Al-Hujurat
আল-হুজুরাত: 9
মূল আরবি
وَإِن طَآئِفَتَانِ مِنَ ٱلْمُؤْمِنِينَ ٱقْتَتَلُوا۟ فَأَصْلِحُوا۟ بَيْنَهُمَا ۖ فَإِنۢ بَغَتْ إِحْدَىٰهُمَا عَلَى ٱلْأُخْرَىٰ فَقَـٰتِلُوا۟ ٱلَّتِى تَبْغِى حَتَّىٰ تَفِىٓءَ إِلَىٰٓ أَمْرِ ٱللَّهِ ۚ فَإِن فَآءَتْ فَأَصْلِحُوا۟ بَيْنَهُمَا بِٱلْعَدْلِ وَأَقْسِطُوٓا۟ ۖ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلْمُقْسِطِينَ
English Translations
And if two factions among the believers should fight, then make settlement between the two. But if one of them oppresses the other, then fight against the one that oppresses until it returns to the ordinance of Allāh. And if it returns, then make settlement between them in justice and act justly. Indeed, Allāh loves those who act justly.
And if two parties or groups among the believers fall to fighting, then make peace between them both, but if one of them rebels against the other, then fight you (all) against the one that which rebels till it complies with the Command of Allah; then if it complies, then make reconciliation between them justly, and be equitable. Verily! Allah loves those who are equitable.
If two groups of the believers fight each other, seek reconciliation between them. And if one of them commits aggression against the other, fight the one that commits aggression until it comes back to Allah’s command. So if it comes back, seek reconciliation between them with fairness, and maintain justice. Surely Allah loves those who maintain justice.
If two parties of the believers happen to fight, make peace between them. But then, if one of them transgresses against the other, fight the one that transgresses until it reverts to Allah's command. And if it does revert, make peace between them with justice, and be equitable for Allah loves the equitable.
And if two parties of believers fall to fighting, then make peace between them. And if one party of them doeth wrong to the other, fight ye that which doeth wrong till it return unto the ordinance of Allah; then, if it return, make peace between them justly, and act equitably. Lo! Allah loveth the equitable.
If two parties among the Believers fall into a quarrel, make ye peace between them: but if one of them transgresses beyond bounds against the other, then fight ye (all) against the one that transgresses until it complies with the command of Allah; but if it complies, then make peace between them with justice, and be fair: for Allah loves those who are fair (and just).
বাংলা অনুবাদ
মু’মিনদের দু’দল লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়লে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর একটি দল অপরটির উপর বাড়াবাড়ি করলে যে দলটি বাড়াবাড়ি করে, তার বিরুদ্ধে তোমরা লড়াই কর যতক্ষণ না সে দলটি আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। অতঃপর যদি দলটি ফিরে আসে, তাহলে তাদের মধ্যে ইনসাফের সঙ্গে ফয়সালা কর আর সুবিচার কর; আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালবাসেন।
আর যদি মুমিনদের দু’দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর বাড়াবাড়ি করে, তাহলে যে দলটি বাড়াবাড়ি করবে, তার বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না সে দলটি আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। তারপর যদি দলটি ফিরে আসে তাহলে তাদের মধ্যে ইনসাফের সাথে মীমাংসা কর এবং ন্যায়বিচার কর। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালবাসেন।
মু’মিনদের দুই দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিবে; অতঃপর তাদের একদল অপর দলকে আক্রমণ করলে আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি তারা ফিরে আসে তাহলে তাদের মধ্যে ন্যায়ের সাথে ফাইসালা করবে এবং সুবিচার করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালবাসেন।
আর মুমিনদের দু’দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর তাদের একদল অন্য দলের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করলে, যারা বাড়াবাড়ি করে তাদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। তারপর যদি তারা ফিরে আসে, তবে তাদের মধ্যে ইনসাফের সাথে আপোষ-মীমাংসা করে দাও এবং ন্যায়বিচার কর। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়বিচারকদেরকে ভালবাসেন।
যদি ঈমানদারদের দুদল একে অপরের সাথে লড়াই করে তাহলে তাদের মধ্যে আপোষ করে দাও। এরপর যদি একদল অপর দলের সাথে বাড়াবাড়ি করে তাদের বিরুদ্ধে তোমরা লড়াই কর; যতক্ষণ না সে দলটি আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসে। অতঃপর যদি (সে দলটি) ফিরে আসে তাহলে উভয় দলের মধ্যে ইনসাফের সাথে ফায়সালা করে দাও। আর সুবিচার কর; নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায় বিচারকারীদেরকে ভালোবাসেন।
৯. হে মুমিনরা! যদি মুসলমানদের দু’টি দল পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয় তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করবে। তাদের মতানৈক্যপূর্ণ বিষয়ে আল্লাহর শরীয়ত মান্য করার প্রতি আহ্বান জানানোর মাধ্যমে। যদি তাদের কোন দল মীমাংসা অমান্য করে এবং সীমালঙ্ঘন করে তাহলে তোমরা সীমালঙ্ঘনকারীর সাথে সে পর্যন্ত যুদ্ধ করো যতক্ষণ না সে আল্লাহর বিধানের প্রতি ফিরে আসে। এতে যদি সে আল্লাহর বিধানের প্রতি ফিরে আসে তাহলে উভয়ের মাঝে ন্যায় ও ইনসাফের মাধ্যমে ফয়সালা করো। আর তাদের মধ্যকার ফায়সালায় ইনসাফ করো। বস্তুতঃ ফায়সালায় ইনসাফকারীদেরকে আল্লাহ ভালোবাসেন।
তাফসীর
৯-১০ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিচ্ছেন যে, যদি মুসলমানদের দুই দল পরস্পর দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়ে তবে অন্যান্য মুসলমানদের উচিত তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেয়া। পরস্পর বিবাদমান দু’টি দলকে মুমিনই বলা হয়েছে। ইমাম বুখারী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন এটাকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে বলেন যে, কোন মুসলমান যত বড়ই নাফরমান হোক না কেন সে ঈমান হতে বের হয়ে যাবে না, যদিও খারেজী, মু'তাযিলা ইত্যাদি সম্প্রদায় এর বিপরীত মত পোষণ করে। নিম্নের হাদীসটিও এ আয়াতের পৃষ্ঠপোষকতা করেঃহযরত আবু বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর ভাষণ দিচ্ছিলেন এবং তাঁর সাথে হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ)-ও মিম্বরের উপর ছিলেন।
কখনো তিনি হযরত হাসান (রাঃ)-এর দিকে তাকাচ্ছিলেন এবং কখনো জনগণের দিকে দেখছিলেন। আর বলছিলেনঃ “আমার এ ছেলে (নাতী) নেতা এবং আল্লাহ তা'আলা এর মাধ্যমে মুসলমানদের বিরাট দু’টি দলের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দেবেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে রূপায়িত হয়েছে। সিরিয়াবাসী ও ইরাকবাসীদের মধ্যে বড় বড় ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পর তাঁরই মাধ্যমে তাদের মধ্যে সন্ধি হয়। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি একদল অন্য দলের উপর বাড়াবাড়ি করে এবং তাদেরকে আক্রমণ করে বসে তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে।
সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য কর, সে অত্যাচারী হোক অথবা অত্যাচারিত হোক।” বর্ণনাকারী হযরত আনাস (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি সাহায্য করতে পারি অত্যাচারিতকে, কিন্তু আমি অত্যাচারীকে কিরূপে সাহায্য করতে পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “অত্যাচারীকে তুমি অত্যাচার করা হতে বাধা দিবে ও বিরত রাখবে, এটাই হবে তোমার তাকে সাহায্য করা।”হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা নবী (সঃ)-কে বলা হয়ঃ “যদি আপনি আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর নিকট একবার যেতেন!” অতঃপর নবী (সঃ) গাধার উপর সওয়ার হয়ে চললেন এবং মুসলমানরাও তাঁর সাথে চলতে লাগলেন।
যখন তারা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর নিকট পৌঁছেন তখন সে নবী (সঃ)-কে বলেঃ “আপনি আমা হতে দূরে থাকুন। আল্লাহর কসম! আপনার গাধার গন্ধ আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। তার একথা শুনে আনসারদের একজন লোক তাকে বললেনঃ “আল্লাহর শপথ! তোমার গন্ধের চেয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গাধার গন্ধ বহুগুণে উত্তম ও পবিত্র।” তাঁর একথা শুনে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর কতক লোকে ভীষণ রেগে গেল এবং এরপর উভয় দলের প্রত্যেক লোকই রাগান্বিত হলো। অতঃপর অবস্থা এতদূর গরালো যে, তাদের মধ্যে হাতাহাতি ও জুতা মারামারি শুরু হয়ে গেল। তাদের ব্যাপারে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন।
সহীহ বুখারীতেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কিছু ঝগড়া-বিবাদ হয়েছিল। তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেয়ার হুকুম এই আয়াতে রয়েছে।হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ইমরান নামক একজন আনসারী ছিলেন। তার স্ত্রীর নাম ছিল উম্মে যায়েদ। তিনি (তাঁর স্ত্রী) তার পিত্রালয়ে যেতে চান। কিন্তু তার স্বামী বাধা দেন এবং বলে দেন যে, তাঁর স্ত্রীর পিত্রালয়ের কোন লোক যেন তার বাড়ীতে না আসে। স্ত্রী তখন তাঁর পিত্রালয়ে এ খবর পাঠিয়ে দেন। খবর পেয়ে সেখান হতে লোক এসে উম্মে যায়েদকে বাড়ী হতে বের করে এবং সাথে করে নিয়ে যাবার ইচ্ছা করে।
ঐ সময় তাঁর স্বামী বাড়ীতে ছিলেন না। তাঁর লোকে তার চাচাতো ভাইদেরকে খবর দেয়। খবর পেয়ে তারা দৌড়িয়ে আসে এবং স্ত্রীর লোক ও স্বামীর লোকদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায় এবং মারামারি ও জুতা ছুঁড়াছুঁড়িও হয়। তাদের ব্যাপারে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উভয়পক্ষের লোকদেরকে ডেকে তাদের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা দুই দলের মধ্যে ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালবাসেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ায় ন্যায়-বিচারকারীরা পরম দয়ালু, মহিমান্বিত আল্লাহর সামনে মণি-মুক্তার আসনে উপবিষ্ট থাকবে, এটা হবে তাদের দুনিয়ায় ন্যায়-বিচার করার প্রতিদান।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “ন্যায়-বিচারকারীরা কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ডান দিকে নূরের আসনে উপবিষ্ট থাকবে।
তারা তাদের হুকুমে, পরিবার পরিজনের মধ্যে এবং যা কিছু তাদের অধিকারে ছিল সবারই মধ্যে ন্যায়ের সাথে বিচার করতো।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।' অর্থাৎ মুমিনরা সবাই পরস্পর দ্বীনী ভাই। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ ততক্ষণ বান্দাকে সাহায্য করতে থাকেন যতক্ষণ বান্দা তার (মুমিন) ভাইকে সাহায্য করতে থাকে।” সহীহ হাদীসে আরো রয়েছেঃ যখন কোন মুসলমান তার (মুসলমান) ভাই এর অনুপস্থিতিতে তার জন্যে দুআ করে তখন ফেরেশতা তার দুআয় আমীন বলেন এবং বলেনঃ আল্লাহ তোমাকেও অনুরূপই প্রদান করুন।" এই ব্যাপারে আরো বহু সহীহ হাদীস রয়েছে।
আরো সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “মুসলমানের পরিস্পরিক প্রেম-প্রীতি, দয়া-সহানুভূতি ও মিলামিশার দৃষ্টান্ত একটি দেহের মত। যখন কোন অঙ্গে ব্যথা হয় তখন গোটা দেহ ঐ ব্যথা অনুভব করে, সারা দেহে জ্বর এসে যায় এবং সারা দেহ জেগে থাকার (অর্থাৎ ঘুম না আসার) কষ্ট পায়।" অন্য সহীহ হাদীসে আছেঃ “এক মুমিন অপর মুমিনের জন্যে একটি দেয়ালের মত, যার একটি অংশ অপর অংশকে শক্ত ও দৃঢ় করে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার এক হাতের অঙ্গুলিগুলোকে অপর হাতের অঙ্গুলিগুলোর মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেখিয়ে দেন।হযরত সাহল ইবনে সা'দ সায়েদী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুমিনের ঈমানদারের সাথে ঐ সম্পর্ক রয়েছে, যে সম্পর্ক মাথার দেহের সাথে রয়েছে।
মুমিন ঈমানদারের জন্যে ঐ ব্যথা অনুভব করে যে ব্যথা অনুভব করে দেহ মাথার জন্যে (অর্থাৎ মাথায় ব্যথা হলে যেমন দেহ তা অনুভব করে, অনুরূপভাবে এক মুমিন ব্যথা পেলে অন্য মুমিনও তার ব্যথায় ব্যথিত হয়)।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘সুতরাং তোমরা তোমাদের ভ্রাতৃদ্বয়ের মধ্যে সন্ধি স্থাপন কর।' অর্থাৎ বিবাদমান দুই ভাইয়ের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দাও। আর সমস্ত কাজ-কর্মের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে চল। আর এটা এমন বিশেষণ যার কারণে তোমাদের উপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হবে। যারা আল্লাহকে ভয় করে চলে তাদের সাথেই আল্লাহর রহমত থাকে।
আর মুমিনদের দু’দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও ; অতঃপর তাদের একদল অন্য দলের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করলে, যারা বাড়াবাড়ি করে তাদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। তারপর যদি তারা ফিরে আসে, তবে তাদের মধ্যে ইনসাফের সাথে আপোষ মীমাংসা করে দাও এবং ন্যায়বিচার কর। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়বিচারকদেরকে ভালবাসেন।
[সূরা আল-হুজুরাত (৪৯): আয়াত ৯] পূর্ণ পৃষ্ঠা
আবু আল-ওয়াজি‘ বলেন: প্রতিটি কঠিন পাথরই হলো ‘রশাদাহ’। তিনি আবৃত্তি করেছেন:আর রজ্জুমুক্ত ও চিহ্নযুক্ত নয় এমন ... তারা কঠিন পাথরের উপরিভাগে আগুনের আলোতে সেঁক নিয়েছে। «১» "আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুগ্রহ ও নিয়ামতস্বরূপ" অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ ও নিআমত হিসেবেই তা করেছেন; সুতরাং এটি এখানে ‘মাফউলে লাহু’ (ক্রিয়ার কারণবাচক পদ)। "আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।" "সর্বজ্ঞ" তোমাদের সংশোধন ও কল্যাণের বিষয়ে, "প্রজ্ঞাময়" তোমাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালনায়। [সূরা আল-হুজুরাত (৪৯): আয়াত ৯]আর যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।
অতঃপর যদি তাদের এক দল অন্য দলের ওপর চড়াও হয়, তবে যে দলটি চড়াও হয়েছে তার বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। এরপর যদি তারা ফিরে আসে, তবে তাদের মধ্যে ইনসাফের সাথে মীমাংসা করো এবং ন্যায়বিচার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচারকদের ভালোবাসেন। (৯)এতে দশটি মাসআলা রয়েছে: প্রথম- মহান আল্লাহর বাণী: "আর যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।" মুতামির ইবনে সুলাইমান আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! আপনি যদি আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের কাছে যেতেন?
তখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার অভিমুখে রওয়ানা হলেন। তিনি একটি গাধার পিঠে আরোহণ করলেন এবং মুসলিমগণ পায়ে হেঁটে চললেন। স্থানটি ছিল লোনা ভূমি। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন তার কাছে পৌঁছালেন, তখন সে বলল: আমার কাছ থেকে দূরে থাকুন! আল্লাহর কসম, আপনার গাধার দুর্গন্ধ আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। তখন আনসারদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি বললেন: আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর গাধার ঘ্রাণ তোমার চেয়ে অনেক বেশি সুগন্ধময়। এতে আবদুল্লাহর পক্ষে তার গোত্রের এক ব্যক্তি রাগান্বিত হলো এবং তাদের প্রত্যেকের পক্ষে তাদের সঙ্গীরা রাগান্বিত হয়ে উঠল।
ফলে তাদের মধ্যে খেজুরের ডাল, হাত এবং জুতো দিয়ে লড়াই শুরু হলো। আমাদের কাছে সংবাদ পৌঁছেছে যে, তাদের প্রেক্ষাপটেই এই আয়াত নাজিল হয়েছে। মুজাহিদ বলেন: এটি আউস ও খাজরাজ গোত্রের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। মুজাহিদ আরও বলেন: আনসারদের দুটি গোত্র লাঠি ও জুতো দিয়ে মারামারি করেছিল, তখন এই আয়াত নাজিল হয়। অনুরূপ বর্ণনা সাঈদ ইবনে জুবায়ের থেকেও পাওয়া যায়: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে আউস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে লড়াই হয়েছিল।(১). মরহুম উস্তাদ আবু আল-ইয়ানের ‘শারহু শাওয়াহিদিল কাশশাফ’-এ বর্ণিত: "বাহ্যত কবি এখানে পরিত্যক্ত আবাসস্থলের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, সেখানে রশি দিয়ে বাঁধা তাঁবুর খুঁটি এবং আগুনের তাপে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া চুলার পাথর ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
‘ওয়াশম’ ও ‘তাওশিম’ অর্থ হলো রঙের পরিবর্তন হওয়া, অর্থাৎ যা আগুনের আলো বা উত্তাপে দগ্ধ হয়েছে। ‘মিন সুম্মির রশাদ’ অংশটি তারই ব্যাখ্যা। ‘সুম্ম’ হলো ‘সাম্মা’ শব্দের বহুবচন, যার অর্থ অত্যন্ত শক্ত ও নিরেট পাথর। কেউ কেউ বলেন: কবি এখানে এমন একদল উটের বর্ণনা দিচ্ছেন যারা কাজের জন্য স্বভাবজাতভাবে পারদর্শী যাদের লাগামের প্রয়োজন হয় না, এবং সফরের প্রভাবে তাদের দেহ বিবর্ণ হয়ে গেছে; তারা এতটাই শক্তিশালী যে শক্ত পাথরের ওপর তাদের খুরের আঘাতের তীব্রতায় স্ফুলিঙ্গ বিচ্ছুরিত হয়।" [ ..... ]
মহান আল্লাহর বাণী: পবিত্র মাস পবিত্র মাসের বিনিময়ে এবং পবিত্র বিষয়সমূহ পারস্পরিক প্রতিশোধের (কিসাস) অধীন। সুতরাং যে ব্যক্তি তোমাদের ওপর আক্রমণ করবে, তোমরাও তার ওপর তদ্রূপ আক্রমণ করো যেরূপ সে তোমাদের ওপর করেছে। আর আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রেখো যে, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন।ইমাম বুখারী নাফে থেকে বর্ণনা করেছেন যে,এক ব্যক্তি ইবনে উমরের নিকট এসে বলল: "কী আপনাকে উদ্বুদ্ধ করল যে আপনি এক বছর হজ করেন ও এক বছর উমরা করেন এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করা পরিত্যাগ করেন, অথচ আপনি অবগত আছেন যে আল্লাহ এতে কতটা উৎসাহিত করেছেন?" তিনি বললেন: "হে ভ্রাতুষ্পুত্র, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি স্তম্ভের ওপর: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কায়েম করা, রমজানের সিয়াম পালন করা, যাকাত প্রদান করা এবং বায়তুল্লাহর হজ সম্পাদন করা।"সে বলল: "আল্লাহ তাঁর কিতাবে যা উল্লেখ করেছেন তা কি আপনি শোনেননি: (যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তবে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও) (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত ৯) এবং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো যতক্ষণ না ফেতনা দূরীভূত হয়
?" তিনি বললেন: "আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে তা করেছি যখন ইসলামের অনুসারীরা সংখ্যায় অল্প ছিল এবং একজন ব্যক্তি তার দ্বীনের কারণে ফেতনার শিকার হতো—হয় তারা তাকে হত্যা করত অথবা নির্যাতন করত।
অবশেষে যখন ইসলামের প্রসার ঘটল, তখন আর ফেতনা রইল না।"ইবনে আবি হাতেম আবু জাবইয়ান থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: এক ব্যক্তি সা’দের নিকট এসে তাকে বলল: "আপনি কি বের হয়ে লোকেদের সাথে যুদ্ধ করবেন না যাতে ফেতনা না থাকে?" সা’দ বললেন: "আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যুদ্ধ করেছি যতক্ষণ না ফেতনা নিঃশেষ হয়েছে। আর তুমি এবং এই স্থূলকায় ব্যক্তিটি চাচ্ছ যে আমি যুদ্ধ করি যাতে ফেতনা সৃষ্টি হয়।"ইবনে জারীর ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরী ষষ্ঠ সনে উমরার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন এবং মুশরিকরা তাঁকে মক্কায় প্রবেশ করতে ও বায়তুল্লাহয় পৌঁছাতে বাধা প্রদান করল এবং তাঁর সাথে থাকা সঙ্গীদেরও প্রতিহত করল।
এতে সাদ ইবনে উবাদাহ দাঁড়িয়ে বললেন: "আল্লাহর কসম, তুমি মিথ্যা বলেছ; তুমি তাকে হত্যা করতে পারবে না। তুমি কেবল জাহিলিয়াতের যুগে আমাদের ও তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান শত্রুতার প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছ।" তখন একজন চিৎকার করে উঠল: "হে আউস বংশীয়রা!" এবং অন্যজন চিৎকার করে উঠল: "হে খাযরাজ বংশীয়রা!"অতঃপর তারা জুতা ও পাথর নিয়ে একে অপরের ওপর চড়াও হলো এবং হাতাহাতি শুরু করল। তখন উসাইদ ইবনে হুদাইর দাঁড়িয়ে বললেন: "এই ঝগড়া কিসের জন্য? স্বয়ং আল্লাহর রাসূল আমাদের কোনো নির্দেশ দিলে আমরা তা পালন করব, কারো নাক ধূলামলিন হলেও আমরা তা গ্রাহ্য করব না।"তিনি যখন মিম্বরে অবস্থান করছিলেন, তখন জিবরাঈল অবতরণ করলেন।
যখন তাঁর ওহীর বিশেষ অবস্থা দূর হলো, তখন জিবরাঈল যা নিয়ে এসেছিলেন তা তিনি তাদের সামনে পাঠ করলেন: "আর যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়..." (সূরা হুজুরাত, আয়াত ৯) শেষ পর্যন্ত। তখন লোকজন চিৎকার করে বলে উঠল: "আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তাতে আমরা সন্তুষ্ট।" অতঃপর তারা একে অপরের দিকে এগিয়ে গেল, একে অপরকে জড়িয়ে ধরল এবং উচ্চস্বরে কাঁদতে লাগল। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বর থেকে নেমে আসলেন।আয়েশার ব্যাপারে ওহী আসতে বিলম্ব হচ্ছিল। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী ইবনে আবি তালিব, উসামা ইবনে যায়িদ এবং বারীরাহকে ডেকে পাঠালেন।
তাঁর পরিবার সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে পরামর্শ করার প্রয়োজন হলে তিনি আলী ও যায়িদের মৃত্যুর পর উসামা ইবনে যায়িদকে বাদ দিতেন না। তিনি আলীকে বললেন: "আয়েশার ব্যাপারে তোমার মতামত কী? লোকজনের কথাবার্তা আমাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তুলেছে।" আলী বললেন: "হে আল্লাহর রাসূল! লোকজন তো অনেক কিছুই বলেছে, অথচ তাকে তালাক দেওয়া আপনার জন্য বৈধ রয়েছে।" অতঃপর তিনি উসামাকে বললেন: "তুমি কী বলো?" উসামা বললেন: "সুবহানাল্লাহ! এ বিষয়ে কথা বলা আমাদের জন্য সমীচীন নয়। আপনি পবিত্র ও মহান! এটি তো এক চরম অপবাদ।"অতঃপর তিনি বারীরাহকে বললেন: "হে বারীরাহ! তুমি কী বলো?" তিনি বললেন: "আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল!
আমি আপনার পরিবারের ব্যাপারে কল্যাণ ছাড়া আর কিছুই জানি না। তবে তিনি একজন অধিক নিদ্রালু নারী, যিনি আটার খামির রেখে ঘুমিয়ে পড়েন, আর গৃহপালিত পশু এসে তা খেয়ে ফেলে। আর যদি এর বাইরে কোনো বিষয় থাকত, তবে আল্লাহ অবশ্যই আপনাকে জানিয়ে দিতেন।"অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে আবু বকর-এর বাড়িতে এলেন এবং আয়েশার কাছে প্রবেশ করে বললেন: "হে আয়েশা! তুমি যদি এমন কিছু করে থাকো, তবে আমাকে বলো, যেন আমি তোমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারি।" আয়েশা বললেন: "আল্লাহর কসম, আমি এ জন্য কখনো আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইব না।""যদি আমি তা করে থাকি, তবে আল্লাহ যেন আমাকে ক্ষমা না করেন।
আমার ও আপনাদের অবস্থা তো ইউসুফের পিতার মতোই—শোকে যাঁর ইয়াকুব নামটি বিস্মৃত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল—যিনি বলেছিলেন: 'আমি আমার অসহনীয় বেদনা ও দুঃখ কেবল আল্লাহর নিকট নিবেদন করছি এবং আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন কিছু জানি যা তোমরা জানো না।'" (সূরা ইউসুফ, আয়াত ৮৬)রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁর সাথে কথা বলছিলেন, ঠিক তখনই জিবরাঈল ওহী নিয়ে অবতরণ করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ওহীর বিশেষ তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব নেমে এল। যখন সেই অবস্থা কাটল, তখন তিনি হাসছিলেন এবং বললেন: "হে আয়েশা! নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমার নির্দোষিতার প্রমাণ অবতীর্ণ করেছেন।" আয়েশা বললেন: "সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, আপনার প্রতিও কৃতজ্ঞ।"অতঃপর তিনি তাঁর সামনে সূরা আন-নূরের সেই অংশটুকু পাঠ করলেন যেখানে তাঁর নির্দোষিতা ও পবিত্রতার প্রমাণ শেষ হয়েছে।
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: "এখন ঘরে যাও।" তখন তিনি উঠে দাঁড়ালেন।রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদের দিকে বের হলেন এবং আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহকে ডেকে পাঠালেন। অতঃপর লোকজনকে সমবেত করে আয়েশার নির্দোষিতা সম্পর্কে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা তিলাওয়াত করে শোনালেন এবং আব্দুল্লাহ ইবনে... এর নিকট লোক পাঠালেন।
