Al-Kafirun
আল-কাফিরুন: 6
মূল আরবি
لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِىَ دِينِ
English Translations
For you is your religion, and for me is my religion."
"To you be your religion, and to me my religion (Islamic Monotheism)."
For you is your faith, and for me, my faith.”
To you is your religion, and to me, my religion.
Unto you your religion, and unto me my religion.
To you be your Way, and to me mine.
বাংলা অনুবাদ
তোমাদের পথ ও পন্থা তোমাদের জন্য (সে পথে চলার পরিণতি তোমাদেরকেই ভোগ করতে হবে) আর আমার জন্য আমার পথ (যে সত্য পথে চলার জন্য আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, এ পথ ছেড়ে আমি অন্য কোন পথ গ্রহণ করতে মোটেই প্রস্তুত নই)।
‘তোমাদের জন্য তোমাদের দীন আর আমার জন্য আমার দীন।’
তোমাদের জন্য তোমাদের কর্মফল এবং আমার জন্য আমার কর্মফল।
তোমাদের দীন তোমাদের, আর আমার দ্বীন আমার।’
তোমাদের দীন তোমাদের জন্য আর আমার দীন আমার জন্য।
৬. তোমাদের জন্য তোমাদেরই বানানো বানোয়াট ধর্ম। পক্ষান্তরে আমার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ ঐশী ধর্ম।
তাফসীর
109:1
‘তোমাদের দ্বীন তোমাদের, আর আমার দ্বীন আমার [১]।’
[১] এর তাফসীর প্রসঙ্গে ইবনে-কাসীর বলেন, এ বাক্যটি তেমনি যেমন অন্য আয়াতে আছে,
وَإِن كَذَّبُوكَ فَقُل لِّي عَمَلِي وَلَكُمْ عَمَلُكُمْ
“আর তারা যদি আপনার প্রতি মিথ্যা আরোপ করে তবে আপনি বলবেন, ‘আমার কাজের দায়িত্ব আমার এবং তোমাদের কাজের দায়িত্ব তোমাদের।” [সূরা ইউনুস: ৪১]
অন্য আয়াতে এসেছে,
لنَآ اَعْمَا لُنَا وَ لَكُمْ اَعْمَا لُكُمْ
“আমাদের কাজের ফল আমাদের জন্য এবং তোমাদের কাজের ফল তোমাদের জন্য”। [সূরা আল-কাসাস: ৫৫, আশ-শুরা: ১৫]। এর সারমর্ম এই যে, ইবনে-কাসীর دين শব্দকে দ্বীনী ক্রিয়াকর্মের অর্থে নিয়েছেন। যার অর্থ, প্রত্যেককে নিজ নিজ কর্মের প্রতিদান ও শাস্তি ভোগ করতে হবে। অর্থাৎ আমার দ্বীন আলাদা এবং তোমাদের দ্বীন আলাদা। আমি তোমাদের মাবুদদের পূজা-উপাসনা-বন্দেগী করিনা এবং তোমরাও আমার মাবুদের পূজা-উপাসনা করো না। আমি তোমাদের মাবুদের বন্দেগী করতে পারি না এবং তোমরা আমার মাবুদের বন্দেগী করতে প্রস্তুত নও। তাই আমার ও তোমাদের পথ কখনো এক হতে পারে না।
বর্তমান কালের কোন কোন জ্ঞানপাপী মনে করে থাকে যে, এখানে কাফেরদেরকে তাদের দ্বীনের উপর থাকার স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তারা এটাকে ইসলামের উদারনীতির প্রমাণ হিসেবে পেশ করে থাকেন। নিঃসন্দেহে ইসলাম উদার। ইসলাম কাউকে অযথা হত্যা বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে অনুমতি দেয় না। কিন্তু তাই বলে তাদেরকে কুফরী থেকে মুক্তি দিতে তাদের মধ্যে দাওয়াত ও দ্বীনের প্রচার-প্রসার ঘটানো থেকে বিরত থাকতে বলেনি। ইসলাম চায় প্রত্যেকটি কাফের ও মুশরিক ইসলামের ছায়াতলে এসে শান্তির বার্তা গ্ৰহণ করুক। আর এ জন্য ইসলাম প্রজ্ঞা, উত্তম উপদেশবাণী, উত্তম পদ্ধতিতে তর্ক-বিতর্ক ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহ্র পথে আহ্বান করাকে প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্য করণীয় বিষয় হিসেবে ঘোষণা করেছে। [দেখুন, সূরা আন-নাহল: ১২৫]
মূলত: এ সমস্ত জ্ঞানপাপীরা এ বিষয়টিকেই সহ্য করতে চায় না। তারা এখানে আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য করে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নামক কুফৱী মতবাদকে জায়েয প্রমাণ করা। এটা নিঃসন্দেহে ঈমান আনার পরে কুফরী করার শামিল, যা মূলত কাফেরদের প্রতি উদারনীতি নয় বরং তারা কাফের থাকা অবস্থায় চিরকালের জন্য তাদের ব্যাপারে দায়মুক্তি, সম্পর্কহীনতা ও অসন্তোষের ঘোষণাবাণী।
আর এ সূরায় কাফেরদের দ্বীনের কোন প্রকার স্বীকৃতিও দেয়া হয়নি। মূলত আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি যারা ঈমান এনেছে তারা দ্বীনের ব্যাপারে কখনো তাদের সাথে সমঝোতা করবে না- এ ব্যাপারে তাদেরকে সর্বশেষ ও চূড়ান্তভাবে নিরাশ করে দেয়া; আর তাদের সাথে সম্পর্কহীনতার ঘোষণাই এ সূরার উদ্দেশ্য। এ সূরার পরে নাযিল হওয়া কয়েকটি মক্কী সূরাতে কাফেরদের সাথে এ দায়মুক্তি, সম্পর্কহীনতা ও অসন্তোষ প্রকাশের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, “হে নবী! বলে দিন হে লোকেরা, যদি তোমরা আমার দ্বীনের ব্যাপারে (এখানে) কোন রকম সন্দেহের মধ্যে থাকো তাহলে (শুনে রাখো), আল্লাহ্ ছাড়া তোমরা যাদের বন্দেগী করছো আমি তাদের বন্দেগী করি না বরং আমি শুধুমাত্র সেই আল্লাহ্র বন্দেগী করি যার কর্তৃত্বাধীনে রয়েছে তোমাদের মৃত্যু।” [সূরা ইউনুস: ১০৪] অন্য সূরায় আল্লাহ্ আরও বলেন, “হে নবী!
যদি এরা এখন আপনার কথা না মানে তা হলে বলে দিন, তোমরা যা কিছু করেছো তা থেকে আমি দায়মুক্ত”। [সূরা আশ-শু‘আরা: ২১৬]
অন্যত্র বলা হয়েছে, “এদেরকে বলুন, আমাদের ত্রুটির জন্য তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না এবং তোমরা যা কিছু করে যাচ্ছো সে জন্য আমাদের জবাবদিহি করতে হবে না। বলুন, আমাদের রব একই সময় আমাদের ও তোমাদের একত্র করবেন এবং আমাদের মধ্যে ঠিকমতো ফায়সালা করবেন।” [সূরা সাবা:২৫-২৬] অন্য সূরায় এসেছে, “এদেরকে বলুন হে আমার জাতির লোকেরা তোমরা নিজেদের জায়গায় কাজ করে যাও। আমি আমার কাজ করে যেতে থাকবো। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে কার ওপর আসছে লাঞ্ছনাকর আযাব এবং কে এমন শাস্তি লাভ করছে যা অটল।” [সূরা আয-যুমার: ৩৯-৪০]। আবার মদীনা তাইয়েবার সমস্ত মুসলিমকেও এই একই শিক্ষা দেয়া হয়।
তাদেরকে বলা হয়েছে, “তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তার সাথীদের মধ্যে রয়েছে একটি উত্তম আদর্শ। (সেটি হচ্ছে) তারা নিজেদের জাতিকে পরিষ্কার বলে দিয়েছে, আমরা তোমাদের থেকে ও তোমরা আল্লাহ্কে বাদ দিয়ে যেসব মাবুদদের পূজা করো তাদের থেকে পুরোপুরি সম্পর্কহীন। আমরা তোমাদের কুফৱী করি ও অস্বীকৃতি জানাই এবং যতক্ষণ তোমরা এক আল্লাহ্র প্রতি ঈমান না আনো ততক্ষণ আমাদের ও তোমাদের মধ্যে চিরকালীন শক্ৰতা সৃষ্টি হয়ে গেছে।” [সূরা আল-মুমতাহিনাহঃ ৪] কুরআন মজীদের একের পর এক এসব সুস্পষ্ট বক্তব্যের পর তোমরা তোমাদের ধর্ম মেনে চলো এবং আমাকে আমার ধর্ম মেনে চলতে দাও-“লাকুম দীনুকুম ওয়ালিয়াদীন” এর এ ধরনের কোন অর্থের অবকাশই থাকে না।
বরং সূরা আয-যুমার এ যে কথা বলা হয়েছে, একে ঠিক সেই পর্যায়ে রাখা যায় যেখানে বলা হয়েছেঃ “হে নবী! এদেরকে বলে দিন, আমি তো আমার দ্বীনকে একমাত্ৰ আল্লাহ্র জন্য নির্ধারিত করে তাঁরই ইবাদাত করবো। তোমরা তাঁকে বাদ দিয়ে যার যার বন্দেগী করতে চাও করতে থাক না কেন।” [১৪]।
সুতরাং এটাই এ আয়াতের মূল ভাষ্য যে, এখানে কাফেরদের সাথে সম্পর্কচ্যুতি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এটাও লক্ষণীয় যে, পবিত্র কুরআনে একথাও আছে, “কাফেররা সন্ধি করতে চাইলে তোমরাও সন্ধি কর।” [সূরা আল-আনফাল: ৬১] তাছাড়া মদীনায় হিজরত করার পর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- তার ও ইয়াহূদীদের সাথে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। তাই সম্পর্কচ্যুতির অর্থ এ নয় যে, তাদের সাথে প্রয়োজনে সন্ধিচুক্তি করা যাবে না। মূলত সন্ধির বৈধতা ও অবৈধতার আসল কারণ হচ্ছে স্থান-কাল-পাত্র এবং সন্ধির শর্তাবলি। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ফয়সালা দিতে গিয়ে বলেছেন- “সে সন্ধি অবৈধ, যা কোন হারামকে হালাল কিংবা হালালকে হারাম করে।” [আবু দাউদ: ৩৫৯৪, তিরমিয়ী: ১৩৫২, ইবনে মাজাহ:২৫৫৩] ইয়াহূদীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তিতে ইসলামের মূলনীতিবিরুদ্ধ কোন বিষয় ছিল না।
উদারতা, সদ্ব্যবহার ও শান্তি অন্বেষায় ইসলামের সাথে কোন ধর্মের তুলনা হয় না। কিন্তু এরূপ শান্তিচুক্তি মানবিক অধিকারের ব্যাপারে হয়ে থাকে- আল্লাহ্ তা‘আলার আইন ও দ্বীনের মূলনীতিতে কোন প্রকার দরকষাকষির অবকাশ নেই। [দেখুন, ইবন্ তাইমিয়্যাহ্, আল-জাওয়াবুস সহীহ, ৩/৫৯-৬২; ইবনুল কাইয়্যিম, বাদায়ি‘উল ফাওয়ায়িদ, ১/২৪৬-২৪৭]
[সূরা আল-কাফিরুন (১০৯): আয়াত ৬] পূর্ণ পৃষ্ঠা
"আর তোমরাও ইবাদতকারী নও যার ইবাদত আমি করি" — এখানে 'মা' (مَا) বর্ণটি মাসদারিয়া (ক্রিয়ামূলীয়)। এর অর্থ হলো: তোমরা আমার ইবাদতের মতো ইবাদতকারী নও, যা হলো তাওহীদ (একত্ববাদ)। [সূরা আল-কাফিরুন (১০৯): আয়াত ৬]তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন এবং আমার জন্য আমার দ্বীন (৬)এতে হুমকির অর্থ নিহিত রয়েছে। এটি মহান আল্লাহর বাণীর মতো: "আমাদের জন্য আমাদের আমল এবং তোমাদের জন্য তোমাদের আমল" [আল-কাসাস: ৫৫]। অর্থাৎ, যদি তোমরা তোমাদের দ্বীন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকো, তবে আমরাও আমাদের দ্বীন নিয়ে সন্তুষ্ট। আর এটি ছিল যুদ্ধের আদেশের আগে, তাই এটি 'তলোয়ারের আয়াত' (আয়াতুস সাইফ) দ্বারা রহিত হয়ে গেছে।
বলা হয়েছে: পুরো সূরাটিই রহিত। আবার বলা হয়েছে: এর কিছুই রহিত হয়নি, কারণ এটি একটি সংবাদ। 'তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন' এর অর্থ হলো তোমাদের দ্বীনের প্রতিদান, এবং 'আমার জন্য আমার দ্বীনের প্রতিদান'। তাদের পথকে 'দ্বীন' বলা হয়েছে কারণ তারা একে বিশ্বাস করত এবং গ্রহণ করেছিল। আরও বলা হয়েছে: এর অর্থ হলো তোমাদের জন্য তোমাদের প্রতিদান এবং আমার জন্য আমার প্রতিদান; কেননা 'দ্বীন' অর্থ প্রতিদান। 'ওয়ালি ইয়া দ্বীন' (وَلِيَ دِينِ)-এর 'ইয়া' বর্ণটিকে ফাতহা (যবর) দিয়ে পড়েছেন নাফি', ইবনে কাসীরের বর্ণনায় বাযযী (তার থেকে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনায়), ইবনে আমিরের বর্ণনায় হিশাম এবং আসিমের বর্ণনায় হাফস।
নসর ইবনে আসিম, সালাম এবং ইয়াকুব উভয় অবস্থায় 'দ্বীনী' (دِينِي)-তে 'ইয়া' বর্ণটিকে বহাল রেখেছেন। তারা বলেছেন: কারণ এটি একটি ইসিম (বিশেষ্য), যেমন 'দ্বীনুকুম'-এর 'কাফ' এবং 'কুমতু'-এর 'তা'। অবশিষ্টরা 'ইয়া' ছাড়াই পড়েছেন, যেমন মহান আল্লাহর বাণী: "অতঃপর তিনিই আমাকে পথ দেখান" [আশ-শুআরা: ৭৮], "কাজেই তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো" [আল ইমরান: ৫০] ইত্যাদির মতো; যা কাসরা (জের) দ্বারাই যথেষ্ট মনে করে এবং মুসহাফের লিখনশৈলী অনুসরণ করে, কারণ এটি তাতে 'ইয়া' ছাড়াই লিখিত হয়েছে। [সূরা আন-নাসরের তাফসীর]সূরা "আন-নাসর"-এর তাফসীর।
সর্বসম্মতিক্রমে এটি মাদানী সূরা। একে 'সূরা আত-তাওদী' (বিদায়ী সূরা) বলা হয়। এটি তিনটি আয়াত বিশিষ্ট। এটিই সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ সূরা যা নাযিল হয়েছে—সহীহ মুসলিমে ইবনে আব্বাস (রা.) এরূপ বলেছেন। পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে [সূরা আন-নাসর (১১০): আয়াত ১]পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামেযখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে (১)'নাসর' (النَّصْرُ) অর্থ সাহায্য। এটি আরবদের এই প্রবাদ থেকে নেওয়া হয়েছে: "বৃষ্টি জমিনকে সাহায্য করেছে", যখন তা অনাবৃষ্টির পর উদ্ভিদ জন্মাতে সাহায্য করে। জনৈক কবি বলেছেন:(১). সূরা আল-কাসাস, আয়াত ৫৫।(২).
সূরা আশ-শুআরা, আয়াত ৭৮।(৩). সূরা আল ইমরান, আয়াত ৫০।(৪). তিনি হলেন রাঈ, যিনি ঘোড়াগুলোকে সম্বোধন করছেন। (লিসানুল আরব, 'নাসর' অনুচ্ছেদ হতে।)
