At-Talaq
আত-তালাক: 1
আরবি
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ ٱلنِّسَآءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا۟ ٱلْعِدَّةَ ۖ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ رَبَّكُمْ ۖ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِنۢ بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّآ أَن يَأْتِينَ بِفَـٰحِشَةٍ مُّبَيِّنَةٍ ۚ وَتِلْكَ حُدُودُ ٱللَّهِ ۚ وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ ٱللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُۥ ۚ لَا تَدْرِى لَعَلَّ ٱللَّهَ يُحْدِثُ بَعْدَ ذَٰلِكَ أَمْرًا
English Translations
O Prophet, when you [Muslims] divorce women, divorce them for [the commencement of] their waiting period and keep count of the waiting period, and fear Allāh, your Lord. Do not turn them out of their [husbands'] houses, nor should they [themselves] leave [during that period] unless they are committing a clear immorality. And those are the limits [set by] Allāh. And whoever transgresses the limits of Allāh has certainly wronged himself. You know not; perhaps Allāh will bring about after that a [different] matter.
O Prophet (SAW)! When you divorce women, divorce them at their 'Iddah (prescribed periods), and count (accurately) their 'Iddah (periods). And fear Allah your Lord (O Muslims), and turn them not out of their (husband's) homes, nor shall they (themselves) leave, except in case they are guilty of some open illegal sexual intercourse. And those are the set limits of Allah. And whosoever transgresses the set limits of Allah, then indeed he has wronged himself. You (the one who divorces his wife) know not, it may be that Allah will afterward bring some new thing to pass (i.e. to return her back to you if that was the first or second divorce).
O prophet, when you people divorce women, divorce them at a time when the period of ‘Iddah may start. And count the period of ‘Iddah, and fear Allah, your Lord. Do not expel them from their houses, nor should they go out, unless they come up with a clearly shameless act. These are the limits prescribed by Allah. And whoever exceeds the limits prescribed by Allah wrongs his own self. You do not know (what will happen in future); it may be that Allah brings about a new situation thereafter.
O Prophet, when you divorce women, divorce them for their waiting-period, and compute the waiting period accurately, and hold Allah, your Lord, in awe. Do not turn them out of their homes (during the waiting period) – nor should they go away (from their homes)– unless they have committed a manifestly evil deed. Such are the bounds set by Allah; and he who transgresses the bounds set by Allah commits a wrong against himself. You do not know: maybe Allah will cause something to happen to pave the way (for reconciliation).
O Prophet! When ye (men) put away women, put them away for their (legal) period and reckon the period, and keep your duty to Allah, your Lord. Expel them not from their houses nor let them go forth unless they commit open immorality. Such are the limits (imposed by) Allah; and whoso transgresseth Allah's limits, he verily wrongeth his soul. Thou knowest not: it may be that Allah will afterward bring some new thing to pass.
O Prophet! When ye do divorce women, divorce them at their prescribed periods, and count (accurately), their prescribed periods: And fear Allah your Lord: and turn them not out of their houses, nor shall they (themselves) leave, except in case they are guilty of some open lewdness, those are limits set by Allah: and any who transgresses the limits of Allah, does verily wrong his (own) soul: thou knowest not if perchance Allah will bring about thereafter some new situation.
বাংলা অনুবাদ
হে নবী! তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে চাও তখন তাদেরকে তালাক দাও তাদের ‘ইদ্দাতের প্রতি লক্ষ্য রেখে, আর ‘ইদ্দাতের হিসাব সঠিকভাবে গণনা করবে, (তালাক দেয়া ও ‘ইদ্দাত পালন সংক্রান্ত শারী‘আতের বিধি-বিধান পালনে) তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় কর। তাদেরকে তাদের বাসগৃহ থেকে বের করে দিও না, আর তারা নিজেরাও যেন বের হয়ে না যায়, যদি না তারা স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। যে কেউ আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করে, সে নিজের উপরই যুলম করে। তোমরা জান না, আল্লাহ হয়তো এরপরও (স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতার) কোন উপায় বের করে দিবেন।
হে নবী, (বল), তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও এবং ‘ইদ্দত হিসাব করে রাখবে এবং তোমাদের রব আল্লাহকে ভয় করবে। তোমরা তাদেরকে তোমাদের বাড়ী-ঘর থেকে বের করে দিয়ো না এবং তারাও বের হবে না। যদি না তারা কোন স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। আর এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। আর যে আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমারেখাসমূহ অতিক্রম করে সে অবশ্যই তার নিজের ওপর যুলম করে। তুমি জান না, হয়তো এর পর আল্লাহ, (ফিরে আসার) কোন পথ তৈরী করে দিবেন।
হে নাবী! তোমরা যদি তোমাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে ইচ্ছা কর তাহলে তাদেরকে তালাক দিও ইদ্দাতের প্রতি লক্ষ্য রেখে, ইদ্দাতের হিসাব রেখ এবং তোমাদের রাব্ব আল্লাহকে ভয় কর; তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ হতে বহিস্কার করনা এবং তারাও যেন বের না হয়, যদি না তারা লিপ্ত হয় স্পষ্ট অশ্লীলতায়; এগুলি আল্লাহর বিধান। যে আল্লাহর বিধান লংঘন করে সে নিজেরই উপর অত্যাচার করে। তুমি জাননা, হয়তো আল্লাহ এরপর কোন উপায় করে দিবেন।
হে নবী! তোমরা যখন তোমাদের স্ত্রীগণকে তালাক দিতে ইচ্ছে কর তাদেরকে তালাক দিও ইদ্দতের প্রতি লক্ষ রেখে এবং তোমরা ইদ্দতের হিসেব রেখো। আর তোমাদের রব আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো। তোমারা তাদেরকে তাদের ঘড়বাড়ি থেকে বহিস্কার করো না এবং তারাও বের হবে না, যদি না তারা লিপ্ত হয় স্পষ্ট অশ্লীলতায়। আর এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা; যে আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করে সে নিজেরই উপর অত্যাচার করে। আপনি জানেন না, হয়ত আল্লাহ্ এর পর কোনো উপায় করে দেবেন।
হে নাবী! তোমরা যখন তোমাদের স্ত্রীদেরকে ত্বালাক দিতে ইচ্ছা কর তবে তাদেরকে ত্বালাক দিয়ো ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে, এবং ইদ্দতের হিসাব রেখো এবং তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় কর; তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ হতে বের করে দিও না এবং তারাও যেন বের না হয়, যদি না তারা লিপ্ত হয় স্পষ্ট অশ্লীলতায়; এগুলো আল্লাহর বিধান; যে আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করে সে নিজের ওপরই জুলুম করে। তুমি জান না, হয়তো আল্লাহ এর পর কোন উপায় বের করে দেবেন।
১. হে নবী! যখন আপনি কিংবা আপনার উম্মতের কেউ নিজ স্ত্রীকে তালাক দিতে চায় তখন যেন সে তার প্রথম ইদ্দত তথা এমন পবিত্রতার সময় তালাক দেয় যাতে তাদের মিলন হয় নি। আর তোমরা ইদ্দতের হিসেব রাখো। যাতে তোমরা নিজেদের স্ত্রীদেরকে ফেরত নিতে চাইলে তা করতে পারো এবং তোমরা আদেশ-নিষেধ মান্য করার মাধ্যমে নিজেদের প্রতিপালককে ভয় করো। তোমরা তালাকপ্রাপ্তাদেরকে নিজেদের আবাসন থেকে বের করে দিয়ো না। আর না তারা ইদ্দত পরিপূর্ণ হওয়ার পূর্বেই সেখান থেকে বের হবে। তবে হ্যাঁ, যদি তারা স্পষ্ট অশ্লীল কাজ যেমন ব্যভিচার করে বসে। এ সব হলো আল্লাহ কর্তৃক বান্দার জন্য নির্ধারিত সীমারেখা। যে ব্যক্তি এগুলো অতিক্রম করবে সে স্বীয় রবের অবাধ্যতার কারণে নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিমজ্জিত করে নিজের উপর অবিচার করবে। হে তালাকদাতা! তুমি জানো না, হতে পারে পরবর্তীতে আল্লাহ উক্ত স্বামীর অন্তরে আগ্রহ সৃষ্টি করে দিতে পারেন। ফলে আপন স্ত্রীকে সে ফেরত নিবে।
তাফসীর
প্রথমতঃ নবী (সঃ)-কে মর্যাদা ও সম্মানের সাথে সম্বোধন করা হয়েছে, অতঃপর এরই অনুসরণে তাঁর উম্মতকে সম্বোধন করা হয়েছে এবং তাদেরকে তালাকের মাসআলা শিক্ষা দেয়া হয়েছে।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে তালাক দেন। তখন তিনি তাঁর পিতা-মাতার বাড়ীতে চলে যান। ঐ সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলা হয়ঃ “তাকে (হযরত তাফসা রাঃ-কে) ফিরিয়ে নাও। সে খুব বেশী রোযাব্রত পালনকারিণী ও অধিক নামায আদায়কারিণী। সে দুনিয়াতেও তোমার স্ত্রী এবং জান্নাতেও তোমার স্ত্রীদেরই অন্তর্ভুক্ত থাকবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এই রিওয়াইয়াটিই ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন) অন্যান্য সনদেও এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে তালাক দিয়েছিলেন, অতঃপর রুকূ করেছিলেন বা ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর স্ত্রীকে মাসিক ঋতুর অবস্থায় তালাক দেন। হযরত উমার (রাঃ) ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসন্তুষ্ট হন এবং বলেনঃ “সে যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয় এবং ঋতু হতে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রীরূপেই রেখে দেয়। অতঃপর পুনরায় ঋতুবতী হওয়ার পর যখন পবিত্র হবে তখন ইচ্ছা হলে এই পবিত্র অবস্থায় সহবাসের পূর্বেই তালাক দিবে। এটাই ঐ ইদ্দত যার হুকুম আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে। এটাও আরো বহু হাদীস গ্রন্থে সনদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবূ যুবায়ের (রঃ) ইযযাহর মাওলা হযরত আবদুর রহমান ইবনে আয়মান (রঃ) হতে শুনেছেন যে, তিনি হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে হায়েযের অবস্থায় তালাক দেয় তার ব্যাপারে আপনার অভিমত কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তাহলে শুনো! হযরত ইবনে উমার (রাঃ) অর্থাৎ তিনি নিজেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশায় তাঁর স্ত্রীকে ঋতুর অবস্থায় তালাক দিয়েছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন। তখন হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তাকে ফিরিয়ে নেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেন যে, এখন হয় তিনি তাকে তালাক দিবেন, না হয় রেখে দিবেন। অতঃপর নবী (সঃ) (আরবি)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। (সহীহ মুসলিমে এটা বর্ণিত হয়েছে) অন্য রিওয়াইয়াতে (আরবি)-এর ভাবার্থ করা হয়েছেঃ “যে তোহর বা পবিত্রাবস্থায় সহবাস করা হয়নি ঐ তোহরে তালাক দেয়া।' বহু লোকই এটাই বলেছেন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ হায়েযের অবস্থায় তালাক দিয়ো না এবং ঐ তোহরেও তালাক দিয়ো না যাতে স্ত্রী-সহবাস করেছো, বরং ঐ সময় পর্যন্ত ছেড়ে রেখো যে, আবার তার হায়েয হবে এবং ঐ হায়েয হতে আবার পবিত্রতা লাভ করবে। ঐ পবিত্র অবস্থায় একটি তালাক দিয়ে দাও। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, ইদ্দত দ্বারা তোহর উদ্দেশ্য। কুরু দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হায়েয। অথবা হামল বা গর্ভবতী অবস্থায় তালাক দাও, যখন হামল প্রকাশিত হয়ে যাবে। যে তোহরে সহবাস করেছো ঐ তোহরে তালাক দিয়ো না। কেননা, এর দ্বারা স্ত্রীর হামল হলো কি না তা জানা যায় না।এখান হতেই বিজ্ঞ আলেমগণ তালাকের আহকাম গ্রহণ করেছেন এবং তালাকের দুই প্রকার করেছেন। তালাকে সুন্নাত ও তালাকে বিদআত। তালাকে সুন্নাত তো এটাই যে, এমন তোহরে বা পবিত্র অবস্থায় তালাক দিবে যাতে স্ত্রী-সহবাস করেনি অথবা হামলের অবস্থায় তালাক দিবে। আর তালাকে বিদআত এই যে, হায়েযের অবস্থায় তালাক দিবে অথবা এমন তোহরে তালাক দিবে যাতে স্ত্রী-সহবাস করেছে এবং হামল হয়েছে কি-না তা জানা যায়নি। তালাকের তৃতীয় প্রকারও রয়েছে যা তালাকে সুন্নাত নয় এবং তালাকে বিদআতও নয়। ওটা হচ্ছে নাবালেগা বা অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ের তালাক এবং ঐ স্ত্রী লোকের তালাক যার হায়েযই হয় না এবং ঐ নারীর তালাক যার সাথে মিলন হয়নি। এসবের আহকাম ও বিস্তারিত আলোচনার জায়গা হচ্ছে ফুরূর কিতাবগুলো, তাফসীর নয়। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে ইদ্দতের হিসাব রাখবে। এমন যেন না হয় যে, ইদ্দতের দীর্ঘতার কারণে স্ত্রীর অন্য স্বামী গ্রহণ করার ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। আর এই ব্যাপারে তোমরা প্রকৃত মাবুদ আল্লাহকে ভয় করবে। ইদ্দতের সময় পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তালাকপ্রাপ্তা নারীর বসবাসের জায়গা দেয়ার দায়িতু স্বামীর উপর ন্যস্ত থাকবে। স্বামী তাকে তার বাড়ী হতে বের করে দিবে না এবং সে নিজেও বের হয়ে যাবে না। কেননা, সে স্বামীর অধিকারে আবদ্ধা রয়েছে।(আরবি) ব্যভিচারকেও অন্তর্ভুক্ত করে এবং এটাও এর মধ্যে শামিল যে, স্ত্রী স্বামীকে বিপদে ফেলবে, তার বিরোধিতা করবে, তাকে কষ্ট দিবে, তার সাথে দুর্ব্যবহার এবং স্বামীর পরিবারের লোকদেরকে কষ্ট দিবে। এরূপ অবস্থায় স্বামীর তার স্ত্রীকে বাড়ী হতে বের করে দেয়া জায়েয।আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ এগুলো আল্লাহর বিধান অর্থাৎ তাঁর শরীয়ত ও সীমারেখা। যে আল্লাহর বিধান লংঘন করে সে নিজেরই উপর অত্যাচার করে। আল্লাহ হয়তো এরপর কোন উপায় করে দিবেন। আল্লাহর ইচ্ছা কেউই জানতে পারে না। ইদ্দতের সময়কাল পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত নারীর তার স্বামীর বাড়ীতে অবস্থান করা, এটা আল্লাহর হুকম। এর মধ্যে এই যৌক্তিকতা রয়েছে যে, হয়তো এই ইদ্দতের মধ্যে তার স্বামীর মত পরিবর্তন হয়ে যাবে। সে হয়তো তালাক দেয়ার কারণে লজ্জিত হবে। তার অন্তরে হয়তো স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার খেয়াল জেগে উঠবে এবং সে স্ত্রীকে রাজআত করেও নিবে। অতঃপর স্বামী-স্ত্রী সুখে শান্তিতে ঘর-সংসার করতে থাকবে। নতুন কোন উপায় উদ্ভাবন করা দ্বারাও এই রাজআতকেই বুঝানো হয়েছে। এর ভিত্তিতেই কতক পূর্ব যুগীয় গুরুজন এবং তাদের অনুসারীদের যেমন হযরত আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) প্রমুখের মাযহাব এই যে, (আরবি) নারী অর্থাৎ ঐ তালাকপ্রাপ্তা নারী যাকে রাজআত করার অধিকার স্বামীর বাকী নেই, এর ইদ্দত পূর্ণ হবার সময় পর্যন্ত বসবাসের জায়গা দেয়া স্বামীর দায়িত্ব নয়। অনুরূপভাবে যে নারীর স্বামী মারা যাবে তার ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার সময় পর্যন্ত তাকে স্থান দেয়া স্বামীর ওয়ারিশদের উপর ওয়াজিব নয়। তাঁদের দলীল হলো হযরত ফাতিমা বিনতু ফাহরিয়্যাহ (রাঃ) সম্পর্কীয় হাদীসটি। তা এই যে, যখন তার স্বামী হযরত আবূ আমর ইবনে হাফস (রাঃ) তাঁকে তৃতীয় ও সর্বশেষ তালাক দিয়ে দেন তখন তিনি তাঁর স্ত্রীর নিকট বিদ্যমান ছিলেন না। বরং ঐ সময় তিনি ইয়ামনে ছিলেন। সেখান হতেই তিনি স্ত্রীকে তালাক দিয়েছিলেন। তখন তাঁর ওয়াকীল তাঁর স্ত্রীর নিকট সামান্য যব পাঠিয়েছিলেন এই বলে যে, এটা তাঁকে খোরাক হিসেবে দেয়া হলো। এতে ঐ নারী অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন। ওয়াকীল তাকে বললেনঃ “অসন্তুষ্ট হচ্ছ কেন? তোমার খরচ বহন করার দায়িত্ব আমাদের নয়।” মহিলাটি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করে এটা জিজ্ঞেস করেন। উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, ঠিকই বটে। তোমার খরচ বহন করার দায়িত্ব তোমার এই স্বামীর উপর নয়।" সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, তাঁকে তিনি বলেনঃ “তোমাকে বসবাসের জন্যে ঘর দেয়াও তোমার এ স্বামীর দায়িত্ব নয়। অতঃপর তাকে নির্দেশ দিলেন যে, তিনি যেন উম্মে শুরায়েক (রাঃ)-এর বাড়ীতে তার ইদ্দতের দিনগুলো অতিবাহিত করেন। তারপর বলেনঃ “সেখানে তো আমার অধিকাংশ সাহাবী যাতায়াত করে থাকে। তুমি বরং আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ)-এর গৃহে ইদ্দত পালন কর। সে অন্ধ মানুষ। তুমি সেখানে তোমার কাপড়ও রেখে দিতে পারবে (শেষ পর্যন্ত)।”মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, ঐ মহিলাটির স্বামীকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন এক যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। তিনি সেখান হতেই তাঁর স্ত্রীকে তালাক পাঠিয়ে দেন।তাঁর স্বামীর ভাই তখন তাঁকে তাঁর স্বামীর বাড়ী হতে চলে যেতে বলেন। মহিলাটি তখন তাঁর স্বামীর ভাইকে বলেনঃ “আমার ইদ্দত পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত আমার পানাহার ও বাসস্থানের দায়িত্ব আমার স্বামীর।” তাঁর স্বামীর ভাই এটা অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত এ ঘটনাটির খবর নবী (সঃ)-এর নিকট পৌঁছে যায়। তিনি ফাতিমা নাম্নী ঐ মহিলাটিকে বলেনঃ “তোমার ভরণ-পোষণ ও বাসস্থানের দায়িত্ব তোমার স্বামীর উপর ঐ সময় রয়েছে যখন তোমাকে রাজআত করার অধিকার তার আছে। এটা যখন নেই তখন ওটাও নেই। তুমি এখান হতে চলে যাও এবং অমুক স্ত্রীলোকের বাড়ীতে তোমার ইদ্দত পালন কর।” অতঃপর বললেনঃ “সেখানে তো আমার সাহাবীরা যাতায়াত করে থাকে! তুমি বরং ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ)-এর বাড়ীতে তোমার ইদ্দতের দিনগুলো অতিবাহিত কর। সে অন্ধ মানুষ। সুতরাং সে তোমাকে দেখতে পাবে না (শেষ পর্যন্ত)।” আবূল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ফাতিমা বিনতু কায়েস (রাঃ) হযরত যহ্হাক ইবনে কায়েস কারাশীর (রাঃ) ভগ্নী ছিলেন। তাঁর স্বামী ছিলেন হযরত আবূ আমর ইবনে হাফস ইবনে মুগীরাহ আল মাখযূমী (রাঃ)। হযরত ফাতিমা (রাঃ) বলেনঃ “আমার স্বামী সেনাবাহিনীর সাথে ইয়ামন গিয়েছেন। সেখান হতে তিনি আমাকে তালাক পাঠিয়েছেন। আমি তখন আমার স্বামীর ওলীদের কাছে আমার ভরণ-পোষণ ও বাসস্থান প্রার্থনা করলে তারা বলেনঃ “তোমার স্বামী আমাদের কাছে কিছুই পাঠায়নি এবং আমাদেরকে কোন অসিয়তও করেনি। আমি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে তাঁকে বললাম ও আমার স্বামী আমর ইবনে হাফস (রাঃ) আমাকে তালাক পাঠিয়েছেন। আমি তখন তাঁর ওলীদের নিকট আমার বাসস্থান ও খাওয়া খরচ প্রার্থনা করলে তারা বলেন যে, তিনি তাঁদের কাছে কোন কিছু পাঠানওনি এবং তাঁদেরকে কোন অসিয়তও করেননি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এমন স্ত্রীর জন্যে বাসস্থান ও খাওয়া খরচের দায়িত্ব স্বামীর উপর রয়েছে যাকে রাজআত করার অধিকার তার স্বামীর উপর রয়েছে। অতঃপর অন্য স্বামী গ্রহণ না করা পর্যন্ত যে স্ত্রী তার স্বামীর জন্যে হালাল নয় তার খাওয়া-পরা ও বাসস্থানের দায়িত্বও তার স্বামীর নেই।"
হে নবী! তোমরা যখন তোমাদের স্ত্রীগণকে তালাক দিতে ইচ্ছে কর তাদেরকে তালাক দিও ইদ্দতের প্রতি লক্ষ রেখে [১] এবং তোমরা ইদ্দতের হিসেব রেখো। আর তোমাদের রব আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো। তোমারা তাদেরকে তাদের ঘড়বাড়ি থেকে বহিস্কার করো না [২] এবং তারাও বের হবে না, যদি না তারা লিপ্ত হয় স্পষ্ট অশ্লীলতায় [৩]। আর এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা ; যে আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করে সে নিজেরই উপর অত্যাচার করে। আপনি জানেন না, হয়ত আল্লাহ্ এর পর কোন উপায় করে দেবেন।
[১] আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বর্ণনা করেন যে, তিনি তার স্ত্রীকে হায়েয অবস্থায় তালাক দিয়েছিলেন। ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এ কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গোচরীভূত করলে তিনি খুব নারায হয়ে বললেনঃ তার উচিত হায়েয অবস্থায় তালাক প্রত্যাহার করে নেয়া এবং স্ত্রীকে বিবাহে রেখে দেয়া। (তালাকটি রাজয়ী তালাক ছিল, যাতে প্রত্যাহারের সুযোগ থাকে) এই হায়েয থেকে পবিত্র হওয়ার পর আবার যখন স্ত্রীর হায়েয হবে এবং তা থেকে পবিত্র হবে, তখন যদি তালাক দিতেই চায়, তবে সহবাসের পূর্বে পবিত্র অবস্থায় তালাক দিবে। এই ইদতের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক প্রদানের আদেশই আল্লাহ তা'আলা (আলোচ্য) আয়াতে দিয়েছেন। [বুখারী: ৫২৫১, মুসলিম: ১৪৭১]
[২] এখানে ইদ্দত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে কি ব্যবহার করতে হবে তা জানিয়ে দেয়া হচ্ছে, বলা হচ্ছে, স্ত্রীদেরকে তাদের গৃহ থেকে বহিষ্কার করো না। এখানে তাদের গৃহ বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, যে পর্যন্ত তাদের বসবাসের হক পুরুষের দায়িত্বে থাকে, সেই পর্যন্ত গৃহে তাদের অধিকার আছে। [দেখুন-ইবন কাসীর]
[৩] প্রকাশ্য নির্লজ্জ কাজ বলে কি বোঝানো হয়েছে, এ সম্পর্কে তিন প্রকার উক্তি বৰ্ণিত আছে। (এক) নির্লজ্জ কাজ বলে খোদ গৃহ থেকে বের হয়ে যাওয়াই বোঝানো হয়েছে। এমতাবস্থায় এটা দৃশ্যত ব্যতিক্রম, যার উদ্দেশ্য গৃহ থেকে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া নয়; বরং নিষেধাজ্ঞাকে আরও জোরদার করা। অর্থাৎ তালাকপ্ৰাপ্তা স্ত্রীরা তাদের স্বামীর গৃহ থেকে বের হবে না, কিন্তু যদি তারা অশ্লীলতায়ই মেতে উঠে ও বের হয়ে পড়ে তবে সে গুণাহগার হবে। সুতরাং এর অর্থ বের হয়ে যাওয়ার বৈধতা নয়; বরং আরও বেশি নিন্দা ও নিষিদ্ধতা প্রমাণ করা।
(দুই) নির্লজ্জ কাজ বলে ব্যভিচার বোঝানো হয়েছে। এমতাবস্থায় ব্যতিক্রম যথার্থ অর্থেই বুঝতে হবে। অর্থাৎ তালাকপ্ৰাপ্ত স্ত্রী ব্যভিচার করলে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে তার প্রতি শরীআতের শাস্তি প্রয়োগ করার জন্যে অবশ্যই তাকে ইদ্দতের গৃহ থেকে বের করা হবে।
(তিন) নির্লজ্জ কাজ বলে কটু কথাবার্তা, ঝগড়া-বিবাদ বোঝানো হয়েছে। আয়াতের অর্থ হবে এই যে, তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীদেরকে তাদের গৃহ থেকে বহিষ্কার করা জায়েয নয়। কিন্তু যদি যারা কটুভাষিণী ও ঝগড়াটে হয় এবং স্বামীর আপনজনদের সাথে দুর্ব্যবহার করে, তবে তাদেরকে ইন্দতের গৃহ থেকে বহিষ্কার করা যাবে। [দেখুন-কুরতুবী, বাগভী]
