছুর মূল হিসেবে জাহির করে তার ভেতরে নিজেদের প্রয়োজনীয় সব নিয়মকে জুড়ে দেওয়া। তারা দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন।
তুলনামূলক সাহিত্যের তাত্ত্বিক ও সংস্কৃত বিশারদ শেলডন পোলক (Sheldon Pollock) তার প্রভাবশালী গ্রন্থ দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অব দ্য গডস ইন দ্য ওয়ার্ল্ড অব মেন (The Language of the Gods in the World of Men)-এ দেখিয়েছেন যে ভারতীয় ঐতিহ্যে কোনো কিছুকে উদ্ভাবন হিসেবে স্বীকার করার চেয়ে পুনরুজ্জীবন হিসেবে দেখানো ছিল অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য (Pollock, 2006)। স্মৃতিশাস্ত্রের লেখকেরা ঠিক এই কাজটি করেছিলেন। তারা নিজেদের সমসাময়িক প্রয়োজন, সামাজিক পক্ষপাত এবং রাজনৈতিক স্বার্থকে উপস্থাপন করেছিলেন একটি প্রাগৈতিহাসিক সত্যের পুনরাবৃত্তি হিসেবে। এই প্রক্রিয়ায় বেদের আদি অর্থ পরিবর্তিত হয়ে এক সম্পূর্ণ নতুন আইনি অর্থ তৈরি হয়েছিল।
ভারততত্ত্বের প্রবাদপ্রতিম পণ্ডিত পাণ্ডুরং বামন কানে (Pandurang Vaman Kane) তার সুবিশাল বহু খণ্ডের আকরগ্রন্থ হিস্ট্রি অব ধর্মশাস্ত্র (History of Dharmaśāstra)-এ দেখিয়েছেন যে স্মৃতিশাস্ত্র কোনো স্থবির বিষয় ছিল না (Kane, 1930)। মনুস্মৃতি বা যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতি রচিত হওয়ার পরও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মেধাতিথি, বিজ্ঞানেশ্বর বা জীমূতবাহনের মতো প্রখ্যাত ভাষ্যকাররা এগুলোর ওপর বিস্তারিত টীকা রচনা করেছেন। বিজ্ঞানেশ্বর যখন দ্বাদশ শতকে তার বিখ্যাত মিতাক্ষরা (Mitākṣarā) টীকা লিখছেন, তখন তিনি সম্পত্তি ও দায়ভাগের এমন সব নিয়ম ব্যাখ্যা করছেন যা মনুর সময়ে কল্পনাই করা যেত না। কিন্তু বিজ্ঞানেশ্বরও দাবি করছেন যে তিনি প্রাচীন স্মৃতি এবং শ্রুতির নির্দেশই ব্যাখ্যা করছেন মাত্র।
এই যে মূল পাঠকে অক্ষত রেখে তার ব্যাখ্যাকে ক্রমাগত ভেঙে নতুন রূপ দেওয়া, এটাই ছিল বৈদিক হার্মেনিউটিক্সের মূল চালিকাশক্তি। এর মাধ্যমে সমাজে স্থিতিশীলতার একটি কৃত্রিম অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। মানুষ ভাবত তারা সেই হাজার বছরের পুরনো বৈদিক শৃঙ্খলার মধ্যেই বাস করছে, অথচ বাস্তবে তারা চলত সমকালীন টীকাকারদের উদ্ভাবিত নিয়মে। বৈদিক কর্তৃত্ব তাই স্মৃতিশাস্ত্রে কোনো স্থির অনুশাসন ছিল না, এটি ছিল একটি উন্মুক্ত আইনি কৌশল। এই কৌশল ব্যবহার করে প্রাচীন ভারত একদিকে সামাজিক পরিবর্তনের ধাক্কা সামলেছে, অন্যদিকে পিতৃতান্ত্রিক ও বর্ণবাদী ক্ষমতার অক্ষটিকে হাজার বছর ধরে অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছে। বৈদিক পাঠের এই চতুর রূপান্তরই স্মৃতিশাস্ত্রকে ভারতীয় উপমহাদেশের সামাজিক ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী দলিলের মর্যাদা দিয়েছে।
মহাকাব্য ও ভগবদ্গীতায় বৈদিক পুনর্ব্যাখ্যা (Vedic Reinterpretation in the Epics and Bhagavad Gītā): রামায়ণ, মহাভারত, যজ্ঞ ও ধর্মের রূপান্তর
পঞ্চম বেদ হিসেবে মহাকাব্যের আত্মপ্রকাশ: বৈদিক কর্তৃত্বের সম্প্রসারণ (Emergence of the Epics as the Fifth Veda: Expansion of Vedic Authority)
প্রাচীন ভারতের চিন্তাজগতে যখন মহাকাব্যের যুগ শুরু হলো, তখন সমাজ আর আগের মতো বৈদিক চারণভূমির সহজ নিয়মে চলছিল না। নগর গড়ে উঠেছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার ঘটছে এবং নানা অঞ্চলের মানুষের মিশ্রণ তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তনশীল সময়ে মানুষের কাছে বৈদিক স্তোত্রগুলোর জটিল রূপক বা দুর্বোধ্য ছন্দ আর আগের মতো সহজে পৌঁছাচ্ছিল না। ঠিক এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে রামায়ণ ও মহাভারতের মতো সুবিশাল আখ্যানগুলো শুধু সাহিত্যের সীমানায় থেমে থাকেনি। রচয়িতারা এগুলোকে এক অভিনব মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। মহাভারতের মতো সুবিশাল পাঠ্যকে ঘোষণা করা হলো পঞ্চম বেদ (Pañcama Veda) হিসেবে। এই দাবি কোনো সাধারণ সাহিত্যিক আত্মশ্লাঘা ছিল না; এটি ছিল একটি সচেতন সামাজিক কৌশল, যার মাধ্যমে পরিবর্তিত সময়ের উপযোগী নতুন বয়ানকে প্রাচীনতম বৈদিক কর্তৃত্বের সমকক্ষ করে তোলার প্রয়াস নেওয়া হয়েছিল।
বৈদিক যুগের সংহিতা বা ব্রাহ্মণ সাহিত্যের প্রবেশাধিকার ছিল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। কেবল উপনয়ন হওয়া উচ্চবর্ণের পুরুষদের জন্যই সেই জ্ঞান নির্দিষ্ট রাখা হয়েছিল। সমাজের এক বিশাল অংশ, বিশেষ করে নারী ও নিম্নবর্ণের মানুষেরা, সেই আলোচনা থেকে বাইরেই রয়ে গিয়েছিল। মহাকাব্যগুলো এই সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক নতুন হার্মেনিউটিক রাস্তা তৈরি করল। ইতিহাস ও পুরাণকে বলা হলো বেদের চোখ ও কান। মহাভারতে স্পষ্ট করেই বলা হলো, যে ব্যক্তি বেদ জানে কিন্তু ইতিহাস ও পুরাণ জানে না, সে প্রকৃতপক্ষে বেদবিদ নয়। ইতিহাস ও পুরাণের মাধ্যমে বেদকে রক্ষা করতে হবে, নয়তো বেদ ভয় পাবে যে কোনো অনভিজ্ঞ মানুষ তাকে খণ্ডিত করে ফেলছে। অর্থাৎ, প্রাচীন বৈদিক পাঠ্যের যে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল, মহাকাব্য নিজেকে তার যোগ্য পরিপূরক হিসেবে হাজির করল।
আমেরিকান ভারততাত্ত্বিক আলফ হিল্টেবিটেল (Alf Hiltebeitel) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে মহাভারতের রচয়িতারা কোনো বিচ্ছিন্ন পৌরাণিক গল্প বলছিলেন না, তারা খুব সুপরিকল্পিতভাবে বৈদিক সংকটের একটি তাত্ত্বিক মীমাংসা খুঁজছিলেন (Hiltebeitel, 2001)। বৈদিক যুগের অন্তিম পর্বে যখন যাগযজ্ঞের অর্থহীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে এবং জৈন বা বৌদ্ধদের মতো অবৈদিক ধারাগুলো সমাজের মনোযোগ আকর্ষণ করছে, তখন মহাকাব্যের লেখকেরা ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্যকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিলেন। তারা প্রাচীন বৈদিক চরিত্র ও দেবমণ্ডলীকে সম্পূর্ণ বর্জন করেননি। বরং তাদের এক বিশাল আখ্যানের ভেতরে স্থান দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছিলেন। এর ফলে মহাকাব্য হয়ে উঠল বৈদিক ধ্যানধারণার এক জনপ্রিয় ও সর্বজনীন অনুবাদ।
একইভাবে ভারততাত্ত্বিক জোহানেস ব্রঙ্কহর্স্ট (Johannes Bronkhorst) বৃহত্তর মগধ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে বৈদিক সংস্কৃতি যখন পূর্ব ভারতে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন তাকে নানা স্থানীয় ও শ্রমণীয় বিশ্বাসের সাথে আপস করতে হয়েছিল (Bronkhorst, 2007)। মহাকাব্যগুলো সেই আপসের চমৎকার নিদর্শন। অন্যদিকে ডাচ ভারততাত্ত্বিক জে. এ. বি. ভ্যান বুইটেনেন (J. A. B. van Buitenen) মহাভারতের অনুবাদ ও বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে পঞ্চম বেদ হিসেবে মহাকাব্যের দাবি আসলে বৈদিক ভাবাদর্শকে গণতান্ত্রিক রূপ দেওয়ার একটি চতুর প্রয়াস ছিল (van Buitenen, 1973)। এখানে বৈদিক কর্তৃত্ব হারিয়ে যায়নি, বরং গল্পের কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে তা আরও বেশি মানুষের মননে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল।
রামায়ণে বৈদিক মূল্যবোধ ও রাজধর্মের পুনর্বিন্যাস (Vedic Values and the Realignment of Rājadharma in the Rāmāyaṇa)
বাল্মীকি রামায়ণের সূচনা পর্বটির দিকে তাকালে বোঝা যায় যে এই মহাকাব্য কতটা গভীরভাবে বৈদিক ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত। অযোধ্যার রাজা দশরথ যখন অপুত্রক থাকার বেদনায় কাতর, তখন তিনি কোনো সাধারণ পারিবারিক পরামর্শ গ্রহণ করছেন না। তিনি আয়োজন করছেন বৈদিক পুত্রকামেষ্টি যজ্ঞ (Putrakāmeṣṭi Yajña) এবং সেই সাথে পরিচালিত হচ্ছে রাজকীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক অশ্বমেধ যজ্ঞ (Aśvamedha Yajña)। এই যজ্ঞগুলোর বিশদ বিবরণ মহাকাব্যে স্পষ্ট করে দেয় যে বৈদিক যাগযজ্ঞের কার্যকারিতা ও পবিত্রতাকে রামায়ণে সরাসরি স্বীকার করে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সাথে বাল্মীকি একটি নতুন মাত্রা যোগ করলেন। যজ্ঞের আগুন যেখানে থেমে যায়, সেখান থেকে শুরু হয় একজন আদর্শ রাজার নৈতিক দায়িত্বের কাহিনী।
রামায়ণে ধর্মের ধারণাটি কেবল পুরোহিতের যজ্ঞবেদীতে আবদ্ধ থাকেনি, তা রূপান্তরিত হয়েছে রাজধর্ম (Rājadharma)-এর বাস্তব রূপায়ণে। সংস্কৃত সাহিত্যের পণ্ডিত শেলডন পোলক (Sheldon Pollock) রামায়ণের রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই মহাকাব্য রাজাকে মহাজাগতিক শৃঙ্খলার পার্থিব প্রতিনিধি হিসেবে দাঁড় করিয়েছে (Pollock, 1993)। রামের চরিত্রটি কোনো সাধারণ রক্তমাংসের রাজপুত্রের নয়; তিনি হয়ে উঠেছেন বৈদিক আদেশের জীবন্ত রূপ। পোলক দেখিয়েছেন যে পরবর্তীকালে ভারতীয় রাজনীতিতে রামের এই রূপটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক মডেলে পরিণত হয়েছিল, যেখানে রাজার প্রতিটি সিদ্ধান্তকে বৈদিক নৈতিকতার চূড়ান্ত প্রতিফলন হিসেবে দেখার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়।
এই মহাকাব্যে বৈদিক মূল্যবোধের পুনর্বিন্যাস ঘটেছে এক অদ্ভুত ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক অভিযানের মাধ্যমে। রাম যখন অযোধ্যা ছেড়ে দণ্ডকারণ্যে প্রবেশ করছেন, তখন তিনি কেবল নির্বাসিত রাজপুত্র নন, তিনি বৈদিক আশ্রমগুলোর রক্ষক। আমেরিকান ভারততাত্ত্বিক রবার্ট গোল্ডম্যান (Robert Goldman) বাল্মীকি রামায়ণের ক্রিটিক্যাল এডিশনের ভূমিকায় ব্যাখ্যা করেছেন যে অরণ্যকাণ্ডে ঋষিদের যজ্ঞ রক্ষা করার কাহিনীটি ছিল আর্য বৈদিক সংস্কৃতির ভৌগোলিক বিস্তারের একটি প্রতীকী রূপ (Goldman, 1984)। অসুর বা রাক্ষসরা বৈদিক যজ্ঞে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে, আর রাম ধনুর্বাণ হাতে সেই যজ্ঞের স্থানগুলোকে নিরাপদ করছেন – এই বর্ণনার মধ্য দিয়ে মহাকাব্যটি বৈদিক জীবনপদ্ধতিকে অরণ্যচারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর শ্রেষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরার সামাজিক প্রয়াস পেয়েছিল।
তবে রামায়ণে বৈদিক আনুগত্যের এই রূপটি প্রাচীন সংহিতার মতো শুষ্ক বা যান্ত্রিক ছিল না। এখানে ধর্মের সাথে জড়িয়ে গেল পারিবারিক প্রেম, ভ্রাতৃত্ব এবং আত্মত্যাগ। পিতার আদেশ পালনের জন্য রামের সিংহাসন ত্যাগ, লক্ষ্মণের ভ্রাতৃভক্তি কিংবা সীতার বনগমন – এগুলোকে বৈদিক সত্যনিষ্ঠার এক আধুনিক মানবিক প্রকাশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। ফলে বৈদিক অনুশাসন যেখানে ছিল কঠোর আনুষ্ঠানিকতায় ঘেরা, রামায়ণে এসে তা হয়ে উঠল সাধারণ মানুষের আবেগ ও অশ্রুর অংশ। এই রূপান্তরের মাধ্যমেই রামের চরিত্রটি হয়ে ওঠে মর্যাদাপূর্ণ আচরণের চূড়ান্ত মানদণ্ড। বৈদিক শাস্ত্রের বিমূর্ত অনুশাসনগুলো রামের জীবনের নানা সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে রক্তমাংসের রূপ লাভ করেছিল।
মহাভারতে যজ্ঞের রূপান্তর ও সহিংসতার সংকট (The Transformation of Sacrifice and the Crisis of Violence in the Mahābhārata)
মহাভারত শুরু হয় একটি যজ্ঞের ভেতরে এবং এর পরিণতিও ঘটে আরেকটি ধ্বংসাত্মক যজ্ঞের মধ্য দিয়ে। রাজা জন্মেজয়ের সর্প নিধনের জন্য আয়োজিত সর্পসত্র (Sarpasatra) যজ্ঞের আসরেই পুরো মহাভারতের কাহিনী শোনানো হচ্ছে। বৈদিক দর্শনে যজ্ঞ ছিল সৃষ্টির পুনর্নবীকরণ এবং দেবতাদের সাথে মানুষের সম্পর্কের পবিত্র সেতু। কিন্তু মহাভারতে এসে সেই যজ্ঞের আগুনে দেখা দিল তীব্র প্রতিহিংসা ও বিনাশের রূপ। এই বৈপরীত্যটি প্রাচীন ভারতীয় সমাজতত্ত্বের একটি বড় দিক উন্মোচন করে। যাগযজ্ঞের মাধ্যমে যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কথা ছিল, সেই যজ্ঞই যখন রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন বৈদিক আচারবাদের ভেতরে থাকা সহিংসতার সংকটটি প্রকটভাবে সামনে চলে আসে।
এই সংকটের চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে। ফরাসি ভারততাত্ত্বিক মাদলিন বিয়ারদো (Madeleine Biardeau) মহাভারতের গভীর মিথতাত্ত্বিক কাঠামো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কুরুক্ষেত্রের ১৮ দিনের লড়াইকে প্রাচীন বৈদিক যাগযজ্ঞের এক সুবিশাল রূপক হিসেবে সাজানো হয়েছিল (Biardeau, 2002)। এই যুদ্ধ নিছক দুটি পরিবারের জমি দখলের লড়াই ছিল না; এটি ছিল এক মহাজাগতিক পরিচ্ছন্নতা অভিযান, যাকে শাস্ত্রে বলা হয়েছে রণযজ্ঞ (Raṇayajña)। যুদ্ধক্ষেত্রটি ছিল যজ্ঞবেদী, ধনুর্বাণ ও তরবারি ছিল যজ্ঞের কাষ্ঠ ও পাত্র, আর অগণিত সেনার জীবন ছিল সেই যজ্ঞে নিবেদিত আহুতি। বিয়ারদো দেখিয়েছেন যে মহাভারতের লেখকেরা বৈদিক যজ্ঞের পরিচিত পরিভাষাগুলো ব্যবহার করেই এই অভূতপূর্ব মানবনিধনকে একটি ধর্মীয় বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
তবে এই যুদ্ধের পর যে মহাশূন্যতা ও হাহাকার তৈরি হয়েছিল, তা বৈদিক যজ্ঞের কার্যকারিতাকে এক গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। যুধিষ্ঠিরের গভীর বিষাদ এবং যুদ্ধের পর রাজ্য পরিচালনায় তার অনীহা কোনো সাময়িক মানসিক দুর্বলতা ছিল না। এটি ছিল সহিংসতার মাধ্যমে ধর্ম প্রতিষ্ঠার বৈদিক যুক্তির প্রতি এক চরম দার্শনিক অনাস্থা। ভারততাত্ত্বিক জেমস এল. ফিটজেরাল্ড (James L. Fitzgerald) মহাভারতের শান্তিপর্বের আলোচনায় দেখিয়েছেন যে যুদ্ধের পরবর্তী অংশে কীভাবে হিংসা ও অহিংসার বিতর্কটি কেন্দ্রীয় স্থান দখল করেছিল (Fitzgerald, 2004)। পশু বলি দিয়ে স্বর্গে যাওয়ার বৈদিক বিধানকে মহাকাব্যের অনেক স্থানেই স্পষ্ট ভাষায় প্রশ্ন করা হয়েছে এবং সেখানে উঠে এসেছে অহিংসার শ্রমণীয় ও উপনিষদীয় আদর্শ।
এই আত্মিক সংকটের কারণেই মহাভারতে যজ্ঞের অর্থ মৌলিকভাবে বদলে যেতে শুরু করে। বাহ্যিক আগুনের বদলে গুরুত্ব পেতে শুরু করে মানুষের অভ্যন্তরীণ সংযম। শান্তিপর্ব ও অনুশাসনপর্বে এসে বারবার বলা হলো যে সত্য কথা বলা, লোভ বর্জন করা এবং সমস্ত জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শন করাই হলো আসল যজ্ঞ। অশ্বমেধ বা রাজসূয়ের মতো ব্যয়বহুল ও রক্তাক্ত যজ্ঞের চেয়ে দরিদ্রকে খাদ্য দান বা আত্মনিয়ন্ত্রণকে উচ্চতর স্থান দেওয়া হলো। মহাভারত এভাবে বৈদিক যজ্ঞের খোলসটিকে অক্ষত রেখেই তার ভেতরে এক ধরনের নৈতিক অহিংসার বীজ রোপণ করল। এটি ছিল বৈদিক কর্তৃত্বকে অস্বীকার না করে তার নিষ্ঠুর রূপটিকে ভেতরে ভেতরে পাল্টে ফেলার এক অসাধারণ হার্মেনিউটিক প্রয়াস।
ভগবদ্গীতায় কর্মযোগ ও যজ্ঞের অন্তর্মুখীকরণ (Karmayoga and the Internalization of Sacrifice in the Bhagavad Gītā)
মহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত অংশ হলেও ভগবদ্গীতা (Bhagavad Gītā) ভারতীয় চিন্তাধারার ইতিহাসে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করেছে। এর কারণ হলো বৈদিক কর্মকাণ্ডের সাথে গীতার সম্পর্কটি ছিল অত্যন্ত নাটকীয় ও সাহসী। গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়েই বৈদিক কর্মকাণ্ডের প্রতি এক তীব্র সমালোচনা দেখতে পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে যে বেদের বাণীতে যারা মুগ্ধ হয়ে কেবল যজ্ঞের ফলের পেছনে ছোটে এবং স্বর্গের স্বপ্ন দেখে, তারা প্রকৃতপক্ষে বিভ্রান্ত। বেদকে বলা হলো প্রকৃতি বা তিনটি গুণের অধীন। অর্জুনকে নির্দেশ দেওয়া হলো সেই ত্রিগুণের সীমানা পেরিয়ে নির্গুণ হতে। এই ধরণের বক্তব্য যেকোনো সাধারণ পাঠকের মনে হতে পারে বৈদিক কর্তৃত্বের সরাসরি বিরোধিতা। কিন্তু গীতা বৈদিক ঐতিহ্যকে উড়িয়ে দেয়নি, বরং তাকে আমূল পুনর্ব্যাখ্যা করেছে।
জার্মান ভারততাত্ত্বিক অ্যাঞ্জেলিকা মালিনার (Angelika Malinar) তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে গীতা বৈদিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছে ঠিকই, কিন্তু যজ্ঞের সমাজতাত্ত্বিক কাঠামোটিকে ভেঙে ফেলতে চায়নি (Malinar, 2007)। মালিনারের মতে, গীতা একটি মধ্যপন্থা তৈরি করেছিল যা সমকালীন সন্ন্যাস আন্দোলন এবং সনাতন বৈদিক ধর্মানুষ্ঠানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে। গীতা ঘোষণা করল যে যজ্ঞ পরিত্যাগ করা চলবে না, বরং যজ্ঞ করার পেছনের উদ্দেশ্যকে বদলে দিতে হবে। বৈদিক যুগে মানুষ যজ্ঞ করত নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে – যেমন সন্তানলাভ, ধনসম্পদ বৃদ্ধি বা মৃত্যুর পর স্বর্গে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। গীতা বলল, এই ফলের আকাঙ্ক্ষাটাই হলো বন্ধনের কারণ। ফলের আশা ত্যাগ করে দায়িত্ব হিসেবে যা করা হয়, তা-ই হলো আসল যজ্ঞ, যাকে বলা হলো নিষ্কাম কর্ম (Niṣkāma Karma)।
এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠল গীতার সুবিখ্যাত কর্মযোগ (Karmayoga)। কর্মযোগের মাধ্যমে যজ্ঞের ধারণাকে মন্দির বা যজ্ঞবেদীর সীমানা থেকে মুক্ত করে আনা হলো মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে। গীতার চতুর্থ অধ্যায়ে যজ্ঞের এক সুবিশাল রূপক তালিকা পেশ করা হলো। সেখানে আগুন কেবল কাঠ পোড়ানোর আগুন নয়; তা হলো সংযমের আগুন, জ্ঞানের আগুন। কেউ ইন্দ্রিয়গুলোকে সংযমের আগুনে আহুতি দিচ্ছে, কেউ প্রাণবায়ুকে অপানবায়ুর মধ্যে আহুতি দিচ্ছে, আবার কেউ সমস্ত পার্থিব জ্ঞানকে পরম জ্ঞানের আগুনে বিসর্জন দিচ্ছে। এই রূপক যজ্ঞের নাম দেওয়া হলো জ্ঞানযজ্ঞ (Jñānayajña)। বলা হলো, বস্তু দিয়ে তৈরি যজ্ঞের চেয়ে জ্ঞান দিয়ে করা যজ্ঞ অনেক বেশি শ্রেষ্ঠ।
ধর্মতত্ত্ববিদ অরবিন্দ শর্মা (Arvind Sharma) গীতার এই যজ্ঞ-তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে এর ফলে বৈদিক পুরোহিতদের যে প্রাতিষ্ঠানিক একচেটিয়া ক্ষমতা ছিল, তা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল (Sharma, 1986)। প্রাচীন নিয়মে পুরোহিত ছাড়া যজ্ঞ সম্পন্ন করা যেত না, আর সেই যজ্ঞে বিপুল পরিমাণ দক্ষিণা দেওয়ার সামর্থ্য কেবল ধনী ও রাজাদেরই ছিল। গীতা যজ্ঞকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেল যেখানে কোনো বাহ্যিক উপকরণের প্রয়োজন নেই। একজন সাধারণ মানুষও তার দৈনন্দিন কর্তব্য কর্মকে ঈশ্বরে সমর্পণ করে একটি মহৎ যজ্ঞে রূপান্তর করতে পারে। বৈদিক ধারণার এই অন্তর্মুখীকরণ ছিল একটি যুগান্তকারী হার্মেনিউটিক পদক্ষেপ, যা বৈদিক উত্তরাধিকারকে ধরে রেখেই তার সামাজিক অভিজাততন্ত্রকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে এনে দিয়েছিল।
স্বধর্ম বনাম বৈদিক শৃঙ্খলা: নৈতিক টানাপোড়েন ও সমন্বয় (Svadharma versus Vedic Order: Moral Tensions and Harmonization)
মহাভারতের যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনের অস্ত্র ফেলে দেওয়া কোনো সাধারণ যুদ্ধভীতি ছিল না। এটি ছিল দুটি বিপরীতমুখী নৈতিক আদর্শের সংঘাত। একদিকে ছিল প্রাচীন কুলধর্ম ও আত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা, অন্যদিকে ছিল ক্ষত্রিয়ের জন্মগত দায়িত্ব। অর্জুন বুঝতে পারছিলেন যে এই যুদ্ধ জয় করতে হলে তাকে নিজের গুরু, পিতামহ ও ভাইদের রক্তে হাত রাঙাতে হবে। তিনি কৃষ্ণের কাছে যুক্তি দিলেন যে এই যুদ্ধ হলে পরিবার ধ্বংস হবে, কুলবধূরা বিপথগামী হবে এবং সমাজে বর্ণসংকর তৈরি হবে – যা বৈদিক সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য এক পরম বিপর্যয়। অর্জুনের এই হতাশা প্রকৃতপক্ষে সমকালীন ভারতীয় সমাজের সেই নৈতিক সংকটকে তুলে ধরেছিল, যেখানে প্রাচীন নিয়মের সাথে বাস্তব জীবনের সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।
দার্শনিক বিমলকৃষ্ণ মতিলাল (Bimal Krishna Matilal) তার বিখ্যাত গ্রন্থ মরাল ডিলেমাস ইন দ্য মহাভারত (Moral Dilemmas in the Mahābhārata)-এ দেখিয়েছেন যে মহাভারতের ধর্ম কোনো সরল সমীকরণ নয় (Matilal, 1989)। মতিলাল দেখিয়েছেন যে মহাকাব্যে ধর্ম সব সময় একটি অপরিবর্তনীয় নিয়ম মেনে চলে না; এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের রূপ বদলায়। কৃষ্ণ যখন অর্জুনকে যুদ্ধ করার উপদেশ দিচ্ছেন, তখন তিনি কোনো সাধারণ বৈদিক শ্লোকের দোহাই দিচ্ছেন না। তিনি অর্জুনকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন তার স্বধর্ম (Svadharma)। বর্ণাশ্রমের কাঠামোতে অর্জুন একজন ক্ষত্রিয়, আর ক্ষত্রিয়ের পরম দায়িত্ব হলো ন্যায়ের পক্ষে অস্ত্র ধারণ করা। কৃষ্ণ স্পষ্ট করে দিলেন যে অন্যের ধর্ম নিখুঁতভাবে পালন করার চেয়ে নিজের ধর্ম ত্রুটিযুক্তভাবে পালন করাও শ্রেয়।
এই স্বধর্মের ধারণার মধ্য দিয়ে বৈদিক সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসকে এক নতুন দার্শনিক বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। ঐতিহাসিক উপিন্দর সিং (Upinder Singh) প্রাচীন ভারতে রাজনৈতিক সহিংসতা ও ধর্মের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে মহাকাব্যগুলো একাধারে বিশ্বজনীন নৈতিকতা এবং নির্দিষ্ট সামাজিক কর্তব্যের মধ্যে এক জটিল ভারসাম্য তৈরি করেছিল (Singh, 2017)। যদি সমাজের প্রতিটি মানুষ সন্ন্যাসীর মতো অহিংস হয়ে যায়, তবে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে। তাই গীতায় কর্ম ও স্বধর্মের এমন এক তত্ত্ব দাঁড় করানো হলো যা রাজ্যশাসন ও যুদ্ধকে পাপের বদলে একটি পবিত্র কর্তব্যে রূপান্তর করে। তবে শর্ত হলো, সেই যুদ্ধ করতে হবে ব্যক্তিগত রাগ, দ্বেষ বা লোভের ঊর্ধ্বে উঠে।
একই সাথে গীতা সন্ন্যাস ও গৃহস্থ জীবনের বৈদিক বিতর্কটিরও একটি দারুণ সমাধান দিয়েছিল। বৈদিক যুগে সন্ন্যাসীদের প্রায়ই সমাজের দায়িত্ব এড়িয়ে চলা মানুষ হিসেবে দেখা হতো, অন্যদিকে উপনিষদ ও বৌদ্ধধর্মে সংসার ত্যাগকেই পরম মুক্তির পথ বলা হচ্ছিল। গীতা এই দুই প্রান্তিক অবস্থানের মাঝে সমন্বয় ঘটাল। কৃষ্ণ বললেন, প্রকৃত ত্যাগ মানে বনবাসে যাওয়া নয় কিংবা কর্ম বন্ধ করে দেওয়া নয়। কর্মের ফলাফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করাই হলো আসল সন্ন্যাস। এই ব্যাখ্যা বৈদিক সমাজকে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। মানুষ সমাজে বাস করবে, তার নির্দিষ্ট পেশাগত ও পারিবারিক দায়িত্ব পালন করবে, কিন্তু মানসিকভাবে সে থাকবে নির্লিপ্ত। এই সমন্বয়ের ফলেই মহাভারত ও গীতা প্রাচীন বৈদিক ঐতিহ্যকে ত্যাগ না করেও তৎকালীন সমাজের জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক চাহিদার সাথে চমৎকারভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছিল।
ভক্তির উত্থান ও বৈদিক আধিপত্যের রূপান্তর (The Rise of Bhakti and Transformation of Vedic Hegemony)
মহাকাব্য ও বিশেষ করে ভগবদ্গীতার মধ্য দিয়ে ভারতীয় ধর্মভাবনায় যে সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনটি ঘটেছিল, তা হলো ভক্তি (Bhakti) বা ব্যক্তিগত ঈশ্বরের প্রতি আত্মনিবেদনের তত্ত্ব। বৈদিক সংহিতায় দেবতারা ছিলেন প্রকৃতির নানা শক্তির রূপক – যেমন ইন্দ্র, বরুণ বা অগ্নি। তাদের সাথে মানুষের সম্পর্ক ছিল অনেকটাই বাণিজ্যিক লেনদেনের মতো; মানুষ যজ্ঞে ঘৃতাহুতি দেবে আর দেবতারা বদলে বৃষ্টি, ধনসম্পদ ও সন্তান দেবেন। অন্যদিকে উপনিষদের যুগে ঈশ্বর হয়ে উঠলেন এক নৈর্ব্যক্তিক, গুণহীন এবং ধারণাতীত ব্রহ্ম, সাধারণ মানুষের পক্ষে যার সান্নিধ্য পাওয়া ছিল অসম্ভব। এই দুই প্রান্তের মাঝখানে মহাকাব্যগুলো নিয়ে এলো এক মূর্ত, দয়াময় এবং মানুষের মতো অনুভূতিশীল ঈশ্বরকে। কৃষ্ণ বা রাম হয়ে উঠলেন সেই পরম সত্তা, যার কাছে মানুষ সরাসরি নিজেকে সমর্পণ করতে পারে।
ব্রিটিশ ভারততাত্ত্বিক জন ব্রকিংটন (John Brockington) তার বিস্তৃত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে কীভাবে মহাকাব্যের বীরত্বগাথাগুলো ধীরে ধীরে ভক্তিভাবাপন্ন রূপ ধারণ করেছিল (Brockington, 1998)। ব্রকিংটনের মতে, মহাভারতের আদিরূপটিতে হয়তো কৃষ্ণ একজন শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতা ও যাদব বীর ছিলেন। কিন্তু কালক্রমে বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বের প্রভাবে তিনি পরমেশ্বর ও বিষ্ণুর পূর্ণাবতারে পরিণত হন। এই রূপান্তরের ফলে বৈদিক প্রাচীন দেবতাদের গুরুত্ব দ্রুত হ্রাস পেতে শুরু করে। ইন্দ্র বা বরুণের মতো বৈদিক দেবতারা মহাকাব্যে প্রায়শই কৃষ্ণের চেয়ে ক্ষমতাহীন এবং অসহায় চরিত্র হিসেবে চিত্রিত হতে লাগলেন। গোবর্ধন পর্বতের কাহিনীতে ইন্দ্রের পূজার বদলে কৃষ্ণের নির্দেশে পর্বতের পূজা করা বৈদিক যাগযজ্ঞের ওপর এক বিশাল আঘাত ছিল।
তবে এই নতুন ভক্তিবাদ কিন্তু বৈদিক ঐতিহ্যকে সরাসরি অস্বীকার করে গড়ে ওঠেনি। বরং এটি বৈদিক ধারণাকে নিজের ভেতরে আত্মস্থ করে নিয়েছিল। ধর্মীয় ইতিহাসবিদ গেভিন ফ্লাড (Gavin Flood) তার গ্রন্থে বিশ্লেষণ করেছেন যে কীভাবে ভক্তি আন্দোলন বৈদিক ধারণার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিল (Flood, 1996)। গীতায় কৃষ্ণ ঘোষণা করছেন যে সমস্ত বৈদিক যজ্ঞের পরম ভোক্তা এবং প্রভু স্বয়ং তিনিই। যে ব্যক্তি যে দেবতারই পূজা করুক না কেন, তা শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণের কাছেই পৌঁছায়। অর্থাৎ, বৈদিক বহুদেবতাবাদকে ভেঙে একক ঈশ্বরের ভক্তির কাঠামোর মধ্যে একীভূত করা হলো। এই হার্মেনিউটিক কৌশলের ফলে কোনো প্রাচীন বৈদিক আচারকে বাতিল করার প্রয়োজন পড়েনি, কেবল তার কেন্দ্রবিন্দুটিকে বদলে দেওয়া হয়েছিল।
ভক্তির এই নতুন ধারণার সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক দিকটি ছিল এর সর্বজনীনতা। বৈদিক যজ্ঞ যেখানে নির্দিষ্ট উচ্চবর্ণের পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত ছিল, ভক্তির দরজা সেখানে সবার জন্য উন্মুক্ত বলে ঘোষণা করা হলো। গীতায় কৃষ্ণ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বললেন যে নারী, বৈশ্য বা শূদ্র – যে কেউই তার শরণাপন্ন হলে পরম গতি লাভ করতে পারে। ঈশ্বরের আরাধনার জন্য কোনো জটিল বৈদিক মন্ত্র বা দামি উপহারের প্রয়োজন নেই; সামান্য একটি পাতা, ফুল, ফল বা একটু জল ভক্তিসহকারে নিবেদন করলেই ঈশ্বর সন্তুষ্ট হন। এই সহজ ও মানবিক পথটি বৈদিক পুরোহিতদের একচেটিয়া ক্ষমতাকে দারুণ এক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছিল। কিন্তু একই সাথে তা বৈদিক ছাতার নিচেই সনাতন বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখার এক অবিশ্বাস্য ক্ষমতা অর্জন করেছিল। মহাকাব্য ও গীতার এই উদ্ভাবনী হার্মেনিউটিক্স বৈদিক ঐতিহ্যকে একটি মৃত প্রত্নতাত্ত্বিক স্মৃতিতে পরিণত হতে দেয়নি, বরং তা সাধারণ মানুষের হৃদয়ের ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে হাজার বছর ধরে টিকে থাকার উপাদান তৈরি করেছিল।
পুরাণসাহিত্যে বৈদিক ঐতিহ্যের পুনর্নির্মাণ (Reconstruction of Vedic Traditions in Purāṇic Literature): দেবতা, পৌরাণিক বয়ান ও সম্প্রদায়গত কর্তৃত্ব
পুরাণের পঞ্চলক্ষণ ও বৈদিক বিশ্বতত্ত্বের রূপান্তর (The Pañcalakṣaṇa of the Purāṇas and the Transformation of Vedic Cosmology)
প্রাচীন ভারতের জ্ঞানতাত্ত্বিক ইতিহাসে পুরাণসাহিত্যের আবির্ভাব ঘটেছিল এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে। বৈদিক যাগযজ্ঞের জটিল কর্মকাণ্ড এবং উপনিষদের গভীর দার্শনিক বিচার যখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছিল, তখন এক নতুন ধরনের সাহিত্যের প্রয়োজন দেখা দেয়। পুরাণ সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে এগিয়ে আসে। ঐতিহাসিকভাবে পুরাণকে সংজ্ঞায়িত করা হতো পাঁচটি বিশেষ লক্ষণের মাধ্যমে, যাকে বলা হয় পঞ্চলক্ষণ (Pañcalakṣaṇa)। এই পাঁচটি বিষয় হলো: সর্গ (Sarga) বা জগতের আদি সৃষ্টি, প্রতিসর্গ (Pratisarga) বা প্রলয় ও পুনঃসৃষ্টি, বংশ (Vaṃśa) বা দেবতা ও ঋষিদের বংশতালিকা, মন্বন্তর (Manvantara) বা মহাজাগতিক কালপর্যায়, এবং বংশানুচরিত (Vaṃśānucarita) বা প্রাচীন রাজবংশগুলোর ইতিহাস। এই পঞ্চলক্ষণের কাঠামোটি আপাতদৃষ্টিতে একটি পৌরাণিক ইতিহাস মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল বৈদিক বিশ্বতত্ত্বকে নতুন যুগের উপযোগী করে পুনর্নির্মাণের এক গভীর পরিকল্পনা।
বৈদিক সাহিত্যের আদি স্তোত্রগুলোতে সৃষ্টির যে বিবরণ পাওয়া যায়, যেমন ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্ত বা পুরুষসূক্ত, সেখানে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি ছিল অনেকটাই বিমূর্ত ও মহাজাগতিক এক রহস্যের মতো। পুরাণে এসে সেই রহস্যময় সৃষ্টিতত্ত্বকে একটি সুশৃঙ্খল এবং চক্রাকার সময়ের ফ্রেমে বেঁধে ফেলা হলো। এখানে চার যুগের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলো – সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর এবং কলি। এই যুগচক্রের মধ্য দিয়ে দেখানো হলো কীভাবে সময়ের অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের নৈতিক অবক্ষয় ঘটে এবং বেদ তার আদি রূপ হারাতে থাকে। ফলে বৈদিক সত্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য পুরাণের মতো জনপ্রিয় মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়। বৈদিক যাগযজ্ঞের কাল যেখানে ছিল রৈখিক বা যজ্ঞের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ, পৌরাণিক কাল সেখানে হয়ে উঠল অনন্ত চক্রের অংশ।
ভারততাত্ত্বিক আর. সি. হাজরা (R. C. Hazra) তার বিখ্যাত গ্রন্থ স্টাডিজ ইন দ্য পৌরাণিক রেকর্ডস অন হিন্দু রাইটস অ্যান্ড কাস্টমস (Studies in the Puranic Records on Hindu Rites and Customs)-এ দেখিয়েছেন যে কীভাবে ব্রাহ্মণ্য পণ্ডিতেরা স্মৃতি ও পুরাণের শ্লোকগুলোতে বৈদিক আচারকে সাধারণ গৃহস্থের জন্য নতুন করে সাজিয়েছিলেন (Hazra, 1940)। হাজরা তার গবেষণায় তুলে ধরেন যে পুরাণগুলো প্রাচীন বৈদিক যাগযজ্ঞের নিয়মগুলোকে হুবহু তুলে ধরেনি, বরং সেগুলোকে পৌরাণিক আচার ও ব্রতের সাথে মিলিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যাতে বৈদিক কর্তৃত্বও অক্ষত থাকে, আবার সমকালীন সমাজের চাহিদাও পূরণ হয়। এটি ছিল ঐতিহ্যের একটি সুবিধাজনক ধারাবাহিকতা রক্ষার চেষ্টা।
অন্যদিকে বিখ্যাত পুরাণ গবেষক লুডো রোশার (Ludo Rocher) তার আকরগ্রন্থ দ্য পুরাণাস (The Purāṇas)-এ উল্লেখ করেছেন যে পঞ্চলক্ষণের এই ধ্রুপদী সংজ্ঞাটি আসলে সব পুরাণে সমানভাবে মানা হয়নি (Rocher, 1986)। অনেক পুরাণে এই পাঁচটি বিষয়ের বাইরে গিয়ে নানা ধরনের ধর্মীয় আইন, তীর্থের মাহাত্ম্য এবং সামাজিক রীতিনীতি যুক্ত হয়েছে। রোশার দেখিয়েছেন যে পৌরাণিক বিশ্বতত্ত্ব তৈরি হয়েছিল বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্তরে। প্রাচীন বৈদিক সৃষ্টিতত্ত্বকে বাতিল না করে তার ওপরে নতুন নতুন পৌরাণিক মিথের স্তর যুক্ত করা হয়েছিল। এর ফলে বৈদিক বিশ্বতত্ত্ব পুরাণে এসে এক বহুস্তরীয় এবং দৃশ্যমান রূপ লাভ করল, যা সাধারণ মানুষের কল্পনার সাথে খাপ খেয়ে যায়।
দেবমণ্ডলীর পুনর্গঠন: বৈদিক দেবতাদের প্রান্তিকীকরণ ও ত্রিমূর্তির উত্থান (Reorganization of the Pantheon: Marginalization of Vedic Deities and Rise of the Trimūrti)
বৈদিক সংহিতার পাতা উল্টালে যে দেবতাদের প্রতাপ সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তারা হলেন ইন্দ্র, বরুণ, অগ্নি এবং সোম। ঋগ্বেদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ স্তোত্র রচিত হয়েছে কেবল ইন্দ্রের বীরত্বগাথা নিয়ে। কিন্তু পুরাণসাহিত্যে প্রবেশ করলেই এই দেবমণ্ডলীর চেহারা একেবারেই অচেনা হয়ে যায়। বৈদিক যুগের পরাক্রমশালী ইন্দ্র পুরাণে এসে পরিণত হলেন এক ক্ষমতাহীন, সিংহাসন হারানোর ভয়ে তটস্থ এবং নৈতিকভাবে দুর্বল এক চরিত্রে। যে কোনো অসুর তপস্যা করে বর লাভ করলেই ইন্দ্রের অমরাবতী হাতছাড়া হয়ে যায়, আর ইন্দ্রকে ছুটতে হয় উচ্চতর দেবতাদের দরবারে। এই পরিবর্তনটি কোনো আকস্মিক কল্পনা ছিল না; এটি ছিল প্রাচীন বৈদিক শক্তিগুলোর ওপর নতুন পৌরাণিক ধর্মীয় ভাবাদর্শের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি স্পষ্ট প্রকাশ।
পুরাণসাহিত্যে বৈদিক দেবতাদের এই প্রান্তিকীকরণের পাশাপাশি কেন্দ্রে উঠে আসে ত্রিমূর্তি (Trimūrti)-র ধারণা – ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিব। বিশ্ব সৃষ্টি, স্থিতি এবং প্রলয়ের এই তিন দেবতা বৈদিক সাহিত্যের প্রান্তে ছিলেন। বৈদিক যুগে রুদ্র ছিলেন এক প্রান্তিক ও ভীতিকর ঝড়ের দেবতা, আর বিষ্ণু ছিলেন কেবল সূর্যের একটি রূপক যিনি তিন পদক্ষেপে বিশ্বজগৎ অতিক্রম করেছিলেন। পৌরাণিক যুগে সেই রুদ্র রূপান্তরিত হলেন পরম যোগী এবং সংহারকর্তা শিবে, আর বৈদিক বিষ্ণু হয়ে উঠলেন সমগ্র মহাবিশ্বের রক্ষাকর্তা ও পরমেশ্বর। এর সাথে যুক্ত হলেন মহাশক্তিরূপী দেবী (Devī), যিনি পৌরাণিক বয়ানে পুরুষ দেবতাদের সমষ্টিগত তেজ থেকে আবির্ভূত হয়ে মহিষাসুরের মতো অসুরদের বিনাশ করেন।
জার্মান ভারততাত্ত্বিক হাইনরিশ ফন স্টিটেনক্রন (Heinrich von Stietencron) হিন্দুধর্মের দেবমণ্ডলীর রূপান্তর নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে বৈদিক দেবতাদের এই অবনমন এবং নতুন পৌরাণিক দেবতাদের উত্থান ছিল মূলত বিভিন্ন স্থানীয় ও আঞ্চলিক পূজাপদ্ধতির ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির সাথে একীভূত হওয়ার ফল (von Stietencron, 2005)। স্টিটেনক্রন দেখান যে ইন্দ্র বা অগ্নির মতো দেবতারা যাগযজ্ঞের সাথে এত গভীরভাবে জড়িত ছিলেন যে সাধারণ মানুষের ভক্তি নিবেদনের জন্য তারা অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। মানুষ এমন দেবতা চেয়েছিল যার সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন করা যায়, যার কাছে সুখ-দুঃখের কথা বলা যায়। বিষ্ণু এবং শিবের রূপগুলোতে সেই ব্যক্তিগত সংযোগের সুযোগ ছিল অনেক বেশি।
আমেরিকান তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ববিদ ওয়েন্ডি ডনিগার (Wendy Doniger) তার বিভিন্ন পৌরাণিক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে বৈদিক দেবতাদের কিন্তু সম্পূর্ণ ছুড়ে ফেলা হয়নি, বরং তাদের পরিণত করা হয়েছে দিকরক্ষক বা দিকপাল (Dikpāla) হিসেবে (Doniger, 1999)। ইন্দ্র হয়ে গেলেন পূর্বদিকের অধিপতি, বরুণ পশ্চিমের, কুবের উত্তরের এবং যম দক্ষিণের। অর্থাৎ, মহাজাগতিক ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে তাদের সরিয়ে প্রশাসনিক পাহারাদারের ভূমিকায় নামিয়ে দেওয়া হলো। ডনিগার ব্যাখ্যা করেন যে এই কৌশলের মাধ্যমে বৈদিক উত্তরাধিকারের প্রতি বাহ্যিক সম্মান দেখানো সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু ক্ষমতার আসল লাগাম তুলে দেওয়া হয়েছিল পৌরাণিক সম্প্রদায়গুলোর নিজস্ব ইষ্টদেবতাদের হাতে।
পৌরাণিক মিথ ও বৈদিক বয়ানের হার্মেনিউটিক পুনর্বিন্যাস (Purāṇic Myth and the Hermeneutic Realignment of Vedic Narratives)
পুরাণসাহিত্যের রচয়িতারা খুব ভালোভাবেই জানতেন যে নিজেদের বয়ানকে গ্রহণযোগ্য করতে হলে সেগুলোকে বৈদিক উৎসের সাথে যুক্ত করা আবশ্যক। তারা এক বিশেষ হার্মেনিউটিক তত্ত্ব তৈরি করলেন, যার নাম উপবৃংহণ (Upabṛṃhaṇa)। এর অর্থ হলো বেদকে সম্প্রসারিত করা বা পূর্ণাঙ্গ করা। মহাভারত ও বিভিন্ন পুরাণে এই ধারণার সপক্ষে বলা হলো যে কলিযুগের মানুষের বুদ্ধি ও আয়ু কমে গেছে, তাই তারা সরাসরি বেদের অর্থ বুঝতে অক্ষম। পুরাণ হলো সেই সহজ মাধ্যম যা বেদের অন্তর্নিহিত ভাবকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য উপাখ্যানের সাহায্যে পূর্ণতা দেয়। অর্থাৎ, পুরাণ নিজেকে বেদের বিরোধী হিসেবে নয়, বরং বেদের সবচেয়ে প্রামাণ্য ও চূড়ান্ত ভাষ্য হিসেবে দাবি করল।
এই হার্মেনিউটিক প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে প্রাচীন বৈদিক মিথগুলোর পৌরাণিক রূপান্তরে। উদাহরণস্বরূপ, ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলে উল্লিখিত শুনঃশেপের কাহিনীটির কথা বলা যায়। বৈদিক পাঠে এটি ছিল যজ্ঞে পশুর বদলে মানুষের আহুতি দেওয়ার এক জটিল সামাজিক ও আনুষ্ঠানিক সংকট। কিন্তু পুরাণে এসে এই কাহিনী পরিণত হলো বিশ্বামিত্রের তপোবল এবং দেবতার করুণার এক আবেগঘন ভক্তিমূলক উপাখ্যানে। একইভাবে ঋগ্বেদের পুরূরবা ও উর্বশীর সংক্ষিপ্ত এবং রহস্যময় সংলাপটি পুরাণগুলোতে হয়ে উঠল এক সুবিশাল রোমান্টিক নাটক, যার সাথে যুক্ত হলো বংশপরম্পরা এবং অভিশাপের নানা পৌরাণিক উপাদান।
অস্ট্রেলিয়ান সংস্কৃত পণ্ডিত গ্রেগ বেইলি (Greg Bailey) গণেশপুরাণ এবং অন্যান্য পৌরাণিক পাঠ্যের বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে পৌরাণিক লেখকেরা ইচ্ছাকৃতভাবেই প্রাচীন বৈদিক শব্দ ও ধারণাকে নতুন মিথের ছাঁচে ফেলেছিলেন (Bailey, 1995)। বেইলি উল্লেখ করেন যে পুরাণগুলোর লক্ষ্য ছিল বৈদিক কর্তৃত্বকে অস্বীকার না করে সমকালীন ধর্মীয় আন্দোলনের স্বার্থে তাকে পুনর্নির্মাণ করা। যখন কোনো নতুন ধর্মীয় আচার বা দেবতার মাহাত্ম্য প্রচার করার প্রয়োজন হতো, তখন পৌরাণিক লেখকেরা দাবি করতেন যে এই আচারের মূল স্বয়ং বেদে রয়েছে, তবে তা সাধারণ মানুষের কাছে অস্পষ্ট ছিল এবং এই পুরাণই তার অর্থ স্পষ্ট করছে।
পৌরাণিক দেবী মাহাত্ম্যের ওপর কাজ করতে গিয়ে ধর্মতত্ত্ববিদ টমাস বি. কোবার্ন (Thomas B. Coburn) তার বিখ্যাত গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে কীভাবে মার্কণ্ডেয়পুরাণ (Mārkaṇḍeyapurāṇa)-এর অন্তর্গত দেবীমাহাত্ম্য অংশে বৈদিক ঋকগুলোকে দেবীর স্তুতিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে (Coburn, 1984)। বৈদিক রাত্রিসূক্ত বা দেব্যাসূক্তের মতো স্তোত্রগুলোকে টেনে এনে পৌরাণিক চণ্ডীর রূপের সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোবার্ন দেখান যে এই পুনর্বিন্যাস ছিল এক ধরণের পাঠগত কূটনীতি। এর ফলে সাধারণ মানুষ ভাবল তারা পরম বৈদিক সত্যেরই আরাধনা করছে, অথচ বাস্তবে তারা যে দেবীর পূজা করছিল তার রূপ ও চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ পৌরাণিক এবং অনেকটাই স্থানীয় উপজাতীয় ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত।
সম্প্রদায়গত আধিপত্য ও বৈদিক উত্তরাধিকার দখলের রাজনীতি (Sectarian Hegemony and the Politics of Appropriating Vedic Heritage)
পুরাণসাহিত্য কোনো একক এবং সমসত্ত্ব গ্রন্থ নয়। এটি বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পারস্পরিক প্রতিযোগিতা এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার এক বিশাল যুদ্ধক্ষেত্র। প্রধানত তিনটি ধারায় পুরাণগুলো বিভক্ত হয়ে পড়েছিল – বৈষ্ণব, শৈব এবং শাক্ত। প্রতিটি সম্প্রদায় দাবি করত যে তাদের আরাধ্য দেবতাই হলেন প্রকৃত পরমেশ্বর বা পরব্রহ্ম (Parabrahman) এবং বেদের সমস্ত স্তোত্র আসলে তারই গুণগান করছে। বিষ্ণুপুরাণ (Viṣṇu Purāṇa) এবং পরবর্তীকালের ভাগবতপুরাণ (Bhāgavata Purāṇa)-এ বিষ্ণুকে সমস্ত সৃষ্টির আদি কারণ এবং বৈদিক পুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলো। সেখানে শিব বা অন্যান্য দেবতাদের দেখানো হলো বিষ্ণুর আজ্ঞাবহ সেবক হিসেবে।
এর ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যায় শৈব পুরাণগুলোতে। শিবপুরাণ (Śiva Purāṇa) কিংবা লিঙ্গপুরাণ (Liṅga Purāṇa)-এ লিঙ্গোদ্ভব মিথের মাধ্যমে দেখানো হলো যে একটি অনন্ত অগ্নিলিংগের শুরু ও শেষ খুঁজতে গিয়ে ব্রহ্মা ও বিষ্ণু ব্যর্থ হলেন এবং অবশেষে তারা শিবের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে বাধ্য হলেন। এখানেও বৈদিক অগ্নির ধারণাকে এনে শিবের সাথে জুড়ে দেওয়া হলো। প্রতিদ্বন্দ্বী সম্প্রদায়গুলোর এই লড়াই কেবল গল্প বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা পুরাণগুলোকে গুণভেদে ভাগ করে একটি কৃত্রিম শ্রেণিবিন্যাস দাঁড় করাল। পদ্মপুরাণে ঘোষণা করা হলো যে বৈষ্ণব পুরাণগুলো হলো সাত্ত্বিক পুরাণ (Sāttvika Purāṇa) যা মুক্তির পথ দেখায়; ব্রহ্মার সাথে সম্পর্কিত পুরাণগুলো হলো রাজসিক পুরাণ (Rājasa Purāṇa) যা স্বর্গের লোভ দেখায়; আর শিবের সাথে সম্পর্কিত পুরাণগুলো হলো তামসিক পুরাণ (Tāmasa Purāṇa) যা মানুষকে নরকের দিকে ঠেলে দেয়।
ধর্মীয় ইতিহাসবিদ ফ্রিডহেলম হার্ডি (Friedhelm Hardy) দক্ষিণ ভারতের ভক্তি আন্দোলন ও পৌরাণিক বৈষ্ণবধর্ম নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে ভাগবত পুরাণে বৈদিক জ্ঞানতত্ত্ব এবং তামিল ভক্তি ঐতিহ্যের এক অবিশ্বাস্য সমন্বয় ঘটানো হয়েছিল (Hardy, 1983)। হার্ডি উল্লেখ করেন যে ভাগবতের রচয়িতারা বৈদিক উপনিষদের অদ্বৈত ধারণাকে এমনভাবে কৃষ্ণভক্তির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলেন যাতে মনে হয় কৃষ্ণপ্রেমই হলো বেদান্তের চূড়ান্ত পরিণতি। এই সমন্বয়ের ফলে বৈষ্ণব সম্প্রদায় একচ্ছত্র দার্শনিক বৈধতা দাবি করতে সক্ষম হয়েছিল।
আমেরিকান ঐতিহাসিক ডেভিড এন. লরেনজেন (David N. Lorenzen) কাপালিক ও কালামুখ সম্প্রদায়ের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন যে মধ্যযুগীয় ভারতে শৈব ও বৈষ্ণব পুরাণগুলোর এই দ্বন্দ্ব ছিল মূলত রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং অর্থনৈতিক সম্পদ দখলের লড়াই (Lorenzen, 1972)। প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ই রাজার অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য নিজেদেরকে সবচেয়ে বেশি বৈদিক-অনুগামী হিসেবে প্রমাণ করতে চাইত। বৈদিক উত্তরাধিকারের এই দখলদারি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তৎকালীন সমাজে কোনো ধর্মমত রাজকীয় স্বীকৃতি পেতে পারত না যদি না তা প্রমাণ করতে পারত যে তার শেকড় বৈদিক ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত। পুরাণগুলো সেই প্রমাণের দলিল হিসেবে কাজ করেছিল।
তীর্থ, ব্রত ও বৈদিক যজ্ঞের লোকায়ত প্রতিস্থাপন (Tīrtha, Vrata, and the Popular Replacement of Vedic Sacrifice)
বৈদিক ধর্মের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান ছিল যাগযজ্ঞ। কিন্তু সেই যজ্ঞ ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল, জটিল এবং সাধারণ মানুষের নাগালের সম্পূর্ণ বাইরে। একটি বড় রাজসূয় বা বাজপেয় যজ্ঞ করার সামর্থ্য কেবল বিত্তশালী রাজা বা অভিজাতদেরই ছিল। সাধারণ মানুষের এই বিচ্ছিন্নতা দূর করতে পুরাণসাহিত্য সম্পূর্ণ নতুন দুটি ধর্মাচরণের উদ্ভাবন করল – তীর্থযাত্রা (Tīrthayātrā) এবং ব্রত (Vrata)। পুরাণের পাতায় পাতায় ঘোষণা করা হলো যে প্রয়াগ, কাশী, গয়া বা পুষ্করে গিয়ে একটি বিশেষ নদীতে স্নান করলে বা কোনো নির্দিষ্ট তিথিতে উপবাস থেকে ব্রত পালন করলে এক হাজার অশ্বমেধ যজ্ঞের সমান পুণ্য লাভ হয়। এই ঘোষণার সামাজিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।
যজ্ঞের যে ফল পেতে লক্ষ মুদ্রা ব্যয় করতে হতো এবং শত শত পুরোহিতকে দক্ষিণা দিতে হতো, সেই একই ফল একটি সাধারণ স্নান বা একদিনের উপবাসের মাধ্যমে অর্জনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো। এর ফলে ধর্মের ক্ষেত্রে এক বিশাল গণতন্ত্রীকরণের সুযোগ তৈরি হলো। যে নারী বা শূদ্রের বৈদিক যজ্ঞবেদীতে বসার কোনো অধিকার ছিল না, তারাও কোনো পবিত্র নদীতে গিয়ে জল স্পর্শ করতে পারত বা ব্রতকথা শুনতে পারত। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই বিকল্প আচারগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব পরিমাপ করার জন্য কিন্তু বৈদিক যজ্ঞেরই একক ব্যবহার করা হয়েছিল। অশ্বমেধ বা বাজপেয়ের ফলের সাথে তুলনা করার অর্থই হলো বৈদিক যজ্ঞের পুণ্যমানকে অবচেতনভাবে সর্বোচ্চ হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া।
ধর্মীয় ভূগোলবিদ ডায়ানা এল. এক (Diana L. Eck) তার সুপরিচিত গ্রন্থ ইন্ডিয়া: আ সেক্রেড জিওগ্রাফি (India: A Sacred Geography)-তে তীর্থের এই রূপান্তর নিয়ে চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন (Eck, 2012)। এক দেখিয়েছেন যে পুরাণগুলো সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশকে একটি পবিত্র মানচিত্রে রূপান্তর করেছিল। নদী, পাহাড়, বন এবং সঙ্গমস্থলগুলোকে কোনো না কোনো দেবতার বাসভূমি হিসেবে ঘোষণা করে একটি অখণ্ড সাংস্কৃতিক ভূগোল গড়ে তোলা হয়েছিল। বৈদিক যুগে পবিত্রতা যেখানে নির্দিষ্ট যজ্ঞবেদীর ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ ছিল, পুরাণের যুগে এসে তা ছড়িয়ে পড়ল মাটির প্রতিটি প্রান্তে। এক দেখান যে তীর্থযাত্রার মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষও এই সুবিশাল সনাতন কাঠামোর সাথে নিজেকে যুক্ত অনুভব করতে শুরু করল।
একইভাবে ভারততাত্ত্বিক সুরিন্দর মোহন ভরদ্বাজ (Surinder Mohan Bhardwaj) তার গবেষণায় তীর্থযাত্রার সামাজিক ও ঐতিহাসিক বিন্যাস পর্যালোচনা করেছেন (Bhardwaj, 1973)। ভরদ্বাজ দেখান যে স্থানীয় প্রথা এবং মেলাগুলোকে স্মৃতি ও পুরাণের অনুশাসনে এনে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। এই তীর্থ ও ব্রতের মধ্য দিয়ে বৈদিক যজ্ঞের স্থান দখল করল পূজা (Pūjā) এবং মূর্তিপূজা। যজ্ঞের আগুনে ঘি ঢালার চেয়ে ঈশ্বরের বিগ্রহের সামনে ফুল ও জল নিবেদন করা অনেক বেশি সহজ ও মানবিক ছিল। পুরাণসাহিত্য এভাবে বৈদিক আনুষ্ঠানিকতাকে সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছিল, যার ফলে প্রাচীন ঐতিহ্যের সামাজিক ভিত্তিটি ধ্বংস না হয়ে বরং বহুগুণে প্রসারিত হয়েছিল।
সামাজিক আত্মীকরণ, ব্রাহ্মণ্য কর্তৃত্ব ও নতুন শাস্ত্রীয় বৈধতা (Social Assimilation, Brahmanical Hegemony and New Scriptural Legitimacy)
পুরাণসাহিত্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক ভূমিকাটি ছিল ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং বিভিন্ন অবৈদিক জনজাতিকে একটি সাধারণ সাংস্কৃতিক বলয়ের ভেতরে টেনে আনা। গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময় থেকে শুরু করে মধ্যযুগ পর্যন্ত ভারতীয় সমাজে কৃষি অর্থনীতির ব্যাপক বিস্তার ঘটছিল। বন কেটে নতুন নতুন জনপদ তৈরি হচ্ছিল এবং অরণ্যচারী উপজাতিরা কৃষিজীবী সমাজে রূপান্তরিত হচ্ছিল। এই নতুন জনগোষ্ঠীগুলোকে সনাতন বর্ণব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা ছিল একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ। ধর্মসূত্র বা মনুস্মৃতির কঠোর আইন দিয়ে এদেরকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না। পুরাণ এই ঐতিহাসিক দায়িত্বটি কাঁধে তুলে নেয়।
এই আত্মীকরণের মূল অস্ত্র ছিল পুরাণের স্থানীয় মাহাত্ম্য বা মাহাত্ম্য (Māhātmya) সাহিত্য। যখন কোনো নতুন অঞ্চলের উপজাতীয় দেবতা খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠত, তখন পৌরাণিক লেখকেরা সেই দেবতাকে কোনো বৈদিক বা প্রধান পৌরাণিক দেবতার সাথে মিলিয়ে দিতেন। কোনো স্থানীয় গ্রামদেবীকে ঘোষণা করা হতো পার্বতী বা দুর্গার একটি রূপ হিসেবে, আবার কোনো স্থানীয় বুনো শিকারী দেবতাকে দেখানো হতো শিব বা বিষ্ণুর অবতার হিসেবে। এর ফলে স্থানীয় মানুষের বিশ্বাসে কোনো আঘাত না হেনেও তাদেরকে বৃহৎ পৌরাণিক দেবমণ্ডলীর অংশ করে ফেলা যেত। এই প্রক্রিয়ার নামই আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে সংস্কৃতায়ন (Sanskritization) হিসেবে পরিচিত।
ইতিহাসবিদ কুণাল চক্রবর্তী (Kunal Chakrabarti) তার আকরগ্রন্থ রিলিজিয়াস প্রসেস: দ্য পুরাণাস অ্যান্ড দ্য মেকিং অব আ রিজিওনাল ট্র্যাডিশন (Religious Process: The Purāṇas and the Making of a Regional Tradition)-এ বাংলার সমাজ গঠনের প্রেক্ষাপটে এই প্রক্রিয়াটি বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছেন (Chakrabarti, 2001)। চক্রবর্তী দেখিয়েছেন যে প্রাচীন বাংলায় যখন বৈদিক ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রবেশ ঘটছিল, তখন স্থানীয় কৃষিভিত্তিক মাতৃতান্ত্রিক বিশ্বাসগুলোর সাথে ব্রাহ্মণ্যবাদের সংঘাত তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গীয় পুরাণগুলো, বিশেষ করে দেবীপুরাণ বা কালিকাপুরাণ, সেই সংঘাত মেটাতে অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। স্থানীয় দেবীদের ব্রাহ্মণ্য শাস্ত্রের ভেতরে জায়গা দেওয়া হলো, যার বিনিময়ে পুরোহিত হিসেবে ব্রাহ্মণদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো।
একই ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন ঐতিহাসিক বিজয় নাথ (Vijay Nath) তার গ্রন্থে (Nath, 2001)। নাথ দেখিয়েছেন যে রাজা ও সামন্তদের কাছ থেকে ব্রহ্মদেয় বা করমুক্ত জমি পেয়ে ব্রাহ্মণরা যখন দূরবর্তী অনগ্রসর অঞ্চলে বসতি স্থাপন করতে যেতেন, তখন তারা সাথে করে পুরাণ নিয়ে যেতেন। তারা স্থানীয় মিথগুলোকে সংস্কৃতে রূপান্তর করতেন এবং সেগুলোকে কোনো প্রধান পুরাণের সাথে জুড়ে দিতেন। এর ফলে স্থানীয় গোষ্ঠীগুলো নিজেদের সনাতন বৈদিক ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত ভেবে গর্ববোধ করত, অথচ তাদের সামাজিক অবস্থানটি নির্ধারিত হতো শূদ্র বা প্রান্তিক বর্ণ হিসেবে।
পুরাণসাহিত্যের এই হার্মেনিউটিক্স ছিল একাধারে অন্তর্ভুক্তি এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের এক সূক্ষ্ম রাজনীতি। পুরাণ বেদকে আকাশে তুলে রেখেছিল যাতে তার পবিত্রতার আলো দিয়ে সমস্ত নতুন উপাদানকে আলোকিত করা যায়, আবার মাটির গভীরে এমন এক শিকড় বিস্তার করেছিল যা প্রতিটি স্থানীয় বিশ্বাসকে নিজের ডালপালার সাথে বেঁধে ফেলেছিল। বৈদিক ঐতিহ্যের এই অভিনব পুনর্নির্মাণের কারণেই প্রাচীন বৈদিক সংহিতার যুগ শেষ হয়ে গেলেও ভারতীয় সমাজ পৌরাণিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে সেই আদি ঐতিহ্যের এক রূপান্তরিত রূপকে আজ অবধি বহন করে নিয়ে যেতে পেরেছে।
আগম, তন্ত্র ও হিন্দুধর্মে বৈদিক উত্তরাধিকার (Vedic Heritage in Āgamas, Tantras and Hinduism): মন্ত্র, মন্দিরপূজা, ভক্তি ও সমকালীন পুনর্ব্যাখ্যা
বৈদিক প্রামাণ্য বনাম আগমিক স্বাতন্ত্র্য: বৈধতার টানাপোড়েন (Vedic Authority versus Āgamic Autonomy: The Tensions of Legitimacy)
প্রাচীন ভারতের ধর্মীয় ইতিহাসের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে দুই ভিন্ন ধারার সংঘাত ও সমন্বয়ের কাহিনী। একদিকে ছিল বৈদিক ঐতিহ্যের প্রাচীন সংহিতা, ব্রাহ্মণ ও আরণ্যক সাহিত্য, যা যাগযজ্ঞের নিয়ম এবং বর্ণাশ্রমের কঠোর শৃঙ্খলার ওপর জোর দিত। অন্যদিকে আনুমানিক পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতক থেকে ক্রমান্বয়ে স্পষ্ট রূপ নিতে শুরু করল আগম (Āgama) এবং তন্ত্র (Tantra) সাহিত্যের ধারা। আগম ও তন্ত্রের গ্রন্থগুলো নিজেদের দাবি করল সরাসরি শিব, বিষ্ণু কিংবা পরাশক্তির মুখনিঃসৃত বাণী হিসেবে। এই নতুন ধারাগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও আধ্যাত্মিক চর্চার এমন সব নিয়ম উপস্থাপন করল, যা বৈদিক কর্মকাণ্ডের সাথে সরাসরি মিলত না। ফলে ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজের ভেতরে এক বড় ধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকট তৈরি হলো। প্রচলিত বৈদিক পণ্ডিতরা তন্ত্রকে সন্দেহের চোখে দেখতে লাগলেন, আবার তন্ত্রের অনুসারীরাও প্রাচীন বৈদিক যজ্ঞকে সময়ের অনুপযোগী বলে ঘোষণা করতে পিছপা হলেন না।
এই ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের ফলে ধর্মীয় ধারার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট বিভাজনরেখা তৈরি হয়েছিল। একটি পক্ষ পরিচিত হলো বৈদিক (Vaidika) নামে, আর অন্য পক্ষ নিজেদের পরিচয় দিল তান্ত্রিক (Tāntrika) বা আগমিক হিসেবে। আগমগুলো প্রধানত তিনটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল – শৈবাগমে শিব প্রধান, পঞ্চরাত্র ও বৈখানস আগমে বিষ্ণু প্রধান, এবং শাক্ততন্ত্রে দেবী হলেন পরম সত্তা। এই সাহিত্যের রচয়িতারা এক নতুন হার্মেনিউটিক যুক্তি খাড়া করলেন। তারা বললেন, সত্যযুগে বৈদিক যজ্ঞ হয়তো কার্যকর ছিল, কিন্তু কলিযুগের দুর্বল ও স্বল্পায়ু মানুষের পক্ষে সেই জটিল যাগযজ্ঞ করা অসম্ভব। তাই এই কলিযুগে মুক্তির একমাত্র সহজ ও সরাসরি পথ হলো আগম ও তন্ত্রের নির্দেশ মেনে চলা। এভাবে তন্ত্র নিজেকে বৈদিক আচারের চেয়েও শ্রেষ্ঠ এবং সমসাময়িক হিসেবে জাহির করতে চাইল।
ভারততাত্ত্বিক অ্যালেক্সিস স্যান্ডারসন (Alexis Sanderson) মধ্যযুগীয় ভারতে শৈবধর্মের বিস্তার ও তান্ত্রিক আধিপত্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই সময়টিতে তান্ত্রিক আচারগুলো রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিল (Sanderson, 2009)। স্যান্ডারসন তার গবেষণায় তুলে ধরেন যে মধ্যযুগের রাজারা নিজেদের শাসনকে সুরক্ষিত করতে বৈদিক যজ্ঞের চেয়ে তান্ত্রিক অভিচার ও সুরক্ষামূলক মন্ত্রের ওপর বেশি নির্ভর করতে শুরু করেছিলেন। এর ফলে বৈদিক পুরোহিতদের বাধ্য হয়ে তান্ত্রিক উপাদানগুলোকে নিজেদের কাঠামোর ভেতরে জায়গা দিতে হয়েছিল। সমাজের বৃহত্তর অংশ যখন তন্ত্রের দিকে ঝুঁকছিল, তখন গোঁড়া বৈদিক ঐতিহ্য যদি পুরোপুরি অনড় থাকত, তবে তাদের সমাজে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল।
এই দ্বন্দ্ব মেটানোর জন্য পরবর্তীকালের স্মৃতিশাস্ত্রের ভাষ্যকাররা এক দারুণ মধ্যপন্থা আবিষ্কার করলেন। ষোড়শ শতকের প্রখ্যাত স্মার্ত পণ্ডিত কুল্লূক ভট্ট (Kullūka Bhaṭṭa) মনুস্মৃতির ভাষ্য রচনা করতে গিয়ে একটি যুগান্তকারী ঘোষণা দিলেন। তিনি বললেন, শ্রুতি দুই প্রকার – এক প্রকার হলো বৈদিক শ্রুতি, আর অন্য প্রকার হলো তান্ত্রিক শ্রুতি। এই ঘোষণার মাধ্যমে তন্ত্রকে কার্যত বেদের সমান্তরাল বা দ্বিতীয় বেদ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হলো। ডাচ ভারততাত্ত্বিক টুন গাউড্রিয়ান (Teun Goudriaan) হিন্দু তন্ত্র বিষয়ক গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে তান্ত্রিক ঐতিহ্যগুলো কখনো বৈদিক কর্তৃত্বকে পুরোপুরি ছুড়ে ফেলে দেয়নি, বরং নিজেদের উচ্চতর সত্য হিসেবে দেখিয়ে বৈদিক কাঠামোকে ভেতরে টেনে নিয়েছিল (Goudriaan, 1981)। ফলে তৈরি হলো এক সমন্বিত ধর্মীয় বাস্তবতা, যেখানে বৈদিক আভিজাত্যের খোলসের ভেতরে তান্ত্রিক আচারগুলো নিরাপদে বিস্তার লাভ করতে পেরেছিল।
মন্ত্রের রূপান্তর: বৈদিক ঋক থেকে তান্ত্রিক বীজমন্ত্র (Transformation of Mantras: From Vedic Ṛks to Tāntric Bījamantras)
বৈদিক ধর্মে মন্ত্রের একটি সুনির্দিষ্ট ব্যাকরণ ছিল। ঋগ্বেদ বা যজুর্বেদের মন্ত্রগুলো ছিল ছন্দোবদ্ধ কাব্য, যার নির্দিষ্ট দেবতা, ঋষি এবং ছন্দ থাকত। সেই মন্ত্রগুলো উচ্চারণ করার সময় স্বর বা উদাত্ত-অনুদাত্ত-স্বরিত সুরের নিয়ম কঠোরভাবে মানতে হতো। সামান্য স্বরের ভুলে যজ্ঞের ফল নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে বিশ্বাস করা হতো। এই বৈদিক মন্ত্রগুলোর অর্থ বোঝা এবং সেগুলো যথাযথভাবে যজ্ঞের আগুনে প্রয়োগ করার অধিকার কেবল নির্দিষ্ট কিছু মানুষের হাতে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু তন্ত্রসাহিত্যের বিকাশের সাথে সাথে মন্ত্রের প্রকৃতিতে এক আমূল পরিবর্তন ঘটে গেল। শব্দ ও ধ্বনিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটাই সম্পূর্ণ পাল্টে দেওয়া হলো।
তন্ত্রে মন্ত্র আর কোনো দীর্ঘ স্তোত্র বা প্রার্থনাসংগীত রইল না। তা রূপান্তরিত হলো একক বা সংকুচিত শব্দধ্বনিতে, যাকে বলা হলো বীজমন্ত্র (Bījamantra)। যেমন ‘হ্রীং’, ‘ক্লীং’, ‘ঐং’, ‘শ্রীং’ কিংবা ‘ফট’। এই বীজমন্ত্রগুলোর আপাতদৃষ্টিতে কোনো ব্যাকরণগত বা আভিধানিক অর্থ থাকে না। বৈদিক সাহিত্যের মতো এখানে দেবতার উদ্দেশ্যে কোনো যুক্তিসঙ্গত স্তুতি নেই। ফরাসি ভারততাত্ত্বিক আন্দ্রে পাদো (André Padoux) কাশ্মীরের অদ্বৈত শৈব দর্শন ও তান্ত্রিক ধ্বনিতত্ত্বের বিশদ বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে তন্ত্রে শব্দকে কেবল ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে নয়, স্বয়ং মহাজাগতিক সৃষ্টির আদি কম্পন হিসেবে দেখা হয়েছিল (Padoux, 1990)। পাদো ব্যাখ্যা করেন যে পরা, পশ্যন্তী, মধ্যমা এবং বৈখরী – বাক্ বা শব্দের এই চার স্তরের মধ্য দিয়ে তন্ত্র এমন এক তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিল যেখানে প্রতিটি বর্ণ বা অক্ষর নিজেই এক একটি মহাজাগতিক শক্তির প্রতীক।
কাশ্মীর শৈবধর্মের প্রধান তাত্ত্বিক অভিনবগুপ্ত (Abhinavagupta) তার সুবিখ্যাত আকরগ্রন্থ তন্ত্রালোক (Tantrāloka)-এ মন্ত্রের এই দর্শনকে পরম উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। অভিনবগুপ্ত দেখান যে বৈদিক কর্মকাণ্ডের মন্ত্র যেখানে একটি বাহ্যিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ব্যবহৃত হতো, তান্ত্রিক মন্ত্র সেখানে চেতনার রূপান্তরের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। বীজমন্ত্রের ধ্বনি মানুষের ভেতরে থাকা পরম শক্তিকে জাগ্রত করে। এই ভাবনায় মাতৃকা বা বর্ণমালার প্রতিটি অক্ষর স্বয়ং পরমেশ্বরীর শরীর হিসেবে গণ্য হতে লাগল। ফলে বৈদিক মন্ত্রের অর্থ বোঝার যে ঐতিহ্য ছিল, তা ভেঙে দিয়ে শব্দের অন্তর্বর্তী শক্তির এক প্রতীকী ও মনস্তাত্ত্বিক অনুশাসন গড়ে তোলা হলো।
ভারততাত্ত্বিক সংযুক্তা গুপ্ত (Sanjukta Gupta) পঞ্চরাত্র ও তান্ত্রিক পূজাপদ্ধতি নিয়ে গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে তান্ত্রিক মন্ত্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল এর প্রয়োগিক সার্বজনীনতা (Gupta, 1979)। বৈদিক মন্ত্র যেখানে নির্দিষ্ট বর্ণ ছাড়া অন্যদের কাছে নিষিদ্ধ ছিল, তান্ত্রিক বীজমন্ত্রে দীক্ষা নেওয়ার সুযোগ সমাজের প্রায় সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল। তান্ত্রিক আচার্যরা দাবি করলেন যে প্রণব বা বৈদিক ‘ওঁ’ কারের মতোই প্রতিটি বীজমন্ত্র অসীম ক্ষমতার উৎস। তবে এই নতুন ধ্বনিতত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার সময়ও বৈদিক কর্তৃত্বের মায়া পুরোপুরি কাটানো যায়নি। তান্ত্রিক গ্রন্থগুলো প্রায়শই যুক্তি দিত যে এই বীজমন্ত্রগুলো আসলে বৈদিক সংহিতারই গোপন নির্যাস, যা ঋষিরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। এভাবে বৈদিক ছাতার নিচেই মন্ত্রের জগতে এক সম্পূর্ণ নতুন ভাষার রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো।
বাস্তু, মণ্ডপ ও মন্দিরপূজা: বৈদিক যজ্ঞবেদীর স্থাপত্যিক পুনর্বিন্যাস (Vāstu, Maṇḍapa and Temple Worship: Architectural Realignment of the Vedic Altar)
বৈদিক ধর্মের কোনো স্থায়ী উপাসনালয় বা মন্দির ছিল না। তাদের যাগযজ্ঞের কেন্দ্র ছিল উন্মুক্ত স্থানে তৈরি করা অস্থায়ী যজ্ঞশালা (Yajñaśālā)। নির্দিষ্ট মাপের ইট দিয়ে সেখানে তৈরি করা হতো অগ্নিকুণ্ড বা বেদী (Vedī)। যজ্ঞ শেষ হয়ে গেলে সেই বেদী ভেঙে ফেলা হতো বা ফেলে রাখা হতো; তার কোনো স্থায়ী পবিত্রতা ছিল না। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে চিরস্থায়ী কোনো পবিত্র স্থানের আকাঙ্ক্ষা সবসময়ই ছিল। এই ঐতিহাসিক শূন্যতা থেকেই প্রথম সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময়ে ভারতবর্ষে পাথরের স্থায়ী মন্দিরের বিস্তার ঘটতে শুরু করল। তবে এই মন্দিরগুলো শূন্য থেকে তৈরি হয়নি। আগম ও স্থাপত্যশাস্ত্রের লেখকেরা বৈদিক যজ্ঞবেদীর ধারণাকেই রূপান্তর করে স্থায়ী পাথরের মন্দিরে পরিণত করেছিলেন।
শিল্প ও স্থাপত্যের ইতিহাসবিদ স্টেলা ক্রামরিশ (Stella Kramrisch) তার যুগান্তকারী গ্রন্থ দ্য হিন্দু টেম্পল (The Hindu Temple)-এ দেখিয়েছেন যে মন্দিরের নির্মাণ নকশাটি আসলে বৈদিক যজ্ঞবেদীরই একটি স্থাপত্যিক বিস্তার (Kramrisch, 1946)। ক্রামরিশ ব্যাখ্যা করেন যে মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন থেকে শুরু করে ভূমিনকশা তৈরির মূল পরিকল্পনাটি পরিচালিত হতো বাস্তুপুরুষমণ্ডল (Vāstupuruṣamaṇḍala)-এর মাধ্যমে। বৈদিক পুরুষসূক্তের সেই আদি মহাজাগতিক পুরুষকে মাটিতে ফেলে তার শরীরের বিভিন্ন অংশে দেবতাদের স্থান নির্দিষ্ট করে মন্দিরের নকশা আঁকা হতো। মন্দিরের গর্ভগৃহটি ছিল যজ্ঞবেদীর সেই পবিত্র কেন্দ্র, যেখানে বহির্বিশ্বের কোনো আলো প্রবেশ করত না। বৈদিক যজ্ঞের আগুন যেখানে জ্বলত, মন্দিরে ঠিক সেই স্থানেই স্থাপন করা হলো দেবতার বিগ্রহ।
এই স্থাপত্যিক পরিবর্তনের ফলে উপাসনার রূপও বদলে গেল। আগমশাস্ত্রগুলো মন্দিরে দেবতার স্থায়ী বসবাসের জন্য তৈরি করল জটিল অনুশাসন, যার নাম প্রতিমাপ্রতিষ্ঠা (Pratimā-pratiṣṭhā)। দেবতাকে আর আকাশে অবস্থানকারী কোনো দূরবর্তী সত্তা মনে করা হলো না; তিনি মন্দিরের রাজকীয় প্রাসাদে বসবাসকারী এক জীবন্ত সম্রাট হিসেবে পূজিত হতে লাগলেন। তৈরি হলো ষোড়শোপচার (Ṣoḍaśopacāra) বা ষোলটি সেবার নিয়ম – দেবতাকে স্নান করানো, নতুন বস্ত্র পরানো, চন্দন লেপন, সুস্বাদু খাদ্য নিবেদন এবং সবশেষে আরতি করা। বৈদিক যজ্ঞের আগুনে পশুবলি বা ঘি ঢালার যে প্রক্রিয়া ছিল, তা প্রতিস্থাপিত হলো বিগ্রহের সেবার মাধ্যমে।
আমেরিকান ঐতিহাসিক রোনাল্ড এম. ডেভিডসন (Ronald M. Davidson) মধ্যযুগীয় ভারতের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় রূপান্তর বিশ্লেষণ করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে মন্দিরগুলো কেবল ধর্মীয় স্থান ছিল না, এগুলো ছিল সামন্ততান্ত্রিক ক্ষমতার প্রধান দুর্গ (Davidson, 2002)। ডেভিডসন দেখান যে রাজারা বিপুল পরিমাণ জমি ও ধনসম্পদ দান করে মন্দির নির্মাণ করতেন নিজেদের ক্ষমতাকে মহিমান্বিত করার জন্য। সাধারণ ভক্তের ভূমিকাও এখানে সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল। বৈদিক যুগে সাধারণ মানুষ ছিল যজ্ঞের পরোক্ষ দর্শক। মন্দিরে এসে মানুষ পেল সরাসরি বিগ্রহের দর্শন পাওয়ার অধিকার, যাকে বলা হলো দর্শন (Darśana)। মন্দিরের গর্ভগৃহ প্রদক্ষিণ করা এবং দেবতার চোখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার এই অভিজ্ঞতা বৈদিক যাগযজ্ঞের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে ধর্মের এক দৃশ্যমান ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দাঁড় করিয়েছিল।
তান্ত্রিক শারীরতত্ত্ব ও বৈদিক যজ্ঞের অন্তর্বর্তীকরণ (Tāntric Somatics and the Internalization of Vedic Sacrifice)
বৈদিক কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে দৃশ্যমান উপাদান ছিল বাহ্যিক আগুন। সেই আগুনে ঘি, কাঠ, সোমরস বা পশুর মাংস আহুতি দিয়ে দেবলোক ও মর্ত্যলোকের মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখা হতো। কিন্তু উপনিষদের যুগ থেকেই এই বাহ্যিক আগুনের উপযোগিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছিল। তন্ত্রসাহিত্যে এসে এই সন্দেহ একটি অত্যন্ত সুসংহত এবং চমকপ্রদ শারীরবৃত্তীয় তত্ত্বে রূপ নিল। তন্ত্র ঘোষণা করল যে মানুষের শরীরই হলো সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। বাইরে যা কিছু আছে – পাহাড়, নদী, সূর্য, চন্দ্র, এমনকি স্বয়ং বৈদিক যজ্ঞের অগ্নি – তার সবকিছুই মানুষের শরীরের ভেতরে বিদ্যমান। ফলে মুক্তি বা সিদ্ধি লাভের জন্য বাইরে কোনো যজ্ঞবেদী তৈরি করার দরকার নেই; নিজের শরীরকেই বানিয়ে ফেলতে হবে পরম যজ্ঞের স্থান।
এই চিন্তার ওপর ভিত্তি করেই তন্ত্রে গড়ে উঠল সূক্ষ্ম শারীরতত্ত্বের এক সুবিশাল বিজ্ঞান। মানুষের দৃশ্যমান মাংসপিণ্ডের শরীরের আড়ালে কল্পনা করা হলো এক সূক্ষ্ম শরীর (Sūkṣma Śarīra)। এই সূক্ষ্ম শরীরে রয়েছে অসংখ্য শক্তির পথ, যার নাম নাড়ী (Nāḍī)। তার মধ্যে প্রধান তিনটি নাড়ী হলো ইড়া, পিঙ্গলা এবং সুষুম্না। শরীরের মেরুদণ্ডের নিচ থেকে মাথার তালু পর্যন্ত কল্পনা করা হলো ছয়টি শক্তি কেন্দ্র বা চক্র (Cakra) – মূলাধার থেকে সহস্রার। আর মূলাধারে ঘুমিয়ে থাকা সুপ্ত শক্তিকে বলা হলো কুণ্ডলিনী (Kuṇḍalinī)। ধর্মীয় ইতিহাসবিদ ডেভিড গর্ডন হোয়াইট (David Gordon White) তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য অ্যালকেমিক্যাল বডি (The Alchemical Body)-তে বিশ্লেষণ করেছেন যে কীভাবে মধ্যযুগীয় নাথযোগী ও তান্ত্রিকরা মানুষের শরীরকে একটি পরীক্ষাগারে রূপান্তর করেছিলেন (White, 1996)। হোয়াইট দেখান যে রসায়নশাস্ত্র, ধাতুবিদ্যা এবং বৈদিক যজ্ঞের প্রক্রিয়াগুলোকে টেনে এনে মানুষের বায়ু, বীর্য ও চেতনার নিয়ন্ত্রণের সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
এই শারীরতাত্ত্বিক রূপান্তরের মাধ্যমে বৈদিক যজ্ঞকে কীভাবে শরীরের ভেতরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল, তা দেখলে বিস্মিত হতে হয়। তন্ত্রে বলা হলো, মানুষের পাকস্থলীর যে পাচক রস বা জঠরাগ্নি (Jaṭharāgni) রয়েছে, তা-ই হলো যজ্ঞের আহবনীয় অগ্নি। মানুষ যে শ্বাস গ্রহণ করছে এবং ত্যাগ করছে, অর্থাৎ প্রাণ ও অপান বায়ু, তা-ই হলো যজ্ঞের দুটি ধারা। মানুষ যা কিছু খাদ্য গ্রহণ করে বা ইন্দ্রিয় দিয়ে যা অনুভব করে, তা সবই সেই অভ্যন্তরীণ আগুনে নিবেদিত হচ্ছে। ব্রিটিশ ভারততাত্ত্বিক গেভিন ফ্লাড (Gavin Flood) তার গ্রন্থ দ্য অ্যাসকেটিক সেলফ (The Ascetic Self)-এ দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই অভ্যন্তরীণ যজ্ঞের ধারণা বৈদিক যজ্ঞের বাহ্যিক আয়োজনকে অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছিল (Flood, 2004)। ফ্লাড উল্লেখ করেন যে তান্ত্রিক সাধক নিজের শরীরের ভেতরেই দেবতাকে স্থাপন করেন এবং নিজের রক্তমাংসের কাঠামোটিকে একটি মহাজাগতিক মন্দিরে পরিণত করেন।
এই অন্তর্বর্তীকরণের সামাজিক অভিঘাত ছিল অত্যন্ত গভীর। যদি নিজের শরীরই যজ্ঞশালা হয় এবং নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসই যদি আহুতি হয়, তবে আর কোনো পুরোহিতের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন থাকে না। এর জন্য কোনো রাজকীয় ব্যয়ের প্রয়োজন নেই, কোনো পশু হত্যার দরকার নেই। এমনকি কোনো বিশেষ সামাজিক বর্ণে জন্ম নেওয়ারও বাধ্যবাধকতা থাকে না। বৈদিক সাহিত্যের যে যাগযজ্ঞ কেবল ধনী ও উচ্চবর্ণের পুরুষদের জন্য উন্মুক্ত ছিল, তান্ত্রিক শারীরতত্ত্ব তাকে নিয়ে এলো মানুষের নিজের চামড়া ও হাড়ের সীমানায়। এটি ছিল প্রাচীন বৈদিক ধর্মাদর্শের সবচেয়ে বৈপ্লবিক হার্মেনিউটিক পুনর্নির্মাণ, যেখানে যজ্ঞ টিকে রইল ঠিকই, কিন্তু তার রক্তক্ষয়ী ও অভিজাত চরিত্রটি সম্পূর্ণ হারিয়ে গেল মানুষের নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরবৃত্তীয় অভিজ্ঞতার গভীরে।
ভক্তি আন্দোলন ও তান্ত্রিক ঐতিহ্যের সামাজিক অভিঘাত (The Bhakti Movement and the Social Impact of the Tāntric Tradition)
মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষে যখন ভক্তি আন্দোলনের প্রবল জোয়ার তৈরি হলো, তখন তার সাথে তন্ত্রের এক গভীর ও জটিল সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বৈদিক বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা যেখানে মানুষকে তাদের জন্ম দিয়ে কঠোরভাবে ভাগ করে রেখেছিল, সেখানে তন্ত্র একটি অদ্ভুত দ্বৈত আচরণ প্রদর্শন করল। তত্ত্বগতভাবে তন্ত্র ছিল বৈষম্যহীনতার এক প্রবল সমর্থক। তান্ত্রিক গ্রন্থগুলোতে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছিল যে তান্ত্রিক দীক্ষা (Dīkṣā) গ্রহণ করার পর মানুষের পূর্ববর্তী কোনো বর্ণ বা জাতিপরিচয় আর অবশিষ্ট থাকে না। ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে অন্ত্যজ শূদ্র – যে কেউই দীক্ষা নিলে একই শিবত্ব বা শক্তিময়তা অর্জন করে। তন্ত্রের গোপন আচারে, বিশেষ করে চক্রপূজা (Cakrapūjā)-র গোলকধাঁধায় যখন সাধকেরা বসতেন, তখন সমস্ত সামাজিক ভেদাভেদ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যেত।
আমেরিকান সমাজতাত্ত্বিক ও ধর্মগবেষক হিউ বি. আরবান (Hugh B. Urban) তার আকরগ্রন্থ তন্ত্র: সেক্স, সিক্রেসি, পলিটিক্স, অ্যান্ড পাওয়ার ইন দ্য স্টাডি অব রিলিজিয়ন (Tantra: Sex, Secrecy, Politics, and Power in the Study of Religion)-এ তন্ত্রের এই সামাজিক মাত্রার ব্যবচ্ছেদ করেছেন (Urban, 2003)। আরবান দেখান যে তন্ত্রের এই ক্ষমতা কাঠামোটি ছিল একই সাথে ধ্বংসাত্মক এবং রক্ষণশীল। একদিকে তা বৈদিক ব্রাহ্মণ্যবাদের শুদ্ধ-অশুদ্ধের ধারণাকে সরাসরি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মদ, মাংস এবং সমাজের নিচু স্তরের নারীদের সাথে সাধনাকে মোক্ষের পথ বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে এই অবাধ্যতা কিন্তু সমাজকে বদলে ফেলার জন্য রাজপথে নামেনি; তা কার্যকর থাকত কেবল রুদ্ধদ্বার তান্ত্রিক চক্রের ভেতরে। চক্রপূজা শেষ হয়ে গেলে সাধককে আবার তার প্রচলিত সামাজিক পরিচয়ে ফিরে যেতে হতো।
তবুও এই তান্ত্রিক ভাবাবেগ মধ্যযুগীয় ভক্তি আন্দোলনের ওপর এক বিশাল ছাপ ফেলেছিল। বিশেষ করে বাংলায় বৈষ্ণব সহজিয়া ধারা এবং শাক্ত পদাবলীর উত্থানের পেছনে তন্ত্রের শারীরতত্ত্ব ও ভক্তির মেলবন্ধন ছিল প্রধান চালিকাশক্তি। কৃষ্ণ ও রাধার প্রেমকে তান্ত্রিক পুরুষ ও প্রকৃতির মিলন হিসেবে দেখা হতে লাগল। রামপ্রসাদ সেনের মতো শাক্ত কবিরা যখন গান বাঁধলেন, তখন সেই গানের ভাষায় বৈদিক যাগযজ্ঞের কঠিন উপমাগুলো গলে গিয়ে এক পরম স্নেহের মাতৃরূপের উপাসনায় পরিণত হলো। দক্ষিণ ভারতের শ্রীবিদ্যা ঐতিহ্যের ওপর গবেষণা করতে গিয়ে ভারততাত্ত্বিক ডগলাস রেনফ্রিউ ব্রুকস (Douglas Renfrew Brooks) দেখিয়েছেন যে কীভাবে উচ্চবর্ণের স্মার্ত ব্রাহ্মণরাও তন্ত্রের ভেতরের বিপজ্জনক উপাদানগুলোকে ছেঁকে ফেলে তাকে বৈদিক দর্শনের সাথে মিলিয়ে নিয়েছিলেন (Brooks, 1990)। ব্রুকস এই প্রক্রিয়াকে নাম দিয়েছেন ‘শুভ্র তন্ত্র’ বা বৈদিকীকরণ।
এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ভক্তি আন্দোলন তন্ত্রের কাছ থেকে এক পরম শক্তি লাভ করেছিল। বৈদিক সাহিত্যে যেখানে নারীদের স্থান ছিল গৌণ এবং যাগযজ্ঞে তারা ছিলেন কেবল স্বামীর সঙ্গী মাত্র, তন্ত্রসাহিত্যে নারীকে স্বয়ং শক্তির মূর্ত প্রতীক হিসেবে ঘোষণা করা হলো। একজন নারীকে অসম্মান করাকে তন্ত্রে চরম পাপ বলে নিদান দেওয়া হয়েছিল। এমনকি দীক্ষাগুরু হিসেবে নারীদের স্থানকে অত্যন্ত উচ্চে রাখা হলো। বৈদিক আধিপত্যের যে দেয়াল নারীকে জ্ঞানের আলো থেকে দূরে রেখেছিল, তন্ত্রের এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি সেই দেয়ালের গায়ে বড়সড় ফাটল ধরিয়ে দিয়েছিল। যদিও বাস্তব সমাজে পিতৃতান্ত্রিক শোষণ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, কিন্তু ধর্মীয় তত্ত্বের জগতে নারীর এই মহিমান্বিত রূপ এক নতুন নৈতিক ভারসাম্য তৈরি করেছিল।
সমকালীন হিন্দুধর্মে বৈদিক ও তান্ত্রিক ঐতিহ্যের মিশ্রণ (The Fusion of Vedic and Tāntric Traditions in Contemporary Hinduism)
আজকের দিনে একজন সাধারণ মানুষ যখন কোনো হিন্দু মন্দিরে যান বা নিজের বাড়িতে কোনো পূজা করেন, তখন তিনি যে আচারগুলো প্রত্যক্ষ করেন, তা কোনো একক উৎসের নয়। এটি হলো বৈদিক এবং তান্ত্রিক ঐতিহ্যের এক শতাব্দীপ্রাচীন নিরবচ্ছিন্ন মিশ্রণ। যে পুরোহিত পূজা করছেন, তিনি হয়তো মুখে বৈদিক গায়ত্রী মন্ত্র পাঠ করছেন, কিন্তু তার হাত দিয়ে তিনি করছেন নানা ধরনের তান্ত্রিক মুদ্রা এবং তিনি বিগ্রহের ওপর প্রয়োগ করছেন তান্ত্রিক অঙ্গন্যাস ও করন্যাস। অর্থাৎ, শরীর দিয়ে তিনি যা করছেন তা আগম ও তন্ত্রের বিধান, আর মুখ দিয়ে তিনি যা উচ্চারণ করছেন তা প্রাচীন বৈদিক ঋক। এই বৈদিক-তান্ত্রিক সংশ্লেষই হলো আধুনিক হিন্দুধর্মের আসল চেহারা।
উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক আধুনিকতার যুগে যখন হিন্দুধর্মের পুনর্মূল্যায়ন শুরু হলো, তখন এই মিশ্রণটি এক নতুন টানাপোড়েনের মুখে পড়েছিল। ব্রাহ্মসমাজ বা আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী (Swami Dayananda Saraswati) ঘোষণা করলেন ‘বেদে ফিরে যাও’। তিনি তন্ত্র ও পৌরাণিক মূর্তিপূজাকে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অবৈদিক বিকৃতি হিসেবে বর্জন করার ডাক দিলেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তন্ত্রের যে শিকড় হাজার বছর ধরে ছড়িয়ে ছিল, তাকে উপড়ে ফেলা সম্ভব ছিল না। এর ঠিক বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংস এবং তার শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ (Swami Vivekananda)। রামকৃষ্ণ সরাসরি তান্ত্রিক সাধনার মধ্য দিয়ে তার ধর্মীয় যাত্রা শুরু করেছিলেন এবং বিবেকানন্দ সেই তান্ত্রিক উপলব্ধিকে বেদান্তের বিশ্বজনীন ভাবাদর্শের সাথে যুক্ত করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরেছিলেন।
আমেরিকান ধর্মীয় ইতিহাসবিদ ব্রায়ান কে. পেনিংটন (Brian K. Pennington) তার গবেষণা গ্রন্থ ওয়াজ হিন্দুইজম ইনভেন্টেড? (Was Hinduism Invented?)-এ দেখিয়েছেন যে কীভাবে উনিশ শতকে ব্রিটিশদের সমালোচনার মুখে পড়ে হিন্দু সংস্কারকরা তাদের ধর্মকে এক পরিচ্ছন্ন রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন (Pennington, 2005)। পেনিংটন দেখান যে ঔপনিবেশিক শাসকেরা তন্ত্রকে কামুকতা ও কুসংস্কারের আঁতুড়ঘর হিসেবে চিত্রিত করেছিল। এর ফলে আধুনিক শিক্ষিত হিন্দুরা তন্ত্রের যৌনতা ও পশুবলির মতো বিষয়গুলোকে আড়াল করে তার ভেতরের দার্শনিক ও যোগভিত্তিক দিকগুলোকে বেশি করে সামনে নিয়ে আসতে শুরু করেন। এর ফলে তন্ত্রের একটি ‘বিশুদ্ধ’ বা পরিমার্জিত রূপ আধুনিক সমাজে প্রতিষ্ঠা পায়।
অন্যদিকে ভারততাত্ত্বিক রিচার্ড এইচ. ডেভিস (Richard H. Davis) তার গ্রন্থে আধুনিক ভারতে মন্দিরের বিগ্রহগুলোর সামাজিক জীবনের ইতিহাস অনুসন্ধান করেছেন (Davis, 1997)। ডেভিস দেখিয়েছেন যে সমকালীন বড় বড় মন্দিরগুলোর পরিচালনা, উৎসবের দিনপঞ্জি এবং ভক্তদের আচার-আচরণ এখনো পুরোপুরি পরিচালিত হয় মধ্যযুগীয় আগমশাস্ত্রের নিয়মে। এই আধুনিক রূপটি প্রমাণ করে যে বৈদিক ঐতিহ্যকে হিন্দুধর্ম কখনোই ত্যাগ করেনি, বরং তাকে রেখেছে এক দূরবর্তী ও শ্রদ্ধেয় পিতৃপুরুষের মতো। আর সেই ঐতিহ্যের বাস্তব দেহ হিসেবে কাজ করেছে আগম ও তন্ত্রের সুবিশাল সংকলন। সমকালীন হিন্দুধর্মের হার্মেনিউটিক কাঠামোটি দাঁড়িয়েই আছে এই যুগলবন্দির ওপর – বৈদিক শাস্ত্র সেখানে জোগায় প্রাচীন বিশুদ্ধতার প্রতীকী বৈধতা, আর আগম ও তন্ত্র সরবরাহ করে প্রতিদিনের পূজাপদ্ধতি, স্থাপত্য, আবেগ এবং ভক্তিমূলক বেঁচে থাকার বাস্তব রসদ।
পরবর্তী হিন্দু ধর্মীয় সাহিত্যের হার্মেনিউটিক্স (Hermeneutics of Later Hindu Religious Literature): গাডামার, রিক্যুর, হাবারমাস, ফুকো ও দেরিদার তাত্ত্বিক প্রয়োগ
গাডামারের ঐতিহাসিক দিগন্ত ও প্রয়োগতত্ত্ব: বৈদিক শ্রুতির ব্যাখ্যা থেকে স্মৃতিশাস্ত্রের জন্ম (Gadamer’s Historical Horizon and Theory of Application: Birth of Smṛti Literature from the Interpretation of Vedic Śruti)
প্রাচীন কোনো গ্রন্থ কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নতুন নতুন সাহিত্যের জন্ম দেয়, তা বোঝার জন্য আধুনিক ব্যাখ্যাতত্ত্ব বা হার্মেনিউটিক্স আমাদের চমৎকার কিছু হাতিয়ার দেয়। জার্মান দার্শনিক হান্স-গেয়র্গ গাডামার (Hans-Georg Gadamer) তার সুবিখ্যাত গ্রন্থ সত্য ও পদ্ধতি (Truth and Method)-তে দেখিয়েছেন যে কোনো প্রাচীন পাঠ্যকে বোঝার প্রক্রিয়াটি কোনো নিষ্ক্রিয় কাজ নয় (Gadamer, 1989)। গাডামারের মতে, হার্মেনিউটিক্স বা ব্যাখ্যার ভেতর তিনটি বিষয় একসাথে কাজ করে – অনুধাবন, ব্যাখ্যা এবং প্রয়োগ (application)। অর্থাৎ, পরবর্তীকালের কোনো ব্যাখ্যাকার কোনো প্রাচীন গ্রন্থ পাঠ করার সময় তার নিজের যুগের বাস্তবতা ও প্রয়োজনের নিরিখে সেই গ্রন্থের অর্থকে নতুন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করেন। পরবর্তী হিন্দু ধর্মীয় সাহিত্যের প্রথম বড় স্তর অর্থাৎ স্মৃতিসাহিত্য (Smṛti literature) – যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধর্মসূত্র (Dharmaśūtra) এবং ধর্মশাস্ত্র (Dharmaśāstra) – সরাসরি বৈদিক সাহিত্যের এই ব্যবহারিক প্রয়োগ ও ব্যাখ্যার ফসল হিসেবেই গড়ে উঠেছে।
বৈদিক সাহিত্যের শেষভাগে রচিত কল্পসূত্র (Kalpasūtra)-র একটি অংশ ছিল শ্রৌতসূত্র ও গৃহ্যসূত্র, আর সেখান থেকেই সরাসরি জন্ম নেয় ধর্মসূত্রগুলো। বৈদিক ব্রাহ্মণ সাহিত্য (Brāhmaṇa literature)-র ভেতর যে যজ্ঞকেন্দ্রিক নির্দেশ বা ‘বিধি’ এবং তার প্রশংসামূলক বাক্য বা ‘অর্থবাদ’ ছিল, স্মৃতিকাররা সেগুলোর ওপরই তাদের পুরো আইনি ও সামাজিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন (Olivelle, 1999)। উদাহরণস্বরূপ, বৈদিক যজ্ঞবেদিতে প্রবেশের জন্য পুরোহিত ও যজমানের যে আচারগত শুদ্ধতার নিয়ম ছিল, আপস্তম্ব বা বৌধায়নের মতো ধর্মসূত্রকাররা এবং পরবর্তীকালে মনুস্মৃতি (Manusmṛti) বা যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতি (Yājñavalkyasmṛti)-র রচয়িতারা সেই যজ্ঞীয় শুদ্ধতার ধারণাটিকে ব্যাখ্যা করে সার্বক্ষণিক সামাজিক শুদ্ধতা ও অস্পৃশ্যতার বিধানে রূপান্তরিত করেন। গাডামারের ভাষায় একে বলা যায় দিগন্তের সম্মিলন (fusion of horizons)। প্রাচীন বৈদিক পুরোহিতদের যজ্ঞীয় দিগন্তের সাথে পরবর্তীকালের নগর ও রাষ্ট্রব্যবস্থার আইনপ্রণেতাদের ঐতিহাসিক দিগন্ত মিলেমিশে তৈরি হয় স্মৃতিশাস্ত্রের নতুন পাঠ।
বৈদিক সাহিত্যের ব্যাখ্যার ওপরই যে স্মৃতিশাস্ত্রগুলো দাঁড়িয়ে আছে, তার সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করেছিল পূর্ব মীমাংসা (Pūrva Mīmāṃsā) দর্শন। জৈমিনি তার মীমাংসাসূত্রে এবং পরবর্তীকালে শবরস্বামী ও কুমারিল ভট্টের মতো তাত্ত্বিকরা বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছেন যে স্মৃতির নিজস্ব কোনো স্বাধীন কর্তৃত্ব নেই; স্মৃতির প্রতিটি বিধানের উৎস হলো বৈদিক শ্রুতি (Clooney, 1990)। যেখানে স্মৃতির কোনো নিয়মের সাথে প্রত্যক্ষ বৈদিক মন্ত্র বা ব্রাহ্মণ বাক্যের মিল পাওয়া যেত না, সেখানে তারা ‘অনুমিত শ্রুতি’ তত্ত্বের অবতারণা করতেন। এর মানে দাঁড়ায়, স্মৃতিকাররা যেহেতু বৈদিক ঐতিহ্যের ভেতরেই বসবাস করতেন, তাই তাদের প্রদত্ত প্রতিটি সামাজিক নিয়ম কোনো না কোনো বিলুপ্ত বা প্রচ্ছন্ন বৈদিক পাঠেরই ব্যাখ্যা। গাডামারের পূর্বধারণা (prejudice) এবং ঐতিহ্যের কর্তৃত্ব (authority of tradition) তত্ত্বের আলোকে বিষয়টি দেখলে বোঝা যায় যে বৈদিক পাঠ এখানে এমন এক পূর্ব-কাঠামো হিসেবে কাজ করেছে, যার বাইরে গিয়ে কোনো সামাজিক বা আইনি চিন্তা করা তৎকালীন ব্রাহ্মণ্য সমাজের পক্ষে সম্ভব ছিল না (Halbfass, 1991)।
গাডামারের কার্যকর ইতিহাস (effective history) তত্ত্বটি আমাদের আরও দেখায় যে মূল পাঠ্য এবং তার পরবর্তী ভাষ্যগুলোর মধ্যে কোনো দেয়াল তোলা যায় না, কারণ মূল পাঠ্যটি ইতিহাসের ভেতর দিয়ে তার ব্যাখ্যার মাধ্যমেই বেঁচে থাকে। ঋগ্বেদের বিবাহসূক্ত বা অন্ত্যেষ্টিসূক্তের মতো মন্ত্রগুলোকে কেন্দ্র করে স্মৃতিশাস্ত্রগুলোতে গড়ে উঠেছে পিতৃসূত্রীয় পরিবারপ্রথা, নারীর সম্পত্তির অধিকার সংক্রান্ত জটিল বিধান এবং পিণ্ডদানের মতো শ্রাদ্ধ-আইন (Lingat, 1973)। আবার মেধাতিথি, বিজ্ঞানেশ্বর বা কুল্লুক ভট্টের মতো মধ্যযুগীয় টীকাকাররা স্মৃতিশাস্ত্রের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পুনরায় বৈদিক শ্রুতিবাক্যগুলোকেই টেনে এনেছেন। ফলে গাডামারের তাত্ত্বিক লেন্স ব্যবহার করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ধর্মসূত্র ও স্মৃতিশাস্ত্রগুলো কোনো স্বতন্ত্র বা বিচ্ছিন্ন সাহিত্য নয়; এগুলো হলো পরিবর্তিত সময়ের দাবিতে বৈদিক শ্রুতিরই ক্রমবর্ধমান আইনি ও সামাজিক ভাষ্য।
পল রিক্যুরের অবয়বান্তর ও রূপক তত্ত্ব: বৈদিক যজ্ঞ ও সংহিতার ব্যাখ্যায় মহাকাব্য ও গীতার নির্মাণ (Paul Ricoeur’s Theory of Distanciation and Metaphor: Construction of the Epics and Gītā through the Interpretation of Vedic Sacrifice and Saṃhitās)
বৈদিক সাহিত্যের আচারগত ও দার্শনিক কাঠামো কীভাবে মহাকাব্য এবং ভগবদ্গীতার মতো গ্রন্থে রূপান্তরিত হলো, তা বিশ্লেষণের জন্য ফরাসি দার্শনিক পল রিক্যুর (Paul Ricoeur)-এর ব্যাখ্যাতত্ত্ব বেশ কার্যকর। রিক্যুর তার ব্যাখ্যার তত্ত্ব (Interpretation Theory) এবং টেক্সট থেকে ক্রিয়ায় (From Text to Action) গ্রন্থে পাঠ্যগত দূরত্ব (distanciation) এবং আত্তীকরণ (appropriation) নামে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার কথা বলেছেন (Ricoeur, 1976)। রিক্যুর দেখান যে মৌখিক বা আচারগত ভাষা যখন একটি স্থির পাঠ্যে পরিণত হয়, তখন তা তার আদি প্রেক্ষাপট ও আদি শ্রোতার গণ্ডি থেকে মুক্ত হয়ে এক ধরনের দূরত্ব অর্জন করে। এই দূরত্বের কারণেই পরবর্তীকালের পাঠক ও লেখকরা সেই প্রাচীন পাঠ্যকে নিজেদের নতুন সংকটের আলোকে আত্তীকরণ বা পুনর্ব্যাখ্যা করতে পারেন। রামায়ণ (Rāmāyaṇa), মহাভারত (Mahābhārata) এবং ভগবদ্গীতা (Bhagavad Gītā) হলো বৈদিক সংহিতা, ব্রাহ্মণ ও উপনিষদের এই পাঠ্যগত দূরত্ব ও পুনর্ব্যাখ্যার সরাসরি ফসল।
মহাভারত গ্রন্থটি নিজের পরিচয় দেয় ‘কার্যষ্ণ বেদ’ বা কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসের বেদ হিসেবে এবং সেখানে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে যে ইতিহাস ও পুরাণের মাধ্যমে বেদের অর্থকে সম্প্রসারিত বা পরিপুষ্ট করতে হবে (Hiltebeitel, 2001)। মহাভারতের পুরো আখ্যানকাঠামোটি লক্ষ করলে দেখা যায়, এটি আসলে বৈদিক যজ্ঞ (yajña) এবং বৈদিক দেব-অসুর সংগ্রামের এক বিশালাকার সাহিত্যিক ভাষ্য। সংহিতা ও ব্রাহ্মণ সাহিত্যে ইন্দ্র, বায়ু, ধর্ম, অশ্বিনীকুমারদ্বয় এবং অসুরদের যে দ্বন্দ্বের কথা বলা হয়েছে, মহাভারতের পাণ্ডব ও কৌরবদের চরিত্রগুলোকে সরাসরি সেই বৈদিক দেবতা ও অসুরদের অংশাবতার হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে। এমনকি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধটিকে মহাভারতে ধাপে ধাপে একটি রণযজ্ঞ (sacrifice of battle) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে অস্ত্রশস্ত্র হলো যজ্ঞের স্রুক ও স্রুব, আর যোদ্ধাদের রক্ত হলো যজ্ঞের আহুতি। রিক্যুর তার জীবন্ত রূপক (The Rule of Metaphor) গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে পুরোনো আক্ষরিক অর্থ অকার্যকর হয়ে পড়লে ভাষা কীভাবে নতুন রূপকের জন্ম দেয় এবং নতুন অর্থের দিগন্ত উন্মোচন করে (Ricoeur, 1977)। বৈদিক পশুযজ্ঞ ও সোমযজ্ঞের আক্ষরিক কাঠামোটিকে রূপকায়িত করেই মহাকাব্যের লেখকরা তাদের রাজনৈতিক ও নৈতিক আখ্যানের সৌধ নির্মাণ করেছেন।
ভগবদ্গীতার দিকে তাকালে বৈদিক সাহিত্যের এই হার্মেনিউটিক পুনর্গঠন আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। গীতার তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়ে বৈদিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রীয় ধারণা ‘কর্ম’, ‘যজ্ঞ’ এবং ‘ব্রহ্ম’-কে ধরে ধরে নতুন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে ‘কর্ম’ শব্দের অর্থ ছিল সুনির্দিষ্টভাবে অগ্নিহোত্র বা দর্শপূর্ণমাসের মতো যাগযজ্ঞের অনুষ্ঠান। শতপথ ব্রাহ্মণের সেই বিখ্যাত ধারণা – যজ্ঞের দ্বারাই প্রজাপতি জগৎ সৃষ্টি করেছেন এবং যজ্ঞই মহাজাগতিক চাকা সচল রাখে – গীতায় সরাসরি উদ্ধৃত ও ব্যাখ্যাত হয়েছে ‘সহযজ্ঞাঃ প্রজাঃ সৃষ্ট্বা’ শ্লোকের মাধ্যমে (Malinar, 2007)। কিন্তু গীতার রচয়িতা রিক্যুরের অর্থের উদ্বৃত্ত (surplus of meaning) বা শব্দের ভেতর লুকিয়ে থাকা অতিরিক্ত অর্থের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বৈদিক যজ্ঞের অর্থকে প্রসারিত করেছেন। গীতায় দ্রব্যযজ্ঞের পাশাপাশি তপোযজ্ঞ, যোগযজ্ঞ, প্রাণায়াম এবং জ্ঞানযজ্ঞকেও বৈদিক যজ্ঞের রূপান্তর হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এছাড়া বৈদিক সাহিত্যের শেষ ভাগ অর্থাৎ উপনিষদ (Upaniṣads)-এর যে ব্রহ্মতত্ত্ব ও আত্মতত্ত্ব, গীতা ও মহাকাব্য সেগুলোরই একটি সমন্বিত ভাষ্য হিসেবে কাজ করেছে। কঠ উপনিষদের রথের রূপক এবং আত্মার অবিনশ্বরতার মন্ত্রগুলো গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে সরাসরি পুনর্ব্যবহৃত ও ব্যাখ্যাত হয়েছে ক্ষত্রিয়র যুদ্ধ-কর্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য (Larson, 1981)। রিক্যুর যেমন বলেন যে প্রতিটি ব্যাখ্যাই প্রাচীন টেক্সটের সামনে একটি নতুন সম্ভাব্য জগৎ উন্মোচন করে, ঠিক তেমনই মহাকাব্য ও গীতার রচয়িতারা বৈদিক সংহিতার কর্ম এবং উপনিষদের জ্ঞানের মধ্যে এক ব্যাখ্যামূলক সেতুবন্ধন তৈরি করে নিষ্কাম কর্ম ও ভক্তির নতুন ধর্মীয় জগৎ নির্মাণ করেছেন (Ricoeur, 1981)। বৈদিক সাহিত্যের শব্দভাণ্ডার, প্রতীক এবং দার্শনিক প্রশ্নগুলোকে কেন্দ্র করে আবর্তিত না হলে মহাকাব্য বা গীতার একটি অধ্যায়ও গড়ে উঠতে পারত না।
রিক্যুরের আখ্যানতত্ত্ব ও সন্দেহের হার্মেনিউটিক্স: বৈদিক সূক্তের পৌরাণিক ভাষ্য ও সম্প্রসারণ (Ricoeur’s Narrative Theory and Hermeneutics of Suspicion: Purāṇic Commentary and Expansion of Vedic Hymns)
মহাকাব্যের মতো পুরাণ সাহিত্য (Purāṇic literature)-ও তার অস্তিত্বের জন্য বৈদিক সাহিত্যের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল। পল রিক্যুর (Paul Ricoeur) তার সময় ও আখ্যান (Time and Narrative) গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে মানুষ বিচ্ছিন্ন প্রতীক, ঘটনা ও মহাজাগতিক সময়ের ধারণাকে আখ্যানবিন্যাস (emplotment)-এর মাধ্যমে বোধগম্য কাহিনীতে রূপান্তর করে (Ricoeur, 1984)। ভারতীয় ঐতিহ্যে পুরাণের কাজকে বলা হয়েছে উপবৃংহণ (upabṛṃhaṇa), যার আক্ষরিক অর্থ হলো সংক্ষিপ্ত বা ঘনীভূত বৈদিক বীজকে জল ও সার দিয়ে বিশাল আখ্যান-বৃক্ষে পরিণত করা। রিক্যুরের আখ্যানতত্ত্বের আলোকে দেখলে বোঝা যায়, বৈদিক সংহিতার যে মন্ত্রগুলো ছিল ইঙ্গিতধর্মী ও কাব্যিক, পুরাণকাররা সেগুলোর ওপর আখ্যানবিন্যাস প্রয়োগ করে শত শত পৃষ্ঠার পৌরাণিক কাহিনী তৈরি করেছেন।
নির্দিষ্ট কিছু বৈদিক সূক্তের দিকে তাকালে এই ব্যাখ্যামূলক প্রক্রিয়াটি হাতেনাতে ধরা পড়ে। যেমন, ঋগ্বেদ (Ṛgveda)-এর দশম মণ্ডলের ৯৫তম সূক্তে রাজা পুরূরবা ও অপ্সরা উর্বশীর মাত্র আঠারোটি মন্ত্রের একটি সংলাপ বা সংবাদ সূক্ত (Saṃvāda Sūkta) রয়েছে। সেখানে তাদের বিচ্ছেদের কথাটুকু কেবল ইঙ্গিতে বলা আছে। পরবর্তীকালে শতপথ ব্রাহ্মণ (Śatapatha Brāhmaṇa) হয়ে বিষ্ণুপুরাণ (Viṣṇu Purāṇa) ও ভাগবতপুরাণ (Bhāgavata Purāṇa)-এ এসে সেই সংক্ষিপ্ত বৈদিক সূক্তটিই দীর্ঘ আখ্যানে পরিণত হয়েছে, যেখানে মিত্র-বরুণের অভিশাপ, গন্ধর্বদের ভেড়া চুরি এবং রাজার বিরহের পূর্ণাঙ্গ পটভূমি যোগ করা হয়েছে (Rocher, 1986)। একইভাবে, ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের ১৫৪তম সূক্তে বিষ্ণুর তিনটি পদক্ষেপের যে সৌর ও মহাজাগতিক রূপক ছিল (‘ইদং বিষ্ণুর্বি চক্রমে’), পুরাণকাররা সেই তিনটি পদক্ষেপের মন্ত্রটিকে ব্যাখ্যা করে নির্মাণ করেছেন বামন অবতার ও দৈত্যরাজ বলির সুবিশাল আখ্যান। আবার ঋগ্বেদের পুরুষসূক্ত (Puruṣasūkta), নাসদীয় সূক্ত (Nāsadīya Sūkta) এবং হিরণ্যগর্ভ সূক্ত (Hiraṇyagarbha Sūkta)-এর সৃষ্টিতত্ত্বের মন্ত্রগুলোকে শব্দ ধরে ধরে ব্যাখ্যা করেই গড়ে তোলা হয়েছে পুরাণের সর্গ ও প্রতিসর্গ অধ্যায়গুলো (Bailey, 1995)।
রিক্যুর ব্যাখ্যাতত্ত্বকে দুটি ধারায় ভাগ করেছিলেন – পুনরুদ্ধারের হার্মেনিউটিক্স (hermeneutics of restoration) এবং সন্দেহের হার্মেনিউটিক্স (hermeneutics of suspicion) (Ricoeur, 1970)। পুনরুদ্ধারের হার্মেনিউটিক্স দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, বৈদিক সংহিতার ভাষা যখন সাধারণ মানুষের কাছে দুর্বোধ্য হয়ে পড়েছিল, তখন পুরাণকাররা বৈদিক দেবতাদের এবং বৈদিক সৃষ্টিতত্ত্বের অর্থকে উদ্ধার করে জনসাধারণের ভাষায় আখ্যান হিসেবে পরিবেশন করেছিলেন। বৈদিক রুদ্রের যে ভয়ংকর অথচ কল্যাণকর রূপ সংহিতায় এবং যজুর্বেদের শতরুদ্রীয় (Śatarudrīya) অংশে ছিল, শিবপুরাণ (Śiva Purāṇa) ও লিঙ্গপুরাণ (Liṅga Purāṇa) সেই বৈদিক বিশেষণগুলোকেই (যেমন নীলগ্রীব, পশুপতি, শঙ্কর) আলাদা আলাদা কাহিনীতে রূপান্তর করে শিবের পূর্ণাঙ্গ পৌরাণিক চরিত্র নির্মাণ করেছে। এখানে প্রতিটি পৌরাণিক গল্প আসলে একটি করে বৈদিক নাম বা মন্ত্রের আখ্যানমূলক টীকা।
অন্যদিকে, রিক্যুরের সন্দেহের হার্মেনিউটিক্স প্রয়োগ করলে এই বৈদিক ব্যাখ্যার পেছনের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বার্থটি উন্মোচিত হয়। পৌরাণিক যুগে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে অসংখ্য অ-বৈদিক, কৃষিভিত্তিক এবং কৌম সমাজের দেবদেবী ও লোকাচার প্রচলিত ছিল, ব্রাহ্মণ্য সমাজ সেগুলোকে সরাসরি উচ্ছেদ করতে পারেনি। তাই পুরাণকাররা এক কৌশলী হার্মেনিউটিক পথ বেছে নেন। তারা স্থানীয় দেবদেবী ও তীর্থস্থানগুলোকে বৈদিক দেবমণ্ডলী এবং বৈদিক সূক্তের নতুন ব্যাখ্যার ভেতর ঢুকিয়ে দেন (Chakrabarti, 2001)। যেমন, শ্রীসূক্তের বৈদিক লক্ষ্মী বা দেবীসূক্তের বৈদিক বাক্-এর ধারণার ওপর ভর করে অসংখ্য স্থানীয় মাতৃদেবীকে বৈদিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে রিক্যুরের তত্ত্ব আমাদের দেখায় যে পুরাণ সাহিত্য একদিকে যেমন বৈদিক সূক্তের রূপক ও আখ্যানমূলক সম্প্রসারণ, অন্যদিকে তা বৈদিক কর্তৃত্বের মাধ্যমে লোকায়ত সংস্কৃতিকে ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের অধীনে নিয়ে আসার এক মতাদর্শিক ভাষ্য।
ইয়ুর্গেন হাবারমাসের যোগাযোগমূলক যৌক্তিকতা ও বৈধতা: বৈদিক অর্থের সামাজিক পুনর্গঠন ও মতাদর্শিক সংকট (Jürgen Habermas’s Communicative Rationality and Legitimation: Social Reconstruction of Vedic Meaning and Ideological Crisis)
বৈদিক সাহিত্যের ওপর ভিত্তি করে কেন পরবর্তীকালে এত বিপুল পরিমাণ নতুন ধর্মীয় সাহিত্য রচনা করার প্রয়োজন পড়ল, তার সমাজতাত্ত্বিক ও দার্শনিক উত্তর পাওয়া যায় জার্মান তাত্ত্বিক ইয়ুর্গেন হাবারমাস (Jürgen Habermas)-এর লেখায়। হাবারমাস তার যোগাযোগমূলক ক্রিয়ার তত্ত্ব (The Theory of Communicative Action) এবং বৈধতার সংকট (Legitimation Crisis) গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে কোনো সমাজব্যবস্থা কেবল জবরদস্তি দিয়ে টিকে থাকতে পারে না; তাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনজগৎ (lifeworld)-এর ভেতর যুক্তি ও অর্থের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্যতা বা বৈধতা অর্জন করতে হয় (Habermas, 1975)। পুরোনো ঐতিহ্যের ভাষা যখন নতুন সামাজিক বাস্তবতার সাথে সংযোগ হারিয়ে ফেলে, তখন সমাজে দেখা দেয় বৈধতার সংকট। পরবর্তী হিন্দু ধর্মীয় সাহিত্যগুলো আসলে প্রাচীন বৈদিক ঐতিহ্যের সেই বৈধতার সংকট মোকাবেলা করার জন্যই বৈদিক অর্থের এক যোগাযোগমূলক পুনর্গঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের দিকে গাঙ্গেয় উপত্যকায় নগরায়ণ, বাণিজ্যের প্রসার এবং বৌদ্ধ, জৈন ও চার্বাকদের মতো শ্রমণ দর্শনের উত্থানের ফলে প্রাচীন বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থা গভীর প্রশ্নের মুখে পড়ে। শ্রমণ দার্শনিকরা বৈদিক পশুহিংসা, পুরোহিতদের একচেটিয়া সংস্কৃত ভাষার কর্তৃত্ব এবং জন্মগত বর্ণভেদের তীব্র সমালোচনা করেন (Thapar, 2002)। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনজগতে প্রাচীন বেদসংহিতা (Veda Saṃhitā) এবং ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলোর আচারকেন্দ্রিক ভাষা তার নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা হারাতে বসে। হাবারমাসের তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো প্রাচীন বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি যখন এমন সংকটে পড়ে, তখন তাকে টিকে থাকার জন্য নিজের অর্থব্যবস্থাকে নতুন যোগাযোগমূলক যুক্তির মাধ্যমে পুনর্গঠন করতে হয় (Habermas, 1984)। স্মৃতি, মহাকাব্য এবং পুরাণের রচয়িতারা ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন; তারা প্রাচীন বৈদিক ধারণাগুলোকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করলেন যা সাধারণ মানুষের নৈতিক ও প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার সাথে সংলাপ স্থাপন করতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বৈদিক ‘ঋত’ এবং ‘ব্রহ্মচর্য’ বা ‘তপস্যা’-র রূপান্তরটির কথা ধরা যাক। ঋগ্বেদে ‘ঋত’ ছিল মহাজাগতিক ও যজ্ঞীয় শৃঙ্খলার ধারণা। পরবর্তী সাহিত্যে এই বৈদিক ঋত-কেই ব্যাখ্যা করে পরিণত করা হলো সামাজিক ও নৈতিক ‘ধর্ম‘ ধারণায়, যার ভেতর অহিংসা, দান, সত্যকথন এবং পরোপকারের মতো সার্বজনীন নৈতিক গুণাবলি যুক্ত করা হলো (Smith, 1989)। আবার বৈদিক যজ্ঞে কেবল উচ্চবর্ণের ধনী যজমানদেরই অধিকার ছিল; কিন্তু মহাকাব্য ও পুরাণগুলো বৈদিক ফলশ্রুতির ধারণাটিকে পুনর্ব্যাখ্যা করে দেখাল যে তীর্থযাত্রা, উপবাস, ব্রত কিংবা দেবতার নামসংকীর্তন করলেই অশ্বমেধ বা রাজসূয় যজ্ঞের সমান ফল পাওয়া যায়। অর্থাৎ, বৈদিক যজ্ঞকেই মানদণ্ড বা মূল একক হিসেবে রেখে নতুন লৌকিক আচারগুলোকে বৈদিক যজ্ঞের সমতুল্য বলে ঘোষণা করা হলো। এর মাধ্যমে নারী ও শূদ্রসহ সমাজের বৃহত্তর অংশকে বৈদিক প্রতীকী ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করা সম্ভব হলো।
তবে হাবারমাসের পদ্ধতিগতভাবে বিকৃত যোগাযোগ (systematically distorted communication) এবং মতাদর্শের সমালোচনা তত্ত্বটি ব্যবহার করলে এই পুনর্ব্যাখ্যার ভেতরের অসম ক্ষমতা-সম্পর্কটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে (Habermas, 1970)। পরবর্তী হিন্দু সাহিত্যগুলো বৈদিক অর্থকে সাধারণ মানুষের জীবনজগতে পৌঁছে দিলেও তারা যোগাযোগের ক্ষেত্রটিকে পুরোপুরি উন্মুক্ত বা সমতাপূর্ণ করেনি। বৈদিক পুরুষসূক্তের চতুর্বর্ণের রূপকটিকে তারা বারবার ব্যবহার করেছে সামাজিক শ্রমবিভাজন ও বৈষম্যকে প্রশ্নাতীত রাখতে। মানুষের জীবনজগতে যখনই বর্ণপ্রথা বা পিতৃতান্ত্রিক নিয়মের বিরুদ্ধে কোনো যৌক্তিক প্রশ্ন উঠেছে, তখনই এই সাহিত্যগুলো বেদের ‘অপৌরুষেয়ত্ব’ বা অলৌকিক অভ্রান্ততার দোহাই দিয়ে মুক্ত বিতর্কের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে (Pollock, 1989)। হাবারমাসের আলোকে তাই বলা যায়, পরবর্তী হিন্দু ধর্মীয় সাহিত্য হলো বৈদিক ঐতিহ্যের এমন এক যোগাযোগমূলক অনুবাদ, যা একদিকে বৈদিক অর্থকে জনবোধ্য করে সামাজিক সংহতি তৈরি করেছে, আবার অন্যদিকে বৈদিক কর্তৃত্বের আবরণে সামাজিক অসমতাকে বৈধতা দিয়েছে।
মিশেল ফুকোর ডিসকোর্স ও ভাষ্য-নীতি: আগম ও তন্ত্রে বৈদিক বাক্ ও মন্ত্রের ক্ষমতা-কাঠামো (Michel Foucault’s Discourse and Principle of Commentary: Power-Structures of Vedic Vāc and Mantra in Āgamas and Tantras)
পরবর্তী হিন্দু ধর্মীয় সাহিত্যের আরেকটি বড় ধারা হলো আগম (Āgama) এবং তন্ত্র সাহিত্য (Tantric literature)। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তন্ত্র ও আগমকে অনেক সময় বৈদিক ধারার বিপরীত বলে মনে হলেও আধুনিক হার্মেনিউটিক্স ও ডিসকোর্স তত্ত্বের আলোকে দেখলে বোঝা যায় যে এগুলোও গভীরভাবে বৈদিক সাহিত্যের ভাষ্য ও রূপান্তরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault) তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ডিসকোর্সের শৃঙ্খলা (The Order of Discourse)-তে দেখিয়েছেন যে কোনো সমাজে ডিসকোর্স বা বয়ান নিয়ন্ত্রণের একটি অন্যতম প্রধান অভ্যন্তরীণ কৌশল হলো ভাষ্য বা কমেন্ট্রি (commentary) (Foucault, 1971)। ফুকোর মতে, প্রতিটি সংস্কৃতিতে কিছু মৌলিক বা আদি টেক্সট থাকে, আর পরবর্তী টেক্সটগুলো সেই আদি টেক্সটের ভাষ্য হিসেবে নিজেদের হাজির করে। ভাষ্যের কৌশলটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক – ভাষ্য দাবি করে যে সে আদি টেক্সটের ভেতর গোপনে থাকা অর্থটিই কেবল প্রকাশ করছে, কিন্তু এই দাবির আড়ালে সে আসলে সম্পূর্ণ নতুন কথা ও নতুন নিয়ম তৈরি করে। আগম ও তন্ত্র সাহিত্যের সাথে বৈদিক সাহিত্যের সম্পর্কটি ফুকোর এই ভাষ্য-নীতিরই একটি প্রত্যক্ষ উদাহরণ।
তান্ত্রিক ও আগমিক গ্রন্থগুলো তাদের মূল তত্ত্ব, মন্ত্রতত্ত্ব এবং সৃষ্টিতত্ত্ব নির্মাণ করেছে বৈদিক সাহিত্যের নির্দিষ্ট কিছু ধারণাকে পুনর্ব্যাখ্যা করে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো বৈদিক বাক্ (Vāc) বা ধ্বনিতত্ত্ব। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১২৫তম সূক্ত অর্থাৎ বাক্ সূক্ত (Vāc Sūkta) এবং ব্রাহ্মণ ও উপনিষদগুলোতে বাক্ বা শব্দকে মহাবিশ্বের সৃজনীশক্তি ও ব্রহ্মের স্বরূপ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছিল। তন্ত্র ও আগম সাহিত্য – যেমন প্রপঞ্চসারতন্ত্র (Prapañcasāratantra), শারদাতিলক (Śāradātilaka) কিংবা কাশ্মীর শৈব আগমগুলো – এই বৈদিক বাক্-তত্ত্বের ওপরই তাদের পুরো মন্ত্রশাস্ত্র ও বর্ণমালাতত্ত্ব (মাতৃকাতত্ত্ব) নির্মাণ করেছে (Padoux, 1990)। ঋগ্বেদের সেই মন্ত্র – যেখানে বলা হয়েছে বাক্ চারটি পদে বিভক্ত এবং তিনভাগ গুহায় লুকানো ও একভাগ মানুষ কথা বলে (ঋগ্বেদ ১.১৬৪.৪৫) – তান্ত্রিক দার্শনিকরা সরাসরি সেই বৈদিক মন্ত্রটিকে ব্যাখ্যা করে তাদের পরা, পশ্যন্তী, মধ্যমা ও বৈখরী বাক্-এর স্তরবিন্যাস গড়ে তুলেছেন। এমনকি তন্ত্রের বীজমন্ত্রগুলোও বৈদিক ওঙ্কার (প্রণব) এবং ছান্দোগ্য ও মাণ্ডূক্য উপনিষদের অক্ষর-উপাসনারই সম্প্রসারিত রূপ।
ফুকোর জ্ঞানের প্রত্নতত্ত্ব (archaeology of knowledge) এবং জ্ঞান ও ক্ষমতা (power-knowledge) তত্ত্বের সাহায্যে পরীক্ষা করলে দেখা যায়, বৈদিক শ্রুতি তৎকালীন ভারতীয় সমাজে এমন এক প্রভাবশালী জ্ঞানকাঠামো (episteme) তৈরি করেছিল যে তান্ত্রিক ও আগমিক আচার্যরাও নিজেদের বৈদিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রমাণ করতে সচেষ্ট ছিলেন (Foucault, 1972)। বৈষ্ণব পাঞ্চারাত্র আগমের তাত্ত্বিক যামুনাচার্য (Yāmunācārya) তার আগমপ্রামাণ্য (Āgamaprāmāṇya) গ্রন্থে এবং পরবর্তীকালে রামানুজ ও বেদান্তদেশিক যুক্তি দিয়ে দেখান যে পাঞ্চারাত্র আগম আসলে যজুর্বেদেরই একটি বিশেষ শাখা (‘একায়ন শাখা’) এবং বৈদিক নারায়ণ সূক্ত ও পুরুষসূক্তের ব্যবহারিক ভাষ্য। আবার শৈব ও শাক্ত তন্ত্রে কুলার্ণবতন্ত্রের মতো গ্রন্থগুলো নিজেদের ‘পঞ্চম বেদ’ বা কলিযুগের উপযোগী শ্রুতি বলে দাবি করে এবং বৈদিক গায়ত্রী মন্ত্রের আদলে অসংখ্য তান্ত্রিক গায়ত্রী মন্ত্র তৈরি করে (Sanderson, 2009)।
ফুকো আরও দেখিয়েছেন যে ডিসকোর্সের পরিবর্তন সবসময় মানুষের শরীর ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন ধরনের শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে (Foucault, 1977)। বৈদিক সাহিত্যে বাহ্যিক যজ্ঞবেদিতে যে অগ্নিহোত্র ও অঙ্গন্যাসের বিধান ছিল, আগম ও তন্ত্র সাহিত্য সেগুলোকে ব্যাখ্যা করে মানবদেহের ভেতরের যোগিক প্রক্রিয়া বা ‘অন্তর্যাগ’ এবং মন্দিরের মূর্তিপূজার বিধানে রূপান্তরিত করে (Flood, 2006)। বৈদিক যজ্ঞের যূপকাষ্ঠ, সমিধ ও আহুতি তন্ত্রে এসে রূপ নেয় কুণ্ডলিনী শক্তি, চক্রভেদ এবং প্রাণায়ামের শারীরিক প্রযুক্তিতে। এভাবে ফুকোর ভাষ্য-নীতি আমাদের দেখায় যে আগম ও তন্ত্র সাহিত্য বৈদিক সংহিতা ও উপনিষদের শব্দ, প্রাণ এবং যজ্ঞের ধারণাগুলোকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং সেগুলোর পুনর্ব্যাখ্যার মাধ্যমেই গুরুবাদ ও মন্দিরকেন্দ্রিক নতুন ক্ষমতা-কাঠামো নির্মাণ করেছে।
জাক দেরিদার বিনির্মাণ, পরিপূরক ও ডিফেরঁস: বৈদিক কেন্দ্রের অনুপস্থিতি ও পরবর্তী শাস্ত্রের অস্থিতিশীল বুনন (Jacques Derrida’s Deconstruction, Supplement and Différance: Absence of the Vedic Center and the Unstable Weaving of Later Scriptures)
বৈদিক সাহিত্যের ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পরবর্তী হিন্দু ধর্মীয় সাহিত্যের সামগ্রিক রূপটিকে চূড়ান্তভাবে বিশ্লেষণ করার জন্য ফরাসি দার্শনিক জাক দেরিদা (Jacques Derrida)-র তত্ত্ব এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। দেরিদা তার গ্রামাটোলজি প্রসঙ্গে (Of Grammatology) এবং লেখা ও ব্যবধান (Writing and Difference) গ্রন্থে বিনির্মাণ (deconstruction), পরিপূরক (supplement) এবং ডিফেরঁস (différance)-এর ধারণাগুলো সামনে এনেছেন (Derrida, 1976)। দেরিদা দেখান যে কোনো ঐতিহ্য যখন দাবি করে যে তার মূলে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, নিখুঁত এবং অপরিবর্তনীয় আদি সত্য বা কেন্দ্র রয়েছে – যাকে তিনি বলেন উপস্থিতির অধিবিদ্যা (metaphysics of presence) – তখন সেই আদি কেন্দ্রটিকে টিকিয়ে রাখার জন্যই অদ্ভুতভাবে অসংখ্য গৌণ টেক্সট বা পরিপূরকের প্রয়োজন পড়ে। ভারতীয় ধর্মীয় সাহিত্যের ইতিহাসে বৈদিক শ্রুতি এবং পরবর্তী স্মৃতি-পুরাণ-তন্ত্রের সম্পর্কটি দেরিদার এই পরিপূরক তত্ত্বেরই এক বাস্তব নিদর্শন।
সনাতন ব্রাহ্মণ্য তত্ত্বে বেদকে বলা হয়েছে পূর্ণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জ্ঞান। কিন্তু দেরিদার পরিপূরক তত্ত্বের দ্বিমুখী নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কিছুর সাথে যখন পরিপূরক যুক্ত হয়, তখন তা একদিকে মূল জিনিসটিকে সমৃদ্ধ করে, আবার অন্যদিকে প্রমাণ করে যে মূল জিনিসটির ভেতর আসলে কোনো অভাব বা শূন্যতা ছিল (Derrida, 1978)। বেদের অর্থ বোঝার জন্য প্রথমে তৈরি হলো ছয়টি বেদাঙ্গ (Vedāṅgas) – শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ ও জ্যোতিষ। যাস্কের নিরুক্ত (Nirukta) স্পষ্ট দেখিয়ে দিল যে বৈদিক শব্দের অর্থ নিয়ে প্রাচীনকালেই সংশয় তৈরি হয়েছিল এবং ব্যুৎপত্তিগত ব্যাখ্যার ছাড়া বেদ বোঝা অসম্ভব ছিল (Kahrs, 1998)। এরপর একে একে যুক্ত হলো উপবেদ, ধর্মশাস্ত্র, মহাকাব্য, আঠারোটি মহাপুরাণ, উপপুরাণ এবং অসংখ্য আগম ও তন্ত্র। এই প্রতিটি সাহিত্যই নিজেদের দাবি করল বেদের পরিপূরক বা ব্যাখ্যা হিসেবে। কিন্তু দেরিদার তত্ত্বানুযায়ী, এই পরিপূরকগুলো বাস্তবে মূল বৈদিক সংহিতার জায়গাটিই দখল করে নিল। সাধারণ হিন্দুর ধর্মজীবনে ঋগ্বেদের ইন্দ্র বা বরুণের মন্ত্র পাঠের জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হলো গীতা পাঠ, চণ্ডী পাঠ, ভাগবত শ্রবণ এবং তান্ত্রিক পূজা।
দেরিদার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ধারণা হলো পুনরাবৃত্তিযোগ্যতা (iterability) এবং চিহ্নরেখা (trace) (Derrida, 1988)। দেরিদা বলেন, ভাষার যেকোনো চিহ্ন বা শব্দ কেবল তখনই টিকে থাকে যখন তাকে নতুন নতুন প্রেক্ষাপটে বারবার উদ্ধৃত বা পুনরাবৃত্ত করা যায়, আর প্রতিটি পুনরাবৃত্তির সাথে সাথে তার অর্থের পরিবর্তন ঘটে। বৈদিক সাহিত্যের মৌলিক শব্দগুলোর দিকে তাকালে এই প্রক্রিয়াটি স্পষ্ট দেখা যায়। যেমন, ঋগ্বেদে ‘মায়া’ শব্দটির অর্থ ছিল দেবতাদের বা অসুরদের বিশেষ নির্মাণকৌশল বা প্রজ্ঞা; শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ, গীতা এবং পরবর্তী পুরাণ ও বেদান্ত সাহিত্যে বারবার পুনরাবৃত্ত ও ব্যাখ্যাত হতে হতে সেই বৈদিক মায়া শব্দটি পরিণত হলো মহাজাগতিক বিভ্রম বা প্রকৃতিশক্তিতে (Goudriaan, 1978)। একইভাবে বৈদিক ‘ভক্তি’ (যার আদি অর্থ ছিল ভাগ বা অংশ), বৈদিক ‘পুরুষ’, ‘প্রকৃতি’, ‘আত্মন্’ এবং ‘সংসার’ – প্রতিটি শব্দই বৈদিক পাঠ্য থেকে যাত্রা শুরু করে পরবর্তী সাহিত্যগুলোতে নতুন নতুন অর্থের স্তর গ্রহণ করেছে। অর্থ কখনোই এক জায়গায় স্থির থাকেনি; দেরিদার ভাষায় তা অবিরাম পিছিয়ে গেছে বা পরিবর্তিত হয়েছে (ডিফেরঁস)।
গাডামার, রিক্যুর, হাবারমাস, ফুকো এবং দেরিদার এই সামগ্রিক তাত্ত্বিক প্রয়োগ আমাদের সামনে পরবর্তী হিন্দু ধর্মীয় সাহিত্যের এক বস্তুনিষ্ঠ ও ঐতিহাসিক চিত্র তুলে ধরে। এখান থেকে দেখা যায় যে স্মৃতি, মহাকাব্য, গীতা, পুরাণ এবং তন্ত্র সাহিত্য আকাশ থেকে পড়া কোনো বিচ্ছিন্ন বা অলৌকিক সৃষ্টি নয়; আবার এগুলো বৈদিক সাহিত্যের অবিকৃত বা যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তিও নয় (Patton, 1994)। বরং প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যের মন্ত্র, যজ্ঞ, প্রতীক এবং ভাষাগত কাঠামোকে ঘিরেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলেছে এক বিশাল হার্মেনিউটিক বা ব্যাখ্যামূলক কর্মযজ্ঞ। সময়ের পরিবর্তন, সামাজিক সংকট এবং ক্ষমতার রাজনীতির সাথে তাল মিলিয়ে পরবর্তীকালের লেখকরা বৈদিক পাঠ্যকে নানাভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন, রূপকায়িত করেছেন এবং তার ওপর নতুন আখ্যান ও বিধিমালার প্রাসাদ নির্মাণ করেছেন। আধুনিক হার্মেনিউটিক্সের এই দার্শনিক লেন্সগুলো ব্যবহার করলে বোঝা যায়, বৈদিক সাহিত্যের অবিরাম পুনর্ব্যাখ্যার ফসল হিসেবেই গড়ে উঠেছে পরবর্তীকালের সমগ্র হিন্দু ধর্মীয় সাহিত্য।
ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায় ও বহু-পদ্ধতিগত পাঠ (Interpretive Communities and Multi-Method Reading): অর্থের প্রতিযোগিতা ও সমন্বিত প্রয়োগ
স্ট্যানলি ফিশ ও বৈদিক ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায় (Fish and Vedic Interpretive Communities): মীমাংসা, বেদান্ত ও আধুনিক ইন্দোলজি
স্ট্যানলি ফিশ ও ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়ের ধারণা (Stanley Fish and the Concept of Interpretive Communities)
আমেরিকান সাহিত্যতাত্ত্বিক ও আইনজ্ঞ স্ট্যানলি ফিশ (Stanley Fish) বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে পাঠ ব্যাখ্যার জগতে এক যুগান্তকারী বিতর্কের সূচনা করেন। দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্য ও ধর্মীয় পাঠের জগতে একটি বদ্ধমূল বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে টেক্সট বা পাঠ্যের একটি নিজস্ব, স্বাধীন ও স্থির অর্থ থাকে। পাঠক কেবল সতর্কভাবে সেই অর্থটিকে পৃষ্ঠার ভেতর থেকে আবিষ্কার করে নেন। ফিশ তার বিখ্যাত গ্রন্থ ইজ দেয়ার আ টেক্সট ইন দিস ক্লাস? দ্য অথরিটি অব ইন্টারপ্রিটেটিভ কমিউনিটিস (Is There a Text in This Class? The Authority of Interpretive Communities) (1980)-এ এই ধারণাকে সরাসরি নাকচ করে দেন। তিনি দেখান যে পাঠ্যের কোনো বস্তুনিষ্ঠ বা অপরিবর্তনীয় কাঠামো থাকে না। পাঠ্য নিজে কোনো অর্থ ধারণ করে না; বরং পাঠকের পাঠ করার প্রক্রিয়াই টেক্সটের ভেতরে অর্থ তৈরি করে। ফিশের এই অবস্থান দর্শনের ইতিহাসে পাঠক-প্রতিক্রিয়া তত্ত্ব (Reader-Response Theory) নামে পরিচিত।
তবে ফিশ পাঠের অর্থকে কোনো ব্যক্তির একান্ত খেয়ালখুশির বিষয় হিসেবেও ছেড়ে দেননি। যদি পাঠ্যের নিজস্ব অর্থ না থাকে, তবে একেকজন পাঠক তো একেক রকম অর্থ করবেন এবং সমাজে কোনো ধরনের যোগাযোগই সম্ভব হবে না। এই সমস্যার সমাধানে ফিশ তার সবচেয়ে প্রভাবশালী ধারণাটি সামনে নিয়ে আসেন, যার নাম ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায় (Interpretive Community)। ফিশ বলেন, কোনো পাঠকই শূন্য থেকে একা একা পড়তে শেখে না। সে সবসময় একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে গড়ে ওঠে। এই সম্প্রদায় পাঠককে কিছু নির্দিষ্ট কৌশল, বিশ্বাস এবং ব্যাখ্যার নিয়মকানুন শিখিয়ে দেয়। একজন পাঠক যখন কোনো লেখা পড়েন, তখন তিনি আসলে সেই সম্প্রদায়ের যৌথ চোখ দিয়ে লেখাটিকে দেখেন। ফলে অর্থ তৈরি হয় পাঠকের ভেতর থেকে নয়, বরং সেই ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়ের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মাবলীর মাধ্যমে।
ফিশ তার পরবর্তী গ্রন্থ ডুইং হোয়াট কামস ন্যাচারালি: চেঞ্জ, রেটোরিক, অ্যান্ড দ্য প্র্যাকটিস অব থিওরি ইন লিটারারি অ্যান্ড লিগ্যাল স্টাডিজ (Doing What Comes Naturally: Change, Rhetoric, and the Practice of Theory in Literary and Legal Studies) (1989)-এ আরও স্পষ্ট করেন যে ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়গুলো কোনো স্থির বা প্রাকৃতিক সত্তা নয়। এগুলো হলো ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এই সম্প্রদায়গুলো নির্ধারণ করে দেয় কোনো টেক্সটের কোন অংশটি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে, কোনটিকে আক্ষরিক অর্থে নিতে হবে আর কোনটিকে রূপক হিসেবে ব্যাখ্যা করতে হবে। একটি সম্প্রদায়ের কাছে যা একদম দিনের আলোর মতো স্পষ্ট বা স্বাভাবিক পাঠ, অন্য একটি সম্প্রদায়ের কাছে তা সম্পূর্ণ ভুল বা ভিত্তিহীন মনে হতে পারে। কারণ সত্য বা অর্থ কোনো স্বাধীন বস্তু নয়; তা হলো কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ঐকমত্যের ফল।
বৈদিক সাহিত্যের হাজার বছরের ইতিহাসকে যদি এই তাত্ত্বিক লেন্স দিয়ে দেখা হয়, তবে এক চমকপ্রদ দৃশ্য উন্মোচিত হয়। বেদ কোনো একটি একক বা অপরিবর্তনীয় গ্রন্থ নয় যা সবার কাছে একই রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে। বরং যুগে যুগে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায় বেদের ওপর নিজেদের ব্যাখ্যার কৌশল প্রয়োগ করেছে এবং সেই প্রক্রিয়ায় কার্যত সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা বেদের জন্ম দিয়েছে। যজ্ঞের পুরোহিতদের কাছে বেদ ছিল এক জিনিস, উপনিষদের সন্ন্যাসীদের কাছে তা ছিল আরেক জিনিস, আবার আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের কাছে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ঐতিহাসিক নথি। ফিশের তত্ত্ব আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কীভাবে এই বিভিন্ন সম্প্রদায় নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ ও পদ্ধতি দিয়ে একই বৈদিক পাঠ্যকে নিজেদের মতো করে নির্মাণ করেছে।
পূর্বমীমাংসা সম্প্রদায় ও কর্মভিত্তিক পাঠের নির্মাণ (Pūrvamīmāṃsā Community and the Construction of Action-Oriented Reading)
ঐতিহাসিক দিক থেকে বৈদিক পাঠ্যের সবচেয়ে প্রাচীন এবং প্রভাবশালী ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায় হলো পূর্বমীমাংসা (Pūrvamīmāṃsā)। মহর্ষি জৈমিনির সূত্র এবং পরবর্তীকালে শবর স্বামী ও কুমারিল ভট্টের মতো পণ্ডিতদের হাত ধরে এই সম্প্রদায়ের ব্যাখ্যাকৌশল গড়ে উঠেছিল। এই সম্প্রদায়ের পাঠের মূল ভিত্তি ছিল দুটি মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক পূর্বধারণা: বেদের অপৌরুষেয়ত্ব (Apauruṣeyatva) এবং নিত্যত্ব (Nityatva)। তারা ধরে নিয়েছিলেন যে বেদের কোনো রচয়িতা নেই – না কোনো মানুষ, না কোনো ঈশ্বর। বেদ হলো মহাবিশ্বের মতোই এক চিরন্তন ও অনাদি শব্দপ্রবাহ। এই পূর্বধারণাটি মীমাংসকদের এমন এক ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়ে পরিণত করেছিল যারা পাঠ্যের ওপর বাইরের কোনো মানবিক বা ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ সহ্য করত না।
ভারততাত্ত্বিক ফ্রান্সিস ডি’সা (Francis X. D’Sa) তার গ্রন্থ শব্দপ্রামাণ্যম ইন শবর অ্যান্ড কুমারিল (Śabdaprāmāṇyam in Śabara and Kumārila) (1980)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে মীমাংসা সম্প্রদায় বৈদিক ভাষাকে কেবলই কাজের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। মীমাংসকদের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ছিল: বেদের প্রতিটি বাক্যের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মানুষকে কোনো না কোনো বৈদিক আচারে প্ররোচিত করা। জৈমিনির মূল সূত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে আম্নায় বা শ্রুতির একমাত্র কাজ হলো ক্রিয়ার উদ্দেশ্য সাধন (Kriyārthatva); যেসব বাক্য কোনো কাজের নির্দেশ দেয় না, সেগুলোর নিজস্ব কোনো অর্থগত প্রামাণ্য নেই। এই ব্যাখ্যাকৌশলের নাম ছিল বিধি (Vidhi)। একজন মীমাংসক পাঠক যখন বেদ পাঠ করেন, তখন তার চোখ কেবল খোঁজে কোথায় আদেশ আছে – “যজ্ঞ করো”, “আহুতি দাও”, “অমুক ফল লাভের জন্য এই নিয়ম পালন করো”।
এই কর্মভিত্তিক পাঠের নিয়ম তৈরি করার কারণে মীমাংসা সম্প্রদায়কে একটি বিশাল পাঠগত সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। বেদের বিশাল একটি অংশ জুড়ে রয়েছে বিভিন্ন গল্প, উপমা, দেবতাদের স্তুতি এবং উপনিষদের দার্শনিক আলোচনা। এগুলো তো সরাসরি কোনো যজ্ঞ করার আদেশ দেয় না। ফিশ যেভাবে বলেন যে সম্প্রদায় তার নিজের সুবিধার্থে টেক্সটের উপাদানগুলোর পদক্রম পুনর্বিন্যাস করে, মীমাংসকরাও ঠিক তাই করলেন। তারা এই অংশগুলোকে একটি অধীনস্থ শ্রেণিতে ফেলে দিলেন, যার নাম অর্থবাদ (Arthavāda)। অর্থবাদ মানে হলো নিছক প্রশংসামূলক বা বর্ণনামূলক কথা। তারা বললেন, উপনিষদে যখন আত্মাকে অমর বা সর্বব্যাপী বলা হচ্ছে, তখন তা কোনো নতুন সত্য প্রচার করছে না; তা কেবল যজ্ঞকারী মানুষের প্রশংসা করছে যাতে সে উৎসাহ নিয়ে যজ্ঞকর্ম চালিয়ে যায়।
সংস্কৃত সাহিত্যের গবেষক লরেন্স ম্যাকক্রিয়া (Lawrence McCrea) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে মীমাংসকদের কাছে টেক্সট ছিল একটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি। সেখানে ব্যক্তিগত ভক্তি বা দার্শনিক ধ্যানের কোনো অবকাশ ছিল না। যজ্ঞের আগুন, ঘি, মন্ত্রোচ্চারণের নিখুঁত স্বর এবং নির্দিষ্ট ফলাফল – এই যান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে বেদের অন্য কোনো অর্থ তাদের প্রাতিষ্ঠানিক চোখে দৃশ্যমানই হতো না। একজন মীমাংসকের কাছে উপনিষদ কোনো পরম মুক্তির পথ ছিল না, বরং যজ্ঞশালার একটি ছোট সহায়ক অংশ মাত্র। এই সম্প্রদায়ের সদস্যরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই নির্দিষ্ট পাঠপদ্ধতিকেই একমাত্র সঠিক বৈদিক পাঠ বলে বিশ্বাস এবং প্রচার করে গেছেন।
বেদান্ত সম্প্রদায় ও জ্ঞানভিত্তিক পাঠের প্রতিষ্ঠা (Vedānta Community and the Establishment of Knowledge-Oriented Reading)
ঠিক এই মীমাংসা সম্প্রদায়ের বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়েছিল আরেকটি শক্তিশালী ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়, যার নাম বেদান্ত (Vedānta) বা উত্তর-মীমাংসা। বাদরায়ণের ব্রহ্মসূত্রকে কেন্দ্র করে এবং পরবর্তীকালে আদি শঙ্কর, রামানুজ ও মাধ্বের মাধ্যমে এই সম্প্রদায় ভারতীয় বৌদ্ধিক মহলে আধিপত্য বিস্তার করে। বেদান্ত সম্প্রদায়ের পাঠের কৌশল ছিল মীমাংসকদের তৈরি করা দুনিয়াকে পুরোপুরি উল্টে দেওয়া। তারা প্রশ্ন তুললেন, যজ্ঞের মাধ্যমে পাওয়া ফল তো নশ্বর এবং সাময়িক; তাহলে কি বেদ মানুষকে কেবল সেই ক্ষণস্থায়ী স্বর্গলাভের নিয়ম শেখানোর জন্যই রচিত হয়েছে? এই প্রশ্নের ওপর দাঁড়িয়ে তারা বেদের উদ্দেশ্য হিসেবে কর্মের বদলে জ্ঞান (Jñāna) বা মুক্তির উপলব্ধিকে স্থাপন করলেন।
বেদান্ত সম্প্রদায় তাদের এই নতুন পাঠ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সমগ্র বেদকে দুটি ভাগে বিভক্ত করল: কর্মকাণ্ড (Karmakāṇḍa) এবং জ্ঞানকাণ্ড (Jñānakāṇḍa)। তারা ঘোষণা করল যে সংহিতা ও ব্রাহ্মণের যাগযজ্ঞ সংক্রান্ত অংশগুলো হলো নিম্নমানের বা প্রাথমিক স্তরের পাঠ, যা কেবল অপরিণত মনের অধিকারীদের চিত্তশুদ্ধির জন্য দেওয়া হয়েছে। আর উপনিষদ হলো বেদের চূড়ান্ত অংশ বা বেদান্ত, যেখানে মানবজীবনের আসল লক্ষ্যের সন্ধান রয়েছে। ফিশের পরিভাষায়, বেদান্ত সম্প্রদায় বেদের ভেতরে অর্থের কেন্দ্রবিন্দুকেই সম্পূর্ণ স্থানান্তরিত করে দিল। যে অংশটিকে মীমাংসকরা অপ্রয়োজনীয় বা গৌণ স্তুতিবাক্য মনে করতেন, বেদান্তবাদীরা সেই উপনিষদীয় বাক্যগুলোকেই বেদের পরম শিরোমণি বানিয়ে দিলেন।
জার্মান ভারততাত্ত্বিক ম্যাক্স মুলার (Max Müller) তার ঐতিহাসিক গ্রন্থ দ্য সিক্স সিস্টেমস অব ইন্ডিয়ান ফিলোসফি (The Six Systems of Indian Philosophy) (1899)-এ ভারতীয় দর্শনের এই অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের বর্ণনা দিয়েছেন। মুলার উল্লেখ করেন, কীভাবে বেদান্তের চিন্তাবিদরা তাদের নিজেদের অধিবিদ্যক অবস্থানকে প্রমাণের জন্য একই বৈদিক শব্দকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ব্যবহার করেছিলেন। শঙ্কর যখন “তৎ ত্বমসি” পড়েন, তখন তিনি সেখানে অদ্বৈত চেতনা আবিষ্কার করেন; রামানুজ যখন পড়েন, তখন তিনি ঈশ্বরের শরীরের সন্ধান পান; আবার মাধ্ব যখন পড়েন, তখন তিনি জীব ও ঈশ্বরের চিরন্তন ভেদ দেখতে পান। মতভেদ থাকা সত্ত্বেও এই সমস্ত বেদান্তিক দলগুলো একটি বিষয়ে একমত ছিল: যজ্ঞের চেয়ে আত্মজ্ঞান শ্রেষ্ঠ এবং বেদ মূলত এক পরম আত্মতত্ত্বের কথাই প্রচার করে।
ফিশের তাত্ত্বিক আলোয় দেখলে বোঝা যায়, বেদান্ত সম্প্রদায় কোনো শূন্যস্থান থেকে এই অর্থ বের করে আনেনি। তাদের এই পাঠ ছিল সন্ন্যাস, ব্যক্তিগত মুক্তি এবং সামাজিক অস্থিরতার এক নতুন যুগে নিজেদের দার্শনিক অবস্থানকে টিকিয়ে রাখার প্রয়াস। তারা প্রাচীন বৈদিক শব্দগুলোর ওপর এমন এক নতুন হার্মেনিউটিক গ্রিড বসিয়ে দিয়েছিলেন যাতে যজ্ঞের ধোঁয়া মিলিয়ে গিয়ে বিশুদ্ধ দার্শনিক তত্ত্ব উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ফলে একই বৈদিক পাঠ বেদান্ত সম্প্রদায়ের হাতে পড়ে এক বিমূর্ত ভাববাদী টেক্সটে রূপান্তরিত হলো, যা আদি বৈদিক যাজকদের কল্পনার সীমানারও বাইরে ছিল।
আধুনিক ইন্দোলজি ও ঐতিহাসিক-ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি (Modern Indology and the Historical-Philological Perspective)
অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকে বৈদিক সাহিত্যের আকাশে সম্পূর্ণ নতুন এক ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটে। এই সম্প্রদায় কোনো ভারতীয় গুরুকুলের ভেতর থেকে জন্ম নেয়নি; তাদের জন্ম হয়েছিল ইউরোপের জ্ঞানালোক, উপনিবেশবাদ এবং আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার কক্ষে। এই সম্প্রদায়ের নাম আধুনিক ইন্দোলজি (Modern Indology)। তারা বেদকে কোনো ঐশ্বরিক, নিত্য বা অপৌরুষেয় বাণী হিসেবে গ্রহণ করতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করলেন। তাদের পাঠপদ্ধতি ছিল ভাষাতাত্ত্বিক ঐতিহাসিকতাবাদ (Philological Historicism)। তারা বেদকে দেখলেন মানুষের রচিত একটি প্রাচীন ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে, যা প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় ও ইন্দো-আর্য জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সমাজজীবনের সাক্ষ্য বহন করে।
অক্সফোর্ডের খ্যাতনামা সংস্কৃত পণ্ডিত আর্থার অ্যান্থনি ম্যাকডোনেল (Arthur Anthony Macdonell) তার বহুল পঠিত গ্রন্থ আ বৈদিক রিডার ফর স্টুডেন্টস (A Vedic Reader for Students) (1917)-এ এই পদ্ধতির রূপরেখা তুলে ধরেন। ইন্দোলজিস্টদের কাছে বেদের প্রতিটি স্তোত্র ছিল কোনো বিশেষ কবি বা ঋষির রচনা, যা একটি নির্দিষ্ট ভূগোল ও সময়ে তৈরি হয়েছিল। তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের সাহায্যে তারা বৈদিক সংস্কৃতের সাথে আবেস্তা, প্রাচীন গ্রিক এবং লাতিনের ব্যাকরণগত মিল পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। ঋগ্বেদের ইন্দ্র তখন আর কোনো মহাজাগতিক দেবতা বা আত্মার রূপক রইলেন না; তিনি পরিণত হলেন ব্রোঞ্জ ও লৌহ যুগের যুদ্ধবাজ যাযাবর আর্য দলের এক পৌরাণিক দলপতিতে, যিনি শত্রুদের দুর্গ ধ্বংস করেন এবং জল আটকে রাখা মেঘকে মুক্ত করেন।
ফরাসি ভারততাত্ত্বিক লুই রেনো (Louis Renou) তার বিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থ দ্য ডেস্টিনি অব দ্য বেদ ইন ইন্ডিয়া (The Destiny of the Veda in India) (1965)-এ ইন্দোলজির এই পাঠগত বৈপ্লবিকতাকে চিহ্নিত করেছেন। রেনো দেখান কীভাবে পশ্চিমা গবেষকরা ভারতীয় ঐতিহ্যের হাজার বছরের ব্যাখ্যার স্তরগুলোকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে সরাসরি প্রাচীনতম মূল টেক্সটের দিকে দৃষ্টি দিলেন। মীমাংসকদের যজ্ঞের জটিল নিয়মাবলী কিংবা বেদান্তের অদ্বৈত মোক্ষ – এই সবকিছুকেই আধুনিক ইন্দোলজি পরবর্তীকালের কৃত্রিম সংযোজন বলে রায় দিল। তাদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল ইতিহাসের স্তরে স্তরে জমে থাকা ব্যাখ্যাগুলোকে মুছে ফেলে রচনার আদিমতম মুহূর্তটিকে উদ্ধার করা।
স্ট্যানলি ফিশের দৃষ্টিতে, আধুনিক ইন্দোলজি নিজেকে যতই বৈজ্ঞানিক এবং পক্ষপাতহীন দাবি করুক না কেন, তারা আসলে আরেকটি সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায় ছাড়া কিছুই নয়। তাদের এই “ঐতিহাসিক বস্তুনিষ্ঠতা” কোনো টেক্সটের ভেতরের জিনিস নয়; এটি তাদের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক রীতির ফসল। উনিশ ও বিশ শতকের ইউরোপীয় যুক্তিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতিগঠনের যে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা ইন্দোলজির ব্যাখ্যাকৌশলকে গভীরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছিল। তারা বেদকে এমনভাবে পাঠ করেছিলেন যাতে তা বিশ্বসাহিত্যের একটি ধ্রুপদী মহাকাব্যে পরিণত হয়। এই সম্প্রদায়ের পাঠের ফলে বেদ তার পুণ্যময় ধর্মীয় মর্যাদা হারিয়ে আধুনিক একাডেমিক গবেষণার এক কৌতূহলোদ্দীপক উপাদানে পরিণত হলো।
একই পাঠ, ভিন্ন জগৎ: ফিশীয় ফ্রেমওয়ার্কে তিন সম্প্রদায়ের সংঘাত (Same Text, Different Worlds: Clash of Three Communities in the Fishian Framework)
এই তিনটি ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়ের মুখোমুখি সংঘাত স্ট্যানলি ফিশের তত্ত্বের সবচেয়ে চমৎকার প্রয়োগক্ষেত্র তৈরি করে। ধরা যাক ঋগ্বেদের সেই অতি-পরিচিত সূক্তগুলোর কথা যেখানে অগ্নির প্রশংসা করা হয়েছে। মীমাংসা সম্প্রদায়ের পাঠক যখন সেই সূক্তটি পড়বেন, তিনি সেখানে কেবল আহুতির নির্দেশ এবং যজ্ঞীয় ফল লাভের প্রতিশ্রুতি দেখবেন। তার কাছে অগ্নির অর্থ হলো যজ্ঞকুণ্ডে প্রজ্বলিত সেই বাস্তব আগুন যা পুরোহিতের দেওয়া মাখন গ্রহণ করে। অন্যদিকে একজন বেদান্তবাদী যখন সেই একই সূক্ত পাঠ করবেন, তিনি অগ্নির বাহ্যিক রূপটিকে রূপক মনে করে তার ভেতরের জ্ঞানাগ্নি বা পরম চৈতন্যের প্রতীক হিসেবে তাকে আবিষ্কার করবেন। আর একজন আধুনিক ইন্দোলজিস্ট যখন সেই সূক্তের সামনে দাঁড়াবেন, তিনি সেখানে প্রাচীন পশুপালক মানুষের প্রকৃতি-উপাসনা এবং অগ্নির আবিষ্কারের ফলে মানব সভ্যতার অগ্রগতির ঐতিহাসিক চিহ্ন খুঁজে পাবেন।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো: বেদের আসল অর্থ কোনটি? স্ট্যানলি ফিশ বলবেন, এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই, কারণ “আসল অর্থ” বলে কোনো স্বাধীন জিনিসের অস্তিত্বই টেক্সটের মধ্যে থাকে না। প্রতিটি সম্প্রদায় নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল দিয়ে টেক্সটকে ভিন্ন ভিন্ন চোখে দেখেছে। টেক্সটের বাইরে এমন কোনো নিরপেক্ষ আদালত নেই যা রায় দিয়ে বলতে পারে যে মীমাংসা ঠিক আর ইন্দোলজি ভুল, কিংবা বেদান্তই একমাত্র সঠিক পথ। কারণ কোনো পাঠকই নিজের সম্প্রদায়ের তৈরি করা চশমাটি খুলে রেখে সম্পূর্ণ নগ্ন চোখে টেক্সটকে দেখতে পারে না। দেখার ক্রিয়াটি নিজেই সবসময় সম্প্রদায়ের নিয়ম দ্বারা নির্ধারিত হয়।
আমেরিকান সংস্কৃত পণ্ডিত শেলডন পোলক (Sheldon Pollock) তার আকর গ্রন্থ দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অব দ্য গডস ইন দ্য ওয়ার্ল্ড অব মেন: সংস্কৃত, কালচার, অ্যান্ড পাওয়ার ইন প্রি-মডার্ন ইন্ডিয়া (The Language of the Gods in the World of Men: Sanskrit, Culture, and Power in Premodern India) (2006)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে সংস্কৃত টেক্সটের ওপর এই প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ সমাজের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত ছিল। যিনি বেদের ব্যাখ্যার অধিকারী হতেন, তিনি সমাজে মতাদর্শিক কর্তৃত্ব লাভ করতেন। মীমাংসকরা নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যাগযজ্ঞের মাধ্যমে রাজশক্তিকে বৈধতা দিয়ে। বেদান্তবাদীরা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বর্ণাশ্রমের উর্ধ্বে উঠে মঠভিত্তিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে। আর ইউরোপীয় ইন্দোলজিস্টরা নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপন করেছিলেন ঔপনিবেশিক প্রশাসন ও আধুনিক শিক্ষার কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে।
অতএব একই বৈদিক পাঠ্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা জগতের জন্ম দিয়েছে। এটি কোনো পাঠগত বিভ্রান্তি বা ভুল বোঝাবুঝি ছিল না। এটি ছিল মানুষের বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলগুলোর নিজস্ব বেঁচে থাকার লড়াই এবং বিশ্বদৃষ্টির প্রতিফলন। ফিশের তত্ত্ব আমাদের এই উপলব্ধি দান করে যে অর্থ কোনো স্থির সম্পত্তি নয় যা একবার দলিল করে নিলেই চিরকালের জন্য নিজের হয়ে যায়। অর্থ হলো একটি যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে বিভিন্ন ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায় নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতার জন্য নিরন্তর লড়াই করে চলে।
ব্যাখ্যার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ও বৈদিক অর্থের ভবিষ্যৎ (Institutional Power of Interpretation and the Future of Vedic Meaning)
ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়গুলো টিকে থাকে তাদের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। এই নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে গুরুকুল, পাঠশালা, মঠ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকাশনা সংস্থা এবং গবেষণা সাময়িকীর সাহায্যে। একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ে নতুন কাউকে প্রবেশ করতে হলে তাকে সেই সম্প্রদায়ের নির্ধারিত শিক্ষাক্রমের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। একজন চিরাচরিত বেদপাঠককে যেমন বছরের পর বছর ধরে স্মৃতিশাস্ত্রে দীক্ষা নিতে হয়, তেমনই একজন আধুনিক পিএইচডি গবেষককে শিখতে হয় আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব ও ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতির নিয়মকানুন। এই প্রাতিষ্ঠানিক দীক্ষা নিশ্চিত করে যে ব্যক্তি পাঠক সম্প্রদায়ের নির্ধারিত ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে না।
সমসাময়িক পৃথিবীতে এই তিনটি সম্প্রদায়ের সংঘাত এক নতুন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপ ধারণ করেছে। একদিকে রয়েছে ঐতিহ্যবাদী গোষ্ঠীগুলো যারা এখনো মীমাংসা বা বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকে বেদকে অপরিবর্তনীয় সত্য এবং জাতীয় পরিচয়ের পরম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। অন্যদিকে রয়েছে বিশ্বজুড়ে একাডেমিক গবেষক ও ঐতিহাসিকরা, যারা প্রত্নতাত্ত্বিক খনন, জেনেটিক্স এবং তুলনামূলক ইতিহাসের আলোকে বেদের মানবীয় ও ঐতিহাসিক চরিত্রকে ক্রমাগত বিশদভাবে তুলে ধরছেন। ইন্টারনেটের যুগে সাধারণ মানুষ যখন সরাসরি বেদের অনুবাদ পড়ার সুযোগ পাচ্ছে, তখন সেখানে আরও বহু অনানুষ্ঠানিক ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়ের জন্ম হচ্ছে। অনেকে বেদ থেকে পরিবেশবাদের তত্ত্ব বের করছেন, অনেকে সমাজতান্ত্রিক সমতার বাণী খুঁজছেন, আবার অনেকে পিতৃতান্ত্রিক নিপীড়নের দলিল আবিষ্কার করছেন।
স্ট্যানলি ফিশের হার্মেনিউটিক্স আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ব্যাখ্যার এই বহুত্ব কোনো বিপদের বিষয় নয়; এটিই পাঠ্যের স্বাভাবিক পরিণতি। কোনো টেক্সটই কোনো একটি নির্দিষ্ট দলের চিরন্তন সম্পত্তি হতে পারে না। যত দিন মানব সমাজ টিকে থাকবে, ততদিন নতুন নতুন সামাজিক পরিস্থিতি তৈরি হবে এবং সেই পরিস্থিতির প্রয়োজনে মানুষ আবার প্রাচীন টেক্সটগুলোর দিকে ফিরে তাকাবে। প্রতিটি নতুন প্রজন্ম তার নিজস্ব ভয়, আশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখতে পাবে সেই অক্ষরের সারিতে।
পরিশেষে বলা যায়, স্ট্যানলি ফিশের ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়ের ধারণাটি বৈদিক সাহিত্যের একপাক্ষিক ও কর্তৃত্ববাদী পাঠের মোহকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। বেদ কেবল কোনো পুরোহিতের যজ্ঞবেদী নয়, কোনো অদ্বৈত সন্ন্যাসীর গুহা নয়, আবার কোনো পাশ্চাত্য অধ্যাপকের লাইব্রেরিও নয়। বেদ হলো এই সমস্ত ঐতিহাসিক কণ্ঠস্বরের এক বিশাল সংঘাতময় সংকলন। অর্থের এই লড়াই প্রমাণ করে যে কোনো প্রাচীন পাঠ্যের প্রাণশক্তি তার অক্ষরের স্থবিরতায় থাকে না; তা বেঁচে থাকে সেই সমস্ত সম্প্রদায়ের সচল ভাবনায়, যারা পাঠ্যটিকে অর্থপূর্ণ করে তোলার জন্য প্রতিটি যুগে নতুন নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে দ্বিধা করে না।
ফিশ ও একই মন্ত্রের বহু পাঠ (Fish and Multiple Readings of One Mantra): সম্প্রদায়ভেদে অর্থ উৎপাদনের পরীক্ষা
ফিশের প্রয়োগমূলক ফ্রেমওয়ার্ক ও মন্ত্রের পাঠগত ক্ষেত্র (Fish’s Applied Framework and the Textual Field of the Mantra)
আমেরিকান তাত্ত্বিক স্ট্যানলি ফিশ (Stanley Fish) সাহিত্যের ব্যাখ্যাশাস্ত্রে একটি গভীর দার্শনিক প্রশ্ন তুলেছিলেন: পাঠ্যের ভেতরে কি অর্থ আগে থেকেই জমা থাকে, নাকি পাঠক পড়ার প্রক্রিয়ায় অর্থ তৈরি করে? ফিশ তার গ্রন্থ প্রফেশনাল কারেক্টনেস: লিটারারি স্টাডিজ অ্যান্ড পলিটিক্যাল চেঞ্জ (Professional Correctness: Literary Studies and Political Change) (1995)-এ দেখান যে পাঠ্য নিজে থেকে কোনো কথা বলতে পারে না। পাঠ্য হলো পৃষ্ঠার ওপর কালির কিছু আঁচড় মাত্র। এই আঁচড়গুলোকে শব্দ, বাক্য এবং অর্থে রূপান্তর করে একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায় (Interpretive Community)। কোনো একটি সম্প্রদায়ের সদস্যরা যখন একই ধরনের পাঠ-পদ্ধতি, বিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক ব্যাকরণ ভাগ করে নেন, তখন তাদের কাছে টেক্সটের অর্থ অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং স্বতঃসিদ্ধ মনে হয়। কিন্তু ভিন্ন একটি সম্প্রদায়ের সামনে সেই একই টেক্সট উপস্থিত হলে তার রূপ সম্পূর্ণ বদলে যায়।
এই তাত্ত্বিক প্রস্তাবনাটি পরীক্ষা করার জন্য বৈদিক সাহিত্যের একটি সুনির্দিষ্ট মন্ত্রকে গবেষণাগারের নমুনার মতো ব্যবহার করা যেতে পারে। ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের ১৬৪তম সূক্তের ৪৬তম ঋকটি ভারতীয় চিন্তার ইতিহাসে অত্যন্ত বিখ্যাত। মন্ত্রটি হলো: “একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্ত্যগ্নিং যমং মাতরিশ্বানমাহুঃ” (সেই এক সৎ-সত্তাকে জ্ঞানীরা বহু নামে ডাকেন; তারা তাকে অগ্নি, যম ও মাতরিশ্বা বলেন)। সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হতে পারে এই মন্ত্রটির একটি সরল এবং সার্বজনীন অর্থ রয়েছে। কিন্তু বৈদিক ব্যাখ্যার ইতিহাস পরীক্ষা করলে দেখা যায়, এই চব্বিশটি সিলেবল বা মাত্রার ক্ষুদ্র শ্লোকটি বিভিন্ন যুগে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী অর্থ উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এটি কোনো আকস্মিক ভুল বোঝাবুঝি ছিল না; বরং প্রতিটি যুগের ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ ও পদ্ধতি দিয়ে এই একই শব্দবন্ধ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা নির্মাণ করেছে।
ধর্মতত্ত্ববিদ বারবারা হোল্ড্রেজ (Barbara A. Holdrege) তার তুলনামূলক গবেষণা গ্রন্থ বেদ অ্যান্ড তোরাহ: ট্রান্সেন্ডিং দ্য টেক্সচুয়ালিটি অব স্ক্রিপচার (Veda and Torah: Transcending the Textuality of Scripture) (1996)-এ উল্লেখ করেছেন কীভাবে বৈদিক সংস্কৃতিতে মন্ত্রের অবস্থান কেবল সাধারণ লিখিত অক্ষরের মতো ছিল না। মন্ত্র ছিল এমন এক পবিত্র ধ্বনি যার কার্যকারিতা নির্ধারিত হতো তা কীভাবে এবং কার দ্বারা প্রযুক্ত হচ্ছে তার ওপর। ফিশের পরিভাষা ধার করে বলা যায়, বৈদিক মন্ত্রের কোনো স্থির ‘টেক্সচুয়াল অবজেক্টিভিটি’ বা পাঠগত বস্তুনিষ্ঠতা ছিল না। বিভিন্ন সম্প্রদায় এই মন্ত্রটিকে তাদের নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে।
এই অধ্যায়ে ঋগ্বেদের এই একটিমাত্র মন্ত্রকে কেন্দ্র করে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়ের পাঠ-পদ্ধতি পরীক্ষা করা হবে। চতুর্দশ শতকের আচারবাদী সায়ণ, পরবর্তীকালের অদ্বৈত ও নব্য-বেদান্তীয় ধারা, উনিশ শতকের সমাজ-সংস্কারক স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর আর্য সমাজ, বিংশ শতকের শুরুতে শ্রীঅরবিন্দের মনস্তাত্ত্বিক ধারা এবং আধুনিক ঐতিহাসিক-ভাষাতাত্ত্বিক ইন্দোলজি – কীভাবে এই পাঁচটি গোষ্ঠী একই মন্ত্র থেকে পাঁচটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ উৎপাদন করল, তা বিশ্লেষণ করাই এখানে মূল লক্ষ্য। ফিশের তত্ত্ব অনুসারে এই সম্প্রদায়ের কেউই মূল টেক্সটকে ‘আবিষ্কার’ করেনি; বরং তারা প্রত্যেকে নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অনুযায়ী টেক্সটটিকে ‘তৈরি’ করেছে।
সায়ণাচার্য ও আচারিক ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায় (Sāyaṇācārya and the Ritualist Interpretive Community)
চতুর্দশ শতকের বিজয়নগর সাম্রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী এবং বেদভাষ্যকার সায়ণাচার্য (Sāyaṇācārya) ছিলেন বৈদিক যাগযজ্ঞ বা যাজ্ঞিক সম্প্রদায়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিনিধি। সায়ণ যখন ঋগ্বেদ ব্যাখ্যা করতে বসেন, তখন তার সামনে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পূর্বমীমাংসা দর্শনের আলোকে প্রতিটি মন্ত্রের যজ্ঞীয় উপযোগিতা নিশ্চিত করা। এই সম্প্রদায়ের পাঠের মূল কৌশল ছিল বিনিযোগ (Viniyoga) – অর্থাৎ একটি মন্ত্র যাগযজ্ঞের কোন নির্দিষ্ট মুহূর্তে, কোন পুরোহিত দ্বারা এবং কোন দেবতার উদ্দেশ্যে উচ্চারিত হবে, তা নির্ধারণ করা। যজ্ঞের বাইরে কোনো মন্ত্রের স্বতন্ত্র দার্শনিক অর্থ খোঁজা এই সম্প্রদায়ের নিয়মের বিরুদ্ধ ছিল।
সায়ণ তার ঋগ্বেদভাষ্যে “একং সৎ” কথাটিকে কোনো অদ্বৈত ব্রহ্ম বা বিমূর্ত দার্শনিক সত্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেননি। তিনি বললেন, এখানে “সৎ” শব্দের অর্থ হলো মহাজাগতিক জলীয় বাষ্প ও তেজ উৎপাদনকারী পরম দেবতা আদিত্য বা সূর্য। যজ্ঞের কার্যকারিতার জন্য সূর্যের উপস্থিতি অপরিহার্য। সায়ণ যুক্তি দিলেন যে এই একই সূর্য যখন বিভিন্ন ঋতুতে এবং বিভিন্ন যজ্ঞকুণ্ডে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে, তখন যাজ্ঞিক বিপ্র বা যজ্ঞকারী ঋষিরা তাকে অগ্নি, যম বা মাতরিশ্বা ইত্যাদি নামে ডাকেন। অর্থাৎ বহুরূপী দেবতারা আসলে কোনো স্বতন্ত্র আধ্যাত্মিক সত্য নন, বরং যজ্ঞের বিভিন্ন আহুতি গ্রহণের জন্য সূর্যেরই বিভিন্ন রূপভেদ।
ভারততাত্ত্বিক লরি প্যাটন (Laurie L. Patton) তার গ্রন্থ ব্রিংগিং দ্য গডস টু মাইন্ড: মন্ত্র অ্যান্ড রিচুয়াল ইন আর্লি ইন্ডিয়ান সেক্রিফাইস (Bringing the Gods to Mind: Mantra and Ritual in Early Indian Sacrifice) (2005)-এ সায়ণের এই আচারিক হার্মেনিউটিক্স বিশ্লেষণ করেছেন। প্যাটন দেখান, সায়ণের সম্প্রদায়ে মন্ত্রের শব্দার্থ সবসময় শারীরিক আচারের বাস্তবতার সাথে যুক্ত ছিল। “অগ্নি” মানে যজ্ঞকুণ্ডের বাস্তব আগুন, “যম” মানে অন্ত্যেষ্টি যজ্ঞের সাথে যুক্ত নিয়ন্তা, এবং “মাতরিশ্বা” মানে সেই বায়ু যা যজ্ঞের আগুনকে প্রজ্বলিত রাখতে সাহায্য করে। বিপ্র বা কবিদের “বহুধা বদন্তি” (নানাভাবে বলা) কথাটিকে সায়ণ যজ্ঞীয় স্তুতি হিসেবে দেখেছেন, কোনো অধিবিদ্যক ভ্রান্তি হিসেবে নয়।
ফিশের তাত্ত্বিক আলোয় দেখলে বোঝা যায়, সায়ণের ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায় এই মন্ত্রটির সমস্ত মনস্তাত্ত্বিক বা দার্শনিক সম্ভাবনাকে শুরুতেই ছেঁটে ফেলেছিল। তাদের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মাবলীতে যাগযজ্ঞই ছিল জগতের একমাত্র বাস্তব প্রযুক্তি। ফলে মন্ত্রটির শব্দগুলোকে তারা এমনভাবে সাজিয়েছিলেন যাতে তা কুরু-পাঞ্চাল বা বিজয়নগরের যজ্ঞশালার কাঠ ও ঘৃতের হিসাব-নিকাশের সাথে নিখুঁতভাবে মিলে যায়। সায়ণের কাছে এই মন্ত্রটি ছিল যজ্ঞের বিভিন্ন দেবতাকে এক সূর্যরূপ মহাজাগতিক উৎসে যুক্ত করে বৈদিক যাগযজ্ঞের সামগ্রিক ঐক্য রক্ষা করার একটি লিটার্জিক্যাল বা উপাসনাগত হাতিয়ার।
বেদান্ত ও নব্য-বেদান্তীয় সম্প্রদায়: সর্বজনীন একত্ববাদের নির্মাণ (Vedānta and Neo-Vedāntic Communities: Construction of Universalist Monism)
ঠিক এই একই মন্ত্র যখন বেদান্ত এবং পরবর্তীকালে উনিশ শতকের নব্য-বেদান্ত (Neo-Vedānta) সম্প্রদায়ের হাতে গিয়ে পৌঁছাল, তখন এর অর্থ কাঠামোয় এক আমূল পরিবর্তন ঘটে গেল। শঙ্কর এবং তার অনুসারী দার্শনিকরা সায়ণের যজ্ঞীয় ব্যাখ্যাকে নিছক প্রাথমিক বা স্থূল স্তর বলে উড়িয়ে দিলেন। তাদের ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়ের মূল লক্ষ্য ছিল সমস্ত বৈদিক পাঠ্যের ভেতরে অদ্বৈত ভাববাদ (Advaita Idealism) প্রতিষ্ঠা করা। ফলে এই সম্প্রদায়ের চোখে “একং সৎ” হয়ে উঠল উপনিষদের সেই গুণহীন, অপরিবর্তনীয় এবং নির্বিশেষ পরম সত্তা বা নির্গুণ ব্রহ্ম।
এই ব্যাখ্যার সবচেয়ে নাটকীয় রূপান্তর ঘটে উনিশ শতকের শেষভাগে স্বামী বিবেকানন্দ এবং আধুনিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদদের হাত ধরে। ঔপনিবেশিক ভারতে তখন খ্রিস্টান মিশনারিরা বহুদেববাদের অভিযোগ তুলে হিন্দুধর্মকে আক্রমণ করছিল। এই ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে বিবেকানন্দের নেতৃত্বাধীন নব্য-বেদান্তীয় সম্প্রদায় ঋগ্বেদের এই মন্ত্রটিকে তাদের প্রধান তাত্ত্বিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। তারা দাবি করলেন যে এই মন্ত্রটি প্রমাণ করে বৈদিক ধর্ম কখনোই বহুদেববাদী ছিল না; শুরু থেকেই তা ছিল এক পরম একত্ববাদী দর্শন। “বহুধা বদন্তি” কথাটিকে তারা বিভিন্ন ধর্মের ঐতিহাসিক বৈচিত্র্য হিসেবে ব্যাখ্যা করলেন। অর্থাৎ ঈশ্বর এক, কিন্তু হিন্দু, মুসলিম বা খ্রিস্টানরা তাকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকে।
আমেরিকান গবেষক রবার্ট মাইনর (Robert N. Minor) তার তুলনামূলক আলোচনায় দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক বৈদান্তিক সম্প্রদায়গুলো এই মন্ত্রটিকে একটি সর্বজনীন ধর্মীয় সহনশীলতার ম্যানিফেস্টো বা ঘোষণাপত্রে পরিণত করেছিল। মন্ত্রটির মূল ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ ছিল ব্রোঞ্জ যুগের যাগযজ্ঞের বহু দেবতার পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণ। কিন্তু নব্য-বেদান্তের পাঠে তা হয়ে উঠল আধুনিক বহুত্ববাদী সমাজের ধর্মীয় ঐক্যের দার্শনিক ভিত্তি। প্রাচীন বৈদিক পাঠের এই আধুনিকীকরণ ছিল তাদের প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য একটি রাজনৈতিক কৌশল।
স্ট্যানলি ফিশের মতে, এই পাঠটি মূল বৈদিক রচয়িতার মনের ভাব প্রকাশ করে না, বরং প্রকাশ করে উনিশ শতকের একদল আধুনিক পাঠকের আকাঙ্ক্ষা। তারা পাশ্চাত্য যুক্তিবাদ এবং ঔপনিবেশিক আধিপত্যের মুখোমুখি হয়ে এমন একটি ব্যাখ্যাকৌশল তৈরি করেছিলেন যা একই সাথে তাদের সনাতন ঐতিহ্যকে মহিমান্বিত করে এবং আধুনিক উদারনীতিবাদী মূল্যবোধের সাথেও সংগতিপূর্ণ হয়। ফলে সায়ণের সেই যজ্ঞের সূর্যদেবতা নব্য-বেদান্তের টেবিলে এসে পরিণত হলেন এক বিশ্বজনীন কসমিক চেতনায়।
আর্য সমাজ ও দয়ানন্দ সরস্বতী: একেশ্বরবাদী পাঠের পুনর্গঠন (Arya Samaj and Dayānanda Sarasvatī: Reconstruction of Monotheistic Reading)
বেদান্তের এই বিমূর্ত ভাববাদের পাশাপাশি উনিশ শতকে আরেকটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও মারমুখী ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়ের উত্থান ঘটেছিল। পণ্ডিত দয়ানন্দ সরস্বতী (Dayānanda Sarasvatī) ১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আর্য সমাজ (Arya Samaj)। দয়ানন্দ পৌরাণিক মূর্তিপূজা, বহুদেববাদ এবং শঙ্করের মায়াবাদ – এই তিনটির বিরুদ্ধেই তীব্র যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি তার আকর গ্রন্থ সত্যার্থ প্রকাশ (Satyarth Prakash) (1874) এবং ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা (Ṛgvedādibhāṣyabhūmikā)-তে বেদ ব্যাখ্যার এক সম্পূর্ণ নতুন ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতির অবতারণা করেন।
দয়ানন্দের ব্যাখ্যাকৌশল দাঁড়িয়ে ছিল প্রাচীন ব্যাকরণবিদ যাস্কের নিরুক্ত পদ্ধতির এক বিশেষ ব্যবহারের ওপর। তিনি ঘোষণা করলেন যে বেদের সমস্ত দেববাচক শব্দ হলো যৌগিক অর্থ (Yaugika / Etymological Meaning) সম্পন্ন, অর্থাৎ তারা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দেবমূর্তিকে নির্দেশ করে না; তারা নির্দেশ করে বিশেষ কিছু গুণাবলীকে। এই নিয়মের ওপর ভিত্তি করে দয়ানন্দ ঋগ্বেদের ১.১৬৪.৪৬ মন্ত্রটির এক অভূতপূর্ব ব্যাখ্যা হাজির করলেন। তিনি বললেন, “একং সৎ” মানে হলো একমাত্র নিরাকার, সর্বশক্তিমান একেশ্বরবাদ (Monotheism)। সেই পরমেশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়।
তাহলে অগ্নি, যম বা মাতরিশ্বা কারা? আর্য সমাজের ব্যাখ্যা অনুসারে এগুলো আলাদা কোনো দেবতা নয়, বরং সেই একই নিরাকার ঈশ্বরের বিভিন্ন গুণবাচক নাম। ঈশ্বর যেহেতু জ্ঞানময় এবং সর্বাগ্রে প্রকাশমান, তাই তার এক নাম ‘অগ্নি’। তিনি যেহেতু সমস্ত সৃষ্টিকে কর্মের নিয়মে সংযত ও বিচার করেন, তাই তার নাম ‘যম’। এবং তিনি যেহেতু সমগ্র মহাবিশ্বের জীবন ও গতির ধারণকারী, তাই তার নাম ‘মাতরিশ্বা’। দয়ানন্দ দৃঢ়ভাবে বললেন যে বিপ্র বা বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা সেই এক ঈশ্বরেরই এই সমস্ত গুণবাচক নাম উচ্চারণ করেন। কোনো বহুদেবতা বৈদিক ধর্মে ছিল না; পরবর্তীকালের পুরোহিতরা স্বার্থসিদ্ধির জন্য বেদের শব্দগুলোর অপব্যাখ্যা করে মূর্তিপূজা তৈরি করেছে।
ভারততাত্ত্বিক জে. টি. এফ. জর্ডেন্স (J. T. F. Jordens) তার প্রামাণ্য জীবনী গ্রন্থ দয়ানন্দ সরস্বতী: হিজ লাইফ অ্যান্ড আইডিয়াস (Dayānanda Sarasvatī: His Life and Ideas) (1978)-এ আর্য সমাজের এই পাঠগত বিপ্লবের সামাজিক ভিত্তি বিশ্লেষণ করেছেন। জর্ডেন্স দেখান, দয়ানন্দ এমন এক বৈদিক ব্যাখ্যা তৈরি করতে চেয়েছিলেন যা আব্রাহামীয় ধর্মগুলোর মতো কঠোর একেশ্বরবাদী এবং একই সাথে সমাজ সংস্কারের হাতিয়ার। ফিশের পরিভাষায়, আর্য সমাজ ছিল এমন এক শক্তিশালী ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায় যার নিজস্ব নিয়মাবলী বৈদিক মন্ত্রের বহুদেববাদী চরিত্রকে জোরপূর্বক একেশ্বরবাদী ব্যাকরণে রূপান্তরিত করেছিল। তাদের তৈরি করা এই নতুন অর্থ এখনো লক্ষ লক্ষ অনুসারীর কাছে একমাত্র সঠিক বৈদিক বার্তা হিসেবে সমাদৃত।
শ্রীঅরবিন্দ ও মনস্তাত্ত্বিক-প্রতীকী সম্প্রদায় (Sri Aurobindo and the Psycho-Symbolic Community)
বিংশ শতকের প্রথমভাগে পন্ডিচেরিতে অবস্থানকালে বিপ্লবী ও দার্শনিক শ্রীঅরবিন্দ (Sri Aurobindo) বেদ ব্যাখ্যার আরেকটি স্বতন্ত্র ধারা নির্মাণ করেন। তিনি সায়ণের আচারবাদ এবং ইউরোপীয় ইন্দোলজি – উভয় পদ্ধতিকেই পৃষ্ঠপোষণকারী ও অগভীর বলে উড়িয়ে দেন। অরবিন্দ তার যুগান্তকারী গ্রন্থ দ্য সিক্রেট অব দ্য বেদ (The Secret of the Veda) (1971)-এ দাবি করেন যে ঋগ্বেদ কোনো আদিম পশুপালক মানুষের প্রার্থনা নয়, আবার তা কোনো নিছক আনুষ্ঠানিক যজ্ঞের বইও নয়। বেদ হলো প্রাচীন ঋষিদের অতিচেতন অনুভূতির এক গভীর প্রতীকী রূপক, যাকে তিনি বলেন প্রতীকবাদী হার্মেনিউটিক্স (Symbolist Hermeneutics)।
অরবিন্দের ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায় ১.১৬৪.৪৬ মন্ত্রটিকে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও অভ্যন্তরীণ বিবর্তনের মানচিত্র হিসেবে পাঠ করে। তার মতে, বৈদিক যজ্ঞ আসলে মানুষের নিজের চেতনার রূপান্তরের প্রতীক। সেখানে পশু বলি দেওয়া মানে মানুষের পাশবিক প্রবৃত্তির বলি দেওয়া, আর সোমরস হলো আধ্যাত্মিক আনন্দের নির্যাস। এই প্রতীকী ছকের ভেতরে “একং সৎ” হলো সেই পরম তুরীয় চেতনা বা সত্য-চেতনা যা সমগ্র সৃষ্টির পেছনে লুক্কায়িত আছে।
অরবিন্দের দৃষ্টিতে অগ্নি, যম বা মাতরিশ্বা কোনো কাল্পনিক দেবতা বা ঈশ্বরের সাধারণ নাম নন; তারা হলেন মানব চেতনার বিভিন্ন রূপান্তরমূলক শক্তির প্রতীক। ‘অগ্নি’ হলেন মানুষের হৃদয়ে জ্বলতে থাকা আধ্যাত্মিক তপস্যা ও পরিবর্তনের সংকল্প। ‘যম’ হলেন চেতনার সেই আত্মসংযম ও আইন যা অহংকারকে ধ্বংস করে। আর ‘মাতরিশ্বা’ হলেন সেই গতিশীল প্রাণশক্তি যা জড় শরীরের ভেতরে উচ্চতর আধ্যাত্মিক শক্তিকে সঞ্চারিত করে। প্রাচীন বিপ্র বা ঋষিরা যখন “বহুধা বদন্তি” বলেন, তখন তারা বোঝাতে চান যে একই পরম চেতনাকে বিভিন্ন মানসিক স্তরে বিভিন্ন শক্তিরূপে অনুভব করা যায়।
ধর্মীয় চিন্তার গবেষক টমাস পিটার্স (Thomas A. Peters) উল্লেখ করেছেন কীভাবে অরবিন্দ বৈদিক ভাষাকে এক আধুনিক অতিন্দ্রীয় মনোবিজ্ঞানের সমকক্ষ করে তুলেছিলেন। ফিশের তাত্ত্বিক চোখে দেখলে, অরবিন্দের এই ব্যাখ্যাটি পুরোপুরি তার নিজস্ব আধ্যাত্মিক দর্শন এবং যোগচর্চার কাঠামোর দ্বারা নির্মিত। তিনি বিংশ শতকের বিবর্তনবাদ এবং আধুনিক মনস্তত্ত্বের উপাদানগুলোকে বৈদিক রূপকের মধ্যে এমনভাবে প্রবিষ্ট করেছিলেন যে প্রাচীন বৈদিক মন্ত্রটি একটি অত্যাধুনিক মনস্তাত্ত্বিক রূপকথায় পরিণত হয়েছিল। এই সম্প্রদায়টির বাইরে সাধারণ কোনো ভাষাতাত্ত্বিক বা আচারিক পাঠকের পক্ষে এই অর্থ কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল।
আধুনিক তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব ও ঐতিহাসিক ইন্দোলজি (Modern Comparative Philology and Historical Indology)
উপরে আলোচিত সমস্ত ভারতীয় ও ভাববাদী সম্প্রদায়ের বিপরীতে অবস্থান করছে আধুনিক ঐতিহাসিক ইন্দোলজি (Historical Indology)। বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব এবং ঐতিহাসিক পদ্ধতির ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করা এই গবেষকদের প্রধান লক্ষ্য ধর্মতাত্ত্বিক বা আধ্যাত্মিক সত্য আবিষ্কার নয়; তাদের লক্ষ্য হলো একটি প্রাচীন সমাজ এবং ভাষার গতিবিধি বিশ্লেষণ করা। এই সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট প্রতিনিধি হলেন আমেরিকান ভারততাত্ত্বিক স্টেফানি জ্যামিসন (Stephanie W. Jamison) এবং জোয়েল ব্রেরেটন (Joel P. Brereton)। তাদের বিশাল তিন খণ্ডের অনুবাদ গ্রন্থ দ্য রিগবেদ: দ্য আর্লিয়েস্ট রিলিজিয়াস পোয়েট্রি অব ইন্ডিয়া (The Rigveda: The Earliest Religious Poetry of India) (2014)-এ তারা এই মন্ত্রটির এক কঠোর ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক পাঠ হাজির করেছেন।
ইন্দোলজিক্যাল সম্প্রদায়ের পাঠ অনুসারে, ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের ১৬৪তম সূক্তটি কোনো স্বাভাবিক প্রার্থনা নয়; এটি হলো একটি ব্রহ্মোদ্য (Brahmodya) বা কাব্যিক ধাঁধার সংকলন। প্রাচীন ভারতে সোমযজ্ঞের সময় বিভিন্ন পুরোহিত ও কবিরা একে অপরকে মহাবিশ্ব, ঋতু, জীবন ও সৃষ্টির রহস্য নিয়ে জটিল ধাঁধাময় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতেন। দীর্ঘতমা ঋষি রচিত এই সূক্তটি ছিল তেমনই এক দার্শনিক ও কাব্যিক প্রতিযোগিতার ফসল। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে “একং সৎ” কথাটি কোনো পরবর্তীকালের উপনিষদীয় ব্রহ্ম নয়; এটি হলো সেই গুহ্য ও রহস্যময় মহাজাগতিক শক্তি, যা বিশ্বের সমস্ত প্রাকৃতিক বৈপরীত্যের পেছনে কার্যকারী হিসেবে প্রাচীন কবিরা অনুমান করছিলেন।
রুশ ভাষাতাত্ত্বিক তাতিয়ানা এলিজারেনকোভা (Tatyana Y. Elizarenkova) তার সুপরিচিত গ্রন্থ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড স্টাইল অব দ্য বৈদিক ঋষিস (Language and Style of the Vedic Ṛṣis) (1995)-এ বৈদিক কবিদের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করেছেন। এলিজারেনকোভা দেখান যে বৈদিক কবিদের কাছে ‘নাম’ এবং ‘রূপ’ ছিল পারস্পরিক শক্তির প্রকাশ। ইন্দ্র, অগ্নি বা মিত্র – এরা প্রাচীন ইন্দো-আর্য প্যান্থিয়নের প্রকৃত পৌরাণিক দেবতাই ছিলেন। কিন্তু এই সুনির্দিষ্ট শ্লোকে কবি একটি বিশেষ কাব্যিক অন্তর্দৃষ্টি প্রকাশ করছেন: এই দেবতারা হয়তো আলাদা আলাদা সত্তা হিসেবে কাজ করছেন, কিন্তু তাদের পেছনে এক অদৃশ্য মহাজাগতিক মেলবন্ধন কাজ করছে যাকে তারা “একং সৎ” বলছেন। বিপ্র বা কবিদের কাজই হলো ভাষার জাদুকরী শক্তিতে সেই এক শক্তিকে বহু নামে রূপায়িত করা।
ডাচ ভারততাত্ত্বিক ইয়ান গোন্ডা (Jan Gonda) তার আকর গ্রন্থ দ্য ভিশন অব দ্য বৈদিক পোয়েটস (The Vision of the Vedic Poets) (1963)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে বৈদিক কাব্যিক কল্পনা কাজ করত। আধুনিক ইন্দোলজি এই মন্ত্রটিকে কোনো সার্বজনীন পরমতসহিষ্ণুতার স্লোগান বা একেশ্বরবাদের প্রমাণ হিসেবে দেখে না; তারা একে দেখে ব্রোঞ্জ যুগের শেষভাগে বৈদিক চিন্তার বিবর্তনের একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে, যেখানে বহুদেববাদী আচারিক কাঠামোর ভেতর থেকেই প্রথমবার মহাজাগতিক ঐক্যের তাত্ত্বিক প্রশ্নগুলো অঙ্কুরিত হতে শুরু করেছিল।
স্ট্যানলি ফিশের হার্মেনিউটিক্স আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে এই ঐতিহাসিক ইন্দোলজিস্টরাও অন্য সবার মতোই একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়। তারা যে পদ্ধতি ব্যবহার করেন – প্রত্নতত্ত্ব, তুলনামূলক ব্যাকরণ, সামাজিক ইতিহাস – সেগুলো তাদের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফলে তাদের দেওয়া পাঠটিও কোনো পরম অপরিবর্তনীয় সত্য নয়, বরং তা আধুনিক অ্যাকাডেমিক সম্প্রদায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ঐকমত্যের একটি ফসল।
পরিশেষে এই পরীক্ষাটি প্রমাণ করে যে ঋগ্বেদের ১.১৬৪.৪৬ মন্ত্রটি কোনো একক অর্থের পাত্র নয়। সায়ণের কাছে তা ছিল যজ্ঞের সূর্যের মহিমা, বিবেকানন্দের কাছে তা ছিল সর্বধর্মসমন্বয়ের দার্শনিক ভিত্তি, দয়ানন্দের কাছে তা ছিল নিরাকার ঈশ্বরের গুণবাচক রূপরেখা, অরবিন্দের কাছে তা ছিল চেতনার অতিন্দ্রীয় বিবর্তন, আর আধুনিক ঐতিহাসিকদের কাছে তা প্রাচীন কাব্যিক ধাঁধার একটি নমুনা। স্ট্যানলি ফিশের সেই মৌলিক অন্তর্দৃষ্টিই এখানে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়: টেক্সট কখনো অর্থ তৈরি করে না, অর্থ তৈরি করে ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়। একই বৈদিক মন্ত্রের এই বহুবিধ পাঠের ইতিহাস মূলত মানব সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর নিজেদের অস্তিত্ব, ক্ষমতা এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাচীন শব্দের আধারে প্রতিষ্ঠা করার এক অন্তহীন বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযাত্রা।
শ্লাইয়ারমাখার, গাডামার ও রিক্যুর দিয়ে নাসদীয় সূক্ত (Schleiermacher, Gadamer and Ricoeur on the Nāsadīya Sūkta): ভাষা, দিগন্ত, মিথ ও অনির্ণেয়তা
নাসদীয় সূক্তের পাঠগত কাঠামো ও সৃষ্টির ধাঁধা (Textual Structure of the Nāsadīya Sūkta and the Riddle of Creation)
ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১২৯তম সূক্তটি বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম গভীর এবং বিস্ময়কর সৃষ্টিতাত্ত্বিক বয়ান হিসেবে স্বীকৃত। ভারতীয় ঐতিহ্যে সূক্তটির প্রথম শব্দবন্ধ অনুসারে একে নাসদীয় সূক্ত (Nāsadīya Sūkta) নামে অভিহিত করা হয়। মাত্র সাতটি ত্রিষ্টুপ ছন্দের ঋক বা শ্লোকে বিন্যস্ত এই পাঠ কোনো সরল ধর্মীয় উপকথা বা বিশ্বাসের বিবরণ দেয় না। সূক্তটি শুরুই হয় এক পরম ভাষাগত প্যারাডক্স বা বিরোধাভাসের মধ্য দিয়ে: “নাসদাসীন্নো সদাসীত্তদানীং” (তখন অসৎ বা অনস্তিত্বও ছিল না, সৎ বা অস্তিত্বও ছিল না)। কোনো কিছু সৃষ্টির আগের মুহূর্তকে মানবভাষায় বর্ণনা করতে গিয়ে কবি প্রচলিত সমস্ত অস্তিত্ববাচক এবং অনস্তিত্ববাচক ধারণাকে একযোগে বাতিল করে দেন। সেখানে আকাশ ছিল না, মহাশূন্য ছিল না, মৃত্যু ছিল না, এমনকি অমরত্বও ছিল না; দিন ও রাত্রির কোনো চিহ্ন পর্যন্ত ছিল না।
সূক্তটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঋকে সেই আদিম অবস্থার এক গাঢ় বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে ছিল এক সর্বগ্রাসী অন্ধকার যা অন্ধকারের দ্বারাই আবৃত ছিল এবং চারপাশ ছিল চিহ্নহীন জলরাশি বা অপ্রকেত সলিল (Apraketa Salila)। এরপর বলা হয়, সেই শূন্যতার মাঝে তপের বা তাপরূপ শক্তির প্রভাবে এক আদি সত্তার জন্ম হলো। চতুর্থ ঋকে এসে ঘটনার মোড় ঘুরে যায়। সেই সত্তার ভেতরে প্রথম জন্ম নিল কাম (Kāma) বা ইচ্ছা, যা কবির ভাষায় মনের প্রথম বীজ। কবি তখন দাবি করেন যে প্রজ্ঞাবান সাধকরা নিজেদের হৃদয়ে বুদ্ধি দিয়ে অনুসন্ধান করে অসতের ভেতরে সতের বন্ধন বা যোগসূত্র আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু এই আপাত-নিশ্চয়তার পরেই সূক্তটি চরম এক সন্দেহের জগতে প্রবেশ করে।
পঞ্চম থেকে সপ্তম ঋক পর্যন্ত কোনো স্থির সিদ্ধান্ত দেওয়ার বদলে কবি একের পর এক সংশয়মূলক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন। সৃষ্টি কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল? এর কোনো ঊর্ধ্বভাগ বা নিম্নভাগ ছিল কি? কে এটা প্রত্যক্ষ করেছিল? সবচেয়ে চরম আঘাতটি আসে ষষ্ঠ ঋকে, যেখানে বৈদিক দেবতাদের কর্তৃত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলা হয়: “অর্বাগ্ দেবা অস্য বিসর্জনে অথ কো বেদ যত আবভূব” (দেবতারা তো এই সৃষ্টির পরে এসেছেন, তাহলে কে জানবে কোথা থেকে এর উৎপত্তি?)। সূক্তের শেষ ঋকটি মানব দর্শনের অন্যতম সাহসী উচ্চারণ: পরম আকাশে যিনি এই মহাবিশ্বের অধ্যক্ষ বা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে বসে আছেন, তিনি হয়তো এর উৎস জানেন, অথবা তিনিও হয়তো জানেন না!
আমেরিকান ভারততাত্ত্বিক ওয়েন্ডি ডনিগার ও’ফ্লাহার্টি (Wendy Doniger O’Flaherty) তার অনুবাদ গ্রন্থ দ্য রিগ বেদ: অ্যান অ্যান্থোলজি (The Rig Veda: An Anthology) (1981)-এ মন্তব্য করেছেন যে এই সূক্তটি অন্যান্য সমস্ত বৈদিক সৃষ্টিতত্ত্বের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। অন্যান্য সূক্তে যখন কোনো পুরুষ বা দেবতার বলিদানের মাধ্যমে জগত তৈরি হয়, নাসদীয় সূক্ত তখন সৃষ্টির যেকোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকে ভেঙে ফেলে। আধুনিক ব্যাখ্যাশাস্ত্র বা হার্মেনিউটিক্সের দৃষ্টিতে এই টেক্সটটি এক অসাধারণ গবেষণার ক্ষেত্র। আধুনিক হার্মেনিউটিক্সের তিন প্রধান পুরুষ – ফ্রিডরিশ শ্লাইয়ারমাখার (Friedrich Schleiermacher), হান্স-গেয়র্গ গাডামার (Hans-Georg Gadamer) এবং পল রিক্যুর (Paul Ricoeur)-এর তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করে এই প্রাচীন পাঠ্যের ভাষা, ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত, মিথ এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক অনির্ণেয়তাকে এক নতুন আলোয় পাঠ করা সম্ভব।
শ্লাইয়ারমাখার ও ব্যাকরণিক-মনস্তাত্ত্বিক পুনর্গঠন (Schleiermacher and Grammatical-Psychological Reconstruction)
আধুনিক হার্মেনিউটিক্সের জনক হিসেবে পরিচিত জার্মান চিন্তাবিদ ফ্রিডরিশ শ্লাইয়ারমাখার (Friedrich Schleiermacher) পাঠ ব্যাখ্যার দুটি সমান্তরাল পদ্ধতির কথা বলেছিলেন: ব্যাকরণিক ব্যাখ্যা এবং মনস্তাত্ত্বিক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যাখ্যা। শ্লাইয়ারমাখার তার সংকলিত গ্রন্থ হার্মেনিউটিক্স অ্যান্ড ক্রিটিসিজম: অ্যান্ড আদার রাইটিংস (Hermeneutics and Criticism: And Other Writings) (1998)-এ দেখান যে কোনো প্রাচীন টেক্সট বুঝতে হলে একদিকে সেই যুগের ভাষার নিয়মকানুন নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়, অন্যদিকে সেই ভাষার মধ্য দিয়ে লেখক বা কবির মনে কোন ব্যক্তিগত চিন্তার উদয় হয়েছিল তা পুনর্নির্মাণ করতে হয়। নাসদীয় সূক্তের ক্ষেত্রে শ্লাইয়ারমাখারের এই দুই হাতিয়ার অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
ব্যাকরণিক স্তরে শ্লাইয়ারমাখারের পদ্ধতি প্রয়োগ করলে দেখা যায়, নাসদীয় সূক্তের বৈদিক সংস্কৃত বাক্যগঠন কোনো স্বাভাবিক বিবরণমূলক রীতি অনুসরণ করে না। বৈদিক সাহিত্যের গবেষক জোয়েল ব্রেরেটন (Joel P. Brereton) তার গবেষণামূলক প্রবন্ধ এডিফাইং পাজলমেন্ট: ঋগ্বেদ ১০.১২৯ অ্যান্ড দ্য ইউজেস অব এনিগমা (Edifying Puzzlement: Ṛgveda 10.129 and the Uses of Enigma) (1999)-এ সূক্তটির বাক্যগঠন বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কীভাবে এখানে দ্বৈত নিষেধাত্মক কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে। “না অসৎ, নো সৎ” – এই বাক্যবন্ধ ব্যাকরণের চিরাচরিত সংজ্ঞাকে আঘাত করে। অসৎ মানে যা নেই, আর সৎ মানে যা আছে। ভাষার ব্যাকরণ এই দুইয়ের বাইরে তৃতীয় কোনো অস্তিত্বের কল্পনা করতে পারে না। কিন্তু বৈদিক কবি ব্যাকরণের এই সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এমন এক ভাষিক শূন্যতা তৈরি করেন যা পাঠককে প্রচলিত ব্যাকরণগত অর্থের বাইরে চিন্তা করতে বাধ্য করে।
অন্যদিকে শ্লাইয়ারমাখারের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দাবি করে যে আমাদের সেই প্রাচীন ঋষি বা কবির মানসিক অভিজ্ঞতার ভেতরে প্রবেশ করতে হবে। ব্রিটিশ দার্শনিক অ্যান্ড্রু বোউই (Andrew Bowie) তার ফ্রম রোমান্টিসিজম টু ক্রিটিকাল থিওরি: দ্য ফিলোসফি অব জার্মান লিটারারি থিওরি (From Romanticism to Critical Theory: The Philosophy of German Literary Theory) (2003) গ্রন্থে উল্লেখ করেন, শ্লাইয়ারমাখারের লক্ষ্য ছিল লেখকের মনস্তাত্ত্বিক সৃজন-মুহূর্তটিকে পুনরুদ্ধার করা। নাসদীয় সূক্তের কবির মনে ঠিক কী চলছিল? তিনি যখন প্রাচীন যাগযজ্ঞের সমস্ত নিশ্চিত নিয়মকানুন পাশে সরিয়ে রেখে এক আদিম অন্ধকারের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তখন তার ভেতরের তীব্র অস্তিত্ববাদী বিস্ময় কীভাবে ভাষায় রূপ নিয়েছিল?
শ্লাইয়ারমাখারের বিখ্যাত হার্মেনিউটিক বৃত্ত (Hermeneutic Circle)-এর নিয়ম অনুসারে, সূক্তের প্রতিটি আলাদা শ্লোককে বুঝতে হবে পুরো সাতটি শ্লোকের সামগ্রিক বিন্যাসের সাপেক্ষে, আবার পুরো সূক্তটিকে বুঝতে হবে প্রতিটি শ্লোকের শব্দার্থের সাপেক্ষে। প্রথম শ্লোকের সেই অস্তিত্বহীনতার অনুভূতি চতুর্থ শ্লোকের মনের সংকল্প বা কামের সাথে কীভাবে যুক্ত এবং শেষ শ্লোকের সংশয়ের সাথে কীভাবে সম্পর্কিত, শ্লাইয়ারমাখারের পদ্ধতি সেই যোগাযোগটিকে উন্মোচন করে। তবে এই পদ্ধতির একটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। আমরা শত চেষ্টা করলেও ব্রোঞ্জ বা লৌহ যুগের একজন বৈদিক কবির মানসিক জগতে পুরোপুরি প্রবেশ করতে পারি না। এই সীমাবদ্ধতাই আমাদের গাডামারের দ্বিতীয় স্তরের হার্মেনিউটিক্সের দিকে পরিচালিত করে।
গাডামার ও অনির্ণেয়তার দিগন্ত (Gadamer and the Horizon of Undecidability)
জার্মান দার্শনিক হান্স-গেয়র্গ গাডামার (Hans-Georg Gadamer) শ্লাইয়ারমাখারের এই মনস্তাত্ত্বিক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টাকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছিলেন। গাডামার তার প্রভাবশালী কাজ ফিলোসফিক্যাল হার্মেনিউটিক্স (Philosophical Hermeneutics) (1976)-এ যুক্তি দেন যে অতীত লেখকের মনের ভাব হুবহু উদ্ধার করা কোনো ব্যাখ্যাদাতার কাজ হতে পারে না। পাঠক কখনোই নিজের বর্তমান ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে লাফ দিয়ে প্রাচীন লেখকের মাথায় গিয়ে বসতে পারে না। গাডামারের কাছে পাঠ ব্যাখ্যা হলো দুই দিগন্তের মিলন বা কথোপকথন। নাসদীয় সূক্তের ক্ষেত্রে গাডামারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো তার প্রশ্ন ও উত্তরের যুক্তি (Logic of Question and Answer)।
গাডামারের মতে, কোনো টেক্সট তখনই জীবন্ত থাকে যখন তা কোনো তৈরি করা মতবাদ প্রচার না করে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। নাসদীয় সূক্ত কোনো সুনির্দিষ্ট সৃষ্টিতাত্ত্বিক তত্ত্ব বা মতবাদ ঘোষণা করে না; এটি মহাবিশ্বের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করার অধিকারটিকে উন্মুক্ত করে দেয়। সূক্তের ষষ্ঠ শ্লোকের সেই বিখ্যাত প্রশ্ন: “কো অদ্ধা বেদ ক ইহ প্রবোচৎ” (কে নিশ্চিতভাবে জানে, কেই বা এখানে তা ঘোষণা করবে?)। গাডামারীয় দৃষ্টিতে, এটি কোনো দুর্বলতার চিহ্ন নয়, বরং এটি হলো মানুষের জ্ঞানের সসীমতার এক গভীর স্বীকারোক্তি। কবি পাঠকদের এমন এক দিগন্তের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন যেখানে সমস্ত নিশ্চিত উত্তর হারিয়ে যায়।
আমেরিকান ব্যাখ্যাতাত্ত্বিক রিচার্ড পামার (Richard E. Palmer) তার ধ্রুপদী গ্রন্থ হার্মেনিউটিক্স: ইন্টারপ্রিটেশন থিওরি ইন শ্লাইয়ারমাখার, দিলথাই, হাইডেগার, অ্যান্ড গাডামার (Hermeneutics: Interpretation Theory in Schleiermacher, Dilthey, Heidegger, and Gadamer) (1969)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে গাডামারের দর্শনে ব্যাখ্যার মুক্ত পরিসর সংরক্ষিত থাকে। নাসদীয় সূক্তের প্রাচীন দিগন্ত ছিল প্রকৃতির বিশালতার সামনে আদিম মানুষের বিস্ময় ও সংশয়। আর আধুনিক পাঠকের দিগন্ত হলো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, সংশয়বাদ এবং মহাজাগতিক একাকীত্ব। যখন এই দুই দিগন্ত মিলিত হয়, তখন নাসদীয় সূক্ত আর তিন হাজার বছর আগের কোনো মৃত ধর্মীয় স্তোত্র থাকে না; তা পরিণত হয় অস্তিত্বের আদি রহস্য নিয়ে মানুষের চিরন্তন আত্মজিজ্ঞাসার এক জীবন্ত দলিলে।
গাডামারের তত্ত্ব আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কেন এই সূক্তটির অর্থ কোনোদিন স্থির হয়ে যায়নি। বিভিন্ন যুগে এই সূক্তটিকে ভারতীয় ভাববাদের অদ্বৈত পরমাত্মার প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, আবার কেউ একে আদিম বস্তুবাদী সংশয়বাদ হিসেবে দেখেছেন। গাডামার বলবেন, এই সমস্ত ব্যাখ্যাই বৈধ, কারণ টেক্সটটি নিজেই তার অর্থের ভেতরে এই অনির্ণেয়তা (Undecidability) বা বহুত্বকে ধারণ করে রেখেছে। যে টেক্সট প্রশ্ন তোলে, তার অর্থ কখনোই একটিমাত্র চূড়ান্ত উত্তরে আটকে থাকতে পারে না।
রিক্যুর, মিথ ও সৃষ্টিবর্ণনার বয়ানতত্ত্ব (Ricoeur, Myth, and the Narrative of Cosmogony)
ফরাসি দার্শনিক পল রিক্যুর (Paul Ricoeur) মিথ ও আখ্যানের ব্যাখ্যায় হার্মেনিউটিক্সকে এক নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছিলেন। রিক্যুর তার সুবিশাল গ্রন্থ টাইম অ্যান্ড ন্যারেটিভ: ভলিউম ১ (Time and Narrative: Vol. 1) (1984)-এ দেখিয়েছেন যে কোনো ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক আখ্যান নিছক ঘটনার বিবরণ নয়; তা হলো সময় ও অস্তিত্বকে নতুনভাবে অনুভব করার এক ভাষাতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। নাসদীয় সূক্তকে যদি কেবল কিছু দার্শনিক সূত্রের সংকলন হিসেবে না দেখে একটি পৌরাণিক আখ্যান বা সৃষ্টি-আখ্যান হিসেবে দেখা হয়, তবে রিক্যুরের মিথ-তত্ত্বের কার্যকারিতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
রিক্যুরের মতে, মিথ কোনো আদিম কুসংস্কার বা মিথ্যা বিজ্ঞান নয়। মিথ হলো গভীরতর সত্যকে রূপকের মাধ্যমে প্রকাশ করার এক বিশেষ বয়ান। নাসদীয় সূক্তে যে আদিম অন্ধকারের কথা বলা হয়েছে, তা কোনো চোখ দিয়ে দেখা অন্ধকার নয়; তা হলো সৃষ্টির পূর্ববর্তী অ-সময় বা কালের অনুপস্থিতির প্রতীক। ডাচ ভারততাত্ত্বিক এফ. বি. জে. কাইপার (F. B. J. Kuiper) তার আকর গ্রন্থ অ্যানশিয়েন্ট ইন্ডিয়ান কসমোগনি (Ancient Indian Cosmogony) (1983)-এ উল্লেখ করেছেন যে বৈদিক সৃষ্টিতত্ত্বে আদিম জলরাশি বা বিশৃঙ্খলা (কসমিক ক্যাওস) ছিল সমস্ত সম্ভাবনার আধার। রিক্যুরীয় ভাষায় এটি হলো সেই আদি বাস্তব যাকে কবি তার ভাষার মাধ্যমে নতুন রূপ দিয়েছেন।
রিক্যুর তার তত্ত্বে ত্রিস্তরীয় অনুকরণ (Threefold Mimesis)-এর ধারণা দিয়েছেন: পূর্ব-বিন্যাস (মিমেসিস ১), রূপায়ন (মিমেসিস ২), এবং পুনর্গঠন (মিমেসিস ৩)। নাসদীয় সূক্তে এই তিনটি স্তর স্পষ্টভাবে কাজ করে। প্রথম স্তরে রয়েছে সৃষ্টির আদিম বিশৃঙ্খলা ও অন্ধকারের মানবিক অনুভূতি। দ্বিতীয় স্তরে বৈদিক কবি সেই বিশৃঙ্খলাকে একটি সুসংহত কাব্যিক আখ্যানে সাজাচ্ছেন – যেখানে শূন্যতা থেকে কামের জন্ম হয়, কাম থেকে সতের জন্ম হয়, এবং অবশেষে তৈরি হয় প্রশ্ন। এই কাব্যিক রূপায়নই হলো সূক্তের মিথ। আর তৃতীয় স্তরে পাঠক যখন এই সূক্তটি পাঠ করে, তখন তার নিজের মহাজাগতিক অস্তিত্বের অভিজ্ঞতা নতুন করে পুনর্গঠিত হয়।
রিক্যুর তার আরেক বিখ্যাত গ্রন্থ হার্মেনিউটিক্স অ্যান্ড দ্য হিউম্যান সায়েন্সেস: এসেস অন ল্যাঙ্গুয়েজ, অ্যাকশন অ্যান্ড ইন্টারপ্রিটেশন (Hermeneutics and the Human Sciences: Essays on Language, Action and Interpretation) (1981)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে পাঠ্য তার আদিম পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক উদ্বৃত্ত অর্থ (Surplus of Meaning) উৎপাদন করে। নাসদীয় সূক্তে যখন বলা হয় “কামস্তদগ্রে সমবর্ততাধি” (আদিতে কাম বা সংকল্পের উদয় হয়েছিল), তখন সেই ‘কাম’ শব্দটি কোনো সাধারণ জৈবিক বাসনায় আটকে থাকে না। তা হয়ে ওঠে বিশ্বসৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি বা মহাজাগতিক ইচ্ছার প্রতীক। রিক্যুরের প্রতীক তত্ত্ব অনুসারে, এই শব্দটি ভাবনার এমন এক অসীম দিগন্ত খুলে দেয় যা কোনো একটি নির্দিষ্ট দর্শনের সীমারেখায় বেঁধে রাখা যায় না।
জ্ঞানতাত্ত্বিক সংশয় ও পরম দ্রষ্টার অজ্ঞতা (Epistemic Skepticism and the Ignorance of the Supreme Overseer)
নাসদীয় সূক্তের সপ্তম এবং চূড়ান্ত ঋকটি সৃষ্টিতত্ত্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর মোচড় তৈরি করে: “যো অস্যাধ্যক্ষঃ পরমে ব্যোমন্ সো অঙ্গ বেদ যদি বা ন বেদ”। পরম আকাশে যিনি অবস্থান করছেন, সেই বিশ্বনিয়ন্তা হয়তো জানেন কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, অথবা তিনিও হয়তো জানেন না। এই একটি বাক্য পুরো ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়। প্রচলিত সমস্ত ধর্মীয় ঐতিহ্যে ঈশ্বর বা পরম সত্তাকে সর্বজ্ঞ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। কিন্তু বৈদিক কবি সেই পরম কর্তৃত্বের ওপরও অজ্ঞতার সম্ভাবনা আরোপ করছেন। এই অংশটি আধুনিক হার্মেনিউটিক্সের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং আকর্ষণীয় গবেষণার বিষয়।
পল রিক্যুর যে সংশয়ের হার্মেনিউটিক্স (Hermeneutics of Suspicion) ধারণার কথা বলেছেন, এই শ্লোকটিতে তার এক প্রাচীন পূর্বাভাস দেখা যায়। কবি এখানে ধর্মীয় নিশ্চিততার আরামদায়ক মিথ্যাকে মেনে নিতে অস্বীকার করছেন। তিনি পরম দ্রষ্টাকেও মানুষের মতোই সংশয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। যদি স্রষ্টা নিজেই না জানেন যে তিনি কীভাবে তৈরি হলেন বা তার সৃষ্টি কীভাবে শুরু হলো, তবে সৃষ্টির কোনো একক কেন্দ্র বা উদ্দেশ্য থাকে না। এটি কোনো নাস্তিক্যবাদী আক্রমণ নয়, বরং এটি হলো অজ্ঞতার এক চরমতম দার্শনিক স্বীকারোক্তি।
শ্লাইয়ারমাখার এই শ্লোকের ব্যাকরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলতেন যে এখানে “যদি বা ন বেদ” অংশটি কবির নিজস্ব ভাষার সীমানার চরম প্রকাশ। মানবভাষা দিয়ে অসীমকে ধরার চেষ্টা যখন ব্যর্থ হয়, তখন কবি এই ধরনের অনিশ্চয়তার আশ্রয়ে নিজের অপারগতা প্রকাশ করেন। এটি ভাষা ও চিন্তার মধ্যকার দ্বন্দ্বের ফল। মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি প্রকাশ করে একজন গভীর সংবেদনশীল মানুষের চরম সততা, যিনি না জেনে কোনো মিথ্যা সান্ত্বনা দিতে চাননি।
অন্যদিকে গাডামার এই অজ্ঞতার ঘোষণাকে দেখবেন একটি চূড়ান্ত উন্মুক্ততার প্রতীক হিসেবে। ঈশ্বর জানেন কি জানেন না – এই প্রশ্নের কোনো মীমাংসা না করে সূক্তটি সমাপ্ত হয়ে যায়। এর ফলে পাঠটি কখনোই শেষ হয় না। এটি পাঠকের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দেয়। পাঠককে এই অনির্ণেয়তার অস্বস্তিকে বরণ করে নিতে হয়। নাসদীয় সূক্ত কোনো সমাপ্ত বা বন্ধ টেক্সট নয়; এটি একটি চিরন্তন প্রশ্নচিহ্ন যা শতাব্দী পেরিয়েও সমানভাবে অস্থির এবং প্রাসঙ্গিক থেকে যায়।
তিন হার্মেনিউটিক্সের ত্রিবেণী সঙ্গমে নাসদীয় সূক্ত (The Nāsadīya Sūkta at the Confluence of Three Hermeneutics)
শ্লাইয়ারমাখার, গাডামার এবং রিক্যুর – এই তিন ব্যাখ্যাতাত্ত্বিকের দৃষ্টিভঙ্গিকে যখন একসাথে নাসদীয় সূক্তের ওপর প্রয়োগ করা হয়, তখন প্রাচীন এই বৈদিক পাঠ্যটি তার চিরাচরিত ধর্মীয় বা পৌরাণিক খোলস ভেঙে এক অসাধারণ আধুনিক রূপ ধারণ করে। শ্লাইয়ারমাখার আমাদের দেখান কীভাবে সূক্তটির আপাত-বিরোধী ব্যাকরণিক কাঠামো এবং কবির গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিস্ময় এক জটিল ভাষিক নকশা তৈরি করেছে। গাডামার আমাদের পথ দেখান কীভাবে এই প্রাচীন শ্লোকগুলো কোনো স্থির উত্তরের বদলে মানব অস্তিত্বের আদি প্রশ্নগুলোকে জাগিয়ে তোলে এবং প্রাচীন দিগন্তের সাথে আধুনিক দিগন্তের এক চিরন্তন সংলাপ রচনা করে। আর রিক্যুর আমাদের উন্মোচন করে দেন কীভাবে সূক্তটির পৌরাণিক প্রতীক এবং আখ্যানকাঠামো সময় ও অস্তিত্বকে নতুন এক শব্দার্থিক বাস্তবতায় পুনর্নির্মাণ করে।
এই ত্রিমুখী বিশ্লেষণের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো সূক্তটির অনির্ণেয়তা (Undecidability)-কে কোনো তাত্ত্বিক ত্রুটি হিসেবে না দেখে এর মূল দার্শনিক শক্তি হিসেবে উপলব্ধি করা। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলো সবসময় সম্পূর্ণ উত্তর দাবি করে; তারা মানুষকে সমস্ত সৃষ্টির কারণ এবং নিয়ম বুঝিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত করতে চায়। কিন্তু নাসদীয় সূক্ত বৈদিক সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন স্তরে অবস্থান করেও সেই নিশ্চিততার দাবিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। সৃষ্টি কোনো সরল পরিকল্পনা নয়, এর উৎস হয়তো সৃষ্টির নিয়মকর্তার নিজের কাছেও এক রহস্যময় ধাঁধা।
আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞানচর্চায় নাসদীয় সূক্তের গুরুত্ব এখানেই। এটি প্রমাণ করে যে বৈদিক চিন্তার ইতিহাস কোনো একমাত্রিক বা অন্ধ বিশ্বাসের ইতিহাস ছিল না। সেখানে গভীরতম সৃষ্টিতাত্ত্বিক বয়ানের ভেতরেই সংশয়, প্রশ্ন এবং অজ্ঞতাকে মর্যাদার সাথে স্থান দেওয়া হয়েছিল। টেক্সটটি কোনো দেবতাকে মহিমান্বিত করতে গিয়ে মানুষের অনুসন্ধিৎসু মনকে খাটো করেনি, বরং দেবতাদের সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার অধীনস্থ করে মানুষের যুক্তি ও ভাবনার দিগন্তকে সর্বোচ্চ উচ্চতায় তুলে ধরেছে।
পরিশেষে বলা যায়, আধুনিক হার্মেনিউটিক্স প্রাচীন টেক্সটগুলোকে জাদুঘরের মৃত উপাদান থেকে মুক্ত করে তাদের ভেতরের জীবন্ত আগুনকে স্পর্শ করার সুযোগ করে দেয়। শ্লাইয়ারমাখারের ভাষাতত্ত্ব, গাডামারের ঐতিহ্যের সংলাপ এবং রিক্যুরের মিথতত্ত্বের মধ্য দিয়ে যখন আমরা নাসদীয় সূক্তের দিকে তাকাই, তখন আমরা আর প্রাচীন যজ্ঞশালার কোনো অন্ধ পুরোহিতকে দেখি না; আমরা দেখতে পাই আদিম অন্ধকারের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা এক নির্ভীক মানব সত্তাকে, যে মহাবিশ্বের অপার শূন্যতার দিকে তাকিয়ে দ্বিধাহীন কণ্ঠে প্রশ্ন করতে পারে: “কে নিশ্চিতভাবে জানে?”
রিক্যুর, ফুকো, হাবারমাস ও দেরিদা দিয়ে পুরুষসূক্ত (Ricoeur, Foucault, Habermas and Derrida on the Puruṣa Sūkta): প্রতীক, ক্ষমতা, বৈধতা ও দ্বৈততা
পুরুষসূক্তের মহাজাগতিক বয়ান ও সমালোচনামূলক পটভূমি (Cosmic Narrative of the Puruṣa Sūkta and Critical Background)
ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ৯০তম সূক্তটি ভারতীয় সমাজ ও ধর্মীয় ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত পাঠ্য। সচরাচর একে পুরুষসূক্ত (Puruṣa Sūkta) নামে অভিহিত করা হয়। ষোলটি ঋকে বিন্যস্ত এই সূক্তে এক আদিম মহাজাগতিক সত্তার আত্মবলিদানের মধ্য দিয়ে সমগ্র মহাবিশ্ব, প্রাকৃতিক উপাদান এবং মানব সমাজের উৎপত্তির বিবরণ দেওয়া হয়েছে। সূক্তের শুরুতে সেই আদি সত্তা বা পুরুষকে সহস্র মস্তক, সহস্র চক্ষু এবং সহস্র পদবিশিষ্ট এক অসীম সত্তা হিসেবে চিত্রিত করা হয়, যিনি সমগ্র পৃথিবীকে আবৃত করেও দশ আঙুল পরিমাণ অতিরিক্ত স্থান অধিকার করে থাকেন। দেবতারা সেই আদিম পুরুষকে যজ্ঞের পশুরূপে কল্পনা করে এক আদি বলিদানের সূচনা করেন। সেই যজ্ঞে নিবেদিত পুরুষের শরীর ছিন্নভিন্ন করে তার বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে বিভিন্ন প্রাণী, প্রাকৃতিক শক্তি এবং আকাশমণ্ডলের সৃষ্টি হয়।
এই সূক্তটির সবচেয়ে ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অংশ হলো এর বারোতম ঋক। সেখানে ভারতীয় সমাজ কাঠামোর চার বর্ণের উৎপত্তির এক সুনির্দিষ্ট শারীরবৃত্তীয় সমীকরণ টানা হয়েছে: “ব্রাহ্মণোঽস্য মুখমাসীদ্বাহু রাজন্যঃ কৃতঃ। ঊরূ তদস্য যদ্বৈশ্যঃ পদ্ভ্যাং শূদ্রোহজায়ত॥” (ব্রাহ্মণ তার মুখ থেকে উৎপন্ন হয়েছিল; তার দুই বাহু থেকে রাজন্য বা ক্ষত্রিয় তৈরি হলো; তার উরু থেকে বৈশ্য জন্ম নিল; এবং তার দুই পা থেকে শূদ্রের জন্ম হলো)। বৈদিক সাহিত্যে চার বর্ণের এই স্পষ্ট এবং ক্রমোচ্চ বিভাজনের উল্লেখ এখানেই প্রথম পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে মনুস্মৃতি থেকে শুরু করে সমস্ত অর্থোডক্স ধর্মশাস্ত্রে সামাজিক স্তরবিন্যাসকে স্বাভাবিক এবং অলঙ্ঘনীয় প্রমাণ করতে এই একটি শ্লোককেই প্রধান ঐশ্বরিক সনদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক ও ভারততাত্ত্বিক রামশরণ শর্মা (R. S. Sharma) তার ক্লাসিক গবেষণা গ্রন্থ শূদ্রাস ইন অ্যানশিয়েন্ট ইন্ডিয়া: আ সোশ্যাল হিস্ট্রি অব দ্য লোয়ার অর্ডার ডাউন টু সিরকা এ.ডি. ৬০০ (Śūdras in Ancient India: A Social History of the Lower Order Down to Circa A.D. 600) (1990)-এ দেখিয়েছেন যে এই সূক্তটি ঋগ্বেদের শেষভাগে সংযোজিত একটি পাঠ্য। ঋগ্বেদের প্রাচীনতর মণ্ডলগুলোতে সমাজ ছিল মূলত পশুপালক ও সমতাবাদী গোত্রভিত্তিক। কিন্তু দশম মণ্ডলের যুগে এসে উত্তর ভারতে যখন উদ্বৃত্ত কৃষির সূচনা ঘটে এবং শ্রেণিবিভক্ত সমাজ গড়ে ওঠে, তখন সেই বৈষম্যমূলক সামাজিক পরিবর্তনকে বৈধতা দিতে এই পৌরাণিক আখ্যানটি তৈরি করা হয়েছিল। এটি ছিল প্রাচীন যাযাবর সমতা থেকে এক কঠোর সামাজিক পদক্রমের দিকে রূপান্তরের একটি সাহিত্যিক সাক্ষ্য।
আধুনিক সমালোচনামূলক তত্ত্বের দৃষ্টিতে পুরুষসূক্ত কোনো নিষ্পাপ সৃষ্টিতত্ত্ব নয়; এটি একটি গভীর রাজনৈতিক টেক্সট। এই অধ্যায়ে সমকালীন ইউরোপীয় দর্শনের চার প্রধান দিকপাল – পল রিক্যুর (Paul Ricoeur), মিশেল ফুকো (Michel Foucault), ইয়ুর্গেন হাবারমাস (Jürgen Habermas) এবং জাক দেরিদা (Jacques Derrida)-এর তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করে পুরুষসূক্তের ব্যবচ্ছেদ করা হবে। রিক্যুরের প্রতীক ও রূপক তত্ত্ব, ফুকোর ক্ষমতা-জ্ঞানের বিন্যাস, হাবারমাসের মতাদর্শিক বৈধতাকরণ সংকট এবং দেরিদার বিনির্মাণমূলক পাঠ – এই চার পদ্ধতির সমন্বয়ে দেখা যাবে কীভাবে একটি প্রাচীন ধর্মীয় মিথ মানব শরীরকে ব্যবহার করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বৈষম্যমূলক সামাজিক ক্ষমতাকে একটি স্বাভাবিক সত্য হিসেবে টিকিয়ে রেখেছিল।
রিক্যুর ও শরীরের মহাজাগতিক রূপক (Ricoeur and the Cosmic Metaphor of the Body)
ফরাসি দার্শনিক পল রিক্যুর (Paul Ricoeur) তার রূপক এবং প্রতীক সংক্রান্ত তত্ত্বে দেখিয়েছেন কীভাবে ভাষা বাস্তবকে কেবল বর্ণনা করে না, বরং রূপকের মাধ্যমে বাস্তবকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করে। পুরুষসূক্তের মূল ভিত্তি হলো একটি রূপক সমীকরণ: সমগ্র মহাবিশ্ব এবং মানব সমাজ হলো একটি বিশাল মানবদেহ। রিক্যুরীয় হার্মেনিউটিক্স অনুসারে, এই ধরনের প্রতীক কোনো আকস্মিক চিত্রকল্প নয়; এর ভেতরে এক গভীর শব্দার্থিক উদ্ভাবন বা অর্থগত রূপান্তর কাজ করে। মানব শরীরের যে অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো জীববিজ্ঞানের দিক থেকে কেবল জৈবিক ক্রিয়া সম্পাদন করে, পুরুষসূক্তের আখ্যানে সেগুলো সামাজিক মর্যাদা এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলার প্রতীকে পরিণত হয়।
তুলনামূলক পৌরাণিক নৃতত্ত্ববিদ ব্রুস লিংকন (Bruce Lincoln) তার আকর গ্রন্থ ডেথ, ওয়ার, অ্যান্ড সেক্রিফাইস: স্টাডিজ ইন আইডিওলজি অ্যান্ড প্র্যাকটিস (Death, War, and Sacrifice: Studies in Ideology and Practice) (1991)-এ ইন্দো-ইউরোপীয় বিভিন্ন সমাজের আদিম সৃষ্টি-আখ্যানগুলোর শরীরবৃত্তীয় মিল পরীক্ষা করেছেন। লিংকন দেখান কীভাবে আদিম বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে মানবদেহকে মহাবিশ্বের ব্লুপ্রিন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হতো। পুরুষসূক্তে চাঁদ তৈরি হয় পুরুষের মন থেকে, সূর্য চোখ থেকে, বায়ু প্রাণ থেকে, এবং আকাশ মাথা থেকে। এই প্রাকৃতিক সৃষ্টির সমান্তরালে যখন মানুষের সামাজিক গোষ্ঠীগুলোকে একই শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে স্থাপন করা হয়, তখন পাঠক বা শ্রোতার মনে একটি প্রতীকী বিভ্রান্তি তৈরি হয়। প্রাকৃতিক সৌরজগৎ যেমন স্বাভাবিক এবং অনিবার্য, তেমনই সামাজিক চার বর্ণের অস্তিত্বকেও প্রকৃতির মতোই স্বয়ংসিদ্ধ বলে মনে হতে থাকে।
রিক্যুর তার প্রতীক তত্ত্বে যে উদ্বৃত্ত অর্থ (Surplus of Meaning) ধারণার কথা বলেছেন, পুরুষসূক্তের শরীর-রূপকে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি বাস্তব মানুষের মুখ, হাত, উরু বা পা কোনো স্বাধীন সামাজিক শ্রেণি নয়; তারা একটি একক জীবের অধীনস্থ অংশ। কিন্তু রূপকের জোরে যখন একটি সামাজিক গোষ্ঠীকে ‘মুখ’ এবং অন্য গোষ্ঠীকে ‘পা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন সেই প্রতীকটি এক নতুন রাজনৈতিক অনুভূতির জন্ম দেয়। মুখকে উচ্চতর, পবিত্র এবং চিন্তার কেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়, আর পা-কে দেখা হয় মাটির সাথে যুক্ত, নিম্ন এবং অপবিত্র হিসেবে। রিক্যুর দেখান যে রূপকের এই অতিরিক্ত অর্থ মানুষের মনোজগতে প্রবেশ করে এমন এক দৃশ্যমান কাঠামো তৈরি করে যার বাইরে চিন্তা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে রিক্যুরের দৃষ্টিতে এই প্রতীকায়নের একটি দ্বিমুখী ভূমিকা রয়েছে। একদিকে এটি বিশৃঙ্খল সামাজিক বাস্তবতাকে একটি কাঠামোগত শৃঙ্খলায় বাঁধার পৌরাণিক চেষ্টা করে। অন্যদিকে এটি বিদ্যমান অসাম্যকে একটি অপরিবর্তনীয় মহাজাগতিক সত্য হিসেবে চিত্রিত করে সামাজিক বৈষম্যের পেছনের হিংসাকে আড়াল করে দেয়। যজ্ঞের কাঠে আদিম পুরুষকে বলি দেওয়ার যে রক্তাক্ত ঘটনা, রূপকের সৌন্দর্যে তা একটি ঐশ্বরিক সৃষ্টির উৎসবে রূপান্তরিত হয়। রিক্যুরের হার্মেনিউটিক্স আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রতীক কেবল ভাবনার উদ্রেকই করে না, বরং প্রতীক অনেক সময় সামাজিক অন্যায়কে পবিত্র আবরণে ঢেকে রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আড়াল হিসেবেও কাজ করে।
ফুকো, ক্ষমতা-জ্ঞান ও শরীর-রাজনীতি (Foucault, Power-Knowledge, and Body-Politics)
ফরাসি উত্তর-কাঠামোবাদী দার্শনিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault) ক্ষমতা এবং জ্ঞানের যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা বলেছেন, পুরুষসূক্ত তার এক ক্লাসিক প্রাচীন দৃষ্টান্ত। ফুকো তার বিখ্যাত গ্রন্থ ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ: দ্য বার্থ অব দ্য প্রিজন (Discipline and Punish: The Birth of the Prison) (1977)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে ক্ষমতা কেবল রাজার তরবারির ডগায় থাকে না; ক্ষমতা ক্রিয়াশীল হয় মানব শরীরকে বিভিন্ন ক্যাটাগরি বা শ্রেণিতে ভাগ করার মাধ্যমে। আধুনিক যুগে এই কাজ করে হাসপাতাল, কারাগার বা বিদ্যালয়। কিন্তু প্রাচীন সমাজে এই কাজটি করত ধর্মীয় ডিসকোর্স বা বাচনভঙ্গি। পুরুষসূক্ত হলো মানব শরীরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণের একটি প্রাথমিক প্রযুক্তি।
ফুকোর তত্ত্বে ক্ষমতা-জ্ঞান (Power-Knowledge) হলো এমন এক ব্যবস্থা যেখানে যে গোষ্ঠী জ্ঞানের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে, তারাই ক্ষমতা ভোগ করে। পুরুষসূক্তে ব্রাহ্মণদের অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছে পুরুষের ‘মুখ’ হিসেবে। মুখ হলো ভাষা, উচ্চারণ, মন্ত্রপাঠ এবং জ্ঞানের কেন্দ্র। এই পৌরাণিক বাচনের মধ্য দিয়ে ব্রাহ্মণ শ্রেণি নিজেদের এমন এক অবস্থানে স্থাপন করল যেখানে জ্ঞান উৎপাদনের সমস্ত কর্তৃত্ব তাদের হাতে চলে আসে। অন্যদিকে রাজন্য বা ক্ষত্রিয়দের স্থান বাহুতে, যা শারীরিক বলপ্রয়োগ ও যুদ্ধ পরিচালনার প্রতীক। বৈশ্যদের স্থান উরুতে, যা কৃষি, পশুপালন ও অর্থনৈতিক উৎপাদনের ভার বহন করে। আর শূদ্রদের স্থান সর্বনিম্ন অংশে, অর্থাৎ পায়ে, যাদের একমাত্র কাজ হলো উপরের তিনটি অঙ্গের ভার বহন করা বা সেবা করা।
ফুকো তার সংকলিত গ্রন্থ পাওয়ার/নলেজ: সিলেক্টেড ইন্টারভিউস অ্যান্ড আদার রাইটিংস (Power/Knowledge: Selected Interviews and Other Writings) (1980)-এ বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে ক্ষমতা মানুষের জৈবিক অস্তিত্বকে নিয়ন্ত্রণ করতে শরীর-রাজনীতি (Body-Politics) প্রয়োগ করে। পুরুষসূক্ত ঠিক এই কাজটি করেছে অতি সূক্ষ্মভাবে। এটি সামাজিক পদক্রমকে কোনো রাজনৈতিক চুক্তির ওপর দাঁড় করায়নি; এটি বৈষম্যকে খোদ জীবতাত্ত্বিক বাস্তবতার রূপ দান করেছে। যদি শূদ্রের জন্মই হয়ে থাকে পরম সত্তার পা থেকে, তবে তার পক্ষে মাথার মতো চিন্তা করার বা মুখের মতো কথা বলার চেষ্টা করাটা হবে এক প্রকৃতিবিরোধী উন্মাদনা। ক্ষমতা এখানে নিজেকে আইন হিসেবে নয়, বরং জীববিজ্ঞানের স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে হাজির করেছে।
এই ডিসকার্সিভ নিয়ন্ত্রণের ফলে ব্যক্তি মানুষের নিজস্ব পরিচয় মুছে গিয়ে সে কেবল একটি বর্ণগত যন্ত্রাংশে পরিণত হয়। শূদ্রের শরীর তখন আর কোনো স্বাধীন সত্তা নয়; তা হলো সমাজের অবকাঠামোর সবচেয়ে নিচের ভিত্তিপ্রস্তর যাকে সবসময় পদদলিত এবং নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ফুকোর দৃষ্টিভঙ্গি দেখায় যে পুরুষসূক্তের এই বাচনভঙ্গিটি প্রাচীন ভারতের পুরোহিততান্ত্রিক ক্ষমতার এমন এক নিখুঁত আর্কিটেকচার তৈরি করেছিল যা শারীরিক কোনো নিয়মিত পুলিশ বাহিনী ছাড়াই মানুষকে নিজের সামাজিক অবস্থানকে আজীবন মেনে নিতে বাধ্য করত।
হাবারমাস, মতাদর্শ ও বৈধতাকরণের সংকট (Habermas, Ideology, and the Legitimation Crisis)
জার্মান সমালোচনামূলক তাত্ত্বিক ইয়ুর্গেন হাবারমাস (Jürgen Habermas) ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে সমাজের বৈধতাকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর গবেষণা করেছেন। হাবারমাস তার প্রভাবশালী গ্রন্থ লেজিটিমেশন ক্রাইসিস (Legitimation Crisis) (1975)-এ দেখান যে সমাজে যখন অর্থনৈতিক বা সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, তখন ক্ষমতাসীন শ্রেণির সামনে একটি বড় সংকট তৈরি হয়: অধীনস্থ মানুষ কেন এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে মেনে নেবে? এই আনুগত্য নিশ্চিত করতে শাসকশ্রেণিকে কিছু এমন যুক্তি ও বিশ্বাসের জাল বুনতে হয় যা বিদ্যমান শাসনব্যবস্থাকে বৈধতা দান করে। একে বলা হয় বৈধতাকরণ কৌশল। পুরুষসূক্ত হলো প্রাচীন ভারতের উদ্ীয়মান বর্ণব্যবস্থার বৈধতাকরণ সংকটের সবচেয়ে সফল মতাদর্শিক সমাধান।
সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিক সুবীর জয়সওয়াল (Suvira Jaiswal) তার গবেষণা গ্রন্থ কাস্ট: অরিজিন, ফাংশন অ্যান্ড ডাইমেনশনস অব চেঞ্জ (Caste: Origin, Function and Dimensions of Change) (1998)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে উত্তর ভারতে লোহার ব্যবহারের ফলে কৃষিজমির বিস্তার ঘটেছিল এবং অনার্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পরাজিত করে বৈদিক সমাজব্যবস্থার প্রান্তে নিয়ে আসা হয়েছিল। এই বিপুল সংখ্যক দাস ও পরাজিত মানুষকে যখন সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা হলো, তখন তাদের বঞ্চিত অবস্থাকে যুক্তিযুক্ত প্রমাণ করার দরকার পড়েছিল। যদি বলা হতো যে তাদের গায়ের জোরে পদানত করে রাখা হয়েছে, তবে সবসময় বিদ্রোহের ঝুঁকি থাকত। কিন্তু পুরুষসূক্ত যখন প্রচার করল যে এই স্তরবিন্যাস কোনো মানুষের তৈরি নয়, এটি খোদ বিশ্বসৃষ্টির মুহূর্তে আদিম পুরুষের আত্মবলিদান থেকেই তৈরি হয়েছে, তখন সেই শাসন নৈতিক ও মহাজাগতিক বৈধতা লাভ করল।
হাবারমাস তার আরেক প্রধান কাজ দ্য থিওরি অব কমিউনিকেটিভ অ্যাকশন: ভলিউম ১ (The Theory of Communicative Action: Vol. 1) (1984)-এ পদ্ধতিগতভাবে বিকৃত যোগাযোগ (Systematically Distorted Communication) ধারণার অবতারণা করেন। এর অর্থ হলো, ক্ষমতার স্বার্থ যখন কোনো যুক্তিবাদী সংলাপকে স্তব্ধ করে দিয়ে কেবল একতরফা বিশ্বাস চাপিয়ে দেয়, তখন ভাষার যোগাযোগমূলক ক্ষমতা বিকৃত হয়ে পড়ে। পুরুষসূক্তে কোনো বিতর্কের সুযোগ রাখা হয়নি। সেখানে কোনো প্রশ্ন নেই যে কেন শূদ্ররা পায়ে থাকবে আর কেন ব্রাহ্মণরা মুখে থাকবে। মিথের ভাষা এমন এক প্রশ্নহীন পরিবেশ তৈরি করে যেখানে শোষিত মানুষ নিজের শোষণকেই পরম ধর্ম বলে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।
হাবারমাসের ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করে স্পষ্ট বোঝা যায় যে পুরুষসূক্তের কাজ ছিল সামাজিক ন্যায়বিচারের যেকোনো গণতান্ত্রিক বা পারস্পরিক আলোচনাকে গোড়াতেই ধ্বংস করা। সমাজের শ্রমবিভাজনকে এমন এক ধর্মীয় আধারে মুড়ে দেওয়া হয়েছিল যাতে উৎপাদনের নিচের তলার মানুষ নিজেদের শ্রমকে কোনো সামাজিক অবিচার হিসেবে না দেখে মহাজাগতিক শৃঙ্খলার এক অনিবার্য অংশ বলে মনে করে। এইভাবে একটি বিশেষ শ্রেণির বৈষয়িক ক্ষমতা চিরস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছিল।
দেরিদা, মুখ-পদ দ্বৈততা ও পাঠের বিনির্মাণ (Derrida, Mouth-Feet Binary, and Textual Deconstruction)
ফরাসি দার্শনিক জাক দেরিদা (Jacques Derrida) পশ্চিমা এবং ঐতিহ্যগত দর্শনের ভিত্তিগুলোকে পরীক্ষা করতে বিনির্মাণ বা ডিকনস্ট্রাকশন (Deconstruction) পদ্ধতির বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। দেরিদা তার যুগান্তকারী গ্রন্থ অফ গ্রামাটোলজি (Of Grammatology) (1976)-এ দেখান যে যেকোনো মতাদর্শিক টেক্সট কিছু মৌলিক বাইনারি অপজিশন বা দ্বৈত বৈপরীত্যের ওপর ভর করে টিকে থাকে – যেমন ভালো/মন্দ, আলো/অন্ধকার, কেন্দ্র/প্রান্ত। এই দ্বৈততায় একটি পদকে সবসময় উচ্চতর বা পবিত্র বলে ঘোষণা করা হয় এবং অপরটিকে নিকৃষ্ট বা প্রান্তিক হিসেবে দেখা হয়। পুরুষসূক্তের টেক্সটেও এই দ্বৈততা চরম রূপ নিয়েছে: মুখ বনাম পদ, উচ্চ বনাম নিম্ন, বিশুদ্ধ বনাম অবিশুদ্ধ।
দেরিদা তার আরেকটি গ্রন্থ রাইটিং অ্যান্ড ডিফারেন্স (Writing and Difference) (1978)-এ প্রমাণ করেছেন যে এই ধরনের পদক্রমিক দ্বৈততা কখনই টেকসই হয় না; টেক্সট নিজেই নিজের ভেতরের এই বৈপরীত্যকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। পুরুষসূক্ত যখন দাবি করে যে মুখ সর্বোত্তম কারণ সেখান থেকে ব্রাহ্মণের জন্ম, আর পা নিকৃষ্ট কারণ সেখান থেকে শূদ্রের জন্ম, তখন দেরিদার বিনির্মাণ পদ্ধতি টেক্সটের ভেতরে থাকা এক অদ্ভুত অ্যাপোরিয়া (Aporia) বা অভ্যন্তরীণ অচলাবস্থাকে উন্মোচন করে। পুরো পুরুষের শরীরটি যদি মহাবিশ্ব হয়, তবে পা ছাড়া কি সেই শরীর দাঁড়াতে পারে? পা-ই তো একমাত্র অংশ যা মাটির সাথে যুক্ত থেকে সম্পূর্ণ শরীরের ভারসাম্য ও গতিশীলতা ধরে রাখে। পা যদি ভেঙে পড়ে, তবে মুখ, বাহু বা উরু – সমস্ত অংশই মাটিতে লুটিয়ে পড়বে। অর্থাৎ যে পদটিকে সবচেয়ে অপবিত্র ও অবহেলিত বলা হচ্ছে, সেটাই কার্যত সমগ্র কাঠামোর সবচেয়ে অপরিহার্য ভিত্তি।
এইভাবে দেরিদার পদ্ধতিতে উচ্চ ও নিম্নের ক্ষমতার খেলাটি উল্টে যায়। মুখ নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ দাবি করলেও সে পুরোপুরি নির্ভরশীল সেই পায়ের ওপর যাকে সে অস্বীকার করতে চায়। যাকে প্রান্তিক হিসেবে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, সে-ই হয়ে ওঠে সমগ্র কাঠামোর প্রকৃত কেন্দ্র। তাছাড়া পাঠ্যটির ভেতরে আরও একটি গভীর শূন্যতা রয়েছে। পুরুষসূক্তে পুরুষকে একই সাথে যজ্ঞের বলি, যজ্ঞকারী এবং যজ্ঞের উপকরণ হিসেবে দেখানো হয়েছে: “যজ্ঞেন যজ্ঞময়জন্ত দেবাস্তানি ধর্মাণি প্রথমান্যাসন” (দেবতারা যজ্ঞের মাধ্যমে যজ্ঞের আরাধনা করেছিলেন, এবং সেগুলোই ছিল প্রথম ধর্মীয় নিয়ম)। এখানে কারণ ও কার্যের কোনো স্থির সীমা নেই। যে বলি হচ্ছে, সে-ই আবার যজ্ঞকারী।
দেরিদা দেখান যে এই ধরনের পাঠ্যের কোনো স্থির বা চূড়ান্ত নির্দেশক থাকে না। পুরুষসূক্ত নিজের ভেতরের হিংসা ও বৈষম্যকে এমন এক জটিল শব্দের গোলকধাঁধায় লুকিয়ে রেখেছে যা একটু সতর্কভাবে বিনির্মাণ করলেই তার ফাঁপা চরিত্রটি বেরিয়ে আসে। মুখ থেকে উচ্চারিত বাক্য কখনো পায়ের অস্তিত্বকে বাতিল করতে পারে না। বরং পায়ের ওপর দাঁড়িয়েই মুখকে তার অহংকারী উচ্চারণ করতে হয়। দেরিদার পাঠ এই টেক্সটের অলৌকিক ক্ষমতার দাবিকে ধসিয়ে দিয়ে প্রমাণ করে যে এর ভেতরের পবিত্র পদক্রমটি ছিল নিছক এক অস্থির ও ভঙ্গুর ভাষাগত কারসাজি।
বহুমাত্রিক পাঠের সংশ্লেষ: মহাজাগতিক মিথ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শাসন (Synthesis of Multi-Method Reading: From Cosmic Myth to Institutional Rule)
এই চারজন তাত্ত্বিকের দৃষ্টিভঙ্গিকে যখন এক জায়গায় আনা হয়, তখন পুরুষসূক্তের পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক ও দার্শনিক চেহারাটি সম্পূর্ণ উন্মোচিত হয়ে পড়ে। কোনো একটিমাত্র পদ্ধতি এই বিশাল টেক্সটের সমস্ত স্তরকে ধরতে পারে না। পল রিক্যুর আমাদের বুঝতে সাহায্য করেন কীভাবে রূপকের জাদুতে মানব শরীর এবং মহাবিশ্ব একাকার হয়ে গিয়ে এক শক্তিশালী নান্দনিক প্রতীকের জন্ম দিয়েছিল। মিশেল ফুকো আমাদের দেখিয়ে দেন সেই রূপক কোনো নিছক সাহিত্য ছিল না; তা ছিল মানবদেহের জৈবিক ক্ষমতাকে সুনির্দিষ্ট পেশা এবং সামাজিক দাসত্বে বন্দি করার এক গভীর ক্ষমতা-জ্ঞানের বিন্যাস। ইয়ুর্গেন হাবারমাস উন্মোচন করেন কীভাবে এই পৌরাণিক আখ্যানটি তৈরি হয়েছিল রাজনৈতিক সংঘাত এড়িয়ে একটি অন্যায় সমাজব্যবস্থাকে চিরস্থায়ী ধর্মীয় বৈধতা দিতে। আর জাক দেরিদা টেক্সটের ভেতর থেকে সেই ক্ষমতার মুখোশটি খুলে দিয়ে দেখান যে মুখ এবং পায়ের এই কৃত্রিম বিভাজন আসলে একটি আত্মঘাতী ভাষাগত নির্মাণ যা নিজেকে নিজেই খণ্ডন করে।
পুরুষসূক্তের এই বহুমুখী পাঠের মধ্য দিয়ে ভারতীয় বর্ণাশ্রম ব্যবস্থার ঐতিহাসিক ভিত্তিটি অত্যন্ত নগ্নভাবে ধরা পড়ে। পরবর্তীকালে মনু বা অন্যান্য বিধিকাররা যখন এই সূক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আইন রচনা করেছিলেন, তখন তারা এই রূপকটিকে আইনগত শাস্তির রূপ দিয়েছিলেন। শূদ্রের বিরুদ্ধে যে অমানবিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল – যেমন বেদ শোনার অপরাধে কানে গলিত সীসা ঢেলে দেওয়া – তা কোনো বিচ্ছিন্ন ধর্মান্ধতা ছিল না। তা ছিল পুরুষের ‘মুখ’ এবং ‘পা’-এর মধ্যকার সেই প্রাচীন বৈপরীত্যকে শারীরিক সন্ত্রাসের মাধ্যমে সমাজে ধরে রাখার রক্তাক্ত প্রচেষ্টা। মুখের সাথে কান বা শ্রুতির যে সম্পর্ক, তা থেকে পা-কে শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখার এই সামাজিক সহিংসতা পুরুষসূক্তের মতাদর্শ থেকেই শক্তি সঞ্চয় করেছিল।
সমসাময়িক ধর্মনিরপেক্ষ পাঠে পুরুষসূক্তের প্রাসঙ্গিকতা কোনো পবিত্র মন্ত্র হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতার পাঠ হিসেবে। এটি মানব ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল নিদর্শন যা দেখায় কীভাবে সাহিত্য এবং ধর্মীয় মিথ যৌথভাবে মানুষের মনের ভেতরে প্রবেশ করে তাকে নিজের পরাধীনতাকে ভালোবাসতে শেখায়। একটি পশুপালক সমাজের বৈষম্যমূলক উত্তরণ কীভাবে মহাজাগতিক রূপ ধারণ করতে পারে, এই সূক্তটি তার এক চিরন্তন গবেষণার ক্ষেত্র।
উপসংহারে বলা যায়, সমালোচনামূলক হার্মেনিউটিক্স প্রাচীন সাহিত্যের কোনো অন্ধ বন্দনা করে না, আবার তাকে কেবল তুচ্ছ আবর্জনা হিসেবে ফেলেও দেয় না। রিক্যুর, ফুকো, হাবারমাস এবং দেরিদার এই সমন্বিত পাঠ পুরুষসূক্তের অলৌকিক খোলসটি ভেঙে দিয়ে একে মানব সংস্কৃতির এক বাস্তব দ্বন্দ্বমুখর ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এই পাঠ আমাদের সজাগ করে দেয় যে যখনই কোনো টেক্সট মানব শরীরের অংশ দিয়ে মানুষের অধিকার এবং সম্মান মাপতে শুরু করে, তখনই বুঝতে হবে সেখানে মহাজাগতিক সত্যের নামে এক গভীর রাজনৈতিক ক্ষমতা নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
গাডামার, ফিশ ও বেদান্ত দিয়ে তৎ ত্বমসি (Gadamer, Fish and Vedānta on Tat Tvam Asi): ঐতিহ্য, সম্প্রদায় ও প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থ
মহাবাক্যের রণক্ষেত্র ও বৈদান্তিক ত্রিবেণী (The Battlefield of the Mahāvākya and the Vedāntic Triad)
ছান্দোগ্য উপনিষদের ষষ্ঠ প্রপাঠকে পিতা উদ্দালক আরুণি যখন পুত্র শ্বেতকেতুকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন “তৎ ত্বমসি” (তুমিই সেই), তখন তিনি হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি যে এই তিনটি ছোট শব্দ পরবর্তী দেড় হাজার বছর ধরে ভারতীয় দর্শনের সবচেয়ে রক্তাক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হবে। বাক্যটিকে ভারতীয় দর্শনে অন্যতম প্রধান মহাবাক্য (Mahāvākya) বা চূড়ান্ত জ্ঞানগর্ভ সূত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে বাক্যটি অত্যন্ত সরল, যেখানে একজন শিক্ষক একজন ছাত্রকে তার পারমার্থিক স্বরূপ চিনিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু বৈদিক সাহিত্যের দীর্ঘ ইতিহাসে এই বাক্যটির অর্থ কখনোই একটি একক বা সর্বসম্মত জায়গায় স্থির থাকেনি। ভারতীয় ভাববাদের প্রধান ধারা বেদান্ত (Vedānta) দর্শনের ভেতরেই এই বাক্যটিকে কেন্দ্র করে তিনটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী এবং আপসহীন শিবিরের জন্ম হয়েছিল।
প্রথম শিবিরে রয়েছেন অষ্টম শতকের দার্শনিক আদি শঙ্কর এবং তার অদ্বৈত বেদান্ত (Advaita Vedānta)। শঙ্কর এই বাক্যের ভেতরে আবিষ্কার করেছিলেন জীব এবং ব্রহ্মের নিরঙ্কুশ অভেদ। তার কাছে মানুষ এবং পরম চেতনার মধ্যে দৃশ্যমান যে পার্থক্য, তা নিছক অজ্ঞান বা মায়ার ফসল; বাক্যটি শোনার সাথে সাথেই সেই দ্বৈততার ভ্রম চূর্ণ হয়ে যায়। দ্বিতীয় শিবিরে একাদশ শতকে এসে দাঁড়ালেন রামানুজ এবং তার বিশিষ্টাদ্বৈত বেদান্ত (Viśiṣṭādvaita Vedānta)। রামানুজ শঙ্করের অভেদকে অস্বীকার করে বললেন, বাক্যটি মানুষের সাথে পরম সত্তার শরীর ও আত্মার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা বলে। এখানে ঐক্য আছে, কিন্তু সেই ঐক্য গুণহীন নয়; তা হলো সম্পর্কের ঐক্য। আর ত্রয়োদশ শতকে মধ্বাচার্য তার দ্বৈত বেদান্ত (Dvaita Vedānta) নিয়ে এসে পুরো টেবিলটিই উল্টে দিলেন। মাধ্ব ব্যাকরণের সন্ধি ভেঙে দাবি করলেন যে বাক্যটি আসলে বলছে “অতৎ ত্বমসি” (তুমি সেই নও), অথবা সমাস করে বলছেন “তুমি তার অধীন”।
এই ত্রিমুখী লড়াই কোনো সাধারণ তাত্ত্বিক বিতর্ক ছিল না। এটি ছিল প্রাচীন ভারতের জ্ঞান, কর্তৃত্ব এবং ধর্মীয় ক্ষমতার এক মহাযুদ্ধ। আধুনিক দর্শনের দুই প্রধান ব্যাখ্যাকারী তাত্ত্বিক – হান্স-গেয়র্গ গাডামার (Hans-Georg Gadamer) এবং স্ট্যানলি ফিশ (Stanley Fish)-এর তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ক একসাথে প্রয়োগ করলে এই বিতর্কের এক চমকপ্রদ চেহারা ধরা পড়ে। গাডামারের কাছে পাঠের ব্যাখ্যা হলো ঐতিহ্যের সচল বহমানতা এবং দিগন্তের এক ঐতিহাসিক মিলন। অন্যদিকে ফিশের কাছে অর্থ কোনো টেক্সটের নিজস্ব সম্পত্তি নয়; অর্থ হলো একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ফসল।
ভারতীয় দর্শনের গবেষক পুরুষোত্তম বিলিমোরিয়া (Purushottama Bilimoria) তার গবেষণা গ্রন্থ শব্দপ্রামাণ্য: ওয়ার্ড অ্যান্ড নলেজ ইন ইন্ডিয়ান ফিলোসফি (Śabdaprāmāṇya: Word and Knowledge in Indian Philosophy) (1988)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে ভারতীয় দর্শনে শব্দের প্রামাণ্যতা কোনো স্থির প্রাকৃতিক নিয়ম ছিল না, বরং তা ছিল পণ্ডিতদের বিচারপদ্ধতির জটিল নির্মাণ। গাডামার এবং ফিশের তত্ত্বের আলোকে যখন “তৎ ত্বমসি” মহাবাক্যের এই বৈদান্তিক সংঘাতকে দেখা হয়, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে উপনিষদের কোনো স্থির ‘আদি অর্থ’ কোনোদিন ছিলই না। টেক্সটটি ছিল একটি উন্মুক্ত ক্ষেত্র, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক দিগন্ত এবং ভিন্ন ভিন্ন মঠভিত্তিক সম্প্রদায় নিজেদের ক্ষমতা ও বিশ্বদৃষ্টি প্রতিষ্ঠা করার জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লড়াই চালিয়েছে।
গাডামার ও কার্যকর ইতিহাসের বৈদান্তিক প্রবাহ (Gadamer and the Vedāntic Flow of Effective History)
জার্মান দার্শনিক হান্স-গেয়র্গ গাডামার (Hans-Georg Gadamer) তার আলোচনায় একটি মৌলিক প্রত্যয় তৈরি করেছিলেন, যার নাম কার্যকর ইতিহাস (Effective History / Wirkungsgeschichte)। গাডামার তার সংকলিত সাক্ষাৎকার গ্রন্থ গাডামার ইন কনভারসেশন: রিফ্লেকশন্স অ্যান্ড কমেন্টারি (Gadamer in Conversation: Reflections and Commentary) (2001)-এ ব্যাখ্যা করেন যে কোনো ঐতিহাসিক পাঠ্যকে তার পরবর্তী প্রভাবের ইতিহাস থেকে আলাদা করে বোঝা সম্ভব নয়। ছান্দোগ্য উপনিষদের “তৎ ত্বমসি” বাক্যটি পড়ার সময় একজন আধুনিক পাঠক কখনই কেবল আড়াই হাজার বছর আগের প্রাচীন উপনিষদটি পড়েন না। তিনি অনিবার্যভাবেই সেই বাক্যটিকে পাঠ করেন শঙ্কর, রামানুজ ও মাধ্বের হাজার বছরের ব্যাখ্যার যে বিশাল কার্যকর ইতিহাস তৈরি হয়েছে, তার ভেতর দিয়ে। সেই পরবর্তী ব্যাখ্যাগুলো মূল টেক্সটের শরীরের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে তাদের বাদ দিয়ে টেক্সটকে নগ্নভাবে দেখা এক অসম্ভব কল্পনা।
গাডামারের তত্ত্বে ঐতিহ্য (Tradition) হলো সেই শক্তি যা অতীত ও বর্তমানকে যুক্ত করে। বেদান্তের চিন্তাবিদরা কখনই নিজেদের কোনো সম্পূর্ণ নতুন ধর্মের প্রবর্তক মনে করেননি। শঙ্কর বা রামানুজ দাবি করেননি যে তারা শূন্য থেকে কোনো দর্শন আবিষ্কার করছেন; তারা সর্বদা দাবি করেছেন যে তারা অনাদি বৈদিক ঐতিহ্যের একনিষ্ঠ ধারক ও বাহক। গাডামার দেখিয়েছেন যে ঐতিহ্য কোনো মৃত পাথরের মতো অতীতের স্মৃতিস্তম্ভ নয়। ঐতিহ্য বেঁচে থাকে ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে। প্রতিবার যখন কোনো নতুন যুগে ঐতিহ্যের টেক্সটকে নতুন করে ব্যাখ্যা করা হয়, তখন ঐতিহ্য এক কদম এগিয়ে যায় এবং তার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
দার্শনিক গবেষক রবার্ট জে. ডস্টাল (Robert J. Dostal) সম্পাদিত দ্য কেমব্রিজ কম্প্যানিয়ন টু গাডামার (The Cambridge Companion to Gadamer) (2002) গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে কীভাবে গাডামারের চিন্তায় ব্যাখ্যার প্রক্রিয়াটি একটি জীবন্ত কথোপকথন হিসেবে রূপ নেয়। উপনিষদের পাঠ্যটি যেন এক প্রাচীন প্রশ্নকর্তা, আর বেদান্তের বিভিন্ন ভাষ্যকাররা হলেন সেই প্রশ্নের উত্তরদাতা। উদ্দালক যখন শ্বেতকেতুকে মাটির পিণ্ড, নদীর প্রবাহ বা জলের লবণের উপমা দিচ্ছিলেন, তখন সেই উপমাগুলো কোনো তৈরি করা মতবাদ ছিল না। সেগুলো ছিল চিন্তার খোরাক। শঙ্কর যখন সেই উপমাগুলোর মুখোমুখি হলেন, তিনি তার অষ্টম শতকের যৌক্তিক দিগন্ত নিয়ে সেগুলোর সাথে সংলাপে বসলেন।
গাডামারীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, শঙ্করের অদ্বৈত ব্যাখ্যা কোনো বিকৃতি নয়; তা হলো বৈদিক ঐতিহ্যের এক নতুন দিগন্তের সংমিশ্রণ (Fusion of Horizons)। একইভাবে রামানুজের ভক্তি-ভিত্তিক দিগন্ত এবং মাধ্বের বাস্তববাদী দ্বৈত দিগন্ত – প্রত্যেকেই উপনিষদের প্রাচীন দিগন্তের সাথে মিলিত হয়ে টেক্সটটির নতুন নতুন কার্যকর ইতিহাস রচনা করেছে। গাডামার আমাদের বুঝতে শেখান যে “তৎ ত্বমসি” মহাবাক্যের সত্য কোনো স্থির বিন্দুতে জমে থাকা বরফ নয়; তা হলো ঐতিহ্যের নদী, যা বিভিন্ন ব্যাখ্যাভাষ্যের পলিমাটি জমিয়ে প্রতিনিয়ত তার গতিপথ পরিবর্তন করেছে।
ফিশ ও মঠভিত্তিক ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়ের সংঘাত (Fish and the Conflict of Monastic Interpretive Communities)
গাডামার যখন ঐতিহ্যকে একটি তুলনামূলক অবিচ্ছিন্ন এবং সমন্বিত প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন, তখন আমেরিকান সাহিত্যতাত্ত্বিক স্ট্যানলি ফিশ (Stanley Fish) সেই রোমান্টিক ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দেন। ফিশ তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য ট্রাবল উইথ প্রিন্সিপল (The Trouble with Principle) (1999)-এ যুক্তি দেন যে কোনো ঐতিহ্যই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এক থাকে না। ঐতিহ্যের নামে যা চলে, তা হলো কিছু শক্তিশালী সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব। ফিশের কেন্দ্রীয় ধারণা হলো ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায় (Interpretive Community)। টেক্সট কোনো অর্থ ধারণ করে না; অর্থ তৈরি করে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়, যার সদস্যরা কিছু বিশেষ নিয়ম, পূর্বধারণা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ ভাগ করে নেয়।
বেদান্তের ইতিহাসকে যদি ফিশের তাত্ত্বিক লেন্স দিয়ে দেখা হয়, তবে এটি ঐতিহ্যের কোনো শান্ত কথোপকথন নয়; এটি হলো পরস্পরবিরোধী তিনটি শক্তিশালী মঠভিত্তিক সম্প্রদায়ের ক্ষমতাদ্বন্দ্ব। শঙ্কর যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তা কোনো ব্যক্তিগত ধ্যানলব্ধ আলো ছিল না। তা ছিল শৃঙ্গেরি, পুরী, দ্বারকা ও যোশীমঠের মতো অদ্বৈত মঠগুলোর সুসংগঠিত বৌদ্ধিক ডিসকোর্স। এই সম্প্রদায়ে যে শিষ্য প্রবেশ করত, তাকে শুরু থেকেই এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো যাতে সে বাক্যের ভেতর কেবল নির্গুণ ব্রহ্ম এবং লক্ষণা পদ্ধতির মাধ্যমে অভেদ দেখতে পায়। তাদের কাছে পাঠের এই পদ্ধতিটিই ছিল একমাত্র স্বাভাবিক ও প্রামাণ্য পথ।
অন্যদিকে রামানুজের অনুসারীরা গড়ে তুলেছিলেন শ্রীবৈষ্ণব সম্প্রদায়, যার প্রধান কেন্দ্র ছিল শ্রীরঙ্গমের মতো বিশাল মন্দির ও মঠ প্রাঙ্গণ। এই সম্প্রদায়ের পাঠের কৌশল ছিল শরীর-শরীরী ভাব এবং বিশিষ্টাদ্বৈত ব্যাকরণ। একজন শ্রীবৈষ্ণব পাঠক যখন “তৎ ত্বমসি” পড়েন, তখন তার চোখের সামনে কোনো নির্বিশেষ শূন্যতা ভাসে না; তার চোখের সামনে ভাসে এক পরম প্রেমময় ঈশ্বর, যার শরীরের অংশ হিসেবে জীবজগৎ অবস্থান করছে। আর উদুপির অষ্ট মঠকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মাধ্ব সম্প্রদায়ের পাঠ-পদ্ধতি ছিল আরও আক্রমণাত্মক। সেখানে ছাত্রদের শেখানো হতো কীভাবে সন্ধি ভেঙে “অতৎ ত্বমসি” পড়তে হয় এবং কীভাবে অদ্বৈতবাদীদের যুক্তিকে ধ্বংস করতে হয়।
ভারততাত্ত্বিক রিচার্ড কিং (Richard King) তার সমালোচনামূলক গ্রন্থ ওরিয়েন্টালিজম অ্যান্ড রিলিজিয়ন: পোস্টকলোনিয়াল থিওরি, ইন্ডিয়া অ্যান্ড “দ্য মিস্টিক ইস্ট” (Orientalism and Religion: Postcolonial Theory, India and “The Mystic East”) (1999)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন মঠ ও সম্প্রদায় নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক সীমানা রক্ষার জন্য ভাষার রাজনীতি ব্যবহার করত। ফিশের দৃষ্টিতে, শঙ্কর, রামানুজ বা মাধ্ব – কেউই উপনিষদের ‘আসল অর্থ’ আবিষ্কার করেননি। তারা প্রত্যেকে নিজেদের সম্প্রদায়ের প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব, রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং সামাজিক প্রভাব টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থটি টেক্সটের ওপর আরোপ করেছিলেন। একটি সম্প্রদায়ের পাঠ অন্য সম্প্রদায়ের কাছে সম্পূর্ণ ভুল মনে হতো, কারণ তাদের ব্যাখ্যার নিয়মাবলী এবং রাজনৈতিক স্বার্থ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
দিগন্তের মিলন বনাম প্রাতিষ্ঠানিক যুদ্ধ: গাডামার ও ফিশের বিতর্ক (Fusion of Horizons vs Institutional Warfare: The Gadamer-Fish Debate)
এই পর্যায়ে এসে গাডামার এবং ফিশের তাত্ত্বিক অবস্থানের মধ্যে এক গভীর দার্শনিক বিতর্ক তৈরি হয়, যা “তৎ ত্বমসি” মহাবাক্যের বিচারকে আরও অর্থপূর্ণ করে তোলে। গাডামার বিশ্বাস করেন যে ব্যাখ্যার লক্ষ্য হলো সত্যের উন্মোচন এবং একটি বোঝাপড়ায় পৌঁছানো। ঐতিহ্যের সাথে পাঠকের দিগন্তের যখন মিলন ঘটে, তখন সেখানে এক ধরনের পারস্পরিক আলো তৈরি হয় যা পাঠের গভীরতাকে বৃদ্ধি করে। গাডামারের ফ্রেমওয়ার্কে বেদান্তের বিভিন্ন ভাষ্যকাররা একই একই মৌলিক দার্শনিক প্রশ্নের বিভিন্ন ঐতিহাসিক একই মৌলিক দার্শনিক প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা ও তাৎপর্যকে উন্মোচিত করেছিলেন। সেখানে বৈচিত্র্য আছে, কিন্তু সেই বৈচিত্র্য একই বৈদিক উৎসের শাখা-প্রশাখা।
স্ট্যানলি ফিশ এই গাডামারীয় অবস্থানকে সরাসরি এক ধরনের নিরীহ ভাববাদ বলে নাকচ করে দেবেন। ফিশ বলবেন, বেদান্তের ইতিহাস কোনো ঐকমত্য বা বোঝাপড়ার ইতিহাস নয়; এটি হলো চরম প্রাতিষ্ঠানিক শত্রুতার ইতিহাস। শঙ্কর যখন অন্য মতবাদ খণ্ডন করেন, তখন তিনি কোনো সমন্বয় খোঁজেন না; তিনি প্রতিপক্ষের মতকে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও বেদবিরোধী বলে উড়িয়ে দেন। একইভাবে মধ্বাচার্য যখন শঙ্করের মায়াবাদকে আক্রমণ করেন, তখন তিনি অদ্বৈতবাদীদের প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ বা প্রতারক বলে চিহ্নিত করেন। এখানে কোনো “দিগন্তের মিলন” ঘটছে না; এখানে ঘটছে এক সম্প্রদায়ের দ্বারা অন্য সম্প্রদায়ের দিগন্তকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার যুদ্ধ।
দার্শনিক বীণা গুপ্ত (Bina Gupta) তার গবেষণামূলক গ্রন্থ দ্য ডিসইন্টারেস্টেড উইটনেস: আ ফ্র্যাগমেন্টারি স্কেচ অব অদ্বৈত বেদান্ত (The Disinterested Witness: A Fragmentary Sketch of Advaita Vedānta) (1998)-এ বেদান্তের অভ্যন্তরীণ জ্ঞানতাত্ত্বিক সংঘাত বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। গুপ্ত দেখান যে অদ্বৈতবাদীরা যে সাক্ষ্য বা বিশুদ্ধ চৈতন্যের কথা বলতেন, দ্বৈতবাদীদের কাছে তা ছিল এক অলীক কল্পনা। এই দুই দর্শনের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি এতই আলাদা ছিল যে তাদের মধ্যে কোনো অর্থপূর্ণ আপস সম্ভব ছিল না। ফিশের পরিভাষায় একে বলা হয় ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়গুলোর অনুবাদযোগ্যতার সংকট (Incommensurability)। একটি সম্প্রদায়ের তৈরি করা ধারণাগত কাঠামো দিয়ে অন্য সম্প্রদায়ের যুক্তির বিচার করা অসম্ভব।
অতএব “তৎ ত্বমসি” মহাবাক্যটি আমাদের দেখায় যে একটি টেক্সট একই সাথে গাডামারীয় ঐতিহ্য এবং ফিশীয় সংঘাতের ক্ষেত্র হতে পারে। ঐতিহ্যের প্রতি অনুগত্যের দিক থেকে তারা সবাই এক সূত্রে বাঁধা; কেউই বেদের প্রামাণ্যতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করতে পারেননি। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের ভেতরের অর্থ নির্ধারণের প্রশ্নে তারা ছিলেন পরস্পরের রক্তচক্ষু শত্রু। টেক্সট এখানে কোনো শান্ত নদীর মতো প্রবাহিত হয়নি; তা পরিণত হয়েছিল এমন এক ঝোড়ো সমুদ্রে যেখানে প্রতিটি সম্প্রদায় নিজের তরী ভাসিয়ে অন্য সবাইকে ডুবিয়ে দিতে চেয়েছিল।
পাঠগত আধিপত্য ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা (Textual Hegemony and Political Patronage)
কোনো ধর্মীয় বা দার্শনিক পাঠের ব্যাখ্যা কেবল লাইব্রেরি বা পণ্ডিতদের বিতর্কেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তার সাথে গভীরভাবে যুক্ত থাকে সমাজের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সম্পদের বণ্টন। মধ্যযুগীয় দক্ষিণ ভারতে এই মহাবাক্যের বিভিন্ন ব্যাখ্যার পেছনে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার এক বিশাল ইতিহাস সক্রিয় ছিল। ঐতিহাসিক রোনাল্ড ইনডেন (Ronald Inden) তার প্রভাবশালী গ্রন্থ ইমাজিনিং ইন্ডিয়া (Imagining India) (1990)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে প্রাক-আধুনিক ভারতে রাজারা নিজেদের সার্বভৌমত্বকে মহিমান্বিত করতে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে জমি ও অর্থ দান করতেন। একটি নির্দিষ্ট দার্শনিক ধারাকে রাজকীয় স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ ছিল সেই ধারার তৈরি করা সামাজিক শৃঙ্খলাকে মেনে নেওয়া।
আমেরিকান ভারততাত্ত্বিক অ্যান্ড্রু নিকলসন (Andrew J. Nicholson) তার গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ইউনিফায়িং হিন্দুইজম: ফিলোসফি অ্যান্ড আইডেন্টিটি ইন ইন্ডিয়ান ইন্টেলেকচুয়াল হিস্ট্রি (Unifying Hinduism: Philosophy and Identity in Indian Intellectual History) (2010)-এ এই রাজনৈতিক সমীকরণ বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। নিকলসন দেখান, বিজয়নগর সাম্রাজ্যের যুগে কীভাবে অদ্বৈত বেদান্ত রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের একটি অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছিল। সাম্রাজ্যের সংহতি রক্ষার জন্য এক পরম অদ্বৈত ঐক্যের দর্শন ছিল অত্যন্ত উপযোগী। বিপরীতে, হৈসল বা যাদব রাজাদের আমলে বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলন এবং বিশিষ্টাদ্বৈত বা দ্বৈত মতবাদ সাধারণ জনগণের আনুগত্য ধরে রাখতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছিল।
ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়গুলো এই রাজনৈতিক বাস্তবতাকে খুব ভালো করেই জানত। তারা বুঝতে পেরেছিল যে রাজসভায় নিজের ভাষ্যকে প্রামাণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে মঠের সম্পত্তি, করমুক্ত জমি এবং অনুসারীদের নিরাপত্তা রক্ষা করা যাবে না। ফলে “তৎ ত্বমসি” বাক্যের ব্যাখ্যাটি পরিণত হয়েছিল রাজদরবারে নিজেদের পাণ্ডিত্য ও মতাদর্শিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রধান পরীক্ষায়। যে ব্যাখ্যাকার রাজাকে বোঝাতে পারতেন যে তার ব্যাখ্যাই বেদ ও ধর্মের সবচেয়ে বিশুদ্ধ রূপ, তিনিই পেতেন মন্দিরের কর্তৃত্ব ও রাজকীয় মোহর।
এই ক্ষমতার লড়াইয়ে যেসব দার্শনিক গোষ্ঠী বৈদিক কর্তৃত্বের বাইরে অবস্থান করত – যেমন চার্বাক বস্তুবাদ বা বৌদ্ধ শূন্যবাদ – তাদেরকে চূড়ান্তভাবে ধর্মদ্রোহী হিসেবে কোণঠাসা করে দেওয়া হয়েছিল। বেদান্তের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যত তীব্র বিরোধই থাক না কেন, তারা সবাই মিলে এই বিষয়ে একমত ছিল যে বৈদিক সীমানার বাইরে কোনো মুক্তি নেই। ফিশের তত্ত্ব আমাদের এই নির্মম সত্যটি মনে করিয়ে দেয় যে ব্যাখ্যার শুদ্ধতা কোনো আসমানি বস্তু নয়; তা তৈরি হয় দরবার, মন্দির, ভূমিদান এবং সামাজিক আধিপত্যের জটিল লেনদেনের ভেতর দিয়ে।
প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থের শিক্ষা ও হার্মেনিউটিক মুক্তি (Lessons of Competing Meanings and Hermeneutic Emancipation)
গাডামার, ফিশ এবং বেদান্তের এই দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রার শেষে এসে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে তা হলো: “তৎ ত্বমসি” মহাবাক্যের আসল অর্থ কোনটি? আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ এবং সমালোচনামূলক চিন্তার উত্তর হলো: এই প্রশ্নের কোনো একক উত্তর নেই এবং উত্তর খোঁজার এই প্রয়াসটি নিজেই একটি ভ্রান্তি। এই মহাবাক্যটির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এর কোনো কাল্পনিক ঐশ্বরিক অর্থে নেই; এর সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে এর অফুরন্ত অর্থ উৎপাদনের ক্ষমতার মধ্যে। মাত্র তিনটি শব্দ কীভাবে মানব মনকে পরম একত্ববাদ থেকে শুরু করে চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী দ্বৈতবাদ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারে, বৈদান্তিক ভাষ্যের ইতিহাস তার এক উজ্জ্বল প্রমাণ।
গাডামারের পাঠ আমাদের শেখায় ঐতিহ্যের গভীরতাকে শ্রদ্ধা করতে। কোনো পাঠ্যই শূন্যে ভেসে থাকে না; মানুষের ভাষা ও চিন্তা সবসময় তার পূর্ববর্তী ইতিহাসের দ্বারা জারিত হয়। উপনিষদের সেই ধুলোমাটি মাখা আরণ্যক পরিবেশ থেকে শুরু করে শঙ্কর, রামানুজ ও মাধ্বের পরিশীলিত তর্ক পর্যন্ত – এই সমগ্র পথচলাটিই মানব চিন্তার ক্রমবিকাশের এক মহাকাব্য। অপরদিকে স্ট্যানলি ফিশ আমাদের সতর্ক করে দেন যেকোনো ব্যাখ্যার প্রাতিষ্ঠানিক ফাঁদ সম্পর্কে। তিনি আমাদের চোখ খুলে দেন যে কোনো ভাষ্যকার যখন দাবি করেন তিনি “ঈশ্বরের আসল কথা” বা “টেক্সটের একমাত্র সত্য” প্রকাশ করছেন, তখনই বুঝতে হবে সেখানে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক ক্ষমতা নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
এই দ্বিমুখী সচেতনতাই একজন আধুনিক পাঠককে প্রদান করে সত্যিকারের হার্মেনিউটিক বা ব্যাখ্যাতাত্ত্বিক মুক্তি। পাঠক তখন আর কোনো একটি মঠের অন্ধ অনুসারী হয়ে থাকেন না। তিনি বুঝতে পারেন যে টেক্সট হলো একটি বহুস্বরবিশিষ্ট জটিল বাদ্যযন্ত্র। শঙ্কর সেখানে বাজিয়েছেন পরম চৈতন্যের একতারা, রামানুজ তুলেছেন শরীর ও আত্মার সম্পর্কের রাগিণী, আর মাধ্ব বাজিয়েছেন পার্থক্যের রণদুন্দুভি। এই সুরগুলোর কোনোটিকেই চূড়ান্ত বা একমাত্র বলে গ্রহণ না করে, এদের দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্যের সামগ্রিক রূপটিকে দেখতে শেখাই হলো সমালোচনামূলক দর্শনের প্রকৃত লক্ষ্য।
পরিশেষে বলা যায়, বৈদিক সাহিত্যের হার্মেনিউটিক্স চর্চা কোনো প্রাচীন জাদুঘরের জীবাশ্ম পরীক্ষা নয়। এটি মানব চেতনার সেই আয়না, যেখানে ভাষা, ক্ষমতা এবং অস্তিত্বের চিরন্তন প্রশ্নগুলো বারবার নতুন রূপে প্রতিফলিত হয়। “তৎ ত্বমসি” বাক্যটি শেষ পর্যন্ত কোনো ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসের বন্ধ খাঁচা নয়; তা হলো মানব ভাষার এক অনন্ত মুক্ত আকাশ, যেখানে প্রতিটি যুগ এবং প্রতিটি সমাজ নিজের অস্তিত্বের নতুন দিগন্ত আবিষ্কারের জন্য ডানা মেলতে পারে। ব্যাখ্যার এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাই টেক্সটকে অমর করে রাখে, আর মানুষকে দেয় চিরকাল নতুন করে ভাবার অপার স্বাধীনতা।
উপসংহার
বৈদিক সাহিত্যের দীর্ঘ ঐতিহাসিক পরিক্রমা এবং তার ব্যাখ্যার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ঐতিহ্যের কোনো অবিভাজ্য ও সমসত্ত্ব অস্তিত্ব নেই। যা তথাকথিত ‘শাশ্বত বৈদিক ধারা’ হিসেবে লোকসমাজে পরিচিত, তা কোনো স্থির সত্য নয়; বরং তা শত শত বছর ধরে চলা নিরবচ্ছিন্ন মতাদর্শিক টানাপোড়েন, ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস এবং ভাষাগত রূপান্তরের একটি সমন্বিত ঐতিহাসিক নির্মাণ। সংহিতা ও ব্রাহ্মণের যাগযজ্ঞকেন্দ্রিক সহিংস আনুষ্ঠানিকতা থেকে উপনিষদের দার্শনিক অন্তর্মুখীকরণ, স্মৃতিশাস্ত্রের কঠোর আইনি সংহিতা থেকে মহাকাব্যের বর্ণনামূলক রাজধর্ম, কিংবা পুরাণের জনপ্রিয় ভক্তিবাদ থেকে তন্ত্রের শরীরভিত্তিক আচার – এই প্রতিটি পর্বেই বৈদিক কর্তৃত্বের ভাষাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো কোনো আকস্মিক আধ্যাত্মিক উন্মেষ ছিল না, এগুলো ছিল সমসাময়িক বস্তুগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সাথে প্রাচীন পাঠ্যের টিকে থাকার হার্মেনিউটিক লড়াই।
এই খণ্ডে যে বিষয়টি বারবার উন্মোচিত হয়েছে তা হলো ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায় (Interpretive Communities)-এর ভূমিকা। কোনো পাঠ্যের অর্থ পাঠ্যের নিজস্ব শব্দের ভেতরে চিরকালের জন্য বন্দি থাকে না; বরং সেই পাঠটি কীভাবে পঠিত হবে, তার কোন অংশটি জোর পাবে আর কোনটি ধামাচাপা পড়বে, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ধারণ করে সেই নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকারী প্রতিষ্ঠান। মীমাংসা দার্শনিকরা যখন বৈদিক মন্ত্রকে কেবল ক্রিয়াকলাপের নির্দেশক হিসেবে পাঠ করেন, অদ্বৈত বেদান্তীরা যখন তাকে আত্মজ্ঞানের মাধ্যম হিসেবে দাবি করেন, আর আধুনিক গবেষকেরা যখন তাকে একটি প্রাচীন সমাজের সমাজতাত্ত্বিক দলিল হিসেবে বিশ্লেষণ করেন – তখন মূলত একই পাঠ বিভিন্ন ব্যাখ্যামূলক কাঠামোর ভেতর দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন সামাজিক কাজ সম্পন্ন করে। ফলে কোনো বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীর ব্যাখ্যাকে একমাত্র বা চূড়ান্ত বলে মেনে নেওয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত বা অ্যাকাডেমিক ভিত্তি অবশিষ্ট থাকে না।
এর মধ্য দিয়ে পাঠের অর্থের বহুত্ব (Plurality of Meaning) এবং তার রাজনৈতিক চরিত্রটি পুরোপুরি উন্মোচিত হয়। পরবর্তী ভারতীয় ধর্মীয় সাহিত্যের প্রতিটি শাখাই কোনো না কোনোভাবে বৈদিক কর্তৃত্বের প্রতীকী মূলধনকে ব্যবহার করতে চেয়েছে। অনেক সময় বৈদিক ধারণার সরাসরি বিরোধিতা বা অবৈদিক উপাদানকে গ্রহণ করার পরও বাহ্যিকভাবে বৈদিক প্রামাণ্যের ছাতা ব্যবহারের যে কৌশল স্মৃতি, পুরাণ ও তন্ত্রে দেখা যায়, তা দেখায় যে ধর্মীয় সাহিত্যে প্রাচীনত্বের দাবি মূলত একটি বৈধতাদানকারী ব্যাকরণ মাত্র। এই ব্যাকরণ সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণিগুলোকে নিজেদের তৈরি আইনকানুন, বর্ণাশ্রম ও পিতৃতান্ত্রিক শৃঙ্খলার পেছনে এক অলৌকিক ও অলঙ্ঘনীয় আভা তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। প্রাচীন ভাষার পবিত্রতার এই খোলসটি সমাজকে বারে বারে এই ধারণায় আচ্ছন্ন রাখতে চেয়েছে যে বর্তমানের সামাজিক অসমতাগুলো আসলে মহাজাগতিক নিয়মেরই অনুবর্তী।
অতএব, বৈদিক সাহিত্যের আধুনিক হার্মেনিউটিক পাঠের চূড়ান্ত সার্থকতা হলো এই সাহিত্যের রহস্যময়তা ও পবিত্রতার কৃত্রিম আবরণ দূর করে একে ইতিহাসের রক্তমাংসের জমিনে ফিরিয়ে আনা। যখন যেকোনো ধর্মগ্রন্থকে কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তার দান হিসেবে না দেখে মানুষের ভাষা, আকাঙ্ক্ষা, শ্রেণি-স্বার্থ এবং ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের ফসল হিসেবে দেখা হয়, তখনই কেবল সেই পাঠের ওপর আরোপিত মতাদর্শিক আধিপত্য ভেঙে ফেলা সম্ভব। বর্তমান খণ্ডের তাত্ত্বিক অনুসন্ধান এই সত্যটিকেই প্রতিষ্ঠা করে যে প্রাচীন সাহিত্যকে অন্ধ ভক্তি বা ভাববাদী প্রশংসার মাধ্যমে নয়, বরং নির্মোহ বিনির্মাণ ও সমালোচনামূলক ব্যাখ্যার মাধ্যমেই সঠিকভাবে অনুধাবন করা সম্ভব। ঐতিহ্যের এই সমালোচনামূলক পুনর্বিচার সমাজকে যে কোনো একরৈখিক ধর্মীয় অন্ধত্ব থেকে মুক্ত করে চিন্তার বহুত্ববাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ দিগন্ত উন্মোচনে সহায়তা করে।
তথ্যসূত্র
- Agamben, G. (1998). Homo sacer: Sovereign power and bare life (D. Heller-Roazen, Trans.). Stanford University Press.
- Ambedkar, B. R. (1946). Who were the Shudras? How they came to be the fourth varna in the Indo-Aryan society. Thacker & Co.
- Appadurai, A. (1981). The past as a scarce resource. Man, 16(2), 201–219.
- Asad, T. (1993). Genealogies of religion: Discipline and reasons of power in Christianity and Islam. Johns Hopkins University Press.
- Aurobindo, S. (1971). The secret of the Veda. Sri Aurobindo Ashram.
- Bader, J. (1990). Meditation in Śaṅkara’s Vedānta. Aditya Prakashan.
- Bailey, G. (1995). Ganeśapurāṇa: Part I, Upāsanākhaṇḍa (Introduction, translation, notes and indexes). Otto Harrassowitz Verlag.
- Bailey, G. (2008). Ganeśa: Studies in an Asian god. State University of New York Press.
- Balslev, A. N. (1983). A study of time in Indian philosophy. Otto Harrassowitz.
- Bartley, C. J. (2002). The theology of Rāmānuja: Realism and religion. RoutledgeCurzon.
- Bataille, G. (1985). Visions of excess: Selected writings, 1927–1939 (A. Stoekl, Ed. & Trans.). University of Minnesota Press.
- Bayly, S. (1999). Caste, society and politics in India from the eighteenth century to the modern age. Cambridge University Press.
- Bell, C. (1992). Ritual theory, ritual practice. Oxford University Press.
- Benveniste, É. (1973). Indo-European language and society (E. Palmer, Trans.). University of Miami Press.
- Betti, E. (1980). Hermeneutics as the general methodology of the Geisteswissenschaften (J. Bleicher, Trans.). In J. Bleicher (Ed.), Contemporary hermeneutics: Hermeneutics as method, philosophy and critique (pp. 51–94). Routledge & Kegan Paul.
- Betty, L. S. (1978). Vādirāja’s refutation of Śaṅkara’s non-dualism: Clearing the way for theism. Motilal Banarsidass.
- Bhardwaj, S. M. (1973). Hindu places of pilgrimage in India: A study in cultural geography. University of California Press.
- Bhattacharji, S. (1975). The Indian theogony: A comparative study of Indian mythology from the Vedas to the Puranas. Cambridge University Press.
- Biardeau, M. (2002). Le Mahābhārata: Un récit fondateur du brahmanisme et son interprétation religieuse (Vols. 1–2). Éditions du Seuil.
- Bilimoria, P. (1988). Śabdaprāmāṇya: Word and knowledge in Indian philosophy. Kluwer Academic Publishers.
- Bilimoria, P. (2008). Postcolonial critiques of modern Indian hermeneutics. Journal of Indian Philosophy, 36(5), 589–608.
- Black, B. (2007). The character of the self in ancient India: Priests, kings, and women in the early Upaniṣads. State University of New York Press.
- Bodewitz, H. W. (1973). Jaiminīya Brāhmaṇa I, 1–65: Translation and commentary with a study of the Agnihotra and Prāṇāgnihotra. E. J. Brill.
- Bourdieu, P. (1977). Outline of a theory of practice (R. Nice, Trans.). Cambridge University Press.
- Bourdieu, P. (1991). Language and symbolic power (G. Raymond & M. Adamson, Trans.; J. B. Thompson, Ed.). Harvard University Press.
- Bowie, A. (2003). From Romanticism to critical theory: The philosophy of German literary theory. Routledge.
- Brereton, J. P. (1999). Edifying puzzlement: Ṛgveda 10.129 and the uses of enigma. Journal of the American Oriental Society, 119(2), 248–260.
- Brockington, J. (1998). The Sanskrit epics. Brill.
- Bronkhorst, J. (2007). Greater Magadha: Studies in the culture of early India. Brill.
- Brooks, D. R. (1990). The secret of the three cities: An introduction to Hindu Śakta Tantrism. University of Chicago Press.
- Brough, J. (1953). The early Brahmanical system of gotra and pravara: A translation of the Gotra-pravara-mañjarī of Puruṣottama-paṇḍita. Cambridge University Press.
- Brown, W. N. (1965). The theories of creation in the Rig Veda. Journal of the American Oriental Society, 85(1), 23–34.
- Buchta, D. (2014). Pedagogical authority and the transmission of knowledge in Mādhva Vedānta. The Journal of Hindu Studies, 7(3), 329–353.
- Caland, W., & Henry, V. (1906). L’Agniṣṭoma: Description complète de la forme normale du sacrifice de soma dans le culte védique (Tome 1). Ernest Leroux.
- Canguilhem, G. (1989). The normal and the pathological (C. R. Fawcett & R. S. Cohen, Trans.). Zone Books.
- Caputo, J. D. (1997). Deconstruction in a nutshell: A conversation with Jacques Derrida. Fordham University Press.
- Carman, J. B. (1974). The theology of Rāmānuja: An essay in interreligious understanding. Yale University Press.
- Chakrabarti, K. (2001). Religious process: The Purāṇas and the making of a regional tradition. Oxford University Press.
- Chakrabarty, D. (2000). Provincializing Europe: Postcolonial thought and historical difference. Princeton University Press.
- Chakravarti, U. (1985). The conceptualization of social mobility in early Buddhism. Social Scientist, 13(5), 16–33.
- Chakravarti, U. (1993). Conceptualising Brahmanical patriarchy in early India: Gender, caste, class and state. Economic and Political Weekly, 28(14), 579–585.
- Childe, V. G. (1926). The Aryans: A study of Indo-European origins. Kegan Paul, Trench, Trubner & Co.
- Classen, C. (1993). Worlds of sense: Exploring the senses in history and across cultures. Routledge.
- Clooney, F. X. (1990). Thinking ritually: Rediscovering the Pūrva Mīmāṃsā of Jaimini. De Nobili Research Library.
- Clooney, F. X. (1993). Theology after Vedānta: An experiment in comparative theology. State University of New York Press.
- Coburn, T. B. (1984). Devī-Māhātmya: The crystallization of the goddess tradition. Motilal Banarsidass.
- Comans, M. (2000). The method of early Advaita Vedānta: A study of Gauḍapāda, Śaṅkara, Sureśvara and Padmapāda. Motilal Banarsidass.
- Critchley, S. (1992). The ethics of deconstruction: Derrida and Levinas. Blackwell.
- Culler, J. (1982). On deconstruction: Theory and criticism after structuralism. Cornell University Press.
- Dasgupta, S. (1922). A history of Indian philosophy (Vol. 1). Cambridge University Press.
- Davidson, R. M. (2002). Indian esoteric Buddhism: A social history of the Tantric movement. Columbia University Press.
- Davis, R. H. (1997). Lives of Indian images. Princeton University Press.
- Dayananda Saraswati, S. (1974). The light of truth (Satyarth Prakash) (C. Bharadwaja, Trans.). Sarvadeshik Arya Pratinidhi Sabha.
- Deliege, R. (1999). The untouchables of India (N. Scott, Trans.). Berg Publishers.
- Derrett, J. D. M. (1968). Religion, law and the state in India. Faber & Faber.
- Derrida, J. (1976). Of grammatology (G. C. Spivak, Trans.). Johns Hopkins University Press.
- Derrida, J. (1978). Writing and difference (A. Bass, Trans.). University of Chicago Press.
- Derrida, J. (1981). Dissemination (B. Johnson, Trans.). University of Chicago Press.
- Derrida, J. (1982). Margins of philosophy (A. Bass, Trans.). University of Chicago Press.
- Derrida, J. (1988). Limited Inc (S. Weber & J. Mehlman, Trans.). Northwestern University Press.
- Derrida, J. (1992). Given time: I. Counterfeit money (P. Kamuf, Trans.). University of Chicago Press.
- Derrida, J. (1993). Aporias (T. Dutoit, Trans.). Stanford University Press.
- Derrida, J. (1997). Politics of friendship (G. Collins, Trans.). Verso.
- Derrida, J. (2000). Of hospitality (R. Bowlby, Trans.). Stanford University Press.
- Derrida, J. (2005). Rogues: Two essays on reason (P.-A. Brault & M. Naas, Trans.). Stanford University Press.
- Deshpande, M. M. (1979). Sociolinguistic attitudes in India: An historical reconstruction. Karoma Publishers.
- Dhand, A. (2008). Woman as fire, woman as sage: Sexual ideology in the Mahābhārata. State University of New York Press.
- Dirks, N. B. (2001). Castes of mind: Colonialism and the making of modern India. Princeton University Press.
- Doniger, W. (1981). The Rig Veda: An anthology. Penguin Books.
- Doniger, W. (1999). Splitting the difference: Gender and myth in ancient Greece and India. University of Chicago Press.
- Doniger, W., & Smith, B. K. (Trans.). (1991). The laws of Manu. Penguin Books.
- Dostal, R. J. (Ed.). (2002). The Cambridge companion to Gadamer. Cambridge University Press.
- Douglas, M. (1966). Purity and danger: An analysis of concepts of pollution and taboo. Routledge & Kegan Paul.
- D’Sa, F. X. (1980). Śabdaprāmāṇyam in Śabara and Kumārila: Towards a study of the Mīmāṃsā experience of language. E. J. Brill.
- Dumont, L. (1980). Homo hierarchicus: The caste system and its implications (M. Sainsbury, L. Dumont, & B. Gulati, Trans.; Complete rev. English ed.). University of Chicago Press.
- Dumont, P.-E. (1939). L’Aśvamedha: Description du sacrifice solennel du cheval dans le culte védique d’après les textes du Yajurveda blanc. Geuthner.
- Eagleton, T. (1991). Ideology: An introduction. Verso.
- Eck, D. L. (2012). India: A sacred geography. Harmony Books.
- Eggeling, J. (1882). The Śatapatha-Brāhmaṇa according to the text of the Mādhyandina school: Part 1, Books I and II. Clarendon Press.
- Elizarenkova, T. Y. (1995). Language and style of the Vedic Ṛṣis. State University of New York Press.
- Erdosy, G. (Ed.). (1995). The Indo-Aryans of ancient South Asia: Language, material culture and ethnicity. Walter de Gruyter.
- Fish, S. (1980). Is there a text in this class? The authority of interpretive communities. Harvard University Press.
- Fish, S. (1989). Doing what comes naturally: Change, rhetoric, and the practice of theory in literary and legal studies. Duke University Press.
- Fish, S. (1995). Professional correctness: Literary studies and political change. Clarendon Press.
- Fish, S. (1999). The trouble with principle. Harvard University Press.
- Fitzgerald, J. L. (Trans. & Ed.). (2004). The Mahābhārata: Book 11, the book of the women; Book 12, the book of peace, part one. University of Chicago Press.
- Flood, G. (1996). An introduction to Hinduism. Cambridge University Press.
- Flood, G. (1999). Beyond phenomenology: Rethinking the study of religion. Cassell.
- Flood, G. (2004). The ascetic self: Subjectivity, memory and tradition. Cambridge University Press.
- Flood, G. (2006). The tantric body: The secret tradition of Hindu religion. I.B. Tauris.
- Foucault, M. (1971). Orders of discourse (R. Swyer, Trans.). Social Science Information, 10(2), 7–30.
- Foucault, M. (1972). The archaeology of knowledge and the discourse on language (A. M. Sheridan Smith, Trans.). Pantheon Books.
- Foucault, M. (1977). Discipline and punish: The birth of the prison (A. Sheridan, Trans.). Pantheon Books.
- Foucault, M. (1980). Power/knowledge: Selected interviews and other writings, 1972–1977 (C. Gordon, Ed.). Pantheon Books.
- Foucault, M. (1984). The order of discourse. In M. J. Shapiro (Ed.), Language and politics (pp. 108–138). New York University Press.
- Foucault, M. (2003). Abnormal: Lectures at the Collège de France, 1974–1975 (G. Burchell, Trans.). Picador.
- Fuller, C. J. (1992). The camphor flame: Popular Hinduism and society in India. Princeton University Press.
- Gadamer, H.-G. (1976). Philosophical hermeneutics (D. E. Linge, Ed. & Trans.). University of California Press.
- Gadamer, H.-G. (1989). Truth and method (J. Weinsheimer & D. G. Marshall, Trans.; 2nd rev. ed.). Continuum.
- Gadamer, H.-G. (2001). Gadamer in conversation: Reflections and commentary (R. E. Palmer, Ed. & Trans.). Yale University Press.
- Gasché, R. (1986). The tain of the mirror: Derrida and the philosophy of reflection. Harvard University Press.
- Geertz, C. (1973). The interpretation of cultures: Selected essays. Basic Books.
- Goldman, R. P. (Trans. & Ed.). (1984). The Rāmāyaṇa of Vālmīki: An epic of ancient India: Vol. 1, Bālakāṇḍa. Princeton University Press.
- Gonda, J. (1963). The vision of the Vedic poets. Mouton & Co.
- Gonda, J. (1975). Vedic literature (Saṃhitās and Brāhmaṇas). Otto Harrassowitz.
- Goudriaan, T. (1978). Māyā divine and human. Motilal Banarsidass.
- Goudriaan, T. (1981). Hindu Tantrism. E. J. Brill.
- Gould, H. A. (1987). The Hindu caste system: The sacralization of a social order. Chanakya Publications.
- Grondin, J. (1994). Introduction to philosophical hermeneutics. Yale University Press.
- Grondin, J. (2003). The philosophy of Gadamer (K. Plant, Trans.). McGill-Queen’s University Press.
- Gupta, B. (1998). The disinterested witness: A fragmentary sketch of Advaita Vedānta. State University of New York Press.
- Gupta, D. (2000). Interrogating caste: Understanding hierarchy through its discontents. Penguin Books India.
- Gupta, S. (1979). The Pāñcarātra attitude to mantra. In H. P. Alper (Ed.), Understanding mantras (pp. 224–248). State University of New York Press.
- Guru, G., & Sarukkai, S. (2012). The cracked mirror: An Indian debate on experience and theory. Oxford University Press.
- Habermas, J. (1970). On systematically distorted communication. Inquiry, 13(1-4), 205–218.
- Habermas, J. (1971). Knowledge and human interests (J. J. Shapiro, Trans.). Beacon Press.
- Habermas, J. (1975). Legitimation crisis (T. McCarthy, Trans.). Beacon Press.
- Habermas, J. (1979). Communication and the evolution of society (T. McCarthy, Trans.). Beacon Press.
- Habermas, J. (1984). The theory of communicative action: Vol. 1. Reason and the rationalization of society (T. McCarthy, Trans.). Beacon Press.
- Habermas, J. (1987). The theory of communicative action: Vol. 2. Lifeworld and system: A critique of functionalist reason (T. McCarthy, Trans.). Beacon Press.
- Habermas, J. (1990). Moral consciousness and communicative action (C. Lenhardt & S. W. Nicholsen, Trans.). MIT Press.
- Halbfass, W. (1988). India and Europe: An essay in understanding. State University of New York Press.
- Halbfass, W. (1991). Tradition and reflection: Explorations in Indian thought. State University of New York Press.
- Hale, W. E. (1986). Ásura- in early Vedic religion. Motilal Banarsidass.
- Hardy, F. (1983). Viraha-bhakti: The early history of Kṛṣṇa devotion in South India. Oxford University Press.
- Hazra, R. C. (1940). Studies in the Puranic records on Hindu rites and customs. University of Dacca.
- Heesterman, J. C. (1985). The inner conflict of tradition: Essays in Indian ritual, kingship, and society. University of Chicago Press.
- Heesterman, J. C. (1993). The broken world of sacrifice: An essay in historical anthropology. University of Chicago Press.
- Hiltebeitel, A. (2001). Rethinking the Mahābhārata: A reader’s guide to the education of the dharma king. University of Chicago Press.
- Hirsch, E. D., Jr. (1967). Validity in interpretation. Yale University Press.
- Hirsch, E. D., Jr. (1976). The aims of interpretation. University of Chicago Press.
- Holdrege, B. A. (1996). Veda and Torah: Transcending the textuality of scripture. State University of New York Press.
- Hubert, H., & Mauss, M. (1964). Sacrifice: Its nature and function (W. D. Halls, Trans.). University of Chicago Press.
- Ilaiah, K. (1996). Why I am not a Hindu: A Sudra critique of Hindutva philosophy, culture and political economy. Samya.
- Inden, R. (1990). Imagining India. Basil Blackwell.
- Jaiswal, S. (1998). Caste: Origin, function and dimensions of change. Manohar Publishers.
- Jamison, S. W. (1996). Sacrificed wife / Sacrificer’s wife: Women, ritual, and hospitality in ancient India. Oxford University Press.
- Jamison, S. W., & Brereton, J. P. (2014). The Rigveda: The earliest religious poetry of India. Oxford University Press.
- Jha, D. N. (2002). The myth of the holy cow. Verso.
- Jordens, J. T. F. (1978). Dayānanda Sarasvatī: His life and ideas. Oxford University Press.
- Kahrs, E. (1998). Indian semantic analysis: The nirvacana tradition. Cambridge University Press.
- Kamuf, P. (Ed.). (1991). A Derrida reader: Between the blurs. Columbia University Press.
- Kane, P. V. (1930). History of Dharmaśāstra: Ancient and mediaeval religious and civil law in India (Vol. 1). Bhandarkar Oriental Research Institute.
- Keith, A. B. (1925). The religion and philosophy of the Veda and Upanishads (Vol. 1). Harvard University Press.
- King, R. (1999). Orientalism and religion: Postcolonial theory, India and “The mystic East”. Routledge.
- Kosambi, D. D. (1956). An introduction to the study of Indian history. Popular Book Depot.
- Kramrisch, S. (1946). The Hindu temple (Vols. 1–2). University of Calcutta.
- Krick, H. (1982). Das Ritual der Feuergründung (Agnyādheya) (G. Oberhammer, Ed.). Verlag der Österreichischen Akademie der Wissenschaften.
- Kristeva, J. (1982). Powers of horror: An essay on abjection (L. S. Roudiez, Trans.). Columbia University Press.
- Kuiper, F. B. J. (1983). Ancient Indian cosmogony: Essays selected and introduced by John Irwin. Vikas Publishing House.
- Larson, G. J. (1975). The Bhagavadgītā as cross-cultural process: Toward an analysis of the social functions of a religious text. Journal of the American Academy of Religion, 43(4), 651–669.
- Larson, G. J. (1981). The song celestial: Two centuries of the Bhagavadgītā in the West. Philosophy East and West, 31(4), 513–540.
- Lester, R. C. (1976). Rāmānuja on the yoga. The Adyar Library and Research Centre.
- Lévi, S. (1966). La doctrine du sacrifice dans les Brāhmaṇas. Presses Universitaires de France. (Original work published 1898)
- Levy, R. I. (1990). Mesocosm: Hinduism and the organization of a traditional Newar city in Nepal. University of California Press.
- Lincoln, B. (1991). Death, war, and sacrifice: Studies in ideology and practice. University of Chicago Press.
- Lincoln, B. (1994). Authority: Construction and corrosion. University of Chicago Press.
- Lingat, R. (1973). The classical law of India (J. D. M. Derrett, Trans.). University of California Press.
- Lipner, J. (1986). The face of truth: A study of meaning and metaphysics in the Vedāntic theology of Rāmānuja. State University of New York Press.
- Llewellyn, J. E. (1993). The Arya Samaj as a fundamentalist movement: A study in comparative fundamentalism. Manohar Publishers.
- Lorenzen, D. N. (1972). The Kāpālikas and Kālāmukhas: Two lost Śaivite sects. University of California Press.
- Lorenzen, D. N. (2006). Who invented Hinduism? Essays on religion in history. Yoda Press.
- Macdonell, A. A. (1917). A Vedic reader for students. Oxford University Press.
- Mahony, W. K. (1998). The artful universe: An introduction to the Vedic religious imagination. State University of New York Press.
- Malamoud, C. (1996). Cooking the world: Ritual and thought in ancient India (D. White, Trans.). Oxford University Press.
- Malinar, A. (2007). The Bhagavadgītā: Doctrines and contexts. Cambridge University Press.
- Marriott, M. (1976). Hindu transactions: Diversity without dualism. In B. Kapferer (Ed.), Transaction and meaning: Directions in the anthropology of exchange and symbolic behavior (pp. 109–142). Institute for the Study of Human Issues.
- Masuzawa, T. (2005). The invention of world religions: Or, how European universalism was preserved in the language of pluralism. University of Chicago Press.
- Matilal, B. K. (Ed.). (1989). Moral dilemmas in the Mahābhārata. Indian Institute of Advanced Study in association with Motilal Banarsidass.
- Mayeda, S. (1992). A thousand teachings: The Upadeśasāhasrī of Śaṅkara. State University of New York Press.
- McCarthy, T. (1978). The critical theory of Jürgen Habermas. MIT Press.
- McCutcheon, R. T. (1997). Manufacturing religion: The discourse on sui generis religion and the politics of nostalgia. Oxford University Press.
- Minkowski, C. Z. (1991). Priesthood in ancient India: A study of the Maitrāvaruṇa priest. De Nobili Research Library.
- Minor, R. N. (1978). Sri Aurobindo: The perfect and the good. Minerva Associates.
- Moffatt, M. (1979). An untouchable community in South India: Structure and consensus. Princeton University Press.
- Müller, F. M. (1878). Lectures on the origin and growth of religion as illustrated by the religions of India. Longmans, Green, and Co.
- Müller, F. M. (1899). The six systems of Indian philosophy. Longmans, Green, and Co.
- Nath, V. (2001). Purāṇas and acculturation: A historico-anthropological perspective. Munshiram Manoharlal.
- Nicholson, A. J. (2010). Unifying Hinduism: Philosophy and identity in Indian intellectual history. Columbia University Press.
- Norris, C. (1987). Derrida. Harvard University Press.
- Oberlies, T. (1998). Die Religion des Ṛgveda: Teil 1. Das religiöse System des Ṛgveda. De Nobili Research Library.
- O’Flaherty, W. D. (1981). The Rig Veda: An anthology. Penguin Classics.
- Oguibénine, B. (1988). Essays on Vedic and Indo-European culture. Motilal Banarsidass.
- Olivelle, P. (1998). The early Upaniṣads: Annotated text and translation. Oxford University Press.
- Olivelle, P. (1999). Dharmasūtras: The law codes of Āpastamba, Gautama, Baudhāyana, and Vasiṣṭha. Oxford University Press.
- Olivelle, P. (Trans. & Ed.). (2005). Manu’s code of law: A critical edition and translation of the Mānava-Dharmaśāstra. Oxford University Press.
- Omvedt, G. (1994). Dalits and the democratic revolution: Dr. Ambedkar and the Dalit movement in colonial India. SAGE Publications.
- Outhwaite, W. (1994). Habermas: A critical introduction. Stanford University Press.
- Padoux, A. (1990). Vāc: The concept of the word in selected Hindu Tantras (J. Gontier, Trans.). State University of New York Press.
- Palmer, R. E. (1969). Hermeneutics: Interpretation theory in Schleiermacher, Dilthey, Heidegger, and Gadamer. Northwestern University Press.
- Parpola, A. (2015). The roots of Hinduism: The early Aryans and the Indus civilization. Oxford University Press.
- Parry, J. P. (1994). Death in Banaras. Cambridge University Press.
- Patton, L. L. (Ed.). (1994). Authority, anxiety, and canon: Essays in Vedic interpretation. State University of New York Press.
- Patton, L. L. (2005). Bringing the gods to mind: Mantra and ritual in early Indian sacrifice. University of California Press.
- Pennington, B. K. (2005). Was Hinduism invented? Britons, Indians, and the colonial construction of religion. Oxford University Press.
- Pollock, S. (1989). Mīmāṃsā and the problem of history in traditional India. Journal of the American Oriental Society, 109(4), 603–610.
- Pollock, S. (1993). Rāmāyaṇa and political imagination in India. The Journal of Asian Studies, 52(2), 261–297.
- Pollock, S. (2006). The language of the gods in the world of men: Sanskrit, culture, and power in premodern India. University of California Press.
- Potter, K. H. (Ed.). (1981). Encyclopedia of Indian philosophies: Vol. 3. Advaita Vedānta up to Śaṅkara and his pupils. Princeton University Press.
- Proferes, T. N. (2007). Vedic ideals of sovereignty and the poetics of power. American Oriental Society.
- Rabinow, P. (Ed.). (1984). The Foucault reader. Pantheon Books.
- Radhakrishnan, S. (1923). Indian philosophy (Vol. 1). George Allen & Unwin.
- Rambachan, A. (1991). Accomplishing the accomplished: The Vedas as a source of valid knowledge in Śaṅkara. University of Hawaii Press.
- Rambachan, A. (1994). The limits of scripture: Vivekananda’s reinterpretation of the Vedas. University of Hawaii Press.
- Rao, K. B. R. (1966). Advaita and Dvaita: A study in the critique of Indian monism. University of Mysore.
- Rau, W. (1957). Staat und Gesellschaft im alten Indien: Nach den Brāhmaṇa-Texten dargestellt. Otto Harrassowitz.
- Renou, L. (1953). Religions of ancient India. Athlone Press.
- Renou, L. (1965). The destiny of the Veda in India. Motilal Banarsidass.
- Ricoeur, P. (1967). The symbolism of evil (E. Buchanan, Trans.). Harper & Row.
- Ricoeur, P. (1970). Freud and philosophy: An essay on interpretation (D. Savage, Trans.). Yale University Press.
- Ricoeur, P. (1976). Interpretation theory: Discourse and the surplus of meaning. Texas Christian University Press.
- Ricoeur, P. (1977). The rule of metaphor: Multi-disciplinary studies of the creation of meaning in language (R. Czerny, K. McLaughlin, & J. Costello, Trans.). University of Toronto Press.
- Ricoeur, P. (1981). Hermeneutics and the human sciences: Essays on language, action and interpretation (J. B. Thompson, Ed. & Trans.). Cambridge University Press.
- Ricoeur, P. (1984). Time and narrative (Vol. 1, K. McLaughlin & D. Pellauer, Trans.). University of Chicago Press.
- Ricoeur, P. (1986). Lectures on ideology and utopia (G. H. Taylor, Ed.). Columbia University Press.
- Rocher, L. (1986). The Purāṇas. Otto Harrassowitz Verlag.
- Roebuck, V. J. (2003). The Upaniṣads. Penguin Books.
- Roy, K. (1994). The emergence of monarchy in North India: Eighth-fourth centuries B.C. Oxford University Press.
- Said, E. W. (1978). Orientalism. Pantheon Books.
- Sallis, J. (Ed.). (1987). Deconstruction and philosophy: The texts of Jacques Derrida. University of Chicago Press.
- Sanderson, A. (2009). The Śaiva age: The rise and dominance of Śaivism during the early medieval period. In S. Einoo (Ed.), Genesis and development of Tantrism (pp. 41–349). Institute of Oriental Culture, University of Tokyo.
- Sarma, D. (2003). An introduction to Mādhva Vedānta. Ashgate Publishing.
- Schleiermacher, F. (1998). Hermeneutics and criticism: And other writings (A. Bowie, Ed. & Trans.). Cambridge University Press.
- Sharma, A. (1986). The Hindu Gītā: Ancient and classical interpretations of the Bhagavadgītā. Duckworth.
- Sharma, B. N. K. (1962). Philosophy of Śrī Madhvācārya. Bharatiya Vidya Bhavan.
- Sharma, B. N. K. (2000). A history of the Dvaita school of Vedānta and its literature (3rd ed.). Motilal Banarsidass.
- Sharma, R. S. (1958). Śūdras in ancient India: A social history of the lower order down to circa A.D. 600. Motilal Banarsidass.
- Sharma, R. S. (1983). Material culture and social formations in ancient India. Macmillan India.
- Sharma, R. S. (1990). Śūdras in ancient India: A social history of the lower order down to circa A.D. 600 (3rd rev. ed.). Motilal Banarsidass.
- Siauve, S. (1968). La doctrine de Madhva: Dvaita-Vedānta. Institut Français d’Indologie.
- Singh, U. (2017). Political violence in ancient India. Harvard University Press.
- Skinner, Q. (1969). Meaning and understanding in the history of ideas. History and Theory, 8(1), 3–53.
- Smith, B. K. (1989). Reflections on resemblance, ritual, and religion. Oxford University Press.
- Smith, D. (2003). Hinduism and modernity. Blackwell Publishing.
- Smith, J. Z. (1982). Imagining religion: From Babylon to Jonestown. University of Chicago Press.
- Southworth, F. C. (2005). Linguistic archaeology of South Asia. RoutledgeCurzon.
- Spivak, G. C. (1988). Can the subaltern speak? In C. Nelson & L. Grossberg (Eds.), Marxism and the interpretation of culture (pp. 271–313). University of Illinois Press.
- Spivak, G. C. (1999). A critique of postcolonial reason: Toward a history of the vanishing present. Harvard University Press.
- Srinivasa Chari, S. M. (1988). Fundamentals of Viśiṣṭādvaita Vedānta: A study based on Vedānta Deśika’s Tattva-muktā-kalāpa. Motilal Banarsidass.
- Staal, F. (1989). Rules without meaning: Ritual, mantras and the human sciences. Peter Lang.
- Stietencron, H. von. (2005). Hindu myth, Hindu history: Religion, art, and politics. Permanent Black.
- Thapar, R. (2002). Early India: From the origins to AD 1300. University of California Press.
- Therborn, G. (1980). The ideology of power and the power of ideology. Verso.
- Trautmann, T. R. (1997). Aryans and British India. University of California Press.
- Tull, H. W. (1989). The Vedic origins of karma: Cosmos as man in ancient Indian myth and ritual. State University of New York Press.
- Urban, H. B. (2003). Tantra: Sex, secrecy, politics, and power in the study of religion. University of California Press.
- van Buitenen, J. A. B. (1956). Rāmānuja’s Vedārthasaṃgraha: Introduction, critical text and annotated translation. Deccan College Postgraduate and Research Institute.
- van Buitenen, J. A. B. (1968). The Pravargya: An ancient Indian milk ritual. Deccan College.
- van Buitenen, J. A. B. (Trans. & Ed.). (1973). The Mahābhārata: Book 1, the book of the beginning. University of Chicago Press.
- Warnke, G. (1987). Gadamer: Hermeneutics, tradition and reason. Stanford University Press.
- Weinsheimer, J. C. (1985). Gadamer’s hermeneutics: A reading of Truth and Method. Yale University Press.
- Wheelock, W. T. (1982). The problem of ritual language: A study of the Shiva master’s mantra. Journal of the American Academy of Religion, 50(1), 49–71.
- White, D. G. (1996). The alchemical body: Siddha traditions in medieval India. University of Chicago Press.
- Witzel, M. (Ed.). (1997a). Inside the texts, beyond the texts: New approaches to the study of the Vedas. Department of Sanskrit and Indian Studies, Harvard University.
- Witzel, M. (1997b). The development of the Vedic canon and its schools: The social and political milieu. In M. Witzel (Ed.), Inside the texts, beyond the texts: New approaches to the study of the Vedas (pp. 257–345). Harvard University Press.
- Wood, D. (1989). The deconstruction of time. Humanities Press International.
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

