ধর্ম ও অপরাধধর্মের মনস্তত্ত্বমানবাধিকার

মাদক, অপরাধ, ইতিহাস, ধর্ম ও সমাজ (Drugs, Crime, History, Religion and Society) খণ্ড ১: মাদক, আসক্তি, বাণিজ্য ও নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস

(মাদকের সাথে ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা, টেরোরিজমের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারগুলো দ্বিতীয় খণ্ডে বিস্তারিত আলোচিত হবে। এখানে তুলনামূলক বেসিক আলোচনা রয়েছে।)

ভূমিকা

মানব সভ্যতার বিবর্তনের ইতিহাস জৈবরাসায়নিক পদার্থের সাথে মানুষের নিরন্তর মিথস্ক্রিয়ার ইতিহাস। উদ্ভিদজগতে প্রাপ্ত বিভিন্ন অ্যালকালয়েড ও রাসায়নিক উপাদান ভক্ষণের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের পরিবর্তন ঘটানোর প্রবণতা কোনো আকস্মিক আধুনিক বিচ্যুতি নয়, বরং এটি একটি সুপ্রাচীন জৈব-নৃতাত্ত্বিক বাস্তবতা। নৃবিজ্ঞানী ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষ চেতনা পরিবর্তনকারী মনস্তাত্ত্বিক পদার্থ (Psychoactive substances) ব্যবহার করেছে। আদিম শিকারী ও সংগ্রাহক সমাজে তথাকথিত আচারিক কিংবা শামানকীয় চর্চায় উদ্ভিদের যে ব্যবহার দেখা যেত, বস্তুনিষ্ঠ সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তা কোনো অলৌকিক বা তুরীয় অভিজ্ঞতা নয়; বরং তা ছিল স্নায়বিক অনুভূতির উদ্দীপন এবং গোত্রীয় সংহতি রক্ষার একটি জৈবিক কৌশল। মানুষের জৈবিক মস্তিষ্ক এবং বাহ্যিক রাসায়নিকের এই জটিল সম্পর্ক সময়ের সাথে সাথে কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা রূপান্তরিত হয়েছে অর্থনীতি, রাজনীতি, ঔপনিবেশিক আধিপত্য এবং আইনগত নিয়ন্ত্রণের এক সুবিশাল কাঠামোগত বাস্তবতায়।

পদার্থের জৈবিক প্রভাব যখন থেকে বাণিজ্যিক মূল্যে রূপান্তরিত হতে শুরু করে, তখন থেকেই মাদক (Drugs), অপরাধ (Crime) এবং সমাজ (Society) – এই তিনটি মাত্রা একে অপরের পরিপূরক ও দ্বন্দ্বমূলক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়। বিশেষ করে প্রাক-আধুনিক যুগে চিকিৎসা ও ভেষজ বিদ্যার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত আফিম বা গাঁজার মতো উপাদানগুলো আধুনিক ধনতন্ত্র বা পুঁজিবাদের বিকাশের সাথে সাথে অত্যন্ত লাভজনক বৈশ্বিক পণ্য (Global commodity) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির উত্থান, সমুদ্রপথে নতুন বাণিজ্যপথ আবিষ্কার এবং ভৌগোলিক বিস্তারের প্রেক্ষাপটে মাদকের উৎপাদন ও বণ্টন একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় রূপ ধারণ করে। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যেভাবে বাংলায় আফিম চাষকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল এবং একচেটিয়া বাণিজ্যিক কর্তৃত্বের মাধ্যমে চীনের বাজার দখল করেছিল, তা প্রমাণ করে যে মাদক কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং তা ছিল রাষ্ট্রীয় ভূ-রাজনীতি ও পুঁজিতান্ত্রিক লুণ্ঠনের একটি প্রধান হাতিয়ার।

এই বাস্তবতায় মাদকের ব্যবহারকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াটিও কোনো চিরন্তন নৈতিক সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। আইন সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, কোন পদার্থটি ‘ঔষধ’ হিসেবে চিকিৎসালয়ে থাকবে এবং কোনটি ‘নিষিদ্ধ মাদক’ হিসেবে কারাগারের কারণ হবে, তা বহুলাংশে নির্ধারিত হয়েছে প্রভাবশালী সামাজিক শ্রেণি ও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ দ্বারা। একই সাথে, ব্যক্তির স্তরে মাদকাসক্তি কীভাবে গড়ে ওঠে – তা কেবল একজন মানুষের দুর্বল ইচ্ছাশক্তির প্রতিফলন নয়। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে আসক্তি হলো মস্তিষ্কের জটিল ডোপামিন পুরষ্কার ব্যবস্থা (Dopamine reward system) এবং ব্যক্তির পারিপার্শ্বিক সামাজিক বিচ্ছিন্নতা (Social alienation) এর যৌথ মিথস্ক্রিয়া।

অতএব, মাদক এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট অপরাধকে বুঝতে হলে আমাদের কোনো অতিপ্রাকৃতিক ব্যাখ্যা বা ধর্মীয় অনুশাসনভিত্তিক পাপ-পুণ্যের দ্বান্দ্বিকতায় আবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন একটি নির্মোহ, বস্তুবাদী ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ। এই গ্রন্থটি সেই লক্ষ্যেই নিবেদিত। এটি ব্যক্তির মস্তিষ্কে রাসায়নিকের আণবিক ক্রিয়া থেকে শুরু করে বিশ্ব পুঁজিবাদের বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী বাণিজ্য পর্যন্ত প্রতিটি স্তরকে বৈজ্ঞানিক কার্যকারণ সম্পর্কের ভিত্তিতে ব্যবচ্ছেদ করে। মাদক কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক ব্যাধি নয়; এটি এমন এক আয়না, যেখানে আধুনিক মানব সমাজের জৈবিক সীমাবদ্ধতা, বাজার অর্থনীতির নির্মমতা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের দমনমূলক ক্ষমতার নিখুঁত প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়।

মাদক ও আসক্তির ভিত্তি (Foundations of Drugs and Addiction): ধারণা, প্রভাব ও নির্ভরশীলতা

মাদকের পরিচয় (Introduction to Drugs): ধারণা ও শ্রেণিবিন্যাস

মাদকের জৈব-রাসায়নিক ও চিকিৎসাগত সংজ্ঞা (Biochemical and Medical Definition of Drugs)

মানুষের শরীর একটি জটিল জৈব-রাসায়নিক কারখানা। এই কারখানায় প্রতি মুহূর্তে কোটি কোটি রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটছে। কোনো বাইরের রাসায়নিক পদার্থ যখন এই চলমান ব্যবস্থার ভেতর প্রবেশ করে তার স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় বা মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়াকে বদলে দেয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় আমরা তাকে ড্রাগ বা মাদক বলি। ঔষধবিজ্ঞান (Pharmacology) অনুযায়ী, খাদ্য কিংবা জলের মতো পুষ্টি উপাদান বাদ দিলে যেকোনো রাসায়নিক যৌগ যা জীবদেহের ক্রিয়াকলাপের রূপান্তর ঘটায়, তা-ই ড্রাগ। রবার্ট জুলিয়েন (Robert Julien) তার গবেষণায় দেখান যে এই যৌগগুলো মূলত মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের গ্রাহক কোষগুলোর সাথে যুক্ত হয়ে জৈবিক বার্তা আদান-প্রদানের পথ বদলে দেয় (Julien et al., 2011)। মানুষের অনুভূতি, ব্যথা, আনন্দ কিংবা ক্লান্তি – সবই স্নায়ু সংকেতের খেলা। কোনো পদার্থ যখন সেই সংকেতের স্বাভাবিক গতি থামিয়ে দেয় অথবা বাড়িয়ে দেয়, তখন মানুষের বাহ্যিক আচরণেও পরিবর্তন ঘটে।

9.3 Characteristics of Drugs to Treat Nervous System Disorders - Pharmacology for Nurses | OpenStax
মানব স্নায়ুতন্ত্রের দুটি নিউরনের মধ্যবর্তী সিন্যাপসের গঠন। প্রিসিন্যাপটিক নিউরন থেকে নিঃসৃত স্নায়ুপ্রেরক অণু সিন্যাপটিক ফাঁক অতিক্রম করে পরবর্তী কোষের রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং রাসায়নিক সংকেত পরিবহন করে।

মস্তিষ্কের কোটি কোটি নিউরন পরস্পরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিকের মাধ্যমে, যেগুলোকে বলা হয় স্নায়ুপ্রেরক (Neurotransmitters)। সাধারণ অবস্থায় ডোপামিন, সেরোটোনিন, গামা-অ্যামিনোবিউটারিক অ্যাসিড বা গাবা (Gamma-aminobutyric acid, GABA) কিংবা নর-এপিনেফ্রিন নির্দিষ্ট মাত্রায় নিঃসৃত হয় এবং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষা করে। বাইরের কোনো মনস্তাত্ত্বিক রাসায়নিক যখন রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়, তখন তা রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধক বা ব্লাড-ব্রেন ব্যারিয়ার (Blood-brain barrier) ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। সেখানে গিয়ে রাসায়নিকটি নিউরনের গ্রাহক বা রিসেপ্টরের সাথে এমনভাবে জুড়ে যায়, যেন এটা শরীরের নিজস্ব কোনো উপাদান। কিছু রাসায়নিক শরীরের প্রাকৃতিক নিউরোট্রান্সমিটারের অনুকরণ করে সংকেত পাঠায়, আবার কিছু রাসায়নিক স্বাভাবিক সংকেত আদান-প্রদানের পথ আটকে দেয়।

বিজ্ঞানীদের কাছে কোনো পদার্থ ভালো বা খারাপ হিসেবে চিহ্নিত হয় না। রাসায়নিকের নিজস্ব কোনো নৈতিক চরিত্র নেই। আফিম গাছ থেকে নিষ্কাশিত মরফিন যেমন তীব্র যন্ত্রণায় কাতর যুদ্ধাহত সৈনিকের জীবন রক্ষা করতে পারে, অতিরিক্ত মাত্রায় অনির্দিষ্ট ব্যবহারে সেই একই পদার্থ শ্বাসযন্ত্রের ক্রিয়া স্তব্ধ করে মানুষের মৃত্যুর কারণও হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোনো পদার্থের উপযোগিতা ও ক্ষতিকর ক্ষমতার মধ্যকার এই সূক্ষ্ম সীমারেখাকে বলা হয় চিকিৎসাগত সূচক (Therapeutic index)। এই সূচকটি যত সংকীর্ণ হয়, পদার্থটির নিরাপত্তা ঝুঁকি তত বেশি বৃদ্ধি পায়। ফলে চিকিৎসা শাস্ত্রে যেটিকে জীবন রক্ষাকারী ঔষধ বলা হয়, অসঙ্গত ব্যবহারে তা-ই স্নায়ুবিধ্বংসী মাদক হিসেবে পরিচিতি পায়।

Pharmacodynamics – Introduction to the Principles of Veterinary Pharmacology
ওষুধের কার্যকর মাত্রা ও বিষক্রিয়াজনক মাত্রার সম্পর্ক নির্দেশকারী ডোজ-প্রতিক্রিয়া বক্ররেখা। মধ্যক কার্যকর মাত্রা (ED₅₀) এবং মধ্যক বিষক্রিয়াজনক মাত্রার (TD₅₀) অনুপাত দ্বারা চিকিৎসাগত সূচক নির্ণয় করা হয়। সূচকটির মান তুলনামূলক কম হলে কার্যকর ও ক্ষতিকর মাত্রার মধ্যবর্তী নিরাপত্তা ব্যবধান সাধারণত সংকীর্ণ হয়।

এই কারণে চিকিৎসাগত সংজ্ঞায়ন সবসময় নির্ভর করে পদার্থের ক্রিয়া, ব্যবহারিক উদ্দেশ্য এবং মাত্রার ওপর। চিকিৎসাবিজ্ঞান কোনো বস্তুকে কেবল তার রাসায়নিক অণুর গঠনের ওপর ভিত্তি করে নিষিদ্ধ বা অনুমোদিত হিসেবে আলাদা করে না। একটি উপাদান কীভাবে রিসেপ্টরকে উদ্দীপিত করছে এবং তার ফলে হোমাস্ট্যাসিস বা দেহের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য কীভাবে বদলে যাচ্ছে, সেটাই চিকিৎসার মূল আলোচ্য। সহজ করে বললে, কোনো রাসায়নিক যখন কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে ব্যক্তির স্বাভাবিক চেতনা, বোধ ও শারীরিক নিয়ন্ত্রণকে পরাস্ত করে, তখন তা ক্লিনিকাল পর্যায় পেরিয়ে অপব্যবহারের পরিমণ্ডলে প্রবেশ করে।

কোনো পদার্থকে একটি সমাজ কীভাবে দেখবে, তা কেবল তার রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে না। একটা রাসায়নিক পদার্থ ড্রাগ নাকি সাধারণ ভেষজ, ক্ষতিকর নাকি গ্রহণযোগ্য, তা নির্ধারণ করে সমাজের ক্ষমতা কাঠামো, আইন ও অর্থনীতি। চিকিৎসাগত বাস্তবতা এবং সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে সব সময় একটা বড় ফারাক থাকে। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে মাদক কোনো অপরিবর্তনীয় বস্তু নয়, বরং এটা একটি সামাজিক নির্মাণ (Social construct)। হাওয়ার্ড বেকার (Howard Becker) তার বিখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক গ্রন্থে পরিষ্কার করেছিলেন যে বিচ্যুতি কোনো আচরণের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য নয়, বরং সমাজ কোনো আচরণের ওপর যে তকমা সেঁটে দেয়, সেটাই বিচ্যুতির জন্ম দেয় (Becker, 1963)। আইন ও প্রচলিত বিধিনিষেধের কারণে একটি পদার্থ কোনো এক ভৌগোলিক সীমায় অপরাধের উপাদান হয়, আবার সীমান্ত পেরোলেই তা পরিণত হয় সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্যে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিভিন্ন সমাজে কোনো কোনো মাদককে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করা হয়েছে, আবার কোনোটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে মারাত্মক অপরাধের কারণ হিসেবে। অ্যালকোহল ও তামাক অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলা সত্ত্বেও আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজগুলোতে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস এবং আইনগতভাবে সম্পূর্ণ বৈধ পণ্য। অথচ সমমানের বা তুলনামূলক কম ক্ষতিকর অনেক উদ্ভিজ্জ পদার্থকে আইনের চোখে মারাত্মক অপরাধ গণ্য করা হয়। থমাস সাস (Thomas Szasz) তার বিশ্লেষণে উল্লেখ করেন যে মধ্যযুগে রাষ্ট্র ও সমাজ যেভাবে ধর্মদ্রোহীদের দমন করত, আধুনিক রাষ্ট্র সেভাবেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের মুখোশ পরিয়ে নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক ব্যবহারকারীকে অপরাধী ও মানসিক রোগী হিসেবে চিহ্নিত করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে (Szasz, 1974)। অর্থাৎ, আইনের চোখে মাদকের শ্রেণিবিভাগ বৈজ্ঞানিক ক্ষতির চেয়েও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা দ্বারা বেশি চালিত হয়।

আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাবশালী সামাজিক শ্রেণিগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থ ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রবল প্রভাব বিস্তার করে। এরিক গুড (Erich Goode) দেখিয়েছেন যে কোনো পদার্থের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার পেছনে অধিকাংশ সময় কাজ করে সেই নির্দিষ্ট পদার্থের সাথে যুক্ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি সমাজের ভীতি (Goode, 2019)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে গাঁজার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে মেক্সিকান অভিবাসীদের প্রতি রাজনৈতিক আতঙ্ক ভূমিকা রেখেছিল, ঠিক যেমন আফিম নিষিদ্ধকরণের পেছনে কাজ করেছিল চীনা শ্রমিকদের প্রতি তৎকালীন অর্থনৈতিক বিদ্বেষ। এখানে রাসায়নিকের বিষাক্ততা মূল বিবেচ্য ছিল না, মূল চালিকাশক্তি ছিল সামাজিক আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টা।

এইভাবে একটি নিরপেক্ষ রাসায়নিক যৌগ আইন ও ক্ষমতার স্পর্শে এসে অপরাধের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। যখন একটি রাষ্ট্র কোনো উপাদানকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, তখন রাতারাতি সেই উপাদানের ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়। কিন্তু মানুষের রাসায়নিক গ্রহণের চাহিদা অদৃশ্য হয়ে যায় না। ফলে আইনের হস্তক্ষেপের মাধ্যমেই তৈরি হয় এক সুবিশাল চোরাবাজার, যেখানে পদার্থের গুণগত মানের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না এবং ঝুঁকির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। আইনগত সংজ্ঞায়ন তাই কেবল মাদক চিহ্নিত করে না, একই সাথে তৈরি করে অপরাধের নতুন রূপরেখা।

শারীরবৃত্তীয় ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস (Classification Based on Physiological and Psychological Effects)

স্নায়ুতন্ত্রের ওপর ক্রিয়া এবং মানুষের আচরণগত প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে ওষুধবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা মাদককে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করে থাকেন। এই বিভাজন কোনো নৈতিক বিচার নয়, বরং পদার্থটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে জাগিয়ে তুলছে নাকি শান্ত করছে, ব্যথাহীন করছে নাকি বাস্তবতার বোধ পাল্টে দিচ্ছে – তার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই চারটি প্রধান ভাগ হলো অবসাদক (Depressants), উত্তেজক (Stimulants), হ্যালুসিনোজেন (Hallucinogens) এবং বেদনানাশক (Analgesics)। প্রতিটি ভাগের কাজ করার নিজস্ব শারীরবৃত্তীয় মেকানিজম রয়েছে, যা মানবদেহের বিভিন্ন সিস্টেমের ওপর আলাদা প্রভাব ফেলে।

Classification of Psychoactive Substances | International Society of Substance Use Professionals
মনঃসক্রিয় পদার্থের প্রধান শ্রেণি ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর তাদের সাধারণ প্রভাবের তুলনা। অবসাদক স্নায়বিক কার্যকলাপ কমায়, উত্তেজক সতর্কতা ও উদ্দীপনা বৃদ্ধি করে, হ্যালুসিনোজেন সংবেদন ও উপলব্ধি পরিবর্তন করে এবং ওপিওয়েড বেদনানাশক ব্যথাসংকেতের পরিবহন ও উপলব্ধি নিয়ন্ত্রণ করে।

প্রথম শ্রেণিটি হলো অবসাদক বা বিষণ্ণতাজনক পদার্থ। এই গোত্রের রাসায়নিকগুলো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের গতি কমিয়ে দেয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অ্যালকোহল, বার্বিচুরেট এবং বিভিন্ন ধরনের বেঞ্জোডায়াজেপাইন। এই উপাদানগুলো মূলত মস্তিষ্কের প্রধান প্রতিরোধমূলক নিউরোট্রান্সমিটার গামা-অ্যামিনোবিউটাইরিক অ্যাসিড (Gamma-aminobutyric acid) বা গাবা (GABA) এর কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা কমে যায়, পেশি শিথিল হয়, দুশ্চিন্তা হ্রাস পায় এবং মানুষের সতর্কতা কমে আসে। তবে মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে এই শিথিলতা শ্বাসনালীকে পুরোপুরি অবশ করে দিতে পারে, যার পরিণতি মৃত্যু।

দ্বিতীয় শ্রেণিটি হলো উত্তেজক পদার্থ, যা স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্ষমতাকে দ্রুত বাড়িয়ে তোলে। কোকেন, অ্যামফিটামিন, মেথাম্ফেটামিন এবং ক্যাফেইন এই শ্রেণির অন্তর্গত। এরা মস্তিষ্কে ডোপামিন এবং নর-এপিনেফ্রিনের পুনঃশোষণ বা রিআপটেক (Reuptake) বন্ধ করে দেয়, যার ফলে নিউরনের সংযোগস্থলে এই রাসায়নিকগুলোর ঘনত্ব অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। ব্যক্তি তখন নিজেকে প্রবল শক্তিশালী, ক্লান্তিহীন এবং আত্মবিশ্বাসী ভাবতে শুরু করে। হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়, রক্তচাপ বাড়ে এবং ক্ষুধা চলে যায়। শরীর তার সংরক্ষিত শক্তির শেষ বিন্দু খরচ করে ফেলে, যার অবসান ঘটে চরম অবসাদ ও বিষাদের ভেতর দিয়ে।

তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিটি হলো হ্যালুসিনোজেন ও বেদনানাশক। এলএসডি, সাইলোসাইবিন কিংবা মেস্কালাইনের মতো হ্যালুসিনোজেনগুলো মস্তিষ্কের সেরোটোনিন রিসেপ্টরকে উত্তেজিত করে সংবেদনশীল অনুভূতির পরিবর্তন ঘটায়। মানুষ এমন কিছু দেখে বা শোনে, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব নেই। অন্যদিকে, আফিম, মরফিন ও হেরোইনের মতো বেদনানাশক উপাদান শরীরের এন্ডোরফিন সিস্টেমের অনুকরণ করে তীব্র যন্ত্রণা দূর করে এক ধরনের মিথ্যা স্বস্তি তৈরি করে। রিচার্ড ডেভেনপোর্ট-হাইনস (Richard Davenport-Hines) তার গবেষণায় দেখান যে মানব সমাজ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কখনো শরীর চাঙ্গা করতে, কখনো বাস্তবতার যন্ত্রণা ভুলতে এই বিভিন্ন রাসায়নিক শ্রেণির আশ্রয় নিয়েছে (Davenport-Hines, 2001)। প্রতিটি শ্রেণির প্রভাব ভিন্ন হলেও তাদের একটাই সাধারণ গুণ – তারা মানবদেহের প্রাকৃতিক রাসায়নিক ভারসাম্যকে সাময়িকভাবে ছিনতাই করে নেয়।

What Does Dopamine Actually Do? – Bliss Welness
মস্তিষ্কের পুরস্কার ও প্রেরণাসংশ্লিষ্ট স্নায়ুবর্তনীর প্রধান অঞ্চল। ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়া, নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্স এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের পারস্পরিক যোগাযোগ পুরস্কারনির্ভর শিক্ষা ও প্রেরণায় ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন আসক্তি-সৃষ্টিকারী পদার্থ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই ব্যবস্থার কার্যক্রম পরিবর্তন করতে পারে।

নির্ভরতা ও ক্ষতির মাত্রাভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস (Classification Based on Dependency and Harm Potential)

কোনো রাসায়নিক গ্রহণ করলে তা আসক্তি তৈরি করবে কি না এবং শরীরের কতটা অপূরণীয় ক্ষতি করবে, তার ওপর ভিত্তি করে ড্রাগকে শ্রেণিবদ্ধ করা আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম বড় কাজ। চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন আসক্তিকে ব্যক্তিগত দোষ হিসেবে না দেখে একটি দীর্ঘস্থায়ী স্নায়বিক রোগ হিসেবে বিবেচনা করে। যখন কোনো পদার্থ নিয়মিত ব্যবহার করা হয়, তখন মানব শরীর সেই রাসায়নিকের উপস্থিতিতেই নিজের স্বাভাবিক কাজ চালাতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। এই অবস্থাকে বলা হয় শারীরিক নির্ভরতা (Physical dependence)। এর পাশাপাশি তৈরি হয় মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতা (Psychological dependence), যেখানে ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট পদার্থ ছাড়া মানসিক স্বস্তি বা স্বাভাবিক বোধ করতে পারে না।

পদার্থটির কার্যকারিতা বজায় রাখতে যখন ক্রমাগত মাত্রা বাড়াতে হয়, বিজ্ঞানের পরিভাষায় তাকে বলে সহনশীলতা (Tolerance)। সহনশীলতা তৈরি হওয়ার পর যদি হঠাৎ ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন শরীরে মারাত্মক উপসর্গ দেখা দেয়, যাকে বলা হয় প্রত্যাহার লক্ষণ (Withdrawal symptoms)। হেরোইন বা অ্যালকোহলের ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলো অত্যন্ত তীব্র ও যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে। শরীর তখন সেই রাসায়নিক পাওয়ার জন্য আর্তনাদ করে। কোষগুলোর এই শারীরবৃত্তীয় চাহিদাই মানুষকে বাধ্য করে বারবার সেই বিষের কাছে ফিরে যেতে, যা সাধারণ দৃষ্টিতে অপরাধপ্রবণতা মনে হলেও চিকিৎসাগত দৃষ্টিতে গুরুতর জৈবিক দাসত্ব।

মাদকের ক্ষতিকর দিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অতীতে বহু বিভ্রান্তি ছিল। কিন্তু আধুনিক গবেষকরা একে বৈজ্ঞানিক কাঠামোর ভেতর নিয়ে এসেছেন। যুক্তরাজ্যের প্রখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী ডেভিড নাট (David Nutt) এবং তার সহকর্মীরা একটি গবেষণায় বিশটি মাদকের সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিমাপ করেছিলেন (Nutt et al., 2007)। তারা কেবল ব্যক্তির শরীরের ক্ষতি বিবেচনা করেননি, বরং মাদকের কারণে হওয়া পারিবারিক সহিংসতা, অর্থনৈতিক ক্ষতি, পরিবেশ দূষণ এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলাকেও মাপকাঠিতে এনেছিলেন। সেখানে দেখা গেছে, অনেক অবৈধ মাদকের চেয়ে আইনগতভাবে স্বীকৃত অ্যালকোহল ও তামাক সামগ্রিক ক্ষতির বিচারে সমাজের অনেক বেশি সর্বনাশ ডেকে আনে।

ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণে আরেকটি জরুরি মানদণ্ড হলো প্রাণঘাতী মাত্রা এবং কার্যকারী মাত্রার অনুপাত বা নিরাপত্তা অনুপাত (Safety ratio)। যেমন, হেরোইনের ক্ষেত্রে যে মাত্রায় নেশা হয়, তার চেয়ে সামান্য বেশি মাত্রা গ্রহণ করলেই ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে; অর্থাৎ এর মার্জিন অব সেফটি খুবই সংকীর্ণ। অপরদিকে ক্যানাবিসের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মাত্রার কারণে সরাসরি মৃত্যুর ঝুঁকি শারীরবৃত্তীয়ভাবে প্রায় অসম্ভব। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই বস্তুনিষ্ঠ তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে ক্ষতিকর ক্ষমতার মাত্রা কোনো অনুমানের বিষয় নয়, বরং এটা একটি নিরেট জৈব-রাসায়নিক পরিমাপ। এই শ্রেণিবিন্যাস তাই আইনপ্রণেতাদের আবেগের বাইরে গিয়ে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর বাস্তবসম্মত কৌশল বা ক্ষতি হ্রাস (Harm reduction) নীতি তৈরিতে পথ দেখায়।

বিংশ শতাব্দীতে এসে মাদক নিয়ন্ত্রণ কোনো একক রাষ্ট্রের বিষয় থাকেনি, তা পরিণত হয়েছে একটি ভূ-রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের জাল হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ বা জাতিসংঘ এই নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। এর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয় ১৯৬১ সালের একক মাদক কনভেনশন (Single Convention on Narcotic Drugs) এর মাধ্যমে। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস কনভেনশন এবং ১৯৮৮ সালের মাদক পাচারবিরোধী কনভেনশনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী মাদকের উৎপাদন, বণ্টন এবং ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কঠোর আইনি স্তরবিন্যাস তৈরি করা হয়। রবিন রুম (Robin Room) এই আন্তর্জাতিক কাঠামোর গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো কীভাবে মাদকের জটিল স্বাস্থ্য সমস্যাকে একটি একক অপরাধ দমন নীতিতে রূপান্তরিত করেছে (Room, 2005)।

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অধীনে মাদকগুলোকে মূলত চারটি তফসিলে ভাগ করা হয়, যা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে পরিচিত হলেও কাঠামোগতভাবে প্রায় একই। তফসিল এক (Schedule I) এর আওতায় রাখা হয় সেই সমস্ত পদার্থকে, যেগুলোর অপব্যবহারের সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি কিন্তু কোনো স্বীকৃত চিকিৎসাগত মূল্য নেই বলে ধরে নেওয়া হয়। হেরোইন, এলএসডি কিংবা মেস্কালাইনের মতো পদার্থকে এই স্তরে রাখা হয়। অথচ বিপরীত দিকে, মরফিন বা মেথাডনের মতো উচ্চ আসক্তি তৈরি করা পদার্থগুলোকে রাখা হয় চিকিৎসাগত উপযোগিতা থাকার কারণে তুলনামূলক নমনীয় তফসিলে। এই বিভাজন আইনত কার্যকর হলেও এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে গবেষকদের মাঝে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে।

আন্তর্জাতিক এই নিয়ন্ত্রণের স্তরবিন্যাসে একটি দৃশ্যমান ঐতিহাসিক পক্ষপাত লক্ষ্য করা যায়। পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রচলিত অ্যালকোহল বা তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব সত্ত্বেও সেগুলোকে কখনোই এই আন্তর্জাতিক তফসিলে আনা হয়নি। বিপরীতে, এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার স্থানীয় সংস্কৃতিতে বহু শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত হওয়া কোকা পাতা, আফিম কিংবা ক্যানাবিসকে দ্রুততম সময়ে বৈশ্বিক অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে। এর পেছনে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের চেয়ে পশ্চিমা ওষুধ শিল্পের বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক আধিপত্য বেশি কাজ করেছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত প্রাকৃতিক ও ভেষজ উপাদানগুলোকে সরিয়ে সেখানে কৃত্রিম ফার্মাসিউটিক্যালসের একচেটিয়া বাজার তৈরির ইতিহাস এই আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যেই নিহিত।

আন্তর্জাতিক এই আইনি কাঠামোর কঠোরতা সত্ত্বেও গত কয়েক দশকে এর অকার্যকারিতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল মাদকের চোরাচালান ও সরবরাহ শূন্যে নামিয়ে আনা। কিন্তু বাস্তবে তা সরবরাহ কমাতে পারেনি, বরং চোরাচালানি নেটওয়ার্ককে আরও পেশাদার ও নিষ্ঠুর করে তুলেছে। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উরুগুয়ে, কানাডা কিংবা ইউরোপের বেশ কিছু দেশ আন্তর্জাতিক তফসিলে থাকা সত্ত্বেও গাঁজা বা নির্দিষ্ট কিছু পদার্থের ব্যক্তিগত ব্যবহারকে অপরাধের তালিকা থেকে মুক্ত করতে শুরু করেছে। আইন যে বাস্তবতার সাথে না মিললে অকার্যকর হতে বাধ্য, আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস তার এক নিখুঁত দলিল।

সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ও প্রাচীন উদ্ভিজ্জ মাদকের বিবর্তন (Cultural Context and Evolution of Ancient Botanical Drugs)

মানুষ এবং চেতনাশোধনকারী উদ্ভিদের সহাবস্থান মানবজাতির সামগ্রিক বিবর্তনের ইতিহাসের সাথে অবিচ্ছেদ্য। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ নিজের পরিবেশের ভেতর থাকা বিভিন্ন উদ্ভিদ চেখে দেখেছে, সেগুলোর ক্রিয়া পরীক্ষা করেছে এবং টিকে থাকার লড়াইয়ে সেগুলোকে ব্যবহার করেছে। আফিম পপি, কোকা গাছ, গাঁজা বা ক্যানাবিস এবং বিভিন্ন ফার্মান্টেড পানীয় কোনো অলৌকিক উৎস থেকে আসেনি; এগুলো পৃথিবীর মাটির স্বাভাবিক উৎপাদন। ডেভিড কোর্টরাইট (David Courtwright) তার গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে একসময় স্থানীয়ভাবে ব্যবহৃত উদ্ভিজ্জ ড্রাগগুলো আধুনিক যুগের সূচনায় বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হলো এবং সামগ্রিক মানব ইতিহাসকে বদলে দিল (Courtwright, 2001)। মানুষের ক্লান্তি দূর করতে, দীর্ঘ পথ চলায় ক্ষুধা চেপে রাখতে কিংবা তীব্র শীত থেকে বাঁচতে এই উদ্ভিদগুলোর ব্যবহার ছিল মূলত টিকে থাকার এক বস্তুনিষ্ঠ জৈবিক চেষ্টা।

প্রাচীন শিকারী-সংগ্রাহক কিংবা কৃষিভিত্তিক সমাজগুলোতে বিভিন্ন গাছের রস বা ধোঁয়া গ্রহণ করা হতো দলগত সংহতি বাড়াতে এবং সামাজিক সংযোগ রক্ষা করতে। আদিম মানুষ যখন কোনো নির্দিষ্ট উদ্ভিদ খেয়ে অদ্ভুত শারীরিক প্রতিক্রিয়া ও অবাস্তব অনুভূতি পেত, প্রাকৃতিক কার্যকারণ ব্যাখ্যা করতে না পেরে তারা সেই অভিজ্ঞতাকে গোষ্ঠীগত আচারের অংশ করে নিত। সমাজবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে এই ধরনের চর্চা কোনো অলৌকিক সত্য ছিল না, বরং তা ছিল প্রকৃতির অজানা শক্তির ভয় দূর করার এবং সামাজিক শৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখার একটি প্রাচীন মনস্তাত্ত্বিক মাধ্যম। পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার শ্রমিকরা যেমন তীব্র উচ্চতায় অক্সিজেন স্বল্পতা ও খিদের জ্বালা সহ্য করতে শত শত বছর ধরে কোকা পাতা চিবিয়েছে, তেমনই সাইবেরিয়ার শীতপ্রধান অঞ্চলের মানুষ প্রতিকূল আবহাওয়া সামলাতে বুনো ছত্রাকের সাহায্য নিয়েছে।

উনবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের অগ্রগতি, বিশেষ করে রসায়নবিদ্যার বিকাশের সাথে সাথে এই প্রাকৃতিক উদ্ভিদের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। ১৮০৫ সালে জার্মান ফার্মাসিস্ট ফ্রিডরিখ সার্টার্নার কাঁচা আফিম থেকে মরফিন অ্যালকালয়েড আলাদা করতে সক্ষম হন। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রাকৃতিক ভেষজ থেকে বিশুদ্ধ রাসায়নিক যৌগ নিষ্কাশনের যুগ। এর পর একে একে কোকা পাতা থেকে কোকেন এবং নানা শক্তিশালী রাসায়নিক ল্যাবরেটরিতে তৈরি হতে থাকে। ভার্জিনিয়া বেরিজ (Virginia Berridge) দেখিয়েছেন কীভাবে ঊনবিংশ শতাব্দীতে সাধারণ মানুষের অনিয়ন্ত্রিত আফিম ব্যবহারের অভ্যাস হঠাৎ করেই পেশাদার ডাক্তারদের কর্তৃত্বাধীন একটি নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসাগত পণ্যে পরিণত হয় (Berridge, 1999)। যখনই উদ্ভিদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাসায়নিকগুলো তাদের বিশুদ্ধ ও ঘনীভূত রূপ নিল, তখনই তাদের আসক্তি তৈরির ক্ষমতা এবং ধ্বংসাত্মক রূপ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেল।

শিল্প বিপ্লব এবং বিশ্ব পুঁজিবাদের প্রসারের ফলে এই রাসায়নিক উপাদানগুলো রূপান্তরিত হয় বিশাল বৈশ্বিক পণ্যে। যে গাছগুলো একসময় নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল, উপনিবেশবাদের হাত ধরে সেগুলো বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের ভোগের বস্তুতে পরিণত হয়। সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো দেখল যে এই পদার্থগুলোর প্রতি মানুষের শারীরিক ও মানসিক আসক্তিকে পুঁজি করে বিপুল সম্পদ আহরণ করা সম্ভব। ফলস্বরূপ, মানুষের প্রাচীন জৈবিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ভেঙে গিয়ে মাদকের আধুনিক বাজারজাতকরণ শুরু হলো। যে ভেষজ একসময় জীবনযাপনের সাধারণ সঙ্গী ছিল, তা বিবর্তিত হয়ে আধুনিক যুগে অপরাধ, কালো টাকা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের একটি কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

ঔষধি ও অনৌষধি মাদক (Medicinal and Non-Medicinal Drugs): ব্যবহার ও অপব্যবহার

ঔষধ ও মাদকের দ্বৈত চরিত্র এবং ব্যবহারিক সীমারেখা (Dual Character of Medicine and Drugs and Operational Boundaries)

ষোড়শ শতকের সুইস চিকিৎসক প্যারাসেলসাস একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, প্রকৃতির সব বস্তুই বিষ, এমন কিছু নেই যাতে বিষ নেই; কেবল সঠিক মাত্রাই ঠিক করে কোনো বস্তু বিষ হবে নাকি ঔষধ। এই পর্যবেক্ষণ রাসায়নিক যৌগের ক্ষেত্রে এক অকাট্য সত্য। রসায়নাগারে তৈরি হওয়া একটি অণু নিজে থেকে কোনো নৈতিক চরিত্র ধারণ করে না। সেই অণুটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে নিরাময় ঘটাবে নাকি বিনাশ ডেকে আনবে, তা নির্ধারিত হয় গ্রহণের উদ্দেশ্য, মাত্রা এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটের দ্বারা। আধুনিক সমাজে আমরা যাকে ‘ঔষধ’ বলে ফার্মেসি থেকে কিনি, আর যেটাকে ‘মাদক’ বলে আদালতের কাঠগড়ায় তুলি – তাদের আণবিক গঠনে অনেক সময় কোনো মৌলিক পার্থক্য থাকে না। পার্থক্য তৈরি হয় ব্যবস্থাপত্র, ব্যবহারকারীর অভিপ্রায় এবং রাষ্ট্রীয় অনুমোদনের সীমানায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় কোনো রোগের লক্ষণ উপশম, শারীরবৃত্তীয় ত্রুটি সংশোধন বা শারীরিক যন্ত্রণা লাঘব করার জন্য যখন কোনো রাসায়নিক গ্রহণ করা হয়, তখন তাকে চিকিৎসাগত ব্যবহার (Therapeutic use) বলা হয়। বিপরীতে, রোগ নিরাময় ছাড়া কেবল মনোদৈহিক অনুভূতির পরিবর্তন, অলীক আনন্দ লাভ বা বাস্তবতার চাপ এড়ানোর উদ্দেশ্যে রাসায়নিক ব্যবহার করা হলে তা চিহ্নিত হয় বিনোদনমূলক ব্যবহার (Recreational use) বা অপব্যবহার হিসেবে। লেসলি আইভারসেন (Leslie Iversen) তার গবেষণায় বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে কীভাবে একই মনস্তাত্ত্বিক রাসায়নিক উপাদান ভিন্ন প্রেক্ষাপটে দুটি বিপরীত অর্থ বহন করে (Iversen, 2008)। কোনো অস্ত্রোপচারের পর রোগীকে তীব্র ব্যথা থেকে মুক্তি দিতে দেওয়া ফেন্টানাইল হলো একটি অপরিহার্য জীবনরক্ষাকারী ঔষধ। কিন্তু সেই একই ফেন্টানাইল যখন একজন সুস্থ মানুষ গভীর মানসিক অসাড়তা পেতে অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় গ্রহণ করে, তখন তা পরিণত হয় এক মরণঘাতী মাদকে।

অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার স্বাভাবিক গতিপথ থেকেই অনিচ্ছাকৃতভাবে অপব্যবহারের জন্ম হয়। চিকিৎসার অংশ হিসেবে দীর্ঘমেয়াদে কোনো নিয়ন্ত্রিত ঔষধ গ্রহণের ফলে রোগীর শরীরে রাসায়নিক নির্ভরতা গড়ে উঠতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই পরিস্থিতিকে বলা হয় চিকিৎসাজনিত নির্ভরতা (Iatrogenic dependence)। একজন ব্যক্তি হয়তো কোনো তীব্র মেরুদণ্ডের ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে নির্দিষ্ট সময় ব্যথানাশক ওষুধ খেয়েছিলেন। কিন্তু একসময় দেখা যায়, শারীরিক ব্যথা সেরে গেলেও তার স্নায়ুতন্ত্র সেই রাসায়নিকের ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে যে ওষুধ বন্ধ করলেই শুরু হয় ভয়াবহ প্রত্যাহারজনিত শারীরিক সংকট। ফলে নিরাময়ের জন্য শুরু হওয়া প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যন্ত মাদকাসক্তির ফাঁদে রূপ নেয়। এখানে অপরাধের কোনো পূর্বপরিকল্পনা থাকে না, বরং ওষুধের নিজস্ব ফার্মাকোলজিক্যাল চরিত্রের কারণেই এই পরিবর্তন ঘটে।

সমাজতাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, ঔষধ এবং মাদকের এই সীমারেখাটি কোনো স্থির রেখা নয়। এটি সংস্কৃতি ও সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বদলে যায়। অ্যান্ড্রু ওয়েইল (Andrew Weil) তার তত্ত্বে দেখান যে মানুষের মধ্যে নিজের চেতনা পরিবর্তন করার এক সহজাত আকাঙ্ক্ষা কাজ করে, যা শৈশবের ঘূর্ণিপাক খেলা থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের নানা অভ্যাসে দৃশ্যমান হয় (Weil, 1998)। সমাজ এই আকাঙ্ক্ষার কিছু রূপকে ঔষধ বা নির্দোষ পানীয় হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, আবার কিছু রূপকে চিহ্নিত করে ধ্বংসাত্মক বিচ্যুতি হিসেবে। ফলে রাসায়নিকের ক্রিয়া নয়, বরং সমাজের রাজনৈতিক ও আইনি কাঠামোই ঠিক করে দেয় কোনটি নিরাময়ের পথ্য আর কোনটি অপরাধের প্রতীক। এই দ্বৈত চরিত্রটি অনুধাবন না করলে ঔষধের অপব্যবহার সমস্যার বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।

প্রেসক্রিপশন ওষুধের বিস্তার ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ভূমিকা (Proliferation of Prescription Drugs and Role of Healthcare Systems)

বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং ওষুধ শিল্পের ব্যাপক অগ্রগতির ফলে বিশ্বজুড়ে প্রেসক্রিপশন ড্রাগ বা ব্যবস্থাপত্রভুক্ত ওষুধের ব্যবহার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। আধুনিক জীবনযাপনের জটিলতা, মানসিক চাপ, অনিদ্রা এবং শারীরিক ব্যথার মতো সমস্যাগুলোকে অতি দ্রুত সমাধান করার তাগিদ তৈরি হয়। এই প্রবণতা সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় চিকিৎসায়ন (Medicalization) নামে পরিচিত। মানুষের স্বাভাবিক দুঃখ, উদ্বেগ বা জীবনের দৈনন্দিন টানাপোড়েনকে যখন নিছক জৈবিক ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিত করে ওষুধের মাধ্যমে নিরাময়যোগ্য বলে প্রচার করা হয়, তখন সমাজজুড়ে কৃত্রিম রাসায়নিকের চাহিদা বেড়ে যায়। চিকিৎসকরা রোগীদের মানসিক সংকট শোনার চেয়ে একটি দ্রুত ব্যবস্থাপত্র লিখে দেওয়াকে সহজ সমাধান ভাবতে শুরু করেন।

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ উত্তর আমেরিকার সাম্প্রতিক ওপিওয়েড মহামারী। ১৯৯০-এর দশকে পারডিউ ফার্মা নামক একটি বহুজাতিক ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘অক্সিকন্টিন’ নামের একটি শক্তিশালী ব্যথানাশক বাজারে নিয়ে আসে। তারা চিকিৎসকদের আশ্বস্ত করেছিল যে এই ওষুধে আসক্তির ঝুঁকি এক শতাংশেরও কম। ব্যারি পেয়ার্স (Barry Meier) তার অনুসন্ধানী গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে তথ্য গোপন এবং আক্রমণাত্মক বাণিজ্যিক বিপণনের মাধ্যমে চিকিৎসকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল রোগীদের নির্বিচারে শক্তিশালী ওপিওয়েড ব্যথানাশক লিখে দিতে (Meier, 2018)। ব্যথানাশকটিকে তখন সাধারণ পেশির ব্যথা বা দাঁতের ব্যথার জন্যও প্রেসক্রিপশনে দেওয়া শুরু হয়। এর ফলাফল হয় বিপর্যয়কর। লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ কোনো অবৈধ মাদক চক্রের সাথে যুক্ত না হয়েও কেবল পারিবারিক চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করতে গিয়ে মারাত্মক মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন।

চিকিৎসা ব্যবস্থার ভেতরেই যখন কোনো বিপজ্জনক রাসায়নিক প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা পায়, তখন তার অপব্যবহার রোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। ব্যথানাশক ছাড়াও উদ্বেগ কমানোর জন্য ব্যবহৃত বেঞ্জোডায়াজেপাইন গোত্রের ঔষধ – যেমন ডায়াজেপাম, আলপ্রাজোলাম বা ক্লোনাজিপাম – এবং মনোযোগ ঘাটতিজনিত সমস্যার জন্য ব্যবহৃত উত্তেজক ওষুধ যেমন অ্যাডেরাল বা রিটালিন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বহু মানুষ চিকিৎসকের অজান্তে দিনের পর দিন এই ওষুধগুলোর মাত্রা বাড়াতে থাকেন। শরীর যখন ওষুধের উচ্চ মাত্রার সাথে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ধরে রাখতেই এই রাসায়নিকগুলোর নিয়মিত সরবরাহ প্রয়োজন হয়। রোগীর কাছে তখন নিরাময় আর আসক্তির ফারাকটুকু পুরোপুরি মুছে যায়।

প্রেসক্রিপশন ওষুধের বিস্তার একসময় অবৈধ মাদক বাজারের প্রধান জোগানদাতার ভূমিকা নিতে শুরু করে। যখন মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশন নবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানান, তখন আসক্ত ব্যক্তিরা বিকল্প পথের সন্ধান করে। বৈধভাবে ওষুধ না পেয়ে তারা কালোবাজার থেকে অবৈধ ট্যাবলেট সংগ্রহ করতে শুরু করে, যা একসময় তাদের সরাসরি হেরোইন বা নিষিদ্ধ ফেন্টানাইলের দিকে ঠেলে দেয়। স্যাম কুইনোনস (Sam Quinones) এই ট্র্যাজেডি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কীভাবে বৈধ প্রেসক্রিপশন ওষুধ শেষ পর্যন্ত মেক্সিকান ব্ল্যাক টার হেরোইনের এক সুবিশাল ভোক্তাশ্রেণী তৈরি করে দিয়েছিল (Quinones, 2015)। একটি আইনি এবং নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা কীভাবে অজান্তে অবৈধ মাদক সাম্রাজ্যের পথ সুগম করতে পারে, এই ঐতিহাসিক ঘটনা তার এক জলজ্যান্ত দলিল।

বিনোদনমূলক মাদক ব্যবহারের আর্থ-সামাজিক গতিপ্রকৃতি (Socio-Economic Dynamics of Recreational Drug Use)

অনৌষধি বা বিনোদনমূলক মাদক ব্যবহারের পেছনে কাজ করে ভিন্ন এক আর্থ-সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাকরণ। মানুষ কেন এমন কিছু গ্রহণ করে যা রোগ নিরাময় করে না, বরং শরীরের ক্ষতি করার প্রবল ঝুঁকি রাখে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে মানুষের আনন্দ লাভের অন্বেষণ, সামাজিক মেলামেশা এবং আধুনিক জীবনের বিচ্ছিন্নতাবোধকে বুঝতে হয়। উৎসব, সামাজিক আড্ডা কিংবা নির্দিষ্ট কোনো উপসংস্কৃতির অংশ হিসেবে মানুষ বহু প্রাচীনকাল থেকেই অ্যালকোহল, গাঁজা বা বিভিন্ন ধরনের উত্তেজক গ্রহণ করে এসেছে। এখানে মূল উদ্দেশ্য অসুস্থতা দূর করা নয়, বরং দৈনন্দিন একঘেয়েমি ভেঙে সাময়িক উত্তেজনা লাভ কিংবা বন্ধুদের সাথে একটি কৃত্রিম সংযোগ অনুভব করা।

আধুনিক নগর সংস্কৃতিতে তরুণ প্রজন্মের মাঝে বিনোদনমূলক মাদকের ব্যবহারকে সমাজবিজ্ঞানীরা একটি নির্দিষ্ট লেন্স থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। হাওয়ার্ড পার্কার (Howard Parker) এবং তার সহ-গবেষকরা তাদের তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে পশ্চিমা বিশ্বে নির্দিষ্ট কিছু মাদকের ব্যবহার আর কোনো বিচ্যুত বা অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠীর কাজ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পরিণত হয়েছে এক ধরনের স্বাভাবিক বা সাধারণ অভ্যাসে (Parker et al., 1998)। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বলা হয় স্বাভাবিকীকরণ তত্ত্ব (Normalization theory)। উইকএন্ডে পার্টিতে গিয়ে ড্রাগ নেওয়া কিংবা তীব্র কর্মব্যস্ত সপ্তাহের শেষে একটু স্বস্তি পেতে কৃত্রিম রাসায়নিকের সাহায্য নেওয়াকে অনেক সমাজে এখন আর অস্বাভাবিক কিছু মনে করা হয় না। অর্থাৎ, বিনোদনমূলক ব্যবহার ধীরে ধীরে ভোক্তা সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।

তবে বিনোদনমূলক ব্যবহারের ধরনের মধ্যেও তীব্র শ্রেণিভেদ বিদ্যমান। সমাজের বিত্তবান ও সুবিধাপ্রাপ্ত অংশের বিনোদনমূলক মাদকের ধরন এবং প্রান্তিক দরিদ্র শ্রেণির ব্যবহারের বাস্তবতা এক নয়। উচ্চবিত্তের পার্টিগুলোতে কোকেন কিংবা দামি সিন্থেটিক রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় উৎসবের আবহ তৈরি করতে, যাকে সমাজের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও অনেক সময় নমনীয় দৃষ্টিতে দেখে। অন্যদিকে, দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের বিনোদনমূলক ব্যবহার অনেক সময় পরিচালিত হয় বেঁচে থাকার তীব্র মানসিক চাপ, হতাশা এবং বঞ্চনা ভোলার তাড়না থেকে। তাদের ব্যবহৃত সস্তা ও ভেজাল মিশ্রিত মাদক আইনগতভাবে কঠোর নিপীড়নের মুখে পড়ে। ফলে বিনোদনমূলক মাদক কেবল আনন্দের মাধ্যম নয়, তা সামাজিক অসমতারও একটি স্পষ্ট নির্দেশক।

পুঁজিবাদী শ্রম ব্যবস্থার সাথেও বিনোদনমূলক ব্যবহারের এক অদ্ভুত যোগসূত্র রয়েছে। আধুনিক করপোরেট ও প্রযুক্তি খাতে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মাত্রার মানসিক চাপ নিয়ে কাজ করতে হয়। উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে অনেক কর্মী বিভিন্ন ধরনের উত্তেজক পদার্থকে তাদের কাজের সঙ্গী বানিয়ে নেন। কাজ শেষে যখন তীব্র অনিদ্রা ও ক্লান্তি চেপে বসে, তখন মনকে শান্ত করতে প্রয়োজন হয় কোনো অবসাদক পদার্থের। এভাবে জীবনধারণের স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে মানুষ তার স্নায়ুতন্ত্রকে সচল রাখতে এবং সাময়িক আনন্দ পেতে কৃত্রিম রাসায়নিকের ওপর নির্ভরশীল হয়। বিনোদন তখন আর নিছক শখ থাকে না, তা হয়ে ওঠে ক্লান্তিকর উৎপাদন ব্যবস্থার ক্লান্তি মোছার এক বিপজ্জনক অবলম্বন।

ওষুধের অপব্যবহার ও স্বচিকিৎসার ঝুঁকি (Drug Misuse and Risks of Self-Medication)

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে কোনো প্রেসক্রিপশন ওষুধ গ্রহণ করা অথবা চিকিৎসকের দেওয়া মাত্রার চেয়ে বেশি বা দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করাকে বলা হয় ওষুধের অপব্যবহার। অনেকেই ভাবেন, যেহেতু এই ওষুধগুলো ফার্মেসিতে বৈধভাবে বিক্রি হয়, তাই এগুলো বোধহয় রাজপথের অবৈধ মাদকের মতো বিপজ্জনক নয়। এই ভ্রান্ত ধারণাটিই অপব্যবহারকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। না জেনে বা ভুল উদ্দেশ্যে ওষুধ খাওয়ার এই প্রবণতাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় স্ব-চিকিৎসা বা সেলফ-মেডিকেশন (Self-medication)। তীব্র অনিদ্রা, সামাজিক ভীতি, ব্যক্তিগত দুঃখবোধ বা বিষণ্ণতা কাটানোর জন্য অনেকেই নিকটস্থ ফার্মেসি থেকে ঘুমের ওষুধ বা প্রশান্তিদায়ক ট্যাবলেট কিনে খেতে শুরু করেন, যার পরিণতি হয় মারাত্মক।

মানুষ কেন নিজে থেকেই কোনো রাসায়নিকের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড খানৎসিয়ান (Edward Khantzian) একটি প্রভাবশালী ধারণা প্রস্তাব করেন, যা পরিচিত স্ব-চিকিৎসা অনুকল্প (Self-medication hypothesis) নামে (Khantzian, 1985)। তার মতে, কোনো মানুষ হঠাৎ করে কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া মাদক নেয় না। ব্যক্তি মূলত তার ভেতরের কোনো অসহ্য মানসিক যন্ত্রণা বা মানসিক ক্ষত উপশম করার চেষ্টা থেকেই নির্দিষ্ট কোনো রাসায়নিক বেছে নেয়। যে ব্যক্তি তীব্র ক্রোধ বা উদ্বেগে ভোগে, সে হয়তো অবচেতনভাবেই নিজেকে শান্ত করতে হেরোইন বা ওপিওয়েডের মতো অবসাদক বেছে নেয়। আবার যে ব্যক্তি গভীর বিষণ্ণতায় জর্জরিত, সে সাময়িক উদ্দীপনার জন্য কোকেন বা অ্যামফিটামিনের মতো উত্তেজক ব্যবহার করে। অর্থাৎ, অপব্যবহারের পেছনে লুকিয়ে থাকে অব্যক্ত যন্ত্রণার এক স্বতঃপ্রণোদিত কিন্তু ভুল চিকিৎসাপদ্ধতি।

অনিয়ন্ত্রিত স্ব-চিকিৎসার ফলে দ্রুতই মানবদেহে তৈরি হয় সহনশীলতা (Tolerance)। যে মাত্রার ওষুধ শুরুতে স্বস্তি দিত, কিছুদিন পর সেই একই ওষুধ আর কোনো কাজ করে না। তখন মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো স্বাভাবিক অনুভূতির জন্য আরও বেশি মাত্রার রাসায়নিক দাবি করে। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো পারস্পরিক সহনশীলতা (Cross-tolerance), যেখানে একটি নির্দিষ্ট ওষুধের প্রতি শরীর অভ্যস্ত হয়ে উঠলে সমগোত্রীয় অন্যান্য ওষুধের কার্যকারিতাও হ্রাস পায়। এর পাশাপাশি জন্ম নেয় নানাবিধ শারীরিক জটিলতা; যকৃতের ক্ষতি, কিডনি বিকল হওয়া এবং স্মৃতিভ্রষ্টতা এর সাধারণ লক্ষণ। দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের ওষুধ অপব্যবহারের পর হঠাৎ তা বন্ধ করে দিলে তীব্র খিঁচুনি এবং মানসিক বিভ্রম দেখা দিতে পারে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন মানুষ একাধিক ওষুধ একসাথে মিশিয়ে ব্যবহার করে, যাকে বলা হয় পলি-ড্রাগ অপব্যবহার। উদাহরণস্বরূপ, অনেকে ঘুমের ওষুধের কার্যকারিতা বাড়াতে তার সাথে অ্যালকোহল গ্রহণ করে। অ্যালকোহল এবং বেঞ্জোডায়াজেপাইন – উভয়ই মস্তিষ্কের শ্বাসযন্ত্র নিয়ন্ত্রণকারী কেন্দ্রকে অবদমিত করে। এই দুটি অবসাদকের যৌথ আক্রমণ অনেক সময় ব্যক্তির অজান্তেই গভীর ঘুমের মধ্যে তার শ্বাসপ্রশ্বাস পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয় শ্বাসযন্ত্রীয় অবদমন বা রেসপিরেটরি ডিপ্রেশন। আধুনিক যুগে প্রেসক্রিপশন ড্রাগের অতিরিক্ত মাত্রায় মৃত্যুর পেছনে এই বিপজ্জনক স্ব-চিকিৎসা এবং সম্মিলিত অপব্যবহারই প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত।

ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্বন্দ্ব (Conflicts between Pharmaceutical Industry and Regulatory Agencies)

ঔষধের উৎপাদন ও বিতরণ এমন এক অর্থনৈতিক খাতের অংশ, যার মূল চালিকাশক্তি মুনাফা। বিশ্বজুড়ে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো যেমন একদিকে যুগান্তকারী জীবনরক্ষাকারী ঔষধ আবিষ্কার করে বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটিয়েছে, তেমনই অন্যদিকে তাদের অতি মুনাফালোভী চরিত্র বহু সময় জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। যেকোনো নতুন ড্রাগ বাজারে আসার আগে তার কার্যকারিতা এবং ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যাচাই করার দায়িত্ব থাকে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফডিএ। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সাথে বহুজাতিক ওষুধ প্রস্তুতকারকদের স্বার্থের এক জটিল দ্বন্দ্ব বিদ্যমান।

অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমাজবিজ্ঞানে এই দ্বন্দ্বকে ব্যাখ্যা করা হয় নিয়ন্ত্রক জিম্মিদশা (Regulatory capture) ধারণার মাধ্যমে। পল স্টার (Paul Starr) তার গবেষণায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে কর্পোরেট বাণিজ্য এবং পেশাদার চিকিৎসা সমিতিগুলো ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াতেই জনস্বাস্থ্যের নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে নিজেদের স্বার্থানুকূল করে গড়ে তোলে (Starr, 1982)। যখন একটি ওষুধ কোম্পানি কোনো নতুন ব্যথানাশক বা মনস্তাত্ত্বিক ওষুধের পেটেন্ট পায়, তখন নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে সর্বোচ্চ মুনাফা তুলে নেওয়ার তাগিদ থাকে তাদের। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ, লবিং এবং গবেষণা তহবিলের প্রলোভন দেখিয়ে ওষুধের বিপজ্জনক দিকগুলোকে অনেক সময় আড়াল করা হয় বা ছোট করে দেখানো হয়।

আরেকটি বড় অনৈতিক কৌশল হলো অফ-লেবেল বিপণন (Off-label marketing)। নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোনো ওষুধকে হয়তো নির্দিষ্ট একটি বিরল রোগের জন্য অনুমোদন দেয়, কিন্তু ওষুধ কোম্পানিগুলো গোপনে চিকিৎসকদের প্ররোচিত করে ওষুধটি সাধারণ অন্যান্য সমস্যার জন্যও প্রেসক্রিপশনে লিখতে। চিকিৎসকদের বিলাসবহুল সেমিনার স্পনসর করা, পরামর্শক হিসেবে মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদান এবং কোম্পানির পক্ষে সাফাই গাওয়া চিকিৎসকদের মাধ্যমে গবেষণাপত্র প্রকাশের নজির আধুনিক ফার্মাসিউটিক্যাল ইতিহাসে প্রচুর। চিকিৎসাবিজ্ঞান এখানে নিখাদ সেবার বদলে পরিণত হয় করপোরেট পণ্যের বিপণন এজেন্সিতে, যার মাশুল দিতে হয় সাধারণ মানুষকে তাদের জীবন ও স্বাস্থ্য দিয়ে।

উন্নয়নশীল ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোতে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। পশ্চিমা বিশ্বে কঠোর বিধিনিষেধের কারণে যেসব আসক্তিকর ঔষধের প্রেসক্রিপশন নিয়ন্ত্রণ করা হয়, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সেগুলোর সহজলভ্য সংস্করণ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অবাধে সরবরাহ করে। দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামো এবং অকার্যকর নজরদারির সুযোগ নিয়ে সেখানে কোনো প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ফার্মেসি থেকে মারাত্মক আসক্তিকর ব্যথানাশক, কাশির সিরাপ এবং সিডেটিভ ট্যাবলেট বিক্রি হতে দেখা যায়। আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এই বৈষম্যমূলক বাণিজ্য থামাতে খুব কমই সফল হয়েছে। ওষুধের মতো সংবেদনশীল উপকরণের বাণিজ্যিকীকরণ তাই বিশ্বজুড়ে এক স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করে রেখেছে।

প্রেসক্রিপশন ওষুধের অপব্যবহার যখন একটি জাতীয় সংকটে রূপ নেয়, তখন রাষ্ট্রযন্ত্র সাধারণত একমুখী ও কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো চিকিৎসকদের নজরদারির আওতায় নিয়ে আসে, প্রেসক্রিপশনের সংখ্যা বেঁধে দেয় এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যথানাশকের উৎপাদন ও বিপণনে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই ধরনের ঢালাও ও অন্ধ পুলিশি পদক্ষেপের ফলে যে রোগীরা সত্যিই অসহ্য দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় ভুগছেন, তাদের চিকিৎসা অধিকার চরমভাবে খর্ব হয়। চিকিৎসকরা শাস্তির ভয়ে বা লাইসেন্স হারানোর আশঙ্কায় তখন প্রকৃত ব্যথায় কাতর ক্যান্সার বা জটিল স্নায়ুরোগীদেরও প্রয়োজনীয় ওপিওয়েড ব্যথানাশক লিখে দিতে অস্বীকার করেন। একে বলা হয় ব্যথানাশক চিকিৎসার পক্ষাঘাত।

আইনগত নজরদারির কারণে বিশেষায়িত উপশমকারী সেবা (Palliative care) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একজন মানুষের জীবনের শেষ দিনগুলোতে তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা থেকে মুক্ত থাকার অধিকার চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান মানবিক নীতি হিসেবে গণ্য। কিন্তু মাদকের অপব্যবহার প্রতিরোধের নৈতিক আতঙ্কে যখন রাষ্ট্রের আইন সব ওপিওয়েড ব্যবহারকারীকে সম্ভাব্য আসক্ত বা অপরাধী হিসেবে সন্দেহ করতে শুরু করে, তখন প্রকৃত রোগীরা মানবিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। কঠোর নীতিমালার ফলে ফার্মেসিগুলো আইনি ঝামেলা এড়াতে প্রয়োজনীয় ঔষধ মজুত রাখা বন্ধ করে দেয়। এর ফলে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যেখানে অপরাধ দমনের নামে অসুস্থ মানুষকে সীমাহীন শারীরিক যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

একই সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটে মাদকাসক্তি নিরাময়ের ক্ষেত্রেও। চিকিৎসাবিজ্ঞানে আসক্তি থেকে মুক্তির জন্য একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হলো ওষুধ সহায়ক চিকিৎসা (Medication-assisted treatment), যেখানে আসক্ত ব্যক্তিকে মেথাডন বা বুপ্রেনরফিনের মতো নিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘমেয়াদী বিকল্প ওষুধ দিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু প্রচলিত আইন ও রক্ষণশীল সামাজিক মানসিকতা এই বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাকে সন্দেহের চোখে দেখে। অনেক নীতিপ্রণেতা একে ‘এক নেশার বদলে আরেক নেশা’ ধরিয়ে দেওয়া হিসেবে বিচার করেন। ফলে এই জীবনরক্ষাকারী ওষুধগুলোর ওপর মাত্রাতিরিক্ত আইনি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়, যা আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা নেওয়াকে কঠিন করে তোলে এবং তাদের পুনরায় কালোবাজারের বিষাক্ত ড্রাগের দিকে ঠেলে দেয়।

কাজেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বাস্থ্যের অধিকারের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা আধুনিক নীতিবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। মাদককে অপরাধের তকমা দিয়ে নির্বিচার দমনপীড়ন চালালে কখনোই তার সমাধান হয় না, আবার ওষুধের বেপরোয়া বাণিজ্যিক বিস্তারও একটি জাতিকে ধ্বংসের মুখে ফেলতে পারে। প্রয়োজন একটি যুক্তিগ্রাহ্য ও বিজ্ঞানসম্মত নীতি, যা অনৌষধি মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলোকে হ্রাস করবে এবং একই সাথে মানুষের ব্যথাহীন জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করবে। নিরাময় এবং অপরাধের মধ্যকার সীমানা নির্ধারণের কাজটি পুলিশ বা আদালতের এক্তিয়ারে ছেড়ে না দিয়ে একে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্যের যুক্তিসঙ্গত কাঠামোর ওপর ফিরিয়ে আনাই হতে পারে এই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান।

নারকোটিক ও সাইকোট্রপিক পদার্থ (Narcotic Drugs and Psychotropic Substances): আইনগত ও চিকিৎসাগত শ্রেণি

নারকোটিক ধারণার ব্যুৎপত্তি ও চিকিৎসাগত বিবর্তন (Etymology and Medical Evolution of Narcotics)

ভাষা কীভাবে বিজ্ঞানের ধারণাকে বদলে দিতে পারে, তার এক প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হলো নারকোটিক শব্দটি। প্রাচীন গ্রিক শব্দ ‘নারকো’ (Narkō বা অসাড় করা) থেকে এই শব্দের উৎপত্তি। প্রাচীন গ্রিসের চিকিৎসাবিদ হিপোক্রেটিস এবং পরবর্তীতে গ্যালেন এমন কিছু ভেষজ উপাদানকে নির্দেশ করতে এই শব্দটি ব্যবহার করতেন, যা শরীরের ব্যথা দূর করে গভীর ঘুম বা তন্দ্রাচ্ছন্ন অসাড়তা তৈরি করতে পারত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ধ্রুপদী ধারায় নারকোটিক বলতে সুনির্দিষ্টভাবে বোঝানো হতো সেই সমস্ত রাসায়নিক উপাদানকে, যা মানবদেহের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ওপর কাজ করে তীব্র যন্ত্রণা লাঘব করে এবং একই সাথে এক ধরনের চেতনাহীন বা আচ্ছন্ন অবস্থা তৈরি করে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আফিম পপি থেকে প্রস্তুত বিভিন্ন নির্যাসই ছিল এই শ্রেণির মূল প্রতিনিধি।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এসে আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান নারকোটিক পদার্থের কাজের নির্দিষ্ট শারীরবৃত্তীয় মেকানিজম আবিষ্কার করে। মানবদেহে প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হিসেবে যে এন্ডোরফিন ব্যবস্থা রয়েছে, ওপিওয়েড গোত্রের পদার্থগুলো সেই একই রিসেপ্টরে গিয়ে যুক্ত হয়। সলোমন স্নাইডার (Solomon Snyder) তার যুগান্তকারী গবেষণায় মস্তিষ্কের ওপিওয়েড রিসেপ্টর এবং তার সাথে বাহ্যিক মরফিনের আণবিক মিথস্ক্রিয়া উন্মোচন করেছিলেন (Snyder, 1989)। মস্তিষ্কে যখন মিউ, ডেল্টা এবং কাপা নামক নির্দিষ্ট রিসেপ্টরগুলো সক্রিয় হয়, তখন যন্ত্রণার সংকেত বহনকারী নিউরনগুলো অবদমিত হয়ে পড়ে। ফলে তীব্র শারীরিক আঘাত সত্ত্বেও ব্যক্তি কোনো যন্ত্রণা অনুভব করে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই বৈশিষ্ট্যই একটি পদার্থকে প্রকৃত নারকোটিক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে।

Neuroanatomy Glossary: Opioid System | ditki medical & biological sciences
ওপিওয়েড রিসেপ্টর সক্রিয় হওয়ার ফলে স্নায়ুকোষের অভ্যন্তরীণ সংকেত পরিবহন ও ব্যথার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণের আণবিক প্রক্রিয়া। ওপিওয়েড রিসেপ্টরের সক্রিয়তা ক্যালসিয়াম আয়নের প্রবেশ কমাতে, পটাশিয়াম আয়নের পরিবহন বাড়াতে এবং উত্তেজক স্নায়ুপ্রেরকের নিঃসরণ হ্রাস করতে পারে। এসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যথাসংকেতের পরিবহন ও উপলব্ধি নিয়ন্ত্রিত হয়।

কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন এই বৈজ্ঞানিক পরিভাষাটি আইন আদালত এবং সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় প্রবেশ করে। সময়ের পরিক্রমায় সাধারণ সংস্কৃতিতে এমন একটি ধারণা তৈরি হয় যে যেকোনো অবৈধ, ক্ষতিকর বা নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুই বোধহয় নারকোটিক। অথচ চিকিৎসাগতভাবে এটি সম্পূর্ণ ভুল। একজন ওষুধবিজ্ঞানী কখনোই কোকেন, অ্যামফিটামিন বা এলএসডি-র মতো পদার্থকে নারকোটিক বলবেন না, কারণ এদের কোনোটিই শরীরের সংবেদনকে অসাড় বা নিস্তেজ করে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে স্নায়বিক উদ্দীপনা বাড়িয়ে তোলে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে নারকোটিক একটি সীমাবদ্ধ এবং নির্দিষ্ট ফার্মাকোলজিক্যাল বিভাগ, যা কেবল ওপিওয়েড এবং বেদনানাশক আচ্ছন্নতাকারী পদার্থের জন্য সংরক্ষিত।

চিকিৎসার প্রয়োজনে এই উপাদানগুলোর গুরুত্ব অপরিহার্য। জটিল অস্ত্রোপচার, যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহ ক্ষত কিংবা ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ের অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণা সামাল দেওয়ার মতো কোনো বিকল্প চিকিৎসাবিজ্ঞান আজও পুরোপুরি তৈরি করতে পারেনি। তবে একই সাথে এই পদার্থগুলোর রয়েছে মারাত্মক শারীরিক নির্ভরতা তৈরি করার ক্ষমতা। একটানা ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্কের নিজস্ব এন্ডোরফিন তৈরি কমে যায় এবং বহিরাগত রাসায়নিকের অনুপস্থিতিতে তীব্র প্রত্যাহার উপসর্গ দেখা দেয়। ফলে নারকোটিক পদার্থের চিকিৎসাগত ইতিহাস একই সাথে যেমন মানব যন্ত্রণার পরম উপশমকারী, তেমনই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা তীব্র শারীরিক দাসত্ব তৈরির অন্যতম কারণ।

Opioid Analgesia and Opioid-Induced Adverse Effects: A Review
ওপিওয়েড রিসেপ্টর সক্রিয় হওয়ার ফলে স্নায়ুকোষের অভ্যন্তরীণ সংকেত পরিবহন ও ব্যথার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণের আণবিক প্রক্রিয়া। ওপিওয়েড রিসেপ্টরের সক্রিয়তা ক্যালসিয়াম আয়নের প্রবেশ কমাতে, পটাশিয়াম আয়নের পরিবহন বাড়াতে এবং উত্তেজক স্নায়ুপ্রেরকের নিঃসরণ হ্রাস করতে পারে। এসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যথাসংকেতের পরিবহন ও উপলব্ধি নিয়ন্ত্রিত হয়।

সাইকোট্রপিক পদার্থের মনোদৈহিক ক্রিয়া ও ফার্মাকোলজি (Psychotropic Substances: Psychosomatic Action and Pharmacology)

নারকোটিকের বিপরীতে সাইকোট্রপিক ধারণাটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে অনেক বেশি আধুনিক এবং ব্যাপক পরিসরজুড়ে বিস্তৃত। এই শব্দটিও গ্রিক ভাষা থেকে ধার করা; ‘সাইকে’ (Psyche বা মন) এবং ‘ট্রপোস’ (Tropos বা মোড় ঘোরানো বা পরিবর্তন করা) – এই দুইয়ের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে সাইকোট্রপিক প্রত্যয়টি। যেকোনো রাসায়নিক যৌগ যা মানবদেহের রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধক পার হয়ে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে প্রবেশ করে এবং মানুষের মেজাজ, চিন্তা, চেতনা, অনুভূতি বা আচরণে প্রত্যক্ষ পরিবর্তন ঘটায়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তা-ই সাইকোট্রপিক পদার্থ। এটি কেবল অসাড়তা বা তন্দ্রা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর কাজ হতে পারে আনন্দ বৃদ্ধি করা, গভীর বিষণ্ণতা কাটানো, অতিউত্তেজিত মনকে শান্ত করা কিংবা অবাস্তব ইন্দ্রিয়ভ্রম সৃষ্টি করা।

বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে আধুনিক মনোরোগ চিকিৎসার জগতে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। এর আগে মানসিক ভারসাম্যহীন রোগীদের শান্ত রাখার জন্য দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক নিগ্রহ বা নিছক অবশকারী ইনজেকশন ব্যবহার করা হতো। কিন্তু ১৯৫০-এর দশকে ক্লোরপ্রমাজিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক ওষুধের যুগ। ডেভিড হিলি (David Healy) তার ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেন কীভাবে নতুন এই সাইকোট্রপিক রাসায়নিকগুলো আবিষ্কারের ফলে উন্মাদাগার কেন্দ্রিক চিকিৎসা বদলে গিয়ে কমিউনিটি সাইকিয়াট্রির রূপ নিয়েছিল (Healy, 2002)। বিজ্ঞান বুঝতে পারে যে মানুষের মানসিক অনুভূতি কোনো বায়বীয় ব্যাপার নয়, তা মস্তিষ্কের সুনির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিকের ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল।

ফার্মাকোলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে সাইকোট্রপিক পদার্থগুলোকে তাদের কাজের প্রকৃতি অনুযায়ী প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথমত, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা বিষণ্ণতারোধী ওষুধ, যা মস্তিষ্কে সেরোটোনিন ও নর-এপিনেফ্রিনের প্রাপ্যতা বাড়িয়ে মানসিক বিষাদ দূর করতে সাহায্য করে। দ্বিতীয়ত, অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ, যা ডোপামিনের অতিরিক্ত ক্রিয়া কমিয়ে হ্যালুসিনেশন বা অবাস্তব ভ্রম দূর করে। তৃতীয়ত, অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগনাশক উপাদান, যার মধ্যে পড়ে বেঞ্জোডায়াজেপাইন গোত্রীয় বিভিন্ন ড্রাগ। এগুলো মস্তিষ্কের সংবেদনশীলতাকে শান্ত রাখে। এর বাইরেও রয়েছে স্টিমুলেন্ট বা উত্তেজক এবং সাইকেডেলিক বা হ্যালুসিনোজেনিক পদার্থ, যা মানুষের ইন্দ্রিয়গত উপলব্ধি ও বাস্তবতার বোধকে সম্পূর্ণ উল্টেপাল্টে দিতে পারে।

14.3: Psychotherapeutics - Social Sci LibreTexts
নির্বাচিত সেরোটোনিন পুনঃশোষণ প্রতিরোধক (Selective Serotonin Reuptake Inhibitor) ওষুধের কার্যপদ্ধতি। স্বাভাবিক অবস্থায় সেরোটোনিন পুনঃশোষিত হলেও এই শ্রেণির ওষুধ পুনঃশোষণ প্রতিরোধ করে স্নায়ুসন্ধিতে সেরোটোনিনের প্রাপ্যতা বাড়ায়।
Twists, Turns, and Tapers: Navigating the Benzodiazepine Ride | Pharmacy Times
গ্যাবা-এ (GABA-A) রিসেপ্টরে বেঞ্জোডায়াজেপাইনের কার্যপদ্ধতি। বেঞ্জোডায়াজেপাইন গ্যাবার নিবৃত্তিমূলক প্রভাব বৃদ্ধি করে স্নায়ুকোষের উত্তেজনাশীলতা কমাতে সাহায্য করে।

সুতরাং, নারকোটিক এবং সাইকোট্রপিকের মূল চিকিৎসাগত পার্থক্যটি অত্যন্ত স্পষ্ট। নারকোটিক যেখানে শারীরিক ব্যথানাশ এবং চেতনার অবদমন ঘটায়, সাইকোট্রপিক সেখানে মনের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া ও মেজাজের ভারসাম্য রূপান্তরের কাজ করে। বহু সাইকোট্রপিক ওষুধ রয়েছে যেগুলোর অপব্যবহারের ক্ষমতা বা আসক্তি তৈরির ঝুঁকি অত্যন্ত কম, যেমন অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা অ্যান্টিসাইকোটিক। অথচ কিছু সাইকোট্রপিক উপাদান, যেমন অ্যামফিটামিন বা স্বল্পমেয়াদী স্লিপিং পিল, তীব্র আসক্তি তৈরি করতে পারে। এই বিপুল বৈচিত্র্যের কারণে সাইকোট্রপিক পদার্থের চিকিৎসাগত ব্যবস্থাপনা এবং আইনি নজরদারি সবসময়ই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পরিচালনা করতে হয়।

Mechanism of Action of Typical Antipsychotics
প্রথম প্রজন্মের অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধের কার্যপদ্ধতি। ডোপামিনের ডি-২ রিসেপ্টর অবরোধের মাধ্যমে এসব ওষুধ মনোবিকারের কিছু উপসর্গ কমাতে পারে। একই প্রক্রিয়ার কারণে নির্দিষ্ট স্নায়ুপথে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক মাদক কূটনীতির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, নারকোটিক এবং সাইকোট্রপিক পদার্থের আইনি সংজ্ঞা বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরিতে তৈরি হয়নি; তৈরি হয়েছে জেনেভা ও নিউ ইয়র্কের কূটনীতিবিদদের দরকষাকষির টেবিলে। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে জাতিসংঘ যখন বৈশ্বিক মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রণয়ন শুরু করে, তখন এই দুই শ্রেণির পদার্থকে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি কনভেনশনে বিভক্ত করা হয়। ১৯৬১ সালে গৃহীত হয় একক মাদক কনভেনশন (Single Convention on Narcotic Drugs, 1961), যার প্রধান লক্ষ্য ছিল কাঁচা আফিম, কোকা পাতা এবং ক্যানাবিসের মতো প্রাকৃতিক বা উদ্ভিজ্জ মাদকগুলোর উৎপাদন ও বাণিজ্য নির্মূল করা। এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে উৎপাদিত এই কৃষিজ পণ্যগুলোকে কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় এনে সেগুলোর ঐতিহ্যবাহী ব্যবহারকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

কিন্তু ১৯৬১ সালের চুক্তি পাশ হওয়ার পরপরই এক নতুন সংকট সামনে আসে। উন্নত পশ্চিমা বিশ্বের ল্যাবরেটরিগুলোতে তখন তৈরি হচ্ছিল কৃত্রিম মনস্তাত্ত্বিক রাসায়নিক – বার্বিচুরেট, অ্যামফিটামিন, ট্রাঙ্কুইলাইজার এবং এলএসডি-র মতো শক্তিশালী সাইকোট্রপিক উপাদান। এই সিন্থেটিক ড্রাগগুলোর ব্যবহার ও অপব্যবহার পশ্চিমা সমাজগুলোতে দ্রুত মহামারী রূপ ধারণ করছিল। উন্নয়নশীল দেশগুলো তখন দাবি তোলে যে তাদের আফিম ও গাঁজার ওপর যেভাবে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, একইভাবে পশ্চিমা ওষুধ কোম্পানিগুলোর উৎপাদিত কৃত্রিম সাইকোট্রপিক ওষুধগুলোর ওপরও কঠোর বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হোক। কিন্তু শক্তিশালী পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ওষুধ শিল্পের বিপুল আর্থিক ক্ষতি মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না।

এই ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ফলস্বরূপ ১৯৭১ সালে জাতিসংঘকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি চুক্তি করতে হয়, যা পরিচিত মনস্তাত্ত্বিক পদার্থ বিষয়ক কনভেনশন (Convention on Psychotropic Substances, 1971) নামে। উইলিয়াম বি. ম্যাকঅ্যালিস্টার (William B. McAllister) আন্তর্জাতিক মাদক কূটনীতির ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কীভাবে পশ্চিমা ওষুধ প্রস্তুতকারক লবির চাপে ১৯৭১ সালের কনভেনশনটিকে ১৯৬১ সালের চুক্তির তুলনায় অনেক বেশি নমনীয় ও দুর্বল করে তৈরি করা হয়েছিল (McAllister, 2000)। ১৯৬১ সালের কনভেনশনে আফিম চাষের ওপর যেখানে কঠোর রাষ্ট্রীয় হিসাবরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের বাধ্যবাধকতা ছিল, ১৯৭১ সালের কনভেনশনে কৃত্রিম সাইকোট্রপিক ওষুধের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে সেই মাত্রার কড়া নজরদারির বাইরে রাখা হয়।

ফলে আন্তর্জাতিক আইনের পাতায় এমন এক কৃত্রিম দ্বিধাবিভক্তি তৈরি হলো যা বিজ্ঞানসম্মত ছিল না। উদ্ভিজ্জ মাদকগুলোকে ফেলা হলো নারকোটিক আইনের কঠোর নিগড়ে, আর পশ্চিমা রসায়নাগারে তৈরি সমমানের বা অনেক ক্ষেত্রে আরও বেশি শক্তিশালী আসক্তিকর রাসায়নিকগুলোকে রাখা হলো সাইকোট্রপিক আইনের তুলনামূলক শিথিল ছায়ায়। এই ঐতিহাসিক বিভাজনটি পরবর্তীতে বিশ্বের প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ মাদক আইনে প্রবেশ করেছে। আইনপ্রণেতারা প্রায়শই ভুলে যান যে ১৯৬১ এবং ১৯৭১ সালের এই আইনি ব্যবধানটি বিজ্ঞানের কোনো নির্দেশ ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতা ও কর্পোরেট পুঁজির এক জটিল আপসনামা।

আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর এই রাজনৈতিক বিভাজন যখন বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ফৌজদারি আইনে রূপ নিল, তখন শুরু হলো এক দীর্ঘস্থায়ী বিভ্রান্তি। বিশ্বের অধিকাংশ দেশের আইনি ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নারকোটিক শব্দটিকে একটি সর্বগ্রাসী আইনি তকমা হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। অনেক দেশের মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে কোকেন এবং গাঁজাকে সরাসরি ‘নারকোটিক’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অথচ রসায়ন ও চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী কোকেন কোনোভাবেই নারকোটিক নয়, এটি একটি চরম উত্তেজক পদার্থ। একইভাবে গাঁজার মূল সক্রিয় উপাদান টিএইচসি একটি ক্যানাবিনয়েড, যা মূলত সাইকোট্রপিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। আইনের এই অজ্ঞতাপ্রসূত মিশ্রণ অপরাধবিজ্ঞানের প্রয়োগকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাদক নিয়ন্ত্রণের ইতিহাসে এই বিভ্রান্তির সূচনা হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। ডেভিড এফ. মুস্তো (David F. Musto) তার ধ্রুপদী গবেষণায় দেখান যে কীভাবে ১৯১৪ সালের হ্যারিসন নারকোটিক আইনের মাধ্যমে চিকিৎসাগত বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আফিমের পাশাপাশি কোকেনকেও নারকোটিক হিসেবে তকমা দেওয়া হয়েছিল (Musto, 1999)। কারণ ছিল স্পষ্ট: আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পক্ষে সাধারণ মানুষকে বোঝানো সহজ ছিল যে সব অবৈধ ড্রাগই এক ধরনের প্রাণঘাতী ‘নারকোটিক’। এর ফলে আইনের চোখে সব আসক্তিকর পদার্থের পার্থক্য মুছে গিয়ে কেবল শাস্তির কঠোরতা প্রধান হয়ে দাঁড়ায়।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও এই ব্রিটিশ ও মার্কিন আইনি বিভ্রান্তি সরাসরি প্রবেশ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের ১৯৮৫ সালের নারকোটিক ড্রাগস অ্যান্ড সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস বা এনডিপিএস আইন কিংবা বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের দিকে তাকালে দেখা যায়, আইনগতভাবে নারকোটিক ও সাইকোট্রপিকের তালিকা করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মাঠপর্যায়ে তাদের অপরাধের শাস্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো বৈজ্ঞানিক ক্ষতি-সূচক বিবেচনা করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর একটি ভেষজ সাইকোট্রপিক বহনের দায়ে যে শাস্তি দেওয়া হয়, অত্যন্ত বিপজ্জনক কোনো নারকোটিক বহনের শাস্তির সাথে তার কোনো যৌক্তিক অনুপাত থাকে না। পুলিশি তদন্ত এবং আদালতের চার্জশিটেও প্রায়শই এই দুই শ্রেণির মৌলিক ফার্মাকোলজিক্যাল পার্থক্য গুলিয়ে ফেলা হয়।

আইন প্রয়োগের এই বৈজ্ঞানিক অজ্ঞতার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিচার ব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষ। টবি সেডন (Toby Seddon) তার সমাজতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে যুক্তি দিয়েছেন যে আধুনিক রাষ্ট্রগুলোতে ড্রাগ আইন মূলত জনস্বাস্থ্যের চেয়ে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে (Seddon, 2010)। যখন একটি আইনি ব্যবস্থা রাসায়নিকের প্রকৃত চরিত্র বুঝতে ব্যর্থ হয়, তখন তা শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে কেবল পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। এক কেজি রাসায়নিকের ক্ষতিকর ক্ষমতা কী, তা স্নায়ুতন্ত্রের ওপর কী প্রভাব ফেলে, সেগুলোর কোনো বিচার আদালতে হয় না; বিচার হয় একটি ভ্রান্ত আইনি সংজ্ঞার অধীনে। ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থার মধ্যে এক চিরস্থায়ী বিরোধ জিইয়ে থাকে।

চিকিৎসায় বৈধ ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রিত বিতরণ ব্যবস্থার বাস্তবায়ন (Legitimate Medical Uses and Implementation of Controlled Distribution)

যদিও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নারকোটিক এবং সাইকোট্রপিক পদার্থকে কেবলই অপরাধ ও চোরাচালানের বস্তু হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত, কিন্তু বাস্তবতা হলো এই দুই শ্রেণির ঔষধ ছাড়া আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এক মুহূর্তও চলতে পারে না। জীবনযাপনের মান রক্ষা এবং তীব্র মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ন্ত্রণে এদের ভূমিকা প্রশ্নাতীত। মরফিন, ফেন্টানাইল, বুপ্রেনরফিন কিংবা মেথাডনের মতো নারকোটিক ব্যথানাশক না থাকলে যেকোনো বড় ধরনের অস্ত্রোপচার অসম্ভব হয়ে পড়ত। অন্যদিকে, তীব্র সাইকোসিস, মেজর ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার বা বাইপোলার ডিসঅর্ডারের মতো জটিল মানসিক রোগের চিকিৎসায় সাইকোট্রপিক ওষুধগুলোর প্রয়োগ প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষকে আত্মহত্যার ঝুঁকি বা মানসিক বিকলঙ্গতা থেকে রক্ষা করছে।

সমসাময়িক নিউরোসাইকিয়াট্রিতে সাইকোট্রপিক ওষুধের উপযোগিতা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। নেড এইচ. কালিন (Ned H. Kalin) তার আলোচনায় দেখিয়েছেন যে মানসিক রোগের জৈবিক কারণ যত বেশি উন্মোচিত হচ্ছে, সাইকোট্রপিক ওষুধের সুনির্দিষ্ট ব্যবহার তত বেশি অপরিহার্য হয়ে উঠছে (Kalin, 2020)। সিজোফ্রেনিয়ার রোগীদের ডোপামিন ভারসাম্য রক্ষা করা কিংবা প্যানিক অ্যাটাকের রোগীর অতিরিক্ত স্নায়বিক উত্তেজনা কমাতে এই ওষুধগুলোর কোনো বিকল্প সাধারণ ভেষজ চিকিৎসায় নেই। কিন্তু সংকট দেখা দেয় এদের বিতরণ এবং নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে। যেহেতু এই ওষুধগুলোর অপব্যবহারের সম্ভাবনা থাকে, তাই রাষ্ট্রগুলোকে একটি অত্যন্ত কঠোর ও জটিল নিয়ন্ত্রিত বিতরণ ব্যবস্থা বা নিয়ন্ত্রিত সরবরাহ শৃঙ্খল (Controlled supply chain) বজায় রাখতে হয়।

এই আইনি নিয়ন্ত্রণের কারণে চিকিৎসকদের বিশেষ ধরনের লাইসেন্স নিতে হয়, প্রেসক্রিপশনের কপি সরকারি দপ্তরে সংরক্ষণ করতে হয় এবং ফার্মেসিগুলোকে প্রতিদিনের বিক্রির নিখুঁত হিসাব রাখতে হয়। এই জটিল প্রক্রিয়ার একটি মারাত্মক নেতিবাচক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। অতিরিক্ত আইনি কড়াকড়ি এবং গ্রেফতারের ভয়ে অনেক দেশের চিকিৎসকরা গুরুতর প্রয়োজনেও রোগীকে উপযুক্ত মাত্রার নারকোটিক ব্যথানাশক বা মনস্তাত্ত্বিক সিডেটিভ লিখে দিতে ভয় পান। একে চিকিৎসা সমাজবিজ্ঞানে বলা হয় ‘ওপিওফোবিয়া’ বা নিয়ন্ত্রিত ওষুধের আইনি ভয়। ফলে চোরাচালান বন্ধ করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা প্রশাসনিক বেড়াজাল অনেক সময় সাধারণ রোগীদের ন্যায্য ও মৌলিক চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তির পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

বৈশ্বিক স্তরে এই নিয়ন্ত্রিত বিতরণের ক্ষেত্রে একটি নির্মম বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন তথ্যে দেখা যায়, পৃথিবীর সিংহভাগ শক্তিশালী নারকোটিক ব্যথানাশক ও আধুনিক সাইকোট্রপিক ওষুধ ব্যবহৃত হয় উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের ধনী দেশগুলোতে। অন্যদিকে, আফ্রিকা এবং এশিয়ার অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর লক্ষ লক্ষ ক্যান্সার রোগী ন্যূনতম একটি মরফিন ট্যাবলেটের অভাবে অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে মৃত্যুবরণ করেন। আইনগত অতিরিক্ত জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক নজরদারির ভীতি দরিদ্র দেশগুলোর হাসপাতালগুলোতে জীবনরক্ষাকারী এই রাসায়নিকগুলোর সরবরাহ প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে। অর্থাৎ, অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণের আইনি কাঠামোটিই আজ বিশ্বের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার মূল কারণ।

আইন ও বিজ্ঞানের দ্বন্দ্ব: সমকালীন শ্রেণিবিন্যাসের পুনর্বিবেচনা (Conflict Between Law and Science: Re-evaluating Contemporary Classifications)

একবিংশ শতাব্দীতে এসে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় মাদক আইনের পঞ্চাশ বছরের পুরোনো কাঠামোটি এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। রসায়নাগারের নিত্যনতুন আবিষ্কার এবং সমকালীন স্নায়ুবিজ্ঞানের অগ্রগতি প্রমাণ করছে যে নারকোটিক ও সাইকোট্রপিক পদার্থের যে অনমনীয় স্তরবিন্যাস তৈরি করা হয়েছিল, তা আধুনিক বাস্তবতার সাথে সম্পূর্ণ বেমানান। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বাজারে এসেছে শত শত নভেল সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্ট্যান্স (Novel psychoactive substances বা NPS) বা সিন্থেটিক ড্রাগ। আণবিক গঠনে সামান্য পরিবর্তন ঘটিয়ে এই নতুন উপাদানগুলো খুব সহজেই বিদ্যমান আইনি সংজ্ঞার ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে যায়। পুলিশ বা আদালত যখন একটি নির্দিষ্ট রাসায়নিককে নিষিদ্ধ করে, চোরাবাজারের রসায়নবিদরা তৎক্ষণাৎ তার অণুর গঠন সামান্য বদলে দিয়ে নতুন এক ড্রাগ বাজারে নিয়ে আসে, যা আইনের খাতায় কোনো নিষিদ্ধ পদার্থের তালিকায় থাকে না।

একই সাথে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ঘটে চলেছে এক অভাবনীয় রূপান্তর, যা পরিচিত ‘সাইকেডেলিক রেনেসাঁ’ নামে। ১৯৭১ সালের আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যে সাইলোসাইবিন, এলএসডি কিংবা এমডিএমএ-কে কোনো চিকিৎসাগত উপযোগিতা নেই বলে সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞার আওতায় রাখা হয়েছিল, আধুনিক চিকিৎসা গবেষণা প্রমাণ করছে যে গুরুতর মানসিক ট্রমা ও বিষণ্ণতা নিরাময়ে সেগুলো অবিশ্বাস্য রকমের কার্যকর। বহু নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিকাল ট্রায়ালে দেখা গেছে যে জটিল বিষণ্ণতা বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারের চিকিৎসায় প্রচলিত ওষুধের চেয়ে এই নিয়ন্ত্রিত সাইকোট্রপিক উপাদানগুলো অনেক দ্রুত ও দীর্ঘস্থায়ী সুফল বয়ে আনে। কিন্তু পুরোনো আন্তর্জাতিক আইন এবং আমলাতান্ত্রিক অনমনীয়তার কারণে গবেষকরা এই রাসায়নিকগুলো নিয়ে স্বাভাবিক গবেষণা চালাতেও চরম আইনি বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।

এই সংকটময় পরিস্থিতিকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছেন বহু শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী। ডেভিড জে. নাট (David J. Nutt) এবং তার সহ-গবেষকরা তাদের বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে কীভাবে আন্তর্জাতিক ড্রাগ আইনের অবৈজ্ঞানিক তফসিলগুলো মস্তিষ্কের গবেষণা ও নতুন মানসিক রোগের চিকিৎসা আবিষ্কারকে স্তব্ধ করে রেখেছে (Nutt et al., 2013)। রাজনীতিবিদরা যখন বিজ্ঞানের অগ্রগতির চেয়ে নিজেদের রাজনৈতিক বয়ানকে বেশি গুরুত্ব দেন, তখন আইন পরিণত হয় মানব কল্যাণের প্রধান শত্রুতে। বর্তমান বিশ্বের প্রয়োজন একটি সার্বিক পুনর্বিন্যাস, যেখানে রাজনৈতিক অনুভূতির বদলে নিরেট বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে পদার্থের ক্ষতিকর ক্ষমতা এবং উপযোগিতা মূল্যায়ন করা হবে।

অতএব, নারকোটিক এবং সাইকোট্রপিক পদার্থের আইনগত ও চিকিৎসাগত ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই দ্বন্দ্ব নিরসনের ওপর। আইনকে বিজ্ঞানের নির্দেশ মানতে হবে, বিজ্ঞানকে আইনের অন্ধ আদেশের দাস হয়ে থাকলে চলবে না। অতীতের ঔপনিবেশিক স্বার্থ ও স্নায়ুযুদ্ধের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে তৈরি হওয়া অকার্যকর আইনগুলোকে বাতিল করে ক্ষতি হ্রাস, সঠিক চিকিৎসাগত অধিকার এবং বস্তুনিষ্ঠ জৈব-রাসায়নিক পরিমাপের ভিত্তিতে একটি আধুনিক ও মানবিক শ্রেণিবিন্যাস গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি। তবেই কেবল একদিকে যেমন ক্ষতিকর অপব্যবহার থেকে সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে নিশ্চিত করা যাবে প্রতিটি মানুষের ব্যথাহীন ও সুস্থ জীবনের মৌলিক অধিকার।

অপব্যবহৃত প্রধান মাদকসমূহ (Major Drugs of Abuse): বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব

ওপিয়েট ও ওপিওয়েড গোত্র: হেরোইন এবং সিন্থেটিক অ্যানালগ (Opiates and Opioid Class: Heroin and Synthetic Analogs)

আফিম পপির কাঁচা ফলের আঠা থেকে নিঃসৃত রস দিয়ে মানুষের চেতনার ওপর প্রভাব বিস্তার করার ইতিহাস বেশ পুরনো। কিন্তু রসায়নবিদরা যখন ল্যাবরেটরিতে এই উদ্ভিজ্জ উপাদানের অণুগুলো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন, তখন চিকিৎসার সম্ভাবনার সাথে সাথে তৈরি হলো ধ্বংসের নতুন পথ। ১৮৯৮ সালে জার্মান কোম্পানি বেয়ারের রসায়নবিদ হাইনরিখ ড্রেসার ডাইঅ্যাসিটাইলমরফিন তৈরি করেন। কোম্পানিটি ওষুধটির নাম দিয়েছিল ‘হেরোইন’, যা এসেছিল জার্মান শব্দ ‘হেরোইশ’ বা বীরত্বপূর্ণ থেকে। তারা দাবি করেছিল এটি মরফিনের চেয়েও নিরাপদ এবং কোনো আসক্তি তৈরি না করেই কাশির উপশম করবে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই উন্মোচিত হলো এক ভিন্ন রূপ; সাধারণ মরফিনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি আসক্তিকর এই পদার্থটি দ্রুতই বিনোদনমূলক অপব্যবহারের শীর্ষ তালিকায় স্থান করে নিল।

হেরোইনের এই তীব্র ক্ষমতার কারণ এর রাসায়নিক গঠনে লুকিয়ে আছে। দুটি অ্যাসিটাইল গ্রুপ থাকার কারণে এটি অত্যন্ত চর্বি-দ্রবণীয় বা লিপিড-সল্যুবল। ফলে সাধারণ মরফিনের তুলনায় এটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধক ভেদ করে সরাসরি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে প্রবেশ করতে পারে। মস্তিষ্কে প্রবেশের সাথে সাথে এটি রূপান্তরিত হয় মরফিনে এবং দ্রুত যুক্ত হয় মিউ-ওপিওয়েড রিসেপ্টর (Mu-opioid receptor) এর সাথে। জর্জ এফ. কুব এবং মিশেল লে মোয়াল তাদের নিউরোবায়োলজিক্যাল গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে ওপিওয়েড যৌগগুলো ভেন্ট্রাল টেগমেনটাল এরিয়া থেকে নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্সে তীব্র ডোপামিন নির্গমন ঘটিয়ে আসক্তির শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে (Koob & Le Moal, 2006)। ফলে ব্যক্তি এক তীব্র কৃত্রিম সুখ বা ইউফোরিয়া অনুভব করে, যাকে ড্রাগ ব্যবহারকারীরা ‘রাশ’ বলে বর্ণনা করে থাকেন।

How Opioids Became an American Epidemic - Paste Magazine
মরফিন ও হেরোইনের রাসায়নিক গঠনের তুলনা। হেরোইনের দুটি অ্যাসিটাইল গ্রুপ এর চর্বিতে দ্রবণীয়তা বৃদ্ধি করে।

এই প্রাথমিক আবেশ কেটে যাওয়ার পর শুরু হয় শারীরবৃত্তীয় নিস্তেজতা, যাকে চলিত ভাষায় বলা হয় ‘অন দ্য নড’। ব্যক্তির শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি কমে যায়, চোখের মণি সূঁচের অগ্রভাগের মতো ছোট হয়ে আসে, রক্তচাপ ও শরীরের তাপমাত্রা হ্রাস পায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। সবচেয়ে মারাত্মক ঝুঁকি হলো শ্বাসযন্ত্রের অবদমন (Respiratory depression)। ওপিওয়েড মস্তিষ্কের ব্রেনস্টেমের সেই অংশটিকে অসাড় করে দেয় যা রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে গেলে শ্বাস নেওয়ার নির্দেশ দেয়। অতিরিক্ত মাত্রায় হেরোইন গ্রহণ করলে ব্যক্তি ঘুমের ঘোরে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করে। নিয়মিত ব্যবহারের ফলে শরীর দ্রুত সহনশীল হয়ে ওঠে। ফলে একই প্রভাব পেতে ক্রমাগত মাত্রা বাড়াতে হয়। ব্যবহার বন্ধ করলেই শুরু হয় ভয়াবহ প্রত্যাহার সংকট; হাড়ের মধ্যে তীব্র ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া, ঠান্ডা ঘাম এবং পেশির কাঁপুনি আসক্ত ব্যক্তিকে পুনরায় ড্রাগটি নিতে বাধ্য করে।

একবিংশ শতাব্দীতে এই সংকটকে নতুন এক মাত্রায় নিয়ে গেছে সিন্থেটিক ওপিওয়েড, বিশেষ করে ফেন্টানাইল এবং এর অ্যানালগসমূহ। ল্যাবরেটরিতে সম্পূর্ণ কৃত্রিমভাবে তৈরি ফেন্টানাইল প্রাকৃতিক মরফিনের চেয়ে পঞ্চাশ থেকে একশত গুণ বেশি শক্তিশালী। মাত্র দুই মিলিগ্রাম ফেন্টানাইল একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট। চোরাকারবারিরা এখন উৎপাদন খরচ কমাতে এবং পরিবহন সহজ করতে সাধারণ হেরোইন বা অন্যান্য ট্যাবলেটের সাথে গোপনে ফেন্টানাইল মিশিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে ব্যবহারকারী অজান্তেই প্রাণঘাতী মাত্রার মুখোমুখি হচ্ছে। ওপিওয়েড ওভারডোজের প্রতিষেধক হিসেবে ন্যালোক্সন নামক একটি রিসেপ্টর অ্যান্টাগনিস্ট জরুরি ভিত্তিতে ব্যবহার করা হলেও সিন্থেটিক অ্যানালগের তীব্রতার কারণে অনেক সময় একাধিক ডোজ দিয়েও রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না।

মনোউদ্দীপক কোকেন ও ক্র্যাক: স্নায়বিক উত্তেজনা ও অবক্ষয় (Psychostimulants Cocaine and Crack: Neural Excitation and Degradation)

দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালার কোকা গাছ থেকে নিষ্কাশিত অ্যালকালয়েড হলো কোকেন। প্রাকৃতিক পাতায় এই ক্ষারকের পরিমাণ থাকে খুবই সামান্য, কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীতে পশ্চিমা রসায়নাগারে একে পরিশোধিত করে তৈরি করা হয় সাদা স্ফটিকাকার হাইড্রোক্লোরাইড লবণ। এই পাউডার নিঃশ্বাসের সাথে টেনে বা ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করানো যায়। বিংশ শতাব্দীর আশির দশকে এর একটি রূপান্তরিত সস্তা রূপ ছড়িয়ে পড়ে, যা পরিচিত ‘ক্র্যাক’ নামে। সাধারণ কোকেন পাউডারের সাথে খাবার সোডা ও জল মিশিয়ে গরম করে তৈরি করা হয় ছোট ছোট কঠিন ডেলা। পাইপে দিয়ে উত্তপ্ত করার সময় এটি যে চটচট শব্দ করে, সেখান থেকেই ‘ক্র্যাক’ নামের উৎপত্তি। এই ধোঁয়া ফুসফুসের মাধ্যমে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়।

স্নায়ুবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোকেনের কাজের ধরন ওপিওয়েডের সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে অবশ করে না, বরং অস্বাভাবিক মাত্রায় উত্তেজিত করে তোলে। সাধারণ অবস্থায় নিউরন থেকে নিঃসৃত ডোপামিন তার কাজ শেষ করে পুনরায় কোষে ফিরে আসে। কোকেন সরাসরি ডোপামিন ট্রান্সপোর্টার (Dopamine transporter) প্রোটিনকে অবরুদ্ধ করে দেয়। এর ফলে ডোপামিন আর ফিরে যেতে পারে না এবং নিউরনের সংযোগস্থলে উপচে পড়ে। এরিক জে. নেসলার (Eric J. Nestler) তার গবেষণায় আণবিক স্তরে দেখিয়েছেন কীভাবে কোকেনের কারণে নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্সে ডোপামিনের এই দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি স্নায়ুকোষের জিনগত অভিব্যক্তিতে পরিবর্তন আনে এবং চিরস্থায়ী আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে (Nestler, 2005)। একই সাথে এটি নর-এপিনেফ্রিন এবং সেরোটোনিনের পুনঃশোষণ বা রিআপটেককে আটকে দেয়।

Cocaine | Encyclopedia MDPI
স্নায়ুসন্ধিতে কোকেনের কার্যপদ্ধতি। কোকেন ডোপামিন, নর-এপিনেফ্রিন ও সেরোটোনিন পরিবহনকারী প্রোটিনের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করে। ফলে স্নায়ুসন্ধিতে এসব সংকেতবাহকের উপস্থিতি ও প্রভাব বৃদ্ধি পায়।
14.4: Neural Circuitry of Drug Reward - Social Sci LibreTexts
স্বাভাবিক স্নায়ুসংকেত পরিবহন এবং কোকেনের প্রভাবে সংকেতবাহকের পুনঃশোষণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার তুলনা। স্বাভাবিক অবস্থায় পরিবহনকারী প্রোটিন সংকেতবাহককে পূর্ববর্তী নিউরনে ফিরিয়ে নেয়; কোকেন এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে।

এই রাসায়নিক ঝড়ের কারণে ব্যক্তি নিজেকে প্রচণ্ড শক্তিশালী, তীক্ষ্ণ এবং ক্লান্তিহীন মনে করতে শুরু করে। ক্ষুধা পুরোপুরি উবে যায়, হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয় এবং রক্তচাপ বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়ে যায়। কিন্তু এই অনুভূতির স্থায়িত্ব অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী, বিশেষ করে ক্র্যাকের ক্ষেত্রে যা মাত্র দশ থেকে পনেরো মিনিট স্থায়ী হয়। এই তীব্র আবেশ শেষ হতেই শুরু হয় গভীর বিষণ্ণতা, ভয় এবং মানসিক শূন্যতা। এই ভয়াবহ পতন থেকে বাঁচতে ব্যক্তি কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ড্রাগটি গ্রহণ করে। এর ফলে তৈরি হয় এক মারাত্মক চক্র। ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে হৃদযন্ত্রের রক্তনালী সংকুচিত হয়ে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি হয়, যা তরুণ সুস্থ ব্যবহারকারীরও তাৎক্ষণিক মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

দীর্ঘদিন কোকেন ব্যবহারের মানসিক প্রভাব ভয়াবহ। আসক্ত ব্যক্তিদের মাঝে তীব্র প্যারানয়া বা অহেতুক সন্দেহবাতিকগ্রস্ততা তৈরি হয়। তারা মনে করতে শুরু করে চারপাশের সবাই তাদের ক্ষতি করতে চাইছে। অনেকে ‘ফর্মিক্যাশন’ নামক এক ধরনের স্পর্শভ্রমে ভোগে, যেখানে তাদের মনে হয় ত্বকের নিচে কোটি কোটি পোকা হেঁটে বেড়াচ্ছে। এই অনুভূতি থেকে বাঁচতে তারা নিজের চামড়া আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে। জেমস এ. ইনসিয়ার্ডি (James A. Inciardi) তার অপরাধবিজ্ঞানীয় বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন কীভাবে ১৯৮০-এর দশকে ক্র্যাকের বিস্তার আমেরিকান শহরগুলোর অপরাধ, পারিবারিক ভাঙন এবং পথসহিংসতাকে এক নজিরবিহীন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল (Inciardi, 2008)। কোকেনের স্নায়বিক প্রভাব ব্যক্তিকে এমন এক আত্মবিধ্বংসী উন্মাদনায় আটকে ফেলে যা থেকে একা ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব।

সিন্থেটিক অ্যাম্ফেটামিন ও মেথাম্ফেটামিন: দীর্ঘস্থায়ী বিষক্রিয়া (Synthetic Amphetamines and Methamphetamine: Chronic Toxicity)

প্রকৃতির কোনো উদ্ভিদের ওপর নির্ভর না করে সম্পূর্ণ রসায়নাগারে তৈরি উদ্দীপক ড্রাগগুলোর মধ্যে অ্যাম্ফেটামিন এবং এর আরও শক্তিশালী রূপ মেথাম্ফেটামিন সর্বাধিক আলোচিত। ১৮৮৭ সালে রোমানিয়ান রসায়নবিদ এডিলিয়ানো প্রথম অ্যাম্ফেটামিন সংশ্লেষণ করেন এবং ১৮৯৩ সালে জাপানি বিজ্ঞানী নাগাই নাগায়োশি আবিষ্কার করেন মেথাম্ফেটামিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান ও জাপানি উভয় পক্ষই নিজেদের সৈন্যদের দীর্ঘ সময় নির্ঘুম ও হিংস্র রাখতে লাখ লাখ পিল সরবরাহ করেছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এই উদ্বৃত্ত রাসায়নিক সাধারণ সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিককালে ঠান্ডা বা সর্দির ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত সিউডোএফিড্রিন থেকে গোপন ল্যাবরেটরিতে তৈরি হচ্ছে বর্ণহীন স্ফটিকাকার মেথাম্ফেটামিন, যা বিশ্বজুড়ে ‘আইস’ বা ‘ক্রিস্টাল মেথ’ নামে পরিচিত।

মেথাম্ফেটামিন এবং কোকেনের প্রভাব বাহ্যিকভাবে উদ্দীপক মনে হলেও এদের জৈবিক কার্যপদ্ধতিতে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কোকেন কেবল ডোপামিনের পুনঃশোষণ আটকে দেয়, কিন্তু মেথাম্ফেটামিন কোষের ভেতরে প্রবেশ করে সংরক্ষিত ডোপামিনকে জোরপূর্বক বাইরে বের করে দেয়। অর্থাৎ এটি ডোপামিন ট্রান্সপোর্টারের দিক উল্টে দেয়। এর ফলে মস্তিষ্কে যে ডোপামিনের বন্যা বয়ে যায়, তা মানুষের যেকোনো প্রাকৃতিক জৈবিক আনন্দের চেয়ে শতগুণ বেশি তীব্র। নোরা ডি. ভলকোভ এবং মার্সেলো মোরালেস পজিট্রন এমিশন টমোগ্রাফি স্ক্যানের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে দীর্ঘমেয়াদী মেথাম্ফেটামিন ব্যবহার মস্তিষ্কের স্ট্রাইটাম অঞ্চলের ডোপামিন গ্রাহকগুলোকে আক্ষরিক অর্থেই শুকিয়ে দেয়, যার ফলে সাধারণ অনুভূতি গ্রহণের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায় (Volkow & Morales, 2015)।

Primary Methamphetamine Mechanism of Action | BioRender Science Templates
মেথাম্ফেটামিনের প্রভাবে স্নায়ুকোষের ভেতরে সংরক্ষিত ডোপামিনের স্থানান্তর এবং ডোপামিন পরিবহনকারীর বিপরীতমুখী কার্যক্রম। ভেসিকুলার মনোঅ্যামিন ট্রান্সপোর্টার-২ (VMAT2) ও ডোপামিন ট্রান্সপোর্টার (DAT) এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
File:Dopamine Transporter Meth.jpg - Wikimedia Commons
পজিট্রন এমিশন টমোগ্রাফি (PET) চিত্রে একজন তুলনামূলক সুস্থ ব্যক্তি ও দীর্ঘদিন মেথাম্ফেটামিন ব্যবহারকারী ব্যক্তির স্ট্রাইটামে ডোপামিন ট্রান্সপোর্টারের প্রাপ্যতার পার্থক্য। মেথাম্ফেটামিন ব্যবহারকারীর চিত্রে পরিবহনকারীর প্রাপ্যতা কম দেখা যাচ্ছে। এটি সরাসরি নিউরন ধ্বংসের প্রমাণ নয়।

মেথাম্ফেটামিন শরীরে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকে। কোকেনের প্রভাব যেখানে আধ ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়, সেখানে মেথাম্ফেটামিনের ক্রিয়া আট থেকে বারো ঘণ্টা পর্যন্ত চলতে পারে। এই দীর্ঘ উদ্দীপনার ফলে শরীর মারাত্মকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ব্যবহারকারীরা একটানা কয়েকদিন না ঘুমিয়ে ও না খেয়ে কাটিয়ে দেয়, যাকে বলা হয় ‘টুইকিং’। এই সময় শরীরে দেখা দেয় চরম হাইপারথার্মিয়া বা তাপমাত্রা বৃদ্ধি, যা কিডনি ও পেশি ধ্বংস করে দিতে পারে। দীর্ঘদিন ব্যবহারের আরেকটি দৃশ্যমান পরিণতি হলো ‘মেথ মাউথ’; মুখের লালা শুকিয়ে যাওয়া, তীব্র অম্লতা এবং দাঁত কিড়মিড় করার অভ্যাসের কারণে আসক্ত ব্যক্তির সমস্ত দাঁত গোড়া থেকে পচে ভেঙে পড়ে। চেহারায় দ্রুত বার্ধক্যের ছাপ পড়ে এবং ত্বক কুঁচকে যায়।

মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে মেথাম্ফেটামিন চরম বিষক্রিয়া বা নিউরোটক্সিসিটি তৈরি করে। এটি মস্তিষ্কের ডোপামিন ও সেরোটোনিন সংবহনকারী স্নায়ুর প্রান্তগুলোকে সরাসরি পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়। এর পরিণতি হলো স্থায়ী মেথাম্ফেটামিন-প্ররোচিত সাইকোসিস। রোগী অবাস্তব কণ্ঠস্বর শুনতে পায়, ঘরের দেয়ালে শত্রু দেখতে পায় এবং নিজের ঘনিষ্ঠতম মানুষদের ওপর প্রাণঘাতী আক্রমণ চালিয়ে বসে। অনেক ক্ষেত্রে মাদক গ্রহণ পুরোপুরি বন্ধ করার কয়েক বছর পরও এই উন্মাদনার লক্ষণগুলো ফিরে আসে। মেথাম্ফেটামিন তাই নিছক আসক্তি নয়, এটি মস্তিষ্কের গঠনকে শারীরিকভাবে পাল্টে দেওয়া এক শক্তিশালী রাসায়নিক বিষ।

ক্যানাবিনয়েড যৌগ: টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল ও সিন্থেটিক রূপ (Cannabinoid Compounds: Tetrahydrocannabinol and Synthetic Variants)

বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এবং সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা মাদকগুলোর অন্যতম হলো ক্যানাবিস বা গাঁজা। ক্যানাবিস স্যাটিভা উদ্ভিদের ফুল, পাতা ও আঠালো রজন থেকে এটি প্রস্তুত হয়। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এটি মারিজুয়ানা, হাশিশ, চরস বা ভাং নামে পরিচিত। এই গাছে শতাধিক রাসায়নিক উপাদান থাকে যাদের সম্মিলিতভাবে ক্যানাবিনয়েড বলা হয়। এর মধ্যে প্রধান মনোদৈহিক উপাদানটি হলো ডেল্টা-৯-টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (Delta-9-tetrahydrocannabinol) বা টিএইচসি। উদ্ভিদে আরেকটি প্রধান উপাদান থাকে যাকে বলে ক্যানাবিডিওল বা সিবিডি, যা মূলত কোনো নেশা তৈরি করে না বরং ব্যথানাশক ও প্রশান্তিদায়ক প্রভাব ফেলে। গাছের জাত ও চাষ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে টিএইচসি-র অনুপাত নিয়ন্ত্রিত হয়।

THC to CBD ratio benefits: 7 Powerful Positive Ways in 2025
টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (THC) ও ক্যানাবিডিওল (CBD)-এর আণবিক গঠনের তুলনা। উভয়ের আণবিক সংকেত একই হলেও পরমাণুর বিন্যাসের পার্থক্যের কারণে এদের ফার্মাকোলজিক্যাল প্রভাব ভিন্ন।

টিএইচসি মানবদেহের নিজস্ব এন্ডোক্যানাবিনয়েড ব্যবস্থা (Endocannabinoid system) এর ওপর কাজ করে। মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্রে অ্যানান্ডামাইড নামক একটি নিজস্ব রাসায়নিক তৈরি হয় যা ক্ষুধা, স্মৃতি এবং ব্যথার ভারসাম্য রাখে। টিএইচসি মস্তিষ্কের সিবি-১ রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হয়ে অ্যানান্ডামাইডের চেয়েও শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। অ্যাভ্রাম গোল্ডস্টেইন (Avram Goldstein) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টরগুলো মূলত মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস, সেরেবেলাম এবং সেরিব্রাল কর্টেক্সে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে থাকে (Goldstein, 2001)। এই কারণে গাঁজা সেবন করলে তাৎক্ষণিকভাবে স্বল্পমেয়াদী স্মৃতিভ্রম ঘটে, সময়ের অনুভূতি ধীর হয়ে যায় এবং পেশির সূক্ষ্ম সমন্বয় ব্যাহত হয়।

CBD 101 — Concussion Alliance
মানবদেহে সিবি-১ ও সিবি-২ ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টরের বিস্তার এবং স্নায়ুসন্ধিতে এন্ডোক্যানাবিনয়েড সংকেত পরিবহন। অ্যানান্ডামাইড ও টু-এজি (2-AG) স্নায়ুসংকেত নিয়ন্ত্রণে অংশ নেয়; উদ্ভিজ্জ টিএইচসিও ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টরে কাজ করে।

সাধারণ অবস্থায় সেবনের পর ব্যক্তি এক ধরনের হালকা শিথিলতা, অহেতুক হাসি এবং তীব্র ক্ষুধা অনুভব করে, যাকে চলতি ভাষায় ‘মাঞ্চিস’ বলা হয়। তবে এর প্রভাব সবসময় আনন্দদায়ক হয় না। বিশেষ করে আধুনিক যুগে সংকরায়ণের মাধ্যমে তৈরি হওয়া উচ্চমাত্রার টিএইচসি-যুক্ত গাঁজা অনেকের ক্ষেত্রে তীব্র উদ্বেগ, বুক ধড়ফড় এবং প্যানিক অ্যাটাক তৈরি করে। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত গাঁজা সেবনের ফলে এক ধরনের মানসিক স্থবিরতা বা অ্যামটিভেশনাল সিন্ড্রোম (Amotivational syndrome) তৈরি হয় বলে তাত্ত্বিকদের একাংশ দাবি করেন। এতে ব্যক্তি জীবনের লক্ষ্য, পড়াশোনা কিংবা কাজের প্রতি সম্পূর্ণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং এক গভীর নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে দিন কাটায়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই উদ্ভিজ্জ মাদকের বাইরে রসায়নাগারে তৈরি সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েড বা ‘স্পাইস’ ও ‘কে-টু’ এর মতো কৃত্রিম ড্রাগ এক নতুন বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ভেষজ পাতার ওপর কৃত্রিম রাসায়নিক স্প্রে করে এগুলো বিক্রি করা হয়। প্রাকৃতিক টিএইচসি যেখানে সিবি-১ রিসেপ্টরের আংশিক উদ্দীপক, এই কৃত্রিম রাসায়নিকগুলো সেখানে শতভাগ সক্রিয় হয়ে রিসেপ্টরকে আঘাত করে। ওয়েন হল এবং লুইসা ডেগেনহার্ট তাদের চিকিৎসাগত বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে কৃত্রিম এবং উচ্চমাত্রার ক্যানাবিনয়েড ব্যবহারের সাথে তীব্র সাইকোসিস, খিঁচুনি এবং তীব্র কিডনি বিকল হওয়ার সরাসরি সংযোগ রয়েছে (Hall & Degenhardt, 2009)। প্রাকৃতিক ও নিরাপদ ভেষজের মিথ্যা বিজ্ঞাপনে বিক্রি হওয়া এই উপাদানগুলো তরুণদের স্নায়ুতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করছে।

সাইকেডেলিক ও ডিসোসিয়েটিভ পদার্থ: চেতনা রূপান্তর ও বিভ্রান্তি (Psychedelics and Dissociatives: Altered Consciousness and Disorientation)

মনস্তাত্ত্বিক পদার্থগুলোর মধ্যে সাইকেডেলিক গোত্রটি তাদের সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ক্রিয়াকলাপের জন্য পরিচিত। এই শ্রেণির মাদকগুলো শরীরের গতি বাড়ায় না কিংবা ঘুম পাড়ায় না, বরং মানুষের ইন্দ্রিয়লব্ধ বাস্তবতার জগৎটিকে সম্পূর্ণ চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। ১৯৩৮ সালে সুইস রসায়নবিদ আলবার্ট হফম্যান আরগট ছত্রাক নিয়ে গবেষণার সময় লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইইথাইলঅ্যামাইড বা এলএসডি সংশ্লেষণ করেন। এর বাইরে রয়েছে বিভিন্ন মাশরুমে পাওয়া সাইলোসাইবিন এবং মেক্সিকান পেয়োটে ক্যাকটাসে থাকা মেস্কালাইন। এই পদার্থগুলো কোনো শারীরিক আসক্তি বা সহনশীলতাজনিত প্রত্যাহার সংকট তৈরি করে না, তবুও এদের অপব্যবহার গভীর মনস্তাত্ত্বিক ঝুঁকির কারণ।

ক্লাসিক্যাল সাইকেডেলিকগুলো মস্তিষ্কের সেরোটোনিন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত হয়, বিশেষ করে সেরোটোনিন ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টর (Serotonin 5-HT2A receptor) এর ওপর এদের প্রবল আকর্ষণ থাকে। ডেভিড ই. নিকোলস (David E. Nichols) সাইকেডেলিক পদার্থের ফার্মাকোলজি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে এই রাসায়নিকগুলো মস্তিষ্কের কর্টিকো-স্ট্রায়াটো-থ্যালামো-কর্টিক্যাল লুপের তথ্য প্রক্রিয়াকরণকে বদলে দেয় (Nichols, 2016)। সাধারণ অবস্থায় মস্তিষ্কের যে ‘ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক’ মানুষের আত্মসচেতনতা বা অহংবোধ নিয়ন্ত্রণ করে, সাইকেডেলিকের প্রভাবে তা সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এর ফলে ব্যক্তি অনুভব করে ‘ইগো ডেথ’ বা আত্মবিলোপ। ইন্দ্রিয়গুলো পরস্পরের সাথে মিশে যায়; মানুষ রঙ শুনতে পায় কিংবা শব্দ দেখতে পায়, বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলে সাইনেস্থেশিয়া।

Wie LSD das Ich auflöst
কার্যকরী চৌম্বকীয় অনুরণন চিত্রায়ণের (fMRI) মাধ্যমে এলএসডির প্রভাবে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের কার্যকরী সংযোগের পরিবর্তন। গবেষণায় দেখা যায়, সেরোটোনিন ৫-এইচটি২এ রিসেপ্টরের সক্রিয়তা এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী।

এর পাশাপাশি রয়েছে ডিসোসিয়েটিভ অ্যানেস্থেটিক গোত্র, যার মধ্যে কেটামিন এবং ফেনসাইক্লিডিন বা পিসিপি প্রধান। এরা সাইকেডেলিকের মতো সেরোটোনিনে কাজ করে না, বরং মস্তিষ্কের এন-মিথাইল-ডি-অ্যাসপার্টেট রিসেপ্টর (N-methyl-D-aspartate receptor) কে অবরুদ্ধ করে দেয়। এর ফলে শরীর ও মনের মধ্যে একটি বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। ব্যক্তি নিজেকে নিজের দেহের বাইরে ভাসমান মনে করে, যাকে বলা হয় ‘আউট অব বডি এক্সপেরিয়েন্স’। অতিরিক্ত মাত্রায় কেটামিন গ্রহণ করলে মানুষ সম্পূর্ণভাবে বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘কে-হোল’ নামক এক অনুভূতিহীন অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যায়। এই অবস্থায় চলাফেরার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলায় মারাত্মক শারীরিক দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে।

14.3: Psychotherapeutics - Social Sci LibreTexts
কেটামিনের মাধ্যমে এনএমডিএ (NMDA) রিসেপ্টর অবরোধ এবং গ্লুটামেট-নির্ভর স্নায়ুসংকেতের পরিবর্তন। কেটামিনের ডিসোসিয়েটিভ ও অন্যান্য স্নায়ুবৈজ্ঞানিক প্রভাব বোঝার জন্য এই কার্যপদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ।

সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দিক হলো এর অনিশ্চয়তা, যাকে বলা হয় ‘ব্যাড ট্রিপ’। মানসিক অবস্থা এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ অনুকূল না হলে ব্যক্তি চরম ভয়, মৃত্যুভীতি এবং নারকীয় বিভ্রমের মুখোমুখি হতে পারে। অনেক সময় এই ড্রাগগুলোর প্রভাব কেটে যাওয়ার কয়েক মাস বা কয়েক বছর পরও ব্যক্তি হঠাৎ করেই সেই বিভ্রমের জগতে ফিরে যায়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয় হ্যালুসিনোজেন পারসিস্টিং পারসেপশন ডিজঅর্ডার (Hallucinogen persisting perception disorder)। এছাড়া যাদের পরিবারে সিজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক রোগের ইতিহাস রয়েছে, সাইকেডেলিক তাদের সুপ্ত মানসিক ভারসাম্যহীনতাকে চিরতরে জাগিয়ে তুলতে পারে। চেতনা নিয়ে এই রাসায়নিক জুয়া তাই ব্যক্তির মানসিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের নিস্তেজক: অ্যালকোহল ও ইনহ্যাল্যান্টস (Central Nervous System Depressants: Alcohol and Inhalants)

আইনি বৈধতা এবং সহজলভ্যতার কারণে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি অপব্যবহৃত এবং প্রাণঘাতী অবসাদক হলো অ্যালকোহল বা ইথানল। প্রাচীনকাল থেকে নানা শস্য ও ফল ফার্মান্টেশনের মাধ্যমে এটি তৈরি হয়ে আসছে। এর পাশাপাশি আধুনিক শিল্পায়নের যুগে আরেক ধরনের মারাত্মক অপব্যবহারের বিস্তার ঘটেছে, যা হলো ইনহ্যাল্যান্ট বা উদ্বায়ী জৈব দ্রাবক। দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত কিশোরদের মাঝে আঠা, পেইন্ট থিনার, গ্যাসোলিন কিংবা অ্যারোসল স্প্রে নাক বা মুখ দিয়ে টেনে নেশা করার এই প্রবণতা অত্যন্ত ভয়াবহ। উভয় শ্রেণির উপাদানই কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সাধারণ কার্যক্রমকে অবদমিত করে এবং মস্তিষ্কের সার্বিক সংযোগ ক্ষমতা ধীর করে দেয়।

অ্যালকোহল মস্তিষ্কের প্রধান প্রতিরোধমূলক রাসায়নিক গাবা-এর রিসেপ্টরকে অতিরিক্ত সক্রিয় করে তোলে এবং একই সাথে গ্লুটামেট নামক উত্তেজক রাসায়নিকের রিসেপ্টরকে ব্লক করে দেয়। ফলে স্নায়ুর বৈদ্যুতিক প্রবাহ কমে যায়। পান করার শুরুতে মানুষের মানসিক জড়তা বা দ্বিধা দূর হয়, যাকে অনেকে সামাজিক স্বস্তি মনে করেন। কিন্তু মাত্রা বাড়ার সাথে সাথে মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে যুক্তিহীন আচরণ, কথা জড়িয়ে যাওয়া, দৃষ্টি ঘোলাটে হওয়া এবং ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। থমাস এফ. বাবর (Thomas F. Babor) এবং তার সহ-গবেষকরা তাদের বৈশ্বিক নির্দেশিকায় দেখিয়েছেন যে অনিয়ন্ত্রিত অ্যালকোহল ব্যবহার কেবল ব্যক্তিগত যকৃতের ক্ষতি করে না, বরং তা সহিংস অপরাধ, সড়ক দুর্ঘটনা এবং পারিবারিক ভাঙনের অন্যতম প্রধান উৎস (Babor et al., 2001)।

Alcohol and alcoholism associated neurological disorders: Current updates in a global perspective and recent recommendations
অ্যালকোহল কীভাবে গাবার নিবৃত্তিমূলক প্রভাব বৃদ্ধি এবং গ্লুটামেটের উত্তেজক সংকেত হ্রাস করতে পারে, তার বৈজ্ঞানিক চিত্র।

দীর্ঘদিন অ্যালকোহল পানের শারীরবৃত্তীয় ক্ষতি অপূরণীয়। এটি মানবদেহের প্রায় প্রতিটি প্রধান অঙ্গকে আক্রমণ করে। লিভার সিরোসিস, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ, কার্ডিওমায়োপ্যাথি এবং কণ্ঠনালী ও পাকস্থলীর ক্যান্সার এর প্রত্যক্ষ ফল। মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হিসেবে দেখা দেয় ওয়ার্নিক-করসাকফ সিন্ড্রোম, যেখানে ভিটামিন বি-১ এর অভাবে অনেক সময় ব্যক্তির নতুন স্মৃতি ধারণের ক্ষমতা চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো দীর্ঘমেয়াদী আসক্তির পর হঠাৎ মদ্যপান বন্ধ করে দিলে শরীরে শুরু হয় ‘ডেলিরিয়াম ট্রেমেনস’। এই তীব্র প্রত্যাহারের সময় রোগী প্রচণ্ড কাঁপুনি, ভয়াবহ হ্যালুসিনেশন এবং হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুর মুখে পড়তে পারে। চিকিৎসাগত নিবিড় পরিচর্যা ছাড়া অ্যালকোহলের শারীরিক প্রত্যাহার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

ইনহ্যাল্যান্টের ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির রূপটি আরও দ্রুত ও ভয়াবহ। এই রাসায়নিক দ্রাবকগুলো চর্বি-দ্রবণীয় হওয়ায় রক্তে মেশার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মস্তিষ্কের মায়েলিন আবরণী ধ্বংস করতে শুরু করে। তীব্র অক্সিজেনের অভাবে মস্তিষ্কের নিউরনগুলো কোষীয় স্তরে মারা যায়। প্রথমবার শুঁকেই কিশোর-কিশোরীরা ‘সাডেন স্নিফিং ডেথ সিন্ড্রোম’ এ আক্রান্ত হয়ে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মারা যেতে পারে। বেঁচে থাকলেও এদের পরিণতি হয় স্থায়ী মস্তিষ্কের পক্ষাঘাত, দৃষ্টিশক্তিহীনতা, শ্রবণশক্তি হ্রাস এবং অপরিবর্তনীয় কিডনি অকার্যকারিতা। আইনি বেড়াজালের বাইরে থাকা এই সস্তা বিষাক্ত পদার্থগুলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্নায়বিক স্বাস্থ্যকে নীরবে নিঃশেষ করে চলেছে।

মাদকাসক্তির ধারণা (Drug Addiction): নির্ভরশীলতা ও আসক্তির বিকাশ

আসক্তির ধারণাগত রূপান্তর ও চিকিৎসাগত মডেল (Conceptual Transformation of Addiction and the Disease Model)

মানুষ যখন কোনো বিশেষ অভ্যাসের কাছে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তখন সমাজ তাকে কীভাবে দেখে? মানব ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মাদকাসক্তিকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিচার করা হয়েছে নিছক একটি নৈতিক স্খলন বা চরিত্রের দুর্বলতা হিসেবে। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বিশ্বাসে মনে করা হতো, যে ব্যক্তি মদ্যপান বা আফিমের প্রতি অতিরিক্ত অনুরক্ত হয়ে পড়ে, সে মূলত নীতিহীন এবং তার ইচ্ছাশক্তির অভাব রয়েছে। বিচ্যুত এই আচরণকে সংশোধন করার জন্য তখন প্রয়োগ করা হতো সামাজিক কলঙ্ক, শারীরিক শাস্তি কিংবা সমাজ থেকে বহিষ্কারের মতো বিধান। কিন্তু উনিশ এবং বিশ শতকে বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ এই দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীর পরিবর্তন এনে দেয়। গবেষকরা বুঝতে শুরু করেন যে একজন মানুষের মস্তিষ্কে বাহ্যিক রাসায়নিকের নিয়মিত উপস্থিতি কোনো বায়বীয় পাপের জন্ম দেয় না, বরং তা স্নায়বিক স্তরে স্থায়ী শারীরিক পরিবর্তন ঘটায়।

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আধুনিক ইমেজিং প্রযুক্তির বিকাশের পর আসক্তিকে একটি সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসা সম্ভব হয়। মার্কিন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন ড্রাগ অ্যাবিউজ-এর সাবেক পরিচালক অ্যালান আই. লেশনার (Alan I. Leshner) তার একটি প্রভাবশালী গবেষণা নিবন্ধে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন যে আসক্তি মূলত একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং বারবার ফিরে আসা মস্তিষ্কের রোগ (Leshner, 1997)। তার এই অবস্থান চিকিৎসা বিজ্ঞানের জগতে মস্তিষ্কের রোগ মডেল (Brain disease model) হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। এই মডেলের মূল কথা হলো, একজন ব্যক্তি হয়তো শুরুতে নিজের ইচ্ছায় মাদক গ্রহণ শুরু করে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের পর মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যপদ্ধতি এমনভাবে বদলে যায় যে মাদক গ্রহণের ওপর তার সচেতন বা ঐচ্ছিক নিয়ন্ত্রণ আর অবশিষ্ট থাকে না।

রোগ মডেলের এই উত্থান মাদকাসক্তদের প্রতি আইনি ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে অনেকটাই বদলে দেয়। যখন আসক্তিকে ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো একটি দীর্ঘস্থায়ী জটিল শারীরিক ব্যাধি হিসেবে গণ্য করা শুরু হলো, তখন শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা সামনে চলে আসে। চিকিৎসাবিজ্ঞান দেখায় যে মাদকের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং বিচার-বুদ্ধির কেন্দ্রটিকে কার্যত বিকল করে দেয়। ফলে আসক্ত ব্যক্তি চাইলেও খুব সহজে মাদক গ্রহণের তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে থামিয়ে রাখতে পারে না। এই জৈবিক বাস্তবতা আসক্তিকে অপরাধের কাঠগড়া থেকে নামিয়ে হাসপাতালের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে আসার ভিত্তি তৈরি করে।

তবে চিকিৎসাগত এই ব্যাখ্যার কিছু সীমাবদ্ধতাও গবেষকদের চোখে ধরা পড়েছে। মনস্তাত্ত্বিক ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ জিন এম. হেম্যান (Gene M. Heyman) তার তত্ত্বে রোগ মডেলের কঠোর জৈবিক রূপটির সমালোচনা করে যুক্তি দেন যে আসক্তিকে একটি সম্পূর্ণ অনৈচ্ছিক বা স্বয়ংক্রিয় জৈবিক ব্যাধি হিসেবে দেখা সমীচীন নয়, বরং এটি প্রণোদনা ও পছন্দের এক জটিল রূপান্তর (Heyman, 2009)। তিনি দেখান যে উপযুক্ত বিকল্প, সামাজিক সমর্থন এবং বাস্তব অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হলে বহু মানুষ চিকিৎসাগত হস্তক্ষেপ ছাড়াই মাদক ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে, যা সাধারণ কোনো মস্তিষ্কের স্থায়ী রোগে সম্ভব হয় না। ফলে সমসাময়িক বিজ্ঞান আসক্তিকে এমন এক সংকট হিসেবে দেখে যা একদিকে স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে, আবার অন্যদিকে ব্যক্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সামাজিক বাস্তবতার সাথেও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকে।

শারীরবৃত্তীয় বনাম মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতার মেকানিজম (Mechanisms of Physiological versus Psychological Dependence)

মাদকাসক্তির আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় দুটি শব্দ – শারীরিক নির্ভরতা এবং মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতা। এই দুইয়ের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্য এবং মেলবন্ধনকে বুঝতে পারলে আসক্তির রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যখন কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন কোনো নির্দিষ্ট রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করাতে থাকে, তখন মানবদেহ সেই রাসায়নিকের উপস্থিতির সাথেই নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে শুরু করে। জীববিজ্ঞানের ভাষায় এই ভারসাম্য রক্ষার প্রক্রিয়াকে বলা হয় হোমাস্ট্যাসিস। এই অবস্থায় বহিরাগত ড্রাগটি দেহের স্বাভাবিক কাজের এক কৃত্রিম অংশ হয়ে দাঁড়ায়। একেই বলা হয় শারীরিক নির্ভরতা (Physical dependence)। শরীর তখন ধরে নেয় যে এই রাসায়নিকটির উপস্থিতিই স্বাভাবিক অবস্থা।

Ch. 1: Substance Use & Misuse versus Substance Use Disorders – Theories and Biological Basis of Addiction
মাদকাসক্তির তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত পর্যায় – মাদক গ্রহণ ও নেশাগ্রস্ততা, প্রত্যাহার ও নেতিবাচক আবেগ এবং পুনরায় মাদক গ্রহণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এই চক্র শারীরবৃত্তীয় ও মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতার পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরে।

শারীরিক নির্ভরতার সবচেয়ে প্রত্যক্ষ বহিঃপ্রকাশ ঘটে দুটি প্রধান উপসর্গের মাধ্যমে: সহনশীলতা এবং প্রত্যাহার সংকট। নিয়মিত ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্কের রিসেপ্টরগুলো রাসায়নিকের প্রতি কম সংবেদনশীল হয়ে পড়ে, যার ফলে একই ধরনের অনুভূতি বা উপশম পেতে ক্রমাগত ওষুধের মাত্রা বাড়াতে হয়। এই দশাকে বলা হয় সহনশীলতা (Tolerance)। কিন্তু আসল বিপর্যয়টি ঘটে যখন কোনো কারণে ব্যক্তি হঠাৎ মাদক গ্রহণ বন্ধ করে দেয়। যেহেতু স্নায়ুতন্ত্র ড্রাগটির কৃত্রিম ভারসাম্যে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল, তাই এর অনুপস্থিতিতে শরীর তীব্র বিদ্রোহ শুরু করে। এই অবস্থাকে বলা হয় প্রত্যাহার উপসর্গ (Withdrawal symptoms)। হেরোইন বা অ্যালকোহল প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে ঠান্ডা ঘাম, পেশির তীব্র খিঁচুনি, রক্তচাপের বিপজ্জনক ওঠানামা এবং অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণা ব্যক্তিকে আক্ষরিক অর্থেই দিশেহারা করে তোলে।

Figure 2.12, The Primary Brain Regions and Neurotransmitter Systems Involved in Each of the Three Stages of the Addiction Cycle - Facing Addiction in America - NCBI Bookshelf
মাদকাসক্তির বিভিন্ন পর্যায়ে বেসাল গ্যাংলিয়া, সম্প্রসারিত অ্যামিগডালা এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের ভূমিকা। ডোপামিন, গ্লুটামেট ও মানসিক চাপ-সম্পর্কিত স্নায়ুসংকেতের পরিবর্তন কীভাবে নির্ভরতা, প্রত্যাহার এবং পুনরায় মাদক গ্রহণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত, তা দেখানো হয়েছে।

এর বিপরীতে রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতা (Psychological dependence), যা বাহ্যিক শারীরিক যন্ত্রণার চেয়ে কোনো অংশে কম শক্তিশালী নয়। এটি হলো মনের একটি গভীর মানসিক ও আবেগীয় অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি বিশ্বাস করতে শুরু করে যে মাদক ছাড়া সে স্বাভাবিকভাবে বাঁচতেই পারবে না। তীব্র মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা, একাকীত্ব বা জীবনের যেকোনো সংকট মোকাবেলার একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে তখন মাদককে দেখা হয়। ব্যক্তির ভেতরে তখন কাজ করে এক দুর্বার তীব্র আকাঙ্ক্ষা (Craving)। এই মানসিক টান এতটাই তীব্র হয় যে রোগী শারীরিকভাবে ড্রাগের শারীরিক বিষক্রিয়া থেকে মুক্ত হওয়ার পরও মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর কেবল মানসিক নির্ভরতার কারণে আবারও মাদকের পুরনো চক্রে ফিরে যায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক গবেষকরা অবশ্য এই শারীরিক এবং মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতার মধ্যকার কৃত্রিম দেওয়ালটিকে ভেঙে ফেলার পক্ষে যুক্তি দেন। কারণ মনস্তাত্ত্বিক টানও শূন্যে তৈরি হয় না; এর পেছনে থাকে মস্তিষ্কের স্মৃতি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অ্যামিগডালা এবং হিপোক্যাম্পাসের সুনির্দিষ্ট নিউরোট্রান্সমিটারের পরিবর্তন। কোনো পুরনো পরিচিত গলি, ড্রাগ গ্রহণের সঙ্গী বা খালি ইনজেকশনের সিরিঞ্জ দেখার সাথে সাথে ব্যক্তির মস্তিষ্কে ডোপামিনের যে তরঙ্গ তৈরি হয়, তা একদিকে মানসিক আকুলতা তৈরি করে এবং একই সাথে হৃৎস্পন্দন বৃদ্ধি ও ঘাম হওয়ার মতো শারীরিক লক্ষণও ফুটিয়ে তোলে। কাজেই নির্ভরতা হলো মন ও শরীরের সম্মিলিত এক জৈবিক দাসত্ব, যা মানুষের সমগ্র অস্তিত্বকে গ্রাস করে ফেলে।

AUD Brain Proteomics Atlas
মানবমস্তিষ্কের অ্যামিগডালা, হিপোক্যাম্পাস, নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্স ও ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়ার অবস্থান। এই অঞ্চলগুলো আবেগ, স্মৃতি, পুরস্কার-শিক্ষণ এবং মাদক-সম্পর্কিত সংকেতের প্রতি প্রতিক্রিয়া গঠনে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রণোদনা-সংবেদনশীলকরণ ও অভ্যাস গঠন প্রক্রিয়া (Incentive-Sensitization and Habit Formation Process)

মাদকাসক্তির ক্ষেত্রে একটি চিরন্তন ধাঁধাঁ হলো – মানুষ কেন এমন একটি বস্তু বারবার গ্রহণ করে যা তাকে আর আগের মতো সুখ দেয় না? সাধারণ ধারণায় মনে করা হয়, মাদকাসক্ত ব্যক্তি কেবল পরম আনন্দ পাওয়ার লোভে মাদক নেয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, দীর্ঘদিন মাদক ব্যবহারের পর ব্যক্তির আনন্দের অনুভূতি একসময় প্রায় শূন্যে নেমে আসে, অথচ মাদক পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। স্নায়ুবিজ্ঞানের জগতে এই ধাঁধাঁর সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য উত্তর দিয়েছে টেরি ই. রবিনসন (Terry E. Robinson) এবং কেন্ট সি. বেরিজের উদ্ভাবিত তত্ত্ব, যা পরিচিত প্রণোদনা-সংবেদনশীলকরণ তত্ত্ব (Incentive-sensitization theory) নামে (Robinson & Berridge, 1993)।

এই তত্ত্বে গবেষকদ্বয় মস্তিষ্কের আনন্দের অনুভূতির সাথে আকাঙ্ক্ষার অনুভূতিকে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করেন। তারা দেখান যে কোনো কিছু ‘পছন্দ করা’ বা আনন্দ পাওয়া এবং কোনো কিছু ‘চাওয়া’ বা তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করা মস্তিষ্কের একই রাসায়নিক দিয়ে পরিচালিত হয় না। আনন্দের অনুভূতি বা পছন্দ করা (Liking) নিয়ন্ত্রিত হয় মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র কিছু অপিয়েট ও গাবা রিসেপ্টর দ্বারা, যেগুলোকে বলা হয় হেডোনিক হটস্পট। অন্যদিকে কোনো কিছু তীব্রভাবে চাওয়া বা আকাঙ্ক্ষা করা (Wanting) পরিচালিত হয় মেসোলিম্বিক ডোপামিন ব্যবস্থার মাধ্যমে। মাদক নিয়মিত ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্কের এই ডোপামিন ব্যবস্থা অস্বাভাবিক সংবেদনশীল হয়ে ওঠে, যার ফলে ড্রাগের প্রতি ‘চাওয়া’ বা প্রণোদনা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, যদিও হেডোনিক হটস্পটের ক্ষয়িষ্ণুতার কারণে ড্রাগের আনন্দ বা ‘পছন্দ করার’ ক্ষমতা ক্রমাগত কমতে থাকে।

Positive Affect: Nature and brain bases of liking and wanting - PMC
মস্তিষ্কে আকাঙ্ক্ষা বা চাওয়ার (Wanting) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিস্তৃত ডোপামিন-নির্ভর স্নায়ুব্যবস্থা এবং আনন্দ বা পছন্দ করার (Liking) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র হেডোনিক হটস্পটগুলোর অবস্থান। সবুজ অংশ আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এবং হলুদ অংশ আনন্দানুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

এই প্রক্রিয়ার পাশাপাশি স্নায়ুতন্ত্রের গভীরে চলতে থাকে আরেকটি রূপান্তর, যাকে বলা হয় অভ্যাস গঠন। যখন কোনো ব্যক্তি শুরুতে মাদক গ্রহণ করে, তখন তার আচরণটি থাকে উদ্দেশ্যমূলক বা গোল-ডিরেক্টেড। সে সচেতনভাবে আনন্দের জন্য বা ব্যথা কমানোর জন্য ড্রাগটি খুঁজে নেয়। এই প্রাথমিক পর্যায়টি মস্তিষ্কের ভেন্ট্রাল স্ট্রাইটাম অঞ্চল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু আচরণটি যখন শত শত বার পুনরাবৃত্তি হতে থাকে, তখন স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের গভীরে অবস্থিত ডরসাল স্ট্রাইটামে স্থানান্তরিত হয়। ব্যারি জে. এভারিট এবং ট্রেভর ডব্লিউ. রবিন্স তাদের গবেষণায় বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে মাদক ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ ভেন্ট্রাল স্ট্রাইটাম থেকে ডরসাল স্ট্রাইটামে সরে যাওয়ার ফলে উদ্দেশ্যমূলক আচরণটি একটি স্বয়ংক্রিয় ও বাধ্যতামূলক অভ্যাসে পরিণত হয় (Everitt & Robbins, 2005)।

Training & Education | Center for the Translational Neuroscience of Alcohol (CTNA)
প্রাথমিক প্রণোদনানির্ভর আচরণ থেকে শর্তাধীন পুনর্বলন এবং পরবর্তী অভ্যাস গঠনের স্নায়বিক প্রক্রিয়া। এতে ভেন্ট্রাল স্ট্রাইটাম, ডরসাল স্ট্রাইটাম, প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স এবং ডোপামিন-গ্লুটামেট সংকেতব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্ক দেখানো হয়েছে।

একবার যখন এই স্বয়ংক্রিয় অভ্যাস গঠিত হয়ে যায়, তখন মাদক গ্রহণ কোনো যুক্তির ওপর নির্ভর করে না। পরিবেশের একটি ছোট ইঙ্গিত, যেমন একটি পরিচিত গন্ধ, কোনো নির্দিষ্ট গান বা পরিচিত কোনো বন্ধুবান্ধবের উপস্থিতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই অভ্যাসকে সচল করে তোলে। ব্যক্তি তখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছায় যেখানে সে জানে যে মাদকটি গ্রহণ করলে তার পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে, স্বাস্থ্য ভেঙে পড়বে এবং কোনো আনন্দও পাওয়া যাবে না; তবুও তার মস্তিষ্কের গভীরের সেই সংবেদনশীল অভ্যাস তাকে টেনে নিয়ে যায় একই আচরণের পুনরাবৃত্তির দিকে। আসক্তি তাই আনন্দের অন্বেষণ নয়, এটি হলো মস্তিষ্কের শেখার ও প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থার এক মারাত্মক স্নায়বিক অপব্যবহার।

Frontiers | Dorsal Striatal Circuits for Habits, Compulsions and Addictions
লক্ষ্যনির্ভর আচরণ, অভ্যাস এবং বাধ্যতামূলক আচরণের মধ্যকার সম্পর্কের বৈজ্ঞানিক মডেল। এতে দেখানো হয়েছে, আচরণ বারবার পুনরাবৃত্তির ফলে ফলাফলের মূল্যায়নের ওপর নির্ভরতা কমে গিয়ে উদ্দীপনা-প্রতিক্রিয়াভিত্তিক স্বয়ংক্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে পারে।

ডায়াগনস্টিক ম্যানুয়ালের বিবর্তন: অপব্যবহার থেকে ব্যবহারজনিত ব্যাধি (Evolution of Diagnostic Manuals: From Abuse to Substance Use Disorder)

মাদকের ক্ষতিকর ব্যবহারকে চিকিৎসাবিজ্ঞান কীভাবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে, তার ইতিহাস অত্যন্ত গতিশীল ও শিক্ষণীয়। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যখন আন্তর্জাতিক মানসিক রোগের তালিকা তৈরি শুরু হয়, তখন মাদকাসক্তিকে দেখা হতো সমাজবিরোধী ব্যক্তিত্বের ত্রুটি হিসেবে। আমেরিকার সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম দিককার নির্দেশিকায় আসক্তিকে কোনো স্বাধীন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবেই ভাবা হতো না। কিন্তু চিকিৎসার অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে এই সংকটকে সুনির্দিষ্ট লক্ষণ ও মাপকাঠির ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করা প্রয়োজন। আশির দশক থেকে ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল বা ডিএসএম-এ মাদক সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর একটি সুসংহত রূপরেখা দেওয়া শুরু হয়।

ডিএসএম-এর তৃতীয় ও চতুর্থ সংস্করণে একটি কৃত্রিম বিভাজন বজায় রাখা হয়েছিল। সেখানে একটি ভাগ ছিল মাদকের অপব্যবহার (Substance abuse) এবং অন্যটি ছিল তুলনামূলক জটিল পর্যায় যাকে বলা হতো মাদক নির্ভরতা (Substance dependence)। অপব্যবহার বলতে বোঝানো হতো যখন কোনো ব্যক্তি মাদক ব্যবহারের কারণে সামাজিক, পারিবারিক বা আইনি সমস্যায় জড়িয়ে পড়ে কিন্তু তার শরীরে তখনও মারাত্মক শারীরিক নির্ভরতা তৈরি হয়নি। অন্যদিকে নির্ভরতা বলতে বোঝানো হতো সেই পরিস্থিতিকে যেখানে শরীরে তীব্র সহনশীলতা ও প্রত্যাহার লক্ষণ দেখা দেয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে চিকিৎসকরা দেখলেন এই বিভাজনটি চিকিৎসাগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রায়শই বিভ্রান্তি তৈরি করছে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে শারীরিক নির্ভরতার স্পষ্ট লক্ষণ না থাকা সত্ত্বেও তাদের অনিয়ন্ত্রিত মাদক গ্রহণ জীবনকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছিল।

এই বাস্তবতায় ২০১৩ সালে প্রকাশিত ডিএসএম-এর পঞ্চম সংস্করণে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (American Psychiatric Association) তাদের ডিএসএম-৫ সংস্করণে অপব্যবহার ও নির্ভরতার মধ্যকার সেই পুরোনো কৃত্রিম বিভাজন পুরোপুরি বাতিল করে দেয় এবং একটি সমন্বিত পরিভাষা প্রবর্তন করে, যার নাম মাদক ব্যবহারজনিত ব্যাধি (Substance use disorder) (American Psychiatric Association, 2013)। নতুন এই নির্দেশিকায় মোট এগারোটি সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড বা উপসর্গ নির্ধারণ করা হয়। এই উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে ব্যবহার, বারবার চেষ্টা করেও কমাতে না পারা, মাদকের চিন্তায় অধিকাংশ সময় ব্যয় করা, ব্যক্তিগত ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি জেনেও ব্যবহার অব্যাহত রাখা, এবং সহনশীলতা ও প্রত্যাহার লক্ষণের উপস্থিতি।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization) তাদের আন্তর্জাতিক রোগ শ্রেণিবিন্যাসের একাদশ সংস্করণ বা আইসিডি-১১ এ প্রায় সমমানের বিজ্ঞানসম্মত মানদণ্ড গ্রহণ করেছে (World Health Organization, 2019)। রোগীকে এখন আর একটি বাইনারি বা ‘হ্যাঁ/না’ কাঠামোর ভেতর ফেলা হয় না, বরং তার সমস্যার তীব্রতা পরিমাপ করা হয় একটি ধারাবাহিক স্কেলের মাধ্যমে। এগারোটি উপসর্গের মধ্যে কয়টি লক্ষণ বিদ্যমান, তার ওপর ভিত্তি করে ব্যাধিটিকে মৃদু, মাঝারি বা তীব্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই রূপান্তরটি আসক্তিকে একটি অস্পষ্ট নৈতিক অপরাধ থেকে মুক্ত করে একটি বস্তুনিষ্ঠ, পরিমাপযোগ্য এবং বৈজ্ঞানিক স্বাস্থ্য সংকটে পরিণত করেছে।

আসক্তির বিকাশের পর্যায়ক্রমিক গতিধারা (Developmental Trajectory and Stages of Addiction)

কোনো মানুষ একদিন ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ নিজেকে চরম মাদকাসক্ত হিসেবে আবিষ্কার করে না। আসক্তির বিকাশ একটি দীর্ঘমেয়াদী, ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা জটিল মনোদৈহিক গতিধারা। এটি শুরু হয় কৌতূহল দিয়ে এবং সময়ের ব্যবধানে তা রূপ নেয় এক নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া সংকটে। গবেষকরা আসক্তির এই বিকাশমান যাত্রাকে সাধারণত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট স্তরে ভাগ করে বিশ্লেষণ করে থাকেন। প্রথম স্তরটি হলো পরীক্ষামূলক ব্যবহার। এই পর্যায়ে ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট বন্ধুমহলের প্ররোচনায়, নিছক কৌতূহল থেকে কিংবা সাময়িক উত্তেজনা লাভের আশায় জীবনে প্রথমবারের মতো কোনো মাদক গ্রহণ করে। এই প্রাথমিক অভিজ্ঞতায় কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না; ব্যক্তি মনে করে সে যখন খুশি এটা বন্ধ করে দিতে পারবে।

দ্বিতীয় স্তরটি হলো অনিয়মিত বা সামাজিক ব্যবহার। এই স্তরে মাদক কেবল বিশেষ কোনো উৎসব, উইকএন্ডের পার্টি কিংবা বিশেষ সামাজিক জমায়েতে বিনোদনের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন ব্যক্তি লক্ষ্য করে যে এই রাসায়নিক উপাদানটি তার মানসিক ক্লান্তি, রাগ কিংবা পারিবারিক চাপ কমাতে সাহায্য করছে, তখনই রূপান্তর শুরু হয়। সে সামাজিক উপলক্ষ ছাড়াই নিজের মানসিক ভারসাম্য ঠিক রাখতে একা একাই ড্রাগ গ্রহণ করতে শুরু করে। এই স্তরটিকে বলা হয় ঝুঁকিপূর্ণ বা নিয়মিত ব্যবহার। এখানে মাদক ধীরে ধীরে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করতে থাকে এবং ব্যক্তি অবচেতনভাবেই মাদক গ্রহণের জন্য টাকা জমানো বা সময় বের করার পরিকল্পনা করতে শুরু করে।

তৃতীয় স্তরে এসে আচরণটি পরিবর্তিত হয় ক্ষতিপূরণমূলক আচরণে। ব্যক্তি তখন আর সুখ পাওয়ার জন্য ড্রাগ নেয় না; বরং তার শরীর ও মনের ভেতর যে অসহ্য অস্বস্তি, শূন্যতা ও যন্ত্রণার জন্ম হয়, তা থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে ড্রাগ গ্রহণ করে। ইতিবাচক অনুভূতির অন্বেষণ তখন নেতিবাচক অনুভূতি থেকে পালানোর মরিয়া চেষ্টায় রূপ নেয়। রবার্ট ওয়েস্ট এবং জেমি ব্রাউন তাদের বিশদ আসক্তি তত্ত্বে দেখিয়েছেন কীভাবে মানব আচরণের আত্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ধাপে ধাপে ভেঙে পড়ে এবং অনুপ্রেরণা কাঠামোটি এককভাবে মাদকের ওপর কেন্দ্রীভূত হয়ে যায় (West & Brown, 2013)। ব্যক্তি এই পর্যায়ে পরিবারের সাথে মিথ্যা কথা বলা, কাজ বা পড়াশোনায় ফাঁকি দেওয়া এবং অর্থনৈতিক সংকটে জড়িয়ে পড়ার মতো চরম ধ্বংসাত্মক আচরণগুলো জেনেবুঝেও করতে থাকে।

চূড়ান্ত স্তরটি হলো চরম আসক্তি এবং ক্রনিক রিল্যাপ্স বা পুনরাবৃত্তির চক্র। এই স্তরে মাদকাসক্ত ব্যক্তির সমগ্র অস্তিত্ব পরিচালিত হয় একটি মাত্র উদ্দেশ্যে – কীভাবে পরবর্তী ডোজটি সংগ্রহ করা যাবে। মাদকের অভাবে শরীর ও মস্তিষ্ক কাজ করতে অস্বীকার করে। ব্যক্তি যদি কোনোভাবে পুনর্বাসনে গিয়ে মাদক ব্যবহার বন্ধও করে, আসক্তির এই বিকাশমান গতিধারার কারণে কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর তার আবারও আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত প্রবল থাকে। মস্তিষ্কে যে স্মৃতি এবং প্রণোদনার ছাপ স্থায়ীভাবে অঙ্কিত হয়ে গেছে, তা ব্যক্তির সারা জীবনের জন্য একটি সুপ্ত ঝুঁকির কারণ হিসেবে রয়ে যায়। আসক্তির এই জটিল পর্যায়ক্রমটি স্পষ্ট করে দেয় কেন একে দ্রুততম সময়ে প্রাথমিক স্তরেই শনাক্ত করা এবং হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন।

বায়োসাইকোসোশ্যাল মডেল: আসক্তির বহুমাত্রিক মিথস্ক্রিয়া (The Biopsychosocial Model: Multidimensional Interactions of Addiction)

আসক্তিকে যদি কেবল মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের ত্রুটি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে একটি বড় সত্য আড়ালে থেকে যায়। আবার যদি এটিকে কেবল দারিদ্র্য বা খারাপ সঙ্গের মতো সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, তবে এর স্নায়বিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা হয়। এই একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক বিজ্ঞান আসক্তিকে ব্যাখ্যা করে বহুমাত্রিক এক সমীকরণের মাধ্যমে। ১৯৭০-এর দশকে প্রখ্যাত মনোচিকিৎসক জর্জ এল. এঞ্জেল (George L. Engel) সামগ্রিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের জন্য একটি যুগান্তকারী রূপরেখা প্রস্তাব করেছিলেন, যা পরিচিত বায়োসাইকোসোশ্যাল মডেল (Biopsychosocial model) নামে (Engel, 1977)। আসক্তিকে গভীরভাবে বুঝতে হলে এই মডেলের তিনটি প্রধান স্তম্ভ – জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক উপাদানের জটিল মিথস্ক্রিয়াকে একযোগে অনুধাবন করতে হয়।

এই মডেলের প্রথম স্তম্ভটি হলো জৈবিক উপাদান। জিনগত বৈশিষ্ট্য আসক্তির ঝুঁকিতে অত্যন্ত বড় ভূমিকা পালন করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের পরিবারে অ্যালকোহল বা অন্যান্য মাদকের দীর্ঘস্থায়ী ইতিহাস রয়েছে, তাদের মস্তিষ্কের গঠন ও ডোপামিন রিসেপ্টরের ঘনত্বে জন্মগতভাবেই কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকতে পারে। এটি কোনো ব্যক্তির ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয় না, তবে তাকে পরিবেশের প্ররোচনায় দ্রুত আসক্ত হয়ে পড়ার এক ধরনের জৈবিক ঝুঁকির মুখে ফেলে রাখে। এছাড়া কিশোর বয়সে যখন মস্তিষ্কের গঠন সম্পূর্ণ হয় না, তখন মাদক গ্রহণ করলে প্রাপ্তবয়স্ক মস্তিষ্কের তুলনায় তা অনেক বেশি স্থায়ী ক্ষতিসাধন করে। ব্যক্তির নিজস্ব শারীরবৃত্তীয় মেটাবলিজম এবং লিভারের এনজাইম ব্যবস্থাও নির্ধারণ করে দেয় ড্রাগ তার শরীরে কত দ্রুত বিষক্রিয়া তৈরি করবে।

দ্বিতীয় স্তম্ভটি হলো মনস্তাত্ত্বিক উপাদান। কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের ধরন, মানসিক আঘাত বা ট্রমার ইতিহাস এবং মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতা আসক্তির পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। শৈশবে অবহেলা, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়া মানুষের মাঝে পরবর্তীতে মাদকাসক্ত হওয়ার হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। এছাড়া যাদের অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডার বা এডিএইচডি, বিষণ্ণতা কিংবা তীব্র সামাজিক উদ্বেগের মতো অন্তর্নিহিত মানসিক ব্যাধি থাকে, তারা প্রায়শই না বুঝে সেই মানসিক কষ্ট থেকে বাঁচতে ড্রাগের আশ্রয় নেয়। তাদের কাছে মাদক কোনো বিলাসিতা নয়, বরং তাদের অব্যক্ত ভেতরের ক্ষতের এক বিষাক্ত মলম।

তৃতীয় স্তম্ভটি হলো সামাজিক এবং পরিবেশগত প্রেক্ষাপট। একজন মানুষ কোন ধরনের সমাজে বেড়ে উঠছে, তার অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন, সমাজে মাদক কতটা সহজলভ্য এবং তার চারপাশে কী ধরনের সামাজিক সংস্কৃতি প্রচলিত রয়েছে – এই বিষয়গুলো আসক্তির গতিপথ চূড়ান্ত করে দেয়। চরম দারিদ্র্য, বেকারত্ব, যুদ্ধবিধ্বস্ত বা অপরাধপ্রবণ পরিবেশ এবং পারিবারিক ভাঙন মানুষকে মাদকের চোরাগলির দিকে ঠেলে দেওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করে। আবার বিপরীতভাবে, বন্ধুদের প্রবল চাপ বা তথাকথিত আধুনিক পার্টি সংস্কৃতির কৃত্রিম গ্রহণযোগ্যতাও তরুণদের প্রলুব্ধ করতে পারে।

কাজেই বায়োসাইকোসোশ্যাল মডেল আমাদের শেখায় যে মাদকাসক্তি কোনো একক কারণে তৈরি হওয়া রোগ নয়। জৈবিক জিন যখন মনস্তাত্ত্বিক ট্রমার সাথে মেশে এবং সেই ব্যক্তি যখন একটি মাদক-সহজলভ্য সামাজিক পরিবেশে বসবাস করে, তখনই আসক্তির পূর্ণাঙ্গ বিস্ফোরণ ঘটে। এই সত্যটি পুনর্বাসন ও চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। কেবল ওষুধ খাইয়ে মস্তিষ্কের রিসেপ্টর মেরামত করলেই আসক্তি দূর হয় না; একই সাথে প্রয়োজন ব্যক্তির মানসিক ক্ষতগুলো সারিয়ে তোলা এবং তাকে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও সহযোগিতামূলক সামাজিক পরিবেশে ফিরিয়ে নেওয়া। একটি সামগ্রিক ও সমন্বিত বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ ছাড়া মাদকাসক্তির এই গভীর সংকট মোকাবেলা করা অসম্ভব।

মাদকাসক্তির কারণ (Causes of Drug Addiction): ব্যক্তি, সমাজ ও পরিবেশ

জৈবিক উত্তরাধিকার ও জিনগত সংবেদনশীলতা (Biological Inheritance and Genetic Vulnerability)

একই পরিবেশে বেড়ে ওঠা দুজন মানুষের একজন কেন কোনো রাসায়নিক গ্রহণ করার পর দ্রুত আসক্ত হয়ে পড়ে, অথচ অন্যজন তা সহজেই পরিহার করতে পারে? এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও আধুনিক বংশগতিবিদ্যা মানবদেহের জিনগত কাঠামোর গভীরে দৃষ্টি দিয়েছে। দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ দেখিয়েছে যে আসক্তি কোনো শূন্যস্থানে ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়, এর পেছনে কাজ করে জৈবিক উত্তরাধিকারের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা। বংশগতির মাধ্যমে পিতা-মাতা থেকে সন্তানে সঞ্চারিত হওয়া বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ব্যক্তির মস্তিষ্কের রাসায়নিক সংবেদনশীলতা তৈরি করে দেয়। এর অর্থ এই নয় যে আসক্তি একটি সুনির্দিষ্ট একক জিনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়; বরং এটি শত শত জিনের জটিল সমন্বয় এবং তাদের সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশের ওপর নির্ভরশীল।

যমজ সন্তান এবং দত্তক নেওয়া সন্তানদের ওপর পরিচালিত তুলনামূলক গবেষণাগুলো এই জৈবিক ভিত্তিকে স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। কেনেথ এস. কেনডলার (Kenneth S. Kendler) এবং তার সহ-গবেষকরা এক দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখিয়েছেন যে বিভিন্ন ধরনের আসক্তির ক্ষেত্রে প্রায় চল্লিশ থেকে ষাট শতাংশ ঝুঁকির পেছনে জিনগত উপাদানের ভূমিকা বিদ্যমান (Kendler et al., 2003)। একডিম্বজ যমজদের (Monozygotic Twins) ক্ষেত্রে একজনের মাদকাসক্তি থাকলে অন্যজনের আসক্ত হওয়ার সম্ভাবনা দ্বিডিম্বজ যমজদের (Dizygotic Twins) তুলনায় বহুগুণ বেশি দেখা যায়। এমনকি জন্মের পরপরই মাদকাসক্ত পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ ও সুশৃঙ্খল পরিবারে দত্তক যাওয়া সন্তানদের মাঝেও এই প্রবণতার প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। এটি দেখায় যে ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক ইচ্ছার বাইরেও তার স্নায়বিক সংবেদনে বংশগতির একটি সুস্পষ্ট ভূমিকা থেকে যায়।

আণবিক জীববিজ্ঞান বা মলিক্যুলার বায়োলজির দৃষ্টিকোণ থেকে এই সংবেদনশীলতা তৈরি হয় মস্তিষ্কের বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটার রিসেপ্টর এবং বিপাকীয় এনজাইমের তারতম্যের মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ, মস্তিষ্কের ডোপামিন ডি-টু রিসেপ্টরের ঘাটতি থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক আনন্দ লাভের অনুভূতি কিছুটা ভোঁতা হতে পারে। ফলে কোনো বহিরাগত রাসায়নিক যখন প্রথমবার তীব্র ডোপামিন নির্গমন ঘটায়, তখন সেই ব্যক্তির মস্তিষ্ক তাকে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি পুরষ্কার হিসেবে গ্রহণ করে। একইভাবে, যকৃতের এনজাইম কীভাবে অ্যালকোহল বা অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থকে ভেঙে ফেলছে, তার গতিও নির্ধারিত হয় জিনের দ্বারা। যাদের শরীর দ্রুত ড্রাগের বিরূপ প্রতিক্রিয়া কাটিয়ে উঠতে পারে বা ইতিবাচক অনুভূতি বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে, তাদের আসক্ত হওয়ার ঝুঁকি শারীরবৃত্তীয়ভাবেই বেড়ে যায়।

তবে বিজ্ঞান কখনোই আসক্তিকে একটি অপরিবর্তনযোগ্য নিয়তি হিসেবে উপস্থাপন করে না। সমসাময়িক বিজ্ঞান জোর দেয় এপিজেনেটিক্স (Epigenetics) এর ওপর, যা পরিবেশ এবং জিনের মধ্যকার সেতু হিসেবে কাজ করে। ব্যক্তির ডিএনএ কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলেও পরিবেশের তীব্র মানসিক চাপ, পুষ্টিহীনতা কিংবা বিষাক্ত অভিজ্ঞতা জিনের কার্যকারিতায় পরিবর্তন আনতে পারে। অর্থাৎ, জেনেটিক ঝুঁকি কেবল একটি সুপ্ত দুর্বলতা তৈরি করে রাখে, যাকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় প্রিডিসপজিশন বলা হয়। উপযুক্ত পরিবেশগত অনুঘটক না পেলে সেই জিনগত ঝুঁকি একা আসক্তির জন্ম দিতে পারে না। তাই জৈবিক নির্ধারনবাদ দিয়ে পুরো বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করা যেমন ভুল, তেমনই শারীরিক উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করে আসক্তিকে নিছক ইচ্ছাশক্তির দুর্বলতা মনে করাও চরম অবৈজ্ঞানিক।

মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিত্বের গড়ন (Psychological Traits and Personality Architecture)

জৈবিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে মানুষের নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক জগৎ। একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের ধরন, মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতা এবং আবেগীয় পরিপক্কতা নির্ধারণ করে দেয় সে জীবনের নানা টানাপোড়েনে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিত্বের লক্ষণ মাদক গ্রহণের প্রবণতাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে তোলে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো আবেগীয় অস্থিরতা বা নিউরোটিসিজম এবং অপরিনামদর্শী আচরণ বা ইমপালসিভিটি। যেসব ব্যক্তি তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টি পেতে ব্যাকুল থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদী ফলাফলের কথা চিন্তা না করে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের মাঝে মাদক পরীক্ষা করার এবং পরবর্তীতে আসক্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।

ব্যক্তিত্বের এই বিশেষ গড়ন নিয়ে গভীর গবেষণা করেছেন প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী মারভিন জুকারম্যান (Marvin Zuckerman)। তিনি তার গবেষণায় দেখান যে এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে নতুনত্ব ও উত্তেজনা অন্বেষণ (Sensation seeking) এর প্রবণতা তীব্রভাবে কাজ করে (Zuckerman, 1994)। এই ধরনের ব্যক্তিরা সাধারণ দৈনন্দিন জীবনের রুটিনে দ্রুত বিরক্ত হয়ে পড়ে এবং যেকোনো নতুন, রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিজ্ঞতার দিকে আকৃষ্ট হয়। তারা বিপদকে অগ্রাহ্য করে কেবল অনুভূতির তীব্রতাকে প্রাধান্য দেয়। মনস্তাত্ত্বিকভাবে এই ধরনের মানসিক কাঠামোর অধিকারী তরুণরা বন্ধুমহলে বা সামাজিক পরিবেশে যখন মাদকের মুখোমুখি হয়, তখন তারা বিপদের ভয়কে পাশ কাটিয়ে কেবল অজানা এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার লোভে তাতে জড়িয়ে পড়ে।

এর পাশাপাশি কাজ করে আবেগীয় অনিয়ন্ত্রণ (Emotional dysregulation) এবং মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করার অক্ষমতা। জীবনের যেকোনো ব্যর্থতা, বিচ্ছেদ, প্রত্যাখ্যান বা গভীর বিষণ্ণতা মোকাবেলা করার জন্য মানুষের নিজস্ব কিছু প্রতিরক্ষামূলক মনস্তাত্ত্বিক কৌশল প্রয়োজন হয়। যাদের শৈশব বা পারিবারিক শিক্ষার কারণে এই স্বাস্থ্যকর কৌশলগুলো গড়ে ওঠে না, তারা খুব দ্রুত ভেঙে পড়ে। মানসিক বিজ্ঞানে একটি পরিচিত ধারণা হলো বিলম্বিত ছাড় বা অবমূল্যায়ন (Delay discounting); আসক্তিপ্রবণ ব্যক্তিরা ভবিষ্যৎ জীবনের বড় কোনো প্রাপ্তির চেয়ে বর্তমান মুহূর্তের ছোট একটি আরাম বা স্বস্তিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে যখন কোনো মাদক তাদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ বা বিষাদকে কয়েক মিনিটের জন্য ভুলিয়ে দেয়, তখন তারা সেই ক্ষণস্থায়ী স্বস্তিকে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সমাধান বলে ধরে নেয়।

মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধির সাথে মাদকের সহাবস্থান বা কো-মরবিডিটিও আসক্তির আরেকটি প্রধান চালিকাশক্তি। যে ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র সামাজিক উদ্বেগ, বাইপোলার ডিজঅর্ডার বা অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডারে ভুগছে, সে অজান্তেই তার মনের অস্থিরতা থামাতে বিভিন্ন রাসায়নিককে স্ব-চিকিৎসার মাধ্যম বানিয়ে ফেলে। তাদের কাছে মাদক কোনো বিলাসিতা বা আনন্দের বস্তু নয়, বরং নিজেদের ভেঙে পড়া মানসিক সত্তাকে কোনোমতে টিকিয়ে রাখার একটি মরিয়া প্রচেষ্টা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, কৃত্রিম এই সাময়িক উপশম একসময় মনের মূল সমস্যাটিকে আরও বহুগুণ জটিল করে তোলে। মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা এবং মাদকের বিষক্রিয়া পরস্পরের হাত ধরে ব্যক্তিকে এক গভীর অন্ধকার চক্রের ভেতর নিমজ্জিত করে।

শৈশবের মানসিক আঘাত ও প্রতিকূল অভিজ্ঞতার প্রভাব (Childhood Trauma and the Impact of Adverse Experiences)

মানুষের মস্তিষ্ক সবচেয়ে দ্রুত এবং সংবেদনশীলভাবে বিকশিত হয় শৈশবে। সেই বিকাশমান বয়সে শিশু যদি একটি নিরাপদ, স্নেহময় ও স্থিতিশীল পরিবেশ না পেয়ে চরম ভয়, সহিংসতা কিংবা অবহেলার মুখোমুখি হয়, তবে তার স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আধুনিক চিকিৎসা ও সমাজবিজ্ঞান অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে যে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের মাদকাসক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় শৈশবের গভীর ট্রমা বা মানসিক ক্ষতের ভেতর। এই ক্ষতগুলো দৃশ্যমান কোনো শারীরিক আঘাত নাও হতে পারে, কিন্তু শিশুর অপরিপক্ক মস্তিষ্কে এগুলো যে দীর্ঘস্থায়ী রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায়, তা সারাজীবন ব্যক্তির আচরণ ও আবেগকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়।

জনস্বাস্থ্য ও মহামারীবিদ্যার ক্ষেত্রে এই বিষয়ে সবচেয়ে ঐতিহাসিক গবেষণাটি পরিচালনা করেছিলেন ভিনসেন্ট ফেলিটি (Vincent Felitti) এবং তার সহযোগী গবেষকরা (Felitti et al., 1998)। তারা হাজার হাজার প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওপর গবেষণা চালিয়ে তৈরি করেন প্রতিকূল শৈশব অভিজ্ঞতা (Adverse childhood experiences বা ACE) এর সূচক। এই গবেষণায় উন্মোচিত হয় যে শৈশবে শারীরিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, তীব্র মানসিক অবহেলা, পিতা-মাতার সহিংস বিচ্ছেদ কিংবা পরিবারের ভেতরে কোনো সদস্যের মানসিক অসুস্থতা প্রত্যক্ষ করা শিশুদের মাঝে পরবর্তীতে মাদকাসক্ত হওয়ার সম্ভাবনা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। যাদের জীবনে চার বা ততোধিক প্রতিকূল শৈশব অভিজ্ঞতা ছিল, সাধারণ মানুষের তুলনায় তাদের ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের ঝুঁকি প্রায় দশ থেকে বারো গুণ বেশি দেখা গেছে।

স্নায়ুবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে শৈশবের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাত শিশুর মস্তিষ্কের স্ট্রেস রেসপন্স সিস্টেম বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থাকে চিরতরে পাল্টে দেয়। অনবরত ভয়ের মধ্যে বেড়ে ওঠার কারণে শিশুর হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি-অ্যাড্রিনাল অক্ষ (Hypothalamic-pituitary-adrenal axis বা HPA axis) অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে ওঠে এবং শরীর অনবরত কর্টিসল ও অন্যান্য স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ করতে থাকে। এর ফলে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অ্যামিগডালা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে পড়ে এবং যুক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণকারী প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের সংযোগ দুর্বল হয়ে যায়। প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে এসে এই ব্যক্তিরা সাধারণ কোনো সামাজিক বিরোধ বা মানসিক চাপেও চরম আতঙ্ক ও অসহায়ত্ব অনুভব করে। তাদের স্নায়ুতন্ত্র সবসময় এক ধরনের অবচেতন সতর্কাবস্থায় থাকে, যা প্রচণ্ড শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির জন্ম দেয়।

এই ক্লান্তিকর ও যন্ত্রণাদায়ক স্নায়বিক অবস্থাকে শান্ত করার জন্যই একসময় তারা মাদকের আশ্রয় গ্রহণ করে। একটি মারাত্মক রাসায়নিক তাদের অবচেতন মস্তিষ্কে সেই কৃত্রিম নিরাপত্তা ও শিথিলতার অনুভূতি দেয়, যা শৈশবে তাদের পাওয়ার কথা ছিল কিন্তু তারা পায়নি। ফলে ড্রাগ ব্যবহার তাদের কাছে আনন্দের জন্য নয়, বরং শৈশবের সেই অপূরণীয় শূন্যতা এবং অবদমিত যন্ত্রণাকে অসাড় করে রাখার একমাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠে। শৈশবের মানসিক আঘাতকে চিহ্নিত না করে কেবল বাহ্যিক মাদকাসক্তির চিকিৎসা করতে গেলে তা অধিকাংশ সময় ব্যর্থ হয়, কারণ মূল ক্ষতটি থেকে যায় স্নায়ুর গভীরেই।

পারিবারিক মিথস্ক্রিয়া ও প্রাথমিক সামাজিকীকরণ (Family Dynamics and Primary Socialization)

পরিবার হলো একটি শিশুর প্রথম সমাজ, যেখানে সে শেখে কীভাবে নিজের আবেগকে প্রকাশ করতে হয়, সংকট সামলাতে হয় এবং নৈতিক সীমানা বজায় রাখতে হয়। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় প্রাথমিক সামাজিকীকরণ। এই পারিবারিক মিথস্ক্রিয়া যদি ত্রুটিপূর্ণ, অকার্যকর বা বিশৃঙ্খল হয়, তবে তা শিশুর মাদকাসক্ত হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করে। যে পরিবারে পিতা-মাতার সাথে সন্তানের সুস্থ মানসিক যোগাযোগ থাকে না, সেখানে সন্তান নিজের মানসিক নিরাপত্তার জন্য বাইরের ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্পগুলোর দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়। শৈশবের এই ভঙ্গুর সামাজিকীকরণ পরবর্তীতে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সংযুক্তি তত্ত্ব এই পারিবারিক টানাপোড়েনকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করে। ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী জন বোলবি (John Bowlby) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে শৈশবে পিতা-মাতার কাছ থেকে প্রাপ্ত স্নেহ, মনোযোগ এবং নির্ভরযোগ্যতা কীভাবে শিশুর ভবিষ্যৎ মানসিক ভিত্তিকে একটি মজবুত রূপ দেয় (Bowlby, 1988)। এই যোগাযোগকে তিনি চিহ্নিত করেছেন সংযুক্তি তত্ত্ব (Attachment theory) হিসেবে। যদি কোনো শিশু তার অভিভাবকের কাছ থেকে ধারাবাহিক অবহেলা বা প্রত্যাখ্যান পায়, তবে তার মধ্যে নিরাপত্তাহীন সংযুক্তি শৈলী গড়ে ওঠে। এই ধরনের শিশুরা বড় হয়ে গভীর একাকীত্ব, পরনির্ভরশীলতা কিংবা চরম আস্থার সংকটে ভোগে। এই অন্তর্নিহিত একাকীত্ব দূর করতে তারা অনেক সময় মাদকের কৃত্রিম উষ্ণতাকে আপন করে নেয়।

পারিবারিক পরিমণ্ডলে পিতা-মাতার নিজস্ব আচরণও এখানে একটি বড় অনুঘটক। আলবার্ট বান্দুরার সামাজিক শিখন তত্ত্ব অনুযায়ী, শিশুরা মূলত তাদের অভিভাবকদের অনুকরণ করে শেখে। যে পরিবারে অভিভাবকরা নিজেরা প্রকাশ্যে অ্যালকোহল, তামাক বা ঘুমের ওষুধ সেবন করে মানসিক চাপ মোকাবেলা করেন, সেই পরিবারের সন্তানরা অবচেতনভাবেই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে জীবনের সংকট বা ক্লান্তি দূর করার স্বাভাবিক উপায় হলো রাসায়নিক গ্রহণ। এছাড়া পিতা-মাতার শাসনপদ্ধতি বা প্যারেন্টিং স্টাইলও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত কঠোর ও দমনমূলক অভিভাবকত্ব যেমন সন্তানের মধ্যে ক্ষোভ ও গোপন বিদ্রোহের জন্ম দেয়, তেমনই অতি-উদাসীন বা সীমানাহীন অভিভাবকত্ব সন্তানকে সঠিক দিকনির্দেশনাহীন করে তোলে।

পারিবারিক কার্যকারিতা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে গবেষক ক্যারল এল. কাম্পফার (Karol L. Kumpfer) এবং তার সহকর্মী দেখিয়েছেন যে দুর্বল পারিবারিক শৃঙ্খলা এবং সন্তানের দৈনন্দিন কার্যকলাপের ওপর পর্যাপ্ত অভিভাবকীয় নজরদারির অভাব কিশোর বয়সে মাদক ব্যবহারের ঝুঁকিকে প্রত্যক্ষভাবে বাড়িয়ে তোলে (Kumpfer & Alvarado, 2003)। পিতা-মাতার মধ্যে অনবরত পারিবারিক কলহ, গার্হস্থ্য হিংসা এবং সন্তানের মানসিক চাহিদার প্রতি উদাসীনতা একটি শিশুকে মানসিকভাবে গৃহহীন করে তোলে। গৃহের এই নিরাপত্তাহীনতাই কিশোরদের এমন এক বিপথগামী জগতের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে মাদকের মাধ্যমে তারা নিজেদের অবমূল্যায়িত সত্তার ক্ষণস্থায়ী সান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টা করে।

সমবয়সীদের প্রভাব ও উপসংস্কৃতির চাপ (Peer Influence and Subcultural Pressures)

কৈশোর এবং প্রারম্ভিক যৌবনে মানুষের সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু পরিবার থেকে সরে গিয়ে সমবয়সী দলের দিকে ধাবিত হয়। এই বয়সে নিজস্ব পরিচয় তৈরি, স্বাধীনতা প্রদর্শন এবং বন্ধুদের দলের স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত তীব্র থাকে। সমবয়সীদের এই গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার তাগিদই বহু সময় তরুণদের মাদক পরীক্ষার অন্ধকার জগতে নিয়ে যায়। একজন কিশোর হয়তো নিজে থেকে কখনোই মাদক স্পর্শ করার কথা ভাবত না, কিন্তু বন্ধুদের দলে ‘স্মার্ট’ প্রমাণিত হওয়া, উপহাস এড়ানো কিংবা দলের ভেতর নিজের গ্রহণযোগ্যতা টিকিয়ে রাখার তাগিদে সে ড্রাগের প্রথম ডোজটি গ্রহণ করে। সামাজিক বিজ্ঞানে একে বলা হয় পিয়ার প্রেশার বা সমবয়সীদের চাপ।

এই আচরণগত সংক্রামকতা কীভাবে কাজ করে, তা বিশদভাবে অনুসন্ধান করেছেন বিকাশমূলক মনোবিজ্ঞানী থমাস জে. ডিশিয়ন (Thomas J. Dishion) এবং তার সহযোগী গবেষক (Dishion & Owen, 2002)। তারা দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে দেখান যে কিশোরদের বন্ধুত্বের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া কীভাবে বিপথগামী আচরণকে শক্তিশালী করে, যাকে তারা নাম দেন বিচ্যুত সমবয়সী সংক্রমণ (Deviant peer contagion)। বন্ধুদের একটি নির্দিষ্ট দল যখন ড্রাগ নেওয়া, স্কুল পালানো বা নিয়ম ভাঙাকে একটি বীরত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে উদযাপন করতে শুরু করে, তখন দলের বাকি সদস্যরাও সেই আচরণকে নিজেদের জীবনের স্বাভাবিক মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে। এখানে ব্যক্তির স্বতন্ত্র বিচারবোধ দলের যৌথ মানসিকতার কাছে পরাজিত হয়।

সমাজবিজ্ঞানীরা এই ক্ষেত্রে দুটি বিপরীতমুখী কিন্তু পরস্পর সম্পর্কিত প্রক্রিয়ার কথা বলেন – নির্বাচন বনাম সামাজিকীকরণ। একদিকে যেমন একজন তরুণ বন্ধুদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে, অন্যদিকে মাদক ব্যবহারে আগ্রহী তরুণরা অবচেতনভাবেই এমন বন্ধুদের খুঁজে নেয় যারা নিজেরাও একই ধরনের অভ্যাসে লিপ্ত। এই দুইয়ের চক্রাকার মিথস্ক্রিয়ায় একটি ক্ষতিকর বন্ধুবৃত্ত গড়ে ওঠে। এই দলগুলোর ভেতরে নিজস্ব কিছু আচার, ভাষা এবং প্রতীকী মূল্য তৈরি হয়, যা মূলধারার সমাজ থেকে তাদের আলাদা করে এক বিচ্ছিন্ন উপসংস্কৃতির জন্ম দেয়। দলের কোনো সদস্য মাদক পরিহার করতে চাইলে তাকে ‘ভীরু’ বা দলত্যাগী বলে চিহ্নিত করা হয়, যা ব্যবহার বন্ধ করার ক্ষেত্রে একটি বিশাল সামাজিক বাধা হিসেবে কাজ করে।

এই উপসংস্কৃতির চাপ কেবল প্রান্তিক বা সুবিধাবঞ্চিত তরুণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তথাকথিত অভিজাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা উচ্চবিত্তের পার্টি সংস্কৃতিতেও এটি ভিন্ন রূপে বিদ্যমান। সেখানে মাদককে দেখা হয় আভিজাত্য, ফ্যাশন বা উত্তর-আধুনিক জীবনধারার অপরিহার্য অংশ হিসেবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই কৃত্রিম জীবনধারা আরও বেশি দৃশ্যমান ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ফলে এক ধরনের তীব্র সামাজিক অন্তর্ভুক্তির আকাঙ্ক্ষা বা বাদ পড়ে যাওয়ার ভয় তরুণদের ক্রমাগত তাড়া করে ফেরে। নিজের দলের স্বীকৃতি না পাওয়ার চেয়ে মাদকের শারীরিক ঝুঁকি মেনে নেওয়াকে তারা অনেক সময় কম বিপজ্জনক মনে করে। সামাজিক অনুমোদনের এই মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক ক্ষুধা আসক্তির বিস্তারে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

কাঠামোগত পরিবেশ, দারিদ্র্য ও মাদকের সহজলভ্যতা (Structural Environment, Poverty, and Drug Availability)

ব্যক্তি এবং তার ক্ষুদ্র সামাজিক সম্পর্কের বাইরেও থাকে একটি বৃহত্তর পরিমণ্ডল – সমাজের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো, নগরায়ণের ধরন এবং বসবাসকারী ভৌগোলিক পরিবেশ। সমাজতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে আসক্তিকে কখনোই কোনো ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন ত্রুটি হিসেবে বোঝা সম্ভব নয়, যদি না তার চারপাশের কাঠামোগত বাস্তবতাকে বিবেচনায় আনা হয়। যেসব এলাকায় চরম দারিদ্র্য, দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব, ভেঙে পড়া জনসেবা এবং আইনের শাসনের অনুপস্থিতি বিদ্যমান, সেখানে মাদকের বিস্তার ঘটে দাবানলের মতো। এই কাঠামোগত দুর্বলতা মানুষের জীবনযাত্রাকে এমন এক হতাশাজনক পর্যায়ে নিয়ে যায় যেখানে যেকোনো ধরনের মাদক পরিণত হয় জীবনের যন্ত্রণা উপশমের একমাত্র সস্তা পথ্যে।

শিকাগো সমাজতাত্ত্বিক ঘরানার গবেষক রবার্ট জে. স্যাম্পসন (Robert J. Sampson) এবং তার সহ-গবেষকরা তাদের যুগান্তকারী তত্ত্বে দেখান যে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার সামাজিক কাঠামোর সাথে অপরাধ ও বিচ্যুতির সম্পর্ক কতটা গভীর (Sampson et al., 1997)। তারা প্রস্তাব করেন যৌথ কার্যকারিতা (Collective efficacy) এর ধারণা, যার অর্থ হলো প্রতিবেশীদের পারস্পরিক আস্থা এবং এলাকার বিশৃঙ্খলা দমনে যৌথভাবে কাজ করার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। যেসব পাড়া বা মহল্লায় যৌথ কার্যকারিতা ভেঙে পড়ে, সেখানে স্থানীয় কিশোর-কিশোরীদের ওপর নজরদারি করার কেউ থাকে না। ফলে সেই এলাকাগুলো দ্রুত পরিণত হয় অপরাধীদের অভয়ারণ্য এবং মাদকের উন্মুক্ত বাজারে। এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা একজন শিশুর জন্য মাদক কোনো দূরবর্তী কল্পনা নয়, এটি তার প্রতিদিনের চোখের সামনের স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়।

মাদকের সহজলভ্যতা বা ভৌগোলিক নৈকট্য এখানে একটি প্রাথমিক অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। একজন ব্যক্তির ভেতরে জিনগত সংবেদনশীলতা থাকতে পারে, মনস্তাত্ত্বিক ট্রমাও থাকতে পারে, কিন্তু তার হাতের কাছে যদি মাদক পৌঁছানোর কোনো উপায় না থাকে, তবে আসক্তি তৈরি হওয়া অসম্ভব। বিপরীতে, যেসব এলাকায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে মাদক কেনাবেচা হয়, অবৈধ ডিলারদের অবাধ যাতায়াত থাকে এবং কোনো ধরনের প্রশাসনিক বাধা ছাড়াই ড্রাগ পাওয়া যায়, সেখানে আসক্তির সূচনা হওয়ার ভৌগোলিক ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। পরিবেশগত সহজলভ্যতা মানুষের নৈতিক দ্বিধা এবং প্রাথমিক ভয়কে খুব দ্রুত দূর করে দেয়। একটি সহজলভ্য বিষ খুব স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল মুহূর্তে মানুষের হাতে উঠে আসে।

এই বাস্তবতাকে নৃবিজ্ঞানের গভীর দৃষ্টিতে উন্মোচন করেছেন প্রখ্যাত গবেষক ফিলিপ বোরগোয়া (Philippe Bourgois)। নিউ ইয়র্কের এল ব্যারিও মহল্লার ক্র্যাক কোকেন ব্যবসায়ীদের ওপর পরিচালিত তার গবেষণায় তিনি দেখান কীভাবে কাঠামোগত নিপীড়ন, বর্ণবাদ এবং মূলধারার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্নতা প্রান্তিক যুবসমাজকে অবৈধ মাদক অর্থনীতির দিকে ঠেলে দেয় (Bourgois, 2003)। যেখানে সম্মানজনক কাজের কোনো সুযোগ নেই, ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা নেই এবং রাষ্ট্রযন্ত্র কেবল জেল-জুলুমের মাধ্যমে উপস্থিতি জানান দেয়, সেখানে মাদক বিক্রি হয়ে ওঠে টিকে থাকার একমাত্র অর্থনৈতিক উপায় এবং মাদক গ্রহণ হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার অসহ্য গ্লানি ভোলার একমাত্র মানসিক আশ্রয়। কাঠামোগত সহিংসতা এভাবেই মানুষের আত্মমর্যাদা ধ্বংস করে আসক্তির জন্য উর্বর জমিন তৈরি করে।

অতএব, মাদকাসক্তির কারণগুলোর সামগ্রিক বিশ্লেষণ আমাদের দেখায় যে এটি কোনো একক রৈখিক পথ নয়। ব্যক্তির অন্তর্নিহিত জিন ও স্নায়ুতন্ত্র থেকে শুরু করে তার শৈশবের মানসিক ট্রমা, পরিবারের ভঙ্গুর বন্ধন, বন্ধুদের সামাজিক চাপ এবং সর্বোপরি সমাজের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক অন্যায্যতা – এই সমস্ত উপাদান একত্রিত হয়ে একজন মানুষকে ধীরে ধীরে আসক্তির অতল গহ্বরে টেনে নিয়ে যায়। এর কোনো একটি দিককে অবহেলা করে আসক্তির মূল শিকড় উৎপাটন করা সম্ভব নয়। ব্যক্তিকে নিরাময় করতে হলে যেমন তার মস্তিষ্কের ও মনের চিকিৎসা করতে হবে, তেমনই সমাজকে সুস্থ করতে হলে সংস্কার করতে হবে তার পরিবার, পরিবেশ ও সামগ্রিক কাঠামোগত বাস্তবতাকে।

মাদক অপব্যবহারের ব্যক্তিগত প্রভাব (Micro-Level Consequences of Drug Abuse): ব্যক্তি ও পরিবারের ক্ষতি

ব্যক্তির শারীরিক অবক্ষয় ও দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যসংকট (Individual Somatic Degradation and Chronic Health Crises)

মানুষের শরীর কোনো সংবেদনহীন যন্ত্র নয়। এটি কোটি কোটি জীবন্ত কোষ, জটিল কলা এবং সূক্ষ্ম জৈব-রাসায়নিক তরলের এক সমন্বিত কাঠামো। যখন কোনো ব্যক্তি অনবরত ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ নিজের রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করাতে থাকে, তখন শরীর ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। মাদক গ্রহণের প্রভাব ক্ষণস্থায়ী মানসিক তীব্রতা বা আচ্ছন্নতার মধ্যেই ফুরিয়ে যায় না। কোষীয় স্তরে এটি প্রতিটি অঙ্গের গঠনকে দুর্বল করতে শুরু করে। দীর্ঘস্থায়ী মাদক ব্যবহারের ফলে ব্যক্তির শারীরিক চেহারা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় এমন কিছু গভীর পরিবর্তন ঘটে, যা বাহ্যিক দৃষ্টিতেই সহজে নজরে আসে। এককালের সুস্থ, সক্ষম ও কর্মঠ মানুষটি সময়ের ব্যবধানে রক্তশূন্য, শীর্ণকায় এবং কম্পনরত এক দুর্বল মানবে রূপান্তরিত হয়।

মাদকের নিয়মিত উপস্থিতি শরীরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ তন্ত্রের ওপর তীব্র বিষাক্ত চাপ তৈরি করে। অতিরিক্ত মাত্রায় উত্তেজক পদার্থ ব্যবহারের কারণে হৃৎপিণ্ডের রক্তনালীগুলো অনবরত সংকুচিত থাকে। এর ফলে স্থায়ী উচ্চ রক্তচাপ, হৃদস্পন্দনের মারাত্মক অনিয়ম এবং করোনারি ধমনীর ক্ষতির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তরুণ বয়সেও অনেক ব্যবহারকারী হঠাৎ মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন বা অকাল হার্ট অ্যাটাকের শিকার হন। অপরদিকে বিষাক্ত দ্রাবক কিংবা কৃত্রিম রাসায়নিকগুলো সরাসরি যকৃতের কোষগুলোকে আক্রমণ করে। ফলে যকৃতে চর্বি জমা, প্রদাহ এবং শেষ পর্যন্ত সিরোসিসের মতো দুরারোগ্য ব্যাধি দেখা দেয়। লুইসা ডেগেনহার্ট (Louisa Degenhardt) এবং ওয়েন হল তাদের গবেষণায় তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তুলে ধরেছেন কীভাবে মাদক অপব্যবহার বিশ্বব্যাপী মানুষের অকাল মৃত্যু, পঙ্গুত্ব এবং শারীরিক অসুস্থতার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে (Degenhardt & Hall, 2012)। শ্বাসযন্ত্রের পক্ষাঘাত থেকে শুরু করে কিডনির স্থায়ী অকার্যকারিতা পর্যন্ত প্রতিটি জটিলতা ব্যক্তির আয়ুষ্কালকে দ্রুত সংকুচিত করে তোলে।

ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের অভ্যাস এই দৈহিক পতনকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। অপরিশোধিত ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে একটি সুঁই একাধিক ব্যক্তির শরীরে ব্যবহারের ফলে রক্তবাহিত প্রাণঘাতী ভাইরাসগুলো খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক হলো হেপাটাইটিস সি ভাইরাস (Hepatitis C virus) এবং হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস (Human immunodeficiency virus বা HIV)। এই ভাইরাসগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে এমনভাবে ধ্বংস করে দেয় যে সামান্য কোনো সংক্রমণও ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এর বাইরেও রয়েছে ত্বকের গভীরে পুঁজ জমা, শিরাগুলো স্থায়ীভাবে শক্ত ও বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং রক্তে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ফলে হৃদযন্ত্রের ভালভে ইনফেক্টিভ এন্ডোকার্ডাইটিস নামের বিপজ্জনক প্রদাহ তৈরি হওয়া। অনেক সময় পচন ধরা অঙ্গ কেটে ফেলা ছাড়া চিকিৎসকদের সামনে আর কোনো উপায় থাকে না।

শারীরিক ক্ষয়ের আরেকটি অবধারিত দিক হলো পুষ্টিহীনতা এবং সংবেদনশীল স্নায়ুর স্থায়ী পক্ষাঘাত। ক্ষতিকর রাসায়নিকের ক্রমাগত প্রভাবে মস্তিষ্কের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণের সংকেত নষ্ট হয়ে যায়। আসক্ত ব্যক্তি দিনের পর দিন প্রয়োজনীয় শর্করা, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ থেকে বঞ্চিত থাকে। এর ফলে মুখের লালাগ্রন্থি শুকিয়ে দাঁত দ্রুত ক্ষয়ে পড়ে, চামড়ায় দীর্ঘস্থায়ী ঘা তৈরি হয়, চুল পড়ে যায় এবং মাংসপেশিগুলো শুকিয়ে হাড়ের সাথে লেগে থাকে। শরীরের স্বাভাবিক পুনর্গঠন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় যেকোনো ছোটখাটো ক্ষত শুকাতে দীর্ঘ সময় লাগে। সামগ্রিকভাবে ব্যক্তির দেহটি এক অবিরাম জৈবিক সংকটের মধ্যে বাস করে, যেখানে প্রতিদিনের স্বাভাবিক চলাফেরাও এক অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণায় রূপ নেয়। দৈহিক এই অবক্ষয় কোনো সাময়িক অসুস্থতা নয়, বরং বহিরাগত বিষের কারণে মানবদেহের নিজস্ব কার্যক্ষমতার এক দীর্ঘমেয়াদী বিনাশ।

জ্ঞানীয় পতন ও মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট (Cognitive Decline and Mental Health Erosion)

শারীরিক ক্ষতির চেয়েও মারাত্মক রূপ ধারণ করে মানুষের চিন্তাশক্তি ও চেতনার ক্ষয়। মাদকাসক্তি ধীরে ধীরে মানুষের সেই সত্তাটিকে গ্রাস করে নেয়, যা তাকে বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করতে, স্মৃতি ধারণ করতে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করতে সাহায্য করে। মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম নিউরোট্রান্সমিটারগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সাথে সাথে ব্যক্তির নিজস্ব মানসিক নিয়ন্ত্রণের সুতো আলগা হয়ে যায়। ব্যক্তি একসময় লক্ষ্য করে যে তার স্মৃতিশক্তি আগের মতো কাজ করছে না, কোনো জটিল কাজের সমাধান করতে গিয়ে সে দিশেহারা হয়ে পড়ছে এবং নিজের সামান্য আবেগ বা ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও সে হারিয়ে ফেলেছে। স্নায়ুতন্ত্রের এই জ্ঞানীয় পতন কোনো কাল্পনিক ধারণা নয়, বরং মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর মধ্যকার সাইন্যাপটিক যোগাযোগ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নিরেট বাস্তবতা।

মস্তিষ্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং মানবীয় অংশ হলো প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, যা মানুষকে আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা যোগায়। রাসায়নিকের দীর্ঘমেয়াদী আক্রমণ এই প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে সবচেয়ে বেশি দুর্বল করে দেয়। এর ফলে ব্যক্তির মাঝে তীব্র মনোযোগের অভাব তৈরি হয়। সে কোনো বই পড়তে পারে না, দীর্ঘ সময় কারো সাথে অর্থপূর্ণ আলাপে যুক্ত থাকতে পারে না এবং সামান্য বাধাতেই হিংস্র বা উন্মত্ত আচরণ করে বসে। একই সাথে স্মৃতি প্রক্রিয়াকরণের প্রধান কেন্দ্র হিপোক্যাম্পাসের নিউরনগুলো ক্ষয়ে যাওয়ার কারণে স্বল্পমেয়াদী স্মৃতি দ্রুত মুছে যায়। ব্যক্তি ভুলে যায় সে কোথায় নিজের জরুরি জিনিসপত্র রেখেছে, কিছুক্ষণ আগে কার সাথে কী কথা বলেছে কিংবা তার কোনো দায়িত্ব ছিল কি না। কার্যনির্বাহী ক্ষমতার এই পতন ব্যক্তির আত্মমর্যাদাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়।

জ্ঞানীয় দুর্বলতার পাশাপাশি দেখা দেয় নানাবিধ তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী মনোরোগ। মাদক গ্রহণ কেবল শারীরিক আরামের অভাব তৈরি করে না, এটি মনের ভেতরে এক গভীর রাসায়নিক শূন্যতার জন্ম দেয়। ব্রিজেট এফ. গ্রান্ট (Bridget F. Grant) এবং তার সহ-গবেষকরা তাদের জাতীয় গবেষণায় পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছেন যে মাদক অপব্যবহারের সাথে জটিল বিষণ্ণতা এবং তীব্র উদ্বেগজনিত ব্যাধির গভীর পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে (Grant et al., 2004)। ড্রাগের কৃত্রিম প্রভাব কেটে যাওয়ার পর মস্তিষ্কে স্বাভাবিক আনন্দের অনুভূতি আর তৈরি হয় না। ব্যক্তির ভেতর জেঁকে বসে এক স্থায়ী মানসিক স্থবিরতা বা অ্যানহেডোনিয়া। পৃথিবীটা তখন তার কাছে অর্থহীন ও ধূসর মনে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি মাদক-প্ররোচিত স্থায়ী সাইকোসিস ও প্যারানয়ায় আক্রান্ত হয়; সে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তার পেছনে গোয়েন্দা লাগানো হয়েছে, খাদ্যে বিষ মেশানো হচ্ছে এবং পরিবারের সবাই তার পরম শত্রু।

এই অন্তহীন মানসিক যন্ত্রণার অনিবার্য পরিণতি ঘটে আত্মপরিচয়ের সংকট ও আত্মহত্যার প্রবণতায়। যখন মাদকাসক্ত ব্যক্তি কখনো সাময়িকভাবে বাস্তবতায় ফিরে আসে এবং নিজের জীবনের ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকায়, তখন তীব্র অপরাধবোধ, লজ্জা ও অনুশোচনা তাকে গ্রাস করে ফেলে। সে উপলব্ধি করতে পারে যে নিজের ইচ্ছার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ অবশিষ্ট নেই। পরিবার ও সমাজের চোখে নিজেকে এক ঘৃণিত পরজীবী হিসেবে দেখার তীব্র মানসিক চাপ তাকে দিশেহারা করে তোলে। ফলে আসক্ত ব্যক্তিদের মাঝে আত্মহত্যার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় বহুগুণ বেশি দেখা যায়। মনের এই অভ্যন্তরীণ ভাঙন একজন মানুষকে জীবিত রেখেই তার চেতনাকে এক স্থায়ী মৃত্যুপুরীতে নির্বাসিত করে।

পারিবারিক সম্পর্কের বিকৃতি ও সহ-নির্ভরতা (Distortion of Family Dynamics and Codependency)

পরিবার হলো মানব সমাজের সবচেয়ে প্রাথমিক ও সংবেদনশীল মনস্তাত্ত্বিক আশ্রয়। এটি এমন এক পরস্পর-নির্ভরশীল সম্পর্কজাল, যেখানে একজন সদস্যের ভারসাম্যহীনতা পুরো কাঠামোর স্থায়িত্বকে নাড়িয়ে দেয়। কোনো পরিবারে যখন মাদকের বিষবাষ্প প্রবেশ করে, তখন সেই বিপর্যয় কেবল ব্যবহারকারীর একার থাকে না; পুরো বাসস্থানটি পরিণত হয় এক স্থায়ী মানসিক সংঘাতের ময়দানে। যে বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে একটি পরিবারের সদস্যরা একত্রে বাস করে, মাদক সেই বিশ্বাসকে শুরুতেই ধ্বংস করে ফেলে। নিজের চাহিদা পূরণ ও অপব্যবহার চালিয়ে যাওয়ার তাগিদে ব্যক্তি ঘরের প্রতিটি সদস্যের সাথে অবলীলায় প্রতারণা করতে শুরু করে। ঘরের স্বাভাবিক আনন্দ, নিরাপত্তা ও নিশ্চিন্ততার পরিবেশ এক নিমেষে উধাও হয়ে সেখানে আসন পাতে এক অন্তহীন অবিশ্বাস।

এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সবচেয়ে কঠিন দিক হলো পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের দীর্ঘমেয়াদী মানসিক ক্লান্তি। জিম অরফোর্ড (Jim Orford) এবং তার সহ-গবেষকরা পারিবারিক গতিপ্রকৃতির ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে একজন আসক্ত সদস্যের কারণে পুরো পরিবার অবিরত উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও ভয়ের এক অস্বাভাবিক আবহে দিন কাটাতে বাধ্য হয় (Orford et al., 2005)। পরিবারের পিতা-মাতা, স্ত্রী বা ভাই-বোন কখনোই জানতে পারেন না যে ঘরের মানুষটি কখন শান্ত থাকবে আর কখন হিংস্র হয়ে উঠবে। রাতে বাইরের দরজায় সামান্য শব্দ হলে কিংবা কেউ চিৎকার করলেই ঘরের বাকি মানুষগুলোর বুক ভয়ে কেঁপে ওঠে। এই সার্বক্ষণিক উদ্বেগ পরিবারের সদস্যদের স্নায়ুকে এমনভাবে অবশ করে দেয় যে তারা নিজেরাও একসময় দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ও শারীরিক অবসাদে আক্রান্ত হয়ে পড়েন।

পারিবারিক সম্পর্কের এই ক্ষতের ভেতর দিয়ে জন্ম নেয় আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, যা সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় পরিচিত সহ-নির্ভরতা (Codependency) নামে। মেলোডি বিটি (Melody Beattie) তার বিখ্যাত তত্ত্বে দেখিয়েছেন কীভাবে আসক্ত ব্যক্তির আচরণ নিয়ন্ত্রণ ও আড়াল করতে গিয়ে পরিবারের নিকটজনেরা নিজেদের মানসিক সুস্থতা ও স্বাধীনতা বিসর্জন দেন (Beattie, 1987)। পরিবারের সদস্যরা লোকলজ্জার ভয়ে আসক্ত ব্যক্তির অন্যায়গুলোকে সমাজের চোখে গোপন করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তারা কর্মক্ষেত্রে গিয়ে তার অনুপস্থিতির জন্য মিথ্যা অজুহাত তৈরি করেন, তার করা দেনা শোধ করতে থাকেন এবং তাকে অপরাধ থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেদের সর্বস্ব খুইয়ে বসেন। এই ধরনের আচরণ প্রকৃতপক্ষে আসক্ত ব্যক্তির আচরণ সংশোধনে কোনো সাহায্য করে না, বরং তাকে কোনো পরিণতি ভোগ না করেই অপব্যবহার চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।

পরিবারের সদস্যদের মধ্যকার স্বাভাবিক ভূমিকাগুলো এই সময় পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। পিতা তার অভিভাবকত্ব হারান, সন্তান হারিয়ে ফেলে শৈশবের নির্ভরতা এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ভালোবাসা তিক্ত ঘৃণায় রূপ নেয়। পরিবারের ভেতরের সাধারণ আলাপচারিতা বন্ধ হয়ে গিয়ে তার জায়গা নেয় চিৎকার, পারস্পরিক দোষারোপ এবং অশ্রুপাত। আসক্ত সদস্যটিকে ঘিরে যে মানসিক টানাপোড়েন তৈরি হয়, তার কারণে পরিবারের অন্যান্য সুস্থ সদস্যরা নিজেদের সামাজিক জীবন থেকেও গুটিয়ে নেন। তারা আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করেন, কোনো সামাজিক উৎসবে অংশ নিতে পারেন না এবং এক ধরনের স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান। এভাবে মাদকাসক্তি কেবল একজন মানুষকে নিঃস্ব করে না, একটি সাজানো পরিবারকে ভেতর থেকে ক্ষতবিক্ষত করে এক ভঙ্গুর ধ্বংসাবশেষে পরিণত করে।

গৃহস্থালি অর্থনীতি ও পারিবারিক দারিদ্রায়ন (Household Economics and Domestic Impoverishment)

মাদকাসক্তি হলো পারিবারিক অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ ও সর্বগ্রাসী গহ্বর। একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত বা শ্রমজীবী পরিবারের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা গড়ে ওঠে বহু বছরের কৃচ্ছ্রসাধন, ক্ষুদ্র সঞ্চয় এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে। কিন্তু কোনো সদস্যের মাদকাসক্তি সেই সমস্ত অর্জনকে চোখের পলকে ধ্বংস করে দিতে পারে। শুরুতে ব্যক্তি হয়তো নিজের হাতখরচ বা ব্যক্তিগত আয় থেকেই মাদকের দাম মেটানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সহনশীলতা বেড়ে যাওয়ার কারণে যখন রাসায়নিকের মাত্রা বাড়াতে হয়, তখন সেই খরচ পরিবারের অন্যান্য সব মৌলিক খাতকে গ্রাস করতে শুরু করে। খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ অর্থ সরাসরি চলে যায় মাদক কারবারিদের পকেটে।

পারিবারিক এই অর্থনৈতিক পতনের সবচেয়ে বড় অনুঘটক হলো কর্মসংস্থান ও নিয়মিত আয়ের অবসান। কাজে ক্রমাগত দেরি করা, দায়িত্বে অবহেলা, মেজাজ হারিয়ে সহকর্মীদের সাথে দুর্ব্যবহার এবং শারীরিক অক্ষমতার কারণে আসক্ত ব্যক্তি একসময় নিজের চাকরি হারায় অথবা ব্যবসায় চরম ক্ষতির মুখোমুখি হয়। ক্যাথলিন ক্লোস্টারম্যান (Keith Klostermann) এবং টিমোথি জে. ও’ফারেল তাদের গবেষণায় বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে মাদকের সমস্যা পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তাকে সমূলে উৎপাটন করে এবং পুরো পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদী বেকারত্বের সংকটে ফেলে দেয় (Klostermann & O’Farrell, 2013)। পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী মানুষটি যখন আয়ের বদলে কেবল এক বেপরোয়া ভোক্তায় পরিণত হয়, তখন গৃহস্থালির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে।

নিয়মিত আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শুরু হয় ঘরের সম্পদ ধ্বংসের করুণ পালা। মাদক না পেলে শরীরে যে তীব্র স্নায়বিক যন্ত্রণা শুরু হয়, তা নিবারণ করার জন্য ব্যক্তি যেকোনো অন্যায় পথ বেছে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না। প্রথমে সে পরিবারের সদস্যদের কাছে নানা মিথ্যা বিপদের কথা বলে টাকা আদায় করে। তাতেও যখন নেশার খরচ কুলিয়ে ওঠে না, তখন নিজের ঘরের ভেতরেই শুরু হয় গোপনে চুরি। ঘরের ফ্যান, টেলিভিশন, রেডিও, রান্নার বাসনকোসন, এমনকি মায়ের বা স্ত্রীর গলার শেষ সম্বল স্বর্ণের অলংকারও স্থানীয় চোরাই বাজারে বা বন্ধকী দোকানে পানির দরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য নিজের গৃহেই কোনো নিরাপদ স্থান অবশিষ্ট থাকে না; মূল্যবান সবকিছু লুকিয়ে রাখার এক অপমানজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়।

চূড়ান্ত পর্যায়ে এই সংকট পরিবারকে ঠেলে দেয় সুদের এক নিষ্ঠুর ফাঁদে। নিয়মিত মাদক সংগ্রহ করতে গিয়ে ব্যক্তি স্থানীয় সুদের কারবারিদের কাছ থেকে অস্বাভাবিক সুদে ধার নিতে থাকে। পাওনাদারদের ক্রমাগত হুমকি, অপমান এবং বাড়ির সামনে এসে গালিগালাজ পরিবারের নিরীহ সদস্যদের সামাজিক মর্যাদা ধূলিসাৎ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে আসক্ত ব্যক্তির আইনি মামলা পরিচালনা করতে কিংবা বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার বিল মেটাতে গিয়ে পরিবারকে নিজেদের বসতবাড়ি বা শেষ সম্বল জমিও বিক্রি করে দিতে হয়। একটি পরিবার ধাপে ধাপে নেমে আসে চরম দারিদ্র্য ও ঋণের অতল গহ্বরে। এই অর্থনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞ কেবল তাৎক্ষণিক নয়, এটি একটি পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের সমস্ত সম্ভাবনাকে স্তব্ধ করে দেয়।

গার্হস্থ্য সহিংসতা ও অন্তরঙ্গ সঙ্গীর ওপর নির্যাতন (Domestic Violence and Intimate Partner Abuse)

ঘরের সীমানা মানুষের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা ছিল, যেখানে সে বাইরের জগতের ক্লান্তি ভুলে বিশ্রাম নেবে। কিন্তু একটি পরিবারে যখন মাদকের আগ্রাসন ঘটে, তখন সেই চার দেয়ালের পরিবেষ্টনীই পরিণত হয় এক উন্মুক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে। মাদক এবং গার্হস্থ্য সহিংসতার গভীর সম্পর্ক অপরাধবিজ্ঞানের এক অত্যন্ত কালো অধ্যায়। নেশার উপাদানগুলো মস্তিষ্কের আত্মনিয়ন্ত্রণকারী অংশকে এমনভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেয় যে সামান্য কোনো মতবিরোধ, সামান্য কোনো দেরি কিংবা তুচ্ছ কোনো কথাও মুহূর্তের মধ্যে উন্মত্ত শারীরিক সহিংসতায় রূপ নেয়। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ব্যক্তি ঘরের সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলোর ওপর চড়াও হতে সামান্যতম দ্বিধা প্রকাশ করে না।

নেশার ঘোরে সঙ্গীর যেকোনো নিরীহ আচরণকে নেতিবাচক বা অবমাননাকর হিসেবে ভুল বোঝার প্রবণতা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। আসক্ত ব্যক্তি প্রায়ই অমূলক সন্দেহ ও পরকীয়া সংক্রান্ত ভ্রমে ভোগে। কেনেথ ই. লিওনার্ড (Kenneth E. Leonard) তার গবেষণায় তথ্যসহকারে প্রমাণ করেছেন যে উচ্চমাত্রার মাদক অপব্যবহার এবং সঙ্গীর ওপর শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক সহিংসতার মধ্যে একটি অকাট্য কার্যকারণ সম্পর্ক রয়েছে (Leonard, 2005)। মাদকের আচ্ছন্নতা একদিকে যেমন ব্যক্তির অনুভূতি ভোঁতা করে দেয়, অন্যদিকে বাড়িয়ে দেয় তার আগ্রাসী প্রবৃত্তি। মাদকাসক্ত মানুষটি যখন কোনো কারণে ড্রাগ পেতে দেরি হয় বা টাকা পায় না, তখন তার শরীরে যে তীব্র প্রত্যাহারজনিত অস্থিরতা তৈরি হয়, তার প্রত্যক্ষ শিকার হতে হয় তার জীবনসঙ্গী এবং বৃদ্ধ পিতামাতাকে।

পারিবারিক এই সহিংসতার রূপ কেবল শারীরিক প্রহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে গভীর মানসিক নির্যাতন, প্রতিনিয়ত গালাগালি, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা এবং যৌন সহিংসতা। আসক্ত ব্যক্তি তার সঙ্গীকে প্রতিনিয়ত বোঝাতে চায় যে পরিবারের সমস্ত দুর্দশার জন্য সেই সঙ্গীই দায়ী। ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করা, প্রিয় জিনিসপত্র পুড়িয়ে দেওয়া এবং মাঝরাতে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া খুব পরিচিত এক চিত্র। ভুক্তভোগী ব্যক্তি প্রতিদিন এই আতঙ্কের মধ্যে বাস করেন যে কখন ড্রাগের প্রভাব কাটবে এবং ঘরের ভেতর তাণ্ডব শুরু হবে। এই অবিরাম ভয় ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস ও মানসিক প্রতিরোধকে পুরোপুরি চূর্ণ করে দেয়।

সবচেয়ে মর্মান্তিক হলো এই সহিংসতার দুষ্টচক্র থেকে ভুক্তভোগীর সহজে মুক্তি না পাওয়ার দীর্ঘমেয়াদী বাস্তবতা। অর্থনৈতিক পরাধীনতা, সামাজিক কলঙ্কের ভয় এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কারণে অত্যাচারিত সঙ্গী দিনের পর দিন এই নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করতে থাকেন। এর ওপর থাকে আসক্ত ব্যক্তির সাময়িক অনুশোচনার বিভ্রান্তিকর নাটক। সহিংস আক্রমণের পর মাদকাসক্ত মানুষটি হয়তো কান্নায় ভেঙে পড়ে, পায়ে ধরে ক্ষমা চায় এবং ভবিষ্যতে আর কখনো মাদক স্পর্শ না করার শপথ করে। কিন্তু এই অনুশোচনা খুব ক্ষণস্থায়ী হয়; শরীরের জৈবিক চাহিদা জেগে ওঠার সাথে সাথেই প্রতিশ্রুতির বাঁধ ভেঙে যায় এবং শুরু হয় একই নারকীয় পর্ব। ঘরের পরিবেশ পরিণত হয় এক দীর্ঘস্থায়ী ট্রমার কারখানায়, যা প্রতিটি সদস্যের মানসিক সত্তাকে তিলে তিলে নিঃশেষ করে ফেলে।

সন্তানের বিকাশ ও পিতামাতার ভূমিকার পক্ষাঘাত (Child Development and Paralysis of Parental Roles)

একটি নিষ্পাপ শিশুর স্বাভাবিক ও সুস্থ বিকাশের জন্য সবচেয়ে জরুরি উপাদান হলো একটি নির্ভরযোগ্য, স্নেহময় এবং সংবেদনশীল পারিবারিক আবহাওয়া। শিশুর মস্তিষ্ক গঠিত হয় তার চারপাশের সামাজিক অভিজ্ঞতার আলোকেই। কিন্তু যে ঘরে পিতামাতা মাদকাসক্ত, সেখানে শৈশব কোনো আনন্দের স্মৃতি থাকে না, তা পরিণত হয় টিকে থাকার এক করুণ ও ভয়াবহ সংগ্রামে। আসক্তি পিতামাতাকে তার প্রাথমিক দায়িত্বগুলো পালনে অক্ষম করে তোলে। শিশুকে সঠিক সময়ে খাবার দেওয়া, তার অসুস্থতায় ওষুধ এনে দেওয়া, তার পড়াশোনার খোঁজ রাখা কিংবা তাকে ভালোবাসা ও নিরাপত্তার অনুভূতি দেওয়ার মতো মৌলিক কাজগুলো অবহেলিত হয়। কারণ আসক্ত পিতামাতার সমগ্র মনোযোগ ও জৈবিক শক্তি নিবদ্ধ থাকে পরবর্তী ডোজের অন্বেষণে।

এই বিশৃঙ্খল পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের ব্যক্তিত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেনেথ জে. শের (Kenneth J. Sher) আসক্ত পরিবারের সন্তানদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে ক্রমাগত অস্থিরতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং অবহেলা শিশুর স্বাভাবিক মানসিক ভিত্তিকে ছিন্নভিন্ন করে দেয় (Sher, 1991)। এই শিশুরা শৈশব থেকেই ক্রনিক স্ট্রেস বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের মধ্যে বড় হয়। তাদের ভেতর এক ধরনের তীব্র ভীতি ও অপরাধবোধ বাসা বাঁধে; তারা মনে করতে শুরু করে যে হয়তো তাদের কোনো ভুলের কারণেই ঘরে এত অশান্তি ও মারামারি ঘটছে। স্কুলে তাদের মনোযোগ নষ্ট হয়ে যায়, শিক্ষাক্ষেত্রে তারা দ্রুত পিছিয়ে পড়ে এবং সমবয়সীদের সাথে স্বাভাবিক ও সহজ সামাজিক সম্পর্ক তৈরিতে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।

এই চরম সংকটের মধ্যে শিশুর কাঁধে চেপে বসে আরেক অস্বাভাবিক দায়িত্ব, যাকে সমাজবিজ্ঞানে বলা হয় প্যারেন্টিফিকেশন (Parentification)। লরা ল্যান্ডার (Laura Lander) এবং তার সহযোগী গবেষকরা পরিবার ব্যবস্থার ওপর তাদের পর্যালোচনায় বিশদভাবে তুলে ধরেছেন কীভাবে আসক্ত পরিবারের অপরিণত শিশুরা নিজেদের শৈশব হারিয়ে বাধ্য হয় প্রাপ্তবয়স্কদের মতো ভূমিকা গ্রহণ করতে (Lander et al., 2013)। মাত্র আট বা দশ বছরের একটি শিশুকে দেখা যায় তার নেশাগ্রস্ত মাতাল পিতাকে সামলাতে, অসুস্থ মাকে সান্ত্বনা দিতে কিংবা ছোট ভাইবোনদের জন্য রান্না করতে। যে বয়সে তাদের মুক্ত বাতাসে খেলাধুলা করার কথা ছিল, সেই বয়সে তারা পরিণত হয় পরিবারের অভিভাবকে। তাদের কাছ থেকে তাদের নিষ্পাপ শৈশবটিকে নিষ্ঠুরভাবে ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

এই পারিবারিক ট্র্যাজেডির সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী ও মারাত্মক পরিণতি হলো ট্রমার আন্তঃপ্রজন্মীয় সঞ্চালন। আসক্ত পরিবারে বড় হওয়া শিশুরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তীব্র মানসিক অবসাদ, ব্যক্তিত্বের জটিলতা এবং গভীর আস্থার সংকটে ভোগে। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, সুস্থ সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি না দেখে বড় হওয়ার কারণে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে যেকোনো সংকট বা মানসিক চাপ মোকাবেলায় তারা নিজেরাও অবচেতনভাবে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার তীব্র ঝুঁকিতে থাকে। গর্ভকালীন অবস্থায় মাতৃদেহে ড্রাগের বিষক্রিয়ার ফলে শারীরিক বিকলাঙ্গতা কিংবা নবজাতকের প্রত্যাহার উপসর্গ নিয়ে জন্ম নেওয়ার মতো শারীরিক ক্ষত তো থাকেই, তার সাথে যুক্ত হয় আজীবন বয়ে বেড়ানো মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতচিহ্ন। মাদকাসক্তি এভাবেই এক প্রজন্মের ব্যক্তিগত ব্যর্থতাকে পরবর্তী প্রজন্মের অবধারিত অভিশাপে রূপান্তর করে।

মাদক অপব্যবহারের সামাজিক প্রভাব (Macro-Level Consequences of Drug Abuse): অর্থনীতি, অপরাধ ও রাষ্ট্র

সামষ্টিক অর্থনীতি ও শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতার অপচয় (Macroeconomics and Loss of Labor Productivity)

একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি হলো তার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। কলকারখানা, গবেষণাগার, কৃষি কিংবা সেবা খাতে নিয়োজিত মানুষের দৈহিক ও মানসিক শ্রমের ওপর ভিত্তি করেই জাতীয় উৎপাদনের চাকা সচল থাকে। কিন্তু কোনো সমাজে যখন মাদকের অপব্যবহার মহামারী আকার ধারণ করে, তখন সেই অর্থনীতির উৎপাদনশীলতায় এক অদৃশ্য রক্তক্ষরণ শুরু হয়। মাদকাসক্তি কেবল ব্যক্তির পকেট খালি করে না, বরং জাতীয় উৎপাদন কাঠামো থেকে লাখ লাখ কর্মক্ষম মানুষকে পদ্ধতিগতভাবে ছিটকে ফেলে দেয়। এর ফলে জাতীয় আয়ে যে স্থবিরতা তৈরি হয়, তা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে শ্লথ করে দেয়।

সামষ্টিক অর্থনীতির পরিভাষায় মাদকের অর্থনৈতিক ক্ষতি পরিমাপের ক্ষেত্রে দুটি প্রধান মাত্রা বিবেচনা করা হয় – প্রত্যক্ষ ব্যয় এবং পরোক্ষ ক্ষতি। প্রত্যক্ষ ব্যয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে মাদকাসক্তদের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য খাতের অতিরিক্ত খরচ, জরুরি চিকিৎসার সংস্থান এবং অপরাধ দমনে বরাদ্দ বাজেট। কিন্তু পরোক্ষ ক্ষতি এর চেয়েও অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী। কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ অনুপস্থিতি বা অ্যাবসেন্টিইজম, কাজের সময় মনোযোগের অভাবে উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া বা প্রেজেন্টিইজম, শিল্প দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি এবং সর্বোপরি অকাল মৃত্যুর কারণে শ্রমশক্তির চিরতরে অপচয় ঘটা। অর্থনীতিবিদ ডেভিড জে. কলিন্স (David J. Collins) এবং হেলেন এম. ল্যাপসলে তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে মাদকের কারণে একটি দেশের অর্থনীতিতে যে পরিমাণ পরোক্ষ ক্ষতি হয়, তা অনেক সময় প্রত্যক্ষ চিকিৎসা ব্যয়ের চেয়েও বহুগুণ বেশি (Collins & Lapsley, 2008)।

যে বয়সে একজন তরুণের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখার কথা, সেই কর্মক্ষম বয়সেই মাদকের আগ্রাসন সবচেয়ে বেশি ঘটে। এর ফলে তরুণ শ্রমশক্তির একটি বিশাল অংশ অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় বা পরজীবী গোষ্ঠীতে পরিণত হয়। রাষ্ট্রকে তখন তাদের উৎপাদনের অংশীদার করার পরিবর্তে তাদের চিকিৎসা ও সামাজিক সুরক্ষার পেছনে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব বরাদ্দ করতে হয়। কলকারখানায় দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দেয়, নতুন উদ্ভাবনী উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাস পায়। বিনিয়োগকারীরা এমন অঞ্চলে শিল্প স্থাপনে নিরুৎসাহিত হন যেখানে শ্রমশক্তির শারীরিক ও মানসিক নির্ভরযোগ্যতা মাদকের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ।

এছাড়াও কর রাজস্বের ওপর মাদকের দ্বিমুখী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। একদিকে আসক্ত ও কর্মহীন ব্যক্তিরা আয়কর ও অন্যান্য উৎপাদনশীল কর প্রদানে ব্যর্থ হয়, অন্যদিকে মাদক ব্যবসার মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়, তার পুরোটাই থাকে অপ্রাতিষ্ঠানিক ও করমুক্ত চোরাবাজারে। ফলে রাষ্ট্রের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সংকুচিত হয়ে পড়ে। এই ঘাটতি মেটাতে গিয়ে সরকারকে প্রায়ই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো উন্নয়নমূলক খাতগুলোর বাজেট কাটছাঁট করতে হয়। এভাবে মাদক অপব্যবহারের অর্থনৈতিক অভিঘাত কোনো একক ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমগ্র জাতির ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে ফেলে।

ড্রাগ-অপরাধ সংযোগ ও কাঠামোগত সহিংসতার ত্রিভুজ (The Drug-Crime Nexus and Tripartite Framework of Violence)

মাদক এবং অপরাধের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানে দীর্ঘকাল ধরে আলোচনা চলছে। মাদক কি মানুষকে অপরাধী বানায়, নাকি অপরাধপ্রবণ মানুষেরাই স্বাভাবিকভাবে মাদকের দিকে আকৃষ্ট হয়? এই বিতর্কের সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক ও সুসংহত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন অপরাধবিজ্ঞানী পল জে. গোল্ডস্টেইন (Paul J. Goldstein)। তিনি তার বিখ্যাত গবেষণায় ড্রাগ ও সহিংসতার আন্তঃসম্পর্ককে একটি ত্রিমাত্রিক ধারণাগত রূপরেখা (Tripartite conceptual framework) এর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছেন (Goldstein, 1985)। এই কাঠামোর তিনটি মাত্রা হলো: মনোদৈহিক সহিংসতা, অর্থনৈতিক বাধ্যতামূলক অপরাধ এবং পদ্ধতিগত সহিংসতা।

প্রথম মাত্রাটি হলো মনোদৈহিক সহিংসতা (Psychopharmacological violence)। কিছু সুনির্দিষ্ট মাদক যখন মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্রে প্রবেশ করে, তখন তা সাময়িকভাবে বিচারবুদ্ধি ভোঁতা করে দেয়, আগ্রাসী মনোভাব বাড়িয়ে তোলে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হ্রাস করে। নেশার প্রভাবে ব্যক্তির ভেতরে অযৌক্তিক সন্দেহ বা প্যারানয়া তৈরি হয়, যার ফলস্বরূপ সে তুচ্ছ কারণে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। পথচারীদের ওপর উদ্দেশ্যহীন হামলা, পারিবারিক নির্যাতন, আকস্মিক মারামারি কিংবা ধর্ষণের মতো অপরাধগুলোর পেছনে এই রাসায়নিক আচ্ছন্নতা একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, সামগ্রিক ড্রাগ-অপরাধের খুব সামান্য অংশই কেবল এই খাঁটি ফার্মাকোলজিক্যাল কারণে ঘটে থাকে।

দ্বিতীয় মাত্রাটি অত্যন্ত দৃশ্যমান, যা পরিচিত অর্থনৈতিক বাধ্যতামূলক অপরাধ (Economically compulsive crime) নামে। মাদক ব্যবহারের শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতা এমন এক স্তরে পৌঁছায় যে ব্যবহারকারী যেকোনো মূল্যে পরবর্তী ডোজটি সংগ্রহ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। যখন বৈধ উপার্জনের সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন মাদকের অর্থ জোগাড় করার জন্য ব্যক্তি সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ে। পকেটমারি, ছিনতাই, গৃহস্থালি চুরি, গাড়ির যন্ত্রাংশ চুরি, প্রতারণা এবং এমনকি সশস্ত্র ডাকাতি এই পর্যায়ের সাধারণ অপরাধ। এই ধরনের অপরাধের শিকার হন মূলত সমাজের সাধারণ ও নিরীহ নাগরিকরা, যার ফলে পুরো সমাজে এক ধরনের স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

তবে গোল্ডস্টেইনের মতে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপটি হলো তৃতীয় মাত্রা, যা পরিচিত পদ্ধতিগত সহিংসতা (Systemic violence) নামে। এই সহিংসতা মাদকের সরাসরি ব্যবহারের সাথে যুক্ত নয়, বরং এটি অবৈধ মাদক বাজারের নিজস্ব পরিচালনা পদ্ধতির একটি অপরিহার্য অংশ। যেহেতু মাদক একটি নিষিদ্ধ পণ্য, তাই এই বাজারের লেনদেনে কোনো আদালত, পুলিশ বা আইনি সালিশের সুযোগ থাকে না। ফলে বিক্রির এলাকা দখল করা, দেনাদারদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা, প্রতিদ্বন্দ্বী চক্রকে নিশ্চিহ্ন করা কিংবা পুলিশি তথ্যদাতাদের হত্যা করার জন্য অপরাধী চক্রগুলো অবধারিতভাবে চরম শারীরিক সহিংসতার ওপর নির্ভর করে। গ্যাং ওয়ার, প্রকাশ্য দিবালোকে বন্দুকযুদ্ধ এবং ভাড়াটে খুনিদের দৌরাত্ম্য এই পদ্ধতিগত সহিংসতারই উপজাত।

কালো টাকা, অর্থপাচার ও সমান্তরাল অর্থনীতি (Illicit Capital, Money Laundering, and Parallel Economies)

বিশ্বজুড়ে মাদকের অবৈধ বাণিজ্য এমন এক অর্থনৈতিক দানব তৈরি করেছে, যা বিশ্বের বহু ছোট ও মাঝারি দেশের জাতীয় বাজেটের চেয়েও আকারে বড়। প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন ডলারের এই চোরাই লেনদেন সাধারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে সম্পূর্ণ ছায়া জগতে বা কালোবাজারে আবর্তিত হয়। এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ যখন মূলধারার অর্থনীতিতে প্রবেশের চেষ্টা করে, তখন তা গোটা আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামোগত স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। অবৈধ মাদক ব্যবসা কেবল চোরাচালানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী ও ক্ষতিকর সমান্তরাল চক্র গড়ে তোলে।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ হলো অর্থপাচার (Money laundering)। মাদক কারবারিরা তাদের অপরাধলব্ধ রক্তমাখা নগদ অর্থকে বৈধ আর্থিক কাঠামোর ভেতর ঢুকিয়ে দিতে তিনটি ধাপে কাজ করে: প্লেসমেন্ট, লেয়ারিং এবং ইন্টিগ্রেশন। তারা প্রথমে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নজর এড়িয়ে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ছোট ছোট অংশে জমা করে। এরপর ভুয়া কোম্পানি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেন এবং জটিল অফশোর হিসাবের মাধ্যমে সেই অর্থের উৎস গোপন করে ফেলে। সবশেষে সেই কালো টাকাকে হোটেল, আবাসন ব্যবসা, বিলাসবহুল রিসোর্ট বা ক্যাসিনোর মতো আপাতদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বৈধ বাণিজ্যিক খাতে বিনিয়োগ করে ‘সাদা’ টাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

এই সমান্তরাল অর্থনীতির কারণে বৈধ বাণিজ্যিক খাতগুলো মারাত্মক অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে। একজন সৎ ব্যবসায়ী যখন ব্যাংক ঋণ ও কর পরিশোধ করে ব্যবসা চালাতে হিমশিম খান, তখন একজন মাদক চোরাকারবারি তার পাচারকৃত কালো টাকার জোরে লোকসান দিয়েও কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারে, কারণ তার মূল লক্ষ্য মুনাফা নয়, বরং অর্থকে বৈধ করা। এর ফলে আবাসন খাতে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, সাধারণ মানুষের পক্ষে জমি বা ফ্ল্যাট কেনা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং মুদ্রাস্ফীতি অনিয়ন্ত্রিত রূপ নেয়। পিটার রয়টার (Peter Reuter) অবৈধ বাজার ও অপরাধের অর্থনীতির ওপর তার ক্লাসিক তত্ত্বে দেখিয়েছেন কীভাবে ভূগর্ভস্থ বা আন্ডারগ্রাউন্ড মাদক অর্থনীতি বৈধ বাজার ব্যবস্থার মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে দেয় (Reuter, 1983)।

দীর্ঘমেয়াদে এই কালো পুঁজি রাষ্ট্রের মুদ্রানীতি এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে পঙ্গু করে ফেলে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন সুদের হার বা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নীতি গ্রহণ করে, তখন সমান্তরাল অর্থনীতির বিপুল নগদ প্রবাহ সেই সমস্ত আইনি পদক্ষেপকে ব্যর্থ করে দেয়। মাদক অর্থনীতি থেকে উৎপন্ন অর্থ আন্তর্জাতিক মুদ্রা পাচার ও হুন্ডি নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করে, যার ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে বৈধ মূলধন বাইরে চলে যায় এবং দেশের মুদ্রা মান দ্রুত হ্রাস পায়। এভাবে মাদক বাণিজ্যের সমান্তরাল অর্থনীতি ধীরে ধীরে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তিটিকেই ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেয়।

আইনশৃঙ্খলা কাঠামো ও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার ওপর চাপ (Strain on Law Enforcement and Criminal Justice Infrastructure)

একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিচারিক কাঠামোর মূল উদ্দেশ্য হলো অপরাধ প্রতিরোধ করা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা। কিন্তু মাদকের ব্যাপক অপব্যবহার ও চোরাচালান এই সমগ্র অবকাঠামোকে এমন এক অস্বাভাবিক চাপের মুখে ঠেলে দিয়েছে যে পুরো ব্যবস্থাটি কার্যত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। পুলিশ বাহিনী, তদন্তকারী সংস্থা, আদালত এবং কারাগার – বিচার ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে এখন সিংহভাগ সময় ও সম্পদ ব্যয় হচ্ছে মাদক সংক্রান্ত মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে। এর ফলে অন্যান্য গুরুতর অপরাধ, যেমন হত্যা, ধর্ষণ, দুর্নীতি বা অর্থনৈতিক জালিয়াতির তদন্ত চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে।

পুলিশি ব্যবস্থার ওপর এই চাপের একটি সরাসরি ও দৃশ্যমান পরিণতি হলো পুলিশের সামরিকীকরণ (Police militarization)। অপরাধবিজ্ঞানী পিটার বি. ক্রাস্কা (Peter B. Kraska) তার গবেষণায় বিশদভাবে তুলে ধরেছেন কীভাবে মাদকের বিস্তার দমনের নামে সাধারণ বেসামরিক পুলিশ বাহিনীকে আধাসামরিক কায়দায় ভারী অস্ত্রশস্ত্র, সাঁজোয়া যান এবং কমান্ডো প্রশিক্ষণ দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে (Kraska, 2007)। এর ফলে পুলিশের চিরাচরিত জনবান্ধব ও সামাজিক ভূমিকা বিলুপ্ত হয়ে সেখানে স্থান নিয়েছে এক আক্রমণাত্মক ও যুদ্ধংদেহী মানসিকতা। পাড়া-মহল্লায় গভীর রাতে সশস্ত্র অভিযান চালানো, সাধারণ মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা এবং নিরীহ নাগরিকদের হয়রানি করা নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশের এই রূপান্তর রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক আস্থার সম্পর্কটিকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়।

আদালতগুলোতে মাদক সংক্রান্ত মামলার স্তূপ জমে থাকার কারণে বিচার ব্যবস্থার স্বাভাবিক গতি থমকে গেছে। বিশ্বের বহু দেশে ফৌজদারি আদালতে বিচারাধীন মামলার অর্ধেকেরও বেশি কেবল মাদক রাখা বা সেবনের মতো অভিযোগ। এই বিপুল মামলার ভার সামলাতে গিয়ে বিচারকরা মামলার মেরিট বা গভীরতা পর্যালোচনার সময় পান না। ফলস্বরূপ, হাজার হাজার অভিযুক্ত বছরের পর বছর বিনা বিচারে কারাগারে আটক থাকে। ধনী ও প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ীরা দামি আইনজীবী নিয়োগ করে জামিনে বেরিয়ে গেলেও দরিদ্র ও প্রান্তিক ব্যবহারকারীরা বছরের পর বছর আইনি বেড়াজালে পিষ্ট হতে থাকে। ন্যায়বিচারের এই দীর্ঘসূত্রতা পুরো আইন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ধ্বংস করে দেয়।

সবচেয়ে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয় কারাগারগুলোতে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কারণে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে গণ-কারাবাস (Mass incarceration) এর এক নির্মম বাস্তবতা। ধারণক্ষমতার দুই থেকে তিন গুণ বেশি কয়েদী নিয়ে চলা এই কারাগারগুলো কার্যত মানুষের চরিত্র সংশোধনের বদলে অপরাধের নতুন পাঠশালায় পরিণত হয়েছে। একজন সাধারণ আসক্ত বা ছোটখাটো বাহক যখন দীর্ঘদিন কারাগারে দুর্ধর্ষ অপরাধীদের সাথে বাস করে, তখন সে কারাগার থেকে মুক্তি পায় একজন পেশাদার ও নেটওয়ার্কযুক্ত অপরাধী হিসেবে। কারাগার রক্ষণাবেক্ষণ, বন্দীদের খাদ্য ও চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রতি বছর যে বিশাল অর্থ ব্যয় হয়, তা শিক্ষা বা জনস্বাস্থ্যের মতো উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা যেত। আইনি ব্যবস্থা এভাবে নিজেই নিজের তৈরি করা ফাঁদে বন্দি হয়ে পড়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়, দুর্নীতি ও নার্কো-রাষ্ট্রের উত্থান (Institutional Decay, Corruption, and the Emergence of Narco-States)

মাদক অর্থনীতির আকার যখন কোনো রাষ্ট্রের আইনি অর্থনীতির তুলনায় অতিমাত্রায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন তা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকে গ্রাস করতে শুরু করে। মাদক চোরাচালানি চক্রগুলো খুব ভালো করেই জানে যে নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালাতে হলে রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিষ্ক্রিয় রাখতে হবে। এর জন্য তারা একটি প্রাচীন ও নিষ্ঠুর নীতি প্রয়োগ করে – অর্থ অথবা বুলেট। অর্থাৎ, সরকারি কর্মকর্তাদের হয় বিপুল অর্থের বিনিময়ে কিনে নেওয়া হবে, অথবা তাদের হত্যা করা হবে। এই কৌশলের সামনে কোনো দুর্বল শাসনব্যবস্থা দীর্ঘদিন নিজের সততা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা বজায় রাখতে পারে না।

দুর্নীতির এই বিষবাষ্প শুরু হয় মাঠপর্যায়ের পুলিশ কনস্টেবল, কাস্টমস কর্মকর্তা এবং সীমান্তরক্ষীদের ঘুষ দেওয়ার মাধ্যমে। কিন্তু ধীরে ধীরে এই দুর্নীতির জাল বিস্তৃত হয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত। পুলিশ কমিশনার, বিচারক, রাজনৈতিক নেতা, এমনকি সংসদ সদস্যরাও কার্টেলগুলোর নিয়মিত মাসোহারাভোগীতে পরিণত হন। নির্বাচনী প্রচারণায় মাদক কারবারিদের কালো টাকা ঢেলে দিয়ে পুতুল রাজনীতিবিদদের ক্ষমতায় বসানো হয়। এর পরিণতিতে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে আইনপ্রণেতারা নিজেরাই মাদক মাফিয়াদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো মাদক ব্যবসায়ীদের নিজস্ব সুরক্ষা বাহিনীতে রূপ নেয়।

এই প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের চরম পর্যায় হলো নার্কো-রাষ্ট্র (Narco-state) এর উত্থান। যখন একটি সার্বভৌম দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে মাদক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারিত হয় কার্টেল প্রধানদের নির্দেশে, তখন সেই রাষ্ট্র কার্যত তার বৈধতা হারিয়ে ফেলে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোইসেস নাইম (Moisés Naím) তার বিখ্যাত তত্ত্বে দেখিয়েছেন কীভাবে বৈশ্বিক অবৈধ নেটওয়ার্কগুলো জাতীয় সার্বভৌমত্বকে ছিনতাই করে প্রথাগত রাষ্ট্রীয় সীমানা ও আন্তর্জাতিক আইনের শাসনকে অর্থহীন করে তুলেছে (Naím, 2005)। লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ, আফ্রিকার কিছু উপকূলীয় অঞ্চল কিংবা মধ্য এশিয়ার কিছু অংশে মাদক লর্ডরা সমান্তরাল সরকার পরিচালনা করে; যেখানে তাদের নিজস্ব সেনাবাহিনী থাকে, নিজস্ব কর আদায় ব্যবস্থা থাকে এবং সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের বদলে তাদের কাছেই আনুগত্য প্রকাশ করতে বাধ্য হয়।

এই ধরনের রাষ্ট্রে মুক্ত গণমাধ্যম এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়। যেসব সৎ সাংবাদিক, বিচারক বা মানবাধিকার কর্মী এই মাদক-রাজনীতি আঁতাতের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস দেখান, তাদের প্রকাশ্য রাজপথে গুলি করে হত্যা করা হয়। মেক্সিকো বা কলম্বিয়ার মতো দেশগুলোতে শত শত সাংবাদিক ও স্থানীয় মেয়র হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন কেবল মাদক চক্রের অপরাধ উন্মোচন করার কারণে। আইন ও শৃঙ্খলার এই পতনের ফলে সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি চরম অবিশ্বাস ও অনাস্থার জন্ম হয়। রাষ্ট্র তখন আর নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রদানকারী কোনো প্রতিষ্ঠান থাকে না, বরং তা পরিণত হয় অপরাধীদের যৌথ লুটপাটের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্মে।

জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সামাজিক সুরক্ষার কাঠামোগত সংকট (Structural Crisis of Public Health Systems and Social Security)

সামাজিক নিরাপত্তার চূড়ান্ত ভিত্তি হলো একটি কার্যকর, সাশ্রয়ী এবং সবার জন্য উন্মুক্ত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা। কিন্তু যখন সমাজে মাদকের অপব্যবহার মহামারী রূপ ধারণ করে, তখন সেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নেমে আসে এক অভূতপূর্ব কাঠামোগত দুর্যোগ। হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলো প্রতিদিন পূর্ণ হয়ে থাকে অতিরিক্ত মাত্রায় মাদক গ্রহণকারী বা ওভারডোজের রোগীদের দিয়ে। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ-র শয্যাগুলো যখন মাদক-প্ররোচিত শারীরিক সংকটে আক্রান্ত রোগীদের দিয়ে পূর্ণ থাকে, তখন স্বাভাবিক হৃদরোগী, দুর্ঘটনাগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রসূতি মায়েরা জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত হন। একটি সমাজের স্বাস্থ্য অবকাঠামো যখন কেবল মাদকের তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দিতে ব্যস্ত থাকে, তখন সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার মান ভেঙে পড়তে বাধ্য।

এর সাথে যুক্ত হয় রক্তবাহিত ও সংক্রামক ব্যাধির এক দ্বিতীয় ঢেউ। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী জনগোষ্ঠীর মাঝে এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাসের সংক্রমণের হার অত্যন্ত বেশি থাকে। এই সংক্রামক রোগগুলো কেবল তাদের নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক এবং অসচেতনতার মাধ্যমে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যেও। ফলে মহামারী নিয়ন্ত্রণের জন্য রাষ্ট্রকে যে বিপুল অর্থ ও জনবল ব্যয় করতে হয়, তা অন্যান্য প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য কর্মসূচির অগ্রগতিকে স্তব্ধ করে দেয়। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও এই সংকট সমান তীব্র; মাদকাসক্তদের জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদী ডিটক্সিফিকেশন, সাইকিয়াট্রিক সাপোর্ট এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালনার খরচ মেটাতে গিয়ে অধিকাংশ দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এই সংকটের সমান্তরালে ঘটে সমাজের মানবিক সংহতি ও সামাজিক পুঁজির অবলুপ্তি। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট ডি. পুটনাম (Robert D. Putnam) তার বিখ্যাত গ্রন্থে সামাজিক পুঁজি (Social capital) এর যে ধারণা উপস্থাপন করেছিলেন, তা মাদকের প্রকোপে কীভাবে ভেঙে পড়ে তা স্পষ্ট লক্ষ্য করা যায় (Putnam, 2000)। পারস্পরিক বিশ্বাস, প্রতিবেশীদের মধ্যে সহানুভূতি এবং যৌথ নাগরিক উদ্যোগ হলো একটি সুস্থ সমাজের প্রাণ। কিন্তু যেসব এলাকায় মাদকের খোলা বাজার গড়ে ওঠে, সেখানে মানুষ একে অপরকে বিশ্বাস করা বন্ধ করে দেয়। প্রত্যেকে নিজের ঘরকে লোহার গ্রিল দিয়ে সুরক্ষিত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, পার্ক বা খেলার মাঠগুলো পরিণত হয় ড্রাগ গ্রহণকারীদের আড্ডায় এবং শিশুদের মুক্তভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ চিরতরে হারিয়ে যায়।

সব মিলিয়ে সমাজের সম্মিলিত প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। সামাজিক সুরক্ষার যে জালটি দুর্বল মানুষকে প্রতিকূলতার মুখে রক্ষা করার কথা ছিল, মাদকের প্রভাবে তা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ই এক ধরনের স্থায়ী মানসিক অবসাদ বা কম্প্যাশন ফ্যাটিগে আক্রান্ত হয়। মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন করার সমস্ত নাগরিক উদ্যোগ ব্যর্থ হতে দেখে মানুষ একসময় সমস্যার সমাধান খোঁজা বন্ধ করে দেয় এবং প্রান্তিক মানুষগুলোকে সমাজের বাইরে ছুড়ে ফেলার এক নিষ্ঠুর উদাসীনতা গ্রহণ করে। এই কাঠামোগত অবক্ষয় কোনো সাময়িক দুর্যোগ নয়; এটি একটি আধুনিক সভ্যতার মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় কার্যকারিতার এক অপূরণীয় বিপর্যয়।

মাদক নির্ভরতার তত্ত্ব (Theories of Drug Dependency): জৈবিক, মনোবৈজ্ঞানিক ও সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা

জৈবরাসায়নিক তত্ত্ব (Biochemical Theories): মস্তিষ্ক ও নির্ভরশীলতা

মস্তিষ্কের পুরষ্কার ব্যবস্থা ও ডোপামিনের ভূমিকা (Brain Reward System and the Role of Dopamine)

মানুষের মাথার খুলির ভেতর দেড় কেজি ওজনের যে নরম অঙ্গটি থাকে, তার কাজ কেবল চিন্তা করা কিংবা স্মৃতি জমিয়ে রাখা নয়। শরীরের সমস্ত অনুভূতি, আনন্দ, বিষাদ এবং বেঁচে থাকার মৌলিক তাগিদগুলোও নিয়ন্ত্রিত হয় এই মস্তিষ্ক থেকেই। ১৯৫৪ সালে বিজ্ঞানী জেমস ওল্ডস (James Olds) এবং পিটার মিলনার (Peter Milner) ইঁদুরের মস্তিষ্কে তড়িৎপ্রবাহ পাঠিয়ে এক চমকপ্রদ ঘটনা লক্ষ্য করেছিলেন (Olds & Milner, 1954)। তারা দেখতে পান, মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু অংশে মৃদু বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দিলে ইঁদুর খাবার কিংবা জল ছেড়ে বারবার সেই উদ্দীপনা পাওয়ার জন্য লিভারে চাপ দিতে থাকে। প্রাণিদেহের এই বিশেষ জৈবিক অঞ্চলটি পরবর্তীকালে পুরস্কার ব্যবস্থা (Reward System) হিসেবে চিহ্নিত হয়। জীববিজ্ঞানের স্বাভাবিক নিয়মে খাবার খাওয়া, জল পান করা কিংবা প্রজাতির ধারাবাহিকতা রক্ষার মতো টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পন্ন হলে মস্তিষ্ক এক ধরনের আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি বিশেষ রাসায়নিক বার্তাবাহক, যার নাম ডোপামিন (Dopamine)।

File:Recolored Overview of reward structures in the human brain2.png - Wikimedia Commons
মস্তিষ্কের মেসোলিম্বিক ডোপামিন ব্যবস্থা (Mesolimbic Dopamine System)। ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়া (VTA) থেকে নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্সে ডোপামিনবাহী স্নায়ুপথ বিস্তৃত হয়েছে। এই ব্যবস্থা পুরস্কার-শিক্ষণ, প্রণোদনা ও আচরণ পুনরাবৃত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মস্তিষ্কের এই রাসায়নিক যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত সূক্ষ্ম নিয়মে কাজ করে। নিউরন নামের স্নায়ুকোষগুলো একটি অপরটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে না, তাদের মাঝে ক্ষুদ্র ফাঁকা জায়গা থাকে যাকে সিন্যাপ্স বলা হয়। যখন কোনো ইতিবাচক বা জীবনধারণের জন্য জরুরি অভিজ্ঞতা ঘটে, তখন মস্তিষ্কের গভীরে ডোপামিন ক্ষরিত হয়ে সিন্যাপ্সে ছড়িয়ে পড়ে এবং গ্রাহক বা রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত হয়। এর ফলে প্রাণীটি আনন্দ বা তৃপ্তি অনুভব করে এবং ভবিষ্যতে সেই কাজটি পুনরাবৃত্তি করার তাগিদ পায়। বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই ব্যবস্থাটি প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থেই গড়ে উঠেছিল। তবে কোনো মাদকদ্রব্য যখন রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে, তখন এই স্বাভাবিক ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়ে। মাদক কোনো প্রাকৃতিক বেঁচে থাকার উদ্দীপক নয়, অথচ এটা স্বাভাবিক যেকোনো অভিজ্ঞতার চেয়ে বহুগুণ বেশি ডোপামিন নিঃসরণ ঘটিয়ে দেয়।

গবেষক রয় ওয়াইজ (Roy Wise) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, বিভিন্ন ধরনের মাদক গ্রহণের ফলে মস্তিষ্কে ডোপামিনের মাত্রা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কয়েকশো গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে (Wise, 1980)। কোকেন বা অ্যামফিটামিনের মতো উদ্দীপক সরাসরি ডোপামিন পরিবাহককে বাধা দেয়, যার ফলে সিন্যাপ্টিক ফাঁকে ডোপামিন দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকে। অন্যদিকে হেরোইন বা মরফিনের মতো অপিয়েটগুলো মস্তিষ্কের অন্যান্য প্রতিরোধক স্নায়ুকে অবদমিত করে ডোপামিনের বন্যা বইয়ে দেয়। স্নায়ুবিজ্ঞানী নোরা ভলকো (Nora Volkow) আধুনিক ব্রেন ইমেজিং প্রযুক্তির সাহায্যে মানুষের মস্তিষ্কে এই পরিবর্তনের দৃশ্য তুলে ধরেন (Volkow et al., 1997)। তার গবেষণায় দেখা যায়, মাদক গ্রহণের ফলে ডোপামিনের এই মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক সংকেত আদান-প্রদানকে পুরোপুরি বিভ্রান্ত করে ফেলে। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক আনন্দ পাওয়ার ক্ষমতা তখন ধীরে ধীরে ভোঁতা হতে শুরু করে।

ডোপামিনকে এক সময় কেবল আনন্দের রাসায়নিক বলে ভাবা হতো, কিন্তু আধুনিক নিউরোবায়োলজি দেখিয়েছে এর কাজ আরও গভীর। এটা কেবল তৃপ্তি দেয় না, বরং কোন বিষয়টি বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেই মনোযোগ নির্ধারণ করে দেয়। মাদক যখন কৃত্রিমভাবে বিশাল পরিমাণ ডোপামিন ছড়িয়ে দেয়, তখন মস্তিষ্ক ভুলভাবে ধরে নেয় যে মাদক গ্রহণ করাটাই বেঁচে থাকার সবচেয়ে জরুরি কাজ। ফলে খাবার, পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক বা অন্যান্য প্রাকৃতিক আনন্দদায়ক বিষয়গুলো মস্তিষ্কের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। ব্যক্তির সচেতন নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তার স্নায়ুতন্ত্র কেবল মাদকের রাসায়নিক সংকেতের প্রতি বাধ্য আচরণ করতে থাকে। জৈবরাসায়নিক দৃষ্টিকোণ থেকে মাদকাসক্তি কোনো নৈতিক স্খলন নয়, বরং মস্তিষ্কের যোগাযোগ ব্যবস্থায় রাসায়নিক অনুপ্রবেশের এক জটিল পরিণতি।

মেসোলিম্বিক পথ ও নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যহীনতা (Mesolimbic Pathway and Neurotransmitter Imbalance)

মস্তিষ্কের পুরস্কার ব্যবস্থার প্রধান স্নায়বিক সড়কটির নাম মেসোলিম্বিক ডোপামিন পথ (Mesolimbic Dopamine Pathway)। এই পথটি শুরু হয় মস্তিষ্কের তলদেশে অবস্থিত ভেন্ট্রাল টেগমেনটাল এরিয়া (Ventral Tegmental Area) বা সংক্ষেপে ভিটিএ থেকে। সেখান থেকে স্নায়ু সংযোগগুলো সোজা চলে যায় লিম্বিক সিস্টেমের অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্স (Nucleus Accumbens)-এ। বিজ্ঞানী জর্জ কুব (George Koob) এই সংযোগস্থলের রাসায়নিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, মাদকাসক্তির প্রাথমিক এবং তীব্র অনুভূতিগুলো এই পথেই তৈরি হয় (Koob, 1992)। ভিটিএ অঞ্চলে থাকা ডোপামিন উৎপাদনকারী কোষগুলো যখন উত্তেজিত হয়, তখন নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্সে প্রচুর ডোপামিন নিঃসৃত হয়। এই ঘটনাটি প্রাণীর মনে এক তীব্র উত্তেজনা ও আনন্দের জন্ম দেয়, যা স্নায়ুবিজ্ঞানের ভাষায় তীব্র ইতিবাচক পুনর্বলন হিসেবে পরিচিত।

মেসোলিম্বিক পথটি একা কাজ করে না, এটা মস্তিষ্কের বিচার-বুদ্ধি ও সিদ্ধান্তের কেন্দ্র প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (Prefrontal Cortex)-এর সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স একজন মানুষকে যুক্তি দিয়ে ভাবতে এবং তাৎক্ষণিক আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। তবে মাদক ক্রমাগত ব্যবহার করার ফলে মেসোলিম্বিক পথ থেকে আসা অতিরিক্ত রাসায়নিক সংকেত কর্টেক্সের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে অকেজো করে ফেলে। বিজ্ঞানী টেরি রবিনসন (Terry Robinson) এবং কেন্ট বেরিজ (Kent Berridge) তাদের বিখ্যাত প্রণোদনা সংবেদনশীলকরণ তত্ত্ব (Incentive-Sensitization Theory)-তে দেখিয়েছেন যে, মাদকের প্রতি মস্তিষ্কের এই তীব্র টান আনন্দের জন্য নয়, বরং একটি অবচেতন কামনার রূপ নেয় (Robinson & Berridge, 1993)। তারা এই প্রক্রিয়াটিকে ‘ওয়ান্টিং’ বা চাওয়া এবং ‘লাইকিং’ বা ভালো লাগা – এই দুই ভাগে ভাগ করেন। মাদকের প্রতি আসক্তি বাড়লে ভালো লাগার অনুভূতি কমে গেলেও চাওয়ার তীব্রতা ক্রমেই বাড়তে থাকে।

ডোপামিনের পাশাপাশি মস্তিষ্কের অন্যান্য রাসায়নিক বার্তাবাহক বা নিউরোট্রান্সমিটারও এই প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, গামা-অ্যামিনোবিউটাইরিক অ্যাসিড বা গাবা (GABA) হলো মস্তিষ্কের প্রধান প্রতিরোধক রাসায়নিক, যা স্নায়ুকোষের অতিরিক্ত উত্তেজনায় রাশ টেনে ধরে। অ্যালকোহল বা সিডেটিভ জাতীয় মাদক গাবার কার্যকারিতা বাড়িয়ে দিয়ে স্নায়ুতন্ত্রকে শিথিল করে দেয়। অন্যদিকে গ্লুটামেট (Glutamate) হলো প্রধান উত্তেজক নিউরোট্রান্সমিটার, যা শিক্ষা এবং স্মৃতি তৈরিতে সাহায্য করে। মাদক ব্যবহারের ফলে ডোপামিন, গাবা এবং গ্লুটামেটের মধ্যকার সুষম ভারসাম্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্সের কোষে ডোপামিন ও গ্লুটামেটের পারস্পরিক ক্রিয়া মাদকের সঙ্গে যুক্ত পরিবেশ, স্থান বা স্মৃতির গভীর ছাপ ফেলে দেয়, যা পরবর্তীতে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে পুনরায় মাদকের দিকে টেনে নিতে বড় ভূমিকা পালন করে।

সেরোটোনিন নামের আরেকটি নিউরোট্রান্সমিটারও এই জটিলতায় যুক্ত থাকে, যা মানুষের মেজাজ, ঘুম ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে। এমডিএমএ বা এক্সট্যাসির মতো মাদক সেরোটোনিনের নিঃসরণ বাড়িয়ে সাময়িক তীব্র উচ্ছ্বাস তৈরি করে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই সমস্ত নিউরোট্রান্সমিটারের স্বাভাবিক ভাণ্ডার ফুরিয়ে যায়। মস্তিষ্ক তখন মাদকের কৃত্রিম উপস্থিতি ছাড়া স্বাভাবিক কোনো রাসায়নিক বার্তাই সঠিকভাবে আদান-প্রদান করতে পারে না। ফলে মেসোলিম্বিক পথটির ভারসাম্যহীনতা এক স্থায়ী রূপ ধারণ করে। স্বাভাবিক জীবনের কোনো সাধারণ উদ্দীপনাই তখন মস্তিষ্কের নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্সে সাড়া জাগাতে পারে না, যার ফলে ব্যক্তি মাদকের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

সহনশীলতা, নির্ভরতা ও প্রত্যাহার সিন্ড্রোম (Tolerance, Dependence and Withdrawal Syndrome)

মাদক যখন বারবার শরীরে প্রবেশ করে, তখন মানবদেহ এবং মস্তিষ্ক সেই রাসায়নিক ঝড়ের সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। জীববিজ্ঞানের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো নিজের ভেতরের পরিবেশকে স্থিতিশীল রাখা। অতিরিক্ত উদ্দীপনার মুখে পড়ে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলো তাদের পৃষ্ঠে থাকা গ্রাহক বা রিসেপ্টরের সংখ্যা কমিয়ে দেয়। এই জৈবিক সুরক্ষামূলক প্রক্রিয়াকে বলা হয় রিসেপ্টর ডাউন-রেগুলেশন (Receptor Down-regulation)। এর ফলে প্রথম দিকে যে পরিমাণ মাদক গ্রহণ করলে তীব্র অনুভূতি পাওয়া যেত, কিছুদিন পর সেই একই পরিমাণ মাদকে আর কোনো অনুভূতিই হয় না। কাঙ্ক্ষিত আনন্দ ফিরে পাওয়ার জন্য ব্যক্তিকে মাদকের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় সহনশীলতা (Tolerance)।

সহনশীলতা কেবল রিসেপ্টরের পরিবর্তনের কারণেই ঘটে না, এর পেছনে যকৃতের বিপাকীয় পরিবর্তনও ভূমিকা রাখে। শরীর মাদককে দ্রুত ভেঙে ফেলার জন্য নির্দিষ্ট এনজাইমের উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়, ফলে মাদক দ্রুত নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। এর পাশাপাশি স্নায়ুকোষের ভেতরেও গভীর পরিবর্তন ঘটে। আণবিক স্নায়ুবিজ্ঞানী এরিক নেসলার (Eric Nestler) তার গবেষণায় প্রমাণ করেছেন যে, দীর্ঘকাল মাদক ব্যবহারের ফলে স্নায়ুকোষের অভ্যন্তরীণ সংকেত প্রেরক প্রোটিন যেমন সিএএমপি এবং প্রতিলিপিকরণ উপাদানগুলোর গঠন পরিবর্তিত হয়ে যায় (Nestler, 2001)। এর ফলে তৈরি হয় শারীরিক নির্ভরতা (Physical Dependence)। এই পর্যায়ে মস্তিষ্ক মাদককে তার সাধারণ কার্যক্রমের একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। মাদক না থাকলে কোষগুলো আর নিজেদের স্বাভাবিক জৈবিক ক্রিয়া চালাতে পারে না।

নির্ভরশীলতা যখন পুরোপুরি তৈরি হয়ে যায়, তখন হঠাৎ মাদক বন্ধ করে দিলে শুরু হয় এক তীব্র শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়, যার নাম প্রত্যাহার সিন্ড্রোম (Withdrawal Syndrome)। অপিয়েট বা হেরোইনে আসক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের লোকাস সেরুলিয়াস (Locus Coeruleus) নামের অঞ্চলটি বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়। এই অংশটি শরীরে নরঅ্যাড্রেনালিন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে, যা হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ ও সতর্কতার সাথে সম্পর্কিত। অপিয়েট সাধারণত এই অঞ্চলটিকে শান্ত রাখে। কিন্তু হঠাৎ মাদক সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে লোকাস সেরুলিয়াস মাত্রাতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বিপুল পরিমাণ নরঅ্যাড্রেনালিন ছেড়ে দেয়। এর ফলে রোগীর শরীরে প্রচণ্ড ঘাম, বমি, পেশির তীব্র খিঁচুনি, ডায়রিয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত কাঁপুনি শুরু হয়।

এই প্রত্যাহার লক্ষণগুলো রোগীকে বোঝায় যে তার মস্তিষ্ক আর নিজস্ব ভারসাম্যে নেই। অ্যালকোহল প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে গাবা রিসেপ্টরের সংবেদনশীলতা কমে যাওয়া এবং গ্লুটামেটের মাত্রাতিরিক্ত উত্তেজনার কারণে রোগীর মারাত্মক খিঁচুনি হতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডেলিরিয়াম ট্রিমেনস বলা হয়। মানসিক দিক থেকেও ব্যক্তি প্রচণ্ড বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং আত্মহত্যার প্রবণতায় ভুগতে পারে, কারণ তখন তার মস্তিষ্কে ডোপামিনের উৎপাদন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। শারীরিক যন্ত্রণা এবং মানসিক হতাশা থেকে বাঁচতেই আসক্ত ব্যক্তি পুনরায় মাদকের শরণাপন্ন হয়। এই চক্রটি ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তির সীমানা পেরিয়ে সম্পূর্ণ জৈবরাসায়নিক এক বন্দিদশায় পরিণত হয়।

অ্যালোস্ট্যাসিস এবং অপব্যবহারের পরিবর্তিত হোমওস্ট্যাসিস (Allostasis and Altered Homeostasis in Substance Abuse)

সাধারণত শরীর তার অভ্যন্তরীণ জৈবিক প্রক্রিয়াগুলোকে একটি নির্দিষ্ট স্বাভাবিক মাত্রায় ধরে রাখতে চায়, যাকে বলে হোমিওস্ট্যাসিস (Homeostasis)। তাপমাত্রা, রক্তচাপ কিংবা গ্লুকোজের মতো মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যও নির্দিষ্ট সীমায় থাকতে ভালোবাসে। কিন্তু দীর্ঘদিন মাদক ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্ক তার সেই পুরোনো সুস্থ ভারসাম্যে আর ফিরে যেতে পারে না। এই সংকটটি ব্যাখ্যা করার জন্য গবেষক জর্জ কুব (George Koob) এবং মিশেল লে মোয়াল (Michel Le Moal) একটি যুগান্তকারী ধারণা উপস্থাপন করেন, যার নাম অ্যালোস্ট্যাসিস তত্ত্ব (Allostasis Theory) (Koob & Le Moal, 2001)। অ্যালোস্ট্যাসিস হলো এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে শরীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে স্থায়িত্ব খোঁজার চেষ্টা করে। তবে মাদকের ক্ষেত্রে এই নতুন ভারসাম্যটি আসলে এক ধরনের রোগাক্রান্ত বা পরিবর্তিত ভিত্তিস্তর।

এই তত্ত্বটির মূল ভিত্তি প্রোথিত রয়েছে মনোবিজ্ঞানী রিচার্ড সলোমন (Richard Solomon)-এর বহু পুরোনো বিপরীত প্রক্রিয়া তত্ত্ব (Opponent-Process Theory)-র ভেতরে (Solomon & Corbit, 1974)। সলোমন ব্যাখ্যা করেছিলেন, মস্তিষ্ক যেকোনো তীব্র আবেগের বিপরীতে একটি বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া তৈরি করে ভারসাম্য বজায় রাখে। মাদক যখন মস্তিষ্কে কৃত্রিম আনন্দের জোয়ার বয়ে আনে (প্রক্রিয়া-ক), শরীর তখন তাকে প্রতিহত করতে এক ধরনের অস্বস্তিকর ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া শুরু করে (প্রক্রিয়া-খ)। শুরুতে মাদকের আনন্দদায়ক প্রভাবই প্রধান থাকে এবং নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দ্রুত মিলিয়ে যায়। কিন্তু বারবার মাদক ব্যবহারের ফলে আনন্দদায়ক অংশটি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মস্তিষ্কের আত্মরক্ষামূলক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াটি দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী হতে থাকে।

কুব এবং লে মোয়াল দেখিয়েছেন যে, অ্যালোস্ট্যাটিক পরিবর্তনের ফলে মস্তিষ্কের পুরস্কার ব্যবস্থার কার্যকারিতা স্থায়ীভাবে নিচে নেমে যায় এবং মানসিক চাপ ব্যবস্থা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেমে থাকা অ্যামিগডালা এবং হাইপোথ্যালামাস থেকে অতিরিক্ত মাত্রায় কর্টিকোট্রপিন-রিলিজিং ফ্যাক্টর (Corticotropin-Releasing Factor) বা সিআরএফ নিঃসৃত হতে থাকে। এর ফলে মাদকাসক্ত ব্যক্তি যখন মাদক নেয় না, তখন সে কেবল স্বাভাবিক থাকে না এমন নয়, বরং এক অসহ্য মানসিক অস্থিরতা, শূন্যতা এবং বিষাদের গভীরে তলিয়ে যায়। গবেষকরা এই অবস্থাকে মাদকাসক্তির ‘অন্ধকার দিক’ বা ডার্ক সাইড বলে অভিহিত করেছেন। আসক্তির এই পর্যায়ে মাদকের ব্যবহার আর আনন্দের অন্বেষণ থাকে না, বরং তা হয়ে দাঁড়ায় অন্তহীন নেতিবাচক অনুভূতি থেকে ক্ষণিকের জন্য মুক্তি পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা।

এইভাবে আসক্তির চালিকাশক্তি ধনাত্মক পুনর্বলন থেকে ঋণাত্মক পুনর্বলনে রূপান্তরিত হয়। মস্তিষ্ক তার স্বাভাবিক হোমিওস্ট্যাটিক সেট-পয়েন্ট হারিয়ে এমন এক অ্যালোস্ট্যাটিক দশায় পৌঁছায় যেখানে টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন মনে হয় নতুন করে মাদক গ্রহণ। ব্যক্তির অনুভূতি প্রকাশের ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে আসে, তার সামাজিক যোগাযোগ ভেঙে পড়ে এবং জৈবরাসায়নিকভাবে মস্তিষ্ক কেবল মানসিক চাপের রাসায়নিকগুলোতেই নিমজ্জিত থাকে। অ্যালোস্ট্যাসিসের এই ধারণাটি স্পষ্ট করে দেয় কেন আসক্তি কেবল একটি সাময়িক শারীরিক উপসর্গ নয়, বরং মস্তিষ্কের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থার এক দীর্ঘমেয়াদী এবং ক্ষতিকর পুনর্বিন্যাস।

স্নায়বিক প্লাস্টিসিটি ও কাঠামোগত অভিযোজন (Neural Plasticity and Structural Adaptation)

মস্তিষ্ক কোনো অনড় বা পাথুরে কাঠামো নয়; এটা অভিজ্ঞতার সাথে সাথে নিজের স্নায়বিক সংযোগগুলোকে নতুন করে সাজিয়ে নিতে পারে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই অভিযোজন ক্ষমতাকে বলা হয় স্নায়বিক প্লাস্টিসিটি (Neural Plasticity)। নতুন ভাষা শেখা বা কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শেখার পেছনে মস্তিষ্কের এই প্লাস্টিসিটিই কাজ করে। তবে মাদকাসক্তির ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের এই অসাধারণ শেখার ক্ষমতাই এক আত্মঘাতী রূপ ধারণ করে। মাদক মস্তিষ্কের নিউরনে এমন কিছু স্থায়ী কাঠামোগত ও রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায়, যা আসক্তির আচরণকে স্মৃতিতে শক্তভাবে গেঁথে দেয়। বিজ্ঞানী এরিক নেসলার তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, দীর্ঘমেয়াদী মাদক সেবনের ফলে স্নায়ুকোষে ডেল্টা-ফস-বি নামের একটি বিশেষ প্রোটিন জমা হতে থাকে, যা মাসের পর মাস অপরিবর্তিত থাকে এবং জিনের প্রকাশকে প্রভাবিত করে স্নায়ুর গঠন বদলে দেয় (Nestler et al., 2001)।

File:ΔFosB accumulation.svg - Wikimedia Commons
একবার মাদক গ্রহণের পর ফস পরিবারের বিভিন্ন প্রোটিনের স্বল্পস্থায়ী বৃদ্ধি এবং পুনরাবৃত্ত মাদক গ্রহণের ফলে অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল ডেল্টা-ফস-বি (ΔFosB) প্রোটিনের ক্রমবর্ধমান সঞ্চয়ের তুলনামূলক রেখাচিত্র।

এই কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যায় নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্স এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের নিউরনগুলোর ডেনড্রাইটিক স্পাইনে। ডেনড্রাইটিক স্পাইন হলো স্নায়ুকোষের সেই ছোট ছোট প্রবর্ধক, যার মাধ্যমে তারা অন্য কোষের কাছ থেকে তথ্য গ্রহণ করে। কোকেন বা নিকোটিনের মতো মাদক বারবার ব্যবহারের ফলে এই স্পাইনগুলোর সংখ্যা এবং ঘনত্ব অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তিত হয়। এর ফলে মস্তিষ্কের পুরস্কার এবং মেমরি সার্কিটের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী সম্ভাবনা (Long-Term Potentiation) বা এলটিপি নামের সিন্যাপ্টিক জোরদারকরণ ঘটে। সহজ কথায়, মাদকের সাথে সম্পর্কিত স্মৃতিগুলো সাধারণ স্মৃতির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং স্থায়ী সংযোগ হিসেবে মস্তিষ্কে খোদাই হয়ে যায়।

Full article: Cellular basis of memory for addiction
নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্সের নিউরনের ডেনড্রাইটিক স্পাইনের ফ্লুরোসেন্স অণুবীক্ষণচিত্র। নিয়ন্ত্রণ অবস্থা, কোকেন প্রয়োগ এবং ডেল্টা-ফস-বি-সম্পর্কিত পরীক্ষামূলক পরিবর্তনের তুলনা করে দেখানো হয়েছে কীভাবে মাদক স্নায়ুকোষের গঠনে পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

গবেষক পিটার কালিভাস (Peter Kalivas) আসক্তির এই স্থায়ী রূপান্তরের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন, যা গ্লুটামেট হোমওস্ট্যাসিস তত্ত্ব (Glutamate Homeostasis Theory) নামে পরিচিত (Kalivas, 2009)। তার গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘকাল মাদক ব্যবহারের ফলে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স থেকে নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্সে গ্লুটামেট প্রেরণের স্বাভাবিক পথটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্নায়ুকোষের বাইরে গ্লুটামেটের মাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী প্রোটিনগুলো কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এর পরিণতিতে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স তার ওপরের স্তর থেকে নিচতলার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা বা ইনহিবিটরি কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলে। আসক্ত ব্যক্তি নিজের ক্ষতি জেনেও কেন নিজেকে থামাতে পারে না, তার জৈবরাসায়নিক কারণ লুকিয়ে আছে মস্তিষ্কের এই প্লাস্টিক পরিবর্তনে।

Drug Addiction as a Pathology of Staged Neuroplasticity | Neuropsychopharmacology
স্বাভাবিক পুরস্কার-সংকেত এবং মাদক-সম্পর্কিত সংকেতের প্রতিক্রিয়ায় গ্লুটামেট নিয়ন্ত্রণের তুলনামূলক মডেল। প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স থেকে নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্সে গ্লুটামেটের প্রবাহ ও গ্লিয়াল কোষের গ্লুটামেট নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তন আসক্তি ও পুনরায় মাদক গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সাথে কোষের অভ্যন্তরীণ এপিজেনেটিক্স (Epigenetics) বা এপিজেনেটিক পরিবর্তনও এই রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করে। মাদক সরাসরি ডিএনএর মূল অনুক্রম পরিবর্তন না করলেও ডিএনএ মোড়ককারী হিস্টোন প্রোটিনের রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায়, যাকে অ্যাসিটাইলেশন বা মিথাইলেশন বলা হয়। এর ফলে নির্দিষ্ট কিছু জিনের কার্যকারিতা স্থায়ীভাবে চালু বা বন্ধ হয়ে যায়। একবার এই জৈবরাসায়নিক পরিবর্তনগুলো ঘটে গেলে, মাদক ছেড়ে দেওয়ার বহু বছর পরেও আসক্তির ঝুঁকি থেকে যায়। পরিবেশের কোনো চেনা উদ্দীপক, যেমন পুরোনো সঙ্গীর মুখ বা মাদকের চেনা গন্ধ পেলেই সেই সুপ্ত প্লাস্টিক সার্কিটগুলো আবার জ্বলে ওঠে এবং তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। এই কারণেই আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান আসক্তিকে মস্তিষ্কের একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং পুনরাবৃত্তিমূলক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করে।

Frontiers | Epigenetic Effects of Addictive Drugs in the Nucleus Accumbens
নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্সে মাদক-প্ররোচিত এপিজেনেটিক পরিবর্তন। হিস্টোন অ্যাসিটাইলেশন, হিস্টোন মিথাইলেশন এবং সংশ্লিষ্ট এনজাইমের কার্যক্রম কীভাবে জিনের প্রকাশ ও মাদক-সম্পর্কিত আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে, তার বৈজ্ঞানিক চিত্র।

জিনগত ঝুঁকি এবং বংশগতির জৈবরাসায়নিক ভিত্তি (Genetic Vulnerability and Biochemical Basis of Heredity)

মাদকের ক্ষতিকর দিক সবার জন্য উন্মুক্ত হলেও সবাই কিন্তু সমানভাবে আসক্ত হয় না। কেউ হয়তো কৌতুহলবশত কয়েকবার মাদক ব্যবহার করে তা ছেড়ে দিতে পারে, আবার কেউ প্রথম কয়েকবারের অভিজ্ঞতার পরেই সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে পড়ে। এই পার্থক্যের মূলে রয়েছে ব্যক্তির অন্তর্নিহিত জিনগত সংবেদনশীলতা (Genetic Vulnerability)। চিকিৎসা নৃবিজ্ঞান এবং আচরণগত জেনেটিক্সের গবেষণাগুলো বহুদিন ধরেই দেখিয়েছে যে মাদকাসক্তির পেছনে পারিবারিক ইতিহাসের বড় ভূমিকা থাকে। যমজ এবং দত্তক নেওয়া সন্তানদের ওপর পরিচালিত বিস্তৃত গবেষণায় দেখা গেছে, মাদকাসক্তির ঝুঁকির প্রায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশই নির্ধারিত হয় বংশগতির মাধ্যমে (Kendler et al., 2003)।

সুইডিশ বংশগতিবিজ্ঞানী কেনেথ কেন্ডলার (Kenneth Kendler) যমজ ভাইবোনদের ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন যে, একই পরিবেশে বড় হওয়া সত্ত্বেও অভিন্ন যমজদের মধ্যে একজনের আসক্তি থাকলে অন্যজনের আসক্ত হওয়ার সম্ভাবনা সাধারণ ভাইবোনদের তুলনায় অনেক বেশি (Kendler et al., 2012)। এই পর্যবেক্ষণটি প্রমাণ করে যে কোনো ব্যক্তির জৈবরাসায়নিক নকশাই তাকে আসক্তির প্রতি বেশি বা কম ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। এই ঝুঁকি কোনো একটিমাত্র জিনের ওপর নির্ভর করে না; এটা হলো শত শত জিনের সম্মিলিত প্রভাব বা পলিজেনিক প্রক্রিয়ার ফল। প্রতিটি জিন মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের রাসায়নিক কাঠামোতে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম তারতম্য তৈরি করে।

উদাহরণস্বরূপ, ডোপামিন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উপাদান হলো ডি২ ডোপামিন রিসেপ্টর জিন (D2 Dopamine Receptor Gene) বা ডিআরডি২ (DRD2)। বিজ্ঞানী আর্নেস্ট নোবল (Ernest Noble) এবং তার সহকর্মীরা আবিষ্কার করেছিলেন যে, যাদের শরীরে ডিআরডি২ জিনের ‘এ১’ অ্যালিল নামক একটি নির্দিষ্ট রূপভেদ থাকে, তাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন ডি২ রিসেপ্টরের সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কম থাকে (Noble et al., 1991)। মস্তিষ্কে রিসেপ্টর কম থাকার অর্থ হলো তারা প্রাকৃতিকভাবে জীবন থেকে সাধারণ আনন্দ কম পায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে অনেক সময় ‘রিওয়ার্ড ডেফিসিয়েন্সি সিন্ড্রোম’ বলা হয়। এই ধরনের ব্যক্তিরা যখন প্রথমবার কোনো মাদক গ্রহণ করে, তখন কৃত্রিম রাসায়নিক বন্যায় তাদের অপূর্ণ পুরস্কার ব্যবস্থা হঠাৎ পূর্ণতা পায়, ফলে তাদের মধ্যে খুব দ্রুত তীব্র আসক্তি গড়ে ওঠার জৈবিক প্রবণতা থাকে।

জিনগত তারতম্য কেবল মস্তিষ্কের রিসেপ্টরেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটা মাদকের বিপাক বা মেটাবলিজমেও বড় ভূমিকা রাখে। যেমন অ্যালকোহল আসক্তির ক্ষেত্রে মানুষের শরীরে অ্যালকোহল ডিহাইড্রোজিনেজ (Alcohol Dehydrogenase) এবং অ্যালডিহাইড ডিহাইড্রোজিনেজ নামক দুটি গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম কাজ করে। পূর্ব এশীয় জনগোষ্ঠীর অনেকের মধ্যেই এই এনজাইমের জিনগত রূপভেদ থাকে, যার ফলে তারা অ্যালকোহল পান করলে তা দ্রুত বিষাক্ত অ্যাসিটালডিহাইডে পরিণত হয় এবং শরীর থেকে সহজে দূর হতে পারে না। এর ফলে তাদের মুখ লাল হয়ে যায়, বমি ভাব হয় এবং তীব্র মাথাব্যথা শুরু হয়। এই অপ্রীতিকর শারীরিক প্রতিক্রিয়ার কারণে তারা প্রাকৃতিকভাবেই অ্যালকোহল আসক্তি থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত থাকে। বিপরীতে যাদের এই এনজাইমগুলো অ্যালকোহল দ্রুত ভেঙে ফেলতে পারে, তারা অনেক বেশি পরিমাণে পান করতে পারে এবং অজান্তেই আসক্তির ফাঁদে পড়ে যায়।

জিনগত এই প্রবণতা কিন্তু ব্যক্তির জীবনে কোনো অমোঘ ভাগ্যলিপি বা অনিবার্য পরিণতি নয়। কোনো ব্যক্তির শরীরে আসক্তির জিনগত ঝুঁকি থাকার অর্থ এই নয় যে সে নিশ্চিতভাবেই মাদকাসক্ত হবে। এটি কেবল একটি জৈবিক দুর্বলতা তৈরি করে। পরিবেশগত চাপ, পারিবারিক সংকট কিংবা মাদকের সহজলভ্যতা যখন এই জিনগত দুর্বলতার সাথে যুক্ত হয়, তখনই কেবল সেই সুপ্ত জিনগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং আসক্তির রূপ নেয়। আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় জিন-পরিবেশ মিথস্ক্রিয়া। এভাবে জৈবরাসায়নিক ও জিনগত তত্ত্বগুলো মাদকাসক্তিকে পাপ বা দুর্বল মানসিকতার বৃত্ত থেকে বের করে এনে আণবিক জীববিদ্যার আলোকে একটি বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যার কাঠামোর ভেতর দাঁড় করায়।

জ্ঞানীয় বিকাশ তত্ত্ব (Cognitive Development Theories): চিন্তা ও আচরণের পরিবর্তন

পিঁয়াজের জ্ঞানীয় পর্যায় ও বয়ঃসন্ধির ঝুঁকি (Piaget’s Cognitive Stages and Adolescent Vulnerability)

মানুষের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি কেবল শরীরের আয়তন বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনা নয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের ভাবনার জগৎ এবং জগৎকে বোঝার দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তিত হতে থাকে। সুইজারল্যান্ডের প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী জঁ পিঁয়াজে (Jean Piaget) প্রথম বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন কীভাবে একটি শিশুর চিন্তাভাবনা ধাপে ধাপে পরিপক্বতার দিকে এগিয়ে যায় (Piaget, 1936)। পিঁয়াজে তার তত্ত্বে জ্ঞানীয় বিকাশের চারটি প্রধান ধাপের কথা বলেছিলেন, যার মধ্যে সর্বশেষ ধাপটি হলো ফরমাল অপারেশনাল পর্যায় (Formal Operational Stage)। সাধারণত এগারো বা বারো বছর বয়স থেকে এই ধাপটি শুরু হয়। এই বয়সেই ছেলেমেয়েরা বিমূর্ত চিন্তা করতে শেখে, সম্ভাব্য ভবিষ্যতের ফলাফল নিয়ে ভাবতে পারে এবং যুক্তি দিয়ে কোনো পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়। তবে এই মানসিক রূপান্তরটি কোনো জাদুকরি নিয়মে রাতারাতি ঘটে যায় না। বাস্তব জীবনে দেখা যায়, বয়ঃসন্ধিকালে শারীরিক পরিবর্তনের সাথে জ্ঞানীয় ক্ষমতার এই নতুন বিকাশ এক ধরনের জটিল ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে, যা তরুণদের মাদক গ্রহণের মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

জ্ঞানীয় বিকাশ যখন শৈশবের বাস্তব চিন্তার গণ্ডি পেরিয়ে বিমূর্ত ধারণার দিকে পা বাড়ায়, তখন কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের নিয়ে এক নতুন ধরনের ভাবনায় মগ্ন হয়। আমেরিকান বিকাশমূলক মনোবিজ্ঞানী ডেভিড এলকাইন্ড (David Elkind) পিঁয়াজের কাজকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে বয়ঃসন্ধিকালের দুটি বিশেষ জ্ঞানীয় বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরেন (Elkind, 1967)। এলকাইন্ড এই মানসিক অবস্থাকে ‘কাল্পনিক দর্শক’ বা ইমাজিনারি অডিয়েন্স এবং ‘ব্যক্তিগত কল্পকাহিনী’ বা পারসোনাল ফ্যাবল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়েরা প্রায়ই মনে করে সমাজের সমস্ত চোখ কেবল তাদের দিকেই নিবদ্ধ রয়েছে। চারপাশের সবাই তাদের আচরণ, পোশাক এবং চলাফেরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এই তীব্র সামাজিক সচেতনতা বা কাল্পনিক দর্শকের চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অনেকেই সহপাঠীদের দলের সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। বন্ধুদের দলে মাদক গ্রহণের চল থাকলে, সেই কাল্পনিক দর্শকের অনুমোদন পেতেই অনেকে প্রথমবারের মতো মাদকে হাত দেয়।

এর চেয়েও ঝুঁকিপূর্ণ জ্ঞানীয় বিভ্রান্তি তৈরি করে ব্যক্তিগত কল্পকাহিনীর ধারণা। এই মানসিক স্তরে তরুণরা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তাদের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি সম্পূর্ণ অনন্য এবং সাধারণ কোনো নিয়ম তাদের ক্ষেত্রে খাটে না। তারা মনে করে, খারাপ কিছু ঘটলে তা অন্যদের জীবনে ঘটবে, তাদের নিজেদের কিছু হতে পারে না। মাদকাসক্তির ক্ষেত্রে এই চিন্তার প্রভাব বেশ মারাত্মক রূপ নেয়। একজন কিশোর হয়তো জানে যে হেরোইন বা মেথামফেটামিন মারাত্মক ক্ষতিকর, কিন্তু সে মনে মনে বিশ্বাস করে যে সে আসক্ত হবে না। তার ধারণা হয়, সে যেকোনো সময় মাদক নেওয়া থামিয়ে দিতে পারবে। এই অপরিপক্ব আত্মবিশ্বাস এবং ঝুঁকির ভুল মূল্যায়নের পেছনে দায়ী মস্তিষ্কের জ্ঞানীয় বিকাশ তখনও পুরোপুরি শেষ না হওয়া।

মস্তিষ্কের যে অংশটি যুক্তি, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, সেই প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স বিশ বছর বয়সের মাঝামাঝি পর্যন্ত পূর্ণতা পায় না। এর ফলে বিমূর্ত চিন্তা করার ক্ষমতা তৈরি হলেও, বাস্তব জীবনের জটিল পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক তৃপ্তি বনাম দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির তুলনা তারা সঠিকভাবে করতে পারে না। মাদকের তাৎক্ষণিক আনন্দ বা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তাদের কাছে ভবিষ্যতের শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব মনে হয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মাদকের প্রতি বয়ঃসন্ধিকালের আকর্ষণ কেবল চারপাশের খারাপ সঙ্গের প্রভাব নয়। এটা কিশোর বয়সের অপরিণত জ্ঞানীয় কাঠামোর এক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া, যেখানে চিন্তার সীমাবদ্ধতাই আচরণের ভুল পথ তৈরি করে দেয়।

কোলবার্গের নৈতিক বিকাশ ও বিচ্যুতির যুক্তি (Kohlberg’s Moral Development and Justification of Deviance)

চিন্তার বিকাশের সাথে মানুষের ন্যায়-অন্যায় বোধের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। আইন বা সামাজিক নিয়মকে মানুষ কীভাবে দেখে, তা নির্ভর করে তার নৈতিক ভাবনার স্তরের ওপর। আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী লরেন্স কোলবার্গ (Lawrence Kohlberg) মানুষের নৈতিক বিচারবুদ্ধির ক্রমবিকাশকে তিনটি প্রধান স্তর এবং ছয়টি উপ-পর্যায়ে বিন্যস্ত করেছিলেন (Kohlberg, 1958)। কোলবার্গ তার তত্ত্বে দেখান যে মানুষ ধীরে ধীরে প্রাক-প্রচলিত পর্যায় (Pre-conventional Stage) থেকে প্রচলিত পর্যায় (Conventional Stage) এবং পরিশেষে উত্তর-প্রচলিত পর্যায় (Post-conventional Stage)-এর দিকে অগ্রসর হয়। মাদক গ্রহণ যেহেতু অধিকাংশ সমাজেই একটি বেআইনি এবং সামাজিকভাবে অননুমোদিত আচরণ, তাই একজন মানুষ কেন জেনেবুঝে এই পথে পা বাড়ায়, তার একটি চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা কোলবার্গের এই স্তরভিত্তিক বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া যায়।

প্রাক-প্রচলিত স্তরে থাকা ব্যক্তি ন্যায়-অন্যায় বিচার করে কেবল তাৎক্ষণিক শাস্তি কিংবা পুরস্কারের মাপকাঠিতে। এখানে কোনো নিয়ম বা আইনের প্রতি অভ্যন্তরীণ শ্রদ্ধা কাজ করে না। কোনো কাজ করলে আনন্দ পাওয়া যাবে কি না কিংবা ধরা পড়লে শাস্তি হবে কি না, এটাই হয়ে ওঠে মূল বিবেচ্য। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, যেসব ব্যক্তি শৈশব বা কৈশোরে এই প্রাক-প্রচলিত নৈতিক চিন্তার গণ্ডি পেরিয়ে পরবর্তী স্তরে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তাদের মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে (Palmer, 2003)। তারা মাদককে কোনো সামাজিক বা ব্যক্তিগত বিপর্যয় হিসেবে দেখে না, বরং দেখে ক্ষণিকের তৃপ্তি লাভের মাধ্যম হিসেবে। যতক্ষণ পর্যন্ত ধরা পড়ার বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে পড়ার সরাসরি ভয় না থাকে, ততক্ষণ তাদের জ্ঞানীয় বিচার মাদক গ্রহণকে সম্পূর্ণ সঙ্গত মনে করে।

সমাজ যখন প্রত্যাশা করে যে ব্যক্তি প্রচলিত স্তরে উন্নীত হয়ে সামাজিক শৃঙ্খলা এবং সমষ্টির স্বার্থ রক্ষা করবে, তখন মাদক ব্যবহারকারী ব্যক্তিরা এক গভীর নৈতিক দ্বন্দ্বের মুখে পড়ে। এই দ্বন্দ্ব দূর করার জন্য তারা নিজেদের চিন্তার কাঠামোকে সুবিধাজনকভাবে বদলে নেয়। সমাজবিজ্ঞানী গ্রেশাম সাইকস (Gresham Sykes) এবং ডেভিড মাতজা (David Matza) বিচ্যুত আচরণের ব্যাখ্যায় এই প্রক্রিয়াকে নিরপেক্ষীকরণ কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন (Sykes & Matza, 1957)। ব্যক্তি যখন নিজের নৈতিক স্খলন বুঝতে পারে, তখন সে নিজের কাছেই নিজের কাজকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য যুক্তি তৈরি করে। তারা দাবি করে যে তারা কারও ক্ষতি করছে না, মাদক নেওয়া তাদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার, কিংবা সমাজ নিজেই অন্যায়ে ভরা। নৈতিক চিন্তার এই আত্মপ্রবঞ্চনা আসক্ত ব্যক্তিকে নিজের কৃতকর্মের অপরাধবোধ থেকে নিষ্কৃতি দেয়।

আমেরিকান সামাজিক মনোবিজ্ঞানী লিওন ফেস্টিঙ্গার (Leon Festinger) এই পরিস্থিতিটিকে জ্ঞানীয় অসঙ্গতি (Cognitive Dissonance) হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন (Festinger, 1957)। যখন কোনো ব্যক্তির বিশ্বাস ও আচরণের মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়, তখন মনের ভেতরে তীব্র অস্বস্তি তৈরি হয়। একজন মাদক গ্রহণকারী ব্যক্তি ভালো করেই জানে যে মাদক নেওয়া ক্ষতিকর এবং সামাজিকভাবে নিন্দনীয়। এই অস্বস্তি দূর করার দুটি উপায় থাকে – হয় মাদক ছেড়ে দেওয়া, না হয় মাদক নেওয়ার সপক্ষে নতুন নতুন নৈতিক যুক্তি খাড়া করা। আসক্ত ব্যক্তিরা প্রায়শই দ্বিতীয় পথটি বেছে নেয়। তারা নিজেদের বোঝায় যে কাজের অতিরিক্ত চাপ কমানোর জন্য এটা দরকার ছিল, কিংবা পরিবার তাদের যথেষ্ট ভালোবাসে না বলেই তারা এই পথ বেছে নিয়েছে। এইভাবে নৈতিক বিকাশের ঘাটতি এবং জ্ঞানীয় আত্মপক্ষ সমর্থনের মিথস্ক্রিয়ায় মাদক গ্রহণের পথটি প্রশস্ত হতে থাকে।

অ্যালবার্ট এলিসের অযৌক্তিক বিশ্বাস ও আসক্তির যুক্তিযুক্তকরণ (Albert Ellis’s Irrational Beliefs and Rationalization of Addiction)

মানুষ বাস্তব জগতের ঘটনা দিয়ে যতটা না প্রভাবিত হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবিত হয় সেই ঘটনাকে সে কীভাবে দেখছে তার ওপর। এই মৌলিক সত্যটি মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার জগতে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রখ্যাত মনোচিকিৎসক অ্যালবার্ট এলিস (Albert Ellis)। এলিস তার উদ্ভাবিত র‍্যাশোনাল ইমোটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (Rational Emotive Behavior Therapy) বা সংক্ষেপে আরইবিটি মডেলে দেখান যে মানুষের মানসিক যন্ত্রণা এবং ক্ষতিকর আচরণের মূলে থাকে তার নিজের তৈরি করা কিছু অযৌক্তিক বিশ্বাস (Ellis, 1962)। মাদকাসক্তির ক্ষেত্রে এই বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট। কোনো কঠিন পরিস্থিতি বা মানসিক চাপ সরাসরি মানুষকে মাদকের দিকে নিয়ে যায় না। বরং সেই পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্যক্তির ভুল বিশ্বাস ও মূল্যায়নই তাকে মাদকের আশ্রয়ে যেতে বাধ্য করে।

এলিস তার সুপরিচিত এবিসি (ABC) কাঠামোর মাধ্যমে বিষয়টি সহজ করে বুঝিয়েছিলেন। এখানে ‘এ’ হলো প্ররোচনামূলক ঘটনা, ‘বি’ হলো ব্যক্তির বিশ্বাস, আর ‘সি’ হলো সেই বিশ্বাসের মানসিক ও আচরণগত পরিণতি। অধিকাংশ মানুষ মনে করে খারাপ ঘটনাটিই তাদের মাদক নিতে বাধ্য করেছে। এলিস জোর দিয়ে বলেন যে ঘটনা নিজে কোনো আচরণ তৈরি করতে পারে না; মধ্যবর্তী বিশ্বাসটিই সবকিছু নির্ধারণ করে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিন্তায় কিছু সুনির্দিষ্ট অযৌক্তিক বিশ্বাস গভীরভাবে গেঁথে থাকে। এর মধ্যে প্রধান হলো হতাশা অসহনশীলতা (Low Frustration Tolerance)। তারা নিজেদের বলতে থাকে, ‘আমি এই মানসিক কষ্ট একেবারেই সহ্য করতে পারছি না’ কিংবা ‘জীবনের সব সমস্যা এখনই শেষ হতে হবে’। এই অসহনশীল চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় মাদকের মাধ্যমে যেকোনো মূল্যে স্বস্তি পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

এলিস আসক্ত ব্যক্তিদের চিন্তার আরেকটি বড় ত্রুটি হিসেবে দেখিয়েছেন চরম দাবিদার চিন্তাভাবনা বা ‘মাস্টারবেশন‘-এর প্রবণতা। আসক্ত ব্যক্তি অবচেতনভাবে দাবি করে বসে যে জগৎকে তার ইচ্ছামতোই চলতে হবে, মানুষ তাকে সবসময় গুরুত্ব দেবে এবং জীবন কোনোভাবেই কঠিন হতে পারবে না। বাস্তব জীবন যখন এই কাল্পনিক প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না, তখন সে প্রচণ্ড হতাশায় ভেঙে পড়ে এবং নিজেকে সান্ত্বনা দিতে মাদকের আশ্রয় নেয়। গবেষক অ্যালবার্ট এলিস (Albert Ellis) এবং তার সহকর্মীরা আসক্তির মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে স্বল্পমেয়াদী আনন্দবাদ (Short-term Hedonism) ধারণার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন (Ellis et al., 1988)। আসক্ত ব্যক্তি ভবিষ্যতের সুদূরপ্রসারী ধ্বংসকে উপেক্ষা করে বর্তমান মুহূর্তের সাময়িক স্বস্তিকে চূড়ান্ত সত্য বলে মনে করে।

মাদকের ওপর নির্ভরতা বাড়ার সাথে সাথে চিন্তার এই অযৌক্তিক জাল আরও বিস্তৃত হয়। ব্যক্তি তখন যুক্তি দিতে শুরু করে যে সে চাইলে যেকোনো দিন মাদক ছেড়ে দিতে পারবে, কিন্তু আজকে একটু শান্তি পাওয়াটা বেশি দরকার। নিজের দুর্বলতাকে সে যৌক্তিক প্রয়োজন হিসেবে সাজিয়ে তোলে। এলিস লক্ষ্য করেছিলেন যে এই অযৌক্তিক বিশ্বাসগুলো এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় চিন্তার মতো কাজ করে, যা সচেতন সিদ্ধান্তের সুযোগ কেড়ে নেয়। ব্যক্তি ভাবতে শেখে না যে অস্বস্তি সহ্য করার ক্ষমতা মানুষের ভেতরেই থাকে। বরং সে মনে করে তার যাবতীয় মানসিক শান্তি নির্ভর করছে একটি নির্দিষ্ট রাসায়নিক পদার্থের ওপর। চিন্তার এই বিভ্রান্তিকর রূপটিই ব্যক্তিকে বছরের পর বছর মাদকের চক্রব্যূহে আটকে রাখে।

অ্যারন বেকের জ্ঞানীয় স্কিমা ও স্বয়ংক্রিয় চিন্তা (Aaron Beck’s Cognitive Schemas and Automatic Thoughts)

মানুষের মস্তিষ্ক তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার জন্য কিছু পূর্বনির্ধারিত মানসিক ছাঁচ ব্যবহার করে, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় জ্ঞানীয় স্কিমা (Cognitive Schema)। প্রখ্যাত মার্কিন মনোচিকিৎসক অ্যারন বেক (Aaron Beck) জ্ঞানীয় থেরাপির ভিত্তি স্থাপন করতে গিয়ে দেখান কীভাবে এই স্কিমাগুলো মানুষের আবেগ ও আচরণকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে (Beck, 1976)। ছোটবেলা থেকে গড়ে ওঠা অভিজ্ঞতার আলোকেই এই মানসিক ছাঁচগুলো তৈরি হয়। কোনো ব্যক্তির স্কিমা যদি আত্মবিশ্বাসহীনতা, অপরাধবোধ কিংবা একাকীত্বের ধারণায় পূর্ণ থাকে, তবে সে যেকোনো পরিস্থিতিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখবে। আসক্তির মনস্তাত্ত্বিক জগতে বেকের এই স্কিমা ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মাদক সেবনের বহু আগেই ব্যক্তির মনের ভেতর এমন কিছু সুপ্ত বিশ্বাস তৈরি হয়ে থাকে যা তাকে বিপদের দিকে ঠেলে দেয়।

বেক এবং তার সহকর্মীরা মাদকাসক্তির জন্য দায়ী জ্ঞানীয় উপাদানগুলোকে তিনটি স্তরে বিন্যস্ত করেছেন, যা তারা তাদের বিখ্যাত গ্রন্থ কগনিটিভ থেরাপি অব সাবস্ট্যান্স অ্যাবিউজ (Cognitive Therapy of Substance Abuse)-এ বিস্তারিত আলোচনা করেন (Beck et al., 1993)। প্রথম স্তরে থাকে অন্তস্থ মৌলিক বিশ্বাস, যেমন ‘আমি কোনো কাজের নই’ বা ‘আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই’। এই মৌলিক বিশ্বাসগুলো থেকে দ্বিতীয় স্তরে জন্ম নেয় কিছু শর্তাধীন বিশ্বাস, যেমন ‘যদি আমি মাদক নেই, তবেই কেবল মানুষের সাথে সহজে মিশতে পারব’ অথবা ‘মাদক ছাড়া আমি আমার ভেতরের চাপ সামলাতে পারব না’। তৃতীয় স্তরটি হলো পরিস্থিতির মুখে বিদ্যুৎগতিতে মাথায় আসা স্বয়ংক্রিয় চিন্তা, যা ব্যক্তিকে সরাসরি ড্রাগ গ্রহণের দিকে পরিচালিত করে।

মাদকাসক্ত ব্যক্তির মনের মধ্যে বিশেষ ধরনের কিছু বিশ্বাস কাজ করে, যাকে বেক অনুমোদনকারী বিশ্বাস (Permissive Beliefs) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যখন কোনো ব্যক্তি মাদক ছাড়ার লড়াই করে, তখন তার মনের ভেতরের এই অনুমতি প্রদানকারী কণ্ঠস্বরটি সবচেয়ে জোরালো হয়ে ওঠে। এই বিশ্বাসগুলো অত্যন্ত চতুরভাবে যুক্তির ছদ্মবেশে হাজির হয়। উদাহরণস্বরূপ, আসক্ত ব্যক্তির মাথায় চিন্তা আসে, ‘আজকের দিনটা খুব খারাপ গেছে, শুধু আজকের জন্যই একটু নেওয়া যায়’ কিংবা ‘আমি তো অনেকদিন ভালো ছিলাম, একটা ডোজ নিলে কিছুই বিগড়ে যাবে না’। এই অনুমোদনকারী চিন্তাগুলো ব্যক্তির মনের সমস্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় এবং সে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে পুনরায় মাদকের দিকে হাত বাড়ায়।

এর পাশাপাশি কাজ করে বিভিন্ন ধরনের জ্ঞানীয় বিকৃতি। আসক্ত ব্যক্তিরা পরিস্থিতিকে সাদা-কালো চশমায় দেখতে ভালোবাসে। কোনো কাজে সামান্য ভুল হলেই তারা ধরে নেয় তাদের জীবন সম্পূর্ণ ব্যর্থ। আবার অনেকে কোনো ভালো ঘটনাকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে কেবল নেতিবাচক বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে থাকে। বেক দেখিয়েছেন যে মাদক কোনো বিচ্ছিন্ন আচরণ নয়, বরং এটা ব্যক্তির গভীর মানসিক যন্ত্রণার এক ভুল ও ক্ষতিকর জ্ঞানীয় উপশম। মস্তিষ্কের চিন্তার প্রণালী যখন ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যায়, তখন মাদক গ্রহণ করাটাই ব্যক্তির কাছে বেঁচে থাকার একমাত্র যৌক্তিক কৌশল বলে মনে হয়। চিন্তার এই ছাঁচগুলোকে ভেঙে নতুন স্বাস্থ্যকর স্কিমা তৈরি না করা পর্যন্ত কেবল শারীরিক চিকিৎসা দিয়ে আসক্তি থেকে স্থায়ী মুক্তি পাওয়া সম্ভব হয় না।

জ্ঞানীয় প্রত্যাশা তত্ত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া (Cognitive Expectancy Theory and Decision-Making Process)

মাদক কীভাবে কাজ করবে, তার অনেকটাই নির্ভর করে ব্যক্তি মনের ভেতরে কী প্রত্যাশা নিয়ে সেটি গ্রহণ করছে তার ওপর। এই মনস্তাত্ত্বিক সত্যটি চমৎকারভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জ্ঞানীয় প্রত্যাশা তত্ত্ব (Cognitive Expectancy Theory)-এর মাধ্যমে। প্রখ্যাত ক্লিনিকাল মনোবিজ্ঞানী মার্ক গোল্ডম্যান (Mark Goldman) তার দীর্ঘ গবেষণায় দেখিয়েছেন যে কোনো পদার্থ গ্রহণের আগেই তার সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে মানুষের মনে কিছু ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়ে থাকে (Goldman et al., 1987)। এই প্রত্যাশাগুলো ব্যক্তি নিজের পূর্ব অভিজ্ঞতা, পরিবার, গণমাধ্যম এবং বন্ধুদের আচরণ দেখে শৈশব থেকেই সঞ্চয় করতে শুরু করে। গোল্ডম্যানের মতে, একজন মানুষ মাদক গ্রহণ করবে কি না, তা বহুলাংশে নির্ধারিত হয় তার মনের ভেতরে থাকা এই ফলাফলের ইতিবাচক প্রত্যাশার পাল্লা কতটা ভারী তার ওপর।

মাদকের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রত্যাশাগুলো সাধারণত কয়েকটি শ্রেণিতে বিভক্ত থাকে। যেমন, উত্তেজনা ও মানসিক চাপ কমে যাওয়ার প্রত্যাশা, সামাজিক জড়তা দূর হয়ে কথা বলার সাহস পাওয়ার প্রত্যাশা এবং শারীরিক আনন্দ বা তীব্র উদ্দীপনা লাভের প্রত্যাশা। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব তরুণের মনে এই বিশ্বাস দৃঢ় থাকে যে অ্যালকোহল বা মাদক তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে অন্যদের চেয়ে আকর্ষণীয় করে তুলবে, তাদের অনিয়ন্ত্রিত মাদক ব্যবহারের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে (Brown et al., 1985)। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মাদকের প্রকৃত রাসায়নিক গুণাগুণের চেয়েও ব্যক্তির এই মানসিক প্রত্যাশা অনেক সময় তার অনুভূতির ওপর বেশি প্রভাব বিস্তার করে। ব্যক্তি যা পাওয়ার আশা করে, মনস্তাত্ত্বিকভাবে সে প্রায় সেটাই অনুভব করতে শুরু করে।

আসক্তি ও পুনরায় আসক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় জ্ঞানীয় প্রত্যাশার ভূমিকা বিশ্লেষণ করেছেন প্রখ্যাত আসক্তি গবেষক অ্যালান মার্ল্যাট (G. Alan Marlatt)। মার্ল্যাট তার সংবেদনশীল রিল্যাপ্স প্রতিরোধ মডেলে দেখিয়েছেন যে আসক্ত ব্যক্তি যখন মাদক ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন সে নানা ধরনের উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় (Marlatt & Gordon, 1985)। এমন পরিস্থিতিতে যদি ব্যক্তির ভেতরে মাদকের ইতিবাচক ফলাফলের প্রত্যাশা প্রবল থাকে এবং তার নিজস্ব মানসিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বা আত্ম-কার্যকারিতার বিশ্বাস দুর্বল হয়, তবে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। মার্ল্যাট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানীয় ঘটনা চিহ্নিত করেছিলেন, যার নাম অ্যাবস্টিনেন্স ভায়োলেশন ইফেক্ট (Abstinence Violation Effect) বা সংক্ষেপে এভিই।

কোনো ব্যক্তি দীর্ঘ সময় মাদক থেকে দূরে থাকার পর ভুলবশত একবার বা সামান্য পরিমাণ মাদক নিয়ে ফেললে এক গভীর জ্ঞানীয় বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। সে ভাবতে শুরু করে যে তার এতদিনকার সমস্ত সাধনা ব্যর্থ হয়ে গেছে, সে আসলে কোনো কাজের নয় এবং তার আর কোনো আশা নেই। এই ধরনের তীব্র আত্মগ্লানি এবং চরম মানসিক হতাশা তাকে দ্রুত পুরোমাত্রার আসক্তির দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। মার্ল্যাটের মতে, সামান্য স্খলনকে চূড়ান্ত পতন হিসেবে বিবেচনা করার এই জ্ঞানীয় দৃষ্টিভঙ্গিই রিল্যাপ্সের প্রধান কারণ। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বিকল্প উপায়ের অভাব এবং প্রত্যাশার ভুল মূল্যায়ন আসক্ত ব্যক্তির সচেতনতাকে বিভ্রান্ত করে রাখে। মন যখন বিশ্বাস করে যে মাদকের আনন্দই জীবনের একমাত্র উদ্ধারকর্তা, তখন যুক্তিবোধ সেই অবাস্তব প্রত্যাশার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়।

দ্বৈত প্রক্রিয়া তত্ত্ব ও কার্যনির্বাহী নিয়ন্ত্রণের ক্ষয় (Dual-Process Theory and Decay of Executive Control)

মানবমনের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতিপ্রকৃতি বুঝতে আধুনিক জ্ঞানীয় বিজ্ঞানে দ্বৈত প্রক্রিয়া তত্ত্ব (Dual-Process Theory) একটি বিশেষ মর্যাদার স্থান দখল করে আছে। নোবেলজয়ী মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কানেম্যান (Daniel Kahneman) তার গবেষণায় মানুষের চিন্তার দুটি সমান্তরাল ধারার কথা বলেছেন, যা সিস্টেম ১ এবং সিস্টেম ২ (System 1 and System 2) নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত (Kahneman, 2011)। সিস্টেম ১ হলো দ্রুত, অবচেতন, স্বয়ংক্রিয় এবং তীব্র আবেগচালিত এক ব্যবস্থা। অন্যদিকে সিস্টেম ২ হলো ধীরগতির, সচেতন, যুক্তিভিত্তিক এবং শ্রমসাধ্য এক মানসিক প্রক্রিয়া। একজন সুস্থ মানুষ এই দুই ব্যবস্থার পারস্পরিক সমন্বয়ে দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত নেয়। তবে মাদক নির্ভরতার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় এই দুই সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।

মাদক ব্যবহারের প্রাথমিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার মূলত সিস্টেম ২-এর হাতে থাকে। ব্যক্তি বিচার করে দেখে মাদক নেওয়াটা ঠিক হবে কি না, এর ভালো ও মন্দ দিকগুলো কী। কিন্তু ক্রমাগত মাদক ব্যবহারের ফলে মেসোলিম্বিক ডোপামিন ব্যবস্থার তীব্র উদ্দীপনা সিস্টেম ১-কে দানবীয় শক্তিতে রূপান্তর করে। জার্মান সামাজিক মনোবিজ্ঞানী ফ্রিটজ স্ট্র্যাক (Fritz Strack) এবং রোল্যান্ড ডয়চ (Roland Deutsch) মানুষের আচরণগত দ্বৈত প্রক্রিয়ার কাঠামো ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন কীভাবে স্বয়ংক্রিয় আবেগীয় তাড়না মানুষের যৌক্তিক চিন্তাকে পরাস্ত করে (Strack & Deutsch, 2004)। আসক্তির ক্ষেত্রে পরিবেশের যেকোনো সংকেত – যেমন একটি চেনা গান, বিশেষ কোনো স্থান বা চেনা কোনো মানুষের উপস্থিতি – অবচেতনভাবে সিস্টেম ১-কে সক্রিয় করে তোলে এবং তীব্র মানসিক তাড়না সৃষ্টি করে।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় শিকার হয় মানুষের কার্যনির্বাহী নিয়ন্ত্রণ (Executive Control)। এই নির্বাহী নিয়ন্ত্রণই মানুষকে তাৎক্ষণিক লোভ সংবরণ করতে শেখায় এবং দূরবর্তী লক্ষ্যের দিকে অবিচল রাখে। কিন্তু আসক্তির গভীরে তলিয়ে যাওয়া ব্যক্তির মস্তিষ্কে সিস্টেম ২ ক্রমেই শক্তিহীন হয়ে পড়ে। মনোবিজ্ঞানী রবার্ট ওয়েস্ট (Robert West) তার বিখ্যাত প্রাইম তত্ত্ব (PRIME Theory)-তে আসক্তির বহুমুখী মানসিক প্রেরণাগুলোকে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছেন (West, 2006)। ওয়েস্ট দেখান কীভাবে মানুষের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন অবচেতন তাড়না এবং তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্যগুলোর সামনে খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। আসক্ত ব্যক্তি নিজের ভেতরে স্পষ্ট দেখতে পায় যে মাদক তার জীবন ধ্বংস করছে, কিন্তু সচেতন যুক্তি সেই ধ্বংসাত্মক ইচ্ছার ওপর রাশ টানতে পারে না।

মেটাকগনিশন বা নিজের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে নিজে সচেতন হওয়ার ক্ষমতাও এই ধাপে বিলুপ্ত হতে থাকে। ব্যক্তি তার নিজের স্বয়ংক্রিয় চিন্তার দাস হয়ে পড়ে। যখনই মাদকের তীব্র বাসনা জাগ্রত হয়, অবচেতন মন তাৎক্ষণিকভাবে সচেতন মনকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য হাজারো যুক্তি হাজির করে। সিস্টেম ২ তখন নিজের স্বাধীন সত্তা হারিয়ে সিস্টেম ১-এর গোলামে পরিণত হয় এবং মাদক পাওয়ার পথ খুঁজে বের করতে নিজের বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করতে থাকে। জ্ঞানীয় বিকাশ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার এই অবক্ষয় কোনো বিচ্ছিন্ন শারীরিক দুর্বলতা নয়। এটা মানুষের চিন্তার সেই জটিল স্থাপত্যের পতন, যেখানে স্বয়ংক্রিয় আদিম আবেগ ধীরে ধীরে মানুষের যুক্তি, বিচার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সমস্ত ক্ষমতা গ্রাস করে ফেলে।

সামাজিকীকরণ ও মাদক নির্ভরতা (Socialization and Drug Dependency): পরিবেশের ভূমিকা

প্রাথমিক সামাজিকীকরণ ও পারিবারিক মিথস্ক্রিয়া (Primary Socialization and Family Interaction)

একটি নবজাতক যখন পরিবারে চোখ মেলে, তখন সে সমাজ, সংস্কৃতি বা মানুষের তৈরি বিধিনিষেধ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকে। পরিবারই হলো সেই আদিম প্রতিষ্ঠান যেখানে সে প্রথম ভাষা শেখে, ভালোবাসার স্পর্শ পায় এবং জগতের ভালো-মন্দের তফাত বুঝতে শুরু করে। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই সূচনালগ্নকে বলা হয় প্রাথমিক সামাজিকীকরণ (Primary Socialization)। পরিবারের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ শিশুর মানসিক ও আবেগীয় ভিত্তিকে তৈরি করে। মা-বাবার মুখের হাসি, তাদের মধ্যকার কথা বলার ধরন এবং কোনো সংকটের মুখে তাদের প্রতিক্রিয়া শিশুর অবচেতন মনে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। শৈশবের এই দিনগুলোতে যদি পরিবার তাকে নিরাপত্তা, স্নেহ ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিতে সক্ষম হয়, তবে শিশুর আত্মবিশ্বাস মজবুত হয়। অন্যদিকে এই প্রাথমিক বন্ধন যদি নড়বড়ে বা বিষাক্ত হয়ে ওঠে, তবে ভবিষ্যৎ জীবনে ব্যক্তির ভেতরে এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

পারিবারিক আবহে শিশুর চারিত্রিক গঠন কীভাবে গড়ে উঠবে, তা বহুলাংশে নির্ভর করে মা-বাবার লালন-পালনের পদ্ধতির ওপর। আমেরিকান বিকাশমূলক মনোবিজ্ঞানী ডায়ানা বাউমরাইন্ড (Diana Baumrind) অভিভাবকদের আচরণকে পর্যালোচনা করে কয়েকটি বিশেষ অভিভাবকত্ব শৈলী চিহ্নিত করেছিলেন (Baumrind, 1991)। বাউমরাইন্ড তার গবেষণায় তুলে ধরেন যে কর্তৃত্বপরায়ণ বা অতিরিক্ত দমনমূলক শাসন এবং সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন বা অবহেলামূলক অভিভাবকত্ব – এই দুই বিপরীতমুখী আচরণই সন্তানের মানসিক বিকাশে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে। অতিরিক্ত কঠোর পরিবারে সন্তান সবসময় ভয়ের ভেতর বাস করে, নিজের মনের কথা খুলে বলতে পারে না। কৈশোরে পৌঁছালে এই ধরনের সন্তানরা পারিবারিক দমবন্ধ পরিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তীব্র বিদ্রোহ করে এবং ভুল আশ্রয়ের সন্ধান করে। আবার যে পরিবারে শাসনের কোনো বালাই নেই, যেখানে মা-বাবা সন্তানের কোনো কাজেরই খোঁজ রাখেন না, সেখানে সন্তান নিজের আচরণের কোনো স্বাস্থ্যকর সীমারেখা খুঁজে পায় না। এমন শিথিল পরিবেশে বেড়ে ওঠা সন্তানরা কোনো নিয়ম মানতে শেখে না এবং খুব সহজেই মাদক গ্রহণের মতো ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাসে লিপ্ত হয়।

পারিবারিক পরিমণ্ডলে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ বা অনুকরণ সামাজিকীকরণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। পরিবারের বড়রা কী উপদেশ দিচ্ছেন, তার চেয়ে শিশুরা অনেক বেশি মনোযোগ দিয়ে দেখে তারা বাস্তবে কী আচরণ করছেন। পরিবারে যদি মা-বাবা বা বয়োজ্যেষ্ঠ কোনো সদস্য জীবনের মানসিক চাপ সামলাতে নিয়মিত অ্যালকোহল, ঘুমের বড়ি বা তামাকের আশ্রয় নেন, তবে সন্তান অবচেতনভাবেই সেই আচরণকে স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ বলে ধরে নেয়। সমাজবিজ্ঞানী পল অ্যামাটো (Paul Amato) পারিবারিক ভাঙন ও সংঘাতের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখান যে মা-বাবার মধ্যকার অবিরাম দ্বন্দ্ব সন্তানের সামাজিক ও আবেগীয় ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে (Amato, 2001)। সন্তান যখন দেখে যে ঘরের বড়রা যে কোনো অশান্তি বা কষ্ট এড়াতে রাসায়নিক পদার্থের ওপর নির্ভর করছেন, তখন তার মনের গভীরে বিশ্বাস জন্মে যায় যে সমস্যা মোকাবেলার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো কোনো মাদকদ্রব্য গ্রহণ করা।

পারিবারিক সংযুক্তির উষ্ণতা একজন মানুষকে বাইরের বহু নেতিবাচক প্রভাব থেকে রক্ষা করার বর্ম হিসেবে কাজ করে। ঘরের ভেতরের এই আবেগীয় বন্ধন যখন ভেঙে যায়, তখন ব্যক্তির মনস্তত্ত্বে এক ধরনের মারাত্মক শূন্যতা তৈরি হয়। পরিবারের কাছে গ্রহণযোগ্যতা না পেয়ে বা অবহেলার শিকার হয়ে তরুণরা নিজেদের অবাঞ্ছিত ভাবতে শুরু করে। তখন তারা পরিবারের বাইরের জগতে এমন কোনো গোষ্ঠীর খোঁজ করে যারা তাদের কোনো বিচার ছাড়াই গ্রহণ করে নেবে। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট আগনিউ (Robert Agnew) তার স্ট্রেন তত্ত্বে স্পষ্ট করেছেন কীভাবে পারিবারিক অবহেলা ও দীর্ঘস্থায়ী চাপ মানুষকে নেতিবাচক আবেগের দিকে ঠেলে দেয় (Agnew, 1992)। প্রাথমিক সামাজিকীকরণের এই ব্যর্থতা সন্তানের ভেতরে আত্মনিয়ন্ত্রণের ঘাটতি তৈরি করে। ফলে পরবর্তী জীবনে যখনই সে জটিল কোনো বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, তখনই সে মাদকের ক্ষতিকর প্ররোচনার সামনে নিজের প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

পিয়ার ক্লাস্টার ও সমবয়সীদের সামাজিক চাপ (Peer Clusters and Peer Social Pressure)

মানুষ যখন শৈশব পার হয়ে বয়ঃসন্ধির চৌকাঠে পা রাখে, তখন তার সামাজিকীকরণের কেন্দ্রবিন্দু নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে। পরিবার তখন কিছুটা পেছনে সরে যায় এবং সামনে এসে দাঁড়ায় সমবয়সী বন্ধুদের দল। সমাজবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বলা হয় গৌণ সামাজিকীকরণ (Secondary Socialization)। এই বয়সে একজন কিশোর বা তরুণ নিজেকে মা-বাবার সন্তান পরিচয়ের বাইরে গিয়ে সমাজের একজন স্বাধীন সদস্য হিসেবে প্রমাণ করতে চায়। এই সময় তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়ে ওঠে সমবয়সীদের স্বীকৃতি। বন্ধুরা কী ভাবছে, তারা কোন ধরনের জামাকাপড় পরছে, কোন ভাষায় কথা বলছে কিংবা অবসরে কী করছে – এই সমস্ত বিষয় তখন তরুণের কাছে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সমবয়সী গোষ্ঠীর এই প্রবল সামাজিকীকরণ শক্তি অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের দীর্ঘদিনের পারিবারিক মূল্যবোধকেও ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

বন্ধুদের দলের এই প্রভাব কীভাবে মাদকাসক্তির রূপ নেয়, তা অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন সমাজবিজ্ঞানী ইউজিন ওটিং (E. R. Oetting) এবং ফ্রেড বিউভেইস (Fred Beauvais)। তাদের প্রণীত তত্ত্বটির নাম পিয়ার ক্লাস্টার তত্ত্ব (Peer Cluster Theory) (Oetting & Beauvais, 1986)। ওটিং এবং বিউভেইস তাদের তত্ত্বে দেখান যে সাধারণ বড় কোনো বন্ধুদলের চেয়ে দুই বা তিনজনের অতি ঘনিষ্ঠ ছোট দল বা ‘ক্লাস্টার’-এর প্রভাব কিশোরদের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ে। কোনো তরুণ মাদকাসক্ত হবে কি না, তা মূলত নির্ধারিত হয় তার সেই ঘনিষ্ঠ পিয়ার ক্লাস্টারের ভেতরে মাদকের অবস্থান কী তার ওপর। এই ক্লাস্টারের সদস্যরা কেবল মাদকের যোগানই দেয় না, বরং মাদক গ্রহণের পক্ষে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যৌক্তিকতা তৈরি করে। তারা একে অপরের কাছে মাদককে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার, আধুনিক হওয়ার কিংবা সাহসিকতার নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরে।

সমবয়সীদের এই চাপ কিন্তু সবসময় সরাসরি বা জবরদস্তিমূলক হয় না। বাস্তবে এই চাপ কাজ করে এক ধরনের অলিখিত মানসিক সমঝোতার মাধ্যমে। কোনো বন্ধু হয়তো সরাসরি জোর করে মুখে মাদক তুলে দেয় না, কিন্তু দলের ভেতরে থাকার শর্ত হিসেবে একটা পরোক্ষ সংকেত জারি থাকে। যদি দলের সবাই কোনো নির্দিষ্ট মাদক নেয় আর একজন তা নিতে অস্বীকার করে, তবে তাকে উপহাসের শিকার হতে হয়। তাকে ভীতু বা ব্যাকডেটেড বলে দল থেকে আলাদা করে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। সমাজবিজ্ঞানী ডেনিস ক্যান্ডেল (Denise Kandel) কিশোরদের মাদক ব্যবহারের সামাজিক পথরেখা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দুটি পারস্পরিক প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন: সামাজিক নির্বাচন এবং সামাজিক প্রভাব (Kandel, 1978)। একদিকে তরুণরা এমন বন্ধুদের দিকে আকৃষ্ট হয় যাদের মনোভাব তাদের সাথে মেলে, অন্যদিকে দলে যুক্ত হওয়ার পর সেই দলের আচরণ তাদের ওপর চেপে বসে।

সমবয়সী গোষ্ঠীর যৌথ সামাজিকীকরণের ফলে এক ধরনের কৃত্রিম ভ্রাতৃত্ব বা সংহতি তৈরি হয়। মাদক সেবন করাকে তখন কোনো ক্ষতিকর কাজ বা অপরাধ মনে হয় না, বরং তা হয়ে দাঁড়ায় নিয়ম ভাঙার যৌথ আনন্দ। সমাজবিজ্ঞানী থমাস দিশিয়ন (Thomas Dishion) এবং তার সহকর্মীরা এই ঘটনাকে বিচ্যুত প্রশিক্ষণ বা ‘ডেভিয়ান্সি ট্রেনিং’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Dishion et al., 1996)। বন্ধুরা যখন একসাথে বসে মাদক ব্যবহারের অভিজ্ঞতা নিয়ে হাসাহাসি করে, কীভাবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ফাঁকি দেওয়া যায় তার বুদ্ধি আঁটে, তখন অবচেতনভাবেই মাদক গ্রহণের আচরণটি দৃঢ় হতে থাকে। একাকী অবস্থায় যে তরুণ হয়তো কখনোই কোনো মাদকে হাত দেওয়ার কথা ভাবত না, সে কেবল সমবয়সী দলের সাথে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে গিয়ে এবং বিচ্ছিন্নতার আতঙ্ক থেকে বাঁচতে গিয়ে ধীরে ধীরে মাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

ব্রনফেনব্রেনারের বাস্তুসংস্থানিক ব্যবস্থা ও বহুস্তরীয় পরিবেশ (Bronfenbrenner’s Ecological Systems and Multi-Layered Environment)

মানুষ কোনো শূন্যস্থানে বা বিচ্ছিন্ন বায়বীয় জগতে বাস করে না। তার সমগ্র জীবন আবর্তিত হয় তাকে ঘিরে থাকা বিভিন্ন পরিবেশগত বলয়ের জটিল সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। পরিবেশ কীভাবে মানুষের মন এবং আচরণকে ধাপে ধাপে রূপ দেয়, তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী উরি ব্রনফেনব্রেনার (Urie Bronfenbrenner)। ব্রনফেনব্রেনার তার প্রণীত বাস্তুসংস্থানিক ব্যবস্থা তত্ত্ব (Ecological Systems Theory)-তে দেখান যে মানববিকাশ কোনো একক রৈখিক প্রক্রিয়ায় ঘটে না, বরং তা পরস্পরের সাথে জড়িত কতগুলো পরিবেশ ব্যবস্থার সম্মিলিত সমীকরণে নির্ধারিত হয় (Bronfenbrenner, 1979)। মাদকাসক্তিও কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়; এটা হলো একজন ব্যক্তির সাথে তার পারিপার্শ্বিক বহুস্তরীয় পরিবেশের ঘাত-প্রতিঘাতের এক সামগ্রিক পরিণতি।

ব্রনফেনব্রেনারের মডেলের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে মাইক্রোসিস্টেম (Microsystem)। এটা হলো ব্যক্তির সবচেয়ে নিকটবর্তী পরিবেশ, যার সাথে সে প্রতিদিন সরাসরি মুখামুখি মিথস্ক্রিয়া করে। পরিবার, স্কুল, খেলার মাঠ এবং পাড়ার বন্ধুরা এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত। কোনো তরুণ যদি তার পরিবারে দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা দেখে, স্কুলে সহপাঠীদের দ্বারা বুলিং বা লাঞ্ছনার শিকার হয়, তবে তার মাইক্রোসিস্টেমটি এক ধরনের মানসিক বিষাক্ততায় ভরে ওঠে। এই স্তরের ব্যর্থতা তাকে তীব্র নিরাপত্তাহীনতায় ভোগায়। দ্বিতীয় স্তরটির নাম হলো মেসোসিস্টেম (Mesosystem), যা একাধিক মাইক্রোসিস্টেমের মধ্যকার সংযোগ বা সম্পর্কের জালকে নির্দেশ করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো তরুণের পরিবারের সাথে তার স্কুলের শিক্ষকদের যোগাযোগ কেমন, কিংবা তার বাবা-মা তার বন্ধুদের চেনেন কি না। যদি পরিবার এবং স্কুলের মধ্যে কোনো যোগাযোগ বা সমন্বয় না থাকে, তবে সেই তরুণের কোনো বিপথগামী আচরণ বড়দের নজরে পড়ে না। এই ফাঁকফোকর তরুণকে মাদকের অন্ধকার গলিতে পা বাড়াতে অবাধ সুযোগ তৈরি করে দেয়।

তৃতীয় স্তরটি হলো এক্সোসিস্টেম (Exosystem), যেখানে ব্যক্তি নিজে সরাসরি উপস্থিত থাকে না, কিন্তু সেই ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত বা ঘটনাগুলো ব্যক্তির জীবনকে পরোক্ষভাবে দারুণভাবে বদলে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, এলাকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বল নজরদারি, কোনো মাদক পুনর্বাসন কেন্দ্রের অভাব, কিংবা মা-বাবার কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ। মা-বাবা যদি এমন কোনো চাকরিতে থাকেন যেখানে তাদের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয় এবং তারা দিনশেষে ক্লান্ত হয়ে সন্তানের দিকে নজর দেওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেন, তবে সেই কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা সন্তানের জন্য বিপদ ডেকে আনে। এরপর আসে ম্যাক্রোসিস্টেম (Macrosystem), যা বৃহত্তর সমাজকাঠামো, জাতীয় অর্থনীতি, আইন এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ নিয়ে গঠিত। একটি সমাজে মাদককে সামাজিকভাবে কীভাবে দেখা হয়, আইনের কঠোরতা কতটুকু এবং মাদকাসক্তদের অপরাধী নাকি রোগী হিসেবে গণ্য করা হয় – এই সামগ্রিক সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ম্যাক্রোসিস্টেম থেকে নির্ধারিত হয়।

ব্রনফেনব্রেনার তার তত্ত্বে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যুক্ত করেছিলেন, যার নাম ক্রোনোসিস্টেম। এটা হলো সময়ের পরিবর্তন এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের প্রভাব। অর্থনৈতিক মহামন্দা, কোনো যুদ্ধপরবর্তী সময় বা কোনো বৈশ্বিক দুর্যোগ সমাজকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দেয়। এমন ঐতিহাসিক মুহূর্তে বেকারত্ব বাড়ে, দারিদ্র্য বাড়ে এবং সমাজের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে, যার হাত ধরে সমাজে মাদকের অনুপ্রবেশ বহুগুণ বেড়ে যায়। ব্রনফেনব্রেনারের এই বহুস্তরীয় বাস্তুসংস্থানিক বিশ্লেষণ দেখায় যে কোনো ব্যক্তির মাদকাসক্ত হওয়ার দায় কেবল তার দুর্বল ইচ্ছাশক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক ধরনের অজ্ঞতা। পরিবেশের প্রতিটি স্তরের ব্যর্থতা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা এবং সমাজব্যবস্থার চাপ সম্মিলিতভাবে একজন মানুষকে এমন এক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয় যেখানে মাদক তার কাছে এক অস্বস্তিকর আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়।

সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধনের অবক্ষয় (Social Control and Erosion of Institutional Bonds)

সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে একটি বড় প্রশ্ন হলো, সমাজে এত বিশৃঙ্খলা এবং লোভ থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ কেন নিয়ম মেনে চলে? অপরাধ বা অপকর্ম না করার পেছনে মানুষের কোন শক্তি কাজ করে? এই প্রশ্নের অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্রখ্যাত আমেরিকান অপরাধবিজ্ঞানী ট্র্যাভিস হির্শি (Travis Hirschi) অপরাধের প্রচলিত ব্যাখ্যাগুলোকে সম্পূর্ণ নতুন এক আলোয় দাঁড় করান (Hirschi, 1969)। হির্শি তার প্রণীত সামাজিক বন্ধন তত্ত্ব (Social Bond Theory)-তে বলেন যে মানুষ স্বভাবগতভাবেই নিজের সুবিধার জন্য আইন ভাঙতে পারে, কিন্তু সমাজের সাথে তার শক্তিশালী মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধনই তাকে বিচ্যুত আচরণ থেকে আটকে রাখে। হির্শির মতে, যখন সমাজের মূলধারার প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে ব্যক্তির এই আত্মিক বন্ধন ঢিলে হয়ে যায় বা ছিঁড়ে যায়, তখনই ব্যক্তি মাদকের মতো ক্ষতিকর ও বেআইনি কাজে জড়িয়ে পড়ার স্বাধীনতা পেয়ে যায়।

হির্শি এই সামাজিক বন্ধনকে চারটি অপরিহার্য উপাদানে বিভক্ত করেছিলেন। প্রথম উপাদানটি হলো সংযুক্তি (Attachment)। এটা নির্দেশ করে কোনো ব্যক্তি তার মা-বাবা, শিক্ষক এবং সমাজের সুস্থ মানুষদের মতামতের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল ও সংবেদনশীল। যদি কোনো তরুণ তার মা-বাবাকে গভীরভাবে ভালোবাসে এবং তাদের মনে আঘাত দিতে ভয় পায়, তবে সে মাদক নেওয়ার আগে দশবার ভাববে। কিন্তু সংযুক্তির এই সুতো যদি ছিঁড়ে যায়, যদি সে মনে করে তাকে কেউ ভালোবাসে না এবং তার ভালো-মন্দে কারও কিছু যায় আসে না, তবে সে সমাজবিরোধী কাজে কোনো দ্বিধাবোধ করে না। দ্বিতীয় উপাদানটি হলো প্রতিশ্রুতি (Commitment), যা প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তির নিজস্ব বিনিয়োগ ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশাকে বোঝায়। যে শিক্ষার্থী ভালো ফলাফলের স্বপ্ন দেখে বা যে তরুণ একটি সুন্দর ক্যারিয়ার গড়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করছে, সে জানে মাদকে জড়ালে তার সব অর্জন এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। তাই সে সচেতনভাবেই মাদক থেকে দূরে থাকে।

সামাজিক বন্ধনের তৃতীয় উপাদানটি হলো অংশগ্রহণ (Involvement)। এটা হলো ইতিবাচক ও গঠনমূলক সামাজিক কর্মকাণ্ডে ব্যক্তির সময় ও শ্রম ব্যয়ের পরিমাণ। যে মানুষ সারা দিন পড়াশোনা, খেলাধুলা, শিল্পচর্চা বা কোনো সামাজিক সংস্থায় ব্যস্ত থাকে, তার মাথায় বিচ্যুত কোনো চিন্তার উদ্রেক হওয়ার সময় থাকে না। অলস সময়, শূন্যতা এবং কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকাটাই তরুণদের মাদকের অন্বেষণে নামার সুযোগ করে দেয়। চতুর্থ এবং চূড়ান্ত উপাদানটি হলো বিশ্বাস (Belief)। এটা প্রকাশ করে সমাজের আইন, নিয়মকানুন এবং সাধারণ নৈতিকতার প্রতি ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ শ্রদ্ধাবোধকে। কোনো ব্যক্তি যদি মনে করে যে সমাজের আইনগুলো ন্যায়সংগত এবং সবাইকে তা মেনে চলা উচিত, তবে সে আইন ভাঙতে ভয় পাবে। কিন্তু সমাজ যদি নিজেই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং ব্যক্তি যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে, তবে মাদকবিরোধী কোনো সামাজিক নিষেধাজ্ঞা তার কাছে অর্থহীন মনে হয়।

বিদ্যালয় হলো সমাজের অন্যতম প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি যা সামাজিক নিয়ন্ত্রণকে কার্যকর করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল বইয়ের পড়া শেখায় না, বরং সমাজবদ্ধ জীবনের নিয়মকানুন ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেয়। সমাজবিজ্ঞানী মারভিন ক্রোন (Marvin Krohn) এবং তার সহকর্মীরা সামাজিক বন্ধন তত্ত্বকে কিশোরদের মাদক ব্যবহারের প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন যে বিদ্যালয়ের সাথে দুর্বল বন্ধন আসক্তির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় (Krohn et al., 1983)। যেসব শিক্ষার্থী প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে, শিক্ষকদের অবহেলার শিকার হয় এবং স্কুলের কোনো কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারে না, তারা এক গভীর বিচ্ছিন্নতাবোধে ভোগে। স্কুল থেকে মানসিকভাবে বিতাড়িত এই তরুণরা তখন নিজেদের মতো অন্যান্য বিচ্ছিন্ন সহপাঠীদের সাথে দল বাঁধে। প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধনের এই সামগ্রিক অবক্ষয় ব্যক্তিকে সমাজের মূলধারা থেকে ছিটকে ফেলে দেয় এবং তাকে মাদকের ক্ষতিকর দুনিয়ায় ঠেলে দেয়।

সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও পাড়া-মহল্লার ভৌত ও সামাজিক পরিবেশ (Social Disorganization and the Physical and Social Environment of Neighborhoods)

কোনো ব্যক্তি কেবল তার ঘরের ভেতরের পরিবেশ দিয়েই গড়ে ওঠে না; সে যে পাড়া বা মহল্লায় বেড়ে উঠছে, তার ভৌত ও সামাজিক বাস্তবতার প্রভাবও তার ব্যক্তিত্বে গভীর দাগ কাটে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সমাজবিজ্ঞানী ক্লিফোর্ড শ (Clifford Shaw) এবং হেনরি ম্যাককে (Henry McKay) অপরাধ ও বিচ্যুতির ভৌগোলিক বিস্তার নিয়ে এক অবিস্মরণীয় গবেষণা পরিচালনা করেন (Shaw & McKay, 1942)। তাদের প্রণীত সামাজিক বিশৃঙ্খলা তত্ত্ব (Social Disorganization Theory) অনুসারে, অপরাধপ্রবণতা কোনো বিশেষ জাতি বা নির্দিষ্ট দলের রক্তে থাকে না, বরং তা এলাকার পরিবেশগত কাঠামোর দুর্বলতার ভেতরে লুকিয়ে থাকে। শ এবং ম্যাককে দেখান যে যেসব এলাকায় ঘন ঘন জনসংখ্যার রদবদল ঘটে, চরম দারিদ্র্য থাকে এবং বিভিন্ন ভাষাভাষী ও সংস্কৃতির মানুষের ভেতর কোনো সামাজিক ঐক্য গড়ে ওঠে না, সেখানে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

একটি স্বাস্থ্যকর ও সুশৃঙ্খল এলাকায় প্রতিবেশীরা একে অপরকে চেনে, শিশুদের ওপর বড়দের একটা অলিখিত পাহারা থাকে এবং কোনো অসঙ্গতি দেখলে পাড়ার প্রবীণরা শাসন করেন। কিন্তু বিশৃঙ্খল এলাকায় এই অনানুষ্ঠানিক সামাজিক নজরদারি সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যায়। আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট স্যাম্পসন (Robert J. Sampson) এবং তার সহকর্মীরা এই বাস্তবতাকে সম্মিলিত কার্যকারিতা (Collective Efficacy) ধারণার মাধ্যমে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন (Sampson et al., 1997)। সম্মিলিত কার্যকারিতা হলো এলাকার মানুষের পারস্পরিক আস্থা এবং নিজেদের এলাকার মঙ্গলের স্বার্থে যেকোনো অপরাধের বিরুদ্ধে যৌথভাবে রুখে দাঁড়ানোর মানসিক সদিচ্ছা। যেসব পাড়া বা মহল্লায় এই যৌথ শক্তি দুর্বল থাকে, সেখানে মাদক কারবারিরা কোনো ধরনের বাধার মুখেই পড়ে না। তারা জানে স্থানীয় বাসিন্দারা ভয়ে বা উদাসীনতায় কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলবে না, ফলে এলাকাটি ধীরে ধীরে মাদকের উন্মুক্ত বাজারে পরিণত হয়।

ভৌত পরিবেশের জরাজীর্ণ অবস্থাও মানুষের মনস্তত্ত্বকে নেতিবাচকভাবে সামাজিকীকরণ করে। সমাজবিজ্ঞানী জেমস কিউ উইলসন (James Q. Wilson) এবং জর্জ কেলিং (George L. Kelling) তাদের বিখ্যাত ব্রোকেন উইন্ডোজ তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে পরিবেশের অবহেলা কীভাবে অপরাধকে আমন্ত্রণ জানায় (Wilson & Kelling, 1982)। ভাঙা ল্যাম্পপোস্ট, পরিত্যক্ত আবর্জনার স্তূপ, দেয়ালে কুরুচিপূর্ণ আঁকিবুঁকি এবং অন্ধকার গলিগুলো পাড়ার তরুণদের অবচেতন মনে এই বার্তা পৌঁছে দেয় যে এই এলাকাটি অভিভাবকহীন এবং এখানে কোনো নিয়ম কাজ করে না। এমন পরিবেশে বড় হওয়া শিশুরা খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রতিদিন চোখের সামনে মাদক কেনাবেচা হতে দেখে। তারা দেখে কীভাবে গলির মোড়ে প্রকাশ্যে মাদকের সেবন চলছে এবং বড়রা তা নীরবে মেনে নিচ্ছে। সুস্থ বিনোদনের কোনো মাঠ না থাকা বা কোনো সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের অনুপস্থিতি তরুণদের এই অন্ধকারের দিকে আরও দ্রুত টেনে নেয়।

অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত এলাকাগুলোতে সামাজিক বিশৃঙ্খলা মাদককে কেবল অভ্যাসে নয়, বরং জীবিকার একমাত্র উপায়ে পরিণত করে। বেকারত্ব ও দারিদ্র্যে জর্জরিত তরুণরা যখন দেখে যে সমাজের প্রচলিত নিয়মে পড়াশোনা করে কোনো ভবিষ্যৎ তৈরি করা যাচ্ছে না, অথচ স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীরা দামী গাড়ি হাঁকিয়ে ক্ষমতা প্রদর্শন করছে, তখন তাদের নৈতিকতার ভিত কেঁপে ওঠে। তারা মাদক ব্যবসাকে আয়ের এবং সামাজিক প্রতিপত্তি অর্জনের সহজ পথ হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। এই ধরনের এলাকায় মাদক নির্ভরতা কোনো ব্যক্তিগত বিচ্যুতি থাকে না, বরং তা হয়ে দাঁড়ায় এলাকার নিজস্ব সংস্কৃতির অংশ। স্থানীয় পরিবেশের এই অসুস্থ সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মাদকের অভিশপ্ত চক্রে আটকে রাখে।

বিচ্যুত উপসংস্কৃতি ও লেবেলিং প্রক্রিয়ার সামাজিকীকরণ (Deviant Subcultures and Socialization Through Labeling)

বৃহত্তর সমাজের মূলধারার সংস্কৃতির ভেতরেও মাঝে মাঝে কিছু বিশেষ গোষ্ঠীর জন্ম হয়, যাদের জীবনদর্শন, বিশ্বাস ও আচরণ মূল সমাজের সাধারণ নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এই ধরনের গোষ্ঠীকে বলা হয় বিচ্যুত উপসংস্কৃতি (Deviant Subculture)। আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী হাওয়ার্ড বেকার (Howard S. Becker) তার সুবিখ্যাত গ্রন্থ আউটসাইডার্স (Outsiders)-এ মাদক ব্যবহারের সামাজিকীকরণকে এক অনন্য সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেছেন (Becker, 1963)। বেকার মারিজুয়ানা সেবনকারীদের জীবনের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে দেখান যে মাদক সেবন কোনো তাৎক্ষণিক জন্মগত তাড়না নয়, বরং এটি একটি নিবিড় সামাজিক শিক্ষার ফসল। কোনো মানুষ একা একা মাদকের পুরো অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে না; তাকে দলের অন্যান্য অভিজ্ঞ সদস্যদের কাছ থেকে শিখতে হয় কীভাবে মাদক গ্রহণ করতে হয়, কীভাবে এর শারীরিক অনুভূতিগুলোকে চিনতে হয় এবং কীভাবে সেই অনুভূতিগুলোকে কষ্টদায়ক না ভেবে আনন্দদায়ক হিসেবে ব্যাখ্যা করতে হয়।

মাদক উপসংস্কৃতির নিজস্ব কিছু গোপন সংকেত, পরিভাষা এবং জীবনযাপনের ধারা থাকে যা বাইরের সাধারণ সমাজের মানুষের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। এই উপসংস্কৃতির ভেতরে প্রবেশ করলে সমাজের মূলধারার নৈতিকতা পুরোপুরি উল্টে যায়। সমাজের চোখে যা অপরাধ বা অবক্ষয়, এই উপসংস্কৃতির ভেতরে তা-ই হয়ে ওঠে মুক্তির আনন্দ, আধুনিকতা এবং আধিপত্যের প্রতীক। দলের নতুন সদস্যরা পুরোন সদস্যদের কাছ থেকে এই বিকৃত যুক্তিগুলো ধীরে ধীরে আত্মস্থ করে। যখন একজন তরুণ এই ধরনের কোনো উপসংস্কৃতির সাথে মানসিকভাবে একাত্ম হয়ে পড়ে, তখন সে সাধারণ সমাজের পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা প্রচলিত আইনের শাসনকে ভণ্ডামি বলে উড়িয়ে দিতে শুরু করে। তার কাছে তার উপসংস্কৃতির বন্ধুদের মতামতই চূড়ান্ত বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়।

সামাজিক প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যক্তিকে একবার অপরাধী হিসেবে দেগে দেওয়া বা তকমা এঁটে দেওয়ার ঘটনাটি এই সামাজিকীকরণকে আরও ধ্বংসাত্মক রূপ দেয়। অপরাধবিজ্ঞানী এডউইন লেমার্ট (Edwin Lemert) বিচ্যুতিকে দুটি ভাগে ভাগ করেছিলেন: প্রাথমিক বিচ্যুতি এবং গৌণ বিচ্যুতি (Lemert, 1951)। প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো ব্যক্তি কৌতূহলবশত বা বন্ধুদের চাপে হয়তো সামান্য মাদক গ্রহণ করে। কিন্তু এই ঘটনাটি যদি সমাজ জেনে ফেলে, তবে সমাজ তাকে তৎক্ষণাৎ ‘মাদকাসক্ত’, ‘চরিত্রহীন’ বা ‘নষ্ট ছেলে’ হিসেবে লেবেল বা তকমা লাগিয়ে দেয়। পরিবার তাকে সন্দেহ করতে শুরু করে, ভালো বন্ধুরা তার সাথে মেলামেশা বন্ধ করে দেয় এবং আত্মীয়স্বজন তাকে এড়িয়ে চলে। সমাজের এই তীব্র প্রত্যাখ্যান ব্যক্তির আত্মপরিচয়কে ভেতর থেকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়।

সমাজ যখন একজন মানুষকে স্বাভাবিক হওয়ার সমস্ত দরজা বন্ধ করে দেয়, তখন সে উপায়ান্তর না পেয়ে সেই বিচ্যুত উপসংস্কৃতির বুকেই সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে। লেমার্ট এই পর্যায়কে গৌণ বিচ্যুতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ব্যক্তি তখন নিজের মনে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সে সত্যিই একজন মাদকাসক্ত এবং সমাজের নিয়মে ফেরা তার পক্ষে আর সম্ভব নয়। সে তখন সচেতনভাবেই মাদক উপসংস্কৃতির একজন পূর্ণাঙ্গ সদস্য হিসেবে নিজের পরিচয় মেনে নেয় এবং সেই অনুযায়ী আচরণ করতে থাকে। তকমা দেওয়ার এই সামাজিক প্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত একজন সাধারণ মানুষকে পূর্ণাঙ্গ মাদক নির্ভরতার অতল গহ্বরে স্থায়ীভাবে নিক্ষেপ করে। পারিপার্শ্বিক সমাজ, সংস্কৃতি এবং পরিবেশের এই বহুস্তরীয় চাপগুলো মিলেমিশে একজন মানুষকে এমন এক জালে বন্দি করে ফেলে, যেখান থেকে কেবল ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তির জোরে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশন তত্ত্ব (Differential Association Theory): অপরাধ শেখার প্রক্রিয়া

এডউইন সাদারল্যান্ড ও অপরাধের সমাজতাত্ত্বিক পাঠ (Edwin Sutherland and the Sociological Study of Crime)

কোনো মানুষ কেন অপরাধী হয়ে ওঠে কিংবা কেন সে মাদকের মতো বিপজ্জনক বস্তুর প্রতি ঝুঁকে পড়ে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অপরাধবিজ্ঞানীরা বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। সেই সময়ে অপরাধকে ব্যাখ্যা করা হতো মূলত বংশগত ত্রুটি, শারীরিক গঠন কিংবা মানসিক বিকারগ্রস্ততার মাধ্যমে। বিশেষ করে ইতালীয় অপরাধবিজ্ঞানী সিজার লোমব্রোসোর শারীরিক লক্ষণভিত্তিক ব্যাখ্যা তখন ইউরোপ ও আমেরিকায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী এডউইন সাদারল্যান্ড (Edwin Sutherland) এই ধরনের জৈবিক ও মানসিক রোগতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাকে সরাসরি নাকচ করে দেন (Sutherland, 1947)। সাদারল্যান্ড দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে অপরাধ কোনো জন্মগত অসুখ নয়; বরং সমাজবদ্ধ মানুষের অন্যান্য স্বাভাবিক আচরণের মতো অপরাধও একটি শিক্ষণীয় বিষয়। মানুষ যেভাবে ছবি আঁকা, সাঁতার কাটা বা গান গাওয়া শেখে, ঠিক একইভাবে সে অপরাধ করা এবং মাদক গ্রহণ করার কৌশলও অন্য মানুষের কাছ থেকে শিখে নেয়।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতাত্ত্বিক ধারার সাথে সাদারল্যান্ডের কাজের গভীর সংযোগ ছিল। সেই সময় শিকাগো শহরের দ্রুত শিল্পায়ন, অভিবাসন এবং বস্তি অঞ্চলের সামাজিক বিশৃঙ্খলা গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল। সাদারল্যান্ড লক্ষ্য করেন যে নির্দিষ্ট কোনো এলাকার ভৌগোলিক পরিবেশ মানুষকে অপরাধী বানায় না, বরং সেই এলাকার মানুষের মধ্যকার যোগাযোগের ধরন অপরাধের বিস্তার ঘটায়। তিনি ১৯৩৯ সালে তার বিখ্যাত পাঠ্যবই প্রিন্সিপলস অব ক্রিমিনোলজি (Principles of Criminology)-এর তৃতীয় সংস্করণে প্রথমবারের মতো ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশন তত্ত্ব (Differential Association Theory) প্রকাশ করেন (Sutherland, 1939)। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে বইটির চতুর্থ সংস্করণে তিনি এই তত্ত্বটিকে আরও পরিমার্জিত ও সুসংহত রূপ দেন, যা অপরাধবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি কালজয়ী মাইলফলক হিসেবে স্থান করে নেয়।

সাদারল্যান্ডের এই তত্ত্বটির আগমন অপরাধের তাত্ত্বিক জগতে এক বৈপ্লবিক মোড় তৈরি করেছিল। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে দারিদ্র্য বা মানসিক দুর্বলতা অপরাধের সার্বজনীন কারণ হতে পারে না। যদি দারিদ্র্যই অপরাধের একমাত্র চালিকাশক্তি হতো, তবে সমাজের ধনী বা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা কখনোই মাদকাসক্ত হতো না কিংবা বড় বড় আর্থিক জালিয়াতিতে জড়াত না। সমাজবিজ্ঞানী জর্জ ভল্ড (George Vold) এবং তার সহকর্মীরা সাদারল্যান্ডের এই চিন্তার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উল্লেখ করেন যে সাদারল্যান্ড অপরাধবিজ্ঞানকে জীববিজ্ঞানের খাঁচা থেকে মুক্ত করে সমাজতত্ত্বের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে নিয়ে এসেছিলেন (Vold et al., 2002)। সাদারল্যান্ড দেখান যে সমাজব্যবস্থায় মানুষের অবস্থানের চেয়েও বড় ব্যাপার হলো সে কাদের সাথে মেলামেশা করছে এবং সেই মেলামেশা থেকে সে কোন ধরনের মূল্যবোধ গ্রহণ করছে।

মাদক নির্ভরতার আলোচনায় সাদারল্যান্ডের এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে কার্যকর। মাদকাসক্তিকে যখন কেবল শারীরিক আসক্তি হিসেবে দেখা হয়, তখন মাদকের সামাজিক বিস্তারের পেছনের গল্পটি হারিয়ে যায়। একজন সাধারণ মানুষ কোনো নির্জন দ্বীপে একা একা বসে মাদক গ্রহণ করতে শেখে না। মাদক সেবনের প্রথম পাঠটি সবসময় আসে অন্য কোনো মানুষের সাথে যোগাযোগের মধ্য দিয়ে। কোনো নতুন ব্যক্তি যখন মাদক গ্রহণকারীদের দলে মেশে, তখন সে ধীরে ধীরে তাদের আচার-আচরণ ও জীবনযাত্রার সাথে পরিচিত হয়। সাদারল্যান্ডের ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশন তত্ত্ব আমাদের বুঝতে শেখায় যে মাদকাসক্তি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক যোগাযোগ ও শিক্ষালাভের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

অপরাধমূলক আচরণ শেখার মূল সূত্র ও প্রস্তাবনাসমূহ (Core Principles and Propositions of Learning Criminal Behavior)

সাদারল্যান্ড তার তত্ত্বটিকে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে উপস্থাপন করার জন্য ১৯৪৭ সালের সংস্করণে নয়টি মৌলিক প্রস্তাবনা বা সূত্রের উল্লেখ করেন (Sutherland, 1947)। এই নয়টি সূত্র অপরাধবিজ্ঞানের ইতিহাসে অপরাধ শেখার প্রক্রিয়ার সবচেয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রথম সূত্রেই সাদারল্যান্ড পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করেন যে অপরাধমূলক আচরণ কোনো সহজাত প্রবৃত্তি নয়, বরং এটি অর্জিত বা শেখা আচরণ। দ্বিতীয় সূত্রে তিনি বলেন, এই শেখার কাজটি ঘটে অন্য ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে, বিশেষ করে মৌখিক এবং শারীরিক ভাষা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে। মানুষ কোনো বই পড়ে বা সিনেমা দেখে যতটা শেখে, তার চেয়ে অনেক বেশি শেখে বাস্তব জীবনে অন্য মানুষের সান্নিধ্যে এসে।

তৃতীয় সূত্রটি সাদারল্যান্ডের তত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে অপরাধমূলক আচরণ শেখার মূল ঘটনাটি ঘটে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত গোষ্ঠী (Intimate Personal Groups)-এর ভেতরে। অর্থাৎ দূরবর্তী কোনো প্রচারমাধ্যম বা টেলিভিশনের চেয়ে পরিবার, বন্ধু বা নিকটাত্মীয়ের মতো ঘনিষ্ঠ মানুষদের প্রভাবই মানুষের মনে স্থায়ী রেখাপাত করে। চতুর্থ সূত্রে বলা হয়েছে, যখন কোনো ব্যক্তি অপরাধমূলক আচরণ শেখে, তখন সে দুটি জিনিস একসাথে রপ্ত করে: প্রথমত, অপরাধ সংঘটনের সুনির্দিষ্ট কৌশল বা পদ্ধতি, যা কখনো খুব জটিল আবার কখনো অত্যন্ত সহজ হতে পারে; এবং দ্বিতীয়ত, অপরাধ করার পেছনে থাকা উদ্দেশ্য, প্রেরণা, যৌক্তিকতা এবং মানসিক মনোভাব। মাদক ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটি পরিষ্কার দেখা যায়; একজন নতুন ব্যবহারকারী কেবল মাদক সেবনের উপায়ই শেখে না, সাথে সাথে শেখে কেন মাদক নেওয়াটা তার জন্য জরুরি।

পঞ্চম সূত্রে সাদারল্যান্ড উল্লেখ করেন যে উদ্দেশ্য এবং প্রেরণার এই দিকটি নির্ধারিত হয় আইনের অনুকূল বা প্রতিকূল সংজ্ঞার ওপর ভিত্তি করে। সমাজে কোনো কোনো গোষ্ঠী আইনকে সম্মান করে, আবার কোনো কোনো গোষ্ঠী আইন ভাঙাকে সাহসিকতা মনে করে। ষষ্ঠ সূত্রটি হলো এই তত্ত্বের কেন্দ্রবিন্দু, যাকে ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের মূল ভিত্তি বলা হয়। এই সূত্রে বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি তখনই অপরাধী বা বিচ্যুত হয়ে ওঠে যখন তার জীবনে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সংজ্ঞার চেয়ে আইন লঙ্ঘনের অনুকূল সংজ্ঞার পাল্লা ভারী হয়ে যায়। সমাজবিজ্ঞানী রস মাৎসুয়েদা (Ross Matsueda) এই প্রক্রিয়ার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে দেখান যে অপরাধ হলো বিপরীতমুখী সামাজিক সংকেতগুলোর মধ্যকার এক জটিল গাণিতিক ভারসাম্যের ফলাফল (Matsueda, 1988)। ব্যক্তির চারপাশে যদি আইন ভাঙার পক্ষে বেশি যুক্তি ও সমর্থন জমা হয়, তবে তার অপরাধে জড়ানো প্রায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।

সপ্তম সূত্রে সাদারল্যান্ড বলেন যে এই সংশ্রব বা যোগাযোগ সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না; এর পুনরাবৃত্তি, স্থায়িত্ব, অগ্রাধিকার এবং তীব্রতা ভিন্ন হতে পারে। শৈশবে যে যোগাযোগ ঘটে তা মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে, আবার যে যোগাযোগ দীর্ঘদিন ধরে ঘন ঘন ঘটে তার প্রভাবও অনেক বেশি স্থায়ী হয়। অষ্টম সূত্রে তিনি দেখান যে অপরাধ শেখার প্রক্রিয়াটি অন্য যেকোনো সাধারণ বিষয় শেখার প্রক্রিয়ার মতোই একই মনস্তাত্ত্বিক নিয়মে পরিচালিত হয়। আর নবম ও শেষ সূত্রে সাদারল্যান্ড যুক্তি দেন যে অপরাধমূলক আচরণকে সাধারণ প্রয়োজন বা মূল্যবোধ দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ একজন সৎ মানুষও অর্থ উপার্জনের জন্য কাজ করে, আবার একজন চোর বা মাদক কারবারি অর্থ পাওয়ার জন্যই অপরাধ করে। সুতরাং উদ্দেশ্য এক হলেও শেখার প্রক্রিয়ার পার্থক্যের কারণেই একজন ব্যক্তি সৎ থাকে আর অন্যজন অপরাধের পথ বেছে নেয়।

আইন লঙ্ঘনের অনুকূল বনাম প্রতিকূল সংজ্ঞা (Definitions Favorable versus Unfavorable to Violating the Law)

সাদারল্যান্ডের তত্ত্বে ‘সংজ্ঞা’ বা ডেফিনিশন শব্দটি কেবল কোনো অভিধানের অর্থ নয়; এটি হলো কোনো নির্দিষ্ট আচরণ সম্পর্কে সমাজের বা ব্যক্তির নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যায়ন এবং নৈতিক ব্যাখ্যা। একজন মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনে দুই ধরনের পরস্পরবিরোধী সংজ্ঞার মুখোমুখি হয়। একদিকে থাকে সমাজের প্রচলিত নিয়ম, রাষ্ট্রীয় আইন এবং নৈতিক অনুশাসন, যা মানুষকে বলে – “মাদক নেওয়া বেআইনি”, “নেশা মানুষের শরীর ও সমাজের ক্ষতি করে”, কিংবা “আইন অমান্য করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ”। এই বার্তাগুলোকে সাদারল্যান্ড আইন লঙ্ঘনের প্রতিকূল সংজ্ঞা (Definitions Unfavorable to Law Violation) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই সংজ্ঞাগুলো মানুষকে অপরাধ এবং ক্ষতিকর আচরণ থেকে দূরে থাকতে উৎসাহিত করে।

অন্যদিকে সমাজে এমন বহু মানুষ বা উপসংস্কৃতি থাকে যারা আইনের সম্পূর্ণ উল্টো ব্যাখ্যা হাজির করে। তারা আইনকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে এবং মাদক গ্রহণকে নানাভাবে মহিমান্বিত করে। তারা প্রচার করে – “একটু মদ বা গাঁজা খেলে কারও কোনো ক্ষতি হয় না”, “নিয়ম ভাঙার ভেতরেই আসল আনন্দ”, কিংবা “আইন তৈরি করেছে একদল স্বার্থপর মানুষ, তাই এটা মানার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই”। সাদারল্যান্ডের ভাষায় এগুলো হলো আইন লঙ্ঘনের অনুকূল সংজ্ঞা (Definitions Favorable to Law Violation)। মাদক নির্ভরতার প্রেক্ষাপটে এই অনুকূল সংজ্ঞাগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও আকর্ষণীয় যুক্তির রূপ নেয়। মাদকাসক্তদের আড্ডায় মাদককে ক্লান্তি দূর করার মহৌষধ, সৃজনশীলতার জ্বালানি কিংবা জীবনের দুঃখ ভোলার একমাত্র উপায় হিসেবে চিত্রিত করা হয়।

কোনো ব্যক্তি মাদকাসক্ত হবে কি না, তা নির্ভর করে তার মনস্তত্ত্বে এই দুই ধরনের সংজ্ঞার অনুপাত কোন দিকে ঝুঁকছে তার ওপর। অপরাধবিজ্ঞানী মার্ক ওয়ার (Mark Warr) কিশোর অপরাধ ও সমবয়সীদের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করে দেখান যে মানুষ যখন এমন কোনো গোষ্ঠীতে সময় কাটায় যেখানে আইন অমান্য করার সপক্ষে ক্রমাগত যুক্তি দেওয়া হয়, তখন তার মনের ভেতরের সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে (Warr, 2002)। কোনো কিশোর যদি এমন পরিবারে বড় হয় যেখানে সবাই মদ বা তামাককে ঘৃণা করে, তবে তার ভেতর আইনের প্রতিকূল সংজ্ঞাগুলো শক্তিশালী থাকে। কিন্তু সে যখন এমন এক বন্ধুদলে প্রবেশ করে যেখানে সবাই নিয়মিত মাদক নেয় এবং মাদক না নেওয়াকে দুর্বলতা মনে করে, তখন তার চারপাশে অনুকূল সংজ্ঞার প্রাচুর্য তৈরি হয়।

এই অনুকূল ও প্রতিকূল সংজ্ঞার লড়াইটি ব্যক্তির মনের ভেতরে এক ধরনের আদর্শিক রূপান্তর ঘটায়। যখন একজন ব্যক্তি বারবার শুনতে থাকে যে মাদক নেওয়া কোনো খারাপ কাজ নয় বরং এটা আধুনিকতার লক্ষণ, তখন সে সমাজের প্রচলিত বিধিনিষেধকে অপ্রয়োজনীয় মনে করতে শুরু করে। গবেষক এলটন জ্যাকসন (Elton Jackson) এবং তার সহকর্মীরা দেখিয়েছেন যে ব্যক্তির আচরণ পরিবর্তন হওয়ার পেছনে এই সংজ্ঞাগুলোর অভ্যন্তরীণ গ্রহণযোগ্যতাই সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে (Jackson et al., 1986)। আইনের প্রতি আনুগত্য কমে গিয়ে যখন বিচ্যুত আচরণের প্রতি সহানুভূতি বাড়ে, তখনই ব্যক্তি প্রথমবারের মতো মাদক গ্রহণ করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে যায়। সাদারল্যান্ডের এই গাণিতিক অনুপাতের ধারণাটি দেখায় যে মানুষের অপরাধপ্রবণতা কোনো আকস্মিক পাগলামি নয়, বরং বিপরীতমুখী সামাজিক সংজ্ঞার অসম ভারসাম্যের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ।

ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত গোষ্ঠী ও যোগাযোগ প্রক্রিয়া (Intimate Personal Groups and the Communication Process)

সাদারল্যান্ড তার তত্ত্বে খুব স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন যে অপরাধ শেখার কাজটি কোনো দূরবর্তী উৎস থেকে সফলভাবে সম্পন্ন হতে পারে না। কোনো ব্যক্তি কেবল সংবাদপত্রে অপরাধের খবর পড়ে, সিনেমায় মাফিয়াদের জীবন দেখে কিংবা দূর থেকে কোনো অপরাধীকে পর্যবেক্ষণ করে নিজে অপরাধী বা মাদকাসক্ত হয়ে ওঠে না। এই শেখার প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন মুখোমুখি ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং আবেগের আদান-প্রদান। এই কারণেই তিনি ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত গোষ্ঠী (Intimate Personal Groups) ধারণার ওপর এত বেশি জোর দিয়েছিলেন। পরিবার, খেলার সাথী, পাড়ার ঘনিষ্ঠ আড্ডার বন্ধু কিংবা কর্মক্ষেত্রের অতি পরিচিত সহকর্মীরাই হলো এই ঘনিষ্ঠ দলের অংশ। এই দলগুলোর ভেতরে যে বিশ্বাস, মায়া এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতা থাকে, তা-ই অন্য মানুষের আচরণকে দ্রুত প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে।

ঘনিষ্ঠ দলগুলোতে যে যোগাযোগ ঘটে, তার শক্তি সাধারণ যোগাযোগের চেয়ে বহুগুণ বেশি। একজন অপরিচিত মানুষ যদি রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাউকে কোনো মাদক নেওয়ার প্রস্তাব দেয়, তবে সে স্বাভাবিকভাবেই ভয় পাবে বা প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করবে। কারণ সেখানে কোনো বিশ্বাসের ভিত্তি নেই। কিন্তু একই প্রস্তাব যখন একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা বিশ্বস্ত বড় ভাইয়ের কাছ থেকে আসে, তখন তা সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নেয়। সেখানে ভয়ের বদলে কাজ করে কৌতূহল এবং আস্থার অনুভূতি। অপরাধবিজ্ঞানী মার্ক ওয়ার (Mark Warr) তার অন্য একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন যে বন্ধুদের দলের ঘনিষ্ঠতাই নির্ধারণ করে তাদের দেওয়া বার্তার কার্যকারিতা কতটুকু হবে (Warr, 1993)। ঘনিষ্ঠ দলের সদস্যরা একে অপরের অনুভূতিকে গভীরভাবে পরোয়া করে, ফলে দলের ভেতরে কোনো আচরণ অনুমোদিত হলে তা ব্যক্তি অতি দ্রুত নিজের মধ্যেও ধারণ করে নেয়।

এই যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় কেবল মুখের কথাই কাজ করে না, বরং শরীরের ভাষা, চাহনি, নীরব সমর্থন এবং যৌথ আনন্দ উদযাপনের মতো বিষয়গুলোও সমান ভূমিকা রাখে। সাদারল্যান্ড উল্লেখ করেছিলেন যে এই যোগাযোগ প্রক্রিয়ার চারটি প্রধান মাত্রা থাকে: অগ্রাধিকার, স্থায়িত্ব, পুনরাবৃত্তি এবং তীব্রতা। অগ্রাধিকার বা প্রায়োরিটি নির্দেশ করে জীবনের কোন সময়ে এই যোগাযোগ ঘটছে। শৈশব বা কৈশোরের শুরুতে তৈরি হওয়া সম্পর্কগুলো মানুষের ব্যক্তিত্বে সবচেয়ে গভীর ভিত্তি গড়ে তোলে। স্থায়িত্ব বা ডিউরেশন বোঝায় একটি সম্পর্ক কত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে আছে। কোনো বন্ধু যদি বছরের পর বছর ধরে সাথে থাকে, তবে তার দেওয়া মূল্যবোধগুলো ব্যক্তির জীবনে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

একইভাবে পুনরাবৃত্তি বা ফ্রিকোয়েন্সি হলো কত ঘন ঘন সেই ব্যক্তিদের সাথে দেখা হচ্ছে এবং কথা হচ্ছে। প্রতিদিন যাদের সাথে দীর্ঘ সময় আড্ডা দেওয়া হয়, তাদের চিন্তাভাবনা মনের ওপর প্রভাব ফেলবেই। আর তীব্রতা বা ইনটেনসিটি নির্দেশ করে সেই সম্পর্কের মানসিক গভীরতা ও প্রতিপত্তি। যদি কোনো তরুণের কাছে তার মাদকাসক্ত বড় ভাই বা কোনো বন্ধুকে অত্যন্ত আকর্ষণীয়, সফল বা সাহসী মনে হয়, তবে সেই সম্পর্কের তীব্রতা অনেক বেশি হবে। গবেষক চার্লস টিটল (Charles Tittle) এবং তার সহকর্মীরা সাদারল্যান্ডের এই যোগাযোগের মাত্রাগুলো পরীক্ষা করে দেখেছেন যে এই চারটি উপাদানের সমন্বয় যেখানে যত বেশি শক্তিশালী, সেখানে বিচ্যুত আচরণের শিক্ষণ তত দ্রুত এবং দীর্ঘস্থায়ী হয় (Tittle et al., 2008)। ঘনিষ্ঠ দলের এই অদৃশ্য বাঁধনই শেষ পর্যন্ত একজন সাধারণ মানুষকে সমাজের চোখ এড়িয়ে মাদকের গোপন জগতে প্রবেশ করতে সাহস যোগায়।

মাদক সংস্কৃতিতে কৌশল ও অনুপ্রেরণার শিক্ষণ (Learning Techniques and Motivations in Drug Culture)

মাদক গ্রহণ করা আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ বা তাৎক্ষণিক কোনো শারীরিক কাজ মনে হতে পারে, কিন্তু সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এটি একটি অত্যন্ত জটিল ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া। সাদারল্যান্ড বলেছিলেন যে অপরাধমূলক আচরণের সাথে সাথে এর নির্দিষ্ট কৌশলগুলোও শিখতে হয়। মাদক ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই কৌশলের শিক্ষাটি একেবারে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করে। কোনো মানুষ জন্ম থেকেই জানে না কীভাবে গাঁজার কলকে তৈরি করতে হয়, কীভাবে সিরিঞ্জে হেরোইন টেনে শিরায় প্রবেশ করাতে হয়, কিংবা কীভাবে কোকেন ব্যবহার করতে হয়। এই সমস্ত ভৌত কৌশল বা টেকনিক তাকে অন্য কোনো অভিজ্ঞ মাদক ব্যবহারকারীর হাত ধরে ধাপে ধাপে শিখতে হয়। সঠিক মাত্রায় মাদক প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে শরীরের ক্ষতি না করে কাঙ্ক্ষিত নেশা অর্জন করার প্রতিটি পদক্ষেপই হলো একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক প্রশিক্ষণের ফসল।

সাদারল্যান্ডের মৃত্যুর পর তার অন্যতম যোগ্য শিষ্য এবং অপরাধবিজ্ঞানী ডোনাল্ড ক্রেসি (Donald Cressey) এই তত্ত্বটিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান এবং কৌশলের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক অনুপ্রেরণার ওপর জোর দেন (Sutherland & Cressey, 1974)। ক্রেসি দেখান যে কেবল মাদক নেওয়ার কৌশল শিখলেই কোনো মানুষ আসক্ত হয়ে যায় না; তাকে শিখতে হয় কীভাবে সেই মাদকের প্রতিক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করতে হবে। প্রথমবার মাদক নিলে শরীরে নানা ধরনের অপ্রীতিকর অনুভূতি তৈরি হতে পারে, যেমন মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, তীব্র হৃৎস্পন্দন কিংবা ভীতি। দলের অভিজ্ঞ সদস্যরা তখন নতুন ব্যবহারকারীকে বোঝায় যে এগুলো কোনো খারাপ লক্ষণ নয়, এগুলোই হলো নেশার আসল মজা। এই সামাজিক দিকনির্দেশনা না পেলে হয়তো অনেকেই প্রথম অভিজ্ঞতার পরেই মাদক ছেড়ে পালিয়ে যেত। সঙ্গীদের দেওয়া অনুপ্রেরণাই শারীরিক অস্বস্তিকে এক ধরনের কৃত্রিম আনন্দে রূপান্তর করতে সাহায্য করে।

কৌশলের আরেকটি বড় অংশ হলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং পরিবারের নজর এড়িয়ে চলার উপায় রপ্ত করা। কীভাবে মাদকের গন্ধ ঢাকতে হবে, চোখের লাল ভাব কাটাতে কোন ড্রপ ব্যবহার করতে হবে, কিংবা পুলিশের তল্লাশি চৌকি ফাঁকি দিয়ে কীভাবে মাদক বহন করতে হবে – এই সমস্ত গোপন জ্ঞান কোনো পাঠ্যবইয়ে পাওয়া যায় না। মাদক ব্যবহারকারীদের ঘনিষ্ঠ আড্ডাই হলো এই ব্যবহারিক কৌশলগুলো শেখার একমাত্র পাঠশালা। গবেষক টমাস উইনফ্রি (L. Thomas Winfree) এবং বার্নার্ড বার্নাট (Frances Bernat) তাদের গবেষণায় তুলে ধরেন যে মাদক সংস্কৃতির ভেতরে থাকা এই কৌশলগত জ্ঞান নতুন সদস্যদের ভেতরে এক ধরনের বিশেষ দক্ষতার অনুভূতি তৈরি করে (Winfree & Bernat, 1998)। তারা নিজেদের সমাজের সাধারণ মানুষদের চেয়ে আলাদা এবং চতুর ভাবতে শুরু করে।

এর পাশাপাশি সবচেয়ে মারাত্মক যে জিনিসটি শেখা হয়, তা হলো অপরাধবোধ দূর করার মানসিক কৌশল বা মোটিভেভেশনাল র‍্যাশনালাইজেশন। মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের কৃতকর্মের পক্ষে অবচেতনভাবেই নানা ধরনের মনগড়া যুক্তি তৈরি করে নেয়। তারা শেখে কীভাবে বলতে হয় – “আমি তো কারও ক্ষতি করছি না, নিজের টাকায় নেশা করছি”, “আজকাল সবাই একটু-আধটু নেয়, এতে দোষের কিছু নেই”, কিংবা “কাজের অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতেই এইটুকু সাহায্য নিচ্ছি”। এই সমস্ত মানসিক যুক্তিগুলো তারা তাদের দলের অভিজ্ঞ সদস্যদের কাছ থেকেই ধার করে। দল যখন বারবার এই যুক্তিগুলোকে বাহবা দেয়, তখন ব্যক্তির মনের ভেতরের শেষ অপরাধবোধটুকুও ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়। কৌশল এবং অনুপ্রেরণার এই যুগপৎ শিক্ষণ একজন মানুষকে ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ মাদক সংস্কৃতির একনিষ্ঠ সদস্যে পরিণত করে।

তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা ও আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা (Limitations of the Theory and Modern Relevance)

যেকোনো সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের মতোই সাদারল্যান্ডের ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশন তত্ত্বটিও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয় এবং বিভিন্ন সময়ে গবেষকরা এর কিছু তাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করেছেন। এই তত্ত্বের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগটি তুলেছিলেন বিখ্যাত অপরাধবিজ্ঞানী দম্পতি শেলডন গ্লুয়েক (Sheldon Glueck) এবং এলিনর গ্লুয়েক (Eleanor Glueck) (Glueck & Glueck, 1950)। তারা একটি অত্যন্ত মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেন: সঙ্গদোষে মানুষ অপরাধী হয়, নাকি অপরাধপ্রবণ মানুষেরাই নিজেদের মতো অন্যান্য অপরাধীদের খুঁজে নিয়ে দল বাঁধে? বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় নির্বাচন বনাম সামাজিকীকরণের বিতর্ক। গ্লুয়েক দম্পতির মতে, সাদারল্যান্ড মানুষের জন্মগত স্বভাব, মানসিক অস্থিরতা এবং ব্যক্তিগত পছন্দকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে কেবল পারিপার্শ্বিক যোগাযোগের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভর করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কোনো ব্যক্তি আগে থেকেই বিচ্যুত আচরণের প্রতি আগ্রহী থাকে এবং সেই কারণেই সে মাদকাসক্তদের দলে গিয়ে যোগ দেয়।

আরেকটি বড় সমালোচনা হলো পরিমাপযোগ্যতার সংকট। সাদারল্যান্ড তার তত্ত্বে আইনের অনুকূল ও প্রতিকূল সংজ্ঞার গাণিতিক ভারসাম্যের কথা বললেও, বাস্তব গবেষণায় এই অনুপাত সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা প্রায় অসম্ভব। একজন মানুষের জীবনে প্রতিদিন কতগুলো অনুকূল সংজ্ঞা জমা হলো আর কতগুলো প্রতিকূল সংজ্ঞা জমা হলো, তা নিখুঁতভাবে গণনা করার কোনো বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বা স্কেল নেই। এছাড়াও সাদারল্যান্ড অপরাধ শেখার সঠিক মনস্তাত্ত্বিক মেকানিজম বা পদ্ধতিটি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেননি। মানুষ কীভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং কোন প্রক্রিয়ায় অন্যকে অনুকরণ করে, তা কেবল যোগাযোগের মাধ্যমে বলে শেষ করা যায় না। পরবর্তীকালে সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট বার্জেস এবং রোনাল্ড একার্স এই তত্ত্বের সাথে স্কিনারের রিইনফোর্সমেন্ট বা আচরণবাদী তত্ত্ব যুক্ত করে এই দুর্বলতা দূর করার চেষ্টা করেন।

এতসব সীমাবদ্ধতা এবং সমালোচনা সত্ত্বেও বর্তমান যুগে দাঁড়িয়েও ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশন তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির এই আধুনিক যুগে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং অপরাধ শেখার পরিধি আরও নতুন মাত্রা পেয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী হেনরি পন্টেল (Henry Pontell) এবং তার সহকর্মীরা কর্পোরেট অপরাধ এবং প্রেসক্রিপশন ড্রাগের অপব্যবহার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে পেশাদার পরিমণ্ডলেও এই তত্ত্ব নিখুঁতভাবে কাজ করে (Pontell et al., 2014)। আমেরিকার ওপিওড সংকটের পেছনে দেখা গেছে যে বড় বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিজেদের ভেতরে এক ধরনের গোপন ঐকমত্য তৈরি করে চিকিৎসকদের অনৈতিকভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। সেই করপোরেট সংস্কৃতির ভেতরে এমন কিছু সংজ্ঞা শেখানো হয়েছিল যা ক্ষতিকর ও আসক্তিকর ওপিওড জাতীয় ওষুধ ছড়িয়ে দেওয়াকে মুনাফার স্বার্থে সম্পূর্ণ বৈধ হিসেবে চিত্রিত করেছিল।

আজকের দিনে ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল জগতও সাদারল্যান্ডের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর নতুন সংস্করণ হিসেবে কাজ করছে। ডার্ক ওয়েবের গোপন ফোরামগুলোতে বসে তরুণরা শিখছে কীভাবে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বেনামে সিন্থেটিক ড্রাগ কেনাবেচা করতে হয় এবং কীভাবে নতুন নতুন ডিজাইনার ড্রাগের মিশ্রণ তৈরি করতে হয়। সেখানে থাকা ব্যবহারকারীরা একে অপরকে অনুকূল সংজ্ঞা দিচ্ছে এবং মাদকবিরোধী সরকারি নীতিগুলোকে উপহাস করছে। গবেষক রস কুম্বার (Ross Coomber) আধুনিক মাদক পাচার ও ব্যবহারের পরিবর্তনশীল গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সাদারল্যান্ডের ধারণার উপযোগিতাকে পুনরায় স্বীকার করেছেন (Coomber, 2015)। ভৌগোলিক দূরত্ব ঘুচে গেলেও মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগের মাধ্যমে বিচ্যুত সংস্কৃতি শেখার যে মৌলিক সত্য সাদারল্যান্ড উন্মোচন করেছিলেন, তা আজকের ডিজিটাল যুগেও মাদকাসক্তির বিস্তার বোঝার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারগুলোর একটি হয়ে টিকে রয়েছে।

সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্ব (Social Learning Theory): অনুকরণ ও পুনর্বলন

অ্যালবার্ট বান্দুরা ও পর্যবেক্ষণমূলক শিক্ষণ (Albert Bandura and Observational Learning)

মানুষের আচরণ কীভাবে গড়ে ওঠে, এই নিয়ে মনস্তত্ত্বের জগতে দীর্ঘকাল ধরে আচরণবাদীদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। জন ওয়াটসন বা বি এফ স্কিনারের মতো গোঁড়া আচরণবাদীরা বিশ্বাস করতেন যে মানুষ কেবল পরিবেশের উদ্দীপক ও প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমেই শেখে। সেখানে মনের ভেতরের ভাবনা বা চিন্তার কোনো স্থান ছিল না। কানাডিয়ান-আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট বান্দুরা (Albert Bandura) এই যান্ত্রিক ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মনস্তত্ত্বে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসেন (Bandura, 1977)। বান্দুরা দেখান যে মানুষ কেবল নিজে ঠেকে শেখে না; সে অন্যদের দেখেও বহু জটিল আচরণ অবলীলায় শিখে ফেলতে পারে। তার প্রণীত সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্ব (Social Learning Theory) অনুসারে, পর্যবেক্ষণ এবং অনুকরণের মাধ্যমে শিক্ষণ সম্পন্ন হয়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় অবসারভেশনাল লার্নিং বা পর্যবেক্ষণমূলক শিক্ষণ। এই তত্ত্বের হাত ধরেই মানুষ বুঝতে পারে কীভাবে মাদকাসক্তির মতো ধ্বংসাত্মক অভ্যাসও কেবল অন্যদের দেখে মনের ভেতর শিকড় গেড়ে বসতে পারে।

বান্দুরার এই তত্ত্বের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রমাণ মেলে ১৯৬১ ও ১৯৬৩ সালের ঐতিহাসিক বোবো ডল পরীক্ষা (Bobo Doll Experiment)-এ (Bandura, Ross, & Ross, 1961)। সেই গবেষণায় শিশুদের একটি বড় প্লাস্টিকের পুতুলের সাথে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সহিংস আচরণ করতে দেখানো হয়েছিল। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিটি পুতুলটিকে মারধর করছিল, লাথি মারছিল এবং চিৎকার করে গালাগাল দিচ্ছিল। পরবর্তীতে যখন সেই শিশুদের একা একটি ঘরে খেলনাগুলোর সাথে রাখা হলো, তখন দেখা গেল তারা ঠিক একইভাবে পুতুলটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কোনো পুরস্কার বা প্রত্যক্ষ প্রণোদনা ছাড়াই শিশুরা কেবল চোখের দেখা থেকেই সেই হিংস্র আচরণটি হুবহু নকল করেছিল। বান্দুরা এখান থেকে দেখান যে মানুষের আচরণ কেবল নিজের অভিজ্ঞতার ফল নয়, বরং চারপাশের মানুষের আচরণকে মস্তিষ্কে ধারণ করার ফসল।

পর্যবেক্ষণমূলক এই শিক্ষণ প্রক্রিয়াটি বান্দুরার মতে চারটি সুনির্দিষ্ট জ্ঞানীয় ধাপের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ হয়: মনোযোগ, স্মৃতিতে ধারণ, আচরণগত পুনরুৎপাদন এবং প্রেষণা। মাদক গ্রহণের সূচনালগ্নে এই চারটি ধাপ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কাজ করে। প্রথমত, কোনো ব্যক্তি যখন তার পরিবারে বা বন্ধুদের আড্ডায় কাউকে মাদক নিতে দেখে, তখন সে সেই ঘটনার প্রতি গভীর মনোযোগ দেয়। দ্বিতীয়ত, সেই দৃশ্যটি, মাদকের গন্ধ এবং ব্যবহারের ভঙ্গি তার মনের স্মৃতিতে গেঁথে যায়। তৃতীয়ত, সুযোগ পাওয়া মাত্রই ব্যক্তি তার শরীরের মাধ্যমে সেই আচরণের পুনরুৎপাদন বা অনুকরণ ঘটায়। আর চতুর্থত, এই আচরণ বারবার করার জন্য প্রয়োজন হয় অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক প্রেষণা, যা তৈরি হয় সঙ্গীদের বাহবা কিংবা শারীরিক আনন্দের প্রত্যাশা থেকে।

মাদকাসক্তির বিস্তার বুঝতে বান্দুরার এই পর্যবেক্ষণমূলক শিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি এক মাধ্যম। একজন তরুণ যখন নিয়মিত দেখে যে তার বড় ভাই বা চেনা কোনো নায়ক সিগারেটে ধোঁয়া উড়িয়ে ক্লান্তি দূর করছে, তখন তার মনে অবচেতনভাবেই একটি মানসিক ছাঁচ বা মডেল তৈরি হয়ে যায়। সে ধরে নেয় যে জীবনের কোনো কঠিন মুহূর্তে এই একই আচরণ করলে হয়তো শান্তি মিলবে। বান্দুরা পরবর্তীতে এই তত্ত্বটিকে আরও সমৃদ্ধ করে তার বিখ্যাত গ্রন্থে রূপ দেন, যার নাম সোশ্যাল ফাউন্ডেশনস অব থট অ্যান্ড অ্যাকশন (Social Foundations of Thought and Action) (Bandura, 1986)। তিনি প্রমাণ করেন যে মানুষের চিন্তার জগৎ পরিবেশের অনুকরণ এবং অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াকরণের যৌথ মিথস্ক্রিয়াতেই গড়ে ওঠে। মাদক গ্রহণ কোনো বিচ্ছিন্ন পাগলামি নয়, বরং এটি চারপাশের মডেলদের দেখে ধাপে ধাপে আত্মস্থ করা এক সুনির্দিষ্ট সামাজিক পাঠ।

রোনাল্ড একার্স ও ডিফারেনশিয়াল রিইনফোর্সমেন্ট তত্ত্ব (Ronald Akers and Differential Reinforcement Theory)

এডউইন সাদারল্যান্ডের ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশন তত্ত্ব অপরাধবিজ্ঞানে অপরাধ শেখার কথা বললেও, সেই শেখার সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াটি কী তা ব্যাখ্যা করতে পারেনি। এই শূন্যতা পূরণ করার জন্য এগিয়ে আসেন অপরাধবিজ্ঞানী রবার্ট বার্জেস (Robert Burgess) এবং রোনাল্ড একার্স (Ronald Akers)। ১৯৬৬ সালে তারা সাদারল্যান্ডের সমাজতাত্ত্বিক ধারণার সাথে আচরণবাদী মনোবিজ্ঞানের অপারেন্ট কন্ডিশনিং বা কার্যকারণ সংযোগের মেলবন্ধন ঘটান (Burgess & Akers, 1966)। পরবর্তীতে একার্স এই তত্ত্বটিকে এককভাবে আরও বিস্তৃত করেন এবং ১৯৭৩ সালে প্রকাশ করেন তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ডেভিয়েন্ট বিহেভিয়ার: এ সোশ্যাল লার্নিং অ্যাপ্রোচ (Deviant Behavior: A Social Learning Approach) (Akers, 1977)। একার্স তার এই কাঠামোতে অপরাধ ও মাদকাসক্তিকে ব্যাখ্যা করার জন্য ডিফারেনশিয়াল রিইনফোর্সমেন্ট তত্ত্ব (Differential Reinforcement Theory) উপস্থাপন করেন, যা পরবর্তীকালে অপরাধবিজ্ঞানের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

একার্সের সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্বটি মূলত চারটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশন বা সংশ্রব, সংজ্ঞা, ডিফারেনশিয়াল রিইনফোর্সমেন্ট বা পার্থক্যমূলক পুনর্বলন এবং অনুকরণ। এখানে একার্স সাদারল্যান্ডের মূল ধারণাকে স্বীকার করেও তার পরিধিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। তিনি বলেন যে মানুষের সাথে মেশাটাই যথেষ্ট নয়; মেশার ফলে যে পুনর্বলন বা প্রাপ্তি ঘটে, সেটাই আচরণকে টিকিয়ে রাখে। ডিফারেনশিয়াল রিইনফোর্সমেন্ট বলতে একার্স বুঝিয়েছেন কোনো একটি কাজের ফলে সম্ভাব্য পুরস্কার এবং শাস্তির মধ্যকার অনুপাত বা ভারসাম্য। কোনো ব্যক্তি যখন দেখে যে মাদক নেওয়ার ফলে শারীরিক বা সামাজিক প্রাপ্তির পাল্লা শাস্তির ভয়ের চেয়ে অনেক বেশি ভারী, তখন সে অবধারিতভাবেই সেই আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে থাকে।

মাদকের ব্যবহারের ক্ষেত্রে একার্স দেখান যে কীভাবে এই চারটি স্তম্ভ একসাথে কাজ করে (Akers, 1998)। প্রথমে ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে ব্যক্তি এমন একদল মানুষের সাথে যুক্ত হয় যারা নিয়মিত মাদক নেয়। এরপর সে তাদের কাছ থেকে মাদক ব্যবহারের অনুকূল সংজ্ঞাগুলো শেখে, অর্থাৎ মাদক নেওয়াকে ভালো বা যুক্তিসঙ্গত মনে করতে শুরু করে। তৃতীয় ধাপে সে বন্ধুদের অনুকরণ করে প্রথমবার মাদক সেবন করে। কিন্তু চতুর্থ ধাপটিই হলো সবচেয়ে জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী, যেখানে কার্যকর হয় পার্থক্যমূলক পুনর্বলন। যদি প্রথমবার মাদক নেওয়ার অভিজ্ঞতাটি আনন্দদায়ক হয় এবং বন্ধুরা তাকে করতালি দিয়ে স্বাগত জানায়, তবে আচরণটি মস্তিষ্কে স্থায়ীভাবে পুনর্বলিত হয়।

একার্স খুব পরিষ্কার করে দেখিয়েছেন যে কোনো আচরণ কেবল সমাজ থেকে শেখা হলেই তা আজীবন টিকে থাকে না। সেই আচরণটি চালিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যক্তির বাস্তব জীবনে নিয়মিত পুনর্বলনের যোগান থাকতে হয়। যদি সমাজ বা পরিবেশ থেকে কোনো আচরণ বারবার পুরস্কৃত হতে থাকে, তবে ব্যক্তি সেই আচরণকে নিজের স্বভাব বানিয়ে ফেলে। বিপরীতে যদি কঠোর শাস্তি বা চরম শারীরিক ভোগান্তি নিয়মিত ঘটতে থাকে, তবে আচরণের তীব্রতা কমে আসে। অপরাধবিজ্ঞানী রোনাল্ড একার্স (Ronald Akers) এবং তার সহকর্মীরা বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে কৈশোরের মাদকাসক্তি বোঝার জন্য তার এই চার-স্তম্ভ বিশিষ্ট মডেলটি অনন্য ভূমিকা পালন করে (Akers et al., 1979)। মাদক নেওয়া কোনো আকস্মিক অন্ধ আবেগ নয়, বরং এটি লাভ-ক্ষতির বাস্তব ও মনস্তাত্ত্বিক পুনর্বলনে সিক্ত এক ধারাবাহিক আচরণ।

প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পুনর্বলনের গতিপ্রকৃতি (Dynamics of Direct and Vicarious Reinforcement)

আচরণবাদী বিজ্ঞানের জনক বি এফ স্কিনার (B. F. Skinner) পুনর্বলন বা রিইনফোর্সমেন্টকে এমন এক উপাদান হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন যা যেকোনো আচরণের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয় (Skinner, 1953)। মাদকাসক্তির জগতে এই পুনর্বলন দুইভাবে কাজ করে: ধনাত্মক পুনর্বলন এবং ঋণাত্মক পুনর্বলন। ধনাত্মক পুনর্বলন হলো কোনো আচরণ করার পর এমন কিছু আনন্দদায়ক বা তৃপ্তিকর পাওয়া, যা মনকে উল্লসিত করে তোলে। কোকেন, মেথামফেটামিন কিংবা হেরোইনের মতো মাদক যখন রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়, তখন ডোপামিনের প্রবল নিঃসরণ ঘটে। এই তীব্র শারীরিক উচ্ছ্বাস বা ইউফোরিয়া হলো সরাসরি ধনাত্মক পুনর্বলনের এক চূড়ান্ত জৈবিক রূপ। এর পাশাপাশি বন্ধুদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা, সামাজিক আড্ডায় নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হওয়া – এগুলো সামাজিক ধনাত্মক পুনর্বলন হিসেবে কাজ করে।

অন্যদিকে ঋণাত্মক পুনর্বলন বলতে কোনো অপ্রীতিকর বা কষ্টদায়ক অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়াকে বোঝায়। বহু মানুষ মাদকাসক্তির গভীরে তলিয়ে যায় এই ঋণাত্মক পুনর্বলনের ফাঁদে পড়ে। জীবনের একাকীত্ব, বিষণ্ণতা, পারিবারিক অশান্তি কিংবা কাজের প্রচণ্ড চাপ যখন মনকে পিষ্ট করে ফেলে, তখন মাদক গ্রহণ করলে সাময়িকভাবে সেই সমস্ত মানসিক যন্ত্রণা উবে যায়। মস্তিষ্ক তখন খুব দ্রুত শিখে নেয় যে এই তীব্র অস্বস্তি থেকে বাঁচার সহজতম উপায় হলো মাদক নেওয়া। আসক্তির পরবর্তী পর্যায়ে যখন মাদকের প্রভাব কাটতে শুরু করে এবং ভয়াবহ শারীরিক প্রত্যাহার লক্ষণ দেখা দেয়, তখন সেই তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা ও কাঁপুনি বন্ধ করার একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়ায় আরেকটি ডোজ গ্রহণ। কষ্ট দূর করে স্বস্তি পাওয়ার এই প্রক্রিয়াটিই হলো ঋণাত্মক পুনর্বলন, যা আসক্ত ব্যক্তিকে মাদকের ক্রীতদাসে পরিণত করে।

পুনর্বলন কেবল ব্যক্তির নিজের অনুভূতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পরোক্ষভাবেও কাজ করে, যাকে বান্দুরা বলেছিলেন পরোক্ষ পুনর্বলন (Vicarious Reinforcement) (Bandura, 1977)। মানুষ যখন দেখে যে অন্য কোনো ব্যক্তি একটি বিশেষ কাজ করে প্রশংসিত হচ্ছে বা লাভবান হচ্ছে, তখন সে নিজেও সেই কাজটি করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। একজন কিশোর যখন তার আড্ডার বড় ভাইদের দেখে যে তারা মাদক নিয়ে গভীর আনন্দে মেতে আছে, তাদের কোনো দুঃখ নেই এবং তারা সবার কাছে খুব সাহসী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, তখন সেই কিশোরটি অবচেতনভাবেই পরোক্ষ পুনর্বলন অনুভব করে। সে নিজের চোখে দেখতে পায় যে মাদক গ্রহণের ফলাফল ইতিবাচক, ফলে তার মনের ভেতরের ভীতি দূর হয়ে যায় এবং সে নিজেই সেই পথ বেছে নিতে প্রলুব্ধ হয়।

সমাজবিজ্ঞানী রোনাল্ড একার্স (Ronald Akers) এবং ক্রিস্টিন সেলার্স (Christine Sellers) পুনর্বলনের এই দ্বিমুখী শক্তি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে মানব আচরণের স্থায়িত্ব পুরোপুরি নির্ভর করে এই প্রাপ্তিগুলোর নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতির ওপর (Akers & Sellers, 2004)। মাদকাসক্ত ব্যক্তি যখন একদিকে বন্ধুদের কাছ থেকে সামাজিক মর্যাদা পায় এবং অন্যদিকে শারীরিক স্তরে পরম আনন্দ বা তীব্র যন্ত্রণা থেকে মুক্তি লাভ করে, তখন আচরণটি বন্ধ করার সমস্ত যুক্তিবোধ পরাজিত হয়। ক্লিনিকাল গবেষক স্টিফেন হিগিন্স (Stephen Higgins) এবং তার সহকর্মীরা আসক্তি চিকিৎসার ক্ষেত্রে পুনর্বলনের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রমাণ করেন যে মাদকের শক্তিশালী পুনর্বলনকে পরাস্ত করতে হলে রোগীকে বিকল্প স্বাস্থ্যকর সামাজিক ও বস্তুগত পুরস্কারের ব্যবস্থা করে দিতে হয় (Higgins et al., 1994)। পুনর্বলনের এই গতিপ্রকৃতিই প্রমাণ করে যে মাদকাসক্তি কেবল একটি রোগ নয়, বরং এটি স্নায়বিক ও সামাজিক পুরস্কারের নিখুঁত ফাঁদে বন্দি হওয়া এক আচরণগত চক্র।

অনুকরণ, মডেলিং ও প্রাথমিক মাদক গ্রহণ (Imitation, Modeling and Initial Drug Ingestion)

কোনো মানুষ জীবনে প্রথমবার যখন মাদকের মুখে পড়ে, তখন পুনর্বলন তখনও শুরু হয়নি; কারণ সে তখনও জানে না মাদক তার শরীরে কেমন প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে। ঠিক এই মাহেন্দ্রক্ষণেই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে অনুকরণ বা মডেলিং। বান্দুরার মতে, অনুকরণ হলো কোনো নতুন ও জটিল আচরণ প্রথমবারের মতো রপ্ত করার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও দ্রুততম পথ (Bandura, 1986)। মানুষ এমন কাউকে মডেল হিসেবে বেছে নেয় যার সামাজিক অবস্থান আকর্ষণীয়, যাকে সে পছন্দ করে এবং যার মতো সে হতে চায়। কৈশোর ও তারুণ্যের সন্ধিক্ষণে এই মডেল হয়ে ওঠে সাধারণত বয়সে কিছুটা বড় সহপাঠী, পাড়ার প্রভাবশালী তরুণ কিংবা চলচ্চিত্রের কোনো চরিত্র। মডেলের এই উপস্থিতি নবাগত ব্যক্তির মনের সমস্ত দ্বিধা ও ভীতি দূর করে দেয়।

মডেলিং প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। একজন নতুন ব্যবহারকারী কেবল মাদক গিলতে বা ধোঁয়া টানতে দেখে না; সে দেখে মডেল কীভাবে মাদকটি প্রস্তুত করছে, কীভাবে হাতে ধরেছে এবং সেবন করার পর তার মুখে কী ধরনের অভিব্যক্তি ফুটে উঠছে। অপরাধবিজ্ঞানী টমাস উইনফ্রি (L. Thomas Winfree) এবং তার সহকর্মীরা কিশোরদের মাদক গ্রহণের ওপর সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্বের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে লক্ষ্য করেন যে বন্ধুদের দলের আচরণ প্রত্যক্ষ করাই হলো প্রথম মাদক সেবনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভবিষ্যৎবাণী (Winfree et al., 1994)। মডেল যদি কোনো দ্বিধাহীন ভঙ্গিতে এবং অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে মাদক গ্রহণ করে, তবে দর্শকের মনেও সেই আচরণের প্রতি কোনো শঙ্কা থাকে না। অনুকরণ তখন কেবল একটি শারীরিক কসরত থাকে না, বরং তা হয়ে দাঁড়ায় মডেলের ব্যক্তিত্বের অংশ হওয়ার এক অবচেতন চেষ্টা।

মডেলের আকর্ষণীয়তা এবং কর্তৃত্ব এই অনুকরণের মাত্রাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। যদি মডেল এমন কেউ হয় যাকে সবাই ভয় পায় বা সম্মান করে, তবে তার মাদক নেওয়ার আচরণটি দর্শকের কাছে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ মনে হয়। অপরাধবিজ্ঞানী মারভিন ক্রোন (Marvin Krohn) এবং তার সহযোগীরা কিশোরদের ধূমপান ও মাদক ব্যবহারের দীর্ঘমেয়াদী তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখান যে সমবয়সী মডেলদের অনুকরণের মাধ্যমেই বেশিরভাগ অপরাধমূলক বা বিচ্যুত আচরণের সূচনা ঘটে (Krohn et al., 1985)। একজন তরুণ যখন দেখে যে তার দলের সবচেয়ে জনপ্রিয় ছেলেটি নিয়মিত মাদক নিচ্ছে এবং সবাই তাকে মধ্যমণি বানিয়ে রেখেছে, তখন সে মনে করে যে ঐ দলে নিজের জায়গা করে নেওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি হলো হুবহু সেই একই আচরণ অনুকরণ করা।

তবে প্রাথমিক এই অনুকরণের পর আচরণের গতিপথ বদলে যায়। বান্দুরা এবং একার্স উভয়েই একমত হয়েছেন যে অনুকরণ হলো দরজায় প্রবেশ করার টিকিট, কিন্তু ভেতরে স্থায়ীভাবে থাকার কারণ হলো পুনর্বলন। প্রথমবার অনুকরণ করে মাদক নেওয়ার পর যদি সেই অভিজ্ঞতা মারাত্মক বমি, আতঙ্ক বা শারীরিক অসুস্থতা তৈরি করে এবং আশপাশের মানুষও যদি তীব্র নিন্দা জানায়, তবে ব্যক্তি সাধারণত দ্বিতীয়বার সেই পথে পা বাড়ায় না। কিন্তু যদি অনুকরণের পর কোনো ইতিবাচক সামাজিক বা শারীরিক প্রাপ্তি ঘটে, তবে অনুকরণ করা আচরণটি ব্যক্তির নিজস্ব অভ্যাসে রূপান্তরিত হয়। অনুকরণ তাই মাদকাসক্তির সূচনালগ্নের সেই সেতু, যার ওপর দিয়ে হেঁটে একজন সুস্থ মানুষ প্রথমবার ক্ষতিকর রাসায়নিকের অচেনা জগতে প্রবেশ করে।

বৈষম্যমূলক উদ্দীপক ও আসক্তির স্থায়িত্ব (Discriminative Stimuli and Maintenance of Addiction)

আচরণবাদী বিজ্ঞানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয় হলো বৈষম্যমূলক উদ্দীপক বা ডিসক্রিমিনেটিভ স্টিমুলাস। বিজ্ঞানী বি এফ স্কিনার দেখান যে কোনো আচরণ সব পরিবেশে সমানভাবে ঘটে না; কিছু নির্দিষ্ট পরিবেশগত সংকেত প্রাণীকে জানিয়ে দেয় যে এখন এই আচরণটি করলে পুরস্কার পাওয়া যাবে (Skinner, 1938)। মাদকাসক্তির দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়ায় এই বৈষম্যমূলক উদ্দীপকগুলো এক অবিশ্বাস্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। কোনো মাদকাসক্ত ব্যক্তি যখন একটি বিশেষ গলির মোড়ে যায়, পুরোনো কোনো গানের সুর শোনে, মাদকের চেনা গন্ধ পায় কিংবা নির্দিষ্ট কিছু সঙ্গীর মুখ দেখে, তখন সেই উদ্দীপকগুলো তার মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায় যে মাদক গ্রহণের সময় হয়েছে। এই সংকেতগুলো অবচেতন মনে এক তীব্র মানসিক তাড়না বা ক্রেভিং তৈরি করে।

একার্স তার তত্ত্বে দেখান যে কীভাবে এই উদ্দীপকগুলো মাদকের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেয় (Akers, 1998)। ঘরে মা-বাবার সামনে যে তরুণ সম্পূর্ণ শান্ত ও সংযত থাকে, সে-ই যখন বন্ধুদের গোপন আড্ডায় যায়, তখন তার আচরণ সম্পূর্ণ বদলে যায়। সেই আড্ডার আলো-আঁধারি পরিবেশ, আসবাবের বিন্যাস এবং বন্ধুদের মুখের ভাষা বৈষম্যমূলক উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। এগুলো ব্যক্তিকে জানিয়ে দেয় যে এখানে মাদক নিলে কোনো শাস্তি হবে না, বরং মিলবে অফুরন্ত স্বাধীনতা ও আনন্দ। পরিবেশের এই উপস্থিতি ব্যক্তির আত্মনিয়ন্ত্রণের সমস্ত বাঁধকে মুহূর্তে শিথিল করে দেয়। ব্যক্তি তখন পরিবেশের সেই সংকেতের কাছে একপ্রকার বাধ্য হয়েই মাথা নত করে।

মনস্তাত্ত্বিক গবেষক ব্রায়ান কার্টার (Brian Carter) এবং স্টিফেন টিফানি (Stephen Tiffany) মাদকাসক্তদের পরিবেশগত সংকেত ও শারীরিক প্রতিক্রিয়ার ওপর বহু গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখান যে বাহ্যিক উদ্দীপকের উপস্থিতিতে আসক্ত ব্যক্তির হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, ঘাম হয় এবং ডোপামিনের তীব্র চাহিদা তৈরি হয় (Carter & Tiffany, 1999)। এটি কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; এটি হলো বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা কন্ডিশনিং বা শিক্ষণের চূড়ান্ত ফল। মাদক প্রস্তুত করার সাধারণ একটি চামচ, একটি খালি বোতল বা একটি লাইটারও তখন সাধারণ বস্তু থাকে না; সেগুলো হয়ে ওঠে মাদক গ্রহণের প্রবল সংকেত। এই উদ্দীপকগুলোর কারণেই বহু মানুষ পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে সুস্থ হয়ে ফেরার পরও নিজের এলাকায় আসামাত্রই আবার পুরোন নেশায় ফিরে যায়।

আসক্তির স্থায়িত্ব তাই কেবল ওষুধের রাসায়নিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; পারিপার্শ্বিক উদ্দীপকের এই গভীর জাল আসক্তিকে বছরের পর বছর ধরে টিকিয়ে রাখে। মস্তিষ্ক যখন কোনো নির্দিষ্ট পরিবেশকে আনন্দের আগমনী বার্তা হিসেবে চিনে ফেলে, তখন যুক্তি দিয়ে সেই সংযোগ ভাঙা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে। আসক্ত ব্যক্তি সচেতনভাবে মাদক ছাড়তে চাইলেও তার ইন্দ্রিয়গুলো যখনই পরিচিত উদ্দীপকের মুখোমুখি হয়, তখনই অবচেতন শিক্ষণ জেগে ওঠে এবং তাকে পুনরায় মাদক গ্রহণের দিকে পরিচালিত করে। বৈষম্যমূলক উদ্দীপকের এই অবিরাম উপস্থিতিই প্রমাণ করে যে মাদকাসক্তি ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ ইচ্ছাশক্তি এবং পরিবেশের সংকেতের মধ্যকার এক অসম স্নায়বিক লড়াই।

আত্ম-কার্যকারিতা ও আসক্তি নিরাময়ের শিক্ষণ (Self-Efficacy and Learning in Addiction Recovery)

মানুষ কেবল পরিবেশের পুতুল নয় যে পরিবেশ যেভাবে নাচাবে সেভাবেই নাচবে। বান্দুরার সামাজিক জ্ঞানীয় তত্ত্বের সবচেয়ে সুন্দর এবং আশাব্যঞ্জক দিকটি হলো মানুষের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার স্বীকৃতি। এই শক্তিকে বান্দুরা অভিহিত করেছেন আত্ম-কার্যকারিতা (Self-Efficacy) হিসেবে (Bandura, 1997)। আত্ম-কার্যকারিতা হলো কোনো নির্দিষ্ট কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য নিজের সামর্থ্যের ওপর ব্যক্তির নিজস্ব বিশ্বাস। আসক্তি চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই ধারণাটি এক পরম পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। কোনো ব্যক্তি যদি অন্তরে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে সে প্রলোভনের মুখেও নিজেকে সংবরণ করতে পারবে, তবে তার মাদক ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। বিপরীতে যার আত্ম-কার্যকারিতার বিশ্বাস দুর্বল, সে সামান্যতম মানসিক চাপের মুখেই পুনরায় মাদকের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

আসক্তি নিরাময়ের প্রক্রিয়াটি আসলে কোনো জাদুকরি পরিবর্তন নয়; এটি হলো নতুন করে স্বাস্থ্যকর আচরণ শেখার এবং পুরোনো ক্ষতিকর শিক্ষাকে ভুলে যাওয়ার এক নিয়মতান্ত্রিক লড়াই। আসক্তি গবেষক জি অ্যালান মার্ল্যাট (G. Alan Marlatt) এবং ডেনিস ডোনোভান (Dennis Donovan) তাদের রিল্যাপ্স প্রতিরোধ তত্ত্বে আত্ম-কার্যকারিতার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন (Marlatt & Donovan, 2005)। তারা দেখান যে আসক্ত ব্যক্তিকে যদি শেখানো যায় কীভাবে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিগুলো চিনতে হবে এবং কীভাবে সঙ্গীদের মাদকের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করতে হবে, তবে তার আত্ম-কার্যকারিতা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। রোগী যখন বুঝতে পারে যে মাদক ছাড়াও মানসিক চাপ মোকাবেলা করার মতো কার্যকর আচরণগত দক্ষতা তার নিজের ভেতর রয়েছে, তখন সে মাদকের দাসত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করতে শুরু করে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই শিক্ষণ তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ ঘটে আচরণীয় পরিবর্তনমূলক থেরাপির মাধ্যমে। প্রখ্যাত ক্লিনিকাল গবেষক ম্যাক্সিন স্টিটজার (Maxine Stitzer) এবং ন্যান্সি পেট্রি (Nancy Petry) আসক্তি নিরাময়ে কন্টিনজেন্সি ম্যানেজমেন্ট বা চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির কার্যকারিতা তুলে ধরেন (Stitzer & Petry, 2006)। এই পদ্ধতিতে রোগীর মাদকহীন সুস্থ আচরণকে বস্তুগত ও সামাজিক পুরস্কার দিয়ে নিয়মিত পুনর্বলিত করা হয়। যখন রোগী দেখে যে রক্ত বা মূত্র পরীক্ষায় মাদক না থাকার প্রমাণ দিলে সে সামাজিকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, তখন তার মস্তিষ্কে একটি বিকল্প ধনাত্মক পুনর্বলন তৈরি হয়। পরিবেশের এই নতুন পুনর্বলন মাদকের রাসায়নিক আনন্দকে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করে।

একই সাথে ব্যক্তিকে এমন এক সামাজিক পরিবেশে নিয়ে যেতে হয় যেখানে ভালো আচরণ অনুকরণের মতো স্বাস্থ্যকর রোল মডেল উপস্থিত থাকে। নিরাময়কামী গোষ্ঠী বা সেলফ-হেল্প গ্রুপগুলোতে যখন একজন নতুন সদস্য দেখে যে তারই মতো মারাত্মক আসক্ত অন্য একজন মানুষ বছরের পর বছর মাদক ছাড়া সম্পূর্ণ সুস্থ ও সফল জীবনযাপন করছে, তখন তার ভেতরে আশার সঞ্চার হয়। সে সেই সফল সহযোদ্ধাকে নিজের নতুন মডেল হিসেবে গ্রহণ করে এবং তার জীবনযাত্রাকে অনুকরণ করতে শেখে। সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্ব এইভাবে অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখায়। যে আচরণ মানুষ একদিন পরিবেশের ক্ষতিকর মডেল দেখে এবং বিকৃত পুনর্বলনের মাধ্যমে শিখেছিল, সঠিক পরিবেশ, সুস্থ রোল মডেল এবং ইতিবাচক সামাজিক পুনর্বলনের মাধ্যমে সেই ক্ষতিকর শিক্ষাকে মুছে ফেলে সুস্থ জীবনের নতুন পাঠ গ্রহণ করা সম্পূর্ণ সম্ভব।

সমন্বিত ব্যাখ্যা (Integrated Perspectives on Drug Dependency): বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ

বায়ো-সাইকো-সোশ্যাল মডেল ও জর্জ এঙ্গেলের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি (The Biopsychosocial Model and George Engel’s Holistic Approach)

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দীর্ঘ ইতিহাসে যেকোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যাকে কোনো একটি সুনির্দিষ্ট অঙ্গের গোলযোগ হিসেবে দেখার এক ধরনের অন্ধ প্রবণতা ছিল। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত আসক্তিকে কখনো স্রেফ মস্তিষ্কের আণবিক দুর্বলতা, আবার কখনো ব্যক্তির নৈতিক অধঃপতন হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা চলেছে। এই ধরনের একমুখী দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা প্রথম স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন আমেরিকান মনোচিকিৎসক জর্জ এঙ্গেল (George Engel) (Engel, 1977)। এঙ্গেল যুক্তি দেন যে মানবদেহ কোনো বিচ্ছিন্ন যন্ত্র নয় যা কেবল রাসায়নিক উপাদানের নিয়মে চলে। তিনি প্রচলিত বায়োমেডিকেল মডেলের যান্ত্রিক সংকোচনবাদকে প্রত্যাখ্যান করে ১৯৭৭ সালে প্রস্তাব করেন বায়ো-সাইকো-সোশ্যাল মডেল (Biopsychosocial Model)। এই মডেলের মূল বার্তা হলো, যেকোনো ব্যাধি বা জটিল মানবীয় আচরণকে বুঝতে হলে শরীরের জীববিজ্ঞান, মনের মনস্তত্ত্ব এবং পারিপার্শ্বিক সমাজব্যবস্থাকে একই সূত্রে গেঁথে বিশ্লেষণ করতে হবে।

মাদক নির্ভরতার জটিল গোলকধাঁধায় এই ত্রিমুখী বিশ্লেষণ অত্যন্ত গভীর সত্য উন্মোচন করে। প্রথম উপাদানটি হলো জৈবিক মাত্রা, যার মধ্যে ব্যক্তির জিনগত ঝুঁকি, নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্য এবং মস্তিষ্কের মেসোলিম্বিক পুরস্কার ব্যবস্থার অভিযোজন অন্তর্ভুক্ত। গবেষক গ্যারি শোয়ার্টজ (Gary Schwartz) স্বাস্থ্য ও রোগের ক্ষেত্রে এই জৈবিক ক্রিয়াশীলতার ওপর বিশদ আলোকপাত করেন (Schwartz, 1982)। কোনো ব্যক্তির শরীরে হয়তো মাদক দ্রুত ভেঙে ফেলার এনজাইমের ঘাটতি থাকতে পারে, কিংবা তার মস্তিষ্কে ডোপামিন রিসেপ্টরের সংখ্যা জন্মগতভাবেই কম হতে পারে। এই জৈবিক সংবেদনশীলতা তাকে প্রাকৃতিকভাবেই আসক্তির ঝুঁকিতে রাখে। কিন্তু এই জৈবিক দুর্বলতা একা কোনো মানুষকে মাদকাসক্ত বানাতে পারে না, যতক্ষণ না অন্য দুটি উপাদান তার সাথে যুক্ত হয়।

দ্বিতীয় উপাদানটি হলো মনস্তাত্ত্বিক মাত্রা, যা ব্যক্তির চিন্তার ধরন, মানসিক চাপ মোকাবেলা করার কৌশল, আবেগীয় ক্ষত এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার সাথে জড়িত। শৈশবের কোনো ট্রমা বা মানসিক আঘাত, বিষণ্ণতা এবং ব্যক্তিত্বের অস্থিরতা মানুষকে সাময়িক মুক্তির পথ খুঁজতে প্ররোচিত করে। আসক্তি গবেষক মার্ক গ্রিফিথস (Mark Griffiths) আসক্তির আচরণগত উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখান যে মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণা থেকে বাঁচার তীব্র আকাঙ্ক্ষাই মাদককে একটি লোভনীয় মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে (Griffiths, 2005)। ব্যক্তির মনের ভেতরের ক্ষোভ বা হীনমন্যতা যখন কোনো সুস্থ উপায়ে প্রকাশিত হতে পারে না, তখন সে রাসায়নিক উপশমের দিকে হাত বাড়ায়। মনস্তত্ত্ব এখানে এমন এক জ্বালানি হিসেবে কাজ করে যা জৈবিক দুর্বলতার আগুনে বাতাস দেয়।

তৃতীয় এবং অত্যন্ত ব্যাপক উপাদানটি হলো সামাজিক ও পরিবেশগত মাত্রা। একজন মানুষের চারপাশে যদি মাদকের সহজলভ্যতা থাকে, তার পরিবারে যদি অশান্তি থাকে এবং তার বন্ধুরা যদি মাদক গ্রহণকে গৌরবের বিষয় মনে করে, তবে তার মাদকাসক্ত হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। সামাজিক দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় নীতি এই পরিবেশগত চাপকে নিয়ন্ত্রণ করে। এঙ্গেলের বায়ো-সাইকো-সোশ্যাল মডেল দেখায় যে মাদকাসক্তি কোনো একটি স্বতন্ত্র উপাদানের একক খেলা নয়। জীববিজ্ঞান যদি বন্দুক প্রস্তুত করে, মনস্তত্ত্ব যদি নিশানা তাক করে, তবে সমাজই শেষ পর্যন্ত সেই বন্দুকের ট্রিগার চেপে দেয়। এই তিন শক্তির অবিরাম পারস্পরিক ক্রিয়াশীলতা না বুঝলে মাদক নির্ভরতার পূর্ণাঙ্গ রহস্য উন্মোচন করা কখনোই সম্ভব নয়।

ডেলবার্ট এলিয়টের সমন্বিত সামাজিক তত্ত্ব (Delbert Elliott’s Integrated Social Theory)

অপরাধবিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্বে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন তাত্ত্বিকরা নিজেদের ধারণাকেই অপরাধের একমাত্র ব্যাখ্যা বলে দাবি করে আসছিলেন। কেউ বলছিলেন সামাজিক বন্ধনের অভাবের কথা, কেউ বলছিলেন লক্ষ্য অর্জনের ব্যর্থতাজনিত চাপের কথা, আবার কেউ বা বন্ধুদের কাছ থেকে শেখার ওপর জোর দিচ্ছিলেন। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে আমেরিকান অপরাধবিজ্ঞানী ডেলবার্ট এলিয়ট (Delbert Elliott) এবং তার সহকর্মীরা এই বিচ্ছিন্ন তত্ত্বগুলোকে জোড়াতালি না দিয়ে একটি সুসংহত তাত্ত্বিক মডেলে রূপ দেওয়ার সাহসী উদ্যোগ নেন (Elliott et al., 1979)। তারা রবার্ট মার্টন ও রিচার্ড ক্লোওয়ার্ডের স্ট্রেন তত্ত্ব, ট্র্যাভিস হির্শির সামাজিক বন্ধন তত্ত্ব এবং রোনাল্ড একার্সের সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্বকে একীভূত করে প্রণয়ন করেন সমন্বিত সামাজিক তত্ত্ব (Integrated Social Theory)।

এলিয়ট তার তত্ত্বটিকে আরও পরিশীলিত রূপ দেন ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ক্লাসিক গ্রন্থ এক্সপ্লেনিং ডেলিনকোয়েন্সি অ্যান্ড ড্রাগ ইউজ (Explaining Delinquency and Drug Use)-এর মাধ্যমে (Elliott et al., 1985)। তিনি দেখান যে কিশোর বয়সের অপরাধ এবং মাদকাসক্তি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি কতগুলো সমাজতাত্ত্বিক ধাপের ধারাবাহিক পরিণতি। এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে থাকে সামাজিক স্ট্রেন বা চরম চাপ এবং সামাজিকীকরণের ব্যর্থতা। যখন কোনো তরুণ সমাজের প্রচলিত উপায়ে সাফল্য পায় না বা পরিবারে অবহেলার শিকার হয়, তখন সমাজের প্রথাগত প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে তার সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে। সে পরিবার, বিদ্যালয় ও আইনের প্রতি নিজের আস্থা ও আনুগত্য হারিয়ে ফেলে।

তবে এলিয়ট লক্ষ্য করেন যে কেবল প্রথাগত বন্ধন ভেঙে গেলেই কোনো মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে না। বন্ধনহীনতা মানুষকে কেবল মুক্ত করে দেয়, যা হির্শির তত্ত্বের মূল কথা ছিল। কিন্তু কোন পথে মানুষ যাবে, তার জন্য প্রয়োজন হয় একটি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা। ঠিক এখানেই এলিয়ট সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্বকে যুক্ত করেন। যখন একজন তরুণের প্রথাগত সামাজিক বন্ধন ছিঁড়ে যায়, তখন সে শূন্যতায় থাকতে পারে না। সে সমাজের মূলধারা থেকে বিতাড়িত হয়ে বিচ্যুত সহকর্মীদের দলের সাথে যুক্ত হয়। এই বিচ্যুত দলের সান্নিধ্যে এসেই সে মাদক ব্যবহারের প্রত্যক্ষ কৌশল এবং অনুকূল যুক্তিগুলো শিখতে শুরু করে।

এই সমন্বিত মডেলে দেখা যায় কীভাবে একটি কারণ অন্য কারণের পথ তৈরি করে দেয়। পারিবারিক অশান্তি বা সামাজিক ব্যর্থতা প্রথমে ব্যক্তির সামাজিক বন্ধন শিথিল করে, শিথিল বন্ধন তাকে বিচ্যুত বন্ধুদের দলের দিকে ঠেলে দেয়, আর সেই দলের ভেতরের সামাজিক শিক্ষণ ও পুনর্বলন তাকে পূর্ণাঙ্গ মাদক নির্ভরতার দিকে পরিচালিত করে। এলিয়টের এই সমন্বিত সামাজিক তত্ত্ব প্রমাণ করে যে মাদকাসক্তি কোনো একক সমাজতাত্ত্বিক ত্রুটির ফল নয়। এটি হলো সামাজিক চাপ, প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধনের অবক্ষয় এবং বিচ্যুত মেলামেশার এক নিখুঁত শৃৃঙ্খলিত নেটওয়ার্ক, যেখানে প্রতিটি ধাপ পূর্ববর্তী ধাপের ওপর ভিত্তি করে আসক্তির ক্ষেত্র তৈরি করে।

ক্যাটালানো ও হকিন্সের সামাজিক বিকাশ মডেল (Catalano and Hawkins’s Social Development Model)

তরুণদের মাদকাসক্তি এবং বিচ্যুত আচরণের গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই প্রখ্যাত গবেষক জে ডেভিড হকিন্স (J. David Hawkins) এবং রিচার্ড ক্যাটালানো (Richard Catalano) একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে হাজির হন (Hawkins et al., 1992)। তারা মানুষের বিকাশের ধারাবাহিকতাকে অপরাধবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্যের কাঠামোর সাথে যুক্ত করে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে প্রণয়ন করেন সামাজিক বিকাশ মডেল (Social Development Model) বা সংক্ষেপে এসডিএম (Catalano & Hawkins, 1996)। হকিন্স এবং ক্যাটালানো দেখতে পান যে মাদকাসক্তির ব্যাখ্যা কেবল অতীতে মানুষের কী ক্ষতি হয়েছে তা দিয়ে করলেই চলে না; দেখতে হয় ব্যক্তির বিকাশের বিভিন্ন বয়সে ঝুঁকি এবং সুরক্ষার উপাদানগুলো কীভাবে ভারসাম্য তৈরি করছে।

সামাজিক বিকাশ মডেলের মূল ভিত্তি প্রোথিত রয়েছে শিশুর সামাজিকীকরণের অভিজ্ঞতার ভেতরে। শৈশব থেকে কৈশোরে পদার্পণের সময় একজন ব্যক্তি পরিবার, স্কুল এবং সমাজের সাথে যে মিথস্ক্রিয়া তৈরি করে, তা তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে: সুযোগ, দক্ষতা এবং পুনর্বলন। একটি শিশুকে যদি পরিবার বা স্কুলে ভালো কাজ করার পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়, সেই কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার মতো দক্ষতা তার ভেতর গড়ে তোলা হয় এবং তার সাফল্যের জন্য যদি তাকে আন্তরিকভাবে পুরস্কৃত বা পুনর্বলিত করা হয়, তবে তার ভেতর সমাজের মূলধারার প্রতি গভীর টান তৈরি হয়। এই ইতিবাচক সংযোগকে হকিন্স ও ক্যাটালানো ‘সামাজিক বন্ধন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

কিন্তু বাস্তব জীবনে সবার বিকাশ এভাবে সরলরেখায় এগোয় না। অনেক শিশুর জীবনে ইতিবাচক সুযোগের চেয়ে ক্ষতিকর সুযোগ বেশি উপস্থিত থাকে। পরিবারে নিয়মিত কলহ, চরম দারিদ্র্য কিংবা পাড়ায় মাদকের খোলামেলা উপস্থিতি শিশুর সুরক্ষামূলক দেয়ালকে গুঁড়িয়ে দেয়। গবেষক জে ডেভিড হকিন্স (J. David Hawkins) এবং তার গবেষক দল আসক্তির সাথে জড়িত একাধিক ঝুঁকির উপাদান চিহ্নিত করেছিলেন, যার মধ্যে পারিবারিক মাদক ব্যবহারের ইতিহাস, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা এবং ক্ষতিকর বন্ধুমহল অন্যতম (Hawkins et al., 1992)। যখন ঝুঁকির উপাদানের পাল্লা সুরক্ষামূলক উপাদানের চেয়ে ভারী হয়ে যায়, তখন শিশুর ভেতর প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে বিচ্যুত আচরণের প্রতি আগ্রহ জন্মায়।

সামাজিক বিকাশ মডেলের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো এটি প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধের ওপর অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়। ক্যাটালানো ও হকিন্স দেখান যে কোনো তরুণের ভেতরে যদি প্রথাগত মূল্যবোধের প্রতি শক্তিশালী আনুগত্য তৈরি করা যায়, তবে বাহ্যিক প্রলোভন সত্ত্বেও সে মাদকের পথ এড়িয়ে চলতে পারে। মাদক নির্ভরতা তাই হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোনো আগাছা নয়; এটি হলো ব্যক্তির বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় সামাজিক পুষ্টির অভাব এবং পরিবেশগত বিষাক্ততার ফল। সুরক্ষার উপাদানগুলো যদি দুর্বল হয়, তবে সামান্যতম প্ররোচনাতেই ব্যক্তি মাদকের মতো ক্ষতিকর উপাদানের সাথে জড়িয়ে পড়ে নিজের বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দেয়।

জন লব ও রবার্ট স্যাম্পসনের জীবনধারা ও বিকাশমূলক গতিপথ (John Laub and Robert Sampson’s Life-Course and Developmental Pathways)

মানুষের জীবন কোনো স্থির চিত্র নয়, এটি সময়ের বহমান স্রোতের মতো পরিবর্তনশীল। মানুষ কৈশোরে যে ভুল করে, যৌবনে বা প্রৌঢ়ত্বে গিয়েও কি সে একই ভুল করে যাবে? এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমেরিকান অপরাধবিজ্ঞানী রবার্ট স্যাম্পসন (Robert J. Sampson) এবং জন লব (John Laub) অপরাধবিজ্ঞানের জগতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেন (Sampson & Laub, 1993)। তারা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শেলডন ও এলিনর গ্লুয়েকের বহু পুরোনো তথ্যভাণ্ডারকে আধুনিক পরিসংখ্যানের আলোয় নতুন করে বিশ্লেষণ করে গড়ে তোলেন জীবনধারা অপরাধবিজ্ঞান (Life-Course Criminology)। তাদের প্রণীত বয়স-বিন্যস্ত অনানুষ্ঠানিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ তত্ত্বে তারা দেখান যে অপরাধ ও আসক্তির যাত্রা ব্যক্তির সমগ্র জীবনব্যাপী ট্র্যাজেক্টরি এবং ট্রানজিশনের জটিল সমীকরণে রূপ নেয়।

স্যাম্পসন ও লবের তত্ত্বে ‘ট্র্যাজেক্টরি’ বলতে জীবনের দীর্ঘমেয়াদী ধারা বা গতিপথকে বোঝায়, যেমন কারও শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন বা ক্রমাগত অপরাধে লিপ্ত থাকার ধারা। অন্যদিকে ‘ট্রানজিশন’ হলো সেই দীর্ঘ যাত্রার ভেতরের সুনির্দিষ্ট কিছু তাৎক্ষণিক ঘটনা, যেমন প্রথম চাকরি পাওয়া, বিয়ে করা কিংবা সন্তান জন্ম নেওয়া। এই ট্রানজিশনগুলো যখন কোনো ব্যক্তির জীবনের ট্র্যাজেক্টরি বা মূল গতিপথকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়, তখন সেগুলোকে বলা হয় ‘মোড় ঘোরানো মুহূর্ত’ বা টার্নিং পয়েন্ট। মাদকাসক্তির ক্ষেত্রে এই টার্নিং পয়েন্টগুলো অসামান্য ভূমিকা পালন করে। বহু মানুষ কৈশোরে মারাত্মক মাদকাসক্ত হয়ে পড়লেও জীবনের পরবর্তী কোনো এক শুভ মোড়ে এসে মাদকের অন্ধকার থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

স্যাম্পসন ও লব তাদের পরবর্তী বিখ্যাত গবেষণামূলক বই শেয়ার্ড বিগিনিংস, ডাইভারজেন্ট লাইভস (Shared Beginnings, Divergent Lives)-এ তুলে ধরেন কীভাবে একসময়ের দাগী অপরাধী ও মাদকাসক্তরা বয়সের সাথে সাথে ভালো পথে ফিরে আসে (Laub & Sampson, 2003)। তারা দেখতে পান যে একটি স্থিতিশীল চাকরি, একজন যত্নশীল জীবনসঙ্গীর সাথে বিবাহবন্ধন কিংবা কোনো সুশৃঙ্খল সামাজিক পরিবেশ মানুষের জীবনে নতুন অনানুষ্ঠানিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনে। নতুন এই সামাজিক বন্ধনগুলো আসক্ত ব্যক্তির মনে এমন এক বোধ তৈরি করে যে এখন মাদক নিলে তার এই সুন্দর জীবন, পরিবার এবং সামাজিক সম্মান চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে। এই শুভ প্রাপ্তিগুলো ব্যক্তির ভেতর এক নতুন দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে, যা তাকে আসক্তি ত্যাগ করতে বাধ্য করে।

জীবনধারার এই দৃষ্টিকোণটি কোনো মানুষকে আজীবন আসক্ত বলে দেগে দেওয়ার বিরুদ্ধে শক্ত যুক্তি খাড়া করে। এটি দেখায় যে মানব চরিত্র পাথরে খোদাই করা কোনো অপরিবর্তনীয় বস্তু নয়। যদিও শৈশবের প্রতিকূলতা আসক্তির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, তবুও জীবনের যেকোনো বয়সে সঠিক সামাজিক সমর্থন এবং অর্থপূর্ণ সম্পর্কের আগমন ঘটলে মানুষ তার ধ্বংসাত্মক পথ থেকে ফিরে আসতে পারে। স্যাম্পসন ও লব মানুষের নিজস্ব স্বাধীন ইচ্ছা বা এজেন্সির গুরুত্বকেও স্বীকার করেছেন। ব্যক্তি কেবল পরিবেশের শিকার নয়, সে উপযুক্ত সুযোগ পেলে নিজের জীবনকে পুনর্গঠন করার ক্ষমতাও রাখে। মাদক নির্ভরতা তাই কোনো নিয়তিবাদী ফাঁদ নয়; জীবনের গতিপথের পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই আসক্তি থেকে চূড়ান্ত মুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়।

জনস্বাস্থ্য মডেল: হোস্ট, এজেন্ট ও পরিবেশের মিথস্ক্রিয়া (Public Health Model: Interaction of Host, Agent and Environment)

মাদকাসক্তিকে কেবল একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত অপরাধ বা আইন ভাঙার ঘটনা হিসেবে দেখলে সমস্যাটির বিশালতাকে সঠিকভাবে পরিমাপ করা যায় না। এই কারণে আধুনিক বিশ্বে মাদক নির্ভরতাকে বোঝার জন্য এপিডেমিওলজি বা মহামারীবিদ্যার জনস্বাস্থ্য মডেল (Public Health Model) একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। জনস্বাস্থ্যের ধ্রুপদী শিক্ষায় সংক্রামক ব্যাধি মোকাবেলার জন্য একটি বিখ্যাত ত্রিমুখী সমীকরণ ব্যবহার করা হয়, যা এজেন্ট-হোস্ট-পরিবেশ ত্রিভুজ (Agent-Host-Environment Triangle) নামে পরিচিত (Gordis, 2000)। মাদকাসক্তির ক্ষেত্রেও এই তিনটি উপাদানের অবিচ্ছেদ্য মিথস্ক্রিয়া নিখুঁতভাবে কাজ করে এবং মাদকের বিস্তারকে একটি সামাজিক মহামারীর মতো উপস্থাপন করে।

এই ত্রিমুখী কাঠামোর প্রথম উপাদানটি হলো ‘এজেন্ট’, যা এখানে মাদকদ্রব্য নিজে। সব মাদক কিন্তু সমান নয়; তাদের রাসায়নিক গঠন, তীব্রতা, রক্তে মেশার গতি এবং আসক্তি তৈরির ক্ষমতায় বড় ধরনের পার্থক্য থাকে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী টমাস বেবর (Thomas Babor) এবং তার সহকর্মীরা তাদের গবেষণায় মাদকের ফার্মাকোলজিক্যাল প্রভাবের ওপর বিশদ আলোকপাত করেন (Babor et al., 2010)। যেমন শিরায় নেওয়া হেরোইন বা ধোঁয়ার মাধ্যমে টানা মেথামফেটামিন যে গতিতে মস্তিষ্কের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে কাবু করে ফেলে, সাধারণ কোনো সিডেটিভ ওষুধ হয়তো সেভাবে করে না। এজেন্টের বিশুদ্ধতা, সহজলভ্যতা এবং এর বাজারমূল্য আসক্তির বিস্তারকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে। বাজারে মাদকের বিষাক্ত ভেজাল উপস্থিত থাকলে তা এজেন্টের ধ্বংসক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

দ্বিতীয় উপাদানটি হলো ‘হোস্ট’, অর্থাৎ মাদক গ্রহণকারী ব্যক্তি নিজে। হোস্টের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, তার বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক সুস্থতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং বংশগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে সে মাদকের আক্রমণে কতটা কাবু হবে। অল্প বয়সে কোনো হোস্ট যদি মাদকের সংস্পর্শে আসে, তবে তার অপরিণত স্নায়ুতন্ত্র খুব দ্রুত এজেন্টের কাছে পরাস্ত হয়। তৃতীয় উপাদানটি হলো ‘পরিবেশ’, যা হোস্ট এবং এজেন্টের মিলন ঘটাতে সাহায্য করে। এই পরিবেশের মধ্যে রয়েছে সামাজিক দারিদ্র্য, বেকারত্ব, আইনের প্রয়োগহীনতা, পারিবারিক অবহেলা এবং সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি। ব্রিটিশ আসক্তি গবেষক জন স্ট্র্যাং (John Strang) এবং তার দল দেখিয়েছেন যে পরিবেশ অনুকূল না হলে কেবল এজেন্টের উপস্থিতিতেই আসক্তি মহামারী হতে পারে না (Strang et al., 2012)।

জনস্বাস্থ্য মডেলের সবচেয়ে বৈপ্লবিক সাফল্য হলো এটি মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে কাঠগড়ায় না দাঁড় করিয়ে একজন অসুস্থ ‘হোস্ট’ হিসেবে বিবেচনা করে। কোনো এলাকায় কলেরা বা ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়লে যেমন রোগীদের শাস্তি না দিয়ে মশা নিধন এবং জলের বিশুদ্ধতার ওপর জোর দেওয়া হয়, মাদকের ক্ষেত্রেও তেমনি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। এই মডেলটিই আধুনিক বিশ্বে ক্ষতি হ্রাসকরণ বা হার্ম রিডাকশন নীতির ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। সুই-বিনিময় কর্মসূচি, মেথাডোন প্রতিস্থাপন থেরাপি এবং নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবার মতো উদ্যোগগুলো হোস্টের জীবন রক্ষা করার লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়। জনস্বাস্থ্যের এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি দেখায় যে মাদক নির্মূল করার জন্য পুলিশি অভিযানের চেয়ে পরিবেশের স্বাস্থ্যকর রূপান্তর এবং হোস্টের সামগ্রিক চিকিৎসা নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে ফলপ্রসূ পথ।

বহুমুখী সংশ্লেষণ ও ভবিষ্যতের সামগ্রিক নীতি (Multidimensional Synthesis and Future Integrated Policy)

মাদক নির্ভরতার মতো একটি বহুমাত্রিক সংকটকে যখন কোনো একটিমাত্র বিজ্ঞানের চশমা দিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়, তখনই সমাধানের সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যায়। জীববিজ্ঞান যেখানে নিউরোট্রান্সমিটার আর জিনের কথা বলে, মনোবিজ্ঞান সেখানে মানসিক ক্ষত আর অযৌক্তিক চিন্তাকে দায়ী করে, আর সমাজবিজ্ঞান আঙুল তোলে পরিবার, বন্ধু আর সামাজিক বৈষম্যের দিকে। তবে বিজ্ঞানের আধুনিক অগ্রগতি আমাদের বুঝতে শিখিয়েছে যে এই বিচ্ছিন্ন তত্ত্বগুলো একে অপরের শত্রু নয়; বরং এরা একই বিশাল হাতির বিভিন্ন অঙ্গ মাত্র। গবেষক ডেভিড নাট (David Nutt) এবং তার সহকর্মীরা বিভিন্ন মাদকের সামগ্রিক ক্ষতি পরিমাপ করতে গিয়ে প্রমাণ করেছেন যে ব্যক্তিগত শারীরিক ক্ষতির চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে মাদকের পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষতির পাল্লা অনেক বেশি ভারী হয় (Nutt et al., 2010)। তাই সমাধান খুঁজতে হলেও সমস্ত বিদ্যাচর্চাকে এক মঞ্চে এসে দাঁড়াতে হবে।

একটি সামগ্রিক তাত্ত্বিক সংশ্লেষণ স্পষ্ট করে দেয় যে আসক্তির সূচনা, স্থায়িত্ব এবং নিরাময়ের প্রতিটি ধাপে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ামক সক্রিয় থাকে। সূচনালগ্নে সমবয়সীদের চাপ, কৌতূহল এবং সামাজিক পরিবেশ প্রধান ভূমিকা রাখে। কিন্তু আসক্তি যখন ধীরে ধীরে দীর্ঘস্থায়ী রূপ ধারণ করে, তখন সামাজিক কারণগুলো পেছনে সরে গিয়ে স্নায়বিক প্লাস্টিসিটি, রিসেপ্টর ডাউন-রেগুলেশন এবং অ্যালোস্ট্যাটিক পরিবর্তনগুলো পুরো দেহ ও মনের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে নিরাময়ের সময়ে আবার ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তি, মনস্তাত্ত্বিক আত্ম-কার্যকারিতা এবং পারিবারিক পুনর্বাসনের মতো উপাদানগুলো মুখ্য হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানী ওয়েইন হল (Wayne Hall) এবং তার সহযোগীরা আসক্তির এই বহুমুখী গতিপ্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে সমন্বিত সমাজনীতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন (Hall et al., 2015)।

এই বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতের মাদকনীতির খোলনলচে বদলে ফেলা জরুরি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা বলপ্রয়োগ ও শাস্তিমূলক মাদকবিরোধী অভিযানগুলো প্রায় সব দেশেই চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে, কারণ তারা আসক্তির পেছনের মনস্তাত্ত্বিক ও জৈবিক সত্যকে অস্বীকার করেছিল। স্নায়ুবিজ্ঞানী নোরা ভলকো (Nora Volkow) এবং তার সহকর্মীরা জোর দিয়ে দেখিয়েছেন যে মাদকাসক্তিকে যখন একটি চিকিৎসাযোগ্য দীর্ঘমেয়াদী মস্তিষ্কের রোগ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তখনই কেবল সফল আরোগ্য সম্ভব (Volkow et al., 2016)। পর্তুগালের মতো কিছু দেশ ব্যক্তিগত মাদক ব্যবহারকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার আওতায় এনে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে আসক্ত ব্যক্তিকে কারাগারে নিক্ষেপ না করে তাকে মানসিক সহায়তা ও সামাজিক কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়াটাই বিজ্ঞানসম্মত পথ।

ভবিষ্যতের যেকোনো সফল কৌশলকে তাই জৈবিক চিকিৎসা, মনস্তাত্ত্বিক থেরাপি এবং সমাজতাত্ত্বিক সংস্কারের এক নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। শরীরে ওষুধের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপির মাধ্যমে ব্যক্তির চিন্তার ত্রুটি সংশোধন করতে হবে। একই সাথে পরিবার ও সমাজে তার জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে সে পুনরায় একা হয়ে না পড়ে। কোনো একটি মাত্র জাদুকরি দাওয়াই দিয়ে এই জটিল ব্যাধি নিরাময় করা অসম্ভব। মানুষের সমস্ত সত্তা – তার মস্তিষ্ক, তার মন এবং তার পারিপার্শ্বিক সমাজকে একসাথে বিবেচনায় এনে সমন্বিতভাবে লড়াই করলেই কেবল মাদক নির্ভরতার এই অন্ধকার জাল ছিন্ন করে সুস্থ জীবনের আলো ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

মাদক বাণিজ্যের ইতিহাস (History of the Drug Trade): চিকিৎসা থেকে বৈশ্বিক বাণিজ্য

প্রাচীন বিশ্বে ঔষধি মাদক (Medicinal Drugs in Ancient Greece and Egypt): চিকিৎসার ঐতিহ্য

নীল নদের তীরে ভেষজ ও চেতনানাশক: এবার্স প্যাপিরাসের সাক্ষ্য (Herbal and Anesthetic Drugs on the Nile: The Evidence of the Ebers Papyrus)

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসকদের কাজ সহজ ছিল না। রোগীকে সুস্থ করার জন্য তাদের নির্ভর করতে হতো নীল নদের পলিমাটিতে জন্মানো নানা ধরনের গাছগাছড়া আর দূরদেশ থেকে আসা রেজিনের ওপর। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১৫৫০ অব্দে লেখা এবার্স প্যাপিরাস (Ebers Papyrus) সেই যুগের চিকিৎসা ভাবনার চমৎকার এক লিখিত দলিল (Bryan, 1930)। প্রায় একশত দশটি কলামে লেখা এই দীর্ঘ নথিতে শত শত রোগের প্রতিকার আর আট শতাধিক প্রেসক্রিপশনের বিবরণ রয়েছে। সেখানে জাদু বা অলৌকিক বিশ্বাসের কিছু বয়ান থাকলেও, বাস্তব চিকিৎসার মূল ভরসা ছিল উদ্ভিজ্জ এবং খনিজ উপাদান। প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসক বা ‘সুনু’ (swnw) খুব ভালো করেই জানতেন যে মানুষের দেহের তীব্র যন্ত্রণা নিরাময়ে সাধারণ লতাপাতায় কাজ হয় না; তার জন্য দরকার এমন কিছু পদার্থ যা স্নায়ুকে অসাড় করতে পারে।

মিশরীয় চিকিৎসাপত্রে আফিম ও তার উৎস পপি গাছের স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। তারা পপি ফুলকে বলতেন ‘শেপেনেন’ (shepen)। এবার্স প্যাপিরাসে এই ভেষজটি শিশুদের অতিরিক্ত কান্না থামাতে এবং পেটের তীব্র যন্ত্রণা উপশমে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে (Worth Estes, 1989)। তবে ভেষজটি সরাসরি কাঁচা খাওয়ানো হতো না। চিকিৎসকরা শুকনো পপি ফল কিংবা তার আঠা নির্দিষ্ট পরিমাণে চূর্ণ করে বিয়ার, দ্রাক্ষারস বা নারীর দুধের সাথে মিশিয়ে রোগীকে দিতেন। দুধ বা অ্যালকোহল ব্যবহারের কারণ ছিল স্পষ্ট; মাদকটির সক্রিয় রাসায়নিক উপক্ষারগুলো জলে সহজে দ্রবীভূত হয় না, কিন্তু অ্যালকোহল বা চর্বিজাতীয় তরলে দ্রুত মিশে যায়। প্রাচীন মানুষ আধুনিক রসায়ন জানত না, কিন্তু বারবার প্রয়োগের মাধ্যমে তারা তরল দ্রাবকের এই ব্যবহারিক সত্যটুকু ঠিকই আবিষ্কার করেছিল।

পপি ছাড়াও মিশরের ভেষজ তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান জুড়ে ছিল ধুতুরা জাতীয় উদ্ভিদ হেনবেন বা হায়োসায়ামাস (Hyoscyamus) এবং ম্যানড্রেক বা ম্যানড্রাগোরা (Mandragora officinarum)। এগুলো ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ট্রোপেন অ্যালকালয়েড সমৃদ্ধ উদ্ভিদ। হেনবেনের ব্যবহার ছিল দাঁতের যন্ত্রণা এবং অস্থিসন্ধির ব্যথা দূর করার মলমে। শল্যচিকিৎসার সময় রোগীর চামড়া কাটার আগে এই উদ্ভিদের রস মাখিয়ে কিছুটা অসাড়তা তৈরি করা হতো, যার বিবরণ এডউইন স্মিথ প্যাপিরাস (Edwin Smith Papyrus)-এর বিভিন্ন আঘাত চিকিৎসার পরোক্ষ ধারায় স্পষ্ট হয় (Nunn, 1996)। তবে মিশরের চিকিৎসকরা জানতেন যে এই উদ্ভিদগুলোর মাত্রা সামান্য এদিক-ওদিক হলেই রোগী চিরতরে ঘুমিয়ে পড়তে পারে। তাই তারা খুব সতর্কতার সাথে মাত্রা বা ডোজ নির্ধারণ করতেন।

মিশরীয় সমাজের চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত শ্রেণীবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত। মন্দিরের সাথে যুক্ত চিকিৎসালয়গুলোতে ভেষজগুলো সংরক্ষণ করা হতো বিশেষ মাটির পাত্রে। মাদকজাতীয় উপাদানের অতিরিক্ত ব্যবহার বা সেবন যে মানুষকে বিভ্রান্তিকর ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয়, তা তাদের অজানা ছিল না। চিকিৎসাপত্রগুলোতে তাই এই পদার্থগুলোকে সাধারণ পথ্য হিসেবে নয়, বরং মারাত্মক শারীরিক বিপর্যয় ঠেকানোর জরুরি হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। রোগীর শরীরের জ্বর, রক্তপাত কিংবা গভীর ক্ষত সারাতে তারা যে ভেষজ তৈরি করতেন, তাতে চেতনানাশক উদ্ভিদের মিশ্রণ থাকত সামান্য। মূল লক্ষ্য ছিল রোগীকে যন্ত্রণামুক্ত রেখে দেহের প্রাকৃতিক নিরাময় প্রক্রিয়াকে কাজ করতে দেওয়া।

মিশরে আফিম ও সাইকোঅ্যাকটিভ উদ্ভিদের ব্যবহার: চিকিৎসাগত ও প্রায়োগিক বাস্তবতা (The Use of Opium and Psychoactive Plants in Egypt: Medical and Practical Realities)

নীল নদ উপত্যকায় উৎপাদিত আফিমের চেয়েও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বেশি পরিচিত ছিল সাইপ্রাস ও লেভান্ট থেকে আসা উচ্চমানের আফিম। প্রত্নতাত্ত্বিক রবার্ট মেরিলিস দেখিয়েছেন যে ব্রোঞ্জ যুগের শেষভাগে সাইপ্রাস থেকে মিশরে বিপুল পরিমাণ মাটির পাত্র আমদানি করা হতো, যেগুলোর নকশা দেখতে ছিল ঠিক উল্টো করে রাখা পপি ফুলের ফলের মতো (Merrillees, 1962)। এই পাত্রগুলোকে বলা হয় বেস-রিং জগলেট। রাসায়নিক বিশ্লেষণে এসব পাত্রের গায়ে আফিমের অ্যালকালয়েডের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে (Koschel, 1996)। প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত সবচেয়ে দামি ও কার্যকর মাদকটির নিয়মিত বাণিজ্যিক সরবরাহ ছিল, এই আবিষ্কার সেই অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে ইতিহাসের সামনে নিয়ে আসে।

মিশরে আফিমের আরেকটি প্রধান ব্যবহার ছিল বেদনানাশক হিসেবে। যুদ্ধক্ষেত্রের আঘাত, অস্ত্রোপচার এবং তীব্র টিউমারের যন্ত্রণায় রোগীকে আফিম ভেজানো ওয়াইন পান করানো হতো। তবে আফিমের বাইরেও আরেকটি উদ্ভিদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায় মিশরীয় শিল্প ও চিকিৎসা বর্ণনায়; সেটা হলো নীল পদ্ম বা নিম্ফিয়া সিরুলিয়া (Nymphaea caerulea)। প্রাচীন দেয়ালচিত্রগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় অভিজাত নারী ও পুরুষরা এই পদ্মের গন্ধ নিচ্ছেন বা তা পাত্রের ভেতর চুবিয়ে রাখছেন। রসায়নবিদরা পরীক্ষা করে দেখেছেন যে এই পদ্মে রয়েছে অ্যাপোমোরফিন ও নুসিফেরিনের মতো অ্যালকালয়েড, যা স্নায়ুকে শান্ত করে এবং এক ধরনের মৃদু সুখকর অনুভূতি তৈরি করে (Bisset, 1991)। চিকিৎসকরা অনিদ্রা এবং মানসিক উদ্বেগ দূর করতে পদ্মের পাপড়ি অ্যালকোহলে ভিজিয়ে রোগীকে খেতে দিতেন।

গাঁজা বা ক্যানাবিসের ব্যবহারও প্রাচীন মিশরে একেবারে অজানা ছিল না। প্যাপিরাসগুলোতে ‘শেমশেমত’ (shemshemet) নামের একটি উদ্ভিদের উল্লেখ রয়েছে, যা গবেষকরা ক্যানাবিস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এবার্স প্যাপিরাসের একটি সূত্রে চোখের প্রদাহ এবং প্রসববেদনা কমানোর জন্য এই উদ্ভিদের রস বাহ্যিকভাবে প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (Russo, 2007)। নারীদের প্রসবকালে জরায়ুর তীব্র সংকোচন ও অসহ্য যন্ত্রণা লাঘব করতে যোনিপথে ক্যানাবিস ও মধুর মিশ্রণে তৈরি পটি ব্যবহার করা হতো। অভ্যন্তরীণভাবে ধূমপান করার চেয়ে প্রাচীন চিকিৎসকরা এই ধরনের উদ্ভিদের বাহ্যিক বা মলম জাতীয় প্রয়োগকেই বেশি নিরাপদ মনে করতেন।

প্রাচীন মিশরীয়দের চিকিৎসা দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বস্তুমুখী পর্যবেক্ষণের ওপর দাঁড়িয়ে। সেখানে অতিপ্রাকৃতিক ব্যাখ্যা বা দেবদেবীর আরাধনার প্রচলন থাকলেও, ঔষধ প্রয়োগের ক্ষেত্রে তারা মানুষের জৈবিক প্রতিক্রিয়ার ওপর নজর রাখতেন। যখন আফিম দেওয়া হতো, তখন রোগীর নাড়ির গতি কমে যাওয়া, শ্বাসপ্রশ্বাস ধীর হওয়া এবং চোখের মণি সংকুচিত হওয়ার লক্ষণগুলো তারা খাতায় লিখে রাখতেন। মাদক সেবনের ফলে মানুষের চেতনা যে আচ্ছন্ন হয়, তাকে তারা কোনো অলৌকিক শক্তি হিসেবে দেখতেন না। শরীরের ভেতরে তরল পদার্থের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণেই এমন পরিবর্তন ঘটে, তাদের ব্যাখ্যা ছিল এরকম। এই প্রায়োগিক জ্ঞানই পরবর্তীতে ক্রীট দ্বীপ হয়ে প্রবেশ করেছিল প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার আঙিনায়।

গ্রিক ভেষজবিদ্যার উত্থান: হিপোক্রেটিস ও হিউমোরাল তত্ত্বের বস্তুবাদী ভিত্তি (The Rise of Greek Herbology: Hippocrates and the Material Foundations of Humoral Theory)

গ্রিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস এক বিরাট বাঁক নেয় যখন রোগব্যাধিকে দেবতাদের অভিশাপ ভাবার বদলে প্রাকৃতিক কারণ হিসেবে খোঁজা শুরু হয়। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন হিপোক্রেটিস (Hippocrates) এবং তার শিষ্যদের রচিত চিকিৎসাসমগ্র। রোগকে দৈব শাস্তি মনে করার প্রচলিত সংস্কার নাকচ করে তারা প্রতিষ্ঠা করেন হিউমোরাল তত্ত্ব (Humoral Theory)। এই মতবাদ অনুসারে মানবদেহ চারটি মৌলিক রস বা হিউমার দ্বারা পরিচালিত: রক্ত, শ্লেষ্মা, হলুদ পিত্ত এবং কৃষ্ণ পিত্ত (Jouanna, 1999)। শরীরে এই চার তরলের ভারসাম্য নষ্ট হলেই মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। ফলে গ্রিক চিকিৎসায় ঔষধি মাদকের কাজ ছিল শরীরে কৃত্রিম কোনো জাদু তৈরি করা নয়, বরং বিষম তরলকে বের করে দিয়ে বা শান্ত করে সমতা ফিরিয়ে আনা।

গ্রিক ভাষায় ওষুধের মূল প্রতিশব্দ ছিল ফার্মাকন (Pharmakon)। শব্দটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক, কারণ এর একই সাথে দুটি বিপরীত অর্থ রয়েছে: প্রতিষেধক এবং বিষ। প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসকরা জানতেন যে কোনো পদার্থই জন্মগতভাবে ভালো বা খারাপ নয়; তার গুণাগুণ নির্ভর করে প্রয়োগের মাত্রা এবং শরীরের অবস্থার ওপর (Nutton, 2004)। যে ভেষজ কম মাত্রায় রোগীকে নিরাময় দেয়, সেই একই ভেষজ অতিরিক্ত মাত্রায় জীবন কেড়ে নিতে পারে। এই দ্বিমুখী ধারণাই গ্রিক ফার্মাকোলজির ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। আফিম, হেমলক কিংবা ব্ল্যাক হেলেবোর ব্যবহারের ক্ষেত্রে তারা তাই চরম সতর্কতার নীতি অনুসরণ করতেন।

হিপোক্রেটিক সংকলনে আফিমকে ডাকা হয়েছে ‘মেকোনিয়ন’ (mekonion) নামে। এটি তীব্র বেদনানাশক এবং নিদ্রাকর্ষক হিসেবে ব্যবহৃত হতো, বিশেষ করে নারীদের জটিল স্ত্রীরোগ ও তীব্র অভ্যন্তরীণ প্রদাহের ক্ষেত্রে (Scarborough, 1982)। কিন্তু হিপোক্রেটিস অতিরিক্ত মাদক ব্যবহারের পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন শরীরকে অতিরিক্ত অসাড় করে দিলে তার স্বাভাবিক নিরাময় ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়। এর বদলে তিনি মৃদু মাত্রার সিডেটিভ বা প্রশান্তিদায়ক উদ্ভিদের পক্ষে মত দেন। তীব্র মানসিক ভারসাম্যহীনতা বা প্রলাপ বকার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতো সাদা ও কালো হেলেবোর। এই গাছ দুটি খেলে প্রচণ্ড বমি এবং রেচন ঘটত, যার মাধ্যমে শরীর থেকে অতিরিক্ত কৃষ্ণ পিত্ত বা ব্ল্যাক বাইল নিষ্কাশিত হতো বলে তারা বিশ্বাস করতেন।

চিকিৎসার এই বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি চিকিৎসকের ভূমিকাকে পুরোহিতের স্তর থেকে নামিয়ে একজন সতর্ক পর্যবেক্ষকের স্তরে রূপান্তর করে। হিপোক্রেটিস রোগীর মুখের ভাব, ত্বকের রং, প্রস্রাবের ঘনত্ব এবং নাড়ির স্পন্দন দেখে ওষুধের মাত্রা ঠিক করতেন (Lloyd, 1979)। কোনো ওষুধ প্রয়োগের পর রোগীর শরীরে মাদকটির কী ধরনের বিষাক্ত প্রভাব পড়ছে, তা লিখে রাখার নিয়ম তারা চালু করেন। ঔষধের ক্রিয়া মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর কীভাবে প্রতিফলিত হয়, গ্রিক চিকিৎসকরা সেই রহস্যের বৈজ্ঞানিক সমাধান খোঁজার সূচনা করেছিলেন কোনো ধরনের আধ্যাত্মিক ধোঁয়াশা ছাড়াই।

উদ্ভিদের শ্রেণিবিন্যাস ও ভেষজবিজ্ঞান: থিওফ্রাস্টাসের পর্যবেক্ষণ (Classification of Plants and Pharmacology: The Observations of Theophrastus)

হিপোক্রেটিসের পর উদ্ভিদ ও মাদকের বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন অ্যারিস্টটলের প্রধান শিষ্য থিওফ্রাস্টাস (Theophrastus)। তাকে উদ্ভিদ্বিজ্ঞানের জনক বলা হয়। তার লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ হিস্টোরিয়া প্লান্টারাম (Historia Plantarum) বা উদ্ভিদের ইতিহাস প্রাচীন চিকিৎসাজগতের এক অমূল্য সম্পদ (Hort, 1916)। থিওফ্রাস্টাস কেবল বাগানের গাছপালা দেখে সন্তুষ্ট হননি। তিনি ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন তৎকালীন পেশাদার শিকড়-সংগ্রাহক বা রাইজোটোমোই (Rhizotomoi) এবং ওষুধ-বিক্রেতা বা ফার্মাকোপোলাই (Pharmakopolai)-দের কাছ থেকে। মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহের এই পদ্ধতি প্রাচীন বিজ্ঞানে বেশ বিরল ছিল।

থিওফ্রাস্টাস তার বইতে পপি গাছের আঠা বা আফিম সংগ্রহের নিখুঁত পদ্ধতির বিশদ বিবরণ দেন। তিনি জানান যে কাঁচা ফলের খোসা হালকাভাবে কেটে দিলে যে সাদা দুধের মতো রস বের হয়, তা রোদে শুকিয়ে গাঢ় বাদামি হয়ে জমাট বাঁধে, আর সেটাই হলো সবচেয়ে শক্তিশালী ওষুধ (Scarborough, 1977)। তিনি মেকোন বা পপির বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেন। কোনটি বুনো পপি আর কোনটি চাষ করা হয়, তাদের কার্যক্ষমতা কেমন, সেগুলোর তুলনামূলক তালিকা তিনি তৈরি করেছিলেন। মাদকের কার্যকারিতা যে উদ্ভিদের পরিপক্বতা এবং সংগ্রহের ঋতুর ওপর নির্ভর করে, এই শারীরবৃত্তীয় সত্যটি তিনিই প্রথম লিখিতভাবে তুলে ধরেন।

মাদকাসক্তি এবং সহনশীলতা বা টলারেন্সের ধারণাটিও থিওফ্রাস্টাসের পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছিল। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে কোনো ব্যক্তি যদি দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত বিষাক্ত বা মাদকজাতীয় ভেষজ গ্রহণ করে, তবে একসময় তার শরীরে সেই পদার্থের কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়। তিনি উদাহরণ দিয়েছিলেন যে একজন সাধারণ মানুষের জন্য যে পরিমাণ ম্যানড্রেক বা অ্যাকোনাইট মারাত্মক হতে পারে, দীর্ঘদিনের অভ্যস্ত কোনো সংগ্রাহক তার চেয়ে বহুগুণ বেশি গ্রহণ করেও সুস্থ থাকতে পারেন (Preus, 1988)। মানবদেহের এই অভিযোজন ক্ষমতা এবং ওষুধের প্রতি নির্ভরতা গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি থিওফ্রাস্টাস লক্ষ্য করেছিলেন অত্যন্ত নির্লিপ্ত বৈজ্ঞানিক চোখ দিয়ে।

ম্যানড্রেক বা আলরাউন উদ্ভিদের চেতনানাশক ক্ষমতা নিয়েও থিওফ্রাস্টাস বিস্তারিত আলোচনা করেন। এই উদ্ভিদের মূলে থাকা স্কোপোলামিন এবং অ্যাট্রোপিন কীভাবে গভীর ঘুম ও অসাড়তা এনে দেয়, তা তিনি বর্ণনা করেছিলেন। তবে শিকড় তোলার সময় যেসব কুসংস্কার প্রচলিত ছিল – যেমন নির্দিষ্ট দিকে মুখ করে দাঁড়ানো বা তলোয়ার দিয়ে মাটিতে দাগ কাটা – সেগুলোকে তিনি লোকবিশ্বাস হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে ওষুধের ক্রিয়া উদ্ভিদের অন্তর্নিহিত উপাদানের ওপর নির্ভর করে, কোনো আচার বা মন্ত্রের ওপর নয়। বাস্তবমুখী এই পর্যবেক্ষণ গ্রিক ভেষজবিজ্ঞানকে কুসংস্কারের হাত থেকে মুক্ত করে পরীক্ষামূলক জ্ঞানের পথে বহু দূর এগিয়ে নিয়েছিল।

রোমান যুগের গ্রিক সংকলন: ডায়োস্কোরাইডিসের মেটেরিয়া মেডিকা ও গ্যালেনের প্রভাব (Greek Compendia in the Roman Era: Dioscorides’ Materia Medica and Galen’s Influence)

রোমান সাম্রাজ্যের সময় গ্রিক চিকিৎসা ঐতিহ্য আরও সংহত রূপ ধারণ করে দুই মহান চিকিৎসকের হাত ধরে। তাদের একজন হলেন সিলিসিয়ার অধিবাসী পেডানিয়াস ডায়োস্কোরাইডিস (Pedanius Dioscorides)। রোমান সেনাবাহিনীর চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার সুবাদে তিনি পুরো সাম্রাজ্য চষে বেড়িয়েছিলেন। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে তিনি রচনা করেন পাঁচ খণ্ডের সুবিশাল বিশ্বকোষ ডি মেটেরিয়া মেডিকা (De Materia Medica) (Riddle, 1985)। এই গ্রন্থে প্রায় ছয়শত ভেষজ উদ্ভিদের সনাক্তকরণ, সংগ্রহ পদ্ধতি, রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া এবং চিকিৎসার বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে। পরবর্তী দেড় হাজার বছর ধরে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের চিকিৎসাবিজ্ঞানে বইটি প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হতো।

ডায়োস্কোরাইডিস আফিমের দুটি রূপের মধ্যে সুস্পষ্ট প্রযুক্তিগত পার্থক্য নির্ধারণ করেছিলেন। তিনি পপির ফল কেটে সংগৃহীত রসকে বলতেন ‘ওপোস’ (opos), যা ছিল সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও তীব্র মাদক। অন্যদিকে পুরো গাছ ও পাতা থেঁতলে তৈরি করা নির্জাসকে তিনি বলতেন ‘মেকোনিয়ন’ (mekonion), যা তুলনামূলকভাবে দুর্বল ও সস্তা ছিল (Scarborough & Nutton, 1982)। শল্যচিকিৎসার সময় ব্যথানাশক হিসেবে তিনি ওয়াইনের সাথে ম্যানড্রেক মূল সেদ্ধ করে প্রস্তুত এক ধরনের তরল ব্যবহারের নির্দেশ দেন। রোগীর চেতনা সাময়িকভাবে লোপ করার এই প্রক্রিয়াটিকে তিনি নাম দিয়েছিলেন ‘অ্যানেস্থেসিয়া’ (anaesthesia)। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে চেতনা বিলোপের ধারণার মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল এই গ্রিক চিকিৎসকের হাত দিয়েই।

দ্বিতীয় শতকে আবির্ভূত হন গ্রিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের আরেক দিকপাল গ্যালেন (Galen)। পারগামামে জন্ম নেওয়া এই চিকিৎসক রোমের গ্ল্যাডিয়েটরদের ক্ষত নিরাময়ের দায়িত্বে ছিলেন এবং পরবর্তীতে সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের ব্যক্তিগত চিকিৎসক হন। গ্যালেন বিশ্বাস করতেন জটিল শারীরিক বিপর্যয় ঠেকাতে একক ভেষজের চেয়ে বহু উপাদানের মিশ্রণ বেশি কার্যকর। এই চিন্তা থেকেই তিনি ব্যাপকভাবে তৈরি করতে শুরু করেন জটিল ঔষধ যৌগ, যার শীর্ষ নিদর্শন ছিল থেরিয়াক (Theriac) (Boudon-Millot, 2012)। থেরিয়াক মূলত সব ধরনের বিষের মহৌষধ হিসেবে তৈরি করা হলেও এর প্রধান এবং সক্রিয় উপাদান ছিল উচ্চমাত্রার আফিম।

থেরিয়াকের চিকিৎসাগত গুরুত্ব এতই বেড়ে গিয়েছিল যে রোমান অভিজাত ও সম্রাটরা প্রতিদিন সকালে এটি নিয়মিত সেবন করতেন বিষপ্রয়োগের ভয় দূর করতে এবং মানসিক স্থৈর্য বজায় রাখতে। ইতিহাসবিদরা লক্ষ্য করেছেন যে সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস নিজেই এই ওষুধের প্রতি শারীরিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন, কারণ আফিম ছাড়া তার ঘুম হতো না এবং পেটের ব্যথায় কষ্ট পেতেন (Africa, 1961)। গ্যালেন অবশ্য মাদক নির্ভরতাকে চিকিৎসাগত উপযোগিতার একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখেছিলেন। তিনি আফিমকে শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী আমাশয় এবং অনিদ্রার অন্যতম প্রধান ওষুধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলে প্রাচীন বিশ্বে চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে আফিমের একটি সর্বজনীন চিকিৎসাগত চাহিদা তৈরি হয়।

প্রাচীন সমাজ ও নিয়ন্ত্রণের রূপরেখা: আসক্তি, বিষবিজ্ঞান ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া (Ancient Society and Regulation: Addiction, Toxicology, and Social Reactions)

প্রাচীন গ্রিস এবং রোমে বর্তমান যুগের মতো মাদক নিষিদ্ধকরণের কোনো আইনগত কাঠামো ছিল না। রাষ্ট্র আফিম বা ক্যানাবিসের ব্যবসা বন্ধ করতে পুলিশ পাঠাত না, কিংবা এগুলোকে সমাজের জন্য ক্ষতিকর কোনো অপরাধমূলক পণ্য হিসেবেও দেখা হতো না (Rinella, 2010)। আফিম, ওয়াইন এবং বিভিন্ন ভেষজ শিকড় খোলা বাজারে বিক্রি হতো সাধারণ পণ্যের মতোই। শহরের বাজারে ‘ফার্মাকোপোলাই’রা তাদের পসরা সাজিয়ে বসত এবং যে কেউ নিজের প্রয়োজনমতো ব্যথা কমাতে বা ঘুমানোর জন্য এগুলো কিনতে পারত। মাদকের ব্যবহার মূলত নিয়ন্ত্রিত হতো চিকিৎসকের ব্যক্তিগত নীতিবোধ এবং পরিবারের অভ্যন্তরীণ রীতিনীতির দ্বারা।

রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞার বদলে সমাজে কাজ করত বিষের ভয় এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি। ভেষজ মাদকগুলোর বেশিরভাগই অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করলে নিশ্চিত মৃত্যু ঘটত। রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য বিষাক্ত ড্রাগের ব্যবহার ছিল অতি পরিচিত ঘটনা। পন্টাসের রাজা ষষ্ঠ মিথ্রিডেটিস বিষের ভয়ে এতই আতঙ্কিত ছিলেন যে তিনি প্রতিদিন সামান্য মাত্রায় বিভিন্ন প্রাণঘাতী ভেষজ গ্রহণ করতেন যাতে তার শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। এই পদ্ধতিকে পরবর্তীতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নাম দেওয়া হয় মিথ্রিডাটিজম (Mithridatism) (Mayor, 2003)। রাষ্ট্রীয় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রেও উদ্ভিজ্জ মাদকের ওপর নির্ভর করা হতো, যার সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯ অব্দে দার্শনিক সক্রেটিসকে হেমলক বা কোনিয়াম ম্যাকুলেটাম (Conium maculatum)-এর বিষাক্ত রস পান করিয়ে হত্যা করা।

চিকিৎসকদের নৈতিক দায়িত্বের ধারণাটি এই অনিয়ন্ত্রিত যুগে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিখ্যাত হিপোক্রেটিক শপথে চিকিৎসকরা অঙ্গীকার করতেন যে তারা কোনো রোগীকে স্বেচ্ছায় কোনো মারাত্মক বা প্রাণঘাতী ওষুধ দেবেন না, এমনকি রোগী নিজে অনুরোধ করলেও নয় (Temkin, 1991)। এই অঙ্গীকার থেকে বোঝা যায় যে সমাজে শক্তিশালী চেতনানাশক ও বিষাক্ত পদার্থ দিয়ে গোপনে মানুষ হত্যার চল ছিল এবং চিকিৎসকদের ওপর সেই অপব্যবহার ঠেকানোর একটি নৈতিক চাপ থাকত। চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং বিষবিজ্ঞানের সীমানা তখন ছিল খুব কাছাকাছি। চিকিৎসকের একটি ভুল সিদ্ধান্তের কারণে রোগীর মৃত্যু ঘটলে চিকিৎসককে চরম সামাজিক নিন্দার মুখে পড়তে হতো।

প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সমাজে আসক্তিকে একটি স্বাধীন সামাজিক ব্যাধি বা আইনগত অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি, কিন্তু অতিরিক্ত সেবনের শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি চিকিৎসকদের নজর এড়ায়নি। তারা লক্ষ্য করেছিলেন যে যারা নিয়মিত থেরিয়াক বা আফিম গ্রহণ করে, তাদের কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয় এবং ওষুধ বন্ধ করলে শরীরে তীব্র কাঁপুনি ও যন্ত্রণা শুরু হয় (Touwaide, 1998)। তবে এই পরিবর্তনগুলোকে তারা ব্যক্তির নৈতিক অধঃপতন হিসেবে দেখার বদলে শরীরের হিউমার বা তরলের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার জৈবিক ফলাফল হিসেবেই মূল্যায়ন করতেন। প্রাচীন বিশ্বের এই চিকিৎসা ঐতিহ্য এভাবেই জাদুবিদ্যা আর ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে শরীরকে আলাদা করে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদানের রসায়ন দিয়ে মানুষের যন্ত্রণা নিরাময়ের এক দীর্ঘ যাত্রার সূচনা করেছিল।

আরব বণিক ও মাদক বাণিজ্য (Arab Traders and Drug Commerce): বাণিজ্যিক বিস্তার

মধ্যযুগীয় বাণিজ্যের বিস্তার: ভূমধ্যসাগর থেকে ভারত মহাসাগর (Expansion of Medieval Trade: From the Mediterranean to the Indian Ocean)

সপ্তম শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক অবস্থান বৈশ্বিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। আরব নাবিক ও সওদাগররা প্রাচীন রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের বাণিজ্যিক পথগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নতুন এক সামুদ্রিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগর থেকে শুরু করে ওমান উপসাগর পেরিয়ে তাদের কাঠের তৈরি পালতোলা জাহাজ বা ‘ধোউ’ (dhow) পৌঁছে যেত ভারতের মালাবার উপকূলে। ইতিহাসবিদ জর্জ হোরানি (George Hourani) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে মৌসুমী বায়ুর দিক পরিবর্তনের ছন্দকে কাজে লাগিয়ে এই নাবিকরা বছরের নির্দিষ্ট সময়ে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা সম্পন্ন করতেন (Hourani, 1995)। এই সামুদ্রিক যোগাযোগ কেবল মসলা বা রেশম পরিবহনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; সেখানে অন্যতম প্রধান মূল্যবান পণ্য হয়ে উঠেছিল বিভিন্ন ধরনের ভেষজ, সুগন্ধি রেজিন এবং চেতনানাশক মাদক।

10.3: East-West Interactions in the Early Middle Ages - Humanities LibreTexts
মধ্যযুগীয় ভারত মহাসাগরের সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ ও মৌসুমি বায়ুর প্রভাব। আরব উপদ্বীপ, পারস্য উপসাগর, পূর্ব আফ্রিকা, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বন্দরগুলোর মধ্যে বিস্তৃত বাণিজ্যিক যোগাযোগের মানচিত্র। মৌসুমি বায়ুর ঋতুভিত্তিক দিক পরিবর্তন দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার সময়সূচি ও নৌপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

আরব বণিকদের হাত ধরে যে আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, সমাজবিজ্ঞানী জ্যানেট আবু-লুগোদ (Janet Abu-Lughod) তাকে ত্রয়োদশ শতকের ইউরোপ-পূর্ব বিশ্ব-ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Abu-Lughod, 1989)। এই ব্যবস্থায় মধ্যপ্রাচ্য ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধন। আলেকজান্দ্রিয়া ও কায়রো থেকে শুরু করে হরমুজ ও বসরা হয়ে বাণিজ্যিক পথগুলো যুক্ত হয়েছিল মালাক্কার প্রণালী এবং চীনের ক্যান্টন বা গুয়াংঝু বন্দরের সাথে। এই দীর্ঘ জলপথে সাধারণ খাদ্যশস্য বা কম দামি পণ্য পরিবহন করে মুনাফা করা কঠিন ছিল। দীর্ঘ যাত্রার বিপুল খরচ এবং সমুদ্রের ঝুঁকি পুষিয়ে নিতে বণিকরা এমন পণ্য বেছে নিতেন যা ওজনে হালকা কিন্তু বাজারে যার মূল্য আকাশছোঁয়া। ঔষধি মাদক, প্রক্রিয়াজাত আফিম, কর্পূর এবং সুগন্ধি নির্যাস ছিল এই বাণিজ্যিক সমীকরণের নিখুঁত উদাহরণ।

ভারত মহাসাগরের এই বাণিজ্য জালে যুক্ত ছিল বহু সংস্কৃতির বন্দর শহর। ইতিহাসবিদ আন্দ্রে উইঙ্ক (André Wink) উল্লেখ করেন যে সিন্ধু, গুজরাট এবং মালাবারের বন্দরগুলোতে আরব বণিকরা স্থায়ী বসতি বা বাণিজ্য কুঠি গড়ে তুলেছিল (Wink, 1990)। এসব অঞ্চলে তারা মধ্যপ্রাচ্যের প্রক্রিয়াজাত ওষুধ ও রেজিন বিক্রি করত এবং বিনিময়ে সংগ্রহ করত স্থানীয় মসলা, সুপারি এবং ভেষজ উপাদান। এই পণ্য আদান-প্রদান মধ্যযুগের অর্থনীতিকে এক গভীর রূপান্তর এনে দেয়। ওষুধ ও মাদক কেবল স্থানীয় নিরাময়কারীর বনের গাছগাছড়া সংগ্রহের বিষয় রইল না; এগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে কেনাবেচা হওয়া উচ্চমূল্যের পণ্যে পরিণত হলো।

আরব বণিকদের এই বাণিজ্যিক তৎপরতার পেছনে কোনো সামরিক দখলদারিত্বের একক উদ্দেশ্য কাজ করেনি। তাদের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল বাণিজ্যিক মুনাফা এবং আন্তর্জাতিক পণ্যের চাহিদার সমন্বয়। মরুময় ভূখণ্ড আর উত্তাল সমুদ্রের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা এই বণিক গোষ্ঠী জানত কোন বন্দরে কোন পদার্থের তীব্র অভাব রয়েছে। তারা দূরদেশের দুর্লভ উদ্ভিদজাত মাদক সংগ্রহ করে এমন সব বাজারে পৌঁছে দিত যেখানে চিকিৎসকরা জটিল রোগের উপশমে সেই উপাদানগুলোর জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতেন। বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের এই প্রসার বৈশ্বিক অর্থনীতির ভরকেন্দ্রকে দীর্ঘ কয়েক শতকের জন্য আরব সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল করে রেখেছিল।

আরব ফার্মাকোপিয়ার রূপান্তর: গ্রিক জ্ঞানের আত্মীকরণ ও নতুন উদ্ভিদের সংযোজন (Transformation of the Arab Pharmacopoeia: Assimilation of Greek Knowledge and Addition of New Botanicals)

অষ্টম শতকে বাগদাদে আব্বাসীয় খেলাফতের আমলে শুরু হওয়া অনুবাদ আন্দোলন বা ট্রান্সলেশন মুভমেন্ট মধ্যযুগীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। গ্রিক পণ্ডিত ডায়োস্কোরাইডিস ও গ্যালেনের ধ্রুপদী চিকিৎসা গ্রন্থগুলো সিরিয়াক হয়ে আরবিতে অনূদিত হতে শুরু করে। তবে আরব চিকিৎসকরা প্রাচীন গ্রিক তত্ত্বকে অন্ধভাবে গ্রহণ করেননি। ইতিহাসবিদ মাইকেল ডোলস (Michael Dols) দেখিয়েছেন যে গ্রিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের বস্তুবাদী ভিত্তি ধরে রেখেই তারা ভারতীয়, পারসিক ও চীনা চিকিৎসা ঐতিহ্য থেকে শত শত নতুন উদ্ভিজ্জ উপাদানের সংযোজন ঘটান (Dols, 1984)। ফলে প্রাচীন গ্রিক ভেষজবিদ্যা রূপ নেয় এক বিশাল ও বৈচিত্র্যময় মধ্যযুগীয় ফার্মাকোপিয়ায়।

এই জ্ঞানতাত্ত্বিক রূপান্তরের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব ছিলেন পারস্যের বহুবিদ্যাবিশারদ ইবনে সিনা (Ibn Sina)। তার বিশ্বখ্যাত চিকিৎসাকোষ আল-কানুন ফি আল-তিব্ব (The Canon of Medicine)-এ তিনি শত শত ভেষজ পদার্থের ভৌত বৈশিষ্ট্য, মাত্রা এবং স্নায়ুতন্ত্রের ওপর তাদের প্রতিক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ দেন (Ibn Sina, 1999)। ইবনে সিনা আফিমকে অত্যন্ত শক্তিশালী বেদনানাশক হিসেবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি সতর্ক করেছিলেন যে এর অতিরিক্ত প্রয়োগ রোগীর শ্বাসযন্ত্রের ক্রিয়া স্তব্ধ করে দিতে পারে। তিনি মাদক ও বিষের ক্রিয়াকে শরীরের তাপ ও আর্দ্রতার পরিবর্তনের সাপেক্ষে বিশ্লেষণ করেছিলেন। মধ্যযুগীয় চিকিৎসায় এই বিশ্লেষণ ছিল সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং পর্যবেক্ষণভিত্তিক, যেখানে কোনো অতিলৌকিক ব্যাখ্যার স্থান ছিল না।

ভেষজ বিজ্ঞানের ব্যবহারিক দিকটিকে সবচেয়ে সুসংহত রূপ দিয়েছিলেন বিজ্ঞানী আল-বিরুনি (Al-Biruni)। তার রচিত আকর গ্রন্থ কিতাব আল-সায়দানা ফি আল-তিব্ব (Kitab al-Saydanah fi al-Tibb) বা ভেষজবিদ্যার বইতে তিনি এগারো শতাধিক ওষুধের নাম, উৎস এবং তাদের বাণিজ্যিক নামাবলি লিপিবদ্ধ করেন (Al-Biruni, 1973)। বিরুনি লক্ষ্য করেছিলেন যে এক অঞ্চলের উদ্ভিদ অন্য অঞ্চলে ভিন্ন নামে পরিচিত হওয়ায় বাজারে প্রতারণার সুযোগ থাকে। তাই তিনি আরবি, গ্রিক, ফারসি, সিরিয়াক এবং সংস্কৃত ভাষার প্রতিশব্দ পাশাপাশি সাজিয়ে ভেষজের এক প্রামাণ্য অভিধান তৈরি করেন। ঔষধি মাদকের বাণিজ্যিক বিস্তারকে বিজ্ঞানসম্মত কাঠামোর মধ্যে ধরে রাখার এই উদ্যোগ ছিল তৎকালীন বিশ্বে একেবারেই অগ্রগামী।

আরব চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ সামি হামারনেহ (Sami Hamarneh) দেখিয়েছেন যে এই যুগে ফার্মেসি বা ‘সায়দানাহ’ একটি স্বতন্ত্র পেশা হিসেবে রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে আসে (Hamarneh, 1962)। বাগদাদ ও দামেস্কের মতো বড় শহরগুলোতে ওষুধের দোকান পরিদর্শনের জন্য ‘মুহতাসিব’ বা বাজার পরিদর্শক নিযুক্ত করা হতো। পরিদর্শকরা পরীক্ষা করে দেখতেন যে বণিকরা আফিম, কর্পূর বা জাফরানে ভেজাল দিচ্ছে কি না। জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়া, যেমন পাতন বা ডিস্টিলেশনের মাধ্যমে তীব্র অ্যালকোহল ও উদ্ভিজ্জ তেলের ঘনত্ব বাড়ানোর কৌশল আবিষ্কার হওয়ায় ওষুধের বিশুদ্ধতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছিল। এই প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণই নিশ্চিত করেছিল যে দূরদেশ থেকে আমদানি করা মাদক যেন মানুষের চিকিৎসার সুনির্দিষ্ট নিয়মের ভেতরেই ব্যবহৃত হয়।

আফিমের বাণিজ্যিক ভূগোল: মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারত ও চীনে বিস্তার (Commercial Geography of Opium: Diffusion from the Middle East to India and China)

মধ্যযুগে আফিমের বাণিজ্যিক ভূগোল ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ। প্রাচীনকাল থেকেই মিশরের থিবস ও আসিউত অঞ্চলে যে উন্নতমানের আফিম উৎপাদিত হতো, আরব বণিকরা তাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি অপরিহার্য পণ্যে রূপান্তর করে। ইতিহাসবিদ মার্টিন বুথ (Martin Booth) তার আকর গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে আরব নাবিকরাই লোহিত সাগর এবং ওমান উপসাগর পেরিয়ে ভারত ও চীনে আফিম পৌঁছানোর প্রাথমিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল (Booth, 1996)। আরবীতে পপির নির্যাসকে বলা হতো ‘আফিয়ুন’ (afyun), যা গ্রিক ‘ওপিয়ন’ শব্দের ধ্বনিগত রূপান্তর। এই ‘আফিয়ুন’ শব্দটিই আরব বণিকদের মুখ থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র এশিয়ার উপকূলীয় বন্দরগুলোতে।

অষ্টম শতকের শুরু থেকেই আরব বাণিজ্য জাহাজগুলো বর্তমান চীনের গুয়াংঝু বন্দরে নিয়মিত যাতায়াত করত। গবেষক ঝ্যাং ইয়াংওয়েন (Zheng Yangwen) চীনের আফিম ব্যবহারের ইতিহাসে দেখিয়েছেন যে তাং রাজবংশের শেষভাগে আরব ব্যবসায়ীরাই চীনে প্রথম আফিম আমদানি করে (Zheng, 2005)। চীনা নথিপত্রে এই মাদককে প্রথমে বলা হতো ‘ইয়া-পিয়ান’ (yapian), যা ছিল নির্দ্বিধায় আরবি ‘আফিয়ুন’ শব্দের চীনা উচ্চারণ। তবে সে যুগে চীনে আফিমের ব্যবহার আধুনিক যুগের মতো ধূমপানের মাধ্যমে আসক্তির রূপ নেয়নি। চীনারা একে গ্রহণ করেছিল অত্যন্ত বিরল ও মূল্যবান ভেষজ হিসেবে, যা ব্যবহার করা হতো দীর্ঘস্থায়ী আমাশয়, ডায়রিয়া এবং তীব্র শারীরিক ব্যথা নিয়ন্ত্রণে।

একইভাবে ভারতীয় উপমহাদেশেও আফিমের ব্যাপক বাণিজ্যায়ন ঘটেছিল আরব ব্যবসায়ীদের হাত ধরেই। ইতিহাসবিদ রিচার্ড ড্যাভেনপোর্ট-হিন্স (Richard Davenport-Hines) দেখিয়েছেন যে চতুর্দশ শতকের আগেই আরব বণিকরা পশ্চিম ভারতের মালাবার ও গুজরাট উপকূলে আফিমের বাণিজ্যিক বাজার তৈরি করে ফেলেছিল (Davenport-Hines, 2002)। পরবর্তীতে এই চাহিদার কারণেই ভারতের মালওয়া বা মালব এবং গঙ্গা অববাহিকায় দেশীয়ভাবে পপি চাষের বিস্তার ঘটে। ভারতে উৎপাদিত কাঁচা আফিম কিনে নিয়ে আরব ব্যবসায়ীরা তা পুনরায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জে বিক্রি করত।

এই বাণিজ্য কোনো প্রান্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম ছিল না। সমুদ্রপথে দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিয়ে পৌঁছানো আফিম ছিল ধনী পরিবার এবং রাজদরবারের চিকিৎসকদের জন্য নির্ধারিত মহার্ঘ পথ্য। আরব বণিকরা আফিমকে শক্ত চাকতির আকারে শুকিয়ে কাপড়ে মুড়িয়ে জাহাজের শুকনো অংশে পরিবহন করত, যাতে সামুদ্রিক নোনা জলের বাষ্পে তা নষ্ট না হয়ে যায়। প্রতিটি বন্দরের কাস্টমস বা শুল্ক দপ্তরে এই মাদকের জন্য উচ্চহারে কর ধার্য করা হতো। আফিমের এই মধ্যযুগীয় চলাচল প্রমাণ করে যে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো এশিয়ায় আসার বহু আগেই এশীয় জলসীমায় একটি সুসংগঠিত এবং লাভজনক মাদক বাণিজ্য ব্যবস্থা কার্যকর ছিল।

হাশিশ ও সামাজিক বিতর্ক: চিকিৎসা থেকে বিনোদনে স্থানান্তর (Hashish and Social Controversy: Transition from Medicine to Recreation)

আরব চিকিৎসা শাস্ত্রে ক্যানাবিস বা গাঁজা পরিচিত ছিল ‘কিন্নাব’ (qinnab) নামে। প্রথমদিকে চিকিৎসকরা একে কানের ব্যথা, ফোড়া এবং জয়েন্টের ব্যথায় মলম হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দিতেন। তবে দ্বাদশ শতকের দিকে এসে মধ্যপ্রাচ্যের শহুরে জীবনে এই উদ্ভিদের এক বিশেষ রূপান্তর ঘটে, যা সাধারণ চিকিৎসা ক্ষেত্র পেরিয়ে চলে যায় নেশা বা সামাজিক বিনোদনের আঙিনায়। প্রস্তুত হতে শুরু করে ‘হাশিশ’ (hashish), যা ছিল ক্যানাবিস উদ্ভিদের রেজিন চেপে তৈরি এক ঘন ও তীব্র মাদক। মধ্যযুগীয় সমাজের গবেষক ফ্রাঞ্জ রোজেনথাল (Franz Rosenthal) তার বিখ্যাত গ্রন্থে এই সামাজিক রূপান্তরের নিখুঁত বিশ্লেষণ হাজির করেছেন (Rosenthal, 1971)।

হাশিশের এই বিস্তার প্রথমদিকে যুক্ত ছিল সমাজের প্রান্তিক পরিব্রাজক এবং ভবঘুরে অতিন্দ্রীয়বাদী দলগুলোর সাথে, যাদের ‘কালান্দার’ বা দরবেশ বলা হতো। এরা পার্থিব মোহ ত্যাগ করে ঘুরে বেড়াত এবং ক্ষুধা দমন ও চেতনার বিকল্প অবস্থা তৈরির উদ্দেশ্যে পাতা চিবিয়ে বা ঘোল বানিয়ে খেত। কিন্তু ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকে আইয়ুবীয় ও মামলুক শাসনামলে হাশিশ কায়রো, দামেস্ক এবং বাগদাদের সাধারণ শহরের তরুণ ও নিম্নবিত্তের আড্ডায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। শহরের বাগানে বা নির্জন সরাইখানায় বসে হাশিশের লেই তৈরি করে খাওয়া এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ নেয়। এটি গ্রিক ঐতিহ্যের নিয়ন্ত্রিত ওষুধের গণ্ডি ভেঙে প্রথম বড় ধরনের সামাজিক মাদকের চরিত্র ধারণ করে।

এই পরিবর্তনের ফলে তৎকালীন আইনজ্ঞ ও ধর্মীয় পণ্ডিতদের মধ্যে তীব্র বিতর্কের সূত্রপাত হয়। ইসলাম ধর্মে মদ বা ‘খামর’ নিষিদ্ধ হলেও হাশিশের ব্যাপারে সরাসরি কোনো প্রাচীন বিধান ছিল না। ফলে বহু আইনজ্ঞ যুক্তি দিতেন যে হাশিশ যেহেতু পানীয় নয় বরং শুষ্ক পাতা, তাই এর ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয় না। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনবিদ, বিশেষ করে হাম্বলী পণ্ডিত ইবনে তাইমিয়া (Ibn Taymiyyah) হাশিশের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং ঘোষণা করেন যে যা কিছু মানুষের বুদ্ধি বা ‘আকল’কে বিভ্রান্ত করে, তা-ই বর্জনীয় (Rosenthal, 1971)। চিকিৎসকরাও লক্ষ্য করেছিলেন যে দীর্ঘকাল হাশিশ সেবনের ফলে মানুষের মানসিক স্থিরতা নষ্ট হয়, আলস্য বাড়ে এবং শরীরে বিষণ্ণতা বাসা বাঁধে।

আইনগত বিতর্ক এবং সামাজিক নিন্দা সত্ত্বেও হাশিশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য কিন্তু থেমে থাকেনি। এটি উচ্চশ্রেণির মানুষের গোপন বিনোদন কক্ষ থেকে শুরু করে নিম্নবিত্তের চায়ের দোকান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মামলুক সুলতানরা মাঝে মাঝে কায়রোর হাশিশ তৈরির বাগানগুলো পুড়িয়ে দেওয়ার বা হাশিশসেবীদের দাঁত উপড়ে ফেলার মতো কঠোর শাস্তি ঘোষণা করতেন। কিন্তু অর্থনৈতিক লাভ এবং ভোক্তাদের অবিরাম চাহিদার কারণে এই দমন অভিযানগুলো কখনোই দীর্ঘমেয়াদে সফল হয়নি। হাশিশের বাণিজ্য এটা স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে কোনো মাদক একবার সমাজের গভীরে শিকড় গেড়ে বসলে কেবল নৈতিক বা আইনি ভীতি দেখিয়ে তার বিপণন বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব।

থেরিয়াকের বৈশ্বিক বাণিজ্য ও প্রতিষেধকের অর্থনীতি (Global Trade in Theriac and the Political Economy of Antidotes)

মধ্যযুগে বৈশ্বিক বাণিজ্যের সবচেয়ে দামি এবং মর্যাদাপূর্ণ ওষুধের নাম ছিল থেরিয়াক (Theriac), যা আরবিতে ‘আল-তিরয়াক’ (al-tiriyaq) নামে পরিচিত ছিল। এটি কোনো সাধারণ ভেষজ ছিল না, বরং ছিল ষাট থেকে সত্তরটি ভিন্ন ভিন্ন উপাদানের জটিল মিশ্রণ। প্রাচীন রোমে এর উৎপত্তি হলেও আরব চিকিৎসকরা এর ফর্মুলায় ব্যাপক পরিমার্জন আনেন। ফার্মাকোলজির ইতিহাসবিদ মার্টিন লেভি (Martin Levey) উল্লেখ করেছেন যে এই মিশ্রণে গুঁড়ো করা বিষধর সাপের মাংস, জাফরাণ, দারুচিনি, কর্পূর এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিপুল পরিমাণ আফিম মেশানো হতো (Levey, 1973)। মনে করা হতো এই মহৌষধ মানবদেহকে যেকোনো বিষাক্ত পদার্থের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম।

মধ্যযুগের রাজকীয় রাজনীতিতে বিষপ্রয়োগ ছিল ক্ষমতা দখলের অত্যন্ত সাধারণ হাতিয়ার। ফলে প্রতিটি রাজদরবারে থেরিয়াকের স্থায়ী মজুদ রাখা ছিল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত। বাগদাদ, কায়রো এবং আলেপ্পোর রাজকীয় পরীক্ষাগারে তৈরি থেরিয়াক ছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক অমূল্য উপহার। ইতিহাসবিদ লরেন্স টোটাভিন (Laurence Totelin) দেখিয়েছেন যে প্রাচ্যের বিভিন্ন সুলতান ও রাজারা ইউরোপের সম্রাট কিংবা ভারতের রাজাদের সাথে মৈত্রী স্থাপনের জন্য এই মূল্যবান ড্রাগ উপহার হিসেবে পাঠাতেন (Totelin, 2004)। এর বাণিজ্যিক মূল্য ছিল অত্যন্ত চড়া, কারণ এর প্রতিটি উপাদান সংগ্রহ করতে হতো পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন প্রান্ত থেকে।

থেরিয়াকের প্রস্তুত প্রণালী ছিল অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ। উপাদানগুলো নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে মাটির পাত্রে বছরের পর বছর ফেলে রাখা হতো যাতে সেগুলো পরিপক্ব হয়। আরব চিকিৎসকদের বিশ্বাস ছিল যে এই মিশ্রণ অন্তত দশ থেকে বারো বছর পুরনো না হলে তার আসল কার্যক্ষমতা প্রকাশ পায় না। ফলে পুরোনো থেরিয়াকের দাম সোনার ওজনের সমান হতো। ধনী বণিকরা এই ওষুধের আন্তর্জাতিক চালান পাঠাতেন বিশেষ পাহারাযুক্ত কাফেলায় করে। মিশরের ফাতেমীয় এবং মামলুক রাজারা এই বাণিজ্যের ওপর নিজস্ব একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছিলেন, কারণ থেরিয়াক তৈরি ও বিক্রির শুল্ক থেকে রাজকোষে বিপুল অর্থ জমা হতো।

চিকিৎসাগত দিক থেকে বিচার করলে থেরিয়াকের কার্যকারিতা মূলত নিহিত ছিল তার উচ্চমাত্রার আফিমের মধ্যে। সাপের বিষ নষ্ট করার যে দাবি এর সাথে যুক্ত ছিল, তার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল না। তবে পেটের তীব্র প্রদাহ, জ্বর বা ব্যথায় আক্রান্ত রোগী থেরিয়াক গ্রহণের পর আফিমের শক্তিশালী প্রভাবে দ্রুত শান্তি পেত এবং ঘুমিয়ে পড়ত। এই তাৎক্ষণিক উপশম মানুষের মনে বিশ্বাস তৈরি করত যে ওষুধটি বোধহয় সত্যিই অলৌকিকভাবে রোগ নিরাময় করেছে। এই মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতা এবং বেদনানাশক ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করেই থেরিয়াক বহু শতাব্দী ধরে মধ্যযুগীয় আন্তর্জাতিক মাদক বাণিজ্যের শীর্ষে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিল।

বাণিজ্যের পরিকাঠামো ও মধ্যযুগীয় পুঁজিবাদ: কারিমি বণিক ও অর্থব্যবস্থা (Infrastructural Networks and Medieval Commerce: The Karimi Merchants and Financial Systems)

মাদক ও ভেষজের এই বৈশ্বিক বাণিজ্য কোনো বিচ্ছিন্ন বা বিশৃঙ্খল উদ্যোগ ছিল না; এর পেছনে কাজ করত মধ্যযুগীয় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের এক সুসংহত কাঠামো। এই বাণিজ্যিক ব্যবস্থার সবচেয়ে প্রভাবশালী চালিকাশক্তি ছিল কারিমি বণিক (Karimi Merchants) নামে পরিচিত এক বিশেষ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। ইতিহাসবিদ এস ডি গোয়েটিন (S. D. Goitein) কায়রোর বিখ্যাত গেনিজা নথিগুলো পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন যে একাদশ থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত এই কারিমি বণিকরা লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের দীর্ঘ দূরত্বের বাণিজ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছিল (Goitein, 1967)। তারা নিজস্ব সশস্ত্র জাহাজবহর ব্যবহার করে মূল্যবান ওষুধ, আফিম এবং মসলার চালান পাহারা দিয়ে আনত।

এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নগদ মুদ্রার ভারী বস্তা সাথে নিয়ে ঘোরা ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। ডাকাতদের উপদ্রব এবং জলদস্যুতার ঝুঁকি কমাতে আরব ও ইহুদি বণিকরা গড়ে তুলেছিল উন্নত আর্থিক পরিকাঠামো। তারা ব্যাপক ব্যবহার শুরু করে ‘সুফতাজা’ (suftaja) বা হুন্ডি ব্যবস্থা, যা আধুনিক লেটার অব ক্রেডিট বা বিনিময় বিলের পূর্বসূরি (Udovitch, 1970)। কায়রোর কোনো ওষুধ ব্যবসায়ী স্থানীয় ব্যাংকারের কাছে অর্থ জমা দিয়ে একটি সুফতাজা কাগজ নিতেন এবং সেই কাগজ দেখিয়ে ভারতের কালিকট বা ক্যাম্বে বন্দরের আড়তদারদের কাছ থেকে টন কে টন কাঁচা ওষুধ ও মসলা সংগ্রহ করতেন। মধ্যযুগীয় অর্থব্যবস্থার এই তরলতা মাদক বাণিজ্যের গতিকে বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

বন্দর শহরগুলোতে গড়ে উঠেছিল বিশাল বাণিজ্যিক সরাইখানা বা ‘কারভানসরাই’ এবং ‘ফুন্দুক’ (funduq)। এখানে দূরদেশ থেকে আসা বণিকরা তাদের পণ্য সংরক্ষণ করতেন এবং নিলামে বিক্রি করতেন। গেনিজা নথিপত্রে সংরক্ষিত ওষুধের দামের তালিকা থেকে জানা যায় যে রিউবার্ব বা রেউচিনি, স্ক্যামোনি রেজিন, কর্পূর এবং মিশরীয় আফিম ছিল সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পণ্যের অন্তর্ভুক্ত (Goitein, 1971)। স্থানীয় ফার্মাসিস্টরা এই পাইকারি বাজার থেকে কাঁচামাল কিনে তাদের নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে ওষুধ তৈরি করতেন। বাণিজ্যের এই প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার ভূমধ্যসাগরের বন্দর ভেনিস ও জেনোয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যারা আরব বণিকদের কাছ থেকে এই ওষুধ কিনে ইউরোপের বাজারে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করত।

পঞ্চদশ শতকের শেষে ১৪৯৮ সালে ভাস্কো দা গামা উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে ভারতে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত এই আরব বাণিজ্য জালেই আবর্তিত হয়েছে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মাদক ও ওষুধের বিনিময়। এটি নিছক স্থানীয় সংস্কৃতির ভেষজ ব্যবহারের গল্প ছিল না; এটা ছিল পুঁজি, সমুদ্রবিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের সম্মিলিত প্রয়াসে গড়ে ওঠা প্রাচীন বিশ্বের এক জটিল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক অর্থনীতি। আরব বণিকরা যে সামুদ্রিক রুট এবং বাজারের পথ তৈরি করে রেখে গিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো সেই পরিকাঠামোকেই বন্দুকের নলের মুখে দখল করে এক নতুন এবং হিংস্র মাদক সাম্রাজ্যের সূচনা করেছিল।

ভারত মহাসাগরে ইউরোপীয় সামুদ্রিক শক্তি (Western Maritime Powers in the Indian Drug Trade): ঔপনিবেশিক প্রতিযোগিতা

পর্তুগিজ শক্তির আগমন ও কার্টাজ ব্যবস্থা: মাদক বাণিজ্যের সামরিকীকরণ (Arrival of Portuguese Power and the Cartaz System: Militarization of the Drug Trade)

১৪৯৮ সালের মে মাসে ভাস্কো দা গামা যখন ভারতের কালিকট বন্দরে নোঙর ফেলেন, তখন ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ জলভাগে এক শতাব্দীপ্রাচীন বাণিজ্যিক ভারসাম্য বজায় ছিল। সেই যুগে আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগরের বন্দরগুলোতে কোনো একক রাজশক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল না। গুজরাটি, আরব, পারসিক, মালয় এবং তামিল বণিকরা নিজস্ব জাহাজে পণ্য বোঝাই করে এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে যেতেন। তাদের সম্পর্কের ভিত্তি ছিল পারস্পরিক বাণিজ্যিক লাভ ও সমঝোতা। সেখানে জলদস্যুতার ভয় ছিল বটে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা সাম্রাজ্য কামান উঁচিয়ে পুরো সমুদ্রের ওপর সার্বভৌম কর্তৃত্ব দাবি করত না। পর্তুগিজ নাবিকদের আগমন সেই দীর্ঘকালীন মুক্ত বাণিজ্যের ঐতিহ্যকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেয়।

লিসবনের রাজদরবার এশিয়ার জলসীমায় প্রবেশ করেছিল ল্যাটিন ধারণার মারে ক্লজুম (Mare Clausum) বা ‘বদ্ধ সমুদ্র’ নীতি মাথায় নিয়ে। পর্তুগিজদের মূল লক্ষ্য ছিল বলপ্রয়োগ করে সমুদ্রপথের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া। তাদের এই আগ্রাসনের প্রধান রূপকার ছিলেন দ্বিতীয় ভাইসরয় আফানসো দে আলবুকার্ক (Afonso de Albuquerque)। আলবুকার্ক বুঝতে পেরেছিলেন যে বিশাল এশীয় ভূখণ্ড দখল করা পর্তুগালের মতো ক্ষুদ্র দেশের পক্ষে অসম্ভব। এর বদলে ভারত মহাসাগরের সংকীর্ণ প্রবেশদ্বারগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই সামরিক ভূরাজনীতির অংশ হিসেবেই ১৫১০ সালে গোয়া, ১৫১১ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রাণকেন্দ্র মালাক্কা এবং ১৫১৫ সালে পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখ হরমুজ পর্তুগিজদের পদানত হয়। এই তিনটি দুর্গই ছিল প্রাচ্যের মাদক ও মসলা চলাচলের মূল ধমনি।

Esplorazioni Geografiche e Imperi Coloniali XV e XVI secolo
Alessandra História 22a 2013: maio 2013
The seasonality of empire: Coping with the intermittence of the global in Portuguese Asia and beyond (1500–1650) | Journal of Global History | Cambridge Core
ষোড়শ শতকে ভারত মহাসাগরে পর্তুগিজদের প্রধান ঘাঁটি ও সামুদ্রিক যোগাযোগপথ। গোয়া, মালাক্কা ও হরমুজের কৌশলগত অবস্থান সমুদ্রপথে তাদের বাণিজ্যিক ও সামরিক কর্তৃত্ব বিস্তারের ভূগোল বোঝায়।

সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ পাকা করতে পর্তুগিজ প্রশাসন চালু করে এক অভিনব সামরিক অনুমতিপত্র, যার নাম কার্টাজ ব্যবস্থা (Cartaz System)। আইনটি ছিল সোজা ও নিষ্ঠুর। ভারত মহাসাগরে চলাচলকারী প্রতিটি দেশীয় জাহাজকে গোয়া, দিউ কিংবা মালাক্কার পর্তুগিজ কাস্টমস অফিস থেকে নির্দিষ্ট অর্থ দিয়ে এই কার্টাজ বা লাইসেন্স কিনতে হতো। লাইসেন্সবিহীন কোনো জাহাজ সাগরে দেখা মাত্রই পর্তুগিজ যুদ্ধজাহাজ তা আক্রমণ করত, পণ্য বাজেয়াপ্ত করত এবং ক্রুদের হত্যা বা দাস বানাত। কার্টাজের শর্তাবলীতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকত যে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য – বিশেষ করে উন্নতমানের মসলা, ঘোড়া এবং উচ্চমূল্যের মাদক – অনুমতি ছাড়া পরিবহন করা যাবে না।

এই ব্যবস্থার জালে সবচেয়ে বেশি আটকা পড়ে ভারতের আফিম ও কর্পূর বাণিজ্য। পশ্চিম ভারতের ক্যাম্বে ও সিন্ধু থেকে যে কাঁচা আফিম মালাক্কার দিকে যেত, তার ওপর পর্তুগিজরা চড়া শুল্ক বসায়। ইতিহাসবিদ সি. আর. বক্সার (C. R. Boxer) তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে পর্তুগিজরা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে স্থানীয় বাণিজ্যের ওপর কর আদায়কারী একটি পরজীবী সামুদ্রিক সাম্রাজ্য বা ‘থ্যালাসোক্রেসি’ গড়ে তুলেছিল (Boxer, 1969)। ইতিহাসবিদ সঞ্জয় সুব্রহ্মণ্যম (Sanjay Subrahmanyam) দেখান যে পর্তুগিজদের এই সামরিকায়ন মাদক বাণিজ্যের সনাতন পথগুলোকে ভেঙে দিয়ে সেগুলোকে জোরপূর্বক গোয়া ও মালাক্কামুখী করেছিল (Subrahmanyam, 1993)। ভারতীয় বণিকরা নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে পর্তুগিজ যুদ্ধজাহাজের বহরকে কর দিয়ে নিরাপত্তা কিনতে বাধ্য হতেন।

তবে পর্তুগিজদের এই সামরিক নিয়ন্ত্রণ সর্বব্যাপী ছিল না। ভারত মহাসাগরের উপকূলীয় ভূগোল ছিল অত্যন্ত জটিল। অসংখ্য অগভীর খাঁড়ি, নদীর মোহনা এবং দ্বীপপুঞ্জের ভেতর দিয়ে দেশীয় ব্যবসায়ীরা প্রায়ই পর্তুগিজদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আফিমের চোরাচালান চালাতেন। স্থানীয় রাজারাও সব সময় কার্টাজ ব্যবস্থাকে মুখ বুজে মেনে নেননি। কালিকটের জামোরিন কিংবা আচের সুলতানের মতো শাসকরা নিয়মিতভাবে পর্তুগিজ নৌবহরকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতেন। তা সত্ত্বেও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে পর্তুগিজদের এই সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই ভারত মহাসাগরের মাদক ও ওষুধের ব্যবসা প্রথমবারের মতো কামান এবং বারুদের শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।

গোয়া ও মালাক্কার সংযোগ: পর্তুগিজদের এশিয়া-অভ্যন্তরীণ আফিম চক্র (The Goa-Malacca Axis: The Portuguese Intra-Asian Opium Circuit)

পর্তুগিজরা খুব দ্রুতই একটি মৌলিক অর্থনৈতিক সত্য আবিষ্কার করে। ইউরোপ থেকে সোনা বা রুপা এনে প্রাচ্যের পণ্য কেনার প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদে লিসবনের জন্য ক্ষতিকর। ইউরোপীয় পণ্য যেমন পশমি কাপড় বা লোহা কেনার মতো কোনো আগ্রহ এশিয়ার মানুষের ছিল না। এই আর্থিক অচলাবস্থা কাটানোর একমাত্র পথ ছিল এশিয়া-অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য (Intra-Asian Trade) বা প্রাচ্যের এক দেশের পণ্য অন্য দেশে বিক্রি করে মুনাফা তৈরি করা। পর্তুগিজ নথিতে একে বলা হতো ‘কারেইরা দা ইন্দিয়া’র সমান্তরালে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক বা আন্তঃবাণিজ্য ব্যবস্থা। এই আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রধান মেরুদণ্ড হয়ে ওঠে গোয়া ও মালাক্কার মধ্যকার সামুদ্রিক অক্ষ।

গোয়া ছিল পর্তুগিজ এশীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী এবং মালাক্কা ছিল দূরপ্রাচ্য ও ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জে প্রবেশের একমাত্র চাবিকাঠি। এই দুই বন্দরের মধ্যবর্তী বাণিজ্যে সবচেয়ে লাভজনক বিনিময় মাধ্যম ছিল আফিম ও সুতি বস্ত্র। গুজরাটের মালওয়া এবং খাম্বাত থেকে সংগৃহীত কাঁচা আফিম গোয়ায় এনে প্রক্রিয়াজাত করা হতো। এরপর সেই মাদক জাহাজে করে নিয়ে যাওয়া হতো মালাক্কায়। ইতিহাসবিদ এম. এন. পিয়ার্সন (M. N. Pearson) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে মালাক্কা এবং জাভার বাজারে সোনা বা রুপার চেয়েও ভারতীয় আফিমের গ্রহণযোগ্যতা ছিল বেশি (Pearson, 1987)। কারণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজদরবার এবং সাধারণ ভোক্তাদের কাছে আফিম ছিল একাধারে বিলাসিতা, ব্যথানাশক ঔষধ এবং সামাজিক আভিজাত্যের স্মারক।

পর্তুগিজ ব্যবসায়ীরা মালাক্কায় আফিম বিক্রি করে সেই অর্থে সংগ্রহ করতেন মশলা দ্বীপপুঞ্জ বা মলুকাসের মহার্ঘ লবঙ্গ, বান্দার জায়ফল এবং সুমাত্রার গোলমরিচ। সহজ কথায়, ভারতীয় মাটি থেকে উৎপাদিত মাদক পরিণত হয়েছিল ইন্দোনেশিয়ার মসলা কেনার প্রধান মুদ্রায়। এই মাদক চক্রের মাধ্যমেই পর্তুগিজ ব্যক্তিগত ব্যবসায়ী বা ‘কাসাদোস’রা (casados) বিপুল বিত্তের মালিক হন। অনেক ক্ষেত্রে রাজকীয় গভর্নররা খাতা-কলমে পর্তুগিজ রাজার সেবা করলেও গোপনে নিজস্ব ব্যক্তিগত জাহাজে আফিমের চালান পাঠিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করতেন। গোয়ার প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং মাদক নির্ভরতা এতটাই গভীর ছিল যে আফিমের চালান কোনো বছর দেরিতে পৌঁছালে পুরো গোয়া শহরের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ত।

এই বাণিজ্যিক পরিমণ্ডলের ভেতরেই প্রাচ্যের ভেষজবিদ্যা নিয়ে ইউরোপীয় বিজ্ঞানের প্রথম প্রামাণ্য গবেষণা সম্পন্ন হয়। গোয়ায় দীর্ঘ তিন দশক চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ইহুদি বংশোদ্ভূত পণ্ডিত গার্সিয়া দে ওরতা (Garcia de Orta)। তিনি ১৫৬৩ সালে গোয়া থেকেই প্রকাশ করেন তার যুগান্তকারী গ্রন্থ কলোকিওস দোস সিম্প্লেস (Colóquios dos simples e drogas da Índia) বা ভারতীয় ভেষজ ও ওষুধের সংলাপ (Orta, 1891)। ওরতা কোনো কুসংস্কারের আশ্রয়ে না গিয়ে স্থানীয় কবিরাজ, হাকিম এবং জোগীদের সাথে সরাসরি কথা বলতেন। তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যে ভারতীয় সমাজ কীভাবে ‘আমফিয়াও’ বা আফিম এবং ‘বাংগে’ বা ক্যানাবিস ব্যবহার করে।

ওরতা লক্ষ্য করেছিলেন যে ভারতীয় যোদ্ধা শ্রেণি, বিশেষ করে রাজপুত ও দাক্ষিণাত্যের পদাতিক সৈনিকরা যুদ্ধের ময়দানে নামার আগে নির্দিষ্ট মাত্রায় আফিম সেবন করত। এটা তাদের ভয় ও শারীরিক ক্লান্তি দূর করত এবং আঘাতের তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করার শক্তি দিত। তিনি আরও লিখেছিলেন যে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের পর ক্লান্তি কাটাতে প্রতিদিন আফিম গ্রহণ করত। পর্তুগিজ নাবিক ও সৈনিকরাও ধীরে ধীরে এই অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছিল। ওরতার বস্তুনিষ্ঠ ও ধর্মনিরপেক্ষ বিবরণ ইউরোপকে প্রথমবারের মতো জানিয়েছিল যে মাদক কেবল দূরদেশের কোনো আজব পদার্থ নয়; এটা মানব স্নায়ুতন্ত্রের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলা এক শক্তিশালী রাসায়নিক উপাদান।

O Conflito entre a China e Portugal (1521-1522). A importância da Artilharia
ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পর্তুগিজ বাণিজ্যিক যোগাযোগের ভূগোল। ভারতের পশ্চিম উপকূলের গোয়া থেকে মালাক্কা এবং আরও পূর্বে মলুকাস ও বান্দা দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত যোগাযোগপথ এশিয়া-অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের পরিসর বোঝায়।

ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থান: মসলা থেকে আফিম একচেটিয়া করার কৌশল (Rise of the Dutch East India Company: Strategy of Monopolizing Spices to Opium)

ষোড়শ শতকের শেষভাগে পর্তুগিজদের দুর্বল নৌপ্রতিরক্ষা এবং ক্রমবর্ধমান প্রশাসনিক দুর্নীতির সুযোগ নিয়ে রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হয় নতুন এক শক্তি। নেদারল্যান্ডসের সাতটি প্রদেশের ব্যবসায়ীরা একত্রিত হয়ে ১৬০২ সালে গঠন করে ইউনাইটেড ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (Vereenigde Oostindische Compagnie), যা সংক্ষেপে ভিওসি (VOC) নামে পরিচিত। ডাচদের এই কোম্পানিটি নিছক কোনো পারিবারিক বা রাজকীয় বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান ছিল না। এটা ছিল পৃথিবীর প্রথম আধুনিক যৌথ মূলধনী কোম্পানি, যার পেছনে কাজ করত শেয়ারবাজার, স্থায়ী পুঁজি এবং উন্নত হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা। ইতিহাসবিদ ফেমকে গাস্ট্রা (Femme Gaastra) দেখিয়েছেন যে ভিওসির সাংগঠনিক কাঠামো এবং পুঁজির ঘনত্ব পর্তুগিজদের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক ও কার্যকর ছিল (Gaastra, 2003)।

ডাচরা ইন্দোনেশিয়ায় তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চরম বলপ্রয়োগের নীতি গ্রহণ করে। ভিওসির গভর্নর-জেনারেল ইয়ান পিটারসজুন কোয়েন (Jan Pieterszoon Coen) ছিলেন এই আগ্রাসী বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যবাদের প্রধান রূপকার। ১৬১৯ সালে তিনি জাভার জয়কার্তা শহর ধ্বংস করে সেখানে ডাচদের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র বাটাভিয়া গড়ে তোলেন। কোয়েনের লক্ষ্য ছিল মসলা দ্বীপপুঞ্জের ওপর সম্পূর্ণ সামরিক একচেটিয়া অধিকার কায়েম করা। ১৬২১ সালে তিনি বান্দা দ্বীপপুঞ্জের স্থানীয় জনগণকে নির্মমভাবে হত্যা ও বিতাড়িত করে পুরো জায়ফল উৎপাদন ব্যবস্থা ডাচ নিয়ন্ত্রণে নেন। কিন্তু সমস্ত মসলা নিজেদের হাতে আসার পর ডাচরা দেখতে পায় যে সেগুলো স্থানীয় চাষি বা রাজাদের কাছ থেকে কেনার জন্য তাদের কাছে পর্যাপ্ত বিনিময় সামগ্রী নেই।

ডাচ বণিকরা দ্রুত আবিষ্কার করল যে জাভা, সুমাত্রা এবং মলুকাসের সমাজে সবচেয়ে শক্তিশালী ভোগের পণ্য হলো ভারতীয় আফিম। নেদারল্যান্ডস থেকে সোনা-রুপা আমদানি করার প্রক্রিয়া কোম্পানির আর্থিক লাভের ওপর চাপ তৈরি করছিল। ফলে কোয়েন এবং তার উত্তরসূরিরা ঠিক করলেন যে এশিয়ার বাণিজ্যের খরচ এশিয়ার পণ্য দিয়েই মেটানো হবে। এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ভারত। ডাচরা সুরাট, কোরোমন্ডেল উপকূল এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে বাংলার বাণিজ্য কুঠিগুলোতে বিপুল পরিমাণ মূলধন বিনিয়োগ করতে শুরু করে। ইতিহাসবিদ অমলেন্দু গুহ (Amalendu Guha) কোম্পানির খতিয়ান বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি থেকেই ভিওসির প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল বাংলা ও বিহারের কাঁচা আফিম সংগ্রহ করা (Guha, 1970)।

ডাচরা বাংলা থেকে কেনা আফিম তাদের জাহাজে করে সোজা বাটাভিয়ায় নিয়ে যেত, যা তারা জাকার্তা ধ্বংস করে প্রতিষ্ঠা করেছিল। জাভার মাতুরাম সালতানাত এবং বানতেনের রাজাদের সাথে তারা একের পর এক চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তির শর্তগুলো ছিল অত্যন্ত চাতুর্যপূর্ণ। ডাচরা স্থানীয় শাসকদের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনে সামরিক সহায়তার আশ্বাস দিত, আর বিনিময়ে লিখে নিত সেই রাজ্যের সমস্ত আফিম বিক্রির একমাত্র অধিকার। ১৬৭৭ সালে মাতুরামের সুলতান দ্বিতীয় অমংগুরাত এক চুক্তির মাধ্যমে পুরো মধ্য জাভায় আফিম আমদানির একক স্বত্ব ডাচ কোম্পানির হাতে তুলে দেন।

১৬৪১ সালে ডাচরা পর্তুগিজদের হাত থেকে মালাক্কা ছিনিয়ে নেয় এবং ১৬৫৮ সালে তাদের সিলন থেকেও বিতাড়িত করে। এর ফলে ভারত মহাসাগরের পূর্ব অর্ধে পর্তুগিজ উপস্থিতির অবসান ঘটে এবং প্রতিষ্ঠিত হয় ভিওসির বজ্রকঠিন একাধিপত্য। ডাচরা মাদক ব্যবসাকে পর্তুগিজদের মতো কোনো অনানুষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত মুনাফার বিষয় হিসেবে রাখেনি। তারা এটিকে পরিণত করেছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাযুক্ত এক বিশালাকার কর্পোরেট সিন্ডিকেটে। যেখানে প্রতিটি কেজি আফিমের ওজন, তার বিশুদ্ধতা এবং তার সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য আমস্টারডামের ডিরেক্টরদের বোর্ডে নিয়মিত হিসাব করা হতো।

Batavia - the journey, the shipwreck and the massacre
Globalization in the Early Modern Era: New Evidence from the Dutch-Asiatic Trade, c. 1600–1800 | The Journal of Economic History | Cambridge Core
ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভিওসির বাণিজ্যিক ঘাঁটি ও যোগাযোগের বিস্তার। ভারতীয় উপকূল, বাংলা, মালাক্কা ও বাটাভিয়ার অবস্থান কোম্পানির এশিয়া-অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের ভৌগোলিক কাঠামো বোঝায়।

বাটাভিয়া ও জাভার মাদক অর্থনীতি: সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রাতিষ্ঠানিক একচেটিয়া (The Drug Economy of Batavia and Java: Social Control and Institutional Monopoly)

বাটাভিয়াকে রাজধানী করে ডাচরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যে শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, তার আর্থিক কাঠামো দাঁড়িয়ে ছিল স্থানীয় জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া মাদক করের ওপর। জাভায় আফিমের ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত ছিল, তবে তা সীমাবদ্ধ ছিল রাজদরবারের অভিজাত এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের চিকিৎসার মধ্যে। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবহারকে এক সর্বগ্রাসী গণভোগের পণ্যে রূপান্তর করে। কোম্পানির পরিচালকরা বুঝতে পেরেছিলেন যে কফি বা মসলার বাগানগুলোতে কাজ করা হাজার হাজার শ্রমিকের ক্লান্তি ও অসন্তোষ দমন করার জন্য আফিম এক জাদুকরী ভূমিকা পালন করতে পারে।

এই গণবিতরণ কার্যকর করতে ডাচরা চালু করে এক বিশেষ নিলাম পদ্ধতি, যার নাম পাচট ব্যবস্থা (Pacht System) বা রাজস্ব ইজারা ব্যবস্থা। ইতিহাসবিদ জেমস রাশ (James R. Rush) জাভার ঔপনিবেশিক মাদক অর্থনীতির বিশ্লেষণে এই ব্যবস্থার ভেতরের সমীকরণ উন্মোচন করেছেন (Rush, 1990)। ডাচ প্রশাসন সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে খুচরা আফিম বিক্রি করত না। তারা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চল বা শহরের জন্য আফিম বিক্রির লাইসেন্স নিলামে তুলত। নিলামে যারা সবচেয়ে বেশি অর্থ অগ্রিম দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিত, তারাই পেত সেই এলাকার ‘ফার্মার’ বা ইজারাদারের পদ। এই ইজারাদারদের সিংহভাগই ছিলেন ধনী ও প্রভাবশালী চীনা অভিবাসী ব্যবসায়ী, যাদের স্থানীয় সমাজের ওপর গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব ছিল।

চীনা ফার্মাররা কোম্পানি থেকে অপরিশোধিত কাঁচা আফিম পাইকারি দরে কিনতেন। এরপর তাদের নিজস্ব কারখানায় সেই আফিম সিদ্ধ করে, ফিল্টার করে এবং বিশেষ গাজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করতেন ‘চান্দু’ (chandu)। চান্দু ছিল মূলত পাইপে ভরে ধূমপানের উপযোগী এক ঘন মাদক পেস্ট। ফার্মাররা শহরের অলিগলিতে এবং গ্রামীণ হাটগুলোতে বিশেষ চান্দু পানের ঘর বা ‘আফিম ডেন’ খুলতেন। শ্রমিকরা দিনভর ক্ষেতে-খামারে বা খনিতে অমানুষিক পরিশ্রম করে যে মজুরি পেত, তার একটা বড় অংশ সন্ধ্যায় সেই চান্দুর দোকানে গিয়েই ঢেলে দিত। এই ব্যবস্থার ফলে সমাজবিজ্ঞানী কার্ল ট্রোকি (Carl A. Trocki)-র মতে, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র শ্রমিকের মজুরির টাকাই মাদক বিক্রির মাধ্যমে পুনরায় নিজের রাজকোষে ফিরিয়ে আনত (Trocki, 1999)।

১৭৪৫ সালে ভিওসি প্রশাসন এই বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করতে প্রতিষ্ঠা করে অ্যাম্ফিয়েন সোসিয়েটাইট (Amfioen Sociëteit) বা বাটাভিয়া আফিম সমিতি। এটি ছিল কোম্পানির শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং ধনাঢ্য বিনিয়োগকারীদের নিয়ে গঠিত এক আধা-ব্যক্তিগত কনসোর্টিয়াম। কোম্পানি সনদ দিয়ে এই সমিতিকে সমগ্র ডাচ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে আফিম আমদানির একক একচেটিয়া ক্ষমতা দেয়। সমিতির বাইরে কোনো সাধারণ ডাচ নাগরিক বা স্থানীয় ব্যবসায়ীর আফিম পরিবহন করা ছিল আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এই সমিতি বার্ষিক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ডাচ রাজকোষে জমা দিত এবং বিনিময়ে তারা আফিমের সরবরাহ ও মূল্যের ওপর সম্পূর্ণ কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখত।

মাদক অর্থনীতির এই প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার জাভানিজ সমাজের ওপর এক মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ক্ষত তৈরি করেছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয় কৃষকরা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছিল চীনা ফার্মার এবং ডাচ প্রশাসনের কাছে। আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা মানুষগুলোর পক্ষে ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ডাচ প্রশাসন মুখে খ্রিস্টীয় নৈতিকতার কথা বললেও বাস্তবে তারা এই সামাজিক ধ্বংসযজ্ঞকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেছিল, কারণ কোম্পানির কোষাগারে জমা হওয়া রাজস্বের প্রায় পনেরো থেকে বিশ শতাংশ আসত এই আফিম ইজারা থেকেই।

ইউরোপীয় আন্তঃসাম্রাজ্যিক সংঘাত: চন্দননগর, ট্রাঙ্কুবার ও হুগলির প্রতিযোগিতা (European Inter-Imperial Rivalry: Competition in Chandannagar, Tranquebar, and Hugli)

অষ্টাদশ শতকের শুরুতে বৈশ্বিক মাদক বাণিজ্যের প্রধান সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয় বাংলা ও বিহারের অববাহিকা। পাটনা, গয়া এবং বেনারসের উর্বর জমিতে যে পপি চাষ হতো, তা রাসায়নিকভাবে ছিল অনন্য। এতে মরফিনের মাত্রা ছিল সঠিক অনুপাতে এবং এর গন্ধ ছিল এশীয় ভোক্তাদের অত্যন্ত প্রিয়। এই উৎকৃষ্ট কাঁচামালের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে এক তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়। হুগলি নদীর দুই তীর রূপ নেয় একাধিক ইউরোপীয় জাতির বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে। ব্রিটিশরা যেখানে কলকাতায় ঘাঁটি গেড়েছিল, ডাচরা বসেছিল চুঁচুড়ায়, ফরাসিরা চন্দননগরে এবং ডেনিশরা তাদের বাণিজ্য কুঠি তৈরি করেছিল শ্রীরামপুর ও ট্রাঙ্কুবারে।

En Inde, croisière sur le Hooghly, le petit Gange du Bengale
হুগলি নদীর তীরে ব্রিটিশ কলকাতা, ফরাসি চন্দননগর, ডাচ চুঁচুড়া ও ডেনিশ শ্রীরামপুরের অবস্থান। নদীপথকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই বাণিজ্যকেন্দ্রগুলো বাংলায় ইউরোপীয় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার ভূগোল বোঝায়।

অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ ওম প্রকাশ (Om Prakash) তার বিভিন্ন গবেষণায় দেখিয়েছেন যে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে ডাচ ও ফরাসিদের মধ্যকার প্রতিযোগিতা কীভাবে বাংলার অভ্যন্তরীণ বাজারকে প্রভাবিত করেছিল (Prakash, 1985)। ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (French East India Company) চেয়েছিল চন্দননগরকে কেন্দ্র করে নিজস্ব এক আফিম নেটওয়ার্ক তৈরি করতে। ফরাসি গভর্নর জোসেফ ফ্রাঁসোয়া ডুপ্লে লক্ষ্য করেছিলেন যে সুদূর চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য বাড়াতে হলে আফিমের বিকল্প নেই। ফরাসিরা দেশীয় ব্যবসায়ীদের আগাম অর্থ বা ‘দাদন’ দিয়ে পাটনা থেকে বিপুল পরিমাণ আফিম তাদের চন্দননগরের গুদামে এনে জমা করতে শুরু করে।

একইভাবে ডেনমার্কের ব্যবসায়ীরা তাদের শ্রীরামপুর কুঠি থেকে অন্যান্য ইউরোপীয়দের চোখ এড়িয়ে আফিমের চোরাচালান চালাত। তারা প্রায়ই নিরপেক্ষ পতাকাবাহী জাহাজে করে এই নিষিদ্ধ পণ্য ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপগুলোতে পৌঁছে দিত, যেখানে ডাচ কোম্পানির কড়া নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল। এই বহুপাক্ষিক প্রতিযোগিতার ফলে বাংলায় আফিমের কাঁচামালের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। বিহারের পাইকার এবং চাটগাঁ ও হুগলির দেশীয় নৌকার মালিকরা ইউরোপীয়দের পারস্পরিক রেষারেষির পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করতেন। তারা বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিদের ডেকে দর কষাকষি করতেন এবং যে কোম্পানি বেশি দাদন দিত, তাদের কাছেই পণ্য হস্তান্তর করতেন।

ইতিহাসবিদ লক্ষ্মী সুব্রহ্মণ্যম (Lakshmi Subramanian) তার গবেষণায় ভারতীয় মহাজন ও ব্যাংকারদের ভূমিকার ওপর আলো ফেলেছেন (Subramanian, 1996)। জগৎ শেঠের মতো বিশাল ব্যাংকিং পরিবারগুলো এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অর্থায়নে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করত। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো নগদ টাকার সংকটে পড়লে এই ভারতীয় ব্যাংকারদের কাছ থেকেই উচ্চ সুদে ঋণ নিত। সেই ঋণের অর্থে কেনা হতো বিহারের আফিম। তবে এই বাণিজ্যিক ভারসাম্য বেশিদিন টেকেনি। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধিরা নিজ নিজ কোম্পানির আইন ভেঙে ব্যক্তিগত বাণিজ্যে লিপ্ত হতে শুরু করেন। কোম্পানির খাতার আড়ালে ব্যক্তিগত মুনাফা লোটার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা বাংলার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্রমশ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।

নবাব আলীবর্দী খানের সময় পর্যন্ত বাংলার আঞ্চলিক সরকার এই ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোকে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছিল। নবাব কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে কোনো ইউরোপীয় শক্তি যেন নদীর তীরে অতিরিক্ত দুর্গ নির্মাণ না করে এবং বাণিজ্যিক বিরোধের মীমাংসা যেন স্থানীয় আদালতের মাধ্যমেই হয়। কিন্তু ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো ততদিনে নিজেদের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সীমা পেরিয়ে পুরোদস্তুর সামরিক শক্তিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা করছিল। আফিম ও রেশমের বিপুল মুনাফা তাদের লোভকে এতটাই বাড়িয়ে দিয়েছিল যে তারা বাংলার দুর্বল রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর সরাসরি আঘাত হানার সুযোগ খুঁজতে থাকে।

বাণিজ্যিক পুঁজি থেকে আঞ্চলিক আধিপত্যে উত্তরণ: অষ্টাদশ শতকের ভূরাজনৈতিক পট পরিবর্তন (Transition from Merchant Capital to Territorial Hegemony: The Eighteenth-Century Geopolitical Shift)

অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে ভারত মহাসাগরের রাজনৈতিক সমীকরণ এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। দীর্ঘদিন ধরে দাপট দেখানো ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধীরে ধীরে ভেতর থেকে ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। নেদারল্যান্ডসের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট, ইউরোপের যুদ্ধগুলোতে ক্রমাগত পরাজয় এবং ভিওসির কর্মকর্তাদের লাগামহীন দুর্নীতির কারণে তাদের বাণিজ্য সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। কোম্পানি যে পরিমাণ অর্থ সামরিক ঘাঁটি ও নৌবহর রক্ষণাবেক্ষণে খরচ করত, আফিম বা মসলা বিক্রির মুনাফা দিয়ে সেই বিশাল ঘাটতি মেটানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক এই সময় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের চিরাচরিত বাণিজ্যিক নীতি ত্যাগ করে সরাসরি ভূখণ্ড দখলের এক আগ্রাসী রণকৌশল গ্রহণ করে।

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধ এবং ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ব্রিটিশদের হাতে। ১৭৬৫ সালে মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার ‘দেওয়ানি’ বা রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ করার পর ব্রিটিশরা সমস্ত মধ্যযুগীয় বাণিজ্যিক রীতিনীতি ছুড়ে ফেলে দেয়। এতদিন যে আফিম কেনাবেচা হতো খোলা বাজারে দর কষাকষির মাধ্যমে, ব্রিটিশরা তা মুহূর্তের মধ্যে তাদের রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া অধিকারে রূপান্তর করে। ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭৩ সালে পুরো আফিম উৎপাদন ও বাণিজ্যকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একক মনোপলি হিসেবে ঘোষণা করেন।

ইতিহাসবিদ কে. এন. চৌধুরী (K. N. Chaudhuri) তার ধ্রুপদী তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে এই ভূরাজনৈতিক বিজয়ের ফলে ভারত মহাসাগরের দীর্ঘদিনের ‘অংশীদারিত্বের যুগ’ শেষ হয়ে যায় এবং শুরু হয় সামরিক সাম্রাজ্যবাদের যুগ (Chaudhuri, 1978)। ইতিহাসবিদ হোল্ডেন ফারবার (Holden Furber) এই ঐতিহাসিক পর্বকে ইউরোপীয় আধিপত্যের চূড়ান্ত সংহতকরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Furber, 1976)। ব্রিটিশরা বাংলায় তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ডাচ, ফরাসি এবং ডেনিশ কোম্পানিগুলোর সমস্ত সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নেয়। তাদের আর স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি আফিম কেনার অধিকার রইল না। ব্রিটিশ বোর্ড অব কাস্টমস প্রতি বছর এই পরাশক্তিগুলোর জন্য নামমাত্র কিছু আফিমের কোটা বরাদ্দ করত, যা তাদের বাণিজ্যিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য একেবারেই যথেষ্ট ছিল না।

চুঁচুড়ায় ডাচদের উপস্থিতি এবং চন্দননগরে ফরাসিদের কুঠিগুলো রাতারাতি গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। ১৭৮০-র দশকের মধ্যে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার আফিম সরবরাহ থেকে প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর ফলে ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জে তাদের শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে তোলা পাচট ব্যবস্থা এবং অ্যাম্ফিয়েন সোসিয়েটাইটের কার্যকারিতা মুখ থুবড়ে পড়ে। ব্রিটিশরা এখন কেবল সমুদ্রের শাসক ছিল না; তারা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর পপি উৎপাদনকারী ভূখণ্ডের একক অধিপতি। তারা এই নতুন রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে বিহারের আফিম চাষিদের এক নির্মম অগ্রিম বা ‘দাদন’ ব্যবস্থার শৃঙ্খলে বন্দি করে ফেলে, যা কৃষককে তার জমিতে অন্য কোনো খাদ্যশস্য ফলানোর অধিকার দিত না।

ভারত মহাসাগরে ইউরোপীয় সামুদ্রিক শক্তিগুলোর এই তিন শতকব্যাপী ঔপনিবেশিক প্রতিযোগিতা প্রমাণ করে যে প্রাথমিক আধুনিক যুগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চরিত্র কোনো দিনই নিরপেক্ষ বা নিরীহ ছিল না। পর্তুগিজদের প্রবর্তিত সশস্ত্র কার্টাজ ব্যবস্থা যে হিংস্রতার সূচনা করেছিল, ডাচদের আমলাতান্ত্রিক কর্পোরেট একচেটিয়াত্ব তাকে পরিণত করেছিল এক মুনাফামুখী রাষ্ট্রীয় যন্ত্রে। আর সেই পথ ধরেই ব্রিটিশরা স্থাপন করেছিল ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ঔপনিবেশিক মাদক মনোপলি। সমুদ্রের উন্মুক্ত বাণিজ্য পথগুলো এভাবে রূপান্তরিত হয়েছিল এক সাম্রাজ্যিক কারাগারে, যার বিষাক্ত ফল পরবর্তী শতাব্দীতে দূরপ্রাচ্যের লাখ লাখ মানুষের জীবনকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও মাদক বাণিজ্য (British East India Company and Drug Trade): বাণিজ্যিক একচেটিয়াকরণ

১৭৭৩ সালের মোড় পরিবর্তন: ওয়ারেন হেস্টিংস ও রাষ্ট্রীয় একচেটিয়াত্বের ভিত্তি (The Turning Point of 1773: Warren Hastings and Foundations of State Monopoly)

১৭৬৫ সালে মুঘল বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি লাভের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামনে এক অভাবনীয় ক্ষমতার দুয়ার খুলে যায়। কিন্তু এই রাজনৈতিক বিজয়ের প্রথম কয়েক বছর কোম্পানির শাসন ছিল চরম বিশৃঙ্খলা এবং ব্যক্তিগত লুটের সমার্থক। কোম্পানির ইংরেজ কর্মচারীরা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ওপর চরম অত্যাচার চালিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আফিম, লবণ ও সুপারির ব্যবসা দখল করে নিয়েছিলেন। বিশেষ করে বিহারের রাজধানী পাটনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আফিমের বাজারটি ছিল সবচেয়ে লোভনীয়। সেখানে কোম্পানির পদস্থ কর্মকর্তারা এক গোপন সিন্ডিকেট তৈরি করেছিলেন, যা স্থানীয় চাষিদের নামমাত্র মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য করত। ১৭৭০ সালের ভয়াবহ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর এই লুটেরা ব্যবস্থার অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে দেয়। রাজস্ব আদায় তলানিতে গিয়ে ঠেকে এবং লন্ডনের ডিরেক্টর সভা কোম্পানিকে দেউলিয়াত্বের হাত থেকে বাঁচাতে প্রশাসনিক সংস্কারের দাবি তোলে।

ঠিক এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ১৭৭২ সালে বাংলার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ওয়ারেন হেস্টিংস (Warren Hastings)। হেস্টিংস বুঝতে পেরেছিলেন যে কর্মচারীদের ব্যক্তিগত লুটপাট বন্ধ না করলে কোম্পানির কোষাগার কখনোই ভরবে না। তিনি লক্ষ্য করলেন যে বিহারের আফিম ছিল এমন এক সম্পদ, যার আন্তর্জাতিক চাহিদা অপরিসীম। ১৭৭৩ সালে হেস্টিংস এক যুগান্তকারী ও নির্মম প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে বাংলা ও বিহারের সমগ্র আফিম উৎপাদন এবং বাণিজ্যের ওপর একমাত্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পূর্ণ একচেটিয়া কর্তৃত্ব থাকবে। কোনো ব্যক্তি বা বেসরকারি বণিক আর সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে আফিম কিনতে পারবে না। ইতিহাসবিদ পি. জে. মার্শাল (P. J. Marshall) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আফিমকে একটি উন্মুক্ত বাণিজ্যিক পণ্য থেকে রূপান্তর করা হয় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় রাজস্বের প্রধান চালিকাশক্তিতে (Marshall, 1987)।

হেস্টিংসের এই পদক্ষেপের পেছনে কোনো জনকল্যাণমূলক চিন্তা ছিল না। তিনি আফিমের মারাত্মক ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত ছিলেন। ১৭৮৬ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দেওয়া এক সাক্ষ্যে হেস্টিংস আফিমকে বর্ণনা করেছিলেন এক অত্যন্ত ক্ষতিকর বিলাসবহুল দ্রব্য হিসেবে, যা কেবল বৈদেশিক বাণিজ্যের উদ্দেশ্যেই উৎপাদন করা উচিত এবং সরকারের দূরদর্শিতা দিয়ে এর অভ্যন্তরীণ ব্যবহার কঠোরভাবে দমন করা দরকার (Richards, 2002)। সহজ কথায়, হেস্টিংসের নীতি ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনস্থ প্রজাদের এই বিষ সেবন করতে দেওয়া হবে না, কিন্তু বাইরের দেশের মানুষের কাছে এই বিষ বিক্রি করে সাম্রাজ্যের কোষাগার ভরিয়ে তুলতে কোম্পানির কোনো দ্বিধা থাকবে না। মাদককে নৈতিক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে আবার সেই মাদকের ওপর ভর করেই রাষ্ট্রীয় কোষাগার চালানোর এই দ্বৈত চরিত্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল হেস্টিংসের আমলেই।

একচেটিয়া কর্তৃত্ব কায়েম করার পর হেস্টিংস প্রথমদিকে আফিম সংগ্রহের জন্য চালু করেন ঠিকাদারি ব্যবস্থা বা কন্ট্রাক্ট সিস্টেম। এই ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ দরদাতাকে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য আফিম উৎপাদনের একচেটিয়া ঠিকাদারি দেওয়া হতো। ঠিকাদার কোম্পানিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ আফিম সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিতেন এবং বিনিময়ে চাষিদের ওপর যথেচ্ছ বলপ্রয়োগের লাইসেন্স পেতেন। ইতিহাসবিদ অমর ফারুকী (Amar Farooqui) দেখিয়েছেন যে হেস্টিংস এই লাভজনক ঠিকাদারিগুলো লন্ডনের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও কোম্পানির পরিচালকদের আত্মীয়স্বজনদের উপহার হিসেবে দিতেন যাতে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সুরক্ষিত থাকে (Farooqui, 1998)। কিন্তু এই ঠিকাদারি ব্যবস্থায় আফিমের গুণমান দ্রুত পড়তে থাকে। ঠিকাদাররা অতিরিক্ত লাভের আশায় কাঁচা রসে নানা ধরনের ভেজাল মেশাতেন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কোম্পানির আফিমের সুনাম ক্ষুণ্ণ হতে শুরু করে এবং কোম্পানি এক নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।

এজেন্সি ব্যবস্থার প্রবর্তন: লর্ড কর্নওয়ালিস ও প্রশাসনিক সুসংহতকরণ (Introduction of the Agency System: Lord Cornwallis and Administrative Consolidation)

ঠিকাদারি ব্যবস্থার দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ করতে কোম্পানির পরবর্তী গভর্নর-জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস (Lord Cornwallis) কঠোর সংস্কারের উদ্যোগ নেন। কর্নওয়ালিস কোম্পানির সিভিল সার্ভিসকে দুর্নীতিমুক্ত করার যে নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তার অন্যতম লক্ষ্য ছিল আফিম বাণিজ্যকে ব্যক্তিগত ঠিকাদারদের হাত থেকে ছিনিয়ে এনে সম্পূর্ণ আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে আনা। ১৭৯৭ সালে গভর্নর-জেনারেল স্যার জন শোরের আমলে এই সংস্কার পূর্ণ রূপ লাভ করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় আফিম এজেন্সি ব্যবস্থা (Opium Agency System)। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আফিম উৎপাদনকে দুটি বিশাল প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করা হয়: বিহারের জন্য পাটনা এজেন্সি এবং যুক্তপ্রদেশের জন্য বেনারস এজেন্সি (Bauer, 2019)।

প্রতিটি এজেন্সির শীর্ষে বসানো হয় কোম্পানির একজন জ্যেষ্ঠ ইংরেজ সিভিল সার্ভেন্টকে, যার পদবী ছিল আফিম এজেন্ট। পাটনা ও গাজীপুরে স্থাপন করা হয় দুটি সুবিশাল সরকারি আফিম প্রক্রিয়াকরণ কারখানা। এই এজেন্টদের অধীনে কাজ করতেন ডেপুটি ও সাব-ডেপুটি এজেন্টদের এক সুবিশাল বাহিনী, যারা ঘোড়ায় চড়ে পুরো শীতকাল জুড়ে চষে বেড়াতেন শত শত গ্রামের পপি ক্ষেত। ইতিহাসবিদ জন এফ. রিচার্ডস (John F. Richards) বিস্তারিত তুলে ধরেছেন যে কীভাবে এই ব্রিটিশ আমলাতন্ত্র এক নিখুঁত জরিপ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি কৃষকের জমির পরিমাণ, পপির চারার সংখ্যা এবং সম্ভাব্য উৎপাদন লিপিবদ্ধ করে রাখত (Richards, 2002)। গ্রামের প্রতিটি ইঞ্চি জমি কোম্পানির রেজিস্টারভুক্ত হয়ে যায়।

এজেন্সি ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে কাঁচা আফিমের গুণমান ও বিশুদ্ধতা পরীক্ষার জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি চালু করা হয়। কারখানাগুলোতে নিয়োগ দেওয়া হয় ইংরেজ রসায়নবিদ ও শল্যচিকিৎসক। তাদের কাজ ছিল কৃষকের আনা প্রতিটি মাটির হাঁড়ি পরীক্ষা করে দেখা যে তাতে জলের পরিমাণ কতটুকু এবং কোনো কাদার মিশ্রণ আছে কি না। আফিমকে একটি নির্দিষ্ট ঘনত্বের স্তরে না পৌঁছানো পর্যন্ত রোদে শুকানো হতো। এরপর কাঠের ছাঁচে ফেলে সেগুলোকে গোল গোল বল বা কেকের আকৃতি দেওয়া হতো, যার বাইরের আবরণ তৈরি হতো শুকনা পপি ফুলের পাপড়ি এবং আঠা দিয়ে। এই গোলকগুলো দেখতে ছিল কামানের গোলার মতো এবং প্রতিটি পেটিতে এমন চল্লিশটি করে গোলক সাজিয়ে রফতানির জন্য প্রস্তুত করা হতো।

এই আমলাতান্ত্রিক সুসংহতকরণের ফলে কোম্পানির আফিম বিশ্ববাজারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্রান্ডে পরিণত হয়। ‘পাটনা আফিম’ এবং ‘বেনারস আফিম’ নাম দুটি আন্তর্জাতিক চোরাচালানীদের কাছে খাঁটি পণ্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। লর্ড কর্নওয়ালিস এভাবে একটি ক্ষতিকর নেশার উৎপাদনকে নিখুঁত রাষ্ট্রীয় শিল্পে রূপান্তর করেছিলেন। কোনো বেসরকারি কারখানা বা স্থানীয় উদ্যোগের সেখানে প্রবেশের কোনো অধিকার ছিল না। কোনো কৃষক যদি অনুমতি ছাড়া নিজের জমিতে এক চিলতে পপি চাষ করত বা উৎপাদিত ফসলের এক রত্তি অংশ নিজের কাছে লুকিয়ে রাখত, তবে তাকে কঠোর কারাদণ্ড এবং জমি বাজেয়াপ্তির মুখোমুখি হতে হতো। কোম্পানির এই কঠোর আইনি শৃঙ্খল ভারতের গ্রামীণ সমাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল।

দাদন ও চাষিদের নিয়ন্ত্রণ: কৃষি উৎপাদনের ঔপনিবেশিক শৃ্ঙ্খল (Dadan and Peasant Control: Colonial Shackles of Agricultural Production)

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আফিম একচেটিয়াত্বের সবচেয়ে নির্মম শিকার ছিল বাংলা ও বিহারের সাধারণ কৃষক সমাজ। পপি চাষ কোনো দিনই কৃষকের স্বতঃস্ফূর্ত পছন্দের ফসল ছিল না। এটি ছিল অত্যন্ত শ্রমঘন এক কৃষিকাজ। জমি বারবার চষা, আগাছা পরিষ্কার করা, সঠিক সময়ে সেচ দেওয়া এবং সবচেয়ে কঠিন কাজ – ভোরবেলা কাঁচা ফলের গায়ে সূক্ষ্ম আঁচড় কেটে আঠা সংগ্রহ করা। পরিবারের নারী, পুরুষ ও শিশুদের দিনরাত এই জমিতে খাটতে হতো। অথচ এই হাড়ভাঙা পরিশ্রমের বিনিময়ে কৃষক যে অর্থ পেত, তা দিয়ে তার পরিবারের অন্ন সংস্থান হতো না। ফলে সাধারণ চাষিরা এই চাষ এড়িয়ে চলতে চাইতেন। কৃষকদের এই অনিচ্ছাকে ভাঙার জন্য কোম্পানি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত দাদন ব্যবস্থা (Dadan System) বা বাধ্যতামূলক অগ্রিম অর্থ প্রদান।

দাদন ছিল মূলত ঋণের এক দুর্ভেদ্য ফাঁদ। প্রতি বছর শরৎকালে কোম্পানির দেশীয় দালাল বা গোমস্তারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে কৃষকদের হাতে জোর করে নগদ রূপার টাকা গুঁজে দিত। অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ বিনয় ভূষণ চৌধুরী (Benoy Bhushan Chaudhuri) তার গবেষণায় ব্যাখ্যা করেছেন যে জমিদারদের উচ্চ খাজনা মেটানোর জন্য কৃষকের যখন নগদ টাকার তীব্র সংকট তৈরি হতো, তখন এই দাদন গ্রহণ করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো উপায় থাকত না (Chaudhuri, 1983)। একবার দাদন গ্রহণ করার অর্থ ছিল কৃষক তার নির্দিষ্ট পরিমাণ জমিতে পপি ছাড়া অন্য কোনো খাদ্যশস্য যেমন ধান বা গম ফলাতে পারবে না। যদি কোনো কৃষক চুক্তি ভঙ্গ করার চেষ্টা করত, তবে কোম্পানির পেয়াদারা এসে তার লাঙল-বলদ ক্রোক করত এবং শারীরিক নির্যাতন চালাত।

উৎপাদিত আফিমের ক্রয়মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোম্পানি কোনো বাজার নিয়মের তোয়াক্কা করত না। ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করত কোম্পানি একতরফাভাবে, যা সবসময় থাকত উৎপাদন খরচের চেয়েও অনেক নিচে। ইতিহাসবিদ সুগত বসু (Sugata Bose) দেখিয়েছেন যে ধান বা পাটের দাম যখন খোলা বাজারে বাড়ত, তখনও আফিমের সরকারি ক্রয়মূল্য দশকের পর দশক ধরে একই জায়গায় স্থির রাখা হতো (Bose, 1993)। কৃষকের ওপর আরেকটি বড় আঘাত ছিল ওজনে কারচুপি। কৃষকরা যখন তাদের সারা বছরের ঘাম ঝরানো আফিম নিয়ে জেলা সদরের সরকারি ওজন কেন্দ্রে পৌঁছাতেন, তখন ইংরেজ আমলা ও দেশীয় ওজনদাররা নানা অজুহাতে ওজনে কম দেখাত। আফিমে অতিরিক্ত জল আছে বা আঠা তরল হয়ে গেছে – এই অজুহাতে কৃষকের প্রাপ্য অর্থের একটি বড় অংশ কেটে নেওয়া হতো।

এই ঋণচক্রের কারণে প্রজন্মান্তরে কৃষক পরিবারগুলো কোম্পানির দাসের মতো জীবন কাটাতে বাধ্য হতো। বাবার নেওয়া দাদনের দায় এসে পড়ত ছেলের কাঁধে। খাদ্যশস্য উৎপাদনের জমি কমে যাওয়ায় এই অঞ্চলগুলোতে স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। পপি চাষের জমিগুলোর উর্বরতা দ্রুত নষ্ট হতো, ফলে পরবর্তী ফসলের ফলন কমে যেত। কোম্পানি যখন প্রতি পেটি আফিম কলকাতায় কয়েক হাজার রুপায় বিক্রি করে বিপুল মুনাফা লুটত, তখন সেই আফিমের মূল উৎপাদক বিহারের কৃষক পরিবারগুলো অনাহারে ও ঋণের বোঝায় ধুঁকে ধুঁকে মরছিল। ঔপনিবেশিক অর্থনীতির এই কাঠামো প্রমাণ করে যে ব্রিটিশ একচেটিয়াত্ব কোনো বাণিজ্যিক দক্ষতার বিষয় ছিল না; এটা ছিল নিরেট পুলিশি ক্ষমতা ও প্রশাসনিক বলপ্রয়োগের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখা এক প্রাতিষ্ঠানিক শোষণ।

ত্রিভুজাকার বাণিজ্যের জন্ম: রূপা, চা এবং আফিমের সাম্রাজ্যিক চক্র (Genesis of the Triangular Trade: The Imperial Circuit of Silver, Tea, and Opium)

ব্রিটিশদের আফিম একচেটিয়াত্ব কেবল ভারতের ভেতরে সীমাবদ্ধ কোনো অর্থনৈতিক কৌশল ছিল না; এর আসল লক্ষ্য ছিল বৈশ্বিক বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় ভারসাম্যহীনতা দূর করা। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে ব্রিটেনে এক নতুন সামাজিক বিপ্লব ঘটে – চা পানের বিস্তার। অভিজাতদের ড্রয়িং রুম থেকে শুরু করে লন্ডনের শিল্প কারখানার শ্রমিকদের ডেরা পর্যন্ত চা হয়ে ওঠে অপরিহার্য পানীয়। কিন্তু সেই যুগে সমস্ত চা আসত একটিমাত্র দেশ থেকে, আর সেটা হলো চিং রাজবংশের (Qing dynasty) অধীনস্থ চীন। চীনের ক্যান্টন বন্দরে গিয়ে ব্রিটিশ বণিকরা বিপুল পরিমাণ চা কিনত। কিন্তু এখানে একটি বড় বাণিজ্যিক সংকট তৈরি হয়। চীনের সম্রাট ও তার প্রজারা ব্রিটিশ পশমি কাপড়, লোহা বা অন্য কোনো ইউরোপীয় শিল্পপণ্য কিনতে সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক ছিল। তারা ব্রিটিশদের কাছে পণ্যের মূল্য হিসেবে দাবি করত কেবল খাঁটি রূপা বা সিলভার বুলিয়ন।

ফলে প্রতি বছর ইংল্যান্ড থেকে জাহাজে করে টন কে টন রূপা চলে যেত চীনের রাজকোষে। ইতিহাসবিদ মাইকেল গ্রিনবার্গ (Michael Greenberg) তার ধ্রুপদী গ্রন্থে একে ব্রিটিশ বাণিজ্যের চরম রক্তক্ষরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন (Greenberg, 1951)। এই একমুখী রূপা প্রবাহ ব্রিটিশ অর্থনীতি এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ধাতব মজুদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। লন্ডন থেকে ব্রিটিশ পরিচালকরা ক্রমাগত তাগিদ দিচ্ছিলেন যে এমন কোনো পণ্য খুঁজে বের করতে হবে যা চীনের বাজারে বিক্রি করে রূপা ফিরিয়ে আনা যায়। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সেই সমাধান খুঁজে পায় বিহারের পপি ক্ষেতে। চীনাদের আফিমের প্রতি দীর্ঘদিনের ঔষধি পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে তারা একে এক গণ-আসক্তিতে রূপান্তরের এক ভয়াবহ পরিকল্পনা সাজায়।

এভাবেই জন্ম নেয় ইতিহাসের কুখ্যাত ত্রিভুজাকার বাণিজ্য (Triangular Trade)। এই আন্তর্জাতিক চক্রটি কাজ করত তিনটি সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক বিন্দুর ওপর ভিত্তি করে। প্রথম পর্বে, ব্রিটিশ প্রস্তুতকারকরা শিল্পপণ্য ও সামরিক শক্তি পাঠাত ভারতে। দ্বিতীয় পর্বে, ভারত থেকে বলপ্রয়োগ করে কৃষকদের দিয়ে আফিম উৎপাদন করিয়ে সেই মাদক পাঠানো হতো চীনে। তৃতীয় পর্বে, চীনের সাধারণ মানুষ ও চোরাচালানীদের কাছে আফিম বিক্রি করে যে কোটি কোটি রূপা আদায় করা হতো, সেই রূপা দিয়ে ক্যান্টন বন্দর থেকে কেনা হতো চা এবং রেশম। এরপর সেই চা পাঠিয়ে দেওয়া হতো লন্ডনের বাজারে।

ইতিহাসবিদ জন কে. ফেয়ারব্যাংক (John K. Fairbank) এই আন্তর্জাতিক লেনদেনকে বর্ণনা করেছেন প্রাচ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে চতুর অর্থনৈতিক ফাঁদ হিসেবে (Fairbank, 1953)। রূপার প্রবাহ পুরোপুরি উল্টো দিকে ঘুরে যায়। এতদিন রূপা ইংল্যান্ড থেকে চীনে যেত, কিন্তু উনিশ শতকের শুরুতে এসে দেখা গেল রূপা চীন থেকে উল্টো স্রোতে এসে পৌঁছাচ্ছে কোম্পানির কলকাতার কোষাগারে। এই আফিম থেকে অর্জিত রাজস্ব দিয়েই ব্রিটিশরা ভারতের বিশাল ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনী বা সিপাহি বাহিনীকে লালন-পালন করত এবং সেই সেনাবাহিনী দিয়েই একে একে দখল করত বাকি ভারত ও বার্মা। চা পানের এক নির্দোষ সামাজিক অভ্যাস টিকিয়ে রাখার জন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এশিয়ার অন্য প্রান্তে কোটি কোটি মানুষকে একটি প্রাণঘাতী রাসায়নিক ড্রাগের ক্রীতদাসে পরিণত করেছিল।

কোম্পানির দ্বৈত নীতি: কলকাতা নিলাম ও ‘কান্ট্রি ট্রেড’ নেটওয়ার্ক (The Company’s Dual Policy: Calcutta Auctions and the ‘Country Trade’ Network)

চীনা সাম্রাজ্যে আফিম কোনো বৈধ পণ্য ছিল না। ১৭২৯ সালে সম্রাট ইয়ংজেং আফিম বিক্রির ওপর প্রথম নিষেধাজ্ঞা জারি করেন এবং ১৭৯৯ ও ১৮০০ সালে সম্রাট জিয়াকিং এর আমদানি ও সেবনের ওপর সম্পূর্ণ মৃত্যুদণ্ডের বিধান সম্বলিত ফরমান জারি করেন। ফলে ব্রিটিশ সরকারের সামনে এক বিরাট আইনি ও কূটনৈতিক সংকট দেখা দেয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যদি সরাসরি তাদের নিজস্ব পতাকাবাহী জাহাজে করে আফিম চীনে নিয়ে যেত, তবে ক্যান্টন বন্দরে তাদের সমস্ত বৈধ চা বাণিজ্য তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যেত এবং আন্তর্জাতিক আইনের চোখে তারা জলদস্যু হিসেবে চিহ্নিত হতো। এই কূটনৈতিক ফাঁদ থেকে বাঁচার জন্য কোম্পানি এক অভিনব দ্বৈত ও ভণ্ড নীতি গ্রহণ করে।

কোম্পানি সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা আফিম উৎপাদন করবে এবং প্যাকেটজাত করবে ঠিকই, কিন্তু তাদের নিজস্ব কোনো জাহাজ এই আফিম নিয়ে চীনের জলসীমায় প্রবেশ করবে না। সমস্ত প্রক্রিয়াজাত আফিম নিয়ে আসা হতো কলকাতায় এবং সেখানে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের কাছে আয়োজন করা হতো সরকারি নিলামের, যা ইতিহাসে পরিচিত কলকাতা নিলাম (Calcutta Auctions) নামে। এই নিলামে কাঁচা আফিম উন্মুক্ত ডাকের মাধ্যমে বিক্রি করা হতো বেসরকারি বণিকদের কাছে। কোম্পানি নিলাম শেষেই পণ্যের সম্পূর্ণ মূল্য বুঝে পেত এবং আইনগতভাবে সমস্ত দায়দায়িত্ব থেকে নিজেদের মুক্ত ঘোষণা করত। তারা দাবি করত যে নিলামের পর ক্রেতা সেই আফিম কোথায় নিয়ে যাবে, তার সাথে ব্রিটিশ রাজমুকুট বা কোম্পানির কোনো সম্পর্ক নেই।

এই আফিম কিনে নেওয়ার জন্য কলকাতায় অপেক্ষায় থাকত একদল দুর্ধর্ষ বেসরকারি ব্যবসায়ী, যাদের বলা হতো কান্ট্রি ট্রেডার্স (Country Traders)। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল স্কটিশ বণিকদের প্রতিষ্ঠিত ফার্ম জার্ডিন ম্যাথিসন (Jardine, Matheson & Co.) এবং ডেন্ট অ্যান্ড কোম্পানি। একই সাথে বোম্বাইয়ের বহু পারসি ব্যবসায়ী, যেমন জামসেটজি জিজিভয় এই সিন্ডিকেটে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। ইতিহাসবিদ অ্যালাইন লিরোথ (Alain Le Pichon) দেখিয়েছেন যে কোম্পানি কীভাবে লাইসেন্স দিয়ে এই বেসরকারি মার্চেন্ট হাউসগুলোকে তাদের অবৈধ নৌবহর পরিচালনার সুযোগ করে দিত (Le Pichon, 2006)।

এই কান্ট্রি ট্রেডাররা ব্যবহার করত সে যুগের সবচেয়ে দ্রুতগামী সশস্ত্র পালতোলা জাহাজ, যাদের বলা হতো ‘আফিম ক্লিপার’। ক্লিপারগুলো কলকাতা থেকে আফিমের পেটি বোঝাই করে তীব্র গতিতে ছুটে যেত দক্ষিণ চীন সাগরের দিকে। তারা চীনের মূল ভূখণ্ডের কাস্টমসের চোখ ফাঁকি দিয়ে পার্ল নদীর মোহনায় অবস্থিত লিন্টিন দ্বীপের মতো গোপন দ্বীপে তাদের ভাসমান গুদাম তৈরি করেছিল। সেখানে অপেক্ষায় থাকত চীনা দুর্নীতিবাজ আন্ডারওয়ার্ল্ডের চোরাচালানীরা, যারা দ্রুতগামী দাঁড়টানা নৌকা বা ‘স্মোকিং ড্রাগন’-এ করে আফিম তুলে নিত এবং স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে তা মূল ভূখণ্ডের অলিগলিতে ছড়িয়ে দিত। ইতিহাসবিদ উইলিয়াম টি. রো (William T. Rowe) দেখিয়েছেন যে এই চোরাচালান নেটওয়ার্ক ছিল অত্যন্ত পেশাদার এবং সহিংস (Rowe, 2009)। কোম্পানি এভাবে মুখে সাধু সেজে পেছনের দরজা দিয়ে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ সংগঠিত মাদক মাফিয়া চক্রকে অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ করে যাচ্ছিল।

মালওয়া আফিমের চ্যালেঞ্জ ও ঔপনিবেশিক সমঝোতা (The Malwa Opium Challenge and Colonial Accommodation)

উনিশ শতকের বিশের দশকে এসে ব্রিটিশ কোম্পানির এই সাজানো একচেটিয়া সাম্রাজ্য এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি হয়। বাংলা ও বিহারে যখন কোম্পানি তাদের লোহার শৃঙ্খল দিয়ে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করছিল, তখন পশ্চিম ভারতের মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানের দেশীয় রাজ্যগুলোতে হঠাৎ করেই আফিম চাষের বিপুল জোয়ার তৈরি হয়। সিন্ধিয়া, হোলকার এবং মেওয়ারের মতো স্বাধীন ও আধা-স্বাধীন রাজাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে উৎপাদিত এই আফিমকে বলা হতো মালওয়া আফিম (Malwa Opium)। এই রাজ্যগুলো ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল, ফলে কোম্পানির আফিম এজেন্সি আইনের কোনো ধার সেখানে খাটত না। স্থানীয় কৃষকরা খোলা বাজারে স্বাধীনভাবে পপি চাষ করত এবং মারোয়াড়ি ও পারসি ব্যবসায়ীরা তাদের নগদ অর্থ দিয়ে উৎসাহিত করতেন।

মালওয়া আফিম খুব দ্রুত ব্রিটিশদের কলকাতার নিলামের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে ওঠে। মালওয়ার আফিম আকারে ও স্বাদে কিছুটা ভিন্ন হলেও চীনা ভোক্তাদের কাছে তা জনপ্রিয়তা পায় এবং সবচেয়ে বড় কথা, এর দাম ছিল কোম্পানির আফিমের চেয়ে অনেক কম। এই আফিম ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত বোম্বাই বন্দর এড়িয়ে কচ্ছ, সিন্ধু এবং করাচি হয়ে পৌঁছে যেত পর্তুগিজ নিয়ন্ত্রিত দমন ও গোয়া বন্দরে। সেখান থেকে পর্তুগিজ ও মার্কিন জাহাজে করে সেই আফিম পাড়ি জমাত চীনে। ইতিহাসবিদ আসিয়া সিদ্দিকী (Asiya Siddiqi) তার গবেষণায় তুলে ধরেছেন যে কীভাবে ১৮২০ সালের দিকে এসে মালওয়া আফিম চীনের বাজারে ব্রিটিশদের বাংলা আফিমকে কোণঠাসা করে ফেলেছিল (Siddiqi, 1982)। কলকাতার নিলামে আফিমের দাম হঠাৎ করে ধসে পড়ে এবং ব্রিটিশ রাজকোষে রাজস্বের টান পড়ে।

শুরুতে ব্রিটিশরা স্বভাবসুলভ আগ্রাসনে মালওয়া আফিম ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল। তারা দেশীয় রাজ্যগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে কারখানা বন্ধ করার চেষ্টা করে, মরুভূমির পথে সশস্ত্র তল্লাশি চৌকি বসায় এবং পুরো রাজস্থান ঘিরে এক সামরিক অবরোধ কায়েম করতে চায়। কিন্তু এই নীতি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। মালওয়ার উটের কাফেলা সশস্ত্র রাজপুতদের পাহারায় ব্রিটিশদের ফাঁকি দিয়ে পাহাড়ি দুর্গম পথ দিয়ে ঠিকই সমুদ্র উপকূলে পৌঁছে যেত। স্থানীয় রাজনৈতিক বিদ্রোহের আশঙ্কায় ব্রিটিশরা বুঝতে পারে যে বলপ্রয়োগ করে এই বাণিজ্য চিরতরে বন্ধ করা যাবে না।

অবশেষে ১৮৩১ সালে ব্রিটিশ সরকার এক বাস্তববাদী সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়, যার নাম পাস ডিউটি ব্যবস্থা (Pass Duty System) (Farooqui, 2005)। ব্রিটিশরা দমন ও করাচির চোরাচালান পথ বন্ধ করার জন্য বোম্বাই বন্দরকে মালওয়া আফিমের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। নিয়ম করা হয় যে দেশীয় ব্যবসায়ীরা বৈধভাবেই মালওয়া আফিম বোম্বাই বন্দর দিয়ে বিদেশে পাঠাতে পারবেন, তবে প্রতিটি পেটির জন্য ব্রিটিশ সরকারকে একটি নির্দিষ্ট ও চড়া ট্রানজিট ট্যাক্স বা পাস ডিউটি দিতে হবে। এই সমঝোতার ফলে বোম্বাইয়ের অর্থনীতিতে এক ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ ঘটে। পারসি, গুজরাটি এবং মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীরা এই আইনি চ্যানেল ব্যবহার করে বিপুল বিত্ত সঞ্চয় করেন, যা পরবর্তীতে বোম্বাইয়ের সুতি বস্ত্র শিল্প এবং ভারতীয় শিল্পায়নের প্রাথমিক পুঁজি হিসেবে কাজ করেছিল।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এভাবে নিজের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ কিছুটা শিথিল করেও ট্রানজিট শুল্কের মাধ্যমে রাজকোষের নিশ্চিত আয় বজায় রাখে। মালওয়া আফিমকে এই ব্যবস্থার ভেতরে টেনে আনার ফলে পুরো ভারতীয় উপমহাদেশের মাদক বাণিজ্য একটি সুসংহত ব্রিটিশ কাঠামোর অধীনে চলে আসে। এই দুই ধরণের আফিম – বাংলার সরকারি একচেটিয়া আফিম এবং মালওয়ার শুল্কযুক্ত বেসরকারি আফিম – সম্মিলিতভাবে আছড়ে পড়ে চীনের উপকূলের ওপর। এর ফলে চিং সাম্রাজ্যের (Qing empire) অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয় এবং শুরু হয় এক অনিবার্য ঐতিহাসিক সংঘাত। বাণিজ্যিক লোভ, প্রশাসনিক প্রাতিষ্ঠানিকতা এবং রাষ্ট্রীয় ভণ্ডামির যে ভিত্তি কোম্পানি গড়ে তুলেছিল, তা শেষ পর্যন্ত কামান গর্জে ওঠার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল যা বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছিল প্রথম আফিম যুদ্ধের রক্তাক্ত ময়দানে।

বাংলায় ব্রিটিশ আফিম ও গাঁজা একচেটিয়া ব্যবস্থা (British Opium and Ganja Monopolies in Bengal): ঔপনিবেশিক শাসন

বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতি ও ঔপনিবেশিক রূপান্তর: আফিম বিভাগের আঞ্চলিক বিস্তার (Bengal’s Rural Economy and Colonial Transformation: Regional Expansion of the Opium Department)

পলাশী এবং বক্সারের যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন বাংলার শাসনক্ষমতা কুক্ষিগত করে, তখন গ্রামীণ সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর এক সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন নেমে আসে। নতুন শাসকদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ভূমি রাজস্বের বাইরেও নিশ্চিত ও সহজে আদায়যোগ্য নগদ আয়ের পথ তৈরি করা। এই উদ্দেশ্যে বাংলার কৃষি ভূগোলকে পুনর্বিন্যাস করা হতে থাকে ঔপনিবেশিক বাণিজ্যের স্বার্থে। সনাতন গ্রামীণ সমাজে কৃষক প্রধানত খাদ্যশস্য, ডাল ও তেলবীজ ফলাত, যা স্থানীয় মানুষের অন্ন সংস্থানের নিশ্চয়তা দিত। কিন্তু কোম্পানির নতুন নীতি খাদ্যশস্যের জমিগুলোকে জোরপূর্বক রূপান্তর করতে শুরু করে অর্থকরী ফসলের ক্ষেত্রে। আফিম ছিল এই জোরপূর্বক অর্থকরী ফসলের শীর্ষ নিদর্শন। বাংলা প্রেসিডেন্সির আওতাধীন বিহার, ছোটনাগপুর এবং উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে কোম্পানির আফিম বিভাগ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাদের জাল বিস্তার করে। ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহ (Ranajit Guha) তার কৃষক বিদ্রোহ সংক্রান্ত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে কোম্পানি কীভাবে সনাতন গ্রামীণ ক্ষমতা কাঠামোকে ধ্বংস করে কৃষকদের ওপর এক ধরনের আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য চাপিয়ে দিয়েছিল (Guha, 1983)।

এই নিয়ন্ত্রণের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ছিল বেঙ্গল আফিম বিভাগ। পাটনা এজেন্সির অধীনে থাকা অঞ্চলগুলোকে কয়েকটি সাব-ডিভিশনে ভাগ করা হয়েছিল, যার কেন্দ্র ছিল পাটনা, গয়া, শাহাবাদ, চম্পারণ এবং তিরহুত। প্রতিটি অঞ্চলে একজন ইংরেজ সাব-ডেপুটি আফিম এজেন্ট নিযুক্ত হতেন। এই শ্বেতাঙ্গ কর্মকর্তার কাজ ছিল কেবল অফিসে বসে ফাইল দেখা নয়, বরং ঘোড়ায় চড়ে পুরো জেলার গ্রামীণ জনপদে ঘুরে পপি চাষের তদারকি করা। এই এজেন্টদের অধীনে কাজ করত দেশীয় কর্মচারীদের এক সুবিশাল নেটওয়ার্ক। এদের মধ্যে ছিল গোমস্তা, মহুরি, তহশিলদার এবং জিলাদার। তারা সাধারণ কৃষকের সাথে সরাসরি যোগাযোগ না করে গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি বা মোড়লদের ‘খাতাদার’ বানাত। এই খাতাদাররা কোম্পানির কাছ থেকে নির্দিষ্ট কমিশন পেত এবং বিনিময়ে গ্রামের দরিদ্র চাষিদের পপি চাষের চুক্তিতে সই করাতে বাধ্য করত।

গ্রামের সাধারণ মানুষের জন্য এই আফিম কর্মচারীদের উপস্থিতি ছিল এক জীবন্ত বিভীষিকা। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে যখন পপি চাষের মৌসুম আসত, তখন সরকারি পেয়াদারা পরিমাপের দড়ি বা জরিপ শিকল নিয়ে মাঠে নেমে পড়ত। কৃষকের সবচেয়ে উর্বর জমি, যেখানে জলসেচের ভালো ব্যবস্থা ছিল এবং যা সাধারণত রবিশস্য বা আউশ ধানের জন্য বরাদ্দ থাকত, সেই জমিগুলোকে আফিম চাষের জন্য জোর করে চিহ্নিত করা হতো। কৃষক যদি আপত্তি করত, তবে তাকে তহশিলদারের কাচারিতে ধরে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হতো এবং তার হাল-বলদ ক্রোক করার হুমকি দেওয়া হতো। ইতিহাসবিদ আনন্দ ইয়াং (Anand A. Yang) তার গ্রামীণ বাজার ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক গ্রন্থে তুলে ধরেছেন যে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এই অঞ্চলগুলোর গ্রামীণ মেলা, হাট এবং সনাতন কৃষি চক্রকে কীভাবে সম্পূর্ণভাবে আফিম উৎপাদনের অধীনস্থ করে ফেলেছিল (Yang, 1989)।

অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ অমিয় কুমার বাগচী (Amiya Kumar Bagchi) দেখিয়েছেন যে এই জোরপূর্বক বাণিজ্যিকীকরণের কারণে বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক মারাত্মক কাঠামোগত সংকট দেখা দেয় (Bagchi, 1972)। কৃষক তার জমিতে কী ফসল ফলাবে, সেই স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। সবচেয়ে উর্বর জমিগুলো পপির দখলে চলে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে চাল, ডাল ও গমের জোগান কমে যেত। ফলে সামান্য খরা বা অনাবৃষ্টি হলেই এলাকায় তীব্র খাদ্য সংকট তৈরি হতো। কোম্পানি যখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি পেটি আফিম চড়া দামে বিক্রি করে রাজকোষ ভরে তুলত, তখন বাংলার পলিমাটিতে ঘাম ঝরানো চাষি পরিবারগুলো ধুঁকত দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে।

পপি চাষের এই আগ্রাসন স্থানীয় পরিবেশ এবং ভূমির উর্বরতার ওপরও গভীর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছিল। পপি একটি অত্যন্ত জমি-শোষণকারী ফসল; এটি মাটির সমস্ত জৈব উপাদান দ্রুত শুষে নেয়। ফলে পরপর দুই বা তিন মৌসুম পপি চাষ করার পর সেই জমি অন্য কোনো ফসলের উপযোগী থাকত না। জমি উর্বর রাখতে বিপুল পরিমাণ গোবর ও জৈব সারের প্রয়োজন হতো, যা জোগাড় করতে গিয়ে কৃষকের গবাদি পশুর সংখ্যা কমে যেত। অন্যদিকে সেচের জলের ওপর তৈরি হতো তীব্র সংঘাত। পপি ক্ষেতে নিয়মিত সেচ দিতে গিয়ে কৃষকরা তাদের শাকসবজি বা খাদ্যশস্যের ক্ষেতে জল দিতে পারত না। খাদ্য সুরক্ষার এই নির্মম বিপর্যয় ঔপনিবেশিক বাংলার কৃষককে পরিণত করেছিল নিজের ভিটেমাটিতেই এক উপায়হীন বন্দিতে।

নওগাঁর গাঁজা মহাল: উত্তরবঙ্গে ক্যানাবিস চাষের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ (The Ganja Mahal of Naogaon: State Control of Cannabis Cultivation in North Bengal)

আফিমের পাশাপাশি ব্রিটিশ প্রশাসন বাংলার আরেকটি প্রাচীন উদ্ভিদের ওপর তাদের শ্যেনদৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল, আর সেটা হলো গাঁজা বা ক্যানাবিস। আবহমান কাল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় আচার, লৌকিক গান, মরমী গানের আসর এবং গ্রামীণ বিনোদনে গাঁজার অবাধ ব্যবহার প্রচলিত ছিল। মানুষ বাড়ির আঙিনায় বা রাস্তার পাশের বুনো ক্যানাবিস গাছ থেকে পাতা ও ফুল সংগ্রহ করে ব্যবহার করত। কিন্তু ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের চোখে এমন অনিয়ন্ত্রিত মাদক ব্যবহার ছিল একেবারেই অপচয়, কারণ এখান থেকে কোনো সরকারি শুল্ক আদায় করা যেত না। উনিশ শতকের মাঝামাঝি এসে ব্রিটিশরা সিদ্ধান্ত নেয় যে সমগ্র বাংলা প্রেসিডেন্সির ক্যানাবিস চাষকে একটি সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখার ভেতরে অবরুদ্ধ করতে হবে। এই সিদ্ধান্তের ফলেই জন্ম নেয় এক অনন্য ঐতিহাসিক অঞ্চল, যার নাম গাঁজা মহাল (Ganja Mahal)।

এই মহালের অবস্থান ছিল বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার নওগাঁ মহকুমায়। ব্রিটিশ আবগারি বিভাগ নওগাঁর কয়েকটি সুনির্দিষ্ট থানা – নওগাঁ সদর, বদলগাছী, মহাদেবপুর এবং আত্রাইয়ের নির্দিষ্ট কিছু গ্রামকে আইনগতভাবে চিহ্নিত করে ‘গাঁজা ট্র্যাক্ট’ বা নিয়ন্ত্রিত চাষের সীমানা হিসেবে ঘোষণা করে। এই নির্ধারিত কয়েক বর্গমাইলের বাইরে বাংলা প্রেসিডেন্সির অন্য কোথাও গাঁজার একটি চারা রোপণ করাও ছিল মারাত্মক দণ্ডনীয় অপরাধ। ইতিহাসবিদ জেমস এইচ. মিলস (James H. Mills) তার আকর গ্রন্থে বিশদভাবে আলোচনা করেছেন যে কীভাবে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র একটি সাধারণ লোকায়ত উদ্ভিদকে আইন ও আমলাতন্ত্রের গ্যাঁড়াকলে ফেলে একচেটিয়া পণ্যে রূপান্তর করেছিল (Mills, 2000)।

নওগাঁর মাটিতে উৎপাদিত গাঁজা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুগন্ধযুক্ত। স্থানীয় চাষিরা বংশপরম্পরায় এক বিশেষ কৃষি কৌশল জানতেন, যাকে তারা বলতেন ‘পোদা কাটন’ বা পুরুষ গাছ ছাঁটাই। তারা খুব সতর্কতার সাথে পুরুষ গাছগুলোকে কেটে ফেলতেন যাতে স্ত্রী মঞ্জরিগুলোতে কোনো বীজ তৈরি না হতে পারে। বীজহীন এই অপ্রস্ফুটিত স্ত্রী ফুলগুলোতেই সবচেয়ে বেশি রেজিন বা নেশার উপাদান জমা হতো। ফসল কাটার পর চাষিরা সেগুলোকে সমতল মাঠে বিছিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় পায়ে মাড়িয়ে ও রোদে শুকিয়ে তিন ধরণের গাঁজা তৈরি করতেন: ‘চ্যাপ্টা’ বা ফ্ল্যাট, ‘গোল’ বা রাউন্ড এবং ভাঙা গুঁড়ো যা ‘চুর’ নামে পরিচিত ছিল।

ফসল প্রস্তুত হওয়ার পর চাষি তা নিজের ঘরে রাখতে পারত না। নওগাঁ শহরে স্থাপন করা হয়েছিল বিশাল কেন্দ্রীয় সরকারি গাঁজা গুদাম বা সরকারি গোলাঘর। চাষিরা মাঠ থেকে সমস্ত ফসল গরুর গাড়িতে বোঝাই করে কঠোর পুলিশি পাহারায় সরাসরি এই গোলাঘরে নিয়ে আসতেন। সেখানে আবগারি বিভাগের পরিদর্শকরা প্রতিটি গাঁটের ওজন ও আর্দ্রতা পরীক্ষা করে চাষিদের একটি নির্দিষ্ট সরকারি দাম দিতেন। গবেষক অশোক মিত্র (Asok Mitra) তার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে এই গাঁজা মহালের ওপর ভিত্তি করে নওগাঁ কীভাবে এক নিস্তব্ধ গ্রামীণ জনপদ থেকে এক জমজমাট ঔপনিবেশিক শহরে পরিণত হয়েছিল (Mitra, 1953)।

নওগাঁর এই কেন্দ্রীয় গুদাম থেকে সিলগালা করা কাঠের পেটিগুলোতে ভরে গাঁজা পাঠানো হতো সারা বাংলায়। বিশেষ পাহারাযুক্ত ট্রেনের ওয়াগনে করে এই মাদক চলে যেত কলকাতা, আসামের চা বাগান, বিহারের কয়লাখনি এবং বার্মা ও লন্ডনের বাজারে। ব্রিটিশ সরকার এই চাষের ওপর বিপুল পরিমাণ আবগারি শুল্ক ধার্য করত। চাষি পেত কেবল তার কায়িক শ্রমের যৎসামান্য মজুরি, যা প্রায়শই উৎপাদন খরচের চেয়েও কম হতো। অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগী ঠিকাদার এবং সরকারের কোষাগারে জমা হতো লাখ লাখ রৌপ্য মুদ্রা। মুক্ত প্রকৃতির একটি বুনো ভেষজকে এভাবে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় বন্দিশালায় আটকে ফেলার ইতিহাস ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের এক নির্মম উদাহরণ।

আবগারি ব্যবস্থার বিকাশ: অভ্যন্তরীণ মাদক ভোগ ও রাজস্ব নিষ্কাশন (Development of the Abkari System: Internal Drug Consumption and Revenue Extraction)

ব্রিটিশদের মাদক নীতির মূল রহস্য লুকিয়ে ছিল তাদের দ্বিমুখী চরিত্রের মধ্যে। বিদেশের বাজারে তারা যখন কোটি কোটি টাকার আফিম পাচার করত, তখন ভারতের অভ্যন্তরীণ সমাজে মাদক বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল এক সুবিশাল প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো। এই ব্যবস্থার নাম ছিল আবগারি ব্যবস্থা (Abkari System)। আরবি শব্দ ‘আব’ বা জল এবং ফারসি ‘কার’ বা তৈরি করা থেকে এই শব্দের উৎপত্তি। মুঘল আমলে মদ্যপানীয়ের ওপর সামান্য শুল্ক আদায়ের জন্য শব্দটি ব্যবহৃত হলেও ব্রিটিশরা একে রূপান্তর করে সমস্ত অভ্যন্তরীণ মাদক নিয়ন্ত্রণের প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক যন্ত্রে। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে কর্নওয়ালিসের সময় থেকেই আবগারি করের বিস্তার শুরু হয় এবং উনিশ শতকে তা রাজস্বের প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়।

আবগারি বিভাগের ঘোষিত নীতি ছিল চরম ভণ্ডামিপূর্ণ। তাদের সরকারি নথিপত্রে বারবার দাবি করা হতো যে সরকারের লক্ষ্য হলো ‘সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে সর্বনিম্ন ভোগ নিশ্চিত করা’ বা ‘ম্যাক্সিমাম রেভিনিউ উইথ মিনিমাম কনসাম্পশন’ (Maximum revenue with minimum consumption)। ব্রিটিশ আমলাদের যুক্তি ছিল, মাদকের ওপর এত বেশি কর বসানো হবে যাতে দাম বেড়ে যায় এবং সাধারণ দরিদ্র মানুষ তা কেনার সামর্থ্য হারিয়ে নেশা ত্যাগ করে। কিন্তু বাস্তবে এই নীতি কাজ করত সম্পূর্ণ বিপরীত ধারায়। সরকারের রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা প্রতি বছর বাড়িয়ে দেওয়া হতো, ফলে জেলা কালেক্টররা বাধ্য হতেন স্থানীয় বাজারে মাদকের বিক্রি বাড়ানোর সমস্ত বন্দোবস্ত করতে।

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার ছিল বার্ষিক দোকান লাইসেন্স নিলাম। প্রতি বছর প্রতিটি জেলায় আফিম, গাঁজা, সিদ্ধি বা ভাঙ, তাড়ি এবং পঁচুই বিক্রির অধিকার বা ‘মহাল’ নিলামে তোলা হতো। স্থানীয় ধনী ব্যবসায়ী ও মহাজনরা, যাদের ‘আবকার’ বলা হতো, তারা এই নিলামে অংশ নিতেন। যিনি সবচেয়ে বেশি রাজস্ব দেওয়ার অঙ্গীকার করতেন, তাকেই নির্দিষ্ট এলাকার জন্য দোকান খোলার লাইসেন্স দেওয়া হতো। ইতিহাসবিদ সব্যসাচী ভট্টাচার্য (Sabyasachi Bhattacharya) ঔপনিবেশিক আর্থিক নীতির বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে ভূমি রাজস্বের পরেই এই আবগারি রাজস্ব ছিল বাংলা সরকারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নগদ আয়ের উৎস (Bhattacharya, 1971)।

নিলামে চড়া দাম দিয়ে লাইসেন্স কেনার পর আবকারদের প্রধান লক্ষ্য হতো যেকোনো মূল্যে বিক্রি বাড়ানো, নতুবা তার সমস্ত জামানত বাজেয়াপ্ত হতো। ফলে ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষকে মাদকাসক্ত করার জন্য নানা ধরনের চাতুর্যের আশ্রয় নিত। গ্রামীণ হাটগুলোতে এবং শহরের মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠত চোখ ধাঁধানো মাদকের দোকান। আগে যেখানে মানুষ উৎসবের দিনে সামান্য তাড়ি বা ভাঙ পান করত প্রথাগত সামাজিক নিয়মের অধীনে, সেখানে এখন মাদক পরিণত হলো একটি বাণিজ্যিক পণ্যে। মানুষ বাধ্য হলো নগদ টাকা দিয়ে সরকারের সিলমোহর মারা দোকান থেকে অতিরিক্ত মূল্যে নেশা কিনতে।

সমাজবিজ্ঞানী সামিতা সেন (Samita Sen) তার গবেষণায় তুলে ধরেছেন যে কীভাবে নিম্নবর্গের শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন কষ্টের সুযোগ নিয়ে তাদের পারিবারিক আয়ের একটি বড় অংশ এই আবগারি ব্যবস্থার মাধ্যমে শুষে নেওয়া হতো (Sen, 1999)। ঘরের চাল ছাওয়ানো বা সন্তানের খাবার কেনার টাকা চলে যেত সরকারি লাইসেন্স করা আফিম ও গাঁজার দোকানে। ব্রিটিশ রাষ্ট্র মুখে নৈতিকতার বাণী আওড়ালেও তাদের বাজেটের ভারসাম্য রক্ষা পেত এই দরিদ্র মানুষের মাদকাসক্তির ওপর ভর করেই। এটি কোনো নিরাময়মূলক ব্যবস্থা ছিল না; এটা ছিল পরিকল্পিতভাবে সমাজের নিম্নবর্গকে নেশার শৃঙ্খলে বেঁধে রেখে রাজকোষ ভরানোর এক ঠান্ডা হিসাব।

গ্রামীণ নজরদারি ও অপরাধায়ন: অবৈধ মাদক দমন আইন (Rural Surveillance and Criminalization: Illicit Drug Suppression Laws)

একচেটিয়া কর্তৃত্বকে নিশ্ছিদ্র রাখতে ব্রিটিশ প্রশাসন জারি করেছিল একগুচ্ছ কঠোর ও দমনমূলক আইন। এর মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিল ১৮৫৭ সালের আফিম আইন বা অ্যাক্ট থার্টিন অব ১৮৫৭ (Act XIII of 1857) এবং পরবর্তীকালে আরও সর্বগ্রাসী আফিম আইন ১৮৭৮ (Opium Act, 1878)। এই আইনগুলোর মাধ্যমে বাংলার গ্রামীণ সমাজে এক আইনি ত্রাস প্রতিষ্ঠা করা হয়। আইন অনুসারে, সরকারের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তির কাছে আফিমের এক রত্তি আঠা, শুকনা পপি ফল বা পপির বীজ রাখাও ছিল মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ। একইভাবে ১৮৭৮ সালের বেঙ্গল এক্সাইজ অ্যাক্ট ক্যানাবিস এবং অন্যান্য দেশীয় পানীয়ের ওপর পুলিশের ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

আইন প্রয়োগের জন্য গড়ে তোলা হয় এক বিশেষ আবগারি পুলিশ বাহিনী ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক। জেলায় জেলায় আবগারি সুপারিন্টেন্ডেন্ট, দারোগা এবং জমাদারদের সাথে যুক্ত হয় একদল বেতনভুক গুপ্তচর, যাদের স্থানীয় মানুষ ডাকত ‘মুখবির’ বলে। এই মুখবিরদের কাজ ছিল গ্রামে গ্রামে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করা। কোন কৃষক গোপনে নিজের ঘরের পেছনে দুটি পপির চারা লাগিয়েছে, বা কে মাঠের ধারে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ক্যানাবিস গাছ থেকে পাতা ছিঁড়েছে – এই সব খবর পৌঁছে যেত আবগারি কাচারিতে। ইতিহাসবিদ রাধিকা সিংহ (Radhika Singha) ঔপনিবেশিক অপরাধ ও শাস্তি সংক্রান্ত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই আইনগুলো সাধারণ গ্রামীণ মানুষের সনাতন অধিকারকে রাতারাতি ‘অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছিল (Singha, 1998)।

এই তল্লাশি ও গ্রেফতারের ক্ষমতা ছিল সীমাহীন এবং স্বেচ্ছাচারী। কোনো বিচারকের পরোয়ানা ছাড়াই একজন সাধারণ আবগারি পেয়াদা যেকোনো কৃষকের ভিটেমাটিতে প্রবেশ করতে পারত। মাটির হাঁড়িকুড়ি ভেঙে তল্লাশি চালানো এবং নারীদের উপস্থিতিতেই বসতঘর তছনছ করা ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। বহু ক্ষেত্রে দেখা যেত যে প্রতিবেশী কোনো ব্যক্তির সাথে জমিজমার বিরোধ থাকলে মানুষ আবগারি পুলিশকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে শত্রু পক্ষকে ফাঁসিয়ে দিত। গ্রেফতারকৃত কৃষকদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো জেলা সদরের বিশেষ আদালতে। সেখানে বিচার হতো অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত প্রক্রিয়ায় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আসামির পক্ষে কোনো আইনজীবী থাকত না।

চিকিৎসা ইতিহাসবিদ ডেভিড আর্নল্ড (David Arnold) লক্ষ্য করেছেন যে উপনিবেশের সাধারণ মানুষের শরীর ও প্রতিদিনের অভ্যাসের ওপর রাষ্ট্র কীভাবে এক কঠোর শৃঙ্খলা চাপিয়ে দিয়েছিল (Arnold, 1993)। দরিদ্র সাঁওতাল বা রাজবংশী মানুষ, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জঙ্গল থেকে বুনো ভাঙ বা তালের তাড়ি সংগ্রহ করে ক্লান্তি দূর করত, তারা হঠাৎ দেখতে পেল তাদের এই প্রাকৃতিক অধিকার এখন ব্রিটিশ আইনের চোখে ‘চোরাচালান’। জরিমানার টাকা দিতে না পারলে কৃষকের হালের বলদ, ঘরের চালের টিন বা জমি নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হতো। এর ফলে হাজার হাজার কৃষক নিঃস্ব হয়ে ভিটেমাটি ত্যাগ করতে বাধ্য হতো। আইন ও অপরাধের এই ঔপনিবেশিক রাজনীতি বাংলার গ্রামীণ সমাজে এক স্থায়ী ভীতির সংস্কৃতি কায়েম করেছিল।

সামাজিক প্রভাব ও আসক্তি: শ্রমিক শ্রেণি ও শহুরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী (Social Impact and Addiction: Working Class and the Urban Margins)

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার শিল্পায়নের সাথে সাথে মাদক বাণিজ্যের সামাজিক পরিণতি এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। কলকাতা, হাওড়া, টিটাগড় এবং বজবজ জুড়ে হুগলি নদীর দুই তীরে গড়ে উঠতে থাকে একের পর এক পাটকল, সুতা কারখানা, ডকইয়ার্ড এবং রেলওয়ে ওয়ার্কশপ। গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হওয়া লাখ লাখ ভূমিহীন কৃষক ও প্রান্তিক মানুষ কাজের সন্ধানে ভিড় জমায় এই শিল্পাঞ্চলগুলোতে। কারখানার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, দিনে বারো থেকে চৌদ্দ ঘণ্টার একটানা অমানুষিক পরিশ্রম এবং বস্তির চরম নোংরা জীবন তাদের ঠেলে দেয় শারীরিক ও মানসিক ধ্বংসের দিকে। এই অসহ্য যন্ত্রণা ও ক্লান্তি ভুলতে তারা ব্যাপকভাবে ঝুঁকে পড়ে আফিম ও গাঁজার দিকে।

শহুরে শ্রমিক বস্তিগুলোতে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘মাদাক’ (madak) এবং ‘চান্দু’ (chandu)। মাদাক ছিল শুকনা পানের পাতা বা ধানের তুষের সাথে কাঁচা আফিমের ক্বাথ মিশিয়ে তৈরি এক ধরণের ধূমপানের উপাদান। এটি খাঁটি আফিমের চেয়ে সস্তা ছিল এবং খুব দ্রুত মানুষের মস্তিষ্কে তীব্র ঘোর তৈরি করতে পারত। কলকাতার চিৎপুর, মেছুয়াবাজার এবং বড়বাজারের অন্ধকার অলিগলিতে গড়ে ওঠে শত শত মাদাকের আড্ডা বা ‘মাদাক ডেন’। ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তী (Dipesh Chakrabarty) তার ধ্রুপদী গবেষণায় বাংলার পাটকল শ্রমিকদের সামাজিক জীবনের এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন (Chakrabarty, 1989)। মিল মালিক এবং ঔপনিবেশিক প্রশাসন এই মাদকের আড্ডার বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নিত না। বরং তারা একে এক ধরণের নিরাপত্তা ভালভ হিসেবে দেখত; কারণ নেশাগ্রস্ত শ্রমিকরা ধর্মঘট বা ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার মতো সচেতন রাজনৈতিক প্রতিরোধের দিকে কম ঝুঁকতো।

এই মাদক সংকটের সবচেয়ে মর্মান্তিক শিকার ছিল নারী শ্রমিক ও তাদের দুধের শিশুরা। পাটকলে কর্মরত হাজার হাজার দরিদ্র নারী তাদের শিশুদের ঘরে একা রেখে কারখানায় কাজ করতে যেতে বাধ্য হতেন। সারাদিন কারখানার তীব্র শব্দ ও ধুলোর মধ্যে কাজ করার সময় ঘরে পড়ে থাকা ক্ষুধার্ত শিশুকে শান্ত রাখার কোনো উপায় তাদের জানা ছিল না। ফলে তারা এক চরম আত্মঘাতী পথ বেছে নিতেন – শিশুর মুখে বা দুধের সাথে খাইয়ে দেওয়া হতো সরিষার দানার সমান কাঁচা আফিম। একে স্থানীয় ভাষায় বলা হতো শিশুকে ‘ঘুম পাড়ানো’। সারাদিন শিশুটি ঘরের মাটির মেঝেতে প্রায় অসাড় হয়ে ঘুমিয়ে থাকত এবং মা নিশ্চিন্তে কারখানায় তার শিফট শেষ করতেন।

ইতিহাসবিদ রঞ্জন চক্রবর্তী (Ranjan Chakrabarti) সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও অপরাধের ইতিহাসে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই বিষাক্ত অভ্যাসের কারণে কলকাতার বস্তিগুলোতে শিশুমৃত্যুর হার মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল (Chakrabarti, 2001)। বহু শিশু আফিমের বিষক্রিয়ায় ধীরে ধীরে শুকিয়ে মারা যেত, কিংবা তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যেত। গ্রামীণ এলাকাতেও এই ক্ষয়ক্ষতির রূপ ছিল একই রকম। বিহার ও বাংলার যেসব জেলায় আফিম ও গাঁজার সবচেয়ে বেশি চাষ হতো, সেখানেই সাধারণ মানুষের মধ্যে আসক্তির মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি। কৃষকরা কাজের ক্লান্তি কাটাতে পপির কাঁচা আঠা চাখত এবং ধীরে ধীরে শারীরিকভাবে এর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ত। উৎপাদনকারী কৃষক নিজেই পরিণত হতো সেই উৎপাদনের প্রধান শিকারে, অথচ রাষ্ট্র কেবল চোখ রাখত আবগারি খাতার ঊর্ধ্বমুখী আয়ের অঙ্কে।

১৮৯৩ সালের হেম্প ড্রাগস কমিশন ও ঔপনিবেশিক ন্যায্যতা (The 1893 Hemp Drugs Commission and Colonial Rationalization)

উনিশ শতকের শেষের দিকে এসে ব্রিটিশ মাদক নীতির বিরুদ্ধে খোদ ইংল্যান্ডের মাটিতে এক তীব্র নৈতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন দানা বাঁধে। খ্রিস্টান মিশনারি, কোয়েকার সম্প্রদায় এবং সমাজ সংস্কারকদের উদ্যোগে লন্ডনে গঠিত হয় সোসাইটি ফর দ্য সাপ্রেশন অব দ্য ওপিয়াম ট্রেড (Society for the Suppression of the Opium Trade)। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে র‍্যাডিক্যাল সদস্যরা সোচ্চার হয়ে ওঠেন। তারা দাবি করেন যে ভারত সরকার এশিয়ার নিরীহ মানুষকে বিষ খাইয়ে সাম্রাজ্যের তহবিল পরিচালনা করছে, যা কোনো সভ্য সরকারের কাজ হতে পারে না। এই আন্দোলনের ঢেউ এসে লাগে ভারতের গাঁজা বা ক্যানাবিস বাণিজ্যের ওপরও। বিশেষ করে ১৮৯২ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে মার্ক স্টুয়ার্ট নামের এক সংসদ সদস্য দাবি করেন যে ভারতে গাঁজা সেবনের ফলেই অধিকাংশ মানুষ উন্মাদ হয়ে যাচ্ছে এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে।

এই তীব্র রাজনৈতিক চাপ সামাল দিতে ভারত সরকার ১৮৯৩ সালে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠন করে, যা ইতিহাসে ইন্ডিয়ান হেম্প ড্রাগস কমিশন (Indian Hemp Drugs Commission) নামে পরিচিত। ডব্লিউ. এম. ম্যাকওয়ার্থ ইয়াং-এর সভাপতিত্বে গঠিত এই কমিশনটি ছিল ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের ইতিহাসের এক বিশাল তদন্ত মহড়া। সাত সদস্যের এই কমিশনে তিনজন ভারতীয় প্রতিনিধিকে রাখা হয় এবং তারা পুরো ভারত ও বাংলা প্রেসিডেন্সি জুড়ে ঘুরে ঘুরে প্রায় এক হাজার দুইশত সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন। সাক্ষীদের তালিকায় ছিলেন ইংরেজ সিভিল সার্জন, ভারতীয় জমিদার, হাকিম, কবিরাজ, মানসিক হাসপাতালের সুপারিন্টেন্ডেন্ট এবং সাধারণ সাধু-সন্ন্যাসী।

কমিশনের সামনে মূল প্রশ্নটি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট: গাঁজা, ভাঙ এবং চরস কি সত্যিই ভারতীয়দের উন্মাদ করে তুলছে, এবং এই মাদক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা সরকারের পক্ষে সম্ভব কি না? ১৮৯৪ সালে কমিশন সাত খণ্ডের এক সুবিশাল প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল ইন্ডিয়ান হেম্প ড্রাগস কমিশন রিপোর্ট (Report of the Indian Hemp Drugs Commission) (Indian Hemp Drugs Commission, 1894)। এই রিপোর্টটি ছিল ঔপনিবেশিক স্বার্থ রক্ষার এক অসাধারণ আমলাতান্ত্রিক কৌশল। কমিশন অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিসংখ্যান ও বৈজ্ঞানিক যুক্তির ছদ্মবেশে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে পরিমিত মাত্রায় গাঁজা বা ভাঙ সেবন মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না, বরং এটি ভারতীয় জলবায়ুতে পরিশ্রমী মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় এক ধরনের বলকারক পথ্য।

কমিশন আরও যুক্তি দেয় যে শত শত বছর ধরে ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে গাঁজা এমনভাবে মিশে আছে যে এটি হঠাৎ নিষিদ্ধ করতে গেলে ব্যাপক গণবিক্ষোভ তৈরি হতে পারে এবং মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে। তবে এই সাংস্কৃতিক সহানুভূতির মুখোশের পেছনে আসল উদ্দেশ্যটি ছিল একেবারেই আর্থিক। ইতিহাসবিদ কালিকিঙ্কর দত্ত (Kalikinkar Datta) তার স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমির বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে সরকার খুব ভালো করেই জানত যে গাঁজা নিষিদ্ধ করলে প্রাদেশিক সরকারের আবগারি রাজস্বে এক অপূরণীয় ধস নামবে (Datta, 1957)। ফলে কমিশন নিষেধাজ্ঞা জারির বদলে সুপারিশ করে যে গাঁজার ওপর শুল্ক আরও বাড়ানো হোক এবং নওগাঁর গাঁজা মহালের মতো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকে আরও শক্তিশালী করা হোক।

১৮৯৩ সালের এই কমিশন ঔপনিবেশিক শোষণের প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। নৈতিক চাপের মুখে পড়েও ব্রিটিশ রাষ্ট্র তাদের সবচেয়ে লাভজনক আর্থিক স্বার্থকে বিসর্জন দেয়নি। বিজ্ঞানের আপাত নিরপেক্ষ ভাষা এবং নৃতাত্ত্বিক তথ্যের আড়ালে তারা আসলে বাংলার আফিম ও গাঁজা একচেটিয়া ব্যবস্থার আয়ুষ্কাল আরও কয়েক দশকের জন্য বাড়িয়ে নিয়েছিল। যে মাদক সাম্রাজ্য পলাশীর যুদ্ধের পর কোম্পানির ব্যক্তিগত লুটের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল, উনিশ শতকের শেষে এসে তা বিজ্ঞানের ছদ্মবেশে এক নিখুঁত রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী শোষণযন্ত্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

ইন্দো-চীন মাদক পাচার (Indo-China Drug Trafficking): আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভূরাজনীতি ও মাদক প্রবাহ: আঞ্চলিক সংযোগের বিস্তার (Geopolitics and Drug Flows in Southeast Asia: Expansion of Regional Connectivity)

উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভৌগোলিক মানচিত্র দ্রুত বদলাতে শুরু করে। একদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বার্মা ও মালয় উপদ্বীপে নিজেদের আধিপত্য পাকাপোক্ত করছিল, অন্যদিকে ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তি মেকং নদী এবং লোহিত নদীর অববাহিকা ধরে তৈরি করছিল তাদের স্বপ্নের সাম্রাজ্য – ফরাসি ইন্দো-চীন। এই বিশাল ভূখণ্ডে ইউরোপীয় শক্তির আগমন সনাতন বাণিজ্যিক যোগাযোগগুলোকে ধ্বংস করেনি, বরং সেগুলোকে এক নতুন ও আগ্রাসী বাণিজ্যিক রূপ দিয়েছিল। এই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মাদক প্রবাহ। ব্রিটিশ ভারত থেকে উৎপাদিত উচ্চমানের আফিম এবং চীনের দক্ষিণ সীমান্ত থেকে আসা বুনো পপির আঠা এই অঞ্চলের সামুদ্রিক ও পাহাড়ি পথগুলোতে এক সুবিশাল আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। ইতিহাসবিদ আলফ্রেড ডব্লিউ. ম্যাককয় (Alfred W. McCoy) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে আধুনিক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রীয় সীমানা এবং অর্থনৈতিক পরিকাঠামো গড়ে ওঠার পেছনে আফিম বাণিজ্যের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী (McCoy, 1972)।

History of Malaysia - About | Economic History Malaysia
উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের সূচনাপর্বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক ভূগোল। ব্রিটিশ বার্মা ও মালয়, ফরাসি ইন্দো-চীন এবং শ্যামদেশের অবস্থান আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সীমান্ত যোগাযোগের পরিসর বোঝায়।

এই অঞ্চলের ভৌগোলিক গঠন ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। একদিকে রয়েছে সুবিশাল দক্ষিণ চীন সাগর এবং শ্যাম উপসাগর, যা মালাক্কা প্রণালী হয়ে ভারত মহাসাগরের সাথে যুক্ত। অন্যদিকে উত্তর দিকে রয়েছে দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকা, ঘন জঙ্গল এবং খরস্রোতা নদী। এই দুই ভূগোলের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা বন্দর শহরগুলো – যেমন সাইগন, হাইফং, ব্যাংকক এবং সিঙ্গাপুর – খুব দ্রুতই মাদক চোরাচালানের আঞ্চলিক আড্ডায় পরিণত হয়। পণ্য চলাচলের এই পথে ইউরোপীয় বাণিজ্যিক স্টিমারগুলোর পাশাপাশি চলাচল করত হাজার হাজার চীনা জাঙ্ক এবং দেশীয় নৌকা। ফলে উন্মুক্ত সমুদ্রের বৈধ বাণিজ্যের আড়ালে গড়ে উঠেছিল এক জটিল ও ছায়াবৃত কালোবাজার।

আঞ্চলিক মাদক প্রবাহের চরিত্র বোঝার জন্য তখনকার অর্থনৈতিক চাহিদাকে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। উনিশ শতকে এই অঞ্চল জুড়ে শুরু হয় ঔপনিবেশিক রবার বাগান, টিনের খনি এবং রেলপথ নির্মাণের বিপুল কর্মযজ্ঞ। এই কঠোর কায়িক পরিশ্রমের জন্য প্রয়োজন ছিল লাখ লাখ সস্তা শ্রমিক। স্থানীয় গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ঔপনিবেশিক কারখানায় কাজ করতে আগ্রহী না হওয়ায় ব্রিটিশ ও ফরাসিরা চীন থেকে বিপুল সংখ্যক অভিবাসী কুলি আমদানি করতে শুরু করে। এই কুলি শ্রমিকদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার অন্যতম উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছিল আফিম। ক্লান্তি, ম্যালেরিয়া এবং মানসিক অবসাদ দূর করতে তারা এই মাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে যে অঞ্চলে কুলিদের চলাচল ছিল, সেখানেই তৈরি হতো মাদকের তীব্র ও স্থায়ী বাজার।

ইতিহাসবিদ ক্রিস্টোফার গোশা (Christopher Goscha) লক্ষ্য করেছেন যে ইন্দো-চীনের সীমানা কোনো নিশ্ছিদ্র প্রাচীর ছিল না; এটি ছিল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, জলদস্যু এবং স্বাধীন ব্যবসায়ীদের অবাধ চলাচলের এক উন্মুক্ত সীমান্ত বা বর্ডারল্যান্ড (Goscha, 1999)। ব্রিটিশ বার্মা থেকে আসা আফিম খুব সহজেই ফরাসি লাওসের সীমান্ত পেরিয়ে চলে যেত শ্যামদেশে বা বর্তমান থাইল্যান্ডে। একইভাবে চীনের ইউনান প্রদেশের পপি ক্ষেত থেকে আসা অপরিশোধিত আঠা টংকিনের নদীপথ ধরে পৌঁছে যেত সাইগনের কারখানায়। আঞ্চলিক এই প্রবাহ কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ ছিল না; এটা ছিল আন্তঃঔপনিবেশিক অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা রাষ্ট্রীয় নীতি এবং বেআইনি সিন্ডিকেটের পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমেই পরিচালিত হতো।

La seconde offensive japonaise : le coup de force du 9 mars 1945 - Le blog de ecrivainducaillou.over-blog.com
ইউনান, টংকিন, লাওস ও বার্মার সীমান্ত অঞ্চলের ভৌগোলিক বিন্যাস। পাহাড়ি সীমান্ত ও নদী অববাহিকার অবস্থান আন্তঃআঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাব্য পথ বোঝায়; এটি নির্দিষ্ট আফিম চালানের পথচিত্র নয়।

ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলো এই আঞ্চলিক মাদক প্রবাহকে পুরোপুরি বন্ধ করার কোনো আন্তরিক উদ্যোগ নেয়নি। তাদের মূল উদ্বেগ ছিল কীভাবে এই প্রবাহকে নিজেদের শুল্ক কাঠামোর ভেতরে এনে সর্বাধিক রাজস্ব আদায় করা যায়। ফলে সীমান্ত পাহারার দায়িত্বে থাকা পুলিশ এবং শুল্ক কর্মকর্তারা প্রায়ই স্থানীয় চোরাচালানীদের সাথে গোপন বোঝাপড়ায় লিপ্ত হতো। যে মাদক সরকারি ডিপো দিয়ে যেত, তা হয়ে উঠত করযুক্ত আইনি পণ্য; আর যা রাতের অন্ধকারে জঙ্গল পেরিয়ে আসত, তা চিহ্নিত হতো চোরাচালান হিসেবে। বৈধ ও অবৈধের এই কৃত্রিম সীমারেখাই ইন্দো-চীন অঞ্চলের মাদক অর্থনীতিকে বছরের পর বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছিল।

ফরাসি ইন্দো-চীন ও আফিম রেজি: পল দুমেরের ঔপনিবেশিক রাজস্ব যন্ত্র (French Indochina and the Opium Régie: Paul Doumer’s Colonial Revenue Machine)

১৮৮০-র দশকের শেষের দিকে ফরাসিরা যখন ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এবং লাওসকে একত্রিত করে ফরাসি ইন্দো-চীন ইউনিয়ন গঠন করে, তখন তাদের ঔপনিবেশিক প্রশাসন এক তীব্র আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছিল। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ এবং শ্বেতাঙ্গ আমলাতন্ত্রের ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্যারিসের কোষাগার খালি হওয়ার উপক্রম হয়। ফরাসি উপনিবেশটি পরিণত হয়েছিল একটি শ্বেতহস্তীতে। ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তে ১৮৯৭ সালে ইন্দো-চীনের গভর্নর-জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন পল দুমের (Paul Doumer)। দুমের ছিলেন এক অত্যন্ত চতুর ও ঠান্ডা মাথার আমলা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে প্যারিসের ভর্তুকির ওপর নির্ভর করে এই সাম্রাজ্য চালানো যাবে না; ইন্দো-চীনকে তার নিজস্ব সম্পদ দিয়েই নিজের ঔপনিবেশিক ব্যয় মেটাতে হবে।

দুমেরের এই আর্থিক উদ্ধার অভিযানের প্রধান অস্ত্র ছিল রাষ্ট্রীয় মাদক একচেটিয়াত্ব, যা ইতিহাসে পরিচিত রেজি দে ওপিয়াম (Régie de l’Opium) বা সরকারি আফিম প্রশাসন নামে। ১৮৯৯ সালের মধ্যে দুমের পূর্ববর্তী সমস্ত বেসরকারি কর ইজারা বা ফার্মিং ব্যবস্থা বাতিল করেন। তিনি সমস্ত আফিম আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ এবং পাইকারি বিক্রির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তুলে নেন ঔপনিবেশিক সরকারের নিজস্ব হাতে। ইতিহাসবিদ চঁতাল দেসর্যুম (Chantal Descours-Gatin) তার ধ্রুপদী গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ফরাসি প্রশাসন কীভাবে মাদক বাণিজ্যকে একটি নিখুঁত ও আধুনিক রাষ্ট্রীয় শিল্পে রূপান্তর করেছিল (Descours-Gatin, 1992)।

File:French Indochina 1900-1945-fr.svg - Wikimedia Commons
টংকিন, আন্নাম, কোচিন-চীন, কম্বোডিয়া ও লাওসসহ ফরাসি ইন্দো-চীনের প্রশাসনিক মানচিত্র। সাইগনকেন্দ্রিক সরকারি আফিম সরবরাহের আলোচনায় উল্লিখিত অঞ্চলগুলোর অবস্থান এতে বোঝা যায়।

এই রাষ্ট্রীয় মাদক শিল্পের প্রতীক ছিল সাইগন শহরের প্রাণকেন্দ্রে নির্মিত সুবিশাল সরকারি আফিম কারখানা, যার আনুষ্ঠানিক নাম ছিল ‘ম্যানুফ্যাকচার দোপিয়াম’ (Manufacture d’Opium)। এই কারখানায় শত শত শ্রমিক আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে কাঁচা আফিম সিদ্ধ করত, তা থেকে কাদা ও ভেজাল দূর করত এবং সুনির্দিষ্ট রাসায়নিক ঘনত্বের ধূমপানের উপযোগী লেই তৈরি করত। এরপর সেই পরিশোধিত আফিম পিতল ও ব্রাস দিয়ে তৈরি বিশেষ বায়ুরোধী কৌটায় ভরা হতো। প্রতিটি কৌটায় ফরাসি সরকারের আনুষ্ঠানিক সিলমোহর লাগানো থাকত। সাইগনের এই কারখানা থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার টন প্যাকেটজাত আফিম চালান করা হতো টংকিন, আন্নাম, কোচিন-চীন, কম্বোডিয়া এবং লাওসের সরকারি বিপণিগুলোতে।

দুমেরের এই রেজি ব্যবস্থার কাঁচামাল প্রধানত আসত দুটি উৎস থেকে। সবচেয়ে উন্নত ও দামি অংশটি কেনা হতো ব্রিটিশ ভারতের কলকাতা নিলাম থেকে, যা ছিল বিখ্যাত ‘পাটনা আফিম’। আর অপেক্ষাকৃত কম দামি ও সাধারণ মানুষের জন্য নির্ধারিত অংশটি চোরাই পথে বা কর দিয়ে আমদানি করা হতো চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে। ফরাসি সরকার এই কাঁচা উপাদান কিনে এনে প্রক্রিয়াজাত করে প্রায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি দামে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করত। ইতিহাসবিদ ডেভিড মার (David G. Marr) ঔপনিবেশিক ভিয়েতনামের সমাজ বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে ফরাসিদের এই আফিম মনোপলি কেবল সাধারণ জনগণের ওপর এক নির্মম করের বোঝাই চাপায়নি, বরং তা শত শত গ্রামীণ পরিবারকে পুরোপুরি নিঃস্ব করে ফেলেছিল (Marr, 1971)।

দুমেরের এই নীতির অর্থনৈতিক সাফল্য ছিল চমকপ্রদ কিন্তু চরম অমানবিক। বিশ শতকের শুরুর দিকে ফরাসি ইন্দো-চীনের মোট সরকারি বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি অর্থ আসত এই একটিমাত্র খাত – আফিম রেজি থেকে। এই মাদকের মুনাফা দিয়েই তৈরি হয়েছিল হাইফং থেকে ইউনান পর্যন্ত বিস্তৃত কুখ্যাত রেলপথ, সাইগনের সুরম্য ভবন এবং ফরাসি সামরিক বাহিনীর ব্যারাক। ফরাসি প্রজাতন্ত্র মুখে ‘স্বাধীনতা, সমতা ও মৈত্রী’র বাণী প্রচার করলেও এশিয়ার মাটিতে তাদের ঔপনিবেশিক টিকে থাকার মূল রসদ জোগাত কোটি কোটি মানুষকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আফিমে আসক্ত করে রাখা।

ইউনানের কাফেলা ও পার্বত্য বাণিজ্য পথ: সীমান্ত চোরাচালানের গতিপ্রকৃতি (Yunnan Caravans and Highland Trade Routes: Dynamics of Border Smuggling)

সামুদ্রিক বন্দরগুলো যখন ফরাসি এবং ব্রিটিশদের কঠোর নজরদারিতে থাকত, তখন ইন্দো-চীনের উত্তরাঞ্চলীয় পাহাড়ি সীমান্তে চলত এক ভিন্ন ধরনের মাদক বাণিজ্য। এই বাণিজ্যের মূল উৎস ছিল চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় দুর্গম প্রদেশ ইউনান। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে চিং রাজবংশের (Qing dynasty) কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়লে ইউনান এবং সিচুয়ান অঞ্চলে পপি চাষ এক অভাবনীয় গতি লাভ করে। এই উর্বর ও পাহাড়ি উপত্যকায় উৎপাদিত আফিম স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিল ‘ইউনান-বাই’ বা ইউনানের সাদা আফিম নামে। এর দাম ছিল ভারতীয় আফিমের চেয়ে অনেক কম, কিন্তু এর সরবরাহ ছিল প্রায় অফুরন্ত। এই বিপুল পরিমাণ সস্তা মাদককে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করত এক বিশেষ যাযাবর সম্প্রদায়, যাদের বলা হতো হোয়া বণিক (Haw Traders)।

হোয়া বণিকরা ছিলেন প্রধানত ইউনানের মুসলিম বা প্যান্থে সম্প্রদায়ের মানুষ। তারা ছিলেন অত্যন্ত সাহসী, দুর্ধর্ষ এবং অস্ত্র চালনায় পারদর্শী। শত শত খচ্চর ও ঘোড়া নিয়ে গঠিত তাদের দীর্ঘ কাফেলা বা ক্যারাভান পাহাড়ি সংকীর্ণ গিরিপথ ধরে চলাচল করত। একেকটি কাফেলায় পঞ্চাশ থেকে একশতটি পর্যন্ত খচ্চর থাকত এবং প্রতিটি খচ্চরের পিঠে বিশেষ চামড়ার থলিতে বোঝাই থাকত কাঁচা আফিমের চাকতি। নৃতাত্ত্বিক গবেষক ওয়েন-চিন চ্যাং (Wen-Chin Chang) এই কাফেলা বাণিজ্যের ইতিহাস অনুসন্ধান করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই ব্যবসায়ীরা দুর্গম বনাঞ্চল, পাহাড়ি নদী এবং ম্যালেরিয়াপ্রবণ উপত্যকা পেরিয়ে কয়েক মাস ধরে পথ চলতেন (Chang, 2014)।

এই কাফেলাগুলোর বাণিজ্যিক রুট ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। ইউনানের তালি বা কুনমিং শহর থেকে যাত্রা শুরু করে তারা দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হতো। একটি পথ চলে যেত বার্মার শান রাজ্যগুলোর ভেতর দিয়ে মেকং নদীর অববাহিকায়; আরেকটি পথ সরাসরি প্রবেশ করত উত্তর লাওসের পাহাড়ি জনপদে; এবং তৃতীয় পথটি লোহিত নদীর খাড়া গিরিখাত ধরে নেমে আসত উত্তর ভিয়েতনামের টংকিন অঞ্চলে। এই পাহাড়ি পথগুলোতে কোনো আনুষ্ঠানিক সীমান্ত চৌকি ছিল না। ফরাসি বা ব্রিটিশ কাস্টমস পেয়াদারা কখনোই এই দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গলে প্রবেশের সাহস পেত না, কারণ হোয়া কাফেলার প্রতিটি সদস্য রাইফেল এবং ধারালো তলোয়ার নিয়ে চলাফেরা করত।

Client Challenge
ইউনান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পার্বত্য অঞ্চলের কাফেলা বাণিজ্যের যোগাযোগপথ। বার্মার শান অঞ্চল, উত্তর লাওস ও উত্তর থাইল্যান্ডের সঙ্গে ইউনানের সংযোগ এই বাণিজ্যের আন্তঃআঞ্চলিক পরিসর বোঝায়।

ঐতিহাসিক অ্যান্ড্রু ফোর্বস (Andrew Forbes) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে এই কাফেলা বাণিজ্য নিছক একমুখী ছিল না (Forbes, 1987)। হোয়া ব্যবসায়ীরা ইউনান থেকে আফিম নিয়ে এসে শ্যামদেশের চিয়াং মাই বা লাওসের লুয়াং প্রাবাংয়ের বাজারে বিক্রি করতেন। বিনিময়ে তারা সমতল থেকে কিনে নিতেন লবণ, শুকনা মাছ, লোহা, ইউরোপীয় সুতি কাপড় এবং সর্বোপরি আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি। এই অস্ত্রগুলো আবার ইউনানে নিয়ে গিয়ে স্থানীয় যুদ্ধবাজ নেতাদের কাছে বিক্রি করা হতো। ফলে মাদক ও অস্ত্রের এক অবিচ্ছেদ্য সমীকরণ এই পাহাড়ি অঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে কার্যকর ছিল।

ইউনান থেকে আসা এই সস্তা আফিম ছিল ফরাসি রেজি ব্যবস্থার জন্য এক বিরাট দুঃস্বপ্ন। ফরাসিরা চেয়েছিল তাদের কারখানায় তৈরি দামি আফিম পুরো ভিয়েতনামে বিক্রি করতে। কিন্তু উত্তর ভিয়েতনামের সাধারণ মানুষ এবং পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীরা অনেক কম দামে এই হোয়া কাফেলার কাছ থেকে চোরাই ইউনানি আফিম কিনে নিত। ফলে ফরাসি প্রশাসন উত্তর সীমান্তে বিশেষ সামরিক ফাঁড়ি বসাতে বাধ্য হয়। কিন্তু পাহাড়ি আদিবাসীদের সহযোগিতা এবং অত্যন্ত জটিল ভৌগোলিক পরিবেশের কারণে এই কাফেলাগুলোর চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করা কখনোই সম্ভব হয়নি। এই পাহাড়ি পথগুলোই পরবর্তীতে বিশ শতকের মাঝামাঝি এসে পরিণত হয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে কুখ্যাত মাদক উৎপাদন অঞ্চল – গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের মূল ধমনিতে।

Southeast Asia Map - Countries & Scale – Royalty-Free Vector | VectorStock
মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ডের সীমান্তসংলগ্ন গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের অবস্থান। মানচিত্রটি পরবর্তী কালের মাদক অর্থনীতির আলোচনায় উল্লিখিত অঞ্চল চিহ্নিত করে; উনিশ শতকের নির্দিষ্ট কাফেলা বা চোরাচালানের পথ দেখায় না।

উপকূলীয় নেটওয়ার্ক ও গোপন সংঘ: ট্রায়াড, কুচক্র ও কুলিদের স্থানান্তর (Coastal Networks and Secret Societies: Triads, Syndicates, and Coolie Migration)

পাহাড়ি গিরিপথের সমান্তরালে ইন্দো-চীনের উপকূলীয় সমুদ্রপথে কাজ করত এক অত্যন্ত সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক আন্ডারওয়ার্ল্ড। এই অপরাধ চক্রের মূল নিয়ন্ত্রক ছিল দক্ষিণ চীনের বন্দরগুলো থেকে ছড়িয়ে পড়া গোপন সংঘ বা ট্রায়াড। ঐতিহ্যগতভাবে এই সংঘগুলোকে বলা হতো তিয়ান্দিহুই (Tiandihui) বা ‘স্বর্গ ও মর্ত্য সমিতি’। শুরুতে এগুলো ছিল চিং রাজবংশ (Qing dynasty) উৎখাতের রাজনৈতিক ও ভ্রাতৃত্বমূলক প্ল্যাটফর্ম, কিন্তু উনিশ শতকের শেষভাগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছে এগুলো রূপান্তরিত হয় নির্মম অপরাধ সিন্ডিকেটে। গবেষক লিয়ন কম্বার (Leon Comber) মালয় ও ইন্দো-চীন অঞ্চলে চীনা গোপন সংঘগুলোর আধিপত্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে এই দলগুলো কীভাবে অভিবাসী শ্রমিকদের জীবন ও মাদক বাণিজ্যের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল (Comber, 1959)।

এই গোপন সংঘগুলোর শক্তি নিহিত ছিল তাদের নিজস্ব সাংগঠনিক রূপরেখা – ‘কংসী’ (kongsi) কাঠামোর মধ্যে। চীন থেকে যখন হাজার হাজার নিরক্ষর ও দরিদ্র কুলি হংকং বা ম্যাকাও হয়ে সাইগন, হাইফং বা চোলনে পৌঁছাত, তখন তাদের কোনো আইনি নিরাপত্তা ছিল না। ট্রায়াডের নেতারা এই অসহায় শ্রমিকদের আশ্রয় দিত, কাজের ব্যবস্থা করত এবং নিজেদের প্রভাব বলয়ে টেনে নিত। কিন্তু এই সুরক্ষার এক ভয়াবহ মূল্য চোকাতে হতো। শ্রমিকদের মজুরির টাকা কেটে নেওয়া হতো তাদেরই সরবরাহ করা আফিম, জুয়া এবং যৌনপল্লীর খরচের নামে। সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্টনি রিড (Anthony Reid) দেখিয়েছেন যে এই কুলি বাণিজ্য এবং মাদক পাচার ছিল একই মুদ্রার দুটি পিঠ; একটি ছাড়া অন্যটি টিকে থাকতে পারত না (Reid, 1993)।

উপকূলীয় পাচারের কৌশলগুলো ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও চতুর। হংকং এবং ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত সিঙ্গাপুর ছিল এই সামুদ্রিক নেটওয়ার্কের দুটি প্রধান রি-শিপমেন্ট হাব। সেখান থেকে নিয়মিত যাতায়াতকারী ইউরোপীয় বাণিজ্যিক বাষ্পীয় জাহাজের গোপন খোপে, কয়লার বাংকারে কিংবা তেলের ব্যারেলে ভরে রাখা হতো শত শত কিলোগ্রাম কাঁচা আফিম। জাহাজের চীনা খালাসি এবং মেকানিকরা প্রায়শই এই গোপন সংঘগুলোর বেতনভুক সদস্য ছিল। জাহাজ যখন সাইগন বা হাইফংয়ের বন্দরে নোঙর ফেলত, তখন রাতের আঁধারে ছোট ছোট দ্রুতগামী সাম্পান বা নৌকায় করে সেই পণ্য খালাস করা হতো। নদীর তীরের অগভীর খাঁড়িগুলোতে আগে থেকেই অপেক্ষায় থাকত গোপন সংঘের সশস্ত্র ক্যাডাররা।

এই কালোবাজারি সিন্ডিকেটগুলোর সাথে ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলা ও কাস্টমস অফিসারদের গভীর আর্থিক সম্পর্ক ছিল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফরাসি কর্মকর্তারা জানতেন কোন জাহাজে মাদক আসছে, কিন্তু মাসোহারা বা ঘুষের বিনিময়ে তারা চোখ বন্ধ রাখতেন। এমনকি সাইগনের বিখ্যাত চীনা শহরতলী চোলনের ধনী ব্যবসায়ীরা প্রায়শই ফরাসি প্রশাসনের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সাথে এক টেবিলে বসে নৈশভোজ করতেন। এই দ্বৈত ব্যবস্থার ফলে সাধারণ খুচরা ব্যবসায়ীরা ধরা পড়লেও মূল মাফিয়া ডনরা সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যেত। এই উপকূলীয় চোরাচালান নেটওয়ার্ক প্রমাণ করে যে উনিশ শতকের আন্তর্জাতিক মাদক বাণিজ্য কেবল ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর একার সৃষ্টি ছিল না; এর পেছনে কাজ করছিল পূর্ব এশিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের এক নিখুঁত ও সমান্তরাল শক্তি।

গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের ভিত্তিপ্রস্তর: হমং জনগোষ্ঠী ও পার্বত্য পপি অর্থনীতি (Foundations of the Golden Triangle: The Hmong and the Highland Poppy Economy)

আজ আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যে অঞ্চলটিকে কুখ্যাত গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল (Golden Triangle) বা স্বর্ণ ত্রিভুজ নামে চিনি – যা মিয়ানমার, লাওস এবং থাইল্যান্ডের সীমান্ত জুড়ে বিস্তৃত – তার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল উনিশ শতকের শেষভাগে ঔপনিবেশিক কর ব্যবস্থার মাধ্যমে। এই পাহাড়ি ভূগোলে একটি বিশেষ নৃতাত্ত্বিক পটভূমি কাজ করেছিল। দক্ষিণ চীনের হান রাজবংশের নির্যাতন ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে লাখ লাখ পাহাড়ি মানুষ দক্ষিণ দিকে অভিবাসন করতে বাধ্য হয়। এদের মধ্যে প্রধান ছিল হমং (Hmong) জনগোষ্ঠী, যাদের চীনারা ডাকত ‘মিয়াও’ বলে। তাদের সাথে ছিল মিয়েন বা ইয়াও এবং শান সম্প্রদায়ের মানুষ। তারা এসে বসতি স্থাপন করে উত্তর ভিয়েতনাম, উত্তর লাওস এবং পূর্ব বার্মার দুর্গম পাহাড়ি উচ্চভূমিতে।

রাজনীতিবিজ্ঞানী জেমস সি. স্কট (James C. Scott) তার বিখ্যাত গ্রন্থে এই অঞ্চলটিকে বর্ণনা করেছেন ‘জোমিয়া’ (Zomia) নামে – এক বিশাল উচ্চভূমি যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সমতলের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও কর কাঠামোর বাইরে টিকে ছিল (Scott, 2009)। এই পাহাড়ি মানুষগুলো ঐতিহ্যগতভাবে জুম বা ঝুম চাষ করত। কিন্তু প্রায় তিন হাজার ফুটের বেশি উচ্চতায় সাধারণ ধান বা খাদ্যশস্যের ফলন খুব একটা ভালো হতো না। অথচ এই তীব্র ঠান্ডা, কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ি ঢাল এবং চুনাপাথর সমৃদ্ধ মাটি ছিল পাপাভার সোমনিফেরাম বা পপি চাষের জন্য একেবারে আদর্শ।

Welcome to Zomia, the Anarchist Country You've Never Heard Of | by Matthijs Bijl | Medium
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চল বা জোমিয়ার ধারণাগত মানচিত্র। জোমিয়া কোনো রাষ্ট্র বা নির্দিষ্ট প্রশাসনিক সীমানা নয়; এটি বিভিন্ন দেশের সীমান্ত অতিক্রমকারী উচ্চভূমিকে বোঝানোর একটি গবেষণাগত ধারণা।

ফরাসি ঔপনিবেশিক প্রশাসন লাওস ও টংকিনের পাহাড়ি অঞ্চল দখল করার পর এই স্বাধীন নৃগোষ্ঠীগুলোর ওপর এক নির্মম করের বোঝা চাপিয়ে দেয়। প্রতিটি পরিবারকে নির্দেশ দেওয়া হয় বার্ষিক নির্দিষ্ট পরিমাণ নগদ রৌপ্য মুদ্রা কর হিসেবে দিতে হবে। কিন্তু এই পাহাড়ি সমাজে কোনো নগদ মুদ্রার প্রচলন ছিল না। তাদের কাছে ছিল না কোনো খনি বা ব্যাংক। এই সংকট থেকে বাঁচার জন্য ফরাসি কর সংগ্রাহকরা এক নতুন নিয়ম চালু করে: যদি কোনো হমং পরিবার নগদ রূপা দিতে না পারে, তবে তাদের কর পরিশোধ করতে হবে কাঁচা আফিমের ওজনে। নৃবিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান চেলেরি (Christian Culas) এবং জিন মিশো (Jean Michaud) তাদের যৌথ গবেষণায় তুলে ধরেছেন যে কীভাবে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের এই কর নীতি হমং সমাজকে তাদের প্রথাগত খাদ্য উৎপাদন ছেড়ে বাণিজ্যিকভাবে পপি চাষে বাধ্য করেছিল (Culas & Michaud, 1997)।

হমং পরিবারগুলো এখন তাদের বাঁচা-মরার তাগিদে জঙ্গল পুড়িয়ে একের পর এক পাহাড়ের ঢালে পপির আবাদ শুরু করে। পুরুষরা জমি তৈরি করত, নারীরা অত্যন্ত নিপুণ হাতে ভোরবেলা কাঁচা ফলের খোসায় সূক্ষ্ম দাগ কেটে আঠা সংগ্রহ করত এবং শিশুরা সেই আঠা পাতা দিয়ে মুড়িয়ে জমা করত। পপি হয়ে ওঠে এই পাহাড়ি অর্থনীতির একমাত্র নগদ ফসল বা বিনিময় মুদ্রা। তারা এই আফিম দিয়ে ফরাসি কর মেটাত এবং সমতলের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বন্দুকের বারুদ ও লবণের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনত। পাহাড়ের এই মুক্ত মানুষগুলো এভাবে নিজেদের অজান্তেই জড়িয়ে পড়েছিল বৈশ্বিক মাদক অর্থনীতির মরণফাঁদে।

এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সমতলের কৃষিনির্ভর আফিম উৎপাদন ধীরে ধীরে পুরোপুরি স্থানান্তরিত হতে থাকে দূরবর্তী পাহাড়ের উপত্যকায়। ফরাসিরা প্রথমদিকে এই চাষকে উৎসাহিত করেছিল কারণ এর ফলে তাদের সরকারি রেজি কারখানার জন্য সস্তা কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত হতো। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি যে তারা এমন এক দানবকে জন্ম দিচ্ছে যা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ভবিষ্যতে কোনো রাষ্ট্রের থাকবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো এই অঞ্চল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, তখন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর এই প্রাতিষ্ঠানিক পপি চাষের অবকাঠামোই রূপ নিয়েছিল পৃথিবীর সর্ববৃহৎ অবৈধ হেরোইন উৎপাদন কেন্দ্রে।

আঞ্চলিক ক্ষমতা সংঘাত ও রাষ্ট্রীয় ধূসর অর্থনীতি: বিশ শতকের প্রাক্কাল (Regional Power Conflicts and the State-Sponsored Grey Economy: Eve of the Twentieth Century)

বিশ শতকের সূচনা লগ্নে এসে ইন্দো-চীন অঞ্চলের মাদক বাণিজ্য এক চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে, যেখানে বৈধ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং অবৈধ সশস্ত্র শক্তির সীমারেখা পুরোপুরি মুছে গিয়েছিল। লোহিত নদীর অববাহিকা এবং মেকং নদীর উপত্যকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সাথে স্থানীয় সশস্ত্র দলগুলোর প্রতিনিয়ত সংঘাত চলত। এদের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিল চীনের তাইপিং বিদ্রোহের ভগ্নাবশেষ থেকে জন্ম নেওয়া সশস্ত্র ভাড়াটে বাহিনী, যা পরিচিত ছিল ব্ল্যাক ফ্ল্যাগ আর্মি (Black Flag Army) বা কৃষ্ণ পতাকা বাহিনী নামে। এদের নেতা লিউ ইয়ংফু উত্তর ভিয়েতনামের নদীপথগুলোতে শক্তিশালী দুর্গ গড়ে তুলেছিলেন।

কৃষ্ণ পতাকা বাহিনীর আয়ের মূল উৎস ছিল পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নৌকা বোঝাই করে আনা আফিমের চালানের ওপর জোরপূর্বক টোল বা শুল্ক আদায় করা। তারা কোনো ব্যবসায়ীকে আফিম নিয়ে যেতে দিত না যদি না তাদের নির্দিষ্ট শুল্ক পরিশোধ করা হতো। ফরাসি সামরিক বাহিনী প্রথমদিকে এই জলদস্যু দলটিকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে, কিন্তু একের পর এক ব্যর্থ অভিযানের পর তারা বুঝতে পারে যে এই বাহিনীকে সামরিকভাবে নির্মূল করা অসম্ভব। ফলে ইতিহাসবিদ পিয়েরে ব্রোশু (Pierre Brocheux) দেখিয়েছেন যে ফরাসি প্রশাসন এক পর্যায়ে এই দলগুলোর সাথেই গোপন বাণিজ্যিক চুক্তিতে পৌঁছায় (Brocheux, 2009)। ফরাসিরা তাদের একটি নির্দিষ্ট এলাকার আফিম বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেয় এবং বিনিময়ে তারা ফরাসি রেজি ডিপোগুলোতে নিয়মিত সরবরাহের নিশ্চয়তা পায়।

একই সময়ে পশ্চিম সীমান্তে শ্যামদেশের রাজতান্ত্রিক সরকারও এই মাদক সমীকরণে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। রাজা চুলালংকর্ন বা পঞ্চম রামের শাসনামলে শ্যামদেশ নিজেকে একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে পুনর্গঠন করছিল। কিন্তু ব্যাংককের আধুনিকীকরণ ও রেলওয়ে নির্মাণের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন ছিল। ব্রিটিশ ও ফরাসিদের মতো শ্যাম রাজকোষও চালু করে তাদের নিজস্ব রাজকীয় আফিম ফার্মিং ব্যবস্থা। ফলে ব্রিটিশ বার্মা, ফরাসি ইন্দো-চীন এবং শ্যামদেশের সীমান্ত অঞ্চলগুলো রূপ নেয় এক চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ধূসর অঞ্চলে। প্রতি বছর এই তিন শক্তির নিয়ন্ত্রিত চোরাচালানীরা একে অপরের জলসীমায় অনুপ্রবেশ করত এবং স্থানীয় পুলিশদের সাথে প্রায়ই রক্তক্ষয়ী বন্দুকযুদ্ধ বেঁধে যেত।

ইতিহাসবিদ ক্যাথরিন মেয়ার (Kathryn Meyer) এবং টেরেন্স ম্যাককার্থি (Terry Parssinen) তাদের বিখ্যাত গবেষণায় একে সংজ্ঞায়িত করেছেন বিশ শতকের সূচনার প্রাতিষ্ঠানিক ‘ওয়েব অব স্মোক’ বা ধোঁয়ার জাল হিসেবে (Meyer & Parssinen, 1998)। ঔপনিবেশিক আইন আদালত একদিকে মুখে চোরাচালান দমনের কথা বলত, আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে শ্বেতাঙ্গ কূটনীতিকরা মাদকের বিরুদ্ধে নৈতিক বক্তৃতা দিতেন, অথচ সেই একই রাষ্ট্রের সরকারি কোষাগার চলত এই মাদকের রক্তমাখা মুনাফা দিয়ে। সরকারি পুলিশ, গোপন অপরাধ সিন্ডিকেট, পাহাড়ি আদিবাসী এবং ইউরোপীয় ট্রেডিং হাউসগুলো মিলে তৈরি করেছিল এক অবিচ্ছেদ্য স্বার্থের চক্র।

ইন্দো-চীন অঞ্চলের এই মাদক নেটওয়ার্ক প্রমাণ করে যে প্রাতিষ্ঠানিক মাদক পাচার কোনো সাময়িক বিশৃঙ্খলা বা রাষ্ট্রের অনুপস্থিতির ফল ছিল না। বরং এটা ছিল আধুনিক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রযন্ত্রের অতি-উপস্থিতি এবং তার সীমাহীন রাজস্ব লোভের প্রত্যক্ষ ফসল। পল দুমেরের রেজি ব্যবস্থা, হোয়া কাফেলার পাহাড়ি বাণিজ্য, উপকূলের ট্রায়াড মাফিয়া এবং হমংদের পার্বত্য পপি অর্থনীতি – এই চারটি শক্তি মিলে এমন এক ঐতিহাসিক পরিকাঠামো নির্মাণ করেছিল যা পরবর্তী শতাব্দীতে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, সিআইএ-র গোপন অপারেশন এবং আন্তর্জাতিক হেরোইন বাণিজ্যের এক ভয়াবহ ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল।

১৮৯৩ সালের রয়্যাল কমিশন অন আফিম (Royal Commission on Opium, 1893): ঔপনিবেশিক নীতির মূল্যায়ন

মেট্রোপলিটন নৈতিক চাপ ও সংসদীয় রাজনীতি: কমিশনের প্রেক্ষাপট (Metropolitan Moral Pressure and Parliamentary Politics: Background of the Commission)

উনিশ শতকের শেষ দশকে এসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মাদক নীতি লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক ঝড়ের মুখোমুখি হয়। কয়েক দশক ধরে চলা আফিম যুদ্ধের কলঙ্ক এবং ভারতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ড্রাগ উৎপাদনের বিষয়টি ব্রিটিশ জনমানসে গভীর অস্বস্তি তৈরি করছিল। বিশেষ করে ভিক্টোরীয় যুগের ধর্মীয় অরাজনৈতিক গোষ্ঠী, কোয়েকার সম্প্রদায় এবং সমাজ সংস্কারকরা এই অনৈতিক বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই নৈতিক প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত সোসাইটি ফর দ্য সাপ্রেশন অব দ্য ওপিয়াম ট্রেড (Society for the Suppression of the Opium Trade)। ইতিহাসবিদ ক্যাথলিন লডউইক (Kathleen L. Lodwick) তার গবেষণায় তুলে ধরেছেন যে এই সংস্থাটি কীভাবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যদের ওপর নিয়মিত নৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করত (Lodwick, 1996)।

এই নৈতিক আন্দোলনের তীব্রতা সর্বোচ্চ রূপ নেয় ১৮৯৩ সালের জুন মাসে। ব্রিটিশ কমন্স সভায় র‍্যাডিক্যাল লিবারেল পার্টির আইরিশ সদস্য আলফ্রেড ওয়েব এক কঠোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সেই প্রস্তাবে দাবি করা হয় যে ভারত সরকার অবিলম্বে সমস্ত আফিম চাষ, উৎপাদন ও রফতানি সম্পূর্ণভাবে বেআইনি ঘোষণা করবে। এই প্রস্তাবের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন স্যার জোসেফ পিজের মতো প্রভাবশালী ব্রিটিশ রাজনীতিবিদরা। তাদের যুক্তি ছিল অত্যন্ত সরাসরি: ব্রিটিশ জাতি অন্য কোনো দেশে নৈতিকতার নামে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করতে পারে না যখন তারা নিজেরাই কোটি কোটি মানুষকে আফিমের বিষাক্ত নেশায় বন্দি রেখে রাজকোষ পরিচালনা করছে। এই প্রস্তাবে কমন্স সভায় প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম গ্ল্যাডস্টোনের সরকার মারাত্মক সংকটের মুখে পড়ে।

গ্ল্যাডস্টোন ছিলেন এক দক্ষ রাজনীতিবিদ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিলে তার সরকারের নৈতিক ভাবমূর্তি ধসে পড়বে এবং বহু সংস্কারবাদী ভোটারের সমর্থন হারাতে হবে। অন্যদিকে ভারতের ব্রিটিশ প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল যে আফিম থেকে আসা বিপুল পরিমাণ বার্ষিক রাজস্ব বন্ধ হলে ভারতের ঔপনিবেশিক সরকার অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যাবে। এই রাজনৈতিক উভয়সঙ্কট থেকে বাঁচার জন্য গ্ল্যাডস্টোন এক চতুর আপস ফর্মুলা বের করেন। তিনি প্রস্তাবটি সরাসরি পাশ না করিয়ে বিষয়টি বিশদ অনুসন্ধানের জন্য একটি রাজকীয় তদন্ত কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। এভাবেই জন্ম নেয় রয়্যাল কমিশন অন আফিম (Royal Commission on Opium)।

তবে কমিশনের কার্যপরিধি বা টার্মস অব রেফারেন্স এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যার উদ্দেশ্য ছিল আসল নৈতিক প্রশ্নটিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার গভীরে চাপা দেওয়া। কমিশনকে কেবল আফিম ভালো না মন্দ তা খতিয়ে দেখতে বলা হয়নি। তাদের প্রধান দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সম্ভাব্যতা যাচাই করা: আফিম নিষিদ্ধ করলে যে বিপুল রাজস্ব ঘাটতি হবে, তা পূরণ করতে ভারতের জনগণের ওপর নতুন কী কী কর চাপানো যেতে পারে? ভারতীয় করদাতারা কি সেই অতিরিক্ত করের বোঝা বইতে রাজি হবে? এবং দেশীয় স্বাধীন রাজ্যগুলো কি এমন কোনো সিদ্ধান্ত মেনে নেবে? ইতিহাসবিদ উইলিয়াম বেকহ্যাম (William B. McAllister) তার ড্রাগ কূটনীতির ইতিহাসে বিশ্লেষণ করেছেন যে এই প্রশ্নমালার মাধ্যমেই গ্ল্যাডস্টোন সরকার আসলে এমন এক মঞ্চ প্রস্তুত করেছিল যার পরিণতিতে আফিম উৎপাদন অব্যাহত রাখাকেই অনিবার্য সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখানো সম্ভব হয় (McAllister, 2000)।

রয়্যাল কমিশনের গঠন ও স্বার্থের সংঘাত: সদস্যদের পক্ষপাত (Composition of the Royal Commission and Conflict of Interest: Bias of the Members)

১৮৯৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গঠিত এই রয়্যাল কমিশনের সদস্যদের তালিকা পরীক্ষা করলেই তার প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতের চরিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন লর্ড ব্র্যাসি (Lord Brassey)। ব্র্যাসি ছিলেন একজন রক্ষণশীল সাম্রাজ্যবাদী অভিজাত ব্যক্তি, যিনি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর শক্তির সমর্থক ছিলেন এবং সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক স্থায়িত্বকে যেকোনো নৈতিক আদর্শের চেয়ে বেশি মূল্যবান মনে করতেন। নয় সদস্যের এই কমিশনে সাতজন সদস্যই ছিলেন হয় ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, নয়তো রাজকীয় স্বার্থের প্রতি সরাসরি অনুগত ব্যক্তি। তাদের মধ্যে ছিলেন পাঞ্জাবের সাবেক লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জেমস লায়াল এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ স্যার উইলিয়াম রবার্টস।

কমিশনে ভারতীয়দের মতামত অন্তর্ভুক্ত করার এক আপাত নিরপেক্ষ ভঙ্গি বজায় রাখতে দুজন প্রভাবশালী দেশীয় অভিজাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়: দ্বারভাঙার মহারাজা লক্ষ্মেশ্বর সিং এবং জুনাগড়ের দেওয়ান হরিদাস বিহারীদাস দেশাই। এই দুই ভারতীয় সদস্য ছিলেন ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামোর ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল জমিদার ও সামন্ত শ্রেণির প্রতিনিধি। তারা সাধারণ ভারতীয় কৃষকের দুর্দশার চেয়ে ব্রিটিশ রাজশক্তির সাথে নিজেদের সুসম্পর্ক এবং দেশীয় রাজ্যগুলোর রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে রাখা হয়েছিল কেবল একজন ব্যক্তিকে, যার নাম হেনরি জে. উইলসন (Henry J. Wilson)। উইলসন ছিলেন একজন একনিষ্ঠ লিবারেল এমপি এবং আপসহীন নৈতিক সংস্কারক।

কমিশনের এই অসম গঠন শুরু থেকেই এক গভীর স্বার্থের সংঘাতের জন্ম দেয়। পুরো কমিশনের ভ্রমণসূচি, লজিস্টিকস এবং ব্যয়ভার বহন করেছিল ভারত সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়। তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড ল্যান্সডাউন ব্যক্তিগতভাবে পুরো প্রশাসনিক প্রক্রিয়াটি তদারকি করছিলেন। ভাইসরয় এবং তার কাউন্সিল খুব ভালো করেই জানতেন যে কমিশনের নেতিবাচক কোনো প্রতিবেদন ভারতীয় ব্রিটিশ শাসনের জন্য কত বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ফলে ভারত সরকার কোনো সুযোগ নিতে রাজি ছিল না। তারা কমিশনকে একটি স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে দেখার বদলে নিজেদের নীতিকে বৈধতা দেওয়ার একটি জনসংযোগ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা সাজায়।

সমাজবিজ্ঞানী ভার্জিনিয়া বেরিজ (Virginia Berridge) দেখিয়েছেন যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র কীভাবে বিজ্ঞানের আপাত নিরপেক্ষ ভাষা এবং রাজকীয় আভিজাত্যের প্রতীকগুলোকে ব্যবহার করে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করত (Berridge, 1999)। উইলসন শুরু থেকেই লক্ষ্য করেছিলেন যে কমিশনের অন্য সদস্যরা সাক্ষ্যপ্রমাণ স্বাধীনভাবে মূল্যায়নের চেয়ে ভারত সরকারের সাজানো ছক অনুযায়ী সিদ্ধান্ত টানতেই বেশি উদগ্রীব ছিলেন। এটি কোনো নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ছিল না; এটা ছিল সাম্রাজ্যিক স্বার্থের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের একটি সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল, যা আধুনিক আমলাতান্ত্রিক চাতুর্যের এক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে।

ভারতে সাক্ষ্যগ্রহণ ও আমলাতান্ত্রিক কারসাজি: সাক্ষীদের নিয়ন্ত্রণ (Witness Hearings in India and Bureaucratic Manipulation: Control of Testimony)

১৮৯৩ সালের নভেম্বর মাসে রয়্যাল কমিশনের সদস্যরা ভারতে এসে পৌঁছান এবং পরবর্তী কয়েক মাস ধরে তারা ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল চষে বেড়ান। তারা কলকাতা, বাঁকিপুর বা পাটনা, বেনারস, লখনউ, আগ্রা, দিল্লি, লাহোর এবং বোম্বাইয়ের মতো প্রধান প্রধান প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে অস্থায়ী আদালত স্থাপন করেন। এই দীর্ঘ অনুসন্ধানে কমিশন মোট ৭২৩ জন সাক্ষীর সরাসরি জবানবন্দি গ্রহণ করে। এই সাক্ষীদের তালিকায় ছিলেন সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভারতীয় মেডিকেল সার্ভিসের শল্যচিকিৎসক, আফিম বিভাগের পরিদর্শক, দেশীয় রাজা ও জমিদার এবং খুব সামান্য সংখ্যক মিশনারি ও ভারতীয় সমাজ সংস্কারক।

কিন্তু এই বিশাল সাক্ষ্যগ্রহণের নেপথ্যে কাজ করছিল এক অভাবনীয় আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও ভয়ভীতির নেটওয়ার্ক। ইতিহাসবিদ পল সি. উইনথার (Paul C. Winther) সরকারি গোপন নথি ও ব্যক্তিগত চিঠিপত্র ঘেঁটে প্রমাণ করেছেন যে ভাইসরয় ল্যান্সডাউনের প্রশাসন প্রতিটি জেলায় অত্যন্ত কঠোর ও গোপন নির্দেশিকা পাঠিয়েছিল (Winther, 2003)। সেই নির্দেশনায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল কেবল এমন ব্যক্তিদেরই সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য বাছাই করতে হবে যারা আফিম ব্যবহারের পক্ষে কথা বলবেন। কোনো সমালোচনামূলক কণ্ঠ যাতে কমিশনের সামনে পৌঁছাতে না পারে, তার জন্য প্রতিটি সাক্ষীর খসড়া বক্তব্য আগে থেকে ব্রিটিশ আমলারা পরীক্ষা ও সম্পাদনা করতেন।

কমিশনের একমাত্র বিদ্রোহী সদস্য হেনরি জে. উইলসন এই নোংরা কারসাজিটি খুব দ্রুত ধরে ফেলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন যে প্রতিটি শহরে সাক্ষীরা প্রায় হুবহু একই ভাষায় জবানবন্দি দিচ্ছেন, যেন তারা কোনো মুখস্থ বুলি আউড়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় কৃষকদের জোর করে ধরে এনে কমিশনের সামনে দাঁড় করানো হতো এবং তাদের শেখানো হতো এই কথা বলতে যে তারা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় পপি চাষ করে এবং আফিম বিক্রি করেই তাদের সংসার চলে। যেসব সাধারণ কৃষক দাদন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বা ব্রিটিশ পেয়াদাদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সত্যি কথা বলতে চেয়েছিল, তাদের স্থানীয় থানার দারোগা ও তহশিলদারদের দিয়ে আটকে রাখা হতো।

মিশনারি এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদী প্রতিনিধিরা যারা আফিম বাণিজ্যের তীব্র বিরোধিতা করতে প্রস্তুত ছিলেন, তাদের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য নামমাত্র সময় বরাদ্দ করা হতো। লর্ড ব্র্যাসি ব্যক্তিগতভাবে বহু বিরোধী সাক্ষীকে জেরা করার সময় মাঝপথে থামিয়ে দিতেন এবং তাদের বক্তব্য নথিতে অন্তর্ভুক্ত না করার পাঁয়তারা করতেন। উইলসন একাধিকবার এর তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং সরকারি এই পক্ষপাতিত্বের সমস্ত প্রমাণ গোপনে নিজের ব্যক্তিগত ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করতে থাকেন। এই সাজানো বিচারিক প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে ঔপনিবেশিক ক্ষমতা কেবল ভূখণ্ড দখল করেই ক্ষান্ত হতো না; নিজেদের অপরাধ ঢাকতে তারা সত্যের বয়ানটিকেও সম্পূর্ণ নিজেদের মতো করে নতুনভাবে তৈরি করতে সক্ষম ছিল।

চিকিৎসাগত যুক্তি ও সাংস্কৃতিক মিথ: ‘পরিমিত ভোগ’ তত্ত্ব (Medical Arguments and Cultural Myths: Theory of ‘Moderate Consumption’)

কমিশনের শুনানিতে সবচেয়ে চতুর কৌশলটি নেওয়া হয়েছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছদ্মবেশে। ভারত সরকার তাদের নিজস্ব অধীনস্থ চিকিৎসক বাহিনী বা ইন্ডিয়ান মেডিকেল সার্ভিসের শ্বেতাঙ্গ ডাক্তারদের এক দীর্ঘ সারি কমিশনের সামনে হাজির করে। তাদের নেতা ছিলেন কমিশনের সদস্য স্যার উইলিয়াম রবার্টস। এই চিকিৎসকরা একযোগে যুক্তি দিতে শুরু করেন যে ভারতীয় জলবায়ু ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় আফিম কোনো মারাত্মক বিষ নয়, বরং এটি সাধারণ দরিদ্র মানুষের জীবনের এক অপরিহার্য রক্ষাকবচ। তারা এক অভিনব তত্ত্বের অবতারণা করেন, যাকে বলা যায় পরিমিত ভোগ তত্ত্ব (Theory of Moderate Consumption)।

এই তত্ত্বের প্রধান ভিত্তি ছিল আফিমকে ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক বা ‘ফেব্রিফিউজ’ হিসেবে উপস্থাপন করা। ব্রিটিশ চিকিৎসকরা জোর গলায় দাবি করেন যে ভারত এক আর্দ্র, জলাভূমিময় এবং ম্যালেরিয়াপ্রবণ দেশ। দরিদ্র ভারতীয় কৃষকের পক্ষে দামি কুইনাইন কিনে খাওয়া অসম্ভব। তাই তারা প্রতিদিন সকালে নির্দিষ্ট মাত্রায় কাঁচা আফিম খেয়ে মাঠে নামে, যা তাদের ম্যালেরিয়ার জীবাণু ও অতিরিক্ত ক্লান্তি থেকে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা খুব ভালো করেই জানতেন যে আফিমের কোনো রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা নেই। এটা কেবল ব্যথা ও কাঁপুনিকে সাময়িকভাবে অসাড় করে রাখে, কিন্তু রোগ নিরাময়ে কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করে না। তা সত্ত্বেও এই বৈজ্ঞানিক বিভ্রান্তিটিকে সরকারি নথিতে একটি পরম সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

এর পাশাপাশি চিকিৎসকরা আফিম সেবনের সাথে ব্রিটিশদের মদ্যপানের এক অদ্ভুত সামাজিক তুলনা টানেন। তারা যুক্তি দেন যে ব্রিটিশ শ্রমিকরা যেমন উইস্কি বা জিন পান করে মাতলামি করে এবং রাজপথে মারামারি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, ভারতীয়রা আফিম খেলে তেমন কোনো বিশৃঙ্খলা ঘটে না। আফিমখোর ভারতীয় মানুষ শান্তভাবে ঘরের কোণে বসে থাকে এবং চুপচাপ নিজের কাজ করে যায়। সমাজবিজ্ঞানী জন ব্রাউন (John Brown) লক্ষ্য করেছেন যে ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ ভারতীয়দের রাজনৈতিকভাবে অনুগত ও শান্ত রাখার এক উপায় হিসেবে আফিমের এই স্নায়বিক স্থবিরতাকে ইতিবাচক গুণ হিসেবে প্রচার করেছিল (Brown, 2002)।

আসক্তি এবং শারীরিক নির্ভরতার বাস্তবতাকে তারা অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে উড়িয়ে দেন। কমিশনের মেডিকেল সদস্যরা দাবি করেন যে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় নিয়মিত আফিম খেলেও তাদের মধ্যে কোনো ধ্বংসাত্মক নেশা বা ‘এডিকশন’ তৈরি হয় না; এটা তাদের কাছে প্রতিদিনের লবণের মতো এক নিরীহ খাদ্যভ্যাস বা ‘হ্যাবিট’। কোনো ব্যক্তি আফিম খাওয়া বন্ধ করলে তার শরীরে যে তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা, ডায়রিয়া এবং স্নায়বিক খিঁচুনি দেখা দেয় – যা ড্রাগ উইথড্রয়ালের ধ্রুপদী লক্ষণ – তাকে তারা রোগের লক্ষণ না বলে আফিম না খাওয়ার কারণে শরীরের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এভাবেই বিজ্ঞানের মোড়কে এক ভয়াবহ রাসায়নিক মাদককে একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচ্য পথ্য হিসেবে বৈধতা দেওয়া হয়।

রাজকোষের সংকট ও দেশীয় রাজ্য: অর্থনীতির অখণ্ড বাস্তবতা (Fiscal Crisis of the Raj and Princely States: The Inflexible Reality of Economics)

সমস্ত নৈতিক ও চিকিৎসাগত যুক্তির পর্দা সরিয়ে দিলে রয়্যাল কমিশনের আসল উদ্বেগের জায়গাটি ছিল একেবারেই অর্থনৈতিক। কমিশন খুব ভালোভাবেই জানত যে নৈতিকতার প্রশ্নে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট হয়তো আলোচনা করতে ভালোবাসে, কিন্তু অর্থের প্রশ্নে তারা কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। সেই সময় বাংলা ও মালওয়া আফিম থেকে ভারত সরকারের মোট বার্ষিক রাজস্ব আসত প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ মিলিয়ন রুপি, যা ছিল রাজকীয় বাজেটের প্রায় দশ শতাংশের কাছাকাছি। তৎকালীন জটিল রুপার অবমূল্যায়ন এবং খরার সংকটের মধ্যে এই বিপুল রাজস্ব হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে পুরো ভারতীয় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রযন্ত্র অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি ছিল।

কমিশন তাদের অনুসন্ধানে সবচেয়ে বেশি জোর দেয় এই ক্ষতি কীভাবে পূরণ হবে সেই প্রশ্নের ওপর। ব্রিটিশ ভারতের অর্থ সচিব এবং অর্থনৈতিক আমলারা কমিশনের সামনে হিসাব কষে দেখান যে আফিম নিষিদ্ধ করতে হলে ঘাটতি মেটানোর জন্য তিনটি বিকল্প পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, ব্রিটেনের কেন্দ্রীয় রাজকোষ থেকে ভারতকে প্রতি বছর সমপরিমাণ অর্থ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভারতের কোটি কোটি কৃষকের ওপর অতিরিক্ত ভূমি রাজস্ব চাপাতে হবে। অথবা তৃতীয়ত, লবণ কর ও নতুন ধরনের আয়কর প্রবর্তন করতে হবে। ব্রিটিশ সরকার লন্ডনের করদাতাদের টাকায় এই ক্ষতি মেটাতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায়। আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিকল্পের ব্যাপারে আমলারা সতর্ক করে দেন যে ভারতীয়দের ওপর অতিরিক্ত কর চাপালে ১৮৫৭ সালের চেয়েও ভয়াবহ এক মহাবিদ্রোহের সূত্রপাত হতে পারে।

এর সাথে যুক্ত হয়েছিল মধ্য ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলোর ভূরাজনৈতিক জটিলতা। গোয়ালিয়র, ইন্দোর, ভূপাল এবং মেওয়ারের মতো দেশীয় রাজ্যগুলোতে উৎপাদিত মালওয়া আফিমের ওপর হাজার হাজার কৃষক, ব্যবসায়ী এবং রাজন্যবর্গের অর্থনীতি নির্ভরশীল ছিল। এই রাজ্যগুলোর শাসকরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে ব্রিটিশদের নৈতিক আন্দোলনের চাপে তারা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী আয়ের উৎস বন্ধ করবেন না। যদি জোর করে আফিম চাষ বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়, তবে তা হবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে তাদের স্বাক্ষরিত দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন।

ইতিহাসবিদ টনি বলান্টাইন (Tony Ballantyne) তার সাম্রাজ্যিক সংযোগের বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে ব্রিটিশরা কীভাবে এই দেশীয় রাজ্যগুলোর প্রতিরোধকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল (Ballantyne, 2002)। কমিশন ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে বুঝিয়ে দেয় যে কেবল ব্রিটিশ ভারতে আফিম বন্ধ করলে কোনো কাজ হবে না; বরং সমস্ত বাণিজ্য চলে যাবে অনিয়ন্ত্রিত দেশীয় রাজ্যগুলোর হাতে। ফলে নৈতিকতার যে দাবি লন্ডনের ড্রয়িং রুমে বসে তোলা হচ্ছিল, তা ভারতের জটিল বাস্তবতায় অবাস্তব এবং আত্মঘাতী এক কল্পনা মাত্র। সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব এবং রাজকোষের নিরাপত্তাকে তারা সমস্ত মানবিক বিবেচনা ও নৈতিক অঙ্গীকারের ওপরে স্থান দিয়েছিল।

উইলসনের ভিন্নমত, চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও ঔপনিবেশিক প্রভাব (Wilson’s Dissent, the Final Report, and Colonial Legacies)

১৮৯৫ সালের এপ্রিল মাসে রয়্যাল কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পেশ করে। সাতটি সুবিশাল খণ্ডে প্রকাশিত রয়্যাল কমিশন অন আফিম রিপোর্ট (Report of the Royal Commission on Opium) ছিল ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের ইতিহাসের এক চরম পক্ষপাতদুষ্ট দলিল (Royal Commission on Opium, 1895)। কমিশনের সংখ্যাগরিষ্ঠ আটজন সদস্য একমত হয়ে ঘোষণা করেন যে ভারতে আফিমের অভ্যন্তরীণ ভোগ সম্পূর্ণ পরিমিত এবং এর কোনো ক্ষতিকর সামাজিক বা শারীরিক প্রভাব নেই। প্রতিবেদনে বলা হয় যে আফিম চাষ বা বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার কোনো প্রয়োজন নেই এবং এটি বন্ধ করার যেকোনো পদক্ষেপ হবে রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক ও আর্থিকভাবে মারাত্মক।

কিন্তু এই সাজানো ঐকমত্যের মুখে সজোরে চপেটাঘাত করেন একমাত্র ভিন্নমতাবলম্বী সদস্য হেনরি জে. উইলসন। তিনি সরকারি প্রতিবেদনের সাথে যুক্ত করেন তার বিখ্যাত এবং ঐতিহাসিক মিনিট অব ডিসেন্ট (Minute of Dissent)। আশি পৃষ্ঠার এই দীর্ঘ নথিতে উইলসন পুরো তদন্ত প্রক্রিয়ার মুখোশ উন্মোচন করে দেন। তিনি তারিখ, সময় এবং স্থান উল্লেখ করে দেখান যে কীভাবে ভারত সরকার সাক্ষীদের কথা সাজিয়ে দিয়েছিল, কীভাবে পুলিশি ভয় দেখিয়ে প্রতিবাদী ভারতীয়দের মুখ বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং কীভাবে মেডিকেল সদস্যদের পক্ষপাতদুষ্ট প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে মিথ্যা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব তৈরি করা হয়েছিল। উইলসনের এই ভিন্নমতের দলিল ছিল ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের ভেতরের অন্ধকার দিকটির এক অবিতর্কিত স্বীকারোক্তি।

উইলসনের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও ব্রিটিশ সরকার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে এবং কমিশনের সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপোর্টকেই আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। পার্লামেন্টে নৈতিক সংস্কারবাদীদের আন্দোলন তাৎক্ষণিকভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে, কারণ সরকার এখন দাবি করতে পারত যে একটি উচ্চপর্যায়ের রাজকীয় কমিশন বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে আফিম বাণিজ্যের বৈধতা নিশ্চিত করেছে। এর ফলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মাদক একচেটিয়াত্বের আয়ুষ্কাল এক ধাক্কায় আরও কয়েক দশকের জন্য বেড়ে যায়। প্রথম আফিম যুদ্ধ ও দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের মাধ্যমে যে সাম্রাজ্যিক মাদক সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছিল, ১৮৯৫ সালের এই প্রতিবেদন তাকে এক আন্তর্জাতিক আইনি ও প্রশাসনিক ঢাল প্রদান করে।

১৮৯৩ সালের রয়্যাল কমিশন অন আফিম তাই নিছক কোনো ঐতিহাসিক তদন্ত ছিল না; এটা ছিল আধুনিক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের আত্মপক্ষ সমর্থনের এক চরম নিদর্শন। এই প্রতিবেদনের কারণেই বিশ শতকের শুরুতে আন্তর্জাতিক মাদক বিরোধী সম্মেলনগুলো – যেমন ১৯০৯ সালের সাংহাই আফিম কমিশন কিংবা ১৯১২ সালের হেগ কনভেনশন – শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারত কোনো বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেয়নি। সাম্রাজ্যিক অর্থনীতির স্বার্থ কীভাবে নৈতিকতা, জনস্বাস্থ্য এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে নিজেদের করতলগত করতে পারে, ভিক্টোরীয় যুগের এই রাজকীয় কমিশন ইতিহাসের পাতায় তার এক চিরন্তন ও অকাট্য প্রমাণ হিসেবে টিকে রয়েছে।

উপসংহার

মাদক, আসক্তি এবং মাদক বাণিজ্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মানব ইতিহাসের এই জটিল সংকটটি কোনো সরল রৈখিক অপরাধমূলক আচরণ নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামোগত অসঙ্গতি এবং মানব মস্তিষ্কের জৈবরাসায়নিক দুর্বলতার এক চরম সমন্বয়। শতাব্দী প্রাচীন ঔপনিবেশিক শাসন থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক রাষ্ট্র পর্যন্ত, মাদক নিয়ন্ত্রণের নামে যে সমস্ত নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলোর ঐতিহাসিক মূল্যায়ন অত্যন্ত বিতর্কিত ও ব্যর্থতায় পর্যবসিত। ঔপনিবেশিক শাসনামলে রাষ্ট্র স্বয়ং যখন মাদক চাষ ও বিতরণের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল, তখন তা ছিল রাজস্ব আহরণের মাধ্যম। অথচ পরবর্তীকালে যখন সেই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার চাপে নিষেধাজ্ঞার রূপ নিল, তখন জন্ম নিল এক সমান্তরাল ভূগর্ভস্থ অর্থনীতি বা আন্ডারগ্রাউন্ড ইকোনমিক্স, যা বিশ্বজুড়ে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং সহিংস অপরাধ চক্রের বিস্তার ঘটিয়েছে।

সমাজতাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক অভিযান বা তথাকথিত মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (War on drugs) ঐতিহাসিকভাবে তার মূল উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। বাজার অর্থনীতির নির্মম সূত্র অনুযায়ী, কোনো পণ্যের চাহিদা যদি স্নায়বিক ও মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে কেবল সরবরাহ দমন করে তার বিলোপ ঘটানো অসম্ভব। বরং কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা এই বাণিজ্যের ঝুঁকি বাড়িয়ে পণ্যের মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি করে, যা আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র (Criminal syndicates) এর জন্য বিপুল মুনাফার সুযোগ তৈরি করে দেয়। এর ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তর, বিশেষ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিচারিক ব্যবস্থার সাথে অপরাধী চক্রের এক ধরনের অশুভ আঁতাত গড়ে ওঠে, যা গোটা সামাজিক ভারসাম্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।

অন্যদিকে, ব্যক্তি পর্যায়ের আসক্তিকে নৈতিক অবক্ষয় কিংবা ইচ্ছাকৃত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার মধ্যযুগীয় দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে অসার প্রমাণিত হয়েছে। স্নায়বিক স্তরে মাদক নির্ভরতা এমন এক ক্রনিক চিকিৎসাগত অবস্থা, যা ব্যক্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে অবদমিত করে। একই সাথে, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, যুদ্ধ এবং সামাজিক বৈষম্যের ফলে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ট্রমা মানুষকে বিভিন্ন সাইকোট্রপিক উপাদানের দিকে ঠেলে দেয়। সুতরাং, কার্যকর পুনর্বাসন ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত না করে কেবল কারাগার ও শারীরিক শাস্তির ওপর নির্ভর করা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নেরই নামান্তর। অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, শাস্তি যখন কার্যকারণকে চিহ্নিত না করে কেবল বাহ্যিক প্রকাশকে দমন করতে চায়, তখন তা সামাজিক অবিচারকেই পুনরুৎপাদন করে।

একটি বিজ্ঞানমনস্ক, বস্তুনিষ্ঠ ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য মাদক সংক্রান্ত নীতিমালাকে নৈতিক গোঁড়ামি ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদ থেকে মুক্ত করা আজ অপরিহার্য। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা এই সংকটকে অতিক্রম করতে হলে প্রয়োজন বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতি, মানবাধিকার এবং প্রমাণভিত্তিক বিজ্ঞানের সমন্বয়। আফিম যুদ্ধ থেকে শুরু করে আজকের মেক্সিকান কার্টেল কিংবা অভ্যন্তরীণ সীমান্ত পাচার – ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, মাদক সমস্যাকে বন্দুকের নলে কিংবা অলীক আধ্যাত্মিক উপদেশে সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস, মাদকের ক্ষতির মাত্রা কমানোর বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ এবং মানুষকে তার আর্থ-সামাজিক বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্ত করে একটি প্রকৃত বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমতাভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

তথ্যসূত্র

  • Abu-Lughod, J. L. (1989). Before European hegemony: The world system A.D. 1250–1350. Oxford University Press.
  • Africa, T. W. (1961). The opium addiction of Marcus Aurelius. Journal of the History of Ideas, 22(1), 97–102.
  • Agnew, R. (1992). Foundation for a general strain theory of crime and delinquency. Criminology, 30(1), 47–88.
  • Akers, R. L. (1977). Deviant behavior: A social learning approach (2nd ed.). Wadsworth Publishing.
  • Akers, R. L. (1998). Social learning and social structure: A general theory of crime and deviance. Northeastern University Press.
  • Akers, R. L., Krohn, M. D., Lanza-Kaduce, L., & Radosevich, M. (1979). Social learning and deviant behavior: A specific test of a general theory. American Sociological Review, 44(4), 636–655.
  • Akers, R. L., & Sellers, C. S. (2004). Criminological theories: Introduction, evaluation, and application (4th ed.). Roxbury Publishing.
  • Al-Biruni, A. R. (1973). Kitab al-Saydanah fi al-Tibb (H. M. Said, Ed. & Trans.). Hamdard National Foundation.
  • Amato, P. R. (2001). Children of divorce in the 1990s: An update of the Amato and Keith (1991) meta-analysis. Journal of Family Psychology, 15(3), 355–370.
  • American Psychiatric Association. (2013). Diagnostic and statistical manual of mental disorders (5th ed.). American Psychiatric Publishing.
  • Arnold, D. (1993). Colonizing the body: State medicine and epidemic disease in nineteenth-century India. University of California Press.
  • Babor, T., Caulkins, J., Edwards, G., Fischer, B., Foxcroft, D. R., Humphreys, K., Obot, I., Rehm, J., Reuter, P., Room, R., Rossow, I., & Strang, J. (2010). Drug policy and the public good. Oxford University Press.
  • Babor, T. F., Higgins-Biddle, J. C., Saunders, J. B., & Monteiro, M. G. (2001). AUDIT: The Alcohol Use Disorders Identification Test: Guidelines for use in primary care (2nd ed.). World Health Organization.
  • Bagchi, A. K. (1972). Private investment in India, 1900–1939. Cambridge University Press.
  • Ballantyne, T. (2002). Orientalism and race: Aryanism in the British Empire. Palgrave Macmillan.
  • Bandura, A. (1977). Social learning theory. Prentice-Hall.
  • Bandura, A. (1986). Social foundations of thought and action: A social cognitive theory. Prentice-Hall.
  • Bandura, A. (1997). Self-efficacy: The exercise of control. W. H. Freeman.
  • Bandura, A., Ross, D., & Ross, S. A. (1961). Transmission of aggression through imitation of aggressive models. The Journal of Abnormal and Social Psychology, 63(3), 575–582.
  • Bauer, R. (2019). The peasant art of opium cultivation: The East India Company’s poppy monopoly in Bihar, 1773–1835. Routledge.
  • Baumrind, D. (1991). The influence of parenting style on adolescent competence and substance use. The Journal of Early Adolescence, 11(1), 56–95.
  • Beattie, M. (1987). Codependent no more: How to stop controlling others and start caring for yourself. Hazelden Publishing.
  • Beck, A. T. (1976). Cognitive therapy and the emotional disorders. International Universities Press.
  • Beck, A. T., Wright, F. D., Newman, C. F., & Liese, B. S. (1993). Cognitive therapy of substance abuse. Guilford Press.
  • Becker, H. S. (1963). Outsiders: Studies in the sociology of deviance. Free Press.
  • Berridge, V. (1999). Opium and the people: Opiate use and drug control policy in nineteenth and early twentieth century England (Rev. ed.). Free Association Books.
  • Bewley-Taylor, D. R. (2012). International drug control: Consensus fractured. Cambridge University Press.
  • Bhattacharya, S. (1971). Financial foundations of the British Raj: Men and ideas in the post-mutiny period of reconstruction of Indian public finance 1858–1872. Indian Institute of Advanced Study.
  • Bisset, N. G. (1991). Phytochemistry and pharmacy of the ancient Egyptians. Journal of Ethnopharmacology, 32(1–3), 77–85.
  • Booth, M. (1996). Opium: A history. St. Martin’s Press.
  • Bose, S. (1993). Peasant labour and colonial capital: Rural Bengal since 1770. Cambridge University Press.
  • Boudon-Millot, V. (2012). Galien de Pergame: Un médecin grec à Rome. Les Belles Lettres.
  • Bourgois, P. (2003). In search of respect: Selling crack in El Barrio (2nd ed.). Cambridge University Press.
  • Bowlby, J. (1988). A secure base: Parent-child attachment and healthy human development. Basic Books.
  • Boxer, C. R. (1969). The Portuguese seaborne empire, 1415–1825. Hutchinson.
  • Brocheux, P. (2009). The Mekong: Environment and history of the Southeast Asian valley. Editions Didier Millet.
  • Bronfenbrenner, U. (1979). The ecology of human development: Experiments by nature and design. Harvard University Press.
  • Brown, J. (2002). The British opium trade and the Royal Commission of 1893–1895. Social History of Alcohol and Drugs, 17(1), 45–68.
  • Brown, S. A., Goldman, M. S., & Christiansen, B. A. (1985). Do alcohol expectancies mediate drinking patterns of adults? Journal of Consulting and Clinical Psychology, 53(4), 512–519.
  • Bryan, C. P. (1930). The Papyrus Ebers. Geoffrey Bles.
  • Burgess, R. L., & Akers, R. L. (1966). A differential association-reinforcement theory of criminal behavior. Social Problems, 14(2), 128–147.
  • Carter, B. L., & Tiffany, S. T. (1999). Meta-analysis of cue-reactivity in addiction research. Addiction, 94(3), 327–340.
  • Catalano, R. F., & Hawkins, J. D. (1996). The social development model: A theory of antisocial behavior. In J. D. Hawkins (Ed.), Delinquency and crime: Current theories (pp. 149–197). Cambridge University Press.
  • Chakrabarti, R. (2001). Authority and violence in colonial Bengal: 1800–1860. Bookland.
  • Chakrabarty, D. (1989). Rethinking working-class history: Bengal 1890–1940. Princeton University Press.
  • Chang, W.-C. (2014). Beyond borders: Stories of Yunnanese Chinese migrants of Burma. Cornell University Press.
  • Chaudhuri, B. B. (1983). Agrarian relations: Eastern India. In D. Kumar & M. Desai (Eds.), The Cambridge economic history of India (Vol. 2, pp. 86–177). Cambridge University Press.
  • Chaudhuri, K. N. (1978). The trading world of Asia and the English East India Company: 1660–1760. Cambridge University Press.
  • Collins, D. J., & Lapsley, H. M. (2008). The costs of tobacco, alcohol and illicit drug abuse to Australian society in 2004/05. Department of Health and Ageing.
  • Comber, L. (1959). Chinese secret societies in Malaya: A survey of the Triad Society from 1800 to 1900. J. J. Augustin.
  • Coomber, R. (2015). A tale of two cities: Understanding local drug markets, user practices, and drug-related harm. International Journal of Drug Policy, 26(7), 637–646.
  • Courtwright, D. T. (2001). Forces of habit: Drugs and the making of the modern world. Harvard University Press.
  • Culas, C., & Michaud, J. (1997). A contribution to the study of Hmong (Miao) migrations and history. Bijdragen tot de Taal-, Land- en Volkenkunde, 153(2), 211–243.
  • Datta, K. (1957). Unrest against British rule in Bihar, 1831–1859. Secretariat Press.
  • Davenport-Hines, R. (2001). The pursuit of oblivion: A social history of drugs. Weidenfeld & Nicolson.
  • Davenport-Hines, R. (2002). The pursuit of oblivion: A global history of narcotics. W. W. Norton & Company.
  • Degenhardt, L., & Hall, W. (2012). Extent of illicit drug use and associated global burden of disease. The Lancet, 379(9810), 55–70.
  • Descours-Gatin, C. (1992). Quand l’opium finançait la colonisation en Indochine: L’élaboration de la régie générale de l’opium, 1860–1914. L’Harmattan.
  • Dishion, T. J., & Owen, L. D. (2002). A longitudinal analysis of friendship and substance use: Bidirectional influence from adolescence to adulthood. Developmental Psychology, 38(4), 480–491.
  • Dishion, T. J., Spracklen, K. M., Andrews, D. W., & Patterson, G. R. (1996). Deviancy training in male adolescent friendships. Behavior Therapy, 27(3), 373–390.
  • Dols, M. W. (1984). Medieval Islamic medicine: The art of healing. University of California Press.
  • Elkind, D. (1967). Egocentrism in adolescence. Child Development, 38(4), 1025–1034.
  • Elliott, D. S., Ageton, S. S., & Canter, R. J. (1979). An integrated theoretical perspective on delinquent behavior. Journal of Research in Crime and Delinquency, 16(1), 3–27.
  • Elliott, D. S., Huizinga, D., & Ageton, S. S. (1985). Explaining delinquency and drug use. SAGE Publications.
  • Ellis, A. (1962). Reason and emotion in psychotherapy. Lyle Stuart.
  • Ellis, A., McInerney, J. F., DiGiuseppe, R., & Yeager, R. J. (1988). Rational-emotive therapy with alcoholics and substance abusers. Pergamon Press.
  • Engel, G. L. (1977). The need for a new medical model: A challenge for biomedicine. Science, 196(4286), 129–136.
  • Everitt, B. J., & Robbins, T. W. (2005). Neural systems of reinforcement for drug addiction: From actions to habits to compulsion. Nature Neuroscience, 8(11), 1481–1489.
  • Fairbank, J. K. (1953). Trade and diplomacy on the China coast: The opening of the treaty ports, 1842–1854. Harvard University Press.
  • Farooqui, A. (1998). Colonial forest policy in Uttarakhand, 1815–1866. Kitab Publishing House.
  • Farooqui, A. (2005). Opium city: The making of early Victorian Bombay. Three Essays Collective.
  • Felitti, V. J., Anda, R. F., Nordenberg, D., Williamson, D. F., Spitz, A. M., Edwards, V., Koss, M. P., & Marks, J. S. (1998). Relationship of childhood abuse and household dysfunction to many of the leading causes of death in adults: The Adverse Childhood Experiences (ACE) Study. American Journal of Preventive Medicine, 14(4), 245–258.
  • Festinger, L. (1957). A theory of cognitive dissonance. Stanford University Press.
  • Forbes, A. (1987). The “Cin-Ho” (Yunnanese Chinese) caravan trade with North Thailand during the late nineteenth and early twentieth centuries. Journal of Asian History, 21(1), 1–47.
  • Furber, H. (1976). Rival empires of trade in the Orient, 1600–1800. University of Minnesota Press.
  • Gaastra, F. S. (2003). The Dutch East India Company: Expansion and decline. Walburg Pers.
  • Glueck, S., & Glueck, E. (1950). Unraveling juvenile delinquency. Commonwealth Fund.
  • Goitein, S. D. (1967). A Mediterranean society: The Jewish communities of the Arab world as portrayed in the documents of the Cairo Geniza (Vol. 1: Economic Foundations). University of California Press.
  • Goitein, S. D. (1971). A Mediterranean society: The Jewish communities of the Arab world as portrayed in the documents of the Cairo Geniza (Vol. 2: The Community). University of California Press.
  • Goldman, M. S., Brown, S. A., & Christiansen, B. A. (1987). Expectancy theory: Thinking about drinking. In H. T. Blane & K. E. Leonard (Eds.), Psychological theories of drinking and alcoholism (pp. 181–226). Guilford Press.
  • Goldstein, A. (2001). Addiction: From biology to drug policy (2nd ed.). Oxford University Press.
  • Goldstein, P. J. (1985). The drugs/violence nexus: A tripartite conceptual framework. Journal of Drug Issues, 15(4), 493–506.
  • Goode, E. (2019). Drugs in American society (10th ed.). McGraw-Hill Education.
  • Gordis, L. (2000). Epidemiology (2nd ed.). W. B. Saunders Company.
  • Goscha, C. E. (1999). Borders, boundaries, and frames of reference: The development of modern Vietnamese perceptions of Indochina. Southeast Asia Program Publications, Cornell University.
  • Grant, B. F., Stinson, F. S., Dawson, D. A., Chou, S. P., Dufour, M. C., Compton, W., Pickering, R. P., & Kaplan, K. (2004). Prevalence and co-occurrence of substance use disorders and independent mood and anxiety disorders: Results from the National Epidemiologic Survey on Alcohol and Related Conditions. Archives of General Psychiatry, 61(8), 807–816.
  • Greenberg, M. (1951). British trade and the opening of China 1800–42. Cambridge University Press.
  • Griffiths, M. (2005). A ‘components’ model of addiction within a biopsychosocial framework. Journal of Substance Use, 10(4), 191–197.
  • Guha, A. (1970). The raw opium trade of the Dutch East India Company in the seventeenth century. The Indian Economic & Social History Review, 7(1), 69–85.
  • Guha, R. (1983). Elementary aspects of peasant insurgency in colonial India. Oxford University Press.
  • Hall, W., Carter, A., & Forlini, C. (2015). The brain disease model of addiction: Is it trivial or untrue? The Lancet Psychiatry, 2(1), 105–107.
  • Hall, W., & Degenhardt, L. (2009). Adverse health effects of non-medical cannabis use. The Lancet, 374(9698), 1383–1391.
  • Hamarneh, S. (1962). Development of Arabic medical therapy in the tenth century. Journal of the History of Medicine and Allied Sciences, 17(3), 365–379.
  • Hawkins, J. D., Catalano, R. F., & Miller, J. Y. (1992). Risk and protective factors for alcohol and other drug problems in adolescence and early adulthood: Implications for substance abuse prevention. Psychological Bulletin, 112(1), 64–105.
  • Healy, D. (2002). The creation of psychopharmacology. Harvard University Press.
  • Heyman, G. M. (2009). Addiction: A disorder of choice. Harvard University Press.
  • Higgins, S. T., Budney, A. J., Bickel, W. K., Foerg, F. E., Donham, R., & Badger, G. J. (1994). Incentives improve outcome in outpatient behavioral treatment of cocaine dependence. Archives of General Psychiatry, 51(7), 568–576.
  • Hirschi, T. (1969). Causes of delinquency. University of California Press.
  • Hort, A. (1916). Theophrastus: Enquiry into plants (Vols. 1–2). Harvard University Press.
  • Hourani, G. F. (1995). Arab seafaring in the Indian Ocean in ancient and early medieval times (Expanded ed.). Princeton University Press.
  • Ibn Sina. (1999). The Canon of Medicine (al-Qanun fi al-tibb) (L. Bakhtiar, Ed.; O. C. Gruner & M. H. Shah, Trans.). Great Books of the Islamic World.
  • Indian Hemp Drugs Commission. (1894). Report of the Indian Hemp Drugs Commission, 1893–94 (Vols. 1–7). Government Central Printing Office.
  • Inciardi, J. A. (2008). The war on drugs IV: The policy and the politics of the drug crisis. Oxford University Press.
  • Iversen, L. (2008). Speed, Ecstasy, Ritalin: The science of amphetamines. Oxford University Press.
  • Jackson, E. F., Tittle, C. R., & Burke, M. J. (1986). Offense-specific models of the differential association process. Social Problems, 33(5), 335–356.
  • Jouanna, J. (1999). Hippocrates (M. B. DeBevoise, Trans.). Johns Hopkins University Press.
  • Julien, R. M., Advokat, C. D., & Comaty, J. E. (2011). A primer of drug action: A comprehensive guide to the actions, uses, and side effects of psychoactive drugs (12th ed.). Worth Publishers.
  • Kahneman, D. (2011). Thinking, fast and slow. Farrar, Straus and Giroux.
  • Kalin, N. H. (2020). Novel mechanisms and targets for psychotropic drug development. The American Journal of Psychiatry, 177(2), 99–102.
  • Kalivas, P. W. (2009). The neural basis of addiction: A pathology of glutamatergic transmission. Nature Reviews Neuroscience, 10(8), 561–572.
  • Kandel, D. B. (1978). Convergences in prospective longitudinal surveys of drug use in normal populations. In D. B. Kandel (Ed.), Longitudinal research on drug use: Empirical findings and methodological issues (pp. 3–38). Hemisphere Publishing.
  • Kendler, K. S., Chen, X., Dick, D., Maes, H., Gillespie, N., Neale, M. C., & Prescott, C. A. (2012). Recent advances in the genetic epidemiology and molecular genetics of substance use disorders. Nature Neuroscience, 15(2), 181–189.
  • Kendler, K. S., Prescott, C. A., Myers, J., & Neale, M. C. (2003). The structure of genetic and environmental risk factors for common psychiatric and substance use disorders in men and women. Archives of General Psychiatry, 60(9), 929–937.
  • Khantzian, E. J. (1985). The self-medication hypothesis of addictive disorders: Focus on heroin and cocaine dependence. The American Journal of Psychiatry, 142(11), 1259–1264.
  • Klostermann, K., & O’Farrell, T. J. (2013). Treating substance abuse: Partner and family involvement. World Psychiatry, 12(1), 72–73.
  • Kohlberg, L. (1958). The development of modes of thinking and choices in years 10 to 16 (Doctoral dissertation, University of Chicago).
  • Koob, G. F. (1992). Drugs of abuse: Anatomy, pharmacology and function of reward pathways. Trends in Pharmacological Sciences, 13, 177–184.
  • Koob, G. F., & Le Moal, M. (2001). Drug addiction, dysregulation of reward, and allostasis. Neuropsychopharmacology, 24(2), 97–129.
  • Koob, G. F., & Le Moal, M. (2006). Neurobiology of addiction. Academic Press.
  • Koschel, K. (1996). Opium alkaloids in a Cypriot base ring I juglet. The Journal of the Antiquities of Jerusalem, 24(1), 16–22.
  • Kraska, P. B. (2007). Militarization and policing – Its relevance to 21st century police. Policing: A Journal of Policy and Practice, 1(4), 501–513.
  • Krohn, M. D., Massey, J. L., Skinner, W. F., & Lauer, R. M. (1983). Social bonding theory and adolescent cigarette smoking: A longitudinal analysis. Journal of Health and Social Behavior, 24(4), 337–349.
  • Krohn, M. D., Skinner, W. F., Massey, J. L., & Akers, R. L. (1985). Social learning theory and adolescent cigarette smoking: A longitudinal study. Social Problems, 32(5), 455–471.
  • Kumpfer, K. L., & Alvarado, R. (2003). Family-handling risks and protective factors for adolescent substance use. Child and Adolescent Psychiatric Clinics of North America, 12(4), 689–710.
  • Lander, L., Howsare, J., & Byrne, M. (2013). The impact of substance use disorders on families and children: From theory to practice. Social Work in Public Health, 28(3–4), 194–205.
  • Laub, J. H., & Sampson, R. J. (2003). Shared beginnings, divergent lives: Delinquent boys to age 70. Harvard University Press.
  • Le Pichon, A. (2006). China trade and empire: Jardine, Matheson & Co. and the Chang River trade, 1833–1842. Oxford University Press.
  • Lemert, E. M. (1951). Social pathology: A systematic approach to the theory of sociopathic behavior. McGraw-Hill.
  • Leonard, K. E. (2005). Alcohol and intimate partner violence: When can we say that heavy drinking is a contributing cause of violence? Addiction, 100(4), 422–425.
  • Leshner, A. I. (1997). Addiction is a brain disease, and it matters. Science, 278(5335), 45–47.
  • Levey, M. (1973). Early Arabic pharmacology: An introduction based on ancient and medieval sources. E. J. Brill.
  • Lloyd, G. E. R. (1979). Magic, reason and experience: Studies in the origin and development of Greek science. Cambridge University Press.
  • Lodwick, K. L. (1996). Crusaders against opium: Protestant missionaries in China, 1874–1917. The University Press of Kentucky.
  • Marlatt, G. A., & Donovan, D. M. (Eds.). (2005). Relapse prevention: Maintenance strategies in the treatment of addictive behaviors (2nd ed.). Guilford Press.
  • Marlatt, G. A., & Gordon, J. R. (Eds.). (1985). Relapse prevention: Maintenance strategies in the treatment of addictive behaviors. Guilford Press.
  • Marr, D. G. (1971). Vietnamese anticolonialism, 1885–1925. University of California Press.
  • Marshall, P. J. (1987). Bengal: The British bridgehead: Eastern India 1740–1828. Cambridge University Press.
  • Matsueda, R. L. (1982). Testing alternative models of delinquency causation: A comparison of differential association and social control theories. American Sociological Review, 47(4), 489–504.
  • Matsueda, R. L. (1988). The current status of differential association theory. Crime & Delinquency, 34(3), 277–306.
  • Mayor, A. (2003). The poison king: The life and legend of Mithradates, Rome’s deadliest enemy. Princeton University Press.
  • McAllister, W. B. (2000). Drug diplomacy in the twentieth century: An international history. Routledge.
  • McCoy, A. W. (1972). The politics of heroin in Southeast Asia. Harper & Row.
  • Meier, B. (2018). Pain killer: An empire of deceit and the origin of America’s opioid epidemic. Random House.
  • Merrillees, R. S. (1962). Opium trade in the Bronze Age Levant. Antiquity, 36(144), 287–292.
  • Meyer, K., & Parssinen, T. (1998). Webs of smoke: Smugglers, warlords, spies, and the history of the international drug trade. Rowman & Littlefield.
  • Mills, J. H. (2000). Madness, cannabis and colonialism: The ‘native-only’ lunatic asylums of British India, 1857–1900. Macmillan.
  • Mitra, A. (1953). An account of land management in West Bengal 1870–1950. West Bengal Government Press.
  • Musto, D. F. (1999). The American disease: Origins of narcotic control (3rd ed.). Oxford University Press.
  • Naím, M. (2005). Illicit: How smugglers, traffickers, and copycats are hijacking the global economy. Doubleday.
  • Nestler, E. J. (2001). Molecular basis of long-term plasticity underlying addiction. Nature Reviews Neuroscience, 2(2), 119–128.
  • Nestler, E. J. (2005). The neurobiology of cocaine addiction. Science & Practice Perspectives, 3(1), 4–10.
  • Nestler, E. J., Barrot, M., & Self, D. W. (2001). DeltaFosB: A sustained molecular switch for addiction. Proceedings of the National Academy of Sciences, 98(20), 11042–11046.
  • Nichols, D. E. (2016). Psychedelics. Pharmacological Reviews, 68(2), 264–355.
  • Noble, E. P., Blum, K., Ritchie, T., Montgomery, A., & Sheridan, P. J. (1991). Allelic association of the D2 dopamine receptor gene with receptor-binding characteristics in alcoholism. Archives of General Psychiatry, 48(7), 648–654.
  • Nunn, J. F. (1996). Ancient Egyptian medicine. University of Oklahoma Press.
  • Nutt, D., King, L. A., Saulsbury, W., & Blakemore, C. (2007). Development of a rational scale to assess the harm of drugs of potential misuse. The Lancet, 369(9566), 1047–1053.
  • Nutt, D. J., King, L. A., & Nichols, D. E. (2013). Effects of Schedule I drug laws on neuroscience research and treatment innovation. Nature Reviews Neuroscience, 14(8), 577–585.
  • Nutt, D. J., King, L. A., & Phillips, L. D. (2010). Drug harms in the UK: A multicriteria decision analysis. The Lancet, 376(9752), 1558–1565.
  • Nutton, V. (2004). Ancient medicine. Routledge.
  • Oetting, E. R., & Beauvais, F. (1986). Peer cluster theory: Drugs and the adolescent. Journal of Counseling & Development, 65(1), 17–22.
  • Olds, J., & Milner, P. (1954). Positive reinforcement produced by electrical stimulation of septal area and other regions of rat brain. Journal of Comparative and Physiological Psychology, 47(6), 419–427.
  • Orford, J., Natera, G., Copello, A., & Velleman, R. (2005). Coping with alcohol and drug problems: The experiences of family members in three contrasting cultures. Routledge.
  • Orta, G. de. (1891). Colóquios dos simples e drogas da Índia (F. A. de Varnhagen, Ed.). Imprensa Nacional.
  • Palmer, E. J. (2003). An overview of Kohlberg’s theory of moral reasoning and its application to the study of antisocial and off-line/on-line offending behaviour. Psychology, Crime & Law, 9(4), 315–332.
  • Parker, H., Aldridge, J., & Measham, F. (1998). Illegal leisure: The normalization of adolescent recreational drug use. Routledge.
  • Pearson, M. N. (1987). The Portuguese in India. Cambridge University Press.
  • Piaget, J. (1936). La naissance de l’intelligence chez l’enfant [The origins of intelligence in children]. Delachaux et Niestlé.
  • Pontell, H. N., Black, W. K., & Geis, G. (2014). Too big to fail, too powerful to jail? On the absence of criminal prosecutions of high-level financial fraud. Crime, Law and Social Change, 61(1), 1–13.
  • Prakash, O. (1985). The Dutch East India Company and the economy of Bengal, 1630–1720. Princeton University Press.
  • Preus, A. (1988). Drugs and psychic states in Theophrastus’ Historia Plantarum. In W. W. Fortenbaugh & R. W. Sharples (Eds.), Theophrastean Studies (pp. 76–99). Transaction Books.
  • Putnam, R. D. (2000). Bowling alone: The collapse and revival of American community. Simon & Schuster.
  • Quinones, S. (2015). Dreamland: The true tale of America’s opiate epidemic. Bloomsbury Press.
  • Reid, A. (1993). Southeast Asia in the age of commerce, 1450–1680 (Vol. 2: Expansion and Crisis). Yale University Press.
  • Reuter, P. (1983). Disorganized crime: The economics of the visible hand. MIT Press.
  • Richards, J. F. (2002). The Indian empire and peasant production of opium in the nineteenth century. Modern Asian Studies, 36(1), 73–102.
  • Riddle, J. M. (1985). Dioscorides on pharmacy and medicine. University of Texas Press.
  • Rinella, M. A. (2010). Pharmakon: Plato, drug culture, and identity in ancient Athens. Lexington Books.
  • Robinson, T. E., & Berridge, K. C. (1993). The neural basis of drug craving: An incentive-sensitization theory of addiction. Brain Research Reviews, 18(3), 247–291.
  • Room, R. (2005). The cultural framing of addiction. Janus Head, 8(1), 221–234.
  • Rosenthal, F. (1971). The herb: Hashish versus medieval Muslim society. E. J. Brill.
  • Rowe, W. T. (2009). China’s last empire: The great Qing. Harvard University Press.
  • Royal Commission on Opium. (1895). Final report of the Royal Commission on Opium (Vols. 1–7). Her Majesty’s Stationery Office.
  • Rush, J. R. (1990). Opium to Java: Revenue farming and Chinese enterprise in colonial Indonesia, 1860–1910. Cornell University Press.
  • Russo, E. B. (2007). History of cannabis and its preparations in saga, science, and sobriquet. Chemistry & Biodiversity, 4(8), 1614–1648.
  • Sampson, R. J., & Laub, J. H. (1993). Crime in the making: Pathways and turning points through life. Harvard University Press.
  • Sampson, R. J., Raudenbush, S. W., & Earls, F. (1997). Neighborhoods and violent crime: A multilevel study of collective efficacy. Science, 277(5328), 918–924.
  • Scarborough, J. (1977). Theophrastus on pharmaceuticals and perfumes. Pharmacy in History, 20(2), 67–75.
  • Scarborough, J. (1982). Opium, henbane, and the Hippocratics. Journal of the History of Medicine and Allied Sciences, 37(3), 299–310.
  • Scarborough, J., & Nutton, V. (1982). The Preface of Dioscorides’ Materia Medica: Introduction, translation, and commentary. Transactions & Studies of the College of Physicians of Philadelphia, 4(3), 187–227.
  • Schwartz, G. E. (1982). Testing the biopsychosocial model: The ultimate challenge facing behavioral medicine? Journal of Consulting and Clinical Psychology, 50(6), 1040–1053.
  • Scott, J. C. (2009). The art of not being governed: An anarchist history of upland Southeast Asia. Yale University Press.
  • Seddon, T. (2010). A history of drugs: Drugs and freedom in the liberal age. Routledge.
  • Sen, S. (1999). Women and labour in late colonial India: The Bengal jute industry. Cambridge University Press.
  • Shaw, C. R., & McKay, H. D. (1942). Juvenile delinquency and urban areas. University of Chicago Press.
  • Sher, K. J. (1991). Children of alcoholics: A critical appraisal of theory and research. University of Chicago Press.
  • Siddiqi, A. (1982). The business world of Jamsetjee Jejeebhoy. The Indian Economic & Social History Review, 19(3–4), 301–324.
  • Singha, R. (1998). A despotism of law: Crime and justice in early colonial India. Oxford University Press.
  • Skinner, B. F. (1938). The behavior of organisms: An experimental analysis. Appleton-Century.
  • Skinner, B. F. (1953). Science and human behavior. Macmillan.
  • Snyder, S. H. (1989). Brainstorming: The science and politics of opiate research. Harvard University Press.
  • Solomon, R. L., & Corbit, J. D. (1974). An opponent-process theory of motivation: I. Temporal dynamics of affect. Psychological Review, 81(2), 119–145.
  • Starr, P. (1982). The social transformation of American medicine: The rise of a sovereign profession and the making of a vast industry. Basic Books.
  • Stitzer, M. L., & Petry, N. M. (2006). Contingency management for treatment of substance abuse. Annual Review of Clinical Psychology, 2, 411–434.
  • Strack, F., & Deutsch, R. (2004). Reflective and impulsive determinants of social behavior. Personality and Social Psychology Review, 8(3), 220–247.
  • Strang, J., Babor, T., Caulkins, J., Fischer, B., Foxcroft, D., & Humphreys, K. (2012). Drug policy and the public good: Evidence for effective interventions. The Lancet, 379(9810), 71–83.
  • Subramanian, L. (1996). Indigenous capital and imperial expansion: Bombay, Surat and the West Coast. Oxford University Press.
  • Subrahmanyam, S. (1993). The Portuguese empire in Asia, 1500–1700: A political and economic history. Longman.
  • Sutherland, E. H. (1939). Principles of criminology (3rd ed.). J. B. Lippincott.
  • Sutherland, E. H. (1947). Principles of criminology (4th ed.). J. B. Lippincott.
  • Sutherland, E. H., & Cressey, D. R. (1974). Criminology (9th ed.). J. B. Lippincott.
  • Sykes, G. M., & Matza, D. (1957). Techniques of neutralization: A theory of delinquency. American Sociological Review, 22(6), 664–670.
  • Szasz, T. (1974). Ceremonial chemistry: The ritual persecution of drugs, addicts, and pushers. Anchor Press.
  • Temkin, O. (1991). Hippocrates in a world of pagans and Christians. Johns Hopkins University Press.
  • Tittle, C. R., Burke, M. J., & Jackson, E. F. (2008). Differential association and criminal behavior: Tests of the core principles. Social Problems, 55(2), 224–248.
  • Totelin, L. M. (2004). Mithridates’ antidote: A pharmacological ghost. Annals of Science, 61(1), 1–19.
  • Touwaide, A. (1998). Therapeutic strategies in antiquity: Poisoning and toxicology. Social History of Medicine, 11(2), 173–192.
  • Trocki, C. A. (1999). Opium, empire and the global political economy: A study of the Asian opium trade 1750–1927. Routledge.
  • Udovitch, A. L. (1970). Partnership and profit in medieval Islam. Princeton University Press.
  • Vold, G. B., Bernard, T. J., & Snipes, J. B. (2002). Theoretical criminology (5th ed.). Oxford University Press.
  • Volkow, N. D., Koob, G. F., & McLellan, A. T. (2016). Neurobiologic advances from the brain disease model of addiction. New England Journal of Medicine, 374(4), 363–371.
  • Volkow, N. D., & Morales, M. (2015). The brain on drugs: From reward to addiction. Cell, 162(4), 712–725.
  • Volkow, N. D., Wang, G. J., Fowler, J. S., Logan, J., Gatley, S. J., Hitzemann, R., Chen, A. D., Dewey, S. L., & Pappas, N. (1997). Decreased striatal dopaminergic responsiveness in detoxified alcoholics. Nature, 386(6627), 830–833.
  • Warr, M. (1993). Age, peers, and delinquency. Criminology, 31(1), 17–40.
  • Warr, M. (2002). Companions in crime: The social aspects of criminal conduct. Cambridge University Press.
  • Weil, A. (1998). The natural mind: An investigation of drugs and the higher consciousness (Rev. ed.). Houghton Mifflin.
  • West, R. (2006). Theory of addiction. Blackwell Publishing.
  • West, R., & Brown, J. (2013). Theory of addiction (2nd ed.). Wiley-Blackwell.
  • Wilson, J. Q., & Kelling, G. L. (1982). Broken windows: The police and neighborhood safety. The Atlantic Monthly, 249(3), 29–38.
  • Winfree, L. T., & Bernat, F. P. (1998). Social learning, differential association, and adolescent drug use. Crime & Delinquency, 44(4), 515–534.
  • Winfree, L. T., Sellers, C. S., & Clason, D. L. (1994). Social learning and adolescent deviations: A path technologies analysis of marijuana and alcohol use. Youth & Society, 26(2), 252–280.
  • Wink, A. (1990). Al-Hind: The making of the Indo-Islamic world (Vol. 1: Early Medieval India and the Expansion of Islam 7th–11th Centuries). E. J. Brill.
  • Winther, P. C. (2003). Anglo-European science and the rhetoric of empire: Malaria, opium, and British rule in India, 1756–1895. Lexington Books.
  • Wise, R. A. (1980). Action of drugs of abuse on brain reward systems. Pharmacology Biochemistry and Behavior, 13, 213–223.
  • World Health Organization. (2019). International statistical classification of diseases and related health problems (11th ed.). World Health Organization.
  • Worth Estes, J. (1989). The medical skills of ancient Egypt. Science History Publications.
  • Yang, A. A. (1989). The limited Raj: Agrarian relations in colonial India, Saran district, 1793–1920. University of California Press.
  • Zheng, Y. (2005). The social life of opium in China. Cambridge University Press.
  • Zuckerman, M. (1994). Behavioral expressions and biosocial bases of sensation seeking. Cambridge University Press.

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.